Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • নুসরাহ – অন্বেষন করতে হয় নাকি প্রস্তুত করতে হয়?

    নুসরাহ – অন্বেষন করতে হয় নাকি প্রস্তুত করতে হয়?

    আরব বসন্ত নামে পরিচিত বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় বিশেষ করে আশ-শামের আন্দোলনের পর গত বেশ কিছুদিন ধরে নুসরাহ বিষয়টি উম্মাহের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে উম্মাহ বা শাবাব, যারা দাওয়াহ করেন তারা যেসব চিন্তা বা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে তা হল:

    ১. হিযব যারা শরীয়া’হ ও রাজনৈতিক বিষয়াদি সম্পর্কে সবচেয়ে সজাগ, তা সত্ত্বেও তারা কেন নুসরাহ অন্বেষনের জন্য জোড় তাগিদ দেয়?
    ২. কেনই বা হিযব এমন একটি শক্তিশালী বাহিনী তৈরী করছেনা যাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্টিত হওয়া যায়?
    ৩. এবং কেনই বা হিযব আল-শামে সশস্ত্র ব্রিগেড বা রেজিমেন্ট গঠন করছেনা; যেটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার আর্মির জন্য নিউক্লিয়াস স্বরূপ কাজ করবে।

    হিযব এমন একটি দল যেটি এক নেতৃত্বের ছায়াতলে ৫ মহাদেশে, ইসলামী বিশ্বে বা অনৈসলামি বিশ্বে তাদের কার্যক্রম থাকার ফলে এই প্রশ্নগুলো আরও গভীর হয়ে উঠে। এবং এটিই হচ্ছে একমাত্র দল যা তার চিন্তা এবং অনুভুতির মধ্যে সংগতি ও ঐক্য বজায় রেখে সমগ্র বিশ্বের এসকল অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে।

    এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আমদের একটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা থাকা প্রয়োজন। আর তা হল-নুসরাহ চাওয়ার মাসআলাহ বা ইস্যুটি দলের পছন্দ বা অপছন্দের উপর নির্ভর করে না বরং উপনীত হুকুম শরী’আহ নির্ধারন করে। এবং শরীয়া’হ যে নির্দেশ দিয়েছে তা প্রত্যেক মুসলিম পালন করতে বাধ্য যদিওবা সকল মানুষ এর প্রতিকুলে রয়েছে। এবং এক্ষেত্রে অন্য কোনো নির্দেশের দিকে গমন করা অবৈধ যেহেতু মূল হুকুমটি আল্লাহর শরী’আহ হতে নেয়া হয়েছে:

    وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا

    আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তখন কোনো ঈমানদার পুরুষ ও কোন ঈমানদার নারীর তাদের সে ব্যাপারে তাদের নিজেদের কোনো রকম এখতিয়ার থাকে না (যে তারা তাতে কোনো রদবদল করবে); যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে, সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। (৩৩:৩৬)

    এই কারণেই দল নুসরাহ অন্বেষনের কাজের জন্য জোড় তাগিদ দেয়। কেননা এটি শরী’আহ বাস্তবায়নের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এটিই একমাত্র কারণ।

    এবং যারা এই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছেন তাদের আমরা প্রশ্নের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করি:

    ১. রাসূল (সা) এর সীরাহ অনুসরণ করা কি মুসলিমদের উপর ফরজ নাকি ফরজ না?
    ২. খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল (সা)-এর হেদায়েদপ্রাপ্ত নবুয়তী জীবন অনুসরণ করতে মুসলিমরা কি বাধ্য নাকি শুধুমাত্র বাথরুমে যাওয়ার পদ্ধতি, অযু ভঙ্গের কারণসমূহ বা তাঁর জীবনের নৈতিকতা অনুসরণ করতে বাধ্য?

    এবং উম্মাহর রাজনীতি করা ও শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়গুলো কি তার (সা)-এর জীবন হতেই নির্ধারিত করতে হবে নাকি পরিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার নিরিখে নির্ধারিত হবে?

    এবং যারা বলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার হুকুমে পৌছানো মূলত একটি উপায় (style) যা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র দেয়া অনেকগুলো উপায় (style) থেকে বেছে নিতে পারি – তাদেরকে জবাবে বলব, একটু থামুন! আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র দ্বীন এবং তার শরীয়া’হ-র ব্যাপারে বড় বড় দাবি করবেন না বিশেষ করে যখন সেই বিষয়ে আপনাদের জ্ঞান নেই। যে কারণে অযু ভাঙ্গে সেসব কারণ জানা না থাকলে অযু ভাঙার কারণ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কী কী হতে পারে তা বলা যেরকম সমীচিন নয় তদ্রুপ খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ব্যাপারেও জ্ঞান না থাকলে উদ্ভট, নিজ চিন্তাপ্রসুত কিছু বলা উচিত নয়। যদি আমরা বিশ্বাস করে থাকি রাসূল (সা) দ্বীনের সকল বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা ব্যাক্ত করেছেন তবে এটা কি করে সম্ভব যে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তা বাস্তবে রূপদান করা সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা দিয়ে যাবেন না? রাসূল (সা) কি বলেননি-“এটিই হচ্ছে পরিস্কার পথ যা রাত্রি দিবালোকের মত স্পষ্ট। আর তা হল আল্লাহ-র কিতাব এবং রাসূল (সা) এর সুন্নাহ”। নাকি খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি এই সরলপথের আওতামুক্ত এবং রাসূল (সা) থেকে আসার কথা না?

    এবং আমরা সকল মুসলিমদের বলতে চাই: মুলত হিযব শরীয়া’হ এর যে দলীল এর কারণে নুসরাহ চাওয়াকে ইচ্ছা হলে পরিবর্তনযোগ্য শুধুমাত্র কোন উসলুব (style) মনে করে না [বরং অপরিবর্তনীয় তরীকা’র (পদ্ধতির) অংশ বলে গন্য করে] এবং তা পালন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয তা হলো:

    প্রথমতঃ সিদ্ধান্তে পৌছানোর জন্য আমাদের কাছে মক্কায় দেখানো মডেল ছাড়া আর কোন মডেল বা দলীল নাই [যা খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির সাথে সম্পর্কযুক্ত]। সাহাবী, আত-তাবে’উন, তাবে-তাবে’ঈনদের যুগে কিংবা ফিকহের কিতাবেও এর কোন মডেল পাওয়া যায় না। এর মানে হলো এটিই একমাত্র শরীয়া’হ দলীল এবং রূপরেখা যা থেকে উৎসারিত হয় ‘কিভাবে ক্ষমতায় যেতে হবে’ এবং তা মেনে চলা ধড়া আমাদের জন্য সেভাবেই ফরজ।

    দ্বিতীয়তঃ নুসরাহ’র ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলীল বিদ্যমান যা নির্দেশনা প্রদান করে যে নুসরাহ তলব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে আসা এক ওহী। সেটি ইবনে কাছীরের সীরাতে (১৬৩/৭), আল-বায়হাকীর দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ (২৯৭/২), ইবনে হিব্বানের সীরাতে (পৃ-৯৩), আবু নাঈম আল আসবাহানীর মা’রেফাতুস সাহাবাহ (২৭৪/৪) এবং আল-ইখতিফায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অভিযানসমুহ ও তিন খলীফার আলোচনায় আবু রাবী’ সুলায়মান বিন মুসা আল-কালাঈ আল-আন্দালুসি (৩৩৭/১) কর্তৃক বর্ণিত আছে।

    আলি ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণিত- ‘যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নবী (সা)-কে আরব গোত্রদের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেন তখন তিনি মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন এবং আমি ও আবু বকর তার সঙ্গী হই…’।

    এই হাদীসের ব্যাপারে আল-ইখতিফার লেখক আল-খালায়ী বলেন- ‘এটি একটি প্রসিদ্ধ (মাশহুর) হাদীস যা আমি রেখেছি তার খ্যাতির কারণে’। অর্থাৎ, হাদীসটি আলেমদের নিকট অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হওয়ায় আল-ইকতিফা’র লেখক এর কিয়দংশ বর্ণনা করেছেন।

    তৃতীয়তঃ তাফসীরে ইবনে কাছিরে নিম্নলিখিত বক্তব্য উল্লেখ আছে:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَخْشَوْنَ النَّاسَ كَخَشْيَةِ اللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً وَقَالُوا رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ لَوْلَا أَخَّرْتَنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآَخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا

    (হে নবী) তুমি কি তাদের অবস্থা দেখনি, যাদের (প্রথম দিকে) যখন বলা হয়েছিলো, তোমরা (আপাতত লড়াই থেকে) নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখো, (এখন) নামায প্রতিষ্ঠা করো ও যাকাত প্রদান করো, তখন তারা জিহাদের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলো, অথচ যখন (পরবর্তি সময়ে) তাদের ওপর (সত্যি সত্যিই) লড়াইর হুকুম নাযিল করা হলো (তখন)! এদের একদল লোক তা (প্রতিপক্ষের) মানুষদের এমনভাবে ভয় করতে শুরু করলো, যেমনি ভয় শুধু আল্লাহকে করা উচিত; অথবা তার চাইতেও বেশী ভয়! তারা আরো বলতে শুরু করলো, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের ওপর যুদ্ধের এ হুকুম (এতো তাড়াতাড়ি) ধার্য করতে গেলে কেন? কতো ভালো হতো যদি তুমি আমাদের সামান্য কিছুটা অবকাশ দিতে? (হে নবী) তুমি বলো, দুনিয়ার এ ভোগ সামগ্রী অত্যন্ত সামান্য; যে ব্যক্তি (আল্লাহ-কে) ভয় করে, তার জন্য পরকাল অনেক উত্তম। আর (সেই পরকালে) তোমাদের উপর বিন্দুমাত্রও কিন্তু অবিচার করা হবে না”।

    ইবন আবী হাতিম বলেন, আলী বিন আল হুসাইন আমাদের বলেন যে মুহাম্মাদ বিন আবদিল আজীজ আমাদের বলেছেন, আবু জুহরাহ ও আলী বিন রামহাহ উভয়েই বলেছেন, আলী বিন আল হাসান আল-হুসাইন বিন ওয়াকীদ, সে আমর বিন দীনার হতে, সে ইকরিমা হতে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন- ‘মক্কায় আব্দুর রহমান বিন আ’উফ ও তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে নবী (সা)-কে বলেন: হে আল্লাহ-র রাসূল (সা) যখন আমরা মুশরিক ছিলাম তখন সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যাক্তি ছিলাম কিন্তু মুসলিম হওয়ার পর আমাদেরকে অপমানিত করা হচ্ছে তখন রাসূল (সা) বলেন: আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। অতএব, মানুষের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না”।

    যখন আল্লাহর আদেশে তিনি মদীনায় হিজরত করলেন তাকে জিহাদ ও প্রতিরক্ষার অনুমতি দেয়া হল তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়:

    (হে নবী) তুমি কি তাদের অবস্থা দেখোনি, যাদের(প্রথম দিকে) যখন বলা হয়েছিলো, তোমরা (আপাতত লড়াই থেকে) নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখো [যুদ্ধ হতে]”
    আন-নাসাঈ, আল-হাকিম তার মুস্তাদরাকে এবং আল-বায়হাকি তার সুনান আল-কুবরায় অনুরূপ বর্ণনা করেন”।

    উপরের আলোচনা থেকে পরিলক্ষিত হয় যে, এ বিষয়টি পছন্দ বা অপছন্দের অবকাশ দিচ্ছে না বরং এটি ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ফরযিয়াতের বিষয়।

    চতুর্থতঃ রাসূল (সা) শত দূর্ভোগ ও নির্যাতনের মুখেও নুসরাহ চাওয়া বন্ধ করে অন্য পথে না গিয়ে বরং (নুসরাহ তলবই) বহাল রাখেন। যা ব্যাপারটিকে আরো পাকাপোক্ত করে যে, এটি উসলূব (স্টাইল)-এর অংশ নয় বরং তরীকা (পদ্ধতি)-র অংশ। যদি এটি স্টাইলের অংশ হতো তবে রাসূল (সা) এটি পরিবর্তন করতেন বিশেষ করে যখন তায়েফের মত (হৃদয়বিদারক) লাঞ্চনা ও ক্ষতির সম্মুক্ষীন হয়েছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন গোত্রপতি, বনু আমির বিন সা’সা এবং বনু হানিফাহসহ প্রমুখ গোত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাখাত হওয়ার পরও বার বার নুসরাহ চাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকা (একটি মাত্র বিষয়ে দিকে নির্দেশ করে আর তা হলো নুসরাহ স্পষ্টরূপে তারীকার অংশ)।

    আমরা এখানে প্রশ্ন করতে চাই-

    ১. মক্কায় রাসূল (সা) এর পক্ষে কি সম্ভব ছিল না যে, উনি একটি গুপ্তঘাতকের দল তৈরী করবেন যারা সেই সব ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবে যারা মুসলিমদের ক্ষতি করেছিল বিশেষতঃ মুসলিমদের উপর এমন কষ্ট-যাতনা আরোপিত করেছিল যেখানে তাদের অনেকে কুফর কিংবা রাসূল (সা)-এর বিরুদ্ধে অপমানজনক কথার ব্যপারে (বাধ্য হয়ে) কুরাইশদের সাথে একমত হতে ধাবিত করে?

    কেন তিনি গুপ্তঘাতক দিয়ে আবু জেহেল,আবু লাহাব, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরাহ ও অন্যান্যদের মত যারা দাওয়ার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাদেরকে হত্যা করবে?

    ২. কেন রাসূল (সা) আবু যর গিফারী (রা)-কে তার গোত্রে ফিরে যেতে বলে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তাদের থেকে যারা ইসলাম কবুল করবে তাদেরকে দিয়ে এমন বাহিনী গঠন করলেন না যারা মক্কা থেকে আসা কুরাইশদের কাফেলা আটকে দিত ও তা লুট করত যাতে এ গনীমত মুসলিমদের সাহায্য করে এবং কুরাইশদেরকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখে এবং একই সাথে মুসলিমগণ তাদের প্রয়োজনীয় ও এর অধিক সম্পদ দখলে পেত?

    ৩. রাসূল (সা) কি দক্ষ ব্যাবসায়ী ছিলেন না এমনকি খাদিজা (রা)-র কি যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ ছিলনা যা ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা যায়? আবু বকর (রা), উসমান (রা), আব্দুর রহমান বিন আ’উফ (রা) কি দক্ষ ব্যবসায়ী এবং সুহাইব আল-রুমী (রা) বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিলেন না? এই রকম ধনাঢ্য ব্যাবসায়ী থাকা সত্ত্বেও রাসূল (সা) কেন ওমর বিন খাত্তাব, হামযা, যুবাইর ইবনে আল আওয়াম এবং সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মত তীব্রতাসম্পন্ন ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের দিয়ে একটি ব্রিগেড বা রেজিমেন্ট গঠন করলেন না যার সম্পূর্ণ ব্যায়ভার রাসূল (সা) করবেন যেটি কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে? এবং এটি করলে এক্ষেত্রে (সমাজের) দুর্বল ও নিপীরিতরা কি কুরাইশদের বিরুদ্ধে রাসূল (সা)-এর পাশে এসে দাড়াত না?

    ৩. রাসূল (সা) –এর কাছে উপরউল্লিখিত উপায় ও পন্থা ছাড়াও অন্যান্য পথ ও উপায় প্রয়োগ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন উনি গোত্রপতিদের কাছ থেকে নুসরাহ অনুসন্ধানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করে গিয়েছেন?

    এ থেকে কি প্রতীয়মান হয় না (নুসরাহ তলবের) এই কাজটি চাওয়াটা আমাদের খেয়াল-খুশির বিষয় নয় বরং এটি তারীকাহ (পদ্ধতির) অংশ যা মেনে চলা ফরজ?

    ৪. (শিয়াবে আবু তালিবে) কেন রাসূলুল্লাহ (সা) তারা কোনো বাহিনী তৈরি করলেন না যারা কুরাইশের বিরুদ্ধে উঠে দাড়াবে? রাসূল (সা) ও তার সাহাবীগণ কি বনু হাশিমসহ কুরাইশ কর্তৃক বয়কট হননি? আর কেনই বা নবী (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ বনু হাশিম গোত্রের সাথে জোট গঠন করে কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ ঘোষনা করলেন না?

    একটি বিষয়কে উপলব্ধি করার আহ্বানে শেষ করব, আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দলের ভালোর জন্য অনেকেই নুসরাহ চাওয়ার ব্যাপারটা অলৌকিক মনে হওয়ায় বলে থাকেন. এটিকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো পন্থায় অগ্রসর হওয়া উচিত! তাদেরকে বলব শুধু আবেগ ও আকাংখা থাকলে হয় না তার সাথে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র শরীয়া’হ-র নির্দেশের প্রয়োজন হয়। এবং এটি গুরুত্বপূর্ণ যে যারা মুসলিমদের কল্যাণ চান তাদের খেয়াল রাখা উচিত যে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর শরীয়া’হর পথ ও মুসলিমদের কল্যাণের ব্যপারে আরো বেশি আগ্রহী।

    রাসূল (সা) কথাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন-

    নিশ্চয়ই আল্লাহ যা হারাম করেছেন সে ব্যপারে অগ্রসরতার ব্যপারে তাঁর আবেগ বা ঈর্ষাকাতরতা (আল-গাইরাহ) রয়েছে

    এবং তিনি (সা) বলেন,

    أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّي

    সা’দ এর প্রতি ঈর্ষাকাতরতা কি তোমাদের বিস্মিত করেছে? আল্লাহ’র শপথ, আমি সা’দ হতে বেশি ঈর্ষাকাতর এবং আল্লাহ আমার চেয়ে বেশি ঈর্ষাকাতর। [বুখারী]

    তাই নুসরাহ চাওয়া ছাড়া আর যত পদ্ধতি আছে সবই হারাম বলে গন্য হবে এবং এই হুকুমটিকে কখনোই অবহেলা করা যাবে না কেননা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) হুদুদ থেকে সামান্য পরিমান বিচ্যুতির ব্যাপারে আল্লাহ অনেক সাবধান থাকতে বলেছেন।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন-

    সেগুলোই আল্লাহ’র দেয়া সীমারেখা, সুতরাং তা লংঘন করোনা। [বাকারাহ ২:২২৯]

    যার শরী’আহ’র ব্যপারে অনেক আবেগ ও আশা-আকাংখা রয়েছে কিন্তু উক্ত বিষয়ে শরীয়া’হ বিষয়াদির (বিশ্লেষনের) ব্যপারে কোনো শৃংখলা নেই তার অবস্থা সেই ব্যাক্তির মত যে জানে না কিভাবে সাঁতার কাটতে হয় কিন্তু সে পানিতে ঝাঁপ দেয় যাতে করে সে ডুবন্ত ব্যাক্তিকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেও ডুবন্ত ব্যাক্তিটির সহযাত্রী হয়ে যায়।

    আল-ওয়াঈ ম্যাগাজিন, সংখ্যা-৩১৮ থেকে অনুদিত
    ভাষান্তরে – কাজী সাইফুল আলম

  • মুসলিম সেনাবাহিনী, তাগুত, নুসরাহ ও খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা

    মুসলিম সেনাবাহিনী, তাগুত, নুসরাহ ও খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা

    মুসলিম সেনাবাহিনী, তাগুত, নুসরাহ ও খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা: একটি ফিকহি (আইনী) ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা

    ইদানিং খুব শোনা যায় খিলাফাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম ভূমিসমূহের “ক্ষমতাধর গোষ্ঠী” (আহল উল হাল ওয়াল ‘আকদ) তথা মুসলিম আর্মিদের কাছ থেকে “নুসরাহ” (সহায়তা) চাওয়া নাকি বোকার স্বর্গে বসবাস। যেসব মুসলিম ভাইরা এ ধারনাটি পোষণ করেন, নিম্নে তাদের কিছু যুক্তি তুলে ধরা হল:

    – মুসলিম বিশ্বের আর্মি হোল তাগুত (খোদাদ্রোহী শক্তি) যারা সাম্রাজ্যবাদী কুফর শক্তিকে টিকিয়ে রাখার মূল ইন্সট্রুমেন্ট। যেমন, ১৯৯২ সনে আলজেরিয়ায় বিপুল ভোটে বিজয়ী “ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট” (এফ আই এস) কে ক্ষমতাচ্যুত আর্মি করেছিল, এবারো যেমন আমরা দেখলাম মিসরে। তাই কিভাবে আমরা তাগুত এর কাছ থেকে নুসরাহ চাইতে পারি যাদের কাজই হোল খিলাফাতের পুনুরুত্থান ঠেকানো?

    – মুসলিম আর্মিরা হল “মুরতাদ” (ধর্মভ্রষ্ট) কারন তারা কুফফার দের দালাল শাসনযন্ত্রেরই অংশ। আর আল্লাহ বলেছেন যারা কুফফার দের সহায়তা করবে তারা তাদেরই একজন বলে বিবেচিত হবে (সূরা মাইদা, ৫১)। এক্ষেত্রে জেনে নেয়া ভাল যারা মুসলিম আর্মিদের মুরতাদ বলছেন তারা “কাফির আসলি” (জন্মগতভাবেই যারা কাফির যেমন, ইহুদি) এবং মুরতাদ এর ভেতর পার্থক্য নিরুপন করেন। তারা বলে থাকেন মুসলিম আর্মি হোল মূলত “মুরতাদ আল-ইস্তিহলাআল” অর্থাৎ আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা তারা না মেনে নিজেরাই মুসলিমদের খুন করা জায়েয করছে।

    – মুসলিম আর্মিদের হাতে স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের রক্ত লেগে আছে। পাকিস্তানের লাল মসজিদের জামিয়া হাফসা মাদ্রাসায় বর্বরোচিত হামলা, মিসরে মুরসি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আর্মি দ্বারা সীমান্তে অবস্থানকারী মুজাহিদিনদের নির্বিচারে খুন ইত্যাদি। তাই এরা মুরতাদিন।

    – আর্মিদের কাছ থেকে নুসরাহ চাওয়া হোল “বিদআত”

    – গত ৫০ বছর যাবতইতো ওদের কাছ থেকে নুসরাহ চাওয়া হোল। এখনো এই স্বপ্ন ভাংছেনা কেন?

    এবার একটু এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক: দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে এই আলোচনায় –

    ১। আকীদা সংক্রান্ত, ২। খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার “মানহাজ” (পদ্ধতি)

    প্রথমেই বলব “ব্ল্যাঙ্কেট তাকফীর” বা ঢালাওভাবে কাফের ঘোষণা দেয়া হবে মহা বড় এক গুনাহ যার ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। থিওলজিকাল বা আকিদা সংক্রান্ত আলোচনার বেশী গভীরে যাব না কারণ ক্লাসিকাল মুজতাহিদিনরা যেসব ক্যাটেগরি বলেছেন একজনের পক্ষে কাফির হওয়ার জন্য তার কোনটির ভেতরই আর্মিদের “ঢালাওভাবে” ফেলা যায় না। যেমন, কুফর আল তাকধিব (সম্পূর্ণরূপে ইসলাম অস্বীকার করা), কুফর আল ইবা’ ওয়াত তাকাব্বুর মা’আত তাসদিক (অহঙ্কারবশত আল্লাহর হুকুম মেনে না নেয়া), কুফর আশ শাক ওয়া আল থান (ঈমানের ৬ টি স্তম্ভের যেকোনো একটিও যদি অস্বীকার করা হয়), কুফর আল ই’রাদ (ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য জানার পরও মুখ ফিরিয়ে নেয়া), এবং কুফর আন নিফাক (মুনাফিকি বিশ্বাস)।

    বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বলা যায় মুসলিম ভূখণ্ডের সেনাবাহিনীর একেবারে উপরিভাগ আসলেই কুফফারদের দালালি করছে যাতে কোন সন্দেহ নেই। তারা উপরের যেকোনো ক্যাটেগরিতে পরে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করতে চাইনা। আমাদের কাজ হবে খিলাফাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে এই সোল্ড আউট সেকশন কেও আল্লাহর দিকে আহ্বান করা ও আযাবের ব্যাপারে ভয় দেখানো, যেমনটি ফিরাউনকে মুসা আলাইহিস সালাম দেখিয়েছিলেন যখন আল্লাহ বললেন “হে মুসা! তুমি ফিরাউন এবং তার দলকে আল্লাহর পথে এখন আহ্বান কর”। ফিরাউন এই আহ্বান মেনে না নিয়ে অহঙ্কারবশত ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে আল্লাহ বলেন ফিরাউনকে আযাবের ভয় দেখাতে।

    যদি তাগুতকে সহায়তা করার কারনেই আর্মিদের মুরতাদ বলতে হয়, তাহলে এই একই চিন্তার আলোকে মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মুসলিমদেরও মুরতাদ বলতে হবে কারন তারা নির্বাচনে ভোট দিয়ে তো তাগুত ক্ষমতায় বসাচ্ছে? সচিবালয়ের সকল মুসলিমদের মুরতাদ বলতে হবে কারন তারা তাগুতি সরকারকে সচল রাখতে সাহায্য করছে? সিটি কর্পোরেশনের ঝাড়ুদারও বাদ পরবে না কারন তারাও এই তাগুতি সরকারের অংশ। আরো জিজ্ঞাসা করতে চাই যে হেফাযতে ইসলামের আন্ডারে যতোগুলো ইসলামি রাজনৈতিক দল আছে যার ভেতর অনেক বড় ওলামা আছেন যারা অবশ্যই ভুল উসূলের কারনে নির্বাচনে ভোট দেন, তাদেরকেও কি আমরা মুরতাদ বলব? প্রান্তিক চাষি যারা তাগুতি সরকারের কৃষিনীতি সচল রেখেছে এবং কাস্টমস এর একজন দরিদ্র ৪র্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা যে পণ্যের ওপর সীল ছাপ্পড় মারে তারাও তো এই ব্ল্যাঙ্কেট তাকফীর থেকে মুক্ত হওয়ার কথা না!!!

    তাই আমাদের এই ব্যাপারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য তৈরি করতে হবে – ফাসিক (পাপী) এবং কাফির বা/এবং মুরতাদ এর ভেতরে; হারাম করে গুনাহগার হওয়া এবং কাফের হওয়ার ভেতরকার পার্থক্য বুঝতে হবে। লাল মসজিদ এর অন্যায়ভাবে খুনের জন্য যারা পাকিস্তানি আর্মিদের কাফির/মুরতাদ বলছেন তাদের প্রশ্ন করা যায় ইয়াযিদ যখন মুসলিমদের খুন করল যার ভেতর রাসূলের (সা) দৌহিত্র এবং সাহাবারাও ছিলেন, ম্যাজরিটি ক্লাসিক্যাল উলামারা ইয়াযিদ কে কাফির বলে নাই; ফাসিক বলেছিল। ওনাদের এই মত ইমাম গাযালি (রা) এরুপে তুলে ধরেছিলেন যে হারাম কাজের জন্য কাউকে কাফির ঘোষণা দেয়া যায় না এমন কি এক মুসলিম ওপর মুসলিম কে খুন করলেও (শার বাদ আল-আমালি, মোল্লা আলি আল-কারি)।

    এবার আসা যাক খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার “মানহাজ” সঙ্ক্রান্ত বিষটিতে। যেহেতু দারুল ইসলাম ধ্বংস কখনো রাসূলের সময় হয়নি যাতে উনি দেখাতে পারেন কি করে আবার রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়, তাই “মানহাজ” এর আলোচনাটি পুরাই “ইজতিহাদি” (অর্থাৎ অতীতের দলীল থেকে বর্তমান বাস্তবতার যোগ তৈরি করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো)। তাই “তাহকিক উল মানাত” (বর্তমান বাস্তবতার পর্যালোচনা) এটাই বলে বর্তমানে আমরা দারুল কুফরে আছি এবং “তাখরিজুল মানাত” (কুরান/সুন্নাহর দলীল পর্যালোচনা বা “তানকিহ” করে শরী’আহ হুকুম এক্সট্রাক্ট করা) এটাই বলছে রাসূলের মক্কী যুগের কর্মপদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে যদি দারুল ইসলাম (খিলাফত) পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই কারণ মক্কী বাস্তবতায় মানহাজ এর দলীল বিদ্যমান। এইখানে এও বলে রাখা আবশ্যক যে বর্তমান যুগের সাথে মক্কী যুগের তুলনা করা হচ্ছেনা, বরং মক্কী যুগ থেকে শুধুমাত্র মানহাজ এক্সট্র্যাক্ট করা হচ্ছে। তাই সিরাতে দেখতে পাই রাসূল প্রায় ৪০ থেকে ৭০ টি গোত্রের কাছে গিয়েছিলেন “তালাব আন নুসরাহ” (রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য চাওয়া) এর জন্য। তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে জড়িয়েছিলেন কিন্তু কোনভাবেই সশস্ত্র সংগ্রামে জড়াননি।

    তাই আমাদের আরও বুঝতে হবে “জিহাদ” যা খিলাফাহ রাষ্ট্রের একটি বৈদেশিক নীতির অংশ (জিহাদুদ-দাফ বা রক্ষণাত্মক জিহাদ ব্যাতিত যা সর্বাবস্থায় ফরয যদি শত্রুর আক্রমণের শিকার হই), এর সাথে খিলাফাহ রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক পার্থক্য আছে; দুটিকে গুলিয়ে ফেললে চলবেনা। তাই জিহাদ কখনই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হতে পারে না, বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আইডিওলজি প্রচারের মূল একটি মাধ্যম। আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় আব্বাস ইবন উবাদা আল-আনসারির প্রস্তাব ছিল “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যদি আদেশ দেন তবে রাতের অন্ধকারেই আমরা তরবারি নিয়ে মিনায় আক্রমন চালাতে পারি”, প্রত্যুত্তরে রাসূল বলেছিলেন “এখনো আমাদের এই আদেশ দেয়া হয়নি”। হিজরতের পর জিহাদ এর হুকুম নাযিল হয়েছিল সূরা বাকারাতে। তাই আমরা দেখতে পাই রাসূল নুসরাহ তালাব ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেননি দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। বরং নুসরাহ খোজা এজন্যই ফরয কারন তা আল্লাহর নির্দেশ ছিল। আল-হাকিম, বাইহাকি, এবং আবু নাইম হযরত আলী (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, “যখন নবী (সা)-কে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন গোত্রগুলোর কাছে নুসরাহ চাইতে, তখন রাসূল (সা) ও আমি (আলী) মিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম আবু বকর কে সাথে নিয়ে”।

    আর যারা গত ৫০ বছরেও তাদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি তাই কোন লাভ নেই, তাদের শুধু বলব আমাদের রাসুলের সিরাত অনুসরণ করতে হবে। সফলতা আল্লাহর হাতে। আল্লাহর রাসূল যখন আরব গোত্রগুলোর কাছ থেকে নুসরাহ চেয়েছিলেন তখনও কাফের মুশরিকরা হেসেছিল, তখনও ‘তালাব উন নুসরাহ’ অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। এবং রাসূলের মাথায় এটা কোন ভাবেই ছিলনা যে মদীনায় আল্লাহ আওয/খাজরাজদের তৈরি করছিলেন। খিলাফত ধ্বংসের পর মুসলিমদের জাতীয়তাবাদ নামক মহামারী রোগ থেকে বের করে আনাটাও সেরকম অবিশ্বাস্য একটি কাজ এখনো মনে হয়। তাহলে কি আমরা এই কাজ বন্ধ করে দিবো?

    পরিশেষে এটিও জেনে নেয়া ভাল সিরিয়ার আসাদ সরকার তাদের পদাতিক ডিভিশন কে এখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে নামাতে ভয় পাচ্ছে কারণ ইতিমধ্যে অনেক আর্মি ডিফ্যাক্ট করে জিহাদ এ যোগদান করেছে এবং সিরিয়ান বিমানবাহিনী যেখানে ৩০% সুন্নি তারাও ডিফ্যাক্ট করার পথে। তাই ঢালাওভাবে তাগুত/মুরতাদ না বলে যারা নিষ্ঠাবান আছে তাদের ঈমান কে জাগ্রত করার চেষ্টা আমাদের করা উচিত ইনশাল্লাহ।

    ইমতিয়াজ সালিম

    Posted by Visionary 

  • বাইতুল-মাল ও এর বিভাগ সমূহ

    বাইতুল-মাল ও এর বিভাগ সমূহ

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ আবদুল কাদীম যাল্লুম (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আল-আমওয়াল ফী দাওলাতিল খিলাফাহ’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত

    বাইতুল-মাল বা ট্রেজারি (State Treasury) বলতে এমন সক্ষম কর্তৃপক্ষকে বুঝানো হয় যা মুসলিমদের ন্যায্য অধিকার পূরণার্থে রাষ্ট্রের সমস্ত আয় ও ব্যয়ের জন্য দায়িত্বশীল। অতএব ভূমি, দালানকোঠা, খনিজ, অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য প্রভৃতি যেসব সম্পদের উপর মুসলিমগণ শর’ঈ হুকুম অনুযায়ী অধিকারপ্রাপ্ত, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য তা নির্ধারিত নয়, তবে কোন খাতে এগুলো ব্যয় করা হবে সেটা নির্ধারিত, সেগুলোই হচ্ছে মুসলিমদের ট্রেজারির মালিকানাধীন সম্পদ, এক্ষেত্রে এটা বিবেচনার বিষয় নয় যে এই সম্পদগুলো ইতিমধ্যে ট্রেজারির সংরক্ষণের আওতায় চলে এসেছে নাকি আসেনি। অনুরূপভাবে, অধিকারপ্রাপ্ত মালিক ও ব্যবহারকারীদের জন্য অথবা মুসলিমগণ ও তাদের দেখাশোনার জন্য অথবা ইসলামের দাওয়াহ বহন করবার জন্য যেসব সম্পদ ব্যয় করতে হবে – একসকল তহবিলের ক্ষেত্র ট্রেজারির দায়িত্ব- এক্ষেত্রে এসব তহবিল খরচ হলো কি হলো না – তা বিবেচ্য নয়। অতএব এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ট্রেজারি হচ্ছে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।

    অন্য এক অর্থে, ট্রেজারি বলতে এমন স্থানকে বুঝানো হয় যেখানে রাষ্ট্রের আয় জমা রাখা হয় এবং যেখান থেকে তা ব্যয় করা হয়।

    উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ অর্থে প্রথম ট্রেজারি প্রতিষ্ঠিত হয় নিম্নোক্ত আয়াতখানি নাযিলের পর:

    يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

    “তারা আপনার কাছে আনফাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। বলে দিন, আনফাল হল আল্লাহর ও রাসূলের। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক।” [আল-আনফাল ১]

    এই আয়াতখানি মূলত নাযিল হয় বদরের যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে, যখন মুসলিমরা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। সাঈদ ইবনু জুবায়ের কর্তৃক বর্ণিত: আমি সূরা আনফাল সম্পর্কে ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন “এটা বদরের সময় নাযিল হয়েছে।” আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ অভিযানের পর বদরই প্রথম যুদ্ধ যেখানে মুসলিমরা অনুরূপভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করেছিল, যার বণ্টন সম্পর্কে আল্লাহ তখন হুকুম বর্ণনা করলেন। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে মুসলিমদের সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং রাসূল (সা) কে নির্দেশ দিলেন যাতে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এ সম্পদকে তিনি মুসলিমদের সর্বোত্তম স্বার্থে ব্যবহার করেন। অতএব, ট্রেজারির এসব সম্পদকে মুসলিমদের অভিভাবক নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এমনভাবে ব্যয় করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল যাতে তারা সর্বাধিক উপকৃত হতে পারে।

    রাষ্ট্রের আয় জমা রাখা এবং ব্যয় করার স্থান অর্থে যদি আমরা ট্রেজারিকে চিন্তা করি তাহলে রাসূল (সা) জীবদ্দশায় এরূপ কোন স্থান ছিলনা; কারণ এসময় আয় ছিল স্বল্প এবং মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন ও মুসলিমদের দেখাশোনার কাজে ব্যয়ের পর আর তেমন কিছুই অবশিষ্ট থাকতনা। প্রত্যেক যুদ্ধের শেষে রাসূল (সা) সমস্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পঞ্চমাংশ (খুমুস) বণ্টন করে দিতেন। সম্পদ বণ্টন করা অথবা উপযুক্ত খাতসমূহে ব্যয় করার ক্ষেত্রে তিনি (সা) দেরি করতেননা। রাসূল (সা) এর একজন হিসাবরক্ষক হানযালা ইবনু সাইফি কর্তৃক বর্ণিত: “রাসূল (সা) আমাকে বললেন: (الزمني وأذكرني بكل شيء لثالثه) আমার সাথে থাক এবং সবকিছু স্মরণ করিয়ে দাও এর তিন দিনের মধ্যেই। তিনি বলেন: এজন্য যেকোনো সম্পদ অথবা খাবার অথবা অর্থ আমি গ্রহণ করতাম তা তিন দিনের মধ্যেই স্মরণ করিয়ে দিতাম।ফলে সবকিছু ব্যয় না করে রাসূল (সা) রাত্রি যাপন করতেননা।” অধিকাংশ ক্ষেত্রে একদিনের মধ্যেই সমস্ত সম্পদ বণ্টিত হয়ে যেত। আল-হাসান ইবনু মুহাম্মাদ কর্তৃক বর্ণিত যে, রাসূল (সা) কখনোই দুপুর বা রাত পর্যন্ত সম্পদ জমা রাখতেননা, “অর্থাৎ, সকালে হাতে পেলে তিনি দুপুরের মধ্যেই বণ্টন করে দিতেন এবং বিকালে পেলে তা রাতের মধ্যেই ব্যয় করে ফেলতেন।” ফলে কখনোই এমন কোন সম্পদ অবশিষ্ট থাকতোনা যার জন্য কোন জায়গা বা রেকর্ডবুকের প্রয়োজন ছিল।

    রাসূল (সা) এর জীবদ্দশায় এ কাজটি এভাবেই সম্পাদিত হতো। খলীফা নিযুক্ত হবার পর আবু বকর (রা) তার খিলাফতের প্রথম বছর একইভাবে এ কাজ সম্পাদন করলেন। যেকোনো অঞ্চল থেকে কোন সম্পদ আসলে তিনি তা মসজিদে নববীতে নিয়ে আসতেন এবং অধিকারপ্রাপ্তদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। একাজে তিনি তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে। একাজে নিযুক্ত হওয়ার পর আবু উবাইদাহ তাকে বললেন: আমি আপনার পক্ষ থেকে সম্পদের দেখাশোনা করব। যাই হোক, খিলাফতের দ্বিতীয়বর্ষে আবু বকর (রা) নিজের ঘরে একটি জায়গা নির্ধারণ করার মধ্য দিয়ে ট্রেজারির সূচনা করলেন, যেখানে তিনি মদীনায় আগত সমস্ত সম্পদ জমা করতেন এবং এর সবকিছুই মুসলিমদের দেখাশোনার কাজে ব্যয় করতেন। আবু বকর (রা) এর ইন্তেকালের পর যখন উমর (রা) খলীফা নিযুক্ত হলেন, তিনি দায়িত্বশীলদের জড়ো করলেন এবং আবু বকর (রা) এর বাসগৃহে প্রবেশ করলেন। তিনি ট্রেজারি খুলে একটি ব্যাগ থেকে পড়ে যাওয়া কেবল একটি দিনার পেলেন। উমর (রা) এর সময়ে যখন প্রচুর এলাকা বিজয় হচ্ছিল এবং মুসলিমরা কিসরা (পারস্য) ও কায়সার (রোমান) এর ভূখণ্ডে বিজয় লাভ করতে লাগল তখন মদীনায় আগত সম্পদের পরিমাণও প্রচুর বৃদ্ধি পেল, ফলে উমর (রা) তখন এগুলোর জন্য একটি ঘরকে নির্দিষ্ট করে দিলেন। এগুলোর জন্য তিনি একটি অ্যাকাউন্ট বুক খুললেন এবং অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নিয়োগ দিলেন, এখান থেকে ভাতা নির্ধারণ করলেন এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্রে সজ্জিত করলেন। অবশ্য মাঝেমধ্যে তিনি তার হাতে আসা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পঞ্চমাংশ মসজিদে নিয়ে আসতেন এবং বিলম্ব না করে সেগুলো বণ্টন করে দিতেন। ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত: “একদিন উমর আমাকে ডাকলেন। আমি তার কাছে গিয়ে দেখলাম যে তিনি একখণ্ড কাপড়ের পাশে বসে আছেন যার উপরে প্রচুর স্বর্ণের টুকরা ছড়িয়ে আছে। তিনি বললেন: আসো এবং এগুলো নিয়ে নিজেদের লোকজনের মধ্যে বণ্টন করে দাও, আর আল্লাহই ভাল জানেন কেন তিনি রাসূল (সা) ও আবু বকরকে না দিয়ে এর পরে আমাকে এই দায়িত্ব অর্পণ করলেন? এর মাধ্যমে তিনি আমার কাছ থেকে কল্যাণ কামনা করেন নাকি অকল্যাণ? আবদুর রহমান ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত: একদিন দুপুরে উমর আমাকে ডাকলেন, তাই আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমার হাত ধরে একটি ঘরে নিয়ে গেলেন যেখানে কিছু বস্তার স্তূপ জমা ছিল। তিনি বললেন: “এখন আল-খাত্তাবের পরিবার আল্লাহর চোখে অনেক ছোট হয়ে গেল, কসম আল্লাহর, এতে যদি আমাদের সম্মানিত হওয়ার মত কিছু থাকত তাহলে আল্লাহ আমার দুই সঙ্গীকেও এভাবে দিতেন এবং তারা একাজে আমাকে একজন উত্তরসূরি হিসেবে রেখে যেতেন।” আবদুর রহমান বলেন: “তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা দেখে আমি বললাম ‘হে আমিরুল মু’মিনীন, আপনি বসুন, আমরা (এ ব্যাপারে) চিন্তা করি।’ তিনি বলেন: ‘আমরা বসলাম এবং মদীনার সমস্ত লোকের নাম লিখলাম, আমরা যারা আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ ছিলাম তাদের নাম, রাসূল (সা) এর স্ত্রীগণের নাম এবং তারপরে অন্যদের নাম লিখলাম।’ ”

    এভাবেই মুসলিমরা গোড়াপত্তন করলেন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ট্রেজারির যেখানে সম্পদ জমা করা হতো এবং রেকর্ডবুক রাখা হতো, যেখান থেকে ভাতা প্রদান করা হতো এবং অধিকারপ্রাপ্তদের তাদের তহবিল পৌঁছিয়ে দেওয়া হতো।

    Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, please check back often for any newer version.
    Link for English translation of the book “Funds in the Khilafah State

    Posted by Visionary 

  • প্রশ্ন-উত্তর: “তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে”

    প্রশ্ন: “তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে” এই হাদীসটি কি দূর্বল (জায়ীফ), এর বিশুদ্ধতা কতটুকু?

    উত্তর:

    আদ-দায়লামী তার মুসনাদ আল-ফিরদাউসে হাদীসটি আবু বাকরা হতে মারফূ সনদে বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী শুয়াবুল ঈমানে আবু ইসহাক আল-শাবি’ হতে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন।

    আল-সুয়ূতী হাদীসটি সম্পর্কে বলেন: এটি দূর্বল (জায়ীফ)

    আল-শাওকানী বলেন, হাদীসটি: ইয়াহইয়া বিন হিশাম; ইউনুস বিন ইসহাক > তার পিতা > তার দাদা > আবু বাকরা হতে মারফূ সনদে এসেছে। আল-সাখাউঈ হাদীসটি সম্পর্কে বলেন, ইয়াহইয়ার হাদীসটি জাল হাদীসগুলোর অন্যতম যা ইয়াহইয়া বিন হিশাম > ইউনূস বিন ইসহাক > (আবু ইসহাক) উমর বিন আবদিল্লাহ (আস-সাবি’ঈ) হতে মুরসাল সনদে বর্ণিত। তারপর তিনি বলেন, এই হাদীসটি মুনকাতি’ (কর্তিত সনদবিশিষ্ট) এবং এর বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া বিন হিশাম (একজন) দূর্বল (রাবী)।

    ইমাম আল-ফাতানীর তাজকিরাতুল মাওদু’আতে:

    “তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে” এর সনদে ইনকিতা’ (কর্তন) রয়েছে এবং ওয়াদি হচ্ছে ইয়াহইয়া বিন হিশাম এবং তার একটি সনদের ধারা রয়েছে যাতে মাজহুল (অজ্ঞাত রাবী) রয়েছে।

    সুতরাং, হাদীসটি দূর্বল বলে বিবেচিত হবে।

    যাইহোক, হাদীসটিতে দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি এমন নয় যে আমরা শাসকদের জুলুম ও শরীআহ’র অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থাকবো। ইমাম আল-মানাউই তার ফাইদুল কাদীর তথা আল-জামি’ আল-কাবীর এর ব্যখ্যায় (এর ৫ খণ্ডে) আলোচ্য হাদীসটির ব্যপারে ইমাম আস-সাখাউই বক্তব্য তুলে ধরেন যেখানে তিনি হাদীসটির দুর্বলতার কথা আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি বলেন, যদি আপনারা তাকওয়া অবলম্বন করেন এবং আল্লাহর শাস্তির ভয় করেন তবে তিনি এমন শাসক নিযুক্ত করে দেবেন যারা আল্লাহকে ভয় করেন এবং বিপরীতক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য। তার এ বক্তব্য কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ

    তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও সৎকর্ম করবে, তাদের প্রতি আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে তাদের তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে নেতৃত্ব (ইসতিখলাফ) প্রদান করবেন।” [সূরা নূর: ৫৫]

    এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে মুসলিমদের মধ্য হতে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি ঈমান ও সৎকর্ম করে তবে তাদেরকে অবশ্যই শাসনক্ষমতা দেয়া হবে। তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয়, আয়াতটিতে ‘মিনকুম’ বলার মাধ্যমে ‘আংশিকতা’ বা ‘ঈশারাতুত তাব’ঈদ’ রাখা হয়েছে, অর্থাৎ, সমগ্র উম্মাহ ভালোকাজ শুরু করলেই শাসনক্ষমতা আসবে, বরং সকলের উপরই দায়িত্ব বর্তায় সৎকাজে অংশগ্রহণ করবার এবং আল্লাহই বুঝবেন কখন উম্মাহ সে পর্যায়ে পৌছেছে যেখানে যথেষ্ট পরিমান উম্মত আল্লাহ সন্তুষ্টি অন্বেষনে ব্যকুল। তবে অনেকেই এসব হাদীস আয়াত পেশ করেন কাজ করবার জন্য উৎসাহিত করার জন্য নয় বরং কিছু কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখার নিমিত্তে। তারা বলে থাকেন, ব্যক্তিগতভাবে সৎকাজ করলেই আল্লাহ শাসনক্ষমতা বা খিলাফত রাষ্ট্র দিয়ে দিবেন। তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখতে চাই, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কি সৎকাজের মধ্যে পড়ে না? আমর বিল-মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য পালনীয় হুকুম শর’ঈ। এবং গুরুত্বের দিক বিবেচনা করলে এই আমলটিই সবার অগ্রে থাকতে হবে অনেক সাধারন আমলের চেয়ে। উপরন্তু কিছু হাদীস অনুযায়ী, শুরুতে এই আমলটি অবহেলা করার কারণেই আমরা আল্লাহর আযাব (এক্ষেত্রে উদাহরসরূপ, খারাপ শাসক) ভাগ্যে পেয়ে থাকি।

    আমাদের বুঝতে হবে আমরা ব্যক্তিগতভাবে ভালো কাজ করতে থাকলে সয়ংক্রিয়ভাবে সমাজ পরিবর্তন হয়ে যাবে না, কারণ ব্যক্তি চলে তার অন্তর্নিহিত চিন্তা দ্বারা আর সমাজ চলে একটি ব্যবস্থা দ্বারা যা সকল ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত করে। সুতরাং, যতক্ষন পর্যন্ত সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে পরিবর্তনের দাবি না তুলে তথা পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন সংগ্রামে লিপ্ত না হয়, ততক্ষন পর্যন্ত সমাজ পরিবর্তন হয় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাও পবিত্র কুরআনে বলেন,

    إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ

    নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির মধ্যে যা আছে তা পরিবর্তন করেন না যতক্ষন না তারা (সেই জাতি) নিজেদের মধ্যে যা রয়েছে তার মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করে। [সূরা রা’দ: ১১]

    এ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা চুড়ান্ত পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করেননি বরং জাতি বা কাওম’কে নির্দিষ্ট করেছেন।

    সুতরাং, আমাদের সকলকেই সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নিতে হবে, পরাজনৈতিক সচেতন হতে হবে, প্রকাশ্যে কথা বলতে হবে, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে হবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করতে হবে এবং চুড়ান্ত সাফল্যের আগ পর্যন্ত তা ঐক্যবদ্ধভাবে চালিয়ে যেতে হবে। একাজে ভয়-ভীতি, জেল-জুলুম ও ত্যাগ-তিতিক্ষা থাকবেই, তবে তাতে পিছিয়ে পড়লে চলবে না, নিস্ক্রিয় হয়ে গেলে হবে না। বরং, প্রতিটি বাধা উপেক্ষা করার মানসিকতা পোষন করতে হবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষনে ইস্পাত-কঠিন দৃঢ় মানসিকতা পোষন করতে হবে। এভাবেই দুনিয়ায় ইসলামের বিজয় ও সাফল্য আসবে, আর আখিরাতের যে সাফল্য মুমিনদের জন্য অপেক্ষা করছে তা অনন্য।

    وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ

    সুতরাং, ঈমানদারদের সুসংবাদ দান করুন.. [সূরা সফ: ১৩]

  • প্রশ্ন-উত্তর: ইসলামী ব্যাংকের সাথে Profit Sales (মুরাবাহা) প্রক্রিয়ায় লেনদেন করা সম্পর্কিত হুকুম

    প্রশ্ন-উত্তর: ইসলামী ব্যাংকের সাথে Profit Sales (মুরাবাহা) প্রক্রিয়ায় লেনদেন করা সম্পর্কিত হুকুম

    নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু আল-রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব 

    প্রশ্ন: আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

    সম্মানিত শাইখ, আমি ইসলামী ব্যাংকের সাথে profit sales (মুরাবাহা) প্রক্রিয়ায় লেনদেন করা সম্পর্কিত হুকুমটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি, উদাহরণস্বরুপ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ায় গাড়ি বা বাড়ি ক্রয় করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আমি জানি যে এটা হারাম কিন্তু যখন কাউকে এ ব্যাপারে উপদেশ দেই তখন বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারিনা। আমি এমন একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ দিচ্ছি যার ব্যাপারে অনেকের ধারণা হচ্ছে তারা ইসলামী ব্যাংকের সাথে যেভাবে লেনদেন করছে এটা তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ…নিজেদের জমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ বসতবাড়ি তৈরি করে দেওয়ার জন্য যদি আমরা কোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে এভাবে চুক্তিবদ্ধ হই যে আমরা কিস্তিতে (চেক) তাদের প্রাপ্য শোধ করব এবং তারা ওয়েল্ডার, মিস্ত্রি, সিমেন্ট…প্রভৃতির যোগান দিবে এসবের উপর একটি নির্দিষ্ট হারে (উদাহরণস্বরুপ ১৫%) লাভের ভিত্তিতে যদিও এক্ষেত্রে তারা বাড়ির মালিক নয়, এই দুটো চুক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?

    উত্তর:

    ওয়া আলাইকুম আস-সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

    ১। ইসলামী ব্যাংকের সাথে profit sales প্রক্রিয়ায় কৃত লেনদেন শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক, যা নিচে ব্যাখ্যা করা হল:

    প্রথমত: ব্যাংক এখানে গাড়ি বা ফ্রিজ কেনার আগেই তা বিক্রির জন্য ক্রেতার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। রাসূল (সা) আমাদেরকে এমন কিছু বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন যার মালিকানা আমাদের নেই, হাকিম ইবনে হিযাম থেকে বর্ণিত:

    قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، يَأْتِينِي الرَّجُلُ يَسْأَلُنِي الْبَيْعَ، لَيْسَ عِنْدِي مَا أَبِيعُهُ، ثُمَّ أَبِيعُهُ مِنَ السُّوقِ فَقَالَ: «لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ»

    আমি বললাম: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, একজন লোক আমার কাছে আসলেন (একটি পণ্য) কেনার জন্য, কিন্তু তা আমার কাছে ছিলনা, আমি সেটা পরে বাজার থেকে এনে তার কাছে বিক্রি করে দিলাম। তিনি (সা) বললেন: এমন কিছু বিক্রি করবেনা যার মালিক তুমি নও। ” [আহমাদ থেকে বর্ণিত]

    লোকটি রাসূল (সা) এর কাছে ঐ ক্রেতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন যিনি তার কাছ থেকে এমন কিছু কিনতে আসলেন যা তার কাছে ছিলনা, তাই তিনি বাজার থেকে তা কিনে আনলেন এবং ক্রেতার কাছে বিক্রি করলেন।

    রাসূল (সা) এরূপ করতে নিষেধ করলেন, যদিনা পণ্যটি তার কাছে বর্তমান থাকে এবং সে তা বিক্রেতাকে প্রদর্শন করে, যাতে বিক্রেতা পণ্যটি ক্রয় করা বা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

    ব্যাপারটি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাকঃ যদি কেউ ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার চায় তাহলে ব্যাংক তার কাছে এর কারণ জানতে চায়। ঋণগ্রহীতা তখন একটি ফ্রিজ বা গাড়ি বা ওয়াশিং মেশিন কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ব্যাংক পণ্যটি কিনে দেওয়ার জন্য তার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে তার কাছে বিক্রি করে।

    এক্ষেত্রে ব্যাংক ক্রেতার জন্য ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই সম্পাদিত চুক্তিটি মানতে ক্রেতা বাধ্য হয়ে পড়েন; ফলে ক্রেতা ব্যাংক থেকে ফ্রিজটি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সুযোগ পাচ্ছেননা, কারণ ফ্রিজটি ব্যাংকের মালিকানায় আসার আগেই ব্যাংকের সাথে তার মতৈক্য হয় এবং এই অবস্থায়ই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়।

    যদি বলা হয় যে পণ্যটি কেনার পরে ব্যাংক তা ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছে তাহলে সেটা হবে ভুল, কারণ ব্যাংক এবং ক্রেতার মধ্যে একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে ব্যাংক ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই; প্রমাণ স্বরূপ বলা যায় যে ব্যাংক ক্রেতার জন্য ফ্রিজটি ক্রয় করার পর তিনি তা কিনতে কোনোভাবেই অস্বীকৃতি জানাতে পারবেননা, কারণ ব্যাংক ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে চুক্তিটি সম্পাদিত করেছে।

    যদি ব্যাংকের কোন গুদাম থাকে এবং তাতে উদাহরণস্বরুপ যদি প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে ফ্রিজ থাকে এবং ক্রেতা অন্য যেকোনো বিক্রেতার সাথে লেনদেন করার মত করে পণ্যটি কেনা বা না কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে এক্ষেত্রে নগদে অথবা কিস্তিতে পণ্য বিক্রি বৈধ বলে বিবেচিত হবে।

    দ্বিতীয়তঃ ক্রেতা যদি কোন কিস্তির মূল্য পরিশোধ করতে দেরি করেন তাহলে সে কিস্তির মূল্য অর্থাৎ ঋণের মূল্যমান বাড়ানো অবৈধ, কারণ এটা হচ্ছে রিবা (সুদ) যাকে বলা হয় রিবা আন-নাসি’য়া (accrued interest)। জাহিলি যুগে যখন ঋণ পরিশোধের সময় আসত তখন ঋণগ্রহীতা যদি নির্ধারিত সময়ে তা শোধ করতে না পারতেন তখন এরূপ প্রচলন ছিল। ইসলাম ঋণের মূল্যমান বাড়ানোকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে এবং দুঃসময়ে থাকা ঋণগ্রহীতাকে ঋণের মূল্যমান কোন রকম বৃদ্ধি ছাড়াই পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছে।

    ((وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ وَأَن تَصَدَّقُوا خَيْر لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ))

    “যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” [আল বাক্বারাহ : ২৮০]

    উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে ব্যাংকের সাথে এই ধরনের লেনদেন অবৈধ।

    ২। বিল্ডিং কনট্রাক্টরদের সাথে সাদৃশ্যতার যে বিষয়টি আপনি উল্লেখ করেছেন তা ঠিক নয়। কনট্রাক্টর এমন কোন বাড়ি বিক্রির চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেননা যা তার মালিকানায় নেই, বরং জমির মালিক এখানে কনট্রাক্টরের সাথে একটি লিজিং কনট্রাক্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যার ফলে কনট্রাক্টর তার কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাড়ির মালিকের কাছ থেকে কিস্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাবেন যা পারিশ্রমিকের বাস্তবতা অনুযায়ী বাড়ির মালিক কনট্রাক্টরকে দিতে সম্মত হয়েছেন। এটি এমন কোন অস্পষ্ট বিক্রয় চুক্তি নয় যেখানে বাড়ির মালিকানা পর্যন্ত বিক্রেতার নেই।

    বাস্তবতা যদি এমন হয় যে কোন একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তা বিক্রির চুক্তি সম্পাদন হচ্ছে অথচ কনট্রাক্টরের মালিকানাও যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় তাহলে তার বিক্রি অবৈধ।

    আপনাদের ভাই আতা’ ইবনু খলীল আবু আল-রাশতাহ

    ২৪ রজব, ১৪৩৪ হিজরী
    ৩ জুন, ২০১৩ খৃষ্টাব্দ

  • টিকফা চুক্তি ও আমাদের করণীয়

    টিকফা চুক্তি ও আমাদের করণীয়

    ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথা বলে যখন ব্রিটিশরা ভারতে আসে তখন জনগণ প্রথমে খুশিই হয়েছিল। কারণ ইংরেজরা হয়তো এখানে বিনিয়োগ করে এদেশের উন্নয়নই করবে!! কিন্তু জনগণ পরে স্বচক্ষে ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিনিয়োগের অন্তরালে সেসময়ের সুপার পাওয়ার উসমানী খিলাফত [অটোমান] রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারত জয়ের নীল নকশা দেখতে পায়। পরবর্তীতে এই ইংরেজরাই প্রায় ১৫০ বছর সরাসরি ভারত উপমহাদেশ শাসন করে, এমনকি এখনো এদেশের শাসকদের এজেন্ট বানিয়ে তারা আগের মতই শাসন করে যাচ্ছে।

    আমেরিকার টিকফা চুক্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যের চাইতে কি ব্যাতিক্রম কিছু??? আসুন দেখি ……

    সবশেষ হাসিনার কেবিনেটে পাশ হওয়া টিকফা চুক্তির মূল কথাগুলো এরকম:

    [১] চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং সেবা খাতের ঢালাও বেসরকারিকরণ করতে হবে ।
    [২] যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধাসমূহ দূর করতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে ।
    [৩] বেসরকারি খাতের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, (মানে সরকারকে জিরো করে আনার বুদ্ধি)।
    [৪] দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করবে ।
    [৫] যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে শুধু সেবা খাতেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে [ তারা কোনো পণ্য এদেশে উৎপাদন করবে না / সোজা কথা সার্ভিস দিয়ে পয়সা নেয়া ]।
    [৬] বাংলাদেশের দেশীয় শিল্প বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদানকারী বাণিজ্য সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ নীতি বাতিল করতে হবে [অর্থাৎ শিল্পখাত চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে] ।
    [৭] যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির উপর কোনো কর আরোপ করা যাবে না ।
    [৮] বিনিয়োগের বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়া হলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ।
    [৯] দেশের জ্বালানি গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর টেলিযোগাযোগ শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে ।
    [১০] কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করতে হবে এবং কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে ।
    [১১] চুক্তি অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ ।  

    টিকফা চুক্তিতে এ কথা আছে যে, দুই পক্ষের মধ্যে কারো বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যদি কোনো এক পক্ষ ব্যর্থ হয় তাহলে অপরপক্ষ তাকে ‘সহযোগিতা’ দিবে। স্পষ্টতই চুক্তির এই ধারাতে বাণিজ্যের পাশাপাশি ‘বিনিয়োগের সুরক্ষার’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিনিয়োগ ও তার সুরক্ষার বিষয়টি প্রায় সর্বাংশে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে বা অন্য কোনো দেশে বিনিয়োগ করার শক্তি বা ক্ষমতা বাংলাদেশের তেমন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে ও সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ। চুক্তির বিধান অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের সেই বিনিয়োগ সুরক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের। বাংলাদেশ যদি সে কাজে অপারগতা প্রদর্শন করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সুরক্ষার কাজে ‘সহযোগিতা’ দিবে। এই ‘সহযোগিতার’ স্বরূপ কি হতে পারে? ধরা যাক, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানির পিএসসি’র মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে সেই বিনিয়োগের সুরক্ষা করা বাংলাদেশের কর্তব্য হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে বিষয়টি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্নের সাথে সম্পৃক্ত তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ‘সহযোগিতা’ দেয়ার ‘সুযোগ’ খুলে দিবে। চুক্তির এই বিষয়ের সাথে আমরা যদি বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌ উপস্থিতি, নৌঘাঁটি স্থাপন, বাংলাদেশের অরক্ষিত সমুদ্রসীমা রক্ষার কাজে সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ সম্পর্কে একদিকে জোরালো মার্কিনী বক্তৃতা-বিবৃতি এবং অন্যদিকে সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কর্তৃক পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্লক ইজারা নিয়ে নেয়ার কথা একসাথে হিসেবে নেই তাহলে কারো পক্ষেই মার্কিন উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুয়ে দুয়ে চারের অঙ্ক মিলিয়ে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

    বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রাজনৈতিক-সামরিক স্ট্র্যাটেজির প্রধান দিক নির্দেশ হলো- ‘চীনকে নিয়ন্ত্রনে রেখে তাকে নিবৃত করা’ (containing the influence of china)। এজন্য এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাকে সে তার আন্তর্জাতিক তত্পরতার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে এবং এখানেই তার বিদেশে অবস্থানরত নৌসেনার বেশিরভাগ মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশকে এই স্ট্র্যাটেজিতে আরো শক্ত করে আটকে ফেলাটা যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গ্লোবাল যুদ্ধের’ আঞ্চলিক সহযোগী করাটাও তার আরেকটি উদ্দেশ্য। এসব ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশকে নিজেদের পরিকল্পনায় আরো নিবিড় ও কাঠামোগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই ‘টিকফা’ স্বাক্ষরে যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ মরিয়া প্রয়াস। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক গোপন সামরিক চুক্তি রয়েছে। এসবের সাথে ‘টিকফা’ স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সাথে সাথে তার নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন হবে।

    ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ হচ্ছে একটি ঘুমন্ত বাঘ। উন্নত দেশের সঙ্গে অনুন্নত দেশের মধ্যে চুক্তিগুলো মূলত করা হয় গরিব দেশের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। তবে ভাগ্যের বদল হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্গে এবং বিশ্বের অন্যান্য ৭২টি দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ চুক্তি করেছে। তাতে তারা খুব বেশি লাভবান হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায় না। ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ সম্পর্কে সরকারের বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিসহ অনেক বিষয় জড়িত। এ ধরনের চুক্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশ হওয়া যে কোনো বিচারেই ক্ষতিকর। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে মার্কিনিদের স্বার্থরক্ষার জন্যই কাজ করতে হবে।

    ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম এদেশে আসে বাণিজ্য করতে, পরে তারা নিজেদের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো পর্তুগিজ ও অন্যান্য দস্যুর কাছ থেকে রক্ষার জন্য ভারতে ঘাটির নামে দুর্গ বানায়। পরে তারা নিজেদের সম্পত্তি রক্ষার জন্য নিজ দেশের সেনাবাহিনীও ভারতে আনতে থাকে। পরে একসময় সেই সেনাবাহিনীই এক এক করে ভারতের সকল অঞ্চল মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে জয় করে নেয়। আর মুসলিমরা তখন নিজ আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় খুবই দুর্বল হয়ে উঠে, যার সুযোগ ইংরেজরা গ্রহন করে।

    টিকফা চুক্তি ফলে এদেশের বাণিজ্যের উপর অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যাবে, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত অ্যামেরিকাও নিজ বাণিজ্য রক্ষার জন্য এদেশে সেনাবাহিনী নিয়ে আসবে। আর যে দেশে অ্যামেরিকা সেনাবাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে সেদেশের অবস্থা সম্পর্কে কারই খারাপ ধারণা নেই। ইরাক, আফগান দেখলে তা আরও পরিস্কার হবে। চিন্তা করেন আপনার বাসার সামনে দিয়ে অ্যামেরিকার সৈন্য হেটে যাচ্ছে আর আপনার বাসায় আপনার স্ত্রী ও মেয়েরা খুব ভাল আছে!!!! …… এ কি আদৌ সম্ভব????!!!!

    আজকে পৃথিবীতে এমন অবস্থা নেই যে কোন দেশ জয় করে সেখানে কলোনি করে সরাসরি গভর্নর দিয়ে চালানো যাবে, যেমনটা ব্রিটিশরা করত। এখন সময় অ্যামেরিকার, কারণ তারা এখন সুপার পাওয়ার। তারা সরাসরি কোন দেশ জয় করে গভর্নর দিয়ে চালায় না। তারা সে দেশে নিজেদের পছন্দের এজেন্ট বসায় যারা তাদের সকল ইচ্ছা অনিচ্ছা পুরন করবে। যেমন এদেশের দুই নেত্রীর কেউ না কেউ প্রতিবার ক্ষমতায় আসে কোন নেত্রীকে জনগণ ঘৃণা করলে আরেক জনকে অ্যামেরিকা ক্ষমতায় আনে। এদের কাউকে ভাল না লাগলে ডক্টর ইউনুস জাতীয় কাউকে ক্ষমতায় আনবে, যার পাবলিক সাপোর্ট ও অ্যামেরিকার এজেন্টশীপ দুইটাই আছে।

    এখানে জনগনের সাপোর্ট পাওয়ার জন্য কিছু কিছু এজেন্ট অনেক সময় অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করে। এতে অ্যামেরিকা খুবই খুশি হয় সে এজেন্টের প্রতি, কারণ এতে জনগণ বুঝতে পারবে না যে সেই নেতাও অ্যামেরিকার এজেন্ট, কারণ সে তো অ্যামেরিকাকে বকে অথবা অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলে। যেমন, পাকিস্তানের ইমরান খান, নওয়াজ শরীফ, ইরানের আহমাদে নিজাদ ইত্যাদি।

    মুলত পৃথিবীর সবস্থানে যেহেতু অ্যামেরিকার আদর্শ গনতন্ত্র ও পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু যেকোন শাসককে ক্ষমতায় যেতে হলে অ্যামেরিকার আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও অ্যামেরিকাকে সকল প্রকার সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় যেতে হবে। তাই বর্তমান প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত আদর্শে যারা ক্ষমতা চায় তারা সবাই কোন না কোন ভাবে অ্যামেরিকার এজেন্ট, হোক সে ইসলাম পন্থী অথবা সমাজতন্ত্রী।

    সুতরাং আজ এদেশের সকল জনগণকে পূর্বের ভুলকে না ভুলে এতটুকু হলেও উপলব্ধি করা উচিত যে তারা যখন  এই গনতান্ত্রিক  আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কোন প্রার্থীকে ভোট দেয় তারা আর কাউকে নয় একজন স্বঘোষিত সাম্রাজ্যবাদী অ্যামেরিকার এজেন্টকে ভোট দেয়, যে কিনা এদেশের সাধারন জনগনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে  অ্যামেরিকার  খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের জোগান দেয়। 

    এতএব, এই ক্রান্তি কালে মানুষের পূর্বের ইতিহাসকে স্মরন করে শুধুমাত্র একটি কাজই করা উচিৎ আর তা হল সেই ৬২২-১৯২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩০০ বছর গৌরবের সাথে পৃথিবীর বুকে একচ্ছত্রভাবে টিকে থাকা ইসলামিক শাসন খিলাফত ব্যাবস্থাকে ফিরিয়ে আনা। আর এ কাজে যারা নিয়োজিত তাদের সক্রিয় ভাবে সহযোগিতা করা। কারণ এটি সেই বাবস্থা যা সরাসরি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত যা মানব জীবনের একমাত্র জীবনবাবস্থা। তবে তারা এ সহযোগিতা করুক আর না করুক খিলাফত আবারো পৃথিবীতে আসবে এটা রাসুল (সা) এর ভবিষ্যৎবানী যা কখনো ভুল হবার নয়……..

    “তোমাদের মধ্যে নবুয়ত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, তারপর আল্লাহ তার সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়তের আদলে খিলাফত। তা তোমাদের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, অতঃপর তিনি তারও সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর আসবে যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন, তা থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন। এক সময় আল্লাহর ইচ্ছায় এরও অবসান ঘটবে।   তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে জুলুমের শাসন এবং তা তোমাদের উপর থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন। তারপর তিনি তা অপসারন করবেন। 

    “তারপর আবার ফিরে আসবে খিলাফত – নবুয়্যতের আদলে।” (মুসনাদে আহমদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা -২৭৩, হাদিস নং-১৮৫৯৬ )

    রাশেদুল ইসলাম

  • হরতাল – গণতান্ত্রিক নির্যাতনের হাতিয়ার

    হরতাল – গণতান্ত্রিক নির্যাতনের হাতিয়ার

    আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির দুই বিবাদমান জোট (A team vs B team) অস্থির সময় পার করছে। আওয়ামী-বিএনপির রাজনীতির মূল কথা ‘যেকোন উপায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের কল্যাণ সাধন করা’ – এটা জনগণের কাছে পরিস্কার। সচেতন জনগণ পরিবর্তন চায়, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সরকারী দলের লুটপাট এবং বিরোধী জোটের হরতাল নামক নির্যাতন থেকে গণমানুষ মুক্তি চায়। হরতাল ডেকে গাড়ী ভাংচুর, ককটেল বিষ্ফোরণ, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, বাসে ট্রেনে আগুন লাগিয়ে দিয়ে জনমনে আতংক তৈরী করা, সাধারণ মানুষের জান-মালের ক্ষতি করা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি জোটের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। হরতালে সারা দেশে শতশত মানুষ আহত-নিহত হওয়া একটা মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় না থেকেও জনগনকে নির্যাতন করার এই হরতাল নামক হাতিয়ারকে ব্যবহার করাকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নিজেদের পবিত্র গণতান্ত্রিক অধিকার মনে করে।

    ১৯৯১-৯৬ বিএনপি মৌসুমে তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে। এখন চলছে ক্ষমতার পালাবদলের মৌসুম। সর্বদলীয় সরকার নাকি নির্দলীয় সরকার- এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এখন মুখোমুখি অবস্থানে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কিংবা ক্ষমতা দখলের জন্য সাধারণ জনগণের জান-মালের ক্ষতি সাধন করতে, রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে, রুটি-রুজির প্রয়োজনে ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষকে আহত-নিহত করতে এই দুই নিপীড়ক দল ও জোট বেশ দক্ষ ও অভিজ্ঞ। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এ বছর এরই মধ্যে হরতাল ও রাজনতৈকি সহিংসতায় মারা গেছে প্রায় ৪০০ মানুষ। প্রকৃত চিত্রটি আরও ভয়াবহ।

    বিগত ২৭, ২৮ ও ২৯ শে অক্টোবরের হরতালের পর বিএনপি জামাত আবার ৪ থেকে ৬ই নভেম্বর হরতাল পালন করেছে। এই মূহুর্তে ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৮৪ ঘন্টার হরতাল চলছে। এই ‘হরতাল উৎসবের’ মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের কোন রাজনৈতিক ক্ষতি বিএনপি করতে না পারলেও দেশের খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগণের ক্ষতি করেছে, সাধারণ মানুষের গাড়ী ভাংচুর করেছে, রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধীদলে থাকলে হরতাল, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস তৈরি করে তাদের রাজনৈতিক শক্তির জানান দেয়। এই দুই নিপীড়ক দল শুধু সন্ত্রাস ই প্রতিপালন করে না বরং এরা সন্ত্রাসী দল। জনগণকে তারা তাদের ক্রীতদাস মনে করে।

    গণতন্ত্র মানেই মানুষ মানুষের জন্য আইন তৈরী করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পার্লামেন্ট, কেবিনেট আইন তৈরীর কারখানা। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে মানুষের জন্য আইন তৈরীর অধিকার দেয়নি। তাই গণতান্ত্রিক সরকার (হোক আওয়ামী সরকার কিংবা বিএনপি সরকার) অবশ্যই জনগণকে যুলুম করছে এবং তারা যালেম। তাই গণতান্ত্রিক শাসক পরিবর্তন নিয়ে হৈচৈ করে আমরা AL ও BNP-র ক্রীতদাস হতে চাইনা। আমাদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখান করতে হবে। যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের বিগত দুই দশকের শাসনামলে হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যা করেছে তাদের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করতে হবে।

    খিলাফত (ইসলামী রাষ্ট্র) পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে হবে। খিলাফত রাষ্ট্রই এ দেশের নিপীড়িত, নিগৃহীত, লাঞ্চিত মুসলমানদের মার্কিন-ভারত দালাল আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুঃশাসন, নির্যাতন থেকে মুক্তি দিবে এবং ইসলাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের নেতৃত্বের স্তরে নিয়ে আসবে যেভাবে ‘অধঃপতিত আরব’- বিশ্বের নেতৃত্বশীল পর্যায়ে এসেছিল এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তেরশ বছর টিকেছিল। আমাদেরকে আবারো সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে সে রাষ্ট্রের ওয়াদা করেছেন যদি আমরা আল্লাহ্‌র নির্দেশ অনুসরণ করি এবং মানব রচিত মতবাদ ছুঁড়ে ফেলে ইসলামকে আমাদের জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেই।

    “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আল্লাহ্‌ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন, যেমন তিনি খিলাফত দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে…।” [সূরা আন নূর : ৫৫]

  • প্রাক-নির্বাচনী নাটকের পুনঃর্মঞ্চায়ন

    প্রাক-নির্বাচনী নাটকের পুনঃর্মঞ্চায়ন

    প্রতি নির্বাচনের পূর্বে আমরা আওয়ামী-বিএনপিসহ অন্যান্যদের দেখতে পায়, সংলাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন হামকো-তুমকো কর্মকান্ডে, যদিও সারাবছর জনগণের স্বার্থে তাদের কোন খবর থাকেনা। বরং তাদের দাসত্ব করতে দেখা যায় তাদের প্রভু আমেরিকা-ভারতের; এর কারণও আছে বৈকি!

    নির্বাচনের পূর্বেই আমেরিকার নিকট দেয় প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতেই তাদের এই ঋণ শোধের দাসত্ব। সরকারে আওয়ামী-বিএনপির যেই আসুক না কেন, ২০ বছর অবধি আমরা এই দাসত্বই দেখে আসছি দেশের স্বার্থ তাদের সামনে বলি দেওয়ার মাধ্যমে। অর্থ্যাৎ, আওয়ামী-বিএনপির জন্যই আমেরিকা আর আমেরিকার স্বার্থেই আওয়ামী-বিএনপি।

    শুধু বাংলাদেশ নয়, তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করেই আমেরিকার এই চক্রান্ত, যার অংশস্বরূপ বাংলাদেশ। আরব বিশ্ব থেকে বিতাড়িত আমেরিকা আজ এশিয়া উপমহাদেশে তার ঘাঁটি গড়তে পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে সে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেকে টার্গেট করেই আগাচ্ছে। কারণ, এই দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে সামরিক শক্তি, কৌশলগত অবস্থান, খনিজের উৎস হিসেবে এই ভূমিদ্বয় আমেরিকার নিকট গুরুত্বপূর্ণ। আর তাছাড়া অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এই অঞ্চলে ইসলামী রাস্ট্রব্যবস্থা খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকানোর চক্রান্তের অংশ হিসেবে তার এই অঞ্চলে পাঁয়তারা।

    আমেরিকা তার এই এজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে তার দুই দালাল হাসিনা-খালেদাকে ৫ বছর পর পর নতুনরূপে নিয়ে আসে জনগণের সামনে, এবং তারা পিলখানা-টাইগার শার্ক-ক্যারাটের মাধ্যমে দেশের সম্পদ-স্বার্থ সমর্পণ করে আমেরিকার সামনে আর আমরাও তাদের উপর বিশ্বাস করি পুনর্বার, বারবার।

    ‌”হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু…”  (সূরা মায়েদা: ৫১)

    “আপনি মানবজাতির মধ্যে ইহুদী ও মুশরেকদেরকে মুসলমানদের অধিক শত্রু হিসেবে পাবেন……” (সূরা মায়েদা: ৮২)

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন,

    মুমিন কখনো একই গর্তে দু’বার পা দেয়না”।

    ১৯৭১ পর থেকে ২০১৩ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আধারে ক্ষমতার পালাবদলে আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজে আসছি। কিন্তু বাস্তব সত্য হল মিথ্যা স্বাধীনতা, মিথ্যা অধিকার, এক জাতি-ভূমির মিথ্যা শ্লোগানে আজ অবধি আমরা শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছি নিজেদের জন্যই কসাই নির্বাচন এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের ছায়াতলে বিভক্ত হওয়ার মাধ্যমে।

    আমরা যতই বলি না কেন সকল ক্ষমতা জনগণের,জনগণের ভোটেই সরকার পরিবর্তন হয় তা মূলত eye wash ছাড়া আর কিছু না। নির্বাচনের পূর্ব মূহুর্তে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরী করা হয়, দেশের একমাত্র সমস্যা হলো একটা সুষ্ঠ নির্বাচন এবং নির্বাচন হলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আওয়ামীলীগ বা বি,এন,পি যে দলই ক্ষমতায় আসুক সীমান্তে হত্যাকান্ড কি বন্ধ হবে, দ্রব্যমূল্যের দাম কি জনগনের হাতের নাগালে আসবে,ইসলামী আকিদা কি সুরক্ষিত থাকবে, আমাদের নদীগুলোতে কি প্রাণ সঞ্চার হবে, জনগনের জান-মালের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হবে, যদি উত্তর হয় ‘না’, তবে কিসের এই সাজানো নির্বাচন, কার জন্য এই নির্বাচন, আমাদের ছুড়ে ফেলে দেয়া দরকার এই নির্বাচনকে।

    আসলে আওয়ামীলীগ, বি.এন.পি যতই মুখে বলুক ক্ষুধা, দারিদ্র মুক্ত, ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করবে,এটা কখনোই সম্ভব নয়, কারণ যেই পুঁজিবাদী তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিয়ে সরকার পরিচালিত হয় সেই ব্যবস্থাই আজকে প্রশ্নের সম্মুখীন। যেই ব্যবস্থা আমেরিকার মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না, অর্থনৈতিক মন্দা দূর করতে পারছে না, সেই ব্যবস্থা কি ভাবে আমাদের সমস্যার সমাধান করবে?

    আমাদের ফিরে যেতে হবে আমাদের বিশ্বাসের নিকট, বিশ্বাস থকে আসা ব্যবস্থার নিকট, যা রাসূল (সা) মদীনায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

    তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শাসন-কর্তৃত্ব দান করলে তারা নামায আদায় করবে যাকাত দেবে এবং সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎকাজকে নিষেধ করবে” (সূরা হাজ্জ: ৪১)

    খিলাফাহ রাষ্ট্র সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধ করবে, জনগনের মৌলিক অধিকার পূরণে সদা সচেষ্ট থাকবে এবং আকীদাকে সুরক্ষিত রাখবে।এ রাষ্ট্রের শাসকের জবাবদীহিতা শুধুমাত্র জনগণের নিকট থাকবে না, থাকবে আল্লাহর নিকট। এ রাষ্ট্র সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে বসিয়ে রেখে উম্মাহর আর্তনাদের দিকে চেয়ে থাকবে না বরং সেনাবাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে উম্মাহর জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিবে।

    তাই আমাদের উচিত পাতানো নির্বাচনী নাটককে জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নামার মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দেয়া।

    হে ইমানদারগণ, যখন আল্লাহ ও তার রাসূল এমন কোন কিছুর দিকে তোমাদেরকে আহবান করেন যা তোমাদের মধ্যে জীবনের সঞ্চার করে তখন সেই আহবানে সাড়া দাও” (সূরা আনফাল: ২৪)

  • প্রশ্ন-উত্তর: খিলাফত প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ভূমিকা কী?

    প্রশ্ন-উত্তর: খিলাফত প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ভূমিকা কী?

    প্রশ্ন: এমন অনেকেই আছে যারা বলে, হিযব তার খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিতে মাদানী যুগকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র মক্কী যুগকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এটি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদকে শরীয়া’হ-র সাথে সাংঘর্ষিক মনে করে যার কারণ হিসেবে তুলে আনা হয় রাসূল (সা) তা করেননি। প্রশ্নকর্তা আরও বলেন: কেন হচ্ছে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির জন্য মাদানী যুগকে নেয়া হইনি যেখানে জিহাদ করা জায়েজ এবং ফরজ ছিল? এর কি কোন সুস্পষ্ট উত্তর আছে? ওয়া জাযাকাল্লাহু খাইরান।  

    উত্তর:

    প্রশ্নে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ:

    ১. যেকোন যথার্থ দলীল আমাদেরকে অবশ্যই মান্য করতে হবে যদি তা কুরআন বা সুন্নাহ থেকে উঠে আসে। এক্ষেত্রে আমাদেরকে লক্ষ্য রাখা উচিত নয় তা কি মক্কী যুগের নাকি মাদানী যুগের।

    ২. দলীল খোঁজার ক্ষেত্রে আমাদের সেইসব দলীলই খোঁজা উচিত যা ঐ মাসআলা বা ইস্যুর সাথে জড়িত, সেসব দলীল আমাদের দরকার নাই যা ঐ মাসআলা বা ইস্যুর সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়-

    ক. উদাহরণস্বরূপ: আমি যদি ওযু কিভাবে করতে হয় তা জানতে চাই, তবে আমি সেসব দলীল অন্বেষন করব যা ওযুর সাথে সম্পর্কিত, সেটি মক্কায় অবতীর্ণ হোক কিংবা মদীনায় অবতীর্ণ হোক। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শরীয়া’হ পদ্ধতি অনুসরণ করে আমি একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারব… কিন্তু আমি রোজার সাথে জড়িত দলীল থেকে ওযুর হুকুম ও প্রণালী বের করতে গবেষনা করব না।

    খ. আবার যেমন: আমি যদি হজ্জ্ব কিভাবে করতে হয় তা জানতে চাই, তবে আমি সেসব দলীল খুজব যা হজ্জ্বের সাথে সম্পর্কিত, সেটি মক্কায় অবতীর্ণ হোক আর মদীনায় অবতীর্ণ হোক। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে আহকাম বের করে আনা হবে… কিন্তু আমি সালাতের সাথে জড়িত দলীল থেকে হজ্জ্বের প্রস্তুতি ও নিয়মাবলী বের করতে চেষ্টা করব না।

    গ. আরও উল্লেখ করা যায়, আমি যদি জিহাদের বিষয়ে জানতে চাই, সেটি ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক ফরযিয়াত হিসেবে হোক কিংবা আক্রমনাত্নক বা রক্ষনাত্নক হোক কিংবা বিজয়ের জন্য বা ইসলাম প্রচারের জন্য হোক, বিজয়টি বলপ্রয়োগ বা আপোসরফার মাধ্যমে হোক…আমি সেসব দলীল খুজব যা জিহাদের সাথে সম্পর্কিত, এক্ষেত্রে মক্কী যুগের বা মাদানী যুগের দলীল বলে পার্থক্য করা আমার জন্য সমীচিন নয়। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে আইনসমূহ বের করে আনা হবে… কিন্তু আমি কখনোই যাকাতের দলীল ব্যবহার করে জিহাদের হুকুম ও এর বিস্তারিত বের করে আনার গবেষনা করব না।

    ঘ. এটিই হলো সকল মাসআলা বা ইস্যুর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নীতি, অর্থাৎ দলীল গবেষনা করা, হোক তা মাক্কী কিংবা মাদানী এবং সেই দলীল হতে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে শরীআহ’র আইন বের করা আনা।

    ৩. এখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আলোচনায় আসা যাক এবং সে সম্পর্কিত দলীল খোঁজার চেষ্টা করি, তা সেটি মক্কায় কিংবা মদীনায় অবতীর্ণ হোক এবং সেই দলীল থেকে উৎসারিত হুকুম বের করি যা প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হয়েছে।

    ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে সব দলীল আমরা পাই তা পবিত্র মক্কা নগরীতে আল্লাহর রাসূলের জীবনকাল ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তিনি প্রথমে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন, তারপর বিশ্বাসী, দৃঢ়চেতা একটি দল গঠন করেন, এরপর তিনি মক্কা ও এর আশেপাশে ইসলামকে প্রকাশ্যে ঘোষনা করেন…এরপর ক্ষমতাধর, সামর্থ্যবান ব্যাক্তিবর্গের কাছ থেকে সাহায্য (নুসরাহ) খোঁজার প্রায়াস চালান। পরিশেষে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তার উপর মদীনা আনসার বাহিনীর মাধ্যমে তার উপর রহম করেন, তাই তিনি তাদের দিকে হিজরত করেন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

    রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এটিই দলীল এবং এর বাইরে আর কোন দলীল নেই। রাসূল (সা) তার জীবনকালে এটি আমাদের পরিষ্কার দলীলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন এবং তা আমাদের আঁকড়ে ধরতে হবে। তাই ইস্যুটি জিহাদের হুকুম আসার আগে মক্কী যুগের কিংবা জিহাদকে ফরজ করার পর মাদানী যুগের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং এটি রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীলাদির অনুসন্ধান-গবেষনার ফল যা শুধুমাত্র মক্কায় পাওয়া যায় যতক্ষন না রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করেন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

    এ বিষয়টি ও জিহাদ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আগেই উল্লেখ করেছি, খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির দলীল তার সাথে সম্পর্কিত দলীলাদি থেকে এবং জিহাদের দলীল তার সাথে সম্পর্কিত দলীলাদি থেকে নিতে হবে। তারা একে অপর থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। তাই খিলাফতের অনুপস্থিতিতে জিহাদ থেমে থাকবে না কারণ রাসূল (সা) বলেছেন-

    «وَالْجِهَادُ مَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ، لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ»

    আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল কর্তৃক আমার প্রেরণ হওয়া হতে যতক্ষন পর্যন্ত না আমার উম্মতের শেষ অংশ দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করবে, ততক্ষন পর্যন্ত জিহাদ চলতে থাকবে, জালেমের জলুম কিংবা ন্যায়পরায়নের ন্যায়বিচার তা কখনোও বন্ধ করতে পারবে না”। (বায়হাকি তার সুনান আল-কুবরা’য়, আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত)।

    সুতরাং, শরীয়া’হর গন্ডির মধ্যে জিহাদ চলতে থাকবে যদিওবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা হোক বা না হোক।

    এবং শাসকগোষ্ঠী জিহাদ করা ছেড়ে দিয়েছে তাই আমরা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা ছেড়ে দেব তাও নয়। যতক্ষন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না ততক্ষন খিলাফত এর কাজ চলতে থাকবে কেননা কাধে খলীফার বা’য়াত বিহীন অবস্থায় মুসলিমদের থাকা হারাম যারা (এর জন্য কাজ করতে) সক্ষম। মুসলিম আবদুল্লাহ বিন উমর হতে বর্ণনা করেন, আমি শুনেছি রাসূল (সা) বলেন,

    «مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا حُجَّةَ لَهُ، وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ، مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً»

    যে আনুগত্য থেকে হাত তুলে নিল তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে দেখা করবে এমন অবস্থায় যে তার স্বপক্ষে কোন দলীল নেই এবং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যখন তার কাধে বা’য়াত নেই, সে এক জাহেলী মরন মরল”।

    তাই জিহাদও চলবে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ ততক্ষন পর্যন্ত চলবে যতক্ষন না তা প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি আর একটির উপর নির্ভরশীল নয়, তারা দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রত্যেক ইস্যুর জন্যই তার শরীয়াহ দলীল অন্বেষন করা হয় এবং সেসব দলীল হতে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য হুকুম বের করে আনা হয়।

    ৪. তাই হিযব সেই পদ্ধতির প্রতি অনুগত যা রাসূল (সা) মক্কায় দেখিয়ে গিয়েছেন মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার আগ পর্যন্ত, খিলাফত প্রতিষ্ঠায় কোন সশস্ত্র সংগ্রাম না করার সাথে মক্কী যুগের কিংবা মাদানী যুগের কোন সম্পর্ক নেই। বরং নবী (সা) মক্কায় যে পদ্ধতি দেখিয়ে গিয়েছেন মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত – এ ছাড়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আর কোন দলীল নেই। সুতরাং ইস্যুটা হচ্ছে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি, এবং তিনি (সা) মক্কায় যে পদ্ধতি দেখিয়ে গিয়েছেন তা ছাড়া আর কোনো পদ্ধতি নেই।

    যদি ইস্যুটা হতো ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ কিংবা তার কাঠামোসমূহের তখন আমরা মদীনায় রাসূল (সা) যা দেখিয়ে দিয়েছেন তা দলীল হিসেবে নিতাম কারণ রাষ্ট্র সেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

    ৫. পরিশেষে:

    ক. একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট দলীল বা প্রমান দরকার সেটি মক্কা বা মদীনায় অবতীর্ণ হোক না কেন। যেমন- রোজার জন্য রোজা সম্পর্কিত দলীল, সালাতের জন্য সালাত সম্পর্কিত দলীল, অনুরূপভাবে জিহাদের জন্য জিহাদ সম্পর্কিত দলীল এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত দলীল অনুসন্ধান করা ইত্যাদি।

    খ. নবী (সা) মক্কায় থাকাকালীন পদ্ধতির প্রতি অনুগত থাকার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পবিত্র মক্কা শহরে যা দেখানো হয়েছে তাছাড়া এর জন্য আর কোন দলীল পাওয়া যায় না। যদি মদিনায় সেরূপ দলীল থাকতো তবে তাও গবেষনার বিষয় হিসেবে আমলে নেয়া হত।

    আমরা আল্লাহ সর্বশক্তিমানের সাহায্য ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাফল্য জন্য কামনা করি, একটি খিলাফতে রাশেদার কামনা করি যা ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মান পুনর্বহাল করবে, কাফের ও কুফ্ফারকে অপদস্থ করবে যাতে করে বিশ্বে কল্যাণ ব্যপ্তি লাভ করে এবং এটি আল্লাহ-র কাছে অতীব প্রিয়।

    ১৭ই জুল-কাদা, ১৪৩৪ হিজরী
    ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

  • সুমাইয়া বিন্‌তু খুব্‌বাত (রা)-এর ঈমানী দৃঢ়তা

    সুমাইয়া বিন্‌তু খুব্‌বাত (রা)-এর ঈমানী দৃঢ়তা

    সুমাইয়া বিন্‌তু খুব্‌রাত (রা) আবু হুজাইফা ইবনুল মুগীরা আল মাখযুমীর দাসী ছিলেন। ইয়াসির (রা) ছিলেন ইয়ামানের অধিবাসী। একবার তিনি মক্কায় এসে এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

    বাইরের কেউ মক্কায় স্থায়ীভাবে থাকতে হলে কোনো না কোনো গোত্রের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হতো। ইয়াসির (রা) আবু হুযাইফা ইবনুল মুগীরার সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং মক্কাতে বসবাস শুরু করতে থাকেন।

    আবু হুযাইফা তার দাসী সুমাইয়া (রা)-কে ইয়াসির (রা)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। সুখেই কাটছিলো তাঁদের দিনগুলো।

    ইতোমধ্যে মুহাম্মাদুর রাসূল (সা) নবুয়্যত লাভ করেন। গোপনে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। ইয়াসির (রা) ও সুমাইয়া (রা) ইসলামের কথা অবগত হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।

    এক সময়ে তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আবু জাহল ও তার সঙ্গীরা তাঁদেরকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য চাপ দিতে থাকে। তাঁরা তাঁদের ঈমানের ওপর অটল থাকেন।

    অতঃপর, তাঁদেরকে দিনের বেলা লোহার পোষাক পরিয়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেয়া শুরু হয়। খুবই যন্ত্রণাদায়ক ছিল এই শাস্তি। প্রচণ্ড উত্তাপে তাঁদের শরীর দুমড়ে যেতে থাকে। কিন্তু তাঁদের ঈমানে এতোটুকু চিড় ধরেনি।

    একদিন আবু জাহল ইয়াসির (রা)-কে ধরে বেদম পিটুনি দেয়। আর বলতে থাকে ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিতে। আল্লাহ্‌র প্রেমিক ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিলেন না। অনবরত চলতে থাকে পিটুনি। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে যায় তাঁর শরীর। এক পর্যায়ে এসে তিনি শহীদ হয়ে যান।

    ইয়াসির (রা)-এর স্ত্রী সুমাইয়া (রা)-কে সারাদিন রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেওয়া হতো। সন্ধ্যায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হতো।

    একদিন শাস্তি ভোগ করে ক্লান্তদেহে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। আবু জাহল তাঁকে দেখে গালমন্দ করতে থাকে। ইসলাম ত্যাগ করতে বলে। সুমাইয়া (রা) তার কথায় কান দিলেন না। ভীষণ ক্ষেপে যায় আবু জাহল। তার হাতে ছিল বল্লম। সে বল্লমটি ছুঁড়ে দেয় সুমাইয়া (রা)-কে লক্ষ্য করে। বল্লমটি তাঁর লজ্জাস্থান ভেদ করে পেছনের দিকে চলে যায়। প্রবল বেগে ঝরতে থাকে রক্ত। 

    এই কঠিন অবস্থাতেও তিনি আঁকড়ে থাকেন ঈমানের ঐশ্বর্য। সুমাইয়া বিন্‌তু খুব্‌বাত (রা) শহীদ হন। আল্লাহ্‌র সন্তোষ অর্জন করে পৌঁছে যান জান্নাতের ঠিকানায়।

    মূল: এ কে এম নাজির আহমেদ কর্তৃক লিখিত আসহাবে রাসূলের জীবনধারা