তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কি অস্ত্র ধরতে হবে?

যদিও মুসলিমরা ১৯২৪ সালে তাদের রাষ্ট্র হারিয়েছিল তাদের হৃদয়ে তাদের দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা টিকে ছিল ঠিকই এবং এর দ্বারা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল খিলাফতের পুনঃআগমনের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এইসব আন্দোলনগুলো খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বলে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য জিহাদকেই একমাত্র পথ দাবি করে। যারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন তাদের আন্তরিকতা ও ত্যাগ সন্দেহের উর্ধ্বে। বর্তমানে যেহেতু অধিক থেকে অধিকতর মানুষের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এই দায়িত্ব পালন করতে তারা সঠিক পদ্ধতির খোঁজ করছেন। তাই এই সকল পদ্ধতি কুরআন ও সূন্নাহ’র আলোকে মূল্যায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুতরাং এই প্রবন্ধে আমি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় “জিহাদ” এই বিষয়ে আলোচনা করব।
যারা মুসলিম ভূমির বর্তমান শাসকদের অস্ত্রের মাধ্যমে সরানোর কথা বলেন তারা এইসব দেশের শাসকদের কাফির হিসেবে গণ্য করেন। কারণ তাঁরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার আইন অনুসারে শাসন করে না। তাঁরা প্রমাণ হিসেবে কুর’আনের নিচের আয়াতটি উল্লেখ করেন,
“এবং যারা আল্লাহর যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে বিচার ফয়সালা করেনা তারা কাফের” (আল মায়িদা-৪৪)
অতঃপর তাঁরা এই শাসকদের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) অ্যাখ্যা দেয় এবং বলেন যে মুসলিমদের অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে কারণ রাসূল (সা) একটি হাদীসে বলেছেন “যে ধর্ম ত্যাগ করে তাকে হত্যা কর যতক্ষন না সে প্রায়শ্চিত্ত করে”। এছাড়াও তারা একটি হাদীস বলেন যা মুসলিমদের আদেশ করে তাদের শাসকদের সাথে জিহাদ করতে যখন তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কুফরি দেখা যায়। বুখারিতে বর্ণিত জুনাদা বিন আবি উমাইয়া এর বরাতে, তিনি বলেন, “আমরা উবাদাহ ইবনুস সামিত এর কাছে গেলাম যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আমরা বললাম আল্লাহ আপনাকে হিদায়াহ দান করুন। আপনি আমাদেরকে রাসূল (সা) এর একটি হাদীস বলুন যার মাধ্যমে আল্লাহ আপনাকে উপকৃত করবেন। তিনি বলেন, “একদা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের সকলের কাছ থেকে বা’ইয়াহ (শপথ) নিলেন যে যাতে আমরা সুখে দুঃখে তার কথা শুনি এবং মানি, সহজ, কঠিন এবং খারাপ অবস্থাতেও যাতে তাঁর আনুগত্য করি। আমরা আরো শপথ করেছি যে আমরা কখনো শাসকদের সাথে বিবাদে যাবনা যতক্ষন পর্যন্ত না তাদের মাঝে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হচ্ছে, আমাদের কাছে যা আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত।
অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের সর্বোত্তম নেতা (ইমাম) আমীর হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ভালবাস এবং তারাও তোমাদের ভালবাসে, যারা তোমাদের জন্য দোয়া করে এবং তোমরা তাদের জন্য দোয়া কর। আর তোমাদের সবচেয়ে মন্দ/খারাপ নেতা হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। যাদেরকে তোমরা বদ-দোয়া কর এবং তারাও তোমাদের জন্য বদ-দোয়া করে। তাকে (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল,“হে আল্লাহর রাসূল (সা) আমরা কি তাদের তরবারী দ্বারা অপসারণ করবনা?” তিনি বলেন, “ না, যতক্ষন না তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং যদি তোমরা তাদেরকে এমন কাজ করতে দেখ যা তোমরা ঘৃণা কর তাহলে তার কাজকে ঘৃণা করিও এবং তার কাছ থেকে আনুগত্যের হাত সরিয়ে নিওনা ”(সহীহ মুসলিম)। উপরের হাদীসটি এটাই অর্থ করে যে,ঐ শাসক যে প্রকাশ্য কুফরি করে এবং আল্লাহ ব্যাতিত অন্য আইনে শাসন করে তার সাথে অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে এবং তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তার মানে কি আমরা বর্তমানে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব? কারণ তারা শরীয়াহ দ্বারা শাসন করছেনা।
প্রথমত, আমরা ঐ দাবী টা দেখি যে বর্তমান শাসকরা মুর্তাদ হয়ে গেছে কারণ তারা আল্লাহর আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করছেনা । ইবনুল কাইয়্যিম এই ব্যাপারে যে সঠিক মতটি দিয়েছেন তা হল:
“সঠিক মত হল যে, আল্লাহ প্রদত্ত আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে শাসন করা বড় এবং ছোট উভয় কুফরীর অন্তর্ভূক্ত, এটা নির্ভর করে যে বিচার করে তার অবস্থানের উপর। যখন সে মনে করে যে ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা বিচার করা বাধ্যতামূলক’ কিন্তু সে এই পথ থেকে অবাধ্যতার দরুন সরে যায় এবং এটা স্বীকার করে যে এই জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে তাহলে এটি হবে ছোট কুফর। কিন্তু সে যদি মনে করে যে ‘এটা বাধ্যতামূলক না’ এবং পছন্দের মালিক সে নিজে, যদিও সে নিশ্চিত যে এটাই আল্লাহর আইন তাহলে এটি বড় কুফর” (মাদারীজ আস সালিকীন, ১/৩৩৬-৩৩৭)
আমরা ইবনুল কাইয়্যিম এর মতের সাথে আরো যোগ করতে পারি যে, যখন আমরা সূরা মায়িদার ঐ পরিচ্ছেদ পড়ি যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো আইন দ্বারা শাসনের কথা বলা হচ্ছে, আমরা দেখি যে যারা তাঁর আইন অনুসারে বিচার ফায়সালা করেনা তাদের তিনি কাফির, জালিম ও ফাসিক বলেছেন। তাই যদি একজন শাসক কুফর দ্বারা শাসন করে দূর্নীতির কারণে অথবা বিরোধীদলের ভয়ে অন্যায় করে যদিও স্বীকার করে যে তার এই কাজ গুনাহ এবং ঘৃণা/নিন্দাযোগ্য তবে সে হবে ফাসিক, জালিম বা কাফির নয়। অন্যদিকে সে যদি কুফর দ্বারা শাসন করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর আইন দ্বারা শাসন করা বাধ্যতামূলক নয় অথবা কুফরী আইন আ-ল্লাহর আইনের চেয়ে ভালো তবে সে নিজেকে ইসলামের বন্ধন থেকে ছিড়ে ফেলল এবং সে মুরতাদ হয়ে গেল। পরের ভাগটিকে প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের কাছে স্পষ্ট যে হাদীস আছে তা হল,
“যতক্ষন আমরা স্পষ্ট কুফর দেখতে পাব যার পক্ষে আমাদের কাছে আল্লাহ কর্তৃক দলীল আছে”
তাছাড়া কাউকে কাফির তকমা লাগিয়ে দেওয়া (কোন প্রকাশ্য দলীল ছাড়া) ইসলামে জায়েজ নেই। এছাড়াও তারা যদি কাফির হয়ে থাকে আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত যে ‘উম্মাহর মধ্যে থেকে কিছু মানুষ অথবা গোষ্ঠী বা দল কি খলীফা বা ইমামের অনুপস্থিতিতে এবং তার অনুমতি ছাড়া মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে? আমরা জানি যে, মুরতাদের শাস্তি সহ অন্য সব হুদুদ বাস্তবায়ন করা ইমামের একচ্ছত্র দায়িত্ব। যদিনা অন্য কোথাও বিশেষভাবে এর বর্ণনা থাকে। রাসূল (সা) এর নিচের হাদীসটি এই ব্যাপারটি পরিস্কার করে,
“ইমামের অনুপস্থিতিতে (রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ব্যতিত) কারো অধিকার নেই হুদুদ বাস্তবায়ন করা”। (বায়হাকী কর্তৃক তাঁর সুনানে বর্ণিত)
ইমাম তাহাবীও মুসলিম ইবন ইয়াসার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেন, “যাকাত (সংগ্রহ), হুদুদ (বাস্তবায়ন), গনীমত (যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি (বন্টন), জুমা (ইমামতি), এগুলো হল ইমাম (সুলতান) আমীরের”।
দ্বিতীয়ত, আমাদেরকে যে সব শাসক প্রকাশ্যে কুফর করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যে হাদীসে আদেশ করা হয়েছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুঝা উচিত। আমরা যদি একটু সচেতনভাবে ঐ হাদীসটির দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে এখানে ঐ শাসকের কথা বলা হয়েছে যারা জনগনের বৈধ বা’ইয়াহ নিয়ে এসেছে এবং তারা ইসলাম অনুসারে শাসন করত কিন্তু পরবর্তীতে কুফর দ্বারা শাসন করতে থাকে। তার মানে হচ্ছে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে খলীফার সাথে যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিন্তু খলীফা পরিস্কার কুফর করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট এই হাদীসের প্রেক্ষাপট থেকে ভিন্ন। বর্তমানে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে আছি যেখানে খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তা কুফর শাসন দ্বারা পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বর্তমান শাসকেরা কখনোই জনগন থেকে শর’ঈ বা’ইয়াহ নেয়নি। তাদের কেউই মোটেও ইসলামকে বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসলামকে বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টাও করেনি। তাই বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুই বিপদগামী শাসককে প্রতিস্থাপন করার চাইতেও অনেক বড়। বরং এটি হচ্ছে সমস্ত কুফর ব্যবস্থা যা মুসলিম ভূমিগুলোতে আরোপিত আছে তাকে সমূলে উৎপাটন করা এবং খিলাফাহ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এইসব আন্দোলনগুলো যেগুলো ইসলামী খিলাফাহ কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে জিহাদের পক্ষালম্বন করে তারা তাদের পদ্ধতিকে ঠিক প্রতিয়মান করতে শরীয়ার একটি মূলনীতি বলে থাকে যা হল-
“কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”।
কিন্তু এটি নিতান্তই ভ্রান্ত যে, কোন সাধারণ মূলনীতি দিয়ে কোন একটি বিশেষ ইস্যুর নির্দিষ্ট মত (হুকুম) দেয়া এবং এই ইস্যুকে নিয়ে অন্যান্য যা বিশেষ টেক্সট আছে তাকে বাদ দেওয়া অথবা কোন বিশেষ টেক্সট না থাকলে ইসলামের অন্যান্য মূলনীতিকে গ্রাহ্য না করা। ড. হেকাল যিনি আমাদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে একটি থিসীস করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একটি ইস্যুতে এই পদ্ধতিতে পরস্পর বিরোধী উপসংহারে আসে তা বিবৃত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ এই ইস্যু যা হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ‘অস্ত্রের ব্যবহার’। এটা অনেকে বলতে পারে যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ কারণ এটা রাসূল (সা) এর হাদীস থেকে প্রমাণিত “যে আমাদের (মুসলিমদের) দিকে অস্ত্র উত্তোলন করে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়”। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরয এবং এটি প্রতিষ্ঠা কখনোও সম্ভব নয় অস্ত্র ছাড়া যা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এখানে একই ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয়ই বিষয় চলে আসছে এবং ইসলামের একটি মূলনীতি হল “যখন কোনো একটি ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয় বিষয় চলে আসে তবে অবৈধতা বৈধতাকে অগ্রাহ্য করবে। তার মানে তখন একজনকে অবশ্যই অবৈধতার হুকুম অনুসারে কাজ করতে হবে এবং তখন অস্ত্র ব্যবহার অবৈধ হবে”। এছাড়া কিছু মানুষ বলতে পারে যে আল্লাহর আইন প্রয়োগের জন্য এই ফরয পালন/বাস্তবায়ন একটি সওয়াবের কাজ এবং যা নিষিদ্ধ তা করা মানে উম্মাহর রক্ত প্রবাহিত করা গুনাহ/ফাসিকি। ইসলামী শরীয়াহ বলে যে “ফাসিকি বা গুনাহকে বাধা দেয়া/ দমন করা আমাদের সওয়াব অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। “যে কাজ ফরয তা করতে যা করার দরকার হয় তাও ফরয” এটি তখনই নেয়া যাবে যখন এই ইস্যুতে কোন পার্থক্য থাকবেনা যে এটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এটি বৈধ কোনো মাধ্যম ছাড়া অর্জন করা যাবেনা। তখনই কেবল বলা যায় যে “কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”। তার মানে কোন বৈধ কাজ যা কোন ফরয কাজ করার মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয় তখন ঐ কাজটি ফরয হয়ে যায়। কিন্তু যখনই এই ফরয কাজটি এমন কোন কাজ ছাড়া করা সম্ভব নয় যা নিজ থেকেই নিষিদ্ধ যেমনটা আমরা এই প্রবন্ধে যা নিয়ে আলোচনা করছি অস্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে- অমারা কি এখন এই ফরযটি পালন করতে এই কাজটি করতে পারি শরীয়ার এই মূলনীতিকে বাদ দিয়ে? আল্লাহর শপথ না! যতক্ষন পর্যন্ত এই কাজটি অন্য আরেকটি মূলনীতি“ প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ/ অবৈধকে বৈধ করে” এর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। হ্যাঁ, তবে যদি এই সম্বন্ধে তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে কোন বিশেষ টেক্সট বা দলিল থেকে থাকে এবং যা অস্ত্র ব্যবহারের সাধারণ মূলনীতিতে এই বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করা থেকে বিরত রাখে তাহলে এই দলীলটি হবে ব্যাতিক্রম এবং এটি “যা ফরয তা পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয” এই মূলনীতিতে পড়ে না। সংক্ষেপে শুধুমাত্র ‘ফরয পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয’ এই মূলনীতিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করে এবং অন্যান্য যে নির্দিষ্ট দলীলগুলো আছে তা অগ্রাহ্য করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধকেই একমাত্র পন্থা হিসেবে বেছে নেওয়াকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। এছাড়াও যারা মুসলিম ভূমিতে সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বলে তারা আরেকটি যুক্তি দেয় যে, মুসলিম ভূমিগুলো আজ দখলকৃত এবং জিহাদ এখন ফারদুল আইন হয়ে গেছে। সেজন্য প্রত্যেক মুসলিমকেই এই দখলকৃত ভূখন্ডগুলোকে মুক্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করতে হবে। এই যুক্তি জিহাদের বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা এক করে ফেলে যেখানে এই দুটি পুরোপুরি ভিন্ন কর্তব্য এবং সেগুলো সম্পাদনের কর্মপদ্ধতিও ভিন্ন। জিহাদ প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরযে আইন হয়ে যায় যখন মুসলিমদের ভূমি দখল হয়ে যায় এবং ঐ ভূমির প্রত্যেক মুসলিমকেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থাক বা না থাক রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে জিহাদ করতে হয়। কিন্তু অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না থাকলে তা প্রতিষ্ঠা করা ফরয হয় যদিও রাষ্ট্রটি বাইরের শত্রু“ দ্বারা দখলকৃত থাক বা না থাক। অনেকে আবার অনেক দূরে এগিয়ে বলে বর্তমানে প্রত্যেক মুসলিম ভূমি দখলকৃত কারণ এদের শাসকেরা উম্মাহর শত্রু“। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এই উম্মাহর শত্রু“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভূমি মুক্ত করা আবশ্যক। তাদের এই ধারণাটি দখলের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভূল। একটি ভূমি তখনই দখল হয়ে যায় যখন তা কোন অমুসলিম বাহ্যিক শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং মুসলিমদের কাছ থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিন, আফগানিস্থান ও ইরাকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শুধুমাত্র সে ক্ষেত্রে জিহাদ করা প্রত্যেকের উপর ফরয হয়ে যায়। তাই বর্তমানে যেহেতু কোন মুসলিম দেশের শাসকেরা ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করছেনা তাই সব মুসলিম দেশই দখলকৃত এটা বলা ভূল কারণ ঐসব ভূমির কর্তৃত্ব এখনও মুসলিমদের হাতে যারা তাকে বাইরের শত্রু“র আক্রমন থেকে রক্ষা করে। তাই এই অবস্থা একমাত্র কার্যকর হবে যখন বিদেশী সেনারা ঐ ভূমি দখল করবে। যখন মুহাম্মদ (সা) মক্কায় দাওয়াহ করছিলেন তখন আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা) অন্যান্য কিছু সাহাবাদের সাথে এসে আল্লাহর রাসূল (সা) থেকে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল এই বলে নিষেধ করেন যে,
“প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, তাই মানুষের সাথে যুদ্ধ করিওনা” (ইবনে আবি হাতিম এবং আন নাসাই ও আল হাকিম কর্তৃক বর্ণিত)।
সুতরাং আমরা মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হইনি। বরং আমাদেরকে রাসূল (সা) মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যেসব কাজগুলো করেছেন তাই অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) এর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বের দাওয়াহ কে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। প্রথম পর্যায় হচ্ছে গোপনে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ তথা সাহাবাদেরকে (রা) ইসলামী চিন্তা-ধারণা এবং আবেগ দ্বারা পরিচালিত করা এবং তাঁদেরকে ইসলামের বার্তা ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা।
দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল তখন থেকে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা রাসূল (সা) কে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। এটি হচ্ছে তখন যখন রাসূল (সা) প্রকাশ্যে কুরাইশদের জীবন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তাদের সর্দারদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এই পর্যায়টি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের। শেষ পর্যায়ে মুহাম্মদ (সা) বিভিন্ন আরব গোত্রের কাছে যান সামরিক সহযোগিতা (নুসরাহ) এর সন্ধানে যতক্ষন পর্যন্ত না মদীনার “আওস ও খাজরাজ” সমর্থন দিতে শপথ করে। (বিস্তারিত জানতে নবী (সা) এর দ্বীন কায়েমের পদ্ধতি দেখুন)।
পরিশেষে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র জিহাদ বা যুদ্ধের কোনো দলীল প্রমাণিত হল না। বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিহাদকে আল্লাহর রাসূল (সা) বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। তার পরিবর্তে রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট পথ আমাদেরকে দেখিয়েছেন এবং আমাদের কঠোরভাবে এই পদ্ধতির সাথে জড়িয়ে থাকতে হবে ও লক্ষ্য রাখতে হবে যেহেতু এটি একটি শরয়ী বাধ্যবাধকতা তাই যেন এই পথ থেকে আমরা বিন্দুমাত্র ও সরে না যাই।
মূল: শফিউল হক
তথ্যসূত্র:
আল জিহাদ ওয়াল কিতাল ফি আস-সিয়াসা আস শারীয়া > ড. মুহাম্মদ খায়ের হেকাল।Posted by Visionary
খিলাফত ব্যবস্থায় শ্রমিক-মালিকদের অধিকার ও শিল্পখাতের স্থিতিশীলতা

একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই পারে শ্রমিক ও মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করে শিল্পখাতকে স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে
বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৮,১০০ টাকা করার দাবিতে ২১ শে সেপ্টেম্বর ২০১৩ থেকে সহিংস আন্দোলন শুরু করে। শত শত শ্রমিক পুলিশের আঘাতে আহত হয়, অনেক সম্পদ ভাংচুর ও লুটপাট হয়। ঢাকা এবং তার আশেপাশের কারখানাগুলোতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কয়েকশত কারখানার কাজ বন্ধ থাকে। চলতি বছরের (২০১৩) জুন মাসে সরকার কর্তৃক সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ বোর্ড গঠন করে দেয়া হয়েছে যেখানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা গত আগষ্ট মাসে তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর গার্মেন্টস মালিকদের প্রতিনিধিরা মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩,৬০০ টাকা প্রস্তাব করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই আন্দোলন শুরু হয়।
তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় (চীন প্রথম)। এই খাতে বাংলাদেশ প্রতি বছর ২১ বিলিয়নের বেশি মার্কিন ডলার আয় করে। শিল্প বিশ্লেষকরা আশা করেন যে আগামী ৫ বছরে এই খাতে দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব। এই শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ নারী।
বিভিন্ন শিল্প কারখানা ও সেবা খাতে শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিদেশী শক্তির উস্কানির পাশাপাশি গার্মেন্টস মালিক এবং শ্রমিকদের মধ্যে কিছু প্রকৃত ইস্যু বিদ্যমান, যা আলোচনা ও সমাধান করা প্রয়োজন। মজুরি নির্ধারণ, সময়মত মজুরি প্রদান না করা, কম মজুরি প্রদান এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোন মজুরি প্রদান না করা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠন করার অধিকার ইত্যাদি সাধারণত শ্রমিক আন্দোলন এবং শ্রমিক অসন্তোষের মূল কারণ। পাশাপাশি মালিকেরা তাদের কারখানা ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং সরকারের কর বিভাগ, চাঁদাবাজ ও ট্রেড ইউনিয়নের অত্যাচার নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিক এবং শ্রমিকের সম্পর্ক শোষক-শোষিতের, অস্থিতিশীল এবং পরস্পরের প্রতি সংঘাতপূর্ণ। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই জাতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে শ্রমিক এবং মালিকদের সম্পর্ক স্থিতিশীল এবং উৎপাদনমুখী হয়। খিলাফত সরকার মালিক এবং শ্রমিক – উভয়ের অধিকার নিশ্চিত করবে যাতে অর্থনীতি শান্তিপূর্ণভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে এই বিষয় সম্পর্কিত কিছু মৌলিক ধারনা নিম্নে আলোচনা করা হলো –
১। মজুরি নির্ধারণ – একজন শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে একটি চুক্তি, যেখানে তার শ্রমের বিনিময়ে তাকে মজুরি প্রদান করা হয়। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে অনুমতি দেয় (এ ক্ষেত্রে গার্মেন্টস কারখানার মালিক তথা উৎপাদককে) শ্রমিককে তার শ্রম দানের জন্য নিয়োগ দিতে। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“… আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বন্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবক রূপে গ্রহণ করে…।” [সূরা আয্ যুখরূফ : ৩২]
শারী’আহ্ অনুযায়ী নিয়োগের সময় চারটি বিষয় শ্রমিকের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে : কাজের প্রকৃতি, কাজের সময়কাল, মজুরি এবং উক্ত কাজে শ্রমিকের যোগ্যতা ও প্রচেষ্টার ধরন। ইসলামী নিয়ম অনুসারে কাজের পূর্বে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করে নিতে হবে। কারণ রাসূল (সা) বলেন, “যদি তোমাদের মধ্যে থেকে তোমরা কোন শ্রমিককে নিয়োগ কর, তাহলে তাকে তার মজুরি সম্পর্কে জানিয়ে দাও।” (ইবনে মাস’উদ থেকে বর্ণিত)
একজন শ্রমিকের দৈনিক কত গ্রাম ক্যালরির প্রয়োজন হয় তার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়। গৃহপালিত পশুপাখিদেরকে যেমন পর্যাপ্ত খাবার দেয়া হয়, যাতে তারা ডিম, দুধ বা মাংস দিতে পারে, তেমনি গার্মেন্টস শ্রমিকদেরও একইভাবে তুলনা করা হয়। সর্বনিম্ন মজুরির ধারনা কিছু দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে দেয়। যখন সরকার কর্তৃক সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তখন অনেক নিয়োগকর্তা ঐ সুবিধাটা গ্রহণ করে এবং তারা সব কর্মচারী বা শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরিতে নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করে। নিয়োগকর্তাদের দক্ষ কর্মীদের ছাটাই করার একটা প্রবণতা থাকে যখন তারা অধিক মজুরি দাবি করে এবং তাদের পরিবর্তে তারা অদক্ষ এবং আধা-দক্ষ শ্রমিকদের অধিক হারে নিয়োগ দান করে যাতে তাদেরকে সর্বনিম্ন মজুরি প্রদান করতে পারে।
সর্বনিম্ন জীবন যাত্রার মানের উপর ভিত্তি করে মজুরি নির্ধারণ করার এই পুঁজিবাদী চিন্তা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিকদের উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে মজুরি নির্ধারণ পদ্ধতিও ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। অন্যান্য শিল্পখাত বা অন্য দেশের মজুরি কিংবা তথাকথিত আন্তর্জাতিক সর্বনিম্ন মানও (international minimum standard) মজুরি নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে না। মজুরি নির্ধারিত হবে শ্রম অথবা শ্রমিকের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুবিধার (benefit) ভিত্তিতে। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে সমাজে তারা বাস করবে সেই সমাজের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী প্রাপ্ত সুবিধার মূল্যের (value) ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা মজুরি নির্ধারণ করবে।
২। মজুরি প্রদানের সময় – কারখানার মালিকদের একটা অভ্যাস হচ্ছে শ্রমিকদের দেরিতে মজুরি প্রদান করা। কয়েক মাসের মজুরি প্রদান না করার মানে হচ্ছে শ্রমিকদের এক প্রকার বন্দি করে রাখা। নিয়োগকর্তারা যুক্তি দেখান যে শ্রমিকদের যদি সব বেতন প্রদান করা হয়, তাহলে কর্মক্ষেত্রে তারা অনুপস্থিত থাকবে বা ক্ষেত্রবিশেষে তারা চাকরি ছেড়ে দিবে। প্রতি বছর বিশেষ করে ঈদের ছুটির আগে বকেয়া বেতন অতিরিক্ত সময়ের কাজের ভাতা এবং উৎসব বোনাসের জন্য শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে হয়। দেরীতে মজুরি প্রদান অথবা প্রদান না করার ব্যাপারে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। বুখারী শরিফে আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন,
“আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল বলেন, শেষ বিচারের দিনে আমি তিন ধরনের ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াব…এবং এমন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে একজন লোককে কাজে নিয়োগ করল এবং তার কাছ থেকে সে পূর্ণ কাজ করিয়ে নিল কিন্তু তাকে তার পূর্ণ মজুরি প্রদান করেনি।”
অন্য একটি হাদিসে আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”
৩। জীবন ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা – গত এক বছরে রানা প্লাজা ধ্বংস এবং তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ড সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যেখানে সহস্রাধিক শ্রমিক মারা গেছে এবং অসংখ্য শ্রমিক আহত হয়েছে। পাশাপাশি রুটিন মাফিক শ্রমিক বিক্ষোভ এবং দেশের গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে নিয়োজিত দালালরা আন্দোলনের নামে দেশের সরকারী ও বেসরকারী সম্পদ ধ্বংস করে চলছে। রাষ্ট্রযন্ত্র শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে কঠোরভাবে দমন করছে। এই ধরনের কাজ ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ইসলামী রাষ্ট্র এই ধরনের যে কোন পরিস্থিতি শক্তভাবে মোকাবেলা করবে। ইসলামী রাষ্ট্র জীবনের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং জনগণের সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করতে বাধ্য। আবু বকর (রা) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্র রাসূল (সা) বিদায় হজ্জের খুতবায় বলেন,
“তোমাদের একজনের রক্ত, সম্পদ, সম্মান অন্য আরেকজনের নিকট নিরাপদ ও পবিত্র যেমন নিরাপদ ও পবিত্র আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর।” (বুখারী ও মুসলিম)
৪। ট্রেড ইউনিয়ন – বর্তমান ব্যবস্থায় মনে করা হয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং সিবিএ শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করবে। কিন্তু অতীতে এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে বিভিন্ন সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম বিশেষতঃ গার্মেন্টস খাত ও রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। খুব সীমিত পরিসরে ক্ষুদ্র ব্যক্তি পর্যায়ের স্বার্থরক্ষার উপর ট্রেড ইউনিয়ন এবং সিবিএ’গুলো গুরুত্বারোপ করে থাকে। বিগত বছরগুলোতে তারা রাজনৈতিক দল ও বিদেশী শক্তির স্বার্থ বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রে যেকোন সংগঠনের প্রধান কাজ হবে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি দল থাকবে যারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে এবং এরাই হবে সফলকাম।” [সূরা আলি ইমরান : ১০৪]
অতএব খিলাফত রাষ্ট্রে সাধারণভাবে সংগঠনের অনুমোদন দেয়া হবে কিন্তু বর্তমান সময়ের আদলে ট্রেড ইউনিয়নকে অনুমোদন দেয়া হবে না। যে কোন অবিচারের জন্য একজন শ্রমিক যে কোন সময় প্রতিকার চেয়ে আদালতে আবেদন করতে পারবে যেখানে কুর’আন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করা হবে।
৫। বিদেশী হস্তক্ষেপ – বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বিদেশী শক্তি যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ বাংলাদেশের শিল্প সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নের সাথে সরাসরি জড়িত। বিভিন্ন সংস্থা যেমন ইউএস এইড (USAID), ডিএফআইডি (DFID) ইত্যাদির মাধ্যমে বর্তমানে তারা অনেক এনজিওকে সাহায্য দিচ্ছে শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে তথাকথিত সচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে। এছাড়াও কমপ্লায়েন্সের (compliance) নামে বিদেশী কোম্পানীগুলো স্থানীয় কারখানার মালিকদের বিভিন্ন বিধি নিষেধ আরোপ করে থাকে। বিদেশীদের একমাত্র উদ্দেশ্য এদেশের শিল্প খাতকে ততটুকু বিকশিত করতে দেয়া যা পশ্চিমা দেশগুলোর প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করবে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে তারা তাদের উপর নির্ভরশীল করে রাখতে পারে। বিদ্যমান ইস্যু ব্যবহার করে তারা শ্রমিক অসন্তোষকে উস্কে দেয় যাতে এই দেশের শিল্পকারখানা সব সময় অস্থিতিশীল এবং ভঙ্গুর থাকে এবং তাদের খেয়াল খুশি মত আমাদের উপর কর্তৃত্ব করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্র কখনও কোন বিদেশী রাষ্ট্র, সংস্থা কিংবা কোম্পানীকে আমাদের শিল্পখাতে নাক গলানো বা কর্তৃত্ব করার সুযোগ দিবে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেন,
“আল্লাহ্ কখনই অবিশ্বাসীদেরকে বিশ্বাসীদের উপর বিজয় দান করবেন না।” [সূরা আন্-নিসা : ১৪১]
বরং খিলাফত রাষ্ট্রের নিজস্ব পরিকল্পনা থাকবে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি ও একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা যাতে এ রাষ্ট্র পৃথিবীতে একটি পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্র হবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র যার প্রধান লক্ষ্য থাকবে সারা পৃথিবীকে ইসলাম দিয়ে শাসন করা। এই নীতির কারণে ইসলামী রাষ্ট্র সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিল্প ও সামরিক দিক দিয়েও শক্তিশালী হবে।
পরিশেষে বলা যায়, জীবনের সকল সমস্যার প্রকৃত সমাধান ইসলাম পরিপূর্ণভাবে দিয়ে থাকে। কিছু কিছু রাষ্ট্রীয় সমস্যার ক্ষেত্রে ইসলাম থেকে আংশিকভাবে সমাধান নিয়ে আমরা সার্বিক পরিবর্তন আশা করতে পারি না। যখন খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ইসলাম পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত থাকবে তখন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। সকল প্রকার শোষণ, অন্যায় কর ও চাঁদা প্রদানসহ সকল জুলুম থেকে মানুষ মুক্ত হবে। ইসলামী মূল্যবোধ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতাসহ জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা হবে এবং রাষ্ট্র সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। পৃথিবীতে এবং পরকালে শান্তি এবং সম্মানের সাথে বাস করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা আমাদের জন্য ফরয দায়িত্ব।
মুহাম্মদ রাইয়ান হাসান
বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল?

একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। অনেকে মনে করেন যেহেতু তৈরী পোষাক খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত এবং যুক্তরাষ্ট্র এর অন্যতম ক্রেতা, তাই বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভবতো বটেই; এক কথায় আত্মহননের শামিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশী রয়েছেন যারা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস। তাই ইসলামী রাষ্ট্র, খিলাফত প্রতিষ্ঠা মানেই হলো জাতিকে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়া; যেমন – যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু মুসলিম হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে, যদি আমরা এই ক্রুসেডারকে প্রতিহত না করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,
“… এবং কিছুতেই আল্লাহ্ কাফিরদেরকে মুসলিমদের ওপর বিজয় দান করবেন না।” [সূরা নিসা : ১৪১]
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্কের দু’টি প্রধান দিক হলো বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় (remittance)। বাস্তবতা যাচাই করতে হলে দু’দেশের সম্পর্কের প্রকৃতি আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে, তবেই আমরা বুঝতে পারব সত্যিই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল কি-না। আমাদের আরো সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে ইসলাম প্রদত্ত সমাধানের প্রতি তথা ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফত এ সমস্যা সমাধানে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাংলাদেশ কতটুকু নির্ভরশীল তা যাচাই করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানির তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ১ নং সারণি থেকে এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (মূল তথ্য সারণির জন্য পরিশিষ্ট দেখুন)। আমাদের জাতীয় আয়ের (জিডিপি) প্রায় এক পঞ্চমাংশ আসে রপ্তানি থেকে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের এই রপ্তানি আয়ের মাত্র এক পঞ্চমাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। সার্বিকভাবে, আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ৪% আসে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি থেকে। আমরা যদি তৈরী পোষাক শিল্পের মূল্য সংযোজন (value addition) ধরি ৫০% (সম্ভাব্য সর্বোচ্চ), তাহলে জিডিপিতে প্রকৃত অবদান হবে ২% মাত্র। সুতরাং সামষ্টিক অর্থনীতির দিক বিচারে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশের তৈরী পোষাক আমদানি বন্ধ করে দিয়ে আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিতে পারে – এটা একটি নিছক গালগল্প।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক একই চিত্র পরিদৃষ্ট হয়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত অর্থ হতে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২ নং সারণিতে আমরা দেখি সাম্প্রতিককালে আমাদের জাতীয় আয়ে প্রবাসী প্রেরিত অর্থের অবদান ১০% এর সামান্য বেশি। যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত প্রবাসী আয় হলো আমাদের মোট প্রাপ্ত প্রবাসী আয়ের ১৪%। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত প্রবাসী আয় আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ১.৫%।
তাই একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত প্রবাসী আয় আমাদের দেশের ক্ষেত্রে কোনভাবেই অপরিহার্য কোন বিষয় নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র হতে আমরা যে অর্থ সাহায্য পাই, তাও কোন বিবেচ্য বিষয় নয়।
২০১০ সালে এ অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ছিল আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ০.১২%। প্রকৃত ইস্যু ও খিলাফতের অধীনে আমাদের বাস্তবতা এখন আমরা রপ্তানি ও প্রবাসী আয় নিয়ে বিতর্কের একটু গভীরে দৃষ্টিপাত করি। এ বিতর্কের মূল কারণগুলো হলো:
– আমাদের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন;
– গার্মেন্টস খাতটি শ্রম নির্ভর; এই খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বহু লোক কর্মসংস্থান হারাবে;
– একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সেখানে অবস্থানরত দশ লক্ষাধিক বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠাবে।বাস্তব অর্থে বৈদেশিক মুদ্রা ও বেকার সমস্যাই হলো মূল আলোচ্য বিষয়। বৈদেশিক মুদ্রা ও বেকার সমস্যা সমাধানে খিলাফত রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তার পূর্বে আমাদের বুঝতে হবে বাস্তব ক্ষেত্রে রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আমাদের সাথে সকল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করাটা কোন সহজ ব্যাপার নয়। আমরা যদি নির্ভরশীলতার কথা বলি তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের কম মজুরীতে শ্রমিক প্রয়োজন: হয় আমাদের তৈরী পোষাক আমদানির মাধ্যমে অথবা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারী অনুযায়ী ২০০৭ সাল পর্যন্ত সেখানে ১৪৩,৬১৯ বাংলাদেশী বাস করে। এর পাশাপাশি অবৈধ অধিবাসীর সংখ্যাও কম নয়। রাতারাতি এত বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে দুঃস্বপ্নের মতো। শ্রমবাজারের অন্য কোন উৎস, বিকল্প তৈরী পোষাক আমদানি বাজার এবং ঐসব বিকল্প দেশের সক্ষমতা তৈরী – এসবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা হলেও সময়ের প্রয়োজন হবে। সে সময়ের মধ্যে বাংলাদেশও খিলাফত সরকারের সহায়তায় রপ্তানির জন্য স্বল্প মেয়াদে বিকল্প বাজার খুঁজতে সক্ষম হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে খিলাফত রাষ্ট্রকে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমরা সমর্থন দিবে এবং মুসলিম বিশ্ব ব্যতীত বহু রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জনগণও এতে পূর্ণ সমর্থন যোগাবে। তাই খিলাফত রাষ্ট্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাষ্ট্র হবেনা; অথবা এই রাষ্ট্র একঘরে নীতিও অবলম্বন করবে না। পক্ষান্তরে খিলাফত রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিকসহ সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, যেহেতু এটি সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। খিলাফত রাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী বলিষ্ঠ জনমত থাকবে। একথা এখানে প্রণিধানযোগ্য যে খিলাফত রাষ্ট্র অবশ্যই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভর নীতি অনুসরণ করবে। তাই অদূর ভবিষ্যতে কোন ক্ষেত্রেই খিলাফত রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা বরদাশত করবে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের দেশসহ মুসলিম জাতিকে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ দান করেছেন। খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অবশ্যই এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যা আঞ্চলিক শক্তি ও পরাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখবে।
বেকার সমস্যা
খিলাফত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক লক্ষ্য জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি নয়; বরং প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ এর লক্ষ্য। তাই খিলাফত রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। খিলাফত রাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে যে সকল পদক্ষেপ গৃহীত হবে তার কিছু নিম্নে উল্লেখিত হলো,
– শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে উৎপাদনমুখিতা অর্থাৎ যে সকল ক্ষেত্রে জনশক্তি দরকার সে চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে প্রশিক্ষিত করা।
– খিলাফত রাষ্ট্র ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে সরকারের খাস জমি বন্টন করে দেবে, পাশাপাশি তাদের সেচ সুবিধা, সার ও বীজ সরবরাহ করবে। আধুনিক কৌশল ও যন্ত্রপাতি ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে তাদের জন্য। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
– শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তার শক্তিশালী শিল্প খাত। খিলাফত রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। তাই এটি শিল্পায়ন বিশেষতঃ শ্রম নির্ভর শিল্প কারখানার প্রতি জোর দেবে যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
– দক্ষ শ্রমশক্তির সঠিক ব্যবহার এবং আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক জ্বালানী সম্পদসমূহকে (তেল, গ্যাস, কয়লা) ভিত্তি করে ব্যাপক শিল্পায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
– খিলাফত রাষ্ট্র অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন করবে। আমাদের রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা হবে নিজস্ব সমরাস্ত্র কারখানা, জাহাজ ও উড়োজাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং সাম্ভাব্য সকল ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করা হবে।
– এছাড়াও নাগরিকগণ সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা পাবে যাতে তারা নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে। যে কোন পর্যায়ে লুটতরাজ, দুর্নীতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ইত্যাদি খিলাফত রাষ্ট্র শক্ত হাতে দমন করবে।ফলে শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হবে যা জাতিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলবে।
বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা
বর্তমান বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারই প্রধান মুদ্রা। বস্তুত বিশ্বের বহু দেশ মার্কিন ডলারে বাণিজ্য করতে এবং এই ডলারকেই রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে রাখতে বাধ্য হয়; যাতে করে ডলারের চাহিদা সর্বদাই বিদ্যমান থাকে। ডলার হলো যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ধরে রাখার একটি অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যখন ইচ্ছা তখনই ডলার ছাপতে পারে। খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এই রাষ্ট্র বাণিজ্যের বিনিময় মাধ্যম ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারকে পরিত্যাগ করবে। খিলাফতের মুদ্রা হবে একই সাথে স্বর্ণ ও রুপা ভিত্তিক অর্থাৎ দ্বিধাতুভিত্তিক (bimetallic standard)। একবার এটি প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো স্বভাবতই খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যে উৎসাহী হবে। আর এটি পূর্বেও বলা হয়েছে যে খিলাফত রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হলো আত্মনির্ভরশীল হওয়া।
আমাদের আমদানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান মূলধনী যন্ত্রাংশ (capital machinery) ও জ্বালানী বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বলা যায় খিলাফত রাষ্ট্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা করবে, যা মূলধনী যন্ত্রাংশ উৎপাদনকে বিশেষ গুরম্নত্ব দেবে, যাতে এই খাতে আমাদের অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে না হয়। তেল আমদানির ক্ষেত্রেও সেই স্বনির্ভর নীতিই প্রযোজ্য। খিলাফত রাষ্ট্র সকল উৎপাদন-অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) পুনর্বিবেচনা করবে এবং নিজস্ব কোম্পানীকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করে অগ্রাধিকার দেবে যাতে এটি ভূ-গর্ভ ও সমুদ্র-গর্ভে সম্পদ অনুসন্ধান করতে পারে। খিলাফত রাষ্ট্র ইতিমধ্যে আবিষ্কৃত বিপুল পরিমাণ কয়লা সম্পদ কাজে লাগাবে।
উপসংহার
উপরের আলোচনায় এটা স্পষ্ট প্রমাণিত যে বাংলাদেশ কখনই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা হতে প্রাপ্ত অর্থ একত্রে আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ৪%। তাই এটি পরিষ্কার যে, আমরা বৈদেশিক সাহায্য ছাড়া চলতে অক্ষম – এটা কাফির সাম্রাজ্যবাদী জাতি ও বিশ্বাসঘাতক শাসকগোষ্ঠীরই প্রচারকৃত ধারনা। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মত শাসক যেখানে একটি পরিবার ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা রাখে না, সেখানে তারা এখন একটি দেশ পরিচালনা করছে। তারা শুধু একটা কাজই করতে পারে আর তা হল কে কত বেশি যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে পারে তার প্রতিযোগিতা করা। তাদের একমাত্র যোগ্যতা হলো ব্যক্তিগত স্বার্থ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় তার সাথে চুক্তি করা। আমাদের বুদ্ধিজীবি সমাজ, রাজনীতিবীদ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সাংবাদিকবৃন্দ, আমলা ও সেনাবাহিনী কিভাবে দুর্নীতিবাজ, অশিক্ষিত ও অযোগ্য এই শাসকবর্গকে মেনে নিচ্ছেন?
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের যথেষ্ট সম্পদ দিয়েছেন, যা দ্বারা আমরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব…।” [সূরা ত্বা-হা : ১২৪]
তাই মুসলিম হিসেবে এসব শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণ করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা আমাদের কর্তব্য, যে রাষ্ট্র আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“… আল্লাহ্ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” [সূরা রাদ : ১১]
পরিশিষ্ট
মোট রপ্তানি ও মোট জাতীয় আয়ের তথ্য সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি তথ্য সূত্র:
http://www.census.gov/foreign-trade/balance/c5380.html
মোট তৈরী পোষাক রপ্তানি তথ্য (অর্থ বছর থেকে রুপান্তরিত) সূত্র: বিজিএমইএ, ইপিবি,
http://bgmea.com.bd/home/pages/TradeInformation
প্রবাসী আয়ের তথ্য সূত্র:
http://www.bangladesh-bank.org/econdata/wagermidtl.php
২০১০ ও ২০০৯ সালে বাংলাদেশে মার্কিন সাহায্যের পরিমাণ যথাক্রমে ১২৪ ও ৬৩ মিলিয়ন ডলার; সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী অধিবাসী তথ্য সূত্র:
http://factfinder.census.govপ্রশ্নোত্তর : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের স্বরুপ

প্রশ্ন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করবেন কি? অন্য কথায়, ইরান কি আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্বাধীনভাবে মার্কিন প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে অগ্রসর হয়? আমরা কি বলতে পারি যে, ইরান এ অঞ্চলে একটি মতবাদ প্রচার করতে চায়, যার নাম জাফরী মাযহাব? সবশেষে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে আমেরিকার প্রকৃত অবস্থান কি?
উত্তর: প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে আমাদেরকে প্রথমে সংক্ষেপে ইরানের সরকারের বাস্তবতা, বিপ্লবের পর থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক পথ পরিক্রমা, প্রজাতন্ত্র ঘোষণা এবং এসব কিছুর সাথে আমেরিকার সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে হবে:
১) ইরানি বিপ্লবের শুরু থেকেই আমেরিকার সম্পৃক্ততা ছিল সুস্পষ্ট। ফ্রান্সের নিউফ্ল-লে-শ্যাঁতো’তে (Neauphle-le-Château) খোমেনীর অবস্থানকালে হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধি দল তার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল। তখন খোমেনী আমেরিকার সাথে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়। পরবর্তীতে মার্কিন সংবাদপত্রগুলো এই ঐকমত্য এবং সেখানে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ব্যাপারে রিপোর্ট প্রকাশ করে… সাম্প্রতিককালে ইরানি প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুল হাসান বানু সাদর ১/১২/২০০০ তারিখে আল-জাজিরার সাথে এক সাক্ষাৎকারে এ সত্যগুলো প্রকাশ করে। সে নিশ্চিত করে যে, ফ্রান্সের নিউফ্ল-লে-শ্যাঁতো’তে (Neauphle-le-Château) খোমেনীর অবস্থানকালে হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিদল সেখানে আসে। ইয়াজদি, বাজারকান, মুসাভি এবং আরদিবাইলি তাদেরকে স্বাগত জানায়… এ দু’পক্ষের মধ্যে অনেকগুলো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় অক্টোবরে প্যারিসের শহরতলীতে। সে সময় রিগ্যান ও বুশ গ্রুপ এবং খোমেনীর গ্রুপের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন রূপ হস্তক্ষেপ করা হবে না – এ শর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করার ব্যাপারে খোমেনী তার সম্মতি প্রদান করে। এর কিছুদিন পরে একটি ফরাসি বিমানে খোমেনী তেহরানে পৌঁছামাত্র তার হাতে শাসনভার তুলে দেয়ার জন্য আমেরিকা শাহপুর বখতিয়ারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আমেরিকা ইরানি সেনাবাহিনীর নেতৃস্থানীয়দের হুশিয়ার করে দেয় যেন তারা খোমেনীর ক্ষমতা গ্রহণের পথে বাধা না দেয়।
তখন থেকে খোমেনী নেতা ও শাসকে পরিণত হয়। এরপর অন্যান্য মুসলিম দেশের সাথে সঙ্গতি রেখে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আদলে ইরানের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। পশ্চিমা সংবিধানের অনুকরণে ইরানের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে; প্রজাতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভাজন, সংসদীয় কর্মকান্ড, ক্ষমতা পৃথকীকরণ ও যোগ্যতার মাপকাঠি ইত্যাদি পুঁজিবাদী সরকার ব্যবস্থার অনুকরণেই করা হয়েছে। ‘ইরানের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম এবং বার জাফরী মাযহাব’ উক্তিটি অধিকাংশ মুসলিম দেশের সংবিধানের মতই – যা থেকে বুঝা যায় না যে, রাষ্ট্র ইসলামের ভিত্তিতে চলবে অথবা এর বার্তা হবে ইসলাম। বরং এ ধরনের উক্তি সরকারী ডিক্রি ও ছুটির দিনের সাথে সম্পর্কিত। এর দ্বারা লোকদের বিশ্বাস ও উপাসনাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে – যার মাধ্যমে জীবনের কিছু বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শিত হয়েছে। ইরানি সংবিধান থেকে বুঝা যায় না যে ইসলামের আকীদা এই সংবিধানের ভিত্তি অথবা এই মাযহাব রাষ্ট্রীয় বার্তা বা পররাষ্ট্রনীতির একটি লক্ষ্য; বরং প্রকৃতপক্ষে এটি দেশপ্রেম নির্ভর বা জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক। পুঁজিবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে ইরানি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাসমূহে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; যেমন: জাতিসংঘ এবং ওআইসিতে অন্তর্ভুক্তি। ইরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও কোন কিছুই ইসলামের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং এটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইরানি রাষ্ট্র কোন বিশেষ বার্তাকে বহন করে না অথবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের ভিত্তিতে করা কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে না। বরং জাতীয়তাবাদী বা দেশপ্রেমজনিত প্রবণতা ইরান সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট – যা বর্তমান ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সীমানা বজায় রাখার নীতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। বিপ্লবের শুরুর দিকে আমরা খোমেনীর সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। আমরা আমেরিকার সাথে সহযোগিতা না করার এবং আমাদের প্রণীত সংবিধানের মত একটি ইসলামি সংবিধানের ঘোষণা দেয়ার জন্য তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম। ইরানের সংবিধানের ত্রুটি বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করে খোমেনীর উদ্দেশ্যে আমরা একটি খোলা চিঠি দিয়েছিলাম। খোমেনী আমাদের উপদেশ গ্রহণ করেনি এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদের আদলে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে এমন সংবিধান নিয়ে অগ্রসর হয়েছে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।
২) রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মাযহাব উল্লেখ প্রসঙ্গে বলা যায়, এটি একটি বার্তা বা পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি অথবা এর উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কিংবা সংবিধান প্রণীত হয়নি অথবা সংবিধানের অনুচ্ছেদসমূহ এই মাযহাব থেকে উদ্ভূত হয়নি। বরং শাসন, বৈদেশিক নীতি, সশস্ত্র বাহিনী ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে সংশিস্নষ্ট ব্যবস্থার মৌলিক বিষয়সমূহ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে গৃহীত হয়েছে; যেভাবে সৌদি আরবের শাসকেরা তাদের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে হিজাজ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হাম্বলী মাযহাবকে ব্যবহার করে। তাছাড়া তাদের সাথে কাজ করতে চায় এমন কোন অনুসারী বা সমর্থকের ক্ষেত্রে ইরান স্বীকারোক্তিমূলক দিকটি (confessional aspect) ব্যবহার করে। এটি তাদের মধ্যে উগ্র জাতিগত বিভক্তির বোধকে উসকে দেয় এবং এ কারণে জাতীয় স্বার্থে তাদের ব্যবহার করা সহজতর হয়। এর মাধ্যমে জাফরী মাযহাব বা শিয়া মতবাদের প্রসার ঘটানো হয় না। বাস্তবতা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যদি ইরানি জাতীয় স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তাহলে ইরান শিয়া বা জাফরী মতবাদকে সাহায্য করে না। ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করলে যখন স্বীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়, তখন ইরান ইসলাম, শিয়া বা জাফরী মতবাদকে দূরে ঠেলে দিতে দ্বিধা করে না। তারা মার্কিন মদদপুষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত ইরাকি ও সিরীয় সরকারকে সাহায্য করছে। শিয়া অধ্যুষিত সৌদি আরবের পূর্বদিকের প্রদেশগুলো তেলসমৃদ্ধ হওয়ায় ইরান সৌদি আরবকে দুর্বল করার জন্য অনেকবার সেখানকার গণজাগরণকে সমর্থন দিয়েছে। বাহরাইনের ক্ষেত্রেও ইরান একই ধরনের নীতি প্রয়োগ করেছে যার জন্য বাহরাইনকে সৌদি আরবের সৈন্য তলব করতে হয়েছে…
জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী হলে ইরান মাযহাবগত বিষয়কে তোয়াক্কা করে না। ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে আজারবাইজান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হতে চায় এবং লোকেরা ইরানের সাথে একীভূত হওয়ার জন্য সীমান্ত ভেঙে দেয়। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে আগ্রাসী রাশিয়া নিজেদের কর্তৃত্বের বাইরে কোন ব্যবস্থা সেখানে যেন প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং পুরনো কমিউনিস্ট দালালদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য বাকুতে প্রবেশ করে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। মুসলিমরা তাদের অধিকার লংঘনকারী রাশিয়ার বশ্যতা ও কমিউনিস্টদের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল অথচ রাশিয়ার আক্রমণের মুখে আজারবাইজানের লোকদের ইরান কোন সাহায্য করেনি। যদিও বাস্তবতা হল আজারবাইজানের অধিকাংশ মুসলিম ইরানের রাষ্ট্রীয় মাযহাব অনুসরণ করে। ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার মদদে আর্মেনিয়া আজারবাইজানের ২০ ভাগ ভূমি দখল করে নেয়। এতে ১০ লাখেরও বেশী লোক তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। তখনও ইরান আজারবাইজানের লোকদের কোন রূপ সাহায্য করেনি। এ করুণ পরিস্থিতি এখনও বিদ্যমান। অথচ ইরান আজারবাইজানের বিপরীতে আর্মেনিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে ! শুধু তাই নয়, ইরান এমন কিছু গ্রুপকে সাহায্য করেছে যাদের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই; যেমন: লেবাননের মিচেল আওনের দল অথবা নাবিহ বেরি এবং অন্যান্যদের ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলন – যারা মার্কিন পদাঙ্ক অনুসরণকারী।
৩) আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের সব কর্মকান্ডই আমেরিকার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও তার পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, যার কিছু উদাহরণ নিচে দেয়া হল:
ক. লেবাননে ইরান তার মাযহাবের অনুসারীদের নিয়ে একটি সশস্ত্র দল গঠন করেছে, যা লেবাননের মূল সেনাবাহিনী থেকে পৃক একটি বিশেষ বাহিনী। লেবানন সরকার এই বিশেষ বাহিনী ও তাদের সামরিক অস্ত্রকে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ইরান ভাল করে জানে যে লেবাননে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত সরকার যা আমেরিকার রাজনীতিকে অনুসরণ করে। লেবানন সরকার আর কোন দলকে অস্ত্র বহন করার অনুমোদন দেয় না অথবা অন্য কোন দলকে সামরিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে স্বীকৃতি প্রদান করে না। লেবাননের ইরান সমর্থিত এই সশস্ত্র দল সিরিয়া সরকারের সমর্থন নিয়ে ইরানের মত আমেরিকার সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে। বাশার আল-আসাদের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে আমেরিকা ইরানি এই সশস্ত্র হিযবকে সিরিয়ার ভেতরে হস্তক্ষেপ করতে লেবানন সরকারকে বাধা প্রদান করেনি। বরং আমেরিকা লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত রেখে এই দলকে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পরোক্ষ অনুমোদন দিয়ে রেখেছে।
খ. আমেরিকা ইরাক দখল করার পর অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। তাই আমেরিকা তখন ইরাকের ভেতরে ইরানকে প্রবেশ করাল নিজস্ব মাযহাবের লোকদের প্রভাবিত করতে; যাতে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা মুক্তি আন্দোলনকে প্রতিরোধ করাযায়, এমনকি মুক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড় করানো যায়, পরস্পরকে বিরোধে জড়িয়ে ফেলা যায়, এবং দখলদারিত্ব ও আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত শাসন ব্যবস্থাকে বৈধতা প্রদান করা যায়। বিশেষ করে ২০০৫ এর পরে আমেরিকা ইবরাহিম আল-জাফরী ও পরবর্তীতে আল-মালিকির নেতৃত্বাধীন ইরানপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোটকে ক্ষমতায় আরোহণ করতে অনুমোদন দেয়। এই সরকারগুলো আমেরিকার মদদে প্রতিষ্ঠিত এবং পরস্পর সর্ম্পকযুক্ত। ইরাকে দখলদারিত্বের আনুষ্ঠানিক অবসানের পর আমেরিকার প্রভাব বজায় রাখতে ইরানি মদদপুষ্ট মালিকি সরকার নিরাপত্তা ও কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে – যা থেকে বুঝা যায় যে, দখলদারিত্ব বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কর্মকর্তারা সহায়তা করায় ও ইরাকে মার্কিন প্রভাবকে সুনিশ্চিত ও স্থিতিশীল করতে কাজ করায় ইরানের ভূমিকায় আমেরিকা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। ইরানের কর্মকর্তারা আমেরিকাকে এভাবে সহযোগিতা করার কথা স্বীকারও করে। মার্কিন দখলদারিত্বের পর পরই ইরান ইরাকে দূতাবাস খোলে। দখলদারিত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০০৫ সালে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি ইরাক সফরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আল-জাফরি নির্বাচিত হয়নি। দু’পক্ষই ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড হিসেবে নিন্দা করেছে। জাফরি যখন ইরান সফর করে তখন ইরাক ও ইরানের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; যার মধ্যে নিরাপত্তা ও সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণ করতে গোয়েন্দা সহযোগিতা চুক্তি, বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপনের মাধ্যমে বসরা ও ইরানকে যুক্ত করা এবং বসরা ও আবাদানের মধ্যে একটি তেল পাইপলাইন স্থাপন করার চুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০০৮ সালে প্রত্যক্ষ দখলদারিত্বের মধ্যে ইরানি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ ইরাক সফর করে। আহমাদিনেজাদ প্রায়শই আমেরিকা ও ইহুদী রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ঝড়ো হাওয়ার মত মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চালাত যদিও তার কাজ কখনই তার বক্তব্যের অনুরূপ নয়। সেসময় ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আহমাদিনেজাদ নিবিড়ভাবে আমেরিকার নীতি অনুসরণ করছিল। দখলদারিত্বের মধ্যে আহমাদিনেজাদ ইরাক সফর করে এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করার দুই সপ্তাহ আগে আবার ইরাক সফর করে মালিকি সরকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। অথচ মালিকি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্ব ও প্রভাব বজায় রাখার জন্য। ২০১০ সালে আমেরিকার দখলদারিত্বের মধ্যে আহমাদিনেজাদ আফগানিস্তান সফর করে এবং আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদারিত্বের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্বরত কারজাই সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে।
গ. ইরান ইয়েমেনেও একই কাজ করে। সেখানে সে আল-হুথী গ্রুপের উপর প্রভাব বিস্তার করে ও এটিকে অস্ত্র সরবরাহ করে। এই গ্রুপটিকে ইরান ইয়েমেনের বৃটিশ দালাল আলি সালিহ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ধর্মনিরপেক্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকেও ইরান সহায়তা দেয়। তারাও একইভাবে আমেরিকার মিত্র এবং দক্ষিণ ইয়েমেনে আমেরিকার প্রতি অনুগত ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
ঘ. ইরান ও সিরীয় সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ পুরনো; বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে প্রথম ইন্তিফাদার সময় থেকে এ সম্পর্ক বিদ্যমান। এরপর থেকে সিরিয়ার মুসলিমদের দমন-নিপীড়ন করার ক্ষেত্রে ইরান সিরীয় সরকারকে সহায়তা করে আসছে যাতেকরে মার্কিন দালাল আসাদ পরিবারকে সমর্থন দিয়ে আমেরিকার পরিকল্পনা নিরবিচ্ছিন্ন রাখা যায়। সিরিয়ার শাসক বাথ পার্টি একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী পার্টি, একথা জানা সত্ত্বেও ইরান সিরিয়ার শাসক পরিবার ও দলকে সাহায্য করেছে। বাথ পার্টির শাসন ব্যবস্থা সাদ্দাম হোসেনের শাসন ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এর সাথে ইরান যুদ্ধ করেছে। যদিও ইসলামের সাথে এই যুদ্ধের কোন সম্পর্ক ছিল না, বরং সাদ্দাম ইসলাম ও তার নিজের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। সাদ্দাম আমেরিকার সাথে যুক্ত এটি খুব সচেতনভাবে জেনে ইরান এই যুদ্ধ করে। ইরান মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসেনি এবং যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে বরং এর উল্টো কাজটিই করেছে; অপরাধী কুফর সরকারের জন্য বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে এবং ইরান অব্যাহতভাবে এরূপ করে আসছে। ইরান সরকার সিরীয় নেতৃবৃন্দের সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখে এবং এর মধ্যে রয়েছে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। আসাদ সরকারকে সমর্থন দিতে ইরান প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং সিরিয়ার জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে হ্রাসকৃত মূল্যে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করেছে। আসাদ সরকার যখন পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে তখন সিরীয় জাগরণে ইরানি হস্তক্ষেপের মধ্যে এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্কের ছাপ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে ইরান হস্তক্ষেপ না করত, ইরানি হিজবুল্লাহ্’র সৈন্যবাহিনী ও ইরানের প্রতি অনুগত মালিকি’র মিলিশিয়া প্রেরণ না করত, তাহলে ইতিমধ্যে বাশার এবং তার সরকারের পতন হয়ে যেত। কুসায়ের ও হোমসের গণহত্যা এবং আজকে আল-ঘাওতায় রাসায়নিক হামলাসহ অন্যান্য ঘটনা থেকে ইরানের এ হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঙ. আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে বলা যায়, ইরান আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদারিত্ব সমর্থন করেছে। কারজাইকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসিয়ে আমেরিকা কর্তৃক গঠিত সরকারের গৃহীত সংবিধানকেও ইরান সমর্থন দিয়েছে – এসবই আমেরিকার প্রতি ইরানের সেবা প্রদানের নমুনা। যখন আমেরিকা তালেবানদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন ইরান আফগানিস্তানের উত্তর অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি উল্লেখ করে যে, ‘যদি আমাদের সৈন্যরা তালেবানদের সাথে যুদ্ধ না করত, তবে আমেরিকা আফগানিস্তানের পাক খাওয়া জলাভূমিতে ডুবে যেত’ (আল-শারক আল-আওসাত পত্রিকা, ৯/২/২০০২)। আবুধাবিতে ১৩/১/২০০৪ তারিখে অনুষ্ঠিত উপসাগর ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ শীর্ষক কংগ্রেসে সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট খাতামি’র আইন ও সংসদ বিষয়ক উপপ্রধান মোহাম্মদ আলি আবতাহি বলেছিল, ‘যদি ইরান সহায়তা না করত, কাবুল ও বাগদাদের কখনই সহজে পতন হত না।’ (ইসলাম অনলাইন নেট, ১৩/১/২০০৪)
নিউইর্য়কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকালে ২৬/৯/২০০৮ তারিখে নিউইয়র্ক টাইমসের সাথে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদও একই ধরনের বক্তব্য দেয়। সেখানে সে বলে, ‘ইরান আফগানিস্তান বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এই সহযোগিতার বিনিময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সরাসরি হুমকি প্রদান করছে। ইরাকে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও আমাদের দেশ আমেরিকাকে সহায়তা প্রদান করেছে।’
৪) পরমাণু কর্মসূচীর ক্ষেত্রে বলা যায় যে, বছরের পর বছর ধরে এটি একটি জায়গায় স্থবির হয়ে আছে, যদিও ইহুদী রাষ্ট্র ইউরোপের সমর্থন ও প্রণোদনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে একাধিকবার এ প্রোগ্রামে আক্রমণ চালানোর হুমকি দিয়ে আসছে। আমেরিকা ইহুদী রাষ্ট্রের এ প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে ও তাকে তা করতে বাধা প্রদান করছে। আজ পর্যন্ত আমেরিকা বাধা প্রদান করে আসছে… ১২/৮/২০১৩ তারিখে মার্কিন চীফ অব স্টাফ জেনারেল মার্টিন ডেম্পসে এ উদ্দেশ্যে ইহুদী রাষ্ট্র সফর করে এবং এর উপর ভিত্তি করে একই তারিখে কুয়েতি কুনা এজেন্সি ইসরাইলের সেনাবাহিনীর রেডিও চ্যানেলের বরাত দিয়ে একটি খবর প্রচার করে, ‘আমেরিকান বিমান বাহিনীর কমান্ডার মার্ক ওয়েলচ ইসরাইলে সপ্তাহব্যাপী একইরকম গোপন সফর শেষ করার কিছুদিনের মধ্যেই ডেম্পসির সফর শুরু হয়।’ সফর উপলক্ষ্যে উভয়পক্ষ চলমান গবেষণামূলক কাজ সম্পর্কে কথা বলা থেকে বিরত থাকে। আমেরিকার অনুরোধে এ অঞ্চলে ব্যাপক অস্থিরতা ও ইরানে আঘাত হানার ব্যাপারে ইসরাইলি পরিকল্পনার কারণে ওয়েলচের সফর গোপন রাখা হয়। কুনা এজেন্সি আরও জানায়, ‘বিশ্লেষকগণ বিশ্বাস করে যে, হাসান রুহানি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে একটি সুযোগ দিতে নিকট ভবিষ্যতে ইসরাইল যাতে ইরানের বিরুদ্ধে কোন নাটকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে সে ব্যাপারে আমেরিকান সেনাবাহিনীর কমান্ডারগণ তাদেরকে বুঝাবে।’
সাদ্দামের সময়ে ১৯৮১ সালে নির্মাণাধীন নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরে হামলা চালাতে ইহুদী রাষ্ট্রকে আমেরিকা অনুমতি দিলেও শতকরা ২০ ভাগ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করা ইরানের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোতে আক্রমণ করতে সে বাধা প্রদান করে; যা থেকে বুঝা যায়, এ অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থে নিয়োজিত ইরানি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তা করা হচ্ছে। ভীতি সঞ্চার করার মাধ্যমে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উপর আমেরিকার প্রভাব বজায় রাখতে আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানকে নিবারক (deterrent) হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আমেরিকা মুসলিম বিশ্বে আধিপত্য বজায় রাখতে ইরানকে ব্যবহার করে।
একটু আগে ফিরে যাই; ২০০৩ সালে সংলাপ শুরুর সময় থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর ব্যাপারে আমেরিকা কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার বদলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতি মনোযোগী হয়। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হতাশ হয় ও ইসরাইল উষ্মা প্রকাশ করে। সংলাপ চলাকালে আমেরিকা প্রত্যেকবার সমস্যার সমাধানকল্পে সামরিক নয় বরং আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার প্রস্তাব দিয়েছে। ‘ইসরাইলি’ শঙ্কাকে প্রশমিত করতে আমেরিকা উপর্যুপরি হস্তক্ষেপ করেছে, কারণ আমেরিকা ইরান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে চায় এবং নিউক্লিয়ার ইস্যুকে জিইয়ে রেখে পারমাণবিক বোমা উৎপাদন পর্যন্ত পৌঁছতে চায়। ইতোমধ্যে এ সমস্যাটি মোটেও সমাধান করা যায়নি, বরং আমেরিকা এটিকে জিইয়ে রেখেছে যাতে করে একজন ত্রাসসৃষ্টিকারী (অর্থাৎ ইরান) অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখাতে পারে এবং উপসাগরে আমেরিকান সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।
এভাবে ব্যবহার করা ছাড়াও, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র মোকাবেলা করা ও এ থেকে রক্ষা করার ছুতোয় তুরস্ক ও মধ্য ইউরোপে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করতে যাচ্ছে আমেরিকা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট বৃদ্ধির ন্যায্যতার ক্ষেত্রে এ যুক্তিটি শীর্ষে রয়েছে।
৫) আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শত্রুতার ব্যাপারে বাহ্যিকভাবে যা দেখা যায়, তা বুঝতে হলে নিম্নের বিষয়গুলোর দিকে আলোকপাত করতে হবে:
ক. বিপ্লবের আগে ও পরে মার্কিনবিরোধী পরিবেশ ও জনমত সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমেরিকাকে লোকদের দুর্ভোগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হত এবং শাহ ও তার নিপীড়নকে সমর্থন দেয়ায় মার্কিনীদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। আমেরিকাকে তখন বড় শয়তান বলা হত। সে কারণে ইরানের শাসকেরা দু’পক্ষের মধ্যকার আলোচনা পুনরায় শুরু করা ও পরবর্তীতে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি সরাসরি ঘোষণা করতে পারেনি। বিশেষ করে প্যারিসে খোমেনীর সাথে আমেরিকার বৈঠকের কথা, খোমেনীর বিপ্লবে ইরানী সেনাবাহিনী যাতে হস্তক্ষেপ না করে সে ব্যাপারে আমেরিকার চাপ প্রয়োগ করার কথা…এসব গোপন কিছু নয়, সে কারণে আমেরিকার সাথে বসার জন্য ইরান সরকারের অভিনব ঘটনার প্রয়োজন ছিল। ১০/৪/১৯৭৯ সালে আমেরিকান দূতাবাসে জিম্মি ঘটনা সংঘটিত হয় এবং সে কারণে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এর মাধ্যমে খোমেনি আরও শক্তিশালী হয় এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত করা ও ইরান-আমেরিকা সম্পর্কের বাস্তবতাকে আড়াল করা সম্ভবপর হয়। পরবর্তীতে আমেরিকান উৎসসমূহ উল্লেখ করে যে এটি ছিল একটি পরিস্কার আমেরিকান নাটক। হাসান বনি সাদরও আল জাজিরার সাথে পূর্বে উল্লেখিত সাক্ষাৎকারে একইরকম কথা বলে, ‘সেটি ছিল আমেরিকানদের সাথে একরকম চুক্তি ও তাদেরই পরিকল্পনা এবং খোমেনী তাকে বুঝানোর পর সে এ ব্যাপারে একমত হয়।’ ২০/১/১৯৮২ সালে উভয়পক্ষ একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যাকে আলজিয়ার্সের সম্মতিপত্র বলা হয় এবং এর মাধ্যমে জিম্মিরা ছাড়া পায়। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রিগ্যান যেদিন ক্ষমতায় আরোহণ করে সেদিন জিম্মিরা মুক্ত হয় এবং চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমেরিকা কার্যত খোমেনীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে মেনে নেয়। চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং এক পক্ষ অপর পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না তা নিশ্চিত হয়। চুক্তিতে আরো বলা হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে উভয় দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরবর্তীতে নতুন সরকারের অনুরোধে ইরানের বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পদ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার আমেরিকা ফেরত দেয়…
খ. বহুদিন ধরে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করার মত পরিবেশ সৃষ্টি করতে ইরানের শাসকগণ কাজ করে আসছে। যদিও ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুসারে তাদের মধ্যে গোপন সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রয়েছে ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে, এবং এখনও তারা তা অব্যাহত রেখেছে… যেন বর্তমান পরিস্থিতি উভয় পক্ষকে লাভবান করে। আর, আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগকে আড়াল করার জন্য ইরান তাদের সাথে শত্রুভাবাপন্ন হওয়ার ভান করছে। এর মধ্যে দিয়ে বাস্তবে ইরান আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে; এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে, আমেরিকা ইরানের শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং তা এ অঞ্চলে ইউরোপ ও ইসরাইলের ভূমিকাকে সীমিত রাখতে আমেরিকাকে সাহায্য করে। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে ইরানবিরোধী মনোভাবের কারণে আমেরিকা এ অঞ্চলে চতুরতার সাথে নিজ স্বার্থ হাসিল করতে পারে। শাসকদের মধ্যে কেউ কেউ ইরানিদের দ্বারা আমেরিকার দালাল হিসেবে অভিযুক্ত হয়, যেমন: প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বানি আল সদর। সে সময় আমেরিকার সাথে সম্পর্কের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত বিদ্যমান থাকায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। কিন্তু প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট রাফসানজানির সাথে আমেরিকার সম্পর্ককে ইরান-গেট এবং ইরান-কন্ট্রা নামে অভিহিত করা হলেও সে সময় এরূপ বিরোধিতা না থাকায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়নি। মাঝে মাঝে সংস্কারপন্থী ও মধ্যপন্থী এবং রক্ষণশীল ও মৌলবাদী হিসেবে প্রেসিডেন্টরা অভিহিত হলেও এবং শাস্তি পেলেও ইরানের নীতিতে কোনরূপ পরিবর্তন দেখা যায়নি। যদিও আমেরিকার বিরুদ্ধে কেউ কখনও কঠিন বক্তব্য বা কখনও হালকা বক্তব্য দিয়ে এসেছে, কিন্তু তাদের কাজ কখনই সেসব বক্তব্যের অনুগামী নয় এবং সেসব বক্তব্য বাস্তবে প্রতিফলিতও হয়নি। একইভাবে ইরানের প্রতি মার্কিন অবস্থানও পরিবর্তিত হয়নি, যদিও রিপাবলিকানদের থেকে কঠিন বক্তব্য পাওয়া গেছে ও ইরানকে তারা শয়তানের অক্ষশক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং ডেমোক্রেটদের থেকে নমনীয় বক্তব্য পাওয়া গেছে। কিন্তু আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে তেমন কোন কার্যকর ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যখন প্রেসিডেন্ট রুহানি নতুন সরকার গঠন করে, তখন সে বলে, ‘তার সরকার হুমকি ও উত্তেজনা রোধ করাকে পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে গ্রহণ করবে’ (রয়টার্স, ১২/৮/২০১৩)। রুহানি ‘জাতিসংঘে ইরানের সাবেক দূত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষিত এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অবনতিশীল সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য গোপন সমঝোতার আওতায় অনুষ্ঠিত গোলটেবিলে অপরিহার্য অংশগ্রহণকারী মুহাম্মাদ জাওয়াদ সারিফকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে’ (রয়টার্স, ১২/৮/২০১৩) নিয়োগ দেয়। রুহানি নির্বাচিত হবার পর আরও স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, ‘আমরা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি দেখতে চাই না। প্রজ্ঞা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, উভয় দেশকে ভবিষ্যত নিয়ে আরও বেশী চিন্তা করা উচিত এবং অতীতের সমস্যাসমূহ নিরসন করা ও সঠিক সমাধানের জন্য এক সাথে বসার চেষ্টা করা উচিত’ (রয়টার্স, ১৭/৬/২০১৩)। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা এর উত্তরে তাকে বলে, ‘ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে পুরোপুরি প্রশমিত করতে একটি কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরান সরকারের সাথে সরাসরি সংলাপে বসতে প্রস্তুত’ (একই সূত্র)। এর অর্থ হল ইরান আমেরিকার সাথে গোপনে কাজ করার অধ্যায়ের ইতি টানতে চায় এবং খোলাখুলি কাজ করার যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে; কিন্তু ভিন্নরূপে, যাতে সে আঞ্চলিক বিষয়ে সম্পর্ক নিরূপক হিসেবে আঞ্চলিকভাবে একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠে।
৬) উপরের আলোচনা থেকে আমরা যে উপসংহারে আসতে পারি তা হল:
শাসনের জন্য আনুষ্ঠানিক মতবাদ হিসেবে ইরান যা উল্লেখ করেছে সেটিকে সে একটি বার্তা বা পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরেনি এবং এ মতবাদের ভিত্তিতে সে সরকার গঠন করেনি কিংবা সংবিধান প্রণয়ন করেনি এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদসমূহও এর ভিত্তিতে নয়। বরং শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক ও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত সংবিধানের মূল ধারাসমূহ নেয়া হয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে, যা সৌদি শাসনব্যবস্থার মত যেখানে সে অঞ্চলের প্রচলিত মতবাদ হাম্বলী মাযহাবকে শাসকেরা স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। ইরানের পররাষ্ট্রনীতি এ অঞ্চল, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বে মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে। উদাহরণস্বরূপ, এক দশকেরও বেশী সময় ধরে ইরাক ও আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখতে ওয়াশিংটনকে ইরান সহায়তা করেছে এবং এছাড়াও লেবাননে তার হিযবের মাধ্যমে সে রাজনৈতিক প্রভাববলয়কে বিস্তার করেছে। সাম্প্রতিককালে আল-আসাদকে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে সিরিয়াতে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে জোটবদ্ধ হয়েছে। সুতরাং ইরাক, আফগানিস্তান, লেবানন ও সিরিয়াতে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ইরান কাজ করছে। এ অঞ্চলের বাইরে আমেরিকা ইরানের আচরণকে সফলভাবে ব্যবহার করে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলকে ভারসাম্যহীন নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করে এবং ইরান ভীতিকে কাজে লাগিয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে।
ইরান আমেরিকার সাথে একই পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং সে সব কিছু বুঝে এই পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ইরান তার সীমা সম্পর্কে অবগত এবং সে কারণে তা অতিক্রম করে না; এমনকি চতুরতার আশ্রয় নিতে বা সত্যকে ঢেকে রাখতে যদি উঁচু গলায় কথা বলতে হয় তখনও – যেমনটি ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়াতে আমেরিকার জন্য ব্যাপক আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসা আহমাদিনেজাদের সময় ঘটেছিল। সে কারণে আমেরিকা তার স্বার্থ পূরণে ইরান সরকারকে এমন সেবাদাস হিসেবে দেখতে পায় যে, মার্কিন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী চক্র এ সরকারকে পরিবর্তনের কোন কারণ খুঁজে পায় না। ১২ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে তারা এরকমই ঘোষণা করে যখন একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনে ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক ও এটি কেমন হওয়া উচিত সে ব্যাপারে রবার্ট গেটস বলে, ‘কেউই ইরানের সরকারকে পরিবর্তন করতে চায় না… আমরা নীতি ও আচরণের পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যাতে করে সে এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য অস্থিরতা ও ত্রাসের কারণ না হয়ে সুপ্রতিবেশী হতে পারে।’
৪ শাওয়াল, ১৪৩৪ হিজরী
২১আগস্ট ২০১৩ খ্রিস্টাব্দআবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রা)-এর আল-কুরআন চর্চা

আবদুল্লাহ (রা)-এর আম্মার নাম ছিল উম্মু আব্দ। সেই জন্য আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা)-কে লোকেরা ইবনু মাসউদ (রা)-কে লোকেরা ইবনু উম্মু আব্দ বলে ডাকত।
ছোটবেলায় তিনি উকবা ইবনু আবি মুআইতের ছাগল পাল নিয়ে মক্কার উপত্যকাগুলোতে চরাতেন। তিনি শুনতেন যে মক্কার এক ব্যক্তি নবুয়্যত লাভ করেছেন। তবে তিনি তাঁকে চিনতেন না। সারাদিন তিনি ছাগল নিয়ে মক্কার বাইরেই থাকতেন। সাঁঝে শহরে ফিরতেন।
একদিন তিনি যথারীতি ছাগল চরাচ্ছিলেন। সহসা দেখতে পান, দুইজন লোক তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁরা খুব পিপাসার্ত ছিলেন। কাছে এসে একজন বলেন, ‘ওহে ছেলে, আমরা খুব পিপাসার্ত। কিছু দুধ দুইয়ে তুমি আমাদেরকে দাও।’ আবদুল্লাহ বললেন, ‘তা আমি পারব না। ছাগলগুলো তো আমার নয়। আমি একজন রাখাল মাত্র’।
আগন্তুকদের একজন বললেন, ‘তাহলে আমাদেরকে একটি ছাগী দেখিয়ে দাও যেটি এখনো পাঁঠার স্পর্শে আসেনি।’ ছেলেটি একটি ছাগীর দিকে ইশারা করলো।
আগন্তুক “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে একটি হাত দিয়ে ছাগীটির ওলান মলতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুধ বের হয়। তিনি গর্ত বিশিষ্ট একটি পাথর টুকরো ওলানের নিচে রাখেন। দুধে তা ভরে যায়। আগন্তুকরা দুধ পান করে পিপাসা মিটালেন। ছেলেটিকেও দুধ পান করালেন। আগন্তুকদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ(সা)। দ্বিতীয় জন আবু বকর আস্ সিদ্দিক (রা)।
এই ঘটনার কিছুদিন পর আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ(রা) নবুয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। একদিন তিনি তাঁর কাছে যান। তাঁকে দেখে চিনতে পারেন। তাঁর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে মনিবরূপে গ্রহণ করে তাঁর সাহচর্যে থাকা শুরু করেন।
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে আল-কুরআন শেখেন। ইয়াসরিবে (আল-মদিনায়) হিজরাতের পরও তিনি আল-কুরআন চর্চায় নিবেদিত থাকেন। তিনি সুমধুর কণ্ঠে আল-কুরআন অধ্যয়ন করতেন। মাঝে-মধ্যে মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁকে আল-কুরআন পড়ে শুনাতে বলতেন।
একদিন রাতে আবু বকর আস্ সিদ্দিক (রা) এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ শেষে তাঁর গৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁরা দেখলেন, এক ব্যক্তি মসজিদে দাঁড়িয়ে সালাতরত অবস্থায় আল-কুরআন তিলাওয়াত করছেন।
আল্লাহ্র রাসূল (সা) কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাঁর তিলাওয়াত শুনলেন। অতঃপর তিনি বললেন,
“আল-কুরআন যেমন অবতীর্ণ হয়েছে তেমন বিশুদ্ধভাবে তা তিলাওয়াত করে কেউ কেউ যদি আনন্দিত হতে চায়, সে যেন ইবনু উম্মু আবদের মতো তিলাওয়াত করে“।
তিনি যে কেবল সুন্দরভাবে আল-কুরআন পাঠ করতে পারতেন, তাই নয়। তিনি ছিলেন আল-কুরআনের গভীর জ্ঞান সমৃদ্ধ একজন ব্যক্তি। আলাপ-আলোচনাকালে তাৎক্ষণিকভাবে আল-কুরআনের ভুরিভুরি আয়াত তিনি উদ্ধৃত করতে পারতেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর সময় একটি ঘটনা। উমর (রা) কোনো একটি সফরে রাতে আরেকটি কাফিলায় রাতের আঁধারে এক কাফিলায় লোক অন্য কাফিলায় লোকদেরকে চিনতে পারছিলেন না। উমর উবনু খাত্তাব (রা) দ্বিতীয় কাফিলার লোকদেরকে কিছু প্রশ্ন করেন। প্রতিটি প্রশ্নে জওয়াবে উচ্চারিত আল-কুরআনের এক একটি আয়াত। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) ভাবলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) ছাড়া আর কারো এমন যোগ্যতা থাকার কথা নয়।
তিনি সবশেষে প্রশ্ন রাখলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) আছেন?’ জওয়াব এলো “হ্যাঁ।”
আল-কুর’আনের মর্মকথা জানার ক্ষেত্রেও আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) ছিলেন প্রথম সারির সাহাবির একজন। তদুপরি আজীবন তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে আল-কুরআনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করে গেছেন।
মূল: সদ্য প্রয়াত এ কে এম নাজির আহমেদ (আল্লাহ তার উপর রহম করুন) এর ’আসহাবে রাসূলের জীবনধারা’ বই হতে
মানতূক ও মাফহূম
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামকে প্রেরণ করেছেন চুড়ান্ত বাণী রূপে যা বিচার দিবস অবধি অব্যাহত থাকবে। এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বাণীকে পরিপূর্ণ রূপে ও সকল বিষয়ের ব্যখ্যাসরূপ বর্ণনা করেছেন,
ما كانَ حَديثًا يُفتَرىٰ وَلٰكِن تَصديقَ الَّذى بَينَ يَدَيهِ وَتَفصيلَ كُلِّ شَيءٍ وَهُدًى وَرَحمَةً لِقَومٍ يُؤمِنونَ
এটি (তথা কুরআন) কোনো মনগড়া কথা নয়, বরং পূর্ববর্তী (ওহীর) সত্যায়ন, প্রত্যেক বিষয়ের বিশদ বিবরণ এবং ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য রহমত ও হেদায়েত [সূরা ইউসূফ: ১১১]
وَنَزَّلنا عَلَيكَ الكِتٰبَ تِبيٰنًا لِكُلِّ شَيءٍ
আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নাযিল করেছি যেটি এমন যে তা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা.. [সূরা আন-নাহল: ৮৯]
তথাপি দেখা যায় যে, কুরআন ও সুন্নাহ আকারের দিক থেকে সীমিত অথচ মানুষ যে সকল সমস্যা ও বিষয়ের সম্মুখীন হয় তার পরিসর অসীম অনুভূত হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন চলে আসে যে, কিভাবে এই সীমিত পরিসরের টেক্সট নাযিলের সময় থেকে শুরু করে বিচার দিবস পর্যন্ত মানুষের সকল সমস্যার সমাধান ধারণ করতে পারে?
এর উত্তর পেতে হলে আমাদের অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনাভঙ্গি বুঝতে হবে।
১) প্রথমতঃ চার্চের দৃষ্টিতে বাইবেল (যা পবিত্র টেক্সট, আইনী টেক্সট) যা গন্ডিবদ্ধ ও যার পরিসর সীমিত, ইসলামী টেক্সট তদরূপ নয়। ইসলামী টেক্সট হচ্ছে একটি সামগ্রিক আইনি বিধান, যা সাহায্য করে টেক্সট থেকে হুকুম বের করে আনতে যদিও তা বাহ্যিকভাবে উল্লেখিত থাকে না। আর এই পদ্ধতি উসূল আল-ফিকহ নামে পরিচিত।
২) দ্বিতীয়তঃ ইসলামী টেক্সট প্রবৃত্তি ও বহুবিধ প্রয়োজনীয়তা সম্বলিত মানুষকে সম্মোধন করেছে, আর দিয়েছে সমাধান কেননা মানুষের প্রকৃতি কখনো পরিবর্তিত হয় না। তাই এটি টেক্সটে উল্লেখিত মূল হুকুমকে সম্প্রসারিত করে উদ্ভূত নতুন বিষয়ের জন্য হুকুম বের করে আনতে একজন মুজতাহিদকে সহায়তা করে।
৩) সবশেষে, টেক্সটের ভাবার্থ এমনভাবে ব্যক্ত, একটি হুকুমকে অন্য হুকুমে সম্প্রসারনের ভিত্তি হিসেবে সহায়ক এবং এই প্রক্রিয়াটিতে অসংখ্য বিষয় জড়িত। এই আর্টিকেলটিতে এই ধরনের দুটি বিষয় বর্ণিত হয়েছে, মানতূক ও মাফহূম।
মানতূক:
মানতূক শব্দটি ‘নাতাকা’ শব্দ থেকে উদ্ভূত (যা ‘উচ্চারন করা’ এর অতীতবাচক রূপ) এবং মানতূক অর্থ হচ্ছে ‘উচ্চারিত শব্দ’ যা অতীতবাচক শব্দ।
শরীআহতে মানতূক বলতে বুঝানো হয় যা টেক্সটের উচ্চারিত বা উল্লেখিত শব্দ হতে সরাসরি উপলব্ধ হয়। যেমন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,
কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে [সূরা বাকারা: ১৮৫]
এই টেক্সটটি রমজানে সিয়ামের ফরজিয়্যাতকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়াও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,
সালাত কায়েম করো
এই আয়াতটি সালাতের ফরজিয়্যাতকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, সালাত আদায় করো, যেভাবে তোমরা আমাকে সালাতে দেখ।
এই হাদীসে বলা হয়েছে যে, মুসলিমদের রাসূল (সা) এর পদ্ধতিতেই সালাত আদায় করতে হবে। এছাড়াও, রাসূল (সা) বলেছেন, সালাতে ইমাম নিয়োজিত হয়েছে অনুসরনের জন্য, তাই তার রুকূ অনুযায়ী রুকূ করো।
হাদীসটি এই দিকনির্দেশনা দেয় যে, সালাতে ইমামকেই অনুসরন করতে হবে ও মুসলিমদের অবশ্যই ইমামের রুকুর পরপরই রুকু করতে হবে। এ উদাহরণের অর্থটি নেয়া হয়েছে তার টেক্সট থেকে। অর্থাৎ, এইসকল অর্থ মানতূক তথা ব্যক্ত শব্দ (শাব্দিক অর্থ) হতে নেয়া হয়েছে যা কুরআনের কোনো আয়াত বা রাসূল (সা)-এর কোনো হাদীস হতে নেয়া হয়েছে ।
মাফহূম:
মাফহূম শব্দটি এসেছে “ফাহিমা”থেকে যার শাব্দিক অর্থ “অনুধাবন করা”বা “বুঝতে পারা”। এখানে মাফহূম মানে সরাসরি টেক্সট থেকে আক্ষরিকভাবে কোন কিছুকে নেয়া বলা হয় না বরং টেক্সটের অর্থ হতে যা পাওয়া যায় অর্থাৎ বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বা পরোক্ষ ভাব। বক্তব্যের আক্ষরিক অর্থ হতে যা বোঝা যায় তা নয় বরং ব্যক্ত বক্তব্য থেকে যা উপলব্ধি করা যায় তা-ই হলো মাফহূমের শরীয়াহগত অর্থ। যেমন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ
তাদের প্রতি ‘উফ’ বলোনা [সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩]
এর সরাসরি অর্থ হলো পিতামাতার প্রতি ‘উফ’ না বলা। তথাপি, এর ভাবার্থ হলো কোনো রকমের বাচনিক বা শারীরিক বিরক্তি প্রকাশ না করা (যদিওবা টেক্সটে তা সরাসরি উল্লেখিত নেই)। অতএব, শব্দটি ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা নেয়া হয়েছে মানতূক থেকে আর প্রত্যক্ষভাবে পিতামাতাকে গালাগাল বা মারধর করার নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নেয়া হয়েছে এর মাফহূম থেকে। আক্ষরিকভাবে ঐ আয়াতে পিতামাতার প্রতি ঐ নির্দিষ্ট ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে আর ঐ আয়াতের অর্থ এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পিতামাতার প্রতি কোনো রকম খারাপ ব্যবহার, তা বাচনিক কিংবা শারীরিক দুর্ব্যবহার হোক তা না করা বুঝাচ্ছে। মাফহূমকে দুইভাগে ভাগ করা যায়:
১। মাফহুম আল মুয়াফাকাহ
২। মাফহুম আল মুখালাফাহ
মাফহুম আল মুয়াফাকাহ:
মুয়াফাকাহ এর শাব্দিক অর্থ “কোন কিছুর সাথে সংগতিপূর্ণ”। তাই, মাফহূম আল মুয়াফাকাহ-র অর্থ দাড়ায় “অনুধাবিত অর্থ যা কোন কিছুর সাথে সংগতিপূর্ণ”।
যদি টেক্সট থেকে উৎসারিত কোন হুকুম বা বিধি যদি ঐ টেক্সটের মানতূকের সাথে সংগতিপূর্ণ হয় তবে তাকে মাফহূম আল মুয়াফাকাহ বলা হবে। পিতামাতাকে শারীরিকভাবে অত্যাচারের উপরোল্লিখিত নিষেধাজ্ঞাটি এর একটি উদাহরণ। পিতামাতাকে মারধরের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মাফহূমটি উফ বলার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মানতূকের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। মাফহূম ও মানতূক উভয়ই কোন কিছু নিষেধ করছে। তাই এই ক্ষেত্রে মাফহূমকে মাফহূম আল মুয়াফাকাহ বলা হবে।
আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا
যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষন করে.. [সূরা নিসা: ১০]
মানতূক অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদকে গ্রাস করার ব্যাপারে নিষেধ করছে। মাফহূম এই আয়াতে শুধু সম্পদ অন্যায়ভাবে নেয়াকে নয় বরং তাদের সম্পদ নষ্ট করে ফেলার নিষেধাজ্ঞার প্রতিও নির্দেশনা দিচ্ছে। এখানে মানতূক ও মাফহূম উভয়ই নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। যেহেতু মাফহূম মানতূকের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ তাই এটি মাফহূম আল মুয়াফাকাহ।
মাফহুম আল মুখালাফাহ:
মুখালাফাহ-র শাব্দিক অর্থ “কোনো কিছু অন্য কিছুর সাথে অসংগতিপূর্ণ হওয়া”। তাই মাফহূম আল মুখালাফাহ এর শাব্দিক অর্থ দাড়ায় “অনুধাবিত অর্থ অন্য কোনো কিছুর সাথে অসংগতিপূর্ণ হওয়া”।
যদি হুকুমটি এমন টেক্সট থেকে নেওয়া হয় যা এর মানতূক এর অর্থের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাহলে তাকে মাফহুম আল-মুখালাফা বলা হবে। উদাহরনসরূপ, যখন মানতুক কোনো বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠা করে অথচ মাফহুম নিষেধ প্রতিষ্ঠা করছে, যেহেতু, বাধ্যবাধকতা ও নিষেধ দুটোই একে অপরের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। এটি তখনো হতে পারে যখন মানতূক বা মাফহুম এর যেকোনো একটি বাধ্যবাধকতা বা নিষেধ প্রতিষ্ঠা করছে এবং অপরটি করছে না। উদাহরনসরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সূরা আহযাবে বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا
যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে [সূরা আহযাব: ৫৮]
এ আয়াতের মানতূক কোনো মুসলিমের উপর বৈধ কারণ ছাড়া কষ্টারোপ বা ক্ষতিসাধন করা নিষেধ করছে। কিন্তু যদি কষ্টারোপের কোনো বৈধ কারণ থেকে থাকে তবে তা করাটি বৈধ বলে বিবেচিত হবে। উদাহরনসরূপ, যদি কোনো মুসলিম চুরি করে তবে তার হাত কেটে দেয়া হবে এবং এটি তার জন্য ক্ষতিসাধন। এক্ষেত্রে, মাফহূম বৈধতা প্রতিষ্ঠা করছে যদিও মানতূক নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করছে। যেহেতু, হালাল ও হারাম একে অপরের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই এই মাফহূমকে বলা হবে মাফহূম আল-মুখালাফা।
আরেকটি উদাহরন রয়েছে সূরা আহযাবে:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا
মুমিনগণ! তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে বিবাহ কর, অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তখন তাদেরকে ইদ্দত পালনে বাধ্য করার অধিকার তোমাদের নাই [সূরা আহযাব: ৪৯]
এখানে মানতূক একটি হুকুম প্রতিষ্ঠা করছে যে, যদি কোনো মহিলাকে তালাক দেয়া হয়, তাহলে সে ইদ্দত ছাড়াই আবার বিবাহ করতে পারবে। মাফহূম বলছে, যদি বিবাহ-সম্ভোগের পরে তালাক হয়, তবে ইদ্দত অপরিহার্য। মানতূক ইদ্দত প্রতিষ্ঠা করে না, তবে মাফহূম ইদ্দত প্রতিষ্ঠা করে, তাই এটি মাফহূম আল-মুখালাফা। এটি এমন এক হুকুমের উদাহরণ যা নির্দিষ্ট শর্তের উপর নির্ভরশীল।
এই মাফহূম চার অবস্থায় প্রয়োগ হতে পারে:
১) যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার সাথে জড়িত থাকে।
২) যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার অবস্থার সাথে জড়িত থাকে।
৩) যদি হুকুমটি কোনো স্থান ও সময়ের উপর সীমারোপ করে।
৪) যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার সাথে জড়িত থাকে।
১। যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার সাথে জড়িত থাকে:
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: ধনী ব্যক্তির (দেনা পরিশোধ) দীর্ঘায়িত করা যুলুম। হাদীসের মানতূক প্রতিষ্ঠা করছে যে, যদি ধনী ব্যক্তি তার দেনা পরিশোধে টাল-বাহানা করে কিংবা দীর্ঘায়িত করে, তবে তা নিষেধ। আর মাফহূম হচ্ছে দরিদ্র ব্যক্তির দেনা পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া বৈধ। এখানে মানতূক নিষেধাজ্ঞা অন্যদিকে মাফহূম বৈধতা প্রতিষ্ঠা করছে।
এই উদাহরণে, মূল টেক্সটের হুকুমটি একটি বর্ণনার সাথে সম্পর্কিত, কোনো নামবাচক কিছুর সাথে নয়। ‘গণী’ শব্দটির অর্থ ধনী যা কোনো ব্যক্তির বর্ণনা যা তার মধ্যে বিরাজ করতে পারে আবার নাও পারে।
২। যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার অবস্থার সাথে জড়িত থাকে:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
وَإِن كُنَّ أُولٰتِ حَملٍ فَأَنفِقوا عَلَيهِنَّ حَتّىٰ يَضَعنَ حَملَهُنَّ
যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তানপ্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করবে [সূরা তালাক: ৬]
আয়াতের মানতূক হচ্ছে তালাকপ্রাপ্ত নারীর সন্তান জন্ম না নেয়ার আগমূহুর্ত পর্যন্ত ভরণপোষণের ফরযিয়্যাত আয়াতের মানতূক থেকে স্পষ্ট। যদিওবা, সে সন্তানসম্ভবা না হলে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়ার ফরযিয়্যাতটি প্রয়োগ না হয়ার বিষয়টি মাফহূম থেকে স্পষ্ট। এক্ষেত্রে মানতূক মাফহূমের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাই এটি মাফহূম আল-মুখালাফা।
৩। যদি হুকুমটি কোনো স্থান ও সময়ের উপর সীমারোপ করে:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ
অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত [সূরা বাকারা: ১৮৭]
আয়াতে মানতূক হচ্ছে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মুসলিমরা রোজা রাখতে বাধ্য। যদিওবা মাফহূমে সূর্যাস্তের পর রোজা রাখাকে হারাম করা হয়েছে। মানতূক মাফহূমের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাই এটি মুখালাফা।
৪। যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার সাথে জড়িত থাকে:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ
ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর [সূরা নূর: ২]
আয়াতের মানতূক হচ্ছে ১০০টি বেত্রাঘাত (দোররা) মারা। মাফহূম হচ্ছে ১০০ এর উর্ধ্বে না যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা। মানতূক মাফহূমের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাই এটি মুখালাফা।
রাসূল (সা) বলেন “যদি সফরকালের সঙ্গী তিনজন হয় তবে একজনকে নেতা নির্বাচন করে নাও”। এবং “পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে অবস্থিত তিনজন মানুষের জন্য তাদের একজনকে আমীর নির্বাচন করা ব্যতিত থাকা বৈধ নয়”।
এইখানে এক বলতে শুধুমাত্র একজনকেই বুঝানো হয়েছে অর্থাৎ একটি সংখ্যার দিকে জোর দিয়েছে অন্যকিছু নয়। এটি মাফহুম আল মুখালাফা থেকে উৎসারিত। এই ক্ষেত্রে অন্য কোন দলীল পাওয়া যায় না যা একে বাতিল করে। তাই, মাফহুম আল মুখালাফাহ উপরোক্ত হাদীসদ্বয় হতে এই নির্দেশনা দেয় যে মুসলিমদের জন্য একের অধিক ব্যক্তির নিকট শাসনকর্তৃত্ব থাকা বৈধ নয়।
যেসব ক্ষেত্রে মাফহূম আল মুখালাফাহ প্রয়োগ হয়না:
যদি উপরোল্লিখিত কোনো বাস্তবতার সাথে হুকুমের মিল না থাকলে তা প্রয়োগ হবে না। যেমন: যদি হুকুমটি কোন গুণের (সিফাত) পরিবর্তে কোন বস্তু (নামবাচক – ইসম) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। এর দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আমরা জানি মজুতদারী ইসলামে হারাম, কেননা রাসূল (সা) বলেন- “একমাত্র অসৎ ব্যক্তিই মজুতদারী করে” [মুসলিম]। তাই কোন পণ্য দাম বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মজুত রেখে বিক্রী করা হারাম। কিন্তু যোগান যদি বেশি হয় এবং পন্যের মজুতকরন যদি জনগণের জন্য বোঝাস্বরূপ না হয়, সেক্ষেত্রে এটি জায়েজ।
আবার, আরেকটি হাদীসে রাসূল (সা) খাদ্য দ্রব্যের মজুতদারীকে কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। এই হাদীসের মানতুক হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের মজুতদারি হারাম, এবং মাফহূম আল-মুখালাফাহ হচ্ছে খাদ্যপণ্য ছাড়া বাকী পণ্যের মজুতদারি হালাল হওয়ার নির্দেশনা। যদিওবা, যেহেতু হারাম হওয়াটা একটি শব্দ “তো’য়াম”-আরবী ব্যাকরন অনুসারে যা একটি বিশেষ্য (ইসম) ও কোন বিশেষণ (সিফাত) নয়, তাই মাফহূম আল-মুখালাফাহ এইক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং শুধু খাদ্যদ্রব্য নয় বরং সব কিছুর মজুতদারি হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই হাদীসের মাফহূমে অন্যান্য পণ্যের মধ্যে একটি পণ্যের মজুতদারি হারামের কথা বলা হয়েছে।
অন্য আরেকটি হাদীসে, রাসূল (সা) বলেন- “তোমরা একের পর এক ইমামের (খলীফার) বা’য়াত পূর্ণ কর” এবং আরেক বর্ণনায় “সকলেই (ইমামই) কুরাইশ থেকে হবে”। [মুসলিম]
প্রথম হাদীসটি একজন ইমাম বা খলীফাহ নিয়োগ সংক্রান্ত। দ্বিতীয় হাদীসটিতে কুরাইশ শব্দটি প্রথমে হাদীসে উল্লেখিত বা’য়াতের ফরযিয়্যাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু যেহেতু কুরাইশ শব্দটি একটি নামবাচক শব্দ (ইসম), তাই মাফহূম আল-মুখালাফাহ প্রয়োগ হবে না অর্থাৎ এক্ষেত্রে ইমামকে কুরাইশ থেকে হতেই হবে তার বাধ্যবাধকতা আর থাকে না।
যদি প্রাপ্ত মাফহূমের বিপরীতে অন্য কোনো দলীল পাওয়া যায় যা মাফহূমের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেক্ষেত্রে এ নীতি প্রয়োগ হবে না। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا
যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে [আহযাব: ৫৮]
এই আয়াতে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়া হারাম করেছে, মাফহুম আল-মুখালাফাহ থেকে তার মানে দাড়ায় অমুসলিমদের কষ্ট দেয়া বৈধ, যা ভুল। কেননা অন্য আরেকটি আয়াতে যেকোনো কাউকে অন্যায়ভাবে কোনরূপ কষ্ট দেয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে যদিও সে অমুসলিম।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا
মুমিনগণ! তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে বিবাহ কর, অতঃপর (যদি) তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তখন তাদেরকে ইদ্দত পালনে বাধ্য করার অধিকার তোমাদের নাই [সূরা আহযাব: ৪৯]
এই আয়াতটি তালাকপ্রাপ্ত মুমিন নারীকে তার ইদ্দতকালের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। আয়াতটি হতে এই মাফহূম পাওয়া যায় যে এটি অমুসলিমদের ব্যপারে প্রযোজ্য নয়, যে তাদের ইদ্দত নেই।
এটি দুইটি কারনে ভুল:
وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ
আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন কুরূ পর্যন্ত [সূরা বাকারা: ২২৮]
এই আয়াতে তালাকপ্রাপ্ত নারীদের তারা তালাকপ্রাপ্ত হওয়া ছাড়া অন্য কোন বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়নি, তাই এই আয়াতের মানতূক সুরা আহযাবে উল্লেখিত মাফহূম আল-মুখালাফাকে খারিজ করে দেয়।
সুরা আহযাবের আয়াতের বর্ণনা (মুসলিম বনাম অমুসলিম)-এ হুকুমটি বাস্তবায়ন করার জন্য কোনো পরোয়ানা জারি করে না। একজন মহিলা সে মুসলিম বা অমুসলিম হওয়া না হওয়ার সাথে তার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এটি আম বা সাধারন হুকুম হিসেবে থাকবে এবং এর বর্ণনা এই হুকুমকে সীমাবদ্ধ করে না। যদি কোনো শিক্ষক কোনো মেধাবী ছাত্রকে পুরষ্কৃত করে থাকে তাহলে সে এর দাবিদার বলা যায়। কিন্তু যদি পুরষ্কারটি কোন মোটা ছাত্রকে দেয়া হয় তবে সেটির সাথে তার কৃতিত্বের কোন সম্পর্ক নেই এবং তাকে এর দাবিদারও বলা যায় না। ঠিক একইভাবে, উল্লেখিত আয়াতটিতে ইদ্দতকাল পূরন করার বিষয়টি কোনো মহিলার বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত করার কোনো ভিত্তি নেই।
সারমর্ম:
পরিশেষে, দুটি বিষয় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে:
প্রথমত, এই বিষয়টি নিয়ে উম্মাহ-র মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য আলোচনা না হওয়ার দরূণ তাদের চিন্তায় বিস্তর ফারাক দেখা দেয়, ফলে সে নিজের সুবিধা মত আয়াতের ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বর্তমান তথাকথিত মুসলিম শাসকগোষ্ঠী তাদের পছন্দের আলেম দিয়ে এই নীতির মাধ্যমে খাদ্যের মজুতকরণ, উম্মাহ-র সম্পদ লুটকে যায়েজ করে নেয়। তাই মুসলিমদেরকে পূনর্জাগরণের জন্য এই নীতি সম্পর্কে ভালো ধারনা থাকা প্রয়োজন কেননা এটি ইসলামী টেক্সটকে ভালোমত উপলব্ধি করার সাথে সম্পর্কযুক্ত যা মুসলিমদের জীবনকে পরিচালিত করে ।দ্বিতীয়ত, টেক্সটকে বুঝার প্রক্রিয়া অন্যান্য প্রক্রিয়ার মতই সূক্ষ্ম; তাই এটি পর্যবেক্ষনের ক্ষেত্রে অবশ্যই কড়া বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। আর তা না করলে, এর সাদৃশ্যতা সেইরূপ যেন কোনো যন্ত্রপাতি, পদ্ধতি, সূত্র ও সমীকরণের জ্ঞান ছাড়াই কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে যাওয়া। যা কোনভাবেই বাঞ্ছনীয় নয়।
নুসরাহ – অন্বেষন করতে হয় নাকি প্রস্তুত করতে হয়?

আরব বসন্ত নামে পরিচিত বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় বিশেষ করে আশ-শামের আন্দোলনের পর গত বেশ কিছুদিন ধরে নুসরাহ বিষয়টি উম্মাহের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে উম্মাহ বা শাবাব, যারা দাওয়াহ করেন তারা যেসব চিন্তা বা প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে তা হল:
১. হিযব যারা শরীয়া’হ ও রাজনৈতিক বিষয়াদি সম্পর্কে সবচেয়ে সজাগ, তা সত্ত্বেও তারা কেন নুসরাহ অন্বেষনের জন্য জোড় তাগিদ দেয়?
২. কেনই বা হিযব এমন একটি শক্তিশালী বাহিনী তৈরী করছেনা যাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্টিত হওয়া যায়?
৩. এবং কেনই বা হিযব আল-শামে সশস্ত্র ব্রিগেড বা রেজিমেন্ট গঠন করছেনা; যেটি খিলাফত প্রতিষ্ঠার আর্মির জন্য নিউক্লিয়াস স্বরূপ কাজ করবে।হিযব এমন একটি দল যেটি এক নেতৃত্বের ছায়াতলে ৫ মহাদেশে, ইসলামী বিশ্বে বা অনৈসলামি বিশ্বে তাদের কার্যক্রম থাকার ফলে এই প্রশ্নগুলো আরও গভীর হয়ে উঠে। এবং এটিই হচ্ছে একমাত্র দল যা তার চিন্তা এবং অনুভুতির মধ্যে সংগতি ও ঐক্য বজায় রেখে সমগ্র বিশ্বের এসকল অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে।
এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আমদের একটি বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা থাকা প্রয়োজন। আর তা হল-নুসরাহ চাওয়ার মাসআলাহ বা ইস্যুটি দলের পছন্দ বা অপছন্দের উপর নির্ভর করে না বরং উপনীত হুকুম শরী’আহ নির্ধারন করে। এবং শরীয়া’হ যে নির্দেশ দিয়েছে তা প্রত্যেক মুসলিম পালন করতে বাধ্য যদিওবা সকল মানুষ এর প্রতিকুলে রয়েছে। এবং এক্ষেত্রে অন্য কোনো নির্দেশের দিকে গমন করা অবৈধ যেহেতু মূল হুকুমটি আল্লাহর শরী’আহ হতে নেয়া হয়েছে:
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًاআল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তখন কোনো ঈমানদার পুরুষ ও কোন ঈমানদার নারীর তাদের সে ব্যাপারে তাদের নিজেদের কোনো রকম এখতিয়ার থাকে না (যে তারা তাতে কোনো রদবদল করবে); যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করবে, সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। (৩৩:৩৬)
এই কারণেই দল নুসরাহ অন্বেষনের কাজের জন্য জোড় তাগিদ দেয়। কেননা এটি শরী’আহ বাস্তবায়নের প্রতিনিধিত্ব করে এবং এটিই একমাত্র কারণ।
এবং যারা এই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছেন তাদের আমরা প্রশ্নের মাধ্যমে জিজ্ঞেস করি:
১. রাসূল (সা) এর সীরাহ অনুসরণ করা কি মুসলিমদের উপর ফরজ নাকি ফরজ না?
২. খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল (সা)-এর হেদায়েদপ্রাপ্ত নবুয়তী জীবন অনুসরণ করতে মুসলিমরা কি বাধ্য নাকি শুধুমাত্র বাথরুমে যাওয়ার পদ্ধতি, অযু ভঙ্গের কারণসমূহ বা তাঁর জীবনের নৈতিকতা অনুসরণ করতে বাধ্য?এবং উম্মাহর রাজনীতি করা ও শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়গুলো কি তার (সা)-এর জীবন হতেই নির্ধারিত করতে হবে নাকি পরিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার নিরিখে নির্ধারিত হবে?
এবং যারা বলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার হুকুমে পৌছানো মূলত একটি উপায় (style) যা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র দেয়া অনেকগুলো উপায় (style) থেকে বেছে নিতে পারি – তাদেরকে জবাবে বলব, একটু থামুন! আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র দ্বীন এবং তার শরীয়া’হ-র ব্যাপারে বড় বড় দাবি করবেন না বিশেষ করে যখন সেই বিষয়ে আপনাদের জ্ঞান নেই। যে কারণে অযু ভাঙ্গে সেসব কারণ জানা না থাকলে অযু ভাঙার কারণ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কী কী হতে পারে তা বলা যেরকম সমীচিন নয় তদ্রুপ খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ব্যাপারেও জ্ঞান না থাকলে উদ্ভট, নিজ চিন্তাপ্রসুত কিছু বলা উচিত নয়। যদি আমরা বিশ্বাস করে থাকি রাসূল (সা) দ্বীনের সকল বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা ব্যাক্ত করেছেন তবে এটা কি করে সম্ভব যে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রক্রিয়া এবং তা বাস্তবে রূপদান করা সম্পর্কে কোন স্পষ্ট ধারণা দিয়ে যাবেন না? রাসূল (সা) কি বলেননি-“এটিই হচ্ছে পরিস্কার পথ যা রাত্রি দিবালোকের মত স্পষ্ট। আর তা হল আল্লাহ-র কিতাব এবং রাসূল (সা) এর সুন্নাহ”। নাকি খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি এই সরলপথের আওতামুক্ত এবং রাসূল (সা) থেকে আসার কথা না?
এবং আমরা সকল মুসলিমদের বলতে চাই: মুলত হিযব শরীয়া’হ এর যে দলীল এর কারণে নুসরাহ চাওয়াকে ইচ্ছা হলে পরিবর্তনযোগ্য শুধুমাত্র কোন উসলুব (style) মনে করে না [বরং অপরিবর্তনীয় তরীকা’র (পদ্ধতির) অংশ বলে গন্য করে] এবং তা পালন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয তা হলো:
প্রথমতঃ সিদ্ধান্তে পৌছানোর জন্য আমাদের কাছে মক্কায় দেখানো মডেল ছাড়া আর কোন মডেল বা দলীল নাই [যা খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির সাথে সম্পর্কযুক্ত]। সাহাবী, আত-তাবে’উন, তাবে-তাবে’ঈনদের যুগে কিংবা ফিকহের কিতাবেও এর কোন মডেল পাওয়া যায় না। এর মানে হলো এটিই একমাত্র শরীয়া’হ দলীল এবং রূপরেখা যা থেকে উৎসারিত হয় ‘কিভাবে ক্ষমতায় যেতে হবে’ এবং তা মেনে চলা ধড়া আমাদের জন্য সেভাবেই ফরজ।
দ্বিতীয়তঃ নুসরাহ’র ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলীল বিদ্যমান যা নির্দেশনা প্রদান করে যে নুসরাহ তলব আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে আসা এক ওহী। সেটি ইবনে কাছীরের সীরাতে (১৬৩/৭), আল-বায়হাকীর দালায়েলুন নুবুওয়্যাহ (২৯৭/২), ইবনে হিব্বানের সীরাতে (পৃ-৯৩), আবু নাঈম আল আসবাহানীর মা’রেফাতুস সাহাবাহ (২৭৪/৪) এবং আল-ইখতিফায় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অভিযানসমুহ ও তিন খলীফার আলোচনায় আবু রাবী’ সুলায়মান বিন মুসা আল-কালাঈ আল-আন্দালুসি (৩৩৭/১) কর্তৃক বর্ণিত আছে।
আলি ইবনে আবি তালিব থেকে বর্ণিত- ‘যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নবী (সা)-কে আরব গোত্রদের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দেন তখন তিনি মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন এবং আমি ও আবু বকর তার সঙ্গী হই…’।
এই হাদীসের ব্যাপারে আল-ইখতিফার লেখক আল-খালায়ী বলেন- ‘এটি একটি প্রসিদ্ধ (মাশহুর) হাদীস যা আমি রেখেছি তার খ্যাতির কারণে’। অর্থাৎ, হাদীসটি আলেমদের নিকট অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হওয়ায় আল-ইকতিফা’র লেখক এর কিয়দংশ বর্ণনা করেছেন।
তৃতীয়তঃ তাফসীরে ইবনে কাছিরে নিম্নলিখিত বক্তব্য উল্লেখ আছে:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ قِيلَ لَهُمْ كُفُّوا أَيْدِيَكُمْ وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ إِذَا فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَخْشَوْنَ النَّاسَ كَخَشْيَةِ اللَّهِ أَوْ أَشَدَّ خَشْيَةً وَقَالُوا رَبَّنَا لِمَ كَتَبْتَ عَلَيْنَا الْقِتَالَ لَوْلَا أَخَّرْتَنَا إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ قُلْ مَتَاعُ الدُّنْيَا قَلِيلٌ وَالْآَخِرَةُ خَيْرٌ لِمَنِ اتَّقَى وَلَا تُظْلَمُونَ فَتِيلًا“(হে নবী) তুমি কি তাদের অবস্থা দেখনি, যাদের (প্রথম দিকে) যখন বলা হয়েছিলো, তোমরা (আপাতত লড়াই থেকে) নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখো, (এখন) নামায প্রতিষ্ঠা করো ও যাকাত প্রদান করো, তখন তারা জিহাদের জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিলো, অথচ যখন (পরবর্তি সময়ে) তাদের ওপর (সত্যি সত্যিই) লড়াইর হুকুম নাযিল করা হলো (তখন)! এদের একদল লোক তা (প্রতিপক্ষের) মানুষদের এমনভাবে ভয় করতে শুরু করলো, যেমনি ভয় শুধু আল্লাহকে করা উচিত; অথবা তার চাইতেও বেশী ভয়! তারা আরো বলতে শুরু করলো, হে আমাদের মালিক, তুমি আমাদের ওপর যুদ্ধের এ হুকুম (এতো তাড়াতাড়ি) ধার্য করতে গেলে কেন? কতো ভালো হতো যদি তুমি আমাদের সামান্য কিছুটা অবকাশ দিতে? (হে নবী) তুমি বলো, দুনিয়ার এ ভোগ সামগ্রী অত্যন্ত সামান্য; যে ব্যক্তি (আল্লাহ-কে) ভয় করে, তার জন্য পরকাল অনেক উত্তম। আর (সেই পরকালে) তোমাদের উপর বিন্দুমাত্রও কিন্তু অবিচার করা হবে না”।
ইবন আবী হাতিম বলেন, আলী বিন আল হুসাইন আমাদের বলেন যে মুহাম্মাদ বিন আবদিল আজীজ আমাদের বলেছেন, আবু জুহরাহ ও আলী বিন রামহাহ উভয়েই বলেছেন, আলী বিন আল হাসান আল-হুসাইন বিন ওয়াকীদ, সে আমর বিন দীনার হতে, সে ইকরিমা হতে ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন- ‘মক্কায় আব্দুর রহমান বিন আ’উফ ও তার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে নবী (সা)-কে বলেন: হে আল্লাহ-র রাসূল (সা) যখন আমরা মুশরিক ছিলাম তখন সমাজের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যাক্তি ছিলাম কিন্তু মুসলিম হওয়ার পর আমাদেরকে অপমানিত করা হচ্ছে তখন রাসূল (সা) বলেন: আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। অতএব, মানুষের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ো না”।
যখন আল্লাহর আদেশে তিনি মদীনায় হিজরত করলেন তাকে জিহাদ ও প্রতিরক্ষার অনুমতি দেয়া হল তখন এ আয়াতটি নাযিল হয়:
“(হে নবী) তুমি কি তাদের অবস্থা দেখোনি, যাদের(প্রথম দিকে) যখন বলা হয়েছিলো, তোমরা (আপাতত লড়াই থেকে) নিজেদের হাত গুটিয়ে রাখো [যুদ্ধ হতে]”
আন-নাসাঈ, আল-হাকিম তার মুস্তাদরাকে এবং আল-বায়হাকি তার সুনান আল-কুবরায় অনুরূপ বর্ণনা করেন”।উপরের আলোচনা থেকে পরিলক্ষিত হয় যে, এ বিষয়টি পছন্দ বা অপছন্দের অবকাশ দিচ্ছে না বরং এটি ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ফরযিয়াতের বিষয়।
চতুর্থতঃ রাসূল (সা) শত দূর্ভোগ ও নির্যাতনের মুখেও নুসরাহ চাওয়া বন্ধ করে অন্য পথে না গিয়ে বরং (নুসরাহ তলবই) বহাল রাখেন। যা ব্যাপারটিকে আরো পাকাপোক্ত করে যে, এটি উসলূব (স্টাইল)-এর অংশ নয় বরং তরীকা (পদ্ধতি)-র অংশ। যদি এটি স্টাইলের অংশ হতো তবে রাসূল (সা) এটি পরিবর্তন করতেন বিশেষ করে যখন তায়েফের মত (হৃদয়বিদারক) লাঞ্চনা ও ক্ষতির সম্মুক্ষীন হয়েছিলেন। পাশাপাশি বিভিন্ন গোত্রপতি, বনু আমির বিন সা’সা এবং বনু হানিফাহসহ প্রমুখ গোত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাখাত হওয়ার পরও বার বার নুসরাহ চাওয়ার ব্যাপারে অটল থাকা (একটি মাত্র বিষয়ে দিকে নির্দেশ করে আর তা হলো নুসরাহ স্পষ্টরূপে তারীকার অংশ)।
আমরা এখানে প্রশ্ন করতে চাই-
১. মক্কায় রাসূল (সা) এর পক্ষে কি সম্ভব ছিল না যে, উনি একটি গুপ্তঘাতকের দল তৈরী করবেন যারা সেই সব ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিবে যারা মুসলিমদের ক্ষতি করেছিল বিশেষতঃ মুসলিমদের উপর এমন কষ্ট-যাতনা আরোপিত করেছিল যেখানে তাদের অনেকে কুফর কিংবা রাসূল (সা)-এর বিরুদ্ধে অপমানজনক কথার ব্যপারে (বাধ্য হয়ে) কুরাইশদের সাথে একমত হতে ধাবিত করে?
কেন তিনি গুপ্তঘাতক দিয়ে আবু জেহেল,আবু লাহাব, ওয়ালীদ ইবনে মুগীরাহ ও অন্যান্যদের মত যারা দাওয়ার কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তাদেরকে হত্যা করবে?
২. কেন রাসূল (সা) আবু যর গিফারী (রা)-কে তার গোত্রে ফিরে যেতে বলে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে তাদের থেকে যারা ইসলাম কবুল করবে তাদেরকে দিয়ে এমন বাহিনী গঠন করলেন না যারা মক্কা থেকে আসা কুরাইশদের কাফেলা আটকে দিত ও তা লুট করত যাতে এ গনীমত মুসলিমদের সাহায্য করে এবং কুরাইশদেরকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখে এবং একই সাথে মুসলিমগণ তাদের প্রয়োজনীয় ও এর অধিক সম্পদ দখলে পেত?
৩. রাসূল (সা) কি দক্ষ ব্যাবসায়ী ছিলেন না এমনকি খাদিজা (রা)-র কি যথেষ্ট পরিমাণ সম্পদ ছিলনা যা ব্যবসার জন্য ব্যবহার করা যায়? আবু বকর (রা), উসমান (রা), আব্দুর রহমান বিন আ’উফ (রা) কি দক্ষ ব্যবসায়ী এবং সুহাইব আল-রুমী (রা) বিপুল সম্পদের অধিকারী ছিলেন না? এই রকম ধনাঢ্য ব্যাবসায়ী থাকা সত্ত্বেও রাসূল (সা) কেন ওমর বিন খাত্তাব, হামযা, যুবাইর ইবনে আল আওয়াম এবং সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের মত তীব্রতাসম্পন্ন ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের দিয়ে একটি ব্রিগেড বা রেজিমেন্ট গঠন করলেন না যার সম্পূর্ণ ব্যায়ভার রাসূল (সা) করবেন যেটি কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে? এবং এটি করলে এক্ষেত্রে (সমাজের) দুর্বল ও নিপীরিতরা কি কুরাইশদের বিরুদ্ধে রাসূল (সা)-এর পাশে এসে দাড়াত না?
৩. রাসূল (সা) –এর কাছে উপরউল্লিখিত উপায় ও পন্থা ছাড়াও অন্যান্য পথ ও উপায় প্রয়োগ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন উনি গোত্রপতিদের কাছ থেকে নুসরাহ অনুসন্ধানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম ও সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করে গিয়েছেন?
এ থেকে কি প্রতীয়মান হয় না (নুসরাহ তলবের) এই কাজটি চাওয়াটা আমাদের খেয়াল-খুশির বিষয় নয় বরং এটি তারীকাহ (পদ্ধতির) অংশ যা মেনে চলা ফরজ?
৪. (শিয়াবে আবু তালিবে) কেন রাসূলুল্লাহ (সা) তারা কোনো বাহিনী তৈরি করলেন না যারা কুরাইশের বিরুদ্ধে উঠে দাড়াবে? রাসূল (সা) ও তার সাহাবীগণ কি বনু হাশিমসহ কুরাইশ কর্তৃক বয়কট হননি? আর কেনই বা নবী (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ বনু হাশিম গোত্রের সাথে জোট গঠন করে কুরাইশদের বিরুদ্ধে সামরিক যুদ্ধ ঘোষনা করলেন না?
একটি বিষয়কে উপলব্ধি করার আহ্বানে শেষ করব, আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দলের ভালোর জন্য অনেকেই নুসরাহ চাওয়ার ব্যাপারটা অলৌকিক মনে হওয়ায় বলে থাকেন. এটিকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো পন্থায় অগ্রসর হওয়া উচিত! তাদেরকে বলব শুধু আবেগ ও আকাংখা থাকলে হয় না তার সাথে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র শরীয়া’হ-র নির্দেশের প্রয়োজন হয়। এবং এটি গুরুত্বপূর্ণ যে যারা মুসলিমদের কল্যাণ চান তাদের খেয়াল রাখা উচিত যে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর শরীয়া’হর পথ ও মুসলিমদের কল্যাণের ব্যপারে আরো বেশি আগ্রহী।
রাসূল (সা) কথাগুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন-
নিশ্চয়ই আল্লাহ যা হারাম করেছেন সে ব্যপারে অগ্রসরতার ব্যপারে তাঁর আবেগ বা ঈর্ষাকাতরতা (আল-গাইরাহ) রয়েছে।
এবং তিনি (সা) বলেন,
أَتَعْجَبُونَ مِنْ غَيْرَةِ سَعْدٍ لَأَنَا أَغْيَرُ مِنْهُ وَاللَّهُ أَغْيَرُ مِنِّيসা’দ এর প্রতি ঈর্ষাকাতরতা কি তোমাদের বিস্মিত করেছে? আল্লাহ’র শপথ, আমি সা’দ হতে বেশি ঈর্ষাকাতর এবং আল্লাহ আমার চেয়ে বেশি ঈর্ষাকাতর। [বুখারী]
তাই নুসরাহ চাওয়া ছাড়া আর যত পদ্ধতি আছে সবই হারাম বলে গন্য হবে এবং এই হুকুমটিকে কখনোই অবহেলা করা যাবে না কেননা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) হুদুদ থেকে সামান্য পরিমান বিচ্যুতির ব্যাপারে আল্লাহ অনেক সাবধান থাকতে বলেছেন।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন-
সেগুলোই আল্লাহ’র দেয়া সীমারেখা, সুতরাং তা লংঘন করোনা। [বাকারাহ ২:২২৯]
যার শরী’আহ’র ব্যপারে অনেক আবেগ ও আশা-আকাংখা রয়েছে কিন্তু উক্ত বিষয়ে শরীয়া’হ বিষয়াদির (বিশ্লেষনের) ব্যপারে কোনো শৃংখলা নেই তার অবস্থা সেই ব্যাক্তির মত যে জানে না কিভাবে সাঁতার কাটতে হয় কিন্তু সে পানিতে ঝাঁপ দেয় যাতে করে সে ডুবন্ত ব্যাক্তিকে বাঁচাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেও ডুবন্ত ব্যাক্তিটির সহযাত্রী হয়ে যায়।
আল-ওয়াঈ ম্যাগাজিন, সংখ্যা-৩১৮ থেকে অনুদিত
ভাষান্তরে – কাজী সাইফুল আলমমুসলিম সেনাবাহিনী, তাগুত, নুসরাহ ও খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা

মুসলিম সেনাবাহিনী, তাগুত, নুসরাহ ও খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা: একটি ফিকহি (আইনী) ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা
ইদানিং খুব শোনা যায় খিলাফাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম ভূমিসমূহের “ক্ষমতাধর গোষ্ঠী” (আহল উল হাল ওয়াল ‘আকদ) তথা মুসলিম আর্মিদের কাছ থেকে “নুসরাহ” (সহায়তা) চাওয়া নাকি বোকার স্বর্গে বসবাস। যেসব মুসলিম ভাইরা এ ধারনাটি পোষণ করেন, নিম্নে তাদের কিছু যুক্তি তুলে ধরা হল:
– মুসলিম বিশ্বের আর্মি হোল তাগুত (খোদাদ্রোহী শক্তি) যারা সাম্রাজ্যবাদী কুফর শক্তিকে টিকিয়ে রাখার মূল ইন্সট্রুমেন্ট। যেমন, ১৯৯২ সনে আলজেরিয়ায় বিপুল ভোটে বিজয়ী “ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট” (এফ আই এস) কে ক্ষমতাচ্যুত আর্মি করেছিল, এবারো যেমন আমরা দেখলাম মিসরে। তাই কিভাবে আমরা তাগুত এর কাছ থেকে নুসরাহ চাইতে পারি যাদের কাজই হোল খিলাফাতের পুনুরুত্থান ঠেকানো?
– মুসলিম আর্মিরা হল “মুরতাদ” (ধর্মভ্রষ্ট) কারন তারা কুফফার দের দালাল শাসনযন্ত্রেরই অংশ। আর আল্লাহ বলেছেন যারা কুফফার দের সহায়তা করবে তারা তাদেরই একজন বলে বিবেচিত হবে (সূরা মাইদা, ৫১)। এক্ষেত্রে জেনে নেয়া ভাল যারা মুসলিম আর্মিদের মুরতাদ বলছেন তারা “কাফির আসলি” (জন্মগতভাবেই যারা কাফির যেমন, ইহুদি) এবং মুরতাদ এর ভেতর পার্থক্য নিরুপন করেন। তারা বলে থাকেন মুসলিম আর্মি হোল মূলত “মুরতাদ আল-ইস্তিহলাআল” অর্থাৎ আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা তারা না মেনে নিজেরাই মুসলিমদের খুন করা জায়েয করছে।
– মুসলিম আর্মিদের হাতে স্বাধীনতাকামী মুসলিমদের রক্ত লেগে আছে। পাকিস্তানের লাল মসজিদের জামিয়া হাফসা মাদ্রাসায় বর্বরোচিত হামলা, মিসরে মুরসি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আর্মি দ্বারা সীমান্তে অবস্থানকারী মুজাহিদিনদের নির্বিচারে খুন ইত্যাদি। তাই এরা মুরতাদিন।
– আর্মিদের কাছ থেকে নুসরাহ চাওয়া হোল “বিদআত”
– গত ৫০ বছর যাবতইতো ওদের কাছ থেকে নুসরাহ চাওয়া হোল। এখনো এই স্বপ্ন ভাংছেনা কেন?
এবার একটু এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যাক: দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে এই আলোচনায় –
১। আকীদা সংক্রান্ত, ২। খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার “মানহাজ” (পদ্ধতি)
প্রথমেই বলব “ব্ল্যাঙ্কেট তাকফীর” বা ঢালাওভাবে কাফের ঘোষণা দেয়া হবে মহা বড় এক গুনাহ যার ব্যাপারে আমাদের খুবই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। থিওলজিকাল বা আকিদা সংক্রান্ত আলোচনার বেশী গভীরে যাব না কারণ ক্লাসিকাল মুজতাহিদিনরা যেসব ক্যাটেগরি বলেছেন একজনের পক্ষে কাফির হওয়ার জন্য তার কোনটির ভেতরই আর্মিদের “ঢালাওভাবে” ফেলা যায় না। যেমন, কুফর আল তাকধিব (সম্পূর্ণরূপে ইসলাম অস্বীকার করা), কুফর আল ইবা’ ওয়াত তাকাব্বুর মা’আত তাসদিক (অহঙ্কারবশত আল্লাহর হুকুম মেনে না নেয়া), কুফর আশ শাক ওয়া আল থান (ঈমানের ৬ টি স্তম্ভের যেকোনো একটিও যদি অস্বীকার করা হয়), কুফর আল ই’রাদ (ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য জানার পরও মুখ ফিরিয়ে নেয়া), এবং কুফর আন নিফাক (মুনাফিকি বিশ্বাস)।
বর্তমান বাস্তবতার আলোকে বলা যায় মুসলিম ভূখণ্ডের সেনাবাহিনীর একেবারে উপরিভাগ আসলেই কুফফারদের দালালি করছে যাতে কোন সন্দেহ নেই। তারা উপরের যেকোনো ক্যাটেগরিতে পরে কিনা এটা নিয়ে আলোচনা করতে চাইনা। আমাদের কাজ হবে খিলাফাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে এই সোল্ড আউট সেকশন কেও আল্লাহর দিকে আহ্বান করা ও আযাবের ব্যাপারে ভয় দেখানো, যেমনটি ফিরাউনকে মুসা আলাইহিস সালাম দেখিয়েছিলেন যখন আল্লাহ বললেন “হে মুসা! তুমি ফিরাউন এবং তার দলকে আল্লাহর পথে এখন আহ্বান কর”। ফিরাউন এই আহ্বান মেনে না নিয়ে অহঙ্কারবশত ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে আল্লাহ বলেন ফিরাউনকে আযাবের ভয় দেখাতে।
যদি তাগুতকে সহায়তা করার কারনেই আর্মিদের মুরতাদ বলতে হয়, তাহলে এই একই চিন্তার আলোকে মুসলিম বিশ্বের সাধারণ মুসলিমদেরও মুরতাদ বলতে হবে কারন তারা নির্বাচনে ভোট দিয়ে তো তাগুত ক্ষমতায় বসাচ্ছে? সচিবালয়ের সকল মুসলিমদের মুরতাদ বলতে হবে কারন তারা তাগুতি সরকারকে সচল রাখতে সাহায্য করছে? সিটি কর্পোরেশনের ঝাড়ুদারও বাদ পরবে না কারন তারাও এই তাগুতি সরকারের অংশ। আরো জিজ্ঞাসা করতে চাই যে হেফাযতে ইসলামের আন্ডারে যতোগুলো ইসলামি রাজনৈতিক দল আছে যার ভেতর অনেক বড় ওলামা আছেন যারা অবশ্যই ভুল উসূলের কারনে নির্বাচনে ভোট দেন, তাদেরকেও কি আমরা মুরতাদ বলব? প্রান্তিক চাষি যারা তাগুতি সরকারের কৃষিনীতি সচল রেখেছে এবং কাস্টমস এর একজন দরিদ্র ৪র্থ শ্রেণীর কর্মকর্তা যে পণ্যের ওপর সীল ছাপ্পড় মারে তারাও তো এই ব্ল্যাঙ্কেট তাকফীর থেকে মুক্ত হওয়ার কথা না!!!
তাই আমাদের এই ব্যাপারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য তৈরি করতে হবে – ফাসিক (পাপী) এবং কাফির বা/এবং মুরতাদ এর ভেতরে; হারাম করে গুনাহগার হওয়া এবং কাফের হওয়ার ভেতরকার পার্থক্য বুঝতে হবে। লাল মসজিদ এর অন্যায়ভাবে খুনের জন্য যারা পাকিস্তানি আর্মিদের কাফির/মুরতাদ বলছেন তাদের প্রশ্ন করা যায় ইয়াযিদ যখন মুসলিমদের খুন করল যার ভেতর রাসূলের (সা) দৌহিত্র এবং সাহাবারাও ছিলেন, ম্যাজরিটি ক্লাসিক্যাল উলামারা ইয়াযিদ কে কাফির বলে নাই; ফাসিক বলেছিল। ওনাদের এই মত ইমাম গাযালি (রা) এরুপে তুলে ধরেছিলেন যে হারাম কাজের জন্য কাউকে কাফির ঘোষণা দেয়া যায় না এমন কি এক মুসলিম ওপর মুসলিম কে খুন করলেও (শার বাদ আল-আমালি, মোল্লা আলি আল-কারি)।
এবার আসা যাক খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার “মানহাজ” সঙ্ক্রান্ত বিষটিতে। যেহেতু দারুল ইসলাম ধ্বংস কখনো রাসূলের সময় হয়নি যাতে উনি দেখাতে পারেন কি করে আবার রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা যায়, তাই “মানহাজ” এর আলোচনাটি পুরাই “ইজতিহাদি” (অর্থাৎ অতীতের দলীল থেকে বর্তমান বাস্তবতার যোগ তৈরি করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানো)। তাই “তাহকিক উল মানাত” (বর্তমান বাস্তবতার পর্যালোচনা) এটাই বলে বর্তমানে আমরা দারুল কুফরে আছি এবং “তাখরিজুল মানাত” (কুরান/সুন্নাহর দলীল পর্যালোচনা বা “তানকিহ” করে শরী’আহ হুকুম এক্সট্রাক্ট করা) এটাই বলছে রাসূলের মক্কী যুগের কর্মপদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে যদি দারুল ইসলাম (খিলাফত) পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাই কারণ মক্কী বাস্তবতায় মানহাজ এর দলীল বিদ্যমান। এইখানে এও বলে রাখা আবশ্যক যে বর্তমান যুগের সাথে মক্কী যুগের তুলনা করা হচ্ছেনা, বরং মক্কী যুগ থেকে শুধুমাত্র মানহাজ এক্সট্র্যাক্ট করা হচ্ছে। তাই সিরাতে দেখতে পাই রাসূল প্রায় ৪০ থেকে ৭০ টি গোত্রের কাছে গিয়েছিলেন “তালাব আন নুসরাহ” (রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সাহায্য চাওয়া) এর জন্য। তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে জড়িয়েছিলেন কিন্তু কোনভাবেই সশস্ত্র সংগ্রামে জড়াননি।
তাই আমাদের আরও বুঝতে হবে “জিহাদ” যা খিলাফাহ রাষ্ট্রের একটি বৈদেশিক নীতির অংশ (জিহাদুদ-দাফ বা রক্ষণাত্মক জিহাদ ব্যাতিত যা সর্বাবস্থায় ফরয যদি শত্রুর আক্রমণের শিকার হই), এর সাথে খিলাফাহ রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি মৌলিক পার্থক্য আছে; দুটিকে গুলিয়ে ফেললে চলবেনা। তাই জিহাদ কখনই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হতে পারে না, বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আইডিওলজি প্রচারের মূল একটি মাধ্যম। আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় আব্বাস ইবন উবাদা আল-আনসারির প্রস্তাব ছিল “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি যদি আদেশ দেন তবে রাতের অন্ধকারেই আমরা তরবারি নিয়ে মিনায় আক্রমন চালাতে পারি”, প্রত্যুত্তরে রাসূল বলেছিলেন “এখনো আমাদের এই আদেশ দেয়া হয়নি”। হিজরতের পর জিহাদ এর হুকুম নাযিল হয়েছিল সূরা বাকারাতে। তাই আমরা দেখতে পাই রাসূল নুসরাহ তালাব ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেননি দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে। বরং নুসরাহ খোজা এজন্যই ফরয কারন তা আল্লাহর নির্দেশ ছিল। আল-হাকিম, বাইহাকি, এবং আবু নাইম হযরত আলী (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, “যখন নবী (সা)-কে আল্লাহ নির্দেশ দিলেন গোত্রগুলোর কাছে নুসরাহ চাইতে, তখন রাসূল (সা) ও আমি (আলী) মিনার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম আবু বকর কে সাথে নিয়ে”।
আর যারা গত ৫০ বছরেও তাদের কাছ থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায়নি তাই কোন লাভ নেই, তাদের শুধু বলব আমাদের রাসুলের সিরাত অনুসরণ করতে হবে। সফলতা আল্লাহর হাতে। আল্লাহর রাসূল যখন আরব গোত্রগুলোর কাছ থেকে নুসরাহ চেয়েছিলেন তখনও কাফের মুশরিকরা হেসেছিল, তখনও ‘তালাব উন নুসরাহ’ অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। এবং রাসূলের মাথায় এটা কোন ভাবেই ছিলনা যে মদীনায় আল্লাহ আওয/খাজরাজদের তৈরি করছিলেন। খিলাফত ধ্বংসের পর মুসলিমদের জাতীয়তাবাদ নামক মহামারী রোগ থেকে বের করে আনাটাও সেরকম অবিশ্বাস্য একটি কাজ এখনো মনে হয়। তাহলে কি আমরা এই কাজ বন্ধ করে দিবো?
পরিশেষে এটিও জেনে নেয়া ভাল সিরিয়ার আসাদ সরকার তাদের পদাতিক ডিভিশন কে এখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে নামাতে ভয় পাচ্ছে কারণ ইতিমধ্যে অনেক আর্মি ডিফ্যাক্ট করে জিহাদ এ যোগদান করেছে এবং সিরিয়ান বিমানবাহিনী যেখানে ৩০% সুন্নি তারাও ডিফ্যাক্ট করার পথে। তাই ঢালাওভাবে তাগুত/মুরতাদ না বলে যারা নিষ্ঠাবান আছে তাদের ঈমান কে জাগ্রত করার চেষ্টা আমাদের করা উচিত ইনশাল্লাহ।
ইমতিয়াজ সালিম
Posted by Visionary
বাইতুল-মাল ও এর বিভাগ সমূহ

নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ আবদুল কাদীম যাল্লুম (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আল-আমওয়াল ফী দাওলাতিল খিলাফাহ’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত
বাইতুল-মাল বা ট্রেজারি (State Treasury) বলতে এমন সক্ষম কর্তৃপক্ষকে বুঝানো হয় যা মুসলিমদের ন্যায্য অধিকার পূরণার্থে রাষ্ট্রের সমস্ত আয় ও ব্যয়ের জন্য দায়িত্বশীল। অতএব ভূমি, দালানকোঠা, খনিজ, অর্থ বা ব্যবসায়িক পণ্য প্রভৃতি যেসব সম্পদের উপর মুসলিমগণ শর’ঈ হুকুম অনুযায়ী অধিকারপ্রাপ্ত, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য তা নির্ধারিত নয়, তবে কোন খাতে এগুলো ব্যয় করা হবে সেটা নির্ধারিত, সেগুলোই হচ্ছে মুসলিমদের ট্রেজারির মালিকানাধীন সম্পদ, এক্ষেত্রে এটা বিবেচনার বিষয় নয় যে এই সম্পদগুলো ইতিমধ্যে ট্রেজারির সংরক্ষণের আওতায় চলে এসেছে নাকি আসেনি। অনুরূপভাবে, অধিকারপ্রাপ্ত মালিক ও ব্যবহারকারীদের জন্য অথবা মুসলিমগণ ও তাদের দেখাশোনার জন্য অথবা ইসলামের দাওয়াহ বহন করবার জন্য যেসব সম্পদ ব্যয় করতে হবে – একসকল তহবিলের ক্ষেত্র ট্রেজারির দায়িত্ব- এক্ষেত্রে এসব তহবিল খরচ হলো কি হলো না – তা বিবেচ্য নয়। অতএব এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ট্রেজারি হচ্ছে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।
অন্য এক অর্থে, ট্রেজারি বলতে এমন স্থানকে বুঝানো হয় যেখানে রাষ্ট্রের আয় জমা রাখা হয় এবং যেখান থেকে তা ব্যয় করা হয়।
উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ অর্থে প্রথম ট্রেজারি প্রতিষ্ঠিত হয় নিম্নোক্ত আয়াতখানি নাযিলের পর:
يَسْأَلُونَكَ عَنِ الْأَنْفَالِ قُلِ الْأَنْفَالُ لِلَّهِ وَالرَّسُولِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ
“তারা আপনার কাছে আনফাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে। বলে দিন, আনফাল হল আল্লাহর ও রাসূলের। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের মধ্যকার অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক।” [আল-আনফাল ১]
এই আয়াতখানি মূলত নাযিল হয় বদরের যুদ্ধ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে, যখন মুসলিমরা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। সাঈদ ইবনু জুবায়ের কর্তৃক বর্ণিত: আমি সূরা আনফাল সম্পর্কে ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন “এটা বদরের সময় নাযিল হয়েছে।” আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ অভিযানের পর বদরই প্রথম যুদ্ধ যেখানে মুসলিমরা অনুরূপভাবে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করেছিল, যার বণ্টন সম্পর্কে আল্লাহ তখন হুকুম বর্ণনা করলেন। তিনি যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে মুসলিমদের সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং রাসূল (সা) কে নির্দেশ দিলেন যাতে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এ সম্পদকে তিনি মুসলিমদের সর্বোত্তম স্বার্থে ব্যবহার করেন। অতএব, ট্রেজারির এসব সম্পদকে মুসলিমদের অভিভাবক নিজের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী এমনভাবে ব্যয় করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল যাতে তারা সর্বাধিক উপকৃত হতে পারে।
রাষ্ট্রের আয় জমা রাখা এবং ব্যয় করার স্থান অর্থে যদি আমরা ট্রেজারিকে চিন্তা করি তাহলে রাসূল (সা) জীবদ্দশায় এরূপ কোন স্থান ছিলনা; কারণ এসময় আয় ছিল স্বল্প এবং মুসলিমদের মধ্যে বণ্টন ও মুসলিমদের দেখাশোনার কাজে ব্যয়ের পর আর তেমন কিছুই অবশিষ্ট থাকতনা। প্রত্যেক যুদ্ধের শেষে রাসূল (সা) সমস্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও পঞ্চমাংশ (খুমুস) বণ্টন করে দিতেন। সম্পদ বণ্টন করা অথবা উপযুক্ত খাতসমূহে ব্যয় করার ক্ষেত্রে তিনি (সা) দেরি করতেননা। রাসূল (সা) এর একজন হিসাবরক্ষক হানযালা ইবনু সাইফি কর্তৃক বর্ণিত: “রাসূল (সা) আমাকে বললেন: (الزمني وأذكرني بكل شيء لثالثه) আমার সাথে থাক এবং সবকিছু স্মরণ করিয়ে দাও এর তিন দিনের মধ্যেই। তিনি বলেন: এজন্য যেকোনো সম্পদ অথবা খাবার অথবা অর্থ আমি গ্রহণ করতাম তা তিন দিনের মধ্যেই স্মরণ করিয়ে দিতাম।ফলে সবকিছু ব্যয় না করে রাসূল (সা) রাত্রি যাপন করতেননা।” অধিকাংশ ক্ষেত্রে একদিনের মধ্যেই সমস্ত সম্পদ বণ্টিত হয়ে যেত। আল-হাসান ইবনু মুহাম্মাদ কর্তৃক বর্ণিত যে, রাসূল (সা) কখনোই দুপুর বা রাত পর্যন্ত সম্পদ জমা রাখতেননা, “অর্থাৎ, সকালে হাতে পেলে তিনি দুপুরের মধ্যেই বণ্টন করে দিতেন এবং বিকালে পেলে তা রাতের মধ্যেই ব্যয় করে ফেলতেন।” ফলে কখনোই এমন কোন সম্পদ অবশিষ্ট থাকতোনা যার জন্য কোন জায়গা বা রেকর্ডবুকের প্রয়োজন ছিল।
রাসূল (সা) এর জীবদ্দশায় এ কাজটি এভাবেই সম্পাদিত হতো। খলীফা নিযুক্ত হবার পর আবু বকর (রা) তার খিলাফতের প্রথম বছর একইভাবে এ কাজ সম্পাদন করলেন। যেকোনো অঞ্চল থেকে কোন সম্পদ আসলে তিনি তা মসজিদে নববীতে নিয়ে আসতেন এবং অধিকারপ্রাপ্তদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। একাজে তিনি তার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিলেন আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে। একাজে নিযুক্ত হওয়ার পর আবু উবাইদাহ তাকে বললেন: আমি আপনার পক্ষ থেকে সম্পদের দেখাশোনা করব। যাই হোক, খিলাফতের দ্বিতীয়বর্ষে আবু বকর (রা) নিজের ঘরে একটি জায়গা নির্ধারণ করার মধ্য দিয়ে ট্রেজারির সূচনা করলেন, যেখানে তিনি মদীনায় আগত সমস্ত সম্পদ জমা করতেন এবং এর সবকিছুই মুসলিমদের দেখাশোনার কাজে ব্যয় করতেন। আবু বকর (রা) এর ইন্তেকালের পর যখন উমর (রা) খলীফা নিযুক্ত হলেন, তিনি দায়িত্বশীলদের জড়ো করলেন এবং আবু বকর (রা) এর বাসগৃহে প্রবেশ করলেন। তিনি ট্রেজারি খুলে একটি ব্যাগ থেকে পড়ে যাওয়া কেবল একটি দিনার পেলেন। উমর (রা) এর সময়ে যখন প্রচুর এলাকা বিজয় হচ্ছিল এবং মুসলিমরা কিসরা (পারস্য) ও কায়সার (রোমান) এর ভূখণ্ডে বিজয় লাভ করতে লাগল তখন মদীনায় আগত সম্পদের পরিমাণও প্রচুর বৃদ্ধি পেল, ফলে উমর (রা) তখন এগুলোর জন্য একটি ঘরকে নির্দিষ্ট করে দিলেন। এগুলোর জন্য তিনি একটি অ্যাকাউন্ট বুক খুললেন এবং অ্যাকাউন্ট্যান্টদের নিয়োগ দিলেন, এখান থেকে ভাতা নির্ধারণ করলেন এবং সশস্ত্র বাহিনীকে অস্ত্রে সজ্জিত করলেন। অবশ্য মাঝেমধ্যে তিনি তার হাতে আসা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পঞ্চমাংশ মসজিদে নিয়ে আসতেন এবং বিলম্ব না করে সেগুলো বণ্টন করে দিতেন। ইবনে আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত: “একদিন উমর আমাকে ডাকলেন। আমি তার কাছে গিয়ে দেখলাম যে তিনি একখণ্ড কাপড়ের পাশে বসে আছেন যার উপরে প্রচুর স্বর্ণের টুকরা ছড়িয়ে আছে। তিনি বললেন: আসো এবং এগুলো নিয়ে নিজেদের লোকজনের মধ্যে বণ্টন করে দাও, আর আল্লাহই ভাল জানেন কেন তিনি রাসূল (সা) ও আবু বকরকে না দিয়ে এর পরে আমাকে এই দায়িত্ব অর্পণ করলেন? এর মাধ্যমে তিনি আমার কাছ থেকে কল্যাণ কামনা করেন নাকি অকল্যাণ? আবদুর রহমান ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত: একদিন দুপুরে উমর আমাকে ডাকলেন, তাই আমি তার কাছে গেলাম। তিনি আমার হাত ধরে একটি ঘরে নিয়ে গেলেন যেখানে কিছু বস্তার স্তূপ জমা ছিল। তিনি বললেন: “এখন আল-খাত্তাবের পরিবার আল্লাহর চোখে অনেক ছোট হয়ে গেল, কসম আল্লাহর, এতে যদি আমাদের সম্মানিত হওয়ার মত কিছু থাকত তাহলে আল্লাহ আমার দুই সঙ্গীকেও এভাবে দিতেন এবং তারা একাজে আমাকে একজন উত্তরসূরি হিসেবে রেখে যেতেন।” আবদুর রহমান বলেন: “তিনি যা নিয়ে এসেছেন তা দেখে আমি বললাম ‘হে আমিরুল মু’মিনীন, আপনি বসুন, আমরা (এ ব্যাপারে) চিন্তা করি।’ তিনি বলেন: ‘আমরা বসলাম এবং মদীনার সমস্ত লোকের নাম লিখলাম, আমরা যারা আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদ ছিলাম তাদের নাম, রাসূল (সা) এর স্ত্রীগণের নাম এবং তারপরে অন্যদের নাম লিখলাম।’ ”
এভাবেই মুসলিমরা গোড়াপত্তন করলেন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ট্রেজারির যেখানে সম্পদ জমা করা হতো এবং রেকর্ডবুক রাখা হতো, যেখান থেকে ভাতা প্রদান করা হতো এবং অধিকারপ্রাপ্তদের তাদের তহবিল পৌঁছিয়ে দেওয়া হতো।
Please note that this is a draft translation. It is likely to go through further edits. So, please check back often for any newer version.
Link for English translation of the book “Funds in the Khilafah State”Posted by Visionary
প্রশ্ন-উত্তর: “তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে”
প্রশ্ন: “তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে” এই হাদীসটি কি দূর্বল (জায়ীফ), এর বিশুদ্ধতা কতটুকু?
উত্তর:
আদ-দায়লামী তার মুসনাদ আল-ফিরদাউসে হাদীসটি আবু বাকরা হতে মারফূ সনদে বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী শুয়াবুল ঈমানে আবু ইসহাক আল-শাবি’ হতে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন।আল-সুয়ূতী হাদীসটি সম্পর্কে বলেন: এটি দূর্বল (জায়ীফ)
আল-শাওকানী বলেন, হাদীসটি: ইয়াহইয়া বিন হিশাম; ইউনুস বিন ইসহাক > তার পিতা > তার দাদা > আবু বাকরা হতে মারফূ সনদে এসেছে। আল-সাখাউঈ হাদীসটি সম্পর্কে বলেন, ইয়াহইয়ার হাদীসটি জাল হাদীসগুলোর অন্যতম যা ইয়াহইয়া বিন হিশাম > ইউনূস বিন ইসহাক > (আবু ইসহাক) উমর বিন আবদিল্লাহ (আস-সাবি’ঈ) হতে মুরসাল সনদে বর্ণিত। তারপর তিনি বলেন, এই হাদীসটি মুনকাতি’ (কর্তিত সনদবিশিষ্ট) এবং এর বর্ণনাকারী ইয়াহইয়া বিন হিশাম (একজন) দূর্বল (রাবী)।
ইমাম আল-ফাতানীর তাজকিরাতুল মাওদু’আতে:
“তোমরা যেমন, তোমাদের উপর সেরূপ শাসকই নিযুক্ত হবে” এর সনদে ইনকিতা’ (কর্তন) রয়েছে এবং ওয়াদি হচ্ছে ইয়াহইয়া বিন হিশাম এবং তার একটি সনদের ধারা রয়েছে যাতে মাজহুল (অজ্ঞাত রাবী) রয়েছে।
সুতরাং, হাদীসটি দূর্বল বলে বিবেচিত হবে।
যাইহোক, হাদীসটিতে দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি এমন নয় যে আমরা শাসকদের জুলুম ও শরীআহ’র অনুপস্থিতির বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থাকবো। ইমাম আল-মানাউই তার ফাইদুল কাদীর তথা আল-জামি’ আল-কাবীর এর ব্যখ্যায় (এর ৫ খণ্ডে) আলোচ্য হাদীসটির ব্যপারে ইমাম আস-সাখাউই বক্তব্য তুলে ধরেন যেখানে তিনি হাদীসটির দুর্বলতার কথা আলোচনা করেছেন। এরপর তিনি বলেন, যদি আপনারা তাকওয়া অবলম্বন করেন এবং আল্লাহর শাস্তির ভয় করেন তবে তিনি এমন শাসক নিযুক্ত করে দেবেন যারা আল্লাহকে ভয় করেন এবং বিপরীতক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য। তার এ বক্তব্য কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেখানে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনবে ও সৎকর্ম করবে, তাদের প্রতি আল্লাহ ওয়াদা করেছেন যে তাদের তিনি অবশ্যই পৃথিবীতে নেতৃত্ব (ইসতিখলাফ) প্রদান করবেন।” [সূরা নূর: ৫৫]
এ আয়াত থেকে বোঝা যায় যে মুসলিমদের মধ্য হতে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যদি ঈমান ও সৎকর্ম করে তবে তাদেরকে অবশ্যই শাসনক্ষমতা দেয়া হবে। তবে এক্ষেত্রে লক্ষ্যনীয়, আয়াতটিতে ‘মিনকুম’ বলার মাধ্যমে ‘আংশিকতা’ বা ‘ঈশারাতুত তাব’ঈদ’ রাখা হয়েছে, অর্থাৎ, সমগ্র উম্মাহ ভালোকাজ শুরু করলেই শাসনক্ষমতা আসবে, বরং সকলের উপরই দায়িত্ব বর্তায় সৎকাজে অংশগ্রহণ করবার এবং আল্লাহই বুঝবেন কখন উম্মাহ সে পর্যায়ে পৌছেছে যেখানে যথেষ্ট পরিমান উম্মত আল্লাহ সন্তুষ্টি অন্বেষনে ব্যকুল। তবে অনেকেই এসব হাদীস আয়াত পেশ করেন কাজ করবার জন্য উৎসাহিত করার জন্য নয় বরং কিছু কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখার নিমিত্তে। তারা বলে থাকেন, ব্যক্তিগতভাবে সৎকাজ করলেই আল্লাহ শাসনক্ষমতা বা খিলাফত রাষ্ট্র দিয়ে দিবেন। তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখতে চাই, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ কি সৎকাজের মধ্যে পড়ে না? আমর বিল-মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্য পালনীয় হুকুম শর’ঈ। এবং গুরুত্বের দিক বিবেচনা করলে এই আমলটিই সবার অগ্রে থাকতে হবে অনেক সাধারন আমলের চেয়ে। উপরন্তু কিছু হাদীস অনুযায়ী, শুরুতে এই আমলটি অবহেলা করার কারণেই আমরা আল্লাহর আযাব (এক্ষেত্রে উদাহরসরূপ, খারাপ শাসক) ভাগ্যে পেয়ে থাকি।
আমাদের বুঝতে হবে আমরা ব্যক্তিগতভাবে ভালো কাজ করতে থাকলে সয়ংক্রিয়ভাবে সমাজ পরিবর্তন হয়ে যাবে না, কারণ ব্যক্তি চলে তার অন্তর্নিহিত চিন্তা দ্বারা আর সমাজ চলে একটি ব্যবস্থা দ্বারা যা সকল ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে পরিচালিত করে। সুতরাং, যতক্ষন পর্যন্ত সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে পরিবর্তনের দাবি না তুলে তথা পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন সংগ্রামে লিপ্ত না হয়, ততক্ষন পর্যন্ত সমাজ পরিবর্তন হয় না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাও পবিত্র কুরআনে বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّى يُغَيِّرُوا مَا بِأَنْفُسِهِمْ
নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির মধ্যে যা আছে তা পরিবর্তন করেন না যতক্ষন না তারা (সেই জাতি) নিজেদের মধ্যে যা রয়েছে তার মধ্যে পরিবর্তন আনয়ন করে। [সূরা রা’দ: ১১]
এ আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা চুড়ান্ত পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করেননি বরং জাতি বা কাওম’কে নির্দিষ্ট করেছেন।
সুতরাং, আমাদের সকলকেই সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নিতে হবে, পরাজনৈতিক সচেতন হতে হবে, প্রকাশ্যে কথা বলতে হবে, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে হবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করতে হবে এবং চুড়ান্ত সাফল্যের আগ পর্যন্ত তা ঐক্যবদ্ধভাবে চালিয়ে যেতে হবে। একাজে ভয়-ভীতি, জেল-জুলুম ও ত্যাগ-তিতিক্ষা থাকবেই, তবে তাতে পিছিয়ে পড়লে চলবে না, নিস্ক্রিয় হয়ে গেলে হবে না। বরং, প্রতিটি বাধা উপেক্ষা করার মানসিকতা পোষন করতে হবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষনে ইস্পাত-কঠিন দৃঢ় মানসিকতা পোষন করতে হবে। এভাবেই দুনিয়ায় ইসলামের বিজয় ও সাফল্য আসবে, আর আখিরাতের যে সাফল্য মুমিনদের জন্য অপেক্ষা করছে তা অনন্য।
وَبَشِّرِ الْمُؤْمِنِينَ
সুতরাং, ঈমানদারদের সুসংবাদ দান করুন.. [সূরা সফ: ১৩]
















