তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই উচ্চমানের নারী শিক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে

পশ্চিমা সরকারসমূহ মালালার নারী শিক্ষার সংগ্রামের ঘটনাটিকে ঔপনিবেশিক রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করেছে
২০১২ অক্টোবর মাসে ১৫ বছরের পাকিস্তানী কিশোরী মালালা ইউসুফযাই এর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে হতভম্ব ও মর্মাহত করেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, পশ্চিমা সরকার ও রাজনীতিবীদরা ফলাও করে একথা প্রচার করে যে, পাকিস্তানে ইসলামপন্থীরাই এ হত্যা চেষ্টার জন্য দায়ী। এবং পশ্চিমা শক্তি নারী অধিকার ও নারী শিক্ষার পক্ষে যুক্তি স্থাপন করে। প্রাক্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ও জাতীসংঘের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্টমন্ত্রী হিলারী ক্লিন্টনসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সংগঠন নারী শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপনের জন্য তার এ সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানায়। এ বছরের ১২ জুলাই জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে মালালাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেখানে তরুণ সমাজের উপস্থিতিতে সে প্রতিটি শিশুর বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার ও এর গুরুত্ব তুলে ধরে।
পাকিস্তানসহ সমগ্র বিশ্বে নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা একটি মহতী প্রচেষ্টা। কিন্তু এ মহতী উদ্যোগের বদলে নির্লজ্জভাবে পশ্চিমা সরকারসমূহ, তাদের তাঁবেদার সংস্থা ও রাজনীতিবিদরা মেয়েটির জীবন সংগ্রাম ও হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে ব্যবহার করে নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিম নারী সমাজে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী মতবাদের প্রচার ও তাদের ইসলামী জীবনাদর্শ ও পরিচয়কে দুর্বল করার লক্ষ যে কাজ করছে। কিন্তু যেখানে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, তুরস্ক ও উজবেকিস্তানের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নারী ও শিশুরা শুধু তাদের ইসলামী পোষাক হিজাব ও নিকাব পরিধান করার কারণে বিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেখানে মালালাকে সমর্থন ও মুসলিম নারীদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয় বৈকি। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের রায়ের ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত ফ্রান্স ও তুরস্কের মুসলিম নারীদের পক্ষে এইসব ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও রাজনীতিবিদ কেন তাদের বলিষ্ঠ কন্ঠ ব্যবহার করে না?
পশ্চিমারা মালালার ঘটনাটিকে ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে বহুল প্রচলিত ঠুনকো অভিযোগ অর্থাৎ ইসলাম নারীদের অধিকার বঞ্চিত করে তাদের নির্যাতন করে এটি প্রচারে ব্যবহার করছে। এবং এটাও প্রচার করছে যে, মুসলিম নারীদের এখন পশ্চিমা ধাঁচের নারী মুক্তি প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে তারা দশকের পর দশক ধরে এসব মিথ্যে প্রচারণা চালিয়ে আসছে যেন মুসলিম বিশ্ব তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন থাকে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকাতে, যা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইসলাম নয়, বরং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতিই পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের নারীদের অমূল্য শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ সমগ্র অঞ্চলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আগ্রাসন, উপর্যুপরি বোমা ও ড্রোন হামলায় বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার নারী শিশু হত্যা করা হচ্ছে, যা উক্ত অঞ্চলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘ কমিটি তাদের শিশু অধিকার বিষয়ক রিপোর্টে উল্লেখ করে “২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বিচার আক্রমণ ও বিমান হামলায়” শত শত শিশু নিহত হয়েছে। এসব শিশুদের অধিকার তাহলে কোথায়? এটা পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, এদের মৃত্যু এ অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ নিশ্চিতকরণে গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে। এসব হামলা ও আগ্রাসন এ অঞ্চলে এমন এক নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীল পরিবেশের জন্ম দিয়েছে, যেখানে অপরাধ, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ এসব নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে ভীত সন্ত্রস্ত পিতা-মাতা তাদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে এমনকি বাড়ির বাইরে বের হতে দিতে সাহস পাননা। কিভাবে নিরাপত্তাহীন, লাশের স্তুপ, ধ্বংসযজ্ঞ ও যুদ্ধকবলিত একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য একটি সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে? আগ্রাসী শক্তির দখলে যাওয়ার ১০ বছর পরেও আফগানিস্তানের প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৯ জনই অশিক্ষিত। এই হচ্ছে সেই পশ্চিমা ধ্বংসাত্মক পররাষ্ট্রনীতির নমুনা, যা মুসলিম নারীদের কাছ থেকে শুধু শিক্ষার অধিকার নয়; বরং তাদের সম্মান, নিরাপত্তা, এমনকি জীবনকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, পশ্চিমা সমর্থিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলো মুসলিম বিশ্বে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ও বিনোদন শিল্প এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে উদার সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এ উদার সংস্কৃতি নারীকে যৌন কামনা পূরণের পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করে ও নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার পথ সুগম করে নারীদের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত করেছে; বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মিশরের মতো মুসলিম জনবহুল রাষ্ট্রে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী, ও অপহরণের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিস্তার ঘটিয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেক নারী শিশু শিক্ষার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হতে সাহস পায়না।
পাশাপাশি পশ্চিমা ত্রুটিপূর্ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে। সুদসহ ঋণের ভারে জর্জরিত এসব রাষ্ট্র কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে অক্ষম, কারণ তাদের জাতীয় আয়ের বেশিরভাগ ব্যয় হয় সুদসমেত ঋণ পরিশোধে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে বরাদ্দ দেবার মতো আর্থিক সঙ্গতি দেশগুলোর নেই। ফলশ্রুতিতে দেশগুলো অপর্যাপ্ত বিদ্যালয়, মানসম্মত শিক্ষায় প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের আইএমএফের মতো সংগঠনগুলোর নীতি এবং অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অনীহার কারণে বহু অভিভাবক অনিচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মাঝে বৈষম্য করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই এটা কোন আশ্চর্যের ব্যপার নয় যে পকিস্তানের প্রায় ৬০% এবং বাংলাদেশ ও মিশরের প্রায় ৫০% নারীই শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত।
সুতরাং, প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতিই মুসলিম বিশ্বে নারী শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
নারী শিক্ষার বিষয়ে ইসলামে সুষ্পষ্ট নীতি রয়েছে। নিম্নোক্ত হাদীস অনুসারে মুসলিম নারীদের জন্য ইসলাম ও জীবন সম্পর্কে বিদ্যার্জন বাধ্যতামূলক। রাসূল (সাঃ) বলেন, “সকল মুসলিম নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরয।” ইসলাম মুসলিম নারীদের পারিপার্শ্বিক ও বহিঃবিশ্বের যাবতীয় জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসূল (সাঃ) এর স্ত্রী হযরত আয়েশা (রা.) শুধু ইসলামী চিন্তাবিদই ছিলেননা; বরং তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও অন্যান্য সাধারণ বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের অধিকারী। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কে জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে উন্নতির পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা একমাত্র সেই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব যা ইসলামের বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের সংবিধানই প্রকৃতভাবে কুর’আন ও সুন্নাহ্’র আলোকে প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের বিধান অনুযায়ী খিলাফত রাষ্ট্র শিক্ষাখাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করবে এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করবে। এটি ইসলামী বিধি ও অনুশাসন মেনে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে, সেখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত উচ্চশিক্ষিত নারী শিক্ষিকা দ্বারা স্কুল পরিচালিত হবে। খিলাফত শাসনব্যবস্থা নারীদের ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, বিচারক, শিক্ষিকা ইত্যাদি পেশায় উদ্বুদ্ধ করবে। আর এসব কিছুর পেছনে ব্যয় বরাদ্দ করবে খিলাফতের শক্তিশালী অর্থনীতি, যেখানে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে এবং সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা আর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র নারীকে তার শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এমন যেকোন ভ্রান্ত ধারণা সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন করবে। সবশেষে খিলাফত রাষ্ট্রই শারী’আহ্ আইনের ভিত্তিতে ইসলামী সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে যেখানে নারীরা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে, তাকে কখনও অবমূল্যায়ন করা হবেনা, পুরুষ তাকে নিজের অভিলাষের ভিত্তিতে নয় বরং সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে যার ফলে সমাজে এমন পরিবেশ নিশ্চিত হবে যেখানে নারী ও শিশুরা নিরাপদে পড়াশুনার জন্য ঘরের বাইরে যেতে পারে এবং তাদের কোন প্রকার অধিকার বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে। নারী শিক্ষার প্রসারে ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে খিলাফত রাষ্ট্র এসকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থার অধীনেই নারী শিক্ষার ইতিহাস এত সমৃদ্ধ হয়েছিল, যেখানে মারিয়াম আল ইস্তিরলাবীর মতো মনীষী ১০ম শতাব্দীতে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নিরুপণে নক্ষত্রবিদ্যা উন্নয়নে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। খিলাফত ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে ফাতিমা আল ফিহ্রীর মতো প্রকৌশলী, যিনি মরোক্কোতে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কারাওইন নির্মান করেন। এমন আরো হাজার হাজার নারী চিন্তাবিদ রয়েছেন, যাদের সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায় মোহাম্মদ আকরাম আন-নদভীর ৪০ খন্ডের বইয়ে। এতে তিনি খিলাফতের সময়কার ৮,০০০ মুসলিম নারী চিন্তাবিদের জীবনী তুলে ধরেছেন। এই সত্যিকার ইসলামী ব্যবস্থায় কায়রোর বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে নারীরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছেন, যেই অধিকার পেতে পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীদের আরো বহু শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়। বহু ইসলামী কলেজসমূহে আজকের পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় অধিক সংখ্যক নারীরা শিক্ষিকা হিসেবে অবদান রেখেছেন। একমাত্র ইসলামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে এসব সম্ভব হয়েছে। খিলাফতই সেই রাষ্ট্র যেখানে সত্যিকার অর্থে নারীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিলো এবং গঠনমূলক ও চমৎকার একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে খিলাফত ব্যবস্থা নারী শিক্ষার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, ইন্শা’আল্লাহ্।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, মালালা নাটকের পান্ডুলিপি পশ্চিমা ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক রচিত হয়েছে মুসলিম বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ ও তাদের ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা মহিলাদের অধিকার রক্ষার জন্য এটা করছে না। তারা এ অঞ্চলে যে শিক্ষা বিস্তার করছে তা একনিষ্ঠ নয় বরং তাদের উদার, ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ বিস্তারের জন্য, যা আমাদের যুব সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছে এবং যা কঠোরভাবে বর্জন করা উচিৎ। আমাদের ইসলামের মূল ভিত্তি ও খিলাফত ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে নারী শিক্ষার উন্নয়ন ও তাদের আল্লাহ্ প্রদত্ত অধিকার সমূহ নিশ্চিত করা সম্ভব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহ্’র নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ্ তার নূরকে প্রজ্জ্বলিত করবেনই যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আস সফ্ : ০৮]
২০ রমজান, ১৪৩৪ হিজরী
২৯ জুলাই ২০১৩, খ্রিস্টাব্দসিরিয়ার গণজাগরণ কেন ভিন্ন?

গত ২৬ মাসে সিরিয়ায় যা ঘটেছে তা থেকে এটি প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, সিরিয়ার গণজাগরণ ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত অন্য সবগুলোর মত নয়, বরং এটি একটি অনন্য গণজাগরণ।
বর্তমানকে অনুধাবন ও ভবিষ্যতের আশাবাদের জন্য অতীতের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। সিরিয়ার গণজাগরণের বর্তমান বাস্তবতা ও অবস্থা বুঝতে একজন সক্ষম হবে না, যদি না সে সেই ইতিহাসকে অনুধাবন করে যা গণজাগরণ শুরু হওয়ার গতিপ্রকৃতিকে নির্ধারণ করেছে।
প্রথম মহাযুদ্ধ : বিভক্তি ও আধিপত্য বিস্তার
সর্বশেষ বৈধ ইসলামী রাষ্ট্র উসমানীয় খিলাফত প্রথম মহাযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর বিজয়ীরা, বিশেষতঃ ব্রিটেন ও ফ্রান্স মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক এ কারণে যে, ইতিহাসে প্রমবারের মত সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে এর প্রতিপক্ষ আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়। ইউরোপীয় শক্তিসমূহ মুসলিম বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপন করে এবং মুসলিম ভূমিসমূহকে ‘বিভক্তি ও আধিপত্য বিস্তারকরণ’ কৌশলের আওতায় বিভক্ত করে।
আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া)-কেও বিভক্ত করা হয়। সিরিয়া ও লেবাননকে দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় যখন জর্ডান ও ফিলিস্তিনকে (যা পরবর্তীতে ইহুদীদের দ্বারা দখলকৃত) বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং নতুন জাতিরাষ্ট্রের পৃথক সীমান্ত রেখাসমূহ তৈরী করা হয়।
এ সময়টি ছিল একটি যুগের শেষ ও অন্য একটি যুগের শুরু। দু’টি বাস্তবতা দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত নতুন যুগকে পশ্চিমারা আজকে পর্যন্ত ধরে রেখেছে এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যতদিন ধরে রাখা যায়। প্রথমটি হল শাসনব্যবস্থা হিসেবে শারী’আহ্’র অপসারণ এবং সাধারণভাবে মুসলিমদের উপর পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ আইনের প্রয়োগ, আর বিশেষতঃ সিরিয়া এখানে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু।
দ্বিতীয়টি হল সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আধিপত্য ও শোষণ অর্থাৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একধরনের পরোক্ষ উপনিবেশবাদ জারি রাখা। নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য এগুলো ছিল কৌশলগত লক্ষ্য – যা ইসলামের উপর পশ্চিমাদের আধিপত্য ও স্বার্থকে সুনিশ্চিত করে। দালাল শাসকদের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করার মাধ্যমে অথবা নতুন বিশ্বব্যবস্থার ধারক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিশ্বব্যাংক এর মাধ্যমে এ বাস্তবতা ধরে রাখা হয়।
সে কারণে ১৯৪৬ সালে সিরিয়া থেকে ফরাসি সৈন্য সরিয়ে নেয়া ও একই বছর তথাকথিত স্বাধীনতা ঘোষণা করা খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। কেননা, যদিও ফ্রান্স বাহ্যিকভাবে সিরিয়া পরিত্যাগ করে, কিন্তু চাপিয়ে দেয়া দালাল শাসকের মাধ্যমে সরাসরি প্রভাব বজায় রাখে।
সিরিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা
১৯৪৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ প্রাধান্য বিস্তার ও স্বার্থরক্ষার জন্য ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে এ প্রতিযোগিতায় সিরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখন্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭১ সালে আমেরিকার সমর্থন নিয়ে আসাদ পরিবার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো মিলিটারী ক্যু এর মাধ্যমে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা চালায়। যদিও আসাদ পরিবারের শাসন আমলে পিতা-পুত্র উভয়ই ফাঁকা বুলির মত প্রচার করেছে যে, তারা ‘ইসরাইল ও আমেরিকা বিরোধী’, কিন্তু তাদের কথার সাথে কাজের ভিন্নতাই বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের কখনওই কথা নয় বরং কর্মকান্ডকেই অধিকতর বিবেচিত বিষয় হিসেবে দেখা উচিত।
আসাদের শাসনামলের বাস্তবতা
আসাদ পরিবারের শাসনামলে সিরিয়া ছিল ভয়, নিষ্ঠুরতা ও দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ। আসাদ সরকার বাথ পার্টি, গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পুরো জাতির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত। সরকার সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে নিষিদ্ধ করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর দমন নিপীড়ন চালায় – বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনসমূহ দমন নিপীড়নের বেশি শিকার হয়। অব্যাহত ইসরাইলি আক্রমণ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংযম অবলম্বন ও ফাঁকা বুলির মাধ্যমে কপট রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেও নিজের জাতির বিরুদ্ধে সামান্যতম অসন্তুষ্টি প্রকাশের কারণে দমন নিপীড়ন চালানোর ক্ষেত্রে আসাদ সরকার ছিল বেশ তৎপর। ১৯৮২ সালে কুখ্যাত হামা গণহত্যার মাধ্যমে সিরিয়ার মুসলিমদের বিরুদ্ধে আসাদ সরকার সবচেয়ে পাশবিক আক্রমণটি চালায়, যেখানে ৪০,০০০ লোককে হত্যা করা হয়েছিল।
আরব বসন্ত
আরব বিশ্বের সাধারণ জনগণের ফুঁসে উঠাই ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ শ্লোগাণ ছিল, ‘উম্মাহ্ এ শাসনের পতন চায়’। আর এটি থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, প্রথম মহাযুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের উপর যে বাস্তবতা চাপিয়ে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে এ উম্মাহ বিদ্রোহ করেছে এবং তারা এর আমূল পরিবর্তন চায়। আরব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলন এ অঞ্চলে পশ্চিমাদের কৌশলগত স্বার্থের প্রতি ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে পশ্চিমারা তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া ও ইয়েমেনে গণজাগরণের উত্তাল ঢেউ-এর লাগাম টেনে ধরে বসেছিল এবং দাবি করছিল তারাও সেসব দেশের জনগণের দাবির সাথে একমত পোষণ করে – যদিওবা তারাই (পশ্চিমারা) দশকের পর দশক ধরে অত্যাচারী শাসক ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। তারই ফলশ্রুতিতে পশ্চিমারা এসব গণআন্দোলনকে ছিনতাই করতে ও প্রাণান্তকর (?) প্রচেষ্টায় কিছু বাহ্যিক (কসমেটিক) পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়। কিন্তু আজকে সেসব দেশে যা ঘটছে তা হল, অব্যাহত বিরাজমান সামাজিক অস্থিরতা ও অসন্তুষ্টি – যা স্ব স্ব জাতিকে একথা ভাবতে বাধ্য করছে যে, তাদের বিপ্লব এখনও শেষ হয়নি।
এখানে মূল কথা হল, পশ্চিমারা এসব গণআন্দোলনের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয় যে, তা এ অঞ্চলে পশ্চিমাদের কৌশলগত স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলতে পারেনি। আর এটি করা হয়েছে কসমেটিক পরিবর্তন করার মাধ্যমে – যা কেবল সমস্যার উপসর্গকে টার্গেট করেছিল, মূল সমস্যাকে নয়। উদাহরণস্বরূপ, মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে আমরা মোবারক ও তার পুত্রদের সম্পদ এবং তার শাসনামলের দুর্নীতির ব্যাপারে জানতে পেরেছি। এর দ্বারা রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারব্যবস্থার প্রকৃত পরিবর্তন নয়, বরং শুধু রাষ্ট্রপ্রধান তথা ব্যক্তি পরিবর্তনের দিকে জনগণের দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত রাখা হয়।
সিরিয়ার গণ-জাগরণ
১৫ মার্চ ২০১১ তারিখে ‘আরব বসন্ত’-এর ধাক্কা সিরিয়ায় পৌঁছে। অন্যান্য দেশের মত সিরিয়ার বিক্ষোভকারীরা আসাদ সরকারের নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তির দাবি তোলে। আসাদ সরকারের নিপীড়নমূলক প্রকৃতি জানা থাকার কারণে কয়েক মাসের মধ্যে এ গণ-জাগরণ দমন করা যাবে-এ ব্যাপারে আমেরিকা আত্মবিশ্বাসী ছিল। ফলে সে সময় আমেরিকার কৌশল ছিল সিরিয়ার জাগরণকে পাত্তা না দেয়া এবং গণ-জাগরণকে দমন করার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে তার আজ্ঞাবহ দালাল আসাদকে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করার একের পর এক সুযোগ করে দেয়া।
তবে ঘটনা খুব দ্রুত গতিতে এগিয়েছে এবং কয়েক মাস পর সিরীয় সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈন্যদের মধ্য থেকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলিবর্ষণের নির্দেশ না মেনে পদত্যাগ করা শুরু হল। এ প্রবণতা আরও এগিয়ে যায় এবং পদত্যাগী সেনাসদস্যরা জাতিকে সরকারের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে Free Syrian Army (FSA) গড়ে তুলে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী পর্যায়ে অসংখ্য সশস্ত্র ব্রিগেড গঠিত হয়।
মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ক্রমাগত সশস্ত্র ব্রিগেডগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ায় এ ব্রিগেডগুলো সমর্থিত সাধারণ সিরীয়দের হাতে দালাল আসাদের পতন হতে পারে-এ হুমকি বুঝতে পেরে আমেরিকা এই উত্তাল গণ-জাগরণের নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করে। অন্যান্য ‘আরব বসন্ত’ এর দেশগুলোর মত গণজাগরণের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমেরিকা নতুন এক কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করল। সেকারণে আমেরিকা Syrian National Coalition (SNC) গঠন, অতঃপর অন্তঃর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও আসাদ পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য নেতৃত্ব উপহার দেয়ার জন্য বিরোধী ব্যক্তিত্ব তৈরিতে সহায়তা করা শুরু করে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের সরে যাওয়ার পথকে সুগম করার জন্য আমেরিকা ‘ইয়েমেনি সমাধান’ এর দিকেও আহ্বান জানায়।
কিন্তু বাস্তবে মাঠে যা ঘটে তা আমেরিকা ও পশ্চিমাদের জন্য ভয়ঙ্কর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। গণজাগরণ যতই এগুতে থাকল ততই সিরিয়ার জনগণ ও সশস্ত্র ব্রিগেডগুলোর শ্লোগাণ ও প্রকাশিত লক্ষ্য ক্রমাগতভাবে ইসলামি প্রকৃতির হতে থাকল। এটি সুস্পষ্ট হতে থাকল যে, সিরিয়ার মুসলিমগণ কেবল প্রেসিডেন্টের অপসারণ চান না। কেননা তা মূল সমস্যার উপসর্গ অর্থাৎ প্রতিদিনকার বঞ্চণা ও দুর্নীতি এর সমাধানকল্পে এটি একটি কসমেটিক পরিবর্তন। সে কারণে তারা পশ্চিমা প্রস্তাবনাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং পশ্চিমা সমর্থিত ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদলকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। এটি সুস্পষ্ট হতে থাকল যে, সিরিয়ার মুসলিমদের দাবি তাদের আক্বীদা ও উচ্চ রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে উদ্ভূত। তারা অনুধাবন করতে পারল যে, মূল সমস্যা হল প্রম মহাযুদ্ধের পর চাপিয়ে দেয়া পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা। আর তারপর থেকে যে সমস্যাসমূহ উদ্ভূত হয় তা ঐ মূল সমস্যার উপসর্গমাত্র। তারা আরও অনুধাবন করতে পারল যে, কেবলমাত্র ইসলামের মাধ্যমে তাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। সে কারণে দক্ষিণে দেরা, রাজধানী দামেস্ক, পশ্চিমে হোমস, উত্তরে আলেপ্পো ও ইদলিব, পূর্বে আল রাকাসহ পুরো সিরিয়াব্যাপী অসংখ্য বিক্ষোভকারী খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানায়। প্রকৃত অর্থে, ইসলামী খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পর এই প্রথমবার মুসলিম বিশ্বের হাজার হাজার সাধারণ জনগণ খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানায়।
সিরিয়ার মুসলিমগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা পুরো বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছে এবং পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কাছে আসন্ন পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হল, গণজাগরণ চলাকালীন সময়ে আসাদ সরকার কর্তৃক ভয়াবহ গণহত্যা ও জঘন্য বর্বর অপরাধ সংঘটিত করার পরও সিরিয়ার মুসলিমগণ এমন কোন রাজনৈতিক সমাধানের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে – যা সরকার কাঠামোকে অক্ষত রেখে প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করবে, হত্যাকান্ডের অবসান ঘটাবে।
সিরিয়ার গণজাগরণের ফলাফল যাতে কোনভাবেই খিলাফত প্রতিষ্ঠার দিকে না যায় এবং সিরিয়াসহ পুরো অঞ্চলজুড়ে পশ্চিমা আধিপত্য খর্ব না হয় সে জন্য আমেরিকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। আসাদ সরকারকে সামরিক ও অবকাঠামোগতভাবে সাহায্য করতে এটি রাশিয়া ও ইরানের সাথে কাজ করছে এবং একই সময়ে তথাকথিত উগ্রবাদী শক্তিসমূহকে দুর্বল করতে সেলিম ইদরিসের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সমর্থিত Supreme Military Council কে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে। এছাড়াও সিরিয়ায় শেকড় রয়েছে এমন একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে এ প্রচেষ্টা পূর্বে SNC এবং অতি সম্প্রতি ঘাসান হিট্টুকে অন্তঃর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
সিরীয় জাগরণের ভবিষ্যত
বিগত ২৬ মাসে কমপক্ষে এক লক্ষ সিরীয় নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। তবে সিরীয় মুসলিমগণ খুব ভালভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে যে, এ পথে আরও ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রয়োজন। তারা আরও বুঝতে পেরেছে যে, এ সংগ্রামের প্রকৃতি হল একদিকে মুসলিম উম্মাহ্ সত্যিকারের মুক্তির জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং অন্যদিকে পশ্চিমাবিশ্ব মুসলিম বিশ্বে ব্যবস্থার পরিবর্তন নয় বরং চেহারার পরিবর্তন সুনিশ্চিত করতে চাচ্ছে যাতে করে মূল সমস্যা নয় বরং এর উপসর্গ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
আরব বিশ্বে সংঘটিত হওয়া অন্যান্য গণজাগরণের মত না হওয়ায় সিরীয় গণজাগরণ অনন্য – যা সভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড়। নবী (সাঃ) আল শামের ভূমি ও এর অধিবাসীদের বিষয়ে অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করেন – যেগুলোতে সে ভূমির রহমতপূর্ণ প্রকৃতি ও এর মুসলিমদের দৃঢ়তার কথা বিবৃত হয়েছে। তাছাড়া মুসলিমদের ইতিহাসে বর্ণিত আছে, এই বিশেষ ভূমিতে ক্রুসেডার ও মঙ্গলদের পরাজিত করে মুসলিমগণ তাদের হৃত শাসনক্ষমতা ও পুনঃজাগরণ ফিরে পায়।
সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, শতাব্দীকালের উপনিবেশবাদ, লাঞ্ছণা এবং নিষ্ঠুরতাকে পেছনে ফেলে আল শামের মুসলিমগণ উম্মাহ্’র পুনঃজাগরণকে নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে তো?
আনাস আলওয়াহ্ওয়াহ্
মে, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দবৃটেন যেভাবে আরববিশ্বকে বিভক্ত করেছিল

আরব বিশ্বজুড়ে জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির প্রক্রিয়া ছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা। একশো বছর আগেও অধিকাংশ আরব অঞ্চল উসমানী খিলাফতের অংশ ছিল। উসমানী খিলাফত ছিল একটি বিশাল বহুজাতিক রাষ্ট্র, যার কেন্দ্র বা রাজধানী ছিল ইস্তাম্বুল। বর্তমানে আরব বিশ্বের মানচিত্র খুবই জটিল একটি গোলকধাঁধার মতো মনে হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কিছু জটিল ঘটনা উসমানী সাম্রাজ্যের পতন এবং নতুন জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটায়। নবসৃষ্ট এসব রাষ্ট্রের নিজস্ব সীমানা ছিল যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত এবং মুসলিমদেরকে একে অন্যের থেকে আলাদা করে ফেলে। এই ঘটনার পেছনে অনেক কারণ থাকলেও, বৃটেনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেইসময়ে বৃটেনের বিবাদমান ৩ পক্ষের সাথে সই করা ৩ টি আলাদা চুক্তিতে পরস্পর বিরোধী অঙ্গীকার ছিল। চুক্তিগুলোর ফলে মুসলিম বিশ্বের একটি বিশাল অংশ বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা:
১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। শত্রু-মিত্র নির্ণয়ের জটিল প্রক্রিয়া, অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, ঔপনিবেশিক বাসনা ও সরকারগুলোর উচ্চপর্যায়ে অব্যবস্থাপনা প্রভৃতি মিলিয়ে এই প্রয়লংকারী যুদ্ধের সূচনা ঘটায়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে প্রায় ১.২ কোটি লোক প্রাণ হারান। যুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে ছিল বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং অক্ষশক্তিতে ছিল জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি।
প্রথমদিকে উসমানী খিলাফত নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা তারা যুদ্ধরত জাতিগুলোর মত ততোটা শক্তিশালী ছিল না এবং নানা আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। ১৯০৮ সালে শেষ শক্তিশালী খলীফা আব্দুল হামিদ দ্বিতীয় কে “৩ পাশা”(তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যুদ্ধমন্ত্রী, নৌমন্ত্রী) উৎখাত করে এবং সামরিক শাসন জারি করে। এরপর থেকে খলীফা পদটি শুধুমাত্র প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হত। এই “৩ পাশা” ছিল ধর্মনিরপেক্ষ এবং পশ্চিমা ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী “তরুণ তুর্কী” গ্রুপের সদস্য। অন্যদিকে, উসমানীরা ইউরোপের নানা শক্তির কাছে বিরাট অঙ্কের ঋণের জালেও আবদ্ধ ছিল, যা তারা পরিশোধে অক্ষম ছিল। এই ঋণ থেকে মুক্তি পাবার লক্ষ্যে শেষপর্যন্ত ওসমানীয়রা এই বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ওসমানীয়রা প্রথমে মিত্রশক্তিতে যোগদানে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে ১৯১৪ সালের অক্টোবরে অক্ষশক্তিতে যোগদান করে।
এর ফলশ্রুতিতে, বৃটেন তৎক্ষণাৎ উসমানী খিলাফতকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের নীলনকশা করতে শুরু করে। বৃটেন ১৮৮৮ সাল থেকে মিশর এবং ১৮৫৭ সাল থেকেই ভারতকে দখল করে নিয়েছিল। উসমানী খিলাফতের অবস্থান ছিল ব্রিটেনের এই দুই উপনিবেশ এর ঠিক মাঝখানে। ফলে বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে উসমানী খিলাফতকে উচ্ছেদ করতে বৃটেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।
আরব বিদ্রোহ:
ব্রিটেনের অন্যতম বড় পরিকল্পনা ছিল উসমানী খিলাফতের আরব জনগণকে উস্কে দেয়া। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরব উপদ্বীপের পশ্চিমের এলাকা হিজাযের একজন ব্যক্তিকে তারা তৎক্ষণাৎ পেয়েও যায়। মক্কার গভর্নর শরীফ হুসেইন বিন আলী উসমানী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শর্তে বৃটেনের সাথে চুক্তি করে। শরীফ হুসেইন নিজের মুসলিম ভাইদের সাথে যুদ্ধ করার এই ব্রিটিশ পরিকল্পনায় কেন অংশ নিয়েছিলেন তার নিশ্চিত কারণ জানা যায় নি। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: ৩ পাশা কর্তৃক তুর্কী জাতীয়তাবাদ বাস্তবায়নের চেষ্টায় তার অসন্তোষ, উসমানী সরকারের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ অথবা নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার মনোবাসনা।
যে কারণেই হোক না কেন, বৃটেনের সাহায্যপুষ্ট হয়ে শরীফ হুসেইন উসমানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নিলেন। অন্যদিকে, বৃটেন বিদ্রোহীদেরকে টাকা ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়, কেননা টাকা ও অস্ত্র ছাড়া উসমানীদের সুসংঘটিত বাহিনীর সাথে পেড়ে ওঠা কষ্টকর ছিল। ব্রিটেন তাদের এও প্রতিশ্রুতি দেয় যে, যুদ্ধের পর শরীফ হুসেইনকে ইরাক ও সিরিয়া সহ গোটা আরব উপদ্বীপ মিলিয়ে একটি বিশাল আরব রাজ্য শাসন করতে দেয়া হবে। দুইপক্ষ (বৃটেন ও শরীফ) এর মধ্যকার এ সম্পর্কীয় আলাপ-আলোচনা ও দর কষাকষি বিষয়ক চিঠিগুলো ইতিহাসে McMahon-Hussein Correspondence (ম্যাকমেহন-শরীফ পত্রবিনিময়) নামে পরিচিত। এই ম্যাকমেহন হলেন মিশরের তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমেহন, যার সাথে শরিফের গোপন আঁতাত চলছিল।
১৯১৬ এর জুনে, শরীফ হুসেইন তার সশস্ত্র আরব বেদুঈনদের নিয়ে যুদ্ধে বেড়িয়ে পড়েন। কয়েক মাসের মধ্যেই বৃটিশ সেনা ও নৌবাহিনীর সহায়তায় আরব বিদ্রোহীরা মক্কা ও জেদ্দা সহ হিযাজের বেশ কয়েকটি শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। ব্রিটেন সৈন্য, টাকা, অস্ত্র, পরামর্শদাতা (যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিখ্যাত “লরেন্স অফ এ্যারাবিয়া”), পতাকা দিয়ে বিদ্রোহীদের সহায়তা করে। মিশরে অবস্থানরত বৃটিশরা বিদ্রোহীদের একটি পতাকা বানিয়ে দেয় যা “আরব বিদ্রোহীদের পতাকা” নামে পরিচিত ছিল। এই পতাকা-ই পরবর্তীতে অন্যান্য আরব দেশ যেমন: জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া, কুয়েতের পতাকা তৈরিতে মডেল (আদর্শ) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯১৭ থেকে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, আরব বিদ্রোহীরা উসমানীদের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। একদিকে বৃটেন বাগদাদ ও জেরুজালেম দখল করে ইরাক ও ফিলিস্তিনে তাদের অবস্থান জোরদার করে, অন্যদিকে আরব বিদ্রোহীরা আম্মান ও দামেস্ক দখল করে বৃটেনকে তাদের কাজে সাহায্য করতে থাকে। এখানে জেনে রাখা জরুরি যে, অধিকাংশ আরব জনগোষ্ঠীরই এই আরব বিদ্রোহে কোন সমর্থন ছিল না। এটি ছিল (ক্ষমতালোভী) কতিপয় নেতার নেতৃত্বাধীন একটি ছোট আন্দোলন যা ঐ নেতাদের নিজস্ব ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছিল। অধিকাংশ আরব জনগোষ্ঠী এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে এবং উসমানী বা বিদ্রোহী কোন পক্ষকেই সমর্থন দেয় নি। শরীফ হুসেইনের আরব রাজ্য বানানোর বাসনা এতদিন ঠিকভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু বৃটেনের অন্যান্য পক্ষের সাথে করা প্রতিশ্রুতিগুলো এবার বাঁধ সাধল।
সাইকস-পিকোট চুক্তি:
আরব বিদ্রোহ শুরু হবার আগেই এবং শরীফ হুসেইন তার আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে বৃটেন ও ফ্রান্সের অন্য পরিকল্পনা করা ছিল। ১৯১৫-১৬ এর শীতকালে, বৃটেনের স্যার মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের ফ্রান্সিস জর্জেস পিকোট উসমানী খিলাফত পরবর্তী আরব বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করতে গোপনে মিলিত হন।
বৃটেন ও ফ্রান্স পুরো আরব বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়ার ব্যাপারে চুক্তি করে, যা পরবর্তীতে সাইকস-পিকোট চুক্তি নামে পরিচিতি লাভ করে। বৃটেন বর্তমানে জর্ডান, ইরাক, কুয়েত নামে পরিচিত এলাকাগুলোর দখল নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ফ্রান্স পায় বর্তমান সিরিয়া, লেবানন ও দক্ষিন তুরস্ক। জায়োনিস্টদের (জায়োনবাদী) ইচ্ছাকে এখানে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ফিলিস্তিনের দখল নেয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে ঠিক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৃটেন ও ফ্রান্সের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর কিছু কিছু জায়গায় আরবের সীমিত মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কথা থাকলেও, ইউরোপীয় শাসন ব্যবস্থাই তাদের উপর কর্তৃত্বশীল থাকবে। চুক্তি অনুযায়ী, অন্যান্য এলাকায় বৃটেন ও ফ্রান্স সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব করার অধিকার পায়।
যদিও এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে করণীয় বিষয়ক একটি গোপন চুক্তি ছিল, কিন্তু ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বলশেভিক সরকার একে সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়। এই সাইকস-পিকোট চুক্তি ও শরীফ হুসেইনকে দেয়া ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে, বৃটেন ও আরব বিদ্রোহীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এটিই বৃটেনের করা সর্বশেষ পরস্পর বিরোধী চুক্তি ছিল না, নাটকের চিত্রনাট্যের এখনো কিছু অংশ বাকি ছিল।
বেলফোর ঘোষণা:
আরেকটি সম্প্রদায়েরও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে শ্যেনদৃষ্টি ছিল এবং তারা হল জায়নবাদীরা। জায়োনিজম হল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন যা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতো। এই আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯ শতকে এবং এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য (যারা ছিল মূলত পোল্যান্ড, জার্মানি, রাশিয়ার বাসিন্দা) ইউরোপের বাইরে একটি আবাসভূমি খুঁজে বের করা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জায়োনিস্টরা বৃটেন সরকারের কাছে যুদ্ধ পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের ব্যাপারে সাহায্য চায়। অন্যদিকে, বৃটিশ সরকারের ভিতরেও এমন অনেক কর্মকর্তা ছিলেন যারা এই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব আরথার বেলফোর। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বরে, বেলফোর (ইহুদিবাদি) জায়োনিস্ট সম্প্রয়দায়ের নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। এই চিঠিতে তিনি ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সরকারী সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
“মহামান্য (বৃটিশ রাজার) সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় বসতি স্থাপনের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং এই লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্যে তার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, এমন কিছুই করা হবে না যাতে ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি (অন্যান্য ধর্মাবলম্বী) সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, অথবা অন্য কোনো দেশে বসবাসকারী ইহুদীদের উপভোগকৃত অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষতিসাধন হয়”
তিনটি পরস্পরবিরোধী চুক্তি:
ফলে দেখা গেল, বৃটেন ১৯১৭ সালের মধ্যেই তিন তিনটি ভিন্ন পক্ষের সাথে তিনটি আলাদা চুক্তি করলো এবং এই তিনটি ভিন্ন চুক্তিতে আরব বিশ্বের ভবিষ্যতের ব্যাপারে তিনটি ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হল। বৃটেন আরবদেরকে আশ্বাস দিল, তারা শরীফ হুসেইনের মাধ্যমে আরব রাজ্যের কর্তৃত্ব পাবে, অন্যদিকে ফ্রান্স এবং বৃটেন চুক্তি করলো, ঠিক ঐ এলাকাগুলোই বৃটেন এবং ফ্রান্স ভাগ করে নিবে। আবার বেলফোর ঘোষণা অনুযায়ী জায়োনবাদীরা ফিলিস্তিন পাওয়ার আশা করলো।
১৯১৮ সালে মিত্রশক্তির বিজয়ের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং ফলশ্রুতিতে উসমানী খিলাফতের ধ্বংস ঘটে। যদিও উসমানীরা ১৯২২ পর্যন্ত নামে মাত্র টিকে ছিল এবং খলীফার পদটি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত নামমাত্র ভাবে টিকে ছিল, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে উসমানীদের অধীনে থাকা সব অঞ্চল ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশে পরিণত হয়। যদিও যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য তিন পক্ষের পরস্পরবিরোধী বিতর্কের মধ্যে আটকা পড়ে যায়।
তাহলে কোন পক্ষ অবশেষে বিজয় লাভ করেছিল? প্রকৃতপক্ষে কেউ-ই তাদের পূর্ণ চাহিদা মোতাবেক সবকিছু পায় নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে লিগ অব নেশনস (জাতিসংঘের আদি রূপ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। লিগ অব নেশন্সের অন্যতম দায়িত্ব ছিল, বিজিত উসমানী অঞ্চলগুলোকে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়া। লিগ অব নেশন্স সম্পূর্ণ আরব বিশ্বকে অনেক ভাগে বিভক্ত করে ফেলে (যাকে মেন্ডেট বলা হয়)। এসব মেন্ডেট বৃটেন ও ফ্রান্স এর হাতে তুলে দেয়া হয় এবং মেন্ডেটগুলো ব্রিটেন ও ফ্রান্স দ্বারা শাসিত হবে যতদিন না ঐ ছোট অঞ্চলটি বা মেন্ডেটটি নিজেই নিজের দায়িত্ব নেবার ব্যাপারে সামর্থ্যবান হয়। এই লিগ অব নেশন-ই সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন সীমানা আরোপ করে দেয়, যা আমরা বর্তমানে মানচিত্রে দেখতে পাই। এই সীমানাগুলো স্থানীয় জনগণের কোনপ্রকার মতামত ছাড়াই আরোপ করা হয়। জাতিগত, ভৌগলিক অথবা ধর্মীয় কোন পরিচয়ই বিবেচনায় আনা হয় নি, অর্থাৎ তা ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী একটি সিদ্ধান্ত। এটা জেনে রাখা জরুরি যে, আরব বিশ্বের এই রাজনৈতিক সীমানা কোনভাবেই বিভিন্ন জাতির উপস্থিতি নির্দেশ করে না। ইরাকি, সিরিয়, জর্ডানি ইত্যাদি পার্থক্যসমূহ সম্পূর্ণরূপে ইউরোপীয় ঔপনিবেশবাদীদের কর্তৃক তৈরি করা হয় আরবদেরকে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত করে ফেলার পদ্ধতি হিসেবে।
মেন্ডেট সিস্টেমের মাধ্যমে বৃটেন এবং ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের উপর তার কাঙ্খিত দখল বুঝে পায়। অন্যদিকে শরীফ হুসেইনের ক্ষেত্রে, তার ছেলেরা বৃটিশদের ছায়াতলে থেকে শাসনকাজ পরিচালনার সুযোগ পায়। প্রিন্স ফয়সালকে সিরিয়া ও ইরাকের রাজা করা হয় এবং প্রিন্স আব্দুল্লাহকে করা হয় জর্ডানের রাজা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বৃটেন এবং ফ্রান্স-ই এইসব এলাকার প্রকৃত কর্তৃত্বে ছিল।
অন্যদিকে, বৃটেন সরকার জায়োনবাদীদেরকে কিছু শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিনে বসতি গড়ার অনুমতি দেয়। বৃটেন সেখানে আগে থেকে বসবাসকারী আরবদের রাগান্বিত করতে চায় নি, তাই তারা ফিলিস্তিনে আসা দেশান্তরিত ইহুদীদের সংখ্যাসীমা বেঁধে দেয়। এর ফলে জায়োনবাদীরা ক্ষেপে ওঠে, ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ইহুদীরা বৃটেনের শর্ত না মেনেই ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা বাড়াতে থাকে। এসব ঘটনা আরবদের ক্ষোভও বাড়িয়ে দেয়, কেননা তাদের কাছে ফিলিস্তিন ছিল এমন একটি ভুমি যা ১১৮৭ সালে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়্যুবির বিজয়ের পর থেকে তাদের নিজেদের ছিলো এবং এখন তা বসতি স্থাপনের ফলে ইহুদীদের বলপূর্বক দখলে চলে যাচ্ছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বৃটেন মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি করেছিল তা আজও বিদ্যমান। পরস্পরবিরোধী চুক্তিগুলো এবং এর ফলে সৃষ্ট আলাদা আলাদা দেশগুলো মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। জায়োনিজমের উত্থান ও মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্যের ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে জালিম সরকারের উপস্থিতি ও অর্থনৈতিক পতন দেখা দিয়েছে। যদিও এই বিভাজনটি গত ১০০ বছরের ছোট পরিক্রমার ভেতরে তৈরি করা হয়েছে, তথাপি বৃটেন এর তৈরি করা এই বিভেদ মুসলিম বিশ্বে আজো শক্তিশালীভাবে বিরাজ করছে।
Bibliography:
Hourani, Albert Habib. A History Of The Arab Peoples. New York: Mjf Books, 1997. Print.
Ochsenwald, William, and Sydney Fisher. The Middle East: A History. 6th. New York: McGraw-Hill, 2003. Print.
মূল: Lost Islamic History হতে নেয়া এক প্রবন্ধ
অনুবাদক: ফারহাত শফী
Posted By Visionary
হারামের উপায়ও হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে

শরীয়াহ’র নীতি (قاعِدَة) বলে-
إذا غلب على الظن أنها توصل إلى الحرام، فإن كان يُخشى أن توصل فلا تكون حراماً
“যদি নিছক পরিমাণ সন্দেহ প্রতিষ্টিত হত, যে এটি হারামের দিকে নির্দেশ করছে এমন হারামের উপায় নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হবে। যদি শুধুমাত্র ভয়ের উদ্রেক হয় যে এটি হারামের দিকে নির্দেশ করে তাহলে এটি হারাম হবে না”
কুরআনে এই নীতিটির প্রমাণ পাওয়া যায়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
“আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা আরাধনা করে তাদেরকে তোমরা মন্দ বলো না। তাহলে তারা ধৃষ্টতায় অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহকে মন্দ বলবে”। [সূরা আন-আম:১০৮]
কাফিরদের অপমান করা মুবাহ (অনুমোদিত) এবং আল্লাহ্ কুরআনে তাদেরকে অপমানিত করেছে। কিন্তু যদি এই অপমান আল্লাহ্কে অপমান করার দিকে কাফিরদের পরিচালিত করে, তাহলে তা করা হারাম। এটি এই কারণে যে আল্লাহ্কে অপমান করা হারাম। এবং এভাবেই শরীয়াহ নীতি প্রণীত হয়েছে, অর্থাৎ,
الوسيلة إلى الحرام محرمة
“হারামের উপায় নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয়”।
যদিওবা হারামের উপায় অবধারিতরূপে হারামের দিকে পরিচালিত হলেই নিষিদ্ধ হয়। অর্থাৎ, যদি এমন উপায় যা হারামের দিকে নিছক পরিমাণ হারামের দিকে পরিচালিত করে, এবং তা শরীয়াহ নীতি দ্বারা প্রতিষ্টিত হয়, তখন এটি হারাম হবে। কাজেই, যদি হারামের দিকে পরিচালিত না করে, যেমন: যদি এটি শুধুমাত্র ভয়ের উদ্রেক হয় যে হারামের দিকে পরিচালিত করছে, অর্থাৎ মহিলাদের মুখ না ঢেকে বাহিরে যাওয়া এবং এ ভয় হয় যে এটা ফিতনা তৈরী করবে, এ ক্ষেত্রে হারাম হবেনা, কারণ কেবল ভয় হয় যে হারামের দিকে পরিচালিত করবে এমন বিষয় হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এটি এ মূলনীতির প্রমাণ।
আরেকটি একই রকম নীতি প্রযোজ্য হবে এভাবে, “যদি মুবাহ জিনিষের কোন সুনির্দিষ্ট উপকরণ হারামের দিকে পরিচালিত করে, ঐ সুনির্দিষ্ট উপকরণটি হারাম হবে কিন্তু জিনিষটি মুবাহ’ই থেকে যাবে”।
এটি বুখারী হতে বিবৃত নাফে’ হতে বর্ণিত, যিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন উমর তাকে বলেন:
أَنَّ النَّاسَ نَزَلُوا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرْضَ ثَمُودَ الْحِجْرَ فَاسْتَقَوْا مِنْ بِئْرِهَا وَاعْتَجَنُوا بِهِ فَأَمَرَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُهَرِيقُوا مَا اسْتَقَوْا مِنْ بِئْرِهَا وَأَنْ يَعْلِفُوا الْإِبِلَ الْعَجِينَ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يَسْتَقُوا مِنْ الْبِئْرِ الَّتِي كَانَتْ تَرِدُهَا النَّاقَةُ
“কিছু লোক রাসূল (সা) এর সাথে ছামুদ আল হিজরে উপস্থিত হন, অতএব তারা ছামুদ আল হিজরের কূপ থেকে পানি নিল এবং তা দ্বারা খামির তৈরী করে নিল। রাসূল (সা) আদেশ দিলেন ঐ পানিগুলো ফেলে দিতে এবং খামিরগুলো পশুদের দিয়ে দিতে; এরপর তিনি পানি নিতে বললেন যেখান থেকে উষ্ট্রী পানি পান করত”
আরেকটি বর্ণনায় আসে, রাসূল (সা) বলেন: “এর কূপ থেকে কেউ পানি করবেনা এবং নামাযের ওযুর পানি হিসেবেও এটি কেউ ব্যবহার করবেনা, যে খামিরই এ পানি দ্বারা তৈরী করা হয়েছে তা পশুদের দিয়ে দাও এবং এর কোন অংশ খাবেনা। কেউ রাতে সঙ্গীবিহীন একাকী বের হবেনা”।
পানি পান করা মুবাহ, কিন্তু ঐ নির্দিষ্ট পানিটি যেটি ছামুদের পানি তা রাসূল (সা) পান করতে নিষেধ করেন কারণ এটি হারামের দিকে পরিচালিত করে; তথাপি পানি মৌলিকভাবে মুবাহ’ই থেকে যায়। এছাড়াও রাতে কোন সঙ্গী ছাড়া বের হওয়া মুবাহ বিষয় কিন্তু রাসূল (সা) সৈন্যদের কেউ ঐ নির্দিষ্ট রাতে এবং ঐ নির্দিষ্ট জায়গায় একাকী সঙ্গীবিহীন যেতে নিষেধ করেন কারণ এটি হারামের দিকে পরিচালিত করে, অন্যথায়, সঙ্গীবিহীন রাতে বের হওয়া মুবাহ’ই থকে যায়। এটি প্রমাণ করে যে ঐ মুবাহ জিনিসের নির্দিষ্ট বিষয়টি হারাম হয় যদি তা হারামের দিকে পরিচালিত করে, এবং জিনিসটি সাধারণভাবে মুবাহ’ই থেকে যায়।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৭ (বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একটি একক জাতিতে পরিণত করা)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
সমস্ত আরব উপদ্বীপের জনগোষ্ঠী দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করার পর এবং আরব ভূখন্ড থেকে মূর্তিপূজা নিশ্চিহ্ন হবার পর আল্লাহর রাসূল (সা) ইন্তিকাল করেন। এ সময় সমস্ত আরব উপদ্বীপ ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত এবং সম্পূর্ন ভাবে ইসলামের আকীদাহ্ ও শাসনব্যবস্থা থেকে উদ্ভুত আইন-কানুন দিয়ে শাসিত। আল্লাহতায়ালা তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করা, মুসলিমদের উপর তাঁর নিয়ামতকে সম্পূর্ন করা এবং দ্বীন ইসলামকে তাঁর পছন্দনীয় জীবনব্যবস্থা হিসাবে মনোনীত করার পরই রাসূল (সা) ইন্তিকাল করেন। এর মধ্যে প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর রাজা ও শাসকবৃন্দের কাছে দূত পাঠিয়ে এ অঞ্চলের জনসাধারণকে ইসলামের দিকে আহবান করা এবং মু’তাহ ও তাবুকের প্রান্তরে সৈন্যদল পাঠিয়ে রোমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করাও অন্তর্ভূক্ত ছিল।
এরপর খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও এ বিজয় অভিযাত্রা চলতে থাকে। খুলাফায়ে রাশেদীনের সময় সর্বপ্রথম ইরাক জয় করা হয় এবং এ সময় এ অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিল পারস্য ও আরব জাতির মিশ্রণ; যারা খ্রিষ্টান, মাযদাকিয়া এবং জরুষ্ট্রিয়ান ধর্মে বিশ্বাস করতো। এরপর, জয় করা হয় পারস্য এবং তারপর আল-শাম অঞ্চল। পারস্য অঞ্চলে জরুষ্ট্রিয়ান, ইহুদী ও খ্রিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী লোকেরা বসবাস করতো এবং পারসিকরা এ অঞ্চল শাসন করতো। অপরদিকে, আল-শাম ছিল রোমানদের উপনিবেশ যেখানে রোমান সংস্কৃতি ও খ্রিষ্ট ধর্মের প্রাবল্য ছিল। এ অঞ্চলে প্রধানত সিরীয়, আর্মেনীয়, ইহুদী, আরব এবং স্বল্প সংখ্যক রোমান বসবাস করতো। এরপর, মুসলিমরা মিশর জয় করে এবং এ অঞ্চলেও কপ্ট, ইহুদী এবং রোমান জাতির লোকেরা মিশ্রিত ভাবে বসবাস করতো। এরপরের পালায় বিজিত হয় উত্তর আফ্রিকা, যেখানে আফ্রিকার বার্বার জাতি রোমানদের শাসন-কর্তৃত্বের নীচে বসবাস করতো। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পরে উমাইয়াদের শাসনামলে সিন্ধ, খাওয়ারিজম এবং সমরকান্দ জয় করে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করা হয়। এ সময়েই আল-আন্দালুস জয় করা হয় এবং একে ইসলামী রাষ্ট্রের একটি প্রদেশে পরিণত করা হয়।
এ সমস্ত বিজিত অঞ্চলের মানুষেরা ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর; তাদের ছিল বিভিন্ন ধরনের ধর্মবিশ্বাস, ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি, প্রথা ও আইনকানুন। স্বাভাবিক ভাবেই তারা মানসিক ও আচরনগত দিক থেকে একে অন্য থেকে ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। সুতরাং, এ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে একটি নির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা, ভাষা, সংস্কৃতি ও আইনকানুন দিয়ে শাসন করে তাদের একটি একক জাতিতে পরিণত করা ছিল সত্যিকারের একটি ব্যাপক ও দুরূহ কাজ এবং এ কাজে সফলতা অর্জন করা ছিল অসাধারন ও বড় মাপের সাফল্য। কিন্তু, ইসলামী জীবনাদর্শের মাধ্যমে বিরাট এ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এবং (পৃথিবীর ইতিহাসে) এ সফলতা অর্জন করেছে শুধু ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামের পতাকাতলে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার নীচে আসার সাথে সাথেই তারা (বিজিত জনগোষ্ঠী) এক উম্মাহ্ বা জাতি হিসাবে বিবেচিত হয়েছে; আর তা হল মুসলিম উম্মাহ্। বস্তুতঃ ইসলামী আকীদাহ্ এবং শাসনব্যবস্থাই ছিল অসাধারন এ সাফল্যের মূলভিত্তি। ভিন্ন ধরনের এই সব জনগোষ্ঠীকে সফলতার সাথে একটি জাতিতে পরিণত করার পেছনে অনেক ধরনের কারণ রয়েছে। কিন্তু, নিম্নবর্ণিত কারণগুলো এগুলোর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ:
১. ইসলামের শিক্ষা।
২. জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এবং কাজেকর্মে মুক্ত অঞ্চলের জনসাধারণের সাথে মুসলিমদের স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা করা।
৩. বিজিত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর দ্রুত ইসলাম গ্রহণ।
৪. ইসলাম গ্রহণকারীদের জীবনাচরণে আমুল পরিবর্তন এবং এর মাধ্যমে অসহনীয় জীবন থেকে সুস্থ ও সুন্দর জীবনে উত্তরণ।
বস্তুতঃ ইসলামের শিক্ষা দ্বীন ইসলামের দিকে মানুষকে আহবান করার বাধ্যবাধকতা অর্পণ করে এবং যখন যেখানে সম্ভব এ আলোকিত বাণীকে ছড়িয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই জিহাদের মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চল বা ভূখন্ড জয় করার প্রয়োজন হয়; যেন সে অঞ্চলের মানুষেরা খুব সহজে ইসলামের আলোকিত আদর্শ এবং এর ন্যায়ভিত্তিক আইনকানুনের যথার্থতা অনুধাবন করতে পারে। ইসলাম আবার যে কোন ব্যক্তি বা জাতিকে ইসলাম গ্রহণ না করে তাদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরার স্বাধীনতাও দেয়। এক্ষেত্রে, তাকে শুধমাত্র ইসলামের লেনদেন ও শাস্তি সংক্রান্ত বিধিবিধানকে মেনে চলতে হয়। শেষোক্ত এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, এই বিষয়টিই মূলতঃ মুসলিম ও অমুসলিম জনসাধারণের কর্মকান্ডের মাঝে একাত্মতা ও বন্ধন তৈরী করে। তারা একই ব্যবস্থা দিয়ে শাসিত হয় এবং জীবনের সমস্যাগুলোকে একই ব্যবস্থা দিয়ে সমাধান করে, যা তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখে। ঐক্যের এ ভিত্তিই অমুসলিমদেরকে মুসলিমদের মতোই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে সাহায্য করে। তারা তখন একই জীবনব্যবস্থার অংশীদার হয়ে এবং একই রাষ্ট্রের অভিভাকত্বের নীচে থেকে একই রকম মানসিক সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে।
এছাড়া, ইসলামের শিক্ষা শাসিত জনগোষ্ঠীকে জাতি, গোত্র বা বর্ণের ভিত্তিতে বিবেচনা না করে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করতে শেখায়। এ কারণে, ইসলামের সামাজিক ও শাস্তি সম্পর্কিত আইনকানুনগুলো কোন রকম পার্থক্য ছাড়াই মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর কার্যকরী করা হয়।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা বা ঘৃনা যেন তোমাদের ন্যায় প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত না রাখে; তোমরা ন্যায়বিচার কর; আর, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তোমাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে খুব ভাল করে জানেন।” [সুরা মায়িদাহঃ ৮]
ইসলামী রাষ্ট্রে আইনের চোখে সকল মানুষ সমান। রাষ্ট্রের শাসক জনগণের বিষয়াদি দেখাশুনা করবে এবং জনগণকে শাসন করবে। আর, রাষ্ট্রের নিয়োজিত বিচারক (কাজী) কোনরকম পক্ষপাতদুষ্টতা ছাড়া জনগণের মাঝে বিদ্যমান বিবাদসমূহ নিষ্পত্তি করবে। এলক্ষ্যে, বিচারক প্রতিটি নাগরিককে মানুষ হিসাবে (মুসলিম বা অমুসলিম হিসাবে নয়) বিবেচনা করে তাদের সমস্যা সমাধান করবে এবং ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা করবে। বস্তুতঃ ইসলামী শাসনব্যবস্থাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঝে সত্যিকারের সমতা ও ঐক্য নিশ্চিত করে।
ইসলাম শাসকদের নির্দেশ দিয়েছে যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সহায়তায় রাষ্ট্রের সমস্ত উলাইয়াতে (প্রদেশ) বসবাসকারী মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চিত করা হয়। প্রদেশের সংগৃহীত রাজস্ব যাই হোক না কেন কিংবা সংগৃহীত সে রাজস্ব জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট হোক বা না হোক। এছাড়া, ইসলাম রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কোষাগারের জন্য বিভিন্ন উলাইয়াহ থেকে কর আদায় করে তা একত্রিত করে একটি একক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলনের নিদের্শ দিয়েছে, যেন বিজিত অঞ্চলগুলো উলাইয়াহ হিসাবে দৃঢ় ভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত হয় এবং তাদেরকে একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে সহায়তা করে। বস্তুতঃ ইসলামী শাসনব্যবস্থা এরকম একটি ব্যবস্থাকে সাফল্যের সাথে নিশ্চিত করেছিল এবং এক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছিল।
এছাড়া, বিজিত অঞ্চলগুলোর বসবাসকারী মানুষের সাথে মুসলিমদের সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা, এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহন করা ও মুসলিমদের সাথে তাদের একীভূত হয়ে যাবার ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। কোন অঞ্চল বা ভূখন্ড জয় করার পরপরই সাধারনত মুসলিমরা সেখানে বসবাস করতে আরম্ভ করত এবং সে জনগোষ্ঠীর মানুষকে ইসলাম ও ইসলামের সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করত। মুসলিমরা তাদের প্রতিবেশী হিসাবে বাস করতো, সকল কর্মকান্ডে তাদের অংশীদার হত এবং একই দেশের নাগরিক হিসাবে একই আইনকানুন দিয়ে শাসিত হত। ইসলামী রাষ্ট্রে কখনই শাসক আর শাসিত কিংবা বিজয়ী আর বিজিত হিসাবে জনসাধারণ বিভাজিত হয়নি; কিংবা, মুসলিম ও আদিবাসীরা আলাদা কোন জনগোষ্ঠী হিসাবে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাস করেনি। তারা সকলেই ছিল রাষ্ট্রের নাগরিক যারা প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে একে অপরকে সবসময় সহযোগিতা করতো। মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর এ ধরনের আচরণ বিজিত জনগোষ্ঠীর কাছে একেবারেই নতুন ছিল। বস্তুতঃ এ শাসকগোষ্ঠী নিজেদেরকে জনগণের কাতারে রেখে তাদেরকে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে শাসন করেছিল এবং এর ভিত্তিতেই তারা জনগণের সেবা ও তাদের বিষয়াদি দেখাশুনা করেছিল। ফলে, এ অঞ্চলসমূহের জনগোষ্ঠী অবাক বিস্ময়ে শাসকগোষ্ঠীর এমন এক আচরণের সাক্ষী হয়েছিল, যে ব্যাপারে তাদের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা উন্নত চরিত্রের শাসকদের কাছ থেকে পেয়েছিল অত্যন্ত চমৎকার আচরণ, যা তাদেরকে এই শাসকবর্গ ও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। শাসক ও সাধারন মুসলিমরা আহলে কিতাবের (ইহুদী ও খ্রিষ্টান) নারীদেরকে বিয়ে করতো, তাদের জবাই করা পশুর মাংস ও খাবার খেত। এ সকল আচরণ মূলতঃ তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে; কারণ, তারা শাসক ও শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের উপর আরোপিত ইসলামী জীবনাদশের্র প্রভাব ও সৌন্দর্য স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। ফলশ্রুতিতে, তারা ধীরে ধীরে মুসলিমদের সাথে একীভূত হয়ে একটি একক উম্মাহ্ বা জাতিতে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহণ করা কোন বিশেষ সময় বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং, প্রতিটি দেশের মানুষই দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। আসলে, বিজিত অঞ্চলগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত— মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফলে, পরবর্তীতে ইসলাম আর বিজয়ী মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে বিজিত এইসব জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে মুসলিমদের সাথে একীভূত হয়েছে এবং এক উম্মাহ’তে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া, ইসলাম নও মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে উন্নততর করে তাদেরকে সামগ্রিক ভাবে পরিবতর্ন করেছিল। এর ফলে, তাদের মাঝে ইসলামী আকীদাহ্ দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা কাজ করেছিল তাদের জীবনাদর্শের ভিত্তি হিসাবে। আর, এ জীবনাদর্শ থেকেই উৎসরিত হয়েছিল তাদের জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন রকম ধ্যান-ধারণা। ইসলাম তাদেরকে অন্ধ ও কুসংস্কাচ্ছন্ন বিশ্বাস থেকে তুলে এনে যৌক্তিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এ পরিবর্তন তাদেরকে মূর্তিপূজা, অগ্নিপূজা, ট্রিনিটি তত্ত্ব বা তিন খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস, ব্যক্তিপূজা এবং এ জাতীয় বিভিন্ন বস্তুর উপাসনা, যা তাদের চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের মূল কারণ ছিল, এগুলো থেকে এক আল্লাহ’র উপাসনার দিকে ধাবিত করেছিল। আর, এক আল্লাহ’র উপাসনাই তাদের অন্তরসমূহকে ক্রমাগত করেছিল আলোকিত। ইসলাম তাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়েছিল এবং তারা কোরআন-সুন্নাহ’র বর্ণনার ভিত্তিতেই বিষয়টি অনুধাবন করেছিল এবং বিশ্বাস করেছিল পরকালের পুরস্কার ও শাস্তির উপরও। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকায় তারা বুঝতে পেরেছিল ক্ষণস্থায়ী এ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। ফলে, তারা ধাবিত হয়েছিল অনন্ত-অসীম ও চিরসুখের জীবনের খোঁজে। একইসাথে, তারা এতটুকু অবহেলা না করে দু’বাহু উম্মুক্ত করে এ জীবনকে যাপন করেছিল। তারা আল্লাহতায়ালা নির্ধারিত সঠিক পন্থা ও নির্দেশনা দিয়ে জীবন যাপনের প্রতিটি সরঞ্জামকে ব্যবহার করেছিল ও উপভোগ করেছিল জীবনের আনন্দ ও প্রাচুর্য্যকে।
ইসলাম আসার পূর্বে, এ সমস্ত জনগোষ্ঠীর মানুষের কর্মকান্ডের মূলভিত্তি ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্থাৎ, ব্যক্তিস্বার্থই ছিল তাদের সকল কমর্কন্ডের মূল নিয়ামক। কিন্তু, ইসলাম গ্রহনের পর তাদের কাজের ভিত্তি পরিবর্তিত হয়ে হালাল-হারামে পরিণত হয়। মূলতঃ আল্লাহতায়ালা যা কিছু আদেশ করেছেন এবং নিষেধ করেছেন সে সবকিছুর উপর গড়ে উঠা ভিত্তিই তাদের সমস্ত কাজের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। তাদের সমস্ত কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়ে যায় আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর, কাজের মূল্য নির্ধারিত হয় কাজের পেছনে নিহিত উদ্দেশ্য থেকে। যেমনঃ যদি, কাজটি হয় নামাজ কিংবা জিহাদ, তাহলে এটি হয় আধ্যাত্মিক কাজ; যদি হয় ক্রয় বা বিক্রয় সংক্রান্ত, তাহলে এটি হয় বস্তুগত কাজ; সহমর্মিতা বা বিশ্বস্ততা হয় নৈতিক কাজ; বিপদে কাউকে সাহায্য করার বিষয়টি হয় মানবিক কাজ ইত্যাদি। মানুষ কাজের পেছনের উদ্দেশ্য এবং কাজের মূল্যের ব্যাপারে পার্থক্য করতে আরম্ভ করে। ফলে, জীবন সম্পর্কে তাদের পূর্বের সকল ধারণা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ইসলাম নির্ধারিত কাজের ভিত্তিতেই জীবনকে পরিমাপ করা হয় এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ নির্ধারিত হয়।
ইসলাম মানুষকে সুখের প্রকৃত সংজ্ঞা শেখায়। ইসলাম পূর্ব সময়ে, সুখ মানুষের জৈবিক ও প্রবৃত্তিগত চাহিদা পূরণের মধ্যে নিহিত ছিল। পরবর্তীতে তা পরিবর্তিত হয়ে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করাতে পরিণত হয়। আসলে, এর মধ্যেই প্রকৃত সুখ নিহিত। কারণ, সুখের প্রকৃত অর্থ হলো, মানবাত্মার চিরস্থায়ী শান্তি। আর, শুধুমাত্র বস্তুগত উপকরণের মাধ্যমে জৈবিক ও প্রবৃত্তিগত চাহিদা পূরণ করে চিরস্থায়ী এ শান্তি লাভ করা কখনও সম্ভব নয়। বস্তুতঃ এ রকম সুখের নাগাল একমাত্র বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।
এভাবেই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গীকে ইসলাম প্রভাবিত করেছে। জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী এবং তাদের জীবনের সকল কর্মকান্ডকে আমূল পরিবর্তন করেছে। পরিবর্তন করেছে তাদের কাজের গুরুত্বের ক্রমধারাকে (Order of Priorities); Some went up in value, others came down. গুরুত্ব নির্ধারনের ক্ষেত্রে মানবজাতি সবসময়ই তার নিজের জীবনকে সবচাইতে উপরের অবস্থানে রেখেছে এবং জীবনাদর্শ এসেছে তার পরের অবস্থানে। কিন্তু, ইসলাম পুরো ব্যাপারটিকে একেবারে উল্টিয়ে দিয়েছে; ইসলাম জীবনাদর্শকে রেখেছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে, এমনকি মানুষের নিজের জীবনের চাইতেও আদর্শকে উপরের স্থান দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি বোঝার পর, ইসলামের প্রয়োজনে মুসলিমরা অকাতরে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতে আরম্ভ করে এবং ইসলামী জীবনাদর্শ যে নিজ জীবনের চাইতে বহুগুণে মূল্যবান তারা এ সত্যকেও সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে শুরু করে। একইসাথে, তারা এটাও বুঝতে পারে যে, ইসলামের জন্য কঠিন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করা মুসলিমদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এভাবেই, জীবনের বিভিন্ন বিষয়গুলো সঠিক ক্রমধারা অনুযায়ী জায়গা করে নেয়। জীবন হয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত। মুসলিমরা অর্জন করে আত্মার চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি; কারণ, তারা বুঝতে পারে যে, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করাই ক্ষনস্থায়ী এ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
এভাবে, নও মুসলিমদের জীবনের সর্বোত্তম আদর্শ (Ideals) সম্পর্কে ধ্যান-ধারণাও পরিবর্তিত হয়ে যায়। অতীতে এ সমস্ত মানুষের সর্বোত্তম আদর্শের ব্যাপারে ভিন্ন ধরণের এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ধ্যান-ধারণা ছিল। কিন্তু, ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা জীবনের এক ও একমাত্র এবং চুড়ান্ত এক আদশের্র সন্ধান পেল। এর ফলে, জীবনের যে সমস্ত বিষয়গুলো তাদের কাছে খুব অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে সবকিছুর মাপকাঠিই একেবারে বদলে গেল; বদলে গেল মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অর্থ। পূর্বে তাদের কাছে মূল্যবোধের অর্থ ছিল ব্যক্তির সাহসিকতা, মার্জিত আচরণ ও শ্রদ্ধাবোধ এবং গোত্রীয় সমর্থন, বিত্তবৈভবের অহংকার, উচ্চ বংশমর্যাদা, Generosity to the point of extravagance. গোত্র বা সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য/বিশ্বস্ততা, দয়ামায়াহীন প্রতিশোধস্পৃহা এবং এই ধরণের অন্যান্য গুনাবলীর উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা হত। কিন্তু, ইসলাম তাদের পুরনো এ সব ধ্যান-ধারণাকে পরিবতর্ন করে দিল। বস্তুতঃ ইসলাম এ সবকিছুকে খুবই নগন্য বিষয়ে পরিণত করলো। এ সমস্ত বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য ছিল যে, মানুষ শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে এ সব বিষয় গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে পারে; তার ব্যক্তিগত লাভ বা লোকসানের উপর ভিত্তি করে নয়। কিংবা, উচ্চ মর্যাদা লাভ বা অহংকারের বশবর্তী হয়ে নয়। এজন্যও নয় যে, এগুলো বংশপরম্পরায় চলে আসা রসম-রেওয়াজ/রীতিনীতি, প্রথা কিংবা ঐতিহ্য, যাকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বরং, ইসলাম এ সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর নির্দেশের পূর্ণ আনুগত্য করাকে বৈধতা দিয়েছে। ব্যক্তিগত, গোত্রীয়, সামষ্টিক এবং জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে শুধু ইসলামের হুকুম-আহকামের কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিয়েছে।
এভাবেই, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের মনমানষিকতা ও আচরণকে ইসলাম পুরোপুরি রূপান্তরিত করেছে; বদলে দিয়েছে তাদের ব্যক্তিত্ব এবং জীবন, মানুষ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী। জীবনের সকল কাজ কোন ভিত্তির উপর সম্পাদিত হবে সে বিষয়ে ধ্যান-ধারণাকেও পুরোপুরি পরিবর্তিত করেছে। ইসলাম মানুষকে বুঝতে শিখিয়েছে যে, এই ক্ষনস্থায়ী জীবনের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আর তা হল, নিজেকে প্রতিনিয়ত ক্রটিবিচ্যুতি থেকে মুক্ত করে মহৎ গুনাবলীর দিকে ধাবিত করা। এছাড়া, মুসলিমরা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনকেই সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে হৃদয়ে ধারণ করেছিল এবং সর্বশক্তি দিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন করারও চেষ্টা করেছিল। যা তাদেরকে পূর্বাবস্থা থেকে আমূল পরিবর্তন করে পরিণত করেছিল নতুন এক সৃষ্টিতে।
এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই মূলতঃ ইসলাম গ্রহণকারীদের তাদের ইসলামপূর্ব অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সাহায্য করেছিল। ইসলাম জীবন সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন ধ্যানধারণা ও লক্ষ্যকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি মাত্র ধারণা ও লক্ষ্যে পরিণত করেছিল। ঐক্যবদ্ধ এই ধারণার ভিত্তিতেই তারা জীবনের সকল বিষয়াদি পরিচালনা করতো। ইসলাম তাদের বিভিন্ন ধরণের স্বার্থকে পরিবর্তন করে একটি মাত্র স্বার্থের নীচে তাদের একত্রিত করেছিল; আর, তা ছিল শুধু ইসলামের স্বার্থ। তাদের জীবনের বিভিন্ন লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে একটি লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল; আর, তা হল আল্লাহর বাণীকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া। পরিণতিতে, স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ একটি একক জাতি বা উম্মাহ’তে পরিণত হয়েছিল; আর, তা হল ইসলামিক উম্মাহ্।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৬ (ইসলামের বিজয়যাত্রা সুসংহতকরণ)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
অতীতে মুসলিমরা বহু দেশ জয় করে সেখানে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছে। বস্তুতঃ ইসলামই তাদের শাসন-ক্ষমতা ও নেতৃত্ব-কর্তৃত্বে উপবিষ্ট হবার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, অমুসলিমদের দ্বারা শাসিত হওয়া মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা সূরা নিসাতে বলেছেন,
“আল্লাহ কখনোই মু’মিনদের উপর কাফিরদেরকে জন্য কোন পথ রাখবেন না।” [সুরা নিসাঃ ১৪১]
এছাড়া, আল্লাহতায়ালা সম্মান ও মর্যাদা মু’মিনদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তিনি সুরা মুনাফিকুনে বলেছেন,
“এবং সম্মান ও মর্যাদা তো শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের জন্যই নির্দিষ্ট, কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।” [সুরা মুনাফিকুনঃ ৮]
আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের ততক্ষন পর্যন্ত প্রতিপত্তি, শাসন-ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব দেননি, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা তাদের মনমানসিকতাকে সত্যিকার ভাবে ইসলামের আলোকে গঠন করতে পেরেছে। আর প্রকৃত অর্থে, এ মানসিকতা বলতে বোঝায়, শাসন-কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব অর্জনের মাধ্যমে ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করা এবং ইসলামের বাণীকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা, ক্ষমতা অর্জনের মোহে মত্ত হয়ে যাওয়া নয়। মুসলিমরা যতক্ষন পর্যন্ত না এই যোগ্যতা ও মানসিকতা অর্জন করেছে [অর্থাৎ, তারা বুঝতে পেরেছে জনগণকে শাসন করা বলতে আসলে কি বোঝায় এবং আল্লাহর কাছে এর জবাবদিহিতা কতোটুকু] ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা তাদেরকে শাসন-কর্তৃত্ব এবং জনগণের দেখাশোনা করার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রেখেছেন। বস্তুতঃ ইসলামের অভূতপূর্ব সৌন্দর্য নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত এই সমস্ত ন্যায়পরায়ণ শাসকদের বিভিন্ন কর্মকান্ড ও উক্তির মধ্য দিয়ে অত্যন্ত জোরালো ভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং জনগণও এ আলোকিত সৌন্দর্যের সাক্ষী হয়েছে, যখন শাসকরা তাদের শরীয়াহ্ আইন-কানুনের মাধ্যমে শাসন করেছে। এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসাবে, এই সমস্ত জনগোষ্ঠির মানুষ ইসলামের সৌন্দর্যে এতো বেশী মুগ্ধ হয়েছে যে, তারা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। ফলে, ইসলামের প্রতিপত্তি, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার তারাও অংশীদার হয়েছে এবং সেইসাথে তাদের দেশগুলোও মুসলিম উম্মাহর অংশ হিসাবে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে।
বিজিত এ সমস্ত দেশগুলোকে ইসলামী আইন-কানুন অনুসারে শাসন করে ইসলামের এই বিজয়যাত্রাকে সুসংহিত করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী হয়েছে এ সমস্ত অঞ্চলের মানুষের ইসলাম গ্রহনের মধ্য দিয়ে [Until the conquer of countries by the Islamic state was given until the Day of Judgement]. মূলতঃ এ অভিযানগুলো বিজিত জনগোষ্ঠির মানুষদেরকে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থা ও শাসন-ব্যবস্থা থেকে সম্পুর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করেছিল এবং তাদেরকে অবিশ্বাসী জনগোষ্ঠি থেকে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠিতে রূপান্তরিত করেছিল। সেইসাথে তাদের ভূ-খন্ড দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়েছিল। ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেবার পূর্ব পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজ করে। তবে, ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ও মুসলিমদের কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাবার পরও এই অঞ্চলের মানুষেরা মুসলিমই থেকে গিয়েছিল এবং তাদের ভূ-খন্ডগুলোও মুসলিম ভূ-খন্ড হিসাবেই বিবেচিত। যদিও বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র অনুপস্থিত, কিন্তু তারপরও যে সমস্ত দেশগুলো একসময় মুসলিমরা জয় করেছিল সে সমস্ত দেশের মানুষ এখনও ইসলামকেই আঁকড়ে ধরে আছে এবং তাদের ভূ-খন্ডগুলো এখনও মুসলিম ভূ-খন্ড হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। এজন্য, এই সমস্ত অঞ্চলগুলোতে ইসলামের কর্তৃত্ব পূনঃপ্রতিষ্ঠিত করে আবারও এ অঞ্চলে ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
মূলতঃ কিছু কিছু বিষয় ইসলামের বিজয়যাত্রাকে স্থায়ী করতে এবং সেইসাথে ইসলামের বীজকে বিচারদিবস পর্যন্ত মানুষের অন্তরে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিল। এগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় বিজিত ভূ-খন্ডগুলোকে শাসন করা সহজ করেছিল, যেমনঃ ইসলামী আইন-কানুনের প্রকৃতি।
আবার অন্যকিছু বিষয় ছিল যা বিজিত জনগোষ্ঠির মানুষকে ইসলাম গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেমনঃ জনগণের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকদের ব্যবহার। আবার কিছু কিছু বিষয় ধর্মান্তরিত নও মুসলিমদের অন্তরে চিরস্থায়ী ভাবে ইসলামকে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিল, যেমন, ইসলামী আকীদাহর প্রকৃতি।
সংক্ষেপে এই বিষয়গুলো নিম্নরূপে সাজানো যায়ঃ
১. ইসলাম একটি যৌক্তিক আকীদাহ্ বা বিশ্বাস, যা মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ায় চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহন করতে বাধ্য করে। এজন্য, যখনই কোন মানুষ ইসলাম গ্রহন করে, তখনই সে চিন্তাশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এর কারণ হল, ইসলাম গ্রহনের সাথে সাথেই তার চিন্তা-চেতনা বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড এবং সৃষ্ট জগতের দিকে ধাবিত হয় এবং আল্লাহর এ সৃষ্ট জগতের ব্যাপকতা ও রহস্যময়তা প্রতিনিয়ত তাকে স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে তোলে। এ চিন্তা-চেতনাই তাকে মহান স্রষ্টার হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে, [শরীয়া’র মূল উৎস থেকে] বিভিন্ন হুকুম অনুসন্ধান করতে এবং তা অনুযায়ী তার জীবনের সমস্ত সমস্যা সমাধান করতে উৎসাহিত করে। আর এভাবেই, ইসলাম ব্যক্তি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় এবং সে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে, জেনেবুঝে ইসলাম দিয়ে তার জীবন পরিচালনা করে।
২. ইসলাম মুসলিমদের জ্ঞানাজর্ন করা এবং ইসলামের রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত থাকাকে বাধ্যতামূলক করেছে। তাই, ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে জানা ও বোঝার জন্য শুধু মুখে দুই কালেমা উচ্চারণ করা যথেষ্ট নয়। বরং, একজন মুসলিমের উচিত ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানার্জন করা। মানুষ, মহাবিশ্ব ও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইসলামের আলোকে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করা এবং ইসলাম এদের মধ্যকার পারস্পারিক সম্পর্ক কিভাবে নির্ধারণ করেছে সে ব্যাপারে অনুসন্ধান করা মুসলিমদের দায়িত্ব। কারণ, এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান মানুষের চিন্তার জগতকে বিস্তৃত ও প্রসারিত করে, তার ধ্যান-ধারণাকে স্বচ্ছ করে এবং সর্বোপরি প্রতিনিয়ত তার মনমানষিকতাকে উন্নত করে – যা তাকে অন্যদের শিক্ষককে পরিণত করে।
৩. বস্তুতঃ ইসলামী জীবনাদর্শ এবং এর শরীয়াহ’র প্রকৃতি হল, এ সম্পর্কিত জ্ঞানকে ধাপে ধাপে ও ক্রমান্বয়ে অর্জন করার প্রয়োজন হয়। এটি একজন মুসলিমকে সে যে সমাজে বসবাস করে সেখান থেকে জ্ঞানার্জন করার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার শিক্ষা দেয়। মুসলিমরা সবসময় বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যেই ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। একারনেই মুসলিমরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। ইসলামী আকীদাহ্ তাদের অন্তর ও হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবার কারনে তাদের ছিল চতুর্দিক পরিবেষ্টনকারী ধ্যান-ধারণা এবং সেইসাথে ছিল সমৃদ্ধ ও দিগন্ত বিস্তৃত জ্ঞানভান্ডার। এছাড়া, মুসলিমরা সাধারনত কোন বিষয় সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা ও চিন্তাভাবনা করার পরই সে ব্যাপারে ইসলামের হুকুম-আহকাম কি হবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতো। কারণ, এ ক্ষেত্রেও ইসলামকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করাই মূল বিষয় হিসাবে বিবেচিত হত।
প্রকৃতঅর্থে, মুসলিমরা শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন করার খাতিরে কখনো ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা কিংবা চিন্তাভাবনা করেনি। কারণ, এক্ষেত্রে এই জ্ঞানসাধনা তাদেরকে শুধু ইসলামের হুকুম-আহকাম বা চিন্তাচেতনায় পরিপূর্ণ জীবন্ত এক লাইব্রেরী বা বইতে পরিণত করতো, যার কোন বাস্তব প্রয়োগ থাকতো না। এই ধরনের জ্ঞানসাধনা তাদেরকে জ্ঞানের এমন এক ধারকে পরিণত করতো, যা তাদের কার্যকলাপ ও জীবনাচরণকে প্রভাবিত করতো না এবং লব্ধ সে জ্ঞানের আলোকে সমাজ পরিবর্তন করার কাজেও উদ্ধুদ্ধ করতো না। অর্জিত এই জ্ঞান সঞ্চিত জলাধারের মতো সমাজে কোন প্রভাব না ফেলেই একসময় শুকিয়ে যেত। এছাড়া, মুসলিমরা ইসলামকে শুধুমাত্র কিছু উপদেশাবলীর সমষ্টি হিসাবেও গ্রহন করেনি। কারণ, তা হলে, ইসলামী আদর্শ তাদেরকে সংকীর্ণ চিন্তাচেতনার ব্যক্তিবর্গে পরিণত করতো, যার ফলে তারা বিশ্বাসের সাথে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপের সম্পর্ক স্থাপন করতে ব্যর্থ হতো। মুসলিমরা খুব সতর্কভাবে বিপদজনক এই দুটি পথকে পরিহার করেছে; একটি হল, শুধুমাত্র জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা করা। আর, অন্যটি হল, ইসলামকে শুধু কিছু উপদেশাবলীর সমষ্টি হিসাবে গ্রহন করা। বস্তুতঃ ইসলামের নির্ধারিত পথেই মুসলিমরা ইসলাম ও এর হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। আর, তা হল আলোকিত চিন্তার মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করা।
৪. ইসলাম প্রগতিশীল আদর্শ। এ আদর্শ সবসময়ই মুসলিমদেরকে নতুন নতুন উচ্চতার দিকে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে পরিপূর্ণতা অর্জনের আলোকিত এক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত করে। বস্তুতঃ ইসলাম মুসলিমদেরকে বাস্তব জীবনে কিছু কাজ করতে বাধ্য করে। আর এ সমস্ত কার্যাবলী মুসলিমদেরকে ধীরে ধীরে এমন এক পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় যেখানে তারা আধ্যাত্মিক উচ্চতা, মানসিক শান্তি এবং সত্যিকারের সুখকে অনুভব করতে পারে। মানুষ যখন এ উচ্চতায় পৌঁছে যায়, তখন সে সেখানেই অবস্থান করতে চায়। সে অবস্থান থেকে পতিত হতে চায় না। কিন্তু, বাস্তবতা হলো, পরিপূর্ণতার এ রকম এক উচ্চতায় পৌঁছানো যত না কঠিন, সে অবস্থানকে ধরে রাখা তার চাইতেও কঠিন কাজ। এজন্য, মুসলিমদেরকে তাদের কাজের ব্যাপারে হতে হবে দৃঢ় প্রত্যয়ী, সংকল্পবদ্ধ ও চিন্তাশীল। এ সমস্ত গুনাবলীর মাধ্যমেই মুসলিমরা তাদের অর্জিত উচ্চতা ও প্রগতিকে ধরে রাখতে পারবে।
মুসলিমদের করণীয় এই সমস্ত কার্যাবলী আসলে সামগ্রিক ইবাদতের সমষ্টি; যাদের মধ্যে কিছু অবশ্য পালনীয় [ফরজ], আর কিছু আনুসাঙ্গিক। সমগ্র মুসলিমের জন্য অবশ্যপালনীয় এ ফরজ কর্তব্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র জাতিকে প্রগতির সাধারণ এক উচ্চতায় নিয়ে আসতে সহায়তা করে। আর, অবশ্যপালনীয় কর্তব্য ছাড়া অন্যসব কাজগুলো প্রতিনিয়ত মানুষকে পরিপূর্ণতা অর্জন করতে উৎসাহিত করে।
ইবাদত হিসাবে করণীয় এই সমস্ত কাজগুলো আসলে দুরূহ বা ভয়াবহ কোন দায়িত্ব নয়। কিংবা, নয় ক্লান্তিকর বা দমবন্ধকরা কোন অনাকাঙ্খিত অভিজ্ঞতা। এ সমস্ত কার্যাবলী মানুষকে তার জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ, উচ্ছাস কিংবা প্রাণ চঞ্চলতা থেকেও বঞ্চিত করে না। না মানব প্রকৃতিকে অস্বীকার করে তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগত চাহিদাগুলোকে দমিয়ে রাখে। আসলে, ইবাদত হিসাবে করণীয় এই সমস্ত কর্তব্যগুলো, বিশেষ করে বাধ্যতামূলক কর্তব্যগুলো পালন করা যে কারও জন্য খুবই সহজ একটি ব্যাপার এবং প্রতিটি মানুষের পক্ষে তা পালন করা সম্ভব। এই ইবাদতগুলো মানুষকে তার জীবন উপভোগ করার পথেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। বস্তুতঃ অবশ্য পালনীয় ইবাদতগুলো ছাড়া, আনুসাঙ্গিক অন্যান্য মানদুব ইবাদতগুলো [যে সমস্ত কাজ করার জন্য মুসলিমদের উৎসাহিত করা হয়েছে] মুসলিমরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে পালন করে। কারণ, তারা জানে এই সমস্ত কাজের মাধ্যমেই তারা আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে।
৫. অতীতের মুসলিমরা দ্বীন ইসলামের আলোকিত বাণীকে সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যেই অন্যান্য দেশ জয় করেছে। এজন্য তারা বিশ্বাস করতো যে, তারা এমন এক বাহিনী যাদের অন্তর মহানুভবতা ও হেদায়েতে পরিপূর্ণ। মুসলিমরা যখন কোন দেশ জয় করতো, তখন সে দেশকে ইসলাম দিয়েই শাসন করতো। আর, কোন জনগোষ্ঠী ইসলাম গ্রহন করার সাথে সাথেই তারা মুসলিমদের মতোই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করতো এবং সেইসাথে, মুসলিমদের জন্য যা যা অবশ্যপালনীয় তারা সে সমস্ত কার্যাবলীও পালন করতে বাধ্য থাকতো। বিজিত নতুন ভূখন্ড ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সমান অধিকার ও মর্যাদা উপভোগ করতো এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচিত হত। কারণ, ইসলামী শাসনব্যবস্থা ঐক্য ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই, বিজিত ভূমির জনগোষ্ঠী কখনো অনুভব করেনি যে, তারা দখলদারিত্ব কিংবা আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। না তারা ঔপনিবেশিকতার কোন চিহ্ন কোনদিন প্রত্যক্ষ করেছে। সুতরাং, এটা বিস্ময়কর নয় যে, ইসলামের বাস্তব প্রয়োগকে স্বচক্ষে অবলোকন করার পর বিজিত জনগোষ্ঠীর মানুষেরা স্বেচ্ছায় দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে এসেছে।
৬. ইসলামের জীবনাদর্শ এবং হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত জ্ঞান কোন বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং, এটা সকলের জন্য উম্মুক্ত একটি বিষয়। প্রকৃত অর্থে, বিজিত ভূমির জনগোষ্ঠীকে ইসলামের আকীদাহ্ ও হুকুম-আহকাম সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক, যেন তারা ইসলামী আকীদাহ্ ও জীবনাদর্শের প্রকৃত সৌন্দর্য ও প্রকৃতিকে গভীর ভাবে অনুভব করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ অঞ্চলগুলোর জনগোষ্ঠীকে ইসলাম দিয়ে শাসন করার লক্ষ্যে সে অঞ্চলে গভর্নর ও বিচারক নিয়োগ করতেন এবং মানুষকে ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে শিক্ষা দেবার জন্য শিক্ষক নিয়োগ করতেন। The Muslims who came after him (saw) conquered many countries and set up rulers and teachers who would teach the people fiqh and Qur’an. The people welcomed Islamic education with open arms until their culture became Islamic. This included those who chose not to embrace Islam.
৭. ইসলামী শরীয়াহ্ শ্বাশত ও সার্বজনীন এবং সেইসাথে এর রয়েছে মানবজীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান দেবার ক্ষমতা। এ কারণেই, মুসলিমদেরকে কখনও বিজিত অঞ্চলগুলোর আইন-কানুন সম্পর্কে গবেষনা করতে হয়নি। কিংবা, যে আইন-কানুন দিয়ে তারা জীবনের সব সমস্যার সমাধান করেছে (শরীয়াহ্ আইন), সে আইন-কানুনের সাথে বিজিত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান আইন-কানুনের কোন রকম সমঝোতাও করতে হয়নি; না তারা এ সকল অঞ্চলে বিদ্যমান আইন হতে কোনরকম আইন গ্রহণ করেছে। কোন অঞ্চল বা দেশ জয় করার সাথে সাথেই তারা সেখানে প্রথমদিন থেকেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং শরীয়াহ্ আইনকে পুরোপুরি বা বাস্তবায়ন করেছে। ইসলামী শাসনব্যবস্থা বা শরীয়াহ্ আইন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা কোনরকম পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি। যেমনঃ এমন কখনও হয়নি যে, তারা বিজিত কোন অঞ্চলে ক, খ ও গ আইন বাস্তবায়ন করেছে, কিন্তু ঘ আইন বাস্তবায়ন করেনি। এই ভেবে যে, ঘ আইনের বাস্তবায়ন হয়তো সে অঞ্চলে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে বিতর্কিত হতে পারে, কিংবা ঘ আইনের বাস্তবায়ন মানুষকে ইসলাম বিমুখ করতে পারে; অথবা, এ আইন মেনে নেয়া জনগণের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হতে পারে। বস্তুতঃ অতীতে ইসলামকে কখনই এরকম পর্যায়ক্রমিক ভাবে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হয়নি। কিংবা, বিচ্ছিন্ন বা খন্ডিত আকারে এখানে সেখানে শরীয়াহ্ আইন প্রয়োগ করা হয়নি।
আসলে, ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে প্রয়োগের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় এমন কোন পরিস্থিতি মুসলিমরা কখনও সহ্য করেনি। তারা ইসলামের আহবানকে সমগ্র বিশ্বের দরবারে পৌঁছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই বিভিন্ন দেশ জয় করেছে এবং সেইসাথে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করে বিজিত অঞ্চলগুলোর দূর্নীতিগ্রস্থ, ঘুনেধরা ও টলায়মান শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ন ভাবে বদলে দিয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের পুরনো ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করতে হয়েছে এবং সম্পূর্ন নতুন এক ব্যবস্থার দ্বারা সে ব্যবস্থাকে সামগ্রিক ভাবে প্রতিস্থাপন করতে হয়েছে। এ কারণেই বিজিত নতুন নতুন অঞ্চলের জনগণকে প্রথমদিন থেকেই শাসন করা মুসলিমদের জন্য ছিল খুব সহজ একটি ব্যাপার। আর, এ কারণে বিজিত এ অঞ্চলগুলোতে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ন ও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শাসন করতে গিয়ে মুসলিমরা কখনও কোন আইনপ্রণয়ন সংক্রান্ত জটিলতার সম্মুখীন হয়নি কিংবা, কুফর ও ইসলামী শাসনব্যবস্থার মাঝামাঝি কোন পর্যায়ও অতিক্রম করেনি। তাদের আহবান ছিল সুষ্পষ্ট; আর এর ভিত্তি ছিল ইসলামী আকীদাহ্। তাদের শাসনব্যবস্থা, আইন-কানুন ও সমস্ত বিধিবিধান এ আকীদাহ্ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। বস্তুতঃ মুসলিমদের প্রণীত আইন-কানুন ছিল শরীয়াহ্ আইন, যা যে কোন মানবগোষ্ঠীর জন্য, যে কোন স্থানে এবং যে কোন সময়ে প্রযোজ্য।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৫ (ইসলাম প্রচারে জিহাদের ভূমিকা)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
মুসলিম উম্মাহর পার্থিব জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো সমস্ত মানবজাতির কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়া। এ লক্ষ্যে, মুসলিম উম্মাহকে সবসময়ই বিশ্বের কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছে। আর, ইসলামের বাণী প্রচার-প্রসারের গুরুদায়িত্ব সবসময় ইসলামী রাষ্ট্রের কাঁধেই অর্পিত হয়েছে। তাই, অন্যান্য দেশ জয় করা এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে লক্ষ্য অর্জন করা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম নির্ধারিত দায়িত্ব-কর্তব্যকে সঠিক ভাবে পালন করার কারণেই অতীতে মুসলিমদের বিজয়ের ধারা অব্যাহত ছিল। আর, এ দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার অর্থ হলো, ইসলামী আইন-কানুনকে অমুসলিমদের উপর প্রয়োগ করে এবং ইসলামী ধ্যান-ধারনাগুলোকে ব্যাখ্যা করে তাদের কাছে এমন ভাবে ইসলামকে পৌঁছে দেয়া যেন ইসলাম তাদের চিন্তার জগতে বিচরণ করতে পারে।
এজন্য, ইসলামের বিজয় অভিযান না পরিচালিত হয়েছে কোন হীন স্বার্থ সিদ্ধি লক্ষ্যে বা কোন জনগোষ্ঠিকে কলোনীতে পরিণত করার উদ্দেশ্যে, আর না তা পরিচালিত হয়েছে কোন বিশেষ এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ করতলগত করার উদ্দেশ্যে। এ সমস্ত বিজয়যাত্রার এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের মহান বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং সেইসাথে তারা যে দুর্নীতিগ্রস্থ শাসনের অধীনে দুঃসহ জীবনযাপন করছিল তা থেকে তাদের মুক্ত করা।
বস্তুতঃ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল খুবই শক্তিশালী ভিত্তির উপর। যে কারণে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ রাষ্ট্র অবলোকন করেছে এর সমৃদ্ধি এবং বিস্তৃতি, বিভিন্ন দেশ জয় করেছে এবং প্রতিনিয়ত এর সীমানাকে বৃদ্ধি করেছে। যেহেতু এ রাষ্ট্রের আকীদাহ্ বা বিশ্বাস সার্বজনীন, তাই এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলেই নিহিত রয়েছে এর সার্বজনীন রাষ্ট্রে পরিণত হবার মূলমন্ত্র এ আকীদাহ্ সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত আকীদাহ্ যা থেকে উৎসরিত হয়েছে বিশ্বকেন্দ্রিক এক ব্যবস্থা এবং এ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য।
যে জন্য প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর ক্রমশঃ বিস্তৃতি ঘটা এবং একের পর এক দেশকে জয় করা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে, এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল কারণই এ বিষয়গুলোকে অবধারিত করে তুলেছিল। রাসূল (সা) আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় যে সকল মুসলিমের কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহন করেছিলেন তারা সকলেই আল্লাহর রাসুলের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন, যদিও এ যুদ্ধে তাদের ধন-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় কিংবা তাদের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু ঘটে। তারা সুখ এবং দুঃখ উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর রাসূল (সা)-এর পরিপূর্ণ আনুগত্য করার শপথ নিয়েছিলেন এবং সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তারা এটাও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তারা কারও অসন্তুষ্টির ভয়ে ভীত হবে না এবং ইসলামী দাওয়াতকে রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে আমৃত্যু লড়াই করবে। আর, এ একনিষ্ঠ আনুগত্যের পুরস্কার হিসাবে তারা পাবে চিরসবুজ জান্নাত। প্রকৃতঅর্থে, ইসলামী রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুতির মূলে এ বিষয়গুলোই সবসময় মূলমন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে। মুসলিমদের সবসময়ই মনে রাখতে হবে, কোন কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হয়েছে? তাদের মূল কাজ কি? সেনাবাহিনী প্রস্তুতির মূল উদ্দেশ্য কি শুধুই ইসলামের দাওয়াত বহন করা নয়? এ উদ্দেশ্যেই কি মুসলিমরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়নি, আনুগত্যের শপথ করেনি এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়নি?
আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একের পর এক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। সমগ্র আরব উপদ্বীপকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসার পর তিনি (সা) কায়সার এবং খসরুর কাছে তাঁর দূত প্রেরণ করেন। আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেয়াও তাঁর দাওয়াতী পরিকল্পনার একটা অংশ ছিল এবং হিজরী ৭ম সালে তিনি (সা) এ কাজ শুরু করেন। এছাড়া, তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের আশেপাশের বিভিন্ন রাজা ও রাজপুত্রদের কাছে দূত পাঠান, তাদের সকলকে ইসলামের দিকে আহবান করেন। মু’তা এবং তাবুকের যুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ এবং উসামার সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করা তাঁর এ সমস্ত পরিকল্পনারই বাস্তব প্রতিফলন। তাঁর উত্তরসূরী খলিফাগণ রাষ্ট্রের শাসক হিসাবে তাঁর গৃহীত পরিকল্পনার অনুসরণ করেছেন এবং যে সমস্ত দেশে দূত পাঠিয়ে তিনি (সা) মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেছিলেন, খলিফাগণ সে সমস্ত দেশ জয় করে প্রকৃতঅর্থে তাঁর পরিকল্পনাকেই বাস্তবায়ন করেছে।
পরবর্তীতে, খুব শীঘ্রই একই পদ্ধতি ও মূলনীতি অনুসরণ করে নতুন নতুন বিজয় অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হয়। রাসূল (সা) এর মূলনীতি অনুসরণ করার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র দেশ জয়ের ব্যাপারে কখনো বিশেষ কোন পছন্দকে প্রাধান্য দেয়নি। কিংবা, এ কাজ কতোটা সহজ বা কতোটা কঠিন এ বিষয়েও মুসলিমরা কখনো চিন্তা-ভাবনা করেনি। যদিও মিশর জয় করা মুসলিমদের জন্য তুলনামূলক ভাবে সহজ ছিল এবং দারিদ্রপীড়িত উত্তর আফ্রিকার রুক্ষ মরুময় প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে সে অঞ্চলে যথেষ্ট পরিমাণ ধনসম্পদও ছিল, কিন্তু, তারপরেও এ সমস্ত কোন বিষয়ই কখনো মুসলিমরা বিবেচনা করেনি। কারণ, তাদের বিভিন্ন দেশজয়ের পেছনের একমাত্র কারণ ছিল ইসলামের বাণীকে সে সমস্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া। মূলতঃ এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই মুসলিমরা প্রাচূর্যমন্ডিত কিংবা প্রাচূর্যহীন সকল রাষ্ট্রকেই মুক্ত করেছে। অথবা, কোন দেশের জনগণ যখন বিজয়ের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে বাঁধাকেও তারা অবলীলায় অপসারণ করেছে। এ কারণেই বিভিন্ন দেশে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার পেছনে সে দেশে ধনসম্পদের উপস্থিতি কিংবা তাদের দারিদ্রপীড়িত অবস্থা কখনো মূল বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়নি। কিংবা, কোন জনগোষ্ঠির ইসলাম গ্রহন করা বা প্রত্যাখান করাও ইসলামের বাণী বহন করার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। প্রকৃতঅর্থে, মুসলিমদের বিভিন্ন দেশজয় করার মূলকারণই ছিল ইসলামের আহবানকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা এবং সেইসাথে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ, ইসলামের এই বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব থেকেই উৎসরিত হয়েছে এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা এই পৃথিবীর প্রতিটি দেশে, প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া জরুরী।
পবিত্র কোরআনে পরিস্কার ভাবে জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সাথে, কোরআনে এ বিষয়েও জোর দেয়া হয়েছে যে, জিহাদ একমাত্র ইসলাম অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসারেই হতে হবে এবং একমাত্র ইসলামের আহবান বিস্তৃতির লক্ষ্যেই হতে হবে। এ ব্যাপারে শক্তিশালী আয়াত নাযিল করে আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের তাঁর পথে জিহাদের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহতায়ালা সুরা আনফালে বলেছেন,
“এবং তোমরা তাদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ কর যতক্ষন পর্যন্ত না (পৃথিবী থেকে) ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট হয়।” [সুরা আল-আনফালঃ ৩৯]
তিনি সুরা বাকারায় বলেছেন,
“এবং তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর যতক্ষন পর্যন্ত না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন কেবল আল্লাহ’র জন্যই নির্দিষ্ট হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়, তবে অত্যাচারী ব্যতীত আর কারো সাথে শত্রুতা নেই।” [সুরা বাকারাহ্ঃ ১৯৩]
আল্লাহতায়ালা সুরা তওবাতে বলেছেন,
“যুদ্ধ কর তাদের সাথে যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, আর না ঈমান আনে কিয়ামত দিবসের উপর, না তারা নিষেধ করে তা হতে যা থেকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল নিষেধ করেছেন এবং তাদের সাথে যারা আহলে কিতাবদের মধ্য হতে সত্যদ্বীনকে স্বীকৃতি দেয় না, যে পর্যন্ত না তারা স্বতঃস্ফুর্ত আনুগত্যের সাথে জিযিয়া প্রদানে সম্মত হয়।” [সুরা তওবাঃ ২৯]
অন্যান্য অনেক আয়াতের সাথে এই আয়াতগুলোও মুসলিমদের জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং জিহাদের মূল উদ্দেশ্য কি হবে তার ইঙ্গিতও এখানে দেয়া হয়েছে। মূলতঃ এ ধরনের আয়াতগুলোই সবসময় মুসলিমদের অন্যান্য দেশ জয় করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, দ্বীন ইসলাম প্রচারের ভিত্তিতেই মূলতঃ ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছিল এবং এ উদ্দেশ্যেই শক্তিশালী মুসলিম সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল। তাই একথা অস্বীকার্য যে, জিহাদ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি বিষয় এবং এর মাধ্যমেই মুসলিমরা বিভিন্ন দেশে বিজয় পতাকা উত্তোলন করেছিল। ইসলামের দাওয়াত বহনের এই গুরুদায়িত্ব আবারও মুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র ফিরিয়ে দেবে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৪ (ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বলতে মূলতঃ বুঝায় এ রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক। এ সম্পর্ক মুসলিম উম্মাহর পররাষ্ট্র বিষয়ক কার্যাবলী দেখাশুনা করার ভিত্তিতেই গড়ে উঠে। বস্তুতঃ ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি একটি স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয় ভিত্তির উপর গঠিত। আর তা হলো, সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়া এবং সকল জাতি ও সমাজের কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়া। এটাই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। মুসলিম উম্মাহ্কে যেই শাসন করুক না কেন, এই ভিত্তি অপরিবর্তনীয় এবং এ ব্যাপারে কোনরকম মতপার্থক্য করার কোন অবকাশ ইসলামে নেই। ইসলামের ইতিহাসের সকল সময়ে এই নীতিকেই মূলভিত্তি হিসাবে ধরা হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার সময় থেকে উসমানী খিলাফতের শেষদিন পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতির এই মূল ভিত্তিকেই অনুসরণ করা হয়েছে।
আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করার প্রথম দিন থেকেই ইসলামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে তাঁর নবগঠিত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিমালা প্রস্তুত করেন। সমগ্র হিজাযে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়ার মানসে তিনি (সা) ইহুদীদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এছাড়া, সমস্ত আরব উপদ্বীপে ইসলামের আহবান পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে হুদাইবিয়া চুক্তি করেন। পরিশেষে, তিনি (সা) আরব উপদ্বীপের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে দূত পাঠিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেন এবং ইসলামের বাণী প্রচারের ভিত্তিতেই তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরীর উদ্যোগ নেন।
এরপরে আশে খলীফাদের যুগ। রাসূল (সা)-কে অনুসরণ করে তারাও ইসলাম প্রচারের ভিত্তিতেই অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক গঠন করেন এবং সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ইসলাম প্রচারের ধারাকে অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীতে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন-ক্ষমতায় আসা প্রতিটি শাসকই ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগীতায় অবতীর্ন হয়েছেন। আব্বাসীয় খলিফাগণের চাইতে উমাইয়া খলিফাগণ নতুন দেশ জয় করা এবং ইসলামের আহবান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশী সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। আবার, মামলুকদের চাইতে উসমানী খলিফাগণ অনেক বেশী সংখ্যক দেশ জয় করেছেন এবং ইসলামের বাণীর প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছেন। এ পার্থক্য মূলতঃ কোন শাসনামলে রাষ্ট্র তার অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় পররাষ্ট্র নীতিকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়েছে। যাইহোক, সব শাসনামলেই দ্বীন ইসলাম প্রচারকে মূলভিত্তি হিসাবে ধরেই ইসলামী রাষ্ট্র অন্যান্য সকল রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরী করেছে। খলিফাগণের শাসনামলের সুদীর্ঘ সময়ে কখনই এ অবস্থা পরিবর্তিত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করা এবং বহির্বিশ্ব ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়াই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের মূলদায়িত্ব। তাই, ইসলামকে বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব সবসময় ইসলামী রাষ্ট্রের উপরই অর্পিত হয়েছে।
আল্লাহতায়ালা ইসলামের সুমহান বাণী সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশ্যে নাযিল করেছেন, আর এ কারণেই ইসলামকে সুনির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে প্রচার করা এবং এর আহবান সকলের কাছে পৌঁছে দেয়া সবসময় ইসলামী রাষ্ট্রের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“এবং (হে মুহাম্মদ) আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু, বেশীর ভাগ মানুষই তা জানে না।” [সুরা সাবাঃ২৮]
আল্লাহতায়ালা আরও বলেছেন,
“হে মানবজাতি! তোমাদের নিকট এসেছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে নসীহত (সদুপদেশ)” [সুরা ইউনুসঃ ৫৭]
তিনি আরও বলেছেন,
“বল, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি।” [সুরা আ’রাফঃ ১৫৮]
এবং তিনি আরও বলেছেন,
“আর এই কোরআন আমার নিকট অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে যেন আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটা পৌঁছাবে তাদের সকলকে এর দ্বারা সতর্ক করতে পারি।” [সুরা আন’আমঃ ১৯]
এছাড়া তিনি বলেছেন,
“হে রাসূল (সা)! যা কিছু তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তুমি (মানুষকে) সবকিছু পৌঁছিয়ে দাও। আর যদি তুমি তা না করো তবে [ধরে নেয়া হবে] তুমি আল্লাহর বাণী মানুষকে পৌঁছিয়ে দাওনি।” [সুরা মায়িদাহ্ঃ ৬৭]
মুহাম্মদ (সা) তার জীবদ্দশায় এই বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার মৃত্যুর পর মুসলিমরা অব্যাহত ভাবে এ দায়িত্ব পালন করেছে। আসলে, মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর রাসূল (সা) যে কাজ শুরু করে গিয়েছিলেন সে কাজেরই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। আর তাই, মুসলিমরা সবসময় রাসূল (সা)-এর প্রদত্ত শিক্ষাকে অনুসরণ করে ইসলাম প্রচার-প্রসারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর বিদায়ী ভাষণে (খুতবাহ্ আল-ওয়াদা) বলেছেন, “তোমরা যারা উপস্থিত তারা অনপুস্থিত লোকদের কাছে তা পৌঁছে দেবে। হয়তোবা অনুপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত ব্যক্তির চাইতে বেশী সতর্ক হবে।” তিনি (সা) আরও বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা তার মুখ উজ্জ্বল করুক, যে আমার কথা শুনবে, তা বুঝবে এবং যেভাবে সে শুনেছে সেভাবেই মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।”
এজন্যই রাসূল (সা)-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর উত্তরাধিকারী খলিফাদের সময়ে ইসলামের বাণীর প্রচার-প্রসার করাই সবসময় অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্কের মূলভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হত। আর, কোরআন-সুন্নাহ্ এবং সাহাবাদের ঐক্যমত (ইজমা আস-সাহাবাহ) অনুযায়ী এটাই হচ্ছে আল্লাহতায়ালা’র সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নির্দেশ।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বলতে আসলে বোঝায় ইসলামের আহবানকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেয়া। এই পররাষ্ট্রনীতি সবসময় একটি নির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় পদ্ধতিতে কার্যকর করা হয় – সেটা হচ্ছে জিহাদ। এখানে আলোচ্য বিষয় নয় কে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতায় আছে। বস্তুতঃ রাসূল (সা) মদীনায় রাষ্ট্র গঠন করার সময় থেকে একেবারে ইসলামী রাষ্ট্রের শেষদিন পর্যন্ত এ পদ্ধতি কখনও পরিবর্তিত হয়নি। আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার পরপরই তাঁর সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন এবং তিনি (সা) ইসলামী দাওয়াতের পথে বস্তুগত বাঁধা দূর করার লক্ষ্যে জিহাদের সূচনা করেছিলেন। যেহেতু কুরাইশরা দাওয়াতের পথে বস্তুগত বাঁধা তৈরী করেছিল, তাই তিনি (সা) সে বাঁধা দূর করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি (সা) (জিহাদের মাধ্যমে) কুরাইশদের অস্তিত্বকে সম্পূর্নভাবে নিশ্চিহ্ন করে দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারের পথকে প্রশস্ত করেন। এরপর তিনি (সা) একের পর এক বাঁধা অপসারণ ও নিশ্চিহ্ন করতে থাকেন, যে পর্যন্ত ইসলামের আহবান সমস্ত আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর, ইসলামী রাষ্ট্র অন্যান্য জাতির মাঝে ইসলাম বিস্তৃত করার লক্ষ্যে তাদের দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। কিন্তু, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা সেখানকার মানুষের মাঝে ইসলাম বিস্তারের পথে বস্তুগত বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই, সেখানকার জনগণের কাছে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছে দেবার জন্য বস্তুগত এই বাঁধা অপসারণ করা জরুরী হয়ে যায়। যেন তারা প্রত্যক্ষ ভাবে ইসলামের সুবিচার অবলোকন ও অনুভব করতে পারে এবং ইসলামের পতাকাতলে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনের সাক্ষী হতে পারে। এছাড়া, এর মাধ্যমে কোনরকম জোরজবরদস্তি কিংবা বলপ্রয়োগ ছাড়াই ইসলামী রাষ্ট্র মানুষকে একটি সত্যিকারের উন্নত জীবনের দিকে আহবান করতে পারে। ইসলামের আহবান প্রচার-প্রসার করার পদ্ধতি হিসাবে অতীতে সবসময়ই জিহাদের ধারা অব্যাহত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, জিহাদের মাধ্যমেই ইসলামী রাষ্ট্র বিভিন্ন বাদশাহী ও রাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে সেখানকার জনগণকে ইসলামী শাসনের নীচে নিয়ে আসে। এভাবেই চারিদিকে ইসলামের আহবান ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলাম দিয়ে শাসিত হবার পর লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। অতীতে ইসলামের পররাষ্ট্রনীতিকে জিহাদের মাধ্যমেই কার্যকরী করা হয়েছে, কোনসময়ই এ নীতি পরিবর্তিত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও তা পরিবর্তিত হবে না।
মুসলিমদের জিহাদের মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে হলে হয় সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে হবে, অথবা অর্থ, মতামত কিংবা লেখালেখির মাধ্যমে যুদ্ধকে সমর্থন করতে হবে। মুসলিমদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক- যা কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত। নিয়মানুযায়ী ১. মুসলিমরা শত্রুপক্ষকে ইসলাম গ্রহনে কিংবা ২. জিযিয়া প্রদানের দিকে আহবান করা না পর্যন্ত কখনোই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ সূচনা করতে পারবে না। এ বিষয়ে শরীয়াহ্ আইন হলো, যখন মুসলিমরা শত্রুপক্ষকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে তখন প্রথমে তাদেরকে ইসলাম গ্রহন করতে আহবান জানাতে হবে। যদি শত্রুপক্ষ ইসলাম গ্রহন করে, তবে তারা মুসলিম উম্মাহর অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। আর, যদি তারা ইসলাম গ্রহনে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাদেরকে জিযিয়া প্রদান করতে বলা হবে। যদি তারা তা প্রদান করতে সম্মত হয়, তবে মুসলিমদের তাদের জান-মাল এবং ধন-সম্পদের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং তাদের দেশ ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে মুসলিম নাগরিকদের মতোই তারা ন্যায়বিচার, সমতা, নিরাপত্তা এবং অভিভাবকত্ব বিষয়ক ও কল্যাণমূলক সকল সুবিধা ভোগ করবে। সেইসাথে তাদের মৌলিক সকল চাহিদা নিশ্চিত করা হবে। তবে, জিযিয়া প্রদানের সাথে সাথে তাদের ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসনকর্তৃত্বেরও আনুগত্য স্বীকার করে নিতে হবে। আর, যদি তারা ইসলাম গ্রহন না করে কিংবা জিযিয়া প্রদানেও অস্বীকৃতি জানায়, তবে সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আইনসঙ্গত হবে।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে, কোন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করা আইনসঙ্গত নয়, যতক্ষন পর্যন্ত না তাদের ইসলামের দিকে আহবান করা হয়। ইসলামের পন্ডিতবর্গ (Scholars) এ বিষয়ে জোর দিয়েছেন যে, যতক্ষন পর্যন্ত না কোন জাতিগোষ্ঠির কাছে ইসলামের আহবান না পৌঁছে, ততক্ষন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা আইনসঙ্গত নয়। সুতরাং, শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার পূর্বে তাদের মাঝে ইসলামের ব্যাপারে জনমত গঠন করা এবং ইসলামের একটি সত্যিকার চিত্র তাদের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। সেইসাথে, সেখানকার জনগণকে ইসলামী আইন-কানুনের সংস্পর্শে আসারও উদ্যোগ নেয়া উচিত যেন অমুসলিমরা অনুভব করতে পারে যে, ইসলাম তাদেরকে প্রকৃত মুক্তির দিকে আহবান করছে। ইসলামী রাষ্ট্র এ লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারে, যেমনঃ ইসলামের ধ্যান-ধারণাগুলোকে পরিস্কার ভাবে ব্যাখ্যা করা, অমুসলিমদের সামনে ইসলামের একটি জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা এবং ইসলামের পক্ষে বিভিন্ন রকম প্রচারণা চালানো ইত্যাদি। এ ধরণের কর্মকান্ডের মধ্যে ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি-সামর্থ্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রদর্শন করাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর রাসূল (সা) এ ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি (সা) কুফর রাষ্ট্রগুলোর কেন্দ্রস্থলে দূত পাঠিয়েছেন। একবার তিনি (সা) নাজদ্ এলাকায় ইসলামের বাণী পৌঁছে দেবার জন্য চল্লিশ জন সাহাবীকে প্রেরণ করেছিলেন। এছাড়া, তিনি (সা) তাবুক যুদ্ধে যাবার পূর্বে মদীনায় তাঁর সেনাবাহিনীর শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছিলেন। এর কারণ রাসূল (সা) বলেছেন, “একমাসের দূরত্ব থাকা অবস্থায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে আমাকে বিজয়ের সংবাদ দেয়া হয়েছে।”
অতীতে মুসলিমদের সেনাবাহিনী সবসময়ই শত্রুপক্ষের ভীতি ও শ্রদ্ধা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। শত শত বছর যাবত ইউরোপে একথা প্রচলিত ছিল যে, মুসলিম সেনাবাহিনীকে কখনোই পরাজিত করা যায় না। যাই হোক, রাজনৈতিক ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করা আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, প্রত্যক্ষ সমর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে ইসলামের ধ্যান-ধারণাগুলোকে প্রচার-প্রসার করা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তিমত্তা প্রদর্শন বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো গ্রহন করা ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য জরুরী। যদিও ইসলামের বাণী প্রচারে জিহাদ একটি অপরিবর্তনীয় ও সুনির্দিষ্ট পন্থা, কিন্তু সামরিকবাহিনীর সাথে মূল সংঘর্ষের পূর্বে অন্যান্য রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কর্মকান্ডগুলো মূলতঃ প্রস্তুতিমূলক কর্মকান্ড এবং এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরণের পদক্ষেপ সাধারনত অন্যান্য জাতি, রাষ্ট্র কিংবা জনগোষ্ঠির সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, হোক তা অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিংবা সৎ প্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক অথবা অন্য কোন ভিত্তির উপর গঠিত সম্পর্ক, যা হয়তো বা পরবর্তীতে ইসলাম প্রচার-প্রসারে সহায়ক হতে পারে।
সুতরাং, যে রাজনৈতিক চিন্তার উপর ভিত্তি করে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারিত হয় তা মূলতঃ তাদের মাঝে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটানো এবং ইসলামের বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ভিত্তিতেই গঠিত। এক্ষেত্রে, অনুসরণীয় একমাত্র পদ্ধতি হল জিহাদ। তবে, এ ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্র বিভিন্ন রকমের পরিকল্পনা ও উপায় অবলম্বন করতে পারে। যেমনঃ ইসলামী রাষ্ট্র তার কিছু সংখ্যক শত্রুরাষ্ট্রের সাথে সৎ প্রতিবেশীসুলভ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে এবং অন্যদের সাথে যুদ্ধ করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) এ ধরনের পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি (সা) মদীনায় আসার পরপরই এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। আবার, রাষ্ট্র তার সমস্ত শত্রুর বিরুদ্ধে একই সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করতে পারে। আবু বকর যখন ইরাক এবং আল-শামে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তখন এ পদ্ধতি গ্রহন করেছিলেন। আবার, রাষ্ট্র তার আকাঙ্খিত ফলাফলের পক্ষে জনমত তৈরীর জন্য কোন শত্রুরাষ্ট্রের সাথে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিও করতে পারে।
আল্লাহর রাসূল (সা) কুরাইশদের সাথে আল-হুদাইবিয়াহ চুক্তি স্বাক্ষর করার সময় এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। আবার, শত্রুপক্ষের মনে ভীতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে, রাষ্ট্র এলাকা ভিত্তিক খন্ড যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) বদর যুদ্ধের পূর্বে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। আবার, উমাইয়া খলিফাদের শাসনামলে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলো, তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন প্রচারনাও এ পরিকল্পনার অন্তর্ভূক্ত ছিল।
দাওয়াতী কার্যক্রমের স্বার্থে, ইসলামী রাষ্ট্র একই সময়ে কোন কোন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে আবার কোন কোন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নাও করতে পারে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র কারো সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে পারে আবার নাও করতে পারে। দাওয়াতী কার্যক্রমকে অভিষ্ট গন্তব্যে নেবার লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে খুব সতর্কতার সাথে এ সমস্ত পরিকল্পনা করতে হবে। ইসলামের আহবানের বিস্তৃতির উদ্দেশ্যে ইসলামী রাষ্ট্র [শত্রুর বিরুদ্ধে] প্রপাগান্ডা এবং [ইসলামের পক্ষে] প্রচার আশ্রয়ও নিতে পারে অথবা, শত্রুপক্ষের গোপন পরিকল্পনা উম্মোচন করা কিংবা স্নায়ু যুদ্ধের (Cold War) কৌশলও গ্রহন করতে পারে।
দাওয়াতী কার্যক্রমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং দাওয়াতকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই রাষ্ট্রকে তার সকল পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ, এ ধরনের পরিকল্পনা সবসময়ই ইসলাম বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে এবং জিহাদের গুরুদায়িত্বকে সহজতর করেছে। এজন্যই এ সমস্ত পদক্ষেপ পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরী। এছাড়া, আল্লাহর রাস্তায় কৃত জিহাদের (জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্) মাধ্যমে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটানোর লক্ষ্যে সর্বদা ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে জনমত গঠন করাও জরুরী।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৩ (ইসলামী রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন নীতিমালা)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
ইসলামী রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন নীতিমালা বলতে মূলতঃ বুঝায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামের হুকুম-আহ্কামকে বাস্তবায়িত করা। আল্লাহ্ প্রদত্ত এ সমস্ত হুকুম-আহ্কামকে ইসলামী রাষ্ট্র এর নিজস্ব ব্যবস্থার অধীনেই বাস্তবায়িত করতো। এ রাষ্ট্র জনগণের মাঝে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক ও লেনদেন নির্ধারন ও দেখাশুনা করা, হুদুদ ও আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তি সমূহ বাস্তবায়ন করা, সমাজের সর্বস্তরে উচ্চ মানের মূল্যবোধ বজায় রাখা, সমাজে ইসলামের বিভিন্ন রীতি-নীতি ও ইবাদতকে নিশ্চিত করা এবং সেইসাথে ইসলামী আইন-কানুনের ভিত্তিতে জনগণের সমস্ত বিষয়াদির তদারকি করতো। বস্তুতঃ ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে বসবাসরত মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর আল্লাহ্ প্রদত্ত হুকুম-আহ্কামকে কিভাবে প্রয়োগ করা হবে ইসলামে তার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারিত রয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র এ নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেই এ সমস্ত হুকুম-আহ্কামকে জনগণের উপর প্রয়োগ করতো। এ পদ্ধতি হুকুম শরীয়াহ্ এবং নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য নির্ধারিত আহ্কামের সাথে সম্পর্কিত। কারণ, ইসলাম এসেছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে সমগ্র মানবজাতিকে ইসলামের দিকে আহবান করেছেন। যেমন, তিনি বলেছেন,
“হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের সেই রবের দাসত্ব করো যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, আশা করা যায় যে, তোমরা মুত্তাকী (আল্লাহভীরু) হতে পারবে।” [সুরাঃ বাকারাহ্ঃ ২১]
তিনি আরও বলেছেন,
“হে মানুষ! কি তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক হতে প্রতারিত করলো?” [আল-ইনফিতরঃ ৬]
উসুল উল-ফিকহ্ (শরীয়াহর মূল উৎস) বিষয়ে পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ বলেছেন যে, ইসলামী শরীয়াহ্ আসলে এ পৃথিবীর প্রতিটি সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষকে উদ্দেশ্য করেই নাযিল করা হয়েছে। হোক সে মুসলিম অথবা অমুসলিম। ইমাম গাজ্জালী তার “আল মুস্তাফা ফি আল-উসুল”বইতে বলেন, “শরীয়াহ্ আইন দিয়ে শাসিত ব্যক্তিকে আইন অনুযায়ী অবশ্যই একজন দায়িত্বশীল, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন ও আইনপ্রণেতার (আল্লাহতায়ালা) আহবান বোঝার যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে। বস্তুতঃ যে সকল গুনাবলীর জন্য একজন মানুষের উপর আল্লাহর হুকুম ফরজ হয়ে যায় তা হলো, তার এমন স্বভাবসুলভ মানবপ্রকৃতি যা দিয়ে সে আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধকে (পুরোপুরি) গ্রহন করতে ও মেনে চলতে পারে।”
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইসলাম আসলে সমস্ত মানবজাতিকেই আহবান করেছে। এ আহবান ইসলামের দিকে সমস্ত মানবজাতির উপর সাধারণ আহবান ও দায়িত্ব হিসাবে আরোপিত হয়েছে। সাধারণ আহবানের মাধ্যমে প্রথমে সমস্ত মানুষকে ইসলামে প্রবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সমস্ত মানুষকে আল্লাহ্ প্রদত্ত সমস্ত হুকুম-আহ্কামের কাছে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। আর, যারা নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস করে, ইসলামী রাষ্ট্র তাদের দল, মত, বিশ্বাস কিংবা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে একটি দলবদ্ধ মানুষ হিসাবে বিবেচনা করে এবং সকলকে ইসলামী আইন-কানুন দিয়েই শাসন করে। প্রয়োজন হয় শুধু জনগণের ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসন-ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলে এ রাষ্ট্রে কোনকিছু নেই। কারণ, এখানে সমস্ত মানুষকেই সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হয় এবং এদের প্রত্যেককেই ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যতোক্ষন পর্যন্ত তারা অর্পিত নাগরিক দায়িত্ব কর্তব্য মেনে চলে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রে বসবাসরত প্রত্যেক ব্যক্তিই শরীয়াহ্ প্রদত্ত পূর্ণ নাগরিক অধিকার ভোগ করে, সে মুসলিমই হোক বা অমুসলিম হোক। আবার, মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক না হয়, তবে শরীয়াহ্ প্রদত্ত নাগরিক অধিকার তাকে প্রদান করা হবে না। ধরা যাক, (ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত) কোন মুসলিম ব্যক্তির মা খ্রিষ্টান এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক। আর, তার বাবা মুসলিম কিন্তু তার ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেই। সেক্ষেত্রে, সে ব্যক্তির মা সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবার অধিকারী হবে, কিন্তু বাবা নয়। মা যদি বিচারকের কাছে ভরণপোষণের ব্যাপারে অভিযোগ করে, তবে বিচারক তার পক্ষে রায় দেবে এবং সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করবে, কারণ এক্ষেত্রে উক্ত মহিলা ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচিত হবে। কিন্তু, যদি সে ব্যক্তির বাবা অভিযোগ উত্থাপন করে, তবে বিচারক তার বিপক্ষে রায় প্রদান করবে। কারণ, সে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক বলে বিবেচিত হবে না। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, শরীয়াহ্ শুধু ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপরই ইসলামী হুকুম-আহ্কাম বাস্তবায়িত করে এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল মানুষকে সাধারণ ভাবে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যার কারণে, তারা সকলেই নাগরিক হিসাবে শরীয়াহ্ প্রদত্ত অভিভাবকত্ব বিষয়ক কিংবা কল্যাণমূলক সকল অধিকার ভোগ করে থাকে।
এটা হচ্ছে শাসন ও অভিভাবকত্বের দৃষ্টিকোন থেকে নাগরিকের অবস্থান সম্পর্কিত বিষয়। আর, ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামী হুকুম-আহ্কাম বাস্তবায়নের বিষয়টি কখনও ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচিত হয় না, বরং তা সর্ম্পূণ ভাবে আইনগত দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হয়। তাই কোরআন-সুন্নাহর দলিলগুলোকে অবশ্যই আইনগত দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে হবে এর কারণ হচ্ছে, শরীয়াহ্ সম্পর্কিত দলিলগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সমস্যার সমাধান করা। এক্ষেত্রে, আইনপ্রণেতা (আল্লাহতয়ালা)’র উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন শুধু আয়াতগুলোর বাহ্যিক অর্থের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে আয়াতগুলোর অর্থ ও বিষয়বস্তুকে পরিপূর্ণ ও যথাযথ ভাবে অনুধাবন করে। এজন্য, হুকুম শরীয়ার উপর ভিত্তি করে যে কোন আইন তৈরী করার ক্ষেত্রে সবসময়ই শরীয়াহ্ প্রদত্ত হুকুমের পেছনের কারণ(ইল্লাহ) কেও বিবেচনা করা হয়। অন্য কথায় বলা যায় যে, হুকুম শরীয়াহ ভিত্তিক কোন সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে সবসময়ই কোরআন-সুন্নাহর দলিলের আইনগত বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। যখন খলিফা (রাষ্ট্রপ্রধান) এই সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে গ্রহন করে, তখন রাষ্ট্রে সেটা আইনেই পরিণত হয় এবং সকলের জন্য সেই আইন মেনে চলা ও তা প্রয়োগ করা কর্তব্য হয়ে যায়।
সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে বসবাসরত সকল নাগরিকের জন্য শরীয়াহ্ আইনের কাছে আত্মসর্মপণ করার বিষয়টি প্রমাণিত ও অপরিবর্তনীয়। আসলে, শরীয়াহ আইনের কাছে আত্মসমর্পণের বিষয়টি মুসলিমদের বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। কারণ, এ ব্যাপারে তারা আল্লাহতায়ালার কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ঈমান আনার অর্থই হলো আকীদাহ্ বা বিশ্বাস থেকে উৎসরিত সমস্ত হুকুম আহকামের কাছে নিঃশর্ত ভাবে আত্মসমর্পণ করা। এক্ষেত্রে মুসলিমদের আকীদাহ্ বা বিশ্বাস তাকে বাধ্য করে এ সমস্ত হুকুম-আহকাম পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতে। প্রতিটি মুসলিম শরীয়াহ্ আইন দিয়ে জীবন পরিচালনার জন্য আল্লাহর কাছে ওয়াদাবদ্ধ, হোক তা তার সাথে আল্লাহর সম্পর্কের বিষয়ে, যেমনঃ বিভিন্ন ধরনের ইবাদত (নামাজ, রোজা ইত্যাদি)। কিংবা, হোক তা নিজের সাথে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে, যেমনঃ মূল্যবোধ বা খাবার সম্পর্কিত বিষয়ে অথবা, হোক তা তার সাথে অন্য সকল মানুষের সম্পর্কের বিষয়ে, যেমনঃ লেনদেন কিংবা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত বিষয়ে।
ইসলামী রাষ্ট্র সমস্ত মুসলিমকে ইসলামী আকীদাহ্ বা বিশ্বাস দিয়েই ঐক্যবদ্ধ রাখে এবং এক্ষেত্রে অবশ্যই কোরআন ও সুন্নাহর দলিলকেই হুকুম-শরীয়ার মূল ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়। হুকুম শরীয়ার মূলনীতি এবং আইনগত সকল সিদ্ধান্ত কোরআন-সুন্নাহর দলিলের উপর ভিত্তি করেই প্রণয়ন করা হয় এবং এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত প্রকাশের কোন অবকাশ থাকে না। কিন্তু, ইজতিহাদের কারণে অতীতের মুসলিমরা বিভিন্ন সময় কোরআন-সুন্নাহর দলিলকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেছে। মূলতঃ এ সমস্ত দলিলের(কোরআনের আয়াত ও রাসুলের হাদিস) ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণেই বিভিন্ন ধরণের মতবাদ (School of Thought) ও সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, ইসলাম সবসময়ই মুসলিমদের গবেষণা (ইজতিহাদ) করতে উৎসাহিত করে এবং সেইসাথে মানুষের মধ্যকার চিন্তাধারার স্বাভাবিক পার্থক্যকেও স্বীকার করে নেয়।
এজন্য সবসময়ই মুসলিমদের মাঝে আকীদাহ্, আইন-কানুন ও উসুল উল-ফিকহ্ এর পদ্ধতি বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। রাসূল (সা) সবসময়ই মুসলিমদের ইজতিহাদ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং বলেছেন যে, মুজতাহিদের (ইজতিহাদের যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি) ইজতিহাদ যদি ভূল হয় তবে তার জন্য রয়েছে একটি নেকী। আর, সঠিক হলে রয়েছে দু’টি নেকী। এ কারণে, সুন্নী, শিয়া’হ, মুতা’যিলাহ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হওয়া কোন আশ্চর্য বিষয় ছিলো না। না আশ্চর্যের বিষয় ছিলো বিভিন্ন মতবাদের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মাযহাব যেমনঃ শাফি’ঈ, হানাফি, মালিকি, হাম্বলী, জা’ফরী, যায়িদী ইত্যাদি মাযহাবের সৃষ্টি হওয়া। এ সমস্ত সম্প্রদায় এবং মাযহাবগুলো একটি মাত্র আকীদাহ্ বা বিশ্বাসকেই আকঁড়ে ধরেছিল, যা ছিলো ইসলামের আকীদাহ্। তাদের সকলের উপরই আল্লাহ্ নির্ধারিত সমস্ত ফরজ দায়িত্ব মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ সকল বিষয়কে পরিহার করার কর্তব্য ছিলো। কোন নির্দিষ্ট মাযহাব নয়, তারা সকলেই সর্বাবস্থায় হুকুম-শরীয়াহ দিয়ে জীবন পরিচালনা করতেই বাধ্য ছিলো।
আসলে, মাযহাবগুলো হচ্ছে হুকুম-শরীয়ার একটি নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাখ্যা, যে ব্যাখ্যা অনুযায়ী মুকাল্লিদগন (যারা মুজতাহিদ নয়), যারা নিজেরা ইজতিহাদ করতে পারে না, তারা হুকুম-শরীয়াহ্ অনুসরণ করে থাকে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, মুসলিমরা শুধু আল্লাহ্ প্রদত্ত আইন-কানুন দিয়েই জীবন পরিচালনা করতে বাধ্য, কোন মাযহাব অনুসরণ করতে বাধ্য নয়। তাই, হয় তাকে হুকুম-শরীয়ার মূল উৎস থেকে নিজে ইজতিহাদ করে শরীয়াহ্ আইন মানতে হবে, অথবা, সে যদি নিজে ইজতিহাদ করতে অপারগ হয় তবে তাকে কোন মাযহাব অনুসরণ করতে হবে। এ কারণেই, যে সমস্ত সম্প্রদায় ও মাযহাব কোরআন ও সুন্নাহকে হুকুম-শরীয়ার একমাত্র উৎস গ্রহন করেছে এবং ইসলামী আকীদাহকে আকঁড়ে ধরেছে তারা সবাই ইসলামের অর্ন্তভূক্ত। এ সমস্ত মতবাদের প্রচারকবৃন্দও মুসলিম এবং তারা ইসলামী আইন-কানুন দিয়েই পরিচালিত। যতক্ষন পর্যন্ত এ সমস্ত মাযহাবের অনুসারীরা ইসলামী আকীদাহর সীমারেখার মধ্যে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র এ সমস্ত সম্প্রদায় ও মাযহাবের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু, যদি কোন মুসলিম ব্যক্তিগত কিংবা দলবদ্ধ ভাবে ইসলামী আকীদাহ্ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় তবে, এ বিষয়টিকে ইরতিদাদ(ধর্মত্যাগ) হিসাবে বিবেচনা করা হবে এবং সে ব্যক্তি বা দলের উপর রাষ্ট্র কর্তৃক মুরতাদ(ধর্মত্যাগী) এর শাস্তি আরোপিত হবে। হুকুম-শরীয়ার কিছু কিছু বিষয় আছে যাতে দ্বিমত প্রকাশের কোন অবকাশ নেই। অর্থাৎ, এ সমস্ত বিষয়ে একটি মাত্র সুনির্দিষ্ট হুকুমকে গ্রহনযোগ্য হিসাবে ধরা হয়। যেমনঃ চোরের হাত কাটা, সুদ নিষিদ্ধ হওয়া, যাকাতের প্রদানের অপরিহার্যতা, দৈনিক পাঁচ বার নামাজের বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি। এ সমস্ত বিষয়ে হুকুম-শরীয়াহ সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। তাই, মুসলিমরা এ সকল ক্ষেত্রে এই সুনির্দিষ্ট হুকুমগুলোই মেনে চলতে বাধ্য। আবার, হুকুম-শরীয়া’র কিছু কিছু বিষয় ও ধ্যান-ধারণা আছে যে সমস্ত বিষয় মুজতাহিদগণ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করার কারণে মুসলিমদের মধ্যে এ সমস্ত বিষয়ে মতপার্থক্য ঘটেছে। যেমনঃ খলিফা হবার পূর্বশর্ত কিংবা খারায আরোপিত ভূমির নির্ধারিত করের অংশ অথবা জমির ভাড়া প্রদান সম্পর্কিত বিষয় ইত্যাদি। এ সমস্ত আইনের ক্ষেত্রে, খলিফা একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে গ্রহন করেন এবং রাষ্ট্রে বসবাসরত সকলের জন্য সেই আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। যারা এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে খলিফার সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষন করে তাদের সকলের জন্যই তাদের নিজস্ব মতামত ত্যাগ করে খলিফার মতামতকে গ্রহন করা কর্তব্য হয়ে যায়। আর, এভাবেই খলিফার সিদ্ধান্ত সকলের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য দূর করে। বস্তুতঃ ইমাম বা খলিফা হুকুম-শরীয়া’র কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের পর প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে সেই আইন মেনে চলা মুসলিমদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে যায়। এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে কেউ যদি সেই নির্দিষ্ট বিষয়ে অন্য কোন হুকুম অনুসরণ করে তবে সে গুনাহগার হবে। কারণ, খলিফা যখন কোন নির্দিষ্ট শরীয়া’হ আইন কার্যকরী করেন, সঙ্গে সঙ্গে তা সকল মুসলিমের জন্য মেনে চলা ফরজ হয়ে যায়। আর, কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে শরীয়া’হ আইন কারো জন্য কখনো একের অধিক হতে পারে না।
তবে, খলিফার জন্য আকীদাহ্ সম্পর্কিত বিষয়ে কোন হুকুমকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া ঠিক নয়, কারণ তাহলে এটা মেনে চলা মুসলিমদের জন্য কষ্টকর হয়ে যেতে পারে। কিন্তু, ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যদি নতুন ধরনের ধ্যান-ধারণা আবির্ভাব হবার সম্ভাবনা থাকে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র এসব দুস্কৃতিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করবে যতক্ষন পর্যন্ত না নতুন এইসব ধ্যান-ধারণা মুসলিমদের কুফরীর (অবিশ্বাস) দিকে ধাবিত না করে। কিন্তু, যদি এইসব ধ্যান-ধারণা মুসলিমদের কুফরীর (অবিশ্বাস) দিকে ধাবিত করে, তবে যারা এ ধরণের অপকর্মের সাথে জড়িত থাকবে রাষ্ট্র তাদের ধর্মত্যাগী হিসাবে বিবেচনা করবে। এছাড়া, খলিফার ইবাদত সম্পর্কিত বিষয়েও কোন নির্দিষ্ট হুকুম গ্রহন করা ঠিক নয়, কারণ এটাও মুসলিমদেরকে কষ্টকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।
সুতরাং, আকীদাহ সম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদের মধ্য হতে কোন নির্দিষ্ট মতামতকে গ্রহন করা খলিফার জন্য সঠিক নয়, যতক্ষন পর্যন্ত না এই সকল মতামত ইসলামী মতবাদ হিসাবে বিবেচিত হয়। আবার, যাকাত ব্যতীত ইবাদত সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও কোন মতবাদকে নির্দিষ্ট করে দেয়া খলিফার জন্য সঠিক নয়, যতক্ষন পর্যন্ত না ইবাদতের এই সমস্ত বিষয় শরীয়া’হ প্রদত্ত আইন-কানুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ সকল বিষয় ছাড়া খলিফা লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া প্রদান, বিবাহ, তালাক, বিবাহ-বিচ্ছেদ পরবর্তী ভরণ-পোষণ, অংশীদারিত্ব ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য, সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি বিষয়ে হুকুম-শরীয়া’হ ভিত্তিক যে কোন আইনকে সকলের জন্য নির্দিষ্ট ও কার্যকরী করতে পারেন। এছাড়া, খলিফা শাস্তি প্রদান বা খাদ্য, বস্ত্র অথবা মূল্যবোধ সম্পর্কিত যে কোন বিষয়ে শরীয়া’হ ভিত্তিক যে কোন সুনির্দিষ্ট আইনকে কার্যকরী করতে পারেন এবং এক্ষেত্রে সকল মুসলিমের খলিফার গৃহীত সিদ্ধান্ত মেনে চলা আবশ্যক হয়ে যায়।
এছাড়া, খলিফাকে অবশ্যই ইবাদতের বিষয় সম্পর্কিত সকল শরীয়াহ্ আইন প্রয়োগ করতে হবে। যারা নামাজ ত্যাগ করবে এবং রমযান মাসে রোযা রাখবে না শরীয়াহ্ আইন অনুযায়ী খলিফা তাদেরকে শাস্তি দিবেন। এ সকল ইবাদত সম্পর্কিত আইন-কানুন সহ সমস্ত শরীয়াহ্ আইন রাষ্ট্রে বাস্তবায়িত বা প্রয়োগ করা খলিফার দায়িত্ব। নামাজ আদায় করার বাধ্যবাধকতা কোন ইজতিহাদ করার বিষয় নয়, বরং এটা যে সমস্ত মুসলিমের উপর ফরয তা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। তাই, এ সমস্ত প্রতিষ্ঠিত বিষয়ে খলিফাকে শরীয়াহ্ আইন সরাসরি প্রয়োগ করতে হবে। এ সমস্ত বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা না করার কোন অবকাশ থাকবে না। শাস্তিমূলক বিধানের (Panel Code) ক্ষেত্রে খলিফা একটি নির্দিষ্ট আইন গ্রহন করবে এবং সকল মুসলিমকে তা মেনে চলার জন্য আদেশ দেয়া হবে। অন্যান্য শাস্তিমূলক বিধানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার প্রযোজ্য হবে। এ সমস্ত কিছুই শুধু মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য হবে। আর, অমুসলিমদের ক্ষেত্রে, যারা কিনা ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন বিশ্বাসে বিশ্বাসী তাদেরকে তিন ভাগে ভাগ করা হবে।
১. যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করে কিন্তু তাদের আকীদাহর মধ্যে এমন কিছু বিষয় আছে যা ইসলামী আকীদাহর সাথে সাংঘর্ষিক।
২. আহলে কিতাবের দলভূক্ত মানুষ।
৩. মুশরিক যাদের মধ্যে রয়েছে- মাজুস (অগ্নিপূজারী), হিন্দু, বৌদ্ধ এবং আহলে কিতাব বহির্ভূত জনগণ।
এ সকল দলভূক্ত মানুষদের তাদের বিশ্বাসের উপরই ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার ব্যাপারে কোনরকম হস্তক্ষেপ করা হবে না। বিবাহ কিংবা তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে তাদেরকে নিজ নিজ ধর্মীয় আইন-কানুন মেনে চলতে দেয়া হবে। এ সকল বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ তাদের ধর্মীয় আইন-কানুন অনুযায়ীই ফয়সালা হবে এবং এজন্য রাষ্ট্র তাদের মধ্য হতে একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্র অধিকৃত বিচারালয়ে বিচারক হিসাবে মনোনীত করবে। এছাড়া, তাদের খাদ্য ও সাজসজ্জা বিষয়েও তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতিকেই প্রধান্য দেয়া হবে এবং এ সকল বিষয়ই সাধারণ নির্দেশের আওতাভূক্ত হবে। আহলে কিতাব বহির্ভূত সম্প্রদায়ের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। মাজুসদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমরা আহলে কিতাবদের সাথে যেমন আচরণ করো তাদের(মাজুস) সাথেও একই রকম আচরণ করো।”
কিন্তু, লেনদেন সংক্রান্ত এবং শাস্তিমূলক বিধান সমূহ মুসলিম-অমুসলিম সহ সকলের উপরই সমান ভাবে প্রযোজ্য হবে। বস্তুতঃ বিভিন্ন অন্যায়ের শাস্তি সম্পর্কিত বিচারকার্যের ব্যাপারে মুসলিম-অমুসলিম সহ সকলের উপরই শরীয়াহ্ আইন প্রয়োগ করা হবে। যারা ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিক হিসাবে বসবাস করবে তারা সবাই লেনদেন ও শাস্তি প্রদান সম্পর্কিত শরীয়াহ্ আইন মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। এক্ষেত্রে, ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা গোত্রীয় ভেদাভেদ বিবেচিত হবে না। অমুসলিমরা মূলতঃ রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্ব এবং আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকেই এ সমস্ত আইন-কানুন মেনে চলবে, ধর্মীয় কিংবা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। তাদের কোন অবস্থাতেই এ সমস্ত আইন-কানুনের উপর বিশ্বাস আনতে বাধ্য করা হবে না। কারণ, তা করা হলে তাদের প্রকৃতপক্ষে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহনে বাধ্য করা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই।” [সুরা বাকারাহঃ ২৫৬]
আল্লাহর রাসূল (সা) আহলে কিতাবের অন্তর্ভূক্ত মানুষদের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ কিংবা বিশ্বাসের জন্য তাদের নিপীড়ন করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু, নাগরিক হিসাবে তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রের শাসন-ক্ষমতা ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে শরীয়াহ্ আইন মেনে চলতে হবে।
পরিশেষে এটা বলা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন নীতি হবে রাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর শরীয়াহ্ আইন কার্যকর করা। নাগরিকদের উপর নিম্নোক্ত উপায়ে শরীয়াহ্ আইন কার্যকর করা হবেঃ
১. সকল মুসলিম নাগরিকের উপর শরীয়াহ্ আইন কার্যকর করা হবে।
২. বিশ্বাস এবং উপাসনা সংক্রান্ত বিষয়ে অমুসলিম নাগরিককের উপর কোনরকম হস্তক্ষেপ করা হবে না ।
৩. সাধারণ আইনের আওতায় খাদ্য ও সাজসজ্জা সম্পর্কিত বিষয়ে অমুসলিম নাগরিককে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুসরণ করতে দেয়া হবে।
৪. অমুসলিমদের বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্র তাদের পক্ষ হতে রাষ্ট্র অধিকৃত বিচারালয়ে বিচারক নিয়োগ করবে এবং এ সংক্রান্ত সকল ঝগড়া-বিবাদ উক্ত বিচারালয়েই ফয়সালা করা হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গঠিত কোন আদালত (Private Court) গ্রহনযোগ্য হবে না। কিন্তু, এ সংক্রান্ত বিবাদ যদি অমুসলিম এবং মুসলিমদের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবে তা মুসলিম বিচারকের মাধ্যমে ইসলামী আইন অনুযায়ী ফয়সালা করা হবে।
৫. অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আইনগত লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর কোনরকম পূর্বশর্ত ছাড়াই শরীয়াহ্ কার্যকর করবে।
৬. ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত সকলকেই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হবে। কোনরকম বৈষম্য ছাড়াই রাষ্ট্র তাদের অভিভাবক হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং তাদের সকল কার্যাবলী দেখাশুনা করবে।



















