Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

    ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

    সূচনা:

    পৃথিবীর চিন্তাশীল মানুষেরা আজকে নতুন করে নিজ নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে, তা তারা যে দেশের নাগরিকই হয়ে থাকুক না কেন। আন্তর্জাতিক নিয়ম, রীতিনীতি ও সংস্থাসমূহ ইতিমধ্যেই সচেতন মানুষের আস্থা হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা রক্ষা এবং নিজস্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা আদৌ যাবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মনে আজকে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা (World Order) মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে সাথে আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যু বাংলাদেশের মানুষের মনে যে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে, তা থেকে মুক্তির উপায় আমাদেরকেই খুঁজতে হবে। এই প্রবন্ধে আমি প্রথমেই আজকের আলোচনার শিরোনামের প্রচলিত ধারণাগত ভিত্তি এবং বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে চাই। এরপর বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শক্তির উৎস চিহ্নিত করে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নীতি প্রস্তাবনা আপনাদের সামনে তুলে ধরব।

    ২. ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা: প্রচলিত ধারণাসমূহ

    ২.১ ছোট রাষ্ট্র

    ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ব্যবহার করে তাদের উপনিবেশগুলোকে নিজেদের ইচ্ছামত ভাগ বাটোয়ারা করেছিল। একটি উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তৎকালীন খিলাফতের একটি প্রদেশ সিরিয়াকে (যা শাম নামে পরিচিত ছিল) বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও প্যালেষ্টাইন – এ কয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে এভাবে ওমান, কাতার, আরব আমিরাত, বাহ্‌রাইনসহ পৃথিবীতে অসংখ্য রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদীরা। এর ফলাফলও তারা জানতো। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ফিশার ১৯১৮ সালে ঘোষণা করেছিলেন, “Sooner or later the small states will go. They will be absorbed in large political aggregates… and nobody will regret their demise, last of all the citizens themselves (Kabir, 2005)।

    কখন একটি রাষ্ট্রকে ছোট বা ক্ষুদ্র (Small/micro) রাষ্ট্র বলা হবে, এব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একমত হতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে বলা যায় যে দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, জাতীয় উৎপাদন, সম্পদের পরিমান, উৎপাদন ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে ছোট রাষ্ট্রের পরিমাপ করা হয়ে থাকে। কমনওয়েল্‌থ সেক্রেটারিয়েট এবং বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে ‘১৫ লাখের নীচে জনসংখ্যা’ যে দেশের, সে দেশকে ছোট রাষ্ট্ররূপে সংজ্ঞায়িত করেছে (Kabir, 2005)। সংস্থা দু’টি অবশ্য যৌথ রিপোর্টে স্বীকার করেছে যে There is no single definition of a small country because size is a relative concept” (Kabir, 2005)। যদি ছোট রাষ্ট্রের জনসংখ্যা ১ কোটিও ধরা হয়, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে যে শুধুমাত্র ঢাকা শহরের জনসংখ্যাই এর চেয়ে বেশী। জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে শতাধিক দেশ জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের তুলনায় ছোট এবং ৭৮টি দেশ আয়তনের তুলনায় ছোট (Kabir, 2005)। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান অবশ্য ছোট ও বড় রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে যুদ্ধ করার ক্ষমতাকে অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছেন (Kabir, 2005)। মূলতঃ ভারতের প্রতিবেশী হওয়ায় ভারতের সাথে জনসংখ্যা, আয়তন বা সামরিক শক্তির তুলনামূলক বিচারে নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান, মালদ্বীপের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও অনেকে ছোট রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে।

    ২.২ নিরাপত্তা

    জাতীয় অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান নিরাপত্তাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে The protection and preservation of the minimum core values of any nation, political independence and territorial integrity” (Hafiz & Khan, 1990)। চিন্তাবিদরা নিরাপত্তাহীনতার উৎস হিসেবে সম্ভাব্য বহিঃশক্তির আক্রমণের পাশাপাশি দেশের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় এনেছেন (Hafiz & Khan, 1990)। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক চাপ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেশের জনগণের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি বৃদ্ধি করে। এই চাপ বিদেশী শক্তি থেকে আসতে পারে, আভ্যন্তরীণও হতে পারে (Hafiz & Khan, 1990)। নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় পরিবেশের বিষয়ও ইদানীং বিভিন্ন লেখালেখিতে চোখে পড়ে। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় সামরিক বিষয় যেমন বিবেচ্য; ঠিক তেমনিভাবে খাদ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদি অসামরিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত।

    ছোট রাষ্ট্র এবং নিরাপত্তা বিষয়ে প্রচলিত তাত্ত্বিক ধারণা সম্পর্কে উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর এবার দেখা যাক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা।

    ৩. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা

    ৩.১ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট

    সমাজতন্ত্রের পতন ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মৃত্যু হয়েছে এবং পুঁজিবাদী আদর্শ সাময়িক বিজয় লাভ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কালবিলম্ব না করে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ প্রতিহত করার নামে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে। পুরো নব্বই দশক জুড়ে বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে সারা বিশ্বে নিজের একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর পরই ঘটে ১১ই সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলা। এই হামলা-পরবর্তী মার্কিন কর্মকান্ড তথা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ও ‘ব্যাপক-বিধ্বংসী অস্ত্রের’ অজুহাতে আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণ অনেকের মনে এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে এই দেশগুলো দখল ও তাদের সম্পদ কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যেই কি টুইন টাওয়ার হামলা হয়েছিলো কিনা।

    বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসের ২০০০ সালে ফরেন এফেয়ার্স – এ লেখা এক নিবন্ধে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে-

    (US Foreign Policy)…will also proceed from the firm ground of the national interest, not from the interests of an illusory international community… (US)… ought to decide unilaterally where, when, how and what to attack (Kabir, 2005)। এরপর কারো প্রশ্ন থাকা উচিত নয় কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে তান্ডব ও ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে।

    বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যদি আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি তবে আমরা দেখতে পাবো যে বিশ্বের এক নম্বর মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা পৃথিবীকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে একেকটি অঞ্চল নিজের অনুগত কোন চামচা বা মোসাহেবকে বর্গা দিয়েছে। যেমন ব্রিটেনকে দিয়েছে ইউরোপ, ইসরাইলকে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, অষ্ট্রেলিয়াকে দিয়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারতকে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি। মার্কিন স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহে (কৌশলগত, সম্পদ বা যে কারণেই হোক না কেন) নিজের তাঁবেদার মেরুদন্ডহীন শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসিয়ে রেখেছে। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ হাসিল করা নিশ্চিত করেছে।

    আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের ভূমিকা: এই পুরো সময়ে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আফগানিস্তান আক্রমণ করা হয়েছে জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে আর ইরাক আক্রমণ করা হয়েছে জাতিসংঘকে তোয়াক্কা না করেই। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে জাতিসংঘ মুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষী এবং মার্কিন-ব্রিটিশ-ইসরাইলের হাতের পুতুল। তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস কামনা করে। এক্ষেত্রে ওআইসি ও আরব লীগের মত সংস্থাগুলো রীতিমত আগ্রাসী শক্তির সহায়কের ভূমিকা পালন করে আসছে। তাদের একমাত্র কাজ মুসলিম জনগণের ক্ষোভ ও আবেগ অনুভুতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, যাতে সাম্রাজ্যবাদীরা নিশ্চিন্তে তাদের আগ্রাসী কার্যকলাপ অব্যাহত রাখতে পারে।

    গণতন্ত্রের মার্কিন চেহারা ও বিশ্বায়ন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চাচ্ছে যে ইরাক-আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তারা মানুষকে মুক্তি ও স্বাধীনতা দেয়ার জন্য এই আগ্রাসন চালাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই পঞ্চাশ ভাগ ভোটার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয় না। আর এই পঞ্চাশ ভাগেরও অর্ধেক ভোট বর্তমান প্রেসিডেন্ট বুশ ছলে-বলে-কৌশলে অর্জন করেছিলেন। এক চতুর্থাংশ মার্কিনীদের সমর্থন নিয়ে বুশ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। বুশ তার এই গণতন্ত্র জোরপূর্বক ইরাক-আফগানিস্তানে চাপিয়ে দিতে চায় অথচ আপন স্বার্থ হাসিলের জন্য পাকিস্তানের সামরিক শাসন ও মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছে।

    মানুষের সম্পদ লুটপাটের জন্য ‘বিশ্বায়ন’ (Globalization) নামে নতুন এক ধারণার জন্ম দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। বিশ্বায়নের নামে সারা বিশ্বে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্প প্রতিষ্ঠা করছে। যে পরিমাণ অর্থ তারা লগ্নী(investment) করে, তার চেয়ে বহুগুণ অর্থ ঐ দেশের জনগণকে শোষণ করে তারা নিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে বিভিন্ন দেশের পুরো অর্থনীতিকে তারা নিজেদের সুবিধামতো সাজিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর পুরো ব্যাপারে জনগণকে নেশাগ্রস্থ ও অন্ধকারে রাখার জন্য রয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও মিডিয়া প্রপাগান্ডা।

    মার্কিন-ভারত-ইসরাইল চক্র: ইসরাইল ও ভারত – এই দু’টি রাষ্ট্র মার্কিন নীতি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনে নিজেরা অনুসরণ করছে। লেবাননে ইসরাইলী হামলা এর সাম্প্রতিকতম প্রমাণ। এই তিন গণতান্ত্রিক দেশ সন্ত্রাস মোকাবেলার নামে মুসলিম ভুখন্ডে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে একমত। ভারতের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র এই তিনদেশের জোট সম্পর্কে বলেছেন : “Such an alliance would have the political will and moral authority to take bold decisions in extreme cases of terrorist provocation” (Mazhar, 2006)। শীর্ষ পর্যায়ের এক নীতি নির্ধারণী সভায় এই তিনদেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, “The US, India and Israel as sister democracies and common victims of international terrorism should pool their resources and experiences in dealing with this menace” (Mazhar, 2006)। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই menace হচ্ছে ইসলামী আদর্শের উত্থান (তাদের ভাষায় Political Islam) এবং তাদের এই সিদ্ধান্ত মুসলিম ভুখন্ডের উপর আগ্রাসনেরই নীল নকশা।

    ৩.২ আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট

    আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা: এই উপমহাদেশের সার্বিক বিষয়ের দায়িত্ব ভারত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বলতেন যে “India is now saddled with the responsibility to maintain the stability, status-quo and the character of this region” (Hafiz & Khan, 1990)। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অঞ্চলে ভারত ইতিমধ্যেই নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এই ব্যাপারে মার্কিন সমর্থনও তারা আদায় করে নিয়েছে। সিকিম ও ভুটানকে হজম করার পর নেপাল তাদের বর্তমান টার্গেট। শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপও মানতে বাধ্য হয়েছে ভারতের আধিপত্য। তবে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান পারমানবিক শক্তির অধিকারী হওয়াতে এই দুই দেশ পরস্পরের সাথে শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখেছে।

    ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক: ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। বিগত ৩৫ বছর যাবত ভারত একের পর এক ইস্যু তৈরী করে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ফারাক্কা বাধ, টিপাইমুখ বাধ, আন্তঃনদী সংযোগ, সীমান্তে বিএসএফের হামলা ও হত্যাযজ্ঞ, কাঁটাতারের বেড়া, পুশইন, ছিটমহল, তালপট্টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা, অসম বাণিজ্য, ট্রানজিট, ত্রিদেশীয় পাইপলাইন, সমুদ্র সীমা নির্ধারণ, টাটার বিনিয়োগ ইত্যাদি অসংখ্য ইস্যু একতরফাভাবে ভারতের তৈরী। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির সভাপতি রাজনাথ সিং সন্ত্রাসীদের ঘাটি গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আক্রমণের আহবান জানান। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতের পত্র-পত্রিকায় ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের উপর সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের আহবান জানিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী ভারতের সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদী মনোভাবের মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। বিগত দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর সাথে ভারতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশের যোগসূত্র স্থাপন করলে বাংলাদেশের জনগণের আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবাজি আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারতের মার্কিনীদের কাছে অভিযোগ উত্থাপন শুধুমাত্র একটি বিষয়েই দিক নির্দেশ করে। আর তা হলো যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে আফগানিস্তান, ইরাক ও লেবাননে হামলে পড়েছে, সেই একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও জঙ্গী দমনের অজুহাতে আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা।

    বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্ক: বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্কের মধ্যেও রয়েছে অনেক উত্থান-পতন। আরাকানে রোহিঙ্গা সমস্যা, সমুদ্রে জলদস্যু এবং বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস আহরণ ইত্যাদি এই দুই দেশের মধ্যে অমিমাংসিত ইস্যু। রোহিঙ্গা উদ্বাস্ত সমস্যা সহ্য করে বাংলাদেশের নেয়া ‘পূর্বমুখী নীতিতে’ (Look east policy) মায়ানমারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও আসিয়ান দেশসমূহের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের এই প্রক্রিয়া কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন দিক উম্মোচনের সম্ভাবনা তৈরী করেছে। কিন্তু বর্তমানে হয় ভারত-মার্কিন চাপে অথবা মায়ানমারের অসহযোগিতার কারণে এই প্রক্রিয়া সামনে অগ্রসর হচ্ছে না।

    ৩.৩. জাতীয় প্রেক্ষাপট

    বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হচ্ছে দুই বৃহৎ দলের কোন্দল, যা অতীতে জাতির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই কোন্দলের কারণে বিদেশী শক্তি সহজেই দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগে পায়। শুধুমাত্র ক্ষমতা লাভকে কেন্দ্র করে পরিচালিত রাজনীতির ফলে এদেশে কোন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে উঠেনি, এমনকি একটি জাতীয় প্রতিরক্ষানীতি পর্যন্ত তৈরী করা হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত ও মার্কিন ভূমিকা সবচেয়ে বেশী আলোচিত বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রয়োজন মতো বাংলাদেশকে “মডারেট মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” অথবা “উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সন্ত্রাসপ্রবণ সমাজ” (Moderate Muslim democracy to high-risk terrorist prone society) রূপে আখ্যায়িত করে। ভারতও নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য কখনো বন্ধুর বেশ ধরে, কখনো আবার বাংলাদেশকে জঙ্গী আস্তানা সাব্যস্ত করে। তবে ভারত-মার্কিন স্বার্থ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন কিনা সে বির্তক এখনো সিদ্ধান্তমূলকভাবে শেষ হয়নি।

    ৪. বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি

    ৪.১ আভ্যন্তরীণ

    বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি এদেশের চলমান দ্বন্দ্ব সংঘাতপূর্ণ স্বার্থের রাজনীতি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক চরম বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হলেও এদেশের জনগণ যখন সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে তখন এই দেশের তথাকথিত নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতির সকল ক্ষেত্রে চরম অসহিষ্ণুতার সাক্ষর রেখেছে। তারা এতটাই ক্ষমতালোভী যে প্রয়োজনে বিদেশী শক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতেও দ্বিধা করেনা।

    ৪.২ বিদেশী শক্তি

    এদেশের মানুষের মধ্যে অন্যান্য মুসলিম দেশের মতোই ইসলামী চেতনা দিন দিন জেগে উঠছে। ইসলামের উত্থানে যাদের বিশ্ব ও আঞ্চলিক কর্তৃত্ব হুমকির সম্মুখীন, তারা নিশ্চয়ই এই জাগরণকে সহ্য করবে না। সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশীয় দোসর আর র, আই.এস.আই, মোসাদ ও সি. আই.এ’র অবাধ ও অবৈধ কার্যকলাপ দেশের মিডিয়াতে মাঝে মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। এদেশের মানুষের মধ্যে একতার বীজ ইসলাম তাদের আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্যবস্তু। ঐক্যবদ্ধ ইসলামী জনতা সম্পর্কে তারা সবচেয়ে বেশী ভীত এবং এই উত্থানকে ঠেকাতে তারা সবচেয়ে বেশী সংকল্পবদ্ধ।

    এই ঝুঁকি মোকাবিলার উপায় হচ্ছে সমগ্র দেশবাসীকে ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে গণজাগরণ সৃষ্টি করা। ইসলামের শত্রুরা যে ভয় সবচেয়ে বেশী করছে, তাদের সে ভয়কে বাস্তবে রূপ দেয়ার মধ্যেই রয়েছে এই নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার একমাত্র উপায়। ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা এর সপক্ষে যুক্তি দেয়। আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে বলতে হবে যে ইসলামের মধ্যে কোন ‘সংখ্যালঘু’ ধারণা নেই। ইসলাম মুসলিম-অমুসলিম সকলের বিশ্বাস, জীবন ও সম্পদের নিশ্চিত নিরাপত্তা দেয়। আর একমাত্র ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষেই এই নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে বলতে হবে যে চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিম-খ্রীষ্টান-ইহুদীসহ সকল ধর্মের মানুষকে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দিতে পেরেছিল। পাক-ভারত উপমহাদেশে আটশত বছরের মুসলিম শাসনেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এর কোন ব্যতিক্রম ছিল না। সুতরাং একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষেই সকল মানুষের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব।

    ৫. নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার উপায়

    ৫.১ তাত্ত্বিক ভিত্তি ও পররাষ্ট্রনীতি

    সমগ্র পৃথিবী ও মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন সুষ্পষ্টভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহ্‌ এ আলোকপাত করেছেন। আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন বলেন :

    (১) … এবং কিছুতেই আল্লাহ্‌ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না। (সুরা নিসা ১৪১)

    (২) তিনিই তার রাসুল (সাঃ) কে প্রেরণ করেছেন পথনির্দেশ ও সত্যধর্ম সহকারে, যাতে একে সকল জীবনব্যবস্থার উপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরেকরা তা অপছন্দ করে। (সুরা আছ্‌-ছফ-৯)

    (৩) হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করোনা, তারা একে অপরের বন্ধু …। (সুরা মায়েদা – ৫১)

    (৪) তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানব জাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে …। (সুরা আলিইমরান – ১১০)

    (৫) ইহুদী ও ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন …। (সুরা বাকারা – ১২০)

    (৬) আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরেকদেরকে পাবেন…। (সুরা মায়েদা – ৮২)

    উপরোক্ত আয়াতসহ অসংখ্য আয়াত ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ্‌ থেকে এটা স্পষ্ট যে ইসলামী রাষ্ট্রর পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি নিম্নরূপ:

    ১. ইসলামী রাষ্ট্র কখনোই অন্যের আধিপত্য মেনে নিতে পারেনা।

    ২. অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি চুক্তি হতে পারে।

    ৩. ইসলামের বাণী ও ন্যায়বিচার পৃথিবীতে অন্যান্য জাতির সামনে তুলে ধরার নীতিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।

    ৫.২ বাংলাদেশের শক্তির উৎস

    বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র নয়। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হবার মতো অনেক উপাদান বাংলাদেশে বিদ্যমান।

    এদেশে রয়েছে:

    ১. ১৭ কোটি মানুষ, যার অধিকাংশ মুসলমান। নেতৃত্ব দুর্বল ও বিভক্ত হলেও বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে এই জাতি ঐক্যবদ্ধ।

    ২. ভৌগলিক পরিবেশের (বিশেষত: নদীমাতৃক সবুজ সমতল ভূমি) কারণে কোন বহিঃশক্তি কখনো এই ভূমিকে বেশীদিন নিজের অধীনে রাখতে পারেনি। রাশিয়া আক্রমণ করে যেমন হিটলার চরম মাশুল দিয়েছিলো, তেমনি এদেশের মাটি দখলে রাখতে যেকোন বিদেশী শক্তির চরম খেসারত দিতে হবে।

    ৩. বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে এই দেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। অন্যভাবে দেখলে বলা যায় যে, ভারত ও চীনের মাঝে স্বাধীন মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। আমরা দেখেছি যে এই কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সেনা ঘাটি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

    ৪. অনেকেই ভারতের পেটের ভিতরে বাংলাদেশের অবস্থানকে বাংলাদেশের দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেন। আমি সবাইকে বলবো যে কারো ঘরের অভ্যন্তরে অবস্থানকে কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তির উৎস হিসাবে দেখার জন্য।

    ৫. বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমিক, শৃংখলাবদ্ধ, দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন। আর সশস্ত্র বাহিনীর সাথে এদেশের জনগণের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অন্যতম পুঁজি।

    ৫.৩ খসড়া প্রতিরক্ষা নীতি

    ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির মূলভিত্তি এবং বাংলাদেশের শক্তির উৎস অনুধাবন করে আমরা বাংলাদেশের জন্য খসড়া প্রতিরক্ষা নীতির মূলনীতি উপস্থাপন করছি:

    ১. সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা: দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীকে সার্বিকভাবে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের একমাত্র শৃংখলাবদ্ধ ও দক্ষ শক্তি। এজন্য

    ক. প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বাহিনীকে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে।

    খ. কোন বিষয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে তা নির্ধারণ করাও একটি জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা মনে করি সমগ্র দেশবাসীর জন্য তিনটি বিষয় রক্ষা করা জরুরী। প্রথমত: এদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের বিশ্বাস (তা সে যে ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকুক না কেন); দ্বিতীয়ত: দেশের মানুষের জীবন; এবং তৃতীয়ত: রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ। উল্লেখিত জীবন ও সম্পদের মধ্যে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, ভৌগোলিক পরিবেশ (নদী, মৎস্য ও বনজ সম্পদ ইত্যাদি), খনিজ সম্পদ (গ্যাস, তেল, কয়লা ইত্যাদি) ও কৌশলগত সম্পদ (বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সমূহ, তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ, শিল্প ইত্যাদি)।

    গ. যারা বলে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর কোন প্রয়োজন নেই তারা নিঃসন্দেহে এদেশের মানুষের বিশ্বাস, জীবন এবং সম্পদ সম্পর্কে কোন তোয়াক্কা করে না। তারা বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে মাত্র। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সিরিয়া, মিশর ইত্যাদি দেশের মত আজ্ঞাবহ সশস্ত্রবাহিনী এদেশের জনগণের কোন প্রয়োজন নেই।

    ঘ. সশস্ত্রবাহিনীর বাজেট নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। এক্ষেত্রে বলতে চাই যে সামগ্রিক বাজেটের অথবা জিডিপির নির্দিষ্ট কোন শতাংশ অথবা অন্য কোন দেশের সাথে কোন প্রকার তুলনা প্রতিরক্ষা বাজেটের ভিত্তি হতে পারে না। আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেট হবে আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে। আর আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

    ঙ. প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশী নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমাদের নিজেদেরকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উৎপাদনের দিকে মনযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে গবেষণা করে এদেশের উপযোগী সরঞ্জাম উদ্ভাবন করতে হবে।

    ২. সিটিজেন’স আর্মি: বর্তমান সামরিক-বেসামরিক নিবিড় সর্ম্পককে আরো এগিয়ে নিয়ে সাধারণ জনগণকে দেশের প্রতিরক্ষায় আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই সম্পৃক্ততার ধরণ হবে নিম্নরূপ:

    ক. সমগ্র জনগণকে প্রাথমিকভাবে জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং দেশের শত্রু-মিত্র সম্পর্কে জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেয়া

    খ. ১৫ বছরের উর্ধ্বে দেশের প্রত্যেক তরুণকে বাধ্যতামূলক মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া (Nabhani, 1998)। দেশে প্রচলিত স্কুল পর্যায়ের সর্বশেষ পরীক্ষার পরে প্রতি স্কুলে দুই মাসব্যাপী এই প্রশিক্ষণ এর আয়োজন করা যেতে পারে।

    গ. যারা স্কুলে গন্ডি পেরিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে যারা এখনো চল্লিশ বছর অতিক্রম করেননি, তাদেরকে পর্যায়ক্রমে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।

    ৩. প্রযুক্তি: জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ বা উদ্ভাবনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে পাকিস্তান ও ভারত পারমানবিক শক্তি অর্জন করায় উভয়েই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে সক্ষম এবং তাদের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য বিরাজ করছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পারমানবিক স্থাপনা পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিচালনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে দেশীয় পারমানবিক স্থাপনা তৈরী করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষকরা এই মতামত আগেই দিয়েছিলেন; “Efforts  could be launched to pursue long-term planning to acquire nuclear weapons technology or explore the prospects, if any (Hafiz & Khan 1990). পারমানবিক শক্তি অর্জনের পদ্ধতি এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ নিয়েও তারা ইতিপূর্বে বক্তব্য রেখেছেন। মূলকথা হল পারমানবিক শক্তি, সাবমেরিন, অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান ইত্যাদি যে প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ উপমহাদেশে শক্তির ভারসাম্য অর্জন করতে পারবে, দীর্ঘমেয়াদে তাই আমাদেরকে করতে হবে।

    ৪. কুটনৈতিক তৎপরতা: সামরিক শক্তি একটি দেশের নিজস্ব পছন্দ বা সিদ্ধান্ত। কিন্তু কুটনীতির বিষয়টি সেরকম নয়। বহিঃর্বিশ্বে বন্ধু সন্ধানের প্রচেষ্টা আমাদের অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। তবে এটা বলতেই হয় যে চারিদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় “Friendship to all, malice to none” জাতীয় হাস্যকর পররাষ্ট্রনীতি একান্তই পরিত্যাজ্য। একমাত্র পাগল ও নাবালকের কোন শত্রু থাকতে পারে না। এই নীতি একটি দেশের দুর্বলতার পরিচয় বহন করে মাত্র। আমাদের কুটনীতিবিদদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দরকষাকষির জন্য (Negotiation) প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।

    ৫. গবেষণা, উন্নয়ন ও শিল্পায়ন: সশস্ত্রবাহিনী প্রত্যেক আদর্শিক রাষ্ট্রে গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবনে নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে। আধুনিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন- ব্যবস্থাপনা, বিপনন ও বিভিন্ন সামগ্রী- যেমন গাড়ী, উড়োজাহাজ, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি খাতে সশস্ত্রবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। মেধাসম্পন্ন এই জনশক্তি এদেশেও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এই বাহিনী পরবর্তীতে গবেষণালব্ধ ফলাফলকে শিল্পে রূপ দিতেও সক্ষম। এভাবে সশস্ত্রবাহিনী জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারে।

    ৫.৪ নীতির যৌক্তিকতা

    উপরোক্ত নীতি বাস্তবায়নের পথে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন জনগণকে প্রশিক্ষণ, পারমানবিক শক্তি অর্জন এবং সার্বিক পরিকল্পনার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে। জনগণকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যাপারে প্রথমে একটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরতে চাই যেখানে বলা হয়েছে ১৯৫০-এর দশকে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৫২ ভাগ আর ১৯৮০-এর দশকে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৮৫ ভাগ (Hafiz & Khan, 1990)। আমি নিশ্চিত যে বর্তমানের ইরাক, আফগানিস্তান ও সর্বশেষ লেবাননের যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৯৯ ভাগ। সুতরাং সকল সাধারণ জনগণের মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশে প্রশিক্ষিত সাধারণ মানুষ আগ্রাসী শক্তির ভয়ের কারণ (Deterence) হয়ে দাড়াবে।

    এবার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বলতে চাই। বলা হয়ে থাকে যে সামরিক খাতে বাজেট বৃদ্ধি হলে উন্নয়ন খাতে কাংখিত অগ্রগতি অর্জিত হবে না। এসম্পর্কে দু’টি কথা। প্রথমত: বর্তমান সম্পদ বন্টনের যে ধারা চলছে তাতে কি আমাদের সামাজিক উন্নয়ন সংগঠিত হচেছ? আরো বেশী সম্পদ সামাজিক খাতে দিলে কি উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচন নিশ্চিত হবে, না দুর্নীতি ও লুটপাট বৃদ্ধি পাবে? সামরিক খাতে খরচ অনুৎপাদনশীল কেন বলা হচ্ছে ? মার্কিন অর্থনীতি টিকেই আছে সামরিক খাতকে কেন্দ্র করে। সকল তথাকথিত উন্নত দেশের ক্ষেত্রে (যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে) এই কথা প্রযোজ্য। আমরা আমাদের বাহিনীকে আগ্রাসী শক্তিরূপে দেখতে চাইনা। তবে যে কোন বিদেশী শক্তির আক্রমণের মুখে একটি সক্ষম বাহিনী রূপে দেখতে চাই। এই বাহিনী নিজে উৎপাদন ও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে যা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।

    ৬. উপসংহার

    আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী আর ভারতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশের কারণে বাংলাদেশের জনগণ আজকে শঙ্কিত। দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবাজি আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারতের মার্কিনীদের কাছে অভিযোগ উত্থাপনের ফলে দেশবাসী আতঙ্কিত। যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে আফগানিস্তান, ইরাক ও লেবাননে হামলে পড়েছে, সেই একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও জঙ্গী দমনের অজুহাতে আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা, তা আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণ করা আজ জরুরী হয়ে পড়েছে। আমরা মনে করি এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাহিনীর রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ ও উদ্ভাবন আমাদের জন্য নতুন দিগন্তের সুচনা করবে। জনগণকে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া আমাদের প্রতিরক্ষার নীতির অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। গবেষণা ও শিল্পায়নে সশস্ত্রবাহিনী যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। একই সাথে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যে যদি সশস্ত্রবাহিনীর রিমোট কন্ট্রোল ওয়াশিংটন, দিল্লী বা অন্য কোথাও থাকে, তবে দেশবাসীর জন্য এই বাহিনী হবে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই কুরআন-সুন্নাহ্‌ অনুসরণ করে প্রস্তুত এই প্রস্তাবিত পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন করতে পারে। দৃঢ়সংকল্প, দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ও শক্তিশালী নেতৃত্ব, ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ জনগণ এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্রবাহিনীই এদেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করতে সক্ষম।

    Bibligraphy 

    (1) Mohammad Humayun Kabir (editor), Small States and Regional Stability in South Asia, Bangladesh Institute of International and Strategic Studies, University Press Limited, 2005 

    (2) M Abdul Hafiz and Mizanur Rahman Khan (Editor), Development, Politics and Security: Third World Context, Bangladesh Institute of International and Strategic Studies, Civil and Military Press, 1990 

    (3) Farhad Mazhar, Gonoprotirokkhma, Oitijjhya, 2006 

    (4) Taqiuddin an-Nabhani, The Islamic State, Khilafat Prokashoni, 1998

    Posted by Visionary 

  • ইসলামী দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব

    ইসলামী দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব

    দাওয়ার অগ্রগতির জন্য দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বিরাজমান থাকার বিষয়টি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। এ বিষয়টি যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন না করা হয় বা অবহেলা করা হয় তবে তা দাওয়ার ফরজিয়্যাত পালনে অবহেলার দিকে নিয়ে যাবে এবং ফলশ্রুতিতে আল্লাহর ক্রোধ আমাদের উপর আপতিত হবে।

    নিম্নের আলোচনায় আমরা দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনা করব। এক্ষেত্রে আমাদের জানতে হবে, পরিবেশ বলতে আমরা কী বুঝি, ভুল পরিবেশের উদাহরণ এবং তা কিভাবে উদ্ভুত হয়, সবশেষে সঠিক পরিবেশ কী এবং তা কিভাবে বজায় রাখতে হয়।

    পরিবেশের অর্থ:

    কোনো চিন্তাকে কোথাও ক্রমাগত বাস্তবায়ন করতে থাকলে একটি পরিবেশের সূচনা হয়। সাধারনত মানুষ একটি পরিবেশকে অনুভব করতে পারে। উদাহরণসরূপ, ঘরে কিংবা বাইরে, মসজিদ কিংবা খেলার মাঠে, স্কুল কিংবা মাদ্রাসায় একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ বিদ্যমান থাকে। যেমন, কোনো বাসায় যদি নারী ও পুরুষের মধ্যে মধ্যে অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ থাকে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে মিলিত হবার জন্য পৃথক স্থান থাকে, তবে বাইরের কেউ (যে এধরনের বিষয় পালন করেনা) সে এই বাসায় গেলে তার স্ত্রীকে পরিবেশের প্রভাবে অন্যান্য নারীদের সাথেই অবস্থান করার জন্য বলবে। একইভাবে, কোনো স্কুল বা কলেজ যেখানে মনযোগ দিয়ে পড়াশুনা করার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়, শ্রেণীকক্ষে ছাত্র-ছা্ত্রীদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথনকে অত্যন্ত গর্হিত হিসেবে দেখা হয়, সেখানে কোনো নতুন ছাত্র বা ছাত্রী ভর্তি হলে সেও পরিবেশের প্রভাবে নিজেকে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে, যদিওবা হয়তো সে এধরনের অধ্যয়নের পরিবেশে সে আগে কখনো পায়নি।

    এই বাস্তবতাকে আরো বৃহত্তরভাবে চিন্তা করলে তাকে জনমত কিংবা জনগণের সাধারন (common) চিন্তা বলতে পারি।

    পরিবেশ নিশ্চিতভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, পরিবেশ যদি ভালো হয় তবে তা ভালো প্রভাব ফেলবে আর যদি বিদ্যমান পরিবেশে ভালোর পরিমান কম হয় তবে মন্দ প্রভাব ফেলবে। উদাহরনসরূপ, একটি শিশু যখন তার গৃহে বেড়ে উঠে তখন তার ঘরের পরিবেশ অবশ্যই তাকে প্রভাবিত করবে। সুতরাং, ঘরে যদি গালাগালি, খবরদারি, কোন্দল ও পাপাচারের পরিবেশ থাকে তবে সে এর কু-প্রভাব শিশুর উপর পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। অপরদিকে যদি ঘরের অভ্যন্তরে তাকওয়া, আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামী আলোচনা ইত্যাদির পরিবেশ থাকে তবে স্বাভাবিকভাবে শিশু তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবে।

    সাধারনত ধারনা করা হয়ে থাকে পরিবেশ বজায় রাখা মূলত কিছু ব্যক্তির দায়িত্ব। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিকোন হতে আমরা প্রত্যেকেই এর জন্য দায়িত্বশীল। এটি প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য এবং এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত। অর্থাৎ, যদি আমি অনুভব করি যে পরিবেশের ব্যাঘাত ঘটেছে, তবে আমার অবশ্যই নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করতে হবে, নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে যে, আমি কি সে দায়িত্ব পালন করেছি কিনা যা এ অবস্থায় আমার করা উচিত ছিল। সুতরাং, প্রত্যেককেই সঠিক পরিবেশ সৃষ্টি ও ভুল পরিবেশ অপসারণের জন্য কাজ করে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন. তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তিনি (সা) আরো বলেন, তোমাদের প্রত্যেকেই ইসলামী সীমান্তসমূহের এক একটি সীমান্ত। তিনি (সা) আরো বলেন, মানুষের মধ্যে কতক রয়েছে যারা কল্যাণের চাবি এবং অকল্যাণের তালা। আবার কতক রয়েছে যারা অকল্যাণের চাবি এবং কল্যাণের তালা।

    রাসূলুল্লাহ (সা) সুন্দর পরিবেশের গুরুত্বারোপ করেছেন যখন তিনি (সা) বলেন, 

    আবু মূসা হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন, 

    مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَكِيرِ الْحَدَّادِ لَا يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا تَشْتَرِيهِ أَوْ تَجِدُ رِيحَهُ وَكِيرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً

    খারাপ সাহচর্যের তুলনায় একটি ভালো সাহচর্যের উদাহরন সুঘন্ধি বিক্রেতা ও কামারের চুল্লির ন্যায়। প্রথম উদাহরণে তুমি হয় সুঘন্ধি কিনবে কিংবা তার সুঘ্রাণ উপভোগ করবে। আর দ্বিতীয় উদাহরণে সেই চুল্লি তোমার কাপড় বা বাড়ি পুরিয়ে দেবে কিংবা তুমি তা হতে একটি বাজে গন্ধ পাবে। [বুখারী]

    হাদীসের এই উপমা বিষয়টিকে আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করে যে পরিবেশের প্রভাব ভালো বা খারাপ ঘ্রানের মতোই।

    রাসূল (সা) আবারও ভালো ও মন্দ সাহচর্যের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা একে অপরের সাথে মিলিত হলে তাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ বিরাজ করে। অর্থাৎ, পরিবার-পরিজনের মধ্যকার পরিবেশ হতে বন্ধু-বান্ধবের মধ্যকার পরিবেশ সাধারনত ভিন্ন হয়। তিনি (সা) বলেন,

    الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ

    ব্যক্তি তার ঘনিষ্ট বন্ধুর দ্বীন (বিশ্বাস, স্বভাবচরিত্র)-এর উপর থাকে। সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেরই দেখা উচিত কার সাথে সে বন্ধুত্ব করছে। [তিরমিযি]

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) উল্লেখ করেন, তোমার দুনিয়ার বন্ধুরা আখিরাতেও তোমার বন্ধু হবে।

    দলের অভ্যন্তরের পরিবেশ:

    এটি অনুধাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ইসলামী আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল উম্মাহর পুনর্জাগরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে। এর অর্থ এই দলের কর্মীরা নিয়মিত বিভিন্ন পাঠচক্র, আলোচনা, সভা ও বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিয়মিত পরস্পরের সাথে মিলিত হবে এবং জনগণের মন জয়ের কাজে নিয়োজিত থাকবে।

    সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই দলের মধ্যে একটি পরিবেশ তৈরি হয়। এই পরিবেশটি যদি সঠিক হয়, তবে তা দাওয়াহর কাজকে সহযোগিতা ও এর উন্নয়নে সহায়তা করবে।

    সঠিক পরিবেশ বজায় না রাখার কু-প্রভাব:

    সমাজের জাহিলিয়্যাত আমাদের ভাইদের প্রভাবিত ও বিচলিত করে। ফলে তারা দলের পরিবেশে এসে তা থেকে আশ্রয় অন্বেষন করে। যদি তারা তা না পায়, তবে দল, দলের কর্মী, দলের চিন্তার প্রতি তাদের বিশ্বাস নিচে নেমে যায়, দূর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে এ অবস্থা দল থেকে তার ঝরে পড়ার উপলক্ষ্যে পরিনত হয়। এক ভাইয়ের সাথে অপর ভাইয়ের সাক্ষাৎ আমাদের স্বস্তির উপলক্ষ্যে পরিনত হতে হবে এবং এ পরিবেশ দলের অভ্যন্তরে প্রত্যেককেই বজায় রাখতে সচেষ্ট হতে হবে। 

    সঠিক পরিবেশ বজায় না থাকার কিছু কারণ নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো,

    ১) অধিক হাস্যরস:

    কখনো কখনো দেখা যায়, দাওয়াহ ও জ্ঞানের পরিবেশের পরিবর্তে দলের মধ্যে একটি মাত্রাতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা ও পরিহাসে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে দাওয়াহ ভাব-গাম্ভীর্যতা ক্ষুন্ন হয় এবং দাওয়াহ তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।

    আনাস (রা) হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন:

    لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا

    “আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম ও কাঁদতে বেশি।” এ কথা শোনার পর সাহাবীগণের মধ্যে এমন কান্নার রোল পড়ে যায় যে তাঁরা মুখ ঢেকে ফেলেন।

    অধিকমাত্রায় হাসি-তামাশা করা থেকে দাওয়াকারীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। তাদের বুঝতে হবে প্রত্যেক বিষয়েরই নির্দিষ্ট সময়, জায়গা ও পরিমান রয়েছে যার বাইরে তা করা শোভনীয় নয়। তাদের এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে অধিক মাত্রায় হাসি-ঠাট্টার ফলে দাওয়ার ভাবগম্ভীর কথা হালকা শোনায়, দাওয়াহ তার উত্তাপ হারায় এবং এর অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। দাওয়ার পরিবেশ অবশ্যই ফিকহ, উসূল আল-ফিকহ, রাজনৈতিক বিশ্লেষন, উম্মাহর বাস্তবতা ও নাফসিয়্যাহ সংক্রান্ত আলোচনায় ভরপুর হতে হবে।

    শায়খ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) তার আত-তাফকীর (Thinking) বইয়ে বলেন,

    (মানুষের) চিন্তার মধ্যে গুরুতর অবস্থা (seriousness) অবিচ্ছেদ্যরূপে থাকে না, তাই মানুষের অধিকাংশ চিন্তাই ভাবগাম্ভীর্যতা বিবর্জিত। অভ্যাস ও ধারাবাহিকতা রক্ষার তাগিদে মানুষ কাজ করে যায়। আমোদ-প্রমোদ চিন্তায় আলাদারূপে বিদ্যমান দেখা যায়। তাই জোর করে (কৃত্রিমভাবে) হলেও গুরুতর অবস্থা (ধরে রাখার) অনুশীলন করতে হবে যেখানে (এই) ভাবগাম্ভীর্যতার ভিত্তি হবে (ব্যক্তির) সংকল্পবদ্ধতা, বাস্তবতা নয়। মূলত, গুরুতর অবস্থা (seriousness) ধরে রাখাটাই মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং, এটি নিশ্চিতভাবে বলতে হবে, ভাবগাম্ভীর্যতা (বা গুরুতর চিন্তা) মানুষের মধ্যে স্বভাবজাত নয়, যদিও কিছু মানুষকে প্রকৃতিগতভাবেই ভাবগম্ভীর হিসেবে প্রত্যক্ষ করা যায়।

    মূলত যা বোঝানো হচ্ছে যে, প্রাত্যহিক চিন্তায় মানুষ সাধারনত serious থাকে না। এবং বর্তমান সমাজের পরিবেশে এটি আরো বাস্তব যেখানে মানুষ টেলিভিশন, নাটক-সিনেমা ও গান-বাজনার সস্তা বিনোদনে ডুবে আছে। কিন্তু, আমাদের জোড় করে হলেও ভাবগম্ভীর (serious) পরিবেশ ধরে রাখতে হবে যদি তা আমাদের মধ্যে স্বভাবজাত না।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাও গুরুত্বারোপ করে বলেন,

    أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ ~وَتَضْحَكُونَ وَلا تَبْكُونَ

    তোমরা কি এই কথার বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ, ক্রন্দন করছ না?(আন নাজমঃ৫৯,৬০)

    ২) অন্যান্য দল নিয়ে অধিক মাতামাতি:

    কোনো সত্যিকারের উদ্দেশ্য ছাড়াই অন্যান্য দল নিয়ে আলোচনার আধিক্যও দলের কর্মীদের মধ্যে দেখা দিতে পারে। এর ফলে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির আলোচনার পরিবর্তে দাওয়াকারীগণ ক্রমাগত অন্যান্য দল নিয়ে আলোচনায় রত থাকে যার অনেকটাই অনর্থক। এ ধরনের অভ্যাস দলের মধ্যে অনেক সমস্যা তৈরি করে। বিশেষ করে এতে কোনো নতুন কেউ কর্মী হিসেবে দলে প্রবেশ করতে মানসিক বাধা অনুভব করে বিশেষ করে যাদের অন্যান্য দলের প্রতি উষ্ণ অনুভূতি রয়েছে। এমনকি সাধারন কোনো ব্যক্তিও অভ্যন্তরের পরিবেশকে কাঁদা ছোড়াছুড়ির পরিবেশ মনে করে দলের সাথে সম্পর্ক তৈরি থেকে বিরত থাকতে পারে। যেহেতু এধরনের আলোচনা আবেগসম্পন্ন এবং তা দলের কর্মীদের নিজেদেরকে অন্যদের হতে শ্রেষ্ঠ হওয়ার অনুভুতি প্রদান করে, তাই এ ধরনের পরিবেশ আমরা কিছু দলের মধ্যে উপস্থিত দেখব। কিন্তু উম্মাহর পুনর্জাগরনের কর্মীদের এ বিপদ থেকে অত্যন্ত সাবধান থাকতে হবে।

    শায়খ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) তার বই মাফাহীম (Concepts)-এ বলেন,

    “এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী যে উম্মাহর সাথে বাস করে তাদের হতে নিজেদের এটি যেন পৃথক কোনো সত্ত্বা না মনে করে। বরং তারা নিজেদের উম্মাহর একটি অংশ মনে করবে কারণ উম্মাহর সদস্যরা মুসলিম যেরকম দলের সদস্যরা মুসলিম। দলের সদস্যরা অন্য কোনো মুসলিম হতে কোনো অংশে বেশি উত্তম নয় যদিও তারা ইসলাম বোঝে ও এর জন্য কাজ করে। দলের ব্যক্তিগণের জন্য রয়েছে বেশি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা, মুসলিমদের সেবা করার নিমিত্তে ও আল্লাহর দৃষ্টির আওতায় ইসলামের জন্য কাজ করার নিমিত্তে। ইসলামী গোষ্ঠীর সদস্যদের এটা বোঝা উচিত তাদের সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন, উম্মাহ ছাড়া তারা মূল্যহীন যাদের মধ্যে তারা কার্যক্রম চালায়। ফলে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, উম্মাহর সাথে গণসংযোগ চালোনো, তাকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রামে অগ্রসর হওয়া, নিশ্চিত করা যাতে উম্মাহ অনুভব করে যে সে নিজেই এই সংগ্রাম চালাচ্ছে। দলকে অবশ্যই এমন কোনো কাজ, কথা/মন্তব্য যা দলকে উম্মাহ হতে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করে, তা যে আকাড়ের হোক না কেন, তা থেকে বিরত থাকতে হবে।….এটা এজন্য যে এটি দল ও তার দাওয়াকে উম্মাহ হতে পৃথক করে ফেলে এবং দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী সমাজের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে আরো একটি সমস্যায় পরিনত হয় যা পূনর্জাগরণকে ব্যহত করে। সুতরাং উম্মাহ হচ্ছে একটি অবিচ্ছেদ্য একক সত্ত্বা এবং দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী (তার মধ্য হতে) উঠে দাড়িয়েছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, রাষ্ট্র ও উম্মাহর মধ্যে ইসলামের প্রহরী হিসেবে, যাতে কোনো বিচ্যুতি না হয় তা নিশ্চিত করা যায়। যদি সে (দল) তার (উম্মাহর) মধ্যে এরকম কিছু (বিচ্যুতি) দেখতে পায়, তবে সে তার মধ্যে ঈমান ও মৌলিকত্ব সঞ্চারিত করবে। যদি সে রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বিচ্যুতি দেখতে পায়, তাহলে সে উম্মাহর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম অনুযায়ী তা সংশোধন করার জন্য কাজ করবে। এভাবেই দলকর্তৃক বহনকৃত দাওয়াহ উৎকর্ষতার সাথে এর প্রকৃত পথে অগ্রসর হবে।

    এটি সত্য যে কিছু দলের মধ্যে ভুল কনসেপ্ট ও পদ্ধতি থাকবে। তথাপি, দাওয়াকারীদের সেসব দলের আলোচনায় অতিমগ্নতা ও আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া হতে সাবধান থাকতে হবে।

    আত-তাকাত্তুল আল-হিযবি বইটির ৫০ পৃষ্ঠায় শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) বলেন:

    সুতরাং দলের সদস্যরা উম্মাহর সাধারণ সদস্যের মতো থাকবে এবং নিজেদের উম্মাহর সেবক ছাড়া অন্য কিছুই মনে করবে না। তাদের উপলব্ধি করতে হবে যে উম্মাহর সেবায় নিয়োজিত হওয়াটাই তাদের দলের মূল কাজ।

    বরং আমাদের কোনো দলের দিকে ক্রমাগত আঙ্গুল না তুলে, ভুল কনসেপ্টের দিকে ফোকাস রাখা উচিত তা সে কনসেপ্ট যেই ধারণ করুক না কেন।

    বস্তুতঃ বিভিন্ন দলের সমালোচনা হতে উম্মাহর মধ্যে সাধারনভাবে কনসেপ্ট আলোচনা-সমালোচনা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষই দল করে না এবং তাদের দাওয়াহ করে মন জয় করে দাওয়াহর কাজে নিয়ে আসা অনেক সহজ। স্বাভাবিকভাবেই দাওয়াহর কাজ করার সময় অন্যান্য দলের কর্মীদের সাথেও সাক্ষাত হবে, আলোচনা-বিশ্লেষন হবে; তবে এ কাজ আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।

    কার্যক্রমের অধিক আলোচনার দরূন সুন্দর সংস্কৃতির পরিবেশ হারিয়ে ফেলা:

    আরেকটি সমস্যা যা দাওয়াকারীদের মধ্যে বিরাজ করতে পারে তা হলো, তারা দলের গৃহীত চিন্তার পরিবর্তে দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশি আলোচনা করছে। দলের অবশ্যই এমন সব দা’ঈ প্রয়োজন যারা ইসলামী চিন্তা অত্যন্ত ভালোভাবে বুঝবে যাতে করে তা দ্বারা তারা উম্মাহকে পুনর্জাগরিত করতে পারে। সুতরাং, দাওয়াকারীদের মধ্যে আলোচনা, প্রশ্ন ও বিতর্কের পরিবেশ বিরাজমান থাকা উচিত। এই ধরনের পরিবেশ দলের তরুনদের বিভিন্ন প্রশ্ন, মতামত ও প্রমানাদির সম্মুখে তাদের চিন্তার উন্নয়নে অনেকটা সাহায্য করবে।

    ১০ জন গভীর চিন্তাশীল কর্মী ১০০ জন দূর্বল কর্মী হতে উত্তম। কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে। তবে এখানে বুঝতে হবে, শরীরে মাংস থাকা যেমন জরুরী, তার থেকে বেশি জরুরী শক্তিশালী হাড় থাকা মাংসকে শরীরের সাথে ধরে রাখে।

    স্বাভাবিকভাবেই একজন দাওয়াকারী যখন অপর কোনো দাওয়াকারী ভাইয়ের সাথে মিলিত হবে তখন তারা বিভিন্ন কল্যাণমুখী আলোচনায় রত হবে। এ ধরনের আলোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে, বিশ্ব পরিস্থিতি, ফিকহী বিষয়াদি, আত্ম-উন্নয়ন, হালাকায় আলোচিত বিভিন্ন কনসেপ্ট-এর বিশ্লেষনমূলক আলোচনা ইত্যাদি।

    ৪) দলবাজি বা উপদলের উপদ্রব:

    আরেকটি পরিবেশ যা দাওয়াহর কাজের জন্য খুবই মারাত্মক, তা হলো দলের মধ্যে বিভিন্ন উপদল তৈরি হওয়া যারা দলের গৃহীত চিন্তার প্রতি অনুগত না হয়ে বিশেষ বিশেষ ব্যাক্তির প্রতি অনুগত থাকে। এরূপ পরিবেশ তখনি তৈরি হয় যখন দলের কর্মীরা হুকুম শরীয়াহ ও সাংগঠনিক নীতিমালার ভঙ্গ করে এবং একে অপরের ব্যাপারে নেতিবাচক আলোচনায় লিপ্ত হয়।

    এটি স্বাভাবিক যে কিছু কিছু ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা অন্যান্য কিছু ভাইদের সাথে সম্পর্কের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। যদিওবা তাদের এটা বোঝা উচিৎ যে, তাদের সকলের মধ্যেই একটি আদর্শিক বন্ধন রয়েছে, যা তাদেরকে দলের মধ্যে বন্ধনে একত্রিত করে। তাই এই বন্ধনটি বন্ধুত্বের বা ব্যাক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ নয় বরং আকিদাহ এবং দলের গৃহীত (adopted) চিন্তার ভিত্তিতে হতে হবে।

    এই দুইটি বিষয়ই একে অপরের সাথে বন্ধনের মূল ভিত্তি হতে হবে। তাই ইসলামি দলে দলবাজি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। দলকে অবশ্যই সামগ্রিকভাবে একক একটি সত্ত্বায় পরিনত হতে হবে।

    এটিও স্বাভাবিক যে কখনো কখনো দলের বিভিন্ন ভাইয়ের কোনো দোষ কিংবা দূর্বলতা চোখে পড়বে এবং তা আমাদের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে। কিন্তু এই বিষয়গুলো রফাদফা করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া বা বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং হুকুম শরীয়াহ ও সাংগঠনিক নীতি অনুসারে এর সমাধান হচ্ছে কিনা তা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষন করতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلا تَجَسَّسُوا وَلا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ

    মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ সন্দেহ থেকে দুরে থাক। নিশ্চয় কিছু কিছু সন্দেহ গোনাহের কাজ। [হুজুরাত:১২]

    এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আব্বাস বলেন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুমিনদের তাদের অন্যান্য ভাইদের ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষন করাকে হারাম করেছেন।

    আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: সন্দেহ হতে দূরে থাকো কারণ সন্দেহ (এর ভিত্তিতে বলা কথা) সবেচেয়ে অসত্য কথাবার্তা (এক নিকৃষ্ট মিথ্যাচার)।

    একজন মুমিন যিনি আপাতদৃষ্টিতে সৎ ও নিষ্ঠাবান তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষন করা বৈধ নয়, বরং তার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখাটাই উৎসাহিত।

    ইসলাম গীবত ও অপবাদকে হারাম করেছে ও একইসাথে মানুষদের ব্যাপারে সন্দেহজনক, কু-ধারণাকে থেকে দূরে থাকতে বলেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ

    এবং একে অপরের পিছনে গোয়েন্দাগিরি করোনা। তোমাদের কেউ যেন কারও পিছনে তার দোষচর্চা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই করবে। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [হুজুরাত: ১২]

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন,

    أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نُهُوا عَنِ النَّجْوَى ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَيَتَنَاجَوْنَ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ 

    আপনি কি ভেবে দেখেননি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালংঘন এবং রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে…[মুজাদালাহ:৮]

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَنَاجَيْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ وَتَنَاجَوْا بِالْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ

    মুমিনগণ, তোমরা যখন কানাকানি কর, তখন পাপাচার, সীমালংঘন ও রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়ে কানাকানি করো না বরং অনুগ্রহ ও খোদাভীতির ব্যাপারে কানাকানি করো। আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর কাছে তোমরা একত্রিত হবে। [মুজাদালাহ: ৯]

    وَإِذَا جَاءهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُواْ بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُوْلِي الأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ وَلَوْلاَ فَضْلُ اللّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لاَتَّبَعْتُمُ الشَّيْطَانَ إِلاَّ قَلِيلاً

    আর যখন তাদের কছে পৌঁছে কোন সংবাদ শান্তি-সংক্রান্ত কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেগুলোকে রটিয়ে দেয়। আর যদি সেগুলো পৌঁছে দিত রাসূল পর্যন্ত কিংবা তাদের উলিল আমর (দায়িত্বশীল) পর্যন্ত, তখন অনুসন্ধান করে দেখা যেত সেসব বিষয়, যা তাতে রয়েছে অনুসন্ধান করার মত। বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা যদি তোমাদের উপর বিদ্যমান না থাকত তবে তোমাদের অল্প কতিপয় লোক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে শুরু করত! [নিসা: ৮৩]

    আবু দাউদ আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেন- “ইসরার রাত্রিতে আমি তামার নখ বিশিষ্ট একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করি যারা নখগুলো দিয়ে তাদের মুখমন্ডল ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! এসমস্ত লোক কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা দুনিয়াতে মানুষের গোশ্ত ভক্ষন করত এবং তাদের মান-সম্মান নষ্ট করত।” অর্থাৎ তারা মানুষের গীবত ও চুগলখোরী করত।

    পশ্চিমা সমাজের সমস্যাগুলো অন্যতম কারণ হিংসা-বিদ্বেষ করাকে ইসলাম নিষেধ করেছে। রাসূল (সা) বলেন, কোনো মুসলিমের প্রতি বিদ্বেষ রেখো না; অন্য মুসলিমদের প্রতি হিংসাত্মক হয়ো না; একজন মুসলিমের বিরুদ্ধে যেয়ো না এবং তাকে পরিত্যাগ করো না। হে আল্লাহর বান্দাগণ, পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। একজন মুসলিমের জন্য এটি বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের সাথে তিনদিনের বেশি সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে।

    পশ্চিমা সমাজে একে অপরকে ছোট করা অনেকটা অবসর-বিনোদনে পরিনত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ

    একজন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে ছোট করা থেকে নিকৃষ্ট আর কিছুই করতে পারে না। [মুসলিম]

    ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এক মুসলিমের অপর মুসলিমের প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ রাখা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের এ ব্যপারে সতর্ক করে গিয়েছেন। তিনি বলেন, 

    تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلاَّ رَجُلاً كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا

    জান্নাতের দরজাগুলো সোমবার ও বৃহস্পতিবার উন্মুক্ত করা হয় এবং প্রত্যেক (আল্লাহর) বান্দাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যে তার ভাইয়ের প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ রাখে। (তাদের ব্যপারে) বলা হবে: এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়; এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়; এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়। [মুসলিম]

    আর পবিত্র কুরআনে আমরা একটি চমৎকার দুআ দেখতে পাই:

    وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ 

    যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলে: হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে ও আমাদের ঈমানে অগ্রগামী ভাইদের ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়। [হাশর: ১০]

    ভাইয়েরা একে অপরের সাথে থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করবে ও ঘনিষ্টতা অনুভব করবে। আমাদের অহংকারবোধকে ইসলাম দিয়ে শান্ত করতে হবে। রাসূল (সা) বলেন, ব্যক্তি তার ঘনিষ্ট সহচরের দীনের উপর থাকে। আর সেই সাহচর্যে কোনো কল্যাণ নেই যাতে একজন (সহচর) তোমার ব্যপারে তার নিজের মতোই উচ্চ ধারনা পোষন করে। [ইহইয়াউ উলূমুদ দীন]

    সমস্যা সমাধানের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ:

    দা’ঈগণ নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করে নেয়া উচিত:

    যদি কোনো দাওয়াকারী এমন কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে অথবা তার টিম-এর কোনো কর্মীর কোনো ভূল দেখে, তখন সে কোনো বিলম্ব না করে তার সাথে বিষয়টি আলোচনা করবে, একজন ভাই হিসেবে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ও নসীহত করবে। সে অবশ্যই এ বিষয়টি নিয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করবে না, সে কোনো দায়িত্বশীল হোক কিংবা না হোক।

    যদি কোনো দাওয়াকারী তার দায়িত্বশীল হতে এমন কোনো কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে, তখন সে কোনো বিলম্ব না করে তার সাথে বিষয়টি আলোচনা করবে, একজন ভাই হিসেবে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ও নসীহত করবে। সে অবশ্যই সেই নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল ভাইয়ের পূর্বে এ বিষয়টি নিয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করবে না।

    যদি এরপরও বিষয়টির শুরাহা তথা সংশোধন না হয়, তবে দাওয়াকারীর উচিত তার নিজস্ব দাওয়া এলাকা অর্থাৎ যে এলাকায় সে কাজ করে, তার দায়িত্বশীলকে বিষয়টি অবহিত করা ও তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা। সে শুধু ততটুকুই আলোচনা করবে যতটুকু সে জানে এবং এলাকার দায়িত্বশীল ছাড়া আর কারো সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে না।

    এরপরও যদি দলের কোনো ব্যক্তি সংশয়মুক্ত না হয় কিংবা প্রত্যাশিত চুড়ান্ত সমাধান না পায়, তবে সে এ বিষয়ে তার দেশের মূল দায়িত্বশীল ব্যতিত অন্য কারো সাথে কোনো কথা বলবে না। যদি সে তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে তবে তাকে সরাসরি তা অবহিত করবে, আর যদি না চিনে তবে তাকে তার নিকট দায়িত্বশীলের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে অবহিত করবে। এক্ষেত্রে তার পাঠচক্রের দায়িত্বশীল, তার এলাকার দায়িত্বশীল কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি তা পড়বে না যদি না দেশের মূল দায়িত্বশীল অনুমতি দেন।

    যদি সে তার দেশের দায়িত্বশীল সদস্য হতে সমাধান না পায়, তবে সে দলের যোগাযোগের সূত্রের মাধ্যমে তার অভিযোগ দলের আমীরের নিকট তুলে ধরতে পারে।

    সামষ্টিক জবাবদিহিতা দলে না থাকাই আবশ্যক। যদি কেউ তার সহকর্মী হতে কোনো ভুল-ত্রুটি কিংবা খারাপ লাগার মতো কিছু দেখে তবে সে তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে নেবে। হালাকার দায়িত্বশীল, সদস্য, ছাত্র কিংবা এলাকার অন্য কোনো দায়িত্বশীল হোক না কেন – কারো জন্যই দলের অভ্যন্তরে সামষ্টিক জবাবদিহিতার অনুমতি থাকা উচিত নয়।

    পাঠচক্রে কোনো ছাত্র যদি মনে করে যে তার প্রশিক্ষক কোনো এক ব্যাখ্যায় ভুল করেছে, তবে তাকে তা শুধরিয়ে দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। তবে তা বিনয় সহকারে ইসলামী শিষ্টাচার পরিপূর্ণ পরিবেশে হতে হবে। যদি এতেও সে সংশয়মুক্ত না হয়, তবে সে প্রশ্নটি মনে রাখবে এবং জ্ঞানসম্পন্ন কোনো দাওয়াকারীকে জিজ্ঞেস করবে অথবা কোনো প্রশ্ন-উত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হলে তাতে তা উত্থাপন করবে। এরপরও যদি প্রশ্নটি অমিমাংসিত রয়ে যায় তবে সে প্রশ্নটি লিখে দেশের দায়িত্বশীলের কাছে উত্তরপ্রাপ্তির জন্য প্রেরণ করতে পারে।

    এর মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করতে চাই তা নিম্নরূপ:

    কখনো কখনো আমরা অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে পড়ি এবং সরাসরি অন্যান্য ভাইদের কাছে গিয়ে নালিশ দেই, সমাধান চাই এবং এই প্রক্রিয়ায় সমস্যাটি অনেক অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করে দেই। এভাবে সমস্যাটি জনে জনে ছড়িয়ে পড়ে, একজন মুসলিমের সম্মান ক্ষুন্ন হয় এবং পুরো বিষয়টি আরো জটিল হয়ে পড়ে। এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, দলের অভ্যন্তরে ফিতনার সম্ভাবনা নির্মূল করা ও ভাইদের সম্মান রক্ষা করা – দুটোই আমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে। এক্ষেত্রে, একটির সাথে আরেকটিকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে না আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসা:

    আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ থেকে দাওয়াকারীদের অনুপ্রেরণা নেয়ায় সবসময় রত থাকতে হবে এবং সাহাবীদের মতো সবসময়েই সঠিক পরিবেশ ও ভাতৃত্ব বজায় রেখে চলতে হবে।

    মুসলিম আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    « أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخًا لَهُ فِى قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ أُرِيدُ أَخًا لِى فِى هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا قَالَ لاَ غَيْرَ أَنِّى أَحْبَبْتُهُ فِى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ فَإِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ »

    এক ব্যক্তি তার ভাইকে দেখার জন্য অন্য এক গ্রামে গেল । আল্লাহ তার জন্য রাস্তায় একজন ফিরিশতা মোতায়েন করলেন। সে ব্যক্তি যখন ফিরিশতার কাছে পৌছল, তখন ফিরিশতা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাওয়ার ইরাদা করছ? সে বলল, আমি এই গ্রামে আমার এক ভাইকে দেখার জন্য যেতে চাই । ফিরিশতা বললেন, তার কাছে কি তোমার কোন অনুগ্রহ আছে, যা তুমি আরো বৃদ্ধি করতে চাও? সে বলল, না। আমি তো শুধু আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের জন্যই তাকে ভালবাসি। ফিরিশতা বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার কাছে এ পয়গাম নিয়ে এসেছি যে, আল্লাহ তোমাকে ভালবাসেন, যেমন তুমি তাকে আল্লাহরই জন্য ভালবেসেছ।

    যেই ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে চায় সে যেন কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালোবাসে। [আহমাদ]

    ভাইয়েরা, কিভাবে আমরা উম্মাহর ঐক্যের কথা বলতে পারি যখন আমরা নিজেরাই দলের অভ্যন্তরে ঐক্য আনতে ব্যর্থ হচ্ছি! ইমাম মুসলিম নু’মান বিন বশীর (রা) হতে বর্ণনা করেন,

    الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ وَإِنِ اشْتَكَى رَأْسُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ

    মুসলিমগণ একটি দেহের মতো। যদি এর চোখ ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তবে সমস্ত দেহই ব্যথায় ভোগে, যদি এর মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তবে সমস্ত দেহই ব্যথায় ভোগে।

    পরিশেষে একটি হাদীস উদ্ধৃত করে আলোচনায় ইতি টানছি। রাসূল (সা) বলেন,

    আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি আছে যারা নবীও না, শহীদও না – তবুও শহীদ ও নবীগণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’য়ালার নিকট ওই বান্দাদের মর্যাদার কারণে তাদেরকে ঈর্ষা করবেন (মর্যাদার স্বীকৃতি দেবেন)। তারা জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদেরকে বলুন, তারা কারা? তিনি (সা) জবাব দিলেন, তারা এমন লোক যারা একে অপরকে আল্লাহর রূহের জন্য ভালোবাসবে যদিও তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার বন্ধন বা সম্পদের লেনদেন নেই। আল্লাহর শপথ, তাদের চেহারায় থাকবে নূর এবং তারা থাকবে নূরের উপর। মানুষ যখন ভীত থাকবে তখন তাদের কোনো ভীতি থাকবে না, এবং মানুষ যখন দুঃখে থাকবে তখন তাদের কোনো দুঃখ থাকবে না। তারপর তিনি এই আয়াত পড়লেন:

    أَلا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ

    মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে, না তারা দুঃখ পাবে। [সূরা ইউনুস: ৬২]

    Posted by Visionary 

  • আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাত আর-রাহিম)

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিযামুল ইজতেমাঈ ফিল ইসলাম ’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা জাহিলিয়্যাতের গোত্রীয়বাদ হারাম করেছেন তখন তিনি গোত্রীয়বাদকে উম্মাহর সন্তানদের একমাত্র বন্ধনের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করাকে হারাম করেছেন, এবং হারাম করেছেন যাতে এটি মুসলিমদের সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন না করে। তবে, তিনি মানুষকে তার আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে ও সদয় হতে নির্দেশ দিয়েছেন। হাকিম ও ইবন হিব্বানে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বললেন, “দাতার হাত উপরে থাকে (অর্থাৎ, তা উত্তম), অতএব, নিকটাত্বীয়দের দিয়ে (দান) শুরু করো। তোমার মা, বাবা, বোন ও ভাই এবং তোমার নিকটাবর্তী ও তোমার নিকটাবর্তী (এর প্রতি)। আসমা বিনতে আবি বকর বলেন, আমার মা যিনি একজন মুশরিক ছিলেন, তিনি মুসলিমদের সাথে কুরাইশদের চুক্তিকালীন সময়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। আমি নবী (সা) হতে উপদেশ নিতে যাই এই বলে যে, “আমার মা আমার সাথে দেখা করতে এসেছে (কিছু অনুগ্রহের জন্য)” নবী (সা) বলেন, “হ্যাঁ, তোমার মায়ের প্রতি ভালো আচরন করো।” (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

    ইসলাম সম্পর্কসমূহকে দুভাগে ভাগ করেছে। প্রথমত, সেসব সম্পর্ক যাদের মৃত্যুর পর তাদের হতে উত্তরাধিকার প্রাপ্তি সম্ভব। দ্বিতীয়ত, মায়ের দিকের আত্মীয়-স্বজন (উলুল আরহাম)। এদের মধ্যে যাদের উত্তরাধিকার রয়েছে তারা হলো যারা আইনত নির্দিষ্ট অংশের উত্তরাধিকারী (আসহাবুল ফুরূদ) ও  যারা পিতার দিক থেকে আত্মীয় (আসাবাত)। মাতার দিকের সম্পর্কসমূহ পুর্ববর্তী সর্ম্পকসমূহ হতে ভিন্ন; তাদের উত্তরাধিকারের কোনো অংশ থাকে না, তারা পৈত্রিক সম্পর্ক থেকেও নয়। তাদের ১০টি ভাগে ভাগ করা যায়: মামা, খালা, নানা, নাতি (কণ্যা হতে), ভাগ্নে, ভাতিজী, চাচাতো বোন, ফুফাতো বোন, সৎ চাচা, ভাতিজা (সৎ ভাই হতে) এবং যারা তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করে।

    আল্লাহ সুবহানাহ ওয়া তা’আলা ব্যক্তির (মৃত) উত্তরাধিকার থেকে উপরোক্ত ব্যক্তিদের অংশ দেননি, তাদের ভরনপোষনও উক্ত ব্যক্তির জন্য আবশ্যক নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আত্মীয়দের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতে ও সদয় হবার ব্যাপারে হুকুম দিয়েছেন। জাবির (রা) হতে বর্ণিত: রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ দরিদ্র হয় তার নিজের জন্য খরচ শুরু করা উচিত এবং তোমাদের মধ্যে যার (সম্পদের) উদ্বৃত্ত রয়েছে, সে যেন তার পরিবারের জন্য খরচ করে এবং তোমাদের মধ্যে যার আরো অধিক উদ্বৃত্ত থাকে সে যেন তার আত্মীয়দের জন্য খরচ করে।” আবু আইয়্যুব থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি নবী (সা) কে বললেন, “আমাকে এমন একটি কাজের কথা বলুন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।” লোকেরা বলল, “তার কী হয়েছে? তার কী হয়েছে?” নবী (সা) বললেন, “তার কিছু (জিজ্ঞেস করবার) আকাঙ্ক্ষা আছে” নবী (সা) বললেন, “(জান্নাতে প্রবেশের জন্য) তোমাকে অবশ্যই আল্লাহর ইবাদত করতে হবে, এবং তাঁর সাথে কোনো শরীক করবে না, যথাযথভাবে সালাত আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আত্মীয়-স্বজন (রাহিম)-এর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে।” [বুখারী] সুতরাং, তিনি (সা) সুসম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই হাদীসসমূহে কাদের সম্পর্কের ব্যাপারে বুঝানো হয়েছে? তারা কি শুধুমাত্র মাতৃসম্পর্কীয় (উলুল আরহাম) নাকি প্রত্যেকেই যারা ব্যক্তির রাহম (মাতৃগর্ভ) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত! এই হাদীসসমূহ নির্দেশনা দেয় প্রত্যেক আত্মীয়ের সাথে উত্তম সম্পর্কের প্রতি, তা হতে পারে মাহরাম অথবা পিতৃসম্পর্ক কিংবা মাতৃসম্পর্কের দিক হতে কোনো গায়ের মাহরাম।

    আত্মীয় (রাহম)-এর সাথে সুসর্ম্পকের ব্যাপারে অনেকগুলো হাদীস বিদ্যমান। তিনি (সা) বলেন, “সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে।” আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেছেন, “যে তার রিযকের প্রশস্ততা এবং প্রাপ্ত জীবনকাল দীর্ঘায়িত হোক, তবে সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখে। [মুত্তাফাকুন আলাইহি] আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত নবী (সা) বলেন, “আল্লাহ যখন তাঁর সৃষ্টি কার্যক্রম শেষ করলেন, তখন গর্ভাশয় বলে উঠলো: সম্পর্ক ছিন্নকারী থেকে আমি আপনার কাছে আশ্রয় গ্রহণ করছি। আল্লাহ বলেন: তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে তোমার সাথে যে সম্পর্ক অটুট রাখবে, আমি তার উপর আমার অনুগ্রহ করবো, আর তার থেকে অনুগ্রহ তুলে নেই যে তোমার সম্পর্ক কর্তন করে?” এতে সে বলল, “হ্যাঁ, হে আমার রব!” এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “এটাই তোমার জন্য”। এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: যদি তোমরা চাও তবে পড়তে পারো: “আর হতে পারে যদি তোমাদের পৃথিবীতে কর্তৃত্ব দেই, তবে তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ ছড়িয়ে বেড়াবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে।” [সূরা মুহাম্মাদ: ২২] তিনি (সা) বললেন: আল-ওয়াসিল (যে আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে) সে নয় যে তার আত্মীয়ের কাছ থেকে পাওয়া ভালো কাজের প্রতিদান দেয়, বরং আল-ওয়াসিল হচ্ছে সেই যে তার সেইসব আত্মীয়ের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে, যারা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে।” এই সবই আত্মীয় স্বজনের সুসম্পর্কের ব্যাপারে উৎসাহ দেয়।

    সিলাত আর-রাহিম ইসলামী সম্প্রদায়ের মাঝে ভালো এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, আত্মীয়-স্বজনের মাঝে ভালো ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, নারী-পুরুষের মেলামেশার ব্যাপারে শর’ঈ সীমা কতটুকু এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই মেলামেশার কতটুকু ফল বয়ে আনে এবং এখান থেকে বিস্তৃত শাখা-প্রশাখার ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন, তার গুরুত্ব নির্দেশ করে। অতএব, ইসলামী শরীআহ সমাজের সামাজিক দিক নিয়ে যে আইনগুলো প্রণয়ন করেছে, তা মানবজাতির জন্য সবচেয়ে উত্তম সমাজব্যবস্থা সরবরাহ করে।

    Posted by Torch Bearer 

  • ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন (Election)

    ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন (Election)

    Election বা নির্বাচন হচ্ছে ইসলামী শরীয়া’র অনুমোদিত উপায়সমুহের একটি যার মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাই করা হয়। রাসূল (সা) বা’ইয়াতে আকাবায় বলেছেন,

    أَخْرِجُوا إِلَيَّ مِنْكُمْ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيبًا يَكُونُونَ عَلَى قَوْمِهِمْ

    তোমাদের মধ্য থেকে বার জন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি (নাকীব) নিয়ে এসো, যারা তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জনগনের প্রতিনিধিত্ব করে”।

    বর্তমানে ইসলামী ভূমিতে সকল ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থায়ই অনৈসলামিক। কেননা, এগুলো কুফর শাসনব্যবস্থা যা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ থেকে নেয়া হয়নি (শুধুমাত্র কতিপয় অংশ ব্যতিত)। যেকোনো মুসলিম যারা আল্লাহ ও রাসূল (সা)-কে বিশ্বাস করে তাদের পক্ষে এই ব্যবস্থায় কোনরূপ সাহায্য বা অংশগ্রহণ কিংবা শাসনব্যবস্থায় কোনো ভূমিকা রাখা সম্পূর্নরূপে হারাম। বরং প্রতিটি মুসলিমের উচিৎ সবোর্চ্চ গতি ও অধ্যবসায় এর সাথে এই কুফর ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসা এবং এর পরিবর্তে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

    وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

    আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী শাসন করেনা, তারাই কাফের“। [সূরা মায়েদা: ৪৪]

    বর্তমান শাসকগোষ্ঠী মুনকারের ধারক ও বাহক এবং সুরক্ষাকারী, শুধু তাই নয়, তারাই হচ্ছে মুনকার প্রধান। অথচ রাসূল (সা) মুসলিমদের আদেশ দিয়েছেন,

    مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ

    তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুনকার (খারাপ বা হারাম কাজ হতে) দেখো, তবে তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করো, যদি তোমরা তাতে সক্ষম না হও, তবে মুখের দ্বারা (পরিবর্তন করো), যদি তা না পার, তবে অন্তরের মাধ্যমে (পরিবর্তন কর) এবং এটাই সবচেয়ে দূর্বলতম ঈমান।”

    অতএব হে মুসলিম, আপনাদের প্রতি আহ্বান, শুধু সাহায্য বা অংশগ্রহন থেকে বিরত থেকে নয় বরং এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করুন। প্রত্যেক মুসলিমেরই এই কুফর ও মুনকারের প্রতি হৃদয়ের মাধ্যমে ঘৃণা পোষন করা উচিত এবং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আল্লাহ কে বলা উচিত; হে আল্লাহ, আমাদের উপর চেপে বসা এই মুনকারটিতে আমরা সন্তুষ্ট নই। পাশাপাশি প্রত্যেক মুসলিমের মুখ দিয়ে পরিবর্তন করা উচিত, তার পরিবার, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীর মধ্যে দাওয়া করে তা সম্ভব। আর যারা এই শাসনব্যবস্থায় থেকে সন্তুষ্ট থাকে,এর শাসকদের প্রশংসা করে ও সাহায্য করে, সে কিঞ্চিত পরিমান ঈমানও তার অন্তরে লালন করে না। সাবধান! হে মুসলিমগন, এই বিষয়টিকে ছোট করে দেখবেন না, কেননা এই ব্যাপারটিতে জড়িয়ে আছে ঈমান এবং কুফর।

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মুসলিম যে আল্লাহ কে ভয় করে তার পক্ষে কি এই কুফর শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া জায়েজ হবে? এর উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, জায়েজ হবে শুধুমাত্র তখনই, যখন সেই প্রার্থী প্রকাশ্যে ঘোষনা দিবে যে,

    – সে এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না,

    – সে নির্বাচিত হোক বা না হোক, এই ব্যবস্থায় কোনরূপ অংশগ্রহণ বা সহবস্থান করবে না,

    – সে এই ব্যবস্থায় বিশ্বাসী কোন প্রার্থীকে কোনোরূপ সাহায্য প্রদান করবে না, তা হোক ব্যক্তিগতভাবে বা নির্বাচনী তালিকার অংশ হিসেবে,

    – এবং সে প্রকাশ্যে আরও ঘোষনা দিবে যে তার এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হল পার্লামেন্ট বা সংসদ কে ব্যবহার করে হকের কথা প্রচার করা এবং তাগুতকে উৎখাতের জন্য মুসলিমদের আহ্বান করা।

    কোন প্রার্থীর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে না যে সে মনে মনে এই ধারনা পোষন করে অথচ শর্তসমুহ গোপন করে। বরং শরীয়া বাধ্যতামুলক করে দিয়েছে যে সে প্রকাশ্যে ঘোষনা দিবে। কেননা, যেকোনো ব্যক্তিই সন্দেহযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত হতে পারে, যখনি সে এই শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রার্থীতার ঘোষনা দেয়। তাই সে যদি নিজেকে সন্দেহযুক্ত অবস্থায় রেখে দেয় সে গুনাহগার হবে। এই অবস্থায় যে কোন মুসলিমের পক্ষে হারাম হবে উক্ত প্রার্থীকে নির্বাচন করা, সাহায্য করা অথবা সাধুবাদ জানানো যদি সে জয়লাভ করে।

    একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইন প্রণয়ন (legislation), মন্ত্রীসভার আস্থা ভোট (vote of confidence in cabinets), চুক্তির অনুমোদন (ratification of treaties), প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (election of a republic’s president) এবং শাসকবর্গ ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহি করা। সুতরাং, শুধুমাত্র শেষের কাজটিই একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে করা হালাল হবে, অন্যসকল কাজকর্ম হারাম। কেননা, আইন কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোন উৎস থেকে হতে পারে না। সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অর্থাৎ তিনিই আইন প্রনয়নকারী। আল্লাহ যা হালাল করেছেন তার বাইরে কিছুই হালাল নয় এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন এর বাইরে কিছুই হারাম নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

    اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

    তারা তাদের যাজক ও দরবেশদের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে“। [তওবা: ৩১]

    রাসূল (সা) এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেছিলেন যখন আদী ইবনে হাতীম আত তা’ঈ (রা) ক্রুশ পরিহিত অবস্থায় এসেছিলেন। আদী বলেছিলেন তারা তাদের (র‍্যাবাই ও যাজক) উপাসনা করেন না। রাসূল (সা) বলেছিলেন,

    أَجَلْ وَلَكِنْ يُحِلُّونَ لَهُمْ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَيَسْتَحِلُّونَهُ وَيُحَرِّمُونَ عَلَيْهِمْ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فَيُحَرِّمُونَهُ فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ لَهُمْ

    হ্যা, (অনুসারীরা করে), তারা (দরবেশ ও যাজকশ্রেনী) হালাল কে হারাম এবং হারাম কে হালাল বানিয়েছে এবং অনুসারীরা তা অনুসরন করেছে। আর এটাই হচ্ছে তাদের ইবাদত।”

    এরপর আদী মুসলিম হয়ে গেলেন। তাই যারা আইন প্রনয়ন করে, হালাল ও হারাম ঘোষনা করে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত, তারা আসলে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং নিজেদেরকে ইলাহে পরিনত করে আর যারা এই ব্যাপারে তার সহযোগী হয় তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাকেই ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছে।

    তাই হে মুসলিম, জেগে উঠুন। যে সংসদ সদস্য কুফর রীতিতে মন্ত্রীসভার উপর আস্থা প্রদান করে, কুফর আইনের ভিত্তিতে চুক্তির অনুমোদন করে অথবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে যে কুফর দ্বারা শাসন করে, তবে সেই প্রার্থী ও তাদের সাথে সমপরিমান অপরাধে অংশগ্রহন করে। আর সেই মুসলিম ব্যক্তি যে সংসদ সদস্যকে এই পর্যায়ে যেতে সাহায্য করে, সেও একই অপরাধে সামিল।

    একজন মুসলিম সে সংসদ সদস্য হোক বা না হোক তার প্রধান উদ্বেগ হওয়া উচিত উম্মাহর অনিবার্য লক্ষ্য (vital cause)। আর তা হলো উম্মাহকে ‘পশ্চিমা মুর্তিপুজার থাবা’ (ভিত্তিহীন পশ্চিমা সংস্কৃতি) হতে রক্ষা করা এবং খিলাফত পুনপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের আলোর দিকে দিকনির্দেশনা দেওয়া। এর পরিবর্তে বর্তমান যুগের সংসদ সদস্যদের আমরা দেখি রাস্তা তৈরী করতে এবং নির্বাচকমন্ডলীর কার্যক্রমের অনুমোদন দিতে, যদিও একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে বিচারবিভাগ বা অন্য যেকোনো শাসন বিভাগে অংশগ্রহণ একটি ‘ফাহিশা’ বা সীমালঙ্ঘন। জর্ডানের সংসদ সদস্যদের একটি ব্লগ (Islamic Action Front) একবার সংসদ প্রত্যাহারে দাবি জানিয়েছিল যদি সরকার রুটির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করে। আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই, তারা তখন কেন প্রত্যাহার করল না যখন জর্ডান সরকার শত্রুর সাথে শান্তিচুক্তি করে, তা কেন তারা প্রত্যাহার করল না যদিও তারা নাকি বিশ্বাস করে এই ব্যবস্থাটি কুফর? নাকি রুটির দাম এর চেয়ে বেশী জরুরী? সরকার কি তাদের প্রত্যাহার বা নমনীয়তার পরোয়া করে? তাই যেইসব প্রার্থী যেকোনো উপায়ে একটি সংসদীয় আসনের জন্য লড়াই করে নিজেদের অপমানিত করে, তাদের শিক্ষা নেয়া উচিত বর্তমান সংসদ সদস্যদের দেখে, তারা দেখবে যে এই সংসদ সদস্যদের অবস্থান আসলেই অর্থহীন। তারা দেখবে যে, যেটাকে তারা চতুরতা ও বাস্তবতার যাচাই মনে করেছিল সেটি আসলে একটি মরিচীকা ও পরিষ্কাররূপে দূরদর্শিতার অভাব। এটি আসলে শাসকগোষ্ঠীর দাসত্ববরণ এবং ইসলাম ও নিজের উপর অত্যাচার। আর এই কারণেই এই সংসদ সদস্যরা যারা ইসলামকে নীতি-নির্ধারনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিষ্ঠায় আসন গ্রহণ করেছিল, তারা যখন ব্যর্থ হয় তখন জনগন মনে করে যে, শুধুমাত্র ব্যক্তি নয়; ইসলামই ব্যর্থ হয়েছে।

    কিছু প্রার্থী তাদের কার্যক্রম কে জায়েজ করার জন্য এই ফতোয়া দেয় যে, ‘দুটি মন্দের মধ্যে ভালটি’। ইহুদিদের নির্বাচনে আরবরা পেরেস-কে নেতানিয়াহুর বিপরীতে এই গন্য করে সমর্থন করেছিল যে পেরেস ও নেতানিয়াহু উভয়ে মন্দ, তবে পেরেস তুলনামুলক কম মন্দ। তাই আরবদের জন্য পেরেস কে নির্বাচিত করা বাধ্যতামুলক হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে, রাশিয়ার নির্বাচনে ইয়েলস্টিন ও কমিউনিস্ট ইওগানভ (Zyuganov) উভয়ই মন্দ ছিল কিন্ত ইয়েলস্টিনকে কম মন্দ গন্য করায় মুসলিমদের জন্য তাকে সমর্থন করা বাধ্যতামুলক হয়ে গিয়েছিল, অর্থাৎ তাদের মতে, ক যদি নির্বাচিত হয় তা মন্দ হবে এবং খ যদি নির্বাচিত হয় তবে তাও মন্দ হবে। কিন্ত, যেহেতু ক তুলনামুলক কম মন্দ তাই ক- কে নির্বাচিত করা বাধ্যতামুলক। এটি কোনো ফিকহ নয় বা কোনো ইজতিহাদও নয়। এই আইনি ভিত্তিটি (the legal basis) এখানে প্রযোজ্য হবে না। উদাহরনস্বরুপ, কেন পেরেসের মুনকার নেতানিয়াহুর মুনকার হতে কম হবে? কে বলল যে ক; খ থেকে কম মন্দ। প্রকৃতপক্ষে এগুলো হলো শুধুমাত্র খেয়াল-খুশি। শরীয়ার ভিত্তি সেখানেই প্রযোজ্য হবে যেখানে শরীয়া দলীল দিয়ে নির্ধারন করে, দুই মন্দের মধ্যে তুলনামুলক কম কোনটি এবং যেখানে এই দুই মন্দ ব্যতীত (তৃতীয়) উপায় থাকে না। Election বা নির্বাচনে অবশ্যই অন্য উপায় বিদ্যমান প্রার্থীর পক্ষে, তা হল প্রাথীতার অনুবন্ধ থেকে শেষ পর্যন্ত শরীয়ার আদেশ মান্য করা, যেটা কার্যকর ও সম্ভব। তাই ‘দুটির মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম মন্দ’ এই শরীয়া ভিত্তির দোহাই দেয়া এই ক্ষেত্রে অকার্যকর। প্রকৃতপক্ষে একজন মুসলমানের পক্ষে সবচেয়ে উত্তম পথ খোলা রয়েছে আর তা হলো নির্বাচনে অংশগ্রহন না করা এবং মন্দের রসাতলে তলিয়ে না যাওয়া।

    এটি সত্য নয় যে একজন মুসলিম (হোক সেটি মুল বিষয় বা সামান্য বিষয়) সংসদ ব্যতীত কাজ করতে পারে না। এটিও সত্য নয় যে সংসদের মাধ্যমেই সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংসদে অংশগ্রহন একটি মিথ্যা সাক্ষ্য, কাযক্রমে নিস্ক্রিয়তাদানকারী এবং উম্মাহর চেপে রাখা ক্ষোভের বিস্রাবন, বিশেষ করে প্রার্থীরা যখন আল্লাহকে ভয় করে (জনগনের ভাষ্যমতে)। প্রকৃত আল্লাহভীরু ব্যক্তির পক্ষে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে এ থেকে বিরত থাকা নতুবা সে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার সরঞ্জামে পরিনত হবে।

    কয়েক বছর আগে (১৯৯০ সালে) আমরা দেখেছি আলজেরীয়ায় ‘ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট’ নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বীনকে বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারে নি। বরং তাদেরকে কারাগারে যেতে হয়েছিল কেননা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার মূল অধিকারিরা কখনোই শত্রুর কাছে ক্ষমতার হস্তান্তর করবে না। তুরস্কতে আমরা দেখেছি Refah Party কে মন্ত্রীসভায় সুযোগ দেয়া হয়নি যতক্ষন না তারা ক্ষমতার দালালদের কাছে অঙ্গীকার করে ও নিশ্চয়তা দেয় যে, সেকুলারিজম ব্যাতীত অন্য কিছু বাস্তবায়ন করবে না এবং ঠিক তাই করবে যা কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ চায়। সুতরাং সমাধান সংসদের মধ্য থেকে নয় বরং শক্তিশালী পক্ষের সাহায্য নিয়ে কর্তৃত্ব গ্রহনের মধ্যেই নিহিত।

    কতিপয় মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের বিজয়ের ব্যাপারে হতাশা কাজ করে। আর এই হতাশা তাদেরকে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহনে বাধ্য করে। এখন সময় হয়েছে এই হতাশা ঝেড়ে ফেলার, এখন সময় হয়েছে সেইসব পশ্চিমা মতবাদ ও রীতিকে ধ্বংস করার যা আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকে আমাদের কে স্বার্থবাদী করে শুধুমাত্র লাভের পিছনে ছুটতে বাধ্য করছে। এখন সময় হয়েছে খিলাফত বাস্তবায়ন করার, শরীয়া বাস্তবায়ন করার এবং কুফর ব্যবস্থার অধীনে কুফর নির্বাচনের পরিবর্তে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে শুরা সদস্য নির্বাচন করার।

    يُرِيدُونَ أَنْ يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَنْ يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ

    তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলোকে নির্বাপিত করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ (এ ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, এ ব্যতিত যে তিনি অবশ্যই তাঁর আলোকে পরিপূর্ণ করবেন, যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে“। [ত‌ওবা:৩৩]
     

    মূল: একটি আরবী লিফলেটের অনুবাদ (ইংরেজী থেকে অনুবাদকৃত)

  • ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কি অস্ত্র ধরতে হবে?

    ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কি অস্ত্র ধরতে হবে?

    যদিও মুসলিমরা ১৯২৪ সালে তাদের রাষ্ট্র হারিয়েছিল তাদের হৃদয়ে তাদের দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা টিকে ছিল ঠিকই এবং এর দ্বারা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল খিলাফতের পুনঃআগমনের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এইসব আন্দোলনগুলো খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বলে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য জিহাদকেই একমাত্র পথ দাবি করে। যারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন তাদের আন্তরিকতা ও ত্যাগ সন্দেহের উর্ধ্বে। বর্তমানে যেহেতু অধিক থেকে অধিকতর মানুষের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এই দায়িত্ব পালন করতে তারা সঠিক পদ্ধতির খোঁজ করছেন। তাই এই সকল পদ্ধতি কুরআন ও সূন্নাহ’র আলোকে মূল্যায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুতরাং এই প্রবন্ধে আমি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় “জিহাদ” এই বিষয়ে আলোচনা করব।

    যারা মুসলিম ভূমির বর্তমান শাসকদের অস্ত্রের মাধ্যমে সরানোর কথা বলেন তারা এইসব দেশের শাসকদের কাফির হিসেবে গণ্য করেন। কারণ তাঁরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার আইন অনুসারে শাসন করে না। তাঁরা প্রমাণ হিসেবে কুর’আনের নিচের আয়াতটি উল্লেখ করেন,

    “এবং যারা আল্লাহর যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে বিচার ফয়সালা করেনা তারা কাফের” (আল মায়িদা-৪৪)

    অতঃপর তাঁরা এই শাসকদের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) অ্যাখ্যা দেয় এবং বলেন যে মুসলিমদের অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে কারণ রাসূল (সা) একটি হাদীসে বলেছেন “যে ধর্ম ত্যাগ করে তাকে হত্যা কর যতক্ষন না সে প্রায়শ্চিত্ত করে”। এছাড়াও তারা একটি হাদীস বলেন যা মুসলিমদের আদেশ করে তাদের শাসকদের সাথে জিহাদ করতে যখন তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কুফরি দেখা যায়। বুখারিতে বর্ণিত জুনাদা বিন আবি উমাইয়া এর বরাতে, তিনি বলেন, “আমরা উবাদাহ ইবনুস সামিত এর কাছে গেলাম যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আমরা বললাম আল্লাহ আপনাকে হিদায়াহ দান করুন। আপনি আমাদেরকে রাসূল (সা) এর একটি হাদীস বলুন যার মাধ্যমে আল্লাহ আপনাকে উপকৃত করবেন। তিনি বলেন, “একদা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের সকলের কাছ থেকে বা’ইয়াহ (শপথ) নিলেন যে যাতে আমরা সুখে দুঃখে তার কথা শুনি এবং মানি, সহজ, কঠিন এবং খারাপ অবস্থাতেও যাতে তাঁর আনুগত্য করি। আমরা আরো শপথ করেছি যে আমরা কখনো শাসকদের সাথে বিবাদে যাবনা যতক্ষন পর্যন্ত না তাদের মাঝে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হচ্ছে, আমাদের কাছে যা আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত।

    অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের সর্বোত্তম নেতা (ইমাম) আমীর হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ভালবাস এবং তারাও তোমাদের ভালবাসে, যারা তোমাদের জন্য দোয়া করে এবং তোমরা তাদের জন্য দোয়া কর। আর তোমাদের সবচেয়ে মন্দ/খারাপ নেতা হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। যাদেরকে তোমরা বদ-দোয়া কর এবং তারাও তোমাদের জন্য বদ-দোয়া করে। তাকে (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল,“হে আল্লাহর রাসূল (সা) আমরা কি তাদের তরবারী দ্বারা অপসারণ করবনা?” তিনি বলেন, “ না, যতক্ষন না তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং যদি তোমরা তাদেরকে এমন কাজ করতে দেখ যা তোমরা ঘৃণা কর তাহলে তার কাজকে ঘৃণা করিও এবং তার কাছ থেকে আনুগত্যের হাত সরিয়ে নিওনা ”(সহীহ মুসলিম)। উপরের হাদীসটি এটাই অর্থ করে যে,ঐ শাসক যে প্রকাশ্য কুফরি করে এবং আল্লাহ ব্যাতিত অন্য আইনে শাসন করে তার সাথে অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে এবং তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তার মানে কি আমরা বর্তমানে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব? কারণ তারা শরীয়াহ দ্বারা শাসন করছেনা।

    প্রথমত, আমরা ঐ দাবী টা দেখি যে বর্তমান শাসকরা মুর্তাদ হয়ে গেছে কারণ তারা আল্লাহর আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করছেনা । ইবনুল কাইয়্যিম এই ব্যাপারে যে সঠিক মতটি দিয়েছেন তা হল:

    “সঠিক মত হল যে, আল্লাহ প্রদত্ত আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে শাসন করা বড় এবং ছোট উভয় কুফরীর অন্তর্ভূক্ত, এটা নির্ভর করে যে বিচার করে তার অবস্থানের উপর। যখন সে মনে করে যে ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা বিচার করা বাধ্যতামূলক’ কিন্তু সে এই পথ থেকে অবাধ্যতার দরুন সরে যায় এবং এটা স্বীকার করে যে এই জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে তাহলে এটি হবে ছোট কুফর। কিন্তু সে যদি মনে করে যে ‘এটা বাধ্যতামূলক না’ এবং পছন্দের মালিক সে নিজে, যদিও সে নিশ্চিত যে এটাই আল্লাহর আইন তাহলে এটি বড় কুফর” (মাদারীজ আস সালিকীন, ১/৩৩৬-৩৩৭)

    আমরা ইবনুল কাইয়্যিম এর মতের সাথে আরো যোগ করতে পারি যে, যখন আমরা সূরা মায়িদার ঐ পরিচ্ছেদ পড়ি যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো আইন দ্বারা শাসনের কথা বলা হচ্ছে, আমরা দেখি যে যারা তাঁর আইন অনুসারে বিচার ফায়সালা করেনা তাদের তিনি কাফির, জালিম ও ফাসিক বলেছেন। তাই যদি একজন শাসক কুফর দ্বারা শাসন করে দূর্নীতির কারণে অথবা বিরোধীদলের ভয়ে অন্যায় করে যদিও স্বীকার করে যে তার এই কাজ গুনাহ এবং ঘৃণা/নিন্দাযোগ্য তবে সে হবে ফাসিক, জালিম বা কাফির নয়। অন্যদিকে সে যদি কুফর দ্বারা শাসন করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর আইন দ্বারা শাসন করা বাধ্যতামূলক নয় অথবা কুফরী আইন আ-ল্লাহর আইনের চেয়ে ভালো তবে সে নিজেকে ইসলামের বন্ধন থেকে ছিড়ে ফেলল এবং সে মুরতাদ হয়ে গেল। পরের ভাগটিকে প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের কাছে স্পষ্ট যে হাদীস আছে তা হল,

    “যতক্ষন আমরা স্পষ্ট কুফর দেখতে পাব যার পক্ষে আমাদের কাছে আল্লাহ কর্তৃক দলীল আছে”

    তাছাড়া কাউকে কাফির তকমা লাগিয়ে দেওয়া (কোন প্রকাশ্য দলীল ছাড়া) ইসলামে জায়েজ নেই। এছাড়াও তারা যদি কাফির হয়ে থাকে আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত যে ‘উম্মাহর মধ্যে থেকে কিছু মানুষ অথবা গোষ্ঠী বা দল কি খলীফা বা ইমামের অনুপস্থিতিতে এবং তার অনুমতি ছাড়া মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে? আমরা জানি যে, মুরতাদের শাস্তি সহ অন্য সব হুদুদ বাস্তবায়ন করা ইমামের একচ্ছত্র দায়িত্ব। যদিনা অন্য কোথাও বিশেষভাবে এর বর্ণনা থাকে। রাসূল (সা) এর নিচের হাদীসটি এই ব্যাপারটি পরিস্কার করে,

    “ইমামের অনুপস্থিতিতে (রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ব্যতিত) কারো অধিকার নেই হুদুদ বাস্তবায়ন করা”। (বায়হাকী কর্তৃক তাঁর সুনানে বর্ণিত)

    ইমাম তাহাবীও মুসলিম ইবন ইয়াসার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেন, “যাকাত (সংগ্রহ), হুদুদ (বাস্তবায়ন), গনীমত (যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি (বন্টন), জুমা (ইমামতি), এগুলো হল ইমাম (সুলতান) আমীরের”।

    দ্বিতীয়ত, আমাদেরকে যে সব শাসক প্রকাশ্যে কুফর করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যে হাদীসে আদেশ করা হয়েছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুঝা উচিত। আমরা যদি একটু সচেতনভাবে ঐ হাদীসটির দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে এখানে ঐ শাসকের কথা বলা হয়েছে যারা জনগনের বৈধ বা’ইয়াহ নিয়ে এসেছে এবং তারা ইসলাম অনুসারে শাসন করত কিন্তু পরবর্তীতে কুফর দ্বারা শাসন করতে থাকে। তার মানে হচ্ছে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে খলীফার সাথে যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিন্তু খলীফা পরিস্কার কুফর করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট এই হাদীসের প্রেক্ষাপট থেকে ভিন্ন। বর্তমানে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে আছি যেখানে খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তা কুফর শাসন দ্বারা পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বর্তমান শাসকেরা কখনোই জনগন থেকে শর’ঈ বা’ইয়াহ নেয়নি। তাদের কেউই মোটেও ইসলামকে বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসলামকে বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টাও করেনি। তাই বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুই বিপদগামী শাসককে প্রতিস্থাপন করার চাইতেও অনেক বড়। বরং এটি হচ্ছে সমস্ত কুফর ব্যবস্থা যা মুসলিম ভূমিগুলোতে আরোপিত আছে তাকে সমূলে উৎপাটন করা এবং খিলাফাহ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এইসব আন্দোলনগুলো যেগুলো ইসলামী খিলাফাহ কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে জিহাদের পক্ষালম্বন করে তারা তাদের পদ্ধতিকে ঠিক প্রতিয়মান করতে শরীয়ার একটি মূলনীতি বলে থাকে যা হল-

    “কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”।

    কিন্তু এটি নিতান্তই ভ্রান্ত যে, কোন সাধারণ মূলনীতি দিয়ে কোন একটি বিশেষ ইস্যুর নির্দিষ্ট মত (হুকুম) দেয়া এবং এই ইস্যুকে নিয়ে অন্যান্য যা বিশেষ টেক্সট আছে তাকে বাদ দেওয়া অথবা কোন বিশেষ টেক্সট না থাকলে ইসলামের অন্যান্য মূলনীতিকে গ্রাহ্য না করা। ড. হেকাল যিনি আমাদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে একটি থিসীস করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একটি ইস্যুতে এই পদ্ধতিতে পরস্পর বিরোধী উপসংহারে আসে তা বিবৃত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ এই ইস্যু যা হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ‘অস্ত্রের ব্যবহার’। এটা অনেকে বলতে পারে যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ কারণ এটা রাসূল (সা) এর হাদীস থেকে প্রমাণিত “যে আমাদের (মুসলিমদের) দিকে অস্ত্র উত্তোলন করে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়”। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরয এবং এটি প্রতিষ্ঠা কখনোও সম্ভব নয় অস্ত্র ছাড়া যা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এখানে একই ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয়ই বিষয় চলে আসছে এবং ইসলামের একটি মূলনীতি হল “যখন কোনো একটি ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয় বিষয় চলে আসে তবে অবৈধতা বৈধতাকে অগ্রাহ্য করবে। তার মানে তখন একজনকে অবশ্যই অবৈধতার হুকুম অনুসারে কাজ করতে হবে এবং তখন অস্ত্র ব্যবহার অবৈধ হবে”। এছাড়া কিছু মানুষ বলতে পারে যে আল্লাহর আইন প্রয়োগের জন্য এই ফরয পালন/বাস্তবায়ন একটি সওয়াবের কাজ এবং যা নিষিদ্ধ তা করা মানে উম্মাহর রক্ত প্রবাহিত করা গুনাহ/ফাসিকি। ইসলামী শরীয়াহ বলে যে “ফাসিকি বা গুনাহকে বাধা দেয়া/ দমন করা আমাদের সওয়াব অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। “যে কাজ ফরয তা করতে যা করার দরকার হয় তাও ফরয” এটি তখনই নেয়া যাবে যখন এই ইস্যুতে কোন পার্থক্য থাকবেনা যে এটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এটি বৈধ কোনো মাধ্যম ছাড়া অর্জন করা যাবেনা। তখনই কেবল বলা যায় যে “কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”। তার মানে কোন বৈধ কাজ যা কোন ফরয কাজ করার মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয় তখন ঐ কাজটি ফরয হয়ে যায়। কিন্তু যখনই এই ফরয কাজটি এমন কোন কাজ ছাড়া করা সম্ভব নয় যা নিজ থেকেই নিষিদ্ধ যেমনটা আমরা এই প্রবন্ধে যা নিয়ে আলোচনা করছি অস্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে- অমারা কি এখন এই ফরযটি পালন করতে এই কাজটি করতে পারি শরীয়ার এই মূলনীতিকে বাদ দিয়ে? আল্লাহর শপথ না! যতক্ষন পর্যন্ত এই কাজটি অন্য আরেকটি মূলনীতি“ প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ/ অবৈধকে বৈধ করে” এর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। হ্যাঁ, তবে যদি এই সম্বন্ধে তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে কোন বিশেষ টেক্সট বা দলিল থেকে থাকে এবং যা অস্ত্র ব্যবহারের সাধারণ মূলনীতিতে এই বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করা থেকে বিরত রাখে তাহলে এই দলীলটি হবে ব্যাতিক্রম এবং এটি “যা ফরয তা পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয” এই মূলনীতিতে পড়ে না। সংক্ষেপে শুধুমাত্র ‘ফরয পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয’ এই মূলনীতিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করে এবং অন্যান্য যে নির্দিষ্ট দলীলগুলো আছে তা অগ্রাহ্য করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধকেই একমাত্র পন্থা হিসেবে বেছে নেওয়াকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। এছাড়াও যারা মুসলিম ভূমিতে সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বলে তারা আরেকটি যুক্তি দেয় যে, মুসলিম ভূমিগুলো আজ দখলকৃত এবং জিহাদ এখন ফারদুল আইন হয়ে গেছে। সেজন্য প্রত্যেক মুসলিমকেই এই দখলকৃত ভূখন্ডগুলোকে মুক্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করতে হবে। এই যুক্তি জিহাদের বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা এক করে ফেলে যেখানে এই দুটি পুরোপুরি ভিন্ন কর্তব্য এবং সেগুলো সম্পাদনের কর্মপদ্ধতিও ভিন্ন। জিহাদ প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরযে আইন হয়ে যায় যখন মুসলিমদের ভূমি দখল হয়ে যায় এবং ঐ ভূমির প্রত্যেক মুসলিমকেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থাক বা না থাক রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে জিহাদ করতে হয়। কিন্তু অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না থাকলে তা প্রতিষ্ঠা করা ফরয হয় যদিও রাষ্ট্রটি বাইরের শত্রু“ দ্বারা দখলকৃত থাক বা না থাক। অনেকে আবার অনেক দূরে এগিয়ে বলে বর্তমানে প্রত্যেক মুসলিম ভূমি দখলকৃত কারণ এদের শাসকেরা উম্মাহর শত্রু“। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এই উম্মাহর শত্রু“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভূমি মুক্ত করা আবশ্যক। তাদের এই ধারণাটি দখলের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভূল। একটি ভূমি তখনই দখল হয়ে যায় যখন তা কোন অমুসলিম বাহ্যিক শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং মুসলিমদের কাছ থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিন, আফগানিস্থান ও ইরাকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শুধুমাত্র সে ক্ষেত্রে জিহাদ করা প্রত্যেকের উপর ফরয হয়ে যায়। তাই বর্তমানে যেহেতু কোন মুসলিম দেশের শাসকেরা ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করছেনা তাই সব মুসলিম দেশই দখলকৃত এটা বলা ভূল কারণ ঐসব ভূমির কর্তৃত্ব এখনও মুসলিমদের হাতে যারা তাকে বাইরের শত্রু“র আক্রমন থেকে রক্ষা করে। তাই এই অবস্থা একমাত্র কার্যকর হবে যখন বিদেশী সেনারা ঐ ভূমি দখল করবে। যখন মুহাম্মদ (সা) মক্কায় দাওয়াহ করছিলেন তখন আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা) অন্যান্য কিছু সাহাবাদের সাথে এসে আল্লাহর রাসূল (সা) থেকে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল এই বলে নিষেধ করেন যে,

    “প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, তাই মানুষের সাথে যুদ্ধ করিওনা” (ইবনে আবি হাতিম এবং আন নাসাই ও আল হাকিম কর্তৃক বর্ণিত)।

    সুতরাং আমরা মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হইনি। বরং আমাদেরকে রাসূল (সা) মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যেসব কাজগুলো করেছেন তাই অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) এর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বের দাওয়াহ কে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। প্রথম পর্যায় হচ্ছে গোপনে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ তথা সাহাবাদেরকে (রা) ইসলামী চিন্তা-ধারণা এবং আবেগ দ্বারা পরিচালিত করা এবং তাঁদেরকে ইসলামের বার্তা ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা।

    দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল তখন থেকে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা রাসূল (সা) কে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। এটি হচ্ছে তখন যখন রাসূল (সা) প্রকাশ্যে কুরাইশদের জীবন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তাদের সর্দারদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এই পর্যায়টি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের। শেষ পর্যায়ে মুহাম্মদ (সা) বিভিন্ন আরব গোত্রের কাছে যান সামরিক সহযোগিতা (নুসরাহ) এর সন্ধানে যতক্ষন পর্যন্ত না মদীনার “আওস ও খাজরাজ” সমর্থন দিতে শপথ করে। (বিস্তারিত জানতে নবী (সা) এর দ্বীন কায়েমের পদ্ধতি দেখুন)।

    পরিশেষে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র জিহাদ বা যুদ্ধের কোনো দলীল প্রমাণিত হল না। বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিহাদকে আল্লাহর রাসূল (সা) বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। তার পরিবর্তে রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট পথ আমাদেরকে দেখিয়েছেন এবং আমাদের কঠোরভাবে এই পদ্ধতির সাথে জড়িয়ে থাকতে হবে ও লক্ষ্য রাখতে হবে যেহেতু এটি একটি শরয়ী বাধ্যবাধকতা তাই যেন এই পথ থেকে আমরা বিন্দুমাত্র ও সরে না যাই।

    মূল: শফিউল হক

    তথ্যসূত্র:
    আল জিহাদ ওয়াল কিতাল ফি আস-সিয়াসা আস শারীয়া > ড. মুহাম্মদ খায়ের হেকাল।

    Posted by Visionary 

  • খিলাফত ব্যবস্থায় শ্রমিক-মালিকদের অধিকার ও শিল্পখাতের স্থিতিশীলতা

    খিলাফত ব্যবস্থায় শ্রমিক-মালিকদের অধিকার ও শিল্পখাতের স্থিতিশীলতা

    একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই পারে শ্রমিক ও মালিকদের অধিকার নিশ্চিত করে শিল্পখাতকে স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে

    বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ৩,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৮,১০০ টাকা করার দাবিতে ২১ শে সেপ্টেম্বর ২০১৩ থেকে সহিংস আন্দোলন শুরু করে। শত শত শ্রমিক পুলিশের আঘাতে আহত হয়, অনেক সম্পদ ভাংচুর ও লুটপাট হয়। ঢাকা এবং তার আশেপাশের কারখানাগুলোতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে কয়েকশত কারখানার কাজ বন্ধ থাকে। চলতি বছরের (২০১৩) জুন মাসে সরকার কর্তৃক সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ বোর্ড গঠন করে দেয়া হয়েছে যেখানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতিনিধিরা গত আগষ্ট মাসে তাদের বেতন বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছিল। ১৭ সেপ্টেম্বর গার্মেন্টস মালিকদের প্রতিনিধিরা মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ৩,৬০০ টাকা প্রস্তাব করে, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই আন্দোলন শুরু হয়।

    তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় (চীন প্রথম)। এই খাতে বাংলাদেশ প্রতি বছর ২১ বিলিয়নের বেশি মার্কিন ডলার আয় করে। শিল্প বিশ্লেষকরা আশা করেন যে আগামী ৫ বছরে এই খাতে দ্বিগুণ আয় করা সম্ভব। এই শিল্পে বর্তমানে প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগ নারী।

    বিভিন্ন শিল্প কারখানা ও সেবা খাতে শ্রমিক আন্দোলন বাংলাদেশে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বিদেশী শক্তির উস্কানির পাশাপাশি গার্মেন্টস মালিক এবং শ্রমিকদের মধ্যে কিছু প্রকৃত ইস্যু বিদ্যমান, যা আলোচনা ও সমাধান করা প্রয়োজন। মজুরি নির্ধারণ, সময়মত মজুরি প্রদান না করা, কম মজুরি প্রদান এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোন মজুরি প্রদান না করা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক সংগঠন করার অধিকার ইত্যাদি সাধারণত শ্রমিক আন্দোলন এবং শ্রমিক অসন্তোষের মূল কারণ। পাশাপাশি মালিকেরা তাদের কারখানা ও সম্পদের নিরাপত্তা এবং সরকারের কর বিভাগ, চাঁদাবাজ ও ট্রেড ইউনিয়নের অত্যাচার নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিক এবং শ্রমিকের সম্পর্ক শোষক-শোষিতের, অস্থিতিশীল এবং পরস্পরের প্রতি সংঘাতপূর্ণ। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই জাতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন যাতে শ্রমিক এবং মালিকদের সম্পর্ক স্থিতিশীল এবং উৎপাদনমুখী হয়। খিলাফত সরকার মালিক এবং শ্রমিক – উভয়ের অধিকার নিশ্চিত করবে যাতে অর্থনীতি শান্তিপূর্ণভাবে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যায়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মালিক-শ্রমিক সম্পর্কের বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে এই বিষয় সম্পর্কিত কিছু মৌলিক ধারনা নিম্নে আলোচনা করা হলো –

    ১। মজুরি নির্ধারণ – একজন শ্রমিক নিয়োগ করা হচ্ছে একটি চুক্তি, যেখানে তার শ্রমের বিনিময়ে তাকে মজুরি প্রদান করা হয়। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তিকে অনুমতি দেয় (এ ক্ষেত্রে গার্মেন্টস কারখানার মালিক তথা উৎপাদককে) শ্রমিককে তার শ্রম দানের জন্য নিয়োগ দিতে। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “… আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বন্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবক রূপে গ্রহণ করে…।” [সূরা আয্‌ যুখরূফ : ৩২]

    শারী’আহ্‌ অনুযায়ী নিয়োগের সময় চারটি বিষয় শ্রমিকের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করতে হবে : কাজের প্রকৃতি, কাজের সময়কাল, মজুরি এবং উক্ত কাজে শ্রমিকের যোগ্যতা ও প্রচেষ্টার ধরন। ইসলামী নিয়ম অনুসারে কাজের পূর্বে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ করে নিতে হবে। কারণ রাসূল (সা) বলেন, “যদি তোমাদের মধ্যে থেকে তোমরা কোন শ্রমিককে নিয়োগ কর, তাহলে তাকে তার মজুরি সম্পর্কে জানিয়ে দাও।” (ইবনে মাস’উদ থেকে বর্ণিত)

    একজন শ্রমিকের দৈনিক কত গ্রাম ক্যালরির প্রয়োজন হয় তার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়। গৃহপালিত পশুপাখিদেরকে যেমন পর্যাপ্ত খাবার দেয়া হয়, যাতে তারা ডিম, দুধ বা মাংস দিতে পারে, তেমনি গার্মেন্টস শ্রমিকদেরও একইভাবে তুলনা করা হয়। সর্বনিম্ন মজুরির ধারনা কিছু দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে দেয়। যখন সরকার কর্তৃক সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে তখন অনেক নিয়োগকর্তা ঐ সুবিধাটা গ্রহণ করে এবং তারা সব কর্মচারী বা শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরিতে নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করে। নিয়োগকর্তাদের দক্ষ কর্মীদের ছাটাই করার একটা প্রবণতা থাকে যখন তারা অধিক মজুরি দাবি করে এবং তাদের পরিবর্তে তারা অদক্ষ এবং আধা-দক্ষ শ্রমিকদের  অধিক হারে নিয়োগ দান করে যাতে তাদেরকে সর্বনিম্ন মজুরি প্রদান করতে পারে।

    সর্বনিম্ন জীবন যাত্রার মানের উপর ভিত্তি করে মজুরি নির্ধারণ করার এই পুঁজিবাদী চিন্তা ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শ্রমিকদের উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে মজুরি নির্ধারণ পদ্ধতিও ইসলাম প্রত্যাখ্যান করে। অন্যান্য শিল্পখাত বা অন্য দেশের মজুরি কিংবা তথাকথিত আন্তর্জাতিক সর্বনিম্ন মানও (international minimum standard) মজুরি নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে না। মজুরি নির্ধারিত হবে শ্রম অথবা শ্রমিকের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুবিধার (benefit) ভিত্তিতে। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যে সমাজে তারা বাস করবে সেই সমাজের জীবনযাত্রার মান অনুযায়ী প্রাপ্ত সুবিধার মূল্যের (value) ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা মজুরি নির্ধারণ করবে।

    ২। মজুরি প্রদানের সময় – কারখানার মালিকদের একটা অভ্যাস হচ্ছে শ্রমিকদের দেরিতে মজুরি প্রদান করা। কয়েক মাসের মজুরি প্রদান না করার মানে হচ্ছে শ্রমিকদের এক প্রকার বন্দি করে রাখা।  নিয়োগকর্তারা যুক্তি দেখান যে শ্রমিকদের যদি সব বেতন প্রদান করা হয়, তাহলে কর্মক্ষেত্রে তারা অনুপস্থিত থাকবে বা ক্ষেত্রবিশেষে তারা চাকরি ছেড়ে দিবে। প্রতি বছর বিশেষ করে ঈদের ছুটির আগে বকেয়া বেতন অতিরিক্ত সময়ের কাজের ভাতা এবং উৎসব বোনাসের জন্য শ্রমিকদের বিক্ষোভ করতে হয়। দেরীতে মজুরি প্রদান অথবা প্রদান না করার ব্যাপারে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। বুখারী শরিফে আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন,

    “আল্লাহ্‌ আজ্জা ওয়া জাল বলেন, শেষ বিচারের দিনে আমি তিন ধরনের ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াব…এবং এমন একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে যে একজন লোককে কাজে নিয়োগ করল এবং তার কাছ থেকে সে পূর্ণ কাজ করিয়ে নিল কিন্তু তাকে তার পূর্ণ মজুরি প্রদান করেনি।”

    অন্য একটি হাদিসে আবদুল্লাহ্‌ ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তাকে তার পারিশ্রমিক দিয়ে দাও।”

    ৩। জীবন ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা – গত এক বছরে রানা প্লাজা ধ্বংস এবং তাজরিন গার্মেন্টসে অগ্নিকান্ড সারা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে যেখানে সহস্রাধিক শ্রমিক মারা গেছে এবং অসংখ্য শ্রমিক আহত হয়েছে। পাশাপাশি রুটিন মাফিক শ্রমিক বিক্ষোভ এবং দেশের গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে নিয়োজিত দালালরা আন্দোলনের নামে দেশের সরকারী ও বেসরকারী সম্পদ ধ্বংস করে চলছে। রাষ্ট্রযন্ত্র শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে কঠোরভাবে দমন করছে। এই ধরনের কাজ ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং ইসলামী রাষ্ট্র এই ধরনের যে কোন পরিস্থিতি শক্তভাবে মোকাবেলা করবে। ইসলামী রাষ্ট্র জীবনের নিরাপত্তা, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং জনগণের সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করতে বাধ্য। আবু বকর (রা) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) বিদায় হজ্জের খুতবায় বলেন,

    “তোমাদের একজনের রক্ত, সম্পদ, সম্মান অন্য আরেকজনের নিকট নিরাপদ ও পবিত্র যেমন নিরাপদ ও পবিত্র আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর।” (বুখারী ও মুসলিম)

    ৪। ট্রেড ইউনিয়ন – বর্তমান ব্যবস্থায় মনে করা হয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং সিবিএ শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করবে। কিন্তু অতীতে এর ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে বিভিন্ন সেক্টরে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যক্রম বিশেষতঃ গার্মেন্টস খাত ও রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। খুব সীমিত পরিসরে ক্ষুদ্র ব্যক্তি পর্যায়ের স্বার্থরক্ষার উপর ট্রেড ইউনিয়ন এবং সিবিএ’গুলো গুরুত্বারোপ করে থাকে। বিগত বছরগুলোতে তারা রাজনৈতিক দল ও বিদেশী শক্তির স্বার্থ বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্রে যেকোন সংগঠনের প্রধান কাজ হবে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করা। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “তোমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি দল থাকবে যারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে এবং এরাই হবে সফলকাম।” [সূরা আলি ইমরান : ১০৪]

    অতএব খিলাফত রাষ্ট্রে সাধারণভাবে সংগঠনের অনুমোদন দেয়া হবে কিন্তু বর্তমান সময়ের আদলে ট্রেড ইউনিয়নকে অনুমোদন দেয়া হবে না। যে কোন অবিচারের জন্য একজন শ্রমিক যে কোন সময় প্রতিকার চেয়ে আদালতে আবেদন করতে পারবে যেখানে কুর’আন ও সুন্নাহ্‌ অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করা হবে।

    ৫। বিদেশী হস্তক্ষেপ – বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং বিদেশী শক্তি যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউ বাংলাদেশের শিল্প সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নের সাথে সরাসরি জড়িত। বিভিন্ন সংস্থা যেমন ইউএস এইড (USAID), ডিএফআইডি (DFID) ইত্যাদির মাধ্যমে বর্তমানে তারা অনেক এনজিওকে সাহায্য দিচ্ছে শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে তথাকথিত সচেতনতা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে। এছাড়াও কমপ্লায়েন্সের (compliance) নামে বিদেশী কোম্পানীগুলো স্থানীয় কারখানার মালিকদের বিভিন্ন বিধি নিষেধ আরোপ করে থাকে। বিদেশীদের একমাত্র উদ্দেশ্য এদেশের শিল্প খাতকে ততটুকু বিকশিত করতে দেয়া যা পশ্চিমা দেশগুলোর প্রয়োজন মেটাতে সাহায্য করবে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে তারা তাদের উপর নির্ভরশীল করে রাখতে পারে। বিদ্যমান ইস্যু ব্যবহার করে তারা শ্রমিক অসন্তোষকে উস্কে দেয় যাতে এই দেশের শিল্পকারখানা সব সময় অস্থিতিশীল এবং ভঙ্গুর থাকে এবং তাদের খেয়াল খুশি মত আমাদের উপর কর্তৃত্ব করতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্র কখনও কোন বিদেশী রাষ্ট্র, সংস্থা কিংবা কোম্পানীকে আমাদের শিল্পখাতে নাক গলানো বা কর্তৃত্ব করার সুযোগ দিবে না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেন,

    “আল্লাহ্‌ কখনই অবিশ্বাসীদেরকে বিশ্বাসীদের উপর বিজয় দান করবেন না।” [সূরা আন্‌-নিসা : ১৪১]

    বরং খিলাফত রাষ্ট্রের নিজস্ব পরিকল্পনা থাকবে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি ও একটি শক্তিশালী শিল্পভিত্তি গড়ে তোলা যাতে এ রাষ্ট্র পৃথিবীতে একটি পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। ইসলামী রাষ্ট্র হবে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র যার প্রধান লক্ষ্য থাকবে সারা পৃথিবীকে ইসলাম দিয়ে শাসন করা। এই নীতির কারণে ইসলামী রাষ্ট্র সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, শিল্প ও সামরিক দিক দিয়েও শক্তিশালী হবে।

    পরিশেষে বলা যায়, জীবনের সকল সমস্যার প্রকৃত সমাধান ইসলাম পরিপূর্ণভাবে দিয়ে থাকে। কিছু কিছু রাষ্ট্রীয় সমস্যার ক্ষেত্রে ইসলাম থেকে আংশিকভাবে সমাধান নিয়ে আমরা সার্বিক পরিবর্তন আশা করতে পারি না। যখন খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ইসলাম পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত থাকবে তখন সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। সকল প্রকার শোষণ, অন্যায় কর ও চাঁদা প্রদানসহ সকল জুলুম থেকে মানুষ মুক্ত হবে। ইসলামী মূল্যবোধ এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতাসহ জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা হবে এবং রাষ্ট্র সকল মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। পৃথিবীতে এবং পরকালে শান্তি এবং সম্মানের সাথে বাস করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা আমাদের জন্য ফরয দায়িত্ব।

    মুহাম্মদ রাইয়ান হাসান

  • বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল?

    বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল?

    একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল। অনেকে মনে করেন যেহেতু তৈরী পোষাক খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত এবং যুক্তরাষ্ট্র এর অন্যতম ক্রেতা, তাই বর্তমান বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভবতো বটেই; এক কথায় আত্মহননের শামিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশী রয়েছেন যারা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস। তাই ইসলামী রাষ্ট্র, খিলাফত প্রতিষ্ঠা মানেই হলো জাতিকে অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়া; যেমন – যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু মুসলিম হিসেবে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে, যদি আমরা এই ক্রুসেডারকে প্রতিহত না করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

    … এবং কিছুতেই আল্লাহ্‌ কাফিরদেরকে মুসলিমদের ওপর বিজয় দান করবেন না।” [সূরা নিসা : ১৪১]

    বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্কের দু’টি প্রধান দিক হলো বাণিজ্য ও প্রবাসী আয় (remittance)। বাস্তবতা যাচাই করতে হলে দু’দেশের সম্পর্কের প্রকৃতি আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে, তবেই আমরা বুঝতে পারব সত্যিই বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল কি-না। আমাদের আরো সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে ইসলাম প্রদত্ত সমাধানের প্রতি তথা ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফত এ সমস্যা সমাধানে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।

    যুক্তরাষ্ট্রে গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাংলাদেশ কতটুকু নির্ভরশীল তা যাচাই করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে মোট রপ্তানির তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। ১ নং সারণি থেকে এটা পরিষ্কার যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে (মূল তথ্য সারণির জন্য পরিশিষ্ট দেখুন)। আমাদের জাতীয় আয়ের (জিডিপি) প্রায় এক পঞ্চমাংশ আসে রপ্তানি থেকে।

    কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের এই রপ্তানি আয়ের মাত্র এক পঞ্চমাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। সার্বিকভাবে, আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ৪% আসে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি থেকে। আমরা যদি তৈরী পোষাক শিল্পের মূল্য সংযোজন (value addition) ধরি ৫০% (সম্ভাব্য সর্বোচ্চ), তাহলে জিডিপিতে প্রকৃত অবদান হবে ২% মাত্র। সুতরাং সামষ্টিক অর্থনীতির দিক বিচারে, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের দেশের তৈরী পোষাক আমদানি বন্ধ করে দিয়ে আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিতে পারে – এটা একটি নিছক গালগল্প।

    বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক একই চিত্র পরিদৃষ্ট হয়। প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রেরিত অর্থ হতে প্রাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২ নং সারণিতে আমরা দেখি সাম্প্রতিককালে আমাদের জাতীয় আয়ে প্রবাসী প্রেরিত অর্থের অবদান ১০% এর সামান্য বেশি। যাই হোক, যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত প্রবাসী আয় হলো আমাদের মোট প্রাপ্ত প্রবাসী আয়ের ১৪%। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত প্রবাসী আয় আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ১.৫%।

    তাই একথা নির্দ্ধিধায় বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র হতে প্রাপ্ত প্রবাসী আয় আমাদের দেশের ক্ষেত্রে কোনভাবেই অপরিহার্য কোন বিষয় নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র হতে আমরা যে অর্থ সাহায্য পাই, তাও কোন বিবেচ্য বিষয় নয়।

    ২০১০ সালে এ অর্থ সাহায্যের পরিমাণ ছিল আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ০.১২%। প্রকৃত ইস্যু ও খিলাফতের অধীনে আমাদের বাস্তবতা এখন আমরা রপ্তানি ও প্রবাসী আয় নিয়ে বিতর্কের একটু গভীরে দৃষ্টিপাত করি। এ বিতর্কের মূল কারণগুলো হলো:

    – আমাদের আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন; 
    – গার্মেন্টস খাতটি শ্রম নির্ভর; এই খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে বহু লোক কর্মসংস্থান হারাবে;
    – একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সেখানে অবস্থানরত দশ লক্ষাধিক বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠাবে।

    বাস্তব অর্থে বৈদেশিক মুদ্রা ও বেকার সমস্যাই হলো মূল আলোচ্য বিষয়। বৈদেশিক মুদ্রা ও বেকার সমস্যা সমাধানে খিলাফত রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে পরবর্তী পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তার পূর্বে আমাদের বুঝতে হবে বাস্তব ক্ষেত্রে রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আমাদের সাথে সকল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করাটা কোন সহজ ব্যাপার নয়। আমরা যদি নির্ভরশীলতার কথা বলি তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের কম মজুরীতে শ্রমিক প্রয়োজন: হয় আমাদের তৈরী পোষাক আমদানির মাধ্যমে অথবা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্রের আদমশুমারী অনুযায়ী ২০০৭ সাল পর্যন্ত সেখানে ১৪৩,৬১৯ বাংলাদেশী বাস করে। এর পাশাপাশি অবৈধ অধিবাসীর সংখ্যাও কম নয়। রাতারাতি এত বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে দুঃস্বপ্নের মতো। শ্রমবাজারের অন্য কোন উৎস, বিকল্প তৈরী পোষাক আমদানি বাজার এবং ঐসব বিকল্প দেশের সক্ষমতা তৈরী – এসবের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা হলেও সময়ের প্রয়োজন হবে। সে সময়ের মধ্যে বাংলাদেশও খিলাফত সরকারের সহায়তায় রপ্তানির জন্য স্বল্প মেয়াদে বিকল্প বাজার খুঁজতে সক্ষম হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে খিলাফত রাষ্ট্রকে সমগ্র বিশ্বের মুসলিমরা সমর্থন দিবে এবং মুসলিম বিশ্ব ব্যতীত বহু রাষ্ট্রে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জনগণও এতে পূর্ণ সমর্থন যোগাবে। তাই খিলাফত রাষ্ট্র বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো রাষ্ট্র হবেনা; অথবা এই রাষ্ট্র একঘরে নীতিও অবলম্বন করবে না। পক্ষান্তরে খিলাফত রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিকসহ সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করবে, যেহেতু এটি সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত। খিলাফত রাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী বলিষ্ঠ জনমত থাকবে। একথা এখানে প্রণিধানযোগ্য যে খিলাফত রাষ্ট্র অবশ্যই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভর নীতি অনুসরণ করবে। তাই অদূর ভবিষ্যতে কোন ক্ষেত্রেই খিলাফত রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা বরদাশত করবে না। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের দেশসহ মুসলিম জাতিকে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদ দান করেছেন। খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে অবশ্যই এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হবে, যা আঞ্চলিক শক্তি ও পরাশক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখবে।

    বেকার সমস্যা

    খিলাফত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক লক্ষ্য জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি নয়; বরং প্রতিটি সাধারণ নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ এর লক্ষ্য। তাই খিলাফত রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণী পরিকল্পনায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। খিলাফত রাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে যে সকল পদক্ষেপ গৃহীত হবে তার কিছু নিম্নে উল্লেখিত হলো,

    – শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে উৎপাদনমুখিতা অর্থাৎ যে সকল ক্ষেত্রে জনশক্তি দরকার সে চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে প্রশিক্ষিত করা।
    – খিলাফত রাষ্ট্র ভূমিহীন কৃষকদের মাঝে সরকারের খাস জমি বন্টন করে দেবে, পাশাপাশি তাদের সেচ সুবিধা, সার ও বীজ সরবরাহ করবে। আধুনিক কৌশল ও যন্ত্রপাতি ও উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে তাদের জন্য। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
    – শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো তার শক্তিশালী শিল্প খাত। খিলাফত রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে বিশ্বে পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। তাই এটি শিল্পায়ন বিশেষতঃ শ্রম নির্ভর শিল্প কারখানার প্রতি জোর দেবে যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।
    – দক্ষ শ্রমশক্তির সঠিক ব্যবহার এবং আমাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক জ্বালানী সম্পদসমূহকে (তেল, গ্যাস, কয়লা) ভিত্তি করে ব্যাপক শিল্পায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
    – খিলাফত রাষ্ট্র অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন করবে। আমাদের রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করা হবে নিজস্ব সমরাস্ত্র কারখানা, জাহাজ ও উড়োজাহাজ নির্মাণ শিল্প এবং সাম্ভাব্য সকল ব্যক্তি খাতকে উৎসাহিত করা হবে।
    – এছাড়াও নাগরিকগণ সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা পাবে যাতে তারা নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে। যে কোন পর্যায়ে লুটতরাজ, দুর্নীতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ইত্যাদি খিলাফত রাষ্ট্র শক্ত হাতে দমন করবে।

    ফলে শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হবে যা জাতিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের দিক থেকে স্বনির্ভর করে গড়ে তুলবে।

    বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজনীয়তা

    বর্তমান বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারই প্রধান মুদ্রা। বস্তুত বিশ্বের বহু দেশ মার্কিন ডলারে বাণিজ্য করতে এবং এই ডলারকেই রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে রাখতে বাধ্য হয়; যাতে করে ডলারের চাহিদা সর্বদাই বিদ্যমান থাকে। ডলার হলো যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য ধরে রাখার একটি অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র সরকার যখন ইচ্ছা তখনই ডলার ছাপতে পারে। খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এই রাষ্ট্র বাণিজ্যের বিনিময় মাধ্যম ও রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারকে পরিত্যাগ করবে। খিলাফতের মুদ্রা হবে একই সাথে স্বর্ণ ও রুপা ভিত্তিক অর্থাৎ দ্বিধাতুভিত্তিক (bimetallic standard)। একবার এটি প্রতিষ্ঠিত হলে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো স্বভাবতই খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যে উৎসাহী হবে। আর এটি পূর্বেও বলা হয়েছে যে খিলাফত রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হলো আত্মনির্ভরশীল হওয়া।

    আমাদের আমদানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান মূলধনী যন্ত্রাংশ (capital machinery) ও জ্বালানী বিষয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। মূলধনী যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে বলা যায় খিলাফত রাষ্ট্র ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা করবে, যা মূলধনী যন্ত্রাংশ উৎপাদনকে বিশেষ গুরম্নত্ব দেবে, যাতে এই খাতে আমাদের অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে না হয়। তেল আমদানির ক্ষেত্রেও সেই স্বনির্ভর নীতিই প্রযোজ্য। খিলাফত রাষ্ট্র সকল উৎপাদন-অংশীদারি চুক্তি (পিএসসি) পুনর্বিবেচনা করবে এবং নিজস্ব কোম্পানীকে (বাপেক্স) শক্তিশালী করে অগ্রাধিকার দেবে যাতে এটি ভূ-গর্ভ ও সমুদ্র-গর্ভে সম্পদ অনুসন্ধান করতে পারে। খিলাফত রাষ্ট্র ইতিমধ্যে আবিষ্কৃত বিপুল পরিমাণ কয়লা সম্পদ কাজে লাগাবে।

    উপসংহার

    উপরের আলোচনায় এটা স্পষ্ট প্রমাণিত যে বাংলাদেশ কখনই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রা হতে প্রাপ্ত অর্থ একত্রে আমাদের জাতীয় আয়ের মাত্র ৪%। তাই এটি পরিষ্কার যে, আমরা বৈদেশিক সাহায্য ছাড়া চলতে অক্ষম – এটা কাফির সাম্রাজ্যবাদী জাতি ও বিশ্বাসঘাতক শাসকগোষ্ঠীরই প্রচারকৃত ধারনা। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মত শাসক যেখানে একটি পরিবার ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা রাখে না, সেখানে তারা এখন একটি দেশ পরিচালনা করছে। তারা শুধু একটা কাজই করতে পারে আর তা হল কে কত বেশি যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে পারে তার প্রতিযোগিতা করা। তাদের একমাত্র যোগ্যতা হলো ব্যক্তিগত স্বার্থ ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় তার সাথে চুক্তি করা। আমাদের বুদ্ধিজীবি সমাজ, রাজনীতিবীদ, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সাংবাদিকবৃন্দ, আমলা ও সেনাবাহিনী কিভাবে দুর্নীতিবাজ, অশিক্ষিত ও অযোগ্য এই শাসকবর্গকে মেনে নিচ্ছেন?

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের যথেষ্ট সম্পদ দিয়েছেন, যা দ্বারা আমরা আত্মনির্ভরশীল হতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব…।” [সূরা ত্বা-হা : ১২৪]

    তাই মুসলিম হিসেবে এসব শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণ করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা আমাদের কর্তব্য, যে রাষ্ট্র আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করবে। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    … আল্লাহ্‌ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” [সূরা রাদ : ১১]

    পরিশিষ্ট

    মোট রপ্তানি ও মোট জাতীয় আয়ের তথ্য সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি তথ্য সূত্র: 
    http://www.census.gov/foreign-trade/balance/c5380.html

    মোট তৈরী পোষাক রপ্তানি তথ্য (অর্থ বছর থেকে রুপান্তরিত) সূত্র: বিজিএমইএ, ইপিবি, 

    http://bgmea.com.bd/home/pages/TradeInformation
     

    প্রবাসী আয়ের তথ্য সূত্র:
    http://www.bangladesh-bank.org/econdata/wagermidtl.php

    ২০১০ ও ২০০৯ সালে বাংলাদেশে মার্কিন সাহায্যের পরিমাণ যথাক্রমে ১২৪ ও ৬৩ মিলিয়ন ডলার; সূত্র: বিশ্ব ব্যাংক যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী অধিবাসী তথ্য সূত্র:
    http://factfinder.census.gov

  • প্রশ্নোত্তর : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের স্বরুপ

    প্রশ্নোত্তর : যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্কের স্বরুপ

    প্রশ্ন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইরানের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করবেন কি? অন্য কথায়, ইরান কি আঞ্চলিক রাজনীতিতে স্বাধীনভাবে মার্কিন প্রভাবমুক্ত হয়ে নিজস্ব পরিকল্পনা অনুসারে অগ্রসর হয়? আমরা কি বলতে পারি যে, ইরান এ অঞ্চলে একটি মতবাদ প্রচার করতে চায়, যার নাম জাফরী মাযহাব? সবশেষে, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপারে আমেরিকার প্রকৃত অবস্থান কি?

    উত্তর: প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হলে আমাদেরকে প্রথমে সংক্ষেপে ইরানের সরকারের বাস্তবতা, বিপ্লবের পর থেকে আজ পর্যন্ত রাজনৈতিক পথ পরিক্রমা, প্রজাতন্ত্র ঘোষণা এবং এসব কিছুর সাথে আমেরিকার সম্পর্ক খতিয়ে দেখতে হবে:

    ১) ইরানি বিপ্লবের শুরু থেকেই আমেরিকার সম্পৃক্ততা ছিল সুস্পষ্ট। ফ্রান্সের নিউফ্‌ল-লে-শ্যাঁতো’তে (Neauphle-le-Château) খোমেনীর অবস্থানকালে হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধি দল তার সাথে সাক্ষাৎ করেছিল। তখন খোমেনী আমেরিকার সাথে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়। পরবর্তীতে মার্কিন সংবাদপত্রগুলো এই ঐকমত্য এবং সেখানে অনুষ্ঠিত বৈঠকের ব্যাপারে রিপোর্ট প্রকাশ করে… সাম্প্রতিককালে ইরানি প্রজাতন্ত্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট আবুল হাসান বানু সাদর ১/১২/২০০০ তারিখে আল-জাজিরার সাথে এক সাক্ষাৎকারে এ সত্যগুলো প্রকাশ করে। সে নিশ্চিত করে যে, ফ্রান্সের নিউফ্‌ল-লে-শ্যাঁতো’তে (Neauphle-le-Château) খোমেনীর অবস্থানকালে হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিদল সেখানে আসে। ইয়াজদি, বাজারকান, মুসাভি এবং আরদিবাইলি তাদেরকে স্বাগত জানায়… এ দু’পক্ষের মধ্যে অনেকগুলো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয় অক্টোবরে প্যারিসের শহরতলীতে। সে সময় রিগ্যান ও বুশ গ্রুপ এবং খোমেনীর গ্রুপের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন রূপ হস্তক্ষেপ করা হবে না – এ শর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা করার ব্যাপারে খোমেনী তার সম্মতি প্রদান করে। এর কিছুদিন পরে একটি ফরাসি বিমানে খোমেনী তেহরানে পৌঁছামাত্র তার হাতে শাসনভার তুলে দেয়ার জন্য আমেরিকা শাহপুর বখতিয়ারের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আমেরিকা ইরানি সেনাবাহিনীর নেতৃস্থানীয়দের হুশিয়ার করে দেয় যেন তারা খোমেনীর ক্ষমতা গ্রহণের পথে বাধা না দেয়।

    তখন থেকে খোমেনী নেতা ও শাসকে পরিণত হয়। এরপর অন্যান্য মুসলিম দেশের সাথে সঙ্গতি রেখে পশ্চিমা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আদলে ইরানের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। পশ্চিমা সংবিধানের অনুকরণে ইরানের সংবিধান প্রণয়ন করা হয়েছে; প্রজাতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিভাজন, সংসদীয় কর্মকান্ড, ক্ষমতা পৃথকীকরণ ও যোগ্যতার মাপকাঠি ইত্যাদি পুঁজিবাদী সরকার ব্যবস্থার অনুকরণেই করা হয়েছে। ‘ইরানের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ইসলাম এবং বার জাফরী মাযহাব’ উক্তিটি অধিকাংশ মুসলিম দেশের সংবিধানের মতই – যা থেকে বুঝা যায় না যে, রাষ্ট্র ইসলামের ভিত্তিতে চলবে অথবা এর বার্তা হবে ইসলাম। বরং এ ধরনের উক্তি সরকারী ডিক্রি ও ছুটির দিনের সাথে সম্পর্কিত। এর দ্বারা লোকদের বিশ্বাস ও উপাসনাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে – যার মাধ্যমে জীবনের কিছু বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শিত হয়েছে। ইরানি সংবিধান থেকে বুঝা যায় না যে ইসলামের আকীদা এই সংবিধানের ভিত্তি অথবা এই মাযহাব রাষ্ট্রীয় বার্তা বা পররাষ্ট্রনীতির একটি লক্ষ্য; বরং প্রকৃতপক্ষে এটি দেশপ্রেম নির্ভর বা জাতীয়তাবাদ ভিত্তিক। পুঁজিবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে গ্রহণ করে ইরানি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাসমূহে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; যেমন: জাতিসংঘ এবং ওআইসিতে অন্তর্ভুক্তি। ইরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও কোন কিছুই ইসলামের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং এটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইরানি রাষ্ট্র কোন বিশেষ বার্তাকে বহন করে না অথবা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের ভিত্তিতে করা কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে না। বরং জাতীয়তাবাদী বা দেশপ্রেমজনিত প্রবণতা ইরান সরকারের মধ্যে সুস্পষ্ট – যা বর্তমান ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সীমানা বজায় রাখার নীতির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। বিপ্লবের শুরুর দিকে আমরা খোমেনীর সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। আমরা আমেরিকার সাথে সহযোগিতা না করার এবং আমাদের প্রণীত সংবিধানের মত একটি ইসলামি সংবিধানের ঘোষণা দেয়ার জন্য তাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম। ইরানের সংবিধানের ত্রুটি বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করে খোমেনীর উদ্দেশ্যে আমরা একটি খোলা চিঠি দিয়েছিলাম। খোমেনী আমাদের উপদেশ গ্রহণ করেনি এবং পশ্চিমা পুঁজিবাদের আদলে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে এমন সংবিধান নিয়ে অগ্রসর হয়েছে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক।

    ২) রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক মাযহাব উল্লেখ প্রসঙ্গে বলা যায়, এটি একটি বার্তা বা পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি অথবা এর উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কিংবা সংবিধান প্রণীত হয়নি অথবা সংবিধানের অনুচ্ছেদসমূহ এই মাযহাব থেকে উদ্ভূত হয়নি। বরং শাসন, বৈদেশিক নীতি, সশস্ত্র বাহিনী ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে সংশিস্নষ্ট ব্যবস্থার মৌলিক বিষয়সমূহ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে গৃহীত হয়েছে; যেভাবে সৌদি আরবের শাসকেরা তাদের ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে হিজাজ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হাম্বলী মাযহাবকে ব্যবহার করে। তাছাড়া তাদের সাথে কাজ করতে চায় এমন কোন অনুসারী বা সমর্থকের ক্ষেত্রে ইরান স্বীকারোক্তিমূলক দিকটি (confessional aspect) ব্যবহার করে। এটি তাদের মধ্যে উগ্র জাতিগত বিভক্তির বোধকে উসকে দেয় এবং এ কারণে জাতীয় স্বার্থে তাদের ব্যবহার করা সহজতর হয়। এর মাধ্যমে জাফরী মাযহাব বা শিয়া মতবাদের প্রসার ঘটানো হয় না। বাস্তবতা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যদি ইরানি জাতীয় স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তাহলে ইরান শিয়া বা জাফরী মতবাদকে সাহায্য করে না। ধর্মনিরপেক্ষতা অবলম্বন করলে যখন স্বীয় স্বার্থ রক্ষিত হয়, তখন ইরান ইসলাম, শিয়া বা জাফরী মতবাদকে দূরে ঠেলে দিতে দ্বিধা করে না। তারা মার্কিন মদদপুষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত ইরাকি ও সিরীয় সরকারকে সাহায্য করছে। শিয়া অধ্যুষিত সৌদি আরবের পূর্বদিকের প্রদেশগুলো তেলসমৃদ্ধ হওয়ায় ইরান সৌদি আরবকে দুর্বল করার জন্য অনেকবার সেখানকার গণজাগরণকে সমর্থন দিয়েছে। বাহরাইনের ক্ষেত্রেও ইরান একই ধরনের নীতি প্রয়োগ করেছে যার জন্য বাহরাইনকে সৌদি আরবের সৈন্য তলব করতে হয়েছে…

    জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থী হলে ইরান মাযহাবগত বিষয়কে তোয়াক্কা করে না। ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে আজারবাইজান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হতে চায় এবং লোকেরা ইরানের সাথে একীভূত হওয়ার জন্য সীমান্ত ভেঙে দেয়। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে আগ্রাসী রাশিয়া নিজেদের কর্তৃত্বের বাইরে কোন ব্যবস্থা সেখানে যেন প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং পুরনো কমিউনিস্ট দালালদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য বাকুতে প্রবেশ করে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। মুসলিমরা তাদের অধিকার লংঘনকারী রাশিয়ার বশ্যতা ও কমিউনিস্টদের হিংস্র থাবা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিল অথচ রাশিয়ার আক্রমণের মুখে আজারবাইজানের লোকদের ইরান কোন সাহায্য করেনি। যদিও বাস্তবতা হল আজারবাইজানের অধিকাংশ মুসলিম ইরানের রাষ্ট্রীয় মাযহাব অনুসরণ করে। ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার মদদে আর্মেনিয়া আজারবাইজানের ২০ ভাগ ভূমি দখল করে নেয়। এতে ১০ লাখেরও বেশী লোক তাদের ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়। তখনও ইরান আজারবাইজানের লোকদের কোন রূপ সাহায্য করেনি। এ করুণ পরিস্থিতি এখনও বিদ্যমান। অথচ ইরান আজারবাইজানের বিপরীতে আর্মেনিয়ার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছে ! শুধু তাই নয়, ইরান এমন কিছু গ্রুপকে সাহায্য করেছে যাদের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই; যেমন: লেবাননের মিচেল আওনের দল অথবা নাবিহ বেরি এবং অন্যান্যদের ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলন – যারা মার্কিন পদাঙ্ক অনুসরণকারী।

    ৩) আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইরানের সব কর্মকান্ডই আমেরিকার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ও তার পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, যার কিছু উদাহরণ নিচে দেয়া হল:

    ক. লেবাননে ইরান তার মাযহাবের অনুসারীদের নিয়ে একটি সশস্ত্র দল গঠন করেছে, যা লেবাননের মূল সেনাবাহিনী থেকে পৃক একটি বিশেষ বাহিনী। লেবানন সরকার এই বিশেষ বাহিনী ও তাদের সামরিক অস্ত্রকে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ইরান ভাল করে জানে যে লেবাননে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত সরকার যা আমেরিকার রাজনীতিকে অনুসরণ করে। লেবানন সরকার আর কোন দলকে অস্ত্র বহন করার অনুমোদন দেয় না অথবা অন্য কোন দলকে সামরিকভাবে ক্ষমতায়িত করতে স্বীকৃতি প্রদান করে না। লেবাননের ইরান সমর্থিত এই সশস্ত্র দল সিরিয়া সরকারের সমর্থন নিয়ে ইরানের মত আমেরিকার সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে। বাশার আল-আসাদের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে আমেরিকা ইরানি এই সশস্ত্র হিযবকে সিরিয়ার ভেতরে হস্তক্ষেপ করতে লেবানন সরকারকে বাধা প্রদান করেনি। বরং আমেরিকা লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রভাবমুক্ত রেখে এই দলকে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পরোক্ষ অনুমোদন দিয়ে রেখেছে। 

    খ. আমেরিকা ইরাক দখল করার পর অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। তাই আমেরিকা তখন ইরাকের ভেতরে ইরানকে প্রবেশ করাল নিজস্ব মাযহাবের লোকদের প্রভাবিত করতে; যাতে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা মুক্তি আন্দোলনকে প্রতিরোধ করাযায়, এমনকি মুক্তি আন্দোলনের বিরুদ্ধে তাদের দাঁড় করানো যায়, পরস্পরকে বিরোধে জড়িয়ে ফেলা যায়, এবং দখলদারিত্ব ও আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত শাসন ব্যবস্থাকে বৈধতা প্রদান করা যায়। বিশেষ করে ২০০৫ এর পরে আমেরিকা ইবরাহিম আল-জাফরী ও পরবর্তীতে আল-মালিকির নেতৃত্বাধীন ইরানপন্থী দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত জোটকে ক্ষমতায় আরোহণ করতে অনুমোদন দেয়। এই সরকারগুলো আমেরিকার মদদে প্রতিষ্ঠিত এবং পরস্পর সর্ম্পকযুক্ত। ইরাকে দখলদারিত্বের আনুষ্ঠানিক অবসানের পর আমেরিকার প্রভাব বজায় রাখতে ইরানি মদদপুষ্ট মালিকি সরকার নিরাপত্তা ও কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে – যা থেকে বুঝা যায় যে, দখলদারিত্ব বজায় রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের কর্মকর্তারা সহায়তা করায় ও ইরাকে মার্কিন প্রভাবকে সুনিশ্চিত ও স্থিতিশীল করতে কাজ করায় ইরানের ভূমিকায় আমেরিকা অত্যন্ত সন্তুষ্ট। ইরানের কর্মকর্তারা আমেরিকাকে এভাবে সহযোগিতা করার কথা স্বীকারও করে। মার্কিন দখলদারিত্বের পর পরই ইরান ইরাকে দূতাবাস খোলে। দখলদারিত্বের চূড়ান্ত পর্যায়ে ২০০৫ সালে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি ইরাক সফরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আল-জাফরি নির্বাচিত হয়নি। দু’পক্ষই ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড হিসেবে নিন্দা করেছে। জাফরি যখন ইরান সফর করে তখন ইরাক ও ইরানের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়; যার মধ্যে নিরাপত্তা ও সীমান্ত পারাপার নিয়ন্ত্রণ করতে গোয়েন্দা সহযোগিতা চুক্তি, বিদ্যুৎ গ্রিড স্থাপনের মাধ্যমে বসরা ও ইরানকে যুক্ত করা এবং বসরা ও আবাদানের মধ্যে একটি তেল পাইপলাইন স্থাপন করার চুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

    ২০০৮ সালে প্রত্যক্ষ দখলদারিত্বের মধ্যে ইরানি প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদ ইরাক সফর করে। আহমাদিনেজাদ প্রায়শই আমেরিকা ও ইহুদী রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ঝড়ো হাওয়ার মত মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চালাত যদিও তার কাজ কখনই তার বক্তব্যের অনুরূপ নয়। সেসময় ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে আহমাদিনেজাদ নিবিড়ভাবে আমেরিকার নীতি অনুসরণ করছিল। দখলদারিত্বের মধ্যে আহমাদিনেজাদ ইরাক সফর করে এবং ক্ষমতা হস্তান্তর করার দুই সপ্তাহ আগে আবার ইরাক সফর করে মালিকি সরকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। অথচ মালিকি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইরাকে মার্কিন দখলদারিত্ব ও প্রভাব বজায় রাখার জন্য। ২০১০ সালে আমেরিকার দখলদারিত্বের মধ্যে আহমাদিনেজাদ আফগানিস্তান সফর করে এবং আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদারিত্বের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্বরত কারজাই সরকারের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে।

    গ. ইরান ইয়েমেনেও একই কাজ করে। সেখানে সে আল-হুথী গ্রুপের উপর প্রভাব বিস্তার করে ও এটিকে অস্ত্র সরবরাহ করে। এই গ্রুপটিকে ইরান ইয়েমেনের বৃটিশ দালাল আলি সালিহ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে। ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ধর্মনিরপেক্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলোকেও ইরান সহায়তা দেয়। তারাও একইভাবে আমেরিকার মিত্র এবং দক্ষিণ ইয়েমেনে আমেরিকার প্রতি অনুগত ধর্মনিরপেক্ষ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

    ঘ. ইরান ও সিরীয় সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক বেশ পুরনো; বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে প্রথম ইন্তিফাদার সময় থেকে এ সম্পর্ক বিদ্যমান। এরপর থেকে সিরিয়ার মুসলিমদের দমন-নিপীড়ন করার ক্ষেত্রে ইরান সিরীয় সরকারকে সহায়তা করে আসছে যাতেকরে মার্কিন দালাল আসাদ পরিবারকে সমর্থন দিয়ে আমেরিকার পরিকল্পনা নিরবিচ্ছিন্ন রাখা যায়। সিরিয়ার শাসক বাথ পার্টি একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী পার্টি, একথা জানা সত্ত্বেও ইরান সিরিয়ার শাসক পরিবার ও দলকে সাহায্য করেছে। বাথ পার্টির শাসন ব্যবস্থা সাদ্দাম হোসেনের শাসন ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এর সাথে ইরান যুদ্ধ করেছে। যদিও ইসলামের সাথে এই যুদ্ধের কোন সম্পর্ক ছিল না, বরং সাদ্দাম ইসলাম ও তার নিজের লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। সাদ্দাম আমেরিকার সাথে যুক্ত এটি খুব সচেতনভাবে জেনে ইরান এই যুদ্ধ করে। ইরান মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসেনি এবং যুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে বরং এর উল্টো কাজটিই করেছে; অপরাধী কুফর সরকারের জন্য বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে এবং ইরান অব্যাহতভাবে এরূপ করে আসছে। ইরান সরকার সিরীয় নেতৃবৃন্দের সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখে এবং এর মধ্যে রয়েছে সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক। আসাদ সরকারকে সমর্থন দিতে ইরান প্রচুর অস্ত্র সরবরাহ করেছে এবং সিরিয়ার জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে হ্রাসকৃত মূল্যে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করেছে। আসাদ সরকার যখন পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে তখন সিরীয় জাগরণে ইরানি হস্তক্ষেপের মধ্যে এ ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্কের ছাপ বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে ইরান হস্তক্ষেপ না করত, ইরানি হিজবুল্লাহ্‌’র সৈন্যবাহিনী ও ইরানের প্রতি অনুগত মালিকি’র মিলিশিয়া প্রেরণ না করত, তাহলে ইতিমধ্যে বাশার এবং তার সরকারের পতন হয়ে যেত। কুসায়ের ও হোমসের গণহত্যা এবং আজকে আল-ঘাওতায় রাসায়নিক হামলাসহ অন্যান্য ঘটনা থেকে ইরানের এ হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়।

    ঙ. আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে বলা যায়, ইরান আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদারিত্ব সমর্থন করেছে। কারজাইকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসিয়ে আমেরিকা কর্তৃক গঠিত সরকারের গৃহীত সংবিধানকেও ইরান সমর্থন দিয়েছে – এসবই আমেরিকার প্রতি ইরানের সেবা প্রদানের নমুনা। যখন আমেরিকা তালেবানদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হচ্ছিল, তখন ইরান আফগানিস্তানের উত্তর অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি উল্লেখ করে যে, ‘যদি আমাদের সৈন্যরা তালেবানদের সাথে যুদ্ধ না করত, তবে আমেরিকা আফগানিস্তানের পাক খাওয়া জলাভূমিতে ডুবে যেত’ (আল-শারক আল-আওসাত পত্রিকা, ৯/২/২০০২)। আবুধাবিতে ১৩/১/২০০৪ তারিখে অনুষ্ঠিত উপসাগর ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ শীর্ষক কংগ্রেসে সাবেক ইরানি প্রেসিডেন্ট খাতামি’র আইন ও সংসদ বিষয়ক উপপ্রধান মোহাম্মদ আলি আবতাহি বলেছিল, ‘যদি ইরান সহায়তা না করত, কাবুল ও বাগদাদের কখনই সহজে পতন হত না।’ (ইসলাম অনলাইন নেট, ১৩/১/২০০৪) 

    নিউইর্য়কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকালে ২৬/৯/২০০৮ তারিখে নিউইয়র্ক টাইমসের সাথে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদও একই ধরনের বক্তব্য দেয়। সেখানে সে বলে, ‘ইরান আফগানিস্তান বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এই সহযোগিতার বিনিময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সরাসরি হুমকি প্রদান করছে। ইরাকে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও আমাদের দেশ আমেরিকাকে সহায়তা প্রদান করেছে।’

    ৪) পরমাণু কর্মসূচীর ক্ষেত্রে বলা যায় যে, বছরের পর বছর ধরে এটি একটি জায়গায় স্থবির হয়ে আছে, যদিও ইহুদী রাষ্ট্র ইউরোপের সমর্থন ও প্রণোদনা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে একাধিকবার এ প্রোগ্রামে আক্রমণ চালানোর হুমকি দিয়ে আসছে। আমেরিকা ইহুদী রাষ্ট্রের এ প্রচেষ্টায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে ও তাকে তা করতে বাধা প্রদান করছে। আজ পর্যন্ত আমেরিকা বাধা প্রদান করে আসছে… ১২/৮/২০১৩ তারিখে মার্কিন চীফ অব স্টাফ জেনারেল মার্টিন ডেম্পসে এ উদ্দেশ্যে ইহুদী রাষ্ট্র সফর করে এবং এর উপর ভিত্তি করে একই তারিখে কুয়েতি কুনা এজেন্সি ইসরাইলের সেনাবাহিনীর রেডিও চ্যানেলের বরাত দিয়ে একটি খবর প্রচার করে, ‘আমেরিকান বিমান বাহিনীর কমান্ডার মার্ক ওয়েলচ ইসরাইলে সপ্তাহব্যাপী একইরকম গোপন সফর শেষ করার কিছুদিনের মধ্যেই ডেম্পসির সফর শুরু হয়।’ সফর উপলক্ষ্যে উভয়পক্ষ চলমান গবেষণামূলক কাজ সম্পর্কে কথা বলা থেকে বিরত থাকে। আমেরিকার অনুরোধে এ অঞ্চলে ব্যাপক অস্থিরতা ও ইরানে আঘাত হানার ব্যাপারে ইসরাইলি পরিকল্পনার কারণে ওয়েলচের সফর গোপন রাখা হয়। কুনা এজেন্সি আরও জানায়, ‘বিশ্লেষকগণ বিশ্বাস করে যে, হাসান রুহানি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিষিক্ত হওয়ার পর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে একটি সুযোগ দিতে নিকট ভবিষ্যতে ইসরাইল যাতে ইরানের বিরুদ্ধে কোন নাটকীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে সে ব্যাপারে আমেরিকান সেনাবাহিনীর কমান্ডারগণ তাদেরকে বুঝাবে।’

    সাদ্দামের সময়ে ১৯৮১ সালে নির্মাণাধীন নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরে হামলা চালাতে ইহুদী রাষ্ট্রকে আমেরিকা অনুমতি দিলেও শতকরা ২০ ভাগ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করা ইরানের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরগুলোতে আক্রমণ করতে সে বাধা প্রদান করে; যা থেকে বুঝা যায়, এ অঞ্চলে আমেরিকার স্বার্থে নিয়োজিত ইরানি সরকারকে টিকিয়ে রাখতে তা করা হচ্ছে। ভীতি সঞ্চার করার মাধ্যমে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর উপর আমেরিকার প্রভাব বজায় রাখতে আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরানকে নিবারক (deterrent) হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। আমেরিকা মুসলিম বিশ্বে আধিপত্য বজায় রাখতে ইরানকে ব্যবহার করে।

    একটু আগে ফিরে যাই; ২০০৩ সালে সংলাপ শুরুর সময় থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচীর ব্যাপারে আমেরিকা কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করার বদলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রতি মনোযোগী হয়। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন হতাশ হয় ও ইসরাইল উষ্মা প্রকাশ করে। সংলাপ চলাকালে আমেরিকা প্রত্যেকবার সমস্যার সমাধানকল্পে সামরিক নয় বরং আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার প্রস্তাব দিয়েছে। ‘ইসরাইলি’ শঙ্কাকে প্রশমিত করতে আমেরিকা উপর্যুপরি হস্তক্ষেপ করেছে, কারণ আমেরিকা ইরান সরকারকে টিকিয়ে রাখতে চায় এবং নিউক্লিয়ার ইস্যুকে জিইয়ে রেখে পারমাণবিক বোমা উৎপাদন পর্যন্ত পৌঁছতে চায়। ইতোমধ্যে এ সমস্যাটি মোটেও সমাধান করা যায়নি, বরং আমেরিকা এটিকে জিইয়ে রেখেছে যাতে করে একজন ত্রাসসৃষ্টিকারী (অর্থাৎ ইরান) অন্যান্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখাতে পারে এবং উপসাগরে আমেরিকান সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে।

    এভাবে ব্যবহার করা ছাড়াও, ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র মোকাবেলা করা ও এ থেকে রক্ষা করার ছুতোয় তুরস্ক ও মধ্য ইউরোপে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করতে যাচ্ছে আমেরিকা। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট বৃদ্ধির ন্যায্যতার ক্ষেত্রে এ যুক্তিটি শীর্ষে রয়েছে।

    ৫) আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শত্রুতার ব্যাপারে বাহ্যিকভাবে যা দেখা যায়, তা বুঝতে হলে নিম্নের বিষয়গুলোর দিকে আলোকপাত করতে হবে:

    ক. বিপ্লবের আগে ও পরে মার্কিনবিরোধী পরিবেশ ও জনমত সৃষ্টি করা হয়েছিল। আমেরিকাকে লোকদের দুর্ভোগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হত এবং শাহ ও তার নিপীড়নকে সমর্থন দেয়ায় মার্কিনীদেরকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। আমেরিকাকে তখন বড় শয়তান বলা হত। সে কারণে ইরানের শাসকেরা দু’পক্ষের মধ্যকার আলোচনা পুনরায় শুরু করা ও পরবর্তীতে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টি সরাসরি ঘোষণা করতে পারেনি। বিশেষ করে প্যারিসে খোমেনীর সাথে আমেরিকার বৈঠকের কথা, খোমেনীর বিপ্লবে ইরানী সেনাবাহিনী যাতে হস্তক্ষেপ না করে সে ব্যাপারে আমেরিকার চাপ প্রয়োগ করার কথা…এসব গোপন কিছু নয়, সে কারণে আমেরিকার সাথে বসার জন্য ইরান সরকারের অভিনব ঘটনার প্রয়োজন ছিল। ১০/৪/১৯৭৯ সালে আমেরিকান দূতাবাসে জিম্মি ঘটনা সংঘটিত হয় এবং সে কারণে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এর মাধ্যমে খোমেনি আরও শক্তিশালী হয় এবং প্রতিপক্ষকে আঘাত করা ও ইরান-আমেরিকা সম্পর্কের বাস্তবতাকে আড়াল করা সম্ভবপর হয়। পরবর্তীতে আমেরিকান উৎসসমূহ উল্লেখ করে যে এটি ছিল একটি পরিস্কার আমেরিকান নাটক। হাসান বনি সাদরও আল জাজিরার সাথে পূর্বে উল্লেখিত সাক্ষাৎকারে একইরকম কথা বলে, ‘সেটি ছিল আমেরিকানদের সাথে একরকম চুক্তি ও তাদেরই পরিকল্পনা এবং খোমেনী তাকে বুঝানোর পর সে এ ব্যাপারে একমত হয়।’ ২০/১/১৯৮২ সালে উভয়পক্ষ একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যাকে আলজিয়ার্সের সম্মতিপত্র বলা হয় এবং এর মাধ্যমে জিম্মিরা ছাড়া পায়। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রিগ্যান যেদিন ক্ষমতায় আরোহণ করে সেদিন জিম্মিরা মুক্ত হয় এবং চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমেরিকা কার্যত খোমেনীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে মেনে নেয়। চুক্তির মাধ্যমে উভয় পক্ষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং এক পক্ষ অপর পক্ষের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না তা নিশ্চিত হয়। চুক্তিতে আরো বলা হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে উভয় দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হবে। পরবর্তীতে নতুন সরকারের অনুরোধে ইরানের বাজেয়াপ্ত হওয়া সম্পদ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার আমেরিকা ফেরত দেয়…

    খ. বহুদিন ধরে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করার মত পরিবেশ সৃষ্টি করতে ইরানের শাসকগণ কাজ করে আসছে। যদিও ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুসারে তাদের মধ্যে গোপন সম্পর্ক ও যোগাযোগ বজায় রয়েছে ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে, এবং এখনও তারা তা অব্যাহত রেখেছে… যেন বর্তমান পরিস্থিতি উভয় পক্ষকে লাভবান করে। আর, আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগকে আড়াল করার জন্য ইরান তাদের সাথে শত্রুভাবাপন্ন হওয়ার ভান করছে। এর মধ্যে দিয়ে বাস্তবে ইরান আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী  পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে; এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠপোষক। অন্যদিকে, আমেরিকা ইরানের শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং তা এ অঞ্চলে ইউরোপ ও ইসরাইলের ভূমিকাকে সীমিত রাখতে আমেরিকাকে সাহায্য করে। আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বে ইরানবিরোধী মনোভাবের কারণে আমেরিকা এ অঞ্চলে চতুরতার সাথে নিজ স্বার্থ হাসিল করতে পারে। শাসকদের মধ্যে কেউ কেউ ইরানিদের দ্বারা আমেরিকার দালাল হিসেবে অভিযুক্ত হয়, যেমন: প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট বানি আল সদর। সে সময় আমেরিকার সাথে সম্পর্কের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত বিদ্যমান থাকায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়। কিন্তু প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট রাফসানজানির সাথে আমেরিকার সম্পর্ককে ইরান-গেট এবং ইরান-কন্ট্রা নামে অভিহিত করা হলেও সে সময় এরূপ বিরোধিতা না থাকায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়নি। মাঝে মাঝে সংস্কারপন্থী ও মধ্যপন্থী এবং রক্ষণশীল ও মৌলবাদী হিসেবে প্রেসিডেন্টরা অভিহিত হলেও এবং শাস্তি পেলেও ইরানের নীতিতে কোনরূপ পরিবর্তন দেখা যায়নি। যদিও আমেরিকার বিরুদ্ধে কেউ কখনও কঠিন বক্তব্য বা কখনও হালকা বক্তব্য দিয়ে এসেছে, কিন্তু তাদের কাজ কখনই সেসব বক্তব্যের অনুগামী নয় এবং সেসব বক্তব্য বাস্তবে প্রতিফলিতও হয়নি। একইভাবে ইরানের প্রতি মার্কিন অবস্থানও পরিবর্তিত হয়নি, যদিও রিপাবলিকানদের থেকে কঠিন বক্তব্য পাওয়া গেছে ও ইরানকে তারা শয়তানের অক্ষশক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং ডেমোক্রেটদের থেকে নমনীয় বক্তব্য পাওয়া গেছে। কিন্তু আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে তেমন কোন কার্যকর ও চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যখন প্রেসিডেন্ট রুহানি নতুন সরকার গঠন করে, তখন সে বলে, ‘তার সরকার হুমকি ও উত্তেজনা রোধ করাকে পররাষ্ট্রনীতি হিসেবে গ্রহণ করবে’ (রয়টার্স, ১২/৮/২০১৩)। রুহানি ‘জাতিসংঘে ইরানের সাবেক দূত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষিত এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অবনতিশীল সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য গোপন সমঝোতার আওতায় অনুষ্ঠিত গোলটেবিলে অপরিহার্য অংশগ্রহণকারী মুহাম্মাদ জাওয়াদ সারিফকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে’ (রয়টার্স,  ১২/৮/২০১৩) নিয়োগ দেয়। রুহানি নির্বাচিত হবার পর আরও স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, ‘আমরা ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি দেখতে চাই না। প্রজ্ঞা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, উভয় দেশকে ভবিষ্যত নিয়ে আরও বেশী চিন্তা করা উচিত এবং অতীতের সমস্যাসমূহ নিরসন করা ও সঠিক সমাধানের জন্য এক সাথে বসার চেষ্টা করা উচিত’ (রয়টার্স, ১৭/৬/২০১৩)। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামা এর উত্তরে তাকে বলে, ‘ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগকে পুরোপুরি প্রশমিত করতে একটি কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরান সরকারের সাথে সরাসরি সংলাপে বসতে প্রস্তুত’ (একই সূত্র)। এর অর্থ হল ইরান আমেরিকার সাথে গোপনে কাজ করার অধ্যায়ের ইতি টানতে চায় এবং খোলাখুলি কাজ করার যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে; কিন্তু ভিন্নরূপে, যাতে সে আঞ্চলিক বিষয়ে সম্পর্ক নিরূপক হিসেবে আঞ্চলিকভাবে একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠে।

    ৬) উপরের আলোচনা থেকে আমরা যে উপসংহারে আসতে পারি তা হল:

    শাসনের জন্য আনুষ্ঠানিক মতবাদ হিসেবে ইরান যা উল্লেখ করেছে সেটিকে সে একটি বার্তা বা পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরেনি এবং এ মতবাদের ভিত্তিতে সে সরকার গঠন করেনি কিংবা সংবিধান প্রণয়ন করেনি এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদসমূহও এর ভিত্তিতে নয়। বরং শাসনব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক ও নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত সংবিধানের মূল ধারাসমূহ নেয়া হয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা থেকে, যা সৌদি শাসনব্যবস্থার মত যেখানে সে অঞ্চলের প্রচলিত মতবাদ হাম্বলী মাযহাবকে শাসকেরা স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। ইরানের পররাষ্ট্রনীতি এ অঞ্চল, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বে মার্কিন স্বার্থের অনুকূলে। উদাহরণস্বরূপ, এক দশকেরও বেশী সময় ধরে ইরাক ও আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব অব্যাহত রাখতে ওয়াশিংটনকে ইরান সহায়তা করেছে এবং এছাড়াও লেবাননে তার হিযবের মাধ্যমে সে রাজনৈতিক প্রভাববলয়কে বিস্তার করেছে। সাম্প্রতিককালে আল-আসাদকে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে সিরিয়াতে মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে জোটবদ্ধ হয়েছে। সুতরাং ইরাক, আফগানিস্তান, লেবানন ও সিরিয়াতে মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ইরান কাজ করছে। এ অঞ্চলের বাইরে আমেরিকা ইরানের আচরণকে সফলভাবে ব্যবহার করে মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপন করাকে এগিয়ে নিয়ে যায়, উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিলকে ভারসাম্যহীন নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করে এবং ইরান ভীতিকে কাজে লাগিয়ে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে।

    ইরান আমেরিকার সাথে একই পথে অগ্রসর হচ্ছে এবং সে সব কিছু বুঝে এই পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ইরান তার সীমা সম্পর্কে অবগত এবং সে কারণে তা অতিক্রম করে না; এমনকি চতুরতার আশ্রয় নিতে বা সত্যকে ঢেকে রাখতে যদি উঁচু গলায় কথা বলতে হয় তখনও – যেমনটি ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়াতে আমেরিকার জন্য ব্যাপক আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসা আহমাদিনেজাদের সময় ঘটেছিল। সে কারণে আমেরিকা তার স্বার্থ পূরণে ইরান সরকারকে এমন সেবাদাস হিসেবে দেখতে পায় যে, মার্কিন সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী চক্র এ সরকারকে পরিবর্তনের কোন কারণ খুঁজে পায় না। ১২ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে তারা এরকমই ঘোষণা করে যখন একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনে ইরান ও আমেরিকার সম্পর্ক ও এটি কেমন হওয়া উচিত সে ব্যাপারে রবার্ট গেটস বলে, ‘কেউই ইরানের সরকারকে পরিবর্তন করতে চায় না… আমরা নীতি ও আচরণের পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা করতে চাই, যাতে করে সে এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য অস্থিরতা ও ত্রাসের কারণ না হয়ে সুপ্রতিবেশী হতে পারে।’

    ৪ শাওয়াল, ১৪৩৪ হিজরী
    ২১আগস্ট ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ

  • আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রা)-এর আল-কুরআন চর্চা

    আবদুল্লাহ ইবনে মাস’উদ (রা)-এর আল-কুরআন চর্চা

    আবদুল্লাহ (রা)-এর আম্মার নাম ছিল উম্মু আব্‌দ। সেই জন্য আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা)-কে লোকেরা ইবনু মাসউদ (রা)-কে লোকেরা ইবনু উম্মু আব্‌দ বলে ডাকত।

    ছোটবেলায় তিনি উকবা ইবনু আবি মুআইতের ছাগল পাল নিয়ে মক্কার উপত্যকাগুলোতে চরাতেন। তিনি শুনতেন যে মক্কার এক ব্যক্তি নবুয়্যত লাভ করেছেন। তবে তিনি তাঁকে চিনতেন না। সারাদিন তিনি ছাগল নিয়ে মক্কার বাইরেই থাকতেন। সাঁঝে শহরে ফিরতেন।

    একদিন তিনি যথারীতি ছাগল চরাচ্ছিলেন। সহসা দেখতে পান, দুইজন লোক তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। তাঁরা খুব পিপাসার্ত ছিলেন। কাছে এসে একজন বলেন, ‘ওহে ছেলে, আমরা খুব পিপাসার্ত। কিছু দুধ দুইয়ে তুমি আমাদেরকে দাও।’ আবদুল্লাহ বললেন, ‘তা আমি পারব না। ছাগলগুলো তো আমার নয়। আমি একজন রাখাল মাত্র’।

    আগন্তুকদের একজন বললেন, ‘তাহলে আমাদেরকে একটি ছাগী দেখিয়ে দাও যেটি এখনো পাঁঠার স্পর্শে আসেনি।’ ছেলেটি একটি ছাগীর দিকে ইশারা করলো।

    আগন্তুক “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম” বলে একটি হাত দিয়ে ছাগীটির ওলান মলতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুধ বের হয়। তিনি গর্ত বিশিষ্ট একটি পাথর টুকরো ওলানের নিচে রাখেন। দুধে তা ভরে যায়। আগন্তুকরা দুধ পান করে পিপাসা মিটালেন। ছেলেটিকেও দুধ পান করালেন। আগন্তুকদের মধ্যে একজন ছিলেন হযরত মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ(সা)। দ্বিতীয় জন আবু বকর আস্‌ সিদ্দিক (রা)।

    এই ঘটনার কিছুদিন পর আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ(রা) নবুয়তপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি সম্পর্কে কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। একদিন তিনি তাঁর কাছে যান। তাঁকে দেখে চিনতে পারেন। তাঁর নিকট ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে মনিবরূপে গ্রহণ করে তাঁর সাহচর্যে থাকা শুরু করেন।

    আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে আল-কুরআন শেখেন। ইয়াসরিবে (আল-মদিনায়) হিজরাতের পরও তিনি আল-কুরআন চর্চায় নিবেদিত থাকেন। তিনি সুমধুর কণ্ঠে আল-কুরআন অধ্যয়ন করতেন। মাঝে-মধ্যে মুহম্মদুর রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁকে আল-কুরআন পড়ে শুনাতে বলতেন।

    একদিন রাতে আবু বকর আস্‌ সিদ্দিক (রা) এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ শেষে তাঁর গৃহ থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁরা দেখলেন, এক ব্যক্তি মসজিদে দাঁড়িয়ে সালাতরত অবস্থায় আল-কুরআন তিলাওয়াত করছেন।

    আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাঁর তিলাওয়াত শুনলেন। অতঃপর তিনি বললেন,

    আল-কুরআন যেমন অবতীর্ণ হয়েছে তেমন বিশুদ্ধভাবে তা তিলাওয়াত করে কেউ কেউ যদি আনন্দিত হতে চায়, সে যেন ইবনু উম্মু আবদের মতো তিলাওয়াত করে“।

    তিনি যে কেবল সুন্দরভাবে আল-কুরআন পাঠ করতে পারতেন, তাই নয়। তিনি ছিলেন আল-কুরআনের গভীর জ্ঞান সমৃদ্ধ একজন ব্যক্তি। আলাপ-আলোচনাকালে তাৎক্ষণিকভাবে আল-কুরআনের ভুরিভুরি আয়াত তিনি উদ্ধৃত করতে পারতেন।

    উমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর সময় একটি ঘটনা। উমর (রা) কোনো একটি সফরে রাতে আরেকটি কাফিলায় রাতের আঁধারে এক কাফিলায় লোক অন্য কাফিলায় লোকদেরকে চিনতে পারছিলেন না। উমর উবনু খাত্তাব (রা) দ্বিতীয় কাফিলার লোকদেরকে কিছু প্রশ্ন করেন। প্রতিটি প্রশ্নে জওয়াবে উচ্চারিত আল-কুরআনের এক একটি আয়াত। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) ভাবলেন, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) ছাড়া আর কারো এমন যোগ্যতা থাকার কথা নয়।

    তিনি সবশেষে প্রশ্ন রাখলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা) আছেন?’ জওয়াব এলো “হ্যাঁ।”

    আল-কুর’আনের মর্মকথা জানার ক্ষেত্রেও আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) ছিলেন প্রথম সারির সাহাবির একজন। তদুপরি আজীবন তিনি নিরবিচ্ছিন্নভাবে আল-কুরআনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়ার কাজ করে গেছেন।

    মূল: সদ্য প্রয়াত এ কে এম নাজির আহমেদ (আল্লাহ তার উপর রহম করুন) এর ‌’আসহাবে রাসূলের জীবনধারা’ বই হতে

  • মানতূক ও মাফহূম

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামকে প্রেরণ করেছেন চুড়ান্ত বাণী রূপে যা বিচার দিবস অবধি অব্যাহত থাকবে। এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বাণীকে পরিপূর্ণ রূপে ও সকল বিষয়ের ব্যখ্যাসরূপ বর্ণনা করেছেন,

    ما كانَ حَديثًا يُفتَرىٰ وَلٰكِن تَصديقَ الَّذى بَينَ يَدَيهِ وَتَفصيلَ كُلِّ شَيءٍ وَهُدًى وَرَحمَةً لِقَومٍ يُؤمِنونَ

    এটি (তথা কুরআন) কোনো মনগড়া কথা নয়, বরং পূর্ববর্তী (ওহীর) সত্যায়ন, প্রত্যেক বিষয়ের বিশদ বিবরণ এবং ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য রহমত ও হেদায়েত [সূরা ইউসূফ: ১১১]

    وَنَزَّلنا عَلَيكَ الكِتٰبَ تِبيٰنًا لِكُلِّ شَيءٍ

    আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নাযিল করেছি যেটি এমন যে তা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা.. [সূরা আন-নাহল: ৮৯]

    তথাপি দেখা যায় যে, কুরআন ও সুন্নাহ আকারের দিক থেকে সীমিত অথচ মানুষ যে সকল সমস্যা ও বিষয়ের সম্মুখীন হয় তার পরিসর অসীম অনুভূত হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন চলে আসে যে, কিভাবে এই সীমিত পরিসরের টেক্সট নাযিলের সময় থেকে শুরু করে বিচার দিবস পর্যন্ত মানুষের সকল সমস্যার সমাধান ধারণ করতে পারে?

    এর উত্তর পেতে হলে আমাদের অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনাভঙ্গি বুঝতে হবে।

    ১) প্রথমতঃ চার্চের দৃষ্টিতে বাইবেল (যা পবিত্র টেক্সট, আইনী টেক্সট) যা গন্ডিবদ্ধ ও যার পরিসর সীমিত, ইসলামী টেক্সট তদরূপ নয়। ইসলামী টেক্সট হচ্ছে একটি সামগ্রিক আইনি বিধান, যা সাহায্য করে টেক্সট থেকে হুকুম বের করে আনতে যদিও তা বাহ্যিকভাবে উল্লেখিত থাকে না। আর এই পদ্ধতি উসূল আল-ফিকহ নামে পরিচিত।

    ২) দ্বিতীয়তঃ ইসলামী টেক্সট প্রবৃত্তি ও বহুবিধ প্রয়োজনীয়তা সম্বলিত মানুষকে সম্মোধন করেছে, আর দিয়েছে সমাধান কেননা মানুষের প্রকৃতি কখনো পরিবর্তিত হয় না। তাই এটি টেক্সটে উল্লেখিত মূল হুকুমকে সম্প্রসারিত করে উদ্ভূত নতুন বিষয়ের জন্য হুকুম বের করে আনতে একজন মুজতাহিদকে সহায়তা করে।

    ৩) সবশেষে, টেক্সটের ভাবার্থ এমনভাবে ব্যক্ত, একটি হুকুমকে অন্য হুকুমে সম্প্রসারনের ভিত্তি হিসেবে সহায়ক এবং এই প্রক্রিয়াটিতে অসংখ্য বিষয় জড়িত। এই আর্টিকেলটিতে এই ধরনের দুটি বিষয় বর্ণিত হয়েছে, মানতূক ও মাফহূম।

    মানতূক:

    মানতূক শব্দটি ‘নাতাকা’ শব্দ থেকে উদ্ভূত (যা ‘উচ্চারন করা’ এর অতীতবাচক রূপ) এবং মানতূক অর্থ হচ্ছে ‘উচ্চারিত শব্দ’ যা অতীতবাচক শব্দ।

    শরীআহতে মানতূক বলতে বুঝানো হয় যা টেক্সটের উচ্চারিত বা উল্লেখিত শব্দ হতে সরাসরি উপলব্ধ হয়। যেমন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

    কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোযা রাখবে [সূরা বাকারা: ১৮৫]

    এই টেক্সটটি রমজানে সিয়ামের ফরজিয়্যাতকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়াও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

    সালাত কায়েম করো

    এই আয়াতটি সালাতের ফরজিয়্যাতকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, সালাত আদায় করো, যেভাবে তোমরা আমাকে সালাতে দেখ।

    এই হাদীসে বলা হয়েছে যে, মুসলিমদের রাসূল (সা) এর পদ্ধতিতেই সালাত আদায় করতে হবে। এছাড়াও, রাসূল (সা) বলেছেন, সালাতে ইমাম নিয়োজিত হয়েছে অনুসরনের জন্য, তাই তার রুকূ অনুযায়ী রুকূ করো।

    হাদীসটি এই দিকনির্দেশনা দেয় যে, সালাতে ইমামকেই অনুসরন করতে হবে ও মুসলিমদের অবশ্যই ইমামের রুকুর পরপরই রুকু করতে হবে। এ উদাহরণের অর্থটি নেয়া হয়েছে তার টেক্সট থেকে। অর্থাৎ, এইসকল অর্থ মানতূক তথা ব্যক্ত শব্দ (শাব্দিক অর্থ) হতে নেয়া হয়েছে যা কুরআনের কোনো আয়াত বা  রাসূল (সা)-এর কোনো হাদীস হতে নেয়া হয়েছে ।

    মাফহূম:

    মাফহূম শব্দটি এসেছে ফাহিমাথেকে যার শাব্দিক অর্থ অনুধাবন করাবা বুঝতে পারা। এখানে মাফহূম মানে সরাসরি টেক্সট থেকে আক্ষরিকভাবে কোন কিছুকে নেয়া বলা হয় না বরং টেক্সটের অর্থ হতে যা পাওয়া যায় অর্থাৎ বক্তব্যের অন্তর্নিহিত বা পরোক্ষ ভাব। বক্তব্যের আক্ষরিক অর্থ হতে যা বোঝা যায় তা নয় বরং ব্যক্ত বক্তব্য থেকে যা উপলব্ধি করা যায় তা-ই হলো মাফহূমের শরীয়াহগত অর্থ। যেমন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

    فَلَا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّ

    তাদের প্রতি ‘উফ’ বলোনা [সূরা বনী ইসরাঈল: ২৩]

    এর সরাসরি অর্থ হলো পিতামাতার প্রতি উফনা বলা। তথাপি, এর ভাবার্থ হলো কোনো রকমের বাচনিক বা শারীরিক বিরক্তি প্রকাশ না করা (যদিওবা টেক্সটে তা সরাসরি উল্লেখিত নেই)। অতএব, শব্দটি ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা নেয়া হয়েছে মানতূক থেকে আর প্রত্যক্ষভাবে পিতামাতাকে গালাগাল বা মারধর করার নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি নেয়া হয়েছে এর মাফহূম থেকে। আক্ষরিকভাবে ঐ আয়াতে পিতামাতার প্রতি ঐ নির্দিষ্ট ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়েছে আর ঐ আয়াতের অর্থ এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, পিতামাতার প্রতি কোনো রকম খারাপ ব্যবহার, তা বাচনিক কিংবা শারীরিক দুর্ব্যবহার হোক তা না করা বুঝাচ্ছে। মাফহূমকে দুইভাগে ভাগ করা যায়:

    ১। মাফহুম আল মুয়াফাকাহ

    ২। মাফহুম আল মুখালাফাহ

    মাফহুম আল মুয়াফাকাহ:

    মুয়াফাকাহ এর শাব্দিক অর্থ কোন কিছুর সাথে সংগতিপূর্ণ। তাই, মাফহূম আল মুয়াফাকাহ-র অর্থ দাড়ায় অনুধাবিত অর্থ যা কোন কিছুর সাথে সংগতিপূর্ণ

    যদি টেক্সট থেকে উৎসারিত কোন হুকুম বা বিধি যদি ঐ টেক্সটের মানতূকের সাথে সংগতিপূর্ণ হয় তবে তাকে মাফহূম আল মুয়াফাকাহ বলা হবে। পিতামাতাকে শারীরিকভাবে অত্যাচারের উপরোল্লিখিত নিষেধাজ্ঞাটি এর একটি উদাহরণ। পিতামাতাকে মারধরের নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মাফহূমটি উফ বলার নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত মানতূকের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। মাফহূম ও মানতূক উভয়ই কোন কিছু নিষেধ করছে। তাই এই ক্ষেত্রে মাফহূমকে মাফহূম আল মুয়াফাকাহ বলা হবে।

    আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন:

    إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَى ظُلْمًا

    যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষন করে.. [সূরা নিসা: ১০]

    মানতূক অন্যায়ভাবে এতিমের সম্পদকে গ্রাস করার ব্যাপারে নিষেধ করছে। মাফহূম এই আয়াতে শুধু সম্পদ অন্যায়ভাবে নেয়াকে নয় বরং তাদের সম্পদ নষ্ট করে ফেলার নিষেধাজ্ঞার প্রতিও নির্দেশনা দিচ্ছে। এখানে মানতূক ও মাফহূম উভয়ই নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। যেহেতু মাফহূম মানতূকের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ তাই এটি মাফহূম আল মুয়াফাকাহ।

    মাফহুম আল মুখালাফাহ:

    মুখালাফাহ-র শাব্দিক অর্থ কোনো কিছু অন্য কিছুর সাথে অসংগতিপূর্ণ হওয়া। তাই মাফহূম আল মুখালাফাহ এর শাব্দিক অর্থ দাড়ায় অনুধাবিত অর্থ অন্য কোনো কিছুর সাথে অসংগতিপূর্ণ হওয়া

    যদি হুকুমটি এমন টেক্সট থেকে নেওয়া হয় যা এর মানতূক এর অর্থের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাহলে তাকে মাফহুম আল-মুখালাফা বলা হবে। উদাহরনসরূপ, যখন মানতুক কোনো বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠা করে অথচ মাফহুম নিষেধ প্রতিষ্ঠা করছে, যেহেতু, বাধ্যবাধকতা ও নিষেধ দুটোই একে অপরের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। এটি তখনো হতে পারে যখন মানতূক বা মাফহুম এর যেকোনো একটি বাধ্যবাধকতা বা নিষেধ প্রতিষ্ঠা করছে এবং অপরটি করছে না। উদাহরনসরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সূরা আহযাবে বলেন,

    وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا

    যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে [সূরা আহযাব: ৫৮]

    এ আয়াতের মানতূক কোনো মুসলিমের উপর বৈধ কারণ ছাড়া কষ্টারোপ বা ক্ষতিসাধন করা নিষেধ করছে। কিন্তু যদি কষ্টারোপের কোনো বৈধ কারণ থেকে থাকে তবে তা করাটি বৈধ বলে বিবেচিত হবে। উদাহরনসরূপ, যদি কোনো মুসলিম চুরি করে তবে তার হাত কেটে দেয়া হবে এবং এটি তার জন্য ক্ষতিসাধন। এক্ষেত্রে, মাফহূম বৈধতা প্রতিষ্ঠা করছে যদিও মানতূক নিষেধাজ্ঞা প্রতিষ্ঠা করছে। যেহেতু, হালাল ও হারাম একে অপরের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই এই মাফহূমকে বলা হবে মাফহূম আল-মুখালাফা।

    আরেকটি উদাহরন রয়েছে সূরা আহযাবে:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا

    মুমিনগণ! তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে বিবাহ কর, অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তখন তাদেরকে ইদ্দত পালনে বাধ্য করার অধিকার তোমাদের নাই [সূরা আহযাব: ৪৯]

    এখানে মানতূক একটি হুকুম প্রতিষ্ঠা করছে যে, যদি কোনো মহিলাকে তালাক দেয়া হয়, তাহলে সে ইদ্দত ছাড়াই আবার বিবাহ করতে পারবে। মাফহূম বলছে, যদি বিবাহ-সম্ভোগের পরে তালাক হয়, তবে ইদ্দত অপরিহার্য। মানতূক ইদ্দত প্রতিষ্ঠা করে না, তবে মাফহূম ইদ্দত প্রতিষ্ঠা করে, তাই এটি মাফহূম আল-মুখালাফা। এটি এমন এক হুকুমের উদাহরণ যা নির্দিষ্ট শর্তের উপর নির্ভরশীল।

    এই মাফহূম চার অবস্থায় প্রয়োগ হতে পারে:

    ১) যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার সাথে জড়িত থাকে।

    ২) যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার অবস্থার সাথে জড়িত থাকে।

    ৩) যদি হুকুমটি কোনো স্থান ও সময়ের উপর সীমারোপ করে।

    ৪) যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার সাথে জড়িত থাকে।

    ১। যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার সাথে জড়িত থাকে:

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: ধনী ব্যক্তির (দেনা পরিশোধ) দীর্ঘায়িত করা যুলুম। হাদীসের মানতূক প্রতিষ্ঠা করছে যে, যদি ধনী ব্যক্তি তার দেনা পরিশোধে টাল-বাহানা করে কিংবা দীর্ঘায়িত করে, তবে তা নিষেধ। আর মাফহূম হচ্ছে দরিদ্র ব্যক্তির দেনা পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া বৈধ। এখানে মানতূক নিষেধাজ্ঞা অন্যদিকে মাফহূম বৈধতা প্রতিষ্ঠা করছে।

    এই উদাহরণে, মূল টেক্সটের হুকুমটি একটি বর্ণনার সাথে সম্পর্কিত, কোনো নামবাচক কিছুর সাথে নয়। ‘গণী’ শব্দটির অর্থ ধনী যা কোনো ব্যক্তির বর্ণনা যা তার মধ্যে বিরাজ করতে পারে আবার নাও পারে।

    ২। যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট বর্ণনার অবস্থার সাথে জড়িত থাকে:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    وَإِن كُنَّ أُولٰتِ حَملٍ فَأَنفِقوا عَلَيهِنَّ حَتّىٰ يَضَعنَ حَملَهُنَّ

    যদি তারা গর্ভবতী হয়, তবে সন্তানপ্রসব পর্যন্ত তাদের ব্যয়ভার বহন করবে [সূরা তালাক: ৬]

    আয়াতের মানতূক হচ্ছে তালাকপ্রাপ্ত নারীর সন্তান জন্ম না নেয়ার আগমূহুর্ত পর্যন্ত ভরণপোষণের ফরযিয়্যাত আয়াতের মানতূক থেকে স্পষ্ট। যদিওবা, সে সন্তানসম্ভবা না হলে তার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেয়ার ফরযিয়্যাতটি প্রয়োগ না হয়ার বিষয়টি মাফহূম থেকে স্পষ্ট। এক্ষেত্রে মানতূক মাফহূমের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাই এটি মাফহূম আল-মুখালাফা।

    ৩। যদি হুকুমটি কোনো স্থান ও সময়ের উপর সীমারোপ করে:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    ثُمَّ أَتِمُّوا الصِّيَامَ إِلَى اللَّيْلِ

    অতঃপর রোযা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত [সূরা বাকারা: ১৮৭]

    আয়াতে মানতূক হচ্ছে সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মুসলিমরা রোজা রাখতে বাধ্য। যদিওবা মাফহূমে সূর্যাস্তের পর রোজা রাখাকে হারাম করা হয়েছে। মানতূক মাফহূমের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাই এটি মুখালাফা।

    ৪। যদি হুকুমটি কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার সাথে জড়িত থাকে:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    الزَّانِيَةُ وَالزَّانِي فَاجْلِدُوا كُلَّ وَاحِدٍ مِنْهُمَا مِئَةَ جَلْدَةٍ

    ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর [সূরা নূর: ২]

    আয়াতের মানতূক হচ্ছে ১০০টি বেত্রাঘাত (দোররা) মারা। মাফহূম হচ্ছে ১০০ এর উর্ধ্বে না যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা। মানতূক মাফহূমের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, তাই এটি মুখালাফা।

    রাসূল (সা) বলেন “যদি সফরকালের সঙ্গী তিনজন হয় তবে একজনকে নেতা নির্বাচন করে নাও”। এবং “পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে অবস্থিত তিনজন মানুষের জন্য তাদের একজনকে আমীর নির্বাচন করা ব্যতিত থাকা বৈধ নয়”।

    এইখানে এক বলতে শুধুমাত্র একজনকেই বুঝানো হয়েছে অর্থাৎ একটি সংখ্যার দিকে জোর দিয়েছে অন্যকিছু নয়। এটি মাফহুম আল মুখালাফা থেকে উৎসারিত। এই ক্ষেত্রে অন্য কোন দলীল পাওয়া যায় না যা একে বাতিল করে। তাই, মাফহুম আল মুখালাফাহ উপরোক্ত হাদীসদ্বয় হতে এই নির্দেশনা দেয় যে মুসলিমদের জন্য একের অধিক ব্যক্তির নিকট শাসনকর্তৃত্ব থাকা বৈধ নয়।

    যেসব ক্ষেত্রে মাফহূম আল মুখালাফাহ প্রয়োগ হয়না:

    যদি উপরোল্লিখিত কোনো বাস্তবতার সাথে হুকুমের মিল না থাকলে তা প্রয়োগ হবে না। যেমন: যদি হুকুমটি কোন গুণের (সিফাত) পরিবর্তে কোন বস্তু (নামবাচক – ইসম) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত হয়। এর দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, আমরা জানি মজুতদারী ইসলামে হারাম, কেননা রাসূল (সা) বলেন- “একমাত্র অসৎ ব্যক্তিই মজুতদারী করে” [মুসলিম]। তাই কোন পণ্য দাম বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মজুত রেখে বিক্রী করা হারাম। কিন্তু যোগান যদি বেশি হয় এবং পন্যের মজুতকরন যদি জনগণের জন্য বোঝাস্বরূপ না হয়, সেক্ষেত্রে এটি জায়েজ।

    আবার, আরেকটি হাদীসে রাসূল (সা) খাদ্য দ্রব্যের মজুতদারীকে কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। এই হাদীসের মানতুক হচ্ছে খাদ্যদ্রব্যের মজুতদারি হারাম, এবং মাফহূম আল-মুখালাফাহ হচ্ছে খাদ্যপণ্য ছাড়া বাকী পণ্যের মজুতদারি হালাল হওয়ার নির্দেশনা। যদিওবা, যেহেতু হারাম হওয়াটা একটি শব্দ “তো’য়াম”-আরবী ব্যাকরন অনুসারে যা একটি বিশেষ্য (ইসম) ও কোন বিশেষণ (সিফাত) নয়, তাই মাফহূম আল-মুখালাফাহ এইক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং শুধু খাদ্যদ্রব্য নয় বরং সব কিছুর মজুতদারি হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। এই হাদীসের মাফহূমে অন্যান্য পণ্যের মধ্যে একটি পণ্যের মজুতদারি হারামের কথা বলা হয়েছে।

    অন্য আরেকটি হাদীসে, রাসূল (সা) বলেন- “তোমরা একের পর এক ইমামের (খলীফার) বা’য়াত পূর্ণ কর” এবং আরেক বর্ণনায় “সকলেই (ইমামই) কুরাইশ থেকে হবে”। [মুসলিম]

    প্রথম হাদীসটি একজন ইমাম বা খলীফাহ নিয়োগ সংক্রান্ত। দ্বিতীয় হাদীসটিতে কুরাইশ শব্দটি প্রথমে হাদীসে উল্লেখিত বা’য়াতের ফরযিয়্যাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু যেহেতু কুরাইশ শব্দটি একটি নামবাচক শব্দ (ইসম), তাই মাফহূম আল-মুখালাফাহ প্রয়োগ হবে না অর্থাৎ এক্ষেত্রে ইমামকে কুরাইশ থেকে হতেই হবে তার বাধ্যবাধকতা আর থাকে না।

    যদি প্রাপ্ত মাফহূমের বিপরীতে অন্য কোনো দলীল পাওয়া যায় যা মাফহূমের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেক্ষেত্রে এ নীতি প্রয়োগ হবে না। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا

    যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে [আহযাব: ৫৮]

    এই আয়াতে মুসলিমদেরকে কষ্ট দেয়া হারাম করেছে, মাফহুম আল-মুখালাফাহ থেকে তার মানে দাড়ায় অমুসলিমদের কষ্ট দেয়া বৈধ, যা ভুল। কেননা অন্য আরেকটি আয়াতে যেকোনো কাউকে অন্যায়ভাবে কোনরূপ কষ্ট দেয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে যদিও সে অমুসলিম।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا

    মুমিনগণ! তোমরা যখন মুমিন নারীদেরকে বিবাহ কর, অতঃপর (যদি) তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বে তালাক দিয়ে দাও, তখন তাদেরকে ইদ্দত পালনে বাধ্য করার অধিকার তোমাদের নাই [সূরা আহযাব: ৪৯]

    এই আয়াতটি তালাকপ্রাপ্ত মুমিন নারীকে তার ইদ্দতকালের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে। আয়াতটি হতে এই মাফহূম পাওয়া যায় যে এটি অমুসলিমদের ব্যপারে প্রযোজ্য নয়, যে তাদের ইদ্দত নেই।

    এটি দুইটি কারনে ভুল:

    وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ

    আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন কুরূ পর্যন্ত [সূরা বাকারা: ২২৮]

    এই আয়াতে তালাকপ্রাপ্ত নারীদের তারা তালাকপ্রাপ্ত হওয়া ছাড়া অন্য কোন বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়নি, তাই এই আয়াতের মানতূক সুরা আহযাবে উল্লেখিত মাফহূম আল-মুখালাফাকে খারিজ করে দেয়।

    সুরা আহযাবের আয়াতের বর্ণনা (মুসলিম বনাম অমুসলিম)-এ হুকুমটি বাস্তবায়ন করার জন্য কোনো পরোয়ানা জারি করে না। একজন মহিলা সে মুসলিম বা অমুসলিম হওয়া না হওয়ার সাথে তার ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এটি আম বা সাধারন হুকুম হিসেবে থাকবে এবং এর বর্ণনা এই হুকুমকে সীমাবদ্ধ করে না। যদি কোনো শিক্ষক কোনো মেধাবী ছাত্রকে পুরষ্কৃত করে থাকে তাহলে সে এর দাবিদার বলা যায়। কিন্তু যদি পুরষ্কারটি কোন মোটা ছাত্রকে দেয়া হয় তবে সেটির সাথে তার কৃতিত্বের কোন সম্পর্ক নেই এবং তাকে এর দাবিদারও বলা যায় না। ঠিক একইভাবে, উল্লেখিত আয়াতটিতে ইদ্দতকাল পূরন করার বিষয়টি কোনো মহিলার বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত করার কোনো ভিত্তি নেই।

    সারমর্ম:

    পরিশেষে, দুটি বিষয় আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে:

    প্রথমত, এই বিষয়টি নিয়ে উম্মাহ-র মধ্যে তেমন উল্লেখযোগ্য আলোচনা না হওয়ার দরূণ তাদের চিন্তায় বিস্তর ফারাক দেখা দেয়, ফলে সে নিজের সুবিধা মত আয়াতের ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বর্তমান তথাকথিত মুসলিম শাসকগোষ্ঠী তাদের পছন্দের আলেম দিয়ে এই নীতির মাধ্যমে  খাদ্যের মজুতকরণ, উম্মাহ-র সম্পদ লুটকে যায়েজ করে নেয়। তাই মুসলিমদেরকে পূনর্জাগরণের জন্য এই নীতি সম্পর্কে ভালো ধারনা থাকা প্রয়োজন কেননা এটি ইসলামী টেক্সটকে ভালোমত উপলব্ধি করার সাথে সম্পর্কযুক্ত যা মুসলিমদের জীবনকে পরিচালিত করে ।

    দ্বিতীয়ত, টেক্সটকে বুঝার প্রক্রিয়া অন্যান্য প্রক্রিয়ার মতই সূক্ষ্ম; তাই এটি পর্যবেক্ষনের ক্ষেত্রে অবশ্যই কড়া বিধি-বিধান মেনে চলতে হবে। আর তা না করলে, এর সাদৃশ্যতা সেইরূপ যেন কোনো যন্ত্রপাতি, পদ্ধতি, সূত্র ও সমীকরণের জ্ঞান ছাড়াই কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে যাওয়া। যা কোনভাবেই বাঞ্ছনীয় নয়।