বিয়ন্ড দ্যা সিমুলেশন

Beyond the Simulation

২০১৬ সালে কোড কনফারেন্সে টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ককে একটি প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হলে তিনি বললেন, যদি আমাকে একটিই প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে আমি জিজ্ঞেস করতাম: “What is outside the simulation?” অর্থাৎ, এই সিমুলেশনের বাইরে কী আছে? মাস্কের বিশ্বাস ছিল, আমরা যে বাস্তবতায় বাস করছি সেটি অনেকটাই একটি উন্নত সিমুলেশন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং এই প্রশ্নটি নিয়ে যদি আমরা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করি, তাহলে আমরা হয়তো এর উত্তর পেতেও পারি। আজকে আমরা এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজবো।

১৯৯৯ সালে মুক্তি পাওয়া ‘The Matrix’ মুভিতে দেখানো হয়, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আসলে এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি ডিজিটাল জগতে বন্দি। তারা নিজেদের মুক্ত মনে করে, স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয় বলে ভাবে। অথচ বাস্তবে তাদের প্রতিটি চিন্তা, ইচ্ছা এবং অনুভূতি একটি সুনির্দিষ্ট কোড দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। মরফিয়াস যখন নিওকে সত্যিকারের পৃথিবী দেখায়, তখন নিও প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারে না। কারণ সে যে জগতকে ‘বাস্তব’ বলে জেনে এসেছে, সেটাই আসলে ছিল সবচেয়ে বড় মিথ্যা। যদিও এই মুভিতে পুরো বিষয়টা রুপক অর্থে বুঝিয়েছে কিন্তু এটি আমাদের বর্তমান জীবনের সাথে অনেকটাই মিলে যায়।

বর্তমান Capitalist World Order ঠিক এমনই একটি সিমুলেশন তৈরি করে রেখেছে, যেখানে মানুষ নিজেকে স্বাধীন মনে করে এগিয়ে চলে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দেখা যায়, একজন মানুষকে স্বপ্ন কে দেখিয়েছে, তার চাহিদা কে তৈরি করেছে, তার সাফল্যের সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করেছে, উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে এসবের কোনোটিই সে নিজে করে নি।

ফরাসি দার্শনিক Jean Baudrillard তাঁর বিখ্যাত বই ‘Simulacra and Simulation’-এ এই ঘটনাকে ‘হাইপার-রিয়েলিটি‘ বলেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক যুগে মানুষ মূল বাস্তবতার সংস্পর্শ হারিয়ে ফেলেছে। মানুষ এখন বিজ্ঞাপন, মিডিয়া এবং কর্পোরেট সংস্কৃতির তৈরি করা ‘নকল বাস্তবতা’ কেই সত্য ভাবতে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার ফিল্টার দেওয়া ছবি বা বাস্তবের চেয়েও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের জগত আমাদের মস্তিষ্কে যে অনুভূতির তৈরি করে, তা হলো এই হাইপার-রিয়েলিটির অংশ।

এখন প্রশ্ন এই সিমুলেশন ঠিক কীভাবে কাজ করে? আর এর বাইরে কি আসলেই কোনো জগৎ আছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেতে হলে আমাদের আগে পুঁজিবাদ (Capitalism) এর লুপহোল গুলো সম্পর্কে জানতে হবে। এটি একটি আইডিওলজি বা মতাদর্শ যা থেকে একটি জীবনব্যবস্থা উঠে আসে। পুঁজিবাদের ভিত্তি হচ্ছে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ধর্মের পৃথকীকরণ যা সেক্যুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা নামে পরিচিত। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রফিট ম্যাক্সিমাইজেশন এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ঈন্দ্রিয়গত পরিতুষ্টি বা উপভোগ। এবং এর ভিত্তিতেই সকল কাজ সম্পন্ন হয়।

পুঁজিবাদ অনেক সূক্ষ্ম কৌশলে তার উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়। সে আপনাকে বন্দি না রেখে, আপনার ইচ্ছাশক্তিকেই তার নিজের স্বার্থে পরিচালিত করে।

মানুষের কিছু জৈবিক চাহিদা (Organic needs) ও সহজাত প্রবৃত্তি (Instinct) রয়েছে। মানুষ এসব চাহিদা ও প্রবৃত্তি সঠিকভাবে পরিতুষ্ট করতে পারলেই সন্তুষ্ট থাকে, যা মানুষকে আনন্দ ও স্বস্তি দেয় । পুঁজিবাদ মানুষের এসব বৈশিষ্ট্য কে ব্যবহার করে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে। এসব কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করার জন্য বাহ্যিক উদ্দীপনার প্রয়োজন, যা পুঁজিবাদ কৃত্রিমভাবে তৈরি করে। যেমন, বিজ্ঞাপনের মূল কাজ হলো আমাদের বোঝানো যে, আমরা এখন যেখানে আছি সেটা ‘যথেষ্ট’ নয়। আমাদের স্মার্টফোনটি পুরনো হয়ে গেছে, আমাদের গাড়িটি ততটা ‘আধুনিক’ নয়, আমাদের পোশাকটি এই সিজনে ‘আউট অব ফ্যাশন’। এই ক্রমাগত অতৃপ্তির বোধ মানুষকে একটা অসীম ভোগচক্রে আটকে রাখে। ২০২৪ সালে সারা পৃথিবীতে বিজ্ঞাপন খাতে খরচ হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি, অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু গড়ে প্রায় ১৩৯ ডলার শুধু তাকে ‘আরও কিছু কিনতে’ রাজি করানোর জন্য ব্যয় হয়েছে।

The Matrix-এ এজেন্ট স্মিথ বলে, ম্যাট্রিক্সের প্রথম ভার্সন ছিল একটা পারফেক্ট দুনিয়া। কোনো কষ্ট নেই, কোনো অভাব নেই। কিন্তু মানুষ সেটা টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কারণ মানুষ তৃপ্ত থাকা সহ্য করতে পারে না। তার দরকার সমস্যা, তুলনা, আর অতৃপ্তি। পুঁজিবাদও ঠিক এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়।

আমাদেরকে কেউ জোর করে কিছু বলেনি, কিন্তু আমরা জানি জীবন কীভাবে কাটাতে হয়।  ভালো রেজাল্ট করা, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, কর্পোরেট চাকরি পাওয়া, বাড়ি-গাড়ি করা, এসবই সুখ। এটা যে আসলে আজীবন দাসত্ব ও ভোগের ফাঁদ সেটা আমরা খুব সহজে বুঝতে পারি না।

এই ‘লাইফস্ক্রিপ্ট’ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন এটি সবচেয়ে বড় কর্পোরেশনগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি উৎপাদনশীল কর্মী এবং সবচেয়ে বেশি ভোক্তা তৈরি করে। মানুষ এই স্ক্রিপ্টের মধ্যে এতটাই আটকে যায় যে, জীবনের গভীর প্রশ্নগুলো তার মনে আর আসেই না: আমি কে? কেন এসেছি? কোথায় যাচ্ছি? বিশ্বব্যাপী পারিবারিক ঋণের পরিমাণ ২০২৩ সালে ৫৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। মানুষ যে স্বপ্নের জীবন ‘কিনতে’ গিয়েছে, সেই জীবনের বোঝাই এখন তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।

আধুনিক ডিজিটাল যুগে পুঁজিবাদ একটি নতুন সম্পদ আবিষ্কার করেছে মানুষের মনোযোগ (Attention)। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায়, কারণ এখানে পণ্য আমরা নিজেরাই। আমাদের মনোযোগ বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি হচ্ছে। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন আমরা বেশিক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমাদের মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ রিলিজ হয় প্রতিটি নতুন নোটিফিকেশনে, প্রতিটি ‘লাইক’-এ। ধীরে ধীরে আমরা এই চক্রের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। ঠিক যেভাবে ম্যাট্রিক্সের মানুষেরা নকল আনন্দে বুঁদ ছিল। Data Reportal-এর ২০২৪ সালের গ্লোবাল রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের গড় মানুষ প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট স্ক্রিনের সামনে কাটায় অর্থাৎ জীবনের জেগে থাকা সময়ের প্রায় ৪০ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষ প্রতিদিন গড়ে ৯ ঘণ্টারও বেশি সময় ইন্টারনেটে ব্যয় করে, যা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়দের মধ্যে একটি।

পুঁজিবাদের সবচেয়ে চতুর কৌশলটি হলো, এর বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টাকেও সে পণ্যে পরিণত করে ফেলে। পরিবেশ আন্দোলন হয়ে যায় ‘গ্রিন প্রোডাক্ট’ বিক্রির সুযোগ। বিপ্লবীদের মুখ ছাপা হয় টি-শার্টে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে পুঁজিবাদ-বিরোধী সিরিজ তৈরি হয়, যা থেকে কর্পোরেশনরা কোটি কোটি টাকা আয় করে। এই সিস্টেম আমাদেরকে ‘বিদ্রোহ’ করার অনুমতি দেয়, যতক্ষণ সেই বিদ্রোহ তাদের মুনাফার পথে বাধা না হয়।

এই পুরো সিমুলেশনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো পরিচয়ের সংকট (Identity Crisis)। মানুষ নিজেকে তার ব্র্যান্ড দিয়ে, তার পদমর্যাদা দিয়ে, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দিয়ে পরিচয় দেয়। সে ভুলে যায় যে, সে আসলে কি উদ্দেশ্যে এই পৃথিবীতে এসেছে। দুনিয়ার বাহ্যিক সিমুলেশনকেই সে চিনে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে এই অবস্থার সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন:

يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ

তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক জানে এবং আর পরকাল সম্পর্কে তারা সম্পূর্ণ বেখেয়াল [সূরা আর-রূম: ৭]

أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ

“তোমরা কি মনে করেছ যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না?”  (সূরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ১১৫)

এই আয়াতটি মানুষকে একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয়: যদি জীবনের কোনো উদ্দেশ্য না-ই থাকে, তাহলে এই চাকরি-টাকা-ভোগের দৌড় কিসের জন্য?

মানুষ যখন নিজেই নিজের জীবনের অর্থ তৈরি করে, তখন একটাই সমস্যা হয়। সে নিজেই জানে না সে আসলে কী চায়। কারণ মানুষ স্বভাবতই একটা সীমাবদ্ধ ও নির্ভরশীল সত্তা। সে যখন নিজের ইচ্ছা বা প্রবৃত্তিকে জীবনের মানদণ্ড বানায়, তখন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়াটা অনিবার্য। অনেকে ভাবে সাকসেস মানে ভালো চাকরি, আবার অনেকে ভাবে সাকসেস মানে ফ্রিডম, ভাইরাল হওয়া ইত্যাদি। প্রতিটা উদ্দেশ্য কিছুদিন পর ফাঁকা লাগে, তখন নতুন একটা খোঁজে। এই দৌড়ের কোনো শেষ নেই।

পুঁজিবাদ এখানেই কাজ করে। মানুষ যখন নিজের মত করে বিভিন্ন রকম উদ্দেশ্য সেট করবে তখন সে ভোগ করা বা বিনোদন কে সুখ মনে করে। এবং একেই জীবনের আল্টিমেট উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেলে। এর ফলে পুঁজিবাদীরা তাদের প্রোডাক্ট সেল করে। কিন্তু এতো ভোগের পরও কেন মানুষ শুন্যতা অনুভব করে? কারণ, মানুষ সীমাবদ্ধ সত্তা হওয়ায় সে যদি নিজের উদ্দেশ্য নিজে সেট করে, তাহলে সেটা অবশ্যই ভুল হবে। তাই, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য নিতে হবে মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর কাছ থেকে। তিনি বলেন,

وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ

“আমি জিন ও মানুষকে কেবল এই উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।” 
(সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬)

এখানে ‘ইবাদত’ বা দাসত্ব মানে শুধু নামাজ-রোজা বা ব্যক্তিগত ইবাদত নয়। ইসলামের পরিভাষায় ইবাদত বা আল্লাহর দাসত্ব বা বন্দেগি মানে জীবনের প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা, তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে তা করা। ঘুমানো, খাওয়া, ব্যবসা করা, সংসার চালানো, রাষ্ট্র পরিচালনা করা। যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে, তার প্রতিটি মুহূর্তের একটি অর্থ আছে  যা তার সৃষ্টিকর্তা নির্ধারণ করেছেন, তখন সে পুঁজিবাদী সিমুলেশনের বাইরে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পায়।

অনেকেই ইসলামকে কেবল একটি ‘ধর্মতত্ত্ব’ হিসেবে বোঝেন। নামাজ, রোজা, হজ্বের কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি। কিন্তু ইসলাম মূলত একটি সম্পূর্ণ আইডিওলজি বা জীবনাদর্শ, যা শুধু ব্যক্তির আধ্যাত্মিক জীবন নয়, বরং সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট বিধান দেয়।

পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় যে ব্যক্তির কাছে অর্থ আছে সে কোনো পরিশ্রম না করেই সুদের মাধ্যমে আরও ধনী হয়, আর যে ঋণ নেয় সে ক্রমাগত গরিব হতে থাকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে অত্যন্ত কঠোরভাবে সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন:

وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৭৫)

ইসলামী অর্থনীতিতে সুনির্দিষ্ট বন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পদের একটি অংশ প্রতি বছর সমাজের দরিদ্র শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়া বাধ্যতামূলক। এটি গরিবের অধিকার। কুরআনে সম্পদের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার কারণটি সরাসরি বলে দেওয়া হয়েছে:

كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنكُمْ

“যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যে কেবল ধনীদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।” (সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৭)

আজকের পৃথিবীতে Oxfam-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র পাঁচজন ধনীর মোট সম্পদ গত চার বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬৯ বিলিয়ন ডলারে, আর একই সময়ে পাঁচ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ আরও গরিব হয়েছে। শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর কাছে পৃথিবীর মোট সম্পদের প্রায় ৮০  শতাংশ কেন্দ্রীভূত।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এর আগমনের আগে আরবের সমাজ ছিল একটি জাহেলি সমাজ। তারা নিজের হাতে পাথর কেটে মূর্তি বানাতো, তারপর সেই মূর্তির সামনে মাথা নত করতো। গোত্রপ্রধান যা বলছে সেটাই সত্য, বাপ-দাদা যা করে এসেছে সেটাই চিরন্তন নিয়ম। মেয়ে সন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত মাটিতে পুঁতে দেওয়া হতো। আর এই পুরো ব্যবস্থাটাকে সবাই “স্বাভাবিক” মনে করেছিল তারা। এটাই ছিল সেই সময়ের সিমুলেশন। কেউ প্রশ্ন করেনি, কারণ সিস্টেমটা এতটাই গভীরে গেঁথে গিয়েছিল যে বিকল্প কল্পনাও করা যাচ্ছিল না।

ইসলাম এসে সমাজের এই সাধারন চিন্তাকে পরিবর্তন করে। তারা যেটাকে “বাস্তবতা” মনে করতো, সেটা আসলে একটা ধোঁকা।

وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ 

“আর পার্থিব জীবন ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আল-ইমরান, আয়াত: ১৮৫)

আরবরা যখন এটা বুঝল, তখন তাদের পুরো পৃথিবীটা বদলে গেল। গোত্রের নেতার ভয় চলে গেল, মূর্তির ভয় চলে গেল। কারণ তারা বুঝে গেল আসল ক্ষমতা কোথায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কার একটি জাহেলি সমাজ পরিবর্তন করে ইনসাফভিত্তিক ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মদিনায় হিজরতের পর তিনি এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলেন যেখানে আইনের উৎস ছিল আল্লাহর বিধান, শাসক ছিলেন জনগণের কাছে জবাবদিহিযোগ্য এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ছিল। সেটাই ছিল খিলাফত ব্যবস্থা, যা দীর্ঘ ১৩০০ বছর পৃথিবীতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে গেছে। যাতে ধোঁকাবাজির কোনো সিমুলেশন ছিল না।

মদিনায় সেই সময় একটি সুদভিত্তিক বাজারব্যবস্থা কিছু ইহুদী ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। রাসূল (সা.) বিকল্প একটি স্বতন্ত্র বাজার প্রতিষ্ঠা করলেন, যেখানে অন্যায় মুনাফা ও কৃত্রিম সংকট তৈরি নিষিদ্ধ। সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) সেই বাজারে প্রমাণ করলেন যে, সুদ ও শোষণ ছাড়াও বড় ব্যবসা সম্ভব।

খলিফা উমর (রা.) এর শাসনামালে তিনি একবার খুতবা দেওয়ার সময় এক সাধারণ নাগরিক উঠে দাঁড়িয়ে খলিফার পরনের কাপড়ের হিসাব চাইলেন। পুঁজিবাদী বা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এই সাহসী নাগরিককে শাস্তি দেওয়া হতো। কিন্তু উমর (রা.) বিনয়ের সাথে তাঁর ছেলেকে ডেকে হিসাব দিলেন।

জেরুজালেম বিজয়ের সময় উমর (রা.) যখন সেখানে পৌঁছান, তখন দেখা গেল উটের লাগাম তাঁর হাতে, আর উটের পিঠে বসা তাঁর দাস। রোমান কর্তৃপক্ষ এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তাদের সমস্ত রাজকীয় জাঁকজমকের কৃত্রিম সিমুলেশন এই সত্যের সামনে মূল্যহীন হয়ে পড়ল।

শুধু রাষ্ট্রকাঠামো নয়, ব্যক্তিজীবনেও ইসলাম পুঁজিবাদী সিমুলেশন থেকে বের হওয়ার পথ দেখায়। মানুষ যখন তার জীবনের সকল কাজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য তার গাইডেন্স অনুযায়ী করবে, তখন তার অন্তর প্রশান্ত হয়। পুঁজিবাদের এই কৃত্রিম পরিচয় থেকে বের করে তার আসল পরিচয় খুঁজে পায়।

إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي

“নিশ্চয়ই আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণে সালাত কায়েম করো।” (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১৪)

মানুষের ভেতরে থাকা জৈবিক চাহিদা ও সহজাত প্রবৃত্তিগুলোকে ইসলাম এমনভাবে বিন্যস্ত করেছে, যাতে প্রতিটির যথাযথ পরিতৃপ্তি নিশ্চিত হয়। এই চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি সুচিন্তিত ভারসাম্য গড়ে তুলে ইসলাম প্রতিটিকেই যথাযথ স্থান দিয়েছে, ফলে মানুষ প্রকৃত তৃপ্তি ও মানসিক প্রশান্তি অনুভব করে। পাশাপাশি এই ব্যবস্থা মানুষকে সেই বিপদ থেকেও নিরাপদ রাখে, যেখানে প্রবৃত্তিকে অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলতে দিলে সে পশুতুল্য অবস্থায় নেমে যেতে পারত।

ইসলামের ‘জুহদ’ (দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিহীনতা) এবং ‘কানাআত মিন কালীল’ (অল্পে তুষ্টি) সরাসরি ভোগবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়ায়। এর মানে এই নয় যে, মুসলমান গরিব থাকবে বা ধনী হওয়ার চেষ্টা করবে না। এর মানে হলো, সে তার সাফল্যকে পুঁজিবাদীদের দেওয়া মানদণ্ডে মাপবে না। সে সত্যিকারের সাফল্যের দিকে ছুটবে, যা হলো চিরস্থায়ী জান্নাত, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।

রাসূল (সা.) বলেছেন: “দুনিয়া মুমিনের কারাগার এবং কাফিরের বেহেশত।” এই হাদিসটি মুমিনকে মনে করিয়ে দেয়, এই পার্থিব জীবন তার চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। পুঁজিবাদের পুরো সিমুলেশন ‘দুনিয়াই সব’ এই বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে। যেদিন মানুষ বিশ্বাস করে যে, এই পৃথিবীর বাইরেও একটি চিরস্থায়ী জীবন আছে, সেদিন থেকেই সিমুলেশনের দেয়ালে ফাটল ধরতে শুরু করে।

রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

আল্লাহর কসম! আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ তো ঠিক ওইরূপ, যেমন তোমাদের কেউ নিজের এই আঙুলটি (হাদিসের রাবী ইয়াহইয়া শাহাদাত আঙুল দিয়ে ইশারা করে দেখালেন) সমুদ্রে ডুবিয়ে দিল। এরপর সে যেন লক্ষ্য করে দেখে যে, আঙুলটি কী পরিমাণ পানি নিয়ে ফিরে এসেছে। (সহীহ মুসলিম- ২৮৫৮)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন:

اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرٌ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ

“জেনে রেখো, পার্থিব জীবন তো কেবল খেলা, কৌতুক, সাজসজ্জা এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যে গর্ব করা ও ধনসম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আল-হাদিদ, আয়াত: ২০)

এই আয়াত আধুনিক ভোগবাদী সমাজের একটি নিখুঁত চিত্র। এটি আজকের ইনস্টাগ্রাম ফিড, ব্র্যান্ডের প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক স্ট্যাটাসের দৌড়কে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করে দেয়।

The Matrix-এ মরফিয়াস নিওকে দুটো অপশন দিয়েছিল। Blue pill মানে সব ভুলে ম্যাট্রিক্সের আরামদায়ক মিথ্যায় ফিরে যেতে বলেছিল, জীবন চলতে থাকুক। Red pill মানে সত্য দুনিয়া, সেটা যতটাই কঠিন হোক। ইসলাম আমাদের সত্যের পথ দেখায়, সেতা যতটাই কঠিন হোক। কারণ, এই পথেই আছে সত্যিকারের মুক্তি।

পারস্যের সেনাপতি রুস্তমের বিশাল দরবারে সাহাবি রিবঈ ইবনে আমের (রা.) দাঁড়িয়ে বলেছিলেন: “আল্লাহ আমাদের পাঠিয়েছেন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে বের করে আল্লাহর দাসত্বে নিয়ে আসতে, পার্থিব জীবনের সংকীর্ণতা থেকে বের করে এর প্রশস্ততার দিকে নিয়ে যেতে।”

এই কথাটি আজও ততটাই প্রাসঙ্গিক। পুঁজিবাদী সিমুলেশন মানুষকে ‘মানুষের দাসত্বে’ রেখেছে। ইসলাম সেই দাসত্ব থেকে মুক্তির পথ দেখায়।

প্রাথমিক যুগের মুসলমানরা যখন ইসলামী জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, তখন মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে তারা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও ন্যায়পরায়ণ সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। এই সাফল্যের রহস্য ছিল একটাই, তারা দুনিয়াকে লক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং উপায় হিসেবে দেখত।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন, যারা তাঁর পথে দৃঢ় থাকে তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ প্রতিশ্রুতি:

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ

“নিশ্চয় যারা বলে, ‘আল্লাহই আমাদের রব’ অতঃপর অবিচল থাকে, ফেরেশতারা তাদের কাছে নাযিল হয় (এবং বলে,) ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর তোমাদেরকে যার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল’।” (সূরা ফুস্সিলাত, আয়াত: ৩০)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কুরআনে আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন:

وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا

“যে ব্যক্তি আমার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকে, তার জীবন হবে সংকুচিত।” (সূরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)

এই আয়াতটি অসাধারণভাবে ব্যাখ্যা করে কেন পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মহত্যা। WHO-এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ২৮০ কোটিরও বেশি মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর প্রায় ৫০,০০০+ মানুষ আত্মহত্যা করে, যা যেকোনো যুদ্ধে আমেরিকার বার্ষিক মৃত্যুর চেয়ে বেশি। বস্তুগত সমৃদ্ধি যখন সর্বোচ্চে পৌঁছায়, তখন আত্মার শূন্যতাও সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। কারণ মানুষের ভেতরে এমন একটি শূন্যতা আছে, যা শুধু তার স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক দিয়েই পূরণ হয়। কোনো গাড়ি বা পদমর্যাদা দিয়ে নয়।

এই সিমুলেশনের বাইরে আছে একটি জীবন যেখানে প্রতিটি মুহূর্তের অর্থ আছে, প্রতিটি কাজের একটি চুড়ান্ত উদ্দেশ্য আছে। ইসলাম হলো সেই “রিয়েল ওয়ার্ল্ড” বা প্রকৃত সত্য, যা এই সিমুলেশনের বাইরে নিয়ে যায়।

The Matrix-এর নিও যখন প্রথমবার Red pill খেয়ে ম্যাট্রিক্সের বাইরের বাস্তবতা দেখে, তখন সে অবাক হয়ে যায়। বাস্তবতা তার কল্পনার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন, কিন্তু অনেক বেশি সত্যিও। আমাদের সামনেও একই পছন্দ আছে। পুঁজিবাদী সিমুলেশনের মিষ্টি মিথ্যায় ডুবে থাকা, নাকি ইসলামের দেখানো মুক্তির পথ বেছে নেওয়া। ইসলাম একটি পূর্ণ জীবনব্যবস্থা যা ব্যক্তির মন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের কাঠামো পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে একটি বিকল্প সিস্টেম প্রস্তাব করে। যে সিস্টেম মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এবং তার আসল পরিচয় ও উদ্দেশ্যের সাথে পুনরায় সংযুক্ত করে।

পুঁজিবাদের ডিজিটাল ম্যাট্রিক্স থেকে সম্পূর্ণ ‘ডিসকানেক্ট’ হয়ে মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এর সাথে ‘কানেক্ট’ হলেই আমরা এই সিমুলেশনের বাইরে আসতে পারবো। এই বৈষম্যপূর্ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে আমাদের চ্যালেঞ্জ করতে হবে। রাসূল (সা.) ও সাহাবিদের সুন্নাহ অনুযায়ী সমাজে ইসলামের সামাজিক, অর্থনৈতিক (সুদমুক্ত) ও রাজনৈতিক ইনসাফ অর্থাৎ খিলাফত ব্যবস্থার পুনর্জাগরণের জন্য নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করে যেতে হবে।

Leave a Reply