রেইপ কেবল একটি সামাজিক অপরাধ নয়; বরং আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার গভীর অসুস্থতার একটি ভয়ংকর লক্ষণ। আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যখন বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ, নারী ধর্ষণ, এমনকি ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনাগুলো মানুষকে আতঙ্কিত, ক্ষুব্ধ ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ করলে, কিংবা টেলিভিশনের সংবাদ দেখলে আমরা নতুন নতুন বিভীষিকার মুখোমুখি হচ্ছি। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হয় না। বরং এগুলো ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরে নিয়মিত আতঙ্কে পরিণত হচ্ছে।
আমরা আজ যে প্রশ্নের মুখোমুখি, তা হলো: কেন এই অপরাধগুলো বারবার ঘটছে? কেন প্রতিবার মানুষের ক্ষোভ, প্রতিবাদ, মানববন্ধন, টকশো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও সমাজের বাস্তবতা পরিবর্তিত হচ্ছে না?
আমরা মনে করি, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদেরকে শুধু আবেগ দিয়ে নয়, চিন্তা দিয়েও বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ, কেবল ক্ষোভ কোনো জাতিকে বাঁচাতে পারে না। একটি জাতিকে বাঁচাতে হলে তাকে নিজের সংকটকে সঠিকভাবে বুঝতে হয়।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে ধর্ষণের কারণ নিয়ে যেসব ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তার অধিকাংশই আংশিক সত্য, কিন্তু পূর্ণ সত্য নয়। আমরা লক্ষণ নিয়ে কথা বলি, কিন্তু রোগ নিয়ে কথা বলি না। আমরা ফলাফল দেখি, কিন্তু শেকড় দেখতে চাই না।
রেইপের কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি বলা হয়, সেটি হলো বিচারহীনতা ও বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা। নিঃসন্দেহে এটি একটি বাস্তব সমস্যা। যখন অপরাধী দ্রুত ও নিশ্চিত শাস্তি পায় না, তখন অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। যখন মানুষ দেখে ক্ষমতা, অর্থ বা রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে অপরাধী পার পেয়ে যেতে পারে, তখন মানুষ আইনের ভয় হারাতে শুরু করে।
কিন্তু আমাদেরকে একটি কঠিন প্রশ্ন করতেই হবে: এই বিচারহীনতা কেন তৈরি হয়েছে? বিচারব্যবস্থা কি আকাশ থেকে নেমে এসেছে? রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো যন্ত্র?
না। বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা নিজেই সমাজের বৃহত্তর নৈতিক ও আদর্শিক সংকটের ফলাফল। যে সমাজে সত্যের মূল্য কমে যায়, যেখানে ক্ষমতা ন্যায়বিচারের ওপরে উঠে যায়, যেখানে রাজনীতিতে ইনসাফের ছিটেফোঁটা থাকে না, যেখানে রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, সেখানে বিচারব্যবস্থা কখনোই ধারাবাহিকভাবে ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না। একটি দোতলা নৌকার তলায় যখন ফুটো হয়, তাতে নৌকার নিচতলাই কেবল ডুবে না। দোতলা-সহ পুরো নৌকাটিই ডুবে যায়। রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তিতে ফুটো থাকলে, যত মেধাবী লোকদেরই বিচারক বানানো হোক না কেন, বিচার বিভাগও ডুবে যাবে। অর্থাৎ বিচারহীনতা একটি কারণ হলেও, সেটি আবার আরও গভীর একটি রোগের লক্ষণও বটে।
একইভাবে আমরা মাদকের কথা বলি। আমরা বলি, মাদকাসক্তি বেড়ে গেছে, তাই অপরাধ বেড়েছে। সন্দেহ নেই, মাদক বহু অপরাধকে উসকে দেয়। মাদক মানুষের বিবেক দুর্বল করে, আত্মনিয়ন্ত্রণ ধ্বংস করে, সহিংসতা বৃদ্ধি করে। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন হলো: কেন মাদক এত সহজলভ্য হয়ে উঠেছে?
এটি কি কেবল কিছু মাদকাসক্ত ব্যক্তি আর কিছু অসৎ ব্যবসায়ীর কারণে? নাকি এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রের দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক মাদক অর্থনীতি, সীমান্ত দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং একটি আদর্শহীন সমাজব্যবস্থা? মাদক কেবল একটি ব্যক্তিগত পাপ নয়; কেবল পারিবারিক সমস্যাই নয়। এটি একটি বিশাল পুঁজির আন্তর্জাতিক ব্যবসা। কোটি কোটি ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সাথে এটি জড়িত। ফলে সমস্যাটি শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি সভ্যতাগত ও নৈতিক সংকটের অংশ।
একই কথা পর্নোগ্রাফির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আজকের পৃথিবীতে শারীরিক চাহিদাকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয় না; বরং এটিকে একটি বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত করা হয়েছে। মানুষের প্রবৃত্তি, কল্পনা, দৃষ্টি ও মনস্তত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি বিশাল বৈশ্বিক শিল্প কাজ করছে। এই শিল্প মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে এমন একটি মানসিকতা তৈরি করে, যেখানে নারীকে, এমনকি শিশুদেরকেও পূর্ণ মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন সত্তা হিসেবে নয়, বরং ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে শেখানো হয়।
এখানেও আমরা একই প্রশ্ন করি: এই পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? কেন রাষ্ট্র, সমাজ ও বৈশ্বিক সংস্কৃতি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করলো, যেখানে অশ্লীলতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, কিন্তু লজ্জাবোধকে আনস্মার্টনেস মনে করা হচ্ছে?
প্রকৃত সত্য হলো ধর্ষণ, মাদক, পর্নোগ্রাফি, সহিংসতা — এগুলোর কোনোটিই মূল রোগ নয়। এগুলো আরও গভীর একটি সংকটের উপসর্গ। আর সেই সংকট হলো — আদর্শিক পতন। চিন্তার পতন। আদর্শিক ভিত্তির পতন। আল্লাহভীতির পতন। মানুষের আত্মিক ও নৈতিক সত্তার পতন।
যে সমাজে মানুষ নিজেকে কেবল প্রবৃত্তির প্রাণীতে পরিণত করে, সেখানে আইন একা সমাজকে রক্ষা করতে পারে না। কারণ আইন মানুষকে কিছু সময়ের জন্য থামাতে পারে, কিন্তু চিন্তা মানুষকে ভেতর থেকে নিয়ন্ত্রণ করে।
একটি সমাজ তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন সেখানে মানুষ শুধু আইন বা পুলিশের ভয়ে নয়, বিবেকের কারণেও অপরাধ থেকে বিরত থাকে। যখন মানুষ বিশ্বাস করে যে, সে কেবল রাষ্ট্রের কাছেই নয়, আল্লাহর কাছেও জবাবদিহি করবে।
আজকের সংকটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো — আমরা এমন একটি সমাজে প্রবেশ করছি, যেখানে স্বাধীনতার কথা বলা হয়, কিন্তু আত্মসংযমের কথা বলা হয় না; অধিকারের কথা বলা হয়, কিন্তু দায়িত্বের কথা বলা হয় না; ভোগের কথা বলা হয়, কিন্তু চরিত্রের কথা বলা হয় না। ফলে সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে একটি নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়। পরিবারিক শিক্ষা ও বন্ধন দুর্বল হয়। লজ্জাবোধ দুর্বল হয়। আত্মিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়। আর এই শূন্যতার মধ্য দিয়েই ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো আরও ভয়ংকরভাবে বিস্তার লাভ করে।
অতএব, আমরা যদি সত্যিই এই সংকটের সমাধান চাই, তাহলে আমাদেরকে শুধু অপরাধীর বিচার নিয়ে কথা বললে হবে না; আমাদেরকে সেই সমাজ, সেই সংস্কৃতি, সেই চিন্তা ও সেই রাষ্ট্রিক কাঠামো নিয়েও কথা বলতে হবে, যেগুলো এই ধরনের অপরাধ জন্ম নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করছে। কারণ, যে সমাজ তার আদর্শিক ভিত্তি হারায়, সে সমাজ একসময় তার মানবিক ভিত্তিও হারিয়ে ফেলে।
আমরা যদি আজকের সংকটকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে চাই, তাহলে আমাদেরকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। প্রশ্নটি হলো: রাষ্ট্র কি আদর্শনিরপেক্ষ হতে পারে? আজকের পৃথিবীতে অনেকেই এমনভাবে কথা বলেন, যেন রাষ্ট্র কেবল একটি প্রশাসনিক যন্ত্র; যেন রাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে নিরপেক্ষ নয়। প্রত্যেক রাষ্ট্রই কোনো না কোনো মূল্যবোধ, কোনো না কোনো সংস্কৃতি, কোনো না কোনো জীবনদর্শনকে রক্ষা করে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেয়।
কিছু রাষ্ট্র ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। কিছু রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে দাঁড় করায়। কিছু রাষ্ট্র ভোগবাদী সংস্কৃতিকে উৎসাহ দেয়। আবার কিছু রাষ্ট্র ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধকে সমাজের কেন্দ্রে স্থাপন করতে চায়। অতএব, প্রশ্নটি আসলে এটি নয় যে রাষ্ট্রের আদর্শ থাকবে, কি থাকবে না। বরং প্রশ্ন হলো: রাষ্ট্র কোন আদর্শের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে?
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ দেশের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আবেগ, নৈতিকতা ও সামাজিক চেতনার একটি বড় অংশ ইসলামী আকিদা ও মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত। গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এখনো পরিবার, লজ্জাবোধ, নৈতিকতা, আল্লাহভীতি ও ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু একই সময়ে রাষ্ট্রের বহু নীতি, শিক্ষা কাঠামো, সাংস্কৃতিক প্রবাহ ও প্রশাসনিক দর্শন এমন এক আদর্শিক কাঠামোর প্রভাব বহন করে, যার শিকড় উপনিবেশিক ও পাশ্চাত্য সেক্যুলার চিন্তায় নিহিত।
ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে একটি আদর্শিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। দেশের মানুষ চারপাশের সমাজের প্রভাবে এক ধরনের নৈতিক চেতনা নিয়ে বড় হয়, কিন্তু রাষ্ট্র তাকে ভিন্ন এক জীবনদর্শনের দিকে ঠেলে দেয়। পরিবার এক ধরনের মূল্যবোধ শেখায়, কিন্তু মিডিয়া ও সংস্কৃতি ভিন্ন বার্তা দেয়। ধর্ম আত্মসংযম শেখায়, কিন্তু বৈশ্বিক ভোগবাদী সংস্কৃতি তার প্রবৃত্তিকে উসকে দেয়। এই দ্বৈততার ভেতরেই সমাজ ধীরে ধীরে বিভ্রান্ত, দুর্বল ও নৈতিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইসলামী আইন ও ইসলামী নৈতিকতার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখে। যেমন: রিজলভ নেটওয়ার্ক নামে গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি বৈশ্বিক কনসোর্টিয়ামের ২০১৭ সালের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, শরিয়াহ আইন মৌলিক সেবা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করে। ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপেও এসেছিল, বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে ৮২ শতাংশই শরিয়াহ আইনের পক্ষে। অর্থাৎ, এই সমাজের মানুষের নৈতিক আকাঙ্ক্ষা এখনো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। জনগণের ভেতরে ইসলামী আকিদার ভিত্তিতে সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু চলমান রাজনীতি ও রাষ্ট্রকাঠামো সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধারাবাহিকভাবে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এখানে আরেকটি বিষয়ও অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলা দরকার। ইসলাম কেবল দ্রুত শাস্তির কথা বলে না। ইসলাম শুধু অপরাধীকে দমন করতে চায় না; ইসলাম এমন একটি সমাজ গঠন করতে চায়, যেখানে অপরাধ জন্ম নেওয়ার পরিবেশই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আজ অনেকেই ইসলামী সমাধান বলতে শুধু দ্রুত বিচার ও প্রকাশ্য শাস্তির বিষয়টি সামনে আনেন। কিন্তু ইসলামি সভ্যতার শক্তি শুধু আইনের কঠোরতায় ছিল না; বরং মানুষের চরিত্র গঠনে ছিল। আদর্শিকভাবে ইসলামের সার্বিক বাস্তবায়ন ছাড়া ওই আউটকাম সম্ভব ছিল না।
ইসলাম প্রথমে মানুষের অন্তরে ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড (ফুরকান) গঠন করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সর্বযুগে ওহীর মাধ্যমে মানুষের কাছে এই ফুরকান পাঠাতেন:

“রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে—মানুষের জন্য পথনির্দেশক ও সৎপথের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড (ফুরকান) হিসেবে।”[সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫]

“তিনি আপনার প্রতি সত্যের সাথে কিতাব নাযিল করেছেন, যা এর আগের কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী। আর তিনি তাওরাত ও ইঞ্জিল নাযিল করেছেন—এর আগে মানুষের জন্য পথনির্দেশ হিসেবে। আর তিনি ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড) নাযিল করেছেন।”[সূরা আলে ইমরান, ৩:৩-৪]

“আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাদের সঙ্গে কিতাব ও মীযান (ন্যায়বিচারের মানদণ্ড) নাযিল করেছি, যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর দাঁড়ায়।”[সূরা আল-হাদীদ, ৫৭:২৫]
ইসলাম মানুষের অন্তরে তাকওয়ার দ্বারা এই ফুরকান সৃষ্টি করে:

“হে ঈমানদারগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তিনি তোমাদের জন্য ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা) সৃষ্টি করে দেবেন, তোমাদের পাপসমূহ মুছে দেবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দেবেন।”[সূরা আল-আনফাল, ৮:২৯]
এভাবে ইসলাম সমাজের মধ্যে আল্লাহর প্রতি জবাবদিহির অনুভূতি সৃষ্টি করে। মানুষকে শেখায়, ক্ষমতা থাকলেও অন্যায় করা হারাম; সুযোগ পেলেও জুলুম হারাম; গোপনে হলেও পাপ আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে নয়।
যে সমাজে এই আকিদা, এই ফুরকান, এই ইসলামী বিবেক শক্তিশালী হয়, সেই সমাজে আইন একা পাহারা দেয় না; মানুষের বিবেকও সমাজকে পাহারা দেয়।
একই সঙ্গে ইসলাম পরিবারকে গুরুত্ব দেয়। কারণ পরিবার শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নৈতিক ও মানসিক নিরাপত্তার কেন্দ্র। পরিবার দুর্বল হয়ে গেলে সমাজের নৈতিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে যায়।
ইসলাম শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু চাকরি বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখে না। শিক্ষা মানুষের চরিত্র, দায়িত্ববোধ ও নৈতিক চেতনা গঠনের মাধ্যম। আজ আমরা ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু চরিত্রবান মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ফলে প্রযুক্তি বাড়ছে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়ছে না।
একইভাবে ইসলামী রাষ্ট্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচারব্যবস্থা কেবল শাস্তি দেওয়ার যন্ত্র নয়; এটি ইনসাফ প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠান। দ্রুত বিচার, নিশ্চিত বিচার, ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত বিচার—এগুলো ছাড়া কোনো সমাজে স্থিতিশীলতা আসতে পারে না।
ইসলাম এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশও চায়, যেখানে অশ্লীলতা ব্যবসায় পরিণত না হয়, যেখানে মানুষের প্রবৃত্তিকে ক্রমাগত উসকে দেওয়া না হয়, যেখানে নারী ও শিশুর মর্যাদা বাজারের পণ্যে পরিণত না হয়।
অতএব, ইসলামী সমাধান বলতে আমরা শুধু কোনো নির্দিষ্ট আইনের ধারা বুঝি না। এটা একটা টোটাল প্যাকেজ। ইসলামী সমাধান বলতে আমরা বুঝি — আকিদার ভিত্তিতে গঠিত একটি সমাজ, একটি জনমুখী ও কার্যকর রাষ্ট্র, ইনসাফপূর্ণ বিচার, শক্তিশালী পুলিসিং, একটি চরিত্রভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, একটি দায়িত্বশীল সংস্কৃতি এবং এমন একটি সভ্যতা, যেখানে মানুষ কেবল আইনের ভয়ে নয়, আল্লাহর ভয়েও অন্যায় থেকে বিরত থাকে।
আজ আমাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে — আমরা কি কেবল প্রতিটি ঘটনার পরে ক্ষোভ প্রকাশ করব, নাকি সমাজের গভীর রোগ নিরাময়ের চেষ্টাও করব? আমরা কি শুধু শাস্তির দাবি জানিয়ে থেমে যাব, নাকি সেই চিন্তা, সেই সংস্কৃতি ও সেই রাষ্ট্রিক কাঠামো নিয়েও কথা বলব, যা ধীরে ধীরে মানুষকে নৈতিকভাবে শূন্য করে তুলছে?
আমরা যদি সত্যিই শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ চাই, যদি সত্যিই নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে চাই, যদি সত্যিই ধর্ষণের মতো অপরাধ কমিয়ে আনতে চাই, তাহলে আমাদেরকে সমাজের আদর্শিক ভিত্তি পুনর্গঠনের দিকে ফিরতে হবে। আমাদেরকে এমন একটি সমাজ গড়তে হবে, যেখানে মানুষ স্বাধীনতা পাবে, কিন্তু সীমাহীন প্রবৃত্তির দাস হবে না। যেখানে আইন থাকবে, কিন্তু আইনকে টিকিয়ে রাখার জন্য আদর্শিক প্রেরণাও থাকবে। যেখানে রাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্র জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে না।
কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় — কোনো সমাজ কেবল আইন, পুলিশ বা প্রযুক্তি দিয়ে টিকে থাকে না, কেবল অর্থনীতি দিয়েও টিকে থাকে না। সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে তার আদর্শিক ভিত্তির ওপর। আর যে সমাজে আল্লাহর দাসত্ব হারিয়ে যায়, সে সমাজের মানুষগুলো প্রবৃত্তির দাস হয়ে পড়ে। জঘন্য সেই সমাজে নিকৃষ্ট সব অপরাধ ঘটতেই থাকবে।








