তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
জনমতের গুরুত্ব

প্রকাশ্য সামাজিক পর্যায়ে জনগণ যে বিষয়টাকে সম্মান বা অসম্মান করে তার ভিত্তিতেইএকটা জাতি পরিচালিত হয়। ব্যক্তিগত মতামতের ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গৌণ। মানুষের সংগঠিত মতামত বা কাজ যা সামাজিক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে করা হয় কেবল তার দ্বারাই জনমত প্রভাবিত হয়। আলাদা আলাদা ভাবে ব্যক্তিরা কী মনে করে বা বিশ্বাস করে তার দ্বারা সমাজ পরিচালিত হয় না। সমাজের সম্মিলিত নীতিবোধই সবসময় জনমত তৈরী করে ও ব্যক্তির মতামতকে প্রভাবিত করে। এর একটা উদাহরণ হচ্ছে কুরাইশদের দ্বারা বয়কট চুক্তির বিলোপ সাধন। আবু জেহেল ও কুরাইশ নেতারা একে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় বললেও জনমতের চাপের কারণে কুরাইশরা এই বয়কটের সমাপ্তি টানতে বাধ্য হয়েছিল।
সমাজ পরিবর্তন করতে হলে সমাজের প্রত্যেককেই পরিবর্তন করতে হবে এমন কোনও আবশ্যকতা নেই। যা আবশ্যক তা হল সম্মিলিত মতামত বা জনমতের পরিবর্তন সাধন। তাই কুফর সমাজকে ইসলামিক সমাজে পরিণত হতে হলে সম্মিলিত চিন্তা ভাবনা ও জনমতগুলোকে অবশ্যই ইসলামিক হতে হবে। মুসাব (রা) যখন মদীনা থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাসূল (সা) কে তাঁর কাজের ফলাফল সম্পর্কে বিবরণ দিচ্ছিলেন তখন তিনি (রা) জানালেন যে ইসলাম মদীনার ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে, তার মানে এই নয় যে সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছে, বরং তার মানে হচ্ছে ইসলাম জনগণের সম্মিলিত মতামতের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এই ভিত্তির উপরই রাসূল (সা) মদীনায় প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
“ইসরাইল রাষ্ট্র”-এর বৈধতার ভিত্তি কী?
গাজা শহরের ওপর চলমান বর্বর ইসরাইলি আগ্রাসন দীর্ঘদিনের বিতর্ককে বিশ্বব্যাপী নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। “মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট” নিরসনের জন্য পশ্চিমা থেকে Two-State Solution [দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলকে মেনে নেয়া]-এর কথা বলা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের জনমত মূলত রাষ্ট্র হিসেবে “ইসরাইল”-এর অস্তিত্বেরই বিপক্ষে। খোদ ওয়াশিংটন পোস্ট অনলাইনেই এসেছে – Two-State Solution এখন মৃত:মধ্যপ্রাচ্যে এই আগ্রাসী সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের উপস্থিতি শুধু মুসলিমরাই মানছেন না, তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের খ্রিস্টান, এমনকি ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি অংশও ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নিতে অনিচ্ছুক। ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার আগ থেকে এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নিয়ে বহু বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে এই বিতর্ক নতুনভাবে জমে উঠেছে:ইহুদি-নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়া বুদ্ধিজীবী মহল সুকৌশলে ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং/অথবা জায়োনিজম (Zionism)-এর বিরোধিতাকে ইহুদিবিদ্বেষ ও Anti-semitism হিসেবে চিহ্নিত করে। অথচ ইসরাইলবিরোধী এবং/অথবা জায়োনিজমবিরোধী হওয়ার সাথে ইহুদিবিরোধী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা Judaism হলো একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম আর জায়োনিজম হলো সেই ধর্মাবলম্বীদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সব ইহুদি এই জায়োনিজমের সমর্থকও নন।
জায়োনিস্টরা ইসরাইল রাষ্ট্রের সপক্ষে যেসব নৈতিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভিত্তি দেখায়, সেগুলো বিবেচনা করা যাক:নৈতিক ভিত্তি
ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ সাল অবধি বসবাসরত আরব জনগোষ্ঠিকে জবরদস্তির মাধ্যমে বিতাড়ন করে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল কখনো নৈতিকতা দাবি করতে পারে না। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে লক্ষ লক্ষ ইউরোপিয়ান ইহুদি ফিলিস্তিনে অনুপ্রবেশের কারণে বহু আরব তাদের বাড়িঘর হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন, জীবন ও জীবিকা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করায় যারা অনৈতিক কিছু দেখেন না, তারাই আবার জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে-এর শ্বেতাঙ্গ-উচ্ছেদের কড়া সমালোচক!
কারো পুরো বাড়ি দখল করে বাড়ির মালিককেই টয়লেটে বসবাস করতে বলা কতটুকু নৈতিক? ইসরাইলি দখলদারদের নৈতিকতার দৌড় ওইটুকুই।
ঐতিহাসিক ভিত্তি
ইসরাইল রাষ্ট্রের দুর্বল নৈতিক ভিত্তিকে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলে সবল করার চেষ্টা করে পশ্চিমারা। জায়োনিস্টরা দাবি করে, তাদের পূর্বপুরুষরা একসময় ফিলিস্তিনের অধিবাসী ছিল। তাই ফিলিস্তিনের ওপর রয়েছে ইহুদিদের ঐতিহাসিক অধিকার!জায়োনিস্টদের এ-দাবি যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলকেও তো মেনে নেয়া উচিত ছিল পশ্চিমাদের। কেননা কুয়েত তো ঐতিহাসিকভাবে মেসোপটেমিয়া [ইরাক]-এরই অংশ ছিল!
পূর্বপুরুষদের বসবাসের কারণে যদি ভূমির ওপর কোনো দাবি জন্মায়, তাহলে তো গোটা আমেরিকার মূল মালিক রেড ইন্ডিয়ানরা। আফ্রিকা থেকে আসা ওবামা বা ইউরোপ থেকে আসা জন কেরির তো সেক্ষেত্রে আমেরিকার উদ্বাস্তু শিবিরে থাকা উচিত। ১৪৯২ সালে ইউরোপিয়ান নাবিক ক্রিস্টোফার কোলাম্বাস যখন আমেরিকায় পা রাখেন, তখন অন্তত এক কোটি রেড ইন্ডিয়ান সারা আমেরিকায় বসবাস করত। এখন জায়োনিস্টদের মতো করে রেড ইন্ডিয়ানরা যদি আমেরিকার স্বত্ব-স্বামিত্ব চেয়ে ইউরোপিয়ান বা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের কচুকাটা করতে থাকে, তাহলে সেটাকে ওবামা-কেরি কি রেড ইন্ডিয়ানদের “Right to Self-defense” বলবেন?
আসলে কারো পূর্বপুরুষ কোনো এক সুদূর অতীতে কোনো একটি ভূ-খণ্ডে বসবাস করার হাজার হাজার বছর পর তাদের উত্তরসূরিরা এসে সেই ভূ-খণ্ডে রাষ্ট্র গঠনের দাবি করলেই যদি তা মেনে নিতে হয়, তাহলে পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রই লোপ পাবে। পৃথিবীকে আবারও হয়ত গুহাচারী মানুষদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। আফ্রিকার গহীন জঙ্গলের গুহাচারী মানুষরাই হবেন বর্তমান পৃথিবীর একমাত্র বৈধ অধিপতি। জায়োনিস্টরা নিশ্চয়ই আফ্রিকার সেসব গুহাচারীর কাছে তাদের সব বড় বড় ব্যাঙ্ক, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, টিভি চ্যানেল, নিউজপেপারগুলো ছেড়ে দেবে না!
তাছাড়া ফিলিস্তিনের ভূমির ওপর জায়োনিস্টদের ঐতিহাসিক দাবির পক্ষে কোনো নিরপেক্ষ প্রমাণ নেই। বরং অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, ফিলিস্তিনের সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দা হলো কেনানবাসীরা:
http://en.wikipedia.org/wiki/Palestine#History
খ্রিস্টপূর্ব তিন সহস্রাব্দে কেনানিরা বর্তমান ফিলিস্তিন অঞ্চলে বসবাস করত। এর প্রায় একহাজার বছর পর খ্রিস্টপূর্ব দুই সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়া থেকে বনি ইসরাইলিরা এসে ফিলিস্তিনে আক্রমণ চালায় ও বসবাস শুরু করে। তাই ঐতিহাসিক ভিত্তিতে কেউ যদি ফিলিস্তিনের ভূমির ওপর অধিকার দাবি করে, সেটা করতে পারে কেনানি-মিশরীয়রা। জায়োনিস্টদের সেই অধিকার নেই।
ধর্মীয় ভিত্তি
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসরাইল রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্ব নেই। কেননা খ্রিস্ট ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের মতো ইহুদি ধর্মেরও কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো বা শাসনব্যবস্থা নেই।ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তালমুদের Tractate Kesubos (p. 111a) অনুসারে, হযরত দাউদ (আ.)-এর বংশধরদের মধ্য থেকে একজন “মসিহ” না আসা পর্যন্ত কোনো ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
http://en.wikipedia.org/wiki/Three_Oathsউনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে শুরু হওয়া জায়োনিস্ট আন্দোলন তালমুদের এই বিধানকে অপব্যাখ্যা করে। জায়োনিস্টদের দেয়া অন্যতম অপব্যাখ্যা হলো, মসিহকে স্বাগত জানানোর জন্য আগে থেকেই একটি ইহুদি রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠা করে রাখতে হবে।
জায়োনিস্টদের এসব ব্যাখ্যাকে বিশ্বের বহু ইহুদি এখনো মেনে নেননি। যেমন, ইহুদি গোষ্ঠি NETUREI KARTA, ইরানে বসবাসকারী Iranian Jewish Community.
NETUREI KARTA-র ইহুদিরা ইসরাইলকে বৈধ রাষ্ট্র মনে করে না। তারা সবসময়ই ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরব:
NETUREI KARTA-র ওয়েব সাইট ভর্তি ইসরাইলবিরোধী প্রচারণায়:ইরানের ইহুদি এমপি Siamak Moreh Sedgh এক সাম্প্রতিক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ইসরাইলের আচরণ নাত্সী জার্মানির মতো। The Times of Israel পত্রিকাতেই সেই সাক্ষাত্কার ছাপা হয়েছে:
রাজনৈতিক ভিত্তি
ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ইতিহাসকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়:
১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে
২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে
৩. ইসরাইলের অধীনে ১৯৪৮ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত
এ-বিষয়ে কোনো ঐতিহাসিক দ্বিমত নেই যে, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি নির্বিশেষে সকল নাগরিক শত শত বছর ধরে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপদেই বসবাস করত।
স্পেনে ১৪৯২ সালে খ্রিস্টানদের Inquisition (ধর্মীয় ভিন্নমত দমনে বিশেষ ট্রাইবুনাল)-এর সময় তুরস্কের উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় বায়াজিদ ইহুদিদেরকে শুধু নিরাপদে আশ্রয়ই দেননি, তিনি খিলাফতের নৌবাহিনীর এডমিরাল কামাল রাইসের নেতৃত্বে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিলেন!
http://en.wikipedia.org/wiki/Kemal_Reis
উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় বায়াজিদ
উসমানিয়া খিলাফতের সেই যুদ্ধজাহাজ স্পেনের মুসলিম ও ইহুদিদেরকে উদ্ধার করেছিল। উদ্ধার পাওয়া ইহুদিদেরকে খলিফা বায়াজিদ তাঁর শাসনাধীন শহর ইস্তাম্বুল [বর্তমান তুরস্কে], সালোনিকা [বর্তমান গ্রিসে], ফিলিস্তিন প্রভৃতি শহরে নিরাপদে বসবাস করতে দেন। খলিফাদের উদার শাসনে এর পর থেকে বিভিন্ন যুগে ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে থাকে। বিশেষত ১৮৮২ সাল থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে পূর্ব ইউরোপে চলমান নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রায় ৩৫,০০০ ইহুদি উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদের শাসনামলে ফিলিস্তিনে এসে আশ্রয় নেয়।http://en.wikipedia.org/wiki/First_Aliyah
উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ
এ-সময়ই ১৯০১ সালে জায়োনিজমের প্রবক্তা, ইসরাইলের স্বপ্নদ্রষ্টা Theodor Herzl খিলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুলে গিয়ে খলিফাকে তিনশ মিলিয়ন পাউন্ডের টোপ দিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ফিলিস্তিনের ভূমি চান।
সিংহহৃদয় খলিফা বলেছিলেন, “Herzl-কে তার পরিকল্পনা বাদ দিতে বলা হচ্ছে। আমি তাকে ফিলিস্তিনের এক ইঞ্চি জমিও দেব না, কারণ এটা [ফিলিস্তিন] আমার একার নয়। মুসলিমরা জিহাদে রক্ত দিয়ে এই ভূমি চাষ করেছে। ইহুদিদের সম্পদ তাদের কাছেই জমিয়ে রাখুক, কারণ খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেলে তারা ফিলিস্তিন বিনা পয়সাতেই পেয়ে যাবে। কিন্তু যতদিন আমি জীবিত আছি, আমি Herzl-এর তরবারিতে আমার শরীরের রক্ত ঝরাতে রাজি আছি, তবু ফিলিস্তিনকে খিলাফত থেকে ছাড়ব না।…“১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় খিলাফতের অধীনে ফিলিস্তিনে ৬৫৭০০ আরব মুসলিম, ৮১০০০ আরব খ্রিস্টান ও ৫৯০০০ ইহুদি বসবাস করত।
১ম বিশ্বযুদ্ধে খিলাফতের কাছ থেকে ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। বিশ্বযুদ্ধে খিলাফতের পতন হলে ১৯২২ সালে ফিলিস্তিন তত্কালীন লিগ অফ নেশন্সের মাধ্যমে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে চলে যায়। “সুসভ্য”, “গণতন্ত্রবাদী”, “মানবহিতৈষী” ব্রিটিশদের আমল থেকেই ফিলিস্তিনের দুর্ভোগের সূচনা হয়। ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনের আরব মুসলিম ও আরব খ্রিস্টানদেরকে স্বভূমি থেকে সরিয়ে ইউরোপ থেকে ইহুদিদের এনে ফিলিস্তিনে জড়ো করতে থাকে।
ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিস্টান অধিবাসীরা এ-সময় বহুবার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু ১ম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে ব্রিটিশরা অস্ত্রের জোরে সেসব বিদ্রোহ দমিয়ে দিয়েছিল। এভাবেই ব্রিটিশরা জায়োনিস্টদেরকে ফিলিস্তিন দান করে।
এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ সালে তথাকথিত জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়া হয়।
সেই ১৯৪৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত জায়োনিস্ট “ইসরাইল রাষ্ট্র”-এর হাতে রক্ত ঝরছে ওই ভূমির মূল অধিবাসী ফিলিস্তিনি আরবদের।
খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ঠিকই বলেছিলেন। ১ম বিশ্বযুদ্ধে খিলাফতের পতনের পর জায়োনিস্টরা ফ্রিতেই ফিলিস্তিন পেয়ে গেছে।
বিশ্বাসঘাতক জাতিসঙ্ঘের মাতৃত্বে ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর পিতৃত্বে প্রসবকৃত এই ভিত্তিহীন অবৈধ রাষ্ট্রটি গত ৬৬ বছর ধরে ফ্রিতেই মুসলিমদের রক্ত খেয়ে যাচ্ছে।
মুসলিমদের জন্য খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদদের মতো অভিভাবক শাসক না আসা পর্যন্ত এভাবেই চলবে।
লেখক: দুরের যাত্রীগ্যাস উত্তোলনে কনকো ফিলিপস, জাতীয় সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন

বন্দর নগরী চট্রগ্রাম থেকে ২৮০ কিলোমিটার দূরত্বে, বঙ্গোপসাগর অবস্থিত দুটি ব্লক ডিএস ০৮-১০ এবং ডিএস ০৮-১১ এখন যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কনকোফিলিপস এর আওতাধীন। ৩০০০-৩৫০০ ফুট গভীরতা সম্পন্ন ব্লক দুটি গভীর সমুদ্রে ৫১৫৮ বর্গ কিঃমিঃ(১২,৭০,০০০ একর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান “শেভরন কর্পোরেশন” ২০০৭ সালে ‘কনকো ফিলিপস’ প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয়। তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কনকোফিলিপসকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস উৎপাদনের দায়িত্ব দেয় “শেভরন কর্পোরেশন”। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় হাইড্রোকার্বন জরিপ চালিয়ে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বরপত্র আহবান করে। বঙ্গোপসাগরের ৮টি ব্লকের জন্য কনকোফিলিপস প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রে অংশগ্রহণ করলেও রহস্যজনকভাবে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান এই দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। একই বছর ২ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর টহল জাহাজ ‘বি.এন.এস নির্ভয়’ বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিরোধপূর্ণ জলসীমার ২০০ মিটার ভিতরে মিয়ানমার নৌ-বাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ সহ খনন যন্ত্র সম্পূর্ণ আরও ৪টি জাহাজকে চিহ্নিত করে। অত্র এলাকায় মিয়ানমার সরকার, দক্ষিণ কোরিয়ার গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান “ড্যাইউ কর্পোরেশন” এবং সুইজারল্যান্ডের গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান “ট্রান্স ওশান”-এর মাধ্যমে জরিপ চালিয়ে বিপুল পরিমান গ্যাস এর মজুদ আবিস্কার করে। বিরোধপূর্ণ সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ মিয়ানমার এর এই গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এর মাঝে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। মিয়ানমার সরকার, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিরোধপূর্ণ জলসীমায় তাদের সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করে। অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় উদীয়মান পরাশক্তি চীনের মাধ্যস্থতা উভয় দেশের মাঝে বিদ্যমান উত্তেজনা হ্রাস পেতে শুরু করে।
পরবর্তী পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গভীর সমুদ্রের ৮টি ব্লকের ভূগর্ভস্থ তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদনের জন্য কনকোফিলিপস-কে নির্বাচিত করার বিষয়ে কোন প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। পরে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর শেষে নির্বাচন করে জয় লাভ করে, এবং যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন রূপে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাসের মধ্য অর্থাৎ জুলাইয়ে বঙ্গোপসাগরের ৯টি ব্লকের মধ্যে ৩টি ব্লকের জন্য দরপত্র আহবান করে। এই ৯ টী ব্লকের মধ্য ডিএস ০৮-১০ ও ডিএস ০৮-১১ এর ৩০ ও ১৫ শতাংশ এলাকাসহ বাকি ৭টি ব্লক ছিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমায়।
অপরদিকে উইকিলিকস এর বরাত দিয়ে ২০১০ সালের ডিসেম্বর এ গার্ডিয়ান পত্রিকায় বলা হয়, কনকোফিলিপস প্রতিষ্ঠানটিকে গ্যাস ব্লক ইজরা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহি চৌধুরীকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন মরিয়ার্টি চাপ প্রয়োগ করছিল। পত্রিকায় আরও বলা হয়, ২০০৯ সালের জুলাইয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়াটি এক বৈঠকে গ্যাস ব্লকগুলো ইজরা দেয়ার বিষয়ে এবং গ্যাস রপ্তানি করতে দেয়ার বিষয়ে জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহি চৌধুরীকে অনুমোদন দিতে বলে। ফলে একই বছর বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ৩টি ব্লকের মধ্য ডিএস ০৮-১০ এবং ডিএস ০৮-১১ ব্লক দুটি কনকোফিলিপস এবং অন্যটি আইরিশ কোম্পানি “টাল্যো”কে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১০ ও ১১নং ব্লক দুটির অবস্থান বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিরোধর্পূণ সমুদ্রসীমায় হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীপরিষদের সাথে কনকোফিলিপস একটি বৈঠকের আয়োজন করে। কনকোফিলিপস প্রাথমিক পর্যায়ে ডিএস ০৮-১১ ব্লকের ৮৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বৈঠকে সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমার এর সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর পেট্রোবাংলা ১০ ও ১১নং ব্লকের বাকি ৩০ ও ১৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কনকোফিলিপস এর সাথে অপর একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা এর পরিচালনায় মোঃ ইমাম উদ্দিন গনমাধ্যমগুলোকে বলেন বাংলাদেশ বিরোধর্পূণ সমুদ্রসীমাগুলো অর্জন করতে পারলে কনকোফিলিপস ১০ ও ১১নং ব্লকের বাকি ৩০ ও ১৫ শতাংশ এলাকায় তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
২০১১ সালের ১৬ জুন পেট্রোবাংলার প্রধান কার্যলয়ে কনকোফিলিপস এবং পেট্রোবাংলার মাঝে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (production sharing contract) স্বাক্ষরিত হয়। এর দুই দিন আগে তেল গ্যাস ও বন্দর রক্ষা কমিটির এক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে নির্মমভাবে হামলা চালিয়ে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ এই চুক্তি দেশের জন্য আত্মঘাতী এবং জাতীয় স্বার্থের বিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন।
কনকোফিলিপস এর ব্যাপারে বাংলাদেশ কতৃক গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরধীতা করে ভারত ও মিয়ানমার সরকার এ ক্ষেত্রে ভারত বিরোধীতার কারণ ছিল গ্যাস ব্লকগুলোকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা। এই বিরোধীতার জের ধরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝে পুনরায় স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে আকস্মিকভাবে মিয়ানমার এর জান্তা সরকার সীমান্তে তাদের সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করে। সীমান্তে উত্তেজনা হ্রাস করার লক্ষ্যে নাসাকা ও বিজিবি-র মাঝে কায়েক দফা পতাকা বৈঠক হয়।
অবশেষে মিয়ানমার এর সাথে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আওয়ামীলীগ সরকার জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইন বিষয়ক সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যস্থতা কামনা করে সদস্য রাস্ট্রগুলো বাংলাদেশের পক্ষে ৩০টি এবং মিয়ানমার এর পক্ষে মাত্র ১টি ভোট দেয়। ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে ৬৬,৪৮৬ বর্গমাইল এলাকা বাংলাদেশের পক্ষে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বর্গমাইল এলাকা বাংলাদেশ অর্জন করে, সেটা দেশবাসীর কাছে সমুদ্রবিজয় রুপে পরিচিতি লাভ করে।
সমুদ্রবিজয়ের পর ২০১২ সালের ২৪ জুলাইয়ে এক বৈঠকে কনকোফিলিপস বাংলাদেশ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারণে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী পর্যায়ে দরপত্রে অগ্রধিকার লাভের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে। কনকোফিলিপস প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ল্যাফরান্দ্রে এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর টমাস জে আর্লে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এর সাথে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে প্রতিষ্ঠানটির এই উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তা বৈঠকে আলোচ্য বিষয়াদি সম্পর্কে কিছু জানাতে রাজি হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেন পরবর্তী দরপত্রে কনকোফিলিপস এর অগ্রধিকার পাওয়া উচিত এ মর্মে তারা তাদের মতামত ব্যক্ত করে। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার এর সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ থাকার কারণে তারা এতদিন গ্যাস ব্লকের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি, তারা এখন কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। তিনি আরও বলেন সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর বাংলাদেশ যে সব ব্লকগুলো অর্জন করেছে সেখানে তারা এখন কাজ করতে চায়।
ইতোমধ্য বর্তমান সরকারের হস্তক্ষেপে ২০১৪ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ভারত এর সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভারত-বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা নির্ধারনের পরিকল্পনা রয়েছে। সমুদ্র বিজয়ের এই পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রকৃত সমুদ্র বিজয় কি আদৌ নিশ্চিত হবে কিনা তা নিয়ে জনমনে সংশয় বিরাজ করছে। মুল্যো বৃদ্ধির প্রতিবাদ করলেও রহস্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপক্ষে এবং বিরোধর্পূণ সমুদ্রসসীমা নিয়ে ভারতের বিপক্ষে কোন কথা বলেনি। এছাড়া ২০১২ সালে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভারত সফরের পর ভারত স্বার্থের বিরোধীতা না করার মাধ্যমে এবং এ বছর ভারতিয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে দেশের স্বার্থের পক্ষে কোন কথা না বলার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃত দাবি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুসারে ‘কনকোফিলিপস’ প্রতিষ্ঠানটি গভীর সমুদ্রে গ্যাস উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের লক্ষ্যে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাস আহরন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর কনকোফিলিপস বাংলাদেশের পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশের অন্য তৃতীয় যেকোন পক্ষ আন্তর্জাতিক মুল্যে কনকোফিলিপস এর কাছ থেকে এই গ্যাস কিনতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটি এই প্রাকৃতিক গ্যাসকে তরল গ্যাসে পরিণত করে বহিঃবিশ্বে রপ্তানি করবে। বাংলাদেশের গ্যাস বিক্রি করে কনকোফিলিপস যে মুনাফা অর্জন করবে বাংলাদেশ তার ৫৫-৮০ শতাংশ পাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে এবং ৬০-৮৫ শতাংশ পাবে তেলের ক্ষেত্রে। এ লভ্যাংশের পুরোটাই বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে অর্জন করবে পেট্রোবাংলা।
আন্তর্জাতিক মুল্যে গ্যাস ক্রয়ের ফলে প্রতিনিয়ত পরিবহন খতে পাল্লা দিয়ে ভাড়া বেড়েই চলবে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরও বেড়ে যাবে। তা ছাড়া ডলারের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে গ্যাসের দামও বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের গ্যাস বিক্রি করে অর্জিত আয় বাংলাদেশ থেকে কনকোফিলিপস তা মার্কিন ডলারে পরিণত করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাবে। এতে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কেন্দীয় ব্যাংকের ডলার রিজার্ভ প্রতিনিয়ত কমতে থকবে। ফলে মুদ্রাস্ফিতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দাম বাড়তে থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশের সার কারখানা যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রান্না বাবদ মোট গ্যাসের চাহিদা ২৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের যোগান মাত্র ১৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
বর্তমানে ‘কনকোফিলিপস’ প্রতিষ্ঠানটি গ্যাস উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে নানা পর্যায়ে টালবাহানা শুরু করেছে।ইতোমধ্য গ্যাসের দাম বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকারকে নতুন করে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের অনুরোধ করেছে। প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার এর ব্লকগুলোর উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে গ্যাসের মুল্যো অণেক বেশী, বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর টমাস জে আর্লে র কথায় ১০ ও ১১নং ব্লকগুলোর উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে গ্যাসের দাম অণেক বেশী না হলেও ১২, ১৬ ও ২১ ব্লকগুলোর উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে গ্যাসের মুল্যো বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের হস্তক্ষেপে নতুন করে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির বিভিন্ন ধারার পরির্তনের সুযোগ রয়েছে এমন আভাষ পাওয়া যায়। পেট্রোবাংলা এর চেয়ারম্যান মো: হুসেইন মন্সুর এক বিবৃতিতে বলেন, “We are happy that international oil firm is to begin its work on time as we are deeply short of natural gas”
বর্তমান শাসন ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণেই বিএনপি-আওয়ামী লীগ দেশ শাসনে চরম ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে আজ দেশের জ্বালানি সম্পদের এই করুণ অবস্থা। মানুষের সার্বভৌমত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতা এই শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ আর এই ক্ষমতাবানরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। তারা ইচ্ছামত নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আইন তৈরী করে জ্বালানি সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে পারে অথচ নিজেরা থাকে সকল আইনের উর্ধ্বে। সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে স্বেচ্ছাচারী এই শাসকগোষ্ঠী জনগণের দায়িত্ব কাঁধে তো নেয়ই না, উপরন্তু তাদেরকে কারো কাছে কোন জবাবদিহি করতে হয়না। কারো কাছে তারা দায়বদ্ধ নয়। অর্থাৎ তাদের অবাধ ও নিরংকুশ ক্ষমতা আছে কিন্তু কোন দায়বদ্ধতা নেই। আর তাই এরা বাংলাদেশে জ্বালানী খাতের উন্নয়নের জন্য বেসরকারী খাত বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদী তেল ও গ্যাস কোম্পানীগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং জানাচ্ছে। জ্বালানী সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে একটি শক্তিশালী আত্মনির্ভরশীল দেশে পরিণত করার কোন ভিশন, পরিকল্পনা বা সংকল্প বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলের নেই। অথচ এদেশে আছে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা-তেল-ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ। আমাদের শুধু দরকার প্রজ্ঞাবান, বিচক্ষণ, সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনাকারী নেতৃত্ব; যে নেতৃত্বের থাকবে ভবিষ্যতের রূপকল্প এবং দৃঢ়সংকল্প; যে নেতৃত্ব সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সঠিক দিক-নিদের্শনা দিয়ে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিবে।
আলাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষ ও বিশ্বজগৎ সৃষ্টির সাথে সাথে মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দিয়েছেন খিলাফত শাসন ব্যবস্থা। ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রধানতম মূলনীতি হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক একমাত্র আলাহ্ সুবহানাহুওয়াতায়ালা। অর্থাৎ তিনিই একমাত্র আইন প্রণেতা। সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান (খলীফা, যিনি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী তথা একই সাথে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান) নিজে কোন আইন তৈরী করতে পারবেন না। তাই তাঁর স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী হবার কোন সুযোগ নেই। ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা মানুষের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য। তিনি মানুষের জ্বালানির চাহিদা অবশ্যই পূরণ করবেন। আর খলীফা তার নিজের কাজের জন্য আলাহর কাছে এবং জনগণ তথা মুসলিম ও অমুসলিম সকল নাগরিকের কাছে ইসলামের জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে জবাবদিহি করতেবাধ্য। তাই খিলাফতের ভিশন হবে জনগণকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল, উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা। জ্বালানী খাতের উন্নয়ন তাই সবদিক থেকেই রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে খিলাফত সরকার নিন্ম লিখিত বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে:
- জ্বালানীসম্পদ কখনোই বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়া হবে না কিংবা কোন ব্যক্তি বা বিদেশী কোম্পানীর মালিকানাধীনে দেয়া হবে না। রাসূলুলাহ্ (সা) ইরশাদ করেন,“তিনটি জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, চারণ ভূমি এবং আগুন” । সুতরাং, জ্বালানী গণমালিকানাধীন সম্পদ অর্থাৎ জ্বালানী সম্পদের উপর সমগ্র দেশবাসীর অধিকার রয়েছে। দেশবাসীর পক্ষ থেকে এই সম্পদের ব্যবস্থাপনার ভার খলিফার উপর ন্যস্ত।
- খিলাফতসরকার জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণ করে বাংলাদেশকে একটি শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সরকার দেশের জ্বালানী সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে এবং বিদেশী কোম্পানীসমূহের সাথে যে সমস্ত অযৌক্তিক বা জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করবে।
- খিলাফতরাষ্ট্র জ্বালানী সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি বা দক্ষ জনশক্তির জন্য বিদেশের উপর নির্ভরশীল হবে না। জ্বালানী সম্পদ খনন, উত্তোলন, পরিশোধন ও বিতরণের প্রযুক্তি এদেশে গড়ে তুলবে এবং মানব সম্পদ উনড়বয়নে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিণের ব্যবস্থা করবে।
- খিলাফতরাষ্ট্র দেশীয় জ্বালানী সম্পদভিত্তিক শিল্প উৎসাহিত করবে, শিল্পায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে এবং যে কোন ধরনের বিদেশী নির্ভরশীলতা নির্মূল করবে। জ্বালানী সুবিধা জনগণের হাতের নাগালে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে খিলাফত রাষ্ট্র সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। খিলাফত রাষ্ট্র শুধু বর্তমান চাহিদা নয়, ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণও নিশ্চিত করবে এবং জ্বালানী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
– তন্ময়
‘দারুল ইসলাম’ তথা খিলাফত রাষ্ট্রের শর’ঈ সংজ্ঞা

“দারুল ইসলাম” হল হুকুম শর’ঈ এর এমন একটি আবশ্যিক শর্ত যেটাকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে কখনই মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তা অথবা আবেগ প্রাধান্য পেতে পারে না। এই খিলাফাহ রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে উম্মাহর সাথে রাষ্ট্রের প্রধানের (খলীফার) “চুক্তির” ওপর ভিত্তি করে এই শর্তে যে খলীফা হুকুম শরী’আকে ১০০ ভাগ বাস্তবায়ন করবে। ইসলামী আইনের ইতিহাসে এই “দারুল ইসলাম” কে ফুকাহারা (ফিকহ শাস্ত্রের আলেম) খিলাফাহ বা ইমামাহ বা সুলতানিয়্যাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর নুসুস (দলীল) থেকে এই রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। শাখা প্রশাখা নিয়ে কিছু ইখতিলাফ থাকলেও রাষ্ট্রের মুল সংজ্ঞা এবং শর্ত নিয়ে তেমন মতবিরোধ কখনই ছিল না।
আরবি ভাষায় “দার” এর বেশ কিছু শাব্দিক অর্থ আছে যেমন “বিরাম স্থান” (মাহাল্লু), “ভুমি” (বালাদ), আবাস ইত্যাদি। কিন্তু শরী’য়তের পরিভাষায় ইসলামী দার (রাষ্ট্র) হল সেই ভুমি যেখানে হুকুম শরীয়াহ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত আছে এবং মুসলমানদের হাতেই আছে আভ্যন্তরীণ বিষয়ে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে “আমান” (নিরাপত্তা) এর নিশ্চয়তা। ইমাম মাওয়ার্দি (রহ) ওনার প্রসিদ্ধ বই “আল-আহকাম আল-সুলতানিয়্যা” এবং “আল-হাউই আল-কাবির” এ একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন: “যা কিছু (মুসলিমদের রক্ত ও সম্মান) এই ইসলামী ভুমিতে (দার) এ আছে তা হারাম এবং যা কিছু (মুশরিকদের রক্ত ও সম্মান) ওই শিরকের ভুমিতে (দার) আছে তা হালাল”। সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় (# ৪২৯৪) সুলাইমান বিন বুরাইদা থকে একটি বর্ণনা আছে যে রাসূলুল্লাহ (সা) যখনি জিহাদের জন্য কোন দল প্রেরণ করতেন, তখন উনি সেটির আমীরকে বলতেন যারাই ইসলাম গ্রহণ করবে তাদেরকে “দারুল হিজরাহ” তথা ইসলামী রাষ্ট্রে দেশান্তর হওয়ার জন্য আহ্বান করতে এবং তখনি তারা সব রকমের নাগরিক সুবিধা পাবে।
হানাফি মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ ইমাম আল কাসানি (রহ) লিখেছিলেন: “আমাদের ইমাম (আবু হানীফা) বলেছেন যে ৩টি ক্ষেত্রে দারুল ইসলাম দারুল কুফরে পরিণত হয় – ইসলামের পরিবর্তে কুফরি আইন যখন প্রভাবশালী হয় অথবা কাফের রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি ছাড়াই যখন দারুল ইসলামের সীমানা থাকে অথবা মুসলিম এবং যিম্মিদের কোন নিরাপত্তা মুসলিমদের হাতে থাকে না” [বাদা’উস সানা’ই, খণ্ড ৭]
রাসূল (সা)-এর সীরাহ ভালমতো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই আল-‘আকাবার ঘটনায় এই দুটি শর্তের – আমান (নিরাপত্তা) এবং শরী’য়াহ বাস্তবায়নে আনুগত্য – ওপর আনসারদের কাছ থেকে রাসূলুল্লাহ বা’য়াহ (শপথ) নিয়েছিলেন যা উবাদা ইবন সামিত (রা) থেকে বায়হাকির বর্ণনায় এসেছে। এই দুটি বিষয় বর্তমান বাস্তবতায় খুবই গুরুত্ব বহন করে। কারণ বর্তমানে যদি কোন দল দারুল ইসলাম তথা খিলাফাহ ঘোষণা দিতে চায় তাহলে আমান এবং শরী’য়াহর পূর্ণ বাস্তবায়নের আলোকেই তা করতে হবে।
শরী’য়তের দৃষ্টিতে এ দুটি বিষয়ের দ্বারাই কোন ভুমিতে “তামকীন” (কর্তৃত্ব) কায়েম হয়েছে বলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন আরবের বিভিন্ন গোত্র থেকে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য “নুসরাহ” (সাহায্য) তালাশ করছিলেন, তখন ওনার কথোপকথন এবং অনড় অবস্থান থেকেই বুঝা যাচ্ছিল উনি যেনতেন ভাবেই একটি ভূমি দখলের পথকে বেছে নেননি। আমরা দেখেছি রাসূলুল্লাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য “তামনা’উনি” (تمنعوني) শব্দ ব্যবহার করেছিলেন যার অর্থ শক্তিমত্তার সাথে কোন কিছুকে রক্ষা করা। এবং এই রক্ষা (منع) করার বিষয়টি এমন ছিল না যে কোন শক্তিশালী গোত্র ওনাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সহায়তা দিতে চেয়েছিল আর উনিও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। বরং রাসূলের শর্ত ছিল যে দারুল ইসলাম তৈরি হবে তা চারিদিক থেকে হবে সুরক্ষিত; যেটাকে রাসূলের ভাষায় আমরা বলতে পারি “হাতাহু” (حاطَهُ)। আলি (রা) হতে বায়হাকির একটি হাসান বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ যখন বানু শায়বান গোত্রের কাছে নুসরাহ চাইলেন এবং ওই গোত্র শর্ত দিল তারা শুধু কুরাইশদের কাছ থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষা করতে পারবে কিন্তু রোমান এবং পারস্যদের কাছ থেকে পারবে না, তখন রাসুলুল্লাহ তাদের ওই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বললেন: “…এই দ্বীনকে আল্লাহ তখনি বিজয় দিবেন যখন চারিদিক থেকে (‘হাতাহু) তা সুরক্ষিত হবে”
(ما أسأتم الرد إذ أفصحتم بالصدق إنه لا يقوم بدين الله إلا من حاطه من جميع جوانبه)
তাই খিলাফাহ রাষ্ট্রের শর’ঈ ব্যাখ্যা হল – এই রাষ্ট্র মুসলিমদের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে এবং হুকুম শরী’য়াহ সামগ্রিকভাবে কায়েম করবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি চিন্তা করি তাহলে যুদ্ধ চলারত অবস্থায় কিছু ভূমি দখলের মাধ্যমেই খিলাফতের ঘোষণাকে আমরা কখনই “তামকীন” বলতে পারি না, এবং এমন হলেও চলবে না যে আংশিকভাবে কিছু শরীয়াহ বাস্তবায়ন এবং হুদুদ কায়েমের মাধ্যমে কোন ভূমি খিলাফতের দাবীদার হতে পারে। এই দারুল ইসলামকে হতে হবে স্বয়ংভর (self sufficient) একটি রাষ্ট্র যা নিজেই নিজের খাদ্য নিরাপত্তা থকে শুরু করে সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সামর্থ্য রাখে । তাই কোন ভঙ্গুর দ্বীপ রাষ্ট্র যেমন খিলাফাহ হতে পারে না, তেমনি যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় কিছু অঞ্চল দখল করে রাষ্ট্রের শর’ঈ শর্ত পূরণ না করে খিলাফাহ রাষ্ট্রের ঘোষণাও দেয়া যেতে পারে না। অতএব, এই “দারুল ইসলাম” (খিলাফাহ) অবশ্যই ইসলামকে ১০০% বাস্তবায়ন করবে; এই রাষ্ট্রের সংবিধান, কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ, অর্থনীতি, মুদ্রানীতি, বিচারব্যবস্থা, বৈদেশিক নীতি ইত্যাদি সব কিছুর ভিত্তি হবে কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে নিঃসৃত দলীল। এই রাষ্ট্র হবে ঠিক রাসূলুল্লাহ (সা) এর মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র এবং ওনার খুলাফায়ে রাশেদীন তথা আবু বকর, উমর, উছমান এবং আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দ্বারা চালিত রাষ্ট্রের মডেল অনুসারে।রমজান ও বিশ্বকাপ

এসেছে মুসলিমদের ইবাদতের জন্য হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম মাস রমজান। এ মহিমান্বিত মাসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনকে মানব জাতির মুক্তির জন্য একমাত্র বিধান হিসেবে পৃথিবীর বুকে নাযিল করেছিলেন। অপরদিকে এসেছে ক্রীড়া জগতের সর্ববৃহৎ আসর বিশ্বকাপ ফুটবল-২০১৪, যা বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রেমীদের বহু প্রতিক্ষিত বিনোদনের একটি আসর। এই ২০ তম বিশ্বকাপ আসরে শুধুমাত্র প্রাইজমানি প্রাদানে ব্যয় হবে ৫৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর স্বাগতিক দেশ ব্রাজিল এই আসরের আয়োজনে আনুমানিক খরচ নির্ধারন করেছে ১৪ বিলয়ন মার্কিন ডলার যার, সম্পূর্ণটা শুধু মাত্র ক্রীড়া বিনোদনের উদ্দেশ্যে ব্যয় হবে।
বছরের প্রতিটি মাসের মতো এ মাসেও আমাদের এই সমাজ শুধুমাত্র আমোদ-ফুর্তি করে এক মহা ব্যস্ত সময় কাটানোর জন্য তৎপর। ইতোমধ্যে অনেকেই ডায়াবোলিকা এবং জার্সি নিয়ে এই সর্বোবৃহৎ আসর উপভোগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছেন। আজ এই সমাজের অধিকাংশ মানুষই বিশেষত তরুনরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানীর লোগো পতাকা নিয়ে ব্যস্ত, এবং কার পতাকা কত বড় তা নিয়ে এক মহান প্রতিযোগীতায় লিপ্ত। পকেটে টাকা-পয়সা যা আছে তা খরচ করে অথবা চাঁদা তুলে হলেও এলাকা বা ক্লাবের পক্ষ থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ছবি সংবলিত একটি বড় ব্যানার অথবা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার বড় একটি পতাকা ঝুলাতেই হবে এমন একটি আমেজ বিরাজ করছে চারদিকে। কোন দল কাপ নেবে, কার গোল কয়টা, কার পয়েন্ট কত তা নিয়ে চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক আর গবেষনা। ইতোমধ্যে জুয়াড়িরা বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে অপেক্ষা করছে এ আসরের জন্য। অপরদিকে নেইমার-মেসি-রোনালদোর ভক্তরা তো আছেই। প্রিয় খেলোয়াড়ের জার্সি পরে নাকি খেলা দেখার মজাই আলাদা। অথচ ১৪০০ বছর আগে এমনি এক রমজান মাসে মুসলিমদের হাতে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মনীর পতাকার পরিবর্তে ছিল কালেমায় তাউহীদ এর পতাকা। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মনির জয়ের পরিবর্তে মুসলিমরা চিন্তা করেছিলেন দ্বীন ইসলামের বিজয় নিয়ে।
প্রিয় ভাইয়েরা, এই ছিল ১৪০০ বছর আগে বদর প্রান্তরে মুসলিমদের চিত্র। এই সেই বদর প্রান্তর যেখানে মুসলিমদের সর্বপ্রম যুদ্ধ হয়েছিল দ্বীন ইসলামের সর্বপ্রম রাষ্ট্র, মদিনা রাষ্ট্রকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। সেই যুদ্ধে মুসলিমদেও বিজয় উলাস ছিল অভাবনীয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও বর্তমান বাস্তবতা হলো ১৪০০ বছর পর আজ মুসলিমরা বিজয় উলাস করে স্পেন, ব্রাজিল, জার্মনী, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ লড়াই দেখে। অথচ প্রতিবছর রম্জান আসলেও বদরের সেই বিজয় উলাস আজ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ব্যক্তিগত কোন ক্ষেত্রেই পালিত হয় না। যে স্পেনের খেলা দেখে আজ মুসলিমরা অভিভূত হয় সে স্পেন ১৭ বছর বয়সে জয় করেন তারিক-বিন-জিয়াদ। অথচ আজকের এই কুফর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কুফর সংস্কৃতির প্রভাবে সাম্প্রতিক টি-২০ বিশ্বকাপের ফ্ল্যাশমবে মুসলিম তরুন ভাইয়েরা নাটকীয় ভঙ্গিমায় নেচেছে। সেই সাথে আমাদের মুসলিম বোনেরা ও নৃত্য পরিবেশন করেছে। ফেসবুক আর ইউটিউব এর সেই ভিডিওগুলোতে পড়েছে শত শত লাইক। গত টি-২০ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ডকাপের থিম সং অনুযায়ী বলতে হয়,
“চার ছক্কা হই হই,
আমাদের দ্বীনি ভাইবোনদের ঈমান গড়াইয়া গেল কই?’’গত বিশ্বকাপ ফুটবলে ছিল ওয়াকা-ওয়াকা এর উন্মাদনা। আর এ সঙ্গিতের সামনে ভাইবোনেরা হয়ে পড়েছিল দিশেহারা। এর পর এবারে এসেছে ‘‘ওলে ওলা ’’। এই গানের তালে তালে নাঁচার জন্য ব্রাজিলে যৌন কর্মী গেছে ১৫,০০,০০০ (পঁনের লক্ষ)।
আসুন আমরা একটু চিন্তা করে দেখি আল্লাহর এই আয়াত নিয়ে,
“হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?”
[ইনফিতার: ৬]আজ পশ্চিমাদের দেয়া গণতান্ত্রিক চিন্তা কি আমদের আল্লাহ সম্পর্কে বিভ্রান্ত করে ফেলেনি! আজকের এই কুফর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে সমগ্র বিশ্বের এবং আমাদের চারপাশের অসংখ্য মানুষ ও প্রতিনিয়ত অভুক্ত অবস্থায় থাকে। দৈনিক পত্রিকাগুলোর পৃষ্টা উল্টালে প্রতিদিন চোখে পড়ে কোন না কোন দ্বীনি বোনের ধর্ষনের খবর। এখন আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে সকল প্রকার বিজ্ঞাপনে নারীদের বেপরোয়া অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সাবানের বিজ্ঞাপনে একজন নারীর গোসল করার দৃশ্য, টু পেস্টের বিজ্ঞাপনে নারী পুরুষের অন্তরঙ্গ মূহুর্তের দৃশ্য এমন কি পুরুষের প্রসাধনী সামগ্রীর বিজ্ঞাপনেও নারী পুরুষের অবাধ ও অশ্লীল আচরন প্রদর্শিত হয়। রমজান মাসে টিভি চ্যানেল গুলোর আরো একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল যে সংবাদপাঠিকারা রম্জানের প্রম দিন থেকে মাথায় কাপড় দিয়ে নিজেদের রক্ষনশীলতা এবং আলাহ্ সুবহানাহুতায়ালার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে ও ঠিক ঈদের পরদিন থেকে মাথায় কাপড় সরিয়ে তথাকথিত সমাজের উগ্রতার পরিচয় দিয়ে থাকে। প্রতি বছরই আমাদের চারপাশে এই নগড়ব বাস্তবতাগুলো ফুটে ওঠে। অপরদিকে সীমান্তে প্রতিবছর আমাদের দ্বীনি ভাইবোনেরা নির্বিচারে প্রাণ হারাচ্ছে। ফেলানী ও মোহাম্মদ মিজানুর রহমানদের মতো আরও নাম না জানা নিহত দ্বীনি ভাই ও বোনদের জন্য সামান্য দুঃখ প্রকাশ করেই কি আপনারা আবার আমোদ ফূর্তিতে লিপ্ত হবেন? আপনাদের এই নিশ্চুপ থাকার কারণে বৈদেশিক শত্রুদের চক্রান্তে পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তা সহ ৭৪ জন নির্মমভাবে নিহত হয়। কিন্তু হাসিনা এবং খালেদার জোট এই ব্যপারে নিশ্চুপ থেকে ক্ষমতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মসজিদে একজন মুসলির সেন্ডেল থেকে শুরু করে একজন মানুষের জানের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এই কুফর গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এর পরেও রম্জান এবং অন্যান্য মাসে রান্নার চুলায় গ্যাস না পেয়ে পানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মত সমস্যাগুলোকেও উপেক্ষা করে মেসি- নেইমার – রোনালদোর মতো খেলোয়াড়দের চুলের স্টাইল নিয়ে উলাস করবেন ? এই বিনোদন, এই উলাস, এই ব্যস্ততা কখনো আপনাদের ঘরে মাসের শেষে চাউলের বস্তা এনে দিবে না। এই পূঁজিবাদী কুফ্রী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে এই পবিত্র রমজান মাসেও নিত্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কিছু সংখ্যক বিত্তবানদের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকলেও অধিকাংশ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়। এরপরও আপনারা নিজেদেরকে হাসিনা খালেদার শাড়ীর আচলে বেঁধে রেখেছেন । তারা শুধূ কাফেরদের দেয়া মানুষের তন্ত্র, তথা জনগনের মন্ত্র, তথা গনতন্ত্রের বস্তাই বহন করবে ,কারো ঘরের চাউলের বস্তা নয় !
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেছেন,
‘‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই তো কাফের।”
‘‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই তো জালেম।”
‘‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই তো ফাসেক।”
[সুরা-আল মায়েদা-৪৪, ৪৫, ৪৭]রাসুলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন –
‘‘যে ব্যক্তি কোন জালিমের সাথে চলে তার শক্তি বৃদ্ধি করে, অথচ সে জানে ঐ ব্যক্তি জালিম, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল।” (বায়হাকী)
কিন্তু আজ থেকে ১৩০০ বছর পূর্বে মুসলিমদের খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) আ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়লার বিচার ব্যবস্থা দ্বারা বিচার ফয়সালা করেছিলেন বলে রাষ্ট্রের এক অভূক্তের ক্ষিদে মিটানোর জন্য নিজের পিঠে করে আটার বস্তা বহন করে ঘরে পৌছে দিয়েছিলেন। প্রতিদিন আপনাদের আশে পাশে অসংখ্য মানুষ যখন না-খেয়ে ঘুমায় তখন কি আপনাদের উল্লাস করবার সময় ? যখন বিশ্বকাপের গোল হতে থাকবে তখন ও কি পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারীদের গুলিতে ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, বার্মা অথবা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তীদের মাঝে কোন মুসলিম পাখির মতো ছটফট করতে করতে মৃত্যু বরন করবে ? আপনারা কি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সেই হাদীস ভুলে গেছেন ? যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন
‘‘একজন মুসলিমকে হত্যা করার চেয়ে কাবার অপমান আল্লাহর কাছে কম গুরুতর।”
তবে কি একজন মুসলিমের রক্তের চেয়ে সামান্য এই দুনিয়ার বিনোদন আর ভোগ-বিলাস আপনাদের কাছে অনেক বেশী পবিত্র ?
যে উম্মত নিজেদেরকে রাসুলালাহ (সা) এর অনুসারী দাবী করেন তাদেরকে প্রশড়ব করছি শেষ বিচারের দিন কোন চেহারা নিয়ে আলাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সামনে দাড়াবেন ? যখন হাশরের ময়দানে আপনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে একজন মুসলিম। সে বলবে ‘‘আমি কুরআনের উম্মতের কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম, কিন্তু উম্মত কোন জবাব দেয়নি। রমজান পার হয়ে গেছে অথছ উম্মত একটু ও নড়ে নি”। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
‘‘সকালে জেগে উঠে যে মুসলিমদের নিয়ে চিন্তিত হয় না, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়”
(কানজুল উম্মাল)রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেছেন,
“যদি তোমরা দেখ যে আমার উম্মত কোন জালেম কে এ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে যে, ‘‘নিশ্চয় তুমি একজন জালেম” তাহলে (সেই উম্মতকে) তাদের হতে বিদায় (অর্থাৎ সেই উম্মতের জন্য বিদায় বা পতন সংকেত)” [আহমদ, তাবারানী, হাকিম, বায়হাকী]
পবিত্র কুরআন এর দিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া আপনাদের কোন পদ নেই বা আশ্রয় ও নেই, যাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার জমিনে তার শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্টিত হয়। কারণ,
‘‘আল্লাহ শাসন কর্তৃত্বের মাধ্যমে যা রক্ষা করেন কুরআন দিয়েও তা রক্ষা করেন না’’
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কুরআন এই জন্য নাযিল করেন নি যে এই কিতাব মৃত মানুষের জন্য পড়া হবে, অথবা তাবিজ হিসেবে বিক্রি হবে বা এ জন্য নয় যে দেয়াল ও বসার ঘর এই কিতাব দিয়ে সাজানো হবে। বরং এই কিতাব নাযিল করা হয়েছে যাতে মানব জাতি এ কিতাব থেকে জীবন বিধান পেতে পারে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেছেন –
‘‘তোমাকে পাঠিয়েছি সত্য সম্বলিত গ্রন্থ দিয়ে যাতে করে আল্লাহ্ তোমাকে যেভাবে দেখিয়েছেন সেভাবে তুমি মানব জাতিকে শাসন করতে পার” (সুরা নিসা-১০৫)
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর” (সুরা বাকারাহ্-২০৮)
আমরা আপনাদের আহবান জানাই, শত বছরের ধুলো-ময়লা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ান, যাতে আমানত ও দায়িত্বের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক গৃহীত মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্টার পদ্ধতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুন। দুনিয়ার বুকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার আইন পুনঃ প্রতিষ্টা তথা খিলাফত পুনঃ প্রতিষ্টা করার কাজের চেয়ে সামান্য ৯০ মিনিটের উত্তেজনা একজন মুমিনের নিকট অনেক বেশী প্রিয় ও পবিত্র হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন
‘‘আর যে (ব্যক্তি) এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে তার কাঁধে (কোন খলীফার) বায়’আত (আনুগত্যের শপথ) তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলী (যুগের) মৃত্যু।’’ (মুসলিম)
সেই ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান করছি, যেখানে জনগণ তথা মানুষের সার্বভৌমত্ব নয়, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকবে ইনশাআল্লাহ। রাসূলুল্লাহ (সা) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন ‘
“……এরপর আবার ফিরে আসবে নবুয়্যুতের আদলের খিলাফত”। (আহমদ)
তন্ময়
উসুলি কা’ইদাহ “সকল বস্তুর ‘আসল’ হল ইবাহা” প্রয়োগ করে কি করে গণতন্ত্রকে জায়েয এবং খিলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছিল

ইবাহা যারাই বলে থাকেন ইসলামে ইবাদতের ‘তউকিফি’ (অর্থাৎ ওয়াহি দ্বারা সুনির্দিষ্ট) ইস্যুগুলো ছাড়া বাকি সব *একশন (কাজ)* বাই ডিফল্ট মুবাহ বা হালাল, তারা ইসলামী আইনবিজ্ঞানের (উসুল আল ফিকহ) বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে খুব ভয়ংকরভাবেই উম্মাহকে ভুল পথে চালিত করছেন। পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় আমাদের অনেকের মনে এটা গেঁথে গেছে (কিছু ভ্রান্ত প্রচারনার দ্বারা) কোন বিষয় যদি ইসলামের সাথে কনফ্লিক্ট না করে এবং ঐ ব্যাপারে কোন শরিয়ার নুসুস (দলীল) যদি না থাকে, তাহলেই তা মুবাহ বা হালাল। এই ভয়ংকর চিন্তার কারনেই মুসলিম উম্মাহকে “ইসলামিক গণতন্ত্র”, “ইসলামিক সমাজতন্ত্র”, “সোশ্যাল জাস্টিস” ইত্যাদি কুফরি চিন্তা গলধঃকরণ করানো হয়েছিল। খিলাফত ধ্বংসের বিস্তারিত ইতিহাস নিয়ে যারা অবহিত নন, তারা এই বিষয়টিও হয়তো জানেন না কাফেররা মুসলিম ভূমিগুলোকে বাইরে থেকে আক্রমণ পরে করেছিল। প্রথমে ভেতর থেকে ধ্বংস করা হয়েছিল কিছু ভ্রান্ত উসুলি কা’ইদাহ (নীতি) প্রয়োগ করে যার ভেতর ছিল এইটিও – “সকল কিছুই বাই ডিফল্ট মুবাহ”। এই নীতির দ্বারা ঐ পশ্চিমা চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত মুসলিম পণ্ডিতরা বলা শুরু করেছিল যে রাজনীতি “তউকিফি” (আল্লাহ দ্বারা নির্ধারিত) না এবং সব কাজই বাই ডিফল্ট হালাল, এবং তা বলেই ফ্রেঞ্চ পেনাল কোড ও রোমান আইন এবং গণতন্ত্র মুসলিম খিলাফতে ঢোকানো হয়েছিল বিখ্যাত পণ্ডিতদের দ্বারা।
এক্ষেত্রে দেখা যায় যেসব ফকিহ বা উসুলিয়্যুন এই চিন্তার প্রচার-প্রসার ঘটান, তারা নীচের কা’ইদাহ (নীতি) টি সর্বদাই উল্লেখ করে থাকেন:
“সব বস্তুর ‘আসল’ বা অরিজিন হল ইবাহা (বা হালাল)” [আল আসলু ফিল-আশইয়া আল ইবাহা]
এখানে উল্লেখ্য ফিকাহ শাস্ত্রবিদরা শুধু বস্তু/জিনিস (আশইয়া) এর ক্ষেত্রে এই কা’ইদাটি ব্যবহার করতেন (আফ’আল বা কাজের ক্ষেত্রে না)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে বলেছেন,
وَخَلَقَ لَكُمْ مَا في الأَرْضِ جَمِيعاً
“এবং তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর বুকে যা আছে সবই সৃষ্টি করেছেন”
আয়াতটিতে আল্লাহ বস্তুকে ‘আম ভাবে উল্লেখ করেছেন তাই সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল, এবং যেগুলো হারাম সেগুলো উল্লখে করা আছে।
কিন্তু সমস্যা হয় যখন বস্তুর (আশইয়া) সাথে একশন বা কাজ (আফ’আল) কে মিশিয়ে ফেলে এই কা’ইদাহটি দ্বারা জাস্টিফাই করানো হয়। এটি একটি কমনসেন্স যে বস্তু আর একশন কখনই এক বিষয় হয় না। আমরা বলতে পারি না ‘ছুরি’ (বস্তু) আর ‘ছুরি মারা’ (একশন) এক বিষয়। তাই অতীতে স্কলাররা প্রয়োজনবোধই করেননি এই নীতির ক্ষেত্রে বস্তুকে একশন থেকে আলাদা করে বোঝানোর।
তাই আফ’আল (একশন) এর ক্ষেত্রে ‘আসল’ (অরিজিন) হল –
“হুকুম আশ-শার’ঈর মাঝে নিজেদের কাজকে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে শরিয়াহর সাথে লেগে থাকা”।
তাই যদি আল্লাহ কোন কাজের জন্য ইবাহা (অনুমতি) দেয় তাহলে তা হবে মুবাহ আর যদি আমরা অনুমতি না দেখতে পাই তাহলে “আদিল্লাহ আশ-শারিয়্যাহ” (শরিয়াহর দলীল) থেকে হুকুম বের করে আনতে হবে। এটা বলার কোন সুযোগ নেই যেহেতু শরিয়াহ এক্ষেত্রে এপারেন্টলি নীরব তাই আমরা সেই একশন সমূহ পালন করতে পারবো।
যারা এই বস্তুর সাথে একশনকে মিলিয়ে দেখেন তারা আবার “মুবাহ” (যা করলে কোন সাওয়াব বা গুনাহ নেই) কে ভিন্ন ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। তারা মনে করেন যেসব বিষয়ে শরিয়াহ কোন তিরস্কার (হারাজ)করে না বা শরিয়াহ নিশ্চুপ, সেগুলোই হল মুবাহ। তাই তিরস্কারের অনুপস্থিতিই হল “অনুমতি” (ইবাহা)। তারা রাসূলের(সা) কথাটি উল্লেখ করেন:
وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْو
“এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে”।
এভাবেই নিকট অতীতের স্কলাররা গণতন্ত্রকে জায়েয করেছিল এই যুক্তিতে যে গণতন্ত্রও “শুরা” (পরামর্শ) ও সামাজিক ন্যায় দ্বারা পরিচালিত এবং সকল বস্তুই যেহেতু বাই ডিফল্ট হালাল, তাই গণতন্ত্রও এডপ্ট করা যাবে। এবং বর্তমানেও অতীতের সেই বিষাক্ত চিন্তা অনেক স্কলাররাই বহন করছে।
তাই এটা জেনে নেয়া ভাল, উসুল আল ফিকহের ক্লাসিক্যাল বইগুলোতে কোথাও বলা নেই; কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে হারাজ (তিরস্কার) এর অনুপশ্তিতিই হল “অনুমতি” (ইবাহা), কারন কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে হারাজ এর অনুপস্থিতি ইঙ্গিতবহন করে না যে ঐ কাজ বা বস্তুটি মুবাহ। আবার ব্যাপারটি এমনও না যে ঐ হারাজটিকে তুলে নেয়ার অর্থই হল “অনুমতি”। তাই, কোন বিষয় মুবাহ হওয়ার অর্থ হল উক্ত বিষয়ে হুকুমদাতা (আল্লাহ) মানুষকে কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে বাছাই করার অপশন দিয়েছেন, এবং এই বাছাইয়ের অপশনটিও শরিয়াহর দলীল দ্বারা সমর্থিত হতে হবে।
যারা উপরে বর্ণিত হাদিসটির (“এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে”) এভাবে ব্যাখ্যা দেন যে শরিয়াহ কিছু বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে তাই ওসব বিষয় মুবাহ, তারা হাদিসটির ভুল ব্যাখ্যা দেন। বিষয়টি এমন না যে শরিয়াহ কোন ব্যাপার এক্সপ্লেইন করে নাই এবং এই চিন্তা করাও পাপ কারন আল্লাহ বলেছেন:
“আজকে আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম…” [মা’য়িদা, ৩]
তিনি আরও বলেছেন:
“আমরা এই কিতাব নাযিল করেছি সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়েই” [নাহল, ৮৯]
তাই ওপরের হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা) বোঝাতে চেয়েছেন সেসব টেক্সট গ্রহণ করো যা তোমাদের দেয়া হয়েছে। আর যে বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাস করা হয়নি তা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস করো না কারণ হয়তো তা আবার হারামও হয়ে যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন:
ذَرُونِي مَا تَرَكْتُمْ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ . فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوهُ . وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرِ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“আমাকে চাপ দিও না সেসবের বাইরে কিছু বলতে যা আমি তোমাদের ইতিমধ্যেই বলেছি। তোমাদের আগে যারা এসেছিল তারা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং তাদের নবীদের সাথে বিতর্ক করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি যদি তোমাদের কিছু করতে নিষেধ করি তাহলে তা থেকে দূরে থাক এবং যদি কিছু করার আদেশ দেই তাহলে তোমাদের সাধ্যমতো করার চেষ্টা করো” [মুসলিম]
তাই মূল কথা হল ইসলামে এমন কিছু নেই যা শরিয়াহ এক্সপ্লেইন করেনি। তাই কোন কিছু মুবাহ বলতে নিলেও আমাদের আগে দলীল ঘাটতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে শরিয়াহ উক্ত বিষয়টিকে মুবাহ ঘোষণা দিয়েছে।
আবার অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকেন নিউক্লিয়ার বোমা, উড়োজাহাজ তৈরি ইত্যাদি একশনগুলোর ক্ষেত্রে তো কোন শরিয়াহ বিধান নেই। তাই এই কাজগুলো যদি আমরা ইবাহা ধরে করতে পারি, তাহলে কেন সকল কাজের ‘আসল” (অরিজিন) এর ক্ষেত্রে আমরা একই কথা বলতে পারি না? এই বিষয়ে ফুকাহাদের মত হল কিছু চিন্তা থাকে আকিদা এবং আহকাম সংক্রান্ত, এবং কিছু থাকে ‘উলুম (বিজ্ঞান), মাদানিয়্যাহ (প্রযুক্তি), উদ্ভাবন/উৎপাদন, দক্ষতা ইত্যাদি সংক্রান্ত। তাই দ্বিতীয় বিষয়ের (যেগুলো আকিদা বা আহকাম সংক্রান্ত নয়) ক্ষেত্রে যদি শরিয়াহ দ্বারা নিষেধকারী কোন দলীল না থাকে, তাহলে তা গ্রহণ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) একবার কিছু কৃষক এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাদের বললেন:
أَنْتُمْ أَدْرَى بِأُمورِ دُنْيَاكُمْ
“তোমরা দুনিয়ার বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক সচেতন”
বদরের যুদ্ধের সময় সাহাবা আল-হুব্বাব বিন আল-মুনযির (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) কে যুদ্ধ-কৌশল সঙ্ক্রান্ত এক প্রশ্ন করেছিল। রাসূলের পরিকল্পনাটি কি ওয়াহি ছিল নাকি রাসুলের নিজস্ব মতামত ছিল তা ঐ সাহাবা জানতে চেয়েছিল, উত্তরে রাসুলুল্লাহ বলেছিলেন:
بَلْ هُوَ الرَّأْيُ وَالحَرْبُ وَالمَكِيدَة
“অবশ্যই এটা আমার মতামত, যুদ্ধবিগ্রহ ও ধূর্ত (বিষয়ের ক্ষেত্রে)”
ঐ সাহাবার পরামর্শে রাসুলুল্লাহ যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করেছিলেন। কারন তা ওয়াহি ছিল না। তাই নন-আহকাম/আকিদার বিষয়ের ‘আসল’ এর ক্ষেত্রে ইবাহা (অনুমতি) আছে যদি কোন বিপরীত টেক্সট আমরা না পাই শারিয়াহ তে। গণতন্ত্র কিন্তু সরাসরি আকিদা বিরোধী।
মোদ্দা কথা: সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল এবং সকল একশন এর ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের শরিয়াহ দ্বারা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কোন ভাবেই বস্তুর সাথে একশনকে এক করে দেখলে হবে না। কারন একশনের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“এবং আল্লাহর রাসূল যা কিছু তোমাদের জন্য এনেছেন তা গ্রহণ করো এবং যেসব থেকে দূরে থাকতে বলেছেন তা পরিত্যাগ করো” [হাশর, ৭]
তাই ওপরের আয়াতের ‘তালাব’ (আবেদন) টিতে যে ‘মা’ (যা কিছু) শব্দটি এসেছে তা ‘আম আকারে এসেছে। এবং এই তালাব হোক সেটা “তালাব উত তারক” (কোন কাজ পরিত্যাগ করার আবেদন) বা তালাব উল ফি’ল (কোন কিছু করার আবেদন) হল তালাব জাযিম (সুনির্দিষ্ট আবেদন) যা মেনে চলা ফরয। তাই সকল একশনের ক্ষেত্রে খুঁজতে হবে শরিয়াহর নুসুস (দলীল) কী বলছে। এটাই হল আফ’আল এর ক্ষেত্রে ‘আসল’।
একমাত্র ইসলামই পারে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নারী নির্যাতন ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাতে
এটা সবার কাছে পরিষ্কার যে বর্তমানে মুসলিম নারীরা ইসলামের প্রতি আক্রমণের ফল ভোগ করছে। পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা ইসলামে নারী সংক্রান্ত নীতির প্রতি নগ্ন আক্রমণ ও হেয় প্রতিপন্ন করার কোন চেষ্টাই বাদ রাখেনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নির্যাতিত মুসলিম নারীদের স্বাধীনতার নামে তাদের পোষাক-পরিচ্ছদে বাধা দেয়া হচ্ছে। জনসমক্ষে অর্ধ-নগ্ন থাকতে পারাই হচ্ছে পশ্চিমাদের নির্ধারিত নারী মুক্তির সংজ্ঞা। তাই পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখা যায় নারী স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের আহবান বলতে আসলে কী বোঝায়, এ আহ্বান নারীদের শোষণ করার আহ্বান ব্যতীত আর কিছু নয়। সকলের কাছেই স্পষ্ট নগ্নতা বিষয়টি শুধুই নারীকেন্দ্রিক আর শুধু নারীরাই এই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে। এই আহ্বান নারীকে যৌন লালসার বস্তুর পর্যায়ে নামিয়ে আনে ও তাকে পুরুষের চোখের খোরাক ও ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করে।বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি এই সস্তা আহ্বানের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট যখন আমরা দেখি আমাদের বোনদের শ্রম শোষিত হচ্ছে পুঁজিপতিদের স্বার্থে, যেখানে তাদের পরিবার ও ভবিষ্যত প্রজন্ম তথা সন্তানরা হচ্ছে বঞ্চিত।জাকার্তার (ইন্দোনেশিয়া) কারখানাগুলোতে ৯০% এর বেশি শ্রমিক নারী, যাদের ৯০% তাদের সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়ানোর অধিকার পায় না। ফলে তাদের সন্তানরা অপুষ্টিতে ভোগে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে কর্মজীবীদের শতকরা ৮০ ভাগই নারী; এই খাতে বাংলাদেশের আয় বার্ষিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জীবন ধারণের লক্ষ্যে ন্যুনতম চাহিদা পূরণের জন্যে এই নারীরা মানবেতর পরিবেশে কাজ করে। অনিরাপদ কর্মস্থলের বিষয়টি জনসমক্ষে আসে সম্প্রতি যখন রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ১০০০ এর বেশি শ্রমিক মারা যায়। এটাই কি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন যা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আমাদের বোনদের উপহার দিচ্ছে? তারা কি শুধু শালীনতা থেকে মুক্তি দেয়, অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে নয়?চরম হতাশাজনক এই পরিস্থিতি চলছে আমাদের মুসলিম শাসকদের আশীর্বাদে ও পূর্ণ সহযোগিতায়। এই শাসকরা পশ্চিমা প্রভুদের কথায় নৃত্য করে এবং উম্মাহ্’কে বিক্রি করে তাদের কাছে যারা সর্বোচ্চ দর হাকায়। যদিও এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে পুঁজিপতি শ্রেণী, তারপরও এটা বলতেই হয় যে মুসলিম শাসকরা সামান্য কমিশনের বিনিময়ে আমাদের ভাই-বোনদের উপর বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক নির্লজ্জ দাসত্ব ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মুক্তবাজার অর্থনীতি আধুনিক সময়ের মুসলিম ভূ-খন্ডে নারীদের দাসত্ব-বাজার তৈরি করেছে যেখানে ভয়াবহ অবস্থায় আমাদের বোনেরা প্রায় বিনা মূল্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।এই ট্র্যাজেডির অবসান সম্ভব শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে, যা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসমূহের সাথে অর্থনৈতিক চুক্তি ছিন্ন করবে। ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নারীদের প্রকৃতিগত ও বাস্তব দায়িত্ব ফিরিয়ে দেবে। ইসলামী সমাজের ভবিষ্যত প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নারীরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে, শাসককে জবাবদিহি করবে ও ইসলাম প্রচারে অংশ নিবে। উম্মাহ্’র প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করা নারীদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ইসলামের ইতিহাস সমৃদ্ধ। যেমন:- ·নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) ও আসমা বিনতে আমর (রা.) আকাবার দ্বিতীয় শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন। এই শপথ অনুষ্ঠানটি রাসূল (সাঃ) এর মদিনা রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পথে ছিল মাইলফলক।
- এক সাধারণ নারী, যিনি হযরত ওমর (রা.) কে মাহর নির্ধারিত করে দেয়ার কারণে জনসম্মুখে জবাবদিহি করেছিলেন।
- ফাতেমা বিনতে কায়স (রা.) একজন সাহাবী ও বিখ্যাত আলেম, যার সাথে ওমর (রা.) এর পরবর্তী খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে পরামর্শ করা হয়েছিল।
- নাফিসা বিনতে হাসান (রহ.) যিনি ইমাম শাফ’ঈর শিক্ষিকা ছিলেন এবং রাজনীতিতে ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। মিশরের জনগণ শাসকের সাথে উদ্ভূত কোন বিবাদের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ফিরে পাবার আশায় বিবাদ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তাঁর কাছে যেত।
হে মুসলিম ভাই ও বোনেরা! এ রকম অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আপনারা নিশ্চয়ই মুসলিম ভূখন্ডে খিলাফত রাষ্ট্র বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে আসবেন। শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মনোনীত ইসলামী ব্যবস্থাই আমাদের মূল্যবোধ ও মর্যাদাকে রক্ষা করবে।খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মুলোৎপাটন করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত ব্যবস্থার বাস্তবায়ন সম্ভব। ইসলামী ব্যবস্থা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, অর্থ বা স্বার্থের ভিত্তিতে নয়। তাই এই ব্যবস্থা কুর’আন ও সুন্নাহ’র বাস্তবায়ন করবে, পুরুষ ও নারীর শোষণের হাত থেকে নারীর দেহকে রক্ষা করবে।রাফি বিন রিফা (রা.) থেকে বর্ণিত,
“রাসূল (সাঃ) দাসী নারীর দু’হাতের উপার্জন ব্যতীত অন্য কোন উপার্জনকে আমাদের জন্য নিষেধ করেছেন।” (আবু দাউদ)হে মহান উম্মাহ্! ধর্মনিরপেক্ষ আক্বীদা ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিহার করুন, যা শুধু সমতার নামে দাসত্বের জন্ম দেয়। খিলাফতে রাশিদা বাস্তবায়নের কাজে আমাদের সাথে যোগদান করুন যা দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে; যার পরেই আমরা সকল নারী, পুরুষ ও শিশু মুক্তি পাবো মানব রচিত আইন ও ব্যবস্থার শোষণ থেকে।গুজরাটের কান্না

This is an old Speech given by brother Muinuddin in UK in 2002 regarding the Gujurat massacre happened in India that year..
https://archive.org/details/ACryFromGujurat150902
খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভুমিকা কী?

১৯২৪ সালে বৃটিশ পররাষ্ট্র সচিব লর্ড কার্জন অনেক দম্ভসহকারে বলেছিলেন “বাস্তবতা এমন যে তুরস্ক আজ মৃত, আর কখন শক্ত হয়ে দাড়াতে পারবে না। কারণ আমরা তাঁর নৈতিক শক্তিকে ভেঙ্গে দিয়েছি আর তা হলো খিলাফত ও ইসলাম। (The situation now is that Turkey is dead and will never rise again, because we have destroyed its moral strength, the Caliphate and Islam)
খিলাফত, মুসলিম উম্মাহর সোনালী অতীত। খিলাফত মুসলিম উম্মাহ এর গৌরব,তার ঐতিহ্যের নাম। ১৯২৪ সালে মুস্তফা কামাল পাশা দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায় খিলাফত। এখন প্রায় ৯০ বছর পর ২০১৪ সালে এসে বিশ্বের সব যায়গায় দাবি উঠেছে খিলাফত এর। এখন মুসলিম উম্মাহ এর একটা বিরাট অংশ হিসেবে আমাদের জানা দরকার খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভুমিকা কী।
খিলাফত কী–
যে রাষ্ট্রব্যবস্থা আহকামে শরীয়াহ এর প্রয়োগ ও ইসলাম প্রচারের জন্য দায়িত্বশীল তাই হচ্ছে খিলাফত। ইসলামী শাসনব্যবস্থাককেই খিলাফত নামে অভিহিত করা হয়। ইমামত বললেও একই ব্যবস্থাকে বুঝায়। এই প্রসংগে শাইখ তাকীউদ্দীন আন-নাবাহানী বলেন, “খিলাফত হলো সকল মুসলিমদের জন্য সাধারন নেতৃত্ব। এর দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামী শরীয়াহ এর আইন বাস্তবায়ন করা এবং সারাবিশ্বের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দেয়া।” (আল খিলাফাহ)
খিলাফাহ কেন জরুরি–
আল্লাহ আমাদের পবিত্র কুর’আনে বলেছেন,“আর আপনি আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে ফয়সালা করুন, এবং আপনার কাছে যে সত্য এসেছে তা ছেড়ে দিয়ে তাদের ইচ্ছার অনুসরন করবেন না। (সূরা মায়িদা- ৪৮)
আল্লাহ যা অবতীর্ণ করে তা অনুযায়ী যারা শাসন করে না তারাই কাফের,ফাসেক এবং জালেম। (মায়িদা- ৪৪, ৪৫, ৪৭)
উপরোক্ত আয়াতসমুহসহ আরো বহু আয়াতে আল্লাহ মুসলিমদের আল্লাহ এর আইন বাস্তবায়ন এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে আদেশদিয়েছেন যে সমাজে মানুষের সমস্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন এর জন্য একজন খলিফা থাকবেন যিনি এগুলার বাস্তবায়ন করবেন। খলিফা ছাড়া হুদুদ তথা ইসলামী আইন বাস্তবায়নকরা সম্ভব না। তাই আল্লাহ’র আদেশ অনুসারে যেহেতু ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা ফরজ, তাই খিলাফত ব্যবস্থা থাকা এবং খলিফা থাকাও ফরজ।রাসূল (সা) বলেন “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা যাবে যার কাঁধে কোনো খলিফার বাইয়াত নাই তবে তার মৃত্যু হলো জাহেলিয়াত এর মৃত্যু” (মুসলিম)
হাদীসে আমরা দেখতে পাই যে, খলীফার বাইয়াত ছাড়া মারা যাবে তার মরণ হবে জাহেলিয়াত এর আমলের মতো। অর্থাৎ সে মুসলিম হলেও তার মরণ হবে একজন জাহেল এর মতো। তাই খলিফার উপস্থিতি তথা খিলাফত থাকা ফরজ।
আরেকটি ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি যে, খিলাফত মুসলিমদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ।
রাসূল (সা) এর ওফাতের পর উনার লাশ খলিফা নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত দাফন করা হয় নাই। অথচ রাসূল(সা)-কে দাফনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো কাজই হতে পারে না। তাই এই ঘটনা থেকেই বুঝা যায় খলিফা নির্বাচন করা এবং খিলাফত থাকা কত গুরুত্বপূর্ণ।
আলী(রা) বলেন, “একজন আমীর ছাড়া জনগন কখনো পরিশুদ্ধ হয় না- সেই আমীর ভালো বা মন্দ (যাই হোক না কেনো)।” (কানজুল উম্মাল)
সুতরাং এর থেকে দেখা যায় যে মুসলিমদের জন্য খিলাফত কত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুসলিমদের মাঝে খিলাফত না থাকাকালে তা প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মুসলিমদের জন্য ফরজ হয়ে পড়ে। যদি মুসলিমরা তাদের মাঝ থেকে খলিফা নির্বাচন করা থেকে বিরত থাকে তাহলে সবাই কবীরা গুনাহ এর কাজ করবে। যদি মুসলিমদের মাঝে কোনো দল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে এবং অন্যরা তা থেকে বিরত থাকে তাহলে যারা খিলাফাহ এর জন্য কাজ করছে তারা ব্যতীত অন্য সবাই গুনাহগার হবে। এভাবে তারা দুনিয়া এবং আখিরাতে চরম শাস্তির সম্মুখীন হবে।
খিলাফতবিহীন সময় মুসলিমদের অবস্থা–
খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে,রাসূল(সা)-কে মদীনার আওস এবং খাজরাজ গোত্র বাইয়াত দেয়ার মাধ্যমে। এবং খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায় ১৯২৪ সালের ৩ রা মার্চ পশ্চিমা দালাল মুস্তফা কামাল পাশার মাধ্যমে। এরপর কেটে গেছে ৯০বছর। এই ৯০ বছরে মুসলিম উম্মাহ এর উপর অত্যাচার, অবিচার হয়েছে অসংখ্য। আজ প্রতিনিয়ত আমাদের চারিপাশে মুসলিমরা অত্যাচার নির্যাতন এর শিকার হচ্ছে। বার্মায় মুসলিমরা মারা যাচ্ছে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ এর হাতে অসংখ্য নারীপুরুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত অত্যাচার আর নির্যাতন এর শিকার হচ্ছে মুসলিমরা। অথচ শাসকগোষ্ঠী নিশ্চুপ। এই অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীরা প্রতিনিয়ত আমেরিকা-বৃটেনের পদলেহন করে যাচ্ছে আর উম্মাহ এর উপর অত্যাচার করছে। খিলাফতবিহীন মুসলিম উম্মাহ’র অবস্থা যে কি ভয়াবহ তা একটি ঘটনার মাধ্যমে বুঝা যায়।
১ম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে উসমানীয় খিলাফত হারার পর যখন উসমানীয় খিলাফতের একেবারে ভঙ্গুর অবস্থা তখন ১৯২০ সালে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স সরকার রাসুল(সা)-কে নিয়ে ব্যাংগাত্মক নাটক করার পরিকল্পনা করে, সে সময় ঐ নাটকের টিকেট ও বিক্রিহয়ে গিয়েছিলো। সেই সময় খলিফা ২য় আব্দুল মাজিদ ব্রিটেন এবং ফ্রান্সকে অনুরোধ করেছিলো সেই নাটকটি মঞ্চস্থ না করতে। জবাবে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স বলে এইটা তাদের দেশের মত প্রকাশের অধিকার। জবাবে খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল মাজিদ বলেন, আপনারা যদি ঐ নাটক মঞ্চস্থ করেন তাহলে আমি জিহাদে আকবর ঘোষণা করবো। খলিফার এই কথা শুনে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এই নাটক আর মঞ্চস্থ করে নাই। অথচ এখন রাসুল(সা)-কে নিয়ে ব্যাংগাত্মক নাটক সিনেমা বানাচ্ছে কাফেররা, রাসূল(সা)-কে ব্যাংগকারীদের সম্মাননা দিচ্ছে,অথচ মুসলিম উম্মাহ কিছুই করতে পারছে।
খিলাফত বিহীন সময়ে তরুণরা হয়ে যাচ্ছে আজ নষ্ট। বর্তমানের অত্যাচারী শাসকরা তরুনদের মাঝে থাকা নিত্যনতুন আবিষ্কারের নেশাকে মেরে ফেলছে, তার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে মেয়ের নাম্বার,গাজার পুরিয়া। যে তরুণ খিলাফত এর সময়ে দেখতো নিত্য নতুন ভূমি জয়ের কথা, যে তরুণ খিলাফত এর সময় চিন্তা করতো জ্ঞান-বিজ্ঞান এ উন্নতির চরম শিকড়ে উঠার কথা আজ সে তরুন চিন্তা করে কিভাবে একটি মেয়ের নাম্বার জোগার করা যায়, কিভাবে হিপহপ গান এর তালে নাচা যায় কিভাবে প্রেম করা যায়, কিভাবে লিটনের ফ্ল্যাটে যাওয়া যায়।
খিলাফতবিহীন সমাজে আজ তরুনদের নিয়ে ব্যবসা করছে মাল্টিন্যশনাল কোম্পানীগুলো। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও ভালোবাসা দিবস এত পপুলার ছিল না। কিন্তু এই কয়েক বছরে বিশেষ করে ২০১০-১৩ সালেরদিকে ভালোবাসা দিবস অত্যন্ত পপুলার করে তুলে কোম্পানীগুলো। কারণ এর পিছনে তাদের কোটি কোটি টাকার বিজনেস হচ্ছে। কার্ডের ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা ইত্যাদি অনেক ব্যবসা।
তারা আমাদের তরুণদের পুঁজিপতিরা শিখাচ্ছে কিভাবে প্রেম করতে হয়, কিভাবে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে কোনো ক্ষতি হবে না। এর পিছনে রয়েছে তাদের সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। “Friends with Benefits” নামক সিনেমা বানিয়ে তারা তরুণ-তরুণীদের শিক্ষা দিচ্ছে, কিভাবে একটি বিপরীত লিংগের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে হয়, কিভাবে তাকে ব্যবহার করে নিজের শারিরিক ক্ষুধা মেটাতে হয়।
আজ তরুনদের রাস্তায় পাগলের মতো “ফ্ল্যাশ মব” নামক প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে নাচিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পুঁজিপতিরা। তরুনদের মাঝে অশ্লীলতা, আর নোংরামী ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে আর মুসলিম উম্মাহ এর মূল চালিকাশক্তি তরুণদের বানিয়ে ফেলছে নপুংশক। এর ফলাফল হিসেবে তৈরী হচ্ছে “ঐশীর” মতো তরুন তরুনী, যারা নিজের বাসনাকে পূর্ণ করার জন্য নিজের মা-বাবাকে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। অথচ দেশের লক্ষ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার আজ চাকরী পায় না, দেশের হাজার হাজার তরুণ আজ বেকারত্বের কষাঘাতে জর্জরিত। কিন্তু সেইদকে কোনো সরকারের কোনো খেয়াল নেই। দেশের শিল্পবিভাগে কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ নেই,নেই কোনো অনুদান। চাকরি না পেয়ে হাজারহাজার তরুন আজকে আত্মহত্যা করছে, কেউবা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এভাবে সমাজের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আজ শোষিত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহ আর আজ আমাদের সম্পদ ব্যবহার করে, আমাদের শোষন করে, আমাদের অত্যাচার করে সুপার পাওয়ার আমেরিকা ও অন্যান্য কুফর রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে কোটিপতি।সমাধান কী?? –
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষন পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না যতক্ষন পর্যন্ত তারা নিজে তা পরিবর্তন করতে সচেষ্ট না হয়। (সূরা রা’দ- ১১)
আমরা যদি বর্তমান সময়ে উম্মাহ এর উপর ঘটিত অত্যাচার, অবিচার থেকে উম্মাহকে মুক্তি দিতে চাই তাহলে আমাদের পুনরায় খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে যেভাবে রাসূল(সা) ও তাঁর সাহাবীরা করেছিলেন। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই আমাদের বলেছেন,
“তোমাদের মাঝে একটি দল থাকা উচিৎ যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবেএবং তারাই হবে সফলকাম” (আল ইমরান-১০৪)
খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের ঠিক সেভাবেই কাজ করতে হবে যেভাবে রাসূল(সা) খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিলেন। রাসূল(সা)-এর পথ ছাড়া আর কোনো পথেই খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা সহীহ নয়। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“রাসূল (সাঃ) তোমাদের যাদেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা করতে নিষেধ করেন তা বর্জন করো।” (হাশর-৭)
এ থেকে বুঝা যায় যে, রাসূল(সা) এর দেখানো পথ ছাড়া আর কোন পথই আল্লাহ এর কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না। তাই আমাদের পুনরায়খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য রাসূল(সা) এর দেখানো পথেই কাজ করতে হবে।
তরুণদের ভুমিকা কী?-
তারুণ্য, এক অমীয় সম্ভাবনার নাম। প্রতিটা সমাজ পরিবর্তনে তরুণদের ভূমিকা সবসময় বেশী থাকে। কারণ তরুণরা চায় সবসময় শোষনমুক্ত সমাজ গড়তে। এমনকি রাসূল (সা) এর সময়ে ইসলাম প্রচারে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে সবচেয়ে বেশী সহায়তা করেছিলেন এই তরুণরা। রাসূল (সা) নিজেই বলেছিলেন, তরুণরা আমাকে সহায়তা করেছে এবং বৃদ্ধরা আমার বিরোধিতা করেছে। ইসলামের ইতিহাসের পাতা ঘুরে দেখলেই আমরা দেখতে পাই যে এতে তরুন মুসলিম বীরদের সংখ্যাই বেশী। কিন্তু বর্তমানে খিলাফাহ বিহীন সময়ে কুফফাররা তরুণদের ব্যস্ত করে রেখেছে বিভিন্ন রকম মোহ দিয়ে যাতে করে তরুণরা তাদের আসল কাজ, তাদের আসল দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে না পারে ।
একটা ছোট উদাহরন দিলেই বুঝা যাবে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভূমিকা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন যখন মুসলিমদের অধীনে ছিলো তখন ব্রিটিশ রাজা প্রতি বছর গোয়েন্দা পাঠাতো সেখানকার অবস্থা দেখার জন্য। গোয়েন্দা স্পেন এর গেইটে এসে দেখলো একটি ১৭-১৮ বছরের ছেলে কাঁদছে। সে তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কাঁদছো কেনো? তখন ছেলেটি বললো “আমার ছোড়া ১০ টি তীর এর মাঝে ৯ টী নিশানায় লেগেছে কিন্তু একটি নিশানায় লাগেনি। তাই আমি কাঁদছি। তখন গোয়েন্দা বললো, তো কী হয়েছে! আমি তো একটা তীরও নিশানায় লাগাতে পারি নাহ। তখন ছেলেটিসাথে সাথে জবাব দিলো, “আমার একটা নিশানা ব্যর্থ হবার কারণে একটা কাফির সেনা বেঁচে যাবে। যা আমি কখনোই মেনে নিতে পারি না। তখন গোয়েন্দা ব্রিটেনে ফিরে এসে রাজাকে বললো “স্পেন আক্রমন করার সময় এখন হয়নি। রাজা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে গোয়েন্দা তাঁর এবং সেই মুসলিম তরুণটির মাঝে কথোপকথনের ঘটনা তুলে ধরলো।
বহু বছর পর যখন আবার সেই গোয়েন্দা স্পেন গেল সে তখন দেখতে পেলো যে স্পেন এর গেটের সামনে একটি তরুন দাঁড়িয়ে আছে এবং কাঁদছে। তখন সে তরুণটির কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে তরুণটি জবাব দিল যে তাঁর প্রেয়সী আরেক ছেলের সাথে পালিয়েছে। এখন তাঁর বেচে থাকার কোন মানে হয় নাহ। তখন গোয়েন্দা খুব উৎসাহের সাথে তাকে বললো “তাতে কি হয়েছে? তুমি আরেকটি জোগাড় করে ফেলবে”।এরপর সে ব্রিটেন এসে সাথে সাথে রাজাকে বললো ‘স্পেন আক্রমণের সময় এখনই।” এবং সে বছর মুসলিমরা স্পেন এর দখলদারিত্ব হারিয়েছিলো। এই ঘটনা থেকেই বুঝা যায় মুসলিম তরুণদের ভুমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ খিলাফত প্রতিষ্ঠায়। তাই প্রত্যেক তরুণকেই খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হবে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই বলেছেন,
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃএব তোমরা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস রাখবে।” (আল ইমরানঃ ১১০)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন,
“তোমরা যদি ঈমান আনো এবং সৎকর্ম কর আল্লাহ তোমাদের ওয়াদা করেছেন পৃথিবীতে তোমাদের শাসনক্ষমতা দান করবেন যেমনটি দান করেছিলেন পূর্ববর্তীদের…………। (আন নূর- ৫৫)”
তরুণদের ইসলামের জন্য কাজ করা যে কত দরকার তা রাসূল (সা) এর এই হাদিস থেকেই বুঝা যায়। রাসূল (সা) বলেন,
“কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া কাউকেই সামনে আগাতে দেয়া হবে না।এর মাঝে একটী হলো তুমি তোমার যৌবনকাল কি কাজে ব্যায় করেছো?” [তিরমিযি]
অর্থাৎ আল্লাহ প্রত্যেক তরুনকেই তাঁর যৌবন কাল সম্পর্কে জিজ্ঞেসকরবেন।
তাই প্রত্যেক তরুণকেই বর্তমান সময়ে মুসলিমদের এই দুরাবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে।
রাসূল(সা) বলেন,
“ইসলাম এসেছে অপিরিচিত অবস্থায় এবং তা আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে যাবে। সুতরাং অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।” তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, অপরিচিত কারা ইয়া রাসুলাল্লাহ? তিনি বললেন, “অপরিচিত তারাই যারা মানুষকে ঠিক করবে, কিংবা সমাজব্যবস্থাকে ঠিক করবে যখন তা দুষিত অবস্থায় থাকবে।” (তাবারানী)
রাসূল (সা) আরো বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পৃথিবীর সব প্রান্ত আমাকে এক করে দেখিয়েছেন।আমি তার পূর্ব থেকে পশ্চিম অংশ দেখেছি। নিশ্চয়ই আমার উম্মতের কর্তৃত্ব তাতে পৌছাবে যা আমার জন্য এক করা হয়েছিলো তা হতে।” (আবু দাউদ)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে দুনিয়ায় নব্যুয়ত এর আদলে খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করার তৌফিক দান করুক, যাতে করে আমরা সেই গুরাবাদের একজন হতেপারি যাদের অন্তর থেকে কিয়ামতের দিন নূর ছড়াবে। এই দুয়া করি। আমীন।
রাকিব ইশরাক মুহাম্মদ ইরতিজা




















