ওপেক (OPEC) – এর ঐতিহাসিক পটভূমি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং মুসলিম বিশ্বের ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) ওপেক (OPEC) ত্যাগ করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বিশ্ব অর্থনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে চলেছে। সংবাদমাধ্যমগুলোতে এটিকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দামের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারে এবং ওপেকের মতো শক্তিশালী তেল কার্টেলের একচেটিয়া আধিপত্যের অবসান ঘটাতে পারে।

তবে এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে শুধু অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে না। এর গভীরে লুকিয়ে আছে সৌদি আরবের সাথে আমিরাতের ক্ষমতার নীরব লড়াই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কৌশল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান জায়নিস্ট-মার্কিন-ইরান সংঘাত। এই সম্পূর্ণ পরিস্থিতি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাতা উল্টে ওপেক গঠনের প্রকৃত কারণ, পেট্রোডলারের ফাঁদ এবং গালফ দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের দিকে তাকাতে হবে।

ওপেকের জন্ম – প্রচলিত আখ্যান বনাম ঐতিহাসিক বাস্তবতা

ওপেক (OPEC) বা ‘অর্গানাইজেশন অফ পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ’ হলো মূলত তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি জোট বা ‘কার্টেল’। অর্থনৈতিক পরিভাষায়, কার্টেল হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একই ধরনের পণ্য সরবরাহকারী প্রতিযোগীরা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করে জোটবদ্ধ হয়ে পণ্যের দাম নির্ধারণ করে। ওপেকের ক্ষেত্রে, তারা তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে বা কমিয়ে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে। উৎপাদন কমালে দাম বাড়ে, আর বাড়ালে দাম কমে। এটি বাজারের একটি সাধারণ মনোপলি বা একচেটিয়া কৌশল।

ওপেক গঠনের একটি বহুল প্রচলিত সাধারণ আখ্যান রয়েছে। বলা হয়, ১৯৬০-এর দশকের আগে বিশ্বের তেল বাজার নিয়ন্ত্রণ করত সাতটি বৃহৎ পশ্চিমা তেল কোম্পানি, যাদের একত্রে ‘সেভেন সিস্টার্স’ (Seven Sisters) বলা হতো। তারা উৎপাদনকারী দেশগুলোর সাথে কোনো আলোচনা না করেই একতরফাভাবে তেলের দাম কমিয়ে দিত, যার ফলে আরব রাষ্ট্রগুলো এবং ভেনিজুয়েলা রাতারাতি বিপুল রাজস্ব হারাত। এই পশ্চিমা শোষণের হাত থেকে নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেই ১৯৬০ সালে সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, কুয়েত এবং ভেনিজুয়েলা মিলে ওপেক গঠন করে।

কিন্তু এই আখ্যানটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য নয়; বরং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী কৌশলকে আড়াল করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বে তিনটি বড় পরিবর্তন ঘটছিল:

১. ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের পতন: দুটি বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের পর, এক সময়ের পরাক্রমশালী ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের মতো ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো আর্থিকভাবে প্রায় দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের বিপুল ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়ে এবং সামরিক শক্তিও ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে যায়। একই সময়ে, আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপনিবেশগুলোতে স্বাধীনতার দাবি ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। উপনিবেশগুলোতে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখা এবং বিদ্রোহ দমন করা এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পক্ষে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ, তারা বাধ্য হয়ে একে একে তাদের উপনিবেশগুলোর ওপর থেকে সরাসরি শাসন প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করে, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করে এবং নতুন পরাশক্তিগুলোর উত্থানের পথ প্রশস্ত করে।

২. সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান এবং সমাজতন্ত্রের ভীতি: সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদের ‘জাতীয়করণ’-এর ধারণা, তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক অ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি জাতীয়করণ করেন। এর জবাবে ১৯৫৩ সালে সিআইএ (CIA) এবং এমআই৬ (MI6) এর মদদে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। একইভাবে ১৯৫৬ সালে মিসরের জামাল আব্দুল নাসের সুয়েজ খাল কোম্পানি জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল মিসরে আক্রমণ চালায়।

৩. মার্কিন সাম্রাজ্যের বিস্তার: ইউরোপীয় শক্তিগুলোর পতনের সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল, যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিস্তার ঠেকানো যায় এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়।

এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের বদলে যুক্তরাষ্ট্র এক নতুন কৌশল গ্রহণ করে। তারা এমন একদল পশ্চিমা-ঘেঁষা আরব ও ভেনিজুয়েলান নেতার মাধ্যমে ওপেক গঠন করে, যারা পশ্চিমাদের দ্বারা শিক্ষিত এবং প্রভাবিত ছিলেন। বাইরে থেকে মনে হতো স্থানীয় নেতারাই তেলের দাম নির্ধারণ করছেন এবং তারা স্বাধীন। কিন্তু বাস্তবে তারা বিপি (BP), শেল (Shell) বা টেক্সাকোর (Texaco) মতো পশ্চিমা তেল কোম্পানিগুলোর পরামর্শেই কাজ করতেন। এটি ছিল সরাসরি উপনিবেশবাদের বদলে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণের এক নতুন পশ্চিমা মেকানিজম, যার উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দের ক্ষোভ প্রশমন করা এবং তাদের সোভিয়েত ব্লকে যোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখা।

১৯৭৩ সালের তেল অবরোধ এবং পেট্রোডলার সাম্রাজ্যের উত্থান

অনেকেই ১৯৭৩ সালের তেল অবরোধকে (Oil Embargo) পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে ওপেকের একটি স্বাধীন ও সাহসী পদক্ষেপ বলে মনে করেন। ইয়োম কিপ্পুর যুদ্ধে (Yom Kippur War) ইসরায়েলকে সমর্থন করার প্রতিবাদে আরব দেশগুলো পশ্চিমাদের ওপর তেল অবরোধ আরোপ করে, যার ফলে তেলের দাম তিনগুণ বেড়ে যায় এবং আমেরিকায় পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।

কিন্তু ডিক্লাসিফায়েড সিআইএ (CIA) ফাইল এবং তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের নিজস্ব বক্তব্য থেকে এক ভিন্ন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিসিঞ্জার মনে করতেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য প্রয়োজন। তিনি এই আরব-ইসরায়েল যুদ্ধকে এমনভাবে পরিচালিত হতে দিয়েছিলেন যাতে দুটি লক্ষ্য অর্জিত হয়:

প্রথমত, ইসরায়েলকে কিছুটা দুর্বল করে তাদের আরব প্রতিবেশীদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা।

দ্বিতীয়ত, আরব দেশগুলোকে বুঝিয়ে দেওয়া যে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ ওয়াশিংটন হয়েই যায়।

এই তেল অবরোধের সবচেয়ে বড় ফলাফল ছিল ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) সিস্টেমের জন্ম। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর (বিশেষ করে সৌদি আরব) মধ্যে একটি অলিখিত চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ওপেকভুক্ত দেশগুলো শুধুমাত্র মার্কিন ডলারে তেল বিক্রি করতে সম্মত হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই রাজতন্ত্রগুলোর সামরিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়। এটি ছিল এমন এক চুক্তি যা পুরো বিশ্বের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

যেহেতু বিশ্বের প্রতিটি দেশের তেল কেনার জন্য মার্কিন ডলারের প্রয়োজন, তাই বিশ্বজুড়ে ডলারের অসীম চাহিদা তৈরি হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ইচ্ছেমতো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে তাদের বিশাল জাতীয় ঋণ মেটাতে সক্ষম হয়, কারণ তারা জানত মুদ্রাস্ফীতি হবে না। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের তেলের মুনাফা পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র এবং মার্কিন রাষ্ট্রীয় বন্ডে (Treasuries) বিনিয়োগ করতে শুরু করে। এভাবেই ওপেক, যা কিনা পশ্চিমা প্রভাব কমানোর কথা বলে তৈরি হয়েছিল, তা পরোক্ষভাবে মার্কিন আধিপত্যকে পাকাপোক্ত করে এবং মুসলিম বিশ্বের সম্পদ দিয়ে পশ্চিমা অর্থনীতিকে চিরস্থায়ী শক্তিতে পরিণত করে।

ব্রিটিশ বিদায়, জিসিসি গঠন এবং সৌদি আরবের আধিপত্য

সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের বর্তমান দ্বন্দ্ব বুঝতে হলে গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল (GCC) বা উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

দশকের পর দশক ধরে এই উপসাগরীয় আমিরাতগুলো (Sheikhdom) ব্রিটিশদের সুরক্ষায় ছিল। বৃটেন কেবল তাদের উপদেষ্টাই ছিল না, বরং তাদের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্য সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ১৯৭১ সালের দিকে বৃটিশ সাম্রাজ্যের পতন স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তারা এই অঞ্চল থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়।

বৃটিশদের এই বিদায়ের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিশাল ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। ইরান এবং বড় প্রতিবেশী সৌদি আরবের দ্বারা গ্রাস হয়ে যাওয়ার ভয়ে ছোট ছোট উপসাগরীয় দেশগুলো ভীত ছিল। এই ভয় এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের রেখে যাওয়া কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই ১৯৮১ সালে গঠিত হয় জিসিসি (GCC)—যার সদস্য হয় সৌদি আরব, আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন এবং ওমান। এর লক্ষ্য ছিল আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা।

কিন্তু এই নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থায় একটি দেশ সবার ওপরে স্থান করে নেয়—সৌদি আরব। বিশাল ভূখণ্ড, সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যা, শক্তিশালী মার্কিন-সমর্থিত সামরিক বাহিনী এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—তাদের হাতে থাকা ‘অতিরিক্ত তেল উৎপাদন ক্ষমতা’ (Spare Oil Capacity)

‘স্পেয়ার অয়েল ক্যাপাসিটি’ মানে হলো, সৌদি আরবের এমন অবকাঠামো প্রস্তুত আছে যা দিয়ে তারা চাইলেই খুব দ্রুত দীর্ঘ সময়ের জন্য তেলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের দাম নির্ধারণের এই ক্ষমতা সৌদি আরবকে ওপেকের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। তারা কোটা নির্ধারণ করে দিত এবং অন্য গালফ রাষ্ট্রগুলো তা মেনে চলতে বাধ্য হতো, যাতে তেলের দাম কমে গিয়ে তাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের উত্থান এবং অস্তিত্ব রক্ষার নীরব যুদ্ধ

সৌদি আরবের তুলনায় সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) অত্যন্ত ছোট একটি দেশ। তাদের মোট জনসংখ্যা মাত্র ১.১ কোটি, যার মধ্যে প্রকৃত আমিরাতি নাগরিক মাত্র ১০ লক্ষের কিছু বেশি। তাদের সামরিক বাহিনী এবং ভৌগোলিক আয়তনও সৌদির তুলনায় নগণ্য। প্রথাগত মাপকাঠিতে আমিরাতের পক্ষে সৌদিকে চ্যালেঞ্জ করা অসম্ভব।

কিন্তু আমিরাতের নেতৃত্ব শুরুতেই তাদের দুটি বড় দুর্বলতা চিহ্নিত করতে পেরেছিল:

১. তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং
২. কৌশলগত গভীরতার (Strategic Depth) অভাব।

অন্যান্য দেশ যখন তেলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে বসেছিল, আমিরাত তখন ভিন্ন পথে হাঁটে। তারা দুবাইকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক, লজিস্টিক এবং এভিয়েশন হাব গড়ে তোলে। এশিয়া, আফ্রিকা এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে বাণিজ্যের মূল প্রবেশদ্বার হয়ে ওঠে দুবাই।

কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক শক্তিই যথেষ্ট ছিল না। কৌশলগত গভীরতা অর্জনের জন্য আমিরাত তাদের বিশাল সম্পদ ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে (বিশেষ করে লোহিত সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কৌশলগত নৌপথগুলোতে) বন্দর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রক্সি মিলিশিয়াদের অর্থায়ন শুরু করে। তারা সামরিকভাবে দেশ দখল না করে অর্থনৈতিক ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে।

সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু: আমিরাতেরও বিশাল তেল মজুত এবং ‘স্পেয়ার অয়েল ক্যাপাসিটি’ রয়েছে। তারা দিনে প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করতে সক্ষম হলেও সৌদি নেতৃত্বাধীন ওপেকের কোটার কারণে তাদের ৩০ লাখ ব্যারেলে আটকে থাকতে হয়। সৌদি আরবের এক ব্যারেল তেল তুলতে খরচ হয় মাত্র ৩ ডলার, কিন্তু আমিরাতের জন্য এটি লাভজনক হলেও সৌদির কোটার কারণে তারা পূর্ণ মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ২০২০ সালে রাশিয়া যখন সৌদির কোটা মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন সৌদি আরব বিশ্ববাজারে সস্তায় তেল ভাসিয়ে দিয়ে তেলের দাম ৪০ ডলারে নামিয়ে এনেছিল, যা অন্য দেশগুলোর অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছিল। আমিরাত সৌদির এই একচেটিয়া খবরদারির ওপর চরম ক্ষুব্ধ।

এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’। রিয়াদ এখন দুবাইয়ের বিকল্প হিসেবে লজিস্টিক ও ফিন্যান্সিয়াল হাব হতে চাইছে। এটি দুবাইয়ের অর্থনৈতিক মডেলের জন্য সরাসরি একটি অস্তিত্বের সংকট।

বর্তমান ভূ-রাজনীতি, হরমুজ প্রণালী এবং আমিরাতের ওপেক ত্যাগের সিদ্ধান্ত

UAE leaves OPEC

বর্তমান জায়নিস্ট-মার্কিন-ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আমিরাত এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ওপেক থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক আবরণ (Political Cover) পেয়ে গেছে।

যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের মতো পরিস্থিতিতে আমিরাতের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তারা চায় ওপেকের কোটা থেকে বেরিয়ে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে বেশি তেল বিক্রি করতে। তারা আর সৌদির নিয়ন্ত্রণ মানতে রাজি নয়, কারণ ইরানের পর তারা সৌদি আরবকেই তাদের সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখে।

আমিরাত বিশ্বাস করে, ওয়াশিংটনের সাথে তাদের গভীর সম্পর্ক (যেমন- কারেন্সি সোয়াপ লাইন যা তাদের সস্তায় ডলার পেতে সাহায্য করে) এবং ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিকীকরণ চুক্তির মাধ্যমে তারা একটি স্বাধীন শক্তিশালী বলয় তৈরি করতে পারবে। তারা এখন সৌদি বলয় থেকে বেরিয়ে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ভারত অক্ষের দিকে ঝুঁকছে।

আমেরিকার নীতি পরিবর্তন এবং ওপেকের ভবিষ্যৎ

স্নায়ুযুদ্ধের সময় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের আগ পর্যন্ত ওপেকের মতো বহুজাতিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার জন্য সুবিধাজনক ছিল। এটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দিত।

কিন্তু আজকের দিনে আমেরিকা বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি এবং তারা নিজেরাই বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশ। এখন আর তাদের এসব বহুজাতিক সংগঠনের প্রয়োজন নেই। আমেরিকা এখন বহুজাতিক চুক্তির বদলে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে বেশি আগ্রহী।

ওপেক দুর্বল হলে বা ভেঙে গেলে তা মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী তো নয়ই, বরং সহায়ক। ওপেকের কোটা প্রথা ভেঙে গেলে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে, তেলের দাম কমবে, যা পশ্চিমা অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতি কমাতে সাহায্য করবে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই আমিরাতের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন, কারণ সস্তা তেল আমেরিকার অর্থনীতির জন্য লাভজনক।

মুসলিম বিশ্বের ট্র্যাজেডি এবং ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

এই সম্পূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক চালচিত্র মুসলিম বিশ্বের জন্য এক বিশাল ট্র্যাজেডি এবং শিক্ষণীয় বিষয়। ওপেক এবং তেলের ইতিহাস স্পষ্টভাবে দেখায় কীভাবে মুসলিম উম্মাহর অমূল্য সম্পদ পশ্চিমা শক্তি এবং গুটিকয়েক রাজপরিবারের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে।

এই প্রাকৃতিক সম্পদ কোনো নির্দিষ্ট পরিবার, রাজা বা শাসকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর সম্পদ। গত কয়েক দশকে তেল থেকে উপার্জিত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার যদি পশ্চিমা ব্যাংকে বা মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ না করে মুসলিম বিশ্বের কল্যাণে ব্যয় করা হতো, তবে আজ এই অঞ্চলে কোনো ক্ষুধা, দারিদ্র্য বা বেকারত্ব থাকত না। এই অর্থ দিয়ে পুরো মুসলিম বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী শিল্প ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি গড়ে তোলা যেত, যা সত্যিকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করত।

বর্তমানে আমরা মধ্যপ্রাচ্যে যে জোটগুলো দেখছি—একদিকে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা, অন্যদিকে আমিরাত, ভারত এবং ইসরায়েলের নতুন অক্ষ—এগুলো সবই ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ এবং সাময়িক লেনদেনের (Transactional interests) ওপর ভিত্তি করে তৈরি। স্বার্থের মিল থাকলে এই দেশগুলো বন্ধু হয়, আর স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে তারা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয় (যেমনটি এখন সৌদি এবং আমিরাতের মধ্যে ঘটছে)। জাতীয়তাবাদী স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া কোনো ঐক্যই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না; তা সহজেই ভেঙে যায় বা বিক্রি হয়ে যায়।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলের মানুষের ঐক্যের ভিত্তি ছিল ভিন্ন। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর এঁকে দেওয়া মানচিত্র বা ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ইসলামী সভ্যতার অভিন্ন দৃষ্টিভংগি ও মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তাদের ঐক্য ছিল। এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ধর্ম নয়, বরং ছিল শাসন ও ঐক্যের মূল ভিত্তি। যতক্ষণ না মুসলিম বিশ্ব এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে একটি আদর্শিক ও সত্যিকারের ঐক্যের পথে ফিরে আসছে, ততক্ষণ ইয়েমেন বা ফিলিস্তিনের মতো সংঘাত থামবে না, এবং বাইরের শক্তির কাছে মুসলিম সম্পদের এই নীরব লুণ্ঠন চলতেই থাকবে।

Leave a Reply