রিসেট ইউর অ্যালগরিদম

রাত ১১টা বাজে, আগামীকাল পরীক্ষা। নোট খোলা আছে সামনে, কিন্তু হাতে ফোন। শুধু “একটু” দেখবো বলে Instagram খুললাম। একটা রিলস, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা। হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত দেড়টা। দুই ঘণ্টা কোথায় গেল? কী দেখলাম? মনে নেই ঠিকমতো। একটা র‍্যান্ডম রান্নার ভিডিও, কারো ট্যুরের ভ্লগ, একটা ক্রাইম নিউজ, কিছু মিম, একটা মোটিভেশনাল কোট, আর মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপন। কিন্তু একবারও থামাতে পারিনি নিজেকে।

এই অনুভূতিটা আমরা প্রায় সবাই ই রিলেট করতে পারি।

এর নাম Doom Scrolling! এবং এটি একটি সুনির্দিষ্ট ডিজাইন। ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি করা একটা সিস্টেম, যেটার একমাত্র কাজ হলো আমাদের স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখা। যত বেশি সময় আমরা থাকবো, তাদের তত বেশি প্রফিট।

কিন্তু এই সিস্টেমটা আসলে কিভাবে কাজ করে?

আমরা মনে করি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছি। তবে প্রকৃতপক্ষে, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ব্যবহার করছে।

Facebook, Instagram, TikTok, YouTube, Google এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের আচরণ রেকর্ড করছে। কোন পোস্টে কতক্ষণ চোখ থামলো, কোন ভিডিওতে দ্বিতীয়বার ফিরে এলাম, কোন বিজ্ঞাপনে একটু ধীরে স্ক্রল করলাম, প্রতিটা ডেটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এই ডেটা দিয়ে তৈরি হচ্ছে আমাদের একটা “Psychological Profile“। তারপর সেই প্রোফাইল অনুযায়ী এমন কন্টেন্ট সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যেটা দেখলে আমরা স্ক্রলিং বন্ধই করতে পারবো না।

একটু চিন্তা করুন-  বন্ধুর সাথে কথায় কথায় নতুন একটা জুতার ব্র্যান্ডের কথা বললাম, কিছুক্ষণ পর ফিডে সেই ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন। কাকতালীয়? না। Meta তার অ্যাপের মাধ্যমে ফোনের মাইক্রোফোন অ্যাক্সেস করে । এটা নিয়ে বহু গবেষণা ও অভিযোগ হয়েছে। Google Maps “লোকেশন হিস্টোরি অফ” থাকলেও আমাদের মুভমেন্ট ট্র্যাক করতে পারে। ২০১৮ সালে Associated Press-এর একটি তদন্তে এটা প্রমাণিত হয়েছে। Cambridge Analytica স্ক্যান্ডালে প্রকাশ পেয়েছিল যে ফেসবুক থেকে ৮৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা চুরি করে তা রাজনৈতিক মতামত পরিবর্তনে ব্যবহার করেছে। হার্ভার্ডের Shoshana Zuboff-এর বই The Age of Surveillance Capitalism (২০১৯) এ Surveillance Capitalism বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে। টেক কোম্পানিগুলো মানুষের আচরণকে “raw material” হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যৎ প্রেডিক্ট এবং প্রভাবিত করে প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করে।

এবং সবচেয়ে ভয়ের বিষয় – আমরা এটা জেনেও মেনে নিয়েছি। কারণ “ফ্রি” সার্ভিস ছেড়ে দেওয়াটা কঠিন মনে হয়। এই স্ক্রলিং ছাড়তে না পারার পেছনে একটা নিউরোলজিক্যাল কারণ আছে। যাকে Dopamine Trap বলা যায়।

প্রতিটা লাইক, প্রতিটা নোটিফিকেশন, প্রতিটা চমকপ্রদ ভিডিও – এগুলো আমাদের ব্রেইনে Dopamine রিলিজ করায়। Dopamine হলো সেই হরমোন যেটা আমাদের “ভালো লাগার” অনুভূতি দেয়। সিগারেট, গেমিং, জুয়া  এগুলোও একইভাবে কাজ করে। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ডিজাইন মাদকের আসক্তির সাথে তুলনীয়।

আর এই ডিজাইনটা দুর্ঘটনাবশত হয়নি।

২০১৭ সালে Facebook-এর প্রথম দিকের প্রেসিডেন্ট Sean Parker নিজেই স্বীকার করেছিলেন-

 “আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটা সিস্টেম বানিয়েছিলাম যেটা মানুষের মনোযোগ ও সময়কে যতটা সম্ভব বেশি নেবে।” তিনি আরো বললেন, “এই সিস্টেম মানুষের মস্তিষ্কের “Vulnerability” কে exploit করে।”

২০২১ সালে Facebook-এর সাবেক প্রোডাক্ট ম্যানেজার Frances Haugen হুইসেলব্লোয়ার হিসেবে প্রকাশ করেছিলেন যে, Facebook-এর নিজস্ব গবেষণাই দেখিয়েছিল তাদের অ্যালগরিদম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।  বিশেষত মেয়েদের মধ্যে body image সমস্যা ও ডিপ্রেশন বাড়াচ্ছে। Facebook সেটা জেনেও কিছু করেনি। কারণ এনগেজমেন্ট কমানো মানে আয় কমানো। AI-চালিত অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কের Reward Center-কে ক্রমাগত সক্রিয় রাখে। এই চক্র মস্তিষ্কের Prefrontal Cortex ও Amygdala-তে পরিবর্তন আনে, যার ফলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়।

এটা শুধু একটা অ্যাপের সমস্যা না। এটা একটা সিস্টেমিক সমস্যা।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে একজন মানুষ দিনে ৪ ঘণ্টার বেশি সময় স্মার্টফোনে ব্যয় করে। বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে এই সংখ্যা আরো বেশি। চার ঘণ্টা মানে দিনের এক-ষষ্ঠাংশ। এক বছরে প্রায় ৬০ দিন। যে কিশোর-কিশোরীরা দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে anxiety ও depression-এর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। প্রায় ২৪.৪% কিশোর-কিশোরী সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির ক্লিনিক্যাল মানদণ্ড পূরণ করে।

১০% কিশোর-কিশোরী প্রতিদিন ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটায়। যত বেশি সময়, তত বেশি depression-এর ঝুঁকি। অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার ঘুমের সমস্যা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং পড়াশোনায় খারাপ ফলাফলের সাথে সরাসরি যুক্ত।

এখন আসি, এতো কিছু জানার পর ও কেন আমরা এই স্ক্রলিং এর নেশায় থাকি?

আমরা হয়তো অনেক সময় স্ক্রলিং এডিকশন কমানোর জন্য বিভিন্ন মেথড এপ্লাই করি। যেমন- ফোন লক করি, নোটিফিকেশন, টাইমার সেট করি, মাঝে মাঝে সোশ্যাল মিডিয়া এপ আনইনস্টল করে দিই। কিন্তু তারপর ও কেন কয়েকদিন পর আবার একই অবস্থা হয়?

এর মুল কারণ আমরা আমাদের এই কাজের কোনো “Why” খুঁজে পাই না। এই কাজের কোনো উদ্দেশ্য বা purpose খুঁজে পাই না। যখন আমাদের কাজের বা জীবনের কোনো উদ্দেশ্য না থাকবে, তখন বিদ্যমান সিস্টেমের উদ্দেশ্যই আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে যায়। এর মাধ্যমে বিদ্যমান সিস্টেম তাদের অ্যালগরিদম দিয়ে আমাদের ইউজ করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করে নেয়।

Doom Scrolling কিভাবে বর্তমান পুঁজিবাদী সিস্টেমের উদ্দেশ্য হাসিলে সাহায্য করছে?

পুঁজিবাদ (Capitalism) হচ্ছে একটা আইডিওলজি বা জীবনব্যবস্থা। যার মুল উদ্দেশ্য প্রফিট ম্যাক্সিমাইজ করা আর অধিক ইন্দ্রীয়গত সুখ (Sensual Pleasure) অর্জন।

আধুনিক পুঁজিবাদী সিস্টেমে এখন শুধু পণ্য বিক্রি হয় না। বিক্রি হয় মানুষের মনোযোগ। এই ধারণার নামই হলো Attention Economy।

আমরা Facebook বা Instagram-কে কোনো টাকা দিই না। তাহলে তারা প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার আয় কোথা থেকে করে? উত্তর সহজ- আমাদের মনোযোগ তারা বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি করে। আমরা যত বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকবো, তত বেশি বিজ্ঞাপন দেখবো, তাদের তত বেশি আয়। Silicon Valley-র একটা বহুল পরিচিত কথা আছে- “If you are not paying for the product, you are the product.”

Meta-র বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী তাদের মোট আয়ের ৯৭%-ই আসে বিজ্ঞাপন থেকে। আর সেই বিজ্ঞাপনের মূল্য নির্ধারিত হয় আমাদের ডেটা দিয়ে। আমরা কী পছন্দ করি, কোথায় যাই, কী কিনি, কী নিয়ে ভাবি। এই ডেটাই তাদের আসল সম্পদ। আর এই সম্পদ তৈরি হয় আমাদের প্রতিটি স্ক্রলের মাধ্যমে।

সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কাছে অলিখিতভাবে একটা বার্তা পাঠাচ্ছে প্রতিদিন। সুন্দর জায়গায় ঘুরতে পারলেই ভালো জীবন। দামি পণ্য ব্যবহার করলেই সফল। ভাইরাল হলেই মূল্যবান। বেশি ফলোয়ার মানেই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা না বুঝেই এই সংজ্ঞাটা মেনে নিচ্ছি। ফলে আমাদের জীবনের পারপাস আর আমাদের নিজেদের না। সেটা তৈরি হচ্ছে Silicon Valley-র একটা কর্পোরেট অফিসে।

তাহলে আসল অ্যালগরিদম কী?

আসল অ্যালগরিদম খোঁজার জন্য আমাদের নিজেদের কে কিছু মৌলিক প্রশ্ন করতে হবে।

১) আমরা কোথা থেকে এসেছি?
২) আমরা কেন এই পৃথিবীতে এসেছি?
৩) আবার কোথায় যাবো?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে পেলে আমরা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাবো এবং আমরা রিভাইভড বা পূনর্জাগরিত হতে পারবো। শাইখ ত্বাকীউদ্দীন নাবহানী (রহ) তার “নিযাম-উল-ইসলাম” বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বলেছেন –

মানুষের পূনর্জাগরণ (ইয়ানহাদু) হয় মানুষ, জীবন এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কে তার সার্বিক চিন্তাধারণার ভিত্তিতে। অর্থাৎ এ জীবনের পূর্বে কি ছিল, পরবর্তীতে কি আছে এবং বর্তমান জীবনের সাথে পূর্বে কি ছিল ও পরে কি আছে তার পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে সার্বিক চিন্তা ভাবনা’র উপর ভিত্তি করেই মানুষের পূনর্জাগরণ হয় (ইয়ানহাদু)

ইসলাম এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সামগ্রিকভাবে দিয়েছে। মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু-ওয়া-তায়ালা আমাদের কে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, অতিশয় ক্ষমাশীল। (সূরা মুলক: ৫৬) 

“আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে।”  (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)।

এটাই আমাদের Core Algorithm, এবং এটা কোনো কর্পোরেট বোর্ডরুমে তৈরি হয়নি। কোনো ডেটা অ্যানালিসিস করে বানানো হয়নি। এটা মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা নিজে নির্ধারণ করেছেন এবং এখানে কোনো hidden agenda নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সবকিছু সম্পর্কেই অবগত। আমদের ইন্টারনাল অ্যালগরিদম সম্পর্কে একমাত্র তিনিই (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) সবচেয়ে ভালো জানেন। তিনি যেহেতু আমাদের পরীক্ষা করার জন্য পাঠিয়েছেন এবং একটি উদ্দেশ্য সেট করে দিয়েছেন তাই তা ফুলফিল করার মাধ্যমেই আমাদের জীবনের প্রকৃত সফলতা অর্জন হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

ٱعْلَمُوٓاْ أَنَّمَا ٱلْحَيَوٲةُ ٱلدُّنْيَا لَعِبٌ وَلَهْوٌ وَزِينَةٌ وَتَفَاخُرُۢ بَيْنَكُمْ وَتَكَاثُرٌ فِى ٱلْأَمْوَٲلِ وَٱلْأَوْلَـٰدِ‌ۖ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَعْجَبَ ٱلْكُفَّارَ نَبَاتُهُۥ ثُمَّ يَهِيجُ فَتَرَٮٰهُ مُصْفَرًّا ثُمَّ يَكُونُ حُطَـٰمًا‌ۖ وَفِى ٱلْأَخِرَةِ عَذَابٌ شَدِيدٌ وَمَغْفِرَةٌ مِّنَ ٱللَّهِ وَرِضْوَٲنٌ‌ۚ وَمَا ٱلْحَيَوٲةُ ٱلدُّنْيَآ إِلَّا مَتَـٰعُ ٱلْغُرُورِ

তোমরা জেনে রাখ যে, দুনিয়ার জীবন ক্রীড়া কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহঙ্কার এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হল বৃষ্টির মত, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদেরকে আনন্দ দেয়, তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও, তারপর তা খড়-কুটায় পরিণত হয়। আর আখিরাতে আছে কঠিন আযাব এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। আর দুনিয়ার জীবনটা তো ধোকার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়। – (সূরা আল-হাদিদ: ২০)

لَهْوٌ  “লাহউন” – অর্থহীন বিনোদন (Amusement)। Reels, Shorts, TikTok – ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখলাম কিন্তু কিছুই মাথায় রইলো না।

زِينَةٌ “যীনাতুন” –  সাজসজ্জ, জাঁকজমক (Adornment)। Aesthetic feed, ফিল্টার, নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর করে উপস্থাপন করার প্রতিযোগিতা।

َتَفَاخُرُۢ بَيْنَكُمْ “তাফাখুরুন বায়নাকুম” – পরস্পরের মধ্যে গর্ব। Flex culture, ভ্রমণের ছবি, দামি পণ্যের শো-অফ, “আমি কতটা ভালো আছি” দেখানোর রেস।

وَتَكَاثُرٌ فِى ٱلْأَمْوَٲلِ “তাকাসুরুন ফিল আমওয়াল” –  সম্পদের প্রতিযোগিতা। “কে কতটা Luxurious জীবন কাটাচ্ছে” – এই অন্তহীন তুলনা।

বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়াকে বর্ণনা করতে এই একটি আয়াতই যথেষ্ট। দুনিয়া সবসময় এভাবেই মানুষকে ধোঁকা দিবে, শুধু মাধ্যমটা বদলাবে।

এই জীবন কতটুকু?

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

كُلُّ نَفْسٍ ذَآئِقَةُ ٱلْمَوْتِ‌ۗ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ ٱلْقِيَـٰمَةِ‌ۖ فَمَن زُحْزِحَ عَنِ ٱلنَّارِ وَأُدْخِلَ ٱلْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ‌ۗ وَمَا ٱلْحَيَوٲةُ ٱلدُّنْيَآ إِلَّا مَتَـٰعُ ٱلْغُرُورِ

প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর ‘অবশ্যই কিয়ামতের দিনে তাদের প্রতিদান পরিপূর্ণভাবে দেয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সে-ই সফলতা পাবে। আর দুনিয়ার জীবন শুধু ধোঁকার সামগ্রী। (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫)

مَتَـٰعُ ٱلْغُرُورِ  “মাতাউল গুরূর” – ধোঁকার সামগ্রী। এর চেয়ে সুন্দর করে দুনিয়ার চরিত্র বলা সম্ভব না। দুনিয়া আমাদের ধোঁকা দেয়। সোশ্যাল মিডিয়াও আমাদের ধোঁকা দেয় – মনে করায় যে এই স্ক্রলিং, এই লাইক, এই ভাইরাল হওয়াটাই জীবনের অর্থ। কিন্তু মৃত্যুর পর? এসব কিছুই কাজে আসবে না। ফলোয়ারের সংখ্যা কাজে আসবে না। কতটা ট্রেন্ডি ছিলাম সেটা কাজে আসবে না।

এখন করনীয় কী?

ইসলাম আমাদের পূর্বে করা তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেয়। আমরা একটু চিন্তা করলেই বুঝতে পারি যে আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা থেকে এসেছি এবং আবার তার কাছেই ফিরে যাবো। তাই আল্লাহ আমাদের কে অবশ্যই একটি উদ্দেশ্যেই এই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। সেটি হচ্ছে তার ইবাদত করা। অর্থাৎ আমরা যে কাজই করবো তার লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জন।

তাই আমাদের জীবনের প্রতিটি কাজ আমাদের সেই কোর উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখেই সাজিয়ে নিতে হবে। আমাদের কাজের প্রায়োরিটি’র ভিত্তিতেই সেট করতে হবে। আমাদের সময়, মনোযোগ, শক্তি – এগুলো সীমিত। প্রতিটি মুহূর্ত আমরা একটা বিনিয়োগ করছি। সোশ্যাল মিডিয়া সেই বিনিয়োগটা নিজের কাছে নিতে চায়। এখন এই বিনিয়োগ যদি আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার গাইডেন্স অনুযায়ী করি, তাহলে আমরা দুনিয়া ও আখিরাত – দুই জায়গায়ই হাইয়েস্ট রিটার্ন পাবো।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেন,

যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয় । (সূরা আর-রাদ: ২৮)

Doom Scrolling-এর পরে আমরা কেমন অনুভব করি? ক্লান্ত, অস্থির, কিছু একটা মিস করার অনুভূতি। এটাকে বলে FOMO – Fear of Missing Out। কিন্তু আমরা আসলে কিছু মিস করিনি – শুধু সময় আর প্রশান্তি হারিয়েছি। অন্যদিকে আল্লাহর স্মরণ বা আল্লাহর যিকির আমাদের সত্যিকারভাবে অন্তরে প্রশান্তি দেয় সেটা আমরা বাস্তবে উপলব্ধি করতে পারি আবার নিউরোলজিক্যালিও এটা প্রমানিত।

কিন্তু “বোঝা” আর “করা” তো এক না। ফোন রাখতে চেষ্টা করি, কিন্তু পারি না। নামাজে মনোযোগ দিতে চাই, কিন্তু মন ঘুরে যায় রিলসের দিকে। এটা কেন হচ্ছে?

কারণ আমরা এখনো সেই জিনিসটা পাইনি – সেটা হচ্ছে “হালাওয়াতুল ঈমান” – ঈমানের মাধুর্য।

হযরত আনাস ইবন মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন —

“তিনটি গুণ আছে; যার মধ্যে এগুলো থাকবে, সে ঈমানের মাধুর্য (মিষ্ট স্বাদ) লাভ করবে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হবে; সে কোনো বান্দাকে ভালোবাসবে কেবল আল্লাহর জন্য; এবং আল্লাহ তাকে কুফর থেকে রক্ষা করার পর আবার কুফরে ফিরে যাওয়াকে সে তেমনই অপছন্দ করবে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে” [বুখারি]।

এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলছেন ঈমানের একটা “স্বাদ” আছে, মাধুর্য আছে। এটা abstract কিছু না — এটা অনুভব করার জিনিস।

ইমাম আন-নাওয়াবী (রহিমাহুল্লাহ) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন —

“এই মহান হাদিসটি ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি মৌলিক বিষয়। আলেমগণ বলেছেন, ঈমানের মাধুর্যের অর্থ হলো আনুগত্যমূলক কাজে আনন্দ অনুভব করা, আল্লাহ তা’আলা ও তাঁর রাসূল -এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কষ্ট সহ্য করা, একে দুনিয়াবি লাভের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, এবং আল্লাহর আনুগত্য ও অবাধ্যতা পরিহার করে তাঁকে ভালোবাসা।”

আর ক্বাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন —

“এ ব্যক্তিই প্রকৃতপক্ষে ঈমানের মাধুর্য লাভ করেছে , যার ঈমানের দৃঢ়তা শক্তিশালী, যার অন্তর এতে প্রশান্তি লাভ করেছে, যার বক্ষ এর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে এবং যার সত্তা-মাংস-রক্তের সঙ্গে তা মিশে গেছে।”

“মাংস-রক্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া” – কী অসাধারণ উপমা!! এটা মানে যখন ঈমান আমাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে যাবে, শুধু বাইরের আচার না – তখন এই মাধুর্য অনুভব হবে।

আরেকটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন –

“যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ -কে রাসূল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছে – সে ঈমানের স্বাদ পেয়েছে।” [মুসলিম]

এখানে রাসুলুল্লাহ (সা) আমাদেরকে ঈমানের মাধুর্য অনুভব করার একটা এলগোরিদম দিয়েছেন। এর মাধ্যমে আমরা পাবো “হায়াতান তাইয়িবা”–  পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন জীবন। উদ্দেশ্যময় জীবন। প্রশান্তির জীবন। এরপর আখিরাতে পাবো চিরশান্তির জান্নাত,যার তলদেশে নহরসমুহ প্রবাহিত। সেখানে আমরা চিরকাল থাকবো। চিরকাল একটা প্রিমিয়াম লাইফ লিড করবো, ইনশাআল্লাহ। এই প্রতিশ্রুতি কোনো টেক কোম্পানি দিতে পারবে না, কোনো ইনফ্লুয়েন্সার দিতে পারবে না – একমাত্র আল্লাহই দিতে পারেন।

আর আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন,

যে পুরুষ বা নারী ঈমানদার হয়ে সৎকর্ম করবে, আমি তাকে অবশ্যই পবিত্র জীবন দান করবো।”  (সূরা আন-নাহল: ৯৭)

“যারা ঈমান এনেছে এবং নেক কাজ করেছে তুমি তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ, যার তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীসমূহ…” (সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫)।

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম চায় আমাদের সময়, মনোযোগ, স্বপ্ন  সবকিছু তাদের অনুযায়ী শেইপ করতে। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দেওয়া অ্যালগরিদমে কোনো ট্র্যাকিং নেই। কোনো বিজ্ঞাপন নেই। কোনো ম্যানিপুলেশন নেই।

পরের বার ফোন তোলার আগে এক সেকেন্ড থামি। জিজ্ঞেস করি নিজেকে  এই মুহূর্তে আমি যা করছি  এটা কি আমার আসল পারপাসের সাথে যায়?” সময় চলে যাচ্ছে। প্রতিটি স্ক্রল আমাদের হায়াতের একটা মুহূর্ত শেষ করছে। সেই মুহূর্তগুলো আর ফিরে আসবে না।

কিন্তু এখনো সময় আছে – রিসেট করার।

Leave a Reply