ইসলাম: একটি ফিকরাহ (আদর্শ) ও তরীকা (কর্মপদ্ধতি)

ইসলাম মানুষের মধ্যে থাকা সেই প্রাণশক্তির (Vital energy) অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা তাকে চালিত করে এবং দৈনন্দিন জীবনে সে যে কাজগুলো করে তার দিকে ধাবিত করে। কারণ, এই প্রাণশক্তির অস্তিত্বের ওপর ভিত্তি করেই ইসলাম প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সমাধানসমূহ গড়ে তুলেছে। ইসলাম মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ভক্তি বা ধার্মিকতার সহজাত প্রবৃত্তির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

فَأَقِمۡ وَجۡهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفٗاۚ فِطۡرَتَ ٱللَّهِ ٱلَّتِي فَطَرَ ٱلنَّاسَ عَلَيۡهَاۚ لَا تَبۡدِيلَ لِخَلۡقِ ٱللَّهِۚ ذَٰلِكَ ٱلدِّينُ ٱلۡقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ

“অতএব আপনি একনিষ্ঠ হয়ে দ্বীনের জন্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুন। আল্লাহর সেই প্রকৃতির অনুসরণ করুন, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটিই সরল সুদৃঢ় দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (সূরা আর-রূম: ৩০)।

মহান আল্লাহ আরও বলেছেন:

وَإِذۡ أَخَذَ رَبُّكَ مِنۢ بَنِيٓ ءَادَمَ مِن ظُهُورِهِمۡ ذُرِّيَّتَهُمۡ وَأَشۡهَدَهُمۡ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمۡ أَلَسۡتُ بِرَبِّكُمۡۖ قَالُواْ بَلَىٰ شَهِدۡنَآۚ أَن تَقُولُواْ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ إِنَّا كُنَّا عَنۡ هَٰذَا غَٰفِلِينَ

“আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের বংশধরদের বের করলেন এবং তাদেরকে তাদের নিজেদের ওপর সাক্ষী করে বললেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ, আমরা সাক্ষী রইলাম।’ (যাতে) তোমরা কিয়ামতের দিন এ কথা না বলো যে, ‘আমরা তো এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম।'” (সূরা আল-আরাফ: ১৭২)।

পাশাপাশি, ইসলাম মানুষের অন্যান্য প্রবৃত্তি এবং জৈবিক চাহিদার অস্তিত্বকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:

زُيِّنَ لِلنَّاسِ حُبُّ ٱلشَّهَوَٰتِ مِنَ ٱلنِّسَآءِ وَٱلۡبَنِينَ وَٱلۡقَنَٰطِيرِ ٱلۡمُقَنطَرَةِ مِنَ ٱلذَّهَبِ وَٱلۡفِضَّةِ وَٱلۡخَيۡلِ ٱلۡمُسَوَّمَةِ وَٱلۡأَنۡعَٰمِ وَٱلۡحَرۡثِۗ ذَٰلِكَ مَتَٰعُ ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَاۖ وَٱللَّهُ عِندَهُۥ حُسۡنُ ٱلۡمَ‍َٔابِ

“মানুষের জন্য আকর্ষণীয় করা হয়েছে নারী, সন্তান-সন্ততি, স্তূপীকৃত সোনা ও রূপা, চিহ্নিত অশ্বরাজি, গবাদি পশু ও ক্ষেত-খামারের প্রতি আসক্তিকে। এসব হলো পার্থিব জীবনের ভোগ্য বস্তু। আর আল্লাহর কাছেই রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।” (সূরা আল ইমরান: ১৪)।

এই জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিগুলোই মানুষের প্রাণশক্তি গঠন করে, কারণ সে প্রাকৃতিকভাবেই এগুলো পূরণের জন্য ধাবিত হয়। যদি ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অনুভূতি না থাকত, তবে মানুষ খাওয়া ও পানের দিকে ধাবিত হতো না। যদি স্রষ্টা ও পরিচালকের প্রয়োজনীয়তার অনুভূতি না থাকত, তবে সে পবিত্রতা ঘোষণা ও ইবাদতের দিকে ধাবিত হতো না। যদি বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা না থাকত, তবে সে বিপদ ও ভয় থেকে নিজেকে রক্ষা করত না, রোগের চিকিৎসা করাত না এবং সম্পদের মালিক হওয়ার চেষ্টা করত না। যদি মানব প্রজাতি টিকিয়ে রাখার প্রবণতা না থাকত, তবে সে পারিবারিক জীবন গড়ত না এবং তার সন্তান, পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের প্রতি স্নেহশীল হতো না… সুতরাং জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে নিহিত এই প্রাণশক্তিই হলো মানবীয় আচরণের মূল উৎস।

যেহেতু জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিগুলো পূরণের জন্য এমন কিছু আচরণগত নিয়মাবলি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যা মানুষের জন্য সঠিক পূরণকে নির্দেশ করবে এবং তাকে সুখ ও শান্তির দিকে নিয়ে যাবে, এবং একে এমন ভুল পূরণ থেকে আলাদা করবে যা তাকে দুঃখ-কষ্টের দিকে ঠেলে দেয়; তাই আল্লাহ তাআলা—যিনি মানুষ এবং তার চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলোর স্রষ্টা—মানুষের এই চাহিদাগুলো পূরণের সঠিক আচরণ বর্ণনা করে ওহী নাযিল করেছেন।

ঈমানের বিষয়গুলো—বিশেষ করে স্রষ্টা, পরিচালক ও পথপ্রদর্শক হিসেবে মহামহিম আল্লাহর প্রতি ঈমান—বর্ণনার মাধ্যমে, এবং এরপর ইবাদতসমূহ (নামাজ, রোজা, হজ ইত্যাদি) যার মাধ্যমে মানুষ তার স্রষ্টার ইবাদত করে তা বর্ণনার মাধ্যমে ইসলাম মানুষের মধ্যে ধার্মিকতার প্রবৃত্তি পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে এবং স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্ককে সুসংগঠিত করেছে।

ব্যভিচারকে হারাম করে এবং বিবাহ, পিতৃত্বের বিধান, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, পিতা-মাতার প্রতি সদয় হওয়া ইত্যাদির বিধান দিয়ে ইসলাম প্রজনন প্রবৃত্তি পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে।

অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন পথ, মালিকানার বিধান, চুরি ও অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ হারাম করা, এবং এমনকি হত্যার মাধ্যমে হলেও নিজের জীবন ও সম্পদ রক্ষার অধিকার প্রদানের মাধ্যমে ইসলাম বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে।

পবিত্র খাবার ও পানীয় হালাল করে এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করে জৈবিক চাহিদা পূরণকে সুশৃঙ্খল করেছে… এভাবেই ইসলাম ব্যবস্থা দিয়েছে। ওপরে যা উল্লেখ করা হয়েছে তা কেবল উদাহরণমাত্র; ইসলাম মানুষের সমস্ত সহজাত চাহিদা পূরণকে এমনভাবে সুশৃঙ্খল করেছে যে, কোনো একটি চাহিদাকে অবহেলা করেনি এবং একটি ভারসাম্য বজায় রেখেছে যাতে কোনো একটি প্রবৃত্তি বা চাহিদা অন্যটির ওপর প্রাধান্য বিস্তার না করে।

যেহেতু মানুষের অনেক সহজাত চাহিদা পূরণের জন্য অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন, যাতে তারা পারস্পরিক সম্মতিতে উপকারিতা বিনিময় করতে পারে এবং সম্ভাব্য বিপদ থেকে বাঁচতে পারে, তাই মানুষের জন্য সমাজ গঠন করা অপরিহার্য ছিল। ফলস্বরূপ, সমাজের সম্পর্কগুলোকে সুসংগঠিত করা মানুষের সহজাত চাহিদা পূরণের ব্যবস্থার একটি মৌলিক অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এই চাহিদাগুলো না থাকলে সমাজই গড়ে উঠত না। এর অর্থ হলো, মানবীয় আচরণ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে তৈরি যেকোনো ব্যবস্থাকে কেবল ব্যক্তি-কেন্দ্রিক নির্দেশনার বাইরে গিয়ে মানব সমাজকে একটি সামষ্টিক সত্তা হিসেবে সম্বোধন করতে হবে, পাশাপাশি ব্যক্তিকে দেওয়া নির্দেশনার বিষয়টি তো রয়েছেই।

এর মানে আরও এই যে, এই ব্যবস্থা কেবল কিছু ব্যক্তির স্বেচ্ছায় এর নির্দেশনা ও নিয়মাবলি মেনে চলার উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে না। কারণ, সমাজের সম্পর্কগুলোকে সুশৃঙ্খল করা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সমাজের সাধারণ সদস্যরা তা মেনে চলে। এখান থেকেই এমন একটি ব্যবস্থার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়, যা মানুষের সহজাত চাহিদা পূরণের নিয়মাবলির সাথে এমন একটি পদ্ধতি যুক্ত করে, যা বাস্তব জীবনে একে কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং কীভাবে তা রক্ষা করতে হবে তা বর্ণনা করবে।

এ কারণেই ইসলাম কেবল সেই ফিকরাহ (মৌলিক দর্শন বা আদর্শ)-এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি যা প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদাগুলোর সঠিক পূরণের দিক নির্দেশনা দেয়, বরং এটি সেই তরীকা (পদ্ধতি)-কেও বর্ণনা করেছে যার মাধ্যমে এই মতাদর্শ বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়, সমাজে বাস্তবায়িত হয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর মাধ্যমে তা সংরক্ষিত হয়। আর এ কারণেই বলা হয়, ইসলাম হলো “ফিকরাহ ও তরিকা” (আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি)।

সুতরাং ইসলাম, যা প্রজনন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে ব্যভিচারকে হারাম করেছে, সেই হারামের সাথে ব্যভিচারের শাস্তির (হদ) বিধানও যুক্ত করেছে—যা হলো এই সমাধানের বাস্তবায়নের একটি তরীকা (পদ্ধতি)। এটি যখন মদ, চুরি, ধর্মত্যাগ (রিদ্দাহ) এবং মুমিন নারী-পুরুষের ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়াকে হারাম করেছে, তখন এই নিষেধাজ্ঞার সাথে এমন দণ্ডবিধি যুক্ত করেছে যার মাধ্যমে লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়া হয়। এটি যখন জীবন ও শরীরের ওপর আক্রমণকে হারাম করেছে, তখন এর পাশাপাশি কিসাস (প্রতিশোধমূলক শাস্তি)-এর বিধান দিয়েছে এবং অন্যান্য শরিয়াহ লঙ্ঘনের জন্য তা’যীর (শাস্তিমূলক ব্যবস্থা)-এরও বিধান দিয়েছে।

ইসলাম যখন সাধারণভাবে শরীয়ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছে, তখন এই বাস্তবায়নের একমাত্র বৈধ পদ্ধতিও বর্ণনা করেছে, আর তা হলো রাষ্ট্র, যা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ ইসলাম দিয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি ও এর ব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে কিতাব (কুরআন) ও সুন্নাহতে বর্ণনা করেছে। নবুওয়ত লাভের পর থেকে মদিনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত এই রাষ্ট্র কায়েমের উদ্দেশ্যে রাসূল (সা.) যে কাজগুলো করেছিলেন, তা-ই হলো এই রাষ্ট্র অনুপস্থিত থাকলে তা প্রতিষ্ঠার একমাত্র শরীয়াহসম্মত ও বাস্তব পদ্ধতি।

এরপর রাসূল (সা.) মদিনায় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা তাঁর যুগেই পুরো আরব উপদ্বীপ জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল, তা-ই সব যুগে ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য অনুকরণীয় বাস্তব মডেল; কারণ এটি মানুষের সমস্যাগুলো সমাধান করে এবং তার প্রবৃত্তিগুলোকে সুসংগঠিত করে। সুতরাং এই মডেলটিকে কতটা অনুসরণ করা হলো, তা-ই হলো এই ব্যবস্থা ও সমাধানগুলো বাস্তবায়নে সফলতার মাপকাঠি।

ইসলাম, যা এর দাওয়াতকে সমগ্র বিশ্বের কাছে পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছে, তা পৌঁছানোর তরিকা (পদ্ধতি)-ও বর্ণনা করেছে—আর তা হলো দাওয়াত ও জিহাদ, যা রাষ্ট্র পরিচালনা করে এবং এটিকে তার পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি বানায়। ইসলাম, যা শাসকের হিসাব নেওয়া এবং সে যদি ইসলামি ব্যবস্থার বিরোধিতা করে বা এর অপপ্রয়োগ করে তবে তাকে পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে, তা করার একটি তরিকাও নির্ধারণ করেছে—আর তা হলো ইসলামি আকিদার ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক দল গঠন করা অপরিহার্য, যা রাষ্ট্র, সমাজের চিন্তাভাবনা এবং সংস্কৃতির ওপর নজর রাখবে; যাতে তারা দাওয়াত, শিক্ষাদান এবং হিসাব নেওয়ার মাধ্যমে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দায়িত্ব পালন করতে পারে।

ইসলাম, যা তার বার্তাকে রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছে, এর জন্য একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করেছে—তা হলো প্রতিরোধমূলক জিহাদ, যার মাধ্যমে উম্মাহ এবং মতাদর্শের শত্রুদের প্রতিহত করা হয়।

ইসলাম ফিকরাহ (ধারণা)-এর বিধান এবং তরীকা (পদ্ধতি)-এর বিধানের মধ্যে তা মেনে চলা ও আঁকড়ে ধরার আবশ্যিকতার ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করেনি। এগুলো সবই শর’ঈ বিধান, যা আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাব এবং তাঁর নবীর (সা.) সুন্নাহতে নাজিল করেছেন এবং এগুলো মহান আল্লাহর এই বাণীর অন্তর্ভুক্ত:

ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়িদাহ: ৩)।

সুতরাং এগুলো মেনে চলার আবশ্যিকতার দিক থেকে ফিকরাহ এবং তরিকার বিধানের মধ্যে পার্থক্য করা জায়েজ নয়; কারণ এ দুটিই হলো দ্বীন, যার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱدۡخُلُواْ فِي ٱلسِّلۡمِ كَآفَّةٗ وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ إِنَّهُۥ لَكُمۡ عَدُوّٞ مُّبِينٞ

“হে মুমিনগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল-বাকারাহ: ২০৮)।

এই আয়াতে ‘সিলম’ বলতে সমগ্র ইসলামকে বোঝানো হয়েছে। বিধানের এই দুটি প্রকারের (ফিকরাহ ও তরীকা) মধ্যকার এই বিভাজন নবুওয়তের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী শতকগুলোতে অধিকাংশ যুগের ফিকহবিদদের কাছে পরিচিত ছিল না। তাহলে কেন আমরা আমাদের বর্তমান ইসলামি সংস্কৃতিতে এই বিভাজনটি গ্রহণ করছি? এটি একটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন। বরং আমাদের এই বিভাজন সম্পর্কে যারা অবগত হবেন, তাদের প্রত্যেকেরই এই প্রশ্নটি উত্থাপন করা উচিত। কারণ, যদিও পরিভাষার বিষয়ে কোনো বাধানিষেধ নেই, তবুও কোনো ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা ছাড়া কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক বিলাসিতার জন্য নতুন ফিকহি বা চিন্তাগত বিভাজন এবং পরিভাষা তৈরি করা জায়েজ নয়।

তাই আমরা এই প্রশ্নের উত্তরে বলব যে, এই বিভাজনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে এবং নিচে তা বর্ণনা করা হলো:

বিগত দুই শতাব্দীতে অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী এবং কিছু ফিকহবিদের মধ্যে একটি ধারণা প্রবল হয়ে ওঠে যে, ইসলাম মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং তার সমস্যা সমাধানে কিছু বিধান দিয়েছে, যা মেনে চলা অপরিহার্য। তবে, এই ব্যবস্থা ও সমাধানগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইসলাম যেসব পদ্ধতির প্রস্তাব করেছিল, সেগুলো ইসলামের প্রাথমিক যুগের জন্য উপযুক্ত ছিল; বর্তমান যুগে সেগুলো মেনে চলার কোনো আবশ্যকতা নেই, এবং আমরা বর্তমান যুগের সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন নতুন পদ্ধতি ও উপায় গ্রহণ করতে পারি।

উসমানীয় খিলাফতের শেষ যুগে এমন কিছু মতামতের উদ্ভব হয় যা অতীতের যুগে পূর্ববর্তীদের অজানা ছিল। কেউ কেউ শর’ঈ হদ (নির্ধারিত শাস্তি)-এর পরিবর্তে তা’যিরী (বিচারকের বিবেচনামূলক) শাস্তির বিধান দেওয়াকে বৈধ ঘোষণা করে। ফলে উসমানীয় দণ্ডবিধি প্রণীত হয়, যা শর’ঈ হদগুলোকে অকার্যকর করে দেয় এবং তার জায়গায় তা’যিরী শাস্তির প্রবর্তন করে। এর পেছনে যুক্তি দেখানো হয় যে, শরিয়তের উদ্দেশ্য হলো হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা এবং হদগুলো হলো সেই বিরত রাখার উপায়; সুতরাং একটি শাস্তির বদলে অন্যটি দিলে কোনো ক্ষতি নেই, যতক্ষণ না এর উদ্দেশ্য অপরাধীকে নিবৃত্ত করা হয়।

তৎকালীন লেখক এবং গ্রন্থকাররা ‘মাকাসিদ আশ-শরীয়াহ’ (শরীয়তের উদ্দেশ্য) তত্ত্বের কথা বারবার বলতে থাকেন। এর মূল কথা হলো, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রণীত বিধানগুলোর কিছু উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছেন, যার জন্য এই বিধানগুলো দেওয়া হয়েছে; এবং এই বিধানগুলো তাদের উদ্দেশ্য থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা মনে করতে লাগলেন যে, মূল বিধানগুলোর চেয়ে এর উদ্দেশ্যগুলোর ওপরই বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। এটি শেষ পর্যন্ত উদ্দেশ্যের দোহাই দিয়ে মূল বিধানগুলোকেই বর্জন করার দিকে নিয়ে যায়।

সত্য হলো, যারা এই তত্ত্বের পক্ষে কথা বলেছেন, তারা বেশ কিছু ভুল করেছেন; এবং পরবর্তীতে যারা এসেছেন, তারা প্রাথমিক যুগের প্রবক্তাদের নির্ধারিত সীমারেখা ও শর্তগুলোকে উপেক্ষা করে সেই ভুলগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন।

প্রথম ভুলটি হলো: তারা শরিয়তের ‘ইল্লত’ (যে কারণের ওপর ভিত্তি করে আইনপ্রণেতা বিধান দিয়েছেন) এবং বিধানের ‘উদ্দেশ্য’ (মাকসাদ)-এর মধ্যে গোলমাল করে ফেলেছেন। ইল্লত হলো এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যার ওপর শরীয়তপ্রণেতা কোনো বিধানকে নির্ভরশীল করেছেন—অর্থাৎ, ইল্লত থাকলে বিধান থাকে, ইল্লত না থাকলে বিধান থাকে না। অন্যদিকে, উদ্দেশ্যগুলো হলো এমন কিছু যা শরীয়তপ্রণেতা বিধানের মাধ্যমে অর্জন করতে চেয়েছেন, কিন্তু বিধানগুলোকে এর ওপর নির্ভরশীল করেননি; অর্থাৎ, বিধানগুলোর ওপর এর কোনো প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ নেই। কারণ, কোনো ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য অর্জিত না-ও হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে বিধানটি বাতিল হয়ে যাবে। এটি শর’ঈ ইল্লতের ঠিক বিপরীত, কারণ ইল্লত ছাড়া বিধানের কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

দ্বিতীয় ভুলটি হলো: তারা ভেবেছিলেন যে কোনো শর’ঈ প্রমাণ (দলীল) ছাড়াই তারা বিধানের উদ্দেশ্যগুলো জানতে পারবেন।

তৃতীয়ত: তারা মনে করেছিলেন যে শর’ঈ প্রমাণ ছাড়াই তারা শরীয়তের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য নতুন বিধান তৈরি করার অধিকার রাখেন; এমনকি যদি এর ফলে শরীয়তপ্রণেতা যে বিধানগুলো নির্ধারণ করেছেন তা বাতিল করার প্রয়োজনও হয়। তারা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, নতুন বাস্তবতার কারণে বিধানগুলোকে উন্নত করা প্রয়োজন এবং পুরোনো পদ্ধতির ওপর অটল থাকা ঠিক নয়। তারা এমন একটি কথা প্রচার করেন যে, “সময় ও স্থানের পরিবর্তনে বিধানের পরিবর্তন করা যায়” এবং যা তার ভুলভাবে দাবি করেন যে এটি একটি শর’ঈ মূলনীতি।

ইসলামি রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি এবং ইসলামি জীবনব্যবস্থা থেকে উম্মাহর ছিটকে পড়ার পর থেকে আমরা যে বর্তমান বাস্তবতায় বাস করছি, তাতে পশ্চিমা সংস্কৃতি, প্রচলিত মানবসৃষ্ট ব্যবস্থা এবং ইসলামের বিধানের ওপর সুপরিকল্পিত আক্রমণের চাপে অনেক মুসলিম বুদ্ধিজীবী পরাস্ত হয়েছেন; যাদের মধ্যে ইসলামি জীবন পুনরায় শুরু করার আহ্বানকারী ব্যক্তি এবং দলগুলোও রয়েছে। তারা ইসলামের বিধানের বিকল্প হিসেবে দেওয়া অনেক প্রস্তাবনার কাছে মাথানত করেছেন, বিশেষত যেগুলো তরীকা (পদ্ধতি)-র বিধানের সাথে সম্পর্কিত।

একটি কথা বেশ প্রচলিত হয়ে গেছে যে, ইসলাম শাসনব্যবস্থার জন্য কোনো বিস্তারিত পদ্ধতি নির্ধারণ করেনি; সুতরাং এমন কোনো মানবসৃষ্ট শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করায় কোনো বাধা নেই যা পরামর্শ (শূরা) এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। এর ফলে প্রজাতন্ত্র, সংসদীয়, মন্ত্রীপরিষদ শাসিত এবং নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের মতো গণতন্ত্রের বিভিন্ন রূপ গ্রহণের দরজা খুলে যায়।

একইভাবে, একটি ধারণা প্রচলিত হয় যে, অতীতে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি এবং যোগাযোগের দুর্বল মাধ্যমের কারণে জিহাদকে গ্রহণ করা হয়েছিল; কিন্তু আজ জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ধারণার প্রসারের এবং যোগাযোগ ও গণমাধ্যমের উন্নতির কারণে জিহাদের মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াত পৌঁছানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। ফলে দাবি করা হয় যে, জিহাদ কেবল আগ্রাসন প্রতিরোধের ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য।

ইসলামি রাষ্ট্র পুনর্গঠনে কর্মরতদের মাঝে এ কথাও ছড়িয়ে পড়ে যে, ইসলাম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি; রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূল (সা.) যে কাজগুলো করেছিলেন, সেগুলো নিছক কিছু পদ্ধতি, ইজতিহাদ এবং মানবিক অভিজ্ঞতা, যা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তারা রাসূল (সা.)-এর সেই কাজগুলোর মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যটি লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হন—যেগুলো তিনি আল্লাহর নির্দেশে বাধ্যতামূলকভাবে করেছিলেন এবং যেগুলো তিনি কেবল অনুমোদিত হিসেবে আইনি উদ্দেশ্য পূরণের পদ্ধতি বা মাধ্যম হিসেবে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছিলেন।

ফলে তারা পরিবর্তনের এমন সব পদ্ধতি গ্রহণ করতে শুরু করেন, যা রাসূল (সা.)-এর পদ্ধতির বিরোধী। কখনও তারা কোনো নিয়মনীতি ছাড়া সশস্ত্র সংগ্রাম গ্রহণ করেছেন, কখনও তারা গণতন্ত্র এবং মানবসৃষ্ট আইনে পরিচালিত ক্ষমতায় অংশগ্রহণের পথ বেছে নিয়েছেন, আবার কখনও দাতব্য কাজকে অনুসারী ও সমর্থক টানার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

এমনকি কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র ছাড়াই ইসলামের সমাধানগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাদের মতে, ওয়াজ ও নসিহতই মানুষকে ফরয ও নফল ইবাদত পালনে এবং হারাম ও মাকরূহ ছেড়ে দেওয়ার ব্যপারে উৎসাহিত করতে যথেষ্ট। তারা মনে করেন ইসলামি স্কুল-কলেজগুলো ইসলামি সংস্কৃতি ও জ্ঞান শেখাতে সক্ষম; দাতব্য সংস্থা ও স্বেচ্ছায় দেওয়া যাকাত তহবিল দরিদ্রদের প্রয়োজন মেটাতে যথেষ্ট; ইসলামি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতি ও সম্পদের ইসলামি বিধান বাস্তবায়ন করবে; এবং পারিবারিক বিষয়াদি ও সামাজিক লেনদেনের আইনের জন্য শরীয়াহ আদালত তো রয়েছেই এবং মুসলিমদের মধ্যকার দন্দ্ব নিরসনের জন্য আলেম ও ফকীহগণ ঐক্যবদ্ধ মত দিতে পারেন। আধুনিক গণমাধ্যম এবং ইন্টারনেট বিশ্বের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতে সক্ষম।

এমন আরও অনেক দাবি, যা ইসলামের সেই শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের বৈশিষ্ট্য কেড়ে নেয় যা আল্লাহ তা’আলা এর জন্য নির্ধারণ করেছেন, যখন তিনি বলেছেন:

هُوَ ٱلَّذِيٓ أَرۡسَلَ رَسُولَهُۥ بِٱلۡهُدَىٰ وَدِينِ ٱلۡحَقِّ لِيُظۡهِرَهُۥ عَلَى ٱلدِّينِ كُلِّهِۦ وَلَوۡ كَرِهَ ٱلۡمُشۡرِكُونَ

“তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সকল দ্বীনের ওপর বিজয়ী করেন, মুশরিকরা তা যত অপছন্দই করুক না কেন।” (সূরা আস-সাফ: ৯)।

এবং যেমনটি রাসূল (সা.) বলেছেন:

الإسلام يعلو ولا يعلى

“ইসলাম বিজয়ী হয়, এর ওপর কেউ বিজয়ী হতে পারে না।”

এই মানুষগুলো ভুলে গেছেন—বা হয়তো জেনেও না জানার ভান করছেন—যে সমাজে রাষ্ট্র কর্তৃক বাস্তবায়িত ব্যবস্থাই মূলত সমাজের সম্পর্কগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এর ওপর তার নিজস্ব ছাপ ফেলে। প্রকৃতপক্ষে, এই ভ্রান্ত ধারণার মানুষগুলো যেসব দাতব্য, শিক্ষামূলক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, সেগুলো প্রচলিত মানবসৃষ্ট আইন এবং সেই শাসকদের নীতির অনুমোদন ছাড়া টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।

এরা ভুলে গেছেন যে শাসনক্ষমতা ও কর্তৃত্ব ছাড়া জীবন এবং সমাজের কোনো ব্যবস্থাই বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এবং এক সমাজে কখনও দুটি ব্যবস্থা একসাথে চলতে পারে না, বিশেষ করে যখন এর একটি হয় ইসলাম।

সুতরাং, এটা স্পষ্ট করা অপরিহার্য যে, ইসলাম কেবল কিছু আধ্যাত্মিক, নৈতিক বা আচরণগত নির্দেশিকার সমষ্টি নয়, যা মানুষ তাদের জীবন পরিচালনাকারী (বিদ্যমান) প্রভাবশালী ব্যবস্থার তোয়াক্কা না করে (তা আলাদাভাবে) স্বেচ্ছায় অনুসরণ করে। বরং, ইসলাম হলো জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। এটি মানুষের প্রাণশক্তি এবং এই শক্তির জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্কগুলো থেকে উদ্ভূত সমস্যাগুলোর সমাধান প্রদান করে। ইসলামে এমন একটি পদ্ধতি রয়েছে যা এই ব্যবস্থাকে গ্রহণকারীদের কাছে ব্যাখ্যা করে দেয় কীভাবে এটিকে বাস্তবায়ন, প্রচার এবং রক্ষা করতে হবে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, যে আকিদা (বিশ্বাস) এই দুনিয়ার জীবন, এর আগে কী ছিল এবং পরে কী হবে সে সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা দেয় এবং মানুষের সমস্যার সমাধান দেয়, পাশাপাশি যে শর’ঈ বিধানগুলো মানুষের বিষয়াবলি সুসংগঠিত করে—তা-ই আমরা “ফিকরাহর বিধান” পরিভাষা দ্বারা বুঝিয়েছি। অন্যদিকে, বাস্তব জীবনে ও সমাজে এই সমাধানগুলো বাস্তবায়ন করতে, পৃথিবীতে এর প্রসার ঘটাতে এবং একে রক্ষা করার জন্য ইসলাম যে বিধানগুলো পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে, তাকেই আমরা “তরীকার বিধান” পরিভাষা দ্বারা বুঝিয়েছি।

সুতরাং, ইবাদতের বিধান, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সম্পত্তি আইন, নারী-পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং তার ফলাফল, খাদ্য, পোশাক ও নৈতিকতার বিধান… এ সবই হলো ফিকরাহ-এর বিধান।

অন্যদিকে, ইসলামি রাষ্ট্র, এর শাসনব্যবস্থা, বায়তুল মাল, গণমাধ্যম, শাস্তির বিধান (হদ, কিসাস, তা’যীর), পররাষ্ট্রনীতি এবং জিহাদের বিধানগুলো… সবই হলো তরীকার বিধান। রাজনৈতিক দল গঠন এবং শাসকদের হিসাব নেওয়ার দায়িত্বও তরীকার বিধানের অন্তর্ভুক্ত।

ফিকরাহ এবং তরিকার বিধানগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা এদের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য দেখতে পাই। ফিকরাহ-এর বিধানগুলো শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলোর মূল উদ্দেশ্যই হলো এগুলো মেনে চলা এবং এদের নিজস্ব সত্তার জন্য এগুলো বাস্তবায়ন করা। অন্যদিকে, তরীকার বিধানগুলো যেহেতু ফিকরাহ-এর বিধানগুলো বাস্তবায়ন, প্রচার এবং সংরক্ষণের পদ্ধতি হিসেবে প্রণীত হয়েছে, তাই এই কাজগুলো এদের নিজস্ব সত্তার জন্য কাম্য নয়; অর্থাৎ এর কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের দিকে খেয়াল না রেখে শুধু এগুলো পালন করা জায়েজ নয়। বরং, তরীকার বিধানগুলোকে ঠিক এমনভাবেই বাস্তবায়ন করতে হবে যা সেই উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়ক হয়, যার জন্য এগুলো প্রণীত হয়েছে, যদিও সম্ভাবনা রয়েছে কখনো কখনো এসব উদ্দেশ্য অর্জিত নাও হতে পারে।

অতএব, ইসলামি রাষ্ট্র তার নিজস্ব সত্তার কারণেই কাঙ্ক্ষিত নয়, এবং এটি মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত কোনো লক্ষ্য নয়; বরং এটি সমাজে ইসলাম বাস্তবায়ন এবং বিশ্বে এর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি তরীকা (পদ্ধতি)। সুতরাং, শরীয়ত অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও এর প্রতিষ্ঠানসমূহ গঠন করার সময় এবং এর গৃহীত নীতিসমূহ নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে, ইসলামী ব্যবস্থার যথাযথ বাস্তবায়ন এবং বিশ্বের কাছে ইসলামের রিসালাহ বার্তার যথাযথ বহন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

এই রাষ্ট্রের যথাযথ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে এবং এর জন্য নির্ধারিত ভূমিকা বজায় রাখতে, শরীয়ত মুসলমানদেরকে রাষ্ট্রকে আন্তরিক পরামর্শ প্রদানে বাধ্য করে। প্রকৃতপক্ষে, প্রয়োজন দেখা দিলে রাষ্ট্রকে জবাবদিহি করার জন্য তাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে, যেহেতু রাষ্ট্র তাদের পক্ষ থেকেই ইসলাম বাস্তবায়ন এবং এর রিসালাহ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। এই জবাবদিহিতা কেবল স্বেচ্ছামূলক বা ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এই রাষ্ট্র যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য শরীয়ত মুসলমানদের ওপর অন্তত একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা ফরজ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلۡتَكُن مِّنكُمۡ أُمَّةٞ يَدۡعُونَ إِلَى ٱلۡخَيۡرِ وَيَأۡمُرُونَ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَيَنۡهَوۡنَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِۚ وَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ

“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত যারা কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অন্যায় কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সূরা আল ইমরান: ১০৪)।

ইমাম ইবনে কাছীর এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “এই আয়াতের অর্থ হলো, উম্মতের মধ্য থেকে এই কাজের জন্য নিবেদিত একটি দল থাকা উচিত, যদিও নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী এই কাজটি করা প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরজ।”

এই কর্তব্যের অগ্রভাগে রয়েছে শাসকদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা, কারণ রাষ্ট্রের ন্যায়পরায়ণতা অপরিসীম কল্যাণ বয়ে আনে, পক্ষান্তরে এর দুর্নীতি ব্যাপক ক্ষতি ও ধ্বংস ডেকে আনে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

أفضل الجهاد كلمة حق عند سلطان جائر

“সবচেয়ে উত্তম জিহাদ হলো অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলা।”

সুতরাং, ইসলামি আকিদার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য শরীয়ত নিজস্ব কোনো কারণে নির্দেশ দেয়নি; বরং এগুলো তরিকার বিধানের অন্তর্ভুক্ত যা অন্য উদ্দেশ্যে প্রণীত হয়েছে।

ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে যখন ইসলামী জীবনযাত্রা বিদ্যমান থাকে, তখন এই রাজনৈতিক কাঠামোগুলোর ভূমিকা হলো শাসকদের উপর নজর রাখা, তাদের পরামর্শ দেওয়া এবং যখনই তারা ব্যর্থ হয়, অন্যায় আচরণ করে বা নিপীড়ন চালায়, তখন তাদের জবাবদিহি করা। তাদের ভূমিকার মধ্যে সমাজের সংস্কৃতি ও সম্মিলিত জনসচেতনতার অভিভাবকত্বও অন্তর্ভুক্ত, যাতে তা ইসলামী সংস্কৃতি ও তার ভাবধারা দ্বারা গঠিত হতে থাকে এবং ইসলামের জন্য অপরিচিত কোনো সাংস্কৃতিক বা সভ্যতামূলক প্রভাব যেন জনরীতিতে, এবং ফলস্বরূপ জনমত ও সামাজিক সম্পর্কে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। কারণ একটি ইসলামী সমাজ অ-ইসলামী ধারণা ও আবেগ দ্বারা কতটা প্রভাবিত হয়, তা-ই নির্ধারণ করে যে তার ইসলামী জীবনযাত্রা কতটা বিঘ্নিত হবে এবং ইসলামী জীবন থেকে কতটা দূরে সরে যেতে শুরু করবে। ইসলামী ইতিহাস এই নীতির সবচেয়ে সুস্পষ্ট সাক্ষ্য।

আর যখন ইসলামী জীবন অনুপস্থিত থাকে, যেমনটা আজকের উম্মাহর বাস্তবতা, তখন ধরে নেওয়া হয় যে, এই রাজনৈতিক কাঠামোসমূহ এবং তাদের দ্বারা পরিচালিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অবশ্যই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবন পুনঃপ্রবর্তনের জন্য শরীয়াহসম্মত ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হিসেবে কাজ করবে।

সুতরাং, শরীয়াহর প্রমাণ থেকে উদ্ভূত পদ্ধতির শরীয়াহসম্মত বিধানের উপর ভিত্তি করে এই কাঠামো কর্তৃক পরিচালিত কর্মকাণ্ডসমূহ—এর গঠন থেকে শুরু করে, এর পাঠচক্র তৈরি, চক্রের মধ্যে আদর্শগত সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রক্রিয়া, সমাজের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখা, অ-ইসলামী ধারণার মোকাবিলা করা, শাসককে রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করা, এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ (সামরিক সমর্থন) চাওয়া পর্যন্ত—এই সবকিছুর কোনোটিই কেবল নিজের স্বার্থে করা যাবে না। বরং, প্রতিটি কাজই সেই উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের প্রতি সতর্ক মনোযোগ দিয়ে সম্পাদন করতে হবে, যার জন্য সেগুলো আইন হিসেবে প্রণীত হয়েছে। অন্যথায়, এই কর্মকাণ্ডগুলো কেবল প্রতীকী ও অর্থহীন অনুশীলন এবং প্রকৃতপক্ষে সময়ের অপচয় হবে।

কাঠামোটিকে অবশ্যই একটি বাস্তব ও কার্যকর হতে হবে, কেবল আনুষ্ঠানিক বা বাহ্যিক কাঠামো হলে চলবে না। এটি কেবল তখনই অর্জন করা সম্ভব, যদি তা একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি ও পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গঠিত হয়, যা এর সকল সদস্য ব্যতিক্রমহীনভাবে গ্রহণ ও মেনে চলে এবং যদি এর এমন একটি প্রশাসনিক কাঠামো থাকে যা এর লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রগতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। এর পরিমণ্ডলগুলোর গঠন এবং সেগুলোর মধ্যে আদর্শগত সংস্কৃতিচর্চা অবশ্যই সেই উদ্দেশ্য দ্বারা পরিচালিত হতে হবে, যার জন্য এগুলো মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

এর উদ্দেশ্য হলো ইসলামী ব্যক্তিত্ব এবং দাওয়াহর আন্তরিক বাহক তৈরি করা। জনসমক্ষে আলোচনা অবশ্যই সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হতে হবে, যার জন্য এটি আইন হিসেবে প্রণীত হয়েছিল, অর্থাৎ প্রচলিত রীতিনীতি পরিবর্তন করা এবং তারপর সেগুলোকে ইসলামী ধারণা অনুযায়ী নতুন রূপ দেওয়া, যা চূড়ান্তভাবে ইসলামী জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেবে।

রাজনৈতিক সংগ্রামও অবশ্যই তার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হতে হবে: ঔপনিবেশিক আধিপত্যের পরিকল্পনা উন্মোচন করা, শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা ও শরীয়াহ লঙ্ঘন প্রকাশ করা এবং তাদের মিথ্যা বৈধতাকে ভেঙে ফেলা।

আর নুসরাহ (সামরিক সমর্থন) চাওয়ার ক্ষেত্রে, তা অবশ্যই সেই উদ্দেশ্যেই গ্রহণ করতে হবে যার জন্য এটি বিধান করা হয়েছিল: ইসলামকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, অর্থাৎ একে শাসন ও কর্তৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করা।

জিহাদ, যা তরীকার বিধানগুলোর মধ্যে অন্যতম মহৎ, এটিও নিজের সত্তার জন্য করা হয় না; বরং এটি করার সময় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে খেয়াল রাখতে হয়। যেমন: ইসলামি ভূখণ্ড থেকে কাফির শত্রুকে বিতাড়ন করা, দারুল কুফর জয় করে দারুল ইসলামে পরিণত করা, শত্রুকে দুর্বল করা যাতে তার বিপদ হতে রক্ষা পাওয়া যায় এবং তাকে পরাজিত করা যায় অথবা শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করা যাতে সে উম্মাহ ও তার স্বার্থের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে না পারে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

وَأَعِدُّواْ لَهُم مَّا ٱسۡتَطَعۡتُم مِّن قُوَّةٖ وَمِن رِّبَاطِ ٱلۡخَيۡلِ تُرۡهِبُونَ بِهِۦ عَدُوَّ ٱللَّهِ وَعَدُوَّكُمۡ وَءَاخَرِينَ مِن دُونِهِمۡ لَا تَعۡلَمُونَهُمُ ٱللَّهُ يَعۡلَمُهُمۡۚ

“আর তোমরা তাদের মোকাবিলার জন্য তোমাদের সাধ্যমতো শক্তি ও অশ্ববাহিনী প্রস্তুত রাখো, যা দিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে…” (সূরা আল-আনফাল: ৬০)।

আর তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

[وَقَٰتِلُوهُمۡ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتۡنَةٞوَيَكُونَ ٱلدِّينُ كُلُّهُۥ لِلَّهِۚ] 

আর তাদের সাথে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তাদের উপর অত্যাচার শেষ হয়ে যায় এবং দ্বীন একমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট হয়। [সূরা আল-বাকারা: ১৯৩]

আর তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

[وَمَا لَكُمۡ لَا تُقَٰتِلُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱلۡمُسۡتَضۡعَفِينَ مِنَ ٱلرِّجَالِ وَٱلنِّسَآءِ وَٱلۡوِلۡدَٰنِ ٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَآ أَخۡرِجۡنَا مِنۡ هَٰذِهِ ٱلۡقَرۡيَةِ ٱلظَّالِمِ أَهۡلُهَا وَٱجۡعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ وَلِيّٗا وَٱجۡعَل لَّنَا مِن لَّدُنكَ نَصِيرًا]

আর তোমাদের কী হয়েছে? তোমরা আল্লাহর পথে এবং সেইসব নির্যাতিত পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য যুদ্ধ করো না, যারা বলে, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে এই অত্যাচারী লোকদের শহর থেকে বের করে আনো এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন রক্ষক নিযুক্ত করো ও তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একজন সাহায্যকারী নিযুক্ত করো।” [সূরা আন-নিসা: ৭৫]

হুদুদ (নির্ধারিত শাস্তি) এবং কিসাস (প্রতিশোধমূলক শাস্তি)-এর মতো শাস্তির বিধানগুলো শুধুমাত্র অপরাধীদের এবং অন্যদের, যাদের আত্মা তাদেরকে অপরাধ, মন্দ কাজ ও সীমালঙ্ঘন করতে প্রলুব্ধ করতে পারে, তাদের নিবৃত্ত করার জন্যই প্রণয়ন করা হয়েছিল। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন,

[وَلَكُمۡ فِي ٱلۡقِصَاصِ حَيَوٰةٞ يَٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ] 

আর হে জ্ঞানীরা, কিসাসের বিধানে তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা সৎকর্মশীল হতে পারো। [সূরা আল-বাকারা: ১৭৯]।

আর তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বললেন,

[ٱلزَّانِيَةُ وَٱلزَّانِي فَٱجۡلِدُواْ كُلَّ وَٰحِدٖ مِّنۡهُمَا مِاْئَةَ جَلۡدَةٖۖ وَلَا تَأۡخُذۡكُم بِهِمَا رَأۡفَةٞ فِي دِينِ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ تُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِۖ وَلۡيَشۡهَدۡ عَذَابَهُمَا طَآئِفَةٞ مِّنَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ]

[ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী পুরুষ—তাদের প্রত্যেককে একশটি করে বেত্রাঘাত কর। আর তাদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরকে আল্লাহর দ্বীন পালনে বিরত না করে, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হও। আর একদল মুমিনকে তাদের শাস্তির সাক্ষী থাকতে দাও।] [সূরা আন-নূর: ২]।

সুতরাং, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এই আদেশ দিয়েছেন যে, মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে। এর উদ্দেশ্য হলো, যারা অশ্লীল কাজ করতে প্রলুব্ধ হতে পারে, তাদের জন্য তারা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

তবে, আমাদের এই বক্তব্য যে, ইসলাম একটি আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি এবং এই পদ্ধতি সম্পর্কিত শরীয়াহ বিধানসমূহ বাধ্যতামূলক, এর অর্থ এই নয় যে, ইসলাম এই ধারণার প্রতিটি দিকের জন্য একটি বিশদ বিধান প্রণয়ন করেছে, যা এর বাস্তবায়ন পদ্ধতিকে স্পষ্ট করে দেবে। বরং এর অর্থ হলো, এই পদ্ধতি (তরীকাহ) সম্পর্কিত যে বিধানসমূহ ইসলাম প্রণয়ন করেছে, তা আমাদের উপর বাধ্যতামূলক, ঠিক যেমন অন্যান্য সকল শরীয়াহ বিধান, ঠিক যেমন মূল ফিকরাহ’র শরীয়াহ বিধানসমূহ। এই অজুহাতে সেগুলোকে উপেক্ষা করা জায়েজ নয় যে, এগুলো অন্য কিছুর জন্য প্রণীত বিধান, নিজেদের জন্য নয়, অথবা এই দাবিতেও নয় যে, বিধানসমূহ সময় ও স্থানভেদে পরিবর্তিত হতে পারে।

অতএব, শরীয়ত যখন ফিকরাহর কোনো বিধান দেয় কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য কোনো বিস্তারিত তরিকা নির্ধারণ করে না, তখন মুসলমানরা উপযুক্ত “ওসায়িল” (উপকরণ) এবং “আসালীব” (শৈলী/কৌশল) বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা রাখে। এখান থেকেই “তরীকা”-এর সাথে “ওসায়িল ও আসালীব”-এর মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। তরীকার বিধানগুলো শর’ঈ দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং মানা বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে, ওসায়িল এবং আসালীব হলো বৈধ বস্তু এবং কাজ, যার মধ্য থেকে মুসলমানরা উপযুক্তটি বেছে নিতে পারে।

পদ্ধতির বিধানগুলো বাধ্যতামূলক, কারণ শরীয়ত এগুলোকে বাধ্যতামূলক করেছে এবং এর সপক্ষে শরীয়তসম্মত প্রমাণও দিয়েছে। সুতরাং, মুসলমানরা এগুলো মেনে চলতে বাধ্য এবং এগুলো গ্রহণ করা বা না করার ব্যাপারে তাদের কোনো বিকল্প নেই। আর উপায় (style) ও উপকরণ (means)-এর ক্ষেত্রে, এগুলো হলো অনুমোদিত কাজ বা উপকরণ; শরীয়ত এগুলোর অনুমোদন নির্দেশ করেছে, বাধ্যবাধকতা নয়। তাই, মুসলমানরা ধারণাটির শরীয়তসম্মত বিধান বাস্তবায়নের জন্য এগুলোর মধ্যে যেটি অধিকতর উপযুক্ত, সেটি বেছে নিতে পারে। একটি উদাহরণই বিষয়টি স্পষ্ট করার সর্বোত্তম উপায়।

ইসলাম যাদের সম্পদের নিসাব (ন্যূনতম পরিমাণ) আছে তাদের সম্পদের উপর যাকাত দিতে বাধ্য করেছে এবং এটি রাষ্ট্রকে যাকাতের তহবিল সংগ্রহ এবং তাদের বৈধ প্রাপকদের মধ্যে বিতরণ করার পদ্ধতি তৈরি করেছে। আল্লাহ বলেন,

[خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا]

“তাদের ধন-সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ কর যাতে তারা তা দ্বারা তাদের পবিত্র ও পবিত্র করে।” [TMQ সূরা আত-তওবা: ১০৩]।

সুতরাং, ইসলাম রাষ্ট্রপ্রধানকে মুসলমানদের কাছ থেকে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেয়।

তবে, যাকাত কীভাবে আদায় করা হবে সে বিষয়ে ইসলাম কোনো বিস্তারিত উপায় নির্দিষ্ট করে দেয়নি। তাই, এই বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র শরীয়তসম্মত যেকোনো উপকরণ ও উপায় অবলম্বন করতে পারে। এ কারণেই নবী (সা.)-এর সময় এবং তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পদ্ধতি ও উপায়ের পার্থক্য ছিল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে নতুন নতুন উপায় ও পদ্ধতির উদ্ভব ও বিকাশ ঘটেছে।

এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো খুলাফা আল-রাশিদীন (সৎপথপ্রাপ্ত খলীফাগণ এর মধ্যে) উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কর্তৃক দিওয়ান (প্রশাসনিক নথিপত্র) প্রতিষ্ঠা, যা এই ক্ষেত্রে একটি গুণগত অগ্রগতি ছিল।

এর একটি উদাহরণ হলো, ইসলাম মুসলমানদের সাধারণ নেতা, অর্থাৎ খলিফা নিয়োগের জন্য বা’য়াতকে শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এটিই মুসলমানদের জন্য একমাত্র বৈধ ও বাধ্যতামূলক পদ্ধতি। বা’য়াহ হলো মুসলিম জনগণ এবং যিনি নেতৃত্বের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্মতিমূলক চুক্তি, যার মাধ্যমে তিনি শরীয়ত অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে জনগণের বিষয়াদি শাসন করেন।

কেবলমাত্র ক্ষমতা দখল (গালাবা), বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকার (উইলিয়াত আল-আহদ) বা অন্য কোনো উপায়ে কারো খিলাফাহ গ্রহণ করার অনুমতি নেই। বা’য়াহ, যা ইসলাম খলিফা নিয়োগের পদ্ধতি হিসেবে বিধান করেছে, তা এই বিষয়টি নিশ্চিত করে যে কর্তৃত্ব উম্মাহরই।

তবে, এই পদ্ধতিটি কীভাবে পালন করা হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশাবলী ছিল না। ফলে, খোলাফায়ে রাশেদীন (সঠিক পথের দিশারী খলীফাগণ) (রহঃ)-দের মধ্যে এর বাস্তবায়নের ধরন ও প্রক্রিয়া ভিন্ন ছিল, অপরদিকে সাহাবীগণ (রহঃ) তাঁদের প্রত্যেক আনুগত্যের শপথের বৈধতার বিষয়ে সর্বসম্মত ছিলেন।

আমাদের বর্তমান সময়ে, খলিফার নির্বাচন এবং তাঁর প্রতি বায়াত (আনুগত্যের শপথ) বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপকরণ ও উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, উম্মাহ ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, যারা হবেন আহলুল হাল ওয়াল আকদ (কর্তৃত্ব ও সিদ্ধান্তের অধিকারী ব্যক্তিগণ) অথবা উম্মাহর পরিষদ। বিকল্পভাবে, উম্মাহ সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নিজেরাই এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারে। তৃতীয় একটি সম্ভাবনা হলো, প্রক্রিয়াটিকে উম্মাহ এবং এর প্রতিনিধিদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া: উম্মাহর পরিষদ প্রার্থীদের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করবে এবং তারপর উম্মাহ সরাসরি ভোটের মাধ্যমে মনোনীত প্রার্থীদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেবে।

আর পদ্ধতি (তরীকাহ) এবং উপকরণ ও শৈলীর (ওসাইল ওয়া আসালিব) মধ্যে পার্থক্যের উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

ইসলামী জীবন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কর্মরত রাজনৈতিক কাঠামোকে সমাজের কাছে পৌঁছাতে এবং শাসকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এগুলো ইসলামী জীবন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত পদ্ধতির বাধ্যতামূলক শরীয়াহ বিধান, কারণ নবী (সা.) পবিত্র কুরআনের বাণী অনুসারে এটি বাধ্যতামূলক করেছেন। তবে, শরীয়াহর আইনগত বিধানে প্রকাশ্য দাওয়াহ এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য বিস্তারিত পদ্ধতি নির্দিষ্ট করা হয়নি, তাই এমন বৈধ উপকরণ ও শৈলী বেছে নেওয়া জায়েজ যা এই দুটি দায়িত্বের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে।

মক্কায় নবী (সা.) বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতেন, যার মধ্যে ছিল পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে লোকদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়া, মক্কার পাড়া-মহল্লায় মিছিল আয়োজন করা, বাজার, জনসমাগমস্থল এবং কাবা শরীফের সামনে মানুষের সাথে কথা বলা। আমাদের সময়ে, জনসমক্ষে ভাষণ, বক্তৃতা, সম্মেলন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, বেতার সম্প্রচার, ইন্টারনেট, বই, পত্রিকা, প্রচারপত্র প্রকাশ, মিছিল এবং সম্মেলন—এগুলো সবই ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো সবই অনুমোদিত উপায়-উপকরণ যা সমাজকে সম্বোধন করা এবং রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণের শরীয়ত পালনের জন্য প্রয়োগ করা যেতে পারে।

সংক্ষেপে, ইসলাম একটি মতাদর্শ যা একটি আদর্শ ও কর্মপদ্ধতি উভয় দ্বারা গঠিত। আদর্শ বলতে বোঝায় আকিদা এবং এর সাথে সম্পর্কিত সবকিছু—চিন্তাভাবনা, তথ্য এবং তা থেকে উদ্ভূত শরীয়তের বিধানসমূহ, যা মানুষ হিসেবে মানুষের আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর পদ্ধতিটি হলো শরীয়তের বিধানসমূহ, যা ব্যাখ্যা করে কীভাবে বাস্তব জীবনে এই সমাধানগুলো প্রয়োগ করা যায়, যাতে একটি ইসলামী জীবনধারায় জীবনযাপনকারী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়। এতে আরও রূপরেখা দেওয়া হয়েছে যে, কীভাবে বিশ্বজুড়ে এই মতাদর্শ ছড়িয়ে দিয়ে বাকি মানবজাতিকে ইসলামী সমাজে অন্তর্ভুক্ত করা যায় এবং কীভাবে এই মতাদর্শকে সংরক্ষণ, সুরক্ষা ও রক্ষা করা যায়।

আর উপায় ও পদ্ধতি হলো সেইসব অনুমোদিত বিষয় ও কাজ, যা মুসলমানরা এমন বিধান বাস্তবায়নের উপায় হিসেবে অবলম্বন করতে পারে, যেগুলোর বাস্তবায়নের জন্য শরীয়াহ কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি উল্লেখ করেনি। কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা উপায় অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়; বরং শরীয়াহর বিধান বাস্তবায়নের জন্য সেগুলোর মধ্যে থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত, সহজ এবং কার্যকরটি বেছে নেওয়া জায়েজ, তবে শর্ত হলো, সেগুলো যেন পদ্ধতির বিধানের বিকল্প না হয় এবং সেগুলোর বৈধতার পক্ষে শরীয়াহর প্রমাণ থাকে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

[قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِي يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٞ]

“বলুন, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।'” (সূরা আল ইমরান: ৩১)।

মূল লেখা হতে ঈষৎ পরিমার্জিত

Leave a Reply