শেয়ার বাজারের বাস্তবতা ও এর শর’ঈ বিধান

এই প্রবন্ধটি ১৯৯৭ সালে রচিত “The turbulence of the stock markets: Their cause & the Shariah rule pertaining to the causes” নামক বই থেকে নেওয়া হয়েছে।

পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক চিন্তাধারা হলো একটি সুবিধাবাদী চিন্তাধারা যা মানুষকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যায়, কারণ এটি মানুষের নিকৃষ্টতম প্রবৃত্তির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। যেসব সমাজ এই চিন্তাধারা গ্রহণ করেছে তাদের বাস্তবতা হলো, তারা কেবল জীবিকা, উৎপাদন ও ভোগের পেছনে ছুটতে থাকে এবং বস্তুগত মূল্যবোধই তাদের একমাত্র চিন্তার বিষয়। এর বাস্তবতা আরও দেখায় যে, মুষ্টিমেয় কিছু পুঁজিপতি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, যারা কঠোর পরিশ্রম করে এবং প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন পার করে। এদের বেশিরভাগই চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে এবং কোনোমতে বেঁচে থাকার মতো উপার্জন করতে (তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে) অক্ষম। তবে, পাশ্চাত্যের শেয়ার বাজারগুলোতে বড় কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য মুসলমানদের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই, কেবল এটি উপলব্ধি করার জন্য যে তারা পুঁজিবাদী চিন্তাধারা ও শেয়ার বাজার দ্বারা প্রতারিত হয়েছে এবং এগুলো আসলে মাকড়সার জালের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এখনই এগুলোর বাস্তবতা তুলে ধরা, এগুলোর দুর্নীতি উন্মোচন করা এবং ইসলাম যে এসব চিন্তাধারা ও চর্চাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে তা ব্যাখ্যা করা অপরিহার্য।

পুঁজিবাদী অর্থনীতির তিনটি মৌলিক ব্যবস্থা না থাকলে পাশ্চাত্যে শেয়ার বাজারগুলো কখনোই অস্তিত্ব লাভ করতে পারত না। এগুলো হলো:

– পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ব্যবস্থা
– সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা
– অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা

এই তিনটি ব্যবস্থা একত্রিত হয়ে পুঁজিবাদী অর্থনীতিকে দুটি অর্থনীতি বা দুই ধরনের বাজারে বিভক্ত করেছে: প্রথমটি হলো প্রকৃত অর্থনীতি (Real Economy), যেখানে উৎপাদন, বিপণন এবং বাস্তব সেবামূলক কাজ সম্পন্ন হয়; আর দ্বিতীয়টি হলো আর্থিক অর্থনীতি (Financial Economy), যাকে অনেকেই পরজীবী অর্থনীতি (Parasite Economy) বলে থাকেন, যেখানে বিভিন্ন আর্থিক কাগজের উদ্ভাবন ও কেনাবেচা হয়। এগুলোকে বাধ্যতামূলক চুক্তি, চেক বা সিকিউরিটিজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা কোনো এক পক্ষের হস্তান্তরযোগ্য অধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে এবং যা কেনাবেচা করা যায়—তা কোম্পানির সম্পত্তিতে হোক, তার ঋণে, সরকারি বন্ডে, রিয়েল এস্টেটে অথবা হস্তান্তরযোগ্য আর্থিক কাগজ দ্বারা প্রত্যয়িত অন্য কোনো অধিকারে হোক। এছাড়া, এগুলোকে বর্তমান বাজার দরের চেয়ে ভিন্ন কোনো মূল্যে অন্য একটি নির্দিষ্ট অধিকার কেনা বা বেচার অস্থায়ী বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয় (যেমন: অপশন চুক্তি)। এর কোনোটির সাথেই প্রকৃত অর্থনীতির কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এই পরজীবী আর্থিক অর্থনীতি এতটাই ফুলেফেঁপে উঠেছে যে এর লেনদেনের মূল্য প্রকৃত অর্থনীতিতে হওয়া লেনদেনকে বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছে।

পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি প্রাথমিকভাবে এমনভাবে গঠন করা হয় যাতে ব্যবসায়ী এবং তাদের ব্যবসাগুলো কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে পাওনাদার ও ব্যবসায় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের হাত থেকে নিজেদের বিশাল পুঁজি রক্ষা করতে পারে। এটি তাদের ওইসব সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগও দেয় যারা এসব ব্যবসায় বিনিয়োগ করে। একটি পাবলিক কোম্পানির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হলো এর দায়বদ্ধতা থাকে সীমিত; সুতরাং, যদি এর ব্যবসা ব্যর্থ হয় এবং লোকসান হয়, তবে যাদের কোম্পানির ওপর অধিকার বা পাওনা রয়েছে, তারা বিনিয়োগকারীদের পুঁজির (শেয়ারহোল্ডিং) পরিমাণ যাই হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু দাবি করতে পারবে না। তারা কেবল কোম্পানির নিজস্ব মূলধন হিসেবে যা অবশিষ্ট আছে তা-ই দাবি করতে পারবে।

পাশ্চাত্যে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত প্রথা যে, একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি রাষ্ট্রের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং ঘোষিত হয়, এর প্রতিষ্ঠাতাদের দ্বারা নয়। রাষ্ট্রই এর মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন (সংঘস্মারক) ইস্যু করে, এর ব্যবসার ধরন এবং শেয়ারের সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেয়। রাষ্ট্রই এর মূল আর্টিক্যালস অফ অ্যাসোসিয়েশন (সংঘবিধি) প্রকাশ করে। তাই, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির একটি কর্পোরেট বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা রয়েছে যা এর বিনিয়োগকারীদের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। এটি কোম্পানির সাথে সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী ব্যক্তিদেরকে কেবল কোম্পানির কাছে জবাবদিহিতা চাওয়ার অধিকার দেয়, বিনিয়োগকারীদের কাছে নয়। ফলে, কোম্পানির দায়বদ্ধতা কেবল কোম্পানির নিজস্ব অবশিষ্ট সম্পদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত অর্থের ওপর বর্তায় না।

যখন রাষ্ট্র কোনো পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন ইস্যু করে, তখন প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্য থেকে অর্থাৎ যারা কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য আবেদন করেছিল তাদের নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন পরিচালনা পর্ষদ (বোর্ড অফ ডিরেক্টরস) নিয়োগ করে। পর্ষদ একজন চেয়ারম্যান নিয়োগ করে এবং কোম্পানি হস্তান্তরযোগ্য সার্টিফিকেটের আকারে শেয়ার বিক্রি শুরু করে। এই ধরনের শেয়ারের মালিকের কিছু নির্দিষ্ট এবং সীমিত অধিকার থাকে। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকে কোম্পানি মুনাফা হিসেবে যা বণ্টন করার সিদ্ধান্ত নেয় তা থেকে তার লভ্যাংশ, অথবা কোম্পানি যদি ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তবে কোম্পানির মূলধন থেকে তার প্রাপ্ত অংশ। এছাড়া প্রতি বছর নতুন পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের জন্য ভোট দেওয়ার অধিকারও তাদের থাকে। তবে, এই সব অধিকার তাদের ধারণকৃত শেয়ারের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, বিনিয়োগকারী ব্যক্তি হিসেবে নয়। উদাহরণস্বরূপ, পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনের সময়, ব্যক্তির সংখ্যার ভিত্তিতে নয় বরং শেয়ারের সংখ্যার ভিত্তিতে ভোট গণনা করা হয়। ফলে, যদি একজন ব্যক্তির কাছে অর্ধেকের চেয়ে একটি শেয়ার বেশি থাকে এবং অবশিষ্ট শেয়ারের মালিক বাকি শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যা ১,০০,০০০ জনও হয়, তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারের অধিকারী সেই একক শেয়ারহোল্ডারই পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে নির্ধারক ভোটটি প্রদান করবে এবং অন্যান্য শেয়ারহোল্ডারদের ভোটের কোনো মূল্যই থাকবে না।

কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবসায়ীদের সাধারণত একটি কোম্পানির অর্ধেক শেয়ারের প্রয়োজন হয় না, কখনো কখনো ৫% বা ১০% শেয়ারই যথেষ্ট হয়। এর কারণ হতে পারে যে বেশিরভাগ ছোট শেয়ারহোল্ডাররা বিক্ষিপ্ত থাকে, অথবা একটি পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন করার জন্য একদল বড় শেয়ারহোল্ডারের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা গড়ে ওঠে, যা সকল শেয়ারহোল্ডারের মূলধন নিয়ন্ত্রণ করে এবং কোম্পানির সমস্ত বিষয়াদি পরিচালনা করে। এটি একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা যা সবাই উপলব্ধি করতে পারে এবং এমন বাস্তবতার সামনে শেয়ার বাজারে কোম্পানির শেয়ার লেনদেন করা ছাড়া কোম্পানিতে বিনিয়োগকৃত নিজস্ব মূলধনের ওপর বেশিরভাগ শেয়ারহোল্ডারের কোনো কর্তৃত্বই থাকে না। প্রকৃতপক্ষে এটি তাদেরকে কোম্পানির অংশীদার বানায় না, বরং কেবলমাত্র কোম্পানির শেয়ার সার্টিফিকেটের মালিক বানায়, যা তারা কোম্পানি বা এর শেয়ারহোল্ডারদের অনুমতি ছাড়াই শেয়ার বাজারে কেনাবেচা করে।

অধিকন্তু, শেয়ার বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণকারী শেয়ারহোল্ডারদের কারও অনুমতি না নিয়ে এবং কাউকে না জানিয়ে তাদের শেয়ার বিক্রি করতে সক্ষম করে। সুতরাং, তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এবং পরিচালিত কোম্পানির কার্যকলাপ সংক্রান্ত যেকোনো দায়বদ্ধতা থেকে সহজেই হাত ধুয়ে ফেলতে পারে। এছাড়াও, যখন তারা আরও শেয়ার কিনতে চায়—তা ওই একই কোম্পানির হোক বা অন্য কোনো কোম্পানির—তাদের কারও সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন হয় না। কিছু শেয়ার কেনা এবং কিছু বিক্রি করার পেছনে তাৎক্ষণিক মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যই তাদের প্ররোচিত করে; তাই, যদি তাদের নিয়ন্ত্রিত কোনো কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে যায়, তবে তারা তাদের সব বা কিছু শেয়ার বিক্রি করে দেয়, আবার দাম কমে গেলে তারা তাদের শেয়ারগুলো পুনরায় কিনে নেয়। অতএব, কোম্পানি, অন্যান্য শেয়ারহোল্ডার, কোম্পানির ব্যবসা বা এর কর্মীদের প্রতি তাদের কোনো আনুগত্য থাকে না। পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে পুঁজিপতিদের একমাত্র লক্ষ্য থাকে এর কার্যক্রমকে এমনভাবে প্রভাবিত করা যাতে এর শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পায়।

এই সব কিছুই শেয়ার বাজার ও অন্যান্য সিকিউরিটিজ এবং প্রকৃত অর্থনীতি—অর্থাৎ যেসব কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয় তাদের বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি করেছে। যে বিষয়টি এই সত্যকে নিশ্চিত করে তা হলো সেই অনুপাত (মূল্য/আয় অনুপাত বা price/earnings ratio) যা ট্রেডাররা শেয়ার বাজারে প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করে এবং এটিকে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি ও হ্রাসের পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করে। এটি হলো শেয়ারের বর্তমান দামের সাথে কোম্পানি কর্তৃক প্রতিটি একক শেয়ারের জন্য প্রদত্ত বার্ষিক লভ্যাংশের অনুপাত। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি একক শেয়ারের বার্ষিক মুনাফা ২ ডলার হয় এবং শেয়ার বাজারে শেয়ারটির দাম ৪০ ডলার হয়, তবে মূল্য/আয় অনুপাত হবে ২০। অন্য কথায়, প্রতি শেয়ারে কোম্পানির মুনাফা হবে সেই শেয়ারের দামের ৫%। সংবাদপত্রগুলো শেয়ার বাজারে লেনদেন হওয়া সব কোম্পানির জন্য প্রতিদিন এই অনুপাতগুলো প্রকাশ করে। এই অনুপাতগুলো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে সেগুলো একে অপরের থেকে অনেক বেশি আলাদা। কিছু কোম্পানির ক্ষেত্রে এই হার ১০০ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে তা ৫-এর মতো কমও হতে পারে। এটি সিকিউরিটিজ ও শেয়ার বাজার এবং প্রকৃত অর্থনীতি ও কোম্পানির বাস্তবতার মধ্যকার সম্পর্কের ফাটলকে নির্দেশ করে। এটি এও নির্দেশ করে যে শেয়ার বাজার একটি বিশাল জুয়ার আড্ডায় (ক্যাসিনো) পরিণত হয়েছে। ফটকা কারবার (Speculation) শেয়ার বাজারগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করে আছে, আর তীব্র ও বারবার ওঠানামা বাজারের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আলোচনা এখানেই শেষ। আর সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, এটিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রধান বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি এজন্য যে, এর বদৌলতে ব্যাংকগুলো আমানত বা ডিপোজিটের নামে মানুষের অর্থ সংগ্রহ করতে পেরেছে এবং এমনভাবে মানুষের অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে যেন সেগুলো আমানতকারীদের অর্থ নয়, বরং ব্যাংকেরই অর্থ। তারা আমানতকারীদের কাছ থেকে তহবিল হিসেবে যা সংগ্রহ করে তা পুঁজিপতি এবং ব্যবসায়ী—যার মধ্যে শেয়ার বাজারের ট্রেডাররাও অন্তর্ভুক্ত—তাদেরকে ঋণ দিয়ে এবং কিছু ক্ষেত্রে আমানতকারীদের নিজেদেরকেই ঋণ দিয়ে প্রতিটি ঋণের জন্য একটি গ্যারান্টিযুক্ত সুদের হার আদায় করে তাদের সংগৃহীত অর্থকে বৈধতা দিতেও সক্ষম হয়েছে।

তবে, এই বৈধকরণের প্রক্রিয়াটি কেবল আংশিক। এর কারণ হলো, ব্যাংকের মালিকরা, যাদের অধিকাংশই পুঁজিপতি এবং তাদের কোম্পানি, ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পায় এবং এই ঋণগুলো দেওয়া হয় হ্রাসকৃত সুদের হারে। খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি কম—এই অজুহাতে অন্যান্য পুঁজিপতি এবং ব্যবসায়ীরা তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকে। সবশেষে আসে সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে ছোট ব্যবসায়ী এবং ভোক্তারা। সুদের হারের এই বৈষম্যের মাধ্যমে এই পক্ষপাতিত্ব স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকায় পুঁজিপতি এবং বড় কোম্পানিগুলোকে দেওয়া ঋণের সুদের হার ৫.৮% থেকে শুরু করে গাড়ি কেনার জন্য দেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে তা ২০% পর্যন্ত হয়ে থাকে। উপসংহারে বলা যায়, সুদী ব্যবস্থা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের অর্থকে খুব অল্প কিছু মানুষের মধ্যে আবর্তিত করতে ভূমিকা রাখে।

প্রকৃত অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকার চেয়ে শেয়ার বাজারে তাদের ভূমিকা অনেক বেশি বিপজ্জনক। এটি এজন্য যে, তারা শেয়ার ব্যবসায়ীদের এমন অঙ্কের ঋণ দেয় যা তাদের কাছে থাকা নগদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। উদাহরণস্বরূপ, শেয়ার বাজারে ১০০ ডলার মূল্যের একটি শেয়ার ক্রেতার নিজের নগদ অর্থ থেকে ৫ ডলার এবং ব্যাংক থেকে ধার করা ৯৫ ডলার, অথবা ব্রোকারেজ হাউস—যারা আবার ব্যাংক থেকে ধার করে—তাদের কাছ থেকে ধার করা অর্থ দিয়ে কেনা যেতে পারে। এর মানে হলো, যে ব্যক্তি শেয়ার বাজারে লেনদেন করেন, তিনি এমন সংখ্যক শেয়ার কিনতে পারেন যার দাম তার কাছে থাকা নগদ অর্থের ক্রয়ক্ষমতার চেয়ে বিশ গুণ বেশি। তবে ব্যাংক অত্যন্ত ধনী পুঁজিপতি ছাড়া অন্য কাউকে এই ধরনের ঋণ দেয় না; এর মানে হলো, কেবল সেই ব্যক্তিরাই ব্যাংকের বদৌলতে বাজারে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে পারবে, এবং ফলস্বরূপ, এই বাজারগুলোর ওপর তাদের প্রভাব বাড়াতে পারবে এবং আমানতকারী বা ব্যবসায়ীদের মতো সাধারণ মানুষের মূল্যে নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারবে।

যেহেতু শেয়ার হিসেবে যা কিছু কেনা হয় তার বেশিরভাগই এমন ঋণ দ্বারা অর্থায়িত হয় যা সেগুলোর মূল্যকে ব্যাপকভাবে ছাড়িয়ে যায়, তাই শেয়ারের দামে তীব্র পতনের পর প্রায়ই আরও বড় পতন ঘটে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ব্যাংক কোনো ট্রেডারকে তার ক্রয় করতে চাওয়া শেয়ারের মূল্যের ৯০% ঋণ দিতে সম্মত হয় এবং এই ট্রেডার যদি ১,০০০,০০০ ডলারের শেয়ার কেনে, তবে ব্যাংক থেকে তার ঋণ হবে ৯০০,০০০ ডলার। তারপর যদি আমরা ধরে নিই যে তার শেয়ারের দাম ২০% কমে গেছে, অর্থাৎ তা ৮০০,০০০ ডলারে নেমে এসেছে, তবে অনুমোদিত ঋণটি হবে ৭২০,০০০ ডলার, অর্থাৎ ৮০০,০০০ ডলারের ৯০%। এই ক্ষেত্রে, শেয়ারের মূল্যের ৯০% ঋণের অনুপাত বজায় রাখার জন্য তাকে অবিলম্বে ব্যাংককে তার ঋণের ১৮০,০০০ ডলার পরিশোধ করতে হবে। যদি তার কাছে অর্থ থাকে তবে সে তার কোনো শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হবে না, কিন্তু যদি তার কাছে অর্থ না থাকে তবে ব্যাংকের কাছে তার বকেয়া ঋণ পরিশোধ করার জন্য তাকে অবিলম্বে তার শেয়ার বিক্রি করতে বাধ্য হতে হবে। এটি বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়িয়ে দেবে এবং দাম আরও কমার দিকে নিয়ে যাবে। যদি অনেক ট্রেডার একই পরিস্থিতিতে পড়ে, তবে এটি দামের ক্রমাগত পতনের দিকে নিয়ে যাবে এবং সম্ভবত বাজারে এক চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

অতএব, শেয়ার বাজারে সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভূমিকা লেনদেন এবং দাম বাড়ানো (স্ফীতি) এবং কমানোর (সংকোচন) মধ্যে ওঠানামা করে। তাই, যখন কিছু নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম বাড়ে, ব্যাংকগুলো সেই নির্দিষ্ট শেয়ারে লেনদেনকারীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে আগ্রহী হয়, যা তাদের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ট্রেডাররাও তখন ছুটে গিয়ে আরও শেয়ার কিনতে শুরু করে এবং দাম বাড়তে বাড়তে একটি অতিরঞ্জিত পর্যায়ে পৌঁছায়। তবে, পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যেতে পারে। কোনো গুজব বা কোনো প্রকল্পের ব্যর্থতার মতো যেকোনো কারণে কিছু নির্দিষ্ট শেয়ারের দাম পড়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণদান কমিয়ে দেয় কারণ যেসব শেয়ার ট্রেডারদের দেওয়া ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে কাজ করছিল সেগুলোর দাম কমে যায়। এই ট্রেডাররা তখন তাদের কিছু বা সমস্ত শেয়ার বিক্রি করার পথ বেছে নেয় এবং এটি অতিরঞ্জিত পর্যায়ে থাকা দামের দ্রুত পতন ঘটাতে শুরু করে। ফলস্বরূপ, শেয়ারের দামের ক্রমাগত পতনের কারণে ব্যাংকগুলো তাদের ঋণ আরও কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

ব্যাংকগুলো এই তহবিল কোথা থেকে পায় এবং যখন তারা তাদের ঋণ কমিয়ে দেয় তখন তারা এগুলো কোথায় নিয়ে যায়—এই প্রশ্নের উত্তর হলো, এই তহবিলগুলো মূলত আমানতকারীদের। সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো মানুষের সঞ্চয় ব্যাংকে রাখার ওপর নির্ভরশীল। তারা এই বাস্তবতার ওপরও নির্ভর করে যে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে যা কিছু তোলা হয় তার বেশিরভাগই একই ব্যাংক বা অন্য কোনো ব্যাংকের অন্য একটি অ্যাকাউন্টে গিয়ে জমা হয় এবং বেশিরভাগ অর্থ ব্যাংকেই থেকে যায়। ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের যা ঋণ দেয় তা আসলে ব্যাংক জমা থেকে বেরিয়ে যাওয়া বস্তুগত অর্থ নয়, বরং এটি একটি অ্যাকাউন্টের অর্থ, যা ব্যাংক ঋণগ্রহীতার জন্য দুটি অ্যাকাউন্ট খুলে তৈরি করে—একটি তার ঋণের জন্য এবং আরেকটি ঋণ থেকে উৎপন্ন অর্থের অ্যাকাউন্ট হিসেবে, যাতে ঋণগ্রহীতা তার প্রয়োজনীয় অর্থ তুলে নিতে পারে। যদি বেশিরভাগ আমানতকারী এবং ঋণগ্রহীতা তাদের আমানত একবারে নগদে তুলে নিতে চায়, তবে তারা তা করতে পারবে না, কারণ সেই আমানতগুলোর বেশিরভাগই ঋণে পরিণত হয়েছে যা হয়তো ক্ষতি হয়েছে বা অন্য ব্যাংকে থাকতে পারে, এবং তাই সেগুলোকে তাৎক্ষণিকভাবে নগদায়ন করা যায় না। এমন ক্ষেত্রে, প্রায়ই ব্যাংকটিকে বন্ধ করে দিয়ে গুটিয়ে ফেলতে হয়।

সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ব্যাংকগুলোর ওপর আস্থার ওপর এবং মানুষের আমানত নিরাপদ—অর্থাৎ তারা যখন খুশি তাদের সব আমানত তুলে নিতে পারে—এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। তবে, এই বক্তব্যটি প্রতারণামূলক এবং ব্যাংকের বাস্তবতার বিপরীত। পাশ্চাত্যে এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে এই প্রতারণা বেশ কয়েকবার উন্মোচিত হয়েছে, যখন আমানতকারীরা তাদের আমানত তুলতে পারেনি এবং ফলস্বরূপ বিপুল পরিমাণ অর্থ হারিয়েছে এবং ব্যাংকগুলো বন্ধ বা দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়েছে। তাই, পাশ্চাত্য অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা (Inconvertible Paper Money) আবিষ্কার করেছে, যা ‘বাধ্যতামূলক বিল’ (Compulsory Bills) নামেও পরিচিত। এই অপরিবর্তনযোগ্য মুদ্রার তদারকি করার দায়িত্ব সরকার কর্তৃক একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত থাকে। আর এই সবই করা হয় নিছক সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো ঢাকতে, এটি যে প্রতারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে সেই সত্যকে আড়াল করতে, এটিকে ধসে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা বজায় রাখতে।

অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে মুদ্রিত কাগজের আকারে এমন একটি মুদ্রা ইস্যু করার ক্ষমতা দেয় যার নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই এবং যা সারা দেশে প্রচলিত থাকে। সরকার দেশের মানুষকে তাদের আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে এই মুদ্রা গ্রহণ করতে বাধ্য করে। দেশের কোনো নাগরিক যদি তার পাওনা ঋণের নিষ্পত্তি হিসেবে এই কাগজ নিতে অস্বীকার করে, তবে আইন ও আদালত তাকে তা গ্রহণ করতে বাধ্য করবে; অন্যথায় সে তার দাবি এবং অধিকার হারাবে।

এর মানে হলো, সরকারের নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত অর্থ ইস্যু করার অধিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংরক্ষণ করে। উদাহরণস্বরূপ, সরকার যখন কর বা অন্যান্য উপায়ে আদায় করা অর্থ ফুরিয়ে ফেলে, তখন সে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হয় এবং তার কাছ থেকে ঋণ নেয়। যা ধার করা হয় তার বিপরীতে একটি ঋণ লিপিবদ্ধ করা হয় এবং একটি জমা অ্যাকাউন্ট খোলা হয় যাতে সরকারি কোষাগার তার ব্যয় মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তুলতে পারে। এটিকে নতুন অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি মনে করে যে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দেওয়ার জন্য দেশে আরও অর্থের প্রয়োজন, তবে তারা প্রচুর এক্সচেকার বিল (সরকারি বিল) বা কোম্পানির সিকিউরিটিজ কিনবে এবং যারা এগুলো বিক্রি করে তাদের অ্যাকাউন্টে—তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকেই হোক বা বাণিজ্যিক ব্যাংকে—এই বিলগুলোর মূল্য লিপিবদ্ধ করবে। এটিও নতুন অর্থ হিসেবে গণ্য হবে।

এর একটি উদাহরণ হলো ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে যা ঘটেছিল, যখন নিউইয়র্কে একদিনেই শেয়ারের দাম ২২% পড়ে যায়। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাৎক্ষণিকভাবে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ইস্যু করে এবং ধাক্কার প্রভাব সামাল দিতে এটি ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোটি কোটি ডলার মূল্যের বিল (সিকিউরিটিজ) কিনে নেয় এবং এই পরিমাণ অর্থ ব্যাংকগুলোর হাতে রাখে, যাতে তারা শেয়ার বাজারের ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে পারে এবং তাদের কষ্ট লাঘব করতে পারে; নিউইয়র্কের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক সিটিব্যাংক বন্ধ হতে চলেছে—এমন গুজব ছড়ানো সত্ত্বেও এই ব্যবস্থাটি সাময়িকভাবে ঝড় সামলাতে এবং সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ত্রুটিগুলো আড়াল করতে সফল হয়েছিল।

কাগুজে মুদ্রা ছাপিয়ে অর্থ ইস্যু করা এবং তা সরকার বা মানুষের অ্যাকাউন্টে রাখা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, আর এই খরচের বোঝা সাধারণ মানুষের ঘাড়েই চাপে, যারা বেশিরভাগ সময় এর কারণগুলো বুঝতে ব্যর্থ হয়। এর কারণ হলো, প্রচলিত অর্থের বৃদ্ধি মুদ্রার মূল্যহ্রাসের দিকে নিয়ে যায়; তাই এই ব্যবস্থার অন্যতম একটি ত্রুটি হলো এটি সর্বদা পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধিতে ভোগে। এই মূল্যবৃদ্ধির বাস্তবতা, যাকে কেউ কেউ মুদ্রাস্ফীতি বলে, তা আসলে মানুষের অর্থের মূল্য হ্রাস এবং তাদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মানের অবনতি। তবে, এই ব্যবস্থার প্রধান ত্রুটি হলো এটি একটি বিশ্বাসগত প্রতারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, অর্থাৎ এই প্রতারণা যে কাগুজে মুদ্রার একটি মূল্য আছে, যেখানে আসলে এর কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই; তবে দেশের আইন এটিকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়েছে এবং বিচার বিভাগের চোখে এটিকে বৈধ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ কারণেই আমরা দেখতে পাই যে, যখন কোনো দুর্বল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সহজেই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং যখন রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও প্রভাব ক্ষুণ্ণ হয়, তখন তার কাগুজে মুদ্রা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তার শাসকরা প্রায়ই বিশ্বাসগত প্রতারণাটি নতুন করে শুরু করতে এবং মুদ্রার মূল্যের ব্যাপারে মানুষকে ধোঁকা দিতে অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় নিজ দেশের মুদ্রার মূল্য হ্রাস করার (অবমূল্যায়ন) আশ্রয় নেয়।

পাশ্চাত্যের এবং পাশ্চাত্যকে অনুসরণ ও অনুকরণকারী প্রতিটি দেশের শেয়ার বাজারগুলোর বাস্তবতা এটাই। শেয়ার বাজারগুলো হলো ব্যবসায়ীদের প্রজনন ক্ষেত্র, কারণ তারা এমন কোনো পণ্য উৎপাদন করে না যা মানুষের কাজে লাগতে পারে এবং ব্যবসায়ীদের জন্য দ্রুত ও সহজ মুনাফা ছাড়া আর কোনো প্রণোদনা সেখানে থাকে না। শেয়ার বাজারগুলো অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে ক্যাসিনোর সাথেই বেশি তুলনীয়। এগুলো মাকড়সার জালের মতো যা সহজেই কেঁপে উঠে। এগুলো পুঁজিবাদী লোভ এবং বস্তুগত মূল্যবোধের পেছনে হাঁসফাঁস করার প্রতীকের প্রতিনিধিত্ব করে। যদি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেমন পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা না থাকত, তবে এই পরজীবী বাজারগুলোর অস্তিত্বই থাকত না এবং এগুলো টিকে থাকতে পারত না। পাশ্চাত্যের এবং পাশ্চাত্যকে অনুসরণ ও অনুকরণকারী প্রতিটি দেশের শেয়ার বাজারগুলোর বাস্তবতা এটাই।

এ বিষয়ে শর’ঈ বিধান নিচে দেওয়া হলো:

পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ব্যবস্থা পাবলিক কোম্পানিকে সীমিত দায়ের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য প্রদান করে, যার উদ্দেশ্য হলো কোম্পানি ব্যর্থ হলে ও লোকসান করলে বড় বড় পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীদের রক্ষা করা। এক্ষেত্রে, যাদের কোম্পানির কাছে দাবি বা পাওনা রয়েছে, তারা বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত সম্পদ যতই বিশাল হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে না। আর্থিক দাবিগুলো কেবল কোম্পানির নিজস্ব সম্পদ হিসেবে যা অবশিষ্ট আছে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই ব্যবস্থা প্রতিটি দিক থেকেই শরীয়তের পরিপন্থী। শরয়ী বিধান সবাইকে ন্যায্য পাওনাদারদের কাছে তাদের ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে বাধ্য করে, এবং তা থেকে কোনো কিছু কেটে নেওয়া নিষিদ্ধ।

ইমাম বুখারী (রহ.) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

“‏ مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِتْلاَفَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ ‏”

“যে ব্যক্তি পরিশোধের নিয়তে মানুষের সম্পদ গ্রহণ করে, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করে দেন, আর যে তা নষ্ট করার নিয়তে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।”

ইমাম আহমদ (রহ.)ও আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

لَتُؤَدُّنَّ ‌الْحُقُوقَ ‌إِلَى ‌أَهْلِهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ، حَتَّى يُقْتَصَّ لِلشَّاةِ الْجَمَّاءِ مِنَ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ نَطَحَتْهَا

“কিয়ামতের দিন তোমরা অবশ্যই পাওনাদারদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে, এমনকি শিংবিহীন ছাগল শিংযুক্ত ছাগলটিকে পাল্টা গুঁতো দিয়ে তার প্রতিশোধ নেবে।”

অতএব, আল্লাহর রাসূল (সা.) দুনিয়ার জীবনে কারও অধিকার পুরোপুরি আদায় করার বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করেছেন, আর যদি কেউ তা না করে তবে সে কিয়ামতের দিন তা করবে। এটি যারা মানুষের অধিকার গ্রাস করে তাদের জন্য একটি সতর্কবাণী হিসেবে কাজ করে।

ধনী ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করাকে শরীয়ত একটি অন্যায় কাজ হিসেবে গণ্য করেছে। ইমাম বুখারী (রহ.) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যিনি বলেন: আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

مَطْلُ الْغَنِيِّ ظُلْمٌ

“ধনী ব্যক্তির (ঋণ পরিশোধে) টালবাহানা করা একটি জুলুম।”

যদি ঋণ পরিশোধে বিলম্ব করা জুলুম হয়, তবে অধিকার গ্রাস করা এবং ঋণ পরিশোধ না করাটা কেমন হবে? নিঃসন্দেহে এটি একটি বৃহত্তর অন্যায় এবং এটি গুরুতর শাস্তির দাবি রাখে। আল্লাহর রাসূল (সা.) আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে যারা উত্তম তারাই শ্রেষ্ঠ মানুষ। কারণ ইমাম বুখারী (রহ.) বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

فَإِنَّ خَيْرَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً

“প্রকৃতপক্ষে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম তারাই, যারা ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে উত্তম।”

অতএব, কোম্পানির লোকসান সমন্বয় করার পর যাদের কোম্পানির কাছে পাওনা রয়েছে তাদের ঋণ পরিশোধকে শুধুমাত্র অবশিষ্ট সম্পত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা নিষিদ্ধ। বরং বিনিয়োগকারীদের সম্পদ থেকে তাদের প্রাপ্য অধিকার বা ঋণ পুরোপুরি পরিশোধ করতে হবে।

এই হলো পাবলিক কোম্পানিগুলোকে সীমিত দায় দেওয়ার কথা। আর পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলো নিজেই ইসলামে অংশীদারি ব্যবসার (কোম্পানির) নিয়মের পরিপন্থী। এর কারণ হলো, পাবলিক কোম্পানির তাদের নিজস্ব সংজ্ঞা অনুযায়ী: “এটি এমন একটি চুক্তি যেখানে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি অঙ্গীকার করে যে তাদের প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে একটি আর্থিক প্রকল্পে অংশগ্রহণ করবে, এবং এর ফলে এই প্রকল্প থেকে যে মুনাফা বা লোকসান হবে তা তারা ভাগ করে নেবে।” এই সংজ্ঞা এবং পাবলিক কোম্পানি বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা অনুযায়ী, এটি স্পষ্ট যে এটি ইসলামী শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে কোনো চুক্তি নয়। কারণ শরীয়ত অনুযায়ী চুক্তি দুই পক্ষের মধ্যে প্রস্তাব (ইজাব) ও গ্রহণের (কবুল) ভিত্তিতে হতে হবে। অন্য কথায়, চুক্তিতে দুটি পক্ষ থাকা উচিত। এক পক্ষ প্রস্তাব দেয়, অর্থাৎ সে এই বলে চুক্তির সূচনা করে: “আমি আপনার সাথে অংশীদারিত্বে প্রবেশ করলাম” বা এই জাতীয় কোনো কথা; এবং অন্য পক্ষ গ্রহণ প্রকাশ করে এই বলে: “আমি গ্রহণ করলাম” বা “আমি রাজি” বা এই জাতীয় কোনো কথা। যদি চুক্তিতে দুটি পক্ষের উপস্থিতি এবং প্রস্তাব ও গ্রহণের উপস্থিতি না থাকে, তবে কোনো চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে না এবং কোনো কিছুকেই বৈধ চুক্তি বলা যায় না।

পাবলিক কোম্পানিতে অংশ নেওয়া কেবল এর শেয়ার কেনার মাধ্যমেই কার্যকর হতে পারে, তা কোম্পানির কাছ থেকেই হোক বা আগে থেকে শেয়ার কিনেছে এমন কারও কাছ থেকেই হোক। শেয়ারহোল্ডারের অংশীদারিত্ব কোম্পানি বা অন্য কোনো শেয়ারহোল্ডারের সাথে কোনো আলোচনা বা চুক্তির দাবি রাখে না। প্রথম থেকেই যা একটি পাবলিক কোম্পানিকে অস্তিত্বে আনে এবং যা একে শেয়ারহোল্ডারদের থেকে স্বাধীন নিজস্ব কৃত্রিম সত্তা বা আইনি সত্তা প্রদান করে, তা হলো সরকার। সরকারই “মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন” ইস্যু করে। আর প্রতিষ্ঠাতাদের ক্ষেত্রে, তাদের মধ্যে একমাত্র চুক্তি হলো কোম্পানি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা সরকারের কাছে যে আবেদন জমা দিয়েছিল তা। যখন “মেমোরেন্ডাম অফ অ্যাসোসিয়েশন” ইস্যু হয়, কোম্পানি কার্যকরভাবে নিজের বিষয়গুলোর দায়িত্বে নিয়োজিত হয় এবং সেভাবেই এটি প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যান্য মানুষের কাছে শেয়ার বিক্রি করে।

এখানে এটা স্পষ্ট যে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো চুক্তি হচ্ছে না এবং সেখানে কোনো প্রস্তাব ও গ্রহণ নেই, কারণ একটিমাত্র শেয়ার কিনলেও যেকোনো ব্যক্তি অংশীদার হয়ে যায়। তাই, পাবলিক কোম্পানি কোনো দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি নয়। বরং এটি একটি কোম্পানিতে অংশীদার হওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তির নেওয়া একক সিদ্ধান্ত। সুতরাং, সে কেবল কোম্পানির একটি শেয়ার কিনেই অংশীদার হয়ে যায়। পাশ্চাত্যের আইন বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের কাজকে চুক্তি মেনে চলা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন, যদিও তা একতরফা হয়। তাদের মতে, এটি নিজের ইচ্ছা প্রকাশের একটি উপায়, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির কাছে বা জনসাধারণের কাছে নিজেকে কোনো বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করে, অন্য ব্যক্তি বা জনসাধারণের সম্মতি বা অসম্মতি নির্বিশেষে। অতএব, পাবলিক কোম্পানির চুক্তিটি শরীয়ত অনুযায়ী অবৈধ। এর কারণ হলো, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী চুক্তিতে এক পক্ষের দেওয়া প্রস্তাব এবং অন্য পক্ষের গ্রহণের মধ্যে এমন একটি যোগসূত্র থাকা আবশ্যক, যা চুক্তিকৃত বিষয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। কিন্তু পাবলিক কোম্পানির চুক্তির ক্ষেত্রে এটি ঘটে না।

পাবলিক কোম্পানির বাস্তবতা ইসলামে কোম্পানির বাস্তবতার বিপরীত। ইসলামে কোম্পানি হলো: “মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে একটি আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্য দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি।” তাই এটি দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে একটি চুক্তি; সুতরাং এটি একতরফা হতে পারে না। বরং দুই বা ততোধিক পক্ষের মধ্যে একটি সম্মতি হতে হবে। চুক্তিটি নিজেই মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে একটি আর্থিক লেনদেন গ্রহণের ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। চুক্তিটি নিছক অর্থ প্রদানের ওপর ভিত্তি করে হওয়াটা মানানসই নয়। শুধু অংশীদারিত্বে প্রবেশের উদ্দেশ্যে এমনটা করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। তাই, কোম্পানি চুক্তিতে আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করাই হলো মূল ভিত্তি।

এই কাজটি চুক্তিবদ্ধ সব পক্ষের দ্বারা বা অন্ততপক্ষে তাদের একজনের দ্বারা, অথবা একপক্ষের শ্রম এবং অন্যপক্ষের মূলধনের সমন্বয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত। চুক্তিকারীদের বা তাদের অন্তত একজনের দ্বারা এই আর্থিক উদ্যোগ গ্রহণ করার ফলে কমপক্ষে একজন সশরীরে কাজ করা (Physical) অংশীদারের উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে ওঠে, যাকে চুক্তির অংশ হতে হবে। তাই ইসলামে সব ধরনের কোম্পানিতে কমপক্ষে একজন সশরীরে কাজ করা অংশীদারের উপস্থিতি পূর্বশর্ত। এটি কোম্পানি চুক্তির একটি মৌলিক উপাদানও। যদি দৈহিক শ্রমদানকারী অংশীদার উপস্থিত থাকে, তবে অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদিত হয়, অন্যথায় অংশীদারিত্ব চুক্তি সম্পাদিত হতে পারে না।

এটি প্রমাণ করে যে পাবলিক কোম্পানিতে অংশীদারিত্ব চুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় শর্তগুলোর অভাব রয়েছে, কারণ যারা পাবলিক কোম্পানিতে নিজেদের অংশীদার হিসেবে দাবি করে তারা কেবল মূলধনের অংশীদার এবং সেখানে সশরীরে কাজ করা কোনো অংশীদার নেই; যদিও কোম্পানির চুক্তিতে দৈহিক শ্রমদানকারী অংশীদারের উপস্থিতি অপরিহার্য। পাবলিক কোম্পানিগুলোতে অংশীদারিত্ব কেবল মূলধন বিনিয়োগকারী অংশীদারদের উপস্থিতির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। পাবলিক কোম্পানি কোনো শ্রমদানকারী অংশীদারের উপস্থিতি ছাড়াই এর কার্যক্রম পরিচালনা করে। শরীয়ত অনুযায়ী, যিনি কেবল মূলধনের অংশীদার, কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা করার কোনো অধিকার তার নেই, বা অংশীদার হিসেবে কোম্পানিতে কাজ করার অধিকারও তার নেই। কোম্পানি চালানো এবং কোম্পানিতে কাজ করার অধিকার কেবল শ্রমদানকারী অংশীদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পাবলিক কোম্পানিতে অংশীদারিত্ব কেবল মূলধনের অংশীদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে হয়, ব্যক্তিদের অংশীদারিত্বের ওপর নয়। ফলে, যার যত বেশি শেয়ার, তার তত বেশি ভোট এবং যার যত কম শেয়ার, তার তত কম ভোট থাকে। এছাড়া, পশ্চিমাদের মতে, পাবলিক কোম্পানির একটি আইনি বা কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তা রয়েছে যার ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার আছে। আবারও, শরীয়ত অনুযায়ী, ক্ষমতা ব্যবহারের অধিকার কেবল এমন একজন ব্যক্তিকেই দেওয়া যেতে পারে যার সেটির যোগ্যতা রয়েছে। এমন কোনো কার্যক্রম যা এই পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় না তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হবে।

অতএব, কোম্পানির পরিচালনার অধিকার একটি কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার ওপর ন্যস্ত করা নিষিদ্ধ। বরং এটি এমন কারও ওপর ন্যস্ত করা উচিত যার পরিচালনা করার যোগ্যতা রয়েছে। যে কোনো কার্যক্রম যা এই পদ্ধতিতে পরিচালিত হয় না তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাতিল বলে গণ্য হয়। অতএব, একটি কোম্পানির পরিচালনার ভার কোনো কৃত্রিম ব্যক্তিসত্তার ওপর ন্যস্ত করা নিষিদ্ধ। বরং এটি এমন কারও ওপর ন্যস্ত করা উচিত যার পরিচালনার যোগ্যতা রয়েছে এবং তাকে অবশ্যই একজন বাস্তব মানুষ হতে হবে। সুতরাং, শরীয়তের দৃষ্টিতে পাবলিক কোম্পানি বাতিল। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে এ পর্যন্তই।

এ ধরনের কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে বলা যায়, এগুলো হলো আর্থিক কাগজ যা কেনার সময় বা মূল্যায়নের সময় কোম্পানির একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এগুলো প্রতিষ্ঠার সময় কোম্পানির মূলধনের প্রতিনিধিত্ব করে না। শেয়ার হলো কোম্পানির অস্তিত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, এটি এর মূলধনের অংশ নয়। শেয়ারের মূল্য অদ্বিতীয় নয় বা এটি স্থিতিশীলও নয়। বরং এটি কোম্পানির লাভ-ক্ষতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। এগুলো অদ্বিতীয় এবং সব সময় নির্দিষ্ট থাকে না, বরং এগুলো প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে। শরয়ী বিধান অনুযায়ী, এই শেয়ার এবং সিকিউরিটিজগুলো লেনদেন করা—তা কেনা হোক বা বিক্রি করা হোক—নিষিদ্ধ। এর কারণ হলো, এই শেয়ারগুলো এমন একটি কোম্পানির যা শরীয়ত অনুযায়ী অবৈধ। এগুলো মূলত বিলের সার্টিফিকেট, যাতে বৈধ মূলধন এবং অবৈধ লেনদেন থেকে অর্জিত অবৈধ মুনাফার মিশ্রণ রয়েছে। প্রতিটি বিল একটি শেয়ারের মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং এই শেয়ারটি অবৈধ কোম্পানির মালিকানাধীন সম্পদের একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। এই সম্পদগুলো এমন একটি অবৈধ লেনদেনের সাথে মিশ্রিত হয়েছে যা শরীয়ত নিষিদ্ধ করেছে। সুতরাং, এটি অবৈধ অর্থ, যার কেনাবেচা অবৈধ, এবং এই ধরনের অর্থের লেনদেন করাও নিষিদ্ধ। যেসব বন্ডে সুদের সাথে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য, এবং ব্যাংক শেয়ার ও অনুরূপ জিনিসগুলোর ক্ষেত্রেও এটি সত্য, কারণ এগুলোর সবটিতেই অবৈধ অর্থের পরিমাণ রয়েছে; তাই এগুলো কেনাবেচা করা অবৈধ, কারণ এর অন্তর্ভুক্ত অর্থটি অবৈধ।

এই হলো পাবলিক কোম্পানি, সেগুলোর ব্যবস্থা এবং সেগুলোর শেয়ারের কথা। আর সুদের ক্ষেত্রে, যা পুঁজিবাদী অর্থনীতি এবং অন্যান্য অর্থনীতির প্রধান বিপর্যয়, হার যাই হোক না কেন ইসলাম এটিকে চূড়ান্তভাবে নিষিদ্ধ করেছে। সুদের অর্থ নিঃসন্দেহে অবৈধ, এবং কোনো ব্যক্তির এই ধরনের অর্থের মালিক হওয়ার অধিকার নেই এবং যদি তাদের মূল মালিক জানা থাকে তবে এটি তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। সুদের ভয়াবহতার কারণে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) যারা সুদ খায় তাদের বর্ণনা করেছেন এমন ব্যক্তি হিসেবে, যাদের শয়তান তার স্পর্শ দিয়ে পাগল করে দিয়েছে।

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন:

 ٱلَّذِینَ یَأۡكُلُونَ ٱلرِّبَوٰا۟ لَا یَقُومُونَ إِلَّا كَمَا یَقُومُ ٱلَّذِی یَتَخَبَّطُهُ ٱلشَّیۡطَٰنُ مِنَ ٱلۡمَسِّۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمۡ قَالُوۤا۟ إِنَّمَا ٱلۡبَیۡعُ مِثۡلُ ٱلرِّبَوٰا۟ۗ وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَیۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰا۟ۚ فَمَن جَاۤءَهُۥ مَوۡعِظَةࣱ مِّن رَّبِّهِۦ فَٱنتَهَىٰ فَلَهُۥ مَا سَلَفَ وَأَمۡرُهُۥۤ إِلَى ٱللَّهِۖ وَمَنۡ عَادَ فَأُو۟لَٰۤئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِیهَا خَٰلِدُونَ

“যারা সুদ খায় তারা (কিয়ামতে) কেবল সেভাবেই দাঁড়াবে যেভাবে দাঁড়ায় সে যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। এটি এজন্য যে তারা বলে: ব্যবসাও তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ এসেছে এবং সে বিরত হয়েছে, তবে অতীতে যা হয়েছে তা ক্ষমার যোগ্য, তার ব্যাপারটি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে; কিন্তু যারা পুনরায় এই অপরাধ করবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।” [আল-বাকারাহ: ২৭৫]

এছাড়াও, সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার তীব্রতার কারণে, যারা এটি ভক্ষণ করে আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন:

یَٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوا۟ ٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ وَذَرُوا۟ مَا بَقِیَ مِنَ ٱلرِّبَوٰۤا۟ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِینَ ۝٢٧٨ فَإِن لَّمۡ تَفۡعَلُوا۟ فَأۡذَنُوا۟ بِحَرۡبࣲ مِّنَ ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦۖ وَإِن تُبۡتُمۡ فَلَكُمۡ رُءُوسُ أَمۡوَٰلِكُمۡ لَا تَظۡلِمُونَ وَلَا تُظۡلَمُونَ 

“হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা সত্যি মুমিন হও। যদি তোমরা তা না করো, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নিয়ে নাও; কিন্তু যদি তোমরা তওবা করো, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে, তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের প্রতিও জুলুম করা হবে না।” [আল-বাকারাহ: ২৭৮-২৭৯]

অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে: অর্থ বা মুদ্রাকে এমন একটি মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করা হয় যা মানুষ পণ্য ও সেবার মূল্যের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সম্মত হয়েছে, তা ধাতব হোক বা অন্য কিছু। এটি এমন একটি মানদণ্ড যার মাধ্যমে সমস্ত পণ্য এবং পরিষেবা পরিমাপ করা হয়। ইসলামের আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই ধাতব মুদ্রার মানদণ্ড ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত এবং প্রচলিত ছিল। যখন ইসলাম এলো, আল্লাহর রাসূল (সা.) দিনার এবং দিরহামকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারের অনুমোদন দিলেন, অর্থাৎ তিনি ধাতব মুদ্রার মানদণ্ড গ্রহণ করলেন। তিনি এগুলোকে একক মুদ্রার পরিমাপক করে দিলেন, যার মাধ্যমে সমস্ত পণ্য ও পরিষেবা পরিমাপ করা হতো।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগ পর্যন্ত বিশ্ব সোনা ও রুপাকে মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে, যখন সোনা ও রুপার লেনদেন স্থগিত করা হয়েছিল। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সোনা ও রুপার লেনদেন আংশিকভাবে আবার শুরু হয়। তারপর এই লেনদেন ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে এবং অবশেষে ১৫ জুলাই ১৯৭১ তারিখে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়, যখন ব্রেটন উডস ব্যবস্থাটি—যা নির্দেশ করেছিল যে ডলারকে সোনার আওতায় রাখা উচিত এবং একটি নির্দিষ্ট মূল্যের সাথে যুক্ত করা উচিত—বাতিল করা হয়েছিল। ফলে, কাগুজে মুদ্রা অপরিবর্তনযোগ্য (বাধ্যতামূলক) হয়ে ওঠে এবং এর পেছনে সোনা বা রুপার কোনো ব্যাকআপ থাকল না। এটি আর সোনা ও রুপার বিকল্প হিসেবেও কাজ করল না এবং এর কোনো অন্তর্নিহিত মূল্যও রইল না। বরং কাগুজে মুদ্রার মূল্য সেই আইন থেকে নেওয়া হয় যা একে একটি বৈধ মুদ্রা হিসেবে চাপিয়ে দেয়। ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো একে তাদের উপনিবেশবাদের একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য তারা বিশ্বের মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করে। এভাবে তারা আর্থিক বিপর্যয় ঘটিয়েছে এবং অর্থনৈতিক ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে এনেছে। তারা অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ছাপানো বাড়িয়ে দেয়, যা মূল্যস্ফীতির হার আকাশচুম্বী করে এবং মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতার অবনতি ঘটায়। এটি ছিল মুদ্রা বাজারে ধাক্কা লাগার পেছনে অবদান রাখা অন্যতম একটি কারণ।

পশ্চিমা বিশ্বে এই ধাক্কাগুলোর পুনরাবৃত্তি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, পাবলিক কোম্পানি ব্যবস্থা, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থার দুর্নীতিকে তুলে ধরে। এটি এই সত্যকেও তুলে ধরে যে যতদিন এই ব্যবস্থাগুলো বিদ্যমান থাকবে ততদিন পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাধি এবং মুদ্রা বাজারের ধাক্কা থেকে বিশ্বকে রক্ষা করা যাবে না। একমাত্র যে জিনিসটি বিশ্বকে এই দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, পাবলিক কোম্পানি ব্যবস্থা, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে বাঁচাতে পারে, তা হলো পাবলিক কোম্পানি ব্যবস্থা বাতিল করা বা এই কোম্পানিগুলোকে ইসলামী কোম্পানিতে রূপান্তরিত করা সহ এই দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বাতিল করা। এই ব্যাধি থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে হলে, সুদভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং অপরিবর্তনযোগ্য কাগুজে মুদ্রা ব্যবস্থা বাতিল করতে হবে এবং পুনরায় সোনা ও রুপার মানদণ্ড চালু করতে হবে।

এটি ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাংকগুলোর সুদী ঋণের অবসান ঘটাবে। এটি সেই ফটকা কারবারগুলোরও (speculations) অবসান ঘটাবে যা মুদ্রা বাজারে এই ধাক্কাগুলোর কারণ হয়েছে। সুদী ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তাও শেষ হয়ে যাবে। ফলস্বরূপ, বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে এবং আর্থিক সংকট দূর হবে। মুদ্রা বাজার থাকার অজুহাতও অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং এর সাথে অর্থনৈতিক সংকটও দূর হবে।

আমাদের সাইয়্যিদ (নেতা) আল্লাহর রাসূল (সা.), তাঁর পরিবার, সাহাবী এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণ করবেন, তাঁদের ওপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

Leave a Reply