আধুনিক বিশ্বে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা বা বয়ান (Narrative) হলো, পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষ করে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপীয় দেশগুলো—তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক পরাশক্তি এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের শিখরে আরোহণ করেছে কেবল তাদের নিজস্ব মেধা, কঠোর পরিশ্রম, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর মাধ্যমে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির গভীরতর সামষ্টিক বিশ্লেষণ আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করে। এই নির্জলা বাস্তবতা হলো শোষণ, উপনিবেশবাদ (Colonialism) এবং সুকৌশলী আধুনিক আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে তৃতীয় বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথ (Global South) থেকে অবিরাম সম্পদ পাচারের এক ভয়াবহ ও ধারাবাহিক চিত্র।
প্রদত্ত ভিডিওটির মূল সুর এবং বিভিন্ন গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে এটি স্পষ্ট যে, পশ্চিমা উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি তাদের নিজেদের ভৌগোলিক সীমানার ভেতরের সম্পদ নয়; বরং শতাব্দী ধরে এশিয়া, আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে পদ্ধতিগতভাবে লুণ্ঠিত সম্পদই তাদের এই অভাবনীয় উন্নতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। নিচে এই ঐতিহাসিক ও আধুনিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত বিস্তারিত এবং ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: উপনিবেশবাদ এবং বৃটিশ ভারতের সম্পদ লুণ্ঠন
বর্তমান বৈশ্বিক বৈষম্যকে বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। সম্পদ লুণ্ঠনের এই প্রথা আজকের নয়, বরং এটি শত শত বছর ধরে চলে আসা এক সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। এর সবচেয়ে বড় এবং প্রকট উদাহরণ হলো ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়ক (Utsa Patnaik) প্রায় দুই শতাব্দীর কর এবং বাণিজ্যের বিশদ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেছেন যে, বৃটিশরা ভারত থেকে যে পরিমাণ সম্পদ লুণ্ঠন করেছে তার আর্থিক মূল্যমান কল্পনাতীত। তার গবেষণা অনুযায়ী, ১৭৬৫ সাল থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে বৃটেন ভারত থেকে প্রায় ৯.২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড সম্পদ পাচার করেছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন (৪৫ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার। এই হিসাবটি বের করা হয়েছে ভারতের রপ্তানি উদ্বৃত্ত আয়কে ৫ শতাংশ সুদের হারে চক্রবৃদ্ধি করে।
লুণ্ঠনের অভিনব মেকানিজম (Tax-and-Buy System & Council Bills):
বৃটিশরা কীভাবে এই বিশাল সম্পদ পাচার করেছিল, তার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত ধূর্ত। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন দেওয়ানি লাভ করে, তখন তারা একটি অদ্ভুত ব্যবস্থার জন্ম দেয়। এর আগে বৃটেন সাধারণ নিয়মে রুপা বা সোনা দিয়ে ভারতের কৃষিপণ্য ও টেক্সটাইল কিনত। কিন্তু দেওয়ানি লাভের পর তারা ভারতীয় কৃষকদের ওপর চড়া করারোপ করে এবং সেই করের টাকার একটি বড় অংশ (প্রায় এক-তৃতীয়াংশ) দিয়েই আবার ভারতীয়দের পণ্য কিনতে শুরু করে। অর্থাৎ, বৃটিশরা ভারতীয়দের নিজস্ব উৎপাদিত পণ্য কিনছিল ভারতীয়দেরই দেওয়া করের টাকা দিয়ে। এটি ছিল মূলত বিনা মূল্যে পণ্য আত্মসাৎ করার এক অভিনব প্রতারণা।
পরবর্তীতে ১৮৫৮ সালে বৃটিশ রাজ শাসনভার গ্রহণের পর এই ব্যবস্থা আরও জটিল আকার ধারণ করে। তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারতীয়দের পণ্য কেনার জন্য “কাউন্সিল বিল” (Council Bills) নামক একটি বিশেষ পেপার কারেন্সি বা কাগজের মুদ্রা চালু করা হয়, যা কেবল লন্ডনে সোনা বা রুপা দিয়ে কেনা যেত। বিদেশি ব্যবসায়ীরা লন্ডনে সোনা দিয়ে এই বিল কিনতেন এবং সেই বিল দিয়ে ভারতীয়দের মূল্য পরিশোধ করতেন। ভারতীয়রা যখন স্থানীয় বৃটিশ অফিসে সেই বিল ভাঙাতেন, তখন তাদেরকে স্থানীয় করের টাকা থেকে রুপি দেওয়া হতো। ফলে ভারতের পাওনা সমস্ত সোনা ও রুপা সরাসরি লন্ডনের কোষাগারে জমা হতে থাকে।
ভারতীয় অর্থনীতি ও জনজীবনে প্রভাব:
এই অপরিসীম লুণ্ঠনের ফলাফল ছিল ভারতের জন্য চরম বিপর্যয়কর।
- ১৯০০ সাল থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যে ভারতে মাথাপিছু আয়ে কার্যত কোনো প্রবৃদ্ধি হয়নি।
- উচ্চ করের চাপে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এতটাই কমে গিয়েছিল যে, ১৯০০ সালে যেখানে বার্ষিক মাথাপিছু খাদ্যশস্য ভোগের পরিমাণ ছিল ২০০ কেজি, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৫৭ কেজিতে এবং ১৯৪৬ সালে তা ১৩৭ কেজিতে নেমে আসে।
- পুষ্টিহীনতা এবং রোগের কারণে মানুষ মাছির মতো মারা যেত; ১৯১১ সালে একজন ভারতীয়র গড় আয়ু ছিল মাত্র ২২ বছর।
- অন্যদিকে, এই লুণ্ঠিত সম্পদ এবং সস্তা কাঁচামালই বৃটেনে শিল্প বিপ্লবের (Industrial Revolution) মূল চালিকাশক্তি এবং অর্থায়নের উৎস হিসেবে কাজ করেছিল।
২. আধুনিক লুণ্ঠনের হাতিয়ার: পেট্রো-ডলার এবং”কালো সোনা”

উপনিবেশবাদের যুগ শেষ হলেও লুণ্ঠন থামেনি, কেবল তার রূপ পরিবর্তন হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি হলো তেল, যাকে ‘কালো সোনা’ (Black Gold) বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ তৃতীয় বিশ্বের এই মহামূল্যবান সম্পদকে পশ্চিমা বিশ্ব কীভাবে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তা বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অবিচারগুলোর একটি।
তেলের অবমূল্যায়ন এবং পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা:
গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য কৃত্রিমভাবে ব্যারেল প্রতি মাত্র ২৫ ডলারের আশেপাশে রাখা হয়েছিল। একটি ব্যারেল তেলের যে অর্থনৈতিক উপযোগিতা, তার তুলনায় এই দাম ছিল হাস্যকর। ফ্রান্সের সাধারণ মিনারেল ওয়াটারের দামও এই তেলের চেয়ে বহুগুণ বেশি। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর (Michael Moore) তার “ফারেনহাইট ৯/১১” (Fahrenheit 9/11) ডকুমেনটারিতে দেখিয়েছেন যে, এই কম দামের সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো প্রায় ৮৪ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদ তৃতীয় বিশ্ব থেকে লুটে নিয়েছে। পশ্চিমাদের গত ৬০-৮০ বছরের বিশাল শিল্পায়ন এবং কারখানাগুলোর বিকাশ মূলত এই অত্যন্ত সস্তা জ্বালানির ওপর নির্ভর করেই ঘটেছে।
তেলের এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো পেট্রো-ডলার সিস্টেম (Petrodollar System)। সত্তরের দশকের পর থেকে এই ব্যবস্থা মার্কিন ডলারের আধিপত্যের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। এই ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল কেনাবেচা বাধ্যতামূলকভাবে মার্কিন ডলারে করতে হয়। এর ফলে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রচুর ডলার আয় করে এবং পরবর্তীতে সেই ডলার “পেট্রো-ডলার রিসাইক্লিং” (Petrodollar Recycling) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বা পশ্চিমা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ করতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ, তেলের টাকা শেষ পর্যন্ত ঘুরেফিরে আমেরিকার কোষাগারেই জমা হয়, যা তাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী রাখে।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন:
তবে, এই পেট্রো-ডলার ব্যবস্থায় সম্প্রতি ফাটল ধরতে শুরু করেছে।
- ২০২১ সালে ইরান চীনের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী একটি কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং তাদের তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশ ইউয়ানে (Yuan) বিক্রি শুরু করে।
- ২০২৩ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো (Aramco) এবং চীনের সিনোপেকের (Sinopec) মধ্যে চুক্তির ফলে দ্বিপাক্ষিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশ ইউয়ানে লেনদেন শুরু হয়।
- একই বছর কাতার পেত্রোচায়নার (PetroChina) সাথে দীর্ঘমেয়াদী তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) চুক্তিতে ডলারকে পাশ কাটিয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলো প্রমাণ করে যে, ডলারের আধিপত্য এবং পশ্চিমাদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
৩. সার্বভৌম সম্পদ তহবিল (Sovereign Wealth Fund) এবং পশ্চিমাদের অর্থায়ন
পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় প্রকল্প, মহাকাশ গবেষণা, কিংবা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিপ্লবের পেছনে যে বিশাল অর্থের প্রয়োজন, তা পশ্চিমা দেশগুলো নিজস্ব পকেট থেকে খরচ করে না। এই অর্থের একটি বিশাল জোগান আসে মধ্যপ্রাচ্য এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর “সার্বভৌম সম্পদ তহবিল” (Sovereign Wealth Fund – SWF) থেকে।
সার্বভৌম সম্পদ তহবিল কী?
সার্বভৌম সম্পদ তহবিল হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিনিয়োগ তহবিল, যা সাধারণত কোনো দেশের পণ্য রপ্তানি (যেমন: তেল বা গ্যাস) থেকে অর্জিত রাজস্ব বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে গঠিত হয়। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় থেকে এই তহবিলগুলো বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বর্তমানে বৈশ্বিক SWF-এর সম্পদের পরিমাণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (GCC) এবং মার্কিন অর্থনীতি:
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ইত্যাদি—তাদের তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে এই ধরনের বিশাল তহবিল গঠন করেছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় এক ডজন সাভরেইন ফান্ডের অধীনে ৪ থেকে ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ রয়েছে।
- আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল সম্পদের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। গ্লোবাল এসডাব্লিউএফ-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের বৃহত্তম সাতটি তহবিল প্রায় ১১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যার সিংহভাগই গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
- সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) ব্ল্যাকস্টোনের (Blackstone) একটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং ব্ল্যাকরক (BlackRock), গোল্ডম্যান স্যাক্স-এর (Goldman Sachs) মতো পশ্চিমা আর্থিক জায়ান্টদের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
- এছাড়া, মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং প্রযুক্তি খাতেও এই দেশগুলোর অর্থ ঢালা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ওপেনএআই (OpenAI) এবং এক্সএআই (xAI)-এর মূলধন সংগ্রহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এমজিএক্স (MGX) বিশাল বিনিয়োগ করেছে।
অর্থাৎ, তৃতীয় বিশ্বের যে অর্থ তাদের নিজেদের দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, সেই অর্থ দিয়ে আমেরিকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপ্লব ঘটানো হচ্ছে এবং মার্কিন শেয়ারবাজারকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রাখা হচ্ছে।
৪. আধুনিক ঋণ ফাঁদ এবং নিট সম্পদ স্থানান্তর (Net Resource Transfer)
পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানি (Multinational Corporations) এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর (যেমন: IMF, World Bank) মাধ্যমে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এবং ঋণের আড়ালে একটি কাঠামোগত লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
উন্নয়নশীলদেশগুলোর বর্তমান সংকট:
জাতিসংঘের ‘ফাইন্যান্সিং ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৪’ (Financing for Sustainable Development Report 2024) অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোর আর্থিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
- বর্তমানে এই দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বার্ষিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ঘাটতি রয়েছে।
- বহু উন্নয়নশীল অর্থনীতি আজ ঋণের ভারে জর্জরিত, যার ফলে দারিদ্র্য এবং ক্ষুধা নিরসনের কয়েক দশকের অগ্রগতি থমকে গেছে।
ঋণ এবং লুণ্ঠনের চক্র:
১৯৮০ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে বিভিন্ন শর্তে প্রায় ১৫০০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ১৫০০ বিলিয়ন ডলার ঋণের মধ্যে প্রায় ১০০০ বিলিয়ন ডলারই আবার পশ্চিমা বিশ্বে ফেরত চলে গেছে। এটি কীভাবে সম্ভব?
এটি ঘটে মূলত অসম বিনিময়, ঋণের চড়া সুদ, এবং “ক্যাপিটাল ফ্লাইট” (Capital Flight) বা অর্থ পাচারের মাধ্যমে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নীতিনির্ধারণের কাজ প্রায়ই আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, যারা পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষা করে এমন একতরফা নীতি চাপিয়ে দেয় (one-size-fits-all approach)। ফলে ঋণের মাধ্যমে যে অর্থ তৃতীয় বিশ্বে আসে, তা দেশের প্রকৃত উন্নয়নে ব্যবহৃত না হয়ে বহুজাতিক কোম্পানির লভ্যাংশ হিসেবে কিংবা দুর্নীতিবাজ অভিজাত শ্রেণির মাধ্যমে সুইজারল্যান্ড বা আমেরিকার ব্যাংকেই আবার জমা হয়।
৫. শাসকশ্রেণির দায়বদ্ধতা এবং সুবিধাভোগী মানসিকতা (Rent-Seeking)
এই সামগ্রিক লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় তৃতীয় বিশ্ব বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো এবং শাসকশ্রেণির ভূমিকা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। পশ্চিমা বিশ্ব তাদের শোষণ প্রক্রিয়া এতটা মসৃণভাবে চালাতে পারত না, যদি না তৃতীয় বিশ্বের শাসকরা তাদের সহযোগী হতেন।
রেন্ট-সিকিং বা সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণি:
উন্নয়নশীল দেশগুলোর, বিশেষ করে পাকিস্তান বা অন্যান্য গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর শাসক এবং এলিট শ্রেণি প্রায়শই ‘রেন্ট-সিকিং’ (rent-seeking) বা সুবিধাভোগী মানসিকতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে। তারা বৈশ্বিক অর্থনীতি থেকে সম্পদ (প্রধানত ঋণের চুক্তির মাধ্যমে) সংগ্রহ করে এবং তার বোঝা পরোক্ষ করের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মজীবী মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়।
রাজনৈতিক শর্তারোপ এবং সহায়তার প্রহসন:
পশ্চিমা মদদপুষ্ট এই ব্যবস্থায় আর্থিক সহায়তার নামে কীভাবে প্রহসন করা হয়, তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো পাকিস্তানের স্টেট ব্যাংকে সৌদি আরবের অর্থ জমা রাখা। পাকিস্তান যখন চরম ডলার সংকটে ভোগে, তখন সৌদি আরব স্টেট ব্যাংকে ১ বিলিয়ন ডলার জমা রাখে, কিন্তু শর্ত জুড়ে দেয় যে এই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না। এটি কেবল ব্যালেন্স শিট ভারী করে দেখানোর জন্য রাখা হয়, যাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কাছে দেশের আর্থিক সামর্থ্যের একটি বিভ্রম তৈরি করা যায়। একইভাবে, তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে মেগা প্রজেক্ট বা রিফাইনারি স্থাপনের নামে বছরের পর বছর কালক্ষেপণ করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য থাকে পশ্চিমা দেশগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডি বা কনসালটেন্সির নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া।
৬. উপসংহার: উত্তরণের পথ এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা
উপরের এই বিশদ আলোচনা থেকে এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, পশ্চিমা বিশ্বের বর্তমান অর্থনৈতিক আধিপত্য কোনো অলৌকিক জাদুর ফল নয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির করের টাকায় ভারতের পণ্য কেনা থেকে শুরু করে আজকের পেট্রো-ডলার পুনর্ব্যবহার এবং সাভরেইন ওয়েলথ ফান্ডের মার্কিন প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ—পুরো প্রক্রিয়াটি একই সুতোর ভিন্ন ভিন্ন প্রান্ত। এটি একটি নিঁখুত ঔপনিবেশিক মডেল (Colonial Model), যা যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করেছে মাত্র।
উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং মুসলিম দেশগুলোর সম্পদ মূলত একটি “গ্লোবাল ওয়েলথ ড্রেইন” (Global Wealth Drain) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিনিয়ত পশ্চিমা কোষাগারে গিয়ে জমা হচ্ছে। এর থেকে মুক্তির পথ অত্যন্ত দুর্গম। যতক্ষণ পর্যন্ত না গ্লোবাল সাউথ তাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবস্থা (যেমনটি ব্রিকস বা ইউয়ানের মাধ্যমে শুরু হয়েছে) শক্তিশালী করতে পারবে, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোতে নিজেদের সমানাধিকার নিশ্চিত করতে পারবে এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবাজ ও পরজীবী শাসকশ্রেণির পতন ঘটিয়ে দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আধুনিক এই লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। পশ্চিমা বিশ্বের চোখধাঁধানো উন্নয়নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই বঞ্চনার ইতিহাস ও অর্থনীতি সম্পর্কে সচেতন হওয়াই এই শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।








