ঈমানের মাধুর্য (حَلاوةُ الإيمانِ হালাওয়াতুল ঈমান); জনগণের নেতৃত্বের হৃদস্পন্দন
হযরত আনাস ইবন মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«ثَلَاثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ: مَنْ كَانَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَمَنْ أَحَبَّ عَبْدًا لَا يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَمَنْ يَكْرَهُ أَنْ يَعُودَ فِي الْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْقَذَهُ اللَّهُ مِنْهُ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُلْقَى فِي النَّارِ»
“তিনটি গুণ আছে; যার মধ্যে এগুলো থাকবে, সে ঈমানের মাধুর্য (মিষ্ট স্বাদ) লাভ করবে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হবে; সে কোনো বান্দাকে ভালোবাসবে কেবল আল্লাহর জন্য; এবং আল্লাহ তাকে কুফর থেকে রক্ষা করার পর আবার কুফরে ফিরে যাওয়াকে সে তেমনই অপছন্দ করবে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে অপছন্দ করে”। [বুখারি বর্ণিত]।
ইমাম আন-নাওয়াবী (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর শরহে (شرح হাদিস ব্যাখ্যা) বলেছেন,
(هَذَا حَدِيثٌ عَظِيمٌ أَصْلٌ مِنْ أُصُولِ الْإِسْلَامِ قَالَ الْعُلَمَاءُ رَحِمَهُمُ اللَّهُ مَعْنَى حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ اسْتِلْذَاذُ الطاعات وتحمل المشقات في رضى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَإِيثَارُ ذَلِكَ عَلَى عَرَضِ الدُّنْيَا وَمَحَبَّةِ الْعَبْدِ رَبَّهُ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى بِفِعْلِ طَاعَتِهِ وَتَرْكِ مُخَالَفَتِهِ وَكَذَلِكَ مَحَبَّةُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ)
“এই মহান হাদিসটি ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অন্তর্ভুক্ত একটি মৌলিক বিষয়। আলেমগণ বলেছেন, ঈমানের মাধুর্যের অর্থ হলো আনুগত্যমূলক কাজে আনন্দ অনুভব করা, আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কষ্ট সহ্য করা, একে দুনিয়াবি লাভের ওপর প্রাধান্য দেওয়া, এবং আল্লাহর আনুগত্য ও অবাধ্যতা পরিহার করে তাঁকে ভালোবাসা; তদ্রূপ আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালোবাসা।”
ক্বাযী ইয়ায (রহিমাহুল্লাহ) বলেন—
«هَذَا الْحَدِيثُ بِمَعْنَى الْحَدِيثِ الْمُتَقَدِّمِ (ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبًّا ، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا ، وَبِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَسُولًا) وَذَلِكَ أَنَّهُ لَا يَصِحُّ الْمَحَبَّةُ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حَقِيقَةً وَحُبُّ الْآدَمِيِّ فِي اللَّهِ وَرَسُولِهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَكَرَاهَةُ الرُّجُوعِ إِلَى الْكُفْرِ إِلَّا لِمَنْ قَوَّى بِالْإِيمَانِ يَقِينُهُ ، وَاطْمَأَنَّتْ بِهِ نَفْسُهُ ، وَانْشَرَحَ لَهُ صَدْرُهُ ، وَخَالَطَ لَحْمَهُ وَدَمَهُ . وَهَذَا هُوهُ الَّذِي وَجَدَ حَلَاوَتَهُ»
এই হাদিসটি পূর্ববর্তী সেই হাদিসেরই অর্থ বহন করে: “যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রাসূল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করেছে, সে ঈমানের স্বাদ আস্বাদন করেছে।” এর কারণ হলো—আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা, আল্লাহর জন্য মানুষকে ভালোবাসা এবং কুফরে ফিরে যাওয়ার প্রতি ঘৃণা—এসব কেবল তার মধ্যেই সত্যভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার ঈমানের দৃঢ়তা শক্তিশালী, যার অন্তর এতে প্রশান্তি লাভ করেছে, যার বক্ষ এর জন্য উন্মুক্ত হয়েছে এবং যার সত্তা-মাংস-রক্তের সঙ্গে তা মিশে গেছে। এ ব্যক্তিই প্রকৃতপক্ষে ঈমানের মাধুর্য লাভ করেছে। তিনি আরও বলেন—
(وَالْحُبُّ فِي اللَّهِ مِنْ ثَمَرَاتِ حُبِّ اللَّهِ)
“আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহকে ভালোবাসারই ফল।”
কারী বদরুদ্দীন আল-আইনী বলেছেন,
(وَقَالَ بَعضهم الْمحبَّة مواطأة الْقلب على مَا يُرْضِي الرب سُبْحَانَهُ، فيحب مَا أحبَّ وَيكرهُ مَا يكره)
“কিছু উলামা বলেছেন, মহব্বত’ হলো অন্তরের এমন সামঞ্জস্য, যা মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির সাথে মিলিত হয়; ফলে সে ভালোবাসে যা তিনি ভালোবাসেন এবং অপছন্দ করে যা তিনি অপছন্দ করেন।”
সংক্ষেপে বলা যায়, ভালোবাসার সারকথা হলো প্রিয় সত্তার সন্তুষ্টির দিকে অন্তরের ঝোঁক। এই ঝোঁক কখনো হতে পারে মানুষের স্বাভাবিক পছন্দনীয় ও আকর্ষণীয় বিষয়ের দিকে—যেমন সুন্দর অবয়ব, সুমধুর কণ্ঠ, রুচিকর খাদ্য ইত্যাদি। আবার তা হতে পারে অন্তর্নিহিত অর্থ ও গুণাবলির কারণে—যেমন নেককার ব্যক্তিবর্গ, আলিম-উলামা এবং সাধারণভাবে সৎ ও গুণী মানুষের প্রতি ভালোবাসা। কখনো এটি হয় কারো অনুগ্রহ, উপকার কিংবা বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করার কারণে।
এই সকল অর্থ ও গুণ নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে পূর্ণভাবে বিদ্যমান ছিল; কারণ তিনি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের সমন্বয়, পূর্ণাঙ্গ মহিমাময় গুণাবলির অধিকারী এবং সর্বপ্রকার উৎকৃষ্ট গুণের সমাবেশস্থল ছিলেন। আর আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) সকল মুসলমানের ওপর অনুগ্রহ করেছেন—তাদের সরল পথে পরিচালিত করে, নেয়ামতসমূহ অব্যাহত রেখে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে তাদের রক্ষা করে।
কিছু আলিম বলেছেন, এই ভালোবাসার ধারণা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; কারণ সমস্ত কল্যাণ তাঁর পক্ষ থেকেই উৎসারিত। ইমাম মালিকসহ অন্যান্য আলিমগণ বলেছেন—
(الْمَحَبَّةُ فِي اللَّهِ مِنْ وَاجِبَاتِ الْإِسْلَامِ)
“আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ইসলামের ফরজ দায়িত্বসমূহের অন্তর্ভুক্ত।”
এটি হাদিসের অর্থ সম্পর্কিত আলোচনা। বর্তমান মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে এর সম্পর্ক বোঝাতে গিয়ে বলা হচ্ছে, যখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন—
«اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا»
অর্থাৎ “আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) এবং তাঁর রাসূল তার নিকট অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয় হবে”— তখন তিনি এমন এক গভীর অনুভূতির কথা বলছেন, যা হৃদয়ের গোপনতম কোণাগুলোতেও অবস্থান করে, এবং যার সঙ্গে থাকে এমন এক গভীর আবেগিক রূপান্তর, যা সব প্রতিদ্বন্দ্বী আকর্ষণকে মুছে দেয়।
এই ভালোবাসাই হলো সেই কেন্দ্রবিন্দু, যার দিকে মানুষের সকল অনুভূতি ও ইন্দ্রিয় আকৃষ্ট হয়। এতে কোনো নেতার প্রতি অন্ধ আনুগত্য থাকে না, কোনো মানবসৃষ্ট সংবিধানকে পবিত্রতা দেওয়া হয় না, এবং আদর্শিক রাজনীতির ভারসাম্যের নামে বিশ্বের নেতৃত্বদানকারী শক্তিগুলোর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পণও করা হয় না। বরং এই ভালোবাসা হলো শরীয়াহর পূর্ণ সার্বভৌমত্বের প্রতি আনুগত্য । এটি সেই মুহূর্ত, যখন মুমিন দেখে যে আন্তর্জাতিক আইন ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-র পরিবর্তে উপাসিত আধুনিক মূর্তি ছাড়া আর কিছু নয়।
এখানে ঈমানের মাধুর্য নিহিত রয়েছে সেই আত্মিক গৌরবে, যা মানুষকে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ছাড়া অন্য কারও সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করতে শেখায়। এতে বিশ্বাস করা হয় যে, ইসলামের আদর্শ কেবল সালাত, কিয়াম, তাহাজ্জুদ ও দোয়ার মতো ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা হলো শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামোসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)- এর প্রদত্ত শরীয়াহর পূর্ণ বাস্তবায়নের প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। পৃথিবীতে কেবল তাদেরই আনুগত্য করা হবে, যাদের আনুগত্য করার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন। আর এই অঙ্গীকারের মাধ্যমেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা বাস্তবভাবে প্রকাশ পায়।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই বাণী—
«اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا»
অর্থাৎ “আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) এবং তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়”—উম্মাহর বিষয়াবলির দেখভালের মূল ভিত্তি ও সারকথা। ইসলামের আদর্শিক বোঝাপড়ায় ভালোবাসা মানে পূর্ণ আত্মসমর্পণ, এবং এটি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর শরীয়াহ ব্যতীত সকল ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করার দাবি রাখে।
যে ব্যক্তি এই ভালোবাসার মাধুর্য আস্বাদন করেছে, সে গণতন্ত্রে জনগণের জন্য আইন প্রণয়নের সার্বভৌমত্বকে গ্রহণ করতে পারে না, এবং মানবসৃষ্ট সংবিধানের পবিত্রতাকেও স্বীকৃতি দেয় না। এটি এমন এক দাওয়াহ, যা উপনিবেশিকদের দ্বারা আমাদের ভূখণ্ডে স্থাপন করা তথাকথিত “রাজনৈতিক প্রতিমা”-গুলোকে ভেঙে চূর্ণ করার আহ্বান জানায়; এবং ঘোষণা করে যে, আনুগত্য কেবল উম্মাহর সেই সভ্যতাগত প্রকল্পের প্রতিই , যা দ্বিতীয় খিলাফাহ রাশিদাহর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে—যা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর কালিমাকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে এবং কাফিরদের অবস্থাকে নিম্নতম পর্যায়ে নামিয়ে আনবে।
আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী—
«وَمن أَحَبَّ َعبًدا ال ُيِحُّبه إاَّل ِهلل عَّز وجَّل»
অর্থাৎ “সে কোনো বান্দাকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালোবাসে”—এটি এমন এক গভীর বন্ধন, যা তথাকথিত জাতিরাষ্ট্রের বিকৃত কাঠামোর ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এটি এমন এক সম্পর্ক, যা ভৌগোলিক সীমানা, রক্তের সম্পর্ক ও ভাষার বিভাজনকে অতিক্রম করে উম্মাহকে এক দেহে রূপান্তরিত করে। যখন তুমি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য তোমার ভাইকে ভালোবাসো, তখন তুমি তোমার জাতিগত পরিচয়কে তার সহায়তার পথে বাধা হতে দাও না, এবং কোনো “জাতীয় স্বার্থ”-কে তার সাহায্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার বৈধতা হিসেবেও গ্রহণ করো না। এই বক্তব্য যেন এক আলোর বন্ধন তৈরি করে, যা পাকিস্তানের এক মুসলমানের হৃদয়কে তার সুদানের ভাইয়ের হৃদয়ের সঙ্গে একাকার করে দেয়; আর উপনিবেশবাদীদের রক্তে আঁকা কৃত্রিম জাতীয় সীমানার বিভাজনকে ছাপিয়ে উম্মাহর একতাবদ্ধ চেতনাকে জাগিয়ে তোলে।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী—
«وَمن َيكَرُه أن َيعوَد في الُكفِر َبعَد إذ أنَق َذه ا ُهلل منه كما َيكَرُه أن ُيلقى في الَّنار»
অর্থাৎ “আল্লাহ তাকে কুফর থেকে রক্ষা করার পর পুনরায় কুফরে ফিরে যেতে সে এমনভাবে ঘৃণা করে, যেমন সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে ঘৃণা করে”— এটি ইসলামের আলো এবং মানবসৃষ্ট ব্যবস্থার অন্ধকারের মধ্যকার এক গভীর হৃদয়গত বিচ্ছেদের প্রকাশ। এটি এমন এক স্পষ্ট ঘোষণা, যেখানে অন্ধকার যুগ ও পরাধীনতার দিকে আর কখনো ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ফুটে ওঠে। এতে প্রতিফলিত হয় সেই মানুষদের মানসিকতা, যারা ইসলামের মাধ্যমে মর্যাদা ও সম্মানের স্বাদ পেয়েছে, কিন্তু পরে তাদের আবার পশ্চিমা আধিপত্য ও পরনির্ভরতার কাঠামোয় ফিরে যেতে বলা হয়। এখানে ‘কুফর’ কেবল স্রষ্টাকে অস্বীকার করাকেই বোঝায় না; বরং এমন এক দমনমূলক ব্যবস্থা, যা উম্মাহকে ঋণের শৃঙ্খল, অপমানজনক চুক্তি এবং ভণ্ড গণতন্ত্রের মাধ্যমে আবদ্ধ করে রাখে। যে মুমিন পুনর্জাগরণের (نهضة) চিন্তাধারায় নিজেকে গড়ে তুলেছে, তার কাছে তথাকথিত নাগরিক রাষ্ট্র বা সেক্যুলারিজম হলো এমন এক আগুন, যা উম্মাহর পরিচয়কে দগ্ধ করে এবং তার ভবিষ্যৎকে গ্রাস করে। তাই তার আদর্শে অটল থাকা, রাজনৈতিক আপসকে প্রত্যাখ্যান করা এবং আধা-সমাধান মেনে না নেওয়া—সবই সেই আগুন থেকে দূরে সরে যাওয়ারই নামান্তর।
এখানে ঈমানের আসল স্বাদ হলো সেই গভীর বিশ্বাস, যা একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষকে এই উপলব্ধি দেয় যে, বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কষ্টকর জীবন যাপন করা, কুফরী ব্যবস্থার ছায়াতলে ভোগবাদী ও ভ্রান্ত সুখে ডুবে থাকার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর, পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ।
দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদের নেতৃত্বে পরিচালিত তীব্র উপনিবেশবাদী আক্রমণের ভারে, এবং যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাগুলো উম্মাহকে দমন করে মানবসৃষ্ট আইন ও জঙ্গলের নীতির অধীন করতে তাদের সকল উপকরণ ব্যবহার করছে, তখন নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী এক দৃঢ় বৌদ্ধিক ভিত্তি (intellectual foundation) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা মৌলিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে শক্তি জোগায়। ঈমানের মাধুর্য সংঘাতের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ইবাদতমূলক আচার নয়; বরং এটি এমন এক বিপ্লবী শক্তি, যা মানবতাকে পশ্চিমা ব্যবস্থার দাসত্ব থেকে মুক্ত করে এবং তাকে ওহির কর্তৃত্বে ফিরিয়ে আনে। এই ভালোবাসাই গাজা, সিরিয়া, কাশ্মীর এবং তুর্কিস্তানের মুসলমানদের রক্তকে এক রক্তে পরিণত করে। এটি সেই বন্ধন, যা কৃত্রিম জাতীয়তাবাদী সীমানাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সেগুলোকে ঔপনিবেশিক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে।
এখানে ঈমানের মাধুর্য নিহিত রয়েছে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে একক পতাকার নিচে ঐক্যবদ্ধ করার নিরন্তর প্রচেষ্টায়—যা রায়াহ আল-উকাবের পতাকা হিসেবে অভিহিত—যাতে মুসলমানরা এমন এক শক্তিশালী আন্তর্জাতিক শক্তিতে পরিণত হয়, যাকে অবিশ্বাসী ও উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো ভয় করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসে, সে এমন কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিকে মেনে নিতে পারে না, যার মাধ্যমে একটি ইহুদি রাষ্ট্রকে সেই ভূমিতে অধিকার প্রদান করা হয়েছে, যা ইসরা (রাত্রিকালীন সফর)-এর গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।
ঈমানের এই স্বাদ জাতিসংঘ ও তার নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবসমূহকে প্রত্যাখ্যান করা এবং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর শরীয়াহর প্রতি অটল থাকা অপরিহার্য করে তোলে—যা ফিলিস্তিনের প্রতি ইঞ্চি ভূমিকে সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে মুক্ত করার (তাহরীর) নির্দেশ দেয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ভিক্ষা চাওয়ার মাধ্যমে নয়; কারণ সেটি সমস্যার মূল উৎস। বরং এটি আল্লাহর ওহির সার্বভৌমত্বকে পশ্চিমা রাজনৈতিক কেন্দ্র যেমন হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনার ওপর ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান।
ঈমানের মাধুর্য নিহিত রয়েছে সেই বিশ্বাসের বন্ধনে, যা ইসলামি উম্মাহকে এক দেহের মতো ঐক্যবদ্ধ করে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য ভালোবাসা সাইকস-পিকট দ্বারা আরোপিত জাতীয়তাবাদী সীমারেখাকে ভেঙে দেওয়ার দাবি তোলে, যেগুলো তথাকথিত ইহুদি রাষ্ট্রকে রক্ষা করে রেখেছে। গাজা ও বায়তুল মাকদিসকে সমর্থন করা কেবল মানবিক সংহতির বিষয় নয়; বরং এটি এমন এক শরয়ি বাধ্যবাধকতা, যা মুসলিম ভূমিতে সামরিক শক্তি ও সুরক্ষার অধিকারীদের (أهل القوة والمنعة আহলুল কুওয়াহ ওয়াল মানাআহ) ওপর বাধ্য করে যে তারা সেই রুয়াইবিদাহদের— দুর্বল ও অযোগ্য শাসকদের —উৎখাত করবে, যারা সেনাবাহিনীকে আল-মসজিদ আল-আকসা মুক্ত করতে অগ্রসর হতে বাধা দেয়।
এই ভ্রাতৃত্ব দখলদার ইহুদি শক্তির সঙ্গে নিরাপত্তা-সমন্বয়কে প্রত্যাখ্যান করে এবং ভূমি ও তার জনগণকে মুক্ত করার লক্ষ্যে জিহাদের চেতনাকে পুনর্জীবিত করে।
ঈমানের এই মাধুর্য আকিদাভিত্তিক ভ্রাতৃত্বকে জাতীয়তাবাদী সামরিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য ভালোবাসা দাবি করে যে, জর্ডান, মিশর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সেনাবাহিনীতে থাকা মুসলমানরা গাজা, সুদান, মিয়ানমার (বার্মা) ও সিরিয়ার মুসলমানদের রক্ত ও ঈমানের ভাই হিসেবে দেখবে এবং তাদের তাৎক্ষণিক সহায়তার যোগ্য মনে করবে।
সামরিক বাহিনীতে থাকা একজন মুমিনকে কুফরের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মধ্যে থাকা এবং তার অধীনতাকে ততটাই ঘৃণা করতে হবে, যতটা সে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে ঘৃণা করে। এখানে ইসলামী আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা মানে হলো পশ্চিমা আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়া এবং সামরিক বাহিনীকে উপনিবেশবাদীদের স্বার্থরক্ষার প্রহরী বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধীতার নামে জনগণের ওপর নিপীড়নের হাতিয়ার হতে না দেওয়া। ঈমানের এই মাধুর্য সামর্থ্যবান ও শক্তিধর গোষ্ঠীসমূহকে (أهل القوة والمنعة) এ অপমানজনক বাস্তবতাকে প্রত্যাখ্যান করতে উদ্বুদ্ধ করে এবং এমন এক মৌলিক পরিবর্তনের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে, যা বর্তমান শাসনব্যবস্থার বৈধতাকে বিলুপ্ত করে দিয়ে নেতৃত্বকে এমন এক অভিভাবক ইমামের হাতে ন্যস্ত করবে—যার পেছনে থেকে সংগ্রাম করা হয় এবং যাকে রক্ষা করা হয়।
আজকের ফিলিস্তিন কোনো দুর্বল আরব সম্মেলন বা বিভ্রান্তিকর আন্তর্জাতিক প্রস্তাবের প্রতীক্ষায় নেই; বরং সে অপেক্ষা করছে এমন এক উম্মাহর, যার সন্তানেরা ঈমানের মাধুর্য আস্বাদন করেছে—যারা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর পথে নিজেদের রক্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত এবং পুঁজিবাদী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
আজকের এই সংগ্রাম মূলত দুই ধারার মধ্যে—মুক্তির আদর্শ (তাহরীর) এবং আত্মসমর্পণের আদর্শের মধ্যে সংগ্রাম।
খিলাফতের প্রতি বিশ্বাস হোক দিকনির্দেশক, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য একজন মুসলমানের অপর মুসলমানের প্রতি ভালোবাসা হোক তার শক্তির উৎস, আর কুফরী ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণা হোক তার চালিকাশক্তি। আজকের মুসলিম বিশ্বের অবস্থা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, তাদের সংকট অস্ত্র বা জনশক্তির ঘাটতিতে নয়; বরং তাদের যুদ্ধনীতি এমন শাসনব্যবস্থার শৃঙ্খলে আবদ্ধ, যা উপনিবেশিক শক্তির প্রতি আনুগত্যে বন্দী । এখানেই ‘ঈমানের মাধুর্য’ বিষয়ক এই আলোচনা সামরিক পরিমণ্ডলের ভেতরে মৌলিক পরিবর্তনের এক অঙ্গীকারে রূপ নেয় এবং সৈন্যদের তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যপানে সংগঠিত করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করে ।
উপনিবেশবাদীরা এমন এক মানসিকতা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে একজন মুসলিম সৈনিক তার পাশের দেশের সেনাবাহিনীর ইউনিফর্ম পরা আরেক মুসলমানকেই শত্রু হিসেবে দেখতে শেখে; অথচ একই সময়ে আমেরিকা ও ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়াকে নিরাপত্তার অপরিহার্যতা হিসেবে গ্রহণ করে!
ধর্মনিরপেক্ষ সামরিক দর্শনে একজন সৈনিক আদেশকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেয়—সে আদেশ বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ হলেও—এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে, তা যতই জালিম হোক না কেন। কিন্তু ইসলামী আকীদাহর দাবি হলো, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ একজন অফিসার ও সৈনিকের কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ও অধিক প্রিয় হতে হবে। এই নির্দেশ তখন সর্বোচ্চ সামরিক কমান্ডারের আদেশেরও ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, যদি তা ইসলামের শরীয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়; এবং সেই শাসনব্যবস্থার স্বার্থেরও ঊর্ধ্বে, যা তথাকথিত ইহুদি সত্তার জাতীয়তাবাদী সীমানাকে পাহারা দেয়।
প্রকৃত সামরিক ডকট্রিন হলো সেই চেতনা, যা একজন সৈনিককে উপলব্ধি করায় যে, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর অবাধ্য হয়ে অজ্ঞ ও অযোগ্য মানুষের আনুগত্য করা চরম ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়; আর প্রকৃত আনুগত্য হলো আল্লাহর দ্বীনকে সমর্থন করা এবং তাঁর কালিমাকে সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠা করা। আজকের বাস্তবতায় এর প্রতিফলন ঘটে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক সহায়তা (নুসরাহ) প্রদানের মাধ্যমে— যা বাহিনীকে নিছক কুচকাওয়াজ বা প্রদর্শনীর বাহিনী না বানিয়ে ইতিহাস নির্ধারণকারী মহাকাব্যিক যুদ্ধের দিকে ধাবিত করে।
আমেরিকান সহায়তা, পশ্চিমা প্রশিক্ষণ এবং অপমানজনক নিরাপত্তা চুক্তির ওপর বাহিনীগুলোর অব্যাহত নির্ভরতা আসলে এমন এক আগুন, যা সৈনিকের মর্যাদা ও দ্বীনকে গ্রাস করে। আর দাওয়াহ বহনকারীর দৃষ্টিতে ঈমানের মাধুর্যই সেই শক্তি, যা দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপ দেয়, বিভক্তিকে ঐক্যে পরিণত করে, এবং হতাশাকে পরিণত করে দৃঢ় অঙ্গীকারে।
এটি এমন কোনো অনুভূতি নয়, যা সালাত শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—যা এ ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে যে, মহাগ্রন্থ কুরআনের উম্মাহ পুঁজিবাদী শক্তির অধীনস্থ হয়ে থাকবে, কিংবা অবিশ্বাসী শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে পরিণত হবে। যখন উম্মাহর শাবাব—তরুণ-তরুণীরা—এই ঈমানের মাধুর্য আস্বাদন করবে,, তখন জুলুমের সিংহাসন তাদের কাছে মাকড়সার জালের চেয়েও তুচ্ছ হয়ে যায়; আর তথাকথিত বাস্তববাদী, পরাজিত রাজনৈতিক যুক্তির পাথরসম ভিত্তি তাদের দৃঢ় আদর্শিক অবস্থানের সামনে ধসে পড়ে। এই ঈমানের মাধুর্যই খিলাফতের ভোরের পথ প্রশস্ত করে—যেখানে ইসলাম আবার মানবতার নেতৃত্ব দেবে, আর ঈমান কেবল অন্তরের স্পন্দন হয়ে থাকবে না; বরং তা রূপ নেবে এমন ন্যায়বিচারে, যা সমগ্র পৃথিবীকে ভরিয়ে দেবে, এবং এমন এক শক্তিতে, যা অহংকারীদের শৃঙ্খল ভেঙে চূর্ণ করে দেবে।
যে উম্মাহর হৃদয় এই বার্তার সত্যে পরিপূর্ণভাবে সিক্ত, সে উম্মাহকে পরাজিত করা যায় না। ঈমানের মাধুর্য হলো সেই রসদ, যা আন্তরিক ও সত্যনিষ্ঠদেরকে জালিমদের নিপীড়নের মোকাবিলায় সক্ষম করে তোলে।
তোমার ঈমানকে তোমার রাজনৈতিক কর্মের চালিকাশক্তি হতে দাও; আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) ও তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি ভালোবাসাকে বিভ্রান্তির অন্ধকারে আলোর দিশারী হিসেবে গ্রহণ কর; আর কুফরী ব্যবস্থার প্রতি ঘৃণাকে তাদের মূল থেকে উপড়ে ফেলার প্রেরণা বানাও।
খিলাফতের ভোর কোনো জাতিসংঘের প্রস্তাবের মাধ্যমে উদিত হবে না; বরং তা উদিত হবে সেই হৃদয়গুলোর মাধ্যমে, যারা ঈমানের মাধুর্য আস্বাদন করেছে, নিজেদের আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর কাছে সমর্পণ করেছে এবং তাঁর দ্বীন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। আর এটি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা)-এর জন্য কোনো কঠিন বিষয় নয়।











