মার্কিন ডলারের আধিপত্য: ব্রেটন উডস থেকে পেট্রোডলার এবং ভবিষ্যতের বিশ্ব ব্যবস্থা

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দিকে লক্ষ্য করলে একটি অদ্ভুত বিষয় চোখে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিয়ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বস্তুগত পণ্য আমদানি করছে—জার্মানির বিলাসবহুল গাড়ি, জাপানের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্স, চীনের তৈরি পোশাক ও যন্ত্রাংশ, কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র যা দিচ্ছে, তা মূলত ছাপাখানার কাগজ বা ডিজিটাল স্পেসের কিছু সংখ্যা—যার নাম ‘মার্কিন ডলার’। সাধারণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, বছরের পর বছর ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ে কোনো দেশের অর্থনীতি টিকে থাকতে পারে না। স্বাভাবিক নিয়মে সেই দেশের মুদ্রার মান ধসে পড়ার কথা এবং চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দেওয়ার কথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটছে না। এই বিস্ময়কর অর্থনৈতিক মডেলের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কয়েক দশকের সুপরিকল্পিত আর্থিক কূটনীতি, সামরিক শক্তির প্রভাব এবং একটি বিশেষ ব্যবস্থা—যা বিশ্বকে মার্কিন মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো মার্কিন ডলারের এই আধিপত্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, পেট্রোডলার ব্যবস্থার কার্যপ্রণালী এবং বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করা।

ব্রেটন উডস চুক্তি ও স্বর্ণের মানদণ্ড

মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে ১৯৪৪ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন প্রায় শেষের দিকে। ইউরোপ ও এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল যুদ্ধবিধ্বস্ত, অর্থনীতি বিপর্যস্ত। এই অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিত্রশক্তির ৪৪টি দেশের প্রতিনিধিরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটন উডস নামক স্থানে মিলিত হন। এই ঐতিহাসিক সম্মেলনেই জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংক।

ব্রেটন উডস চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ। যুদ্ধের সময় মিত্র দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রচুর অস্ত্র ও রসদ কিনেছিল এবং এর মূল্য পরিশোধ করেছিল স্বর্ণের মাধ্যমে। ফলে যুদ্ধের শেষে বিশ্বের মোট মজুত স্বর্ণের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই চলে আসে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। এই সুবিশাল স্বর্ণভাণ্ডারের ওপর ভিত্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দেয় যে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুদ্রার মান ডলারের সাপেক্ষে নির্ধারিত হবে এবং ডলারের মান স্বর্ণের সাপেক্ষে নির্দিষ্ট থাকবে।

এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি: মার্কিন সরকার ঘোষণা করে যে, তারা যেকোনো বিদেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রতি আউন্স স্বর্ণের বিনিময়ে ৩৫ মার্কিন ডলার প্রদান করবে। অর্থাৎ, ডলার কেবল একটি কাগজের টুকরো ছিল না; এটি ছিল নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণের একটি আস্থার দলিল বা রসিদ। বিশ্বব্যাপী ডলারের প্রতি এই অগাধ আস্থার কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের ভল্টে সুরক্ষিত থাকা বাস্তব স্বর্ণ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ডলারকে গ্রহণ করেছিল কারণ তারা জানত, চাইলেই এই কাগজ দিয়ে সরাসরি ভৌত স্বর্ণ পাওয়া সম্ভব। এই চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন ডলার ব্রিটিশ পাউন্ডকে সরিয়ে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রার স্থান দখল করে নেয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি এবং নিক্সন শক

১৯৪৫ থেকে ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত ব্রেটন উডস ব্যবস্থা বেশ সফলভাবেই কাজ করে। কিন্তু ষাটের দশকের শেষের দিকে এসে এই ব্যবস্থায় ফাটল ধরতে শুরু করে। এর প্রধান কারণ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যধিক ব্যয়। এক দিকে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসনের ‘গ্রেট সোসাইটি’ কর্মসূচির অধীনে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ ব্যয়, অন্যদিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিপুল সামরিক খরচ—সব মিলিয়ে মার্কিন অর্থনীতি চরম চাপের মুখে পড়ে।

যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ ঘাটতি মেটাতে মার্কিন সরকার তাদের স্বর্ণের মজুতের তুলনায় অনেক বেশি ডলার ছাপাতে শুরু করে। অর্থনীতিতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডলারের সরবরাহ মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের প্রকৃত মান কমতে শুরু করে। ইউরোপীয় দেশগুলো, বিশেষ করে ফ্রান্স, এই অসঙ্গতি প্রথম ধরতে পারে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গল মার্কিন সরকারের এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেন এবং তাদের কাছে থাকা উদ্বৃত্ত ডলারের বিনিময়ে ব্রেটন উডস চুক্তি অনুযায়ী স্বর্ণ দাবি করতে শুরু করেন।

ফ্রান্সের দেখাদেখি অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও ডলারের ওপর আস্থা হারিয়ে তা স্বর্ণে রূপান্তর করতে শুরু করে। এই ব্যাপক দাবির ফলে আমেরিকার ফোর্ট নক্সের স্বর্ণের ভল্টগুলো দ্রুত খালি হতে থাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ দিয়ে বাজারে থাকা সমস্ত ডলারের ব্যাকআপ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। সরকার এমন স্বর্ণের রসিদ ইস্যু করছিল, বাস্তবে যার কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

এই চরম সংকটময় মুহূর্তে, ১৯৭১ সালের ১৫ আগস্ট মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন একটি যুগান্তকারী এবং একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি ঘোষণা দেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে ডলারের বিনিময়ে স্বর্ণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসছে। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘নিক্সন শক’ (Nixon Shock) নামে পরিচিত। এই একটি মাত্র ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্বের প্রধান মুদ্রার সাথে একটি ভৌত পণ্যের (স্বর্ণ) দীর্ঘদিনের সংযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন হয়ে যায়। ডলার পরিণত হয় একটি ‘ফিয়াট মুদ্রা’ বা আস্থানির্ভর মুদ্রায়—যার নিজস্ব কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই, কেবল সরকারের আদেশের কারণেই তা চলে। স্বর্ণের এই নিশ্চয়তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলার ব্যবহার চালিয়ে যাওয়ার আর কোনো যৌক্তিক কারণ বাকি ছিল না বিশ্বের কাছে।

পেট্রোডলারের জন্ম এবং মার্কিন-সৌদি কৌশলগত চুক্তি

স্বর্ণের মানদণ্ড বাতিল হওয়ার পর ডলারের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, ঠিক তখনই মার্কিন নীতিনির্ধারকরা ডলারের জন্য একটি নতুন ‘অ্যাঙ্কর’ বা ভিত্তি খুঁজতে শুরু করেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিশ্বের প্রতিটি দেশের বেঁচে থাকার জন্য এমন একটি জিনিস প্রয়োজন যার চাহিদা কখনোই শেষ হবে না। সেই জিনিসটি হলো জ্বালানি তেল। আধুনিক শিল্পায়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সামরিক শক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো তেল।

১৯৭০-এর দশকের শুরুতে সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক এবং রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসন সৌদি রাজপরিবারের সাথে একটি গোপন ও অত্যন্ত কৌশলগত চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৪ সালে মার্কিন অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম সাইমন সৌদি আরব সফর করেন এবং একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছান।

এই চুক্তির শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি রাজতন্ত্রকে দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সুরক্ষা প্রদান, অত্যাধুনিক অস্ত্র সরবরাহ এবং তাদের তেলের খনিগুলোকে যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর বিনিময়ে সৌদি আরব একটি যুগান্তকারী শর্ত মেনে নেয়: তারা তাদের সমস্ত অপরিশোধিত তেল রপ্তানির মূল্য নির্ধারণ এবং বিক্রি করবে শুধুমাত্র এবং একচেটিয়াভাবে মার্কিন ডলারে। অন্য কোনো দেশের মুদ্রা তারা গ্রহণ করবে না।

সৌদি আরবের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। অর্গানাইজেশন অফ দ্য পেট্রোলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (OPEC) বা ওপেক-এর ভেতরে সৌদি আরবের ব্যাপক প্রভাব ছিল। তাদের নেতৃত্বে ১৯৭৫ সালের মধ্যে ওপেকের সদস্যভুক্ত অন্যান্য প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করে এবং ডলারে তেল বিক্রির নীতি গ্রহণ করে। স্বর্ণের মানদণ্ড থেকে তেলের মানদণ্ডে এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় ‘পেট্রোডলার’ (Petrodollar) ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থাটি মার্কিন মুদ্রার বৈশ্বিক চাহিদা স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করে।

পেট্রোডলার রিসাইক্লিং: বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণের চক্র

পেট্রোডলার ব্যবস্থা কেবল ডলারের চাহিদাই বাড়ায়নি, এটি এমন একটি অর্থনৈতিক চক্র তৈরি করেছে যা পরোক্ষভাবে মার্কিন অর্থনীতিকে অর্থায়ন করে চলেছে। এই চক্রটি ‘পেট্রোডলার রিসাইক্লিং’ (Petrodollar Recycling) নামে পরিচিত। এই চক্রের কার্যপ্রণালী বিশ্লেষণ করলে বিশ্ব অর্থনীতির একটি পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যায়।

প্রথম ধাপ: ডলার অর্জন

জাপান, ভারত, চীন বা ইউরোপের যেকোনো দেশের তাদের অর্থনীতি সচল রাখার জন্য তেলের প্রয়োজন। কিন্তু ওপেক দেশগুলো যেহেতু তেল বিক্রির বিনিময়ে কেবল ডলারই গ্রহণ করে, তাই এই দেশগুলোকে আগে মার্কিন ডলার জোগাড় করতে হয়। ডলার পাওয়ার একমাত্র উপায় হলো নিজেদের উৎপাদিত পণ্য, সেবা বা কাঁচামাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজেই শুধু কাগজ ছাপিয়ে বিশ্বের সেরা পণ্যগুলো ভোগ করার সুযোগ পায়।

দ্বিতীয় ধাপ: তেলের মূল্য পরিশোধ

পণ্য রপ্তানি করে অর্জিত ডলার দিয়ে এই দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে (মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে) অপরিশোধিত তেল ক্রয় করে। ফলে প্রচুর পরিমাণ মার্কিন ডলার তেল আমদানিকারক দেশগুলো থেকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর (যেমন: সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত) হাতে গিয়ে জমা হয়।

তৃতীয় ধাপ: উদ্বৃত্ত ডলারের বিনিয়োগ (রিসাইক্লিং)

তেল বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর হাতে যে বিপুল পরিমাণ ‘উদ্বৃত্ত ডলার’ জমা হয়, তা তারা নিজেদের দেশের ভেতরে পুরোপুরি খরচ করতে পারে না। এই বিশাল অংকের অর্থ ফেলে রাখলে মুদ্রাস্ফীতি হতে পারে। তাই এই অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করার প্রয়োজন পড়ে। চুক্তির অলিখিত শর্ত এবং নিরাপত্তার খাতিরে, এই দেশগুলো তাদের উদ্বৃত্ত পেট্রোডলার পুনরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই বিনিয়োগ করে। তারা মূলত মার্কিন ট্রেজারি বন্ড (Treasury Bonds) কেনে এবং আমেরিকান স্টক মার্কেটে বা রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করে।

এই চক্রের চূড়ান্ত ফলাফল হলো একটি বাধ্যতামূলক অর্থায়ন ব্যবস্থা। পুরো বিশ্বকে তেলের জন্য ডলার মজুত করতে হচ্ছে এবং তেল উৎপাদকরা সেই ডলার আবার আমেরিকাতেই ফেরত পাঠাচ্ছে। এটি মার্কিন সরকারকে তাদের বিশাল বাজেট ঘাটতি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের জন্য একটি স্থায়ী রক্ষাকবচ প্রদান করে। এই ব্যবস্থার কারণেই আমেরিকা তাদের সামর্থ্যের চেয়েও বেশি ঋণ নিতে পারে এবং সুদের হার কৃত্রিমভাবে কম রাখতে সক্ষম হয়।

ভূ-রাজনীতি, সামরিক আধিপত্য এবং সুইফট (SWIFT) ব্যবস্থা

পেট্রোডলার ব্যবস্থা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেবল অর্থনৈতিক সুবিধাই দেয় না, এটি তাদের ভূ-রাজনৈতিক এবং সামরিক আধিপত্যেরও মূল চাবিকাঠি। এই ব্যবস্থার কল্যাণে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় করার স্বাধীনতা পায়। বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট তাদের পরবর্তী ১০টি শক্তিশালী দেশের সম্মিলিত সামরিক বাজেটের চেয়েও বেশি। বিশ্বজুড়ে তাদের শত শত সামরিক ঘাঁটি এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার জোগান পরোক্ষভাবে এই ডলারভিত্তিক বিশ্ব ব্যবস্থাই দিয়ে থাকে।

এর বাইরে, ডলারের এই আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাথমিক অবকাঠামো ‘সুইফট’ (SWIFT – Society for Worldwide Interbank Financial Telecommunication)-এর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রদান করে। সুইফট হলো আন্তর্জাতিক লেনদেনের একটি মেসেজিং নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে অর্থ স্থানান্তরিত হয়। যেহেতু বিশ্বের প্রায় ৮০% এর বেশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং লেনদেন ডলারে হয়, তাই যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই অধিকাংশ লেনদেন ক্লিয়ারেন্স পায়।

এই নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে একটি মারাত্মক অর্থনৈতিক অস্ত্র প্রদান করেছে। যদি কোনো দেশ মার্কিন নীতির বিরোধিতা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র সহজেই সেই দেশের ব্যাংকগুলোকে সুইফট নেটওয়ার্ক থেকে ব্লক করে দিতে পারে। আর্থিক অ্যাক্সেস বাতিল করার এই ক্ষমতা একটি আধুনিক রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান, ভেনিজুয়েলা এবং সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার ওপর আরোপিত আর্থিক নিষেধাজ্ঞাগুলো এই ‘ওয়েপনাইজেশন অফ ফাইন্যান্স’ (Weaponization of Finance) বা ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ এবং ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা

পেট্রোডলার একটি ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা মনে হলেও, এর ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে অপরিশোধিত তেলের ভৌত (Physical) স্থানান্তরের ওপর। আর এই ভৌত স্থানান্তর মূলত কয়েকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সংকীর্ণ সামুদ্রিক করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। এই জায়গাগুলো বিশ্ব বাণিজ্যের ‘চোক পয়েন্ট’ (Choke points) হিসেবে পরিচিত।

এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz)। এটি পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ জলপথ, যার এক পাশে রয়েছে ইরান এবং অন্য পাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০% থেকে ৩০% প্রতিদিন এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হয়। এই পথটি যদি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হবে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রুটটি হলো বাব-আল-মান্দেব প্রণালী (Bab-el-Mandeb Strait), যা লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে। এই প্রণালীটি ভারত মহাসাগর থেকে সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপের বাজারে পণ্য ও তেল সরবরাহের প্রধান পথ।

এই প্রণালীগুলোর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান খুবই স্পর্শকাতর। হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের বিশাল নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং তারা প্রায়শই পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মুখে এই প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেয়। অন্যদিকে বাব-আল-মান্দেব প্রণালীর কাছেই ইয়েমেনের অবস্থান, যেখানে হুথি বিদ্রোহীরা প্রায়ই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে আক্রমণ চালায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিশাল। তাদের প্রধান কাজগুলোর একটি হলো বিশ্বব্যাপী এই সমুদ্রপথগুলো খোলা রাখা এবং বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলী প্রমাণ করে যে, শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকা সত্ত্বেও এই সংকীর্ণ প্রণালীগুলোর নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অসম যুদ্ধনীতি (Asymmetric warfare), ড্রোন হামলা এবং মাইন ব্যবহারের কারণে এই চ্যানেলগুলো সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। এই পথগুলো সুরক্ষিত করতে না পারার এই অক্ষমতাই ডলার-ভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ভৌত দুর্বলতা প্রকাশ করে। যখনই এই রুটগুলোতে সংঘাত দেখা দেয়, গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয় এবং মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের পলিসি যা-ই হোক না কেন, বিশ্বজুড়ে তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে।

মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে বিভাজন

সামুদ্রিক পথের এই দুর্বলতা এবং পেট্রোডলারের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি একটি নির্দিষ্ট ছকে আবদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে তেল সমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর মধ্যে, কোনোভাবেই যেন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একটি ঐক্যবদ্ধ ব্লক বা জোট গড়ে উঠতে না পারে।

যদি কোনো কারণে মুসলিম তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য বিকল্প মুদ্রায় (যেমন ইউরো, চাইনিজ ইউয়ান বা স্বর্ণ) তেলের বাণিজ্য করবে, তবে সেটি হবে মার্কিন আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা। মার্কিন নীতি নির্ধারকরা সর্বদা নিশ্চিত করতে চান যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেন সুরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকে। এই বিভাজন নীতি বা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসি নিশ্চিত করে যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্যান্য গালফ দেশগুলো কখনোই পেট্রোডলার চুক্তির বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে অন্য মুদ্রায় বাণিজ্যের ঝুঁকি নেবে না।

ডি-ডলারাইজেশন: একটি নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার পদধ্বনি?

গত পাঁচ দশকে পেট্রোডলার ব্যবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করলেও, বর্তমানে এর ভিত্তি কিছুটা হলেও নড়বড়ে হতে শুরু করেছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন ‘ডি-ডলারাইজেশন’ (De-dollarization) বা ডলার নির্ভরতা কমানোর একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

প্রথমত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চীনের উত্থান। চীন বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। তারা ক্রমশ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে চাপ দিচ্ছে ডলারে নয়, বরং চীনের নিজস্ব মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এ (Yuan) তেলের মূল্য গ্রহণ করার জন্য। একে বলা হচ্ছে ‘পেট্রো-ইউয়ান’ (Petro-yuan) এর ধারণা। সম্প্রতি সৌদি আরব এবং চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি বাণিজ্য চুক্তি ইউয়ানে সম্পন্ন হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা কয়েক দশক আগে অকল্পনীয় ছিল।

দ্বিতীয়ত, ব্রিকস (BRICS) জোটের সম্প্রসারণ। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত এই জোট সম্প্রতি সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর এবং ইথিওপিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নিজেদের কলেবর বৃদ্ধি করেছে। ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলারের পরিবর্তে স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে একটি অভিন্ন ব্রিকস কারেন্সি চালুর ব্যাপারেও আলোচনা করছে।

তৃতীয়ত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রাতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞার প্রয়োগ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ বাজেয়াপ্ত করা এবং তাদের সুইফট ব্যবস্থা থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করেছে। অনেক দেশই এখন বুঝতে পারছে যে নিজেদের সম্পূর্ণ রিজার্ভ ডলারে রাখা এবং পশ্চিমা ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হতে পারে। ফলে দেশগুলো এখন স্বর্ণের মজুত বাড়াচ্ছে এবং বাণিজ্যের বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম (যেমন চীনের CIPS) তৈরি করছে।

পেট্রোডলার ব্যবস্থার পতন হলে কী ঘটবে?

যদি সত্যিই বিশ্বজুড়ে তেলের বাণিজ্য থেকে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য কমে যায়, তবে তার ফলাফল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। কাঠামোগতভাবে এর প্রভাবগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ডলারের মান পতন: জ্বালানি কেনার জন্য যদি বিশ্বের আর ডলার মজুত রাখার বাধ্যবাধকতা না থাকে, তবে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের মজুতকৃত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বিশ্ববাজারে ছেড়ে দেবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ব্যাপক অবমূল্যায়ন ঘটবে।

২. সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি: পেট্রোডলার রিসাইক্লিংয়ের অভাবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ড কেনার মতো বিদেশী ক্রেতার অভাব দেখা দেবে। সরকারকে ঋণ নেওয়ার জন্য বাধ্য হয়েই বন্ডের সুদের হার বাড়াতে হবে। এর ফলে আমেরিকান নাগরিকদের জন্য বাড়ি কেনার মর্টগেজ লোন, গাড়ির লোন এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বহুগুণ বেড়ে যাবে। অর্থনীতিতে চরম মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে যা জীবনযাত্রার মানকে ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেবে।

৩. নিষেধাজ্ঞার প্রভাবহীনতা: লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত দেশগুলো যদি ডলার-নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে জ্বালানি এবং প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর বাণিজ্য করতে সক্ষম হয়, তবে মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার আর কোনো ধার থাকবে না। এটি বৈশ্বিক রাজনীতিতে আমেরিকার খবরদারি করার ক্ষমতা অনেকাংশে খর্ব করবে।

৪. সামরিক বাজেট সংকোচন: অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়লে এবং ঋণের বোঝা বেড়ে গেলে মার্কিন সরকারের পক্ষে বর্তমানের মতো এত বিশাল সামরিক বাজেট বজায় রাখা সম্ভব হবে না। এর ফলে বিশ্বব্যাপী তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলোর কার্যক্রম গুটিয়ে আনতে হতে পারে, যা বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে (Balance of Power) সম্পূর্ণ পরিবর্তন করে দেবে।

উপসংহার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে অবস্থান কোনো শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। এটি একটি অত্যন্ত জটিল, সুপরিকল্পিত এবং পঞ্চাশ বছর ধরে চলমান ‘তেল এবং ঋণের চক্রের’ ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে যে ডলারের আধিপত্যের বীজ বপন করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালের স্বর্ণের মানদণ্ড বাতিলের মাধ্যমে তা এক গভীর সংকটে পড়েছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের পেট্রোডলার চুক্তি সেই সংকট থেকে কেবল উত্তরণই ঘটায়নি, বরং মার্কিন অর্থনীতিকে একটি চিরস্থায়ী লাইফ-সাপোর্ট প্রদান করেছে।

আজকের দিনে পেট্রোডলার কেবল একটি অর্থনৈতিক ধারণা নয়; এটি বিশ্বের ভূ-রাজনীতি, যুদ্ধ এবং শান্তির নিয়ন্ত্রক। এই ব্যবস্থাটি ততদিনই স্থিতিশীল এবং কার্যকর থাকবে, যতদিন বিশ্বের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলো তাদের এই অমূল্য সম্পদের দাম কেবল মার্কিন ডলারে নির্ধারণ করতে রাজি থাকবে এবং বিশ্ব বাণিজ্যে শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে অপরিশোধিত তেল তার প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখবে।

তবে, ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে কোনো বৈশ্বিক মুদ্রার আধিপত্য চিরস্থায়ী হয় না। একসময় ডাচ গিল্ডার, ফরাসি ফ্রাঙ্ক এবং ব্রিটিশ পাউন্ডের যে আধিপত্য ছিল, তা সময়ের পরিক্রমায় ম্লান হয়ে গেছে। বর্তমান বিশ্বে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ, নতুন অর্থনৈতিক জোটের উত্থান, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন (যেমন ডিজিটাল মুদ্রা) এবং ডলারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার মার্কিন নীতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিকল্প ব্যবস্থার যে সন্ধান চলছে, তা আগামী দশকগুলোতে মার্কিন ডলারের আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। পেট্রোডলারের পতন হয়তো রাতারাতি ঘটবে না, তবে পরিবর্তনের হাওয়া যে বইতে শুরু করেছে, তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ইতোমধ্যেই ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে। দীর্ঘ সময় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব, শান্তি-নিরাপত্তার অভাব এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য বিভিন্ন অধঃপতন ক্রমেই মুসলিমদের মাঝে ঐক্যের আওয়াজকে বুলন্দ করে চলছে। ঐতিহাসিকভাবে খিলাফত ব্যবস্থা যেভাবে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি বৈশ্বিক শক্তিতে রূপান্তর করেছিল, অনেকেই ধারণা করেন আবারো মুসলিরা রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে মুসলিমরা পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে আসীন হতে পারবে এবং ইসলামের সার্বজনীন আদর্শ দ্বারা শাসনের মাধ্যমে মানবজাতিকে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভয়াল গ্রাস হতে মুক্ত করতে পারবে। ভবিষ্যতে যা-ই ঘটুক না কেন, বিশ্ব ব্যবস্থা আর এককেন্দ্রিক থাকবে না বলেই ইংগিত পাওয়া যাচ্ছে, বরং তা একটি ভিন্ন রকমের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকেই ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে।

মূল লেখা হতে ঈষৎ পরিমার্জিত

Leave a Reply

Discover more from RETURN OF ISLAM

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading