তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২উসুলি কা’ইদাহ “সকল বস্তুর ‘আসল’ হল ইবাহা” প্রয়োগ করে কি করে গণতন্ত্রকে জায়েয এবং খিলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছিল

ইবাহা যারাই বলে থাকেন ইসলামে ইবাদতের ‘তউকিফি’ (অর্থাৎ ওয়াহি দ্বারা সুনির্দিষ্ট) ইস্যুগুলো ছাড়া বাকি সব *একশন (কাজ)* বাই ডিফল্ট মুবাহ বা হালাল, তারা ইসলামী আইনবিজ্ঞানের (উসুল আল ফিকহ) বিষয়ে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে খুব ভয়ংকরভাবেই উম্মাহকে ভুল পথে চালিত করছেন। পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় আমাদের অনেকের মনে এটা গেঁথে গেছে (কিছু ভ্রান্ত প্রচারনার দ্বারা) কোন বিষয় যদি ইসলামের সাথে কনফ্লিক্ট না করে এবং ঐ ব্যাপারে কোন শরিয়ার নুসুস (দলীল) যদি না থাকে, তাহলেই তা মুবাহ বা হালাল। এই ভয়ংকর চিন্তার কারনেই মুসলিম উম্মাহকে “ইসলামিক গণতন্ত্র”, “ইসলামিক সমাজতন্ত্র”, “সোশ্যাল জাস্টিস” ইত্যাদি কুফরি চিন্তা গলধঃকরণ করানো হয়েছিল। খিলাফত ধ্বংসের বিস্তারিত ইতিহাস নিয়ে যারা অবহিত নন, তারা এই বিষয়টিও হয়তো জানেন না কাফেররা মুসলিম ভূমিগুলোকে বাইরে থেকে আক্রমণ পরে করেছিল। প্রথমে ভেতর থেকে ধ্বংস করা হয়েছিল কিছু ভ্রান্ত উসুলি কা’ইদাহ (নীতি) প্রয়োগ করে যার ভেতর ছিল এইটিও – “সকল কিছুই বাই ডিফল্ট মুবাহ”। এই নীতির দ্বারা ঐ পশ্চিমা চিন্তাধারা দ্বারা প্রভাবিত মুসলিম পণ্ডিতরা বলা শুরু করেছিল যে রাজনীতি “তউকিফি” (আল্লাহ দ্বারা নির্ধারিত) না এবং সব কাজই বাই ডিফল্ট হালাল, এবং তা বলেই ফ্রেঞ্চ পেনাল কোড ও রোমান আইন এবং গণতন্ত্র মুসলিম খিলাফতে ঢোকানো হয়েছিল বিখ্যাত পণ্ডিতদের দ্বারা।
এক্ষেত্রে দেখা যায় যেসব ফকিহ বা উসুলিয়্যুন এই চিন্তার প্রচার-প্রসার ঘটান, তারা নীচের কা’ইদাহ (নীতি) টি সর্বদাই উল্লেখ করে থাকেন:
“সব বস্তুর ‘আসল’ বা অরিজিন হল ইবাহা (বা হালাল)” [আল আসলু ফিল-আশইয়া আল ইবাহা]
এখানে উল্লেখ্য ফিকাহ শাস্ত্রবিদরা শুধু বস্তু/জিনিস (আশইয়া) এর ক্ষেত্রে এই কা’ইদাটি ব্যবহার করতেন (আফ’আল বা কাজের ক্ষেত্রে না)। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে বলেছেন,
وَخَلَقَ لَكُمْ مَا في الأَرْضِ جَمِيعاً
“এবং তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীর বুকে যা আছে সবই সৃষ্টি করেছেন”
আয়াতটিতে আল্লাহ বস্তুকে ‘আম ভাবে উল্লেখ করেছেন তাই সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল, এবং যেগুলো হারাম সেগুলো উল্লখে করা আছে।
কিন্তু সমস্যা হয় যখন বস্তুর (আশইয়া) সাথে একশন বা কাজ (আফ’আল) কে মিশিয়ে ফেলে এই কা’ইদাহটি দ্বারা জাস্টিফাই করানো হয়। এটি একটি কমনসেন্স যে বস্তু আর একশন কখনই এক বিষয় হয় না। আমরা বলতে পারি না ‘ছুরি’ (বস্তু) আর ‘ছুরি মারা’ (একশন) এক বিষয়। তাই অতীতে স্কলাররা প্রয়োজনবোধই করেননি এই নীতির ক্ষেত্রে বস্তুকে একশন থেকে আলাদা করে বোঝানোর।
তাই আফ’আল (একশন) এর ক্ষেত্রে ‘আসল’ (অরিজিন) হল –
“হুকুম আশ-শার’ঈর মাঝে নিজেদের কাজকে সীমাবদ্ধ রাখার মাধ্যমে শরিয়াহর সাথে লেগে থাকা”।
তাই যদি আল্লাহ কোন কাজের জন্য ইবাহা (অনুমতি) দেয় তাহলে তা হবে মুবাহ আর যদি আমরা অনুমতি না দেখতে পাই তাহলে “আদিল্লাহ আশ-শারিয়্যাহ” (শরিয়াহর দলীল) থেকে হুকুম বের করে আনতে হবে। এটা বলার কোন সুযোগ নেই যেহেতু শরিয়াহ এক্ষেত্রে এপারেন্টলি নীরব তাই আমরা সেই একশন সমূহ পালন করতে পারবো।
যারা এই বস্তুর সাথে একশনকে মিলিয়ে দেখেন তারা আবার “মুবাহ” (যা করলে কোন সাওয়াব বা গুনাহ নেই) কে ভিন্ন ভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। তারা মনে করেন যেসব বিষয়ে শরিয়াহ কোন তিরস্কার (হারাজ)করে না বা শরিয়াহ নিশ্চুপ, সেগুলোই হল মুবাহ। তাই তিরস্কারের অনুপস্থিতিই হল “অনুমতি” (ইবাহা)। তারা রাসূলের(সা) কথাটি উল্লেখ করেন:
وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْو
“এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে”।
এভাবেই নিকট অতীতের স্কলাররা গণতন্ত্রকে জায়েয করেছিল এই যুক্তিতে যে গণতন্ত্রও “শুরা” (পরামর্শ) ও সামাজিক ন্যায় দ্বারা পরিচালিত এবং সকল বস্তুই যেহেতু বাই ডিফল্ট হালাল, তাই গণতন্ত্রও এডপ্ট করা যাবে। এবং বর্তমানেও অতীতের সেই বিষাক্ত চিন্তা অনেক স্কলাররাই বহন করছে।
তাই এটা জেনে নেয়া ভাল, উসুল আল ফিকহের ক্লাসিক্যাল বইগুলোতে কোথাও বলা নেই; কোন বিষয়ের ক্ষেত্রে হারাজ (তিরস্কার) এর অনুপশ্তিতিই হল “অনুমতি” (ইবাহা), কারন কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে হারাজ এর অনুপস্থিতি ইঙ্গিতবহন করে না যে ঐ কাজ বা বস্তুটি মুবাহ। আবার ব্যাপারটি এমনও না যে ঐ হারাজটিকে তুলে নেয়ার অর্থই হল “অনুমতি”। তাই, কোন বিষয় মুবাহ হওয়ার অর্থ হল উক্ত বিষয়ে হুকুমদাতা (আল্লাহ) মানুষকে কোন কাজ করা বা না করার ক্ষেত্রে বাছাই করার অপশন দিয়েছেন, এবং এই বাছাইয়ের অপশনটিও শরিয়াহর দলীল দ্বারা সমর্থিত হতে হবে।
যারা উপরে বর্ণিত হাদিসটির (“এবং যে বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা হয়েছে সেসব বিষয়ে মাফ করে দেয়া হয়েছে”) এভাবে ব্যাখ্যা দেন যে শরিয়াহ কিছু বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছে তাই ওসব বিষয় মুবাহ, তারা হাদিসটির ভুল ব্যাখ্যা দেন। বিষয়টি এমন না যে শরিয়াহ কোন ব্যাপার এক্সপ্লেইন করে নাই এবং এই চিন্তা করাও পাপ কারন আল্লাহ বলেছেন:
“আজকে আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম…” [মা’য়িদা, ৩]
তিনি আরও বলেছেন:
“আমরা এই কিতাব নাযিল করেছি সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়েই” [নাহল, ৮৯]
তাই ওপরের হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা) বোঝাতে চেয়েছেন সেসব টেক্সট গ্রহণ করো যা তোমাদের দেয়া হয়েছে। আর যে বিষয়ে কিছু জিজ্ঞাস করা হয়নি তা নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস করো না কারণ হয়তো তা আবার হারামও হয়ে যেতে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন:
ذَرُونِي مَا تَرَكْتُمْ فَإِنَّمَا هَلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ بِكَثْرَةِ سُؤَالِهِمْ وَاخْتِلَافِهِمْ عَلَى أَنْبِيَائِهِمْ . فَإِذَا نَهَيْتُكُمْ عَنْ شَيْءٍ فَاجْتَنِبُوهُ . وَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرِ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“আমাকে চাপ দিও না সেসবের বাইরে কিছু বলতে যা আমি তোমাদের ইতিমধ্যেই বলেছি। তোমাদের আগে যারা এসেছিল তারা অতিরিক্ত প্রশ্ন করা এবং তাদের নবীদের সাথে বিতর্ক করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাই আমি যদি তোমাদের কিছু করতে নিষেধ করি তাহলে তা থেকে দূরে থাক এবং যদি কিছু করার আদেশ দেই তাহলে তোমাদের সাধ্যমতো করার চেষ্টা করো” [মুসলিম]
তাই মূল কথা হল ইসলামে এমন কিছু নেই যা শরিয়াহ এক্সপ্লেইন করেনি। তাই কোন কিছু মুবাহ বলতে নিলেও আমাদের আগে দলীল ঘাটতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে শরিয়াহ উক্ত বিষয়টিকে মুবাহ ঘোষণা দিয়েছে।
আবার অনেকেই যুক্তি দিয়ে থাকেন নিউক্লিয়ার বোমা, উড়োজাহাজ তৈরি ইত্যাদি একশনগুলোর ক্ষেত্রে তো কোন শরিয়াহ বিধান নেই। তাই এই কাজগুলো যদি আমরা ইবাহা ধরে করতে পারি, তাহলে কেন সকল কাজের ‘আসল” (অরিজিন) এর ক্ষেত্রে আমরা একই কথা বলতে পারি না? এই বিষয়ে ফুকাহাদের মত হল কিছু চিন্তা থাকে আকিদা এবং আহকাম সংক্রান্ত, এবং কিছু থাকে ‘উলুম (বিজ্ঞান), মাদানিয়্যাহ (প্রযুক্তি), উদ্ভাবন/উৎপাদন, দক্ষতা ইত্যাদি সংক্রান্ত। তাই দ্বিতীয় বিষয়ের (যেগুলো আকিদা বা আহকাম সংক্রান্ত নয়) ক্ষেত্রে যদি শরিয়াহ দ্বারা নিষেধকারী কোন দলীল না থাকে, তাহলে তা গ্রহণ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) একবার কিছু কৃষক এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং তাদের বললেন:
أَنْتُمْ أَدْرَى بِأُمورِ دُنْيَاكُمْ
“তোমরা দুনিয়ার বিষয়ে আমার চেয়ে অধিক সচেতন”
বদরের যুদ্ধের সময় সাহাবা আল-হুব্বাব বিন আল-মুনযির (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) কে যুদ্ধ-কৌশল সঙ্ক্রান্ত এক প্রশ্ন করেছিল। রাসূলের পরিকল্পনাটি কি ওয়াহি ছিল নাকি রাসুলের নিজস্ব মতামত ছিল তা ঐ সাহাবা জানতে চেয়েছিল, উত্তরে রাসুলুল্লাহ বলেছিলেন:
بَلْ هُوَ الرَّأْيُ وَالحَرْبُ وَالمَكِيدَة
“অবশ্যই এটা আমার মতামত, যুদ্ধবিগ্রহ ও ধূর্ত (বিষয়ের ক্ষেত্রে)”
ঐ সাহাবার পরামর্শে রাসুলুল্লাহ যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করেছিলেন। কারন তা ওয়াহি ছিল না। তাই নন-আহকাম/আকিদার বিষয়ের ‘আসল’ এর ক্ষেত্রে ইবাহা (অনুমতি) আছে যদি কোন বিপরীত টেক্সট আমরা না পাই শারিয়াহ তে। গণতন্ত্র কিন্তু সরাসরি আকিদা বিরোধী।
মোদ্দা কথা: সকল বস্তু বাই ডিফল্ট হালাল এবং সকল একশন এর ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের শরিয়াহ দ্বারা সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। কোন ভাবেই বস্তুর সাথে একশনকে এক করে দেখলে হবে না। কারন একশনের ক্ষেত্রে আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا آَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“এবং আল্লাহর রাসূল যা কিছু তোমাদের জন্য এনেছেন তা গ্রহণ করো এবং যেসব থেকে দূরে থাকতে বলেছেন তা পরিত্যাগ করো” [হাশর, ৭]
তাই ওপরের আয়াতের ‘তালাব’ (আবেদন) টিতে যে ‘মা’ (যা কিছু) শব্দটি এসেছে তা ‘আম আকারে এসেছে। এবং এই তালাব হোক সেটা “তালাব উত তারক” (কোন কাজ পরিত্যাগ করার আবেদন) বা তালাব উল ফি’ল (কোন কিছু করার আবেদন) হল তালাব জাযিম (সুনির্দিষ্ট আবেদন) যা মেনে চলা ফরয। তাই সকল একশনের ক্ষেত্রে খুঁজতে হবে শরিয়াহর নুসুস (দলীল) কী বলছে। এটাই হল আফ’আল এর ক্ষেত্রে ‘আসল’।
একমাত্র ইসলামই পারে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় নারী নির্যাতন ও শোষণের পরিসমাপ্তি ঘটাতে
এটা সবার কাছে পরিষ্কার যে বর্তমানে মুসলিম নারীরা ইসলামের প্রতি আক্রমণের ফল ভোগ করছে। পশ্চিমা পুঁজিবাদীরা ইসলামে নারী সংক্রান্ত নীতির প্রতি নগ্ন আক্রমণ ও হেয় প্রতিপন্ন করার কোন চেষ্টাই বাদ রাখেনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নির্যাতিত মুসলিম নারীদের স্বাধীনতার নামে তাদের পোষাক-পরিচ্ছদে বাধা দেয়া হচ্ছে। জনসমক্ষে অর্ধ-নগ্ন থাকতে পারাই হচ্ছে পশ্চিমাদের নির্ধারিত নারী মুক্তির সংজ্ঞা। তাই পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখা যায় নারী স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের আহবান বলতে আসলে কী বোঝায়, এ আহ্বান নারীদের শোষণ করার আহ্বান ব্যতীত আর কিছু নয়। সকলের কাছেই স্পষ্ট নগ্নতা বিষয়টি শুধুই নারীকেন্দ্রিক আর শুধু নারীরাই এই আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে। এই আহ্বান নারীকে যৌন লালসার বস্তুর পর্যায়ে নামিয়ে আনে ও তাকে পুরুষের চোখের খোরাক ও ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করে।বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি এই সস্তা আহ্বানের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট যখন আমরা দেখি আমাদের বোনদের শ্রম শোষিত হচ্ছে পুঁজিপতিদের স্বার্থে, যেখানে তাদের পরিবার ও ভবিষ্যত প্রজন্ম তথা সন্তানরা হচ্ছে বঞ্চিত।জাকার্তার (ইন্দোনেশিয়া) কারখানাগুলোতে ৯০% এর বেশি শ্রমিক নারী, যাদের ৯০% তাদের সন্তানদের বুকের দুধ খাওয়ানোর অধিকার পায় না। ফলে তাদের সন্তানরা অপুষ্টিতে ভোগে। বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাতে কর্মজীবীদের শতকরা ৮০ ভাগই নারী; এই খাতে বাংলাদেশের আয় বার্ষিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জীবন ধারণের লক্ষ্যে ন্যুনতম চাহিদা পূরণের জন্যে এই নারীরা মানবেতর পরিবেশে কাজ করে। অনিরাপদ কর্মস্থলের বিষয়টি জনসমক্ষে আসে সম্প্রতি যখন রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ১০০০ এর বেশি শ্রমিক মারা যায়। এটাই কি কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন যা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র আমাদের বোনদের উপহার দিচ্ছে? তারা কি শুধু শালীনতা থেকে মুক্তি দেয়, অর্থনৈতিক দৈন্যতা থেকে নয়?চরম হতাশাজনক এই পরিস্থিতি চলছে আমাদের মুসলিম শাসকদের আশীর্বাদে ও পূর্ণ সহযোগিতায়। এই শাসকরা পশ্চিমা প্রভুদের কথায় নৃত্য করে এবং উম্মাহ্’কে বিক্রি করে তাদের কাছে যারা সর্বোচ্চ দর হাকায়। যদিও এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে পুঁজিপতি শ্রেণী, তারপরও এটা বলতেই হয় যে মুসলিম শাসকরা সামান্য কমিশনের বিনিময়ে আমাদের ভাই-বোনদের উপর বিদেশী কোম্পানী কর্তৃক নির্লজ্জ দাসত্ব ও শোষণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মুক্তবাজার অর্থনীতি আধুনিক সময়ের মুসলিম ভূ-খন্ডে নারীদের দাসত্ব-বাজার তৈরি করেছে যেখানে ভয়াবহ অবস্থায় আমাদের বোনেরা প্রায় বিনা মূল্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।এই ট্র্যাজেডির অবসান সম্ভব শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ইসলামী অর্থনীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে, যা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসমূহের সাথে অর্থনৈতিক চুক্তি ছিন্ন করবে। ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নারীদের প্রকৃতিগত ও বাস্তব দায়িত্ব ফিরিয়ে দেবে। ইসলামী সমাজের ভবিষ্যত প্রজন্মের নেতৃত্ব গড়ার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নারীরা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করবে, শাসককে জবাবদিহি করবে ও ইসলাম প্রচারে অংশ নিবে। উম্মাহ্’র প্রতি দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করা নারীদের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে ইসলামের ইতিহাস সমৃদ্ধ। যেমন:- ·নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) ও আসমা বিনতে আমর (রা.) আকাবার দ্বিতীয় শপথ অনুষ্ঠানে প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন। এই শপথ অনুষ্ঠানটি রাসূল (সাঃ) এর মদিনা রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পথে ছিল মাইলফলক।
- এক সাধারণ নারী, যিনি হযরত ওমর (রা.) কে মাহর নির্ধারিত করে দেয়ার কারণে জনসম্মুখে জবাবদিহি করেছিলেন।
- ফাতেমা বিনতে কায়স (রা.) একজন সাহাবী ও বিখ্যাত আলেম, যার সাথে ওমর (রা.) এর পরবর্তী খলীফা নিয়োগের ক্ষেত্রে পরামর্শ করা হয়েছিল।
- নাফিসা বিনতে হাসান (রহ.) যিনি ইমাম শাফ’ঈর শিক্ষিকা ছিলেন এবং রাজনীতিতে ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। মিশরের জনগণ শাসকের সাথে উদ্ভূত কোন বিবাদের ক্ষেত্রে তাদের অধিকার ফিরে পাবার আশায় বিবাদ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে তাঁর কাছে যেত।
হে মুসলিম ভাই ও বোনেরা! এ রকম অসংখ্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আপনারা নিশ্চয়ই মুসলিম ভূখন্ডে খিলাফত রাষ্ট্র বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে আসবেন। শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মনোনীত ইসলামী ব্যবস্থাই আমাদের মূল্যবোধ ও মর্যাদাকে রক্ষা করবে।খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বর্তমান দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মুলোৎপাটন করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত ব্যবস্থার বাস্তবায়ন সম্ভব। ইসলামী ব্যবস্থা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে জবাবদিহিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, অর্থ বা স্বার্থের ভিত্তিতে নয়। তাই এই ব্যবস্থা কুর’আন ও সুন্নাহ’র বাস্তবায়ন করবে, পুরুষ ও নারীর শোষণের হাত থেকে নারীর দেহকে রক্ষা করবে।রাফি বিন রিফা (রা.) থেকে বর্ণিত,
“রাসূল (সাঃ) দাসী নারীর দু’হাতের উপার্জন ব্যতীত অন্য কোন উপার্জনকে আমাদের জন্য নিষেধ করেছেন।” (আবু দাউদ)হে মহান উম্মাহ্! ধর্মনিরপেক্ষ আক্বীদা ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিহার করুন, যা শুধু সমতার নামে দাসত্বের জন্ম দেয়। খিলাফতে রাশিদা বাস্তবায়নের কাজে আমাদের সাথে যোগদান করুন যা দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে; যার পরেই আমরা সকল নারী, পুরুষ ও শিশু মুক্তি পাবো মানব রচিত আইন ও ব্যবস্থার শোষণ থেকে।গুজরাটের কান্না

This is an old Speech given by brother Muinuddin in UK in 2002 regarding the Gujurat massacre happened in India that year..
https://archive.org/details/ACryFromGujurat150902
খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভুমিকা কী?

১৯২৪ সালে বৃটিশ পররাষ্ট্র সচিব লর্ড কার্জন অনেক দম্ভসহকারে বলেছিলেন “বাস্তবতা এমন যে তুরস্ক আজ মৃত, আর কখন শক্ত হয়ে দাড়াতে পারবে না। কারণ আমরা তাঁর নৈতিক শক্তিকে ভেঙ্গে দিয়েছি আর তা হলো খিলাফত ও ইসলাম। (The situation now is that Turkey is dead and will never rise again, because we have destroyed its moral strength, the Caliphate and Islam)
খিলাফত, মুসলিম উম্মাহর সোনালী অতীত। খিলাফত মুসলিম উম্মাহ এর গৌরব,তার ঐতিহ্যের নাম। ১৯২৪ সালে মুস্তফা কামাল পাশা দ্বারা ধ্বংস হয়ে যায় খিলাফত। এখন প্রায় ৯০ বছর পর ২০১৪ সালে এসে বিশ্বের সব যায়গায় দাবি উঠেছে খিলাফত এর। এখন মুসলিম উম্মাহ এর একটা বিরাট অংশ হিসেবে আমাদের জানা দরকার খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভুমিকা কী।
খিলাফত কী–
যে রাষ্ট্রব্যবস্থা আহকামে শরীয়াহ এর প্রয়োগ ও ইসলাম প্রচারের জন্য দায়িত্বশীল তাই হচ্ছে খিলাফত। ইসলামী শাসনব্যবস্থাককেই খিলাফত নামে অভিহিত করা হয়। ইমামত বললেও একই ব্যবস্থাকে বুঝায়। এই প্রসংগে শাইখ তাকীউদ্দীন আন-নাবাহানী বলেন, “খিলাফত হলো সকল মুসলিমদের জন্য সাধারন নেতৃত্ব। এর দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামী শরীয়াহ এর আইন বাস্তবায়ন করা এবং সারাবিশ্বের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌছে দেয়া।” (আল খিলাফাহ)
খিলাফাহ কেন জরুরি–
আল্লাহ আমাদের পবিত্র কুর’আনে বলেছেন,“আর আপনি আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে ফয়সালা করুন, এবং আপনার কাছে যে সত্য এসেছে তা ছেড়ে দিয়ে তাদের ইচ্ছার অনুসরন করবেন না। (সূরা মায়িদা- ৪৮)
আল্লাহ যা অবতীর্ণ করে তা অনুযায়ী যারা শাসন করে না তারাই কাফের,ফাসেক এবং জালেম। (মায়িদা- ৪৪, ৪৫, ৪৭)
উপরোক্ত আয়াতসমুহসহ আরো বহু আয়াতে আল্লাহ মুসলিমদের আল্লাহ এর আইন বাস্তবায়ন এর নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে আদেশদিয়েছেন যে সমাজে মানুষের সমস্ত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন এর জন্য একজন খলিফা থাকবেন যিনি এগুলার বাস্তবায়ন করবেন। খলিফা ছাড়া হুদুদ তথা ইসলামী আইন বাস্তবায়নকরা সম্ভব না। তাই আল্লাহ’র আদেশ অনুসারে যেহেতু ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা ফরজ, তাই খিলাফত ব্যবস্থা থাকা এবং খলিফা থাকাও ফরজ।রাসূল (সা) বলেন “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা যাবে যার কাঁধে কোনো খলিফার বাইয়াত নাই তবে তার মৃত্যু হলো জাহেলিয়াত এর মৃত্যু” (মুসলিম)
হাদীসে আমরা দেখতে পাই যে, খলীফার বাইয়াত ছাড়া মারা যাবে তার মরণ হবে জাহেলিয়াত এর আমলের মতো। অর্থাৎ সে মুসলিম হলেও তার মরণ হবে একজন জাহেল এর মতো। তাই খলিফার উপস্থিতি তথা খিলাফত থাকা ফরজ।
আরেকটি ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি যে, খিলাফত মুসলিমদের জন্য কত গুরুত্বপূর্ণ।
রাসূল (সা) এর ওফাতের পর উনার লাশ খলিফা নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত দাফন করা হয় নাই। অথচ রাসূল(সা)-কে দাফনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কোনো কাজই হতে পারে না। তাই এই ঘটনা থেকেই বুঝা যায় খলিফা নির্বাচন করা এবং খিলাফত থাকা কত গুরুত্বপূর্ণ।
আলী(রা) বলেন, “একজন আমীর ছাড়া জনগন কখনো পরিশুদ্ধ হয় না- সেই আমীর ভালো বা মন্দ (যাই হোক না কেনো)।” (কানজুল উম্মাল)
সুতরাং এর থেকে দেখা যায় যে মুসলিমদের জন্য খিলাফত কত গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুসলিমদের মাঝে খিলাফত না থাকাকালে তা প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মুসলিমদের জন্য ফরজ হয়ে পড়ে। যদি মুসলিমরা তাদের মাঝ থেকে খলিফা নির্বাচন করা থেকে বিরত থাকে তাহলে সবাই কবীরা গুনাহ এর কাজ করবে। যদি মুসলিমদের মাঝে কোনো দল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে এবং অন্যরা তা থেকে বিরত থাকে তাহলে যারা খিলাফাহ এর জন্য কাজ করছে তারা ব্যতীত অন্য সবাই গুনাহগার হবে। এভাবে তারা দুনিয়া এবং আখিরাতে চরম শাস্তির সম্মুখীন হবে।
খিলাফতবিহীন সময় মুসলিমদের অবস্থা–
খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে,রাসূল(সা)-কে মদীনার আওস এবং খাজরাজ গোত্র বাইয়াত দেয়ার মাধ্যমে। এবং খিলাফত ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায় ১৯২৪ সালের ৩ রা মার্চ পশ্চিমা দালাল মুস্তফা কামাল পাশার মাধ্যমে। এরপর কেটে গেছে ৯০বছর। এই ৯০ বছরে মুসলিম উম্মাহ এর উপর অত্যাচার, অবিচার হয়েছে অসংখ্য। আজ প্রতিনিয়ত আমাদের চারিপাশে মুসলিমরা অত্যাচার নির্যাতন এর শিকার হচ্ছে। বার্মায় মুসলিমরা মারা যাচ্ছে। সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ এর হাতে অসংখ্য নারীপুরুষ মারা যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত অত্যাচার আর নির্যাতন এর শিকার হচ্ছে মুসলিমরা। অথচ শাসকগোষ্ঠী নিশ্চুপ। এই অত্যাচারী শাসকগোষ্ঠীরা প্রতিনিয়ত আমেরিকা-বৃটেনের পদলেহন করে যাচ্ছে আর উম্মাহ এর উপর অত্যাচার করছে। খিলাফতবিহীন মুসলিম উম্মাহ’র অবস্থা যে কি ভয়াবহ তা একটি ঘটনার মাধ্যমে বুঝা যায়।
১ম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির কাছে উসমানীয় খিলাফত হারার পর যখন উসমানীয় খিলাফতের একেবারে ভঙ্গুর অবস্থা তখন ১৯২০ সালে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স সরকার রাসুল(সা)-কে নিয়ে ব্যাংগাত্মক নাটক করার পরিকল্পনা করে, সে সময় ঐ নাটকের টিকেট ও বিক্রিহয়ে গিয়েছিলো। সেই সময় খলিফা ২য় আব্দুল মাজিদ ব্রিটেন এবং ফ্রান্সকে অনুরোধ করেছিলো সেই নাটকটি মঞ্চস্থ না করতে। জবাবে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স বলে এইটা তাদের দেশের মত প্রকাশের অধিকার। জবাবে খলিফা দ্বিতীয় আব্দুল মাজিদ বলেন, আপনারা যদি ঐ নাটক মঞ্চস্থ করেন তাহলে আমি জিহাদে আকবর ঘোষণা করবো। খলিফার এই কথা শুনে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স এই নাটক আর মঞ্চস্থ করে নাই। অথচ এখন রাসুল(সা)-কে নিয়ে ব্যাংগাত্মক নাটক সিনেমা বানাচ্ছে কাফেররা, রাসূল(সা)-কে ব্যাংগকারীদের সম্মাননা দিচ্ছে,অথচ মুসলিম উম্মাহ কিছুই করতে পারছে।
খিলাফত বিহীন সময়ে তরুণরা হয়ে যাচ্ছে আজ নষ্ট। বর্তমানের অত্যাচারী শাসকরা তরুনদের মাঝে থাকা নিত্যনতুন আবিষ্কারের নেশাকে মেরে ফেলছে, তার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছে মেয়ের নাম্বার,গাজার পুরিয়া। যে তরুণ খিলাফত এর সময়ে দেখতো নিত্য নতুন ভূমি জয়ের কথা, যে তরুণ খিলাফত এর সময় চিন্তা করতো জ্ঞান-বিজ্ঞান এ উন্নতির চরম শিকড়ে উঠার কথা আজ সে তরুন চিন্তা করে কিভাবে একটি মেয়ের নাম্বার জোগার করা যায়, কিভাবে হিপহপ গান এর তালে নাচা যায় কিভাবে প্রেম করা যায়, কিভাবে লিটনের ফ্ল্যাটে যাওয়া যায়।
খিলাফতবিহীন সমাজে আজ তরুনদের নিয়ে ব্যবসা করছে মাল্টিন্যশনাল কোম্পানীগুলো। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও ভালোবাসা দিবস এত পপুলার ছিল না। কিন্তু এই কয়েক বছরে বিশেষ করে ২০১০-১৩ সালেরদিকে ভালোবাসা দিবস অত্যন্ত পপুলার করে তুলে কোম্পানীগুলো। কারণ এর পিছনে তাদের কোটি কোটি টাকার বিজনেস হচ্ছে। কার্ডের ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট ব্যবসা ইত্যাদি অনেক ব্যবসা।
তারা আমাদের তরুণদের পুঁজিপতিরা শিখাচ্ছে কিভাবে প্রেম করতে হয়, কিভাবে শারীরিক সম্পর্কে জড়ালে কোনো ক্ষতি হবে না। এর পিছনে রয়েছে তাদের সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। “Friends with Benefits” নামক সিনেমা বানিয়ে তারা তরুণ-তরুণীদের শিক্ষা দিচ্ছে, কিভাবে একটি বিপরীত লিংগের মানুষের সাথে বন্ধুত্ব করতে হয়, কিভাবে তাকে ব্যবহার করে নিজের শারিরিক ক্ষুধা মেটাতে হয়।
আজ তরুনদের রাস্তায় পাগলের মতো “ফ্ল্যাশ মব” নামক প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে নাচিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পুঁজিপতিরা। তরুনদের মাঝে অশ্লীলতা, আর নোংরামী ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছে আর মুসলিম উম্মাহ এর মূল চালিকাশক্তি তরুণদের বানিয়ে ফেলছে নপুংশক। এর ফলাফল হিসেবে তৈরী হচ্ছে “ঐশীর” মতো তরুন তরুনী, যারা নিজের বাসনাকে পূর্ণ করার জন্য নিজের মা-বাবাকে খুন করতেও দ্বিধা করছে না। অথচ দেশের লক্ষ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার আজ চাকরী পায় না, দেশের হাজার হাজার তরুণ আজ বেকারত্বের কষাঘাতে জর্জরিত। কিন্তু সেইদকে কোনো সরকারের কোনো খেয়াল নেই। দেশের শিল্পবিভাগে কোনো উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ নেই,নেই কোনো অনুদান। চাকরি না পেয়ে হাজারহাজার তরুন আজকে আত্মহত্যা করছে, কেউবা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
এভাবে সমাজের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আজ শোষিত হচ্ছে মুসলিম উম্মাহ আর আজ আমাদের সম্পদ ব্যবহার করে, আমাদের শোষন করে, আমাদের অত্যাচার করে সুপার পাওয়ার আমেরিকা ও অন্যান্য কুফর রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে কোটিপতি।সমাধান কী?? –
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা ততক্ষন পর্যন্ত পরিবর্তন করেন না যতক্ষন পর্যন্ত তারা নিজে তা পরিবর্তন করতে সচেষ্ট না হয়। (সূরা রা’দ- ১১)
আমরা যদি বর্তমান সময়ে উম্মাহ এর উপর ঘটিত অত্যাচার, অবিচার থেকে উম্মাহকে মুক্তি দিতে চাই তাহলে আমাদের পুনরায় খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে যেভাবে রাসূল(সা) ও তাঁর সাহাবীরা করেছিলেন। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই আমাদের বলেছেন,
“তোমাদের মাঝে একটি দল থাকা উচিৎ যারা মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবেএবং তারাই হবে সফলকাম” (আল ইমরান-১০৪)
খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের ঠিক সেভাবেই কাজ করতে হবে যেভাবে রাসূল(সা) খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিলেন। রাসূল(সা)-এর পথ ছাড়া আর কোনো পথেই খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা সহীহ নয়। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“রাসূল (সাঃ) তোমাদের যাদেন তা তোমরা গ্রহণ করো এবং যা করতে নিষেধ করেন তা বর্জন করো।” (হাশর-৭)
এ থেকে বুঝা যায় যে, রাসূল(সা) এর দেখানো পথ ছাড়া আর কোন পথই আল্লাহ এর কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না। তাই আমাদের পুনরায়খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য রাসূল(সা) এর দেখানো পথেই কাজ করতে হবে।
তরুণদের ভুমিকা কী?-
তারুণ্য, এক অমীয় সম্ভাবনার নাম। প্রতিটা সমাজ পরিবর্তনে তরুণদের ভূমিকা সবসময় বেশী থাকে। কারণ তরুণরা চায় সবসময় শোষনমুক্ত সমাজ গড়তে। এমনকি রাসূল (সা) এর সময়ে ইসলাম প্রচারে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে সবচেয়ে বেশী সহায়তা করেছিলেন এই তরুণরা। রাসূল (সা) নিজেই বলেছিলেন, তরুণরা আমাকে সহায়তা করেছে এবং বৃদ্ধরা আমার বিরোধিতা করেছে। ইসলামের ইতিহাসের পাতা ঘুরে দেখলেই আমরা দেখতে পাই যে এতে তরুন মুসলিম বীরদের সংখ্যাই বেশী। কিন্তু বর্তমানে খিলাফাহ বিহীন সময়ে কুফফাররা তরুণদের ব্যস্ত করে রেখেছে বিভিন্ন রকম মোহ দিয়ে যাতে করে তরুণরা তাদের আসল কাজ, তাদের আসল দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে না পারে ।
একটা ছোট উদাহরন দিলেই বুঝা যাবে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় তরুণদের ভূমিকা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন যখন মুসলিমদের অধীনে ছিলো তখন ব্রিটিশ রাজা প্রতি বছর গোয়েন্দা পাঠাতো সেখানকার অবস্থা দেখার জন্য। গোয়েন্দা স্পেন এর গেইটে এসে দেখলো একটি ১৭-১৮ বছরের ছেলে কাঁদছে। সে তাকে জিজ্ঞেস করলো, তুমি কাঁদছো কেনো? তখন ছেলেটি বললো “আমার ছোড়া ১০ টি তীর এর মাঝে ৯ টী নিশানায় লেগেছে কিন্তু একটি নিশানায় লাগেনি। তাই আমি কাঁদছি। তখন গোয়েন্দা বললো, তো কী হয়েছে! আমি তো একটা তীরও নিশানায় লাগাতে পারি নাহ। তখন ছেলেটিসাথে সাথে জবাব দিলো, “আমার একটা নিশানা ব্যর্থ হবার কারণে একটা কাফির সেনা বেঁচে যাবে। যা আমি কখনোই মেনে নিতে পারি না। তখন গোয়েন্দা ব্রিটেনে ফিরে এসে রাজাকে বললো “স্পেন আক্রমন করার সময় এখন হয়নি। রাজা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে গোয়েন্দা তাঁর এবং সেই মুসলিম তরুণটির মাঝে কথোপকথনের ঘটনা তুলে ধরলো।
বহু বছর পর যখন আবার সেই গোয়েন্দা স্পেন গেল সে তখন দেখতে পেলো যে স্পেন এর গেটের সামনে একটি তরুন দাঁড়িয়ে আছে এবং কাঁদছে। তখন সে তরুণটির কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলে তরুণটি জবাব দিল যে তাঁর প্রেয়সী আরেক ছেলের সাথে পালিয়েছে। এখন তাঁর বেচে থাকার কোন মানে হয় নাহ। তখন গোয়েন্দা খুব উৎসাহের সাথে তাকে বললো “তাতে কি হয়েছে? তুমি আরেকটি জোগাড় করে ফেলবে”।এরপর সে ব্রিটেন এসে সাথে সাথে রাজাকে বললো ‘স্পেন আক্রমণের সময় এখনই।” এবং সে বছর মুসলিমরা স্পেন এর দখলদারিত্ব হারিয়েছিলো। এই ঘটনা থেকেই বুঝা যায় মুসলিম তরুণদের ভুমিকা কত গুরুত্বপূর্ণ খিলাফত প্রতিষ্ঠায়। তাই প্রত্যেক তরুণকেই খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হবে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই বলেছেন,
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। অতঃএব তোমরা সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং আল্লাহতে বিশ্বাস রাখবে।” (আল ইমরানঃ ১১০)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন,
“তোমরা যদি ঈমান আনো এবং সৎকর্ম কর আল্লাহ তোমাদের ওয়াদা করেছেন পৃথিবীতে তোমাদের শাসনক্ষমতা দান করবেন যেমনটি দান করেছিলেন পূর্ববর্তীদের…………। (আন নূর- ৫৫)”
তরুণদের ইসলামের জন্য কাজ করা যে কত দরকার তা রাসূল (সা) এর এই হাদিস থেকেই বুঝা যায়। রাসূল (সা) বলেন,
“কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ছাড়া কাউকেই সামনে আগাতে দেয়া হবে না।এর মাঝে একটী হলো তুমি তোমার যৌবনকাল কি কাজে ব্যায় করেছো?” [তিরমিযি]
অর্থাৎ আল্লাহ প্রত্যেক তরুনকেই তাঁর যৌবন কাল সম্পর্কে জিজ্ঞেসকরবেন।
তাই প্রত্যেক তরুণকেই বর্তমান সময়ে মুসলিমদের এই দুরাবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে।
রাসূল(সা) বলেন,
“ইসলাম এসেছে অপিরিচিত অবস্থায় এবং তা আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে যাবে। সুতরাং অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।” তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, অপরিচিত কারা ইয়া রাসুলাল্লাহ? তিনি বললেন, “অপরিচিত তারাই যারা মানুষকে ঠিক করবে, কিংবা সমাজব্যবস্থাকে ঠিক করবে যখন তা দুষিত অবস্থায় থাকবে।” (তাবারানী)
রাসূল (সা) আরো বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পৃথিবীর সব প্রান্ত আমাকে এক করে দেখিয়েছেন।আমি তার পূর্ব থেকে পশ্চিম অংশ দেখেছি। নিশ্চয়ই আমার উম্মতের কর্তৃত্ব তাতে পৌছাবে যা আমার জন্য এক করা হয়েছিলো তা হতে।” (আবু দাউদ)
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে দুনিয়ায় নব্যুয়ত এর আদলে খিলাফাহ ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করার তৌফিক দান করুক, যাতে করে আমরা সেই গুরাবাদের একজন হতেপারি যাদের অন্তর থেকে কিয়ামতের দিন নূর ছড়াবে। এই দুয়া করি। আমীন।
রাকিব ইশরাক মুহাম্মদ ইরতিজাছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

সূচনা:
পৃথিবীর চিন্তাশীল মানুষেরা আজকে নতুন করে নিজ নিজ দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে, তা তারা যে দেশের নাগরিকই হয়ে থাকুক না কেন। আন্তর্জাতিক নিয়ম, রীতিনীতি ও সংস্থাসমূহ ইতিমধ্যেই সচেতন মানুষের আস্থা হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় অখন্ডতা রক্ষা এবং নিজস্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা আদৌ যাবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মনে আজকে প্রশ্ন উঠেছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা (World Order) মানুষকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে সাথে আঞ্চলিক ও জাতীয় রাজনীতির বিভিন্ন ইস্যু বাংলাদেশের মানুষের মনে যে নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে, তা থেকে মুক্তির উপায় আমাদেরকেই খুঁজতে হবে। এই প্রবন্ধে আমি প্রথমেই আজকের আলোচনার শিরোনামের প্রচলিত ধারণাগত ভিত্তি এবং বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করতে চাই। এরপর বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শক্তির উৎস চিহ্নিত করে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নীতি প্রস্তাবনা আপনাদের সামনে তুলে ধরব।
২. ছোট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা: প্রচলিত ধারণাসমূহ
২.১ ছোট রাষ্ট্র
ইতিহাস থেকে আমরা জানি যে ইউরোপের ঔপনিবেশিক শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স জাতিরাষ্ট্রের ধারণা ব্যবহার করে তাদের উপনিবেশগুলোকে নিজেদের ইচ্ছামত ভাগ বাটোয়ারা করেছিল। একটি উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। তৎকালীন খিলাফতের একটি প্রদেশ সিরিয়াকে (যা শাম নামে পরিচিত ছিল) বর্তমান সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান ও প্যালেষ্টাইন – এ কয়টি ভাগে ভাগ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে এভাবে ওমান, কাতার, আরব আমিরাত, বাহ্রাইনসহ পৃথিবীতে অসংখ্য রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদীরা। এর ফলাফলও তারা জানতো। ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ফিশার ১৯১৮ সালে ঘোষণা করেছিলেন, “Sooner or later the small states will go. They will be absorbed in large political aggregates… and nobody will regret their demise, last of all the citizens themselves (Kabir, 2005)।
কখন একটি রাষ্ট্রকে ছোট বা ক্ষুদ্র (Small/micro) রাষ্ট্র বলা হবে, এব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একমত হতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে বলা যায় যে দেশের আয়তন, জনসংখ্যা, জাতীয় উৎপাদন, সম্পদের পরিমান, উৎপাদন ক্ষমতা ইত্যাদি দিয়ে ছোট রাষ্ট্রের পরিমাপ করা হয়ে থাকে। কমনওয়েল্থ সেক্রেটারিয়েট এবং বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে ‘১৫ লাখের নীচে জনসংখ্যা’ যে দেশের, সে দেশকে ছোট রাষ্ট্ররূপে সংজ্ঞায়িত করেছে (Kabir, 2005)। সংস্থা দু’টি অবশ্য যৌথ রিপোর্টে স্বীকার করেছে যে There is no single definition of a small country because size is a relative concept” (Kabir, 2005)। যদি ছোট রাষ্ট্রের জনসংখ্যা ১ কোটিও ধরা হয়, তাহলে অবশ্যই বলতে হবে যে শুধুমাত্র ঢাকা শহরের জনসংখ্যাই এর চেয়ে বেশী। জাতিসংঘের ১৯২ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে শতাধিক দেশ জনসংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের তুলনায় ছোট এবং ৭৮টি দেশ আয়তনের তুলনায় ছোট (Kabir, 2005)। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান অবশ্য ছোট ও বড় রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য করতে গিয়ে যুদ্ধ করার ক্ষমতাকে অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করেছেন (Kabir, 2005)। মূলতঃ ভারতের প্রতিবেশী হওয়ায় ভারতের সাথে জনসংখ্যা, আয়তন বা সামরিক শক্তির তুলনামূলক বিচারে নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান, মালদ্বীপের পাশাপাশি বাংলাদেশকেও অনেকে ছোট রাষ্ট্র হিসেবে গণ্য করে।
২.২ নিরাপত্তা
জাতীয় অধ্যাপক তালুকদার মনিরুজ্জামান নিরাপত্তাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে The protection and preservation of the minimum core values of any nation, political independence and territorial integrity” (Hafiz & Khan, 1990)। চিন্তাবিদরা নিরাপত্তাহীনতার উৎস হিসেবে সম্ভাব্য বহিঃশক্তির আক্রমণের পাশাপাশি দেশের আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় এনেছেন (Hafiz & Khan, 1990)। একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সামরিক চাপ প্রতিরোধের ক্ষমতা দেশের জনগণের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি বৃদ্ধি করে। এই চাপ বিদেশী শক্তি থেকে আসতে পারে, আভ্যন্তরীণও হতে পারে (Hafiz & Khan, 1990)। নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনায় পরিবেশের বিষয়ও ইদানীং বিভিন্ন লেখালেখিতে চোখে পড়ে। সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় সামরিক বিষয় যেমন বিবেচ্য; ঠিক তেমনিভাবে খাদ্য, অর্থনীতি, পরিবেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদি অসামরিক বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত।
ছোট রাষ্ট্র এবং নিরাপত্তা বিষয়ে প্রচলিত তাত্ত্বিক ধারণা সম্পর্কে উপরোক্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনার পর এবার দেখা যাক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা।
৩. আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা
৩.১ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট
সমাজতন্ত্রের পতন ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের মৃত্যু হয়েছে এবং পুঁজিবাদী আদর্শ সাময়িক বিজয় লাভ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কালবিলম্ব না করে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ প্রতিহত করার নামে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করে। পুরো নব্বই দশক জুড়ে বিভিন্ন কায়দা-কানুন করে সারা বিশ্বে নিজের একচ্ছত্র নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর পরই ঘটে ১১ই সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ার হামলা। এই হামলা-পরবর্তী মার্কিন কর্মকান্ড তথা ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ও ‘ব্যাপক-বিধ্বংসী অস্ত্রের’ অজুহাতে আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণ অনেকের মনে এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যে এই দেশগুলো দখল ও তাদের সম্পদ কুক্ষিগত করার উদ্দেশ্যেই কি টুইন টাওয়ার হামলা হয়েছিলো কিনা।
বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিজা রাইসের ২০০০ সালে ফরেন এফেয়ার্স – এ লেখা এক নিবন্ধে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে-
(US Foreign Policy)…will also proceed from the firm ground of the national interest, not from the interests of an illusory international community… (US)… ought to decide unilaterally where, when, how and what to attack (Kabir, 2005)। এরপর কারো প্রশ্ন থাকা উচিত নয় কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা বিশ্বে তান্ডব ও ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যদি আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করি তবে আমরা দেখতে পাবো যে বিশ্বের এক নম্বর মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সারা পৃথিবীকে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করে একেকটি অঞ্চল নিজের অনুগত কোন চামচা বা মোসাহেবকে বর্গা দিয়েছে। যেমন ব্রিটেনকে দিয়েছে ইউরোপ, ইসরাইলকে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য, অষ্ট্রেলিয়াকে দিয়েছে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারতকে দিয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি। মার্কিন স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ দেশসমূহে (কৌশলগত, সম্পদ বা যে কারণেই হোক না কেন) নিজের তাঁবেদার মেরুদন্ডহীন শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসিয়ে রেখেছে। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থ হাসিল করা নিশ্চিত করেছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের ভূমিকা: এই পুরো সময়ে তথাকথিত আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত লজ্জাজনক। আফগানিস্তান আক্রমণ করা হয়েছে জাতিসংঘের অনুমোদন নিয়ে আর ইরাক আক্রমণ করা হয়েছে জাতিসংঘকে তোয়াক্কা না করেই। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে জাতিসংঘ মুসলিম ও ইসলামবিদ্বেষী এবং মার্কিন-ব্রিটিশ-ইসরাইলের হাতের পুতুল। তথাকথিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শুধু ইসলাম ও মুসলমানদের ধ্বংস কামনা করে। এক্ষেত্রে ওআইসি ও আরব লীগের মত সংস্থাগুলো রীতিমত আগ্রাসী শক্তির সহায়কের ভূমিকা পালন করে আসছে। তাদের একমাত্র কাজ মুসলিম জনগণের ক্ষোভ ও আবেগ অনুভুতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা, যাতে সাম্রাজ্যবাদীরা নিশ্চিন্তে তাদের আগ্রাসী কার্যকলাপ অব্যাহত রাখতে পারে।
গণতন্ত্রের মার্কিন চেহারা ও বিশ্বায়ন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চাচ্ছে যে ইরাক-আফগানিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও তাদের অন্যতম লক্ষ্য। তারা মানুষকে মুক্তি ও স্বাধীনতা দেয়ার জন্য এই আগ্রাসন চালাচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই পঞ্চাশ ভাগ ভোটার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয় না। আর এই পঞ্চাশ ভাগেরও অর্ধেক ভোট বর্তমান প্রেসিডেন্ট বুশ ছলে-বলে-কৌশলে অর্জন করেছিলেন। এক চতুর্থাংশ মার্কিনীদের সমর্থন নিয়ে বুশ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট। বুশ তার এই গণতন্ত্র জোরপূর্বক ইরাক-আফগানিস্তানে চাপিয়ে দিতে চায় অথচ আপন স্বার্থ হাসিলের জন্য পাকিস্তানের সামরিক শাসন ও মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্র নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছে।
মানুষের সম্পদ লুটপাটের জন্য ‘বিশ্বায়ন’ (Globalization) নামে নতুন এক ধারণার জন্ম দিয়েছে পশ্চিমা বিশ্ব। বিশ্বায়নের নামে সারা বিশ্বে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানীসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবসা, বিনিয়োগ ও শিল্প প্রতিষ্ঠা করছে। যে পরিমাণ অর্থ তারা লগ্নী(investment) করে, তার চেয়ে বহুগুণ অর্থ ঐ দেশের জনগণকে শোষণ করে তারা নিয়ে যাচ্ছে। একইভাবে বিভিন্ন দেশের পুরো অর্থনীতিকে তারা নিজেদের সুবিধামতো সাজিয়ে নিয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সহায়ক ভূমিকা পালন করে। আর পুরো ব্যাপারে জনগণকে নেশাগ্রস্থ ও অন্ধকারে রাখার জন্য রয়েছে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও মিডিয়া প্রপাগান্ডা।
মার্কিন-ভারত-ইসরাইল চক্র: ইসরাইল ও ভারত – এই দু’টি রাষ্ট্র মার্কিন নীতি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখছে এবং প্রয়োজনে নিজেরা অনুসরণ করছে। লেবাননে ইসরাইলী হামলা এর সাম্প্রতিকতম প্রমাণ। এই তিন গণতান্ত্রিক দেশ সন্ত্রাস মোকাবেলার নামে মুসলিম ভুখন্ডে নিজেদের স্বার্থ হাসিলে একমত। ভারতের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রজেশ মিশ্র এই তিনদেশের জোট সম্পর্কে বলেছেন : “Such an alliance would have the political will and moral authority to take bold decisions in extreme cases of terrorist provocation” (Mazhar, 2006)। শীর্ষ পর্যায়ের এক নীতি নির্ধারণী সভায় এই তিনদেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, “The US, India and Israel as sister democracies and common victims of international terrorism should pool their resources and experiences in dealing with this menace” (Mazhar, 2006)। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এই menace হচ্ছে ইসলামী আদর্শের উত্থান (তাদের ভাষায় Political Islam) এবং তাদের এই সিদ্ধান্ত মুসলিম ভুখন্ডের উপর আগ্রাসনেরই নীল নকশা।
৩.২ আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা: এই উপমহাদেশের সার্বিক বিষয়ের দায়িত্ব ভারত নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বলতেন যে “India is now saddled with the responsibility to maintain the stability, status-quo and the character of this region” (Hafiz & Khan, 1990)। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এই অঞ্চলে ভারত ইতিমধ্যেই নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এই ব্যাপারে মার্কিন সমর্থনও তারা আদায় করে নিয়েছে। সিকিম ও ভুটানকে হজম করার পর নেপাল তাদের বর্তমান টার্গেট। শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপও মানতে বাধ্য হয়েছে ভারতের আধিপত্য। তবে ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তান পারমানবিক শক্তির অধিকারী হওয়াতে এই দুই দেশ পরস্পরের সাথে শক্তির ভারসাম্য বজায় রেখেছে।
ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক: ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। বিগত ৩৫ বছর যাবত ভারত একের পর এক ইস্যু তৈরী করে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ফারাক্কা বাধ, টিপাইমুখ বাধ, আন্তঃনদী সংযোগ, সীমান্তে বিএসএফের হামলা ও হত্যাযজ্ঞ, কাঁটাতারের বেড়া, পুশইন, ছিটমহল, তালপট্টি, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা, অসম বাণিজ্য, ট্রানজিট, ত্রিদেশীয় পাইপলাইন, সমুদ্র সীমা নির্ধারণ, টাটার বিনিয়োগ ইত্যাদি অসংখ্য ইস্যু একতরফাভাবে ভারতের তৈরী। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির সভাপতি রাজনাথ সিং সন্ত্রাসীদের ঘাটি গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আক্রমণের আহবান জানান। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতের পত্র-পত্রিকায় ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং বিশ্লেষকরা বাংলাদেশের উপর সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসনের আহবান জানিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী ভারতের সম্প্রসারণবাদ ও আধিপত্যবাদী মনোভাবের মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। বিগত দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ঘটনাবলীর সাথে ভারতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশের যোগসূত্র স্থাপন করলে বাংলাদেশের জনগণের আতঙ্কিত না হয়ে উপায় নেই। দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবাজি আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারতের মার্কিনীদের কাছে অভিযোগ উত্থাপন শুধুমাত্র একটি বিষয়েই দিক নির্দেশ করে। আর তা হলো যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে আফগানিস্তান, ইরাক ও লেবাননে হামলে পড়েছে, সেই একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও জঙ্গী দমনের অজুহাতে আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা।
বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্ক: বাংলাদেশ-মায়ানমার সম্পর্কের মধ্যেও রয়েছে অনেক উত্থান-পতন। আরাকানে রোহিঙ্গা সমস্যা, সমুদ্রে জলদস্যু এবং বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস আহরণ ইত্যাদি এই দুই দেশের মধ্যে অমিমাংসিত ইস্যু। রোহিঙ্গা উদ্বাস্ত সমস্যা সহ্য করে বাংলাদেশের নেয়া ‘পূর্বমুখী নীতিতে’ (Look east policy) মায়ানমারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন ও আসিয়ান দেশসমূহের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের এই প্রক্রিয়া কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন দিক উম্মোচনের সম্ভাবনা তৈরী করেছে। কিন্তু বর্তমানে হয় ভারত-মার্কিন চাপে অথবা মায়ানমারের অসহযোগিতার কারণে এই প্রক্রিয়া সামনে অগ্রসর হচ্ছে না।
৩.৩. জাতীয় প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান বিষয় হচ্ছে দুই বৃহৎ দলের কোন্দল, যা অতীতে জাতির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই কোন্দলের কারণে বিদেশী শক্তি সহজেই দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগে পায়। শুধুমাত্র ক্ষমতা লাভকে কেন্দ্র করে পরিচালিত রাজনীতির ফলে এদেশে কোন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে উঠেনি, এমনকি একটি জাতীয় প্রতিরক্ষানীতি পর্যন্ত তৈরী করা হয়নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত ও মার্কিন ভূমিকা সবচেয়ে বেশী আলোচিত বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রয়োজন মতো বাংলাদেশকে “মডারেট মুসলিম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র” অথবা “উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ সন্ত্রাসপ্রবণ সমাজ” (Moderate Muslim democracy to high-risk terrorist prone society) রূপে আখ্যায়িত করে। ভারতও নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য কখনো বন্ধুর বেশ ধরে, কখনো আবার বাংলাদেশকে জঙ্গী আস্তানা সাব্যস্ত করে। তবে ভারত-মার্কিন স্বার্থ বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এক ও অভিন্ন কিনা সে বির্তক এখনো সিদ্ধান্তমূলকভাবে শেষ হয়নি।
৪. বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি
৪.১ আভ্যন্তরীণ
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি এদেশের চলমান দ্বন্দ্ব সংঘাতপূর্ণ স্বার্থের রাজনীতি। অর্থনৈতিক ও সামাজিক চরম বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হলেও এদেশের জনগণ যখন সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে তখন এই দেশের তথাকথিত নেতৃবৃন্দ রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনীতির সকল ক্ষেত্রে চরম অসহিষ্ণুতার সাক্ষর রেখেছে। তারা এতটাই ক্ষমতালোভী যে প্রয়োজনে বিদেশী শক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতেও দ্বিধা করেনা।
৪.২ বিদেশী শক্তি
এদেশের মানুষের মধ্যে অন্যান্য মুসলিম দেশের মতোই ইসলামী চেতনা দিন দিন জেগে উঠছে। ইসলামের উত্থানে যাদের বিশ্ব ও আঞ্চলিক কর্তৃত্ব হুমকির সম্মুখীন, তারা নিশ্চয়ই এই জাগরণকে সহ্য করবে না। সাম্রাজ্যবাদীদের এদেশীয় দোসর আর র, আই.এস.আই, মোসাদ ও সি. আই.এ’র অবাধ ও অবৈধ কার্যকলাপ দেশের মিডিয়াতে মাঝে মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। এদেশের মানুষের মধ্যে একতার বীজ ইসলাম তাদের আক্রমণের একমাত্র লক্ষ্যবস্তু। ঐক্যবদ্ধ ইসলামী জনতা সম্পর্কে তারা সবচেয়ে বেশী ভীত এবং এই উত্থানকে ঠেকাতে তারা সবচেয়ে বেশী সংকল্পবদ্ধ।
এই ঝুঁকি মোকাবিলার উপায় হচ্ছে সমগ্র দেশবাসীকে ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ করে গণজাগরণ সৃষ্টি করা। ইসলামের শত্রুরা যে ভয় সবচেয়ে বেশী করছে, তাদের সে ভয়কে বাস্তবে রূপ দেয়ার মধ্যেই রয়েছে এই নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার একমাত্র উপায়। ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা এর সপক্ষে যুক্তি দেয়। আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে বলতে হবে যে ইসলামের মধ্যে কোন ‘সংখ্যালঘু’ ধারণা নেই। ইসলাম মুসলিম-অমুসলিম সকলের বিশ্বাস, জীবন ও সম্পদের নিশ্চিত নিরাপত্তা দেয়। আর একমাত্র ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রের পক্ষেই এই নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব। ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে গেলে বলতে হবে যে চৌদ্দশত বছরের ইতিহাসে ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিম-খ্রীষ্টান-ইহুদীসহ সকল ধর্মের মানুষকে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দিতে পেরেছিল। পাক-ভারত উপমহাদেশে আটশত বছরের মুসলিম শাসনেও একই চিত্র দেখা গেছে। বাংলাদেশেও এর কোন ব্যতিক্রম ছিল না। সুতরাং একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষেই সকল মানুষের নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব।
৫. নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলার উপায়
৫.১ তাত্ত্বিক ভিত্তি ও পররাষ্ট্রনীতি
সমগ্র পৃথিবী ও মানবজাতির সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সুষ্পষ্টভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা নীতি সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহ্ এ আলোকপাত করেছেন। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন :
(১) … এবং কিছুতেই আল্লাহ্ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না। (সুরা নিসা ১৪১)
(২) তিনিই তার রাসুল (সাঃ) কে প্রেরণ করেছেন পথনির্দেশ ও সত্যধর্ম সহকারে, যাতে একে সকল জীবনব্যবস্থার উপর বিজয়ী করেন, যদিও মুশরেকরা তা অপছন্দ করে। (সুরা আছ্-ছফ-৯)
(৩) হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করোনা, তারা একে অপরের বন্ধু …। (সুরা মায়েদা – ৫১)
(৪) তোমরাই হলে সর্বোত্তম জাতি, মানব জাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে …। (সুরা আলিইমরান – ১১০)
(৫) ইহুদী ও ও খ্রীষ্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ করেন …। (সুরা বাকারা – ১২০)
(৬) আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরেকদেরকে পাবেন…। (সুরা মায়েদা – ৮২)
উপরোক্ত আয়াতসহ অসংখ্য আয়াত ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহ্ থেকে এটা স্পষ্ট যে ইসলামী রাষ্ট্রর পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি নিম্নরূপ:
১. ইসলামী রাষ্ট্র কখনোই অন্যের আধিপত্য মেনে নিতে পারেনা।
২. অমুসলিম রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি চুক্তি হতে পারে।
৩. ইসলামের বাণী ও ন্যায়বিচার পৃথিবীতে অন্যান্য জাতির সামনে তুলে ধরার নীতিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
৫.২ বাংলাদেশের শক্তির উৎস
বাংলাদেশ ছোট রাষ্ট্র নয়। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্র হবার মতো অনেক উপাদান বাংলাদেশে বিদ্যমান।
এদেশে রয়েছে:
১. ১৭ কোটি মানুষ, যার অধিকাংশ মুসলমান। নেতৃত্ব দুর্বল ও বিভক্ত হলেও বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে এই জাতি ঐক্যবদ্ধ।
২. ভৌগলিক পরিবেশের (বিশেষত: নদীমাতৃক সবুজ সমতল ভূমি) কারণে কোন বহিঃশক্তি কখনো এই ভূমিকে বেশীদিন নিজের অধীনে রাখতে পারেনি। রাশিয়া আক্রমণ করে যেমন হিটলার চরম মাশুল দিয়েছিলো, তেমনি এদেশের মাটি দখলে রাখতে যেকোন বিদেশী শক্তির চরম খেসারত দিতে হবে।
৩. বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে এই দেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। অন্যভাবে দেখলে বলা যায় যে, ভারত ও চীনের মাঝে স্বাধীন মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক। আমরা দেখেছি যে এই কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সেনা ঘাটি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
৪. অনেকেই ভারতের পেটের ভিতরে বাংলাদেশের অবস্থানকে বাংলাদেশের দুর্বলতা হিসেবে উল্লেখ করেন। আমি সবাইকে বলবো যে কারো ঘরের অভ্যন্তরে অবস্থানকে কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তির উৎস হিসাবে দেখার জন্য।
৫. বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী দেশপ্রেমিক, শৃংখলাবদ্ধ, দক্ষ ও মেধাসম্পন্ন। আর সশস্ত্র বাহিনীর সাথে এদেশের জনগণের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অন্যতম পুঁজি।
৫.৩ খসড়া প্রতিরক্ষা নীতি
ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির মূলভিত্তি এবং বাংলাদেশের শক্তির উৎস অনুধাবন করে আমরা বাংলাদেশের জন্য খসড়া প্রতিরক্ষা নীতির মূলনীতি উপস্থাপন করছি:
১. সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা: দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীকে সার্বিকভাবে সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের একমাত্র শৃংখলাবদ্ধ ও দক্ষ শক্তি। এজন্য
ক. প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বাহিনীকে যথাযথ প্রস্তুতি নেয়ার সুযোগ তৈরী করে দিতে হবে।
খ. কোন বিষয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে তা নির্ধারণ করাও একটি জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা মনে করি সমগ্র দেশবাসীর জন্য তিনটি বিষয় রক্ষা করা জরুরী। প্রথমত: এদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষের বিশ্বাস (তা সে যে ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকুক না কেন); দ্বিতীয়ত: দেশের মানুষের জীবন; এবং তৃতীয়ত: রাষ্ট্র ও জনগণের সম্পদ। উল্লেখিত জীবন ও সম্পদের মধ্যে রয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য, ভৌগোলিক পরিবেশ (নদী, মৎস্য ও বনজ সম্পদ ইত্যাদি), খনিজ সম্পদ (গ্যাস, তেল, কয়লা ইত্যাদি) ও কৌশলগত সম্পদ (বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সমূহ, তথ্য, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ, শিল্প ইত্যাদি)।
গ. যারা বলে দেশের সশস্ত্রবাহিনীর কোন প্রয়োজন নেই তারা নিঃসন্দেহে এদেশের মানুষের বিশ্বাস, জীবন এবং সম্পদ সম্পর্কে কোন তোয়াক্কা করে না। তারা বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে মাত্র। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, সিরিয়া, মিশর ইত্যাদি দেশের মত আজ্ঞাবহ সশস্ত্রবাহিনী এদেশের জনগণের কোন প্রয়োজন নেই।
ঘ. সশস্ত্রবাহিনীর বাজেট নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। এক্ষেত্রে বলতে চাই যে সামগ্রিক বাজেটের অথবা জিডিপির নির্দিষ্ট কোন শতাংশ অথবা অন্য কোন দেশের সাথে কোন প্রকার তুলনা প্রতিরক্ষা বাজেটের ভিত্তি হতে পারে না। আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেট হবে আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে। আর আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ঙ. প্রতিরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ক্ষেত্রে বিদেশী নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমাদের নিজেদেরকে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম উৎপাদনের দিকে মনযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে গবেষণা করে এদেশের উপযোগী সরঞ্জাম উদ্ভাবন করতে হবে।
২. সিটিজেন’স আর্মি: বর্তমান সামরিক-বেসামরিক নিবিড় সর্ম্পককে আরো এগিয়ে নিয়ে সাধারণ জনগণকে দেশের প্রতিরক্ষায় আরো গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। এই সম্পৃক্ততার ধরণ হবে নিম্নরূপ:
ক. সমগ্র জনগণকে প্রাথমিকভাবে জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং দেশের শত্রু-মিত্র সম্পর্কে জনগণকে পরিষ্কার ধারণা দেয়া
খ. ১৫ বছরের উর্ধ্বে দেশের প্রত্যেক তরুণকে বাধ্যতামূলক মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া (Nabhani, 1998)। দেশে প্রচলিত স্কুল পর্যায়ের সর্বশেষ পরীক্ষার পরে প্রতি স্কুলে দুই মাসব্যাপী এই প্রশিক্ষণ এর আয়োজন করা যেতে পারে।
গ. যারা স্কুলে গন্ডি পেরিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে যারা এখনো চল্লিশ বছর অতিক্রম করেননি, তাদেরকে পর্যায়ক্রমে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা।
৩. প্রযুক্তি: জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ বা উদ্ভাবনের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে পাকিস্তান ও ভারত পারমানবিক শক্তি অর্জন করায় উভয়েই স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণে সক্ষম এবং তাদের মধ্যে শক্তির ভারসাম্য বিরাজ করছে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পারমানবিক স্থাপনা পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পরিচালনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। তাদেরকে নিয়ে দেশীয় পারমানবিক স্থাপনা তৈরী করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষকরা এই মতামত আগেই দিয়েছিলেন; “Efforts could be launched to pursue long-term planning to acquire nuclear weapons technology or explore the prospects, if any (Hafiz & Khan 1990). পারমানবিক শক্তি অর্জনের পদ্ধতি এবং পরবর্তী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার পথ নিয়েও তারা ইতিপূর্বে বক্তব্য রেখেছেন। মূলকথা হল পারমানবিক শক্তি, সাবমেরিন, অত্যাধুনিক যুদ্ধ বিমান ইত্যাদি যে প্রযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ উপমহাদেশে শক্তির ভারসাম্য অর্জন করতে পারবে, দীর্ঘমেয়াদে তাই আমাদেরকে করতে হবে।
৪. কুটনৈতিক তৎপরতা: সামরিক শক্তি একটি দেশের নিজস্ব পছন্দ বা সিদ্ধান্ত। কিন্তু কুটনীতির বিষয়টি সেরকম নয়। বহিঃর্বিশ্বে বন্ধু সন্ধানের প্রচেষ্টা আমাদের অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে। তবে এটা বলতেই হয় যে চারিদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় “Friendship to all, malice to none” জাতীয় হাস্যকর পররাষ্ট্রনীতি একান্তই পরিত্যাজ্য। একমাত্র পাগল ও নাবালকের কোন শত্রু থাকতে পারে না। এই নীতি একটি দেশের দুর্বলতার পরিচয় বহন করে মাত্র। আমাদের কুটনীতিবিদদের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দরকষাকষির জন্য (Negotiation) প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে।
৫. গবেষণা, উন্নয়ন ও শিল্পায়ন: সশস্ত্রবাহিনী প্রত্যেক আদর্শিক রাষ্ট্রে গবেষণার মাধ্যমে মানুষের জীবনে নতুন ধারার প্রবর্তন করেছে। আধুনিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন- ব্যবস্থাপনা, বিপনন ও বিভিন্ন সামগ্রী- যেমন গাড়ী, উড়োজাহাজ, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি খাতে সশস্ত্রবাহিনীর অবদান অনস্বীকার্য। মেধাসম্পন্ন এই জনশক্তি এদেশেও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এই বাহিনী পরবর্তীতে গবেষণালব্ধ ফলাফলকে শিল্পে রূপ দিতেও সক্ষম। এভাবে সশস্ত্রবাহিনী জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারে।
৫.৪ নীতির যৌক্তিকতা
উপরোক্ত নীতি বাস্তবায়নের পথে অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন জনগণকে প্রশিক্ষণ, পারমানবিক শক্তি অর্জন এবং সার্বিক পরিকল্পনার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে। জনগণকে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যাপারে প্রথমে একটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরতে চাই যেখানে বলা হয়েছে ১৯৫০-এর দশকে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৫২ ভাগ আর ১৯৮০-এর দশকে যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৮৫ ভাগ (Hafiz & Khan, 1990)। আমি নিশ্চিত যে বর্তমানের ইরাক, আফগানিস্তান ও সর্বশেষ লেবাননের যুদ্ধে বেসামরিক মানুষের নিহতের সংখ্যা শতকরা ৯৯ ভাগ। সুতরাং সকল সাধারণ জনগণের মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ জরুরী হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশে প্রশিক্ষিত সাধারণ মানুষ আগ্রাসী শক্তির ভয়ের কারণ (Deterence) হয়ে দাড়াবে।
এবার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বলতে চাই। বলা হয়ে থাকে যে সামরিক খাতে বাজেট বৃদ্ধি হলে উন্নয়ন খাতে কাংখিত অগ্রগতি অর্জিত হবে না। এসম্পর্কে দু’টি কথা। প্রথমত: বর্তমান সম্পদ বন্টনের যে ধারা চলছে তাতে কি আমাদের সামাজিক উন্নয়ন সংগঠিত হচেছ? আরো বেশী সম্পদ সামাজিক খাতে দিলে কি উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচন নিশ্চিত হবে, না দুর্নীতি ও লুটপাট বৃদ্ধি পাবে? সামরিক খাতে খরচ অনুৎপাদনশীল কেন বলা হচ্ছে ? মার্কিন অর্থনীতি টিকেই আছে সামরিক খাতকে কেন্দ্র করে। সকল তথাকথিত উন্নত দেশের ক্ষেত্রে (যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে) এই কথা প্রযোজ্য। আমরা আমাদের বাহিনীকে আগ্রাসী শক্তিরূপে দেখতে চাইনা। তবে যে কোন বিদেশী শক্তির আক্রমণের মুখে একটি সক্ষম বাহিনী রূপে দেখতে চাই। এই বাহিনী নিজে উৎপাদন ও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারে যা ইতিপূর্বে আলোচিত হয়েছে।
৬. উপসংহার
আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী আর ভারতের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাশের কারণে বাংলাদেশের জনগণ আজকে শঙ্কিত। দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বোমাবাজি আর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভারতের মার্কিনীদের কাছে অভিযোগ উত্থাপনের ফলে দেশবাসী আতঙ্কিত। যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ঠুনকো অজুহাত দেখিয়ে আফগানিস্তান, ইরাক ও লেবাননে হামলে পড়েছে, সেই একই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও জঙ্গী দমনের অজুহাতে আগ্রাসনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে কিনা, তা আমাদেরকে ভেবে দেখতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণ করা আজ জরুরী হয়ে পড়েছে। আমরা মনে করি এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাহিনীর রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনা। সশস্ত্রবাহিনীর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ ও উদ্ভাবন আমাদের জন্য নতুন দিগন্তের সুচনা করবে। জনগণকে মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া আমাদের প্রতিরক্ষার নীতির অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। গবেষণা ও শিল্পায়নে সশস্ত্রবাহিনী যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। একই সাথে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে যে যদি সশস্ত্রবাহিনীর রিমোট কন্ট্রোল ওয়াশিংটন, দিল্লী বা অন্য কোথাও থাকে, তবে দেশবাসীর জন্য এই বাহিনী হবে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। একমাত্র ইসলামী রাষ্ট্রই কুরআন-সুন্নাহ্ অনুসরণ করে প্রস্তুত এই প্রস্তাবিত পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন করতে পারে। দৃঢ়সংকল্প, দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ও শক্তিশালী নেতৃত্ব, ইসলামের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ জনগণ এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্রবাহিনীই এদেশের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করতে সক্ষম।
Bibligraphy
(1) Mohammad Humayun Kabir (editor), Small States and Regional Stability in South Asia, Bangladesh Institute of International and Strategic Studies, University Press Limited, 2005
(2) M Abdul Hafiz and Mizanur Rahman Khan (Editor), Development, Politics and Security: Third World Context, Bangladesh Institute of International and Strategic Studies, Civil and Military Press, 1990
(3) Farhad Mazhar, Gonoprotirokkhma, Oitijjhya, 2006
(4) Taqiuddin an-Nabhani, The Islamic State, Khilafat Prokashoni, 1998
Posted by Visionary
ইসলামী দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার গুরুত্ব

দাওয়ার অগ্রগতির জন্য দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বিরাজমান থাকার বিষয়টি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। এ বিষয়টি যদি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন না করা হয় বা অবহেলা করা হয় তবে তা দাওয়ার ফরজিয়্যাত পালনে অবহেলার দিকে নিয়ে যাবে এবং ফলশ্রুতিতে আল্লাহর ক্রোধ আমাদের উপর আপতিত হবে।
নিম্নের আলোচনায় আমরা দলের মধ্যে সঠিক পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টি আলোচনা করব। এক্ষেত্রে আমাদের জানতে হবে, পরিবেশ বলতে আমরা কী বুঝি, ভুল পরিবেশের উদাহরণ এবং তা কিভাবে উদ্ভুত হয়, সবশেষে সঠিক পরিবেশ কী এবং তা কিভাবে বজায় রাখতে হয়।
পরিবেশের অর্থ:
কোনো চিন্তাকে কোথাও ক্রমাগত বাস্তবায়ন করতে থাকলে একটি পরিবেশের সূচনা হয়। সাধারনত মানুষ একটি পরিবেশকে অনুভব করতে পারে। উদাহরণসরূপ, ঘরে কিংবা বাইরে, মসজিদ কিংবা খেলার মাঠে, স্কুল কিংবা মাদ্রাসায় একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ বিদ্যমান থাকে। যেমন, কোনো বাসায় যদি নারী ও পুরুষের মধ্যে মধ্যে অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ থাকে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে মিলিত হবার জন্য পৃথক স্থান থাকে, তবে বাইরের কেউ (যে এধরনের বিষয় পালন করেনা) সে এই বাসায় গেলে তার স্ত্রীকে পরিবেশের প্রভাবে অন্যান্য নারীদের সাথেই অবস্থান করার জন্য বলবে। একইভাবে, কোনো স্কুল বা কলেজ যেখানে মনযোগ দিয়ে পড়াশুনা করার প্রতি অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করা হয়, শ্রেণীকক্ষে ছাত্র-ছা্ত্রীদের নিজেদের মধ্যে কথোপকথনকে অত্যন্ত গর্হিত হিসেবে দেখা হয়, সেখানে কোনো নতুন ছাত্র বা ছাত্রী ভর্তি হলে সেও পরিবেশের প্রভাবে নিজেকে তার সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে, যদিওবা হয়তো সে এধরনের অধ্যয়নের পরিবেশে সে আগে কখনো পায়নি।
এই বাস্তবতাকে আরো বৃহত্তরভাবে চিন্তা করলে তাকে জনমত কিংবা জনগণের সাধারন (common) চিন্তা বলতে পারি।
পরিবেশ নিশ্চিতভাবে মানুষকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, পরিবেশ যদি ভালো হয় তবে তা ভালো প্রভাব ফেলবে আর যদি বিদ্যমান পরিবেশে ভালোর পরিমান কম হয় তবে মন্দ প্রভাব ফেলবে। উদাহরনসরূপ, একটি শিশু যখন তার গৃহে বেড়ে উঠে তখন তার ঘরের পরিবেশ অবশ্যই তাকে প্রভাবিত করবে। সুতরাং, ঘরে যদি গালাগালি, খবরদারি, কোন্দল ও পাপাচারের পরিবেশ থাকে তবে সে এর কু-প্রভাব শিশুর উপর পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। অপরদিকে যদি ঘরের অভ্যন্তরে তাকওয়া, আল্লাহর হুকুম মেনে চলা, কুরআন তেলাওয়াত, ইসলামী আলোচনা ইত্যাদির পরিবেশ থাকে তবে স্বাভাবিকভাবে শিশু তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠবে।
সাধারনত ধারনা করা হয়ে থাকে পরিবেশ বজায় রাখা মূলত কিছু ব্যক্তির দায়িত্ব। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিকোন হতে আমরা প্রত্যেকেই এর জন্য দায়িত্বশীল। এটি প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য এবং এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেয়া উচিত। অর্থাৎ, যদি আমি অনুভব করি যে পরিবেশের ব্যাঘাত ঘটেছে, তবে আমার অবশ্যই নিজেকে দায়িত্বশীল মনে করতে হবে, নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে যে, আমি কি সে দায়িত্ব পালন করেছি কিনা যা এ অবস্থায় আমার করা উচিত ছিল। সুতরাং, প্রত্যেককেই সঠিক পরিবেশ সৃষ্টি ও ভুল পরিবেশ অপসারণের জন্য কাজ করে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন. তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমরা প্রত্যেকেই তোমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। তিনি (সা) আরো বলেন, তোমাদের প্রত্যেকেই ইসলামী সীমান্তসমূহের এক একটি সীমান্ত। তিনি (সা) আরো বলেন, মানুষের মধ্যে কতক রয়েছে যারা কল্যাণের চাবি এবং অকল্যাণের তালা। আবার কতক রয়েছে যারা অকল্যাণের চাবি এবং কল্যাণের তালা।
রাসূলুল্লাহ (সা) সুন্দর পরিবেশের গুরুত্বারোপ করেছেন যখন তিনি (সা) বলেন,
আবু মূসা হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন,
مَثَلُ الْجَلِيسِ الصَّالِحِ وَالْجَلِيسِ السَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَكِيرِ الْحَدَّادِ لَا يَعْدَمُكَ مِنْ صَاحِبِ الْمِسْكِ إِمَّا تَشْتَرِيهِ أَوْ تَجِدُ رِيحَهُ وَكِيرُ الْحَدَّادِ يُحْرِقُ بَدَنَكَ أَوْ ثَوْبَكَ أَوْ تَجِدُ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً
খারাপ সাহচর্যের তুলনায় একটি ভালো সাহচর্যের উদাহরন সুঘন্ধি বিক্রেতা ও কামারের চুল্লির ন্যায়। প্রথম উদাহরণে তুমি হয় সুঘন্ধি কিনবে কিংবা তার সুঘ্রাণ উপভোগ করবে। আর দ্বিতীয় উদাহরণে সেই চুল্লি তোমার কাপড় বা বাড়ি পুরিয়ে দেবে কিংবা তুমি তা হতে একটি বাজে গন্ধ পাবে। [বুখারী]
হাদীসের এই উপমা বিষয়টিকে আরো জোরালোভাবে উপস্থাপন করে যে পরিবেশের প্রভাব ভালো বা খারাপ ঘ্রানের মতোই।
রাসূল (সা) আবারও ভালো ও মন্দ সাহচর্যের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা একে অপরের সাথে মিলিত হলে তাদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ বিরাজ করে। অর্থাৎ, পরিবার-পরিজনের মধ্যকার পরিবেশ হতে বন্ধু-বান্ধবের মধ্যকার পরিবেশ সাধারনত ভিন্ন হয়। তিনি (সা) বলেন,
الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
ব্যক্তি তার ঘনিষ্ট বন্ধুর দ্বীন (বিশ্বাস, স্বভাবচরিত্র)-এর উপর থাকে। সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেরই দেখা উচিত কার সাথে সে বন্ধুত্ব করছে। [তিরমিযি]
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) উল্লেখ করেন, তোমার দুনিয়ার বন্ধুরা আখিরাতেও তোমার বন্ধু হবে।
দলের অভ্যন্তরের পরিবেশ:
এটি অনুধাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, ইসলামী আদর্শভিত্তিক কোনো রাজনৈতিক দল উম্মাহর পুনর্জাগরণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে। এর অর্থ এই দলের কর্মীরা নিয়মিত বিভিন্ন পাঠচক্র, আলোচনা, সভা ও বিভিন্ন কর্মকান্ডে নিয়মিত পরস্পরের সাথে মিলিত হবে এবং জনগণের মন জয়ের কাজে নিয়োজিত থাকবে।
সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই দলের মধ্যে একটি পরিবেশ তৈরি হয়। এই পরিবেশটি যদি সঠিক হয়, তবে তা দাওয়াহর কাজকে সহযোগিতা ও এর উন্নয়নে সহায়তা করবে।
সঠিক পরিবেশ বজায় না রাখার কু-প্রভাব:
সমাজের জাহিলিয়্যাত আমাদের ভাইদের প্রভাবিত ও বিচলিত করে। ফলে তারা দলের পরিবেশে এসে তা থেকে আশ্রয় অন্বেষন করে। যদি তারা তা না পায়, তবে দল, দলের কর্মী, দলের চিন্তার প্রতি তাদের বিশ্বাস নিচে নেমে যায়, দূর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে এ অবস্থা দল থেকে তার ঝরে পড়ার উপলক্ষ্যে পরিনত হয়। এক ভাইয়ের সাথে অপর ভাইয়ের সাক্ষাৎ আমাদের স্বস্তির উপলক্ষ্যে পরিনত হতে হবে এবং এ পরিবেশ দলের অভ্যন্তরে প্রত্যেককেই বজায় রাখতে সচেষ্ট হতে হবে।
সঠিক পরিবেশ বজায় না থাকার কিছু কারণ নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হলো,
১) অধিক হাস্যরস:
কখনো কখনো দেখা যায়, দাওয়াহ ও জ্ঞানের পরিবেশের পরিবর্তে দলের মধ্যে একটি মাত্রাতিরিক্ত হাসি-ঠাট্টা ও পরিহাসে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। ফলে দাওয়াহ ভাব-গাম্ভীর্যতা ক্ষুন্ন হয় এবং দাওয়াহ তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়।
আনাস (রা) হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন:
لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا
“আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম ও কাঁদতে বেশি।” এ কথা শোনার পর সাহাবীগণের মধ্যে এমন কান্নার রোল পড়ে যায় যে তাঁরা মুখ ঢেকে ফেলেন।
অধিকমাত্রায় হাসি-তামাশা করা থেকে দাওয়াকারীদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। তাদের বুঝতে হবে প্রত্যেক বিষয়েরই নির্দিষ্ট সময়, জায়গা ও পরিমান রয়েছে যার বাইরে তা করা শোভনীয় নয়। তাদের এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে অধিক মাত্রায় হাসি-ঠাট্টার ফলে দাওয়ার ভাবগম্ভীর কথা হালকা শোনায়, দাওয়াহ তার উত্তাপ হারায় এবং এর অগ্রগতি শ্লথ হয়ে পড়ে। দাওয়ার পরিবেশ অবশ্যই ফিকহ, উসূল আল-ফিকহ, রাজনৈতিক বিশ্লেষন, উম্মাহর বাস্তবতা ও নাফসিয়্যাহ সংক্রান্ত আলোচনায় ভরপুর হতে হবে।
শায়খ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) তার আত-তাফকীর (Thinking) বইয়ে বলেন,
(মানুষের) চিন্তার মধ্যে গুরুতর অবস্থা (seriousness) অবিচ্ছেদ্যরূপে থাকে না, তাই মানুষের অধিকাংশ চিন্তাই ভাবগাম্ভীর্যতা বিবর্জিত। অভ্যাস ও ধারাবাহিকতা রক্ষার তাগিদে মানুষ কাজ করে যায়। আমোদ-প্রমোদ চিন্তায় আলাদারূপে বিদ্যমান দেখা যায়। তাই জোর করে (কৃত্রিমভাবে) হলেও গুরুতর অবস্থা (ধরে রাখার) অনুশীলন করতে হবে যেখানে (এই) ভাবগাম্ভীর্যতার ভিত্তি হবে (ব্যক্তির) সংকল্পবদ্ধতা, বাস্তবতা নয়। মূলত, গুরুতর অবস্থা (seriousness) ধরে রাখাটাই মূল উদ্দেশ্য। সুতরাং, এটি নিশ্চিতভাবে বলতে হবে, ভাবগাম্ভীর্যতা (বা গুরুতর চিন্তা) মানুষের মধ্যে স্বভাবজাত নয়, যদিও কিছু মানুষকে প্রকৃতিগতভাবেই ভাবগম্ভীর হিসেবে প্রত্যক্ষ করা যায়।
মূলত যা বোঝানো হচ্ছে যে, প্রাত্যহিক চিন্তায় মানুষ সাধারনত serious থাকে না। এবং বর্তমান সমাজের পরিবেশে এটি আরো বাস্তব যেখানে মানুষ টেলিভিশন, নাটক-সিনেমা ও গান-বাজনার সস্তা বিনোদনে ডুবে আছে। কিন্তু, আমাদের জোড় করে হলেও ভাবগম্ভীর (serious) পরিবেশ ধরে রাখতে হবে যদি তা আমাদের মধ্যে স্বভাবজাত না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাও গুরুত্বারোপ করে বলেন,
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ ~وَتَضْحَكُونَ وَلا تَبْكُونَ
তোমরা কি এই কথার বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছ? এবং হাসছ, ক্রন্দন করছ না?(আন নাজমঃ৫৯,৬০)
২) অন্যান্য দল নিয়ে অধিক মাতামাতি:
কোনো সত্যিকারের উদ্দেশ্য ছাড়াই অন্যান্য দল নিয়ে আলোচনার আধিক্যও দলের কর্মীদের মধ্যে দেখা দিতে পারে। এর ফলে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির আলোচনার পরিবর্তে দাওয়াকারীগণ ক্রমাগত অন্যান্য দল নিয়ে আলোচনায় রত থাকে যার অনেকটাই অনর্থক। এ ধরনের অভ্যাস দলের মধ্যে অনেক সমস্যা তৈরি করে। বিশেষ করে এতে কোনো নতুন কেউ কর্মী হিসেবে দলে প্রবেশ করতে মানসিক বাধা অনুভব করে বিশেষ করে যাদের অন্যান্য দলের প্রতি উষ্ণ অনুভূতি রয়েছে। এমনকি সাধারন কোনো ব্যক্তিও অভ্যন্তরের পরিবেশকে কাঁদা ছোড়াছুড়ির পরিবেশ মনে করে দলের সাথে সম্পর্ক তৈরি থেকে বিরত থাকতে পারে। যেহেতু এধরনের আলোচনা আবেগসম্পন্ন এবং তা দলের কর্মীদের নিজেদেরকে অন্যদের হতে শ্রেষ্ঠ হওয়ার অনুভুতি প্রদান করে, তাই এ ধরনের পরিবেশ আমরা কিছু দলের মধ্যে উপস্থিত দেখব। কিন্তু উম্মাহর পুনর্জাগরনের কর্মীদের এ বিপদ থেকে অত্যন্ত সাবধান থাকতে হবে।
শায়খ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) তার বই মাফাহীম (Concepts)-এ বলেন,
“এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী যে উম্মাহর সাথে বাস করে তাদের হতে নিজেদের এটি যেন পৃথক কোনো সত্ত্বা না মনে করে। বরং তারা নিজেদের উম্মাহর একটি অংশ মনে করবে কারণ উম্মাহর সদস্যরা মুসলিম যেরকম দলের সদস্যরা মুসলিম। দলের সদস্যরা অন্য কোনো মুসলিম হতে কোনো অংশে বেশি উত্তম নয় যদিও তারা ইসলাম বোঝে ও এর জন্য কাজ করে। দলের ব্যক্তিগণের জন্য রয়েছে বেশি দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা, মুসলিমদের সেবা করার নিমিত্তে ও আল্লাহর দৃষ্টির আওতায় ইসলামের জন্য কাজ করার নিমিত্তে। ইসলামী গোষ্ঠীর সদস্যদের এটা বোঝা উচিত তাদের সংখ্যা যত বেশিই হোক না কেন, উম্মাহ ছাড়া তারা মূল্যহীন যাদের মধ্যে তারা কার্যক্রম চালায়। ফলে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে, উম্মাহর সাথে গণসংযোগ চালোনো, তাকে সঙ্গে নিয়ে সংগ্রামে অগ্রসর হওয়া, নিশ্চিত করা যাতে উম্মাহ অনুভব করে যে সে নিজেই এই সংগ্রাম চালাচ্ছে। দলকে অবশ্যই এমন কোনো কাজ, কথা/মন্তব্য যা দলকে উম্মাহ হতে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা হিসেবে চিহ্নিত করে, তা যে আকাড়ের হোক না কেন, তা থেকে বিরত থাকতে হবে।….এটা এজন্য যে এটি দল ও তার দাওয়াকে উম্মাহ হতে পৃথক করে ফেলে এবং দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী সমাজের অসংখ্য সমস্যার মধ্যে আরো একটি সমস্যায় পরিনত হয় যা পূনর্জাগরণকে ব্যহত করে। সুতরাং উম্মাহ হচ্ছে একটি অবিচ্ছেদ্য একক সত্ত্বা এবং দলের ব্যক্তিগোষ্ঠী (তার মধ্য হতে) উঠে দাড়িয়েছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য, রাষ্ট্র ও উম্মাহর মধ্যে ইসলামের প্রহরী হিসেবে, যাতে কোনো বিচ্যুতি না হয় তা নিশ্চিত করা যায়। যদি সে (দল) তার (উম্মাহর) মধ্যে এরকম কিছু (বিচ্যুতি) দেখতে পায়, তবে সে তার মধ্যে ঈমান ও মৌলিকত্ব সঞ্চারিত করবে। যদি সে রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো বিচ্যুতি দেখতে পায়, তাহলে সে উম্মাহর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসলাম অনুযায়ী তা সংশোধন করার জন্য কাজ করবে। এভাবেই দলকর্তৃক বহনকৃত দাওয়াহ উৎকর্ষতার সাথে এর প্রকৃত পথে অগ্রসর হবে।
এটি সত্য যে কিছু দলের মধ্যে ভুল কনসেপ্ট ও পদ্ধতি থাকবে। তথাপি, দাওয়াকারীদের সেসব দলের আলোচনায় অতিমগ্নতা ও আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া হতে সাবধান থাকতে হবে।
আত-তাকাত্তুল আল-হিযবি বইটির ৫০ পৃষ্ঠায় শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রহ) বলেন:
সুতরাং দলের সদস্যরা উম্মাহর সাধারণ সদস্যের মতো থাকবে এবং নিজেদের উম্মাহর সেবক ছাড়া অন্য কিছুই মনে করবে না। তাদের উপলব্ধি করতে হবে যে উম্মাহর সেবায় নিয়োজিত হওয়াটাই তাদের দলের মূল কাজ।
বরং আমাদের কোনো দলের দিকে ক্রমাগত আঙ্গুল না তুলে, ভুল কনসেপ্টের দিকে ফোকাস রাখা উচিত তা সে কনসেপ্ট যেই ধারণ করুক না কেন।
বস্তুতঃ বিভিন্ন দলের সমালোচনা হতে উম্মাহর মধ্যে সাধারনভাবে কনসেপ্ট আলোচনা-সমালোচনা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ মানুষই দল করে না এবং তাদের দাওয়াহ করে মন জয় করে দাওয়াহর কাজে নিয়ে আসা অনেক সহজ। স্বাভাবিকভাবেই দাওয়াহর কাজ করার সময় অন্যান্য দলের কর্মীদের সাথেও সাক্ষাত হবে, আলোচনা-বিশ্লেষন হবে; তবে এ কাজ আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়।
কার্যক্রমের অধিক আলোচনার দরূন সুন্দর সংস্কৃতির পরিবেশ হারিয়ে ফেলা:
আরেকটি সমস্যা যা দাওয়াকারীদের মধ্যে বিরাজ করতে পারে তা হলো, তারা দলের গৃহীত চিন্তার পরিবর্তে দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বেশি আলোচনা করছে। দলের অবশ্যই এমন সব দা’ঈ প্রয়োজন যারা ইসলামী চিন্তা অত্যন্ত ভালোভাবে বুঝবে যাতে করে তা দ্বারা তারা উম্মাহকে পুনর্জাগরিত করতে পারে। সুতরাং, দাওয়াকারীদের মধ্যে আলোচনা, প্রশ্ন ও বিতর্কের পরিবেশ বিরাজমান থাকা উচিত। এই ধরনের পরিবেশ দলের তরুনদের বিভিন্ন প্রশ্ন, মতামত ও প্রমানাদির সম্মুখে তাদের চিন্তার উন্নয়নে অনেকটা সাহায্য করবে।
১০ জন গভীর চিন্তাশীল কর্মী ১০০ জন দূর্বল কর্মী হতে উত্তম। কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর অবশ্যই গুরুত্ব রয়েছে। তবে এখানে বুঝতে হবে, শরীরে মাংস থাকা যেমন জরুরী, তার থেকে বেশি জরুরী শক্তিশালী হাড় থাকা মাংসকে শরীরের সাথে ধরে রাখে।
স্বাভাবিকভাবেই একজন দাওয়াকারী যখন অপর কোনো দাওয়াকারী ভাইয়ের সাথে মিলিত হবে তখন তারা বিভিন্ন কল্যাণমুখী আলোচনায় রত হবে। এ ধরনের আলোচনার বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে, বিশ্ব পরিস্থিতি, ফিকহী বিষয়াদি, আত্ম-উন্নয়ন, হালাকায় আলোচিত বিভিন্ন কনসেপ্ট-এর বিশ্লেষনমূলক আলোচনা ইত্যাদি।
৪) দলবাজি বা উপদলের উপদ্রব:
আরেকটি পরিবেশ যা দাওয়াহর কাজের জন্য খুবই মারাত্মক, তা হলো দলের মধ্যে বিভিন্ন উপদল তৈরি হওয়া যারা দলের গৃহীত চিন্তার প্রতি অনুগত না হয়ে বিশেষ বিশেষ ব্যাক্তির প্রতি অনুগত থাকে। এরূপ পরিবেশ তখনি তৈরি হয় যখন দলের কর্মীরা হুকুম শরীয়াহ ও সাংগঠনিক নীতিমালার ভঙ্গ করে এবং একে অপরের ব্যাপারে নেতিবাচক আলোচনায় লিপ্ত হয়।
এটি স্বাভাবিক যে কিছু কিছু ভাইয়ের মধ্যে সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা অন্যান্য কিছু ভাইদের সাথে সম্পর্কের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। যদিওবা তাদের এটা বোঝা উচিৎ যে, তাদের সকলের মধ্যেই একটি আদর্শিক বন্ধন রয়েছে, যা তাদেরকে দলের মধ্যে বন্ধনে একত্রিত করে। তাই এই বন্ধনটি বন্ধুত্বের বা ব্যাক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে হওয়া উচিৎ নয় বরং আকিদাহ এবং দলের গৃহীত (adopted) চিন্তার ভিত্তিতে হতে হবে।
এই দুইটি বিষয়ই একে অপরের সাথে বন্ধনের মূল ভিত্তি হতে হবে। তাই ইসলামি দলে দলবাজি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। দলকে অবশ্যই সামগ্রিকভাবে একক একটি সত্ত্বায় পরিনত হতে হবে।
এটিও স্বাভাবিক যে কখনো কখনো দলের বিভিন্ন ভাইয়ের কোনো দোষ কিংবা দূর্বলতা চোখে পড়বে এবং তা আমাদের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন করতে পারে। কিন্তু এই বিষয়গুলো রফাদফা করার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া বা বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং হুকুম শরীয়াহ ও সাংগঠনিক নীতি অনুসারে এর সমাধান হচ্ছে কিনা তা সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষন করতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلا تَجَسَّسُوا وَلا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ
মুমিনগণ, তোমরা অধিকাংশ সন্দেহ থেকে দুরে থাক। নিশ্চয় কিছু কিছু সন্দেহ গোনাহের কাজ। [হুজুরাত:১২]
এই আয়াতের তাফসীরে ইবনে আব্বাস বলেন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুমিনদের তাদের অন্যান্য ভাইদের ব্যাপারে মন্দ ধারণা পোষন করাকে হারাম করেছেন।
আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূল (সা) বলেন: সন্দেহ হতে দূরে থাকো কারণ সন্দেহ (এর ভিত্তিতে বলা কথা) সবেচেয়ে অসত্য কথাবার্তা (এক নিকৃষ্ট মিথ্যাচার)।
একজন মুমিন যিনি আপাতদৃষ্টিতে সৎ ও নিষ্ঠাবান তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষন করা বৈধ নয়, বরং তার সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখাটাই উৎসাহিত।
ইসলাম গীবত ও অপবাদকে হারাম করেছে ও একইসাথে মানুষদের ব্যাপারে সন্দেহজনক, কু-ধারণাকে থেকে দূরে থাকতে বলেছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ
এবং একে অপরের পিছনে গোয়েন্দাগিরি করোনা। তোমাদের কেউ যেন কারও পিছনে তার দোষচর্চা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই করবে। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। [হুজুরাত: ১২]
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন,
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ نُهُوا عَنِ النَّجْوَى ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا نُهُوا عَنْهُ وَيَتَنَاجَوْنَ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ
আপনি কি ভেবে দেখেননি, যাদেরকে কানাঘুষা করতে নিষেধ করা হয়েছিল অতঃপর তারা নিষিদ্ধ কাজেরই পুনরাবৃত্তি করে এবং পাপাচার, সীমালংঘন এবং রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়েই কানাঘুষা করে…[মুজাদালাহ:৮]
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَنَاجَيْتُمْ فَلَا تَتَنَاجَوْا بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَمَعْصِيَتِ الرَّسُولِ وَتَنَاجَوْا بِالْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ
মুমিনগণ, তোমরা যখন কানাকানি কর, তখন পাপাচার, সীমালংঘন ও রাসূলের অবাধ্যতার বিষয়ে কানাকানি করো না বরং অনুগ্রহ ও খোদাভীতির ব্যাপারে কানাকানি করো। আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর কাছে তোমরা একত্রিত হবে। [মুজাদালাহ: ৯]
وَإِذَا جَاءهُمْ أَمْرٌ مِّنَ الأَمْنِ أَوِ الْخَوْفِ أَذَاعُواْ بِهِ وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُوْلِي الأَمْرِ مِنْهُمْ لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ وَلَوْلاَ فَضْلُ اللّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ لاَتَّبَعْتُمُ الشَّيْطَانَ إِلاَّ قَلِيلاً
আর যখন তাদের কছে পৌঁছে কোন সংবাদ শান্তি-সংক্রান্ত কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেগুলোকে রটিয়ে দেয়। আর যদি সেগুলো পৌঁছে দিত রাসূল পর্যন্ত কিংবা তাদের উলিল আমর (দায়িত্বশীল) পর্যন্ত, তখন অনুসন্ধান করে দেখা যেত সেসব বিষয়, যা তাতে রয়েছে অনুসন্ধান করার মত। বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা যদি তোমাদের উপর বিদ্যমান না থাকত তবে তোমাদের অল্প কতিপয় লোক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে শুরু করত! [নিসা: ৮৩]
আবু দাউদ আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেন- “ইসরার রাত্রিতে আমি তামার নখ বিশিষ্ট একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করি যারা নখগুলো দিয়ে তাদের মুখমন্ডল ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল! এসমস্ত লোক কারা? জিবরাঈল (আ) বললেন, এরা দুনিয়াতে মানুষের গোশ্ত ভক্ষন করত এবং তাদের মান-সম্মান নষ্ট করত।” অর্থাৎ তারা মানুষের গীবত ও চুগলখোরী করত।
পশ্চিমা সমাজের সমস্যাগুলো অন্যতম কারণ হিংসা-বিদ্বেষ করাকে ইসলাম নিষেধ করেছে। রাসূল (সা) বলেন, কোনো মুসলিমের প্রতি বিদ্বেষ রেখো না; অন্য মুসলিমদের প্রতি হিংসাত্মক হয়ো না; একজন মুসলিমের বিরুদ্ধে যেয়ো না এবং তাকে পরিত্যাগ করো না। হে আল্লাহর বান্দাগণ, পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। একজন মুসলিমের জন্য এটি বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের সাথে তিনদিনের বেশি সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকবে।
পশ্চিমা সমাজে একে অপরকে ছোট করা অনেকটা অবসর-বিনোদনে পরিনত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ
একজন ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে ছোট করা থেকে নিকৃষ্ট আর কিছুই করতে পারে না। [মুসলিম]
ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও এক মুসলিমের অপর মুসলিমের প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ রাখা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের এ ব্যপারে সতর্ক করে গিয়েছেন। তিনি বলেন,
تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الاِثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لاَ يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا إِلاَّ رَجُلاً كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ فَيُقَالُ أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا
জান্নাতের দরজাগুলো সোমবার ও বৃহস্পতিবার উন্মুক্ত করা হয় এবং প্রত্যেক (আল্লাহর) বান্দাকে ক্ষমা করে দেয়া হয় কেবলমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যে তার ভাইয়ের প্রতি কোনোরূপ বিদ্বেষ রাখে। (তাদের ব্যপারে) বলা হবে: এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়; এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়; এদের দুজনকে (ক্ষমা করা) পিছিয়ে দাও যতক্ষন না তারা মিমাংসা করে নেয়। [মুসলিম]
আর পবিত্র কুরআনে আমরা একটি চমৎকার দুআ দেখতে পাই:
وَالَّذِينَ جَاءُوا مِنْ بَعْدِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ وَلَا تَجْعَلْ فِي قُلُوبِنَا غِلًّا لِلَّذِينَ آَمَنُوا رَبَّنَا إِنَّكَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
যারা তাদের পরে আগমন করেছে। তারা বলে: হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদেরকে ও আমাদের ঈমানে অগ্রগামী ভাইদের ক্ষমা কর এবং ঈমানদারদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে কোন বিদ্বেষ রেখো না। হে আমাদের পালনকর্তা, আপনি দয়ালু, পরম করুণাময়। [হাশর: ১০]
ভাইয়েরা একে অপরের সাথে থাকতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করবে ও ঘনিষ্টতা অনুভব করবে। আমাদের অহংকারবোধকে ইসলাম দিয়ে শান্ত করতে হবে। রাসূল (সা) বলেন, ব্যক্তি তার ঘনিষ্ট সহচরের দীনের উপর থাকে। আর সেই সাহচর্যে কোনো কল্যাণ নেই যাতে একজন (সহচর) তোমার ব্যপারে তার নিজের মতোই উচ্চ ধারনা পোষন করে। [ইহইয়াউ উলূমুদ দীন]
সমস্যা সমাধানের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ:
দা’ঈগণ নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে তাদের সমস্যাগুলো সমাধান করে নেয়া উচিত:
যদি কোনো দাওয়াকারী এমন কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে অথবা তার টিম-এর কোনো কর্মীর কোনো ভূল দেখে, তখন সে কোনো বিলম্ব না করে তার সাথে বিষয়টি আলোচনা করবে, একজন ভাই হিসেবে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ও নসীহত করবে। সে অবশ্যই এ বিষয়টি নিয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করবে না, সে কোনো দায়িত্বশীল হোক কিংবা না হোক।
যদি কোনো দাওয়াকারী তার দায়িত্বশীল হতে এমন কোনো কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে, তখন সে কোনো বিলম্ব না করে তার সাথে বিষয়টি আলোচনা করবে, একজন ভাই হিসেবে তাকে স্মরণ করিয়ে দিবে ও নসীহত করবে। সে অবশ্যই সেই নির্দিষ্ট দায়িত্বশীল ভাইয়ের পূর্বে এ বিষয়টি নিয়ে আর কারো সাথে আলোচনা করবে না।
যদি এরপরও বিষয়টির শুরাহা তথা সংশোধন না হয়, তবে দাওয়াকারীর উচিত তার নিজস্ব দাওয়া এলাকা অর্থাৎ যে এলাকায় সে কাজ করে, তার দায়িত্বশীলকে বিষয়টি অবহিত করা ও তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা। সে শুধু ততটুকুই আলোচনা করবে যতটুকু সে জানে এবং এলাকার দায়িত্বশীল ছাড়া আর কারো সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে না।
এরপরও যদি দলের কোনো ব্যক্তি সংশয়মুক্ত না হয় কিংবা প্রত্যাশিত চুড়ান্ত সমাধান না পায়, তবে সে এ বিষয়ে তার দেশের মূল দায়িত্বশীল ব্যতিত অন্য কারো সাথে কোনো কথা বলবে না। যদি সে তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে তবে তাকে সরাসরি তা অবহিত করবে, আর যদি না চিনে তবে তাকে তার নিকট দায়িত্বশীলের মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে অবহিত করবে। এক্ষেত্রে তার পাঠচক্রের দায়িত্বশীল, তার এলাকার দায়িত্বশীল কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তি তা পড়বে না যদি না দেশের মূল দায়িত্বশীল অনুমতি দেন।
যদি সে তার দেশের দায়িত্বশীল সদস্য হতে সমাধান না পায়, তবে সে দলের যোগাযোগের সূত্রের মাধ্যমে তার অভিযোগ দলের আমীরের নিকট তুলে ধরতে পারে।
সামষ্টিক জবাবদিহিতা দলে না থাকাই আবশ্যক। যদি কেউ তার সহকর্মী হতে কোনো ভুল-ত্রুটি কিংবা খারাপ লাগার মতো কিছু দেখে তবে সে তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে নেবে। হালাকার দায়িত্বশীল, সদস্য, ছাত্র কিংবা এলাকার অন্য কোনো দায়িত্বশীল হোক না কেন – কারো জন্যই দলের অভ্যন্তরে সামষ্টিক জবাবদিহিতার অনুমতি থাকা উচিত নয়।
পাঠচক্রে কোনো ছাত্র যদি মনে করে যে তার প্রশিক্ষক কোনো এক ব্যাখ্যায় ভুল করেছে, তবে তাকে তা শুধরিয়ে দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত। তবে তা বিনয় সহকারে ইসলামী শিষ্টাচার পরিপূর্ণ পরিবেশে হতে হবে। যদি এতেও সে সংশয়মুক্ত না হয়, তবে সে প্রশ্নটি মনে রাখবে এবং জ্ঞানসম্পন্ন কোনো দাওয়াকারীকে জিজ্ঞেস করবে অথবা কোনো প্রশ্ন-উত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হলে তাতে তা উত্থাপন করবে। এরপরও যদি প্রশ্নটি অমিমাংসিত রয়ে যায় তবে সে প্রশ্নটি লিখে দেশের দায়িত্বশীলের কাছে উত্তরপ্রাপ্তির জন্য প্রেরণ করতে পারে।
এর মাধ্যমে আমরা যা অর্জন করতে চাই তা নিম্নরূপ:
কখনো কখনো আমরা অত্যন্ত অধৈর্য হয়ে পড়ি এবং সরাসরি অন্যান্য ভাইদের কাছে গিয়ে নালিশ দেই, সমাধান চাই এবং এই প্রক্রিয়ায় সমস্যাটি অনেক অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কাছে প্রকাশ করে দেই। এভাবে সমস্যাটি জনে জনে ছড়িয়ে পড়ে, একজন মুসলিমের সম্মান ক্ষুন্ন হয় এবং পুরো বিষয়টি আরো জটিল হয়ে পড়ে। এটি উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে, দলের অভ্যন্তরে ফিতনার সম্ভাবনা নির্মূল করা ও ভাইদের সম্মান রক্ষা করা – দুটোই আমাদের উদ্দেশ্য হতে হবে। এক্ষেত্রে, একটির সাথে আরেকটিকে সাংঘর্ষিক অবস্থানে না আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাতে হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য একে অপরকে ভালোবাসা:
আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবাসা সংক্রান্ত হাদীসসমূহ থেকে দাওয়াকারীদের অনুপ্রেরণা নেয়ায় সবসময় রত থাকতে হবে এবং সাহাবীদের মতো সবসময়েই সঠিক পরিবেশ ও ভাতৃত্ব বজায় রেখে চলতে হবে।
মুসলিম আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
« أَنَّ رَجُلاً زَارَ أَخًا لَهُ فِى قَرْيَةٍ أُخْرَى فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ مَلَكًا فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ أَيْنَ تُرِيدُ قَالَ أُرِيدُ أَخًا لِى فِى هَذِهِ الْقَرْيَةِ. قَالَ هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا قَالَ لاَ غَيْرَ أَنِّى أَحْبَبْتُهُ فِى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ. قَالَ فَإِنِّى رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ »
এক ব্যক্তি তার ভাইকে দেখার জন্য অন্য এক গ্রামে গেল । আল্লাহ তার জন্য রাস্তায় একজন ফিরিশতা মোতায়েন করলেন। সে ব্যক্তি যখন ফিরিশতার কাছে পৌছল, তখন ফিরিশতা জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কোথায় যাওয়ার ইরাদা করছ? সে বলল, আমি এই গ্রামে আমার এক ভাইকে দেখার জন্য যেতে চাই । ফিরিশতা বললেন, তার কাছে কি তোমার কোন অনুগ্রহ আছে, যা তুমি আরো বৃদ্ধি করতে চাও? সে বলল, না। আমি তো শুধু আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের জন্যই তাকে ভালবাসি। ফিরিশতা বললেন, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার কাছে এ পয়গাম নিয়ে এসেছি যে, আল্লাহ তোমাকে ভালবাসেন, যেমন তুমি তাকে আল্লাহরই জন্য ভালবেসেছ।
যেই ঈমানের মিষ্টতা অনুভব করতে চায় সে যেন কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই ভালোবাসে। [আহমাদ]
ভাইয়েরা, কিভাবে আমরা উম্মাহর ঐক্যের কথা বলতে পারি যখন আমরা নিজেরাই দলের অভ্যন্তরে ঐক্য আনতে ব্যর্থ হচ্ছি! ইমাম মুসলিম নু’মান বিন বশীর (রা) হতে বর্ণনা করেন,
الْمُسْلِمُونَ كَرَجُلٍ وَاحِدٍ إِنِ اشْتَكَى عَيْنُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ وَإِنِ اشْتَكَى رَأْسُهُ اشْتَكَى كُلُّهُ
মুসলিমগণ একটি দেহের মতো। যদি এর চোখ ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তবে সমস্ত দেহই ব্যথায় ভোগে, যদি এর মাথা ব্যথায় আক্রান্ত হয়, তবে সমস্ত দেহই ব্যথায় ভোগে।
পরিশেষে একটি হাদীস উদ্ধৃত করে আলোচনায় ইতি টানছি। রাসূল (সা) বলেন,
আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে এমন কিছু ব্যক্তি আছে যারা নবীও না, শহীদও না – তবুও শহীদ ও নবীগণ কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা’য়ালার নিকট ওই বান্দাদের মর্যাদার কারণে তাদেরকে ঈর্ষা করবেন (মর্যাদার স্বীকৃতি দেবেন)। তারা জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদেরকে বলুন, তারা কারা? তিনি (সা) জবাব দিলেন, তারা এমন লোক যারা একে অপরকে আল্লাহর রূহের জন্য ভালোবাসবে যদিও তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার বন্ধন বা সম্পদের লেনদেন নেই। আল্লাহর শপথ, তাদের চেহারায় থাকবে নূর এবং তারা থাকবে নূরের উপর। মানুষ যখন ভীত থাকবে তখন তাদের কোনো ভীতি থাকবে না, এবং মানুষ যখন দুঃখে থাকবে তখন তাদের কোনো দুঃখ থাকবে না। তারপর তিনি এই আয়াত পড়লেন:
أَلا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلا هُمْ يَحْزَنُونَ
মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু, তাদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে, না তারা দুঃখ পাবে। [সূরা ইউনুস: ৬২]
Posted by Visionary
ইসলামের দৃষ্টিতে নির্বাচন (Election)

Election বা নির্বাচন হচ্ছে ইসলামী শরীয়া’র অনুমোদিত উপায়সমুহের একটি যার মাধ্যমে প্রতিনিধি বাছাই করা হয়। রাসূল (সা) বা’ইয়াতে আকাবায় বলেছেন,
أَخْرِجُوا إِلَيَّ مِنْكُمْ اثْنَيْ عَشَرَ نَقِيبًا يَكُونُونَ عَلَى قَوْمِهِمْ
“তোমাদের মধ্য থেকে বার জন নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি (নাকীব) নিয়ে এসো, যারা তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জনগনের প্রতিনিধিত্ব করে”।
বর্তমানে ইসলামী ভূমিতে সকল ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থায়ই অনৈসলামিক। কেননা, এগুলো কুফর শাসনব্যবস্থা যা আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ থেকে নেয়া হয়নি (শুধুমাত্র কতিপয় অংশ ব্যতিত)। যেকোনো মুসলিম যারা আল্লাহ ও রাসূল (সা)-কে বিশ্বাস করে তাদের পক্ষে এই ব্যবস্থায় কোনরূপ সাহায্য বা অংশগ্রহণ কিংবা শাসনব্যবস্থায় কোনো ভূমিকা রাখা সম্পূর্নরূপে হারাম। বরং প্রতিটি মুসলিমের উচিৎ সবোর্চ্চ গতি ও অধ্যবসায় এর সাথে এই কুফর ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসা এবং এর পরিবর্তে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
“আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী শাসন করেনা, তারাই কাফের“। [সূরা মায়েদা: ৪৪]
বর্তমান শাসকগোষ্ঠী মুনকারের ধারক ও বাহক এবং সুরক্ষাকারী, শুধু তাই নয়, তারাই হচ্ছে মুনকার প্রধান। অথচ রাসূল (সা) মুসলিমদের আদেশ দিয়েছেন,
مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ وَذَلِكَ أَضْعَفُ الإِيمَانِ
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুনকার (খারাপ বা হারাম কাজ হতে) দেখো, তবে তা হাত দিয়ে পরিবর্তন করো, যদি তোমরা তাতে সক্ষম না হও, তবে মুখের দ্বারা (পরিবর্তন করো), যদি তা না পার, তবে অন্তরের মাধ্যমে (পরিবর্তন কর) এবং এটাই সবচেয়ে দূর্বলতম ঈমান।”
অতএব হে মুসলিম, আপনাদের প্রতি আহ্বান, শুধু সাহায্য বা অংশগ্রহন থেকে বিরত থেকে নয় বরং এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন করুন। প্রত্যেক মুসলিমেরই এই কুফর ও মুনকারের প্রতি হৃদয়ের মাধ্যমে ঘৃণা পোষন করা উচিত এবং এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আল্লাহ কে বলা উচিত; হে আল্লাহ, আমাদের উপর চেপে বসা এই মুনকারটিতে আমরা সন্তুষ্ট নই। পাশাপাশি প্রত্যেক মুসলিমের মুখ দিয়ে পরিবর্তন করা উচিত, তার পরিবার, আত্নীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীর মধ্যে দাওয়া করে তা সম্ভব। আর যারা এই শাসনব্যবস্থায় থেকে সন্তুষ্ট থাকে,এর শাসকদের প্রশংসা করে ও সাহায্য করে, সে কিঞ্চিত পরিমান ঈমানও তার অন্তরে লালন করে না। সাবধান! হে মুসলিমগন, এই বিষয়টিকে ছোট করে দেখবেন না, কেননা এই ব্যাপারটিতে জড়িয়ে আছে ঈমান এবং কুফর।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন মুসলিম যে আল্লাহ কে ভয় করে তার পক্ষে কি এই কুফর শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া জায়েজ হবে? এর উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, জায়েজ হবে শুধুমাত্র তখনই, যখন সেই প্রার্থী প্রকাশ্যে ঘোষনা দিবে যে,
– সে এই ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না,
– সে নির্বাচিত হোক বা না হোক, এই ব্যবস্থায় কোনরূপ অংশগ্রহণ বা সহবস্থান করবে না,
– সে এই ব্যবস্থায় বিশ্বাসী কোন প্রার্থীকে কোনোরূপ সাহায্য প্রদান করবে না, তা হোক ব্যক্তিগতভাবে বা নির্বাচনী তালিকার অংশ হিসেবে,
– এবং সে প্রকাশ্যে আরও ঘোষনা দিবে যে তার এই নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য হল পার্লামেন্ট বা সংসদ কে ব্যবহার করে হকের কথা প্রচার করা এবং তাগুতকে উৎখাতের জন্য মুসলিমদের আহ্বান করা।
কোন প্রার্থীর জন্য এতটুকুই যথেষ্ট হবে না যে সে মনে মনে এই ধারনা পোষন করে অথচ শর্তসমুহ গোপন করে। বরং শরীয়া বাধ্যতামুলক করে দিয়েছে যে সে প্রকাশ্যে ঘোষনা দিবে। কেননা, যেকোনো ব্যক্তিই সন্দেহযুক্ত ও দোষী সাব্যস্ত হতে পারে, যখনি সে এই শাসনব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রার্থীতার ঘোষনা দেয়। তাই সে যদি নিজেকে সন্দেহযুক্ত অবস্থায় রেখে দেয় সে গুনাহগার হবে। এই অবস্থায় যে কোন মুসলিমের পক্ষে হারাম হবে উক্ত প্রার্থীকে নির্বাচন করা, সাহায্য করা অথবা সাধুবাদ জানানো যদি সে জয়লাভ করে।
একজন সংসদ সদস্যের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইন প্রণয়ন (legislation), মন্ত্রীসভার আস্থা ভোট (vote of confidence in cabinets), চুক্তির অনুমোদন (ratification of treaties), প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন (election of a republic’s president) এবং শাসকবর্গ ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহি করা। সুতরাং, শুধুমাত্র শেষের কাজটিই একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে করা হালাল হবে, অন্যসকল কাজকর্ম হারাম। কেননা, আইন কুরআন ও সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোন উৎস থেকে হতে পারে না। সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অর্থাৎ তিনিই আইন প্রনয়নকারী। আল্লাহ যা হালাল করেছেন তার বাইরে কিছুই হালাল নয় এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন এর বাইরে কিছুই হারাম নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,
اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ
“তারা তাদের যাজক ও দরবেশদের আল্লাহর পরিবর্তে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে“। [তওবা: ৩১]
রাসূল (সা) এই আয়াতটি তেলাওয়াত করেছিলেন যখন আদী ইবনে হাতীম আত তা’ঈ (রা) ক্রুশ পরিহিত অবস্থায় এসেছিলেন। আদী বলেছিলেন তারা তাদের (র্যাবাই ও যাজক) উপাসনা করেন না। রাসূল (সা) বলেছিলেন,
أَجَلْ وَلَكِنْ يُحِلُّونَ لَهُمْ مَا حَرَّمَ اللَّهُ فَيَسْتَحِلُّونَهُ وَيُحَرِّمُونَ عَلَيْهِمْ مَا أَحَلَّ اللَّهُ فَيُحَرِّمُونَهُ فَتِلْكَ عِبَادَتُهُمْ لَهُمْ
“হ্যা, (অনুসারীরা করে), তারা (দরবেশ ও যাজকশ্রেনী) হালাল কে হারাম এবং হারাম কে হালাল বানিয়েছে এবং অনুসারীরা তা অনুসরন করেছে। আর এটাই হচ্ছে তাদের ইবাদত।”
এরপর আদী মুসলিম হয়ে গেলেন। তাই যারা আইন প্রনয়ন করে, হালাল ও হারাম ঘোষনা করে আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত, তারা আসলে আল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং নিজেদেরকে ইলাহে পরিনত করে আর যারা এই ব্যাপারে তার সহযোগী হয় তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাকেই ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছে।
তাই হে মুসলিম, জেগে উঠুন। যে সংসদ সদস্য কুফর রীতিতে মন্ত্রীসভার উপর আস্থা প্রদান করে, কুফর আইনের ভিত্তিতে চুক্তির অনুমোদন করে অথবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করে যে কুফর দ্বারা শাসন করে, তবে সেই প্রার্থী ও তাদের সাথে সমপরিমান অপরাধে অংশগ্রহন করে। আর সেই মুসলিম ব্যক্তি যে সংসদ সদস্যকে এই পর্যায়ে যেতে সাহায্য করে, সেও একই অপরাধে সামিল।
একজন মুসলিম সে সংসদ সদস্য হোক বা না হোক তার প্রধান উদ্বেগ হওয়া উচিত উম্মাহর অনিবার্য লক্ষ্য (vital cause)। আর তা হলো উম্মাহকে ‘পশ্চিমা মুর্তিপুজার থাবা’ (ভিত্তিহীন পশ্চিমা সংস্কৃতি) হতে রক্ষা করা এবং খিলাফত পুনপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের আলোর দিকে দিকনির্দেশনা দেওয়া। এর পরিবর্তে বর্তমান যুগের সংসদ সদস্যদের আমরা দেখি রাস্তা তৈরী করতে এবং নির্বাচকমন্ডলীর কার্যক্রমের অনুমোদন দিতে, যদিও একজন সংসদ সদস্যের পক্ষে বিচারবিভাগ বা অন্য যেকোনো শাসন বিভাগে অংশগ্রহণ একটি ‘ফাহিশা’ বা সীমালঙ্ঘন। জর্ডানের সংসদ সদস্যদের একটি ব্লগ (Islamic Action Front) একবার সংসদ প্রত্যাহারে দাবি জানিয়েছিল যদি সরকার রুটির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করে। আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই, তারা তখন কেন প্রত্যাহার করল না যখন জর্ডান সরকার শত্রুর সাথে শান্তিচুক্তি করে, তা কেন তারা প্রত্যাহার করল না যদিও তারা নাকি বিশ্বাস করে এই ব্যবস্থাটি কুফর? নাকি রুটির দাম এর চেয়ে বেশী জরুরী? সরকার কি তাদের প্রত্যাহার বা নমনীয়তার পরোয়া করে? তাই যেইসব প্রার্থী যেকোনো উপায়ে একটি সংসদীয় আসনের জন্য লড়াই করে নিজেদের অপমানিত করে, তাদের শিক্ষা নেয়া উচিত বর্তমান সংসদ সদস্যদের দেখে, তারা দেখবে যে এই সংসদ সদস্যদের অবস্থান আসলেই অর্থহীন। তারা দেখবে যে, যেটাকে তারা চতুরতা ও বাস্তবতার যাচাই মনে করেছিল সেটি আসলে একটি মরিচীকা ও পরিষ্কাররূপে দূরদর্শিতার অভাব। এটি আসলে শাসকগোষ্ঠীর দাসত্ববরণ এবং ইসলাম ও নিজের উপর অত্যাচার। আর এই কারণেই এই সংসদ সদস্যরা যারা ইসলামকে নীতি-নির্ধারনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিষ্ঠায় আসন গ্রহণ করেছিল, তারা যখন ব্যর্থ হয় তখন জনগন মনে করে যে, শুধুমাত্র ব্যক্তি নয়; ইসলামই ব্যর্থ হয়েছে।
কিছু প্রার্থী তাদের কার্যক্রম কে জায়েজ করার জন্য এই ফতোয়া দেয় যে, ‘দুটি মন্দের মধ্যে ভালটি’। ইহুদিদের নির্বাচনে আরবরা পেরেস-কে নেতানিয়াহুর বিপরীতে এই গন্য করে সমর্থন করেছিল যে পেরেস ও নেতানিয়াহু উভয়ে মন্দ, তবে পেরেস তুলনামুলক কম মন্দ। তাই আরবদের জন্য পেরেস কে নির্বাচিত করা বাধ্যতামুলক হয়ে গিয়েছিল। একইভাবে, রাশিয়ার নির্বাচনে ইয়েলস্টিন ও কমিউনিস্ট ইওগানভ (Zyuganov) উভয়ই মন্দ ছিল কিন্ত ইয়েলস্টিনকে কম মন্দ গন্য করায় মুসলিমদের জন্য তাকে সমর্থন করা বাধ্যতামুলক হয়ে গিয়েছিল, অর্থাৎ তাদের মতে, ক যদি নির্বাচিত হয় তা মন্দ হবে এবং খ যদি নির্বাচিত হয় তবে তাও মন্দ হবে। কিন্ত, যেহেতু ক তুলনামুলক কম মন্দ তাই ক- কে নির্বাচিত করা বাধ্যতামুলক। এটি কোনো ফিকহ নয় বা কোনো ইজতিহাদও নয়। এই আইনি ভিত্তিটি (the legal basis) এখানে প্রযোজ্য হবে না। উদাহরনস্বরুপ, কেন পেরেসের মুনকার নেতানিয়াহুর মুনকার হতে কম হবে? কে বলল যে ক; খ থেকে কম মন্দ। প্রকৃতপক্ষে এগুলো হলো শুধুমাত্র খেয়াল-খুশি। শরীয়ার ভিত্তি সেখানেই প্রযোজ্য হবে যেখানে শরীয়া দলীল দিয়ে নির্ধারন করে, দুই মন্দের মধ্যে তুলনামুলক কম কোনটি এবং যেখানে এই দুই মন্দ ব্যতীত (তৃতীয়) উপায় থাকে না। Election বা নির্বাচনে অবশ্যই অন্য উপায় বিদ্যমান প্রার্থীর পক্ষে, তা হল প্রাথীতার অনুবন্ধ থেকে শেষ পর্যন্ত শরীয়ার আদেশ মান্য করা, যেটা কার্যকর ও সম্ভব। তাই ‘দুটির মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম মন্দ’ এই শরীয়া ভিত্তির দোহাই দেয়া এই ক্ষেত্রে অকার্যকর। প্রকৃতপক্ষে একজন মুসলমানের পক্ষে সবচেয়ে উত্তম পথ খোলা রয়েছে আর তা হলো নির্বাচনে অংশগ্রহন না করা এবং মন্দের রসাতলে তলিয়ে না যাওয়া।
এটি সত্য নয় যে একজন মুসলিম (হোক সেটি মুল বিষয় বা সামান্য বিষয়) সংসদ ব্যতীত কাজ করতে পারে না। এটিও সত্য নয় যে সংসদের মাধ্যমেই সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া যায়। প্রকৃতপক্ষে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সংসদে অংশগ্রহন একটি মিথ্যা সাক্ষ্য, কাযক্রমে নিস্ক্রিয়তাদানকারী এবং উম্মাহর চেপে রাখা ক্ষোভের বিস্রাবন, বিশেষ করে প্রার্থীরা যখন আল্লাহকে ভয় করে (জনগনের ভাষ্যমতে)। প্রকৃত আল্লাহভীরু ব্যক্তির পক্ষে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে এ থেকে বিরত থাকা নতুবা সে জনগণকে ধোঁকা দেওয়ার সরঞ্জামে পরিনত হবে।
কয়েক বছর আগে (১৯৯০ সালে) আমরা দেখেছি আলজেরীয়ায় ‘ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট’ নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বীনকে বাস্তবায়নে এগিয়ে যেতে পারে নি। বরং তাদেরকে কারাগারে যেতে হয়েছিল কেননা কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার মূল অধিকারিরা কখনোই শত্রুর কাছে ক্ষমতার হস্তান্তর করবে না। তুরস্কতে আমরা দেখেছি Refah Party কে মন্ত্রীসভায় সুযোগ দেয়া হয়নি যতক্ষন না তারা ক্ষমতার দালালদের কাছে অঙ্গীকার করে ও নিশ্চয়তা দেয় যে, সেকুলারিজম ব্যাতীত অন্য কিছু বাস্তবায়ন করবে না এবং ঠিক তাই করবে যা কর্তৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিবর্গ চায়। সুতরাং সমাধান সংসদের মধ্য থেকে নয় বরং শক্তিশালী পক্ষের সাহায্য নিয়ে কর্তৃত্ব গ্রহনের মধ্যেই নিহিত।
কতিপয় মুসলিমদের মধ্যে ইসলামের বিজয়ের ব্যাপারে হতাশা কাজ করে। আর এই হতাশা তাদেরকে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহনে বাধ্য করে। এখন সময় হয়েছে এই হতাশা ঝেড়ে ফেলার, এখন সময় হয়েছে সেইসব পশ্চিমা মতবাদ ও রীতিকে ধ্বংস করার যা আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকে আমাদের কে স্বার্থবাদী করে শুধুমাত্র লাভের পিছনে ছুটতে বাধ্য করছে। এখন সময় হয়েছে খিলাফত বাস্তবায়ন করার, শরীয়া বাস্তবায়ন করার এবং কুফর ব্যবস্থার অধীনে কুফর নির্বাচনের পরিবর্তে ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে শুরা সদস্য নির্বাচন করার।
يُرِيدُونَ أَنْ يُطْفِئُوا نُورَ اللَّهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَيَأْبَى اللَّهُ إِلَّا أَنْ يُتِمَّ نُورَهُ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
“তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর আলোকে নির্বাপিত করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ (এ ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, এ ব্যতিত যে তিনি অবশ্যই তাঁর আলোকে পরিপূর্ণ করবেন, যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে“। [তওবা:৩৩]
মূল: একটি আরবী লিফলেটের অনুবাদ (ইংরেজী থেকে অনুবাদকৃত)
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কি অস্ত্র ধরতে হবে?

যদিও মুসলিমরা ১৯২৪ সালে তাদের রাষ্ট্র হারিয়েছিল তাদের হৃদয়ে তাদের দ্বীনের প্রতি ভালোবাসা টিকে ছিল ঠিকই এবং এর দ্বারা বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল খিলাফতের পুনঃআগমনের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এইসব আন্দোলনগুলো খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কথা বলে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই মহান দায়িত্ব পালনের জন্য জিহাদকেই একমাত্র পথ দাবি করে। যারা এই পদ্ধতি অনুসরণ করেন তাদের আন্তরিকতা ও ত্যাগ সন্দেহের উর্ধ্বে। বর্তমানে যেহেতু অধিক থেকে অধিকতর মানুষের এই দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এই দায়িত্ব পালন করতে তারা সঠিক পদ্ধতির খোঁজ করছেন। তাই এই সকল পদ্ধতি কুরআন ও সূন্নাহ’র আলোকে মূল্যায়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সুতরাং এই প্রবন্ধে আমি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় “জিহাদ” এই বিষয়ে আলোচনা করব।
যারা মুসলিম ভূমির বর্তমান শাসকদের অস্ত্রের মাধ্যমে সরানোর কথা বলেন তারা এইসব দেশের শাসকদের কাফির হিসেবে গণ্য করেন। কারণ তাঁরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার আইন অনুসারে শাসন করে না। তাঁরা প্রমাণ হিসেবে কুর’আনের নিচের আয়াতটি উল্লেখ করেন,
“এবং যারা আল্লাহর যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে বিচার ফয়সালা করেনা তারা কাফের” (আল মায়িদা-৪৪)
অতঃপর তাঁরা এই শাসকদের মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) অ্যাখ্যা দেয় এবং বলেন যে মুসলিমদের অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হবে কারণ রাসূল (সা) একটি হাদীসে বলেছেন “যে ধর্ম ত্যাগ করে তাকে হত্যা কর যতক্ষন না সে প্রায়শ্চিত্ত করে”। এছাড়াও তারা একটি হাদীস বলেন যা মুসলিমদের আদেশ করে তাদের শাসকদের সাথে জিহাদ করতে যখন তাদের মধ্যে প্রকাশ্য কুফরি দেখা যায়। বুখারিতে বর্ণিত জুনাদা বিন আবি উমাইয়া এর বরাতে, তিনি বলেন, “আমরা উবাদাহ ইবনুস সামিত এর কাছে গেলাম যখন তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং আমরা বললাম আল্লাহ আপনাকে হিদায়াহ দান করুন। আপনি আমাদেরকে রাসূল (সা) এর একটি হাদীস বলুন যার মাধ্যমে আল্লাহ আপনাকে উপকৃত করবেন। তিনি বলেন, “একদা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের সকলের কাছ থেকে বা’ইয়াহ (শপথ) নিলেন যে যাতে আমরা সুখে দুঃখে তার কথা শুনি এবং মানি, সহজ, কঠিন এবং খারাপ অবস্থাতেও যাতে তাঁর আনুগত্য করি। আমরা আরো শপথ করেছি যে আমরা কখনো শাসকদের সাথে বিবাদে যাবনা যতক্ষন পর্যন্ত না তাদের মাঝে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হচ্ছে, আমাদের কাছে যা আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত।
অন্য একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের সর্বোত্তম নেতা (ইমাম) আমীর হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ভালবাস এবং তারাও তোমাদের ভালবাসে, যারা তোমাদের জন্য দোয়া করে এবং তোমরা তাদের জন্য দোয়া কর। আর তোমাদের সবচেয়ে মন্দ/খারাপ নেতা হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ঘৃণা কর এবং তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। যাদেরকে তোমরা বদ-দোয়া কর এবং তারাও তোমাদের জন্য বদ-দোয়া করে। তাকে (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল,“হে আল্লাহর রাসূল (সা) আমরা কি তাদের তরবারী দ্বারা অপসারণ করবনা?” তিনি বলেন, “ না, যতক্ষন না তারা তোমাদের মাঝে সালাত প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং যদি তোমরা তাদেরকে এমন কাজ করতে দেখ যা তোমরা ঘৃণা কর তাহলে তার কাজকে ঘৃণা করিও এবং তার কাছ থেকে আনুগত্যের হাত সরিয়ে নিওনা ”(সহীহ মুসলিম)। উপরের হাদীসটি এটাই অর্থ করে যে,ঐ শাসক যে প্রকাশ্য কুফরি করে এবং আল্লাহ ব্যাতিত অন্য আইনে শাসন করে তার সাথে অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে এবং তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তার মানে কি আমরা বর্তমানে শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব? কারণ তারা শরীয়াহ দ্বারা শাসন করছেনা।
প্রথমত, আমরা ঐ দাবী টা দেখি যে বর্তমান শাসকরা মুর্তাদ হয়ে গেছে কারণ তারা আল্লাহর আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করছেনা । ইবনুল কাইয়্যিম এই ব্যাপারে যে সঠিক মতটি দিয়েছেন তা হল:
“সঠিক মত হল যে, আল্লাহ প্রদত্ত আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে শাসন করা বড় এবং ছোট উভয় কুফরীর অন্তর্ভূক্ত, এটা নির্ভর করে যে বিচার করে তার অবস্থানের উপর। যখন সে মনে করে যে ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দ্বারা বিচার করা বাধ্যতামূলক’ কিন্তু সে এই পথ থেকে অবাধ্যতার দরুন সরে যায় এবং এটা স্বীকার করে যে এই জন্য তাকে শাস্তি পেতে হবে তাহলে এটি হবে ছোট কুফর। কিন্তু সে যদি মনে করে যে ‘এটা বাধ্যতামূলক না’ এবং পছন্দের মালিক সে নিজে, যদিও সে নিশ্চিত যে এটাই আল্লাহর আইন তাহলে এটি বড় কুফর” (মাদারীজ আস সালিকীন, ১/৩৩৬-৩৩৭)
আমরা ইবনুল কাইয়্যিম এর মতের সাথে আরো যোগ করতে পারি যে, যখন আমরা সূরা মায়িদার ঐ পরিচ্ছেদ পড়ি যেখানে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো আইন দ্বারা শাসনের কথা বলা হচ্ছে, আমরা দেখি যে যারা তাঁর আইন অনুসারে বিচার ফায়সালা করেনা তাদের তিনি কাফির, জালিম ও ফাসিক বলেছেন। তাই যদি একজন শাসক কুফর দ্বারা শাসন করে দূর্নীতির কারণে অথবা বিরোধীদলের ভয়ে অন্যায় করে যদিও স্বীকার করে যে তার এই কাজ গুনাহ এবং ঘৃণা/নিন্দাযোগ্য তবে সে হবে ফাসিক, জালিম বা কাফির নয়। অন্যদিকে সে যদি কুফর দ্বারা শাসন করে এবং এটা বিশ্বাস করে যে আল্লাহর আইন দ্বারা শাসন করা বাধ্যতামূলক নয় অথবা কুফরী আইন আ-ল্লাহর আইনের চেয়ে ভালো তবে সে নিজেকে ইসলামের বন্ধন থেকে ছিড়ে ফেলল এবং সে মুরতাদ হয়ে গেল। পরের ভাগটিকে প্রমাণ বা প্রতিষ্ঠা করতে আমাদের কাছে স্পষ্ট যে হাদীস আছে তা হল,
“যতক্ষন আমরা স্পষ্ট কুফর দেখতে পাব যার পক্ষে আমাদের কাছে আল্লাহ কর্তৃক দলীল আছে”
তাছাড়া কাউকে কাফির তকমা লাগিয়ে দেওয়া (কোন প্রকাশ্য দলীল ছাড়া) ইসলামে জায়েজ নেই। এছাড়াও তারা যদি কাফির হয়ে থাকে আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত যে ‘উম্মাহর মধ্যে থেকে কিছু মানুষ অথবা গোষ্ঠী বা দল কি খলীফা বা ইমামের অনুপস্থিতিতে এবং তার অনুমতি ছাড়া মুরতাদের শাস্তি প্রয়োগ করতে পারে? আমরা জানি যে, মুরতাদের শাস্তি সহ অন্য সব হুদুদ বাস্তবায়ন করা ইমামের একচ্ছত্র দায়িত্ব। যদিনা অন্য কোথাও বিশেষভাবে এর বর্ণনা থাকে। রাসূল (সা) এর নিচের হাদীসটি এই ব্যাপারটি পরিস্কার করে,
“ইমামের অনুপস্থিতিতে (রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ব্যতিত) কারো অধিকার নেই হুদুদ বাস্তবায়ন করা”। (বায়হাকী কর্তৃক তাঁর সুনানে বর্ণিত)
ইমাম তাহাবীও মুসলিম ইবন ইয়াসার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সাঃ) বলেন, “যাকাত (সংগ্রহ), হুদুদ (বাস্তবায়ন), গনীমত (যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি (বন্টন), জুমা (ইমামতি), এগুলো হল ইমাম (সুলতান) আমীরের”।
দ্বিতীয়ত, আমাদেরকে যে সব শাসক প্রকাশ্যে কুফর করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যে হাদীসে আদেশ করা হয়েছে তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুঝা উচিত। আমরা যদি একটু সচেতনভাবে ঐ হাদীসটির দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে এখানে ঐ শাসকের কথা বলা হয়েছে যারা জনগনের বৈধ বা’ইয়াহ নিয়ে এসেছে এবং তারা ইসলাম অনুসারে শাসন করত কিন্তু পরবর্তীতে কুফর দ্বারা শাসন করতে থাকে। তার মানে হচ্ছে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে খলীফার সাথে যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত থাকবে কিন্তু খলীফা পরিস্কার কুফর করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট এই হাদীসের প্রেক্ষাপট থেকে ভিন্ন। বর্তমানে আমরা এমন একটা সময়ের মধ্যে আছি যেখানে খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তা কুফর শাসন দ্বারা পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বর্তমান শাসকেরা কখনোই জনগন থেকে শর’ঈ বা’ইয়াহ নেয়নি। তাদের কেউই মোটেও ইসলামকে বাস্তবায়ন করেনি। এমনকি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ইসলামকে বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টাও করেনি। তাই বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুই বিপদগামী শাসককে প্রতিস্থাপন করার চাইতেও অনেক বড়। বরং এটি হচ্ছে সমস্ত কুফর ব্যবস্থা যা মুসলিম ভূমিগুলোতে আরোপিত আছে তাকে সমূলে উৎপাটন করা এবং খিলাফাহ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এইসব আন্দোলনগুলো যেগুলো ইসলামী খিলাফাহ কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে জিহাদের পক্ষালম্বন করে তারা তাদের পদ্ধতিকে ঠিক প্রতিয়মান করতে শরীয়ার একটি মূলনীতি বলে থাকে যা হল-
“কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”।
কিন্তু এটি নিতান্তই ভ্রান্ত যে, কোন সাধারণ মূলনীতি দিয়ে কোন একটি বিশেষ ইস্যুর নির্দিষ্ট মত (হুকুম) দেয়া এবং এই ইস্যুকে নিয়ে অন্যান্য যা বিশেষ টেক্সট আছে তাকে বাদ দেওয়া অথবা কোন বিশেষ টেক্সট না থাকলে ইসলামের অন্যান্য মূলনীতিকে গ্রাহ্য না করা। ড. হেকাল যিনি আমাদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে একটি থিসীস করেছিলেন। তিনি শুধুমাত্র একটি ইস্যুতে এই পদ্ধতিতে পরস্পর বিরোধী উপসংহারে আসে তা বিবৃত করেছেন। উদাহরণস্বরূপ এই ইস্যু যা হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ‘অস্ত্রের ব্যবহার’। এটা অনেকে বলতে পারে যে, মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ কারণ এটা রাসূল (সা) এর হাদীস থেকে প্রমাণিত “যে আমাদের (মুসলিমদের) দিকে অস্ত্র উত্তোলন করে সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়”। কিন্তু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরয এবং এটি প্রতিষ্ঠা কখনোও সম্ভব নয় অস্ত্র ছাড়া যা ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। এখানে একই ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয়ই বিষয় চলে আসছে এবং ইসলামের একটি মূলনীতি হল “যখন কোনো একটি ইস্যুতে বৈধ-অবৈধ উভয় বিষয় চলে আসে তবে অবৈধতা বৈধতাকে অগ্রাহ্য করবে। তার মানে তখন একজনকে অবশ্যই অবৈধতার হুকুম অনুসারে কাজ করতে হবে এবং তখন অস্ত্র ব্যবহার অবৈধ হবে”। এছাড়া কিছু মানুষ বলতে পারে যে আল্লাহর আইন প্রয়োগের জন্য এই ফরয পালন/বাস্তবায়ন একটি সওয়াবের কাজ এবং যা নিষিদ্ধ তা করা মানে উম্মাহর রক্ত প্রবাহিত করা গুনাহ/ফাসিকি। ইসলামী শরীয়াহ বলে যে “ফাসিকি বা গুনাহকে বাধা দেয়া/ দমন করা আমাদের সওয়াব অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। “যে কাজ ফরয তা করতে যা করার দরকার হয় তাও ফরয” এটি তখনই নেয়া যাবে যখন এই ইস্যুতে কোন পার্থক্য থাকবেনা যে এটি অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এটি বৈধ কোনো মাধ্যম ছাড়া অর্জন করা যাবেনা। তখনই কেবল বলা যায় যে “কোন ফরয কাজের জন্য যা করতে হয় তাও ফরয”। তার মানে কোন বৈধ কাজ যা কোন ফরয কাজ করার মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয় তখন ঐ কাজটি ফরয হয়ে যায়। কিন্তু যখনই এই ফরয কাজটি এমন কোন কাজ ছাড়া করা সম্ভব নয় যা নিজ থেকেই নিষিদ্ধ যেমনটা আমরা এই প্রবন্ধে যা নিয়ে আলোচনা করছি অস্ত্রের ব্যবহার সম্বন্ধে- অমারা কি এখন এই ফরযটি পালন করতে এই কাজটি করতে পারি শরীয়ার এই মূলনীতিকে বাদ দিয়ে? আল্লাহর শপথ না! যতক্ষন পর্যন্ত এই কাজটি অন্য আরেকটি মূলনীতি“ প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ/ অবৈধকে বৈধ করে” এর দ্বারা আচ্ছন্ন হয়। হ্যাঁ, তবে যদি এই সম্বন্ধে তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অস্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে কোন বিশেষ টেক্সট বা দলিল থেকে থাকে এবং যা অস্ত্র ব্যবহারের সাধারণ মূলনীতিতে এই বিষয়কে অন্তর্ভূক্ত করা থেকে বিরত রাখে তাহলে এই দলীলটি হবে ব্যাতিক্রম এবং এটি “যা ফরয তা পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয” এই মূলনীতিতে পড়ে না। সংক্ষেপে শুধুমাত্র ‘ফরয পালন করতে যা করতে হয় তাও ফরয’ এই মূলনীতিকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করে এবং অন্যান্য যে নির্দিষ্ট দলীলগুলো আছে তা অগ্রাহ্য করে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধকেই একমাত্র পন্থা হিসেবে বেছে নেওয়াকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। এছাড়াও যারা মুসলিম ভূমিতে সশস্ত্র যুদ্ধের কথা বলে তারা আরেকটি যুক্তি দেয় যে, মুসলিম ভূমিগুলো আজ দখলকৃত এবং জিহাদ এখন ফারদুল আইন হয়ে গেছে। সেজন্য প্রত্যেক মুসলিমকেই এই দখলকৃত ভূখন্ডগুলোকে মুক্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যুদ্ধ করতে হবে। এই যুক্তি জিহাদের বাধ্যবাধকতা ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা এক করে ফেলে যেখানে এই দুটি পুরোপুরি ভিন্ন কর্তব্য এবং সেগুলো সম্পাদনের কর্মপদ্ধতিও ভিন্ন। জিহাদ প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরযে আইন হয়ে যায় যখন মুসলিমদের ভূমি দখল হয়ে যায় এবং ঐ ভূমির প্রত্যেক মুসলিমকেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা থাক বা না থাক রাষ্ট্রকে মুক্ত করতে জিহাদ করতে হয়। কিন্তু অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা না থাকলে তা প্রতিষ্ঠা করা ফরয হয় যদিও রাষ্ট্রটি বাইরের শত্রু“ দ্বারা দখলকৃত থাক বা না থাক। অনেকে আবার অনেক দূরে এগিয়ে বলে বর্তমানে প্রত্যেক মুসলিম ভূমি দখলকৃত কারণ এদের শাসকেরা উম্মাহর শত্রু“। তাই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এই উম্মাহর শত্রু“দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ভূমি মুক্ত করা আবশ্যক। তাদের এই ধারণাটি দখলের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভূল। একটি ভূমি তখনই দখল হয়ে যায় যখন তা কোন অমুসলিম বাহ্যিক শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং মুসলিমদের কাছ থেকে সব ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে ফিলিস্তিন, আফগানিস্থান ও ইরাকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। শুধুমাত্র সে ক্ষেত্রে জিহাদ করা প্রত্যেকের উপর ফরয হয়ে যায়। তাই বর্তমানে যেহেতু কোন মুসলিম দেশের শাসকেরা ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করছেনা তাই সব মুসলিম দেশই দখলকৃত এটা বলা ভূল কারণ ঐসব ভূমির কর্তৃত্ব এখনও মুসলিমদের হাতে যারা তাকে বাইরের শত্রু“র আক্রমন থেকে রক্ষা করে। তাই এই অবস্থা একমাত্র কার্যকর হবে যখন বিদেশী সেনারা ঐ ভূমি দখল করবে। যখন মুহাম্মদ (সা) মক্কায় দাওয়াহ করছিলেন তখন আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা) অন্যান্য কিছু সাহাবাদের সাথে এসে আল্লাহর রাসূল (সা) থেকে যুদ্ধের অনুমতি চেয়েছিলেন। কিন্তু রাসূল এই বলে নিষেধ করেন যে,
“প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, তাই মানুষের সাথে যুদ্ধ করিওনা” (ইবনে আবি হাতিম এবং আন নাসাই ও আল হাকিম কর্তৃক বর্ণিত)।
সুতরাং আমরা মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যুদ্ধের জন্য আদিষ্ট হইনি। বরং আমাদেরকে রাসূল (সা) মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে যেসব কাজগুলো করেছেন তাই অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) এর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বের দাওয়াহ কে আমরা তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। প্রথম পর্যায় হচ্ছে গোপনে একটি নির্দিষ্ট গ্রুপ তথা সাহাবাদেরকে (রা) ইসলামী চিন্তা-ধারণা এবং আবেগ দ্বারা পরিচালিত করা এবং তাঁদেরকে ইসলামের বার্তা ছড়ানোর জন্য প্রস্তুত করা।
দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল তখন থেকে যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা রাসূল (সা) কে প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ দেন। এটি হচ্ছে তখন যখন রাসূল (সা) প্রকাশ্যে কুরাইশদের জীবন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তাদের সর্দারদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। এই পর্যায়টি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের। শেষ পর্যায়ে মুহাম্মদ (সা) বিভিন্ন আরব গোত্রের কাছে যান সামরিক সহযোগিতা (নুসরাহ) এর সন্ধানে যতক্ষন পর্যন্ত না মদীনার “আওস ও খাজরাজ” সমর্থন দিতে শপথ করে। (বিস্তারিত জানতে নবী (সা) এর দ্বীন কায়েমের পদ্ধতি দেখুন)।
পরিশেষে, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র জিহাদ বা যুদ্ধের কোনো দলীল প্রমাণিত হল না। বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিহাদকে আল্লাহর রাসূল (সা) বিশেষভাবে নিষেধ করেছেন। তার পরিবর্তে রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট পথ আমাদেরকে দেখিয়েছেন এবং আমাদের কঠোরভাবে এই পদ্ধতির সাথে জড়িয়ে থাকতে হবে ও লক্ষ্য রাখতে হবে যেহেতু এটি একটি শরয়ী বাধ্যবাধকতা তাই যেন এই পথ থেকে আমরা বিন্দুমাত্র ও সরে না যাই।
মূল: শফিউল হক
তথ্যসূত্র:
আল জিহাদ ওয়াল কিতাল ফি আস-সিয়াসা আস শারীয়া > ড. মুহাম্মদ খায়ের হেকাল।Posted by Visionary























