Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • আর বান্দাদের মধ্যে আলেমগণই আল্লাহকে বেশি ভয় করে..

    আর বান্দাদের মধ্যে আলেমগণই আল্লাহকে বেশি ভয় করে..

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
    নিশ্চয়ই তাঁর বান্দাদের আলেমগণই আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালি ও ক্ষমাশীল“।
    [আল-ফাতির: ২৮]

    এ আয়াতের ব্যাপারে ইবন কাছীর বলেন,
    (كلما كانت المعرفة به أتمّ والعلم به أكمل، كانت الخشية له أعظم وأكثر)
    “আল্লাহ ও তাঁর ক্ষমতার ব্যাপারে জ্ঞান যত বেশি পূর্ণ হবে তত বেশি তাকে বেশি ভয় করবে তারা যারা এই পুর্নাঙ্গ জ্ঞান ধারণ করে”।

    ইমাম কুরতুবি বলেন,
    (فَمَنْ عَلِمَ أَنَّهُ عَزَّ وَجَلَّ قَدِيرٌ أَيْقَنَ بِمُعَاقَبَتِهِ عَلَى الْمَعْصِيَةِ)
    “আলেম তারাই যারা আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপার জ্ঞান রাখেন। তারা আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে কোনো সন্দেহের মধ্যে নেই (তা বান্দার অপরাধ যা-ই হোক না কেন)”।

    আলী ইবন আবি তালহা ইবন আব্বাসের বরাত দিয়ে বলেন,

    (الَّذِينَ عَلِمُوا أَنَّ اللَّهَ على كل شي قَدِيرٌ)
    “আলেমগণ তারাই যারা জানেন যে আল্লাহ যেকোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখেন”।

    আল-রাবি’ বর্ণনা করেন যে ইবন আব্বাস বলেন,
    (مَنْ لَمْ يَخْشَ اللَّهَ تَعَالَى فَلَيْسَ بِعَالِمٍ)
    “যে আল্লাহ (ও তার শাস্তি)-কে ভয় করেনা সে আলেমই নয়”।

    আলী ইবন আবি তালিব (রা) বলেন,

    إِنَّ الْفَقِيهَ حق الفقيه من لم يقنط النَّاسَ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، وَلَمْ يُرَخِّصْ لَهُمْ فِي مَعَاصِي اللَّهِ تَعَالَى، وَلَمْ يُؤَمِّنْهُمْ مِنْ عَذَابِ اللَّهِ، وَلَمْ يَدَعِ الْقُرْآنَ رَغْبَةً عَنْهُ إِلَى غَيْرِهِ، إِنَّهُ لَا خَيْرَ فِي عِبَادَةٍ لَا عِلْمَ فِيهَا، وَلَا عِلْمَ لَا فِقْهَ فِيهِ، وَلَا قِرَاءَةَ لَا تَدَبُّرَ فِيهَا

    সত্যিকারের ফকীহ সে-ই যে কখনো মানুষকে হাল ছেড়ে দিতে দেয় না কিংবা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হতে দেয় না; আল্লাহর অবাধ্যতাকে তুচ্ছ করে দেখেনা; মানুষ আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে- এ ধরনের অনুভুতি দেয় না; বিচার করার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনকে পরিত্যাগ করে না। ইবাদত জ্ঞানভিত্তিক না হলে তা মুল্যহীন, এবং জ্ঞান তার প্রকৃত বুঝ ছাড়া (জেনে রাখা) মুল্যহীন। এবং উপলব্ধি বিহীন তেলাওয়াত এর (প্রকৃতার্থে) কোনো মুল্য নেই”।

    আর আল্লাহ শক্তিশালি.. অর্থাৎ, যিনি শাস্তি দেন ও পুরস্কার প্রদান করেন তাকে ভয় করে চলা উচিত।

    ইসলামি জ্ঞানের পরিমান ব্যাক্তি হতে ব্যাক্তিতে ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী হবেন এবং তারা যাদের জ্ঞান সল্প তাদের শিক্ষা দান করবেন। ইসলামি আইন-কানুনের ব্যাপারে যাদের গভীর জ্ঞান রয়েছে তারাই উলামা হিসেবে পরিচিত। তারা ইসলামে কোনো আধ্যাত্মিক পদে অধিষ্ঠিত নন, তবে তাদের জ্ঞানের আধিক্যের কারণে তাদের অধিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারাই উম্মাহকে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে থাকেন, ইসলামের গুরুত্ব বোঝার ব্যাপারে ও তার ভিত্তিতে জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য উম্মাহর সদস্যদের পথ খুজে পাবার ব্যাপারে তারা সহায়তা করে থাকেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পরিষ্কার করে বলেছেন যে আলেমগণকে তাঁর নাযিলকৃত বিধান মানুষের মাঝে প্রকাশ্যে বর্ণনা করতে হবে।

    وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ

    আর যারা পূর্বে কিতাব পেয়েছিল তাদের হতে আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে তারা মানুষকে তা ব্যাখ্যা করে জানাবে এবং তা গোপন করবে না“। [আলে ইমরান: ১৮৭]

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জ্ঞান লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে সাবধান করেছেন যা তিনি আমাদের আমানতসরূপ দিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

    নিশ্চয় যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাযিল করেছি (তা) মানুষের জন্য কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও; সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাতকারীগণেরও“।
    [বাকারা ২:১৫৯]

    আল্লাহর রাসূল আমাদের আলেমদের সম্মান ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করেছেন যখন তিনি (সা) বলেন,

    (مَنْ يُرِدْ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ)
    যার জন্য আল্লাহ কল্যাণ কামনা করেন তাকে তিনি দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন“। [বুখারি]

    তিনি (সা) বলেন,

    إِنَّ مَثَلَ الْعُلَمَاءِ فِي الْأَرْضِ كَمَثَلِ النُّجُومِ فِي السَّمَاءِ يُهْتَدَى بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ فَإِذَا انْطَمَسَتْ النُّجُومُ أَوْشَكَ أَنْ تَضِلَّ الْهُدَاةُ

    দুনিয়ায় আলেমগণের তুলনা আকাশের তারকারাজির মতো। অন্ধকারে তা দ্বারা জলে ও স্থলে পথপ্রাপ্তি হয়। যদি তারকারাজি অস্ত যায়, তবে (মানুষের) পথপ্রদর্শক (তথা সঠিক পথের দিশা) হারিয়ে ফেলার উপক্রম হবে“। [আহমদ]

    সুতরাং, আল্লাহর রাসূলের এসব হাদীস হতে আমরা বুঝতে পারি যে উম্মাহকে পথ দেখাতে ও দ্বীনের অগ্রগতির জন্য আলেমদের ভুমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে তাদেরকে অত্যন্ত প্রয়োজন যাতে তারা উম্মাহকে পথ দেখাতে পারে যে কিভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কিভাবে উম্মাহকে একটি দেহের মতো ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, কিভাবে বিশ্বমঞ্চের নিয়ন্ত্রন নিতে হবে। আলেমগণকেই যালেম শাসকের বিরুদ্ধে উম্মাহর পক্ষে নেতৃত্ব নিতে হবে, সেসব যালেমদের বিরুদ্ধে যারা শুধুমাত্র কুফর শাসন কায়েম করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং উম্মাহকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট, এবং এজন্য উম্মাহর যেসব সন্তানদের জেলে পুড়ছে, অত্যাচার ও হত্যা করছে যারা ইসলাম অনুযায়ী সমাজে জীবনধারণ করতে চায়। অতীতে ইসলামের আলেমগণ নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা রেখেছেন। তারা সর্বদাই অন্য সকল স্বার্থের বিপরীতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের পক্ষে শক্তিশালি অবস্থান গ্রহণ করেছেন, কখনো কখনো তাদের জীবনবিপন্ন করে হলেও। তারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেননি, তাই ইসলামের ব্যাপারে কোনোরূপ আপোষ ছাড়াই সবসময় সত্য উচ্চারন করেছেন। বিশেষ করে শাসক ও তাদের কার্যাবলীর ব্যাপারে তারা এ কাজ গুরুত্ব সহকারে করেছেন।

    মুহাম্মাদ (সা) বলেন, যে-ই কোনো যালেম শাসককে আল্লাহর হুকুম লংঘন, তাঁর সাথে কৃত চুক্তি ভংগ, সুন্নাহর সাথে দ্বিমত পোষন, পাপকাজ এবং আল্লাহর বান্দাদের সাথে শত্রুতা করতে দেখে, এবং সে সে ব্যাপারে কিছু বলে বা করে না, তবে এটি আল্লাহর দায়িত্ব তাকে সেখানে (জাহান্নামে) পৌছিয়ে দেয়া যেখানে তার থাকার কথা। [তারীখ আত-তাবারি, আল-কামিল লি-ইবন আছীর]

    মুহাম্মাদ (সা) বলেন,

    سَتَكُونُ بَعْدِي أُمَرَاءُ مَنْ صَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ بِوَارِدٍ عَلَيَّ الْحَوْضَ

    “আমার পরে অচিরেই (যালেম) শাসকেরা আসবে যারা (তাদের জনগণকে দুর্দশায় পতিত করবে)। যে-ই তাদের মিথ্যাকে সমর্থন করবে এবং যুলুমে তাদের সাহায্য করবে, সে আমার মধ্য হতে না এবং আমি তার মধ্য হতে নই এবং সে হাউজে কাওসারে আমার কাছে (পানি পান করতে) আসতে পারবে না”। [আহমদ, নাসাঈ, তিরমিজি]

    শাসকদের জবাবদিহী করার ক্ষেত্রে যে আলেমগণ চুপ থাকেননি বরং ইসলামের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন তার কিছু উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো।

    সুফিয়ান আছ-ছাওরী বলেন, “যখন (খলীফা) আবু জা’ফর আল মানসূর হজ করতে আসলে আমাকে ডেকে পাঠান। তার পেয়াদাগণ রাতের বেলা আমার ঘরে এসে খুঁজে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। যখন আমি তার সামনে উপস্থিত হই তখন তিনি আমাকে তার কাছে বসান। তিনি বলেন, কেন আপনি আমাদের কাছে থাকেন না যাতে আমরা আপনার সাথে আমাদের (রাষ্ট্রীয়) কাজের ব্যাপারে পরামর্শ করতে পারি? আপনি যা বলবেন আমরা তা-ই করবো। আমি (সুফিয়ান) বললাম, (كم أنفقت في سفرك هذا؟) আপনি আপনার এ (হজের) সফরে কত অর্থ ব্যয় করেছেন? আল-মানসূর বললেন, (لا أدري، لي أمناء ووكلاء) আমার জানা নেই, (তবে) এ ব্যাপারে আমার (নিযুক্ত) বিশ্বাসযোগ্য সহকারী রয়েছে। আমি বললাম, (فما عذرك غدًا، إذا وقفت بين يدي الله تعالى فسألك عن ذلك؟) কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর সামনে দাড়াবেন তখন আপনার কৈফিয়ত কী হবে, যদি আল্লাহ এ বিষয়ে আপনাকে প্রশ্ন করেন? এরপর তিনি উমর (রা)-এর উদাহরণ টেনে বলেন, উমর (রা) একবার তার খাদেমকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, (كم أنفقت في سفرنا هذا؟) আমাদের (হজের) সফরে কত খরচ করেছো? খাদেম বলেছিলেন, (يا أمير المؤمنين، ثمانية عشر دينارًا) হে আমীরুল মু‘মিনীন, ১৮ দিনার। উমর তাতে বলে উঠলেন, (ويحكم أجحفنا ببيت مال المسلمين) দুর্ভোগ তোমাদের! আমরা মুসলিম কোষাগার থেকে বেশি খরচ করে ফেলেছি। সুফিয়ান আরো উদ্ধৃত করে বলেন, ইবন মাসউদ বর্ণিত হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, (رب متخوض في مال الله، ومال رسول الله فيما شاءت نفسه له النار غدًا) যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সম্পদ হতে (অমিতব্যায়ীর মতো) নিজের ইচ্ছেমতো ব্যয় করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম (অপেক্ষমান রয়েছে)। (সুফিয়ান এসব বলতে থাকলে) আল-মানসূরের এক সহকারী বলে ওঠে, (أمير المؤمنين يُستقبل بمثل هذا) আমীরুল মু‘মিনীনের সাথে এধরণের ব্যাবহার! এতে সুফিয়ান ঈমানদারের আত্মমর্যাদা ও শক্তির বলে জবাব দিলেন, (اسكت إنما أهلك فرعون هامان، وهامان فرعون) খামোশ! হামান-ই ফিরআউনকে ধ্বংস করেছিল এবং ফিরআউন হামানকে। (অর্থাৎ, যে ভুল উপদেশ দিয়েছিল সে তার মাধ্যমে অপরকে ধ্বংস করেছে আর যে উপদেশ গ্রহণ করেছে, সে তা গ্রহণ করেছে, সে সঠিক কাজ না করে, ভুল উপদেশ গ্রহণের মাধ্যমে উপদেশদাতাকেও ধ্বংস করলো)”। [সিরাজুল মুলূক, পৃষ্ঠা-৫১]

    যালেম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইরাকে ওয়ালি থাকাকালীন সেখানে হাতীত আয-যায়্যাত নামক একজন আলেম ছিলেন। যখন আল-হাজ্জাজ তাকে গ্রেফতার করে প্রশ্ন করে: (فما تقولي في) আমার ব্যাপারে তোমার ধারণা কী? আয-যায়্যাত জবাবে বলেন, (أقول: إنك عدو من أعداء الله في الأرض، تنتهك المحارم، وتقتل بالظنة) আমি বলি তুমি দুনিয়ায় আল্লাহর দুশমনের মধ্য হতে একজন, তুমি আল্লাহর হুকুম ভংগ করো এবং স্রেফ সন্দেহের ভিত্তিতে হত্যা করে থাকো। আল-হাজ্জাজ এরপর জিজ্ঞেস করে: (فما تقول في أمير المؤمنين) আমীরুল মু‘মিনীন (আবদুল মালিক বিন মারওয়ান) সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? জবাবে তিনি বলেন, (انه أعظم جرما منك، وانما أنت خطيئة من خطاياه) সে তোমার চেয়েও বড় পাপী, তুমি কেবল তারই পাপের একটি অংশ। এরপর হাজ্জাজ তাকে নিপীড়ন করার হুকুম দেয়। তারা বাঁশের খুটি তার মাংসের মধ্যে গেথে দেয় এবং পরবর্তীতে বাঁশ চিড়তে শুরু করে ফলে আয-যায়্যাতের মাংস ছিড়ে চলে আসতে থাকে। এতে তিনি শহীদ হন। তাঁর বয়স ছিল কেবল ১৮ বছর। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।

    আদ-দারিমি বর্ণিত এক বর্ণনায় এসেছে: খলীফা সুলাইমান বিন আবদিল মালিক একদা মদীনায় অবস্থান করছিলেন। সেসময় তিনি আবু হাজিম নামক তৎকালীন এক আলেমকে ডেকে পাঠান। আবু হাজিম যখন আসলেন তখন সুলাইমান জিজ্ঞেস করলেন, (ما لنا نكره الموت) আমরা মৃত্যুকে এত অপছন্দ করি কেন? আবু হাজিম বললেন, (لانكم أخربتم الآخرة وعمرتم الدنيا فكرهتم أن تنتقلوا من العمران إلى الخراب) কারণ তোমরা দুনিয়াকে নির্মান করেছ এবং আখিরাতকে ধ্বংস করেছ। তাই তোমরা নির্মান হতে ধ্বংসস্তুপে যেতে অপছন্দ করো। অতঃপর তাকে ভালো উপদেশ দেবার পর সুলাইমান তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? আবু হাজিম বলেন, আমাকে জবাব দিতে বাধ্য করো না। তিনি বলেন, এটা উপদেশ, আপনার বলতে হবে। আবু হাজিম বলেন, (إن آباءك قهروا الناس بالسيف وأخذوا هذا الملك عنوة على غير مشورة من المسلمين ولا رضاهم حتى قتلوا منهم مقتلة عظيمة فقد ارتحلوا عنها فلو شعرت ما قالوه وما قيل لهم) তোমার পুর্বপুরুষগণ মুসলিমদের উপর চড়াও হয়ে তাদের মতামত ও সম্মতি ছাড়াই ক্ষমতা দখল করেছে। তারা অনেকসংখ্যক মুসলিমকে হত্যাও করেছে। তাদের আচরন ও তাদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা আপনারতো জেনে থাকার কথা। একজন লোক বলে উঠলেন, (بئس ما قلت يا أبا حازم) আপনি খুব খারাপ কথা বললেন হে আবু হাজিম! আবু হাজিম বললেন, (كذبت إن الله أخذ ميثاق العلماء ليبيننه للناس ولا تكتمونه) আপনি মিথ্যা বললেন, (বরং) আল্লাহ আলেমদের হতে চুক্তি নিয়েছেন যে তারা (প্রকৃত জ্ঞান) মানুষকে ব্যাখ্যা করে বর্ণনা করবে এবং তা লুকায়িত রাখবে না।

    ইমাম মালিক বিন আনাস বর্ণনা করেন, যাকে আল্লাহ কিছু জ্ঞান বা ফিকহ দান করেছেন, প্রত্যেক সেই মুসলিমের দায়িত্ব শাসকের মুখাপেক্ষি হওয়া, তাকে সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎকাজে নিষেধ করা। এর মাধ্যমে অন্যদের হতে আলেমগণ পৃথকভাবে চিহ্নিত হন যখন তারা শাসকের মুখাপেক্ষী হন।

    এ লেখার পাঠকগণের চিন্তা করা উচিত, অতীতে যেখানে আলেমগণ যালেম কিন্তু বৈধ খলীফাদের সাথে এরূপ আচরণ করেছিলেন, সেখানে বর্তমান আলেমগণের ভুমিকা কী হওয়া উচিত? আল-যাহিছ আল-বায়ান ওয়াত-তাবঈনে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হে আল্লাহর রাসূল, কারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ? তিনি জবাবে বলেন, (العلماء اذا فسدوا) আলেমগণ, যদি তারা দুর্নীতিপরায়ন হয়ে পড়ে।

    আলী (রা) এক বর্ণনায় বলেন, দুধরনের ব্যাক্তিকে আমি সহ্য করতে পারিনা। নির্লজ্জ আলেম ও মুর্খ আবেদ। মুর্খ আবেদ তার ইবাদত দ্বারা মানুষকে প্রতারিত করে এবং আলেম তার নির্লজ্জতা দ্বারা।

    আলেমগণ যদি সত্যিকারের ইসলামি আলেম হয়ে থাকেন তবে তারা অবশ্যই তাদের নিজেদের আমলের উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের পথ দেখাবেন, যদিওবা এতে তাদের জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ) উপলব্ধি করেছিলেন যে আলেম হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে উম্মাহকে দেখিয়ে দেয়া যে একজন মুসলিম আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। তিনি বলেন, (اذا سكت العالم تقية والجاهل يجهل، فمتى يظهر الحق) যদি আলেমগণ তাকিয়া অবলম্বন করে চুপ থাকেন (অর্থাৎ, নিজের সুরক্ষার জন্য জ্ঞান লুকিয়ে রাখে), আর অজ্ঞ মানুষেরা অজ্ঞতায় পড়ে থাকে, তবে সত্য কখন উন্মোচিত হবে?

    (যারা জ্ঞান লুকায়িত রাখে) এ ধরণের আলেমগণ অনেককেই পথচ্যুত করেছে, বিশেষ করে যারা তাদেরকে না বুঝেই আদর্শরূপে গ্রহণ করেছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তাদের আলেমগণের কথা পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন। এধরণের আলেমগণের মধ্যে কতক পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত, কতক হিকমতের দোহাই দিয়ে যুলুমের ব্যাপারে চুপ থাকেন এবং কতক তাদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের ব্যস্ততায় মগ্ন। মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য, খিলাফত প্রতিষ্ঠা কিংবা রাষ্ট্রে শরীআহ’র পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের তেমন কথা বলতে দেখা যায় না।

    ইমাম গাজ্জালি তার গ্রন্থ ইহইয়া উলূম আদ-দ্বীন এর ৭ম খণ্ডের ৭২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, এই ছিল আলেমগণের পথ ও নীতি: সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজের নিষেধ করা। তারা শাসকদের প্রতাপের ব্যাপারে কমই সন্তপ্ত থাকতেন। তারা তাদের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করতেন এবং আল্লাহর দেয়া শাহাদাত অর্জনকে মেনে নিতেন। যখন তাদের নিয়ত বিশুদ্ধ ছিল, তাদের কথা অন্তর নম্র করতো। কিন্তু এখন লোভলালসা আলেমগণের জিহ্বাকে বেঁধে ফেলেছে এবং তাদের নিশ্চুপ করে রেখেছে। যদি তারা কথা বলেই, তবে তাদের কথা কোনো কাজকেই সহায়তা করে না এবং এভাবে তারা ব্যর্থই হবে। যদি তারা সত্য বলতো এবং জ্ঞানকে তার নির্দিষ্ট হক প্রদান করতো, তবে তারা সফল হতো। শাসকদের দুর্নীতির ফলে জনগণ দুর্নীতিপরায়ন হয় আর আলেমদের দুর্নীতির ফলে দুর্নীতিপরায়ন শাসকগণ টিকে থাকে। আর আলেমরা দুর্নীতিপরায়ন হয় সম্পদ ও ক্ষমতার লোভের দরুন।

    যে-ই দুনিয়ার ভালোবাসা প্রাবল্যে ডুবে থাকবে, সে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে সে সাধারন জনগণকে প্রশ্ন করতে পারবেনা। আর যে সাধারণ জনগণকেই প্রশ্ন করতে পারেনা, কিভাবে সে শাসক কিংবা উচ্চাসনের ব্যাক্তিবর্গকে প্রশ্ন করার যোগ্যতা ও সাহস অর্জন করবে?

  • যৌথ সামরিক মহড়া ও সেমিনার হল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতিয়ার যার মাধ্যমে সে তার ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়

    যৌথ সামরিক মহড়া ও সেমিনার হল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতিয়ার যার মাধ্যমে সে তার ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়

    খবর: গত ১৪/০৯/১৪ তারিখে রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ মিলিটারি এবং যুক্তরাষ্ট্র আর্মির প্যাসিফিক কমান্ড যৌথভাবে ৩৮তম প্যাসিফি আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার (PAMS) এ আয়োজন করে। ৩২টি দেশের বিভিন্ন সমকালীন বিষয়ে মতবিনিময় এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে “আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ” মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সকল দেশকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি’র প্যাসিফিক কমান্ডার জেনারেল ভিনসেন্ট ব্রুকস, যাতে সকল দেশ একমত হয়েছে।

    মন্তব্য:
    দক্ষিণে বিশাল বঙ্গোপসাগর থাকার ফলে অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ধরা হয়। আন্দামান নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে যদিওবা মার্কিনীদের বৃহৎ নৌবহরের উপস্থিতি রয়েছেম তারপরও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিজেদের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালে ওবামা যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তার পররাষ্ট্রনীতি ফোকাসের ঘোষণা দিল সেই সময় থেকেই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বও আরো বেড়ে গেছে। তখন থেকেই আমরা দেখেছি বাংলাদেশে বিভিন্ন মার্কিন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের আনাগোনা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন। এছাড়াও এই অঞ্চলে মার্কিনীদের উপস্থিতিকে বৈধতা দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমেরিকার কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে টেনে নেয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশী আইন প্রয়োগকারী ও সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরে আমেরিকার প্রভাবকে শক্তিশালী করার জন্য গত সপ্তাহে আমেরিকান নৌ-বাহিনীর দ্বারা বঙ্গোপসাগরে “ক্যারাট” (Cooperation Afloat Readiness and Training) নামক নৌমহড়া আয়োজন করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীও অংশগ্রহণ করেছে।

    মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই এসব যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং “প্যামস” এর মতো সামরিক ফোরাম সমূহের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। একমাত্র রাজনৈতিক ভাবে অজ্ঞ এবং পশ্চিমাদের দালাল ছাড়া এটা আর কারো কাছে অজানা নয় যে বিভিন্ন অনুন্নত দেশে এসব মার্কিন সহায়তা কার্যক্রমের মূল কারণ কি। এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয় আমেরিকা এবং তার অন্যান্য মিত্রশক্তিগুলো নিঃস্বার্থভাবে অন্যদের জন্য কল্যাণময়ী কোন কাজ করতে পারে। এসব রক্তচোষা সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে মুসলিম ভূমিগুলোকে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে খিলাফতের পুনরাবির্ভাব ঘটানো।

    আমরা তাই বাংলাদেশের জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময় থেকে এও একইভাবে পাকিস্তানও আজ পর্যন্ত আমেরিকার সকল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়ন করে আসছে। কিন্তু আজকে এটা পরিস্ফুটিত যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় শামিল হতে গিয়ে পাকিস্তান শাসকদের এই মার্কিন তাঁবেদারির খেসারত সেই দেশের সাধারণ জনগণদেরই দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের তাঁবেদার শাসকরাও বিশ্বাসঘাতকতার সেই একই পথে হাঁটছে যার পরিণতি দেশ এবং দেশের জনগণের ধ্বংস বৈ অন্য কিছু হবে না।

    এছাড়া এসব যৌথ মহড়া এবং প্রশিক্ষণের আরেকটি উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর তাদের কুফরি নেতৃত্ব কায়েম করা। তাদের কৌশল হল এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনীর ভেতর “ধর্মনিরপেক্ষতা” ও “পাশ্চাত্য সংস্কৃতি” নিয়ে মোহ তৈরি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে এসব থেকে রক্ষা করেন এবং তারা যেন পুতুল হাসিনার শৃঙ্খল ভেঙ্গে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ দান করতে পারে। একমাত্র খিলাফতই পারবে এই অঞ্চল থেকে কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে বিতাড়িত করতে।

    ইমদাদুল আমিন

  • আল্লাহ্‌’র ভয়ে এবং স্মরণে ক্রন্দন করা

    আল্লাহ্‌’র ভয়ে এবং স্মরণে ক্রন্দন করা

    অধ্যায় ৬

    সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌’র ভয়ে ক্রন্দন করা মানদুব (Recommended) এবং এর দলীল হচ্ছে কুর’আন এবং সুন্নাহ্‌:

    কুর’আন-এর দলীলের ক্ষেত্রে:

    أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ، وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ

    “তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছো? এবং হাসছো-ক্রন্দন করছো না?” [সূরা আন-নাজম: ৫৯-৬০]

    وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا

    “তারা ক্রন্দন করতে করতে নতমস্তকে ভুমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরো বৃদ্ধি পায়।” [সূরা আল-ইস্‌রা:১০৯]

    إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا

    “তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহ্‌’র আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তখন তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়তো এবং ক্রন্দন করতো।” [সূরা মারইয়াম:৫৮]

    সুন্নাহ্‌’র দলীলের ক্ষেত্রে:

    ইবনে মাস’উদ বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেন:

    اقْرَأْ عَلَيَّ قُلْتُ آقْرَأُ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ قَالَ فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ سُورَةَ النِّسَاءِ حَتَّى بَلَغْتُ { فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا } قَالَ أَمْسِكْ فَإِذَا عَيْنَاهُ تَذْرِفَانِ

    আমাকে কুর’আন তিলাওয়াত করে শোনাও।” তিনি (আবদুল্লাহ্‌ বিন মাস’উদ (রা) বললেন: ‘আমি কি আপনাকে কুর’আন তিলাওয়াত করে শুনাবো অথচ যখন এটা আপনার উপরই নাযিল হয়েছে।’ প্রতুত্তরে রাসূল (সা) বললেন: “আমি অন্য কারো মুখে কুর’আন তিলাওয়াত শুনতে বেশী ভালোবাসি।” অতঃপর আব্দুল্লাহ্‌ ইবনে মাস’উদ (রা) তাকে (সা) সূরা নিসা তিলাওয়াত করে শুনালেন। তিনি (রা) যখন নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করছিলেন: “আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী (স্বাক্ষী) এবং আপনাকে ডাকবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে (স্বাক্ষীরূপে)”। [সূরা আন-নিসা:৪১]; রাসূল (সা) বললেন: ‘যথেষ্ট হয়েছে।’ যখন ইবনে মাস’উদ রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর চেহারার দিকে তাকালেন, দেখলেন তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    আনাস (রা.) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) এমনভাবে আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছিলেন যে আমি পূর্বে এমনভাবে তাঁকে বলতে শুনিনি:

    لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا قَالَ فَغَطَّى أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وُجُوهَهُمْ لَهُمْ خَنِينٌ

    “আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম, কাঁদতে বেশি। অতঃপর সাহাবীগণ (রা) তাদের মুখ ঢেকে ফেললেন কারণ তারা কাঁদছিলেন এবং ফুপাচ্ছিলেন।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

    سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمْ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ….. وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ

    “শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্‌’র আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। …এবং সে ব্যক্তি যে একাকী গোপনে আল্লাহ্‌-কে স্মরণ করে এবং তার চোখদুটি অশ্রুতে ভরে উঠে।“[মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    ইবনে উমর (রা) বর্ণিত: যখন রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর ব্যাথা চরমে পৌছালো তখন তাকে (সা) জিজ্ঞেস করা হলো, কে নামাজের ইমামতি করবে? তিনি (সা) বললেন:

    مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ قَالَتْ عَائِشَةُ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ غَلَبَهُ الْبُكَاءُ

    “আবু বকরকে বলো নামাজে ইমামতি করার জন্য।” ‘আয়েশা (রা) বললেন: “আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি হয়তো তাঁর ক্রদনের কাছে পরাভূত হয়ে যেতে পারেন।” আল-বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এবং হাদীসটি আল-মুসলিম কর্তৃক নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে:

    قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ الْقُرْآنَ لاَ يَمْلِكُ دَمْعَهُ

    ‘আয়েশা (রা.) বলেন:

    হে আল্লাহ্‌’র রাসূল (সা), আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি কুর’আন তিলাওয়াতের সময় তার ক্রন্দনকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হবেন না…।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    আনাস (রা.) হতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) উবাই বিন কা’ব (রা.)-কে বলেন,

    إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِى أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ (لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا) ». قَالَ وَسَمَّانِى لَكَ قَالَ « نَعَمْ ». قَالَ فَبَكَى

    “আল্লাহ্‌ ‘আজ্জা ওয়া যাল নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি তোমাকে (এ আয়াতটি) তিলাওয়াত করে শুনাই: “যারা অবিশ্বাস করেছিল…” [সূরা বাইয়্যিনাহ:১]; তিনি রাসূল (সা)-কে প্রশ্ন করলেন: “আল্লাহ্‌ কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন?” জবাবে তিনি (সা) বললেন: “হ্যাঁ”। একথা শুনে উবাই কাঁদতে আরম্ভ করলেন।[মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেন:

    لَا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ وَلَا يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ

    আল্লাহ্‌’র ভয়ে ক্রন্দনকারী ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না দুধ দোহনের পর তা আবার উলানে ফেরৎ যায়; এবং আল্লাহ্‌’র রাস্তায় জিহাদের সময় উত্থিত ধুলি এবং জাহান্নামের আগুন হতে উত্থিত ধোঁয়া কখনোই একত্রিত হবে না।” আত্‌-তিরমিযী হতে বর্ণিত, যিনি একে হাসান সহীহ্‌ উল্লেখ করেছেন।

    আবদুল্লাহ্‌ বিন শাকির (রা) হতে বর্ণিত:

    وَهُوَ يُصَلِّي وَلِجَوْفِهِ أَزِيزٌ كَأَزِيزِ الْمِرْجَلِ مِنَ الْبُكَاءِ

    আমি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর নিকট এমন এক সময়ে পৌঁছালাম যখন তিনি (সা) সালাত আদায় করছিলেন। তিনি (সা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন এবং তার বুক থেকে ফুটন্ত কেটলীর মতো শব্দ আসছিল।” আন-নববী বলেন: “হাদীসটি আবু দাউদ এবং আত্‌-তিরমিযী তার আশ-শামা’য়িল-এ এর ইসনাদকে সহীহ্‌ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।”

    ইব্রাহীম বিন আবদ আর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেন যে, ইফতার করার জন্য আবদ আর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর কাছে যখন কিছু খাবার আনা হলো, তখন তিনি বললেন:

    قُتِلَ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي كُفِّنَ فِي بُرْدَةٍ إِنْ غُطِّيَ رَأْسُهُ بَدَتْ رِجْلَاهُ وَإِنْ غُطِّيَ رِجْلَاهُ بَدَا رَأْسُهُ وَأُرَاهُ قَالَ وَقُتِلَ حَمْزَةُ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي ثُمَّ بُسِطَ لَنَا مِنْ الدُّنْيَا مَا بُسِطَ أَوْ قَالَ أُعْطِينَا مِنْ الدُّنْيَا مَا أُعْطِينَا وَقَدْ خَشِينَا أَنْ تَكُونَ حَسَنَاتُنَا عُجِّلَتْ لَنَا ثُمَّ جَعَلَ يَبْكِي حَتَّى تَرَكَ الطَّعَامَ

    “মুসা’ব বিন ‘উমায়ের শহীদ হন। তিনি আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। তার মৃতদেহকে ঢাকতে এমন এক টুকরো কাপড় ছাড়া আমাদের কাছে আর কিছুই ছিল না, যা দ্বারা তার মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যাচ্ছিল এবং পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যাচ্ছিল। হামজা শহীদ হন এবং তিনিও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্‌ আমাদেরকে পৃথিবীতে অনেক নিয়ামতের মধ্যে রেখেছেন। আমি এই ভয়ে খুবই ভীত যে আল্লাহ্‌ হয়তো এই পৃথিবীতে আমাদের সব পুরষ্কার দিয়ে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি (রা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে এমনভাবে ক্রন্দন করতে লাগলেন যে আর কিছুই খেতে পারলেন না।

    আল-‘ইরবাদ বিন সা’রিয়্যা (রা) বলেন:

    وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَوْعِظَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ

    “রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) আমাদের সামনে এমন খুতবা দিলেন, যার ফলে আমাদের হৃদয় আল্লাহ্‌’র ভয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো এবং চোখ দিয়ে অশ্রু নেমে এল…।” [আবু দাউদ ও আত্‌-তিরমিযী]; দ্বিতীয়জন হাদীসটিকে হাসান সহীহ্‌ বলেছেন।

    আনাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেছেন:

    من ذكر الله ففاضت عيناه من خشية الله حتى يصيب الأرض من دموعه لم يعذبه الله تعالى يوم القيامة

    “যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌-কে স্মরণ করে এবং এতে আল্লাহ্‌’র ভয়ে তার চোখ থেকে অশ্রু বেড়িয়ে আসে, কিয়ামতের দিন ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ্‌ তাকে শাস্তি দিবেন না যতক্ষন না তার অশ্রু জমীনে গিয়ে পড়বে।” আল-হাকিম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং সহীহ্‌ বলেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন।

    আবু রায়হানা বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর সাথে একটি অভিযানে অংশ নিয়েছিলাম এবং তখন তাঁকে বলতে শুনেছি:

     حرمت النار على عين دمعت من خشية الله حرمت النار على عين سهرت في سبيل الله قال : و نسيت الثالثة قال أبو شريح : و سمعت بعد أنه قال : حرمت النار على عين غضت عن محارم الله

    “সে চোখের জন্য দোযখের আগুন হারাম যা আল্লাহ্‌’র ভয়ে কাঁদে, আল্লাহ্‌’র রাস্তায় জিহাদের ময়দানে সর্বদা জাগ্রত থাকে এবং আমি তৃতীয়টি ভুলে গেছি। কিন্তু পরবর্তীতে আমি শুনেছি তিনি বলছেন, ‘আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন এরকম কোন কিছু দেখা থেকে বিরত থাকার জন্য দৃষ্টিকে নীচে নামিয়ে রাখে।” আহমাদ এবং আল-হাকিম হতে বর্ণিত। আল-হাকিম এটিকে সহীহ্‌ বলেছেন, এবং আয-যাহাবী এবং আন-নাসা’ঈ এ বিষয়ে তার (আল-হাকিম) সাথে একমত পোষণ করেছেন।

    ইবনে আবু মুলায়কাহ্‌ থেকে বর্ণিত, আমরা হিজরে আব্দুল্লাহ্‌ বিন আমর-এর সাথে বসে ছিলাম, যিনি বলেন:

    ابكوا فإن لم تجدوا بكاء فتباكوا لو تعلمون العلم لصلى أحدكم حتى ينكسر ظهره و لبكى حتى ينقطع صوته

    “কাঁদো, এবং যদি তোমরা কাঁদতে না পারো, তবে অন্তত: (আল্লাহ্‌’র ভয়ে) কাঁদার ভান করো। যেই সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম খেয়ে বলছি, যদি তোমাদের কেউ সত্যি সত্যি জানতো কী অপেক্ষা করছে তবে তোমরা আল্লাহ্‌’র নিকট ততক্ষণ পর্যন্ত কাকুতি-মিনতি করতে যতক্ষণ না তোমাদের গলা ভেঁঙ্গে যায় এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সালাত আদায় করতে যতক্ষণ না তোমাদের কোমর ভেঁঙ্গে যায়।”

    এটা বর্ণিত আছে যে, আলি (রা) বলেছেন:

    ما كان فينا فارس يوم بدر غير المقدام ولقد رأيتنا وما فينا إلا نائم إلا رسول الله صلى الله عليه و سلم تحت شجرة يصلي ويبكي حتى أصبح

    বদরের যুদ্ধের দিন আল-মিকদাদ ছাড়া আমাদের আর কারো নিকট একটি ঘোড়া ছিল না এবং রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) ছাড়া আমি আর কাউকে সে রাতে ইবাদতে মশগুল দেখিনি, তিনি (সা) একটি গাছের নীচে ইবাদত করছিলেন এবং সকাল পর্যন্ত ক্রন্দন করেন।” এটি ইবনে খুজাইমা তার সহীহ্‌তে উল্লেখ করেছেন।

    ছাওবান (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বলেছেন:

    طوبي لمن ملك لسانه ووسعه بيته وبكى على خطيئته

    “সেই ব্যক্তি কল্যানপ্রাপ্ত যে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে, তার আবাসস্থল তার জন্য প্রশস্থ হয়েছে এবং সে তার ভুলের জন্য ক্রন্দন করেছে।” আত্‌-তাবারানী হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং একে হাসান আখ্যা দিয়েছেন।

    Taken from the book “From Essential Elements of Islamic Disposition”

  • কর্মের মানদন্ড

    অনেকেই উদ্দেশ্যহীনভাবে জীবনে অগ্রসর হতে থাকে। তাই তারা পরিমাপ করার কোনো মানদন্ড ছাড়াই তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করে। ফলে, তাদের খারাপ কাজকে ভালো মনে করে তা করতে দেখবেন। তারা ভালো কাজকে খারাপ মনে করে তা হতে বিরত থাকে। বৈরুত, দামেস্ক কিংবা বাগদাদের মতো বৃহৎ ইসলামী শহরগুলোতে একজন মুসলিম নারী তার পা উন্মুক্ত করে, তার সৌন্দর্য ও আকর্ষনীয়তা দেখিয়ে মনে করে যে সে একটি ভালো কাজ করছে। একইভাবে, মসজিদমুখী নেক ব্যাক্তি শাসকের দুর্নীতির ব্যাপারে কথা বলা থেকে বিরত থাকে, কারণ তা রাজনীতি আর রাজনৈতিক কথা বলাই খারাপ। এধরনের নারী ও পুরুষ পাপে নিপতিত। কারণ তারা তাদের কার্যাবলী পরিমাপ করার জন্য কোনো মাপকাঠি গ্রহণ করেনি। যদি তারা একটি মাপকাঠি গ্রহন করতো তবে তারা যে মতাদর্শকে খোলামেলাভাবে গ্রহণ করার দাবি করে, তার পরিপন্থি কার্যাবলী সম্পাদন করতো না। তাই, এটি গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষের একটি মানদন্ড থাকবে যা দ্বারা সে তার কার্যাবলী পরিমাপ করবে, যাতে কাজ সম্পাদন করার পূর্বে সে কাজের বাস্তবতা জানতে পারে।

    ইসলাম মানুষকে তার কার্যাবলী পরিমাপ করার জন্য একটি মানদন্ড আরোপ করেছে, যাতে সে জানতে পারে এর মধ্যে কোনটি ভালো এবং কোনটি মন্দ। অতঃপর সে মন্দ হতে বিরত থাকে এবং ভালো কাজ সম্পাদন করে। এই মানদন্ড হচ্ছে শরীআহ (ইসলামি আইন)। এভাবেই, শরীআহ যে কাজকে ভালো বলে তা ভালো আর যে কাজকে মন্দ বলে তা মন্দ। এ মানদন্ড স্থির, তাই ভালো মন্দে পরিনত হয় না, এবং মন্দ ভালোতে রূপান্তরিত হয় না। বরং, শরীআহ যাকে ভালো বলে তা ভালোই রয়ে যায়, এবং শরীআহ যা মন্দ হিসেবে দেখে তা মন্দই রয়ে যায়।

    তাই মানুষ সচেতনভাবে এক সোজা পথে অগ্রসর হয়, এবং সে বিষয়াদিসমূহ যেরকম সেভাবেই তা বোঝে। যদি সে শরীআহ’কে মানদন্ড হিসেবে তৈরি না করে তবে বিষয়টি ভিন্ন হবে, বরং সেক্ষেত্রে সে তার মস্তিস্কপ্রসুত চিন্তাকে তার মানদন্ড হিসেবে তৈরি করেছে। এধরনের ক্ষেত্রে সে এলোমেলোভাবে অগ্রসর হবে, কারণ কোনো বাস্তবতাভেদে কোনো বিষয় ভালো হতে মন্দে পরিনত হয়, কারণ, মস্তিস্ক আজকের ভালোকে আগামীতে মন্দ হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে। সে এক দেশে তা ভালো হিসেবে আবার অন্য দেশে তা মন্দ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তাই তার বাছ-বিচার নড়বড়ে হয়ে পড়ে, এবং ভালো-মন্দ তার কাছে পরম বিষয় হতে আপেক্ষিক বিষয়ে পরিনত হয়। তখন সে ভালো করতে যেয়ে মন্দ এবং মন্দ করা থেকে বিরত থাকতে যেয়ে ভালো হতে বিরত থাকার দুর্দশায় নিপতিত হয়।

    সুতরাং, কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে শরীআহ’র বরাত দেয়া আবশ্যক, এবং সকল কাজের জন্য একে মানদন্ডরূপে গ্রহণ করতে হবে, এবং (শরীআহ) আইনের দৃষ্টিতে যা ভালো তা ভালো হিসেবে এবং (শরীআহ) আইনের দৃষ্টিতে যা মন্দ তা মন্দ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

    Taken from the book ‘Islamic Thought’

  • চালের বাজারে অস্থিরতা: পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা এর জন্য দায়ী

    চালের বাজারে অস্থিরতা: পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা এর জন্য দায়ী

    সম্প্রতি চালে বাজার আবার অস্থির হয়ে ওঠেছে। পাইকারী থেকে শুরু করে খুচরা বাজারে এর প্রভাব চোখে পড়ার মতো। খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে ২-৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় শ্রীলংকাতে টন প্রতি ৪৫০ ডলার দরে ৫০ হাজার টন চাল রপ্তানি ঘোষণা করেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি তার চট্টগ্রামে ফ্লাইওভার উদ্ধোধনের ভাষনে এ রপ্তানির বিষয়টি গর্ব করে উল্লেখও করেছেন। উল্লেখ্য ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জুলাই- সেপ্টেম্বরে তুলনায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে একই সময়ে চালের আমদানিও বেড়েছে। ৪৫০ ডলার দরে রপ্তানিযোগ্য চালের উৎপাদন খরচ পড়বে ৪৩৬ ডলার এবং লাভ হবে ১৪ ডলার। অর্থাৎ প্রতিকেজি চালের মূল্য হবে ৩৩টাকা। এই সরকারের তথাকথিত মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে লোক দেখানোর জন্য সরকার তড়িগড়ি করে রপ্তানি খাতে নাম লিখিয়েছে। সাধারণত জনগণের চাহিদা পূরণের পর যেসব দ্রব্য বা পণ্য উদ্বৃত্ত থাকে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রপ্তানি করা হয়ে থাকে। আর আমদানি তখনই হয় যখন কোনো পণ্য বা দ্রব্যের ঘাটতি থাকে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশ একই সাথে চাল যেমন রপ্তানি করছে তেমনি চাল আমদানিও করছে। একই পণ্য একই সাথে রপ্তানি ও আমদানি করা সত্যিই রহস্যজনক! এই আমদানি-রপ্তানির দোলাচলের প্রভাব চালের বাজারে সর্বত্র দৃশ্যমান। আবার রপ্তানি করে ১৪ ডলার আয় দিয়ে আমদানি মূল্য কতটুকু মেটানো সম্ভব তাও প্রশ্নবিদ্ধ। এই সরকারের মন্ত্রি-প্রতিমন্ত্রি থেকে শুরু করে সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা চালের আমদানি-রপ্তানির আলো আঁধারির খেলা থেকে অনেক টাকা লুটপাট করতে চায়।

    সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকারের একজন রাজনীতিবিদ (মাহবুবুল আলম হানিফ) নির্বাচনি ব্যয় প্রসঙ্গে বলেন, “নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত ২৫ লাখ টাকা দিয়ে নির্বাচনি ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। দেশের মধ্যবিত্তরা রাজনীতি করতে পারছে না এই কারণে। তাই রাজনীতিবিদদের রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসা করতে হবে।” উক্ত এ ব্যক্তির কথা থেকে বুঝতে পারা যায় তারা দেশের প্রতিনিধি হতে চায় জনগণের সেবক হওয়ার জন্য নয়; বরং শোষক হওয়ার জন্য। নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে হলে ক্ষমতায় বসে লুটপাট না করলে নির্বাচনি ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। চালের আমদানি-রপ্তানি সেই ধরনের-ই একটা বিষয় যেখান থেকে তারা অনেক টাকা লুটপাট করে নিতে চায়। যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সাধারন জনগণের স্বার্থ রক্ষা না করে শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করে তাই শাসকগণ জনগণের খাদ্যের চাহিদার দিকে লক্ষ্য না রেখে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের খাদ্য পণ্য রপ্তানির আবাধ স্বাধীনতা প্রদান করে যা দেশে খাদ্যপ্যনের অপ্রতুলতা তৈরি করে যা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে। এর জন্য দায়ী পুঁজিবাদী শাসন তথা এর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। মানুষের তৈরী এই শাসনব্যবস্থা মূলত এইসব দুর্নীতিবাজ শাসক ও ব্যবসায়ী তৈরীর কারখানা।

    পুঁজিবাদী অর্থনীতির অন্যতম প্রবক্তা অ্যাডাম স্মিথ তার বিখ্যাত An Inquiry into the Nature and Causes of the Wealth of Nations (1776) গ্রন্থে বলেন, “প্রতিটি ব্যক্তি… গণমানুষের স্বার্থ রক্ষার কোন ইচ্ছা পোষণ করেনা এবং সে জানেও না যে সে গণমানুষের স্বার্থ হাসিলে কতটুকু সহায়তা করছে। ব্যক্তি শুধুমাত্র নিজের লাভ নিয়ে সদাব্যস্ত। একটি অদৃশ্য হাতের কল্যাণে সে গণমানুষের স্বার্থের পক্ষে ভূমিকা রাখে যা ব্যক্তি কখনোই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করে না, করার ইচ্ছাও পোষণ করেনা”।

    পুঁজিবাদী ব্যবস্থা যেহেতু শুধু মাত্র “বস্তুগত লাভ ও স্বার্থকে” সকল কাজের ভিত্তি ধরে এগোয় যার ফলে ঘুষ-দুর্নীতি, দলবাজি, জোচ্চুরি ইত্যাদি নিত্য দিনের ব্যপার হয়ে দাঁড়ায়। শাসক থেকে পিয়ন সকলে দুর্নীতিবাজ হয়ে যায়। ঘুষ-দুর্নীতি যে জাতির প্রতিদিনের কর্ম সে দেশে দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক এবং জাতির কাজই হয়ে যাবে কিভাবে কিভাবে আই এম এফ বা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে খুশি করা যায়। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন ‘………যে জায়গায় ঘুষের লেনদেন হয় সে জায়গায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অন্য জাতির ভয় চাপিয়ে দেন।” [মুসনাদে ইমাম আহমাদ] অর্থাৎ আমরা আল্লাহর দেয়া রাষ্ট্র খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না করি তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে ইহকালে যেমন শাস্তি দিবেন (যেমন মার্কিন-ভারতের দালাল যালিম শাসককে চাপিয়ে দেওয়া) তেমনি পরকালেও পকড়াও করবেন জাহান্নামের আগুন দিয়ে। তাই আমাদেরকে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থাকে বর্জন করে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্টা করতে হবে।

    খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেভাবে এই সমস্যার সমাধান করবে:

    প্রথমত, খাদ্য যেহেতু জনগণের মৌলিক চাহিদার একটি তাই খিলাফত রাষ্ট্র জনগণের চাহিদা পূরণের দিকে সর্বাধিক নজর রাখবে। রাসূল (সা) বলেন,

    বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য এক টুকরা কাপড়, আর খাওয়ার জন্য এক টুকরা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।” [তিরমিযী]

    তাই খলীফাকে অবশ্যই জনগণের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করতে হবে ব্যবসায়ীদের স্বার্থ নয় । জনগণের খাদ্যের চাহিদা পূরন হলে সে অবশিষ্ট অংশ রপ্তানি করতে ব্যসায়ীদের অনুমতি দিতে পারবে।

    দ্বিতীয়ত, ইসলামী রাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মত ব্যবসায়ীদের ব্যবসা করার অধিকার কেড়ে নেয় না আর অন্যদিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মত যে কোন উপায়ে মুনাফা করার জন্য সবকিছু ব্যবসায়ীদের উপর ছেড়ে দেয়না। খিলাফত সরকার প্রথমেই ব্যবসায়ী সমাজের মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধ সুপ্রতিষ্ঠিত করবে। সৎ ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আরশের ছায়ায় স্থান লাভ করবেন বলে রাসূল (সা) ঘোষণা করেছেন। ইসলামী রাষ্ট্র বস্তুগত লাভ নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টিকে সকল কাজের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে এবং জনগণকে এর উপর সবসময় সচেতন রাখবে এবং তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ল্যক্ষে কাজ করবে।

    তৃতীয়ত, খিলাফত রাষ্ট্র সর্বপরি জনগণের কল্যাণের জন্য অনবরত কাজ করে যাবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না”। [মুসলিম]

    দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রনে ইসলামী অর্থনীতির অনান্য সমাধান সমূহ:

    ১। ইসলামের সমাধান জিনিসপত্রের সরবরাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। সম্পদের সুষ্ঠু বিতরণকে ইসলাম মূল অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখে। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন,

    “যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়” [সূরা হাশর: ৭]

    তাই খিলাফত রাষ্ট্র সম্পদের সুষ্ট বিতরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাবে।

    ২। খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো ভূমি অনাবাদী রাখা যাবে না। এর কারণ উৎপাদন সবসময় সচল রাখা খিলাফত রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য। উৎপাদন যত বেশি বাড়বে জনগণের চাহিদা তত বেশি পূরণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের ভূমি যেহেতু উর্বর তাই এখানে অনাবাদী জমিগুলোকে আবাদী করার মাধ্যমে জনগণের চাহিদা মেটানো সম্ভব।

    ৩। খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মুদ্রানীতি হবে স্বর্ণ এবং রৌপ্য। এই মুদ্রানীতিতে দ্রব্যমূল্যের দাম যেমন নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তেমনি জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো যাবে। এভাবে খিলাফত রাষ্ট্র চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের চাহিদা নিশ্চিত করবে।

  • প্রশ্ন-উত্তর: নবীদের ইজতিহাদ প্রসঙ্গে – শাইখ আতা আবু রাশতা

    প্রশ্ন-উত্তর: নবীদের ইজতিহাদ প্রসঙ্গে – শাইখ আতা আবু রাশতা

    নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব 

    প্রশ্ন: সকল নবীই কি তাদের ইজতিহাদে সঠিক নাকি শুধু মুস্তফা (সা)?

    প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় নিম্নোক্ত প্রসঙ্গে – ইবন কাছীর সূরা আম্বিয়া ৭৮ নং আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ ও আবদুল্লাহ বিন আব্বাস কে উদ্ধৃত করে বলেন যে তারা বলেছেন, নবী দাউদ (আ) মেষপালক ও গৃহস্থের মালিক যার ক্ষেত মাড়িয়েছিল মেষপালকের ভেড়াটি তাদের মধ্যে ফয়সালা দিয়েছিলেন যাতে ভেড়াটি গৃহস্থকে দিয়ে দেয়া হয়।

    পরে তার ছেলে সুলায়মান তাকে বলেন, এটি পরিবর্তন করুন, হে আল্লাহর নবী! অতঃপর তিনি রায়টি ব্যাখ্যা নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, গৃহস্থ ভেড়াটি তার জিম্মায় নিয়ে তা হতে দুধ আহরণ করবে, আর মেষপালক জমি চাষ করে পুর্বরূপে ফিরিয়ে আনবে অর্থাৎ, ভেড়া মাড়ানোর পুর্বের অবস্থায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, আমরা সুলায়মানকে এ বিষয়ে উপলব্ধি দান করলাম। এর অর্থ কি এই যে নবী দাউদ (আ) ইজতিহাদ করেছিলেন যা পরবর্তীতে সুলায়মান সংশোধন করে দিয়েছিলেন?

    সকল নবীই হুকুম-আহকাম বর্ণনায় মা’সূম অর্থাৎ, তারা নিজেদের মস্তিস্কপ্রসুত রায় দেন না। তার নবী বা রাসূল হওয়াটি – তিনি যে শরীআহর হুকুম বর্ণনার ক্ষেত্রে মাসূম, তা অপরিহার্য করে তোলে অর্থাৎ, তিনি ব্যাক্তিগতভাবে কোনো ইজতিহাদ করে হুকুম শরীআহ বর্ণনা করেন না। অনুগ্রহপূর্বক, ইসলামি ব্যাক্তিত্ব বইটির ১ম খণ্ডে ‘নবীদের অভ্রান্তিসত্ত্বতা (ইসমাহ)’ ও ‘রাসূলের জন্য মুজতাহিদ হওয়াটি অমানানসই’ (এ অংশদ্বয়) দেখুন। সুতরাং, আহকাম শরীআহ বর্ণনায় নবীগণ নিজেদের মাথা খাটিয়ে ইজতিহাদ করেন না, বরং তারা কেবল আল্লাহ পক্ষ হতে ওহী প্রচার করেন।

    وَدَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ * فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ وَكُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ

    এবং স্মরণ করুন দাউদ ও সুলায়মানকে, যখন তাঁরা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করেছিলেন। তাতে রাত্রিকালে কিছু লোকের মেষ ঢুকে পড়েছিল। তাদের বিচার আমার সম্মুখে ছিল। অতঃপর আমি সুলায়মানকে সে ফায়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং আমি উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়েছিলাম। আমি পর্বত ও পক্ষীসমূহকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম; তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত। এই সমস্ত আমিই করেছিলাম। [সুরা আম্বিয়া: ৭৮-৭৯]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বাণী:

    فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ )
    ‘‘অতঃপর আমি সুলায়মানকে সে ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম’’

    দলীলস্বরূপ যে সুলায়মান (আ)-এর ফয়সালা একটি ওহী ছিল। এবং তাঁর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বাণী:

    كُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا )
    উভয়কেই আমি ফয়সালা ও জ্ঞান দান করেছি

    দলীলস্বরূপ যে দাউদ (আ)-এর ফয়সালাও ওহী নির্ধারিত। যেহেতু সুলায়মানের ফয়সালা পরে এসেছে, তাই তা পুর্বের রায়কে রহিত করেছে।

    আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, কোনো কোনো তাফসীরে এসেছে যে দাউদ ও সুলায়মান উভয়ে ইজতিহাদ করেছেন এবং সুলায়মানের ইজতিহাদ বেশি সঠিক। যারা এ মত পোষন করেন তারা আহকাম শরীআহ বর্ণনায় নবী-রাসূলদের ইজতিহাদ করার বিষয়টিকে অস্বীকার করেন না। তারা বলেন, আল্লাহ তাদের ইজতিহাদকে সংশোধন করে দেন যদি তারা ভুল করেন।

    ৬ই মুহাররাম, ১৪৩৩ হি:
    ১ ডিসেম্বর, ২০১১ ইং

  • ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক কুফরী শাসনব্যবস্থা/সংবিধানই দেশের আজকের অস্থিতিশীলতা, অচলাবস্থা ও সংঘাতের প্রধান কারণ

    ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক কুফরী শাসনব্যবস্থা/সংবিধানই দেশের আজকের অস্থিতিশীলতা, অচলাবস্থা ও সংঘাতের প্রধান কারণ

    জনগণের মধ্যে থাকা কিছু অগভীর (ভুল) ধারণা:

    • হাসিনা-খালেদা মহিলা হওয়ায় দেশে সংঘাত ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সুতরাং পুরুষ শাসন এ সংঘাত ও চলাবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
    • সত্যিকারের গনতন্ত্র চর্চা না হওয়ায় এ সংঘাত। সুতরাং সমাধান হল আরও গনতান্ত্রিক হওয়া।
    • মন্দের ভাল হিসেবে বিকল্প না থাকায় এক দলকে ছেড়ে অপর দলকে বেছে নেয়া উচিত।
    • গনতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যতিত বৈধ ও গ্রহণযোগ্য পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়।
    • ডিজিটাল বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাও, নতুন ধারার রাজনীতি… ইত্যাদি
    • তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার, সর্বদলীয় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার, দু নেত্রীর মধ্যকার সংলাপ ইত্যাদি বর্তমান সংকটের সম্ভাব্য সমাধান।

    সংকটের কারণ:

    • ওবামা, বুশ ও মনমোহন সিং এর জীবনব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ’র পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে রাষ্ট্র থেকে দ্বীনকে পৃথক করা হয়েছে। ইসলামী আক্বীদার সাথে যা সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। হাসিনা-খালেদা পরিবার নিয়ন্ত্রিত দ্বি-জোটীয় গনতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজ স্বার্থ সংরক্ষণ ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে ক্ষমতাসীন দলগুলো সুবিধামত সংবিধান পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন করে। আর তা ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর প্রতিকূলে যাওয়ায় সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে।
    • স্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকেরও বেশী সময় ধরে সাম্য, গনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সস্তা শ্লোগানের আড়ালে নব্য ঔপনিবেশবাদের রাজনীতিকে বাস্তবায়িত করার কারণে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত সম্পদের উপর সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন, বৃটিশ ও আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন ভারত বৃটেন নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক মঞ্চে বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষক দালাল স্বরূপ আবির্ভাব ঘটে মুজিব-জিয়া-এরশাদ-হাসিনা-খালেদার। ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় হাসিনা-খালেদা পরিবার নিয়ন্ত্রিত দ্বিজোটীয় গনতান্ত্রিক রাজনীতি এদেশে বিভক্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য আমেরিকা, ভারত, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় এ ধরনের বিভক্তি ও বিশৃংখলা বজায় থাকুক।
    • ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি সবসময় অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেকারণে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থকেন্দ্রিক এ রাজনীতি ক্ষমতাসীন জোটের (হাসিনা কিংবা খালেদা গংদের) লুন্ঠন, দূর্নীতি ও বিশৃংখলার মহোৎসব ছাড়া আর কিছুই নয়। বিরোধী জোটে থাকা দলগুলো পরবর্তী পাঁচবছরের জন্য লুটপাটের সুযোগ পেতে ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তাকে সুগম করতে চায়। আর সরকারী জোট লুটপাট ও দূর্নীতির এ ধারাকে বজায় রাখতে চায়। সুতরাং হালুয়া রুটির ভাগ পেতে ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা নব্বইয়ের পর থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সংঘাতকে অর্ণিবার্য করে তুলছে।

    ‘তুমি কি তাদের কে দেখনি, যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে এবং জাতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তারা দগ্ধ হবে দোযখে এবং যেখানে তারা প্রবেশ করবে সেটা কতই না মন্দ আবাস।’(সূরা ইবরাহিম:২৮-২৯)  

    সমাধান:

    • হাসিনা, খালেদা মহিলা হওয়ায় দেশে এ অস্থিতিশীলতা বা সংকট তৈরি হয়েছে তা সঠিক নয়। বিগত চল্লিশ বছরে মুজিব, জিয়া, এরশাদ বাংলাদেশকে শাসন করলেও আমাদের সমস্যা দূরীভূত হয়নি। তারা সবাই পুরুষ ছিল। সমস্যাটি পুরুষ বা মহিলার নয়, বরং মুজিব, জিয়া, এরশাদও খালেদা হাসিনার মত আমাদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দ্বারা শাসন করায় তাদের সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। উল্টো এসব তথাকথিত শাসক ও তাদের পরিবারের সদস্য ও উচ্ছিষ্টভোগীরা অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে। সুতরাং সমস্যার কারণ বা সমাধান ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যে নেই, বরং মানবরচিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘ইন্না দিনা ই’নদাল্লাহিল ইসলাম..’
    • ডিজিটাল বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাও, নতুন ধারার রাজনীতি…ইত্যাদি সস্তা শ্লোগান অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার, সর্বদলীয় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার, দু নেত্রীর মধ্যকার সংলাপ, আরও বেশী গনতন্ত্রের চর্চা করা ইত্যাদি বর্তমান সংকটের সমাধান নয়। এসব সস্তা শ্লোগান ও ভুল ধারণা সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মূল কারণগুলোকে আড়াল করে এবং জনগনকে বেহুদা বিতর্কের মধ্যে ব্যস্ত রাখে। ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক কুফরী শাসনব্যবস্থাকে খিলাফত দ্বারা প্রতিস্থাপনই এ অস্থিতিশীলতা, সংঘাত ও অচলাবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।
    • বিকল্প না থাকায় একটি জোটকে ছেড়ে অন্য জোটকে মন্দের ভাল হিসেবে বেছে নেয়া সংকট থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখবে না। যেমন: ১৯৯৬ এ খালেদাকে ছেড়ে হাসিনাকে বেছে নেয়ায়, ২০০১ এ আবার হাসিনাকে ছেড়ে খালেদাকে বেছে নেয়ায় এবং ২০০৮ এ খালেদাকে ছেড়ে হাসিনাকে বেছে নেয়ায় দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, বরং পালাক্রমে এই দুই পরিবার লুটপাট ও দূর্নীতির সুযোগ পেয়েছে। কোন সরকারের সময় বিগত সরকারের চেয়ে একশ খুন কম হলে, পঞ্চাশটি ধর্ষণ কম হলে, পঞ্চাশটি ডাকাতির ঘটনা কম হলে সে সরকার ভাল হয়ে যায় না। বরং পবিত্র কোরআন অনুসারে অন্যায়ভাবে একটি হত্যাও গোটা মানবজাতিকে হত্যার শামিল। মন্দের ভাল কিছু ইসলামে নেই।

    ‘…নিশ্চয়ই সত্য মিথ্যা থেকে আলাদা হয়ে গেছে…।’ (সূরা আল বাক্বারা:২৫৬)
    ‘ভাল ও মন্দ কখনওই এক হতে পারে না।…’ (সূরা হামীম সিজদাহ:৩৪)
    ‘বলুন: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’ (সূরা বনী ইসরাইল: ৮১)

    • গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচন এ জুলুম প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার একটি মাধ্যম। একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহ অনুসরণ করে ক্ষমতাশীল লোকদের থেকে নুসরাহ(বস্তুগত সাহায্য) লাভ করে নুবয়্যতের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যর্থ কুফরী ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব। আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম বর্ণণা করেন, আমি আবু হুরাইরার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেন,

    বনী ঈসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, একজন নবীর মৃত্যুর পরে আসতেন আরেকজন নবী। আমার পরে আর কোন নবী আসেবেন না, আমার পরে আসবে খলিফা এবং তারা হবে সংখ্যায় অনেক।সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি আমাদেরকে কি নির্দেশ দিচ্ছেন (এই ব্যাপারে) ?” তখন তিনি উত্তর দিলেন, “তোমরা তাদের একজনের পর আরেকজনের কাছে আনুগত্যের শপথ (বাইয়াহ) পূরণ করবে, তাদেরকে তাদের অধিকার দেবে এবং আল্লাহ তাদেরকে তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন। “

    • নুবয়্যতের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যর্থ কুফরী ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশকি শক্তি(আমেরিকা, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ও আধিপত্যবাদী শক্তির(ভারত) রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে এবং জনগনের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি সুনিশ্চিত করা যাবে।
    • ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি সবসময় অর্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু ইসলামিক শরী’আহ রাজনীতি থেকে অর্থকে পৃথক করেছে এবং রাজনীতি করার সাথে আখেরাতের সাফল্যকে সর্ম্পকযুক্ত করেছে বলে এ ব্যবস্থায় শাসকের ক্ষমতালিপ্সু, দূর্নীতিবাজ ও জনগনের সম্পদ লুন্ঠনকারী হওয়া সম্ভব নয়।
      আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত রাসূল(সা) বলেন,

    ‘শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ’র আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুওতা) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। তাঁরা হলেন, একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক,…।’

    রাফীম আহমেদ

  • খিলাফত ও ভারতীয় উপমহাদেশ

    খিলাফত ও ভারতীয় উপমহাদেশ

    খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের পর আরও একটি বার্ষিকী অতিক্রম করছে মুসলিম উম্মাহ। এই মুহুর্তে অতিব জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস ফিরে দেখা এবং এই পতন ও ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল তা খতিয়ে দেখা। ধারণা করা হয়, খিলাফত ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের ও তৎকালীন আলেম-ওলামাদের কোন প্রতিক্রিয়াই ছিল না এবং তারা এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন নি। কিন্তু এটি সত্য না; ইতিহাস সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট যে, মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, কিভাবে তাঁরা এটি রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন এবং আল্লাহর ছায়াকে দুনিয়া থেকে নির্মূল হতে দেখে কীরূপ কষ্ট সহ্য করেছিলেন। এই ভারত উপমহাদেশের মুসলিম ও তাদের গড়ে তোলা খিলাফত আন্দোলন তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ।

    মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া জানার পূর্বে আমাদের জেনে নেয়া দরকার কিভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা এই ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিল। যেখানে ইসলামি উম্মাহর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বসবাস। সংখ্যায় যার পরিমাণ প্রায় অর্ধ বিলিয়ন, অর্থাৎ ভারতে ২৫০ মিলিয়ন মুসলিম, পাকিস্তানে ১৬০ মিলিয়ন মুসলিম এবং বাংলাদেশে ১২০ মিলিয়ন মুসলিম। বস্তুত উর্দূ হচ্ছে যথা সম্ভব এই উম্মাহর সবচেয়ে বহুল উচ্চারিত ভাষা। এমনকি আরবী অপেক্ষাও বেশি।

    ভারতে খিলাফতের ইতিহাস:

    ৭১১ খ্রিষ্টাব্দ; মুসলিম বণিকেরা সীলন (Ceylon) থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নোঙর ফেলেছিলেন সিন্ধু উপকূলে। কিন্তু তাদের জাহাজ লুট করা হয় এবং মুসলিমদের আটক করে জেলবন্দী করা হয়। এই খবরটি তৎকালীন খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানীতে খলীফা আল ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের কানে পৌঁছল। তিনি তৎকালীন বাগদাদের ওয়ালী (গভর্নর) হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে চিঠি পাঠালেন যেন সে তৎক্ষণাত সিন্ধুর শাসক প্রধানের কাছ থেকে ক্ষমা আদায়ের ব্যবস্থা করে ও মুসলিমদের মুক্ত করে। একদল সেনাবাহিনী পাঠানো হলো যার নেতৃত্বে ছিলেন এই উম্মাহর দীপ্তিমান সন্তানদের মধ্যে একজন। এই যুবকের নামটি সকল মুসলিম বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের অন্তরে এক উচ্চ স্থান দখল করে আছে। এই যুবকের কাঁধেই দায়িত্ব পড়েছিল খিলাফাহ্ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে একটি অপরিচিত ভুমিতে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যাওয়ার। তাঁর নাম মুহাম্মদদ বিন কাসিম আল-ছাকাফী। বিলাদ-আল-হিনদ মুক্তকারী।

    যখন খিলাফত রাষ্টের সেনাবাহিনী দিবাল পৌঁছাল (বর্তমান করাচির কাছাকাছি), মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর দাবীসমূহ রাজা দাহিরের কাছে তুলে ধরলেন। রাজা দাবীসমূহ প্রত্যাহার করেছিলো এবং ফলাফলসরূপ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল ও তার রাজ্য দখলে নেয়া হয়েছিল।

    এই সফলতার পরপরই মুহাম্মদ বিন কাসিম আরও অভিযান পরিচালনা করেছিলেন যেহেতু মুসলিম বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের বাণীকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরা। এই আকীদার জোরেই মুসলিম সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে করতে মূলতান পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ৭১৪ খ্রিষ্টাব্দতে সমগ্র সিন্ধু অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের নিম্নাঞ্চল খিলাফত রাষ্ট্রের হুকুমের অধীনে চলে এসেছিল।

    ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল বিজিত হওয়ার পর তাঁর সেনাবাহীনী মূর্তিপূজারীদেরকে অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর প্রশাসনে মুসলিম ও অমুসলিম বিভেদ ছিল না। তিনি বিজিত ভুমিসমূহের অমুসলিম কর্মকর্তাদের তাদের আগের জায়গায় বহাল রেখেছিলেন।

    মুহাম্মদ বিন কাসিম খিলাফতের অধীনস্ত প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “মানুষের ব্যপারে সততা ও রাষ্ট্র সৎভাবে পরিচালনা কর। কর নির্ধারন করো মানুষের পরিশোধ করার সামর্থ্য অনুযায়ী।

    খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের সময় অর্থাৎ ৭২৪ থেকে ৭৪৩ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে কাশ্মীর ও কাঙ্গারা খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। এবং ৭৫৪ থেক ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আব্বাসীয় খলীফা আবু জাফর আল মানছুর কান্দাহার মুক্ত করেন এবং তাঁরই প্রচেষ্টায় সংগঠিত ভাবে সমগ্র ভারত উপমহাদেশে খিলাফত রাষ্ট্রের সীমান্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৭৮৬-৮০৯ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে, হারুন আর রশীদের খিলাফত আমলে মুসলিম আর্মি সিন্ধু সীমান্ত বৃদ্ধি করে গুজরাট (অর্থাৎ বর্তমান ভারতে) পর্যন্ত নিয়ে যায়। এই সময়ে এসেই মুসলিম সেনাবাহীনী স্থানীয় ভাবে বসবাস শুরু করেছিল এবং নতুন শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। এই সময়ে পর থেকেই ব্যাপক সংখ্যক ভারতীয়রা তাদের কুফর সামাজিক বর্ণবাদী সংস্কৃতির ভিত্তিহীনতা থেকে উঠে এসে বিশ্ব ভাতৃত্বের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা সন্ধান পেয়েছিল ইসলামের আলোর, আল্লাহর ইবাদাতের এবং পরিত্যাগ করেছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন কুফর, অজ্ঞতা ও মিথ্যা মুর্তিপূজা। ইসলাম শাসন করেছিল যা বর্তমানে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে পরিচিত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে।

    ওরিয়েন্টালিস্টরা (প্রাচ্যবাদী) যে ভাবে ভারতের ইতিহাসে তুলে ধরে তার বিপরীতে আমাদের বুঝতে হবে যে ভারত খিলাফতের উইলায়া’হ ছিল। কিছু খলীফার অবহেলার কারণে কিছুকাল এটি অপর্যবেক্ষিত অবস্থায় ছিল এবং একে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তথাপী, শাসকবর্গ এখানে আহকাম শরী’আহ বাস্তবায়িত অবস্থায় রেখেছিলেন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার পূর্ব পর্যন্ত এটি দার-উল-ইসলামের অংশ ছিল।

    মুসলিম ইতিহাসবিদ, ইবনে কাসীর আল-দামিস্কি (মৃত্যু- ৭৭৪ হিজরী) তাঁর বিখ্যাত কর্ম ‘আল-বিদায়াহ-ওয়ান-নিহায়াহ’ তে ইন্ডিয়াকে দার-উল-ইসলামের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর বিজয়ের ব্যাপারে কিছু হাদীসও উল্লেখ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত:

    হে আমার সত্য বন্ধু, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “এই উম্মতের সেনাবাহিনী সিন্ধু ও আল-হিন্দ পর্যন্ত পৌঁছাবে। আমি যদি এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই এবং শহীদ হই তবে তা একটি (মঙ্গলজনক) বিষয়, আর আমি যদি ফিরে আসি তবে আমি হব মুক্ত আবু হুরায়রা। মহিমান্বিত রব আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন”। (আহমাদ)

    ভারতবর্ষ খিলাফতের অধিভূক্ত প্রদেশ ছিল সমগ্র দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মুঘল আমলে (১৫২৬ – ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) শুধুমাত্র আকবরের শাসনামল ব্যতীত যেহেতু সে ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল এবং দ্বীন-ই-ইলাহী নামে নতুন ধর্মের প্রবর্তন করেছিল।

    বার শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশে মুহাম্মদ ঘূড়ি (Mohammad of Ghor) ইন্দো-গঙ্গা অববাহিকা (Indo-Gangetic Plain) আক্রমণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিজিত হয় গজনী, মূলতান, সিন্ধু, লাহোড় এবং দিল্লী। তাঁর একজন সেনাপ্রধান কুতুব উদ্দীন আইবেগ দিল্লীর সুলতান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তের শতাব্দীদে শামসুদ্দিন ইলতুতমিস (১২১১-১২৩৬), একজন অভিজ্ঞ তুর্কী দাস যোদ্ধা দিল্লীর ক্ষমতায় আসলে পরবর্তী সুলতানদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির পথ সুগম হয়। পরবর্তী ১০০ বছরে দিল্লী সুলতানীয়াত প্রসারিত হয়ে পূর্ব বাংলা এবং দক্ষিণ ডেক্কান (Deccan) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাঁচ রাজবংশ দ্বারা দিল্লী সুলতানীয়াত শাসিত হয়েছিল) মামলূক বংশ (১২০৬-৯০) খলজী বংশ (১২৯০-১৩২০), তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৩), সৈয়দ বংশ (১৪১৪-৫১) এবং লোদী বংশ (১৪৫১-১৫২৬)।

    মধ্য এশিয়ার বংশোদ্ভূত বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লী দখলে নেন এবং সর্বপ্রথম মুঘল শাসক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৫৩০ সালে তার পূত্র হুমায়ুন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় (১৫৩০-৫৬)। ভোপাল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত একটি ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, বাবর তার পূত্রকে নিম্নলিখিত অছিয়ত নামা দিয়ে গিয়েছিল। যা থেকে বুঝা যায় তার মধ্যে কিছু ভূল থাকলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন :-

    “পূত্র! নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিও: কোন ধর্মের প্রতি ঘৃণা পোষণ করিও না। তুমি অব্যশই ন্যায় বাস্তবায়ন করবে তথাপী মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও আচার সমূহ মাথায় রেখে। কিছু সময় গরু জবাই করা থেকে বিরত থাকো। যাতে স্থানীয়দের অন্তরে স্থান করে নিতে পারো। এটি তোমাকে জনগনের আরো নিকটবর্তী করবে।

    কোন ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থান ধ্বংস করো না এবং সকলের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো যাতে দেশে শান্তি সুনিশ্চিত হয়। ইসলামের দাওয়াত ভালোভাবেই পৌছে দেয়া সম্ভব দয়া ও ভালাবাসার তলোয়ার দিয়ে, জুলুম ও অত্যাচারের তলোয়ার বদলে। শিয়া সুন্নীর মধ্যকার বিভেদ সমূহ এড়িয়ে চলো। তোমার জনগণের বিবিধ বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যবেক্ষণ কর ঠিক যেভাবে ঋতু সমূহের বিবিধ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।”

    আমাদের ইতিহাস নেয়ার ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে কেননা ভারতবর্ষ ও ইসলামের বেশির ভাগ ইতিহাস লেখা হয়েছে ওরিয়েন্টালিষ্টদের (প্রাচ্যবাদী) দ্বারা। আমরা অবশ্যই স্বীকার করি যে, ভারতবর্ষের কিছু মুসলিম শাসক ইসলামী হুকুমের অপপ্রয়োগ করেছিলেন এবং কতিপয় অন্যায় সম্পাদন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ভারতীয় উপমহাদেশ দার-উল-ইসলামের অন্তর্ভূক্ত ছিল যেহেতু ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়িত অবস্থায় ছিল। প্রধান শহরগুলোর আদালতের নথীসমূহ যা এখনো বিদ্যামান তাতে দেখা যায় যে ইসলামী শরীয়া ব্যতীত অন্য কোন, আইনের উৎসই গ্রহণযোগ্য ছিল না।

    অপপ্রয়োগ খিলাফত, ওয়ালী (গভর্নর) কিংবা আমীল (মেয়র)-এর (শর’ঈ বৈধতা) বাতিলের দলীল হতে পারে না। অসংখ্য হাদীস রয়েছে যেখানে যদি অত্যাচারীও হয় তারপরও আমীরের আনুগত্য ফরয করা হয়েছে যতক্ষণ পযন্ত সে শরীয়া বাস্তবায়ন করে এবং কোন কুফর বাওয়াহ (সুস্পষ্ট কুফরী) সম্পাদন না করে।

    আনাস বিন মলিক থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “শুন এবং মান্য কর, এমনকি যদিও তোমরা শাসিত হও একজন আবীসীনিয়ান দাস কর্তৃক যার মাথা কিসমিসের ন্যায়

    অন্য এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    যতক্ষণ পর্যন্ত সে তোমাদের আল্লাহর কিতাব দিয়ে পরিচালনা করে।

    মুসলিম বর্ণনা করেছেন আউফ বিন মালিক থেকে বর্ণিত আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি,

    তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ভালোবাসো এবং সে তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তার জন্য দোয়া কর এবং সে তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ঘৃনা কর এবং সে তোমাদের ঘৃণা করে। তোমর তাকে অভিসম্পাত কর এবং সে তোমাদের অভিসম্পাত করে।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম। “হে রাসূলাল্লাহ, আমরা কি তার বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না? ? তিনি (সঃ) বললেন। “না! যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম করে। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ একজন ওয়ালী দ্বারা শাসিত হও এবং তাকে গুনাহে নিমজ্জিত দেখতে পাও, তবে সে যেন আল্লাহর বিরূদ্ধে কৃত গুণাহকে ঘৃণা করে। কিন্তু আনুগত্য হতে যেন হাত সরিয়ে না নেয়।

    আহমাদ ও আবু দাউদ হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    হে আবু যর, তুমি কি করবে যদি কোন ওয়ালী গণীমত ভোগদখল করে ও তোমাকে তা থেকে বঞ্চিত করে?” তিনি বললেন, “সে সত্তার কছম যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, আমি তরবারী তুলে নিব এবং ততক্ষণ যুদ্ধ করব যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনার সাথে মিলিত হই।” এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “আমি তোমাকে এমন কিছু বলব যা এর থেকে উত্তম। ধৈর্য্যশীল হও এবং সহ্য কর যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সাথে মিলিত হও।”

    ভারত যে বৈশ্বিক খিলাফতের অংশ ছিল তা অমুসলিম লেখকরাও বর্ণনা করেছেন। যেমন হিন্দু লেখক শশী এস শর্মা তার বই ‘Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis’ এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:

    “দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬) তার সর্বশেষ অস্তিত্ব পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিম সাম্রাজ্যের বৈধ অংশ ছিল যার কার্যক্রম আব্বাসীয় খলিফাদের বৈধ অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুলতানগন নিজেদেরকে খলীফার ডেপুটি মনে করতেন এবং তাদের নির্বাহী ও আইনী কর্তৃত্ব (খলীফার দেয়া) প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই বৈধতা পেত। যেহেতু সকল সম্প্রদায়ের (উম্মাহর) সামগ্রিক কর্তৃত্বের বৈধতা খলীফার ছিল। তাই প্রত্যেক রাজা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি ইসলামের ইমামের জন্য ও তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনক্ষমতা পালন করার দাবী করত। “[Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 247]

    মুহাম্মদ শাহ বাহমান (১৪৬৩-৮২), উসমানীয় সুলতান মুহাম্মদ ২য়কে একমাত্র যোগ্য খলীফা বলে সম্বোধন করত। বিজাপুর রাজ্য তুর্কী (উসমানী) প্রতীককে রাজ্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। গুজরাটের নেতৃস্থানীয় উচ্চ বংশীয় মালিক আয়ায সুলতান সেলিম ১মকে পৃথিবীর খলীফা বলে সম্বোধণ করেছেন। মূঘল সম্রাটেরা যে তুর্কীর সুলতানের প্রতি অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন যার প্রমান পাওয়া যায় দিল্লী ও ইস্তাম্বুলের মধ্যে আদান প্রদানকৃত কিছু চিঠিপত্রে। সুলতান সুলাইমানকে লেখা একটি পত্রে, হুমায়ুন (ভারতের সম্রাট) তাঁকে সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলী সমৃদ্ধ খলীফা বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার খিলাফতের শাশ্বত চিরস্থায়িত্বের জন্য দোয়া করেছিলেন। তিনি সুলতানকে ইঙ্গিত করে একটি কোরআনের আয়াত ও উল্লেখ করেছিলেন “তিনি (আল্লাহ) আপনাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন। সুলতান ইব্রাহীম শাহজাহানকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যেখানে তিনি নিজেকে বিশ্বের সম্রাটদের নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল রূপে উল্লেখ করেছেন যিনি খিলাফতের আসনে আসীন হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। আহমাদ আকা, একজন তুর্কী প্রতিনিধি সুলতানের পক্ষ থেকে ১৬৯০ সালে একটি সরকারী পত্র নিয়ে আওরঙ্গজেবের মহলে এসেছিল যা কুরআনের আয়াত দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল এবং সুলতান নিজেকে ইসলামের খলীফা বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৭২৩ সালে মুহাম্মদ শাহ (১৭১৯-১৭৪৮) মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ইস্তাম্বুলের তুর্কী সম্রাটের সাথে চিঠি আদান-প্রদান বজায় রাখেন। তাঁর চিঠিতে মুহাম্মদ শাহ সুলতানকে মহান সম্রাটদের আশ্রয়দাতা ‘মর্যাদাবান সম্রাটের নিরাপত্তাদানকারী’, ‘সম্মানীত খিলাফতের রূপকার’ এবং ‘শরীয়তের আদর্শ প্রচারকারী’ বলে সম্বোধন করেছিলেন,” [Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 248-249]

    কিছু প্রাচীন নিদর্শন খিলাফত ও ভারতের মধ্যে সংযোগের চিত্রও তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ (১২১১-৩৬) যিনি ভারতের ওয়ালী ছিলেন, তাঁর সময়কার রৌপ্য মূদ্রার একপাশে খলীফা আল মুসতানসীরের নাম এবং অন্য পাশে খিলাফতের সাহায্যকারী হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেছিলেন।

    এমনকি ১২৫৮ খৃষ্টাব্দে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর যখন খলীফা আল-মুসতা’সীমের মৃত্যু হয়, তারপরও ভারতের মূদ্রায় তাঁর নাম ব্যবহার অব্যাহত ছিল।

    ভারত ইসলামী শাসনামলে মহান আলেমদের জন্ম দিয়েছে যেমন শেখ আহমাদ সিরহিন্দী (দীল্লীতে মৃত্যু বরণ, ১৬২৪ খ্রিঃ) যিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানী নামেও পরিচিত। তিনি ফিকহ শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। তিনি উসমানী শাসকদের নিজের মতামত পেশ করে ৫৩৬ টি চিঠি লিখেছিলেন যে গুলোকে একত্রে ‘সংগৃহীত পত্র’ বা ‘মাকতুবাত’ বলা হয়।

    শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২ খৃঃ) ভারতের সবচেয়ে সম্মাণিত আলেমদের মধ্যে একজন এবং তিনি দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরের প্রায় সকল দল ও মাযহাবের কাছে সমান ভাবে গ্রহণীয় ও সম্মানিত। তিনি তার উর্বর লেখনী ক্ষমতার দ্বারা অসংখ্য ইসলামি বিষয়ে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে কুরআনের আয়াত থেকে উর্দু অনুবাদকর্ম যা অন্যতম পুরোনো ও মাধূর্য্যময় একটি অনুবাদকর্ম। এছাড়া তিনি কোরআন অনুবাদ করেছেন সংস্কৃত ভাষায়, যদিও সমসাময়িক মুসলিম আলেমরা কুরআন কে তার প্রকৃত ভাষায় রাখার পক্ষে ছিলেন তবে পরবর্তীতে ভারতের ইসলামি আলেমরা তাঁর এই কর্মকে গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং সমালোচনার পরিবর্তে স্বাগত জানিয়েছেন। এছাড়াও তারঁ বিখ্যাত কর্মের মধ্যে রয়েছে হুজ্জাত-আল-বালিগাহ এবং আল-তাফহীমাত আল-ইলাহীয়া’। শাহ ওয়ালী উল্লাহ ‘ইজালাত আল খীফা’ তে খিলাফত সম্বদ্ধে বলেছেন-“খিলাফত হচ্ছে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির নেতৃত্ব যার উত্থান হয়েছে দ্বীন বাস্তবায়নের জন্য তথাপী ইলমের শাখা সমূহ পুণর্জাগরণ, ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, জিহাদ পরিচালনা, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, যোদ্ধাদের পুরস্কৃতকরণ বিচার ব্যবস্থা তৈরী ও আইন প্রয়োগ অপরাধ দমন এই সবগুলো কাজ বাস্তবায়ন এর দ্বারা করতে হবে যেন তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিনিধিত্ব করে”।

    ইসলামের উলাইয়া আম্মা (আম বা সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) গ্রহণযোগ্য:

    ভারতীয় উপমহাদেশকে খলীফাদের পক্ষ থেকে উলাইয়া আম্মা (সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) দেয়া হয়েছিল যা শরী’আর হুকুম অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিত্ব। এটা সত্য যে খলীফাগণ উলাইয়াত বা প্রদেশগুলোর ব্যাপারে অনুসন্ধান, সরাসরি প্রতিনিধি নিয়োগ ও অপসারনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। এটি একটি রীতিতে পরিণত হয়েছিল যে সরাসরি নিয়োগের পরিবর্তে যেই প্রাদেশিক ক্ষমতা গ্রহণ করতো তাকেই মেনে নেয়া হত। তা সত্ত্বেও যেহেতু তাদেরকে গ্রহণ করা হত তাই তাদের কর্তৃত্ব খলীফা কর্তৃক সমর্থিত ছিল।

    নিম্নে দুই ধরণের উইলায়াতের পক্ষে ইসলামি দলীল তুলে ধরা হল, যা নেয়া হয়েছে শেখ তাকী উদ্দীন আন নাবহানী ও শেখ আব্দুল কাদীম যাল্লুম কর্তৃক লিখিত বই The Ruling System in Islam (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা) এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে,

    “ওয়ালী (গভর্নর) হচ্ছেন খলীফার প্রতিনিধি। তিনি সেই সকল কার্যই সম্পাদন করেন যে সকল কাজের জন্য খলীফা তাকে নিজের পক্ষে কর্তৃত্ব দান করেন। শরী’য়ায় উইলায়ার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। সুতরাং খলীফার পক্ষ থেকে কোনো হুকুমের ব্যাপারে যিনিই নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন তিনিই হবেন ওয়ালী। পাশাপাশি সে সকল শর্তের ভিত্তিতে খলীফা তাকে নিয়োগ দিবেন। তবে কোন একটি দেশের উইলায়াহ ভৌগলিক ভাবে নির্দিষ্ট। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) ওয়ালী নিয়োগের ক্ষেত্রে আয়তন নির্ধারন করে দিয়েছেন অর্থাৎ যেখানে তিনি (সা) আমীরকে ইমারত (শাসনকর্তৃত্ব) সহকারে নিয়োগ দিয়েছেন।

    দুই ধরনের উইলাইয়া রয়েছে: সাধারণ ও বিশেষ। সাধারণ উইলায়াতে সকল ধরনের হুকুমি ব্যাপার সমূহ নিযুক্ত থাকবে। উক্ত উইলায়ার কাউকে নিয়োগের অর্থ দাঁড়ায় খলীফা উক্ত ওয়ালীকে নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব স্বরূপ ইমারাহ প্রদান করেছেন। যিনি উইলায়ার জনগণের সকল স্বাভাবিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য, নিয়োগ প্রাপ্ত। সুতরাং তিনি সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। অন্যদিকে বিশেষ ইমারা হচ্ছে যেখানে আমীর নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশে সীমাবদ্ধ বিষয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত যেমন- সৈন্য পরিচালনা, নাগরিকদের শাসনকার্য পরিচালনা, ভুমি প্রতিরক্ষা আর নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দান। কিন্তু বিচার বিভাগ পরিচালনা, খারাজ ও সদকা আদায়ের ব্যাপারে তার কর্তৃত্ব থাকবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণ দায়িত্ব (উইলায়া আম্মা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) যখন আমরু বিন হাযমকে ইয়েমেনে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তেমনি ভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) বিশেষ দায়িত্ব (উইলায়া খাসসা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) আলী বিন আবি তালিবকে ইয়েমেনের বিচার বিভাগের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। খলীফাগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ানকে আল-শামের সাধারণ ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলন। অন্যদিকে আলী বিন আবি তালিব আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসকে বসরায় শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বিশেষ ক্ষমতা (উইলায়া খাসসা) সহকারে নিয়োগ দিয়েছিলেন, বায়তুল মালের দায়িত্ব ব্যতিত, যেখানে নিয়োগ দিয়েছিলেন যিয়াদকে।

    শুরুর দিকে দুই ধরনের উইলায়াহ প্রচলিত ছিল: উইলায়াহ সালাহ্ এবং উইলায়াহ খারাজ। তাই ইতিহাসে উইলায়ার আমীরের ক্ষেত্রে দুই ধরণের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়: প্রথমটি হচ্ছে সালাতের উপর ইমারাহ্ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সালাহ ও খারাজের উপর ইমারাহ। অন্য কথায় আমীর নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন সালাত ও খারাজ উভয়ের উপর অথবা শুধুমাত্র সালাতের উপর। এখানে উইলায়াহ বা ইমারাহ এর ক্ষেত্রে সালাহ শব্দটি শুধুমাত্র নামাযে নেতৃত্ব দেয়া বুঝাচ্ছে না কারণ হচ্ছে সালাহ শব্দটি শাসনকার্যের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় যেখানে বায়তুল মালের খাজনা বা কর অন্তর্ভূক্ত নয়। তাই ওয়ালী যদি সালাহ এবং খারাজ উভয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তবে ঐ উইলায়াহ হবে সাধারণ (উইলায়াহ আম্মা)। আর তার উইলায়াহ যদি সীমাবদ্ধ হয়, শুধুমাত্র সালাহ অথবা শুধুমাত্র খারাজের জন্য, তবে ঐটি বিশেষ উইলায়াহ (উইলায়াহ খাসসা) উভয় ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণরূপে খলীফার এখতিয়ারভূক্ত, যেহেতু তাঁরই অধিকার রয়েছে উইলায়াহকে সীমাবদ্ধ করার যা হতে পারে খারাজের ক্ষেত্রে, বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে, অথবা খারাজ, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনী ছাড়াও অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে। তিনি প্রদেশ উইলায়াহ পরিচালনায় যা ভাল মনে করবেন তাই করবেন। কারণ শরী’য়াহ ওয়ালীর কার্যক্রম নির্দিষ্ট করে দেয় নি এবং তিনি শাসনব্যবস্থার সকল কার্য পরিচালনায়ও বাধ্য নন। তবে এটি অবশ্যই নির্ধারিত যে ওয়ালী বা আমীর শাসনকার্যের কর্তৃত্বের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তিনি খলীফার প্রতিনিধি এবং তিনি অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আমীর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এই সকল বিষয় উঠে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মকান্ডের মধ্যে। তবে শরী’আহ খলীফার জন্য ওয়ালী নিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে, হোক সে সাধারণ উইলায়াহ (উইলায়াহ আম্মা) বা বিশেষ উইলায়া (উইলায়া খাসসা) যা তাঁর (খলীফার) নিজস্ব এখতিয়ারভূক্ত এবং এর সবই রাসূলুল্লাহ (সা) এর কার্যকলাপ দ্বারা প্রমাণিত।

    সীরাত ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফারওয়া বিন মুসাইককে মুরাদ, যুবাইর ও মিজহাজ গোত্রের উপর নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর তাঁর সাথে খালিদ বিন সাইদ বিন আল আসকে সদাকার ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

    এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) যিয়াদ বিন লবীদ আল-আনসারীকে হাদারামাউতে সদাকাহর ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি (সা) আলী বিন আবী তালিবকে নাযরানে পাঠিয়েছিলেন সদাকাহ ও যিজিয়া আদায়ের জন্য। এছাড়াও তিনি (সা) তাকে (আলী) (রা) ইয়েমেনে কাজী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যেভাবে আল- হাকিম থেকে বর্ণিত হয়েছে।

    কিতাবুল ইসতিয়াব থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) মুয়ায বিন জাবালকে আল-জানাদে নিয়োগ দিয়েছিলেন মানুষকে কুরআন ও ইসলামি আইন শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং তাদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য। তিনি (সা) তাকে ইয়েমেনের আমিলদের নিকট থেকে সদাকাহ আদায়ের জন্যও নিয়োগ দিয়েছিলেন। সীরাত ইবন হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) উহুদ যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে ইবনে উম্মে মাকতুমকে আল-মদীনায় সালাতের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। [The Ruling System in Islam, Sheikh Taqi-ud-deen-an-Nabhani & Sheikh Abdul Qadeem Zalloom, Al-Khilafah Publications]

    ভারতে বৃটিশ আগ্রাসন ও মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া:

    ঔপনিবেশিকদের ক্রমাগত কুটচাল ও মুসলিম উম্মাহর বহুলাংশে বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের দরুণ, কুফফাররা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রভাব বিস্তারের সুপ্ত ইচ্ছার প্রতিফলনের সুযোগ খুঁজে পায়। ১৬০০ খ্রিঃ বৃটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করে। এটা ছিল বেদনাদায়ক যুগের সূচনা যখন বৃটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা উম্মাহর ভূমি ও সম্পদ লুন্ঠন করা শুরু করে। তারা মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝেও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

    বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশের আক্রমণ করে ১৮১৯ সালে, যখন তারা মুসলিমদের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এই যুদ্ধ উপমহাদেশে ইসলামি কর্তৃত্ব ও আক্রমণকারী বৃটেনের মধ্যে কিছু কুফর শক্তি যথা হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য কুফর শক্তির সাহায্যে পাল্টাপাল্টি সফলতার মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। বৃটেন মুসলিমদের সাথে ২৭ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৮৪৬ সালে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেয়।

    এই সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে যেহেতু মুঘল উইলায়াহ দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তাই এর অন্যান্য অংশের শাসকবর্গ ইস্তাম্বুলে খলীফার কাছ থেকে সাহায্য ও (শাসনকতৃত্বের) বৈধতা চেয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ কান্নুরের রাণী ১৭৭৯ সালে সুলতান আব্দুল হামিদকে উদ্দেশ্য করে একটি কুটনীতিক পত্র লিখেছিলেন, যেখানে তিনি, খলীফার কাছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে নিরাপত্তার আরজি করেছিলেন। মাইসুরের টিপু সুলতান (বৈধতা) অন্বেষণের পর খলীফার কাছ থেকে একটি স্বীকৃতি পত্র পেয়েছিলেন যেখানে তাকে মাইসুরের শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

    বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা ভারত থেকে ইসলামি শাসন সরিয়ে দেয়ার পরও মুসলিমরা ইস্তাম্বুলের খলীফার প্রতি অনুগত ছিল। অনেকে জিহাদ পরিচালনা অব্যাহত রেখেছিল যেমন বিখ্যাত সায়্যিদ আহমাদ শহীদ। অন্যান্যরা বিশেষ করে ইয়াগিস্তানের (আফগানিস্তানের পূর্বে পশতুন উপজাতীয় অঞ্চল, সংযুক্ত হেয়াট, কান্দাহার, কাবুল, গাজনী ও কাবুল যা বৃটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল) আলেমগণ ঔপনিবেশিকদের বিরূদ্ধে জিহাদ পরিচালনা ও সংগঠিত করেছিলেন।

    গ্রীক-তুর্কী যুদ্ধের ফলাফল যখন উসমানী খিলাফতের পক্ষে এসেছিল, তখন ভারতের মুসলিমেরা মওলানা আব্দুল বারীর নেতৃত্বে লাখনৌতে একটি সৌজন্য বৈঠক করে সুলতানকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত যখন বলকান এবং ত্রিপোলী যুদ্ধে দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন মুসলিমেরা পশ্চিমা শক্তির খিলাফতকে দূর্বল করে দেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরূদ্ধে গর্জে উঠেছিল।

    মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, যিনি খিলাফতের পক্ষের একজন অবিসংবাদিত কর্মী এবং বৃটিশ বিরোধী অবস্থানের জন্য সুপরিচিত, তিনি বৃটেনের লিংকন কলেজ থেকে মাত্র স্নাতক শেষ করে ফিরেছিলেন। ১৯১৪ সালে লন্ডন টাইমসে প্রকাশিত একটি অনুচ্ছেদের প্রতিউত্তরে তিনি ছত্রিশ ঘন্টা বৈঠকের সম্পাদকীয় ‘The Choice of Turks’ লিখেছিলেন। ১৯১২ তে বলকান যুদ্ধ শুরু হলে তিনি অর্থ যোগানের সনির্বন্ধ আবেদন করেছিলেন এবং তুর্কীর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি মেডিকেল মিশন প্রেরণ করেছিলেন।

    ভারতের সুপ্রসিদ্ধ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল-উলুম-দেওবন্দের প্রধান, শাইখ-উল-হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, বলকান ও ত্রিপোলী যুদ্ধে খিলাফতের সাহায্যার্থে অর্থ-সংগ্রহের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করেছিলেন। মওলানা হোসাইন আহম্মদ মাদানী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, “বলকান ও ক্রিপোলীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মওলানা মাহমুদ হাসানের মনে ও হৃদয়ে দুঃখের ছাপ ফেলেছিল। এটিই তাঁকে তার পূর্বসূরী মওলানা কাসিম নানুতভির (যিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং সোভিয়েত-তুর্কী যুদ্ধে খিলাফতের পক্ষে সহযোগীতা করেছিলেন) দেখিয়ে দেওয়া পথে পরিচালিত করে। মওলানা মাহমুদ হাসান ইসলামের স্বার্থে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং উসমানী সাম্রাজ্যের পক্ষে সম্ভাব্য সকল সাহায্য বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দ বন্ধ রাখার ফতোয়া দিয়েছিলেন, উসমানী সাম্রাজ্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন, তুর্কীতে ছাত্র প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, নিজেই একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপরও তিনি উসমানী সাম্রাজ্যকে তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া সাহায্যে সন্তুষ্ট ছিলেন না। এর মূল কারণ ছিল বলকান যুদ্ধের ফলাফল যা তাঁর মত মুসলিম স্বপ্নদর্শীদের বিচলিত করে দিয়েছিল। তাঁরা জানতেন যে ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা ইসলামের মশাল থেকে বিচ্ছুরিত আলো নিভিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তার উপর মিঃ স্কুইবদের মত বৃটিশ শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা, মুসলিমদের উপর রাশিয়ার পরিচালিত নৃশংসতা এবং তুর্কীর বিভাজন এই বিশ্বাসকে আরো পাকাপোক্ত করেছিল যে, বহুদিনের প্রতিপালিত গ্ল্যাডস্টোনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সময় শ্বেতাঙ্গদের চলে এসেছে।” [Naqsh-E- Hayat, Vol.2, pg.140]

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, কুফর শক্তির ধ্বংস কামনা করে, (তুরস্কের) সুলতান ও তাঁর আর্মির সফলতার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে ভারতের মসজিদগুলোর খুতবা উষ্ণ দোয়ায় প্রতিধ্বনিত হতো। যখন মওলানা শওকত আলী, যিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কেন তিনি তুরস্কের সুলতানের নামে খুতবা পড়েছিলেন, তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে দোষ দিতে পারো না যদি ইসলামের খলীফা একই সাথে তুর্কীর সুলতানও হয়।” [The Khilafat Movement, Gail Minault, Oxford University Press, 1982, p.55]

    খিলাফত রাষ্ট্র ভারতের মুসলিমদের এই প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাদের একে (খিলাফতকে) সাহায্য করতে ও বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে আহ্বান করেছিল।

    খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানী ইস্তাম্বুল থেকে আরবী সংবাদপত্র ‘আল-জাওয়াইত’ প্রকাশিত হত। এই ‘আল-জাওয়াইত’ এর পরিচালক ভারতের দারুল-উলুম-দেওবন্দের ছাত্রদের জন্য একটি ‘শুভেচ্ছা কপি’ পাঠিয়েছিলেন যা ইস্তাম্বুল থেকে প্রায় আট হাজার মাইল দূরে [Saweaneh Qasmi, Vol.2, p.329]

    শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান যার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, খিলাফতের প্রত্যক্ষ সমর্থক ছিলেন এবং তা রক্ষার জন্য জোর প্রচেষ্ঠা চালিয়েছিলেন। তিনি হিযাজে ভ্রমন করে মক্কায় নিযুক্ত খিলাফতের ওয়ালী (গভর্নর) ও খলীফার সহকারীদের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। উক্ত ওয়ালী বৃটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের সহযোগীতার স্বার্থে শায়খের হাতে কিছু নথিপত্র দিয়েছিলেন। ভারতের মুসলিমদের উদ্দেশ্যে ওয়ালীর এক আবেদন এই নথিপত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল। উক্ত আবেদনে মক্কার ওয়ালী শাইখুল হিন্দকে ঔপনিবেশিক বৃটিশদের বিরূদ্ধে আন্দোলনের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছিলেন এবং ভারতের মুসলিমদেরও একে পূর্ণ সমর্থনের দেবার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি ভারতীয় মুসলিমদের আন্দোলনে খিলাফত কর্তৃক সকল ধরনের পার্থিব সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। মক্কার গর্ভনরের লিখিত এই নথিপত্র ইতিহাসে ‘গালিব নামা’ নামে খ্যাত। এছাড়াও শায়খ ১৩৩৪ হিজরীতে হজ্জ্ব পালনের পর আনোয়ার পাশা ও জামাল পাশার সাথেও সাক্ষাত করেন, যারা খিলাফত রাষ্ট্রের কর্মকর্তা ছিলেন। আনোয়ার পাশাও বৃটিশদের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের অবিরত আন্দোলনের প্রশংসা করে একটি আবেদন পত্র লিখেন। এই পত্রের লেখাগুলো গালিব নামার সাথে মিল ছিল, যেমন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে উসমানী খিলাফতের পক্ষ থেকে ভারতের মুসলিমদের পার্থিব সহযোগীতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। এছাড়াও উক্ত পত্রে উসমানী খিলাফতের সকল নাগরিক ও কর্মচারীদের শাইখুল হিন্দের প্রতি পুর্ণ আস্থা রাখতে ও পার্থিব সহায়তা প্রদানের উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। এ পত্রসমূহ বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার শত বাধার মূখে গোপনে ভারতে পাচার করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সমগ্র ইয়াগিস্তান জুড়ে বিলি করা হয়েছিল। [The prisoners of Malta (Asiran-e-Mallta), Maulana Syed Muhammad Mian. jamiat ulama –I-Hind]

    ভারতের মুসলিমরা শরীফ হোসাইনের বিশ্বাসঘাতকতা ও বৃটিশদের সহযোগিতায় (খিলাফতের বিরুদ্ধে) তার বিদ্রোহের ব্যাপারে সচেতন ছিল। তারা বৃটিশ কর্তৃক হিযাজ অঞ্চলের খাদ্য রসদ সরবরাহ বন্ধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

    কর্নেল টি. ই. লরেন্স কর্তৃক ছড়ানো প্রপাগান্ডা, তার চটকদার ও আবেগপ্রবণ আরবী বক্তৃতা এবং শরীফ হোসেন ও হেনরী মেকমোহান কর্তৃক সম্পাদিত গোপন চুক্তি সত্ত্বেও, হিযাজ অঞ্চলের সাধারণ নাগরিক তুর্কীদের বিপরীতে সংগঠিত বিদ্রোহের বিরূদ্ধে ছিল না। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৃটিশ সরকার খুবই অমানবিক ও একটি নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছিল। শাইখুল ইসলাম মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন: “হিযাজে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ কর দেয়া হযেছিল। জাহাজযোগে হিযাজে শেষ খাদ্য চালানটি পৌঁছেছিল ১৩৩৪ হিজরীর সফর মাসে। যেহেতু খাদ্য সরবরাহ বন্ধ ছিল, মূল্য বৃদ্ধি পেল এবং মানুষ অনাহারে মরতে লাগল ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের দরূণ, ১৩৩৪ হিজরীর জমাদিউল-সানী মাসে ফায়রোজী আগানবোট কয়েক হাজার বস্তা চাউল নিয়ে কলকাতা ছেড়ে যায়। কিন্তু তাও জোরপূর্বক এডেন বন্দরে খালাস করা হয়। এটি শুধুমাত্র তখনই জেদ্দায় পৌঁছানোর অনুমতি দেয়া হয়, যখন হিযাজ থেকে উসমানী সাম্রাজের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়েছিল।” [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiatul-I-Hind, English Edition, P.45]

    পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, শাইখুল হিন্দ, মওলানা মাহমুদ হাসান তাঁর সত্যের প্রতি অবিচলতা ও উসমানী খিলাফতের সমর্থন বর্জন না করার দরূন বৃটিশ কর্তৃক মাল্টায় বন্দী ছিলেন। বৃটিশরা চেয়েছিল তাঁর দ্বারা উসমানী খিলাফত বর্জন করতে এবং শরীফ হোসেনকে সমর্থন করে একটি ফতোয়া জারি করতে। শাইখুল হিন্দ ১৩৩৫ হিজরীর ২৩ সফর হিযাজে (মক্কায়) বিশ্বাসঘাতক শরীফ হোসেন কর্তৃক গ্রেফতার হন। তিনি এবং অন্যান্য অনেক আলেমকে ১৩৩৫ হিজরীর ২৯ রবিউল সানী (২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯১৭) একটি জাহাজে করে কায়রো হয়ে মাল্টায় প্রেরন করা হয়। অন্যান্য ভারতীয় উলামাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী, মওলানা আজিজ গুল, মওলানা হাকিম নূসরাত হুসেন ও মওলানা ওয়াহিদ আহমেদ যাদের প্রত্যেককেই বৃটিশরা কারাগারে চাপ সৃষ্টি করেছিল। মওলানা মাহমুদ হাসান ৩ বছর ৪মাস জেলবন্দী ছিলেন। তিনি ১৯২০ সালের ৪ঠা জুলাই মুক্ত হয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। এই সময়টি মালটা থেকে ফিরে আসার পাশাপাশি ছিল খিলাফত আন্দোলনের সূচনালগ্ন। [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind]

    ১৩২১ হিজরীতে নিজারাতুল মারিফ (কুরআন শিক্ষা একাডেমী) প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজাহিদ মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির নেতৃত্বে যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম চিন্তাবিদ তৈরী করে ইসলাম বিরোধী প্রচারণার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং ইসলামি চিন্তা ছড়িয়ে দেয়া। বৃটিশরা এই হুমকির প্রভাব বুঝতে পেরেছিল। যা বৃটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ (CID) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়। যার শিরোনাম ছিল (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah Sindhi), সেখানে বলা হয়েছে-

    “মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী দারুল উলুম দেওবন্দকে তাঁর মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারছিলেন না। এই লক্ষ্যে তিনি দিল্লীতে একটি মাদরাসা (নিজারুতুল মা’আরিফ) প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ………… যা এটির নাম থেকে স্পষ্ট, মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কুরআনের ব্যাখ্যা ও সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা শিক্ষা দেয়ার জন্য। এটি আরবী ভাষাও শিক্ষা দিত।” (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah sindhi, Section 17)

    “নিজারাতুল মারিফ এর এই শিক্ষাদানের পাশাপাশি, যা ছিল বেআইনী, এটি ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন সাক্ষাতস্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হত।” [The Petition of the British Queen vs Maulana Obaidullah Sindhi, Section 20]

    বৃটিশরা এই বিষযটির প্রতি ইঙ্গিত করছিল যে নিজারাতুল মারিফ মুসলিম বিদ্রোহীদের সাক্ষাত স্থান ও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যারা ভারতে বৃটিশ সরকারের শাসন উৎখাত করতে চেয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল হাকীম আজমল খান, ড. মুখতার আহমদ আনসারী, মওলানা শওকত আলী, মওলানা মুহাম্মাদ আলী জওহর, মওলানা জাফর আলী খান ও মওলানা আবুল কালাম আজাদ।

    মুসলিম আলেমগণ, চিন্তাবিদ ও মাঠকর্মীগণ বিদেশি পণ্য বয়কট ও বৃটিশ সরকারের সাথে অসহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল। এই ইস্যুগুলোকে সমর্থন করে জনগণকে জড়ো করার লক্ষ্যে বৈঠকাদির আয়োজন করা হতো। এই বৈঠকগুলো পরিচালিত হতো ‘মু‘তামার আল-আনসার’ (The Workers Conference) নামক ব্যানারে এবং বিভিন্ন পত্রিকায় তা প্রকাশিত হত যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ পরিচালিত আল-হিলাল ও মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর পরিচালিত ‘দ্যা কমরেড’ পত্রিকায়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর উভয়কেই সংবাদপত্রে বৃটিশ বিরোধী প্রবন্ধ ছাপার দরুণ কারারূদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। শেষের জন ১৯১১ থেকে ১৯১৫ খৃঃ পর্যন্ত চার বছর জেল খেটেছিলেন।

    ভারতের মুসলিম চিন্তাবিদগণ (Intelligentsia) খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯১২ সালের ৬ই নভেম্বর তাঁর আল-হিলাল পত্রিকায় তাঁদের দর্শন সমূহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে লিখেছিলেন যে, উসমানী সুলতানই মুসলিমদের নিরাপত্তার সর্বশেষ তরবারী ধারণ করেন। এতদূর পর্যন্ত লিখেছিলেন যে, “খিলাফত মূলত শরীআহকে ধর্মীয় সমগ্রতা প্রদানকারী (শক্তি)” এটি “ওহীর মাধ্যমে জরুরী হয়ে পড়েছে যে, এটি আল্লাহর প্রতিষ্ঠান এবং এর কর্তৃত্বের প্রতি আনূগত্য ফরয বা ইতিবাচক নির্দেশনা।”

    খিলাফত আন্দোলন:

    ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে, মওলানা মুহাম্মদ আলী ও তাঁর ভাই শওকত আলী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুখতার আহমেদ আনসারী ও হাসরাত মোহানী সহ খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) নামে একটি নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু করেন। খিলাফত রক্ষায় সাধ্যানুযায়ী যেকোনো সুযোগের সদ্ব্যবহার করা তাদের সংকল্পবদ্ধ লক্ষ্য ছিল। তাঁরা ভারতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে খিলাফত কনফারেন্সের আয়োজন করেছিলেন। এটি লক্ষণীয় যে, খিলাফত আন্দোলনের উলামা ও কর্মীগণ বিভিন্ন মাযহাব ও প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছিলেন, উদাহরণস্বরূপ মওলানা আবুল কালাম আজাদ গায়ের তাকলীদি (যারা মাযহাবের তাকলীদ হারাম মনে করেন) হিসেবে পরিচিত এবং মওলানা মাহমুদুল হাসান ছিলেন দেওবন্দী যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী, তা সত্ত্বেও তাঁরা খিলাফত সুরক্ষার লক্ষ্যে একতাবদ্ধ ছিলেন।

    ১৯১৯ সালে বোম্বে খিলাফত কমিটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক লক্ষ্যে একমত হয়; “প্রথমতঃ তুর্কী সুলতানের প্রতি খলীফা হিসেবে পার্থিব ক্ষমতা ধরে রাখার জোরালো দাবি জানানো, এবং দ্বিতীয়ত, ইসলামের পবিত্র ভুমিসমূহে তাঁর অব্যাহত কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা।”

    ১৯২০ সালে বেঙ্গল প্রাদেশিক খিলাফত কনফারেন্সের কলকাতা সভায় সভাপতির বক্তব্যে মওলানা আবুল কালাম আজাদ খিলাফতের গুরুত্ব আলোচনা করে ঘোষণা দেন, “এই প্রতিষ্ঠানের (খিলাফতের) লক্ষ্য হচ্ছে মুসলিম জাতিকে সঠিক পথে সংগঠিত করা ও নেতৃত্ব দেয়া, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং আল্লাহর বাণীকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া। এই সকল বিষয়ের জন্য খলীফার পার্থিব কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা অত্যাবশ্যক।” মওলানা আযাদের এই ব্যাপারে কোন কোন সন্দেহ ছিল না যে, “একজন ইমাম ব্যতীত তাদের জীবন অনৈসলামিক হয়ে পড়বে এবং মৃত্যুর পরে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।”

    মওলানা আযাদ ১৯২০ সালে মাসআলা-এ-খিলাফত (খিলাফতের মাসাআলা সমূহ) নামে একটি বই প্রকাশ করেন যেখানে তিনি বলেন, “খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব না তাই ভারতের মুসলিমদের উচিত তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও ক্ষমতা দিয়ে এর জন্য কাজ করা।”

    একই বইয়ের ১৭৬ নম্বর পৃষ্ঠায় মওলানা আজাদ বলেন; “দুই ধরণের আহকাম শরীআহ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে ব্যক্তি সম্পর্কিত যেমন আদেশ ও নিষেধ, ফরজ (বাধ্যতামূলক) ও ওয়াজিবসমূহ যা নিজেদের পরিপূর্ণতার জন্য। দ্বিতীয়টি ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত নয় বরং উম্মাহর সাথে, জাতির সাথে সম্পর্কিত, সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা এবং রাষ্ট্রের রাজনীতি যেমন ভুমি জয় করা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা।”

    Peter Hardy’ র মতে, মওলানা আজাদ বিশ্বাস করতেন যে, “যে মুসলিম ধর্ম ও রাজনীতিকে মুসলিমদের থেকে আলাদা করবে সে নিঃশব্দে কর্মসম্পাদনকারী মুরতাদ।”

    ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানো ও খলীফার সমসাময়িক ক্ষমতার প্রতি যৌথ বাহিনীর হুমকি, মুসলিম জাতির নেতাদের এতটাই চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছিল যে, তাদের অনেকেই ভারত থেকে হিজরতের (Migration) পক্ষে ফতোয়া দেয়ার তাগিদ অনুভব করেন।

    মওলানা আবুল কালাম আজাদ একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন যা ১৯২০ সালের ৩০ জুলাই অমৃতসরের দৈনিক আহল-এ-হাদীস এ প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত ফতোয়ায় তিনি বৃটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগের বিকল্প হিসেবে ভারত থেকে হিজরতের জোর দাবি জানিয়েছিলেন ।

    মওলানা আব্দুল বারী তাঁর ফতোয়ায় বলেছিলেন, “প্রত্যেক মুসলিম যারা এখানে বসবাস করছেন তাদের অসহযোগে সংযুক্ত হওয়া উচিত। আর তা যদি সম্ভব না হয় তবে হিজরত করা উচিত।” মওলানা শওকত আলী কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির পক্ষে একটি ফতোয়া জারি করেন, যেখানে প্রত্যেক নিষ্ঠাবান মুসলিমকে ভারতে অবস্থান করার এবং অসহযোগের জন্য কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। শুধুমাত্র এটি সম্ভব না হলেই তারা হিজরতের ব্যাপারটি আমলে নিতে পারেন। এই ফতোয়ার চমৎকার প্রভাব তৈরি হয়েছিল এবং হাজার হাজার মুসলিম ভারতের দার-উল-হারব ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেহেতু তুর্কী খলিফার পদ যা তাদের ধর্মীয় অধিকার হিসেবে চিহ্নিত ছিল, তা খর্ব হয়েছিল।”

    খিলাফতের প্রশ্নটি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রশ্নই ছিল না বরং এই ব্যাপারটি ছিল মুক্তি অথবা ধ্বংসের” প্রশ্ন। তুর্কী যদি শাসনাঞ্চল হারায়, ইসলাম মতাদর্শ হিসেবে হুমকির মুখে পড়বে।

    মওলানা শওকত আলী এই অনুভূতির পক্ষেই ১৯২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর সমগ্র ভারত খিলাফত কনফারেন্সের দশম অধিবেশনে তার সভাপতি বক্তব্যে বলেছিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত জাজিরাত-উল-আরব এর এক ইঞ্চি ভূমিও অমুসলিমদের প্রভাবে রয়েছে, একজন মুসলিমের অন্তরে শান্তি থাকতে পারে না। [The Indian Muslims, Shan Muhammad, Meenakshi Prakashani, 1981, Vol. VII; p.209]

    মোহাম্মদ আসাফ আলী কর্তৃক ১৯২১ সালের ২রা নভেম্বর ‘কমরেড’ পত্রিকার সম্পাদককে লিখিত একটি চিঠিতে খিলাফতের ইসলামি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়,” তুরস্কের সম্মান ইসলামের সম্মানের সাথে সমার্থক, উসমানী সাম্রাজ্যের অস্ত্বিত্ব মুসলিম জাতির পার্থিব উন্নতির জন্য আবশ্যক …. উসমানী সাম্রাজ্য বিলুপ্তির সাথে সাথে সভ্যতা হিসেবে ইসলামের শক্তি হারিয়ে যাবে… তুরস্কের পতন ঘটলে ইসলাম দাঁড়াতে পারবে না। তাই তুরস্কই হচ্ছে ইসলামের মেরূদন্ড।” মওলানা মুহাম্মদ আলী এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দিয়েছিলেন যিনি গুরুত্বারোপ করেছিলেন যে তা সাধারণ মুসলিমদের মতকে প্রতিফলিত করে।

    ১৯১৯ সালের ২৬ জানুয়ারী লক্ষনৌতে ফিরাঙ্গী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্জুমান মুইদ-উল-ইসলামের সভায় সমাধানস্বরূপ বলা হয়: “ফিরাঙ্গী মহলের আলেমদের এই সভায় সুলতান মুহাম্মদ ষষ্ঠ-এর প্রতি একনিষ্ট ও সচেতন আনুগত্যের পাশাপাশি জোরালোভাবে এ ঘোষণা দিচ্ছে যে সঠিক ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান তুর্কী সুলতানই হচ্ছে আইনসম্মত খলীফা এবং (আলেমগণ) এও ঘোষণা দিচ্ছে যে, ইসলাম কখনই খিলাফতের প্রশ্নে অমুসলিমদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না।

    প্রকৃতপক্ষে, সৈয়দ সুলাইমান নদভীর মতো সেসময়কার অনেক আলেমই খিলাফত থাকার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। মওলানা নদভী বলেন: “…….অন্যান্য বিশিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আল্লামা নাসাফী, ইমাম রাজি, কাজী উযুদ, এই ব্যাপারে তাদের বইগুলোতে বিশদ আলোচনা করেছেন এবং উক্ত ব্যাপারে সর্বশেষ কর্তৃপক্ষ ধরে নেয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা) হতে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে সহীহ মুসলিমে সুষ্পষ্ঠভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, কোন মুসলমান যদি তার সময়ের ইমামকে স্বীকার করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে তাবে সে কাফেরের মতো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।” [The Muslim outlook march 1920]

    মওলানা মুহাম্মদ আলী ১৯২০ সালে প্যারিসে একটি বক্তৃতায় বলেন, “খিলাফত হচ্ছে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তুরস্কের সুলতানকে ঈমানদারদের নেতা ও তাদের নবীর খলীফাদের উত্তরসূরী হিসেবে মেনে দিয়েছে। এই বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ এই যে খলীফার, যিনি বিশ্বাসীদের নেতা, অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ সীমানা, পর্যাপ্ত পরিমাণ সামরিক ও নৌ সম্পদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্পদ থাকতে হবে।”

    সৈয়দ হুসেইন যিনি প্যারিস-এর সভায় মুহাম্মদ আলীর সাথে একই মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বলেছেন, “যদি পৃথিবীতে ইসলাম টিকে থাকতে হয়, তবে এটি অত্যাবশ্যক যে ইসলামের অবশ্যই একটি খিলাফত থাকবে। যেটি চৌদ্দশ বছর পূর্বে যখন থেকে ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে তখন থেকেই তা ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।”

    মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর আরও বলেন, “তুর্কী সুলতান ছিলেন খলীফা বা নবীর উত্তরসূরী এবং আমির উল-মুমিনীন বা বিশ্বাসীদের নেতা, এবং খিলাফত আমাদের সেইরূপ গুরূত্বপূর্ণ ব্যাপার ঠিক যেমনি কুরআন কিংবা নবীর সুন্নাহ। “[My life a Fragnent, Mohammed Ali Johar, pg.41]

    বস্তুতঃ আলেমগণ খিলাফত আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা নিয়েছিলেন। নিম্নোক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ন দফা যা ১৯২০ সালের ৫ ও ৬ ই এপ্রিল ভারতের উলেমাদের জন্য অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের ঘোষণা থেকে নেয়া হয়েছে, যেখানে অনেক উলেমাই অংশগ্রহণ করেছিলেন:

    ঘোষিত দফা ১: আলেমদের অবশ্যই খিলাফত বিষয়ে জনমত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

    দফা ২ : কপটাচারি (মুনাফিক) আলেম এবং এই বিষয়ের বিরুদ্ধবাদী আলেমদের বয়কট করতে হবে।

    দফা ৭ : উলেমাদের অবশ্যই তাদের অনুসরণকারীদের নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা নিতে হবে যে, তারা খিলাফতের বিষয়ে বলতে ও লিখতে গিয়ে তাদের মন-প্রাণ উৎসর্গ করবেন।

    দফা ৯ : মুসলিমদের অবশ্যই সাংবিধানিক নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে।

    ১৯২০ সালের ১৯ ও ২০ নভেম্বর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত সম্মেলনে জামিয়াত আল উলেমা হিন্দ কর্তৃক ঘোষিত নিম্নোক্ত কয়েকটি দফা থেকে খিলাফতের ব্যপারে তাদের সমর্থনকেও তুলে ধরে:

    • ইংরেজরা ইসলাম এবং মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং তাদের বিরুদ্ধচারন করা ফরয।
    • উম্মাহর নিরাপত্তা দেয়া এবং খিলাফতের নিরাপত্তা দেয়া একটি পবিত্র ইসলামি জরুরত। যদি এই দেশের ভাইয়েরা এই ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগীতা করেন, তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, যার কথা এর আগে উল্লেখ করা হয়েছিল, তিনি ১৩৩৮ হিজরীর ২০ রমযান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পর তিনি একনিষ্টভাবে খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর উত্তরসূরী মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী লিখেছেন, “জেল ও নির্বাসনের কষ্ট সহ্য করে যখন হযরত শাইখুল হিন্দ রহমতুল্লাহ আলাইহি ভারতে ফিরে আসলেন, আমরা তাঁর বৃটিশদের প্রতি ঘৃণা ও উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতি স্পৃহার কোনো কমতি দেখতে পেলাম না। দেশে জারি করা মার্শাল আইন, দেশের অভ্যন্তরে রওলাট অ্যাক্ট কার্যকরণ ও জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা, উসমানী খিলাফতের বিভাজন এবং ভারতের বাইরে তুর্কীদের সাথে অমানবিক ব্যবহার তাঁকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছিল। তিনি বোম্বেতে পা রাখা মাত্রই মওলানা শওকত আলী এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করেন। ফিরাঙ্গী মহল, লক্ষনৌ-এর মওলানা আব্দুল বারী এবং আহমেদাবাদ থেকে মহাত্মা গান্ধী শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসানকে বোম্বেতে গ্রহণ করতে এসেছিলেন। তাঁদের সাথে এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে প্রকাশ্যে ও নির্জনে আলোচনার পর, শাইখুল হিন্দও ভারত মুক্তির দাবীতে অহিংস আন্দোলন শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছিলে।” [Naqsh-e-Hayt, Vol.2,p.247]

    শায়খের একটি ফতোয়ার বইতে খিলাফত রাষ্ট্রের উপনিবেশিকদের প্রতি সহযোগীতার বিষয়টি উঠে আসে। যদিও তা ১৯২০ সালে ইস্যু করা হয়েছিল তাঁর উল্লেখিত অনেক দফাই আজ অবধি প্রয়োগযোগ্য। তিনি বলেন:

    “ইসলামের শত্রুরা ইসলামের বিরূদ্ধে আঘাত হানতে এবং ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে কোনো কিছু করাই অবশিষ্ট রাখেনি। ইরাক, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া যা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবা এবং তাঁদের অনুসারীদের দ্বারা বিজিত হয়েছিল, আজ আবার ইসলামের শত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে । খিলাফতের মার্যাদা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলা হয়েছে। খলীফাতুল-মুসলিমীন (মুসলিমদের খলীফা), যিনি এই গ্রহে সকল মানুষকে একতাবদ্ধ রাখবেন, যিনি এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বস্বরূপ ইসলামের বিশ্বজনীন আইন বাস্তবায়ন করবেন, যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থের নিরাপত্তা দিবেন। যিনি এই বিশ্বে আল্লাহর বাণীর মহিমা অক্ষুন্ন রাখবেন এবং বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করবেন, আজ শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং তাঁকে আজ অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হয়েছে…………ইসলামের পতাকা আজ নিচুতে উড়ছে। হযরত আবু উবাইদা (রা) সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা), খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা) এবং আবু আইয়ুব আনসারী (রা)-এর আত্মারা আজ অস্থির। কেন তা হল? এর কারণ মুসলমানরা তাদের সম্ভ্রম, মর্যাদা ও আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলেছে। সাহসিকতাও ধর্মীয় শক্তিমত্তা ছিল যাদের দূর্গ ও উত্তরাধিকার তারা তা আজ হারাতে বসেছে তাদের অজ্ঞতা এবং অতিমাত্রায় অবহেলার দরুণ।

    বিষয়টি শুধু এই নয় যে এক মুসলিম কষ্টের সময় আরেক মুসলিম ভাইকে সাহায্য করছে না। বরং দুঃখজনকভাবে, সুনাম কুড়ানো ও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্বের অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এক ভাইকে আরেক ভাইয়ের মাথা কাটতে ঠেলে দিয়েছে। মুসলিম মুসলিমের রক্ত পান করছে। মুসলিমগণ তাদের নিজেদের ভাইদের রক্তে হাত রঞ্জিত করছে।

    হে ইসলামের সন্তানেরা! এবং হে মহান এ জাতির প্রেমিকেরা। তোমরা আমার চেয়ে ভালো জানো, যেই গর্জন ও আগুন ইসলামি বিশ্বের তাঁবুগুলোকে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং ইসলামি খিলাফতের দূর্গে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে তা নির্গত হয়েছে আরব ও ভারতীয়দের তাজা রক্ত থেকে। যে সম্পদের ক্ষমতাবলে খ্রিষ্টানরা মুসলিম জাতিকে আয়ত্তে আনতে সমর্থ হয়েছে তার একটি বৃহৎ অংশ তোমাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল।

    তাই কোনো নির্বোধ ও মাথামোটা মুসলিম কি থাকতে পারে যে বুঝে না খৃষ্টানদের সহযোগীতার ফলাফল কী ? এবং এটাও কি বুঝে না যে, একজন ডুবন্ত মানুষ যদি একটি খঁড়কুটোকে আঁকরে ধরে এবং সহযোগীতার পথ খুঁজতে থাকে তবে কি তা তাকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে? “ [From the Fatwa of Maulana Mahmood Hossan on 16th Safar 1339 Hijri, Corresponding to October 29th 1920 Gregonina year, The Prisoners of Malta (Asira’n-E-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind. English edition p.78-79]

    যেভাবে আজকের উলেমাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনীতি ও ইসলামকে আলাদা বলতে চান তাদের মত নয়, বরং তৎকালীন উলেমারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খিলাফত ধ্বংসের মাত্র কিছুকাল পূর্বে ১৯২৩ সালের ২৪ শে ডিসেম্বর গয়া’তে জামিয়াত-উল-উলামা-হিন্দের ৪র্থ অধিভেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে ইসলামের জ্ঞানী আলেম ও শিক্ষকেরা ভারতের সকল অংশ থেকে একত্রিত হয়ে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলে। সামগ্রিক সকল তর্ক-বিতর্কের পর এই অধিবেশন সর্বসম্মত মতামত দিয়েছিল যে, রাজনীতি ও ধর্ম ইসলামের অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

    খিলাফত আন্দোলন এমনকি হিন্দুদের উপরও যেরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল তা দেখে বর্তমান ইন্ডিয়ার জনক, মোহনদাস করমাচাঁদ গান্ধী এতে অংশ নিয়েছিলেন এবং কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির সদস্য হয়েছিলেন।

    তবে ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের হাতে খিলাফত ধ্বংসের পর এই আন্দোলনের পতন হয়। অনেকেই তখন খিলাফতের পুনঃস্থাপন অসম্ভব মনে করে এবং বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের থেকে ভারতকে মুক্ত করাকেই কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে শুরু করেন।

    খিলাফত ধ্বংসের একদিন পরে মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর বলেছিলেন, যা ১৯২৪ সালের ৪ঠা মার্চ টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। “এটা নির্ধারণ করা কঠিন হবে যে খিলাফতের পতন ভারতের মুসলমানদের অন্তরে ঠিক কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে। আমি শুধু নিশ্চিতভাবে এতুটুকুই বলতে পারি যে এটি ইসলাম ও সভ্যতা উভয়ের জন্যই ধ্বংস প্রমাণিত হবে। এই সম্মানিত প্রতিষ্ঠান যা ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলামের ঐক্যের প্রতীক, এর দমন ইসলামের (শক্তির) ভেঙে পড়ার কারন হবে………..।

    তিনি কত সত্যই না বলেছিলেন। এটি ধ্বংসের পর মুসলিম বিশ্ব ঠিক তা-ই প্রত্যক্ষ করেছে, যা তিনি বলেছিলেন। আজ এটি ধ্বংসের প্রায় আশি বছরেরও বেশি সময় পরে এসে, খিলাফত আবার গণমাধ্যমগুলোর গুঞ্জনধ্বণিতে পরিণত হয়েছে যেহেতু পশ্চিমা রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও নেতারা এর ফিরে আসার ভয়ে ভীত এবং মুসলিম উম্মাহ এর পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাকুলভাবে আকাংক্ষিত। ২০০৬ সালের ১১ই অক্টোবর বুধবার হোয়াইট হাউসের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের (তৎকালীন) প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিল, “চরমপন্থীরা মুক্তমনা লোকদের ভীতি প্রর্দশনের চেষ্টা করছে যাতে উদারপন্থী সরকারগুলোকে উৎখাত কার যায় এবং যাতে খিলাফতের বিস্তৃতি ঘটানো যায়। এর চেয়ে বেশি ঝুকির বাস্তবতা আর হতে পারে না। যা আমি আগেই বলেছি, আমরা যে পৃথিবীতে বসবাস করি, তাতে চরমপন্থী উপাদান রয়েছে যারা লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। এবং তারা চায় যাতে আমরা (তাদের পথ হতে) সরে পড়ি। তারা সরকার উৎখাত করতে চায়। তারা একটি আদর্শিক খিলাফতকে বিস্তৃত করতে চায় যার বিশ্বাসের মধ্যে স্বাধীনতার কোন ধারণার অন্তর্ভুক্তি নেই।”

    পশ্চিমাদের বুঝা উচিত যেহেতু খিলাফত ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ঘৃণা করার পরিবর্তে তাদের একে প্রণিধান করা উচিত যাতে তারা এর সাথে (প্রয়োজনীয় চুক্তিতে) আবদ্ধ হতে পারে যখন এটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

    ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা ভুলে যায় নি। এই উপমহাদশের অনেক দল, আলেম ও চিন্তাবিদরা এটিকে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ বিষয়টি হিযবুত তাহরীর থেকে শুরু করে পাকিস্তানে ড. ইসরার আহমেদ-এর তানজীম-ই-ইসলামি, বাংলাদেশের খিলাফত আন্দোলন ও খিলাফত মজলিস সহ বর্তমানে নিষিদ্ধ Students Islamic Movement of India (SIMI) সহ আরো অনেক আন্দোলনের এর আহ্বান থেকে পরিষ্কার।

    খিলাফত আবার ফিরে আসবে এবং এর শাসন আবার ভারত উপমহাদেশকে মুক্ত করবে যা নিম্নোক্ত হাদীসসমূহ পাশাপাশি আরও হাদীস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।

    আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “তোমাদের মধ্যে একটি দল ভারতবর্ষ জয় করবে। আল্লাহ তাদের জন্য (ভারতবর্ষকে) মুক্ত করে দিবেন, এমনকি তারা এর শাসকদের শিকল পরিহিত অবস্থায় নিয়ে আসবে। আল্লাহ তাদের গূনাহসমূহ মাফ করে দিবেন- যখন তারা ফিরে আসবে (ভারতবর্ষ থেকে) তারা সিরিয়াতে ইবনে মরিয়মকে খুঁজে পাবে” [Naim b. Hammad in Al-Fitan]

    ছাওবান থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “আমার উম্মতের দুটি দলকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন – একটি দল যারা ভারতবর্ষ জয় করবে এবং অন্য দলটি যারা ঈসা ইবন মরিয়মের সাথে থাকবে।” [Ahmad and An-Nasai]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আমাদেরকে আজকের খিলাফত আন্দোলনে শরীক হওয়ার তৌফিক দিন, যে ভাবে আমাদের পূর্বসূরীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।

    আবু ইসমাইল আল-বেইরভী
    রমযান ১৪২৭; অক্টোবর, ২০০৬
    অনুবাদ : সোহান ইয়াসির ইকবাল।

  • ব্যক্তিপর্যায় ও প্রকাশ্য গণসংযোগ

    ব্যক্তিপর্যায় ও প্রকাশ্য গণসংযোগ

    ব্যক্তিপর্যায় এবং প্রকাশ্য গণসংযোগের গুরুত্বের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই এই দুই পর্যায়ের গণসংযোগকে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক পুরষ্কৃত মহান ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে নুহ (আ)-এর ঘটনা উল্লেখ করেন: যেখানে আমরা দেখি, তিনি (আ) তার জাতি হতে প্রাপ্ত সাড়ার ব্যাপারে তার রবের কাছে নালিশ জানান, এবং ৯৫০ বছরের এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি (আ) কী পরিমাণ ধৈর্য্যসহকারে তার জাতির কাছে দাওয়াহ্‌ পৌঁছে দেন। জাতির কাছে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাসহ, সুস্পষ্টরূপে বক্তব্য উপস্থাপন এবং সরল-সঠিকপথের দিকে আহ্বানের পরই কেবল তিনি (আ) আল্লাহ্‌’র নিকট অভিযোগ জানান। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও উল্লেখ করেন, কিভাবে নুহ (আ) তার জাতির কাছে ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ে একনিষ্টভাবে দাওয়াহ্‌ পৌঁছে দেন,

    (ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا * ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا)
    অতঃপর নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াহ্‌ দিয়েছি, অতঃপর নিশ্চয়ই আমি ঘোষণা সহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি” [সূরা নুহ: ৮-৯]।

    এই গণসংযোগ যে কি পরিমাণ গুরুত্ব ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে করা হয়েছিল তা নুহ (আ)-এর সাক্ষ্য হতে অত্যন্ত পরিষ্কার,

    (رَبِّ إِنِّى دَعَوْتُ قَوْمِى لَيْلاً وَنَهَاراً)
    সে বলল: হে আমার রব! নিশ্চয়ই, আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবা-রাত্রি দাওয়াহ্‌ পৌঁছে দিয়েছি,” [সূরা নুহ্‌: ৫]

    অর্থাৎ ‘আমি দিবা-রাত্রি দাওয়াহ্‌ পৌঁছে দেয়া বন্ধ করিনি, তোমার আদেশ-নিষেধ পৌঁছেছি এবং তোমার আনুগত্য করেছি।’

    তাছাড়া, তিনি (আ) জনগণের কাছ থেকে প্রাপ্ত সাড়াকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই গণসংযোগটি পরিচালনা করেন, এমনকি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হলেও। নুহ (আ) ঘোষণা দেন,

    (وَإِنِّى كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُواْ أَصَـبِعَهُمْ فِى ءَاذَنِهِمْ وَاسْتَغْشَوْاْ ثِيَابَهُمْ)
    এবং নিশ্চয়ই, আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াহ্‌ দিয়েছি যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন, ততবারই তারা কানে আঙ্গুলি দিয়েছে, মুখমন্ডল বস্ত্রাবৃত করেছে” [সূরা নুহ: ৭]

    অর্থাৎ, ‘আমার বক্তব্য যাতে না শুনতে পায় এজন্য তারা তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছে।’ রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-এর দাওয়াহ্‌ প্রত্যাখ্যানকারী কুরাইশ গোত্রের কাফিরদের ব্যাপারেও আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একই বর্ণনা দেন,

    (وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُواْ لاَ تَسْمَعُواْ لِهَـذَا الْقُرْءَانِ وَالْغَوْاْ فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ)
    আর কাফিররা বলে: “তোমরা এ কুর’আন শ্রবণ করো না, এবং এর তিলাওয়াতের সময় হট্টগোল সৃষ্টি কর যাতে তোমরা জয়ী হও“।” [সূরা ফুস্‌সিলাত : ২৬]

    (وَاسْتَغْشَوْاْ ثِيَابَهُمْ) “তারা তাদের বস্ত্র দ্বারা তাদেরকে বস্ত্রাবৃত করে রাখতো,” ইবনে আব্বাস হতে ইবনে যারির সংকলন করেছেন যে তিনি বলেন, “তিনি (সা) যাতে তাদেরকে চিনতে না পারেন এজন্য তারা তাঁর (সা) নিকট হতে বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতো।” সা’ঈদ বিন যুবায়ের এবং আস-সুদ্দি উভয়ে বলেছেন, “তারা তাদের মাথা ঢেকে রেখেছিল যাতে তারা রাসূল (সাঃ)-এর বক্তব্য শুনতে না পায়”। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিষয়টিকে আরও ব্যাখ্যা করে বলেন (وَأَصَرُّواْ) “এবং তারা এ বিষয়ে একগুয়েমি করেছে,” অর্থাৎ তারা পূর্বের কুফর এবং আল্লাহ্‌’র সাথে শিরক রত অবস্থা চলমান রেখেছিল। এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    (وَاسْتَكْبَرُواْ اسْتِكْبَاراً)
    …এবং তারা চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শনে নিজেদেরকে নিমগ্ন রেখেছে” [সূরা নুহ: ৭]

    অর্থাৎ, তারা সত্য অনুসরণ এবং সত্যের কাছে আত্নসমর্পন থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল।

    পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের পর পরবর্তী গণসংযোগের জন্য পর্যাপ্ত চিন্তা প্রয়োগ করা প্রয়োজন। দাওয়াহ্‌’র ফলাফল নিরুৎসাহব্যাঞ্জক এবং বিপরীত হলেও বিশ্বাসীরা এতে হতাশ কিংবা বিচলিত হন না। ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ের দাওয়াহ্‌ বন্ধ করেন না। বরং, কিভাবে দাওয়াহ্‌ বহন করলে তা জনগণের নিকট সহজে বোধগোম্য হবে, জনগণ তা সাদরে গ্রহণ করবে এবং জীবনের উদ্দেশ্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত করবে, সে বিষয়ের উপর চিন্তারোপ করেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বক্তব্যে আমরা দেখতে পাই যে নুহ (আঃ) উৎসাহব্যাঞ্জক যুক্তি দ্বারা তার জাতিকে আহ্বান করেছেন,

    (وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَلٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّـتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَاراً)
    তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন” [সূরা নূহ্‌: ১২]

    অর্থাৎ, ‘যদি তোমরা অনুতপ্ত হও এবং আল্লাহ্‌’র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাঁর আনুগত্য কর, তবে তিনি তোমাদের রিযক বাড়িয়ে দিবেন এবং আসমান হতে মেঘমালা বর্ষণ করবেন। তিনি পৃথিবীর উপর রহমত বর্ষণ করবেন এবং জমীনে ফসল জন্মাবেন। অর্থাৎ তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাদেরকে আরও সম্পদ, আরও সন্তান, আরও গবাদীপশু এবং বিভিন্ন ফলমূলসমৃদ্ধ বাগান দিবেন। এসব বাগানের ভিতর দিয়ে নদী বইয়ে দিবেন।’ এটাই হচ্ছে উৎসাহব্যাঞ্জক দাওয়াহ্‌ প্রদানের নমূনা। অতঃপর ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) একে ভারসাম্যপূর্ণ করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    (مَّا لَكُمْ لاَ تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَاراً)
    তোমাদের কী হল যে তোমরা আল্লাহ্‌’র শ্রেষ্ঠত্বের আশা করছ না?” [সুরা নূহ্‌ :১৩]

    অর্থাৎ তিনি মহামহিম। ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ এবং আত-দাহ্‌হাক হতে বর্ণিত। ইবনে আব্বাস বলেন, “আল্লাহ্‌’র বিরাটত্ব-বিশালতাকে যেভাবে অনুধাবন করা উচিত সেভাবে তোমরা অনুধাবন করছো না। অর্থাৎ তোমরা তাঁর শাস্তি ও ক্রোধকে ভয় করছো না।”

    আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসূল (সা) ব্যক্তিপর্যায় এবং প্রকাশ্যে মানুষকে দাওয়াহ্‌ দিয়েছেন। তাই আমরা দেখতে পাই শুরুতে রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) তাঁর স্বাভাবিক পরিচিত গন্ডির মধ্যে দাওয়াহ্‌ করেন। প্রথমে তিনি (সা) তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা)-কে দাওয়াহ্‌ করেন এবং তিনি (রা) তা গ্রহণ করেন। তারপর তিনি (সা) তাঁর চাচাতো ভাই আলী (রা.)-কে দাওয়াহ্‌ করেন এবং তিনি (রা) তা গ্রহণ করেন। তারপর তিনি (সা) তাঁর দাস যায়িদ (রা)-কে দাওয়াহ্‌ করেন এবং তিনি (রা) তা গ্রহণ করেন। এবং অতঃপর তিনি (সা) তাঁর বন্ধু আবু বকর (রা)-কে দাওয়াহ্‌ করেন এবং তিনিও (রা) তা গ্রহণ করেন। তিনি (সা) ব্যক্তিগত পর্যায়ে দাওয়াহ্‌ অব্যাহত রেখেছিলেন, কিছু লোক ঈমান এনেছিল এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করেছিল। অতঃপর ইসলামগ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে, যতক্ষন না এটা কুরাইশদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকদের সাথে দেখা করতেন এবং বলতেন তাদেরকে আল্লাহ্‌’র পক্ষ থেকে এই আদেশ দেয়া হয়েছে যে তারা শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।

    ব্যক্তিপর্যায়ের গণসংযোগের জন্য রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) পরিচিতজনদের গন্ডির বাইরেও দাওয়াহ্‌ করেছেন। তারপর আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিম্নোক্ত আয়াত নাযিলের পর তিনি (সা) সমাজের বৃহত্তর পরিসরে সামষ্টিক পর্যায়ে প্রকাশ্য দাওয়াহ্‌ শুরু করেন:

    (فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ)
    অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়; এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” [আল-হিজর: ৯৪];

    তিনি (সা) কুরাইশদের সাফা পাহাড়ে ডেকে প্রকাশ্যে এবং জনসম্মুখে ইসলামের দাওয়াহ্‌ পৌঁছে দেন এবং বলেন তিনি আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক মনোনীত রাসূল এবং তাদেরকে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এবং তিনি (সা) ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি প্রকাশ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠির কাছে ইসলামের দাওয়াহ্‌ পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর প্রকাশ্য গণসংযোগ ছিল খুবই বলিষ্ঠ এবং গতিশীল। তিনি প্রকাশ্যে কুরাইশদের বিরোধিতা করেছেন; তাদের দেব-দেবী, বিশ্বাস এবং চিন্তাসমূহের ভ্রান্তি, দূষণ এবং ত্রুটিসমূহকে উন্মোচিত করেছেন। তিনি যেভাবে সমাজে বিদ্যমান সকল ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং চিন্তাগুলোকে আক্রমন করেছেন, ঠিক একইভাবে তিনি জীবন সম্পর্কিত অন্যান্য চিন্তাসমূহকেও প্রকাশ্যে আক্রমন করেছেন। সুদগ্রহণ, কন্যা সন্তানকে হত্যা, মাপে কম দেয়া, যিনাহ্‌ সহ সকল কুফর জীবনযাপনকে আক্রমন করে সেই সময়ে কুর’আনের আয়াতগুলো নাযিল হয়। এবং পাশাপাশি কুরাইশ সর্দার, এবং তাদের পূর্বপুুরুষ ও তাদের চিন্তাকে আক্রমন ও অপদস্থ করে, রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) এবং সাহাবীগণদের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্রকে উন্মোচন করে বহু আয়াত নাযিল হয়। শুধুমাত্র নাযিলকৃত ইসলামের বাণীর উপর গভীর বিশ্বাসই ছিল তাঁর একমাত্র অস্ত্র, তাই ব্যক্তিপর্যায়ে তিনি আর কোন উপায়-উপকরণ কিংবা সাহায্য কিংবা অস্ত্রের আশ্রয় নেননি। বিপরীত এবং আক্রমাত্নক প্রতিক্রিয়া পেয়েও তিনি এতে অটল ছিলেন।

    সাহাবীগণ (রা) কর্তৃক সম্পাদিত ব্যক্তিপর্যায় এবং প্রকাশ্য গণসংযোগগুলোকে রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) নিজে তদারকি করেছেন। আবু বকর (রা)-এর ব্যক্তিপর্যায়ের দাওয়াহ্‌’কে তিনি তদারকি করেছেন। আবু বকর (রা) ছিলেন তার পরিচিতজনদের নিকট উচ্চ চরিত্রের অধিকারী, তারা তার সঙ্গ পছন্দ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার কাছে পরামর্শ চাইতেন। তিনি (রা) তার প্রভাব খাটিয়ে উসমান বিন আফ্‌ফান, পাশাপাশি যুবায়ের ইবনে আল-আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ্‌ প্রমূখকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন। আবু বকর (রা) তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) নিকট হাজির করান এবং তারা প্রত্যেকে তাদের ঈমান আনয়নকে নিশ্চিত করেন এবং নামায আদায় করেন।

    এবং রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) প্রকাশ্য গণসংযোগকেও অত্যন্ত গুরুত্ব এবং যত্নসহ তদারকি করেছেন। মুসা’ব (রা)-কে তিনি (সা) মদীনাতে প্রেরণ করেন এবং একবছরের মধ্যে তিনি (রা) একে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রভুমি হিসেবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হন। কারণ সেখানে ইসলামগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হলেও আল্লাহ্‌’র রাসূল (সা)-এর মাত্র একজন সাহাবীর (মুসা’ব বিন উমায়ের) বলিষ্ঠ প্রকাশ্য গণসংযোগ সমাজের প্রচলিত চিন্তা ও আবেগকে রূপান্তরিত করে মদীনার সমাজব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। মুসা’ব বিন উমায়ের (রা.) একাই মদিনাকে পরিবর্তন করে ফেলেন, মদিনায় প্রচলিত চিন্তা ও আবেগকে রূপান্তর ঘটিয়ে ফেলেন। মদিনার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এমনভাবে ইসলাম গ্রহণ করে যা ঐ সমাজের সামষ্টিক চিন্তাজগতের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়, এবং রাতারাতি তাদের চিন্তা ও আবেগসমূহের মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটে। এ থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে ইসলামগ্রহণকারীগণ যখন প্রকাশ্য গণসংযোগে বলিষ্ঠ এবং পারদর্শী হয় তখন সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগানো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে বাধ্য। তাছাড়া এ থেকে এটাও প্রতিয়মান হয় যে, যদি নতুন কোন চিন্তা ও আবেগ দ্বারা সমাজের বিদ্যমান পারস্পরিক সম্পর্কগুলো প্রভাবিত হয়, তবে ঐ চিন্তার বাহকের সংখ্যা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন তা অভীষ্ট সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। মদীনার লোকেরা সমাজে বিদ্যমান চিন্তাসমূহের ক্রটি অনুধাবন করেছিল এবং তারা বিকল্প চিন্তা ও জীবনব্যবস্থার অনুসন্ধান করছিল। আর এজন্যই ইসলামের দাওয়াহ্‌’র প্রতি ব্যাপক সমর্থন পেতে মুসা’ব ইবনে উমায়েরকে বেশী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি, তিনি প্রকাশ্যে মদীনার জনগণকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন এবং ইসলামের চিন্তা ও বিধি-বিধানসমূহের শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। তিনি মদিনার জনগণের কাছ থেকে দ্রুত ইতিবাচক সাড়া এবং ইসলামের গ্রহণের ব্যাপারে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখতে পান। ইসলামী বিধি-বিধানসমূহ শিক্ষালাভ এবং জানার ব্যাপারে তাদের ব্যাপক আগ্রহ দেখে তিনি উৎফুল্ল হন। চোখের সামনে মুসলিমদের দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইসলামের প্রসার দেখে আরও অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দাওয়াহ্‌’র প্রচেষ্টাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেন।

    রাসূলুল্লাহ্‌ (সা) তীক্ষ্নদৃষ্টি দিয়ে প্রকাশ্য গণসংযোগের প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফলগুলো পর্যবেক্ষন করছিলেন। হজ্বের মৌসুমের প্রাক্কালে মুসা’ব (রা) মক্কায় ফিরে আসলে রাসুলুল্লাহ্‌ (সা) তার কাছ থেকে মদীনার সার্বিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেন। সেখানকার মুসলিম ও তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি, ইসলাম ও এর দ্রুত প্রসারসহ মদীনার সার্বিক অবস্থার তথ্য নেন। তাছাড়া সেখানকার জনগণের মধ্যে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌’র রাসূল (সা)-কে নিয়ে আলোচনা কতটুকু, এবং ইসলাম সমাজের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কিনা এসব বিষয়েরও তথ্য নেন। মুসা’ব (রা.) মুসলিমদের সামর্থ্য এবং রুঁখে দাড়ানো শক্তি যা ইসলামকে মদিনার আধিপত্যশীল শক্তিতে রূপান্তর করেছে, সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্‌ (সা)-কে অবগত করেন। তিনি আরও জানান যে দাওয়াহ্‌ এবং আল্লাহ্‌’র দ্বীনকে রক্ষার ব্যাপারে কিছু মুসলিমের বিশ্বাস এবং দৃঢ়সংকল্প পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

    …তাই একইভাবে দাওয়াহ্‌ বহনকারীগণদের অবশ্যই ব্যাপক গণসংযোগে লিপ্ত হতে হবে। এবং এই গণসংযোগকে শুধুমাত্র ব্যক্তিপর্যায়ের গন্ডির মধ্যে বিদ্যমান কিছু ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী কিংবা জমায়েতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং জনমত এবং জনসচেতনতাকে আরও পাকাপোক্ত এবং শক্তিশালী করতে একে সামষ্টিক পর্যায়ের প্রকাশ্য গণসংযোগের দিকে ধাবিত করতে হবে। মুসলিমদেরকে বাজার, মসজিদ কিংবা রাজপথ, প্রকাশ্য গণসংযোগের প্রত্যেকটি সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাদেরকে কর্মস্থল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার আয়োজন করতে হবে। মুসলিমদের সমসাময়িক এবং চলমান বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাপারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম এবং সমাবেশে তাদের বক্তব্য অবশ্যই অত্যন্ত সুস্পষ্ট হতে হবে। প্রকাশ্য গণসংযোগ গতানুগতিক ও গঁধবাঁধা নয়, বরং অবশ্যই বলিষ্ঠ ও সুপরিকল্পিত হতে হবে। জনগণের প্রতিক্রিয়াকে খুবই যত্নসহকারে পর্যালোচনাকেও এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে এবং এতে জনগণের কাছে কি কি বিষয় সুস্পষ্ট এবং কি কি বিষয় অস্পষ্ট তা বেরিয়ে আসবে। পাশাপাশি এসব বিষয়ে যুক্তিগুলো এবং যুক্তিগুলোর সাথে ইসলামের দৃঢ় ও সুস্পষ্ট সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকতে হবে। প্রকাশ্য গণসংযোগের সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে উপযুক্ত স্থান-কাল নির্বাচন করতে হবে। জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা যাই হোক না কেন এই বলিষ্ঠ এবং কার্যকরী প্রকাশ্য গণসংযোগের ফলে শুরুতেই জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক উৎসাহব্যাঞ্জক সাড়া দাওয়াহ্‌ বহনকারীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এই বলিষ্ঠ গণসংযোগ তাকে দাওয়াহ্‌ বহনের দক্ষতাকে আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও জ্ঞান অন্বেষণে বাধ্য করবে, কারণ জনগণ তখন তার কাছে অতিগুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধান চাইবে। এবং সর্বোপরী, ফলাফল এবং পুরষ্কার একমাত্র আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হাতে এই উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে এবং অর্জিত জ্ঞানের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে এই গণসংযোগ পরিচালনা করতে হবে। ইন্‌শা’আল্লাহ্‌, এসব প্রস্তুতি গণসচেতনতাকে আরও গতিশীল করে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।

    খিলাফতের ট্রেন তার সর্বশেষ গন্তব্যের দিকে দ্রম্নত ছুটে আসছে এবং ইসলামী উম্মাহ্‌ এবং উম্মাহ্‌’র বিরুদ্ধে অবস্থানকারী উভয় গোষ্ঠীই এর উপস্থিতি টের পাচ্ছে। সুতরাং, মুসলিমদের উচিত এই গতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়া এবং খিলাফতের প্রত্যাবর্তনের পূর্বে সমাজের জনমত ও জনসচেতনতাকে আরও যতটুকু সম্ভব শক্তিশালী করে নেয়া, কারণ তা সন্নিকটে, ইন্‌শা’আল্লাহ্‌। নিশ্চয়ই হতাশার পরেই রয়েছে আশার আলো, এবং দুঃখের পর সুসংবাদ, এবং কষ্টের পর স্বস্তি, এবং দূর্ভোগের পর আরাম, এবং তা হবে দীর্ঘস্থায়ী।

    (وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ * بِنَصْرِ اللَّهِ يَنْصُرُ مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيم)
    এবং সেদিন মু’মিনগণ আল্লাহ্‌ প্রদত্ত বিজয় দ্বারা আনন্দিত হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে বিজয় দান করেন, এবং তিনি পরাক্রমশালী, পরম করুণাময়। ” [সূরা আর-রূম: ৪-৫]

  • মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের মূল কারণ চিন্তার অধঃপতন

    মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের মূল কারণ চিন্তার অধঃপতন

    মুসলিম উম্মাহ্ বর্তমানে যে পশ্চাদপদতা ও লাঞ্ছনার গহ্বরে পতিত তা থেকে উম্মাহ্কে উদ্ধার করা এবং উম্মাহকে কুফরী চিন্তা, কুফরী ব্যবস্থা, কুফরী বিধি-বিধান, কুফর দেশসমূহের আধিপত্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি থেকে মুক্ত করা কেবল মাত্র তখনই সম্ভব হবে যখন উম্মাহর চিন্তার বর্তমান অধঃপতনকে পরিবর্তন করে উন্নত চিন্তার বিকাশ ঘটানো যাবে আর এটা করার উপায় হচ্ছে যে চিন্তাগুলো মুসলিম উম্মাহ্কে অপদস্থতার এই চরম অবস্থা পর্যন্ত এনে পৌঁছিয়েছে সেগুলোকে চিহ্নিত করে ইসলামী চিন্তা দ্বারা সেগুলোর পরিবর্তন ঘটানো।

    বস্তুতঃ উম্মাহর বর্তমান অবস্থার কারণ হচ্ছে ইসলামকে বুঝে তার বিধি-বিধানকে মান্য করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অবহেলা এবং দুর্বলতা, যা অনেক আগে থেকে শুরু হয়ে আজও চলছে। এই চিন্তাগত অধঃপতনের দরুন উম্মাহ্‘র মাঝে বহু নতুন বিষয়ের উদ্ভব ঘটেছে, যার প্রধান প্রধান কিছু বিষয় নিচে উল্লেখ করা হলো।

    ক. হিন্দু, পারসিক এবং গ্রীক দর্শনের অনুপ্রবেশের পর ইসলাম আর এসব দর্শনের মাঝে পূর্ণ বৈপরিত্য থাকা সত্বেও কেউ কেউ ইসলামকে এগুলোর সাথে মিলানোর চেষ্টা করেছেন।

    খ. ইসলামের দুশমনরা ইসলামের দুর্নাম করা এবং মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে দূরে রাখার জন্য ইসলামের নামে মুসলমানদের মাঝে এমন কিছু বিধি-বিধান ও চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে, যা আদৌ ইসলামী নয়।

    গ. ইসলামের উপলব্ধি এবং এর বিধি-বিধানগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে আরবী ভাষার প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের ক্রমবর্ধমান ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে একে ইসলাম থেকে পৃথক করে দেওয়া হয়েছে; যদিও আল্লাহ্‌র দ্বীনকে তার মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য কোন ভাষা দিয়ে পুরোপুরি উপলব্ধি করা অসম্ভব। তাছাড়া নতুন নতুন পরিস্থিতিতে ইজতিহাদের মাধ্যমে মাসআলা ইস্তিম্বাত করা এবং সে আলোকে ফাতওয়া প্রদানের জন্য আরবী ভাষার নাহু-সরফ, আদাব, বালাগাত-ফাসাহাত (ব্যাকরণ, সাহিত্য ও অলংকার) ইত্যাদি বিষয়ের সুগভীর জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক।

    ঘ. খৃষ্টীয় সতের শতাব্দী হতে পশ্চিমা কুফর দেশগুলো মুসলমানদের উপর মিশনারী, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আগ্রাসন চালাতে শুরু করে। তাদের এই আগ্রাসনের উদ্দেশ্য ছিল উম্মাহর মধ্যে ইসলামের বুঝ এর ব্যাপারে বিকৃতি ঘটিয়ে মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ইসলামকে ধ্বংস করা।

    এহেন পরিস্থিতিতে মুসলমানদেরকে জাগ্রত করার জন্য বিভিন্ন ভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। ইসলামী-অনৈসলামী বহু আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে সবই অকৃতকার্য রয়ে গেছে। না মুসলমানদেরকে জাগ্রত করা সম্ভব হয়েছে, না অধঃপতন ও জিল্লতীর পথ রোধ করা গেছে। ইসলাম দ্বারা মুসলমানদেরকে জাগ্রত করার এসব চেষ্টা ও আন্দোলন সফল না হওয়ার পিছনে অনেক কারন রয়েছে, যেমন-

    (১) অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে যে, যাঁরা মুসলমানদেরকে জাগ্রত করার সুকঠিন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তারা নিজেরাই ইসলামিক চিন্তাকে যথাযথ গভীরতায় অনুধাবন করেননি। এটা এ জন্য হয়েছে যে, তাঁরা প্রায়শই কিছু আচ্ছন্নকারী বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁরা মুসলিম উম্মাহ্কে জাগ্রত করার মাধ্যম হিসাবে সুনির্দিষ্ট কোন চিন্তা ও পদ্ধতির কথা বলেননি; বরং মোটা দাগে ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন। মুসলমানদের বাস্তব সমস্যাবলীর ইসলামিক সমাধান এবং ঐ সমাধানগুলোর প্রায়োগিক দিক নিয়ে তারা সুগভীর আলোচনা করেননি। এসব সমাধানগুলো তাঁদের নিজেদেও চিন্তার মাঝেও স্বচ্ছভাবে ছিলনা। ফলে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পারিপার্শিক অনৈসলামিক বাস্তবতাই তাদের চিন্তার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। শুধু তাই নয়, বাস্তবতার সাথে ইসলামকে মিলানোর জন্য কেউ কেউ ইসলামের এমনসব ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন, যা নুসূস তথা কুরআন ও হাদীস দ্বারা অনুমোদিত নয় এবং যা রাসূল (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম থেকে বর্ণিত হয়ে আসা মূল ব্যাখ্যার পরিপন্থী। মোট কথা অনৈসলামিক বাস্তবতাকে ইসলাম দ্বারা পরিবর্তন করার বিষয়টিকে মুখ্য হিসাবে দেখার পরিবর্তে প্রচলিত বাস্তবতার সাথে ইসলামকে মিলিয়ে ও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এজন্যই ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদির সাথে ইসলামের পরিপূর্ণ বৈপরিত্য থাকা সত্বেও তাঁদের কেউ কেউ এগুলোকে ইসলামী বলে গণ্য করেছেন এবং মানুষকে এগুলোর প্রতি আহ্বান করেছেন।

    (২) ইসলামী চিন্তা ও আহকাম বাস্তবায়নের সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করার পরিবর্তে আপাতঃ ফলদায়ক কিছু করাকেই তাদের কেউ কেউ ইসলাম বাস্তবায়নের পথ মনে করেছেন। আর ইসলামী পুণঃর্জাগরণের উপায় হিসাবে শুধুমাত্র মসজিদ নির্মাণ, বই পত্র প্রকাশ, দাতব্য ও সমাজ-সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান খোলা, চরিত্র গঠন ও ব্যক্তির সংশোধনকেই মনে করেছেন যথেষ্ট। অন্য দিকে সমাজ নষ্ট হওয়া কিংবা সমাজের উপর প্রাধান্য বিস্তারকারী কুফর চিন্তা, কুফর ব্যবস্থা ও কুফর বিধি-বিধানের প্রাবল্য সম্পর্কে তারা ছিলেন অনেকটাই অমনোযোগী। তাদের ধারনা ছিল ব্যক্তির সংশোধন দ্বারাই সমাজ সংশোধন হয়ে যাবে। অথচ সমাজ সংশোধন করার কার্যকর উপায় হচ্ছে ব্যক্তির সংশোধনের পাশাপাশি সমাজের চিন্তাধারা, অনুভূতি এবং ব্যবস্থাদিরও সংশোধন করা । আর ব্যক্তির সংশোধনও অনেকাংশে সমাজ সংশোধন দ্বারাই সম্ভব। কারন সমাজ শুধুমাত্র কতিপয় ব্যক্তির সমষ্টিরই নাম নয়, বরং সমাজ হচ্ছে ব্যক্তি ও কতিপয় সম্পর্কের সমষ্টির নাম। অর্থাৎ সমাজ বলা হয়, ব্যক্তি, চিন্তা, অনুভূতি এবং শাসন ব্যবস্থার সমষ্টিকে। তাই সমাজ পরিবর্তন করতে হলে এ সবগুলোকেই পরিবর্তন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) জাহেলী সমাজকে ইসলামী সমাজে পরিবর্তন করার জন্য এ কাজগুলোই করেছেন। তিনি (সা) সমাজে বিদ্যমান আকীদা (বিশ্বাস) কে পরিবর্তন করে ইসলামী আকীদায় পরিনত করেছেন। জাহেলী চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা এবং প্রথাগুলোকে তিনি ইসলামী চিন্তা- ভাবনা, ইসলামী ধ্যান-ধারণা এবং ইসলামী আচরণ দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) মানুষের আবেগ-অনুভুতি তগুলোকে জাহেলী চিন্তা, জাহেলী বিশ্বাস এবং জাহেলী প্রথা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইসলামী আকীদা এবং ইসলামী চিন্তা ও আহকামের সাথে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এ পথেই আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা‘আলা তাঁর রাসূলকে মদীনার সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মদীনাবাসী ইসলামী আকীদার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরা ইসলামী চিন্তা, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামী আহকামকে আপন করে নিয়েছেন, তখনই তিনি (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ “বাই‘আতে‘আকাবায়ে ছানিয়ার” (আকাবার দ্বিতীয় বাই‘আত) পর মদীনায় হিজরত করেছেন এবং সেখানে ইসলামী বিধি-বিধান সমূহ রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এভাবেই মদীনায় একটি ইসলামী সমাজ কায়েম হয়েছিল।

    (৩) কেউ কেউ মনে করেছেন মুসলিম জনগনের উপর শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামের পুর্ণজাগরণ সম্ভব। তাই তারা অস্ত্র তুলে নিয়েছেন। কিন্তু তারা “দারুল কুফর” এবং “দারুল ইসলামের” মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হননি। তারা এটাও উপলব্ধি করেননি যে, দারুল কুফর এবং দারুল ইসলামে দাওয়াত এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ভিন্নতা থাকা উচিত? আজকে আমরা যে সব দেশে বসবাস করছি, এগুলোও নীতিগতভাবে দারুল কুফর। কারন এখানে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও কাফেরদের চিন্তা, বিধি-বিধান ও কুফরী শাসন ব্যবস্থাই কার্যকর। এ অবস্থাটি হযরত মুহাম্মদ (সা) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির সময়ের মক্কা শরীফের অবস্থার সাথে অনেকাংশেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব, এখানের দাওয়াতের ধরনও হবে সেসময়ের মতই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের সুন্নাহ্ অনুযায়ী ইসলাম প্রতিষ্ঠার কর্মসূচীগুলো শুধু দাওয়াত ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কোনরূপ সশস্ত্র তৎপরতার রূপ লাভ করবেনা। কারণ তখনকার কাজের উদ্দেশ্য এটা ছিলনা যে, শুধুমাত্র এমন কোন শাসককে হটানো যে ইসলামী রাষ্ট্রে কুফর আইন চালু করেছে কিংবা সে নিজে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে (যাকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপসারণ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে) বরং উদ্দেশ্য ছিল একটি দারুল কুফরকে তার সমস্ত চিন্তা ও ব্যবস্থাদিসহ পুরোপুরি পরিবর্তন করা। আর এই পরিবর্তন সম্ভব সে দেশের বা সে সমাজের ব্যাপক জনগণের মধ্যে বিদ্যমান চিন্তা, অনুভূতি এবং প্রচলিত রাষ্ট্রকাঠামোকে পুরোপুরি পরিবর্তনের মাধ্যমে। রাসূল (সা) মক্কায় সে উদ্দেশ্যেই কাজ করেছিলেন। অপরদিকে দারুল ইসলামের বিষয়টি ভিন্ন। দারুল ইসলাম হচ্ছে এমন ভূমি যেখানে আল্লাহ্‌র অবতীর্ন আহ্কাম দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু কোন শাসক যদি ক্ষমতায় এসে সরাসরি স্পষ্ট কুফরী বিধান দ্বারা প্রকাশ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে শুরু করে, তাহলে তার বিরোধিতা করা মুসলমানদের জন্য ফরয। মুসলমানরা তাকে চ্যালেঞ্জ করবে, যেন সে পুনরায় ইসলামের দিকে ফিরে আসে। যদি সে ফিরে না আসে, তাহলে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা উম্মাহ্‘র উপর ফরয হয়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে তাকে পুনরায় আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত বিধান চালু করার জন্য বাধ্য করা হবে। যেমন হযরত উবাদাহ বিন সামিত (রা)-বর্ণিত এক হাদীসে আছে,

    “এবং (আমরা রাসূল (সা) এর সাথে এ বাই’আতও করেছি যে) আমরা ‘উলূল আমরের’ সাথে ততক্ষন পর্যন্ত বিবাদ করবনা, যতক্ষন না সে প্রকাশ্য কুফুরীতে লিপ্ত হয়; (রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) এমন কুফুরী যে বিষয়ে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত কোন শক্তিশালী প্রমান রয়েছে।”

    ইমাম মুসলিম (রহ) হযরত আ’উফ ইবনে মালিক (রা) এর সূত্রে বর্ণনা করেন,

    “বলা হলো হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তরবারী দ্বারা তাদেরকে অপসারণ করবো না ? তিনি বললেন ‘না! যতক্ষন পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত কায়েম রাখবে।

    সালাত কয়েম রাখার কথা বলে এখানে ইসলামী আহ্কাম মোতাবেক শাসন পরিচালনার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে (দ্বীনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ রুকন উল্লেখ করে সম্পূর্ণ দ্বীনকে বুঝানোর মূলনীতি অনুযায়ী)।’ এই দু’টি হাদীস আমাদেরকে দারুল ইসলামে শাসকদেরকে চ্যালেঞ্জ করা এবং তাদেরকে স্পষ্ট কুফরী থেকে বিরত রাখার জন্য কিভাবে কখন অস্ত্র ধরা বা শক্তি প্রয়োগ করা যাবে, তার পন্থা শিখিয়ে দিয়েছে।