তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং

যে কোন বিষয় সম্বন্ধে সম্যক ধারনা পাওয়া যায় যখন সেই বিষয়টি সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর অধীনে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী ব্যাংকিং এর বিষয়টিও তেমনই। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ব্যাঙ্কিং এর একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। এই বিশেষ ভূমিকার কারনে ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসা’ অন্যান্য ‘ব্যবসা/বাণিজ্য’ থেকে পৃথক। তার আইনি কাঠামোও পৃথক। ব্যাঙ্কিং ব্যবসা ছাড়া অন্য কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের নামের সঙ্গে ‘ব্যাংক’ শব্দটি যুক্ত করতে পারেনা (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৮)। ব্যাঙ্ক-কোম্পানি বলতে বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনাকারী কোন কোম্পানিকে বুঝায় (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৭(ণ))। এই ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে সকল কোম্পানি পণ্য উৎপাদন বা বাণিজ্য পরিচালনা করে এবং শুধুমাত্র এই উৎপাদন বা বানিজ্যের অর্থ সংস্থানের জন্য জনগণের নিকট থেকে টাকার আমানত গ্রহণ করে সেই সকল কোম্পানি ব্যাংক ব্যবসা করছে বলে গণ্য হবেনা। ব্যাংক ব্যবসা বলতে অর্থ কর্জ প্রদান বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে জনসাধারণের নিকট থেকে এইরূপ আমানত গ্রহণ করা, যা চাহিবা মাত্র বা অন্য কোনভাবে পরিশোধযোগ্য, এবং চেক, ড্রাফ্ট, আদেশ বা অন্যকোন পদ্ধতিতে প্রত্যাহারযোগ্য (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৫(ত))। অর্থাৎ কোন ব্যাংক পণ্য উৎপাদন বা প্রকৃত বানিজ্য পরিচালনা করতে পারেনা। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ইসলামী ব্যাঙ্কিংসহ সব ধরনের ব্যাঙ্কিং এই ব্যাঙ্কিং সঙ্ঘার পরিধির ভিতর পরিচালিত হয়, যা সাধারণ ব্যবসা/বানিজ্য থেকে পৃথক। ইসলামী ব্যাঙ্কিং পরিচালনার বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার (Guidelines) প্রথম সেকশনে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। নীতিমালায় বালা হচ্ছেঃ “ This guideline has been prepared mainly on the basis of Banking Companies Act 1991, Companies Act 1994, and Prudential Regulations of Bangladesh Bank. However, this guideline should be treated as supplimentary, not substitute, to the existing banking laws, rules and regulations. In case of any point not covered under this guideline as also in case of any contradiction, the instruction issued under the Banking Companies Act and Companies Act will prevail.”
সরকারের রাজস্বনীতি (Fiscal Policy) বাস্তবায়বনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) প্রয়োজনীয় মুদ্রানীতি (Monetary Policy) গ্রহন করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রানীতি মূলত ব্যাংক-কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে থাকে। অর্থাৎ ব্যাংক হচ্ছে এই সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নির্ধারণ ও বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ব্যাঙ্কগুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদান। অর্থাৎ, সংগ্রহীত আমানতের একটি অংশ গচ্ছিত রেখে বাকি অর্থ ঋণ প্রদান করা। কিন্তু এই প্রদানকৃত ঋণ আমানতদাতার (Depositor) আমানতকে হ্রাস করেনা। বরং আমানতদাতা যেকোন সময় তার আমানত উত্তোলন করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় Fractional Reserve Banking বলা হয়। এই ক্রমাগত নতুন ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) মাধ্যমে ব্যাঙ্কগুলো নতুন অর্থ সৃষ্টি ও তার প্রবাহ বৃদ্ধি করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকসহ সকল ব্যাংকের কার্যক্রমকে সরকারের এই মৌল উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হয়। ঋণ সৃষ্টির এই মৌলিক চরিত্র রক্ষার জন্যই ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সীমিত করা হয়। অর্থাৎ, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকেও এই ঋণ সৃষ্টির আলোকে যাচাই করতে হবে।
কিন্তু ইসলামী ব্যাংক সরকারের এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাহ্যত একমত প্রকাশ করেনা। আদর্শগত কারনে ইসলামী ব্যাংক দাবী করে যে তারা সুদ ভিত্তিক ঋণ প্রদান করেনা, বরং তারা মুলত বাণিজ্য (Trading) বা উৎপাদনে মূলধনী বিনিয়োগ (Equity Investment) করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকের এই ব্যবসায়িক দাবী আইনসংগত ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসার’ পরিপন্থী, যা আগেই উল্লেখ করেছি। বিপরীতমুখী দুটি ধারনার সমন্বয়ের এই অসম্ভব প্রচেষ্টার কারনে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ও তাদের দালিলিক উপস্থাপনার ভিতর বিস্তর পার্থক্য, অসংগতি এবং জটিলতা দেখা যায়।
উপরন্তু, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আমাদের সমাজের ধারনার মাঝেও সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। ব্যাংকের ঋণপ্রদানকারী চরিত্রই আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের ধারনায় উপস্থিত। ইসলামী ব্যাংক এখানে কোন ব্যতিক্রম নয়। ইসলামী ব্যাংকের সহযোগিতায় যদি আপনি একটি গাড়ি কিনেন তবে আপনি সাধারণভাবে মনে করেননা যে গাড়িটি আপনি ইসলামী ব্যাংক থেকে কিনেছেন। বরং মনে করেন আপনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে (অর্থাৎ ঋণ নিয়ে) গাড়িটি কিনেছেন। আমরা সাধারণভাবে বলিনা যে ইসলামী ব্যাংক ভাল গাড়ি বিক্রি করে। যদিও এখানে দালিলিকভাবে ইসলামী ব্যাংক গাড়ি বিক্রেতা এবং আপনি গাড়ি ক্রেতা। অনুরূপভাবে কোন শিল্পপতি ইসলামী ব্যাংকের সহায়তায় কাঁচামাল ক্রয় করলে সাধারণভাবে তিনি মনে করেননা যে ইসলামী ব্যাংক তার ব্যবসায়ের অংশীদার। বরং মনে করেন কাঁচামাল তিনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে কিনেছেন। সুতরাং, দেখা যায় ইসলামী ব্যাঙ্কিং এর ক্ষেত্রে সেবা গ্রহীতা ও সেবা প্রদানকারীর মাঝে ধারণাগত ঐক্য নেই, যা তাদের চুক্তিকে বাতিল বা অকার্যকর করে দেয়। আলোচনাটি এখানেই শেষ করে দেয়া যায়। তবু অধিকতর অনুধাবনের স্বার্থে প্রধান অসংগতিগুলোকে আরও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।
লেনদেন ও পরিচালনার প্রকৃতি:
যেহেতু ব্যাংকিং লেনদেন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ সুদের হার নিয়ত্রন ও ঋণ সৃষ্টির জন্য, পরিচালিত হয়, সেহেতু তার লেনদেনের প্রকৃতিকে সীমাবদ্ধ করতে হয়। আইন ব্যাংকগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন পণ্যের ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবসা করতে অনুমোদন দেয়না (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৯)। অবশ্য এখানে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ধারাটি শিথিল করা হয়েছে। এখানে অনুধাবনের বিষয় হচ্ছে তাদের অনুসৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি অবশ্যই প্রকৃত বানিজ্যের অনুরূপ নয়। প্রকৃত বানিজ্যিক লেনদেন (Real Commercial Transaction) অর্থনীতিতে ঋণ সৃষ্টিতে কোন ভূমিকা রাখেনা। তাই এই ধরনের প্রকৃত বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাঙ্কিং কোম্পানির আওতা বহির্ভূত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নিয়ত্রন ও তত্ত্বাবধানের সীমার বাইরে। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক তাদের এই ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতিতে এমন বৈশিষ্ট্য আরোপ করে যাতে তা চূড়ান্ত বিচারে ঋণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে ব্যহত না করে। এ কারনেই প্রচলিত (Conventional) ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতির মাঝে প্রচুর সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন,
(১) আমানতদাতাকে প্রদেয় এবং বিনিয়োগ থেকে অর্জিত লাভের হার (Mark-up) প্রচলিত ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারণ করা হয়। কারন লাভ বা সুদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। অপরপক্ষে, প্রকৃত বাণিজ্যের লাভ বাজার চাহিদা ও ব্যবসায়িক ঝুকির উপর নির্ভরশীল, কোন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয় নয়।
(২) ইসলামী ব্যাংক এবং প্রচলিত ব্যাংক প্রায় একই ধরনের পুঁজির পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy), Statutory Reserve, সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা (Asset-Liability Management), ঝুকি বিশ্লেষণ (Risk Analysis), বিনিয়োগকৃত সম্পদের শ্রেণীকরণ ইত্যাদির নীতি মেনে চলে। স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো অনুসরণের কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই।
(৩) মূলধন বিনিয়োগের (Equity Investment) ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়, বর্তমানে যা হচ্ছে মোট মূলধন (Total Equity) এর সর্বোচ্চ ২৫%। এই সীমা কোন ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের (Debt and Equity) সামান্য অংশ। বিনিয়োগের এই সীমা ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক এই সীমার অতিরিক্ত মূলধনী বিনিয়োগের (Equity Investment) যে সকল উপায় (Instruments) অবলম্বন করে থাকে তা মূলধনের চরিত্র ধারন করেনা, বরং চূড়ান্ত বিচারে তা হয় ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন (Quasi Debt)। যেমন, (ক) বিনিয়োগের উপর লাভের হার নির্ধারণ এবং অর্জিত লাভ বিতরণে (আমানতদাতাদের মাঝে) ‘অতিক্রান্ত সময়’ কে বিবেচনায় আনা, (খ) বিনিয়োগের উপর ইসলামী ব্যাংকের দাবী (Claim) ঐ ব্যবসায় প্রকৃত মূলধনদাতাদের দাবীর উপরে স্থাপন করা বা অন্যান্য ঋণ সরবরাহকারী ব্যাংকের দাবীর সমপর্যায়ে রাখা, (গ) বিনিয়োগ/ঋণ পুনঃতফসিল (Loan Rescheduling) এর বিধি অনুসরণ করা, ইত্যাদি। ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিনিয়োগগুলোকে তাদের নীতির অধীনেই গ্রহণ করে থাকে, অর্থাৎ ধরে নেয়া হয় ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগের এই সীমা অতিক্রম করেনি।
বিনিয়োগ প্রবাহে জটিলতা:
ইসলামী ব্যাংক আমানতদাতার কাছ থেকে ব্যবসার ব্যবস্থাপক (মুদারিব) হিসেবে আমানত গ্রহণ করে থাকে এবং আমানতদাতা হয় পুঁজি বিনিয়োগকারী (সাহিব আল-মাল)। অপরপক্ষে ইসলামী ব্যাংক পুঁজি বিনিয়োগকারী হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থলগ্নি করে থাকে, যেখানে লগ্নিকৃত ব্যবসার প্রতিষ্ঠান/মালিক হয় ব্যবসার ব্যবস্থাপক। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক এখানে দ্বৈত চরিত্র ধারন করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ইসলামী ব্যাংক প্রকৃত অর্থে ব্যবসা ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করেনা। কারন অর্থ লগ্নি করা আর ব্যবসা পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। তাই আমানতদাতার সঙ্গে তার চুক্তিটি অকার্যকর।
অর্থ প্রবাহের এই ধারা এবং দলিলাদি বিশ্লেষণ করে ইসলামী ব্যাংককে বড়জোর একটি বিশেষায়িত আর্থিক মাধ্যম (Special Purpose Vehicle) বলা যায়, যা Pass-Through পদ্ধতিতে অর্থ সঞ্চারন করছে, কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হবার শর্তগুলো পূরণ করেনা।
আমানত ব্যবস্থাপনায় জটিলতা:
যেকোন ধরনের বিনিয়োগ বিনিয়োগকারীর তহবিলকে সমপরিমাণে হ্রাস করে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ইসলামী ব্যাংক যখন আমানত বিনিয়োগ করে তখন আমানতদাতার আমানত শুধু অক্ষুন্নই থাকেনা আমানতদাতা যেকোনো সময় তা উত্তোলনও করতে পারে। ইসলামী ব্যাংককে এটি করতে হয় ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। আমানতের এই বৈশিষ্ট্যটি কোন স্বাভাবিক ব্যবসায় পরিলক্ষিত হয়না। দ্বিতীয়ত, আমানতদাতাদের যেকোনো সময় আমানত ফেরতের এই অঙ্গিকার কোন ব্যাংকেরই সামর্থ্যের অধিন নয়, অর্থাৎ ব্যাংক সকল আমানতদাতাদের আমানত এক সঙ্গে ফেরত দিতে পারেনা। সুতরাং, তাদের এই অঙ্গিকার ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর।
হিসাব এবং কর কাঠামো:
প্রচলিত ব্যাংকের মতই ইসলামী ব্যাংকের হিসাব ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইনের অধীনে রক্ষা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত Guidelines on the Specimen Reports and Financial Statements for Banks under Islamic Shariah-য় বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই দেখা যায় মুদারাবা এবং আল-ওয়াদিয়া হিসাবের (প্রচলিত ব্যাংকের সঞ্চয়ী এবং চলতি হিসাবের অনুরূপ হিসাব) অধীনে সংগৃহীত আমানত মূলধনী দায় (Equity Liability) না হয়ে সাধারণ দেনা (Debt Liability) হিসেবে দেখানো হয়। অর্থাৎ Accounting Standard ইসলামী ব্যাংকের আমানতকে সাধারণ ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিবেচনা করে সাধারণ দেনার শ্রেণীভুক্ত করে।
ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান সুদের মতই তার প্রদেয় লাভের উপর কর সুবিধা (Tax Benefit) পেয়ে থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ ক্ষেত্রে লাভকে সুদের বৈশিষ্ট্যেই বিবেচনা করে এবং প্রদেয় লাভকে সুদের মতই আর্থিক খরচ (Financial Expense) হিসেবে গণ্য করে। লাভকে আর্থিক খরচ হিসেবে গণ্য করার কারনে ইসলামী ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখতে পারে। ব্যাংকিং কোম্পানির আয়কর অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়কর থেকে ৩০% থেকে ৫০% অধিক হয়ে থাকে যাতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে Return on Capital এবং Return on Labor এর মাঝে ভারসাম্য বজায় থাকে। এ ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংককে পৃথক করা হয়না। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকের আয়কে তার বিনিয়োগকৃত তহবিলের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে বলে ধরা হয়, তার ব্যবসায়িক শ্রমের (Labor) বিপরীতে নয়। সংক্ষেপে, হিসাব এবং কর কর্তৃপক্ষ ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকে মূলত ঋণ সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করে, কোন প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম হিসেবে নয়।
মুরাবাহা বিনিয়োগ:
ইসলামী ব্যাংককের ৫০% এর অধিক লেনদেন হয় মুরাবাহা পদ্ধতিতে। তাই এই প্রকারের লেনদেনের দুটো সমস্যা আলাদা ভাবে উল্লেখ করছি। প্রথমত, ব্যাংক এখানে যে পণ্যটি ক্রেতার কাছে বিক্রি করে তা বিক্রয়ের সময় তার মালিকানায় থাকেনা। দ্বিতীয়ত, ক্রেতা কোন কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এই উভয় রীতিকেই ইসলাম নিষিদ্ধ করে। উপরের আলোচনা থেকে এটা বলা যায় যে ইসলামের অর্থব্যবস্থা (Economy) এই কুফর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কারন দুটি ব্যবস্থা দুটি বিপরীতমুখী মতাদর্শের (Ideology) ভিত্তিতে গঠিত। এই দুই মতাদর্শের মাঝে সমন্বয়ের চেষ্টা মানুষকে প্রতারিত করে মাত্র। এবং এই প্রতারনা যুলুমের গণতান্ত্রিক-ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। তাই আজ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হওয়াই হবে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। খিলাফাহ রাষ্ট্রই ইসলামের ন্যায় ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত বিনিয়োগ, উৎপাদন, এবং সুষম বণ্টনের ক্ষেত্র তৈরি করবে। তখনই কেবল মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে।
Mahmud Saadiq
এটা কি রাষ্ট্র নাকি মৃত্যুপুরী?

– সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মহসিন খান বলেছেন ‘স্যুট এ্যাট সাইট’ অর্থাৎ দেখা মাত্র গুলি।
– এর আগে বিজিবি প্রধানের একই বক্তব্য ছিল
– মন্ত্রীসভা কমিটির সভাপতি ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ‘নাশকতাকারীদের’ ধরতে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
– বিরোধী দলকে নিঃশেষ করতে নির্দেশ চান সাংসদ শামীম উসমান
– রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন সরকার সাংবিধানিক শাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে।
– এ ছাড়া প্রতিদিন মন্ত্রী সাংসদরা এক প্রকার মুখস্ত বলে বেড়াচ্ছেন ‘সর্বোচ্চ কঠোর ব্যাবস্থা নেওয়া হবে’
– রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যক্তিবর্গের হুমকি ধমকি ও তা কার্যকরে সরকারের নীতি নির্ধারণী কমিটির সভায় তার অনুমোদন।
একদিকে আওয়ামি সরকার দেশের জনগণের সম্পদ ব্যবহার করছে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে বি এন পি ক্ষমতায় যাওয়ার লিপ্সায় তার গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে।
এই দু দলের যাঁতাকলে একদিকে যেমন দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামি সরকারের নির্দেশে পুলিশ বিজিবি’র গুলিতে হতাহত হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে বিরোধী দলীয় গুন্ডাবাহিনীর কাছে চোরাগুপ্তা হামলার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যার করুণ সাক্ষী দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিট ও মর্গগুলি।
এই অন্যায় জুলুম কোন পক্ষই দায় শিকার করছেনা, যদিও তা দিবালোকের মতই পরিষ্কার।
বি এন পি – আওয়ামিলীগের এই জুলুম নিষ্পেষণ আজকে নতুন নয়, বরং ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার দৌড়ে বলির পাঁঠা হয় সাধারণ জনগণ। বিএনপি আওয়ামিলীগ গণতন্ত্রেরই সৃষ্টি। তায় এ হত্যাযজ্ঞ, জুলুম, অন্যায় ততদিন চলতে থাকবে যতদিন গণতন্ত্র বহাল তবিয়তে এ দেশে প্রতিষ্টিত থাকবে।
বাংলাদেশ ১৫ কোটি মুসলমানের দেশ এখানে সধারণ জনগণের একমাত্র দাবি আল্লাহ্র হুকুমতেই দেশ চলবে। আর মুসলমানদের শাসনব্যবস্থা কখনোই গণতন্ত্র হতে পারেনা। মুসলমানদের আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্ধারিত একমাত্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা হল খিলাফত।
খিলাফত সে শাসনব্যবস্থা যেখানে পরিপূর্ণ আল্লাহ্’র হুকুম বাস্তবায়িত হয়। খিলাফত এমন শাসক ও দায়িত্বশীল পদ তৈরী করে যেখানে সকল দায়িত্বশীল আল্লাহ্কে ভয় করে ও জনগণের জবাবদিহিতার সম্মুখীন থাকে।
বাংলাদেশে বর্তমান সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ গণতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করা। নিশ্চয় এই জমিনে ইমানদারদের সৎকর্ম ও দোয়ায় আল্লাহ্ খিলাফতের ওয়াদা পূরন করবে, ইনশাল্লাহ।
আমাদের প্রিয় রাসূল (স) বলেছেন “ …সুম্মা তাকুনু খিলাফাতান আলা মিনহাজিন নুবুওয়াহ” অর্থাৎ, অত্যাচারের অন্ধকারের যুগ শেষে নুবয়্যতের আদলের খিলাফাহ’র স্নিগ্ধ আলোর ভোর খুব সন্নিকটেই। এখন সময় এসেছে কুফরি গণতন্ত্রের বুকে পদাঘাত করে সেই দিকে ফিরে যাওয়া যে দিকে আল্লাহ্ ও তার রাসূল আমাদেরকে আহ্বান করছেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আল কুরআনে বলেন-
“হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সেই ডাকে সাড়া দাও, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যা তোমাদের মাঝে জীবনের সঞ্চার করে“। (আনফাল: ২৪)
আতিক রহমান
জ্বলছে; জ্বলুক বাংলাদেশ !

“দেশপ্রেমিক” বিপ্লবী “বাঙালি” জনতা আজ নির্বাক দর্শকে পরিণত হয়েছে। দুই নেত্রীর অন্তর্দাহে যখন জ্বলে যাচ্ছে বাংলাদেশ তখন কোথায় গেল আমাদের দেশপ্রেম, কোথায় গেল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মূলত এগুলো কিছু ফাকা বুলি ছাড়া আর কিছুই না।
আজ প্রতিবাদী মানুষকে জনগণের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ-বিজিবি দ্বারা পাখির মতো গুলি করা হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে, এবং প্রতিবাদের নামে মানুষকে আগুন এ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, জনগণের সম্পদ জ্বালানো হচ্ছে, ভাংচুর করা হচ্ছে। আজ জনগণের জান নিয়ে পুতুল খেলায় মগ্ন দুই নেত্রী। বিষয়টা যেন এমন পুতুল নাচের সুতো যেন তাদের হাতে, তারাও নাচায় আমরাও নাচি। কখনো সরকার তার লাইসেন্সকৃত অস্ত্রধারী বাহিনী দিয়ে মানুষ মারছে অন্যদিকে বিএনপি তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে মানুষ পোড়াচ্ছে।
আজ আমরা কি সে দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন আমরা স্বয়ং নিজে অথবা আমাদের পরিবারের কেউ আগুনে পুড়ে মারা পড়ব? অথবা কোন বুলেট এসে আমাদের, শিশুদের, মা-বোন-স্ত্রীদের দের বুকে লাগবে? তবেই কি আমাদের ঘুম ভাঙবে? তাহলে রাসূল(সা) বলেছেন,
“তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং লোকদের কল্যাণময় কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। অন্যথায় আল্লাহ কোন আযাবের মাধ্যমে তোমাদের ধ্বংস করে দেবেন কিংবা তোমাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক পাপাচারী, অন্যায়কারী ও জালিম লোকদেরকে তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দেবেন। এসময় তোমাদের মধ্যেকার নেককার লোকেরা মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া, প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করবে, কিন্তু তা কিছুতেই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।” (মুসনাদে আহমাদ)
পুরো জাতি আজ নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে- না আছে জানের নিরাপত্তা, না আছে মালের নিরাপত্তা, না আছে খাদ্যের নিরাপত্তা, না আছে বাসস্থানের নিরাপত্তা, না আছে চলাচলের নিরাপত্তা, না আছে আয়-রোজগারের নিরাপত্তা- অথচ তাকাই দেখি হাসিনার দিকে, তাকাই দেখি খালেদার দিকে আর তাদের দিকে যারা গণতন্ত্রের কথা বলে “সবাই সোনাই সোহাগা” কারোরই কোনো কিছুর অভাব নাই। এরাই আমাদের নেতৃত্ব, এরাই আমাদের নেত্রী।এরাই আমাদের গণতন্ত্রের নরকে নিয়ে যাওয়া যালিম।
তিনি (সাঃ) বলেন,
“যদি তুমি দেখ যে আমার উম্মত কোন জালেমকে একথা বলতে ভয় পাচ্ছে যে, ‘তুমি একজন জালেম’ তাহলে আমার উম্মতকে বিদায়” [অর্থাৎ এটা উম্মতের জন্য বিদায় বা পতনের সংকেত] (আহমাদ, তাবারানী, হাকিম, রায়হাকী)
আমরা কি হাসিনা/খালেদার দুঃশাসনের অধীনে থাকা কি আমাদের তাকদীর মনে করছি !!! কখনোই এটা আমাদের তাকদীর হতে পারে না কারণ আল্লাহ মুসলমানকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্টার জন্য, বিজয়ের জন্য, দুনিয়া শাসনের জন্য; যুলুম-নির্যাতন সয্য করার জন্য নয়। এটাই আল্লাহ ও তার রাসুলের ওয়াদা। আল্লাহ সুবনাহুতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন। যেমন তিনি খিলাফত দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।” [সুরা আন নুরঃ ৫৫]
ফয়সাল রাহমান
১৭/০১/২০১৫গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মৃত্যু, কুফরি মৃত্যু


গত ৬ই জানুয়ারী থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র রক্ষার নামে বিরোধী পক্ষের অবরোধ কর্মসূচীর জ্বালাও পোড়াও এবং সরকার পক্ষের দমন নিপীড়ন ও গণগ্রেফতারে আতঙ্কিত বাংলাদেশের জনমনে একটি প্রশ্ন উঠেছে যে এই গণতন্ত্র টা কি জিনিস? কিভাবে এটা রক্ষা হয়? এটা রক্ষার সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্কই বা কী? এবং এটা রক্ষার নামে যত নিরীহ মানুষ প্রান হারাচ্ছে এবং বিনা অপরাধে কারাবরণ করছে এর দায়ভার কার? এবং এর থেকে মুক্তির কার্যকর উপায় কী?
প্রথম কথা, আমরা প্রথম এই ধরণের রাজনৈতিক সংকট দেখছি না এর আগেও আমরা এই দেশে দুই পক্ষের ক্ষমতার লড়াইয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বলি দেখেছি, বহুবার দেখেছি। এবং যখনি এ ধরণের সংকট দেখা গিয়েছে তখনি দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের অনেক বরেণ্য নাগরিকদের বলতে শুনেছি ‘গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আমাদেরকে এখন এরূপ করতে হবে ঐরূপ করতে হবে ‘যার মানে দাড়ায় এই ধরণের সংকটে যেখানে মানুষের জীবন বিপন্ন সেখানেও সেই বিষয়টাকেই রক্ষা করতে হবে যা কিনা এই সমস্যা/ সংকটের মূল কারণ।
হ্যাঁ, এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মানুষ বা তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগতাদের ইচ্ছা অনুযায়ী যা ইচ্ছা তাই আইন তৈরি করে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দেশ শাসন করে সেই আইন বা শাসনে জনগনের জীবন দুঃসহই কেন না হয়ে উঠে । আজ এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারনেই শেখ হাসিনার মতো এমন জালেম ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত যে কিনা বিরোধী পক্ষকে দমনের নামে দেশের সাধারণ মানুষের উপর ষ্টীম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে তার দল ও পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে , এবং এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারনেই তার বিরোধী পক্ষও দেশের সাধারণ মানুষের জান মাল ধ্বংস করছে। এই সবই কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলাফল নয়? তাহলে কার স্বার্থে এই গণতন্ত্র কে টিকিয়ে রাখার ধোঁয়া তোলা হচ্ছে? আমরা জানি এই দুই পক্ষই তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য মার্কিন ব্রিটেন ভারতের দালালি করে এবং তাদের এই দালালি কে টিকিয়ে রাখার জন্যই তাদের এই প্রভুদের নির্ধারিত পদ্ধতি এই জুলুমের হাতিয়ার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের ইসলামপ্রেমী আল্লাহ্ভীরু জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শরিক করে এই উম্মাহকে হারামে নিমজ্জিত করেছে, কারন যখনই আমরা এই ব্যবস্থা, এই শাসকদের মেনে নিচ্ছি আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে শিরকে মত্ত হচ্ছি, কারন এই ব্যবস্থা মানুষের তৈরি আইন দ্বারা পরিচালিত হয় যার অধিকার মানুষকে দেওয়া হয়নি।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
আইন দেয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ্ । [ সূরা ইউসুফ – ৪০ , আনআম – ৫৭]
তিনি আরও বলেন ,
আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না তারাই তো কাফের। জালেম। ফাসেক । [আল মায়িদা – ৪৪,৪৫,৪৭]
তিনি আরও বলেন ,
আর আপনি আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না । [সূরা আল মায়িদা – ৪৮]
এর মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি যে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি কুফর ব্যবস্থা এবং এর সাথে সম্পৃক্ত থেকে আমরা নিজেদের কুফর এর সাথে জড়িয়ে ফেলছি । এবং দেশ জুড়ে যেই জুলুম অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ড চলছে তা এই কুফর ব্যবস্থারই ফলাফল এবং আমরা ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক এই কুফরের বেড়াজালে পড়ে গিয়েছি । আল্লাহ্ আমাদের জন্য কুফর ব্যবস্থার অধীনে থাকা, একে মেনে নেয়া, এবং আল্লাহ্র ভিন্ন অন্য কোনো জীবন ব্যবস্থা অনুযায়ী নিজেদেরকে পরিচালিত করা নিষিদ্ধ (হারাম) করেছেন । এবং একই সাথে একজন খলীফার অধীনে থাকাকে বাধ্যতামূলক করেছেন যিনি আমাদেরকে আল্লাহর দেয়া বিধি বিধান, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমাদেরকে শাসন করবেন এবং মুসলিমদের জান, মাল ও সম্মান রক্ষার্থে সদা সচেষ্ট থাকবেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে তার কাঁধে (কোনো খলীফার) বায়’আত (আনুগত্যর শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলি (যুগের) মৃত্যু । [মুসলিম]
তিনি আরও বলেন, যে (ব্যক্তি) কোনো ইমাম (খলীফা) ব্যতিত মারা গেল , সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করলো । [আহমদ]
তাই নিশ্চিত ভাবে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা যদি মৃত্যুবরণ করি তাহলে আমাদের মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। তাই আমাদেরকে অবশ্যই এই কুফর ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে যেন একজন খলীফাকে বায়’আত দেয়ার মাধ্যমে নিজেদেরকে কুফর ও শিরকের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে এবং জাহিলিয়াতের মৃত্যু হতে বাঁচতে সক্ষম হই।
মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন
খবর বিশ্লেষণ: অবরুদ্ধ দেশ, উত্তরণের উপায়

রাজনৈতিক দাবি আদায়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হরতাল–অবরোধ এখন আতংক ও দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরতাল-অবোরধের নামে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছে। দিন দিন এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বেড়েই চলছে । অবরোধ কর্মসুচি পালনের নামে গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা, নির্বিচারে বাস-ট্রাকে ভাঙচুর-আগুন, রেললাইন উপড়ে ফেলে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী –“অবোরধের বিভীষিকায় মধ্যরাতে পুড়ল ৫ প্রাণ”, “সহিংস রাজনীতির শিকার ফেনীর এস.এস.সি পরীক্ষার্থী অনিক ও শাহরিয়ার”, “বাসে–ট্রাকে বোমা দুই যুবক নিহত, অবরোধে অর্ধশতক গাড়িতে আগুন”, “পুলিশের বাসে পেট্রলবোমা, দগ্ধ ৫ পুলিশ” এই হল অবরোধের আংশিক চিত্র । বিরোধী দলের কথা অনুযায়ী, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। অপরদিকে সরকার যে কোন মুল্যে নাশকতা, সন্ত্রাস দূর করে জনগণের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, প্রয়োজনে নাশকতাকারীদের পায়ে নয়, বুকে গুলি করা হবে।
বর্তমান পরিস্থিতির মত যে কোন অস্থির সময়ে এক শ্রেনীর উচ্ছিষ্টভোগী সুশীল ও আওয়ামী বিএনপির রাজনীতি থেকে বিতাড়িত কিছু ব্যক্তি দেশ ও জাতিকে উদ্ধারে “সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সংলাপ তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়”। তাদের মতে সমোঝতা-সংলাপ এর মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান করা যায়। অনেকের মতে, আমদের দেশে Proper গণতন্ত্র নাই, গণতন্ত্রের নামে পরিবারতন্ত্র বিদ্যমান। আমাদের রাজনীতিবিদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব রয়েছে, তাই আমরা উন্নতি করতে পারছি না। তথাকথিত প্রগতিশীলদের মতে, ধর্মীয় রাজনীতিই আমাদের পিছিয়ে পড়ার মুল কারণ।
আমদের সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে যেই গণতন্ত্রকে উপস্তাপন করা হয়, মুলত সেই গণতন্ত্রই আমাদের সকল দুর্ভোগ এর জন্য দায়ী। গণতন্ত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে আমন্য করে মানুষের সার্বভৌমত্বকে মান্য করা হয়, এখানে কতিপয় মানুষ সকল জনগণের জন্য আইন তৈরি করে, এখানে শাসকের জবাবদিহিতা শুধু মাত্র জনগণের কাছে, আল্লাহর কাছে নয়। গণতন্ত্রে মালিকানার স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে দেশের সম্পদসমূহ বিদেশী কোম্পাণির হাতে তুলে দেয়া হয়, ব্যক্তি ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে সমাজে যিনা-ব্যভিচার, অশ্লীলতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও ইসলামি আকিদাকে নিয়ে কটাক্ষ ও কটূক্তি করা হয়। গনতন্ত্র আমদেরকে আওয়ামী-বিনপিতে বিভক্ত করে বিদেশী প্রভুদের লুটপাটের সুযোগ করে দেয় ও দেশে তৈরি করে কিছু দালাল, যালিম ও মুনাফিক শাসকগোষ্টী, যারা জনগণকে পুড়িয়ে, হরতাল-অবরোধ দিয়ে, জনগণকে জিম্মি করে, জনগণের মৌলিক অধিকারকে কুক্ষিগত করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের মাধ্যমে রাজনীতি করে।
আমাদের ১৫ কোটি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে, শক্তিশালী জাতি হিসেবে দাড়ানোর জন্য গণতন্ত্রকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে সামগ্রিকভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসলামের বিধানসমুহ ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আর্ন্তজাতিক বিষয় পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। কিভাবে শাসক নির্বাচন করতে হবে, কিভাবে শাসককে অপসারন করা হবে, কিভাবে শাসককে জবাবদিহি করা হবে, শাসক জনগণের কোন অধিকারসমূহ পূরন করতে বাধ্য, সবই ইসলামে বিস্তারিত বলা আছে। ইসলামের আইন সমুহ মানুষের ফিতরাতের সাথে মিলে এবং যুগের কারণে আইন সমূহ কখনোই পুরাতন/অচল হয় না কারণ আইন সমূহের উৎস অসীম আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা।
তাই একমাত্র ইসলামই পারে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দীনতা দূর করে ও আওয়ামী–বিএনপির ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম হিসেবে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে মাথা উচু করে দাড় করাতে ।
রাসূল (সা) ১৪০০ বছর পূর্বে মদিনায় ইসলাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আউস, খাযরায, ইহুদি ও বেদুইনদের নিয়ে এমন এক শক্তিশালী মুসলিম জাতি তৈরি করেছেন যার সূর্যোদয় শুধু মাত্র আরব ভুন্ডে ছিল না, বরং ওই রাষ্ট্রের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পরেছিল সমগ্র পৃথিবীতে, যখন যানবাহন ছিল উট ও যোগাযোগের মাধ্যম ছিল কেবল মুখের ভাষা ও কলমের লেখনী। তেমনি আমরা ও যদি ইসলাম দিয়ে সকল সম্যসার সমাধান করি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম বাস্তবায়ন করি তবে পূর্বের মত আবার আমরা ইনশাল্লাহ শক্তিশালী জাতি হিসেবে আর্বিভূত হব।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন –
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাদের তিনি খিলাফত দান করবেন, যেমনটি তিনি দান করেছেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের……………”।
(সুরা নূরঃ ৫৫)আবু তালিম
খবর বিশ্লেষণ: যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ

খবর: রাজধানীর সংসদ ভবনের পূর্ব পাশে খেজুর বাগান রোডে যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ। এতে আগুনে দগ্ধ হয়েছেন দুজন ছাত্রী এবং আহত হয়েছে অপর একজন ছাত্রী।
এছাড়া এর পূর্বেও শুধুমাত্র এই কয়েকদিনের অবরোধ/হরতালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেই বাসে/গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আহত প্রায় অর্ধ শতাধিক, নিহত ৫ (এটি লেখা পর্যন্ত)
২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ এই অবরোধ/হরতালের নামে হাসিনা/খালেদার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখে আসছে। এইসকল যালিমেরা ধারাবাহিকভাবেই শোষণের জন্য ক্ষমতায় আসে, আর এরপর নিজেদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জনগণের ক্ষতি করে চলেছে। তাদের লালিত গুন্ডাদের দ্বারা জনগণের জান-মাল ধ্বংসে লিপ্ত। মায়ের কোলের শিশু থেকে বয়স্ক ব্যক্তি পর্যন্ত কেউই আজ স্বস্তিতে নেই।
আবার, অন্যদিকে প্রশাসন দিয়ে জঙ্গি দমন, নিরাপত্তা বিধানের মিথ্যা ধোঁয়া উড়িয়ে জনগণের মাঝে গ্রেফতার, গুম/খুন আতংক সৃষ্টি করে রেখেছে শাসকগোষ্টী। ফলে জনগণ তাদের নিজেদের গৃহেও স্বস্তিতে নেই।
আবার, এইসকল অস্থিতিশীল পরিবেশে বাজার সিন্ডিকেট মুহুর্মুহু দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে চলেছে। স্টেশনারি থেকে নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য সবকিছুতেই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে দাম বেড়ে চলেছে। প্রকৃত সন্ত্রাসের জন্মদাতা এই সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী এসি রুমে শুয়ে বসে জনগণের টাকায় দিব্যি আয়েস করে দিন কাটাচ্ছে।
নষ্ট গণতান্ত্রিক রাজনীতির সার্কাসে জনগণকে বিএনপি-আওয়ামী লীগ পরিচয়ে বিভক্ত করে নিজেদের ফায়দা লুটায় ব্যস্ত।
২০ বছরের এই গণতান্ত্রিক দুঃস্বপ্ন আমাদের ১৪০০ বছরের সোনালী ইতিহাস থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে না। এটা আমাদের ত্বকদীর নয়। রাসূল (সা) এর প্রতিষ্ঠিত খিলাফত রাষ্ট্রের ১৪০০ বছরের শাসনে আমরা দেখছি, জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, উম্মাহ’র ঐক্য। বর্তমান দূর্নীতিবাজ শাসকদের মত নয়, বরং এমন এক শাসনব্যবস্থা যা অর্থনৈতিক ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধায় যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন এক শাসন ব্যবস্থা যেখানে কুফর শক্তি আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসূল (সা)-কে অপমানের হিম্মত করে না। এমন এক শাসন ব্যবস্থা যা উম্মাহকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসে, আর ইতিহাস এর সাক্ষী।
সুতরাং, আমাদের জন্য এটা সর্বোচ্চ সময়, যখন আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থাকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে নিজেদের পুনরায় সম্মানিত করবো। হাসিনা-খালেদার এই ক্ষমতার কামড়া-কামড়ি থেকে নিজেদের রক্ষায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা উৎখাত পূর্বক খিলাফত প্রতিষ্ঠার ফরয দায়িত্ব পালনের কোন বিকল্প নেই।
এবং রাসূল(সা) বলেছেন,
“…এরপর আবারো আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত”
আর বান্দাদের মধ্যে আলেমগণই আল্লাহকে বেশি ভয় করে..

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
“নিশ্চয়ই তাঁর বান্দাদের আলেমগণই আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শক্তিশালি ও ক্ষমাশীল“।
[আল-ফাতির: ২৮]এ আয়াতের ব্যাপারে ইবন কাছীর বলেন,
(كلما كانت المعرفة به أتمّ والعلم به أكمل، كانت الخشية له أعظم وأكثر)
“আল্লাহ ও তাঁর ক্ষমতার ব্যাপারে জ্ঞান যত বেশি পূর্ণ হবে তত বেশি তাকে বেশি ভয় করবে তারা যারা এই পুর্নাঙ্গ জ্ঞান ধারণ করে”।ইমাম কুরতুবি বলেন,
(فَمَنْ عَلِمَ أَنَّهُ عَزَّ وَجَلَّ قَدِيرٌ أَيْقَنَ بِمُعَاقَبَتِهِ عَلَى الْمَعْصِيَةِ)
“আলেম তারাই যারা আল্লাহর ক্ষমতার ব্যাপার জ্ঞান রাখেন। তারা আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে কোনো সন্দেহের মধ্যে নেই (তা বান্দার অপরাধ যা-ই হোক না কেন)”।আলী ইবন আবি তালহা ইবন আব্বাসের বরাত দিয়ে বলেন,
(الَّذِينَ عَلِمُوا أَنَّ اللَّهَ على كل شي قَدِيرٌ)
“আলেমগণ তারাই যারা জানেন যে আল্লাহ যেকোনো কিছু করার ক্ষমতা রাখেন”।আল-রাবি’ বর্ণনা করেন যে ইবন আব্বাস বলেন,
(مَنْ لَمْ يَخْشَ اللَّهَ تَعَالَى فَلَيْسَ بِعَالِمٍ)
“যে আল্লাহ (ও তার শাস্তি)-কে ভয় করেনা সে আলেমই নয়”।আলী ইবন আবি তালিব (রা) বলেন,
إِنَّ الْفَقِيهَ حق الفقيه من لم يقنط النَّاسَ مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ، وَلَمْ يُرَخِّصْ لَهُمْ فِي مَعَاصِي اللَّهِ تَعَالَى، وَلَمْ يُؤَمِّنْهُمْ مِنْ عَذَابِ اللَّهِ، وَلَمْ يَدَعِ الْقُرْآنَ رَغْبَةً عَنْهُ إِلَى غَيْرِهِ، إِنَّهُ لَا خَيْرَ فِي عِبَادَةٍ لَا عِلْمَ فِيهَا، وَلَا عِلْمَ لَا فِقْهَ فِيهِ، وَلَا قِرَاءَةَ لَا تَدَبُّرَ فِيهَا
সত্যিকারের ফকীহ সে-ই যে কখনো মানুষকে হাল ছেড়ে দিতে দেয় না কিংবা আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হতে দেয় না; আল্লাহর অবাধ্যতাকে তুচ্ছ করে দেখেনা; মানুষ আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে নিরাপদ হয়ে গিয়েছে- এ ধরনের অনুভুতি দেয় না; বিচার করার ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনকে পরিত্যাগ করে না। ইবাদত জ্ঞানভিত্তিক না হলে তা মুল্যহীন, এবং জ্ঞান তার প্রকৃত বুঝ ছাড়া (জেনে রাখা) মুল্যহীন। এবং উপলব্ধি বিহীন তেলাওয়াত এর (প্রকৃতার্থে) কোনো মুল্য নেই”।
আর আল্লাহ শক্তিশালি.. অর্থাৎ, যিনি শাস্তি দেন ও পুরস্কার প্রদান করেন তাকে ভয় করে চলা উচিত।
ইসলামি জ্ঞানের পরিমান ব্যাক্তি হতে ব্যাক্তিতে ভিন্ন হয়ে থাকে। তাই কিছু মানুষ অন্যদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী হবেন এবং তারা যাদের জ্ঞান সল্প তাদের শিক্ষা দান করবেন। ইসলামি আইন-কানুনের ব্যাপারে যাদের গভীর জ্ঞান রয়েছে তারাই উলামা হিসেবে পরিচিত। তারা ইসলামে কোনো আধ্যাত্মিক পদে অধিষ্ঠিত নন, তবে তাদের জ্ঞানের আধিক্যের কারণে তাদের অধিক দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারাই উম্মাহকে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে থাকেন, ইসলামের গুরুত্ব বোঝার ব্যাপারে ও তার ভিত্তিতে জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য উম্মাহর সদস্যদের পথ খুজে পাবার ব্যাপারে তারা সহায়তা করে থাকেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পরিষ্কার করে বলেছেন যে আলেমগণকে তাঁর নাযিলকৃত বিধান মানুষের মাঝে প্রকাশ্যে বর্ণনা করতে হবে।
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ
“আর যারা পূর্বে কিতাব পেয়েছিল তাদের হতে আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে তারা মানুষকে তা ব্যাখ্যা করে জানাবে এবং তা গোপন করবে না“। [আলে ইমরান: ১৮৭]
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জ্ঞান লুকিয়ে রাখার ব্যাপারে সাবধান করেছেন যা তিনি আমাদের আমানতসরূপ দিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ
“নিশ্চয় যারা গোপন করে, আমি যেসব বিস্তারিত তথ্য এবং হেদায়েতের কথা নাযিল করেছি (তা) মানুষের জন্য কিতাবের মধ্যে বিস্তারিত বর্ণনা করার পরও; সে সমস্ত লোকের প্রতিই আল্লাহর অভিসম্পাত এবং অন্যান্য অভিসম্পাতকারীগণেরও“।
[বাকারা ২:১৫৯]আল্লাহর রাসূল আমাদের আলেমদের সম্মান ও গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করেছেন যখন তিনি (সা) বলেন,
(مَنْ يُرِدْ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ)
“যার জন্য আল্লাহ কল্যাণ কামনা করেন তাকে তিনি দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন“। [বুখারি]তিনি (সা) বলেন,
إِنَّ مَثَلَ الْعُلَمَاءِ فِي الْأَرْضِ كَمَثَلِ النُّجُومِ فِي السَّمَاءِ يُهْتَدَى بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ فَإِذَا انْطَمَسَتْ النُّجُومُ أَوْشَكَ أَنْ تَضِلَّ الْهُدَاةُ
“দুনিয়ায় আলেমগণের তুলনা আকাশের তারকারাজির মতো। অন্ধকারে তা দ্বারা জলে ও স্থলে পথপ্রাপ্তি হয়। যদি তারকারাজি অস্ত যায়, তবে (মানুষের) পথপ্রদর্শক (তথা সঠিক পথের দিশা) হারিয়ে ফেলার উপক্রম হবে“। [আহমদ]
সুতরাং, আল্লাহর রাসূলের এসব হাদীস হতে আমরা বুঝতে পারি যে উম্মাহকে পথ দেখাতে ও দ্বীনের অগ্রগতির জন্য আলেমদের ভুমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে তাদেরকে অত্যন্ত প্রয়োজন যাতে তারা উম্মাহকে পথ দেখাতে পারে যে কিভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, কিভাবে উম্মাহকে একটি দেহের মতো ঐক্যবদ্ধ করতে হবে, কিভাবে বিশ্বমঞ্চের নিয়ন্ত্রন নিতে হবে। আলেমগণকেই যালেম শাসকের বিরুদ্ধে উম্মাহর পক্ষে নেতৃত্ব নিতে হবে, সেসব যালেমদের বিরুদ্ধে যারা শুধুমাত্র কুফর শাসন কায়েম করে ক্ষান্ত হয়নি, বরং উম্মাহকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট, এবং এজন্য উম্মাহর যেসব সন্তানদের জেলে পুড়ছে, অত্যাচার ও হত্যা করছে যারা ইসলাম অনুযায়ী সমাজে জীবনধারণ করতে চায়। অতীতে ইসলামের আলেমগণ নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা রেখেছেন। তারা সর্বদাই অন্য সকল স্বার্থের বিপরীতে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর স্বার্থের পক্ষে শক্তিশালি অবস্থান গ্রহণ করেছেন, কখনো কখনো তাদের জীবনবিপন্ন করে হলেও। তারা আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেননি, তাই ইসলামের ব্যাপারে কোনোরূপ আপোষ ছাড়াই সবসময় সত্য উচ্চারন করেছেন। বিশেষ করে শাসক ও তাদের কার্যাবলীর ব্যাপারে তারা এ কাজ গুরুত্ব সহকারে করেছেন।
মুহাম্মাদ (সা) বলেন, যে-ই কোনো যালেম শাসককে আল্লাহর হুকুম লংঘন, তাঁর সাথে কৃত চুক্তি ভংগ, সুন্নাহর সাথে দ্বিমত পোষন, পাপকাজ এবং আল্লাহর বান্দাদের সাথে শত্রুতা করতে দেখে, এবং সে সে ব্যাপারে কিছু বলে বা করে না, তবে এটি আল্লাহর দায়িত্ব তাকে সেখানে (জাহান্নামে) পৌছিয়ে দেয়া যেখানে তার থাকার কথা। [তারীখ আত-তাবারি, আল-কামিল লি-ইবন আছীর]
মুহাম্মাদ (সা) বলেন,
سَتَكُونُ بَعْدِي أُمَرَاءُ مَنْ صَدَّقَهُمْ بِكَذِبِهِمْ وَأَعَانَهُمْ عَلَى ظُلْمِهِمْ فَلَيْسَ مِنِّي وَلَسْتُ مِنْهُ وَلَيْسَ بِوَارِدٍ عَلَيَّ الْحَوْضَ
“আমার পরে অচিরেই (যালেম) শাসকেরা আসবে যারা (তাদের জনগণকে দুর্দশায় পতিত করবে)। যে-ই তাদের মিথ্যাকে সমর্থন করবে এবং যুলুমে তাদের সাহায্য করবে, সে আমার মধ্য হতে না এবং আমি তার মধ্য হতে নই এবং সে হাউজে কাওসারে আমার কাছে (পানি পান করতে) আসতে পারবে না”। [আহমদ, নাসাঈ, তিরমিজি]
শাসকদের জবাবদিহী করার ক্ষেত্রে যে আলেমগণ চুপ থাকেননি বরং ইসলামের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন তার কিছু উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হলো।
সুফিয়ান আছ-ছাওরী বলেন, “যখন (খলীফা) আবু জা’ফর আল মানসূর হজ করতে আসলে আমাকে ডেকে পাঠান। তার পেয়াদাগণ রাতের বেলা আমার ঘরে এসে খুঁজে আমাকে ধরে নিয়ে যায়। যখন আমি তার সামনে উপস্থিত হই তখন তিনি আমাকে তার কাছে বসান। তিনি বলেন, কেন আপনি আমাদের কাছে থাকেন না যাতে আমরা আপনার সাথে আমাদের (রাষ্ট্রীয়) কাজের ব্যাপারে পরামর্শ করতে পারি? আপনি যা বলবেন আমরা তা-ই করবো। আমি (সুফিয়ান) বললাম, (كم أنفقت في سفرك هذا؟) আপনি আপনার এ (হজের) সফরে কত অর্থ ব্যয় করেছেন? আল-মানসূর বললেন, (لا أدري، لي أمناء ووكلاء) আমার জানা নেই, (তবে) এ ব্যাপারে আমার (নিযুক্ত) বিশ্বাসযোগ্য সহকারী রয়েছে। আমি বললাম, (فما عذرك غدًا، إذا وقفت بين يدي الله تعالى فسألك عن ذلك؟) কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহর সামনে দাড়াবেন তখন আপনার কৈফিয়ত কী হবে, যদি আল্লাহ এ বিষয়ে আপনাকে প্রশ্ন করেন? এরপর তিনি উমর (রা)-এর উদাহরণ টেনে বলেন, উমর (রা) একবার তার খাদেমকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, (كم أنفقت في سفرنا هذا؟) আমাদের (হজের) সফরে কত খরচ করেছো? খাদেম বলেছিলেন, (يا أمير المؤمنين، ثمانية عشر دينارًا) হে আমীরুল মু‘মিনীন, ১৮ দিনার। উমর তাতে বলে উঠলেন, (ويحكم أجحفنا ببيت مال المسلمين) দুর্ভোগ তোমাদের! আমরা মুসলিম কোষাগার থেকে বেশি খরচ করে ফেলেছি। সুফিয়ান আরো উদ্ধৃত করে বলেন, ইবন মাসউদ বর্ণিত হাদীসে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, (رب متخوض في مال الله، ومال رسول الله فيما شاءت نفسه له النار غدًا) যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সম্পদ হতে (অমিতব্যায়ীর মতো) নিজের ইচ্ছেমতো ব্যয় করে, তার জন্য রয়েছে জাহান্নাম (অপেক্ষমান রয়েছে)। (সুফিয়ান এসব বলতে থাকলে) আল-মানসূরের এক সহকারী বলে ওঠে, (أمير المؤمنين يُستقبل بمثل هذا) আমীরুল মু‘মিনীনের সাথে এধরণের ব্যাবহার! এতে সুফিয়ান ঈমানদারের আত্মমর্যাদা ও শক্তির বলে জবাব দিলেন, (اسكت إنما أهلك فرعون هامان، وهامان فرعون) খামোশ! হামান-ই ফিরআউনকে ধ্বংস করেছিল এবং ফিরআউন হামানকে। (অর্থাৎ, যে ভুল উপদেশ দিয়েছিল সে তার মাধ্যমে অপরকে ধ্বংস করেছে আর যে উপদেশ গ্রহণ করেছে, সে তা গ্রহণ করেছে, সে সঠিক কাজ না করে, ভুল উপদেশ গ্রহণের মাধ্যমে উপদেশদাতাকেও ধ্বংস করলো)”। [সিরাজুল মুলূক, পৃষ্ঠা-৫১]
যালেম শাসক হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ইরাকে ওয়ালি থাকাকালীন সেখানে হাতীত আয-যায়্যাত নামক একজন আলেম ছিলেন। যখন আল-হাজ্জাজ তাকে গ্রেফতার করে প্রশ্ন করে: (فما تقولي في) আমার ব্যাপারে তোমার ধারণা কী? আয-যায়্যাত জবাবে বলেন, (أقول: إنك عدو من أعداء الله في الأرض، تنتهك المحارم، وتقتل بالظنة) আমি বলি তুমি দুনিয়ায় আল্লাহর দুশমনের মধ্য হতে একজন, তুমি আল্লাহর হুকুম ভংগ করো এবং স্রেফ সন্দেহের ভিত্তিতে হত্যা করে থাকো। আল-হাজ্জাজ এরপর জিজ্ঞেস করে: (فما تقول في أمير المؤمنين) আমীরুল মু‘মিনীন (আবদুল মালিক বিন মারওয়ান) সম্পর্কে তোমার ধারণা কী? জবাবে তিনি বলেন, (انه أعظم جرما منك، وانما أنت خطيئة من خطاياه) সে তোমার চেয়েও বড় পাপী, তুমি কেবল তারই পাপের একটি অংশ। এরপর হাজ্জাজ তাকে নিপীড়ন করার হুকুম দেয়। তারা বাঁশের খুটি তার মাংসের মধ্যে গেথে দেয় এবং পরবর্তীতে বাঁশ চিড়তে শুরু করে ফলে আয-যায়্যাতের মাংস ছিড়ে চলে আসতে থাকে। এতে তিনি শহীদ হন। তাঁর বয়স ছিল কেবল ১৮ বছর। আল্লাহ তাঁর উপর রহম করুন।
আদ-দারিমি বর্ণিত এক বর্ণনায় এসেছে: খলীফা সুলাইমান বিন আবদিল মালিক একদা মদীনায় অবস্থান করছিলেন। সেসময় তিনি আবু হাজিম নামক তৎকালীন এক আলেমকে ডেকে পাঠান। আবু হাজিম যখন আসলেন তখন সুলাইমান জিজ্ঞেস করলেন, (ما لنا نكره الموت) আমরা মৃত্যুকে এত অপছন্দ করি কেন? আবু হাজিম বললেন, (لانكم أخربتم الآخرة وعمرتم الدنيا فكرهتم أن تنتقلوا من العمران إلى الخراب) কারণ তোমরা দুনিয়াকে নির্মান করেছ এবং আখিরাতকে ধ্বংস করেছ। তাই তোমরা নির্মান হতে ধ্বংসস্তুপে যেতে অপছন্দ করো। অতঃপর তাকে ভালো উপদেশ দেবার পর সুলাইমান তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? আবু হাজিম বলেন, আমাকে জবাব দিতে বাধ্য করো না। তিনি বলেন, এটা উপদেশ, আপনার বলতে হবে। আবু হাজিম বলেন, (إن آباءك قهروا الناس بالسيف وأخذوا هذا الملك عنوة على غير مشورة من المسلمين ولا رضاهم حتى قتلوا منهم مقتلة عظيمة فقد ارتحلوا عنها فلو شعرت ما قالوه وما قيل لهم) তোমার পুর্বপুরুষগণ মুসলিমদের উপর চড়াও হয়ে তাদের মতামত ও সম্মতি ছাড়াই ক্ষমতা দখল করেছে। তারা অনেকসংখ্যক মুসলিমকে হত্যাও করেছে। তাদের আচরন ও তাদের সম্পর্কে মানুষের ধারণা আপনারতো জেনে থাকার কথা। একজন লোক বলে উঠলেন, (بئس ما قلت يا أبا حازم) আপনি খুব খারাপ কথা বললেন হে আবু হাজিম! আবু হাজিম বললেন, (كذبت إن الله أخذ ميثاق العلماء ليبيننه للناس ولا تكتمونه) আপনি মিথ্যা বললেন, (বরং) আল্লাহ আলেমদের হতে চুক্তি নিয়েছেন যে তারা (প্রকৃত জ্ঞান) মানুষকে ব্যাখ্যা করে বর্ণনা করবে এবং তা লুকায়িত রাখবে না।
ইমাম মালিক বিন আনাস বর্ণনা করেন, যাকে আল্লাহ কিছু জ্ঞান বা ফিকহ দান করেছেন, প্রত্যেক সেই মুসলিমের দায়িত্ব শাসকের মুখাপেক্ষি হওয়া, তাকে সৎকাজের আদেশ দেয়া ও অসৎকাজে নিষেধ করা। এর মাধ্যমে অন্যদের হতে আলেমগণ পৃথকভাবে চিহ্নিত হন যখন তারা শাসকের মুখাপেক্ষী হন।
এ লেখার পাঠকগণের চিন্তা করা উচিত, অতীতে যেখানে আলেমগণ যালেম কিন্তু বৈধ খলীফাদের সাথে এরূপ আচরণ করেছিলেন, সেখানে বর্তমান আলেমগণের ভুমিকা কী হওয়া উচিত? আল-যাহিছ আল-বায়ান ওয়াত-তাবঈনে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হে আল্লাহর রাসূল, কারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষ? তিনি জবাবে বলেন, (العلماء اذا فسدوا) আলেমগণ, যদি তারা দুর্নীতিপরায়ন হয়ে পড়ে।
আলী (রা) এক বর্ণনায় বলেন, দুধরনের ব্যাক্তিকে আমি সহ্য করতে পারিনা। নির্লজ্জ আলেম ও মুর্খ আবেদ। মুর্খ আবেদ তার ইবাদত দ্বারা মানুষকে প্রতারিত করে এবং আলেম তার নির্লজ্জতা দ্বারা।
আলেমগণ যদি সত্যিকারের ইসলামি আলেম হয়ে থাকেন তবে তারা অবশ্যই তাদের নিজেদের আমলের উদাহরণের মাধ্যমে আমাদের পথ দেখাবেন, যদিওবা এতে তাদের জীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ) উপলব্ধি করেছিলেন যে আলেম হিসেবে তাঁর দায়িত্ব হচ্ছে উম্মাহকে দেখিয়ে দেয়া যে একজন মুসলিম আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। তিনি বলেন, (اذا سكت العالم تقية والجاهل يجهل، فمتى يظهر الحق) যদি আলেমগণ তাকিয়া অবলম্বন করে চুপ থাকেন (অর্থাৎ, নিজের সুরক্ষার জন্য জ্ঞান লুকিয়ে রাখে), আর অজ্ঞ মানুষেরা অজ্ঞতায় পড়ে থাকে, তবে সত্য কখন উন্মোচিত হবে?
(যারা জ্ঞান লুকায়িত রাখে) এ ধরণের আলেমগণ অনেককেই পথচ্যুত করেছে, বিশেষ করে যারা তাদেরকে না বুঝেই আদর্শরূপে গ্রহণ করেছে। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে তাদের আলেমগণের কথা পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন। এধরণের আলেমগণের মধ্যে কতক পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলার প্রচেষ্টায় ব্যস্ত, কতক হিকমতের দোহাই দিয়ে যুলুমের ব্যাপারে চুপ থাকেন এবং কতক তাদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের ব্যস্ততায় মগ্ন। মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক ঐক্য, খিলাফত প্রতিষ্ঠা কিংবা রাষ্ট্রে শরীআহ’র পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের তেমন কথা বলতে দেখা যায় না।
ইমাম গাজ্জালি তার গ্রন্থ ইহইয়া উলূম আদ-দ্বীন এর ৭ম খণ্ডের ৭২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, এই ছিল আলেমগণের পথ ও নীতি: সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজের নিষেধ করা। তারা শাসকদের প্রতাপের ব্যাপারে কমই সন্তপ্ত থাকতেন। তারা তাদের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করতেন এবং আল্লাহর দেয়া শাহাদাত অর্জনকে মেনে নিতেন। যখন তাদের নিয়ত বিশুদ্ধ ছিল, তাদের কথা অন্তর নম্র করতো। কিন্তু এখন লোভলালসা আলেমগণের জিহ্বাকে বেঁধে ফেলেছে এবং তাদের নিশ্চুপ করে রেখেছে। যদি তারা কথা বলেই, তবে তাদের কথা কোনো কাজকেই সহায়তা করে না এবং এভাবে তারা ব্যর্থই হবে। যদি তারা সত্য বলতো এবং জ্ঞানকে তার নির্দিষ্ট হক প্রদান করতো, তবে তারা সফল হতো। শাসকদের দুর্নীতির ফলে জনগণ দুর্নীতিপরায়ন হয় আর আলেমদের দুর্নীতির ফলে দুর্নীতিপরায়ন শাসকগণ টিকে থাকে। আর আলেমরা দুর্নীতিপরায়ন হয় সম্পদ ও ক্ষমতার লোভের দরুন।
যে-ই দুনিয়ার ভালোবাসা প্রাবল্যে ডুবে থাকবে, সে এতই ব্যস্ত হয়ে পড়বে যে সে সাধারন জনগণকে প্রশ্ন করতে পারবেনা। আর যে সাধারণ জনগণকেই প্রশ্ন করতে পারেনা, কিভাবে সে শাসক কিংবা উচ্চাসনের ব্যাক্তিবর্গকে প্রশ্ন করার যোগ্যতা ও সাহস অর্জন করবে?
যৌথ সামরিক মহড়া ও সেমিনার হল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতিয়ার যার মাধ্যমে সে তার ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়

খবর: গত ১৪/০৯/১৪ তারিখে রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ মিলিটারি এবং যুক্তরাষ্ট্র আর্মির প্যাসিফিক কমান্ড যৌথভাবে ৩৮তম প্যাসিফি আর্মি ম্যানেজমেন্ট সেমিনার (PAMS) এ আয়োজন করে। ৩২টি দেশের বিভিন্ন সমকালীন বিষয়ে মতবিনিময় এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে “আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ” মোকাবেলায় দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চলমান কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সকল দেশকে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি’র প্যাসিফিক কমান্ডার জেনারেল ভিনসেন্ট ব্রুকস, যাতে সকল দেশ একমত হয়েছে।
মন্তব্য:
দক্ষিণে বিশাল বঙ্গোপসাগর থাকার ফলে অবস্থানগত কারণেই বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে ধরা হয়। আন্দামান নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে যদিওবা মার্কিনীদের বৃহৎ নৌবহরের উপস্থিতি রয়েছেম তারপরও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিজেদের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে আরও সুসংহত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশেষ করে ২০১১ সালে ওবামা যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তার পররাষ্ট্রনীতি ফোকাসের ঘোষণা দিল সেই সময় থেকেই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্বও আরো বেড়ে গেছে। তখন থেকেই আমরা দেখেছি বাংলাদেশে বিভিন্ন মার্কিন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের আনাগোনা এবং যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন। এছাড়াও এই অঞ্চলে মার্কিনীদের উপস্থিতিকে বৈধতা দেয়ার জন্য বাংলাদেশকে আমেরিকার কুখ্যাত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে টেনে নেয়া হচ্ছে এবং বাংলাদেশী আইন প্রয়োগকারী ও সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরে আমেরিকার প্রভাবকে শক্তিশালী করার জন্য গত সপ্তাহে আমেরিকান নৌ-বাহিনীর দ্বারা বঙ্গোপসাগরে “ক্যারাট” (Cooperation Afloat Readiness and Training) নামক নৌমহড়া আয়োজন করা হয়েছে যাতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীও অংশগ্রহণ করেছে।মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই এসব যৌথ মহড়া, প্রশিক্ষণ এবং “প্যামস” এর মতো সামরিক ফোরাম সমূহের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করতে হবে। একমাত্র রাজনৈতিক ভাবে অজ্ঞ এবং পশ্চিমাদের দালাল ছাড়া এটা আর কারো কাছে অজানা নয় যে বিভিন্ন অনুন্নত দেশে এসব মার্কিন সহায়তা কার্যক্রমের মূল কারণ কি। এটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয় আমেরিকা এবং তার অন্যান্য মিত্রশক্তিগুলো নিঃস্বার্থভাবে অন্যদের জন্য কল্যাণময়ী কোন কাজ করতে পারে। এসব রক্তচোষা সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের মূল উদ্দেশ্যই হয়ে থাকে মুসলিম ভূমিগুলোকে তাদের দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে খিলাফতের পুনরাবির্ভাব ঘটানো।
আমরা তাই বাংলাদেশের জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসনের সময় থেকে এও একইভাবে পাকিস্তানও আজ পর্যন্ত আমেরিকার সকল ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়ন করে আসছে। কিন্তু আজকে এটা পরিস্ফুটিত যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী এজেন্ডায় শামিল হতে গিয়ে পাকিস্তান শাসকদের এই মার্কিন তাঁবেদারির খেসারত সেই দেশের সাধারণ জনগণদেরই দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশের তাঁবেদার শাসকরাও বিশ্বাসঘাতকতার সেই একই পথে হাঁটছে যার পরিণতি দেশ এবং দেশের জনগণের ধ্বংস বৈ অন্য কিছু হবে না।
এছাড়া এসব যৌথ মহড়া এবং প্রশিক্ষণের আরেকটি উদ্দেশ্য হল বাংলাদেশের সামরিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর তাদের কুফরি নেতৃত্ব কায়েম করা। তাদের কৌশল হল এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনীর ভেতর “ধর্মনিরপেক্ষতা” ও “পাশ্চাত্য সংস্কৃতি” নিয়ে মোহ তৈরি করা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে এসব থেকে রক্ষা করেন এবং তারা যেন পুতুল হাসিনার শৃঙ্খল ভেঙ্গে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ দান করতে পারে। একমাত্র খিলাফতই পারবে এই অঞ্চল থেকে কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে বিতাড়িত করতে।
ইমদাদুল আমিন
আল্লাহ্’র ভয়ে এবং স্মরণে ক্রন্দন করা

অধ্যায় ৬
সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র ভয়ে ক্রন্দন করা মানদুব (Recommended) এবং এর দলীল হচ্ছে কুর’আন এবং সুন্নাহ্:
কুর’আন-এর দলীলের ক্ষেত্রে:
أَفَمِنْ هَذَا الْحَدِيثِ تَعْجَبُونَ، وَتَضْحَكُونَ وَلَا تَبْكُونَ
“তোমরা কি এই বিষয়ে আশ্চর্যবোধ করছো? এবং হাসছো-ক্রন্দন করছো না?” [সূরা আন-নাজম: ৫৯-৬০]
وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا
“তারা ক্রন্দন করতে করতে নতমস্তকে ভুমিতে লুটিয়ে পড়ে এবং তাদের বিনয়ভাব আরো বৃদ্ধি পায়।” [সূরা আল-ইস্রা:১০৯]
إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آَيَاتُ الرَّحْمَنِ خَرُّوا سُجَّدًا وَبُكِيًّا
“তাদের কাছে যখন দয়াময় আল্লাহ্’র আয়াতসমূহ পাঠ করা হতো, তখন তারা সেজদায় লুটিয়ে পড়তো এবং ক্রন্দন করতো।” [সূরা মারইয়াম:৫৮]
সুন্নাহ্’র দলীলের ক্ষেত্রে:
ইবনে মাস’উদ বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেন:
اقْرَأْ عَلَيَّ قُلْتُ آقْرَأُ عَلَيْكَ وَعَلَيْكَ أُنْزِلَ قَالَ فَإِنِّي أُحِبُّ أَنْ أَسْمَعَهُ مِنْ غَيْرِي فَقَرَأْتُ عَلَيْهِ سُورَةَ النِّسَاءِ حَتَّى بَلَغْتُ { فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا } قَالَ أَمْسِكْ فَإِذَا عَيْنَاهُ تَذْرِفَانِ
“আমাকে কুর’আন তিলাওয়াত করে শোনাও।” তিনি (আবদুল্লাহ্ বিন মাস’উদ (রা) বললেন: ‘আমি কি আপনাকে কুর’আন তিলাওয়াত করে শুনাবো অথচ যখন এটা আপনার উপরই নাযিল হয়েছে।’ প্রতুত্তরে রাসূল (সা) বললেন: “আমি অন্য কারো মুখে কুর’আন তিলাওয়াত শুনতে বেশী ভালোবাসি।” অতঃপর আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাস’উদ (রা) তাকে (সা) সূরা নিসা তিলাওয়াত করে শুনালেন। তিনি (রা) যখন নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করছিলেন: “আর তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে, যখন আমি ডেকে আনবো প্রতিটি উম্মতের মধ্য থেকে অবস্থা বর্ণনাকারী (স্বাক্ষী) এবং আপনাকে ডাকবো তাদের উপর অবস্থা বর্ণনাকারীরূপে (স্বাক্ষীরূপে)”। [সূরা আন-নিসা:৪১]; রাসূল (সা) বললেন: ‘যথেষ্ট হয়েছে।’ যখন ইবনে মাস’উদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চেহারার দিকে তাকালেন, দেখলেন তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]
আনাস (রা.) বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমনভাবে আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছিলেন যে আমি পূর্বে এমনভাবে তাঁকে বলতে শুনিনি:
لَوْ تَعْلَمُونَ مَا أَعْلَمُ لَضَحِكْتُمْ قَلِيلًا وَلَبَكَيْتُمْ كَثِيرًا قَالَ فَغَطَّى أَصْحَابُ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وُجُوهَهُمْ لَهُمْ خَنِينٌ
“আমি যা জানি তোমরা যদি তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম, কাঁদতে বেশি। অতঃপর সাহাবীগণ (রা) তাদের মুখ ঢেকে ফেললেন কারণ তারা কাঁদছিলেন এবং ফুপাচ্ছিলেন।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمْ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ….. وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ
“শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্’র আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না। …এবং সে ব্যক্তি যে একাকী গোপনে আল্লাহ্-কে স্মরণ করে এবং তার চোখদুটি অশ্রুতে ভরে উঠে।“[মুত্তাফিকুন আলাইহি]
ইবনে উমর (রা) বর্ণিত: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাথা চরমে পৌছালো তখন তাকে (সা) জিজ্ঞেস করা হলো, কে নামাজের ইমামতি করবে? তিনি (সা) বললেন:
مُرُوا أَبَا بَكْرٍ فَلْيُصَلِّ بِالنَّاسِ قَالَتْ عَائِشَةُ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ غَلَبَهُ الْبُكَاءُ
“আবু বকরকে বলো নামাজে ইমামতি করার জন্য।” ‘আয়েশা (রা) বললেন: “আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি হয়তো তাঁর ক্রদনের কাছে পরাভূত হয়ে যেতে পারেন।” আল-বুখারী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এবং হাদীসটি আল-মুসলিম কর্তৃক নিম্নোক্তভাবে বর্ণিত হয়েছে:
قَالَتْ فَقُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أَبَا بَكْرٍ رَجُلٌ رَقِيقٌ إِذَا قَرَأَ الْقُرْآنَ لاَ يَمْلِكُ دَمْعَهُ
‘আয়েশা (রা.) বলেন:
“হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), আবু বকর একজন নরম হৃদয়ের মানুষ এবং তিনি কুর’আন তিলাওয়াতের সময় তার ক্রন্দনকে নিয়ন্ত্রন করতে সক্ষম হবেন না…।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]
আনাস (রা.) হতে বর্ণিত: রাসূলুল্লাহ্ (সা) উবাই বিন কা’ব (রা.)-কে বলেন,
إِنَّ اللَّهَ أَمَرَنِى أَنْ أَقْرَأَ عَلَيْكَ (لَمْ يَكُنِ الَّذِينَ كَفَرُوا) ». قَالَ وَسَمَّانِى لَكَ قَالَ « نَعَمْ ». قَالَ فَبَكَى
“আল্লাহ্ ‘আজ্জা ওয়া যাল নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি তোমাকে (এ আয়াতটি) তিলাওয়াত করে শুনাই: “যারা অবিশ্বাস করেছিল…” [সূরা বাইয়্যিনাহ:১]; তিনি রাসূল (সা)-কে প্রশ্ন করলেন: “আল্লাহ্ কি আপনার কাছে আমার নাম উল্লেখ করেছেন?” জবাবে তিনি (সা) বললেন: “হ্যাঁ”। একথা শুনে উবাই কাঁদতে আরম্ভ করলেন।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]
আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
لَا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ وَلَا يَجْتَمِعُ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَدُخَانُ جَهَنَّمَ
“আল্লাহ্’র ভয়ে ক্রন্দনকারী ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না দুধ দোহনের পর তা আবার উলানে ফেরৎ যায়; এবং আল্লাহ্’র রাস্তায় জিহাদের সময় উত্থিত ধুলি এবং জাহান্নামের আগুন হতে উত্থিত ধোঁয়া কখনোই একত্রিত হবে না।” আত্-তিরমিযী হতে বর্ণিত, যিনি একে হাসান সহীহ্ উল্লেখ করেছেন।
আবদুল্লাহ্ বিন শাকির (রা) হতে বর্ণিত:
وَهُوَ يُصَلِّي وَلِجَوْفِهِ أَزِيزٌ كَأَزِيزِ الْمِرْجَلِ مِنَ الْبُكَاءِ
“আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এমন এক সময়ে পৌঁছালাম যখন তিনি (সা) সালাত আদায় করছিলেন। তিনি (সা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিলেন এবং তার বুক থেকে ফুটন্ত কেটলীর মতো শব্দ আসছিল।” আন-নববী বলেন: “হাদীসটি আবু দাউদ এবং আত্-তিরমিযী তার আশ-শামা’য়িল-এ এর ইসনাদকে সহীহ্ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।”
ইব্রাহীম বিন আবদ আর রহমান বিন আউফ বর্ণনা করেন যে, ইফতার করার জন্য আবদ আর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর কাছে যখন কিছু খাবার আনা হলো, তখন তিনি বললেন:
قُتِلَ مُصْعَبُ بْنُ عُمَيْرٍ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي كُفِّنَ فِي بُرْدَةٍ إِنْ غُطِّيَ رَأْسُهُ بَدَتْ رِجْلَاهُ وَإِنْ غُطِّيَ رِجْلَاهُ بَدَا رَأْسُهُ وَأُرَاهُ قَالَ وَقُتِلَ حَمْزَةُ وَهُوَ خَيْرٌ مِنِّي ثُمَّ بُسِطَ لَنَا مِنْ الدُّنْيَا مَا بُسِطَ أَوْ قَالَ أُعْطِينَا مِنْ الدُّنْيَا مَا أُعْطِينَا وَقَدْ خَشِينَا أَنْ تَكُونَ حَسَنَاتُنَا عُجِّلَتْ لَنَا ثُمَّ جَعَلَ يَبْكِي حَتَّى تَرَكَ الطَّعَامَ
“মুসা’ব বিন ‘উমায়ের শহীদ হন। তিনি আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। তার মৃতদেহকে ঢাকতে এমন এক টুকরো কাপড় ছাড়া আমাদের কাছে আর কিছুই ছিল না, যা দ্বারা তার মাথা ঢাকলে পা বের হয়ে যাচ্ছিল এবং পা ঢাকলে মাথা বের হয়ে যাচ্ছিল। হামজা শহীদ হন এবং তিনিও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। অতঃপর আল্লাহ্ আমাদেরকে পৃথিবীতে অনেক নিয়ামতের মধ্যে রেখেছেন। আমি এই ভয়ে খুবই ভীত যে আল্লাহ্ হয়তো এই পৃথিবীতে আমাদের সব পুরষ্কার দিয়ে দিয়েছেন।” অতঃপর তিনি (রা) ফুপিয়ে ফুপিয়ে এমনভাবে ক্রন্দন করতে লাগলেন যে আর কিছুই খেতে পারলেন না।
আল-‘ইরবাদ বিন সা’রিয়্যা (রা) বলেন:
وَعَظَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَوْعِظَةً ذَرَفَتْ مِنْهَا الْعُيُونُ وَوَجِلَتْ مِنْهَا الْقُلُوبُ
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের সামনে এমন খুতবা দিলেন, যার ফলে আমাদের হৃদয় আল্লাহ্’র ভয়ে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো এবং চোখ দিয়ে অশ্রু নেমে এল…।” [আবু দাউদ ও আত্-তিরমিযী]; দ্বিতীয়জন হাদীসটিকে হাসান সহীহ্ বলেছেন।
আনাস (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
من ذكر الله ففاضت عيناه من خشية الله حتى يصيب الأرض من دموعه لم يعذبه الله تعالى يوم القيامة
“যে ব্যক্তি আল্লাহ্-কে স্মরণ করে এবং এতে আল্লাহ্’র ভয়ে তার চোখ থেকে অশ্রু বেড়িয়ে আসে, কিয়ামতের দিন ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহ্ তাকে শাস্তি দিবেন না যতক্ষন না তার অশ্রু জমীনে গিয়ে পড়বে।” আল-হাকিম হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং সহীহ্ বলেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন।
আবু রায়হানা বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে একটি অভিযানে অংশ নিয়েছিলাম এবং তখন তাঁকে বলতে শুনেছি:
حرمت النار على عين دمعت من خشية الله حرمت النار على عين سهرت في سبيل الله قال : و نسيت الثالثة قال أبو شريح : و سمعت بعد أنه قال : حرمت النار على عين غضت عن محارم الله
“সে চোখের জন্য দোযখের আগুন হারাম যা আল্লাহ্’র ভয়ে কাঁদে, আল্লাহ্’র রাস্তায় জিহাদের ময়দানে সর্বদা জাগ্রত থাকে এবং আমি তৃতীয়টি ভুলে গেছি। কিন্তু পরবর্তীতে আমি শুনেছি তিনি বলছেন, ‘আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন এরকম কোন কিছু দেখা থেকে বিরত থাকার জন্য দৃষ্টিকে নীচে নামিয়ে রাখে।” আহমাদ এবং আল-হাকিম হতে বর্ণিত। আল-হাকিম এটিকে সহীহ্ বলেছেন, এবং আয-যাহাবী এবং আন-নাসা’ঈ এ বিষয়ে তার (আল-হাকিম) সাথে একমত পোষণ করেছেন।
ইবনে আবু মুলায়কাহ্ থেকে বর্ণিত, আমরা হিজরে আব্দুল্লাহ্ বিন আমর-এর সাথে বসে ছিলাম, যিনি বলেন:
ابكوا فإن لم تجدوا بكاء فتباكوا لو تعلمون العلم لصلى أحدكم حتى ينكسر ظهره و لبكى حتى ينقطع صوته
“কাঁদো, এবং যদি তোমরা কাঁদতে না পারো, তবে অন্তত: (আল্লাহ্’র ভয়ে) কাঁদার ভান করো। যেই সত্ত্বার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম খেয়ে বলছি, যদি তোমাদের কেউ সত্যি সত্যি জানতো কী অপেক্ষা করছে তবে তোমরা আল্লাহ্’র নিকট ততক্ষণ পর্যন্ত কাকুতি-মিনতি করতে যতক্ষণ না তোমাদের গলা ভেঁঙ্গে যায় এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সালাত আদায় করতে যতক্ষণ না তোমাদের কোমর ভেঁঙ্গে যায়।”
এটা বর্ণিত আছে যে, আলি (রা) বলেছেন:
ما كان فينا فارس يوم بدر غير المقدام ولقد رأيتنا وما فينا إلا نائم إلا رسول الله صلى الله عليه و سلم تحت شجرة يصلي ويبكي حتى أصبح
“বদরের যুদ্ধের দিন আল-মিকদাদ ছাড়া আমাদের আর কারো নিকট একটি ঘোড়া ছিল না এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ছাড়া আমি আর কাউকে সে রাতে ইবাদতে মশগুল দেখিনি, তিনি (সা) একটি গাছের নীচে ইবাদত করছিলেন এবং সকাল পর্যন্ত ক্রন্দন করেন।” এটি ইবনে খুজাইমা তার সহীহ্তে উল্লেখ করেছেন।
ছাওবান (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
طوبي لمن ملك لسانه ووسعه بيته وبكى على خطيئته
“সেই ব্যক্তি কল্যানপ্রাপ্ত যে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে, তার আবাসস্থল তার জন্য প্রশস্থ হয়েছে এবং সে তার ভুলের জন্য ক্রন্দন করেছে।” আত্-তাবারানী হাদীসটি উল্লেখ করেছেন এবং একে হাসান আখ্যা দিয়েছেন।
Taken from the book “From Essential Elements of Islamic Disposition”
কর্মের মানদন্ড
অনেকেই উদ্দেশ্যহীনভাবে জীবনে অগ্রসর হতে থাকে। তাই তারা পরিমাপ করার কোনো মানদন্ড ছাড়াই তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করে। ফলে, তাদের খারাপ কাজকে ভালো মনে করে তা করতে দেখবেন। তারা ভালো কাজকে খারাপ মনে করে তা হতে বিরত থাকে। বৈরুত, দামেস্ক কিংবা বাগদাদের মতো বৃহৎ ইসলামী শহরগুলোতে একজন মুসলিম নারী তার পা উন্মুক্ত করে, তার সৌন্দর্য ও আকর্ষনীয়তা দেখিয়ে মনে করে যে সে একটি ভালো কাজ করছে। একইভাবে, মসজিদমুখী নেক ব্যাক্তি শাসকের দুর্নীতির ব্যাপারে কথা বলা থেকে বিরত থাকে, কারণ তা রাজনীতি আর রাজনৈতিক কথা বলাই খারাপ। এধরনের নারী ও পুরুষ পাপে নিপতিত। কারণ তারা তাদের কার্যাবলী পরিমাপ করার জন্য কোনো মাপকাঠি গ্রহণ করেনি। যদি তারা একটি মাপকাঠি গ্রহন করতো তবে তারা যে মতাদর্শকে খোলামেলাভাবে গ্রহণ করার দাবি করে, তার পরিপন্থি কার্যাবলী সম্পাদন করতো না। তাই, এটি গুরুত্বপূর্ণ যে মানুষের একটি মানদন্ড থাকবে যা দ্বারা সে তার কার্যাবলী পরিমাপ করবে, যাতে কাজ সম্পাদন করার পূর্বে সে কাজের বাস্তবতা জানতে পারে।
ইসলাম মানুষকে তার কার্যাবলী পরিমাপ করার জন্য একটি মানদন্ড আরোপ করেছে, যাতে সে জানতে পারে এর মধ্যে কোনটি ভালো এবং কোনটি মন্দ। অতঃপর সে মন্দ হতে বিরত থাকে এবং ভালো কাজ সম্পাদন করে। এই মানদন্ড হচ্ছে শরীআহ (ইসলামি আইন)। এভাবেই, শরীআহ যে কাজকে ভালো বলে তা ভালো আর যে কাজকে মন্দ বলে তা মন্দ। এ মানদন্ড স্থির, তাই ভালো মন্দে পরিনত হয় না, এবং মন্দ ভালোতে রূপান্তরিত হয় না। বরং, শরীআহ যাকে ভালো বলে তা ভালোই রয়ে যায়, এবং শরীআহ যা মন্দ হিসেবে দেখে তা মন্দই রয়ে যায়।
তাই মানুষ সচেতনভাবে এক সোজা পথে অগ্রসর হয়, এবং সে বিষয়াদিসমূহ যেরকম সেভাবেই তা বোঝে। যদি সে শরীআহ’কে মানদন্ড হিসেবে তৈরি না করে তবে বিষয়টি ভিন্ন হবে, বরং সেক্ষেত্রে সে তার মস্তিস্কপ্রসুত চিন্তাকে তার মানদন্ড হিসেবে তৈরি করেছে। এধরনের ক্ষেত্রে সে এলোমেলোভাবে অগ্রসর হবে, কারণ কোনো বাস্তবতাভেদে কোনো বিষয় ভালো হতে মন্দে পরিনত হয়, কারণ, মস্তিস্ক আজকের ভালোকে আগামীতে মন্দ হিসেবে দেখতে শুরু করতে পারে। সে এক দেশে তা ভালো হিসেবে আবার অন্য দেশে তা মন্দ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তাই তার বাছ-বিচার নড়বড়ে হয়ে পড়ে, এবং ভালো-মন্দ তার কাছে পরম বিষয় হতে আপেক্ষিক বিষয়ে পরিনত হয়। তখন সে ভালো করতে যেয়ে মন্দ এবং মন্দ করা থেকে বিরত থাকতে যেয়ে ভালো হতে বিরত থাকার দুর্দশায় নিপতিত হয়।
সুতরাং, কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে শরীআহ’র বরাত দেয়া আবশ্যক, এবং সকল কাজের জন্য একে মানদন্ডরূপে গ্রহণ করতে হবে, এবং (শরীআহ) আইনের দৃষ্টিতে যা ভালো তা ভালো হিসেবে এবং (শরীআহ) আইনের দৃষ্টিতে যা মন্দ তা মন্দ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
Taken from the book ‘Islamic Thought’


















