তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২প্রশ্ন-উত্তর: নবীদের ইজতিহাদ প্রসঙ্গে – শাইখ আতা আবু রাশতা

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব
প্রশ্ন: সকল নবীই কি তাদের ইজতিহাদে সঠিক নাকি শুধু মুস্তফা (সা)?
প্রশ্নটি উত্থাপিত হয় নিম্নোক্ত প্রসঙ্গে – ইবন কাছীর সূরা আম্বিয়া ৭৮ নং আয়াত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি আবদুল্লাহ বিন মাসউদ ও আবদুল্লাহ বিন আব্বাস কে উদ্ধৃত করে বলেন যে তারা বলেছেন, নবী দাউদ (আ) মেষপালক ও গৃহস্থের মালিক যার ক্ষেত মাড়িয়েছিল মেষপালকের ভেড়াটি তাদের মধ্যে ফয়সালা দিয়েছিলেন যাতে ভেড়াটি গৃহস্থকে দিয়ে দেয়া হয়।
পরে তার ছেলে সুলায়মান তাকে বলেন, এটি পরিবর্তন করুন, হে আল্লাহর নবী! অতঃপর তিনি রায়টি ব্যাখ্যা নিম্নোক্তভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, গৃহস্থ ভেড়াটি তার জিম্মায় নিয়ে তা হতে দুধ আহরণ করবে, আর মেষপালক জমি চাষ করে পুর্বরূপে ফিরিয়ে আনবে অর্থাৎ, ভেড়া মাড়ানোর পুর্বের অবস্থায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, আমরা সুলায়মানকে এ বিষয়ে উপলব্ধি দান করলাম। এর অর্থ কি এই যে নবী দাউদ (আ) ইজতিহাদ করেছিলেন যা পরবর্তীতে সুলায়মান সংশোধন করে দিয়েছিলেন?
সকল নবীই হুকুম-আহকাম বর্ণনায় মা’সূম অর্থাৎ, তারা নিজেদের মস্তিস্কপ্রসুত রায় দেন না। তার নবী বা রাসূল হওয়াটি – তিনি যে শরীআহর হুকুম বর্ণনার ক্ষেত্রে মাসূম, তা অপরিহার্য করে তোলে অর্থাৎ, তিনি ব্যাক্তিগতভাবে কোনো ইজতিহাদ করে হুকুম শরীআহ বর্ণনা করেন না। অনুগ্রহপূর্বক, ইসলামি ব্যাক্তিত্ব বইটির ১ম খণ্ডে ‘নবীদের অভ্রান্তিসত্ত্বতা (ইসমাহ)’ ও ‘রাসূলের জন্য মুজতাহিদ হওয়াটি অমানানসই’ (এ অংশদ্বয়) দেখুন। সুতরাং, আহকাম শরীআহ বর্ণনায় নবীগণ নিজেদের মাথা খাটিয়ে ইজতিহাদ করেন না, বরং তারা কেবল আল্লাহ পক্ষ হতে ওহী প্রচার করেন।
وَدَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ * فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ وَكُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ وَكُنَّا فَاعِلِينَ
এবং স্মরণ করুন দাউদ ও সুলায়মানকে, যখন তাঁরা শস্যক্ষেত্র সম্পর্কে বিচার করেছিলেন। তাতে রাত্রিকালে কিছু লোকের মেষ ঢুকে পড়েছিল। তাদের বিচার আমার সম্মুখে ছিল। অতঃপর আমি সুলায়মানকে সে ফায়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম এবং আমি উভয়কে প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দিয়েছিলাম। আমি পর্বত ও পক্ষীসমূহকে দাউদের অনুগত করে দিয়েছিলাম; তারা আমার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করত। এই সমস্ত আমিই করেছিলাম। [সুরা আম্বিয়া: ৭৮-৭৯]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বাণী:
( فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ )
‘‘অতঃপর আমি সুলায়মানকে সে ফয়সালা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম’’দলীলস্বরূপ যে সুলায়মান (আ)-এর ফয়সালা একটি ওহী ছিল। এবং তাঁর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বাণী:
( كُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا )
“উভয়কেই আমি ফয়সালা ও জ্ঞান দান করেছি”দলীলস্বরূপ যে দাউদ (আ)-এর ফয়সালাও ওহী নির্ধারিত। যেহেতু সুলায়মানের ফয়সালা পরে এসেছে, তাই তা পুর্বের রায়কে রহিত করেছে।
আপনার জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, কোনো কোনো তাফসীরে এসেছে যে দাউদ ও সুলায়মান উভয়ে ইজতিহাদ করেছেন এবং সুলায়মানের ইজতিহাদ বেশি সঠিক। যারা এ মত পোষন করেন তারা আহকাম শরীআহ বর্ণনায় নবী-রাসূলদের ইজতিহাদ করার বিষয়টিকে অস্বীকার করেন না। তারা বলেন, আল্লাহ তাদের ইজতিহাদকে সংশোধন করে দেন যদি তারা ভুল করেন।
৬ই মুহাররাম, ১৪৩৩ হি:
১ ডিসেম্বর, ২০১১ ইংব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক কুফরী শাসনব্যবস্থা/সংবিধানই দেশের আজকের অস্থিতিশীলতা, অচলাবস্থা ও সংঘাতের প্রধান কারণ

জনগণের মধ্যে থাকা কিছু অগভীর (ভুল) ধারণা:
- হাসিনা-খালেদা মহিলা হওয়ায় দেশে সংঘাত ও অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। সুতরাং পুরুষ শাসন এ সংঘাত ও চলাবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারে।
- সত্যিকারের গনতন্ত্র চর্চা না হওয়ায় এ সংঘাত। সুতরাং সমাধান হল আরও গনতান্ত্রিক হওয়া।
- মন্দের ভাল হিসেবে বিকল্প না থাকায় এক দলকে ছেড়ে অপর দলকে বেছে নেয়া উচিত।
- গনতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যতিত বৈধ ও গ্রহণযোগ্য পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়া সম্ভব নয়।
- ডিজিটাল বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাও, নতুন ধারার রাজনীতি… ইত্যাদি
- তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার, সর্বদলীয় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার, দু নেত্রীর মধ্যকার সংলাপ ইত্যাদি বর্তমান সংকটের সম্ভাব্য সমাধান।
সংকটের কারণ:
- ওবামা, বুশ ও মনমোহন সিং এর জীবনব্যবস্থা ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ’র পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে রাষ্ট্র থেকে দ্বীনকে পৃথক করা হয়েছে। ইসলামী আক্বীদার সাথে যা সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। হাসিনা-খালেদা পরিবার নিয়ন্ত্রিত দ্বি-জোটীয় গনতান্ত্রিক রাজনীতিতে নিজ স্বার্থ সংরক্ষণ ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে ক্ষমতাসীন দলগুলো সুবিধামত সংবিধান পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন করে। আর তা ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর প্রতিকূলে যাওয়ায় সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে।
- স্বাধীনতা পরবর্তী চার দশকেরও বেশী সময় ধরে সাম্য, গনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সস্তা শ্লোগানের আড়ালে নব্য ঔপনিবেশবাদের রাজনীতিকে বাস্তবায়িত করার কারণে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, রাজনীতি ও ভূ-কৌশলগত সম্পদের উপর সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন, বৃটিশ ও আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন ভারত বৃটেন নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক মঞ্চে বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষক দালাল স্বরূপ আবির্ভাব ঘটে মুজিব-জিয়া-এরশাদ-হাসিনা-খালেদার। ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় হাসিনা-খালেদা পরিবার নিয়ন্ত্রিত দ্বিজোটীয় গনতান্ত্রিক রাজনীতি এদেশে বিভক্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করার জন্য আমেরিকা, ভারত, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন চায় এ ধরনের বিভক্তি ও বিশৃংখলা বজায় থাকুক।
- ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি সবসময় অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেকারণে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থকেন্দ্রিক এ রাজনীতি ক্ষমতাসীন জোটের (হাসিনা কিংবা খালেদা গংদের) লুন্ঠন, দূর্নীতি ও বিশৃংখলার মহোৎসব ছাড়া আর কিছুই নয়। বিরোধী জোটে থাকা দলগুলো পরবর্তী পাঁচবছরের জন্য লুটপাটের সুযোগ পেতে ক্ষমতায় যাওয়ার রাস্তাকে সুগম করতে চায়। আর সরকারী জোট লুটপাট ও দূর্নীতির এ ধারাকে বজায় রাখতে চায়। সুতরাং হালুয়া রুটির ভাগ পেতে ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতায় যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা নব্বইয়ের পর থেকে প্রতি পাঁচ বছর পর পর সংঘাতকে অর্ণিবার্য করে তুলছে।
‘তুমি কি তাদের কে দেখনি, যারা আল্লাহর নেয়ামতকে কুফরে পরিণত করেছে এবং জাতিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তারা দগ্ধ হবে দোযখে এবং যেখানে তারা প্রবেশ করবে সেটা কতই না মন্দ আবাস।’(সূরা ইবরাহিম:২৮-২৯)
সমাধান:
- হাসিনা, খালেদা মহিলা হওয়ায় দেশে এ অস্থিতিশীলতা বা সংকট তৈরি হয়েছে তা সঠিক নয়। বিগত চল্লিশ বছরে মুজিব, জিয়া, এরশাদ বাংলাদেশকে শাসন করলেও আমাদের সমস্যা দূরীভূত হয়নি। তারা সবাই পুরুষ ছিল। সমস্যাটি পুরুষ বা মহিলার নয়, বরং মুজিব, জিয়া, এরশাদও খালেদা হাসিনার মত আমাদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা দ্বারা শাসন করায় তাদের সময়ে দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি। উল্টো এসব তথাকথিত শাসক ও তাদের পরিবারের সদস্য ও উচ্ছিষ্টভোগীরা অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছে। সুতরাং সমস্যার কারণ বা সমাধান ব্যক্তি পরিবর্তনের মধ্যে নেই, বরং মানবরচিত ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘ইন্না দিনা ই’নদাল্লাহিল ইসলাম..’
- ডিজিটাল বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশ বাঁচাও-মানুষ বাঁচাও, নতুন ধারার রাজনীতি…ইত্যাদি সস্তা শ্লোগান অথবা তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার, সর্বদলীয় অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার, দু নেত্রীর মধ্যকার সংলাপ, আরও বেশী গনতন্ত্রের চর্চা করা ইত্যাদি বর্তমান সংকটের সমাধান নয়। এসব সস্তা শ্লোগান ও ভুল ধারণা সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মূল কারণগুলোকে আড়াল করে এবং জনগনকে বেহুদা বিতর্কের মধ্যে ব্যস্ত রাখে। ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক কুফরী শাসনব্যবস্থাকে খিলাফত দ্বারা প্রতিস্থাপনই এ অস্থিতিশীলতা, সংঘাত ও অচলাবস্থা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।
- বিকল্প না থাকায় একটি জোটকে ছেড়ে অন্য জোটকে মন্দের ভাল হিসেবে বেছে নেয়া সংকট থেকে বের হওয়ার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখবে না। যেমন: ১৯৯৬ এ খালেদাকে ছেড়ে হাসিনাকে বেছে নেয়ায়, ২০০১ এ আবার হাসিনাকে ছেড়ে খালেদাকে বেছে নেয়ায় এবং ২০০৮ এ খালেদাকে ছেড়ে হাসিনাকে বেছে নেয়ায় দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি, বরং পালাক্রমে এই দুই পরিবার লুটপাট ও দূর্নীতির সুযোগ পেয়েছে। কোন সরকারের সময় বিগত সরকারের চেয়ে একশ খুন কম হলে, পঞ্চাশটি ধর্ষণ কম হলে, পঞ্চাশটি ডাকাতির ঘটনা কম হলে সে সরকার ভাল হয়ে যায় না। বরং পবিত্র কোরআন অনুসারে অন্যায়ভাবে একটি হত্যাও গোটা মানবজাতিকে হত্যার শামিল। মন্দের ভাল কিছু ইসলামে নেই।
‘…নিশ্চয়ই সত্য মিথ্যা থেকে আলাদা হয়ে গেছে…।’ (সূরা আল বাক্বারা:২৫৬)
‘ভাল ও মন্দ কখনওই এক হতে পারে না।…’ (সূরা হামীম সিজদাহ:৩৪)
‘বলুন: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে। নিশ্চয় মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।’ (সূরা বনী ইসরাইল: ৮১)- গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নির্বাচন এ জুলুম প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার একটি মাধ্যম। একমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহ অনুসরণ করে ক্ষমতাশীল লোকদের থেকে নুসরাহ(বস্তুগত সাহায্য) লাভ করে নুবয়্যতের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যর্থ কুফরী ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব। আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম বর্ণণা করেন, আমি আবু হুরাইরার সাথে পাঁচ বছর অতিবাহিত করেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেন,
‘বনী ঈসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, একজন নবীর মৃত্যুর পরে আসতেন আরেকজন নবী। আমার পরে আর কোন নবী আসেবেন না, আমার পরে আসবে খলিফা এবং তারা হবে সংখ্যায় অনেক।সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি আমাদেরকে কি নির্দেশ দিচ্ছেন (এই ব্যাপারে) ?” তখন তিনি উত্তর দিলেন, “তোমরা তাদের একজনের পর আরেকজনের কাছে আনুগত্যের শপথ (বাইয়াহ) পূরণ করবে, তাদেরকে তাদের অধিকার দেবে এবং আল্লাহ তাদেরকে তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন। “
- নুবয়্যতের আদলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যর্থ কুফরী ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশকি শক্তি(আমেরিকা, বৃটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন) ও আধিপত্যবাদী শক্তির(ভারত) রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও আধিপত্য থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে এবং জনগনের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি সুনিশ্চিত করা যাবে।
- ধর্মনিরপেক্ষ ও গনতান্ত্রিক কুফর শাসনব্যবস্থায় রাজনীতি সবসময় অর্থকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কিন্তু ইসলামিক শরী’আহ রাজনীতি থেকে অর্থকে পৃথক করেছে এবং রাজনীতি করার সাথে আখেরাতের সাফল্যকে সর্ম্পকযুক্ত করেছে বলে এ ব্যবস্থায় শাসকের ক্ষমতালিপ্সু, দূর্নীতিবাজ ও জনগনের সম্পদ লুন্ঠনকারী হওয়া সম্ভব নয়।
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত রাসূল(সা) বলেন,
‘শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ’র আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুওতা) ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। তাঁরা হলেন, একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক,…।’
রাফীম আহমেদ
খিলাফত ও ভারতীয় উপমহাদেশ

খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের পর আরও একটি বার্ষিকী অতিক্রম করছে মুসলিম উম্মাহ। এই মুহুর্তে অতিব জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে ইতিহাস ফিরে দেখা এবং এই পতন ও ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল তা খতিয়ে দেখা। ধারণা করা হয়, খিলাফত ধ্বংসের প্রতি মুসলিমদের ও তৎকালীন আলেম-ওলামাদের কোন প্রতিক্রিয়াই ছিল না এবং তারা এর গুরুত্ব বুঝতে পারেন নি। কিন্তু এটি সত্য না; ইতিহাস সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট যে, মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল, কিভাবে তাঁরা এটি রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন এবং আল্লাহর ছায়াকে দুনিয়া থেকে নির্মূল হতে দেখে কীরূপ কষ্ট সহ্য করেছিলেন। এই ভারত উপমহাদেশের মুসলিম ও তাদের গড়ে তোলা খিলাফত আন্দোলন তার জ্বাজ্জল্যমান উদাহরণ।
মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া জানার পূর্বে আমাদের জেনে নেয়া দরকার কিভাবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা এই ভারতীয় উপমহাদেশে পৌঁছেছিল। যেখানে ইসলামি উম্মাহর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর বসবাস। সংখ্যায় যার পরিমাণ প্রায় অর্ধ বিলিয়ন, অর্থাৎ ভারতে ২৫০ মিলিয়ন মুসলিম, পাকিস্তানে ১৬০ মিলিয়ন মুসলিম এবং বাংলাদেশে ১২০ মিলিয়ন মুসলিম। বস্তুত উর্দূ হচ্ছে যথা সম্ভব এই উম্মাহর সবচেয়ে বহুল উচ্চারিত ভাষা। এমনকি আরবী অপেক্ষাও বেশি।
ভারতে খিলাফতের ইতিহাস:
৭১১ খ্রিষ্টাব্দ; মুসলিম বণিকেরা সীলন (Ceylon) থেকে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে নোঙর ফেলেছিলেন সিন্ধু উপকূলে। কিন্তু তাদের জাহাজ লুট করা হয় এবং মুসলিমদের আটক করে জেলবন্দী করা হয়। এই খবরটি তৎকালীন খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানীতে খলীফা আল ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের কানে পৌঁছল। তিনি তৎকালীন বাগদাদের ওয়ালী (গভর্নর) হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে চিঠি পাঠালেন যেন সে তৎক্ষণাত সিন্ধুর শাসক প্রধানের কাছ থেকে ক্ষমা আদায়ের ব্যবস্থা করে ও মুসলিমদের মুক্ত করে। একদল সেনাবাহিনী পাঠানো হলো যার নেতৃত্বে ছিলেন এই উম্মাহর দীপ্তিমান সন্তানদের মধ্যে একজন। এই যুবকের নামটি সকল মুসলিম বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমদের অন্তরে এক উচ্চ স্থান দখল করে আছে। এই যুবকের কাঁধেই দায়িত্ব পড়েছিল খিলাফাহ্ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনীকে একটি অপরিচিত ভুমিতে নেতৃত্ব দিয়ে নিয়ে যাওয়ার। তাঁর নাম মুহাম্মদদ বিন কাসিম আল-ছাকাফী। বিলাদ-আল-হিনদ মুক্তকারী।
যখন খিলাফত রাষ্টের সেনাবাহিনী দিবাল পৌঁছাল (বর্তমান করাচির কাছাকাছি), মুহাম্মদ বিন কাসিম তাঁর দাবীসমূহ রাজা দাহিরের কাছে তুলে ধরলেন। রাজা দাবীসমূহ প্রত্যাহার করেছিলো এবং ফলাফলসরূপ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল ও তার রাজ্য দখলে নেয়া হয়েছিল।
এই সফলতার পরপরই মুহাম্মদ বিন কাসিম আরও অভিযান পরিচালনা করেছিলেন যেহেতু মুসলিম বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহ আজ্জা ওয়া জালের বাণীকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরা। এই আকীদার জোরেই মুসলিম সেনাবাহিনী অভিযান পরিচালনা করতে করতে মূলতান পর্যন্ত পৌছে গিয়েছিলেন। তিন বছরের মধ্যে অর্থাৎ ৭১৪ খ্রিষ্টাব্দতে সমগ্র সিন্ধু অঞ্চল এবং পাঞ্জাবের নিম্নাঞ্চল খিলাফত রাষ্ট্রের হুকুমের অধীনে চলে এসেছিল।
ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল বিজিত হওয়ার পর তাঁর সেনাবাহীনী মূর্তিপূজারীদেরকে অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোর পথে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর প্রশাসনে মুসলিম ও অমুসলিম বিভেদ ছিল না। তিনি বিজিত ভুমিসমূহের অমুসলিম কর্মকর্তাদের তাদের আগের জায়গায় বহাল রেখেছিলেন।
মুহাম্মদ বিন কাসিম খিলাফতের অধীনস্ত প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “মানুষের ব্যপারে সততা ও রাষ্ট্র সৎভাবে পরিচালনা কর। কর নির্ধারন করো মানুষের পরিশোধ করার সামর্থ্য অনুযায়ী।
খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের সময় অর্থাৎ ৭২৪ থেকে ৭৪৩ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে কাশ্মীর ও কাঙ্গারা খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। এবং ৭৫৪ থেক ৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আব্বাসীয় খলীফা আবু জাফর আল মানছুর কান্দাহার মুক্ত করেন এবং তাঁরই প্রচেষ্টায় সংগঠিত ভাবে সমগ্র ভারত উপমহাদেশে খিলাফত রাষ্ট্রের সীমান্ত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ৭৮৬-৮০৯ খ্রিষ্ট্রাব্দের মধ্যে, হারুন আর রশীদের খিলাফত আমলে মুসলিম আর্মি সিন্ধু সীমান্ত বৃদ্ধি করে গুজরাট (অর্থাৎ বর্তমান ভারতে) পর্যন্ত নিয়ে যায়। এই সময়ে এসেই মুসলিম সেনাবাহীনী স্থানীয় ভাবে বসবাস শুরু করেছিল এবং নতুন শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল। এই সময়ে পর থেকেই ব্যাপক সংখ্যক ভারতীয়রা তাদের কুফর সামাজিক বর্ণবাদী সংস্কৃতির ভিত্তিহীনতা থেকে উঠে এসে বিশ্ব ভাতৃত্বের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। তারা সন্ধান পেয়েছিল ইসলামের আলোর, আল্লাহর ইবাদাতের এবং পরিত্যাগ করেছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন কুফর, অজ্ঞতা ও মিথ্যা মুর্তিপূজা। ইসলাম শাসন করেছিল যা বর্তমানে ইন্ডিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ নামে পরিচিত এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে।
ওরিয়েন্টালিস্টরা (প্রাচ্যবাদী) যে ভাবে ভারতের ইতিহাসে তুলে ধরে তার বিপরীতে আমাদের বুঝতে হবে যে ভারত খিলাফতের উইলায়া’হ ছিল। কিছু খলীফার অবহেলার কারণে কিছুকাল এটি অপর্যবেক্ষিত অবস্থায় ছিল এবং একে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তথাপী, শাসকবর্গ এখানে আহকাম শরী’আহ বাস্তবায়িত অবস্থায় রেখেছিলেন এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার পূর্ব পর্যন্ত এটি দার-উল-ইসলামের অংশ ছিল।
মুসলিম ইতিহাসবিদ, ইবনে কাসীর আল-দামিস্কি (মৃত্যু- ৭৭৪ হিজরী) তাঁর বিখ্যাত কর্ম ‘আল-বিদায়াহ-ওয়ান-নিহায়াহ’ তে ইন্ডিয়াকে দার-উল-ইসলামের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর বিজয়ের ব্যাপারে কিছু হাদীসও উল্লেখ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত:
“হে আমার সত্য বন্ধু, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “এই উম্মতের সেনাবাহিনী সিন্ধু ও আল-হিন্দ পর্যন্ত পৌঁছাবে। আমি যদি এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই এবং শহীদ হই তবে তা একটি (মঙ্গলজনক) বিষয়, আর আমি যদি ফিরে আসি তবে আমি হব মুক্ত আবু হুরায়রা। মহিমান্বিত রব আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন”। (আহমাদ)
ভারতবর্ষ খিলাফতের অধিভূক্ত প্রদেশ ছিল সমগ্র দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দ) এবং মুঘল আমলে (১৫২৬ – ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ) শুধুমাত্র আকবরের শাসনামল ব্যতীত যেহেতু সে ইসলাম থেকে মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল এবং দ্বীন-ই-ইলাহী নামে নতুন ধর্মের প্রবর্তন করেছিল।
বার শতাব্দীর শেষ চতুর্থাংশে মুহাম্মদ ঘূড়ি (Mohammad of Ghor) ইন্দো-গঙ্গা অববাহিকা (Indo-Gangetic Plain) আক্রমণ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিজিত হয় গজনী, মূলতান, সিন্ধু, লাহোড় এবং দিল্লী। তাঁর একজন সেনাপ্রধান কুতুব উদ্দীন আইবেগ দিল্লীর সুলতান হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তের শতাব্দীদে শামসুদ্দিন ইলতুতমিস (১২১১-১২৩৬), একজন অভিজ্ঞ তুর্কী দাস যোদ্ধা দিল্লীর ক্ষমতায় আসলে পরবর্তী সুলতানদের সাম্রাজ্য বৃদ্ধির পথ সুগম হয়। পরবর্তী ১০০ বছরে দিল্লী সুলতানীয়াত প্রসারিত হয়ে পূর্ব বাংলা এবং দক্ষিণ ডেক্কান (Deccan) পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পাঁচ রাজবংশ দ্বারা দিল্লী সুলতানীয়াত শাসিত হয়েছিল) মামলূক বংশ (১২০৬-৯০) খলজী বংশ (১২৯০-১৩২০), তুঘলক বংশ (১৩২০-১৪১৩), সৈয়দ বংশ (১৪১৪-৫১) এবং লোদী বংশ (১৪৫১-১৫২৬)।
মধ্য এশিয়ার বংশোদ্ভূত বাবর ১৫২৬ সালে দিল্লী দখলে নেন এবং সর্বপ্রথম মুঘল শাসক হিসেবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ১৫৩০ সালে তার পূত্র হুমায়ুন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় (১৫৩০-৫৬)। ভোপাল কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত একটি ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়, বাবর তার পূত্রকে নিম্নলিখিত অছিয়ত নামা দিয়ে গিয়েছিল। যা থেকে বুঝা যায় তার মধ্যে কিছু ভূল থাকলেও ইসলাম প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন :-
“পূত্র! নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিও: কোন ধর্মের প্রতি ঘৃণা পোষণ করিও না। তুমি অব্যশই ন্যায় বাস্তবায়ন করবে তথাপী মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও আচার সমূহ মাথায় রেখে। কিছু সময় গরু জবাই করা থেকে বিরত থাকো। যাতে স্থানীয়দের অন্তরে স্থান করে নিতে পারো। এটি তোমাকে জনগনের আরো নিকটবর্তী করবে।
কোন ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থান ধ্বংস করো না এবং সকলের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করো যাতে দেশে শান্তি সুনিশ্চিত হয়। ইসলামের দাওয়াত ভালোভাবেই পৌছে দেয়া সম্ভব দয়া ও ভালাবাসার তলোয়ার দিয়ে, জুলুম ও অত্যাচারের তলোয়ার বদলে। শিয়া সুন্নীর মধ্যকার বিভেদ সমূহ এড়িয়ে চলো। তোমার জনগণের বিবিধ বৈশিষ্ট্যসমূহ পর্যবেক্ষণ কর ঠিক যেভাবে ঋতু সমূহের বিবিধ বৈশিষ্ট্য রয়েছে।”
আমাদের ইতিহাস নেয়ার ক্ষেত্রে যত্নবান হতে হবে কেননা ভারতবর্ষ ও ইসলামের বেশির ভাগ ইতিহাস লেখা হয়েছে ওরিয়েন্টালিষ্টদের (প্রাচ্যবাদী) দ্বারা। আমরা অবশ্যই স্বীকার করি যে, ভারতবর্ষের কিছু মুসলিম শাসক ইসলামী হুকুমের অপপ্রয়োগ করেছিলেন এবং কতিপয় অন্যায় সম্পাদন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ভারতীয় উপমহাদেশ দার-উল-ইসলামের অন্তর্ভূক্ত ছিল যেহেতু ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়িত অবস্থায় ছিল। প্রধান শহরগুলোর আদালতের নথীসমূহ যা এখনো বিদ্যামান তাতে দেখা যায় যে ইসলামী শরীয়া ব্যতীত অন্য কোন, আইনের উৎসই গ্রহণযোগ্য ছিল না।
অপপ্রয়োগ খিলাফত, ওয়ালী (গভর্নর) কিংবা আমীল (মেয়র)-এর (শর’ঈ বৈধতা) বাতিলের দলীল হতে পারে না। অসংখ্য হাদীস রয়েছে যেখানে যদি অত্যাচারীও হয় তারপরও আমীরের আনুগত্য ফরয করা হয়েছে যতক্ষণ পযন্ত সে শরীয়া বাস্তবায়ন করে এবং কোন কুফর বাওয়াহ (সুস্পষ্ট কুফরী) সম্পাদন না করে।
আনাস বিন মলিক থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“শুন এবং মান্য কর, এমনকি যদিও তোমরা শাসিত হও একজন আবীসীনিয়ান দাস কর্তৃক যার মাথা কিসমিসের ন্যায়”
অন্য এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“যতক্ষণ পর্যন্ত সে তোমাদের আল্লাহর কিতাব দিয়ে পরিচালনা করে।”
মুসলিম বর্ণনা করেছেন আউফ বিন মালিক থেকে বর্ণিত আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি,
“তোমাদের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ভালোবাসো এবং সে তোমাদের ভালোবাসে। তোমরা তার জন্য দোয়া কর এবং সে তোমাদের জন্য দোয়া করে। আর তোমাদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট নেতা হল সেই ব্যক্তি যাকে তোমরা ঘৃনা কর এবং সে তোমাদের ঘৃণা করে। তোমর তাকে অভিসম্পাত কর এবং সে তোমাদের অভিসম্পাত করে।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম। “হে রাসূলাল্লাহ, আমরা কি তার বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না? ? তিনি (সঃ) বললেন। “না! যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম করে। যদি তোমাদের মধ্যে কেউ একজন ওয়ালী দ্বারা শাসিত হও এবং তাকে গুনাহে নিমজ্জিত দেখতে পাও, তবে সে যেন আল্লাহর বিরূদ্ধে কৃত গুণাহকে ঘৃণা করে। কিন্তু আনুগত্য হতে যেন হাত সরিয়ে না নেয়।”
আহমাদ ও আবু দাউদ হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“হে আবু যর, তুমি কি করবে যদি কোন ওয়ালী গণীমত ভোগদখল করে ও তোমাকে তা থেকে বঞ্চিত করে?” তিনি বললেন, “সে সত্তার কছম যিনি আপনাকে সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন, আমি তরবারী তুলে নিব এবং ততক্ষণ যুদ্ধ করব যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনার সাথে মিলিত হই।” এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “আমি তোমাকে এমন কিছু বলব যা এর থেকে উত্তম। ধৈর্য্যশীল হও এবং সহ্য কর যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সাথে মিলিত হও।”
ভারত যে বৈশ্বিক খিলাফতের অংশ ছিল তা অমুসলিম লেখকরাও বর্ণনা করেছেন। যেমন হিন্দু লেখক শশী এস শর্মা তার বই ‘Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis’ এ বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:
“দিল্লী সুলতানীয়াত (১২০৫-১৫২৬) তার সর্বশেষ অস্তিত্ব পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিম সাম্রাজ্যের বৈধ অংশ ছিল যার কার্যক্রম আব্বাসীয় খলিফাদের বৈধ অধিরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সুলতানগন নিজেদেরকে খলীফার ডেপুটি মনে করতেন এবং তাদের নির্বাহী ও আইনী কর্তৃত্ব (খলীফার দেয়া) প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমেই বৈধতা পেত। যেহেতু সকল সম্প্রদায়ের (উম্মাহর) সামগ্রিক কর্তৃত্বের বৈধতা খলীফার ছিল। তাই প্রত্যেক রাজা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তি ইসলামের ইমামের জন্য ও তার প্রতিনিধি হিসেবে শাসনক্ষমতা পালন করার দাবী করত। “[Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 247]
মুহাম্মদ শাহ বাহমান (১৪৬৩-৮২), উসমানীয় সুলতান মুহাম্মদ ২য়কে একমাত্র যোগ্য খলীফা বলে সম্বোধন করত। বিজাপুর রাজ্য তুর্কী (উসমানী) প্রতীককে রাজ্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছিল। গুজরাটের নেতৃস্থানীয় উচ্চ বংশীয় মালিক আয়ায সুলতান সেলিম ১মকে পৃথিবীর খলীফা বলে সম্বোধণ করেছেন। মূঘল সম্রাটেরা যে তুর্কীর সুলতানের প্রতি অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন যার প্রমান পাওয়া যায় দিল্লী ও ইস্তাম্বুলের মধ্যে আদান প্রদানকৃত কিছু চিঠিপত্রে। সুলতান সুলাইমানকে লেখা একটি পত্রে, হুমায়ুন (ভারতের সম্রাট) তাঁকে সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলী সমৃদ্ধ খলীফা বলে সম্বোধন করেছেন এবং তার খিলাফতের শাশ্বত চিরস্থায়িত্বের জন্য দোয়া করেছিলেন। তিনি সুলতানকে ইঙ্গিত করে একটি কোরআনের আয়াত ও উল্লেখ করেছিলেন “তিনি (আল্লাহ) আপনাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন। সুলতান ইব্রাহীম শাহজাহানকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যেখানে তিনি নিজেকে বিশ্বের সম্রাটদের নিরাপত্তা ও আশ্রয়স্থল রূপে উল্লেখ করেছেন যিনি খিলাফতের আসনে আসীন হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। আহমাদ আকা, একজন তুর্কী প্রতিনিধি সুলতানের পক্ষ থেকে ১৬৯০ সালে একটি সরকারী পত্র নিয়ে আওরঙ্গজেবের মহলে এসেছিল যা কুরআনের আয়াত দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল এবং সুলতান নিজেকে ইসলামের খলীফা বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৭২৩ সালে মুহাম্মদ শাহ (১৭১৯-১৭৪৮) মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে ইস্তাম্বুলের তুর্কী সম্রাটের সাথে চিঠি আদান-প্রদান বজায় রাখেন। তাঁর চিঠিতে মুহাম্মদ শাহ সুলতানকে মহান সম্রাটদের আশ্রয়দাতা ‘মর্যাদাবান সম্রাটের নিরাপত্তাদানকারী’, ‘সম্মানীত খিলাফতের রূপকার’ এবং ‘শরীয়তের আদর্শ প্রচারকারী’ বলে সম্বোধন করেছিলেন,” [Shashi S. Sharma, Caliphs and Sultans – Religious ideology and political praxis, pg. 248-249]
কিছু প্রাচীন নিদর্শন খিলাফত ও ভারতের মধ্যে সংযোগের চিত্রও তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ (১২১১-৩৬) যিনি ভারতের ওয়ালী ছিলেন, তাঁর সময়কার রৌপ্য মূদ্রার একপাশে খলীফা আল মুসতানসীরের নাম এবং অন্য পাশে খিলাফতের সাহায্যকারী হিসেবে নিজের নাম খোদাই করেছিলেন।
এমনকি ১২৫৮ খৃষ্টাব্দে বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর যখন খলীফা আল-মুসতা’সীমের মৃত্যু হয়, তারপরও ভারতের মূদ্রায় তাঁর নাম ব্যবহার অব্যাহত ছিল।
ভারত ইসলামী শাসনামলে মহান আলেমদের জন্ম দিয়েছে যেমন শেখ আহমাদ সিরহিন্দী (দীল্লীতে মৃত্যু বরণ, ১৬২৪ খ্রিঃ) যিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানী নামেও পরিচিত। তিনি ফিকহ শাস্ত্রের সুপ্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন। তিনি উসমানী শাসকদের নিজের মতামত পেশ করে ৫৩৬ টি চিঠি লিখেছিলেন যে গুলোকে একত্রে ‘সংগৃহীত পত্র’ বা ‘মাকতুবাত’ বলা হয়।
শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২ খৃঃ) ভারতের সবচেয়ে সম্মাণিত আলেমদের মধ্যে একজন এবং তিনি দক্ষিণ এশিয়া ও এর বাইরের প্রায় সকল দল ও মাযহাবের কাছে সমান ভাবে গ্রহণীয় ও সম্মানিত। তিনি তার উর্বর লেখনী ক্ষমতার দ্বারা অসংখ্য ইসলামি বিষয়ে বিস্তৃতভাবে লিখেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে কুরআনের আয়াত থেকে উর্দু অনুবাদকর্ম যা অন্যতম পুরোনো ও মাধূর্য্যময় একটি অনুবাদকর্ম। এছাড়া তিনি কোরআন অনুবাদ করেছেন সংস্কৃত ভাষায়, যদিও সমসাময়িক মুসলিম আলেমরা কুরআন কে তার প্রকৃত ভাষায় রাখার পক্ষে ছিলেন তবে পরবর্তীতে ভারতের ইসলামি আলেমরা তাঁর এই কর্মকে গ্রহণ করে নিয়েছেন এবং সমালোচনার পরিবর্তে স্বাগত জানিয়েছেন। এছাড়াও তারঁ বিখ্যাত কর্মের মধ্যে রয়েছে হুজ্জাত-আল-বালিগাহ এবং আল-তাফহীমাত আল-ইলাহীয়া’। শাহ ওয়ালী উল্লাহ ‘ইজালাত আল খীফা’ তে খিলাফত সম্বদ্ধে বলেছেন-“খিলাফত হচ্ছে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির নেতৃত্ব যার উত্থান হয়েছে দ্বীন বাস্তবায়নের জন্য তথাপী ইলমের শাখা সমূহ পুণর্জাগরণ, ইসলামি আচার-অনুষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, জিহাদ পরিচালনা, সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, যোদ্ধাদের পুরস্কৃতকরণ বিচার ব্যবস্থা তৈরী ও আইন প্রয়োগ অপরাধ দমন এই সবগুলো কাজ বাস্তবায়ন এর দ্বারা করতে হবে যেন তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিনিধিত্ব করে”।
ইসলামের উলাইয়া আম্মা (আম বা সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) গ্রহণযোগ্য:
ভারতীয় উপমহাদেশকে খলীফাদের পক্ষ থেকে উলাইয়া আম্মা (সাধারণ প্রতিনিধিত্ব) দেয়া হয়েছিল যা শরী’আর হুকুম অনুযায়ী একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিত্ব। এটা সত্য যে খলীফাগণ উলাইয়াত বা প্রদেশগুলোর ব্যাপারে অনুসন্ধান, সরাসরি প্রতিনিধি নিয়োগ ও অপসারনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন। এটি একটি রীতিতে পরিণত হয়েছিল যে সরাসরি নিয়োগের পরিবর্তে যেই প্রাদেশিক ক্ষমতা গ্রহণ করতো তাকেই মেনে নেয়া হত। তা সত্ত্বেও যেহেতু তাদেরকে গ্রহণ করা হত তাই তাদের কর্তৃত্ব খলীফা কর্তৃক সমর্থিত ছিল।
নিম্নে দুই ধরণের উইলায়াতের পক্ষে ইসলামি দলীল তুলে ধরা হল, যা নেয়া হয়েছে শেখ তাকী উদ্দীন আন নাবহানী ও শেখ আব্দুল কাদীম যাল্লুম কর্তৃক লিখিত বই The Ruling System in Islam (ইসলামী শাসন ব্যবস্থা) এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে,
“ওয়ালী (গভর্নর) হচ্ছেন খলীফার প্রতিনিধি। তিনি সেই সকল কার্যই সম্পাদন করেন যে সকল কাজের জন্য খলীফা তাকে নিজের পক্ষে কর্তৃত্ব দান করেন। শরী’য়ায় উইলায়ার কোন নির্দিষ্ট সীমা নেই। সুতরাং খলীফার পক্ষ থেকে কোনো হুকুমের ব্যাপারে যিনিই নিয়োগ প্রাপ্ত হবেন তিনিই হবেন ওয়ালী। পাশাপাশি সে সকল শর্তের ভিত্তিতে খলীফা তাকে নিয়োগ দিবেন। তবে কোন একটি দেশের উইলায়াহ ভৌগলিক ভাবে নির্দিষ্ট। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) ওয়ালী নিয়োগের ক্ষেত্রে আয়তন নির্ধারন করে দিয়েছেন অর্থাৎ যেখানে তিনি (সা) আমীরকে ইমারত (শাসনকর্তৃত্ব) সহকারে নিয়োগ দিয়েছেন।
দুই ধরনের উইলাইয়া রয়েছে: সাধারণ ও বিশেষ। সাধারণ উইলায়াতে সকল ধরনের হুকুমি ব্যাপার সমূহ নিযুক্ত থাকবে। উক্ত উইলায়ার কাউকে নিয়োগের অর্থ দাঁড়ায় খলীফা উক্ত ওয়ালীকে নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব স্বরূপ ইমারাহ প্রদান করেছেন। যিনি উইলায়ার জনগণের সকল স্বাভাবিক কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণের জন্য, নিয়োগ প্রাপ্ত। সুতরাং তিনি সাধারণভাবে পর্যবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত। অন্যদিকে বিশেষ ইমারা হচ্ছে যেখানে আমীর নির্দিষ্ট দেশ বা প্রদেশে সীমাবদ্ধ বিষয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত যেমন- সৈন্য পরিচালনা, নাগরিকদের শাসনকার্য পরিচালনা, ভুমি প্রতিরক্ষা আর নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দান। কিন্তু বিচার বিভাগ পরিচালনা, খারাজ ও সদকা আদায়ের ব্যাপারে তার কর্তৃত্ব থাকবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণ দায়িত্ব (উইলায়া আম্মা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) যখন আমরু বিন হাযমকে ইয়েমেনে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তেমনি ভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) বিশেষ দায়িত্ব (উইলায়া খাসসা) সহকারে ওয়ালী নিয়োগ দিয়েছেন। যেমন তিনি (সা) আলী বিন আবি তালিবকে ইয়েমেনের বিচার বিভাগের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। খলীফাগণ রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন। উমার ইবনুল খাত্তাব মুয়াবিয়া বিন আবি সুফিয়ানকে আল-শামের সাধারণ ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলন। অন্যদিকে আলী বিন আবি তালিব আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসকে বসরায় শাসনকার্য পরিচালনার জন্য বিশেষ ক্ষমতা (উইলায়া খাসসা) সহকারে নিয়োগ দিয়েছিলেন, বায়তুল মালের দায়িত্ব ব্যতিত, যেখানে নিয়োগ দিয়েছিলেন যিয়াদকে।
শুরুর দিকে দুই ধরনের উইলায়াহ প্রচলিত ছিল: উইলায়াহ সালাহ্ এবং উইলায়াহ খারাজ। তাই ইতিহাসে উইলায়ার আমীরের ক্ষেত্রে দুই ধরণের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়: প্রথমটি হচ্ছে সালাতের উপর ইমারাহ্ আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সালাহ ও খারাজের উপর ইমারাহ। অন্য কথায় আমীর নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন সালাত ও খারাজ উভয়ের উপর অথবা শুধুমাত্র সালাতের উপর। এখানে উইলায়াহ বা ইমারাহ এর ক্ষেত্রে সালাহ শব্দটি শুধুমাত্র নামাযে নেতৃত্ব দেয়া বুঝাচ্ছে না কারণ হচ্ছে সালাহ শব্দটি শাসনকার্যের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় যেখানে বায়তুল মালের খাজনা বা কর অন্তর্ভূক্ত নয়। তাই ওয়ালী যদি সালাহ এবং খারাজ উভয়ের উপর নিয়োগপ্রাপ্ত হন, তবে ঐ উইলায়াহ হবে সাধারণ (উইলায়াহ আম্মা)। আর তার উইলায়াহ যদি সীমাবদ্ধ হয়, শুধুমাত্র সালাহ অথবা শুধুমাত্র খারাজের জন্য, তবে ঐটি বিশেষ উইলায়াহ (উইলায়াহ খাসসা) উভয় ক্ষেত্রেই এটি সম্পূর্ণরূপে খলীফার এখতিয়ারভূক্ত, যেহেতু তাঁরই অধিকার রয়েছে উইলায়াহকে সীমাবদ্ধ করার যা হতে পারে খারাজের ক্ষেত্রে, বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে, অথবা খারাজ, বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনী ছাড়াও অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে। তিনি প্রদেশ উইলায়াহ পরিচালনায় যা ভাল মনে করবেন তাই করবেন। কারণ শরী’য়াহ ওয়ালীর কার্যক্রম নির্দিষ্ট করে দেয় নি এবং তিনি শাসনব্যবস্থার সকল কার্য পরিচালনায়ও বাধ্য নন। তবে এটি অবশ্যই নির্ধারিত যে ওয়ালী বা আমীর শাসনকার্যের কর্তৃত্বের ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তিনি খলীফার প্রতিনিধি এবং তিনি অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আমীর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন। এই সকল বিষয় উঠে এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মকান্ডের মধ্যে। তবে শরী’আহ খলীফার জন্য ওয়ালী নিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে, হোক সে সাধারণ উইলায়াহ (উইলায়াহ আম্মা) বা বিশেষ উইলায়া (উইলায়া খাসসা) যা তাঁর (খলীফার) নিজস্ব এখতিয়ারভূক্ত এবং এর সবই রাসূলুল্লাহ (সা) এর কার্যকলাপ দ্বারা প্রমাণিত।
সীরাত ইবনে হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সঃ) ফারওয়া বিন মুসাইককে মুরাদ, যুবাইর ও মিজহাজ গোত্রের উপর নিয়োগ দিয়েছিলেন। আর তাঁর সাথে খালিদ বিন সাইদ বিন আল আসকে সদাকার ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) যিয়াদ বিন লবীদ আল-আনসারীকে হাদারামাউতে সদাকাহর ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি (সা) আলী বিন আবী তালিবকে নাযরানে পাঠিয়েছিলেন সদাকাহ ও যিজিয়া আদায়ের জন্য। এছাড়াও তিনি (সা) তাকে (আলী) (রা) ইয়েমেনে কাজী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যেভাবে আল- হাকিম থেকে বর্ণিত হয়েছে।
কিতাবুল ইসতিয়াব থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) মুয়ায বিন জাবালকে আল-জানাদে নিয়োগ দিয়েছিলেন মানুষকে কুরআন ও ইসলামি আইন শিক্ষা দেয়ার জন্য এবং তাদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য। তিনি (সা) তাকে ইয়েমেনের আমিলদের নিকট থেকে সদাকাহ আদায়ের জন্যও নিয়োগ দিয়েছিলেন। সীরাত ইবন হিশাম থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) উহুদ যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে ইবনে উম্মে মাকতুমকে আল-মদীনায় সালাতের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। [The Ruling System in Islam, Sheikh Taqi-ud-deen-an-Nabhani & Sheikh Abdul Qadeem Zalloom, Al-Khilafah Publications]
ভারতে বৃটিশ আগ্রাসন ও মুসলমানদের প্রতিক্রিয়া:
ঔপনিবেশিকদের ক্রমাগত কুটচাল ও মুসলিম উম্মাহর বহুলাংশে বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের দরুণ, কুফফাররা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রভাব বিস্তারের সুপ্ত ইচ্ছার প্রতিফলনের সুযোগ খুঁজে পায়। ১৬০০ খ্রিঃ বৃটিশরা ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করে। এটা ছিল বেদনাদায়ক যুগের সূচনা যখন বৃটিশ ও অন্যান্য ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা উম্মাহর ভূমি ও সম্পদ লুন্ঠন করা শুরু করে। তারা মুসলিম ও অমুসলিমদের মাঝেও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
বৃটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশের আক্রমণ করে ১৮১৯ সালে, যখন তারা মুসলিমদের শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে পড়ে। এই যুদ্ধ উপমহাদেশে ইসলামি কর্তৃত্ব ও আক্রমণকারী বৃটেনের মধ্যে কিছু কুফর শক্তি যথা হিন্দু, বৌদ্ধ ও অন্যান্য কুফর শক্তির সাহায্যে পাল্টাপাল্টি সফলতার মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। বৃটেন মুসলিমদের সাথে ২৭ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৮৪৬ সালে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নেয়।
এই সময় ভারতবর্ষের বিভিন্ন অংশে যেহেতু মুঘল উইলায়াহ দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তাই এর অন্যান্য অংশের শাসকবর্গ ইস্তাম্বুলে খলীফার কাছ থেকে সাহায্য ও (শাসনকতৃত্বের) বৈধতা চেয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ কান্নুরের রাণী ১৭৭৯ সালে সুলতান আব্দুল হামিদকে উদ্দেশ্য করে একটি কুটনীতিক পত্র লিখেছিলেন, যেখানে তিনি, খলীফার কাছে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে নিরাপত্তার আরজি করেছিলেন। মাইসুরের টিপু সুলতান (বৈধতা) অন্বেষণের পর খলীফার কাছ থেকে একটি স্বীকৃতি পত্র পেয়েছিলেন যেখানে তাকে মাইসুরের শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
বৃটিশ ঔপনিবেশিকরা ভারত থেকে ইসলামি শাসন সরিয়ে দেয়ার পরও মুসলিমরা ইস্তাম্বুলের খলীফার প্রতি অনুগত ছিল। অনেকে জিহাদ পরিচালনা অব্যাহত রেখেছিল যেমন বিখ্যাত সায়্যিদ আহমাদ শহীদ। অন্যান্যরা বিশেষ করে ইয়াগিস্তানের (আফগানিস্তানের পূর্বে পশতুন উপজাতীয় অঞ্চল, সংযুক্ত হেয়াট, কান্দাহার, কাবুল, গাজনী ও কাবুল যা বৃটিশ শাসনামলে ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত ছিল) আলেমগণ ঔপনিবেশিকদের বিরূদ্ধে জিহাদ পরিচালনা ও সংগঠিত করেছিলেন।
গ্রীক-তুর্কী যুদ্ধের ফলাফল যখন উসমানী খিলাফতের পক্ষে এসেছিল, তখন ভারতের মুসলিমেরা মওলানা আব্দুল বারীর নেতৃত্বে লাখনৌতে একটি সৌজন্য বৈঠক করে সুলতানকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত যখন বলকান এবং ত্রিপোলী যুদ্ধে দূর্বল হয়ে পড়েছিল, তখন মুসলিমেরা পশ্চিমা শক্তির খিলাফতকে দূর্বল করে দেয়ার ষড়যন্ত্রের বিরূদ্ধে গর্জে উঠেছিল।
মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর, যিনি খিলাফতের পক্ষের একজন অবিসংবাদিত কর্মী এবং বৃটিশ বিরোধী অবস্থানের জন্য সুপরিচিত, তিনি বৃটেনের লিংকন কলেজ থেকে মাত্র স্নাতক শেষ করে ফিরেছিলেন। ১৯১৪ সালে লন্ডন টাইমসে প্রকাশিত একটি অনুচ্ছেদের প্রতিউত্তরে তিনি ছত্রিশ ঘন্টা বৈঠকের সম্পাদকীয় ‘The Choice of Turks’ লিখেছিলেন। ১৯১২ তে বলকান যুদ্ধ শুরু হলে তিনি অর্থ যোগানের সনির্বন্ধ আবেদন করেছিলেন এবং তুর্কীর ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি মেডিকেল মিশন প্রেরণ করেছিলেন।
ভারতের সুপ্রসিদ্ধ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, দারুল-উলুম-দেওবন্দের প্রধান, শাইখ-উল-হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, বলকান ও ত্রিপোলী যুদ্ধে খিলাফতের সাহায্যার্থে অর্থ-সংগ্রহের জন্য বিরামহীনভাবে কাজ করেছিলেন। মওলানা হোসাইন আহম্মদ মাদানী তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, “বলকান ও ক্রিপোলীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মওলানা মাহমুদ হাসানের মনে ও হৃদয়ে দুঃখের ছাপ ফেলেছিল। এটিই তাঁকে তার পূর্বসূরী মওলানা কাসিম নানুতভির (যিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দের সহকারী প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এবং সোভিয়েত-তুর্কী যুদ্ধে খিলাফতের পক্ষে সহযোগীতা করেছিলেন) দেখিয়ে দেওয়া পথে পরিচালিত করে। মওলানা মাহমুদ হাসান ইসলামের স্বার্থে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং উসমানী সাম্রাজ্যের পক্ষে সম্ভাব্য সকল সাহায্য বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি দারুল-উলুম-দেওবন্দ বন্ধ রাখার ফতোয়া দিয়েছিলেন, উসমানী সাম্রাজ্যের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন, তুর্কীতে ছাত্র প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন, নিজেই একটি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এরপরও তিনি উসমানী সাম্রাজ্যকে তাঁর পক্ষ থেকে দেয়া সাহায্যে সন্তুষ্ট ছিলেন না। এর মূল কারণ ছিল বলকান যুদ্ধের ফলাফল যা তাঁর মত মুসলিম স্বপ্নদর্শীদের বিচলিত করে দিয়েছিল। তাঁরা জানতেন যে ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা ইসলামের মশাল থেকে বিচ্ছুরিত আলো নিভিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। তার উপর মিঃ স্কুইবদের মত বৃটিশ শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতা, মুসলিমদের উপর রাশিয়ার পরিচালিত নৃশংসতা এবং তুর্কীর বিভাজন এই বিশ্বাসকে আরো পাকাপোক্ত করেছিল যে, বহুদিনের প্রতিপালিত গ্ল্যাডস্টোনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সময় শ্বেতাঙ্গদের চলে এসেছে।” [Naqsh-E- Hayat, Vol.2, pg.140]
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, কুফর শক্তির ধ্বংস কামনা করে, (তুরস্কের) সুলতান ও তাঁর আর্মির সফলতার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে ভারতের মসজিদগুলোর খুতবা উষ্ণ দোয়ায় প্রতিধ্বনিত হতো। যখন মওলানা শওকত আলী, যিনি এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল কেন তিনি তুরস্কের সুলতানের নামে খুতবা পড়েছিলেন, তিনি উত্তরে বলেছিলেন, “তোমরা আমাকে দোষ দিতে পারো না যদি ইসলামের খলীফা একই সাথে তুর্কীর সুলতানও হয়।” [The Khilafat Movement, Gail Minault, Oxford University Press, 1982, p.55]
খিলাফত রাষ্ট্র ভারতের মুসলিমদের এই প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং তাদের একে (খিলাফতকে) সাহায্য করতে ও বৃটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে আহ্বান করেছিল।
খিলাফত রাষ্ট্রের রাজধানী ইস্তাম্বুল থেকে আরবী সংবাদপত্র ‘আল-জাওয়াইত’ প্রকাশিত হত। এই ‘আল-জাওয়াইত’ এর পরিচালক ভারতের দারুল-উলুম-দেওবন্দের ছাত্রদের জন্য একটি ‘শুভেচ্ছা কপি’ পাঠিয়েছিলেন যা ইস্তাম্বুল থেকে প্রায় আট হাজার মাইল দূরে [Saweaneh Qasmi, Vol.2, p.329]
শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদুল হাসান যার কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, খিলাফতের প্রত্যক্ষ সমর্থক ছিলেন এবং তা রক্ষার জন্য জোর প্রচেষ্ঠা চালিয়েছিলেন। তিনি হিযাজে ভ্রমন করে মক্কায় নিযুক্ত খিলাফতের ওয়ালী (গভর্নর) ও খলীফার সহকারীদের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন। উক্ত ওয়ালী বৃটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের সহযোগীতার স্বার্থে শায়খের হাতে কিছু নথিপত্র দিয়েছিলেন। ভারতের মুসলিমদের উদ্দেশ্যে ওয়ালীর এক আবেদন এই নথিপত্রের মধ্যে অন্যতম ছিল। উক্ত আবেদনে মক্কার ওয়ালী শাইখুল হিন্দকে ঔপনিবেশিক বৃটিশদের বিরূদ্ধে আন্দোলনের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছিলেন এবং ভারতের মুসলিমদেরও একে পূর্ণ সমর্থনের দেবার জন্য উৎসাহ দিয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি ভারতীয় মুসলিমদের আন্দোলনে খিলাফত কর্তৃক সকল ধরনের পার্থিব সহযোগীতার আশ্বাস দিয়েছিলেন। মক্কার গর্ভনরের লিখিত এই নথিপত্র ইতিহাসে ‘গালিব নামা’ নামে খ্যাত। এছাড়াও শায়খ ১৩৩৪ হিজরীতে হজ্জ্ব পালনের পর আনোয়ার পাশা ও জামাল পাশার সাথেও সাক্ষাত করেন, যারা খিলাফত রাষ্ট্রের কর্মকর্তা ছিলেন। আনোয়ার পাশাও বৃটিশদের বিরুদ্ধে ভারতের মুসলিমদের অবিরত আন্দোলনের প্রশংসা করে একটি আবেদন পত্র লিখেন। এই পত্রের লেখাগুলো গালিব নামার সাথে মিল ছিল, যেমন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে উসমানী খিলাফতের পক্ষ থেকে ভারতের মুসলিমদের পার্থিব সহযোগীতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। এছাড়াও উক্ত পত্রে উসমানী খিলাফতের সকল নাগরিক ও কর্মচারীদের শাইখুল হিন্দের প্রতি পুর্ণ আস্থা রাখতে ও পার্থিব সহায়তা প্রদানের উৎসাহ দেয়া হয়েছিল। এ পত্রসমূহ বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থার শত বাধার মূখে গোপনে ভারতে পাচার করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে সমগ্র ইয়াগিস্তান জুড়ে বিলি করা হয়েছিল। [The prisoners of Malta (Asiran-e-Mallta), Maulana Syed Muhammad Mian. jamiat ulama –I-Hind]
ভারতের মুসলিমরা শরীফ হোসাইনের বিশ্বাসঘাতকতা ও বৃটিশদের সহযোগিতায় (খিলাফতের বিরুদ্ধে) তার বিদ্রোহের ব্যাপারে সচেতন ছিল। তারা বৃটিশ কর্তৃক হিযাজ অঞ্চলের খাদ্য রসদ সরবরাহ বন্ধের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
কর্নেল টি. ই. লরেন্স কর্তৃক ছড়ানো প্রপাগান্ডা, তার চটকদার ও আবেগপ্রবণ আরবী বক্তৃতা এবং শরীফ হোসেন ও হেনরী মেকমোহান কর্তৃক সম্পাদিত গোপন চুক্তি সত্ত্বেও, হিযাজ অঞ্চলের সাধারণ নাগরিক তুর্কীদের বিপরীতে সংগঠিত বিদ্রোহের বিরূদ্ধে ছিল না। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৃটিশ সরকার খুবই অমানবিক ও একটি নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছিল। শাইখুল ইসলাম মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী বিষয়টি এভাবে বর্ণনা করেছেন: “হিযাজে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ কর দেয়া হযেছিল। জাহাজযোগে হিযাজে শেষ খাদ্য চালানটি পৌঁছেছিল ১৩৩৪ হিজরীর সফর মাসে। যেহেতু খাদ্য সরবরাহ বন্ধ ছিল, মূল্য বৃদ্ধি পেল এবং মানুষ অনাহারে মরতে লাগল ভারতের মুসলিমদের আন্দোলনের দরূণ, ১৩৩৪ হিজরীর জমাদিউল-সানী মাসে ফায়রোজী আগানবোট কয়েক হাজার বস্তা চাউল নিয়ে কলকাতা ছেড়ে যায়। কিন্তু তাও জোরপূর্বক এডেন বন্দরে খালাস করা হয়। এটি শুধুমাত্র তখনই জেদ্দায় পৌঁছানোর অনুমতি দেয়া হয়, যখন হিযাজ থেকে উসমানী সাম্রাজের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়েছিল।” [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiatul-I-Hind, English Edition, P.45]
পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, শাইখুল হিন্দ, মওলানা মাহমুদ হাসান তাঁর সত্যের প্রতি অবিচলতা ও উসমানী খিলাফতের সমর্থন বর্জন না করার দরূন বৃটিশ কর্তৃক মাল্টায় বন্দী ছিলেন। বৃটিশরা চেয়েছিল তাঁর দ্বারা উসমানী খিলাফত বর্জন করতে এবং শরীফ হোসেনকে সমর্থন করে একটি ফতোয়া জারি করতে। শাইখুল হিন্দ ১৩৩৫ হিজরীর ২৩ সফর হিযাজে (মক্কায়) বিশ্বাসঘাতক শরীফ হোসেন কর্তৃক গ্রেফতার হন। তিনি এবং অন্যান্য অনেক আলেমকে ১৩৩৫ হিজরীর ২৯ রবিউল সানী (২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯১৭) একটি জাহাজে করে কায়রো হয়ে মাল্টায় প্রেরন করা হয়। অন্যান্য ভারতীয় উলামাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী, মওলানা আজিজ গুল, মওলানা হাকিম নূসরাত হুসেন ও মওলানা ওয়াহিদ আহমেদ যাদের প্রত্যেককেই বৃটিশরা কারাগারে চাপ সৃষ্টি করেছিল। মওলানা মাহমুদ হাসান ৩ বছর ৪মাস জেলবন্দী ছিলেন। তিনি ১৯২০ সালের ৪ঠা জুলাই মুক্ত হয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। এই সময়টি মালটা থেকে ফিরে আসার পাশাপাশি ছিল খিলাফত আন্দোলনের সূচনালগ্ন। [The Prisoners of Malta (Asiran-e-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind]
১৩২১ হিজরীতে নিজারাতুল মারিফ (কুরআন শিক্ষা একাডেমী) প্রতিষ্ঠিত হয়। মুজাহিদ মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধির নেতৃত্বে যার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম চিন্তাবিদ তৈরী করে ইসলাম বিরোধী প্রচারণার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এবং ইসলামি চিন্তা ছড়িয়ে দেয়া। বৃটিশরা এই হুমকির প্রভাব বুঝতে পেরেছিল। যা বৃটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ (CID) কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়। যার শিরোনাম ছিল (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah Sindhi), সেখানে বলা হয়েছে-
“মওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধী দারুল উলুম দেওবন্দকে তাঁর মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারছিলেন না। এই লক্ষ্যে তিনি দিল্লীতে একটি মাদরাসা (নিজারুতুল মা’আরিফ) প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ………… যা এটির নাম থেকে স্পষ্ট, মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কুরআনের ব্যাখ্যা ও সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা শিক্ষা দেয়ার জন্য। এটি আরবী ভাষাও শিক্ষা দিত।” (The Petition of British Queen Vs Maulana Obaidullah sindhi, Section 17)
“নিজারাতুল মারিফ এর এই শিক্ষাদানের পাশাপাশি, যা ছিল বেআইনী, এটি ষড়যন্ত্রকারীদের গোপন সাক্ষাতস্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হত।” [The Petition of the British Queen vs Maulana Obaidullah Sindhi, Section 20]
বৃটিশরা এই বিষযটির প্রতি ইঙ্গিত করছিল যে নিজারাতুল মারিফ মুসলিম বিদ্রোহীদের সাক্ষাত স্থান ও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল, যারা ভারতে বৃটিশ সরকারের শাসন উৎখাত করতে চেয়েছিল। এদের মধ্যে ছিল হাকীম আজমল খান, ড. মুখতার আহমদ আনসারী, মওলানা শওকত আলী, মওলানা মুহাম্মাদ আলী জওহর, মওলানা জাফর আলী খান ও মওলানা আবুল কালাম আজাদ।
মুসলিম আলেমগণ, চিন্তাবিদ ও মাঠকর্মীগণ বিদেশি পণ্য বয়কট ও বৃটিশ সরকারের সাথে অসহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছিল। এই ইস্যুগুলোকে সমর্থন করে জনগণকে জড়ো করার লক্ষ্যে বৈঠকাদির আয়োজন করা হতো। এই বৈঠকগুলো পরিচালিত হতো ‘মু‘তামার আল-আনসার’ (The Workers Conference) নামক ব্যানারে এবং বিভিন্ন পত্রিকায় তা প্রকাশিত হত যেমন মওলানা আবুল কালাম আজাদ পরিচালিত আল-হিলাল ও মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর পরিচালিত ‘দ্যা কমরেড’ পত্রিকায়। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর উভয়কেই সংবাদপত্রে বৃটিশ বিরোধী প্রবন্ধ ছাপার দরুণ কারারূদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। শেষের জন ১৯১১ থেকে ১৯১৫ খৃঃ পর্যন্ত চার বছর জেল খেটেছিলেন।
ভারতের মুসলিম চিন্তাবিদগণ (Intelligentsia) খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। মওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯১২ সালের ৬ই নভেম্বর তাঁর আল-হিলাল পত্রিকায় তাঁদের দর্শন সমূহের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে লিখেছিলেন যে, উসমানী সুলতানই মুসলিমদের নিরাপত্তার সর্বশেষ তরবারী ধারণ করেন। এতদূর পর্যন্ত লিখেছিলেন যে, “খিলাফত মূলত শরীআহকে ধর্মীয় সমগ্রতা প্রদানকারী (শক্তি)” এটি “ওহীর মাধ্যমে জরুরী হয়ে পড়েছে যে, এটি আল্লাহর প্রতিষ্ঠান এবং এর কর্তৃত্বের প্রতি আনূগত্য ফরয বা ইতিবাচক নির্দেশনা।”
খিলাফত আন্দোলন:১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বরে, মওলানা মুহাম্মদ আলী ও তাঁর ভাই শওকত আলী, মওলানা আবুল কালাম আজাদ, ড. মুখতার আহমেদ আনসারী ও হাসরাত মোহানী সহ খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) নামে একটি নতুন সংগঠনের যাত্রা শুরু করেন। খিলাফত রক্ষায় সাধ্যানুযায়ী যেকোনো সুযোগের সদ্ব্যবহার করা তাদের সংকল্পবদ্ধ লক্ষ্য ছিল। তাঁরা ভারতে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে খিলাফত কনফারেন্সের আয়োজন করেছিলেন। এটি লক্ষণীয় যে, খিলাফত আন্দোলনের উলামা ও কর্মীগণ বিভিন্ন মাযহাব ও প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছিলেন, উদাহরণস্বরূপ মওলানা আবুল কালাম আজাদ গায়ের তাকলীদি (যারা মাযহাবের তাকলীদ হারাম মনে করেন) হিসেবে পরিচিত এবং মওলানা মাহমুদুল হাসান ছিলেন দেওবন্দী যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী, তা সত্ত্বেও তাঁরা খিলাফত সুরক্ষার লক্ষ্যে একতাবদ্ধ ছিলেন।
১৯১৯ সালে বোম্বে খিলাফত কমিটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক লক্ষ্যে একমত হয়; “প্রথমতঃ তুর্কী সুলতানের প্রতি খলীফা হিসেবে পার্থিব ক্ষমতা ধরে রাখার জোরালো দাবি জানানো, এবং দ্বিতীয়ত, ইসলামের পবিত্র ভুমিসমূহে তাঁর অব্যাহত কর্তৃত্ব সুনিশ্চিত করা।”
১৯২০ সালে বেঙ্গল প্রাদেশিক খিলাফত কনফারেন্সের কলকাতা সভায় সভাপতির বক্তব্যে মওলানা আবুল কালাম আজাদ খিলাফতের গুরুত্ব আলোচনা করে ঘোষণা দেন, “এই প্রতিষ্ঠানের (খিলাফতের) লক্ষ্য হচ্ছে মুসলিম জাতিকে সঠিক পথে সংগঠিত করা ও নেতৃত্ব দেয়া, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, শান্তি ফিরিয়ে আনা এবং আল্লাহর বাণীকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়া। এই সকল বিষয়ের জন্য খলীফার পার্থিব কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখা অত্যাবশ্যক।” মওলানা আযাদের এই ব্যাপারে কোন কোন সন্দেহ ছিল না যে, “একজন ইমাম ব্যতীত তাদের জীবন অনৈসলামিক হয়ে পড়বে এবং মৃত্যুর পরে তারা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।”
মওলানা আযাদ ১৯২০ সালে মাসআলা-এ-খিলাফত (খিলাফতের মাসাআলা সমূহ) নামে একটি বই প্রকাশ করেন যেখানে তিনি বলেন, “খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব না তাই ভারতের মুসলিমদের উচিত তাদের সমস্ত প্রচেষ্টা ও ক্ষমতা দিয়ে এর জন্য কাজ করা।”
একই বইয়ের ১৭৬ নম্বর পৃষ্ঠায় মওলানা আজাদ বলেন; “দুই ধরণের আহকাম শরীআহ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে ব্যক্তি সম্পর্কিত যেমন আদেশ ও নিষেধ, ফরজ (বাধ্যতামূলক) ও ওয়াজিবসমূহ যা নিজেদের পরিপূর্ণতার জন্য। দ্বিতীয়টি ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত নয় বরং উম্মাহর সাথে, জাতির সাথে সম্পর্কিত, সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা এবং রাষ্ট্রের রাজনীতি যেমন ভুমি জয় করা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালা।”
Peter Hardy’ র মতে, মওলানা আজাদ বিশ্বাস করতেন যে, “যে মুসলিম ধর্ম ও রাজনীতিকে মুসলিমদের থেকে আলাদা করবে সে নিঃশব্দে কর্মসম্পাদনকারী মুরতাদ।”
ভারত থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব হারানো ও খলীফার সমসাময়িক ক্ষমতার প্রতি যৌথ বাহিনীর হুমকি, মুসলিম জাতির নেতাদের এতটাই চিন্তাগ্রস্ত করে তুলেছিল যে, তাদের অনেকেই ভারত থেকে হিজরতের (Migration) পক্ষে ফতোয়া দেয়ার তাগিদ অনুভব করেন।
মওলানা আবুল কালাম আজাদ একটি ফতোয়া জারি করেছিলেন যা ১৯২০ সালের ৩০ জুলাই অমৃতসরের দৈনিক আহল-এ-হাদীস এ প্রকাশিত হয়েছিল। উক্ত ফতোয়ায় তিনি বৃটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগের বিকল্প হিসেবে ভারত থেকে হিজরতের জোর দাবি জানিয়েছিলেন ।
মওলানা আব্দুল বারী তাঁর ফতোয়ায় বলেছিলেন, “প্রত্যেক মুসলিম যারা এখানে বসবাস করছেন তাদের অসহযোগে সংযুক্ত হওয়া উচিত। আর তা যদি সম্ভব না হয় তবে হিজরত করা উচিত।” মওলানা শওকত আলী কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির পক্ষে একটি ফতোয়া জারি করেন, যেখানে প্রত্যেক নিষ্ঠাবান মুসলিমকে ভারতে অবস্থান করার এবং অসহযোগের জন্য কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। শুধুমাত্র এটি সম্ভব না হলেই তারা হিজরতের ব্যাপারটি আমলে নিতে পারেন। এই ফতোয়ার চমৎকার প্রভাব তৈরি হয়েছিল এবং হাজার হাজার মুসলিম ভারতের দার-উল-হারব ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেহেতু তুর্কী খলিফার পদ যা তাদের ধর্মীয় অধিকার হিসেবে চিহ্নিত ছিল, তা খর্ব হয়েছিল।”
খিলাফতের প্রশ্নটি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রশ্নই ছিল না বরং এই ব্যাপারটি ছিল মুক্তি অথবা ধ্বংসের” প্রশ্ন। তুর্কী যদি শাসনাঞ্চল হারায়, ইসলাম মতাদর্শ হিসেবে হুমকির মুখে পড়বে।
মওলানা শওকত আলী এই অনুভূতির পক্ষেই ১৯২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর সমগ্র ভারত খিলাফত কনফারেন্সের দশম অধিবেশনে তার সভাপতি বক্তব্যে বলেছিলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত জাজিরাত-উল-আরব এর এক ইঞ্চি ভূমিও অমুসলিমদের প্রভাবে রয়েছে, একজন মুসলিমের অন্তরে শান্তি থাকতে পারে না। [The Indian Muslims, Shan Muhammad, Meenakshi Prakashani, 1981, Vol. VII; p.209]
মোহাম্মদ আসাফ আলী কর্তৃক ১৯২১ সালের ২রা নভেম্বর ‘কমরেড’ পত্রিকার সম্পাদককে লিখিত একটি চিঠিতে খিলাফতের ইসলামি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি চিহ্নিত করা হয়,” তুরস্কের সম্মান ইসলামের সম্মানের সাথে সমার্থক, উসমানী সাম্রাজ্যের অস্ত্বিত্ব মুসলিম জাতির পার্থিব উন্নতির জন্য আবশ্যক …. উসমানী সাম্রাজ্য বিলুপ্তির সাথে সাথে সভ্যতা হিসেবে ইসলামের শক্তি হারিয়ে যাবে… তুরস্কের পতন ঘটলে ইসলাম দাঁড়াতে পারবে না। তাই তুরস্কই হচ্ছে ইসলামের মেরূদন্ড।” মওলানা মুহাম্মদ আলী এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন দিয়েছিলেন যিনি গুরুত্বারোপ করেছিলেন যে তা সাধারণ মুসলিমদের মতকে প্রতিফলিত করে।
১৯১৯ সালের ২৬ জানুয়ারী লক্ষনৌতে ফিরাঙ্গী মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় আঞ্জুমান মুইদ-উল-ইসলামের সভায় সমাধানস্বরূপ বলা হয়: “ফিরাঙ্গী মহলের আলেমদের এই সভায় সুলতান মুহাম্মদ ষষ্ঠ-এর প্রতি একনিষ্ট ও সচেতন আনুগত্যের পাশাপাশি জোরালোভাবে এ ঘোষণা দিচ্ছে যে সঠিক ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, বর্তমান তুর্কী সুলতানই হচ্ছে আইনসম্মত খলীফা এবং (আলেমগণ) এও ঘোষণা দিচ্ছে যে, ইসলাম কখনই খিলাফতের প্রশ্নে অমুসলিমদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না।
প্রকৃতপক্ষে, সৈয়দ সুলাইমান নদভীর মতো সেসময়কার অনেক আলেমই খিলাফত থাকার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। মওলানা নদভী বলেন: “…….অন্যান্য বিশিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে আল্লামা নাসাফী, ইমাম রাজি, কাজী উযুদ, এই ব্যাপারে তাদের বইগুলোতে বিশদ আলোচনা করেছেন এবং উক্ত ব্যাপারে সর্বশেষ কর্তৃপক্ষ ধরে নেয়া উচিত। রাসূলুল্লাহ (সা) হতে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে সহীহ মুসলিমে সুষ্পষ্ঠভাবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, কোন মুসলমান যদি তার সময়ের ইমামকে স্বীকার করা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে তাবে সে কাফেরের মতো অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।” [The Muslim outlook march 1920]
মওলানা মুহাম্মদ আলী ১৯২০ সালে প্যারিসে একটি বক্তৃতায় বলেন, “খিলাফত হচ্ছে সমগ্র বিশ্বের মুসলিম জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী তুরস্কের সুলতানকে ঈমানদারদের নেতা ও তাদের নবীর খলীফাদের উত্তরসূরী হিসেবে মেনে দিয়েছে। এই বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ এক অংশ এই যে খলীফার, যিনি বিশ্বাসীদের নেতা, অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ সীমানা, পর্যাপ্ত পরিমাণ সামরিক ও নৌ সম্পদ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থনৈতিক সম্পদ থাকতে হবে।”
সৈয়দ হুসেইন যিনি প্যারিস-এর সভায় মুহাম্মদ আলীর সাথে একই মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন বলেছেন, “যদি পৃথিবীতে ইসলাম টিকে থাকতে হয়, তবে এটি অত্যাবশ্যক যে ইসলামের অবশ্যই একটি খিলাফত থাকবে। যেটি চৌদ্দশ বছর পূর্বে যখন থেকে ইসলামের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে তখন থেকেই তা ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।”
মওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর আরও বলেন, “তুর্কী সুলতান ছিলেন খলীফা বা নবীর উত্তরসূরী এবং আমির উল-মুমিনীন বা বিশ্বাসীদের নেতা, এবং খিলাফত আমাদের সেইরূপ গুরূত্বপূর্ণ ব্যাপার ঠিক যেমনি কুরআন কিংবা নবীর সুন্নাহ। “[My life a Fragnent, Mohammed Ali Johar, pg.41]
বস্তুতঃ আলেমগণ খিলাফত আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভুমিকা নিয়েছিলেন। নিম্নোক্ত কিছু গুরুত্বপূর্ন দফা যা ১৯২০ সালের ৫ ও ৬ ই এপ্রিল ভারতের উলেমাদের জন্য অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের ঘোষণা থেকে নেয়া হয়েছে, যেখানে অনেক উলেমাই অংশগ্রহণ করেছিলেন:
ঘোষিত দফা ১: আলেমদের অবশ্যই খিলাফত বিষয়ে জনমত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
দফা ২ : কপটাচারি (মুনাফিক) আলেম এবং এই বিষয়ের বিরুদ্ধবাদী আলেমদের বয়কট করতে হবে।
দফা ৭ : উলেমাদের অবশ্যই তাদের অনুসরণকারীদের নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা নিতে হবে যে, তারা খিলাফতের বিষয়ে বলতে ও লিখতে গিয়ে তাদের মন-প্রাণ উৎসর্গ করবেন।
দফা ৯ : মুসলিমদের অবশ্যই সাংবিধানিক নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হবে।
১৯২০ সালের ১৯ ও ২০ নভেম্বর দিল্লীতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত সম্মেলনে জামিয়াত আল উলেমা হিন্দ কর্তৃক ঘোষিত নিম্নোক্ত কয়েকটি দফা থেকে খিলাফতের ব্যপারে তাদের সমর্থনকেও তুলে ধরে:
- ইংরেজরা ইসলাম এবং মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং তাদের বিরুদ্ধচারন করা ফরয।
- উম্মাহর নিরাপত্তা দেয়া এবং খিলাফতের নিরাপত্তা দেয়া একটি পবিত্র ইসলামি জরুরত। যদি এই দেশের ভাইয়েরা এই ব্যাপারে সাহায্য ও সহযোগীতা করেন, তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসান, দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান, যার কথা এর আগে উল্লেখ করা হয়েছিল, তিনি ১৩৩৮ হিজরীর ২০ রমযান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বোম্বে ফিরে আসেন। ফিরে আসার পর তিনি একনিষ্টভাবে খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর উত্তরসূরী মওলানা হুসাইন আহমাদ মাদানী লিখেছেন, “জেল ও নির্বাসনের কষ্ট সহ্য করে যখন হযরত শাইখুল হিন্দ রহমতুল্লাহ আলাইহি ভারতে ফিরে আসলেন, আমরা তাঁর বৃটিশদের প্রতি ঘৃণা ও উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রতি স্পৃহার কোনো কমতি দেখতে পেলাম না। দেশে জারি করা মার্শাল আইন, দেশের অভ্যন্তরে রওলাট অ্যাক্ট কার্যকরণ ও জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যা, উসমানী খিলাফতের বিভাজন এবং ভারতের বাইরে তুর্কীদের সাথে অমানবিক ব্যবহার তাঁকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করেছিল। তিনি বোম্বেতে পা রাখা মাত্রই মওলানা শওকত আলী এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য সদস্যদের সাথে সাক্ষাত করেন। ফিরাঙ্গী মহল, লক্ষনৌ-এর মওলানা আব্দুল বারী এবং আহমেদাবাদ থেকে মহাত্মা গান্ধী শাইখুল হিন্দ মওলানা মাহমুদ হাসানকে বোম্বেতে গ্রহণ করতে এসেছিলেন। তাঁদের সাথে এবং খিলাফত কমিটির অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সাথে প্রকাশ্যে ও নির্জনে আলোচনার পর, শাইখুল হিন্দও ভারত মুক্তির দাবীতে অহিংস আন্দোলন শুরু করার পক্ষে মত দিয়েছিলে।” [Naqsh-e-Hayt, Vol.2,p.247]
শায়খের একটি ফতোয়ার বইতে খিলাফত রাষ্ট্রের উপনিবেশিকদের প্রতি সহযোগীতার বিষয়টি উঠে আসে। যদিও তা ১৯২০ সালে ইস্যু করা হয়েছিল তাঁর উল্লেখিত অনেক দফাই আজ অবধি প্রয়োগযোগ্য। তিনি বলেন:
“ইসলামের শত্রুরা ইসলামের বিরূদ্ধে আঘাত হানতে এবং ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করতে কোনো কিছু করাই অবশিষ্ট রাখেনি। ইরাক, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া যা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাহাবা এবং তাঁদের অনুসারীদের দ্বারা বিজিত হয়েছিল, আজ আবার ইসলামের শত্রুদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে । খিলাফতের মার্যাদা ছিঁড়ে টুকরো করে ফেলা হয়েছে। খলীফাতুল-মুসলিমীন (মুসলিমদের খলীফা), যিনি এই গ্রহে সকল মানুষকে একতাবদ্ধ রাখবেন, যিনি এই পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বস্বরূপ ইসলামের বিশ্বজনীন আইন বাস্তবায়ন করবেন, যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থের নিরাপত্তা দিবেন। যিনি এই বিশ্বে আল্লাহর বাণীর মহিমা অক্ষুন্ন রাখবেন এবং বাস্তবায়ন সুনিশ্চিত করবেন, আজ শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং তাঁকে আজ অপ্রয়োজনীয় করে তোলা হয়েছে…………ইসলামের পতাকা আজ নিচুতে উড়ছে। হযরত আবু উবাইদা (রা) সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রা), খালিদ বিন ওয়ালীদ (রা) এবং আবু আইয়ুব আনসারী (রা)-এর আত্মারা আজ অস্থির। কেন তা হল? এর কারণ মুসলমানরা তাদের সম্ভ্রম, মর্যাদা ও আত্মসম্মান হারিয়ে ফেলেছে। সাহসিকতাও ধর্মীয় শক্তিমত্তা ছিল যাদের দূর্গ ও উত্তরাধিকার তারা তা আজ হারাতে বসেছে তাদের অজ্ঞতা এবং অতিমাত্রায় অবহেলার দরুণ।
বিষয়টি শুধু এই নয় যে এক মুসলিম কষ্টের সময় আরেক মুসলিম ভাইকে সাহায্য করছে না। বরং দুঃখজনকভাবে, সুনাম কুড়ানো ও কাফিরদের সাথে বন্ধুত্বের অর্জনের আকাঙ্ক্ষা এক ভাইকে আরেক ভাইয়ের মাথা কাটতে ঠেলে দিয়েছে। মুসলিম মুসলিমের রক্ত পান করছে। মুসলিমগণ তাদের নিজেদের ভাইদের রক্তে হাত রঞ্জিত করছে।
হে ইসলামের সন্তানেরা! এবং হে মহান এ জাতির প্রেমিকেরা। তোমরা আমার চেয়ে ভালো জানো, যেই গর্জন ও আগুন ইসলামি বিশ্বের তাঁবুগুলোকে জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং ইসলামি খিলাফতের দূর্গে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে তা নির্গত হয়েছে আরব ও ভারতীয়দের তাজা রক্ত থেকে। যে সম্পদের ক্ষমতাবলে খ্রিষ্টানরা মুসলিম জাতিকে আয়ত্তে আনতে সমর্থ হয়েছে তার একটি বৃহৎ অংশ তোমাদের কঠোর পরিশ্রমের ফসল।
তাই কোনো নির্বোধ ও মাথামোটা মুসলিম কি থাকতে পারে যে বুঝে না খৃষ্টানদের সহযোগীতার ফলাফল কী ? এবং এটাও কি বুঝে না যে, একজন ডুবন্ত মানুষ যদি একটি খঁড়কুটোকে আঁকরে ধরে এবং সহযোগীতার পথ খুঁজতে থাকে তবে কি তা তাকে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে পারবে? “ [From the Fatwa of Maulana Mahmood Hossan on 16th Safar 1339 Hijri, Corresponding to October 29th 1920 Gregonina year, The Prisoners of Malta (Asira’n-E-Malta), Maulana Syed Muhammad Mian, Jamiat ulama-I-Hind. English edition p.78-79]
যেভাবে আজকের উলেমাদের মধ্যে কেউ কেউ রাজনীতি ও ইসলামকে আলাদা বলতে চান তাদের মত নয়, বরং তৎকালীন উলেমারা বুঝতে পেরেছিলেন যে এই দুটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। খিলাফত ধ্বংসের মাত্র কিছুকাল পূর্বে ১৯২৩ সালের ২৪ শে ডিসেম্বর গয়া’তে জামিয়াত-উল-উলামা-হিন্দের ৪র্থ অধিভেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে ইসলামের জ্ঞানী আলেম ও শিক্ষকেরা ভারতের সকল অংশ থেকে একত্রিত হয়ে মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রশ্নে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলে। সামগ্রিক সকল তর্ক-বিতর্কের পর এই অধিবেশন সর্বসম্মত মতামত দিয়েছিল যে, রাজনীতি ও ধর্ম ইসলামের অবিচ্ছেদ্য উপাদান।
খিলাফত আন্দোলন এমনকি হিন্দুদের উপরও যেরূপ প্রভাব বিস্তার করেছিল তা দেখে বর্তমান ইন্ডিয়ার জনক, মোহনদাস করমাচাঁদ গান্ধী এতে অংশ নিয়েছিলেন এবং কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির সদস্য হয়েছিলেন।
তবে ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের হাতে খিলাফত ধ্বংসের পর এই আন্দোলনের পতন হয়। অনেকেই তখন খিলাফতের পুনঃস্থাপন অসম্ভব মনে করে এবং বৃটিশ ঔপনিবেশিকদের থেকে ভারতকে মুক্ত করাকেই কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে শুরু করেন।
খিলাফত ধ্বংসের একদিন পরে মওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর বলেছিলেন, যা ১৯২৪ সালের ৪ঠা মার্চ টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। “এটা নির্ধারণ করা কঠিন হবে যে খিলাফতের পতন ভারতের মুসলমানদের অন্তরে ঠিক কী পরিমাণ প্রভাব ফেলবে। আমি শুধু নিশ্চিতভাবে এতুটুকুই বলতে পারি যে এটি ইসলাম ও সভ্যতা উভয়ের জন্যই ধ্বংস প্রমাণিত হবে। এই সম্মানিত প্রতিষ্ঠান যা ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ইসলামের ঐক্যের প্রতীক, এর দমন ইসলামের (শক্তির) ভেঙে পড়ার কারন হবে………..।
তিনি কত সত্যই না বলেছিলেন। এটি ধ্বংসের পর মুসলিম বিশ্ব ঠিক তা-ই প্রত্যক্ষ করেছে, যা তিনি বলেছিলেন। আজ এটি ধ্বংসের প্রায় আশি বছরেরও বেশি সময় পরে এসে, খিলাফত আবার গণমাধ্যমগুলোর গুঞ্জনধ্বণিতে পরিণত হয়েছে যেহেতু পশ্চিমা রাজনীতিবিদ, চিন্তাবিদ ও নেতারা এর ফিরে আসার ভয়ে ভীত এবং মুসলিম উম্মাহ এর পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাকুলভাবে আকাংক্ষিত। ২০০৬ সালের ১১ই অক্টোবর বুধবার হোয়াইট হাউসের সামনে একটি সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের (তৎকালীন) প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিল, “চরমপন্থীরা মুক্তমনা লোকদের ভীতি প্রর্দশনের চেষ্টা করছে যাতে উদারপন্থী সরকারগুলোকে উৎখাত কার যায় এবং যাতে খিলাফতের বিস্তৃতি ঘটানো যায়। এর চেয়ে বেশি ঝুকির বাস্তবতা আর হতে পারে না। যা আমি আগেই বলেছি, আমরা যে পৃথিবীতে বসবাস করি, তাতে চরমপন্থী উপাদান রয়েছে যারা লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে। এবং তারা চায় যাতে আমরা (তাদের পথ হতে) সরে পড়ি। তারা সরকার উৎখাত করতে চায়। তারা একটি আদর্শিক খিলাফতকে বিস্তৃত করতে চায় যার বিশ্বাসের মধ্যে স্বাধীনতার কোন ধারণার অন্তর্ভুক্তি নেই।”
পশ্চিমাদের বুঝা উচিত যেহেতু খিলাফত ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই ঘৃণা করার পরিবর্তে তাদের একে প্রণিধান করা উচিত যাতে তারা এর সাথে (প্রয়োজনীয় চুক্তিতে) আবদ্ধ হতে পারে যখন এটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা খিলাফতের প্রয়োজনীয়তা ভুলে যায় নি। এই উপমহাদশের অনেক দল, আলেম ও চিন্তাবিদরা এটিকে ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছেন। এ বিষয়টি হিযবুত তাহরীর থেকে শুরু করে পাকিস্তানে ড. ইসরার আহমেদ-এর তানজীম-ই-ইসলামি, বাংলাদেশের খিলাফত আন্দোলন ও খিলাফত মজলিস সহ বর্তমানে নিষিদ্ধ Students Islamic Movement of India (SIMI) সহ আরো অনেক আন্দোলনের এর আহ্বান থেকে পরিষ্কার।
খিলাফত আবার ফিরে আসবে এবং এর শাসন আবার ভারত উপমহাদেশকে মুক্ত করবে যা নিম্নোক্ত হাদীসসমূহ পাশাপাশি আরও হাদীস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত।
আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে একটি দল ভারতবর্ষ জয় করবে। আল্লাহ তাদের জন্য (ভারতবর্ষকে) মুক্ত করে দিবেন, এমনকি তারা এর শাসকদের শিকল পরিহিত অবস্থায় নিয়ে আসবে। আল্লাহ তাদের গূনাহসমূহ মাফ করে দিবেন- যখন তারা ফিরে আসবে (ভারতবর্ষ থেকে) তারা সিরিয়াতে ইবনে মরিয়মকে খুঁজে পাবে” [Naim b. Hammad in Al-Fitan]
ছাওবান থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“আমার উম্মতের দুটি দলকে আল্লাহ জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন – একটি দল যারা ভারতবর্ষ জয় করবে এবং অন্য দলটি যারা ঈসা ইবন মরিয়মের সাথে থাকবে।” [Ahmad and An-Nasai]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আমাদেরকে আজকের খিলাফত আন্দোলনে শরীক হওয়ার তৌফিক দিন, যে ভাবে আমাদের পূর্বসূরীরা অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আবু ইসমাইল আল-বেইরভী
রমযান ১৪২৭; অক্টোবর, ২০০৬
অনুবাদ : সোহান ইয়াসির ইকবাল।ব্যক্তিপর্যায় ও প্রকাশ্য গণসংযোগ

ব্যক্তিপর্যায় এবং প্রকাশ্য গণসংযোগের গুরুত্বের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতি থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই এই দুই পর্যায়ের গণসংযোগকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক পুরষ্কৃত মহান ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর পবিত্র গ্রন্থে নুহ (আ)-এর ঘটনা উল্লেখ করেন: যেখানে আমরা দেখি, তিনি (আ) তার জাতি হতে প্রাপ্ত সাড়ার ব্যাপারে তার রবের কাছে নালিশ জানান, এবং ৯৫০ বছরের এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি (আ) কী পরিমাণ ধৈর্য্যসহকারে তার জাতির কাছে দাওয়াহ্ পৌঁছে দেন। জাতির কাছে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাসহ, সুস্পষ্টরূপে বক্তব্য উপস্থাপন এবং সরল-সঠিকপথের দিকে আহ্বানের পরই কেবল তিনি (আ) আল্লাহ্’র নিকট অভিযোগ জানান। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও উল্লেখ করেন, কিভাবে নুহ (আ) তার জাতির কাছে ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ে একনিষ্টভাবে দাওয়াহ্ পৌঁছে দেন,
(ثُمَّ إِنِّي دَعَوْتُهُمْ جِهَارًا * ثُمَّ إِنِّي أَعْلَنْتُ لَهُمْ وَأَسْرَرْتُ لَهُمْ إِسْرَارًا)
“অতঃপর নিশ্চয়ই আমি তাদেরকে প্রকাশ্যে দাওয়াহ্ দিয়েছি, অতঃপর নিশ্চয়ই আমি ঘোষণা সহকারে প্রচার করেছি এবং গোপনে চুপিসারে বলেছি” [সূরা নুহ: ৮-৯]।এই গণসংযোগ যে কি পরিমাণ গুরুত্ব ও কঠোর পরিশ্রমের সাথে করা হয়েছিল তা নুহ (আ)-এর সাক্ষ্য হতে অত্যন্ত পরিষ্কার,
(رَبِّ إِنِّى دَعَوْتُ قَوْمِى لَيْلاً وَنَهَاراً)
“সে বলল: হে আমার রব! নিশ্চয়ই, আমি আমার সম্প্রদায়কে দিবা-রাত্রি দাওয়াহ্ পৌঁছে দিয়েছি,” [সূরা নুহ্: ৫]অর্থাৎ ‘আমি দিবা-রাত্রি দাওয়াহ্ পৌঁছে দেয়া বন্ধ করিনি, তোমার আদেশ-নিষেধ পৌঁছেছি এবং তোমার আনুগত্য করেছি।’
তাছাড়া, তিনি (আ) জনগণের কাছ থেকে প্রাপ্ত সাড়াকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করে এই গণসংযোগটি পরিচালনা করেন, এমনকি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হলেও। নুহ (আ) ঘোষণা দেন,
(وَإِنِّى كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُواْ أَصَـبِعَهُمْ فِى ءَاذَنِهِمْ وَاسْتَغْشَوْاْ ثِيَابَهُمْ)
“এবং নিশ্চয়ই, আমি যতবারই তাদেরকে দাওয়াহ্ দিয়েছি যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করে দেন, ততবারই তারা কানে আঙ্গুলি দিয়েছে, মুখমন্ডল বস্ত্রাবৃত করেছে” [সূরা নুহ: ৭]অর্থাৎ, ‘আমার বক্তব্য যাতে না শুনতে পায় এজন্য তারা তাদের কানসমূহ বন্ধ করে দিয়েছে।’ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাওয়াহ্ প্রত্যাখ্যানকারী কুরাইশ গোত্রের কাফিরদের ব্যাপারেও আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একই বর্ণনা দেন,
(وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُواْ لاَ تَسْمَعُواْ لِهَـذَا الْقُرْءَانِ وَالْغَوْاْ فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ)
“আর কাফিররা বলে: “তোমরা এ কুর’আন শ্রবণ করো না, এবং এর তিলাওয়াতের সময় হট্টগোল সৃষ্টি কর যাতে তোমরা জয়ী হও“।” [সূরা ফুস্সিলাত : ২৬](وَاسْتَغْشَوْاْ ثِيَابَهُمْ) “তারা তাদের বস্ত্র দ্বারা তাদেরকে বস্ত্রাবৃত করে রাখতো,” ইবনে আব্বাস হতে ইবনে যারির সংকলন করেছেন যে তিনি বলেন, “তিনি (সা) যাতে তাদেরকে চিনতে না পারেন এজন্য তারা তাঁর (সা) নিকট হতে বিভিন্ন ছলচাতুরির মাধ্যমে নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতো।” সা’ঈদ বিন যুবায়ের এবং আস-সুদ্দি উভয়ে বলেছেন, “তারা তাদের মাথা ঢেকে রেখেছিল যাতে তারা রাসূল (সাঃ)-এর বক্তব্য শুনতে না পায়”। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিষয়টিকে আরও ব্যাখ্যা করে বলেন (وَأَصَرُّواْ) “এবং তারা এ বিষয়ে একগুয়েমি করেছে,” অর্থাৎ তারা পূর্বের কুফর এবং আল্লাহ্’র সাথে শিরক রত অবস্থা চলমান রেখেছিল। এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
(وَاسْتَكْبَرُواْ اسْتِكْبَاراً)
“…এবং তারা চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শনে নিজেদেরকে নিমগ্ন রেখেছে” [সূরা নুহ: ৭]অর্থাৎ, তারা সত্য অনুসরণ এবং সত্যের কাছে আত্নসমর্পন থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল।
পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণের পর পরবর্তী গণসংযোগের জন্য পর্যাপ্ত চিন্তা প্রয়োগ করা প্রয়োজন। দাওয়াহ্’র ফলাফল নিরুৎসাহব্যাঞ্জক এবং বিপরীত হলেও বিশ্বাসীরা এতে হতাশ কিংবা বিচলিত হন না। ব্যক্তি ও সামষ্টিক পর্যায়ের দাওয়াহ্ বন্ধ করেন না। বরং, কিভাবে দাওয়াহ্ বহন করলে তা জনগণের নিকট সহজে বোধগোম্য হবে, জনগণ তা সাদরে গ্রহণ করবে এবং জীবনের উদ্দেশ্যের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত করবে, সে বিষয়ের উপর চিন্তারোপ করেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বক্তব্যে আমরা দেখতে পাই যে নুহ (আঃ) উৎসাহব্যাঞ্জক যুক্তি দ্বারা তার জাতিকে আহ্বান করেছেন,
(وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَلٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَل لَّكُمْ جَنَّـتٍ وَيَجْعَل لَّكُمْ أَنْهَاراً)
“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্যে উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদীনালা প্রবাহিত করবেন” [সূরা নূহ্: ১২]অর্থাৎ, ‘যদি তোমরা অনুতপ্ত হও এবং আল্লাহ্’র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাঁর আনুগত্য কর, তবে তিনি তোমাদের রিযক বাড়িয়ে দিবেন এবং আসমান হতে মেঘমালা বর্ষণ করবেন। তিনি পৃথিবীর উপর রহমত বর্ষণ করবেন এবং জমীনে ফসল জন্মাবেন। অর্থাৎ তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাদেরকে আরও সম্পদ, আরও সন্তান, আরও গবাদীপশু এবং বিভিন্ন ফলমূলসমৃদ্ধ বাগান দিবেন। এসব বাগানের ভিতর দিয়ে নদী বইয়ে দিবেন।’ এটাই হচ্ছে উৎসাহব্যাঞ্জক দাওয়াহ্ প্রদানের নমূনা। অতঃপর ভীতিপ্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) একে ভারসাম্যপূর্ণ করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
(مَّا لَكُمْ لاَ تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَاراً)
“তোমাদের কী হল যে তোমরা আল্লাহ্’র শ্রেষ্ঠত্বের আশা করছ না?” [সুরা নূহ্ :১৩]অর্থাৎ তিনি মহামহিম। ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ এবং আত-দাহ্হাক হতে বর্ণিত। ইবনে আব্বাস বলেন, “আল্লাহ্’র বিরাটত্ব-বিশালতাকে যেভাবে অনুধাবন করা উচিত সেভাবে তোমরা অনুধাবন করছো না। অর্থাৎ তোমরা তাঁর শাস্তি ও ক্রোধকে ভয় করছো না।”
আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসূল (সা) ব্যক্তিপর্যায় এবং প্রকাশ্যে মানুষকে দাওয়াহ্ দিয়েছেন। তাই আমরা দেখতে পাই শুরুতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর স্বাভাবিক পরিচিত গন্ডির মধ্যে দাওয়াহ্ করেন। প্রথমে তিনি (সা) তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা)-কে দাওয়াহ্ করেন এবং তিনি (রা) তা গ্রহণ করেন। তারপর তিনি (সা) তাঁর চাচাতো ভাই আলী (রা.)-কে দাওয়াহ্ করেন এবং তিনি (রা) তা গ্রহণ করেন। তারপর তিনি (সা) তাঁর দাস যায়িদ (রা)-কে দাওয়াহ্ করেন এবং তিনি (রা) তা গ্রহণ করেন। এবং অতঃপর তিনি (সা) তাঁর বন্ধু আবু বকর (রা)-কে দাওয়াহ্ করেন এবং তিনিও (রা) তা গ্রহণ করেন। তিনি (সা) ব্যক্তিগত পর্যায়ে দাওয়াহ্ অব্যাহত রেখেছিলেন, কিছু লোক ঈমান এনেছিল এবং কিছু প্রত্যাখ্যান করেছিল। অতঃপর ইসলামগ্রহণকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে, যতক্ষন না এটা কুরাইশদের মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকদের সাথে দেখা করতেন এবং বলতেন তাদেরকে আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে এই আদেশ দেয়া হয়েছে যে তারা শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবে না।
ব্যক্তিপর্যায়ের গণসংযোগের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) পরিচিতজনদের গন্ডির বাইরেও দাওয়াহ্ করেছেন। তারপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিম্নোক্ত আয়াত নাযিলের পর তিনি (সা) সমাজের বৃহত্তর পরিসরে সামষ্টিক পর্যায়ে প্রকাশ্য দাওয়াহ্ শুরু করেন:
(فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ)
“অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়; এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।” [আল-হিজর: ৯৪];তিনি (সা) কুরাইশদের সাফা পাহাড়ে ডেকে প্রকাশ্যে এবং জনসম্মুখে ইসলামের দাওয়াহ্ পৌঁছে দেন এবং বলেন তিনি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক মনোনীত রাসূল এবং তাদেরকে তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এবং তিনি (সা) ব্যক্তিপর্যায়ের পাশাপাশি প্রকাশ্যে বিভিন্ন গোষ্ঠির কাছে ইসলামের দাওয়াহ্ পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর প্রকাশ্য গণসংযোগ ছিল খুবই বলিষ্ঠ এবং গতিশীল। তিনি প্রকাশ্যে কুরাইশদের বিরোধিতা করেছেন; তাদের দেব-দেবী, বিশ্বাস এবং চিন্তাসমূহের ভ্রান্তি, দূষণ এবং ত্রুটিসমূহকে উন্মোচিত করেছেন। তিনি যেভাবে সমাজে বিদ্যমান সকল ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং চিন্তাগুলোকে আক্রমন করেছেন, ঠিক একইভাবে তিনি জীবন সম্পর্কিত অন্যান্য চিন্তাসমূহকেও প্রকাশ্যে আক্রমন করেছেন। সুদগ্রহণ, কন্যা সন্তানকে হত্যা, মাপে কম দেয়া, যিনাহ্ সহ সকল কুফর জীবনযাপনকে আক্রমন করে সেই সময়ে কুর’আনের আয়াতগুলো নাযিল হয়। এবং পাশাপাশি কুরাইশ সর্দার, এবং তাদের পূর্বপুুরুষ ও তাদের চিন্তাকে আক্রমন ও অপদস্থ করে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং সাহাবীগণদের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্রকে উন্মোচন করে বহু আয়াত নাযিল হয়। শুধুমাত্র নাযিলকৃত ইসলামের বাণীর উপর গভীর বিশ্বাসই ছিল তাঁর একমাত্র অস্ত্র, তাই ব্যক্তিপর্যায়ে তিনি আর কোন উপায়-উপকরণ কিংবা সাহায্য কিংবা অস্ত্রের আশ্রয় নেননি। বিপরীত এবং আক্রমাত্নক প্রতিক্রিয়া পেয়েও তিনি এতে অটল ছিলেন।
সাহাবীগণ (রা) কর্তৃক সম্পাদিত ব্যক্তিপর্যায় এবং প্রকাশ্য গণসংযোগগুলোকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে তদারকি করেছেন। আবু বকর (রা)-এর ব্যক্তিপর্যায়ের দাওয়াহ্’কে তিনি তদারকি করেছেন। আবু বকর (রা) ছিলেন তার পরিচিতজনদের নিকট উচ্চ চরিত্রের অধিকারী, তারা তার সঙ্গ পছন্দ করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার কাছে পরামর্শ চাইতেন। তিনি (রা) তার প্রভাব খাটিয়ে উসমান বিন আফ্ফান, পাশাপাশি যুবায়ের ইবনে আল-আওয়াম, আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস এবং তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ্ প্রমূখকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন। আবু বকর (রা) তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিকট হাজির করান এবং তারা প্রত্যেকে তাদের ঈমান আনয়নকে নিশ্চিত করেন এবং নামায আদায় করেন।
এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রকাশ্য গণসংযোগকেও অত্যন্ত গুরুত্ব এবং যত্নসহ তদারকি করেছেন। মুসা’ব (রা)-কে তিনি (সা) মদীনাতে প্রেরণ করেন এবং একবছরের মধ্যে তিনি (রা) একে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রভুমি হিসেবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হন। কারণ সেখানে ইসলামগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হলেও আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর মাত্র একজন সাহাবীর (মুসা’ব বিন উমায়ের) বলিষ্ঠ প্রকাশ্য গণসংযোগ সমাজের প্রচলিত চিন্তা ও আবেগকে রূপান্তরিত করে মদীনার সমাজব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়। মুসা’ব বিন উমায়ের (রা.) একাই মদিনাকে পরিবর্তন করে ফেলেন, মদিনায় প্রচলিত চিন্তা ও আবেগকে রূপান্তর ঘটিয়ে ফেলেন। মদিনার বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এমনভাবে ইসলাম গ্রহণ করে যা ঐ সমাজের সামষ্টিক চিন্তাজগতের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়, এবং রাতারাতি তাদের চিন্তা ও আবেগসমূহের মধ্যে আমূল পরিবর্তন ঘটে। এ থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় যে ইসলামগ্রহণকারীগণ যখন প্রকাশ্য গণসংযোগে বলিষ্ঠ এবং পারদর্শী হয় তখন সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগানো প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে বাধ্য। তাছাড়া এ থেকে এটাও প্রতিয়মান হয় যে, যদি নতুন কোন চিন্তা ও আবেগ দ্বারা সমাজের বিদ্যমান পারস্পরিক সম্পর্কগুলো প্রভাবিত হয়, তবে ঐ চিন্তার বাহকের সংখ্যা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন তা অভীষ্ট সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। মদীনার লোকেরা সমাজে বিদ্যমান চিন্তাসমূহের ক্রটি অনুধাবন করেছিল এবং তারা বিকল্প চিন্তা ও জীবনব্যবস্থার অনুসন্ধান করছিল। আর এজন্যই ইসলামের দাওয়াহ্’র প্রতি ব্যাপক সমর্থন পেতে মুসা’ব ইবনে উমায়েরকে বেশী সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়নি, তিনি প্রকাশ্যে মদীনার জনগণকে ইসলামের দিকে আহ্বান করেন এবং ইসলামের চিন্তা ও বিধি-বিধানসমূহের শিক্ষা দেয়া শুরু করেন। তিনি মদিনার জনগণের কাছ থেকে দ্রুত ইতিবাচক সাড়া এবং ইসলামের গ্রহণের ব্যাপারে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখতে পান। ইসলামী বিধি-বিধানসমূহ শিক্ষালাভ এবং জানার ব্যাপারে তাদের ব্যাপক আগ্রহ দেখে তিনি উৎফুল্ল হন। চোখের সামনে মুসলিমদের দ্রুত সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইসলামের প্রসার দেখে আরও অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দাওয়াহ্’র প্রচেষ্টাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) তীক্ষ্নদৃষ্টি দিয়ে প্রকাশ্য গণসংযোগের প্রতিক্রিয়া এবং ফলাফলগুলো পর্যবেক্ষন করছিলেন। হজ্বের মৌসুমের প্রাক্কালে মুসা’ব (রা) মক্কায় ফিরে আসলে রাসুলুল্লাহ্ (সা) তার কাছ থেকে মদীনার সার্বিক অবস্থার খোঁজ-খবর নেন। সেখানকার মুসলিম ও তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তি, ইসলাম ও এর দ্রুত প্রসারসহ মদীনার সার্বিক অবস্থার তথ্য নেন। তাছাড়া সেখানকার জনগণের মধ্যে শুধুমাত্র আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে নিয়ে আলোচনা কতটুকু, এবং ইসলাম সমাজের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কিনা এসব বিষয়েরও তথ্য নেন। মুসা’ব (রা.) মুসলিমদের সামর্থ্য এবং রুঁখে দাড়ানো শক্তি যা ইসলামকে মদিনার আধিপত্যশীল শক্তিতে রূপান্তর করেছে, সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অবগত করেন। তিনি আরও জানান যে দাওয়াহ্ এবং আল্লাহ্’র দ্বীনকে রক্ষার ব্যাপারে কিছু মুসলিমের বিশ্বাস এবং দৃঢ়সংকল্প পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।
…তাই একইভাবে দাওয়াহ্ বহনকারীগণদের অবশ্যই ব্যাপক গণসংযোগে লিপ্ত হতে হবে। এবং এই গণসংযোগকে শুধুমাত্র ব্যক্তিপর্যায়ের গন্ডির মধ্যে বিদ্যমান কিছু ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী কিংবা জমায়েতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং জনমত এবং জনসচেতনতাকে আরও পাকাপোক্ত এবং শক্তিশালী করতে একে সামষ্টিক পর্যায়ের প্রকাশ্য গণসংযোগের দিকে ধাবিত করতে হবে। মুসলিমদেরকে বাজার, মসজিদ কিংবা রাজপথ, প্রকাশ্য গণসংযোগের প্রত্যেকটি সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাদেরকে কর্মস্থল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা সভার আয়োজন করতে হবে। মুসলিমদের সমসাময়িক এবং চলমান বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাপারে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম এবং সমাবেশে তাদের বক্তব্য অবশ্যই অত্যন্ত সুস্পষ্ট হতে হবে। প্রকাশ্য গণসংযোগ গতানুগতিক ও গঁধবাঁধা নয়, বরং অবশ্যই বলিষ্ঠ ও সুপরিকল্পিত হতে হবে। জনগণের প্রতিক্রিয়াকে খুবই যত্নসহকারে পর্যালোচনাকেও এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে এবং এতে জনগণের কাছে কি কি বিষয় সুস্পষ্ট এবং কি কি বিষয় অস্পষ্ট তা বেরিয়ে আসবে। পাশাপাশি এসব বিষয়ে যুক্তিগুলো এবং যুক্তিগুলোর সাথে ইসলামের দৃঢ় ও সুস্পষ্ট সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে যথেষ্ট প্রস্তুতি থাকতে হবে। প্রকাশ্য গণসংযোগের সর্বোচ্চ ফলাফল পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে উপযুক্ত স্থান-কাল নির্বাচন করতে হবে। জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা যাই হোক না কেন এই বলিষ্ঠ এবং কার্যকরী প্রকাশ্য গণসংযোগের ফলে শুরুতেই জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক উৎসাহব্যাঞ্জক সাড়া দাওয়াহ্ বহনকারীর মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করে। এই বলিষ্ঠ গণসংযোগ তাকে দাওয়াহ্ বহনের দক্ষতাকে আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও জ্ঞান অন্বেষণে বাধ্য করবে, কারণ জনগণ তখন তার কাছে অতিগুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধান চাইবে। এবং সর্বোপরী, ফলাফল এবং পুরষ্কার একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হাতে এই উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে এবং অর্জিত জ্ঞানের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে এই গণসংযোগ পরিচালনা করতে হবে। ইন্শা’আল্লাহ্, এসব প্রস্তুতি গণসচেতনতাকে আরও গতিশীল করে শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
খিলাফতের ট্রেন তার সর্বশেষ গন্তব্যের দিকে দ্রম্নত ছুটে আসছে এবং ইসলামী উম্মাহ্ এবং উম্মাহ্’র বিরুদ্ধে অবস্থানকারী উভয় গোষ্ঠীই এর উপস্থিতি টের পাচ্ছে। সুতরাং, মুসলিমদের উচিত এই গতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়া এবং খিলাফতের প্রত্যাবর্তনের পূর্বে সমাজের জনমত ও জনসচেতনতাকে আরও যতটুকু সম্ভব শক্তিশালী করে নেয়া, কারণ তা সন্নিকটে, ইন্শা’আল্লাহ্। নিশ্চয়ই হতাশার পরেই রয়েছে আশার আলো, এবং দুঃখের পর সুসংবাদ, এবং কষ্টের পর স্বস্তি, এবং দূর্ভোগের পর আরাম, এবং তা হবে দীর্ঘস্থায়ী।
(وَيَوْمَئِذٍ يَفْرَحُ الْمُؤْمِنُونَ * بِنَصْرِ اللَّهِ يَنْصُرُ مَنْ يَشَاءُ وَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيم)
“এবং সেদিন মু’মিনগণ আল্লাহ্ প্রদত্ত বিজয় দ্বারা আনন্দিত হবে। তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে বিজয় দান করেন, এবং তিনি পরাক্রমশালী, পরম করুণাময়। ” [সূরা আর-রূম: ৪-৫]মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের মূল কারণ চিন্তার অধঃপতন

মুসলিম উম্মাহ্ বর্তমানে যে পশ্চাদপদতা ও লাঞ্ছনার গহ্বরে পতিত তা থেকে উম্মাহ্কে উদ্ধার করা এবং উম্মাহকে কুফরী চিন্তা, কুফরী ব্যবস্থা, কুফরী বিধি-বিধান, কুফর দেশসমূহের আধিপত্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি থেকে মুক্ত করা কেবল মাত্র তখনই সম্ভব হবে যখন উম্মাহর চিন্তার বর্তমান অধঃপতনকে পরিবর্তন করে উন্নত চিন্তার বিকাশ ঘটানো যাবে। আর এটা করার উপায় হচ্ছে যে চিন্তাগুলো মুসলিম উম্মাহ্কে অপদস্থতার এই চরম অবস্থা পর্যন্ত এনে পৌঁছিয়েছে সেগুলোকে চিহ্নিত করে ইসলামী চিন্তা দ্বারা সেগুলোর পরিবর্তন ঘটানো।
বস্তুতঃ উম্মাহর বর্তমান অবস্থার কারণ হচ্ছে ইসলামকে বুঝে তার বিধি-বিধানকে মান্য করার ক্ষেত্রে ধারাবাহিক অবহেলা এবং দুর্বলতা, যা অনেক আগে থেকে শুরু হয়ে আজও চলছে। এই চিন্তাগত অধঃপতনের দরুন উম্মাহ্‘র মাঝে বহু নতুন বিষয়ের উদ্ভব ঘটেছে, যার প্রধান প্রধান কিছু বিষয় নিচে উল্লেখ করা হলো।
ক. হিন্দু, পারসিক এবং গ্রীক দর্শনের অনুপ্রবেশের পর ইসলাম আর এসব দর্শনের মাঝে পূর্ণ বৈপরিত্য থাকা সত্বেও কেউ কেউ ইসলামকে এগুলোর সাথে মিলানোর চেষ্টা করেছেন।
খ. ইসলামের দুশমনরা ইসলামের দুর্নাম করা এবং মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে দূরে রাখার জন্য ইসলামের নামে মুসলমানদের মাঝে এমন কিছু বিধি-বিধান ও চিন্তার অনুপ্রবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে, যা আদৌ ইসলামী নয়।
গ. ইসলামের উপলব্ধি এবং এর বিধি-বিধানগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে আরবী ভাষার প্রতি অবহেলা প্রদর্শনের ক্রমবর্ধমান ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে একে ইসলাম থেকে পৃথক করে দেওয়া হয়েছে; যদিও আল্লাহ্র দ্বীনকে তার মূল ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন করে অন্য কোন ভাষা দিয়ে পুরোপুরি উপলব্ধি করা অসম্ভব। তাছাড়া নতুন নতুন পরিস্থিতিতে ইজতিহাদের মাধ্যমে মাসআলা ইস্তিম্বাত করা এবং সে আলোকে ফাতওয়া প্রদানের জন্য আরবী ভাষার নাহু-সরফ, আদাব, বালাগাত-ফাসাহাত (ব্যাকরণ, সাহিত্য ও অলংকার) ইত্যাদি বিষয়ের সুগভীর জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক।
ঘ. খৃষ্টীয় সতের শতাব্দী হতে পশ্চিমা কুফর দেশগুলো মুসলমানদের উপর মিশনারী, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক আগ্রাসন চালাতে শুরু করে। তাদের এই আগ্রাসনের উদ্দেশ্য ছিল উম্মাহর মধ্যে ইসলামের বুঝ এর ব্যাপারে বিকৃতি ঘটিয়ে মুসলমানদেরকে ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে ইসলামকে ধ্বংস করা।
এহেন পরিস্থিতিতে মুসলমানদেরকে জাগ্রত করার জন্য বিভিন্ন ভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। ইসলামী-অনৈসলামী বহু আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে সবই অকৃতকার্য রয়ে গেছে। না মুসলমানদেরকে জাগ্রত করা সম্ভব হয়েছে, না অধঃপতন ও জিল্লতীর পথ রোধ করা গেছে। ইসলাম দ্বারা মুসলমানদেরকে জাগ্রত করার এসব চেষ্টা ও আন্দোলন সফল না হওয়ার পিছনে অনেক কারন রয়েছে, যেমন-
(১) অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে যে, যাঁরা মুসলমানদেরকে জাগ্রত করার সুকঠিন দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন, তারা নিজেরাই ইসলামিক চিন্তাকে যথাযথ গভীরতায় অনুধাবন করেননি। এটা এ জন্য হয়েছে যে, তাঁরা প্রায়শই কিছু আচ্ছন্নকারী বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁরা মুসলিম উম্মাহ্কে জাগ্রত করার মাধ্যম হিসাবে সুনির্দিষ্ট কোন চিন্তা ও পদ্ধতির কথা বলেননি; বরং মোটা দাগে ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন। মুসলমানদের বাস্তব সমস্যাবলীর ইসলামিক সমাধান এবং ঐ সমাধানগুলোর প্রায়োগিক দিক নিয়ে তারা সুগভীর আলোচনা করেননি। এসব সমাধানগুলো তাঁদের নিজেদেও চিন্তার মাঝেও স্বচ্ছভাবে ছিলনা। ফলে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে পারিপার্শিক অনৈসলামিক বাস্তবতাই তাদের চিন্তার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে। শুধু তাই নয়, বাস্তবতার সাথে ইসলামকে মিলানোর জন্য কেউ কেউ ইসলামের এমনসব ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন, যা নুসূস তথা কুরআন ও হাদীস দ্বারা অনুমোদিত নয় এবং যা রাসূল (সা) ও সাহাবায়ে কিরাম থেকে বর্ণিত হয়ে আসা মূল ব্যাখ্যার পরিপন্থী। মোট কথা অনৈসলামিক বাস্তবতাকে ইসলাম দ্বারা পরিবর্তন করার বিষয়টিকে মুখ্য হিসাবে দেখার পরিবর্তে প্রচলিত বাস্তবতার সাথে ইসলামকে মিলিয়ে ও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এজন্যই ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদির সাথে ইসলামের পরিপূর্ণ বৈপরিত্য থাকা সত্বেও তাঁদের কেউ কেউ এগুলোকে ইসলামী বলে গণ্য করেছেন এবং মানুষকে এগুলোর প্রতি আহ্বান করেছেন।
(২) ইসলামী চিন্তা ও আহকাম বাস্তবায়নের সঠিক ও সুনির্দিষ্ট পন্থা অবলম্বন করার পরিবর্তে আপাতঃ ফলদায়ক কিছু করাকেই তাদের কেউ কেউ ইসলাম বাস্তবায়নের পথ মনে করেছেন। আর ইসলামী পুণঃর্জাগরণের উপায় হিসাবে শুধুমাত্র মসজিদ নির্মাণ, বই পত্র প্রকাশ, দাতব্য ও সমাজ-সেবা মূলক প্রতিষ্ঠান খোলা, চরিত্র গঠন ও ব্যক্তির সংশোধনকেই মনে করেছেন যথেষ্ট। অন্য দিকে সমাজ নষ্ট হওয়া কিংবা সমাজের উপর প্রাধান্য বিস্তারকারী কুফর চিন্তা, কুফর ব্যবস্থা ও কুফর বিধি-বিধানের প্রাবল্য সম্পর্কে তারা ছিলেন অনেকটাই অমনোযোগী। তাদের ধারনা ছিল ব্যক্তির সংশোধন দ্বারাই সমাজ সংশোধন হয়ে যাবে। অথচ সমাজ সংশোধন করার কার্যকর উপায় হচ্ছে ব্যক্তির সংশোধনের পাশাপাশি সমাজের চিন্তাধারা, অনুভূতি এবং ব্যবস্থাদিরও সংশোধন করা । আর ব্যক্তির সংশোধনও অনেকাংশে সমাজ সংশোধন দ্বারাই সম্ভব। কারন সমাজ শুধুমাত্র কতিপয় ব্যক্তির সমষ্টিরই নাম নয়, বরং সমাজ হচ্ছে ব্যক্তি ও কতিপয় সম্পর্কের সমষ্টির নাম। অর্থাৎ সমাজ বলা হয়, ব্যক্তি, চিন্তা, অনুভূতি এবং শাসন ব্যবস্থার সমষ্টিকে। তাই সমাজ পরিবর্তন করতে হলে এ সবগুলোকেই পরিবর্তন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) জাহেলী সমাজকে ইসলামী সমাজে পরিবর্তন করার জন্য এ কাজগুলোই করেছেন। তিনি (সা) সমাজে বিদ্যমান আকীদা (বিশ্বাস) কে পরিবর্তন করে ইসলামী আকীদায় পরিনত করেছেন। জাহেলী চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা এবং প্রথাগুলোকে তিনি ইসলামী চিন্তা- ভাবনা, ইসলামী ধ্যান-ধারণা এবং ইসলামী আচরণ দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। এভাবেই আল্লাহ্র রাসূল (সা) মানুষের আবেগ-অনুভুতি তগুলোকে জাহেলী চিন্তা, জাহেলী বিশ্বাস এবং জাহেলী প্রথা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ইসলামী আকীদা এবং ইসলামী চিন্তা ও আহকামের সাথে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এ পথেই আল্লাহ্ সুবহানাহু তা‘আলা তাঁর রাসূলকে মদীনার সমাজ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার মর্যাদায় ভূষিত করেছেন। যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মদীনাবাসী ইসলামী আকীদার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন এবং তাঁরা ইসলামী চিন্তা, ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ইসলামী আহকামকে আপন করে নিয়েছেন, তখনই তিনি (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ “বাই‘আতে‘আকাবায়ে ছানিয়ার” (আকাবার দ্বিতীয় বাই‘আত) পর মদীনায় হিজরত করেছেন এবং সেখানে ইসলামী বিধি-বিধান সমূহ রাষ্ট্রীয়ভাবে কার্যকর করার পদক্ষেপ নিয়েছেন। এভাবেই মদীনায় একটি ইসলামী সমাজ কায়েম হয়েছিল।
(৩) কেউ কেউ মনে করেছেন মুসলিম জনগনের উপর শক্তি প্রয়োগ করে ইসলামের পুর্ণজাগরণ সম্ভব। তাই তারা অস্ত্র তুলে নিয়েছেন। কিন্তু তারা “দারুল কুফর” এবং “দারুল ইসলামের” মাঝে পার্থক্য করতে সক্ষম হননি। তারা এটাও উপলব্ধি করেননি যে, দারুল কুফর এবং দারুল ইসলামে দাওয়াত এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার ক্ষেত্রে কী ধরনের ভিন্নতা থাকা উচিত? আজকে আমরা যে সব দেশে বসবাস করছি, এগুলোও নীতিগতভাবে দারুল কুফর। কারন এখানে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও কাফেরদের চিন্তা, বিধি-বিধান ও কুফরী শাসন ব্যবস্থাই কার্যকর। এ অবস্থাটি হযরত মুহাম্মদ (সা) এর নবুয়্যত প্রাপ্তির সময়ের মক্কা শরীফের অবস্থার সাথে অনেকাংশেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব, এখানের দাওয়াতের ধরনও হবে সেসময়ের মতই। অর্থাৎ এক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের সুন্নাহ্ অনুযায়ী ইসলাম প্রতিষ্ঠার কর্মসূচীগুলো শুধু দাওয়াত ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, কোনরূপ সশস্ত্র তৎপরতার রূপ লাভ করবেনা। কারণ তখনকার কাজের উদ্দেশ্য এটা ছিলনা যে, শুধুমাত্র এমন কোন শাসককে হটানো যে ইসলামী রাষ্ট্রে কুফর আইন চালু করেছে কিংবা সে নিজে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে (যাকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অপসারণ করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে) বরং উদ্দেশ্য ছিল একটি দারুল কুফরকে তার সমস্ত চিন্তা ও ব্যবস্থাদিসহ পুরোপুরি পরিবর্তন করা। আর এই পরিবর্তন সম্ভব সে দেশের বা সে সমাজের ব্যাপক জনগণের মধ্যে বিদ্যমান চিন্তা, অনুভূতি এবং প্রচলিত রাষ্ট্রকাঠামোকে পুরোপুরি পরিবর্তনের মাধ্যমে। রাসূল (সা) মক্কায় সে উদ্দেশ্যেই কাজ করেছিলেন। অপরদিকে দারুল ইসলামের বিষয়টি ভিন্ন। দারুল ইসলাম হচ্ছে এমন ভূমি যেখানে আল্লাহ্র অবতীর্ন আহ্কাম দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু কোন শাসক যদি ক্ষমতায় এসে সরাসরি স্পষ্ট কুফরী বিধান দ্বারা প্রকাশ্যে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে শুরু করে, তাহলে তার বিরোধিতা করা মুসলমানদের জন্য ফরয। মুসলমানরা তাকে চ্যালেঞ্জ করবে, যেন সে পুনরায় ইসলামের দিকে ফিরে আসে। যদি সে ফিরে না আসে, তাহলে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা উম্মাহ্‘র উপর ফরয হয়ে যাবে এবং এর মাধ্যমে তাকে পুনরায় আল্লাহ্র নাযিলকৃত বিধান চালু করার জন্য বাধ্য করা হবে। যেমন হযরত উবাদাহ বিন সামিত (রা)-বর্ণিত এক হাদীসে আছে,
“এবং (আমরা রাসূল (সা) এর সাথে এ বাই’আতও করেছি যে) আমরা ‘উলূল আমরের’ সাথে ততক্ষন পর্যন্ত বিবাদ করবনা, যতক্ষন না সে প্রকাশ্য কুফুরীতে লিপ্ত হয়; (রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) এমন কুফুরী যে বিষয়ে তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত কোন শক্তিশালী প্রমান রয়েছে।”
ইমাম মুসলিম (রহ) হযরত আ’উফ ইবনে মালিক (রা) এর সূত্রে বর্ণনা করেন,
“বলা হলো হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তরবারী দ্বারা তাদেরকে অপসারণ করবো না ? তিনি বললেন ‘না! যতক্ষন পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত কায়েম রাখবে।”
সালাত কয়েম রাখার কথা বলে এখানে ইসলামী আহ্কাম মোতাবেক শাসন পরিচালনার প্রতি ইংগিত করা হয়েছে (দ্বীনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ রুকন উল্লেখ করে সম্পূর্ণ দ্বীনকে বুঝানোর মূলনীতি অনুযায়ী)।’ এই দু’টি হাদীস আমাদেরকে দারুল ইসলামে শাসকদেরকে চ্যালেঞ্জ করা এবং তাদেরকে স্পষ্ট কুফরী থেকে বিরত রাখার জন্য কিভাবে কখন অস্ত্র ধরা বা শক্তি প্রয়োগ করা যাবে, তার পন্থা শিখিয়ে দিয়েছে।
জনমতের গুরুত্ব

প্রকাশ্য সামাজিক পর্যায়ে জনগণ যে বিষয়টাকে সম্মান বা অসম্মান করে তার ভিত্তিতেইএকটা জাতি পরিচালিত হয়। ব্যক্তিগত মতামতের ভূমিকা এক্ষেত্রে অত্যন্ত গৌণ। মানুষের সংগঠিত মতামত বা কাজ যা সামাজিক সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে করা হয় কেবল তার দ্বারাই জনমত প্রভাবিত হয়। আলাদা আলাদা ভাবে ব্যক্তিরা কী মনে করে বা বিশ্বাস করে তার দ্বারা সমাজ পরিচালিত হয় না। সমাজের সম্মিলিত নীতিবোধই সবসময় জনমত তৈরী করে ও ব্যক্তির মতামতকে প্রভাবিত করে। এর একটা উদাহরণ হচ্ছে কুরাইশদের দ্বারা বয়কট চুক্তির বিলোপ সাধন। আবু জেহেল ও কুরাইশ নেতারা একে পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় বললেও জনমতের চাপের কারণে কুরাইশরা এই বয়কটের সমাপ্তি টানতে বাধ্য হয়েছিল।
সমাজ পরিবর্তন করতে হলে সমাজের প্রত্যেককেই পরিবর্তন করতে হবে এমন কোনও আবশ্যকতা নেই। যা আবশ্যক তা হল সম্মিলিত মতামত বা জনমতের পরিবর্তন সাধন। তাই কুফর সমাজকে ইসলামিক সমাজে পরিণত হতে হলে সম্মিলিত চিন্তা ভাবনা ও জনমতগুলোকে অবশ্যই ইসলামিক হতে হবে। মুসাব (রা) যখন মদীনা থেকে প্রত্যাবর্তন করে রাসূল (সা) কে তাঁর কাজের ফলাফল সম্পর্কে বিবরণ দিচ্ছিলেন তখন তিনি (রা) জানালেন যে ইসলাম মদীনার ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে, তার মানে এই নয় যে সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছে, বরং তার মানে হচ্ছে ইসলাম জনগণের সম্মিলিত মতামতের উপর প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এই ভিত্তির উপরই রাসূল (সা) মদীনায় প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
“ইসরাইল রাষ্ট্র”-এর বৈধতার ভিত্তি কী?
গাজা শহরের ওপর চলমান বর্বর ইসরাইলি আগ্রাসন দীর্ঘদিনের বিতর্ককে বিশ্বব্যাপী নতুন করে উজ্জীবিত করেছে। “মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট” নিরসনের জন্য পশ্চিমা থেকে Two-State Solution [দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলকে মেনে নেয়া]-এর কথা বলা হলেও মধ্যপ্রাচ্যের জনমত মূলত রাষ্ট্র হিসেবে “ইসরাইল”-এর অস্তিত্বেরই বিপক্ষে। খোদ ওয়াশিংটন পোস্ট অনলাইনেই এসেছে – Two-State Solution এখন মৃত:মধ্যপ্রাচ্যে এই আগ্রাসী সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের উপস্থিতি শুধু মুসলিমরাই মানছেন না, তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যের খ্রিস্টান, এমনকি ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি অংশও ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নিতে অনিচ্ছুক। ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার আগ থেকে এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে একটি ইহুদিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নিয়ে বহু বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিতে এই বিতর্ক নতুনভাবে জমে উঠেছে:ইহুদি-নিয়ন্ত্রিত পশ্চিমা মিডিয়া বুদ্ধিজীবী মহল সুকৌশলে ইসরাইল রাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং/অথবা জায়োনিজম (Zionism)-এর বিরোধিতাকে ইহুদিবিদ্বেষ ও Anti-semitism হিসেবে চিহ্নিত করে। অথচ ইসরাইলবিরোধী এবং/অথবা জায়োনিজমবিরোধী হওয়ার সাথে ইহুদিবিরোধী হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা Judaism হলো একটি একেশ্বরবাদী ধর্ম আর জায়োনিজম হলো সেই ধর্মাবলম্বীদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। সব ইহুদি এই জায়োনিজমের সমর্থকও নন।
জায়োনিস্টরা ইসরাইল রাষ্ট্রের সপক্ষে যেসব নৈতিক, ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভিত্তি দেখায়, সেগুলো বিবেচনা করা যাক:নৈতিক ভিত্তি
ফিলিস্তিনে ১৯৪৮ সাল অবধি বসবাসরত আরব জনগোষ্ঠিকে জবরদস্তির মাধ্যমে বিতাড়ন করে প্রতিষ্ঠিত ইসরাইল কখনো নৈতিকতা দাবি করতে পারে না। ১৮৮১ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে লক্ষ লক্ষ ইউরোপিয়ান ইহুদি ফিলিস্তিনে অনুপ্রবেশের কারণে বহু আরব তাদের বাড়িঘর হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়েছেন, জীবন ও জীবিকা হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।
ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করায় যারা অনৈতিক কিছু দেখেন না, তারাই আবার জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে-এর শ্বেতাঙ্গ-উচ্ছেদের কড়া সমালোচক!
কারো পুরো বাড়ি দখল করে বাড়ির মালিককেই টয়লেটে বসবাস করতে বলা কতটুকু নৈতিক? ইসরাইলি দখলদারদের নৈতিকতার দৌড় ওইটুকুই।
ঐতিহাসিক ভিত্তি
ইসরাইল রাষ্ট্রের দুর্বল নৈতিক ভিত্তিকে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনার কথা বলে সবল করার চেষ্টা করে পশ্চিমারা। জায়োনিস্টরা দাবি করে, তাদের পূর্বপুরুষরা একসময় ফিলিস্তিনের অধিবাসী ছিল। তাই ফিলিস্তিনের ওপর রয়েছে ইহুদিদের ঐতিহাসিক অধিকার!জায়োনিস্টদের এ-দাবি যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে ১৯৯০ সালে সাদ্দাম হোসেনের কুয়েত দখলকেও তো মেনে নেয়া উচিত ছিল পশ্চিমাদের। কেননা কুয়েত তো ঐতিহাসিকভাবে মেসোপটেমিয়া [ইরাক]-এরই অংশ ছিল!
পূর্বপুরুষদের বসবাসের কারণে যদি ভূমির ওপর কোনো দাবি জন্মায়, তাহলে তো গোটা আমেরিকার মূল মালিক রেড ইন্ডিয়ানরা। আফ্রিকা থেকে আসা ওবামা বা ইউরোপ থেকে আসা জন কেরির তো সেক্ষেত্রে আমেরিকার উদ্বাস্তু শিবিরে থাকা উচিত। ১৪৯২ সালে ইউরোপিয়ান নাবিক ক্রিস্টোফার কোলাম্বাস যখন আমেরিকায় পা রাখেন, তখন অন্তত এক কোটি রেড ইন্ডিয়ান সারা আমেরিকায় বসবাস করত। এখন জায়োনিস্টদের মতো করে রেড ইন্ডিয়ানরা যদি আমেরিকার স্বত্ব-স্বামিত্ব চেয়ে ইউরোপিয়ান বা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের কচুকাটা করতে থাকে, তাহলে সেটাকে ওবামা-কেরি কি রেড ইন্ডিয়ানদের “Right to Self-defense” বলবেন?
আসলে কারো পূর্বপুরুষ কোনো এক সুদূর অতীতে কোনো একটি ভূ-খণ্ডে বসবাস করার হাজার হাজার বছর পর তাদের উত্তরসূরিরা এসে সেই ভূ-খণ্ডে রাষ্ট্র গঠনের দাবি করলেই যদি তা মেনে নিতে হয়, তাহলে পৃথিবীর প্রায় সব রাষ্ট্রই লোপ পাবে। পৃথিবীকে আবারও হয়ত গুহাচারী মানুষদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। আফ্রিকার গহীন জঙ্গলের গুহাচারী মানুষরাই হবেন বর্তমান পৃথিবীর একমাত্র বৈধ অধিপতি। জায়োনিস্টরা নিশ্চয়ই আফ্রিকার সেসব গুহাচারীর কাছে তাদের সব বড় বড় ব্যাঙ্ক, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি, টিভি চ্যানেল, নিউজপেপারগুলো ছেড়ে দেবে না!
তাছাড়া ফিলিস্তিনের ভূমির ওপর জায়োনিস্টদের ঐতিহাসিক দাবির পক্ষে কোনো নিরপেক্ষ প্রমাণ নেই। বরং অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, ফিলিস্তিনের সবচেয়ে পুরনো বাসিন্দা হলো কেনানবাসীরা:
http://en.wikipedia.org/wiki/Palestine#History
খ্রিস্টপূর্ব তিন সহস্রাব্দে কেনানিরা বর্তমান ফিলিস্তিন অঞ্চলে বসবাস করত। এর প্রায় একহাজার বছর পর খ্রিস্টপূর্ব দুই সহস্রাব্দে মেসোপটেমিয়া থেকে বনি ইসরাইলিরা এসে ফিলিস্তিনে আক্রমণ চালায় ও বসবাস শুরু করে। তাই ঐতিহাসিক ভিত্তিতে কেউ যদি ফিলিস্তিনের ভূমির ওপর অধিকার দাবি করে, সেটা করতে পারে কেনানি-মিশরীয়রা। জায়োনিস্টদের সেই অধিকার নেই।
ধর্মীয় ভিত্তি
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের কাছে ইসরাইল রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্ব নেই। কেননা খ্রিস্ট ধর্ম বা হিন্দু ধর্মের মতো ইহুদি ধর্মেরও কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামো বা শাসনব্যবস্থা নেই।ইহুদি ধর্মগ্রন্থ তালমুদের Tractate Kesubos (p. 111a) অনুসারে, হযরত দাউদ (আ.)-এর বংশধরদের মধ্য থেকে একজন “মসিহ” না আসা পর্যন্ত কোনো ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
http://en.wikipedia.org/wiki/Three_Oathsউনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে শুরু হওয়া জায়োনিস্ট আন্দোলন তালমুদের এই বিধানকে অপব্যাখ্যা করে। জায়োনিস্টদের দেয়া অন্যতম অপব্যাখ্যা হলো, মসিহকে স্বাগত জানানোর জন্য আগে থেকেই একটি ইহুদি রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠা করে রাখতে হবে।
জায়োনিস্টদের এসব ব্যাখ্যাকে বিশ্বের বহু ইহুদি এখনো মেনে নেননি। যেমন, ইহুদি গোষ্ঠি NETUREI KARTA, ইরানে বসবাসকারী Iranian Jewish Community.
NETUREI KARTA-র ইহুদিরা ইসরাইলকে বৈধ রাষ্ট্র মনে করে না। তারা সবসময়ই ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরব:
NETUREI KARTA-র ওয়েব সাইট ভর্তি ইসরাইলবিরোধী প্রচারণায়:ইরানের ইহুদি এমপি Siamak Moreh Sedgh এক সাম্প্রতিক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ইসরাইলের আচরণ নাত্সী জার্মানির মতো। The Times of Israel পত্রিকাতেই সেই সাক্ষাত্কার ছাপা হয়েছে:
রাজনৈতিক ভিত্তি
ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ইতিহাসকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়:
১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে
২. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে
৩. ইসরাইলের অধীনে ১৯৪৮ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত
এ-বিষয়ে কোনো ঐতিহাসিক দ্বিমত নেই যে, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনের মুসলিম, খ্রিস্টান ও ইহুদি নির্বিশেষে সকল নাগরিক শত শত বছর ধরে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে নিরাপদেই বসবাস করত।
স্পেনে ১৪৯২ সালে খ্রিস্টানদের Inquisition (ধর্মীয় ভিন্নমত দমনে বিশেষ ট্রাইবুনাল)-এর সময় তুরস্কের উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় বায়াজিদ ইহুদিদেরকে শুধু নিরাপদে আশ্রয়ই দেননি, তিনি খিলাফতের নৌবাহিনীর এডমিরাল কামাল রাইসের নেতৃত্বে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছিলেন!
http://en.wikipedia.org/wiki/Kemal_Reis
উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় বায়াজিদ
উসমানিয়া খিলাফতের সেই যুদ্ধজাহাজ স্পেনের মুসলিম ও ইহুদিদেরকে উদ্ধার করেছিল। উদ্ধার পাওয়া ইহুদিদেরকে খলিফা বায়াজিদ তাঁর শাসনাধীন শহর ইস্তাম্বুল [বর্তমান তুরস্কে], সালোনিকা [বর্তমান গ্রিসে], ফিলিস্তিন প্রভৃতি শহরে নিরাপদে বসবাস করতে দেন। খলিফাদের উদার শাসনে এর পর থেকে বিভিন্ন যুগে ইউরোপ থেকে দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে প্রবেশ করতে থাকে। বিশেষত ১৮৮২ সাল থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে পূর্ব ইউরোপে চলমান নির্যাতন থেকে বাঁচতে প্রায় ৩৫,০০০ ইহুদি উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদের শাসনামলে ফিলিস্তিনে এসে আশ্রয় নেয়।http://en.wikipedia.org/wiki/First_Aliyah
উসমানিয়া খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ
এ-সময়ই ১৯০১ সালে জায়োনিজমের প্রবক্তা, ইসরাইলের স্বপ্নদ্রষ্টা Theodor Herzl খিলাফতের রাজধানী ইস্তাম্বুলে গিয়ে খলিফাকে তিনশ মিলিয়ন পাউন্ডের টোপ দিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ফিলিস্তিনের ভূমি চান।
সিংহহৃদয় খলিফা বলেছিলেন, “Herzl-কে তার পরিকল্পনা বাদ দিতে বলা হচ্ছে। আমি তাকে ফিলিস্তিনের এক ইঞ্চি জমিও দেব না, কারণ এটা [ফিলিস্তিন] আমার একার নয়। মুসলিমরা জিহাদে রক্ত দিয়ে এই ভূমি চাষ করেছে। ইহুদিদের সম্পদ তাদের কাছেই জমিয়ে রাখুক, কারণ খিলাফত ধ্বংস হয়ে গেলে তারা ফিলিস্তিন বিনা পয়সাতেই পেয়ে যাবে। কিন্তু যতদিন আমি জীবিত আছি, আমি Herzl-এর তরবারিতে আমার শরীরের রক্ত ঝরাতে রাজি আছি, তবু ফিলিস্তিনকে খিলাফত থেকে ছাড়ব না।…“১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় খিলাফতের অধীনে ফিলিস্তিনে ৬৫৭০০ আরব মুসলিম, ৮১০০০ আরব খ্রিস্টান ও ৫৯০০০ ইহুদি বসবাস করত।
১ম বিশ্বযুদ্ধে খিলাফতের কাছ থেকে ব্রিটিশরা ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিন দখল করে নেয়। বিশ্বযুদ্ধে খিলাফতের পতন হলে ১৯২২ সালে ফিলিস্তিন তত্কালীন লিগ অফ নেশন্সের মাধ্যমে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে চলে যায়। “সুসভ্য”, “গণতন্ত্রবাদী”, “মানবহিতৈষী” ব্রিটিশদের আমল থেকেই ফিলিস্তিনের দুর্ভোগের সূচনা হয়। ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনের আরব মুসলিম ও আরব খ্রিস্টানদেরকে স্বভূমি থেকে সরিয়ে ইউরোপ থেকে ইহুদিদের এনে ফিলিস্তিনে জড়ো করতে থাকে।
ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিস্টান অধিবাসীরা এ-সময় বহুবার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু ১ম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে ব্রিটিশরা অস্ত্রের জোরে সেসব বিদ্রোহ দমিয়ে দিয়েছিল। এভাবেই ব্রিটিশরা জায়োনিস্টদেরকে ফিলিস্তিন দান করে।
এর পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৮ সালে তথাকথিত জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়া হয়।
সেই ১৯৪৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত জায়োনিস্ট “ইসরাইল রাষ্ট্র”-এর হাতে রক্ত ঝরছে ওই ভূমির মূল অধিবাসী ফিলিস্তিনি আরবদের।
খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদ ঠিকই বলেছিলেন। ১ম বিশ্বযুদ্ধে খিলাফতের পতনের পর জায়োনিস্টরা ফ্রিতেই ফিলিস্তিন পেয়ে গেছে।
বিশ্বাসঘাতক জাতিসঙ্ঘের মাতৃত্বে ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর পিতৃত্বে প্রসবকৃত এই ভিত্তিহীন অবৈধ রাষ্ট্রটি গত ৬৬ বছর ধরে ফ্রিতেই মুসলিমদের রক্ত খেয়ে যাচ্ছে।
মুসলিমদের জন্য খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদদের মতো অভিভাবক শাসক না আসা পর্যন্ত এভাবেই চলবে।
লেখক: দুরের যাত্রীগ্যাস উত্তোলনে কনকো ফিলিপস, জাতীয় সম্পদের অবাধ লুণ্ঠন

বন্দর নগরী চট্রগ্রাম থেকে ২৮০ কিলোমিটার দূরত্বে, বঙ্গোপসাগর অবস্থিত দুটি ব্লক ডিএস ০৮-১০ এবং ডিএস ০৮-১১ এখন যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কনকোফিলিপস এর আওতাধীন। ৩০০০-৩৫০০ ফুট গভীরতা সম্পন্ন ব্লক দুটি গভীর সমুদ্রে ৫১৫৮ বর্গ কিঃমিঃ(১২,৭০,০০০ একর) এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান “শেভরন কর্পোরেশন” ২০০৭ সালে ‘কনকো ফিলিপস’ প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেয়। তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং মজুদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে কনকোফিলিপসকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস উৎপাদনের দায়িত্ব দেয় “শেভরন কর্পোরেশন”। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় হাইড্রোকার্বন জরিপ চালিয়ে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্তর্জাতিক বাজারে দ্বরপত্র আহবান করে। বঙ্গোপসাগরের ৮টি ব্লকের জন্য কনকোফিলিপস প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রে অংশগ্রহণ করলেও রহস্যজনকভাবে অন্য কোন প্রতিষ্ঠান এই দরপত্রে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে। একই বছর ২ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর টহল জাহাজ ‘বি.এন.এস নির্ভয়’ বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিরোধপূর্ণ জলসীমার ২০০ মিটার ভিতরে মিয়ানমার নৌ-বাহিনীর যুদ্ধ জাহাজ সহ খনন যন্ত্র সম্পূর্ণ আরও ৪টি জাহাজকে চিহ্নিত করে। অত্র এলাকায় মিয়ানমার সরকার, দক্ষিণ কোরিয়ার গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান “ড্যাইউ কর্পোরেশন” এবং সুইজারল্যান্ডের গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান “ট্রান্স ওশান”-এর মাধ্যমে জরিপ চালিয়ে বিপুল পরিমান গ্যাস এর মজুদ আবিস্কার করে। বিরোধপূর্ণ সীমান্তে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ মিয়ানমার এর এই গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এর মাঝে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। মিয়ানমার সরকার, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বিরোধপূর্ণ জলসীমায় তাদের সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করে। অবশেষে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় উদীয়মান পরাশক্তি চীনের মাধ্যস্থতা উভয় দেশের মাঝে বিদ্যমান উত্তেজনা হ্রাস পেতে শুরু করে।
পরবর্তী পর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গভীর সমুদ্রের ৮টি ব্লকের ভূগর্ভস্থ তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উৎপাদনের জন্য কনকোফিলিপস-কে নির্বাচিত করার বিষয়ে কোন প্রকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। পরে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত সফর শেষে নির্বাচন করে জয় লাভ করে, এবং যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন রূপে স্বীকৃতি লাভ করে। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ছয় মাসের মধ্য অর্থাৎ জুলাইয়ে বঙ্গোপসাগরের ৯টি ব্লকের মধ্যে ৩টি ব্লকের জন্য দরপত্র আহবান করে। এই ৯ টী ব্লকের মধ্য ডিএস ০৮-১০ ও ডিএস ০৮-১১ এর ৩০ ও ১৫ শতাংশ এলাকাসহ বাকি ৭টি ব্লক ছিল বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমায়।
অপরদিকে উইকিলিকস এর বরাত দিয়ে ২০১০ সালের ডিসেম্বর এ গার্ডিয়ান পত্রিকায় বলা হয়, কনকোফিলিপস প্রতিষ্ঠানটিকে গ্যাস ব্লক ইজরা দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহি চৌধুরীকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জন মরিয়ার্টি চাপ প্রয়োগ করছিল। পত্রিকায় আরও বলা হয়, ২০০৯ সালের জুলাইয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়াটি এক বৈঠকে গ্যাস ব্লকগুলো ইজরা দেয়ার বিষয়ে এবং গ্যাস রপ্তানি করতে দেয়ার বিষয়ে জ্বালানী উপদেষ্টা তৌফিক ই এলাহি চৌধুরীকে অনুমোদন দিতে বলে। ফলে একই বছর বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ৩টি ব্লকের মধ্য ডিএস ০৮-১০ এবং ডিএস ০৮-১১ ব্লক দুটি কনকোফিলিপস এবং অন্যটি আইরিশ কোম্পানি “টাল্যো”কে দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১০ ও ১১নং ব্লক দুটির অবস্থান বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিরোধর্পূণ সমুদ্রসীমায় হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীপরিষদের সাথে কনকোফিলিপস একটি বৈঠকের আয়োজন করে। কনকোফিলিপস প্রাথমিক পর্যায়ে ডিএস ০৮-১১ ব্লকের ৮৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বৈঠকে সমুদ্রসীমা নিয়ে মিয়ানমার এর সাথে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর পেট্রোবাংলা ১০ ও ১১নং ব্লকের বাকি ৩০ ও ১৫ শতাংশ এলাকা জুড়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কনকোফিলিপস এর সাথে অপর একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্তও গ্রহণ করে। এ বিষয়ে পেট্রোবাংলা এর পরিচালনায় মোঃ ইমাম উদ্দিন গনমাধ্যমগুলোকে বলেন বাংলাদেশ বিরোধর্পূণ সমুদ্রসীমাগুলো অর্জন করতে পারলে কনকোফিলিপস ১০ ও ১১নং ব্লকের বাকি ৩০ ও ১৫ শতাংশ এলাকায় তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
২০১১ সালের ১৬ জুন পেট্রোবাংলার প্রধান কার্যলয়ে কনকোফিলিপস এবং পেট্রোবাংলার মাঝে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি (production sharing contract) স্বাক্ষরিত হয়। এর দুই দিন আগে তেল গ্যাস ও বন্দর রক্ষা কমিটির এক শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীতে নির্মমভাবে হামলা চালিয়ে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ আনু মোহাম্মদ এই চুক্তি দেশের জন্য আত্মঘাতী এবং জাতীয় স্বার্থের বিরোধী বলে আখ্যায়িত করেন।
কনকোফিলিপস এর ব্যাপারে বাংলাদেশ কতৃক গৃহীত সিদ্ধান্তের বিরধীতা করে ভারত ও মিয়ানমার সরকার এ ক্ষেত্রে ভারত বিরোধীতার কারণ ছিল গ্যাস ব্লকগুলোকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সাথে ভারতের বিরোধপূর্ণ সমুদ্রসীমা। এই বিরোধীতার জের ধরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মাঝে পুনরায় স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়। পরবর্তীতে আকস্মিকভাবে মিয়ানমার এর জান্তা সরকার সীমান্তে তাদের সামরিক শক্তি বাড়াতে শুরু করে। সীমান্তে উত্তেজনা হ্রাস করার লক্ষ্যে নাসাকা ও বিজিবি-র মাঝে কায়েক দফা পতাকা বৈঠক হয়।
অবশেষে মিয়ানমার এর সাথে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আওয়ামীলীগ সরকার জাতিসংঘের সামুদ্রিক আইন বিষয়ক সম্মেলনে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যস্থতা কামনা করে সদস্য রাস্ট্রগুলো বাংলাদেশের পক্ষে ৩০টি এবং মিয়ানমার এর পক্ষে মাত্র ১টি ভোট দেয়। ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ট্রাইবুনালে ৬৬,৪৮৬ বর্গমাইল এলাকা বাংলাদেশের পক্ষে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বর্গমাইল এলাকা বাংলাদেশ অর্জন করে, সেটা দেশবাসীর কাছে সমুদ্রবিজয় রুপে পরিচিতি লাভ করে।
সমুদ্রবিজয়ের পর ২০১২ সালের ২৪ জুলাইয়ে এক বৈঠকে কনকোফিলিপস বাংলাদেশ গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারণে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী পর্যায়ে দরপত্রে অগ্রধিকার লাভের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে। কনকোফিলিপস প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ল্যাফরান্দ্রে এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর টমাস জে আর্লে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এর সাথে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে প্রতিষ্ঠানটির এই উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তা বৈঠকে আলোচ্য বিষয়াদি সম্পর্কে কিছু জানাতে রাজি হয়নি। অর্থমন্ত্রী বলেন পরবর্তী দরপত্রে কনকোফিলিপস এর অগ্রধিকার পাওয়া উচিত এ মর্মে তারা তাদের মতামত ব্যক্ত করে। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার এর সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ থাকার কারণে তারা এতদিন গ্যাস ব্লকের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি, তারা এখন কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। তিনি আরও বলেন সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর বাংলাদেশ যে সব ব্লকগুলো অর্জন করেছে সেখানে তারা এখন কাজ করতে চায়।
ইতোমধ্য বর্তমান সরকারের হস্তক্ষেপে ২০১৪ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ভারত এর সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ভারত-বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা নির্ধারনের পরিকল্পনা রয়েছে। সমুদ্র বিজয়ের এই পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রকৃত সমুদ্র বিজয় কি আদৌ নিশ্চিত হবে কিনা তা নিয়ে জনমনে সংশয় বিরাজ করছে। মুল্যো বৃদ্ধির প্রতিবাদ করলেও রহস্যজনকভাবে এখন পর্যন্ত বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের বিপক্ষে এবং বিরোধর্পূণ সমুদ্রসসীমা নিয়ে ভারতের বিপক্ষে কোন কথা বলেনি। এছাড়া ২০১২ সালে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভারত সফরের পর ভারত স্বার্থের বিরোধীতা না করার মাধ্যমে এবং এ বছর ভারতিয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে দেশের স্বার্থের পক্ষে কোন কথা না বলার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রকৃত দাবি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
চুক্তির শর্ত অনুসারে ‘কনকোফিলিপস’ প্রতিষ্ঠানটি গভীর সমুদ্রে গ্যাস উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের লক্ষ্যে ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এছাড়া বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে ভূগর্ভস্থ প্রাকৃতিক গ্যাস আহরন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর কনকোফিলিপস বাংলাদেশের পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশের অন্য তৃতীয় যেকোন পক্ষ আন্তর্জাতিক মুল্যে কনকোফিলিপস এর কাছ থেকে এই গ্যাস কিনতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটি এই প্রাকৃতিক গ্যাসকে তরল গ্যাসে পরিণত করে বহিঃবিশ্বে রপ্তানি করবে। বাংলাদেশের গ্যাস বিক্রি করে কনকোফিলিপস যে মুনাফা অর্জন করবে বাংলাদেশ তার ৫৫-৮০ শতাংশ পাবে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে এবং ৬০-৮৫ শতাংশ পাবে তেলের ক্ষেত্রে। এ লভ্যাংশের পুরোটাই বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে অর্জন করবে পেট্রোবাংলা।
আন্তর্জাতিক মুল্যে গ্যাস ক্রয়ের ফলে প্রতিনিয়ত পরিবহন খতে পাল্লা দিয়ে ভাড়া বেড়েই চলবে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরও বেড়ে যাবে। তা ছাড়া ডলারের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে গ্যাসের দামও বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের গ্যাস বিক্রি করে অর্জিত আয় বাংলাদেশ থেকে কনকোফিলিপস তা মার্কিন ডলারে পরিণত করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাবে। এতে দেশের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও কেন্দীয় ব্যাংকের ডলার রিজার্ভ প্রতিনিয়ত কমতে থকবে। ফলে মুদ্রাস্ফিতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দাম বাড়তে থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশের সার কারখানা যানবাহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রান্না বাবদ মোট গ্যাসের চাহিদা ২৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের যোগান মাত্র ১৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
বর্তমানে ‘কনকোফিলিপস’ প্রতিষ্ঠানটি গ্যাস উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে নানা পর্যায়ে টালবাহানা শুরু করেছে।ইতোমধ্য গ্যাসের দাম বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ সরকারকে নতুন করে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের অনুরোধ করেছে। প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার এর ব্লকগুলোর উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে গ্যাসের মুল্যো অণেক বেশী, বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগবে। ম্যানেজিং ডিরেক্টর টমাস জে আর্লে র কথায় ১০ ও ১১নং ব্লকগুলোর উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে গ্যাসের দাম অণেক বেশী না হলেও ১২, ১৬ ও ২১ ব্লকগুলোর উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তিতে গ্যাসের মুল্যো বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের হস্তক্ষেপে নতুন করে উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির বিভিন্ন ধারার পরির্তনের সুযোগ রয়েছে এমন আভাষ পাওয়া যায়। পেট্রোবাংলা এর চেয়ারম্যান মো: হুসেইন মন্সুর এক বিবৃতিতে বলেন, “We are happy that international oil firm is to begin its work on time as we are deeply short of natural gas”
বর্তমান শাসন ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণেই বিএনপি-আওয়ামী লীগ দেশ শাসনে চরম ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে আজ দেশের জ্বালানি সম্পদের এই করুণ অবস্থা। মানুষের সার্বভৌমত্ব ও স্বেচ্ছাচারিতা এই শাসন ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ আর এই ক্ষমতাবানরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। তারা ইচ্ছামত নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে আইন তৈরী করে জ্বালানি সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে পারে অথচ নিজেরা থাকে সকল আইনের উর্ধ্বে। সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে স্বেচ্ছাচারী এই শাসকগোষ্ঠী জনগণের দায়িত্ব কাঁধে তো নেয়ই না, উপরন্তু তাদেরকে কারো কাছে কোন জবাবদিহি করতে হয়না। কারো কাছে তারা দায়বদ্ধ নয়। অর্থাৎ তাদের অবাধ ও নিরংকুশ ক্ষমতা আছে কিন্তু কোন দায়বদ্ধতা নেই। আর তাই এরা বাংলাদেশে জ্বালানী খাতের উন্নয়নের জন্য বেসরকারী খাত বিশেষ করে সাম্রাজ্যবাদী তেল ও গ্যাস কোম্পানীগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং জানাচ্ছে। জ্বালানী সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে দেশকে একটি শক্তিশালী আত্মনির্ভরশীল দেশে পরিণত করার কোন ভিশন, পরিকল্পনা বা সংকল্প বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দলের নেই। অথচ এদেশে আছে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা-তেল-ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ। আমাদের শুধু দরকার প্রজ্ঞাবান, বিচক্ষণ, সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও পরিকল্পনাকারী নেতৃত্ব; যে নেতৃত্বের থাকবে ভবিষ্যতের রূপকল্প এবং দৃঢ়সংকল্প; যে নেতৃত্ব সুযোগের সদ্ব্যবহার করে সঠিক দিক-নিদের্শনা দিয়ে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিবে।
আলাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষ ও বিশ্বজগৎ সৃষ্টির সাথে সাথে মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দিয়েছেন খিলাফত শাসন ব্যবস্থা। ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রধানতম মূলনীতি হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক একমাত্র আলাহ্ সুবহানাহুওয়াতায়ালা। অর্থাৎ তিনিই একমাত্র আইন প্রণেতা। সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান (খলীফা, যিনি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী তথা একই সাথে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান) নিজে কোন আইন তৈরী করতে পারবেন না। তাই তাঁর স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারী হবার কোন সুযোগ নেই। ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা মানুষের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য। তিনি মানুষের জ্বালানির চাহিদা অবশ্যই পূরণ করবেন। আর খলীফা তার নিজের কাজের জন্য আলাহর কাছে এবং জনগণ তথা মুসলিম ও অমুসলিম সকল নাগরিকের কাছে ইসলামের জ্বালানি নীতি বাস্তবায়নে জবাবদিহি করতেবাধ্য। তাই খিলাফতের ভিশন হবে জনগণকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে ও সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল, উন্নত ও শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা। জ্বালানী খাতের উন্নয়ন তাই সবদিক থেকেই রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবে।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে খিলাফত সরকার নিন্ম লিখিত বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করবে:
- জ্বালানীসম্পদ কখনোই বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়া হবে না কিংবা কোন ব্যক্তি বা বিদেশী কোম্পানীর মালিকানাধীনে দেয়া হবে না। রাসূলুলাহ্ (সা) ইরশাদ করেন,“তিনটি জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, চারণ ভূমি এবং আগুন” । সুতরাং, জ্বালানী গণমালিকানাধীন সম্পদ অর্থাৎ জ্বালানী সম্পদের উপর সমগ্র দেশবাসীর অধিকার রয়েছে। দেশবাসীর পক্ষ থেকে এই সম্পদের ব্যবস্থাপনার ভার খলিফার উপর ন্যস্ত।
- খিলাফতসরকার জাতীয় জ্বালানী নিরাপত্তা নীতি নির্ধারণ করে বাংলাদেশকে একটি শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সরকার দেশের জ্বালানী সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়ার সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করবে এবং বিদেশী কোম্পানীসমূহের সাথে যে সমস্ত অযৌক্তিক বা জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করবে।
- খিলাফতরাষ্ট্র জ্বালানী সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি বা দক্ষ জনশক্তির জন্য বিদেশের উপর নির্ভরশীল হবে না। জ্বালানী সম্পদ খনন, উত্তোলন, পরিশোধন ও বিতরণের প্রযুক্তি এদেশে গড়ে তুলবে এবং মানব সম্পদ উনড়বয়নে প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিণের ব্যবস্থা করবে।
- খিলাফতরাষ্ট্র দেশীয় জ্বালানী সম্পদভিত্তিক শিল্প উৎসাহিত করবে, শিল্পায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে এবং যে কোন ধরনের বিদেশী নির্ভরশীলতা নির্মূল করবে। জ্বালানী সুবিধা জনগণের হাতের নাগালে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে খিলাফত রাষ্ট্র সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। খিলাফত রাষ্ট্র শুধু বর্তমান চাহিদা নয়, ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণও নিশ্চিত করবে এবং জ্বালানী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
– তন্ময়
‘দারুল ইসলাম’ তথা খিলাফত রাষ্ট্রের শর’ঈ সংজ্ঞা

“দারুল ইসলাম” হল হুকুম শর’ঈ এর এমন একটি আবশ্যিক শর্ত যেটাকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে কখনই মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তা অথবা আবেগ প্রাধান্য পেতে পারে না। এই খিলাফাহ রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে উম্মাহর সাথে রাষ্ট্রের প্রধানের (খলীফার) “চুক্তির” ওপর ভিত্তি করে এই শর্তে যে খলীফা হুকুম শরী’আকে ১০০ ভাগ বাস্তবায়ন করবে। ইসলামী আইনের ইতিহাসে এই “দারুল ইসলাম” কে ফুকাহারা (ফিকহ শাস্ত্রের আলেম) খিলাফাহ বা ইমামাহ বা সুলতানিয়্যাহ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর নুসুস (দলীল) থেকে এই রাষ্ট্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন। শাখা প্রশাখা নিয়ে কিছু ইখতিলাফ থাকলেও রাষ্ট্রের মুল সংজ্ঞা এবং শর্ত নিয়ে তেমন মতবিরোধ কখনই ছিল না।
আরবি ভাষায় “দার” এর বেশ কিছু শাব্দিক অর্থ আছে যেমন “বিরাম স্থান” (মাহাল্লু), “ভুমি” (বালাদ), আবাস ইত্যাদি। কিন্তু শরী’য়তের পরিভাষায় ইসলামী দার (রাষ্ট্র) হল সেই ভুমি যেখানে হুকুম শরীয়াহ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত আছে এবং মুসলমানদের হাতেই আছে আভ্যন্তরীণ বিষয়ে এবং বহিঃশত্রুর আক্রমন থেকে “আমান” (নিরাপত্তা) এর নিশ্চয়তা। ইমাম মাওয়ার্দি (রহ) ওনার প্রসিদ্ধ বই “আল-আহকাম আল-সুলতানিয়্যা” এবং “আল-হাউই আল-কাবির” এ একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন: “যা কিছু (মুসলিমদের রক্ত ও সম্মান) এই ইসলামী ভুমিতে (দার) এ আছে তা হারাম এবং যা কিছু (মুশরিকদের রক্ত ও সম্মান) ওই শিরকের ভুমিতে (দার) আছে তা হালাল”। সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় (# ৪২৯৪) সুলাইমান বিন বুরাইদা থকে একটি বর্ণনা আছে যে রাসূলুল্লাহ (সা) যখনি জিহাদের জন্য কোন দল প্রেরণ করতেন, তখন উনি সেটির আমীরকে বলতেন যারাই ইসলাম গ্রহণ করবে তাদেরকে “দারুল হিজরাহ” তথা ইসলামী রাষ্ট্রে দেশান্তর হওয়ার জন্য আহ্বান করতে এবং তখনি তারা সব রকমের নাগরিক সুবিধা পাবে।
হানাফি মাযহাবের প্রখ্যাত ফকীহ ইমাম আল কাসানি (রহ) লিখেছিলেন: “আমাদের ইমাম (আবু হানীফা) বলেছেন যে ৩টি ক্ষেত্রে দারুল ইসলাম দারুল কুফরে পরিণত হয় – ইসলামের পরিবর্তে কুফরি আইন যখন প্রভাবশালী হয় অথবা কাফের রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি ছাড়াই যখন দারুল ইসলামের সীমানা থাকে অথবা মুসলিম এবং যিম্মিদের কোন নিরাপত্তা মুসলিমদের হাতে থাকে না” [বাদা’উস সানা’ই, খণ্ড ৭]
রাসূল (সা)-এর সীরাহ ভালমতো পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই আল-‘আকাবার ঘটনায় এই দুটি শর্তের – আমান (নিরাপত্তা) এবং শরী’য়াহ বাস্তবায়নে আনুগত্য – ওপর আনসারদের কাছ থেকে রাসূলুল্লাহ বা’য়াহ (শপথ) নিয়েছিলেন যা উবাদা ইবন সামিত (রা) থেকে বায়হাকির বর্ণনায় এসেছে। এই দুটি বিষয় বর্তমান বাস্তবতায় খুবই গুরুত্ব বহন করে। কারণ বর্তমানে যদি কোন দল দারুল ইসলাম তথা খিলাফাহ ঘোষণা দিতে চায় তাহলে আমান এবং শরী’য়াহর পূর্ণ বাস্তবায়নের আলোকেই তা করতে হবে।
শরী’য়তের দৃষ্টিতে এ দুটি বিষয়ের দ্বারাই কোন ভুমিতে “তামকীন” (কর্তৃত্ব) কায়েম হয়েছে বলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন আরবের বিভিন্ন গোত্র থেকে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য “নুসরাহ” (সাহায্য) তালাশ করছিলেন, তখন ওনার কথোপকথন এবং অনড় অবস্থান থেকেই বুঝা যাচ্ছিল উনি যেনতেন ভাবেই একটি ভূমি দখলের পথকে বেছে নেননি। আমরা দেখেছি রাসূলুল্লাহ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য “তামনা’উনি” (تمنعوني) শব্দ ব্যবহার করেছিলেন যার অর্থ শক্তিমত্তার সাথে কোন কিছুকে রক্ষা করা। এবং এই রক্ষা (منع) করার বিষয়টি এমন ছিল না যে কোন শক্তিশালী গোত্র ওনাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামরিক সহায়তা দিতে চেয়েছিল আর উনিও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। বরং রাসূলের শর্ত ছিল যে দারুল ইসলাম তৈরি হবে তা চারিদিক থেকে হবে সুরক্ষিত; যেটাকে রাসূলের ভাষায় আমরা বলতে পারি “হাতাহু” (حاطَهُ)। আলি (রা) হতে বায়হাকির একটি হাসান বর্ণনায় এসেছে রাসূলুল্লাহ যখন বানু শায়বান গোত্রের কাছে নুসরাহ চাইলেন এবং ওই গোত্র শর্ত দিল তারা শুধু কুরাইশদের কাছ থেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিরক্ষা করতে পারবে কিন্তু রোমান এবং পারস্যদের কাছ থেকে পারবে না, তখন রাসুলুল্লাহ তাদের ওই প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বললেন: “…এই দ্বীনকে আল্লাহ তখনি বিজয় দিবেন যখন চারিদিক থেকে (‘হাতাহু) তা সুরক্ষিত হবে”
(ما أسأتم الرد إذ أفصحتم بالصدق إنه لا يقوم بدين الله إلا من حاطه من جميع جوانبه)
তাই খিলাফাহ রাষ্ট্রের শর’ঈ ব্যাখ্যা হল – এই রাষ্ট্র মুসলিমদের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে এবং হুকুম শরী’য়াহ সামগ্রিকভাবে কায়েম করবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যদি চিন্তা করি তাহলে যুদ্ধ চলারত অবস্থায় কিছু ভূমি দখলের মাধ্যমেই খিলাফতের ঘোষণাকে আমরা কখনই “তামকীন” বলতে পারি না, এবং এমন হলেও চলবে না যে আংশিকভাবে কিছু শরীয়াহ বাস্তবায়ন এবং হুদুদ কায়েমের মাধ্যমে কোন ভূমি খিলাফতের দাবীদার হতে পারে। এই দারুল ইসলামকে হতে হবে স্বয়ংভর (self sufficient) একটি রাষ্ট্র যা নিজেই নিজের খাদ্য নিরাপত্তা থকে শুরু করে সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সামর্থ্য রাখে । তাই কোন ভঙ্গুর দ্বীপ রাষ্ট্র যেমন খিলাফাহ হতে পারে না, তেমনি যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায় কিছু অঞ্চল দখল করে রাষ্ট্রের শর’ঈ শর্ত পূরণ না করে খিলাফাহ রাষ্ট্রের ঘোষণাও দেয়া যেতে পারে না। অতএব, এই “দারুল ইসলাম” (খিলাফাহ) অবশ্যই ইসলামকে ১০০% বাস্তবায়ন করবে; এই রাষ্ট্রের সংবিধান, কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ, অর্থনীতি, মুদ্রানীতি, বিচারব্যবস্থা, বৈদেশিক নীতি ইত্যাদি সব কিছুর ভিত্তি হবে কুরআন এবং সুন্নাহ থেকে নিঃসৃত দলীল। এই রাষ্ট্র হবে ঠিক রাসূলুল্লাহ (সা) এর মদীনার ইসলামী রাষ্ট্র এবং ওনার খুলাফায়ে রাশেদীন তথা আবু বকর, উমর, উছমান এবং আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) দ্বারা চালিত রাষ্ট্রের মডেল অনুসারে।রমজান ও বিশ্বকাপ

এসেছে মুসলিমদের ইবাদতের জন্য হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম মাস রমজান। এ মহিমান্বিত মাসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনকে মানব জাতির মুক্তির জন্য একমাত্র বিধান হিসেবে পৃথিবীর বুকে নাযিল করেছিলেন। অপরদিকে এসেছে ক্রীড়া জগতের সর্ববৃহৎ আসর বিশ্বকাপ ফুটবল-২০১৪, যা বিশ্বজুড়ে ফুটবল প্রেমীদের বহু প্রতিক্ষিত বিনোদনের একটি আসর। এই ২০ তম বিশ্বকাপ আসরে শুধুমাত্র প্রাইজমানি প্রাদানে ব্যয় হবে ৫৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর স্বাগতিক দেশ ব্রাজিল এই আসরের আয়োজনে আনুমানিক খরচ নির্ধারন করেছে ১৪ বিলয়ন মার্কিন ডলার যার, সম্পূর্ণটা শুধু মাত্র ক্রীড়া বিনোদনের উদ্দেশ্যে ব্যয় হবে।
বছরের প্রতিটি মাসের মতো এ মাসেও আমাদের এই সমাজ শুধুমাত্র আমোদ-ফুর্তি করে এক মহা ব্যস্ত সময় কাটানোর জন্য তৎপর। ইতোমধ্যে অনেকেই ডায়াবোলিকা এবং জার্সি নিয়ে এই সর্বোবৃহৎ আসর উপভোগ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে রয়েছেন। আজ এই সমাজের অধিকাংশ মানুষই বিশেষত তরুনরা ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মানীর লোগো পতাকা নিয়ে ব্যস্ত, এবং কার পতাকা কত বড় তা নিয়ে এক মহান প্রতিযোগীতায় লিপ্ত। পকেটে টাকা-পয়সা যা আছে তা খরচ করে অথবা চাঁদা তুলে হলেও এলাকা বা ক্লাবের পক্ষ থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ছবি সংবলিত একটি বড় ব্যানার অথবা ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার বড় একটি পতাকা ঝুলাতেই হবে এমন একটি আমেজ বিরাজ করছে চারদিকে। কোন দল কাপ নেবে, কার গোল কয়টা, কার পয়েন্ট কত তা নিয়ে চলছে তুমুল তর্ক-বিতর্ক আর গবেষনা। ইতোমধ্যে জুয়াড়িরা বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে অপেক্ষা করছে এ আসরের জন্য। অপরদিকে নেইমার-মেসি-রোনালদোর ভক্তরা তো আছেই। প্রিয় খেলোয়াড়ের জার্সি পরে নাকি খেলা দেখার মজাই আলাদা। অথচ ১৪০০ বছর আগে এমনি এক রমজান মাসে মুসলিমদের হাতে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মনীর পতাকার পরিবর্তে ছিল কালেমায় তাউহীদ এর পতাকা। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, জার্মনির জয়ের পরিবর্তে মুসলিমরা চিন্তা করেছিলেন দ্বীন ইসলামের বিজয় নিয়ে।
প্রিয় ভাইয়েরা, এই ছিল ১৪০০ বছর আগে বদর প্রান্তরে মুসলিমদের চিত্র। এই সেই বদর প্রান্তর যেখানে মুসলিমদের সর্বপ্রম যুদ্ধ হয়েছিল দ্বীন ইসলামের সর্বপ্রম রাষ্ট্র, মদিনা রাষ্ট্রকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। সেই যুদ্ধে মুসলিমদেও বিজয় উলাস ছিল অভাবনীয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও বর্তমান বাস্তবতা হলো ১৪০০ বছর পর আজ মুসলিমরা বিজয় উলাস করে স্পেন, ব্রাজিল, জার্মনী, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ লড়াই দেখে। অথচ প্রতিবছর রম্জান আসলেও বদরের সেই বিজয় উলাস আজ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ব্যক্তিগত কোন ক্ষেত্রেই পালিত হয় না। যে স্পেনের খেলা দেখে আজ মুসলিমরা অভিভূত হয় সে স্পেন ১৭ বছর বয়সে জয় করেন তারিক-বিন-জিয়াদ। অথচ আজকের এই কুফর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কুফর সংস্কৃতির প্রভাবে সাম্প্রতিক টি-২০ বিশ্বকাপের ফ্ল্যাশমবে মুসলিম তরুন ভাইয়েরা নাটকীয় ভঙ্গিমায় নেচেছে। সেই সাথে আমাদের মুসলিম বোনেরা ও নৃত্য পরিবেশন করেছে। ফেসবুক আর ইউটিউব এর সেই ভিডিওগুলোতে পড়েছে শত শত লাইক। গত টি-২০ ক্রিকেট ওয়ার্ল্ডকাপের থিম সং অনুযায়ী বলতে হয়,
“চার ছক্কা হই হই,
আমাদের দ্বীনি ভাইবোনদের ঈমান গড়াইয়া গেল কই?’’গত বিশ্বকাপ ফুটবলে ছিল ওয়াকা-ওয়াকা এর উন্মাদনা। আর এ সঙ্গিতের সামনে ভাইবোনেরা হয়ে পড়েছিল দিশেহারা। এর পর এবারে এসেছে ‘‘ওলে ওলা ’’। এই গানের তালে তালে নাঁচার জন্য ব্রাজিলে যৌন কর্মী গেছে ১৫,০০,০০০ (পঁনের লক্ষ)।
আসুন আমরা একটু চিন্তা করে দেখি আল্লাহর এই আয়াত নিয়ে,
“হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?”
[ইনফিতার: ৬]আজ পশ্চিমাদের দেয়া গণতান্ত্রিক চিন্তা কি আমদের আল্লাহ সম্পর্কে বিভ্রান্ত করে ফেলেনি! আজকের এই কুফর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে সমগ্র বিশ্বের এবং আমাদের চারপাশের অসংখ্য মানুষ ও প্রতিনিয়ত অভুক্ত অবস্থায় থাকে। দৈনিক পত্রিকাগুলোর পৃষ্টা উল্টালে প্রতিদিন চোখে পড়ে কোন না কোন দ্বীনি বোনের ধর্ষনের খবর। এখন আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি যেখানে সকল প্রকার বিজ্ঞাপনে নারীদের বেপরোয়া অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন সাবানের বিজ্ঞাপনে একজন নারীর গোসল করার দৃশ্য, টু পেস্টের বিজ্ঞাপনে নারী পুরুষের অন্তরঙ্গ মূহুর্তের দৃশ্য এমন কি পুরুষের প্রসাধনী সামগ্রীর বিজ্ঞাপনেও নারী পুরুষের অবাধ ও অশ্লীল আচরন প্রদর্শিত হয়। রমজান মাসে টিভি চ্যানেল গুলোর আরো একটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হল যে সংবাদপাঠিকারা রম্জানের প্রম দিন থেকে মাথায় কাপড় দিয়ে নিজেদের রক্ষনশীলতা এবং আলাহ্ সুবহানাহুতায়ালার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে ও ঠিক ঈদের পরদিন থেকে মাথায় কাপড় সরিয়ে তথাকথিত সমাজের উগ্রতার পরিচয় দিয়ে থাকে। প্রতি বছরই আমাদের চারপাশে এই নগড়ব বাস্তবতাগুলো ফুটে ওঠে। অপরদিকে সীমান্তে প্রতিবছর আমাদের দ্বীনি ভাইবোনেরা নির্বিচারে প্রাণ হারাচ্ছে। ফেলানী ও মোহাম্মদ মিজানুর রহমানদের মতো আরও নাম না জানা নিহত দ্বীনি ভাই ও বোনদের জন্য সামান্য দুঃখ প্রকাশ করেই কি আপনারা আবার আমোদ ফূর্তিতে লিপ্ত হবেন? আপনাদের এই নিশ্চুপ থাকার কারণে বৈদেশিক শত্রুদের চক্রান্তে পিলখানা হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তা সহ ৭৪ জন নির্মমভাবে নিহত হয়। কিন্তু হাসিনা এবং খালেদার জোট এই ব্যপারে নিশ্চুপ থেকে ক্ষমতার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। মসজিদে একজন মুসলির সেন্ডেল থেকে শুরু করে একজন মানুষের জানের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এই কুফর গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এর পরেও রম্জান এবং অন্যান্য মাসে রান্নার চুলায় গ্যাস না পেয়ে পানি ও বিদ্যুৎ সংকটের মত সমস্যাগুলোকেও উপেক্ষা করে মেসি- নেইমার – রোনালদোর মতো খেলোয়াড়দের চুলের স্টাইল নিয়ে উলাস করবেন ? এই বিনোদন, এই উলাস, এই ব্যস্ততা কখনো আপনাদের ঘরে মাসের শেষে চাউলের বস্তা এনে দিবে না। এই পূঁজিবাদী কুফ্রী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে এই পবিত্র রমজান মাসেও নিত্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য কিছু সংখ্যক বিত্তবানদের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকলেও অধিকাংশ মানুষের ক্রয়সীমার বাইরে চলে যায়। এরপরও আপনারা নিজেদেরকে হাসিনা খালেদার শাড়ীর আচলে বেঁধে রেখেছেন । তারা শুধূ কাফেরদের দেয়া মানুষের তন্ত্র, তথা জনগনের মন্ত্র, তথা গনতন্ত্রের বস্তাই বহন করবে ,কারো ঘরের চাউলের বস্তা নয় !
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেছেন,
‘‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই তো কাফের।”
‘‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই তো জালেম।”
‘‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই তো ফাসেক।”
[সুরা-আল মায়েদা-৪৪, ৪৫, ৪৭]রাসুলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন –
‘‘যে ব্যক্তি কোন জালিমের সাথে চলে তার শক্তি বৃদ্ধি করে, অথচ সে জানে ঐ ব্যক্তি জালিম, তাহলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেল।” (বায়হাকী)
কিন্তু আজ থেকে ১৩০০ বছর পূর্বে মুসলিমদের খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) আ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়লার বিচার ব্যবস্থা দ্বারা বিচার ফয়সালা করেছিলেন বলে রাষ্ট্রের এক অভূক্তের ক্ষিদে মিটানোর জন্য নিজের পিঠে করে আটার বস্তা বহন করে ঘরে পৌছে দিয়েছিলেন। প্রতিদিন আপনাদের আশে পাশে অসংখ্য মানুষ যখন না-খেয়ে ঘুমায় তখন কি আপনাদের উল্লাস করবার সময় ? যখন বিশ্বকাপের গোল হতে থাকবে তখন ও কি পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষনকারীদের গুলিতে ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, বার্মা অথবা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তীদের মাঝে কোন মুসলিম পাখির মতো ছটফট করতে করতে মৃত্যু বরন করবে ? আপনারা কি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সেই হাদীস ভুলে গেছেন ? যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন
‘‘একজন মুসলিমকে হত্যা করার চেয়ে কাবার অপমান আল্লাহর কাছে কম গুরুতর।”
তবে কি একজন মুসলিমের রক্তের চেয়ে সামান্য এই দুনিয়ার বিনোদন আর ভোগ-বিলাস আপনাদের কাছে অনেক বেশী পবিত্র ?
যে উম্মত নিজেদেরকে রাসুলালাহ (সা) এর অনুসারী দাবী করেন তাদেরকে প্রশড়ব করছি শেষ বিচারের দিন কোন চেহারা নিয়ে আলাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সামনে দাড়াবেন ? যখন হাশরের ময়দানে আপনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিবে একজন মুসলিম। সে বলবে ‘‘আমি কুরআনের উম্মতের কাছে সাহায্য চেয়েছিলাম, কিন্তু উম্মত কোন জবাব দেয়নি। রমজান পার হয়ে গেছে অথছ উম্মত একটু ও নড়ে নি”। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
‘‘সকালে জেগে উঠে যে মুসলিমদের নিয়ে চিন্তিত হয় না, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত নয়”
(কানজুল উম্মাল)রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেছেন,
“যদি তোমরা দেখ যে আমার উম্মত কোন জালেম কে এ কথা বলতে ভয় পাচ্ছে যে, ‘‘নিশ্চয় তুমি একজন জালেম” তাহলে (সেই উম্মতকে) তাদের হতে বিদায় (অর্থাৎ সেই উম্মতের জন্য বিদায় বা পতন সংকেত)” [আহমদ, তাবারানী, হাকিম, বায়হাকী]
পবিত্র কুরআন এর দিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া আপনাদের কোন পদ নেই বা আশ্রয় ও নেই, যাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার জমিনে তার শাসন কর্তৃত্ব প্রতিষ্টিত হয়। কারণ,
‘‘আল্লাহ শাসন কর্তৃত্বের মাধ্যমে যা রক্ষা করেন কুরআন দিয়েও তা রক্ষা করেন না’’
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কুরআন এই জন্য নাযিল করেন নি যে এই কিতাব মৃত মানুষের জন্য পড়া হবে, অথবা তাবিজ হিসেবে বিক্রি হবে বা এ জন্য নয় যে দেয়াল ও বসার ঘর এই কিতাব দিয়ে সাজানো হবে। বরং এই কিতাব নাযিল করা হয়েছে যাতে মানব জাতি এ কিতাব থেকে জীবন বিধান পেতে পারে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেছেন –
‘‘তোমাকে পাঠিয়েছি সত্য সম্বলিত গ্রন্থ দিয়ে যাতে করে আল্লাহ্ তোমাকে যেভাবে দেখিয়েছেন সেভাবে তুমি মানব জাতিকে শাসন করতে পার” (সুরা নিসা-১০৫)
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর” (সুরা বাকারাহ্-২০৮)
আমরা আপনাদের আহবান জানাই, শত বছরের ধুলো-ময়লা ঝেড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ান, যাতে আমানত ও দায়িত্বের সাথে রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক গৃহীত মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্টার পদ্ধতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করুন। দুনিয়ার বুকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার আইন পুনঃ প্রতিষ্টা তথা খিলাফত পুনঃ প্রতিষ্টা করার কাজের চেয়ে সামান্য ৯০ মিনিটের উত্তেজনা একজন মুমিনের নিকট অনেক বেশী প্রিয় ও পবিত্র হতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন
‘‘আর যে (ব্যক্তি) এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে তার কাঁধে (কোন খলীফার) বায়’আত (আনুগত্যের শপথ) তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলী (যুগের) মৃত্যু।’’ (মুসলিম)
সেই ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান করছি, যেখানে জনগণ তথা মানুষের সার্বভৌমত্ব নয়, সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে এবং কেয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকবে ইনশাআল্লাহ। রাসূলুল্লাহ (সা) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন ‘
“……এরপর আবার ফিরে আসবে নবুয়্যুতের আদলের খিলাফত”। (আহমদ)
তন্ময়


























