Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • নাগরিক সমস্যার কারণ ও ইসলামিক সমাধান: প্রেক্ষিত আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন

    নাগরিক সমস্যার কারণ ও ইসলামিক সমাধান: প্রেক্ষিত আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন

    ঢাকা ও চট্রগ্রাম মহানগরে প্রধান প্রধান নাগরিক সমস্যাসমূহ কি কি?

    • পর্যাপ্ত ও যথাযথ রাস্তাঘাটের অভাব
    •  অদক্ষ ও অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়নিষ্কাশন)
    • যানজট ও অপ্রতুল পরিবহন
    • জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা

    সমস্যাসমূহের কারণ:
    বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই ঢাকা ও চট্রগ্রাম মহানগরীতে নাগরিক সমস্যাসমূহের প্রধান কারণঃ

    ১. পুঁজিবাদের প্রকৃতিই হল সব নাগরিক সুবিধাকে শাসকশ্রেণীর নাগালের মধ্যে রাখা ও এগুলোকে কেন্দ্রীভূত করা। ঢাকা ও চট্রগ্রামে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, অফিস -আদালত, সচিবালয়, সশস্ত্রবাহিনীসমূহের সদর দপ্তর, প্রধান বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, কল কারখানা ইত্যাদি। একারণে গ্রাম থেকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, জীবিকা অন্বেষণ ও উন্নত জীবনের আশায় এসব নগরীতে চলে আসছে এবং বিধায় নগরীগুলো আরও বেশী জনাকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এমকি ভিক্ষা করা, রিক্সা চালানো, গৃহকর্মীর কাজ, গার্মেন্টস ও দিনমজুরের কাজের জন্যও গ্রামের লোকজন ঢাকায় আসছে। নাগরিক সুবিধা থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনগত সেবা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কল কারখানা ইত্যাদি বিকেন্দ্রীকরণ না করায় দলে দলে গ্রাম থেকে লোকজন ঢাকা বা চট্রগ্রামে আসছে এবং নাগরিক সমস্যাসমূহকে প্রকট থেকে প্রকটতর করছে।

    ২. কোন মৌলিক চিন্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে উঠেনি। সেকারণে এখানকার মূলধারার রাজনীতবিদ ও শাসকগণ আদর্শিকভাবে দেওলিয়া, বিধায় নগরায়ণও অপরিকল্পিত। একসময়ের খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ বা বর্তমান সময়ের নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মত কোন মাস্টারপ্লানিং এর মাধ্যমে ঢাকা বা চট্রগ্রাম নগরী গড়ে উঠেনি। এখানে গৃহায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন(রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, পয়নিষ্কাশন) সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদী নয়। অনেকসময় পুঁজিবাদী হীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে যথেচ্ছভাবে এগুলো করা হচ্ছে এবং বিধায় যানজট, অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা, জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্নতার সৃষ্টি হচ্ছে।

    সমাধান:

    ১. সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যক্তি পরিবর্তন করে নাগরিক সমস্যার সমাধান করা যাবে না, বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ইসলাম দ্বারা প্রতিস্থাপনই সত্যিকারের সমাধান। এর আগেও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে হানিফ, সাদেক হোসেন খোকা, মহিউদ্দিন চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছিল এবং তারা প্রত্যেকেই ঢাকা ও চট্রগ্রামের নাগরিক সমস্যা সমাধানে কী দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল তা এসব নগরীর যানজট, উন্মুক্ত ডাস্টবিন, মশার উপদ্রব ও সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দেখলেই বোঝা যায়।

    ২. ইসলামে শাসন একটি ফরয ইবাদত হওয়ায় শাসকগণ নাগরিক সুবিধাকে কেন্দ্রীভূত করবে না, বরং খলীফা নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা(অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) এবং উম্মাহ’র অধিকার(চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা) তাদের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে বাধ্য থাকবেন। খলিফা উমার(রা) বলেছেন, “আমি নির্ঘুম রাত্রি কাটাই এ চিন্তায় যে, মসৃণ না করতে পারার কারণে কোন বকরী বাগদাদের রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় তার খোড়ায় চোট পেলে আল্লাহ সুওতা আমাকে হাশরের ময়দানে পাকড়াও করবেন।” যে শাসক বকরী বা ছাগলের চোট নিয়ে এত চিন্তিত তিনি মানুষের অধিকারের ব্যাপারে কতটুকু উদ্বিগ্ন ছিলেন তা বলাই বাহুল্য ।

    ৩. খিলাফত রাষ্ট্রের শাসক উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণ করবেন এবং সেকারণে ঢাকা বা চট্রগ্রামের মত হাতেগোনা দু’একটি নগীর উপর এত চাপ পড়বে না।

    ৪. আদর্শিক সত্তার(ব্যক্তি, দল ও রাষ্ট্র) চিন্তার প্রক্রিয়া হলো: লক্ষ্য ঠিক করা, লক্ষ্য অর্জনের জন্য চিন্তা করা এবং চিন্তার ভিত্তিতে কাজ করা এবং চিন্তার এ প্রক্রিয়াই ফলদায়ক ও টেকসই। খিলাফত রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি থাকায় তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে যথেচ্ছভাবে উন্নয়ন করবে না এবং সেখানে উন্নয়ন হবে টেকসই ও সুপরিকল্পিত। অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্র অপিরকল্পিত নগরায়ণ করবে না এবং সেকারণে যানজট, অদক্ষ ও অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়নিষ্কাশন), জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছনতার মত সমস্যাগুলো থাকবে না। খিলাফত রাষ্ট্র মধ্যযুগেই বাগদাদ নগরীতে নাগরিকদের জন্য রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট এবং ঘরে ঘরে পাইপের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছিল যখন ইউরোপের লোকেরা শৌচাগার ও গোসলখানা সর্ম্পকে কোন ধারণাই রাখত না।

    রাফীম আহমেদ

  • নববর্ষের ইতিবৃত্ত

    নববর্ষের ইতিবৃত্ত

    আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপর বাংলাদেশে লাগবে সুরের ও রঙের মাতন। চারদিকে দেখা যাবে লাল, নীল, হলুদ রঙ। মাথার উপর উঠে নাচবে নানা রঙের পশু-পাখি। গ্লানি ও জ্বরা মুছে যাওয়ার কামনায় হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি পরা তরুণ আর বাসন্তি রঙের শাড়ি পরা তরুণীদের পদচারনায় মুখরিত হবে জনপথ। বাতাস ভরে উঠবে ইলিশের গন্ধে। মেলায়, মাঠে ময়দানে চলবে পানতা পানের হিড়িক। বছর ঘুরে এলো বৈশাখ; এসো হে বৈশাখ এসো এসো।

    বৈশাখ এলেই বারবার উঠে আসে একটা শব্দ- ‘হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্য’। এই হাজার বছরের ঐতিহ্যকে স্বরন করিয়ে দিতে আজ অজপাড়াগায়েও বৈশাখী উৎসব পালন করা হয়; বৈশাখী মেলা বসে সর্বত্র। আগে পুরাতন কাপড়েই বৈশাখ পালন করা যেত এখন নতুন বৈশাখী জামা লাগে। পহেলা বৈশাখ যেন বাঙালিদের ঈদের দিন। তবে এই ‘হাজার বছরের বাঙালি ঐতিহ্যে’র বয়স কিন্তু মোটেও হাজার বছর না। খুব বেশি দিন আগে না, বৈশাখী উৎসব সীমাবদ্ধ ছিলো রমনা বটমূলে, তারপর দেশের নামকরা কিছু স্থানে এখন সারাদেশে। কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে বৈশাখ কখনই উৎসবের মাস ছিলো না, বৈশাখ ছিলো কর্মব্যস্ততার মাস।

    বাংলা বর্ষের প্রথম মাস বৈশাখের নামকরন করা হয়েছে বিশাখা নামক নক্ষত্রের নামে। ধর্মান্তরিত সম্রাট আকবর সর্ব প্রথম রাজনৈতিক কারণে (কথিত অর্থনৈতিক কারণ) ভারতবর্ষে প্রচলিত হিজরী সনের পরিবর্তে হিন্দু পুরোহিতদের প্রচলিত বর্ষপঞ্জিকা সংস্কারের মাধ্যমে ইলাহী বর্ষ চালু করে। কথিত আছে, পহেলা বৈশাখ হিন্দু ধর্মের প্রবাদপুরুষ রাজা বিক্রমাদিত্যের সিংহাসন আরোহনের দিন, তাই এই দিনটি হিন্দুদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অবাঙালি আকবরের প্রচলনকৃত বর্ষের প্রথম দিন হিন্দুরা বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন নামে এখনো পালন করে থাকে; যেমন থাইল্যান্ডে সংক্রান, বার্মাতে থিংগিয়ান। কালের পরিক্রমায় এই এলাহী সনকেই বাংলা সন বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। এই তথাকথিত বাংলা সন সকল বাংলাভাষীর কাছে বিশেষত বাংলাভাষী মু্সলিমদের কাছে কখনোই জনপ্রিয় ছিলো না। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্ত্তণ ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সনে ঢাকার রমনা পার্কের বটমূলে ‘ছায়ানট’ পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির নিপীড়ন এর প্রতিবাদে বাঙালি জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার লক্ষ্যে এই বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৮৯ সাল থেকে বর্ষবরন অনুষ্ঠানে সংযোজিত হয় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। এরশাদের নিপীড়ন এর প্রতিবাদে চারুকলার কিছু ছাত্র তখন পহেলা বৈশাখে এটি চালু করে। এর অন্যতম সংগঠক ছিলো শিল্পী তরুণ ঘোষ। পশ্চিম বাংলার বরোদায় আর্ট ইনিষ্টিটিউটের ছাত্র ছিল সে। বরোদা হতে আদমানীকৃত কনসেপ্ট দিয়ে তরুণ ঘোষ চারুকলার এ অনুষ্ঠানকে সাজায়। পরবর্তীতে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ও বাম-রাম ঘরানার কিছু বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’র নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য়। এতে লক্ষ্মীপেঁচা, বাদুর, বাঘ, বানর, হনুমান ও রাক্ষস-খোক্ষসসহ বিচিত্র সব জন্তুজানোয়ারের মুখোশ পরে মিছিল করে এরা। ২০০১ সালে বর্ষবরনের সবচেয়ে বড় আয়োজন রমনার বটমূলের অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়। এ বোমা হামলাকে কেন্দ্র করে এ অনুষ্ঠানকে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার প্রয়াস নেয়া হয়। এ প্রয়াসে হাত বাড়িয়ে দেয় দেশের শীর্ষ পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলো। তারা এগিয়ে আসে বৈশাখী মেলা, বৈশাখী ফ্যাশন, বৈশাখী কনসার্ট ইত্যাদির পৃষ্টপোষকতায়। রমনা বটমূলের বর্ষবরন উৎসব ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে। পহেলা বৈশাখ পরিনত হয় বাঙালিদের প্রানের (!) উৎসবে।

    পহেলা বৈশাখকে সার্বজনিন উৎসবের দিন বলা হচ্ছে অথচ এ দিনের সকল আচারানুষ্ঠান হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাস হতে উদ্ধুত যা এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ট জনগন মুসলিমদের ধর্ম-বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় আচারের দিনকে কি সার্বজনিন উৎসবের দিন বলা যাবে? অগ্নি ও সূর্য মহিমান্বিতকরন, গনেশ পুজার অংশ মঙ্গলশোভাযাত্রা, মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জলন, মূর্তি নিয়ে সড়ক প্রদক্ষিন, চৈত্র সংক্রান্তির ধারাবাহিকতায় ঘট পূজা, নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা সবই কি মুসলিমদের ঈমান-আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক না? পহেলা বৈশাখ যে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বিশেষ দিন তা এই দিনের প্রচলিত অনুষ্ঠান দেখলে সহজেই অনুমেয়। এইটা কখনই মুসলিমের অনুষ্ঠান দিন হতে পারে না তাই এটাকে সার্বজনিন উৎসবের দিন বলা অযৌক্তিক। এ দিনকে বাঙালিদের সার্বজনিন উৎসবের দিন বানানোর হীন প্রচেষ্টা করা হচ্ছে। পুঁজিবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এর পেছনে প্রধান ভুমিকা রাখছে। তারা তাদের ব্যবসার স্বার্থে এ দিনকে কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা করছে। তাইতো দেখা যায় বাটা-এপেক্সের বৈশাখী জুতার অফার, বিউটি পার্লারের সাজের অফার, রেডিসন-সোনারগাঁর বৈশাখী কাপল অফার, পিজ্জাহাট-কেএফসির পানতা ইলিশ অফার। যে পানতা ভাত এদেশের অসহায় গরীব প্রজা অপারগ হয়ে প্রতিদিন খায় সেই পানতা ভাত পুঁজিবাদ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করে। এটা কি অসহায় মানুষদের সাথে মশকরার নামান্তর নয়? বৈশাখ এলে প্রথম আলো-ডেইলি স্টার ব্যস্ত হয়ে যায় ফ্যাশন শিখাতে, কোকাকোলা-পেপসি ব্যস্ত হয়ে যায় কনসার্ট আয়োজনে। সবখানেই যেন বৈশাখী মাতাল বানিজ্য। এই বানিজ্যের ঠেলায় এ মাসে ইলিশের হালি হয়ে যায় ষোল হাজার টাকা। এই বানিজ্যের সুফল খানিকটা ভোগ করে চারুকলা প্রশিক্ষিত মৌসুমী ব্যবসায়ীরা। বৈশাখ সত্যিই যেন তাদের জন্য আশির্বাদ হয়ে আসে। সারা বছরের বেকারত্বের খরার পর বৈশাখী বানিজ্য তাদের জন্য পরম শীতলতা।

    পুঁজিবাদী কোম্পানি কর্তৃক প্রমোটকৃত হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের দিন এখন আমাদের তরুণরা পালন করছে মহাসমারোহে। পহেলা বৈশাখ উদযাপন অনৈসলামিক জানার পরও মুসলিম তরুণ-তরুণীরা এটা পালন করছে শুধুমাত্র একটি কারণে- ‘মৌজ-মাস্তি-আনন্দ-ফুর্তি’। আমাদের শেখানো হয়েছে- ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। এই উৎসব পালন করতে গিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রায় গায়ে গা মিলিয়ে হাটার আনন্দ যেন অন্য রকম। প্রেমচ্ছুক তরুণ-তরুণীদের জন্য এ দিন যেন প্রেম খোঁজে বেড়ানোর দিন। কাপলদের জন্য রঙ্গিন পহেলা বৈশাখে ডেটিং এর মজাই আলাদা। আর এই মজার পরিমানটা বেড়ে যায় যখন লোলুপ বেনিয়ারা অবাধ প্রেম ও যৌনতার সুযোগ করে দেয়। অত্যধিক আনন্দের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রতি বৈশাখেই ধর্ষন-শ্লীলতাহানীর মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা বেড়ে চলেছে।

    হে মুসলিম তরুণেরা! পহেলা বৈশাখের আচারানুষ্ঠান বিজাতীয় সংস্কৃতি হতে এসেছে জানার পরও শুধুমাত্র সাময়িক আনন্দের আশায় আপনারা কি এটা পালন করবেন? এই অশ্লীল ধর্মাচার আপনার বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক জেনেও কি আপনি স্রোতে গা ভাসিয়ে দেবেন? পুঁজিবাদী বেনিয়াদের ব্যবসায়ের ক্রীড়নক হিসেবে আপনি কি কাজ করবেন? পুঁজিবাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম তরুণদের পরিচয় ভুলিয়ে দেয়া। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও এর ধারক-বাহক পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলিমদের ভুমিতে প্রাচীন বিজাতীয় সংস্কৃতিকে নিজেদের সংস্কৃতি হিসেবে দাঁড় করাতে চায়। এইজন্য তারা মিসরবাসিকে অনুপ্রাণিত করে ফেরাউনদের ইতিহাস দ্বারা, অগ্নিপুজারীদের নববর্ষ নওরোজকে উপস্থাপন করে পারস্যের মুসলিমদের সংস্কৃতি হিসেবে। একইভাবে বাংলার মুসলিমদের কে তারা অনুপ্রাণিত করতে চায় আর্যদের ইতিহাস ও সংস্কৃতি দ্বারা। তাদের এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তারা পৌত্তলিক সংস্কৃতিকে হাজার বছরের বাঙ্গালিদের সংস্কৃতি বলে চালিয়ে দিতে চায়। যারা অশ্বত্থ গাছকে বট গাছ বলে চালিয়ে দিতে পারে, তারা কি অন্যের সংস্কৃতিকে আপনার সংস্কৃতি বলে চালাতে পারে না? আপনি কি এইসব জানার পরও তাদের পাঁতা ফাঁদে পা দেবেন? অথচ আপনি হচ্ছেন আবুবকর-উমর, আবু হানিফা-শাহজালালের উত্তরসুরী। আপনি কি একবারও ভেবে দেখবেন না রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: “যে অন্য জাতিকে অনুকরন করে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত” (আবু দাউদ)

    হে মুস’আব বিন উমায়ের এর উত্তরসুরী, হে তরুণ! আল্লাহ তায়ালা আপনাকে মেধা দিয়েছেন, সুন্দর অবয়ব দিয়েছেন। আপনি কি একবারও ভাববেন না কী ক্ষমতা দিয়ে আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, কিসের জন্য আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? আপনাকে পালকের মতো ভেসে যাওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয় নি। আপনার রয়েছে ক্ষমতা নিজেকে চেনার, তারুণ্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করে সমাজকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নেয়ার। তাই আসুন আমরা পহেলা বৈশাখের রঙে রঙ্গিত না হয়ে আমাদের স্রষ্টা আল্লাহর রঙে রঙ্গিত হই:

    আল্লাহর রঙ। আর রঙের ক্ষেত্রে আল্লাহর চেয়ে কে বেশি সুন্দর? আমরা তারই উপাসনাকারী”। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৩৮)

  • ইয়েমেন: খায়রা উম্মাহ’র রক্তক্ষরণ ও মুসলিম শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত

    ইয়েমেন: খায়রা উম্মাহ’র রক্তক্ষরণ ও মুসলিম শাসকদের বিশ্বাসঘাতকতার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত

    ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের পর থেকে মুসলিম বিশ্ব অভিভাবকহীন। তখন থেকে খাইরা উম্মাহ’র জীবন, সম্পদ ও ইজ্জত কাফেরদের কাছ থেকে নিরাপদ নয়। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, চেচনিয়া, বসনিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া এবং সর্বশেষ সংযোজন ইয়েমেন।

     পুঁজিবাদ ও গনতন্ত্রের ধ্বজাধারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির দিক থেকে এখন ক্ষয়িষ্ণু। সেকারণে সে এখন আগের মত পৃথিবীর সব জায়গায় নিজে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কিন্তু এজেন্টদের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গঠন করে স্বীয় স্বার্থরক্ষা করার হীন কৌশল প্রয়োগ করার সক্ষমতা তার রয়েছে। ইয়েমেনের সংকট মূলত: সে অঞ্চলে আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যকার প্রতিযোগিতার ফসল। দুঃখজনক হলেও সত্য মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম শাসকগণ আজকে আমেরিকা ও ব্রিটেনের স্বার্থ সুরক্ষার জন্য তাদের সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যবহার করছে, মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ উস্কে দিচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ১০ টি দেশের মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সামরিক জোট মুসলিম কিবলা রক্ষার নামে মর্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আজকে ইয়েমেনে সামরিক আগ্রাসন চালাচ্ছে-যদিও মুসলিমদের কিবলা কা’বা আক্রান্ত নয়। বরং মুসলিমদের প্রথম কিবলা বায়তুল মাকদিস গত ষাট বছর ধরে মুসলিমদের চিরশত্রু ইহুদীদের দখলে থাকা সত্ত্বেও এ শাসকগণ এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি, মজলুম ফিলিস্তিনিদের উদ্ধার করতে ও পশ্চিমাদের জারজ সন্তান ঈসরাইলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মিলিয়ে দিতে তাদের ট্যাঙ্ক, বোমারু বিমান, মিসাইলগুলো একবারের জন্য গর্জন করেনি। পবিত্র হিজাজ অঞ্চলে কাফেরদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও সেখানে মুসলিমদের রক্তপিপাসু মার্কিন সেনাবাহিনীকে ঘাঁটি করার অনুমতি দিয়েছে। এ শাসকেরা কখনোই মুসলিম উম্মাহ’র প্রতিনিধিত্ব করেনি, বরং মুসলিম উম্মাহ, ইসলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) এর সাথে ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। বাংলাদেশের শাসকবর্গ সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এ জোটের আগ্রাসনে সমর্থন দিয়েছে।

    বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের পেছনেও রয়েছে এ অঞ্চলকে ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের প্রতিযোগিতা। আওয়ামীলীগ ও বিএনপি মূলত: তাদের প্রভূ ব্রিটেন ও আমেরিকার মদদপুষ্ট। বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণও হল ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যে সমঝোতা না হওয়া। অর্থাৎ অন্যান্য মুসলিম দেশের মত বাংলাদেশে আওয়ামী বিএনপি জোটের রাজনীতিও উপনিবেশবাদীদের অনুকূলে ও খাইরা উম্মাহ’র স্বার্থ পরিপন্থী।

    বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের হারার পেছনে ভারতের ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনায় এ দেশের মুসলিমদের জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখি। পিতার পুরুষাঙ্গ কামড়ানোর মত জঘন্য এ জাতীয়তাবাদী সুরসুরি পশ্চিমা ও ভারতীয় মিডিয়ার মাধ্যমে আরও উস্কে দেয়া হয়। কিন্তু যখন সীমান্তে বিএসএফ কতৃক নির্মমভাবে খায়রা উম্মাহ’র সন্তানদের হত্যা করা হয় তখন মুসলিমদের সেভাবে সরব হতে দেখি না। বাংলাদেশের মুসলিমদের মনে রাখতে হবে যে, ক্রিকেট নিয়ে সরব হলে ঔপনিবেশবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন হয় ও খায়রা উম্মাহ’র জাতীয়তাবাদী পরিচয় সংকট তীব্রতর হয়। বরং এদেশের মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মিশর, সুদান, ইরাক, ইরান, তুরষ্ক, ইয়েমেনসহ গোটা মুসলিম বিশ্বে কা’বা’র চেয়ে পবিত্র খায়রা উম্মাহ’র রক্তক্ষরণের কারণ বিশ্বাসঘাতক শাসকদের বিরুদ্ধে এবং এটাই মুসলিম উম্মাহ’র প্রধান ইস্যু। কেননা গোটা মুসলিম উম্মাহ হল একটি দেহের মত এবং এ দেহের কোথাও ব্যাথা পেলে গোটা দেহ তা অনুভব করে। আর এ উম্মাহ’র প্রভূ এক, রাসূল (সা) এক, কিতাব এক, শান্তি এক, যুদ্ধ এক, কালেমা এক, লক্ষ্য এক- এবং তা হল জান্নাত।

    বাংলাদেশ সহ মুসলিম বিশ্বের শাসকেরা আজকে উম্মাহ’র উপর দূর্যোগের মত। সেকারণে অনতিবিলম্বে বাংলাদেশসহ সব মুসলিম দেশের বিশ্বাসঘাতক শাসকদের অপসারণ করে নব্যুয়তের আদলের খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের সাথে যোগাযোগ ও তাদের সংঘটিত করতে এর জন্য আন্দোলনকারীদের সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা সাধারণ মুসলিমদের প্রধান কর্তব্য। অন্যথায় রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    ‘যখন লোকেরা কাউকে জুলুম করতে দেখে এবং তাকে প্রতিহত করে না, তখন আল্লাহ দ্রুতই তাদের সবাইকে (জালিম ও জুলুম প্রত্যক্ষকারী) আযাবের মধ্যে নিমজ্জিত করেন।’ (তিরমিযী)

    রাফীম আহমেদ

  • আরব বসন্ত – স্বপ্ন থেকে অরাজকতা

    আরব বসন্ত – স্বপ্ন থেকে অরাজকতা

    এখন থেকে দীর্ঘ চার বছর পূর্বে তিউনিশিয়ার এক বাজারে মুহাম্মদ বুয়াজিজী’র আত্মাহুতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের মোবারক, গাদ্দাফী, বেন আলী, বাশার আল আসাদ ও আব্দুল্লাহ সালেহদের মতো ফেরাউন সমতূল্য যে সমস্ত অত্যাচারী আর জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে স্বত:স্ফূর্ত আন্দোলন শুরু হয়েছিল, আরব বসন্ত খ্যাত যে আন্দোলনের মাধ্যমে আরবের নির্যাতিত জনগণ পরিবর্তনের আশার আলো দেখেছিল, আজ সে আন্দোলন সিরিয়া, মিশর, ইয়েমেন, তিউনিসিয়া কিংবা লিবিয়াতে সীমাহীন অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ আর বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়েছে; আর সেইসাথে, প্রতিটি দেশেই আন্দোলন পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থা দাপটের সাথে টিকে আছে। যে আন্দোলনের খাতিরে মানুষ জালিম শাসকের রক্তচক্ষু, ঘাতকের বুলেট কিংবা সামরিক হস্তক্ষেপ এ সবকিছুকে উপেক্ষা করে রাস্তায় নেমেছিল এবং সত্যিকার পরিবর্তনের আশায় দ্বিধাহীন চিত্তে তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিল, সে আন্দোলন আজ নৈরাশ্যের ঘন আঁধারে ডুবে যাবার উপক্রম হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদনান খান এ করুন পরিণতির মূলকারণ হিসাবে চারটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন:

    প্রথমত: যে সব দেশে বিপ্লবী সরকারগুলো সফলতার সাথে যুগ যুগ ধরে ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকা স্বৈরশাসকদের সফল ভাবে ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেলেছে, ক্ষমতার মসনদ অধিষ্ঠিত হবার পর তারা নিজেরাও তাদের পূর্ববর্তীদের মতোই নিজেদের অযোগ্য আর প্রাগমেটিক প্রমাণ করেছে। তিউনিশিয়া ও মিশর এ দুটো দেশেই এন-নাহদা ও মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের দেশের জনগণকে ইসলামী শাসনের স্বপ্ন দেখিয়েছে আর ইসলামকে বিক্রি করেই তারা নির্বাচনে জয় লাভ করেছে; কিন্তু ক্ষমতার যাবার সাথে সাথে তারা পশ্চিমাদের রাজীখুশী করতে সকলক্ষেত্রে একই সাথে পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামকে বাস্তবায়ন না করে, পর্যায়ক্রমে (গ্রাজুয়ালিজম) ইসলাম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছে। দু:খজনক হলেও সত্য যে, এ দলগুলো নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হবার পরেও এবং সংসদীয় ও প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে জনগণের সর্বাত্মক সমর্থন লাভ করার পরেও সত্যিকার ভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। বস্তুত: জনগণের সাথে তারা তাদের কৃত অঙ্গীকার পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এখানে মনে রাখতে হবে যে, যে নির্বাচনে তারা জয় লাভ করেছে সে নির্বাচন পূর্ব থেকেই ক্রটিপূর্ণ। কারণ, এ নির্বাচন গণতান্ত্রিক বা সংসদীয় পন্থায় নির্বাচন, যেখানে মুসলিম উম্মাহ’র দূর্ভোগের প্রধানতম কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সকল উপাদান ও কাঠামো বিদ্যমান আছে। বস্তুত: এদেশগুলোর মুসলিম জনগোষ্ঠী শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন না করে, বেন আলী বা মোবারকের মতো স্বৈরশাসকদের পরিবর্তন করে উদার গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে, যারা তাদের উপর দূর্নীতিগ্রস্থ ও নষ্ট-ভ্রষ্ট একই ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করেছে।

    দ্বিতীয়ত: মধ্যপ্রাচ্য এ পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান হবার কারণে, আর্ন্তজাতিক শক্তিগুলো এ অঞ্চলকে সবসময় তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রনে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে। আর এজন্যই আন্দোলনের শুরু থেকেই আমেরিকা, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন আন্দোলনে নাক গলিয়ে এটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে যে, শাসকের চেহারা পরিবর্তিত হলেও যেন তাদের অনুমোদিত শাসনব্যবস্থা যেন একই থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক আন্দোলনরত দল মনে করে যে, তারা গণতন্ত্র, উদার ব্যক্তিস্বাধীনতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার মতো পশ্চিমা মূল্যবোধকে সমর্থন করলেই পশ্চিমা বিশ্ব স্বৈরাচারী শাসকদের ‍উৎখাতে তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু, তারা এটা বুঝতে ব্যর্থ হয় যে, মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে বিদেশীদের অনুপ্রবেশের সুযোগেই, মার্কিন যু্ক্তরাষ্ট্র মিশরের সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ইসরাইলের সাথে মিশরের কৃত চুক্তি বজায় রেখে এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থরক্ষা করছে। আর, মুরসী মিশরে আভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হলে তাকে পরিত্যাগ করে, “গণতন্ত্রকে সুসংহত” করার উছিলায় সিসি’র সামরিক অভ্যূত্থানকে যুক্তিযুক্ত বলে অভিহিত করেছে। একইভাবে, লিবিয়াতেও ফ্রান্স ও ব্রিটেন মধ্যবর্তী ও স্থায়ী সরকার গঠনে একযোগে কাজ করেছে, যে সরকারের মধ্যে বেশীর ভাগ কর্মকর্তাই গাদ্দাফী আমলের। বস্তুত: মধ্রপ্রাচ্যের রাজনৈতিক শ্রেণীর সাথে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের যে সুসসর্ম্পক তার পেছনে ঐতিহাসিক যোগসূত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী শুধু এ অঞ্চলের পররাষ্টনীতিকেই নিয়ন্ত্রিন করেনি, বরং এদেশগুলোর বিভিন্ন আভ্যন্তরীন সংগঠন, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সুশীলসমাজ সবার উপরেই তাদের ব্যাপক প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে।

    তৃতীয়ত: এ আন্দোলনে জনগণের জন্য ছিল না কোন নীলনকশা, সুদূরপ্রসারী চিন্তা কিংবা শাসককে জবাবদিহিতা করার সঠিক আর সুচিন্তিত কোন পন্থা। বস্তুত: লিবিয়া আর সিরিয়াতে দীর্ঘকাল ব্যাপী কোন বিরোধীদলের অস্তিত্বই ছিল না। আর, মিশর আর ইয়েমেনে যা ছিল, তা শুধুমাত্র নামসর্বস্ব। যার ফলে, যখন জনগণ স্বৈরাচারী সরকারকে উৎখাত করতে সমর্থ হয়েছে, এর পরবর্তী পন্থা কি হবে তা নিয়ে তারা সমস্যায় পতিত হয়েছে এবং পরবর্তীতে, একই শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে তারা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছে, যে শাসনব্যবস্থা নিজেই তাদের দূর্ভোগের মূল কারণ। এ থেকে প্রমাণ হয় যে, যদিও জনসমর্থন পরিবর্তনের পক্ষে কাজ করেছে, কিন্তু এ পরিবর্তনের প্রকৃতি ও গঠন সম্পর্কে জনমনে সুষ্পষ্ট কোন ধারণা না থাকায় বাস্তবে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

    চতুর্থত: অনেক দেশেই স্বৈরশাসককে উৎখাত করার পর পরই আন্দোলনরত দলগুলো একে অন্যের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা দেশগুলোকে অনেকক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। লিবিয়াতে অরাজকতা আর স্বশস্ত্র বাহিনীগুলোর সহিংসতা শেকড় গেড়ে বসেছে, যা তাদের তেল ক্ষেত্রগুলোকে হুমকীর সম্মুখীন করেছে। দেশের সহিংসতা অব্যাহত ভাবে বৃদ্ধির ফলে সমগ্র দেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ছে। সিরিয়াতে পশ্চিমারা মধ্যপন্থী বিদ্রোহী দলগুলোকে সমর্থন করায়, ইসলামপন্থী বিদ্রোহীদের সাথে মডারেট দলগুলোর সংঘর্ষ চলছে। এর মধ্যে আইএসআইএস এর উপস্থিতি পুরো পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ইয়েমেনে হাউতিরা সালেহ সরকারকে উৎখাত করার পর নতুন হাদি সরকার তাদেরকে পূর্বের সরকারের মতো আবারও বঞ্চিত করায় আবারও তারা বর্তমান সরকারকে উৎখাত করে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে দেশটি উত্তর আর দক্ষিণ দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। উত্তর অংশ রয়েছে হাউতিদের দখলে আর দক্ষিণ অংশ রয়েছে পূর্ববর্তী সরকারের দখলে।

    উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশগুলোতে আরব বসন্ত নামক আন্দোলন গত চার বছরে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতা, অর্থনৈতিক স্থবিরতা আর ভয়াবহ অরাজকতা ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনি; উপরন্ত জনগণের এত ত্যাগ আর তিতিক্ষার পরও পূর্বের শাসনব্যবস্থা আগের মতোই শেকড় গেড়ে আছে। আসলে, এ অঞ্চলগুলোতে সত্যিকার পরিবর্তন আনতে হলে এ আন্দোলনকে সঠিক আর সুচিন্তিত পথে পরিচায় করতে হবে, জনগণকে পরিবর্তনের বিষয়ে সঠিক দিকনিদের্শনা দিতে হবে। আর সর্বোপরি, খিলাফত ধ্বংসের পর পশ্চিমা বিশ্ব যে পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা আর ধর্মনিরপেক্ষ মূ্ল্যেবোধের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য সহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে তাদের স্বার্থরক্ষায় এইসব যালিম, নিষ্ঠুর আর স্বৈরশাসক তৈরী করেছে সেই পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থার শেকড় মুসলিম বিশ্ব থেকে সমূলে উৎপাটন করে আবারও নবুয়্যতের আদলে খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

    ফাহমিদা মুন্নী
    (আদনান খানের বিশ্লেষণ অবলম্বনে)

  • নুসরাহ-ই ইসলাম/খিলাফত প্রতিষ্ঠার শরী’আহ সম্মত পদ্ধতি

    নুসরাহ-ই ইসলাম/খিলাফত প্রতিষ্ঠার শরী’আহ সম্মত পদ্ধতি

    সমাজে প্রচলিত ভুল চিন্তা:

    • গণতান্ত্রিক নির্বাচন ইসলাম প্রতিষ্ঠার গ্রহণযোগ্য ও বৈধ পদ্ধতি।
    • কিছু লোক মনে করে জিহাদ বা অস্ত্র ধারণ করা ইসলাম প্রতিষ্ঠার আরেকটি পদ্ধতি।

    নুসরাহ এর বিষয়টি জানার পর কিছু লোক যা বলতে পারে

    • নুসরাহের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীকে উস্কে দিয়ে গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করা হবে।
    • নুসরাহ ক্ষমতা পরিবর্তনের অসাংবিধানিক পদ্ধতি।
    • নুসরাহ অনুসন্ধানের মাধ্যমে সামরিক শাসনের রাস্তাকে সুগম করা হচ্ছে।

    যুক্তিখন্ডন:

     ১. নির্বাচন কোন ব্যবস্থা নয়, বরং নেতা নির্বাচনের একটি উপায় মাত্র। পৃথিবীর ইতিহাসে কোন ব্যবস্থাই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বা প্রতিস্থাপিত হয়নি। যেমন: মদীনাতে ইসলাম, ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, রাশিয়া বা চীনে সমাজতন্ত্র নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং মদীনাতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আউস ও খাজরাজ গোত্রের সামরিক সক্ষমতা সম্পন্ন নেতৃবৃন্দ কতৃক রাসূলুল্লাহ (সা) কে নুসরাহ প্রদানের মাধ্যমে, সাধারণ জনগন ও দার্শনিকদের সাথে শাসক ও যাজকসম্প্রদায়ের শত শত বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মাধ্যমে ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অত্যাচারী জারদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আর গণতন্ত্র হল পুঁজিবাদী জীবনাদর্শের শাসনতন্ত্র যেখানে মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বা আইন প্রণয়নকারী বা বিধানদাতা-যা ইসলামের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। কেননা ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বা আইনপ্রণেতা বা বিধানদাতা এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা {‘আল্লাহ্ ছাড়া আর কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই।’(সূরা ইউসুফ:৪০)}। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন সে ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখার একটি উপায় মাত্র। সুতরাং গনতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা হারাম কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফরজ একটি ইবাদত পালন করার নামান্তর মাত্র। আর ইসলামে হারাম কোন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোন ইবাদত সুসম্পন্ন করা হারাম। যেমন কেউ চুরির মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দান করলে তা আল্লাহ’র কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। আর ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হওয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি অন্য কোন ব্যবস্থা থেকে নেয়ার প্রয়োজন নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহকে(পদ্ধতিকে) অনুসরণ করে নুসরাহ অর্জনের মাধ্যমে সর্বপ্রথম ইসলামিক/খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ এবং অবশ্যই প্রথম খলিফা নির্বাচনের মাধ্যমে আসবেন না। কিন্তু পরবর্তী খলিফাগণ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্বাচিত হতে পারেন যেমনটি হয়েছিল আজ থেকে ১৪০০ বছর আগে উসমান (রা)কে খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে। 

    ২. বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় কে আসীন হবে তা আমেরিকা, ভারত, ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। আর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার এ নির্বাচন একটি আইওয়াশ ও প্রতারণা মাত্র। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মোজেনা ও ভারতীয় রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণসহ সাম্রাজ্যবাদী অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের জোর তৎপরতা ও দৌড়ঝাপ দেখলে এ কথার প্রমাণ পাওয়া যায়। হাসিনা অসংখ্যবার তার বক্তব্যে বলেছে যে, ২০০১ সালে গ্যাস বিক্রি না করায় সে ক্ষমতায় যেতে পারেনি। অর্থাৎ গ্যাস বিক্রি বা দেশের সম্পদ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার সাথে ক্ষমতায় যাওয়া না যাওয়ার সর্ম্পক রয়েছে। সে একবারও বলেনি জগগন তাকে ভোট দেয়নি বলে ক্ষমতায় আসতে পারেনি। তাহলে ২০০১ সালে কী খালেদা গ্যাস বিক্রিসহ দেশের সম্পদ লুট করার লাইসেন্স দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল? ২০০৮ সালে হাসিনা কী এ ধরনের মুচলেকা ও দাসখতের বিনিময়ে ক্ষমতায় এসেছে? সুতরাং হাসিনা খালেদার সুতার নাটাই দেশের বাইরে থাকায় প্রতি পাঁচ বছর পর পর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেদিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেদিনটি হাসিনা খালেদার জন্য হলেও কখনওই সাধারণ জনগনের জন্য উৎসবের দিন নয়, বরং এটি পুরো জাতিকে আহাম্মক বা বোকা বা প্রতারণা করার জন্য একটি নিকৃষ্ট কালো দিবস।  

    ৩. জিহাদ বা অস্ত্র ধারণ করার মাধ্যমে ইসলামিক রাষ্ট্র বা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা শরী’আহ সম্মত নয়। কেননা মদীনাতে প্রথম ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে অস্ত্র ধারণ করার কোন নজির সীরাতে বা কুরআন ও সুন্নাহতে নেই। আমরা মক্কীযুগে কিছু সাহাবীর অস্ত্র ধারণ করা বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিষেধাজ্ঞা মনে করিয়ে দিতে চাই, যখন তিনি (সা) বলেছিলেন,

    ‘আমি ক্ষমা করবার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, সুতরাং যুদ্ধ করো না।’ (সীরাত ইবনে হিসাম)

    এছাড়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে নাজিল করেন যে,

    ‘তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দিতে থাক? অতঃপর যখন তাদের প্রতি জিহাদের নির্দেশ দেয়া হল,…..।’ (সূরা নিসা:৭৭)

    ৪. নির্যাতিত ও বার বার প্রত্যাখাত হওযার পরও রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও আবু বকর, কখনও পালকপুত্র জায়েদ, কখনও আলী (রা) কে সাথে নিয়ে তায়েফের বনু সাকিফ, ইয়েমেনের বনু কিন্দা ছাড়াও বনু শা’সা, বনু নাজির, বনু বিকাহ, বনু কা’বসহ প্রভৃতি গোত্রের সামরিক সক্ষমতা সম্পন্ন গোত্রপ্রধানদের কাছে আল্লাহ’র নির্দেশে নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন। নির্যাতিত ও প্রত্যাখাত হওয়ার পরও এ কাজ নিবিড়ভাবে অব্যাহত রাখায় এটি সুন্নাহ বা পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, কেবলমাত্র দাড়ি রাখা, লম্বা জুব্বা পড়া, মিসওয়াক করা, টুপি পড়াই রাসূল (সা) এর সুন্নাহ বা পদ্ধতি নয়, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ অনুসন্ধান করাও তাঁর (সা) সুন্নাহ বা পদ্ধতি। 

    ৫. নির্বাচিত সরকার বলতে জনসমর্থিত সরকার বা নেতৃবৃন্দ বা শাসককে বুঝানো হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমাদের নবী (সা)-সহ প্রত্যেক নবী (আ) আল্লাহ’র নির্দেশে তৎকালীণ সময়কার স্বীকৃত বা তথাকথিত জনসমর্থিত শাসকদেরকে উৎখাত করে আল্লাহ’র শাসন কায়েম করেছিলেন। যেমন: ইব্রাহিম (আ) নমরুদকে, মুসা (আ) ফেরাউনকে এবং মুহম্মদ (সা) মদীনার জনসমর্থিত ভাবি শাসক আবদুল্লাহ বিন উবাই ও মক্কার জনসমর্থিত শাসকগোষ্ঠী আবু জাহল, আবু লাহাব, ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ, উতবাহ, শাইবাকে উৎখাত করে আল্লাহ’র দ্বীন কায়েম করেছিলেন। তাদেরকে উৎখাত করার যে কারণ ছিল এখনকার তথাকথিত নির্বাচিত শাসকদের ইতিহাসের ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে দেয়ার পেছনেও একই কারণ বিদ্যমান। অর্থাৎ হাসিনা খালেদাসহ মুসলিম বিশ্বের বর্তমানকালের যে কোন শাসকই নমরুদ, ফেরাউন, আবদুল্লাহ বিন উবাই, আবু জাহল, আবু লাহাব, ওয়ালিদ বিন মুগীরাহ, উতবাহ, শাইবার মত ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন ব্যবস্থা দিয়ে মুসলিমদের শাসন করছে। পবিত্র কোরআন অনুসারে এসব শাসকগণ কুফরী করছে, জুলুম করছে ও ফিসক করছে। সেকারণে সামরিকবাহিনীর সহায়তা নিয়ে এইসব জালিম ও ফাসেক শাসকদের উৎখাত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা একটি ফরজ দায়িত্ব এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতি বা সুন্নাহ। 

    ৬. কুফরী সংবিধানের মাধ্যমে মানুষকে আইন তৈরির ক্ষমতা দেয়ায় শাসকগণ নিজের সুবিধামত আইন প্রণয়ন করে শিরক, জুলুম ও কুফরীকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং এটি কুরআন, সুন্নাহ তথা ইসলামের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এ সংবিধান অনুসারে ইসলাম দিয়ে জনগনকে শাসন করা ও সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আর্ন্তজাতিক জীবনসহ সামগ্রিকভাবে ইসলাম পালন করা অসাংবিধানিক। স্বভাবতই এ কারণে নুসরাহ অনুসন্ধান করাও অসাংবিধানিক হবে। কীভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে তা জানার জন্য কেন আমরা মানবরচিত কুফরী সংবিধানের শরণাপন্ন হব? বরং এর জন্য আমাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহ’র শরণাপন্ন হতে হবে।  

    ৭. খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হলে সামরিকবাহিনী রাজনৈতিক কতৃপক্ষের নির্দেশে আমীরুল জিহাদের অধীনে পরিচালিত হবে। পৃথিবীর কোন আদর্শিক রাষ্ট্রে(খিলাফত রাষ্ট্র, পুজিবাদী রাষ্ট্র যেমন: আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন) সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেনি। বরং সামরিক বাহিনী রাজনৈতিক কতৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহ(আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স) অধঃপতিত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখার জন্য সেসব দেশের সামরিক বাহিনীকে ক্যু এর মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে উৎসাহিত করে ও প্রত্যক্ষ মদদ দেয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও অতি সম্প্রতি মিশরে ঘটে যাওয়া তথাকথিত সফল সামরিক অভ্যূত্থানসমূহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষে সংঘটিত হয়েছে। নুসরাহ অনুসন্ধান করার উদ্দেশ্য সামরিক বাহিনীকে শাসন ক্ষমতা দখল করার জন্য উৎসাহিত করা নয়, বরং এর উদ্দেশ্য হল কুফর, জালিম ও ফাসেক গনতান্ত্রিক শাসকদের(হাসিনা, খালেদা) অপসারণ করে নিষ্ঠাবান ইসলামিক রাজনৈতিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনে বস্তুগত সহায়তা প্রদান করা। যে মুসলিম সামরিক অফিসারগণ এ কাজে সহায়তা করবেন তাদের জন্য রয়েছে সা’দ বিন মু’আজ (রা) এর মত দুনিয়ার সম্মান ও গৌরব এবং পরাক্রমশালী আল্লাহ’র সন্তুষ্টি ও মহাপুরষ্কার। 

    রাফীম আহমেদ

  • পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক আদর্শের উনুনে ঝলসানো এক দেশ আজ বাংলাদেশ

    পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক আদর্শের উনুনে ঝলসানো এক দেশ আজ বাংলাদেশ

    বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের ডাকা হরতালের কারণে গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারীর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পেছানো হয়েছে। এর আগে গত রোববারের (২রা ফেব্রুয়ারী) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও একই কারণে পেছানো হয়েছিল।

    পরীক্ষা পেছানোর কথা জানিয়ে গত রোববারই শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পরীক্ষার দিন হরতাল থাকলে তা পরিবর্তন করা হবে। হরতালের কারণে পরীক্ষা পেছানো নতুন কোনো ঘটনা নয়। আমরা ১৯৯৬ সালেও দেখেছি আওয়ামীলীগের ডাকা হরতালের কারণে ৩ মাস এস. এস. সি পরীক্ষা পেছানো হয়েছিল। সরকারের হরতাল পেছানোর উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নয়, বরং ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার নিমিত্তে বিরোধী দলের প্রতি জনগণের আক্রোশ বৃদ্ধিই তার লক্ষ্য। সরকার যদি জনগণের নিরাপত্তার কথাই চিন্তা করতো তবে অফিস আদালত বন্ধ রাখতো, গার্মেন্টস আর মিল কারখানাগুলো বন্ধ রাখতো।

    আজ দিনের আলোর মতো পরিস্কার যে, বিএনপির আন্দোলন ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আর আওয়ামীলীগের আন্দোলন প্রতিরোধ শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। একদিকে বিএনপি জনগণের জান মালের নিরাপত্তার কথা তোয়াক্কা করছে না অন্যদিকে আওয়ামীলীগ তাদের দলীয় স্বার্থে জনগণের পরিশ্রমের টাকা পুরস্কার স্বরূপ দান করছে।

    এ অবস্থার জন্য শুধুমাত্র বি এন পি বা আওয়ামীলীগ দায়ী নয়, বরং এই শাসন ব্যবস্থাই দায়ী যা শাসকবর্গকে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী করে দেয়। আজকের এই অবস্থার জন্য একমাত্র গণতন্ত্রই দায়ী যেখানে শাসকবর্গকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার কোনো ব্যবস্থা নাই। এই দুরাবস্থার জন্য শুধুমাত্র এই শাসন ব্যবস্থাই দায়ী যে শাসন ব্যবস্থা ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্য কয়েকশ ক্ষমতাপিপাসু ও দূর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দেয়।

    এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আজ সময়ের দাবী, এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আজ পুড়ে মরে যাওয়া মানুষদের স্বজনদের দাবী, এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আজ বার্ণ ইউনিটে ঝলসে যাওয়া রোগীদের দাবী, এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আজ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের যাতাকলে পিষ্ট প্রতিটি জনগনের দাবী, এই শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন আমাদের আক্বীদাহ ও ঈমানের দাবী। তাই এখনই আমাদের এই পুঁজিবাদী গণতন্ত্রকে উপড়ে ফেলে দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা তথা খিলাফত পূনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যোগ দিতে হবে। তা না হলে আমাদের উপর শুধু জালিমের জুলুমই নেমে আসবে না বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আযাব ছেয়ে পড়বে।

    আবু দাউদ শরীফে রাসূল (সা) বলেন,

    “যারা কোনো অত্যাচার হতে দেখেও অত্যাচারকারীর হাত ধরে তাকে বিরত না রাখবে, তখন আল্লাহ তাদের সকলকে শাস্তি দিয়ে ছেয়ে ফেলবেন।”

    মিরাজুল হক

  • সুবিধাভোগী রাজনীতির বৃত্তে আবদ্ধ বাংলাদেশ এবং ভুক্তভোগী আমজনতা

    সুবিধাভোগী রাজনীতির বৃত্তে আবদ্ধ বাংলাদেশ এবং ভুক্তভোগী আমজনতা

    বাংলাদেশে এই মুহুর্তে একটি রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ২০১৫ সালের প্রথম থেকেই দুইটি বিবাদমান পক্ষের ক্ষমতার চেয়ারে যাওয়ার দ্বন্দের মাঝখানে পরে অবরোধ – হরতালে, পেট্রোল বোমায়, সংঘর্ষে, পুলিশী নির্যাতনে অসংখ্য মানুষ আহত-নিহত হয়েছে, অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছে, সর্বোপরি পুরো দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পরেছে। এ যেন এক অঘোষিত যুদ্ধের মাঝে পরে গেছে বাংলাদেশ।

    চলমান বাস্তবতার দিকে কেউ এক পলক তাকালে যে কারো কাছেই একটি বিষয় প্রকট ভাবে চোখে পরবে, তা হলো, এই যে মারামারি –হানাহানি, সংঘর্ষ এতে কিন্ত দেশের ঐই সব রাজনীতিবিদ যারা ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বা মসনদে বসার জন্য বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে উসকানি দিচ্ছে, কিংবা টক শো তে বিভিন্ন মতামত দিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেলছে অথবা পত্রিকায় কলাম লিখে পাতা ভরিয়ে ফেলছে ইত্যাদি সহ বুদ্ধিজীবি, সুশীল সমাজ বলে পরিচিত একটি বিশেষ শ্রেনীর মানুষের কোনো সমস্যায় হচ্ছে না, এই দ্বন্দের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শুধুমাত্র সাধারন আমজনতার। এরই ফলে আমরা দেখি, ও লেভেল পরীক্ষা আসলে হরতাল, অবরোধ ইত্যাদিসহ আন্দোলন শিথিল করা হয়, কারন সমাজের এই বিশেষ শ্রেনীর ছেলেমেয়েরা ত ইংলিশ মিডিয়ামেই পরে!!!!! অপরদিকে, এস এস সি বা এইচ এস সি পরীক্ষার মধ্যেও হরতাল চলে, কারন আমজনতার সন্তানরাই ত এই পরীক্ষা দেয়। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় বাংলাদেশের সমাজ আজ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে যার একদিকে আছে আমজনতা এবং অপর দিকে আছে এই তথাকথিত রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি সহ সুশীল সমাজ যাদের কাছে আমজনতার প্রাণের কোনো মুল্য নেই।

    এই দ্বিধাবিভক্ত সমাজের মুলে আছে মানব-রচিত এই গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা, যা দাবী করে যে এটা সকল মানুষের সমানাধিকার সংরক্ষন করে কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই গণতন্ত্র, সমাজের বিশেষ কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয় যারা একে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমত আইন বানিয়ে এর সুফল ভোগ করে আর ভুক্তভোগী হয় আমজনতা। মানুষ যখন এইভাবে আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করে নিজের খেয়াল খুশীর অনুসরন করে তখন এই ধরনের কষ্টকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

    যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জীবনকে আমি কষ্টের জীবনে পরিনত করব।’’ [২০; ১২৪]

    কুরআনে বর্ণিত এই কষ্টের জীবনই কি আমরা যাপন করছি না!! আমরা এমন এক শাসক গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছি যারা আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থাকে এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরন করে আমাদের শাসন করছে এবং যার ফলে সমাজে ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

    তাই আসুন, আমরা এই মানব-রচিত গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এবং যারা এর মসনদে বসে আছে তাদের ছুড়ে ফেলি এবং সেনাবাহিনীসহ দেশের প্রভাবশালী মানুষের কাছে আহ্বান তুলি তারা যেন এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং এই সব দালাল শাসকদের উচ্ছেদ করে খিলাফত রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের হাতে অতি শীঘ্রই ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

    মুনতাসির রাজিব

  • প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহ্’কে ভয় করা

    প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহ্’কে ভয় করা

    অধ্যায় ৫: প্রকাশ্যে এবং গোপনে আল্লাহ্’কে ভয় করা

    আল্লাহ্’কে ভয় করা ফরয এবং যার দলিল হচ্ছে কুর’আন এবং সুন্নাহ্। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কু’রআনে বলেন:

    وَإِيَّايَ فَاتَّقُونِ

    একমাত্র আমাকেই ভয় কর। ” [সূরা আল-বাক্বারা :৪১]

    وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ

    আমি ছাড়া কাউকে ভয় করো না। ” [সূরা আল-বাক্বারা: ৪০]

    إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

    নিশ্চয়ই শয়তান শুধুমাত্র তার বন্ধুগণ হতে তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে; কিন্তু যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তবে তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় করো। ” [সূরা আলি ইমরান: ১৭৫]

    وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর (শাস্তি) সমপর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। ” [সূরা আলি ইমরান: ২৮]

    فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ

    অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো। ” [সূরা আল-মা’য়িদাহ্: ৩]

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ

    হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। ” [সূরা আন-নিসা: ১]

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ

    যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহ্’র নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়ে। ” [সূরা আল-আনফাল: ২]

    وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ ، إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِمَنْ خَافَ عَذَابَ الْآَخِرَةِ ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ ، وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ ، يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ ، فَأَمَّا الَّذِينَ شَقُوا فَفِي النَّارِ لَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌ وَشَهِيقٌ

    আর তোমার পরওয়ারদেগার যখন কোন পাপপূর্ণ জনপদকে পাকড়াও করেন, তখন এমনিভাবেই করে থাকেন। নিশ্চয়ই তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক, কঠিন। নিশ্চয়ই ইহার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্য যে আখিরাতের আযাবকে ভয় করে। উহা এমন একটি দিন, যেদিন সমস্ত মানব সম্প্রদায়কে একসাথে সমবেত করা হবে, সেদিনটি হলো সকলের হাযিরের দিন। আর আমি ওটা শুধু সামান্য কালের জন্যে বিলম্বিত রেখেছি। যখন সেই দিন আসবে তখন কোন ব্যক্তি আল্লাহ্’র অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না। অনন্তর তাদের মধ্যে কতক তো দূর্ভাগা হবে এবং কতক হবে ভাগ্যবান। অতএব, যারা দূর্ভাগা হবে তারা তো দোযখে এই অবস্হায় থাকবে যে, তাতে তাদের চীৎকার ও আর্তনাদ হতে থাকবে। ” [সূরা হুদ: ১০২-১০৬]

    وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ

    এবং যারা বজায় রাখে ঐ সম্পর্ক, যা বজায় রাখতে আল্লাহ্ আদেশ দিয়েছেন এবং স্বীয় পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কঠোর হিসাবের আশঙ্কা রাখে। ” [সূরা রাদ: ২১]

    ذَلِكَ لِمَنْ خَافَ مَقَامِي وَخَافَ وَعِيدِ

    এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম: ১৪]

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ ، يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ

    হে মানব সম্প্রদায়! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিসমৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুত: আল্লাহ্’র আযাব অত্যন্ত কঠিন। ” [সূরা আল-হাজ্জ্ব:১-২]

    وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ

    যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্যে রয়েছে দু’টি উদ্যান (অর্থাৎ, জান্নাতে)। ” [সূরা আর-রহমান: ৪৬]

    مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا

    “তোমাদের কি হল, (যে তোমরা আল্লাহ্-কে (তাঁর শাস্তি) ভয় করছো না, এবং) (আল্লাহ্-এর কাছ থেকে) মানমর্যাদা পাওয়ার মোটেই আশা পোষণ করো না?” [সূরা নুহ: ১৩]

    এর অর্থ হলো তোমাদের কি হলো যে তোমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-এর শ্রেষ্ঠত্বকে ভয় করছো না।

    يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ، وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ، وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ، لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ

    সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতার কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।” [সূরা আবাসা: ৩৪-৩৭]

    সুন্নাহ্-এর দলিলের ক্ষেত্রে বলা যায়, কিছু হাদীসের সরাসরি শব্দ প্রয়োগ (মানতূক) এবং কিছু হাদীসের অন্তর্নিহিত অর্থ (মাফহূম) থেকে আল্লাহ্-কে ভয় করা ফরয হওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে:

    আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলতে শুনেছি :

    শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্-এর আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। তাঁরা হলেন: একজন ন্যায়বিচারক শাসক, একজন যুবক যে আল্লাহ্-এর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, একজন ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদের সাথে সংযুক্ত, দুইজন ব্যক্তি যারা কেবলমাত্র আল্লাহ্-এর ওয়াস্তে একে অপরকে ভালবাসে-যারা একত্রিত হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্নও হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে, যাকে কোন অভিজাত পরিবারের সুন্দরী রমণী অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য আহ্বান জানায় এবং তখন সে বলে, ‘আমি আল্লাহ্-কে ভয় পাই’, একজন লোক যে গোপনে এমনভাবে দান করে যে, সে ডানহাতে দান করলে তার বাম হাত তা জানতে পারে না এবং সে ব্যক্তি যিনি একাকী গোপনে আল্লাহ্-কে স্মরণ করেন এবং অতঃপর তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে।”

    আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:

    “আমি যা জানি যদি তোমরা তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশি। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    ‘আদী বিন হাতিম (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

    বিচার দিবসে তোমাদের কারোই তার এবং আল্লাহ্-এর মাঝে কোন মধ্যস্থতাকারী থাকবে না, সে তার ডানদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না, এবং অতঃপর সে তার বামদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। অতঃপর সে তার সামনে তাকাবে এবং আগুন ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না। এবং সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেই তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচানো উচিত, এমনকি একটি খেজুরের অর্ধাংশ (দান)-এর বিনিময়ে হলেও।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, যিনি বলেছেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন :

    লোকেরা খালি পায়ে, নগ্ন ও খৎনাবিহীন অবস্থায় হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে।” ‘আয়েশা (রা.) বললেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! পুরুষ এবং মহিলাগণ কি একে অপরেরর দিকে তাকাবে?” প্রত্যুত্তরে তিনি (সা) বললেন, “পরিস্থিতি তাদের জন্য এতটাই ভয়াবহ হবে যে তারা এতে মনযোগ দেয়ার কোন সুযোগই পাবে না।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    নু’মান বিন আল-বাশী’র (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন যে:

    “বিচারের দিন যে ব্যক্তি দোযখের অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে কম কষ্ট পাবে, তার পা দুটিকে জ্বলন্ত অঙ্গারের নীচে স্হাপন করা হবে এবং এতে করে তার মগজ ফুটতে থাকবে। ”

    ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    “দুনিয়ার সব মানুষ তার প্রভূর সামনে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে যে, তখন প্রত্যেকে তার ঘামে কানের মধ্যখান পর্যন্ত ডুবে যাবে। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    শেষবিচারের দিন মানুষ এমন অঝোরে ঘামতে থাকবে যে তাদের ঘামে ভৃ-পৃষ্ঠে সত্তর হাত গভীরতা তৈরি হবে, এবং তাদের কান অবদি ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তা থামবে না। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন (ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে), ‘আমার বান্দা যখন কোন পাপ কাজের মনস্থির করে, তবে তোমরা তা তার আমলনামায় লিপিবদ্ধ করো না, যতক্ষন না সে তা সম্পাদন করে। আর যদি সে করে তবে সেটিকে শুধুমাত্র একটি পাপ কাজ হিসেবেই লিপিবদ্ধ করো। কিন্তু যদি সে আমার ভয়ে কাজটি করা থেকে বিরত থাকে, তবে সেটিকে একটি ভালো কাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ করো। আর বান্দা যখন ভালো কাজের মনস্থির করে, অতঃপর তা সম্পাদন না করলেও তার আমলনামায় একটি ভালো কাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ করো, এবং যদি সে তা সম্পাদন করে, তখন সেটিকে দশ থেকে শুরু করে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে লিপিবদ্ধ করো। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    ঈমানদারগণ যদি জানতো যে আল্লাহ্ কী ধরণের শাস্তি মজুদ করে রেখেছেন, তাহলে তাদের কেউ আর জান্নাতের আশা পোষণ করতো না। এবং কাফিররা যদি জানতো আল্লাহ্’র হাতে কত ধরনের রহমত রয়েছে, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশের আশা কখনও ত্যাগ করতো না। ” [মুসলিম]

    ইবনে উমর বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    বনী ইসরাইলের সম্প্রদায়ের কিফল তার খারাপ কাজের জন্য গুনাহ্-এর পরোয়া করতো না। একদিন এক মহিলা তার কাছে এলো এবং সে ঐ মহিলাকে ৬০ দিনার দিল, তার সাথে যিনাহ্’র সম্পর্ক করার উদ্দেশ্যে। যখন কিফল মহিলাটি যিনাহ্’র দিকে আহ্বান করলো, তখন সে (মহিলাটি) ভয়ে থরথর করে কাঁপতে এবং ক্রন্দন করতে লাগলো। সে (কিফল) বলল: তুমি কাঁদছো কেনো? মহিলাটি বলল: এটা এমন এক ধরনের কাজ যা আমি আগে কখনও করিনি। কেবলমাত্র অভাবের তাড়নায় আমি এটা করতে বাধ্য হচ্ছি। কিফল বললো: তুমি এমন করছো কারণ তুমি আল্লাহ্-কে ভয় করো! তবে আমার তো আল্লাহ্-কে এর চেয়ে বেশি ভয় পাওয়া উচিত। যাও; টাকাগুলো নিয়ে চলে যাও, আল্লাহ্’র কসম, আমি কখনোই আর আল্লাহ্’র অবাধ্য হবো না। অতঃপর সে রাতেই কিফল মারা গেলো এবং লোকেরা তার দরজার উপর এই লেখা দেখতো পেলো: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কিফলকে মাফ করে দিয়েছেন’, যা দেখে সবাই বেশ অবাক হয়েছিল।’’ আত্-তিরমিযী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে হাসান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল-হাকিম এটিকে সহীহ্ বলেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন। ইবনে হিব্বান তার সহীহতে এবং আল-বায়হাকী তার আল-শু’আবে তা উল্লেখ করেছেন।

    আবু হুরায়রা (রা.)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন যে, তাঁর রব বলেন:

    আমার ইজ্জতের কসম, আমি আমার বান্দার জন্য দু’বারের জন্য ভয় এবং দু’বারের জন্য সুরক্ষা বয়ে আনবো না। যদি সে দুনিয়াতে আমাকে ভয় করে, তাহলে বিচার দিবসে আমি তাকে সুরক্ষা দিবো। আর দুনিয়াতে সে যদি (আমার ভয়ের ব্যাপারে) নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে, তাহলে আখিরাতে আমি তার জন্য ভয়ের কারণ হবো ” এটি ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহতে উল্লেখ করেন।

    বর্ণিত আছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:

    “যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন:

    হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর। ’’ [সূরা আত-তাহরীম:৬]; একদা রাসূল (সা) সাহাবীগণদের সামনে আয়াতটি তিলাওয়াত করেন, তখন আয়াতটি শুনে এক যুবক অজ্ঞান হয়ে গেলো। রাসূল (সা) বালকটির হৃদপিন্ডের উপর হাত রাখলেন এবং তখনও তার স্পন্দন পেলেন, এবং বালকটিকে বললেন: হে যুবক, বল: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্। যুবকটিও পুনরাবৃত্তি করলো: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: এটা কি আমাদের মধ্য হতে তার জন্য, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)? জবাবে রাসূল (সা) বললেন: তোমরা কি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এ আয়াতটি শুনতে পাওনি:

    “এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে (বিচার দিবসে অথবা আমার শাস্তির ভয়ে) দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকেও ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম :১৪]’’; ইহা আল-হাকিম হতে বর্ণিত এবং তিনি একে যাচাই করেছেন। আয-যাহাবী তার সাথে একমত পোষণ করেছেন।

    বর্ণিত আছে যে, আয়েশা (রা.) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আল্লাহ্ ‘আজ্জা ওয়া যাল্লা-এর নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলওয়াত করলাম:

    এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত, কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। [সূরা আল-মু’মিনুন: ৬০]; তিনি (রা.) আরও যোগ করে বললেন:

    “এরা কি তারা, যারা মদ খায় এবং চুরি করে, (ইত্যাদি)?”- ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী- এরা কি সে ব্যক্তি যারা যিনাহ্ করে, চুরি করে ও মদ খায় যদিও তারা আল্লাহ্ ‘আজ্জা ওয়া যাল্লা-কে ভয় করে? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: না! ওয়াকী’র বর্ণনা অনুযায়ী: না, হে আস-সিদ্দিক-এর কন্যা, বরং তারা হলো যারা রোযা রাখে, সালাত আদায় করে ও দান করে, ইত্যাদি; এবং তারা এই ভয় করে যে তাদের ইবাদত হয়তো আল্লাহ্’র দরবারে কবুল নাও হতে পারে। ” আল-বায়হাকী তার শু’আব আল-ঈমান, আল-হাকিম তার মুসতাদরাক-এ এটিকে সহীহ্ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন।

    সাওবান (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    আমি নিশ্চয়ই জানি, আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক তিহামা সাদা পাহাড়ের ন্যায় নেক কাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকনায় পরিণত করে দিবেন। “সাওবান বললেন, ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), আমাদেরকে তাদের সম্পর্কে অবগত করুন, যাতে অজ্ঞতাবশত: আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যাই!’ তিনি (সা) বললেন, “তারা তোমাদের ভাই, এবং তোমাদের লোকদের মধ্য হতে, এবং তারা রাতগুলোকে সেভাবেই অতিবাহিত করে যেভাবে তোমরা অতিবাহিত করো (অর্থাৎ ইবাদতের মধ্য দিয়ে, ইত্যাদি।), কিন্তু তারা সেই সমস্ত লোক, যারা, যখন একাকী অবস্থায় থাকে তখন হারাম কাজে লিপ্ত থাকে এবং আল্লাহ্’র নিষেধ অমান্য করে।” (ইবনে মাজাহ্) মিজবা’হ্ আজ-জুযা’যাহ্ বইয়ের লেখক আল-কান্নানী হাদিসটিকে সহীহ্ এবং এর বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

    আবদুল্লাহ্ বিন মাস’উদ (রা.) আমাদের দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন; এদের একটি রাসূল (সা) এবং অপরটি তার উপর বর্তায়। বর্ণনাটি নিম্নরূপ:

    একজন ঈমানদারের নিকট তার পাপসমূহ এমন পর্বতের ন্যায় দৃশ্যমান যেন সে তার নীচে বসে আছে এবং তা তার উপর যেকোনো মুহুর্তে ধ্বসে পড়তে পারে। আর একজন খোদাদ্রোহীর কাছে তার গুণাহসমূহ এমন তুচ্ছ মাছির ন্যায় দৃশ্যমান যেন সেটা তার নাকের ডগার সামনে ঘুর্ণিমান এবং সে থাপ্পর দ্বারা সেটাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে…” আল-বুখারী হতে বর্ণিত।

    সা’দ (রা.) বর্ণনা করেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি:

    আল্লাহ্ (সর্বশক্তিমান, সর্বসম্মানিত) সেই বান্দাকে ভালবাসেন, যিনি ত্বাকীঈ’ (অর্থাৎ, আল্লাহ্ ভীরু), ঘানীঈ’ (অর্থাৎ, হৃদয়ের দিক থেকে ধনী) এবং খাফিঈ’ (অর্থাৎ, যে লোক দেখানো কাজ হতে বিরত থাকে)।’’ মুসলিম হতে বর্ণিত।

    উসামাহ্ বিন সুরাইক বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    তোমাদের যেকোনো প্রকারের কাজ যা আল্লাহ্ নিকট অপছন্দীয়, তা হতে দূরে থাকো, বিশেষত: যখন তোমরা একা থাকো। ইবনে হিব্বান তার সহীহতে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন

    আবদুল্লাহ বিন আমর হতে বর্ণিত:

    “রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো; কারা সর্বশ্রেষ্ঠ? জবাবে তিনি (সা) বললেন: প্রত্যেক মাখমুম আল-কালব এবং সৎ জবান সম্পন্ন ব্যক্তি। তারা বললো: সৎ জবান সম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমরা জানি কিন্তু মাখমুম আল-কালব কি? তিনি (সা) বললেন: প্রত্যেক আল্লাহ্ ভীরু ও পবিত্র হৃদয়, যেখানে কোনো পাপ, অন্যায়, ঘৃণা কিংবা শত্রুতা স্থান পায়নি। ” আল-কান্নানী এর ইসনাদকে সহীহ্ বলেছেন এবং আল-বায়হাকী তার সুনানে একইভাবে তা উল্লেখ করেছেন।

    আবু উমা’মাহ্ (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:

    আমার দৃষ্টিতে আমার বন্ধুদের (আউলিয়া’) মধ্যে সবচেয়ে ঈর্ষণীয় ব্যক্তি হলো সেই ঈমানদার যার রয়েছে সামান্য সম্পদ, কিন্তু সালাতে রয়েছে তার গভীর মনোযোগ, যে আল্লাহ্’র ইবাদত করে সর্বোৎকৃষ্ট উপায়ে এবং তাকে (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-কে) সে সবার অগোচরে মান্য করে, এবং সে লোকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেউ নয় এবং তার দিকে কেউ অঙ্গুলি নির্দেশ করে না (লোকেরা তার কাছে ধরনা দেয়না), প্রাপ্ত রিযক তার জন্য যথেষ্ট এবং এতেই সে সন্তুষ্ট। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার আঙ্গুলে টোকা দিলেন এবং বললেন, ‘উপরে উল্লেখিত ব্যক্তি খুব দ্রুত মারা যায় (দ্রুত জীবন পার করে), এবং খুব কম লোক তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এবং সে সামান্য সম্পদ রেখে যায়। ” আত-তিরমিযী হতে বর্ণিত, হাদীসটিকে হাসান আখ্যায়িত করেছেন।

    বাহায বিন হাকিম বর্ণনা করেন যে, বানু কুসাইর মসজিদে জুরা’রাহ্ বিন আবি আও’ফা (রা.) আমাদের নামাজে ইমামতি করছিলেন। তিনি সূরা আল-মুদ্দাস্সির তিলাওয়াত করছিলেন যতক্ষণ না তিনি নীচের আয়াতটিতে পৌছান:

    অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে।” [সূরা মুদ্দাস্সির:৮]; এরপরই তিনি (রা.) পড়ে যান এবং মারা যান। এটি আল-হাকিম হতে বর্ণিত, যিনি ইসনাদকে সহীহ্ বলেছেন।

    ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    যদি তোমাদের কেউ আল-‘আব্বাসের দেখা পাও তবে তাকে হত্যা করো না, কারণ তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। আবু হুযাইফা বিন ‘উতাবা বলেন: ‘আপনি কি আমাদের পিতা, সন্তান ও গোত্রের লোকদের হত্যা করতে চান এবং আল-‘আব্বাসকে ছেড়ে দিতে চান?’ আল্লাহ্’র কসম, আমি যদি তার দেখা পাই তবে আমি তাকে আমার তলোয়ার দিয়ে আঘাত করবো। এ কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কানে পৌছালো, এবং তিনি (সা) ‘উমর বিন আল-খাত্তাব (রা.)-কে বললেন: হে আবু হাফস– এবং উমর (রা.) বর্ণনা করেন যে সেটাই ছিল প্রথমবার যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই নামে সম্বোধন করেছিলেন – আল্লাহ্ রাসূল (সা)-এর চাচার চেহারা কি তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়া উচিত? ‘উত্তরে উমর (রা.) বললেন: আমাকে তার গর্দান হতে মাথা আলাদা করতে দিন, কারণ সে মুনাফেকী প্রদর্শন করেছে। আবু হুযাইফা বলতেন: সেদিনের পর থেকে আমার এই কথার জন্য আমি নিজেকে কখনোই নিরাপদ মনে করতাম না। শাহাদাতের মৃত্যুই যার একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত, তাই আমি সর্বদা ভীত থাকতাম যদি আমার শাহাদাতের মৃত্যুর সৌভাগ্য না হয়। আল-ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন”। আল-হাকিম তার আল-মুসতাদরাক গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন এবং মুসলিম-এর শর্তানুযায়ী একে সহীহ্ বলেছেন।

  • ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্প

    ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্প

    একটি যুক্তি প্রায়ই উপস্থাপিত হয় যে ইসলামী ব্যাংক পুরোপুরি ইসলামী না হলেও মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য এটি আবশ্যক। আরেকটি যুক্তি হল মানুষ যেমন ত্রুটিহীন নয় ইসলামী ব্যাংকও তেমন ত্রুটিহীন নয়, কিন্তু তারা ক্রমাগত চেষ্টা করছে ইসলামী শারিয়াহ যথাযথভাবে অনুসরণ করে ‘ব্যাংকিং’ সেবা দান করার। এবং এই ক্রমাগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ব্যাংকিং-এর একটি যথার্থ ইসলামী বিকল্পধারা তৈরি হবে। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ইসলামী ব্যাংককে সহযোগিতা করা।

    প্রথমেই দেখছি প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। কোন বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা পরিমাপের জন্য একটি মানদণ্ড প্রয়োজন। আমি এখানে সেই মানদণ্ডকে নির্ধারণ করছি “কোন ‘আইনসিদ্ধ অধিকার বাস্তবায়নের জন্য আবশ্যকীয় উপায়” হিসেবে। এখন দেখা যাক ইসলামী ব্যাংক মানুষের কোন কোন মানবিক সমস্যার সমাধান দিচ্ছে এবং তার কোন বিকল্প হতে পারে কিনা।

    (১) অর্থের হেফাজত (Custodial Service): এটি একটি বৈধ অধিকার এবং যেকোনো ব্যাংক থেকেই এই সেবা গ্রহণ করা যায়। এখানে ইসলামের কোন বিধিনিষেধ নেই। সব ব্যাংকের চলতি হিসাব (Current Account) এই সুবিধা প্রদান করে থাকে। ইসলামী ব্যাংক এখানে কোন বিশেষ সেবা প্রদান করেনা। তাই প্র্যজনিয়তার যুক্তিটি এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাচ্ছেনা।

    (২)ব্যবসায়ে অর্থের সংস্থান (Financing Business): ব্যবসায়ে ক্রমাগত অর্থের সংস্থান পাওয়া কারো অধিকারের পর্যায়ভুক্ত নয়। আর অর্থের বিনিময়ে অর্থের সংস্থান তো অবৈধই। ব্যবসা হচ্ছে একাধিক ব্যক্তির শ্রম অথবা শ্রম ও পুঁজির সমন্বয়ে লাভের প্রত্যাশায় উৎপাদন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। এবং এই একত্র হওয়া ব্যক্তিদের পারস্পরিক পরিচিতি তাদের ব্যবসায়িক চুক্তির জন্য অপরিহার্য। ব্যবসা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সুযোগ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত জনদের একত্র করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। কেউ বলতে পারেন এই প্রক্রিয়ায় বৃহৎ পুঁজি গঠন কঠিন। এর উত্তরে বলা যায় বৃহৎ পুঁজি গঠন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তাছাড়া বৃহৎ পুঁজি গঠন কারো অধিকারও নয়। ব্যবসায়ীগন তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসা প্রসারিত করবেন। এটিই সুস্থ চিন্তা।

    (৩) বিনিয়োগ (Investment): উদ্বৃত্ত বিনিয়োগকে ইসলাম উৎসাহিত করে। ইসলামী ব্যাংক বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিনিয়োগকারীর পক্ষে পুঁজি-প্রার্থী ব্যবসার ঝুকি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা (Financial Feasibility) যাচাই, বিনিয়োগ পরামর্শ, এবং উভয়ের ভিতর যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারীর পক্ষে ব্যবসায়ে প্রতিনিধিত্বও (Wakala/Representation) করতে পারে। অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীগণও উত্তম বিনিয়োগকারী সন্ধানের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সেবা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকগুলো অনেকটা Private Equity বা Venture Capital Firm-এর মত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। কাজগুলো যেহেতু ব্যাংকের সংগে বিশিষ্ট নয়, যেকোনো যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই সকল সেবা প্রদান করতে পারে। অর্থাৎ, এই কাজগুলো পরিচালনার জন্য ‘ব্যাংকিং’ লাইসেন্সের কোন প্রয়োজন নেই।

    প্রশ্ন উঠতে পারে অল্প পুঁজির মালিক যার নিয়মিত আয় প্রয়োজন কিন্তু অধিক ঝুকি নিতে সক্ষম নয় সে কিভাবে বিনিয়োগ করবে? এর উত্তরে বলা যায় সামগ্রিক প্রকৃত অর্থনীতি (Real Economy) যদি আয় সৃষ্টি করতে পারে তবে বিনিয়োগকারীগণও তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের উপর আয় করতে সক্ষম। যদিও সমগ্র অর্থনীতির ভিতর কিছু ব্যবসা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিনিয়োগকারীকে অবশ্যই ব্যবসার ঝুকি গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসার অর্থ প্রবাহের প্রকৃতির (Cash Flow Pattern) উপর তার আয় বা লাভ পাওয়ার সময়কাল নির্ধারিত হবে। পূর্ব থেকে এটা নির্ধারণ করা যাবেনা যে বিনিয়োগকারী প্রতি মাসে বা প্রতি বছর ব্যবসা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় পাবে, কারন এটা ব্যবসার প্রকৃতি বিরুদ্ধ। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা অবশ্যই তার বিনিয়োগকৃত ব্যবসার প্রকৃতির সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোন প্রত্যাশা তার চাহিদা বা অধিকার নয়।

    (৪) ভোক্তা ঋণ (Consumer Credit): ভোক্তা ঋণের আওতায় ভোক্তাগন যে সকল দ্রব্য ক্রয় করে থাকে তা তাদের জীবন ধারনের জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন গাড়ি, ফ্রিজ, টিভি, এসি, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি। এই দ্রব্যগুলো শুধু তাদের জীবনযাত্রার মানকে বৃদ্ধি করে এবং তাদের ভোগের সময়কাল এগিয়ে আনে। ভোক্তা সহজেই তার ক্রয়ক্ষমতা অর্জন না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে। তাই এই ধরনের ঋণ তার প্রয়োজনকে প্রতিষ্ঠা করেনা।

    (৫) বৈদেশিক বাণিজ্য (Foreign Trade): আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনা করা মানুষের বৈধ অধিকার। যে কোন ব্যাংকের মাধ্যমে ১০০%-মার্জিন লেটার অব ক্রেডিটের (LC) বিপরীতে আমদানিকারক বিনা সুদে পণ্য আমদানি করতে পারে। অনুরূপভাবে পণ্য রপ্তানিও করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংককে তার সেবার বিনিময়ে শুধু কিছু চার্জ দিতে হয়। সুতরাং, মানুষের এই প্রয়োজন পূরণের বৈধ পন্থা বিদ্যমান। ইসলামী ব্যাংক এখানে অপ্রয়োজনীয়।

    উপরের আলোচনা থেকে এটা বোঝা যায় যে ইসলামী ব্যাংকের অবর্তমানেও মানুষ তাদের বৈধ প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে সক্ষম। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তার যুক্তিটি এখানে ব্যর্থ হচ্ছে। বস্তুতঃ মানুষের বৈধ প্রয়োজনগুলো পূরণের জন্য ‘ব্যাংকিং’ (তার প্রকৃত অর্থে) অপরিহার্য নয়।

    সবশেষে ত্রুটিহীন হবার প্রচেষ্টার যুক্তিটি যাচাই করছি। এটা সত্য যে আমরা কেউ ত্রুটিহীন নই। আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে (Private Sphere) প্রতিনিয়ত পরিশুদ্ধ হবার চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের বিষয়টি জনসাধারণের সংগে লেনদেনের প্রকাশ্য আহবানের (Public Offer) সংগে সম্পর্কিত। কোন আইনের খণ্ডিত অনুসরণের মাধ্যমে সেই আইন অনুসৃত হচ্ছে এমন দাবী গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও তার প্রায়োগিক দুর্বলতা থাকতে পারে। সুতরাং, রূপ ও মাত্রার ভিন্নতার কারনে এই ব্যক্তিগত এবং প্রকাশ্য বিষয়দুটি তুলনাযোগ্য নয়।

    Mahmud Saadiq

  • খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা – ধারা ১

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি হিযবুত তাহরীর প্রণীত “খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা – এর প্রয়োজনীয় দলিলসমূহ, সাধারণ বিধিসমূহ” বইটি থেকে নেওয়া হয়েছে

    ধারা ১

    ইসলামী আক্বীদাহ হলো রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, কাঠামো, জবাবদিহিতা কিংবা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত অন্য কোন বিষয়, যা কিনা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উৎসারিত নয়, তা রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না। একই সময়ে, ইসলামী আক্বীদাহ রাষ্ট্রের সংবিধান এবং আইন-কানুনের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করবে; তাই, সংবিধান এবং আইন-কানুনের সাথে সম্পর্কিত এমন কোন বিষয়ও রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না, যা কিনা ইসলামী আকীদাহ হতে উদ্ভূত নয়।

    দলিলসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

    কোন একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে কিছু নতুন চিন্তার আবির্ভাবের ফলে, যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নতুন চিন্তার আবির্ভাবের দরুণ শাসনক্ষমতারও (জনগণের বিষয়াদি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করার নিয়মতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষ) পরিবর্তন ঘটে, কেননা এই চিন্তাগুলো দৃঢ়বিশ্বাসে পরিণত হওয়ায় তা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। এই দৃঢ় চিন্তাগুলোর উপর ভিত্তি করেই মানুষের কর্মকান্ড বিকশিত হতে থাকে। এভাবে জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তিত হতে থাকে, যার ফলে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গীও পরিবর্তিত হয়। সরকার হচ্ছে এমন কর্তৃপক্ষ যে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের অভিভাবক এবং এগুলোর তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত। ফলে, রাষ্ট্র বিকশিত হয় এবং সরকারব্যবস্থা গড়ে উঠে ঐ ভিত্তিকে কেন্দ্র করে, যে ভিত্তির উপর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে। বলাবাহুল্য, জীবন সম্পর্কে নির্দিষ্ট একটি চিন্তার উপর ভিত্তি করেই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে। তাই, মূলত এ চিন্তাটিই রাষ্ট্র এবং সরকারব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

    যেহেতু একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী বিকশিত হয়, তাই এগুলোকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলোর উপর ভিত্তি করেই সরকার জনগণের বিষয়াদি পরিচালনা করে এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যবস্থাপনা করে। সে কারণে, কোন একটি একক চিন্তার পরিবর্তে একগুচ্ছ চিন্তাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই একগুচ্ছ চিন্তার পরিপূর্ণ প্রভাব জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর উন্মেষ ঘটায়, যার ধারাবাহিকতায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের প্রতিও একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে এবং যার ভিত্তিতে এগুলোর (স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের) ব্যবস্থাপনার জন্য শাসনকর্তৃত্বও নির্ধারিত হয়। সুতরাং, রাষ্টের্র সংজ্ঞা হচ্ছে কোন একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক গৃহীত একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাস বাস্তবায়নকারী একটি নির্বাহী প্রতিষ্ঠান।

    এটি হচ্ছে রাষ্ট্র সম্পর্কিত, যা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা থেকে নিরূপিত, অর্থাৎ যা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ তদারকি করে এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

    বলাবাহুল্য, এই একগুচ্ছ চিন্তা যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাস একটি মৌলিক চিন্তা থেকে উৎসারিত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। যদি রাষ্ট্র একটি মৌলিক চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি মজবুত ভিত্তি এবং দৃঢ় কাঠামো সম্পন্ন হবে, কেননা এটি মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর কারণ হচ্ছে মৌলিক চিন্তা এমন একটি চিন্তা যা অন্য কোন চিন্তা হতে উদ্ভূত নয়, বরং এটা নিজেই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ। ফলে এক্ষেত্রে বলা যাবে যে, রাষ্ট্র একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, রাষ্ট্র যদি কোন মৌলিক চিন্তার উপর ভিত্তি করে গড়ে না উঠে, তবে খুব সহজেই এর পতন সাধিত হবে এবং এর কর্তৃত্ব ও অস্তিত্ব উপড়ে ফেলা খুব কঠিন কিছু হবেনা। কারণ এটি কোন বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই রাষ্ট্রের শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য প্রয়োজন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করে একে প্রতিষ্ঠিত করা, যে আক্বীদাহ হতে রাষ্ট্র সম্পর্কিত অন্যান্য চিন্তাসমূহ উৎসারিত হবে। অর্থাৎ এটি এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ, যা হতে জীবন সম্পর্কে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিফলিত হয় এমন একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাসের উন্মেষ ঘটবে, এবং যার ধারাবাহিকতায় জীবনের প্রতি রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী জন্ম নিবে, যা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের মানদন্ড নির্ধারণ করবে।

    শুধুমাত্র ইসলামী আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, কেননা যে চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাস উম্মাহ (মুসলিমদের সমষ্টি) নিজের মাঝে ধারণ করেছে সেগুলো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ হতে উৎসারিত। প্রথমত, উম্মাহ এ আক্বীদাহ’কে গ্রহণ করেছে এবং সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এটিকেই একমাত্র সত্য আক্বীদাহ হিসেবে আলিঙ্গন করেছে। তাই, এ আক্বীদাহ হতেই সে (উম্মাহ) জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক চিন্তা গ্রহণ করেছে, এবং এরই ভিত্তিতে জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠেছে এবং ঐ সমস্ত বিষয়কে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে যাকে এই আক্বীদাহ অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। এ আক্বীদাহ হতে উৎসারিত জীবন সম্পর্কিত বিভিন্ন চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাসসমূহকেও উম্মাহ গ্রহণ করেছে। আর তাই ইসলামী আক্বীদাহ ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি।

    উপরন্তু রাসূল (সা) একটি নির্দিষ্ট ভিত্তির উপর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাই সকল যুগে, সকল স্থানের জন্যই ইসলামী রাষ্ট্র এই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আহকাম সম্পর্কিত আয়াত নাযিল না হওয়া সত্ত্বেও, মদীনার কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই রাসূল (সা) একে ইসলামী আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিমদের জীবনধারণ, পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়াদি, বিভিন্ন দূর্দশা অপসারণ এবং পারস্পরিক বিবাদ বিসম্বাদ নিরসণের ভিত্তি হিসেবে ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র প্রেরিত রাসূল’ এই সাক্ষ্যকে মানদন্ড হিসেবে প্রতিস্থপন করেন। অন্য কথায়, জীবনের সকল বিষয়, সরকারব্যবস্থা, এবং শাসন কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে একে গ্রহণ করা হয়। তিনি (সা) এখানেই ক্ষান্ত হননি, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা জিহাদের আহকাম নাযিলের মাধ্যমে এই আক্বীদাহ-কে অন্য জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: “আমি (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হয়েছি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যতক্ষণ না তারা ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র প্রেরিত রাসূল’ এ কথার স্বীকৃতি দেয়। যদি তারা তা করে, তবে তাদের জীবন ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ, তবে যেটা আল্লাহ’র আইন (অর্থাৎ শারীআহ লঙঘনে প্রাপ্য শাস্তি) তা ব্যতীত। আর তাদের হিসাব নিকাশ আল্লাহ’র কাছে।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী হতে বর্ণিত]

    এছাড়াও, রাসূল (সা) রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে আক্বীদাহ’র সার্বক্ষণিক উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করতে মুসলিমদের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন। তিনি মুসলিমদেরকে তলোয়ার শাণিত করার নির্দেশ প্রদান করেছেন, যাতে করে শাসন¶মতায় কুফর স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলে অর্থাৎ কর্তৃত্ব এবং আইনের উৎস হতে যদি আক্বীদাহ অপসারিত হয়ে পড়ে, তবে যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া যায়। রাসূল (সাঃ)-এর উক্তি “সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসক” তথা যালিম শাসকদের ব্যাপারে সাহাবাগণ (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করবো না?” তিনি (সাঃ) উত্তর দিলেন, “না, যত¶ন পর্যন্ত তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখে।” [মুসলিম]; তিনি শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্যের বিষয়টি অর্থাৎ বাই’য়াতের (শাসকের প্রতি আনুগত্যের শপথ) বৈধতা সম্পর্কিত করেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না শাসক হতে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হয়। নিকৃষ্ট শাসকদের ব্যাপারে আউফ বিন মালিক (রা.)-এর বর্ণনা হতে পাওয়া যায়, “রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “হে আল্লাহ’র রাসূল (সাঃ) আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করব না?” তিনি (সা) উত্তর দিলেন, “না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম রাখে।” [মুসলিম]; বাইয়াত বিষয়ে উবাদা বিন আস সামিত (রা)-এর বর্ণনা হতে পাওয়া যায়, “… এবং আমরা কর্তৃত্বশীলদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না কুফরের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়”, এবং তাবারানীর বর্ণনায় শব্দগুলো এভাবে এসেছে, “সুস্পষ্ট কুফর”। ইবনে হিব্বানের সহীহ বর্ণনায় বলা হয়েছে, “যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ’র প্রতি অবাধ্যতা সুস্পষ্ট হয়”। এই সবকিছু হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে ইসলামী আক্বীদাহ। যেহেতু, রাসূল (সা) নিজে এর উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, এবং এর সুরক্ষায় তলোয়ার শাণিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এর প্রসারে জিহাদের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

    পূর্বে বর্ণিত নীতিমালার অনুসরণে খসড়া সংবিধানের প্রথম ধারাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ধারাটি রাষ্ট্রকে এমন কোন চিন্তা, দৃঢ়বিশ্বাস কিংবা মাপকাঠিকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছে, যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উৎসারিত নয়। শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী আক্বীদাহ’কে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেই চলবেনা, বরং রাষ্ট্রের যেকোন গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুত্বহীন বিষয়াদির ক্ষেত্রেও আক্বীদাহ’র প্রতিফলন থাকতে হবে। তাই, রাষ্ট্রের পক্ষে জীবন বা শাসন সম্পর্কিত এমন কোন মতবাদ গ্রহণ নিষিদ্ধ যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, কিংবা যার উদ্ভব ঘটেছে ইসলামী আক্বীদাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক অন্য কোন আক্বীদাহ হতে। ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, এমন যেকোন মতবাদ ইসলামী রাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করবে। সে কারণে, ইসলামী রাষ্ট্র, গণতন্ত্রকে মেনে নিবে না, যেহেতু এটি ইসলামী আক্বীদা হতে উদ্ভূত হয়নি এবং এই আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত অন্যান্য চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে, ইসলামী রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করবেনা‌ কারণ এটি ইসলামী আক্বীদাহ হতে আসেনি, বরং ইসলামী আক্বিদাহ হতে উৎসারিত চিন্তাসমূহ একে প্রত্যাখ্যান করেছে, এর অনুমোদন নিষিদ্ধ করেছে এবং এর বিপজ্জনক পরিণতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। একইভাবে, দেশপ্রেমের মত চিন্তারও কোন অস্তিত্ব থাকবেনা, যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয় এবং এর সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোতে গণতন্ত্রের অনুকরণে কোন মন্ত্রী পরিষদ থাকবেনা, এবং এই রাষ্ট্র ব্যবস্হা, সাম্রাজ্যবাদী, রাজতান্ত্রিক কিংবা প্রজাতান্ত্রিক কোন মতবাদের উপর ভিত্তি করেও গড়ে উঠবেনা। কেননা এগুলোর কোনটাই ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, বরং এর সাথে সাংঘর্ষিক। উপরন্তু, ইসলামী আক্বীদাহ বহির্ভূত কোন মতবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা যেকোন ব্যক্তি, দল বা আন্দোলনের জন্য নিষিদ্ধ। তাই, এই ধরনের যেকোন জবাবদিহিতা নিষিদ্ধ এবং অনুরূপভাবে ইসলামী আক্বীদাহ বহির্ভূত মতবাদের ভিত্তিতে কোন দল বা আন্দোলন গড়ে উঠাও নিষিদ্ধ। বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামী আক্বীদাহ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের আবদ্ধ রাখে। কারণ, এর রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা এবং পাশাপাশি তা হতে উৎসারিত হিসেবে জীবনের সকল বিষয়, এবং রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হিসেবে এর সম্পর্কিত সকল কর্মকান্ড, এবং রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হিসেবে এর বিভিন্ন সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হতে হবে এর আক্বীদাহ, অর্থাৎ ইসলামী আক্বীদাহ।

    ধারার ২য় অংশ এ সত্য হতে গৃহীত যে, সংবিধানই হচ্ছে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা (কানুন আল আসাসি), এভাবে এটি নিজেই একটি আইন, আর আইন হচ্ছে কর্তৃপক্ষের জারিকৃত বিধান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা কিছু তাঁর রাসূল (সা)-এর উপর নাযিল করেছেন, তা দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করতে শাসককে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি ঐ সমস্ত শাসককে কাফির আখ্যায়িত করেছেন, যারা আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানকে অপরিপূর্ণ, অযোগ্য মনে করে এবং নিজের বিধানকে উপযুক্ত মনে করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ঐ সকল শাসককে ‘আসি’ (অবাধ্য) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যারা আল্লাহ’র বিধানের পরিবর্তে অন্য বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে, কিন্তু ঐ বিধানকে উপযুক্ত মনে করে না। এ থেকে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শাসকের জারিকৃত বিধান, তথা যেকোন আইন এবং সংবিধান অবশ্যই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা)-এর প্রতি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই হতে হবে। আল্লাহ’র কিতাব এবং তাঁর রাসূল (সা)-এর সুন্নাহ হতে শাসককে শারী’আহ আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনার নির্দেশ সুস্পষ্ট। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ

    “কিন্তু না, তোমার রব-এর শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবেনা, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে। ” [সূরা আন-নিসা: ৬৫] এবং

    وَأَنْ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ

    আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফায়সালা করুন। ” [সূরা আল-মা’য়েদাহ: ৪৯]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর নাযিলকৃত বিধান বহির্ভূত অন্য কোন আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনার ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ণের ক্ষমতাকে তাঁর বিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ

    যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী শাসন করেনা, তারা কাফির। ” [সূরা আল-মা’য়েদাহ: ৪৪]

    এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন কিছু প্রবর্তন করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” [বুখারী]; সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে: “এমন কিছু যা আমাদের দ্বীনের নির্দেশ বহির্ভূত”, এবং ইবনে হাজমের আল-মুহাল্লা এবং ইবনে আবদ আল-বার-এর আল-তামহীদ-এর বর্ণনায় এসেছে: “এমন প্রত্যেকটি কাজ যা আমাদের নির্দেশের ভিত্তিতে নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” এগুলো থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের আইন অবশ্যই ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত হতে হবে; এগুলোই হচ্ছে শারী’আহ আইন, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল-এর উপর নাযিল করেছেন বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, হোক এই নাযিলকৃত বাণীর অর্থ পরিষ্কারভাবে বর্ণিত (explicit); যেগুলোকে কুর’আন, সুন্নাহ এবং সাহাবী (রা.)-দের ইজমা-এর মধ্যে প্রতিফলিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; অথবা হোক এই নাযিলকৃত বাণীর অর্থ পরোক্ষভাবে বর্ণিত (implicit); যেগুলোকে শারী’আহ প্রদত্ত ইল্লাহ (reason)-এর সাথে কিয়াস করে পাওয়া যায় এবং এগুলোকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুমের ইঙ্গিত বহনকারী হুকুম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্যই ধারাটির ২য় অংশকে খসড়ায় স্থান দেয়া হয়েছে।

    সেইসাথে, বান্দার যেকোন কাজ যেহেতু তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নির্দেশে পরিচালিত হতে বাধ্য, তাই তাদের বিভিন্ন বিষয়ের ব্যবস্থাপনাও আল্লাহ’র নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত হতে বাধ্য। ইসলামী শারী’আহ নাযিল করা হয়েছে মানুষের সকল সম্পর্ক পরিচালনা করার জন্য, এ সম্পর্ক হতে পারে স্রষ্টার সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক, ব্যক্তির নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তির সাথে সমাজের সম্পর্ক। শারী’আহ আইনের বাধ্যবাধকতার দরুণ, নিজেদের বিষয়াদি যথেচ্ছভাবে পরিচালনা করার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    وَمَا آتَاكُمْ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

    …রাসূল তোমাদেরকে যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।” [সূরা আল-হাশর: ৭]

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:

    وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلاَ مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمْ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ

    আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে নির্দেশ প্রদান করেন তখন কোন মু’মিন পূরুষ কিংবা মু’মিনা নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন অধিকার থাকবে না। ” [সূরা আল-আহযাব: ৩৬]

    রাসূল (সা) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কিছু বিষয়কে ফরয (অবশ্যই পালনীয়) করেছেন, সুতরাং সেগুলোকে অবহেলা করো না; এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কিছু বিষয়কে হারাম (অবশ্যই বর্জনীয়), সুতরাং সেগুলো লংঘন করো না।” (আবি ছা’লাবাহ হতে আল-দারাকুতনি কতৃক সংকলিত, এবং আল-নববী তার আল-রিয়াদ আল-সালিহিন-এ এটাকে হাসান হিসেবে নিশ্চিত করেছেন)। তিনি (সা) আরও বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের (ইসলাম) মধ্যে এমন নতুন কিছু প্রবর্তন করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি; আয়েশা (রা.) হতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত]

    সুতরাং, এটা সুনিশ্চিত যে, শাসক নয়, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-ই হচ্ছেন আইন প্রণয়নকারী। তিনিই সেই সত্ত্বা, যিনি জনগণ এবং শাসককে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কর্মকান্ডে তাঁর বিধান মেনে চলতে বাধ্য করেছেন, তাঁর বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং অন্য যেকোন বিধান অনুসরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এ কারণে, জনগণের বিষয়াদি পরিচালনার ক্ষেত্রে মানবরচিত বিধানের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং শাসক কর্তৃক মানবরচিত বিধান পালনে জনগণকে বাধ্য করারও কোন সুযোগ নেই।

    পরবর্তী ধারা