Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • সুবিধাভোগী রাজনীতির বৃত্তে আবদ্ধ বাংলাদেশ এবং ভুক্তভোগী আমজনতা

    সুবিধাভোগী রাজনীতির বৃত্তে আবদ্ধ বাংলাদেশ এবং ভুক্তভোগী আমজনতা

    বাংলাদেশে এই মুহুর্তে একটি রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ২০১৫ সালের প্রথম থেকেই দুইটি বিবাদমান পক্ষের ক্ষমতার চেয়ারে যাওয়ার দ্বন্দের মাঝখানে পরে অবরোধ – হরতালে, পেট্রোল বোমায়, সংঘর্ষে, পুলিশী নির্যাতনে অসংখ্য মানুষ আহত-নিহত হয়েছে, অনেকেই নিঃস্ব হয়ে গেছে, সর্বোপরি পুরো দেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পরেছে। এ যেন এক অঘোষিত যুদ্ধের মাঝে পরে গেছে বাংলাদেশ।

    চলমান বাস্তবতার দিকে কেউ এক পলক তাকালে যে কারো কাছেই একটি বিষয় প্রকট ভাবে চোখে পরবে, তা হলো, এই যে মারামারি –হানাহানি, সংঘর্ষ এতে কিন্ত দেশের ঐই সব রাজনীতিবিদ যারা ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য বা মসনদে বসার জন্য বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে উসকানি দিচ্ছে, কিংবা টক শো তে বিভিন্ন মতামত দিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেলছে অথবা পত্রিকায় কলাম লিখে পাতা ভরিয়ে ফেলছে ইত্যাদি সহ বুদ্ধিজীবি, সুশীল সমাজ বলে পরিচিত একটি বিশেষ শ্রেনীর মানুষের কোনো সমস্যায় হচ্ছে না, এই দ্বন্দের ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে শুধুমাত্র সাধারন আমজনতার। এরই ফলে আমরা দেখি, ও লেভেল পরীক্ষা আসলে হরতাল, অবরোধ ইত্যাদিসহ আন্দোলন শিথিল করা হয়, কারন সমাজের এই বিশেষ শ্রেনীর ছেলেমেয়েরা ত ইংলিশ মিডিয়ামেই পরে!!!!! অপরদিকে, এস এস সি বা এইচ এস সি পরীক্ষার মধ্যেও হরতাল চলে, কারন আমজনতার সন্তানরাই ত এই পরীক্ষা দেয়। এথেকে স্পষ্ট হয়ে যায় বাংলাদেশের সমাজ আজ দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে যার একদিকে আছে আমজনতা এবং অপর দিকে আছে এই তথাকথিত রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি সহ সুশীল সমাজ যাদের কাছে আমজনতার প্রাণের কোনো মুল্য নেই।

    এই দ্বিধাবিভক্ত সমাজের মুলে আছে মানব-রচিত এই গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থা, যা দাবী করে যে এটা সকল মানুষের সমানাধিকার সংরক্ষন করে কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই গণতন্ত্র, সমাজের বিশেষ কিছু মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয় যারা একে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ইচ্ছেমত আইন বানিয়ে এর সুফল ভোগ করে আর ভুক্তভোগী হয় আমজনতা। মানুষ যখন এইভাবে আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করে নিজের খেয়াল খুশীর অনুসরন করে তখন এই ধরনের কষ্টকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেছেন,

    যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ হবে, তার জীবনকে আমি কষ্টের জীবনে পরিনত করব।’’ [২০; ১২৪]

    কুরআনে বর্ণিত এই কষ্টের জীবনই কি আমরা যাপন করছি না!! আমরা এমন এক শাসক গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছি যারা আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থাকে এড়িয়ে গিয়ে নিজেদের খেয়াল-খুশীর অনুসরন করে আমাদের শাসন করছে এবং যার ফলে সমাজে ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।

    তাই আসুন, আমরা এই মানব-রচিত গনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এবং যারা এর মসনদে বসে আছে তাদের ছুড়ে ফেলি এবং সেনাবাহিনীসহ দেশের প্রভাবশালী মানুষের কাছে আহ্বান তুলি তারা যেন এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং এই সব দালাল শাসকদের উচ্ছেদ করে খিলাফত রাষ্ট্র কায়েম করার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের হাতে অতি শীঘ্রই ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

    মুনতাসির রাজিব

  • প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহ্’কে ভয় করা

    প্রকাশ্যে ও গোপনে আল্লাহ্’কে ভয় করা

    অধ্যায় ৫: প্রকাশ্যে এবং গোপনে আল্লাহ্’কে ভয় করা

    আল্লাহ্’কে ভয় করা ফরয এবং যার দলিল হচ্ছে কুর’আন এবং সুন্নাহ্। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কু’রআনে বলেন:

    وَإِيَّايَ فَاتَّقُونِ

    একমাত্র আমাকেই ভয় কর। ” [সূরা আল-বাক্বারা :৪১]

    وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ

    আমি ছাড়া কাউকে ভয় করো না। ” [সূরা আল-বাক্বারা: ৪০]

    إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

    নিশ্চয়ই শয়তান শুধুমাত্র তার বন্ধুগণ হতে তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে; কিন্তু যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তবে তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় করো। ” [সূরা আলি ইমরান: ১৭৫]

    وَيُحَذِّرُكُمُ اللَّهُ نَفْسَهُ

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর (শাস্তি) সমপর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন। ” [সূরা আলি ইমরান: ২৮]

    فَلَا تَخْشَوْهُمْ وَاخْشَوْنِ

    অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো। ” [সূরা আল-মা’য়িদাহ্: ৩]

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ

    হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো। ” [সূরা আন-নিসা: ১]

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللَّهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ

    যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহ্’র নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়ে। ” [সূরা আল-আনফাল: ২]

    وَكَذَلِكَ أَخْذُ رَبِّكَ إِذَا أَخَذَ الْقُرَى وَهِيَ ظَالِمَةٌ إِنَّ أَخْذَهُ أَلِيمٌ شَدِيدٌ ، إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً لِمَنْ خَافَ عَذَابَ الْآَخِرَةِ ذَلِكَ يَوْمٌ مَجْمُوعٌ لَهُ النَّاسُ وَذَلِكَ يَوْمٌ مَشْهُودٌ ، وَمَا نُؤَخِّرُهُ إِلَّا لِأَجَلٍ مَعْدُودٍ ، يَوْمَ يَأْتِ لَا تَكَلَّمُ نَفْسٌ إِلَّا بِإِذْنِهِ فَمِنْهُمْ شَقِيٌّ وَسَعِيدٌ ، فَأَمَّا الَّذِينَ شَقُوا فَفِي النَّارِ لَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌ وَشَهِيقٌ

    আর তোমার পরওয়ারদেগার যখন কোন পাপপূর্ণ জনপদকে পাকড়াও করেন, তখন এমনিভাবেই করে থাকেন। নিশ্চয়ই তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক, কঠিন। নিশ্চয়ই ইহার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্য যে আখিরাতের আযাবকে ভয় করে। উহা এমন একটি দিন, যেদিন সমস্ত মানব সম্প্রদায়কে একসাথে সমবেত করা হবে, সেদিনটি হলো সকলের হাযিরের দিন। আর আমি ওটা শুধু সামান্য কালের জন্যে বিলম্বিত রেখেছি। যখন সেই দিন আসবে তখন কোন ব্যক্তি আল্লাহ্’র অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না। অনন্তর তাদের মধ্যে কতক তো দূর্ভাগা হবে এবং কতক হবে ভাগ্যবান। অতএব, যারা দূর্ভাগা হবে তারা তো দোযখে এই অবস্হায় থাকবে যে, তাতে তাদের চীৎকার ও আর্তনাদ হতে থাকবে। ” [সূরা হুদ: ১০২-১০৬]

    وَالَّذِينَ يَصِلُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ وَيَخَافُونَ سُوءَ الْحِسَابِ

    এবং যারা বজায় রাখে ঐ সম্পর্ক, যা বজায় রাখতে আল্লাহ্ আদেশ দিয়েছেন এবং স্বীয় পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কঠোর হিসাবের আশঙ্কা রাখে। ” [সূরা রাদ: ২১]

    ذَلِكَ لِمَنْ خَافَ مَقَامِي وَخَافَ وَعِيدِ

    এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম: ১৪]

    يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمْ إِنَّ زَلْزَلَةَ السَّاعَةِ شَيْءٌ عَظِيمٌ ، يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ وَتَضَعُ كُلُّ ذَاتِ حَمْلٍ حَمْلَهَا وَتَرَى النَّاسَ سُكَارَى وَمَا هُمْ بِسُكَارَى وَلَكِنَّ عَذَابَ اللَّهِ شَدِيدٌ

    হে মানব সম্প্রদায়! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিসমৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুত: আল্লাহ্’র আযাব অত্যন্ত কঠিন। ” [সূরা আল-হাজ্জ্ব:১-২]

    وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ

    যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্যে রয়েছে দু’টি উদ্যান (অর্থাৎ, জান্নাতে)। ” [সূরা আর-রহমান: ৪৬]

    مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا

    “তোমাদের কি হল, (যে তোমরা আল্লাহ্-কে (তাঁর শাস্তি) ভয় করছো না, এবং) (আল্লাহ্-এর কাছ থেকে) মানমর্যাদা পাওয়ার মোটেই আশা পোষণ করো না?” [সূরা নুহ: ১৩]

    এর অর্থ হলো তোমাদের কি হলো যে তোমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-এর শ্রেষ্ঠত্বকে ভয় করছো না।

    يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ، وَأُمِّهِ وَأَبِيهِ ، وَصَاحِبَتِهِ وَبَنِيهِ ، لِكُلِّ امْرِئٍ مِنْهُمْ يَوْمَئِذٍ شَأْنٌ يُغْنِيهِ

    সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতার কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।” [সূরা আবাসা: ৩৪-৩৭]

    সুন্নাহ্-এর দলিলের ক্ষেত্রে বলা যায়, কিছু হাদীসের সরাসরি শব্দ প্রয়োগ (মানতূক) এবং কিছু হাদীসের অন্তর্নিহিত অর্থ (মাফহূম) থেকে আল্লাহ্-কে ভয় করা ফরয হওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে:

    আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলতে শুনেছি :

    শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্-এর আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। তাঁরা হলেন: একজন ন্যায়বিচারক শাসক, একজন যুবক যে আল্লাহ্-এর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, একজন ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদের সাথে সংযুক্ত, দুইজন ব্যক্তি যারা কেবলমাত্র আল্লাহ্-এর ওয়াস্তে একে অপরকে ভালবাসে-যারা একত্রিত হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্নও হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে, যাকে কোন অভিজাত পরিবারের সুন্দরী রমণী অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য আহ্বান জানায় এবং তখন সে বলে, ‘আমি আল্লাহ্-কে ভয় পাই’, একজন লোক যে গোপনে এমনভাবে দান করে যে, সে ডানহাতে দান করলে তার বাম হাত তা জানতে পারে না এবং সে ব্যক্তি যিনি একাকী গোপনে আল্লাহ্-কে স্মরণ করেন এবং অতঃপর তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে।”

    আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:

    “আমি যা জানি যদি তোমরা তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশি। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    ‘আদী বিন হাতিম (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন :

    বিচার দিবসে তোমাদের কারোই তার এবং আল্লাহ্-এর মাঝে কোন মধ্যস্থতাকারী থাকবে না, সে তার ডানদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না, এবং অতঃপর সে তার বামদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। অতঃপর সে তার সামনে তাকাবে এবং আগুন ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না। এবং সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেই তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচানো উচিত, এমনকি একটি খেজুরের অর্ধাংশ (দান)-এর বিনিময়ে হলেও।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    আয়েশা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত, যিনি বলেছেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন :

    লোকেরা খালি পায়ে, নগ্ন ও খৎনাবিহীন অবস্থায় হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে।” ‘আয়েশা (রা.) বললেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! পুরুষ এবং মহিলাগণ কি একে অপরেরর দিকে তাকাবে?” প্রত্যুত্তরে তিনি (সা) বললেন, “পরিস্থিতি তাদের জন্য এতটাই ভয়াবহ হবে যে তারা এতে মনযোগ দেয়ার কোন সুযোগই পাবে না।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    নু’মান বিন আল-বাশী’র (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন যে:

    “বিচারের দিন যে ব্যক্তি দোযখের অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে কম কষ্ট পাবে, তার পা দুটিকে জ্বলন্ত অঙ্গারের নীচে স্হাপন করা হবে এবং এতে করে তার মগজ ফুটতে থাকবে। ”

    ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    “দুনিয়ার সব মানুষ তার প্রভূর সামনে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে যে, তখন প্রত্যেকে তার ঘামে কানের মধ্যখান পর্যন্ত ডুবে যাবে। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    শেষবিচারের দিন মানুষ এমন অঝোরে ঘামতে থাকবে যে তাদের ঘামে ভৃ-পৃষ্ঠে সত্তর হাত গভীরতা তৈরি হবে, এবং তাদের কান অবদি ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তা থামবে না। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন (ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে), ‘আমার বান্দা যখন কোন পাপ কাজের মনস্থির করে, তবে তোমরা তা তার আমলনামায় লিপিবদ্ধ করো না, যতক্ষন না সে তা সম্পাদন করে। আর যদি সে করে তবে সেটিকে শুধুমাত্র একটি পাপ কাজ হিসেবেই লিপিবদ্ধ করো। কিন্তু যদি সে আমার ভয়ে কাজটি করা থেকে বিরত থাকে, তবে সেটিকে একটি ভালো কাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ করো। আর বান্দা যখন ভালো কাজের মনস্থির করে, অতঃপর তা সম্পাদন না করলেও তার আমলনামায় একটি ভালো কাজ হিসেবে লিপিবদ্ধ করো, এবং যদি সে তা সম্পাদন করে, তখন সেটিকে দশ থেকে শুরু করে সাতশত গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে লিপিবদ্ধ করো। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    ঈমানদারগণ যদি জানতো যে আল্লাহ্ কী ধরণের শাস্তি মজুদ করে রেখেছেন, তাহলে তাদের কেউ আর জান্নাতের আশা পোষণ করতো না। এবং কাফিররা যদি জানতো আল্লাহ্’র হাতে কত ধরনের রহমত রয়েছে, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশের আশা কখনও ত্যাগ করতো না। ” [মুসলিম]

    ইবনে উমর বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    বনী ইসরাইলের সম্প্রদায়ের কিফল তার খারাপ কাজের জন্য গুনাহ্-এর পরোয়া করতো না। একদিন এক মহিলা তার কাছে এলো এবং সে ঐ মহিলাকে ৬০ দিনার দিল, তার সাথে যিনাহ্’র সম্পর্ক করার উদ্দেশ্যে। যখন কিফল মহিলাটি যিনাহ্’র দিকে আহ্বান করলো, তখন সে (মহিলাটি) ভয়ে থরথর করে কাঁপতে এবং ক্রন্দন করতে লাগলো। সে (কিফল) বলল: তুমি কাঁদছো কেনো? মহিলাটি বলল: এটা এমন এক ধরনের কাজ যা আমি আগে কখনও করিনি। কেবলমাত্র অভাবের তাড়নায় আমি এটা করতে বাধ্য হচ্ছি। কিফল বললো: তুমি এমন করছো কারণ তুমি আল্লাহ্-কে ভয় করো! তবে আমার তো আল্লাহ্-কে এর চেয়ে বেশি ভয় পাওয়া উচিত। যাও; টাকাগুলো নিয়ে চলে যাও, আল্লাহ্’র কসম, আমি কখনোই আর আল্লাহ্’র অবাধ্য হবো না। অতঃপর সে রাতেই কিফল মারা গেলো এবং লোকেরা তার দরজার উপর এই লেখা দেখতো পেলো: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কিফলকে মাফ করে দিয়েছেন’, যা দেখে সবাই বেশ অবাক হয়েছিল।’’ আত্-তিরমিযী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে হাসান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল-হাকিম এটিকে সহীহ্ বলেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন। ইবনে হিব্বান তার সহীহতে এবং আল-বায়হাকী তার আল-শু’আবে তা উল্লেখ করেছেন।

    আবু হুরায়রা (রা.)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন যে, তাঁর রব বলেন:

    আমার ইজ্জতের কসম, আমি আমার বান্দার জন্য দু’বারের জন্য ভয় এবং দু’বারের জন্য সুরক্ষা বয়ে আনবো না। যদি সে দুনিয়াতে আমাকে ভয় করে, তাহলে বিচার দিবসে আমি তাকে সুরক্ষা দিবো। আর দুনিয়াতে সে যদি (আমার ভয়ের ব্যাপারে) নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে, তাহলে আখিরাতে আমি তার জন্য ভয়ের কারণ হবো ” এটি ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহতে উল্লেখ করেন।

    বর্ণিত আছে যে, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন:

    “যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন:

    হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর। ’’ [সূরা আত-তাহরীম:৬]; একদা রাসূল (সা) সাহাবীগণদের সামনে আয়াতটি তিলাওয়াত করেন, তখন আয়াতটি শুনে এক যুবক অজ্ঞান হয়ে গেলো। রাসূল (সা) বালকটির হৃদপিন্ডের উপর হাত রাখলেন এবং তখনও তার স্পন্দন পেলেন, এবং বালকটিকে বললেন: হে যুবক, বল: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্। যুবকটিও পুনরাবৃত্তি করলো: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: এটা কি আমাদের মধ্য হতে তার জন্য, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)? জবাবে রাসূল (সা) বললেন: তোমরা কি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এ আয়াতটি শুনতে পাওনি:

    “এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে (বিচার দিবসে অথবা আমার শাস্তির ভয়ে) দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকেও ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম :১৪]’’; ইহা আল-হাকিম হতে বর্ণিত এবং তিনি একে যাচাই করেছেন। আয-যাহাবী তার সাথে একমত পোষণ করেছেন।

    বর্ণিত আছে যে, আয়েশা (রা.) বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আল্লাহ্ ‘আজ্জা ওয়া যাল্লা-এর নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলওয়াত করলাম:

    এবং যারা যা দান করবার, তা ভীত, কম্পিত হৃদয়ে এ কারণে দান করে যে, তারা তাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করবে। [সূরা আল-মু’মিনুন: ৬০]; তিনি (রা.) আরও যোগ করে বললেন:

    “এরা কি তারা, যারা মদ খায় এবং চুরি করে, (ইত্যাদি)?”- ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী- এরা কি সে ব্যক্তি যারা যিনাহ্ করে, চুরি করে ও মদ খায় যদিও তারা আল্লাহ্ ‘আজ্জা ওয়া যাল্লা-কে ভয় করে? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: না! ওয়াকী’র বর্ণনা অনুযায়ী: না, হে আস-সিদ্দিক-এর কন্যা, বরং তারা হলো যারা রোযা রাখে, সালাত আদায় করে ও দান করে, ইত্যাদি; এবং তারা এই ভয় করে যে তাদের ইবাদত হয়তো আল্লাহ্’র দরবারে কবুল নাও হতে পারে। ” আল-বায়হাকী তার শু’আব আল-ঈমান, আল-হাকিম তার মুসতাদরাক-এ এটিকে সহীহ্ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং আয-যাহাবী এর সাথে একমত পোষণ করেছেন।

    সাওবান (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    আমি নিশ্চয়ই জানি, আমার উম্মতের মধ্যে কিছু লোক তিহামা সাদা পাহাড়ের ন্যায় নেক কাজ নিয়ে উপস্থিত হবে, কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকনায় পরিণত করে দিবেন। “সাওবান বললেন, ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), আমাদেরকে তাদের সম্পর্কে অবগত করুন, যাতে অজ্ঞতাবশত: আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে যাই!’ তিনি (সা) বললেন, “তারা তোমাদের ভাই, এবং তোমাদের লোকদের মধ্য হতে, এবং তারা রাতগুলোকে সেভাবেই অতিবাহিত করে যেভাবে তোমরা অতিবাহিত করো (অর্থাৎ ইবাদতের মধ্য দিয়ে, ইত্যাদি।), কিন্তু তারা সেই সমস্ত লোক, যারা, যখন একাকী অবস্থায় থাকে তখন হারাম কাজে লিপ্ত থাকে এবং আল্লাহ্’র নিষেধ অমান্য করে।” (ইবনে মাজাহ্) মিজবা’হ্ আজ-জুযা’যাহ্ বইয়ের লেখক আল-কান্নানী হাদিসটিকে সহীহ্ এবং এর বর্ণনাকারীদের বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

    আবদুল্লাহ্ বিন মাস’উদ (রা.) আমাদের দু’টি হাদীস বর্ণনা করেছেন; এদের একটি রাসূল (সা) এবং অপরটি তার উপর বর্তায়। বর্ণনাটি নিম্নরূপ:

    একজন ঈমানদারের নিকট তার পাপসমূহ এমন পর্বতের ন্যায় দৃশ্যমান যেন সে তার নীচে বসে আছে এবং তা তার উপর যেকোনো মুহুর্তে ধ্বসে পড়তে পারে। আর একজন খোদাদ্রোহীর কাছে তার গুণাহসমূহ এমন তুচ্ছ মাছির ন্যায় দৃশ্যমান যেন সেটা তার নাকের ডগার সামনে ঘুর্ণিমান এবং সে থাপ্পর দ্বারা সেটাকে তাড়িয়ে দিচ্ছে…” আল-বুখারী হতে বর্ণিত।

    সা’দ (রা.) বর্ণনা করেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি:

    আল্লাহ্ (সর্বশক্তিমান, সর্বসম্মানিত) সেই বান্দাকে ভালবাসেন, যিনি ত্বাকীঈ’ (অর্থাৎ, আল্লাহ্ ভীরু), ঘানীঈ’ (অর্থাৎ, হৃদয়ের দিক থেকে ধনী) এবং খাফিঈ’ (অর্থাৎ, যে লোক দেখানো কাজ হতে বিরত থাকে)।’’ মুসলিম হতে বর্ণিত।

    উসামাহ্ বিন সুরাইক বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    তোমাদের যেকোনো প্রকারের কাজ যা আল্লাহ্ নিকট অপছন্দীয়, তা হতে দূরে থাকো, বিশেষত: যখন তোমরা একা থাকো। ইবনে হিব্বান তার সহীহতে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন

    আবদুল্লাহ বিন আমর হতে বর্ণিত:

    “রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করা হলো; কারা সর্বশ্রেষ্ঠ? জবাবে তিনি (সা) বললেন: প্রত্যেক মাখমুম আল-কালব এবং সৎ জবান সম্পন্ন ব্যক্তি। তারা বললো: সৎ জবান সম্পন্ন ব্যক্তিদের সম্পর্কে আমরা জানি কিন্তু মাখমুম আল-কালব কি? তিনি (সা) বললেন: প্রত্যেক আল্লাহ্ ভীরু ও পবিত্র হৃদয়, যেখানে কোনো পাপ, অন্যায়, ঘৃণা কিংবা শত্রুতা স্থান পায়নি। ” আল-কান্নানী এর ইসনাদকে সহীহ্ বলেছেন এবং আল-বায়হাকী তার সুনানে একইভাবে তা উল্লেখ করেছেন।

    আবু উমা’মাহ্ (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:

    আমার দৃষ্টিতে আমার বন্ধুদের (আউলিয়া’) মধ্যে সবচেয়ে ঈর্ষণীয় ব্যক্তি হলো সেই ঈমানদার যার রয়েছে সামান্য সম্পদ, কিন্তু সালাতে রয়েছে তার গভীর মনোযোগ, যে আল্লাহ্’র ইবাদত করে সর্বোৎকৃষ্ট উপায়ে এবং তাকে (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-কে) সে সবার অগোচরে মান্য করে, এবং সে লোকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কেউ নয় এবং তার দিকে কেউ অঙ্গুলি নির্দেশ করে না (লোকেরা তার কাছে ধরনা দেয়না), প্রাপ্ত রিযক তার জন্য যথেষ্ট এবং এতেই সে সন্তুষ্ট। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার আঙ্গুলে টোকা দিলেন এবং বললেন, ‘উপরে উল্লেখিত ব্যক্তি খুব দ্রুত মারা যায় (দ্রুত জীবন পার করে), এবং খুব কম লোক তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে এবং সে সামান্য সম্পদ রেখে যায়। ” আত-তিরমিযী হতে বর্ণিত, হাদীসটিকে হাসান আখ্যায়িত করেছেন।

    বাহায বিন হাকিম বর্ণনা করেন যে, বানু কুসাইর মসজিদে জুরা’রাহ্ বিন আবি আও’ফা (রা.) আমাদের নামাজে ইমামতি করছিলেন। তিনি সূরা আল-মুদ্দাস্সির তিলাওয়াত করছিলেন যতক্ষণ না তিনি নীচের আয়াতটিতে পৌছান:

    অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে।” [সূরা মুদ্দাস্সির:৮]; এরপরই তিনি (রা.) পড়ে যান এবং মারা যান। এটি আল-হাকিম হতে বর্ণিত, যিনি ইসনাদকে সহীহ্ বলেছেন।

    ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, বদরের যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    যদি তোমাদের কেউ আল-‘আব্বাসের দেখা পাও তবে তাকে হত্যা করো না, কারণ তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আসতে বাধ্য করা হয়েছে। আবু হুযাইফা বিন ‘উতাবা বলেন: ‘আপনি কি আমাদের পিতা, সন্তান ও গোত্রের লোকদের হত্যা করতে চান এবং আল-‘আব্বাসকে ছেড়ে দিতে চান?’ আল্লাহ্’র কসম, আমি যদি তার দেখা পাই তবে আমি তাকে আমার তলোয়ার দিয়ে আঘাত করবো। এ কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কানে পৌছালো, এবং তিনি (সা) ‘উমর বিন আল-খাত্তাব (রা.)-কে বললেন: হে আবু হাফস– এবং উমর (রা.) বর্ণনা করেন যে সেটাই ছিল প্রথমবার যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই নামে সম্বোধন করেছিলেন – আল্লাহ্ রাসূল (সা)-এর চাচার চেহারা কি তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হওয়া উচিত? ‘উত্তরে উমর (রা.) বললেন: আমাকে তার গর্দান হতে মাথা আলাদা করতে দিন, কারণ সে মুনাফেকী প্রদর্শন করেছে। আবু হুযাইফা বলতেন: সেদিনের পর থেকে আমার এই কথার জন্য আমি নিজেকে কখনোই নিরাপদ মনে করতাম না। শাহাদাতের মৃত্যুই যার একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত, তাই আমি সর্বদা ভীত থাকতাম যদি আমার শাহাদাতের মৃত্যুর সৌভাগ্য না হয়। আল-ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন”। আল-হাকিম তার আল-মুসতাদরাক গ্রন্থে হাদিসটি উল্লেখ করেছেন এবং মুসলিম-এর শর্তানুযায়ী একে সহীহ্ বলেছেন।

  • ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্প

    ইসলামী ব্যাংকিং-এর প্রয়োজনীয়তা ও বিকল্প

    একটি যুক্তি প্রায়ই উপস্থাপিত হয় যে ইসলামী ব্যাংক পুরোপুরি ইসলামী না হলেও মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য এটি আবশ্যক। আরেকটি যুক্তি হল মানুষ যেমন ত্রুটিহীন নয় ইসলামী ব্যাংকও তেমন ত্রুটিহীন নয়, কিন্তু তারা ক্রমাগত চেষ্টা করছে ইসলামী শারিয়াহ যথাযথভাবে অনুসরণ করে ‘ব্যাংকিং’ সেবা দান করার। এবং এই ক্রমাগত প্রচেষ্টার মাধ্যমে ব্যাংকিং-এর একটি যথার্থ ইসলামী বিকল্পধারা তৈরি হবে। তাই আমাদের কর্তব্য হচ্ছে ইসলামী ব্যাংককে সহযোগিতা করা।

    প্রথমেই দেখছি প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি। কোন বিষয়ের প্রয়োজনীয়তা পরিমাপের জন্য একটি মানদণ্ড প্রয়োজন। আমি এখানে সেই মানদণ্ডকে নির্ধারণ করছি “কোন ‘আইনসিদ্ধ অধিকার বাস্তবায়নের জন্য আবশ্যকীয় উপায়” হিসেবে। এখন দেখা যাক ইসলামী ব্যাংক মানুষের কোন কোন মানবিক সমস্যার সমাধান দিচ্ছে এবং তার কোন বিকল্প হতে পারে কিনা।

    (১) অর্থের হেফাজত (Custodial Service): এটি একটি বৈধ অধিকার এবং যেকোনো ব্যাংক থেকেই এই সেবা গ্রহণ করা যায়। এখানে ইসলামের কোন বিধিনিষেধ নেই। সব ব্যাংকের চলতি হিসাব (Current Account) এই সুবিধা প্রদান করে থাকে। ইসলামী ব্যাংক এখানে কোন বিশেষ সেবা প্রদান করেনা। তাই প্র্যজনিয়তার যুক্তিটি এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাচ্ছেনা।

    (২)ব্যবসায়ে অর্থের সংস্থান (Financing Business): ব্যবসায়ে ক্রমাগত অর্থের সংস্থান পাওয়া কারো অধিকারের পর্যায়ভুক্ত নয়। আর অর্থের বিনিময়ে অর্থের সংস্থান তো অবৈধই। ব্যবসা হচ্ছে একাধিক ব্যক্তির শ্রম অথবা শ্রম ও পুঁজির সমন্বয়ে লাভের প্রত্যাশায় উৎপাদন বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করা। এবং এই একত্র হওয়া ব্যক্তিদের পারস্পরিক পরিচিতি তাদের ব্যবসায়িক চুক্তির জন্য অপরিহার্য। ব্যবসা পরিচালনার জন্য যথেষ্ট সুযোগ আমাদের সমাজে বিদ্যমান। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিত জনদের একত্র করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। কেউ বলতে পারেন এই প্রক্রিয়ায় বৃহৎ পুঁজি গঠন কঠিন। এর উত্তরে বলা যায় বৃহৎ পুঁজি গঠন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। তাছাড়া বৃহৎ পুঁজি গঠন কারো অধিকারও নয়। ব্যবসায়ীগন তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যবসা প্রসারিত করবেন। এটিই সুস্থ চিন্তা।

    (৩) বিনিয়োগ (Investment): উদ্বৃত্ত বিনিয়োগকে ইসলাম উৎসাহিত করে। ইসলামী ব্যাংক বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে পারে। তারা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে বিনিয়োগকারীর পক্ষে পুঁজি-প্রার্থী ব্যবসার ঝুকি ও আর্থিক সম্ভাব্যতা (Financial Feasibility) যাচাই, বিনিয়োগ পরামর্শ, এবং উভয়ের ভিতর যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারে। প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগকারীর পক্ষে ব্যবসায়ে প্রতিনিধিত্বও (Wakala/Representation) করতে পারে। অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীগণও উত্তম বিনিয়োগকারী সন্ধানের ক্ষেত্রে ইসলামী ব্যাংকগুলোর সেবা গ্রহণ করতে পারে। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকগুলো অনেকটা Private Equity বা Venture Capital Firm-এর মত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। কাজগুলো যেহেতু ব্যাংকের সংগে বিশিষ্ট নয়, যেকোনো যোগ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই সকল সেবা প্রদান করতে পারে। অর্থাৎ, এই কাজগুলো পরিচালনার জন্য ‘ব্যাংকিং’ লাইসেন্সের কোন প্রয়োজন নেই।

    প্রশ্ন উঠতে পারে অল্প পুঁজির মালিক যার নিয়মিত আয় প্রয়োজন কিন্তু অধিক ঝুকি নিতে সক্ষম নয় সে কিভাবে বিনিয়োগ করবে? এর উত্তরে বলা যায় সামগ্রিক প্রকৃত অর্থনীতি (Real Economy) যদি আয় সৃষ্টি করতে পারে তবে বিনিয়োগকারীগণও তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থের উপর আয় করতে সক্ষম। যদিও সমগ্র অর্থনীতির ভিতর কিছু ব্যবসা ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিনিয়োগকারীকে অবশ্যই ব্যবসার ঝুকি গ্রহণ করতে হবে। ব্যবসার অর্থ প্রবাহের প্রকৃতির (Cash Flow Pattern) উপর তার আয় বা লাভ পাওয়ার সময়কাল নির্ধারিত হবে। পূর্ব থেকে এটা নির্ধারণ করা যাবেনা যে বিনিয়োগকারী প্রতি মাসে বা প্রতি বছর ব্যবসা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় পাবে, কারন এটা ব্যবসার প্রকৃতি বিরুদ্ধ। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর প্রত্যাশা অবশ্যই তার বিনিয়োগকৃত ব্যবসার প্রকৃতির সংগে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোন প্রত্যাশা তার চাহিদা বা অধিকার নয়।

    (৪) ভোক্তা ঋণ (Consumer Credit): ভোক্তা ঋণের আওতায় ভোক্তাগন যে সকল দ্রব্য ক্রয় করে থাকে তা তাদের জীবন ধারনের জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন গাড়ি, ফ্রিজ, টিভি, এসি, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি। এই দ্রব্যগুলো শুধু তাদের জীবনযাত্রার মানকে বৃদ্ধি করে এবং তাদের ভোগের সময়কাল এগিয়ে আনে। ভোক্তা সহজেই তার ক্রয়ক্ষমতা অর্জন না করা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারে। তাই এই ধরনের ঋণ তার প্রয়োজনকে প্রতিষ্ঠা করেনা।

    (৫) বৈদেশিক বাণিজ্য (Foreign Trade): আমদানি ও রপ্তানির মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনা করা মানুষের বৈধ অধিকার। যে কোন ব্যাংকের মাধ্যমে ১০০%-মার্জিন লেটার অব ক্রেডিটের (LC) বিপরীতে আমদানিকারক বিনা সুদে পণ্য আমদানি করতে পারে। অনুরূপভাবে পণ্য রপ্তানিও করতে পারে। এক্ষেত্রে ব্যাংককে তার সেবার বিনিময়ে শুধু কিছু চার্জ দিতে হয়। সুতরাং, মানুষের এই প্রয়োজন পূরণের বৈধ পন্থা বিদ্যমান। ইসলামী ব্যাংক এখানে অপ্রয়োজনীয়।

    উপরের আলোচনা থেকে এটা বোঝা যায় যে ইসলামী ব্যাংকের অবর্তমানেও মানুষ তাদের বৈধ প্রয়োজনগুলো পূরণ করতে সক্ষম। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তার যুক্তিটি এখানে ব্যর্থ হচ্ছে। বস্তুতঃ মানুষের বৈধ প্রয়োজনগুলো পূরণের জন্য ‘ব্যাংকিং’ (তার প্রকৃত অর্থে) অপরিহার্য নয়।

    সবশেষে ত্রুটিহীন হবার প্রচেষ্টার যুক্তিটি যাচাই করছি। এটা সত্য যে আমরা কেউ ত্রুটিহীন নই। আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে (Private Sphere) প্রতিনিয়ত পরিশুদ্ধ হবার চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু ইসলামী ব্যাংকের বিষয়টি জনসাধারণের সংগে লেনদেনের প্রকাশ্য আহবানের (Public Offer) সংগে সম্পর্কিত। কোন আইনের খণ্ডিত অনুসরণের মাধ্যমে সেই আইন অনুসৃত হচ্ছে এমন দাবী গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও তার প্রায়োগিক দুর্বলতা থাকতে পারে। সুতরাং, রূপ ও মাত্রার ভিন্নতার কারনে এই ব্যক্তিগত এবং প্রকাশ্য বিষয়দুটি তুলনাযোগ্য নয়।

    Mahmud Saadiq

  • খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা – ধারা ১

    নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি হিযবুত তাহরীর প্রণীত “খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা – এর প্রয়োজনীয় দলিলসমূহ, সাধারণ বিধিসমূহ” বইটি থেকে নেওয়া হয়েছে

    ধারা ১

    ইসলামী আক্বীদাহ হলো রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, কাঠামো, জবাবদিহিতা কিংবা রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত অন্য কোন বিষয়, যা কিনা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উৎসারিত নয়, তা রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না। একই সময়ে, ইসলামী আক্বীদাহ রাষ্ট্রের সংবিধান এবং আইন-কানুনের ভিত্তি হিসেবেও কাজ করবে; তাই, সংবিধান এবং আইন-কানুনের সাথে সম্পর্কিত এমন কোন বিষয়ও রাষ্ট্রে বিরাজ করতে পারবে না, যা কিনা ইসলামী আকীদাহ হতে উদ্ভূত নয়।

    দলিলসমূহের বিস্তারিত ব্যাখ্যা

    কোন একটি রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে কিছু নতুন চিন্তার আবির্ভাবের ফলে, যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। নতুন চিন্তার আবির্ভাবের দরুণ শাসনক্ষমতারও (জনগণের বিষয়াদি ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা করার নিয়মতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষ) পরিবর্তন ঘটে, কেননা এই চিন্তাগুলো দৃঢ়বিশ্বাসে পরিণত হওয়ায় তা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করে। এই দৃঢ় চিন্তাগুলোর উপর ভিত্তি করেই মানুষের কর্মকান্ড বিকশিত হতে থাকে। এভাবে জীবনের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তিত হতে থাকে, যার ফলে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গীও পরিবর্তিত হয়। সরকার হচ্ছে এমন কর্তৃপক্ষ যে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের অভিভাবক এবং এগুলোর তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত। ফলে, রাষ্ট্র বিকশিত হয় এবং সরকারব্যবস্থা গড়ে উঠে ঐ ভিত্তিকে কেন্দ্র করে, যে ভিত্তির উপর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে। বলাবাহুল্য, জীবন সম্পর্কে নির্দিষ্ট একটি চিন্তার উপর ভিত্তি করেই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে। তাই, মূলত এ চিন্তাটিই রাষ্ট্র এবং সরকারব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

    যেহেতু একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করেই জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী বিকশিত হয়, তাই এগুলোকেই ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এগুলোর উপর ভিত্তি করেই সরকার জনগণের বিষয়াদি পরিচালনা করে এবং জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ব্যবস্থাপনা করে। সে কারণে, কোন একটি একক চিন্তার পরিবর্তে একগুচ্ছ চিন্তাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই একগুচ্ছ চিন্তার পরিপূর্ণ প্রভাব জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর উন্মেষ ঘটায়, যার ধারাবাহিকতায় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের প্রতিও একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে এবং যার ভিত্তিতে এগুলোর (স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের) ব্যবস্থাপনার জন্য শাসনকর্তৃত্বও নির্ধারিত হয়। সুতরাং, রাষ্টের্র সংজ্ঞা হচ্ছে কোন একটি জনগোষ্ঠী কর্তৃক গৃহীত একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাস বাস্তবায়নকারী একটি নির্বাহী প্রতিষ্ঠান।

    এটি হচ্ছে রাষ্ট্র সম্পর্কিত, যা রাষ্ট্রের সংজ্ঞা থেকে নিরূপিত, অর্থাৎ যা জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ তদারকি করে এবং তা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

    বলাবাহুল্য, এই একগুচ্ছ চিন্তা যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থাৎ একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ় বিশ্বাস একটি মৌলিক চিন্তা থেকে উৎসারিত হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। যদি রাষ্ট্র একটি মৌলিক চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি মজবুত ভিত্তি এবং দৃঢ় কাঠামো সম্পন্ন হবে, কেননা এটি মৌলিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর কারণ হচ্ছে মৌলিক চিন্তা এমন একটি চিন্তা যা অন্য কোন চিন্তা হতে উদ্ভূত নয়, বরং এটা নিজেই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ। ফলে এক্ষেত্রে বলা যাবে যে, রাষ্ট্র একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যদিকে, রাষ্ট্র যদি কোন মৌলিক চিন্তার উপর ভিত্তি করে গড়ে না উঠে, তবে খুব সহজেই এর পতন সাধিত হবে এবং এর কর্তৃত্ব ও অস্তিত্ব উপড়ে ফেলা খুব কঠিন কিছু হবেনা। কারণ এটি কোন বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই রাষ্ট্রের শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য প্রয়োজন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করে একে প্রতিষ্ঠিত করা, যে আক্বীদাহ হতে রাষ্ট্র সম্পর্কিত অন্যান্য চিন্তাসমূহ উৎসারিত হবে। অর্থাৎ এটি এমন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ, যা হতে জীবন সম্পর্কে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিফলিত হয় এমন একগুচ্ছ চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাসের উন্মেষ ঘটবে, এবং যার ধারাবাহিকতায় জীবনের প্রতি রাষ্ট্রের একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী জন্ম নিবে, যা জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহের মানদন্ড নির্ধারণ করবে।

    শুধুমাত্র ইসলামী আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, কেননা যে চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাস উম্মাহ (মুসলিমদের সমষ্টি) নিজের মাঝে ধারণ করেছে সেগুলো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আক্বীদাহ হতে উৎসারিত। প্রথমত, উম্মাহ এ আক্বীদাহ’কে গ্রহণ করেছে এবং সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে এটিকেই একমাত্র সত্য আক্বীদাহ হিসেবে আলিঙ্গন করেছে। তাই, এ আক্বীদাহ হতেই সে (উম্মাহ) জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক চিন্তা গ্রহণ করেছে, এবং এরই ভিত্তিতে জীবন সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠেছে এবং ঐ সমস্ত বিষয়কে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে যাকে এই আক্বীদাহ অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। এ আক্বীদাহ হতে উৎসারিত জীবন সম্পর্কিত বিভিন্ন চিন্তা, মাপকাঠি এবং দৃঢ়বিশ্বাসসমূহকেও উম্মাহ গ্রহণ করেছে। আর তাই ইসলামী আক্বীদাহ ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তি।

    উপরন্তু রাসূল (সা) একটি নির্দিষ্ট ভিত্তির উপর ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তাই সকল যুগে, সকল স্থানের জন্যই ইসলামী রাষ্ট্র এই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। আহকাম সম্পর্কিত আয়াত নাযিল না হওয়া সত্ত্বেও, মদীনার কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই রাসূল (সা) একে ইসলামী আক্বীদাহ’র উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) মুসলিমদের জীবনধারণ, পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়াদি, বিভিন্ন দূর্দশা অপসারণ এবং পারস্পরিক বিবাদ বিসম্বাদ নিরসণের ভিত্তি হিসেবে ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র প্রেরিত রাসূল’ এই সাক্ষ্যকে মানদন্ড হিসেবে প্রতিস্থপন করেন। অন্য কথায়, জীবনের সকল বিষয়, সরকারব্যবস্থা, এবং শাসন কর্তৃত্বের ভিত্তি হিসেবে একে গ্রহণ করা হয়। তিনি (সা) এখানেই ক্ষান্ত হননি, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা জিহাদের আহকাম নাযিলের মাধ্যমে এই আক্বীদাহ-কে অন্য জাতির মাঝে ছড়িয়ে দিতে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) বলেছেন: “আমি (আল্লাহ’র পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হয়েছি যেন মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি যতক্ষণ না তারা ‘আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র প্রেরিত রাসূল’ এ কথার স্বীকৃতি দেয়। যদি তারা তা করে, তবে তাদের জীবন ও সম্পদ আমার কাছ থেকে নিরাপদ, তবে যেটা আল্লাহ’র আইন (অর্থাৎ শারীআহ লঙঘনে প্রাপ্য শাস্তি) তা ব্যতীত। আর তাদের হিসাব নিকাশ আল্লাহ’র কাছে।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী হতে বর্ণিত]

    এছাড়াও, রাসূল (সা) রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে আক্বীদাহ’র সার্বক্ষণিক উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করতে মুসলিমদের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন। তিনি মুসলিমদেরকে তলোয়ার শাণিত করার নির্দেশ প্রদান করেছেন, যাতে করে শাসন¶মতায় কুফর স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হলে অর্থাৎ কর্তৃত্ব এবং আইনের উৎস হতে যদি আক্বীদাহ অপসারিত হয়ে পড়ে, তবে যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া যায়। রাসূল (সাঃ)-এর উক্তি “সবচেয়ে নিকৃষ্ট শাসক” তথা যালিম শাসকদের ব্যাপারে সাহাবাগণ (রা.) জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করবো না?” তিনি (সাঃ) উত্তর দিলেন, “না, যত¶ন পর্যন্ত তারা তোমাদের মধ্যে সালাত কায়েম রাখে।” [মুসলিম]; তিনি শাসকের প্রতি জনগণের আনুগত্যের বিষয়টি অর্থাৎ বাই’য়াতের (শাসকের প্রতি আনুগত্যের শপথ) বৈধতা সম্পর্কিত করেছেন ততক্ষণ পর্যন্ত, যতক্ষণ না শাসক হতে সুস্পষ্ট কুফর পরিলক্ষিত হয়। নিকৃষ্ট শাসকদের ব্যাপারে আউফ বিন মালিক (রা.)-এর বর্ণনা হতে পাওয়া যায়, “রাসূল (সা)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, “হে আল্লাহ’র রাসূল (সাঃ) আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ার উত্তোলন করব না?” তিনি (সা) উত্তর দিলেন, “না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম রাখে।” [মুসলিম]; বাইয়াত বিষয়ে উবাদা বিন আস সামিত (রা)-এর বর্ণনা হতে পাওয়া যায়, “… এবং আমরা কর্তৃত্বশীলদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হবো না যতক্ষণ পর্যন্ত না কুফরের চিহ্ন পরিলক্ষিত হয়”, এবং তাবারানীর বর্ণনায় শব্দগুলো এভাবে এসেছে, “সুস্পষ্ট কুফর”। ইবনে হিব্বানের সহীহ বর্ণনায় বলা হয়েছে, “যতক্ষণ পর্যন্ত না আল্লাহ’র প্রতি অবাধ্যতা সুস্পষ্ট হয়”। এই সবকিছু হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে হবে ইসলামী আক্বীদাহ। যেহেতু, রাসূল (সা) নিজে এর উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, এবং এর সুরক্ষায় তলোয়ার শাণিত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং এর প্রসারে জিহাদের নির্দেশ প্রদান করেছিলেন।

    পূর্বে বর্ণিত নীতিমালার অনুসরণে খসড়া সংবিধানের প্রথম ধারাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ধারাটি রাষ্ট্রকে এমন কোন চিন্তা, দৃঢ়বিশ্বাস কিংবা মাপকাঠিকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছে, যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উৎসারিত নয়। শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামী আক্বীদাহ’কে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করলেই চলবেনা, বরং রাষ্ট্রের যেকোন গুরুত্বপূর্ণ কিংবা গুরুত্বহীন বিষয়াদির ক্ষেত্রেও আক্বীদাহ’র প্রতিফলন থাকতে হবে। তাই, রাষ্ট্রের পক্ষে জীবন বা শাসন সম্পর্কিত এমন কোন মতবাদ গ্রহণ নিষিদ্ধ যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, কিংবা যার উদ্ভব ঘটেছে ইসলামী আক্বীদাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক অন্য কোন আক্বীদাহ হতে। ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, এমন যেকোন মতবাদ ইসলামী রাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করবে। সে কারণে, ইসলামী রাষ্ট্র, গণতন্ত্রকে মেনে নিবে না, যেহেতু এটি ইসলামী আক্বীদা হতে উদ্ভূত হয়নি এবং এই আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত অন্যান্য চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে, ইসলামী রাষ্ট্র জাতীয়তাবাদ গ্রহণ করবেনা‌ কারণ এটি ইসলামী আক্বীদাহ হতে আসেনি, বরং ইসলামী আক্বিদাহ হতে উৎসারিত চিন্তাসমূহ একে প্রত্যাখ্যান করেছে, এর অনুমোদন নিষিদ্ধ করেছে এবং এর বিপজ্জনক পরিণতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছে। একইভাবে, দেশপ্রেমের মত চিন্তারও কোন অস্তিত্ব থাকবেনা, যা ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয় এবং এর সাথে সাংঘর্ষিক। একইভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোতে গণতন্ত্রের অনুকরণে কোন মন্ত্রী পরিষদ থাকবেনা, এবং এই রাষ্ট্র ব্যবস্হা, সাম্রাজ্যবাদী, রাজতান্ত্রিক কিংবা প্রজাতান্ত্রিক কোন মতবাদের উপর ভিত্তি করেও গড়ে উঠবেনা। কেননা এগুলোর কোনটাই ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত নয়, বরং এর সাথে সাংঘর্ষিক। উপরন্তু, ইসলামী আক্বীদাহ বহির্ভূত কোন মতবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা যেকোন ব্যক্তি, দল বা আন্দোলনের জন্য নিষিদ্ধ। তাই, এই ধরনের যেকোন জবাবদিহিতা নিষিদ্ধ এবং অনুরূপভাবে ইসলামী আক্বীদাহ বহির্ভূত মতবাদের ভিত্তিতে কোন দল বা আন্দোলন গড়ে উঠাও নিষিদ্ধ। বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামী আক্বীদাহ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে, যা রাষ্ট্র এবং নাগরিকদের আবদ্ধ রাখে। কারণ, এর রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা এবং পাশাপাশি তা হতে উৎসারিত হিসেবে জীবনের সকল বিষয়, এবং রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হিসেবে এর সম্পর্কিত সকল কর্মকান্ড, এবং রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা হিসেবে এর বিভিন্ন সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হতে হবে এর আক্বীদাহ, অর্থাৎ ইসলামী আক্বীদাহ।

    ধারার ২য় অংশ এ সত্য হতে গৃহীত যে, সংবিধানই হচ্ছে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা (কানুন আল আসাসি), এভাবে এটি নিজেই একটি আইন, আর আইন হচ্ছে কর্তৃপক্ষের জারিকৃত বিধান। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা কিছু তাঁর রাসূল (সা)-এর উপর নাযিল করেছেন, তা দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করতে শাসককে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি ঐ সমস্ত শাসককে কাফির আখ্যায়িত করেছেন, যারা আল্লাহ’র নাযিলকৃত বিধানকে অপরিপূর্ণ, অযোগ্য মনে করে এবং নিজের বিধানকে উপযুক্ত মনে করে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ঐ সকল শাসককে ‘আসি’ (অবাধ্য) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যারা আল্লাহ’র বিধানের পরিবর্তে অন্য বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে, কিন্তু ঐ বিধানকে উপযুক্ত মনে করে না। এ থেকে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শাসকের জারিকৃত বিধান, তথা যেকোন আইন এবং সংবিধান অবশ্যই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা)-এর প্রতি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাসের ভিত্তিতেই হতে হবে। আল্লাহ’র কিতাব এবং তাঁর রাসূল (সা)-এর সুন্নাহ হতে শাসককে শারী’আহ আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনার নির্দেশ সুস্পষ্ট। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    فَلاَ وَرَبِّكَ لاَ يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ

    “কিন্তু না, তোমার রব-এর শপথ! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবেনা, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার উপর ন্যস্ত না করে। ” [সূরা আন-নিসা: ৬৫] এবং

    وَأَنْ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ

    আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী ফায়সালা করুন। ” [সূরা আল-মা’য়েদাহ: ৪৯]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর নাযিলকৃত বিধান বহির্ভূত অন্য কোন আইন দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনার ব্যাপারে সতর্ক করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ণের ক্ষমতাকে তাঁর বিধানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ

    যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী শাসন করেনা, তারা কাফির। ” [সূরা আল-মা’য়েদাহ: ৪৪]

    এ ছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন কিছু প্রবর্তন করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” [বুখারী]; সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে: “এমন কিছু যা আমাদের দ্বীনের নির্দেশ বহির্ভূত”, এবং ইবনে হাজমের আল-মুহাল্লা এবং ইবনে আবদ আল-বার-এর আল-তামহীদ-এর বর্ণনায় এসেছে: “এমন প্রত্যেকটি কাজ যা আমাদের নির্দেশের ভিত্তিতে নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” এগুলো থেকে এই ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের আইন অবশ্যই ইসলামী আক্বীদাহ হতে উদ্ভূত হতে হবে; এগুলোই হচ্ছে শারী’আহ আইন, যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল-এর উপর নাযিল করেছেন বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, হোক এই নাযিলকৃত বাণীর অর্থ পরিষ্কারভাবে বর্ণিত (explicit); যেগুলোকে কুর’আন, সুন্নাহ এবং সাহাবী (রা.)-দের ইজমা-এর মধ্যে প্রতিফলিত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; অথবা হোক এই নাযিলকৃত বাণীর অর্থ পরোক্ষভাবে বর্ণিত (implicit); যেগুলোকে শারী’আহ প্রদত্ত ইল্লাহ (reason)-এর সাথে কিয়াস করে পাওয়া যায় এবং এগুলোকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত হুকুমের ইঙ্গিত বহনকারী হুকুম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এজন্যই ধারাটির ২য় অংশকে খসড়ায় স্থান দেয়া হয়েছে।

    সেইসাথে, বান্দার যেকোন কাজ যেহেতু তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নির্দেশে পরিচালিত হতে বাধ্য, তাই তাদের বিভিন্ন বিষয়ের ব্যবস্থাপনাও আল্লাহ’র নির্দেশ অনুযায়ী পরিচালিত হতে বাধ্য। ইসলামী শারী’আহ নাযিল করা হয়েছে মানুষের সকল সম্পর্ক পরিচালনা করার জন্য, এ সম্পর্ক হতে পারে স্রষ্টার সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক, ব্যক্তির নিজের সাথে নিজের সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তির সাথে সমাজের সম্পর্ক। শারী’আহ আইনের বাধ্যবাধকতার দরুণ, নিজেদের বিষয়াদি যথেচ্ছভাবে পরিচালনা করার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    وَمَا آتَاكُمْ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

    …রাসূল তোমাদেরকে যা আদেশ করেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।” [সূরা আল-হাশর: ৭]

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:

    وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلاَ مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمْ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ

    আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন বিষয়ে নির্দেশ প্রদান করেন তখন কোন মু’মিন পূরুষ কিংবা মু’মিনা নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন অধিকার থাকবে না। ” [সূরা আল-আহযাব: ৩৬]

    রাসূল (সা) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ কিছু বিষয়কে ফরয (অবশ্যই পালনীয়) করেছেন, সুতরাং সেগুলোকে অবহেলা করো না; এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কিছু বিষয়কে হারাম (অবশ্যই বর্জনীয়), সুতরাং সেগুলো লংঘন করো না।” (আবি ছা’লাবাহ হতে আল-দারাকুতনি কতৃক সংকলিত, এবং আল-নববী তার আল-রিয়াদ আল-সালিহিন-এ এটাকে হাসান হিসেবে নিশ্চিত করেছেন)। তিনি (সা) আরও বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের (ইসলাম) মধ্যে এমন নতুন কিছু প্রবর্তন করে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত। ” [মুত্তাফাকুন আলাইহি; আয়েশা (রা.) হতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত]

    সুতরাং, এটা সুনিশ্চিত যে, শাসক নয়, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-ই হচ্ছেন আইন প্রণয়নকারী। তিনিই সেই সত্ত্বা, যিনি জনগণ এবং শাসককে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং কর্মকান্ডে তাঁর বিধান মেনে চলতে বাধ্য করেছেন, তাঁর বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং অন্য যেকোন বিধান অনুসরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। এ কারণে, জনগণের বিষয়াদি পরিচালনার ক্ষেত্রে মানবরচিত বিধানের কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং শাসক কর্তৃক মানবরচিত বিধান পালনে জনগণকে বাধ্য করারও কোন সুযোগ নেই।

    পরবর্তী ধারা

  • ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং

    ব্যাংকিং ও ইসলামী ব্যাংকিং

    যে কোন বিষয় সম্বন্ধে সম্যক ধারনা পাওয়া যায় যখন সেই বিষয়টি সামগ্রিক সামাজিক কাঠামোর অধীনে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী ব্যাংকিং এর বিষয়টিও তেমনই। ধনতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ব্যাঙ্কিং এর একটি বিশেষ ভূমিকা আছে। এই বিশেষ ভূমিকার কারনে ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসা’ অন্যান্য ‘ব্যবসা/বাণিজ্য’ থেকে পৃথক। তার আইনি কাঠামোও পৃথক। ব্যাঙ্কিং ব্যবসা ছাড়া অন্য কোন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের নামের সঙ্গে ‘ব্যাংক’ শব্দটি যুক্ত করতে পারেনা (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৮)। ব্যাঙ্ক-কোম্পানি বলতে বাংলাদেশে ব্যাংক ব্যবসা পরিচালনাকারী কোন কোম্পানিকে বুঝায় (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৭(ণ))। এই ধারার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে যে সকল কোম্পানি পণ্য উৎপাদন বা বাণিজ্য পরিচালনা করে এবং শুধুমাত্র এই উৎপাদন বা বানিজ্যের অর্থ সংস্থানের জন্য জনগণের নিকট থেকে টাকার আমানত গ্রহণ করে সেই সকল কোম্পানি ব্যাংক ব্যবসা করছে বলে গণ্য হবেনা। ব্যাংক ব্যবসা বলতে অর্থ কর্জ প্রদান বা বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে জনসাধারণের নিকট থেকে এইরূপ আমানত গ্রহণ করা, যা চাহিবা মাত্র বা অন্য কোনভাবে পরিশোধযোগ্য, এবং চেক, ড্রাফ্‌ট, আদেশ বা অন্যকোন পদ্ধতিতে প্রত্যাহারযোগ্য (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৫(ত))। অর্থাৎ কোন ব্যাংক পণ্য উৎপাদন বা প্রকৃত বানিজ্য পরিচালনা করতে পারেনা। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে ইসলামী ব্যাঙ্কিংসহ সব ধরনের ব্যাঙ্কিং এই ব্যাঙ্কিং সঙ্ঘার পরিধির ভিতর পরিচালিত হয়, যা সাধারণ ব্যবসা/বানিজ্য থেকে পৃথক। ইসলামী ব্যাঙ্কিং পরিচালনার বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার (Guidelines) প্রথম সেকশনে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। নীতিমালায় বালা হচ্ছেঃ “ This guideline has been prepared mainly on the basis of Banking Companies Act 1991, Companies Act 1994, and Prudential Regulations of Bangladesh Bank. However, this guideline should be treated as supplimentary, not substitute, to the existing banking laws, rules and regulations. In case of any point not covered under this guideline as also in case of any contradiction, the instruction issued under the Banking Companies Act and Companies Act will prevail.”

    সরকারের রাজস্বনীতি (Fiscal Policy) বাস্তবায়বনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) প্রয়োজনীয় মুদ্রানীতি (Monetary Policy) গ্রহন করে থাকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই মুদ্রানীতি মূলত ব্যাংক-কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে থাকে। অর্থাৎ ব্যাংক হচ্ছে এই সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার নির্ধারণ ও বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ব্যাঙ্কগুলোর প্রধান কাজ হচ্ছে আমানত গ্রহণ ও ঋণ প্রদান। অর্থাৎ, সংগ্রহীত আমানতের একটি অংশ গচ্ছিত রেখে বাকি অর্থ ঋণ প্রদান করা। কিন্তু এই প্রদানকৃত ঋণ আমানতদাতার (Depositor) আমানতকে হ্রাস করেনা। বরং আমানতদাতা যেকোন সময় তার আমানত উত্তোলন করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটিকে ব্যাঙ্কিং পরিভাষায় Fractional Reserve Banking বলা হয়। এই ক্রমাগত নতুন ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) মাধ্যমে ব্যাঙ্কগুলো নতুন অর্থ সৃষ্টি ও তার প্রবাহ বৃদ্ধি করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকসহ সকল ব্যাংকের কার্যক্রমকে সরকারের এই মৌল উদ্দেশ্য সাধনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হয়। ঋণ সৃষ্টির এই মৌলিক চরিত্র রক্ষার জন্যই ব্যাংকের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সীমিত করা হয়। অর্থাৎ, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকেও এই ঋণ সৃষ্টির আলোকে যাচাই করতে হবে।

    কিন্তু ইসলামী ব্যাংক সরকারের এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাহ্যত একমত প্রকাশ করেনা। আদর্শগত কারনে ইসলামী ব্যাংক দাবী করে যে তারা সুদ ভিত্তিক ঋণ প্রদান করেনা, বরং তারা মুলত বাণিজ্য (Trading) বা উৎপাদনে মূলধনী বিনিয়োগ (Equity Investment) করে থাকে। ইসলামী ব্যাংকের এই ব্যবসায়িক দাবী আইনসংগত ‘ব্যাঙ্কিং ব্যবসার’ পরিপন্থী, যা আগেই উল্লেখ করেছি। বিপরীতমুখী দুটি ধারনার সমন্বয়ের এই অসম্ভব প্রচেষ্টার কারনে ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম ও তাদের দালিলিক উপস্থাপনার ভিতর বিস্তর পার্থক্য, অসংগতি এবং জটিলতা দেখা যায়।

    উপরন্তু, ইসলামী ব্যাংক নিয়ে আমাদের সমাজের ধারনার মাঝেও সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। ব্যাংকের ঋণপ্রদানকারী চরিত্রই আমাদের সমাজের সাধারণ মানুষের ধারনায় উপস্থিত। ইসলামী ব্যাংক এখানে কোন ব্যতিক্রম নয়। ইসলামী ব্যাংকের সহযোগিতায় যদি আপনি একটি গাড়ি কিনেন তবে আপনি সাধারণভাবে মনে করেননা যে গাড়িটি আপনি ইসলামী ব্যাংক থেকে কিনেছেন। বরং মনে করেন আপনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে (অর্থাৎ ঋণ নিয়ে) গাড়িটি কিনেছেন। আমরা সাধারণভাবে বলিনা যে ইসলামী ব্যাংক ভাল গাড়ি বিক্রি করে। যদিও এখানে দালিলিকভাবে ইসলামী ব্যাংক গাড়ি বিক্রেতা এবং আপনি গাড়ি ক্রেতা। অনুরূপভাবে কোন শিল্পপতি ইসলামী ব্যাংকের সহায়তায় কাঁচামাল ক্রয় করলে সাধারণভাবে তিনি মনে করেননা যে ইসলামী ব্যাংক তার ব্যবসায়ের অংশীদার। বরং মনে করেন কাঁচামাল তিনি ইসলামী ব্যাংকের অর্থায়নে কিনেছেন। সুতরাং, দেখা যায় ইসলামী ব্যাঙ্কিং এর ক্ষেত্রে সেবা গ্রহীতা ও সেবা প্রদানকারীর মাঝে ধারণাগত ঐক্য নেই, যা তাদের চুক্তিকে বাতিল বা অকার্যকর করে দেয়। আলোচনাটি এখানেই শেষ করে দেয়া যায়। তবু অধিকতর অনুধাবনের স্বার্থে প্রধান অসংগতিগুলোকে আরও বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

    লেনদেন ও পরিচালনার প্রকৃতি:

    যেহেতু ব্যাংকিং লেনদেন একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ সুদের হার নিয়ত্রন ও ঋণ সৃষ্টির জন্য, পরিচালিত হয়, সেহেতু তার লেনদেনের প্রকৃতিকে সীমাবদ্ধ করতে হয়। আইন ব্যাংকগুলোকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোন পণ্যের ক্রয়, বিক্রয় বা বিনিময় ব্যবসা করতে অনুমোদন দেয়না (ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১, ধারা-৯)। অবশ্য এখানে ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই ধারাটি শিথিল করা হয়েছে। এখানে অনুধাবনের বিষয় হচ্ছে তাদের অনুসৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতি অবশ্যই প্রকৃত বানিজ্যের অনুরূপ নয়। প্রকৃত বানিজ্যিক লেনদেন (Real Commercial Transaction) অর্থনীতিতে ঋণ সৃষ্টিতে কোন ভূমিকা রাখেনা। তাই এই ধরনের প্রকৃত বাণিজ্যিক লেনদেন ব্যাঙ্কিং কোম্পানির আওতা বহির্ভূত এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও নিয়ত্রন ও তত্ত্বাবধানের সীমার বাইরে। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক তাদের এই ক্রয়-বিক্রয় পদ্ধতিতে এমন বৈশিষ্ট্য আরোপ করে যাতে তা চূড়ান্ত বিচারে ঋণ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকে ব্যহত না করে। এ কারনেই প্রচলিত (Conventional) ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন পদ্ধতির মাঝে প্রচুর সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন,

    (১) আমানতদাতাকে প্রদেয় এবং বিনিয়োগ থেকে অর্জিত লাভের হার (Mark-up) প্রচলিত ব্যাংকের সুদের হারের সঙ্গে মিল রেখে নির্ধারণ করা হয়। কারন লাভ বা সুদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। অপরপক্ষে, প্রকৃত বাণিজ্যের লাভ বাজার চাহিদা ও ব্যবসায়িক ঝুকির উপর নির্ভরশীল, কোন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয় নয়।

    (২) ইসলামী ব্যাংক এবং প্রচলিত ব্যাংক প্রায় একই ধরনের পুঁজির পর্যাপ্ততা (Capital Adequacy), Statutory Reserve, সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা (Asset-Liability Management), ঝুকি বিশ্লেষণ (Risk Analysis), বিনিয়োগকৃত সম্পদের শ্রেণীকরণ ইত্যাদির নীতি মেনে চলে। স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো অনুসরণের কোন প্রাসঙ্গিকতা নেই।

    (৩) মূলধন বিনিয়োগের (Equity Investment) ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি সীমা নির্ধারণ করে দেয়, বর্তমানে যা হচ্ছে মোট মূলধন (Total Equity) এর সর্বোচ্চ ২৫%। এই সীমা কোন ব্যাংকের মোট বিনিয়োগের (Debt and Equity) সামান্য অংশ। বিনিয়োগের এই সীমা ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং, ইসলামী ব্যাংক এই সীমার অতিরিক্ত মূলধনী বিনিয়োগের (Equity Investment) যে সকল উপায় (Instruments) অবলম্বন করে থাকে তা মূলধনের চরিত্র ধারন করেনা, বরং চূড়ান্ত বিচারে তা হয় ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন (Quasi Debt)। যেমন, (ক) বিনিয়োগের উপর লাভের হার নির্ধারণ এবং অর্জিত লাভ বিতরণে (আমানতদাতাদের মাঝে) ‘অতিক্রান্ত সময়’ কে বিবেচনায় আনা, (খ) বিনিয়োগের উপর ইসলামী ব্যাংকের দাবী (Claim) ঐ ব্যবসায় প্রকৃত মূলধনদাতাদের দাবীর উপরে স্থাপন করা বা অন্যান্য ঋণ সরবরাহকারী ব্যাংকের দাবীর সমপর্যায়ে রাখা, (গ) বিনিয়োগ/ঋণ পুনঃতফসিল (Loan Rescheduling) এর বিধি অনুসরণ করা, ইত্যাদি। ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগের এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই বিনিয়োগগুলোকে তাদের নীতির অধীনেই গ্রহণ করে থাকে, অর্থাৎ ধরে নেয়া হয় ইসলামী ব্যাংক বিনিয়োগের এই সীমা অতিক্রম করেনি।

    বিনিয়োগ প্রবাহে জটিলতা:

    ইসলামী ব্যাংক আমানতদাতার কাছ থেকে ব্যবসার ব্যবস্থাপক (মুদারিব) হিসেবে আমানত গ্রহণ করে থাকে এবং আমানতদাতা হয় পুঁজি বিনিয়োগকারী (সাহিব আল-মাল)। অপরপক্ষে ইসলামী ব্যাংক পুঁজি বিনিয়োগকারী হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায় অর্থলগ্নি করে থাকে, যেখানে লগ্নিকৃত ব্যবসার প্রতিষ্ঠান/মালিক হয় ব্যবসার ব্যবস্থাপক। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ইসলামী ব্যাংক এখানে দ্বৈত চরিত্র ধারন করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ইসলামী ব্যাংক প্রকৃত অর্থে ব্যবসা ব্যবস্থাপকের ভূমিকা পালন করেনা। কারন অর্থ লগ্নি করা আর ব্যবসা পরিচালনা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। তাই আমানতদাতার সঙ্গে তার চুক্তিটি অকার্যকর।

    অর্থ প্রবাহের এই ধারা এবং দলিলাদি বিশ্লেষণ করে ইসলামী ব্যাংককে বড়জোর একটি বিশেষায়িত আর্থিক মাধ্যম (Special Purpose Vehicle) বলা যায়, যা Pass-Through পদ্ধতিতে অর্থ সঞ্চারন করছে, কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হবার শর্তগুলো পূরণ করেনা।

    আমানত ব্যবস্থাপনায় জটিলতা:

    যেকোন ধরনের বিনিয়োগ বিনিয়োগকারীর তহবিলকে সমপরিমাণে হ্রাস করে। ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। ইসলামী ব্যাংক যখন আমানত বিনিয়োগ করে তখন আমানতদাতার আমানত শুধু অক্ষুন্নই থাকেনা আমানতদাতা যেকোনো সময় তা উত্তোলনও করতে পারে। ইসলামী ব্যাংককে এটি করতে হয় ঋণ সৃষ্টির (Credit Creation) উদ্দেশ্য পূরণের জন্য। আমানতের এই বৈশিষ্ট্যটি কোন স্বাভাবিক ব্যবসায় পরিলক্ষিত হয়না। দ্বিতীয়ত, আমানতদাতাদের যেকোনো সময় আমানত ফেরতের এই অঙ্গিকার কোন ব্যাংকেরই সামর্থ্যের অধিন নয়, অর্থাৎ ব্যাংক সকল আমানতদাতাদের আমানত এক সঙ্গে ফেরত দিতে পারেনা। সুতরাং, তাদের এই অঙ্গিকার ইসলামী আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর।

    হিসাব এবং কর কাঠামো:

    প্রচলিত ব্যাংকের মতই ইসলামী ব্যাংকের হিসাব ব্যাঙ্ক-কোম্পানি আইনের অধীনে রক্ষা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত Guidelines on the Specimen Reports and Financial Statements for Banks under Islamic Shariah-য় বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই দেখা যায় মুদারাবা এবং আল-ওয়াদিয়া হিসাবের (প্রচলিত ব্যাংকের সঞ্চয়ী এবং চলতি হিসাবের অনুরূপ হিসাব) অধীনে সংগৃহীত আমানত মূলধনী দায় (Equity Liability) না হয়ে সাধারণ দেনা (Debt Liability) হিসেবে দেখানো হয়। অর্থাৎ Accounting Standard ইসলামী ব্যাংকের আমানতকে সাধারণ ঋণের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বিবেচনা করে সাধারণ দেনার শ্রেণীভুক্ত করে।

    ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান সুদের মতই তার প্রদেয় লাভের উপর কর সুবিধা (Tax Benefit) পেয়ে থাকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এ ক্ষেত্রে লাভকে সুদের বৈশিষ্ট্যেই বিবেচনা করে এবং প্রদেয় লাভকে সুদের মতই আর্থিক খরচ (Financial Expense) হিসেবে গণ্য করে। লাভকে আর্থিক খরচ হিসেবে গণ্য করার কারনে ইসলামী ব্যাংক প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বজায় রাখতে পারে। ব্যাংকিং কোম্পানির আয়কর অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়কর থেকে ৩০% থেকে ৫০% অধিক হয়ে থাকে যাতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে Return on Capital এবং Return on Labor এর মাঝে ভারসাম্য বজায় থাকে। এ ক্ষেত্রেও ইসলামী ব্যাংককে পৃথক করা হয়না। অর্থাৎ ইসলামী ব্যাংকের আয়কে তার বিনিয়োগকৃত তহবিলের বিপরীতে অর্জিত হয়েছে বলে ধরা হয়, তার ব্যবসায়িক শ্রমের (Labor) বিপরীতে নয়। সংক্ষেপে, হিসাব এবং কর কর্তৃপক্ষ ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমকে মূলত ঋণ সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করে, কোন প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম হিসেবে নয়।

    মুরাবাহা বিনিয়োগ:

    ইসলামী ব্যাংককের ৫০% এর অধিক লেনদেন হয় মুরাবাহা পদ্ধতিতে। তাই এই প্রকারের লেনদেনের দুটো সমস্যা আলাদা ভাবে উল্লেখ করছি। প্রথমত, ব্যাংক এখানে যে পণ্যটি ক্রেতার কাছে বিক্রি করে তা বিক্রয়ের সময় তার মালিকানায় থাকেনা। দ্বিতীয়ত, ক্রেতা কোন কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়। এই উভয় রীতিকেই ইসলাম নিষিদ্ধ করে। উপরের আলোচনা থেকে এটা বলা যায় যে ইসলামের অর্থব্যবস্থা (Economy) এই কুফর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। কারন দুটি ব্যবস্থা দুটি বিপরীতমুখী মতাদর্শের (Ideology) ভিত্তিতে গঠিত। এই দুই মতাদর্শের মাঝে সমন্বয়ের চেষ্টা মানুষকে প্রতারিত করে মাত্র। এবং এই প্রতারনা যুলুমের গণতান্ত্রিক-ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে। তাই আজ ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হওয়াই হবে আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। খিলাফাহ রাষ্ট্রই ইসলামের ন্যায় ভিত্তিক অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকৃত বিনিয়োগ, উৎপাদন, এবং সুষম বণ্টনের ক্ষেত্র তৈরি করবে। তখনই কেবল মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত হবে।

    Mahmud Saadiq

  • এটা কি রাষ্ট্র নাকি মৃত্যুপুরী?

    এটা কি রাষ্ট্র নাকি মৃত্যুপুরী?

    – সমাজকল্যাণ মন্ত্রী মহসিন খান বলেছেন ‘স্যুট এ্যাট সাইট’ অর্থাৎ দেখা মাত্র গুলি।

    – এর আগে বিজিবি প্রধানের একই বক্তব্য ছিল

    – মন্ত্রীসভা কমিটির সভাপতি ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ‘নাশকতাকারীদের’ ধরতে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

    – বিরোধী দলকে নিঃশেষ করতে নির্দেশ চান সাংসদ শামীম উসমান

    – রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ বলেছেন সরকার সাংবিধানিক শাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে।

    – এ ছাড়া প্রতিদিন মন্ত্রী সাংসদরা এক প্রকার মুখস্ত বলে বেড়াচ্ছেন ‘সর্বোচ্চ কঠোর ব্যাবস্থা নেওয়া হবে’

    – রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ব্যক্তিবর্গের হুমকি ধমকি ও তা কার্যকরে সরকারের নীতি নির্ধারণী কমিটির সভায় তার অনুমোদন।

    একদিকে আওয়ামি সরকার দেশের জনগণের সম্পদ ব্যবহার করছে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে, অন্যদিকে বি এন পি ক্ষমতায় যাওয়ার লিপ্সায় তার গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে।

    এই দু দলের যাঁতাকলে একদিকে যেমন দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামি সরকারের নির্দেশে পুলিশ বিজিবি’র গুলিতে হতাহত হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ, অন্যদিকে বিরোধী দলীয় গুন্ডাবাহিনীর কাছে চোরাগুপ্তা হামলার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যার করুণ সাক্ষী দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোর বার্ন ইউনিট ও মর্গগুলি।

    এই অন্যায় জুলুম কোন পক্ষই দায় শিকার করছেনা, যদিও তা দিবালোকের মতই পরিষ্কার।

    বি এন পি – আওয়ামিলীগের এই জুলুম নিষ্পেষণ আজকে নতুন নয়, বরং ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার দৌড়ে বলির পাঁঠা হয় সাধারণ জনগণ। বিএনপি আওয়ামিলীগ গণতন্ত্রেরই সৃষ্টি। তায় এ হত্যাযজ্ঞ, জুলুম, অন্যায় ততদিন চলতে থাকবে যতদিন গণতন্ত্র বহাল তবিয়তে এ দেশে প্রতিষ্টিত থাকবে।

    বাংলাদেশ ১৫ কোটি মুসলমানের দেশ এখানে সধারণ জনগণের একমাত্র দাবি আল্লাহ্‌র হুকুমতেই দেশ চলবে। আর মুসলমানদের শাসনব্যবস্থা কখনোই গণতন্ত্র হতে পারেনা। মুসলমানদের আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে নির্ধারিত একমাত্র রাষ্ট্র ব্যবস্থা হল খিলাফত।

    খিলাফত সে শাসনব্যবস্থা যেখানে পরিপূর্ণ আল্লাহ্‌’র হুকুম বাস্তবায়িত হয়। খিলাফত এমন শাসক ও দায়িত্বশীল পদ তৈরী করে যেখানে সকল দায়িত্বশীল আল্লাহ্‌কে ভয় করে ও জনগণের জবাবদিহিতার সম্মুখীন থাকে।

    বাংলাদেশে বর্তমান সংকট উত্তরণের একমাত্র পথ গণতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করা। নিশ্চয় এই জমিনে ইমানদারদের সৎকর্ম ও দোয়ায় আল্লাহ্‌ খিলাফতের ওয়াদা পূরন করবে, ইনশাল্লাহ।

    আমাদের প্রিয় রাসূল (স) বলেছেন “ …সুম্মা তাকুনু খিলাফাতান আলা মিনহাজিন নুবুওয়াহ” অর্থাৎ, অত্যাচারের অন্ধকারের যুগ শেষে নুবয়্যতের আদলের খিলাফাহ’র স্নিগ্ধ আলোর ভোর খুব সন্নিকটেই। এখন সময় এসেছে কুফরি গণতন্ত্রের বুকে পদাঘাত করে সেই দিকে ফিরে যাওয়া যে দিকে আল্লাহ্‌ ও তার রাসূল আমাদেরকে আহ্বান করছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আল কুরআনে বলেন-

    হে ঈমানদারগণ, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সেই ডাকে সাড়া দাও, যখন তোমাদের সে কাজের প্রতি আহবান করা হয়, যা তোমাদের মাঝে জীবনের সঞ্চার করে“। (আনফাল: ২৪)

    আতিক রহমান

  • জ্বলছে; জ্বলুক বাংলাদেশ !

    জ্বলছে; জ্বলুক বাংলাদেশ !

    “দেশপ্রেমিক” বিপ্লবী “বাঙালি” জনতা আজ নির্বাক দর্শকে পরিণত হয়েছে। দুই নেত্রীর অন্তর্দাহে যখন জ্বলে যাচ্ছে বাংলাদেশ তখন কোথায় গেল আমাদের দেশপ্রেম, কোথায় গেল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মূলত এগুলো কিছু ফাকা বুলি ছাড়া আর কিছুই না।

    আজ প্রতিবাদী মানুষকে জনগণের অর্থে প্রতিপালিত পুলিশ-বিজিবি দ্বারা পাখির মতো গুলি করা হচ্ছে, গ্রেফতার করা হচ্ছে, এবং প্রতিবাদের নামে মানুষকে আগুন এ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে, জনগণের সম্পদ জ্বালানো হচ্ছে, ভাংচুর করা হচ্ছে। আজ জনগণের জান নিয়ে পুতুল খেলায় মগ্ন দুই নেত্রী। বিষয়টা যেন এমন পুতুল নাচের সুতো যেন তাদের হাতে, তারাও নাচায় আমরাও নাচি। কখনো সরকার তার লাইসেন্সকৃত অস্ত্রধারী বাহিনী দিয়ে মানুষ মারছে অন্যদিকে বিএনপি তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে মানুষ পোড়াচ্ছে।  

    আজ আমরা কি সে দিনের অপেক্ষায় আছি যেদিন আমরা স্বয়ং নিজে অথবা আমাদের পরিবারের কেউ আগুনে পুড়ে মারা পড়ব? অথবা কোন বুলেট এসে আমাদের, শিশুদের, মা-বোন-স্ত্রীদের দের বুকে লাগবে? তবেই কি আমাদের ঘুম ভাঙবে? তাহলে রাসূল(সা) বলেছেন,

    তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং লোকদের কল্যাণময় কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করবে। অন্যথায় আল্লাহ কোন আযাবের মাধ্যমে তোমাদের ধ্বংস করে দেবেন কিংবা তোমাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক পাপাচারী, অন্যায়কারী ও জালিম লোকদেরকে তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দেবেন। এসময় তোমাদের মধ্যেকার নেককার লোকেরা মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া, প্রার্থনা ও কান্নাকাটি করবে, কিন্তু তা কিছুতেই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না।” (মুসনাদে আহমাদ)

    পুরো জাতি আজ নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছে- না আছে জানের নিরাপত্তা, না আছে মালের নিরাপত্তা, না আছে খাদ্যের নিরাপত্তা, না আছে বাসস্থানের নিরাপত্তা, না আছে চলাচলের নিরাপত্তা, না আছে আয়-রোজগারের নিরাপত্তা- অথচ তাকাই দেখি হাসিনার দিকে, তাকাই দেখি খালেদার দিকে আর তাদের দিকে যারা গণতন্ত্রের কথা বলে “সবাই সোনাই সোহাগা” কারোরই কোনো কিছুর অভাব নাই। এরাই আমাদের নেতৃত্ব, এরাই আমাদের নেত্রী।এরাই আমাদের গণতন্ত্রের নরকে নিয়ে যাওয়া যালিম।

    তিনি (সাঃ) বলেন,

    যদি তুমি দেখ যে আমার উম্মত কোন জালেমকে একথা বলতে ভয় পাচ্ছে যে, ‘তুমি একজন জালেম’ তাহলে আমার উম্মতকে বিদায়” [অর্থাৎ এটা উম্মতের জন্য বিদায় বা পতনের সংকেত] (আহমাদ, তাবারানী, হাকিম, রায়হাকী)

    আমরা কি হাসিনা/খালেদার দুঃশাসনের অধীনে থাকা কি আমাদের তাকদীর মনে করছি !!! কখনোই এটা আমাদের তাকদীর হতে পারে না কারণ আল্লাহ মুসলমানকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্টার জন্য, বিজয়ের জন্য, দুনিয়া শাসনের জন্য; যুলুম-নির্যাতন সয্য করার জন্য নয়। এটাই আল্লাহ ও তার রাসুলের ওয়াদা। আল্লাহ সুবনাহুতায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,

    “তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন। যেমন তিনি খিলাফত দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য।” [সুরা আন নুরঃ ৫৫]

    ফয়সাল রাহমান
    ১৭/০১/২০১৫

  • গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মৃত্যু, কুফরি মৃত্যু

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মৃত্যু, কুফরি মৃত্যু

    গত ৬ই জানুয়ারী থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র রক্ষার নামে বিরোধী পক্ষের অবরোধ কর্মসূচীর জ্বালাও পোড়াও এবং সরকার পক্ষের দমন নিপীড়ন ও গণগ্রেফতারে আতঙ্কিত বাংলাদেশের জনমনে একটি প্রশ্ন উঠেছে যে এই গণতন্ত্র টা কি জিনিস? কিভাবে এটা রক্ষা হয়? এটা রক্ষার সাথে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্কই বা কী? এবং এটা রক্ষার নামে যত নিরীহ মানুষ প্রান হারাচ্ছে এবং বিনা অপরাধে কারাবরণ করছে এর দায়ভার কার? এবং এর থেকে মুক্তির কার্যকর উপায় কী?

    প্রথম কথা, আমরা প্রথম এই ধরণের রাজনৈতিক সংকট দেখছি না এর আগেও আমরা এই দেশে দুই পক্ষের ক্ষমতার লড়াইয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বলি দেখেছি, বহুবার দেখেছি। এবং যখনি এ ধরণের সংকট দেখা গিয়েছে তখনি দেশের অনেক বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের অনেক বরেণ্য নাগরিকদের বলতে শুনেছি ‘গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আমাদেরকে এখন এরূপ করতে হবে ঐরূপ করতে হবে ‘যার মানে দাড়ায় এই ধরণের সংকটে যেখানে মানুষের জীবন বিপন্ন সেখানেও সেই বিষয়টাকেই রক্ষা করতে হবে যা কিনা এই সমস্যা/ সংকটের মূল কারণ।

    হ্যাঁ, এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যেখানে মানুষ বা তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগতাদের ইচ্ছা অনুযায়ী যা ইচ্ছা তাই আইন তৈরি করে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দেশ শাসন করে সেই আইন বা শাসনে জনগনের জীবন দুঃসহই কেন না হয়ে উঠে । আজ এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারনেই শেখ হাসিনার মতো এমন জালেম ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত যে কিনা বিরোধী পক্ষকে দমনের নামে দেশের সাধারণ মানুষের উপর ষ্টীম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে তার দল ও পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে , এবং এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারনেই তার বিরোধী পক্ষও দেশের সাধারণ মানুষের জান মাল ধ্বংস করছে। এই সবই কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ফলাফল নয়? তাহলে কার স্বার্থে এই গণতন্ত্র কে টিকিয়ে রাখার ধোঁয়া তোলা হচ্ছে? আমরা জানি এই দুই পক্ষই তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য মার্কিন ব্রিটেন ভারতের দালালি করে এবং তাদের এই দালালি কে টিকিয়ে রাখার জন্যই তাদের এই প্রভুদের নির্ধারিত পদ্ধতি এই জুলুমের হাতিয়ার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বাংলাদেশের ইসলামপ্রেমী আল্লাহ্‌ভীরু জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শরিক করে এই উম্মাহকে হারামে নিমজ্জিত করেছে, কারন যখনই আমরা এই ব্যবস্থা, এই শাসকদের মেনে নিচ্ছি আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে শিরকে মত্ত হচ্ছি, কারন এই ব্যবস্থা মানুষের তৈরি আইন দ্বারা পরিচালিত হয় যার অধিকার মানুষকে দেওয়া হয়নি।

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    আইন দেয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ্‌ । [ সূরা ইউসুফ – ৪০ , আনআম – ৫৭]

    তিনি আরও বলেন ,

    আল্লাহ্‌ যা নাযিল করেছেন তা অনুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না তারাই তো কাফের। জালেম। ফাসেক । [আল মায়িদা – ৪৪,৪৫,৪৭]

    তিনি আরও বলেন ,

    আর আপনি আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে তাদের মাঝে ফয়সালা করুন এবং আপনার কাছে যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না । [সূরা আল মায়িদা – ৪৮]

    এর মাধ্যমে আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছি যে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি কুফর ব্যবস্থা এবং এর সাথে সম্পৃক্ত থেকে আমরা নিজেদের কুফর এর সাথে জড়িয়ে ফেলছি । এবং দেশ জুড়ে যেই জুলুম অত্যাচার এবং হত্যাকাণ্ড চলছে তা এই কুফর ব্যবস্থারই ফলাফল এবং আমরা ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক এই কুফরের বেড়াজালে পড়ে গিয়েছি । আল্লাহ্‌ আমাদের জন্য কুফর ব্যবস্থার অধীনে থাকা, একে মেনে নেয়া, এবং আল্লাহ্‌র ভিন্ন অন্য কোনো জীবন ব্যবস্থা অনুযায়ী নিজেদেরকে পরিচালিত করা নিষিদ্ধ (হারাম) করেছেন । এবং একই সাথে একজন খলীফার অধীনে থাকাকে বাধ্যতামূলক করেছেন যিনি আমাদেরকে আল্লাহর দেয়া বিধি বিধান, কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী আমাদেরকে শাসন করবেন এবং মুসলিমদের জান, মাল ও সম্মান রক্ষার্থে সদা সচেষ্ট থাকবেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে তার কাঁধে (কোনো খলীফার) বায়’আত (আনুগত্যর শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলি (যুগের) মৃত্যু । [মুসলিম]

    তিনি আরও বলেন, যে (ব্যক্তি) কোনো ইমাম (খলীফা) ব্যতিত মারা গেল , সে জাহিলিয়াতের মৃত্যু বরণ করলো । [আহমদ]

    তাই নিশ্চিত ভাবে এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা যদি মৃত্যুবরণ করি তাহলে আমাদের মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু। তাই আমাদেরকে অবশ্যই এই কুফর ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে হবে যেন একজন খলীফাকে বায়’আত দেয়ার মাধ্যমে নিজেদেরকে কুফর ও শিরকের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে এবং জাহিলিয়াতের মৃত্যু হতে বাঁচতে সক্ষম হই।

    মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন

  • খবর বিশ্লেষণ: অবরুদ্ধ দেশ, উত্তরণের উপায়

    খবর বিশ্লেষণ: অবরুদ্ধ দেশ, উত্তরণের উপায়

    রাজনৈতিক দাবি আদায়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হরতাল–অবরোধ এখন আতংক ও দুর্ভোগের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরতাল-অবোরধের নামে একের পর এক সহিংস ঘটনা ঘটছে। দিন দিন এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বেড়েই চলছে । অবরোধ কর্মসুচি পালনের নামে গাড়িতে আগুন দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে মারা, নির্বিচারে বাস-ট্রাকে ভাঙচুর-আগুন, রেললাইন উপড়ে ফেলে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী –“অবোরধের বিভীষিকায় মধ্যরাতে পুড়ল ৫ প্রাণ”, “সহিংস রাজনীতির শিকার ফেনীর এস.এস.সি পরীক্ষার্থী অনিক ও শাহরিয়ার”, “বাসে–ট্রাকে বোমা দুই যুবক নিহত, অবরোধে অর্ধশতক গাড়িতে আগুন”,‍ “পুলিশের বাসে পেট্রলবোমা, দগ্ধ ৫ পুলিশ” এই হল অবরোধের আংশিক চিত্র । বিরোধী দলের কথা অনুযায়ী, জনগণের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। অপরদিকে সরকার যে কোন মুল্যে নাশকতা, সন্ত্রাস দূর করে জনগণের মাঝে শান্তি বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, প্রয়োজনে নাশকতাকারীদের পায়ে নয়, বুকে গুলি করা হবে।

    বর্তমান পরিস্থিতির মত যে কোন অস্থির সময়ে এক শ্রেনীর উচ্ছিষ্টভোগী সুশীল ও আওয়ামী বিএনপির রাজনীতি থেকে বিতাড়িত কিছু ব্যক্তি দেশ ও জাতিকে উদ্ধারে “সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে সংলাপ তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়”। তাদের মতে সমোঝতা-সংলাপ এর মাধ্যমেই সকল সমস্যার সমাধান করা যায়। অনেকের মতে, আমদের দেশে Proper গণতন্ত্র নাই, গণতন্ত্রের নামে পরিবারতন্ত্র বিদ্যমান। আমাদের রাজনীতিবিদের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব রয়েছে, তাই আমরা উন্নতি করতে পারছি না। তথাকথিত প্রগতিশীলদের মতে, ধর্মীয় রাজনীতিই আমাদের পিছিয়ে পড়ার মুল কারণ।

    আমদের সকল সমস্যার সমাধান হিসেবে যেই গণতন্ত্রকে উপস্তাপন করা হয়, মুলত সেই গণতন্ত্রই আমাদের সকল দুর্ভোগ এর জন্য দায়ী। গণতন্ত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে আমন্য করে মানুষের সার্বভৌমত্বকে মান্য করা হয়, এখানে কতিপয় মানুষ সকল জনগণের জন্য আইন তৈরি করে, এখানে শাসকের জবাবদিহিতা শুধু মাত্র জনগণের কাছে, আল্লাহর কাছে নয়। গণতন্ত্রে মালিকানার স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে দেশের সম্পদসমূহ বিদেশী কোম্পাণির হাতে তুলে দেয়া হয়, ব্যক্তি ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে সমাজে যিনা-ব্যভিচার, অশ্লীলতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও ইসলামি আকিদাকে নিয়ে কটাক্ষ ও কটূক্তি করা হয়। গনতন্ত্র আমদেরকে আওয়ামী-বিনপিতে বিভক্ত করে বিদেশী প্রভুদের লুটপাটের সুযোগ করে দেয় ও দেশে তৈরি করে কিছু দালাল, যালিম ও মুনাফিক শাসকগোষ্টী, যারা জনগণকে পুড়িয়ে, হরতাল-অবরোধ দিয়ে, জনগণকে জিম্মি করে, জনগণের মৌলিক অধিকারকে কুক্ষিগত করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের মাধ্যমে রাজনীতি করে।

    আমাদের ১৫ কোটি মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে, শক্তিশালী জাতি হিসেবে দাড়ানোর জন্য গণতন্ত্রকে ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে সামগ্রিকভাবে ইসলাম বাস্তবায়ন করতে হবে। ইসলামের বিধানসমুহ ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও আর্ন্তজাতিক বিষয় পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। কিভাবে শাসক নির্বাচন করতে হবে, কিভাবে শাসককে অপসারন করা হবে, কিভাবে শাসককে জবাবদিহি করা হবে, শাসক জনগণের কোন অধিকারসমূহ পূরন করতে বাধ্য, সবই ইসলামে বিস্তারিত বলা আছে। ইসলামের আইন সমুহ মানুষের ফিতরাতের সাথে মিলে এবং যুগের কারণে আইন সমূহ কখনোই পুরাতন/অচল হয় না কারণ আইন সমূহের উৎস অসীম আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা।

    তাই একমাত্র ইসলামই পারে আমাদের দেশের রাজনৈতিক দীনতা দূর করে ও আওয়ামী–বিএনপির ভেদাভেদ ভুলে মুসলিম হিসেবে ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসেবে মাথা উচু করে দাড় করাতে ।

    রাসূল (সা) ১৪০০ বছর পূর্বে মদিনায় ইসলাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আউস, খাযরায, ইহুদি ও বেদুইনদের নিয়ে এমন এক শক্তিশালী মুসলিম জাতি তৈরি করেছেন যার সূর্যোদয় শুধু মাত্র আরব ভুন্ডে ছিল না, বরং ওই রাষ্ট্রের ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পরেছিল সমগ্র পৃথিবীতে, যখন যানবাহন ছিল উট ও যোগাযোগের মাধ্যম ছিল কেবল মুখের ভাষা ও কলমের লেখনী। তেমনি আমরা ও যদি ইসলাম দিয়ে সকল সম্যসার সমাধান করি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম বাস্তবায়ন করি তবে পূর্বের মত আবার আমরা ইনশাল্লাহ শক্তিশালী জাতি হিসেবে আর্বিভূত হব।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন –

    তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তাদের তিনি খিলাফত দান করবেন, যেমনটি তিনি দান করেছেন তোমাদের পূর্ববর্তীদের……………”।
    (সুরা নূরঃ ৫৫)

    আবু তালিম

  • খবর বিশ্লেষণ: যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ

    খবর বিশ্লেষণ: যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ

    খবর: রাজধানীর সংসদ ভবনের পূর্ব পাশে খেজুর বাগান রোডে যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ। এতে আগুনে দগ্ধ হয়েছেন দুজন ছাত্রী এবং আহত হয়েছে অপর একজন ছাত্রী।

    এছাড়া এর পূর্বেও শুধুমাত্র এই কয়েকদিনের অবরোধ/হরতালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানেই বাসে/গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় আহত প্রায় অর্ধ শতাধিক, নিহত ৫ (এটি লেখা পর্যন্ত)

    ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ এই অবরোধ/হরতালের নামে হাসিনা/খালেদার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড দেখে আসছে। এইসকল যালিমেরা ধারাবাহিকভাবেই শোষণের জন্য ক্ষমতায় আসে, আর এরপর নিজেদের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জনগণের ক্ষতি করে চলেছে। তাদের লালিত গুন্ডাদের দ্বারা জনগণের জান-মাল ধ্বংসে লিপ্ত। মায়ের কোলের শিশু থেকে বয়স্ক ব্যক্তি পর্যন্ত কেউই আজ স্বস্তিতে নেই।

    আবার, অন্যদিকে প্রশাসন দিয়ে জঙ্গি দমন, নিরাপত্তা বিধানের মিথ্যা ধোঁয়া উড়িয়ে জনগণের মাঝে গ্রেফতার, গুম/খুন আতংক সৃষ্টি করে রেখেছে শাসকগোষ্টী। ফলে জনগণ তাদের নিজেদের গৃহেও স্বস্তিতে নেই।

    আবার, এইসকল অস্থিতিশীল পরিবেশে বাজার সিন্ডিকেট মুহুর্মুহু দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়িয়ে চলেছে। স্টেশনারি থেকে নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য সবকিছুতেই রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে দাম বেড়ে চলেছে। প্রকৃত সন্ত্রাসের জন্মদাতা এই সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী এসি রুমে শুয়ে বসে জনগণের টাকায় দিব্যি আয়েস করে দিন কাটাচ্ছে।

    নষ্ট গণতান্ত্রিক রাজনীতির সার্কাসে জনগণকে বিএনপি-আওয়ামী লীগ পরিচয়ে বিভক্ত করে নিজেদের ফায়দা লুটায় ব্যস্ত।

    ২০ বছরের এই গণতান্ত্রিক দুঃস্বপ্ন আমাদের ১৪০০ বছরের সোনালী ইতিহাস থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে না। এটা আমাদের ত্বকদীর নয়। রাসূল (সা) এর প্রতিষ্ঠিত খিলাফত রাষ্ট্রের ১৪০০ বছরের শাসনে আমরা দেখছি, জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, শাসকগোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, উম্মাহ’র ঐক্য। বর্তমান দূর্নীতিবাজ শাসকদের মত নয়, বরং এমন এক শাসনব্যবস্থা যা অর্থনৈতিক ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ বিধায় যাকাত নেওয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। এমন এক শাসন ব্যবস্থা যেখানে কুফর শক্তি আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসূল (সা)-কে অপমানের হিম্মত করে না। এমন এক শাসন ব্যবস্থা যা উম্মাহকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসে, আর ইতিহাস এর সাক্ষী।

    সুতরাং, আমাদের জন্য এটা সর্বোচ্চ সময়, যখন আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থাকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে নিজেদের পুনরায় সম্মানিত করবো। হাসিনা-খালেদার এই ক্ষমতার কামড়া-কামড়ি থেকে নিজেদের রক্ষায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা উৎখাত পূর্বক খিলাফত প্রতিষ্ঠার ফরয দায়িত্ব পালনের কোন বিকল্প নেই।

    এবং রাসূল(সা) বলেছেন,

    “…এরপর আবারো আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত”