তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
প্রশ্ন-উত্তর: ইসলামী ব্যাংকের সাথে Profit Sales (মুরাবাহা) প্রক্রিয়ায় লেনদেন করা সম্পর্কিত হুকুম

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু আল-রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব
প্রশ্ন: আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
সম্মানিত শাইখ, আমি ইসলামী ব্যাংকের সাথে profit sales (মুরাবাহা) প্রক্রিয়ায় লেনদেন করা সম্পর্কিত হুকুমটি স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করছি, উদাহরণস্বরুপ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ায় গাড়ি বা বাড়ি ক্রয় করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। আমি জানি যে এটা হারাম কিন্তু যখন কাউকে এ ব্যাপারে উপদেশ দেই তখন বিস্তারিত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারিনা। আমি এমন একটি বাস্তবসম্মত উদাহরণ দিচ্ছি যার ব্যাপারে অনেকের ধারণা হচ্ছে তারা ইসলামী ব্যাংকের সাথে যেভাবে লেনদেন করছে এটা তার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ…নিজেদের জমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ বসতবাড়ি তৈরি করে দেওয়ার জন্য যদি আমরা কোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সাথে এভাবে চুক্তিবদ্ধ হই যে আমরা কিস্তিতে (চেক) তাদের প্রাপ্য শোধ করব এবং তারা ওয়েল্ডার, মিস্ত্রি, সিমেন্ট…প্রভৃতির যোগান দিবে এসবের উপর একটি নির্দিষ্ট হারে (উদাহরণস্বরুপ ১৫%) লাভের ভিত্তিতে যদিও এক্ষেত্রে তারা বাড়ির মালিক নয়, এই দুটো চুক্তির মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আস-সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
১। ইসলামী ব্যাংকের সাথে profit sales প্রক্রিয়ায় কৃত লেনদেন শরীয়াহর সাথে সাংঘর্ষিক, যা নিচে ব্যাখ্যা করা হল:
প্রথমত: ব্যাংক এখানে গাড়ি বা ফ্রিজ কেনার আগেই তা বিক্রির জন্য ক্রেতার সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে। রাসূল (সা) আমাদেরকে এমন কিছু বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন যার মালিকানা আমাদের নেই, হাকিম ইবনে হিযাম থেকে বর্ণিত:
قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، يَأْتِينِي الرَّجُلُ يَسْأَلُنِي الْبَيْعَ، لَيْسَ عِنْدِي مَا أَبِيعُهُ، ثُمَّ أَبِيعُهُ مِنَ السُّوقِ فَقَالَ: «لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ»
আমি বললাম: “ইয়া রাসূলাল্লাহ, একজন লোক আমার কাছে আসলেন (একটি পণ্য) কেনার জন্য, কিন্তু তা আমার কাছে ছিলনা, আমি সেটা পরে বাজার থেকে এনে তার কাছে বিক্রি করে দিলাম। তিনি (সা) বললেন: এমন কিছু বিক্রি করবেনা যার মালিক তুমি নও। ” [আহমাদ থেকে বর্ণিত]
লোকটি রাসূল (সা) এর কাছে ঐ ক্রেতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন যিনি তার কাছ থেকে এমন কিছু কিনতে আসলেন যা তার কাছে ছিলনা, তাই তিনি বাজার থেকে তা কিনে আনলেন এবং ক্রেতার কাছে বিক্রি করলেন।
রাসূল (সা) এরূপ করতে নিষেধ করলেন, যদিনা পণ্যটি তার কাছে বর্তমান থাকে এবং সে তা বিক্রেতাকে প্রদর্শন করে, যাতে বিক্রেতা পণ্যটি ক্রয় করা বা না করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
ব্যাপারটি আরেকটু ব্যাখ্যা করা যাকঃ যদি কেউ ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার চায় তাহলে ব্যাংক তার কাছে এর কারণ জানতে চায়। ঋণগ্রহীতা তখন একটি ফ্রিজ বা গাড়ি বা ওয়াশিং মেশিন কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করলে ব্যাংক পণ্যটি কিনে দেওয়ার জন্য তার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য একটি নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে তার কাছে বিক্রি করে।
এক্ষেত্রে ব্যাংক ক্রেতার জন্য ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই সম্পাদিত চুক্তিটি মানতে ক্রেতা বাধ্য হয়ে পড়েন; ফলে ক্রেতা ব্যাংক থেকে ফ্রিজটি কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সুযোগ পাচ্ছেননা, কারণ ফ্রিজটি ব্যাংকের মালিকানায় আসার আগেই ব্যাংকের সাথে তার মতৈক্য হয় এবং এই অবস্থায়ই চুক্তিটি সম্পাদিত হয়।
যদি বলা হয় যে পণ্যটি কেনার পরে ব্যাংক তা ক্রেতার কাছে বিক্রি করেছে তাহলে সেটা হবে ভুল, কারণ ব্যাংক এবং ক্রেতার মধ্যে একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়েছে ব্যাংক ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই; প্রমাণ স্বরূপ বলা যায় যে ব্যাংক ক্রেতার জন্য ফ্রিজটি ক্রয় করার পর তিনি তা কিনতে কোনোভাবেই অস্বীকৃতি জানাতে পারবেননা, কারণ ব্যাংক ফ্রিজটি ক্রয় করার পূর্বেই একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে চুক্তিটি সম্পাদিত করেছে।
যদি ব্যাংকের কোন গুদাম থাকে এবং তাতে উদাহরণস্বরুপ যদি প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে ফ্রিজ থাকে এবং ক্রেতা অন্য যেকোনো বিক্রেতার সাথে লেনদেন করার মত করে পণ্যটি কেনা বা না কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন তাহলে এক্ষেত্রে নগদে অথবা কিস্তিতে পণ্য বিক্রি বৈধ বলে বিবেচিত হবে।
দ্বিতীয়তঃ ক্রেতা যদি কোন কিস্তির মূল্য পরিশোধ করতে দেরি করেন তাহলে সে কিস্তির মূল্য অর্থাৎ ঋণের মূল্যমান বাড়ানো অবৈধ, কারণ এটা হচ্ছে রিবা (সুদ) যাকে বলা হয় রিবা আন-নাসি’য়া (accrued interest)। জাহিলি যুগে যখন ঋণ পরিশোধের সময় আসত তখন ঋণগ্রহীতা যদি নির্ধারিত সময়ে তা শোধ করতে না পারতেন তখন এরূপ প্রচলন ছিল। ইসলাম ঋণের মূল্যমান বাড়ানোকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে এবং দুঃসময়ে থাকা ঋণগ্রহীতাকে ঋণের মূল্যমান কোন রকম বৃদ্ধি ছাড়াই পরিশোধের সুযোগ করে দিয়েছে।((وَإِن كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَىٰ مَيْسَرَةٍ وَأَن تَصَدَّقُوا خَيْر لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ))
“যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে তাকে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও, তবে তা খুবই উত্তম যদি তোমরা উপলব্ধি কর।” [আল বাক্বারাহ : ২৮০]
উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে ব্যাংকের সাথে এই ধরনের লেনদেন অবৈধ।
২। বিল্ডিং কনট্রাক্টরদের সাথে সাদৃশ্যতার যে বিষয়টি আপনি উল্লেখ করেছেন তা ঠিক নয়। কনট্রাক্টর এমন কোন বাড়ি বিক্রির চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেননা যা তার মালিকানায় নেই, বরং জমির মালিক এখানে কনট্রাক্টরের সাথে একটি লিজিং কনট্রাক্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যার ফলে কনট্রাক্টর তার কাজ সম্পন্ন করার জন্য বাড়ির মালিকের কাছ থেকে কিস্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাবেন যা পারিশ্রমিকের বাস্তবতা অনুযায়ী বাড়ির মালিক কনট্রাক্টরকে দিতে সম্মত হয়েছেন। এটি এমন কোন অস্পষ্ট বিক্রয় চুক্তি নয় যেখানে বাড়ির মালিকানা পর্যন্ত বিক্রেতার নেই।
বাস্তবতা যদি এমন হয় যে কোন একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার আগেই তা বিক্রির চুক্তি সম্পাদন হচ্ছে অথচ কনট্রাক্টরের মালিকানাও যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত নয় তাহলে তার বিক্রি অবৈধ।আপনাদের ভাই আতা’ ইবনু খলীল আবু আল-রাশতাহ
২৪ রজব, ১৪৩৪ হিজরী
৩ জুন, ২০১৩ খৃষ্টাব্দটিকফা চুক্তি ও আমাদের করণীয়

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কথা বলে যখন ব্রিটিশরা ভারতে আসে তখন জনগণ প্রথমে খুশিই হয়েছিল। কারণ ইংরেজরা হয়তো এখানে বিনিয়োগ করে এদেশের উন্নয়নই করবে!! কিন্তু জনগণ পরে স্বচক্ষে ইংরেজদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিনিয়োগের অন্তরালে সেসময়ের সুপার পাওয়ার উসমানী খিলাফত [অটোমান] রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভারত জয়ের নীল নকশা দেখতে পায়। পরবর্তীতে এই ইংরেজরাই প্রায় ১৫০ বছর সরাসরি ভারত উপমহাদেশ শাসন করে, এমনকি এখনো এদেশের শাসকদের এজেন্ট বানিয়ে তারা আগের মতই শাসন করে যাচ্ছে।
আমেরিকার টিকফা চুক্তি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্দেশ্যের চাইতে কি ব্যাতিক্রম কিছু??? আসুন দেখি ……
সবশেষ হাসিনার কেবিনেটে পাশ হওয়া টিকফা চুক্তির মূল কথাগুলো এরকম:
[১] চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং সেবা খাতের ঢালাও বেসরকারিকরণ করতে হবে ।
[২] যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধাসমূহ দূর করতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে ।
[৩] বেসরকারি খাতের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, (মানে সরকারকে জিরো করে আনার বুদ্ধি)।
[৪] দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করবে ।
[৫] যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে শুধু সেবা খাতেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে [ তারা কোনো পণ্য এদেশে উৎপাদন করবে না / সোজা কথা সার্ভিস দিয়ে পয়সা নেয়া ]।
[৬] বাংলাদেশের দেশীয় শিল্প বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদানকারী বাণিজ্য সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ নীতি বাতিল করতে হবে [অর্থাৎ শিল্পখাত চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে] ।
[৭] যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির উপর কোনো কর আরোপ করা যাবে না ।
[৮] বিনিয়োগের বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়া হলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ।
[৯] দেশের জ্বালানি গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর টেলিযোগাযোগ শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে ।
[১০] কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করতে হবে এবং কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে ।
[১১] চুক্তি অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ ।টিকফা চুক্তিতে এ কথা আছে যে, দুই পক্ষের মধ্যে কারো বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যদি কোনো এক পক্ষ ব্যর্থ হয় তাহলে অপরপক্ষ তাকে ‘সহযোগিতা’ দিবে। স্পষ্টতই চুক্তির এই ধারাতে বাণিজ্যের পাশাপাশি ‘বিনিয়োগের সুরক্ষার’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিনিয়োগ ও তার সুরক্ষার বিষয়টি প্রায় সর্বাংশে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে বা অন্য কোনো দেশে বিনিয়োগ করার শক্তি বা ক্ষমতা বাংলাদেশের তেমন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে ও সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ। চুক্তির বিধান অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের সেই বিনিয়োগ সুরক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের। বাংলাদেশ যদি সে কাজে অপারগতা প্রদর্শন করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সুরক্ষার কাজে ‘সহযোগিতা’ দিবে। এই ‘সহযোগিতার’ স্বরূপ কি হতে পারে? ধরা যাক, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানির পিএসসি’র মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে সেই বিনিয়োগের সুরক্ষা করা বাংলাদেশের কর্তব্য হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে বিষয়টি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্নের সাথে সম্পৃক্ত তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ‘সহযোগিতা’ দেয়ার ‘সুযোগ’ খুলে দিবে। চুক্তির এই বিষয়ের সাথে আমরা যদি বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌ উপস্থিতি, নৌঘাঁটি স্থাপন, বাংলাদেশের অরক্ষিত সমুদ্রসীমা রক্ষার কাজে সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ সম্পর্কে একদিকে জোরালো মার্কিনী বক্তৃতা-বিবৃতি এবং অন্যদিকে সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কর্তৃক পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্লক ইজারা নিয়ে নেয়ার কথা একসাথে হিসেবে নেই তাহলে কারো পক্ষেই মার্কিন উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুয়ে দুয়ে চারের অঙ্ক মিলিয়ে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রাজনৈতিক-সামরিক স্ট্র্যাটেজির প্রধান দিক নির্দেশ হলো- ‘চীনকে নিয়ন্ত্রনে রেখে তাকে নিবৃত করা’ (containing the influence of china)। এজন্য এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাকে সে তার আন্তর্জাতিক তত্পরতার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে এবং এখানেই তার বিদেশে অবস্থানরত নৌসেনার বেশিরভাগ মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশকে এই স্ট্র্যাটেজিতে আরো শক্ত করে আটকে ফেলাটা যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গ্লোবাল যুদ্ধের’ আঞ্চলিক সহযোগী করাটাও তার আরেকটি উদ্দেশ্য। এসব ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশকে নিজেদের পরিকল্পনায় আরো নিবিড় ও কাঠামোগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই ‘টিকফা’ স্বাক্ষরে যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ মরিয়া প্রয়াস। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক গোপন সামরিক চুক্তি রয়েছে। এসবের সাথে ‘টিকফা’ স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সাথে সাথে তার নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ হচ্ছে একটি ঘুমন্ত বাঘ। উন্নত দেশের সঙ্গে অনুন্নত দেশের মধ্যে চুক্তিগুলো মূলত করা হয় গরিব দেশের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। তবে ভাগ্যের বদল হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্গে এবং বিশ্বের অন্যান্য ৭২টি দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ চুক্তি করেছে। তাতে তারা খুব বেশি লাভবান হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায় না। ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ সম্পর্কে সরকারের বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিসহ অনেক বিষয় জড়িত। এ ধরনের চুক্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশ হওয়া যে কোনো বিচারেই ক্ষতিকর। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে মার্কিনিদের স্বার্থরক্ষার জন্যই কাজ করতে হবে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম এদেশে আসে বাণিজ্য করতে, পরে তারা নিজেদের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো পর্তুগিজ ও অন্যান্য দস্যুর কাছ থেকে রক্ষার জন্য ভারতে ঘাটির নামে দুর্গ বানায়। পরে তারা নিজেদের সম্পত্তি রক্ষার জন্য নিজ দেশের সেনাবাহিনীও ভারতে আনতে থাকে। পরে একসময় সেই সেনাবাহিনীই এক এক করে ভারতের সকল অঞ্চল মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে জয় করে নেয়। আর মুসলিমরা তখন নিজ আদর্শ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় খুবই দুর্বল হয়ে উঠে, যার সুযোগ ইংরেজরা গ্রহন করে।
টিকফা চুক্তি ফলে এদেশের বাণিজ্যের উপর অ্যামেরিকার নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যাবে, তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত অ্যামেরিকাও নিজ বাণিজ্য রক্ষার জন্য এদেশে সেনাবাহিনী নিয়ে আসবে। আর যে দেশে অ্যামেরিকা সেনাবাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে সেদেশের অবস্থা সম্পর্কে কারই খারাপ ধারণা নেই। ইরাক, আফগান দেখলে তা আরও পরিস্কার হবে। চিন্তা করেন আপনার বাসার সামনে দিয়ে অ্যামেরিকার সৈন্য হেটে যাচ্ছে আর আপনার বাসায় আপনার স্ত্রী ও মেয়েরা খুব ভাল আছে!!!! …… এ কি আদৌ সম্ভব????!!!!
আজকে পৃথিবীতে এমন অবস্থা নেই যে কোন দেশ জয় করে সেখানে কলোনি করে সরাসরি গভর্নর দিয়ে চালানো যাবে, যেমনটা ব্রিটিশরা করত। এখন সময় অ্যামেরিকার, কারণ তারা এখন সুপার পাওয়ার। তারা সরাসরি কোন দেশ জয় করে গভর্নর দিয়ে চালায় না। তারা সে দেশে নিজেদের পছন্দের এজেন্ট বসায় যারা তাদের সকল ইচ্ছা অনিচ্ছা পুরন করবে। যেমন এদেশের দুই নেত্রীর কেউ না কেউ প্রতিবার ক্ষমতায় আসে কোন নেত্রীকে জনগণ ঘৃণা করলে আরেক জনকে অ্যামেরিকা ক্ষমতায় আনে। এদের কাউকে ভাল না লাগলে ডক্টর ইউনুস জাতীয় কাউকে ক্ষমতায় আনবে, যার পাবলিক সাপোর্ট ও অ্যামেরিকার এজেন্টশীপ দুইটাই আছে।
এখানে জনগনের সাপোর্ট পাওয়ার জন্য কিছু কিছু এজেন্ট অনেক সময় অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন করে। এতে অ্যামেরিকা খুবই খুশি হয় সে এজেন্টের প্রতি, কারণ এতে জনগণ বুঝতে পারবে না যে সেই নেতাও অ্যামেরিকার এজেন্ট, কারণ সে তো অ্যামেরিকাকে বকে অথবা অ্যামেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলে। যেমন, পাকিস্তানের ইমরান খান, নওয়াজ শরীফ, ইরানের আহমাদে নিজাদ ইত্যাদি।
মুলত পৃথিবীর সবস্থানে যেহেতু অ্যামেরিকার আদর্শ গনতন্ত্র ও পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠিত, সেহেতু যেকোন শাসককে ক্ষমতায় যেতে হলে অ্যামেরিকার আদর্শ প্রতিষ্ঠা ও অ্যামেরিকাকে সকল প্রকার সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় যেতে হবে। তাই বর্তমান প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত আদর্শে যারা ক্ষমতা চায় তারা সবাই কোন না কোন ভাবে অ্যামেরিকার এজেন্ট, হোক সে ইসলাম পন্থী অথবা সমাজতন্ত্রী।
সুতরাং আজ এদেশের সকল জনগণকে পূর্বের ভুলকে না ভুলে এতটুকু হলেও উপলব্ধি করা উচিত যে তারা যখন এই গনতান্ত্রিক আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কোন প্রার্থীকে ভোট দেয় তারা আর কাউকে নয় একজন স্বঘোষিত সাম্রাজ্যবাদী অ্যামেরিকার এজেন্টকে ভোট দেয়, যে কিনা এদেশের সাধারন জনগনের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে অ্যামেরিকার খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের জোগান দেয়।
এতএব, এই ক্রান্তি কালে মানুষের পূর্বের ইতিহাসকে স্মরন করে শুধুমাত্র একটি কাজই করা উচিৎ আর তা হল সেই ৬২২-১৯২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৩০০ বছর গৌরবের সাথে পৃথিবীর বুকে একচ্ছত্রভাবে টিকে থাকা ইসলামিক শাসন খিলাফত ব্যাবস্থাকে ফিরিয়ে আনা। আর এ কাজে যারা নিয়োজিত তাদের সক্রিয় ভাবে সহযোগিতা করা। কারণ এটি সেই বাবস্থা যা সরাসরি সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত যা মানব জীবনের একমাত্র জীবনবাবস্থা। তবে তারা এ সহযোগিতা করুক আর না করুক খিলাফত আবারো পৃথিবীতে আসবে এটা রাসুল (সা) এর ভবিষ্যৎবানী যা কখনো ভুল হবার নয়……..
“তোমাদের মধ্যে নবুয়ত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, তারপর আল্লাহ তার সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়তের আদলে খিলাফত। তা তোমাদের মধ্যে থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন, অতঃপর তিনি তারও সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর আসবে যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন, তা থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন। এক সময় আল্লাহর ইচ্ছায় এরও অবসান ঘটবে। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে জুলুমের শাসন এবং তা তোমাদের উপর থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন। তারপর তিনি তা অপসারন করবেন।
“তারপর আবার ফিরে আসবে খিলাফত – নবুয়্যতের আদলে।” (মুসনাদে আহমদ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা -২৭৩, হাদিস নং-১৮৫৯৬ )
রাশেদুল ইসলাম
হরতাল – গণতান্ত্রিক নির্যাতনের হাতিয়ার

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির দুই বিবাদমান জোট (A team vs B team) অস্থির সময় পার করছে। আওয়ামী-বিএনপির রাজনীতির মূল কথা ‘যেকোন উপায়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের কল্যাণ সাধন করা’ – এটা জনগণের কাছে পরিস্কার। সচেতন জনগণ পরিবর্তন চায়, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সরকারী দলের লুটপাট এবং বিরোধী জোটের হরতাল নামক নির্যাতন থেকে গণমানুষ মুক্তি চায়। হরতাল ডেকে গাড়ী ভাংচুর, ককটেল বিষ্ফোরণ, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, বাসে ট্রেনে আগুন লাগিয়ে দিয়ে জনমনে আতংক তৈরী করা, সাধারণ মানুষের জান-মালের ক্ষতি করা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি জোটের রাজনৈতিক সংস্কৃতি। হরতালে সারা দেশে শতশত মানুষ আহত-নিহত হওয়া একটা মামুলি ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্র ক্ষমতায় না থেকেও জনগনকে নির্যাতন করার এই হরতাল নামক হাতিয়ারকে ব্যবহার করাকে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি নিজেদের পবিত্র গণতান্ত্রিক অধিকার মনে করে।
১৯৯১-৯৬ বিএনপি মৌসুমে তৎকালীন বিরোধীদল আওয়ামী লীগ ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে। এখন চলছে ক্ষমতার পালাবদলের মৌসুম। সর্বদলীয় সরকার নাকি নির্দলীয় সরকার- এই ইস্যুতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এখন মুখোমুখি অবস্থানে। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কিংবা ক্ষমতা দখলের জন্য সাধারণ জনগণের জান-মালের ক্ষতি সাধন করতে, রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে, রুটি-রুজির প্রয়োজনে ঘর ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষকে আহত-নিহত করতে এই দুই নিপীড়ক দল ও জোট বেশ দক্ষ ও অভিজ্ঞ। পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী এ বছর এরই মধ্যে হরতাল ও রাজনতৈকি সহিংসতায় মারা গেছে প্রায় ৪০০ মানুষ। প্রকৃত চিত্রটি আরও ভয়াবহ।
বিগত ২৭, ২৮ ও ২৯ শে অক্টোবরের হরতালের পর বিএনপি জামাত আবার ৪ থেকে ৬ই নভেম্বর হরতাল পালন করেছে। এই মূহুর্তে ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত টানা ৮৪ ঘন্টার হরতাল চলছে। এই ‘হরতাল উৎসবের’ মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের কোন রাজনৈতিক ক্ষতি বিএনপি করতে না পারলেও দেশের খেটে খাওয়া প্রান্তিক জনগণের ক্ষতি করেছে, সাধারণ মানুষের গাড়ী ভাংচুর করেছে, রাজপথে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধীদলে থাকলে হরতাল, অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনমনে ত্রাস তৈরি করে তাদের রাজনৈতিক শক্তির জানান দেয়। এই দুই নিপীড়ক দল শুধু সন্ত্রাস ই প্রতিপালন করে না বরং এরা সন্ত্রাসী দল। জনগণকে তারা তাদের ক্রীতদাস মনে করে।
গণতন্ত্র মানেই মানুষ মানুষের জন্য আইন তৈরী করবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পার্লামেন্ট, কেবিনেট আইন তৈরীর কারখানা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে মানুষের জন্য আইন তৈরীর অধিকার দেয়নি। তাই গণতান্ত্রিক সরকার (হোক আওয়ামী সরকার কিংবা বিএনপি সরকার) অবশ্যই জনগণকে যুলুম করছে এবং তারা যালেম। তাই গণতান্ত্রিক শাসক পরিবর্তন নিয়ে হৈচৈ করে আমরা AL ও BNP-র ক্রীতদাস হতে চাইনা। আমাদের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে প্রত্যাখান করতে হবে। যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের বিগত দুই দশকের শাসনামলে হরতাল ও রাজনৈতিক সহিংসতায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষ হত্যা করেছে তাদের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন প্রত্যাহার করতে হবে।
খিলাফত (ইসলামী রাষ্ট্র) পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, রাজনৈতিক সংগ্রাম করতে হবে। খিলাফত রাষ্ট্রই এ দেশের নিপীড়িত, নিগৃহীত, লাঞ্চিত মুসলমানদের মার্কিন-ভারত দালাল আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুঃশাসন, নির্যাতন থেকে মুক্তি দিবে এবং ইসলাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের নেতৃত্বের স্তরে নিয়ে আসবে যেভাবে ‘অধঃপতিত আরব’- বিশ্বের নেতৃত্বশীল পর্যায়ে এসেছিল এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল যে রাষ্ট্রব্যবস্থা তেরশ বছর টিকেছিল। আমাদেরকে আবারো সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে সে রাষ্ট্রের ওয়াদা করেছেন যদি আমরা আল্লাহ্র নির্দেশ অনুসরণ করি এবং মানব রচিত মতবাদ ছুঁড়ে ফেলে ইসলামকে আমাদের জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মেনে নেই।
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে আল্লাহ্ তাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত দান করবেন, যেমন তিনি খিলাফত দান করেছিলেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে…।” [সূরা আন নূর : ৫৫]
প্রাক-নির্বাচনী নাটকের পুনঃর্মঞ্চায়ন

প্রতি নির্বাচনের পূর্বে আমরা আওয়ামী-বিএনপিসহ অন্যান্যদের দেখতে পায়, সংলাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন হামকো-তুমকো কর্মকান্ডে, যদিও সারাবছর জনগণের স্বার্থে তাদের কোন খবর থাকেনা। বরং তাদের দাসত্ব করতে দেখা যায় তাদের প্রভু আমেরিকা-ভারতের; এর কারণও আছে বৈকি!
নির্বাচনের পূর্বেই আমেরিকার নিকট দেয় প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতেই তাদের এই ঋণ শোধের দাসত্ব। সরকারে আওয়ামী-বিএনপির যেই আসুক না কেন, ২০ বছর অবধি আমরা এই দাসত্বই দেখে আসছি দেশের স্বার্থ তাদের সামনে বলি দেওয়ার মাধ্যমে। অর্থ্যাৎ, আওয়ামী-বিএনপির জন্যই আমেরিকা আর আমেরিকার স্বার্থেই আওয়ামী-বিএনপি।
শুধু বাংলাদেশ নয়, তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াকে কেন্দ্র করেই আমেরিকার এই চক্রান্ত, যার অংশস্বরূপ বাংলাদেশ। আরব বিশ্ব থেকে বিতাড়িত আমেরিকা আজ এশিয়া উপমহাদেশে তার ঘাঁটি গড়তে পাঁয়তারা করে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে সে পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেকে টার্গেট করেই আগাচ্ছে। কারণ, এই দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশে সামরিক শক্তি, কৌশলগত অবস্থান, খনিজের উৎস হিসেবে এই ভূমিদ্বয় আমেরিকার নিকট গুরুত্বপূর্ণ। আর তাছাড়া অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এই অঞ্চলে ইসলামী রাস্ট্রব্যবস্থা খিলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকানোর চক্রান্তের অংশ হিসেবে তার এই অঞ্চলে পাঁয়তারা।
আমেরিকা তার এই এজেন্ডাসমূহ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে তার দুই দালাল হাসিনা-খালেদাকে ৫ বছর পর পর নতুনরূপে নিয়ে আসে জনগণের সামনে, এবং তারা পিলখানা-টাইগার শার্ক-ক্যারাটের মাধ্যমে দেশের সম্পদ-স্বার্থ সমর্পণ করে আমেরিকার সামনে আর আমরাও তাদের উপর বিশ্বাস করি পুনর্বার, বারবার।
”হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না, তারা একে অপরের বন্ধু…” (সূরা মায়েদা: ৫১)
“আপনি মানবজাতির মধ্যে ইহুদী ও মুশরেকদেরকে মুসলমানদের অধিক শত্রু হিসেবে পাবেন……” (সূরা মায়েদা: ৮২)
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা) বলেন,
“মুমিন কখনো একই গর্তে দু’বার পা দেয়না”।
১৯৭১ পর থেকে ২০১৩ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের আধারে ক্ষমতার পালাবদলে আমরা সমস্যার সমাধান খুঁজে আসছি। কিন্তু বাস্তব সত্য হল মিথ্যা স্বাধীনতা, মিথ্যা অধিকার, এক জাতি-ভূমির মিথ্যা শ্লোগানে আজ অবধি আমরা শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছি নিজেদের জন্যই কসাই নির্বাচন এবং বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দলের ছায়াতলে বিভক্ত হওয়ার মাধ্যমে।
আমরা যতই বলি না কেন সকল ক্ষমতা জনগণের,জনগণের ভোটেই সরকার পরিবর্তন হয় তা মূলত eye wash ছাড়া আর কিছু না। নির্বাচনের পূর্ব মূহুর্তে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরী করা হয়, দেশের একমাত্র সমস্যা হলো একটা সুষ্ঠ নির্বাচন এবং নির্বাচন হলেই সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আওয়ামীলীগ বা বি,এন,পি যে দলই ক্ষমতায় আসুক সীমান্তে হত্যাকান্ড কি বন্ধ হবে, দ্রব্যমূল্যের দাম কি জনগনের হাতের নাগালে আসবে,ইসলামী আকিদা কি সুরক্ষিত থাকবে, আমাদের নদীগুলোতে কি প্রাণ সঞ্চার হবে, জনগনের জান-মালের নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হবে, যদি উত্তর হয় ‘না’, তবে কিসের এই সাজানো নির্বাচন, কার জন্য এই নির্বাচন, আমাদের ছুড়ে ফেলে দেয়া দরকার এই নির্বাচনকে।
আসলে আওয়ামীলীগ, বি.এন.পি যতই মুখে বলুক ক্ষুধা, দারিদ্র মুক্ত, ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরি করবে,এটা কখনোই সম্ভব নয়, কারণ যেই পুঁজিবাদী তথা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দিয়ে সরকার পরিচালিত হয় সেই ব্যবস্থাই আজকে প্রশ্নের সম্মুখীন। যেই ব্যবস্থা আমেরিকার মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না, অর্থনৈতিক মন্দা দূর করতে পারছে না, সেই ব্যবস্থা কি ভাবে আমাদের সমস্যার সমাধান করবে?
আমাদের ফিরে যেতে হবে আমাদের বিশ্বাসের নিকট, বিশ্বাস থকে আসা ব্যবস্থার নিকট, যা রাসূল (সা) মদীনায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
“তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শাসন-কর্তৃত্ব দান করলে তারা নামায আদায় করবে যাকাত দেবে এবং সৎ কাজে আদেশ এবং অসৎকাজকে নিষেধ করবে” (সূরা হাজ্জ: ৪১)
খিলাফাহ রাষ্ট্র সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধ করবে, জনগনের মৌলিক অধিকার পূরণে সদা সচেষ্ট থাকবে এবং আকীদাকে সুরক্ষিত রাখবে।এ রাষ্ট্রের শাসকের জবাবদীহিতা শুধুমাত্র জনগণের নিকট থাকবে না, থাকবে আল্লাহর নিকট। এ রাষ্ট্র সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে বসিয়ে রেখে উম্মাহর আর্তনাদের দিকে চেয়ে থাকবে না বরং সেনাবাহিনী প্রেরণের মাধ্যমে উম্মাহর জান-মালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিবে।
তাই আমাদের উচিত পাতানো নির্বাচনী নাটককে জনগণের সামনে তুলে ধরা এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজপথে নামার মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দেয়া।
“হে ইমানদারগণ, যখন আল্লাহ ও তার রাসূল এমন কোন কিছুর দিকে তোমাদেরকে আহবান করেন যা তোমাদের মধ্যে জীবনের সঞ্চার করে তখন সেই আহবানে সাড়া দাও” (সূরা আনফাল: ২৪)
প্রশ্ন-উত্তর: খিলাফত প্রতিষ্ঠায় জিহাদের ভূমিকা কী?

প্রশ্ন: এমন অনেকেই আছে যারা বলে, হিযব তার খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিতে মাদানী যুগকে গুরুত্ব না দিয়ে শুধুমাত্র মক্কী যুগকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এটি খিলাফত প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদকে শরীয়া’হ-র সাথে সাংঘর্ষিক মনে করে যার কারণ হিসেবে তুলে আনা হয় রাসূল (সা) তা করেননি। প্রশ্নকর্তা আরও বলেন: কেন হচ্ছে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির জন্য মাদানী যুগকে নেয়া হইনি যেখানে জিহাদ করা জায়েজ এবং ফরজ ছিল? এর কি কোন সুস্পষ্ট উত্তর আছে? ওয়া জাযাকাল্লাহু খাইরান।
উত্তর:
প্রশ্নে এমন অনেক বিষয় রয়েছে যা ব্যাখ্যা-সাপেক্ষ:
১. যেকোন যথার্থ দলীল আমাদেরকে অবশ্যই মান্য করতে হবে যদি তা কুরআন বা সুন্নাহ থেকে উঠে আসে। এক্ষেত্রে আমাদেরকে লক্ষ্য রাখা উচিত নয় তা কি মক্কী যুগের নাকি মাদানী যুগের।
২. দলীল খোঁজার ক্ষেত্রে আমাদের সেইসব দলীলই খোঁজা উচিত যা ঐ মাসআলা বা ইস্যুর সাথে জড়িত, সেসব দলীল আমাদের দরকার নাই যা ঐ মাসআলা বা ইস্যুর সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়-ক. উদাহরণস্বরূপ: আমি যদি ওযু কিভাবে করতে হয় তা জানতে চাই, তবে আমি সেসব দলীল অন্বেষন করব যা ওযুর সাথে সম্পর্কিত, সেটি মক্কায় অবতীর্ণ হোক কিংবা মদীনায় অবতীর্ণ হোক। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শরীয়া’হ পদ্ধতি অনুসরণ করে আমি একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারব… কিন্তু আমি রোজার সাথে জড়িত দলীল থেকে ওযুর হুকুম ও প্রণালী বের করতে গবেষনা করব না।
খ. আবার যেমন: আমি যদি হজ্জ্ব কিভাবে করতে হয় তা জানতে চাই, তবে আমি সেসব দলীল খুজব যা হজ্জ্বের সাথে সম্পর্কিত, সেটি মক্কায় অবতীর্ণ হোক আর মদীনায় অবতীর্ণ হোক। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে আহকাম বের করে আনা হবে… কিন্তু আমি সালাতের সাথে জড়িত দলীল থেকে হজ্জ্বের প্রস্তুতি ও নিয়মাবলী বের করতে চেষ্টা করব না।
গ. আরও উল্লেখ করা যায়, আমি যদি জিহাদের বিষয়ে জানতে চাই, সেটি ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক ফরযিয়াত হিসেবে হোক কিংবা আক্রমনাত্নক বা রক্ষনাত্নক হোক কিংবা বিজয়ের জন্য বা ইসলাম প্রচারের জন্য হোক, বিজয়টি বলপ্রয়োগ বা আপোসরফার মাধ্যমে হোক…আমি সেসব দলীল খুজব যা জিহাদের সাথে সম্পর্কিত, এক্ষেত্রে মক্কী যুগের বা মাদানী যুগের দলীল বলে পার্থক্য করা আমার জন্য সমীচিন নয়। এরপর সেসব দলীল থেকে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে আইনসমূহ বের করে আনা হবে… কিন্তু আমি কখনোই যাকাতের দলীল ব্যবহার করে জিহাদের হুকুম ও এর বিস্তারিত বের করে আনার গবেষনা করব না।
ঘ. এটিই হলো সকল মাসআলা বা ইস্যুর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নীতি, অর্থাৎ দলীল গবেষনা করা, হোক তা মাক্কী কিংবা মাদানী এবং সেই দলীল হতে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে শরীআহ’র আইন বের করা আনা।৩. এখন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আলোচনায় আসা যাক এবং সে সম্পর্কিত দলীল খোঁজার চেষ্টা করি, তা সেটি মক্কায় কিংবা মদীনায় অবতীর্ণ হোক এবং সেই দলীল থেকে উৎসারিত হুকুম বের করি যা প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হয়েছে।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে সব দলীল আমরা পাই তা পবিত্র মক্কা নগরীতে আল্লাহর রাসূলের জীবনকাল ছাড়া অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তিনি প্রথমে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দেন, তারপর বিশ্বাসী, দৃঢ়চেতা একটি দল গঠন করেন, এরপর তিনি মক্কা ও এর আশেপাশে ইসলামকে প্রকাশ্যে ঘোষনা করেন…এরপর ক্ষমতাধর, সামর্থ্যবান ব্যাক্তিবর্গের কাছ থেকে সাহায্য (নুসরাহ) খোঁজার প্রায়াস চালান। পরিশেষে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তার উপর মদীনা আনসার বাহিনীর মাধ্যমে তার উপর রহম করেন, তাই তিনি তাদের দিকে হিজরত করেন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এটিই দলীল এবং এর বাইরে আর কোন দলীল নেই। রাসূল (সা) তার জীবনকালে এটি আমাদের পরিষ্কার দলীলের মাধ্যমে দেখিয়েছেন এবং তা আমাদের আঁকড়ে ধরতে হবে। তাই ইস্যুটি জিহাদের হুকুম আসার আগে মক্কী যুগের কিংবা জিহাদকে ফরজ করার পর মাদানী যুগের সাথে সম্পর্কিত নয় বরং এটি রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীলাদির অনুসন্ধান-গবেষনার ফল যা শুধুমাত্র মক্কায় পাওয়া যায় যতক্ষন না রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করেন এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
এ বিষয়টি ও জিহাদ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আগেই উল্লেখ করেছি, খিলাফত প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির দলীল তার সাথে সম্পর্কিত দলীলাদি থেকে এবং জিহাদের দলীল তার সাথে সম্পর্কিত দলীলাদি থেকে নিতে হবে। তারা একে অপর থেকে স্বতন্ত্র ও ভিন্ন। তাই খিলাফতের অনুপস্থিতিতে জিহাদ থেমে থাকবে না কারণ রাসূল (সা) বলেছেন-
«وَالْجِهَادُ مَاضٍ مُنْذُ بَعَثَنِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَى أَنْ يُقَاتِلَ آخِرُ أُمَّتِي الدَّجَّالَ، لَا يُبْطِلُهُ جَوْرُ جَائِرٍ وَلَا عَدْلُ عَادِلٍ»
“আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল কর্তৃক আমার প্রেরণ হওয়া হতে যতক্ষন পর্যন্ত না আমার উম্মতের শেষ অংশ দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করবে, ততক্ষন পর্যন্ত জিহাদ চলতে থাকবে, জালেমের জলুম কিংবা ন্যায়পরায়নের ন্যায়বিচার তা কখনোও বন্ধ করতে পারবে না”। (বায়হাকি তার সুনান আল-কুবরা’য়, আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণিত)।
সুতরাং, শরীয়া’হর গন্ডির মধ্যে জিহাদ চলতে থাকবে যদিওবা খিলাফত প্রতিষ্ঠা হোক বা না হোক।
এবং শাসকগোষ্ঠী জিহাদ করা ছেড়ে দিয়েছে তাই আমরা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা ছেড়ে দেব তাও নয়। যতক্ষন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না ততক্ষন খিলাফত এর কাজ চলতে থাকবে কেননা কাধে খলীফার বা’য়াত বিহীন অবস্থায় মুসলিমদের থাকা হারাম যারা (এর জন্য কাজ করতে) সক্ষম। মুসলিম আবদুল্লাহ বিন উমর হতে বর্ণনা করেন, আমি শুনেছি রাসূল (সা) বলেন,
«مَنْ خَلَعَ يَدًا مِنْ طَاعَةٍ، لَقِيَ اللهَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا حُجَّةَ لَهُ، وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِي عُنُقِهِ بَيْعَةٌ، مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً»
“যে আনুগত্য থেকে হাত তুলে নিল তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহর সাথে দেখা করবে এমন অবস্থায় যে তার স্বপক্ষে কোন দলীল নেই এবং যে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যখন তার কাধে বা’য়াত নেই, সে এক জাহেলী মরন মরল”।
তাই জিহাদও চলবে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ ততক্ষন পর্যন্ত চলবে যতক্ষন না তা প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি আর একটির উপর নির্ভরশীল নয়, তারা দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রত্যেক ইস্যুর জন্যই তার শরীয়াহ দলীল অন্বেষন করা হয় এবং সেসব দলীল হতে প্রতিষ্ঠিত শর’ঈ পদ্ধতি অনুযায়ী নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য হুকুম বের করে আনা হয়।
৪. তাই হিযব সেই পদ্ধতির প্রতি অনুগত যা রাসূল (সা) মক্কায় দেখিয়ে গিয়েছেন মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার আগ পর্যন্ত, খিলাফত প্রতিষ্ঠায় কোন সশস্ত্র সংগ্রাম না করার সাথে মক্কী যুগের কিংবা মাদানী যুগের কোন সম্পর্ক নেই। বরং নবী (সা) মক্কায় যে পদ্ধতি দেখিয়ে গিয়েছেন মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত – এ ছাড়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আর কোন দলীল নেই। সুতরাং ইস্যুটা হচ্ছে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি, এবং তিনি (সা) মক্কায় যে পদ্ধতি দেখিয়ে গিয়েছেন তা ছাড়া আর কোনো পদ্ধতি নেই।
যদি ইস্যুটা হতো ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ কিংবা তার কাঠামোসমূহের তখন আমরা মদীনায় রাসূল (সা) যা দেখিয়ে দিয়েছেন তা দলীল হিসেবে নিতাম কারণ রাষ্ট্র সেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল।৫. পরিশেষে:
ক. একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নির্দিষ্ট দলীল বা প্রমান দরকার সেটি মক্কা বা মদীনায় অবতীর্ণ হোক না কেন। যেমন- রোজার জন্য রোজা সম্পর্কিত দলীল, সালাতের জন্য সালাত সম্পর্কিত দলীল, অনুরূপভাবে জিহাদের জন্য জিহাদ সম্পর্কিত দলীল এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত দলীল অনুসন্ধান করা ইত্যাদি।
খ. নবী (সা) মক্কায় থাকাকালীন পদ্ধতির প্রতি অনুগত থাকার অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য পবিত্র মক্কা শহরে যা দেখানো হয়েছে তাছাড়া এর জন্য আর কোন দলীল পাওয়া যায় না। যদি মদিনায় সেরূপ দলীল থাকতো তবে তাও গবেষনার বিষয় হিসেবে আমলে নেয়া হত।
আমরা আল্লাহ সর্বশক্তিমানের সাহায্য ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাফল্য জন্য কামনা করি, একটি খিলাফতে রাশেদার কামনা করি যা ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মান পুনর্বহাল করবে, কাফের ও কুফ্ফারকে অপদস্থ করবে যাতে করে বিশ্বে কল্যাণ ব্যপ্তি লাভ করে এবং এটি আল্লাহ-র কাছে অতীব প্রিয়।১৭ই জুল-কাদা, ১৪৩৪ হিজরী
২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৩সুমাইয়া বিন্তু খুব্বাত (রা)-এর ঈমানী দৃঢ়তা

সুমাইয়া বিন্তু খুব্রাত (রা) আবু হুজাইফা ইবনুল মুগীরা আল মাখযুমীর দাসী ছিলেন। ইয়াসির (রা) ছিলেন ইয়ামানের অধিবাসী। একবার তিনি মক্কায় এসে এখানেই স্থায়ীভাবে থেকে যাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বাইরের কেউ মক্কায় স্থায়ীভাবে থাকতে হলে কোনো না কোনো গোত্রের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হতো। ইয়াসির (রা) আবু হুযাইফা ইবনুল মুগীরার সঙ্গে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন এবং মক্কাতে বসবাস শুরু করতে থাকেন।
আবু হুযাইফা তার দাসী সুমাইয়া (রা)-কে ইয়াসির (রা)-এর সঙ্গে বিয়ে দেন। সুখেই কাটছিলো তাঁদের দিনগুলো।
ইতোমধ্যে মুহাম্মাদুর রাসূল (সা) নবুয়্যত লাভ করেন। গোপনে তিনি ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। ইয়াসির (রা) ও সুমাইয়া (রা) ইসলামের কথা অবগত হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।
এক সময়ে তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ হয়ে পড়ে। আবু জাহল ও তার সঙ্গীরা তাঁদেরকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য চাপ দিতে থাকে। তাঁরা তাঁদের ঈমানের ওপর অটল থাকেন।
অতঃপর, তাঁদেরকে দিনের বেলা লোহার পোষাক পরিয়ে রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেয়া শুরু হয়। খুবই যন্ত্রণাদায়ক ছিল এই শাস্তি। প্রচণ্ড উত্তাপে তাঁদের শরীর দুমড়ে যেতে থাকে। কিন্তু তাঁদের ঈমানে এতোটুকু চিড় ধরেনি।
একদিন আবু জাহল ইয়াসির (রা)-কে ধরে বেদম পিটুনি দেয়। আর বলতে থাকে ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিতে। আল্লাহ্র প্রেমিক ইসলাম ত্যাগের ঘোষণা দিলেন না। অনবরত চলতে থাকে পিটুনি। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে যায় তাঁর শরীর। এক পর্যায়ে এসে তিনি শহীদ হয়ে যান।
ইয়াসির (রা)-এর স্ত্রী সুমাইয়া (রা)-কে সারাদিন রোদে দাঁড় করিয়ে রেখে শাস্তি দেওয়া হতো। সন্ধ্যায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হতো।
একদিন শাস্তি ভোগ করে ক্লান্তদেহে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। আবু জাহল তাঁকে দেখে গালমন্দ করতে থাকে। ইসলাম ত্যাগ করতে বলে। সুমাইয়া (রা) তার কথায় কান দিলেন না। ভীষণ ক্ষেপে যায় আবু জাহল। তার হাতে ছিল বল্লম। সে বল্লমটি ছুঁড়ে দেয় সুমাইয়া (রা)-কে লক্ষ্য করে। বল্লমটি তাঁর লজ্জাস্থান ভেদ করে পেছনের দিকে চলে যায়। প্রবল বেগে ঝরতে থাকে রক্ত।
এই কঠিন অবস্থাতেও তিনি আঁকড়ে থাকেন ঈমানের ঐশ্বর্য। সুমাইয়া বিন্তু খুব্বাত (রা) শহীদ হন। আল্লাহ্র সন্তোষ অর্জন করে পৌঁছে যান জান্নাতের ঠিকানায়।
মূল: এ কে এম নাজির আহমেদ কর্তৃক লিখিত আসহাবে রাসূলের জীবনধারা
যুক্তরাষ্ট্রের আশু পতন ও খিলাফতের উত্থান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ধ্বসের শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে। এর পর ২০০৮ সালে এসে তা বিশ্ব মন্দায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ওবামা প্রশাসন বেইল আউট প্যকেজের মাধ্যেমে জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে বড় বড় পুঁজিপতিদের কোম্পানিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা চালায় এবং একে একে মার্কিন জনগণের উপর ট্যাক্সের মাত্রা বড়িয়ে তার তার বাজেট ঘাটতি পূরনের চেষ্টা চালায়। এতে করেও ওবামা প্রশাসন মার্কিন অর্থনীতিতে সচলতা ফেরাতে পারেনি।
বর্তমানে অর্থনৈতিক অচল অবস্থা রাজনৈতিক অচল অবস্থা তৈরি করেছে এবং এই অচলাবস্থার কারণে ৮ লাখেরও বেশি কর্মচারীকে বিনা বেতনে ছুটি দিতে হয়েছে এবং জাতীয় পার্ক, পর্যটন এলাকা, সরকারি ওয়েবসাইট, অফিস ভবন এবং নাসাসহ আরও অনেক কিছু বন্ধ করে দিতে হয়েছে – যেটাকে বলা হচ্ছে SHUT DOWN। কিন্তু অতীতে আমারা মার্কিনীদের জাতীয় স্বার্থের ব্যপারে সব সময় ঐক্যবদ্ধ দেখেছি কিন্তু এবার হচ্ছে তার ব্যতিক্রম। এবার তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দেশের সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটদের নিজেদের স্বার্থ এখন দেশের স্বার্থের চেয়ে গুরত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমারা জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় নব্বই শতাংশ সম্পদ হল দুই শতাংশ লোকের হাতে আর এরাই হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার মালিক। আজ অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের জনগণের হাতে টাকা নেই তাই মার্কিন অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য ঋণসীমা বৃদ্ধির প্রয়োজন ও সেবা খাতে অর্থের বরাদ্দ প্রয়োজন যা কিনা আবার আগামী নির্বাচনে জেতার জন্য ডেমোক্রেটদের জন্য সহায়ক আবার যা কিনা অনেক পুঁজিপতি কংগ্রেস সদ্যসের আর্থিক ক্ষতিরও কারন। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে পুঁজিপতিরা আজ দেশ চালাতে ইচ্ছুক নয় আজ তাই তাদের মধ্যে অনৈক্য স্পষ্ট এবং এই অনৈক্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতনের ঘণ্টা।
“এরা সে লোক, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর এরা যা কিছু মিথ্যা মা’বুদ সাব্যস্ত করেছিল, তা সবই তাদের থেকে হারিয়ে গেছে”। (সুরা হুদ: ২১)
আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ এবং সমগ্র বিশ্বে সে তার নিয়ন্ত্রন হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত মুসলিম প্রধান দেশ গুলোতে সে উম্মাহর তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে আর মুসলিম উম্মাহ মাঝে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্যের দাবী তীব্র হচ্ছে।
বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আজ আমেরিকা নিজেদের তৈরি করা মরণফাঁদে আটকা – ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তাদের যুদ্ধের খরচ প্রায় ৪ – ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যার বোঝা তাদের জনগণদেরই নিতে হচ্ছে। এত খরচের পরও তারা কোথায় বিজয় এর মুখ দেখছেনা। আল্লাহ যথার্থই বলেন:
“যারা কাফের তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে মানুষদের আল্লাহর পথ হতে হটানোর জন্য, আর তারা তা খরচ করেই চলবে, অতঃপর, তাদের এই ব্যয় তাদের জন্য পরিতাপের কারণ হবে এবং অবশেষে তাদেরকেই পরাজয় বহন করতে হবে” (আনফাল: ৩৬)
আজ তাই আমেরিকার শেষ ভরসা হোল মুসলিম বিশ্বের তাঁবেদার শাসক গুলো। সিরিয়ার মুসলিম অভ্যুত্থান ঠেকানোর জন্য মার্কিনীদের হয়ে আজ লড়ছে তুরস্ক, সৌদি আরব ইত্যাদি। আমাদের দেশেও একই ধারাবাহিকতায় দালালি করে যাচ্ছে হাসিনা, খালেদার মতো নেতারা।
তাই মুসলিম বিশ্বের এইসব বিশ্বাসঘাতক শাসকদের মূলোৎপাটন করে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহ আবারো ফিরে পেতে পারে তার হারানো গৌরব।
তাই আজ বাংলাদেশের মুসলিমদের উচিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং মার্কিনীদের হাত থেকে বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিয়ে নেওয়া।
তোমাদের পরওয়ারদেগার শীঘ্রই তোমাদের শত্রুদের ধ্বংস করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দেশে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কেমন কাজ কর। (সুরা আরাফ: ১২৯)
বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের কূটকৌশল

পুঁজিবাদের বেসরকারিকরণ চিন্তার কারণেই বিদ্যুৎ আজ সামর্থের বাইরে এবং অপ্রাপ্য, যা গণতন্ত্র দ্বারা সুরক্ষিত। গণতন্ত্রের দ্বারা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারই দায়ী। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কিছু ব্যক্তি মালিকানায়, দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা দান করে, তারাই মূলত বিদ্যুৎ সম্পদের পূর্ণ সুবিদা পেয়ে থাকে আর অন্যদিকে সাধারণ জনগণ কষ্টের সম্মুখীন হয়।
বিদ্যুৎ হলো উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও বিপননের মতো ক্রমানুসারিক সমন্বিত এবং বহু স্তরে বিন্যস্ত এক প্রক্রিয়া যার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই প্রযুক্তি। তবে বর্তমান বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিগত বিষয়টি বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সঙ্কট সৃষ্টি হলে তা শিল্প, কৃষি, উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন ইত্যাদি সবকিছুকেই বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে এখন প্রতিদিন প্রায় ১৪-১৬ ঘণ্টা বিদুৎ থাকে না। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরো শোচনীয়।
বিদ্যুত চাহিদা নিয়ে পিডিবি এবং সরকার সব সময়ই লুকোচুরি করে। সঙ্গত কারণে মনে করা হয় যত বেশি লোডশেডিং তত বেশি সঙ্কট। সঙ্কটের আবর্তেই ঘুরছে বিদ্যুত খাত। একের পর এক নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে কিন্তু এর কতটা সুফল পাচ্ছে জনগণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সঙ্কট উত্তরণে সরকার প্রথম থেকেই ভুলপথে হাঁটছে। সাশ্রয়ী বিদ্যুত উৎপাদনের বদলে কম সময়ে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্রর দিকে ঝোঁকায় বিদ্যুতের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের দেশের মানুষ কতটা মূল্য বৃদ্ধি সহ্য করতে পারবে তার কোন হিসেব না করেই বিদ্যুত প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি জীবনযাত্রার প্রত্যেকটি স্তরে প্রভাব ফেলে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি শুধু এককভাবে গ্রাহকের বিদ্যুত বিল বাবদ খরচই বৃদ্ধি করে না। শিল্প এবং কৃষি উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়েছে প্রাত্যহিক জীবনে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ চাহিদা ও ঘাটতি:
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে উৎপাদন ৫ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। চাহিদা ও উৎপাদনে ব্যবধান ২০০০ মেগাওয়াট। দেশে মোট ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬০ কিলোমিটার বিতরণ লাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ সঞ্চালন লাইনের অন্তত ৪০ শতাংশই জরাজীর্ণ। বাংলাদেশে মাত্র ৪০% (Access to Electricity) বাড়িতে বিদ্যুত পৌঁছে গেছে। বাকি ৬০% বাড়িতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি।
৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের কর্মক্ষমতার ৮৫-৯০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। আর বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্যাপাসিটির তুলনায় আরও অনেক কম। যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে ৩৩ শতাংশ কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তার ওপর সিস্টেমলসের কারণে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।
সঙ্কট নিরসনে অদূরদর্শী ও আত্মঘাতী প্রচেষ্টা:
সম্প্রতি ভাড়া ভিত্তিক ও বেসকারি উদ্যোগে বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা দেশের মানুষকে দ্রুত আংশিক সমাধান এনে দেবে হয়তো কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে দামে বেড়ে গরীবের নাগালের বাইরে চলে যাবে এই কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুত। এরই মধ্যে সরকারের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা ও ফায়দা লুটার রাজনীতির স্বীকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হয় বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবানে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করে। কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বেসরকারিভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চড়া মূল্যে সরকারকে কিনতে হচ্ছে যা ভোক্তাদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ভোগে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।
তারই ফলশ্রুতিতে সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি, ২০১২ বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের কাছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি (এনটিপিসি) যৌথ অর্থায়নে প্রায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে গত ২৯ জানুয়ারি ২০১২ সালে। চুক্তির সমস্যা হচ্ছে প্রকল্পের অর্থ আসবে বিদেশী ঋণ থেকে ৭০ ভাগ, ভারত ১৫ ভাগ আর বাংলাদেশ ১৫ ভাগ। বিদেশী ঋনের সুদ টানা এবং পরিশোধ করার দায় দায়িত্ব বাংলাদেশের। অর্থ্যাৎ ভারতের বিনিয়োগ মাত্র ১৫ ভাগ। কিন্তু তারা মালিকানা পাচ্ছে ৫০ ভাগ। পুরো অর্ধেক। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পি ডি বি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে। কী সে ফর্মুলা? যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ এর দাম হবে ৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতি টন ১৪৫ ডলার হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। অথচ দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের সাথে মাওয়া, খুলনার লবন চড়া এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা তে যে তিনটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যে চুক্তি হয়েছে পি ডি বির সাথে সেখানে সরকার মাওয়া থেকে ৪ টাকায় প্রতি ইউনিট এবং আনোয়ারা ও লবন চড়া থেকে ৩টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে। সরকার এর মধ্যেই ১৪৫ ডলার করে রামপালের জন্য কয়লা আমদানির প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তার মানে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা দিয়ে পি ডি বি এখান থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবো সেটা নিশ্চিত।
বিদ্যুতের দাম, কয়লার উৎস নির্ধারণ না করেই এবং কৃষি জমি নষ্ট ও পরিবেশগত প্রভাব বিষয়ক আপত্তি উপেক্ষা করেই এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে এই তাপবিদ্যুকেন্দ্র স্থাপনে একে সুন্দরবন ধ্বংসকারী ও জাতীয় স্বার্থের বিরোধী উদ্যোগ বলে নানাভাবে আপত্তি জানিয়ে এলেও সরকার তা কানে তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি। ফলে অব্যাহত সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো নানা সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ সরকারের এই ভূমিকাকেও এখন দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া ভারতপন্থী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে মানুষ। সব আপত্তি উপেক্ষা করে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে রামপাল উপজেলার সাপমারি, কাটাখালি ও কৈগরদাসকাঠি মৌজায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে।
এভাবে জনগণের বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকারকে উপেক্ষা করে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ভারতের সাথে নির্লজ্জভাবে এ চুক্তি করেছে। এছাড়া বিশ্ব ব্যাংক, আই.এম.এফ ও এ.ডি.বি – র পরামর্শে বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারিকরণের সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিয়েছে সরকার। আর এর প্রমাণ মিলে, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে দুর্বল করে রাখা, বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থপন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি এই পরিকল্পনার বিষয়ে বিদ্যুৎ খাত বিশেষজ্ঞ ও পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো বিদ্যুৎ ও একটি সেবা খাত। এ খাতে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণ হলে তারা যে কোন সময় সরকার এবং জনগণকে জিম্মি করতে পারে। যা অতীতে হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি খাতে না দিয়ে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও গ্যাস ভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজনৈতিক বিবেচনা:
বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার বিষয়ের সাথে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের প্রশ্ন জড়িত। বড় বড় এসব দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি প্রজেক্টের ঠিকাদারী পাওয়ার জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলো লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে। এসব প্রজেক্ট দেয়া-নেয়াকে কেন্দ্র করে আছে কমিশনের লেন-দেনের ব্যাপার। এসব কমিশনের টাকার পরিমাণ কল্পনাতীত। রাজনীতিবিদ আমলাতন্ত্র প্রভৃতি নীতি নির্ধারকদের আসল আকর্ষণ হলো এই কমিশনের ভাগ পাওয়ার দিকে। সঙ্কটের আশু নিরসনের দিকে মনোযোগ দেয়ার প্রতি তাদের সময়ইবা কই সে বিষয়ে তাদের তেমন আগ্রহই বা ততোটা থাকবে কেন। কোনো দেশীয় কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু প্রজেক্ট হাতে নিয়ে সমস্যার ভার কিছুটা লাঘবের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে, তাতেও কর্তাব্যক্তিরা অনাগ্রহী। কারণ তিনটি
এক. দেশীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এসব কাজ করালে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে যেভাবে কমিশন হাতে নেয়া যায়, এক্ষেত্রে সেটা পাওয়া যাবে না।
দুই. সঙ্কট যদি লাঘব হয় তাহলে গভীর সঙ্কটের অজুহাত কাজে লাগিয়ে বেশি দামে বিদেশিদেরকে প্রজেক্ট পাইয়ে দিয়ে কমিশনের পরিমাণ বাড়ানো যাবে না।
তিন. সঙ্কট লাঘবের জন্য আশু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ থেকে তেমন কমিশন পাওয়ার সুযোগ কম।
বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, শক্তি-সম্পদ প্রভৃতি কোনো সঙ্কটই অসমাধানযোগ্য নয়। সমাধানের উপায় আছে, পথ আছে। বাধা হলো মুষ্টিমেয় মানুষের ফায়দা লুটার লালসা। দুর্নীতি পরায়ণ এ সরকার ব্যবস্থায় ভয় দেখিয়ে বা নীতিবাক্য শুনিয়ে নিবৃত্ত করা যাবে না। লুটপাটের পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে বদলে ফেলতে না পারলে এই বাধা দূর হবে না।
সঙ্কট উত্তরণের উপায়:
সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং নীতি না থাকায় – মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা সব সময়ই অদূরদর্শী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। আর এ ধরণের প্রবণতা শুরু হয়েছে সেই ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই।
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ব্যর্থতা দিয়ে বোঝা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের কী পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা এখানে চলছে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক দূরবস্থা মূলতঃ দুটি কারণে সৃষ্ট; প্রথমত: শাসকদের আদর্শিক শূণ্যতা, দ্বিতীয়ত: আদর্শিক শূণ্যতার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা।
যতদিন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে এ দু’টি বিষয়ে পরিবর্তন না ঘটবে, ততদিন পর্যন্ত যত সম্পদই থাকুক না কেন আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও আধিপত্য বিস্তারকারী ভারতের শিকার হতে থাকবো। কোন শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি না থাকলে কিসের উপর আমরা আমাদের অর্থনীতিকে গড়ে তুলবো? যখন কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত অনুপস্থিত থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যেসব নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয় তা পরস্পর সাংঘর্ষিক হতে বাধ্য এবং এমতাবস্থায় কোন সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে অর্থনীতিকে পরিচালনা করা কখনোই সম্ভব নয়।
মুসলিম হিসেবে আমরা প্রতিটি বিষয় কুরআন ও সুন্নাহ্’র আলোকে দেখতে বাধ্য। বিজ্ঞান , প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাপারেও একই কথা। রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে যে, খেজুর গাছের কলম করা বিষয়ক কৃষি প্রযুক্তির ব্যাপারে তিনি (সা) বলেছেন, “তোমাদের দৈনন্দিন জীবনের এসব বিষয় তোমরাই ভাল জান।” [আহমদ]
ইসলাম পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটাবে এবং ইসলামিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করবে। ব্যবস্থা হিসাবে ইসলাম সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করবে, এরই কৌশল বা পদ্ধতি স্বরূপ গণ মালিকানাধীন বিদ্যুৎ সম্পদ, কয়লা, তেল, গ্যাসের সুষম বন্টনের মাধ্যমে এর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। এই সম্পদ না রাষ্ট্রীয় মালিকানাদীন না ব্যক্তি মালিকানাদীন। এর উপর জনগণের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের অধিকার খিলাফত সরকার নিশ্চিত করবে। কারণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেন,
“তিন জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, চারণ ভূমি এবং আগুন।”
এই হাদীসের আবেদন উক্ত তিন বস্তুর মাঝেই সীমিত নয়, বরং এর আওতায় প্রত্যেক ঐ সমস্ত বস্তুও শামিল, যা সমাজের সকল মানুষের সমান ভাবে প্রয়োজন। একারনে ঐ সমস্ত যন্ত্রপাতি এবং উপকরনও এর মধ্যে শামীল, যা মানুষের নিত্য দিনের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়। যেমন-পানি উত্তোলনের পাম্প, পানি সরবরাহের পাইপ লাইন, পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সরবরাহ তার ইত্যাদি।
রাষ্ট্রের নাগরিকের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে খলীফা বাধ্য। যদি খলীফা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা)। রাসূল (সা) বলেছেন: “সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।” ইমাম (তথা খলীফা যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনি)ও দায়িত্বশীল, তাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।”
মা’কিল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ্ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।” (মুসলিম)
সুতরাং খিলাফত রাষ্ট্রে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল রাখা কোন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক খলীফার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবেন।
আসিফ রহমান আতিক
খিলাফত ব্যবস্থা কি মাত্র ত্রিশ বছর টিকে ছিল?

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে সারা বিশ্বের নেতা রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সা) এর হাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তা ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ বিশ্বাসঘাতক কামাল আতাতুর্কের হাতে তা ধ্বংস হয়। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বা খিলাফত ব্যবস্থা যে ধারাবাহিকভাবে টিকেছিল তা ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে তা আমাদের কাছে বোধগম্য হবে।
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এ ব্যবস্থার ধারাবাহিক অস্তিত্ব বুঝতে চাই, তাহলে দেখতে হবে প্রথমতঃ এ ব্যবস্থার কাঠামো কি ইতিহাস জুড়ে টিকেছিল কিনা। দ্বিতীয়তঃ এ কাঠামোতে সময়ের আবর্তে কি কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা। রাসুল (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়ের ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলো হল:
১। খলীফা বা রাষ্ট্রপ্রধান।
২। খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তাফউঈদ)।
৩। খলীফার নির্বাহী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তানফীয)।
৪। গভর্ণরবৃন্দ (উলাহ্)।
৫। আমীর-উল-জিহাদ।
৬। বিচার বিভাগ।
৭। প্রশাসনিক বিভাগ।
৮। উম্মাহ্ কাউন্সিল (মাজলিস আল-উম্মাহ্)।তাই আমরা যদি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ১৩০০ বছরের ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই পরামর্শ সভা মাজলিস আল উম্মাহই শুধু বিভিন্ন সময়ে উপেক্ষিত বা অবহেলিত ছিল। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর মাজলিস আল উম্মাহর প্রতি কিছু সংখ্যক খলীফার উদাসীনতার অর্থ এই নয় যে, পরামর্শ সভা না থাকলেই ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফতের অবসান হয়ে গেল। অন্য সব স্তম্ভ টিকে থাকলে মাজলিসুল উম্মাহ বা শুরা ছাড়াও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে, যদিও শুরা উম্মাহর অধিকার। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ ও বিদেশী সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঘটলেও এমন কখনো হয় নি যে, মুসলিমরা খলীফা বিহীন ছিল।
নিজের পুত্রকে খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দেয়া বা বংশীয় শাসনের অভিযোগ খানিকটা সত্য এবং এটাও সত্য যে, খলীফা নিয়োগের বায়াতের পদ্ধতিতেও কখনো কখনো অনিয়ম দেখা যায়। কিন্তু এটা খিলাফতের ধারাবাহিকতাকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। অনেক সময় এমনও ঘটেছে যে, খলীফা তার ছেলেকে যোগ্য মনে করলে তার মৃত্যুর আগেই জনগণের কাছ থেকে ছেলের জন্য বায়াতের শপথ আদায় করেছিলেন। পরবর্তীতে তা আবার নবায়ন করেছেন। এ বাই’য়াত মূলত প্রভাবশালী লোকজন এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করত।
খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফত টিকে থাকার কথা ইসলামী আলেমরাও স্বীকার করেছেন। যদিও এদের মধ্যে দু একজন তিরমিযী শরীফের একটি হাদীসের কারণে প্রথম চার খলীফার পর পরবর্তী খলীফাদের ক্ষেত্রে ‘খলীফা’ শব্দটি ব্যবহার করতে অপছন্দ করতেন। সে হাদীসটি হল: রাসুল (সা) বলেছেন, “আমার পর আমার উম্মাহর মধ্যে ৩০ বছর পর্যন্ত খিলাফত থাকবে তারপর শুরু হবে বংশীয় আকড়ে ধরা শাসন”(মুলকান আদ্দান) [একই বর্ণনা-সুনানে আবু দাউদ (২/২৬৪) এবং মুসনাদে আহমদ (১/১৬৯) থেকেও পাওয়া যায়।] ইসলামী বিশারদগণ ব্যাখ্যা করেন যে, যেহেতু এ হাদীসটি এ বিষয়ক অন্যান্য হাদীসের সঙ্গে আপাত দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মত প্রদান করে তাই এই হাদীসের গূঢ় অর্থ ৩০ বছর পর খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাবে তা নিশ্চিতভাবে বোঝাচ্ছে না।
জাবির বিন সামুরাহ (রা) বর্ণনা করেন, “রাসূল (সা) বলেন, দ্বীন ইসলাম ততদিন পর্যন্ত টিকে থাকবে যতদিন না আল্লাহর নির্ধারিত ক্ষণ উপস্থিত হয় অথবা কুরাইশ বংশীয় বারজন খলীফা তোমাদেরকে শাসন না করে” [সহীহ মুসলিম]।
এ হাদীস থেকে বোঝা যায় মুসলমানদের চার পাঁচ জন নয় বরং একাধিক সংখ্যক খলীফা শাসন করবেন। এ হাদীস অনুসারে খিলাফত ব্যবস্থা শুধু ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বাস্তব সম্মত নয়। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় কাজী আইয়াদ বলেন, “এই হাদীসটিতে যেখানে বলা হয়েছে ‘আমার পর খিলাফত ৩০ বছর টিকে থাকবে, এর পর শুরু হবে বংশীয় শাসন’ যা পুর্ববর্তী এই হাদীসটির সাথে সাংঘর্ষিক- ‘যত দিন না কুরাইশ বার জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করে, ইসলামী দ্বীন ততদিন টিকে থাকবে’। [সহীহ মুসলিম] এ সাংঘর্ষিক মনে হওয়া বিবৃতির সমাধান হল – ৩০ বছর খিলাফত টিকে থাকবে নবুয়্যতের আদলে অর্থাৎ সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফত ব্যবস্থার আদলে। বাস্তবে এই ত্রিশ বছর হযরত আবু বকর (রা) থেকে হাসান বিন আলী (রা) এর শাসনকালকেই বোঝায়। [এভাবেই আন-নববী তার সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখ করেছেন পৃষ্ঠা-৮২১। পাঠক লক্ষ্য করুন এ ত্রিশ বছরে চার জন নয় বরং পাঁচ জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করেছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রাসূল (সা) বলেন, “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, যখন এক মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোন নবী নেই। শীঘ্রই খলীফারা আসছেন এবং তারা সংখ্যায় হবেন অনেক। তারা (রা) (সাহাবীরা) জিজ্ঞেস করলেন, তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ দেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা তাদের একজনের পর একজনের বায়’আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে”। (বুখারী, মুসলিম)
উল্লিখিত হাদীস থেকে বোঝা যায় রাসুল (সা) এর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী না আসায় কার তত্ত্বাবধানে মুসলমানদের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হবে সেটা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন এবং সেটা হচ্ছে খিলাফত ব্যবস্থা ও খলীফার তত্ত্বাবধানে।
১২ জন খলীফার বিষয়টিও কাযী আইয়াদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন ‘সম্ভবত হাদীসটিতে যে ১২ জন খলীফার কথা বলা হয়েছে – তারা হল এমন ১২ জন খলীফা যাদের শাসনকালে ইসলামের শৌর্য-বীর্য বৃদ্ধি পেয়েছিল-উম্মাহ ঐ সকল নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং সর্বোপরি খলীফা হিসেবে উম্মাহর দেখাশুনাও তারা ঠিকভাবে করেছিলেন। [আস সুয়ূতি তারীখ আল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ১৪]
ইবনে হাজার বলেন, “এই হাদীসটি সম্পর্কে যে কয়েকজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার মধ্যে কাযী আইয়াদের যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ রাসূল (সা) এর কিছু সংশ্লিষ্ট সহীহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েই তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেমন: এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন, লোকেরা তাদেরকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবে……”। (ফাতহুল বারী) এর পাশাপাশি ইবনে হাজার কয়েকজন খলীফার উদাহরণসহ ঐতিহাসিক সত্যতা তুলে ধরেন।
ইমাম শাফে’ঈ (র) এর অনুসারী ফিকহ বিশেষজ্ঞ সাইফ-উদ-দ্বীন আল আমিদি তার বইয়ের মধ্যে (আল ইমামা মিন আবকার আল আফকার ফি উসুল আদ দিন, পৃ-৩০৬) সংশ্লিষ্ট হাদীসটির ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, এ হাদীসটিতে বলা হয়েছে ‘আমার খিলাফত থাকবে ৩০ বছর তারপর এতে বংশীয় শাসনের রীতি আসবে’। এ হাদিসটিতে চার খলীফা [আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা)] পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা টিকে থাকবে তা বোঝায়নি। এবং এই হাদীসটি দিয়ে শুধু এ কথাও বোঝায়নি যে, চার খলীফার সময় পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং রাসূল (সা) বুঝিয়েছেন-তাঁর পর কোন প্রকার বিচ্যুতি ছাড়া তাঁর নেতৃত্বের ধরণ (সুন্নাহ অনুসারে) ইমাম বা খলীফারা উল্লেখিত সময় পর্যন্ত নেতৃত্ব দেবেন। এর পর বেশীর ভাগ শাসকরাই উত্তরাধিকার সূত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ অলংকৃত করে শাসন করবেন। তা সত্ত্বেও যে খিলাফত ব্যবস্থা টিকে ছিল তা নিচের দুটি বিষয় থেকে বোঝা যায়।
প্রথমতঃ পরবর্তী সকল সময়ে উম্মাহর মধ্যে এ ব্যাপারে ঐক্যমত ছিল যে তাদের একজন ইমাম বা খলীফা থাকতে হবে এবং তাকে মানা আবশ্যক।
দ্বিতীয়তঃ তিনি (সা) বলেছেন, ‘তারপর আসবে (তাসির) মুলকান’। এখানে যে বাক্যাংশটি ব্যবহার করা হয়েছে সে ‘তাসিরু মুলকান’ (تصير ملكا) দিয়ে খিলাফতকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। উল্লিখিত ক্রিয়াটি (তাসিরু) খিলাফতকে ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই বোঝায় না। এ দিয়ে আরও প্রতিপন্ন হয় না যে খিলাফতই ‘মুলকে’ পরিণত হবে। কেননা একটি বিষয় অন্য বিষয়ে পরিণত হতে গেলে প্রথম বিষয়টির অস্তিত্বে থাকা অবশ্যই জরুরী। এখানে প্রথম উল্লিখিত বিষয়ে ইমাম আমিদি ব্যাখ্যা করেন, দলিল অনুসারে উম্মাহকে অবশ্যই সে যুগের ইমামকে (খলীফাকে) মানতে হবে। এটা দিয়ে অবশ্যই এক খলীফার পর আরেক খলীফা আসার বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা হয় নি। আমিদির দ্বিতীয় যুক্তি হল ভাষাতাত্ত্বিক। উক্ত হাদিসটির বক্তব্য হল- খিলাফতের চরিত্র বা প্রেক্ষিত পরিবর্তিত হয়েছে; খিলাফত ব্যবস্থা নিজে নয়। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে যেমন: ‘তারপর তারেক রেগে গেল’ (ثم يصير طارق غاضبا) এখানে তারেকের অবস্থান বা গুণগত অবস্থার পরিবর্তন বুঝিয়েছে। অর্থাৎ তারেক রেগে গিয়ে আলী বা উমরে পরিণত হতে পারে না। একইভাবে হাদিসটিতে যখন বলা হয়েছে “ছুম্মা তাসিরু মুলকান” এর অর্থ হল এবং ‘এরপর আসবে বংশীয় শাসন’ এ বাক্যাংশ দিয়ে কখনো বোঝা যায় না যে খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে গেল। বরং ঐ ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আসাকে বোঝায়।
৯০৩ হিজরিতে খলীফা মুতাওয়াক্কিল আবুল-’ইজ মৃত্যুবরণ করেন। তার স্থানে তার ছেলে আল মুসতামসিক বিল্লাহ খলীফা নিযুক্ত হন। এ সময়ে বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইমাম জালাল আল-দিন সুয়ুতি তারীখ আল খুলাফা (খলীফাদের ইতিহাস) বইয়ে তখন পর্যন্ত খলীফা হসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি এ বইয়ের সূচনায় বলেন, “আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত যত খলীফা শাসন করেছেন এখানে সংক্ষেপে সে সব খলীফাদের জীবনী তুলে ধরলাম। যারা ছিলেন বিশ্বাসীদের নেতা (আমীর উল মু’মিনিন) যারা উম্মাহর সকল বিষয় নিয়ে দেখাশুনা করতেন”। তার এই বই লেখার সময়টা ছিল হিজরতের ৯০০ বছর পর। সমস্ত খিলাফতের সময়কাল জুড়েই তৎকালীন খলীফাদের সাথে ইসলামী পণ্ডিতদের যোগাযোগ ছিল। কেউ কেউ খলীফাদের বিভিন্ন কাজের কৈফিয়ত বা ইসলামী ব্যাখ্যা চাইতেন। আবার কেউ কেউ তাদের শাসন কাজে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় – ইমাম আবু হানিফা খলীফা আল মানসুরের এক সিদ্ধান্তের কৈফিয়ত চেয়েছিলেন। কাজি আবু ইউসুফ খলীফা হারুন অর রশিদের শাসন আমলে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুসতানসির বিল্লাহ তাতারদের পরাজিত করার পর আল-’ইজ বিন আব্দুস সালাম তার নিকট বায়’আত গ্রহণ করেছিলেন।
উসমানীয় খিলাফতের শেষের দিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তিগুলো যখন মুসলিমদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিল দেয়ার ষড়যন্ত্রে মগ্ন ছিল তখন মাওলানা কাশিম নানুতবি (র) এর সরাসরি ছাত্র ও দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মাওলানা মুহাম্মদ হাসান (র) ১৯২০ সালে ইসলামের শত্রুদের সাম্রাজ্যবাদী ছোবল থেকে উসমানীয় খিলাফতকে রক্ষা করার জন্য মুসলিমদের উদ্দেশ্যে এক ফতোয়া জারি করেন। সম্মানিত মাওলানা হাসান বলেন ‘ইসলামের শত্রুরা ইসলামের সম্মান ও প্রতিপত্তি ধ্বংস করতে চেষ্টার ত্রুটি করছে। ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়ার উপর তাদের লোভাতুর দৃষ্টি পড়ছে। মুসলমানদের খলীফা – যিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করেন, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি, ইসলামের সার্বজনীন আইন বাস্তবায়নকারী; যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করেন এবং সৃষ্টিকর্তার সম্মানিত বাণী পৃথিবীর বুকে রক্ষা ও বাস্তবায়নকারী, সেই খলীফারা আজ শত্রু বেষ্টিত ……… [মাওলানা সাইদ মুহাম্মদ মিয়ার “দ্যা প্রিজনার অফ মাল্টা” বইয়ে ২৯ অক্টোবর ১৯২০ সালে জারিকৃত ফতোয়াটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন, পৃষ্ঠা ৭৮]
খিলাফত আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলি যোহার খিলাফত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “তুরস্কের খলীফারা হল রাসূল (সা) এর উত্তরাধিকারী। মুমিনদের নেতা বা বিশ্বাসীদের প্রধান। যার অস্তিত্বের কথা কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। (মোহাম্মদ আলী যোহার, মাই লাইফ এ ফ্র্যাগমেন্ট)। এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলান আবুল কালাম আজাদের ১৯২০ সালে খিলাফত নিয়ে লেখা “দ্যা ইস্যু অব খিলাফত” বইয়ের শুরুতেই লিখেন, খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। ইন্ডিয়ার মুসলমানদের উচিত তাদের সর্বোশক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে খিলাফত রক্ষা করার জন্য কাজ করা”। বইটির মধ্যে আবু বকর (রা) থেকে শুরু করে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সকল খলীফার একটি তালিকাও তিনি সংযোজন করেন। খিলাফতের শেষ পর্যায়ে এসেও তাই আমরা দেখতে পাই খিলাফত টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে উলামারা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফতের ধারাবাহিকতা থাকাটা আহলুস সুন্নাতের বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রসঙ্গে শাফি মাযহাবের ইমাম আত-তাফতাজানী হানাফী মাযহাবের ইমাম আন নাসাফির চিন্তার সঙ্গে সম্পুর্ণ একমত পোষণ করেন। এ বিষয়ে আত-তাফতাজানী বলেন, উম্মাহর জন্য একজন ইমাম নিয়োগ করা যে বাধ্যতামূলক সে বিষয়ে সকল ইমামের মধ্যে মতৈক্য আছে। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়’আত (আনুগত্যের শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)। আত-তাফতাজানী আরও বলেন, “মুসলিমদের একজন ইমাম থাকা বাধ্যতামূলক যিনি মুসলমানদের প্রশাসন পরিচালনা করবেন। যিনি মুসলিমদের জন্য নির্দেশিত ডিক্রিগুলো রক্ষা করবেন, মুসলিমদের ভৌগলিক সীমানা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করবেন, মুসলিম সেনাবাহিনীকে যথাযথ সামরিক সরঞ্জামে সুসজ্জিত রাখবেন, জনগণের দানের অর্থ গচ্ছিত রাখবেন, জুম্মাহর নামাজ ও প্রধান প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিবেন, সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করবেন, বৈধ অধিকার রক্ষার পক্ষে তিনি প্রমাণাদি গ্রহণ করবেন। অভিভাবকহীন যুবক যুবতীদের নিজ অভিভাবকত্বে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। [আকিদাত অ্যান নাসাফিয়া পৃঃ ১৪৭]
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও দলীলের নিরীখে ইমাম তাফতাজানী বক্তব্য যে ঠিক তা বোঝা যায়। একজন খলীফা নিয়োগ করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক যা রাসূল (সা) এর সুন্নাহেরই প্রতিফলন। তাই উল্লেখিত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় আমাদের সমাজে খিলাফতের কাল “ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ” ছিল তা নিতান্তই অবাস্তবিক, অযৌক্তিক ও অলীক অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। খিলাফত ব্যবস্থা উম্মাহকে দেখাশুনার ব্যবস্থা হিসেবে রাসূল (সা) এর ওফাতের পর উসমানীয় খিলাফতের আমল পর্যন্ত টিকেছিল।
আমাদের উপাস্য কি আল্লাহ না টাকা ?

আমাদের বর্তমান সমাজের মানুষের প্রধান লক্ষ্য হল যে কোন উপায়েই হোক সম্পদশালী ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সমাজের সবাই তাদের সম্পদ বৃদ্ধির চিন্তায় মগ্ন। যেন টাকা পয়সাই হচ্ছে জীবনে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি। কেউই তার বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। সবার চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা ক্রমাগত বাড়ছে। আর এসব চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য মানুষ সবসময় নতুন নতুন সুযোগের সন্ধান করছে।
এখন মানুষের লক্ষ্য হল অর্থ উপার্জন – তা যে কোন উপায়েই হোক না কেন। ঘুষ নিয়ে হোক, অন্যের কাছ থেকে ছিনতাই করে হোক অথবা সুদের একাউন্টে টাকা জমিয়ে সেই টাকা দ্বিগুন বা তিনগুন হবার অপেক্ষা ইত্যাদি যে কোন উপায়েই হোক টাকা উপার্জন করতে হবে। কেননা এখনকার সমাজে টাকার সাথে সাথে বাড়ে স্ট্যাটাস; যার টাকা আছে সেই সম্মানিত, মান্যগণ্য। যে যত বেশি দামের গাড়িতে চড়ে, যার বিয়ে যত বেশি জাকজমক আর ব্যয়বহুল, যে যত বেশি খাবার অপচয় করতে পারে সে তত বেশি সফল। যে ব্যক্তি তেমন বেশি টাকার মালিক হতে ব্যর্থ হয়েছে, যেন তার জীবনটাই বৃথা। সবাই যেন অর্থ সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।
টাকা পয়সার মালিক হওয়া আর নিজের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার ব্যস্ততা এমনভাবে আমাদেরকে গ্রাস করেছে যে আমরা জীবনের মৌলিক বাস্তবতা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছি। এ জীবনের বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করার কোন সময় আমাদের নেই। আমাদের অবস্থাটা এমন যেন চিরকাল বেঁচে থাকব। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, কাজকর্ম ও লাইফস্টাইল দেখে এমনটাই মনে হয় যেন আমাদের জীবন চিরস্থায়ী। আমরা ভুলে গিয়েছি যে কিছুকাল পূর্বে আমাদের কোন অস্তিত্বই ছিল না। আমরা এই সত্য বিস্মৃত হয়ে গিয়েছি যে, জীবন চিরস্থায়ী নয়। শীঘ্রই এ জীবনের শেষ হবে। আমাদের সবার জন্য চরম বাস্তবতা হচ্ছে মৃত্যু। আমাদের কারো জানা নেই আমরা কতদিন বাঁচব। হয়ত কয়েক বছর, কয়েক মাস, কয়েক দিন, কয়েক ঘন্টা, এমনকি কয়েক মিনিট মাত্র। এই লেখা পড়ে শেষ করার আগেই আমাদের মৃত্যু হতে পারে। এ জীবনের প্রতি আমাদের নিয়ন্ত্রণ কত সামান্য !
এখন আমরা একটা পুরোপুরি বস্তুবাদী সমাজে বাস করছি। এখানে জীবনের উদ্দেশ্য হল সম্পদ জমা করা আর সর্বোচ্চ পরিমাণে জীবনের স্বাদ উপভোগ করা। নাচ-গান, গার্লফ্রেন্ড, দামী গাড়ি, পার্টি, ফিল্ম ইত্যাদি নিয়েই কাটছে আমাদের সময়। আর এসবের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের দরকার বেশি বেশি টাকা। এই “মানি এন্ড এনজয়” কালচার আমাদের এতটাই ব্যস্ত রাখে যে আমরা আমাদের জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো ভুলে যাই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য, দাগ লাগানো অশ্ব, গবাদিপশু এবং ক্ষেত খামারের প্রতি আকর্ষণ মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এসব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু আর আল্লাহর নিকট আছে উত্তম আশ্রয়স্থল।” (আল-কুরআন ০৩:১৪)
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, কেননা আল্লাহ তার মধ্যে এক অনন্য চিন্তাশক্তি দান করেছেন। তাই এটা মানুষের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না যে, সে সারা জীবন ধরে একটার পর একটা চাহিদার পেছনে ছুটে চলবে আর কী উদ্দেশ্যে সে এই পৃথিবীতে এসেছে, মৃত্যুর পর তার কী পরিণতি হবে, সে ব্যাপারে কোন চিন্তা-ভাবনা করবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনের শত শত আয়াতে মানবজাতিকে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার ব্যাপারে সবসময় সজাগ থাকতে বলেছে। কিন্তু আজ এ পৃথিবীর চাকচিক্য আমাদেরকে এমনভাবে ভোগবিলাসের চিন্তায় মগ্ন করে ফেলেছে যে, মানুষ যে কত দুর্বল তা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না।
এখন আমরা সামান্য সময়ের জন্যও চিন্তা করি না যে, যে সমস্ত অর্থ ও সম্পদ আমরা পুঞ্জিভূত করছি তার কিছুই আমাদের সাথে কবরে যাবে না। আমরা যতই টাকা পয়সা জমা করি না কেন, তা কখনো মৃত্যুর ফেরেশ্তাকে আমাদের জীবন নেয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“দুর্ভোগ তাদের প্রত্যেকের যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে; যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে – তার ধারণা যে তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে; কখনো নয়; সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায় .. .. ..।” (আল কুরআন ১০৪: ০১-০৪)
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে; যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও; এটা সঙ্গত নয়; শীঘ্রই তা তোমরা জানতে পারবে।” (আল কুরআন ১০২:০১-০৩)আজ আমাদের অহংকারের কোন সীমা নেই। আমাদের ধারণা যে আমরা বহুদিন বাঁচব। যেভাবে আমরা ব্যয় করি, অপচয় করি এবং নিজের প্রশংসা করি তা থেকে আমাদের অহংকারের মাত্রাটা বোঝা যায়।
“মানুষ কি মনে করে যে কখনো তার উপর কেউ ক্ষমতাবান হবে না ? সে বলে (অহংকারের সাথে), আমি প্রচুর সম্পদ নিঃশেষ করেছি। সে কি মনে করে তাকে কেউ দেখেনি ?” (আল কুরআন ৯০:০৫-০৬)
এখনো আমাদের সাবধান হওয়ার সময় আছে
ইসলাম মানুষকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার তাগিদ দেয়। সে কে, কোথা হতে কী উদ্দেশ্যে সে এই পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ তার পরিচয় ও জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে বেখবর হয়ে পশুদের মত আদিম চাহিদা ও প্রবৃত্তির দাস হয়ে সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিবে – এটা হতে পারে না।
যদিও আমরা শুক্রবারে জুমার নামাজে উপস্থিত হয়ে আর মাঝে মাঝে মিলাদ মাহফিলে যোগ দিয়ে আল্লাহর সাথে চালাকি করি কিন্তু বাস্তবে আমরা জানি যে শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে আমাদের জীবন পরিচালিত হচ্ছে না। আমরা জীবনযাপন করি আমাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণের লক্ষ্যে। আমাদের ইসলাম সীমাবদ্ধ টুপি, পাঞ্জাবী ইত্যাদি কিছু বাহ্যিক আচার আচরণের মধ্যে। আমাদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তি হল যা আমাদের নিজেদেরকে সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট করে। আমাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাগুলোই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেন সেগুলোই আমাদের ‘উপাস্য’। আমাদের এধরনের মানসিকতার প্রতি নির্দেশ করে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন যে তার নিজ খেয়াল খুশিকে উপাস্য (ইলাহ) বানিয়ে নিয়েছে ?” (আল কুরআন ২৫:৪৩)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বারবার মানুষের অহংকার সম্পর্কে তাকে সাবধান করে দিয়েছেন। তিনি মানুষকে সতর্ক করেছেন বিচারের দিনের বাস্তবতা সম্পর্কে যা আমাদের সবার জন্য অপেক্ষা করছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“নিশ্চয়ই বিচারের দিন আসবে, এতে কোন সন্দেহ নেই, তারপরও অধিকাংশ মানুষ অবিশ্বাসী।” (আল কুরআন ৪০:৫৯)
মানুষ যাতে নিজের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে সেজন্য ইসলাম এই পৃথিবীতে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রত্যেককে চিন্তাশক্তি দান করেছেন যার মাধ্যমে আমরা আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বুঝতে পারি। আমরা যখন চিন্তাভাবনা করতে শুরু করি তখন খুব সহজেই বুঝতে পারি আমরা কিভাবে পৃথিবীতে এসেছি এবং কোন উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা না করাটা বোকামী ও উন্মাদনা ছাড়া আর কিছু নয়।
এ জীবনের পরে যে জীবন আসছে তা চিরস্থায়ী। তাহলে কেন আমরা এ জীবনকেই চিরস্থায়ী মনে করছি ? যেহেতু মৃত্যু একটা নিশ্চিত সত্য এবং মৃত্যুর পরের জীবনটাই চিরস্থায়ী এবং আল্লাহর বিচারে ঠিক হবে আমাদের সেই জীবন, সেহেতু আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে যেসব আদেশ ও নির্দেশ দিয়েছেন তার উপর ভিত্তি করে এ জীবন পরিচালিত করাই আমাদের জন্য একমাত্র করণীয়।
“এ পৃথিবীর জীবনটা খেলাধুলা আর তামাশা মাত্র। কিন্তু মুত্তাকীদের জন্য এর চাইতে উত্তম হল পরকালের আবাস। তাহলে কি এরপরও তোমরা বুঝবে না ?” (আল কুরআন ০৬:৩২)
আমাদের বর্তমান সমাজ ইসলাম থেকে অনেক দূরে। এই সমাজে যেসব লক্ষ্য ও মূল্যবোধের প্রতি তাগিদ রয়েছে সেগুলো আল্লাহ প্রদত্ত লক্ষ্য ও মূল্যবোধসমূহের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের জীবন কাটছে অন্যান্য প্রাণীদের মত শুধুমাত্র নিজের চাহিদা ও খেয়াল খুশকে সামনে রেখে। কোন সুস্থ চিন্তা তথা আদর্শ আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে না। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরাধ, দুর্নীতি, নিপীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির ব্যাপক বিস্তার কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।
আমরা মুসলমান এই জন্য যে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি যে আমরা আল্লাহর দাস, আল্লাহর আদেশ পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা আমাদের কর্তব্য। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা পরিষ্কারভাবে এ জীবনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে দিয়েছেন:
“আমি মানুষ ও জ্বীন সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য।” (আল কুরআন ৫১:৫৬)
এর অর্থ হল পার্থিব ভোগবিলাস নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম মানুষকে খাওয়া ও পান করা, সন্তান জন্মদান ও আয় রোজগার করতে উৎসাহিত করে; কিন্তু এগুলোকেই জীবনের উদ্দেশ্য হিসাবে নির্ধারণ করেনি। তাই একজন মুসলমান কখনো নিজের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাগুলোকে কেন্দ্র করে সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিতে পারে না।
আজ সময় এসেছে ইসলামী লক্ষ্য ও মূল্যবোধ থেকে আমরা কত দূরে সেটা উপলব্ধি করার। কেন আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-কে ভুলে গিয়েছি। কেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) আমাদের জীবনে আর তত গুরুত্বপূর্ণ নয় ? আমরা কিভাবে ভুলে গিয়েছি যে আল্লাহর সাথে আমাদের দেখা হবে এবং আমাদের কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে? কিভাবে আমরা এই তুচ্ছ জীবনের বিনিময়ে পরকাল বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছি ? আর তাই আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা জিজ্ঞেস করছেন,
“হে মানুষ ! কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম প্রতিপালক হতে বিভ্রান্ত করল ?” (আল কুরআন ৮২:০৬)


















