তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
যুক্তরাষ্ট্রের আশু পতন ও খিলাফতের উত্থান

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ধ্বসের শুরু হয়েছে ২০০৭ সাল থেকে। এর পর ২০০৮ সালে এসে তা বিশ্ব মন্দায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ওবামা প্রশাসন বেইল আউট প্যকেজের মাধ্যেমে জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে বড় বড় পুঁজিপতিদের কোম্পানিকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা চালায় এবং একে একে মার্কিন জনগণের উপর ট্যাক্সের মাত্রা বড়িয়ে তার তার বাজেট ঘাটতি পূরনের চেষ্টা চালায়। এতে করেও ওবামা প্রশাসন মার্কিন অর্থনীতিতে সচলতা ফেরাতে পারেনি।
বর্তমানে অর্থনৈতিক অচল অবস্থা রাজনৈতিক অচল অবস্থা তৈরি করেছে এবং এই অচলাবস্থার কারণে ৮ লাখেরও বেশি কর্মচারীকে বিনা বেতনে ছুটি দিতে হয়েছে এবং জাতীয় পার্ক, পর্যটন এলাকা, সরকারি ওয়েবসাইট, অফিস ভবন এবং নাসাসহ আরও অনেক কিছু বন্ধ করে দিতে হয়েছে – যেটাকে বলা হচ্ছে SHUT DOWN। কিন্তু অতীতে আমারা মার্কিনীদের জাতীয় স্বার্থের ব্যপারে সব সময় ঐক্যবদ্ধ দেখেছি কিন্তু এবার হচ্ছে তার ব্যতিক্রম। এবার তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দেশের সমস্যা সমাধানে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রেটদের নিজেদের স্বার্থ এখন দেশের স্বার্থের চেয়ে গুরত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমারা জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় নব্বই শতাংশ সম্পদ হল দুই শতাংশ লোকের হাতে আর এরাই হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতার মালিক। আজ অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশের জনগণের হাতে টাকা নেই তাই মার্কিন অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য ঋণসীমা বৃদ্ধির প্রয়োজন ও সেবা খাতে অর্থের বরাদ্দ প্রয়োজন যা কিনা আবার আগামী নির্বাচনে জেতার জন্য ডেমোক্রেটদের জন্য সহায়ক আবার যা কিনা অনেক পুঁজিপতি কংগ্রেস সদ্যসের আর্থিক ক্ষতিরও কারন। নিজের পকেটের টাকা দিয়ে পুঁজিপতিরা আজ দেশ চালাতে ইচ্ছুক নয় আজ তাই তাদের মধ্যে অনৈক্য স্পষ্ট এবং এই অনৈক্য হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতনের ঘণ্টা।
“এরা সে লোক, যারা নিজেরাই নিজেদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, আর এরা যা কিছু মিথ্যা মা’বুদ সাব্যস্ত করেছিল, তা সবই তাদের থেকে হারিয়ে গেছে”। (সুরা হুদ: ২১)
আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ এবং সমগ্র বিশ্বে সে তার নিয়ন্ত্রন হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত মুসলিম প্রধান দেশ গুলোতে সে উম্মাহর তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে আর মুসলিম উম্মাহ মাঝে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঐক্যের দাবী তীব্র হচ্ছে।
বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে আজ আমেরিকা নিজেদের তৈরি করা মরণফাঁদে আটকা – ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে তাদের যুদ্ধের খরচ প্রায় ৪ – ৬ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যার বোঝা তাদের জনগণদেরই নিতে হচ্ছে। এত খরচের পরও তারা কোথায় বিজয় এর মুখ দেখছেনা। আল্লাহ যথার্থই বলেন:
“যারা কাফের তারা তাদের সম্পদ ব্যয় করে মানুষদের আল্লাহর পথ হতে হটানোর জন্য, আর তারা তা খরচ করেই চলবে, অতঃপর, তাদের এই ব্যয় তাদের জন্য পরিতাপের কারণ হবে এবং অবশেষে তাদেরকেই পরাজয় বহন করতে হবে” (আনফাল: ৩৬)
আজ তাই আমেরিকার শেষ ভরসা হোল মুসলিম বিশ্বের তাঁবেদার শাসক গুলো। সিরিয়ার মুসলিম অভ্যুত্থান ঠেকানোর জন্য মার্কিনীদের হয়ে আজ লড়ছে তুরস্ক, সৌদি আরব ইত্যাদি। আমাদের দেশেও একই ধারাবাহিকতায় দালালি করে যাচ্ছে হাসিনা, খালেদার মতো নেতারা।
তাই মুসলিম বিশ্বের এইসব বিশ্বাসঘাতক শাসকদের মূলোৎপাটন করে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই মুসলিম উম্মাহ আবারো ফিরে পেতে পারে তার হারানো গৌরব।
তাই আজ বাংলাদেশের মুসলিমদের উচিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং মার্কিনীদের হাত থেকে বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিয়ে নেওয়া।
তোমাদের পরওয়ারদেগার শীঘ্রই তোমাদের শত্রুদের ধ্বংস করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দেশে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। তারপর দেখবেন, তোমরা কেমন কাজ কর। (সুরা আরাফ: ১২৯)
বাংলাদেশের রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনে ভারতের আধিপত্য বিস্তারের কূটকৌশল

পুঁজিবাদের বেসরকারিকরণ চিন্তার কারণেই বিদ্যুৎ আজ সামর্থের বাইরে এবং অপ্রাপ্য, যা গণতন্ত্র দ্বারা সুরক্ষিত। গণতন্ত্রের দ্বারা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের জন্য সরকারই দায়ী। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কিছু ব্যক্তি মালিকানায়, দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তা দান করে, তারাই মূলত বিদ্যুৎ সম্পদের পূর্ণ সুবিদা পেয়ে থাকে আর অন্যদিকে সাধারণ জনগণ কষ্টের সম্মুখীন হয়।
বিদ্যুৎ হলো উৎপাদন, সঞ্চালন, বিতরণ ও বিপননের মতো ক্রমানুসারিক সমন্বিত এবং বহু স্তরে বিন্যস্ত এক প্রক্রিয়া যার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই প্রযুক্তি। তবে বর্তমান বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিগত বিষয়টি বেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সঙ্কট সৃষ্টি হলে তা শিল্প, কৃষি, উৎপাদন, সংরক্ষণ, বিপণন ইত্যাদি সবকিছুকেই বিপর্যয়ে নিক্ষেপ করে। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে এখন প্রতিদিন প্রায় ১৪-১৬ ঘণ্টা বিদুৎ থাকে না। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরো শোচনীয়।
বিদ্যুত চাহিদা নিয়ে পিডিবি এবং সরকার সব সময়ই লুকোচুরি করে। সঙ্গত কারণে মনে করা হয় যত বেশি লোডশেডিং তত বেশি সঙ্কট। সঙ্কটের আবর্তেই ঘুরছে বিদ্যুত খাত। একের পর এক নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে আসছে কিন্তু এর কতটা সুফল পাচ্ছে জনগণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সঙ্কট উত্তরণে সরকার প্রথম থেকেই ভুলপথে হাঁটছে। সাশ্রয়ী বিদ্যুত উৎপাদনের বদলে কম সময়ে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুতকেন্দ্রর দিকে ঝোঁকায় বিদ্যুতের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের দেশের মানুষ কতটা মূল্য বৃদ্ধি সহ্য করতে পারবে তার কোন হিসেব না করেই বিদ্যুত প্রকল্পগুলো হাতে নেয়া হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি জীবনযাত্রার প্রত্যেকটি স্তরে প্রভাব ফেলে। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি শুধু এককভাবে গ্রাহকের বিদ্যুত বিল বাবদ খরচই বৃদ্ধি করে না। শিল্প এবং কৃষি উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে। ইতোমধ্যে যার প্রভাব পড়েছে প্রাত্যহিক জীবনে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ চাহিদা ও ঘাটতি:
জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা ৭ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট, এর বিপরীতে উৎপাদন ৫ হাজার ৩০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। চাহিদা ও উৎপাদনে ব্যবধান ২০০০ মেগাওয়াট। দেশে মোট ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪৬০ কিলোমিটার বিতরণ লাইনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এ সঞ্চালন লাইনের অন্তত ৪০ শতাংশই জরাজীর্ণ। বাংলাদেশে মাত্র ৪০% (Access to Electricity) বাড়িতে বিদ্যুত পৌঁছে গেছে। বাকি ৬০% বাড়িতে এখনও বিদ্যুৎ পৌঁছেনি।
৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের কর্মক্ষমতার ৮৫-৯০ শতাংশ উৎপাদন করতে পারছে। আর বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্যাপাসিটির তুলনায় আরও অনেক কম। যন্ত্রপাতির উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে ৩৩ শতাংশ কম বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। তার ওপর সিস্টেমলসের কারণে প্রায় ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে।
সঙ্কট নিরসনে অদূরদর্শী ও আত্মঘাতী প্রচেষ্টা:
সম্প্রতি ভাড়া ভিত্তিক ও বেসকারি উদ্যোগে বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা দেশের মানুষকে দ্রুত আংশিক সমাধান এনে দেবে হয়তো কিন্তু অদূর ভবিষ্যতে দামে বেড়ে গরীবের নাগালের বাইরে চলে যাবে এই কাঙ্ক্ষিত বিদ্যুত। এরই মধ্যে সরকারের দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতা ও ফায়দা লুটার রাজনীতির স্বীকার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নিয়ে আসা হয় বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহবানে বিদেশী বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ খাতে বিনিয়োগ করে। কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বেসরকারিভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ চড়া মূল্যে সরকারকে কিনতে হচ্ছে যা ভোক্তাদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ভোগে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।
তারই ফলশ্রুতিতে সর্বশেষ ২৯ জানুয়ারি, ২০১২ বাগেরহাটের রামপালে সুন্দরবনের কাছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছে সরকার। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কোম্পানি (এনটিপিসি) যৌথ অর্থায়নে প্রায় এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে গত ২৯ জানুয়ারি ২০১২ সালে। চুক্তির সমস্যা হচ্ছে প্রকল্পের অর্থ আসবে বিদেশী ঋণ থেকে ৭০ ভাগ, ভারত ১৫ ভাগ আর বাংলাদেশ ১৫ ভাগ। বিদেশী ঋনের সুদ টানা এবং পরিশোধ করার দায় দায়িত্ব বাংলাদেশের। অর্থ্যাৎ ভারতের বিনিয়োগ মাত্র ১৫ ভাগ। কিন্তু তারা মালিকানা পাচ্ছে ৫০ ভাগ। পুরো অর্ধেক। উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনবে পি ডি বি। বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে একটা ফর্মুলা অনুসারে। কী সে ফর্মুলা? যদি কয়লার দাম প্রতি টন ১০৫ ডলার হয় তবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ এর দাম হবে ৫ টাকা ৯০ পয়সা এবং প্রতি টন ১৪৫ ডলার হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। অথচ দেশীয় ওরিয়ন গ্রুপের সাথে মাওয়া, খুলনার লবন চড়া এবং চট্টগ্রামের আনোয়ারা তে যে তিনটি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যে চুক্তি হয়েছে পি ডি বির সাথে সেখানে সরকার মাওয়া থেকে ৪ টাকায় প্রতি ইউনিট এবং আনোয়ারা ও লবন চড়া থেকে ৩টাকা ৮০ পয়সা দরে বিদ্যুৎ কিনবে। সরকার এর মধ্যেই ১৪৫ ডলার করে রামপালের জন্য কয়লা আমদানির প্রস্তাব চূড়ান্ত করে ফেলেছে। তার মানে ৮ টাকা ৮৫ পয়সা দিয়ে পি ডি বি এখান থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনবো সেটা নিশ্চিত।
বিদ্যুতের দাম, কয়লার উৎস নির্ধারণ না করেই এবং কৃষি জমি নষ্ট ও পরিবেশগত প্রভাব বিষয়ক আপত্তি উপেক্ষা করেই এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে। সুন্দরবনের কোলঘেঁষে এই তাপবিদ্যুকেন্দ্র স্থাপনে একে সুন্দরবন ধ্বংসকারী ও জাতীয় স্বার্থের বিরোধী উদ্যোগ বলে নানাভাবে আপত্তি জানিয়ে এলেও সরকার তা কানে তোলার প্রয়োজন বোধ করেনি। ফলে অব্যাহত সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনের মতো নানা সমস্যার সমাধানে ব্যর্থ সরকারের এই ভূমিকাকেও এখন দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেয়া ভারতপন্থী পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছে মানুষ। সব আপত্তি উপেক্ষা করে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহেই রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে রামপাল উপজেলার সাপমারি, কাটাখালি ও কৈগরদাসকাঠি মৌজায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ করেছে।
এভাবে জনগণের বিদ্যুৎ পাওয়ার অধিকারকে উপেক্ষা করে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ভারতের সাথে নির্লজ্জভাবে এ চুক্তি করেছে। এছাড়া বিশ্ব ব্যাংক, আই.এম.এফ ও এ.ডি.বি – র পরামর্শে বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারিকরণের সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে নিয়েছে সরকার। আর এর প্রমাণ মিলে, সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে দুর্বল করে রাখা, বেসরকারি বিনিয়োগে নতুন নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থপন করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি এই পরিকল্পনার বিষয়ে বিদ্যুৎ খাত বিশেষজ্ঞ ও পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, শিক্ষা, চিকিৎসার মতো বিদ্যুৎ ও একটি সেবা খাত। এ খাতে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণ হলে তারা যে কোন সময় সরকার এবং জনগণকে জিম্মি করতে পারে। যা অতীতে হয়েছে। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারি খাতে না দিয়ে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও গ্যাস ভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপনে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজনৈতিক বিবেচনা:
বিদ্যুৎ খাতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা যুক্ত করার বিষয়ের সাথে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের প্রশ্ন জড়িত। বড় বড় এসব দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি প্রজেক্টের ঠিকাদারী পাওয়ার জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলো লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে বসে আছে। এসব প্রজেক্ট দেয়া-নেয়াকে কেন্দ্র করে আছে কমিশনের লেন-দেনের ব্যাপার। এসব কমিশনের টাকার পরিমাণ কল্পনাতীত। রাজনীতিবিদ আমলাতন্ত্র প্রভৃতি নীতি নির্ধারকদের আসল আকর্ষণ হলো এই কমিশনের ভাগ পাওয়ার দিকে। সঙ্কটের আশু নিরসনের দিকে মনোযোগ দেয়ার প্রতি তাদের সময়ইবা কই সে বিষয়ে তাদের তেমন আগ্রহই বা ততোটা থাকবে কেন। কোনো দেশীয় কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কিছু প্রজেক্ট হাতে নিয়ে সমস্যার ভার কিছুটা লাঘবের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিলে, তাতেও কর্তাব্যক্তিরা অনাগ্রহী। কারণ তিনটি
এক. দেশীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এসব কাজ করালে বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে যেভাবে কমিশন হাতে নেয়া যায়, এক্ষেত্রে সেটা পাওয়া যাবে না।
দুই. সঙ্কট যদি লাঘব হয় তাহলে গভীর সঙ্কটের অজুহাত কাজে লাগিয়ে বেশি দামে বিদেশিদেরকে প্রজেক্ট পাইয়ে দিয়ে কমিশনের পরিমাণ বাড়ানো যাবে না।
তিন. সঙ্কট লাঘবের জন্য আশু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ থেকে তেমন কমিশন পাওয়ার সুযোগ কম।
বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি, শক্তি-সম্পদ প্রভৃতি কোনো সঙ্কটই অসমাধানযোগ্য নয়। সমাধানের উপায় আছে, পথ আছে। বাধা হলো মুষ্টিমেয় মানুষের ফায়দা লুটার লালসা। দুর্নীতি পরায়ণ এ সরকার ব্যবস্থায় ভয় দেখিয়ে বা নীতিবাক্য শুনিয়ে নিবৃত্ত করা যাবে না। লুটপাটের পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে বদলে ফেলতে না পারলে এই বাধা দূর হবে না।
সঙ্কট উত্তরণের উপায়:
সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং নীতি না থাকায় – মুসলিম দেশগুলোর শাসকরা সব সময়ই অদূরদর্শী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। আর এ ধরণের প্রবণতা শুরু হয়েছে সেই ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই।
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান ব্যর্থতা দিয়ে বোঝা যায় প্রাকৃতিক সম্পদের কী পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা এখানে চলছে। আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক দূরবস্থা মূলতঃ দুটি কারণে সৃষ্ট; প্রথমত: শাসকদের আদর্শিক শূণ্যতা, দ্বিতীয়ত: আদর্শিক শূণ্যতার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অদূরদর্শীতা।
যতদিন পর্যন্ত মুসলিম বিশ্বে এ দু’টি বিষয়ে পরিবর্তন না ঘটবে, ততদিন পর্যন্ত যত সম্পদই থাকুক না কেন আমরা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও আধিপত্য বিস্তারকারী ভারতের শিকার হতে থাকবো। কোন শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি না থাকলে কিসের উপর আমরা আমাদের অর্থনীতিকে গড়ে তুলবো? যখন কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শিক ভিত অনুপস্থিত থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনায় যেসব নীতি ও কৌশল গ্রহণ করা হয় তা পরস্পর সাংঘর্ষিক হতে বাধ্য এবং এমতাবস্থায় কোন সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে অর্থনীতিকে পরিচালনা করা কখনোই সম্ভব নয়।
মুসলিম হিসেবে আমরা প্রতিটি বিষয় কুরআন ও সুন্নাহ্’র আলোকে দেখতে বাধ্য। বিজ্ঞান , প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক বিকাশের ব্যাপারেও একই কথা। রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে এ হাদীসটি বর্ণিত আছে যে, খেজুর গাছের কলম করা বিষয়ক কৃষি প্রযুক্তির ব্যাপারে তিনি (সা) বলেছেন, “তোমাদের দৈনন্দিন জীবনের এসব বিষয় তোমরাই ভাল জান।” [আহমদ]
ইসলাম পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটাবে এবং ইসলামিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করবে। ব্যবস্থা হিসাবে ইসলাম সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করবে, এরই কৌশল বা পদ্ধতি স্বরূপ গণ মালিকানাধীন বিদ্যুৎ সম্পদ, কয়লা, তেল, গ্যাসের সুষম বন্টনের মাধ্যমে এর ব্যবহার নিশ্চিত করবে। এই সম্পদ না রাষ্ট্রীয় মালিকানাদীন না ব্যক্তি মালিকানাদীন। এর উপর জনগণের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের অধিকার খিলাফত সরকার নিশ্চিত করবে। কারণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেন,
“তিন জিনিষের মাঝে সকল মানুষ শরীক। এগুলো হচ্ছে পানি, চারণ ভূমি এবং আগুন।”
এই হাদীসের আবেদন উক্ত তিন বস্তুর মাঝেই সীমিত নয়, বরং এর আওতায় প্রত্যেক ঐ সমস্ত বস্তুও শামিল, যা সমাজের সকল মানুষের সমান ভাবে প্রয়োজন। একারনে ঐ সমস্ত যন্ত্রপাতি এবং উপকরনও এর মধ্যে শামীল, যা মানুষের নিত্য দিনের প্রয়োজনে ব্যবহার হয়। যেমন-পানি উত্তোলনের পাম্প, পানি সরবরাহের পাইপ লাইন, পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সরবরাহ তার ইত্যাদি।
রাষ্ট্রের নাগরিকের এই মৌলিক চাহিদা পূরণে খলীফা বাধ্য। যদি খলীফা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা)। রাসূল (সা) বলেছেন: “সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।” ইমাম (তথা খলীফা যিনি সর্বসাধারণের উপর শাসক হিসেবে নিয়োজিত তিনি)ও দায়িত্বশীল, তাকেও তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জবাবদিহি করতে হবে।”
মা’কিল (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “এমন আমীর যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ এরপর সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ্ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।” (মুসলিম)
সুতরাং খিলাফত রাষ্ট্রে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ বা স্থিতিশীল রাখা কোন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। এটি প্রত্যেক খলীফার সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জনগণের এইসব মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবেন।
আসিফ রহমান আতিক
খিলাফত ব্যবস্থা কি মাত্র ত্রিশ বছর টিকে ছিল?

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে সারা বিশ্বের নেতা রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সা) এর হাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তা ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ বিশ্বাসঘাতক কামাল আতাতুর্কের হাতে তা ধ্বংস হয়। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বা খিলাফত ব্যবস্থা যে ধারাবাহিকভাবে টিকেছিল তা ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও শরীয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ করলে তা আমাদের কাছে বোধগম্য হবে।
আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এ ব্যবস্থার ধারাবাহিক অস্তিত্ব বুঝতে চাই, তাহলে দেখতে হবে প্রথমতঃ এ ব্যবস্থার কাঠামো কি ইতিহাস জুড়ে টিকেছিল কিনা। দ্বিতীয়তঃ এ কাঠামোতে সময়ের আবর্তে কি কোন পরিবর্তন এসেছে কিনা। রাসুল (সা) ও খুলাফায়ে রাশেদিনের সময়ের ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান স্তম্ভগুলো হল:
১। খলীফা বা রাষ্ট্রপ্রধান।
২। খলীফার প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তাফউঈদ)।
৩। খলীফার নির্বাহী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তানফীয)।
৪। গভর্ণরবৃন্দ (উলাহ্)।
৫। আমীর-উল-জিহাদ।
৬। বিচার বিভাগ।
৭। প্রশাসনিক বিভাগ।
৮। উম্মাহ্ কাউন্সিল (মাজলিস আল-উম্মাহ্)।তাই আমরা যদি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ১৩০০ বছরের ইতিহাসের চুলচেরা বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখতে পাই পরামর্শ সভা মাজলিস আল উম্মাহই শুধু বিভিন্ন সময়ে উপেক্ষিত বা অবহেলিত ছিল। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর মাজলিস আল উম্মাহর প্রতি কিছু সংখ্যক খলীফার উদাসীনতার অর্থ এই নয় যে, পরামর্শ সভা না থাকলেই ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফতের অবসান হয়ে গেল। অন্য সব স্তম্ভ টিকে থাকলে মাজলিসুল উম্মাহ বা শুরা ছাড়াও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চলতে পারে, যদিও শুরা উম্মাহর অধিকার। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ ও বিদেশী সেনাবাহিনীর আগ্রাসন ঘটলেও এমন কখনো হয় নি যে, মুসলিমরা খলীফা বিহীন ছিল।
নিজের পুত্রকে খলীফা হিসেবে মনোনয়ন দেয়া বা বংশীয় শাসনের অভিযোগ খানিকটা সত্য এবং এটাও সত্য যে, খলীফা নিয়োগের বায়াতের পদ্ধতিতেও কখনো কখনো অনিয়ম দেখা যায়। কিন্তু এটা খিলাফতের ধারাবাহিকতাকে কখনো প্রভাবিত করতে পারেনি। অনেক সময় এমনও ঘটেছে যে, খলীফা তার ছেলেকে যোগ্য মনে করলে তার মৃত্যুর আগেই জনগণের কাছ থেকে ছেলের জন্য বায়াতের শপথ আদায় করেছিলেন। পরবর্তীতে তা আবার নবায়ন করেছেন। এ বাই’য়াত মূলত প্রভাবশালী লোকজন এবং জনপ্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করত।
খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফত টিকে থাকার কথা ইসলামী আলেমরাও স্বীকার করেছেন। যদিও এদের মধ্যে দু একজন তিরমিযী শরীফের একটি হাদীসের কারণে প্রথম চার খলীফার পর পরবর্তী খলীফাদের ক্ষেত্রে ‘খলীফা’ শব্দটি ব্যবহার করতে অপছন্দ করতেন। সে হাদীসটি হল: রাসুল (সা) বলেছেন, “আমার পর আমার উম্মাহর মধ্যে ৩০ বছর পর্যন্ত খিলাফত থাকবে তারপর শুরু হবে বংশীয় আকড়ে ধরা শাসন”(মুলকান আদ্দান) [একই বর্ণনা-সুনানে আবু দাউদ (২/২৬৪) এবং মুসনাদে আহমদ (১/১৬৯) থেকেও পাওয়া যায়।] ইসলামী বিশারদগণ ব্যাখ্যা করেন যে, যেহেতু এ হাদীসটি এ বিষয়ক অন্যান্য হাদীসের সঙ্গে আপাত দৃষ্টিতে সাংঘর্ষিক মত প্রদান করে তাই এই হাদীসের গূঢ় অর্থ ৩০ বছর পর খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে যাবে তা নিশ্চিতভাবে বোঝাচ্ছে না।
জাবির বিন সামুরাহ (রা) বর্ণনা করেন, “রাসূল (সা) বলেন, দ্বীন ইসলাম ততদিন পর্যন্ত টিকে থাকবে যতদিন না আল্লাহর নির্ধারিত ক্ষণ উপস্থিত হয় অথবা কুরাইশ বংশীয় বারজন খলীফা তোমাদেরকে শাসন না করে” [সহীহ মুসলিম]।
এ হাদীস থেকে বোঝা যায় মুসলমানদের চার পাঁচ জন নয় বরং একাধিক সংখ্যক খলীফা শাসন করবেন। এ হাদীস অনুসারে খিলাফত ব্যবস্থা শুধু ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা বাস্তব সম্মত নয়। এ হাদীসের ব্যাখ্যায় কাজী আইয়াদ বলেন, “এই হাদীসটিতে যেখানে বলা হয়েছে ‘আমার পর খিলাফত ৩০ বছর টিকে থাকবে, এর পর শুরু হবে বংশীয় শাসন’ যা পুর্ববর্তী এই হাদীসটির সাথে সাংঘর্ষিক- ‘যত দিন না কুরাইশ বার জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করে, ইসলামী দ্বীন ততদিন টিকে থাকবে’। [সহীহ মুসলিম] এ সাংঘর্ষিক মনে হওয়া বিবৃতির সমাধান হল – ৩০ বছর খিলাফত টিকে থাকবে নবুয়্যতের আদলে অর্থাৎ সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফত ব্যবস্থার আদলে। বাস্তবে এই ত্রিশ বছর হযরত আবু বকর (রা) থেকে হাসান বিন আলী (রা) এর শাসনকালকেই বোঝায়। [এভাবেই আন-নববী তার সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যার মধ্যে উল্লেখ করেছেন পৃষ্ঠা-৮২১। পাঠক লক্ষ্য করুন এ ত্রিশ বছরে চার জন নয় বরং পাঁচ জন খলীফা উম্মাহকে শাসন করেছেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রাসূল (সা) বলেন, “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ, যখন এক মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোন নবী নেই। শীঘ্রই খলীফারা আসছেন এবং তারা সংখ্যায় হবেন অনেক। তারা (রা) (সাহাবীরা) জিজ্ঞেস করলেন, তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ দেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা তাদের একজনের পর একজনের বায়’আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে”। (বুখারী, মুসলিম)
উল্লিখিত হাদীস থেকে বোঝা যায় রাসুল (সা) এর পর কিয়ামত পর্যন্ত আর কোন নবী না আসায় কার তত্ত্বাবধানে মুসলমানদের যাবতীয় কর্মকান্ড পরিচালিত হবে সেটা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন এবং সেটা হচ্ছে খিলাফত ব্যবস্থা ও খলীফার তত্ত্বাবধানে।
১২ জন খলীফার বিষয়টিও কাযী আইয়াদ ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন ‘সম্ভবত হাদীসটিতে যে ১২ জন খলীফার কথা বলা হয়েছে – তারা হল এমন ১২ জন খলীফা যাদের শাসনকালে ইসলামের শৌর্য-বীর্য বৃদ্ধি পেয়েছিল-উম্মাহ ঐ সকল নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং সর্বোপরি খলীফা হিসেবে উম্মাহর দেখাশুনাও তারা ঠিকভাবে করেছিলেন। [আস সুয়ূতি তারীখ আল খুলাফা, পৃষ্ঠা: ১৪]
ইবনে হাজার বলেন, “এই হাদীসটি সম্পর্কে যে কয়েকজন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার মধ্যে কাযী আইয়াদের যুক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী কারণ রাসূল (সা) এর কিছু সংশ্লিষ্ট সহীহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়েই তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন। যেমন: এ সম্পর্কে রাসূল (সা) বলেন, লোকেরা তাদেরকে কেন্দ্র করে একত্রিত হবে……”। (ফাতহুল বারী) এর পাশাপাশি ইবনে হাজার কয়েকজন খলীফার উদাহরণসহ ঐতিহাসিক সত্যতা তুলে ধরেন।
ইমাম শাফে’ঈ (র) এর অনুসারী ফিকহ বিশেষজ্ঞ সাইফ-উদ-দ্বীন আল আমিদি তার বইয়ের মধ্যে (আল ইমামা মিন আবকার আল আফকার ফি উসুল আদ দিন, পৃ-৩০৬) সংশ্লিষ্ট হাদীসটির ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, এ হাদীসটিতে বলা হয়েছে ‘আমার খিলাফত থাকবে ৩০ বছর তারপর এতে বংশীয় শাসনের রীতি আসবে’। এ হাদিসটিতে চার খলীফা [আবু বকর, উমর, উসমান, আলী (রা)] পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা টিকে থাকবে তা বোঝায়নি। এবং এই হাদীসটি দিয়ে শুধু এ কথাও বোঝায়নি যে, চার খলীফার সময় পর্যন্ত খিলাফত ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ থাকবে। বরং রাসূল (সা) বুঝিয়েছেন-তাঁর পর কোন প্রকার বিচ্যুতি ছাড়া তাঁর নেতৃত্বের ধরণ (সুন্নাহ অনুসারে) ইমাম বা খলীফারা উল্লেখিত সময় পর্যন্ত নেতৃত্ব দেবেন। এর পর বেশীর ভাগ শাসকরাই উত্তরাধিকার সূত্রে রাষ্ট্রপ্রধানের পদ অলংকৃত করে শাসন করবেন। তা সত্ত্বেও যে খিলাফত ব্যবস্থা টিকে ছিল তা নিচের দুটি বিষয় থেকে বোঝা যায়।
প্রথমতঃ পরবর্তী সকল সময়ে উম্মাহর মধ্যে এ ব্যাপারে ঐক্যমত ছিল যে তাদের একজন ইমাম বা খলীফা থাকতে হবে এবং তাকে মানা আবশ্যক।
দ্বিতীয়তঃ তিনি (সা) বলেছেন, ‘তারপর আসবে (তাসির) মুলকান’। এখানে যে বাক্যাংশটি ব্যবহার করা হয়েছে সে ‘তাসিরু মুলকান’ (تصير ملكا) দিয়ে খিলাফতকেই নির্দেশ করা হচ্ছে। উল্লিখিত ক্রিয়াটি (তাসিরু) খিলাফতকে ছাড়া অন্য কোন কিছুকেই বোঝায় না। এ দিয়ে আরও প্রতিপন্ন হয় না যে খিলাফতই ‘মুলকে’ পরিণত হবে। কেননা একটি বিষয় অন্য বিষয়ে পরিণত হতে গেলে প্রথম বিষয়টির অস্তিত্বে থাকা অবশ্যই জরুরী। এখানে প্রথম উল্লিখিত বিষয়ে ইমাম আমিদি ব্যাখ্যা করেন, দলিল অনুসারে উম্মাহকে অবশ্যই সে যুগের ইমামকে (খলীফাকে) মানতে হবে। এটা দিয়ে অবশ্যই এক খলীফার পর আরেক খলীফা আসার বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ করা হয় নি। আমিদির দ্বিতীয় যুক্তি হল ভাষাতাত্ত্বিক। উক্ত হাদিসটির বক্তব্য হল- খিলাফতের চরিত্র বা প্রেক্ষিত পরিবর্তিত হয়েছে; খিলাফত ব্যবস্থা নিজে নয়। একটা উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে যেমন: ‘তারপর তারেক রেগে গেল’ (ثم يصير طارق غاضبا) এখানে তারেকের অবস্থান বা গুণগত অবস্থার পরিবর্তন বুঝিয়েছে। অর্থাৎ তারেক রেগে গিয়ে আলী বা উমরে পরিণত হতে পারে না। একইভাবে হাদিসটিতে যখন বলা হয়েছে “ছুম্মা তাসিরু মুলকান” এর অর্থ হল এবং ‘এরপর আসবে বংশীয় শাসন’ এ বাক্যাংশ দিয়ে কখনো বোঝা যায় না যে খিলাফত ব্যবস্থা শেষ হয়ে গেল। বরং ঐ ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন আসাকে বোঝায়।
৯০৩ হিজরিতে খলীফা মুতাওয়াক্কিল আবুল-’ইজ মৃত্যুবরণ করেন। তার স্থানে তার ছেলে আল মুসতামসিক বিল্লাহ খলীফা নিযুক্ত হন। এ সময়ে বিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ইমাম জালাল আল-দিন সুয়ুতি তারীখ আল খুলাফা (খলীফাদের ইতিহাস) বইয়ে তখন পর্যন্ত খলীফা হসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তিনি এ বইয়ের সূচনায় বলেন, “আবু বকর (রা) এর মৃত্যুর পর থেকে এ পর্যন্ত যত খলীফা শাসন করেছেন এখানে সংক্ষেপে সে সব খলীফাদের জীবনী তুলে ধরলাম। যারা ছিলেন বিশ্বাসীদের নেতা (আমীর উল মু’মিনিন) যারা উম্মাহর সকল বিষয় নিয়ে দেখাশুনা করতেন”। তার এই বই লেখার সময়টা ছিল হিজরতের ৯০০ বছর পর। সমস্ত খিলাফতের সময়কাল জুড়েই তৎকালীন খলীফাদের সাথে ইসলামী পণ্ডিতদের যোগাযোগ ছিল। কেউ কেউ খলীফাদের বিভিন্ন কাজের কৈফিয়ত বা ইসলামী ব্যাখ্যা চাইতেন। আবার কেউ কেউ তাদের শাসন কাজে সরাসরি সহযোগিতা করতেন। উদাহরণ দিয়ে বলা যায় – ইমাম আবু হানিফা খলীফা আল মানসুরের এক সিদ্ধান্তের কৈফিয়ত চেয়েছিলেন। কাজি আবু ইউসুফ খলীফা হারুন অর রশিদের শাসন আমলে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুসতানসির বিল্লাহ তাতারদের পরাজিত করার পর আল-’ইজ বিন আব্দুস সালাম তার নিকট বায়’আত গ্রহণ করেছিলেন।
উসমানীয় খিলাফতের শেষের দিকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী শক্তিগুলো যখন মুসলিমদের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে দিল দেয়ার ষড়যন্ত্রে মগ্ন ছিল তখন মাওলানা কাশিম নানুতবি (র) এর সরাসরি ছাত্র ও দারুল উলুম দেওবন্দের প্রধান মাওলানা মুহাম্মদ হাসান (র) ১৯২০ সালে ইসলামের শত্রুদের সাম্রাজ্যবাদী ছোবল থেকে উসমানীয় খিলাফতকে রক্ষা করার জন্য মুসলিমদের উদ্দেশ্যে এক ফতোয়া জারি করেন। সম্মানিত মাওলানা হাসান বলেন ‘ইসলামের শত্রুরা ইসলামের সম্মান ও প্রতিপত্তি ধ্বংস করতে চেষ্টার ত্রুটি করছে। ইরাক, ফিলিস্তিন, সিরিয়ার উপর তাদের লোভাতুর দৃষ্টি পড়ছে। মুসলমানদের খলীফা – যিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করেন, পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি, ইসলামের সার্বজনীন আইন বাস্তবায়নকারী; যিনি মুসলিমদের অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করেন এবং সৃষ্টিকর্তার সম্মানিত বাণী পৃথিবীর বুকে রক্ষা ও বাস্তবায়নকারী, সেই খলীফারা আজ শত্রু বেষ্টিত ……… [মাওলানা সাইদ মুহাম্মদ মিয়ার “দ্যা প্রিজনার অফ মাল্টা” বইয়ে ২৯ অক্টোবর ১৯২০ সালে জারিকৃত ফতোয়াটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন, পৃষ্ঠা ৭৮]
খিলাফত আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা মাওলানা মুহাম্মদ আলি যোহার খিলাফত সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “তুরস্কের খলীফারা হল রাসূল (সা) এর উত্তরাধিকারী। মুমিনদের নেতা বা বিশ্বাসীদের প্রধান। যার অস্তিত্বের কথা কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। (মোহাম্মদ আলী যোহার, মাই লাইফ এ ফ্র্যাগমেন্ট)। এ প্রসঙ্গে উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলান আবুল কালাম আজাদের ১৯২০ সালে খিলাফত নিয়ে লেখা “দ্যা ইস্যু অব খিলাফত” বইয়ের শুরুতেই লিখেন, খিলাফত ছাড়া ইসলামের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। ইন্ডিয়ার মুসলমানদের উচিত তাদের সর্বোশক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে খিলাফত রক্ষা করার জন্য কাজ করা”। বইটির মধ্যে আবু বকর (রা) থেকে শুরু করে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সকল খলীফার একটি তালিকাও তিনি সংযোজন করেন। খিলাফতের শেষ পর্যায়ে এসেও তাই আমরা দেখতে পাই খিলাফত টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে উলামারা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। খুলাফায়ে রাশেদিনের পর খিলাফতের ধারাবাহিকতা থাকাটা আহলুস সুন্নাতের বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ প্রসঙ্গে শাফি মাযহাবের ইমাম আত-তাফতাজানী হানাফী মাযহাবের ইমাম আন নাসাফির চিন্তার সঙ্গে সম্পুর্ণ একমত পোষণ করেন। এ বিষয়ে আত-তাফতাজানী বলেন, উম্মাহর জন্য একজন ইমাম নিয়োগ করা যে বাধ্যতামূলক সে বিষয়ে সকল ইমামের মধ্যে মতৈক্য আছে। কারণ রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে তার কাঁধে কোন খলীফার বায়’আত (আনুগত্যের শপথ) নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)। আত-তাফতাজানী আরও বলেন, “মুসলিমদের একজন ইমাম থাকা বাধ্যতামূলক যিনি মুসলমানদের প্রশাসন পরিচালনা করবেন। যিনি মুসলিমদের জন্য নির্দেশিত ডিক্রিগুলো রক্ষা করবেন, মুসলিমদের ভৌগলিক সীমানা সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করবেন, মুসলিম সেনাবাহিনীকে যথাযথ সামরিক সরঞ্জামে সুসজ্জিত রাখবেন, জনগণের দানের অর্থ গচ্ছিত রাখবেন, জুম্মাহর নামাজ ও প্রধান প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দিবেন, সৃষ্টিজগতের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করবেন, বৈধ অধিকার রক্ষার পক্ষে তিনি প্রমাণাদি গ্রহণ করবেন। অভিভাবকহীন যুবক যুবতীদের নিজ অভিভাবকত্বে বিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। [আকিদাত অ্যান নাসাফিয়া পৃঃ ১৪৭]
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও দলীলের নিরীখে ইমাম তাফতাজানী বক্তব্য যে ঠিক তা বোঝা যায়। একজন খলীফা নিয়োগ করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক যা রাসূল (সা) এর সুন্নাহেরই প্রতিফলন। তাই উল্লেখিত তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় আমাদের সমাজে খিলাফতের কাল “ত্রিশ বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ” ছিল তা নিতান্তই অবাস্তবিক, অযৌক্তিক ও অলীক অনুমান ছাড়া আর কিছুই নয়। খিলাফত ব্যবস্থা উম্মাহকে দেখাশুনার ব্যবস্থা হিসেবে রাসূল (সা) এর ওফাতের পর উসমানীয় খিলাফতের আমল পর্যন্ত টিকেছিল।
আমাদের উপাস্য কি আল্লাহ না টাকা ?

আমাদের বর্তমান সমাজের মানুষের প্রধান লক্ষ্য হল যে কোন উপায়েই হোক সম্পদশালী ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া। সমাজের সবাই তাদের সম্পদ বৃদ্ধির চিন্তায় মগ্ন। যেন টাকা পয়সাই হচ্ছে জীবনে সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি। কেউই তার বর্তমান অবস্থায় সন্তুষ্ট নয়। সবার চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা ক্রমাগত বাড়ছে। আর এসব চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য মানুষ সবসময় নতুন নতুন সুযোগের সন্ধান করছে।
এখন মানুষের লক্ষ্য হল অর্থ উপার্জন – তা যে কোন উপায়েই হোক না কেন। ঘুষ নিয়ে হোক, অন্যের কাছ থেকে ছিনতাই করে হোক অথবা সুদের একাউন্টে টাকা জমিয়ে সেই টাকা দ্বিগুন বা তিনগুন হবার অপেক্ষা ইত্যাদি যে কোন উপায়েই হোক টাকা উপার্জন করতে হবে। কেননা এখনকার সমাজে টাকার সাথে সাথে বাড়ে স্ট্যাটাস; যার টাকা আছে সেই সম্মানিত, মান্যগণ্য। যে যত বেশি দামের গাড়িতে চড়ে, যার বিয়ে যত বেশি জাকজমক আর ব্যয়বহুল, যে যত বেশি খাবার অপচয় করতে পারে সে তত বেশি সফল। যে ব্যক্তি তেমন বেশি টাকার মালিক হতে ব্যর্থ হয়েছে, যেন তার জীবনটাই বৃথা। সবাই যেন অর্থ সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।
টাকা পয়সার মালিক হওয়া আর নিজের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার ব্যস্ততা এমনভাবে আমাদেরকে গ্রাস করেছে যে আমরা জীবনের মৌলিক বাস্তবতা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছি। এ জীবনের বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করার কোন সময় আমাদের নেই। আমাদের অবস্থাটা এমন যেন চিরকাল বেঁচে থাকব। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, কাজকর্ম ও লাইফস্টাইল দেখে এমনটাই মনে হয় যেন আমাদের জীবন চিরস্থায়ী। আমরা ভুলে গিয়েছি যে কিছুকাল পূর্বে আমাদের কোন অস্তিত্বই ছিল না। আমরা এই সত্য বিস্মৃত হয়ে গিয়েছি যে, জীবন চিরস্থায়ী নয়। শীঘ্রই এ জীবনের শেষ হবে। আমাদের সবার জন্য চরম বাস্তবতা হচ্ছে মৃত্যু। আমাদের কারো জানা নেই আমরা কতদিন বাঁচব। হয়ত কয়েক বছর, কয়েক মাস, কয়েক দিন, কয়েক ঘন্টা, এমনকি কয়েক মিনিট মাত্র। এই লেখা পড়ে শেষ করার আগেই আমাদের মৃত্যু হতে পারে। এ জীবনের প্রতি আমাদের নিয়ন্ত্রণ কত সামান্য !
এখন আমরা একটা পুরোপুরি বস্তুবাদী সমাজে বাস করছি। এখানে জীবনের উদ্দেশ্য হল সম্পদ জমা করা আর সর্বোচ্চ পরিমাণে জীবনের স্বাদ উপভোগ করা। নাচ-গান, গার্লফ্রেন্ড, দামী গাড়ি, পার্টি, ফিল্ম ইত্যাদি নিয়েই কাটছে আমাদের সময়। আর এসবের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য আমাদের দরকার বেশি বেশি টাকা। এই “মানি এন্ড এনজয়” কালচার আমাদের এতটাই ব্যস্ত রাখে যে আমরা আমাদের জীবনের মৌলিক বিষয়গুলো ভুলে যাই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“নারী, সন্তান, রাশিকৃত স্বর্ণরৌপ্য, দাগ লাগানো অশ্ব, গবাদিপশু এবং ক্ষেত খামারের প্রতি আকর্ষণ মানুষের নিকট মনোরম করা হয়েছে। এসব ইহজীবনের ভোগ্য বস্তু আর আল্লাহর নিকট আছে উত্তম আশ্রয়স্থল।” (আল-কুরআন ০৩:১৪)
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, কেননা আল্লাহ তার মধ্যে এক অনন্য চিন্তাশক্তি দান করেছেন। তাই এটা মানুষের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না যে, সে সারা জীবন ধরে একটার পর একটা চাহিদার পেছনে ছুটে চলবে আর কী উদ্দেশ্যে সে এই পৃথিবীতে এসেছে, মৃত্যুর পর তার কী পরিণতি হবে, সে ব্যাপারে কোন চিন্তা-ভাবনা করবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনের শত শত আয়াতে মানবজাতিকে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ার জন্য আহবান জানিয়েছেন। কুরআন আমাদেরকে জীবনের প্রকৃত বাস্তবতার ব্যাপারে সবসময় সজাগ থাকতে বলেছে। কিন্তু আজ এ পৃথিবীর চাকচিক্য আমাদেরকে এমনভাবে ভোগবিলাসের চিন্তায় মগ্ন করে ফেলেছে যে, মানুষ যে কত দুর্বল তা আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না।
এখন আমরা সামান্য সময়ের জন্যও চিন্তা করি না যে, যে সমস্ত অর্থ ও সম্পদ আমরা পুঞ্জিভূত করছি তার কিছুই আমাদের সাথে কবরে যাবে না। আমরা যতই টাকা পয়সা জমা করি না কেন, তা কখনো মৃত্যুর ফেরেশ্তাকে আমাদের জীবন নেয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“দুর্ভোগ তাদের প্রত্যেকের যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে; যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে – তার ধারণা যে তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে; কখনো নয়; সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায় .. .. ..।” (আল কুরআন ১০৪: ০১-০৪)
“প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে; যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও; এটা সঙ্গত নয়; শীঘ্রই তা তোমরা জানতে পারবে।” (আল কুরআন ১০২:০১-০৩)আজ আমাদের অহংকারের কোন সীমা নেই। আমাদের ধারণা যে আমরা বহুদিন বাঁচব। যেভাবে আমরা ব্যয় করি, অপচয় করি এবং নিজের প্রশংসা করি তা থেকে আমাদের অহংকারের মাত্রাটা বোঝা যায়।
“মানুষ কি মনে করে যে কখনো তার উপর কেউ ক্ষমতাবান হবে না ? সে বলে (অহংকারের সাথে), আমি প্রচুর সম্পদ নিঃশেষ করেছি। সে কি মনে করে তাকে কেউ দেখেনি ?” (আল কুরআন ৯০:০৫-০৬)
এখনো আমাদের সাবধান হওয়ার সময় আছে
ইসলাম মানুষকে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করার তাগিদ দেয়। সে কে, কোথা হতে কী উদ্দেশ্যে সে এই পৃথিবীতে এসেছে, মানুষ তার পরিচয় ও জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে বেখবর হয়ে পশুদের মত আদিম চাহিদা ও প্রবৃত্তির দাস হয়ে সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিবে – এটা হতে পারে না।
যদিও আমরা শুক্রবারে জুমার নামাজে উপস্থিত হয়ে আর মাঝে মাঝে মিলাদ মাহফিলে যোগ দিয়ে আল্লাহর সাথে চালাকি করি কিন্তু বাস্তবে আমরা জানি যে শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে আমাদের জীবন পরিচালিত হচ্ছে না। আমরা জীবনযাপন করি আমাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণের লক্ষ্যে। আমাদের ইসলাম সীমাবদ্ধ টুপি, পাঞ্জাবী ইত্যাদি কিছু বাহ্যিক আচার আচরণের মধ্যে। আমাদের পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তি হল যা আমাদের নিজেদেরকে সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট করে। আমাদের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাগুলোই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। যেন সেগুলোই আমাদের ‘উপাস্য’। আমাদের এধরনের মানসিকতার প্রতি নির্দেশ করে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আপনি কি তার প্রতি লক্ষ্য করেছেন যে তার নিজ খেয়াল খুশিকে উপাস্য (ইলাহ) বানিয়ে নিয়েছে ?” (আল কুরআন ২৫:৪৩)
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বারবার মানুষের অহংকার সম্পর্কে তাকে সাবধান করে দিয়েছেন। তিনি মানুষকে সতর্ক করেছেন বিচারের দিনের বাস্তবতা সম্পর্কে যা আমাদের সবার জন্য অপেক্ষা করছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“নিশ্চয়ই বিচারের দিন আসবে, এতে কোন সন্দেহ নেই, তারপরও অধিকাংশ মানুষ অবিশ্বাসী।” (আল কুরআন ৪০:৫৯)
মানুষ যাতে নিজের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে চিন্তা করে সেজন্য ইসলাম এই পৃথিবীতে এসেছে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রত্যেককে চিন্তাশক্তি দান করেছেন যার মাধ্যমে আমরা আমাদের চারপাশের বাস্তবতা বুঝতে পারি। আমরা যখন চিন্তাভাবনা করতে শুরু করি তখন খুব সহজেই বুঝতে পারি আমরা কিভাবে পৃথিবীতে এসেছি এবং কোন উদ্দেশ্যে আমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা না করাটা বোকামী ও উন্মাদনা ছাড়া আর কিছু নয়।
এ জীবনের পরে যে জীবন আসছে তা চিরস্থায়ী। তাহলে কেন আমরা এ জীবনকেই চিরস্থায়ী মনে করছি ? যেহেতু মৃত্যু একটা নিশ্চিত সত্য এবং মৃত্যুর পরের জীবনটাই চিরস্থায়ী এবং আল্লাহর বিচারে ঠিক হবে আমাদের সেই জীবন, সেহেতু আল্লাহ তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা)-এর মাধ্যমে যেসব আদেশ ও নির্দেশ দিয়েছেন তার উপর ভিত্তি করে এ জীবন পরিচালিত করাই আমাদের জন্য একমাত্র করণীয়।
“এ পৃথিবীর জীবনটা খেলাধুলা আর তামাশা মাত্র। কিন্তু মুত্তাকীদের জন্য এর চাইতে উত্তম হল পরকালের আবাস। তাহলে কি এরপরও তোমরা বুঝবে না ?” (আল কুরআন ০৬:৩২)
আমাদের বর্তমান সমাজ ইসলাম থেকে অনেক দূরে। এই সমাজে যেসব লক্ষ্য ও মূল্যবোধের প্রতি তাগিদ রয়েছে সেগুলো আল্লাহ প্রদত্ত লক্ষ্য ও মূল্যবোধসমূহের সম্পূর্ণ বিপরীত। আমাদের জীবন কাটছে অন্যান্য প্রাণীদের মত শুধুমাত্র নিজের চাহিদা ও খেয়াল খুশকে সামনে রেখে। কোন সুস্থ চিন্তা তথা আদর্শ আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে না। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অপরাধ, দুর্নীতি, নিপীড়ন, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির ব্যাপক বিস্তার কোন আশ্চর্যের বিষয় নয়।
আমরা মুসলমান এই জন্য যে আমরা স্বীকার করে নিয়েছি যে আমরা আল্লাহর দাস, আল্লাহর আদেশ পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা আমাদের কর্তব্য। কেননা আল্লাহ তা’য়ালা পরিষ্কারভাবে এ জীবনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করে দিয়েছেন:
“আমি মানুষ ও জ্বীন সৃষ্টি করেছি শুধুমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য।” (আল কুরআন ৫১:৫৬)
এর অর্থ হল পার্থিব ভোগবিলাস নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য। ইসলাম মানুষকে খাওয়া ও পান করা, সন্তান জন্মদান ও আয় রোজগার করতে উৎসাহিত করে; কিন্তু এগুলোকেই জীবনের উদ্দেশ্য হিসাবে নির্ধারণ করেনি। তাই একজন মুসলমান কখনো নিজের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাগুলোকে কেন্দ্র করে সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিতে পারে না।
আজ সময় এসেছে ইসলামী লক্ষ্য ও মূল্যবোধ থেকে আমরা কত দূরে সেটা উপলব্ধি করার। কেন আমরা এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-কে ভুলে গিয়েছি। কেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) আমাদের জীবনে আর তত গুরুত্বপূর্ণ নয় ? আমরা কিভাবে ভুলে গিয়েছি যে আল্লাহর সাথে আমাদের দেখা হবে এবং আমাদের কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে? কিভাবে আমরা এই তুচ্ছ জীবনের বিনিময়ে পরকাল বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছি ? আর তাই আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা জিজ্ঞেস করছেন,
“হে মানুষ ! কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম প্রতিপালক হতে বিভ্রান্ত করল ?” (আল কুরআন ৮২:০৬)
কমিউনিজমের রাজনৈতিক বিবর্তন

সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদী সভ্যতা ও পাশ্চাত্যের পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতা উভয়ই যখন পৃথিবীর আলো বাতাসে টিকে ছিল, তখন এই দুই সভ্যতার মধ্যকার পার্থক্য বোঝার উপায় স্পষ্ট ছিল। কালক্রমে বস্তুবাদী সভ্যতার পতন হলো-পৃথিবীর আলো বাতাস ছেড়ে সেটা ঠাঁই করে নিল সচেতন বস্তুবাদীদের কাগজে-কলমে পৃথিবীর দখল চলে গেল ভোগবাদীদের একক আধিপত্যে। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা ঘটতে শরু করল এরপর, যখন ভোগবাদী আর বস্তুবাদী সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য ঘুচতে লাগল আর বস্তুবাদীরা ভোগবাদী সভ্যতার গৌরবে আহ্লাদিত হয়ে উঠতে শুরু করল। ভোগবাদীদের নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের প্রয়োজনে উদ্ভাবিত ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতিশীলতা’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘বৈজ্ঞানিকতার দোহাই’ ইত্যাদি বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা বস্তুবাদীরা ধীরে ধীরে নিজেদের ঈমান-আকীদার অংশ করে নিল এবং এখন আমরা দেখছি পশ্চিমা ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন প্রজেক্ট সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে (WAR ON TERRORISM) বস্তুবাদীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে তত্ত্বে, ভাষণে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের আন্তরিক (?) সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদীদের রাজনীতি- বিশেষত মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে – টিকে আছে, তাদের নিজেদের চিন্তা-আদর্শের ধারে নয়, জনসমর্থনের ভারেও নয়, বরং তা ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের সচেতন কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাদেরই চাপিয়ে দেয়া রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে নির্বিঘ্ন রাখার জন্যে।
বাংলাদেশে বস্তুবাদী বামরাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র উচ্চশিক্ষার বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষে তার পরিবেশ, পরিস্থিতি, সমাজ, রাজনীতি, জীবন, সংসার সবকিছুকে সামনে রেখে চিন্তাভাবনা, গবেষণা, বিশ্লেষেণ করা সহজ ও সুবিধাজনক এবং রাজনৈতিক ফলে অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও সামাজিকভাবে ভারসাম্যহীন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের উক্ত উপাদানগুলোর উপযোগী উপস্থিতির কারণে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের সচেতনতা ও কর্মকাণ্ড যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। সাম্রাজ্যবাদীদেরও খুব স্বাভাবিকভাবে বস্তুবাদী রাজনীতির চাষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণকেই ‘বীজতলা’ হিসাবে বেছে নিয়েছে। সুবিধাবাদী রাজনীতি ও অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের ফল স্বরূপ দেশময় বিস্তৃত নানা রূপের শোষণ নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক সাম্যবাদ আকর্ষণীয় তত্ত্ব বটে। তার উপর পাশ্চাত্যের কাঙ্ক্ষিত ছাঁচে তৈরী রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুকরণ প্রিয় রাষ্ট্রপরিচালকদের সুদীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র চালনা আর লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষাহীন রাজনীতির ফলে সৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার মধ্যে স্বতঃ চিন্তাশীল তারুণ্যের জন্য অবলম্বন হিসেবে ধরা দেয় ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’, ‘বিজ্ঞান চেতনা’, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’, ‘বিবর্তনবাদ’ ইত্যাদি আপাতঃ ভারী ভারী তত্ত্ব। কিন্তু জ্ঞানগর্ভের এসব তত্ত্বের বাস্তবায়ন হয় বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির নয়া মেরুকরণের পরিপ্রেক্ষিত- ইসলাম বিরোধীতার মাধ্যমে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের আশ্রিত মিডিয়া বিশেষের ‘প্রগতিশীলতা’র বাহ্বা পেয়ে তথাকথিত সমাজতন্ত্রীদের অধিকাংশই টিকে থাকে আর বেড়ে উঠতে থাকে এক জন কার্যত ভোগবাদী বুর্জোয়া রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক তল্পিবাহক হিসেবে, যদিও আলোচনার টেবিলে সে পুরোদস্তুর ‘সাম্যবাদী’ কর্মী, নিজের পুস্তকি চিন্তা- আদর্শের প্রমাণ দিতে গিয়ে যে কল্পিত তত্ত্বের দায় ঠেকাতে নিজেদের উদ্ভাবিত গণ্ডীবদ্ধ চিন্তার তর্ক হাজির করে যার সবটাই অতিরিক্ত পরিমাণে অবাস্তব তত্ত্ব পড়ার বদহজম।
‘বীজতলা’ ছেড়ে যখন সমাজ-রাষ্ট্রের মূল জমিতে হাজির হয় তখন তারা কল্পিত তত্ত্ব ও বাস্তব দুনিয়ার পার্থক্য বুঝতে পারে। এখানে পুস্তকি তত্ত্বের আলোচনার টিবিলটা আরো ছোট, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাঠ-ময়দান আরো ব্যাপক এবং বর্তমান বাস্তবতায় মেরুকরণ আরো প্রকট। নতুন বাস্তবতায় স্বল্প সংখ্যক সমাজতন্ত্রী সততার বশে ঝাপসা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে আন্দোলন চালিয়ে যান। অধিকাংশই পৃথিবীর বাস্তবতায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। তাই করতে গিয়ে ধীরে ধীরে তাদের দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত ঐতিহাসিক বস্তুবাদী তত্ত্বের লেজ খসে পড়ে; কাল্পনিক সাম্যবাদী তত্ত্বের লোম ঝরে যায়; মাথায় শুধু থেকে যায় ইসলাম বিদ্বেষের শিং, নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে টিকে থাকতে সেটার গুরুত্ব অপরিসীম। এভাবে বিবর্তিত হয়ে তাত্ত্বিক সমাজতন্ত্রী নতুন ফসল হিসেবে সাম্রাজ্যবাদীদের ঘরে ওঠে। এখন নতুন জীবনের রূপ- রস- গন্ধে, নতুন তত্ত্বের ডিগবাজিতে তাদের পথ- পন্থা বদলে যায়, একবিংশ শতাব্দির রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদে তাদের এক সময়কার শ্রেণীশত্রু বুর্জোয়া রাজনীতিকরা এখন তাদেরই রাজনৈতিক বন্ধু বনে যায়, আর বিবর্তিত সমাজতন্ত্রী তার দ্বান্দ্বিক চেতনার দাবি মেটাতে শত্রু হিসেবে বেছে নেয় সাম্রাজ্যবাদীদের ঘোষিত শত্রু ‘ইসলাম’ কে। এখনকার সময়ে ভোগবাদী ও বস্তুবাদী রাজনীতিক কিংবা বুদ্ধিজীবীদের আর আলাদা করে চিনবার উপায় নেই। ইসলাম বিদ্বেষই উভয়ের তথাকথিত প্রগতিশীলতা ও বুদ্ধিজীবীকার মূল সনদ। শুধু রাজনীতি নয় সমাজের যে ক্ষেত্রেই যাক্ না কেন এসব বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীরা তাদের তত্ত্বের বাকীসব চরিত্র হারিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সুর মিলিয়ে ক্রমাগত মৌলবাদ বিরোধিতার নামে ইসলাম বিদ্বেষ ছড়ায় আর ইসলামের যে কোনো চিহ্ন দেখামাত্রই তাকে জোর গলায় ‘জঙ্গি’, ‘মৌলবাদী’ আখ্যা দিয়ে বিশ্ব পুঁজিপতিদের বাহ্বা কুড়ায়। সাংবাদিক ও কলামিস্ট সঞ্জীব চৌধুরীর ভাষায় ” আরো কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক ‘মুক্তমনা’ সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মী শিখে ফেলেছেন যে, দাঁড়ি-টুপি ওয়ালা মুসলমানদের জঙ্গি বলে কষে গালি দিতে পারলে বিদেশি শক্তিমানদের দরবারে সুগন্ধি তামাক দিয়ে সাজানো কল্কে পাওয়া যায়।” বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সত্যায়িত প্রগতিশীল ধারার পত্রিকাগুলোর কর্ণধার এক এক জন এমনি বিবর্তিত সমাজতন্ত্রী। পাশ্চাত্যের তোষণে, ভারতের পোষণে টিকে থাকা প্রগতিশীলতার প্রলেপ লাগানো বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই এবং সাম্যবাদী তত্ত্বের শেষে গন্ধটুকু পর্যন্ত দূর করতে আধুনিকতার তেলে ভাজা তথাকথিত সুশীল সমাজও এ ধরনের বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত। কেউ কেউ নতুন পরিবেশের প্রতিযোগিতায় নিজেদের জন্য সুবিধাজনক স্থান বেছে নিতে চায় না বা পারে না। তারা অধিকাংশই স্থায়ীভাবে বুর্জোয়া রাজনীতির সাংস্কৃতির তল্পিবাহক হয়ে থেকে যায়। তারা নিজেদের মুক্তমনা, উদারপন্থী, সংস্কৃতিমনা হিসাবে সাজাতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের ধ্যান-ধারণাগুলোকে নানা রূপে, ছন্দোবদ্ধ ছলাকলায় হাজির করে আর গাঁজার কল্কিতে বিপ্লবী টান দিয়ে এক সময়কার সাম্যবাদী রাজনীতির স্মৃতি রোমন্থন করে। এসব বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীরা যেখানেই থাক তাদের একটি মাত্র মূল চরিত্র টিকে থাকে, আর তা হলো ইসলাম-বিদ্বেষ। কথায়, কাজে, লেখায়, তত্ত্বে, তর্কে, সবক্ষেত্রে তারা ইসলাম বিরোধিতা করে নিজেদের জ্ঞান গরিমার প্রকাশ ঘটায়।
বিজয়ী সভ্যতাকে সাধারণ দৃষ্টিতে সব সময় অবিনাশী মনে হলেও পৃথিবীর ইতিহাস হচ্ছে সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও তার মধ্যদিয়ে সভ্যতা পরিবর্তনের ইতিহাস। বস্তুবাদী সভ্যতার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে গেলেও বহমান ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতারও পতন অবশ্যম্ভাবী। পৃথিবীর মানুষের জন্য পরবর্তী সভ্যতা, জীবন ব্যবস্থা কী হবে? বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে বলা যায় সেটা হবে ইসলাম। এটা শুধু বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক দৃশ্যমানতা থেকে নয় বরং আধিপত্যের শিখরে থাকা পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতার ধারক-বাহকদের ইসলামের প্রতি আচরণ থেকেই বুঝা যায়।
WAR ON TERRORISM এর নামে সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামকেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছে। NATO’র সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল Willie Class এর ভাষায় “The alliance has placed Islam as a target for its hostility in place of the Soviet Union”। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন “The militants believe that controlling one country will Muslim masses, enabling them to overthrow all moderate governments in the region, and establish a radical Islamic empire that spans from Spain to Indonesia” এখানে Militants হিসেবে যাই বুঝানো হোক না কেন মার্কিন শক্তির মূল ভয়টা যে ইসলামি সভ্যতার পুনর্জাগরণের- প্রেসিডেন্ট বুশের ভাষায় যা স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া ব্যাপী বিস্তৃত কট্টরপন্থী ইসলামি সাম্রাজ্য-তা সহজেই বুঝা যায় কিংবা প্রায় একই সময়ে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের দেয়া ভাষণ They demand the elimination of Israel; the withdrawal of all westerners from Muslim countries, irrespective of the wishes of people and governments; the establishment of effectively taleban states and sharia law in the Arab world en route to one caliphate of all Muslim nations – এখানেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মূল ভয় ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান যা মূলত খিলাফত ব্যবস্থা যদিও ব্লেয়ার সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে সেটাকে তালেবান রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করেছেন। ইরাক হামলার পূর্বে দেয়া ভাষণে Donald Rumsfled বলেছিলেন Iraq would serve as the base of a new Islamic Caliphate to extend throughout the middle east which would threaten the legitimate government in Europe, Africa and Asia. This is their plan. They have said so. We made terrible mistake if we fail to listen and learn – এখানেও তাদের ইসলামি খিলাফতের উত্থানের ভয় স্পষ্ট। সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে ও শুনতে ভুল করে নি। তারা তাদের সভ্যতার প্রধান শত্রু হিসেবে ক্রমবর্ধমান ও ক্রম উত্থানশীল ইসলামি সভ্যতাকে বেছে নিয়েছে। শুধু ভাষণে নয়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বর্তমানে তার বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সর্বোপরি ক্রমাগত সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে মুসলিম দেশগুলোতে। আর এ কাজে তারা যথারীতি তাদের কাছে সদ্য পরাজিত বস্তুবাদী সভ্যতার নেতা-কর্মীদের যথাযথভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে। বস্তুবাদীদের- নিজেদেরই উদ্ভাবিত তত্ত্বানুযায়ী- তাদের সাথে পুঁজিবাদীদের মূল বিরোধিতা যেহেতু অর্থনৈতিক, কাজেই সাম্রাজ্যবাদীরা খুব সহজেই তাদের এসব দুর্বল শত্রুদের মুসলিম দেশগুলোতে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তি বজায় রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এবং সেটাই করে তারা এসব দেশের পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সমাজ কাঠামোর Immunity বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বের রাজনীতির বাস্তবতায় সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন শত্রু ইসলামের মোকাবিলায় সাম্রাজ্যবাদীদেরই দেয়া ভ্যাকসিন হিসাবে কাজ করছে (ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে মূলত নির্দিষ্ট জীবাণুকে মৃত বা দুর্বল করে মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় যা ঐ মানুষের শরীরের Immunity বাড়িয়ে দেয় ফলে পরবর্তীকালে শক্তিশালী অ সক্রিয় জীবাণু ঐ শরীরে বংশ বিস্তার করতে পারে না)। পুঁজিতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদীরা একসময় তাদের শত্রু সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য তৎকালীন তালেবান সরকারকে সহযোগিতা করেছিল, এখন তারা বিশ্বব্যাপী ইসলামের রাজনৈতিক উত্থানকে স্তব্ধ করার জন্য বস্তুবাদী রাজনীতির নেতা কর্মীদের, তাদের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে, ব্যবহার করছে। এই কথাটাই বুঝা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগানের বক্তব্য থেকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রাক্কালে ১৯৮৯ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তৎকালীন এই বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে যখন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের পর এই মতাদর্শের কর্মীদের নিয়ে মার্কিন পরিকল্পনা বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়: What about activists? রোনাল্ড রিগান বলেছিলেন “We will feed them, we will keep them alive. They will help us to fight with radicals as like radicals help us to fight the”।
সুগন্ধি তামাকের কল্কেতে যাদের আসক্তি ধরে গেছে, তথাকথিত প্রগতিশীলতার রসে যারা মজে গেছে, সুশীল, বুদ্ধিজীবী সীল গায়ে লাগানোর কিংবা টিকিয়ে রাখার স্বপ্নে যারা বিভোর হয়ে আছে তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের হাতিয়ার হয়েই থাকবে। তারা সাম্রাজ্যবাদীদের দোসর হিসেবে ক্রমাগত মৌলবাদের গন্ধ খুঁজে বেড়াবে। কিন্তু যে বাম রাজনীতি এক সময় গণমানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেখানে কি এখনো সৎ ও সচেতন নেতা-কর্মী নেই? যারা শত্রু-মিত্র নির্ণয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের পাতা ছক অনুসরণ করবে না, যারা শুধুমাত্র তত্ত্বে নয় উপস্থিত সমাজ ও বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় পরিবর্তনের সূত্র খুঁজে সঠিক পক্ষে অবস্থান নেবে?
এটা ঠিক যে, সভ্যতা পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত কারণ বৈষয়িক জ্ঞানের ভাণ্ডার নেই, ভাববাদী আদর্শের ভাবলুতায় নেই, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বিচারের জ্ঞান-গভীরতায়ও নেই এবং এটাও ঠিক যে এটা সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়া কিংবা উৎপাদনের হাতিয়ারের মধ্যেও নেই। বরং তা নিহিত থাকে পরিবর্তনশীল সমাজের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান মানুষ, জীবন ও জগৎ-সংসার সম্পর্কে ক্রিয়াশীল ধারণার মধ্যে এবং তার উপরই নির্ভর করে অর্জিত হয় বৈষয়িক জ্ঞান, গড়ে ওঠে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ, চিহ্নিত হয় শত্রু-মিত্র, নির্ধারিত হয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার রূপরেখা, ঠিক হয় উৎপাদনের হাতিয়ারসহ সকল বস্তুগত অধিকরণের নিয়ম নীতি আর অধিকারীর কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণ। বস্তুবাদীরা যখন বলেন “The final causes of social changes and political revolution in society are to be sought, not in men’s brain, not in means better insight into eternal truth and justice, but in the means of production and exchange (Engels)” – সেটাও মূলত তাদের বস্তুবাদী দর্শন থেকে উদ্গত সমাজ পরিবর্তনের তত্ত্ব। বস্তুবাদী দর্শন-ই বস্তুবাদী সভ্যতার রূপরেখা, নিয়ম-নীতি, সমাজ-কাঠামো, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি ঠিক করে দেয়। একইভাবে পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতা ও তার সমাজের রূপরেখা, নিয়মনীতি, সমাজ কাঠামো, ন্যায় অন্যায়ের বোধ ঠিক করে দেয়। মানুষ, জীবন ও জগৎ-সংসার সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা ও তার ভিত্তিতে তৈরী সমাজ-কাঠামো, নিয়ম-নীতি, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি, সামাজিক সম্পর্কের সূত্র, সাংস্কৃতিক উপরি-কাঠামো, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কার্য-কলাপের পথ পন্থা- এ সবকিছুই ‘ইসলাম’ তার নিজস্বতার ভিত্তিতেই দেয়। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের কথিত ‘Evil Empire’ হিসেবে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের পর তার উত্তরসূরী বুশ-ব্লেয়ারদের চিহ্নিত নতুন ‘Evil Ideology’ হচ্ছে উদীয়মান জীবনাদর্শ ইসলাম। এই বোধটুকু বুঝে, শুনে, নিরপেক্ষ চিন্তা ভাবনায়, বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় আনতে গেলে বস্তুবাদীদের বেশ খানিকটা সৎ সাহসের দরকার আছে। আর সেটাকে উপেক্ষা করে শুধু ইস্যু ভিত্তিক কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়ন করার মধ্যদিয়ে যদি তারা আশা করেন যে, একসময় সাম্রাজ্যবাদ দূর হয়ে বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনা, সমাজ কাঠামো তৈরি হয়ে যাবে তাহলে তা ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেয়ার মতো হবে এবং তাতে আঞ্চলিক আদিপত্যবাদী, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দেয়া নানান খেতাবে, ‘লোকে যাতে বুদ্ধিমাসন বলে হঠাৎ ভ্রম করতে পারে’ এতটুকু বুদ্ধির জোরে খেতাব দাতাদের যথেষ্ট উপকার করা হবে কিন্তু দেশ ও দশের মুক্তির দিক নির্দেশনা দেয়া যাবে না।
একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই উচ্চমানের নারী শিক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে

পশ্চিমা সরকারসমূহ মালালার নারী শিক্ষার সংগ্রামের ঘটনাটিকে ঔপনিবেশিক রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করেছে
২০১২ অক্টোবর মাসে ১৫ বছরের পাকিস্তানী কিশোরী মালালা ইউসুফযাই এর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে হতভম্ব ও মর্মাহত করেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, পশ্চিমা সরকার ও রাজনীতিবীদরা ফলাও করে একথা প্রচার করে যে, পাকিস্তানে ইসলামপন্থীরাই এ হত্যা চেষ্টার জন্য দায়ী। এবং পশ্চিমা শক্তি নারী অধিকার ও নারী শিক্ষার পক্ষে যুক্তি স্থাপন করে। প্রাক্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ও জাতীসংঘের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্টমন্ত্রী হিলারী ক্লিন্টনসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সংগঠন নারী শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিশ্বের দরবারে উপস্থাপনের জন্য তার এ সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানায়। এ বছরের ১২ জুলাই জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে মালালাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেখানে তরুণ সমাজের উপস্থিতিতে সে প্রতিটি শিশুর বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার ও এর গুরুত্ব তুলে ধরে।
পাকিস্তানসহ সমগ্র বিশ্বে নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা একটি মহতী প্রচেষ্টা। কিন্তু এ মহতী উদ্যোগের বদলে নির্লজ্জভাবে পশ্চিমা সরকারসমূহ, তাদের তাঁবেদার সংস্থা ও রাজনীতিবিদরা মেয়েটির জীবন সংগ্রাম ও হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে ব্যবহার করে নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিম নারী সমাজে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী মতবাদের প্রচার ও তাদের ইসলামী জীবনাদর্শ ও পরিচয়কে দুর্বল করার লক্ষ যে কাজ করছে। কিন্তু যেখানে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, তুরস্ক ও উজবেকিস্তানের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নারী ও শিশুরা শুধু তাদের ইসলামী পোষাক হিজাব ও নিকাব পরিধান করার কারণে বিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেখানে মালালাকে সমর্থন ও মুসলিম নারীদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয় বৈকি। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের রায়ের ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত ফ্রান্স ও তুরস্কের মুসলিম নারীদের পক্ষে এইসব ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও রাজনীতিবিদ কেন তাদের বলিষ্ঠ কন্ঠ ব্যবহার করে না?
পশ্চিমারা মালালার ঘটনাটিকে ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে বহুল প্রচলিত ঠুনকো অভিযোগ অর্থাৎ ইসলাম নারীদের অধিকার বঞ্চিত করে তাদের নির্যাতন করে এটি প্রচারে ব্যবহার করছে। এবং এটাও প্রচার করছে যে, মুসলিম নারীদের এখন পশ্চিমা ধাঁচের নারী মুক্তি প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে তারা দশকের পর দশক ধরে এসব মিথ্যে প্রচারণা চালিয়ে আসছে যেন মুসলিম বিশ্ব তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন থাকে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকাতে, যা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইসলাম নয়, বরং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতিই পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের নারীদের অমূল্য শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ সমগ্র অঞ্চলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আগ্রাসন, উপর্যুপরি বোমা ও ড্রোন হামলায় বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার নারী শিশু হত্যা করা হচ্ছে, যা উক্ত অঞ্চলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘ কমিটি তাদের শিশু অধিকার বিষয়ক রিপোর্টে উল্লেখ করে “২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বিচার আক্রমণ ও বিমান হামলায়” শত শত শিশু নিহত হয়েছে। এসব শিশুদের অধিকার তাহলে কোথায়? এটা পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, এদের মৃত্যু এ অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ নিশ্চিতকরণে গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে। এসব হামলা ও আগ্রাসন এ অঞ্চলে এমন এক নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীল পরিবেশের জন্ম দিয়েছে, যেখানে অপরাধ, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ এসব নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে ভীত সন্ত্রস্ত পিতা-মাতা তাদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে এমনকি বাড়ির বাইরে বের হতে দিতে সাহস পাননা। কিভাবে নিরাপত্তাহীন, লাশের স্তুপ, ধ্বংসযজ্ঞ ও যুদ্ধকবলিত একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য একটি সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে? আগ্রাসী শক্তির দখলে যাওয়ার ১০ বছর পরেও আফগানিস্তানের প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৯ জনই অশিক্ষিত। এই হচ্ছে সেই পশ্চিমা ধ্বংসাত্মক পররাষ্ট্রনীতির নমুনা, যা মুসলিম নারীদের কাছ থেকে শুধু শিক্ষার অধিকার নয়; বরং তাদের সম্মান, নিরাপত্তা, এমনকি জীবনকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শুধু তাই নয়, পশ্চিমা সমর্থিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলো মুসলিম বিশ্বে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ও বিনোদন শিল্প এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে উদার সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এ উদার সংস্কৃতি নারীকে যৌন কামনা পূরণের পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করে ও নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার পথ সুগম করে নারীদের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত করেছে; বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মিশরের মতো মুসলিম জনবহুল রাষ্ট্রে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী, ও অপহরণের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিস্তার ঘটিয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেক নারী শিশু শিক্ষার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হতে সাহস পায়না।
পাশাপাশি পশ্চিমা ত্রুটিপূর্ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে। সুদসহ ঋণের ভারে জর্জরিত এসব রাষ্ট্র কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে অক্ষম, কারণ তাদের জাতীয় আয়ের বেশিরভাগ ব্যয় হয় সুদসমেত ঋণ পরিশোধে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে বরাদ্দ দেবার মতো আর্থিক সঙ্গতি দেশগুলোর নেই। ফলশ্রুতিতে দেশগুলো অপর্যাপ্ত বিদ্যালয়, মানসম্মত শিক্ষায় প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের আইএমএফের মতো সংগঠনগুলোর নীতি এবং অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অনীহার কারণে বহু অভিভাবক অনিচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মাঝে বৈষম্য করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই এটা কোন আশ্চর্যের ব্যপার নয় যে পকিস্তানের প্রায় ৬০% এবং বাংলাদেশ ও মিশরের প্রায় ৫০% নারীই শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত।
সুতরাং, প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতিই মুসলিম বিশ্বে নারী শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।
নারী শিক্ষার বিষয়ে ইসলামে সুষ্পষ্ট নীতি রয়েছে। নিম্নোক্ত হাদীস অনুসারে মুসলিম নারীদের জন্য ইসলাম ও জীবন সম্পর্কে বিদ্যার্জন বাধ্যতামূলক। রাসূল (সাঃ) বলেন, “সকল মুসলিম নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরয।” ইসলাম মুসলিম নারীদের পারিপার্শ্বিক ও বহিঃবিশ্বের যাবতীয় জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসূল (সাঃ) এর স্ত্রী হযরত আয়েশা (রা.) শুধু ইসলামী চিন্তাবিদই ছিলেননা; বরং তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও অন্যান্য সাধারণ বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের অধিকারী। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কে জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে উন্নতির পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা একমাত্র সেই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব যা ইসলামের বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের সংবিধানই প্রকৃতভাবে কুর’আন ও সুন্নাহ্’র আলোকে প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের বিধান অনুযায়ী খিলাফত রাষ্ট্র শিক্ষাখাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করবে এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করবে। এটি ইসলামী বিধি ও অনুশাসন মেনে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে, সেখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত উচ্চশিক্ষিত নারী শিক্ষিকা দ্বারা স্কুল পরিচালিত হবে। খিলাফত শাসনব্যবস্থা নারীদের ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, বিচারক, শিক্ষিকা ইত্যাদি পেশায় উদ্বুদ্ধ করবে। আর এসব কিছুর পেছনে ব্যয় বরাদ্দ করবে খিলাফতের শক্তিশালী অর্থনীতি, যেখানে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে এবং সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা আর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র নারীকে তার শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এমন যেকোন ভ্রান্ত ধারণা সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন করবে। সবশেষে খিলাফত রাষ্ট্রই শারী’আহ্ আইনের ভিত্তিতে ইসলামী সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে যেখানে নারীরা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে, তাকে কখনও অবমূল্যায়ন করা হবেনা, পুরুষ তাকে নিজের অভিলাষের ভিত্তিতে নয় বরং সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে যার ফলে সমাজে এমন পরিবেশ নিশ্চিত হবে যেখানে নারী ও শিশুরা নিরাপদে পড়াশুনার জন্য ঘরের বাইরে যেতে পারে এবং তাদের কোন প্রকার অধিকার বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে। নারী শিক্ষার প্রসারে ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে খিলাফত রাষ্ট্র এসকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থার অধীনেই নারী শিক্ষার ইতিহাস এত সমৃদ্ধ হয়েছিল, যেখানে মারিয়াম আল ইস্তিরলাবীর মতো মনীষী ১০ম শতাব্দীতে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নিরুপণে নক্ষত্রবিদ্যা উন্নয়নে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। খিলাফত ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে ফাতিমা আল ফিহ্রীর মতো প্রকৌশলী, যিনি মরোক্কোতে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কারাওইন নির্মান করেন। এমন আরো হাজার হাজার নারী চিন্তাবিদ রয়েছেন, যাদের সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায় মোহাম্মদ আকরাম আন-নদভীর ৪০ খন্ডের বইয়ে। এতে তিনি খিলাফতের সময়কার ৮,০০০ মুসলিম নারী চিন্তাবিদের জীবনী তুলে ধরেছেন। এই সত্যিকার ইসলামী ব্যবস্থায় কায়রোর বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে নারীরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছেন, যেই অধিকার পেতে পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীদের আরো বহু শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়। বহু ইসলামী কলেজসমূহে আজকের পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় অধিক সংখ্যক নারীরা শিক্ষিকা হিসেবে অবদান রেখেছেন। একমাত্র ইসলামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে এসব সম্ভব হয়েছে। খিলাফতই সেই রাষ্ট্র যেখানে সত্যিকার অর্থে নারীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিলো এবং গঠনমূলক ও চমৎকার একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে খিলাফত ব্যবস্থা নারী শিক্ষার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, ইন্শা’আল্লাহ্।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, মালালা নাটকের পান্ডুলিপি পশ্চিমা ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক রচিত হয়েছে মুসলিম বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ ও তাদের ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা মহিলাদের অধিকার রক্ষার জন্য এটা করছে না। তারা এ অঞ্চলে যে শিক্ষা বিস্তার করছে তা একনিষ্ঠ নয় বরং তাদের উদার, ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ বিস্তারের জন্য, যা আমাদের যুব সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছে এবং যা কঠোরভাবে বর্জন করা উচিৎ। আমাদের ইসলামের মূল ভিত্তি ও খিলাফত ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে নারী শিক্ষার উন্নয়ন ও তাদের আল্লাহ্ প্রদত্ত অধিকার সমূহ নিশ্চিত করা সম্ভব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহ্’র নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ্ তার নূরকে প্রজ্জ্বলিত করবেনই যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আস সফ্ : ০৮]
২০ রমজান, ১৪৩৪ হিজরী
২৯ জুলাই ২০১৩, খ্রিস্টাব্দসিরিয়ার গণজাগরণ কেন ভিন্ন?

গত ২৬ মাসে সিরিয়ায় যা ঘটেছে তা থেকে এটি প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, সিরিয়ার গণজাগরণ ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত অন্য সবগুলোর মত নয়, বরং এটি একটি অনন্য গণজাগরণ।
বর্তমানকে অনুধাবন ও ভবিষ্যতের আশাবাদের জন্য অতীতের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। সিরিয়ার গণজাগরণের বর্তমান বাস্তবতা ও অবস্থা বুঝতে একজন সক্ষম হবে না, যদি না সে সেই ইতিহাসকে অনুধাবন করে যা গণজাগরণ শুরু হওয়ার গতিপ্রকৃতিকে নির্ধারণ করেছে।
প্রথম মহাযুদ্ধ : বিভক্তি ও আধিপত্য বিস্তার
সর্বশেষ বৈধ ইসলামী রাষ্ট্র উসমানীয় খিলাফত প্রথম মহাযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর বিজয়ীরা, বিশেষতঃ ব্রিটেন ও ফ্রান্স মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক এ কারণে যে, ইতিহাসে প্রমবারের মত সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে এর প্রতিপক্ষ আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়। ইউরোপীয় শক্তিসমূহ মুসলিম বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপন করে এবং মুসলিম ভূমিসমূহকে ‘বিভক্তি ও আধিপত্য বিস্তারকরণ’ কৌশলের আওতায় বিভক্ত করে।
আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া)-কেও বিভক্ত করা হয়। সিরিয়া ও লেবাননকে দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় যখন জর্ডান ও ফিলিস্তিনকে (যা পরবর্তীতে ইহুদীদের দ্বারা দখলকৃত) বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং নতুন জাতিরাষ্ট্রের পৃথক সীমান্ত রেখাসমূহ তৈরী করা হয়।
এ সময়টি ছিল একটি যুগের শেষ ও অন্য একটি যুগের শুরু। দু’টি বাস্তবতা দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত নতুন যুগকে পশ্চিমারা আজকে পর্যন্ত ধরে রেখেছে এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যতদিন ধরে রাখা যায়। প্রথমটি হল শাসনব্যবস্থা হিসেবে শারী’আহ্’র অপসারণ এবং সাধারণভাবে মুসলিমদের উপর পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ আইনের প্রয়োগ, আর বিশেষতঃ সিরিয়া এখানে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু।
দ্বিতীয়টি হল সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আধিপত্য ও শোষণ অর্থাৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একধরনের পরোক্ষ উপনিবেশবাদ জারি রাখা। নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য এগুলো ছিল কৌশলগত লক্ষ্য – যা ইসলামের উপর পশ্চিমাদের আধিপত্য ও স্বার্থকে সুনিশ্চিত করে। দালাল শাসকদের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করার মাধ্যমে অথবা নতুন বিশ্বব্যবস্থার ধারক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিশ্বব্যাংক এর মাধ্যমে এ বাস্তবতা ধরে রাখা হয়।
সে কারণে ১৯৪৬ সালে সিরিয়া থেকে ফরাসি সৈন্য সরিয়ে নেয়া ও একই বছর তথাকথিত স্বাধীনতা ঘোষণা করা খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। কেননা, যদিও ফ্রান্স বাহ্যিকভাবে সিরিয়া পরিত্যাগ করে, কিন্তু চাপিয়ে দেয়া দালাল শাসকের মাধ্যমে সরাসরি প্রভাব বজায় রাখে।
সিরিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা
১৯৪৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ প্রাধান্য বিস্তার ও স্বার্থরক্ষার জন্য ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে এ প্রতিযোগিতায় সিরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখন্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭১ সালে আমেরিকার সমর্থন নিয়ে আসাদ পরিবার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো মিলিটারী ক্যু এর মাধ্যমে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা চালায়। যদিও আসাদ পরিবারের শাসন আমলে পিতা-পুত্র উভয়ই ফাঁকা বুলির মত প্রচার করেছে যে, তারা ‘ইসরাইল ও আমেরিকা বিরোধী’, কিন্তু তাদের কথার সাথে কাজের ভিন্নতাই বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের কখনওই কথা নয় বরং কর্মকান্ডকেই অধিকতর বিবেচিত বিষয় হিসেবে দেখা উচিত।
আসাদের শাসনামলের বাস্তবতা
আসাদ পরিবারের শাসনামলে সিরিয়া ছিল ভয়, নিষ্ঠুরতা ও দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ। আসাদ সরকার বাথ পার্টি, গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পুরো জাতির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত। সরকার সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে নিষিদ্ধ করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর দমন নিপীড়ন চালায় – বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনসমূহ দমন নিপীড়নের বেশি শিকার হয়। অব্যাহত ইসরাইলি আক্রমণ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংযম অবলম্বন ও ফাঁকা বুলির মাধ্যমে কপট রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেও নিজের জাতির বিরুদ্ধে সামান্যতম অসন্তুষ্টি প্রকাশের কারণে দমন নিপীড়ন চালানোর ক্ষেত্রে আসাদ সরকার ছিল বেশ তৎপর। ১৯৮২ সালে কুখ্যাত হামা গণহত্যার মাধ্যমে সিরিয়ার মুসলিমদের বিরুদ্ধে আসাদ সরকার সবচেয়ে পাশবিক আক্রমণটি চালায়, যেখানে ৪০,০০০ লোককে হত্যা করা হয়েছিল।
আরব বসন্ত
আরব বিশ্বের সাধারণ জনগণের ফুঁসে উঠাই ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ শ্লোগাণ ছিল, ‘উম্মাহ্ এ শাসনের পতন চায়’। আর এটি থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, প্রথম মহাযুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের উপর যে বাস্তবতা চাপিয়ে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে এ উম্মাহ বিদ্রোহ করেছে এবং তারা এর আমূল পরিবর্তন চায়। আরব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলন এ অঞ্চলে পশ্চিমাদের কৌশলগত স্বার্থের প্রতি ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে পশ্চিমারা তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া ও ইয়েমেনে গণজাগরণের উত্তাল ঢেউ-এর লাগাম টেনে ধরে বসেছিল এবং দাবি করছিল তারাও সেসব দেশের জনগণের দাবির সাথে একমত পোষণ করে – যদিওবা তারাই (পশ্চিমারা) দশকের পর দশক ধরে অত্যাচারী শাসক ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। তারই ফলশ্রুতিতে পশ্চিমারা এসব গণআন্দোলনকে ছিনতাই করতে ও প্রাণান্তকর (?) প্রচেষ্টায় কিছু বাহ্যিক (কসমেটিক) পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়। কিন্তু আজকে সেসব দেশে যা ঘটছে তা হল, অব্যাহত বিরাজমান সামাজিক অস্থিরতা ও অসন্তুষ্টি – যা স্ব স্ব জাতিকে একথা ভাবতে বাধ্য করছে যে, তাদের বিপ্লব এখনও শেষ হয়নি।
এখানে মূল কথা হল, পশ্চিমারা এসব গণআন্দোলনের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয় যে, তা এ অঞ্চলে পশ্চিমাদের কৌশলগত স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলতে পারেনি। আর এটি করা হয়েছে কসমেটিক পরিবর্তন করার মাধ্যমে – যা কেবল সমস্যার উপসর্গকে টার্গেট করেছিল, মূল সমস্যাকে নয়। উদাহরণস্বরূপ, মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে আমরা মোবারক ও তার পুত্রদের সম্পদ এবং তার শাসনামলের দুর্নীতির ব্যাপারে জানতে পেরেছি। এর দ্বারা রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারব্যবস্থার প্রকৃত পরিবর্তন নয়, বরং শুধু রাষ্ট্রপ্রধান তথা ব্যক্তি পরিবর্তনের দিকে জনগণের দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত রাখা হয়।
সিরিয়ার গণ-জাগরণ
১৫ মার্চ ২০১১ তারিখে ‘আরব বসন্ত’-এর ধাক্কা সিরিয়ায় পৌঁছে। অন্যান্য দেশের মত সিরিয়ার বিক্ষোভকারীরা আসাদ সরকারের নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তির দাবি তোলে। আসাদ সরকারের নিপীড়নমূলক প্রকৃতি জানা থাকার কারণে কয়েক মাসের মধ্যে এ গণ-জাগরণ দমন করা যাবে-এ ব্যাপারে আমেরিকা আত্মবিশ্বাসী ছিল। ফলে সে সময় আমেরিকার কৌশল ছিল সিরিয়ার জাগরণকে পাত্তা না দেয়া এবং গণ-জাগরণকে দমন করার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে তার আজ্ঞাবহ দালাল আসাদকে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করার একের পর এক সুযোগ করে দেয়া।
তবে ঘটনা খুব দ্রুত গতিতে এগিয়েছে এবং কয়েক মাস পর সিরীয় সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈন্যদের মধ্য থেকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলিবর্ষণের নির্দেশ না মেনে পদত্যাগ করা শুরু হল। এ প্রবণতা আরও এগিয়ে যায় এবং পদত্যাগী সেনাসদস্যরা জাতিকে সরকারের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে Free Syrian Army (FSA) গড়ে তুলে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী পর্যায়ে অসংখ্য সশস্ত্র ব্রিগেড গঠিত হয়।
মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ক্রমাগত সশস্ত্র ব্রিগেডগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ায় এ ব্রিগেডগুলো সমর্থিত সাধারণ সিরীয়দের হাতে দালাল আসাদের পতন হতে পারে-এ হুমকি বুঝতে পেরে আমেরিকা এই উত্তাল গণ-জাগরণের নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করে। অন্যান্য ‘আরব বসন্ত’ এর দেশগুলোর মত গণজাগরণের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমেরিকা নতুন এক কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করল। সেকারণে আমেরিকা Syrian National Coalition (SNC) গঠন, অতঃপর অন্তঃর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও আসাদ পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য নেতৃত্ব উপহার দেয়ার জন্য বিরোধী ব্যক্তিত্ব তৈরিতে সহায়তা করা শুরু করে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের সরে যাওয়ার পথকে সুগম করার জন্য আমেরিকা ‘ইয়েমেনি সমাধান’ এর দিকেও আহ্বান জানায়।
কিন্তু বাস্তবে মাঠে যা ঘটে তা আমেরিকা ও পশ্চিমাদের জন্য ভয়ঙ্কর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। গণজাগরণ যতই এগুতে থাকল ততই সিরিয়ার জনগণ ও সশস্ত্র ব্রিগেডগুলোর শ্লোগাণ ও প্রকাশিত লক্ষ্য ক্রমাগতভাবে ইসলামি প্রকৃতির হতে থাকল। এটি সুস্পষ্ট হতে থাকল যে, সিরিয়ার মুসলিমগণ কেবল প্রেসিডেন্টের অপসারণ চান না। কেননা তা মূল সমস্যার উপসর্গ অর্থাৎ প্রতিদিনকার বঞ্চণা ও দুর্নীতি এর সমাধানকল্পে এটি একটি কসমেটিক পরিবর্তন। সে কারণে তারা পশ্চিমা প্রস্তাবনাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং পশ্চিমা সমর্থিত ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদলকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। এটি সুস্পষ্ট হতে থাকল যে, সিরিয়ার মুসলিমদের দাবি তাদের আক্বীদা ও উচ্চ রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে উদ্ভূত। তারা অনুধাবন করতে পারল যে, মূল সমস্যা হল প্রম মহাযুদ্ধের পর চাপিয়ে দেয়া পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা। আর তারপর থেকে যে সমস্যাসমূহ উদ্ভূত হয় তা ঐ মূল সমস্যার উপসর্গমাত্র। তারা আরও অনুধাবন করতে পারল যে, কেবলমাত্র ইসলামের মাধ্যমে তাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। সে কারণে দক্ষিণে দেরা, রাজধানী দামেস্ক, পশ্চিমে হোমস, উত্তরে আলেপ্পো ও ইদলিব, পূর্বে আল রাকাসহ পুরো সিরিয়াব্যাপী অসংখ্য বিক্ষোভকারী খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানায়। প্রকৃত অর্থে, ইসলামী খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পর এই প্রথমবার মুসলিম বিশ্বের হাজার হাজার সাধারণ জনগণ খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানায়।
সিরিয়ার মুসলিমগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা পুরো বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছে এবং পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কাছে আসন্ন পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হল, গণজাগরণ চলাকালীন সময়ে আসাদ সরকার কর্তৃক ভয়াবহ গণহত্যা ও জঘন্য বর্বর অপরাধ সংঘটিত করার পরও সিরিয়ার মুসলিমগণ এমন কোন রাজনৈতিক সমাধানের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে – যা সরকার কাঠামোকে অক্ষত রেখে প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করবে, হত্যাকান্ডের অবসান ঘটাবে।
সিরিয়ার গণজাগরণের ফলাফল যাতে কোনভাবেই খিলাফত প্রতিষ্ঠার দিকে না যায় এবং সিরিয়াসহ পুরো অঞ্চলজুড়ে পশ্চিমা আধিপত্য খর্ব না হয় সে জন্য আমেরিকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। আসাদ সরকারকে সামরিক ও অবকাঠামোগতভাবে সাহায্য করতে এটি রাশিয়া ও ইরানের সাথে কাজ করছে এবং একই সময়ে তথাকথিত উগ্রবাদী শক্তিসমূহকে দুর্বল করতে সেলিম ইদরিসের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সমর্থিত Supreme Military Council কে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে। এছাড়াও সিরিয়ায় শেকড় রয়েছে এমন একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে এ প্রচেষ্টা পূর্বে SNC এবং অতি সম্প্রতি ঘাসান হিট্টুকে অন্তঃর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।
সিরীয় জাগরণের ভবিষ্যত
বিগত ২৬ মাসে কমপক্ষে এক লক্ষ সিরীয় নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। তবে সিরীয় মুসলিমগণ খুব ভালভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে যে, এ পথে আরও ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রয়োজন। তারা আরও বুঝতে পেরেছে যে, এ সংগ্রামের প্রকৃতি হল একদিকে মুসলিম উম্মাহ্ সত্যিকারের মুক্তির জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং অন্যদিকে পশ্চিমাবিশ্ব মুসলিম বিশ্বে ব্যবস্থার পরিবর্তন নয় বরং চেহারার পরিবর্তন সুনিশ্চিত করতে চাচ্ছে যাতে করে মূল সমস্যা নয় বরং এর উপসর্গ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।
আরব বিশ্বে সংঘটিত হওয়া অন্যান্য গণজাগরণের মত না হওয়ায় সিরীয় গণজাগরণ অনন্য – যা সভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড়। নবী (সাঃ) আল শামের ভূমি ও এর অধিবাসীদের বিষয়ে অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করেন – যেগুলোতে সে ভূমির রহমতপূর্ণ প্রকৃতি ও এর মুসলিমদের দৃঢ়তার কথা বিবৃত হয়েছে। তাছাড়া মুসলিমদের ইতিহাসে বর্ণিত আছে, এই বিশেষ ভূমিতে ক্রুসেডার ও মঙ্গলদের পরাজিত করে মুসলিমগণ তাদের হৃত শাসনক্ষমতা ও পুনঃজাগরণ ফিরে পায়।
সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, শতাব্দীকালের উপনিবেশবাদ, লাঞ্ছণা এবং নিষ্ঠুরতাকে পেছনে ফেলে আল শামের মুসলিমগণ উম্মাহ্’র পুনঃজাগরণকে নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে তো?
আনাস আলওয়াহ্ওয়াহ্
মে, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দবৃটেন যেভাবে আরববিশ্বকে বিভক্ত করেছিল

আরব বিশ্বজুড়ে জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির প্রক্রিয়া ছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা। একশো বছর আগেও অধিকাংশ আরব অঞ্চল উসমানী খিলাফতের অংশ ছিল। উসমানী খিলাফত ছিল একটি বিশাল বহুজাতিক রাষ্ট্র, যার কেন্দ্র বা রাজধানী ছিল ইস্তাম্বুল। বর্তমানে আরব বিশ্বের মানচিত্র খুবই জটিল একটি গোলকধাঁধার মতো মনে হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কিছু জটিল ঘটনা উসমানী সাম্রাজ্যের পতন এবং নতুন জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটায়। নবসৃষ্ট এসব রাষ্ট্রের নিজস্ব সীমানা ছিল যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত এবং মুসলিমদেরকে একে অন্যের থেকে আলাদা করে ফেলে। এই ঘটনার পেছনে অনেক কারণ থাকলেও, বৃটেনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেইসময়ে বৃটেনের বিবাদমান ৩ পক্ষের সাথে সই করা ৩ টি আলাদা চুক্তিতে পরস্পর বিরোধী অঙ্গীকার ছিল। চুক্তিগুলোর ফলে মুসলিম বিশ্বের একটি বিশাল অংশ বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা:
১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। শত্রু-মিত্র নির্ণয়ের জটিল প্রক্রিয়া, অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, ঔপনিবেশিক বাসনা ও সরকারগুলোর উচ্চপর্যায়ে অব্যবস্থাপনা প্রভৃতি মিলিয়ে এই প্রয়লংকারী যুদ্ধের সূচনা ঘটায়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে প্রায় ১.২ কোটি লোক প্রাণ হারান। যুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে ছিল বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং অক্ষশক্তিতে ছিল জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি।
প্রথমদিকে উসমানী খিলাফত নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা তারা যুদ্ধরত জাতিগুলোর মত ততোটা শক্তিশালী ছিল না এবং নানা আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। ১৯০৮ সালে শেষ শক্তিশালী খলীফা আব্দুল হামিদ দ্বিতীয় কে “৩ পাশা”(তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যুদ্ধমন্ত্রী, নৌমন্ত্রী) উৎখাত করে এবং সামরিক শাসন জারি করে। এরপর থেকে খলীফা পদটি শুধুমাত্র প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হত। এই “৩ পাশা” ছিল ধর্মনিরপেক্ষ এবং পশ্চিমা ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী “তরুণ তুর্কী” গ্রুপের সদস্য। অন্যদিকে, উসমানীরা ইউরোপের নানা শক্তির কাছে বিরাট অঙ্কের ঋণের জালেও আবদ্ধ ছিল, যা তারা পরিশোধে অক্ষম ছিল। এই ঋণ থেকে মুক্তি পাবার লক্ষ্যে শেষপর্যন্ত ওসমানীয়রা এই বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ওসমানীয়রা প্রথমে মিত্রশক্তিতে যোগদানে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে ১৯১৪ সালের অক্টোবরে অক্ষশক্তিতে যোগদান করে।
এর ফলশ্রুতিতে, বৃটেন তৎক্ষণাৎ উসমানী খিলাফতকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের নীলনকশা করতে শুরু করে। বৃটেন ১৮৮৮ সাল থেকে মিশর এবং ১৮৫৭ সাল থেকেই ভারতকে দখল করে নিয়েছিল। উসমানী খিলাফতের অবস্থান ছিল ব্রিটেনের এই দুই উপনিবেশ এর ঠিক মাঝখানে। ফলে বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে উসমানী খিলাফতকে উচ্ছেদ করতে বৃটেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।
আরব বিদ্রোহ:
ব্রিটেনের অন্যতম বড় পরিকল্পনা ছিল উসমানী খিলাফতের আরব জনগণকে উস্কে দেয়া। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরব উপদ্বীপের পশ্চিমের এলাকা হিজাযের একজন ব্যক্তিকে তারা তৎক্ষণাৎ পেয়েও যায়। মক্কার গভর্নর শরীফ হুসেইন বিন আলী উসমানী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শর্তে বৃটেনের সাথে চুক্তি করে। শরীফ হুসেইন নিজের মুসলিম ভাইদের সাথে যুদ্ধ করার এই ব্রিটিশ পরিকল্পনায় কেন অংশ নিয়েছিলেন তার নিশ্চিত কারণ জানা যায় নি। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: ৩ পাশা কর্তৃক তুর্কী জাতীয়তাবাদ বাস্তবায়নের চেষ্টায় তার অসন্তোষ, উসমানী সরকারের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ অথবা নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার মনোবাসনা।
যে কারণেই হোক না কেন, বৃটেনের সাহায্যপুষ্ট হয়ে শরীফ হুসেইন উসমানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নিলেন। অন্যদিকে, বৃটেন বিদ্রোহীদেরকে টাকা ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়, কেননা টাকা ও অস্ত্র ছাড়া উসমানীদের সুসংঘটিত বাহিনীর সাথে পেড়ে ওঠা কষ্টকর ছিল। ব্রিটেন তাদের এও প্রতিশ্রুতি দেয় যে, যুদ্ধের পর শরীফ হুসেইনকে ইরাক ও সিরিয়া সহ গোটা আরব উপদ্বীপ মিলিয়ে একটি বিশাল আরব রাজ্য শাসন করতে দেয়া হবে। দুইপক্ষ (বৃটেন ও শরীফ) এর মধ্যকার এ সম্পর্কীয় আলাপ-আলোচনা ও দর কষাকষি বিষয়ক চিঠিগুলো ইতিহাসে McMahon-Hussein Correspondence (ম্যাকমেহন-শরীফ পত্রবিনিময়) নামে পরিচিত। এই ম্যাকমেহন হলেন মিশরের তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমেহন, যার সাথে শরিফের গোপন আঁতাত চলছিল।
১৯১৬ এর জুনে, শরীফ হুসেইন তার সশস্ত্র আরব বেদুঈনদের নিয়ে যুদ্ধে বেড়িয়ে পড়েন। কয়েক মাসের মধ্যেই বৃটিশ সেনা ও নৌবাহিনীর সহায়তায় আরব বিদ্রোহীরা মক্কা ও জেদ্দা সহ হিযাজের বেশ কয়েকটি শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। ব্রিটেন সৈন্য, টাকা, অস্ত্র, পরামর্শদাতা (যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিখ্যাত “লরেন্স অফ এ্যারাবিয়া”), পতাকা দিয়ে বিদ্রোহীদের সহায়তা করে। মিশরে অবস্থানরত বৃটিশরা বিদ্রোহীদের একটি পতাকা বানিয়ে দেয় যা “আরব বিদ্রোহীদের পতাকা” নামে পরিচিত ছিল। এই পতাকা-ই পরবর্তীতে অন্যান্য আরব দেশ যেমন: জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া, কুয়েতের পতাকা তৈরিতে মডেল (আদর্শ) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯১৭ থেকে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, আরব বিদ্রোহীরা উসমানীদের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। একদিকে বৃটেন বাগদাদ ও জেরুজালেম দখল করে ইরাক ও ফিলিস্তিনে তাদের অবস্থান জোরদার করে, অন্যদিকে আরব বিদ্রোহীরা আম্মান ও দামেস্ক দখল করে বৃটেনকে তাদের কাজে সাহায্য করতে থাকে। এখানে জেনে রাখা জরুরি যে, অধিকাংশ আরব জনগোষ্ঠীরই এই আরব বিদ্রোহে কোন সমর্থন ছিল না। এটি ছিল (ক্ষমতালোভী) কতিপয় নেতার নেতৃত্বাধীন একটি ছোট আন্দোলন যা ঐ নেতাদের নিজস্ব ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছিল। অধিকাংশ আরব জনগোষ্ঠী এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে এবং উসমানী বা বিদ্রোহী কোন পক্ষকেই সমর্থন দেয় নি। শরীফ হুসেইনের আরব রাজ্য বানানোর বাসনা এতদিন ঠিকভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু বৃটেনের অন্যান্য পক্ষের সাথে করা প্রতিশ্রুতিগুলো এবার বাঁধ সাধল।
সাইকস-পিকোট চুক্তি:
আরব বিদ্রোহ শুরু হবার আগেই এবং শরীফ হুসেইন তার আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে বৃটেন ও ফ্রান্সের অন্য পরিকল্পনা করা ছিল। ১৯১৫-১৬ এর শীতকালে, বৃটেনের স্যার মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের ফ্রান্সিস জর্জেস পিকোট উসমানী খিলাফত পরবর্তী আরব বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করতে গোপনে মিলিত হন।
বৃটেন ও ফ্রান্স পুরো আরব বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়ার ব্যাপারে চুক্তি করে, যা পরবর্তীতে সাইকস-পিকোট চুক্তি নামে পরিচিতি লাভ করে। বৃটেন বর্তমানে জর্ডান, ইরাক, কুয়েত নামে পরিচিত এলাকাগুলোর দখল নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ফ্রান্স পায় বর্তমান সিরিয়া, লেবানন ও দক্ষিন তুরস্ক। জায়োনিস্টদের (জায়োনবাদী) ইচ্ছাকে এখানে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ফিলিস্তিনের দখল নেয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে ঠিক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৃটেন ও ফ্রান্সের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর কিছু কিছু জায়গায় আরবের সীমিত মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কথা থাকলেও, ইউরোপীয় শাসন ব্যবস্থাই তাদের উপর কর্তৃত্বশীল থাকবে। চুক্তি অনুযায়ী, অন্যান্য এলাকায় বৃটেন ও ফ্রান্স সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব করার অধিকার পায়।
যদিও এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে করণীয় বিষয়ক একটি গোপন চুক্তি ছিল, কিন্তু ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বলশেভিক সরকার একে সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়। এই সাইকস-পিকোট চুক্তি ও শরীফ হুসেইনকে দেয়া ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে, বৃটেন ও আরব বিদ্রোহীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এটিই বৃটেনের করা সর্বশেষ পরস্পর বিরোধী চুক্তি ছিল না, নাটকের চিত্রনাট্যের এখনো কিছু অংশ বাকি ছিল।
বেলফোর ঘোষণা:
আরেকটি সম্প্রদায়েরও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে শ্যেনদৃষ্টি ছিল এবং তারা হল জায়নবাদীরা। জায়োনিজম হল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন যা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতো। এই আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯ শতকে এবং এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য (যারা ছিল মূলত পোল্যান্ড, জার্মানি, রাশিয়ার বাসিন্দা) ইউরোপের বাইরে একটি আবাসভূমি খুঁজে বের করা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জায়োনিস্টরা বৃটেন সরকারের কাছে যুদ্ধ পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের ব্যাপারে সাহায্য চায়। অন্যদিকে, বৃটিশ সরকারের ভিতরেও এমন অনেক কর্মকর্তা ছিলেন যারা এই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব আরথার বেলফোর। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বরে, বেলফোর (ইহুদিবাদি) জায়োনিস্ট সম্প্রয়দায়ের নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। এই চিঠিতে তিনি ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সরকারী সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
“মহামান্য (বৃটিশ রাজার) সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় বসতি স্থাপনের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং এই লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্যে তার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, এমন কিছুই করা হবে না যাতে ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি (অন্যান্য ধর্মাবলম্বী) সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, অথবা অন্য কোনো দেশে বসবাসকারী ইহুদীদের উপভোগকৃত অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষতিসাধন হয়”
তিনটি পরস্পরবিরোধী চুক্তি:
ফলে দেখা গেল, বৃটেন ১৯১৭ সালের মধ্যেই তিন তিনটি ভিন্ন পক্ষের সাথে তিনটি আলাদা চুক্তি করলো এবং এই তিনটি ভিন্ন চুক্তিতে আরব বিশ্বের ভবিষ্যতের ব্যাপারে তিনটি ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হল। বৃটেন আরবদেরকে আশ্বাস দিল, তারা শরীফ হুসেইনের মাধ্যমে আরব রাজ্যের কর্তৃত্ব পাবে, অন্যদিকে ফ্রান্স এবং বৃটেন চুক্তি করলো, ঠিক ঐ এলাকাগুলোই বৃটেন এবং ফ্রান্স ভাগ করে নিবে। আবার বেলফোর ঘোষণা অনুযায়ী জায়োনবাদীরা ফিলিস্তিন পাওয়ার আশা করলো।
১৯১৮ সালে মিত্রশক্তির বিজয়ের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং ফলশ্রুতিতে উসমানী খিলাফতের ধ্বংস ঘটে। যদিও উসমানীরা ১৯২২ পর্যন্ত নামে মাত্র টিকে ছিল এবং খলীফার পদটি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত নামমাত্র ভাবে টিকে ছিল, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে উসমানীদের অধীনে থাকা সব অঞ্চল ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশে পরিণত হয়। যদিও যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য তিন পক্ষের পরস্পরবিরোধী বিতর্কের মধ্যে আটকা পড়ে যায়।
তাহলে কোন পক্ষ অবশেষে বিজয় লাভ করেছিল? প্রকৃতপক্ষে কেউ-ই তাদের পূর্ণ চাহিদা মোতাবেক সবকিছু পায় নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে লিগ অব নেশনস (জাতিসংঘের আদি রূপ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। লিগ অব নেশন্সের অন্যতম দায়িত্ব ছিল, বিজিত উসমানী অঞ্চলগুলোকে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়া। লিগ অব নেশন্স সম্পূর্ণ আরব বিশ্বকে অনেক ভাগে বিভক্ত করে ফেলে (যাকে মেন্ডেট বলা হয়)। এসব মেন্ডেট বৃটেন ও ফ্রান্স এর হাতে তুলে দেয়া হয় এবং মেন্ডেটগুলো ব্রিটেন ও ফ্রান্স দ্বারা শাসিত হবে যতদিন না ঐ ছোট অঞ্চলটি বা মেন্ডেটটি নিজেই নিজের দায়িত্ব নেবার ব্যাপারে সামর্থ্যবান হয়। এই লিগ অব নেশন-ই সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন সীমানা আরোপ করে দেয়, যা আমরা বর্তমানে মানচিত্রে দেখতে পাই। এই সীমানাগুলো স্থানীয় জনগণের কোনপ্রকার মতামত ছাড়াই আরোপ করা হয়। জাতিগত, ভৌগলিক অথবা ধর্মীয় কোন পরিচয়ই বিবেচনায় আনা হয় নি, অর্থাৎ তা ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী একটি সিদ্ধান্ত। এটা জেনে রাখা জরুরি যে, আরব বিশ্বের এই রাজনৈতিক সীমানা কোনভাবেই বিভিন্ন জাতির উপস্থিতি নির্দেশ করে না। ইরাকি, সিরিয়, জর্ডানি ইত্যাদি পার্থক্যসমূহ সম্পূর্ণরূপে ইউরোপীয় ঔপনিবেশবাদীদের কর্তৃক তৈরি করা হয় আরবদেরকে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত করে ফেলার পদ্ধতি হিসেবে।
মেন্ডেট সিস্টেমের মাধ্যমে বৃটেন এবং ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের উপর তার কাঙ্খিত দখল বুঝে পায়। অন্যদিকে শরীফ হুসেইনের ক্ষেত্রে, তার ছেলেরা বৃটিশদের ছায়াতলে থেকে শাসনকাজ পরিচালনার সুযোগ পায়। প্রিন্স ফয়সালকে সিরিয়া ও ইরাকের রাজা করা হয় এবং প্রিন্স আব্দুল্লাহকে করা হয় জর্ডানের রাজা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বৃটেন এবং ফ্রান্স-ই এইসব এলাকার প্রকৃত কর্তৃত্বে ছিল।
অন্যদিকে, বৃটেন সরকার জায়োনবাদীদেরকে কিছু শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিনে বসতি গড়ার অনুমতি দেয়। বৃটেন সেখানে আগে থেকে বসবাসকারী আরবদের রাগান্বিত করতে চায় নি, তাই তারা ফিলিস্তিনে আসা দেশান্তরিত ইহুদীদের সংখ্যাসীমা বেঁধে দেয়। এর ফলে জায়োনবাদীরা ক্ষেপে ওঠে, ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ইহুদীরা বৃটেনের শর্ত না মেনেই ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা বাড়াতে থাকে। এসব ঘটনা আরবদের ক্ষোভও বাড়িয়ে দেয়, কেননা তাদের কাছে ফিলিস্তিন ছিল এমন একটি ভুমি যা ১১৮৭ সালে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়্যুবির বিজয়ের পর থেকে তাদের নিজেদের ছিলো এবং এখন তা বসতি স্থাপনের ফলে ইহুদীদের বলপূর্বক দখলে চলে যাচ্ছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বৃটেন মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি করেছিল তা আজও বিদ্যমান। পরস্পরবিরোধী চুক্তিগুলো এবং এর ফলে সৃষ্ট আলাদা আলাদা দেশগুলো মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। জায়োনিজমের উত্থান ও মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্যের ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে জালিম সরকারের উপস্থিতি ও অর্থনৈতিক পতন দেখা দিয়েছে। যদিও এই বিভাজনটি গত ১০০ বছরের ছোট পরিক্রমার ভেতরে তৈরি করা হয়েছে, তথাপি বৃটেন এর তৈরি করা এই বিভেদ মুসলিম বিশ্বে আজো শক্তিশালীভাবে বিরাজ করছে।
Bibliography:
Hourani, Albert Habib. A History Of The Arab Peoples. New York: Mjf Books, 1997. Print.
Ochsenwald, William, and Sydney Fisher. The Middle East: A History. 6th. New York: McGraw-Hill, 2003. Print.
মূল: Lost Islamic History হতে নেয়া এক প্রবন্ধ
অনুবাদক: ফারহাত শফী
Posted By Visionary
হারামের উপায়ও হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে

শরীয়াহ’র নীতি (قاعِدَة) বলে-
إذا غلب على الظن أنها توصل إلى الحرام، فإن كان يُخشى أن توصل فلا تكون حراماً
“যদি নিছক পরিমাণ সন্দেহ প্রতিষ্টিত হত, যে এটি হারামের দিকে নির্দেশ করছে এমন হারামের উপায় নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হবে। যদি শুধুমাত্র ভয়ের উদ্রেক হয় যে এটি হারামের দিকে নির্দেশ করে তাহলে এটি হারাম হবে না”
কুরআনে এই নীতিটির প্রমাণ পাওয়া যায়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ
“আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা আরাধনা করে তাদেরকে তোমরা মন্দ বলো না। তাহলে তারা ধৃষ্টতায় অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহকে মন্দ বলবে”। [সূরা আন-আম:১০৮]
কাফিরদের অপমান করা মুবাহ (অনুমোদিত) এবং আল্লাহ্ কুরআনে তাদেরকে অপমানিত করেছে। কিন্তু যদি এই অপমান আল্লাহ্কে অপমান করার দিকে কাফিরদের পরিচালিত করে, তাহলে তা করা হারাম। এটি এই কারণে যে আল্লাহ্কে অপমান করা হারাম। এবং এভাবেই শরীয়াহ নীতি প্রণীত হয়েছে, অর্থাৎ,
الوسيلة إلى الحرام محرمة
“হারামের উপায় নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয়”।
যদিওবা হারামের উপায় অবধারিতরূপে হারামের দিকে পরিচালিত হলেই নিষিদ্ধ হয়। অর্থাৎ, যদি এমন উপায় যা হারামের দিকে নিছক পরিমাণ হারামের দিকে পরিচালিত করে, এবং তা শরীয়াহ নীতি দ্বারা প্রতিষ্টিত হয়, তখন এটি হারাম হবে। কাজেই, যদি হারামের দিকে পরিচালিত না করে, যেমন: যদি এটি শুধুমাত্র ভয়ের উদ্রেক হয় যে হারামের দিকে পরিচালিত করছে, অর্থাৎ মহিলাদের মুখ না ঢেকে বাহিরে যাওয়া এবং এ ভয় হয় যে এটা ফিতনা তৈরী করবে, এ ক্ষেত্রে হারাম হবেনা, কারণ কেবল ভয় হয় যে হারামের দিকে পরিচালিত করবে এমন বিষয় হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এটি এ মূলনীতির প্রমাণ।
আরেকটি একই রকম নীতি প্রযোজ্য হবে এভাবে, “যদি মুবাহ জিনিষের কোন সুনির্দিষ্ট উপকরণ হারামের দিকে পরিচালিত করে, ঐ সুনির্দিষ্ট উপকরণটি হারাম হবে কিন্তু জিনিষটি মুবাহ’ই থেকে যাবে”।
এটি বুখারী হতে বিবৃত নাফে’ হতে বর্ণিত, যিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন উমর তাকে বলেন:
أَنَّ النَّاسَ نَزَلُوا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرْضَ ثَمُودَ الْحِجْرَ فَاسْتَقَوْا مِنْ بِئْرِهَا وَاعْتَجَنُوا بِهِ فَأَمَرَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُهَرِيقُوا مَا اسْتَقَوْا مِنْ بِئْرِهَا وَأَنْ يَعْلِفُوا الْإِبِلَ الْعَجِينَ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يَسْتَقُوا مِنْ الْبِئْرِ الَّتِي كَانَتْ تَرِدُهَا النَّاقَةُ
“কিছু লোক রাসূল (সা) এর সাথে ছামুদ আল হিজরে উপস্থিত হন, অতএব তারা ছামুদ আল হিজরের কূপ থেকে পানি নিল এবং তা দ্বারা খামির তৈরী করে নিল। রাসূল (সা) আদেশ দিলেন ঐ পানিগুলো ফেলে দিতে এবং খামিরগুলো পশুদের দিয়ে দিতে; এরপর তিনি পানি নিতে বললেন যেখান থেকে উষ্ট্রী পানি পান করত”
আরেকটি বর্ণনায় আসে, রাসূল (সা) বলেন: “এর কূপ থেকে কেউ পানি করবেনা এবং নামাযের ওযুর পানি হিসেবেও এটি কেউ ব্যবহার করবেনা, যে খামিরই এ পানি দ্বারা তৈরী করা হয়েছে তা পশুদের দিয়ে দাও এবং এর কোন অংশ খাবেনা। কেউ রাতে সঙ্গীবিহীন একাকী বের হবেনা”।
পানি পান করা মুবাহ, কিন্তু ঐ নির্দিষ্ট পানিটি যেটি ছামুদের পানি তা রাসূল (সা) পান করতে নিষেধ করেন কারণ এটি হারামের দিকে পরিচালিত করে; তথাপি পানি মৌলিকভাবে মুবাহ’ই থেকে যায়। এছাড়াও রাতে কোন সঙ্গী ছাড়া বের হওয়া মুবাহ বিষয় কিন্তু রাসূল (সা) সৈন্যদের কেউ ঐ নির্দিষ্ট রাতে এবং ঐ নির্দিষ্ট জায়গায় একাকী সঙ্গীবিহীন যেতে নিষেধ করেন কারণ এটি হারামের দিকে পরিচালিত করে, অন্যথায়, সঙ্গীবিহীন রাতে বের হওয়া মুবাহ’ই থকে যায়। এটি প্রমাণ করে যে ঐ মুবাহ জিনিসের নির্দিষ্ট বিষয়টি হারাম হয় যদি তা হারামের দিকে পরিচালিত করে, এবং জিনিসটি সাধারণভাবে মুবাহ’ই থেকে যায়।


















