তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মিশনারী আগ্রাসন | ইসলামী রাষ্ট্র

[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
মিশনারী আক্রমন: ইসলামী রাষ্ট্রে বিজ্ঞানের নাম করে ইউরোপের অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ কাজের জন্য তাদের মোটা অংকের অর্থ বরাদ্দ ছিল। মূলতঃ এটি ছিল বিজ্ঞান ও মানবতার নামে মিশনারীদের (ধর্মপ্রচার প্রতিষ্ঠান) ছদ্মাবরণে পরোক্ষভাবে উপনিবেশিকতার প্রসার। এ আক্রমনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল মুসলিম ভূখন্ডে রাজনৈতিক গোয়েন্দা শাখা কার্যকর করতে এবং সাংস্কৃতিক উপনিবেশিকতার বিপ্লব ঘটাতে, যাতে করে মুসলিম ভূখন্ড গুলো পশ্চিমা কুচক্রীদের অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। এ উপনিবেশবাদের সূচনা হয় যখন মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং এটি মূলত পরিচালিত হয়েছিল ফরাসী, ইংরেজ ও মার্কিণ মিশনারীদের মাধ্যমে।
ফলাফল স্বরূপ এ মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে ফরাসী ও ইংরেজরা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এরা মূলত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছিল যারা প্যান আরব ও প্যান তুর্কীবাদকে উৎসাহিত করেছিল। পাশাপাশি শিক্ষিত মুসলিমদের পশ্চিমাভিমুখী করার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর পিছনে প্রধানত দুটি লক্ষ্য ছিল। প্রথমত: বর্ণবাদকে উস্কে দিয়ে উসমানী রাষ্ট্র তুরস্ক হতে আরবদের বিচ্ছিন্ন করা ও সেই সুবাদে ইসলামী রাষ্ট্রে ফাটল সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত: মুসলিমদের অজ্ঞতার সুযোগে তাদের ইসলামের প্রকৃত বন্ধন সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তোলা।
মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্কল্পনার (স্কীম) মাধ্যমে প্রথম পর্বটি ভালোমত সম্পন্ন করলেও দ্বিতীয় বিষয়টি অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়টিকে তারা তুরস্ক, আরব, পারস্য এবং অন্যান্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উপর ছেড়ে দিয়েছিল যা মুসলিমদের ঐক্য বিনষ্ট করতে ও ইসলামের মূলনীতি হতে বিচ্ছিন্ন করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল।
মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করেছিল বিভিন্ন পর্যায়ে এবং তার ফলাফল পুরো মুসলিম বিশ্বেই পরিলক্ষিত হয়েছিল। বর্তমানে আমরা যে দুর্বলতা ও অধঃপতন প্রত্যক্ষ করছি তা এই সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টার ফলাফল। উপনিবেশবাদী শক্তি গুলোই আমাদের অগ্রযাত্রায় বাঁধার প্রাচীর সৃষ্টিতে প্রথম ইটটি স্থাপন করেছিল যা পরবর্তীতে আমাদের ও আমাদের আদর্শের মাঝে একটি দুর্জ্জেয় ব্যবধান রচনা করে দিয়েছে।
ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো মুসলিম বিশ্বে তাদের মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরী করেছিল কারণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের মিথ্যা প্রচারণা (propaganda) কোন কার্যকর ফল বয়ে আনছিল না। ক্রুসেডের বিরুদ্ধে জিহাদে মুসলিমরা তাদের ধৈর্য্য, সাহস এবং শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছিল। যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারগণ মুসলিমদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল, তখন তারা মূলত দুটি বিষয়ের উপর ভরসা করেছিল। এগুলো ছিল তাদের নিজস্ব হিসাব প্রসূত এবং এক্ষেত্রে তারা সাফল্যের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী ছিল। তারা ধারণা করেছিল এ দুটি বিষয় ইসলাম ও মুসলিমদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে প্রধান ভূমিকা রাখবে।
প্রথমতঃ তারা মুসলিম বিশ্বে বসবাসরত, বিশেষত আল শাম অঞ্চলের খৃষ্টানদের উপর নির্ভর করেছিল। কারণ তারা সংখ্যায় ছিল অনেক এবং অত্যন্ত ধার্মিক। ইউরোপীয়রা তাদের অভিন্ন বিশ্বাসের ভাই হিসাবে বিবেচনা করত। ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল ধর্মীয় যুদ্ধের খাতিরে তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও গুপ্তচরবৃত্তিতে তাদের সহায়তা করবে।
দ্বিতীয়তঃ ইউরোপীয়রা তাদের সংখ্যাধিক্য ও শক্তিমত্তার উপর বেশ আস্থাশীল ছিল। তারা জানত যে মুসলিমরা ইতিমধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত থাকত। স্পষ্টতঃ তাদের ঐক্যে ফাটল ধরেছিল। ইউরোপীয়রা ধারণা করত, একবার মুসলিমদের পরাজিত করতে পারলে তারা চিরতরে তাদের পদানত হবে ও সমূলে ধ্বংস হবে এবং তাদের দ্বীন কতগুলো আচার সর্বস্ব অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। অবশ্য বাস্তবে তাদের এ আশা ভেস্তে গিয়েছিল এবং তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিফলে গেল। তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে লক্ষ্য করল যে রণক্ষেত্রে মুসলিমদের পাশাপাশি আরব খৃষ্টানরা ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ করেছিল। ইউরোপীয়দের যাবতীয় মিথ্যা প্রচারণা তাদের উপর কোন কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ইউরোপীয়রা যে বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল তা হচ্ছে, আরব খৃষ্টানরা মুসলিমদের সাথে একত্রে বসবাস করত, সমঅধিকার ভোগ করত এবং রাষ্ট্রের প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করত। মুসলিমরা তাদের নিকট হতে খাবার গ্রহণ করত, খৃষ্টান নারীদের বিয়ে করত, তাদের দৈনন্দিন কাজে অংশীদার ছিল এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ করত।
খলীফা ও গভর্নরগণ রাষ্ট্রে আইনের শাসন ন্যায় সম্মতভাবে বাস্তবায়ন করতেন। আল কুরাফী এবং ইবনে হায়াম লিখেছেন,
“যদি আগ্রাসী শক্তি আমাদের ভূখণ্ডকে আক্রমন করে তবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে যিন্মিদের রক্ষা করা আর এজন্য প্রয়োজনে আমরা জীবন দেব। এ দায়িত্ব পালনে সামান্য অবহেলা যিম্মীদের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হবে।”
আল কুরাফী আরো বলেছেন,
“যিম্মিদের প্রতি মুসলিমদের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র ব্যবহার, দুরবলদের প্রতি সহমর্মিতা, দরীদ্রদের সাহায্য, ক্ষুধার্তদের আহারের ব্যবস্থা করা, তাদের জন্য পোষাকের ব্যবস্থা করা এবং তাদের সাথে মার্জিতভাবে কথা বলা। মুসলিমদের প্রত্যাঘাত করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতিবেশীদের আঘাতকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা উচিত। যে কোন সংকর্মশীল ধর্মপরায়ণ মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের প্রতি উত্তম উপদেশ দেয়া, তাদের সম্পদ, পরিবার, সম্মান ও অধিকার রক্ষা করা।”
একথা বিবেচনা করলে মুসলিমদের সহযোগী হিসাবে খৃষ্টানদের লড়াই করার বিষয়টি স্বাভাবিক। ইউরোপীয়রা আরো বিস্মিত হল যখন দেখল তাদের দ্বিতীয় কৌশলটিও বাস্তব ফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হল। তারা আল শাম দখল করে নিয়েছিল এবং মুসলিমদের সামগ্রিকভাবে পরাজিত করেছিল। তারা নিকৃষ্টতম নৃশংসতার স্বাক্ষর রেখেছিল এবং এ সময় তারা প্রথমবারের মত ব্যাপকভাবে মুসলিমদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল যা আজও অব্যাহত রয়েছে। তারা ধারণা করেছিল, সবকিছুই তাদের পক্ষে গিয়েছে এবং মুসলিমরা আর কোনদিন তাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। অবশ্য মুসলিমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যে তাদের ভূখণ্ড থেকে দখলদার বাহিনীকে অপসারণ করতে হবে। যদিওবা প্রায় দুইশত বছর ক্রুসেডারগণ মুসলিম ভূখণ্ড দখল করে রেখেছিল এবং ইতিমধ্যে তারা তাদের সাম্রাজ্য ও principalities স্থাপন করেছিল, কিন্তু মুসলিমরা অবশেষে তাদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছিল।
ইউরোপীয়রা মুসলিমদের এ অভাবিত সাফল্যের রহস্য উদ্ঘাটনে মনোযোগ দিল। তারা লক্ষ্য করল এর বীজ ইসলামেই নিহিত আছে। মুসলিমদের শক্তির উৎস হচ্ছে তাদের আকীদা এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছিল আইনকানুন ও অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণের অনুপম ব্যবস্থাটি। ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের ঐক্যের পিছনে এটিই ছিল মূল কারণ। তাদের সময়ে অবিশ্বাসী উপনিবেশবাদীরা ইসলামী বিশ্ব দখলের নতুন কৌশল গ্রহণ করল। তারা ইসলামী বিশ্বে অনুপ্রবেশের সর্বোত্তম পথটি বেছে নিয়েছিল এবং তা হচ্ছে মিশনারীদের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এর লক্ষ্য ছিল খৃষ্টানদের সমর্থন অর্জন ও মুসলিমদের মধ্যে তাদের দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা।
তারা আশা করেছিল যে এ পদ্ধতিটি মুসলিমদের দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহের উদ্রেক করবে এবং তাদের আকীদা নড়বড়ে হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা যাবে এবং তা মুসলিমদের দুর্বল করে ফেলবে।
উপনিবেশবাদীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হয়েছিল। ১৬শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ তারা মাল্টায় মিশনারী কেন্দ্র স্থাপন করতে সমর্থ হল এবং এটি তাদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হল যেখান থেকে পরবর্তীতে তারা মুসলিম বিশ্বে মিশনারী কার্যক্রমের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা করেছিল। প্রাথমিক অবস্থায় তারা এখান থেকেই তাদের মিশন কার্য পরিচালনা করত। পরবর্তীতে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। ১৬২৫ খৃষ্টাব্দে তারা তাদের মূল ঘাঁটি আল শাম এ সরিয়ে নেয় এবং এখান থেকে তাদের মিশনারী আন্দোলনের শুরু করে।
অবশ্য এসময় তাদের কার্যক্রম ছিল সীমিত। তারা কিছু স্কুল স্থাপন ও বই পুস্তক প্রকাশ করা ছাড়া বিশেষ কিছু করতে পারে নি। বস্তুত: তারা সবার নিকট থেকে ব্যাপক বাধা ও অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়েছিল। ১৭৭৩ খৃষ্টাব্দ পর্যান্তদের কাজ অব্যাহত থাকে এবং এ সময় তাদের ঈসায়ী (jesuits) কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম তখনো চলছিল – যেমন ‘আজ়ারীয়’ মিশনারী। এদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তাদের অস্তিত্ব প্রায় শূন্যের পর্যায়ে নেমে এসেছিল। ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তাদের কাজ মাল্টায় সীমাবদ্ধ ছিল। এসময় বৈরুতে তাদের একটি কেন্দ্র চালু হয় এবং মিশনারীদের কাজ পুনর্দোমে শুরু হয়। প্রথমদিকে তারা বেশ প্রতিকূলতার শিকার হলেও তাদের কাজ অব্যাহত ছিল। প্রাথমিকভাবে তাদের কাজের ক্ষেত্র ছিল ধর্মবাণী ও ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রচার। তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ছিল সীমিত ও দুর্বল।
১৮৩৪ সালে মিশনারী তৎপরতা সমগ্র শাম এ ছড়িয়ে পড়ল। লেবাননের আন্তুরা গ্রামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হল এবং মার্কিন মিশন তাদের বই পুস্তক প্রকাশনা ও প্রচারের সুবিধার্থে মাল্টা থেকে ছাপাখানা ও দোকান বৈরুতে সরিয়ে নিল।
প্রখ্যাত মার্কিন মিশনারী এলাই স্মিথ এ সময়ে খুবই তৎপর ছিল। সে মাল্টায় স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে মিশনের ছাপাখানার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ১৮২৭ সালে তিনি বৈরুতে এসেছিল। কিন্তু ভয় এবং একঘেয়েমী তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল বলে সে পুনরায় মাল্টায় ফিরে যায়। অবশেষে পুনরায় ১৮৩৪ সালে তার স্ত্রী সহ সে বৈরুতে আসে এবং মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় তার কাজের পরিধি বেড়ে গেল এবং আল শাম অঞ্চলে, বিশেষত বৈরুতে তার কাজে আত্মনিয়োগ করল। তার ও তার মত আরও অনেকের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে মিশনারী আন্দোলনের পুনর্জন্ম হল। যখন ইব্রাহিম পাশা প্রাথমিক স্কুলের জন্য একটি নতুন পাঠ্যসূচী গ্রহণ করে তা সিরিয়াতে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন মিশনারীদের সামনে এক নতুন সুযোগের দ্বার খুলে গেল। মিশরীয় শিক্ষা ব্যবস্থা হতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ সিলেবাসটি প্রণীত হয়েছিল এবং মিশরীয় ব্যবস্থাটি গৃহীত হয়েছিল ফরাসী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে। মিশনারীরা এ সুযোগটি গ্রহণ করেছিল এবং তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা আন্দোলনে কার্যকর অবদান রেখেছিল। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা তাদের প্রকাশনার কাজ বিস্তৃত করতে সক্ষম হল। সবকিছু ছাড়িয়ে মিশনারী আন্দোলন সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করল। তারা ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মের স্বাধীনতার নামে পরস্পরের প্রতি ক্রোধের আগুন প্রজ্বলিত করল এবং মুসলিম, খৃষ্টান ও দ্রুজ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে আকীদা সম্পর্কিত বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করল।
ইব্রাহিম পাশা যখন আল শাম থেকে পিছু হটল তখন অস্থিরতা, আতঙ্ক আর নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছিল এবং জনগণের মাঝে ব্যাপক বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। বিদেশী প্রতিনিধিবৃন্দ, বিশেষত: মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর সুযোগ নিল। আল শামে উসমানী রাষ্ট্রের দুর্বল প্রভাবের সুযোগে তারা নাগরিকদের মাঝে অসন্তুষ্টি উস্কে দিতে লাগল। এক বছরের মাথায়, ১৮৪১ সালে লেবাননের পার্বত্য অঞ্চলে খৃষ্টান ও ইসমাইলী দারাজী সম্প্রদায়ের (druze) মাঝে মারাত্মক গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ল। অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে বিদেশী রাষ্ট্র সমূহের চাপে ও হস্তক্ষেপে উসমানী রাষ্ট্র লেবাননের জন্য পৃথক একটি শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল। এ ব্যবস্থায় প্রদেশটিকে দুটি পৃথক ভাগে ভাগ করে ফেলা হল এবং এক অংশে খৃষ্টান সম্প্রদায় ও অন্য অংশে দারাজী (druze) সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হল। উসমানী রাষ্ট্র উভয় প্রদেশে একজন করে গভর্ণর নিযুক্ত করলেন যাতে উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে কোন বিরোধ বা সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। এ ব্যবস্থাটি সফল হয়নি, কারণ এটি ছিল একটি অস্বাভাবিক সমাধান। এসময় বৃটেন ও ফ্রান্স এতে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ল এবং যেখানেই কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিল সেখানেই তারা নাগরিকদের মাঝে বিবাদ ও সংঘাত উস্কে দিতে লাগল।
বৃটেন ও ফ্রান্স এ সংঘাতের অজুহাতে লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করা শুরু করল। ফরাসীরা মাওয়ারিন ক্যাথলিক খৃষ্টান সম্প্রদায় (maronites) এবং বৃটিশরা দারাজী সম্প্রদায়ের পক্ষাবলন্বন করল। এর মাধ্যমে ১৮৪৫ সালে নতুন করে গোলযোগ সৃষ্টি হল। এ সময় দৃশ্যপট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। আক্রমণের নৃশংসতা এত ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল যে গীর্জা, মঠ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। চৌর্যবৃত্তি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে সমস্যাটির একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য উসমানী রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিকে লেবাননে পাঠালো। কিন্তু তিনি উত্তেজনার সাময়িক প্রশমন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেন নি। এ দিকে মিশনারীরা তাদের কার্যক্রম আরো ঘনীভূত করল। ১৮৫৭ সালে মাওয়ারিন খৃষ্টান সম্প্রদায় (maronite) বিপ্লব ও সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোষণা দিল। মাওয়ারিন ধর্মগুরুরা কৃষকদের মধ্যে তাদের সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলল। ফলশ্রুতিতে উত্তরাঞ্চলে তারা এক ভয়াবহ আক্রমণের সূচনা করল। এভাবে এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের শুরু হল এবং তা দক্ষিণেও ছড়িয়ে পড়ল। খৃষ্টান কৃষকেরা তাদের দারাজী সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল এবং বৃটিশ ও ফরাসীরা তাদের মিত্রদের সাহায্য করতে লাগল। এর ফলাফলস্বরূপ গোটা লেবাননে গৃহ যুদ্ধ (civil strife) ছড়িয়ে পড়ল। দারাজী সম্প্রদায় নির্বিচারে পাদ্রী, সাধারণ জনগণ নির্বিশেষে খৃষ্টান হত্যা করতে শুরু করল। এ সংঘাতের ফলে হাজার হাজার লোক হতাহত হল কিংবা উদ্বাস্তু ও গৃহহীন হয়ে পড়ল।
আল শাম এর সর্বত্র গোলযোগের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল। দামাস্কাসে মুসলিম ও খৃষ্টান অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র ঘৃণার বিষ ছড়ানো হচ্ছিল। অবশেষে ১৮৬০ সালে মুসলিমরা একটি খৃষ্টান জেলা আক্রমন করে বসলে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সংঘর্ষের সাথে যুক্ত হয়েছিল যুগপৎ গণলুন্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ। এ সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটাতে উসমানী রাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হল। এর ফলে যদিও বা লেবাননে শান্তি স্থাপন করা সম্ভব হল, কিন্তু পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকারী রাষ্ট্রগুলো আল শাম এ অনুপ্রবেশের জন্য একে একটি সুযোগ হিসাবে নিল। ফলে তারা উপকূলে তাদের রণতরী সমাবেশ করতে শুরু করল।
একই বছরের আগস্টে ফ্রান্স বিপ্লব দমন করতে বৈরুতে তাদের পদাতিক বাহিনীর একটি ডিভিশন প্রেরণ করেছিল। এভাবেই লেবানন ও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে উসমানী রাষ্ট্রে অসন্তোষ ও সংঘাত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ, যারা বহুদিন থেকেই উসমানী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে আসছিল। তারা এ ব্যাপারে সফল হয়েছিল এবং উসমানী রাষ্ট্রকে বাধ্য করেছিল সিরিয়ার জন্য দুটি প্রদেশে বিভক্ত করে একটি আলাদা শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে এবং লেবাননকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে। এ ঘটনার মাধ্যমেই লেবানন, আল শাম থেকে পৃথক হয়ে গেল। লেবাননের জন্য স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত স্বায়ত্ত শাসন দেয়া হল। এ ব্যবস্থায় সরকার প্রধান হল একজন খ্রিষ্টান যে স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিনিধিদের একটি কাউন্সিলের সহায়তায় শাসন কার্য পরিচালনা করে।
তখন থেকেই বিদেশী শক্তিগুলো লেবাননের বিষয়গুলো পরিচালনা করে আসছে এবং তাদের কাজের মূল কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এভাবে লেবানন একটি সেতু হিসাবে কাজ করেছে যার মাধ্যমে বিদেশী শক্তি উসমানী রাষ্ট্র তথা ইসলামী ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে মিশনারীরা একটি নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করল। মিশনারীরা শুধুমাত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা, ছাপাখানা ও ক্লিনিক স্থাপন করেই সন্তুষ্ট ছিলনা, বরং তারা তাদের মধ্যে একটি সংঘ (এসোসিয়েশন) সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করল। ১৮৪২ সালে মার্বিশ মিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিজ্ঞান সংঘ স্থাপনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হল। এ কমিটির কাজ প্রায় পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এর মধ্যে তারা একটি সংঘ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল যার নাম ছিল “বিজ্ঞান ও শিল্প সংঘ” (Association of Arts and Sciences)। এর সদস্যদের মধ্যে ছিল নাসিফ আল ইয়াযিজী, এবং বুত্রুস আল বুসতাদী, (আরবদের উদ্দেশ্যে গঠিত বিধায় লেবানীজ খ্রিষ্টানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল) এবং এলাই স্মিথ, কর্নেলিয়াস ভ্যান ডাইক ও ব্রাইটন কর্ণেল চার্চিল। প্রথমে এ সংঘের উদ্দেশ্য ছিল অস্পষ্ট। তারা বয়স্কদের ও শিশু কিশোরদের স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষা দিত। তারা বয়স্ক ও কিশোরদের পশ্চিমা সংস্কৃতি শেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করত এবং এভাবে মিশনারী পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের মন ও চিন্তাধারাকে গড়ে তুলছিল।
অবশ্য সংঘটির নিরলস প্রচেষ্টার পরও দু বছরে তারা গোটা শাম অঞ্চলে মাত্র পঞ্চাশ জন সদস্যকে দলে টানতে সক্ষম হয়েছিল। তারা সকলেই ছিল খ্রিষ্টান, বিশেষত বৈরুত অঞ্চলের অধিবাসী। কোন মুসলিম কিংবা দারাজী সম্প্রদায় তাদের দলে তখনো যোগ দেয়নি। তাদের কাজ সম্প্রসারিত ও ত্বরান্বিত করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও খুব একটা সফল হচ্ছিল না। পাঁচ বছরের মাথায় এ সংঘটির অবলুপ্তি ঘটে। এর মাঝে তারা উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য না পেলেও মিশনারীদের মাঝে আরো অনেকগুলো সংঘ তৈরীর আকাঙ্খা সৃষ্টি হয়েছিল। কাজেই ১৮৫০ সালে আরেকটি সংঘ স্থাপিত হল এবং এর নাম দেয়া হয়েছিল “প্রাচ্য সংঘ” (oriental association). ফরাসী ঈসায়ী সঙ্ঘের যাজক হেনরি দেব্রোনিয়ের অভিভাবকত্বে ও সহযোগিতায় খ্রিষ্টান সদস্যদের নিয়ে ঈসায়ীগণ (Jesuits) এ সংঘটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তার পূর্ববর্তী “বিজ্ঞান ও শিল্প সংঘের” পথ অনুসরণ করেছিল এবং স্বল্প সময় পর এটিও ভেঙ্গে যায়।
এরপর আরো বেশ কটি সংঘ স্থাপিত হয় কিন্তু তাদের সবকটিই ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়ে অপসৃত হয়। ১৮৫৭ সালে একটি নতুন সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় যারা একটি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। এর সকল সদস্যই ছিল আরব এবং এতে কোন বিদেশী সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এবার তাদের প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখল এবং কিছু মুসলিম ও দারাজী সম্প্রদায়ের লোকও তাদের সংঘে যোগ দিল। এ সংঘটি তাদের গ্রহণ করেছিল, কারণ তারা সবাই ছিল আরব। এর নাম দেয়া হল, “সিরীয় বিজ্ঞান সংঘ” (Syrian Science Association)। সংঘটি তাদের কাজে সাফল্য পেতে শুরু করল এবং বিদেশী সদস্য না থাকায় আরবদের নিকট গ্রহণ যোগ্যতা পেল। এর সদস্যরা নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে লাগল, তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমর্থন পেতে লাগল এবং ক্রমে এর সদস্য সংখ্যা একশত পঞ্চাশে উন্নীত হল। এর প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কিছু প্রখ্যাত আরব ব্যক্তিত্ব ছিল, যেমন দারাজী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে মোহাম্মদ আরসালান, মুসলিমদের মধ্য থেকে হুসাইন বায়হাম। আরব খ্রিষ্টান সম্প্রদায় থেকেও অনেকে যোগ দিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল বুত্রুস বুসতাদীর সন্তান ইব্রাহীম আল ইয়াযিজী। এ সংঘটি অন্যান্য সংঘের চেয়ে বেশী সময় স্থায়ী হয়েছিল। এর কর্মসূচীর পরিকল্পনা করা হয়েছিল আরব জাতীয়তাবাদ কে প্রজ্বলিত করার উদ্দেশ্যে। অবশ্য বিজ্ঞানের মোড়কে এর গুপ্ত উদ্দেশ্যটি ছিল উপনিবেশবাদ ও মিশনারীর প্রসার। এটি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য একটি ছায়া সংগঠন হিসাবে কাজ করছিল।
১৮৭৫ সালে বৈরুতে “গুপ্ত সংঘ” (secret association) নামে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মূলত রাজনৈতিক চিন্তাধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি আরব জাতীয়তাবাদের ধারণাটি উস্কে দিতে শুরু করল। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিল বৈরুত প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজের পাঁচজন তরুণ। এরা সকলেই ছিল খ্রিষ্টান, যাদের মিশনারী সংগঠনগুলো প্রভাবিত করতে পেরেছিল। প্রতিষ্ঠার পর তারা অল্প সংখ্যক সদস্য দলে নিল। এ সংঘটি তাদের লিফলেট ও ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদের ডাক দিল এবং তারা আরবদের, বিশেষত সিরীয় ও লেবানীজদের, রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবী তুলল।
অবশ্য এদের প্রকৃত কাজ ও কর্মসূচী একেবারেই ভিন্ন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হত। এরা মানুষের অন্তরে অদ্ভুত আকাঙ্খা ও মিথ্যা আশার জন্ম দিতে লাগল। তারা আরব জাতীয়তাবাদের প্রতি আহ্বান করত এবং উসমানী রাষ্ট্রকে তুর্কী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে এর বিরোধিতাকে উৎসাহিত করত। এটি রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার জন্য কাজ করছিল এবং আরব জাতীয়তাবাদকে জীবনের ভিত্তি হিসাবে প্রচার করতে লাগল। এ সংঘটি সর্বদা আরব জাতীয়তাবাদকে উর্ধ্বে তুলে ধরত। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সকলেই তাদের সাহিত্য ও লেখনীতে তুর্কীদের আরবদের নিকট থেকে ইসলামী খিলাফত ছিনিয়ে নেয়া, ইসলামী শরীয়াহ লংঘন ও দীনকে অবমাননা করার জন্য দায়ী করত। এ থেকে সংঘটির প্রকৃত চরিত্র ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় এবং তা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বিপক্ষে একধরণের অসন্তোষ সৃষ্টি করা। এরা দীন সম্পর্কে সন্দেহ ও হতাশা সৃষ্টি করত এবং অনৈসলামিক মূলনীতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজত। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা শক্তিরাই এ আন্দোলনগুলো শুরু করেছিল। তারাই এদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তাদের পর্যবেক্ষণ করত ও তাদের পরিচালনা করত। তারা তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিবরণী লিখত। উদাহরণ স্বরূপ, ১৮৮০ সালের ২৮ জুলাই, বৈরুতে নিযুক্ত ব্রিটিশ কন্স্যাল, তার সরকারের নিকট একটি টেলিগ্রাম পাঠায় যাতে বলা হয়, “বিপ্লবী লিফলেটের বিতরণ শুরু হয়েছে। উৎস হিসাবে মিজাতকে সন্দেহ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও অবস্থা শান্ত রয়েছে। ডাকযোগে বিস্তারিত জানান হবে।”
বৈরুতের রাস্তায় একটি লিফলেট বিলি ও দেয়ালে লাগানোর পর এই টেলিগ্রামটি পাঠানো হয়েছিল। এরপর বৈরুত ও দামাস্কাসে নিযুক্ত ব্রিটিশ কন্স্যালগণ বেশ কিছু চিঠি পাঠায়।
এ চিঠিগুলোর সাথে ছিল সংঘের সদস্যদের বিলিকৃত লিফলেটের কপি। এটি একটি যথার্থ তথ্যপ্রমাণ যা থেকে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয় যে, আল শাম এ তাদের কার্যক্রম শুরু করা প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজের আন্দোলনটি তাদের পরিকল্পনা ছিল। আল শাম অঞ্চলেই সংঘের কার্যক্রম বেশী পরিলক্ষিত হত। অবশ্য অন্যান্য আরব অধ্যুষিত অঞ্চলেও এদের কার্যক্রম চলছিল। ১৮৮২ সালে জেদ্দায় নিযুক্ত ব্রিটিশ কমিশনারের তার সরকারের কাছে লেখা চিঠিতে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। আরব আন্দোলন সম্পর্কে সে লিখে,
“আমার কাছে এ খবর পৌঁছেছে যে, এমনকি মক্কায়ও কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। আমি যা শুনেছি তা থেকে মনে হচ্ছে নাজদের সাথে দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূখন্ড অর্থাৎ দক্ষিণ ইরাককে একত্রিত করার একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যেখানে মনসুর পাশাকে নিয়োগ দেয়া হবে এবং আসীর ও ইয়েমেন কে একত্রিত করে আলী ইবনে আবিদ কে তার শাসক নিযুক্ত করা হবে।”
এ বিষয়গুলোতে শুধুমাত্র বৃটেনই আগ্রহী ছিল না বরং ফ্রান্সও গভীর আগ্রহ প্রকাশ করছিল। ১৮৮২ সালে বৈরুতে নিযুক্ত একজন ফরাসী কর্মকর্তা ফরাসী উদ্বেগের কথা জানায় এই বলে,
“স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমি বৈরুতে থাকাকালীন সময়ে মুসলিম যুবকদের স্কুল ও ক্লিনিক স্থাপন এবং দেশের পুনর্জাগরণের কাজে একাগ্রতা লক্ষ্য করেছি। এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হচ্ছে এ আন্দোলনটি যে কোন উপদলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত। এ সংঘে খৃষ্টান সদস্যদের স্বাগত জানানো হয় এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাদের উপর নির্ভর করা হয়।”
বাগদাদ থেকে একজন ফরাসী লিখেছিল,
“আমি যেখানেই গিয়েছি সেখানেই একই মাত্রার একটি সাধারণ অনুভূতি লক্ষ্য করেছি এবং তা হচ্ছে তুর্কীদের প্রতি বিদ্বেষ। এই তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য সমষ্টিগত কাজ শুরুর জন্য একটি ধারণা প্রণয়নের কাজ চলছে। দিগন্তপ্রসারী আরব জাতীয়তাবাদ আন্দোলন দানা বাঁধছে এবং অচিরেই তা আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই জাতি, যারা দীর্ঘকাল যাবৎ শোষিত হয়েছে তারা মুসলিম বিশ্বে তাদের স্বাভাবিক মর্যাদার দাবী তুলতে যাচ্ছে এবং বিশ্বের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে।”
ধর্ম ও বিজ্ঞানের নামে এই মিশনারী কার্যক্রম শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও বৃটেনের আকর্ষণবিন্দুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আরো বহুদূর ছড়িয়ে গিয়েছিল এবং অধিকাংশ অনৈসলামীক রাষ্ট্রগুলোতেও তাদের কার্যপরিধি বিস্তৃত করেছিল। এর মধ্যে ছিল জারের শাসনাধীন রাশিয়া কর্তৃক প্রেরিত মিশনারী অভিযান এবং প্রুশিয়া (জার্মানী) কর্তৃক বিভিন্ন মিশনারী কাজে প্রেরিত একদল সেবিকা (ক্যারডের সন্ন্যাসিনী)। বিভিন্ন মিশনারী ও পশ্চিমা প্রতিনিধিদের মধ্যে মতভেদ, রাজনৈতিক কার্যক্রমের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল এক ও অভিন্ন। তা হচ্ছে প্রাচ্যে খৃষ্টধর্মের প্রচার, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রসার এবং মুসলিমদের মাঝে তাদের দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা, তিক্ততা ছড়িয়ে দেয়া, তাদের ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞা সূচক দৃষ্টিভঙ্গী তৈরী করা এবং পশ্চিম ও পশ্চিমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে প্রশংসা করতে প্ররোচিত করা।
মিশনারীরা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাদের ধর্মপ্রচার অব্যাহত রেখেছিল। তারা ইসলামী সংস্কৃতি ও ইসলামী জীবনযাত্রাকে অবজ্ঞা করে, মুসলিমদের পশ্চাদপদ ও বর্বর হিসাবে চিহ্নিত করেছে যা প্রায় প্রতিটি ইউরোপীয়ানের অসুস্থ বিবেচনা লব্ধ মতমতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আমাদের ভূখন্ডে অবিশ্বাস্য ও উপনিবেশবাদের ব্যাপক বিস্তৃতি তাদের সাফল্যকেই প্রতিফলিত করে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৭ (বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একটি একক জাতিতে পরিণত করা)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
সমস্ত আরব উপদ্বীপের জনগোষ্ঠী দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করার পর এবং আরব ভূখন্ড থেকে মূর্তিপূজা নিশ্চিহ্ন হবার পর আল্লাহর রাসূল (সা) ইন্তিকাল করেন। এ সময় সমস্ত আরব উপদ্বীপ ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত এবং সম্পূর্ন ভাবে ইসলামের আকীদাহ্ ও শাসনব্যবস্থা থেকে উদ্ভুত আইন-কানুন দিয়ে শাসিত। আল্লাহতায়ালা তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করা, মুসলিমদের উপর তাঁর নিয়ামতকে সম্পূর্ন করা এবং দ্বীন ইসলামকে তাঁর পছন্দনীয় জীবনব্যবস্থা হিসাবে মনোনীত করার পরই রাসূল (সা) ইন্তিকাল করেন। এর মধ্যে প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর রাজা ও শাসকবৃন্দের কাছে দূত পাঠিয়ে এ অঞ্চলের জনসাধারণকে ইসলামের দিকে আহবান করা এবং মু’তাহ ও তাবুকের প্রান্তরে সৈন্যদল পাঠিয়ে রোমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করাও অন্তর্ভূক্ত ছিল।
এরপর খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও এ বিজয় অভিযাত্রা চলতে থাকে। খুলাফায়ে রাশেদীনের সময় সর্বপ্রথম ইরাক জয় করা হয় এবং এ সময় এ অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিল পারস্য ও আরব জাতির মিশ্রণ; যারা খ্রিষ্টান, মাযদাকিয়া এবং জরুষ্ট্রিয়ান ধর্মে বিশ্বাস করতো। এরপর, জয় করা হয় পারস্য এবং তারপর আল-শাম অঞ্চল। পারস্য অঞ্চলে জরুষ্ট্রিয়ান, ইহুদী ও খ্রিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী লোকেরা বসবাস করতো এবং পারসিকরা এ অঞ্চল শাসন করতো। অপরদিকে, আল-শাম ছিল রোমানদের উপনিবেশ যেখানে রোমান সংস্কৃতি ও খ্রিষ্ট ধর্মের প্রাবল্য ছিল। এ অঞ্চলে প্রধানত সিরীয়, আর্মেনীয়, ইহুদী, আরব এবং স্বল্প সংখ্যক রোমান বসবাস করতো। এরপর, মুসলিমরা মিশর জয় করে এবং এ অঞ্চলেও কপ্ট, ইহুদী এবং রোমান জাতির লোকেরা মিশ্রিত ভাবে বসবাস করতো। এরপরের পালায় বিজিত হয় উত্তর আফ্রিকা, যেখানে আফ্রিকার বার্বার জাতি রোমানদের শাসন-কর্তৃত্বের নীচে বসবাস করতো। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পরে উমাইয়াদের শাসনামলে সিন্ধ, খাওয়ারিজম এবং সমরকান্দ জয় করে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করা হয়। এ সময়েই আল-আন্দালুস জয় করা হয় এবং একে ইসলামী রাষ্ট্রের একটি প্রদেশে পরিণত করা হয়।
এ সমস্ত বিজিত অঞ্চলের মানুষেরা ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর; তাদের ছিল বিভিন্ন ধরনের ধর্মবিশ্বাস, ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি, প্রথা ও আইনকানুন। স্বাভাবিক ভাবেই তারা মানসিক ও আচরনগত দিক থেকে একে অন্য থেকে ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। সুতরাং, এ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে একটি নির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা, ভাষা, সংস্কৃতি ও আইনকানুন দিয়ে শাসন করে তাদের একটি একক জাতিতে পরিণত করা ছিল সত্যিকারের একটি ব্যাপক ও দুরূহ কাজ এবং এ কাজে সফলতা অর্জন করা ছিল অসাধারন ও বড় মাপের সাফল্য। কিন্তু, ইসলামী জীবনাদর্শের মাধ্যমে বিরাট এ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়েছে এবং (পৃথিবীর ইতিহাসে) এ সফলতা অর্জন করেছে শুধু ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামের পতাকাতলে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার নীচে আসার সাথে সাথেই তারা (বিজিত জনগোষ্ঠী) এক উম্মাহ্ বা জাতি হিসাবে বিবেচিত হয়েছে; আর তা হল মুসলিম উম্মাহ্। বস্তুতঃ ইসলামী আকীদাহ্ এবং শাসনব্যবস্থাই ছিল অসাধারন এ সাফল্যের মূলভিত্তি। ভিন্ন ধরনের এই সব জনগোষ্ঠীকে সফলতার সাথে একটি জাতিতে পরিণত করার পেছনে অনেক ধরনের কারণ রয়েছে। কিন্তু, নিম্নবর্ণিত কারণগুলো এগুলোর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ:
১. ইসলামের শিক্ষা।
২. জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এবং কাজেকর্মে মুক্ত অঞ্চলের জনসাধারণের সাথে মুসলিমদের স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা করা।
৩. বিজিত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর দ্রুত ইসলাম গ্রহণ।
৪. ইসলাম গ্রহণকারীদের জীবনাচরণে আমুল পরিবর্তন এবং এর মাধ্যমে অসহনীয় জীবন থেকে সুস্থ ও সুন্দর জীবনে উত্তরণ।
বস্তুতঃ ইসলামের শিক্ষা দ্বীন ইসলামের দিকে মানুষকে আহবান করার বাধ্যবাধকতা অর্পণ করে এবং যখন যেখানে সম্ভব এ আলোকিত বাণীকে ছড়িয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই জিহাদের মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চল বা ভূখন্ড জয় করার প্রয়োজন হয়; যেন সে অঞ্চলের মানুষেরা খুব সহজে ইসলামের আলোকিত আদর্শ এবং এর ন্যায়ভিত্তিক আইনকানুনের যথার্থতা অনুধাবন করতে পারে। ইসলাম আবার যে কোন ব্যক্তি বা জাতিকে ইসলাম গ্রহণ না করে তাদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরার স্বাধীনতাও দেয়। এক্ষেত্রে, তাকে শুধমাত্র ইসলামের লেনদেন ও শাস্তি সংক্রান্ত বিধিবিধানকে মেনে চলতে হয়। শেষোক্ত এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, এই বিষয়টিই মূলতঃ মুসলিম ও অমুসলিম জনসাধারণের কর্মকান্ডের মাঝে একাত্মতা ও বন্ধন তৈরী করে। তারা একই ব্যবস্থা দিয়ে শাসিত হয় এবং জীবনের সমস্যাগুলোকে একই ব্যবস্থা দিয়ে সমাধান করে, যা তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখে। ঐক্যের এ ভিত্তিই অমুসলিমদেরকে মুসলিমদের মতোই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে সাহায্য করে। তারা তখন একই জীবনব্যবস্থার অংশীদার হয়ে এবং একই রাষ্ট্রের অভিভাকত্বের নীচে থেকে একই রকম মানসিক সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে।
এছাড়া, ইসলামের শিক্ষা শাসিত জনগোষ্ঠীকে জাতি, গোত্র বা বর্ণের ভিত্তিতে বিবেচনা না করে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করতে শেখায়। এ কারণে, ইসলামের সামাজিক ও শাস্তি সম্পর্কিত আইনকানুনগুলো কোন রকম পার্থক্য ছাড়াই মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর কার্যকরী করা হয়।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা বা ঘৃনা যেন তোমাদের ন্যায় প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত না রাখে; তোমরা ন্যায়বিচার কর; আর, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তোমাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে খুব ভাল করে জানেন।” [সুরা মায়িদাহঃ ৮]
ইসলামী রাষ্ট্রে আইনের চোখে সকল মানুষ সমান। রাষ্ট্রের শাসক জনগণের বিষয়াদি দেখাশুনা করবে এবং জনগণকে শাসন করবে। আর, রাষ্ট্রের নিয়োজিত বিচারক (কাজী) কোনরকম পক্ষপাতদুষ্টতা ছাড়া জনগণের মাঝে বিদ্যমান বিবাদসমূহ নিষ্পত্তি করবে। এলক্ষ্যে, বিচারক প্রতিটি নাগরিককে মানুষ হিসাবে (মুসলিম বা অমুসলিম হিসাবে নয়) বিবেচনা করে তাদের সমস্যা সমাধান করবে এবং ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা করবে। বস্তুতঃ ইসলামী শাসনব্যবস্থাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঝে সত্যিকারের সমতা ও ঐক্য নিশ্চিত করে।
ইসলাম শাসকদের নির্দেশ দিয়েছে যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সহায়তায় রাষ্ট্রের সমস্ত উলাইয়াতে (প্রদেশ) বসবাসকারী মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চিত করা হয়। প্রদেশের সংগৃহীত রাজস্ব যাই হোক না কেন কিংবা সংগৃহীত সে রাজস্ব জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট হোক বা না হোক। এছাড়া, ইসলাম রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কোষাগারের জন্য বিভিন্ন উলাইয়াহ থেকে কর আদায় করে তা একত্রিত করে একটি একক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলনের নিদের্শ দিয়েছে, যেন বিজিত অঞ্চলগুলো উলাইয়াহ হিসাবে দৃঢ় ভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত হয় এবং তাদেরকে একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে সহায়তা করে। বস্তুতঃ ইসলামী শাসনব্যবস্থা এরকম একটি ব্যবস্থাকে সাফল্যের সাথে নিশ্চিত করেছিল এবং এক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছিল।
এছাড়া, বিজিত অঞ্চলগুলোর বসবাসকারী মানুষের সাথে মুসলিমদের সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা, এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহন করা ও মুসলিমদের সাথে তাদের একীভূত হয়ে যাবার ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। কোন অঞ্চল বা ভূখন্ড জয় করার পরপরই সাধারনত মুসলিমরা সেখানে বসবাস করতে আরম্ভ করত এবং সে জনগোষ্ঠীর মানুষকে ইসলাম ও ইসলামের সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করত। মুসলিমরা তাদের প্রতিবেশী হিসাবে বাস করতো, সকল কর্মকান্ডে তাদের অংশীদার হত এবং একই দেশের নাগরিক হিসাবে একই আইনকানুন দিয়ে শাসিত হত। ইসলামী রাষ্ট্রে কখনই শাসক আর শাসিত কিংবা বিজয়ী আর বিজিত হিসাবে জনসাধারণ বিভাজিত হয়নি; কিংবা, মুসলিম ও আদিবাসীরা আলাদা কোন জনগোষ্ঠী হিসাবে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাস করেনি। তারা সকলেই ছিল রাষ্ট্রের নাগরিক যারা প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে একে অপরকে সবসময় সহযোগিতা করতো। মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর এ ধরনের আচরণ বিজিত জনগোষ্ঠীর কাছে একেবারেই নতুন ছিল। বস্তুতঃ এ শাসকগোষ্ঠী নিজেদেরকে জনগণের কাতারে রেখে তাদেরকে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে শাসন করেছিল এবং এর ভিত্তিতেই তারা জনগণের সেবা ও তাদের বিষয়াদি দেখাশুনা করেছিল। ফলে, এ অঞ্চলসমূহের জনগোষ্ঠী অবাক বিস্ময়ে শাসকগোষ্ঠীর এমন এক আচরণের সাক্ষী হয়েছিল, যে ব্যাপারে তাদের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা উন্নত চরিত্রের শাসকদের কাছ থেকে পেয়েছিল অত্যন্ত চমৎকার আচরণ, যা তাদেরকে এই শাসকবর্গ ও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। শাসক ও সাধারন মুসলিমরা আহলে কিতাবের (ইহুদী ও খ্রিষ্টান) নারীদেরকে বিয়ে করতো, তাদের জবাই করা পশুর মাংস ও খাবার খেত। এ সকল আচরণ মূলতঃ তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে; কারণ, তারা শাসক ও শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের উপর আরোপিত ইসলামী জীবনাদশের্র প্রভাব ও সৌন্দর্য স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। ফলশ্রুতিতে, তারা ধীরে ধীরে মুসলিমদের সাথে একীভূত হয়ে একটি একক উম্মাহ্ বা জাতিতে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহণ করা কোন বিশেষ সময় বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং, প্রতিটি দেশের মানুষই দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। আসলে, বিজিত অঞ্চলগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত— মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফলে, পরবর্তীতে ইসলাম আর বিজয়ী মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে বিজিত এইসব জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে মুসলিমদের সাথে একীভূত হয়েছে এবং এক উম্মাহ’তে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া, ইসলাম নও মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে উন্নততর করে তাদেরকে সামগ্রিক ভাবে পরিবতর্ন করেছিল। এর ফলে, তাদের মাঝে ইসলামী আকীদাহ্ দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা কাজ করেছিল তাদের জীবনাদর্শের ভিত্তি হিসাবে। আর, এ জীবনাদর্শ থেকেই উৎসরিত হয়েছিল তাদের জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন রকম ধ্যান-ধারণা। ইসলাম তাদেরকে অন্ধ ও কুসংস্কাচ্ছন্ন বিশ্বাস থেকে তুলে এনে যৌক্তিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এ পরিবর্তন তাদেরকে মূর্তিপূজা, অগ্নিপূজা, ট্রিনিটি তত্ত্ব বা তিন খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস, ব্যক্তিপূজা এবং এ জাতীয় বিভিন্ন বস্তুর উপাসনা, যা তাদের চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের মূল কারণ ছিল, এগুলো থেকে এক আল্লাহ’র উপাসনার দিকে ধাবিত করেছিল। আর, এক আল্লাহ’র উপাসনাই তাদের অন্তরসমূহকে ক্রমাগত করেছিল আলোকিত। ইসলাম তাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়েছিল এবং তারা কোরআন-সুন্নাহ’র বর্ণনার ভিত্তিতেই বিষয়টি অনুধাবন করেছিল এবং বিশ্বাস করেছিল পরকালের পুরস্কার ও শাস্তির উপরও। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকায় তারা বুঝতে পেরেছিল ক্ষণস্থায়ী এ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। ফলে, তারা ধাবিত হয়েছিল অনন্ত-অসীম ও চিরসুখের জীবনের খোঁজে। একইসাথে, তারা এতটুকু অবহেলা না করে দু’বাহু উম্মুক্ত করে এ জীবনকে যাপন করেছিল। তারা আল্লাহতায়ালা নির্ধারিত সঠিক পন্থা ও নির্দেশনা দিয়ে জীবন যাপনের প্রতিটি সরঞ্জামকে ব্যবহার করেছিল ও উপভোগ করেছিল জীবনের আনন্দ ও প্রাচুর্য্যকে।
ইসলাম আসার পূর্বে, এ সমস্ত জনগোষ্ঠীর মানুষের কর্মকান্ডের মূলভিত্তি ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্থাৎ, ব্যক্তিস্বার্থই ছিল তাদের সকল কমর্কন্ডের মূল নিয়ামক। কিন্তু, ইসলাম গ্রহনের পর তাদের কাজের ভিত্তি পরিবর্তিত হয়ে হালাল-হারামে পরিণত হয়। মূলতঃ আল্লাহতায়ালা যা কিছু আদেশ করেছেন এবং নিষেধ করেছেন সে সবকিছুর উপর গড়ে উঠা ভিত্তিই তাদের সমস্ত কাজের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। তাদের সমস্ত কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়ে যায় আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর, কাজের মূল্য নির্ধারিত হয় কাজের পেছনে নিহিত উদ্দেশ্য থেকে। যেমনঃ যদি, কাজটি হয় নামাজ কিংবা জিহাদ, তাহলে এটি হয় আধ্যাত্মিক কাজ; যদি হয় ক্রয় বা বিক্রয় সংক্রান্ত, তাহলে এটি হয় বস্তুগত কাজ; সহমর্মিতা বা বিশ্বস্ততা হয় নৈতিক কাজ; বিপদে কাউকে সাহায্য করার বিষয়টি হয় মানবিক কাজ ইত্যাদি। মানুষ কাজের পেছনের উদ্দেশ্য এবং কাজের মূল্যের ব্যাপারে পার্থক্য করতে আরম্ভ করে। ফলে, জীবন সম্পর্কে তাদের পূর্বের সকল ধারণা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ইসলাম নির্ধারিত কাজের ভিত্তিতেই জীবনকে পরিমাপ করা হয় এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ নির্ধারিত হয়।
ইসলাম মানুষকে সুখের প্রকৃত সংজ্ঞা শেখায়। ইসলাম পূর্ব সময়ে, সুখ মানুষের জৈবিক ও প্রবৃত্তিগত চাহিদা পূরণের মধ্যে নিহিত ছিল। পরবর্তীতে তা পরিবর্তিত হয়ে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করাতে পরিণত হয়। আসলে, এর মধ্যেই প্রকৃত সুখ নিহিত। কারণ, সুখের প্রকৃত অর্থ হলো, মানবাত্মার চিরস্থায়ী শান্তি। আর, শুধুমাত্র বস্তুগত উপকরণের মাধ্যমে জৈবিক ও প্রবৃত্তিগত চাহিদা পূরণ করে চিরস্থায়ী এ শান্তি লাভ করা কখনও সম্ভব নয়। বস্তুতঃ এ রকম সুখের নাগাল একমাত্র বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।
এভাবেই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গীকে ইসলাম প্রভাবিত করেছে। জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী এবং তাদের জীবনের সকল কর্মকান্ডকে আমূল পরিবর্তন করেছে। পরিবর্তন করেছে তাদের কাজের গুরুত্বের ক্রমধারাকে (Order of Priorities); Some went up in value, others came down. গুরুত্ব নির্ধারনের ক্ষেত্রে মানবজাতি সবসময়ই তার নিজের জীবনকে সবচাইতে উপরের অবস্থানে রেখেছে এবং জীবনাদর্শ এসেছে তার পরের অবস্থানে। কিন্তু, ইসলাম পুরো ব্যাপারটিকে একেবারে উল্টিয়ে দিয়েছে; ইসলাম জীবনাদর্শকে রেখেছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে, এমনকি মানুষের নিজের জীবনের চাইতেও আদর্শকে উপরের স্থান দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি বোঝার পর, ইসলামের প্রয়োজনে মুসলিমরা অকাতরে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতে আরম্ভ করে এবং ইসলামী জীবনাদর্শ যে নিজ জীবনের চাইতে বহুগুণে মূল্যবান তারা এ সত্যকেও সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে শুরু করে। একইসাথে, তারা এটাও বুঝতে পারে যে, ইসলামের জন্য কঠিন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করা মুসলিমদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এভাবেই, জীবনের বিভিন্ন বিষয়গুলো সঠিক ক্রমধারা অনুযায়ী জায়গা করে নেয়। জীবন হয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত। মুসলিমরা অর্জন করে আত্মার চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি; কারণ, তারা বুঝতে পারে যে, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করাই ক্ষনস্থায়ী এ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
এভাবে, নও মুসলিমদের জীবনের সর্বোত্তম আদর্শ (Ideals) সম্পর্কে ধ্যান-ধারণাও পরিবর্তিত হয়ে যায়। অতীতে এ সমস্ত মানুষের সর্বোত্তম আদর্শের ব্যাপারে ভিন্ন ধরণের এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ধ্যান-ধারণা ছিল। কিন্তু, ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা জীবনের এক ও একমাত্র এবং চুড়ান্ত এক আদশের্র সন্ধান পেল। এর ফলে, জীবনের যে সমস্ত বিষয়গুলো তাদের কাছে খুব অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে সবকিছুর মাপকাঠিই একেবারে বদলে গেল; বদলে গেল মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অর্থ। পূর্বে তাদের কাছে মূল্যবোধের অর্থ ছিল ব্যক্তির সাহসিকতা, মার্জিত আচরণ ও শ্রদ্ধাবোধ এবং গোত্রীয় সমর্থন, বিত্তবৈভবের অহংকার, উচ্চ বংশমর্যাদা, Generosity to the point of extravagance. গোত্র বা সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য/বিশ্বস্ততা, দয়ামায়াহীন প্রতিশোধস্পৃহা এবং এই ধরণের অন্যান্য গুনাবলীর উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা হত। কিন্তু, ইসলাম তাদের পুরনো এ সব ধ্যান-ধারণাকে পরিবতর্ন করে দিল। বস্তুতঃ ইসলাম এ সবকিছুকে খুবই নগন্য বিষয়ে পরিণত করলো। এ সমস্ত বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য ছিল যে, মানুষ শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে এ সব বিষয় গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে পারে; তার ব্যক্তিগত লাভ বা লোকসানের উপর ভিত্তি করে নয়। কিংবা, উচ্চ মর্যাদা লাভ বা অহংকারের বশবর্তী হয়ে নয়। এজন্যও নয় যে, এগুলো বংশপরম্পরায় চলে আসা রসম-রেওয়াজ/রীতিনীতি, প্রথা কিংবা ঐতিহ্য, যাকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বরং, ইসলাম এ সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর নির্দেশের পূর্ণ আনুগত্য করাকে বৈধতা দিয়েছে। ব্যক্তিগত, গোত্রীয়, সামষ্টিক এবং জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে শুধু ইসলামের হুকুম-আহকামের কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিয়েছে।
এভাবেই, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের মনমানষিকতা ও আচরণকে ইসলাম পুরোপুরি রূপান্তরিত করেছে; বদলে দিয়েছে তাদের ব্যক্তিত্ব এবং জীবন, মানুষ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী। জীবনের সকল কাজ কোন ভিত্তির উপর সম্পাদিত হবে সে বিষয়ে ধ্যান-ধারণাকেও পুরোপুরি পরিবর্তিত করেছে। ইসলাম মানুষকে বুঝতে শিখিয়েছে যে, এই ক্ষনস্থায়ী জীবনের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আর তা হল, নিজেকে প্রতিনিয়ত ক্রটিবিচ্যুতি থেকে মুক্ত করে মহৎ গুনাবলীর দিকে ধাবিত করা। এছাড়া, মুসলিমরা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনকেই সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে হৃদয়ে ধারণ করেছিল এবং সর্বশক্তি দিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন করারও চেষ্টা করেছিল। যা তাদেরকে পূর্বাবস্থা থেকে আমূল পরিবর্তন করে পরিণত করেছিল নতুন এক সৃষ্টিতে।
এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই মূলতঃ ইসলাম গ্রহণকারীদের তাদের ইসলামপূর্ব অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সাহায্য করেছিল। ইসলাম জীবন সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন ধ্যানধারণা ও লক্ষ্যকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি মাত্র ধারণা ও লক্ষ্যে পরিণত করেছিল। ঐক্যবদ্ধ এই ধারণার ভিত্তিতেই তারা জীবনের সকল বিষয়াদি পরিচালনা করতো। ইসলাম তাদের বিভিন্ন ধরণের স্বার্থকে পরিবর্তন করে একটি মাত্র স্বার্থের নীচে তাদের একত্রিত করেছিল; আর, তা ছিল শুধু ইসলামের স্বার্থ। তাদের জীবনের বিভিন্ন লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে একটি লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল; আর, তা হল আল্লাহর বাণীকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া। পরিণতিতে, স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ একটি একক জাতি বা উম্মাহ’তে পরিণত হয়েছিল; আর, তা হল ইসলামিক উম্মাহ্।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৬ (ইসলামের বিজয়যাত্রা সুসংহতকরণ)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
অতীতে মুসলিমরা বহু দেশ জয় করে সেখানে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছে। বস্তুতঃ ইসলামই তাদের শাসন-ক্ষমতা ও নেতৃত্ব-কর্তৃত্বে উপবিষ্ট হবার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, অমুসলিমদের দ্বারা শাসিত হওয়া মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা সূরা নিসাতে বলেছেন,
“আল্লাহ কখনোই মু’মিনদের উপর কাফিরদেরকে জন্য কোন পথ রাখবেন না।” [সুরা নিসাঃ ১৪১]
এছাড়া, আল্লাহতায়ালা সম্মান ও মর্যাদা মু’মিনদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তিনি সুরা মুনাফিকুনে বলেছেন,
“এবং সম্মান ও মর্যাদা তো শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের জন্যই নির্দিষ্ট, কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।” [সুরা মুনাফিকুনঃ ৮]
আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের ততক্ষন পর্যন্ত প্রতিপত্তি, শাসন-ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব দেননি, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা তাদের মনমানসিকতাকে সত্যিকার ভাবে ইসলামের আলোকে গঠন করতে পেরেছে। আর প্রকৃত অর্থে, এ মানসিকতা বলতে বোঝায়, শাসন-কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব অর্জনের মাধ্যমে ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করা এবং ইসলামের বাণীকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা, ক্ষমতা অর্জনের মোহে মত্ত হয়ে যাওয়া নয়। মুসলিমরা যতক্ষন পর্যন্ত না এই যোগ্যতা ও মানসিকতা অর্জন করেছে [অর্থাৎ, তারা বুঝতে পেরেছে জনগণকে শাসন করা বলতে আসলে কি বোঝায় এবং আল্লাহর কাছে এর জবাবদিহিতা কতোটুকু] ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা তাদেরকে শাসন-কর্তৃত্ব এবং জনগণের দেখাশোনা করার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রেখেছেন। বস্তুতঃ ইসলামের অভূতপূর্ব সৌন্দর্য নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত এই সমস্ত ন্যায়পরায়ণ শাসকদের বিভিন্ন কর্মকান্ড ও উক্তির মধ্য দিয়ে অত্যন্ত জোরালো ভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং জনগণও এ আলোকিত সৌন্দর্যের সাক্ষী হয়েছে, যখন শাসকরা তাদের শরীয়াহ্ আইন-কানুনের মাধ্যমে শাসন করেছে। এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসাবে, এই সমস্ত জনগোষ্ঠির মানুষ ইসলামের সৌন্দর্যে এতো বেশী মুগ্ধ হয়েছে যে, তারা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। ফলে, ইসলামের প্রতিপত্তি, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার তারাও অংশীদার হয়েছে এবং সেইসাথে তাদের দেশগুলোও মুসলিম উম্মাহর অংশ হিসাবে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে।
বিজিত এ সমস্ত দেশগুলোকে ইসলামী আইন-কানুন অনুসারে শাসন করে ইসলামের এই বিজয়যাত্রাকে সুসংহিত করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী হয়েছে এ সমস্ত অঞ্চলের মানুষের ইসলাম গ্রহনের মধ্য দিয়ে [Until the conquer of countries by the Islamic state was given until the Day of Judgement]. মূলতঃ এ অভিযানগুলো বিজিত জনগোষ্ঠির মানুষদেরকে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থা ও শাসন-ব্যবস্থা থেকে সম্পুর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করেছিল এবং তাদেরকে অবিশ্বাসী জনগোষ্ঠি থেকে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠিতে রূপান্তরিত করেছিল। সেইসাথে তাদের ভূ-খন্ড দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়েছিল। ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেবার পূর্ব পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজ করে। তবে, ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ও মুসলিমদের কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাবার পরও এই অঞ্চলের মানুষেরা মুসলিমই থেকে গিয়েছিল এবং তাদের ভূ-খন্ডগুলোও মুসলিম ভূ-খন্ড হিসাবেই বিবেচিত। যদিও বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র অনুপস্থিত, কিন্তু তারপরও যে সমস্ত দেশগুলো একসময় মুসলিমরা জয় করেছিল সে সমস্ত দেশের মানুষ এখনও ইসলামকেই আঁকড়ে ধরে আছে এবং তাদের ভূ-খন্ডগুলো এখনও মুসলিম ভূ-খন্ড হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। এজন্য, এই সমস্ত অঞ্চলগুলোতে ইসলামের কর্তৃত্ব পূনঃপ্রতিষ্ঠিত করে আবারও এ অঞ্চলে ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
মূলতঃ কিছু কিছু বিষয় ইসলামের বিজয়যাত্রাকে স্থায়ী করতে এবং সেইসাথে ইসলামের বীজকে বিচারদিবস পর্যন্ত মানুষের অন্তরে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিল। এগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় বিজিত ভূ-খন্ডগুলোকে শাসন করা সহজ করেছিল, যেমনঃ ইসলামী আইন-কানুনের প্রকৃতি।
আবার অন্যকিছু বিষয় ছিল যা বিজিত জনগোষ্ঠির মানুষকে ইসলাম গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেমনঃ জনগণের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকদের ব্যবহার। আবার কিছু কিছু বিষয় ধর্মান্তরিত নও মুসলিমদের অন্তরে চিরস্থায়ী ভাবে ইসলামকে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিল, যেমন, ইসলামী আকীদাহর প্রকৃতি।
সংক্ষেপে এই বিষয়গুলো নিম্নরূপে সাজানো যায়ঃ
১. ইসলাম একটি যৌক্তিক আকীদাহ্ বা বিশ্বাস, যা মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ায় চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহন করতে বাধ্য করে। এজন্য, যখনই কোন মানুষ ইসলাম গ্রহন করে, তখনই সে চিন্তাশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এর কারণ হল, ইসলাম গ্রহনের সাথে সাথেই তার চিন্তা-চেতনা বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড এবং সৃষ্ট জগতের দিকে ধাবিত হয় এবং আল্লাহর এ সৃষ্ট জগতের ব্যাপকতা ও রহস্যময়তা প্রতিনিয়ত তাকে স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে তোলে। এ চিন্তা-চেতনাই তাকে মহান স্রষ্টার হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে, [শরীয়া’র মূল উৎস থেকে] বিভিন্ন হুকুম অনুসন্ধান করতে এবং তা অনুযায়ী তার জীবনের সমস্ত সমস্যা সমাধান করতে উৎসাহিত করে। আর এভাবেই, ইসলাম ব্যক্তি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় এবং সে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে, জেনেবুঝে ইসলাম দিয়ে তার জীবন পরিচালনা করে।
২. ইসলাম মুসলিমদের জ্ঞানাজর্ন করা এবং ইসলামের রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত থাকাকে বাধ্যতামূলক করেছে। তাই, ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে জানা ও বোঝার জন্য শুধু মুখে দুই কালেমা উচ্চারণ করা যথেষ্ট নয়। বরং, একজন মুসলিমের উচিত ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানার্জন করা। মানুষ, মহাবিশ্ব ও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইসলামের আলোকে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করা এবং ইসলাম এদের মধ্যকার পারস্পারিক সম্পর্ক কিভাবে নির্ধারণ করেছে সে ব্যাপারে অনুসন্ধান করা মুসলিমদের দায়িত্ব। কারণ, এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান মানুষের চিন্তার জগতকে বিস্তৃত ও প্রসারিত করে, তার ধ্যান-ধারণাকে স্বচ্ছ করে এবং সর্বোপরি প্রতিনিয়ত তার মনমানষিকতাকে উন্নত করে – যা তাকে অন্যদের শিক্ষককে পরিণত করে।
৩. বস্তুতঃ ইসলামী জীবনাদর্শ এবং এর শরীয়াহ’র প্রকৃতি হল, এ সম্পর্কিত জ্ঞানকে ধাপে ধাপে ও ক্রমান্বয়ে অর্জন করার প্রয়োজন হয়। এটি একজন মুসলিমকে সে যে সমাজে বসবাস করে সেখান থেকে জ্ঞানার্জন করার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার শিক্ষা দেয়। মুসলিমরা সবসময় বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যেই ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। একারনেই মুসলিমরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। ইসলামী আকীদাহ্ তাদের অন্তর ও হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবার কারনে তাদের ছিল চতুর্দিক পরিবেষ্টনকারী ধ্যান-ধারণা এবং সেইসাথে ছিল সমৃদ্ধ ও দিগন্ত বিস্তৃত জ্ঞানভান্ডার। এছাড়া, মুসলিমরা সাধারনত কোন বিষয় সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা ও চিন্তাভাবনা করার পরই সে ব্যাপারে ইসলামের হুকুম-আহকাম কি হবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতো। কারণ, এ ক্ষেত্রেও ইসলামকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করাই মূল বিষয় হিসাবে বিবেচিত হত।
প্রকৃতঅর্থে, মুসলিমরা শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন করার খাতিরে কখনো ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা কিংবা চিন্তাভাবনা করেনি। কারণ, এক্ষেত্রে এই জ্ঞানসাধনা তাদেরকে শুধু ইসলামের হুকুম-আহকাম বা চিন্তাচেতনায় পরিপূর্ণ জীবন্ত এক লাইব্রেরী বা বইতে পরিণত করতো, যার কোন বাস্তব প্রয়োগ থাকতো না। এই ধরনের জ্ঞানসাধনা তাদেরকে জ্ঞানের এমন এক ধারকে পরিণত করতো, যা তাদের কার্যকলাপ ও জীবনাচরণকে প্রভাবিত করতো না এবং লব্ধ সে জ্ঞানের আলোকে সমাজ পরিবর্তন করার কাজেও উদ্ধুদ্ধ করতো না। অর্জিত এই জ্ঞান সঞ্চিত জলাধারের মতো সমাজে কোন প্রভাব না ফেলেই একসময় শুকিয়ে যেত। এছাড়া, মুসলিমরা ইসলামকে শুধুমাত্র কিছু উপদেশাবলীর সমষ্টি হিসাবেও গ্রহন করেনি। কারণ, তা হলে, ইসলামী আদর্শ তাদেরকে সংকীর্ণ চিন্তাচেতনার ব্যক্তিবর্গে পরিণত করতো, যার ফলে তারা বিশ্বাসের সাথে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপের সম্পর্ক স্থাপন করতে ব্যর্থ হতো। মুসলিমরা খুব সতর্কভাবে বিপদজনক এই দুটি পথকে পরিহার করেছে; একটি হল, শুধুমাত্র জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা করা। আর, অন্যটি হল, ইসলামকে শুধু কিছু উপদেশাবলীর সমষ্টি হিসাবে গ্রহন করা। বস্তুতঃ ইসলামের নির্ধারিত পথেই মুসলিমরা ইসলাম ও এর হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। আর, তা হল আলোকিত চিন্তার মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করা।
৪. ইসলাম প্রগতিশীল আদর্শ। এ আদর্শ সবসময়ই মুসলিমদেরকে নতুন নতুন উচ্চতার দিকে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে পরিপূর্ণতা অর্জনের আলোকিত এক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত করে। বস্তুতঃ ইসলাম মুসলিমদেরকে বাস্তব জীবনে কিছু কাজ করতে বাধ্য করে। আর এ সমস্ত কার্যাবলী মুসলিমদেরকে ধীরে ধীরে এমন এক পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় যেখানে তারা আধ্যাত্মিক উচ্চতা, মানসিক শান্তি এবং সত্যিকারের সুখকে অনুভব করতে পারে। মানুষ যখন এ উচ্চতায় পৌঁছে যায়, তখন সে সেখানেই অবস্থান করতে চায়। সে অবস্থান থেকে পতিত হতে চায় না। কিন্তু, বাস্তবতা হলো, পরিপূর্ণতার এ রকম এক উচ্চতায় পৌঁছানো যত না কঠিন, সে অবস্থানকে ধরে রাখা তার চাইতেও কঠিন কাজ। এজন্য, মুসলিমদেরকে তাদের কাজের ব্যাপারে হতে হবে দৃঢ় প্রত্যয়ী, সংকল্পবদ্ধ ও চিন্তাশীল। এ সমস্ত গুনাবলীর মাধ্যমেই মুসলিমরা তাদের অর্জিত উচ্চতা ও প্রগতিকে ধরে রাখতে পারবে।
মুসলিমদের করণীয় এই সমস্ত কার্যাবলী আসলে সামগ্রিক ইবাদতের সমষ্টি; যাদের মধ্যে কিছু অবশ্য পালনীয় [ফরজ], আর কিছু আনুসাঙ্গিক। সমগ্র মুসলিমের জন্য অবশ্যপালনীয় এ ফরজ কর্তব্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র জাতিকে প্রগতির সাধারণ এক উচ্চতায় নিয়ে আসতে সহায়তা করে। আর, অবশ্যপালনীয় কর্তব্য ছাড়া অন্যসব কাজগুলো প্রতিনিয়ত মানুষকে পরিপূর্ণতা অর্জন করতে উৎসাহিত করে।
ইবাদত হিসাবে করণীয় এই সমস্ত কাজগুলো আসলে দুরূহ বা ভয়াবহ কোন দায়িত্ব নয়। কিংবা, নয় ক্লান্তিকর বা দমবন্ধকরা কোন অনাকাঙ্খিত অভিজ্ঞতা। এ সমস্ত কার্যাবলী মানুষকে তার জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ, উচ্ছাস কিংবা প্রাণ চঞ্চলতা থেকেও বঞ্চিত করে না। না মানব প্রকৃতিকে অস্বীকার করে তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগত চাহিদাগুলোকে দমিয়ে রাখে। আসলে, ইবাদত হিসাবে করণীয় এই সমস্ত কর্তব্যগুলো, বিশেষ করে বাধ্যতামূলক কর্তব্যগুলো পালন করা যে কারও জন্য খুবই সহজ একটি ব্যাপার এবং প্রতিটি মানুষের পক্ষে তা পালন করা সম্ভব। এই ইবাদতগুলো মানুষকে তার জীবন উপভোগ করার পথেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। বস্তুতঃ অবশ্য পালনীয় ইবাদতগুলো ছাড়া, আনুসাঙ্গিক অন্যান্য মানদুব ইবাদতগুলো [যে সমস্ত কাজ করার জন্য মুসলিমদের উৎসাহিত করা হয়েছে] মুসলিমরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে পালন করে। কারণ, তারা জানে এই সমস্ত কাজের মাধ্যমেই তারা আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে।
৫. অতীতের মুসলিমরা দ্বীন ইসলামের আলোকিত বাণীকে সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যেই অন্যান্য দেশ জয় করেছে। এজন্য তারা বিশ্বাস করতো যে, তারা এমন এক বাহিনী যাদের অন্তর মহানুভবতা ও হেদায়েতে পরিপূর্ণ। মুসলিমরা যখন কোন দেশ জয় করতো, তখন সে দেশকে ইসলাম দিয়েই শাসন করতো। আর, কোন জনগোষ্ঠী ইসলাম গ্রহন করার সাথে সাথেই তারা মুসলিমদের মতোই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করতো এবং সেইসাথে, মুসলিমদের জন্য যা যা অবশ্যপালনীয় তারা সে সমস্ত কার্যাবলীও পালন করতে বাধ্য থাকতো। বিজিত নতুন ভূখন্ড ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সমান অধিকার ও মর্যাদা উপভোগ করতো এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচিত হত। কারণ, ইসলামী শাসনব্যবস্থা ঐক্য ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই, বিজিত ভূমির জনগোষ্ঠী কখনো অনুভব করেনি যে, তারা দখলদারিত্ব কিংবা আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। না তারা ঔপনিবেশিকতার কোন চিহ্ন কোনদিন প্রত্যক্ষ করেছে। সুতরাং, এটা বিস্ময়কর নয় যে, ইসলামের বাস্তব প্রয়োগকে স্বচক্ষে অবলোকন করার পর বিজিত জনগোষ্ঠীর মানুষেরা স্বেচ্ছায় দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে এসেছে।
৬. ইসলামের জীবনাদর্শ এবং হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত জ্ঞান কোন বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং, এটা সকলের জন্য উম্মুক্ত একটি বিষয়। প্রকৃত অর্থে, বিজিত ভূমির জনগোষ্ঠীকে ইসলামের আকীদাহ্ ও হুকুম-আহকাম সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক, যেন তারা ইসলামী আকীদাহ্ ও জীবনাদর্শের প্রকৃত সৌন্দর্য ও প্রকৃতিকে গভীর ভাবে অনুভব করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ অঞ্চলগুলোর জনগোষ্ঠীকে ইসলাম দিয়ে শাসন করার লক্ষ্যে সে অঞ্চলে গভর্নর ও বিচারক নিয়োগ করতেন এবং মানুষকে ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে শিক্ষা দেবার জন্য শিক্ষক নিয়োগ করতেন। The Muslims who came after him (saw) conquered many countries and set up rulers and teachers who would teach the people fiqh and Qur’an. The people welcomed Islamic education with open arms until their culture became Islamic. This included those who chose not to embrace Islam.
৭. ইসলামী শরীয়াহ্ শ্বাশত ও সার্বজনীন এবং সেইসাথে এর রয়েছে মানবজীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান দেবার ক্ষমতা। এ কারণেই, মুসলিমদেরকে কখনও বিজিত অঞ্চলগুলোর আইন-কানুন সম্পর্কে গবেষনা করতে হয়নি। কিংবা, যে আইন-কানুন দিয়ে তারা জীবনের সব সমস্যার সমাধান করেছে (শরীয়াহ্ আইন), সে আইন-কানুনের সাথে বিজিত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান আইন-কানুনের কোন রকম সমঝোতাও করতে হয়নি; না তারা এ সকল অঞ্চলে বিদ্যমান আইন হতে কোনরকম আইন গ্রহণ করেছে। কোন অঞ্চল বা দেশ জয় করার সাথে সাথেই তারা সেখানে প্রথমদিন থেকেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং শরীয়াহ্ আইনকে পুরোপুরি বা বাস্তবায়ন করেছে। ইসলামী শাসনব্যবস্থা বা শরীয়াহ্ আইন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা কোনরকম পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি। যেমনঃ এমন কখনও হয়নি যে, তারা বিজিত কোন অঞ্চলে ক, খ ও গ আইন বাস্তবায়ন করেছে, কিন্তু ঘ আইন বাস্তবায়ন করেনি। এই ভেবে যে, ঘ আইনের বাস্তবায়ন হয়তো সে অঞ্চলে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে বিতর্কিত হতে পারে, কিংবা ঘ আইনের বাস্তবায়ন মানুষকে ইসলাম বিমুখ করতে পারে; অথবা, এ আইন মেনে নেয়া জনগণের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হতে পারে। বস্তুতঃ অতীতে ইসলামকে কখনই এরকম পর্যায়ক্রমিক ভাবে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হয়নি। কিংবা, বিচ্ছিন্ন বা খন্ডিত আকারে এখানে সেখানে শরীয়াহ্ আইন প্রয়োগ করা হয়নি।
আসলে, ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে প্রয়োগের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় এমন কোন পরিস্থিতি মুসলিমরা কখনও সহ্য করেনি। তারা ইসলামের আহবানকে সমগ্র বিশ্বের দরবারে পৌঁছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই বিভিন্ন দেশ জয় করেছে এবং সেইসাথে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করে বিজিত অঞ্চলগুলোর দূর্নীতিগ্রস্থ, ঘুনেধরা ও টলায়মান শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ন ভাবে বদলে দিয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের পুরনো ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করতে হয়েছে এবং সম্পূর্ন নতুন এক ব্যবস্থার দ্বারা সে ব্যবস্থাকে সামগ্রিক ভাবে প্রতিস্থাপন করতে হয়েছে। এ কারণেই বিজিত নতুন নতুন অঞ্চলের জনগণকে প্রথমদিন থেকেই শাসন করা মুসলিমদের জন্য ছিল খুব সহজ একটি ব্যাপার। আর, এ কারণে বিজিত এ অঞ্চলগুলোতে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ন ও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শাসন করতে গিয়ে মুসলিমরা কখনও কোন আইনপ্রণয়ন সংক্রান্ত জটিলতার সম্মুখীন হয়নি কিংবা, কুফর ও ইসলামী শাসনব্যবস্থার মাঝামাঝি কোন পর্যায়ও অতিক্রম করেনি। তাদের আহবান ছিল সুষ্পষ্ট; আর এর ভিত্তি ছিল ইসলামী আকীদাহ্। তাদের শাসনব্যবস্থা, আইন-কানুন ও সমস্ত বিধিবিধান এ আকীদাহ্ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। বস্তুতঃ মুসলিমদের প্রণীত আইন-কানুন ছিল শরীয়াহ্ আইন, যা যে কোন মানবগোষ্ঠীর জন্য, যে কোন স্থানে এবং যে কোন সময়ে প্রযোজ্য।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৫ (ইসলাম প্রচারে জিহাদের ভূমিকা)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
মুসলিম উম্মাহর পার্থিব জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো সমস্ত মানবজাতির কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়া। এ লক্ষ্যে, মুসলিম উম্মাহকে সবসময়ই বিশ্বের কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছে। আর, ইসলামের বাণী প্রচার-প্রসারের গুরুদায়িত্ব সবসময় ইসলামী রাষ্ট্রের কাঁধেই অর্পিত হয়েছে। তাই, অন্যান্য দেশ জয় করা এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে লক্ষ্য অর্জন করা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম নির্ধারিত দায়িত্ব-কর্তব্যকে সঠিক ভাবে পালন করার কারণেই অতীতে মুসলিমদের বিজয়ের ধারা অব্যাহত ছিল। আর, এ দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার অর্থ হলো, ইসলামী আইন-কানুনকে অমুসলিমদের উপর প্রয়োগ করে এবং ইসলামী ধ্যান-ধারনাগুলোকে ব্যাখ্যা করে তাদের কাছে এমন ভাবে ইসলামকে পৌঁছে দেয়া যেন ইসলাম তাদের চিন্তার জগতে বিচরণ করতে পারে।
এজন্য, ইসলামের বিজয় অভিযান না পরিচালিত হয়েছে কোন হীন স্বার্থ সিদ্ধি লক্ষ্যে বা কোন জনগোষ্ঠিকে কলোনীতে পরিণত করার উদ্দেশ্যে, আর না তা পরিচালিত হয়েছে কোন বিশেষ এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ করতলগত করার উদ্দেশ্যে। এ সমস্ত বিজয়যাত্রার এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের মহান বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং সেইসাথে তারা যে দুর্নীতিগ্রস্থ শাসনের অধীনে দুঃসহ জীবনযাপন করছিল তা থেকে তাদের মুক্ত করা।
বস্তুতঃ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল খুবই শক্তিশালী ভিত্তির উপর। যে কারণে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ রাষ্ট্র অবলোকন করেছে এর সমৃদ্ধি এবং বিস্তৃতি, বিভিন্ন দেশ জয় করেছে এবং প্রতিনিয়ত এর সীমানাকে বৃদ্ধি করেছে। যেহেতু এ রাষ্ট্রের আকীদাহ্ বা বিশ্বাস সার্বজনীন, তাই এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলেই নিহিত রয়েছে এর সার্বজনীন রাষ্ট্রে পরিণত হবার মূলমন্ত্র এ আকীদাহ্ সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত আকীদাহ্ যা থেকে উৎসরিত হয়েছে বিশ্বকেন্দ্রিক এক ব্যবস্থা এবং এ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য।
যে জন্য প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর ক্রমশঃ বিস্তৃতি ঘটা এবং একের পর এক দেশকে জয় করা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে, এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল কারণই এ বিষয়গুলোকে অবধারিত করে তুলেছিল। রাসূল (সা) আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় যে সকল মুসলিমের কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহন করেছিলেন তারা সকলেই আল্লাহর রাসুলের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন, যদিও এ যুদ্ধে তাদের ধন-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় কিংবা তাদের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু ঘটে। তারা সুখ এবং দুঃখ উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর রাসূল (সা)-এর পরিপূর্ণ আনুগত্য করার শপথ নিয়েছিলেন এবং সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তারা এটাও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তারা কারও অসন্তুষ্টির ভয়ে ভীত হবে না এবং ইসলামী দাওয়াতকে রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে আমৃত্যু লড়াই করবে। আর, এ একনিষ্ঠ আনুগত্যের পুরস্কার হিসাবে তারা পাবে চিরসবুজ জান্নাত। প্রকৃতঅর্থে, ইসলামী রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুতির মূলে এ বিষয়গুলোই সবসময় মূলমন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে। মুসলিমদের সবসময়ই মনে রাখতে হবে, কোন কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হয়েছে? তাদের মূল কাজ কি? সেনাবাহিনী প্রস্তুতির মূল উদ্দেশ্য কি শুধুই ইসলামের দাওয়াত বহন করা নয়? এ উদ্দেশ্যেই কি মুসলিমরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়নি, আনুগত্যের শপথ করেনি এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়নি?
আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একের পর এক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। সমগ্র আরব উপদ্বীপকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসার পর তিনি (সা) কায়সার এবং খসরুর কাছে তাঁর দূত প্রেরণ করেন। আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেয়াও তাঁর দাওয়াতী পরিকল্পনার একটা অংশ ছিল এবং হিজরী ৭ম সালে তিনি (সা) এ কাজ শুরু করেন। এছাড়া, তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের আশেপাশের বিভিন্ন রাজা ও রাজপুত্রদের কাছে দূত পাঠান, তাদের সকলকে ইসলামের দিকে আহবান করেন। মু’তা এবং তাবুকের যুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ এবং উসামার সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করা তাঁর এ সমস্ত পরিকল্পনারই বাস্তব প্রতিফলন। তাঁর উত্তরসূরী খলিফাগণ রাষ্ট্রের শাসক হিসাবে তাঁর গৃহীত পরিকল্পনার অনুসরণ করেছেন এবং যে সমস্ত দেশে দূত পাঠিয়ে তিনি (সা) মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেছিলেন, খলিফাগণ সে সমস্ত দেশ জয় করে প্রকৃতঅর্থে তাঁর পরিকল্পনাকেই বাস্তবায়ন করেছে।
পরবর্তীতে, খুব শীঘ্রই একই পদ্ধতি ও মূলনীতি অনুসরণ করে নতুন নতুন বিজয় অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হয়। রাসূল (সা) এর মূলনীতি অনুসরণ করার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র দেশ জয়ের ব্যাপারে কখনো বিশেষ কোন পছন্দকে প্রাধান্য দেয়নি। কিংবা, এ কাজ কতোটা সহজ বা কতোটা কঠিন এ বিষয়েও মুসলিমরা কখনো চিন্তা-ভাবনা করেনি। যদিও মিশর জয় করা মুসলিমদের জন্য তুলনামূলক ভাবে সহজ ছিল এবং দারিদ্রপীড়িত উত্তর আফ্রিকার রুক্ষ মরুময় প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে সে অঞ্চলে যথেষ্ট পরিমাণ ধনসম্পদও ছিল, কিন্তু, তারপরেও এ সমস্ত কোন বিষয়ই কখনো মুসলিমরা বিবেচনা করেনি। কারণ, তাদের বিভিন্ন দেশজয়ের পেছনের একমাত্র কারণ ছিল ইসলামের বাণীকে সে সমস্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া। মূলতঃ এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই মুসলিমরা প্রাচূর্যমন্ডিত কিংবা প্রাচূর্যহীন সকল রাষ্ট্রকেই মুক্ত করেছে। অথবা, কোন দেশের জনগণ যখন বিজয়ের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে বাঁধাকেও তারা অবলীলায় অপসারণ করেছে। এ কারণেই বিভিন্ন দেশে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার পেছনে সে দেশে ধনসম্পদের উপস্থিতি কিংবা তাদের দারিদ্রপীড়িত অবস্থা কখনো মূল বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়নি। কিংবা, কোন জনগোষ্ঠির ইসলাম গ্রহন করা বা প্রত্যাখান করাও ইসলামের বাণী বহন করার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। প্রকৃতঅর্থে, মুসলিমদের বিভিন্ন দেশজয় করার মূলকারণই ছিল ইসলামের আহবানকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা এবং সেইসাথে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ, ইসলামের এই বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব থেকেই উৎসরিত হয়েছে এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যা এই পৃথিবীর প্রতিটি দেশে, প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া জরুরী।
পবিত্র কোরআনে পরিস্কার ভাবে জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সাথে, কোরআনে এ বিষয়েও জোর দেয়া হয়েছে যে, জিহাদ একমাত্র ইসলাম অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসারেই হতে হবে এবং একমাত্র ইসলামের আহবান বিস্তৃতির লক্ষ্যেই হতে হবে। এ ব্যাপারে শক্তিশালী আয়াত নাযিল করে আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের তাঁর পথে জিহাদের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহতায়ালা সুরা আনফালে বলেছেন,
“এবং তোমরা তাদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ কর যতক্ষন পর্যন্ত না (পৃথিবী থেকে) ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট হয়।” [সুরা আল-আনফালঃ ৩৯]
তিনি সুরা বাকারায় বলেছেন,
“এবং তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর যতক্ষন পর্যন্ত না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন কেবল আল্লাহ’র জন্যই নির্দিষ্ট হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়, তবে অত্যাচারী ব্যতীত আর কারো সাথে শত্রুতা নেই।” [সুরা বাকারাহ্ঃ ১৯৩]
আল্লাহতায়ালা সুরা তওবাতে বলেছেন,
“যুদ্ধ কর তাদের সাথে যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, আর না ঈমান আনে কিয়ামত দিবসের উপর, না তারা নিষেধ করে তা হতে যা থেকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল নিষেধ করেছেন এবং তাদের সাথে যারা আহলে কিতাবদের মধ্য হতে সত্যদ্বীনকে স্বীকৃতি দেয় না, যে পর্যন্ত না তারা স্বতঃস্ফুর্ত আনুগত্যের সাথে জিযিয়া প্রদানে সম্মত হয়।” [সুরা তওবাঃ ২৯]
অন্যান্য অনেক আয়াতের সাথে এই আয়াতগুলোও মুসলিমদের জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং জিহাদের মূল উদ্দেশ্য কি হবে তার ইঙ্গিতও এখানে দেয়া হয়েছে। মূলতঃ এ ধরনের আয়াতগুলোই সবসময় মুসলিমদের অন্যান্য দেশ জয় করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, দ্বীন ইসলাম প্রচারের ভিত্তিতেই মূলতঃ ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছিল এবং এ উদ্দেশ্যেই শক্তিশালী মুসলিম সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল। তাই একথা অস্বীকার্য যে, জিহাদ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি বিষয় এবং এর মাধ্যমেই মুসলিমরা বিভিন্ন দেশে বিজয় পতাকা উত্তোলন করেছিল। ইসলামের দাওয়াত বহনের এই গুরুদায়িত্ব আবারও মুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র ফিরিয়ে দেবে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৪ (ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বলতে মূলতঃ বুঝায় এ রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক। এ সম্পর্ক মুসলিম উম্মাহর পররাষ্ট্র বিষয়ক কার্যাবলী দেখাশুনা করার ভিত্তিতেই গড়ে উঠে। বস্তুতঃ ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি একটি স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয় ভিত্তির উপর গঠিত। আর তা হলো, সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেয়া এবং সকল জাতি ও সমাজের কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়া। এটাই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি। মুসলিম উম্মাহ্কে যেই শাসন করুক না কেন, এই ভিত্তি অপরিবর্তনীয় এবং এ ব্যাপারে কোনরকম মতপার্থক্য করার কোন অবকাশ ইসলামে নেই। ইসলামের ইতিহাসের সকল সময়ে এই নীতিকেই মূলভিত্তি হিসাবে ধরা হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার সময় থেকে উসমানী খিলাফতের শেষদিন পর্যন্ত পররাষ্ট্রনীতির এই মূল ভিত্তিকেই অনুসরণ করা হয়েছে।
আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করার প্রথম দিন থেকেই ইসলামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে তাঁর নবগঠিত রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিমালা প্রস্তুত করেন। সমগ্র হিজাযে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়ার মানসে তিনি (সা) ইহুদীদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এছাড়া, সমস্ত আরব উপদ্বীপে ইসলামের আহবান পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে হুদাইবিয়া চুক্তি করেন। পরিশেষে, তিনি (সা) আরব উপদ্বীপের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে দূত পাঠিয়ে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেন এবং ইসলামের বাণী প্রচারের ভিত্তিতেই তাদের সাথে সম্পর্ক তৈরীর উদ্যোগ নেন।
এরপরে আশে খলীফাদের যুগ। রাসূল (সা)-কে অনুসরণ করে তারাও ইসলাম প্রচারের ভিত্তিতেই অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক গঠন করেন এবং সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ইসলাম প্রচারের ধারাকে অব্যাহত রাখেন। পরবর্তীতে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন-ক্ষমতায় আসা প্রতিটি শাসকই ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগীতায় অবতীর্ন হয়েছেন। আব্বাসীয় খলিফাগণের চাইতে উমাইয়া খলিফাগণ নতুন দেশ জয় করা এবং ইসলামের আহবান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশী সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। আবার, মামলুকদের চাইতে উসমানী খলিফাগণ অনেক বেশী সংখ্যক দেশ জয় করেছেন এবং ইসলামের বাণীর প্রচার-প্রসার ঘটিয়েছেন। এ পার্থক্য মূলতঃ কোন শাসনামলে রাষ্ট্র তার অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় পররাষ্ট্র নীতিকে বেশী গুরুত্ব দিয়েছে, তার উপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়েছে। যাইহোক, সব শাসনামলেই দ্বীন ইসলাম প্রচারকে মূলভিত্তি হিসাবে ধরেই ইসলামী রাষ্ট্র অন্যান্য সকল রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরী করেছে। খলিফাগণের শাসনামলের সুদীর্ঘ সময়ে কখনই এ অবস্থা পরিবর্তিত হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করা এবং বহির্বিশ্ব ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়াই হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের মূলদায়িত্ব। তাই, ইসলামকে বিশ্বব্যাপী প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব সবসময় ইসলামী রাষ্ট্রের উপরই অর্পিত হয়েছে।
আল্লাহতায়ালা ইসলামের সুমহান বাণী সমগ্র মানবজাতির উদ্দেশ্যে নাযিল করেছেন, আর এ কারণেই ইসলামকে সুনির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে প্রচার করা এবং এর আহবান সকলের কাছে পৌঁছে দেয়া সবসময় ইসলামী রাষ্ট্রের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলে বিবেচিত হয়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“এবং (হে মুহাম্মদ) আমি তো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছি। কিন্তু, বেশীর ভাগ মানুষই তা জানে না।” [সুরা সাবাঃ২৮]
আল্লাহতায়ালা আরও বলেছেন,
“হে মানবজাতি! তোমাদের নিকট এসেছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে নসীহত (সদুপদেশ)” [সুরা ইউনুসঃ ৫৭]
তিনি আরও বলেছেন,
“বল, হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর রাসূল হিসাবে প্রেরিত হয়েছি।” [সুরা আ’রাফঃ ১৫৮]
এবং তিনি আরও বলেছেন,
“আর এই কোরআন আমার নিকট অহীর মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে যেন আমি তোমাদেরকে এবং যাদের নিকট এটা পৌঁছাবে তাদের সকলকে এর দ্বারা সতর্ক করতে পারি।” [সুরা আন’আমঃ ১৯]
এছাড়া তিনি বলেছেন,
“হে রাসূল (সা)! যা কিছু তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার উপর অবতীর্ণ করা হয়েছে, তুমি (মানুষকে) সবকিছু পৌঁছিয়ে দাও। আর যদি তুমি তা না করো তবে [ধরে নেয়া হবে] তুমি আল্লাহর বাণী মানুষকে পৌঁছিয়ে দাওনি।” [সুরা মায়িদাহ্ঃ ৬৭]
মুহাম্মদ (সা) তার জীবদ্দশায় এই বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তার মৃত্যুর পর মুসলিমরা অব্যাহত ভাবে এ দায়িত্ব পালন করেছে। আসলে, মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর রাসূল (সা) যে কাজ শুরু করে গিয়েছিলেন সে কাজেরই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। আর তাই, মুসলিমরা সবসময় রাসূল (সা)-এর প্রদত্ত শিক্ষাকে অনুসরণ করে ইসলাম প্রচার-প্রসারের ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছে। আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর বিদায়ী ভাষণে (খুতবাহ্ আল-ওয়াদা) বলেছেন, “তোমরা যারা উপস্থিত তারা অনপুস্থিত লোকদের কাছে তা পৌঁছে দেবে। হয়তোবা অনুপস্থিত ব্যক্তি উপস্থিত ব্যক্তির চাইতে বেশী সতর্ক হবে।” তিনি (সা) আরও বলেছেন, “আল্লাহতায়ালা তার মুখ উজ্জ্বল করুক, যে আমার কথা শুনবে, তা বুঝবে এবং যেভাবে সে শুনেছে সেভাবেই মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।”
এজন্যই রাসূল (সা)-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর উত্তরাধিকারী খলিফাদের সময়ে ইসলামের বাণীর প্রচার-প্রসার করাই সবসময় অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্কের মূলভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হত। আর, কোরআন-সুন্নাহ্ এবং সাহাবাদের ঐক্যমত (ইজমা আস-সাহাবাহ) অনুযায়ী এটাই হচ্ছে আল্লাহতায়ালা’র সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট নির্দেশ।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বলতে আসলে বোঝায় ইসলামের আহবানকে বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেয়া। এই পররাষ্ট্রনীতি সবসময় একটি নির্দিষ্ট অপরিবর্তনীয় পদ্ধতিতে কার্যকর করা হয় – সেটা হচ্ছে জিহাদ। এখানে আলোচ্য বিষয় নয় কে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতায় আছে। বস্তুতঃ রাসূল (সা) মদীনায় রাষ্ট্র গঠন করার সময় থেকে একেবারে ইসলামী রাষ্ট্রের শেষদিন পর্যন্ত এ পদ্ধতি কখনও পরিবর্তিত হয়নি। আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার পরপরই তাঁর সেনাবাহিনী প্রস্তুত করেছিলেন এবং তিনি (সা) ইসলামী দাওয়াতের পথে বস্তুগত বাঁধা দূর করার লক্ষ্যে জিহাদের সূচনা করেছিলেন। যেহেতু কুরাইশরা দাওয়াতের পথে বস্তুগত বাঁধা তৈরী করেছিল, তাই তিনি (সা) সে বাঁধা দূর করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি (সা) (জিহাদের মাধ্যমে) কুরাইশদের অস্তিত্বকে সম্পূর্নভাবে নিশ্চিহ্ন করে দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারের পথকে প্রশস্ত করেন। এরপর তিনি (সা) একের পর এক বাঁধা অপসারণ ও নিশ্চিহ্ন করতে থাকেন, যে পর্যন্ত ইসলামের আহবান সমস্ত আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর, ইসলামী রাষ্ট্র অন্যান্য জাতির মাঝে ইসলাম বিস্তৃত করার লক্ষ্যে তাদের দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। কিন্তু, বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা সেখানকার মানুষের মাঝে ইসলাম বিস্তারের পথে বস্তুগত বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই, সেখানকার জনগণের কাছে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছে দেবার জন্য বস্তুগত এই বাঁধা অপসারণ করা জরুরী হয়ে যায়। যেন তারা প্রত্যক্ষ ভাবে ইসলামের সুবিচার অবলোকন ও অনুভব করতে পারে এবং ইসলামের পতাকাতলে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনের সাক্ষী হতে পারে। এছাড়া, এর মাধ্যমে কোনরকম জোরজবরদস্তি কিংবা বলপ্রয়োগ ছাড়াই ইসলামী রাষ্ট্র মানুষকে একটি সত্যিকারের উন্নত জীবনের দিকে আহবান করতে পারে। ইসলামের আহবান প্রচার-প্রসার করার পদ্ধতি হিসাবে অতীতে সবসময়ই জিহাদের ধারা অব্যাহত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, জিহাদের মাধ্যমেই ইসলামী রাষ্ট্র বিভিন্ন বাদশাহী ও রাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে সেখানকার জনগণকে ইসলামী শাসনের নীচে নিয়ে আসে। এভাবেই চারিদিকে ইসলামের আহবান ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলাম দিয়ে শাসিত হবার পর লক্ষ লক্ষ মানুষ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করে। অতীতে ইসলামের পররাষ্ট্রনীতিকে জিহাদের মাধ্যমেই কার্যকরী করা হয়েছে, কোনসময়ই এ নীতি পরিবর্তিত হয়নি এবং ভবিষ্যতেও তা পরিবর্তিত হবে না।
মুসলিমদের জিহাদের মাধ্যমে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে হলে হয় সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে হবে, অথবা অর্থ, মতামত কিংবা লেখালেখির মাধ্যমে যুদ্ধকে সমর্থন করতে হবে। মুসলিমদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক- যা কোরআন ও হাদিসের মাধ্যমে প্রমাণিত। নিয়মানুযায়ী ১. মুসলিমরা শত্রুপক্ষকে ইসলাম গ্রহনে কিংবা ২. জিযিয়া প্রদানের দিকে আহবান করা না পর্যন্ত কখনোই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ সূচনা করতে পারবে না। এ বিষয়ে শরীয়াহ্ আইন হলো, যখন মুসলিমরা শত্রুপক্ষকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলবে তখন প্রথমে তাদেরকে ইসলাম গ্রহন করতে আহবান জানাতে হবে। যদি শত্রুপক্ষ ইসলাম গ্রহন করে, তবে তারা মুসলিম উম্মাহর অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। আর, যদি তারা ইসলাম গ্রহনে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তাদেরকে জিযিয়া প্রদান করতে বলা হবে। যদি তারা তা প্রদান করতে সম্মত হয়, তবে মুসলিমদের তাদের জান-মাল এবং ধন-সম্পদের নিরাপত্তা দিতে হবে এবং তাদের দেশ ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে। ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে মুসলিম নাগরিকদের মতোই তারা ন্যায়বিচার, সমতা, নিরাপত্তা এবং অভিভাবকত্ব বিষয়ক ও কল্যাণমূলক সকল সুবিধা ভোগ করবে। সেইসাথে তাদের মৌলিক সকল চাহিদা নিশ্চিত করা হবে। তবে, জিযিয়া প্রদানের সাথে সাথে তাদের ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসনকর্তৃত্বেরও আনুগত্য স্বীকার করে নিতে হবে। আর, যদি তারা ইসলাম গ্রহন না করে কিংবা জিযিয়া প্রদানেও অস্বীকৃতি জানায়, তবে সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আইনসঙ্গত হবে।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে, কোন জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করা আইনসঙ্গত নয়, যতক্ষন পর্যন্ত না তাদের ইসলামের দিকে আহবান করা হয়। ইসলামের পন্ডিতবর্গ (Scholars) এ বিষয়ে জোর দিয়েছেন যে, যতক্ষন পর্যন্ত না কোন জাতিগোষ্ঠির কাছে ইসলামের আহবান না পৌঁছে, ততক্ষন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা আইনসঙ্গত নয়। সুতরাং, শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনার পূর্বে তাদের মাঝে ইসলামের ব্যাপারে জনমত গঠন করা এবং ইসলামের একটি সত্যিকার চিত্র তাদের কাছে উপস্থাপন করা উচিত। সেইসাথে, সেখানকার জনগণকে ইসলামী আইন-কানুনের সংস্পর্শে আসারও উদ্যোগ নেয়া উচিত যেন অমুসলিমরা অনুভব করতে পারে যে, ইসলাম তাদেরকে প্রকৃত মুক্তির দিকে আহবান করছে। ইসলামী রাষ্ট্র এ লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারে, যেমনঃ ইসলামের ধ্যান-ধারণাগুলোকে পরিস্কার ভাবে ব্যাখ্যা করা, অমুসলিমদের সামনে ইসলামের একটি জীবন্ত চিত্র ফুটিয়ে তোলা এবং ইসলামের পক্ষে বিভিন্ন রকম প্রচারণা চালানো ইত্যাদি। এ ধরণের কর্মকান্ডের মধ্যে ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি-সামর্থ্য ও প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রদর্শন করাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিভিন্ন সময়ে আল্লাহর রাসূল (সা) এ ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি (সা) কুফর রাষ্ট্রগুলোর কেন্দ্রস্থলে দূত পাঠিয়েছেন। একবার তিনি (সা) নাজদ্ এলাকায় ইসলামের বাণী পৌঁছে দেবার জন্য চল্লিশ জন সাহাবীকে প্রেরণ করেছিলেন। এছাড়া, তিনি (সা) তাবুক যুদ্ধে যাবার পূর্বে মদীনায় তাঁর সেনাবাহিনীর শক্তিমত্তা প্রদর্শন করেছিলেন। এর কারণ রাসূল (সা) বলেছেন, “একমাসের দূরত্ব থাকা অবস্থায় শত্রুর মনে ভীতি সৃষ্টির মাধ্যমে আমাকে বিজয়ের সংবাদ দেয়া হয়েছে।”
অতীতে মুসলিমদের সেনাবাহিনী সবসময়ই শত্রুপক্ষের ভীতি ও শ্রদ্ধা অর্জনে সমর্থ হয়েছে। শত শত বছর যাবত ইউরোপে একথা প্রচলিত ছিল যে, মুসলিম সেনাবাহিনীকে কখনোই পরাজিত করা যায় না। যাই হোক, রাজনৈতিক ভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করা আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, প্রত্যক্ষ সমর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগে ইসলামের ধ্যান-ধারণাগুলোকে প্রচার-প্রসার করা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তিমত্তা প্রদর্শন বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো গ্রহন করা ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য জরুরী। যদিও ইসলামের বাণী প্রচারে জিহাদ একটি অপরিবর্তনীয় ও সুনির্দিষ্ট পন্থা, কিন্তু সামরিকবাহিনীর সাথে মূল সংঘর্ষের পূর্বে অন্যান্য রাজনৈতিক পদক্ষেপ ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত কর্মকান্ডগুলো মূলতঃ প্রস্তুতিমূলক কর্মকান্ড এবং এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরণের পদক্ষেপ সাধারনত অন্যান্য জাতি, রাষ্ট্র কিংবা জনগোষ্ঠির সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, হোক তা অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিংবা সৎ প্রতিবেশীমূলক সম্পর্ক অথবা অন্য কোন ভিত্তির উপর গঠিত সম্পর্ক, যা হয়তো বা পরবর্তীতে ইসলাম প্রচার-প্রসারে সহায়ক হতে পারে।
সুতরাং, যে রাজনৈতিক চিন্তার উপর ভিত্তি করে অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারিত হয় তা মূলতঃ তাদের মাঝে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটানো এবং ইসলামের বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ভিত্তিতেই গঠিত। এক্ষেত্রে, অনুসরণীয় একমাত্র পদ্ধতি হল জিহাদ। তবে, এ ব্যাপারে ইসলামী রাষ্ট্র বিভিন্ন রকমের পরিকল্পনা ও উপায় অবলম্বন করতে পারে। যেমনঃ ইসলামী রাষ্ট্র তার কিছু সংখ্যক শত্রুরাষ্ট্রের সাথে সৎ প্রতিবেশীসুলভ চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে এবং অন্যদের সাথে যুদ্ধ করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) এ ধরনের পদ্ধতির অনুমোদন দিয়েছেন। তিনি (সা) মদীনায় আসার পরপরই এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। আবার, রাষ্ট্র তার সমস্ত শত্রুর বিরুদ্ধে একই সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করতে পারে। আবু বকর যখন ইরাক এবং আল-শামে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছিলেন তখন এ পদ্ধতি গ্রহন করেছিলেন। আবার, রাষ্ট্র তার আকাঙ্খিত ফলাফলের পক্ষে জনমত তৈরীর জন্য কোন শত্রুরাষ্ট্রের সাথে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিও করতে পারে।
আল্লাহর রাসূল (সা) কুরাইশদের সাথে আল-হুদাইবিয়াহ চুক্তি স্বাক্ষর করার সময় এ পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। আবার, শত্রুপক্ষের মনে ভীতি সৃষ্টি করার লক্ষ্যে, রাষ্ট্র এলাকা ভিত্তিক খন্ড যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) বদর যুদ্ধের পূর্বে এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন। আবার, উমাইয়া খলিফাদের শাসনামলে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তারা একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলো, তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন প্রচারনাও এ পরিকল্পনার অন্তর্ভূক্ত ছিল।
দাওয়াতী কার্যক্রমের স্বার্থে, ইসলামী রাষ্ট্র একই সময়ে কোন কোন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে আবার কোন কোন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত নাও করতে পারে। প্রয়োজনে রাষ্ট্র কারো সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করতে পারে আবার নাও করতে পারে। দাওয়াতী কার্যক্রমকে অভিষ্ট গন্তব্যে নেবার লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে খুব সতর্কতার সাথে এ সমস্ত পরিকল্পনা করতে হবে। ইসলামের আহবানের বিস্তৃতির উদ্দেশ্যে ইসলামী রাষ্ট্র [শত্রুর বিরুদ্ধে] প্রপাগান্ডা এবং [ইসলামের পক্ষে] প্রচার আশ্রয়ও নিতে পারে অথবা, শত্রুপক্ষের গোপন পরিকল্পনা উম্মোচন করা কিংবা স্নায়ু যুদ্ধের (Cold War) কৌশলও গ্রহন করতে পারে।
দাওয়াতী কার্যক্রমের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং দাওয়াতকে ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই রাষ্ট্রকে তার সকল পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ, এ ধরনের পরিকল্পনা সবসময়ই ইসলাম বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে এবং জিহাদের গুরুদায়িত্বকে সহজতর করেছে। এজন্যই এ সমস্ত পদক্ষেপ পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত জরুরী। এছাড়া, আল্লাহর রাস্তায় কৃত জিহাদের (জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ্) মাধ্যমে ইসলামের বিস্তৃতি ঘটানোর লক্ষ্যে সর্বদা ইসলাম এবং ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষে জনমত গঠন করাও জরুরী।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৩ (ইসলামী রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন নীতিমালা)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
ইসলামী রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন নীতিমালা বলতে মূলতঃ বুঝায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামের হুকুম-আহ্কামকে বাস্তবায়িত করা। আল্লাহ্ প্রদত্ত এ সমস্ত হুকুম-আহ্কামকে ইসলামী রাষ্ট্র এর নিজস্ব ব্যবস্থার অধীনেই বাস্তবায়িত করতো। এ রাষ্ট্র জনগণের মাঝে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক ও লেনদেন নির্ধারন ও দেখাশুনা করা, হুদুদ ও আল্লাহ্ প্রদত্ত শাস্তি সমূহ বাস্তবায়ন করা, সমাজের সর্বস্তরে উচ্চ মানের মূল্যবোধ বজায় রাখা, সমাজে ইসলামের বিভিন্ন রীতি-নীতি ও ইবাদতকে নিশ্চিত করা এবং সেইসাথে ইসলামী আইন-কানুনের ভিত্তিতে জনগণের সমস্ত বিষয়াদির তদারকি করতো। বস্তুতঃ ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে বসবাসরত মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর আল্লাহ্ প্রদত্ত হুকুম-আহ্কামকে কিভাবে প্রয়োগ করা হবে ইসলামে তার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নির্ধারিত রয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র এ নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেই এ সমস্ত হুকুম-আহ্কামকে জনগণের উপর প্রয়োগ করতো। এ পদ্ধতি হুকুম শরীয়াহ্ এবং নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য নির্ধারিত আহ্কামের সাথে সম্পর্কিত। কারণ, ইসলাম এসেছে সমগ্র মানবজাতির জন্য। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে সমগ্র মানবজাতিকে ইসলামের দিকে আহবান করেছেন। যেমন, তিনি বলেছেন,
“হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের সেই রবের দাসত্ব করো যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, আশা করা যায় যে, তোমরা মুত্তাকী (আল্লাহভীরু) হতে পারবে।” [সুরাঃ বাকারাহ্ঃ ২১]
তিনি আরও বলেছেন,
“হে মানুষ! কি তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক হতে প্রতারিত করলো?” [আল-ইনফিতরঃ ৬]
উসুল উল-ফিকহ্ (শরীয়াহর মূল উৎস) বিষয়ে পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ বলেছেন যে, ইসলামী শরীয়াহ্ আসলে এ পৃথিবীর প্রতিটি সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষকে উদ্দেশ্য করেই নাযিল করা হয়েছে। হোক সে মুসলিম অথবা অমুসলিম। ইমাম গাজ্জালী তার “আল মুস্তাফা ফি আল-উসুল”বইতে বলেন, “শরীয়াহ্ আইন দিয়ে শাসিত ব্যক্তিকে আইন অনুযায়ী অবশ্যই একজন দায়িত্বশীল, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন ও আইনপ্রণেতার (আল্লাহতায়ালা) আহবান বোঝার যোগ্যতা সম্পন্ন হতে হবে। বস্তুতঃ যে সকল গুনাবলীর জন্য একজন মানুষের উপর আল্লাহর হুকুম ফরজ হয়ে যায় তা হলো, তার এমন স্বভাবসুলভ মানবপ্রকৃতি যা দিয়ে সে আল্লাহ্র আদেশ-নিষেধকে (পুরোপুরি) গ্রহন করতে ও মেনে চলতে পারে।”
তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইসলাম আসলে সমস্ত মানবজাতিকেই আহবান করেছে। এ আহবান ইসলামের দিকে সমস্ত মানবজাতির উপর সাধারণ আহবান ও দায়িত্ব হিসাবে আরোপিত হয়েছে। সাধারণ আহবানের মাধ্যমে প্রথমে সমস্ত মানুষকে ইসলামে প্রবেশ করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সমস্ত মানুষকে আল্লাহ্ প্রদত্ত সমস্ত হুকুম-আহ্কামের কাছে আত্মসমর্পণ করতে আদেশ দেয়া হয়েছে। আর, যারা নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রের অধীনে বসবাস করে, ইসলামী রাষ্ট্র তাদের দল, মত, বিশ্বাস কিংবা সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলকে একটি দলবদ্ধ মানুষ হিসাবে বিবেচনা করে এবং সকলকে ইসলামী আইন-কানুন দিয়েই শাসন করে। প্রয়োজন হয় শুধু জনগণের ইসলামী রাষ্ট্র ও শাসন-ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলে এ রাষ্ট্রে কোনকিছু নেই। কারণ, এখানে সমস্ত মানুষকেই সাধারণ মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হয় এবং এদের প্রত্যেককেই ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়, যতোক্ষন পর্যন্ত তারা অর্পিত নাগরিক দায়িত্ব কর্তব্য মেনে চলে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে রাষ্ট্রে বসবাসরত প্রত্যেক ব্যক্তিই শরীয়াহ্ প্রদত্ত পূর্ণ নাগরিক অধিকার ভোগ করে, সে মুসলিমই হোক বা অমুসলিম হোক। আবার, মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও যদি কেউ ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক না হয়, তবে শরীয়াহ্ প্রদত্ত নাগরিক অধিকার তাকে প্রদান করা হবে না। ধরা যাক, (ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত) কোন মুসলিম ব্যক্তির মা খ্রিষ্টান এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক। আর, তার বাবা মুসলিম কিন্তু তার ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নেই। সেক্ষেত্রে, সে ব্যক্তির মা সন্তানের কাছ থেকে ভরণপোষণ পাবার অধিকারী হবে, কিন্তু বাবা নয়। মা যদি বিচারকের কাছে ভরণপোষণের ব্যাপারে অভিযোগ করে, তবে বিচারক তার পক্ষে রায় দেবে এবং সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করবে, কারণ এক্ষেত্রে উক্ত মহিলা ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচিত হবে। কিন্তু, যদি সে ব্যক্তির বাবা অভিযোগ উত্থাপন করে, তবে বিচারক তার বিপক্ষে রায় প্রদান করবে। কারণ, সে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক বলে বিবেচিত হবে না। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, শরীয়াহ্ শুধু ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের উপরই ইসলামী হুকুম-আহ্কাম বাস্তবায়িত করে এবং এক্ষেত্রে রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল মানুষকে সাধারণ ভাবে রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যার কারণে, তারা সকলেই নাগরিক হিসাবে শরীয়াহ্ প্রদত্ত অভিভাবকত্ব বিষয়ক কিংবা কল্যাণমূলক সকল অধিকার ভোগ করে থাকে।
এটা হচ্ছে শাসন ও অভিভাবকত্বের দৃষ্টিকোন থেকে নাগরিকের অবস্থান সম্পর্কিত বিষয়। আর, ইসলামী রাষ্ট্রে ইসলামী হুকুম-আহ্কাম বাস্তবায়নের বিষয়টি কখনও ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে বিবেচিত হয় না, বরং তা সর্ম্পূণ ভাবে আইনগত দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হয়। তাই কোরআন-সুন্নাহর দলিলগুলোকে অবশ্যই আইনগত দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে হবে এর কারণ হচ্ছে, শরীয়াহ্ সম্পর্কিত দলিলগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের সমস্যার সমাধান করা। এক্ষেত্রে, আইনপ্রণেতা (আল্লাহতয়ালা)’র উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন শুধু আয়াতগুলোর বাহ্যিক অর্থের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে আয়াতগুলোর অর্থ ও বিষয়বস্তুকে পরিপূর্ণ ও যথাযথ ভাবে অনুধাবন করে। এজন্য, হুকুম শরীয়ার উপর ভিত্তি করে যে কোন আইন তৈরী করার ক্ষেত্রে সবসময়ই শরীয়াহ্ প্রদত্ত হুকুমের পেছনের কারণ(ইল্লাহ) কেও বিবেচনা করা হয়। অন্য কথায় বলা যায় যে, হুকুম শরীয়াহ ভিত্তিক কোন সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে সবসময়ই কোরআন-সুন্নাহর দলিলের আইনগত বিষয়টিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। যখন খলিফা (রাষ্ট্রপ্রধান) এই সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে গ্রহন করে, তখন রাষ্ট্রে সেটা আইনেই পরিণত হয় এবং সকলের জন্য সেই আইন মেনে চলা ও তা প্রয়োগ করা কর্তব্য হয়ে যায়।
সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে বসবাসরত সকল নাগরিকের জন্য শরীয়াহ্ আইনের কাছে আত্মসর্মপণ করার বিষয়টি প্রমাণিত ও অপরিবর্তনীয়। আসলে, শরীয়াহ আইনের কাছে আত্মসমর্পণের বিষয়টি মুসলিমদের বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত বিষয়। কারণ, এ ব্যাপারে তারা আল্লাহতায়ালার কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। ঈমান আনার অর্থই হলো আকীদাহ্ বা বিশ্বাস থেকে উৎসরিত সমস্ত হুকুম আহকামের কাছে নিঃশর্ত ভাবে আত্মসমর্পণ করা। এক্ষেত্রে মুসলিমদের আকীদাহ্ বা বিশ্বাস তাকে বাধ্য করে এ সমস্ত হুকুম-আহকাম পরিপূর্ণভাবে মেনে চলতে। প্রতিটি মুসলিম শরীয়াহ্ আইন দিয়ে জীবন পরিচালনার জন্য আল্লাহর কাছে ওয়াদাবদ্ধ, হোক তা তার সাথে আল্লাহর সম্পর্কের বিষয়ে, যেমনঃ বিভিন্ন ধরনের ইবাদত (নামাজ, রোজা ইত্যাদি)। কিংবা, হোক তা নিজের সাথে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে, যেমনঃ মূল্যবোধ বা খাবার সম্পর্কিত বিষয়ে অথবা, হোক তা তার সাথে অন্য সকল মানুষের সম্পর্কের বিষয়ে, যেমনঃ লেনদেন কিংবা ক্ষতিপূরণ সম্পর্কিত বিষয়ে।
ইসলামী রাষ্ট্র সমস্ত মুসলিমকে ইসলামী আকীদাহ্ বা বিশ্বাস দিয়েই ঐক্যবদ্ধ রাখে এবং এক্ষেত্রে অবশ্যই কোরআন ও সুন্নাহর দলিলকেই হুকুম-শরীয়ার মূল ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়। হুকুম শরীয়ার মূলনীতি এবং আইনগত সকল সিদ্ধান্ত কোরআন-সুন্নাহর দলিলের উপর ভিত্তি করেই প্রণয়ন করা হয় এবং এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত প্রকাশের কোন অবকাশ থাকে না। কিন্তু, ইজতিহাদের কারণে অতীতের মুসলিমরা বিভিন্ন সময় কোরআন-সুন্নাহর দলিলকে বিভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেছে। মূলতঃ এ সমস্ত দলিলের(কোরআনের আয়াত ও রাসুলের হাদিস) ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণেই বিভিন্ন ধরণের মতবাদ (School of Thought) ও সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, ইসলাম সবসময়ই মুসলিমদের গবেষণা (ইজতিহাদ) করতে উৎসাহিত করে এবং সেইসাথে মানুষের মধ্যকার চিন্তাধারার স্বাভাবিক পার্থক্যকেও স্বীকার করে নেয়।
এজন্য সবসময়ই মুসলিমদের মাঝে আকীদাহ্, আইন-কানুন ও উসুল উল-ফিকহ্ এর পদ্ধতি বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। রাসূল (সা) সবসময়ই মুসলিমদের ইজতিহাদ করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং বলেছেন যে, মুজতাহিদের (ইজতিহাদের যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি) ইজতিহাদ যদি ভূল হয় তবে তার জন্য রয়েছে একটি নেকী। আর, সঠিক হলে রয়েছে দু’টি নেকী। এ কারণে, সুন্নী, শিয়া’হ, মুতা’যিলাহ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হওয়া কোন আশ্চর্য বিষয় ছিলো না। না আশ্চর্যের বিষয় ছিলো বিভিন্ন মতবাদের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মাযহাব যেমনঃ শাফি’ঈ, হানাফি, মালিকি, হাম্বলী, জা’ফরী, যায়িদী ইত্যাদি মাযহাবের সৃষ্টি হওয়া। এ সমস্ত সম্প্রদায় এবং মাযহাবগুলো একটি মাত্র আকীদাহ্ বা বিশ্বাসকেই আকঁড়ে ধরেছিল, যা ছিলো ইসলামের আকীদাহ্। তাদের সকলের উপরই আল্লাহ্ নির্ধারিত সমস্ত ফরজ দায়িত্ব মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ সকল বিষয়কে পরিহার করার কর্তব্য ছিলো। কোন নির্দিষ্ট মাযহাব নয়, তারা সকলেই সর্বাবস্থায় হুকুম-শরীয়াহ দিয়ে জীবন পরিচালনা করতেই বাধ্য ছিলো।
আসলে, মাযহাবগুলো হচ্ছে হুকুম-শরীয়ার একটি নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাখ্যা, যে ব্যাখ্যা অনুযায়ী মুকাল্লিদগন (যারা মুজতাহিদ নয়), যারা নিজেরা ইজতিহাদ করতে পারে না, তারা হুকুম-শরীয়াহ্ অনুসরণ করে থাকে। এখানে মনে রাখা দরকার যে, মুসলিমরা শুধু আল্লাহ্ প্রদত্ত আইন-কানুন দিয়েই জীবন পরিচালনা করতে বাধ্য, কোন মাযহাব অনুসরণ করতে বাধ্য নয়। তাই, হয় তাকে হুকুম-শরীয়ার মূল উৎস থেকে নিজে ইজতিহাদ করে শরীয়াহ্ আইন মানতে হবে, অথবা, সে যদি নিজে ইজতিহাদ করতে অপারগ হয় তবে তাকে কোন মাযহাব অনুসরণ করতে হবে। এ কারণেই, যে সমস্ত সম্প্রদায় ও মাযহাব কোরআন ও সুন্নাহকে হুকুম-শরীয়ার একমাত্র উৎস গ্রহন করেছে এবং ইসলামী আকীদাহকে আকঁড়ে ধরেছে তারা সবাই ইসলামের অর্ন্তভূক্ত। এ সমস্ত মতবাদের প্রচারকবৃন্দও মুসলিম এবং তারা ইসলামী আইন-কানুন দিয়েই পরিচালিত। যতক্ষন পর্যন্ত এ সমস্ত মাযহাবের অনুসারীরা ইসলামী আকীদাহর সীমারেখার মধ্যে থাকবে ততক্ষন পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্র এ সমস্ত সম্প্রদায় ও মাযহাবের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু, যদি কোন মুসলিম ব্যক্তিগত কিংবা দলবদ্ধ ভাবে ইসলামী আকীদাহ্ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় তবে, এ বিষয়টিকে ইরতিদাদ(ধর্মত্যাগ) হিসাবে বিবেচনা করা হবে এবং সে ব্যক্তি বা দলের উপর রাষ্ট্র কর্তৃক মুরতাদ(ধর্মত্যাগী) এর শাস্তি আরোপিত হবে। হুকুম-শরীয়ার কিছু কিছু বিষয় আছে যাতে দ্বিমত প্রকাশের কোন অবকাশ নেই। অর্থাৎ, এ সমস্ত বিষয়ে একটি মাত্র সুনির্দিষ্ট হুকুমকে গ্রহনযোগ্য হিসাবে ধরা হয়। যেমনঃ চোরের হাত কাটা, সুদ নিষিদ্ধ হওয়া, যাকাতের প্রদানের অপরিহার্যতা, দৈনিক পাঁচ বার নামাজের বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি। এ সমস্ত বিষয়ে হুকুম-শরীয়াহ সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয়। তাই, মুসলিমরা এ সকল ক্ষেত্রে এই সুনির্দিষ্ট হুকুমগুলোই মেনে চলতে বাধ্য। আবার, হুকুম-শরীয়া’র কিছু কিছু বিষয় ও ধ্যান-ধারণা আছে যে সমস্ত বিষয় মুজতাহিদগণ ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করার কারণে মুসলিমদের মধ্যে এ সমস্ত বিষয়ে মতপার্থক্য ঘটেছে। যেমনঃ খলিফা হবার পূর্বশর্ত কিংবা খারায আরোপিত ভূমির নির্ধারিত করের অংশ অথবা জমির ভাড়া প্রদান সম্পর্কিত বিষয় ইত্যাদি। এ সমস্ত আইনের ক্ষেত্রে, খলিফা একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে গ্রহন করেন এবং রাষ্ট্রে বসবাসরত সকলের জন্য সেই আইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। যারা এই বিষয়গুলোর ব্যাপারে খলিফার সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষন করে তাদের সকলের জন্যই তাদের নিজস্ব মতামত ত্যাগ করে খলিফার মতামতকে গ্রহন করা কর্তব্য হয়ে যায়। আর, এভাবেই খলিফার সিদ্ধান্ত সকলের মধ্যে বিদ্যমান মতপার্থক্য দূর করে। বস্তুতঃ ইমাম বা খলিফা হুকুম-শরীয়া’র কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের পর প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে সেই আইন মেনে চলা মুসলিমদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে যায়। এ সিদ্ধান্তের বিপরীতে কেউ যদি সেই নির্দিষ্ট বিষয়ে অন্য কোন হুকুম অনুসরণ করে তবে সে গুনাহগার হবে। কারণ, খলিফা যখন কোন নির্দিষ্ট শরীয়া’হ আইন কার্যকরী করেন, সঙ্গে সঙ্গে তা সকল মুসলিমের জন্য মেনে চলা ফরজ হয়ে যায়। আর, কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে শরীয়া’হ আইন কারো জন্য কখনো একের অধিক হতে পারে না।
তবে, খলিফার জন্য আকীদাহ্ সম্পর্কিত বিষয়ে কোন হুকুমকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া ঠিক নয়, কারণ তাহলে এটা মেনে চলা মুসলিমদের জন্য কষ্টকর হয়ে যেতে পারে। কিন্তু, ভ্রান্ত বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যদি নতুন ধরনের ধ্যান-ধারণা আবির্ভাব হবার সম্ভাবনা থাকে, সেক্ষেত্রে রাষ্ট্র এসব দুস্কৃতিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করবে যতক্ষন পর্যন্ত না নতুন এইসব ধ্যান-ধারণা মুসলিমদের কুফরীর (অবিশ্বাস) দিকে ধাবিত না করে। কিন্তু, যদি এইসব ধ্যান-ধারণা মুসলিমদের কুফরীর (অবিশ্বাস) দিকে ধাবিত করে, তবে যারা এ ধরণের অপকর্মের সাথে জড়িত থাকবে রাষ্ট্র তাদের ধর্মত্যাগী হিসাবে বিবেচনা করবে। এছাড়া, খলিফার ইবাদত সম্পর্কিত বিষয়েও কোন নির্দিষ্ট হুকুম গ্রহন করা ঠিক নয়, কারণ এটাও মুসলিমদেরকে কষ্টকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।
সুতরাং, আকীদাহ সম্পর্কিত বিভিন্ন মতবাদের মধ্য হতে কোন নির্দিষ্ট মতামতকে গ্রহন করা খলিফার জন্য সঠিক নয়, যতক্ষন পর্যন্ত না এই সকল মতামত ইসলামী মতবাদ হিসাবে বিবেচিত হয়। আবার, যাকাত ব্যতীত ইবাদত সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও কোন মতবাদকে নির্দিষ্ট করে দেয়া খলিফার জন্য সঠিক নয়, যতক্ষন পর্যন্ত না ইবাদতের এই সমস্ত বিষয় শরীয়া’হ প্রদত্ত আইন-কানুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এ সকল বিষয় ছাড়া খলিফা লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, ভাড়া প্রদান, বিবাহ, তালাক, বিবাহ-বিচ্ছেদ পরবর্তী ভরণ-পোষণ, অংশীদারিত্ব ভিত্তিক ব্যবসা-বাণিজ্য, সন্তানের অভিভাবকত্ব ইত্যাদি বিষয়ে হুকুম-শরীয়া’হ ভিত্তিক যে কোন আইনকে সকলের জন্য নির্দিষ্ট ও কার্যকরী করতে পারেন। এছাড়া, খলিফা শাস্তি প্রদান বা খাদ্য, বস্ত্র অথবা মূল্যবোধ সম্পর্কিত যে কোন বিষয়ে শরীয়া’হ ভিত্তিক যে কোন সুনির্দিষ্ট আইনকে কার্যকরী করতে পারেন এবং এক্ষেত্রে সকল মুসলিমের খলিফার গৃহীত সিদ্ধান্ত মেনে চলা আবশ্যক হয়ে যায়।
এছাড়া, খলিফাকে অবশ্যই ইবাদতের বিষয় সম্পর্কিত সকল শরীয়াহ্ আইন প্রয়োগ করতে হবে। যারা নামাজ ত্যাগ করবে এবং রমযান মাসে রোযা রাখবে না শরীয়াহ্ আইন অনুযায়ী খলিফা তাদেরকে শাস্তি দিবেন। এ সকল ইবাদত সম্পর্কিত আইন-কানুন সহ সমস্ত শরীয়াহ্ আইন রাষ্ট্রে বাস্তবায়িত বা প্রয়োগ করা খলিফার দায়িত্ব। নামাজ আদায় করার বাধ্যবাধকতা কোন ইজতিহাদ করার বিষয় নয়, বরং এটা যে সমস্ত মুসলিমের উপর ফরয তা একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য। তাই, এ সমস্ত প্রতিষ্ঠিত বিষয়ে খলিফাকে শরীয়াহ্ আইন সরাসরি প্রয়োগ করতে হবে। এ সমস্ত বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত গ্রহন করা না করার কোন অবকাশ থাকবে না। শাস্তিমূলক বিধানের (Panel Code) ক্ষেত্রে খলিফা একটি নির্দিষ্ট আইন গ্রহন করবে এবং সকল মুসলিমকে তা মেনে চলার জন্য আদেশ দেয়া হবে। অন্যান্য শাস্তিমূলক বিধানের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার প্রযোজ্য হবে। এ সমস্ত কিছুই শুধু মুসলিমদের জন্য প্রযোজ্য হবে। আর, অমুসলিমদের ক্ষেত্রে, যারা কিনা ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন বিশ্বাসে বিশ্বাসী তাদেরকে তিন ভাগে ভাগ করা হবে।
১. যারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করে কিন্তু তাদের আকীদাহর মধ্যে এমন কিছু বিষয় আছে যা ইসলামী আকীদাহর সাথে সাংঘর্ষিক।
২. আহলে কিতাবের দলভূক্ত মানুষ।
৩. মুশরিক যাদের মধ্যে রয়েছে- মাজুস (অগ্নিপূজারী), হিন্দু, বৌদ্ধ এবং আহলে কিতাব বহির্ভূত জনগণ।
এ সকল দলভূক্ত মানুষদের তাদের বিশ্বাসের উপরই ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার ব্যাপারে কোনরকম হস্তক্ষেপ করা হবে না। বিবাহ কিংবা তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে তাদেরকে নিজ নিজ ধর্মীয় আইন-কানুন মেনে চলতে দেয়া হবে। এ সকল বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদ তাদের ধর্মীয় আইন-কানুন অনুযায়ীই ফয়সালা হবে এবং এজন্য রাষ্ট্র তাদের মধ্য হতে একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্র অধিকৃত বিচারালয়ে বিচারক হিসাবে মনোনীত করবে। এছাড়া, তাদের খাদ্য ও সাজসজ্জা বিষয়েও তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতিকেই প্রধান্য দেয়া হবে এবং এ সকল বিষয়ই সাধারণ নির্দেশের আওতাভূক্ত হবে। আহলে কিতাব বহির্ভূত সম্প্রদায়ের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। মাজুসদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন, “তোমরা আহলে কিতাবদের সাথে যেমন আচরণ করো তাদের(মাজুস) সাথেও একই রকম আচরণ করো।”
কিন্তু, লেনদেন সংক্রান্ত এবং শাস্তিমূলক বিধান সমূহ মুসলিম-অমুসলিম সহ সকলের উপরই সমান ভাবে প্রযোজ্য হবে। বস্তুতঃ বিভিন্ন অন্যায়ের শাস্তি সম্পর্কিত বিচারকার্যের ব্যাপারে মুসলিম-অমুসলিম সহ সকলের উপরই শরীয়াহ্ আইন প্রয়োগ করা হবে। যারা ইসলামী রাষ্ট্রে নাগরিক হিসাবে বসবাস করবে তারা সবাই লেনদেন ও শাস্তি প্রদান সম্পর্কিত শরীয়াহ্ আইন মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। এক্ষেত্রে, ধর্মীয়, জাতিগত কিংবা গোত্রীয় ভেদাভেদ বিবেচিত হবে না। অমুসলিমরা মূলতঃ রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্ব এবং আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকেই এ সমস্ত আইন-কানুন মেনে চলবে, ধর্মীয় কিংবা আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। তাদের কোন অবস্থাতেই এ সমস্ত আইন-কানুনের উপর বিশ্বাস আনতে বাধ্য করা হবে না। কারণ, তা করা হলে তাদের প্রকৃতপক্ষে জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহনে বাধ্য করা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি নেই।” [সুরা বাকারাহঃ ২৫৬]
আল্লাহর রাসূল (সা) আহলে কিতাবের অন্তর্ভূক্ত মানুষদের ধর্মীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ কিংবা বিশ্বাসের জন্য তাদের নিপীড়ন করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু, নাগরিক হিসাবে তাদের অবশ্যই রাষ্ট্রের শাসন-ক্ষমতা ও আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে শরীয়াহ্ আইন মেনে চলতে হবে।
পরিশেষে এটা বলা যায় যে, ইসলামী রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীন নীতি হবে রাষ্ট্রে বসবাসরত মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর শরীয়াহ্ আইন কার্যকর করা। নাগরিকদের উপর নিম্নোক্ত উপায়ে শরীয়াহ্ আইন কার্যকর করা হবেঃ
১. সকল মুসলিম নাগরিকের উপর শরীয়াহ্ আইন কার্যকর করা হবে।
২. বিশ্বাস এবং উপাসনা সংক্রান্ত বিষয়ে অমুসলিম নাগরিককের উপর কোনরকম হস্তক্ষেপ করা হবে না ।
৩. সাধারণ আইনের আওতায় খাদ্য ও সাজসজ্জা সম্পর্কিত বিষয়ে অমুসলিম নাগরিককে তাদের নিজস্ব ধর্মীয় রীতি-নীতি অনুসরণ করতে দেয়া হবে।
৪. অমুসলিমদের বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্র তাদের পক্ষ হতে রাষ্ট্র অধিকৃত বিচারালয়ে বিচারক নিয়োগ করবে এবং এ সংক্রান্ত সকল ঝগড়া-বিবাদ উক্ত বিচারালয়েই ফয়সালা করা হবে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গঠিত কোন আদালত (Private Court) গ্রহনযোগ্য হবে না। কিন্তু, এ সংক্রান্ত বিবাদ যদি অমুসলিম এবং মুসলিমদের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবে তা মুসলিম বিচারকের মাধ্যমে ইসলামী আইন অনুযায়ী ফয়সালা করা হবে।
৫. অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আইনগত লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ে ইসলামী রাষ্ট্র মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর কোনরকম পূর্বশর্ত ছাড়াই শরীয়াহ্ কার্যকর করবে।
৬. ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসরত সকলকেই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হবে। কোনরকম বৈষম্য ছাড়াই রাষ্ট্র তাদের অভিভাবক হিসাবে দায়িত্ব পালন করবে এবং তাদের সকল কার্যাবলী দেখাশুনা করবে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩২ (ইসলামী রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
আল্লাহর রাসূল (সা)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবাগণ সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে রাসূল (সা)-এর স্থলে একজন খলিফা নিয়োগ করে তাকে বাই’য়াত দেবার সিদ্ধান্ত নেন। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে, মুসলিমরা ১৩৪২ হিজরী বা ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে খলিফা নিয়োগ করে। তবে, তারা নিযুক্ত খলিফাকে আমির আল-মু’মিনীন (মুমিনদের নেতা) কিংবা সাধারন ভাবে ইমাম বলেও সম্বোধন করত।
ইসলামের ইতিহাসে বাই’য়াত গ্রহন ছাড়া কখনো কেউ খলিফা হয়নি। ইসলামী রাষ্ট্র এই নিয়মের ধারাবাহিকতা তার অস্তিত্ব টিকে থাকার শেষদিন পর্যন্ত রক্ষা করেছে। তবে, বাই’য়াতের প্রয়োগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে খলিফাকে সরাসরি বাই’য়াত দেয়া হয়েছে। কোন সময় খলিফাগণ তাদের আত্মীয়-স্বজনের বাইরে অন্য কাউকে খলিফা হিসাবে মনোনীত করেছেন। কেউ কেউ আবার স্বীয় পুত্র বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মনোনীত করেছেন। আর, অন্যরা তাদের পরিবারের মধ্য হতে একাধিক সদস্যকে খলিফা হিসাবে মনোনয়ন দিয়ে গেছেন। কিন্তু, এই মনোনয়ন কখনোই খলিফা হবার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বরঞ্চ, খলিফার দায়িত্ব বুঝে নেবার আগে তাকে অবশ্যই মুসলিমদের পক্ষ হতে বাই’য়াত গ্রহন করতে হয়েছে। বাই’য়াত ছাড়া কোন খলিফাকেই কখনো এ পদের দায়িত্ব দেয়া হয় নাই। বাই’য়াত গ্রহনের পদ্ধতিও সবসময় একরকম ছিল না। কখনো আহল্ আল-হাল ওয়াল ’আকদ্ (সমাজের সম্মানিত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ) এর কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহন করা হয়েছে। কখনো আবার জনসাধারনের কাছ থেকেও বাই’য়াত নেয়া হয়েছে। আবার, কোন কোন ক্ষেত্রে শাইখ আল-ইসলাম (প্রসিদ্ধ আলিম) এর কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহন করা হয়েছে। তবে, কিছু নিদির্ষ্ট সময়ে বাই’য়াত গ্রহন পদ্ধতির অপব্যবহার হয়েছে। কিন্তু, তারপরেও এই বাই’য়াত গ্রহন পদ্ধতি সবসময়ই কার্যকর ছিল এবং বাই’য়াত ব্যতীত কেউ কখনো উত্তরাধিকার সূত্রে খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রধান বা খলিফা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহন করেনি।
প্রত্যেক খলিফাই তার সাহায্যকারী হিসাবে একাধিক সহকারী নিযুক্ত করেছেন, যাদের ইতিহাসে কিছু সময় পর্যন্ত ওয়াজির (সহকারী) বলা হত। এছাড়া, খলিফাগণ বিভিন্ন প্রদেশের গর্ভনর, প্রধান বিচারপতি, সেনাবাহিনীর প্রধান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানকে নিযুক্ত করতেন। ইসলামী রাষ্ট্রের কাঠামো সবসময়ই এই রকমই ছিল। সাম্রাজ্যবাদী কাফিররা উসমানী খিলাফত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ইসলামী রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে পরিণত করার পূর্ব পর্যন্ত এ রাষ্ট্রের কাঠামো কখনো পরিবর্তিতও হয়নি।
ইতিহাসের পুরোটা সময় জুড়েই ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নানারকম ঘটনার অবতারণা হয়েছিল। তবে, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এ ঘটনাগুলো বাইরের শক্তি বা কারণ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ছিল না। এ ঘটনাগুলো ছিল তৎকালীন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ইসলামের ব্যাখ্যা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির ফলাফল। পরবর্তী সময়ে যারা এ ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করেছে তারা তাদের নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী এ প্রেক্ষাপটকে ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছে। মূলতঃ ইসলামের ব্যাখ্যা নিয়ে যাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে, তাদের প্রত্যেকে ইসলামের আলোকেই তৎকালীন পরিস্থিতিকে নিজস্ব মতামত অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু, তারপরও তাদের এ বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা ছিল ইসলামিক।
এই মতভেদগুলো আসলে একজন ব্যক্তি হিসাবে খলিফার সাথে সম্পর্কিত ছিল, খলিফার পদ বা দায়িত্বের সাথে সম্পর্কিত ছিল না। উদাহরন স্বরুপ বলা যায়, মতপার্থক্য ছিল কে খলিফা হবে সে বিষয়ে, কিন্তু শাসন-ব্যবস্থার কাঠামো নিয়ে কোন মতপার্থক্য ছিল না। মতপার্থক্য সবসময়ই সীমাবদ্ধ ছিল কিছু ক্ষুদ্র বিষয়ের মধ্যে। ফলে, শাসন-ব্যবস্থার ভিত্তি বা মূলনীতির সাথে এর কোন সম্পর্ক ছিল না। কোরআন ও সুন্নাহ যে শাসন-ব্যবস্থার মূলভিত্তি হবে, এ বিষয়ে মুসলিমদের মধ্যে কখনো মতভেদ হয়নি। মতপার্থক্য হয়েছিল কোরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যায়। একই ভাবে, একজন খলিফাকে যে মুসলিম উম্মাহর নেতা হিসাবে নিযুক্ত করতে হবে, এ বিষয়েও মুসলিমদের মধ্যে কখনো মতভেদ হয়নি। কিন্তু, কে খলিফা হিসাবে নিযুক্ত হবে তা নিয়ে মতভেদ হয়েছিল। এছাড়া, মুসলিমরা সবসময়ই এ ব্যাপারে একমত ছিল যে, দ্বীন-ইসলামকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং ইসলামের আলোকিত আহবানকে সমস্ত পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে দিতে হবে। আল্লাহর হুকুম-আহকামকে বাস্তবায়িত করতে হবে এবং মানুষকে দ্বীন-ইসলামের দিকে আহবান করতে হবে, এ ভিত্তির উপরই সকল খলিফা শাসনকার্য পরিচালনা করতো। এদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য ইসলামকে ভুল ভাবে বোঝার কারণে ইসলামের আইন-কানুনের ভুল প্রয়োগ করেছিল। আর কেউ কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবেই এসব আইন-কানুনের অপব্যবহার করেছিল। কিন্তু, সবকিছুর পরেও তারা সকলেই শুধু ইসলামকেই বাস্তবায়ন করেছিল। তাদের সকলেই ইসলামের ভিত্তিতে এবং ইসলামের আহবান সমস্ত পৃথিবীতে বিস্তৃত করার উদ্দেশ্যেই অন্যান্য দেশ, জাতি ও মানুষের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।
এজন্যই, বিভিন্ন বিষয়ে মুসলিমদের মধ্যে এই আভ্যন্তরীন মতপার্থক্য কখনো ইসলামের জয়যাত্রাকে স্তব্ধ করতে পারেনি, কিংবা পারেনি ইসলামের বিস্তার রোধে কার্যকরী কোন ভূমিকা রাখতে। বরঞ্চ, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকে ১১’শ হিজরী (১৭’শ খ্রীষ্টাব্দ) পর্যন্ত কোরআনের আলোকিত আহবানকে পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত করতে একের পর এক অঞ্চল জয় করেছে। ইসলামের পতাকাতলে এসেছে পারস্য, ভারতবর্ষ ও ককেশিয়া (রাশিয়ার একটি অংশ)। পূর্বে ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা চীন, রাশিয়া এবং কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। এছাড়া, ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে এসেছে পশ্চিমে মিশর, উত্তর আফ্রিকা, আন্দালুস (স্পেন) এবং উত্তরে শামের সমগ্র অঞ্চল। একই সাথে আনাদহউল (তুরস্ক), বলকান, দক্ষিন ও পূর্ব ইউরোপ জয় করে এ রাষ্ট্রের সীমানা পৌঁছে গেছে ব্যাক সী পর্যন্ত। ইসলামী রাষ্ট্র আরও জয় করেছে আল-ক্বারাম (ক্রাইমিন উপদ্বীপ) এবং ইউক্রেনের দক্ষিনাঞ্চল। বিস্তীর্ণ ভূমিতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করবার পর এ রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী পৌঁছেছে একেবারে ভিয়েনার দরজা পর্যন্ত। বস্তুতঃ মানসিক দূর্বলতা উম্মাহর ভেতর শেকড় গেঁড়ে না বসা পর্যন্ত এবং ইসলামের অপব্যাখ্যা তীব্র আকারে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত, শক্তিশালী মুসলিম বাহিনী না কোনদিন দেশ জয় করা বন্ধ করেছে, আর না ইসলামের আহবানকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা থেকে বিরত থেকেছে। এরপর, ইসলামী রাষ্ট্র দ্রুত অধঃপতনের দিকে চলে যায়। এমনকি ইসলাম বহির্ভূত জীবনব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত আইন-কানুনকেও শরীয়াহ্ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক নয় ভেবে স্বীকৃতি দেয় এবং শেষপর্যন্ত ধ্বংস হয়ে যায়।
আসলে, ইসলামী রাষ্ট্রের উন্নতি ও সমৃদ্ধির রহস্য নিহিত ছিল এ রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিসামর্থ্য, এর সৃজনশীলতা এবং ইজতিহাদ ও কিয়াস (যৌক্তিক তুলনামূলক ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামী শরীয়াহ’র মূল উৎস থেকে হুকুম বের করা) করার ক্ষমতার উপর। হিজরী প্রথম শতাব্দীতে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জয় করার পর ইসলামী রাষ্ট্র যখন ব্যাপক ভাবে বিস্তৃত হল, তখন অধিকৃত এলাকাগুলোতে উদ্ভুত নতুন নতুন সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে ইজতিহাদ এক নতুন মাত্রা লাভ করেছিল। নতুন নতুন বিষয়ে শরীয়াহ্ আইনের বাস্তবায়ন মূলতঃ পারস্য, ইরাক, আল-শাম, মিশর, স্পেন, ভারতবর্ষ এবং অন্যান্য দেশের অধিবাসীদের ইসলামে গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেছিল। আর, তৎকালীন এ পরিস্থিতিতে মুসলিমদের কৃত ইজতিহাদের গ্রহনযোগ্যতা ও নতুন সমস্যা সমাধানে তাদের সৃজনশীলতাকেও নিশ্চিত করেছিল। হিজরী পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত এ অবস্থা বিরাজমান থাকে। তারপর, কাঠামোগত ভাবে যখন ইসলামী রাষ্ট্র দূর্বল হতে থাকে, সেইসাথে মুসলিমদের সৃজনশীলতা ও ইজতিহাদ করার ক্ষমতাও ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
এর মধ্যে আবার সংঘটিত হয় ক্রুসেড এবং বিজয়ী শক্তি হিসাবে পূণরায় আর্বিভূত না হওয়া পর্যন্ত এ ক্রুসেড মুসলিমদের মনমগজ আচ্ছন্ন করে রাখে। এরপরে আসে মামলুকদের রাজত্বকাল। তারা ইসলামী রাষ্ট্রের চালকের আসনে বসে ঠিকই, কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয়গুলো খুবই কম গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। ফলে, মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক অন্ধত্ব আরও বিস্তৃত হয় এবং রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা অসারতার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এরপর, তাতারদের ধ্বংসাত্মক আগ্রাসনের ফলে মুসলিমরা জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তাতার বাহিনী কর্তৃক বিপুল সংখ্যক বই-পুস্তক টাইগ্রীস নদীতে নিক্ষিপ্ত হওয়া এবং তাদের হাতে উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জিত বিশাল জ্ঞানভান্ডার ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা বুদ্ধিবৃত্তিক শূণ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। আর, এ সমস্ত কারণ থেকে উৎসরিত গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক শূণ্যতাই মূলতঃ ইজতিহাদের পথকে অবরুদ্ধ করে। ফলে, নতুন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তখন ইজতিহাদের পরিবর্তে শুধু ফতোয়া জারি করা কিংবা কোরআন ও সুন্নাহ’র বিকৃত ও অপব্যাখ্যার মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকে।
এ সমস্ত ঘটনার ফলশ্রুতিতে, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে ইসলামী রাষ্ট্র পতনোম্মুখ অবস্থার সম্মুখীন হয়। এ পর্যায়ে আসে উসমানী খিলাফতের যুগ। ক্ষমতায় আরোহন করার পর তারা সামরিক বাহিনীর শক্তিসামর্থ্য বৃদ্ধির দিকে মনোযোগী হয় এবং ইস্তাম্বুল (কন্সট্যান্টিনোপল) ও বলকান অঞ্চল জয় করে নেয়। ইসলামী রাষ্ট্রকে আবারও নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে তারা দর্শনীয় ভাবে ইউরোপ তছনছ করে দেয়। কিন্তু, এ সব কোনকিছুই মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে পূণঃজাগরিত করতে পারে না। আসলে, উসমানী খিলাফতের সময়ে মুসলিমদের সামরিক বাহিনীর শক্তিসামর্থ্য বৃদ্ধি হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তা বুদ্ধিবৃত্তিক পূণঃজাগরনের ভিত্তিতে হয়নি। ফলে, ইসলামী রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর এই দূর্দান্ত প্রতাপ সময়ের সাথে বুদবুদের মতো মিলিয়ে যেতে থাকে এবং একসময় সম্পূর্ন ভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। কিন্তু, এ সকল সীমাবদ্ধতা থাকা সত্তেও উসমানী খিলাফত সাফল্যের সাথে দ্বীন ইসলামকে বিস্তৃত করেছিল। আর, বিভিন্ন অঞ্চলে বহন করেছিল ইসলামের আলোকিত আহবান। বিজিত এ সব অঞ্চলের অধিবাসীরা একসময় ইসলামও গ্রহন করেছিল। এ অঞ্চলে বর্তমানে লক্ষ লক্ষ মুসলিমের উপস্থিতির কৃতিত্ব অনেকটাই উসমানী খলিফাদের।
নিম্নলিখিত কারণ দুটি কিছু খলিফা ও গর্ভনরকে এমন ভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে সহায়তা করেছে, যা ইসলামী রাষ্ট্রের ঐক্যবদ্ধ শক্তি ও প্রভাব- প্রতিপত্তিকে ক্রমশ দূর্বল করেছে।
১. ইসলামী রার্ষ্টের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ধরনের মতামতের উপস্থিতি বিরাজ করা। (শরীয়াহ্ প্রদত্ত হুকুমের ব্যাপারে)
২. রাজনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে, খলিফাগণ কর্তৃক নির্দিষ্ট কিছু হুকুম-আহকামকে গ্রহন করার ক্ষেত্রে গাফিলতি করা, যদিও অন্যান্য ক্ষেত্রে, যেমন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু হুকুম-আহকামকে গ্রহন করা হয়েছিল।
কিন্তু, এ সকল কারণও আসলে এ রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে বিপন্ন করার জন্য যথেষ্ট ছিল না। উদাহরন স্বরূপ বলা যায়, গভর্নরদের সাধারন ভাবে কিছু শাসন-ক্ষমতা ছিল এবং এই ক্ষমতা ছিল ব্যাপক। এ ক্ষমতাবলেই তারা খলিফার প্রতিনিধি বা সহকারী হিসাবে বিভিন্ন বিষয়ে স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতো। ব্যাপক এ শাসন-ক্ষমতার অধিকারী হয়ে কিছু কিছু গভর্ণর একসময় নিজেদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ভাবতে শুরু করে এবং স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসিত ভূ-খন্ডের শাসকের মতো আচরন করতে থাকে। খলিফার প্রতি তাদের আনুগত্য শুধু খলিফাকে বাই’আত প্রদান করা, জু’মার নামাজে তার জন্য দোয়া করা, মুদ্রাতে তার নাম ব্যবহার করা সহ অন্যান্য ছোটখাট বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু, নতাদের অধীনস্ত অঞ্চলের শাসন-কর্তৃত্ত পুরোপুরি ভাবেই তাদের কাছে চলে যায়। ফলে, ইসলামী রাষ্ট্রের এই প্রদেশগুলো কার্যত স্বায়ত্ত-শাসিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে পরিণত হয়। উদাহরন স্বরূপ, হামদানিইন, সালযুক এবং অন্যান্য শাসনামলের কথা বলা যায়। কিন্তু, ওয়ালী বা গভর্ণরদের এই ব্যাপক ক্ষমতার কারণেও আসলে ইসলামের বিশাল রাষ্ট্র খন্ড খন্ড হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র তৈরী হয়নি।
যেমন, মিশরের গভর্ণর হিসাবে নিযুক্ত আমর ইবন আল-আসও ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। একই ভাবে, মু’য়ায়িয়া ইবন আবু সুফিয়ানও শামের বিশাল অঞ্চলের গভর্ণর ছিলেন। কিন্তু, তা সত্তেও, এই গভর্ণররা কখনোই নিজেদের খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করেননি। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে খলিফাদের দূর্বলতা প্রকাশ হতে থাকে, তখন গভর্ণরদের ভেতর প্রদেশগুলোকে স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসিত রাষ্ট্র হিসাবে শাসন করার এই ধারা ধীরে ধীরে শেঁকড় গেড়ে বসে। ফলে, উলাইয়াহ্ বা প্রদেশগুলো বিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হিসাবে একক সরকার-ব্যবস্থার অধীনে থাকা সত্তেও ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো আচরণ করতে থাকে।
কিন্তু, এ সবকিছু সত্তেও ইসলামী রাষ্ট্র অবিভক্ত ছিল। একক রাষ্ট্র হিসাবে এর ঐক্য ছিল অটুট, যেখানে খলিফাগণ সবসময়ই ওয়ালী বা গভর্ণরকে নিযুক্ত করতেন কিংবা পদচ্যুত করতেন। আর, গভর্ণররা যতো ক্ষমতার অধিকারীই হোক না কেন, তারাও কখনো নিজেদের খলিফার শাসন-কর্তৃত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার দুঃসাহস দেখায়নি। বাস্তবতা হলো, ইসলামী রাষ্ট্র ইতিহাসের কোন সময়েই বিভিন্ন প্রদেশের সমন্বয়ে গঠিত কনফেডারেশন ছিল না, এমনকি যখন গভর্ণররা শাসন-কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে চুড়ান্ত স্বাধীনতা উপভোগ করেছে তখনো না। এটা সবসময়ই ছিল একটি একক রাষ্ট্র যার প্রধান ছিলেন একজন খলিফা। সমস্ত রাষ্ট্রের উপর তারই ছিল সর্বময় ক্ষমতা। এমনকি, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরস্থ ছোট ছোট গ্রামেও খলিফার কর্তৃত্বই বিরাজমান ছিল।
এছাড়া, স্পেনে খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং মিশরে ফাতিমিদ রাষ্ট্র জন্মের বিষয়গুলো ছিল অন্য ধরনের সমস্যা। এগুলো ঠিক স্বায়িত্বশাসিত গভর্ণরদের তৈরী করা সমস্যার মতো ছিল না। স্পেনের গভর্ণররা তাদের অধীনস্ত প্রদেশের (উলাইয়াহ্) উপর সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিল, আর সেই সাথে তাদের শাসিত প্রদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষনাও দিয়েছিল। কিন্তু, এই গভর্ণরদেরকে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ কখনো খলিফা হিসাবে বাই’আত দেয়নি। পরবর্তী সময়ে, এই গর্ভণররা নিজেদের উক্ত প্রদেশে বসবাসকারী মুসলিমদের খলিফা হিসাবে ঘোষনাও দিয়েছিল।
কিন্তু, সমগ্র মুসলিম উম্মাহ’র খলিফা হিসাবে স্বীকৃতি তারা কখনোই পায়নি। বস্তুতঃ তখনো, সমগ্র মুসলিম উম্মাহর খলিফা একজনই ছিল। আর, শাসন-কর্তৃত্বও ছিল তার হাতেই। স্পেনের উলাইয়াহকেও (প্রদেশ) সেই সময় আলাদা একটি উলাইয়াহ্ বা প্রদেশ হিসাবেই স্বীকৃতি দেয়া হতো, শুধু এই প্রদেশটি খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা বা খলিফার অধীনে ছিল না। উসমানী শাসনামলে ইরানের ক্ষেত্রে একই ব্যাপার ঘটেছিল। ইরানে কোন খলিফা ছিল না, কিন্তু, উলাইয়াহ্ বা প্রদেশ হিসাবে ইরান আবার খলিফার কর্তৃত্বের অধীনেও ছিল না। আর, ফাতিমিদদের রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল ইসমাইলীদের দ্বারা, যারা প্রকৃত অর্থে ছিল ইসলাম বহির্ভুত সম্প্রদায়।
সতরাং, ইসলামের দৃষ্টিতে ফাতিমিদদের কর্মকান্ডের কোন আইনগত বৈধতা নেই এবং তাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রও ইসলামী রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচিত হবার পক্ষে কোন যুক্তি নেই। আব্বাসীয় খিলাফতের পাশাপাশি তাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে তাই কোনভাবেই একের অধিক খিলাফত রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ, ফাতিমিদরা পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় হওয়ায় শরীয়াহ্ আইনের দৃষ্টিতে তাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের বৈধতা ছিল না। আসলে, এই সম্প্রদায়টি গোপন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রকে এমন ভাবে পরিবর্তন করতে চেয়েছিল, যেন তাদের ভ্রান্ত মতাদর্শ দ্বারাই ইসলামী রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু, তাদের সে চেষ্টা সফল হয়নি। এরপরেও ইসলামী রাষ্ট্র অবিভক্ত থেকে এর একতা বজায় রেখেছে।
যদিও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন মতালম্বী সম্প্রদায় তাদের ভ্রান্ত ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে এর শাসন-কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কাযর্ত সব অপচেষ্টা ইসলামী রাষ্ট্রকে কখনো খন্ড-বিখন্ড করে বহুসংখ্যক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারেনি।
এই এভাবেই ভিন্ন মতালম্বীদের সকল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে ইতিহাসে ইসলামী রাষ্ট্র অবিভক্ত থাকে। যদিও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চেয়েছিলো এবং মূলতঃ এ অভিলাষ থেকেই তারা ক্ষমতা দখলের প্রয়াস চালিয়েছিল, কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এ সমস্ত প্রতিকুল পরিস্থিতির মোকাবিলা করে ইসলামী রাষ্ট্র একটি অবিভক্ত একক রাষ্ট্র হিসাবেই টিকে ছিলো। ইসলামী রাষ্ট্রের অবিভক্ততা এবং একটি একক অভিন্ন রাষ্ট্র হিসাবে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, বিভিন্ন উলাইয়াহতে বিভিন্ন ধরনের শাসন অবস্থা বিরাজ করা সত্তেও যে কোন মুসলিম কোন রকম বাধা বিপত্তি বা প্রশ্ন ছাড়াই পূর্ব থেকে পশ্চিমে অবিভক্ত ইসলামী রার্ষ্টের এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ভ্রমন করতে পারতো। সমস্ত সাম্রাজ্যের কোথাও তাদের পরিচয় সম্পর্কে কোনরকম প্রশ্ন করা হতো না।
এভাবেই ইসলামী রাষ্ট্র সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে একটি মাত্র অভিন্ন ব্যবস্থার নীচে ঐক্যবদ্ধ রেখেছিলো এবং ইতিহাসে এর ধারাবাহিকতাও বজায় ছিলো। পশ্চিমা কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ১৯২৪ সালে তাদের এজেন্ট মুস্তফা কামালের হাতে এ রাষ্ট্র ধ্বংস করে দেবার পূর্ব পর্যন্ত এ রাষ্ট্র ছিলো শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩১ (ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতি ইহুদীদের আচরণ)
ইহুদীরা আসলে ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য কখনোই তেমন কোন হুমকী ছিল না। আরবরাই মূলতঃ আল্লাহর রাসূল (সা)-এর শাসন কর্তৃত্বের সামনে হুমকী হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বিশেষ করে কুরাইশরা ছিল এ ব্যাপারে অগ্রগামী। এজন্যই তিনি (সা) ইহুদীদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, যেন ইহুদীরা তাঁর কর্তৃত্ব মেনে নেয় এবং রাসূল (সা)-এর শত্রুপক্ষের সাথে কোনরকম মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ না হয়। কিন্তু, ইহুদীরা যখন দেখতে থাকে যে, ইসলামী রাষ্ট্র দিনে দিনে শক্তিশালী হয়ে উঠছে এবং হেযাযে মুসলিমদের শাসন-কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে, তখন তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নানারকম অপপ্রচার ও কুৎসা রটনা করে। বদরের যুদ্ধে কাফিরদের উপর মুসলিমদের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর তারা আরও উদ্বিগ্ন হয়ে তাদের মিথ্যা অপপ্রচারের মাত্রা বৃদ্ধি করে, এমনকি আল্লাহর রাসূল (সা)-এর বিরুদ্ধেও তারা ষড়যন্ত্র করতে আরম্ভ করে।
ইহুদীদের এ দূর্বৃত্তপনা ও চক্রান্ত ঔদ্ধত্যের কথা একসময় আল্লাহর রাসূল (সা) এবং মুসলিমদের কাছে পৌঁছে যায়। এর ফলশ্রুতিতে, ইহুদী ও মুসলিমদের পরস্পরের মধ্যে সৃষ্টি হয় প্রচন্ড ঘৃণা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা। দুই পক্ষই একে অন্যকে উচিত শিক্ষা দেবার জন্য মুখিয়ে থাকে। এদিকে, সময়ের সাথে সাথে ইহুদীদের ঔদ্ধত্য দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। ইহুদীদের মধ্যে বনু উমার ইবন আউফ গোত্রের আবু আফাক নামের এক ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা) এবং সাহাবীদের উদ্দেশ্যে অপমানজনক কবিতা আবৃত্তি করতো। আসমা বিনত মারওয়ান নামের এক মহিলা সবসময় ইসলামকে হেয় প্রতিপন্ন করে কথা বলতো এবং রাসূল (সা)-কেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো। মুসলিম নারীরা পথ-ঘাটে যাতায়াত করার সময় কা’ব ইবন আশরাফ নামের এক ইহুদী তাদের দিকে অশ্লীল বাক্য ছুঁড়ে দিত। এমনকি, সে মদীনা থেকে মক্কায় গিয়ে কুরাইশদের মুহাম্মদ (সা)-এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার জন্য উত্তেজক কবিতা আবৃতি করতো। এ পর্যায়ে, মুসলিমরা তাদের এই অত্যাচার সহ্য না করতে পেরে তাদের এই আশায় হত্যা করে যে, এতে হয়তো ইহুদীরা ভীত হয়ে এ সমস্ত জঘন্য কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকবে। কিন্তু, এরপরেও ইহুদীরা তাদের এই ঘৃণা মিশ্রিত মিথ্যা অপপ্রচার ও অত্যাচার চালিয়ে যায় এবং এর মাত্রা চুড়ান্ত ভাবে বৃদ্ধি করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের বিভিন্ন ভাবে সর্তক করেন এবং তারা যদি এই সমস্ত জঘন্য কার্যকলাপ থেকে বিরত না হয়, তবে তার পরিণতি কি হতে পারে সেটাও তাদের জানিয়ে দেন। কিন্তু, কোনকিছুই তাদের নিবৃত করতে পারে না। এছাড়া, আল্লাহর রাসুলের এ সর্তক বাণীকে তারা গুরুত্বের সাথেও গ্রহন করে না। বরং, তারা মুহাম্মদ (সা) এর এ সকল উপদেশকে পুরোপুরি প্রত্যাখান করে চরম বিদ্বেষের সাথে তাঁকে বলে, “শোন হে মুহাম্মদ! তুমি বোধ হয় ভাবছো আমরা তোমারই লোক। কিন্তু, নিজেকে ভ্রান্তির মধ্যে রেখো না। যুদ্ধ সম্পর্কে কোন রকম জ্ঞান ছাড়াই তুমি শত্রুর মুকাবিলা করেছো এবং সৌভাগ্যবশতঃ ফলাফল তোমার পক্ষেই এসেছে। আল্লাহর কসম, আমরা যদি কোনদিন তোমার সাথে যুদ্ধ করি তাহলে তুমি দেখবে আমরাই প্রকৃত যোদ্ধা।”
এ পর্যায়ে আসলে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মদীনার ইহুদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। এরপর মুসলিমরা বনু কাইনুকার দূর্গ ঘেরাও করে এবং কাউকে তাদের বসতি থেকে বের হতে না দিয়ে ১৫ দিন অবরুদ্ধ করে রাখে। এমনকি অন্যান্যদের তাদের কাছে খাদ্যদ্রব্য পৌঁছে দেয়া থেকেও বিরত রাখে। এ অবস্থায় ইহুদীদের মুহাম্মদ (সা)-এর আনুগত্য স্বীকার করে তাঁর ফয়সালাকে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। এরপর, রাসূল (সা) তাঁর স্বীয় অনুগ্রহে ইহুদীদেরকে তাদের সমস্ত ধন-সম্পদ ও মালামাল নিয়ে মদীনা ত্যাগ করার অনুমতি দেন। এ ফয়সালা মেনে নিয়ে তারা মদীনা ত্যাগ করে ওয়াদী আল-কুরা নামক স্থানে কিছুদিন অবস্থান করে। তারপর, তারা মদীনার আরও উত্তরে যাত্রা করে আল-শামের সীমান্তবর্তী অঞ্চল আদরা’তে পৌঁছায়। বস্তুতঃ বনু কাইনুকা গোত্রকে বহিস্কার করার পর মদীনার ইহুদীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে যায় এবং যে সমস্ত ইহুদীরা মদীনায় রয়ে যায় তারা বহিস্কৃত হবার আশঙ্কায় মুসলিমদের কর্তৃত্বের কাছে আত্মসর্মপণ করে। কিন্তু, যখন তারা পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে তাদের ভেতর আবারও পুড়নো ঘৃন্য অভ্যাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। বিশেষ করে, ওহুদের ময়দানে মুসলিমদের পরাজয়ের পর তাদের ভেতর প্রতিহিংসা আর ঘৃণার আগুন জ্বলে উঠে। আবারও তারা মুহাম্মদ (সা)-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে আরম্ভ করে এবং এক পর্যায়ে তাঁকে হত্যা করার ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়।
আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের এ গোপন চক্রান্ত সম্পর্কে কিছুটা আন্দাজ করলেন এবং তাদের এ সব ঘৃণ্য চক্রান্তের প্রকৃত স্বরূপ উম্মোচন করার লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করলেন। একদিন তিনি (সা) আবু বকর, ওমর এবং আলী সহ দশজন সাহাবাকে নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে বনু নাযির গোত্রের বসতিতে গেলেন। আল্লাহর রাসূল (সা)-কে দেখে ইহুদীরা কৃত্রিম আনন্দ উদ্ভাসিত হলো এবং সাদরে তাঁকে বরণ করলো। কিন্তু, কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি (সা) তাদের আচার-আচরনে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেলেন। একজন ইহুদীকে তিনি (সা) একপাশ থেকে হেঁটে যেতে দেখলেন এবং আরেক ইহুদীকে তিনি (সা) যে বাড়ীতে বসে ছিলেন সেখানে ঢুকতে দেখলেন। বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কায় তিনি (সা) দ্রুতবেগে সেখান থেকে উঠে গেলেন এবং এমন ভাবে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন যাতে মনে হলো তিনি (সা) আবার কিছুক্ষন পরেই ফিরে আসবেন। এর মধ্যে শুধু একটু সময়ের জন্য থেমে তিনি (সা) একজন সাহাবীকে বললেন, তিনি (সা) ফিরে না আসা পর্যন্ত যেন সে এখানে অপেক্ষা করে। রাসূল (সা)-এর আকস্মিক প্রস্থানে ইহুদীরাও দ্বিধাদ্বন্দের ভেতরে পড়ে যায়। কারণ, উপরে উপরে তারা মুসলিমদের সাথে খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ আচরন করছিল। সাহাবাগণ এখানে কিছুক্ষন অপেক্ষা করে আল্লাহর রাসুলের খোঁজে বাইরে বের হবার সিদ্ধান্ত নেন। শেষপর্যন্ত তারা রাসূল (সা)-কে মসজিদে নববীর মধ্যে খুজে পান এবং নবী (সা) তাদেরকে ইহুদীদের ষড়যন্ত্রের কথা অবহিত করেন। এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) মুহাম্মদ ইবন মাসলামাহকে বনু নাযির গোত্রে পাঠিয়ে ইহুদীদের মদীনা ত্যাগ করার নির্দেশ দেন। বনু নাযির গোত্রকে এ নিদের্শ বাস্তবায়িত করার জন্য দশদিন সময় দেয়া হয়েছিল অর্থাৎ, দশদিনের মধ্যে তাদের দেশ ত্যাগ করার আদেশ দেয়া হয়েছিল। দশদিন পরও তারা দেশত্যাগ না করায় রাসূল (সা) তাদের বসতি ঘেরাও করেন। অবশেষে, বনু নাযির রণে ভঙ্গ দিয়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এদের মধ্যে কেউ কেউ খায়বারে বসতি স্থাপন করে। আর, বাকীরা আল-শামের আদরা’ অঞ্চলে চলে যায়।
তারপর থেকে মদীনা ইহুদীদের দূর্বৃত্তপণা থেকে মোটামুটি ভাবে মুক্ত হয়ে যায়। শুধু, বনু কুরাইযা নামে একটি বৃহৎ ইহুদী গোত্র মদীনায় রয়ে যায়। কিন্তু, চুক্তি ভঙ্গের কোন কাজ না করায় আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের ব্যাপারে নীরব থাকেন।
কিন্তু, এ শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি আসলে খুব স্বল্প সময়ের জন্যই বিরাজ করে। কারণ, বনু কুরাইযা স্বচক্ষে বনু কাইনুকা’ ও বনু নাযির গোত্রের পরিণতি দেখেছিল। এছাড়া, অবস্থানগত দিক থেকে দূর্বল থাকায় মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়েও তারা ক্রমশঃ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছিল। ফলে, হুয়াই ইবন কা’ব এর নিকট হতে কুপ্রস্তাব পাবার পর তারাও দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এবং খন্দকের যুদ্ধের সময় মুসলিমদের ধ্বংস করতে আসা শত্রুপক্ষের সাথে মিত্রতা করার যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালায়। মূলতঃ মুসলিমদের পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করার এই ষড়যন্ত্রে শরীক হয়ে তারা রাসূল (সা)-এর সাথে তাদের কৃত চুক্তি ভঙ্গ করে। আবারও তারা তাদের কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করে বিশ্বাসঘাতকতার মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হয়। এ কারণেই, মুহাম্মদ (সা) সম্মিলিত শত্রুবাহিনীর হুমকী থেকে মুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই বনু কুরাইযাকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং ২৫ রাত তাদের দূর্গ ঘেরাও করে রাখেন। অবরুদ্ধ অবস্থায় দূর্গ থেকে বের হতে না পেরে তারা তীব্র মানসিক যন্ত্রনায় আচ্ছন্ন হয় এবং আল্লাহতায়ালা তাদের অন্তরে ভীতি সৃষ্টি করে দেন।
এ পর্যায়ে তারা আল্লাহর রাসূল (সা)-কে খবর পাঠিয়ে বলে, “আমাদের কাছে আবু লুবাবাহকে পাঠিয়ে দিন যেন আমরা সমস্যা সমাধানে তার সাথে পরামর্শ করতে পারি।”আবু লুবাবাহ্ ছিল তাদের প্রাক্তন মিত্র গোত্র বনু আউসের প্রতিনিধি। তাকে দেখা মাত্রই তারা তার কাছে ছুটে আসে। ইহুদীদের নারী ও শিশুরা তার কাছে এসে কাঁদতে শুরু করে। তাদের কান্না দেখে আবু লুবাবাহ্ খুবই দুঃখিত হন। এরপর, ইহুদীরা বলে, “হে আবু লুবাবাহ্! তোমার কি মনে হয় আমাদের মুহাম্মদের ফয়সালা মেনে নেয়া উচিত?” আবু লুবাবাহ্ “হ্যাঁ,” সূচক উত্তর দেয় এবং তার হাত দিয়ে গলার দিকে নির্দেশ করে ফয়সালা মেনে না নেয়ার ভয়ঙ্কর পরিণতি সম্পর্কে সর্তক করে। তারপর তিনি ফিরে আসেন। কা’ব ইবন আসাদ সমঝোতা করার জন্য কিছু প্রস্তাব দেয় কিন্তু ইহুদীরা তাও প্রত্যাখান করলে সে বলে, “তোমাদের মুহাম্মদের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই।”এরপর, ইহুদীরা মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে খবর পাঠায় যেন, তিনি (সা) তাদেরকে খালি হাতে শহর ত্যাগ করে আদরা যাবার অনুমতি দেন। কিন্তু, তিনি (সা) তা প্রত্যাখান করেন এবং তাদেরকে তাঁর ফয়সালা মেনে নেবার জন্য চাপ দিতে থাকেন।
এ অবস্থার পরপ্রেক্ষিতে ইহুদীরা তাদের প্রাক্তন মিত্র আউসকে বিষয়টি ফয়সালা করার অনুরোধ জানায়। আউস গোত্র আল্লাহর রাসূল (সা)-এর কাছে আসলে তিনি (সা) তাদের বলেন, “হে আউস, তোমাদের মধ্য হতে যে কোন একজন যদি তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে কি তোমরা এতে সন্তুষ্ট থাকবে?” উত্তরে তারা বলে, “হ্যাঁ, আমরা তা গ্রহন করবো।”এরপর, রাসূল (সা) বলেন, “ইহুদীদের বলে দাও তোমাদের মধ্য হতে যাকে ইচ্ছা তাকেই যেন তারা নির্বাচিত করে।”
ইহুদীরা আউস গোত্র থেকে সা’দ ইবন মু’য়াজকে বিচারক হিসাবে নির্বাচিত করে। সা’দ উভয় পক্ষ থেকে এ প্রতিজ্ঞা নেয় যে, সে যে সিদ্ধান্ত দেবে উভয়পক্ষকেই বিনা প্রতিবাদে তা মেনে নিতে হবে। দুই পক্ষই এতে সম্মত হবার পর, সা’দ বনু কুরাইযাকে তাদের অস্ত্রসস্ত্র সহ দূর্গ থেকে বের হয়ে আসার নির্দেশ দেন এবং তার সামনে তা রাখতে বলেন । ইহুদীরা তার নির্দেশ অনুযায়ী অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে আসে। তারপর, তিনি তার বিচারের রায় দিয়ে বলেন, বনু কুরাইযার পুরুষদের হত্যা করা হবে, তাদের সমস্ত সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে এবং তাদের নারী ও শিশুদের যুদ্ধবন্দী হিসাবে গ্রহন করা হবে। বিচারের এ রায় শোনার পর আল্লাহর রাসূল (সা) উচ্চকন্ঠে বলেন, “তাঁর শপথ যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আল্লাহ এবং মুসলিমরা তোমার ফয়সালাকে গ্রহন করেছে এবং আমার পক্ষ থেকে আমি অবশ্যই তা বাস্তবায়ন করবো।”এরপর, তিনি (সা) মদীনার বাজারে গিয়ে সেখানে বড় বড় গর্ত খোঁড়ার নির্দেশ দেন। দলে দলে ইহুদী পুরুষদের সেখানে আনা হয়। তারপর, তাদের শিরচ্ছেদ করে গর্তের ভেতর পুঁতে ফেলা হয়। তিনি (সা) ইহুদীদের সমস্ত ধন-সম্পদ, জমি-জমা, খেজুরবাগান এবং নারী ও শিশুদেরকে মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করে দেন। আর, নিজের জন্য এর থেকে এক পঞ্চমাংশ রাখেন। তিনি (সা) এ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত অর্থের কিছুটা সা’দ ইবন যায়িদ আল-আনসারীকে অস্ত্রসস্ত্র ক্রয় করার জন্য দেন। সা’দ নযদে গিয়ে ঘোড়া ও অস্ত্রসস্ত্র কিনে নিয়ে আসে, যা মুসলিম সেনাবাহিনী ও তাদের অস্ত্রভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে।
এভাবেই বনু কুরাইযাকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়। কিন্তু, মদীনার আশেপাশের অন্যান্য ইহুদী গোত্রগুলো তখনো ঘাপটি মেরে ছিল। এদের মধ্যে সবচাইতে শক্তিশালী ছিল খায়বারের ইহুদী গোত্রগুলো। তারা আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সাথে কোনরকম চুক্তি করতেও প্রস্তুত ছিল না। এছাড়া, হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে মুসলিমদের ধ্বংস করে দেয়ার লক্ষ্যে তারা গোপনে কুরাইশদের সাথে ষড়যন্ত্রও করেছিল। ফলে, তাদের স্বাধীন উপস্থিতি ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত করছিল হুমকীর সম্মুখীন। এজন্য, কুরাইশদের সাথে হুদাইবিয়া সন্ধি করার পরপরই আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সেনাবাহিনীকে খায়বার জয়ের প্রস্তুতি নিতে বলেন। এরপর, খায়বার জয় করার লক্ষ্যে, ১৭০০ মুজাহিদ যাত্রা আরম্ভ করে, যাদের মধ্যে ১০০ জন ছিল অশ্বারোহী। আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে তারা ছিল নিশ্চিত। এরপর, মুসলিম বাহিনী খায়বারে গিয়ে ইহুদীদের দূর্গ ঘেরাও করে রাখে এবং তাদের ধ্বংস করার প্রস্তুতি নেয়। ওদিকে, দূর্গের ভেতর ইহুদীরা আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ করতে থাকে। সালাম ইবন মাসকাম নামের এক ইহুদী প্রস্তাব দেয় যে, তারা তাদের নারী-শিশু ও তাদের ধন-সম্পদ আল-ওয়াতিহ্ ও আল-সালালিম দূর্গে নিরাপদে রেখে আসবে। আর, তাদের অস্ত্রভান্ডার লুকিয়ে রাখবে না’য়িম দূর্গে। এরপর, ইহুদী যোদ্ধারা সালাম ইবন মাসকামের নেতৃত্বে নাতাত দূর্গের অভ্যন্তরে অবস্থান নেবে।
দুইপক্ষের মধ্যে প্রথম সংঘর্ষ হয় নাতাত দূর্গের কাছে, তারপর আরম্ভ হয় ভয়াবহ আক্রমণ, আর পাল্টা আক্রমণ। বর্ণিত আছে যে, ঐ দিনের যুদ্ধে ৫০ জন মুসলিম যোদ্ধা আহত হয়েছিল। আর, ইহুদীদের নেতা সালাম ইবন মাসকাম নিহত হওয়ায় আল-হারিছ ইবন আবি যয়নাব তাদের নেতৃত্ব গ্রহন করেছিল। এক পর্যায়ে, ইহুদী নেতা আল-হারিছ প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দৃঢ় চিত্তে মুসলিমদের মুকাবিলা করার জন্য দূর্গের বাইরে বেরিয়ে আসে, কিন্তু খাযরাজের যোদ্ধারা তাকে পিছু হটতে বাধ্য করে।
ইহুদীদের অবরুদ্ধ করে মুসলিমরা ধীরে ধীরে তাদের আক্রমণকে আরও শানিত করে। আর, অন্যদিকে ইহুদীরা তা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। এভাবে কিছুদিন পার হয়। এরপর, একদিন আল্লাহর রাসূল (সা) আবু বকর (রা)-কে না’য়িম দূর্গ ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করেন। তিনি বীরের মতো যুদ্ধ করেন, কিন্তু তাকে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়। পরদিন, রাসূল (সা) ওমর (রা)-কে একই দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। কিন্তু, তিনিও শূন্য হাতে ফিরে আসেন। সবশেষে, তিনি (সা) আলী (রা)-কে ডেকে বলেন, “এই পতাকা হাতে এগিয়ে যাও যে পর্যন্ত না আল্লাহ তোমাকে বিজয় দান না করেন।”এ নির্দেশের পর ’আলী (রা) দূর্গের দিকে রওনা হয়ে যান। দূর্গের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর কিছু ইহুদী যোদ্ধা বের হয়ে এসে তাকে আক্রমণ করে। এক ইহুদীর আঘাতে তার হাত থেকে বর্ম পড়ে যায়। এরপর, আলী দূর্গের দরজা শক্ত করে ধরেন এবং এ দরজাকেই ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে যুদ্ধ করতে থাকেন। দূর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস না করা পর্যন্ত তিনি দরজা ধরেই আক্রমণ চালাতে থাকেন। তারপর, তিনি দূর্গের এ দরজাকে অস্থায়ী সেতু হিসাবে ব্যবহার করে বাকী মুসলিমদের ইহুদীদের সুরক্ষিত আস্তানায় ঢোকার ব্যবস্থা করে দেন।
না’য়িম দূর্গকে নিজেদের কব্জায় আনার পরপরই মুসলিমরা ইহুদীদের অন্যান্য দূর্গগুলো আক্রমণ করতে আরম্ভ করে এবং একটার পর একটা দূর্গ ধ্বংস করে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসে। শেষপর্যন্ত, তারা আল-ওয়াতিহ্ এবং আল-সালালিম দূর্গকে আক্রমণ করতে এগিয়ে যায়। এ পর্যায়ে, ইহুদীরা বিজয়ের আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়ে মুসলিমদের কাছে আত্মসর্মপণ করে। তারা শান্তিচুক্তির বিনিময়ে মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে তাদের জীবন ভিক্ষা করে। আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের এ প্রস্তাব মেনে নিয়ে তাদেরকে খায়বারে বসবাস করার অনুমতি দেয়। তবে, যুদ্ধের নীতিমালা অনুযায়ী ইহুদীদের সমস্ত সম্পদ মুসলিমদের অধিকারে চলে আসে। আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের এ শর্তে খায়বারে বসবাস করার অনুমতি দেয় যে, এখানকার সমস্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফলমূল ও শস্যের অর্ধেক তারা মুসলিমদের দেবে আর বাকী অর্ধেক তারা মজুরী হিসাবে রেখে দেবে।
এভাবে, খায়বারে ইসলামী রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়। এদিকে, ফাদাকের ইহুদীরা খায়বারের ইহুদীদের আত্মসমর্পণের কথা জানতে পেরে প্রাণভয়ে তাদের উৎপাদিত অর্ধেক ফসলের বিনিময়ে মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করে। এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) ওয়াদি আল-কুরা হয়ে মদীনায় ফিরে আসার প্রস্তুতি নেন। মুসলিম বাহিনীর প্রত্যাবর্তন কালে কোন রকম যুদ্ধ ছাড়াই তায়মা’র ইহুদীরা মুসলিমদের জিযিয়া দিতে সম্মত হয় এবং তাদের আধিপত্য মেনে নেয়।
এ সমস্ত ঘটনার ফলশ্রুতিতে, সমস্ত আরব উপদ্বীপে ইহুদীদের শাসন-কর্তৃত্ব একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর, এভাবেই আল্লাহর রাসূল (সা) সমগ্র আরবে তাঁর শাসন-কর্তৃত্ব বিস্তৃত করে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেন।
ইসলামী সভ্যতা (আল হাদারাহ আল ইসলামিয়্যাহ)
নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিযামুল ইসলাম’ বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে গৃহীত
হাদারাহ (সভ্যতা) ও মাদানিয়্যাহ (বস্তুগত অগ্রসরমানতা) এর মাঝে একটি পার্থক্য রয়েছে। হাদারাহ বলতে জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা এবং মাদানিয়্যাহ বলতে জীবন যাপনের উপকরণের বস্তুগত অবস্থা কে বোঝায়। হাদারাহ অনেকবেশী নির্দিষ্ট এবং তা জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর উপর নির্ভর করে, পক্ষান্তরে মাদানিয়্যাহ সুনির্দিষ্ট হতে পারে কিংবা সার্বজনীন হতে পারে। কাজেই হাদারাহ হতে উদ্ভূত বস্তুসমূহ অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট, যেমন মূর্তি। আবার বিজ্ঞান ও তার অগ্রযাত্রা, শিল্প ও তার বিবর্তন ইত্যাদি থেকে উদ্ভূত বস্তু সমূহ অনেকবেশী সার্বজনীন এবং তা কোন নির্দিষ্ট জাতির জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং তারা অনেক বেশি সার্বজনীন, যেমন শিল্প ও বিজ্ঞান।
হাদারাহ ও মাদানিয়্যাহের মধ্যবর্তী এ পার্থক্যটির প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখা উচিৎ। একই সাথে হাদারাহ থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ (বস্তু) এবং শিল্প ও বিজ্ঞান থেকে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ (বস্তু) এর মধ্যকার ভিন্নতা সম্পর্কেও পার্থক্য করা প্রয়োজন। এটি এজন্য প্রয়োজন যাতে মাদানিয়্যাহ গ্রহণ কালে এর বস্তুগত রূপ ও এর সভ্যতার মধ্যবর্তী পার্থক্য স্পষ্ট হয়। পশ্চিমা শিল্প ও বিজ্ঞান হতে উদ্ভূত পশ্চিমা মাদানিয়্যাহ গ্রহণে কোনরূপ বাধা নেই। কিন্তু পশ্চিমা সভ্যতা থেকে উদ্ভূত পশ্চিমা মাদানিয়্যাহ কোন ভাবেই গ্রহণ করা যাবেনা। কারণ আমরা কখনোই পশ্চিমা হাদারাহ গ্রহণ করতে পারিনা, কারণ তা প্রতিষ্ঠার মূল ভিত্তি, জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ও মানব জীবনের সুখ (happiness) সম্পর্কিত ধারণাটিই ইসলামী হাদারাহ এর সাথে সাংঘর্ষিক।
পশ্চিমা হাদারাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দ্বীন থেকে জীবনের পৃথকীকরণের উপর ভিত্তি করে, এবং এটি জীবনের যে কোন কাজেই দ্বীনের ভূমিকাকে অস্বীকার করে, ফলত: এটি দ্বীন কে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। যারা জীবনে দ্বীনের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে তাদের জন্য এরূপ পৃথকীকরণই স্বাভাবিক। এই ভিত্তির উপরই জীবন ও জীবনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই হাদারাহ’র দৃষ্টিতে মুনাফার অন্বেষণ করাই হচ্ছে সমগ্র জীবনের মূল উদ্দেশ্য। এ ধারণা ও হাদারাহতে লাভ বা মুনাফাই হচ্ছে সবচেয়ে প্রভাববিস্তার কারী ধারণা। কাজেই এ জীবন পরিচালনার মূল মাপকাঠি হচ্ছে মুনাফা। কারণ তারা জীবনকে মুনাফা হিসাবে চিত্রিত করে। তাদের দৃষ্টিতে সুখ (happiness) হচ্ছে মানুষকে সর্বোচ্চ ঈন্দ্রিয়গত সুখ প্রদান এবং এ লক্ষ্যে মানুষকে প্রয়োজনীয় উপকরণে তারা সজ্জিত করে। পশ্চিমা হাদারাহতে মুনাফা অর্জনের তীব্র আকংখাই মূল উপজীব্য বিষয় এবং মুনাফা ছাড়া অন্য কোন বিষয়ের উপরই তারা মনোযোগ দিতে আগ্রহী নয় এমনকি অন্য কোন বিষয়কে তারা স্বীকৃতি দিতেও প্রস্তুত নয়। ফলে এর উপর ভিত্তি করেই সকল কাজ নির্ধারিত হয়। আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো শুধুমাত্র ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ করা হয় এবং তা সামাজিক ব্যবস্থার অংশ নয়। মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়াদিকে শুধুমাত্র গীর্জা ও পুরোহিতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ফলত পশ্চিমা হাদারাহতে বস্তুগত মূল্যবোধ ছাড়া কোনরূপ নৈতিক, আধ্যাত্মিক কিংবা মানবতাবাদী মূল্যবোধের স্থান নেই। এর ফলে, মানবতাবাদী কাজ গুলো রাষ্ট্র বিচ্ছিন্ন কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন রেডক্রস ও মিশনারী গুলোর সাথে সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে। বস্তুগত মূল্যের বাইরে অন্য যেকোন মূল্যবোধই জীবন থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। পশ্চিমা হাদারাহ গঠিত হয়েছে জীবন সম্পর্কিত এরূপ ধারণা সমূহের উপর ভিত্তি করে।
ইসলামি হাদারাহ মৌলিক দিক থেকেই পশ্চিমা হাদারাহ এর সাথে সাংঘর্ষিক। এর জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ও সুখের (happiness) অর্থ সম্পর্কিত ধারণাই পশ্চিমা হাদারাহ হতে সম্পূর্ণ পৃথক। ইসলামী হাদারাহ গড়ে উঠেছে এ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যে আল্লাহ সকল কিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি মানুষ, জীবন এবং মহাবিশ্বের জন্য একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) মুহাম্মদ (সা) কে প্রেরণ করেছেন ইসলাম সহ যা সমগ্র মানব জাতির জন্য একমাত্র দ্বীন। এর অর্থ হচ্ছে ইসলামি হাদারাহ প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামী আকীদার উপর ভিত্তি করে, যা গঠিত হয় আল্লাহ, আল্লাহর ফিরিশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূলগণ, আখিরাত, ক্বাদা ও ক্বদর এর উপর পরিপূর্ণ ও দৃঢ় বিশ্বাস থেকে। কাজেই আকীদাই হচ্ছে হাদারাহ এর মূল ভিত্তি এবং ফলত এ হাদারাহ আধ্যাত্মিকতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে।
ইসলামী হাদারাহতে জীবন গড়ে উঠে ইসলামী দর্শনের উপর ভিত্তি করে যা উদ্ভুত হয়েছে ইসলামী মতাদর্শ বা আকীদা থেকে। এবং এর উপর ভিত্তি করেই জীবন ও কর্মসমূহ প্রতিষ্ঠিত। এই দর্শনে আধ্যাত্মিকতার সাথে বস্তু জীবনের মিশ্রন সংগঠিত হয় অর্থাৎ মানুষের কার্যাবলী আহকাম শরীয়াহ কর্তৃক পরিচালিত হয় এবং এটিই জীবনের ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। এ দর্শন মতে মানুষের কার্যাবলী হচ্ছে বস্তু (পদার্থ) আর ঐ কাজ করার সময়ে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক তৈরী করা, অর্থাৎ হালাল ও হারাম অনুযায়ী কাজ করার বিষয়টিতে থাকে আধ্যাত্মিকতা। অর্থাৎ এখানে বস্তু ও আধ্যাত্মিকতার একটি সংমিশ্রন ঘটছে। এভাবে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী একজন মুসলিমের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত হয়। একজন মুসলিমের কাজের পিছনে চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অন্য কোনধরণের লাভ বা মুনাফা নয়। অবশ্য গৃহীত কাজের একটি তাৎক্ষণিক লক্ষ্য থাকে এবং কাজ ভেদে এর মূল্যবোধ ও বিভিন্ন হয়। ব্যবসা বানিজ্যে নিয়োজিত এক ব্যক্তির ব্যবসায়িক লাভের মাধ্যমে তার বস্তুগত মুনাফা অর্জন হতে পারে। ব্যবসা বানিজ্য একটি বস্তুগত কাজ, কিন্তু তা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে অনুধাবন করে এবং কেবলমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তার আদেশ ও নিষেধ মেনে চলে। এ কাজটি করতে গিয়ে তার যে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য থাকে তা হচ্ছে ব্যবসায়িক লাভ, এটি কাজটির একধরণের বস্তুগত মূল্যবোধ।
এছাড়া মূল্যবোধ হতে পারে আধ্যাত্মিক, যেমন সালাত, যাকাত, রোজা ও হজ্জ্ব। কিংবা এ মূল্যবোধ হতে পারে নৈতিক, যেমন সত্য বলা, সততা কিংবা আনুগত্য প্রদর্শন ইত্যাদি। অথবা এ মূল্যবোধ হতে পারে মানবিক, যেমন ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার কিংবা দরিদ্রদের সাহায্য করা। এ কাজগুলো করতে গিয়ে কোন ব্যক্তি এ মূল্য গুলো অর্জনের প্রতি মনোযোগী হয় ও তা অর্জনের চেষ্টা করে। অবশ্য এ মূল্যবোধ গুলো কাজগুলোর পিছনের মূল চালিকাশক্তি, কিংবা মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। এগুলো শুধুমাত্র বিভিন্ন কাজের মূল্যবোধ মাত্র যা কাজের ধরণ ভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে।
সুখ (happiness) হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, মানুষের নিজের চাহিদা পূরণ নয়। এরূপ চাহিদা পুরণ যেমন, জৈবিক চাহিদা, প্রবৃত্তিগত আকাংখা পূরণ মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মাধ্যম কিন্তু এগুলোর পূরণ সুখ নিশ্চিত করেনা। সংক্ষেপে এটিই হচ্ছে জীবন সম্পর্কে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী এবং এই ভিত্তির উপরই গড়ে উঠে একজনের দৃষ্টিভঙ্গী। এ দৃষ্টিভঙ্গীই ইসলামী হাদারাহর মূল ভিত্তি। স্পষ্টত যেকোন বিবেচনায়ই ইসলামী হাদারাহ পশ্চিমা হাদারাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক। ইসলামী হাদারাহ হতে উদ্ভূত মাদানিয়্যাহ (বস্তু) পশ্চিমা হাদারাহ হতে উদ্ভুত বস্তুর সাথে সাংঘর্ষিক। উদাহরণ স্বরূপ, একটি ফটোগ্রাফ (ছবি) হচ্ছে একধরণের মাদানিয়্যাহ। পশ্চিমা হাদারাহ অনুযায়ী নারীর সকল সৌন্দর্য্য উন্মোচক কোন নগ্ন ছবি একটি গ্রহণযোগ্য মাদানিয়্যাহ বস্তু যা নারী সম্পর্কে পশ্চিমা ধারণা’র সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। কাজেই পশ্চিমের কোন ব্যক্তির নিকট এ ধরণের ছবি একটি শিল্প কর্ম এবং শৈল্পিক মান বিদ্যমান থাকলে এধরণের ছবি তার নিকট গর্বের বিষয়। অবশ্য এধরণের মাদানিয়্যাহ বস্তু ইসলামী হাদারাহ ও নারীর সম্পর্কে ইসলামী ধারণা’র সাথে সাংঘর্ষিক, যেখানে নারী হচ্ছে মর্যাদার বিষয় এবং তার মর্যাদা রক্ষা করা বাঞ্ছনীয়। একই সাথে এধরণের ছবিকে প্রতিহত করা প্রয়োজন কারণ তা যৌনাকাংখাকে উস্কে দেয় এবং সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা করে। অনুরূপভাবে যখন কোন মুসলিম একটি মাদানিয়্যাহ বস্তু যেমন বাড়ী নির্মাণ করতে যায়, তখন সে লক্ষ্য রাখে যেন কোন অবস্থাতেই বহিরাগতদের নিকট অন্তঃপূরের নারীরা দৃশ্যমান না হয়। ফলে একজন মুসলিম গৃহাভ্যন্তরে দেয়াল তৈরী করে কিন্তু পশ্চিমারা এর প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়না। পশ্চিমা হাদারাহ থেকে উদ্ভূত যেকোন মাদানিয়্যাহ বস্তুর জন্য এটি প্রযোজ্য, যেমন মূর্তি এবং অনুরূপ বস্তু সমূহ। অনুরূপভাবে যদি কোন বিশেষ পোষাক অবিশ্বাসীদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে থাকে, তবে মুসলিমদের জন্য তা নিষিদ্ধ, কারণ এটি জীবন সম্পর্কে একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী বহন করে। অবশ্য যদি অন্য কোন পোষাক যা প্রয়োজনে বা সাজ সজ্জার তাগিদে পরা হয় এবং যা কুফরের সাথে সম্পর্কিত নয়, তখন তা সার্বজনীন মাদানিয়্যাহ হিসাবে পরিগণিত হয়, এবং তা মুসলিমদের ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত মাদানিয়্যাহ বস্তু যেমন, গবেষণাগারের উপকরণ (ল্যবোরেটরী ইক্যূইপমেন্ট), চিকিৎসা ও শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, গালিচা (কার্পেট), ইত্যাদি সার্বজনীন মাদানিয়্যাহ’র অন্তর্গত। এরূপ বস্তু সমূহ যা হাদারাহ থেকে উদ্ভূত নয়, কিংবা হাদারাহ’র সাথে সম্পর্কিত নয়, তা ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে।
বর্তমান বিশ্ব নিয়ন্ত্রনকারী পশ্চিমা সভ্যতার প্রতি এক পলক দৃষ্টি দিলেই আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে যে তা মানুষকে শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারেনা। বরং পশ্চিমা সভ্যতাই বর্তমান মানুষের জীবনের গভীরে প্রোথিত দুর্দশা ও ভোগান্তির মূল কারণ। এই হাদারাহ, যা’র মূলে মানব জীবনের বিষয়গুলো থেকে দ্বীন কে পৃথক করা হয়েছে তা মানুষের ফিতরাহ’র পরিপন্থী। এবং এ সমাজে মানুষের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলোর কোন মূল্য নেই। উপরন্তু জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী হিসাবে মুনাফা এবং মুনাফা অর্জনই মানুষের মধ্যবর্তী সম্পর্কগুলোর মূল ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হয়। ফলত: অবধারিত ভাবে এটি চিরস্থায়ী দুর্ভোগ ও অশান্তি ছাড়া আর কিছুই সৃষ্টি করতে পারেনা। যতক্ষণ পর্যন্ত মুনাফা হচ্ছে মূলভিত্তি, ততক্ষণ পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই এতে সংঘর্ষ এবং মানুষের মাঝে সম্পর্কগুলো প্রতিষ্ঠা করতে শক্তি প্রয়োগের উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেতে থাকবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এ হাদারাহ’র অনুসারীদের জন্য উপনিবেশবাদ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া কারণ এখানে মুনাফাই জীবনের মূল ভিত্তি এবং নৈতিকতার কোন তোয়াক্কা করা হয়না। কাজেই, স্বাভাবিক ভাবেই আধ্যাত্মিকতার মূল্যবোধ যেমন উপেক্ষিত হয় ঠিক তেমনি অন্য যে কোন ভালো নৈতিকতার বিকাশও রুদ্ধ হয়ে যায় এবং জীবন প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রতিযোগিতা, সংগ্রাম, আগ্রাসন ও উপনিবেশের উপর। বর্তমান বিশ্বে মানুষের মাঝে আধ্যাত্মিকতার সঙ্কট, চিরস্থায়ী উদ্বেগ, সর্বত্র মন্দের ব্যপক বিস্তৃতি পরিলক্ষিত হচ্ছে যা স্পষ্টতই পশ্চিমা হাদারাহ’র ফলাফল। এটি সমগ্র বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর মাধ্যমে এরূপ ভয়াবহ পরিণতির দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে, এবং ফলশ্রুতিতে বিশ্ব মানবতার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপন্ন করে তুলেছে।
ইসলামী হাদারাহ যা ৭ম শতাব্দী থেকে ১৮শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, তার একটি তথ্যচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এতে কখনোই উপনিবেশবাদী নীতি ছিলনা। অবশ্যই উপনিবেশবাদ ধারণাটি ইসলামী প্রকৃতি বিরোধী, কারণ এতে মুসলিম এবং অমুসলিমদের মাঝে বৈষম্য করা হয়নি। ফলত উক্ত শাসনামলে, এর অন্তর্গত সকল মানুষের জন্যই এটি ন্যায় বিচার সুনিশ্চিত করেছিল। কারণ এটি এমন এক হাদারাহ যা আধ্যাত্মিকতার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বস্তুগত, আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক সকল মূল্যবোধ কেই পরিপূর্ণ করে। আকীদা জীবনের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়, যা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নিয়ন্ত্রিত হয় আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের সীমারেখার মাধ্যমে। এখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই সুখ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। যখন ইসলামী হাদারাহ পূর্বের মত বিশ্বে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে, তখন এটি সুনিশ্চিত ভাবেই বিশ্বের সঙ্কটের সমাধান করবে ও সমগ্র মানবতার কল্যাণ নিশ্চিত করবে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩০ (ইসলামী রাষ্ট্রের কাঠামো)
মদীনায় পা রাখার প্রথম দিন থেকেই আল্লাহর রাসূল (সা) মুসলিম ও অমুসলিম সহ সবাইকে শাসন করেছেন এবং তাদের সমস্ত বিষয় দেখাশুনা করেছেন। ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করার পর তিনি (সা) একটি আদর্শ ইসলামী সমাজ গঠনে মনোনিবেশ করেন যেন, এ সমাজ প্রকৃত অর্থেই একটি জনকল্যাণমূলক সমাজে পরিণত হয়। মদীনার রাষ্টপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন কালে তিনি (সা) ইহুদী গোত্র, বনু দামরাহ এবং বনু মুদলাজের সাথে চুক্তি করেন। পরবর্তীতে তিনি (সা) কুরাইশ এবং আইলাহ, আল-যারবা ও উযরাহ’র গোত্র প্রধানদের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তিনি (সা) একথাও মেনে নেন যে, কোন গোত্রের মানুষকেই হজ্জ্ব করতে বাধাঁ দেয়া যাবে না আর, না কারো পবিত্র মাসে আক্রান্ত হবার কোন ভয় থাকবে। সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে তিনি (সা) অনেক যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন এবং এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন। তিনি (সা) হামযাহ ইবন ’আব্দুল মুত্তালিব, মুহাম্মদ ইবন ’উবাইদা ইবন আল-হারিছাহ এবং সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাসকে কুরাইশদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। তিনি (সা) যায়িদ ইবন হারিছাহ, জাফর ইবন আবি তালিব এবং আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। একই ভাবে, তিনি (সা) খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদকে দুমাত আল-জান্দাল গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্বে নিযুক্ত করেন। এছাড়া, অসংখ্য যুদ্ধে তিনি (সা) নিজে নেতৃত্ব দেন যেখানে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এছাড়াও তিনি (সা) প্রতিটি প্রদেশে একজন ওয়ালী (Governor) এবং প্রতিটি অঞ্চলে একজন আমিল (Sub-governor) নিযুক্ত করেন। উদাহরন স্বরূপ, তিনি (সা) মক্কা বিজয়ের পরপরই উতাব ইবন উসাইদকে মক্কার ওয়ালী হিসাবে নিযুক্ত করেন এবং বাদান ইবন সাসান ইসলাম গ্রহন করার পর তিনি (সা) তাকে ইয়েমেনের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। মু’য়াজ ইবন আল জাবাল আল-খাযরাজী আল-জানান প্রদেশের এবং খালিদ ইবন সা’য়িদ ইবন আল আস সানা’র ওয়ালী হিসাবে নিযুক্ত হন। আল্লাহর রাসূল (সা) যায়িদ ইবন লুবাইদ ইবন ছালাবাহ আল-আনসারীকে হাযরামাউতের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। আবু মুসা আল-আশ’য়ারীকে যাবিদ ও এডেন এর এবং আমর ইবন আল’আস ওমানের ওয়ালী হিসাবে নিযুক্ত করেন। আর, মদীনাতে তিনি (সা) আবু দুজানাহকে মদীনার আমিল হিসাবে দায়িত্ব দেন। আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর চারপাশের মানুষদের মধ্যে যোগ্যতা অনুসারে বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিভিন্ন দায়িত্বের জন্য নিযুক্ত করতেন। যাদের অন্তর ঈমানের আলোতে পরিপূর্ণ ছিলো শুধু তাদেরকেই তিনি (সা) শাসনকার্যের গুরুদায়িত্ব দেন। বর্ণিত আছে যে, মু’য়াজ ইবন জাবাল আল-খাযরাজিকে ইয়েমেনের শাসনকর্তা হিসাবে নিযুক্ত করার সময় তিনি (সা) তাকে জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি দিয়ে জনগণকে শাসন করবে হে মু’য়াজ?” উত্তরে মু’য়াজ বলেন, “আমি আল্লাহর কিতাব দিয়ে তাদের শাসন করবো।”তারপর তিনি (সা) বলেন, “যদি এ ব্যাপারে সেখানে কিছু না পাও?” তখন মু’য়াজ বলেন, “তাহলে আমি রাসুলের সুন্নাহর মধ্যে তা খুঁজবো।”এটা শুনে রাসূল (সা) তাকে বলেন, “যদি সেখানেও না পাও?” উত্তরে মু’য়াজ বলেন, “তাহলে আমার জ্ঞান অনুযায়ী ইজতিহাদ(গবেষণা) করবো।”একথা শুনে আল্লাহর রাসূল (সা) অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে যান এবং বলেন, “প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি তাঁর রাসুলের বার্তাবাহককে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন।”এছাড়া, আরও বর্ণিত আছে যে, আল্লাহর রাসূল (সা) আব্বান ইবন সা’য়িদকে বাহরাইনের ওয়ালী নিযুক্ত করার সময় তাকে বলেন, “’আবদ আল কায়েসের লোকেদের সাথে সুন্দর আচরন করবে। আর, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন করবে।”
আল্লাহর রাসূল (সা) আচার-আচরন ও ঈমানের দিক থেকে সবচাইতে শ্রেষ্ঠ মুসলিমদেরকেই শাসক হিসাবে নিযুক্ত করতেন। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে তিনি (সা) ওয়ালীকে অর্থসংগ্রহ, জনগণকে ইসলামের আগমনের সু-সংবাদ দেয়া, মানুষকে কুরআনের আলোকে গড়ে তোলা এবং তাদেরকে দ্বীন-ইসলাম বোঝানোর দায়িত্ব দিতেন। তিনি (সা) তাঁর নিযুক্ত ওয়ালীকে কঠিন হস্তে অন্যায় ও বিদ্রোহ দমনের নির্দেশ দিতেন। কিন্তু, সত্যবাদীতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিনয়ী ও অমায়িক আচরন করতে বলেন। এছাড়া, বিবাদমান গোত্রগুলোর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের নিষ্পত্তি করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার গোত্রীয় রীতিনীতিকে মানদন্ড হিসাবে নিতে নিষেধ করেন। বরং, সকলক্ষেত্রে, আল্লাহ প্রদত্ত আইনকানুনকেই একমাত্র মানদন্ড হিসাবে গ্রহন করার নির্দেশ দেন।
আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর নিযুক্ত শাসকদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক পঞ্চমাংশ সংগ্রহ করার নিদের্শ দেন। এছাড়া, মুসলিমদেরকে আল্লাহতায়ালা যে সমস্ত ক্ষেত্রে সাদাকাহ্ দিতে বলেছেন, সে সমস্ত অর্থও সংগ্রহ করতে বলেন। তিনি (সা) ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের মধ্য হতে যারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহন করেছে তাদেরকে এ সু-সংবাদ দেবার নির্দেশ দেন যে, এখন থেকে তারা বিশ্বাসীদের সমপরিমান অধিকার লাভ করবে এবং তাদেরকে অন্যসব মুসলিমদের মতোই একই দায়িত্ব পালন করতে হবে। তিনি (সা) ইহুদী, খ্রিষ্টান বা অন্য যে কারো উপর যে কোন ধরনের অত্যাচার প্রতিহত করার নির্দেশও দেন। আল্লাহর রাসূল (সা) মু’য়াজ (রা)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর পূর্বে তাকে বলেন, “আহলে কিতাবের লোকদের শাসন করার জন্য তোমাকে পাঠানো হচ্ছে। তোমার প্রথম কাজ হবে তাদের এক আল্লাহর দাসত্বের দিকে আহবান করা। যদি তারা তা মেনে নেয়, তবে তুমি তাদের জানিয়ে দেবে যে, আল্লাহ তাদের উপর যাকাত ফরয করেছেন, সম্পদশালীদের কাছ থেকে যাকাত সংগ্রহ এবং দরিদ্রদের মধ্যে তা বিতরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। যদি তারা তা মেনে নেয়, তবে তাদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করবে এবং তাদের এ আমানত দেখাশুনা করবে এবং নির্যাতিত মানুষের আর্তনাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করবে। মনে রেখ, নির্যাতিত মানুষ ও আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা নেই।”আল্লাহর রাসূল (সা) খায়বারের ইহুদীদের উৎপাদিত শস্য ও ফলফলাদি পরিমাপ করে তা থেকে রার্ষ্টের নির্ধারিত অংশ সংগ্রহ করার জন্য সাধারনত আব্দুল্লাাহ ইবন রুওয়াহাকে নিযুক্ত করতেন। তারা আল্লাহর রাসূল (সা)-এর কাছে একবার তার মূল্যায়নের ব্যাপারে অভিযোগ করে এবং আব্দুল্লাহকে ঘুষ হিসাবে কিছু সোনা-দানা দেবার চেষ্টা করে। তারা বলে, “এগুলো (সোনা-দানা) নিয়ে যাও এবং শস্য ভাগাভাগির ব্যাপারে একটু ছাড় দাও।”উত্তরে আব্দুল্লাহ বলেন, “হে ইহুদীরা, তোমরা হচ্ছো আল্লাহর সৃষ্টি জগতের মধ্যে সবচাইতে নিকৃষ্ট। কিন্তু, আমি ন্যায়বিচারের ব্যাপারে এতটুকু ছাড় দেব না। যা তোমরা আমাকে ঘুষ হিসাবে গ্রহন করতে বলেছো তা আল্লাহর দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ। সুতরাং, তা আমি গ্রহন করতে পারবো না।”এ কথা শুনে ইহুদীরা বলে, “এজন্যই আল্লাহ পৃথিবী ও জান্নাত তৈরী করেছেন।”
আল্লাহর রাসূল (সা) সবসময়ই বিভিন্ন প্রদেশে তাঁর নিযুক্ত শাসক ও ব্যবস্থাপকদের উপর নজর রাখতেন এবং তাদের কার্যকলাপের সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন। তিনি (সা) তাদের বিরুদ্ধে উত্থিত অভিযোগও মনোযোগের সাথে শুনতেন। একবার বাহরাইনে তাঁর নিযুক্ত আমিল আল-আলা ইবন আল-হাদরামির বিরুদ্ধে আবদ কায়িসের একদল প্রতিনিধি তাঁর কাছে অভিযোগ উত্থাপন করায়, তিনি (সা) উক্ত আমিলকে ঐ অঞ্চল থেকে অপসারন করেন। এছাড়া, তিনি (সা) এটাও লক্ষ্য রাখতেন যে, তাঁর নিয়োগকৃত ব্যবস্থাপকরা কিভাবে রাষ্ট্রের নির্ধারিত অর্থ সংগ্রহ করছে এবং রাজস্ব খাতে অর্জিত অর্থ কিভাবে ব্যয় করছে। একবার তিনি (সা) একব্যক্তিকে যাকাত সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত করেন। সেখান থেকে ফেরার পর উক্ত ব্যক্তি তাঁকে বলেন, “এই হচ্ছে আপনার নির্ধারিত অংশ আর এগুলো আমাকে উপহার হিসাবে দেয়া হয়েছে।”একথা শোনার পর আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন, “এই ব্যক্তির বিষয়টা কি? আল্লাহ আমাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পন করেছেন আমরা তাকে সে অনুযায়ী কাজে নিযুক্ত করেছি, আর সে কি না বলছে, এটা আপনার অংশ আর এটা আমাকে উপহার হিসাবে দেয়া হয়েছে? সে কি বাড়ীতে তার মাতা-পিতার সাথে বসে উপহারের প্রত্যাশা করতে পারে না? আমরা যদি কাউকে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন কাজের জন্য নিযুক্ত করি এবং তারপরেও যদি সে এর বাইরে কোনকিছু গ্রহন করে, তবে সেটা হবে অসৎ উপার্জন।”
আল্লাহর রাসূল (সা) মানুষের মাঝে ঝগড়া-বিবাদের নিষ্পত্তি করার জন্য বিচারক নিযুক্ত করেছেন। তিনি (সা) আলী (রা)-কে ইয়েমেনের বিচারক এবং আব্দুল্লাহ ইবন নওফেলকে মদীনার বিচারক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। সেইসাথে, তিনি (সা) মু’য়াজ ইবন জাবাল এবং আবু মুসা আল-আশয়ারীকেও ইয়েমেনের বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। তিনি (সা) তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কি দিয়ে তোমরা বিচার-ফয়সালা করবে?” উত্তরে তারা বলেন, “আমরা যদি আল্লাহর কিতাব ও রাসুলের সুন্নাহতে তা খুঁজে না পাই তবে, কিয়াসের মাধ্যমে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত বের করবো।”তিনি (সা) তাদের এ পদ্ধতিকে স্বীকৃতি দেন। আল্লাহর রাসূল (সা) বিভিন্ন স্থানে শুধু বিচারক নিযুক্ত করেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি (সা) বিচারক এবং শাসকদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগের সঠিক তদন্ত ও বিচার করার জন্য বিচারকদের সমন্বয়ে জুরী বোর্ড (মাযালিম) গঠন করেন। তিনি (সা) বিচার বিভাগ ও জুরী বোর্ডের আমির (নেতা) হিসাবে রাশিদ ইবন ’আব্দুল্লাহকে নিযুক্ত করেন এবং জুরী বোর্ডের সামনে উপস্থাপিত সকল অভিযোগ তদন্ত করার দায়িত্ব দেন।
আল্লাহর রাসূল (সা) জনগণের সমস্ত বিষয়াদির ব্যাপারেই দেখাশুনা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি বিভাগের প্রধান হিসাবে একজন রেজিষ্টার বা লিপিবদ্ধকারক নিয়োগ করেছিলেন। আলী ইবন আবি তালিব এর দায়িত্ব ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য গোত্র বা রাষ্ট্রের সকল প্রকার চুক্তি লিপিবদ্ধ করা। আল-হারিছ ইবন আউফ (রা) রাসূল (সা) এর সীলমোহরের দায়িত্বে ছিলেন, মু’য়াইকিব ইবন আবি ফাতিমাহ ছিলেন যুদ্ধলব্ধ মালামালের দায়িত্বে, হুযাইফা ইবন আল-ইয়ামান ছিলেন সমগ্র হেযাযে উৎপন্ন ফল-ফলাদি ও শস্য পরিমাপ ও মূল্যায়ন করার দায়িত্বে, যুবাইর ইবন আল-আওওয়াম ছিলেন সাদাকা বিভাগের সেক্রেটারী, আল-মুগীরা ইবন শু’বাহকে দেয়া হয়েছিল ঋণ বিষয়ক ও লেনদেন সংক্রান্ত দলিলপত্র লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব এবং শারকাবিল ইবন হাসানাহ’কে নিযুক্ত করা হয়েছিল বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ’র কাছে রাসূল (সা)-এর প্রেরিত পত্র লেখার দায়িত। তিনি (সা) প্রতিটি বিভাগের একজন সেক্রেটারী বা পরিচালক নিযুক্ত করেছিলেন, বিভাগের সংখ্যা যতো বেশীই হোক না কেন। এ সমস্ত বিষয়ে তিনি (সা) তাঁর সাহাবীদের মধ্যে যাদের গভীর চিন্তাশক্তি ও বিভিন্ন বিষয় উপলব্ধি করার ক্ষমতা রয়েছে, বিশেষ করে যারা দ্বীন-ইসলামের জন্য তাদের জীবনকে পুরোপুরি উৎসর্গিত করেছিল, তাদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। আনসারদের মধ্য হতে এ রকম ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল সাত জন আর মুহাজিরদের মধ্য হতে ছিল সাত জন। এদের মধ্যে ছিল, হামযাহ, আবু বকর, ওমর, জা’ফর, আলী, ইবন মাসউদ, সালমান, আম্মার, হুযাইফা, আবু দার, আল-মিকদাদ এবং বিলাল। এছাড়া, তিনি (সা) বিভিন্ন সময়ে অন্যদের সাথেও পরামর্শ করতেন, কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই উল্লেখিত ব্যক্তিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান নিতেন। এদের সকলকে নিয়েই আসলে মাজলিশ্ আল-উম্মাহ গঠিত হয়েছিল।
আল্লাহর রাসূল (সা) মুসলিম-অমুসলিম সহ নির্বিশেষে সকলের উপর কয়েক প্রকার জমিজমা, উৎপন্ন ফসল এবং গবাদি পশুর উপর কর আরোপ করেন। এগুলো যাকাত, উশর (নির্দিষ্ট ফসলের এক দশমাংশ), ফা’ই (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ), খারাজ (জমির উপর আরোপিত খাজনা) এবং জিযিয়া (রাষ্ট্রের অমুসলিমদের নাগরিকদের উপর আরোপিত কর) নিয়ে গঠিত ছিল। আনফাল ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ছিল বায়তুল মালের সম্পদ (রাষ্ট্রের সম্পদ)। যাকাতের অর্থ পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনযায়ী আট প্রকারের মানুষের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হতো, এর বাইরে কেউ যাকাতের সম্পদ পেত না। যাকাতের অর্থ কখনোই রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটানোর কাজে ব্যবহার করা হতো না। রাষ্ট্রের সকল ব্যয় ফা’ই, খারাজ, জিযিয়া এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হতে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমেই করা হতো। বস্তুতঃ এ সমস্ত খাত হতে প্রাপ্ত সম্পদই রাষ্ট্রের সকল ব্যয়ভার বহন করা কিংবা যুদ্ধ পরিচালনায় প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য যথেষ্ট ছিল। যে জন্য, ইসলামী রার্ষ্টের অর্থজনিত কোন সমস্যা কখনো ছিল না।
এভাবেই আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাঠামোগত ভিত্তি তৈরী করেন। প্রতিটি জিনিস তিনি (সা) নিজের হাতে করেন এবং তাঁর জীবদ্দশায়ই এ কাজ সম্পন্ন করেন। তিনি (সা) ছিলেন তাঁর নিজের হাতে গড়া এ রাষ্ট্রের প্রধান। এছাড়া, তাঁকে রাষ্ট্রীয় কাজে সাহায্য করার জন্য ছিল তাঁর সহকারী, গর্ভনর, বিচারক, সৈন্যবাহিনী, সেক্রেটারী এবং তাঁকে পরামর্শ দেবার জন্য ছিল শুরা কাউন্সিল (পরিষদ)। তাই, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এই কাঠামোর ভিত্তিতেই তা তৈরী করতে হবে এবং এই কাঠামোই অনুমোদন করতে হবে। ইসলামী রাষ্ট্র সম্পর্কিত এ সকল খুঁটিনাটি বিষয়গুলো বহু সংখ্যক মানুষের বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনার (তাওয়াতুর) মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে। আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় আসার প্রথম দিন থেকেই রাষ্ট্র প্রধানের ভূমিকা পালন করেছেন। এ দীর্ঘ সময়ে আবু বকর এবং ওমর তাঁর সহকারী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সাহাবীগণ সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে আবু বকরকে নিযুক্ত করেন, নবী কিংবা ওহীর বার্তাবাহক হিসাবে নয়। কারণ, তিনি (সা) ছিলেন সর্বশেষ নবী এবং তাঁর পরে আর কারও কাছে ওহী নাযিল হবে না।
তাহলে, দেখা যাচ্ছে যে, আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর জীবদ্দশায়ই একটি পরিপূর্ণ সরকার ব্যবস্থা তৈরী করেছিলেন। বস্তুতঃ মৃত্যুর পর তিনি (সা) এমন এক শাসন-ব্যবস্থা বা সরকার-ব্যবস্থা রেখে যান, যা ইতিমধ্যে সকলের কাছে পরিচিত সুস্পষ্ট ছিল।









