Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • কমিউনিজমের রাজনৈতিক বিবর্তন

    কমিউনিজমের রাজনৈতিক বিবর্তন

    সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদী সভ্যতা ও পাশ্চাত্যের পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতা উভয়ই যখন পৃথিবীর আলো বাতাসে টিকে ছিল, তখন এই দুই সভ্যতার মধ্যকার পার্থক্য বোঝার উপায় স্পষ্ট ছিল। কালক্রমে বস্তুবাদী সভ্যতার পতন হলো-পৃথিবীর আলো বাতাস ছেড়ে সেটা ঠাঁই করে নিল সচেতন বস্তুবাদীদের কাগজে-কলমে পৃথিবীর দখল চলে গেল ভোগবাদীদের একক আধিপত্যে। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটা ঘটতে শরু করল এরপর, যখন ভোগবাদী আর বস্তুবাদী সভ্যতার মধ্যে পার্থক্য ঘুচতে লাগল আর বস্তুবাদীরা ভোগবাদী সভ্যতার গৌরবে আহ্‌লাদিত হয়ে উঠতে শুরু করল। ভোগবাদীদের নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের প্রয়োজনে উদ্ভাবিত ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতিশীলতা’, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’, ‘বৈজ্ঞানিকতার দোহাই’ ইত্যাদি বিভিন্ন ধ্যান-ধারণা বস্তুবাদীরা ধীরে ধীরে নিজেদের ঈমান-আকীদার অংশ করে নিল এবং এখন আমরা দেখছি পশ্চিমা ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন প্রজেক্ট সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে (WAR ON TERRORISM) বস্তুবাদীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে তত্ত্বে, ভাষণে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের আন্তরিক (?) সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে সমাজতান্ত্রিক বস্তুবাদীদের রাজনীতি- বিশেষত মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে – টিকে আছে, তাদের নিজেদের চিন্তা-আদর্শের ধারে নয়, জনসমর্থনের ভারেও নয়, বরং তা ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের সচেতন কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাদেরই চাপিয়ে দেয়া রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে নির্বিঘ্ন রাখার জন্যে।

    বাংলাদেশে বস্তুবাদী বামরাজনীতির প্রধান ক্ষেত্র উচ্চশিক্ষার বিশেষতঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের পক্ষে তার পরিবেশ, পরিস্থিতি, সমাজ, রাজনীতি, জীবন, সংসার সবকিছুকে সামনে রেখে চিন্তাভাবনা, গবেষণা, বিশ্লেষেণ করা সহজ ও সুবিধাজনক এবং রাজনৈতিক ফলে অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও সামাজিকভাবে ভারসাম্যহীন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের উক্ত উপাদানগুলোর উপযোগী উপস্থিতির কারণে এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীদের সচেতনতা ও কর্মকাণ্ড যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। সাম্রাজ্যবাদীদেরও খুব স্বাভাবিকভাবে বস্তুবাদী রাজনীতির চাষের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণকেই ‘বীজতলা’ হিসাবে বেছে নিয়েছে। সুবিধাবাদী রাজনীতি ও অপরিণামদর্শী অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের ফল স্বরূপ দেশময় বিস্তৃত নানা রূপের শোষণ নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে কাল্পনিক সাম্যবাদ আকর্ষণীয় তত্ত্ব বটে। তার উপর পাশ্চাত্যের কাঙ্ক্ষিত ছাঁচে তৈরী রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুকরণ প্রিয় রাষ্ট্রপরিচালকদের সুদীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্র চালনা আর লক্ষ্য ও আকাঙ্ক্ষাহীন রাজনীতির ফলে সৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতার মধ্যে স্বতঃ চিন্তাশীল তারুণ্যের জন্য অবলম্বন হিসেবে ধরা দেয় ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’, ‘বিজ্ঞান চেতনা’, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’, ‘বিবর্তনবাদ’ ইত্যাদি আপাতঃ ভারী ভারী তত্ত্ব। কিন্তু জ্ঞানগর্ভের এসব তত্ত্বের বাস্তবায়ন হয় বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতির নয়া মেরুকরণের পরিপ্রেক্ষিত- ইসলাম বিরোধীতার মাধ্যমে। ভারতীয় আধিপত্যবাদী ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের আশ্রিত মিডিয়া বিশেষের ‘প্রগতিশীলতা’র বাহ্বা পেয়ে তথাকথিত সমাজতন্ত্রীদের অধিকাংশই টিকে থাকে আর বেড়ে উঠতে থাকে এক জন কার্যত ভোগবাদী বুর্জোয়া রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক তল্পিবাহক হিসেবে, যদিও আলোচনার টেবিলে সে পুরোদস্তুর ‘সাম্যবাদী’ কর্মী, নিজের পুস্তকি চিন্তা- আদর্শের প্রমাণ দিতে গিয়ে যে কল্পিত তত্ত্বের দায় ঠেকাতে নিজেদের উদ্ভাবিত গণ্ডীবদ্ধ চিন্তার তর্ক হাজির করে যার সবটাই অতিরিক্ত পরিমাণে অবাস্তব তত্ত্ব পড়ার বদহজম।

    ‘বীজতলা’ ছেড়ে যখন সমাজ-রাষ্ট্রের মূল জমিতে হাজির হয় তখন তারা কল্পিত তত্ত্ব ও বাস্তব দুনিয়ার পার্থক্য বুঝতে পারে। এখানে পুস্তকি তত্ত্বের আলোচনার টিবিলটা আরো ছোট, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাঠ-ময়দান আরো ব্যাপক এবং বর্তমান বাস্তবতায় মেরুকরণ আরো প্রকট। নতুন বাস্তবতায় স্বল্প সংখ্যক সমাজতন্ত্রী সততার বশে ঝাপসা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ফ্যাকাশে আন্দোলন চালিয়ে যান। অধিকাংশই পৃথিবীর বাস্তবতায় নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। তাই করতে গিয়ে ধীরে ধীরে তাদের দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত ঐতিহাসিক বস্তুবাদী তত্ত্বের লেজ খসে পড়ে; কাল্পনিক সাম্যবাদী তত্ত্বের লোম ঝরে যায়; মাথায় শুধু থেকে যায় ইসলাম বিদ্বেষের শিং, নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে টিকে থাকতে সেটার গুরুত্ব অপরিসীম। এভাবে বিবর্তিত হয়ে তাত্ত্বিক সমাজতন্ত্রী নতুন ফসল হিসেবে সাম্রাজ্যবাদীদের ঘরে ওঠে। এখন নতুন জীবনের রূপ- রস- গন্ধে, নতুন তত্ত্বের ডিগবাজিতে তাদের পথ- পন্থা বদলে যায়, একবিংশ শতাব্দির রাজনৈতিক ব্যবচ্ছেদে তাদের এক সময়কার শ্রেণীশত্রু বুর্জোয়া রাজনীতিকরা এখন তাদেরই রাজনৈতিক বন্ধু বনে যায়, আর বিবর্তিত সমাজতন্ত্রী তার দ্বান্দ্বিক চেতনার দাবি মেটাতে শত্রু হিসেবে বেছে নেয় সাম্রাজ্যবাদীদের ঘোষিত শত্রু ‘ইসলাম’ কে। এখনকার সময়ে ভোগবাদী ও বস্তুবাদী রাজনীতিক কিংবা বুদ্ধিজীবীদের আর আলাদা করে চিনবার উপায় নেই। ইসলাম বিদ্বেষই উভয়ের তথাকথিত প্রগতিশীলতা ও বুদ্ধিজীবীকার মূল সনদ। শুধু রাজনীতি নয় সমাজের যে ক্ষেত্রেই যাক্‌ না কেন এসব বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীরা তাদের তত্ত্বের বাকীসব চরিত্র হারিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে সুর মিলিয়ে ক্রমাগত মৌলবাদ বিরোধিতার নামে ইসলাম বিদ্বেষ ছড়ায় আর ইসলামের যে কোনো চিহ্ন দেখামাত্রই তাকে জোর গলায় ‘জঙ্গি’, ‘মৌলবাদী’ আখ্যা দিয়ে বিশ্ব পুঁজিপতিদের বাহ্বা কুড়ায়। সাংবাদিক ও কলামিস্ট সঞ্জীব চৌধুরীর ভাষায় ” আরো কয়েকটি দেশের মতো বাংলাদেশের কিছু সংখ্যক ‘মুক্তমনা’ সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মী শিখে ফেলেছেন যে, দাঁড়ি-টুপি ওয়ালা মুসলমানদের জঙ্গি বলে কষে গালি দিতে পারলে বিদেশি শক্তিমানদের দরবারে সুগন্ধি তামাক দিয়ে সাজানো কল্কে পাওয়া যায়।” বাংলাদেশে সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সত্যায়িত প্রগতিশীল ধারার পত্রিকাগুলোর কর্ণধার এক এক জন এমনি বিবর্তিত সমাজতন্ত্রী। পাশ্চাত্যের তোষণে, ভারতের পোষণে টিকে থাকা প্রগতিশীলতার প্রলেপ লাগানো বুদ্ধিজীবীদের অধিকাংশই এবং সাম্যবাদী তত্ত্বের শেষে গন্ধটুকু পর্যন্ত দূর করতে আধুনিকতার তেলে ভাজা তথাকথিত সুশীল সমাজও এ ধরনের বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত। কেউ কেউ নতুন পরিবেশের প্রতিযোগিতায় নিজেদের জন্য সুবিধাজনক স্থান বেছে নিতে চায় না বা পারে না। তারা অধিকাংশই স্থায়ীভাবে বুর্জোয়া রাজনীতির সাংস্কৃতির তল্পিবাহক হয়ে থেকে যায়। তারা নিজেদের মুক্তমনা, উদারপন্থী, সংস্কৃতিমনা হিসাবে সাজাতে গিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের ধ্যান-ধারণাগুলোকে নানা রূপে, ছন্দোবদ্ধ ছলাকলায় হাজির করে আর গাঁজার কল্কিতে বিপ্লবী টান দিয়ে এক সময়কার সাম্যবাদী রাজনীতির স্মৃতি রোমন্থন করে। এসব বিবর্তিত সমাজতন্ত্রীরা যেখানেই থাক তাদের একটি মাত্র মূল চরিত্র টিকে থাকে, আর তা হলো ইসলাম-বিদ্বেষ। কথায়, কাজে, লেখায়, তত্ত্বে, তর্কে, সবক্ষেত্রে তারা ইসলাম বিরোধিতা করে নিজেদের জ্ঞান গরিমার প্রকাশ ঘটায়।

    বিজয়ী সভ্যতাকে সাধারণ দৃষ্টিতে সব সময় অবিনাশী মনে হলেও পৃথিবীর ইতিহাস হচ্ছে সভ্যতার দ্বন্দ্ব ও তার মধ্যদিয়ে সভ্যতা পরিবর্তনের ইতিহাস। বস্তুবাদী সভ্যতার সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে গেলেও বহমান ভোগবাদী সাম্রাজ্যবাদী সভ্যতারও পতন অবশ্যম্ভাবী। পৃথিবীর মানুষের জন্য পরবর্তী সভ্যতা, জীবন ব্যবস্থা কী হবে? বর্তমান পৃথিবীর প্রেক্ষাপটে বলা যায় সেটা হবে ইসলাম। এটা শুধু বর্তমান পৃথিবীতে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক দৃশ্যমানতা থেকে নয় বরং আধিপত্যের শিখরে থাকা পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতার ধারক-বাহকদের ইসলামের প্রতি আচরণ থেকেই বুঝা যায়।

    WAR ON TERRORISM এর নামে সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামকেই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বেছে নিয়েছে। NATO’র সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল Willie Class এর ভাষায় “The alliance has placed Islam as a target for its hostility in place of the Soviet Union”। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন “The militants believe that controlling one country will Muslim masses, enabling them to overthrow all moderate governments in the region, and establish a radical Islamic empire that spans from Spain to Indonesia” এখানে Militants হিসেবে যাই বুঝানো হোক না কেন মার্কিন শক্তির মূল ভয়টা যে ইসলামি সভ্যতার পুনর্জাগরণের- প্রেসিডেন্ট বুশের ভাষায় যা স্পেন থেকে ইন্দোনেশিয়া ব্যাপী বিস্তৃত কট্টরপন্থী ইসলামি সাম্রাজ্য-তা সহজেই বুঝা যায় কিংবা প্রায় একই সময়ে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের দেয়া ভাষণ They demand the elimination of Israel; the withdrawal of all westerners from Muslim countries, irrespective of the wishes of people and governments; the establishment of effectively taleban states and sharia law in the Arab world en route to one caliphate of all Muslim nations – এখানেও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মূল ভয় ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান যা মূলত খিলাফত ব্যবস্থা যদিও ব্লেয়ার সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে সেটাকে তালেবান রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করেছেন। ইরাক হামলার পূর্বে দেয়া ভাষণে Donald Rumsfled বলেছিলেন Iraq would serve as the base of a new Islamic Caliphate to extend throughout the middle east which would threaten the legitimate government in Europe, Africa and Asia. This is their plan. They have said so. We made terrible mistake if we fail to listen and learn – এখানেও তাদের ইসলামি খিলাফতের উত্থানের ভয় স্পষ্ট। সাম্রাজ্যবাদীরা বুঝতে ও শুনতে ভুল করে নি। তারা তাদের সভ্যতার প্রধান শত্রু হিসেবে ক্রমবর্ধমান ও ক্রম উত্থানশীল ইসলামি সভ্যতাকে বেছে নিয়েছে। শুধু ভাষণে নয়, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বর্তমানে তার বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সর্বোপরি ক্রমাগত সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে মুসলিম দেশগুলোতে। আর এ কাজে তারা যথারীতি তাদের কাছে সদ্য পরাজিত বস্তুবাদী সভ্যতার নেতা-কর্মীদের যথাযথভাবে ব্যবহার করে যাচ্ছে। বস্তুবাদীদের- নিজেদেরই উদ্ভাবিত তত্ত্বানুযায়ী- তাদের সাথে পুঁজিবাদীদের মূল বিরোধিতা যেহেতু অর্থনৈতিক, কাজেই সাম্রাজ্যবাদীরা খুব সহজেই তাদের এসব দুর্বল শত্রুদের মুসলিম দেশগুলোতে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিপত্তি বজায় রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে এবং সেটাই করে তারা এসব দেশের পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সমাজ কাঠামোর Immunity বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বের রাজনীতির বাস্তবতায় সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদীদের নতুন শত্রু ইসলামের মোকাবিলায় সাম্রাজ্যবাদীদেরই দেয়া ভ্যাকসিন হিসাবে কাজ করছে (ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে মূলত নির্দিষ্ট জীবাণুকে মৃত বা দুর্বল করে মানুষের শরীরে প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় যা ঐ মানুষের শরীরের Immunity বাড়িয়ে দেয় ফলে পরবর্তীকালে শক্তিশালী অ সক্রিয় জীবাণু ঐ শরীরে বংশ বিস্তার করতে পারে না)। পুঁজিতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদীরা একসময় তাদের শত্রু সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য তৎকালীন তালেবান সরকারকে সহযোগিতা করেছিল, এখন তারা বিশ্বব্যাপী ইসলামের রাজনৈতিক উত্থানকে স্তব্ধ করার জন্য বস্তুবাদী রাজনীতির নেতা কর্মীদের, তাদের জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে, ব্যবহার করছে। এই কথাটাই বুঝা যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিগানের বক্তব্য থেকে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের প্রাক্কালে ১৯৮৯ সালে দেয়া সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে তৎকালীন এই বিদায়ী প্রেসিডেন্টকে যখন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের পর এই মতাদর্শের কর্মীদের নিয়ে মার্কিন পরিকল্পনা বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হয়: What about activists? রোনাল্ড রিগান বলেছিলেন “We will feed them, we will keep them alive. They will help us to fight with radicals as like radicals help us to fight the”।

    সুগন্ধি তামাকের কল্কেতে যাদের আসক্তি ধরে গেছে, তথাকথিত প্রগতিশীলতার রসে যারা মজে গেছে, সুশীল, বুদ্ধিজীবী সীল গায়ে লাগানোর কিংবা টিকিয়ে রাখার স্বপ্নে যারা বিভোর হয়ে আছে তারা ভারতীয় আধিপত্যবাদের হাতিয়ার হয়েই থাকবে। তারা সাম্রাজ্যবাদীদের দোসর হিসেবে ক্রমাগত মৌলবাদের গন্ধ খুঁজে বেড়াবে। কিন্তু যে বাম রাজনীতি এক সময় গণমানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সেখানে কি এখনো সৎ ও সচেতন নেতা-কর্মী নেই? যারা শত্রু-মিত্র নির্ণয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের পাতা ছক অনুসরণ করবে না, যারা শুধুমাত্র তত্ত্বে নয় উপস্থিত সমাজ ও বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় পরিবর্তনের সূত্র খুঁজে সঠিক পক্ষে অবস্থান নেবে?

    এটা ঠিক যে, সভ্যতা পরিবর্তনের অন্তর্নিহিত কারণ বৈষয়িক জ্ঞানের ভাণ্ডার নেই, ভাববাদী আদর্শের ভাবলুতায় নেই, সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় বিচারের জ্ঞান-গভীরতায়ও নেই এবং এটাও ঠিক যে এটা সমাজের উৎপাদন প্রক্রিয়া কিংবা উৎপাদনের হাতিয়ারের মধ্যেও নেই। বরং তা নিহিত থাকে পরিবর্তনশীল সমাজের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান মানুষ, জীবন ও জগৎ-সংসার সম্পর্কে ক্রিয়াশীল ধারণার মধ্যে এবং তার উপরই নির্ভর করে অর্জিত হয় বৈষয়িক জ্ঞান, গড়ে ওঠে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ, চিহ্নিত হয় শত্রু-মিত্র, নির্ধারিত হয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার রূপরেখা, ঠিক হয় উৎপাদনের হাতিয়ারসহ সকল বস্তুগত অধিকরণের নিয়ম নীতি আর অধিকারীর কর্মকাণ্ড ও আচার-আচরণ। বস্তুবাদীরা যখন বলেন “The final causes of social changes and political revolution in society are to be sought, not in men’s brain, not in means better insight into eternal truth and justice, but in the means of production and exchange (Engels)” – সেটাও মূলত তাদের বস্তুবাদী দর্শন থেকে উদ্‌গত সমাজ পরিবর্তনের তত্ত্ব। বস্তুবাদী দর্শন-ই বস্তুবাদী সভ্যতার রূপরেখা, নিয়ম-নীতি, সমাজ-কাঠামো, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি ঠিক করে দেয়। একইভাবে পুঁজিতান্ত্রিক ভোগবাদী সভ্যতা ও তার সমাজের রূপরেখা, নিয়মনীতি, সমাজ কাঠামো, ন্যায় অন্যায়ের বোধ ঠিক করে দেয়। মানুষ, জীবন ও জগৎ-সংসার সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণা ও তার ভিত্তিতে তৈরী সমাজ-কাঠামো, নিয়ম-নীতি, ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি, সামাজিক সম্পর্কের সূত্র, সাংস্কৃতিক উপরি-কাঠামো, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কার্য-কলাপের পথ পন্থা- এ সবকিছুই ‘ইসলাম’ তার নিজস্বতার ভিত্তিতেই দেয়। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের কথিত ‘Evil Empire’ হিসেবে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার পতনের পর তার উত্তরসূরী বুশ-ব্লেয়ারদের চিহ্নিত নতুন ‘Evil Ideology’ হচ্ছে উদীয়মান জীবনাদর্শ ইসলাম। এই বোধটুকু বুঝে, শুনে, নিরপেক্ষ চিন্তা ভাবনায়, বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় আনতে গেলে বস্তুবাদীদের বেশ খানিকটা সৎ সাহসের দরকার আছে। আর সেটাকে উপেক্ষা করে শুধু ইস্যু ভিত্তিক কিছু কর্মসূচী বাস্তবায়ন করার মধ্যদিয়ে যদি তারা আশা করেন যে, একসময় সাম্রাজ্যবাদ দূর হয়ে বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনা, সমাজ কাঠামো তৈরি হয়ে যাবে তাহলে তা ঘোড়ার আগে গাড়ী জুড়ে দেয়ার মতো হবে এবং তাতে আঞ্চলিক আদিপত্যবাদী, বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের দেয়া নানান খেতাবে, ‘লোকে যাতে বুদ্ধিমাসন বলে হঠাৎ ভ্রম করতে পারে’ এতটুকু বুদ্ধির জোরে খেতাব দাতাদের যথেষ্ট উপকার করা হবে কিন্তু দেশ ও দশের মুক্তির দিক নির্দেশনা দেয়া যাবে না।

  • বিশ্ববাসীর উপর আমেরিকার গুপ্তচরবৃত্তি

    বিশ্ববাসীর উপর আমেরিকার গুপ্তচরবৃত্তি

    কিছুদিন পূর্বে সি.আই.এ (central intelligence agency) এবং এন.এস.এ (national security agency) এর সাবেক পরামর্শক এডওয়ার্ড স্লোডেন কর্তৃক ফাঁস করা তথ্যের মাধ্যমে জানা যায় যে আমেরিকা সারা বিশ্বের সাধারণ নাগরিকদের ব্যাক্তিগত ইমেইল, ছবি, ফোনালাপ এবং তাদের পাঠানো ক্ষুদ্র বার্তার (SMS) উপর গোপন নজরদারি করার জন্য প্রিজম (PRISM) নামে একটি গোপন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের এই ঘৃণ্য কর্মসূচির জন্য আমেরিকা শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সবার কাছ থেকে কঠিন প্রতিবাদের মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী আমেরিকার নানা অপকর্মের দোসর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর জাস্টিস কমিশনার আমেরিকার এ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে একটি প্রতিবাদ লিপি পাঠায়, যেখানে সে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর নাগরিকদের ব্যক্তিগত অধিকার সুরক্ষা সম্পর্কিত সাতটি প্রশ্নের উত্তর দাবি করে। তাছারা চীনও আমেরিকার এই ঘৃণ্য দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। চীনের একটি জাতীয় দৈনিক (The China Daily) চীনের পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লী হেইডং (Li Haidong) এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, “দীর্ঘদিন যাবত আমেরিকা চীনকে ইন্টারনেট ভিত্তিক গুপ্তচরবৃত্তির জন্য দায়ী করে আসছে। কিন্তু এখন এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো এই আমেরিকা সরকারের লাগামহীন ক্ষমতা।”

    প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বভাবসুলভভাবেই এই কর্মসূচির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছে বিশ্ববাসীর উপর নজরদারি করার অধিকার তার সরকারের রয়েছে, কারণ আমেরিকার জনগণকে সন্ত্রাসবাদের হুমকি থেকে রক্ষা করা তার সরকারের দায়িত্ব। ওবামার এই বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে আমেরিকার তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ কোন কিছুই অলঙ্ঘনীয় নয়। এবং এখন পুরো বিশ্বই আমেরিকার কপটতা ও দ্বিমুখী আচরণে অতিষ্ঠ এবং চরমভাবে বিরক্ত।

    সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ মূলতঃ পুরো বিশ্বের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ। এর আওতায় আমেরিকা যেখানে খুশি এবং যার উপর খুশি গোপন নজরদারি করে চলেছে। এক্ষেত্রে তারা শত্রু কিংবা মিত্র তোয়াক্কা করছে না, কোন আইন তারা মানছে না এবং মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করে চলার অধিকারকেও বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়েছে। বস্তুতঃ এর ফলে দেশে কিংবা দেশের বাইরে কেউই প্রকৃত নিরাপদ কিংবা স্বাধীন নয়।

    ২০০৯ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী আমেরিকা ৬১,০০০ হ্যাকিং অপারেশন পরিচালনা করেছে। এর জবাবে মুসলিম বিশ্বের শাসকরা বরাবরের মতই নিরবতা পালন করে। তাদের এই নিরব দর্শকের ভুমিকা কোন অংশেই আমেরিকার প্রিজম কর্মসূচির চেয়ে কম জঘন্য নয়। কারণ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধের মূল প্রতিপক্ষ হলো মুসলিমরা। আর তাই আমেরিকার এই গোপন নজরদারি কর্মসূচির মূল লক্ষবস্তু হলো মুসলিম বিশ্ব এবং বিশেষতঃ রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান ঠেকানো। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের ‘শাসকেরা’ হলো পশ্চিমাদের দাস, আমেরিকার দুর্গন্ধযুক্ত পঁচা আদর্শের অনুসারি ক্রীড়নক, বিশ্বব্যাপী তাদের মিথ্যা বুলির মুখপাত্র এবং ইসলাম ও মুসলিমদের শত্রু। এ কারণেই মুসলিমদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় আমেরিকার এই হিংস্র থাবা সত্ত্বেও তাদের নিরবতা কোন আশ্চর্যজনক ঘটনা নয়। এই মেরুদন্ডহীন ‘শাসকরা’ ইতিমধ্যে আমেরিকা কর্তৃক তাদের আকাশ সীমার উপর দখল মেনে নিয়েছে, যেখানে মালি, ইয়েমেন, সুদান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক ও অন্যান্য মুসলিম ভূখন্ডে চালকবিহীন ড্রোন ব্যবহার করে আমেরিকা সাধারণ নিরস্ত্র মানুষদের পাখির মত হত্যা করে চলেছে। এই নির্লজ্জ, বেহায়া ‘শাসকরা’ একত্রে জড়ো হয়ে আমেরিকার খাতিরে ইসলামের পূণ্যভূমি আল-শাম এ খিলাফতের উত্থানকে ঠেকানোর জন্য সিরিয়ার মুসলিমদেরকে নির্বিচারে হত্যা করার পক্ষে মত দিয়েছে। আর তাই যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের শাসকরা তাদের নিজেদের জনগণের অধিকার রক্ষার ব্যাপারে সোচ্চার সেখানে মুসলিম বিশ্বের শাসকদের এহেন নিরবতা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

    আমরা জানি, বিজয় সুনিশিচতভাবে আল্লাহ্‌’র পক্ষ থেকেই আসে এবং বিশ্ববাসীর উপর আমেরিকার এই অত্যাচারী আগ্রাসনের অবসান খুবই নিকটে। সুতরাং খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের প্রচেষ্টাকে বেগবান করতে হবে এবং আমাদের রক্ষক হিসেবে একজন খলীফাকে নিয়োগ করতে হবে যিনি আমাদের শত্রুর বন্দুকের নল এবং ক্ষেপনাস্ত্রের নিশানা থেকে রক্ষা করবেন। যিনি আমাদের মর্যাদা, সম্মান ও আবাসস্থলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবেন এবং আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করবেন। আমাদের মুসলিম ভাই যারা পৃথিবীর বুকে ইসলামকে আবার ফিরিয়ে আনার জন্য সংগ্রাম করছে, তাদের সাথে আমাদের আহ্বান ও প্রচেষ্টাকে একত্রিত করে বলতে হবে: “আমাদের এই কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ্‌’র জন্য, আমাদের এই কাজ শুধুমাত্র আল্লাহ্‌’র জন্য।” এবং “আপনি ছাড়া আমাদের আর কোন সাহায্যকারী নেই, হে আল্লাহ্‌!

    আসুন খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি যাতে করে কুফরের অন্ধকার থেকে বের হয়ে, ইসলাম ও ন্যায়পরায়ণতার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আবার পৃথিবীর নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারি।

  • একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই উচ্চমানের নারী শিক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে

    একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই উচ্চমানের নারী শিক্ষা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনবে

    পশ্চিমা সরকারসমূহ মালালার নারী শিক্ষার সংগ্রামের ঘটনাটিকে ঔপনিবেশিক রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করেছে

    ২০১২ অক্টোবর মাসে ১৫ বছরের পাকিস্তানী কিশোরী মালালা ইউসুফযাই এর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে হতভম্ব ও মর্মাহত করেছে। বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, পশ্চিমা সরকার ও রাজনীতিবীদরা ফলাও করে একথা প্রচার করে যে, পাকিস্তানে ইসলামপন্থীরাই এ হত্যা চেষ্টার জন্য দায়ী। এবং পশ্চিমা শক্তি নারী অধিকার ও নারী শিক্ষার পক্ষে যুক্তি স্থাপন করে। প্রাক্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ও জাতীসংঘের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিষয়ক বিশেষ দূত গর্ডন ব্রাউন, জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এবং প্রাক্তন মার্কিন পররাষ্টমন্ত্রী হিলারী ক্লিন্টনসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ ও বিভিন্ন সংগঠন নারী শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিশ্বের দরবারে  উপস্থাপনের জন্য তার এ সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানায়। এ বছরের ১২ জুলাই জাতিসংঘের সদর দপ্তর নিউইয়র্কে মালালাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যেখানে তরুণ সমাজের উপস্থিতিতে সে প্রতিটি শিশুর বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার ও এর গুরুত্ব তুলে ধরে।

    পাকিস্তানসহ সমগ্র বিশ্বে নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা একটি মহতী প্রচেষ্টা। কিন্তু এ মহতী উদ্যোগের বদলে নির্লজ্জভাবে পশ্চিমা সরকারসমূহ, তাদের তাঁবেদার সংস্থা ও রাজনীতিবিদরা মেয়েটির জীবন সংগ্রাম ও হত্যাচেষ্টার ঘটনাকে ব্যবহার করে নিজেদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থে মুসলিম নারী সমাজে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থী মতবাদের প্রচার ও তাদের ইসলামী জীবনাদর্শ ও পরিচয়কে দুর্বল করার লক্ষ যে কাজ করছে। কিন্তু যেখানে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, তুরস্ক ও উজবেকিস্তানের মতো ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে নারী ও শিশুরা শুধু তাদের ইসলামী পোষাক হিজাব ও নিকাব পরিধান করার কারণে বিদ্যালয়ে যাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, সেখানে মালালাকে সমর্থন ও মুসলিম নারীদের শিক্ষার অধিকার নিয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয় বৈকি। ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের রায়ের ফলে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে শিক্ষার অধিকার বঞ্চিত ফ্রান্স ও তুরস্কের মুসলিম নারীদের পক্ষে এইসব ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও রাজনীতিবিদ কেন তাদের বলিষ্ঠ কন্ঠ ব্যবহার করে না?

    পশ্চিমারা মালালার ঘটনাটিকে ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে বহুল প্রচলিত ঠুনকো অভিযোগ অর্থাৎ ইসলাম নারীদের অধিকার বঞ্চিত করে তাদের নির্যাতন করে এটি প্রচারে ব্যবহার করছে। এবং এটাও প্রচার করছে যে, মুসলিম নারীদের এখন পশ্চিমা ধাঁচের নারী মুক্তি প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে তারা দশকের পর দশক ধরে এসব মিথ্যে প্রচারণা চালিয়ে আসছে যেন মুসলিম বিশ্ব তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন থাকে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঠেকাতে, যা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইসলাম নয়, বরং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী পররাষ্ট্রনীতিই পাকিস্তানসহ অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের নারীদের অমূল্য শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে। পাকিস্তান,  আফগানিস্তানসহ সমগ্র অঞ্চলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আগ্রাসন, উপর্যুপরি বোমা ও ড্রোন হামলায় বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার নারী শিশু হত্যা করা হচ্ছে, যা উক্ত অঞ্চলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘ কমিটি তাদের শিশু অধিকার বিষয়ক রিপোর্টে উল্লেখ করে “২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বিচার আক্রমণ ও বিমান হামলায়” শত শত শিশু নিহত হয়েছে। এসব শিশুদের অধিকার তাহলে কোথায়? এটা পরিস্কারভাবে বোঝা যায় যে, এদের মৃত্যু এ অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থ নিশ্চিতকরণে গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া হয়েছে। এসব হামলা ও আগ্রাসন এ অঞ্চলে এমন এক নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীল পরিবেশের জন্ম দিয়েছে, যেখানে অপরাধ, খুন, ধর্ষণ, অপহরণ এসব নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে ভীত সন্ত্রস্ত পিতা-মাতা তাদের মেয়েদের বিদ্যালয়ে এমনকি বাড়ির বাইরে বের হতে দিতে সাহস পাননা। কিভাবে নিরাপত্তাহীন, লাশের স্তুপ, ধ্বংসযজ্ঞ ও যুদ্ধকবলিত একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য একটি সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে? আগ্রাসী শক্তির দখলে যাওয়ার ১০ বছর পরেও আফগানিস্তানের প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে ৯ জনই অশিক্ষিত। এই হচ্ছে সেই পশ্চিমা ধ্বংসাত্মক পররাষ্ট্রনীতির নমুনা, যা মুসলিম নারীদের কাছ থেকে শুধু শিক্ষার অধিকার নয়; বরং তাদের সম্মান, নিরাপত্তা, এমনকি জীবনকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

    শুধু তাই নয়, পশ্চিমা সমর্থিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারগুলো মুসলিম বিশ্বে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ও বিনোদন শিল্প এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে উদার সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। এ উদার সংস্কৃতি নারীকে যৌন কামনা পূরণের পণ্য হিসাবে উপস্থাপন করে ও নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার পথ সুগম করে নারীদের মর্যাদা ভূলুন্ঠিত করেছে; বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও মিশরের মতো মুসলিম জনবহুল রাষ্ট্রে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী, ও অপহরণের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিস্তার ঘটিয়েছে। নিরাপত্তার অভাবে অনেক নারী শিশু শিক্ষার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হতে সাহস পায়না।

    পাশাপাশি পশ্চিমা ত্রুটিপূর্ণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে। সুদসহ ঋণের ভারে জর্জরিত এসব রাষ্ট্র কোন ধরনের অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে অক্ষম, কারণ তাদের জাতীয় আয়ের বেশিরভাগ ব্যয় হয় সুদসমেত ঋণ পরিশোধে; শিক্ষা, স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে বরাদ্দ দেবার মতো আর্থিক সঙ্গতি দেশগুলোর নেই। ফলশ্রুতিতে দেশগুলো অপর্যাপ্ত বিদ্যালয়, মানসম্মত শিক্ষায় প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠী ও তাদের আইএমএফের মতো সংগঠনগুলোর নীতি এবং অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থায় অনীহার কারণে বহু অভিভাবক অনিচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের ছেলে ও মেয়ে সন্তানের মাঝে বৈষম্য করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই এটা কোন আশ্চর্যের ব্যপার নয় যে পকিস্তানের প্রায় ৬০% এবং বাংলাদেশ ও মিশরের প্রায় ৫০% নারীই শিক্ষার আলো হতে বঞ্চিত।

    সুতরাং, প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ও পররাষ্ট্রনীতিই মুসলিম বিশ্বে নারী শিক্ষার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

    নারী শিক্ষার বিষয়ে ইসলামে সুষ্পষ্ট নীতি রয়েছে। নিম্নোক্ত হাদীস অনুসারে মুসলিম নারীদের জন্য ইসলাম ও জীবন সম্পর্কে বিদ্যার্জন বাধ্যতামূলক। রাসূল (সাঃ) বলেন, “সকল মুসলিম নর-নারীর ওপর জ্ঞানার্জন করা ফরয।” ইসলাম মুসলিম নারীদের পারিপার্শ্বিক ও বহিঃবিশ্বের যাবতীয় জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসূল (সাঃ) এর স্ত্রী হযরত আয়েশা (রা.) শুধু ইসলামী চিন্তাবিদই ছিলেননা; বরং তিনি ছিলেন একাধারে চিকিৎসাশাস্ত্র, সাহিত্য ও অন্যান্য সাধারণ বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানের অধিকারী। শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কে জ্ঞানার্জনে উৎসাহিত করার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে উন্নতির পাশাপাশি সমগ্র বিশ্বে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও নারী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা একমাত্র সেই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব যা ইসলামের বিশ্বাসের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রের সংবিধানই প্রকৃতভাবে কুর’আন ও সুন্নাহ্‌’র আলোকে প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের বিধান অনুযায়ী খিলাফত রাষ্ট্র শিক্ষাখাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করবে এবং নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল শিক্ষার্থীর উচ্চ শিক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করবে। এটি ইসলামী বিধি ও অনুশাসন মেনে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে, সেখানে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত উচ্চশিক্ষিত নারী শিক্ষিকা দ্বারা স্কুল পরিচালিত হবে। খিলাফত শাসনব্যবস্থা নারীদের ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী করে গড়ে তোলার পাশাপাশি চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, বিচারক, শিক্ষিকা ইত্যাদি পেশায় উদ্বুদ্ধ করবে। আর এসব কিছুর পেছনে ব্যয় বরাদ্দ করবে খিলাফতের শক্তিশালী অর্থনীতি, যেখানে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে এবং সকল নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকার হিসেবে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

    শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা আর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র নারীকে তার শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে এমন যেকোন ভ্রান্ত ধারণা সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন করবে। সবশেষে খিলাফত রাষ্ট্রই শারী’আহ্‌ আইনের ভিত্তিতে ইসলামী সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তুলবে যেখানে নারীরা মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে, তাকে কখনও অবমূল্যায়ন করা হবেনা, পুরুষ তাকে নিজের অভিলাষের ভিত্তিতে নয় বরং সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখবে যার ফলে সমাজে এমন পরিবেশ নিশ্চিত হবে যেখানে নারী ও শিশুরা নিরাপদে পড়াশুনার জন্য ঘরের বাইরে যেতে পারে এবং তাদের কোন প্রকার অধিকার বিন্দুমাত্র ক্ষুন্ন হলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে। নারী শিক্ষার প্রসারে ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে খিলাফত রাষ্ট্র এসকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

    একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থার অধীনেই নারী শিক্ষার ইতিহাস এত সমৃদ্ধ হয়েছিল, যেখানে মারিয়াম আল ইস্তিরলাবী মতো মনীষী ১০ম শতাব্দীতে সূর্য ও নক্ষত্রের অবস্থান নিরুপণে নক্ষত্রবিদ্যা উন্নয়নে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। খিলাফত ব্যবস্থা সৃষ্টি করেছে ফাতিমা আল ফিহ্‌রী মতো প্রকৌশলী, যিনি মরোক্কোতে বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় কারাওইন নির্মান করেন। এমন আরো হাজার হাজার নারী চিন্তাবিদ রয়েছেন, যাদের সম্পর্কে বর্ণনা পাওয়া যায় মোহাম্মদ আকরাম আন-নদভীর ৪০ খন্ডের বইয়ে। এতে তিনি খিলাফতের সময়কার ৮,০০০ মুসলিম নারী চিন্তাবিদের জীবনী তুলে ধরেছেন। এই সত্যিকার ইসলামী ব্যবস্থায় কায়রোর বিখ্যাত আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে নারীরা শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছেন, যেই অধিকার পেতে পশ্চিমা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীদের আরো বহু শতাব্দী অপেক্ষা করতে হয়। বহু ইসলামী কলেজসমূহে আজকের পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তুলনায় অধিক সংখ্যক নারীরা শিক্ষিকা হিসেবে অবদান রেখেছেন। একমাত্র ইসলামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে এসব সম্ভব হয়েছে। খিলাফতই সেই রাষ্ট্র যেখানে সত্যিকার অর্থে নারীর শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠিত ছিলো এবং গঠনমূলক ও চমৎকার একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে খিলাফত ব্যবস্থা নারী শিক্ষার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে, ইন্‌শা’আল্লাহ্‌।

    প্রিয় ভাই ও বোনেরা, মালালা নাটকের পান্ডুলিপি পশ্চিমা ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক রচিত হয়েছে মুসলিম বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ ও তাদের ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা মহিলাদের অধিকার রক্ষার জন্য এটা করছে না। তারা এ অঞ্চলে যে শিক্ষা বিস্তার করছে তা একনিষ্ঠ নয় বরং তাদের উদার, ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ বিস্তারের জন্য, যা আমাদের যুব সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছে এবং যা  কঠোরভাবে বর্জন করা উচিৎ। আমাদের ইসলামের মূল ভিত্তি ও খিলাফত ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে নারী শিক্ষার উন্নয়ন ও তাদের আল্লাহ্‌ প্রদত্ত অধিকার সমূহ নিশ্চিত করা সম্ভব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহ্‌’র নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ্‌ তার নূরকে প্রজ্জ্বলিত করবেনই যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আস সফ্‌ : ০৮]

    ২০ রমজান, ১৪৩৪ হিজরী
    ২৯ জুলাই ২০১৩, খ্রিস্টাব্দ

  • সিরিয়ার গণজাগরণ কেন ভিন্ন?

    সিরিয়ার গণজাগরণ কেন ভিন্ন?

    গত ২৬ মাসে সিরিয়ায় যা ঘটেছে তা থেকে এটি প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, সিরিয়ার গণজাগরণ ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত অন্য সবগুলোর মত নয়, বরং এটি একটি অনন্য গণজাগরণ।

    বর্তমানকে অনুধাবন ও ভবিষ্যতের আশাবাদের জন্য অতীতের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। সিরিয়ার গণজাগরণের বর্তমান বাস্তবতা ও অবস্থা বুঝতে একজন সক্ষম হবে না, যদি না সে সেই ইতিহাসকে অনুধাবন করে যা গণজাগরণ শুরু হওয়ার গতিপ্রকৃতিকে নির্ধারণ করেছে।

    প্রথম মহাযুদ্ধ : বিভক্তি ও আধিপত্য বিস্তার

    সর্বশেষ বৈধ ইসলামী রাষ্ট্র উসমানীয় খিলাফত প্রথম মহাযুদ্ধে মিত্র বাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর বিজয়ীরা, বিশেষতঃ ব্রিটেন ও ফ্রান্স মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক এ কারণে যে, ইতিহাসে প্রমবারের মত সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে এর প্রতিপক্ষ আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়। ইউরোপীয় শক্তিসমূহ মুসলিম বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপন করে এবং মুসলিম ভূমিসমূহকে ‘বিভক্তি ও আধিপত্য বিস্তারকরণ’ কৌশলের আওতায় বিভক্ত করে।

    আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া)-কেও বিভক্ত করা হয়। সিরিয়া ও লেবাননকে দু’টি ভিন্ন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় যখন জর্ডান ও ফিলিস্তিনকে (যা পরবর্তীতে ইহুদীদের দ্বারা দখলকৃত) বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং নতুন জাতিরাষ্ট্রের পৃথক সীমান্ত রেখাসমূহ তৈরী করা হয়।

    এ সময়টি ছিল একটি যুগের শেষ ও অন্য একটি যুগের শুরু। দু’টি বাস্তবতা দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত নতুন যুগকে পশ্চিমারা আজকে পর্যন্ত ধরে রেখেছে এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে যতদিন ধরে রাখা যায়। প্রথমটি হল শাসনব্যবস্থা হিসেবে শারী’আহ্‌’র অপসারণ এবং সাধারণভাবে মুসলিমদের উপর পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ আইনের প্রয়োগ, আর বিশেষতঃ সিরিয়া এখানে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু।

    দ্বিতীয়টি হল সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে আধিপত্য ও শোষণ অর্থাৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একধরনের পরোক্ষ উপনিবেশবাদ জারি রাখা। নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রাখার জন্য এগুলো ছিল কৌশলগত লক্ষ্য – যা ইসলামের উপর পশ্চিমাদের আধিপত্য ও স্বার্থকে সুনিশ্চিত করে। দালাল শাসকদের উপর প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করার মাধ্যমে অথবা নতুন বিশ্বব্যবস্থার ধারক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেমন: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং বিশ্বব্যাংক এর মাধ্যমে এ বাস্তবতা ধরে রাখা হয়।

    সে কারণে ১৯৪৬ সালে সিরিয়া থেকে ফরাসি সৈন্য সরিয়ে নেয়া ও একই বছর তথাকথিত স্বাধীনতা ঘোষণা করা খুব বেশি গুরুত্ব বহন করে না। কেননা, যদিও ফ্রান্স বাহ্যিকভাবে সিরিয়া পরিত্যাগ করে, কিন্তু চাপিয়ে দেয়া দালাল শাসকের মাধ্যমে সরাসরি প্রভাব বজায় রাখে।

    সিরিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা

    ১৯৪৬ সাল থেকে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ প্রাধান্য বিস্তার ও স্বার্থরক্ষার জন্য ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে এ প্রতিযোগিতায় সিরিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখন্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৭১ সালে আমেরিকার সমর্থন নিয়ে আসাদ পরিবার ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো মিলিটারী ক্যু এর মাধ্যমে সিরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা চালায়। যদিও আসাদ পরিবারের শাসন আমলে পিতা-পুত্র উভয়ই ফাঁকা বুলির মত প্রচার করেছে যে, তারা ‘ইসরাইল ও আমেরিকা বিরোধী’, কিন্তু তাদের কথার সাথে কাজের ভিন্নতাই বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। এ কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের কখনওই কথা নয় বরং কর্মকান্ডকেই অধিকতর বিবেচিত বিষয় হিসেবে দেখা উচিত।

    আসাদের শাসনামলের বাস্তবতা

    আসাদ পরিবারের শাসনামলে সিরিয়া ছিল ভয়, নিষ্ঠুরতা ও দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ। আসাদ সরকার বাথ পার্টি, গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনীর মাধ্যমে পুরো জাতির উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখত। সরকার সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে নিষিদ্ধ করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের উপর দমন নিপীড়ন চালায় – বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনসমূহ দমন নিপীড়নের বেশি শিকার হয়। অব্যাহত ইসরাইলি আক্রমণ ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সংযম অবলম্বন ও ফাঁকা বুলির মাধ্যমে কপট রাগের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেও নিজের জাতির বিরুদ্ধে সামান্যতম অসন্তুষ্টি প্রকাশের কারণে দমন নিপীড়ন চালানোর ক্ষেত্রে আসাদ সরকার ছিল বেশ তৎপর। ১৯৮২ সালে কুখ্যাত হামা গণহত্যার মাধ্যমে সিরিয়ার মুসলিমদের বিরুদ্ধে আসাদ সরকার সবচেয়ে পাশবিক আক্রমণটি চালায়, যেখানে ৪০,০০০ লোককে হত্যা করা হয়েছিল।

    আরব বসন্ত

    আরব বিশ্বের সাধারণ জনগণের ফুঁসে উঠাই ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ শ্লোগাণ ছিল, ‘উম্মাহ্‌ এ শাসনের পতন চায়’। আর এটি থেকে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, প্রথম মহাযুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের উপর যে বাস্তবতা চাপিয়ে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে এ উম্মাহ বিদ্রোহ করেছে এবং তারা এর আমূল পরিবর্তন চায়। আরব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এ আন্দোলন এ অঞ্চলে পশ্চিমাদের কৌশলগত স্বার্থের প্রতি ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    তবে পশ্চিমারা তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া ও ইয়েমেনে গণজাগরণের উত্তাল ঢেউ-এর লাগাম টেনে ধরে বসেছিল এবং দাবি করছিল তারাও সেসব দেশের জনগণের দাবির সাথে একমত পোষণ করে – যদিওবা তারাই (পশ্চিমারা) দশকের পর দশক ধরে অত্যাচারী শাসক ও দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। তারই ফলশ্রুতিতে পশ্চিমারা এসব গণআন্দোলনকে ছিনতাই করতে ও প্রাণান্তকর (?) প্রচেষ্টায় কিছু বাহ্যিক (কসমেটিক) পরিবর্তনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সমর্থ হয়। কিন্তু আজকে সেসব দেশে যা ঘটছে তা হল, অব্যাহত বিরাজমান সামাজিক অস্থিরতা ও অসন্তুষ্টি – যা স্ব স্ব জাতিকে একথা ভাবতে বাধ্য করছে যে, তাদের বিপ্লব এখনও শেষ হয়নি।

    এখানে মূল কথা হল, পশ্চিমারা এসব গণআন্দোলনের উপর এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয় যে, তা এ অঞ্চলে পশ্চিমাদের কৌশলগত স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলতে পারেনি। আর এটি করা হয়েছে কসমেটিক পরিবর্তন করার মাধ্যমে – যা কেবল সমস্যার উপসর্গকে টার্গেট করেছিল, মূল সমস্যাকে নয়। উদাহরণস্বরূপ, মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে আমরা মোবারক ও তার পুত্রদের সম্পদ এবং তার শাসনামলের দুর্নীতির ব্যাপারে জানতে পেরেছি। এর দ্বারা রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারব্যবস্থার প্রকৃত পরিবর্তন নয়, বরং শুধু রাষ্ট্রপ্রধান তথা ব্যক্তি পরিবর্তনের দিকে জনগণের দৃষ্টিকে কেন্দ্রীভূত রাখা হয়।

    সিরিয়ার গণ-জাগরণ

    ১৫ মার্চ ২০১১ তারিখে ‘আরব বসন্ত’-এর ধাক্কা সিরিয়ায় পৌঁছে। অন্যান্য দেশের মত সিরিয়ার বিক্ষোভকারীরা আসাদ সরকারের নিপীড়নের হাত থেকে মুক্তির দাবি তোলে। আসাদ সরকারের নিপীড়নমূলক প্রকৃতি জানা থাকার কারণে কয়েক মাসের মধ্যে এ গণ-জাগরণ দমন করা যাবে-এ ব্যাপারে আমেরিকা আত্মবিশ্বাসী ছিল। ফলে সে সময় আমেরিকার কৌশল ছিল সিরিয়ার জাগরণকে পাত্তা না দেয়া এবং গণ-জাগরণকে দমন করার জন্য প্রচ্ছন্নভাবে তার আজ্ঞাবহ দালাল আসাদকে প্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করার একের পর এক সুযোগ করে দেয়া।

    তবে ঘটনা খুব দ্রুত গতিতে এগিয়েছে এবং কয়েক মাস পর সিরীয় সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈন্যদের মধ্য থেকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের উপর গুলিবর্ষণের নির্দেশ না মেনে পদত্যাগ করা শুরু হল। এ প্রবণতা আরও এগিয়ে যায় এবং পদত্যাগী সেনাসদস্যরা জাতিকে সরকারের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে Free Syrian Army (FSA) গড়ে তুলে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী পর্যায়ে অসংখ্য সশস্ত্র ব্রিগেড গঠিত হয়।

    মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ক্রমাগত সশস্ত্র ব্রিগেডগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ায় এ ব্রিগেডগুলো সমর্থিত সাধারণ সিরীয়দের হাতে দালাল আসাদের পতন হতে পারে-এ হুমকি বুঝতে পেরে আমেরিকা এই উত্তাল গণ-জাগরণের নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে নিরলস প্রচেষ্টা শুরু করে। অন্যান্য ‘আরব বসন্ত’ এর দেশগুলোর মত গণজাগরণের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে আমেরিকা নতুন এক কৌশলের আশ্রয় গ্রহণ করল। সেকারণে আমেরিকা Syrian National Coalition (SNC) গঠন, অতঃপর অন্তঃর্বর্তীকালীন সরকার গঠন ও আসাদ পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য নেতৃত্ব উপহার দেয়ার জন্য বিরোধী ব্যক্তিত্ব তৈরিতে সহায়তা করা শুরু করে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্টের সরে যাওয়ার পথকে সুগম করার জন্য আমেরিকা ‘ইয়েমেনি সমাধান’ এর দিকেও আহ্বান জানায়।

    কিন্তু বাস্তবে মাঠে যা ঘটে তা আমেরিকা ও পশ্চিমাদের জন্য ভয়ঙ্কর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। গণজাগরণ যতই এগুতে থাকল ততই সিরিয়ার জনগণ ও সশস্ত্র ব্রিগেডগুলোর শ্লোগাণ ও প্রকাশিত লক্ষ্য ক্রমাগতভাবে ইসলামি প্রকৃতির হতে থাকল। এটি সুস্পষ্ট হতে থাকল যে, সিরিয়ার মুসলিমগণ কেবল প্রেসিডেন্টের অপসারণ চান না। কেননা তা মূল সমস্যার উপসর্গ অর্থাৎ প্রতিদিনকার বঞ্চণা ও দুর্নীতি এর সমাধানকল্পে এটি একটি কসমেটিক পরিবর্তন। সে কারণে তারা পশ্চিমা প্রস্তাবনাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং পশ্চিমা সমর্থিত ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদলকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করল। এটি সুস্পষ্ট হতে থাকল যে, সিরিয়ার মুসলিমদের দাবি তাদের আক্বীদা ও উচ্চ রাজনৈতিক সচেতনতা থেকে উদ্ভূত। তারা অনুধাবন করতে পারল যে, মূল সমস্যা হল প্রম মহাযুদ্ধের পর চাপিয়ে দেয়া পশ্চিমা জীবনব্যবস্থা। আর তারপর থেকে যে সমস্যাসমূহ উদ্ভূত হয় তা ঐ মূল সমস্যার উপসর্গমাত্র। তারা আরও অনুধাবন করতে পারল যে, কেবলমাত্র ইসলামের মাধ্যমে তাদের বর্তমান সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। সে কারণে দক্ষিণে দেরা, রাজধানী দামেস্ক, পশ্চিমে হোমস, উত্তরে আলেপ্পো ও ইদলিব, পূর্বে আল রাকাসহ পুরো সিরিয়াব্যাপী অসংখ্য বিক্ষোভকারী খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানায়। প্রকৃত অর্থে, ইসলামী খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পর এই প্রথমবার মুসলিম বিশ্বের হাজার হাজার সাধারণ জনগণ খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানায়।

    সিরিয়ার মুসলিমগণের প্রতিরোধ ও দৃঢ়তা পুরো বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছে এবং পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কাছে আসন্ন পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সবচেয়ে অবাক হওয়ার বিষয় হল, গণজাগরণ চলাকালীন সময়ে আসাদ সরকার কর্তৃক ভয়াবহ গণহত্যা ও জঘন্য বর্বর অপরাধ সংঘটিত করার পরও সিরিয়ার মুসলিমগণ এমন কোন রাজনৈতিক সমাধানের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে – যা সরকার কাঠামোকে অক্ষত রেখে প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করবে, হত্যাকান্ডের অবসান ঘটাবে।

    সিরিয়ার গণজাগরণের ফলাফল যাতে কোনভাবেই খিলাফত প্রতিষ্ঠার দিকে না যায় এবং সিরিয়াসহ পুরো অঞ্চলজুড়ে পশ্চিমা আধিপত্য খর্ব না হয় সে জন্য আমেরিকা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছে। আসাদ সরকারকে সামরিক ও অবকাঠামোগতভাবে সাহায্য করতে এটি রাশিয়া ও ইরানের সাথে কাজ করছে এবং একই সময়ে তথাকথিত উগ্রবাদী শক্তিসমূহকে দুর্বল করতে সেলিম ইদরিসের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সমর্থিত Supreme Military Council কে শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে। এছাড়াও সিরিয়ায় শেকড় রয়েছে এমন একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানোর জন্য রাজনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে এ প্রচেষ্টা পূর্বে SNC এবং অতি সম্প্রতি ঘাসান হিট্টুকে অন্তঃর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।

    সিরীয় জাগরণের ভবিষ্যত

    বিগত ২৬ মাসে কমপক্ষে এক লক্ষ সিরীয় নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। তবে সিরীয় মুসলিমগণ খুব ভালভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে যে, এ পথে আরও ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রয়োজন। তারা আরও বুঝতে পেরেছে যে, এ সংগ্রামের প্রকৃতি হল একদিকে মুসলিম উম্মাহ্‌ সত্যিকারের মুক্তির জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং অন্যদিকে পশ্চিমাবিশ্ব মুসলিম বিশ্বে ব্যবস্থার পরিবর্তন নয় বরং চেহারার পরিবর্তন সুনিশ্চিত করতে চাচ্ছে যাতে করে মূল সমস্যা নয় বরং এর উপসর্গ মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।

    আরব বিশ্বে সংঘটিত হওয়া অন্যান্য গণজাগরণের মত না হওয়ায় সিরীয় গণজাগরণ অনন্য – যা সভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি মোড়। নবী (সাঃ) আল শামের ভূমি ও এর অধিবাসীদের বিষয়ে অনেকগুলো হাদীস উল্লেখ করেন – যেগুলোতে সে ভূমির রহমতপূর্ণ প্রকৃতি ও এর মুসলিমদের দৃঢ়তার কথা বিবৃত হয়েছে। তাছাড়া মুসলিমদের ইতিহাসে বর্ণিত আছে, এই বিশেষ ভূমিতে ক্রুসেডার ও মঙ্গলদের পরাজিত করে মুসলিমগণ তাদের হৃত শাসনক্ষমতা ও পুনঃজাগরণ ফিরে পায়।

    সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, শতাব্দীকালের উপনিবেশবাদ, লাঞ্ছণা এবং নিষ্ঠুরতাকে পেছনে ফেলে আল শামের মুসলিমগণ উম্মাহ্‌’র পুনঃজাগরণকে নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করতে পারবে তো?

    আনাস আলওয়াহ্‌ওয়াহ্‌
    মে, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দ

  • বৃটেন যেভাবে আরববিশ্বকে বিভক্ত করেছিল

    বৃটেন যেভাবে আরববিশ্বকে বিভক্ত করেছিল

    আরব বিশ্বজুড়ে জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টির প্রক্রিয়া ছিল এক মর্মান্তিক ঘটনা। একশো বছর আগেও অধিকাংশ আরব অঞ্চল উসমানী খিলাফতের অংশ ছিল। উসমানী খিলাফত ছিল একটি বিশাল বহুজাতিক রাষ্ট্র, যার কেন্দ্র বা রাজধানী ছিল ইস্তাম্বুল। বর্তমানে আরব বিশ্বের মানচিত্র খুবই জটিল একটি গোলকধাঁধার মতো মনে হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের কিছু জটিল ঘটনা উসমানী সাম্রাজ্যের পতন এবং নতুন জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটায়। নবসৃষ্ট এসব রাষ্ট্রের নিজস্ব সীমানা ছিল যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে বিভক্ত এবং মুসলিমদেরকে একে অন্যের থেকে আলাদা করে ফেলে। এই ঘটনার পেছনে অনেক কারণ থাকলেও, বৃটেনের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। সেইসময়ে বৃটেনের বিবাদমান ৩ পক্ষের সাথে সই করা ৩ টি আলাদা চুক্তিতে পরস্পর বিরোধী অঙ্গীকার ছিল। চুক্তিগুলোর ফলে মুসলিম বিশ্বের একটি বিশাল অংশ বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা:

    ১৯১৪ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। শত্রু-মিত্র নির্ণয়ের জটিল প্রক্রিয়া, অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, ঔপনিবেশিক বাসনা ও সরকারগুলোর উচ্চপর্যায়ে অব্যবস্থাপনা প্রভৃতি মিলিয়ে এই প্রয়লংকারী যুদ্ধের সূচনা ঘটায়। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে প্রায় ১.২ কোটি লোক প্রাণ হারান। যুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে ছিল বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া এবং অক্ষশক্তিতে ছিল জার্মানি ও অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি।

    প্রথমদিকে উসমানী খিলাফত নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কেননা তারা যুদ্ধরত জাতিগুলোর মত ততোটা শক্তিশালী ছিল না এবং নানা আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সমস্যায় আক্রান্ত ছিল। ১৯০৮ সালে শেষ শক্তিশালী খলীফা আব্দুল হামিদ দ্বিতীয় কে “৩ পাশা”(তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, যুদ্ধমন্ত্রী, নৌমন্ত্রী) উৎখাত করে এবং সামরিক শাসন জারি করে। এরপর থেকে খলীফা পদটি শুধুমাত্র প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হত। এই “৩ পাশা” ছিল ধর্মনিরপেক্ষ এবং পশ্চিমা ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী “তরুণ তুর্কী” গ্রুপের সদস্য। অন্যদিকে, উসমানীরা ইউরোপের নানা শক্তির কাছে বিরাট অঙ্কের ঋণের জালেও আবদ্ধ ছিল, যা তারা পরিশোধে অক্ষম ছিল। এই ঋণ থেকে মুক্তি পাবার লক্ষ্যে শেষপর্যন্ত ওসমানীয়রা এই বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ওসমানীয়রা প্রথমে মিত্রশক্তিতে যোগদানে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তীতে ১৯১৪ সালের অক্টোবরে অক্ষশক্তিতে যোগদান করে।

    এর ফলশ্রুতিতে, বৃটেন তৎক্ষণাৎ উসমানী খিলাফতকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করার এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের নীলনকশা করতে শুরু করে। বৃটেন ১৮৮৮ সাল থেকে মিশর এবং ১৮৫৭ সাল থেকেই ভারতকে দখল করে নিয়েছিল। উসমানী খিলাফতের অবস্থান ছিল ব্রিটেনের এই দুই উপনিবেশ এর ঠিক মাঝখানে। ফলে বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে উসমানী খিলাফতকে উচ্ছেদ করতে বৃটেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে ওঠে।

    আরব বিদ্রোহ:

    ব্রিটেনের অন্যতম বড় পরিকল্পনা ছিল উসমানী খিলাফতের আরব জনগণকে উস্কে দেয়া। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরব উপদ্বীপের পশ্চিমের এলাকা হিজাযের একজন ব্যক্তিকে তারা তৎক্ষণাৎ পেয়েও যায়। মক্কার গভর্নর শরীফ হুসেইন বিন আলী উসমানী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শর্তে বৃটেনের সাথে চুক্তি করে। শরীফ হুসেইন নিজের মুসলিম ভাইদের সাথে যুদ্ধ করার এই ব্রিটিশ পরিকল্পনায় কেন অংশ নিয়েছিলেন তার নিশ্চিত কারণ জানা যায় নি। সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে: ৩ পাশা কর্তৃক তুর্কী জাতীয়তাবাদ বাস্তবায়নের চেষ্টায় তার অসন্তোষ, উসমানী সরকারের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ অথবা নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার মনোবাসনা।

    যে কারণেই হোক না কেন, বৃটেনের সাহায্যপুষ্ট হয়ে শরীফ হুসেইন উসমানীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার প্রস্তুতি নিলেন। অন্যদিকে, বৃটেন বিদ্রোহীদেরকে টাকা ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়, কেননা টাকা ও অস্ত্র ছাড়া উসমানীদের সুসংঘটিত বাহিনীর সাথে পেড়ে ওঠা কষ্টকর ছিল। ব্রিটেন তাদের এও প্রতিশ্রুতি দেয় যে, যুদ্ধের পর শরীফ হুসেইনকে ইরাক ও সিরিয়া সহ গোটা আরব উপদ্বীপ মিলিয়ে একটি বিশাল আরব রাজ্য শাসন করতে দেয়া হবে। দুইপক্ষ (বৃটেন ও শরীফ) এর মধ্যকার এ সম্পর্কীয় আলাপ-আলোচনা ও দর কষাকষি বিষয়ক চিঠিগুলো ইতিহাসে McMahon-Hussein Correspondence (ম্যাকমেহন-শরীফ পত্রবিনিময়) নামে পরিচিত। এই ম্যাকমেহন হলেন মিশরের তৎকালীন ব্রিটিশ হাই কমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমেহন, যার সাথে শরিফের গোপন আঁতাত চলছিল।

    ১৯১৬ এর জুনে, শরীফ হুসেইন তার সশস্ত্র আরব বেদুঈনদের নিয়ে যুদ্ধে বেড়িয়ে পড়েন। কয়েক মাসের মধ্যেই বৃটিশ সেনা ও নৌবাহিনীর সহায়তায় আরব বিদ্রোহীরা মক্কা ও জেদ্দা সহ হিযাজের বেশ কয়েকটি শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। ব্রিটেন সৈন্য, টাকা, অস্ত্র, পরামর্শদাতা (যার মধ্যে অন্যতম ছিল বিখ্যাত “লরেন্স অফ এ্যারাবিয়া”), পতাকা দিয়ে বিদ্রোহীদের সহায়তা করে। মিশরে অবস্থানরত বৃটিশরা বিদ্রোহীদের একটি পতাকা বানিয়ে দেয় যা “আরব বিদ্রোহীদের পতাকা” নামে পরিচিত ছিল। এই পতাকা-ই পরবর্তীতে অন্যান্য আরব দেশ যেমন: জর্ডান, ফিলিস্তিন, সুদান, সিরিয়া, কুয়েতের পতাকা তৈরিতে মডেল (আদর্শ) হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯১৭ থেকে ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, আরব বিদ্রোহীরা উসমানীদের থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নিতে সক্ষম হয়। একদিকে বৃটেন বাগদাদ ও জেরুজালেম দখল করে ইরাক ও ফিলিস্তিনে তাদের অবস্থান জোরদার করে, অন্যদিকে আরব বিদ্রোহীরা আম্মান ও দামেস্ক দখল করে বৃটেনকে তাদের কাজে সাহায্য করতে থাকে। এখানে জেনে রাখা জরুরি যে, অধিকাংশ আরব জনগোষ্ঠীরই এই আরব বিদ্রোহে কোন সমর্থন ছিল না। এটি ছিল (ক্ষমতালোভী) কতিপয় নেতার নেতৃত্বাধীন একটি ছোট আন্দোলন যা ঐ নেতাদের নিজস্ব ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছিল। অধিকাংশ আরব জনগোষ্ঠী এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে এবং উসমানী বা বিদ্রোহী কোন পক্ষকেই সমর্থন দেয় নি। শরীফ হুসেইনের আরব রাজ্য বানানোর বাসনা এতদিন ঠিকভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু বৃটেনের অন্যান্য পক্ষের সাথে করা প্রতিশ্রুতিগুলো এবার বাঁধ সাধল।

    সাইকস-পিকোট চুক্তি:

    আরব বিদ্রোহ শুরু হবার আগেই এবং শরীফ হুসেইন তার আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠার পূর্বে বৃটেন ও ফ্রান্সের অন্য পরিকল্পনা করা ছিল। ১৯১৫-১৬ এর শীতকালে, বৃটেনের স্যার মার্ক সাইকস ও ফ্রান্সের ফ্রান্সিস জর্জেস পিকোট উসমানী খিলাফত পরবর্তী আরব বিশ্বের ভাগ্য নির্ধারণ করতে গোপনে মিলিত হন।

    বৃটেন ও ফ্রান্স পুরো আরব বিশ্বকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়ার ব্যাপারে চুক্তি করে, যা পরবর্তীতে সাইকস-পিকোট চুক্তি নামে পরিচিতি লাভ করে। বৃটেন বর্তমানে জর্ডান, ইরাক, কুয়েত নামে পরিচিত এলাকাগুলোর দখল নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। ফ্রান্স পায় বর্তমান সিরিয়া, লেবানন ও দক্ষিন তুরস্ক। জায়োনিস্টদের (জায়োনবাদী) ইচ্ছাকে এখানে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে ফিলিস্তিনের দখল নেয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে ঠিক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বৃটেন ও ফ্রান্সের দখলকৃত অঞ্চলগুলোর কিছু কিছু জায়গায় আরবের সীমিত মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কথা থাকলেও, ইউরোপীয় শাসন ব্যবস্থাই তাদের উপর কর্তৃত্বশীল থাকবে। চুক্তি অনুযায়ী, অন্যান্য এলাকায় বৃটেন ও ফ্রান্স সম্পূর্ণ নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব করার অধিকার পায়।

    যদিও এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যে করণীয় বিষয়ক একটি গোপন চুক্তি ছিল, কিন্তু ১৯১৭ সালে রাশিয়ান বলশেভিক সরকার একে সবার সামনে উন্মোচন করে দেয়। এই সাইকস-পিকোট চুক্তি ও শরীফ হুসেইনকে দেয়া ব্রিটেনের প্রতিশ্রুতির মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য পরিলক্ষিত হয়। যার ফলে, বৃটেন ও আরব বিদ্রোহীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এটিই বৃটেনের করা সর্বশেষ পরস্পর বিরোধী চুক্তি ছিল না, নাটকের চিত্রনাট্যের এখনো কিছু অংশ বাকি ছিল।

    বেলফোর ঘোষণা:

    আরেকটি সম্প্রদায়েরও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দৃশ্যপটের দিকে শ্যেনদৃষ্টি ছিল এবং তারা হল জায়নবাদীরা। জায়োনিজম হল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন যা ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতো। এই আন্দোলনের সূচনা হয় ১৯ শতকে এবং এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপের ইহুদিদের জন্য (যারা ছিল মূলত পোল্যান্ড, জার্মানি, রাশিয়ার বাসিন্দা) ইউরোপের বাইরে একটি আবাসভূমি খুঁজে বের করা।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে জায়োনিস্টরা বৃটেন সরকারের কাছে যুদ্ধ পরবর্তীতে ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনের ব্যাপারে সাহায্য চায়। অন্যদিকে, বৃটিশ সরকারের ভিতরেও এমন অনেক কর্মকর্তা ছিলেন যারা এই রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব আরথার বেলফোর। ১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বরে, বেলফোর (ইহুদিবাদি) জায়োনিস্ট সম্প্রয়দায়ের নেতা ব্যারন রথচাইল্ডকে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। এই চিঠিতে তিনি ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকারের সরকারী সমর্থন রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

    “মহামান্য (বৃটিশ রাজার) সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় বসতি স্থাপনের ব্যাপারে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং এই লক্ষ্যে উপনীত হবার জন্যে তার পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। এটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাচ্ছে, এমন কিছুই করা হবে না যাতে ফিলিস্তিনে বিদ্যমান অ-ইহুদি (অন্যান্য ধর্মাবলম্বী) সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, অথবা অন্য কোনো দেশে বসবাসকারী ইহুদীদের উপভোগকৃত অধিকার ও রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষতিসাধন হয়”

    তিনটি পরস্পরবিরোধী চুক্তি:

    ফলে দেখা গেল, বৃটেন ১৯১৭ সালের মধ্যেই তিন তিনটি ভিন্ন পক্ষের সাথে তিনটি আলাদা চুক্তি করলো এবং এই তিনটি ভিন্ন চুক্তিতে আরব বিশ্বের ভবিষ্যতের ব্যাপারে তিনটি ভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হল। বৃটেন আরবদেরকে আশ্বাস দিল, তারা শরীফ হুসেইনের মাধ্যমে আরব রাজ্যের কর্তৃত্ব পাবে, অন্যদিকে ফ্রান্স এবং বৃটেন চুক্তি করলো, ঠিক ঐ এলাকাগুলোই বৃটেন এবং ফ্রান্স ভাগ করে নিবে। আবার বেলফোর ঘোষণা অনুযায়ী জায়োনবাদীরা ফিলিস্তিন পাওয়ার আশা করলো।

    ১৯১৮ সালে মিত্রশক্তির বিজয়ের মাধ্যমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং ফলশ্রুতিতে উসমানী খিলাফতের ধ্বংস ঘটে। যদিও উসমানীরা ১৯২২ পর্যন্ত নামে মাত্র টিকে ছিল এবং খলীফার পদটি ১৯২৪ সাল পর্যন্ত নামমাত্র ভাবে টিকে ছিল, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে উসমানীদের অধীনে থাকা সব অঞ্চল ইউরোপিয়ানদের উপনিবেশে পরিণত হয়। যদিও যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য তিন পক্ষের পরস্পরবিরোধী বিতর্কের মধ্যে আটকা পড়ে যায়।

    তাহলে কোন পক্ষ অবশেষে বিজয় লাভ করেছিল? প্রকৃতপক্ষে কেউ-ই তাদের পূর্ণ চাহিদা মোতাবেক সবকিছু পায় নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালীন সময়ে লিগ অব নেশনস (জাতিসংঘের আদি রূপ) প্রতিষ্ঠা করা হয়। লিগ অব নেশন্সের অন্যতম দায়িত্ব ছিল, বিজিত উসমানী অঞ্চলগুলোকে ভাগ বাটোয়ারা করে দেয়া। লিগ অব নেশন্স সম্পূর্ণ আরব বিশ্বকে অনেক ভাগে বিভক্ত করে ফেলে (যাকে মেন্ডেট বলা হয়)। এসব মেন্ডেট বৃটেন ও ফ্রান্স এর হাতে তুলে দেয়া হয় এবং মেন্ডেটগুলো ব্রিটেন ও ফ্রান্স দ্বারা শাসিত হবে যতদিন না ঐ ছোট অঞ্চলটি বা মেন্ডেটটি নিজেই নিজের দায়িত্ব নেবার ব্যাপারে সামর্থ্যবান হয়। এই লিগ অব নেশন-ই সর্বপ্রথম মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিভিন্ন সীমানা আরোপ করে দেয়, যা আমরা বর্তমানে মানচিত্রে দেখতে পাই। এই সীমানাগুলো স্থানীয় জনগণের কোনপ্রকার মতামত ছাড়াই আরোপ করা হয়। জাতিগত, ভৌগলিক অথবা ধর্মীয় কোন পরিচয়ই বিবেচনায় আনা হয় নি, অর্থাৎ তা ছিল সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী একটি সিদ্ধান্ত। এটা জেনে রাখা জরুরি যে, আরব বিশ্বের এই রাজনৈতিক সীমানা কোনভাবেই বিভিন্ন জাতির উপস্থিতি নির্দেশ করে না। ইরাকি, সিরিয়, জর্ডানি ইত্যাদি পার্থক্যসমূহ সম্পূর্ণরূপে ইউরোপীয় ঔপনিবেশবাদীদের কর্তৃক তৈরি করা হয় আরবদেরকে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত করে ফেলার পদ্ধতি হিসেবে।

    মেন্ডেট সিস্টেমের মাধ্যমে বৃটেন এবং ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের উপর তার কাঙ্খিত দখল বুঝে পায়। অন্যদিকে শরীফ হুসেইনের ক্ষেত্রে, তার ছেলেরা বৃটিশদের ছায়াতলে থেকে শাসনকাজ পরিচালনার সুযোগ পায়। প্রিন্স ফয়সালকে সিরিয়া ও ইরাকের রাজা করা হয় এবং প্রিন্স আব্দুল্লাহকে করা হয় জর্ডানের রাজা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বৃটেন এবং ফ্রান্স-ই এইসব এলাকার প্রকৃত কর্তৃত্বে ছিল।

    অন্যদিকে, বৃটেন সরকার জায়োনবাদীদেরকে কিছু শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিনে বসতি গড়ার অনুমতি দেয়। বৃটেন সেখানে আগে থেকে বসবাসকারী আরবদের রাগান্বিত করতে চায় নি, তাই তারা ফিলিস্তিনে আসা দেশান্তরিত ইহুদীদের সংখ্যাসীমা বেঁধে দেয়। এর ফলে জায়োনবাদীরা ক্ষেপে ওঠে, ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ইহুদীরা বৃটেনের শর্ত না মেনেই ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপনকারীর সংখ্যা বাড়াতে থাকে। এসব ঘটনা আরবদের ক্ষোভও বাড়িয়ে দেয়, কেননা তাদের কাছে ফিলিস্তিন ছিল এমন একটি ভুমি যা ১১৮৭ সালে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়্যুবির বিজয়ের পর থেকে তাদের নিজেদের ছিলো এবং এখন তা বসতি স্থাপনের ফলে ইহুদীদের বলপূর্বক দখলে চলে যাচ্ছিল।

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা বৃটেন মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি করেছিল তা আজও বিদ্যমান। পরস্পরবিরোধী চুক্তিগুলো এবং এর ফলে সৃষ্ট আলাদা আলাদা দেশগুলো মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্য ও বিভেদ সৃষ্টি করে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। জায়োনিজমের উত্থান ও মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্যের ফলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে জালিম সরকারের উপস্থিতি ও অর্থনৈতিক পতন দেখা দিয়েছে। যদিও এই বিভাজনটি গত ১০০ বছরের ছোট পরিক্রমার ভেতরে তৈরি করা হয়েছে, তথাপি বৃটেন এর তৈরি করা এই বিভেদ মুসলিম বিশ্বে আজো শক্তিশালীভাবে বিরাজ করছে।

    Bibliography:

    Hourani, Albert Habib. A History Of The Arab Peoples. New York: Mjf Books, 1997. Print.

    Ochsenwald, William, and Sydney Fisher. The Middle East: A History. 6th. New York: McGraw-Hill, 2003. Print.

    মূল: Lost Islamic History হতে নেয়া এক প্রবন্ধ

    অনুবাদক: ফারহাত শফী

    Posted By Visionary

  • হারামের উপায়ও হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে

    হারামের উপায়ও হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবে

    শরীয়াহ’র নীতি (قاعِدَة) বলে-

    إذا غلب على الظن أنها توصل إلى الحرام، فإن كان يُخشى أن توصل فلا تكون حراماً

    “যদি নিছক পরিমাণ সন্দেহ প্রতিষ্টিত হত, যে এটি হারামের দিকে নির্দেশ করছে এমন হারামের উপায় নিষিদ্ধ বলে বিবেচিত হবে। যদি শুধুমাত্র ভয়ের উদ্রেক হয় যে এটি হারামের দিকে নির্দেশ করে তাহলে এটি হারাম হবে না”

    কুরআনে এই নীতিটির প্রমাণ পাওয়া যায়, আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدْوًا بِغَيْرِ عِلْمٍ

    আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা আরাধনা করে তাদেরকে তোমরা মন্দ বলো না। তাহলে তারা ধৃষ্টতায় অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহকে মন্দ বলবে”। [সূরা আন-আম:১০৮]

    কাফিরদের অপমান করা মুবাহ (অনুমোদিত) এবং আল্লাহ্‌ কুরআনে তাদেরকে অপমানিত করেছে। কিন্তু যদি এই অপমান আল্লাহ্‌কে অপমান করার দিকে কাফিরদের পরিচালিত করে, তাহলে তা করা হারাম। এটি এই কারণে যে আল্লাহ্‌কে অপমান করা হারাম। এবং এভাবেই শরীয়াহ নীতি প্রণীত হয়েছে, অর্থাৎ,

    الوسيلة إلى الحرام محرمة

    “হারামের উপায় নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয়”।

    যদিওবা হারামের উপায় অবধারিতরূপে হারামের দিকে পরিচালিত হলেই নিষিদ্ধ হয়। অর্থাৎ, যদি এমন উপায় যা হারামের দিকে নিছক পরিমাণ হারামের দিকে পরিচালিত করে, এবং তা শরীয়াহ নীতি দ্বারা প্রতিষ্টিত হয়, তখন এটি হারাম হবে। কাজেই, যদি হারামের দিকে পরিচালিত না করে, যেমন: যদি এটি শুধুমাত্র ভয়ের উদ্রেক হয় যে হারামের দিকে পরিচালিত করছে, অর্থাৎ মহিলাদের মুখ না ঢেকে বাহিরে যাওয়া এবং এ ভয় হয় যে এটা ফিতনা তৈরী করবে, এ ক্ষেত্রে হারাম হবেনা, কারণ কেবল ভয় হয় যে হারামের দিকে পরিচালিত করবে এমন বিষয় হারাম বা নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এটি এ মূলনীতির প্রমাণ।

    আরেকটি একই রকম নীতি প্রযোজ্য হবে এভাবে, “যদি মুবাহ জিনিষের কোন সুনির্দিষ্ট উপকরণ হারামের দিকে পরিচালিত করে, ঐ সুনির্দিষ্ট উপকরণটি হারাম হবে কিন্তু জিনিষটি মুবাহ’ই থেকে যাবে”।

    এটি বুখারী হতে বিবৃত নাফে’ হতে বর্ণিত, যিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবন উমর তাকে বলেন:

    أَنَّ النَّاسَ نَزَلُوا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَرْضَ ثَمُودَ الْحِجْرَ فَاسْتَقَوْا مِنْ بِئْرِهَا وَاعْتَجَنُوا بِهِ فَأَمَرَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُهَرِيقُوا مَا اسْتَقَوْا مِنْ بِئْرِهَا وَأَنْ يَعْلِفُوا الْإِبِلَ الْعَجِينَ وَأَمَرَهُمْ أَنْ يَسْتَقُوا مِنْ الْبِئْرِ الَّتِي كَانَتْ تَرِدُهَا النَّاقَةُ

    “কিছু লোক রাসূল (সা) এর সাথে ছামুদ আল হিজরে উপস্থিত হন, অতএব তারা ছামুদ আল হিজরের কূপ থেকে পানি নিল এবং তা দ্বারা খামির তৈরী করে নিল। রাসূল (সা) আদেশ দিলেন ঐ পানিগুলো ফেলে দিতে এবং খামিরগুলো পশুদের দিয়ে দিতে; এরপর তিনি পানি নিতে বললেন যেখান থেকে উষ্ট্রী পানি পান করত”

    আরেকটি বর্ণনায় আসে, রাসূল (সা) বলেন: “এর কূপ থেকে কেউ পানি করবেনা এবং নামাযের ওযুর পানি হিসেবেও এটি কেউ ব্যবহার করবেনা, যে খামিরই এ পানি দ্বারা তৈরী করা হয়েছে তা পশুদের দিয়ে দাও এবং এর কোন অংশ খাবেনা। কেউ রাতে সঙ্গীবিহীন একাকী বের হবেনা”।

    পানি পান করা মুবাহ, কিন্তু ঐ নির্দিষ্ট পানিটি যেটি ছামুদের পানি তা রাসূল (সা) পান করতে নিষেধ করেন কারণ এটি হারামের দিকে পরিচালিত করে; তথাপি পানি মৌলিকভাবে মুবাহ’ই থেকে যায়। এছাড়াও রাতে কোন সঙ্গী ছাড়া বের হওয়া মুবাহ বিষয় কিন্তু রাসূল (সা) সৈন্যদের কেউ ঐ নির্দিষ্ট রাতে এবং ঐ নির্দিষ্ট জায়গায় একাকী সঙ্গীবিহীন যেতে নিষেধ করেন কারণ এটি হারামের দিকে পরিচালিত করে, অন্যথায়, সঙ্গীবিহীন রাতে বের হওয়া মুবাহ’ই থকে যায়। এটি প্রমাণ করে যে ঐ মুবাহ জিনিসের নির্দিষ্ট বিষয়টি হারাম হয় যদি তা হারামের দিকে পরিচালিত করে, এবং জিনিসটি সাধারণভাবে মুবাহ’ই থেকে যায়।

  • মিশনারী আগ্রাসন | ইসলামী রাষ্ট্র

    মিশনারী আগ্রাসন | ইসলামী রাষ্ট্র

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    মিশনারী আক্রমন: ইসলামী রাষ্ট্রে বিজ্ঞানের নাম করে ইউরোপের অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে গিয়েছিল। এ কাজের জন্য তাদের মোটা অংকের অর্থ বরাদ্দ ছিল। মূলতঃ এটি ছিল বিজ্ঞান ও মানবতার নামে মিশনারীদের (ধর্মপ্রচার প্রতিষ্ঠান) ছদ্মাবরণে পরোক্ষভাবে উপনিবেশিকতার প্রসার। এ আক্রমনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল মুসলিম ভূখন্ডে রাজনৈতিক গোয়েন্দা শাখা কার্যকর করতে এবং সাংস্কৃতিক উপনিবেশিকতার বিপ্লব ঘটাতে, যাতে করে মুসলিম ভূখন্ড গুলো পশ্চিমা কুচক্রীদের অন্যতম প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। এ উপনিবেশবাদের সূচনা হয় যখন মুসলিম বিশ্ব পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশের দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছিল এবং এটি মূলত পরিচালিত হয়েছিল ফরাসী, ইংরেজ ও মার্কিণ মিশনারীদের মাধ্যমে।

    ফলাফল স্বরূপ এ মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে ফরাসী ও ইংরেজরা প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। এরা মূলত জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়েছিল যারা প্যান আরব ও প্যান তুর্কীবাদকে উৎসাহিত করেছিল। পাশাপাশি শিক্ষিত মুসলিমদের পশ্চিমাভিমুখী করার ব্যাপারে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এর পিছনে প্রধানত দুটি লক্ষ্য ছিল। প্রথমত: বর্ণবাদকে উস্কে দিয়ে উসমানী রাষ্ট্র তুরস্ক হতে আরবদের বিচ্ছিন্ন করা ও সেই সুবাদে ইসলামী রাষ্ট্রে ফাটল সৃষ্টি করা। দ্বিতীয়ত: মুসলিমদের অজ্ঞতার সুযোগে তাদের ইসলামের প্রকৃত বন্ধন সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ করে তোলা।

    মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্কল্পনার (স্কীম) মাধ্যমে প্রথম পর্বটি ভালোমত সম্পন্ন করলেও দ্বিতীয় বিষয়টি অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। এ বিষয়টিকে তারা তুরস্ক, আরব, পারস্য এবং অন্যান্য জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উপর ছেড়ে দিয়েছিল যা মুসলিমদের ঐক্য বিনষ্ট করতে ও ইসলামের মূলনীতি হতে বিচ্ছিন্ন করতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিল।

    মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করেছিল বিভিন্ন পর্যায়ে এবং তার ফলাফল পুরো মুসলিম বিশ্বেই পরিলক্ষিত হয়েছিল। বর্তমানে আমরা যে দুর্বলতা ও অধঃপতন প্রত্যক্ষ করছি তা এই সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টার ফলাফল। উপনিবেশবাদী শক্তি গুলোই আমাদের অগ্রযাত্রায় বাঁধার প্রাচীর সৃষ্টিতে প্রথম ইটটি স্থাপন করেছিল যা পরবর্তীতে আমাদের ও আমাদের আদর্শের মাঝে একটি দুর্জ্জেয় ব্যবধান রচনা করে দিয়েছে।

    ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো মুসলিম বিশ্বে তাদের মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরী করেছিল কারণ মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের মিথ্যা প্রচারণা (propaganda) কোন কার্যকর ফল বয়ে আনছিল না। ক্রুসেডের বিরুদ্ধে জিহাদে মুসলিমরা তাদের ধৈর্য্য, সাহস এবং শক্তিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছিল। যখন যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রুসেডারগণ মুসলিমদের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল, তখন তারা মূলত দুটি বিষয়ের উপর ভরসা করেছিল। এগুলো ছিল তাদের নিজস্ব হিসাব প্রসূত এবং এক্ষেত্রে তারা সাফল্যের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী ছিল। তারা ধারণা করেছিল এ দুটি বিষয় ইসলাম ও মুসলিমদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে প্রধান ভূমিকা রাখবে।

    প্রথমতঃ তারা মুসলিম বিশ্বে বসবাসরত, বিশেষত আল শাম অঞ্চলের খৃষ্টানদের উপর নির্ভর করেছিল। কারণ তারা সংখ্যায় ছিল অনেক এবং অত্যন্ত ধার্মিক। ইউরোপীয়রা তাদের অভিন্ন বিশ্বাসের ভাই হিসাবে বিবেচনা করত। ইউরোপীয়দের ধারণা ছিল ধর্মীয় যুদ্ধের খাতিরে তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও গুপ্তচরবৃত্তিতে তাদের সহায়তা করবে।

    দ্বিতীয়তঃ ইউরোপীয়রা তাদের সংখ্যাধিক্য ও শক্তিমত্তার উপর বেশ আস্থাশীল ছিল। তারা জানত যে মুসলিমরা ইতিমধ্যেই বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত থাকত। স্পষ্টতঃ তাদের ঐক্যে ফাটল ধরেছিল। ইউরোপীয়রা ধারণা করত, একবার মুসলিমদের পরাজিত করতে পারলে তারা চিরতরে তাদের পদানত হবে ও সমূলে ধ্বংস হবে এবং তাদের দ্বীন কতগুলো আচার সর্বস্ব অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। অবশ্য বাস্তবে তাদের এ আশা ভেস্তে গিয়েছিল এবং তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও বিফলে গেল। তারা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে লক্ষ্য করল যে রণক্ষেত্রে মুসলিমদের পাশাপাশি আরব খৃষ্টানরা ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ করেছিল। ইউরোপীয়দের যাবতীয় মিথ্যা প্রচারণা তাদের উপর কোন কার্যকর প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। ইউরোপীয়রা যে বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল তা হচ্ছে, আরব খৃষ্টানরা মুসলিমদের সাথে একত্রে বসবাস করত, সমঅধিকার ভোগ করত এবং রাষ্ট্রের প্রতি সমান দায়িত্ব পালন করত। মুসলিমরা তাদের নিকট হতে খাবার গ্রহণ করত, খৃষ্টান নারীদের বিয়ে করত, তাদের দৈনন্দিন কাজে অংশীদার ছিল এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ করত।

    খলীফা ও গভর্নরগণ রাষ্ট্রে আইনের শাসন ন্যায় সম্মতভাবে বাস্তবায়ন করতেন। আল কুরাফী এবং ইবনে হায়াম লিখেছেন,

    “যদি আগ্রাসী শক্তি আমাদের ভূখণ্ডকে আক্রমন করে তবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে যিন্মিদের রক্ষা করা আর এজন্য প্রয়োজনে আমরা জীবন দেব। এ দায়িত্ব পালনে সামান্য অবহেলা যিম্মীদের অধিকার লঙ্ঘনের শামিল হবে।”

    আল কুরাফী আরো বলেছেন,

    “যিম্মিদের প্রতি মুসলিমদের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র ব্যবহার, দুরবলদের প্রতি সহমর্মিতা, দরীদ্রদের সাহায্য, ক্ষুধার্তদের আহারের ব্যবস্থা করা, তাদের জন্য পোষাকের ব্যবস্থা করা এবং তাদের সাথে মার্জিতভাবে কথা বলা। মুসলিমদের প্রত্যাঘাত করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রতিবেশীদের আঘাতকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা উচিত। যে কোন সংকর্মশীল ধর্মপরায়ণ মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের প্রতি উত্তম উপদেশ দেয়া, তাদের সম্পদ, পরিবার, সম্মান ও অধিকার রক্ষা করা।”

    একথা বিবেচনা করলে মুসলিমদের সহযোগী হিসাবে খৃষ্টানদের লড়াই করার বিষয়টি স্বাভাবিক। ইউরোপীয়রা আরো বিস্মিত হল যখন দেখল তাদের দ্বিতীয় কৌশলটিও বাস্তব ফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হল। তারা আল শাম দখল করে নিয়েছিল এবং মুসলিমদের সামগ্রিকভাবে পরাজিত করেছিল। তারা নিকৃষ্টতম নৃশংসতার স্বাক্ষর রেখেছিল এবং এ সময় তারা প্রথমবারের মত ব্যাপকভাবে মুসলিমদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল যা আজও অব্যাহত রয়েছে। তারা ধারণা করেছিল, সবকিছুই তাদের পক্ষে গিয়েছে এবং মুসলিমরা আর কোনদিন তাদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। অবশ্য মুসলিমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল যে তাদের ভূখণ্ড থেকে দখলদার বাহিনীকে অপসারণ করতে হবে। যদিওবা প্রায় দুইশত বছর ক্রুসেডারগণ মুসলিম ভূখণ্ড দখল করে রেখেছিল এবং ইতিমধ্যে তারা তাদের সাম্রাজ্য ও principalities স্থাপন করেছিল, কিন্তু মুসলিমরা অবশেষে তাদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়েছিল।

    ইউরোপীয়রা মুসলিমদের এ অভাবিত সাফল্যের রহস্য উদ্ঘাটনে মনোযোগ দিল। তারা লক্ষ্য করল এর বীজ ইসলামেই নিহিত আছে। মুসলিমদের শক্তির উৎস হচ্ছে তাদের আকীদা এবং তার সাথে যুক্ত হয়েছিল আইনকানুন ও অমুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণের অনুপম ব্যবস্থাটি। ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের ঐক্যের পিছনে এটিই ছিল মূল কারণ। তাদের সময়ে অবিশ্বাসী উপনিবেশবাদীরা ইসলামী বিশ্ব দখলের নতুন কৌশল গ্রহণ করল। তারা ইসলামী বিশ্বে অনুপ্রবেশের সর্বোত্তম পথটি বেছে নিয়েছিল এবং তা হচ্ছে মিশনারীদের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এর লক্ষ্য ছিল খৃষ্টানদের সমর্থন অর্জন ও মুসলিমদের মধ্যে তাদের দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা।

    তারা আশা করেছিল যে এ পদ্ধতিটি মুসলিমদের দ্বীনের ব্যাপারে সন্দেহের উদ্রেক করবে এবং তাদের আকীদা নড়বড়ে হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা যাবে এবং তা মুসলিমদের দুর্বল করে ফেলবে।

    উপনিবেশবাদীরা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হয়েছিল। ১৬শ শতাব্দীর শেষ নাগাদ তারা মাল্টায় মিশনারী কেন্দ্র স্থাপন করতে সমর্থ হল এবং এটি তাদের প্রধান ঘাঁটিতে পরিণত হল যেখান থেকে পরবর্তীতে তারা মুসলিম বিশ্বে মিশনারী কার্যক্রমের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞের সূচনা করেছিল। প্রাথমিক অবস্থায় তারা এখান থেকেই তাদের মিশন কার্য পরিচালনা করত। পরবর্তীতে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল। ১৬২৫ খৃষ্টাব্দে তারা তাদের মূল ঘাঁটি আল শাম এ সরিয়ে নেয় এবং এখান থেকে তাদের মিশনারী আন্দোলনের শুরু করে।

    অবশ্য এসময় তাদের কার্যক্রম ছিল সীমিত। তারা কিছু স্কুল স্থাপন ও বই পুস্তক প্রকাশ করা ছাড়া বিশেষ কিছু করতে পারে নি। বস্তুত: তারা সবার নিকট থেকে ব্যাপক বাধা ও অসহযোগিতার সম্মুখীন হয়েছিল। ১৭৭৩ খৃষ্টাব্দ পর্যান্তদের কাজ অব্যাহত থাকে এবং এ সময় তাদের ঈসায়ী (jesuits) কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য কিছু কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম তখনো চলছিল – যেমন ‘আজ়ারীয়’ মিশনারী। এদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও তাদের অস্তিত্ব প্রায় শূন্যের পর্যায়ে নেমে এসেছিল। ১৮২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তাদের কাজ মাল্টায় সীমাবদ্ধ ছিল। এসময় বৈরুতে তাদের একটি কেন্দ্র চালু হয় এবং মিশনারীদের কাজ পুনর্দোমে শুরু হয়। প্রথমদিকে তারা বেশ প্রতিকূলতার শিকার হলেও তাদের কাজ অব্যাহত ছিল। প্রাথমিকভাবে তাদের কাজের ক্ষেত্র ছিল ধর্মবাণী ও ধর্মীয় সংস্কৃতি প্রচার। তাদের শিক্ষা কার্যক্রম ছিল সীমিত ও দুর্বল।

    ১৮৩৪ সালে মিশনারী তৎপরতা সমগ্র শাম এ ছড়িয়ে পড়ল। লেবাননের আন্তুরা গ্রামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হল এবং মার্কিন মিশন তাদের বই পুস্তক প্রকাশনা ও প্রচারের সুবিধার্থে মাল্টা থেকে ছাপাখানা ও দোকান বৈরুতে সরিয়ে নিল।

    প্রখ্যাত মার্কিন মিশনারী এলাই স্মিথ এ সময়ে খুবই তৎপর ছিল। সে মাল্টায় স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে মিশনের ছাপাখানার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। ১৮২৭ সালে তিনি বৈরুতে এসেছিল। কিন্তু ভয় এবং একঘেয়েমী তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিল বলে সে পুনরায় মাল্টায় ফিরে যায়। অবশেষে পুনরায় ১৮৩৪ সালে তার স্ত্রী সহ সে বৈরুতে আসে এবং মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। এ সময় তার কাজের পরিধি বেড়ে গেল এবং আল শাম অঞ্চলে, বিশেষত বৈরুতে তার কাজে আত্মনিয়োগ করল। তার ও তার মত আরও অনেকের নিরলস প্রচেষ্টার ফলে মিশনারী আন্দোলনের পুনর্জন্ম হল। যখন ইব্রাহিম পাশা প্রাথমিক স্কুলের জন্য একটি নতুন পাঠ্যসূচী গ্রহণ করে তা সিরিয়াতে বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত নিলেন তখন মিশনারীদের সামনে এক নতুন সুযোগের দ্বার খুলে গেল। মিশরীয় শিক্ষা ব্যবস্থা হতে উদ্বুদ্ধ হয়ে এ সিলেবাসটি প্রণীত হয়েছিল এবং মিশরীয় ব্যবস্থাটি গৃহীত হয়েছিল ফরাসী শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে। মিশনারীরা এ সুযোগটি গ্রহণ করেছিল এবং তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষা আন্দোলনে কার্যকর অবদান রেখেছিল। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা তাদের প্রকাশনার কাজ বিস্তৃত করতে সক্ষম হল। সবকিছু ছাড়িয়ে মিশনারী আন্দোলন সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করল। তারা ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মের স্বাধীনতার নামে পরস্পরের প্রতি ক্রোধের আগুন প্রজ্বলিত করল এবং মুসলিম, খৃষ্টান ও দ্রুজ ধর্মাবলম্বীদের মাঝে আকীদা সম্পর্কিত বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করল।

    ইব্রাহিম পাশা যখন আল শাম থেকে পিছু হটল তখন অস্থিরতা, আতঙ্ক আর নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছিল এবং জনগণের মাঝে ব্যাপক বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল। বিদেশী প্রতিনিধিবৃন্দ, বিশেষত: মিশনারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর সুযোগ নিল। আল শামে উসমানী রাষ্ট্রের দুর্বল প্রভাবের সুযোগে তারা নাগরিকদের মাঝে অসন্তুষ্টি উস্কে দিতে লাগল। এক বছরের মাথায়, ১৮৪১ সালে লেবাননের পার্বত্য অঞ্চলে খৃষ্টান ও ইসমাইলী দারাজী সম্প্রদায়ের (druze) মাঝে মারাত্মক গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ল। অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে বিদেশী রাষ্ট্র সমূহের চাপে ও হস্তক্ষেপে উসমানী রাষ্ট্র লেবাননের জন্য পৃথক একটি শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হল। এ ব্যবস্থায় প্রদেশটিকে দুটি পৃথক ভাগে ভাগ করে ফেলা হল এবং এক অংশে খৃষ্টান সম্প্রদায় ও অন্য অংশে দারাজী (druze) সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হল। উসমানী রাষ্ট্র উভয় প্রদেশে একজন করে গভর্ণর নিযুক্ত করলেন যাতে উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে কোন বিরোধ বা সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়। এ ব্যবস্থাটি সফল হয়নি, কারণ এটি ছিল একটি অস্বাভাবিক সমাধান। এসময় বৃটেন ও ফ্রান্স এতে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ল এবং যেখানেই কর্তৃপক্ষ সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিল সেখানেই তারা নাগরিকদের মাঝে বিবাদ ও সংঘাত উস্কে দিতে লাগল।

    বৃটেন ও ফ্রান্স এ সংঘাতের অজুহাতে লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করা শুরু করল। ফরাসীরা মাওয়ারিন ক্যাথলিক খৃষ্টান সম্প্রদায় (maronites) এবং বৃটিশরা দারাজী সম্প্রদায়ের পক্ষাবলন্বন করল। এর মাধ্যমে ১৮৪৫ সালে নতুন করে গোলযোগ সৃষ্টি হল। এ সময় দৃশ্যপট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। আক্রমণের নৃশংসতা এত ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল যে গীর্জা, মঠ পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। চৌর্যবৃত্তি, হত্যা, লুণ্ঠন ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে সমস্যাটির একটি স্থায়ী সমাধানের জন্য উসমানী রাষ্ট্র তার পররাষ্ট্র বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিকে লেবাননে পাঠালো। কিন্তু তিনি উত্তেজনার সাময়িক প্রশমন ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য অর্জন করতে পারেন নি। এ দিকে মিশনারীরা তাদের কার্যক্রম আরো ঘনীভূত করল। ১৮৫৭ সালে মাওয়ারিন খৃষ্টান সম্প্রদায় (maronite) বিপ্লব ও সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোষণা দিল। মাওয়ারিন ধর্মগুরুরা কৃষকদের মধ্যে তাদের সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলল। ফলশ্রুতিতে উত্তরাঞ্চলে তারা এক ভয়াবহ আক্রমণের সূচনা করল। এভাবে এক রক্তক্ষয়ী বিপ্লবের শুরু হল এবং তা দক্ষিণেও ছড়িয়ে পড়ল। খৃষ্টান কৃষকেরা তাদের দারাজী সামন্তপ্রভুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল এবং বৃটিশ ও ফরাসীরা তাদের মিত্রদের সাহায্য করতে লাগল। এর ফলাফলস্বরূপ গোটা লেবাননে গৃহ যুদ্ধ (civil strife) ছড়িয়ে পড়ল। দারাজী সম্প্রদায় নির্বিচারে পাদ্রী, সাধারণ জনগণ নির্বিশেষে খৃষ্টান হত্যা করতে শুরু করল। এ সংঘাতের ফলে হাজার হাজার লোক হতাহত হল কিংবা উদ্বাস্তু ও গৃহহীন হয়ে পড়ল।

    আল শাম এর সর্বত্র গোলযোগের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল। দামাস্কাসে মুসলিম ও খৃষ্টান অধিবাসীদের মধ্যে তীব্র ঘৃণার বিষ ছড়ানো হচ্ছিল। অবশেষে ১৮৬০ সালে মুসলিমরা একটি খৃষ্টান জেলা আক্রমন করে বসলে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সংঘর্ষের সাথে যুক্ত হয়েছিল যুগপৎ গণলুন্ঠন ও ধ্বংসযজ্ঞ। এ সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটাতে উসমানী রাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হল। এর ফলে যদিও বা লেবাননে শান্তি স্থাপন করা সম্ভব হল, কিন্তু পশ্চিমা ষড়যন্ত্রকারী রাষ্ট্রগুলো আল শাম এ অনুপ্রবেশের জন্য একে একটি সুযোগ হিসাবে নিল। ফলে তারা উপকূলে তাদের রণতরী সমাবেশ করতে শুরু করল।

    একই বছরের আগস্টে ফ্রান্স বিপ্লব দমন করতে বৈরুতে তাদের পদাতিক বাহিনীর একটি ডিভিশন প্রেরণ করেছিল। এভাবেই লেবানন ও সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে উসমানী রাষ্ট্রে অসন্তোষ ও সংঘাত ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ, যারা বহুদিন থেকেই উসমানী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করে আসছিল। তারা এ ব্যাপারে সফল হয়েছিল এবং উসমানী রাষ্ট্রকে বাধ্য করেছিল সিরিয়ার জন্য দুটি প্রদেশে বিভক্ত করে একটি আলাদা শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে এবং লেবাননকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে। এ ঘটনার মাধ্যমেই লেবানন, আল শাম থেকে পৃথক হয়ে গেল। লেবাননের জন্য স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে পরিচালিত স্বায়ত্ত শাসন দেয়া হল। এ ব্যবস্থায় সরকার প্রধান হল একজন খ্রিষ্টান যে স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিনিধিদের একটি কাউন্সিলের সহায়তায় শাসন কার্য পরিচালনা করে।

    তখন থেকেই বিদেশী শক্তিগুলো লেবাননের বিষয়গুলো পরিচালনা করে আসছে এবং তাদের কাজের মূল কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এভাবে লেবানন একটি সেতু হিসাবে কাজ করেছে যার মাধ্যমে বিদেশী শক্তি উসমানী রাষ্ট্র তথা ইসলামী ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে।

    এদিকে মিশনারীরা একটি নতুন কর্মপন্থা গ্রহণ করল। মিশনারীরা শুধুমাত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা, ছাপাখানা ও ক্লিনিক স্থাপন করেই সন্তুষ্ট ছিলনা, বরং তারা তাদের মধ্যে একটি সংঘ (এসোসিয়েশন) সৃষ্টির পরিকল্পনা গ্রহণ করল। ১৮৪২ সালে মার্বিশ মিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিজ্ঞান সংঘ স্থাপনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হল। এ কমিটির কাজ প্রায় পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল। এর মধ্যে তারা একটি সংঘ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল যার নাম ছিল “বিজ্ঞান ও শিল্প সংঘ” (Association of Arts and Sciences)। এর সদস্যদের মধ্যে ছিল নাসিফ আল ইয়াযিজী, এবং বুত্রুস আল বুসতাদী, (আরবদের উদ্দেশ্যে গঠিত বিধায় লেবানীজ খ্রিষ্টানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল) এবং এলাই স্মিথ, কর্নেলিয়াস ভ্যান ডাইক ও ব্রাইটন কর্ণেল চার্চিল। প্রথমে এ সংঘের উদ্দেশ্য ছিল অস্পষ্ট। তারা বয়স্কদের ও শিশু কিশোরদের স্কুলে বিজ্ঞান শিক্ষা দিত। তারা বয়স্ক ও কিশোরদের পশ্চিমা সংস্কৃতি শেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করত এবং এভাবে মিশনারী পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের মন ও চিন্তাধারাকে গড়ে তুলছিল।

    অবশ্য সংঘটির নিরলস প্রচেষ্টার পরও দু বছরে তারা গোটা শাম অঞ্চলে মাত্র পঞ্চাশ জন সদস্যকে দলে টানতে সক্ষম হয়েছিল। তারা সকলেই ছিল খ্রিষ্টান, বিশেষত বৈরুত অঞ্চলের অধিবাসী। কোন মুসলিম কিংবা দারাজী সম্প্রদায় তাদের দলে তখনো যোগ দেয়নি। তাদের কাজ সম্প্রসারিত ও ত্বরান্বিত করতে ব্যাপক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও খুব একটা সফল হচ্ছিল না। পাঁচ বছরের মাথায় এ সংঘটির অবলুপ্তি ঘটে। এর মাঝে তারা উল্লেখযোগ্য কোন সাফল্য না পেলেও মিশনারীদের মাঝে আরো অনেকগুলো সংঘ তৈরীর আকাঙ্খা সৃষ্টি হয়েছিল। কাজেই ১৮৫০ সালে আরেকটি সংঘ স্থাপিত হল এবং এর নাম দেয়া হয়েছিল “প্রাচ্য সংঘ” (oriental association). ফরাসী ঈসায়ী সঙ্ঘের যাজক হেনরি দেব্রোনিয়ের অভিভাবকত্বে ও সহযোগিতায় খ্রিষ্টান সদস্যদের নিয়ে ঈসায়ীগণ (Jesuits) এ সংঘটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি তার পূর্ববর্তী “বিজ্ঞান ও শিল্প সংঘের” পথ অনুসরণ করেছিল এবং স্বল্প সময় পর এটিও ভেঙ্গে যায়।

    এরপর আরো বেশ কটি সংঘ স্থাপিত হয় কিন্তু তাদের সবকটিই ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়ে অপসৃত হয়। ১৮৫৭ সালে একটি নতুন সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয় যারা একটি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। এর সকল সদস্যই ছিল আরব এবং এতে কোন বিদেশী সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এবার তাদের প্রচেষ্টা সাফল্যের মুখ দেখল এবং কিছু মুসলিম ও দারাজী সম্প্রদায়ের লোকও তাদের সংঘে যোগ দিল। এ সংঘটি তাদের গ্রহণ করেছিল, কারণ তারা সবাই ছিল আরব। এর নাম দেয়া হল, “সিরীয় বিজ্ঞান সংঘ” (Syrian Science Association)। সংঘটি তাদের কাজে সাফল্য পেতে শুরু করল এবং বিদেশী সদস্য না থাকায় আরবদের নিকট গ্রহণ যোগ্যতা পেল। এর সদস্যরা নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করতে লাগল, তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমর্থন পেতে লাগল এবং ক্রমে এর সদস্য সংখ্যা একশত পঞ্চাশে উন্নীত হল। এর প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের মধ্যে কিছু প্রখ্যাত আরব ব্যক্তিত্ব ছিল, যেমন দারাজী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে মোহাম্মদ আরসালান, মুসলিমদের মধ্য থেকে হুসাইন বায়হাম। আরব খ্রিষ্টান সম্প্রদায় থেকেও অনেকে যোগ দিল। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল বুত্রুস বুসতাদীর সন্তান ইব্রাহীম আল ইয়াযিজী। এ সংঘটি অন্যান্য সংঘের চেয়ে বেশী সময় স্থায়ী হয়েছিল। এর কর্মসূচীর পরিকল্পনা করা হয়েছিল আরব জাতীয়তাবাদ কে প্রজ্বলিত করার উদ্দেশ্যে। অবশ্য বিজ্ঞানের মোড়কে এর গুপ্ত উদ্দেশ্যটি ছিল উপনিবেশবাদ ও মিশনারীর প্রসার। এটি পশ্চিমা সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য একটি ছায়া সংগঠন হিসাবে কাজ করছিল।

    ১৮৭৫ সালে বৈরুতে “গুপ্ত সংঘ” (secret association) নামে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি মূলত রাজনৈতিক চিন্তাধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি আরব জাতীয়তাবাদের ধারণাটি উস্কে দিতে শুরু করল। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিল বৈরুত প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজের পাঁচজন তরুণ। এরা সকলেই ছিল খ্রিষ্টান, যাদের মিশনারী সংগঠনগুলো প্রভাবিত করতে পেরেছিল। প্রতিষ্ঠার পর তারা অল্প সংখ্যক সদস্য দলে নিল। এ সংঘটি তাদের লিফলেট ও ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে আরব জাতীয়তাবাদের ডাক দিল এবং তারা আরবদের, বিশেষত সিরীয় ও লেবানীজদের, রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবী তুলল।

    অবশ্য এদের প্রকৃত কাজ ও কর্মসূচী একেবারেই ভিন্ন উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হত। এরা মানুষের অন্তরে অদ্ভুত আকাঙ্খা ও মিথ্যা আশার জন্ম দিতে লাগল। তারা আরব জাতীয়তাবাদের প্রতি আহ্বান করত এবং উসমানী রাষ্ট্রকে তুর্কী রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করে এর বিরোধিতাকে উৎসাহিত করত। এটি রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার জন্য কাজ করছিল এবং আরব জাতীয়তাবাদকে জীবনের ভিত্তি হিসাবে প্রচার করতে লাগল। এ সংঘটি সর্বদা আরব জাতীয়তাবাদকে উর্ধ্বে তুলে ধরত। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সকলেই তাদের সাহিত্য ও লেখনীতে তুর্কীদের আরবদের নিকট থেকে ইসলামী খিলাফত ছিনিয়ে নেয়া, ইসলামী শরীয়াহ লংঘন ও দীনকে অবমাননা করার জন্য দায়ী করত। এ থেকে সংঘটির প্রকৃত চরিত্র ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় এবং তা হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের বিপক্ষে একধরণের অসন্তোষ সৃষ্টি করা। এরা দীন সম্পর্কে সন্দেহ ও হতাশা সৃষ্টি করত এবং অনৈসলামিক মূলনীতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক আন্দোলন প্রতিষ্ঠার সুযোগ খুঁজত। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমা শক্তিরাই এ আন্দোলনগুলো শুরু করেছিল। তারাই এদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তাদের পর্যবেক্ষণ করত ও তাদের পরিচালনা করত। তারা তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে বিবরণী লিখত। উদাহরণ স্বরূপ, ১৮৮০ সালের ২৮ জুলাই, বৈরুতে নিযুক্ত ব্রিটিশ কন্স্যাল, তার সরকারের নিকট একটি টেলিগ্রাম পাঠায় যাতে বলা হয়, “বিপ্লবী লিফলেটের বিতরণ শুরু হয়েছে। উৎস হিসাবে মিজাতকে সন্দেহ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও অবস্থা শান্ত রয়েছে। ডাকযোগে বিস্তারিত জানান হবে।”

    বৈরুতের রাস্তায় একটি লিফলেট বিলি ও দেয়ালে লাগানোর পর এই টেলিগ্রামটি পাঠানো হয়েছিল। এরপর বৈরুত ও দামাস্কাসে নিযুক্ত ব্রিটিশ কন্স্যালগণ বেশ কিছু চিঠি পাঠায়।

    এ চিঠিগুলোর সাথে ছিল সংঘের সদস্যদের বিলিকৃত লিফলেটের কপি। এটি একটি যথার্থ তথ্যপ্রমাণ যা থেকে স্পষ্টতঃ প্রতীয়মান হয় যে, আল শাম এ তাদের কার্যক্রম শুরু করা প্রোটেস্ট্যান্ট কলেজের আন্দোলনটি তাদের পরিকল্পনা ছিল। আল শাম অঞ্চলেই সংঘের কার্যক্রম বেশী পরিলক্ষিত হত। অবশ্য অন্যান্য আরব অধ্যুষিত অঞ্চলেও এদের কার্যক্রম চলছিল। ১৮৮২ সালে জেদ্দায় নিযুক্ত ব্রিটিশ কমিশনারের তার সরকারের কাছে লেখা চিঠিতে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠে। আরব আন্দোলন সম্পর্কে সে লিখে,

    “আমার কাছে এ খবর পৌঁছেছে যে, এমনকি মক্কায়ও কিছু কিছু বুদ্ধিজীবী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। আমি যা শুনেছি তা থেকে মনে হচ্ছে নাজদের সাথে দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূখন্ড অর্থাৎ দক্ষিণ ইরাককে একত্রিত করার একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে যেখানে মনসুর পাশাকে নিয়োগ দেয়া হবে এবং আসীর ও ইয়েমেন কে একত্রিত করে আলী ইবনে আবিদ কে তার শাসক নিযুক্ত করা হবে।”

    এ বিষয়গুলোতে শুধুমাত্র বৃটেনই আগ্রহী ছিল না বরং ফ্রান্সও গভীর আগ্রহ প্রকাশ করছিল। ১৮৮২ সালে বৈরুতে নিযুক্ত একজন ফরাসী কর্মকর্তা ফরাসী উদ্বেগের কথা জানায় এই বলে,

    “স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে এবং আমি বৈরুতে থাকাকালীন সময়ে মুসলিম যুবকদের স্কুল ও ক্লিনিক স্থাপন এবং দেশের পুনর্জাগরণের কাজে একাগ্রতা লক্ষ্য করেছি। এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ করা প্রয়োজন তা হচ্ছে এ আন্দোলনটি যে কোন উপদলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত। এ সংঘে খৃষ্টান সদস্যদের স্বাগত জানানো হয় এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তাদের উপর নির্ভর করা হয়।”

    বাগদাদ থেকে একজন ফরাসী লিখেছিল,

    “আমি যেখানেই গিয়েছি সেখানেই একই মাত্রার একটি সাধারণ অনুভূতি লক্ষ্য করেছি এবং তা হচ্ছে তুর্কীদের প্রতি বিদ্বেষ। এই তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থা হতে উত্তরণের জন্য সমষ্টিগত কাজ শুরুর জন্য একটি ধারণা প্রণয়নের কাজ চলছে। দিগন্তপ্রসারী আরব জাতীয়তাবাদ আন্দোলন দানা বাঁধছে এবং অচিরেই তা আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এই জাতি, যারা দীর্ঘকাল যাবৎ শোষিত হয়েছে তারা মুসলিম বিশ্বে তাদের স্বাভাবিক মর্যাদার দাবী তুলতে যাচ্ছে এবং বিশ্বের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেশনা দিতে যাচ্ছে।”

    ধর্ম ও বিজ্ঞানের নামে এই মিশনারী কার্যক্রম শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও বৃটেনের আকর্ষণবিন্দুতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং আরো বহুদূর ছড়িয়ে গিয়েছিল এবং অধিকাংশ অনৈসলামীক রাষ্ট্রগুলোতেও তাদের কার্যপরিধি বিস্তৃত করেছিল। এর মধ্যে ছিল জারের শাসনাধীন রাশিয়া কর্তৃক প্রেরিত মিশনারী অভিযান এবং প্রুশিয়া (জার্মানী) কর্তৃক বিভিন্ন মিশনারী কাজে প্রেরিত একদল সেবিকা (ক্যারডের সন্ন্যাসিনী)। বিভিন্ন মিশনারী ও পশ্চিমা প্রতিনিধিদের মধ্যে মতভেদ, রাজনৈতিক কার্যক্রমের ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল এক ও অভিন্ন। তা হচ্ছে প্রাচ্যে খৃষ্টধর্মের প্রচার, পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রসার এবং মুসলিমদের মাঝে তাদের দ্বীন সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করা, তিক্ততা ছড়িয়ে দেয়া, তাদের ইতিহাসের প্রতি অবজ্ঞা সূচক দৃষ্টিভঙ্গী তৈরী করা এবং পশ্চিম ও পশ্চিমাদের জীবন যাত্রা সম্পর্কে প্রশংসা করতে প্ররোচিত করা।

    মিশনারীরা ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাদের ধর্মপ্রচার অব্যাহত রেখেছিল। তারা ইসলামী সংস্কৃতি ও ইসলামী জীবনযাত্রাকে অবজ্ঞা করে, মুসলিমদের পশ্চাদপদ ও বর্বর হিসাবে চিহ্নিত করেছে যা প্রায় প্রতিটি ইউরোপীয়ানের অসুস্থ বিবেচনা লব্ধ মতমতে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে আমাদের ভূখন্ডে অবিশ্বাস্য ও উপনিবেশবাদের ব্যাপক বিস্তৃতি তাদের সাফল্যকেই প্রতিফলিত করে।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৭ (বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে একটি একক জাতিতে পরিণত করা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    সমস্ত আরব উপদ্বীপের জনগোষ্ঠী দ্বীন ইসলামে প্রবেশ করার পর এবং আরব ভূখন্ড থেকে মূর্তিপূজা নিশ্চিহ্ন হবার পর আল্লাহর রাসূল (সা) ইন্তিকাল করেন। এ সময় সমস্ত আরব উপদ্বীপ ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত এবং সম্পূর্ন ভাবে ইসলামের আকীদাহ্ ও শাসনব্যবস্থা থেকে উদ্ভুত আইন-কানুন দিয়ে শাসিত। আল্লাহতায়ালা তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণ করা, মুসলিমদের উপর তাঁর নিয়ামতকে সম্পূর্ন করা এবং দ্বীন ইসলামকে তাঁর পছন্দনীয় জীবনব্যবস্থা হিসাবে মনোনীত করার পরই রাসূল (সা) ইন্তিকাল করেন। এর মধ্যে প্রতিবেশী অঞ্চলগুলোর রাজা ও শাসকবৃন্দের কাছে দূত পাঠিয়ে এ অঞ্চলের জনসাধারণকে ইসলামের দিকে আহবান করা এবং মু’তাহ ও তাবুকের প্রান্তরে সৈন্যদল পাঠিয়ে রোমান সাম্রাজ্য আক্রমণ করাও অন্তর্ভূক্ত ছিল।

    এরপর খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগেও এ বিজয় অভিযাত্রা চলতে থাকে। খুলাফায়ে রাশেদীনের সময় সর্বপ্রথম ইরাক জয় করা হয় এবং এ সময় এ অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিল পারস্য ও আরব জাতির মিশ্রণ; যারা খ্রিষ্টান, মাযদাকিয়া এবং জরুষ্ট্রিয়ান ধর্মে বিশ্বাস করতো। এরপর, জয় করা হয় পারস্য এবং তারপর আল-শাম অঞ্চল। পারস্য অঞ্চলে জরুষ্ট্রিয়ান, ইহুদী ও খ্রিষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী লোকেরা বসবাস করতো এবং পারসিকরা এ অঞ্চল শাসন করতো। অপরদিকে, আল-শাম ছিল রোমানদের উপনিবেশ যেখানে রোমান সংস্কৃতি ও খ্রিষ্ট ধর্মের প্রাবল্য ছিল। এ অঞ্চলে প্রধানত সিরীয়, আর্মেনীয়, ইহুদী, আরব এবং স্বল্প সংখ্যক রোমান বসবাস করতো। এরপর, মুসলিমরা মিশর জয় করে এবং এ অঞ্চলেও কপ্ট, ইহুদী এবং রোমান জাতির লোকেরা মিশ্রিত ভাবে বসবাস করতো। এরপরের পালায় বিজিত হয় উত্তর আফ্রিকা, যেখানে আফ্রিকার বার্বার জাতি রোমানদের শাসন-কর্তৃত্বের নীচে বসবাস করতো। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পরে উমাইয়াদের শাসনামলে সিন্ধ, খাওয়ারিজম এবং সমরকান্দ জয় করে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যুক্ত করা হয়। এ সময়েই আল-আন্দালুস জয় করা হয় এবং একে ইসলামী রাষ্ট্রের একটি প্রদেশে পরিণত করা হয়।

    এ সমস্ত বিজিত অঞ্চলের মানুষেরা ছিল বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর; তাদের ছিল বিভিন্ন ধরনের ধর্মবিশ্বাস, ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি, প্রথা ও আইনকানুন। স্বাভাবিক ভাবেই তারা মানসিক ও আচরনগত দিক থেকে একে অন্য থেকে ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। সুতরাং, এ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মবিশ্বাসের মানুষকে একটি নির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা, ভাষা, সংস্কৃতি ও আইনকানুন দিয়ে শাসন করে তাদের একটি একক জাতিতে পরিণত করা ছিল সত্যিকারের একটি ব্যাপক ও দুরূহ কাজ এবং এ কাজে সফলতা অর্জন করা ছিল অসাধারন ও বড় মাপের সাফল্য। কিন্তু, ইসলামী জীবনাদর্শের মাধ্যমে বিরাট এ সাফল্য অর্জন  করা সম্ভব হয়েছে এবং (পৃথিবীর ইতিহাসে) এ সফলতা অর্জন করেছে শুধু ইসলামী রাষ্ট্র। ইসলামের পতাকাতলে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থার নীচে আসার সাথে সাথেই তারা (বিজিত জনগোষ্ঠী) এক উম্মাহ্ বা জাতি হিসাবে বিবেচিত হয়েছে; আর তা হল মুসলিম উম্মাহ্। বস্তুতঃ ইসলামী আকীদাহ্ এবং শাসনব্যবস্থাই ছিল অসাধারন এ সাফল্যের মূলভিত্তি। ভিন্ন ধরনের এই সব জনগোষ্ঠীকে সফলতার সাথে একটি জাতিতে পরিণত করার পেছনে অনেক ধরনের কারণ রয়েছে। কিন্তু, নিম্নবর্ণিত কারণগুলো এগুলোর মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ:

    ১. ইসলামের শিক্ষা।

    ২. জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে এবং কাজেকর্মে মুক্ত অঞ্চলের জনসাধারণের সাথে মুসলিমদের স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা করা।

    ৩. বিজিত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর দ্রুত ইসলাম গ্রহণ।

    ৪. ইসলাম গ্রহণকারীদের জীবনাচরণে আমুল পরিবর্তন এবং এর মাধ্যমে অসহনীয় জীবন থেকে সুস্থ ও সুন্দর জীবনে উত্তরণ।

    বস্তুতঃ ইসলামের শিক্ষা দ্বীন ইসলামের দিকে মানুষকে আহবান করার বাধ্যবাধকতা অর্পণ করে এবং যখন যেখানে সম্ভব এ আলোকিত বাণীকে ছড়িয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই জিহাদের মাধ্যমে অন্যান্য অঞ্চল বা ভূখন্ড জয় করার প্রয়োজন হয়; যেন সে অঞ্চলের মানুষেরা খুব সহজে ইসলামের আলোকিত আদর্শ এবং এর ন্যায়ভিত্তিক আইনকানুনের যথার্থতা অনুধাবন করতে পারে। ইসলাম আবার যে কোন ব্যক্তি বা জাতিকে ইসলাম গ্রহণ না করে তাদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরার স্বাধীনতাও দেয়। এক্ষেত্রে, তাকে শুধমাত্র ইসলামের লেনদেন ও শাস্তি সংক্রান্ত বিধিবিধানকে মেনে চলতে হয়। শেষোক্ত এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ, এই বিষয়টিই মূলতঃ মুসলিম ও অমুসলিম জনসাধারণের কর্মকান্ডের মাঝে একাত্মতা ও বন্ধন তৈরী করে। তারা একই ব্যবস্থা দিয়ে শাসিত হয় এবং জীবনের সমস্যাগুলোকে একই ব্যবস্থা দিয়ে সমাধান করে, যা তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখে। ঐক্যের এ ভিত্তিই অমুসলিমদেরকে মুসলিমদের মতোই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করতে সাহায্য করে। তারা তখন একই জীবনব্যবস্থার অংশীদার হয়ে এবং একই রাষ্ট্রের অভিভাকত্বের নীচে থেকে একই রকম মানসিক সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে।

    এছাড়া, ইসলামের শিক্ষা শাসিত জনগোষ্ঠীকে জাতি, গোত্র বা বর্ণের ভিত্তিতে বিবেচনা না করে মানুষ হিসাবে বিবেচনা করতে শেখায়। এ কারণে, ইসলামের সামাজিক ও শাস্তি সম্পর্কিত আইনকানুনগুলো কোন রকম পার্থক্য ছাড়াই মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের উপর কার্যকরী করা হয়।

    আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,

    “কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা বা ঘৃনা যেন তোমাদের ন্যায় প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত না রাখে; তোমরা ন্যায়বিচার কর; আর, এটাই তাকওয়ার নিকটবর্তী এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই, আল্লাহ তোমাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে খুব ভাল করে জানেন।” [সুরা মায়িদাহঃ ৮]

    ইসলামী রাষ্ট্রে আইনের চোখে সকল মানুষ সমান। রাষ্ট্রের শাসক জনগণের বিষয়াদি দেখাশুনা করবে এবং জনগণকে শাসন করবে। আর, রাষ্ট্রের নিয়োজিত বিচারক (কাজী) কোনরকম পক্ষপাতদুষ্টতা ছাড়া জনগণের মাঝে বিদ্যমান বিবাদসমূহ নিষ্পত্তি করবে। এলক্ষ্যে, বিচারক প্রতিটি নাগরিককে মানুষ হিসাবে (মুসলিম বা অমুসলিম হিসাবে নয়) বিবেচনা করে তাদের সমস্যা সমাধান করবে এবং ঝগড়া-বিবাদের ফয়সালা করবে। বস্তুতঃ ইসলামী শাসনব্যবস্থাই রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের মাঝে সত্যিকারের সমতা ও ঐক্য নিশ্চিত করে।

    ইসলাম শাসকদের নির্দেশ দিয়েছে যেন রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সহায়তায় রাষ্ট্রের সমস্ত উলাইয়াতে (প্রদেশ) বসবাসকারী মানুষের মৌলিক চাহিদার নিশ্চিত করা হয়। প্রদেশের সংগৃহীত রাজস্ব যাই হোক না কেন কিংবা সংগৃহীত সে রাজস্ব জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট হোক বা না হোক। এছাড়া, ইসলাম রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কোষাগারের জন্য বিভিন্ন উলাইয়াহ থেকে কর আদায় করে তা একত্রিত করে একটি একক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রচলনের  নিদের্শ দিয়েছে, যেন বিজিত অঞ্চলগুলো উলাইয়াহ হিসাবে দৃঢ় ভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে সংযুক্ত হয় এবং তাদেরকে একটি একক ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে সহায়তা করে। বস্তুতঃ ইসলামী শাসনব্যবস্থা এরকম একটি ব্যবস্থাকে সাফল্যের সাথে নিশ্চিত করেছিল এবং এক্ষেত্রে সফলতা লাভ করেছিল।

    এছাড়া, বিজিত অঞ্চলগুলোর বসবাসকারী মানুষের সাথে মুসলিমদের সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে মেলামেশা, এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহন করা ও মুসলিমদের সাথে তাদের একীভূত হয়ে যাবার ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল। কোন অঞ্চল বা ভূখন্ড জয় করার পরপরই সাধারনত মুসলিমরা সেখানে বসবাস করতে আরম্ভ করত এবং সে জনগোষ্ঠীর মানুষকে ইসলাম ও ইসলামের সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করত। মুসলিমরা তাদের প্রতিবেশী হিসাবে বাস করতো, সকল কর্মকান্ডে তাদের অংশীদার হত এবং একই দেশের নাগরিক হিসাবে একই আইনকানুন দিয়ে শাসিত হত। ইসলামী রাষ্ট্রে কখনই শাসক আর শাসিত কিংবা বিজয়ী আর বিজিত হিসাবে জনসাধারণ বিভাজিত হয়নি; কিংবা, মুসলিম ও আদিবাসীরা আলাদা কোন জনগোষ্ঠী হিসাবে বিচ্ছিন্ন ভাবে বসবাস করেনি। তারা সকলেই ছিল রাষ্ট্রের নাগরিক যারা প্রাত্যহিক কর্মকান্ডে একে অপরকে সবসময় সহযোগিতা করতো। মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর এ ধরনের আচরণ বিজিত জনগোষ্ঠীর কাছে একেবারেই নতুন ছিল। বস্তুতঃ এ শাসকগোষ্ঠী নিজেদেরকে জনগণের কাতারে রেখে তাদেরকে ন্যায় ও সমতার ভিত্তিতে শাসন করেছিল এবং এর ভিত্তিতেই তারা জনগণের সেবা ও তাদের বিষয়াদি দেখাশুনা করেছিল। ফলে, এ অঞ্চলসমূহের জনগোষ্ঠী অবাক বিস্ময়ে শাসকগোষ্ঠীর এমন এক আচরণের সাক্ষী হয়েছিল, যে ব্যাপারে তাদের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তারা উন্নত চরিত্রের শাসকদের কাছ থেকে পেয়েছিল অত্যন্ত চমৎকার আচরণ, যা তাদেরকে এই শাসকবর্গ ও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। শাসক ও সাধারন মুসলিমরা আহলে কিতাবের (ইহুদী ও খ্রিষ্টান) নারীদেরকে বিয়ে করতো, তাদের জবাই করা পশুর মাংস ও খাবার খেত। এ সকল আচরণ মূলতঃ তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে; কারণ, তারা শাসক ও শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের উপর আরোপিত ইসলামী জীবনাদশের্র প্রভাব ও সৌন্দর্য স্বচক্ষে অবলোকন করেছে। ফলশ্রুতিতে, তারা ধীরে ধীরে মুসলিমদের সাথে একীভূত হয়ে একটি একক উম্মাহ্ বা জাতিতে পরিণত হয়েছে।

    এছাড়া, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ইসলাম গ্রহণ করা কোন বিশেষ সময় বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং, প্রতিটি দেশের মানুষই দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। আসলে, বিজিত অঞ্চলগুলোতে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত— মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে। ফলে, পরবর্তীতে ইসলাম আর বিজয়ী মুসলিমদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে বিজিত এইসব জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে মুসলিমদের সাথে একীভূত হয়েছে এবং এক উম্মাহ’তে পরিণত হয়েছে।

    এছাড়া, ইসলাম নও মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে উন্নততর করে তাদেরকে সামগ্রিক ভাবে পরিবতর্ন করেছিল। এর ফলে, তাদের মাঝে ইসলামী আকীদাহ্ দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা কাজ করেছিল তাদের জীবনাদর্শের ভিত্তি হিসাবে। আর, এ জীবনাদর্শ থেকেই উৎসরিত হয়েছিল তাদের জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন রকম ধ্যান-ধারণা। ইসলাম তাদেরকে অন্ধ ও কুসংস্কাচ্ছন্ন বিশ্বাস থেকে তুলে এনে যৌক্তিক বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এ পরিবর্তন তাদেরকে মূর্তিপূজা, অগ্নিপূজা, ট্রিনিটি তত্ত্ব বা তিন খোদার অস্তিত্বে বিশ্বাস, ব্যক্তিপূজা এবং এ জাতীয় বিভিন্ন বস্তুর উপাসনা, যা তাদের চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের মূল কারণ ছিল, এগুলো থেকে এক আল্লাহ’র উপাসনার দিকে ধাবিত করেছিল। আর, এক আল্লাহ’র উপাসনাই তাদের অন্তরসমূহকে ক্রমাগত করেছিল আলোকিত। ইসলাম তাদের মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়েছিল এবং তারা কোরআন-সুন্নাহ’র বর্ণনার ভিত্তিতেই বিষয়টি অনুধাবন করেছিল এবং বিশ্বাস করেছিল পরকালের পুরস্কার ও শাস্তির উপরও। মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর দৃঢ় বিশ্বাস থাকায় তারা বুঝতে  পেরেছিল ক্ষণস্থায়ী এ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। ফলে, তারা ধাবিত হয়েছিল অনন্ত-অসীম ও চিরসুখের জীবনের খোঁজে। একইসাথে, তারা এতটুকু অবহেলা না করে দু’বাহু উম্মুক্ত করে এ জীবনকে যাপন করেছিল। তারা আল্লাহতায়ালা নির্ধারিত সঠিক পন্থা ও নির্দেশনা দিয়ে জীবন যাপনের প্রতিটি সরঞ্জামকে ব্যবহার করেছিল ও উপভোগ করেছিল জীবনের আনন্দ ও প্রাচুর্য্যকে।

    ইসলাম আসার পূর্বে, এ সমস্ত জনগোষ্ঠীর মানুষের কর্মকান্ডের মূলভিত্তি ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ অর্থাৎ, ব্যক্তিস্বার্থই ছিল তাদের সকল কমর্কন্ডের মূল নিয়ামক। কিন্তু, ইসলাম গ্রহনের পর তাদের কাজের ভিত্তি পরিবর্তিত হয়ে হালাল-হারামে পরিণত হয়। মূলতঃ আল্লাহতায়ালা যা কিছু আদেশ করেছেন এবং নিষেধ করেছেন সে সবকিছুর উপর গড়ে উঠা ভিত্তিই তাদের সমস্ত কাজের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়। তাদের সমস্ত কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়ে যায় আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর, কাজের মূল্য নির্ধারিত হয় কাজের পেছনে নিহিত উদ্দেশ্য থেকে। যেমনঃ যদি, কাজটি হয় নামাজ কিংবা জিহাদ, তাহলে এটি হয় আধ্যাত্মিক কাজ; যদি হয় ক্রয় বা বিক্রয় সংক্রান্ত, তাহলে এটি হয় বস্তুগত কাজ; সহমর্মিতা বা বিশ্বস্ততা হয় নৈতিক কাজ; বিপদে কাউকে সাহায্য করার বিষয়টি হয় মানবিক কাজ ইত্যাদি। মানুষ কাজের পেছনের উদ্দেশ্য এবং কাজের মূল্যের ব্যাপারে পার্থক্য করতে আরম্ভ করে। ফলে, জীবন সম্পর্কে তাদের পূর্বের সকল ধারণা পরিবর্তিত হয়ে যায়। ইসলাম নির্ধারিত কাজের ভিত্তিতেই জীবনকে পরিমাপ করা হয় এবং জীবনের প্রকৃত অর্থ নির্ধারিত হয়।

    ইসলাম মানুষকে সুখের প্রকৃত সংজ্ঞা শেখায়। ইসলাম পূর্ব সময়ে, সুখ মানুষের জৈবিক ও প্রবৃত্তিগত চাহিদা পূরণের মধ্যে নিহিত ছিল। পরবর্তীতে তা পরিবর্তিত হয়ে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করাতে পরিণত হয়। আসলে, এর মধ্যেই প্রকৃত সুখ নিহিত। কারণ, সুখের প্রকৃত অর্থ হলো, মানবাত্মার চিরস্থায়ী শান্তি। আর, শুধুমাত্র বস্তুগত উপকরণের মাধ্যমে জৈবিক ও প্রবৃত্তিগত চাহিদা পূরণ করে চিরস্থায়ী এ শান্তি লাভ করা কখনও সম্ভব নয়। বস্তুতঃ এ রকম সুখের নাগাল একমাত্র বিশ্বব্রক্ষ্মান্ডের স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।

    এভাবেই ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেয়া মানুষের জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গীকে ইসলাম প্রভাবিত করেছে। জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী এবং তাদের জীবনের সকল কর্মকান্ডকে আমূল পরিবর্তন করেছে। পরিবর্তন করেছে তাদের কাজের গুরুত্বের ক্রমধারাকে (Order of Priorities); Some went up in value, others came down. গুরুত্ব নির্ধারনের ক্ষেত্রে মানবজাতি সবসময়ই তার নিজের জীবনকে সবচাইতে উপরের অবস্থানে রেখেছে এবং জীবনাদর্শ এসেছে তার পরের অবস্থানে। কিন্তু, ইসলাম পুরো ব্যাপারটিকে একেবারে উল্টিয়ে দিয়েছে; ইসলাম জীবনাদর্শকে রেখেছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে, এমনকি মানুষের নিজের জীবনের চাইতেও আদর্শকে উপরের স্থান দেয়া হয়েছে। এ বিষয়টি বোঝার পর, ইসলামের প্রয়োজনে মুসলিমরা অকাতরে নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতে আরম্ভ করে এবং ইসলামী জীবনাদর্শ যে নিজ জীবনের চাইতে বহুগুণে মূল্যবান তারা এ সত্যকেও সঠিক ভাবে অনুধাবন করতে শুরু করে। একইসাথে,  তারা এটাও  বুঝতে  পারে  যে, ইসলামের জন্য কঠিন সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ করা মুসলিমদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এভাবেই, জীবনের বিভিন্ন বিষয়গুলো সঠিক ক্রমধারা অনুযায়ী জায়গা করে নেয়। জীবন হয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত। মুসলিমরা অর্জন করে আত্মার চিরস্থায়ী সুখ ও শান্তি; কারণ, তারা বুঝতে পারে যে, আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করাই ক্ষনস্থায়ী এ জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য।

    এভাবে, নও মুসলিমদের জীবনের সর্বোত্তম আদর্শ (Ideals) সম্পর্কে ধ্যান-ধারণাও পরিবর্তিত হয়ে যায়। অতীতে এ সমস্ত মানুষের সর্বোত্তম আদর্শের ব্যাপারে ভিন্ন ধরণের এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ধ্যান-ধারণা ছিল। কিন্তু, ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা জীবনের এক ও একমাত্র এবং চুড়ান্ত এক আদশের্র সন্ধান পেল। এর ফলে, জীবনের যে সমস্ত বিষয়গুলো তাদের কাছে খুব অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে সবকিছুর মাপকাঠিই একেবারে বদলে  গেল; বদলে গেল মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অর্থ। পূর্বে তাদের কাছে মূল্যবোধের অর্থ ছিল ব্যক্তির সাহসিকতা, মার্জিত আচরণ ও শ্রদ্ধাবোধ এবং গোত্রীয় সমর্থন, বিত্তবৈভবের অহংকার, উচ্চ বংশমর্যাদা, Generosity to the point of extravagance. গোত্র বা সম্প্রদায়ের প্রতি আনুগত্য/বিশ্বস্ততা, দয়ামায়াহীন প্রতিশোধস্পৃহা এবং এই ধরণের অন্যান্য গুনাবলীর উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা হত। কিন্তু, ইসলাম তাদের পুরনো এ সব ধ্যান-ধারণাকে পরিবতর্ন করে দিল। বস্তুতঃ ইসলাম এ সবকিছুকে খুবই নগন্য বিষয়ে পরিণত করলো। এ সমস্ত বিষয়ে ইসলামের বক্তব্য ছিল যে, মানুষ শুধুমাত্র আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে এ সব বিষয় গ্রহণ কিংবা বর্জন করতে পারে; তার ব্যক্তিগত লাভ বা লোকসানের উপর ভিত্তি করে নয়। কিংবা, উচ্চ মর্যাদা লাভ বা অহংকারের বশবর্তী হয়ে নয়। এজন্যও নয় যে, এগুলো বংশপরম্পরায় চলে আসা রসম-রেওয়াজ/রীতিনীতি, প্রথা কিংবা ঐতিহ্য, যাকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। বরং, ইসলাম এ সকল বিষয়ের ক্ষেত্রে শুধু আল্লাহর নির্দেশের পূর্ণ আনুগত্য করাকে বৈধতা দিয়েছে। ব্যক্তিগত, গোত্রীয়, সামষ্টিক এবং জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে শুধু ইসলামের হুকুম-আহকামের কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের নির্দেশ দিয়েছে।

    এভাবেই, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে তাদের মনমানষিকতা ও আচরণকে ইসলাম পুরোপুরি রূপান্তরিত করেছে; বদলে দিয়েছে তাদের ব্যক্তিত্ব এবং জীবন, মানুষ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী। জীবনের সকল কাজ কোন ভিত্তির উপর সম্পাদিত হবে সে বিষয়ে ধ্যান-ধারণাকেও পুরোপুরি পরিবর্তিত করেছে। ইসলাম মানুষকে বুঝতে শিখিয়েছে যে, এই ক্ষনস্থায়ী জীবনের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আর তা হল, নিজেকে প্রতিনিয়ত ক্রটিবিচ্যুতি থেকে মুক্ত করে মহৎ গুনাবলীর দিকে ধাবিত করা। এছাড়া, মুসলিমরা আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনকেই সর্বোত্তম আদর্শ হিসাবে হৃদয়ে ধারণ করেছিল এবং সর্বশক্তি দিয়ে এ লক্ষ্য অর্জন করারও চেষ্টা করেছিল। যা তাদেরকে পূর্বাবস্থা থেকে আমূল পরিবর্তন করে পরিণত করেছিল নতুন এক সৃষ্টিতে।

    এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই মূলতঃ ইসলাম গ্রহণকারীদের তাদের ইসলামপূর্ব অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে সাহায্য করেছিল। ইসলাম জীবন সম্পর্কে তাদের বিভিন্ন ধ্যানধারণা ও লক্ষ্যকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি মাত্র ধারণা ও লক্ষ্যে পরিণত করেছিল। ঐক্যবদ্ধ এই ধারণার ভিত্তিতেই তারা জীবনের সকল বিষয়াদি পরিচালনা করতো। ইসলাম তাদের বিভিন্ন ধরণের স্বার্থকে পরিবর্তন করে একটি মাত্র স্বার্থের নীচে তাদের একত্রিত করেছিল; আর, তা ছিল শুধু ইসলামের স্বার্থ। তাদের জীবনের বিভিন্ন লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়ে একটি লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল; আর, তা হল আল্লাহর বাণীকে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া। পরিণতিতে, স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষ একটি একক জাতি বা উম্মাহ’তে পরিণত হয়েছিল; আর, তা হল ইসলামিক উম্মাহ্।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৬ (ইসলামের বিজয়যাত্রা সুসংহতকরণ)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    অতীতে মুসলিমরা বহু দেশ জয় করে সেখানে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছে। বস্তুতঃ ইসলামই তাদের শাসন-ক্ষমতা ও নেতৃত্ব-কর্তৃত্বে উপবিষ্ট হবার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ, অমুসলিমদের দ্বারা শাসিত হওয়া মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। আল্লাহতায়ালা সূরা নিসাতে বলেছেন,

    “আল্লাহ কখনোই মু’মিনদের উপর কাফিরদেরকে জন্য কোন পথ রাখবেন না।” [সুরা নিসাঃ ১৪১]

    এছাড়া, আল্লাহতায়ালা সম্মান ও মর্যাদা মু’মিনদের জন্য নির্ধারিত করেছেন। তিনি সুরা মুনাফিকুনে বলেছেন,

    “এবং সম্মান ও মর্যাদা তো শুধু আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদের জন্যই নির্দিষ্ট, কিন্তু মুনাফিকরা তা জানে না।” [সুরা মুনাফিকুনঃ ৮]

    আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের ততক্ষন পর্যন্ত প্রতিপত্তি, শাসন-ক্ষমতা এবং নেতৃত্ব দেননি, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা তাদের মনমানসিকতাকে সত্যিকার ভাবে ইসলামের আলোকে গঠন করতে পেরেছে। আর প্রকৃত অর্থে, এ মানসিকতা বলতে বোঝায়, শাসন-কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব অর্জনের মাধ্যমে ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করা এবং ইসলামের বাণীকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা, ক্ষমতা অর্জনের মোহে মত্ত হয়ে যাওয়া নয়। মুসলিমরা যতক্ষন পর্যন্ত না এই যোগ্যতা ও মানসিকতা অর্জন করেছে [অর্থাৎ, তারা বুঝতে পেরেছে জনগণকে শাসন করা বলতে আসলে কি বোঝায় এবং আল্লাহর কাছে এর জবাবদিহিতা কতোটুকু] ততক্ষন পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা তাদেরকে শাসন-কর্তৃত্ব এবং জনগণের দেখাশোনা করার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রেখেছেন। বস্তুতঃ ইসলামের অভূতপূর্ব সৌন্দর্য নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত এই সমস্ত ন্যায়পরায়ণ শাসকদের বিভিন্ন কর্মকান্ড ও উক্তির মধ্য দিয়ে অত্যন্ত জোরালো ভাবে প্রকাশিত হয়েছে এবং জনগণও এ আলোকিত সৌন্দর্যের সাক্ষী হয়েছে, যখন শাসকরা তাদের শরীয়াহ্ আইন-কানুনের মাধ্যমে শাসন করেছে। এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হিসাবে, এই সমস্ত জনগোষ্ঠির মানুষ ইসলামের সৌন্দর্যে এতো বেশী মুগ্ধ হয়েছে যে, তারা স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করেছে। ফলে, ইসলামের প্রতিপত্তি, নেতৃত্ব ও ক্ষমতার তারাও অংশীদার হয়েছে এবং সেইসাথে তাদের দেশগুলোও মুসলিম উম্মাহর অংশ হিসাবে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়ে গেছে।

    বিজিত এ সমস্ত দেশগুলোকে ইসলামী আইন-কানুন অনুসারে শাসন করে ইসলামের এই বিজয়যাত্রাকে সুসংহিত করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী হয়েছে এ সমস্ত অঞ্চলের মানুষের ইসলাম গ্রহনের মধ্য দিয়ে [Until the conquer of countries by the Islamic state was given until the Day of Judgement]. মূলতঃ এ অভিযানগুলো বিজিত জনগোষ্ঠির মানুষদেরকে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থা ও শাসন-ব্যবস্থা থেকে সম্পুর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করেছিল এবং তাদেরকে অবিশ্বাসী জনগোষ্ঠি থেকে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠিতে রূপান্তরিত করেছিল। সেইসাথে তাদের ভূ-খন্ড দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়েছিল। ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেবার পূর্ব পর্যন্ত এই অবস্থা বিরাজ করে। তবে, ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ও মুসলিমদের কর্তৃত্ব ধ্বংস হয়ে যাবার পরও এই অঞ্চলের মানুষেরা মুসলিমই থেকে গিয়েছিল এবং তাদের ভূ-খন্ডগুলোও মুসলিম ভূ-খন্ড হিসাবেই বিবেচিত। যদিও বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র অনুপস্থিত, কিন্তু তারপরও যে সমস্ত দেশগুলো একসময় মুসলিমরা জয় করেছিল সে সমস্ত দেশের মানুষ এখনও ইসলামকেই আঁকড়ে ধরে আছে এবং তাদের ভূ-খন্ডগুলো এখনও মুসলিম ভূ-খন্ড হিসাবেই বিবেচিত হচ্ছে। এজন্য, এই সমস্ত অঞ্চলগুলোতে ইসলামের কর্তৃত্ব পূনঃপ্রতিষ্ঠিত করে আবারও এ অঞ্চলে ইসলামী শাসন-ব্যবস্থা ফিরিয়ে নিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

    মূলতঃ কিছু কিছু বিষয় ইসলামের বিজয়যাত্রাকে স্থায়ী করতে এবং সেইসাথে ইসলামের বীজকে বিচারদিবস পর্যন্ত মানুষের অন্তরে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিল। এগুলোর মধ্যে কিছু বিষয় বিজিত ভূ-খন্ডগুলোকে শাসন করা সহজ করেছিল, যেমনঃ ইসলামী আইন-কানুনের প্রকৃতি।

    আবার অন্যকিছু বিষয় ছিল যা বিজিত জনগোষ্ঠির মানুষকে ইসলাম গ্রহনে উদ্বুদ্ধ করেছিল, যেমনঃ জনগণের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসকদের ব্যবহার। আবার কিছু কিছু বিষয় ধর্মান্তরিত নও মুসলিমদের অন্তরে চিরস্থায়ী ভাবে ইসলামকে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিল, যেমন, ইসলামী আকীদাহর প্রকৃতি।

    সংক্ষেপে এই বিষয়গুলো নিম্নরূপে সাজানো যায়ঃ

    ১. ইসলাম একটি যৌক্তিক আকীদাহ্ বা বিশ্বাস, যা মানুষকে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়ায় চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহন করতে বাধ্য করে। এজন্য, যখনই কোন মানুষ ইসলাম গ্রহন করে, তখনই সে চিন্তাশীল ব্যক্তিতে পরিণত হয়। এর কারণ হল, ইসলাম গ্রহনের সাথে সাথেই তার চিন্তা-চেতনা বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড এবং সৃষ্ট জগতের দিকে ধাবিত হয় এবং আল্লাহর এ সৃষ্ট জগতের ব্যাপকতা ও রহস্যময়তা প্রতিনিয়ত তাকে স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করে তোলে। এ চিন্তা-চেতনাই তাকে মহান স্রষ্টার হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে, [শরীয়া’র মূল উৎস থেকে] বিভিন্ন হুকুম অনুসন্ধান করতে এবং তা অনুযায়ী তার জীবনের সমস্ত সমস্যা সমাধান করতে উৎসাহিত করে। আর এভাবেই, ইসলাম ব্যক্তি মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয় এবং সে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে, জেনেবুঝে ইসলাম দিয়ে তার জীবন পরিচালনা করে।

    ২. ইসলাম মুসলিমদের জ্ঞানাজর্ন করা এবং ইসলামের রীতি-নীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত থাকাকে বাধ্যতামূলক করেছে। তাই, ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে জানা ও বোঝার জন্য শুধু মুখে দুই কালেমা উচ্চারণ করা যথেষ্ট নয়। বরং, একজন মুসলিমের উচিত ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞানার্জন করা। মানুষ, মহাবিশ্ব ও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইসলামের আলোকে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরী করা এবং ইসলাম এদের মধ্যকার পারস্পারিক সম্পর্ক কিভাবে নির্ধারণ করেছে সে ব্যাপারে অনুসন্ধান করা মুসলিমদের দায়িত্ব। কারণ, এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান মানুষের চিন্তার জগতকে বিস্তৃত ও প্রসারিত করে, তার ধ্যান-ধারণাকে স্বচ্ছ করে এবং সর্বোপরি প্রতিনিয়ত তার মনমানষিকতাকে উন্নত করে – যা তাকে অন্যদের শিক্ষককে পরিণত করে।

    ৩. বস্তুতঃ ইসলামী জীবনাদর্শ এবং এর শরীয়াহ’র প্রকৃতি হল, এ সম্পর্কিত জ্ঞানকে ধাপে ধাপে ও ক্রমান্বয়ে অর্জন করার প্রয়োজন হয়। এটি একজন মুসলিমকে সে যে সমাজে বসবাস করে সেখান থেকে জ্ঞানার্জন করার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার শিক্ষা দেয়। মুসলিমরা সবসময় বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যেই ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। একারনেই মুসলিমরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। ইসলামী আকীদাহ্ তাদের অন্তর ও হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে যাবার কারনে তাদের ছিল চতুর্দিক পরিবেষ্টনকারী ধ্যান-ধারণা এবং সেইসাথে ছিল সমৃদ্ধ ও দিগন্ত বিস্তৃত জ্ঞানভান্ডার। এছাড়া, মুসলিমরা সাধারনত কোন বিষয় সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা ও চিন্তাভাবনা করার পরই সে ব্যাপারে ইসলামের হুকুম-আহকাম কি হবে সে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতো। কারণ, এ ক্ষেত্রেও ইসলামকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করাই মূল বিষয় হিসাবে বিবেচিত হত।

    প্রকৃতঅর্থে, মুসলিমরা শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জন করার খাতিরে কখনো ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা কিংবা চিন্তাভাবনা করেনি। কারণ, এক্ষেত্রে এই জ্ঞানসাধনা তাদেরকে শুধু ইসলামের হুকুম-আহকাম বা চিন্তাচেতনায় পরিপূর্ণ জীবন্ত এক লাইব্রেরী বা বইতে পরিণত করতো, যার কোন বাস্তব প্রয়োগ থাকতো না। এই ধরনের জ্ঞানসাধনা তাদেরকে জ্ঞানের এমন এক ধারকে পরিণত করতো, যা তাদের কার্যকলাপ ও জীবনাচরণকে প্রভাবিত করতো না এবং লব্ধ সে জ্ঞানের আলোকে সমাজ পরিবর্তন করার কাজেও উদ্ধুদ্ধ করতো না। অর্জিত এই জ্ঞান সঞ্চিত জলাধারের মতো সমাজে কোন প্রভাব না ফেলেই একসময় শুকিয়ে যেত। এছাড়া, মুসলিমরা ইসলামকে শুধুমাত্র কিছু উপদেশাবলীর সমষ্টি হিসাবেও গ্রহন করেনি। কারণ, তা হলে, ইসলামী আদর্শ তাদেরকে সংকীর্ণ চিন্তাচেতনার ব্যক্তিবর্গে পরিণত করতো, যার ফলে তারা বিশ্বাসের সাথে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপের সম্পর্ক স্থাপন করতে ব্যর্থ হতো। মুসলিমরা খুব সতর্কভাবে বিপদজনক এই দুটি পথকে পরিহার করেছে; একটি হল, শুধুমাত্র জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা করা। আর, অন্যটি হল, ইসলামকে শুধু কিছু উপদেশাবলীর সমষ্টি হিসাবে গ্রহন করা। বস্তুতঃ ইসলামের নির্ধারিত পথেই মুসলিমরা ইসলাম ও এর হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেছে। আর, তা হল আলোকিত চিন্তার মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই অর্জিত জ্ঞানকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করা।

    ৪. ইসলাম প্রগতিশীল আদর্শ। এ আদর্শ সবসময়ই মুসলিমদেরকে নতুন নতুন উচ্চতার দিকে নিয়ে যায় এবং তাদেরকে পরিপূর্ণতা অর্জনের আলোকিত এক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত করে। বস্তুতঃ ইসলাম মুসলিমদেরকে বাস্তব জীবনে কিছু কাজ করতে বাধ্য করে। আর এ সমস্ত কার্যাবলী মুসলিমদেরকে ধীরে ধীরে এমন এক পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায় যেখানে তারা আধ্যাত্মিক উচ্চতা, মানসিক শান্তি এবং সত্যিকারের সুখকে অনুভব করতে পারে। মানুষ যখন এ উচ্চতায় পৌঁছে যায়, তখন সে সেখানেই অবস্থান করতে চায়। সে অবস্থান থেকে পতিত হতে চায় না। কিন্তু, বাস্তবতা হলো, পরিপূর্ণতার এ রকম এক উচ্চতায় পৌঁছানো যত না কঠিন, সে অবস্থানকে ধরে রাখা তার চাইতেও কঠিন কাজ। এজন্য, মুসলিমদেরকে তাদের কাজের ব্যাপারে হতে হবে দৃঢ় প্রত্যয়ী, সংকল্পবদ্ধ ও চিন্তাশীল। এ সমস্ত গুনাবলীর মাধ্যমেই মুসলিমরা তাদের অর্জিত উচ্চতা ও প্রগতিকে ধরে রাখতে পারবে।

    মুসলিমদের করণীয় এই সমস্ত কার্যাবলী আসলে সামগ্রিক ইবাদতের সমষ্টি; যাদের মধ্যে কিছু অবশ্য পালনীয় [ফরজ], আর কিছু আনুসাঙ্গিক। সমগ্র মুসলিমের জন্য অবশ্যপালনীয় এ ফরজ কর্তব্যগুলো স্বাভাবিকভাবেই সমগ্র জাতিকে প্রগতির সাধারণ এক উচ্চতায় নিয়ে আসতে সহায়তা করে। আর, অবশ্যপালনীয় কর্তব্য ছাড়া অন্যসব কাজগুলো প্রতিনিয়ত মানুষকে পরিপূর্ণতা অর্জন করতে উৎসাহিত করে।

    ইবাদত হিসাবে করণীয় এই সমস্ত কাজগুলো আসলে দুরূহ বা ভয়াবহ কোন দায়িত্ব নয়। কিংবা, নয় ক্লান্তিকর বা দমবন্ধকরা কোন অনাকাঙ্খিত অভিজ্ঞতা। এ সমস্ত কার্যাবলী মানুষকে তার জীবনের স্বাভাবিক আনন্দ, উচ্ছাস কিংবা প্রাণ চঞ্চলতা থেকেও বঞ্চিত করে না। না মানব প্রকৃতিকে অস্বীকার করে তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগত চাহিদাগুলোকে দমিয়ে রাখে। আসলে, ইবাদত হিসাবে করণীয় এই সমস্ত কর্তব্যগুলো, বিশেষ করে বাধ্যতামূলক কর্তব্যগুলো পালন করা যে কারও জন্য খুবই সহজ একটি ব্যাপার এবং প্রতিটি মানুষের পক্ষে তা পালন করা সম্ভব। এই ইবাদতগুলো মানুষকে তার জীবন উপভোগ করার পথেও বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় না। বস্তুতঃ অবশ্য পালনীয় ইবাদতগুলো ছাড়া, আনুসাঙ্গিক অন্যান্য মানদুব ইবাদতগুলো [যে সমস্ত কাজ করার জন্য মুসলিমদের উৎসাহিত করা হয়েছে] মুসলিমরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে পালন করে। কারণ, তারা জানে এই সমস্ত কাজের মাধ্যমেই তারা আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারবে।

    ৫. অতীতের মুসলিমরা দ্বীন ইসলামের আলোকিত বাণীকে সমস্ত বিশ্বে ছড়িয়ে দেবার লক্ষ্যেই অন্যান্য দেশ জয় করেছে। এজন্য তারা বিশ্বাস করতো যে, তারা এমন এক বাহিনী যাদের অন্তর মহানুভবতা ও হেদায়েতে পরিপূর্ণ। মুসলিমরা যখন কোন দেশ জয় করতো, তখন সে দেশকে ইসলাম দিয়েই শাসন করতো। আর, কোন জনগোষ্ঠী ইসলাম গ্রহন করার সাথে সাথেই তারা মুসলিমদের মতোই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করতো এবং সেইসাথে, মুসলিমদের জন্য যা যা অবশ্যপালনীয় তারা সে সমস্ত কার্যাবলীও পালন করতে বাধ্য থাকতো। বিজিত নতুন ভূখন্ড ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ অন্যান্য অঞ্চলের মতোই সমান অধিকার ও মর্যাদা উপভোগ করতো এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচিত হত। কারণ, ইসলামী শাসনব্যবস্থা ঐক্য ও সমতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। এ কারণেই, বিজিত ভূমির জনগোষ্ঠী কখনো অনুভব করেনি যে, তারা দখলদারিত্ব কিংবা আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। না তারা ঔপনিবেশিকতার কোন চিহ্ন কোনদিন প্রত্যক্ষ করেছে। সুতরাং, এটা বিস্ময়কর নয় যে, ইসলামের বাস্তব প্রয়োগকে স্বচক্ষে অবলোকন করার পর বিজিত জনগোষ্ঠীর মানুষেরা স্বেচ্ছায় দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে এসেছে।

    ৬. ইসলামের জীবনাদর্শ এবং হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত জ্ঞান কোন বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট নয়। বরং, এটা সকলের জন্য উম্মুক্ত একটি বিষয়। প্রকৃত অর্থে, বিজিত ভূমির জনগোষ্ঠীকে ইসলামের আকীদাহ্ ও হুকুম-আহকাম সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক, যেন তারা ইসলামী আকীদাহ্ ও জীবনাদর্শের প্রকৃত সৌন্দর্য ও প্রকৃতিকে গভীর ভাবে অনুভব করতে পারে। আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনস্থ অঞ্চলগুলোর জনগোষ্ঠীকে ইসলাম দিয়ে শাসন করার লক্ষ্যে সে অঞ্চলে গভর্নর ও বিচারক নিয়োগ করতেন এবং মানুষকে ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কে শিক্ষা দেবার জন্য শিক্ষক নিয়োগ করতেন। The Muslims who came after him (saw) conquered many countries and set up rulers and teachers who would teach the people fiqh and Qur’an. The people welcomed Islamic education with open arms until their culture became Islamic. This included those who chose not to embrace Islam.

    ৭. ইসলামী শরীয়াহ্ শ্বাশত ও সার্বজনীন এবং সেইসাথে এর রয়েছে মানবজীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান দেবার ক্ষমতা। এ কারণেই, মুসলিমদেরকে কখনও বিজিত অঞ্চলগুলোর আইন-কানুন সম্পর্কে গবেষনা করতে হয়নি। কিংবা, যে আইন-কানুন দিয়ে তারা জীবনের সব সমস্যার সমাধান করেছে (শরীয়াহ্ আইন), সে আইন-কানুনের সাথে বিজিত অঞ্চলগুলোতে বিদ্যমান আইন-কানুনের কোন রকম সমঝোতাও করতে হয়নি; না তারা এ সকল অঞ্চলে বিদ্যমান আইন হতে কোনরকম আইন গ্রহণ করেছে। কোন অঞ্চল বা দেশ জয় করার সাথে সাথেই তারা সেখানে প্রথমদিন থেকেই ইসলামী শাসনব্যবস্থা এবং শরীয়াহ্ আইনকে পুরোপুরি বা বাস্তবায়ন করেছে। ইসলামী শাসনব্যবস্থা বা শরীয়াহ্ আইন বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা কোনরকম পর্যায়ক্রমিক পদক্ষেপও গ্রহণ করেনি। যেমনঃ এমন কখনও হয়নি যে, তারা বিজিত কোন অঞ্চলে ক, খ ও গ আইন বাস্তবায়ন করেছে, কিন্তু ঘ আইন বাস্তবায়ন করেনি। এই ভেবে যে, ঘ আইনের বাস্তবায়ন হয়তো সে অঞ্চলে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে বিতর্কিত হতে পারে, কিংবা ঘ আইনের বাস্তবায়ন মানুষকে ইসলাম বিমুখ করতে পারে; অথবা, এ আইন মেনে নেয়া জনগণের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর হতে পারে। বস্তুতঃ অতীতে ইসলামকে কখনই এরকম পর্যায়ক্রমিক ভাবে ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হয়নি। কিংবা, বিচ্ছিন্ন বা খন্ডিত আকারে এখানে সেখানে শরীয়াহ্ আইন প্রয়োগ করা হয়নি।

    আসলে, ইসলামকে পরিপূর্ণ ভাবে প্রয়োগের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় এমন কোন পরিস্থিতি মুসলিমরা কখনও সহ্য করেনি। তারা ইসলামের আহবানকে সমগ্র বিশ্বের দরবারে পৌঁছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যেই বিভিন্ন দেশ জয় করেছে এবং সেইসাথে ইসলামী শাসনব্যবস্থাকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়ন করে বিজিত অঞ্চলগুলোর দূর্নীতিগ্রস্থ, ঘুনেধরা ও টলায়মান শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ন ভাবে বদলে দিয়েছে। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের পুরনো ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করতে হয়েছে এবং সম্পূর্ন নতুন এক ব্যবস্থার দ্বারা সে ব্যবস্থাকে সামগ্রিক ভাবে প্রতিস্থাপন করতে হয়েছে। এ কারণেই বিজিত নতুন নতুন অঞ্চলের জনগণকে প্রথমদিন থেকেই শাসন করা মুসলিমদের জন্য ছিল খুব সহজ একটি ব্যাপার। আর, এ কারণে বিজিত এ অঞ্চলগুলোতে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ন ও দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শাসন করতে গিয়ে মুসলিমরা কখনও কোন আইনপ্রণয়ন সংক্রান্ত জটিলতার সম্মুখীন হয়নি কিংবা, কুফর ও ইসলামী শাসনব্যবস্থার মাঝামাঝি কোন পর্যায়ও অতিক্রম করেনি। তাদের আহবান ছিল সুষ্পষ্ট; আর এর ভিত্তি ছিল ইসলামী আকীদাহ্। তাদের শাসনব্যবস্থা, আইন-কানুন ও সমস্ত বিধিবিধান এ আকীদাহ্ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল। বস্তুতঃ মুসলিমদের প্রণীত আইন-কানুন ছিল শরীয়াহ্ আইন, যা যে কোন মানবগোষ্ঠীর জন্য, যে কোন স্থানে এবং যে কোন সময়ে প্রযোজ্য।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৩৫ (ইসলাম প্রচারে জিহাদের ভূমিকা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    মুসলিম উম্মাহর পার্থিব জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো সমস্ত মানবজাতির কাছে ইসলামের সুমহান বাণী পৌঁছে দেয়া। এ লক্ষ্যে, মুসলিম উম্মাহকে সবসময়ই বিশ্বের কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকতে হয়েছে। আর, ইসলামের বাণী প্রচার-প্রসারের গুরুদায়িত্ব সবসময় ইসলামী রাষ্ট্রের কাঁধেই অর্পিত হয়েছে। তাই, অন্যান্য দেশ জয় করা এবং অত্যন্ত সফলতার সাথে লক্ষ্য অর্জন করা ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য খুব স্বাভাবিক একটা বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম নির্ধারিত দায়িত্ব-কর্তব্যকে সঠিক ভাবে পালন করার কারণেই অতীতে মুসলিমদের বিজয়ের ধারা অব্যাহত ছিল। আর, এ দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার অর্থ হলো, ইসলামী আইন-কানুনকে অমুসলিমদের উপর প্রয়োগ করে এবং ইসলামী ধ্যান-ধারনাগুলোকে ব্যাখ্যা করে তাদের কাছে এমন ভাবে ইসলামকে পৌঁছে দেয়া যেন ইসলাম তাদের চিন্তার জগতে বিচরণ করতে পারে।

    এজন্য, ইসলামের বিজয় অভিযান না পরিচালিত হয়েছে কোন হীন স্বার্থ সিদ্ধি লক্ষ্যে বা কোন জনগোষ্ঠিকে কলোনীতে পরিণত করার উদ্দেশ্যে, আর না তা পরিচালিত হয়েছে কোন বিশেষ এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ করতলগত করার উদ্দেশ্যে। এ সমস্ত বিজয়যাত্রার এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের মহান বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং সেইসাথে তারা যে দুর্নীতিগ্রস্থ শাসনের অধীনে দুঃসহ জীবনযাপন করছিল তা থেকে তাদের মুক্ত করা।

    বস্তুতঃ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল খুবই শক্তিশালী ভিত্তির উপর। যে কারণে, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ রাষ্ট্র অবলোকন করেছে এর সমৃদ্ধি এবং বিস্তৃতি, বিভিন্ন দেশ জয় করেছে এবং প্রতিনিয়ত এর সীমানাকে বৃদ্ধি করেছে। যেহেতু এ রাষ্ট্রের আকীদাহ্ বা বিশ্বাস সার্বজনীন, তাই এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূলেই নিহিত রয়েছে এর সার্বজনীন রাষ্ট্রে পরিণত হবার মূলমন্ত্র এ আকীদাহ্ সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরিত আকীদাহ্ যা থেকে উৎসরিত হয়েছে বিশ্বকেন্দ্রিক এক ব্যবস্থা এবং এ ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা হয়েছে বিশ্বের সকল মানুষের জন্য।

    যে জন্য প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর ক্রমশঃ বিস্তৃতি ঘটা এবং একের পর এক দেশকে জয় করা ছিল খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রকৃতপক্ষে, এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল কারণই এ বিষয়গুলোকে অবধারিত করে তুলেছিল। রাসূল (সা) আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় যে সকল মুসলিমের কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহন করেছিলেন তারা সকলেই আল্লাহর রাসুলের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন, যদিও এ যুদ্ধে তাদের ধন-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয় কিংবা তাদের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গের মৃত্যু ঘটে। তারা সুখ এবং দুঃখ উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর রাসূল (সা)-এর পরিপূর্ণ আনুগত্য করার শপথ নিয়েছিলেন এবং সর্বাবস্থায় সত্য কথা বলার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। তারা এটাও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তারা কারও অসন্তুষ্টির ভয়ে ভীত হবে না এবং ইসলামী দাওয়াতকে রক্ষার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রেখে আমৃত্যু লড়াই করবে। আর, এ একনিষ্ঠ আনুগত্যের পুরস্কার হিসাবে তারা পাবে চিরসবুজ জান্নাত। প্রকৃতঅর্থে, ইসলামী রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুতির মূলে এ বিষয়গুলোই সবসময় মূলমন্ত্র হিসাবে কাজ করেছে। মুসলিমদের সবসময়ই মনে রাখতে হবে, কোন কারণে ইসলামী রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুত করা হয়েছে? তাদের মূল কাজ কি? সেনাবাহিনী প্রস্তুতির মূল উদ্দেশ্য কি শুধুই ইসলামের দাওয়াত বহন করা নয়? এ উদ্দেশ্যেই কি মুসলিমরা সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়নি, আনুগত্যের শপথ করেনি এবং প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়নি?

    আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একের পর এক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। সমগ্র আরব উপদ্বীপকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসার পর তিনি (সা) কায়সার এবং খসরুর কাছে তাঁর দূত প্রেরণ করেন। আরব উপদ্বীপের বাইরে ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেয়াও তাঁর দাওয়াতী পরিকল্পনার একটা অংশ ছিল এবং হিজরী ৭ম সালে তিনি (সা) এ কাজ শুরু করেন। এছাড়া, তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের আশেপাশের বিভিন্ন রাজা ও রাজপুত্রদের কাছে দূত পাঠান, তাদের সকলকে ইসলামের দিকে আহবান করেন। মু’তা এবং তাবুকের যুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ এবং উসামার সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করা তাঁর এ সমস্ত পরিকল্পনারই বাস্তব প্রতিফলন। তাঁর উত্তরসূরী খলিফাগণ রাষ্ট্রের শাসক হিসাবে তাঁর গৃহীত পরিকল্পনার অনুসরণ করেছেন এবং যে সমস্ত দেশে দূত পাঠিয়ে তিনি (সা) মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেছিলেন, খলিফাগণ সে সমস্ত দেশ জয় করে প্রকৃতঅর্থে তাঁর পরিকল্পনাকেই বাস্তবায়ন করেছে।

    পরবর্তীতে, খুব শীঘ্রই একই পদ্ধতি ও মূলনীতি অনুসরণ করে নতুন নতুন বিজয় অভিযানের প্রস্তুতি নেয়া হয়। রাসূল (সা) এর মূলনীতি অনুসরণ করার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র দেশ জয়ের ব্যাপারে কখনো বিশেষ কোন পছন্দকে প্রাধান্য দেয়নি। কিংবা, এ কাজ কতোটা সহজ বা কতোটা কঠিন এ বিষয়েও মুসলিমরা কখনো চিন্তা-ভাবনা করেনি। যদিও মিশর জয় করা মুসলিমদের জন্য তুলনামূলক ভাবে সহজ ছিল এবং দারিদ্রপীড়িত উত্তর আফ্রিকার রুক্ষ মরুময় প্রকৃতির প্রেক্ষাপটে সে অঞ্চলে যথেষ্ট পরিমাণ ধনসম্পদও ছিল, কিন্তু, তারপরেও এ সমস্ত কোন বিষয়ই কখনো মুসলিমরা বিবেচনা করেনি। কারণ, তাদের বিভিন্ন দেশজয়ের পেছনের একমাত্র কারণ ছিল ইসলামের বাণীকে সে সমস্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া। মূলতঃ এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই মুসলিমরা প্রাচূর্যমন্ডিত কিংবা প্রাচূর্যহীন সকল রাষ্ট্রকেই মুক্ত করেছে। অথবা, কোন দেশের জনগণ যখন বিজয়ের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে বাঁধাকেও তারা অবলীলায় অপসারণ করেছে। এ কারণেই বিভিন্ন দেশে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেয়ার পেছনে সে দেশে ধনসম্পদের উপস্থিতি কিংবা তাদের দারিদ্রপীড়িত অবস্থা কখনো মূল বিষয় হিসাবে বিবেচিত হয়নি। কিংবা, কোন জনগোষ্ঠির ইসলাম গ্রহন করা বা প্রত্যাখান করাও ইসলামের বাণী বহন করার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। প্রকৃতঅর্থে, মুসলিমদের বিভিন্ন দেশজয় করার মূলকারণই ছিল ইসলামের আহবানকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করা এবং সেইসাথে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ, ইসলামের এই বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব থেকেই উৎসরিত হয়েছে এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা,  যা এই পৃথিবীর প্রতিটি দেশে, প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া জরুরী।

    পবিত্র কোরআনে পরিস্কার ভাবে জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে। একই সাথে, কোরআনে এ বিষয়েও জোর দেয়া হয়েছে যে, জিহাদ একমাত্র ইসলাম অনুমোদিত পদ্ধতি অনুসারেই হতে হবে এবং একমাত্র ইসলামের আহবান বিস্তৃতির লক্ষ্যেই হতে হবে। এ ব্যাপারে শক্তিশালী আয়াত নাযিল করে আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের তাঁর পথে জিহাদের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।

    আল্লাহতায়ালা সুরা আনফালে বলেছেন,

    “এবং তোমরা তাদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ কর যতক্ষন পর্যন্ত না (পৃথিবী থেকে) ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন কেবল আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট হয়।” [সুরা আল-আনফালঃ ৩৯]

    তিনি সুরা বাকারায় বলেছেন,

    “এবং তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ কর যতক্ষন পর্যন্ত না ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দ্বীন কেবল আল্লাহ’র জন্যই নির্দিষ্ট হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়, তবে অত্যাচারী ব্যতীত আর কারো সাথে শত্রুতা নেই।” [সুরা বাকারাহ্ঃ ১৯৩]

    আল্লাহতায়ালা সুরা তওবাতে বলেছেন,

    “যুদ্ধ কর তাদের সাথে যারা আল্লাহর উপর ঈমান আনে না, আর না ঈমান আনে কিয়ামত দিবসের উপর, না তারা নিষেধ করে তা হতে যা থেকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল নিষেধ করেছেন এবং তাদের সাথে যারা আহলে কিতাবদের মধ্য হতে সত্যদ্বীনকে স্বীকৃতি দেয় না, যে পর্যন্ত না তারা স্বতঃস্ফুর্ত আনুগত্যের সাথে জিযিয়া প্রদানে সম্মত হয়।” [সুরা তওবাঃ ২৯]

    অন্যান্য অনেক আয়াতের সাথে এই আয়াতগুলোও মুসলিমদের জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং জিহাদের মূল উদ্দেশ্য কি হবে তার ইঙ্গিতও এখানে দেয়া হয়েছে। মূলতঃ এ ধরনের আয়াতগুলোই সবসময় মুসলিমদের অন্যান্য দেশ জয় করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

    সুতরাং, দেখা যাচ্ছে, দ্বীন ইসলাম প্রচারের ভিত্তিতেই মূলতঃ ইসলামী রাষ্ট্র গঠন করা হয়েছিল এবং এ উদ্দেশ্যেই শক্তিশালী মুসলিম সেনাবাহিনী গঠিত হয়েছিল। তাই একথা অস্বীকার্য যে, জিহাদ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি বিষয় এবং এর মাধ্যমেই মুসলিমরা বিভিন্ন দেশে বিজয় পতাকা উত্তোলন করেছিল। ইসলামের দাওয়াত বহনের এই গুরুদায়িত্ব আবারও মুসলিমদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র ফিরিয়ে দেবে।