তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২জন্মপূর্বে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ – ইসলামী শরী’আহর হুকুম
প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্নভাবে তার কাঙ্খিত সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়েছে এবং অনাকাঙ্খিত সন্তানের জন্ম নিরোধ ও বর্জনের জন্য অতীতে প্রচলিত বহুবিদ উপায়ও অবলম্বন করেছে। আইয়্যামে জাহিলিয়ার যুগে, ছেলে সন্তান খুবই কাঙ্খিত ছিল কেননা সে যুদ্ধ-বিগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এবং তাদের গোত্রকে উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে পরিচালিত করবে। অপরদিকে, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পথিত করে ধ্বংস করা হতো। যেমন: আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর যখন কন্যা সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হলো।” [সূরা আত-তাকউইর: ৯]
যখন অনাকাঙ্খিত সন্তান নষ্ট করার অন্যান্য পদ্ধতি উদ্ভাবিত হলো, যেমন: মায়ের গর্ভাশয় পর্যবেক্ষণ করে সন্তানটির লিঙ্গের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, মানুষ তখন সন্তানটি অযাচিত লিঙ্গের হলে গর্ভপাত ঘটিয়ে সন্তানটিকে ধ্বংস করার উপায় অবলম্বন করে।
পরবর্তীকালে যখন আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি হলো এবং সেই সাথে গর্ভাশয়ে অবস্থিত ভ্রুনটি সহজেই পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতি সহজতর হলো তখন তারা উদ্ভাবন করলো যে, জিনের এসিডিক প্রবণতা চূড়ান্তভাবে কন্যা সন্তানের দিকে ধাবিত হয়, অপরদিকে এলকেলিন জিন পুত্র সন্তানের দিকে ধাবিত হয়। ফলে তারা সঙ্গমের পূর্বে নারীর যোনিপথে উপযুক্ত একটি ক্ষারযুক্ত (এলকেলিন) পরিবেশ তৈরীর চেষ্টা করলো। আর এভাবেই তার এলকেলিন ডুশ (Douch) নামে এক রাসায়নিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করল যা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম নিশ্চিত করবে।
পরবর্তীতে তারা খাদ্যভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অবলম্বন করলো যা নারীর দেহে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরীতে সহায়তা করবে। এই গবেষণার মাধ্যমে তারা অনুধাবন করতে পারল যে, খাদ্য প্রক্রিয়া গর্ভাশয়ে অবস্থিত ডিম্বকোষের লিঙ্গ নির্ধারণের প্রবণতাকে দুইভাবে প্রভাবিত করে।
প্রথমতঃ এই প্রক্রিয়া নারীর যোনিপথে ও গর্ভাশয়ে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরী করে। তারা দেখতে পেল যে, পটাশিয়াম ও সোডিয়াম গর্ভাশয়ের মৌলিক অবস্থাকে এলকেলিনে রূপান্তর করে যা পরবর্তীতে একটি পুত্র সন্তান জন্মের দিকে ধাবিত হয়। অপরদিকে ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালশিয়াম এমন একটি এসিডিক পরিবেশ তৈরী করে যা কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।
দ্বিতীয়তঃ খাদ্য প্রক্রিয়া ডিম্বাণু প্রাচীরকে প্রভাবিত করে এবং একে নারী বা পুরুষ যেকোন শুক্রাণু গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। আর এভাবেই তারা দম্পতিদেরকে বিশেষ করে নারীদেরকে পুত্র সন্তান লাভের জন্য বিশেষ এক ধরনের ডায়েট (খাদ্যাভ্যাস) গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করে। যে ডায়েট এলকেলিনের পরিবেশ নিশ্চিত করে যেমনঃ লবনাক্ত গোশত খাওয়া, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করা, মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণ করা, ফলমূল খাওয়া এবং পটাশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। এরূপ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এলকেলিন পরিবেশ নিশ্চিত করবে।
অপরদিকে যখন কন্যা সন্তানের আকাঙ্খা করা হয় তখন তারা এমন খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেয় যা শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করবে যেমনঃ দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ, কম লবন খাওয়া, গোশত পরিহার করা বিশেষ করে লবনাক্ত গোশত, ফলমূল, মসলাযুক্ত ও সুগন্ধিযুক্ত খাবার পরিহার করা এবং ক্যালশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। ঐ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করে।
পরবর্তীতে তারা অন্য এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করল যেখানে তারা দেখলো যে, যদি গর্ভাশয়ে নারীর ডিম্বাণুটি পুরুষের শুক্রাণুর আগে প্রবেশ করে অর্থাৎ যখন নারীর ডিম্বাণুটি নির্গত হয় এবং পুরুষের শুক্রাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন আশা করা যায় যে, সন্তানটি পুত্র সন্তান হবে। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে নির্গত হয় এবং নারীর ডিম্বাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন সন্তানটি কন্যা সন্তান হবে বলে ধরে নেয় যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি নারীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পরপরই সঙ্গম করা হয় তবে সন্তানটি খুব সম্ভব পুত্র সন্তান হবে। অন্যাথায় কন্যা সন্তান হবে। অর্থাৎ গর্ভাশয়ে ডিম্বাণু অবস্থানকালে যদি সঙ্গম করা হয় (ডিম্বাশয় থেকে ডিম্ব নির্গত হওয়ার একদিনের মধ্যে) তখন পুত্র সন্তান হবে। আর যদি ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বেই সঙ্গম করা হয় তবে কন্যা সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। ফলে তারা পরামর্শ দেন যে, যদি নিষিক্ত ডিম্বাণুতে অনাকাঙ্খিত সন্তান জন্মের সম্ভাবনা থাকে তবে বীর্যপাতের ঠিক পূর্বমুহুর্তে সঙ্গমের বিরতি টানা বা ‘আজল’ করা (অথবা Contraception ব্যবহার করা) উচিৎ।
আর যদি কাঙ্খিত সন্তানের সম্ভাবনা থাকে তবে সঙ্গম চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। ফলে আজল বা সঙ্গমে বিরতি এবং Contraception সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের একটি মাধ্যমে পরিণত হলো।
এপদ্ধতি কার্যকর করার জন্য নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার সময়ের উপর দৃষ্টি রাখতে হয় যাতে করে যদি পুত্র সন্তান কাঙ্খিত হয় তাহলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বে যেন সঙ্গম না করা হয় অর্থাৎ গর্ভাশয়ে পুরুষের শুক্রাণু প্রবেশের পর যেন স্ত্রীর ডিম্বাণু নির্গত না হয়। আর এজন্য এসময়ে আজল অথবা Contraception ব্যবহার করা হয় এবং পুরুষকে তার সঙ্গম নিয়ন্ত্রণ করতে হয় যেন গর্ভাশয়ে স্ত্রীর ডিম্বাণু বিদ্যমান থাকাবস্থায় পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হয়।
অপরদিকে, কন্যা সন্তান কাঙ্খিত হলে স্ত্রীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার মুহুর্তে কিংবা তার ঠিক পরপরই যেন সঙ্গম না করা হয় বরং ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পূর্বমুহুতেই যেন সঙ্গম করা হয়। কেননা যদি ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়ের অতি পূর্বেই সঙ্গম হয় তবে ডিম্বাণুটি নিষিক্ত হওয়ার পূবেই পুরুষের শুক্রাণুটি মারা যাবে।
এ সম্পর্কে রাসূলের (সা) একটি হাদীস আছে। রাসূল (সা) বলেন, “পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে পুরুষের বীর্যের পূর্বে নারীর বীর্য নির্গত হয় এবং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে নারীর বীর্যের পূর্বে পুরুষের বীর্য নির্গত হয়।” [বুখারী]
এই হাদীসটি ইমাম মুসলিমও তার সহিহ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন।
এই হাদীস ব্যাখ্যায় ইমাম মুসলিম (রহ.) হযরত ছাওবান (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস বর্ণনা করেন। বর্ণনাকারী বলেন, একবার এক ইহুদী ধর্মযাজক রাসূলের (সাঃ) এর নিকট এসে কিছু প্রশ্ন করল। একপর্যায়ে সে পুত্র সন্তানের প্রসঙ্গে আসলো তখন রাসূল (সা) বললেন, “যখন তারা (স্বামী/স্ত্রী) যৌনমিলন করে এবং পুরুষের সারবস্তু (শুক্র) নারীর সারবস্তুর (ডিম্ব) উপর বিজয়ী হয়, তখন তা পুত্র সন্তান হয় আর তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশেই সৃষ্টি হয়। আর যখন নারীর সারবস্তু পুরুষের সারবস্তুর উপর বিজয়ী হয় তখন তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশেই কন্যা সন্তান হয়।”
পুরুষের শুক্র নারীর ডিম্বের উপর বিজয়ী হওয়ার অর্থ হলো নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পর পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হওয়া। আর এজন্য গর্ভাশয়ে এ দুটি উপাদানের (শুক্র ও ডিম্ব) মধ্যে যে কোন একটিকে আগে থেকেই বিদ্যমান থাকতে হবে। আর তখনই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশে পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে অথবা বিপরীতে কন্যা সন্তান জন্ম নিবে। অর্থাৎ নারীর ডিম্ব পুরুষের শুক্রের উপর বিজয়ী হবে অর্থাৎ তা পুরুষের শুক্রের পরে ও তার উপর বর্তিত হবে।
অতঃপর তারা এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অবতারণা করল, তা হলো সিলেক্টিভ স্পার্ম ভ্যাকসিনেশন। এই পদ্ধতিতে পুরুষের শুক্রের Y ক্রোমোজোম থেকে X ক্রোমোজোমকে পৃথক করে গর্ভাশয়ের বাইরে একটি টেস্টটিউবে রাখতে হয় এবং পরবর্তীতে তা গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।
বিজ্ঞানীরা এই ধারণায় উপনীত হয়েছেন যে, পুরুষের শুক্রাণুতে Y এবং X উভয় ক্রোমোজোমই বিদ্যমান থাকে (Y পুরুষ ক্রোমোজোম আর X স্ত্রী ক্রোমোজোম) আর নারীর ডিম্বাণুতে শুধু XX ক্রোমোজোম থাকে। তারা উদ্ভাবন করলেন যখন পুরুষের শুক্রাণুর Y ক্রোমোজোমটি নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন YX জিন গঠিত হয় যা পরবর্তীতে পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুর X ক্রোমোজোম নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন একটি XX জিন গঠিত হয় যার ফলে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। সে অনুযায়ী X ও Y ক্রোমোজোমকে পৃথক করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। কেউ যদি পুত্র সন্তান চান তাহলে তারা নারীর ডিম্বাণুর সাথে পুরুষের Y ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে একটি টেস্টটিউবে স্থাপন করেন। আর কন্যা সন্তান চাইলে নারীর ডিম্বাণুর সাথে X ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে টেস্টটিউবে স্থাপন করেন।
এছাড়া আরও একটি পদ্ধতি আছে যা কিছুটা ভিন্ন মাত্রার। এই পদ্ধতিতে টেস্ট টিউবে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণুর সাথে YY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় কন্যা সন্তান আর XY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় পুত্র সন্তান। অতএব, পুত্র সন্তান চাইলে তার (স্ত্রী) গর্ভাশয়ে XY ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়। অপরদিকে কেউ কন্যা সন্তান চাইলে তার মধ্যে XX ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়।
উভয় পদ্ধতির উদ্দেশ্যই এক, তথাপি প্রথম পদ্ধতিতে নিষিক্ত করার পূর্বে পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে পরীক্ষা করে X ও Y ক্রোমোজোম পৃথক করা হয় আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে নিষিক্ত ডিম্বাণু পরীক্ষা করে XX (স্ত্রী) বা XY (পুরুষ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের উপরোক্ত বাস্তবতা উপলদ্ধির পর নিম্নে ইসলামী শারী’আহ্’র হুকুম বর্ণনা করা হলো:
(ক) গর্ভাবস্থায় কোন সন্তান হত্যা করা হারাম কেননা তা উদ্দেশ্যমূলক ও ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয় যার শাস্তি হলো পরকালে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া। আর পৃথিবীতে এর শাস্তি হলো নিহতের অভিভাবক যদি ক্ষমা না করেন তবে কিসাস কার্যকর করতে হবে আর নিহতের অভিভাবক ক্ষমা করে দিলে মুক্তিপন প্রদান করতে হবে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুসলমানকে হত্যা করে তার পরিণাম হলো জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তার উপর আল্লাহ্’র ক্ষোভ ও অভিশাপ আর তার জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি।” [সূরা নিসা: ৯৪]
(খ) যদি পিতামাতা গর্ভাশয়ে অবস্থিত কোন ভ্রুনকে অনাকাঙ্খিত মনে করে হত্যা করে অর্থাৎ ভ্রুনটি হলো কন্যা আর পিতা পুত্র সন্তান কামনা করছেন অতঃপর তিনি ভ্রুনটি হত্যা করলেন। এটা সম্পূর্ণভাবে হারাম এবং শাস্তিযোগ্য পাপ।
বুখারী ও মুসলিম থেকে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, “একবার হুযাইল গোত্রের দুই মহিলার মধ্যে ঝগড়া বাধলো তখন একজন অপরজনকে লক্ষ্য করে একটি পাথর নিক্ষেপ করলো এতে সে মহিলার গর্ভপাত হয়ে গেল। তখন রাসূল (সা) বিচারের রায় দিলেন যে, ভ্রুন হত্যাকারীকে মুক্তিপন হিসেবে একজন পুরুষ বা স্ত্রী দাস/দাসী মুক্ত করতে হবে।”
(গ) সাময়িকভাবে যৌন মিলন থেকে বিরত থাকা বা যৌনলিমন করার সময় বীর্যপাতের পূর্বে আজল করা, নির্দিষ্ট কোন খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ করা, এসিডিক বা এলকেলিন যেকোন ধরনের ঢুশ ব্যবহার করা বা যোনিপথ ধৌত বা পরিস্কার করা এইসব কিছুই জায়েয। এতে কোন ত্রুটি নেই।
স্ত্রীর যোনিপথের বাইরে বীর্যপাত বা আজল করা সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহ.) আ’তা কর্তৃক যাবির এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে যখন কুরআন নাযিল হতো তখন আজল করতাম।” ইমাম মুসলিম কর্তৃক এরূপ আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে আজল করতাম, তিনি (সা) তা জানতেন এবং আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেননি।”
খাদ্য বা ঢুশ গ্রহণের ক্ষেত্রে এগুলো খাদ্য, পানীয় ও গোসলের দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত।
(ঘ) পুরুষের শুক্রাণু থেকে পুরুষ ক্রোমোজোম ও স্ত্রী ক্রোমোজোম আলাদা করা অতঃপর স্ত্রীর ডিম্বাণুকে পুরুষের Y ক্রোমোজোমে রসাথে নিষিক্ত করা (পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে) অথবা X ক্রোমোজোমের সাথে নিষিক্ত করা (কন্যার ক্ষেত্রে) অথবা পুরুষ ও স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে কাঙ্খিত লিঙ্গের ক্রোমোজোমকে গর্ভাশয়ে স্থাপন করা এসকল প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি জায়েয নাই। কেননা এগুলো গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে চিকিৎসা বা গর্ভধারণের উপযোগী করার কোন প্রক্রিয়া নয়। এবং এ পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবে কোন পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা স্ত্রীর ডিম্বাশয়কে টেস্টটিউবে নিষিক্ত করণের চিকিৎসা পদ্ধতি বলেও বিবেচিত নয়। এটা বরং নারী ও পুরুষ জিনকে পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া, এটা এমন কোন প্রক্রিয়া নয় যা স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে গর্ভধারণে সক্ষমতা দিবে। সংক্ষেপে এটা কোন চিকিৎসা বা বন্ধাত্ব দূরীকরণের কোন উপায়ও নয়।
এ প্রক্রিয়াটির বাস্তবায়ন কারো গুপ্তাঙ্গ প্রদর্শন ব্যতিত সম্ভবপর নয়। কেননা স্ত্রী ডিম্বাণু সংগ্রহ করতে ও তা প্রতিস্থাপন করতে অবশ্যই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করতে হবে। এরূপ প্রদর্শন সম্পূর্ণ হারাম এবং শুধুমাত্র চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন অনুমোদিত অন্য কোন কারণে নয়। যেহেতু উপরোক্ত শুক্রাণু ও ডিম্বাণু পৃথকীকরণ ও নির্ধারণের বিষয়টি চিকিৎসা সংক্রান্ত কোন বিষয় নয় সেহেতু এই উদ্দেশ্যে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন জায়েয নেই এবং তা হারাম।
পরিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা উচিৎ যা মূলতঃ ইসলামের আকীদা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ এসকল পদ্ধতি ও গবেষণার মানে এই না যে মানুষের সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে, মানুষ শুধু নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী এবং নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষ্ণ করতে পারে, যেগুলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক সৃষ্ট ও নির্ধারিত এবং তিনি নারী-পুরুষের মধ্যে এই বৈশিষ্টগুলো সন্নিবিহিত করেছেন। মানুষ শুধু এই মহিমান্বিত সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতির ব্যাখ্যা প্রদান ও পর্যালোচনা করতে পারে, সে তার তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বিশেষ কোন খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে পারে। সে হয়তো পুরুষ ক্রোমোজোম থেকে স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে স্ত্রীর গর্ভাশয়ের বাইরে নিষিক্ত করে তা গর্ভাশয়ে পুনঃস্থাপন করতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সকল প্রক্রিয়া কোন আত্মা বা রুহ সৃষ্টি করতে পারবেনা কেননা তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন কোন কিছু সৃষ্টি করতে মনস্থ হন শুধুমাত্র তখনই সে বস্তুটি অস্তিত্বে আসে আরআল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যদি ইচ্ছা পোষণ না করেন তবে মানুষের সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা সত্বেও কোন কিছুই সৃষ্টি হতে পারবে না। একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা যাকে অস্তিত্বে আনতে চান তাই আসে আর যাকে চান না তা অস্তিত্বে আসতে পারেনা।
অর্থাৎ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং একমাত্র তিনিই নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেন যা পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত; তন্মধ্যে কতিপয় হলো:
“তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক, তিনি ব্যতিত অন্য কোন ইলাহ নেই। তিনি সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা, অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর তিনি সকল বিষয়ের উপর অভিভাবক।” [সূরা আল-আনআম: ১০২]
“হে মানবজাতি! একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং সতর্কভাবে তা শ্রবণ কর। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ ব্যতিত অন্য কোন উপাস্যের দিকে আহ্বান করে, যদি তারা সকলে একটি উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় তবুও তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না। আর যদি মাছিটি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয় তাদের কোন ক্ষমতা নেই তারা মাছির কাছ থেকে তা উদ্ধার করবে। অনুসন্ধানকারী ও অনুসন্ধানের বস্তু উভয়ই দুর্বল।” [সূরা হজ্জ্ব: ৭৩]
“নিশ্চয়ই আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সর্বময় মালিক আল্লাহ্ তা’আলা, তিনি যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা যাকে ইচ্ছা পুত্র কন্যা উভয়ই দান করেন, যাকে ইচ্ছা বন্ধা করেন, নিশ্চয়ই তিনি মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান।” [সূরা আশ-শূরা: ৪৯-৫০]
“নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ সৃষ্টিকর্তা।” [সূরা হজ্জ্ব: ৮৬]
“যে সৃষ্টি করে আর যে সৃষ্টি করে না উভয়ই কি সমান? তবুও কি তোমরা বুঝো না।” [সূরা নাহল: ১৭]
“ইহাই আল্লাহ্’র সৃষ্টি। সুতরাং আমাকে দেখাও যে, তারা (আল্লাহ্ ব্যতিত তোমাদের অন্য উপাস্যগণ) কি সৃষ্টি করেছে? বরং জালিমরা (মুশরিক, পাপাচারী, আল্লাহ্’র একত্ববাদে অবিশ্বাসী) স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত।” [সূরা লোকমান: ১১]
“হে মানবজাতি! যদি তোমরা কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দিহান থাকো তবে ভেবে দেখ যে নিশ্চয় আমরাই তো তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর অপবিত্র পানি (শুক্র) থেকে, অতঃপর জমাট রক্ত থেকে, অতঃপর পূর্ণ ও অপূর্ণ মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের নিকট আমাদের কুদরত ব্যক্ত করার জন্য এবং আমরা আমাদের ইচ্ছামত জরায়ুতে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত রাখি, অতঃপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, অতঃপর তোমরা যৌবনে পদার্পন কর, অতঃপর তোমাদের কারো মৃত্যু হয় যৌবনের পূর্বেই আবার তোমাদের কেউ দুর্দশাগ্রস্থ বার্ধক্যে পৌঁছাও ফলে যে বিষয় তার জানা ছিল তাও সে ভুলে যায়, তোমরা ভূমিকে শুষ্কাবস্থায় দেখতে পাও অতঃপর যখন আমরা তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন তা শস্য-শ্যামল হয় এবং আমরা তাতে নানাবিধ সুন্দর উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে থাকি।” [সূরা হজ্জ্বঃ ৫]
“আর নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে মাটির সারবস্তু থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাকে শুক্রাণুরূপে নিরাপদ স্থানে রাখি, অতঃপর শুক্রবিন্দুকে জমাটবাঁধা রক্তে পরিণত করি, অতঃপর সেই জমাটবাঁধা রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করি, অতঃপর সেই মাংসপিন্ডকে অস্থিতে রূপান্তর করি, পরে অস্থিকে গোশত দ্বারা ঢেকে দেই, অতঃপর তাকে আমরা স্বতন্ত্র সৃষ্টিতে পরিণত করি। অতএব আল্লাহ্ মহান, উত্তম স্রষ্টা।” [সূরা মু’মিনুনঃ ১২-১৪]
“হে মানবজাতি! কিসে তোমাদেরকে মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে বিরত রেখেছে? যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করে সুঠাম স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য দান করেছেন। এবং তিনি যে আকৃতি চেয়েছেন সেই আকৃতিই দিয়েছেন।” [সূরা ইনফিতার: ৬-৮]
“তিনিই তার ইচ্ছানুযায়ী গর্ভাশয়ে তোমাদের আকৃতি দান করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আলি-ইমরান: ৬]
আকীদা ও বিশ্বাস সংক্রান্ত এ বিষয়গুলো প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিৎ যেন সে হেদায়েত ও সরল সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই পৃথিবীকে বহুবিধ জ্ঞান ও চিন্তার উপকরণ দিয়ে সুসজ্জিত করে রেখেছেন যা মানুষ জানত না, আর আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকেও বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাশক্তি ও কোন বিষয় অনুধাবনের ক্ষমতা দান করেছেন যেন যারা আল্লাহ্’কে বিশ্বাস করে, তারা তাঁর নিকট থেকে উন্নত মর্যাদা লাভ করতে পারে আর যারা আল্লাহ্’কে অস্বীকার করে তারা এ পৃথিবীতে লাঞ্ছনা ও পরকালে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করবে।
সবশেষে, সকল প্রসংশা বিশ্বজগতের মহান প্রতিপালন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য।
খিলাফাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ
সিরিয়া: সাম্রাজ্যবাদের লড়াইয়ের নতুন ক্ষেত্র

সারা বিশ্বের নজর এখন সিরিয়ার দিকে। দেশি-বিদেশী সমস্ত মিডিয়াতে এই মুহুর্তে আলোচনার বিষয় একটাই আর তা হল কবে আমেরিকা সিরিয়াতে আক্রমন করতে যাচ্ছে। পছন্দের এজেন্টদের ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত করতে লিবিয়াতে যখন ১ মাসের মধ্যেই পশ্চিমারা সামরিক হামলা চালিয়েছে, তখন ২ বছরেরও অধিক সময় ধরে চলা সিরিয় সংঘাতে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু এবং তার চাইতে বহুগুন বেশি সংখ্যকের উদ্ধাস্তু হিসেবে প্রতিবেশি দেশসমূহে আশ্রয়গ্রহণ স্বত্ত্বেও পশ্চিমাদের নীরবতা লক্ষ্যনীয়। তাহলে কেন হঠাৎ আমেরিকা সিরিয়া আক্রমনের তোড়জোড় শুরু করল? কেনই বা এতদিন পশ্চিমারা নীরব ছিল? সম্ভাব্য এই আক্রমনের লক্ষ্য ও পরিনতিই বা কী হতে পারে?
আমেরিকার মদদে ১৯৭০ সালে বাশার আল-আসাদের পিতা হাফিয কর্তৃক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিরিয়ার ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়েই মূলত ২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সিরিয়াতে মার্কিন প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে গত চার দশকেরও অধিক সময় ধরে আসাদ পরিবার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছে। যার মধ্যে ইসরাঈল রাষ্ট্রকে সুরক্ষা প্রদান এবং ইসলামপন্থী দমন প্রধানতম। কিন্তু তিউনিশিয়া থেকে ছড়িয়ে পড়া গণআন্দোলনের ঢেউ সিরিয়াতেও বাশারের ভরকেন্দ্রে ধাক্কা দেয় এবং বাশার তা সামরিক কায়দায় নির্মমভাবে দমনের পথ বেছে নিলে সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র আরব জাহান জুড়েই জনগণের আবেগ ইসলামের পক্ষে হলেও, পশ্চিমারা এই প্রথম স্তম্ভিত ও ভীত হয়ে উঠে সিরিয়ান জনগণকে পশ্চিমা সাহায্য ও গণতন্ত্রের ফর্মূলা প্রত্যাখ্যান করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনমনীয় আত্মত্যাগ করতে দেখে ফলে অনেক চেষ্টা করেও আমেরিকা ও তার পশ্চিমা সহযোগীরা বাশারের বিকল্প কোনো গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সিরিয় জনগণের সামনে উপস্থাপনে বরাবরই ব্যর্থ হয়ে আসছে। ফলে মুখে হাঁকডাক দিলেও তারা বাশারের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অবস্থান নেয়নি, উপরন্তু বিদ্রোহী যোদ্ধারা আদর্শগতভাবে খিলাফতপন্থী হওয়ায় তাদেরকে সাহায্য করা থেকে বিরত থেকেছে, বরং বাশারকে রাসায়নিক অস্ত্রপ্রয়োগসহ নির্বিচারে মানুষ হত্যা চালিয়ে যেতে দিয়েছে, যাতে সব পক্ষই শেষাবধি পশ্চিমা আপোষ ফর্মূলা মেনে নিতে বাধ্য হয়।
কিন্তু এদতসত্ত্বেও ইসলামী প্রতিরোধ যোদ্ধারা ইতিমধ্যেই সিরিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল নিজেদের তত্ত্ববধানে নিয়ে আসতে পেরেছে এবং দামেস্ক বিজয়ের মাধ্যমে বাশারের পতন ও খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জলতর হতে শুরু করেছে। একদিকে ইরাক-আফগানিস্তানে শোচনীয় পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা পশ্চিমারা নতুন আরেকটি ফ্রন্টে মুসলিমদের মোকাবেলা করার ব্যপারে দ্বিধাগ্রস্থ যা বৃটেনের পার্লামেন্টে ভোটসংখ্যা থেকে প্রতীয়মান, অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফতের পুনরুত্থান ঠেকানো ব্যাপারে ঐক্যমত্য আমেরিকা ও ফ্রান্স নিজস্ব দান্দ্বিক কুটনৈতিক স্বার্থসত্ত্বেও মালি ও সিরিয়াতে পরস্পরকে সমর্থন করছে। আর রাশিয়া ও চীন মূলতঃ আসাদ পরবর্তী সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব খর্ব করে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতেই আমেরিকার সাথে দরকষাকষি করছে, তাতার্স নৌ-ঘাঁটি থেকে সকল রুশ অফিসারদের সরিয়ে নেয়া এর সুস্পষ্ট দলীল।
তাই আসাদ পরবর্তীতে যাতে ইসলামপন্থীরা এককভাবে ক্ষমতার অংশীদার হতে না পারে, সেজন্য যতটা আগ্রাসী হওয়া প্রয়োজন আমেরিকা প্রয়োজনে একাই তা হবে, যদিও তার ক্ষয়িষ্ণু শক্তি ও বিরোধী ব্যাপক বিশ্বজনমত তাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগাচ্ছে, যায়েদ বিন ছাবিত (রা) এর বর্ণনায় ইমাম আহমাদ ও তিরমিযি সূত্রে উল্লেখিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “আমি দেখেছি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র ফেরেশতারা আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া)-এর উপর তাদের পাখাসমূহ বিছিয়ে দিয়েছেন”। তাই আজ আমাদের উচিত সিরিয়ার পবিত্র ভূমিতে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চলমান সংগ্রামকে সমর্থন করা এবং এর বিপক্ষে আমেরিকা ও পশ্চিমা কাফেরদের সমস্ত ষড়যন্ত্রকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করা, যাতে তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হয় এবং জমীনে ইসলাম বাস্তবায়ন শুরু হয়।
আবু আয-যাহরা
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৭ (ইহুদী এবং খ্রীষ্টানদের সাথে বির্তক)
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অমুসলিমরা মুসলিমদের শক্তিসার্মথ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে যে, মুসলিমদের শক্তিসার্মথ্য আসলে তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। আর, তারা এটাও বুঝতে পারে যে, যে হৃদয় ইসলামের জন্য সকল প্রকার অত্যাচার নির্যাতনের পথ পাড়ি দিয়েছে সে হৃদয় কখনো দ্বীন ইসলাম রক্ষায় অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করতে পিছপা হবে না। বরং এ হৃদয় সবসময়ই ইসলাম রক্ষায় অবলীলায় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। এছাড়া, মুসলিমরা এ সময় মদীনায় তাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করছিলো, ইসলামের সমস্ত হুকুম- আহকামকে বাস্তবায়িত করেছিলো এবং প্রতিদিনই দ্বীন ইসলাম নতুন এক উচ্চতায় উঠছিলো যা মুসলিমদের ক্রমশঃ করছিলো আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান ও সত্যিকার অর্থে পরিতৃপ্ত।
কিন্তু, ইসলামের শত্রুরা কোনভাবেই দ্বীন ইসলাম ও মুসলিমদের ক্রমবর্ধিত এ প্রভাব-প্রতিপত্তিকে সহ্য করতে পারছিলো না, বিশেষ করে মদীনার প্রতিবেশী ইহুদী গোত্রগুলোর মাঝে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ তীব্র ভাবে প্রকাশিত হল। মুসলিমদের ব্যাপারে তাদের ভয়ও ক্রমশ বাড়তে থাকলো। যখন তারা দেখলো যে, মুসলিমরা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে এবং অসংখ্য মানুষ ইসলামের আহবানে সাড়া দিচ্ছে তখন তারা নতুন করে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবাদের বিপরীতে তাদের অবস্থানকে পূণঃ বিবেচনা করলো। যখন তাদের নিজেদের মধ্য হতেও বেশকিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলো তখন তারা সত্যিকার ভাবে চিন্তিত ও ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লো। তারা ভীত হলো এই ভেবে যে, দ্বীন ইসলাম একসময় তাদের মাঝেও প্রবেশ করবে এবং ইহুদী গোত্রগুলোর মধ্যেও ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করবে। এ আশঙ্কায় তারা ইসলাম, ইসলামী আকীদাহ ও ইসলামের হুকুম-আহকামের প্রতি তীব্র আক্রমণের তীর নিক্ষেপ করলো। পরিণতিতে ইহুদী ও মুসলিমদের মাঝে তীব্র বাক-বিতন্ডা ও স্নায়ু যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন সংঘাতের সৃষ্টি হলো। বস্তুতঃ ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই বিবাদ ও সংঘাত মক্কার কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের তীব্র সংঘাতের চাইতেও ব্যাপক ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিলো।
আল্লাহর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীদের সাথে লিপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে ইহুদীদের মূল অস্ত্র ছিলো ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা ও পূর্ববর্তী নবীদের সম্পর্কে তাদের গুপ্ত জ্ঞান। তাদের মধ্যে এমন কিছু ধর্মগুরু ছিলো যারা বাহ্যিক ভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলো। তারা মুসলিমদের সাথে উঠা-বসা করতো এবং পরহেজগারীতার ভান করতো। কিন্তু, অল্পকিছুদিনের মধ্যেই দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে তাদের সন্দেহ, অবিশ্বাস ও দ্বিধা-দ্বন্দ প্রকাশিত হয়ে গেলো। তারা মুহাম্মদ (সা)কে এমন সব প্রশ্ন করতো, যাতে ইসলামের মূল বিশ্বাস এবং ওহীর সত্যতা নিয়ে মুসলিমদের মাঝেও বিভ্রান্তি ও সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের ভীত নড়ে যায়।
আউস ও খাযরাজ গোত্রের মাঝে যারা শুধুমাত্র মুসলিমদের মাঝে শত্রুতা ও সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্য ইসলাম গ্রহন করেছিলো, ইহুদীরা তাদের সাথেই দলবদ্ধ হলো। শেষ পর্যন্ত মুসলিম ও ইহুদীদের মধ্যকার এই সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে, শান্তিচুক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রায় যুদ্ধ বাঁধার উপক্রম হলো।
একবার আবু বকর (রা) ইহুদীদের আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় প্রচন্ড রাগান্বিত হন এবং তাঁর ক্রোধ দমনে ব্যর্থ হন। এখানে মনে রাখা দরকার যে, আবু বকর (রা) তাঁর অসাধারন প্রজ্ঞা, অসীম ধৈর্য্য ও ঠান্ডা মেজাজের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ ঘটনাটি মুসলিমদের প্রতি ইহুদীদের উদ্ধত্য ও তীব্র ঘৃণার একটি জলজ্যান্ত উদাহারণ। বণির্ত আছে যে, একবার আবু বকর (রা) ফিনহাস নামের এক ইহুদীকে ডেকে তাকে আল্লাহকে ভয় করতে বলেন এবং ইসলাম গ্রহন করার উপদেশ দেন।
এর জবাবে ফিনহাস বলে,“আমরা আল্লাহর মতো দরিদ্র নই, কারণ তিনি নিজেকে আমাদের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। আমরা তাঁর উপর নির্ভর করি না, কিন্তু তিনি আমাদের উপর নির্ভর করেন। তিনি যদি আমাদের উপর নির্ভর নাই করতেন তবে তিনি আমাদের তাঁকে ঋণ দিতে বলতেন না, যেমনটি তোমাদের নবী বলে থাকেন। তোমাদের নবী তোমাদের সুদ নিতে নিষেধ করেন, কিন্তু আমাদের করেন না। তিনি(আল্লাহতায়ালা) যদি সত্যিকার ভাবেই অভাবমুক্ত হতেন তবে, আমাদের জন্য সুদ হালাল করতেন না। ফিনহাস এ বিষয়ে আল্লাহর নাযিলকৃত নিম্নোক্ত আয়াতটিকে উদ্দেশ্য করে, যেখানে আল্লাহতায়ালা বলেছেন,
“কে আছে এমন যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ, তবে আল্লাহ তা বহুগুণে বর্ধিত করে দেবেন।” [সুরা বাকারাহঃ ২৪৫]
আবু বকর (রা) ফিনহাসের এ উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে এতো বেশী রাগান্বিত হয়ে পড়েন যে, তিনি ফিনহাসের মুখে আঘাত করেন এবং বলেন, “সে সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার ভাগ্য! ওহে আল্লাহর শত্রু, যদি আমাদের মধ্যে কোনরূপ চুক্তি না থাকতো তবে আমি অবশ্যই তোকে হত্যা করতাম।”
ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই তর্কবিতর্কের উষ্ণতা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে এবং এ অবস্থা বেশকিছু সময় ধরে বিরাজ করে। এ পরিস্থিতিতে খ্রীষ্টানদের ষাটজনের একটি দল নজরান থেকে মদীনায় আগমন করে। তারা ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই বিবাদ সম্পর্কে পূর্বেই অবহিত হয়েছিলো। তারা এ আশায় মদীনায় আগমন করেছিলো যে, হয়তো ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই ফাটল আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং তাদের অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করার জন্য খ্রীষ্টান ধর্মবিশ্বাস এক বিরাট ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে খ্রীষ্টান ধমর্ও ইহুদী ও ইসলাম ধর্মের ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে খ্রীষ্টানদের এই দলটি ইহুদী ও মুসলিম উভয়ের সাথেই সম্পর্ক বজায় রেখেছিলো।
আল্লাহর রাসূল (সা) ইহুদীদের সাথে সাথে তাদেরকেও আহলে কিতাব বলে সম্বোধন করেন এবং উভয় দলকে ইসলামের দিকে আহবান করেন। তিনি (সা) তাদেরকে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে শোনান,
“বল (হে মুহাম্মদ)! হে আহলে কিতাবগণ, একটি বিষয়ের দিকে আসো যা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবো না, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাবো না। কিন্তু, যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে আমরা মুসলিমদের অর্ন্তভূক্ত।” [সুরা আলি ইমরানঃ ৬৪]
এরপর, ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা মুহাম্মদ (সা) কে অন্যান্য নবীদের বিষয়ে প্রশ্ন করতে থাকে। আল্লাহর রাসূল (সা) এর জবাবে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে শোনান,
“বল! আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর উপর এবং যা কিছু নাযিল হয়েছে আমাদের উপর এবং যা কিছু নাযিল হয়েছে ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানদের উপর এবং যা কিছু নাযিল হয়েছে মুসা এবং ঈসার উপর এবং যা কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীদেরকে দেয়া হয়েছে তার উপর। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং নিশ্চয়ই আমরা তার প্রতিই অনুগত।” [সুরা বাকারাহঃ ১৩৬]
এ কথার পর ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা মুহাম্মদ (সা) কে বলার মতো আর কিছুই খুঁজে পেতো না। বস্তুত তাদের অন্তর রাসূল (সা) এই যুক্তিকে মেনে নিয়েছিলো এবং সত্য তাদের কাছে দিনের আলোর মতো প্রকাশিত হয়েছিলো। কিন্তু, তারা শুধু তাদের সম্মান, প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং সামাজিক পদমর্যাদা হারানোর ভয়ে ইসলাম গ্রহন থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলো এবং তাদের মধ্যে অনেকে এ কথা স্বীকারও করেছিলো। বর্ণিত আছে
যে, নজরান থেকে আগত আবু হারিছাহ্ নামে এক খ্রীষ্টান দূত, যে ছিল তাদের মধ্যকার একজন প্রসিদ্ধ আলেম, সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুর কাছে একথা স্বীকার করেছিল যে, মুহাম্মদ (সা) যে সত্য কথা বলছে এ ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহ নেই। তার বন্ধু যখন তাকে জিজ্ঞেস করলো তাহলে কেন সে সত্য জেনেও ইসলাম গ্রহন করছে না? এর উত্তরে সে বলেছিলো,“তারা (রোমান বা বাইজাইন্টাইনরা) আমাদের যেভাবে সম্মানিত করেছে, বিভিন্ন পদমর্যাদায় ভূষিত করেছে, অর্থ-সম্পদ দিয়ে যাচ্ছে, যদি আমি ইসলাম গ্রহন করি, তবে তারা এ সমস্ত কিছু আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে। কারণ, মুহাম্মদ (সা) যা বলে, তারা এর সম্পূর্ণ বিপরীতম অবস্থানে।” এ ঘটনাই প্রমাণ করে যে, তাদের নিলর্জ্জ স্বাথর্পরতা, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ ও অহেতুক অন্ধ গোর্য়াতুমিই আসলে তাদের ইসলাম গ্রহন করা থেকে বিরত রেখেছিলো। এরপর আল্লাহর রাসূল (সা) খ্রীষ্টান দূতদেরকে মুবাহালার (নিজেদের উপর আল্লাহর ক্রোধ বর্ষণের প্রার্থনা) জন্য প্রকাশ্যে আহবান করেছিলেন, যেন খ্রীষ্টান ও মুসলিমদের মধ্য হতে যারা মিথ্যাবাদী তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব বর্ষিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি (সা) তাদের উদ্দেশ্যে নীচের আয়াতটি পাঠ করেছিলেন,
“অতঃপর তোমার নিকট সত্য এসে যাবার পরও যদি এ সম্পর্কে তোমার সাথে কেউ বিবাদ করে, তাহলে বলঃ আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রদের ও তোমাদের পুত্রদের এবং আমাদের স্ত্রীদের ও তোমাদের স্ত্রীদের এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের। তারপর চলো আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত করি যারা মিথ্যাবাদী।” [সুরা ইমরানঃ ৬১]
এ আহবানের পর তারা (খ্রীষ্টান দূতেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে এবং ঘোষণা দেয় যে, তারা মবাহালায় অংশগ্রহন করবে না এবং মুহাম্মদ (সা) কে তাঁর আনীত দ্বীনের উপরই ছেড়ে দেবে আর, তারাও তাদের দ্বীনকেই আঁকড়ে থাকবে। এছাড়া, তারা মুহাম্মদ (সা) কে অনুরোধ করে যেন, তিনি (সা) তাঁর পক্ষ হতে একজন দায়িত্বশীল মুসলিমকে তাদের নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক বিষয়ে মীমাংসা করার জন্য পাঠিয়ে দেন। এ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে, রাসূল (সা) আবু উবাইদাহ ইবন আল-জাররাহকে ইসলাম দিয়ে তাদের বিচারকার্য পরিচালনা করার জন্য পাঠিয়ে দেন।
বস্তুতঃ এ পর্যায়ে, ইসলামী দাওয়াতের অপ্রতিরোধ্য গতি, ইসলামী আকীদাহর শক্তি এবং সত্যদ্বীনের শাণিত যুক্তিতর্কের ধার এমন ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে যে, মুনাফিক, ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের উত্থাপিত সমস্ত মিথ্যা যুক্তিতর্ক ও অভিযোগ নিমেষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের ইসলাম বর্হিভূত ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনা খুব দ্রুত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং পরাক্রমশালী অস্তিত্ব ও সঠিক জীবনব্যবস্থা হিসাবে শুধুমাত্র ইসলামই টিকে থাকে। এভাবে, ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত সার্বক্ষনিক আলোচনা-পর্যালোচনা, ইসলামের দিকে মানুষকে আহবান ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলাম ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরের গভীরে প্রোথিত হতে থাকে। আর, ইসলামের সমুন্নত পতাকাতলে সকল ভ্রান্ত জীবনব্যবস্থা, বিশ্বাস ও শাসনকার্য বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু, এ সবকিছুর পরও মুনাফিক ও ইহুদীদের অন্তরে মুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার আগুন দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। একথা অনস্বীকার্য যে, মদীনায় ইসলামের শাসন-ক্ষমতা ও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ সে সময় সবকিছুর উপর কর্তৃত্বশীল হয়। এছাড়া, বিভিন্ন ছোট ছোট অভিযানের মাধ্যমে মুসলিমদের প্রদর্শিত শক্তি-সামর্থ্য ইসলামের শত্রুপক্ষের মুখও মোটামুটি বন্ধ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত, মহান আল্লাহতায়ালার বাণীই সকল ভ্রান্ত মতাদর্শের উপর বিজয়ী হয় এবং ইসলামের শত্রুরা বাধ্য হয় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও ইসলামের শাসন-কর্তৃত্বের কাছে সম্পূর্ণ ভাবে নতি স্বীকার করতে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৬ (মদীনার জীবন)
ইসলামের রয়েছে একটি নির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা যেটা মূলতঃ রূপ লাভ করছে জীবন সম্পর্কে কিছু বিশেষ ধ্যানধারনার থেকে। এগুলোই হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতির মূল উপাদান, যেটা অন্য যে কোন সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ন ভাবে আলাদা। ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে তিনটি মূল বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়ঃ
১. ইসলামী জীবনব্যবস্থা ইসলামী আকীদাহ বা বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।
২. ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানুষের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় আল্লাহ নির্ধারিত হালাল-হারামের উপর ভিত্তি করে।
৩. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই এ জীবনব্যবস্থায় সুখের প্রকৃত অর্থ।
এটাই হচ্ছে ইসলামী জীবনব্যবস্থা এবং এ রকম একটি জীবনই মুসলিমদের এক এবং একমাত্র কাম্য। কিন্তু, এ রকম একটি জীবনব্যবস্থা পেতে হলে মুসলিমদের অবশ্যই দরকার একটি ইসলামী রাষ্ট্র, যা ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম-আহকামকে সমাজে সর্বতোভাবে বাস্তবায়ন করবে।
মুসলিমরা মদীনায় হিজরতের পর ইসলামী আকীদাহর ভিত্তিতে রচিত একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী জীবন পরিচালনা করেছিলো। আর, এই সময়ই সমাজ জীবন, বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি সম্পকির্ত আয়াত এবং ইবাদত সম্পকির্ত আয়াত নাজিল হয়। হিজরী দ্বিতীয় সালে মুসলিমদের উপর যাকাত ও সিয়াম ফরজ করা হয়। এরপর আজান ফরজ করা হয় এবং মদীনাবাসী বিলাল ইবন রাবি’য়াহ সুললিত কন্ঠে দিনে পাঁচবার আজান শুনতে থাকে। আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় আসার ১৭ মাস পর কিবলার দিক পরিবর্তন করে কাবাকে কিবলা হিসাবে নির্ধারন করা হয়। এরপর একে একে ইবাদত, খাদ্য, মূল্যবোধ, মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করা সম্পর্কিত কুরআনের বিভিন্ন আয়াত নাজিল হতে থাকে। মদ এবং শুকরের মাংস নিষিদ্ধ করা হয় এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড ও অপরাধীর শাস্তি বিষয়ক আয়াতও এ সময়ে নাজিল হয়। আয়াত নাজিল করা হয় ব্যাবসায়িক লেনদেন বিষয়ে, সব ধরনের সুদ কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। মদীনায় যখনই মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কিত কোন আয়াত নাজিল হতো আল্লাহর রাসূল (সা) আয়াতটিকে মুসলিমদের জন্য ব্যাখ্যা করতেন যেন তারা সে অনুযায়ী তাদের জীবন পরিচালনা করতে পারে। তিনি (সা) মদীনার মুসলিমদের সকল বিষয় দেখাশুনা করতেন, তিনি তাঁর কথা, কাজ ও তাঁর সম্মুখে ঘটিত কাজের ব্যাপারে নীরব থেকে মুসলিমের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ মিটমাট ও সমস্যার সমাধান করতেন। এজন্যই রাসূল (সা) এর কথা, কাজ ও বিশেষ বিষয়ে তাঁর নীরবতা সবই শরীয়াহর উৎস। কারণ, আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা সুরা নাজমে বলেছেন,
“এবং (তিনি) প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। (এই) কুরআন হলো ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়।” [সুরা নাজমঃ ৩-৪]
এভাবেই মদীনায় মুসলিমদের জীবন সম্পূর্ন ব্যতিক্রমধর্মী একটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পরিচালিত হতে থাকে, আর এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো পুরোপুরি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি। আর ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করেই একটি ব্যতিক্রমধর্মী সমাজ ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠে। ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও আবেগ অনুভূতি ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করতে শুরু করে এবং সমাজের সর্বস্তরে ইসলামের হুকুম-আহকামগুলোও পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়িত হয়। দ্বীন ইসলাম সমাজের মানুষকে দেয় জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান এবং দেয় জীবনের সমস্ত বিষয়ে দিকনিদের্শ না। ইসলামী দাওয়াতের এ পর্যায়টি, যে পর্যায়ে মুসলিমরা ইসলামের উপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো তা রাসূল (সা)-কে সত্যিকার ভাবে আনন্দিত করেছিলো। কারণ, এ পর্যায়ে মুসলিমরা নির্ভয়ে এবং কোনরূপ অত্যাচার নির্যাতন ব্যতীতই ব্যক্তিগত ও দলবদ্ধ ভাবে ইসলামের সমস্ত হুকুম-আহকাম মেনে চলতে পারছিলো এবং ইসলাম একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো। তারা তাদের জীবনের সমস্ত সমস্যা আল্লাহতায়ালার হুকুম অনুযায়ী সমাধান করতো, নতুন কোন বিষয়ের অবতারণা হলে তা সবসময়ই তা আল্লাহর রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দিতো এবং তারা কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতো না। শুধু তাই নয়, তারা তাদের প্রতিটি কর্মকান্ডও আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে পরিচালিত করতো আর এতেই তারা সত্যিকারের মানসিক শান্তি ও সুখ লাভ করতো। মুসলিমদের মধ্য হতে অনেকে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহন, কুরআন মুখস্ত করা কিংবা জ্ঞানার্জনের আশায় মুহাম্মদ (সা)-কে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো। এভাবে ধীরে ধীরে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করে এবং মুসলিমরাও দিনে দিনে শক্তিশালী হতে থাকে।
পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মোড়লরাই মুসলিম বিশ্বে স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে

২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানকে গতন্ত্রের বসন্ত, আরবদের বহুদিনের কাঙ্খিত অর্জন ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করেছিল পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব। বিশ্বে যা কিছু ভাল অর্জন সবই তারা গণতান্ত্রিক চেতনার নামে চালিয়ে দেয়। এক বছরের মাথায় সেনা অভ্যুত্থানে মিসরে বিশ্ব স্বীকৃত প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রেসিডেন্ট মুরসির সরকারের পতন ঘটানো হয়েছে। প্রেসিডেন্টের পক্ষে-বিপক্ষে কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভের পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটায়। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট মুরসি ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি আদলি মানসুরকে মিসরের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী। একই সাথে দেশটির সংবিধান স্থগিত করা হয়েছে এবং সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল আল ফাত্তাহ আল সিসি দেশে আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন। এর আগে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনের দখল নেয় সেনাসদস্যরা। বন্ধ করে দেয় মুরসি সমর্থক গণমাধ্যমগুলোকে।
দুই বছর আগে কায়রোর তাহরির স্কয়ারে তরুণদের উত্তাল গণআন্দোলন গোটা মিসরে ছড়িয়ে পড়লে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। অবসান ঘটে তার তিন দশকের স্বৈরশাসনের। তার ক্ষমতার উৎসও ছিল মূলত সেনাবাহিনী। মোবারকের পতনের পর ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ হুসেন তানতাবির নেতৃত্বে সামরিক পরিষদ ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর দুদফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের জুনে সরকার গঠন করে মুরসির দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি। দলটির সঙ্গে মিসরের শক্তিশালী ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, আমেরিকা সমর্থিত সেনাবাহিনী কখনোই যাদের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সেনা ও সেকুলার দলগুলোর সমর্থিত প্রার্থী আহমদ শফিককে হারিয়ে ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন ড. মুরসি। এর আগে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি পার্লামেন্টের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থাৎ ২৩৫টি আসন লাভ করে। ইসলামপন্থী অপর রাজনৈতিক দল আল নূর পার্টি ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থাৎ ১২১টি আসন লাভ করে। সেকুলার দলগুলো সম্মিলিতভাবে পার্লামেন্টের ১৫ শতাংশ আসন লাভেও ব্যর্থ হয়। পার্লামেন্টে নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে মোবারকের রাজনৈতিক দলসহ অন্য সেকুলার দলগুলোর গণভিত্তি অনেক দুর্বল।
হোসনি মোবারকের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার প্রধান একটি নিয়ামক ছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি মিসরের সেনাবাহিনীকে বছরে ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে। মিসরে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় মার্কিন বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি। এর পেছনের কারণ অবশ্য ১৯৭৯ সালে স্বাক্ষরিত মিসর-ইসরাইল শান্তিচুক্তিকে সমুন্নত রাখা। যাকে আমরা ইসরাঈলকে নিরাপদ রাখা ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার স্বার্থে কাজ করার জন্য বাৎসরিক ঘুষ বলতে পারি।
ইখওয়ানের রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে হোসনি মোবারকের মানবাধিকার বিরোধী দমনমূলক কর্মকাণ্ডে পশ্চিমা দেশগুলো পুরোপুরিভাবে অবগত ছিল। অধিকার হরণ কিংবা নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কখনওই মোবারক সরকারের সমালোচনা বা চাপ প্রয়োগ করেনি। বরং এরা ইসলামপন্থী দলটির ওপর নির্যাতনকে সমর্থন জুগিয়েছে। এখন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর একইভাবে পশ্চিমা বিশ্ব নির্লিপ্ত ভূমিকা নিয়েছে। কারণ গণতন্ত্রের চেয়ে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতারোহণ তাদের কাছে বেশি বিপজ্জনক মনে হয়েছে। আরব বসন্তের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব আশা করেছিল সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্টিত হবে কিন্তু ফলাফল হয়েছে উল্টো। প্রমাণ হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আদর্শ শত বছর পর হলে কথা বলে, মানুষের জীবন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে।আরব বিশ্বে মুসলিম তরুণরা স্বৈরতন্ত্রের জিঞ্জির হতে মুক্তির জন্য যে বিপ্লবের সূচনা করেছিল, সে মুক্তির স্বপ্ন ভঙ্গ হলে তারা চরমপন্থার দিকেও পা বাড়াতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু পশ্চিমা সমর্থিত গোষ্ঠি বা সেনাবাহিনী সুযোগ দিচ্ছে না, তারা হয়তো বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার চিন্তা করবে বিকল্প পন্থায়। মজার ব্যপার হলো, বিশ্ব জুড়ে দেখা যায়, সেকুলাররা গণতন্ত্রবাদীদের সমর্থন দেয় কিন্তু মিশরে স্বৈরশাসকদের সমর্থন দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। তাহলে কি তারা স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে ইসলামি ব্যবস্থাকে তাদের জন্য বেশি বিপদজনক মনে করে! ব্রাদার হুডের ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি নির্বাচনের আগে শরীয়া আইন, অবৈধ ইসরাঈলের বিরোধিতা ও ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার দিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা ঘোষণা দেয় সিভিল স্টেট বা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। তারা নিজেদের কখনো কখনো মডারেট মুসলিম হিসেবেও ঘোষণা করে। তারা ইসরাঈলের সাথে কৃত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির স্বীকৃতিসহ ইসরাঈলকেও স্বীকৃতি দেয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে নিজ দলের মধ্যে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে। জনগণের ইসলামের চাহিদার থেকে দূরে এসেও পশ্চিমা ও তাদের দেশীয় দোসরদের মুরসি সন্তুষ্ট করতে পারেননি। তাই ব্রাদারহুড তথা মুসলিমবিশ্বের অন্যান্য ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সামনেও বড় প্রশ্ন থাকবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচন কী তাদের ইসলামি সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিপন্থি? নাকি পশ্চিমা সেকুলার পুঁজিবাদী বিশ্ব চায়- ইসলামপন্থিরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করুক কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ইসলামি আদর্শ যেন বাস্তবায়ন না করে।
আমরা ৯০-এর দশকে আলজেরিয়ায় দেখেছি যখন ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ার পরও সেনাবাহিনী সে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং লিয়ামেন জেরুয়ালের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে, তখন সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো সেনা শাসককে সমর্থন জানিয়েছিল। একই সাথে পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে সেনাশাসকের পাশে এসে দাঁড়ায়। লিয়ামিন জেরুয়াল তিন দশক ধরে দেশটিতে একদলীয় শাসন কায়েম করে রেখেছে। নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেয়ার ফল হিসেবে আলজেরিয়ায় জনগণকে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের মুখে পড়তে হয়েছে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ সশস্ত্র লড়াইয়ে জীবন দিয়েছে। বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও কাউন্টার পাঞ্চ- এর লেখক ইসাম আল-আমিন তার সাম্প্রতিক একটি লেখায় লিখেছেন, “আলজেরিয়া ও ফিলিস্তিনের মানুষ যখন ১৯৯২ ও ২০০৬ সালে ইসলামপন্থিদের নির্বাচিত করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসলামপন্থিদের বিজয়কে ভিন্ন চোখে দেখেছে। মিশরেও ইসলামপন্থিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। গত দুই দশকে এটা তৃতীয় বার ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের এরূপ অবস্থান ভবিষ্যতে ইসলামি দলগুলোর সাথে পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নির্ণায়ক হতে পারে।”
পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠিরা মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদেরকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা ও তাদের সব রকমের সহযোগিতা দিয়ে মসনদে টিকিয়ে রাখার বিষয়গুলো আজ বুঝতে আর কারো বাকী নেই। ওসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলো থেকে সম্পদ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য বৃটিশ-ফ্রান্স-আমেরিকা কখনো স্বৈরশাসক আবার কখনো সেনা-স্বৈরশাসক ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদের সঙ্গে আমেরিকার দহরম মহরম সম্পর্কের কথা কারো না জানা নেই। জামাল আব্দুল নাসের, ইসলাম কারিমভ, হোসনে জাইম, করিম কাসেম, হাফিজ আল আসাদ, জেনারেল সুহার্তো, সাদ্দাম, সৌদ বংশের শাসকগণ, গাদ্দাফি, মোবারক, আইয়ুব খান, জিয়াউল হক, মোশাররফদের মতো বর্তমান ও সাবেক স্বৈরশাসকরা আমেরিকা-বৃটেনের-ফ্রান্সের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে টিকে আছে, টিকে ছিল। তেল সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনায় ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনপ্রিয় মোসাদেক সরকারকে হটিয়ে রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতায় বসায়। অনুগত স্বৈরশাসক রেজা শাহ পাহলভীর শাসনামলে সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের নামে আমেরিকা বাৎসরিক ত্রিশ মিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রদান করত।
১৯৯৫ সালে ক্লিন্টন এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একজন অফিসিয়াল নিউইয়র্ক টাইমসে ইন্দোনেশিয়ার স্বৈরশাসক জেনারেল সুহার্তোকে ‘আওয়ার কাইন্ড অফ গাই’ হিসেবে সম্মোধন করেন। এতে সুস্পষ্ট হয় ইন্দোনেশিয়ায় তার আমলের গণহত্যা ও জুলুমের শাসনে তখনকার আমেরিকান এ্যাম্বাসেডরের তথা আমেরিকার অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের প্রতি নগ্ন সমর্থন। ২০ মার্চ, ২০০৩ সালে সাদ্দামের কাছে গণবিধবংসী অস্ত্র আছে এ অযুহাতে হামলা চালিয়ে আজ পুরো জাতিকে ধ্বংসের মহড়ায় আমেরিকান সৈন্যরা মগ্ন। অথচ এই সাদ্দামকে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র দেওয়ার হাজারো প্রমাণ হাজির করা যাবে। দ্যা এল এ টাইমসের ১৯৮৪ সালের এক রিপোর্টে প্রকাশিত হয় ২০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪৫ বেল ও ২১৪ এস টি নামের যুদ্ধে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার আমেরিকা সাদ্দামকে হস্তান্তর করে। ১৯৮৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করে ঐ হেলিকপ্টারগুলো ব্যবহার করে কুর্দি দমনে বিষাক্ত গ্যাস ছোড়া হয়।
তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির ঘটনা প্রবাহ লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এ দেশগুলোর স্বৈরশাসকদের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করা আমেরিকা-বৃটেনের লক্ষ্য নয়। তাই যদি হতো, তাহলে এ দেশগুলোতে কখনো সামরিক শাসক, কখনো স্বৈরশাসক কখনো পুতুল সরকার আবার কখনো তথাকথিত ভঙ্গুর গণতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদীরা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় নিয়ে আসত না। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য শুধু এ দেশগুলোর সম্পদকে লুটপাট করা এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল রাখা যাতে করে মুসলিম উম্মাহ যেন কোনোভাবেই বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাবশালী না হয়ে উঠতে পারে। কারণ, মুসলিম বিশ্বে যদি গণপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারগুলো দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকে তাহলে এ সকল জনপ্রিয় সরকার জনগণের চাপে সাম্রাজ্যবাদীদের চাহিদা পুরণ করতে পারেনা। একথার সত্যতা বোঝা যায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে তাকালে। বাংলাদেশে বিএনপি-আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত-আমেরিকা যে সকল সুযোগ-সুবিধাগুলো চেয়েছিল তা কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি দিতে পারেনি অথচ ফখরুদ্দিন সরকার সে সকল অনেক সুযোগ-সুবিধা কোনো রূপ দেন-দরবার ছাড়াই দিয়ে দেয়।
ঐতিহাসিক ও আর্দশিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বলতে হয়, ষোড়শ শতকে ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপে যখন প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়, মধ্যপ্রাচ্য তথা অর্ধপৃথিবীতে তখনও ইসলামি শাসনের তখন স্বর্ণযুগ চলছিল। হাজার বছরের ক্রুসেডের বারং বার যুদ্ধ ও পরাজয়ের ইতিহাসও হয়তো পশ্চিমারা ভুলতে পারে না। তাদের ধারণা সেকুলার পুঁজিবাদী গণতন্ত্র ধর্মভিত্তিক মুসলিম সমাজে হয়তো মানিয়ে উঠতে পারবে না। তাই মুসলিম বিশ্বেও ১৪০০ বছরের ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নিরিখে পশ্চিমারা হয়তো ইসলামপন্থি দলগুলোকে সমর্থন দিতে সংকোচ বোধ করে। ঐতিহাসিক ও আর্দশিক এ দ্বন্দ্বের অভিজ্ঞতা মনে হয় ইসলাম ও পুঁজিবাদী সেকুলার গণতন্ত্রের ভবিষ্যত সম্পর্কের রূপ নির্ধারণ করবে।
খান শরীফুজ্জামান সোহেল
লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি গবেষকমার্ক্সীয় অর্থনীতির মূলভিত্তি ও চিন্তার ভুল

অর্থনীতিবিষয়ক অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক (Socialist) ধারণার জন্ম হয়েছে বিগত উনিশ শতকে। সমাজতান্ত্রিকরা খুবই কঠোরভাবে পুঁজিবাদী (Capitalist) অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে। সমাজতন্ত্রের এই শক্তিশালী আবির্ভাবের অন্যতম কারণ হল পুঁজিবাদের দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক অসমতা।
সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও প্রভাবশালী হচ্ছে কার্ল মার্ক্সের তত্ত্ব। যার উপর ভিত্তি করে কমিঊনিস্ট পার্টি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান যুগেও তার তত্ত্বের অনেক প্রভাব রয়েছে। তার সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থের নাম হল ‘দাস ক্যাপিটাল’ (পুঁজি) যার মাধ্যমে তিনি পুঁজিবাদী চিন্তাবিদদের আক্রমণ করেন। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তা এড্যাম স্মিথ এর মতে, ”কোন পণ্যের মূল্য নির্ভর করে সে পণ্য উৎপাদন করতে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয়িত হয়েছে তার উপর।” অর্থাৎ, যে পণ্য উৎপাদনে দুই ঘন্টা সময় লেগেছে তার মূল্য যা উৎপাদনে এক ঘন্টা সময় লাগে তার চাইতে বেশি। পরবর্তীতে রিকার্ডো এর সাথে সংযোজন করেন, “কোনো পণ্যের মূল্য শুধুমাত্র এটি উৎপাদনে যে পরিমাণ শ্রম বা কাজ হয়েছে তার উপর নির্ভর করে না বরং অতীতে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে এবং উৎপাদনের যন্ত্রপাতি তৈরীতে যে কাজ হয়েছে তার উপরও নির্ভর করে।”
মূল্যের এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে মার্ক্স ব্যাক্তি মালিকানা ও পুঁজিবাদকে আক্রমণ করেন। তিনি মূল্য নির্ধারণের একমাত্র উৎস হচ্ছে পণ্য উৎপাদনে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয়িত হয়। সুতরাং, শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে যে মূল্যে বিক্রি হচ্ছে তার পূর্ণ দাবিদার হল শ্রমিক নিজে। কিন্তু, পুঁজিবাদী সমাজে মালিকপক্ষ শ্রমিককে সামান্য কিছু মজুরী দিচ্ছে এবং লাভের একটি বিরাট অংশ নিজের পকেটে পুড়ে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা শ্রমিককে শোষণ করছে।
যে চিন্তার উপর ভিত্তি করে মার্ক্সীয় দর্শন গড়ে উঠেছে তা হল ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ (Historical Evolution) বা অন্যভাবে বলা যায় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। এ তত্ত্বের সারাংশ নিম্নে উল্লেখ করা হল –প্রত্যেক যুগে কোন একটি সমাজ ব্যবস্থা তার অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল স্বরূপ। ব্যবস্থার এই রূপান্তর মূলত বস্তুগত অবস্থা (Material Situation) উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সংগ্রাম বা দন্দ্বের ফলাফল। ইতিহাস আমাদের বলে, এই সংগ্রামের সমাপ্তি হয় যারা শোষিত এবং সংখ্যায় বেশী তাদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। পূর্ব যুগেও এই দন্দ্ব বিদ্যমান ছিলো স্বাধীন মানুষ এবং দাসের মধ্য, এরপর অভিজাত ও প্রজার মধ্যে, তারপর অভিজাত ও কৃষকের মধ্যে, তারপর বিভিন্ন গোত্র প্রধানদের মধ্যে। এই দ্বন্দ্বে শোষিত শ্রেণী সব সময় শোষক শ্রেণীর উপর জয়ী হবে।
ফরাসী বিপ্লবের সময় এই সংগ্রাম দন্দ্ব সংগঠিত হয় বুর্জোয়া (পুঁজিপতি) শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে যা মূলত দুটি শ্রেণীর স্বার্থের মাঝে দন্দ্ব এবং এর উৎস অর্থনৈতিক কারণ।
বর্তমান যুগে, উৎপাদনের উপায় বা হাতিয়ার পরিবর্তিত হয়েছে। উৎপাদন ব্যবস্থা এককেন্দ্রিক হতে বহুকেন্দ্রিক হলেও মালিকানা ব্যবস্থা বা ব্যাক্তিমালিকানার কোন পরিবর্তন হয় নাই। যার ফলে একজন মালিকের অধীনে শ্রম দানকারী অনেক শ্রমিকের এই মালিকানায় কোন অংশ নেই এবং তারা প্রতিনিয়ত শোষণের শিকার হচ্ছে। বাজারে পণ্যের মুল্য ও শ্রমিকের বেতনের এই পার্থক্য মার্ক্সের ভাষায় হল উদ্বৃত্ত মুল্য যা প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকের অংশ তা মালিক পক্ষ অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। এই দন্দ্ব চলতে থাকবে যতদিন না মালিকানার ধরণ উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে উপযোগী না হয়। অর্থাৎ ব্যাক্তি মালিকানা সামাজিক মালিকানায় পরিণত না হয় ততদিন। সামাজিক বিবর্তনের সুত্র মতে, এ দন্দ্ব অবশ্যই শোষিত শ্রেণী বিজয়ী হবে।
পুঁজির মালিকদের পরাজয়ের বীজ বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে নিহিত এবং তাদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকবে। যার কারণ একাগ্রতা সূত্র (Law of Concentration) ও মুক্ত প্রতিযোগিতা পদ্ধতি (Process of Free Competition)। একাগ্রতা সূত্র মতে পুঁজিবাদীর সংখ্যা কমতে থাকবে এবং শ্রমিক শ্রেনীর সংখ্যা বাড়বে। মুক্ত প্রতিযোগিতা সূত্র মতে, উৎপাদন সীমা অতিক্রম করবে এবং উৎপাদনের পরিমান বৃদ্ধি পাবে যা স্বল্প বেতনভোগী শ্রমিকশ্রেনীর ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে হবে। এর ফলে মালিকরা তাদের পুঁজি হারাবে এবং ধীরে ধীরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। একাগ্রতা সূত্র (Law of Concentration) যদি কেঊ কোন শিল্প যেমন – চকলেট কারখানার নিয়ে গবেষণা করে তবে খেয়াল করবে কারখানার সংখ্যা দিন দিন কমবে অন্যদিকে শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে বড় কারখানাগুলো ছোট কারখানাগুলোকে গ্রাস করে নিবে।
এভাবেই, সংকট তৈরি হবে ও এর পুনরাবৃত্তি হবে যা একসময় পুঁজিবাদের মুল ভিত্তিগুলোকে ধ্বংস করে দিবে। এর মধ্য দিয়ে কমিউনিজমের আবির্ভাব ঘটবে যা ঐতিহাসিক বিবর্তনের সর্বশেষ স্তর কারণ ইহা ব্যাক্তি মালিকানা ধ্বংস করে দিবে এবং এর ফলে কোন শ্রেণী থাকবে না ও দন্দ্ব ও থাকবে না।
পরিশেষে বলা যায়, সমাজতান্ত্রিকরা সমাজে প্রতিটি ব্যাক্তির মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন – মুনাফার ক্ষেত্রে সাম্যতা, উৎপাদনের ক্ষেত্রে সাম্যতা অর্থাৎ, পরম সাম্যতা প্রতিষ্ঠা। এ ধরনের সাম্যতা অসম্ভব এবং অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই না। কারণ সৃষ্টিগতভাবে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সংগঠন ক্ষমতা এক নয় এবং তাদের চাহিদা ও সন্তুষ্টির সীমার মাঝেও পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে, কেউ যদি তাদের মধ্যে সমানভাবে পণ্য ও সেবা বন্টন করে দেয় এরপরও এসব সম্পদ উৎপাদনে ও কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সমতা বিধান সম্ভব না। তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের যে পরিমাণ তার ক্ষেত্রেও সমতা বিধান সম্ভব নয়।
মালিকানা ও উৎপাদনের উপায়ের মধ্যে পার্থক্য খুবই স্বাভাবিক। ব্যক্তি মালিকানার পুরোপুরি বিলুপ্তি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। মালিকানার ইচ্ছা মানুষের বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি হতে উৎসারিত এবং এই প্রকৃতিটিকে ধ্বংস করা সম্ভব নয় কারণ তা মানুষের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। সুতরাং, ব্যাক্তি মালিকানার বিলুপ্তি যা মানুষের প্রবৃত্তির সাথে সাংঘর্ষিক এবং তাকে অশান্তির দিকে ঠেলে দিবে। সুতরাং, এই প্রবৃত্তিকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করার চাইতে তা সংগঠনের চেষ্টা করা উচিত। যেমন – মানুষ কোন কোন সম্পদের মালিক হবে তা নির্ধারণ করা। অন্যদিকে, মানুষের সকল প্রকার সম্পদ অর্জনে যদি সীমারেখা টানা হয় তবে তারা অলস জাতিতে পরিণত হবে।
তারা বলে, শ্রমিক শ্রেণীর শোষণের সমাধান হল তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যাতে করে মালিক শ্রেণীর সাথে তাদের দন্দ্ব প্রবল হয় কিন্তু যদি মালিক শ্রেণী তাদের চাহিদা পূরণের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীকে সন্তুষ্ট করে তবে তারা শোষণ অনুভব করতে পারবে না এবং বিবর্তনও হবে না। সুতরাং, উৎপাদন ও বিতরণ এর সংগঠনের সমতা বাস্তবায়নের জন্য দ্বন্ধ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বিবর্তন ঘটানো কখনো সমাধান হতে পারে না বরং সমস্যার প্রকৃতি অনুধাবন করে সঠিক আইনের মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে।
কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বের মধ্যে ভুলগুলোর তিনটি দিক রয়েছে-
প্রথমত: মুল্য সম্বন্ধে তার মতবাদের মধ্যে ভ্রান্তি ও মতভেদ রয়েছে। তার মতে মুল্য হচ্ছে কোন পণ্য উৎপাদনে যে পরিমান কাজ বা শ্রম ব্যয়িত হয় তা কিন্তু বাস্তবে তা ঠিক নয়। কাজের পাশাপাশি পণ্যের কাঁচামাল, চাহিদা ও সরবরাহ ইত্যাদি কারণ মুল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। সুতরাং, মুল্যের একমাত্র উৎস হল ব্যায়িত শ্রম এই ধারণা সঠিক নয় যা পণ্যের প্রকৃতি সম্বন্ধে অনুপযোগী ধারণা।
দ্বিতীয়ত: তার মতে কোন একটি সময়ে যে সামাজিক কাঠামো তা ঐ সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল এবং ব্যাবস্থার মধ্যে এই বিবর্তন শুধু একটি কারণে সংগঠিত হয় আর তা হল শ্রেণীগুলোর মধ্যে দন্দ্ব যার লক্ষ হল বস্তগত অবস্থার উন্নয়ন। এই মতবাদ ভ্রান্তিমূলক, ভিত্তিহীন এবং অনুমান নির্ভর। ঐতিহাসিক ঘটনা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লষণ করলে তা সহজে অনুধাবন করা যায়। আমরা জানি, রাশিয়ার সমাজতন্ত্রে রূপান্তর কোন বস্তুগত বিবর্তন বা শ্রেণী দন্দ্বের মাধ্যমে সংগঠিত হয় নি। বরং একটি দল রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে, জনগনের উপর তার চিন্তাকে প্রয়োগ করে এবং ব্যবস্থার পরিবর্তন করে। রাশিয়া যে সকল রাষ্ট্র বিজয় করে তাতে তারা জোরপূর্বক সমাজতন্ত্র চালু করে যা কোন প্রাকৃতিক বিবর্তন নয়। অনুরূপভাবে, তৎকালীন রাশিয়া বা চীন ছিল কৃষি নির্ভর অন্যদিকে জার্মানি, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা ছিল শিল্প কারখানা নির্ভর যেখানে পুঁজির মালিকের সংখ্যা কম ও শ্রমিকের সংখ্যা বেশি ছিল। মার্ক্সের তত্ত্ব মতে, শ্রেনী দ্বন্ধের কারনে রাশিয়ার বিবর্তন না হয়ে ইংল্যান্ড বা আমেরিকার বিবর্তন হওয়ার কথা। কিন্তু এসকল দেশে এখনো পুঁজিবাদ বাস্তবায়িত রয়েছে।
তৃতীয়ত: একাগ্রতা সূত্র (Law of Concentration) ও মুক্ত প্রতিযোগিতা পদ্ধতি (Process of Free Competition) মতে পুঁজিবাদীদের সংখ্যা কমতে থাকবে এবং শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা বাড়বে। এই তত্ত্বটি সঠিক নয় কারণ উৎপাদন বা কারখানার একাগ্রতা (Concentration) একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌছে বন্ধ হয়ে যাবে এবং তা বিবর্তনের জন্য প্রভাবক হিসাবে আর কাজ করবে না। আরও বলা যায় এর কোন অস্তিত্ব নাই, তা হল কৃষিখাত। তা হলে কিভাবে সমাজে বিবর্তন হবে? যা প্রমাণ করে এই সকল তত্ত্ব ভুল।
সমাজতন্ত্রে, সমাজের সমস্যার কারণ হিসেবে যে তত্ত্বগুলোর অবতারণা করা হয়েছে তা বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নয়। সমাধানগুলো অনুমান নির্ভর যা মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৫ (জিহাদের সূচনা)
মদীনা নামক যে ভূমিকে রাসূল (সা) বসবাস করবার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, সেখানে তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই ইসলামী হুকুম-আহকামও বাস্তবায়ন করেছিলেন। বস্তুতঃ মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই আল্লাহর তরফ থেকে হুকুম-আহকামের আয়াত নাযিল হতে থাকে। রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের মূলভিত্তি এবং মদীনার সমাজকে ইসলামী আকীদাহ ও আইন-কানুনের ভিত্তিতেই শক্তিশালী করেছিলেন এবং মদীনার মুসলিমদের (মুহাজির ও আনসার) মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর শরীয়াহর মাধ্যমে ইসলামী শাসনব্যবস্থা মদীনার মুসলিমদের জীবনে বাস্তবিক ভাবে অনুপ্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে ইসলামী শাসনব্যবস্থার আলোকে গঠিত এই সমাজই সমস্ত পৃথিবীতে ইসলামের বার্তা বহনের গুরুদায়িত্ব পালন করে। The number of Muslims substantially increased and they became a force to be reckoned with, individuals and groups alike embraced Islam every other day, amongst them Jews and others.
রাসূল (সা) মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তিসামর্থ্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হবার সাথে সাথে সমস্ত আরব ব-দ্বীপে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবার
ব্যাপারে মনোযোগী হলেন। একই সাথে তিনি (সা) এটাও বুঝতে পারছিলেন যে, মক্কার কুরাইশরা ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের পথে যে কঠিন বাঁধা সৃষ্টি করে রেখেছে সে কঠিনতম বাঁধা অতিক্রম করতে শক্তিপ্রয়োগ অপরিহার্য। কারণ, কুরাইশদের এই প্রবল প্রতিরোধের মুখে শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থায় দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা আর অরণ্যে রোদন করা ছিলো আসলে একই কথা।
রাসূল (সা) যখন মক্কায় তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন তখন তাঁর পক্ষে এ কঠিনতম বাধাঁ অতিক্রম করা ছিলো অসম্ভব। কারণ, তখন না ছিলো ইসলাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আর না ছিলো বাঁধা অপসারণে প্রয়োজনীয় বস্তুগত শক্তি অর্জনের কোন সুযোগ। কিন্তু, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথেই রাসূল (সা) বস্তুগত এ শক্তি অর্জনের সুযোগ ও ক্ষমতার অধিকারী হন। বাঁধা অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করার সুযোগও তাঁর হাতে এসে যায়। এরপর তিনি (সা) যা করেন, তা হলো মূলতঃ তাঁর সৈন্যবাহিনীকে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা এবং দাওয়াতী কার্যক্রম প্রচার প্রসারে নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরী করা। এ কারণেই তিনি (সা) তাঁর দলবলকে বিভিন্ন আরব ভূ-খন্ডের বিভিন্ন স্থানে অতর্কিত অভিযানে পাঠান, যার মধ্যে কোন কোন তিনি নিজেও অংশগ্রহন করেছিলেন। এ সমস্ত অভিযানের উদ্দেশ্যই ছিলো পৌত্তলিকদের মুসলিমদের শক্তিসামর্থ প্রদশর্ন করার মাধ্যমে পৌত্তলিকদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। এ অভিযানগুলোর মধ্যে সর্বশেষ অভিযান ছিলো ’আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের অভিযান, মূলতঃ এটা ছিলো বদরের যুদ্ধের সূচনা পর্ব।
হিজরী দ্বিতীয় সালের রজব মাসে মুহাম্মদ (সা) আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বে মুহাজিরদের একটি দলকে অভিযানে পাঠান। তিনি (সা) আব্দুল্লাহ ইবন জাহশকে তাঁর লিখিত একটি চিঠি দেন এবং আদেশ দেন যেন দুই দিনের পথ অতিক্রম করার পূর্বে এটি খোলা না হয়। চিঠি খোলার পর তিনি (সা) আব্দুল্লাহ ইবন জাহশকে তাঁর লিখিত নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার আদেশ দেন এবং এ আদেশ পালনে তার দলের অন্যান্যদের জোর জবরদস্তি করতে নিষেধ করেন। দুইদিন যাত্রার পর ’আব্দুল্লাহ ইবন জাহশ চিঠি খুলে দেখলেন সেখানে লেখা আছে, “আমার এই চিঠি পড়ার পর তোমরা মক্কা ও তা’য়িফের মধ্যবর্তী স্থান নাখলাহ পর্যন্ত যাত্রা করবে এবং কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার জন্য ওৎ থাকবে এবং তারা যা যা কিছু বহন করছে সে সম্পর্কে আমাদের অবহিত করবে”। চিঠি পড়ার পর তিনি চিঠির বিষয়বস্তু ও রাসূল (সা) এর নির্দেশ সম্পর্কে তার সঙ্গীদের অবহিত করেন এবং একই সাথে এটাও জানিয়ে দেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা) এ দায়িত্ব পালনে কাউকে জোর জবরদস্তি করতে নিষেধ করেছেন।
দলের সকলেই অর্পিত দায়িত্ব পালনে সম্মতি প্রকাশ করে এবং গন্তব্যের দিকে দলবদ্ধ ভাবে এগিয়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস আল জুহরি এবং উতবাহ ইবন গাজওয়ান তাদের হারানো উট খুঁজতে গিয়ে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে, তারা দু’জন কুরাইশদের হাতে বন্দী হয়। এদিকে, আব্দুল্লাহ ইবন জাহশ নাখলাহ নামক স্থানে পৌঁছে রাসূল (সা) এর নির্দেশ অনুসারে কুরাইশদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে এবং একপর্যায়ে বাণিজ্য সামগ্রী ভর্তি কুরাইশদের একটি ক্যারাভান তার নজরে আসে। আব্দুল্লাহ ইবন জাহশ কি করবে সেটা নির্ধারণ করার জন্য তার সঙ্গী সাথীদের সাথে পরামর্শ করতে থাকে। কারণ, সেদিন ছিলো রজব মাসের শেষ দিন আর রজব মাস ছিলো যুদ্ধ করার জন্য নিষিদ্ধ মাস। তারা ভাবতে থাকে, যদি তারা কাফেলাকে আক্রমণ করে তবে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা হবে অথচ আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের এ ব্যাপারে কোন নির্দেশ দেননি। তারা একে অপরকে বলতে থাকে, “আল্লাহর কসম, তোমরা যদি আজ রাতে তাদের ছেড়ে দাও তবে তারা পবিত্র এলাকায় প্রবেশ করবে এবং তোমাদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। আর, যদি তোমরা তাদের হত্যা করো তবে, তোমরা তাদের নিষিদ্ধ মাসে হত্যা করবে”। প্রথমদিকে তারা আক্রমণ করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্থ এবং ভীত থাকলেও পরবর্তীতে তারা শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করার জন্য একে অন্যকে উৎসাহিত করে এবং আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলিমদের মধ্য হতে একজন বাণিজ্য কাফেলার নেতা ’আমর ইবন হাদরামিকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে এবং তাকে হত্যা করে। শেষ পর্যন্ত তারা কাফেলার দু’জনকে বন্দী করে এবং সমস্ত বাণিজ্য সামগ্রী নিয়ে তারা মদীনায় ফিরে আসে।
মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার পর রাসূল (সা) তাদের বলেন, “আমি তো তোমাদের নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করার কোন নির্দেশ দেইনি”। অতঃপর, তিনি (সা) বন্দী দুজনের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন বা যুদ্ধলব্ধ মালামাল থেকে কোনকিছু নিতে অস্বীকার করেন। এটাই ছিলো আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বে অভিযানের সর্বশেষ ফলাফল। যদিও, আল্লাহর রাসূল (সা) এ দলটিকে কুরাইশদের উপর নজরদারি করার জন্য পাঠিয়েছিলেন কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এ ঘটনা নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ, হত্যাকান্ড, শত্রুপক্ষকে যুদ্ধবন্দী হিসাবে মদীনায় নিয়ে আসা এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গণীমতের মাল হিসাবে নিয়ে আসা পর্যন্ত গড়ায়। সুতরাং, এ বিষয়ে ইসলামী শরীয়াহর হুকুম কি হতে পারে?
বস্তুতঃ এ বিষয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্যই রাসূল (সা) অপেক্ষা করতে থাকেন এবং এ কারণেই তিনি (সা) যুদ্ধবন্দী ও প্রাপ্ত মালামালের ব্যাপারে কোনরকম সিদ্ধান্ত গ্রহনে বিরত থাকেন। অপরদিকে, কুরাইশরা এ ঘটনাকে ইসলাম ও মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে অপপ্রচার করার মোক্ষম সুযোগ হিসাবে লুফে নেয়। তারা সমস্ত আরব গোত্রগুলোর মধ্যে প্রচার করতে থাকে যে, মুহাম্মদ (সা) ও সঙ্গীরা নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতা নষ্ট করেছে, তারা পবিত্র মাসে রক্তপাত করেছে, সম্পদ লুট করেছে এবং কুরাইশদের বন্দী করেছে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে মক্কায় অবস্থিত মুসলিম ও পৌত্তলিক কুরাইশদের মধ্যে বাকবিতন্ডা শুরু হয়। মক্কার মুসলিমরা তাদের মদীনার মুসলিম ভাইদের এ বলে রক্ষা করার চেষ্টা করে যে, মুসলিমরা রজব মাসে নয় বরং শাবান মাসে কাফেলা আক্রমণ করেছে। কিন্তু, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারনা দমনে তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অপরদিকে, ইহুদীরাও এ সুযোগের সদ্বব্যবহার করতে থাকে এবং তারা আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের কাজের ব্যাপক সমালোচনা ও তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করতে শুরু করে। পৌত্তলিক ও ইহুদীদের মিলিত এ অপপ্রচারে মুসলিমরা মারাত্মক ভাবে আক্রান্ত হয়। আর আল্লাহর রাসূল (সা) নীরব থেকে এ ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। অবশেষে, আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা এ বিষয়কে কেন্দ্র করে সুরা বাকারার কয়েকটি আয়াত নাজিল করেন,
“সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে (তারা) জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও, এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে হারামের পথে বাঁধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদের বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার থেকেও বড় পাপ। আর ফিতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ। বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদেরকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে, যদি তা সম্ভব হয়”। [সুরা বাকারাহঃ ২১৭]
এই আয়াতটি নাজিল হবার পর মুসলিমরা আনন্দে উল্লাসিত হয়ে উঠে এবং রাসূল (সা) তারপর যুদ্ধলব্ধ মালামাল মুসলিমদের মাঝে বিতরণ করে দেন এবং সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস আল জুহরী এবং উতবাহ ইবন গাজওয়ান এর মুক্তির বিনিময়ে কুরাইশ যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করে দেন। বস্তুতঃ কুরআনের এই আয়াতটি কুরাইশদের ইসলামের বিরুদ্ধে সমস্ত অপপ্রচারকে একনিমিষে স্তব্ধ করে দেয়। পবিত্র মাসে যুদ্ধের ব্যাপারে এ আয়াতটি কুরাইশদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে এবং একই সাথে এটাও ঘোষণা করে যে, পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা পাপ কিন্তু, আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষকে মসজিদুল হারাম থেকে ফিরিয়ে দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদের বহিস্কার করা, পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা ও হত্যা করা হতেও গুরুতর পাপ।
দ্বীন ইসলাম গ্রহন করার কারণে মুসলিমদের উপর কুরাইশদের নির্মম অত্যাচার ও চরম নির্যাতনমূলক আচরন আল্লাহর দৃষ্টিতে ছিলো পবিত্র মাস কিংবা অন্য কোন মাসে যুদ্ধ ও হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর ব্যাপার । বস্তুতঃ মক্কায় অবস্থান কালে কুরাইশরা মুসলিমদেরকে দ্বীন ইসলাম থেকে ফেরানোর জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। এ অবস্থায় মুসলিমদের কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ব্যতীত আর কোন পথই খোলা ছিলো না। যদি তা হারাম মাসে হয় তবুও। কুরাইশরাই বস্তুতঃ ইসলামী দাওয়াতের পথে চুড়ান্ত রকমের বাঁধা সৃষ্টি করেছিলো, তারা আরবের জনসাধারনকে ইসলাম গ্রহন করা থেকে বিরত রেখেছিলো, নিজেরা জেনেশুনে আল্লাহকে অস্বীকার করেছিলো, মসজিদুল হারামের পবিত্র এলাকা থেকে সেখানকার অধিবাসীদের বহিস্কার করেছিলো এবং সর্বোপরি ইসলাম গ্রহনের জন্য মুসলিমের উপর প্রচন্ড নির্যাতন চালিয়েছিলো। নিষিদ্ধ মাস কিংবা অন্য যে কোন মাসে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাই ছিলো তাদের কর্মফলের উপযুক্ত প্রতিদান। সুতরাং, ’আব্দুলাহ ইবন জাহশ পবিত্র মাসে কুরাইশদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, তা তাকে বা কোন মুসলিমকেই আসলে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারেনি।
আর এভাবেই, আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বে মুসলিমদের এ অভিযান হয়ে গেল ইসলামের ইতিহাসের একটি মাইল ফলক। এ ঘটনাই মূলতঃ ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রম প্রচার-প্রসারে গৃহীত পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য একটি দিকনির্দেশনা হয়ে থাকলো। এ অভিযানে ওয়াকিদ ইবন আব্দুল্লাহ আল-তামিমি তীর ছুঁড়ে কুরাইশ কাফেলার সর্দারকে হত্যা করে এবং এটাই ছিলো আল্লাহর পথে কোন মুসলিমের হাতে প্রথম রক্তপাত। জিহাদের আয়াত নাজিলের পূর্ব পর্যন্ত পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা নিষিদ্ধই থাকে। যদিও এ ঘটনার পর এ ব্যাপারে হুকুমটি পরিবতির্ত যায়। বস্তুতঃ উপরোক্ত আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা পবিত্র মাসে যুদ্ধ করার উপর থেকে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৪ (জিহাদের প্রস্তুতি)
মদীনার প্রান্তসীমায় অবস্থিত ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে চুক্তি সম্পন্ন হবার পর রাসূল (সা) যখন বুঝলেন যে, মদীনার নবগঠিত ইসলামী সমাজ দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন তিনি জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। কারণ, দ্বীন ইসলামের আহবানকে সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে কুফর নিয়ন্ত্রিত ভূমিকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসা ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। আর ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবার এ কাজটি কোন ভাবেই মিশনারীদের কাজের সাথে তুলনীয় নয়। বরং, ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করা, তাদেরকে ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেয়া ও সমাজের মানুষকে এ আলোকে গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন ইসলাম বাস্তবায়নের পথে যে কোন ধরনের বস্তুগত বাঁধা অপসারণ করতে প্রয়োজনীয় বস্তুগত পদক্ষেপ গ্রহন করা।
বস্তুতঃ মক্কার কুরাইশরা সবসময়ই দ্বীন ইসলাম প্রচারের পথে সর্বাত্মক বস্তুগত বাঁধা তৈরী করেছে, যে কারণে এ বাঁধা অপসারনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা এমনিতেই জরুরী ছিলো। এ চিন্তা মাথায় রেখে এবং একই সাথে মদীনায় সীমানা অতিক্রম করে ইসলামের আহবানকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে রাসূল (সা) তাঁর সৈনাবাহিনী প্রস্তুত করতে শুরু করলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি (সা) কুরাইশদেরকে চ্যালেঞ্জ করে বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু বাহিনী প্রেরণ করেন যা একই সাথে মদীনার মুনাফিক, ইহুদী ও মদীনার বাইরের ইহুদী গোত্রগুলোকেও সর্তক সংকেত প্রদান করেছিলো। তিনি চারমাসে মদীনার বাইরে তিনটি সৈন্যদল পাঠান।
তিনি (সা) হামযাহ (রা) এর নেতৃত্বে মুহাজিরদের মধ্য হতে ত্রিশজনের একটি দলকে আল-’ইশয়ের নিকটবর্তী অঞ্চলে পাঠান, এ অভিযানে আনসারদের মধ্য থেকে কেউ অংশগ্রহন করেনি। হামযাহ (রা) তাঁর দলবলসহ সমুদ্র তীরে আবু জাহল ইবন হিশাম ও তার তিনশত সহযাত্রীর মুখোমুখি হলে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়, কিন্তু মাযদি ইবন ’আমর আল-জুহানি উভয় পক্ষকে যুদ্ধ ব্যতীতই আলাদা করে দেন। এরপর রাসূল (সা) মুহাজিরদের মধ্য হতে ষাট জন অশ্বারোহীকে মুহাম্মদ ইবন ’উবাইদা ইবন আল-হারিছাহর নেতৃত্বে অভিযানে পাঠান। এ অভিযানেও আনসারদের মধ্য হতে কেউ ছিলো না। মুহাম্মদ ইবন ’উবাইদা (রা) রাবিগাহর উপত্যকায় আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হন। আবু সুফিয়ান এ সময় দুশোরও বেশী অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিল। এ অভিযানও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়নি, শুধুমাত্র সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস ঐদিন শত্রুপক্ষকে উদ্দেশ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। এছাড়া, আল্লাহর রাসূল (সা) সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে বিশজন অশ্বারোহীকে মক্কার দিকে প্রেরণ করেছিলেন, কিন্তু তারাও কোনরকম যুদ্ধ ব্যতীতই ফিরে আসেন।
এ অভিযানগুলো মূলতঃ মদীনায় যুদ্ধের একটি আবহ তৈরী করেছিলো এবং রাসূল (সা) এর পরিকল্পিত একের পর এক এই অভিযানগুলো মক্কার কুরাইশদেরকেও যথেষ্ট পরিমাণে শঙ্কিত করেছিলো। কিন্তু, রাসূল (সা) শুধু তাঁর দলবলকে অভিযানে প্রেরণ করেই থেমে থাকেননি বরং, পরবর্তীতে তিনি (সা) নিজেও কুরাইশদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহন করেন। মদীনাতে রাসূল (সা) এর হিজরতের এক বছর পর তিনি (সা) কুরাইশ এবং বনু দামরাহ গোত্রকে অতর্কিত আক্রমণের উদ্দেশ্যে ওয়াদ্দান পর্যন্ত পৌঁছে যান। এ অভিযানে তিনি (সা) কুরাইশদের মুখোমুখি না হলেও বনু দামরাহ গোত্র আল্লাহর রাসুলের সাথে শান্তিচুক্তি করে। এরপর আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার আনসার ও মুহাজিরদের সমন্বয়ে গঠিত দুইশত যোদ্ধা সহ অভিযানে বের হন এবং রাদওয়ার নিকটবর্তী বুয়াত নামক স্থানে পৌঁছান। এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিলো উমাইয়া ইবনে খালফের নেতৃত্বে প্রায় আড়াই হাজার উট এবং একশত যোদ্ধার সম্বন্বয়ে গঠিত পৌত্তলিকদের বাণিজ্য কাফেলাকে ধাওয়া করা। কিন্তু, এ বাণিজ্য
কাফেলাটি প্রচলিত পথ না ধরে অন্য পথ ধরে যাত্রা করায় আল্লাহর রাসূল (সা) পৌত্তলিকদের এ দলটিকে ধরতে ব্যর্থ হন। বুয়াত অভিযানের তিন মাস পর রাসূল (সা) আবু সালামাহ ইবন ’আবদ আল-আসাদকে মদীনার দায়িত্বে রেখে দু’শোর বেশি মুসলিম সহ আবারও অভিযানে বের হন। তিনি (সা) তাঁর দলবল সহ ইয়ানবু উপত্যকার আল-উশাইরাহ নামক স্থানে পৌঁছান। এ স্থানে তিনি (সা) জমাদিউল আউয়াল মাসে পৌঁছান এবং জমাদিউস সানির কিছুদিন পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন। এ স্থানে তিনি কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলাকে ধাওয়া করার জন্য অবস্থান গ্রহন করেন। কিন্তু, এবারও তিনি (সা) তাঁর লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হন। কিন্তু, এ অভিযান একেবারে ব্যর্থ হয়নি, কারণ এই অভিযানে তিনি (সা) বনু মুদলাজ এবং তাদের মিত্র বনু দামরাহর সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন।
এরপর আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় ফিরে আসার মাত্র দশদিনের মধ্যে কারজ ইবন জাবির আল ফাহরি নামে এক পৌত্তলিক মদীনার চারনভূমি আক্রমণ করে। আল্লাহর রাসূল (সা) সাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে তার খোঁজে বের হন। কারজ ইবন জাবির ছিলো কুরাইশদের মিত্র পক্ষের লোক। আল্লাহর রাসূল (সা) বদরের নিকটবর্তী সাফওয়ান উপত্যকা পর্যন্ত কারজ ইবন জাবিরকে ধাওয়া করেন। কিন্তু, কারজ ইবন জাবির পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এটা ছিলো বদর প্রান্তরে মুসলিমদের প্রথম আক্রমণ।
এভাবেই আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর গঠিত সৈন্যবাহিনীকে সমস্ত আরব ব-দ্বীপ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অভিযানে পাঠিয়ে কুরাইশদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। যদিও এ সকল অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কোন যুদ্ধ সংগঠিত হয়নি কিন্তু, তারপরেও এ সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিযান থেকে অর্জিত প্রাপ্তি পরবর্তী সময়ের বড় বড় যুদ্ধের পথকে মসৃণ করেছিলো। কারণ, এ সমস্ত অভিযানে মুসলিমদের যে সামরিক প্রশিক্ষণ হয় তা মূলতঃ তাদের যুদ্ধের ময়দানের জন্যই প্রস্তুত করে। এছাড়া, মুসলিমদের ছোট ছোট এ সমস্ত অভিযান মদীনার মুনাফিক ও ইহুদী গোত্রগুলোর মেরুদন্ডে আতঙ্কের স্রোত প্রবাহিত করে, যা তাদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ঝামেলা তৈরী করার চিন্তা থেকে বিরত রাখে। কুরাইশদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাসূল (সা) এর এ প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ যেমন একদিকে পৌত্তলিকদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিলো আবার অন্যদিকে মুসলিমরা মানসিকভাবে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে উজ্জীবিত হয়েছিলো। এছাড়া, রাসূল (সা) মদীনা এবং লোহিত সাগর তীরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাসকৃত বিভিন্ন গোত্র যেমন, বনু দামরাহ, বনু মুদলাজ এবং আরও অনেক গোত্রের সাথে মিত্রতার চুক্তি করে কুরাইশদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার পথে অনেক বাঁধাবিপত্তিরও সৃষ্টি করেন।
মুনকার পরিবর্তনের জন্য শক্তি প্রয়োগ সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল

মুনকারের অপসারন একটি ফরজ দায়িত্ব এবং একে প্রতিহত করার জন্য শক্তিপ্রয়োগ নির্ভর করে সামর্থ্যের উপরে।
শরীয়াহ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত এবং নিষিদ্ধ সমস্ত কাজই হচ্ছে মুনকার, যেমন কোন ফরয কাজে অবহেলা করা অথবা কোন হারাম কাজ সম্পাদন করা। মুনকারের অপসারন করা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত হুকুম শর’ঈ যা ব্যক্তিগত, দলগত, সাংগঠনিক, জাতিগত এবং রাষ্ট্রীয় সমস্ত পর্যায়ে সকল মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আবু সাঈদ আল খুদরী থেকে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, “আমি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কোন মুনকার দেখে তাহলে সে যেন তার হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়, যদি সে তাতে সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন মুখ দিয়ে তা সম্পাদন করে এবং যদি সে তাতেও সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন তার অন্তর দিয়ে তা (প্রত্যাখ্যান) করে এবং এটাই হচ্ছে দূর্বলতম ঈমান”।
সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে দল বা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা মুসলিমদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে একটি ফরয দায়িত্ব। আল্লাহ্ বলেন,
“তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল বের হোক যারা মানুষকে কল্যাণের (খায়ের) দিকে ডাকবে সৎকাজের (মারুফ) আদেশ করবে এবং অসৎকাজের (মুনকার) নিষেধ করবে এবং তারাই হচ্ছে সফলকাম’’। [আলে-ইমরান: ১০৪]
এই জাতিকে আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠ জাতির সম্মানে ভূষিত করেছেন যার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণে, যাতে সে সৎকাজের আদেশ করতে পারে, অসৎকাজে নিষেধ করতে পারে এবং আল্লাহর উপরে ঈমান আনতে পারে । তিনি বলেন,
“তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি যার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণে যাতে তোমরা সৎ কাজের আদেশ কর, অসৎ কাজের নিষেধ কর এবং আল্লাহর উপরে ঈমান আন’’। [আলে ইমরান: ১১০]
সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধকে আল্লাহ মুমিন এবং মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্যকারী সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন,
“মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী একে অপরের হতে, তারা অসৎ কাজের আদেশ করে এবং সৎ কাজে নিষেধ করে’’। [আত তাওবাহ: ৬৭]
তিনি আরো বলেন,
“মুমিন নর-নারী একে অন্যের আউলিয়া (সাহায্যকারী, রক্ষক, বন্ধু)। তারা সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজের নিষেধ করে এবং তারা সালাত কায়েম করে”। [আত তাওবাহ: ৭১]
মুনকারের ব্যাপারে নীরব থাকা এবং তা নির্মূলের লক্ষ্যে কাজ না করার ব্যাপারে আল্লাহ মুসলিমদেরকে শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন। হুযাইফা বিন আল ইয়ামান থেকে বর্ণিত যে রাসূল (সা) বলেছেন, “সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে, অন্যথায় আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন, তখন তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে (সাহায্য চাইবে) কিন্তু তিনি সাড়া দিবেন না ।হাইছাম থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি, ‘কোন সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে কিছু লোক যদি অন্যায় কাজ সংঘটিত করে এবং সেটা পরিবর্তন করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা সেটা না করে তাহলে আল্লাহ্ তাদের সবার উপরে আযাব নাযিল করেন”।
আহমাদ থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) বলেছেন, “কিছু বিশেষ লোকের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ্ সমস্ত মানুষকে শাস্তি দেন না, যদি না তারা নিজেদের মধ্যে অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখে এবং পরিবর্তন করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা না করে। যদি তারা এরূপ আচরণ করে তাহলে তিনি সেসব বিশেষ লোকের পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ মানুষকেও শাস্তি প্রদান করেন”।
অতএব কোন মুসলিম যদি তার সামনে কোন অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখে – যেকোনো অপকর্ম- তাহলে তাতে নিষেধ করতে হবে এবং নিজ নিজ সামর্থ্য অনুসারে। আবু সাঈদ আল খুদরী কর্তৃক হাদীসে উল্লেখিত তিনটি পন্থার যেকোনো একটি অনুসারে একে পরিবর্তন করতে হবে, অন্যথায় সে গোনাহগার হবে ।
মুসলিমরা ইসলামী শাসনব্যবস্থার অধীনে থাকুক অথবা কুফর শাসনব্যবস্থার অধীনে, শাসক ইসলামী শাসনব্যবস্থা যথার্থরুপে বাস্তবায়ন করুক অথবা এর অপপ্রয়োগ করুক- সর্বাবস্থায়ই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ মুসলিমদের উপর ফরয। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধের চর্চা রাসুল (সা) এর সময়ে ছিল, সাহাবাদের (রা) সময়ে ছিল, তাবিঈ এবং তাবি-তাবিঈগণের সময়েও ছিল এবং এটা কিয়ামতের আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে । ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্র যে কারো দ্বারাই মুনকার সংঘটিত হতে পারে । রাষ্ট্র, ব্যক্তি এবং সংগঠন প্রত্যেকেরই দায়িত্ব হচ্ছে মুনকারকে নিষেধ করা এবং তা পরিবর্তন করা ।
ইসলামী রাষ্ট্রে মূলত শাসকই হচ্ছেন জনগণের বিষয়াদিকে শরীয়া আইন দ্বারা দেখাশোনা করার জন্য দায়িত্বশীল, অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি বা দল কর্তৃক সংঘটিত মুনকারকে শরীয়া দ্বারা নিষেধ করার জন্যও তিনি দায়িত্বশীল। রাসূল (সা) বলেন, “ইমাম হচ্ছে রাখাল (রক্ষক) এবং সে তার জনগণের জন্য দায়িত্বশীল”। আল্লাহ্ তাকে সবধরনের ফরয (আল্লাহ্ কর্তৃক নির্দিষ্ট দায়িত্ব সমূহ) পালনের জন্য ব্যক্তি দলের উপর শক্তিপ্রয়োগের ক্ষমতা দিয়েছেন। যদি এসব দায়িত্ব পালন করানোর জন্য তাদের উপর শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে সেটা করতে তিনি বাধ্য। আল্লাহ্ তার উপরে এটাও বাধ্যতামূলক করেছেন যে তিনি নিষিদ্ধ কাজ বাস্তবায়ন করা থেকে লোকজনকে প্রতিরোধ করবেন। যদি এসব নিষিদ্ধ কাজ থেকে লোকজনকে সরিয়ে রাখতে তাদের উপর শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে সেটা করতে তিনি বাধ্য । অতএব হাত অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মুনকারের পরিবর্তন এবং প্রতিরোধের জন্য মূলত রাষ্ট্রই হচ্ছে দায়িত্বশীল, কারণ ইসলামের প্রয়োগ এবং ইসলামী আইন মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য শক্তি প্রয়োগ উভয়ের জন্য শরীয়াহ মোতাবেক রাষ্ট্র হচ্ছে দায়িত্বশীল ।
এবার আসা যাক ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত কোন অপকর্মের ব্যাপারে, কোন ব্যক্তি যদি তার সামনে কোন অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখে; যেমন কোন ব্যক্তি কর্তৃক মদ্যপান করা, চুরি করা, কাউকে হত্যার চেষ্টা করা অথবা কোন নারীর সাথে ব্যভিচার করা অথবা অন্য যেকোনো অপকর্ম তাহলে সেসব অপকর্মে নিষেধ করা এবং এগুলোকে পরিবর্তন ও নির্মূল করা তার জন্য একটি বাধ্যবাধকতা; এ কাজে ব্যর্থ হলে সে গোনাহগার হবে। নিজের হাত দ্বারা যদি সে অপকর্মকে নির্মূল করতে সক্ষম হয় অথবা এরূপ সম্ভাবনাও থাকে তাহলে পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করা এবং তা নির্মূল করা তার জন্য একটি বাধ্যবাধকতা। এভাবেই সে কাউকে মদ্যপান করা অথবা চুরি করা অথবা কাউকে হত্যা করা অথবা কারো সাথে ব্যভিচার করা থেকে বিরত রাখবে। একে নিজের হাত দিয়ে সে প্রতিহত ও নির্মূল করবে কারণ এরূপ করতে সে সক্ষম এবং এর মাধ্যমে সে পালন করবে রাসূল (সা) এর হাদীস, “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কোনো অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখ, সে যেন নিজের হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়”।
হাত অর্থাৎ শক্তিপ্রয়োগের বিষয়টি নির্ভর করে কোন অপকর্মকে পরিবর্তন করার প্রকৃত সামর্থ্যের উপর—এমনকি যদি অপকর্মটি হাত দ্বারা পরিবর্তন ও নির্মূলের সম্ভাবনাও পরিলক্ষিত হয় । যদি অপকর্ম নির্মূলের সামর্থ্য না থাকে তাহলে হাত ব্যবহারের প্রয়োজন নেই কারণ এক্ষেত্রে অপকর্ম পরিবর্তন ও নির্মূলের যে লক্ষ্য তা অর্জিত হবেনা। তার ক্ষেত্র হলো প্রকৃতপক্ষে অপকর্মটি পরিবর্তনের সামর্থ্য ।
আর এর প্রমাণ হচ্ছে অক্ষমতার ক্ষেত্রে হাদীসটিতে হুকুমের পরিবর্তন অর্থাৎ হাত দিয়ে নিষেধ করা এবং নির্মূল করার সামর্থ্য না থাকলে মুখ দিয়ে নিষেধ করার হুকুম; যেখানে বলা হচ্ছে “যদি সে তাতে সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন মুখ দিয়ে তা নিষেধ করে।” মুখ দিয়ে নিষেধ করাকে অপকর্মের পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করা যাবে না বরং এর মানে হচ্ছে অপকর্ম সম্পাদনকারীকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা অর্থাৎ অপকর্ম সম্পাদনকে প্রত্যাখ্যান করা। যদি সে মৌখিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে না পারে তাহলে অন্তর দিয়ে অপকর্মটি ঘৃণা করতে হবে এবং সে কোনভাবে একে গ্রহণ করতে পারবেনা।
এতক্ষণ আলোচনা হলো ব্যক্তি এবং দল কর্তৃক সংঘটিত অপকর্মের ব্যাপারে, যেমন শাসক যদি অন্যায় আচরণ করে অথবা জনগণের সম্পদে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে অথবা কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অথবা জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে অথবা রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করে অথবা ইসলামের কোনো হুকুমের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে অথবা অন্য যেকোনো অপকর্ম করে তাহলে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা, তার অপকর্মকে প্রত্যাখ্যান করা এবং তা পরিবর্তন করা জাতি, সেনাবাহিনী, দল এবং ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত মুসলিমের উপর একটি বাধ্যবাধকতা; তারা যদি এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও তা পরিবর্তনের জন্য কাজ করা থেকে বিরত থাকে তাহলে তারা গুনাহগার হবে।
শাসকের কিছু অপকর্মের ক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ ও পরিবর্তন করার বিষয়টি মুখ দ্বারা সম্পাদন করতে হবে যেমনটি মুসলিম কর্তৃক উম্মে সালমা হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের কিছু নেতা (আমীর) আসবে, যাদের কিছু কাজ তোমরা সত্য বলে স্বীকার করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখ্যান করবে। যারা (অন্যায়কে) ঘৃণা করবে তারা নিজেদেরকে (দায়িত্ব থেকে) মুক্ত করে নিবে এবং যে প্রত্যাখ্যান করবেI সে নিরাপদ, কিন্তু তাদের কি অবস্থা হবে যারা (অন্যায়কে) গ্রহণ করবে এবং অনুসরণ করবে?” আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ হতে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) বলেন, “না, আল্লাহর কসম, তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং অত্যাচারীর হাত চেপে ধরবে এবং তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে ও তাতে স্থির রাখতে প্রকৃত অর্থেই শক্তি প্রয়োগ করবে, নাহলে আল্লাহ তোমাদের কিছু লোকের অন্তরের সাথে অন্যদের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দিবেন এবং তিনি তোমাদেরকে অভিশাপ দিবেন যেভাবে তাদেরকে দিয়েছিলেন।” অনূরূপভাবে, অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলাকে রাসূল (সা) সর্বোত্তম জিহাদ সাব্যস্ত করেছেন। “কোনটি সর্বোত্তম জিহাদ?” এক লোকের এরূপ প্রশ্নের জবাবে রাসূল (সা) বলেন: “অত্যাচারী শাসকের সামনে একটি সত্য কথা বলা”।
শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সমস্ত হাদীসেই শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এই ক্ষেত্রটি হচ্ছে এমন প্রকাশ্যে কুফরে লিপ্ত হওয়া যার ব্যাপারে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে সন্দেহাতীত প্রমান বিদ্যমান; অর্থ্যাৎ যদি সে আল্লাহ’র ওহীজাত আইন পরিত্যাগ করে এবং প্রকাশ্যে কুফর আইন দ্বারা শাসন করে। আউফ বিন মালিক আল আশযায়ী থেকে বর্ণিত, “আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের শাসকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন তারা যাদেরকে তোমরা ভালোবাস এবং তারা তোমাদেরকে ভালোবাসে এবং তারা তোমাদের জন্য দুয়া করে এবং তোমরা তাদের জন্য দুয়া কর। এবং তোমাদের শাসকদের মধ্যে নিকৃষ্ঠ হচ্ছে তারা যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর এবং তারা তোমাদেরকে ঘৃণা করে”।তিনি বর্ণনা করেন, “আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না?’ তিনি বললেন, ‘না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মাঝে সালাত কায়েম রাখে”। সালাত কায়েম রাখা বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে ইসলামে শাসন কায়েম রাখা; অর্থাৎ অংশবিশেষকে উল্লেখের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করার ভিত্তিতে বুঝানো হয়েছে শর’ঈ আহকাম পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা।
উম্মে সালামা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের কিছু নেতা (আমীর) আসবে যাদের কিছু কাজ সত্য বলে স্বীকার করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখান করে। যারা (অন্যায়কে) ঘৃণা করবে সে নিজেকে (দায়িত্ব থেকে) মুক্ত করে নিবে এবং যে প্রত্যাখান করবে সে নিরাপদ, কিন্তু তাদের কী হবে যারা (অন্যায়কে) গ্রহণ করবে এবং অনুসরণ করবে”। তারা বললেন, “আমরা কি তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না?” তিনি বললেন, “না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করে”। অর্থ্যাৎ ‘অংশবিশেষকে উল্লেখের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করার ভিত্তিতে বুঝানো হয়েছে যতক্ষণ তার সালাতসহ সমস্ত শর’ঈ আহকাম বাস্তবায়ন করে। উবাদা বিন আস সামিত হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমরা রাসূল (সা) এর কাছে কিছু বিষয়ে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) দিলাম, কঠিন ও সহজ সমস্ত অবস্থায় (তাঁর প্রতি) শ্রবন ও আনুগত্য করার ব্যাপারে, নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের ক্ষেত্রে (তাঁর আদেশকে) নিজেদের উপরে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে এবং কতৃর্ত্বশীল লোকদের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাদে লিপ্ত না হওয়ার ব্যাপারে যতক্ষণ আমরা এমন প্রকাশ্য কুফর না দেখি যার ব্যাপারে সর্বশক্তিমান আল্লাহর তরফ থেকে প্রমাণ বিদ্যমাণ এবং (বাইয়াত দিলাম) আল্লাহর খাতিরে আমাদের সর্বদা সত্য কথা বলার ব্যাপারে”।
অতএব তিনি এই তিনটি হাদীস অনুযায়ী শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা নিষিদ্ধ, যদি না সে আল্লাহর ওহী অনুযায়ী শাসন না করে অর্থাৎ শুধুমাত্র তখন যখন সে এমন প্রকাশ্য কুফর আইন দিয়ে শাসন করতে শুরু করে যার কুফর হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর তরফ থেকে সন্দেহাতীত প্রমাণ বিদ্যমান।
অতএব, যখন কোন মুসলিম শাসক আল্লাহর ওহী দিয়ে শাসন না করে বরং স্পষ্ট কুফর আইন দিয়ে শাসন করে তখন সমস্ত মুসলিম তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করতে বাধ্য, যার মাধ্যমে তাকে কর্তৃত্ব থেকে অপসারণ করা যায় সেসব কুফর আইন যেগুলো দিয়ে সে শাসন করত সেগুলো অপসারন করা যায় এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইন গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা যায়। শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের ব্যাপারটি একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে তখনই আরোপ হয় যখন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে এবং কুফর আইন সমূহকে অপসারণ করার সামর্থ্য থাকবে অথবা এরূপ সম্ভাবনা থাকবে কারণ মুনকারকে হাত তথা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন করার কাজটি নির্ভর করে প্রকৃতপক্ষে সেই সামর্থ উপরে যার মাধ্যমে মুনকারকে অপসারণ করা যায়। মুনকারকে হাত দিয়ে পরিবর্তন করার বাধ্যবাধকতা যে হাদীসটিতে এসেছে তার প্রয়োগ এবং কুফর আইন দিয়ে শাসনকারী শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রহের বাধ্যবাধকতা যে হাদীস দুটিতে এসেছে তারও প্রয়োগ নির্ভর করে প্রকৃত পক্ষে মুনকার ও স্পষ্ট কুফরকে পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগের সামর্থ্যের উপরে অথবা এরূপ সম্ভাবনার উপরে। কিন্তু মুনকার এবং কুফর আইনের পরিবর্তন ও অপসারণের মত পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগের সামর্থ যদি না থাকে অথবা এরূপ সম্ভাবনা ও না থাকে তাহলে এ থেকে তখন বিরত থাকতে হবে কারণ তখন মুনকার ও কুফর আইন সমূহের প্রকৃত পরিবর্তন এবং অপসারণের সেই উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না যার জন্য শরীয়াহ শক্তি প্রয়োগ বাধ্যতা মূলক করেছে । এরূপ পরিস্থিতিতে মুনকারকে নিষেধ করার দায়িত্বটি মুখ দিয়ে পালন করতে হবে, এবং পাশাপাশি সক্ষমতা অর্জনের জন্য অথবা এরূপ সম্ভাবনা সৃষ্টির জন্য শক্তি বৃদ্ধি প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে যাতে মুনকার এবং কুফর আইন সমূহকে প্রকৃত পক্ষে পরিবর্তন করা যায় এবং এরুপ পরিস্থিতিতেই শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। পুরো জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এর সামরিক ক্ষমতা সম্পন্ন সেনাবাহিনী, প্রভাব শক্তি সম্পন্ন বৃহৎ গোত্র সমূহ ও এর সামরিক শক্তিসহ অথবা উম্মাহর মধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তারকারী রাজনৈতিক দল সমূহ – এদের যে কেউ যখন কুফর আইন-কানুন সমূহ দিয়ে শাসনকারী এবং ইসলামের বিধান-সমূহ পরিত্যাগকারী শাসককে অপসারণের সামর্থ অর্জন করে তাহলে সেক্ষেত্রে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে সে শরীয়াহ অনুযায়ী বাধ্য, যাতে তাকে এবং কুফর আইন-কানুন সমুহকে অপসারন করা যায় এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইন-কানুন সমূহকে পুনঃস্থাপন করা যায়।
ইসলামের দশটি মৌলিক বিধানের মধ্যে এটি হচ্ছে একটি যাকে আমরা পেয়েছি আমাদের উপরে একটি দায়িত্ব হিসেবে, যাতে আমরা এই পথনির্দেশনা অনুসারে গণমানুষকে সচেতন করতে পারি। নিশ্চয় আল্লাহ তার বিষয়কে পূর্ণতা দান করবেন, যদিও অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।
প্রবন্ধটি ১ জুলাই, ১৯৮৯ (২৮ জুল-কা’দা, ১৪০৯ হি) সালে আরবী ভাষায় প্রকাশিত একটি লেখার অনুবাদ হতে নেয়া হয়েছে
————————————————————————————————————————–
উপরের লেখাটির প্রতিক্রিয়ায় একই বছরে প্রকাশিত একটি প্রশ্নোত্তর নিম্নে দেয়া হলো:প্রশ্নোত্তর: “মুনকার নিষেধ করা একটি দায়িত্ব এবং একে প্রতিহত করার জন্য শক্তি প্রয়োগ নির্ভর করে সামর্থ্যের উপর” লিফলেট সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর
প্রিয় ভাইয়েরা,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতাহু। “মুনকার নিষেধ করা একটি ফরজ দায়িত্ব এবং একে প্রতিহত করার জন্য শক্তি প্রয়োগ নির্ভর করে সামর্থ্যের উপরে” শিরোনামে প্রকাশিত লিফলেটটি অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন রকম জিজ্ঞাসা ও সমালোচনার ভিতরে কিছু সমালোচনার বর্ণনা ছিল এরুপ – “হিজব” একটি পথভ্রষ্ট দল, অন্যকিছু সমালোচনার বিষয়বস্তু ছিল – হিজবের নীতিমালা ও কার্যপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এবং নতুন কর্মপদ্ধতির অবলম্বন। এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা এবং সমালোচনা কোন একজন ব্যক্তি বা কোন একটি এলাকা থেকে আসেনি বরং এগুলো এসেছে অনেক লোকের কাছ থেকে এবং অনেক এলাকা থেকে।
প্রিয় ভাইয়েরা, আমি সততার সাথে বলছি এসব প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা ও সমালোচনা ছিল উপশম দানকারী, প্রশান্তিদায়ক যা আত্মাকে পুলকিত করেছে এবং অন্তরকে আনন্দিত ও প্রশান্তিময় করেছে, কারণ এগুলো চিন্তা ও কাঠামোগত ঐক্যের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিকে প্রমাণিত করেছে এবং এতে শাবাবদের প্রচন্ড সততা, আন্তরিকতা এবং দলকে রক্ষার জন্য প্রবল আগ্রহের বিষয়টিই প্রমাণিত হয়েছে। এতে শাবাব ও নেতা হিসেবে আবশ্যকীয়ভাবে সেসব চিন্তার প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি প্রমাণীত হয়েছে যেগুলোতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি, যেগুলো আমরা গ্রহণ করেছি এবং যেগুলোর ভিত্তিতে আমরা নিজেদেরকে সংগঠিত করেছি এবং যেগুলো আমরা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ এবং এ দুটো দ্বারা অনুমোদিত অন্যান্য উৎস থেকে ইজতিহাদের মাধ্যমে বের করেছি। এ গুলোতে যে কোন পরিবর্তন বা পরিমার্জন শুধুমাত্র ওহীজাত প্রমাণের সাপেক্ষেই গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় প্রত্যাখ্যাত-এটিও প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের ও সকলের প্রতি এটি একটি অনুগ্রহ যা চিন্তা ও কাঠামোগত ঐক্যকে নিরাপত্তা প্রদান করে এবং পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে আমাদেরকে রক্ষা করে।
প্রিয় ভাইয়েরা, এবার আলোচনা করা যাক লিফলেটের বিষয়বস্তু নিয়ে, এটি প্রকাশ করার অনুপ্রেরণা ও উদ্দেশ্য নিয়ে এবং ব্যাখ্যা করা যাক যে এটি আমাদের গৃহীত চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক নয় বা তাতে কোন পরিবর্তন বা পরিমার্জনও করা হয়নি এই লিফলেটের মাধ্যমে।
কিছু আন্তরিক ইসলামী দলের সাথে আলোচনাকালে আমাদের কিছু শাবাব মুনকার নির্মূলের লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগের শর’ঈ হুকুম সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল এবং এই প্রশ্নটিই হচ্ছে আলোচ্য লিফলেট প্রকাশের অনুপ্রেরণা। তাদেরকে একটি জবাব প্রেরণ করা হয়েছে যার সাথে ইসলামী জীবনব্যবস্থার পুনরুত্থান ও খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজের সাথে পার্থক্য সূচিত করা হয়েছে, (অর্থাৎ) খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য দলটিকে অবশ্যই রাসূল (সা) এর সীরাত অনুসরণ করতে হবে অর্থাৎ মক্কী জীবনের কর্মপদ্ধতি হতে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত তার (সা) অনুসরণে তিনটি ধাপের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এরপর সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ সম্পর্কে তাদের কাছে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে মুনকারকে নিষেধের হুকুম সম্পর্কিত আলোচনাটি শাবাব ও গণমানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
শাবাবদের পক্ষ থেকে একই প্রশ্নের জবাব প্রদান এবং তারপর বাকি শাবাব ও জনগণের কাছে তা প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল মূলত এ বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রদান যে, ইসলামী দলসমূহ শক্তি প্রয়োগের বিষয়টিকে যে ভাবে চিন্তা করে ও তা বাস্তবায়ন করে সেটা হাত দিয়ে মুনকার পরিবর্তন সম্পর্কিত হাদীস সমূহের সাথে এবং শাসক যখন স্পষ্ট কুফরে লিপ্ত হয় তখন তার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক বিদ্রোহ সম্পর্কিত হাদীস সমূহের সাথে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি শাবাব পক্ষ যাতে এ ব্যাপারে ইসলামী দলসমূহের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে ও তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং সর্বোপরি কুফর আইনসমূহ অপসারণ করে ওহীজাত আইন পুনঃস্থাপনের দায়িত্ব পালনের জন্য উম্মাহকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। অতএব এক্ষেত্রে উপরোক্ত লক্ষ্যগুলো অর্জন ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না।
অতএব দলের গৃহীত চিন্তা পরিত্যাগ করে নতুন কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা কোনভাবেই উদ্দেশ্য ছিলনা, এমনকি এরূপ চিন্তা কখনো মাথায় আসেনি।
আমাদের গ্রহণকৃত চিন্তার সাথে লিফলেটের বিষয়বস্তু সামঞ্জস্যতার ব্যাপারে ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:
১. ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত মুনকারের ব্যাপারে যখন লিফলেট এ আলোচনা করা হয়েছে, তখন বলা হয়েছে যে একে হাত দিয়ে পরিবর্তন করার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্র ও ব্যাক্তির এবং একাজের জন্য দলের দায়িত্বের কথা বলা হয়নি, কারণ এ ব্যাপারে আমরা যা বুঝি সেটা হচ্ছে ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত মুনকার নির্মূলের দায়িত্ব কোন দলের নয়।
আবার মুনকার সংঘটনকারী ব্যক্তিকে হাত দিয়ে প্রতিহত করার কথা যখন বলা হয়েছে, তখন সেটিও সুনির্দিষ্ট কিছু মুনকারের জন্য অনুমোদিত। অতএব চুরি করা, ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া ও হত্যা করা প্রভৃতি যেহেতু মুসলিম ভূখন্ড সমূহে অনুমোদিত নয়, অতএব রাতের বেলায় কাউকে কোনো স্থানে চুরি করতে দেখলে অথবা কোন নারীর সাথে যেনার চেষ্টা করতে দেখলে অথবা কাউকে হত্যার প্রচেষ্টা করতে দেখলে, যে কোন মুসলিমের উপর একটি শর’ঈ দায়িত্ব যে সে একাজগুলো প্রতিহত করবে যদি সে এসব মুনকারকে হাত দিয়ে প্রতিহত করার সামর্থ্য রাখে। যদি সে এগুলো প্রতিহত না করে, তাহলে সে আল্লাহর চোখে গোনাহাগার হবে কারণ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি দায়িত্ব সে পরিত্যাগ করেছে।কিন্তু রাষ্ট্রের আইন দ্বারা অনুমোদিত মুনকার সমূহ, যেমন সমাজে নারীর অবাধ চলাফেরা প্রভৃতি ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত হলেও এগুলোকে শাসক কর্তৃক সংঘটিত মুনকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কারণ এগুলো শাসক কর্তৃক বাস্তবায়িত আইন ও ব্যবস্থার কারণে উদ্ভুত। এসব মুনকার নির্মূলের উপায় হচ্ছে সেই ব্যবস্থাকে নির্মূল করে দেওয়া যা এগুলোকে অনুমোদন দেয়। ব্যক্তি কর্তৃক ব্যাংক ধ্বংস করে দেওয়া, ডিসকো গুঁড়িয়ে দেওয়া অথবা শরঈ পোশাক পরিধান না করে প্রকাশ্য চলাফেরায় নারীদেরকে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে এসব মুনকার নির্মূল সম্ভব নয়।
প্রয়াত তাকী উদ্দিন আন নাবাহানী (রহ) এর সময়ে একটি প্রশ্নের জবাব (তারিখ অনুল্লেখিত) প্রদান করা হয়েছিল যাতে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ প্রত্যেক মুসলিমের উপর একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং এটি কোন সামষ্টিক দায়িত্ব নয়; জবাবটি ছিল নিম্নরূপ:
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ প্রত্যেক মুসলিমের উপর একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং এটি কোন সামষ্টিক দায়িত্ব নয়, কারণ এখানে সৎকাজের প্রকৃতি অনুযায়ী সমস্ত সৎকাজকেই বুঝানো হয়েছে এবং কোন সুনির্দিষ্ট সৎকাজ বা সুনির্দিষ্ট অসৎকাজকে বুঝানো হয়নি। যদি এই বাস্তবতাটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে থাকে তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে এরূপ দায়িত্ব পালনের কোনো শেষ নেই কারণ সর্বযুগে, সর্বত্র এর পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে এবং হাদীসের বর্ণনা সে ব্যক্তির অপরাধ ব্যখ্যা করার জন্য এসেছে যে ব্যক্তি এগুলোকে অবজ্ঞা করল। রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কোন অপকর্ম হতে দেখে সে যেন তাঁর হাত দিয়ে তা পরিবর্তন (প্রতিহত) করে দেয়, যদি তাতে সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন তাঁর মুখ দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয় আর যদি সে তাতেও অক্ষম হয় তাহলে সে যেন অন্তর দিয়ে পরিবর্তন (প্রত্যাখ্যান) করে এবং এটাই হচ্ছে সর্বনিম্ন স্তরের ঈমান”। অতএব হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ দেখে” অর্থাৎ যে দেখল এটি তাঁর উপরে একটি বাধ্যবাধকতা, এবং তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে” অর্থাৎ তিনি এরূপ বলেননি “যদি তোমরা (দলবদ্ধভাবে) দেখ”। এবার সেই ব্যক্তির আলোচনায় আসা যাক যে সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজের নিষেধ করে, যদি কোন ব্যক্তি কাউকে আদেশ ও নিষেধ করা সত্ত্বেও আদিষ্ট ব্যক্তি বিরত না হয়, তাহলে তাঁর সাথে পানাহার এবং চলাফেরা করা আদেশকারীর জন্য হারাম হয়ে যাবে যতক্ষণনা আদিষ্ট ব্যক্তি অপকর্ম থেকে বিরত হচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়টি ইসলামী জীবনব্যবস্থার পুনর্বহালের কর্মীর (দাঈ’র) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অতএব যদি সে কোন মুসলিমকে ইসলামী পুনর্বহালের জন্য কাজ করতে বলে এবং একটি সামষ্টিক দায়িত্ব হিসেবে সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী যদি সে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে তাঁর সাথে পানাহার এবং চলাফেরা করতে দাঈ’র কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য পরিচালিত কার্যক্রমের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ রয়েছে যা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে যেগুলোর ক্ষেত্রে তাদের জন্য সেই নির্দিষ্ট শর’ঈ হুকুম বিদ্যমান। অতএব, জুলুম পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত অত্যাচারীর হাত শক্তভাবে চেপে ধরে রাখা একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব; কিন্তু ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য কাজ করা একটি সামষ্টিক দায়িত্ব যদিও এর কিছু কাজ ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং দাওয়াত পৌছে দেওয়া সামষ্টিক দায়িত্ব।
২. লিফলেটে শাসক কর্তৃক সংঘটিত মুনকারের আলোচনা এসেছে তিনটি অনুচ্ছেদ, যার শুরু হয়েছিল এভাবে “এবং এগুলো ছিল ব্যক্তি বা দল কর্তৃক সংঘটিত মুনকার; কিন্তু শাসক কর্তৃক সংঘটিত মুনকার……” এবং চতুর্থ অনুচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এ আলোচনা চলছিল যার শুরু হয়েছিল এভাবে, “এবং তাঁর সাথে বিদ্রোহ করার বাধ্যবাধকতা নির্ভর করে সামর্থ্যের উপরে” এই বর্ণনা “যুলুম করা সত্ত্বেও শাসকের প্রতি আনুগত্য করা মুসলিমদের জন্য একতী বাধ্যবাধকতা” শিরোনামে প্রকাশিত Dossier (পৃষ্ঠা ৬৫-৭০) এর বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্ণনার সামঞ্জস্যতার একটি উদাহরণ হিসেবে আমরা ৬৮ পৃষ্ঠার ২২ নং লাইনটি বিবেচনা করতে পারি, যেখানে বলা হচ্ছে, “হাদীসের অর্থগত নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া এবং তাঁর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিবাদে জড়ানোর নির্দেশটি তখনই বৈধ যখন সে প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত হয়। দলীলের শব্দগত (মানতূক) নির্দেশনার মতো অর্থগত (মাফহূম) নির্দেশনাও সমানভাবেই বাধ্যবাধকতা অতএব এসব হাদীস হচ্ছে আমাদের নিকট প্রমাণ যে, আইনপ্রণেতার তরফ থেকে আমরা শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করতে, যুদ্ধে লিপ্ত হতে এবং তাদের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত হতে বাধ্য যদি প্রকাশ্য কুফর পরিলক্ষিত হয়।লিফলেটের সর্বশেষ অনুচ্ছেদ যা থেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সূত্রপাত তাঁর শুরু হলো এভাবে “এবং উম্মাহ যদি ঐক্যবদ্ধ হয় …প্রভৃতি” যদি এই বর্ণনাটি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে আর কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না। যখন দল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো তখন তাঁর দায়িত্বের সীমারেখা টেনে দেওয়া হলো তিনটি বিষয়ে সামর্থ্য অর্জনের উপরে। প্রথমতঃ যদি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তাদের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান থাকে দ্বিতীয়তঃ যদি বৃহৎ গোত্রসমূহের মধ্যে তাদের পর্যাপ্ত প্রভাব বিদ্যমান থাকে। তৃতীয়তঃ যদি উম্মাহর মধ্যে তাদের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান থাকে। কোন দলের পক্ষে এই তিনটি বিষয় অর্জন করা কখনই সম্ভব না, যদি না তারা রাজনৈতিক সংগ্রামে অবর্তীণ হয় এবং নুসরাহ খোঁজ করা সহ তিনটি ধাপের ভিতরে দিয়ে অগ্রসর হয়; কারণ নুসরাহ খোঁজ ছাড়া সেনাবাহিনী এবং বৃহৎ গোত্রসমূহের মধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তার করা সম্ভবনা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ব্যতীত উম্মাহর মধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তার সম্ভব না।
কুফর আইনকানুনসমূহের ধ্বংস এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইনকানুনসমূহকে পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে উম্মাহ ও বৃহৎ গোত্রসমূহ তখনই অগ্রযাত্রা করবে যখন তারা জনমত এবং গণজাগরণ প্রত্যক্ষ করবে। একইভাবে সেনাবাহিনী এবং বৃহৎ গোত্রসমূহের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা যাবেনা, যদিনা তারা এমন একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিচালিত হয় যারা রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের চর্চা করে।প্রদত্ত ব্যাখ্যার আলোকে এটা স্পস্ট যে লিফলেটের বিষয়বস্তু এবং গ্রহণকৃত চিন্তার মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। যাই হোক বাস্তবতা হলো ১৯৬৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দল নুসরাহ দিতে সামর্থ্যবান ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমেই শক্তি সংগ্রহের প্রচেষ্টায় লিপ্ত যাতে সে কুফর আইনসমূহের পরিবর্তন করতে পারে এবং আল্লাহর ওহীর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে; এবং এ কাজটি দল ব্যবস্থার ভিতরে থেকেই সম্পাদন করে বাইরে থেকে নয় যদিও সমস্ত মুসলিম ভূখন্ডসমূহকে এটা দারুল কুফর হিসেবে বিবেচনা করে দারুল ইসলাম হিসেবে নয়। অতএব দেখা যাচ্ছে এই বাস্তবতা ও অনেক প্রচেষ্টার ভিতর দিয়ে দল যা চর্চা করে এসেছে তাঁর সবকিছু ভুলে যাওয়া হয়েছে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা এবং সমালোচনা করার সময়ে ।
অতএব কুফর আইনসমুহের অপসারণ এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইনকানুন সমূহের পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত শক্তি অর্জনের যে বাধ্যবাধকতা, তা রাসূল (সা) এর কর্মপন্থা অনুসারে হিজব সম্পাদন করেছে নুসরাহ খোঁজার ভিতর দিয়ে, দল ও শাবাব এর মধ্যে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্রে সজ্জিত করার ভিতর দিয়ে নয়।প্রিয় ভাইয়েরা, আপনাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও সমালোচনার জবাব আমরা এই চিঠিতে ব্যাখ্যা করেছি। অতএব এটা স্পষ্ট হলো যে এর সাথে আমাদের গ্রহণকৃত চিন্তার কোন বিপরীত নেই এবং আমরা গ্রহণকৃত কর্মপদ্ধতিকে পরিত্যাগ করিনি এবং কোন নতুন পদ্ধতিও গ্রহণ করিনি।
আমরা দুআ করছি যাতে আল্লাহ তার পক্ষ হতে আমাদেরকে সাহায্য করেন, আমাদেরকে সর্বোত্তম পথে পরিচালিত করেন এবং বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেন, তার দ্বীনের ব্যাপারে যেন তিনি আমাদেরকে সাহায্য করেন এবং তার সাথে সাক্ষাৎলাভের আগ পর্যন্ত আমরা যেন তার দাওয়াত পৌঁছে দিতে পারি, আমাদের কোন কাজ যেন বৃথা না যায়, আমাদের আশা প্রত্যাশাগুলো যেন হতাশায় পর্যবসতি না হয় এবং আমরা যাতে ইখলাসের সাথে নিজেদের কার্যসম্পাদন করতে পারি এবং আমরা যেন দ্রুততার সাথে মুক্তির দিকে অগ্রসর হতে পারি এবং অদুর ভবিষ্যতে তার তরফ থেকে একটি মহান বিজয় দিয়ে সম্মানিত করার জন্য প্রার্থনা করি যার মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করতে, ইসলামের পতাকা সুউচ্চে তুলে ধরতে এবং নাযিলকৃত শাসনব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করতে সক্ষমতা দান করবেন। এই প্রত্যাশায় আমাদের দুআ শেষ করছি।
২৫ মুহাররম, ১৪১০
২৬ আগষ্ট, ১৯৮৯Visionary
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৩ (ইসলামী সমাজ গঠন)
আল্লাহ তা’য়ালা প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি। এ প্রবৃত্তির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই মানুষ সবসময় একত্রিত হয়ে দলবদ্ধ ভাবে বসবাস করতে চায়। আর দলবদ্ধ মানুষের পরস্পরের উপর নির্ভরশীলতা এবং একে অন্যের সাথে মেলামেশা একটি স্বাভাবিক প্রকৃতিগত ব্যাপার। কিন্তু, শুধুমাত্র কিছু মানুষের দলবদ্ধ ভাবে বসবাসের ব্যাপারটি একটি সমাজ তৈরী করে না। মূলতঃ ততক্ষন পর্যন্ত এই দলবদ্ধ মানুষগুলো একটি সমাজ তৈরী করতে পারে না, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা সকলের মাঝে বিদ্যমান একই ধরনের কিছু চিন্তা-ভাবনা দ্বারা পরস্পর আবদ্ধ হয়। একই ধরনের কিছু কারণকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য বিপদজনক বা হুমকি মনে করে থাকে এবং তা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চায়। দলবদ্ধ কিছু মানুষের মধ্যে যদি এ ধরনের একটি সম্পর্ক তৈরী হয়, শুধুমাত্র তখনই সত্যিকার অর্থে একটি সমাজ তৈরী হয়। আবার, নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ না হলে সত্যিকারের একটি সুষম সমাজও তৈরী হয় না।
বস্তুতঃ সুষম সমাজ তৈরীতে সমাজের মানুষের মধ্যে নিম্নলিখিত উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন:
১. সমাজের মানুষের মধ্যে চিন্তার একতা।
২. মানুষে মানুষে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে সর্বসম্মত ভাবে গ্রহন করা না করার জন্য প্রয়োজন আবেগ-অনুভূতির মধ্যে একতা।
৩. সমাজে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে সমাধান করার জন্যও প্রয়োজন একটি নির্ধারিত সমাজ-ব্যবস্থা।
তাই, কোন সমাজ সম্পর্কে কোন মতামত বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পূর্বে প্রয়োজন সমাজে প্রচলিত ধ্যান-ধারনা, বিদ্যমান আবেগ-অনুভূতি এবং সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষনা করে সমাজের প্রকৃত চরিত্র অনুধাবনের চেষ্টা করা। মূলতঃ উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোই নির্ধারন করে দেয় একটি সমাজ থেকে আরেকটি সমাজের পার্থক্য। ব্যাপারটি বোঝার জন্য আমরা রাসূল (সা) হিজরত করার পর মদীনার তৎকালীন সমাজব্যবস্থার উপর আলোকপাত করবো।
সে সময়ে মদীনার সমাজ তিনটি দলে বিভক্ত ছিলো। একটি হলো আনসার ও মুহাজির নিয়ে গঠিত মুসলিমদের দল, যেটি ছিলো সর্ববৃহৎ। আরেকটি দলে ছিলো আউস ও খাযরাজ গোত্রের মূর্তিপুজারীরা (যারা ইসলাম গ্রহন করেনি) এবং তৃতীয় দলটি ছিলো ইহুদীদের, যারা আবার চারটি উপদলে বিভক্ত ছিলো। এদের মধ্যে একটি দল মদীনায় বসবাস করতো, যারা বনু কায়নুকা গোত্র নামে পরিচিত ছিলো। আর মদীনার বাইরের ইহুদীদের দলগুলো বনু নাদির, খায়বার এবং বনু কুরাইজা নামে পরিচিত ছিলো। প্রকৃতপক্ষে, মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার আগেও সেখানে ইহুদীদের আলাদা সমাজ ছিলো, যা মদীনার তৎকালীন সমাজ থেকে ছিলো একেবারেই ভিন্ন। জীবন সম্পর্কে মদীনার মুশরিক গোত্রগুলো থেকে ইহুদীদের সম্পূর্ন ভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারনাই ছিলো এর মূল কারণ। মূলতঃ তারা তাদের নিজস্ব এসব ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতেই পরিচালনা করতো তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ড। ফলে, ইহুদীরা মদীনার ভেতরে ও এর চারপাশে বসবাস করা সত্বেও কখনই মদীনার সমাজের অংশ হতে পারেনি। আর মুশরিকরা ছিলো সংখ্যালঘু এবং তারা মদীনার প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া ইসলামের আদর্শ দিয়ে ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত ছিলো। এজন্য, ইসলাম গ্রহন না করলেও ইসলামী ধ্যান-ধারনা, আদর্শ এবং ইসলামের শাসন-কর্তৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করা ছিলো তাদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার ইসলামী আকীদার ভিত্তিতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ঐক্য। ইসলামই তাদের কর্মকান্ডকে একসুরে বেঁধেছিলো এবং ইসলামের আলোকিত আদর্শই তৈরী করেছিলো তাদের মধ্যে জীবন সম্পর্কে একই ধরনের ধ্যান-ধারনা ও আবেগ-অনুভূতি। তাই এ আদর্শের ভিত্তিতেই তাদের জীবনের প্রতিটি কাজ পরিচালিত হওয়া ও তাদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো তৈরী হওয়াও ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার।
আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী আকীদার ভিত্তিতে মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরী করতে শুরু করলেন। তিনি মুসলিমদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে আহবান করলেন, যাতে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং জীবনের অন্যান্য কর্মকান্ডের উপরও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিদ্যমান থাকে। এ চিন্তা মাথায় রেখেই তিনি (সা) ’আলী ইবন আবি তালিব, তাঁর চাচা হামযা (রা) এবং তাঁর ক্রীতদাস যায়িদ (রা) এর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করলেন। একই ভাবে আবু বকর (রা) এবং খারিযাহ ইবন যায়েদও পরস্পরের ভাই হলেন। তারপর তিনি (সা) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যেও একই ভাবে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করলেন। এভাবে, ’উমর ইবন আল-খাত্তাব (রা) ও ’উতবাহ ইবন মালিক আল-খাযরাজি পরস্পরের ভাই হলেন। আবার, তালহাহ ইবন ’উবাইদুল্লাহ ও আবু আইয়ুব আল আনসারী এবং ’আবদ আল-রাহমান ইবন ’আওফ ও সা’দ ইবন আল-রাবি’য়াও পরস্পরের ভাই হয়ে গেলেন।
মদীনার সমাজে এই ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার ফলাফল বাস্তবিক ভাবে প্রতিফলিত হয়েছিলো। এই ভ্রাতৃত্ববোধের কারণেই মদীনার আনসাররা তাদের মুসলিম মুহাজির ভাইদের প্রতি প্রদর্শন করেছিলো অকল্পনীয় উদারতা, যা আনসার ও মুহাজিরদের সম্পর্ককে করেছিলো সুদৃঢ় ও মজবুত।
ভ্রাতৃত্বের দাবী অনুযায়ী তারা মুহাজিরদের অর্থ-সম্পদ থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুতে অংশীদার করেছিলো। এমনকি তারা একসাথে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষিকাজও করতো। মুহাজিরদের মধ্যে যাদের ব্যবসা করার মতো মনমানষিকতা ছিলো তারা আস্তে আস্তে ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহন করতে লাগলো। যেমনঃ ’আবদ আর রহমান ইবন ’আউফ বাজারে মাখন বিক্রি করতেন। আর যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে গেল না, তারা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে লাগলো। যেমনঃ আবু বকর ও ’আলী (রা) আনসারদের জমিতে চাষাবাদ করতেন। রাসূল (সা) বললেন, “যার একখন্ড জমি আছে সে যেন তা চাষ করে, অথবা তার ভাইকে চাষ করার জন্য দেয়।”এভাবেই মুসলিমরা জীবিকা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কাজ করতে লাগলো। কিন্তু, তারপরেও মুসলিমদের মধ্যে ছোট একটি দল রয়ে গেলো, যাদের না ছিলো কোন অর্থ, না পেল তারা কোন কাজ আর না ছিলো তাদের কোন থাকার জায়গা। তারা ছিলো খুবই অভাবী, তারা মুহাজির-আনসার কোন দলেরই অর্ন্তভূক্ত ছিলো না। এরা ছিলো মূলতঃ বেদুইন যারা ইসলাম গ্রহন করার পর মদিনায় এসেছিলো। রাসূল (সা) নিজে এদের দায়িত্ব নিলেন, মসজিদের এক অংশে তাদের থাকার বন্দোবস্ত করে দিলেন এবং ক্রমে এরা আহল আস সুফ্ফাহ নামে পরিচিতি লাভ করলো। মুসলিমদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহতায়ালা স্বচ্ছলতা দিয়েছিলেন সে সব মহানুভব হৃদয়ের মানুষেরাই এদের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করতো। এভাবেই আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে স্থিতিশীল করেছিলেন এবং তাদের পরস্পরের সাথে পরস্পরের সম্পর্ককে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। চারিদিকে কুফর পরিবেষ্টিত অবস্থায় মদীনার ইসলামী সমাজ এরকম একটি মজবুত ও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো বলেই তা মুনাফিক ও ইহুদীদের সকল হীন চক্রান্তকে নস্যাৎ করতে সমর্থ হয়েছিলো। মদীনার ইসলামী সমাজ সবসময়ই ঐকবদ্ধ ছিলো এবং রাসূল (সা) মুসলিমদের মধ্যকার এই একতাকে নিশ্চিত করেছিলেন।
মদীনায় ইসলামী সমাজ গঠনে সেখানকার মুশরিকরা কখনোই কার্যকরী কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রথমদিকে, তারা ইসলামী হুকুম- আহকামের কাছে সম্পূর্ন ভাবে নতি স্বীকার করেছিলো, তারপর আস্তে আস্তে সমাজে তাদের প্রভাব কমতে কমতে একসময় তা সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো।
আর, ইহুদীদের সমাজ সবসময়ই মদীনার সমাজ থেকে সম্পূর্ন আলাদা ছিলো, এমনকি ইসলাম আসার পূর্বেও। তারপর মদীনায় যখন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলো, ইহুদীদের সাথে মদীনার সমাজের এই পার্থক্য আরও ঘনীভূত হলো। তাই, কিছু নির্ধারিত ভিত্তির উপর ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যে একটি পারস্পারিক সম্পর্ক নির্ধারন করা জরুরী হয়ে পড়লো। সুতরাং, সমাজের অন্যান্য সদস্যদের ব্যাপারে মুসলিমদের অবস্থান কি হবে তা রাসূল (সা) নির্ধারন করলেন। এই প্রেক্ষাপটে, রাসূল (সা) মুহাজির ও আনসারদের ব্যাপারে একটি সনদ তৈরী করলেন, যাতে তিনি (সা) ইহুদীদেরকে ধর্মীয় ও সম্পদে অধিকার দিয়ে তাদের সাথে একটি চুক্তি করলেন এবং বিনিময়ে ইহুদী সম্প্রদায়ের জন্য কিছু দায়িত্ব নির্ধারন করে দিলেন। তিনি (সা) চুক্তিপত্রটি এভাবে শুরু করেছিলেন,“এটি হচ্ছে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে সনদ, যিনি কুরাইশ ও ইয়াসরিবের(মদীনা) বিশ্বাসী মুসলিমদের উপর কর্তৃত্বশীল এবং তাদের উপরও যারা তাদেরকে অনুসরন করবে, তাদের সাথে যোগ দেবে এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। সমস্ত পৃথিবীর মানুষের বিপরীতে তারা হবে একটি জাতি”। তারপর, তিনি (সা) বিশ্বাসীদের মধ্যে কিভাবে সম্পর্ক গঠিত হবে তা উল্লেখ করেন। এছাড়া, তিনি (সা) উক্ত সনদে ইহুদীদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক কেমন হবে তাও উল্লেখ করে বলেন,“একজন মুসলিম কখনোই কোন অমুসলিমের খাতিরে কোন মুসলিমকে হত্যা করবে না। এমনকি, একজন অবিশ্বাসীকে কোন মুসলিম একজন মুসলিমের বিরুদ্ধে কখনো সাহায্যও করবে না। আল্লাহর সাথে তাদের কৃত চুক্তি এক এবং চুক্তি ভঙ্গকারী দায়ভার গ্রহন করবে। মু’মিনরা হচ্ছে সমস্ত বহিরাগতদের বিরুদ্ধে একে অপরের সাহায্যকারী। ইহুদীদের মধ্য হতে যারা আমাদের অনুসরন করবে তারা সাহায্য ও সমান অধিকার প্রাপ্ত হবে। তাদের ব্যাপারে কোন অন্যায় করা হবে না, না তাদের শত্রুকে কোনরকম সাহায্য করা হবে। মু’মিনদের মধ্যকার শান্তি থাকবে অবিচ্ছেদ্য। মু’মিনরা যখন আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করবে তখন কোনরকম পৃথক শান্তিচুক্তি করা যাবে না। চুক্তির শর্ত অবশ্যই সবার জন্য সমান ভাবে যুক্তিযুক্ত হতে হবে”। এ চুক্তিতে যে সকল ইহুদী গোত্র মদীনার সীমানার বাইরে বাস করতো তাদের কথা বলা হয়নি, বরং যে সব ইহুদী ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হতে চেয়েছিলো শুধু তাদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রদত্ত চুক্তি অনুযায়ী, মদীনায় বসবাসকারী যে কোন ইহুদী ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে মুসলিমদের সমান অধিকার পেয়েছিলো এবং তাদের সাথে মুসলিমদের মতোই ব্যবহার করা হতো। ইসলামী রাষ্ট্রে তাদেরকে জিম্মি (শর্তসাপেক্ষে নাগরিক) হিসাবে বিবেচনা করা হতো। চুক্তিপত্রের পরের দিকে যে সব ইহুদী গোত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে ছিলো বনু ’আউফ এবং বনু নাজ্জার এবং আরও অনেকে।
উল্লেখিত ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে তা এ সনদে উল্লেখ করা ছিলো। এখানে পরিষ্কার ভাবে লিখিত ছিলো যে, ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এ সম্পর্ক হবে শুধুমাত্র ইসলামী হুকুম-আহকাম, ইসলামের শাসন-কর্তৃত্ব এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার উপর ভিত্তি করে। চুক্তির কিছু কিছু শর্ত ছিলো নিম্নরূপঃ
১. The close friends of the Jews are as themselves. মুহাম্মদ (সা) এর অনুমতি ছাড়া কেউ মদীনার বাইরে যেতে পারবে না।
২. চুক্তিপত্রে উল্লেখিত সকলের জন্য ইয়াসরিব পূণ্যভূমি হিসাবে বিবেচিত হবে।
৩. যদি কোন ব্যাপারে কোন মতভেদ বা বিবাদের সৃষ্টি হয়, যা কিনা সমাজে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
৪. কুরাইশ এবং তাদের সাহায্যকারীদের কোনরকম নিরাপত্তা দেয়া হবে না।
আল্লাহর রাসুলের তৈরী এ সনদ মদীনার প্রান্তসীমায় বসবাসরত ইহুদী গোত্রগুলোর অবস্থান নির্ধারন করেছিলো। এ সনদ তাদের উপর এ শর্তও আরোপ করেছিলো যে, আল্লাহর রাসূল (সা) অর্থাৎ, ইসলামী রাষ্ট্রের অনুমতি ব্যতীত তারা মদীনার বাইরে যেতে পারবে না। এ চুক্তির মাধ্যমে ইহুদী গোত্রগুলোকে যুদ্ধ বা অন্য কোন গোত্রকে যুদ্ধে সহযোগিতার মাধ্যমে মদীনার পবিত্রতা বা শান্তি নষ্ট করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। এছাড়া, ইহুদী গোত্রগুলোর উপর কুরাইশ গোত্র বা কুরাইশদের মিত্রদেরকেও কোনরকম সাহায্য করার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিলো। চুক্তি অনুযায়ী, সনদের কোন ব্যাপারে বিবাদের সৃষ্টি হলে তারা তা আল্লাহর রাসূল (সা) এর দিকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য ছিলো। ইহুদীরা এ চুক্তির সকল শর্ত মেনে নিয়েছিলো এবং উল্লেখিত গোত্রগুলোও শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলো। এ গোত্রগুলোর মধ্যে ছিলো বুনু ’আউফ, বন আল-নাজ্জার, বনু আল-হারিছাহ, বনু সায়ি’দাহ, বনু জুশাম, বনু আল-আউস এবং বনু ছালাবাহ। বনু কুরাইজা, বনু আল-নাজির এবং বন কাইনুকা এ সময় এ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলেও পরবর্তীতে তারা স্বেচ্ছায় চুক্তির সকল শর্ত মেনে নিয়েই এতে স্বাক্ষর করেছিলো।
এ চুক্তির মাধ্যমে রাসূল (সা) নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো শক্ত ভাবে নিরুপণ করেছিলেন। এছাড়া, ইসলামী রাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী ইহুদী গোত্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্কও দৃঢ় ও সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণিত শর্তের ভিত্তিতে রচিত হয়েছিলো। উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামী হুকুম আহকামকেই সব বিচার-ফায়সালার মাপকাঠি হিসাবে ধরা হতো। মূলতঃ এ পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল (সা) মোটামুটি ভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ইসলামী রাষ্ট্র একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ইহুদীদের অতর্কিত আক্রমণ ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নবগঠিত এ রাষ্ট্র কিছুটা নিরাপত্তা লাভ করেছে। সতরাং, এরপর তিনি (সা) ইসলামী দাওয়াতের পথে অবস্থিত বস্তুগত বাঁধা অপসারনে মনোনিবেশ করলেন এবং জিহাদের প্রস্তুতি নিতে থাকলেন।


















