তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৯ (আরব উপদ্বীপ শাসন)
তাবুক অভিযানের মাধ্যমে মূলতঃ আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছিলেন, যার ফলে ইসলামের শত্রুপক্ষের লোকেরা এ রাষ্ট্রকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছিলো। একই সাথে, এ অভিযান বহির্বিশ্বে ইসলামের উদাত্ত আহবানকে ছড়িয়ে দেয়ার পদ্ধতি হিসাবে তাঁর উত্তরসূরীদের কাছে একটি চমৎকার দৃষ্টান্তও হয়ে থাকলো।
আল্লাহর রাসূল (সা) তাবুকের অভিযান থেকে ফিরে আসার পরপরই ইয়েমেন, হাজরামাউত ও ওমান সহ আরব উপদ্বীপের সমস্ত দক্ষিনাঞ্চল রাসূল (সা) এর আনুগত্য স্বীকার করে ইসলামের পতাকাতলে চলে আসে। শুধু তাই নয়, তারা ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্বকেও মেনে নেয়।
হিজরী নবম সালে, এ অঞ্চলের দূতেরা উদ্বিগ্ন চিত্তে একে একে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর কাছে আসতে লাগলো এবং তাদের ও তাদের গোত্রভূক্ত লোকদের ইসলাম গ্রহনের স্বীকৃতি দিলো। এ সমস্ত ঘটনার ফলশ্রুতিতে, সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে ইসলামী রাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শুধু আরবের অভ্যন্তরীন বিষয়গুলোর মধ্যে মূর্তিপূজারীই যা একটু সমস্যা তৈরী করছিলো। কারণ, মুহাম্মদ (সা)-এর কৃত চুক্তি অনুযায়ী পৌত্তলিকদের মূর্তিপূজা করা কিংবা কাবাঘর তাওয়াফ করার অনুমতি ছিলো। এ চুক্তিতে পরিষ্কার ভাবে বলা ছিলো যে, তারা নির্ভয়ে কাবাঘর তাওয়াফ করতে পারবে এবং পবিত্র মাসে তাদের কোন প্রকার ক্ষতি করা হবে না।
কিন্তু, এ অবস্থা বেশীদিন চলতে দেবার যুক্তিসঙ্গত কোন কারণ ছিলো না। কারণ, কতোদিন আর ইসলামের আকীদার সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী মুর্তিপূজারীদের পবিত্র কাবাঘরে আগমনকে সহ্য করা যায়? কিভাবে এই সম্পূর্ন বিপরীতধর্মী দুটো বিশ্বাসের মানুষেরা একত্রিত হয়ে পবিত্র এ ঘরকে তাওয়াফ করতে পারে, যখন এই দুটি বিশ্বাসের মধ্যে একটির আগমনই হয়েছে মূর্তিপূজাকে সম্পূর্ন রূপে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করতে? এছাড়া, এ জনপদের সকলেই যখন ইসলামী রাষ্ট্র ও এক আল্লাহর নিরঙ্কুশ শাসন-কর্তৃতের কাছে মাথা নত করেছে, তখন কি মূর্তিপূজারীদেরকে তাদের খেয়াল-খুশী অনু্যায়ী ছেড়ে দেয়া যায়? তাছাড়া, মূর্তিপূজা ছিলো একটি সম্পূর্ন পরিত্যক্ত ও ভ্রান্ত বিশ্বাস, যা সমাজের সামগ্রিক ঐক্যের জন্যও ছিলো বিপদজনক। তাই, এ পরিত্যক্ত বিশ্বাসকে সমাজ থেকে সম্পূর্ণ রূপে নিশ্চিহ্ন করা ছিল অপরিহার্য।
তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার পর মুসলিমরা যখন আবু বকর (রা)-এর নেতৃত্বে হজ্জ্বের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, ঠিক এ সময়েই আল্লাহতায়ালা মুশরিকদের উদ্দেশ্য করে রাসূল (সা)-এর কাছে সুরা আত-তাওবা নাযিল করেন। আল্লাহর এ নির্দেশ পেয়ে আল্লাহর রাসূল (সা) আলী ইবন আবি তালিবকে আবু বকর (রা)-এর সাথে মক্কায় পাঠিয়ে দেন এবং মক্কার জনসাধারনকে আল্লাহর নাযিলকৃত আয়াত শুনাতে বলেন। মক্কায় গিয়ে আলী ইবন আবি তালিব আবু হুরায়রাকে সঙ্গে নিয়ে মক্কার জনগণকে নাযিলকৃত আয়াতসমূহ তিলওয়াত করে শোনান।
“আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ হতে অব্যাহতি (ঘোষনা করা) হচ্ছে ঐ মুশরিকদের (অঙ্গীকার) হতে, যাদের সাথে তোমরা সন্ধি করেছিলে।” [সুরা আত-তাওবাঃ ১]
সুরা তওবার উপরোক্ত আয়াত হতে তিনি নিম্নোক্ত আয়াত পর্যন্ত তিলওয়াত করেন,
“আর এই মুশরিকদের বিরুদ্ধে তোমরা সকলে মিলিত ভাবে যুদ্ধ করো, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সকলে মিলে যুদ্ধ করে। আর জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথেই রয়েছেন।” [সরা আত-তওবাঃ ৩৬]
এ আয়াত পর্যন্ত তিলওয়াত করার পর আলী (রা) কিছুক্ষন নীরব থাকলেন। তারপর, চিৎকার করে বললেন, “হে মানুষেরা! অবশ্যই কোন অবিশ্বাসীই জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং কোন মুশরিকই এ বছরের পর থেকে হজ্জ্ব করতে পারবে না। আর, কেউ কাবাঘরকে নগ্ন হয়ে প্রদক্ষিন করতে পারবে না। আজকের পর থেকে যাদের সাথে মুহাম্মদ (সা)-এর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি আছে, সেই চুক্তি ব্যতীত আর কোন চুক্তি হবে না।”এ চারটি নিদের্শ আলী (রা) জারি করলেন এবং জনসাধারনকে নিজ নিজ বাড়ী ফিরে যাবার জন্য চারমাস সময় দিলেন। ঐ বছরের পর থেকে আর কখনো কোন মুশরিক হজ্জ্ব করতে আসেনি, না তারা আর কোনদিন নগ্ন হয়ে কা’বাঘরকে প্রদক্ষিন করেছে।
এরপর, আল্লাহতায়ালার নাযিলকৃত ইসলামিক আক্বীদাহর ভিত্তিতে নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের ছত্রছায়াই সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে আল্লাহর বাণী বিস্তৃতি লাভ করতে আরম্ভ করলো। সুরা বারা’য়াহ(তাওবা), সবচাইতে শেষ সুরা, নাযিল হবার সাথে সাথেই সমগ্র আরব উপদ্বীপ থেকে মূর্তিপূজা সমূলে উৎপাটিত হলো এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি সমাপ্ত হয়ে গেল। ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক সকল ধ্যান-ধারনা এবং ইসলামী রাষ্ট্র ব্যতীত অন্য সবকিছুর শাসন-কর্তৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হলো। আর, এভাবেই সমস্ত মানবজাতির কাছে দ্বীন ইসলামের আহবান পৌঁছে দেবার শক্তিশালী ভিত্তি প্রস্তুত হলো।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৮ (তাবুকের যুদ্ধ)
আল্লাহর রাসূল (সা)-এর কাছে, এ মর্মে সংবাদ পৌঁছে যে, মু’তার যুদ্ধে মুসলিম যোদ্ধাদের অসাধারণ রণকৌশলের জন্য রোমানদের বিশাল বাহিনীকে বাধ্যতামূলক সৈন্য প্রত্যাহার করতে হয়েছিল, সে অসহনীয় লজ্জাজনক স্মৃতি মুছে ফেলার জন্য তারা আরব উপদ্বীপের উত্তরাংশে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছে। এ সময় রোমান বাহিনীকে মুকাবিলা করার জন্য রাসূল (সা) নিজেই সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন, যেন রোমানদের এ উচ্চাভিলাসকে এমন ভাবে ধ্বংস করে দেয়া যায়, যাতে তারা ভবিষ্যতে আর কখনোই মুসলিমদের ভূমি আক্রমণ করা বা মুসলিমদের ব্যাপারে কোনরকম হস্তক্ষেপ করার দুঃসাহস না করে।
সময়টা ছিল গ্রীষ্মের শেষভাগ। অসহনীয় গরমের ফলে চারিদিকে চলছিল খরা আর অনাবৃষ্টি। এছাড়া, মদীনা থেকে আল-শামের দূরত্বও ছিল অনেক। যাত্রাপথ ছিল কঠিন আর দুরপাল্লার যাত্রার জন্য তখন অনূকুল সময়ও ছিল না। এ সমস্ত পরিস্থিতির বিবেচনায়, এ অভিযান ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। আল্লাহর রাসূল (সা) এ সমস্ত বিষয় বিবেচনা করার পরে অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই শত্রুপক্ষকে মুকাবিলা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তের কথা সাহাবাদের জানালেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলেন। অন্যান্য অভিযান বা যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাসূল (সা) সাধারনতঃ তাঁর যাত্রার আসল উদ্দেশ্য গোপন রেখে, কৌশলগত দিক থেকে শত্রুকে ধোঁকা দেবার চেষ্টা করতেন।
কিন্তু, এ যাত্রায় তিনি (সা) পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে, প্রস্তুতির প্রথম দিন থেকেই রাসূল (সা) রোমান সীমান্তে তাদের শক্তিশালী বাহিনীকে মুকাবিলা করার ঘোষনা দিলেন। এ লক্ষ্যে, তিনি (সা) সকল গোত্রকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেবার আহবান জানালেন যেন যুদ্ধক্ষেত্রে মুজাহিদদের সংখ্যাকে যথা সম্ভব বৃদ্ধি করা যায়। তিনি (সা) বিত্তশালী মুসলিমদের নির্দেশ দিলেন যেন, আল্লাহ তাদেরকে অনুগ্রহ পূর্বক যে সম্পদ দিয়েছেন তা থেকে তারা উদার হস্তে দান করে। যাতে, মুসলিম সৈন্যদল অস্ত্র-সস্ত্রের দিক থেকে যথাসম্ভব শক্তিশালী হতে পারে। এছাড়া, রোমানদের বিরুদ্ধে এ জিহাদে অংশগ্রহন করার জন্য তিনি (সা) সাধারন ভাবে সবাইকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন। তাঁর এ আহবানে মুসলিমরা বিভিন্ন ভাবে সাড়া দিয়েছিল। যারা ইসলামের আলোকিত আহবান ও পথনির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে ইসলাম গ্রহন করেছিল, তারা আল্লাহর রাসুলের এ আহবানে প্রচণ্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে সাড়া দিলো। এদের মধ্যে কেউ কেউ এতো দরিদ্র ছিল যে, তাদের যুদ্ধে যাবার জন্য একটি খচ্চরও ছিল না। আবার, অনেকে ছিল বিত্তশালী, যারা রাসূল (সা)-এর কাছে তাদের সমস্ত সম্পদ তুলে দিলো। এরা ছিল তারা, যারা স্বেচ্ছায় তাদের জীবনকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করেছিল, আর শহীদ হবার তীব্র আকাঙ্খাকে বুকে নিয়ে জিহাদে অংশ গ্রহন করেছিল। আর, যারা প্রাণভয়ে কিংবা দুনিয়ার ধনসম্পদের আকাঙ্খায় ইসলাম গ্রহন করেছিল (হয় তারা ভেবেছিল ইসলাম গ্রহণ না করলে তাদের ধনসম্পদ মুসলিমদের হস্তগত হয়ে যাবে, অথবা গণীমতের আশায় তারা ধর্মান্তরিত হয়েছিল), তাদের কাছ থেকে তেমন কোন সাড়া পাওয়া গেল না। উপরন্তু, যুদ্ধে যোগদান না করার জন্য তারা নানারকম উছিলা খুঁজতে লাগল। তারা নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করে বলতে লাগলো, এই ভয়াবহ গরমে যদি আমরা এতো দূরে যুদ্ধ করতে যাই, তবে তীব্র গরমেই আমরা মারা পড়বো। এরা ছিল প্রকৃত অর্থে মুনাফিক। তারা একে অন্যকে বললো, “এই প্রচন্ড গরমে গিয়ে তোমরা যুদ্ধ করো না।”আল্লাহতায়ালা তাদের এই অসন্তোষ নিয়ে কোরআনের আয়াত নাযিল করলেন,
“তারা বলে, ‘এই গরমে তোমরা অগ্রসর হয়ো না।’ তাদেরকে বলে দাও (হে মুহাম্মদ), জাহান্নামের আগুন এর থেকেই অনেক বেশী উত্তপ্ত, যদি তারা তা বুঝতো।” [সুরা আত-তাওবাঃ ৮১]
আল্লাহর রাসূল (সা) যাদ্দ ইবন কায়িসকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি বনু আসফারদের মুকাবিলা করতে চাও না, যাদ্দ?” উত্তরে যাদ্দ বললো, “আপনি যদি আমাকে যুদ্ধে যাবার জন্য উদ্বুদ্ধ না করে পেছনে থাকার অনুমতি দেন তো ভালো। কারণ, সবাই জানে যে, আমি নারীদের প্রতি একটু বেশী আসক্ত। সতরাং, আমার ভয় হচ্ছে যে, রোমানদের সুন্দরী রমণীদের দেখে আমি আত্মসংবরণ করতে পারবো না।”একথা শোনার পর, রাসূল (সা) তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এরপর, আল্লাহতায়ালা যাদ্দ সম্পর্কে কোরআনে আয়াত নাযিল করে বললেন,
“আর, তাদের মধ্যে যে বলে, ‘আমাকে (জিহাদ থেকে) নিষ্কৃতি দিন এবং পরীক্ষা থেকে রেহাই দিন।’ (জেনে রাখো যে) অবশ্যই, তারা এক বিরাট পরীক্ষার মধ্যে পড়েছে। নিশ্চয়ই, জাহান্নাম অবিশ্বাসীদের চারিদিক থেকে ঘিরে রাখবে।” [সুরা আত-তওবাঃ ৪৯]
মুনাফিকরা আল্লাহ ও রাসুলের সাথে তাদের বিশ্বাসঘাতকতায় এখানেই থেমে থাকলো না, তারা অন্যদেরকেও যুদ্ধে না যাবার জন্য উৎসাহিত করতে লাগলো। এ অবস্থায়, রাসূল (সা) মুনাফিকদের কঠিন শাস্তি দিয়ে তাদেরকে উচিত শিক্ষা দেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। যখন, আল্লাহর রাসুলের কাছে এ সংবাদ পৌঁছালো যে, কিছু মুনাফিক সুওয়াইলিম নামের ইহুদীর বাসায় বসে যুদ্ধের বিষয়ে মুসলিমদের মনে সন্দেহ ও দ্বিধাদ্বন্দ সৃষ্টি করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে, সাথে সাথে তিনি (সা) তাঁর সাহাবী তালহা ইবন ’উবাইদুল্লাহর নেতৃত্বে একদল লোক পাঠিয়ে উক্ত ইহুদীর বাড়ী পুড়িয়ে দেবার নির্দেশ দিলেন। আগুন লাগানোর পর, সব চক্রান্তকারীরা দ্রুত পালিয়ে গেল। এদের মধ্যে একজন পালাতে গিয়ে পা ভেঙ্গে ফেললেও শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। এ ঘটনা সমস্ত মুনাফিকদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হয়ে যায় এবং এ ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি করা থেকে তারা বিরত হয়।
সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল (সা) এর এই প্রচন্ড দৃঢ়তা ও অক্লান্ত প্রচেষ্টা জনসাধারনকে গভীর ভাবে নাড়া দিলো এবং শেষপর্যন্ত অসংখ্য মুসলিম যুদ্ধ অংশগ্রহন করার জন্য সমবেত হলো। মোট ৩০,০০০ মুসলিম এ জিহাদে অংশ গ্রহন করার জন্য আল্লাহর রাসুলের ডাকে সাড়া দিয়েছিল। এ সেনাবাহিনীর নামকরণ করা হয়েছিল আল-’উসরাহ(বিপদ অথবা সঙ্কট)। কারণ, তাদেরকে গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাবদাহে, মদীনা থেকে বহুদূরে রোমান সীমান্তে অপরাজেয় বাইজেন্টাইন বাহিনীকে মুকাবিলা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এছাড়া, বিরাট এ সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করার জন্য অনেক অর্থবলেরও প্রয়োজন ছিল। যাই হোক, সৈন্যবাহিনীকে একত্রিত করা হলো। আবু বকর (রা) এ বাহিনীকে যখন ইমামতি করছিলেন, সেই ফাঁকে আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনাতে তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো সম্পাদন করছিলেন এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে সাহাবাদের মদীনার শাসনকার্য পরিচালনার নির্দেশ বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। তিনি (সা) এ সময় মুহাম্মদ ইবন মাসলামাহকে মদীনার দায়িত্বে নিযুক্ত করে এবং ’আলী ইবন আবু তালিবকে তাঁর স্ত্রীদের দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে তাদেরকে মদীনায় রেখে যান। এরপর, রাসূল (সা) সৈন্যবাহিনীর সাথে পুণরায় যোগ দেন এবং তাদের নেতৃত্ব দেন। এরপর, সৈন্যদলকে সামনে অগ্রসর হবার নির্দেশ দেয়া হয়। বিশাল সৈন্যবাহিনী একযোগে তাদের শক্তিসামর্থ্য ও শৌর্য-বীর্য অতুলনীয় ভাবে প্রদর্শন করতে করতে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। আর, মদীনায় থেকে যাওয়া লোকেরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাদের নয়নাভিরাম এ যাত্রাকে উপভোগ করে। এমনকি, মদীনার মুসলিম নারীরাও তাদের বাড়ির ছাদে উঠে চমৎকার এ দৃশ্য উপভোগ করে এবং বিশাল এ বাহিনীকে বিদায় জানায়।
দ্বিতীয় কোন চিন্তা মনে স্থান না দিয়ে এবং তীব্র দাবদাহ, ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও রুক্ষ ধূলি-ধূসর প্রান্তরের সকল কষ্টকে অবলীলায় উপেক্ষা করে মুসলিম বাহিনী গন্তব্যের পানে বিরতিহীন ভাবে চলতে থাকে। মুসলিম সৈন্যদলের ক্লান্তিহীন দুঃসাহসী এ যাত্রা এবং অজেয়কে জয় করার দুর্দান্ত এ প্রচেষ্টা পেছনে পড়ে থাকা দলগুলোকে দারুন ভাবে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে, তারাও দ্রুতগতিতে এগিয়ে এসে মূলবাহিনীর সাথে যুক্ত হয় এবং তাবুকের প্রান্তরে যেখানে রোমান সৈন্যরা মুসলিমদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে ঘাঁটি গেড়ে ছিল সেদিকে এগিয়ে দৃঢ় চিত্তে যায়। যখন অগ্রসরমান এ মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা ও শক্তিসামর্থ্য সম্পর্কে রোমানরা অবগত হয়, সাথে সাথে মু’তার যুদ্ধের তিক্তস্মৃতি তাদের মানসপটে ভেসে উঠে। তারা স্মরণ করে, কিভাবে সংখ্যায় নগন্য ও অস্ত্রসস্ত্রের দিক থেকে অত্যন্ত দূর্বল হওয়া সত্তেও মুসলিমরা দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে বীরের মতো তাদের সাথে যুদ্ধ করেছে। আর, আল্লাহর রাসূল (সা) স্বয়ং এবার তাঁর বাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন শুনে তাদের মেরুদন্ডে ভয়ের শীতল স্রোত প্রবাহিত হতে থাকে। সমস্ত অবস্থা পর্যবেক্ষন করে, তারা মুসলিমদের ভয়ে সাংঘাতিক ভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং শেষপর্যন্ত আল-শামের অভ্যন্তরস্থ সরক্ষিত দূর্গে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। রোমান বাহিনীর এভাবে সম্পূর্ন রূপে পিছু হটে যাবার ফলে, রোমানদের আল-শামের সীমান্ত অঞ্চল অরক্ষিত হয়ে যায়। এ সংবাদ আল্লাহর রাসূল (সা)-এর কাছে পৌঁছানোর পর তিনি (সা) বিরতীহীন ভাবে যাত্রা করে তাবুকের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন এবং কোনরকম যুদ্ধ ছাড়াই এ অঞ্চল জয় করে তাবুকের প্রান্তরে অবস্থান গ্রহন করেন। তিনি (সা) এ যাত্রায় রোমান বাহিনীর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত না হবার সিদ্ধান্ত নেন এবং তাবুক ও এর আশেপাশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দখল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকেন। এ সময় যারা মুখোমুখি মুসলিমদেরকে মুকাবিলা করতে চেয়েছিল এবং বিচ্ছিন্ন ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল তাদেরকে গুঁড়িয়ে দেবার জন্য মুসলিম বাহিনী প্রায় একমাস তাবুকের প্রান্তরে অবস্থান করে। এ অঞ্চল জয় করার পর, রাসূল (সা) রোমানদের নিযুক্ত গর্ভনর ও এ অঞ্চলের বিভিন্ন গোত্রীয় নেতাদের কাছে তাঁর পক্ষ থেকে বার্তা পাঠান। তিনি (সা) আইলা’র গর্ভনর ইয়ুহানা ইবন রু’মাহ সহ আল-যাবরা এবং আদরাহ’র অধিবাসীদেরকে তাঁর কাছে আত্মসর্মপনের নিদের্শ দেন এবং তাঁর শাসন-কতৃর্ত্ব মেনে নিতে বলেন। তারা নিরুপায় হয়ে রাসূল (সা) এর সাথে শান্তিচুক্তি করে এবং জিযিয়া প্রদান করতে সম্মত হয়। অভিযানের উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবার পর আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় ফিরে আসেন।
রাসূল (সা)-এর এ অনুপস্থিতির সুযোগে, মদীনার মুনাফিকরা মুসলিমদের মধ্যে মিথ্যা প্রচারনা চালায়, যার ফলে মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি হয়। তারা তু-আওয়ান এলাকায় একটি মসজিদ নির্মাণ করে তাদের এ অসৎ ও বিভক্তিমূলক প্রচারনাকে শক্তিশালী করে। এ মসজিদটি ছিলো দিনের বেলায় মদীনা থেকে এক ঘন্টা দূরের পথ। যারা কোরআনের আয়াতকে বিকৃত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকতো এবং মুসলিমদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে সমাজের মধ্যে বিষাক্ত কর্থাবার্তা ছড়িয়ে দিতো, এ মসজিদটিকে মূলতঃ তারাই আশ্রয় স্থল হিসাবে ব্যবহার করতো। আল্লাহর রাসূল (সা) যখন তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন এ মসজিদের নির্মাতা রাসূল (সা)-কে অনুরোধ করেছিলেন এখানে নামাজ আদায় করার জন্য। কিন্তু, আল্লাহর রাসূল (সা) তাকে যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করার নিদের্শ দেন। ফিরে আসার পথে তিনি (সা) মুনাফিকদের এ সমস্ত জঘন্য কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হন এবং মসজিদ সম্পর্কে আসল তথ্য জানতে পারেন। সবকিছু শোনার পর, তিনি (সা) মসজিদটিকে সম্পূর্ন ভাবে ধ্বংস করে পুড়িয়ে দেবার নিদের্শ দেন। এভাবেই, তিনি (সা) কোন দয়া প্রদশর্ন না করে, মুনাফিকদের ষড়যন্ত্রকে কঠিন ভাবে মুকাবিলা করেছিলেন। এ শিক্ষা পাবার পর, তারা এতো আতঙ্কিত হয়েছিল যে, পরবর্তীতে আর কখনোই এ ধরনের কার্যকলাপ করার দুঃসাহস প্রদর্শন করেনি।
তাবুক অভিযানের সমাপ্তির পর সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে মুসলিমদের একচ্ছত্র শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সমস্ত উপদ্বীপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো আল্লাহতায়ালার সুমহান বাণীর আলোকিত আহবান এবং শেষপর্যন্ত সমস্ত চ্যালেঞ্জ মুকাবিলা করে আল্লাহর রাসূল (সা)-এ অঞ্চলে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শাসন-ক্ষমতাকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত করেছিলেন। বস্তুত, এ অভিযানের পর, সমস্ত আরব ভূ-খন্ড থেকে দলে দলে বিভিন্ন গোত্রের মানুষ মুহাম্মদ (সা) কাছে আগমন করতে থাকে এবং তাঁকে বাই’য়াত দিয়ে আনুগত্যের শপথ করে ইসলাম গ্রহন করে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৭ (হুনায়ুনের যুদ্ধ)
হাওয়াজিন গোত্রের লোকেরা যখন শুনতে পেল কিভাবে মুসলিমরা মক্কা জয় করে নিয়েছে, তখন তারা আশঙ্কা করতে লাগল যে, তারাও হয়ত মুসলিমদের আক্রমণের শিকার হতে পারে কিংবা তাদের ঘরবাড়ী মুসলিমদের হাতে ধ্বংস হতে পারে। এজন্য, সম্ভাব্য এ বিপদ মুকাবিলার জন্য তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। মালিক ইবন ’আউফ আল-নাদরি হাওয়াজিন ও বনু ছাকিফ গোত্রের যোদ্ধাদের একত্রিত করে মুসলিমদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে উতাস উপত্যকায় পৌঁছাল।
মুসলিমদের মক্কা বিজয়ের ১৫ দিন পর হাওয়াজিন ও বনু ছাকিফ গোত্রের ধেয়ে আসা এ সৈন্যবাহিনীর সংবাদ মুসলিমদের কাছে পৌঁছাল। সাথে সাথে তারা তাদেরকে মুকাবিলা করার প্রস্তুতি নিল। এদিকে, মালিক তার সৈন্যদল সহ উতাস উপত্যকায় অবস্থান নেয়ার পরিবর্তে উপত্যকার সবচাইতে দূর্গম অঞ্চল হুনায়ুন এলাকায় অবস্থান নিল। এখানে, সে খুবই সর্তকতার সাথে কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তার বাহিনীকে সজ্জিত করল। মুসলিমরা উপত্যকায় প্রবেশ করা মাত্রই সে তার বাহিনীকে আক্রমণ করার নির্দেশ দিয়েছিল, যাতে মুসলিম বাহিনী অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। অত্যন্ত সর্তকতার সাথে পুরো পরিকল্পনা করে তারা উপত্যকায় মুসলিমদের আগমনের অপেক্ষা করতে লাগল।
এর কিছুদিনের মধ্যেই মুসলিমরা হুনায়ুন উপত্যকায় প্রবেশ করে। আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কা থেকে দুই সহস্র যোদ্ধা এবং মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে আগত আরও ১০,০০০ যোদ্ধা নিয়ে যাত্রা করেন। এই অপরাজেয় বাহিনী নিয়ে তিনি (সা) বিকেল বেলায় হুনায়ুনের উপত্যকায় পৌঁছান। এখানে তাঁরা পরদিন সুবহে সাদিক পর্যন্ত বিশ্রাম নিয়ে একেবারে উষালগ্নে উপত্যকার অভ্যন্তরে যাত্রা করেন। মুসলিমদের সেনাবাহিনী যখন উপত্যকার অভ্যন্তরে প্রবেশ করছিল তখন আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহন করে তাঁর সৈন্যবাহিনীর পেছনের দিকে ছিলেন। এরপর, হাওয়াজিনের নেতা মালিকের পরিকল্পনা অনুযায়ী শুরু হয় শত্রুপক্ষের অতর্কিত আক্রমণ। অন্ধকার ভেদ করে চতুর্দিক থেকে বৃষ্টির মতো বর্শার আঘাত আসতে থাকে। অর্তকিত এ আক্রমণে ক্ষতবিক্ষত হয়ে মুসলিম বাহিনী দিশেহারা হয়ে যায়। আক্রমণ যেহেতু চর্তুদিক থেকে আসছিল, মুসলিমরা চর্তুমূখী এ আক্রমণকে কি করে প্রতিহত করবে তা বুঝে উঠতে পারছিল না। তারপর, ভয়ে আতঙ্কে কেউ কারো দিকে লক্ষ্য না করে প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিক পারে পালিয়ে যায়। তারা দলে দলে মুহাম্মদ (সা) এর পাশ দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল এবং তাঁর দিকেও লক্ষ্য করছিল না কিংবা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল না। শেষপর্যন্ত শুধু আল-আব্বাস এবং আল্লাহর রাসূল (সা) যুদ্ধক্ষেত্রে রয়ে গেলেন। এছাড়া, বাকী সবাই পরাজিত হয়ে নিজ নিজ জীবন রক্ষায় পালিয়ে বাঁচল। মুহাম্মদ (সা) যেখানে ছিলেন সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলেন, তাঁর চারপাশে রইল শুধু আনসার, মুহাজির ও তাঁর পরিবারের সম্বনয়ে গঠিত ছোট্ট একটি দল। তিনি (সা) তাঁর লোকদের ডেকে বললেন, “ওহে মানুষেরা, তোমরা কোথায় যাচ্ছ?” কিন্তু, তারা মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে তাঁর আহবান শুনতে ব্যর্থ হল এবং পেছন দিকে না তাকিয়ে পালাতে থাকল। হাওয়াজিন ও ছাকিফ গোত্রের লোকেরা তাদের ধাওয়া করে যাকে যেখানে পেল হত্যা করল।
এটি ছিল আল্লাহর রাসুলের জীবনের সবচাইতে জটিল ও সঙ্কটপূর্ণ এক অভিজ্ঞতা। এ অভিযানের চরম হতাশাজনক পরিসমাপ্তি ছিল তাঁর কাছে অচিন্তনীয়। সাহাবা, তাঁর শক্তিশালী বাহিনী ও মক্কার নও মুসলিমদের পুর্ণ উদ্যেমে পলায়নপর অবস্থার মধ্যে তিনি (সা) দৃঢ় চিত্তে অবিচল ভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাদেরকে ফিরে আসার জন্য বারবার আহবান করতে লাগলেন। এদের মধ্যে যারা খুব সম্প্রতি (মক্কা বিজয়ের পর) ইসলাম গ্রহন করেছিল, তারা প্রকাশ্যেই ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করতে লাগল। তারা মুসলিমদের এ পরাজয়ে বিদ্বেষে পূর্ণ আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল। কালদা ইবন হাম্বল বলল, “নিশ্চয়ই, আজ সমস্ত যাদুটোনার পরাজয় হয়েছে।”শায়বা ইবন ’উসমান ইবন তালহা বলল, “আজ আমার মুহাম্মদের উপর প্রতিশোধ নেবার দিন।” আবু সুফিয়ান উপহাসের সাথে বলল, “তাদের (সেনাবাহিনীর) এ পলায়ন থামবে না, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা সমুদ্র তীরে পৌঁছায়।”
এরকম একটা নিশ্চিত পরাজয়ের সম্ভাবনা মূলতঃ তাদের পলায়নকেই তরান্বিত করেছিল, যারা মক্কায় খুব সম্প্রতি ইসলাম গ্রহন করেছিল এবং নিজেদের হীন উদ্দেশ্য ও প্রকৃত চেহারা আড়াল করতে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সাথে এ যুদ্ধে শরীক হয়েছিল। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ সময় মুহাম্মদ (সা) যে কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা ছিল অত্যন্ত জঘন্য। কিন্তু, পিছু হটে যাবার কোন চিন্তা না করে, তিনি (সা) অবিচল চিত্তে যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকলেন এবং তাঁর সাদা খচ্চরের পিঠে আরোহন করে শত্রুপক্ষের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলেন। এ সময় তাঁর চাচা আল-’আব্বাস ইবন ’আবদ আল-মুত্তালিব রাসূল (সা) এর সাথে ছিলেন। আর, আবু সুফিয়ান ইবন আল-হারিছ ইবন ’আবদ আল মুত্তালিব (not to be confused with Abu Sufyan ibn Harb Abu Mu’awiyah) রাসূল (সা) এর বাহনের নাকের রশি ধরে সাথে সাথে এগুতে থাকলেন যেন, এটি কোন বিপদজনক অবস্থানের দিকে যেতে না পারে। এ পর্যায়ে, আল-’আব্বাস চিৎকার করে বললেন, “হে আনসার, যারা তোমরা আল্লাহর রাসূলকে আথিতেয়তা ও নিরাপত্তা দিয়েছ! হে মুহাজির, যারা তোমরা বৃক্ষের নীচে তাঁর কাছে শপথ করেছ! মুহাম্মদ (সা) এখনও বেঁচে আছে, সুতরাং, তোমরা ফিরে আস।”
আল-’আব্বাসের পূণঃপূণঃ এই আর্তনাদ উপত্যকার চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। পরাজিত পলায়নপর মুসলিমরা অবশেষে তার আহবান শুনতে পেল। তাদের মনে পড়লো আল্লাহর রাসুলের কথা। মনে পড়লো জিহাদের দায়িত্বের কথা। সহসাই তারা অনুভব করলো এই লজ্জাজনক পরাজয়ের ভয়াবহ পরিণামের কথা। তারা অনুভব করলো, যদি এখানে আজ পৌত্তলিকরা তাদের গুঁড়িয়ে দেয়, তাহলে যে দ্বীন রক্ষায় তারা নিঃশেষে জীবন দিয়েছে, তার পরিসমাপ্তি এখানেই ঘটবে। শেষপর্যন্ত, আল-’আব্বাসের আহবানে সাড়া দিয়ে তারা রাসূল (সা)-এর চারিদিকে সমাবেত হতে লাগলো এবং পূর্ণ উদ্যেম ও সাহসিকতার সাথে একে একে পুণরায় যুদ্ধে যোগ দিতে লাগলো। এরপর তারা আবারও এক বিশাল বাহিনীতে পরিণত হল এবং যুদ্ধ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করলো। ঘটনার এ নাটকীয় পরিবর্তনের পর আল্লাহর রাসূল (সা) ধীরে ধীরে বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে লাগলেন এবং এক পর্যায়ে, একমুঠো নুড়ি পাথর তুলে শত্রুপক্ষের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, “আজ তোমাদের মুখ ধূলিমলিন হোক!”
এরপর, মুসলিমরা জীবনের পরোয়া না করে হাওয়াজিন ও ছাকীফ গোত্রের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালায়। ভয়ঙ্কর এ আক্রমণের মুখে কিছুক্ষনের মধ্যেই পৌত্তলিকরা বুঝে যায় যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে না গেলে ধ্বংস অনিবার্য। পালাবার সময় তারা তাদের ধনসম্পদ ও নারীদের ফেলে রেখেই চলে যায়, যেগুলো পরে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হিসাবে মুসলিমদের হস্তগত হয়।
পলায়নপর পৌত্তলিকদের পিছু পিছু মুসলিমরা ধাওয়া করে এবং তাদের মধ্যে অনেককে বন্দী করে। এমনকি তারা উপত্যকার ভেতর লুকিয়ে থাকা মুশরিকদেরও খুঁজে বের করে হত্যা করে। তাদের দলনেতা মালিক ইবন ’আউফ তায়েফে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এভাবেই আল্লাহতায়ালা মুসলিমদের সাহায্য করেন অভাবনীয় এক সাফল্য অর্জন করতে এবং এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নীচের আয়াতগুলো নাযিল করেন,
“অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে যুদ্ধে বহুক্ষেত্রে (কাফিরদের উপর) বিজয়ী করেছেন এবং হুনায়ুনের দিনেও, যখন সংখ্যাধিক্যের গর্ব তোমাদেরকে উম্মত্ত করেছিল। অতঃপর, তোমাদের সেই সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোনই কাজে আসেনি, আর ভূ-পৃষ্ঠ নিজের প্রশস্ততা সত্তেও তোমাদের জন্য সঙ্কীর্ণ হয়েছিল। অতঃপর, তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন পূর্বক পলায়ন করলে। তারপর, আল্লাহ নিজ রাসুলের প্রতি এবং অন্যান্য ঈমানদারদের প্রতি নিজের পক্ষ থেকে সাকিনাহ্ (সান্তনা, স্বস্তি) নাযিল করলেন এবং এমন বাহিনী (ফেরেশতা) পাঠালেন যাদেরকে তোমরা দেখতে পাওনি। আর, কাফিরদেরকে শাস্তি প্রদান করলেন। আর, এটাই হচ্ছে তাদের কর্মের ফলাফল। অনন্তও আল্লাহ যাকে চান তাকে সুযোগ দান করেন। আর, আল্লাহ হচ্ছেন অতি ক্ষমাশীল, পরম করুণাময়।” [সুরা তওবাঃ ২৫-২৭]
শত্রুকে পরাজিত করার পর এ যুদ্ধে প্রচুর পরিমাণ ধনসম্পদ যুদ্ধলব্ধ মালামাল হিসাবে মুসলিমদের হস্তগত হয়েছিল। এ যুদ্ধে প্রায় বিশ হাজার উট, চলি-শ হাজার ভেড়া এবং চার হাজার রূপার বর্ম মুসলিমদের হাতে আসে। অসংখ্য পৌত্তলিক নিহত হয়। আর, প্রায় ছয় হাজার পৌত্তলিক যুদ্ধবন্দী হয়। এদের সবাইকে ওয়াদি আল-যি’রানাহ নামক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। মুসলিমদের মধ্যে ঠিক কতজন শহীদ হয়েছিল তা জানা যায়নি। তবে, তারা সংখ্যায় অনেক ছিল এবং কিছু সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী প্রায় দুটো মুসলিম গোত্র পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) যুদ্ধলব্ধ মালামাল ও বন্দীদের আল-যি’রানাহতে রেখে দলবল নিয়ে তা’য়িফ ঘেরাও করেন, যাদের কাছে মালিক ইবন ’আউফ পরাজিত হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। তা’য়িফ ছিল বনু ছাকিফদের বাসস্থান। পুরো তা’য়িফ নগরী ছিল সুরক্ষিত দূর্গ সদৃশ এবং এ অঞ্চলের লোকেরা ছিল অবরোধ যুদ্ধে পারদর্শী। এছাড়া, এরা ছিল অত্যন্ত বিত্তশালী ও প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী। বনু ছাকিব গোত্রের লোকদের তীর চালনায় ছিল অসাধারণ দক্ষতা। মুসলিমদের কোন দল নগরীর দিকে অগ্রসর করার চেষ্টা করা মাত্রই তারা বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করে মুসলিম যোদ্ধাদের হত্যা করছিল। কিছুক্ষনের মধ্যেই মুসলিমরা বুঝে ফেলে যে, দূর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। এজন্য, তারা মুহাম্মদ (সা)-এর পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় শত্রুর তীরের নিশানার বাইরে অবস্থান গ্রহন করে। এমতাবস্থায়, আল্লাহর রাসূল (সা) কামানের মতো গোলা নিক্ষেপকারী এক অস্ত্রের সাহায্যে তা’য়িফের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেবার জন্য বনু দাওস গোত্রের সাহায্য চাইলেন। তা’য়িফ অবরোধ করার চারদিন পর দাওস গোত্র তাদের এ যুদ্ধাস্ত্র সহ মুসলিমদের সাথে যোগ দেয়। এরপর, মুসলিমরা নতুন এ যুদ্ধাস্ত্রের সাহায্যে দূর্গ আক্রমণ করে। আর, ট্যাঙ্কের মতো এক বাহনে চড়ে মুসলিমরা দূর্গের দেয়ালের কাছাকাছি গিয়ে আক্রমণ করার চেষ্টা করছিল যেন খুব তাড়াতাড়িই দূর্গের প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু, অগ্রসর হওয়া মাত্রই তা’য়িফের যোদ্ধারা তাদের দিকে জ্বলন্ত ধাতুর টুকরা ছুঁড়ে মারতে থাকে যাতে ট্যাঙ্কগুলো পুড়ে যায় আর মুসলিমরা আত্মরক্ষার্থে পালাতে থাকে।
এ সুযোগে শত্রুপক্ষ তাদের দিকে বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করে মুসলিম যোদ্ধাদের অনেককে হত্যা করে। সরাসরি দূর্গ ধ্বংস করতে না পেরে যুদ্ধকৌশল হিসাবে মুসলিমরা তাদের আঙ্গুর বাগান কেটে পুড়িয়ে দেয় যেন ছাকিফ গোত্র আত্মসর্মপন করতে বাধ্য হয়। কিন্তু, তারপরও বনু ছাকিফ আত্মসর্মপন না করায় মুসলিমরা অবরোধ উঠিয়ে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরমধ্যে পবিত্র মাস শুরু হয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল (সা) যুল আল-ক্বা’দা মাসের প্রথম দিনে তা’য়িফ থেকে অবরোধ উঠিয়ে মুসলিমদের সহ মক্কা যাত্রা করেন। যাত্রাপথে যুদ্ধলব্ধ মালামাল ও বন্দীদের জন্য তারা আল-যি’রানাহতে কয়েকদিন অবস্থান করেন। এ সময়কালে, অনেক সমস্যা সমাধান করার সাথে সাথে আল্লাহর রাসূল (সা) এটাও ঘোষনা দেন যে, যদি মালিক ইবন ’আউফ ইসলাম গ্রহন করে, তবে তিনি (সা) সমস্ত ধনসম্পদ সহ পরিবারের সবাইকে তার কাছে ফিরিয়ে দেবেন। এ সংবাদ মালিক ইবন আউফের কানে পৌঁছানো মাত্রই সে ত্বড়িৎ বেগে মুহাম্মদ (সা)-এর নিকটে হাজির হয় এবং ইসলাম গ্রহন করে। মাত্র কিছুদিন পূর্বে মুহাম্মদ (সা) যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তা’য়িফ ঘেরাও করেছিলেন, আশ্চর্যজনক ভাবে সেই একই ব্যক্তিকে তিনি (সা) তাঁর প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী সমস্ত সম্পদ ফিরিয়ে দেয় এবং সেইসাথে তাকে অতিরিক্ত ১০০ উটও দান করেন।
এ ঘটনার পর মুসলিমরা আশঙ্কা করে যে, এভাবে হাওয়াজিন গোত্রের যে কেউ এসে দাবী করা মাত্রই যদি মুহাম্মদ (সা)-তার সম্পদ ফিরিয়ে দিতে শুরু করে তবে তাদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মধ্যে অবশিষ্ট আর কিছুই থাকবে না। এজন্য তারা দাবী করে যে, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ তাদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হোক, যেন সকলে তাদের প্রাপ্য বুঝে পায়। এ বিষয় নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করতে থাকে এবং একপর্যায়ে তাদের এ কানাঘুষা মুহাম্মদ (সা)-এর কান পর্যন্ত পৌঁছায়। এ কথা শোনার পর, তিনি (সা) জনসম্মুখে পার্শ্ববর্তী উটের কুঁজ থেকে একটা লোম উঠিয়ে তাঁর আঙ্গুল দিয়ে শক্ত করে ধরে বলেন, “হে মানুষেরা! আল্লাহর কসম তোমাদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে আমার নিজের জন্য এক পঞ্চমাংশ ব্যতীত অতিরিক্ত আর কিছুই নেই, এমনকি এই লোমের সমপরিমাণও নেই। আর এই এক-পঞ্চমাংশ সম্পদও আমি তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দেব। সুতরাং, কেউ যদি অন্যায় ভাবে একটা সূঁচ পরিমান জিনিসও নেয়, তবে কিয়ামতের দিনে এটা হবে তার জন্য খুবই অপমান ও যন্ত্রনার কারণ এবং এজন্য সে ও তার পরিবারবর্গ চুড়ান্ত ভাবে অপমানিত হবে।” আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর জন্য (আল্লাহ থেকে নির্দিষ্ট) একপঞ্চমাংশ সম্পদ রেখে বাকী সম্পদকে সাহাবাদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। তাঁর নিজের সম্পদকে তিনি (সা) যাদের অন্তর জয় করার প্রয়োজন ছিল তাদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন, বিশেষ করে ইসলাম গ্রহনের পূর্বে যারা তাঁর ঘোরতর শত্রু ছিল তাদেরকে তিনি (সা) এ সম্পদ দান করে দিলেন। তিনি (সা) আবু সুফিয়ান, তার ছেলে মুয়া’য়িয়া, আল-হারিছাহ ইবন আল-হারিছাহ, আল-হারিছাহ ইবন আল-হিশাম, সুহাইল ইবন ’আমর, হাওয়াইতিব ইবন ’আবদ আল-উজ্জা এবং বিভিন্ন গোত্রের প্রধানদের তাদের নিজ নিজ অংশের সাথে অতিরিক্ত আরও ১০০ উট দান করলেন এবং অন্যদেরকে তাদের অংশের সাথে অতিরিক্ত আরও ৫০টি করে উট দিলেন।
যুদ্ধলব্ধ সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল (সা) অসম্ভব উদারতা ও মহানুবতা প্রদর্শন করেছিলেন। একই সাথে, তিনি (সা) প্রদর্শন করেছিলেন অসাধারন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদশির্তা। কিন্তু, তাঁর এ সুচিন্তিত ও দূরদর্শীতাপূর্ণ পদক্ষেপের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্যে অনেক মুসলিমই বুঝতে পারল না। আনসাররা, যারা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ থেকে কিছুই পেল না, তারা মুহাম্মদ (সা) এর এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজেদের মধ্যে কানাঘুষা করতে শুরু করলো এবং দূর্ভাগ্যবশতঃ বিষয়টি নিয়ে ভেতরে ভেতরে তাদের অন্তরে ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। আনসারদের মধ্য হতে একজনের কথায় তাদের এই ক্ষোভের বিষয়টি শেষপর্যন্ত প্রকাশিত হয়ে পড়লো। ক্ষোভের সাথে সে বললো, “আল্লাহর কসম! আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর নিজের লোকজনের স্বার্থ রক্ষা করেছেন।”এ পর্যায়ে, সা’দ ইবন উবাদাহ আল্লাহর রাসুলের কাছে গিয়ে তাঁকে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন। আল্লাহর রাসূল (সা) সা’দকে জিজ্ঞেস করলেন, “এ ব্যাপারে তোমার অবস্থান কোথায় সা’দ?” উত্তরে তিনি বললেন, “আমি আমার লোকদের সাথে একমত।” আল্লাহর রাসূল (সা) তাকে বললেন, “তাহলে তুমি তোমার লোকদের সবাইকে এখানে একত্রিত করো।” যখন এ বিষয়ে সচেতন সবাই একসাথে হলো, তখন মুহাম্মদ (সা) তাদেরকে বললেন, “তোমাদের কাছ থেকে আজ আমি একি শুনতে পাচ্ছি? তোমরা কি আমার ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষন করছো? আমি কি তোমাদের কাছে এমন এক অবস্থায় আসিনি যখন তোমরা পথভ্রষ্ট ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে আমার মাধ্যমে পথ দেখিয়েছেন? তোমরা কি দরিদ্র ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ তোমাদেরকে স্বচ্ছলতা দিয়েছেন? তোমরা কি একে অপরের শত্রু ছিলে না, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের হৃদয়কে ভালোবাসায় পূর্ণ করেছেন?” উত্তরে তারা বললো, “হ্যাঁ, সবই আল্লাহ আর তাঁর রাসুলের অনুগ্রহ।” তিনি (সা) আবারও বললেন, “তোমরা কেন উত্তর দিচ্ছো না, হে আনসারেরা?” তারা উত্তরে বললো, “কিভাবে আমরা আপনার কথার উত্তর দিবো? যখন সকল অনুগ্রহ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের।” রাসূল (সা) বললেন, “তোমরা চাইলে এ কথা বলতে পারো যে, যখন সবাই আপনাকে মিথ্যাবাদী বলেছে, আমরা আপনার উপর ঈমান এনেছি। আপনি যখন অসহায় ছিলেন আমরা তখন আপনাকে সাহায্য করেছি। আপনি যখন ভাসমান ছিলেন, আমরা আপনাকে আশ্রয় দিয়েছি। যখন আপনি নিঃস্ব ছিলেন তখন আমরা আপনাকে স্বস্থি দিয়েছি। তাহলে, এর প্রতিটি কথার উত্তরে আমি বলবো তোমরা সত্য কথা বলছো। আজ তোমরা দুনিয়ার সামান্য কিছু ভালো জিনিসের জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করছো, অথচ আমি দূর্বল মুসলিমদের এ উদ্দেশ্যে তা দিয়েছি যেন তা দিয়ে তাদের অন্তরকে জয় করতে পারি। আর, তোমাদের উপর আমি দ্বীন ইসলাম এর আমানত অর্পন করেছি। তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও হে আনসাররা যে, অন্য সব লোক ভেড়া আর উটের পাল নিয়ে ফেরৎ যাবে, আর তোমরা আল্লাহর রাসূলকে তোমাদের সঙ্গে নিয়ে যাবে? সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, যদি আমাকে হিজরত করতে না হতো তবে আমি তোমাদের মতোই আনসার হতাম। যদি সমস্ত মানুষ একদিকে যায় আর আনসাররা যায় অন্য পথে, তবে আমি তোমাদের পথে যাওয়াই পছন্দ করবো। হে আল্লাহ! তুমি আনসারদের উপর তোমার করুণা বর্ষণ করো, করুণা বর্ষণ করো তাদের সন্তান এবং তারপরে তাদের সন্তানদের উপর।”একথা শুনে আনসাররা তাদের ভুল বুঝতে পেরে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলো। এমনকি কাঁদতে কাঁদতে তাদের দাঁড়ি অশ্রুতে ভিজে গেল। কান্নাজড়িত কন্ঠে তারা বললো, “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের অংশ নিয়েই সন্তুষ্ট আর আপনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট।”
এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর দলবল নিয়ে মক্কায় উমরাহ করার উদ্দেশ্যে গমন করলেন। মক্কার শাসনকার্য পরিচালনার জন্য উতবা ইবন উসাইদকে সেখানকার ওয়ালী হিসাবে নিযুক্ত করলেন। আর, সেখানকার জনগণকে ইসলামের শিক্ষা দান করার জন্য মনোনিত করলেন মুয়া’দ ইবন জাবালকে। তারপর, তিনি (সা) আনসার ও মুহাজিরদের সহ মদীনায় ফিরে আসলেন।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৬ (মক্কা বিজয়)
কুরাইশদের সাথে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর হুদাইবিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পরপরই খুযাআ’হ গোত্র মুহাম্মদ (সা)-এর নিরাপত্তায় চলে আসে এবং বনু বকর কুরাইশদের পক্ষ নেয়। এরপর থেকে আল্লাহর রাসুলের সাথে কুরাইশদের শান্তিপূর্ণ সম্পর্কই বজায় থাকে এবং উভয়পক্ষই আবার ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করে। মুসলিমদের সাথে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য কুরাইশরা তাদের ব্যবসার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করে। এদিকে, আল্লাহর রাসূল (সা) সমগ্র মানবজাতির কাছে ইসলামের আহবান ছড়িয়ে দেবার পাশাপাশি আরব ভূ-খন্ডে ইসলামী রাষ্ট্রের অবস্থানকে সুসংহত ও শক্তিশালী করেন এবং ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তার ব্যাপারে জোর দেন।
খায়বারে ইহুদীদের কর্তৃত্ব ধ্বংস করার পর তিনি (সা) বিভিন্ন রাজ্যের অধিপতিদের কাছে তাঁর দূত পাঠিয়ে বর্হিবিশ্বের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন। তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে বিস্তৃত করে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসেন যে, একপর্যায়ে সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে। এরপর, হুদাইবিয়া সন্ধির ঠিক একবছর পূর্ণ হলে তিনি (সা) সাহাবীদের কাযা উমরাহ আদায়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন, যে উমরাহ পালন করতে আগের বছর তাদের কুরাইশরা বাঁধা দিয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে দুই সহস্র মুসলিম যাত্রা করে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এ সময় তাদের সাথে শুধু কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া আর কোনকিছুই ছিল না।
কিন্তু, তারপরেও কুরাইশরা যে কোন সময় বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে একথা মাথায় রেখে তিনি (সা) মুহাম্মদ ইবন মাসলামাহর নেতৃত্বে অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত ১০০ অশ্বারোহীর একটি দলকে উমরাহ যাত্রীদের সামনে রাখেন। মক্কার পবিত্রতা নষ্ট করা কিংবা চুক্তিভঙ্গ করা কোনটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। এরপর, মুসলিমরা কোনরকম সংঘর্ষ বা দূর্ঘটনা ছাড়াই মক্কায় যায়, উমরাহ পালন করে নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসে। রাসূল (সা) উমরাহ পালন করে মদীনায় ফিরে আসার পর মক্কার জনগণ ইসলাম গ্রহন করতে আরম্ভ করে। খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ, ’আমর ইবন আল-’আস এবং কাবার রক্ষক ’উসমান ইবন তালহা সহ মক্কার বিপুল সংখ্যক মানুষ ইসলামের ছায়াতলে চলে আসে। ফলে, দিনে দিনে মুসলিমরা শক্তিশালী হয়ে উঠে। আর, অন্যদিকে দূর্বলতা আর আতঙ্ক কুরাইশদের গ্রাস করে।
মু’তার যুদ্ধে মুসলিমরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় কুরাইশরা ধরেই নেয় যে, মুসলিমরা নিঃশেষ হয়ে গেছে। এজন্য, তারা তাদের মিত্রপক্ষ বনু বকরকে বনু খুযাআ গোত্রকে আক্রমণের ইন্ধন যোগাতে থাকে। এ লক্ষ্যে, তারা তাদের প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্র দিয়েও সাহায্য করে। কুরাইশদের প্ররোচনায় বনু বকর খুযাআ গোত্রকে আক্রমণ করে তাদের কিছু ব্যক্তিকে হত্যা করে। আর, বাকীরা নিরাপত্তার আশায় পালিয়ে মদীনায় চলে আসে। খুযাআ’ গোত্রের ’আমর ইবন সালিম দ্রুত মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে গিয়ে সমস্ত ঘটনা খুলে বলে এবং সাহায্যের আবেদন করে। মুহাম্মদ (সা) তাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন, “তোমারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে, হে ’আমর ইবন সালিম।”
এ পর্যায়ে, আল্লাহর রাসূল (সা) কুরাইশদের এ বিশ্বাসঘাতকতাকে উপেক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নেন এবং তিনি (সা) এটাও ভাবেন যে, মক্কা বিজয় না করা পর্যন্ত এ সমস্যার কোন সমাধান করা সম্ভব না। এদিকে, চুক্তি ভঙ্গ করে কুরাইশরা অত্যন্ত ভীত হয়ে যায়। তারা চুক্তিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে চুক্তির সময় বৃদ্ধি করার জন্য আবু সুফিয়ানকে মদীনায় প্রেরণ করে। আবু সুফিয়ান সরাসরি মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে না গিয়ে প্রথমে তার কন্যা ও রাসূল (সা)-এর স্ত্রী উম্ম হাবীবার কাছে যায়। গৃহে প্রবেশ করার পর, সে যখন রাসূল (সা)-এর বিছানায় বসতে যায় উম্ম হাবীবাহ্ দ্রুত বিছানা গুটিয়ে ফেলেন যেন আবু সুফিয়ান সেখানে বসতে না পারে। আবু সুফিয়ান তাকে জিজ্ঞেস করে যে, আমি কি এই বিছানার অযোগ্য, না কি এই বিছানাই আমার অযোগ্য? উত্তরে উম্ম হাবীবাহ্ বলেন, “এটা হচ্ছে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর বিছানা। আর তুমি হচ্ছো একজন ঘৃণিত মুশরিক। সুতরাং, আমি চাই না যে তুমি তাঁর বিছানায় বসো।”এ কথার উত্তরে আবু সুফিয়ান বলে, “আল্লাহর কসম! আমাকে ছেড়ে আসার পর তোমার অনেক অধঃপতন হয়েছে।”তারপর, উত্তেজিত হয়ে উম্ম হাবীবার গৃহ থেকে বেড়িয়ে যায়।
পরবর্তীতে, আবু সুফিয়ান কোনক্রমে রাসূল (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাঁকে চুক্তির সময় বৃদ্ধির আকুল আবেদন জানায়। কিন্তু, তার এ আবেদনে রাসূল (সা) কোন সাড়া না দিয়ে তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেন। এরপর, আবু সুফিয়ান আবু বকরের কাছে ছুটে যায় এবং তাঁকে রাসূল (সা)-এর কাছে এ বিষয়ে আবেদন করার জন্য অনুরোধ করে। আবু বকর (রা) তাকে প্রত্যাখান করেন। এরপর, সে ’ওমর ইবন খাত্তাবের কাছে ছুটে যায়, কিন্তু, ’ওমর (রা) তাকে ধমক দিয়ে বলে, “তুমি কি আশা কর যে, আমি তোমার পক্ষ হয়ে আল্লাহর রাসুলের কাছে আবেদন করবো? আল্লাহর কসম, যদি আমার কাছে একটি মাত্র পিপড়াও থাকত তবে, তা দিয়েই আমি তোমার সাথে যুদ্ধ করতাম।”শেষ পর্যন্ত, সে ’আলী ইবন আবি তালিবের সাথে সাক্ষাৎ করে। তিনি তখন ফাতিমা (রা)-এর সাথে ছিলেন। আবু সুফিয়ান ’আলী (রা)-কে তার পক্ষ হয়ে আল্লাহর রাসুলের কাছে আবেদন করতে অনুরোধ করলে ’আলী (রা) বলেন, আল্লাহর রাসূল (সা) যখন কোন বিষয়ে মনস্থির করেন তখন সে বিষয়ে তাঁকে বিরত রাখার চেষ্টা করা অর্থহীন। এরপর, সে ফাতিমা (রা)-এর দিকে ঘুরে তাঁর সন্তান হাসান (রা)-কে তাদের নিরাপত্তা দেবার আবেদন করে। এর উত্তরে তিনি বলেন, “তোমাকে একমাত্র আল্লাহর রাসূল (সা) ছাড়া কেউ নিরাপত্তা দিতে পারবে না।”
এ পর্যায়ে আবু সুফিয়ান মরিয়া হয়ে দ্রুতগতিতে মক্কায় ফিরে যায় এবং কুরাইশদের অভিজ্ঞতার কথা খুলে বলে। ইতিমধ্যে, আল্লাহর রাসূল (সা) সাহাবীদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন এবং তিনি (সা) তাঁর দলবল সহ মক্কার দিকে যাত্রা করেন। তিনি (সা) তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে আচমকা উপস্থিত হয়ে কুরাইশদের হতবিহবল করে দিতে চেয়েছিলেন, যেন অপ্রস্তুত অবস্থায় তারা বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং বিনা রক্তপাতেই মক্কা বিজয় করা যায়।
মক্কা বিজয় অভিযানে ১০,০০০ মুসলিম সৈন্য মদীনা থেকে যাত্রা করে। কুরাইশদের অজান্তেই তারা মক্কার মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরবর্তী মার আল-দাহরান এলাকায় পৌঁছে যায়। কুরাইশরা ইতিমধ্যেই আঁচ করতে থাকে যে, মুসলিমরা তাদের যে কোন সময় আক্রমণ করতে পারে এবং তাদের নেতৃস্থানীয়রা এই আক্রমণ প্রতিহত করার ব্যাপারে গবেষনাও করতে থাকে। এ অবস্থায় কুরাইশদের অঘোষিত সর্দার আবু সুফিয়ানের নও মুসলিম আল-’আব্বাসের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। সে তার কাছ থেকে মক্কার উপর ঘনিয়ে আসা সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে অবহিত হয়। এ সময় তিনি রাসূল (সা)-এর সাদা রঙের খচ্চরের উপর আরোহন করছিলেন, যেন কুরাইশরা বুঝতে পারে যে, হয় তাদের রাসূল (সা)-এর কাছে নিরাপত্তা চাইতে হবে অথবা নিশ্চিত ধ্বংসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, মুসলিমদের এই সুসজ্জিত বিশাল বাহিনীকে মুকাবিলা করার কোন উপায়ই তখন কুরাইশদের ছিল না। আল-’আব্বাস আবু সুফিয়ানকে বলেন, “দেখছো তো আল্লাহর রাসূল (সা) বিশাল বাহিনী নিয়ে উপস্থিত। তাদের যদি জোরপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করতে হয়, তাহলে মনে হয় তোমাদের ধুলার সাথে মিশে যেতে হবে।”আবু সুফিয়ান ব্যাকুল হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে, “এ অবস্থায় আমাকে কি করতে হবে তাই বল?” তিনি তখন তাকে তার খচ্চরের পিঠে আরোহন করতে বলেন এবং রাসূল (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছে নিরাপত্তা কামনা করতে বলেন। মুসলিমদের ছাউনী অতিক্রম করার সময় তারা ওমর (রা) এর আগুনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে। ’ওমর (রা) রাসূল (সা) এর খচ্চর এবং তাদের চিরশত্রু আবু সুফিয়ানকে চিনে ফেলেন।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে, আব্বাস (রা) আবু সুফিয়ানের প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করতে উদ্যাত হলেন। কিন্তু, তার আগেই ক্ষিপ্রগতিতে ওমর (রা) আল্লাহর রাসুলের তাঁবুর দিকে ছুটে গেলেন। উদ্দেশ্য প্রাণের শত্রুর দেহ থেকে গর্দান নামিয়ে ফেলার অনুমতি প্রার্থনা করা। এ অবস্থায় তার খচ্চরকে দ্রুতবেগে চালিয়ে ওমরের আগেই পৌঁছে গেলেন রাসূল (সা)-এর তাঁবুতে। চিৎকার করে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি তাকে (আবু সুফিয়ান) আমার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা দিয়েছি।” এরপর, আব্বাস (রা) এবং ওমর (রা) মধ্যে এ বিষয়কে কেন্দ্র করে তুমুল বির্তক আরম্ভ হয়। আল্লাহর রাসূল (সা) আব্বাস (রা)-কে বলেন, “আপনি একে আপনার গৃহে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং আগামীকাল সকালে তাকে নিয়ে আসেন।” পরদিন, তাকে আল্লাহর রাসুলের কাছে নিয়ে আসা হয় এবং সে ইসলাম গ্রহন করে।
এরপর, আব্বাস (রা) রাসূল (সা)-কে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফিয়ান এমন একজন মানুষ, যে সবসময়ই মানুষের মাঝে সম্মানিত হতে ভালবাসে। আপনি কি এ ব্যাপারে কিছু করবেন?” একথা শোনার পর রাসূল (সা) ঘোষনা দিলেন, “যে আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে সে নিরাপদ। যে নিজ গৃহে দরজা বন্ধ করে অবস্থান করবে সে নিরাপদ। যে কাবাঘরে অবস্থান করবে সেও নিরাপদ।” এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) আবু সুফিয়ানকে চুঁড়ার একটি অংশে দাঁড় করিয়ে দিলেন যেন, মুসলিমদের বিশাল বাহিনী তাকে অতিক্রম করার সময় সে তা দেখতে পায়। এরপর, সে দ্রুতগতিতে মক্কায় ফিরে এসে চিৎকার করে ঘোষনা দেয়, “তোমরা শোন, আল্লাহর রাসূল, মুহাম্মদ তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত, যাদের মুকাবিলা করার কোন সামর্থ্যই তোমাদের নেই। সুতরাং, যে আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে। যে নিজগৃহে দরজা বন্ধ করে থাকবে, সে নিরাপত্তা লাভ করবে। আর, যে কাবাগৃহে অবস্থান করবে সেও নিরাপত্তা লাভ করবে।” এ ঘোষনা শোনার পর কুরাইশরা সমস্ত প্রতিরোধ উঠিয়ে নেয়। এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) সর্তকতার সাথে মক্কায় প্রবেশ করেন। তিনি (সা) তাঁর বিশাল সৈন্যবাহিনীকে চারটি ভাগ করেছিলেন এবং নিতান্ত বাধ্য না হলে কোনপ্রকার রক্তপাত করতে নিষেধ করেছিলেন। মুসলিম বাহিনী বিনা বাঁধায় বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করে। শুধুমাত্র, খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদের বাহিনীকে কিছুটা প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, যেটা তিনি দ্রুত নিষ্পত্তি করেছিলেন।
এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কার উচ্চভূমি থেকে নেমে আসেন। তাওয়াফ করার উদ্দেশ্যে কাবাঘরের দিকে এগিয়ে যাবার আগে তিনি (সা) এ স্থানে কিছুক্ষন থেমেছিলেন। এরপর তিনি (সা) সাতবার কা’বা ঘর প্রদক্ষিন করে উসমান ইবন তালহাকে কা’বা ঘরের দরজা খোলার নির্দেশ দেন। এ সময় সমস্ত জনসাধারণ তাঁর পাশে সমবেত হয়। তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি (সা) পবিত্র কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলওয়াত করেন, যেখানে আল্লাহতায়ালা বলছেন,
হে মানবজাতি! আমরা তোমাদেরকে একজোড়া মানব-মানবী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর, তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই, আল্লাহর দৃষ্টিতে সেই সবচাইতে বেশী সম্মানিত যার তাকওয়া সবচাইতে বেশী। নিশ্চয়ই, আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু সম্পর্কে অবহিত।” [সুরা আল-হুজুরাতঃ ১৩]
তারপর, তিনি (সা) কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে কুরাইশরা, তোমরা আজ আমার কাছ থেকে কি আচরন আশা করো?” উত্তরে তারা বলে, “ভালো, কারণ তুমি আমাদের মহৎ ভাই, আমাদের মহৎ ভাইয়ের সন্তান।” তিনি (সা) বললেন, “তোমরা এখন মুক্ত, তোমরা যে যেখানে চাও যেতে পার।” কা’বার ভেতরের দেয়ালে যত ফেরেশতা ও নবীদের ছবি অঙ্কিত ছিল, তিনি (সা) সে সবকিছু ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ দেন। তিনি (সা) কাঠের তৈরী একটি ঘুঘু পাখি কা’বার ভেতর আবিষ্কার করেন, যা তিনি (সা) নিজহাতে ভেঙ্গে ছুঁড়ে ফেলে দেন। সবশেষে, কা’বার ভেতরের অসংখ্য মূর্তিগুলোর দিকে তাঁর হাতের লাঠি দিয়ে নির্দেশ করে তিনি (সা) পবিত্র কোরআনের নীচের আয়াতটি তিলওয়াত করেন, “এবং বলঃ সত্য এসেছে এবং মিথ্যা নিশ্চিহ্ন হয়েছে। নিশ্চয়ই, মিথ্যাকে তো নিশ্চিহ্ন হতেই হবে।”[সুরা আল-ইসরাঃ ৮১]
এরপর, কা’বা ঘরের অভ্যন্তরের মূর্তিগুলো একে একে মাটিতে পরে গেল, তারপর সেগুলোকে ভেঙ্গে, পুড়িয়ে কা’বার প্রাঙ্গন থেকে সরিয়ে ফেলা হল। আর, এভাবেই শেষপর্যন্ত, পবিত্র কাবাঘর মুশরিকদের অপবিত্রতা থেকে মুক্তি পেল।
এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) পনের দিন মক্কায় অবস্থান করলেন। এর মধ্যে, মক্কার শাসন কার্যাবলী বিন্যস্ত করেন এবং জনসাধারনকে ইসলাম শিক্ষা দেন।
এভাবে, মক্কা পুরোপুরি পৌত্তলিকদের কবল থেকে মুক্ত হয় এবং শেষপর্যন্ত ইসলামী দাওয়াতের পথে অন্যতম বস্তুগত বাঁধা অপসারিত হয়। এরপরেও আরব উপদ্বীপে কিছু কিছু ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধ বলয় থেকে যায় যেমনঃ হুনায়ুন, তা’য়িফ ইত্যাদি। এ শহরগুলো জয় করে নেয়ার পরই মূলত সমগ্র আরব ভূ-খন্ডে মুসলিমদের চূড়ান্ত বিজয় অজির্ত হয়। আর, প্রকৃতপক্ষে, মক্কা বিজয়ের পর এ ক্ষুদ্র প্রতিরোধ বলয়গুলোকে ভেঙ্গে দেয়া মুসলিমদের জন্য বিশেষ কঠিন কাজও ছিল না।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৫ (মু’তার যুদ্ধ)
প্রতিনিধি দল বহির্বিশ্ব থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পরপরই আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেন এবং আরব ভূ-খন্ডের বাইরে জিহাদ করার ঘোষনা দেন। এ লক্ষ্যে, তিনি (সা) রোমান ও পারস্যের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে আরম্ভ করেন। আর, রোমান সাম্রাজ্যের সাথে তাঁর সীমান্ত যুক্ত থাকায় তিনি (সা) তাদের গতিবিধির উপর বিশেষ ভাবে নজর দেন এবং গুপ্তচরের মাধ্যমে ধারাবাহিক ভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। রাসূল (সা) তাঁর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতার কারণে এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি একবার আরব ভূ-খন্ডের বাইরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো যায়, তবে ইসলামের আহবানকে বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। তাই তিনি (সা) এ লক্ষ্যে, আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) থেকেই জিহাদের সূচনা করবেন বলে স্থির করেন। কারণ, খসরুর ইয়েমেনের গর্ভনর বরহান ইসলাম গ্রহন করার পর তিনি (সা) সেখান থেকে কোনরকম আক্রমণের আশঙ্কা মুক্ত ছিলেন। এজন্য, তিনি (সা) রোমানদের মুকাবিলা করার জন্য আল-শামেই সৈন্য পাঠানোর চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন। এরপর, হিজরী ৭ম সালের জুমাদিউল ’উলা মাসে, হুদাইবিয়া সন্ধির কয়েকমাস পরেই তিনি (সা) তিন হাজার যোদ্ধার এক দক্ষ বাহিনী তৈরী করেন। যায়েদ ইবন হারিছাহকে এ বাহিনীর নেতা নিযুক্ত করে নির্দেশ দেন যে, “যদি যায়েদ নিহত হয় তবে, জা’ফর নেতৃত্বে থাকবে, আর জা’ফর নিহত হলে ’আব্দুল্লাহ ইবন রুওয়াহাহ্ নেতৃত্ব দেবেন।”
নির্দেশ পাবার পর সৈন্যবাহিনী নিদিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে, আর নও মুসলিম হিসাবে খালিদ ইবন ওয়ালিদ (তিনি হুদাইবিয়া সন্ধির পরপরই ইসলাম গ্রহন করেছিলেন) তাদের সঙ্গী হন। রাসূল (সা) সৈন্যদলের সাথে মদীনার প্রান্তবর্তী সীমানা পর্যন্ত যান। মুসলিম যোদ্ধাদের তিনি (সা) নারী, পঙ্গু বা অচল ব্যক্তি ও শিশুদেরকে আক্রমণ না করার নির্দেশ দেন এবং সেইসাথে, গাছপালা বা বাড়ীঘরও ধ্বংস করতে নিষেধ করেন। তারপর, রাসূল (সা) এবং মদীনার বাকী মুসলিমরা সৈন্যদলের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলেন, “এ যাত্রায় আল্লাহ তোমাদের সহায় হউন, তোমাদের রক্ষা করুন আর নিরাপদে আমাদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন ।”
এরপর, সৈন্যবাহিনী রনাঙ্গনের দিকে এগিয়ে যায়। এর মধ্যেই নেতৃস্থানীয়রা যুদ্ধের কৌশল নির্ধারন করে। তারা ঠিক করে যে, শত্রুকে ত্বড়িৎগতিতে আচম্কা আক্রমণ করে তাদের বিজয়কে সুনিশ্চিত করবে, ঠিক যেভাবে রাসূল (সা) আক্রমণ পরিচালনা করে থাকেন। সৈন্যদলের নেতৃস্থানীয় যোদ্ধারা এতে সম্মতি দিলে তারা উদ্দেশ্য সাধনে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু, মু’য়ান (আরবের উত্তরাঞ্চল) এলাকায় পৌঁছানোর পর তারা শুনতে পায় যে, হিরাক্লিয়াসের আল-শাম অঞ্চলের গভর্নর শারহাবিল আল-গাচ্ছানী তাদের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে ১,০০,০০০ সৈন্য সমাবেশ করেছে। আকস্মিক এ সংবাদে তারা হতবিহবল হয়ে দুই রাত সেখানেই যাত্রা বিরতী করে এবং ভয়ঙ্কর এ বাহিনীকে কিভাবে মুকাবিলা করবে সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে। এ অবস্থায় তারা চিন্তা করে দেখে যে, তাদের জন্য সবচাইতে নিরাপদ পদক্ষেপ হচ্ছে রাসূল (সা)-কে পত্র মারফত অবস্থা বণর্না করা। তিনি (সা) যদি তাদের সাহায্য করার জন্য আরও সৈন্য পাঠান তো ভাল, আর তা না হলে, পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তারা তাঁর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবে।
এ অবস্থায় ’আব্দুল্লাহ ইবন রুওয়াহাহ্ সৈন্যদলকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে বলেন, “আল্লাহর কসম! তোমরা শাহাদতের পেয়ালা পান করার জন্যই এখানে এসেছো, যদিও তোমরা মৃত্যুকে অপছন্দ করো। জেনে রাখো, শত্রুর সাথে আমরা আমাদের সংখ্যা কিংবা শক্তিসামর্থ্য দিয়ে যুদ্ধ করি না, আমরা যুদ্ধ করি আমাদের দ্বীন ইসলামের শক্তি দিয়ে যা দিয়ে আল্লাহতায়ালা আমাদের সম্মানিত করেছেন। সুতরাং, তোমরা নির্ভয়ে এগিয়ে যাও। শাহাদত কিংবা বিজয়, দুটোর যে কোনটাই আমাদের জন্য পছন্দনীয়।” একথা শোনার পর, মুসলিম বাহিনী ঈমানী শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠে এবং দৃঢ় চিত্তে শত্রুপক্ষের মুকাবিলায় এগিয়ে যায়, যে পর্যন্ত না তারা মাশরিফ নামের এক গ্রামে পৌঁছে। শত্রুপক্ষ যখন মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে আসে ততক্ষনে মুসলিমরা মু’তাহ গ্রামে প্রবেশ করেছে। এখানেই, দুইপক্ষ পরস্পরের মুখোমুখি হয়। শুরু হয় যুদ্ধ।
মু’তার প্রাঙ্গনে এ যুদ্ধ ছিল স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ। যুদ্ধের ময়দানের সর্বত্র ছিল মৃত্যুর বিভীষিকা, আর চারিদিকে বইছিলো রক্তের বন্যা। শাহাদতের অমিয় স্বাদ পান করার তীব্র আকাঙ্খায় মাত্র ৩০০০ মুসলিম সৈন্য জীবন বাজি রেখে লড়েছিল ২,০০,০০০ রোমান যোদ্ধার সাথে (রোমানরা তাদের বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য আরও ১,০০,০০০ অতিরিক্ত সৈন্য প্রস্তুত করে রেখেছিল)। ভয়ঙ্কর ও অসম এ যুদ্ধে যায়িদ ইবন হারিছাহ্ ইসলামের পতাকা হাতে লড়াই করছিলেন। এক পর্যায়ে, পরিণামের কথা বিন্দুমাত্র না ভেবে তিনি শত্রুব্যুহ ভেদ করে অরক্ষিত অবস্থায় রোমান সৈন্যদের ভেতরে ঢুকে যান। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তিনি প্রচন্ড সাহসের সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন। তার সাহসিকতা ছিল দুর্দান্ত আর নায়কচিত বীরত্ব ছিল অতুলনীয়। শেষ পর্যন্ত শত্রুর বর্শার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এরপর জা’ফর ইবন আবি তালিব ইসলামের পতাকা তুলে নেন। জা’ফর ছিলেন ৩৩ বছরের সুদশর্ন এক টগবগে যুবক। মৃত্যুর ভয়ঙ্কর বিভীষিকাকে উপেক্ষা করে তিনিও বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। একপর্যায়ে, শত্রুপক্ষ তার সওয়ারকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিনি ক্ষিপ্র গতিতে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে তলোয়ারের এক আঘাতে ঘোড়ার পায়ের রগ কেটে দেন। তারপর, দ্রুততার সাথে শত্রুকে আঘাত করতে করতে পায়ে হেঁটেই শত্রুবুহ্যের একেবারে ভেতরে ঢুকে যান। এ সময়ে এক রোমান সৈন্য তাকে তলোয়ারের আঘাতে দ্বিখন্ডিত করে হত্যা করে ফেলে। এরপর, আব্দুললাহ্ ইবন রুওয়াহাহ্ পতাকা তুলে নেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে শত্রুর মুকাবিলায় অগ্রসর হন। প্রথম দিকে সামনে এগুতে একটু দ্বিধাগ্রস্থ হলেও একরকম জোর করেই তিনি নিজেকে ভয়ঙ্কর রণক্ষেত্রে ঠেলে দেন, তারপর যুদ্ধ করতে করতে একসময় তিনিও শহীদ হয়ে যান। এ সময়ে, ছাবিত ইবন আকরাম পতাকা হাতে বলেন, “মুসলিমরা! তোমরা একজনের পেছনে সারিবদ্ধ হও।”এরপর, মুসলিমরা খালিদ ইবন আল- ওয়ালিদের পেছনে সমবেত হয়। খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ তার সৈন্যদলকে এমন দক্ষতার সাথে সজ্জিত করেন, যাতে শত্রুপক্ষ বেশ চাপের মুখে পড়ে যায়। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত তিনি শত্রুপক্ষকে ছোট ছোট আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করেন।
বস্তুতঃ এ যুদ্ধ ছিল এক অসম যুদ্ধ, কারণ শত্রুপক্ষের বিপুল সংখ্যার তুলনায় মুসলিম বাহিনী ছিল অত্যন্ত নগন্য। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে, রাতের বেলায় খালিদ চাতুর্যপূর্ণ এক যুদ্ধকৌশলের পরিকল্পনা করেন। খালিদ তার বাহিনীর একটি অংশকে শোরগোল তৈরী করার জন্য পেছনে রেখে দেন, যাতে রোমানরা মনে করে মুসলিমদের সাহায্য করার জন্য আরও সৈন্যদল এসে পৌঁছেছে। হট্টগোল শুনে রোমানরা ভীত হয়ে একপর্যায়ে আক্রমণ বন্ধ করে দেয়। এমনকি এ অবস্থায় খালিদ (রা) আক্রমণ বন্ধ করলে তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে যায়। এরপর, খালিদ (রা) যুদ্ধের ময়দান থেকে তার সৈন্যদল প্রত্যাহার করে নেন এবং দলবল নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। যদিও এ যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয়ী বা পরাজিত কোনটাই হয়নি, কিন্তু তাদের অর্জন ছিল উল্ল্যেখযোগ্য।
এ যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী মুসলিমদের প্রত্যেকেই জানত যে, প্রতিটি মূহুর্তে মৃত্যু তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে, কিন্তু তারপরেও তারা বীরের মতো যুদ্ধ করেছে এবং মৃত্যুকে নির্ভয়ে আলিঙ্গন করেছে। কারণ, আল্লাহর জন্য হত্যা করতে বা জীবন দিতে মুসলিমরা আদিষ্ট। আর, আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করা হচ্ছে বিনিয়োগের সবচাইতে লাভবান ক্ষেত্র। এটাই হচ্ছে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“নিশ্চয়ই, আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মু’মিনদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা [কখনো] হত্যা করে এবং [কখনো] নিহত হয়। এ সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল এবং কুরআনে। আর, কে আছে যে আল্লাহ অপেক্ষা অঙ্গীকার পালনে অধিক সত্যবাদী? অতএব, তোমরা আনন্দ করতে থাকো তোমাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ের উপর যা তোমরা সম্পাদন করেছ, আর এটাই হচ্ছে চুড়ান্ত সফলতা।” [সুরা তওবাঃ ১১১]
আর, এ কারণেই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এ যুদ্ধের নায়করা বীরের মতো যুদ্ধ করেছে। তারা এটাও প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধ ছাড়া মুসলিমদের জন্য যদি অন্য কোন পথ খোলা না থাকে, তাহলে তাদের অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে। সেক্ষেত্রে, নিশ্চিত মৃত্যুর বিভীষিকা কখনোই বিবেচ্য বিষয় হবে না। আর, জিহাদের ক্ষেত্রেও শত্রুপক্ষের সংখ্যা, শক্তিসামর্থ্য, অস্ত্রসস্ত্র এগুলো বিবেচ্য বিষয় হবে না, বরং লক্ষ্য অর্জনই হবে মূল বিষয়, তার জন্য যতো বড় ত্যাগেরই প্রয়োজন হোক না কেন কিংবা তার ফলাফল যাই হোক না কেন।
মুসলিমদের সাথে রোমানদের এই যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যে জন্য মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মুসলিম সেনানায়কদের যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে মুকাবিলা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। বস্তুতঃ মুসলিমদের মৃত্যুর ভয়ে কখনোই ভীত হওয়া উচিত না। আর, না তাদের আল্লাহর পথে জিহাদ করা ব্যতীত দ্বিতীয় কোন বিষয় চিন্তা করা উচিত। এ যুদ্ধের শুরু থেকেই আল্লাহর রাসূল (সা) জানতেন রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তে তাদের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়ানো কতোটা বিপদজনক। কিন্তু, শত্রুপক্ষের অন্তরে ভীতি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এটা খুবই কার্যকরী উপায় ছিল। আর সমস্ত বিশ্ববাসীকে এটা দেখানোও প্রয়োজন ছিল যে, সংখ্যায় নগন্য হওয়া সত্তেও বিশ্বাসীরা কিভাবে শুধু তাদের অতুলনীয় ঈমানী শক্তিকে পুঁজি করে, তাদের রবের সন্তুষ্টির জন্য দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে শত্রুকে মুকাবিলা করতে পারে। প্রকৃত অর্থে, জিহাদই হচ্ছে একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে মুসলিমরা নতুন নতুন ভূ-খন্ড জয় করে সেখানে ইসলামের হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করতে পারে, ছড়িয়ে দিতে পারে ইসলামের আলোকিত আহবান বিশ্বব্যাপী। আর, এ যুদ্ধ মূলতঃ মুসলিমদের অপরিহার্য সেই জিহাদের জন্যই প্রস্তুত করেছিল, সাফল্যের সাথে ক্ষেত্র তৈরী করেছিল পরবর্তীতে রোমানদের সাথে সংঘটিত তাবুক যুদ্ধের। মু’তার যুদ্ধ রোমানদের এত বেশী নাড়া দিয়েছিল যে, পরবর্তীতে মুসলিমরা আল-শাম জয় করা না পর্যন্ত দুঃসাহসী এ বাহিনীর মুখোমুখি হবার সম্ভাবনাই ছিল রোমানদের আতঙ্কের ব্যাপার।
ব্যর্থ গণতন্ত্রের সমাধান কি “তত্ত্বাবধায়ক সরকার” ?

আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উঠিয়ে নেয়া পরবর্তী তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল হবে কি হবে কিনা? কিংবা বিদ্যমান সংশোধিত সংবিধানের আলোকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নাকি নতুন কোন নির্বাচনী রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে তা নিয়ে সকল জল্পনা কল্পনা আবর্তিত হচ্ছে।
এই রূপ একটি রাজনৈতিক সংকট ছিয়ানব্বই সালে জাতি প্রত্যক্ষ করে। মূলত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অবিশ্বাস থেকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বি.এন.পি কে বাধ্য করা হয় “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা” সংবিধানে সংযোজন করতে। আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে তৎকালীন এই আন্দোলন সংগঠিত হয় বি.এন.পি বিরুদ্ধে, যা এখন বি.এন.পি নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী জোটের বিরুদ্ধে চলমান।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশ পরবর্তী দ্বিজাতি তত্ত্বের বাতাবরণে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও পাকিস্তানের উত্থান ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রভাবাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্থানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করা হয়। সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ ও পরবর্তীতে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জনগণের আকাংক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়। বৃটিশ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ঔপনিবেশিক রাজনীতি তৎকালীন পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতিভূ হয়ে উঠে যা কথিত স্বাধীন বাংলাদেশের ও নিয়ন্ত্রক। স্বাধীনতা পরবর্তী চারদশকের ও বেশী সময় ধরে সাম্য, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরেপক্ষতার সস্তা শ্লোগানের আড়ালে নয়া ঔপনিবেশিক রাজনীতিকে বাস্তবায়িত করা হয়েছে। এই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, রাজনীতি ও ভূকৌশলগত সম্পদের উপর সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন, বৃটিশ ও আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মার্কিন ভারত বৃটেন নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক মঞ্চে বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষক দালাল স্বরুপ আবির্ভাব ঘটে মুজিব -জিয়া-এরশাদ গংদের।
হাসিনা -খালেদা নিয়ন্ত্রিত দ্বি-জোটীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সেই স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করে যা আরো বেশি লুন্ঠন, দূর্নীতির বিস্তার ঘটায় এবং দেশকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে। গণতান্ত্রিক দলগুলোর ক্ষমতা দখল ও লুন্ঠনের লড়াইয়ে যে পারস্পরিক অবিশ্বাস সে অবিশ্বাসের গহ্বরে ততত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম। কাজেই তথাকথিত তত্তাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কী লুন্ঠন, দূর্নীতি, জ্বালাও পোড়ানোর রাজনীতি থেকে জনগণকে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হবে? নাকি মার্কিন -ভারত-বৃটেনের স্বারথে গণবিরোধী, দূর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন করে পুনর্বাসিত করবে?
বস্তুতঃ দলীয় সরকার কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যর্থ গণতান্ত্রিক শাসনকে টিকিয়ে রাখার ছলনা বৈ আর কিছুই নয় যা এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে দ্বীন কে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে। ইসলামি আকীদার সাথে যা সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। এই দেশের মুসলিমদের অবশ্যই কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুর আড়ালে দূর্নীতিগ্রস্থ ও নিপীড়নমূলক কুফর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও তাদের এদেশীয় দালালদের প্রতিহত করতে হবে। সেই সাথে ইসলামি আকীদা ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে জোরালো করতে হবে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহকে কুফরীতে পরিণত করেছে এবং তাদের জনগণকে তারা ধবংসের আবাসস্থল উপহার দিয়েছে। তারাই জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে, আর তা অতি নিকৃষ্ট আবাসস্থল।” [সূরা ইবরাহিম :২৮-২৯]আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন,”আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ অতিবাহিত করেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেছেন,
“বনী ইসরাঈলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই খলীফাগণ আসবেন এবং তারা সংখ্যায় অনেক। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই’আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করবেন।”মোর্শেদ আলম
রাজনৈতিক বিশ্লেষকআপনার ধান্দা কী?

আজকাল আমাদের সমাজে এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে কোন না কোন ধান্ধার পেছনে ঘুরছে না? উঠতি বয়সের তরুণ থেকে শুরু করে বয়সী কর্মজীবি মানুষ, সবাই একটার পর একটা ধান্দায় সমস্ত জীবন পার করে দিচ্ছে। নিজের ধান্দা ছাড়া অন্য কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় কারো নেই। সবার মুখে একই কথা “ভাই আমি খুবই ব্যস্ত, আমার কোন সময় নেই।”
আসুন আমরা দেখি কোন ধান্দার পেছনে আমরা পাগলের মত ছুটে চলেছি আর কি নিয়েই বা সমাজের তরুণ বৃদ্ধ সবাই এত ব্যস্ত।
এখনকার দিনে তরুণদের একমাত্র ধান্দা হচ্ছে যত বেশী পারা যায় ফুর্তি করা, আনন্দে থাকা, জীবনের স্বাদ উপভোগ করা। সবার মধ্যে একই চিন্তা কিভাবে একটা ‘অ্যাফেয়ার’ করা যায়। একটা বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড খুবই প্রয়োজন – “তা না হলে জীবনটাই বৃথা” এরকম একটা মানসিকতা সবার মধ্যে। হলিউড-বলিউড সংস্কৃতির তীব্র আগ্রাসন তাদের চিন্তার জগতকে এতটাই দখল করে নিয়েছে যে এসব ছাড়া অন্য কোন কিছু তারা ভাবতেই পারে না। বিয়ের আগে প্রেম, সেক্স এগুলো এখনকার দিনের ফ্যাশন। লেকের পাড়ে, পার্কে, লাইব্রেরীর বারান্দায় সর্বত্র যুগলদের সদাসর্বদা ব্যাপক উপস্থিতি এখন আর কারোরই চোখ এড়ায় না। আজকাল ছেলে মেয়ে সম্পর্ক শুধু ‘নির্দোষ প্রেম’ কিংবা বিয়ের সম্পর্ক নয় – এসব ক্ষেত্রে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা এখন ওপেন সিক্রেট।
ছেলেরা একটা ‘মেয়ে’ খুজঁছে সর্বত্র, সর্বক্ষণ। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হিন্দি ছবি, মিউজিক ভিডিও, সিনে ম্যাগাজিন কিংবা সাইবার ক্যাফেতে ডাউনলোড করা পর্নোছবি সব কিছুতেই ছেলেদের একটাই ধান্ধা – একটা মেয়ে।
ছেলেদের এই ধান্ধা পূরণের জন্য সমস্ত নগর জুড়ে চলছে আরো নানা আয়োজন – কনসার্ট, ফ্যাশন শো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।
বারে গিয়ে দামী বিদেশী মদ, বিয়ার ইত্যাদি সম্ভব না হলেও অন্ততপক্ষে ‘ডাইল’ কিংবা ‘ইয়াবা’ এর ফিলিংস নেয়া বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণের কাছে আরেকটি ধান্ধা। আর এই ধান্ধার পেছনে ছুটতে গিয়ে তারা চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে।
বয়সের সাথে সাথে আমাদের ধান্দাও পাল্টায়। শিক্ষা জীবনের শেষে যুবকদের মাথায় ঢোকে ক্যারিয়ারের ধান্দা। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা কিভাবে, কাকে ধরে, ঘুষ কিংবা তোষামোদ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। সহসাই সে বুঝতে পারে চাকুরীর বাজারে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা অনেক, তাই তাকে ‘জ্যাক’ ধরতে হবে। শুরু হয় ‘মামা’ খোঁজার ধান্দা। একটা ভাল চাকরির জন্য সে সবকিছু করতে রাজি। এমনকি নিজেকে বিক্রি করতেও তার মনে কোন বাধা নেই।
একটা চাকরি পাবার পর তার চিন্তা এর চেয়ে ভাল চাকরি কিভাবে পাওয়া যায় অথবা কিভাবে বসকে খুশি করে তাড়াতাড়ি প্রমোশন পাওয়া যায়। আর বসকে খুশি করার উপায় হচ্ছে, নয়টা থেকে নয়টা গাধার মত খাটা আর বসের সব ইচ্ছা পূরণ করা। বস তার কাছে দেবতার মত, বসকে কিছুতেই অসন্তুষ্ট করা যাবে না। সারাক্ষণ বসের প্রশংসা করতে হবে। বস ইজ অলওয়েজ রাইট। বসের সামান্য অনুরোধই তার জন্য হুকুম। স্যারের প্রিয়পাত্র হবার জন্য প্রত্যেক অফিসে যেন প্রতিযোগিতা চলছে। সবার মাথায় একটাই ধান্দা কিভাবে আরো উপরে ওঠা যায়। দুনিয়ার অন্য কোন কিছু নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? এই চাকরিটাই যেন তার জীবন। তার ধারণা এই চাকরিই তার জীবনের সফলতা ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে যদি তার চাকরিটা মোটামুটি স্থায়ী হয়ে যায় আর এর মধ্যে দুএকটা প্রমোশনও জুটে যায় তাহলে সে যথেষ্ট আস্থার সাথে বিয়ের বাজারে দরদাম শুরু করতে পারে।
অপরদিকে যারা চাকরির ধান্দায় অন্যদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারে না তাদের ধান্দা হচ্ছে যে কোনভাবে হোক দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো। বিদেশে যাবার ধান্দা মাথায় ঢুকলে শুরু হয় বিভিন্ন বিদেশী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিবিশনে যাওয়া এবং সেই সঙ্গে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন নামী-বেনামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটার পর একটা এপ্লিকেশন পাঠানো। এর মধ্যে চলতে থাকে স্পোকেন ইংলিশ কোর্স কিংবা SAT/TOEFL/IELTS এ ভাল স্কোর করার প্রাণপণ চেষ্টা। দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যাবার ধান্দার পেছনে খরচ হতে থাকে লাখ লাখ টাকা। অনেক সময় সে এতটাই মরিয়া হয়ে উঠে যে অবৈধ পথে বিদেশে যাবার মত বিপজ্জনক পথ বেছে নিতেও সে পিছপা হয় না।
বয়স যখন পঁয়ত্রিশ কোঠা পেরোয় আর সংসার জীবন শুরু হয় তখন তার ধান্ধাও পাল্টে যায়। এখন তার আসল ধান্ধা কিভাবে ধন সম্পদ আরো বাড়ানো যায়। এজন্য বৈধ অবৈধ যেকোন পন্থা অবলম্বন করতে সে রাজি।
সে চিন্তা করতে থাকে তার যখন ৬৫ বছর বয়স হবে তখন সে কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকবে আর তার সন্তানদের জন্য কত বেশি সম্পদ রেখে যেতে পারবে। এখন এটাই তার একমাত্র ‘মাথাব্যাথা’। সে দিনরাত পরিশ্রম করে যাতে করে আরো বেশি টাকা উপার্জন করা যায় এবং ভবিষ্যতের সকল ঝুঁকি ও বিপদাপদ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা যায়। নামী কোম্পানির শেয়ার কেনা, ব্যাংকে উচ্চ হার সুদে ডিপোজিট একাউন্ট খোলা, জমি কেনা, ব্যাংকলোন নিয়ে এপার্টমেন্ট কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় টাকা খাটানো ইত্যাদি সব উপায়েই সে চেষ্টা করতে থাকে যাতে করে সে আরো বেশি সম্পদশালী হতে পারে। এর কোন শেষ নেই। তার আরো চাই, আরো। একটা ধান্ধা পূরণ হলে তাকে আরেকটা ধান্ধার নেশায় পেয়ে বসে। টাকাই হচ্ছে চূড়ান্ত ধান্ধা। যেন এটা একটা ড্রাগ যা ছাড়া সে বাঁচতে পারেনা। তার সমস্ত চিন্তা, কথা ও কাজের পেছনে একটাই উদ্দেশ্য – টাকা উপার্জন। একটাই মাপকাঠি – আর্থিক লাভক্ষতি। লাভ হলে সে কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করে বা কথা বলে আর লাভের সম্ভাবনা না থাকলে তা করে না।
আর নিজের পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে নিজেকে সফল প্রমাণ করার জন্য ক্রমাগত চাপ তো আছেই। যত টাকা আর সম্পদ তত ‘সম্মান, ‘গুরুত্ব’, ‘স্ট্যাটাস’, আর ‘নিরাপত্তা’ – এটাই আজকের সমাজের প্রচলিত ধারণা।
এবার থামুন এবং চিন্তা করুন
আমাদের জীবনের সমস্ত সময় ব্যয় হচ্ছে শুধুমাত্র আমাদের ধান্দাগুলো পূরণের কাজে যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-গরিব সবাই এমন একটা কালচারের দাস হয়ে পড়েছি যা আমাদেরকে ব্যস্ত রাখছে বস্তুগত এবং ইন্দ্রিয় সুখ লাভের সার্বক্ষণিক চেষ্টার মধ্যে। আমাদের মধ্যে যে যত বেশি সম্পদ উপার্জন এবং ফূর্তি করতে পেরেছে তাকে তত বেশি সফল বলে মনে করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা যারা এই ধান্দা কালচারের মধ্যে পুরোপুরি ডুবে আছি তারা কিন্তু খুব বেশী চিন্তা-ভাবনা করে এটা গ্রহণ করিনি। জীবনের সফলতার এই ধারণাকে আমরা অন্ধভাবে গ্রহণ করেছি। কখনও প্রশ্ন করিনি এই ধারণাটি কি ঠিক না ভুল? বরং আমরা সমাজে আগে থেকেই যে সব ধান্ধা প্রচলিত আছে সেগুলোকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছি মাত্র। আমরা সব সময় সমাজের বাকী লোকদের সাথে নিজেকে তুলনা করি এবং তাদের সাথে ধন সম্পদ উপার্জন আর ভোগ বিলাসের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই। কিন্তু কখনও জানতেও চেষ্টা করিনা আমাদের সমাজের লোকদের এই চিন্তা ও কাজ কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
মানুষ সারা জীবন ধরে শুধুমাত্র বস্তুগত ও ইন্দ্রিয় সুখের জন্য একটার পর একটা ধান্ধার পেছনে ছুটে চলবে, একজন বিবেকবান মানুষের কাছে এটা কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পশুদের মধ্যেও জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তি রয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকেও খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে হয়। তারাও সন্তান জন্ম দেয় এবং বিরূপ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার সন্ধান করে। কিন্তু তারপরও পশু এবং মানুষের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রাণীরা নিজের অবস্থাকে উন্নত করার জন্য চিন্তা করতে পারে না। তাই আমরা দেখি মানুষের চেয়ে অনেক বড় এবং শক্তিশালী প্রাণীদেরকেও মানুষ পোষ মানায় এবং নিজের কাজে ব্যবহার করে। ফলে মানুষ পৃথিবীতে শাসন করে, প্রাণীরা নয়। মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ গুণ থাকার কারণেই মানুষ এটা করতে পারে আর তা হলো তার নিজ ও তার চারপাশের জগতকে নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা।
মানুষকে অবশ্যই এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে হবে এবং তার চারপাশের জগত, তার নিজের জীবন এবং অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। শুধুমাত্র খাওয়া দাওয়া ভোগ বিলাস আর সন্তান জন্ম দিয়ে পশুর মত সমস্ত জীবন কাটিয়ে দেয়া মানুষের কাজ হতে পারেনা। তাকে অবশ্যই জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান লাভ করতে হবে। সে কিভাবে কোথা থেকে এ পৃথিবীতে এসেছে? তার জীবনের উদ্দেশ্য কি? এই জীবনের পরে কি ঘটবে?
মানুষের কিছু মৌলিক বাস্তবতা আছে যেগুলো সে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারে না। সে নিজের আকার আকৃতি কিংবা লিঙ্গ নির্ধারণ করতে পারে না। সে অক্সিজেন, খাদ্য-পানীয় ছাড়া বাঁচতে পারে না। নিজের জীবন ও মৃত্যুর ওপরও তার বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে সে মৃত্যূবরণ করবে। প্রতিনিয়ত তার জীবনের শেষ দিন, শেষ মুহূর্তটির দিকে সে এগিয়ে যাচ্ছে। সে এই সময়টিকে এগিয়েও আনতে পারে না, পিছিয়েও দিতে পারে না।
এসব অনস্বীকার্য বাস্তবতা একটা বিষয়কেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে; তা হলো মানুষ নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে পারে না, বরং মানুষ নিজেই অন্যের দ্বারা সৃষ্ট এবং এমনভাবে তাকে ডিজাইন করা হয়েছে যা সে কিছুতেই পরিবর্তন করতে পারে না।
ইসলাম মানুষকে তার জীবনের মৌলিক প্রশ্নাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার তাগিদ দেয়। পবিত্র কোরআনের শত শত আয়াতে মানুষকে তার চারপাশের বাস্তব জগতকে মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করার জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে। বিশ্বজগত তথা সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, দিনরাত্রির আবর্তন, প্রাণীকূল, বৃক্ষরাজি, বিভিন্ন বর্ণের মানুষ ও তাদের মুখের ভাষা ইত্যাদি হাজারো বিষয় নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এদের মধ্যেকার জটিল সুনিপুণ ব্যবস্থাপনাকে বিবেচনা করে আল্লাহ মানুষকে চরম সত্যে উপনীত হবার জন্য আহবান করছেন। কোরআনে আয়াতের পর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে মূক, বধির ও অন্ধের মত নিজের চারপাশে ঘটমান বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন।
“নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবারাত্রির আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে সেই সব মানুষদের জন্য যারা চিন্তাশীল।” (সূরা আলি ইমরান:১৯০)
“এবং তার নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে আকাশ ও পৃথিবী, তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র; অবশ্যই এসব কিছুই নিদর্শন সেই সব লোকদের জন্য যারা জ্ঞানী।” (সূরা আর রূম:২২)
ইসলাম পৌরাণিক কল্পকাহিনী কিংবা মানুষের চিন্তাপ্রসূত কুসংস্কারের উপর গড়ে ওঠা কোন জীবনব্যবস্থা নয়। অনুমান অথবা অন্ধ ধারণা নির্ভর তত্ত্বের কোন স্থান ইসলামে নেই।
মহান স্রষ্টা আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তার সর্বশেষ পয়গম্বর হিসাবে হযরত মুহাম্মদ (সা) এর নবুওয়তের বুদ্ধিগ্রাহ্য সুনিশ্চিত প্রমাণসহই ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসাবে মানব জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে সতর্ক করেছেন যে আমাদের এই জীবনটাই সবকিছু নয়। মৃত্যুর পর আরও একটি জীবন আছে যেখানে আমাদেরকে এই জীবনের সকল কাজের জবাবদিহি করতে হবে। এটা একটা সুনিশ্চিত বিষয়।
আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি ফূর্তি আর ভোগবিলাস করে কাটিয়ে দেয়ার জন্য এই জীবন সৃষ্টি করেননি। বরং মহান স্রষ্টার উপাসনা করার জন্যই আমাদের জীবন। আর এর মানে হচ্ছে, সকল মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে আসা। আজকের দিনে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, যা আমরা করি এবং করিনা আর যে সব ধান্ধায় আমরা দিনরাত ডুবে থাকি এসবই এসেছে আমাদের সমাজের প্রচলিত চিন্তাহীন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতি থেকে। আমাদের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কি হবে, আমরা যা নিয়ে ব্যস্ত তা আমাদেরকে বাস্তবে কতটা রক্ষা করতে পারে এবং পারবে এসব নিয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা-ভাবনা করিনা বলেই আজকে আমরা এসব তুচ্ছ ধান্ধার পেছনে অন্ধ উম্মাদের মত ছুটে চলেছি। দাসত্ব করছি আমাদের নিজের খেয়াল খুশী কিংবা অন্য মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছার। ইসলাম এসেছে মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহর দাসত্বে নিয়োজিত করার জন্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,
“পার্থিব জীবনতো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতিত কিছুই নয়, যারা সাবধানতা অবলম্বন করে (আল্লাহর ব্যাপারে) তাদের জন্য রয়েছে পরকালে উত্তম প্রতিদান। তবুও কি তোমরা বুঝবে না।” (আল কোরআন-০৬:৩২)
ইসলামে যদিও বা আল্লাহর দাসত্ব করে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনকেই মানব জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে তারপরেও মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিকে কখনও অস্বীকার করা হয়নি। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা এবং যৌন চাহিদা ও সম্পদ লাভের আকাঙ্ক্ষা রেখে দিয়েছেন। আর এসব মৌলিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি পূরণ করার জন্য ইসলামে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হে বিশ্বাসীগণ, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে উত্তম আহারাদি দিয়েছেন তা খাও এবং আল্লাহ নিকট শুকরিয়া আদায় কর, যদি তোমরা শুধুমাত্র তাকেই উপাসনা করে থাক।” (আল কোরআন ২:১৭২)
“আল্লাহ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ককে এভাবে বর্ণনা করেন, “তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ স্বরূপ আর তোমরাও তাদের জন্য পরিচ্ছদ স্বরূপ।” (আল কোরআন ২:১৮৭)
কিন্তু তাই বলে সব ধরণের কামনা বাসনার যথেচ্ছা পূরণই মানবজীবনের উদ্দেশ্য হতে পারেনা।
আজকের সমাজে ইসলামকে বিশেষ কিছু আচার অনুষ্ঠানের সমষ্টি বলে মনে করা হচ্ছে । আমরা যে বিশ্বাস লালন করি তা আমাদের মধ্যে কোন চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে আসেনি, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের অনুকরণ করছি মাত্র। ফলে সারাদিনে বা সারা সপ্তাহে দু’একবার কিছু শব্দ উচ্চারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে আমাদের ইসলাম যার সাথে আমাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীর কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ, রাসূল (সা), আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম – এ বিষয় গুলো আমাদের সমাজের লোকদের কাছে অনেক দূরবর্তী বিষয়। কারও কারও কাছে দূর অতীতের ইতিহাস বা গল্প মাত্র। তারা মনে করে এগুলোকে গুরুত্ব দেয়া বা না দেয়া যার যার ব্যক্তিগত বিষয়; দৈনন্দিন, সামাজিক, অর্থনৈতিক কার্যাবলীর ক্ষেত্রে এসব বিষয় টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক। ফলে প্রতি শুক্রবারে আমরা যে দলে দলে মসজিদে যাই কিংবা লক্ষ লক্ষ মানুষ রমজানে রোযা রাখে তার কোন প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া সমাজে প্রতিফলিত হয়না। অনেক ক্ষেত্রে আমরা জানিও না কিংবা প্রশ্নও করিনা বছরের পর বছর ধরে এসব আচার অনুষ্ঠান কেনইবা আমরা পালন করছি। যার ফলে আমরা পরিণত হয়েছি ‘মডারেট ফ্রাইডে মুসলিম’ এ। আসলে আমাদের জীবন চলে আমাদের নিজের ধান্দার নিয়ন্ত্রণে, ইসলামের সাথে যার কোন সম্পর্কই নেই।
এখন সময় এসেছে আমাদের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত কেন আমরা আমাদের ধান্ধাগুলোর পেছনে এরকম অন্ধ উম্মাদের মত ছুটে চলেছি। আমরা কি আমাদের জীবন ও মৃত্যুকে পাল্টে দিতে পারি? আমরা কি অমর হতে পারব? আমরা যদি আরও বেশী ধন সম্পদ জড়ো করি তাহলে কি মৃত্যুকে ঠেকাতে পারব? অবশ্যই উত্তর হচ্ছে – না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“অবশ্যই প্রত্যেক আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান:১৮৫)
আসুন আমরা এখন থেকেই ইসলামকে বুদ্ধি বিবেচনা ব্যবহার করে জানতে চেষ্টা করি এবং সে অনুযায়ী আমাদের জীবন ও সমাজকে পরিচালনা করতে শুরু করি। এটা আমাদের ব্যক্তিস্বত্ত্বার মধ্যে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনবে এবং সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?” (সূরা আল ইনফিতার:০৬)
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৪ (প্রতিবেশী দেশে দূত প্রেরণ)
যেহেতু, ইসলাম একটি সার্বজনীন দ্বীন এবং এ দ্বীন প্রেরণ করাই হয়েছে মানব জাতির সার্বিক কল্যাণে, তাই হেযাযে ইসলামী দাওয়াত একটা সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর সাথে সাথেই মুহাম্মদ (সা) হেযাযের বাইরে ইসলামের আহবান ছড়িয়ে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কারণ, আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“এবং আমি তোমাকে সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসাবে পাঠিয়েছি।” [সুরা আম্বিয়াঃ ১০৭]
আল্লাহতায়ালা সুরা সাবা-তে আরও বলেছেন,
“এবং আমি তোমাকে সমস্ত মানবজাতির প্রতি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী হিসাবে প্রেরণ করেছি।” [সুরা সাবাঃ ২৮]
এছাড়া, আল্লাাহতায়ালা সুরা তওবাতে বলেছেন,
“নিশ্চয়ই তিনি রাসূল পাঠিয়েছেন হেদায়েত ও সত্যদ্বীন সহকারে যেন এই দ্বীন সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী হয়, যদিও মুশরিকরা তা ঘৃণা করে।” [সুরা তওবাঃ ৩৩]
নিজ দেশে ইসলামী দাওয়াতকে শক্তিশালী করা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা রক্ষায় সামর্থ্য অজর্ন করার পরই আল্লাহর রাসূল (সা) বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ আরম্ভ করেন। তিনি (সা) একে একে বিভিন্ন স্থানে তাঁর দূত পাঠাতে আরম্ভ করলেন। তাঁর শাসন-কর্তৃতের বাইরের সমস্ত আরব ভূ-খন্ডকে তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আওতায় নিয়ে এসেছিলেন। তারপর, যখন, সমস্ত হেযায অঞ্চলে তাঁর কতর্ত্বৃ প্রতিষ্ঠিত হল, তখন আরবের সীমানার বাইরের যে কোন অঞ্চলের সাথে যোগাযোগকে পররাষ্টনীতি হিসাবে বিবেচনা করা হত। যেমনঃ পারস্য বা রোমান সাম্রাজ্য। ইতিমধ্যে, হুদাইবিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এবং খায়বারে ইহুদীদের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হবার পর পুরো হেযায অঞ্চলেই মুহাম্মদ (সা)-এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারণ, কুরাইশদেরও আসলে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কোন শক্তি ছিল না। এ রকম অবস্থাতেই তিনি (সা) বহির্বিশ্বে তাঁর প্রতিনিধি দল পাঠান। যা হোক, ইতিহাস বলে, ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন দেবার জন্য নিজভূমিতে রাসূল (সা)-এর শাসন-কর্তৃত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হবার পরই তিনি (সা) বহির্বিশ্বে তাঁর প্রতিনিধি প্রেরণ করেছিলেন।
খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তনের একদিন পর রাসূল (সা) সাহাবীদের ডেকে বললেন, “হে আমার লোকসকল! নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আমাকে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণার্থে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং, ঈসা ইবন মারিয়মের হাওয়ারীদের মতো তোমরা আমার বিরুদ্ধাচারন করো না।” তখন সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, “আর কিভাবে হাওয়ারীগণ তার বিরুদ্ধাচারণ করেছিল হে আল্লাহর রাসূল?” তিনি (সা) বললেন, “তিনি তাদের আহবান করেছিলেন, যার দিকে আমি তোমাদের আহবান করছি। কিন্তু, কাউকে নিকটবর্তী কোন স্থানে প্রেরণ করা হলে সে তা মেনে নিত। অথচ, দূরবর্তী স্থানে প্রেরণ করা হলে সে তা অপছন্দ করতো এবং পিছে পড়ে থাকত।”
এরপর তিনি (সা) তাঁর সাহাবীদের বললেন যে তিনি (সা) হিরাক্লিয়াস (রোমান অধিপতি), খসরু (পারস্যের অধিপতি), আল-মাওকিস (মিশরের অধিপতি), আল-হারিছাহ আল-গাচ্ছানী (হীরার অধিপতি), আল-হারিছাহ আল-হিমইয়ারী (ইয়েমেনের অধিপতি) এবং আল-নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার অধিপতি)-কে ইসলামে আহবান জানিয়ে দূত প্রেরণ করতে চান। সাহাবারা এ কথায় সম্মত হলেন এবং রাসূল (সা) এর জন্য ”মুহাম্মদ, আল্লাহর রাসূল”কথাটি খোদাই করা একটি রুপার সীলমোহর তৈরী করলেন। এরপর, তিনি (সা) এ সমস্ত শাসকবর্গকে ইসলামের দিকে আহবান জানিয়ে তাদের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। হিরাক্লিয়াসের কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছানোর জন্য দাহিয়াহ ইবন খালিফাহ আল-কালবী, খসরুর কাছে আব্দুল্লাহ ইবন হুযাইফা আল-সাহমী, নাজ্জাশীর কাছে উমর ইবন উমাইয়া আল-দামরী, মুকাওকিসের কাছে হাতিব ইবন আবি বালতা, ওমানের বাদশাহর কাছে ’আমর ইবন আল ’আস আল-সাহমী, আল ইয়ামামাহর বাদশাহর কাছে সুলাইত ইবন ’আমর, বাহরাইনের বাদশাহর কাছে আল-’আলা ইবন আল-হাদারামী, আল-হারিছাহ আল-গাচ্ছানী, তুকহাম আল-শামের বাদশাহর কাছে সুজা ইবন ওয়াহাব আল-আসাদী এবং আল-হারিছাহ আল-হিমইয়ারীর কাছে আল-মুহাজির ইবন উমাইয়া আল-মাখযুমী কে দূত হিসাবে প্রেরণ করলেন।
প্রেরিত দূতেরা একই সাথে যাত্রা শুরু করেন এবং আল্লাহর রাসূল (সা) এর নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছান। প্রেরিত দূতেরা এসব শাসকবর্গের কাছে রাসূল (সা) এর বার্তা পৌঁছে দেন। আল্লাহর রাসুলের আহবানে বেশীর ভাগই শাসকই মোটামুটি ইতিবাচক সাড়া দেয়। আর এদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত রূঢ় ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায়। আরবের শাসকদের মধ্যে, ইয়েমেন ও ওমানের বাদশাহ্ রূঢ় প্রতিক্রিয়া জানায়। বাহরাইনের বাদশাহ ইতিবাচক সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহন করে। আর, ইয়ামামার বাদশাহ বলে, সে ইসলাম গ্রহন করতে প্রস্তুত যদি তাকে শাসক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। আল্লাহর রাসূল (সা) তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। আর, অনারব শাসকদের মধ্যে, আল্লাহর রাসুলের চিঠি পাঠ করার পর পারস্যের অধিপতি খসরু অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে সে চিঠি টুকরা টুকরা করে ফেলে। শুধু তাই নয়, হেযাযের নেতার কর্তিত মস্তক তার কাছে হাজির করার জন্য সে তার ইয়েমেনের গর্ভনর বুদহানকে নির্দেশ দেয়।
আল্লাহর রাসূল (সা)-একথা শোনার পর বলেন, “আল্লাহ যেন খসরুর রাজত্ব টুকরা টুকরা করে দেন।” এদিকে, খসরুর নির্দেশ পাবার পর ইয়েমেনের গভর্নর বুদহান ইসলামের ব্যাপারে খোজঁ খবর নেন এবং খুব দ্রুতই ইসলাম গ্রহনের ঘোষনা দেন। তাকে মুহাম্মদ (সা) ইয়েমেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। যদিও তিনি প্রকৃত অর্থে আল-হারিছাহ আল-হিমইয়ারী অর্থাৎ, ইয়েমেনের বাদশাহ ছিলেন না। আর, মিশরের অধিপতি মুকাওকিস দাওয়াতের উত্তরে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর জন্য উপহার পাঠান। নাজ্জাশীর মনোভাবও ছিল ইতিবাচক, বলা হয়ে থাকে যে, নাজ্জাশী আসলে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন। আর, হিরাক্লিয়াস আসলে রাসূল (সা) এর এ আহবানকে এত গুরুত্ব দেয়নি। না সে কোন সৈন্য পাঠানোর ব্যাপারে মনযোগী ছিল, আর না এ ব্যাপারে কিছু বলেছিল। আল-হারিছাহ আল-গাচ্ছানী যখন আরবের এ ধর্ম প্রচারককে শাস্তি দেবার জন্য সৈন্যদল পাঠানোর অনমুতি চায়, তখন সে এর উত্তরে কিছুই বলেনি বরং, গাচ্ছানীকে আল-কুদসে (জেরুজালেম) যাবার নির্দেশ দিয়েছিল।
বহির্বিশ্বে এই দাওয়াতী কার্যক্রমের ফলে, আরবের লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। তারা দলবদ্ধ হয়ে রাসূল (সা)-এর কাছে ছুটে আসে এবং ইসলাম গ্রহনের ঘোষনা দেয়। আর, অনারবদের সাথে রাসূল (সা) জিহাদ করার ঘোষনা দেন এবং এজন্য তাঁর সৈন্যবাাহিনী প্রস্তুত করতে থাকেন।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৩ (খায়বারের যুদ্ধ)
আল্লাহর রাসূল (সা) হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ১৫ দিন মদীনায় অবস্থান করেন। এরপর, তিনি (সা) সাহাবীদের খায়বার আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেন। সে সাথে তিনি (সা) এটাও বলেন যে, শুধু যারা হুদাইবিয়া প্রান্তরে তাঁর সাথে উপস্থিত ছিল তারাই যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।
বস্তুতঃ হুদাইবিয়া প্রান্তরে যাত্রা করার পূর্বেই রাসূল (সা) কুরাইশদের সাথে খায়বারের ইহুদী গোত্রগুলোর গোপন আঁতাতের খবর পেয়েছিলেন। মুসলিমদেরকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য তারা একত্রিত হয়ে গোপনে মদীনা আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিল। গোপন এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত হবার পরই তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে যুদ্ধবিরতী চুক্তি সম্পাদন করার লক্ষ্যে মক্কায় শান্তিপূর্ণ সফরের পরিকল্পনা করেন। যেন, কুরাইশ গোত্রের সাথে তাঁর অভিষ্ট সন্ধি হওয়া মাত্রই তিনি (সা) খায়বারের বিশ্বাসঘাতক ইহুদীদের শায়েস্তা করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাই, কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধবিরতী চুক্তির মাধ্যমে যখন ইহুদীরা কুরাইশদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি (সা) মুসলিমদের খায়বার আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন।
আল্লাহর রাসূল (সা) ১৬০০ মুসলিম পদাতিক ও ১০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে খায়বারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এদের সকলেই ছিল আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে নিশ্চিত। যাত্রা করার তিনদিনের মধ্যে রাসূল (সা) তাঁর দলবল সহ খায়বার পৌঁছে যান এবং ইহুদীরা তাদের উপস্থিতি টের পাবার আগেই তাদের দূর্গ ঘেরাও করে ফেলেন। যদিও মুসলিমরা রাতেই খায়বারে ইহুদীদের বসতিতে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু, তা সত্তেও তারা আক্রমণ না করে শুধু দূর্গের বাইরে বসেই রাত পার করেছিল। সকালবেলায় ইহুদী গোত্রের কৃষকরা একে একে কোদাল-কাস্তে আর ঝুড়ি হাতে দূর্গের বাইরে বের হয়ে এল। হঠাৎ, দূর্গের পাশে মুসলিমদের দেখতে পেয়ে তারা ভয়ে পেছন ফিরে দৌড়ে পালালো আর চিৎকার করে বলতে লাগল, “মুহাম্মদ এসেছে তার বাহিনী নিয়ে।” তাদের চিৎকার শুনে রাসূল (সা) বললেন, “আল্লাহু আকবর (আল্লাহ মহান)! খায়বারের ইহুদীদের ধ্বংস আসন্ন। আমরা যখন কোন এলাকায় আগমন করি তখনই তাদের দূর্ভাগ্য সূচিত হয়; তাদের সকালটা তাদের জন্য মন্দ, যাদের পূর্বে সতর্ক করা হয়েছিল।”
খায়বারের ইহুদীরা হুদায়বিয়া সন্ধির বিষয়ে অবহিত হবার পর থেকেই মুহাম্মদ (সা)-এর কাছ থেকে আক্রমণের আশঙ্কা করছিল। ইহুদীদেরকে তাদের মিত্রপক্ষ কুরাইশ থেকে বিচ্ছিন্ন করাই যে এ চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য, তারা এটা পরিস্কার ভাবে বুঝেছিল। নতুন এ বিপদজনক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ ওয়াদি আল-কুরা’ এবং তায়মা’র ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে নতুন মিত্রতা তৈরী করার প্রস্তাবও দিয়েছিল, যেন তারা একত্রিত হয়ে মদীনা আক্রমণ করতে পারে। তাহলে, তাদের নিজেদের রক্ষা করতে আরবদের থলের আর কোন দরকার হত না। বিশেষ করে, এরকম একটা বিপদজনক সময়ে যখন কুরাইশরা আল্লাহর রাসুলের সাথে শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। অন্যান্য ইহুদীরা অবশ্য মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করার সুখস্বপ্নে বিভোর ছিল। তারা আশা করেছিল যে, মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই হয়তো মুসলিমদের ইহুদী বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে। তারা মাঝে মাঝেই একে অপরকে সম্ভাব্য এ বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিত। তারা এটাও জানতো যে, মুহাম্মদ (সা) কুরাইশদের সাথে তাদের গোপন চক্রান্তের কথা জানতে পেরেছেন এবং তাদের আক্রমণ করতে একরকম প্রস্তুত হয়েই আছেন। কিন্তু, তাদের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই, মুসলিমদের কাছ থেকে আকষ্মিক এ আক্রমণের জন্য তারা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। ফলে, সব পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তারা ঘাতাফান গোত্রের সাহায্য চাইতে বাধ্য হল। তারা তাদের অবস্থানকে সুরক্ষিত করতে ও মুসলিমদের আক্রমণকে প্রতিহত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, মুসলিম সেনাবাহিনীর ত্বড়িৎ আক্রমণের মুখে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
অবশেষে, তারা মরিয়া হয়ে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সাথে সমঝোতা করার শেষ চেষ্টা করল। তিনি (সা) তাদের জীবন ভিক্ষা দিলেন। শুধু তাই নয়, মুহাম্মদ (সা) তাদের নিজ নিজ গৃহে থাকারও অনুমতি দিলেন। বিজয়ের নীতি অনুসারে সিদ্ধান্ত হল যে, ইহুদীদের জমিজমা ও আঙ্গুরের বাগান মুহাম্মদ (সা)-এর অধিকারে থাকবে। ইহুদীরা তাদের কৃষিক্ষেত ও বাগানে কাজ করতে পারবে তবে, বাৎসরিক উৎপাদিত ফসল ও ফলমূলের অর্ধেক মুসলিমদের দিতে হবে। শেষপর্যন্ত তারা মুহাম্মদ (সা)-এর এ সকল শর্ত মেনে নিয়েই সেখানে বসবাস করতে সম্মত হয়।
এরপর, মুহাম্মদ (সা) সাহাবীদের নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন এবং পরবর্তী বছর কাযা উমরাহ্ আদায় করার পূর্ব পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। খায়বারে ইহুদীদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব খর্ব করে ইসলামের শাসন-কর্তৃতের কাছে ইহুদীদের নতি স্বীকার করানোর মাধ্যমে বিপদজনক উত্তরাঞ্চল থেকে আল-শাম পর্যন্ত এলাকাকে রাসূল (সা) নিরাপদ এলাকায় পরিণত করেন। যেভাবে, তিনি (সা) হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের দক্ষিনাঞ্চলকে করেছিলেন বিপদমুক্ত। প্রকৃতপক্ষে, রাসূল (সা) এই সব কর্মকান্ডই সমস্ত আরব ভূ-খন্ড ও বর্হিবিশ্বে ইসলামের আহবানকে প্রসারিত করার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২২ (হুদাইবিয়ার সন্ধি)
এভাবে, আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় হিজরতের পর একে একে ছয়টি বছর পার হয়ে যায়। ইতিমধ্যে, রাসূল (সা) মদীনায় ইসলামী সমাজের সার্বিক সুসংহত অবস্থা এবং শত্রু মুকাবিলায় তাঁর সৈন্যবাহিনীর শক্তিসামর্থ্য সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যান। আর, ইসলামী রাষ্ট্রও সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে অন্যতম শক্তি হিসাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু, তা সত্তেও, রাসূল (সা) তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারে নতুন নতুন পদক্ষেপের কথা চিন্তা করতে থাকেন, যাতে একই সাথে ইসলামের আহবানও হয় প্রতিনিয়ত শক্তিশালী, আর শত্রুপক্ষ হয় আরও দূর্বল।
এরমধ্যে, রাসূল (সা) এর কাছে সংবাদ পৌঁছে যে, খায়বার ও মক্কার লোকেরা একত্রিত হয়ে আবারও মুসলিমদের আক্রমণ করার ফন্দি আঁটছে। এ খবর শোনার পর, মক্কার লোকদের নিবৃত করার জন্য তিনি (সা) একটি চমৎকার পরিকল্পনা করেন। এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল খায়বারের ইহুদীদেরকে তাদের মিত্র কুরাইশ গোত্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং একই সাথে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, যাতে সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে রাসূল (সা) এর দাওয়াতী কার্যক্রমের পথ মসৃণ হয়ে যায়। এ লক্ষ্যে, তিনি (সা) তাঁর সাহাবীদের সহ পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করার উদ্দেশ্যে মক্কা যাবার পরিকল্পনা করেন। তিনি (সা) জানতেন যে, যেহেতু আরব গোত্রগুলো পবিত্র মাসে যুদ্ধ করে না, সেহেতু তাঁর জন্য এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। এছাড়া, তিনি (সা) এটাও জানতেন যে, ইতিমধ্যে কুরাইশদের ঐক্যে ফাটল ধরেছে এবং মুসলিমদের সম্পর্কে তাদের মনে যথেষ্ট পরিমাণ ভীতিও জন্মেছে। সুতরাং এ পরিস্থিতিতে, মুসলিমদের ত্বড়িৎ বেগে আক্রমণ করার আগে তারা অবশ্যই দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে। এ সমস্ত কিছু চিন্তা-ভাবনা করেই তিনি (সা) হজ্জ্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, যদি কুরাইশরা তাঁকে উমরাহ করতে বাঁধা দেয়, তাহলে তিনি (সা) এটাকে কুরাইশদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন। আর, এর মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের আহবানকেও জনসাধারনের কাছে অনেক গ্রহনযোগ্য করতে পারবেন।
এ সমস্ত সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে, আল্লাহর রাসূল (সা) যুল কা’দার পবিত্র মাসে হজ্জ্ব করার ঘোষনা দেন এবং আরবের অন্যান্য গোত্রগুলোকেও তাঁর সাথে শান্তিপুর্ণ এ সফরে অংশ নিতে আহবান করেন। বস্তুতঃ তিনি (সা) যে এবার শুধু হজ্জের উদ্দেশ্যেই মক্কা যাচ্ছেন, আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে নয়, এ বার্তা সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্যই তিনি (সা) আরব গোত্রগুলোকে তাঁর সাথে এ পবিত্র কাজে শরীক হতে আহবান করেন। এমনকি, যারা তাঁর দ্বীনের অর্ন্তভূক্ত নয় অর্থাৎ অমুসলিম গোত্রগুলোকেও তিনি (সা) তাঁর সঙ্গী হতে আহবান জানান। যাতে সকলেই পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারে যে, তাঁর যুদ্ধ করার কোন অভিপ্রায় নেই।
এ সফরে রাসূল (সা) নিজে তাঁর মাদী উট কুসউয়া’র পিঠে চড়ে নেতৃত্ব দেন এবং ১৪০০ সাহাবী ও ৭০ টি উট সহ মদীনা ত্যাগ করেন। আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবা সফরের এই শান্তিপূর্ণ মনোভাব সকলকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে তিনি (সা) ইহরাম বাঁধা অবস্থায় যাত্রা শুরু করেন। মদীনা থেকে ছয় বা সাত মাইল দূরত্বে যুল হালিফাহ্ নামক জায়গায় পৌঁছালে অন্যান্য সাহাবীরাও ইহরাম বাঁধেন এবং ইহরামের কাপড় পড়েন। তারপর, তারা আবার মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কুরাইশরা পূর্বেই শুনেছিল যে, মুহাম্মদ (সা) হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা দিকে আসছেন। কিন্তু, তারা এটা ভেবে ভীত হয় যে, হয়তো মক্কায় প্রবেশের জন্য এটা মুহাম্মদদের নতুন কোন চাল। এ সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে না পেরে তারা শেষ পর্যন্ত মক্কা প্রবেশকালে মুহাম্মদ (সা)-কে বাঁধা দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ কাজে কুরাইশরা খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ ও ইকরামাহ্ ইবন আবি জাহল এর নেতৃত্বে দুইশত দুর্দান্ত অশ্বারোহীর একটি দলকে নিযুক্ত করে। মুশরিকদের এ দলটি মদীনা থেকে আগত হজ্জ্বযাত্রীদের বাঁধা প্রদানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। ধি তুহা নামক স্থানে পৌঁছে তারা যাত্রা বিরতী করে এবং হজ্জ্বযাত্রীদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এদিকে, রাসূল (সা) উসফান গ্রামে প্রবেশ করলে কুরাইশদের প্রেরিত এ বাহিনী সম্পর্কে খবর পান। এ গ্রামের কা’ব নামের এক ব্যক্তিকে রাসূল (সা) কুরাইশদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় যে, “কুরাইশরা আপনার আগমনের সংবাদ পেয়ে, বাঘের চামড়া পরিধান করে দুগ্ধবতী উটের পিঠে আপনাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তারা ধি তুহায় যাত্রা বিরতী করে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে এবং প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তাদের সাথে মুকাবিলার আগপর্যন্ত তারা আপনাকে কোনভাবেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। তাদের অশ্বারোহী দলের সাথে রয়েছে খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ, যাকে তারা আগে থেকেই কুরা’আল ঘামিম এলাকায় পাঠিয়ে দিয়েছে।”উসফান থেকে কুরা’আল ঘামিম এর অবস্থান ছিল আট মাইল দূরত্বে।
একথা শোনার পর রাসূল (সা) বললেন, “ধ্বংস হোক কুরাইশরা! যুদ্ধ তাদেরকে আসলে গ্রাস করেছে। কি তাদের এমন ক্ষতি হত যদি তারা আমাদের ও অন্য গোত্রগুলোকে আমাদের হালে ছেড়ে দিত? তাদের অন্তরের অভিলাষ হল, যদি তারা আমাকে হত্যা করতে পারত! যদি আল্লাহতায়ালা আমাকে বিজয়ী করেন তাহলে তারা ইসলামে দলে দলে প্রবেশ করবে। যদি তারা তা না করে তবে শক্তি অর্জন করার পর তারা আমার সাথে যুদ্ধ করতো। সুতরাং, তারা আসলে চায় কি? আল্লাহর কসম, আল্লাহতায়ালা যে কাজের জন্য আমাকে নিযুক্ত করেছেন তার জন্য আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতেও পিছ পা হব না। হয় আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাব।”
এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর পরিকল্পনার উপরই অটল থাকলেন এবং গভীর ভাবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কারণ, এবারে তাঁর কৌশল ছিল শান্তিপূর্ণ এবং যুদ্ধের কোন প্রস্তুতি নিয়েও তিনি (সা) আসেননি। কিন্তু, তাঁর যুদ্ধ করার ইচ্ছা না থাকলেও কুরাইশদের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা এবং এ উদ্দেশ্যেই তারা দলবল পাঠিয়েছে। সুতরাং, তিনি (সা) ভাবতে লাগলেন, তাঁর কি মদীনায় ফিরে যাওয়া উচিত, নাকি পূর্বপরিকল্পনা বাতিল করে যুদ্ধ করা উচিত? তিনি (সা) মুসলিমদের ঈমান সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন। তিনি (সা) এটাও জানতেন যে, যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন পথ যদি তাঁদের জন্য খোলা না থাকে তাহলে মুসলিমরা নির্দেশ পাওয়া মাত্র যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে এতটুকু পিছ পা হবে না।
যাই হোক, অনেক চিন্তা ভাবনার পর রাসূল (সা) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁর আশঙ্কা অনুযায়ী যদি তাঁকে হজ্জ্ব করতে বাঁধা দেওয়াও হয় তবুও তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়েই সমস্ত ব্যাপারটি ফয়সালা করবেন। এ ব্যাপারে তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে কোনরকম সংঘর্ষে যাবেন না বা বিরূপ পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক হজ্জ্বও করবেন না। কারণ, এবার তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বেরও হননি বা আক্রমণ করার কথা চিন্তাও করেননি। এছাড়া, এবার তাঁর শান্তিপূর্ণ এই পরিকল্পনার প্রকৃত উদ্দেশ্যই ছিল ইসলামের আহবানের মহানুভবতা ও সৌন্দর্যকে কুরাইশদের কাছে তুলে ধরা এবং ইসলামের পক্ষে মক্কায় জনমত তৈরী করা। আর, কুরাইশদের নির্বোধ গোর্য়াতুমি, পথভ্রষ্টতা ও ভয়ঙ্কর আক্রমণাত্মক মনোভাব থেকে ইসলাম যে কতো উপরে সেটাও মক্কার সমাজের মানুষের কাছে তুলে ধরা। কারণ, ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রমকে সঠিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু তাই নয়, সমাজে ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরীর মাধ্যমেই ইসলামী দাওয়াতের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে, ফলে ইসলাম বিজয়ী শক্তি হিসাবে আর্বিভূত হয়। তিনি (সা) ভেবে দেখলেন যে, তিনি (সা) যদি যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে মক্কায় ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরীর পরিকল্পনাটা ভেস্তে যেতে পারে। সুতরাং, তিনি (সা) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কোন অবস্থাতেই তিনি (সা) কোনরকম সংঘর্ষে যাবেন না এবং তাঁর শান্তিপূর্ণ পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করবেন।
এ পর্যায়ে, আল্লাহর রাসূল (সা) গভীর ভাবে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে রাসূল (সা) এর দক্ষতা ও বিচক্ষনতা ছিল অতুলনীয়। এ বিচক্ষনতা ও দূরদর্শিতা থেকেই তিনি (সা) তাঁর শান্তিপূর্ণ পুর্বপরিকল্পনায় অটল থাকতে চাচ্ছিলেন। তিনি (সা) কোনভাবেই চাচ্ছিলেন না তার পরিকল্পনা ভেস্তে যাক কিংবা জনমত তৈরী করার চমৎকার এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাক। কারণ, তাঁকে যদি কোন কারণে যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে তাঁর পরিকল্পনা বুমেরাং হয়ে তাঁর কাছেই ফিরে আসবে। তখন কুরাইশরা এ চমৎকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সমস্ত আরবে ভয়ঙ্কর প্রচারনা চালাবে। পরিণতিতে জনমত চলে যাবে তাঁর বিপক্ষে। তিনি (সা) মুসলিমদের ডাকলেন এবং বললেন, “কেউ কি আছে যে আমাদের এমন এক রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেতে পারবে সে রাস্তায় কুরাইশ বাহিনীর সাথে মুকাবিলা হবে না?” মুসলিমদের মধ্য হতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে এগিয়ে এল এবং তাদেরকে পাহাড়ের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ন পাথুরে গিরিপথের ভেতর দিয়ে নিয়ে চললো যে পর্যন্ত না তারা হুদাইবিয়া নামে মক্কার নিম্নবর্তী এক উপত্যকায় পৌঁছাল। এখানেই রাসূল (সা) তাঁর দলবল সহ অবস্থান নিলেন। খালিদ ও ’ইকরামাহ্ সৈন্যদল মুহাম্মদ (সা) এর দলবলকে হুদাইবিয়া প্রান্তরে দেখে আতঙ্কিত হয়ে মক্কা রক্ষায় দ্রুত সেখানে ফিরে গেল। মুসলিম বাহিনীর এই দুঃসাহসী পদক্ষেপ দেখে পৌত্তলিকদের মেরুদন্ডে যেন আতঙ্কের স্রোত প্রবাহিত হয়ে গেল। তারা নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না, কিভাবে মুসলিমরা এতো দক্ষতা ও চতুরতার সাথে তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের অরক্ষিত সীমান্তে এসে উপস্থিত হল। এই পুরিস্থিতিতে, কুরাইশরা মক্কার ভেতর সূদৃড় অবস্থান নিল আর রাসূল (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে অবস্থান নিলেন হুদাইবিয়ার প্রান্তরে। দুইপক্ষ এভাবে মুখোমুখি অবস্থায় দিন পার করতে থাকল এবং প্রত্যেকেই ভাবতে লাগলো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা। মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবল যে, কুরাইশরা তাদের কোন অবস্থাতেই হজ্জ্ব পালন করতে দেবে না। বরং, তাদের সাথে যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নেবে। তারা ভেবে দেখল যে, এ অবস্থায় তাদের আসলে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ ব্যতীত কোন পথ খোলা নেই। তাই, তাদের উচিত শত্রুপক্ষের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়া, তারপর হজ্জ্ব পালন করা। এর ফলে, কুরাইশদেরকে চরম একটা শিক্ষা দেয়া যাবে।
ইতিমধ্যে, কুরাইশরাও মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার স্বপ্ন বিভোর হল। এমনকি, যদি তারা যুদ্ধ করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তবুও। কিন্তু, খুব শীঘই্র তাদের এ সব সুখ স্বপ্ন বুদবুদের মতো মিলিয়ে গেল। কারণ, তারা জানত মুখোমুখি হবার জন্য মুসলিমরা হচ্ছে সবচাইতে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ। তাই, তারা শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের পক্ষ থেকেই প্রথম পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।
প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে, আল্লাহর রাসূল (সা) ইহরাম বাঁধা অবস্থায় পূর্ব পরিকল্পনার উপরই অটল থাকলেন। হুদাইবিয়ার প্রান্তরে তিনি (সা) শুধু দৃঢ়তার সাথে অবস্থান গ্রহন করলেন। অপেক্ষা করতে লাগলেন কুরাইশদের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। তিনি (সা) এটা খুব ভাল করেই জানতেন যে, কুরাইশরা তাঁর ভয়ে অত্যন্ত ভীত এবং খুব শীঘ্রই তারা তাঁর সাথে হজ্জ্ব পালন বিষয়ে দেনদরবার করার জন্য প্রতিনিধি পাঠাবে। সুতরাং, তিনি (সা) ধৈর্য্য সহকারে কুরাইশদের প্রতিনিধি দলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এরপর, কুরাইশরা প্রথমে খুযায়া গোত্রের কিছু লোক সহ বুদাইল ইবন ওরাকা কে রাসূল (সা) এর কাছে পাঠায়। প্রতিনিধি দল এসে জানতে চায় যে, রাসূল (সা) আসলে কি জন্য মক্কায় আগমন করেছেন। কিছুক্ষন কথাবার্তার পরই তারা নিশ্চিত হয়ে যায় যে. মুসলিমদের মক্কা আক্রমণ করার আসলে কোন উদ্দেশ্য নেই। বরং, তারা পবিত্র কাবাঘরের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্যই মদীনা থেকে যাত্রা করেছে।
প্রতিনিধি দল কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে ঘটনা বর্ণনা করে এবং পুরো ব্যাপারটি তাদের বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু, কুরাইশরা তাদের কথা অবিশ্বাস করে এবং বলে যে, তারা মুহাম্মদ (সা) এর কথায় প্রভাবিত হয়ে গেছে। কুরাইশরা এরপর আরেকটি প্রতিনিধি দল পাঠায়, তারাও তাদের কাছে এসে একই কথাই বলে। এরপর, কুরাইশরা আল-আহবাস (আবিসিনিয়ার অধিবাসী) গোত্রের প্রধান আল-হুলাইসকে রাসূল (সা) এর সাথে দেনদরবার করার জন্য পাঠায়। কুরাইশরা একরকম নিশ্চিত ছিল যে, আল-হুলাইসের মুহাম্মদ (সা) কে নিবৃত করতে পারবে। আসলে, রাসূল (সা) এর বিরুদ্ধে হুলাইসকে ক্ষেপিয়ে তোলাই ছিল তাদের হুলাইসকে পাঠানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য। তারা ভেবেছিল, হুলাইস যখন রাসূলুল্লাহর সাথে কোন মীমাংসায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে, তখন মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি তার ঘৃণা আরও বেড়ে যাবে। ফলে, সে মুহাম্মদ (সা) এর আক্রমণ থেকে মক্কা রক্ষা করার ব্যাপারে তার মনোভাব আরও দৃঢ় হবে। যা হোক, মুহাম্মদ (সা) যখন হুলাইসের আসার কথা শুনলেন তিনি (সা) তাদের কুরবানীর পশুগুলোকে মুক্ত করে দিতে বললেন যেন সে বলতে পারে মুসলিমরা হজ্জ্বের জন্যই এসেছে, যুদ্ধের জন্য নয়।
আল-হুলাইস উপত্যকার পাশ থেকে আগত কুরবানীর পশুগুলোকে তার পাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখল। সে আরও দেখল উমরাহ করার জন্য মুসলিমদের প্রস্তুত করা তাঁবুগুলো হজ্জ্বের মতো পবিত্র ইবাদতের আমেজে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। তাদেরকে দেখে মনেও হচ্ছে না যে, তারা যুদ্ধ করতে এসেছে। এ সব কিছু দেখে সে এতো অভিভূত হল যে, সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে, মুসলিমরা যুদ্ধ করতে নয় বরং হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যেই এসেছে। এমনকি সে মুহাম্মদ (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ না করেই কুরাইশদের কাছে ফিরে গেল এবং তাদেরকে সবকিছু বিস্তারিত বর্ণনা করল। শুধু তাই নয়, ফিরে এসে সে কুরাইশদের ধমক দিয়ে বলল, যেন তারা মুহাম্মদ (সা) এবং কাবার মাঝে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। আর, মুসলিমদের নির্বিঘ্নে হজ্জ্ব পালন করতে দেয়া হয়। এর ব্যতিক্রম হলে, সে তাঁর সৈন্যদল প্রত্যাহার করে নেবে। কুরাইশরা তাদের উদ্যত স্বরকে নমনীয় করে হুলাইসকে শান্ত করল। তারা হুলাইসের কাছে আরও ভাল কোন প্রস্তাবের জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নিল। হুলাইস এতে সম্মতি দিলে তারা ’উরওয়া ইবন মাস’উদ আল-ছাকাফিকে পরবর্তী প্রতিনিধি হিসাবে পাঠাল এবং তারা ছাকাফিকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করল যে, তারা তার দেয়া সিদ্ধান্তকেই মেনে নেবে। ’উরওয়া ইবন মাস’উদ রাসূল (সা) এর কাছে গিয়ে তাকে হজ্জ্ব না করে মদীনার ফেরত যাবার অনুরোধ করল। কিন্তু, তার সে চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল।
একই সাথে, এটাও স্বীকার করল যে, মুহাম্মদ (সা) এর অবস্থানই সঠিক। তারপর সে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বললো, “হে কুরাইশরা! আমি খসরুর দরবারে গিয়েছি, কায়সারের দরবারেও গিয়েছি, গিয়েছি নাজ্জাশীর দরবারেও। কিন্তু, পৃথিবীর কোথাও আমি এমন কোন বাদশাহ্ দেখিনি যিনি মুহাম্মদের চাইতে বেশী তাঁর সঙ্গীদের ভালোবাসা পেয়েছেন। যখন তিনি ওজু করেন তখন তাঁর সাহাবারাও সাথে সাথে তা করার জন্য দৌড়ে যায়। যদি তাঁর একটা চুলও পড়ে যায় তবে তারা তা কুড়াবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছুটে যায়। আমার ধারণা, তারা কোন অবস্থাতেই মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করবে না। সুতরাং, তোমরা কি করবে তা তোমরা নিজেরাই ঠিক কর।”
কিন্তু, উরওয়া ইবন মাস’উদের এ দ্বিধাহীন বক্তব্য শুধু মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি কুরাইশদের বিদ্বেষ, ঘৃণা আর প্রতিহিংসাই বৃদ্ধি করল। তাদের অন্ধ গোঁর্য়াতুমি ও মিথ্যা অহঙ্কার পরবর্তী মধ্যস্থতার সকল পথকে রুদ্ধ করে দিল। তাদের মধ্যকার আলাপ-আলোচনার আর কোন মূল্যই থাকল না। এরপর, রাসূল (সা) তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি (সা) ভাবলেন, হয়ত কুরাইশ প্রতিনিধিরা তাঁর সাথে আলোচনা করার ব্যাপারে আতঙ্ক বোধ করছে। তাই তিনি (সা) তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠালেন এবং আশা করলেন হয়ত সে কুরাইশদের সাথে মধ্যস্থতা করতে সমর্থ হবে। কিন্তু, কুরাইশরা রাসূল (সা) এর প্রতিনিধিকে বহনকারী উটের পায়ের রগ কেটে ফেলল এবং দূতকে হত্যা করতে উদ্যত হল। সৌভাগ্যবশতঃ আল-আহবাসের সেনাদল তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসল। মুসলিমদের প্রতি কুরাইশদের বিদ্বেষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং তারা এক পর্যায়ে মুসলিমদের তাঁবুতে পাথর নিক্ষেপ করার জন্য তাদের বখাটে ছেলেদের লেলিয়ে দেয়। কুরাইশদের এ হীন আচরনে মুসলিমরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু রাসূল (সা) তাদেরকে শান্ত করেন। পরদিন, কুরাইশরা মুসলিমদের ছাউনী ঘেরাও করে তাদের প্রহার করার জন্য ৫০ জনের একটি দল পাঠায়। কিন্তু, মুসলিমরা তাদের বন্দী করে রাসূল (সা)এর কাছে নিয়ে যায়। রাসূল (সা) তাদের ক্ষমা করে দেন এবং তাদের ছেড়ে দেবার নির্দেশ দেন।
মুহাম্মদ (সা) এ মহানুভব আচরন মক্কাবাসীদের প্রচন্ড ভাবে নাড়া দেয় এবং এরপর তাদের মুহাম্মদ (সা) এর দাবীর ব্যাপারে আর কোনই সন্দেহ থাকে না। তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, মুহাম্মদ (সা) আসলে প্রথম থেকে সত্য কথাই বলে আসছেন। এ ঘটনা তাদের পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দিল যে, মুহাম্মদ (সা) আসলে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যেই এসেছেন, যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে নয়। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে, মুহাম্মদ (সা) মূলতঃ মক্কার জনসাধারনের জনমত তাঁর নিজের পক্ষে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন। এরফলে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, তিনি (সা) যদি তাঁর দলবল নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে চান আর কুরাইশরা যদি তাদের মক্কা প্রবেশ কালে বাঁধা দিতে চায়, তবে মক্কার জনগণ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলোই মুহাম্মদ (সা) এর সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং মুসলিমদের সমর্থন করবে। সুতরাং, এ পর্যায়ে কুরাইশরা তাদের উদ্দেশ্যমূলক প্ররোচনা থেকে নিজেদের বিরত করল এবং খুব গুরুত্বের সাথে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে মনোযোগ দিল। রাসূল (সা) এরপর আরেকজন দূতকে তাঁর পক্ষ থেকে কুরাইশদের নিকট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তিনি (সা) ওমর ইবন খাত্তাবকে মক্কার যাবার নিদের্শ দিলেন। কিন্তু ওমর (রা) তাঁকে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি কুরাইশদের কাছে আমার জীবননাশের আশঙ্কা করছি। কারণ, এখন আমাকে নিরাপত্তা দেবার জন্য বনু আদি ইবন কা’ব আর মক্কায় নেই। আর আপনি কুরাইশদের সাথে আমার শত্রুতা এবং তাদের প্রতি আমার রূঢ় ব্যবহার সম্পর্কেও জানেন। আমি এক্ষেত্রে, আমার পরিবর্তে উসমান ইবন আফফানের নাম প্রস্তাব করতে চাই, যাকে পাঠানো আমার থেকেও বেশী ফলপ্রসু হবে।”
ওমর (রা) এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে রাসূল (সা) উসমান ইবন আফফানকে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেন। উসমান (রা) মক্কায় গিয়ে আল্লাহর রাসুলের বার্তা কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেন। তারা তাঁকে কাবাঘর তাওয়াফ করার প্রস্তাব দিয়ে বলে, “তুমি যদি কাবাঘর প্রদক্ষিন করতে চাও তবে তা করতে পার।”উত্তরে উসমান (রা) বলেন, “আমি ততক্ষন পর্যন্ত তা করব না যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহর রাসূল (সা) তা করেন।”উসমান (রা) এরপর কুরাইশদের সাথে শান্তিচুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন, কিন্তু প্রথম পর্যায়ে কুরাইশরা তা পুরোপুরি প্রত্যাখান করে। শান্তিুচুক্তির বিষয়ে এই আলোচনার ক্ষেত্র ছিল ব্যাপক এবং সে সময়ে তা ছিল অত্যন্ত কঠিন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা শান্তি চুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখানের অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে থাকে এবং এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়ায় যাতে উভয়পক্ষের কাছেই তা গ্রহনযোগ্য হয়। একসময় তারা ’উসমান (রা) এর সাথে আলোচনা করতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে থাকে এবং তাঁর সাথে একত্রে বসেই অনেক বাকবিতন্ডার পর অবশেষে জটিল এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় খুঁজে বের করে। যার ফলশ্রুতিতে, মুহাম্মদ (সা) এর সাথে তাদের যুদ্ধাবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে।
এদিকে উসমান (রা) যখন মক্কায় তাঁর অবস্থানকে দীর্ঘায়িত করেন এবং মক্কার রাস্তাঘাটের কোথাও তাকে দেখা যায়না, তখন মুসলিম শিবিরে রটে যায় যে, কুরাইশরা তাঁকে হত্যা করেছে। এ সংবাদ শোনার পর, মুসলিমরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যায় এবং কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। এ পর্যায়ে, রাসূল (সা) আবার নতুন করে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেন। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর কাছে মনে হয়, দূত হিসাবে মক্কায় গমনের পরও পবিত্র মাসে উসমানকে হত্যা করে কুরাইশরা তাঁর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এ কারণে, তিনি (সা) ঘোষনা দেন, “শত্রুপক্ষের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা এ স্থান ত্যাগ করব না।”তিনি (সা) সাহাবীদের সকলকে নিয়ে একটি গাছের নীচে দাঁড়ান এবং এ স্থানেই তাদের সকলের কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহন করেন। আমৃত্যু লড়ার শপথ করে তারা রাসূল (সা) এর নিকট বাই’য়াত করেন। বাই’য়াত গ্রহন সম্পন্ন হলে, রাসূল (সা) তাঁর এক হাত দিয়ে আরেক হাত শক্ত করে ধরে উসমান (রা) এর পক্ষে এমন ভাবে বাই’য়াত করেন যে, মনে হয় যেন উসমান (রা) তাঁদের সাথেই আছেন। এ বাই’য়াত পরবর্তীতে বাই’য়াত আল-রিদওয়ান নামে পরিচিত হয়। এসম্পর্কে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন,
“নিশ্চয়ই, আল্লাহ ঈমানদারদের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন যখন তারা গাছের নীচে তোমার নিকট বাই’য়াত করেছিল। তিনি জানতেন তাদের হৃদয়ে কি আছে এবং তিনি তাদের জন্য (তাদের অন্তরে) সাকীনাহ (প্রশান্তি ও স্বস্তি) দান করলেন। এবং বিজয়কে নিকটবর্তী করে তিনি তাদের পুরস্কৃত করলেন।” [সুরা ফাতহ্ঃ ১৮]
যখন বাই’য়াত গ্রহন সম্পন্ন হল এবং মুসলিমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল, এ সময়ে মুসলিম শিবিরে খবর পৌঁছাল যে, উসমান (রা) কে হত্যা করা হয়নি। এর পরপরই উসমান (রা) ছাউনীতে ফিরে আসেন এবং কুরাইশদের প্রস্তাব সম্পর্কে রাসূল (সা) কে অবহিত করেন। এরপর, আবারও মুহাম্মদ (সা) এবং কুরাইশদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়। এরপর, কুরাইশরা সুহাইল ইবন আমরকে দুই শিবিরের মধ্যে যুদ্ধবিরতী চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য রাসূল (সা) এর নিকট দূত হিসাবে প্রেরণ করে। কুরাইশদের দূত সেইসাথে মুসলিমদের হজ্জ্ব এবং উমরাহ্ পালন বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করে। আলোচিত দ্বিতীয় বিষয়টিতে তাদের শর্ত ছিল যে, মুসলিমদের এবার হজ্জ্ব না করেই ফিরে যেতে হবে। কিন্তু, পরবর্তী বছরে তাদের হজ্জের অনমুতি দেয়া হবে।
আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের এ সমস্ত চুক্তি মেনে নিয়েই তাদের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। কারণ, তিনি (সা) বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি (সা) যে উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন ইতিমধ্যে তা অজির্ত হয়ে গেছে। সুতরাং, তিনি (সা) এবার পবিত্র ঘর তাওয়াফ করেন বা না করেন তাতে আর কিছুই আসে যায় না। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের পথকে মসৃণ ও বাধামুক্ত করতে এবং ইসলামের সুমহান বাণী আরবের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে তিনি (সা) চেয়েছিলেন খায়বারের বিশ্বাসঘাতক ইহুদী গোত্রগুলোকে পুরোপুরি কুরাইশদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে। কারণ, ইহুদী আর কুরাইশদের এই মৈত্রীই প্রকৃত অর্থে তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারের পথে বিরাট বাঁধা সৃষ্টি করেছিল আর ইসলাম প্রচার-প্রসারের পথকে করেছিল রুদ্ধ। এ লক্ষ্যেই তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে একটি যুদ্ধবিরতী চুক্তি স্বাক্ষর করতে উদগ্রীব ছিলেন যেন কুরাইশদের পক্ষ থেকে কোন ধরনের আক্রমণের আশঙ্কা না থাকে। আর, হজ্জ্ব কিংবা উমরাহ্ পালন করা আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ, সেটা তিনি (সা) পরবর্তী বছরই করতে পারতেন।
যুদ্ধবিরতী চুক্তি এবং এর শর্তাবলীর ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (সা) সুহাইল ইবন ’আমরের সাথে দীর্ঘ সময় যাবত সুক্ষাতিসুক্ষ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আসলে, এই আলোচনা ছিল খুবই ব্যাপক এবং একটা সমঝোতার জায়গায় এসে দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার বিষয়টি ছিল খুবই কঠিন কাজ। একেক সময় মনে হচ্ছিল আলোচনা ফলপ্রসু হবে না এবং পুরো ব্যাপারটিই ভেস্তে যাবে। আল্লাহর রাসুলের প্রচন্ড পরিমান রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা না থাকলে হয়তো পুরো ব্যাপারটি ভেস্তেও যেত। মুসলিমরা খুব কাছ থেকেই পুরো ব্যাপারটি পর্যবেক্ষন করে এবং তারাও ভাবে যে, রাসূল (সা) উমরাহ্ করার বিষয়েই দেনদরবার করছেন। কিন্তু, রাসূল (সা) এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের সাথে যুদ্ধবিরতী চুক্তি সম্পাদন করা। যে জন্য, চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে মুসলিমরা বিরক্ত হলেও আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে এটাকেই আল্লাহর রহমত মনে করেন। ফলে, তিনি (সা) চুক্তির প্রতিটি শর্ত ও স্বল্পমেয়াদী সুযোগসুবিধার দিকে লক্ষ্য না করে, সুহাইলের ইচ্ছা অনুযায়ীই আলোচনা চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত, কিছু নির্দিষ্ট শর্তাবলীর ভিত্তিতে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধবিরতী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির শর্তাবলী মুসলিমদের অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও রাগান্বিত করে। তারা অপমানজনক এ চুক্তি প্রত্যাখান করে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করাকেই শ্রেয় মনে করে এবং এ জন্য রাসূল (সা) কে বারবার অনুরোধও করে। চুক্তির শর্ত দেখে ওমর (রা) লাফিয়ে উঠে যায় এবং আবু বকর (রা) এর কাছে গিয়ে বলেন, “কেন আমরা এমন সব শর্ত মেনে নিচ্ছি যা আমাদের দ্বীনকে হেয় প্রতিপন্ন করছে?” ওমর (রা) তাঁর সঙ্গে রাসূল (সা) এর কাছে গিয়ে এ চুক্তি বাতিলের দাবীতে আবেদন করার জন্য আবু বকর (রা) কে জোর করতে থাকেন। আবু বকর (রা) তাঁকে এ ধরণের প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখার নিষ্ফল চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ওমর (রা) একাই রাসূল (সা) এর কাছে যান এবং চুক্তির ব্যাপারে তাঁর ক্রোধ ও উষ্মা প্রকাশ করেন। কিন্তু, এ সব কোন কিছুই রাসূল (সা) এর সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করতে পারে না। বরং, তিনি (সা) ইস্পাত কঠিন সংকল্প ও প্রচন্ড মানসিক দৃঢ়তার সাথে তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি (সা) ওমর (রা) কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূল ও তাঁর অনুগত দাস। আমি অবশ্যই তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করে কোন কাজ করব না এবং অবশ্যই তিনি আমাকে অপমানিত ও ক্ষতিগ্রস্থ করবেন না।”
চুক্তিপত্র তৈরী করার জন্য রাসূল (সা) আলী ইবন আবু তালিবকে নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে লিখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “লিখ, শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু।”এ সময় সুহাইল বাঁধা দিয়ে বলে, “থামো! আমি পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু একথা মানতে রাজী নই। বরং, তুমি লিখ, তোমার নামে, হে প্রভু”। রাসূল (সা) আলী (রা) কে তাই লিখার নির্দেশ দিলেন। তারপর তিনি (সা) বললেন, “লিখ, এটা হচ্ছে সেই চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ ও সুহাইল ইবন আমরের মধ্যে”। এ পর্যায়ে সুহাইল আবারও বাঁধা দিয়ে বললো, “থামো! যদি আমি স্বীকারই করে নিতাম তুমি আল্লাহর রাসূল, তাহলে তোমাদের আমাদের মধ্যে কোন বিরোধই থাকত না। বরং, তুমি তোমার নাম ও তোমার বাবার নাম লিখ।” রাসূল (সা) আলী (রা) কে বললেন, “লিখ, এটা হচ্ছে সেই চুক্তিপত্র, যা মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ, সুহাইল ইবন আমরের সাথে স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছে।” শুরুতে এ বাক্যগুলি লিখার পর নিম্নোক্ত শর্তাবলীর ভিত্তিতে উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিপত্র লিখা হয়ঃ
১. যুদ্ধবিরতী সময়কালে উভয়পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা কোনরকম আক্রমণাত্মক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকবে।
২. যদি কুরাইশদের মধ্য হতে কেউ ইসলাম গ্রহন করে এবং গোত্র প্রধানের অনুমতি ব্যতীত মুহাম্মদ (সা) এর নিকট পালিয়ে যায় তবে, তিনি (সা) তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন। কিন্তু, মুহাম্মদ (সা) এর নিকট থেকে যদি কেউ কুরাইশদের কাছে গমন করে তবে তারা তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।
৩. আরব গোত্রসমূহের মধ্য থেকে যে কেউ যদি স্বাক্ষরিত এ চুক্তির পক্ষে মুহাম্মদ (সা) এর মিত্র হতে চায় তবে, তা তারা পারবে। আবার, যদি কেউ কুরাইশদের মিত্র হতে চায় তবে তাও তারা পারবে।
৪. মুহাম্মদ (সা) ও মুসলিমদের এবার হজ্জ্ব না করেই মদীনায় ফিরে যেতে হবে। সামনের বছর তাদের মক্কায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কোন বাঁধা থাকবে না। তবে, তখন তারা মাত্র তিনদিন মক্কায় অবস্থান করতে পারবে। এ সময় তারা কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারবে না।
৫. এই চুক্তি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এবং এ সময়কাল হচ্ছে স্বাক্ষরিত হবার সময় থেকে পরবর্তী দশবছর।
ইতিমধ্যে, এ চুক্তির ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে প্রচন্ড অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরী হয়। তাদের এ ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ভেতর দিয়েই আল্লাহর রাসূল (সা) সুহাইল ইবন আমরের সাথে এ চুক্তি সম্পাদন করেন। মুসলিম শিবিরে দানা বেঁধে উঠা এ প্রচন্ড উত্তেজনা ও ভয়ানক অসন্তোষের মধ্যে আল্লাহর রাসূলকে রেখে সুহাইল মক্কায় ফিরে যায়। যুদ্ধ করার জন্য মুসলিমদের এতো ব্যাকুলতা ও চুক্তি স্বাক্ষরের পর তাদের চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে আল্লাহর রাসূল (সা) ভেতরে ভেতরে খুবই মর্মাহত হন এবং প্রচণ্ড অসহায় বোধ করতে থাকেন। শেষপর্যন্ত, তিনি (সা) তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামাহ্ (রা) এর কাছে তাঁর অন্তরের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট ও হতাশার কথা খুলে বলেন। উম্মে সালামাহ্ (রা) তাঁকে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! মুসলিমরা কখনোই আপনার অবাধ্য হবে না। তারা তো শুধু তাদের দ্বীন, আল্লাহর উপর তাদের অবিচল ঈমান ও আপনার আনীত বাণীর ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর। আপনি আপনার মাথা কামিয়ে ফেলুন এবং হাদীর পশুগুলোকে জবাই করে ফেলুন। দেখবেন, মুসলিমরাও সাথে সাথে আপনাকে অনুসরণ করবে। তারপর, তাদের নিয়ে আপনি মদীনায় ফিরে যান।”
উম্মে সালামাহ্ (রা) এর পরামর্শ অনুযায়ী রাসূল (সা) তাঁবু থেকে বেরিয়ে তাঁর মাথা মুড়িয়ে ফেলেন এবং উমরাহ্ আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত করে মানসিক ভাবে প্রশান্তি ও তৃপ্তি বোধ করেন। আল্লাহর রাসূল (সা) কে এ অবস্থায় দেখে মুসলিমরাও শেষপর্যন্ত নিজ নিজ পশু জবাই করার জন্য ছুটে যায় এবং মাথা মুড়িয়ে ফেলে। এরপর, রাসূল (সা) মুসলিমদেরসহ মদীনার পথে যাত্রা করেন। প্রায় অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর আল্লাহতায়ালা সুরা ফাতহ্ নাযিল করেন। আল্লাহর রাসূল সদ্য নাযিলকৃত এ সুরার পুরোটাই সাহাবীদেরকে তিলওয়াত করে শোনান। শুধুমাত্র তখনই মুসলিমরা সত্যিকার ভাবে বলতে পারে যে, হুদাইবিয়া সন্ধির মাধ্যমে আসলে মুসলিমদেরই চুড়ান্ত বিজয় অজির্ত হয়েছে।
মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার পরপরই রাসূল (সা) এবার খায়বারের ইহুদীদের সাথে চুড়ান্ত বোঝাপড়া করে আরব ভূ-খন্ডের বাইরে ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা করেন। এর মাধ্যমে তিনি (সা) ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রমকেও শক্তিশালী করার চিন্তা করেন। হুদাইবিয়া সন্ধিকে কার্যকরী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে তিনি (সা) একদিকে বর্হিবিশ্বের সাথে সম্পর্ক তৈরীর চেষ্টা করেন। আবার, অন্যদিকে, এ সন্ধির মাধ্যমেই তিনি (সা) আরব ভূ-খন্ডে দাওয়াতী কার্যক্রমের পথে বাধা হয়ে দাড়ানো কিছু ক্ষুদ্র প্রতিরোধ বলয়কে ভেঙ্গে দেন। অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদশির্তা থেকে হজ্জ্ব পালন করার উছিলায় আল্লাহর রাসূল (সা) যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছিলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে তাঁর সে পুরো পরিকল্পনাই তিনি (সা) শেষপর্যন্ত বাস্তবায়ন করেন। লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেক বাঁধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্তেও, এ চুক্তির সুবাদেই তিনি (সা) পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর প্রতিটি উদ্দেশ্য হাসিল করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর এ সমস্ত সাফল্য পরবর্তীতে সন্দেহাতীত প্রমাণ করে দেয় যে, হুদাইবিয়া সন্ধি প্রকৃত অর্থেই মুসলিমদের জন্য বিজয়ের বার্তা বহন করে এনেছে। রাসূল (সা) এর অর্জিত কিছু সাফল্য হলঃ
১. হুদাইবিয়া প্রান্তরে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা) সাধারণ ভাবে সমস্ত আরবের মধ্যে এবং বিশেষ করে কুরাইশদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপারে জনমত তৈরী করতে পেরেছিলেন। যা প্রকৃত অর্থে আরবদের দৃষ্টিতে মুসলিমদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করেছিল এবং কুরাইশদের মর্যাদাকে করেছিল ক্ষুন্ন ।
২. এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের ঈমানের দৃঢ়তা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিলেন। বস্তুতঃ হুদাইবিয়া সন্ধি সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করেছিল যে, মুসলিমদের ঈমান ইস্পাত কঠিন ও অনমনীয়। এছাড়া, দ্বীন রক্ষার খাতিরে তাদের দুঃসাহসী পদক্ষেপ ও স্বতঃস্ফুর্ত আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তও বিরল।
৩. এ ঘটনা থেকে মুসলিমরা এ শিক্ষাও লাভ করেছিল যে, ইসলাম প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে দক্ষ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক চাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
৪. এর ফলে, মক্কায় অবস্থানকারী মুসলিমরা আসলে শত্রুবুহ্যের ভেতরে থেকেই ইসলামী দাওয়াতের ছোট ছোট কেন্দ্র তৈরী করেছিল।
৫. এছাড়া, এ চুক্তির মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয়েছিল যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গৃহীত সকল পদ্ধতিই একই উৎস, সত্যবাদীতা ও ন্যায়পরায়নতার ভিত্তিতে হতে হবে। তবে, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ও প্রজ্ঞার মাধ্যমেই লক্ষ্য অর্জনের পথ নির্ধারন করতে হবে। এক্ষেত্রে, অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কৌশল হিসাবে, শত্রুপক্ষের কাছে লক্ষ্য অর্জনের উপায় ও প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখা যাবে।










