তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২সিরিয়া আক্রমনে ইউরোপের অবস্থান

বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী, ডেভিড ক্যামেরন গত ২৯শে আগষ্ট মানবিকতার দোহাই দিয়ে আবেগপ্রবন আবেদন করা সত্ত্বেও সিরিয়ায় সামরিক সংশ্লিষ্টতার জন্য সংসদীয় অনুমোদন নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। বৈশ্বিক বিষয়াদি, বিশেষ করে সিরিয়ার জন্য যখন আমেরিকা একটি জোট গঠন করতে সচেষ্ট তখন ইউরোপীয় অবস্থান (বিশেষ করে বৃটেন ও ফ্রান্স) অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। যখন আরব বসন্তের বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ঘটনাবলী ক্রমাগতভাবে বিশ্বকে কাঁপিয়ে চলছে, তখন ইউরোপ ও আমেরিকার বিভাজন ও মতানৈক্য আরো প্রকটভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।
বৃটেন ও ফ্রান্স উভয়েরই বিশ্ব ময়দানে বিভিন্ন উচ্চাকাঙ্খা রয়েছে। কিন্তু উভয়েই বিশ্বশক্তি আমেরিকা কর্তৃক পর্যদুস্ত হয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশক্তি হিসেবে উভয়কে প্রতিস্থাপন করে আমেরিকা ও সোভিয়েত রাশিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উভয় জাতিই আমেরিকার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতার চেষ্টায় রত। এক্ষেত্রে বৃটেন সবসময়ই আমেরিকার সাথে কাজ করার নীতি অবলম্বন করেছে। কখনো আমেরিকার সহযোগী শক্তি হিসেবে, পাশাপাশি কখনো আমেরিকার প্রচেষ্টাকে জটিল, পরিবর্তন কিংবা বিচ্যুত করে দেবার নিমিত্তে। যেখানেই বৃটিশ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সেখানেই তারা আমেরিকার পাশে এসে দাড়িয়েছে। আবার যেখানে তাদের স্বার্থের বিপরীত দেখতে পেয়েছে সেখানেও তারা আমেরিকার সাথে থেকেছে যাতে করে আমেরিকার পরিকল্পনা দূর্বল করে দেয়া যায়। সুতরাং, আপাত দৃষ্টিতে আমেরিকা ও বৃটেনের সম্পর্কে কোনো উত্তেজনা দেখা যায়নি। কিন্তু অভ্যন্তরে তারা সবসময়ই আমেরিকার পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জ করতে চেষ্টা করেছে। দো গলের আমলে ফ্রান্স আমেরিকাকে একটি হুমকি হিসেবে দেখতো যা প্যারিসকে বিশ্বে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। সুতরাং, সেসময় তারা প্রকাশ্যে আমেরিকার বিরোধিতা করে। তবে, নিকোলাস সারকোজি ২০০৭ এ ক্ষমতায় এসে বৃটিশ পদ্ধতি অবলম্বন করতে শুরু করে। উদাহরনসরূপ, ফ্রান্স, বৃটেন ও আমেরিকা সকলেই উত্তর কোরিয়া, ইরান ও ফিলিস্তিনের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের মতো বিভিন্ন বিষয়ের পক্ষে একসাথে কাজ করেছে। আবার, লেবানন, সুদান ও নাইজেরিয়াতে তারা একে অপরের সাথে বিরোধিতা ও প্রতিযোগিতা করেছে।
আমেরিকা, ফ্রান্স ও বৃটেনের জন্য সিরিয়া নতুন আরেক যুদ্ধক্ষেত্র। শুরুর দিকে আমেরিকা যখন বাশারকে সংস্কারের কথা বলছিল, তখন ইউরোপিয়ানরা তার উচ্ছেদের কথা বলছিল। ২০১১তে হিলারি ক্লিনটন বলেন, “যা আমি বুঝি তা হচ্ছে যে তাদের এখনো সংস্কারের কার্যক্রম নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। কেউ বিশ্বাস করেনি গাদ্দাফী তা করবে। (তবে) মানুষ আসলেই বিশ্বাস করে যে সিরিয়ার সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য সুযোগ রয়েছে। সুতরাং, আমরা আমাদের মিত্রদের সাথে এক হয়ে ক্রমাগতভাবে এ বিষয়ে জোরালো চাপ প্রয়োগ করে যেতে থাকবো।” অপরদিকে জি-৮ সম্মেলনে ডেভিড ক্যামেরন বলেন, “আসাদের হাত রক্তে রঞ্জিত। এটি অচিন্তনীয় যে এ স্বৈরাচারী এ জাতির ভবিষ্যতে কোনো ভুমিকা নিতে পারবে।” প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স সিরিয়াকে তার জন্য কেটে নেয় ও আলাওয়ীদের ক্ষমতায় রেখে তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সে তার গুরুত্ব হারাতে থাকে এবং সিরিয়া আমেরিকার প্রভাববলয়ে প্রবেশ করে।
বাশার আল-আসাদের গণহত্যার চিত্র যখন সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়, তখন আমেরিকা অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নিতে শুরু করে এবং বিরোধী পক্ষের সাথে আলোচনা শুরু করে। তবে, ২০১২তে লিওন প্যানেট্টা মার্কিন অবস্থান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেন, “আমি মনে করি যখন আসাদ প্রস্থান করবে – এবং সে প্রস্থান করবে – সে দেশের স্থিতিশীলিতা সংরক্ষন করার চেষ্টা করে। এবং সেধরনের স্থিতিশীলিতা সংরক্ষনের জন্য সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো সিকিউরিটি ফোর্সসহ সেনাবাহিনী ও পুলিশকে রক্ষনাবেক্ষন করা যাতে করে তারা নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ (That’s a key)।” সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল (যা পরে সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়েলিশনে পরিবর্তিত হয়) সবসময়ই সরকারের সাথে আলাপ চালাতে চেয়েছে যা বরাবরই মার্কিন অবস্থান ছিল। তবে, বৃটেন ও ফ্রান্স উভয়ই আমেরিকা হতে ভিন্ন ধারায় অগ্রসর হয়েছে, যেমন, ‘সিরিয়ার মিত্র’ (Friends of Syria) গ্রুপটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ইউরোপের তত্ত্বাবধানে গাস্সান হিট্টোকে প্রধান করে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় যা নির্দেশনা দেয় যে আসাদ সরকারের সাথে কোনো বোঝাপড়া হবে না। এটিই সবসময় ইউরোপের অবস্থান ছিল। তবে, এই মধ্যবর্তী সরকার সিরিয়া হতে নির্বাসিত এবং সিরিয়ার অভ্যন্তরে সাংগঠনিকভাবে দূর্বল।
বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে আমেরিকা সিরিয়ায় ফ্রান্স ও বৃটেনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাসমূহকে দূর্বল করে দেয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ, আসাদের কিছু সহচর রেখে নতুন চেহারা সম্বলিত একটি মধ্যবর্তী সরকার গঠন, ইয়েমেনি মডেল প্রয়োগ, জাতিসংঘের ব্যবহার ইত্যাদি। এসকল প্রচেষ্টার পরও সরকার এখনো টিকে আছে। (আমেরিকার বিপরীতে) ইউরোপ ক্রমাগতভাবে আসাদ সরকারের উচ্ছেদের কথা বলে আসলেও, সম্প্রতি গত ২১ আগষ্ট, আল-ঘুটায় আসাদ সরকার কর্তৃক রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে আমেরিকা তার অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে এবং দ্রুত ভুমধ্যসাগরে তার নৌবাহিনীর চারটি যুদ্ধজাহাজকে সচল করে। এই পরিবর্তিত অবস্থান বৃটেন ও ফ্রান্স কিছুটা অপ্রস্তুত করে যেহেতু আমেরিকা বরাবরই সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে বলে আসছিল। কিন্তু পরিবর্তিত এ অবস্থানের দরুন ফ্রান্স ও বৃটেন আমেরিকার হস্তক্ষেপের এ বাস্তবতা মোকাবেলা করতে বাধ্য হচ্ছে।
যদিও বৃটেন ও ফ্রান্স আপাত দৃষ্টিতে আমেরিকার সাথে এক হয়ে কাজ করে বলে মনে হয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে তারা একে অপরের প্রতিযোগী – সিরিয়া যার নতুন এক অধ্যায়। সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা বৃটেন ও ফ্রান্সের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের হৃদয়ে অবস্থিত এ জাতির উপর হস্তক্ষেপ করে ফায়দা হাসিলের মূলত নতুন এক সুযোগ নিয়ে এসেছে। অপরদিকে, আমেরিকা ইউরোপীয়দের বিভিন্ন বাধা পাশ কাটিয়ে সিরিয়াকে নিজের প্রভাববলয়ে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য কোনো ব্যপারে একমত না হলেও, সিরিয়া যাতে তাদের উভয়ের হাত থেকেই চলে না যায়, সে ব্যাপারেই তারা সকলেই একমত হবে।
প্রবন্ধটি ভু-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদনান খান এর একটি বিশ্লেষন হতে নেয়া এবং কিছুটা পরিমার্জিত
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১২ (ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা)
আল্লাহর রাসূল (সা) অবশেষে মদীনায় এসে পৌঁছালেন এবং বিপুল সংখ্যক মদীনাবাসী তাঁকে সানন্দে বরণ করে নিলো। এদের মধ্যে মুসলিম, ইহুদী ও মূর্তিপূজারী সবধরনের মানুষই ছিলো। মদীনাবাসী অধীর আগ্রহে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো এবং সকলেই সাক্ষী হতে চেয়েছিলো সেই আনন্দঘন মূহুর্তের, যখন আল্লাহর রাসূল (সা) উপস্থিত হবেন তাঁর নতুন আবাসভূমিতে। সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই মুসলিমরা তাকে ঘিরে ধরলো এবং আন্তরিক আথিতেয়তার মাধ্যমে তাঁর সেবাশ্রষশার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। বস্তুতঃ ইসলামের আহবানকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তারা তাদের জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত ছিলো।
আনসারদের মধ্যে সবাই চাচ্ছিলো যেন নবী (সা) তার গৃহেই অবস্থান করে। কিন্তু রাসূল (সা) তাঁর উটনীর রশি ছেড়ে দিলেন। উটনী নিজের ইচ্ছা মতো পথ চলতে চলতে একসময় আমর গোত্রের সন্তান সাহল ও সুহাইলের গুদামঘরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। পরবর্তীতে রাসূল (সা) এই দুই ইয়াতীম শিশুর কাছ থেকে এ জায়গাটি ক্রয় করে নেন এবং এখানেই তাঁর মসজিদ ও এর চারপাশ ঘিরে তাঁর বাসগৃহ নির্মাণ করেন। মসজিদ ও বাসগৃহ নির্মাণের ক্ষেত্রে রাসূল (সা) খুবই সহজলভ্য ও সাধারন উপকরণ ব্যবহার করায় নির্মাণ কাজ খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। মূলতঃ মসজিদটি ছিলো একটি বড় হলঘর, যার চারপাশ ইটের তৈরী দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিলো। এর ছাদের কিছু অংশ ছিলো খেজুর শাখা দিয়ে আবৃত, আর বাকীটা ছিলো খোলা। মসজিদের কিছু অংশ ব্যবহার করা হতো দরিদ্র ও গৃহহীন মানুষের আশ্রয়স্থল হিসাবে। এশার নামাজের সময় ছাড়া আর কখনোই মসজিদে আলো জ্বালানো হতো না। সাধারনত খড়ের তৈরী মশাল দিয়েই করা হতো এ আলোর ব্যবস্থা।
রাসূল (সা) এর জন্য তৈরী ঘরগুলোও মসজিদের মতোই সাধারন ছিলো, শুধুমাত্র মসজিদ থেকে একটু বেশী আলোকিত ছিলো। আল্লাহর রাসূল(সা) মসজিদ ও তাঁর গৃহ নির্মাণ এর সময়টুকুতে আবি আইয়ুব খালিদ ইবন যায়িদ আল-আনসারির গৃহে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হবার সাথে সাথেই নিজগৃহে চলে আসলেন। এখানে আসার পর, রাসূল (সা) ভাবতে লাগলেন তাঁর নতুন জীবন সর্ম্পকে, কিভাবে ইসলামী দাওয়াত এক অধ্যায় থেকে অন্য অধ্যায়ে প্রবেশ করলো, একেবারে ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরীর পর্যায় থেকে একটি কুফর সমাজের সাথে ইসলামী আদর্শের সাংঘর্ষিক পর্যায় এবং সবশেষে একটি ইসলামী সমাজ যেখানে মানুষের উপর কার্যকরী হবে ইসলামের বিধিবিধান। তিনি ভাবতে লাগলেন এ নতুন যুগের সূচনা সম্পর্কে, যা তাকে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করার পর্যায় ও অসহনীয় অত্যাচার-নির্যাতন থেকে নিয়ে এসেছে শাসন-কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা অর্জনের পর্যায়ে এবং প্রাপ্য এ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বই এখন ইসলামকে রক্ষা করবে, নিরাপত্তা দেবে এবং ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবে পৃথিবীব্যাপী। মদীনায় আসার পর পরই রাসূল (সা) মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন এবং এ মসজিদেই তিনি নামাজ পড়াতেন, সাহাবীদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ করতেন। এখানেই তিনি মদীনার জনসাধারনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতেন ও তাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করতেন। তিনি (সা) এ সকল কাজে আবু বকর (রা) ও ওমর (রা)-কে তাঁর দুই সহকারী হিসাবে নিযুক্ত করলেন, বললেন, “এ পৃথিবীতে আবু বকর ও ওমর হচ্ছে আমার দুই সহকারী”।
মুসলিমরা সাধারনত সকল বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ এবং জীবনসম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা নেবার জন্য রাসূল (সা)-এর চারপাশে সমবেত হতো। এভাবে, তিনি সদ্যগঠিত এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক এবং সেনাপতির ভূমিকা গ্রহন করলেন। তিনি (সা) মুসলিমদের সব বিষয় সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতেন, তাদের মধ্যকার বিভিন্ন ঝগড়া-বিবাদেরও ফয়সালা করতেন, নিযুক্ত করতেন মুসলিম সৈন্যবাহিনীর বিভিন্ন অংশের প্রধান এবং সেনাবাহিনীকে মদীনার বাইরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পাঠাতেন।
আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার উপস্থিত হবার দিন থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রের সূচনা করেছিলেন এবং পুরো সমাজকে পরিবর্তন করে এ রাষ্ট্রকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর উদ্যেগ নিয়েছিলেন। একই সাথে এ রাষ্ট্র রক্ষা করা ও দ্বীন ইসলামের আহবান সর্বত্র ছড়িয়ে দেবার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন প্রয়োজনীয় সৈন্যবাহিনী। বস্তুতঃ এ সবকিছুর মাধ্যমেই তিনি আল্লাহর দ্বীনকে পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত করতে সকল বস্তুগত বাঁধা সফলতার সাথে দূর করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১১ (আকাবার দ্বিতীয় শপথ)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
আকাবার প্রথম শপথ ছিলো মুসলিমদের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সাহায্য। কারণ, যদিও এ শপথের সময় মাত্র অল্পকিছু মদীনাবাসী ইসলাম গ্রহন করেছিলো, তারপরও মুসা’ব (রা) এর একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফলে মাত্র একবছরের মধ্যে মদীনাবাসীর মধ্যে প্রচলিত ভ্রান্ত ও ঘুঁণেধরা ধ্যান-ধারনা ও আবেগ-অনভূতিগুলো পরিবতির্ত হয়ে গিয়েছিলো। যা কিনা মক্কায় এর থেকে অনেক বেশী সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহন করার পরও সম্ভব হয়নি। মক্কার জনগোষ্ঠির একটা বিরাট অংশ নিজেদের ইসলামের আহবান থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলো এবং ইসলামকে সম্পূর্নভাবে প্রত্যাখান করেছিলো, ফলে, সে সমাজকে ইসলামের প্রচারিত আদর্শের সৌন্দর্য তেমন ভাবে নাড়া দিতে পারেনি। অপরদিকে, মদীনার বেশীর ভাগ মানুষই ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এবং ইসলামী চিন্তা-চেতনা ও আদর্শ সামগ্রিক ভাবে মদীনাবাসীদের হৃদয়কে প্রচন্ড ভাবে নাড়া দিয়েছিলো, যা পরিবর্তন করেছিলো তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে লালিত ক্ষয়ে যাওয়া ধ্যান-ধারনা ও চিন্তাকে। এ ঘটনা সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করে যে, যখন ব্যক্তিগত ভাবে কিছু সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে এবং তারা সমাজ ও গণমানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাদের বিশ্বাস বা ঈমান যত দৃঢ়ই হোক না কেন তা সামগ্রিকভাবে সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে না, আর না ইসলামী চিন্তা-চেতনা সমাজের মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। এ ঘটনা আরও প্রমাণ করে যে, দাওয়াতী কার্যক্রমে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহনকারীর সংখ্যা যত কমই হোক না কেন, মানুষে মানুষে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে যদি সঠিক চিন্তা-চেতনা ও আবেগ-অনুভূতির মাধ্যমে প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়, তবে এটাই সমাজকে প্রত্যাশিত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করে। এ ঘটনাগুলো থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, যখন কোন সমাজ কুফর ধ্যান-ধারনা ও আদর্শকে শক্তভাবে আকঁড়ে থাকে (যেমন ছিলো মক্কার সমাজ), এ ধরনের সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এ সব চিন্তা-চেতনাকে পরিবর্তন করে সামগ্রিকভাবে সমাজ পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। আবার অপরদিকে, যে সমাজে এ কুফর চিন্তা-চেতনার শেকড়গুলো অপেক্ষাকৃত দূর্বল (যেমনটা ছিলো মদীনার সমাজ), সে সমাজে সামগ্রিকভাবে সমাজের মানুষের ধ্যান-ধারনার পরিবর্তন ঘটানো সহজ যদিও সে সমাজে কুফর বা ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনাগুলো উপস্থিত থাকে।
মূলতঃ এ কারণেই ইসলামের আহবান মক্কাবাসীর তুলনায় মদীনাবাসীকে অনেক বেশী প্রভাবিত করেছিলো। মদীনার জনগণ এটা বুঝতে পেরেছিলো যে, তাদের মাঝে প্রচলিত ধ্যান-ধারনা ও চিন্তা-চেতনাগুলো অসাড় ও ভ্রান্ত এবং তারা জীবন সম্পর্কে এর বিকল্প কোন আদর্শ বা ধ্যান-ধারনার সন্ধান করছিলো। ঠিক বিপরীতভাবে, মক্কার সমাজের মানুষেরা তাদের মাঝে প্রচলিত ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠিত আদর্শ নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলো এবং এ ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনাগুলো পরিবর্তিত হয়ে যাবার আশঙ্কায় খুবই ব্যতিব্যস্ত ছিলো। বিশেষ করে, মক্কার নেতৃস্থানীয় কিছু ব্যক্তি যেমন, আবু লাহাব, আবু জাহল এবং আবু সুফিয়ান এর মতো লোকেরা এ ব্যাপারে খুবই সোচ্চার ছিলো। মূলতঃ এ কারনেই মুসা’ব ইবন উমায়ের মদীনাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে সমাজের মানুষের কাছ থেকে ব্যাপকভাবে সাড়া পেয়েছিলেন, তিনি গণমানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেছিলেন এবং তাদেরকে সত্য দ্বীনের শিক্ষা ও আইন-কানুনে শিক্ষিত করেছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন মদীনার জনগণের ইসলামের আলোকিত আহবানে দ্রুত সাড়া দেবার ও ইসলাম গ্রহন করার মতো মনমানষিকতা। শুধু তাই নয়, মদীনাবাসীর ছিলো ইসলামী আদর্শকে পরিপূর্ণ জানার ও আল্লাহ প্রদত্ত আইন-কানুনগুলো শেখার একান্ত প্রচেষ্টা, যা মুসা’ব (রা) এর অন্তরকে করেছিলো আনন্দে উদ্ভাসিত। এভাবে, তার চোখের সামনেই মদীনায় মুসলিমদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো এবং মুসা’ব ইবন উমায়ের দ্বিগুন উৎসাহের সাথে তার দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলেন।
এরপর যখন হজ্জের মৌসুম আসলো, মুসা’ব (রা) মক্কায় ফিরে আসলেন এবং মুহাম্মদ (সা) এর কাছে মদীনায় মুসলিমদের সংখ্যা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি এবং সেখানে ইসলামের দ্রুত প্রসারের কথা জানালেন। তিনি জানালেন কিভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার ঘরে ঘরে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং ইসলাম এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তিনি আরও জানালেন মদীনার সমাজে মুসলিমদের শক্তি-সামর্থ্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতার কথা, যা ইসলামকে সে সমাজে প্রভাবশালী অস্তিত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বললেন, মদীনার কিছু কিছু মুসলিমদের ঈমান এতো দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ যে, তারা এ বছরই মক্কায় আসতে চায়।
আল্লাহর রাসূল (সা) মুসা’ব ইবন উমায়ের এর কাছ থেকে এ সব সংবাদ শুনে খুবই আনন্দিত হলেন এবং মক্কার সমাজের সাথে মদীনার সমাজের তুলনা করে গভীর ভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, একনাগারে গত বারোটি বছর ধরে তিনি মক্কার মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করছেন, সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করেছেন, তার প্রতিদিনের প্রতিটি মূহুর্ত তিনি দাওয়াতী কাজে ব্যয় করেছেন, প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন, এ সবকিছু করতে গিয়ে সবধরনের জুলুম, অত্যাচার ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু, এতো কিছুর পরও মক্কাবাসী এখনও নিমজ্জিত রয়েছে মিথ্যা অহমিকা আর অন্ধ গোয়ার্তুমির নিকষ কালো অন্ধকারে। মক্কাবাসীর প্রচন্ড নিষ্ঠুর, বরফ কঠিন ও অনুশোচনাবিহীন হৃদয়ে তার প্রাণান্তকর এ প্রচেষ্টা বিন্দুমাত্র আচঁড় কাটতে পারেনি, বরং তাদের দূর্ভেদ্য অন্তর পূর্বের মতোই পূর্বপুরুষদের ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মক্কার জনসাধারন ছিলো খুবই রূঢ় প্রকৃতির এবং তাদের অন্তরে মুর্তিপূজার মতো বিকৃত ধ্যান-ধারনার শেকড় ছিলো গভীর ভাবে প্রোথিত। মূলতঃ এ কারনেই তারা ইসলামের আলোকিত আদর্শে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছিলো এবং নিমজ্জিত ছিলো শিরকের মতো ভয়ঙ্কর পাপে। অপরদিকে, মদীনার চিত্র ছিলো একেবারেই অন্যরকম। খাযরাজ গোত্রের একদল মানুষ ইসলাম গ্রহন করার পর একবছর পার হতে না হতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো আকাবার প্রথম শপথ। পরবর্তীতে মুসা’ব ইবন উমায়েরের মাত্র একবছরের প্রচেষ্টায় সমস্ত মদীনা ইসলামী ধ্যান-ধারনার আলোকে এমন ভাবে উদ্দীপ্ত হলো যে, এটাই পরবর্তীতে অল্প সময়ের মধ্যে অবিশ্বাস্য সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহনের ভিত্তি তৈরী করেছিলো। অন্যদিকে, মক্কায় যারা ইসলাম গ্রহন করেছিলো তাদের মধ্যেই ইসলামের আদর্শ ও চিন্তা-চেতনা সীমাবদ্ধ ছিলো। উপরন্তু, তারা হয়েছিলো কুরাইশদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার। কিন্তু, মদীনাতে ইসলামী আদর্শ বিস্তৃতি লাভ করেছিলো দ্রুত গতিতে আর ইসলাম গ্রহন করায় সেখানকার মুসলিমরা ইহুদী বা কাফিরদের কোনরকম অত্যাচার বা নির্যাতনেরও শিকার হয়নি। মূলতঃ এ অবস্থা মদীনাবাসীর অন্তরে ইসলামকে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিলো এবং মুসলিমদের জন্য উম্মোচিত করেছিলো ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার নতুন দ্বার।
মুহাম্মদ (সা) এর কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, মদীনাই হতে পারে সেই উজ্জ্বল বর্তিকা যেখান থেকে ইসলামের আদর্শ, ঈমান ও জীবন-ব্যবস্থার আলো বিচ্ছুরিত হতে পারে বিশ্বময়। অতঃপর তিনি (সা) মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাঁর সাহাবীদের তাদের মুসলিম ভাইদের সঙ্গী হবার সু্যোগ করে দিলো, তারা মুক্ত হলেন তাদের উপর আপতিত কুরাইশদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে এবং খুঁজে পেলেন একটি পবিত্র ও নিরাপদ আশ্রয়। রাসূল (সা)-এর এ পদক্ষেপ তাদের দাওয়াতী কার্যক্রমে সম্পুর্ণভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দিলো এবং তারা খুব স্বাভাবিক ভাবেই পরবর্তী পর্যায়ের দিকে অগ্রসর হলেন, যেটা ছিলো মূলতঃ ইসলামকে বাস্তব জীবনে কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করা এবং ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সহায়তায় ইসলামের আহবানকে বলিষ্ঠভাবে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া।
এখানে এটা বলে রাখা দরকার যে, মুহাম্মদ (সা) দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যে প্রচণ্ড পরিমাণ বাঁধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা অতিক্রম করার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা কিংবা এ ব্যাপারে চুড়ান্ত ধৈর্য্য ও একনিষ্ঠতার পরিচয় না দিয়েই শুধুমাত্র অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রক্ষা পাবার জন্য মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেননি। তিনি মক্কায় দীর্ঘ দশটি বছর প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন, দাওয়াতী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য গভীর ভাবে চিন্তা করেছেন। তিনি (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ এজন্য সবরকমের ভয়ঙ্কর অত্যাচার ও নির্যাতনকে হাসিমুখে বরণ করেছেন। কুরাইশদের নিষ্ঠুর অত্যাচার ও প্রবল প্রতিরোধ আল্লাহর রাসূল (সা)-কে এক মূহুতের্র জন্য লক্ষ্যচ্যুত করতে তো পারেইনি, উপরন্তু এ প্রবল প্রতিরোধ তাঁর ঈমানী শক্তি ও আল্লাহর বাণীর প্রতি তাঁর বিশ্বাসকে প্রতিনিয়ত নিয়ে গিয়েছে নতুন এক উচ্চতায়। তিনি (সা) নিশ্চিতভাবেই জানতেন আল্লাহর সাহায্য আসবে এবং এ নিশ্চিত বিশ্বাসই তাকে করেছিলো আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী ও আশাবাদী। শুধু তাই নয়, তাঁর কাছে এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে মক্কাবাসীর হৃদয় আসলে কতো কঠিনভাবে অন্ধ গোয়ার্তুমির মধ্যে নিমজ্জিত, তাদের অন্তর কতো সংকীর্ন এবং সর্বোপরি তারা কতো নিষ্ঠুর ও পথভ্রান্ত। এ বাস্তবতা থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মক্কায় ইসলামের বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন এবং তাঁর সকল প্রচেষ্টা হবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত। মূলতঃ এ কারনেই মক্কা ত্যাগ করা ও এর বিকল্প কোন স্থানের সন্ধান করা ছিলো খুবই জরুরী। আর তাই, এ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই তিনি (সা) মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। সুতরাং, অত্যাচার বা নির্যাতন নয়, এ কারণগুলোই ছিলো তাঁর ও সাহাবীদের মক্কা থেকে হিজরত করার এক ও একমাত্র কারণ।
এছাড়া, একই সাথে এটাও সত্য যে, রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদেরকে কুরাইশদের নিষ্ঠুর ও ভয়ঙ্কর অত্যাচার থেকে রক্ষার জন্য তাদের আবিসিনিয়া
হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ, যদিও নিমর্ম নির্যাতন ও অত্যাচার মুসিলমদের ঈমানী শক্তি ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে দৃঢ় করে, বাতিল শক্তির প্রবল প্রতিরোধ মুসলিমদের আরো প্রত্যয়ী করে তোলে, তারপরও জীবন রক্ষার তাগিদে নির্যাতনস্থল ত্যাগ করার অনুমতিও ইসলাম দিয়েছে। বস্তুতঃ এ দৃঢ় ঈমানী শক্তি থেকেই মুসলিমরা অবলীলায় আল্লাহর জন্য সকল দুঃখ-কষ্টকে তচ্ছু তাচ্ছিল্য করতে পারে। নির্দিধায় তারা উৎসর্গ করতে পারে নিজ জীবন সহ তাদের ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, মানসিক স্বস্তি সহ সবকিছু। কিন্তু, তারপরও কোন কোন সময় বিরতিহীন অসহনীয় অত্যাচার ঈমানদারদের হাঁপিয়ে তোলে। তখন সঙ্গত কারনেই তাদের সকল প্রচেষ্টা দাওয়াতী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা সত্যদ্বীনকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করার থেকে, নিজেকে ক্রমাগত অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এ কারনেই মুসলিমদের এই জুলুম আর অত্যাচারের রাজত্ব থেকে হিজরত করে পাড়ি জমাতে হয়েছিলো আবিসিনিয়ায়।
যাই হোক, তাদের দ্বিতীয়বার হিজরত করতে হয়েছিলো সম্পূর্ন ভিন্ন কারণে। বস্তুতঃ দ্বিতীয়বার মুসলিমরা তাদের দ্বীনকে প্রাত্যহিক জীবনে ও সমাজে কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করার জন্যই রাসূল (সা) সহ হিজরত করেছিলো। তারা তৈরী করতে চেয়েছিলো একটি পরিপূর্ণ ইসলামী সমাজ, যেখান থেকে তারা ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবে সারা বিশ্বে। মূলতঃ এ রকম একটি প্রেক্ষাপটেই আল্লাহর রাসূল (সা) সাহাবীদের মদীনায় হিজরত করার বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু, এ সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বে তাঁর প্রয়োজন ছিলো হজ্জ্ব করতে আগত মদীনার মুসলিমদের সাথে সাক্ষাৎ করা, দ্বীন ইসলামকে রক্ষা করার জন্য তাদের স্বতঃস্ফুর্ততাকে পরীক্ষা করা এবং সর্বোপরি ইসলামের জন্য তারা কতোটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত তা পর্যালোচনা করা। তাঁর এটাও নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিলো যে, মদীনার মুসলিমরা তাঁর সঙ্গে আনুগত্যের শপথে আবদ্ধ হবে এবং প্রয়োজনে তাঁর জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকবে, যা মূলতঃ তৈরী করবে একটি ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিভূমি।
এ অবস্থায় রাসূল (সা) হজ্জ্বযাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এটা ছিলো ৬২২ খ্রীষ্টাব্দ, দাওয়াতী কার্যক্রমের বারোতম বছর। আগত বিপুল সংখ্যক হজ্জ্বযাত্রীর মধ্যে ৭৫ জন ছিলো মুসলিম (যার মধ্যে ৭২ জন ছিলো পুরুষ এবং ২ জন ছিলো নারী) । এদের মধ্যে একজন নারী ছিলো বনু মাযিন ইবন আল-নাজ্জার গোত্র থেকে আগত নুসাইবা বিনত কা’ব উম্ম আমারাহ্ এবং অন্যজন ছিলো বনু সালামাহ গোত্র থেকে আগত আসমা বিনত আমর ইবন আদি।
আল্লাহর রাসূল (সা) মুসলিম হজ্জ্বযাত্রীদের এ দলটির সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদেরকে দ্বিতীয় আনুগত্যের শপথের কথা জানালেন।
বস্তুতঃ এবারের অঙ্গীকার শুধুমাত্র দাওয়াতী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও জুলুম-নির্যাতন থেকে নিরাপত্তা প্রদানের ব্যাপার সম্পর্কিত ছিলো না। বরং, এ অঙ্গীকারের সীমানা ছিলো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এটা ছিলো মুসলিমদের সম্ভাব্য সকল আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি তৈরী করার অঙ্গীকার। এটা ছিলো ইসলামের এমন এক কেন্দ্রবিন্দু প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, যা তৈরী করবে ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ভিত্তিভূমি। যে রার্ষ্টের থাকবে নিজেকে রক্ষা করার মতো প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি এবং সে শক্তি দূর করবে দ্বীন ইসলাম প্রচার ও প্রয়োগের পথে ছড়িয়ে থাকা সকল বাঁধা।
আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের সাথে অঙ্গীকারের ব্যাপারে কথা বললেন, তাদের স্বতঃস্ফুর্ততাকে অনুভব করলেন। আবার, আগত মুসলিমরাও আইয়্যমে তাশরিকের দিনগুলোতে তাঁর সাথে আকাবার উপত্যকায় সাক্ষাৎ করতে সম্মত হলো। তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কেউ কাউকে জাগাবে না, না কেউ অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করবে।”তৃতীয় রাত্রি পার হবার পর তারা গোপনে আকাবা উপত্যকায় রাসূল (সা)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য উপস্থিত হলো, যাদের মধ্যে আগত দু’জন মুসলিম নারীও ছিলো। আল্লাহর রাসূল (সা) সেখানে তাঁর চাচা আল-আব্বাসকে নিয়ে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত মুসলিমরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো। রাসূল (সা)এর চাচা তখন পর্যন্ত ঈমান না আনলেও তিনি চেয়েছিলেন তার ভাতিজার পূর্ণ নিরাপত্তা। বস্তুতঃ তিনিই প্রথম সংলাপ শুরু করেন এবং বলেন, “হে খাযরাজ সম্প্রদায়ের লোকেরা, তোমরা জানো যে মুহাম্মদের অবস্থান আমাদের কাছে কোথায়। আমরা তাকে এতোদিন পর্যন্ত নিজ সম্প্রদায়ের মানুষ হতে রক্ষা করে এসেছি। তিনি আমাদের মধ্যে পরিপূর্ণ সম্মান ও নিরাপত্তার সাথেই বসবাস করছেন। কিন্তু, এখন তিনি তোমাদের সাথে বসবাস করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদি তোমরা মনে করে থাকো যে, তোমরা তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারবে এবং তাঁর প্রতি কৃত অঙ্গীকার পালন করে তাকে শত্র থেকে নিরাপত্তা দিতে পারবে, তাহলে তোমরা এ দায়িত্ব গ্রহন করো। আর যদি তোমরা মনে করে থাকো যে, তোমরা তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং বিপদে তাঁকে পরিত্যাগ করবে, তবে তা এখনই জানিয়ে দাও।” প্রত্তুতরে তারা বললো, “আমরা শুনেছি আপনি কি বলেছেন। হে আল্লাহর রাসূল, এখন আমরা আপনার কথা শুনতে চাই। আপনি আপনার ও আপনার রবের জন্য যা ইচ্ছা পছন্দ করুন।” রাসূলুল্লাহ (সা) কুরআন তিলওয়াত করার পর তাদের বললেন, “আমি তোমাদের কাছে এই অঙ্গীকার চাই যে, তোমরা আমাকে রক্ষা করবে সেভাবে, যেভাবে তোমরা তোমাদের নারী ও সন্তানদের রক্ষা করো।” আল-বারা (রা) শপথ গ্রহনের জন্য তার হাত উঠালেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার পূর্ণ আনুগত্যের শপথ করছি। আল্লাহর কসম, আমরা হচ্ছি যোদ্ধাজাতি। যুদ্ধ ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বংশ পরম্পরায় আমাদের ধমনীতে প্রবাহিত হয়েছে।”
আল-বারা (রা) কথার মাঝেই আবু আল-হাইছাম ইবন আল-ছাইহান প্রবেশ করলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের অন্য সম্প্রদায়ের (ইহুদী) সাথে মৈত্রী চুক্তি রয়েছে, আমরা যদি সে চুক্তি ছিন্ন করে আপনার পক্ষ অবলম্বন করি এবং তারপর যদি আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেন, তবে কি আপনি আমাদের ছেড়ে আপনার নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসবেন?” এ কথার উত্তরে আল্লাহর রাসূল (সা) হেসে বললেন, “না, এখন থেকে তোমাদের রক্তই আমার রক্ত এবং তোমাদের কাছে যা পবিত্র আমার কাছেও তা পবিত্র। আমি তোমাদের একজন এবং তোমরা আমাদের। আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং তাদের সাথে শান্তিচুক্তি করবো যারা তোমাদের সাথে সন্ধি করবে।”অতঃপর আল-’আব্বাস ইবন ’উবাদাহ (রা) বললেন, “হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা, তোমরা কি বুঝতে পারছো তোমরা কোন বিষয়ে সহায়তা দেবার জন্য এ ব্যক্তির সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হচ্ছো? এর অর্থ হচ্ছে যে কোন মূল্যে তাঁর জন্য লড়াই করা। তোমরা যদি সম্পদ হারানোর ভয় করে থাকো, তোমাদের মধ্যে সম্মানিত ব্যক্তিদের নিহত হবার আশঙ্কা করে থাকো, তাহলে এখনই পিছু হটে যাও।
আল্লাহর কসম, যদি তোমরা তা করো, তবে এ দুনিয়া ও আখেরাতে তোমরা হবে চরম ভাবে লাঞ্চিত। কিন্তু, যদি তোমরা আনুগত্যের শপথ পূর্ণ করো, তবে তোমাদের সম্পদের ক্ষতি বা সম্মানিত ব্যক্তিরা নিহত হলেও এটাই তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে বয়ে নিয়ে আসবে সাফল্য।” মদীনার মুসলিমদের দলটি এ সকল শর্তেই আল্লাহর রাসূল (সা) এর আনুগত্য মেনে নিলো এবং জিজ্ঞেস করলো, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনার আনুগত্য করার বিনিময়ে আমরা কি পাবো?” রাসূলুল্লাহ (সা) দৃঢ় ভাবে উত্তর দিলেন, “জান্নাত।”
তারা তাদের হাত বাড়ালেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-ও তাঁর হাত বাড়ালেন, অতঃপর তারা এ বলে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন যে, “আমরা এই বলে শপথ গ্রহন করছি যে, আমরা সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ সর্বাবস্থায়ই আপনার আনুগত্য করবো। সর্বদা সত্য কথার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবো এবং আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করতে কারো সামনেই মাথা নত করবো না”। শপথ গ্রহন শেষে আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, “তোমাদের মধ্যে সমাজে নেতৃস্থানীয় যে বারোজন আছে, তাদের আমার কাছে নিয়ে আসো।” তারা খাযরাজ গোত্র থেকে নয়জন এবং আউস গোত্র থেকো তিনজনকে নিয়ে আসলেন। রাসূল (সা) এ সকল গোত্র প্রধানদের বললেন, “তোমরা তোমাদের জনগণের উপর দায়িত্বশীল, যেভাবে ঈসা(আ) ছিলেন তাঁর অনুসারীদের উপর দায়িত্বশীল। আর আমি আমার লোকদের উপর দায়িত্বশীল।”একথা শোনার পর তারা যে যার শয্যায় ফিরে গেলেন, অতঃপর নিজ নিজ ক্যারাভানে পৌঁছে মদীনায় ফিরে আসলেন।
তারপর, আল্লাহর রাসূল (সা) মুসলিমদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন এবং মুসলিমরাও এ নির্দেশ অনুযায়ী একাকী কিংবা ছোট ছোট দল গঠন করে মক্কা ত্যাগ করতে শুরু করলো। ইতিমধ্যে কুরাইশদের কাছে শপথ গ্রহনের খবর পৌঁছে গেলে তারা মুসলিমদের হিজরতে বাঁধা দিতে লাগলো। তারা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের মাঝে এসে দাঁড়ালো যেন তারা মক্কা ত্যাগ না করতে পারে। কিন্তু, তা সত্তেও মুসলিমদের মক্কা থেকে মদীনা যাত্রা অব্যাহত থাকলো। আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কায় রয়ে গেলেন এবং তিনি আদৌ মদীনায় যাবেন কিনা এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও কাউকে দিলেন না। কিন্তু, বিভিন্ন ঘটনা থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনিও মক্কা ত্যাগ করবেন। মুহাম্মদ (সা) কিছু না বলা পর্যন্ত আবু বকর (রা) তাঁর কাছে হিজরতের অনুমতি চাইতে থাকলেন। এক পর্যায়ে, আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, “এতো তাড়াহুড়ো করো না, এমনও হতে পারে যে আল্লাহ তোমার জন্য একজন সফরসঙ্গী নির্ধারন করে দেবেন।” আবু বকর (রা) তখন বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরত করতে চাচ্ছেন।
আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করবেন এটা বুঝতে পেরে কুরাইশরা খুবই চিন্তিত হয়ে গেলো। কারণ, তারা জানতো যে মদীনায় মুসলিমদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নিঃসন্দেহে সেখানে মুসলিমরা এখন অনেক বেশী শক্তিশালী। তার উপর যদি মক্কার মুসলিমরাও মদীনায় হিজরত করে তবে মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি স্বভাবতই আরও বৃদ্ধি পাবে। তারা এটাও আশঙ্কা করছিলো যে, রাসূল (সা) যদি কোনভাবে মদীনায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে তাহলে তাদের অস্তিত্ব হবে বিপন্ন। এজন্য তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর মদীনা গমন কিভাবে ঠেকানো যায় তা নিয়ে দিনরাত চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলো। আবার চিন্তা করে দেখলো যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যদি মক্কায়ও থেকে যায় তাহলেও মদীনার মুসলিমরা তাদের নবীর সম্মান রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হবে কুরাইশদের বিরুদ্ধে। তখন তাদের সংঘবদ্ধ এ শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করা হয়ে যাবে আরেক সমস্যা। সবদিক ভেবেচিন্তে তারা মদীনার মুসলিম, ইসলাম এবং মুহাম্মদের সাথে সম্ভাব্য সকল সংঘর্ষ এড়ানোর লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূল (সা)-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো এবং সেইসাথে নবী (সা)-কে মদীনায় হিজরতে বাঁধা দেবার কৌশল অবলম্বন করলো।
সীরাতের গ্রন্থগুলোতে ’আয়িশা (রা) এবং আবু উমামাহ ইবন শাম কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, আকাবার উপত্যকায় ৭৩ জন মুসলিম উপস্থিত হয়ে
যখন মুহাম্মদ (সা)-কে নিরাপত্তা ও সবরকম সহায়তা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো, তখন থেকেই হিজরত করতে চাওয়ায় মক্কার মুসলিমদের উপর কাফিরদের অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা প্রচন্ড আকার ধারণ করলো। কুরাইশরা তাদের যেখানে সেখানে অপমান ও বিভিন্ন ভাবে আক্রমণ করতে লাগলো। তারা এ ব্যাপারে মুহাম্মদ (সা)এর কাছে অভিযোগ করলে তিনি উত্তরে বললেন, “আমাকে তোমাদের হিজরতের জন্য বাসভূমি নির্ধারন করে দেয়া হবে।”
এর কিছুদিন পরেই তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে বললেন, “আমাকে বলা হয়েছে যেন তোমরা ইয়াসরিবে (মদীনায়) হিজরত করো। যে ব্যক্তি সেখানে যেতে চায় সে যেন নিশ্চিন্তে তার যাত্রা শুরু করে।” এ নির্দেশের পরপরই মুসলিমরা শহর ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো । তারা গোপনে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মক্কা ত্যাগ করতে লাগলো। কিন্তু, আল্লাহর রাসূল (সা) তখনও তাঁর নিজের ব্যাপারে আল্লাহর অনুমতির অপেক্ষা করছিলেন। আবু বকর (রা) তাকে বারবার এ ব্যাপারে প্রশ্ন করায় তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, “এতো তাড়াহুড়ো করো না, এমনও হতে পারে আল্লাহতায়ালা তোমার জন্য একজন সফরসঙ্গী নির্বাচন করে দেবেন”। আবু বকর (রা) মনে মনে প্রত্যাশা করতে লাগলেন যে, আল্লাহ তা’য়ালা হয়তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-কেই তাঁর সফরসঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করবেন।
কুরাইশরা মুসলিমদের দলে দলে মক্কা ত্যাগের কথা জানার সাথে সাথেই বুঝতে পারলো যে, খুব শীঘ্রই লড়াই এর ময়দানে তাদের রাসূল (সা)-কে মুকাবিলা করতে হবে। তারা কুরাইশদের দারুল নাদওয়ার পরামর্শ কক্ষে একত্রিত হয়ে কিছুক্ষন তর্কবিতর্কের পর মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যার সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। জিবরাইল (আ) মুহাম্মদ (সা)-কে এ ঘটনা অবহিত করলেন এবং তাকে নিজ শয্যায় না ঘুমানোর নির্দেশ দিলেন। সে রাত্রে তিনি(সা) তাঁর শয্যায় ঘুমানো থেকে বিরত থাকলেন এবং এ সময়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের অনুমতি আসলো।
মদীনায় ইসলামের শক্তিশালী অস্তিত্ব হিসাবে আত্মপ্রকাশ, সেখানকার মানুষের মধ্যে আল্লাহর রাসূল (সা)-কে গ্রহণ করার মতো স্বতঃস্ফুর্ততা এবং সর্বোপরি সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র্ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাই মুহাম্মদ (সা)-কে মদীনায় হিজরত করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। যে কারও এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বা এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করা একেবারেই অনুচিত হবে যে, কুরাইশরা তাকে হত্যা করে ফেলতে পারে এই ভয়ে তিনি (সা) মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। তিনি (সা) তাঁর উপর আপতিত বিপদ-আপদ বা অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত ছিলেন না, বরং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সবসময়ই তাঁর জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। বস্তুতঃ তাঁর হিজরতের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো দাওয়াতী কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সেই সাথে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্জনে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া এটাও পরিষ্কার যে, কুরাইশরা মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করতে চেয়েছিলো এই ভয়ে যে, তিনি মদীনায় পৌঁছে গেলে পূর্ণ নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির অধিকারী হবেন। কিন্তু, সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও কুরাইশরা তাদের ষড়যন্ত্র সফল করতে ব্যর্থ হলো। রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করলেন এবং তাদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণিত করে, তাঁর এ হিজরতের ঘটনাই ইসলামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলো। এটা মূলতঃ মানুষকে সত্য দ্বীনের পথে আহবানের অধ্যায় থেকে আল্লাহর দ্বীনের আলোকে একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার অধ্যায়ে প্রবেশ করলো। প্রতিষ্ঠিত হলো ইসলামী রাষ্ট্র যেখানে শাসন-কর্তৃত্ব হলো শুধুই আল্লাহর। এছাড়া ইসলামী রাষ্ট্র আল্লাহর দ্বীনকে প্রাত্যহিক জীবনে বাস্তবভাবে প্রয়োগ করে, যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের পথে আহবান করলো এবং এর সামরিক শক্তি মুসলিমদের রক্ষা করলো সকল প্রকার বিপদ-আপদ এবং শত্রুদের জুলুম-নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১০ (মদীনায় দাওয়াতী কার্যক্রম)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
আনসারদের যে দলটি রাসূল (সা) এর সাথে আকাবায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলো, তারা মদীনায় ফিরে যাবার পর সেখানকার প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় ইসলামের আহবান। পরবর্তীতে তারা আল্লাহর রাসূল (সা) এর কাছে দ্বীন ও কুরআন শিক্ষার জন্য মদীনায় একজনকে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি প্রেরণ করে। রাসূল (সা) সাধারনত যারা ইসলাম গ্রহন করতো তাদেরকে পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করতেন এবং তাদেরকে ব্যক্তিত্বকে ইসলামের আলোকে গঠন করতেন, যেন তারা পুরোপুরি ভাবেই ইসলামের আদর্শকে উপলব্ধি করতে পারে। বস্তুতঃ ইসলামের আলোকে চরিত্র গঠন করা প্রতিটি মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব, কারণ এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে চেতনাদৃপ্ত দৃঢ় ঈমান ও মানুষ বুঝতে পারে ইসলামের অর্ন্তনিহিত আদর্শ এবং ইসলামের আদর্শকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা প্রদান করে। মদীনার যে দলটি ইসলাম গ্রহন করেছিলো তারা এটা বুঝতে পেরেছিলো বলেই রাসূল (সা)-কে দ্বীন শিক্ষার জন্য একজন সাহায্যকারী পাঠানোর দাবী করেছিলো। চিঠি পাবার পর, মুহাম্মদ (সা) মদীনায় মুস’আব ইবন উমায়েরকে নও মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষার জন্য পাঠান।
মদীনায় আগমনের পর মুস’আব ইবন উমায়ের আসা’দ ইবন জুরারাহর সাথে জুটিবদ্ধ হয়ে পূর্ণ উদ্যমে দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন। তারা ইসলামের আহবান পৌঁছে দেন মদীনার বিভিন্ন গৃহ থেকে শুরু করে বেদুঈনদের ছাউনীগুলোতে পর্যন্ত। মদীনাবাসীকে কুরআন পাঠ করে শোনান। এভাবে ধীরে ধীরে একজন দু’জন মানুষ ইসলাম গ্রহন করতে শুরু করে। এ অবস্থা চলতে থাকে ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন পর্যন্ত না আউস আল-াহ জাতিভুক্ত খাতমাহ্, ওয়া’লী এবং ওয়াকিফ গোত্র ছাড়া আনসারদের প্রতিটি গৃহে ইসলামের আহবান ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর তিনি রাসূল (সা)-এর কাছে নও মুসলিমদের একত্রিত করার অনুমতি চেয়ে পত্র লিখেন। রাসূল (সা) তাকে অনুমতি প্রদান করেন এবং বলেন, “ইহুদীরা সাববাথের ঘোষনা দেয়া পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা করবে। তারপর, বিকেলবেলায় আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্মিলিত ভাবে দু’রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং নামাজ শেষে তোমার বক্তব্য (খুতবা) প্রদান করব”। রাসূল (সা) এর আদেশক্রমে, মুস’আব ইবন উমায়ের নও মুসলিমদের সা’দ ইবন খায়সামার গৃহে একত্রিত করেন। প্রায় বারোজন মদীনাবাসী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি একটি ছাগল জবাই করে তাদের আপ্যায়ন করেন। ইতিহাস অনুযায়ী মুস’আব ইবন উমায়েরই হচ্ছে প্রথম মুসলিম যিনি জুমার নামাজ প্রতিষ্ঠিত করেন।
মুস’আব ইবন উমায়ের এভাবে মদীনায় তার দাওয়াতী কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন এবং মদীনাবাসীকে দ্বীন শিক্ষা দিতে থাকেন। একদিন আসা’দ ইবন জুরারাহ মুস’আব ইবন উমায়েরকে সঙ্গে করে বনু আল-আসহাল এবং বনু জা’ফর এর এলাকায় প্রবেশ করে (ঘটনাক্রমে সা’দ ইবন মুয়াজ ছিলো আসা’দ ইবন জুরারার মায়ের সম্পর্কের ভাই)। তারা দু’জন এবং মদীনার আরও কিছু নও মুসলিম বনু জা’ফর গোত্রের এলাকাভুক্ত মারক্ব নামের একটি কুপের পাশে একত্রিত হয়। এ সময়ে সা’দ ইবন মুয়াজ এবং উসাইদ ইবন হুদায়ের ছিলো তাদের নিজ নিজ গোত্রের প্রধান। বনু ’আবদ আল-আসহাল এবং অন্যান্য গোত্রগুলোও তাদের অনুসরনকারী মুর্তিপূজারী ছিলো। যখন সা’দ ইবন মুয়াজ শুনলো যে, মুস’আব ইবন উমায়ের তাদের এলাকায় প্রবেশ করেছে, তখন সাথে সাথে সে উসাইদ ইবন হুদায়েরকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়ে বললো, “যারা আমাদের এলাকায় প্রবেশ করে আমাদের গোত্রের লোকদের বোকা বানাচ্ছে তাদের কাছে যাও। তাদের আমাদের সীমানা থেকে বের করে দিয়ে বলো যেন তারা আর কখনো আমাদের এলাকায় প্রবেশ না করে।”
সা’দ ইবন মুয়াজ আরও বলে যে, আসা’দ ইবন জুরারার সাথে যদি আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো তবে আমি তোমাকে এ ঝামেলার মধ্যে ঠেলে দিতাম না। কিন্তু, সে আমার সম্পর্কে খালাতো ভাই, তাই আমার পক্ষে তার বিরুদ্ধে কোনকিছু করা সম্ভব নয়। একথা বলার পর, উসাইদ তার বর্শা তুলে নিলেন এবং মুস’আব ইবন উমায়ের এর দলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। আসা’দ উসাইদকে দেখার সাথে সাথে মুস’আবকে বললেন, “এই যে লোকটি তোমার দিকে আসছে সে হলো এ গোত্রের প্রধান। তুমি তাকে আল্লাহ ওয়াস্তে সত্য কথা পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দাও”। মুস’আব বললো, “যদি সে আমাদের সাথে বসতে রাজী হয়, তবে আমি তার সাথে কথা বলবো”। উসাইদ ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো এবং বললো, “কেন তোমরা আমাদের মধ্যকার দূর্বল লোকদের বিভ্রান্ত করছো? তোমাদের উদ্দেশ্য কি? আমাদেরকে আমাদের বিশ্বাসের উপর ছেড়ে দাও”। মুস’আব বললেন,“আপনি কি আমাদের সাথে বসে একটু আমাদের কথা শুনবেন? যদি আমাদের কথা আপনার ভালো লাগে তাহলে গ্রহন করবেন। আর যদি না ভালো লাগে তাহলে প্রত্যাখান করবেন”। উসাইদ মুস’আব ইবনে উমায়ের এর এ যৌক্তিক প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলেন। তারপর তার বর্শা মাটিতে গেঁথে মসা’বের সামনে বসলেন। মুস’আব (রা) তাকে ইসলামের আদর্শ ও জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করলেন এবং কুরআন তিলওয়াত করে শোনালেন। উপস্থিত মুসলিমদের বর্ণনা অনুযায়ী, “আল্লাহর কসম, সে কিছু বলবার আগেই আমরা ইসলামের দীপ্তি তার চোখেমুখে লক্ষ্য করছিলা”। উসাইদ বললো, “কি চমৎকার কথাই না তোমরা বলছো! তো তোমাদের দ্বীন গ্রহন করতে হলে আমাকে কি করতে হবে?” তারা বললো, “তোমাকে অবশ্যই প্রথমে গোসলের করে পবিত্র হতে হবে, তোমার পোশাক পবিত্র করতে হবে, তারপর সত্যকে সাক্ষী দিয়ে শাহাদাহ পাঠ করার পর দু’রাকাত নামাজ আদায় করতে হবে”। উসাইদ সাথে সাথে তাই করলেন এবং বললেন, “আমার পেছনে আমি এক ব্যক্তিকে রেখে এসেছি, সে যদি তোমাদের দ্বীন গ্রহন করে তবে তার গোত্রের লোকেরাও তাকে অনুসরন করবে। আমি এখনই তাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তার নাম হচ্ছে সা’দ ইবন মুয়াজ।”
উসাইদ তার বর্শা হাতে দ্রুত পায়ে সা’দ ইবন মুয়াজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন। সা’দ তখন তার গোত্রের লোকদের সাথে বসে আলোচনা করছিলো। যখন সা’দ উসাইদকে আসতে দেখলেন সে বললো, “আল্লাহর কসম, যে উসাইদ এখান থেকে গিয়েছে আর যে ফিরে এসেছে তারা দু’জন এক নয়”। অতঃপর উসাইদ আসার পর তার কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন, বললেন, “আমি দু’ব্যক্তির সাথে কথা বলেছি এবং তাদের মধ্যে কোনরকম খারাপ কোনকিছু দেখতে পাইনি। আমি তাদের কাজে আর অগ্রসর হতে নিষেধ করার পর তারা বলেছে, তুমি যেটা বলবে আমরা সেটাই করবো; তারপর তারা বললো, আসা’দ ইবনে জুরারাহ তোমার খালাতো ভাই হয় এটা জানার পরও বনু হারিছাহ গোত্র তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলো যেন তুমি সমাজের কাছে আত্মীয়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ এবং বিশ্বাসঘাতক হিসাবে প্রমাণিত হও।
বনু হারিছাহ গোত্র সম্পর্কে একথা শোনার সাথে সাথে সা’দ ইবন মুয়াজ ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর তার বর্শা হাতে নিয়ে বললো, “আল্লাহর কসম, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি আসলে তোমার কাজে ব্যর্থ হয়েছো।”তারপর সে মুস’আব এবং আসা’দ এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলো। সেখানে গিয়ে সা’দ দেখলো তারা খুব আয়েশের সাথে দলবল নিয়ে সেখানে বসে আছে। সা’দ ইবন মুয়াজ বুঝলো আসলে উসাইদের ইচ্ছা ছিলো সে যেন তাদের কথা শোনে। অত্যন্ত রাগান্বিত আর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সে তাদের পাশে গিয়ে দাড়াঁলো এবং আসা’দকে উদ্দেশ্য করে বললো, “শোন আবু উমামা, আমাদের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে সে সম্পর্কের ভিত্তিতেই কি তোমার আমার প্রতি আচরন করা উচিত নয়? তুমি কি আমার বাসভূমিতে এসে এমন কিছু করতে চাও যা আমরা ঘৃণা করি?” ইতিমধ্যে সা’দকে দেখার সাথে সাথে আসা’দ মুস’আবকে বলেছিলো, “হে মুস’আব, আল্লাহর কসম, এই গোত্রগুলো যাকে অনুসরন করে সে নিজেই এখন তোমার সামনে উপস্থিত। সে যদি তোমার অনুসরনকারী হয়, তবে তার গোত্রের কোন লোকই আর পিছে পরে থাকবে না।”মুস’আব তাকে আগের মতোই বললেন, “আপনি কি বসে একটু আমাদের কথা শুনবেন না? যদি আপনার আমাদের কথা ভালো লাগে তাহলে গ্রহন করবেন আর না ভালো লাগলে প্রত্যাখান করবেন।”মুস’আব ইবন উমায়ের এর এ যৌক্তিক প্রস্তাবে সা’দ রাজী হয়ে গেলো এবং তার বর্শা মাটিতে গেঁথে তাদের সামনে বসলো। মুস’আব তাকে ইসলামের আদর্শ ব্যাখ্যা করলেন এবং কুরআন তিলওয়াত করে শোনালেন।
উপস্থিত মুসলিমদের বণর্না অনুযায়ী, “আল্লাহর কসম, সে কিছু বলবার আগেই আমরা ইসলামের দীপ্তি তার চোখে মুখে দেখতে পাচ্ছিলাম”। উসাইদের মতো একই ভাবে সা’দ বললো, “কি চমৎকার কথাই না তোমরা বলছো! তো তোমাদের দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে আমাকে কি করতে হবে?” মুসলিমরা বললো এজন্য তোমার নিজেকে এবং তোমার পোশাক-পরিচ্ছদকে পবিত্র করতে হবে। তারপর সত্যের সাক্ষ্য হিসাবে শাহাদাহ পাঠ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করতে হবে। একথা শোনার পর সা’দ ইবন মুয়াজ তৎক্ষনাৎ তাই করলো এবং বর্শা হাতে তার গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গেলো। সেখানে উসাইদ ইবন হুদায়ের তার গোত্রের লোকদের সাথে আলোচনা করছিলেন। তারা সা’দকে আসতে দেখে বললো, “আল্লাহর কসম, যে সা’দ আমাদের এখান থেকে গিয়েছে আর যে ফিরে এসেছে তারা দু’জন এক নয়”। গোত্রের লোকেরা তার পথ রোধ করে দাঁড়ালে সা’দ ইবন মুয়াজ তাদের জিজ্ঞেস করলো, “হে বনু আবদ আল-আসহাল, তোমরা তোমাদের উপর আমার কর্তৃত্বকে কিভাবে পরিমাপ করো?” তারা বললো, “আপনি আমাদের গোত্র প্রধান, আমাদের সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা বেশী সজাগ, সবচাইতে ন্যায়বিচারক এবং নেতা হিসাবে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যবান”। একথা শোনার পর সা’দ বললো, “আমি ততক্ষন পর্যন্ত তোমাদের সাথে কথা বলবো না যতক্ষন পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনো”। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবদ আল-আসহাল গোত্রের সকলে ঈমান আনলো। মুস’আব ইবন উমায়ের তারপর আসা’দ ইবন জুরারাহর গৃহে ফিরে আসলেন এবং তার গৃহেই অতিথি হিসাবে বাস করতে লাগলেন। এর সাথে তিনি তার দাওয়াতী কার্যক্রমও অব্যহত রাখলেন যে পর্যন্ত না আনসারদের প্রতিটি গৃহে অন্তত একজন মুসলিম নারী ও পুরুষ ইসলাম গ্রহন করলো। এভাবে মুস’আব ইবন উমায়ের একবছর মদীনাতে অবস্থান করলেন, আউস ও খাযরাজ গোত্রকে দ্বীন শিক্ষা দিলেন এবং বুক ভরা আনন্দ নিয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন আল্লাহর শাসন-কর্তৃত্ব ও সত্য দ্বীনের সাহায্যকারীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা।
মুস’আব (রা) সাধারনত মদীনার প্রতিটি গৃহে যেতেন, তাদের সাথে কথা বলতেন এবং তাদের কাছে আল্লাহর রাসূল (সা) এর আহবান পৌঁছে দিতেন। তিনি মদীনার ক্ষেত-ক্ষামারে গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলতেন এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করতেন। তিনি মদীনার নেতৃস্থানীয় মানুষদের সাথেও বিতর্ক করতেন এবং তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতেন। দাওয়াতের বিস্তৃতির ব্যাপারে তিনি প্রায়ই কিছু কৌশল অবলম্বন করতেন, যেমনটি তিনি করেছিলেন আসা’দ ইবন জুরারাহর ক্ষেত্রে, যেন সত্য দ্বীনের আহবান সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এ রকম বিভিন্ন কৌশলপূর্ন দাওয়াতী কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি একবছরের মধ্যে সে সমাজের মানুষের মুর্তিপূজার মতো বিকৃত ও ক্ষয়ে যাওয়া ধ্যান-ধারনা ও ভ্রান্ত আবেগ-অনুভূতিগুলোকে পরিবতর্ন করে তাদের মধ্যে তাওহীদ, ঈমান ও ইসলামী চিন্তা-চেতনার বীজ বপন করেছিলেন। যা তাদের অন্তর থেকে শিরক এর সকল শাখা-প্রশাখাকে সমূলে উৎপাটিত করেছিলো এবং তাদের প্রতারনা, ঠকবাজি সহ সকল পাপের পথ থেকে বিরত রেখেছিলো। মুস’আব ইবন উমায়ের এবং ইসলাম গ্রহনকারী মুসলিমদের নিরলস প্রচেষ্টা ও বিভিন্ন কার্যক্রম মাত্র একবছরের মধ্যে মদীনাবাসীকে শিরকের নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত জনগোষ্ঠি থেকে পরিণত করে ইসলাম গ্রহনকারী জনগোষ্ঠিতে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৯ (আকাবার প্রথম শপথ)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
আকাবার প্রথম শপথ:
পরের বছর মদীনা থেকে বারো জনের একটি দল হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করে এবং আকাবার উপত্যকায় মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে। এখানেই তারা মুহাম্মদ (সা) এর সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, যা আকাবার প্রথম শপথ নামে পরিচিত । তারা আল্লাহর রাসূল (সা)-কে এ মর্মে অঙ্গীকার দেয় যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন (জিনাহ) করবে না, তাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, প্রতিবেশীর সাথে দূর্ব্যবহার করবে না এবং সর্বাবস্থায় মুহাম্মদ (সা) এর নের্তৃত্ব মেনে নেবে। যদি তারা তাদের শপথ রক্ষা করে তবে পরস্কার স্বরূপ রয়েছে জান্নাত। কিন্তু, যদি তারা ওয়াদা ভঙ্গ করে তবে আল্লাহ চাইলে তাদের শাস্তি দেবেন অথবা ক্ষমা করবেন।
রাসূল (সা) এর সাথে এ চুক্তিতে আবদ্ধ হবার পর তারা হজ্জের মৌসুম শেষে মদীনায় ফিরে যায়।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৮ (দাওয়াতী কার্যক্রমের সম্প্রসারণ)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
মুহাম্মদ (সা) বনু সাকিফ এবং তায়েফ গোত্র কর্তৃক নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এবং হজ্জের মৌসুমে কিন্দা, কালব, বনু ’আ-মির ও বনু হানিফা কর্তৃক সম্পূর্ণ ভাবে প্রত্যাখ্যাত হবার পর থেকেই মূলতঃ আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি কুরাইশদের সহিংসতা চুড়ান্ত আকার ধারন করে। এ অবস্থা কুরাইশদের মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর দলকে সমাজ ও বর্হিজগৎ থেকে আরো বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ তৈরী করে দেয়। কিন্তু এ সমস্ত ঘটনা আল্লাহর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীদের দৃঢ় ঈমানে না কোন ফাটল ধরাতে পারে, না তারা আল্লাহর প্রতিশ্রুত বিজয়ের ব্যাপারে কখনো সন্দেহ প্রকাশ করেন। বরং, তারা শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত সত্য পথের উপর অবিচল ভাবে দন্ডায়মান থাকে।
এভাবে, মুহাম্মদ (সা) তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন এবং পরিণাম নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত না হয়ে যখনই সম্ভব বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে থাকেন। কুরাইশ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ চেষ্টা করেছে তাঁর আনীত দ্বীনের ভবিষ্যত নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও ঠাট্টা তামাশা করতে, কিন্তু তিনি এসব কটুক্তি বা হীন মন্তব্যে কখনো কান দেননি বা ইসলামের বিজয়ের ব্যাপারে এতোটুকু সন্দেহ প্রকাশ করেননি। তিনি জানতেন আল্লাহতায়ালা তাকে তাঁর রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছেন। তাই, তাঁকে (সা) সবরকম ক্ষতি থেকে রক্ষা করা এবং তাঁর মনোনীত দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা করা তাঁরই দায়িত্ব। তাই তিনি দাওয়াতী কার্যক্রম সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষা করেছেন।
সৌভাগ্যবশত ইসলামের বিজয়ের জন্য মুহাম্মদ (সা)-কে খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। হজ্জ্বের মৌসুমে ইয়াসরিব (মদীনা) থেকে আগত আল-খাযরাজ গোত্রের একদল মানুষ যখন আল্লাহর রাসূল (সা) এর আহবানে ইসলাম গ্রহণ করলো তখনই তাঁর আনিত দ্বীনের বিজয়ের লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত হতে থাকলো।
আল্লাহর রাসুলের (সা) আহবান শোনার পর তারা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বলে, “আল্লাহর কসম, এই হচ্ছে সেই নবী যার কথা আমরা ইহুদীদের কাছে শুনেছি এবং আমরা তাঁকে (আল্লাহর রাসূল (সা)-কে) কোন অবস্থাতেই আমাদের পূর্বে তাদের স্বীকৃতি দেবার সুযোগ দেবো না।”এরপর তারা রাসূল (সা)-এর আহবানে সাড়া দেয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। They said to him, “we have left our people (Aws & Khazraj), for no tribes are so divided by hatred and rancor as they. Perhaps Allah will unite them through you, if so, then no man will be mightier than you.”
ইয়াসরিবে ফিরে যাবার পর তারা নিজ গোত্রের লোকদের মুহাম্মদ (সা) এর কথা জানায় এবং ইসলাম এর দিকে আহবান করে। তারা সেখানকার মানুষের হৃদয় ও অন্তরকে সত্য দ্বীন গ্রহন করার জন্য প্রস্তুত করতে সক্ষম হয় এবং আউস ও খাযরাজ গোত্রের প্রতিটি ঘরে ঘরে মুহাম্মদ (সা) আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৭ ইসলামী দাওয়াতের দুটি পর্যায়
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
মক্কায় মুহাম্মদ (সা)-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের মূলত দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে রাসূল (সা) সাহাবীদের দ্বীন শিক্ষা দেন এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক উন্নতি ঘটান। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে দ্বীন ইসলামের প্রচার করেন এবং সেই সাথে শুরু হয় সংগ্রাম। প্রথম পর্যায়ের মূল লক্ষ্য ছিল দ্বীনের এই সম্পর্কে নতুন ধ্যান-ধারণা তাদের অন্তরে দৃঢ় ভাবে প্রোথিত করে সেই আলোকে তাদের চরিত্রকে গড়ে তোলা এবং তাদের সংগটিত করা। আর পরবর্তী পর্যায়ের লক্ষ্য ছিল এই আদর্শ ভিত্তিক ধ্যান-ধারণা গুলোকে এমন এক চালিকা শক্তিতে পরিণত করা যা সমাজের প্রতিটি স্তরে এগুলোকে বাস্তবায়ন করে সমাজকে একেবারে নতুন করে ঢেলে সাজানো। আসলে বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত যে কোন আদর্শ বা ধ্যান-ধারনাই হলো প্রাণহীন কতগুলো তত্ত্ব কথার সমষ্টি, জীবনে যার কোন বাস্তব প্রভাব নেই। নির্জীব এই সব তত্ত্ব কথাগুলোতে প্রাণের সঞ্চার করতে এবং এগুলো সমাজের প্রতিটি স্তরে কার্যকরী করতে প্রথমে প্রয়োজন এই ধ্যান-ধারণা গুলোকে প্রচন্ড এক চালিকা শক্তিতে পরিণত করা। যা সমাজের মানুষ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে গ্রহন করবে, এগুলোর গভীরতা অনুভব করবে, প্রচার করবে এবং সর্বোপরি এগুলোর বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করতে প্রস্তুত থাকবে। এরকম একটা পরিস্থিতেই কেবল সমাজে নতুন এই আদর্শকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে ।
মুহাম্মদ (সা) ঠিক এ পদ্ধতিতেই মক্কায় তাঁর দ্বীন প্রচার করেছিলেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেন, ইসলামী ধ্যান-ধারণার আলোকে তাদের চরিত্রকে গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ইসলামের নিয়ম নীতি গুলো শিক্ষা দেন। এ পর্যায়ে তিনি মানুষকে ইসলামী আকীদাহর (বিশ্বাস) ভিত্তিতে একত্রিত করতেন এবং গোপনে তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দিতেন। আল্লাহর রাসূল (সা) বিরতিহীন ভাবে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেন এবং প্রচন্ড নিষ্ঠার সাথে ইসলামের আলোকে তাঁর অনুসারীদের চরিত্র গড়ে তোলেন। তিনি তাদেরকে আল আরকাম (রা)-এর বাড়িতে একত্রিত করতেন অথবা নওমুসলিমের নিজ বাড়িতে বা উপত্যকায় কাউকে পাঠাতেন, যেখানে তারা গোপনে কয়েকজন একত্রিত হয়ে দ্বীন শিক্ষা করতেন। এভাবে তাদের মধ্যে ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হয় এবং সবোর্পরি নতুন এই দ্বীনকে তারা এমন ভাবে অনুধাবন করে যে, দ্বীন প্রচারের জন্য তারা সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
ইসলামের আদর্শ তাদের হৃদয়ে ও অন্তরে এমন ভাবে প্রোথিত হয়ে যায় যে, তাদের রক্তের প্রতিটি অনু পরমানুর মধ্যে মিশে যায় ইসলামী চিন্তা চেতনা এবং তারা প্রত্যেকে হয়ে যায় দ্বীন ইসলামের জীবন্ত উদাহরন। তাদের প্রতিটি কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে ইসলামের সৌন্দর্য এবং তারা শত চেষ্টার পরও কুরাইশদের কাছ থেকে তাদের ইসলাম গ্রহনের সংবাদ গোপন করতে ব্যর্থ হয়।
তারা বিশ্বস্ত এবং ইসলাম গ্রহন করার মতো মন-মানষিকতা সম্পন্ন লোকদের সাথে কথা বলতে শুরু করেন। এভাবে, মক্কাবাসীরা তাদের আহবান সম্পর্কে জানতে শুরু করে এবং সমাজে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে শুরু করে। এটা ছিল মূলতঃ দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায় এবং এরপর প্রয়োজন হয় ইসলামী আহবানকে সমাজের মাঝে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে দেয়ার। পরবর্তীতে যখন শুরু হয় ব্যাপক গণসংযোগ এবং ইসলামের আহবান লিপ্ত হয় সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারনার সাথে প্রকাশ্য সংঘর্ষে, মূলতঃ তখন থেকেই ইসলামী দাওয়াত নওমুসলিমদের একত্রিত করে তাদের দ্বীন শিক্ষা দেবার পর্যায় অতিক্রম করে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে মানুষ ইসলামী আদর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে শুরু করে। ফলে, কিছু মানুষ ইসলামের আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহন করে আর বাকীরা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বস্তুত, কুফর ও বাতিলশক্তির উপর এবং ঈমান এবং ন্যায়পরায়নতা জয়লাভের পূর্বে এ ধরনের সংঘাত অনিবার্য। এছাড়া সত্যকে গ্রহন না করতে মানুষ যতই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে, তাদের অন্তর সত্যের অর্নিবান শিখাকে পাশ কাটিয়ে যেতেও পারে না, আবার আলোকিত আদর্শ দিয়ে প্রভাবিত না হয়েও পারে না। না পারে তারা তাদের বিদ্বেষী মনোভাব দিয়ে সত্য বিকাশের পথকে চিরকালের জন্য রুখে দিতে।
এভাবেই কুফর আর ইসলামের প্রচন্ড রকম পরস্পর বিরোধী ধ্যান-ধারনার মাঝে সংঘাত ও সংঘষের্র মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে ইসলামী দাওয়াতের গণসংযোগ পর্যায়। এ পর্যায় শুরু হয় সেই সময় থেকে যখন আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে করে এমন ভাবে কাবাঘর প্রদক্ষিন করেন যা মক্কাবাসীদের কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। মূলতঃ এই সময় থেকেই রাসূল (সা) কাফিরদের প্রচলিত জীবন-ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকাশ্যে সমাজের মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেন।
এ সময় রাসূল (সা)-এর উপর অবতীর্ণ ওহী দ্বারা আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা তাঁর একত্ববাদের ঘোষনা দেন এবং একই সাথে কোরআনের আয়াতের মাধ্যমেই কুফর জীবন-ব্যবস্থা ও মুর্তিপুজাকে বাতিল বলে ঘোষনা করেন। এছাড়া, এ সময়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব আয়াত নাজিল হয় যেখানে কাফিরদের অন্ধভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারাকে অনুকরন করাকে তীব্র ভাবে সমালোচনা করা হয়। আয়াত নাজিল হয় সমাজের প্রতারনাপুর্ণ লেনদেনের প্রকৃত চেহারা উম্মোচন করে, যে সকল আয়াতে সুদভিত্তিক লেনদেন এবং ওজনে কম দেয়ার মতো ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধকে প্রচন্ড ভাবে আক্রমণ করা হয়। সমাজের মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করার জন্য মুহাম্মদ (সা) তাদের একত্রিত করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। এ লক্ষ্যে তিনি তাঁর গোত্রের লোকদের একত্রিত করতেন, তাদের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন, তারপর তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং তাদের সহযোগিতা চাইতেন। কিন্তু গোত্রের লোকেরা তাকে প্রত্যাখ্যান করত। তিনি (সা) সাফা পাহাড়ের পাদদেশে মক্কাবাসীদের একত্রিত করে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেছিলেন, কিন্তু তাঁর এ আহবান শুধুইমাত্র কুরাইশ নেতাবৃন্দের বিশেষ করে আবু লাহাবের ক্রোধের কারণ হয়েছিলো। ফলে, আল্লাহর রাসুলের সাথে কুরাইশ সম্প্রদায় ও অন্যান্য আরবের মধ্যকার সম্পর্কের তীক্ষতা আরও গভীর হয়েছিলো। এভাবে সাহাবীদের দার-উল-আরকাম এবং উপত্যকায় গোপনে বিশেষ ভাবে শিক্ষা দেবার সাথে সাথে গণসংযোগের পর্যায়ও দাওয়াতী কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হলো।
এভাবে, ইসলামের আহবান শুধুমাত্র যোগ্য এবং সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের পরিবর্তে সাধারন ভাবে সমাজের সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। বস্তুতঃ ইসলামের আহবানের শক্তিতে শঙ্কিত হয়ে কুরাইশরা যখন রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীদের দিকে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর ঘৃণার বাণ নিক্ষেপ করতে লাগলো, তখনই ইসলামের প্রকাশ্য এ আহবান এবং ইসলামী চেতনাদৃপ্ত ব্যক্তি তৈরীর প্রভাব সমাজে প্রকাশিত হতে লাগলো। ইসলামী আদর্শ বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে যত বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলো, তা ততবেশী কাফিরদের ক্রোধ আর ঘৃণার কারণ হয়ে উঠলো । কাফিররা যখন অনুভব করলো তারা কোনভাবেই মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর প্রচারিত আদর্শকে পাশ কাটাতে পারবে না, তখন তারা ইসলামের আহবান চিরতরে বন্ধ করে দেবার লক্ষ্যে উঠে পড়ে লাগলো। আর সেইসাথে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি কাফিরদের অত্যাচার নির্যাতন ধারণ করলো।
বস্তুতঃ মুসলিমদের প্রকাশ্য জনসম্মুখে আহবান সমাজকে ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করেছিলো। যা দাওয়াতী কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সমাজে তৈরী করেছিলো প্রয়োজনীয় জনমত এবং এর সাহায্যেই পরবর্তীতে দাওয়াতের এই কার্যক্রম সমস্ত মক্কাব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে যতই দিন যেতে লাগলো মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। ইসলামের ছায়াতলে যেভাবে আসতে লাগলো বঞ্চিত, নির্যাতিত আর নিপীড়িত জনগোষ্ঠি, একই ভাবে সমাজের সম্মানিত ও নেতৃস্থানীয় মানুষ সহ ধনী ব্যবসায়ী শ্রেনীর মানষুও আলোকিত হলো সত্যের আলোয়। বস্তুতঃ তাদের ধনসম্পদ বা ব্যবসা-বাণিজ্য তাদেরকে রাসূল (সা) এর সত্য আহবানে সাড়া দেবার কর্তব্য থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বস্তুতঃ যারা ইসলাম গ্রহন করেছিলো তারা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলো পবিত্রতা, প্রজ্ঞা ও সত্যের সৌন্দর্যকে। যা তাদের মুক্ত করেছিলো মানবচরিত্রের অন্ধ গোয়ার্তুমি এবং মিথ্যা অহমিকার কলুষতা থেকে। ইসলাম গ্রহন করার মূহুর্তেই তারা বঝুতে পেরেছিলো এ আহবানের ন্যায়সঙ্গত ভিত্তি ও আহবানকারীর সত্যনিষ্ঠতা। এভাবে মক্কার প্রতিটি প্রান্তে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গেল এবং মক্কার নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহন করতে লাগলো। যদিও মক্কাবাসীদের প্রকাশ্যে এবং সমষ্টিগত ভাবে আহবান করার ফলে মুসলিমদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা তীব্র হয়েছিলো, তবুও মূলতঃ এ প্রকাশ্য আহবানই ইসলামের আহবানকে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভে সহায়তা করেছিলো। ইসলামী দাওয়াতের সাফল্য নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের শুধু ক্রোধের কারনই হয়নি, বরং এ সাফল্য তাদের অন্তরে তীব্র প্রতিহিংসার আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছিলো। কারণ, আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কার সমাজে শক্তিশালী ভাবে প্রতিষ্ঠিত জুলুম-নির্যাতন ও শোষন-বঞ্চনার মতো অসুস্থ, অনৈতিক ও বিকৃত ধ্যান- ধারনাগুলোকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করেছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে অনমনীয় ভাবে আদর্শিক সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন।
প্রকাশ্য ভাবে আহবানের এই পর্যায়টি ছিলো মূলতঃ একটি চুড়ান্ত ভাবে পার্থক্যকারী পর্যায়। এর একদিকে ছিলেন আল্লাহর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীবৃন্দ এবং অপরদিকে ছিলো কাফির নেতৃবৃন্দ ও কুরাইশ সম্প্রদায়। যদিও এর মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ, ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন এবং প্রকাশ্যে গণসংযোগের মধ্যকার সময়টিকেও বিবেচনা করা হয় খুবই নাজুক এবং স্পর্শকাতর হিসাবে, কারণ এই সময় ইসলামের দাওয়াতকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন ছিলো প্রচন্ড পরিমাণ প্রজ্ঞা, অন্তর্দৃষ্টি, ধৈয্য এবং সর্বোপরি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার নিপুন ক্ষমতার। কিন্তু, তারপরও প্রকাশ্য গণসংযোগ পর্যায়কেই সবচাইতে কঠিন সময় বলে বিবেচনা করা হয়। কারণ, এ জন্য মুসলিমদের সত্যকে নির্ভয়ে প্রচার করা এবং বাতিল শক্তি ও শাসন-ব্যবস্থাকে সরাসরি অস্বীকার করার মতো প্রচন্ড পরিমাণ সাহস ও পরিণতিতে যে কোন ধরনের পরিণাম মেনে নেবার জন্য মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিলো। এটা এ কারনেই যে, মুসলিমদের জন্য দ্বীন এবং ঈমানের পরীক্ষা ছিলো অবধারিত।
আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবীরা পর্বতসম অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন ও আক্রমন সহ্য করে ঈমানের এ পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হন।
প্রচন্ড আক্রমনাত্মক ও নিপীড়নমূলক এ অত্যাচারের সম্মুখীন হয়ে মুসলিমদের একটি দল মক্কা ত্যাগ করে আবিসিনিয়ায় চলে যায়, কেউ কেউ নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করে আর কিছু সংখ্যক মুসলিম নির্যাতন সহ্য করে মক্কায়ই থেকে যায়। মুসলিমরা ততক্ষন পর্যন্ত একাগ্রচিত্তে দৃঢ়তা এবং একনিষ্ঠতার সাথে বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না ইসলামের আলোকিত আহবান কুফর ধ্যান-ধারনার নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে থাকা মক্কার সমাজকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করে। যদিও মুহাম্মদ (সা)-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রথম তিনবছর মূলতঃ আল-আরকাম (রা) এর গৃহেই সীমাবদ্ধ ছিলো এবং এ সময়টাই ছিলো দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়, কিন্তু তারপরও পরবর্তী আটবছর আল্লাহর রাসূল (সা)কে করতে হয়েছিলো কঠিন সংগ্রাম। বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে নবুওতের সুস্পষ্ট প্রমাণ দেবার পরও পরবর্তী বছরগুলোতে তাকে লিপ্ত হতে হয়েছিলো বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে ভয়াবহ সংগ্রামে। বস্তুতঃ এ সময়টা স্মরণীয় হয়ে আছে এজন্য যে, এ দীর্ঘ আটবছরে কুরাইশরা মুসলিমদের একমহুর্তের জন্য অত্যাচার ও নির্যাতন করা থেকে বিরত হয়নি, না তারা দেখিয়েছিলো মুসলিম ও ইসলামের প্রতি কোনরকমের কোন সহানুভূতি। মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যকার এই সাংঘষির্ক এবং বিপরীতমুখী অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেই ইসলামের আহবান সমস্ত আরব উপদ্বীপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমস্ত মানুষের কাছে ইসলাম একটি আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। এছাড়া, হজ্জ্ব করতে আগত আরবদের মাধ্যমেও এ আহবান আরব গোত্রগুলোর মাঝে বিস্তৃতি লাভ করে। কিন্তু, এ আরব গোত্রগুলো কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবার আশঙ্কায় ঈমান আনার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে মূলতঃ দর্শকের ভূমিকা পালন করে এবং মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর প্রচারিত আদর্শকে সম্পূর্ন ভাবে পাশ কাটিয়ে যায়। বস্তুতঃ মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের এই ভয়ঙ্কর অবস্থাই দাওয়াতের তৃতীয় পর্যায় অর্থাৎ যে পর্যায় ইসলামকে সম্পূর্ন ভাবে প্রয়োগ করবে তার অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে।
মক্কাবাসীর ইসলামী দাওয়াতের প্রতি এরূপ বিদ্বেষ ও সহিংসতা ধীরে ধীরে মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার সমস্ত সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়।
উপরন্তু, মুসলিমদের উপর কাফিরদের ক্রমবধর্মান অত্যাচার ও নির্যাতন দাওয়াতী কাযর্ক্রমের পথে বিরাট বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থা আরও জটিল আকার ধারন করে যখন মক্কাবাসী সম্পূর্ণ ভাবে ইসলামকে প্রত্যাখান করে।
আমেরিকা কি সিরিয়া আক্রমন করবে?

গত বুধবার, ২১ আগষ্ট, সিরিয় সরকার দামেস্কের পাশেই আল-ঘুটায় জনসাধারনের উপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমন চালিয়ে প্রায় ১৭২৯ জনকে হত্যা করে। এর একদিন পরেই ফরাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট ফেবিয়াস বলেন, এধরনের আক্রমন প্রমানিত হলে ‘পাল্টা আক্রমন’ (reaction with force)-এর প্রয়োজন হতে পারে। গত শুক্রবার ২৩শে আগষ্টে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব চাক হেজেল বলেন, ক্রুজ মিসাইল দ্বারা সম্ভাব্য আক্রমনের প্রস্তুতির জন্য নৌবাহিনীর কিছু এসেট সিরিয়ার কাছে পৌছানোর আদেশ দিয়েছে পেন্টাগন। এছাড়া বৃটেনও খুব শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছে যেখানে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে কথা বলেন এবং ঐক্যমতে পৌছান যে এধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিপক্ষে একটি ‘শক্তিশালী জবাব’ (serious response) দিতে হবে। গত রবিবার, ওয়াশিংটনের বেশ কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতাগণ মতামত পোষন করেন যে তারা মার্কিন ও এর মিত্রশক্তি কর্তৃক সীমাবদ্ধ সামরিক আক্রমন প্রত্যাশা করেন। সুতরাং, এসবের মধ্যে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠে আসে: আমেরিকা কি সিরিয়া আক্রমন করবে?
এখানে একটি মূল বিষয় হচ্ছে, এটি খুবই অনাকাঙ্খিত যে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করবে এটা না উপলব্ধি করেই আসাদ সরকার ব্যপকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। প্রথমতঃ আসাদ সরকার ইতোমধ্যে বিদ্রোহীদের আক্রমনের মুখে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দ্বিতীয়তঃ তারা মিডিয়া উত্তেজনা এড়িয়ে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার না করেই বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। আসাদ সরকার ইতিপূর্বেও সল্প আকারে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে; কিন্তু আমেরিকা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এ থেকে একটি বিষয় বোঝা যায় যে আসাদ সরকার তখনই এধরনের (রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের মতো) গর্হিত কাজে লিপ্ত হবে যখন সে মার্কিন সবুজ সংকেত পাবে যাতে মার্কিন স্বার্থ জড়িত।
সুতরাং কেন ওয়াশিংটন এধরনের সবুজ সংকেত দেবে যাতে বিশ্ব জনমত উত্তেজিত হবে এবং এ ঘটনায় নিস্ক্রিয়তার দরুন মার্কিন ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপি ক্ষুন্ন হবে? আসাদ সরকার গত ৪৩ বছর মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করে আসছে। আমেরিকার এখনো আসাদ সরকারকে প্রয়োজন যেহেতু সিরিয় বিদ্রোহীদের মাঝে তার স্বার্থ রক্ষাকারী মিত্র খুঁজে বের করা অত্যন্ত দুরূহ বলেই প্রমানিত হয়েছে। এ বিষয়টি পরিস্কারভাবে উচ্চারিত হয়েছে মার্কিন জয়েন্ট চীফ অফ স্টাফ-এর চেয়ারম্যান জেনারেল ডেম্পসের বক্তব্যে যখন তিনি বলেন, আমি মনে করি যে [বিদ্রোহী] অংশই আমরা পছন্দ করি তাদের অবশ্যই তাদের স্বার্থ ও আমাদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকতে হবে যখন ক্ষমতা তাদের দিকে মোড় নেবে। বর্তমানে, তারা সে অবস্থানে নেই। সুতরাং, আমেরিকা এ ধরনের (রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের) সবুজ সংকেত তখনই দেবে যখন তারা এর ওজর দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে সিরিয়া আক্রমন করতে চাইবে।
আমেরিকা আসাদ সরকারের প্রতি ইরানি সমর্থন ও সিরিয়ার ভুমিতে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের দিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়া সরকারকে ঠেকিয়ে রাখা যতক্ষন না আমেরিকা কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহী দল তৈরি করা যা আসাদ সরকারকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। এ সবকিছুই ব্যর্থ হয়ে আসছে। হিজবুল্লাহ আসাদকে হোমসে কিছুটা শক্তি যুগিয়েছে, কুসাইর শহর দখল করে দিয়েছে ও দামেস্কে সহায়তা করেছে। এসব কিছুই ছিল সীমিত আকারে আর লেবাননে আভ্যন্তরিন বিষয়াদি ও যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক ক্ষতির দরুন তারা ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং, আমেরিকা সামরিক হস্তক্ষেপ করবে যদি বিদ্রোহীদের চাপে আসাদ সরকার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছায়।
বিগত কয়েক সপ্তাহে বিদ্রোহীদের ফিরতি উত্থান হয়েছে। যদিও গত দুবছরে যুদ্ধে এটি প্রথমবরের মতো নয়, কিন্তু এবারের বিশেষত্ব হল সামরিক ঘাটি ও চেকপয়েন্ট হতে বিদ্রোহীদের প্রাপ্ত অস্ত্র। আলেপ্পোর মেনেগ বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রন নিতে গিয়ে বিদ্রোহীরা অসংখ্য অস্ত্র প্রাপ্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে, টি-৭২ ট্যাংক, এন্টি ট্যাংক গান, হেভি মেশিন গানস, ৫৭মিমি এন্টি এয়ারক্রাফ্ট গানস, প্রচুর গ্রেনেড ও গোলাবারুদ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রাপ্তি হল দামেস্কের শহরতলীর অস্ত্র ভান্ডার যেখানে বিদ্রোহীরা শত-শত আধুনিক ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র খুঁজে পেয়েছে যা আসাদের যেকোনো ট্যাংকই ধ্বংস করতে সক্ষম। এসব ক্ষেপনাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ফরাসী মিলান টাইপ, রাশিয়ান করনেট, কনকার্স ও ফ্যাজোট টাইপ। এরমধ্যে করনেট সর্বাধুনিক এবং আসাদের যেকোনো আধুনিক ট্যাংক ধ্বংস করতে সক্ষম।
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহারের দিক দিয়ে আসাদের শুধুমাত্র দুটি সুবিধা রয়েছে। ভারী সামরিক অস্ত্রাদি ও বিমান। ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করে বিদ্রোহীরা ভারী অস্ত্রাদির ভান্ডার ও বিমান উড্ডয়নের জন্য ব্যবহৃত এয়ারবেইসগুলো দখল করে নিতে পারবে। তাই, আগামী দিনগুলোতে সিরিয়ার সামরিক-কৌশলগত ভারসাম্য পাল্টে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে – যা মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। এধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপের পেছনে যে উদ্দেশ্যগুলো থাকতে পারে তা নিম্নরূপ:
১) যেকোনো বড়মাপের মরনঘাতি অস্ত্রাদি যা বিদ্রোহী হাতে চলে আসতে পারে তা বিনষ্ট করা।
২) ভবিষ্যতে জাবহাত আল-নুসরাহ ও একই ধরনের জঙ্গী গ্রুপের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার সদ্ব্যবহার করা।
৩) ভবিষ্যতের কোনো তীব্র অবস্থার জন্য প্রস্তুতি নেয়া বিশেষ করে যদি বর্তমান সরকার যদি পরাভূত হয় এবং বিদ্রোহীরা বর্তমান বিশ্ব অবস্থার প্রভাববলয় থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে বিশেষ করে যদি তা হয় একটি ইসলামী রাষ্ট্র।আমেরিকা প্রাথমিকভাবে কোনো সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করতে ইচ্ছুক নয়। সুতরাং, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ঐক্যমতে পৌছাতে না পারলে, ন্যাটোর সহায়তায় সীমাবদ্ধ কোনো আক্রমন আসতে পারে সিরিয়ায়।
সন্তানকে সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দিন

অনেক কষ্ট করে একটি সন্তানকে ছোট থেকে বড় করার পর তার কাছ থেকে পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণ অন্তত: এতোটুকু অবশ্যই আশা করেন যে, তারা যেন তাদেরকে মান্য করে, শ্রদ্ধা করে এবং কখনো তাদের অবাদ্ধাচারণ না করে। কিন্তু আমাদের আজকের সমাজের সম্মানিত অভিভাবকগণ কি তাদের আদরের সন্তানদের কাছ থেকে এমন ন্যুনতম শালীন ও উত্তম ব্যবহার পাচ্ছেন?
বাস্তবতার আলোকে সত্য কথা বলতে গেলে অধিকাংশ অভিভাবকগণই দু’চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। আজকাল অনেককে খুবই দুঃখ ও আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায় যে, ‘সন্তান কথা শুনে না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে।’ সাম্প্রতিক সময়ে তো অবস্থা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সন্তান কর্তৃক আপন পিতাকে হত্যার সংবাদও আসছে। মা’কে মারধরের ঘটনা তো অনুল্লেখ্য !
কী ভয়াবহ ব্যাপার! একবারও কি আমরা চিন্তা করেছি? যে মা’ এতো কষ্ট করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন। মৃত্যুর চেয়েও কঠিন যন্ত্রণা সহ্য করে প্রসব করেছেন ও লালন-পালন করেছেন। যে বাবা বছরের পর বছর আপন সন্তানের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য তিলে তিলে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। সেই পিতা-মাতা তাদের বার্ধক্যে আপন সন্তান থেকে ন্যুনতম উত্তম ব্যবহারও পাবেন না! একটি সভ্য সমাজ এটা কিভাবে মেনে নিতে পারে? কেন এমনটি হচ্ছে? এতো আদর-যত্নে লালিত সন্তান নিজ বাবা-মা’র সাথে কেন এমন দুর্ব্যবহার করছে? তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি?
এর মূল কারণ আমরা আমাদের সন্তানের শারীরিক সুস্বাস্থ্য আর ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির জন্য সব কিছু করলেও তাদের নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন। একজন মানব সন্তান হিসেবে তার জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য্য বিষয় ছিলো সবার আগে তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করা এবং কুরআন-হাদীসের মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করা। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারেও অমনোযোগী। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম দৈহিক ও শারীরিকভাবে খুবই সুন্দর অবয়ব নিয়ে গড়ে উঠলেও নৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে থেকে যাচ্ছে অপূর্ণতা। স্রষ্টার সাথে সম্পর্কহীন থাকার কারণে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থ আর ভোগ-বিলাসই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। ফলে এক সময় তারা আর নিজ পিতা-মাতাকেও শ্রদ্ধা ও সম্মান করছে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও পার্থিব স্বার্থ ও পুঁজিবাদী চিন্তার বাইরে নৈতিক ও আদর্শিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মতো ঈমান ও তাওহীদের শিক্ষা নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে কি ভয়াবহ বিপর্যয় যে অপেক্ষা করছে তা আল্লাহই ভালো জানেন।
আজ এ অবস্থার পরিবর্তন চাইলে সন্তানদের জন্য সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যকাল থেকেই প্রতিটি মুসলিম শিশু-কিশোরকে ঈমান ও তাওহীদ শিক্ষা দিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তাদের সিলেবাসে ঈমান-আকীদা বিনির্মাণকারী পাঠ্য এবং কুরআন-হাদীসের মৌলিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ ব্যাপারে সময় থাকতেই কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার তাওফীক দিন। আমীন।ইসহাক খান
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৬ (ইসলামী দাওয়াতের জনসংযোগ পর্যায়)
[নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]
আল্লাহর রাসূল (সা) দাওয়াতী জীবনে আপোসের পরিবর্তে সংগ্রামের পথই বেছে নিয়েছিলেন এবং তাঁর দলকে কুরাইশদের সামনে সরাসরি এবং দৃঢ় ভাবে উপস্থাপন করে তাদের দিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। ফলে, কুরাইশদের উপর এর প্রভাব যা হবার কথা তাই হয়েছিল। ইসলামের এ দৃঢ় আহবানকে অস্বীকার করায় তাদের এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। এছাড়া ইসলামের আহবানের যে প্রকৃতি ছিল তা স্বভাবতই একে কুরাইশ এবং তৎকালীন সমাজের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত করেছিল। কারণ, এ আহবান ছিল আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকৃতি দেবার, এ আহবান ছিল মূর্তি পূজা ত্যাগ করে শুধুই মাত্র তাঁকে ইবাদত করার আর ক্ষয়ে যাওয়া যে কলুষিত সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে কুরাইশরা বাস করছিল তা পুরোপুরি বদলে ফেলার। মূলতঃ রাসূল (সা) যখন কুরাইশদের চিন্তা-ভাবনার অসারতা প্রমান করেন, তাদের উপাস্য দেব-দেবীকে সমাজে হাস্যকর ভাবে উপস্থাপন করেন, তাদের ক্ষয়ে যাওয়া জীবন ব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে দেন এবং সর্বোপরি তাদের নিপীড়নমূলক সমাজ ব্যবস্থার মুখোশ উম্মোচন করেন তখন স্বভাবতই ইসলাম দাঁড়িয়ে যায় তৎকালীন সমাজের সাথে সাংঘর্ষিক এক অবস্থানে। আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত আয়াত দিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কুরাইশদের জীবন-ব্যবস্থাকে আক্রমন করতেন। তিনি তাদের শুনাতেন সেই আয়াত যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
“নিশ্চিত ভাবে তোমরা (অবিশ্বাসীরা) এবং তোমরা আল্লাহকে ছাড়া যাদের উপাসনা করো তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন”। [সুরা আল-আম্বিয়া: ৯৮]
তিনি কঠিন ভাবে সমাজের প্রচলিত শোষনমূলক সুদী ব্যবস্থাকে আক্রমন করতেন।
“এবং তোমরা সুদ হিসাবে (অন্যদের) যা দিয়ে থাকো, এ আশায় যে তা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হবে, আল্লাহর দৃষ্টিতে এতে কোন বৃদ্ধি নেই”। [সুরা আর-রুম: ৩৯]
তিনি আক্রমন করতেন তাদের যারা মাপে কম দেয়,
“ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যখন তারা অন্যের কাছ থেকে মেপে নেয় পুরোপুরি নেয়, কিন্তু যখন অন্যকে দেয় তখন প্রাপ্যের চাইতে কম দেয়।” (সুরা আল-মুতফফিফিন: ১-৩)
এর ফলশ্রতিতে কুরাইশরা স্বাভাবিকভাবেই রাসূল (সা)-কে প্রতিহত করার চেষ্টা করে এবং তাঁর ও তাঁর সাহাবীদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সংঘর্ষের ফলে তারা ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর প্রচারিত দ্বীনকে অপপ্রচার, নিযার্তন, বয়কট সহ বিভিন্ন উপায়ে আক্রমন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। তাদের এহেন কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল (সা) কোন রকম নমনীয়তা প্রদর্শন না করে তাদের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যান এবং আল্লাহর আদেশ অনুসারে তাদের ঘুঁণে ধরা কলুষিত আদর্শকে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন। কুরাইশদের শত অত্যাচার আর নিযার্তন সত্তেও তিনি (সা) কোন রকম আপোষ বা সমঝোতা ছাড়াই সব মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেন, যদিও তাঁর না ছিল নিজেকে রক্ষা করার মতো কোন ব্যবস্থা, না পেয়েছিলেন বাস্তবিকভাবে কোন সাহায্য, না ছিল তাঁর পক্ষে কোন জোট আর না তাঁর কাছে ছিল কোন অস্ত্র। সমাজের দৃষ্টি আকষর্ন করে এবং প্রতিদ্বন্ধি মনোভাব নিয়েই তিনি (সা) নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন। সকল দূর্গম বাঁধা অতিক্রম করে তিনি দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের সাথে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহবান করেছিলেন, তিনি (সা) কখনও ক্ষমতাশীন কাউকে দলে ভিড়ানোর জন্য এতোটুকু দূর্বলতাকে প্রশ্রয় দেননি এবং আল্লাহর বাণী প্রচারের জন্য সবসময় যন্ত্রনাদায়ক দূর্গম গিরিপথ অতিক্রম করতে প্রস্তুত ছিলেন। বস্তুতঃ এ কারনেই কুরাইশরা তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের পথে যে কঠিনতম প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেছিলো তা তিনি অবলীলায় অতিক্রম করতে পেরেছিলেন।
আল্লাহর রাসূল (সা) দক্ষতা ও সফলতার সাথে সত্যের আহবান মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার পর মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আসতে
থাকে আর সত্য তার আপন শক্তিতে পরাজিত করে মিথ্যাকে। এভাবেই ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে আরববাসীদের মধ্যে, বহু মূর্তিপূজারী, খ্রীশ্চিয়ান ধমের্র অনুসারী ইসলামের আলোয় হয় আলোকিত, উপরন্তু কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকেরাও গভীর আগ্রহে শুনতে থাকে কুরআনের সুললিত বাণী।
রাসূল (সা) মক্কায় থাকাকালীন সময়েই আল-তুফাইল ইবন ’আমর আল-দাউসী একবার সেখানে আসেন। তিনি ছিলেন আরবদের মধ্যে সম্মানিত, তীক্ষ ধীশক্তির অধিকারী আর উচুঁ দরের একজন কবি। মক্কায় পা রাখার সাথে সাথেই কুরাইশরা তাকে মুহাম্মদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেয় এবং বলে, মুহাম্মদ হচ্ছে একজন ভয়ঙ্কর যাদুকর, তার কথা মানুষকে তার পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলে। তারা খুবই উদ্বিগ্ন ভাবে তাকে বলে যেন সে কোন ভাবেই মুহাম্মদের সাথে কথা না বলে কিংবা তার কথাও না শুনে। এরপর একদিন তুফাইল কাবাগৃহে যান, ঘটনাক্রমে মুহাম্মদ (সা)ও সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তুফাইল তাঁর কিছু কথা শুনলেন এবং আবিষ্কার করলেন এগুলো খুবই চমৎকার। তারপর তিনি নিজেই নিজেকে বলেন,“আল্লাহর শপথ, আমি একজন বুদ্ধিমান মানুষ, একজন কবি, খুব ভালো ভাবেই জানি ভালো আর মন্দের পার্থক্য, তাহলে এই মানুষটি যা বলছে তা শুনতে আমাকে কিসে বাঁধা দিচ্ছে ? যদি তা ভালো হয় তবে আমি অবশ্যই তা গ্রহন করবো আর যদি খারাপ হয় তবে তা ছুঁড়ে ফেলে দেবো।”তারপর তিনি মুহাম্মদ (সা)-কে তাঁর গৃহ পর্যন্ত অনুসরন করেন এবং তাকে তার নিজের সবকথা খুলে বলেন। মুহাম্মদ (সা) তাকে কুরআন তিলওয়াত করে শোনান এবং দ্বীন ইসলামের দিকে আহবান করেন। তুফাইল দ্বিধাহীন চিত্তে সত্যকে আলিঙ্গন করেন এবং মুসলিমদের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যান। এরপর তিনি নিজ গোত্রের লোকদের মাঝে ফিরে যান এবং সেখানে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন।
নতুন নবী আর্বিভাবের খবর শুনে বিশজন খ্রীশ্চিয়ানের একটি দল মক্কায় আসে মুহাম্মদ (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে। রাসূল (সা)-এর আহবান শুনবার পর তাকে সত্য নবী বলে স্বীকৃতি দেয় এবং তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। এই ঘটনা শুনে কুরাইশরা ক্রোধে উম্মত্ত হয়ে পড়ে এবং মক্কা ত্যাগ করার সময় এ দলটির পথ রোধ করে দাঁড়ায়, তারপর ছুঁড়ে দেয় তাদের দিকে তীর্যক আর অপমানজনক মন্তব্য, বলে,“আল্লাহ তোমাদের ধ্বংস করুন! কি জঘন্য খারাপ লোকই না তোমরা। তোমাদের স্বজাতি তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে এই মানুষটির ব্যাপারে খোঁজ খবর নেবার জন্য। আর যেই মাত্র না তোমরা তার সাথে সাক্ষাৎ করলে ওমনি নিজ ধর্ম ত্যাগ করে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলে!” কিন্তু এ ঘটনা তাদের অবস্থানকে এতোটুকু টলায়মান না করে বরং আল্লাহর উপর তাদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় আর মজবুত করে। এভাবে, সমাজে রাসূল (সা) এর প্রভাব যতোই বাড়তে থাকে, মানুষের কুরআনের বাণী শুনবার আগ্রহও ততো গভীর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয় যে, কুরাইশদের মধ্য হতে মুহাম্মদ (সা) এর ঘোরতর শত্রুও কুরআনের বাণী শুনে চমৎকৃত হয়ে ভাবতে থাকে মুহাম্মদ আসলে যা বলে তা সবই সত্য। এবং এ ভাবনা তাদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, তারা লোক চক্ষুর অগোচরে লুকিয়ে লুকিয়ে কুরআন শুনতে শুরু করে।
মুহাম্মদ (সা) যখন তাঁর গৃহে নামাজ আদায় করতেন তখন আবু সুফিয়ান ইবন হারব, আবু জাহল ’আমর ইবন হিশাম এবং আল-আকনাস ইবন সুরাইক এরা প্রত্যেকেই কুরআন শুনবার আকাঙ্খায় একে অন্যেকে লুকিয়ে সেখানে উপস্থিত হতো। প্রত্যেকেই ছদ্মবেশ ধারন করে এমন এক জায়গায় বসতো যেখান থেকে তারা তিলওয়াত শুনতে পারে। কেউই টের পেতো না অপরজনের উপস্থিতি। আল্লাহর রাসূল (সা) প্রতিদিনই রাতের ইবাদতের জন্য উঠতেন এবং কুরআন তিলওয়াত করতেন। প্রতি রাতেই তারা খুব মনোযোগের সাথে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কুরআন শুনতো যে পর্যন্ত না ভোরের আলো ফুটে উঠে, তারপর তাড়াতাড়ি ছত্রভঙ্গ হয়ে স্থান ত্যাগ করতো। এভাবে একদিন বাড়ি ফিরবার পথে হঠাৎ করেই তাদের একে অন্যের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়, ফলে অপ্রস্তুত হয়ে একজন আরেকজনকে অভিযুক্ত করে বলতে থাকে, “খবরদার এমন কাজ যেন আর না হয়, যদি আমাদের মধ্য হতে কোন দূর্বল চিত্তের নির্বোধ লোক তোমাদের দেখে ফেলে তবে কিন্তু সমাজে তোমাদের অবস্থান হয়ে যাবে নড়বড়ে আর পাল্লা মুহাম্মদের দিকেই ঝুঁকে যাবে।”পরদিন তারা প্রত্যেকেই অনুভব করতে থাকে তাদের পা যেন অনিচ্ছাসত্তেও তাদের চুম্বকের মতো সেদিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে তারা কাটিয়েছে গতরাত। তারা তিনজন সেদিন আবারও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনে মুহাম্মদ (সা) এর কন্ঠে কুরআনের সুমধুর বাণী। ভোরবেলা বাড়ি ফেরার পথে আবারও দেখা হয় তাদের, একইভাবে অভিযুক্ত করে তারা একে অন্যেকে, কিন্তু এসব কোন কিছুই তাদের তৃতীয় রাতে সেখানে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তারা যখন বুঝতে পারে মুহাম্মদের প্রচারিত বাণীর প্রতি তাদের অপ্রতিরোধ্য দূর্বলতা তখন তারা দৃঢ়চিত্তে শপথ করে যে সেখানে তারা আর কখনই যাবে না। এ ঘটনাটির ফলে মূলতঃ মুহাম্মদ (সা) এর ব্যাপারে তাদের অন্তরে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম হয়। কিন্তু, এ ঘটনায় মূলতঃ তাদের নিজেদের দূর্বলতা নিজেদের কাছে যেভাবে উম্মোচিত হয়ে পড়ে, গোত্রীয় প্রধান হিসাবে তা মেনে নেয়া তাদের জন্য হয়ে যায় খুবই কষ্টকর। তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এটা অন্যদেরকে মুহাম্মদের দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করবে।
বস্তুতঃ কুরাইশদের তৈরী সবরকম প্রতিবন্ধকতা সত্তেও ইসলামের আলো মক্কার সীমানা ভেদ করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আশঙ্কাকে সত্যে পরিণত করে ইসলামের আহবান আরব উপদ্বীপের সমস্ত গোত্র গুলোর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে তারা মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড আক্রমনাত্মক ভূমিকা গ্রহন করে। ক্রমবর্ধমান নির্যাতন আর আক্রমন যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকে তখন রাসূল (সা) তায়িফ গোত্রের কাছে নুসরাহ (সাহায্য) আর বনু ছাকিফ গোত্রের কাছে নিরাপত্তা চান এই আশায় যে তারা হয়তো ইসলাম গ্রহন করবে। তিনি নিজে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেন, কিন্তু বিনিময়ে তারা মুহাম্মদ (সা) এর সাথে করে প্রচন্ড রূঢ় আর নিমর্ম আচরণ। তাদের লেলিয়ে দেয়া দাস আর বখাটে ছেলেরা মুহাম্মদ (সা) কে নানা রকম কটুক্তি করেই ক্ষান্ত হয় না সেইসাথে অবিরাম ভাবে পাথর নিক্ষেপ করে তাঁর পা থেকে মাথা পর্যন্ত করে ফেলে রক্তাক্ত। এদের নির্মম অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে তিনি (সা) রবি’য়াহর পুত্র শাবিব ও শায়বার খেজুর বাগানে আশ্রয় নেন এবং সেখানে বসে বিষন্ন হৃদয়ে ভাবতে থাকেন ইসলামের দাওয়াত ও তাঁর বর্তমান পরিস্থিতির কথা। তিনি জানতেন নেতৃত্বের দেয়া নিরাপত্তা ব্যতিত তিনি মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন না, একইভাবে তিনি তায়েফেও ফিরে যেতে পারবেন না, বিশেষ করে সেখানে যে আচরণের শিকার হয়েছেন তিনি, এরপর। পাশাপাশি তিনি ফলের বাগানেও থাকতে পারছিলেন না, কারণ তা দুজন কাফিরের মালিকানায় ছিল। প্রচন্ড অসহায় ভাবে তিনি মর্মাহত আর ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে আকাশের দিকে দু’হাত উচুঁ করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। ব্যথিত হৃদয়ে প্রচন্ড দৃঢ়তার সাথে বলেন,“প্রভু আমার! আমি দূর্বল, অসহায়, সহায় সম্বলহীন, নগন্য। তাই মানুষের উপেক্ষার পাত্র। আমার সকল ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে আমি আজ তোমারই কাছে আবেদন করছি। পরম করুণাময় আমার! তুমিই তো দর্বল আর অসহায়ের আশ্রয়দাতা। তুমি কি এই সব মানুষের নিষ্ঠুরতার উপরই আমাকে ছেড়ে দিচ্ছো প্রভু? যারা আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় কিংবা আমার সাথে শত্রুতা করে তুমি কি তাদের দয়ার উপরই কি আমাকে ছেড়ে দিলে? তুমি যদি আমার উপর নারাজ না হয়ে থাকো তবে আমার আর কিছুর পরোয়া নেই। তুমি যদি আমাকে দাও নিরাপত্তা তবে এটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট। তুমি আমাকে এমন নিরাপত্তা দাও যেন সকল আধাঁর কেটে গিয়ে আমার চারিদিক হয় আলোকিত। আলোকিত হয় আমার ইহকাল আর পরকাল। তোমার ক্রোধ নয়, আমার উপর করুণা বর্ষিত করো দয়াময়। নিশ্চয়ই তুমিই সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান, নিশ্চয়ই তোমার হাতেই সর্বময় কর্তৃত্ব”।
পরবর্তীতে রাসূল (সা) আল-মুত’য়িম ইবন ’আদির নিরাপত্তায় মক্কায় ফিরে আসেন। এদিকে কুরাইশদের কানে তায়িফের ঘটনা পৌঁছানোর সাথে সাথে তারা তাদের অত্যাচার আর দূর্ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি করে এবং তারা মক্কাবাসীদের মুহাম্মদ (সা) আহবানে সাড়া দিতে নিষেধ করে। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে মক্কাবাসীরা তাঁর সাহচার্য পরিত্যাগ করে এবং তাঁর আহবান শোনা থেকে বিরত থাকে। এতো কিছুর পরও মুহাম্মদ (সা) বিন্দুমাত্র ভেঙ্গে না পড়ে উৎসবের মাস গুলোতে আগত গোত্রের মানুষদের আল্লাহর দ্বীনের পথে আহবান করতে থাকেন, তাদেরকে ইসলামের
দাওয়াত দেন এবং নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসাবে তাদের কাছে উপস্থাপন করে তাঁর উপর ঈমান আনতে বলেন। কিন্তু তিনি (সা) প্রতি পদক্ষেপেই হন তাঁর অবিশ্বাসী এবং কুটিল মানসিকতার চাচা আবু লাহাবের নজরদারীর শিকার। সে আগত গোত্রের লোকদের আহবান করে রাসূল (সা)-কে উপেক্ষা করতে, তাঁর কথা না শুনতে কিংবা তাঁর প্রতি মনোযোগ প্রদর্শন না করতে।
এরপর দাওয়াতী কাজ পরিচালনার জন্য মুহাম্মদ (সা) ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। তিনি (সা) বিভিন্ন গোত্রের আবাসস্থলে যান এবং তাদের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তিনি কিন্দা, কালব, বনু হানিফাহ, এবং বনু ’আমির ইবন সা’সাহ গোত্র গুলোকে আহবান করেন সত্য দ্বীনের পথে। কিন্তু, এরা সকলেই রাসূল (সা) এর আহবানে সাড়া না দিয়ে তিক্ততার সাথে তাঁর বিরোধিতা করে বিশেষ করে বনু হানিফাহ । বনু ’আমির ইবন সা’সাহ তাঁর (সা) মৃত্যুর পর কাঙ্খিত কর্তৃত্বের দাবী করে। তিনি (সা) বলেন, “শাসন-কর্তৃত্ব তো শুধুই আল্লাহর হাতে এবং তিনি যাকে খুশী তাকে তা দান করেন।”একথা শোনার পর বনু ’আমির কোন রকম সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে।
এভাবে মক্কা ও তায়িফবাসীসহ সকল গোত্রের লোকেরা ইসলাম প্রত্যাখান করে। মক্কায় ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগত অন্য সকল গোত্রের লোকেরা ক্রমশঃ এইসব ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হয় এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই তারা সরে যায় মুহাম্মদ (সা) থেকে অনেক অনেক দূরে। সমস্ত জায়গা থেকে প্রত্যাখাত মুহাম্মদ (সা) হয়ে পড়েন সম্পূর্ণ একাকী । মক্কাবাসীদের চরম প্রত্যাখান, অবিশ্বাস আর প্রচন্ড বিরোধিতার মুখে তাঁর মক্কায় দ্বীন প্রচারকে ক্রমশঃ কঠিনতর করে তুলে আর মক্কাবাসীদের ইসলাম গ্রহন করার সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে।

















