তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৫ (মু’তার যুদ্ধ)
প্রতিনিধি দল বহির্বিশ্ব থেকে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পরপরই আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করেন এবং আরব ভূ-খন্ডের বাইরে জিহাদ করার ঘোষনা দেন। এ লক্ষ্যে, তিনি (সা) রোমান ও পারস্যের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে আরম্ভ করেন। আর, রোমান সাম্রাজ্যের সাথে তাঁর সীমান্ত যুক্ত থাকায় তিনি (সা) তাদের গতিবিধির উপর বিশেষ ভাবে নজর দেন এবং গুপ্তচরের মাধ্যমে ধারাবাহিক ভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে থাকেন। রাসূল (সা) তাঁর প্রজ্ঞা ও দূরদর্শীতার কারণে এটা বুঝতে পেরেছিলেন যে, যদি একবার আরব ভূ-খন্ডের বাইরে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো যায়, তবে ইসলামের আহবানকে বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। তাই তিনি (সা) এ লক্ষ্যে, আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া) থেকেই জিহাদের সূচনা করবেন বলে স্থির করেন। কারণ, খসরুর ইয়েমেনের গর্ভনর বরহান ইসলাম গ্রহন করার পর তিনি (সা) সেখান থেকে কোনরকম আক্রমণের আশঙ্কা মুক্ত ছিলেন। এজন্য, তিনি (সা) রোমানদের মুকাবিলা করার জন্য আল-শামেই সৈন্য পাঠানোর চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন। এরপর, হিজরী ৭ম সালের জুমাদিউল ’উলা মাসে, হুদাইবিয়া সন্ধির কয়েকমাস পরেই তিনি (সা) তিন হাজার যোদ্ধার এক দক্ষ বাহিনী তৈরী করেন। যায়েদ ইবন হারিছাহকে এ বাহিনীর নেতা নিযুক্ত করে নির্দেশ দেন যে, “যদি যায়েদ নিহত হয় তবে, জা’ফর নেতৃত্বে থাকবে, আর জা’ফর নিহত হলে ’আব্দুল্লাহ ইবন রুওয়াহাহ্ নেতৃত্ব দেবেন।”
নির্দেশ পাবার পর সৈন্যবাহিনী নিদিষ্ট গন্তব্যে যাত্রা শুরু করে, আর নও মুসলিম হিসাবে খালিদ ইবন ওয়ালিদ (তিনি হুদাইবিয়া সন্ধির পরপরই ইসলাম গ্রহন করেছিলেন) তাদের সঙ্গী হন। রাসূল (সা) সৈন্যদলের সাথে মদীনার প্রান্তবর্তী সীমানা পর্যন্ত যান। মুসলিম যোদ্ধাদের তিনি (সা) নারী, পঙ্গু বা অচল ব্যক্তি ও শিশুদেরকে আক্রমণ না করার নির্দেশ দেন এবং সেইসাথে, গাছপালা বা বাড়ীঘরও ধ্বংস করতে নিষেধ করেন। তারপর, রাসূল (সা) এবং মদীনার বাকী মুসলিমরা সৈন্যদলের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলেন, “এ যাত্রায় আল্লাহ তোমাদের সহায় হউন, তোমাদের রক্ষা করুন আর নিরাপদে আমাদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন ।”
এরপর, সৈন্যবাহিনী রনাঙ্গনের দিকে এগিয়ে যায়। এর মধ্যেই নেতৃস্থানীয়রা যুদ্ধের কৌশল নির্ধারন করে। তারা ঠিক করে যে, শত্রুকে ত্বড়িৎগতিতে আচম্কা আক্রমণ করে তাদের বিজয়কে সুনিশ্চিত করবে, ঠিক যেভাবে রাসূল (সা) আক্রমণ পরিচালনা করে থাকেন। সৈন্যদলের নেতৃস্থানীয় যোদ্ধারা এতে সম্মতি দিলে তারা উদ্দেশ্য সাধনে অগ্রসর হতে থাকে। কিন্তু, মু’য়ান (আরবের উত্তরাঞ্চল) এলাকায় পৌঁছানোর পর তারা শুনতে পায় যে, হিরাক্লিয়াসের আল-শাম অঞ্চলের গভর্নর শারহাবিল আল-গাচ্ছানী তাদের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে ১,০০,০০০ সৈন্য সমাবেশ করেছে। আকস্মিক এ সংবাদে তারা হতবিহবল হয়ে দুই রাত সেখানেই যাত্রা বিরতী করে এবং ভয়ঙ্কর এ বাহিনীকে কিভাবে মুকাবিলা করবে সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে। এ অবস্থায় তারা চিন্তা করে দেখে যে, তাদের জন্য সবচাইতে নিরাপদ পদক্ষেপ হচ্ছে রাসূল (সা)-কে পত্র মারফত অবস্থা বণর্না করা। তিনি (সা) যদি তাদের সাহায্য করার জন্য আরও সৈন্য পাঠান তো ভাল, আর তা না হলে, পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য তারা তাঁর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করবে।
এ অবস্থায় ’আব্দুল্লাহ ইবন রুওয়াহাহ্ সৈন্যদলকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে বলেন, “আল্লাহর কসম! তোমরা শাহাদতের পেয়ালা পান করার জন্যই এখানে এসেছো, যদিও তোমরা মৃত্যুকে অপছন্দ করো। জেনে রাখো, শত্রুর সাথে আমরা আমাদের সংখ্যা কিংবা শক্তিসামর্থ্য দিয়ে যুদ্ধ করি না, আমরা যুদ্ধ করি আমাদের দ্বীন ইসলামের শক্তি দিয়ে যা দিয়ে আল্লাহতায়ালা আমাদের সম্মানিত করেছেন। সুতরাং, তোমরা নির্ভয়ে এগিয়ে যাও। শাহাদত কিংবা বিজয়, দুটোর যে কোনটাই আমাদের জন্য পছন্দনীয়।” একথা শোনার পর, মুসলিম বাহিনী ঈমানী শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠে এবং দৃঢ় চিত্তে শত্রুপক্ষের মুকাবিলায় এগিয়ে যায়, যে পর্যন্ত না তারা মাশরিফ নামের এক গ্রামে পৌঁছে। শত্রুপক্ষ যখন মুসলিম বাহিনীর দিকে এগিয়ে আসে ততক্ষনে মুসলিমরা মু’তাহ গ্রামে প্রবেশ করেছে। এখানেই, দুইপক্ষ পরস্পরের মুখোমুখি হয়। শুরু হয় যুদ্ধ।
মু’তার প্রাঙ্গনে এ যুদ্ধ ছিল স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ। যুদ্ধের ময়দানের সর্বত্র ছিল মৃত্যুর বিভীষিকা, আর চারিদিকে বইছিলো রক্তের বন্যা। শাহাদতের অমিয় স্বাদ পান করার তীব্র আকাঙ্খায় মাত্র ৩০০০ মুসলিম সৈন্য জীবন বাজি রেখে লড়েছিল ২,০০,০০০ রোমান যোদ্ধার সাথে (রোমানরা তাদের বাহিনীকে সাহায্য করার জন্য আরও ১,০০,০০০ অতিরিক্ত সৈন্য প্রস্তুত করে রেখেছিল)। ভয়ঙ্কর ও অসম এ যুদ্ধে যায়িদ ইবন হারিছাহ্ ইসলামের পতাকা হাতে লড়াই করছিলেন। এক পর্যায়ে, পরিণামের কথা বিন্দুমাত্র না ভেবে তিনি শত্রুব্যুহ ভেদ করে অরক্ষিত অবস্থায় রোমান সৈন্যদের ভেতরে ঢুকে যান। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তিনি প্রচন্ড সাহসের সাথে যুদ্ধ করতে থাকেন। তার সাহসিকতা ছিল দুর্দান্ত আর নায়কচিত বীরত্ব ছিল অতুলনীয়। শেষ পর্যন্ত শত্রুর বর্শার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এরপর জা’ফর ইবন আবি তালিব ইসলামের পতাকা তুলে নেন। জা’ফর ছিলেন ৩৩ বছরের সুদশর্ন এক টগবগে যুবক। মৃত্যুর ভয়ঙ্কর বিভীষিকাকে উপেক্ষা করে তিনিও বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে থাকেন। একপর্যায়ে, শত্রুপক্ষ তার সওয়ারকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিনি ক্ষিপ্র গতিতে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে তলোয়ারের এক আঘাতে ঘোড়ার পায়ের রগ কেটে দেন। তারপর, দ্রুততার সাথে শত্রুকে আঘাত করতে করতে পায়ে হেঁটেই শত্রুবুহ্যের একেবারে ভেতরে ঢুকে যান। এ সময়ে এক রোমান সৈন্য তাকে তলোয়ারের আঘাতে দ্বিখন্ডিত করে হত্যা করে ফেলে। এরপর, আব্দুললাহ্ ইবন রুওয়াহাহ্ পতাকা তুলে নেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে শত্রুর মুকাবিলায় অগ্রসর হন। প্রথম দিকে সামনে এগুতে একটু দ্বিধাগ্রস্থ হলেও একরকম জোর করেই তিনি নিজেকে ভয়ঙ্কর রণক্ষেত্রে ঠেলে দেন, তারপর যুদ্ধ করতে করতে একসময় তিনিও শহীদ হয়ে যান। এ সময়ে, ছাবিত ইবন আকরাম পতাকা হাতে বলেন, “মুসলিমরা! তোমরা একজনের পেছনে সারিবদ্ধ হও।”এরপর, মুসলিমরা খালিদ ইবন আল- ওয়ালিদের পেছনে সমবেত হয়। খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ তার সৈন্যদলকে এমন দক্ষতার সাথে সজ্জিত করেন, যাতে শত্রুপক্ষ বেশ চাপের মুখে পড়ে যায়। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার পূর্ব পর্যন্ত তিনি শত্রুপক্ষকে ছোট ছোট আক্রমণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে বাধ্য করেন।
বস্তুতঃ এ যুদ্ধ ছিল এক অসম যুদ্ধ, কারণ শত্রুপক্ষের বিপুল সংখ্যার তুলনায় মুসলিম বাহিনী ছিল অত্যন্ত নগন্য। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে, রাতের বেলায় খালিদ চাতুর্যপূর্ণ এক যুদ্ধকৌশলের পরিকল্পনা করেন। খালিদ তার বাহিনীর একটি অংশকে শোরগোল তৈরী করার জন্য পেছনে রেখে দেন, যাতে রোমানরা মনে করে মুসলিমদের সাহায্য করার জন্য আরও সৈন্যদল এসে পৌঁছেছে। হট্টগোল শুনে রোমানরা ভীত হয়ে একপর্যায়ে আক্রমণ বন্ধ করে দেয়। এমনকি এ অবস্থায় খালিদ (রা) আক্রমণ বন্ধ করলে তারা অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে যায়। এরপর, খালিদ (রা) যুদ্ধের ময়দান থেকে তার সৈন্যদল প্রত্যাহার করে নেন এবং দলবল নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন। যদিও এ যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয়ী বা পরাজিত কোনটাই হয়নি, কিন্তু তাদের অর্জন ছিল উল্ল্যেখযোগ্য।
এ যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী মুসলিমদের প্রত্যেকেই জানত যে, প্রতিটি মূহুর্তে মৃত্যু তাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে, কিন্তু তারপরেও তারা বীরের মতো যুদ্ধ করেছে এবং মৃত্যুকে নির্ভয়ে আলিঙ্গন করেছে। কারণ, আল্লাহর জন্য হত্যা করতে বা জীবন দিতে মুসলিমরা আদিষ্ট। আর, আল্লাহর জন্য যুদ্ধ করা হচ্ছে বিনিয়োগের সবচাইতে লাভবান ক্ষেত্র। এটাই হচ্ছে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“নিশ্চয়ই, আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মু’মিনদের জান ও মাল কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে, যাতে তারা [কখনো] হত্যা করে এবং [কখনো] নিহত হয়। এ সত্য অঙ্গীকার করা হয়েছে তাওরাত, ইঞ্জিল এবং কুরআনে। আর, কে আছে যে আল্লাহ অপেক্ষা অঙ্গীকার পালনে অধিক সত্যবাদী? অতএব, তোমরা আনন্দ করতে থাকো তোমাদের এই ক্রয়-বিক্রয়ের উপর যা তোমরা সম্পাদন করেছ, আর এটাই হচ্ছে চুড়ান্ত সফলতা।” [সুরা তওবাঃ ১১১]
আর, এ কারণেই নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও এ যুদ্ধের নায়করা বীরের মতো যুদ্ধ করেছে। তারা এটাও প্রমাণ করেছে যে, যুদ্ধ ছাড়া মুসলিমদের জন্য যদি অন্য কোন পথ খোলা না থাকে, তাহলে তাদের অবশ্যই যুদ্ধ করতে হবে। সেক্ষেত্রে, নিশ্চিত মৃত্যুর বিভীষিকা কখনোই বিবেচ্য বিষয় হবে না। আর, জিহাদের ক্ষেত্রেও শত্রুপক্ষের সংখ্যা, শক্তিসামর্থ্য, অস্ত্রসস্ত্র এগুলো বিবেচ্য বিষয় হবে না, বরং লক্ষ্য অর্জনই হবে মূল বিষয়, তার জন্য যতো বড় ত্যাগেরই প্রয়োজন হোক না কেন কিংবা তার ফলাফল যাই হোক না কেন।
মুসলিমদের সাথে রোমানদের এই যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যে জন্য মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও মুসলিম সেনানায়কদের যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে মুকাবিলা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। বস্তুতঃ মুসলিমদের মৃত্যুর ভয়ে কখনোই ভীত হওয়া উচিত না। আর, না তাদের আল্লাহর পথে জিহাদ করা ব্যতীত দ্বিতীয় কোন বিষয় চিন্তা করা উচিত। এ যুদ্ধের শুরু থেকেই আল্লাহর রাসূল (সা) জানতেন রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তে তাদের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীর মুখোমুখি দাঁড়ানো কতোটা বিপদজনক। কিন্তু, শত্রুপক্ষের অন্তরে ভীতি ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এটা খুবই কার্যকরী উপায় ছিল। আর সমস্ত বিশ্ববাসীকে এটা দেখানোও প্রয়োজন ছিল যে, সংখ্যায় নগন্য হওয়া সত্তেও বিশ্বাসীরা কিভাবে শুধু তাদের অতুলনীয় ঈমানী শক্তিকে পুঁজি করে, তাদের রবের সন্তুষ্টির জন্য দুর্দান্ত সাহসিকতার সাথে শত্রুকে মুকাবিলা করতে পারে। প্রকৃত অর্থে, জিহাদই হচ্ছে একমাত্র উপায়, যার মাধ্যমে মুসলিমরা নতুন নতুন ভূ-খন্ড জয় করে সেখানে ইসলামের হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করতে পারে, ছড়িয়ে দিতে পারে ইসলামের আলোকিত আহবান বিশ্বব্যাপী। আর, এ যুদ্ধ মূলতঃ মুসলিমদের অপরিহার্য সেই জিহাদের জন্যই প্রস্তুত করেছিল, সাফল্যের সাথে ক্ষেত্র তৈরী করেছিল পরবর্তীতে রোমানদের সাথে সংঘটিত তাবুক যুদ্ধের। মু’তার যুদ্ধ রোমানদের এত বেশী নাড়া দিয়েছিল যে, পরবর্তীতে মুসলিমরা আল-শাম জয় করা না পর্যন্ত দুঃসাহসী এ বাহিনীর মুখোমুখি হবার সম্ভাবনাই ছিল রোমানদের আতঙ্কের ব্যাপার।
ব্যর্থ গণতন্ত্রের সমাধান কি “তত্ত্বাবধায়ক সরকার” ?

আওয়ামী লীগের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার উঠিয়ে নেয়া পরবর্তী তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল হবে কি হবে কিনা? কিংবা বিদ্যমান সংশোধিত সংবিধানের আলোকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নাকি নতুন কোন নির্বাচনী রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে তা নিয়ে সকল জল্পনা কল্পনা আবর্তিত হচ্ছে।
এই রূপ একটি রাজনৈতিক সংকট ছিয়ানব্বই সালে জাতি প্রত্যক্ষ করে। মূলত দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অবিশ্বাস থেকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বি.এন.পি কে বাধ্য করা হয় “তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা” সংবিধানে সংযোজন করতে। আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে তৎকালীন এই আন্দোলন সংগঠিত হয় বি.এন.পি বিরুদ্ধে, যা এখন বি.এন.পি নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী জোটের বিরুদ্ধে চলমান।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশ পরবর্তী দ্বিজাতি তত্ত্বের বাতাবরণে উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত ও পাকিস্তানের উত্থান ঘটে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রভাবাধীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্থানের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করা হয়। সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ ও পরবর্তীতে আমেরিকা নিয়ন্ত্রিত মুসলিম অধ্যুষিত পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জনগণের আকাংক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়। বৃটিশ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ঔপনিবেশিক রাজনীতি তৎকালীন পাকিস্তানের ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রতিভূ হয়ে উঠে যা কথিত স্বাধীন বাংলাদেশের ও নিয়ন্ত্রক। স্বাধীনতা পরবর্তী চারদশকের ও বেশী সময় ধরে সাম্য, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরেপক্ষতার সস্তা শ্লোগানের আড়ালে নয়া ঔপনিবেশিক রাজনীতিকে বাস্তবায়িত করা হয়েছে। এই দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, রাজনীতি ও ভূকৌশলগত সম্পদের উপর সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন, বৃটিশ ও আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মার্কিন ভারত বৃটেন নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক মঞ্চে বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষক দালাল স্বরুপ আবির্ভাব ঘটে মুজিব -জিয়া-এরশাদ গংদের।
হাসিনা -খালেদা নিয়ন্ত্রিত দ্বি-জোটীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও সেই স্বার্থকেই প্রতিনিধিত্ব করে যা আরো বেশি লুন্ঠন, দূর্নীতির বিস্তার ঘটায় এবং দেশকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলছে। গণতান্ত্রিক দলগুলোর ক্ষমতা দখল ও লুন্ঠনের লড়াইয়ে যে পারস্পরিক অবিশ্বাস সে অবিশ্বাসের গহ্বরে ততত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার জন্ম। কাজেই তথাকথিত তত্তাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কী লুন্ঠন, দূর্নীতি, জ্বালাও পোড়ানোর রাজনীতি থেকে জনগণকে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হবে? নাকি মার্কিন -ভারত-বৃটেনের স্বারথে গণবিরোধী, দূর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন করে পুনর্বাসিত করবে?
বস্তুতঃ দলীয় সরকার কিংবা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যর্থ গণতান্ত্রিক শাসনকে টিকিয়ে রাখার ছলনা বৈ আর কিছুই নয় যা এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহর পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনে নিয়ে দ্বীন কে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করে। ইসলামি আকীদার সাথে যা সুস্পষ্ট সাংঘর্ষিক। এই দেশের মুসলিমদের অবশ্যই কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুর আড়ালে দূর্নীতিগ্রস্থ ও নিপীড়নমূলক কুফর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র ও তাদের এদেশীয় দালালদের প্রতিহত করতে হবে। সেই সাথে ইসলামি আকীদা ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে জোরালো করতে হবে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহকে কুফরীতে পরিণত করেছে এবং তাদের জনগণকে তারা ধবংসের আবাসস্থল উপহার দিয়েছে। তারাই জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হবে, আর তা অতি নিকৃষ্ট আবাসস্থল।” [সূরা ইবরাহিম :২৮-২৯]আবু হাজিমের বরাত দিয়ে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন,”আমি আবু হুরায়রার সাথে পাঁচ অতিবাহিত করেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, রাসূল (সা) বলেছেন,
“বনী ইসরাঈলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তার স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই খলীফাগণ আসবেন এবং তারা সংখ্যায় অনেক। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা) বললেন, তোমরা একজনের পর একজনের বাই’আত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে প্রশ্ন করবেন।”মোর্শেদ আলম
রাজনৈতিক বিশ্লেষকআপনার ধান্দা কী?

আজকাল আমাদের সমাজে এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে কোন না কোন ধান্ধার পেছনে ঘুরছে না? উঠতি বয়সের তরুণ থেকে শুরু করে বয়সী কর্মজীবি মানুষ, সবাই একটার পর একটা ধান্দায় সমস্ত জীবন পার করে দিচ্ছে। নিজের ধান্দা ছাড়া অন্য কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় কারো নেই। সবার মুখে একই কথা “ভাই আমি খুবই ব্যস্ত, আমার কোন সময় নেই।”
আসুন আমরা দেখি কোন ধান্দার পেছনে আমরা পাগলের মত ছুটে চলেছি আর কি নিয়েই বা সমাজের তরুণ বৃদ্ধ সবাই এত ব্যস্ত।
এখনকার দিনে তরুণদের একমাত্র ধান্দা হচ্ছে যত বেশী পারা যায় ফুর্তি করা, আনন্দে থাকা, জীবনের স্বাদ উপভোগ করা। সবার মধ্যে একই চিন্তা কিভাবে একটা ‘অ্যাফেয়ার’ করা যায়। একটা বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড খুবই প্রয়োজন – “তা না হলে জীবনটাই বৃথা” এরকম একটা মানসিকতা সবার মধ্যে। হলিউড-বলিউড সংস্কৃতির তীব্র আগ্রাসন তাদের চিন্তার জগতকে এতটাই দখল করে নিয়েছে যে এসব ছাড়া অন্য কোন কিছু তারা ভাবতেই পারে না। বিয়ের আগে প্রেম, সেক্স এগুলো এখনকার দিনের ফ্যাশন। লেকের পাড়ে, পার্কে, লাইব্রেরীর বারান্দায় সর্বত্র যুগলদের সদাসর্বদা ব্যাপক উপস্থিতি এখন আর কারোরই চোখ এড়ায় না। আজকাল ছেলে মেয়ে সম্পর্ক শুধু ‘নির্দোষ প্রেম’ কিংবা বিয়ের সম্পর্ক নয় – এসব ক্ষেত্রে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা এখন ওপেন সিক্রেট।
ছেলেরা একটা ‘মেয়ে’ খুজঁছে সর্বত্র, সর্বক্ষণ। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হিন্দি ছবি, মিউজিক ভিডিও, সিনে ম্যাগাজিন কিংবা সাইবার ক্যাফেতে ডাউনলোড করা পর্নোছবি সব কিছুতেই ছেলেদের একটাই ধান্ধা – একটা মেয়ে।
ছেলেদের এই ধান্ধা পূরণের জন্য সমস্ত নগর জুড়ে চলছে আরো নানা আয়োজন – কনসার্ট, ফ্যাশন শো, সুন্দরী প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।
বারে গিয়ে দামী বিদেশী মদ, বিয়ার ইত্যাদি সম্ভব না হলেও অন্ততপক্ষে ‘ডাইল’ কিংবা ‘ইয়াবা’ এর ফিলিংস নেয়া বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণের কাছে আরেকটি ধান্ধা। আর এই ধান্ধার পেছনে ছুটতে গিয়ে তারা চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে।
বয়সের সাথে সাথে আমাদের ধান্দাও পাল্টায়। শিক্ষা জীবনের শেষে যুবকদের মাথায় ঢোকে ক্যারিয়ারের ধান্দা। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা কিভাবে, কাকে ধরে, ঘুষ কিংবা তোষামোদ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়। সহসাই সে বুঝতে পারে চাকুরীর বাজারে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা অনেক, তাই তাকে ‘জ্যাক’ ধরতে হবে। শুরু হয় ‘মামা’ খোঁজার ধান্দা। একটা ভাল চাকরির জন্য সে সবকিছু করতে রাজি। এমনকি নিজেকে বিক্রি করতেও তার মনে কোন বাধা নেই।
একটা চাকরি পাবার পর তার চিন্তা এর চেয়ে ভাল চাকরি কিভাবে পাওয়া যায় অথবা কিভাবে বসকে খুশি করে তাড়াতাড়ি প্রমোশন পাওয়া যায়। আর বসকে খুশি করার উপায় হচ্ছে, নয়টা থেকে নয়টা গাধার মত খাটা আর বসের সব ইচ্ছা পূরণ করা। বস তার কাছে দেবতার মত, বসকে কিছুতেই অসন্তুষ্ট করা যাবে না। সারাক্ষণ বসের প্রশংসা করতে হবে। বস ইজ অলওয়েজ রাইট। বসের সামান্য অনুরোধই তার জন্য হুকুম। স্যারের প্রিয়পাত্র হবার জন্য প্রত্যেক অফিসে যেন প্রতিযোগিতা চলছে। সবার মাথায় একটাই ধান্দা কিভাবে আরো উপরে ওঠা যায়। দুনিয়ার অন্য কোন কিছু নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? এই চাকরিটাই যেন তার জীবন। তার ধারণা এই চাকরিই তার জীবনের সফলতা ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে যদি তার চাকরিটা মোটামুটি স্থায়ী হয়ে যায় আর এর মধ্যে দুএকটা প্রমোশনও জুটে যায় তাহলে সে যথেষ্ট আস্থার সাথে বিয়ের বাজারে দরদাম শুরু করতে পারে।
অপরদিকে যারা চাকরির ধান্দায় অন্যদের সাথে কুলিয়ে উঠতে পারে না তাদের ধান্দা হচ্ছে যে কোনভাবে হোক দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো। বিদেশে যাবার ধান্দা মাথায় ঢুকলে শুরু হয় বিভিন্ন বিদেশী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিবিশনে যাওয়া এবং সেই সঙ্গে আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন নামী-বেনামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটার পর একটা এপ্লিকেশন পাঠানো। এর মধ্যে চলতে থাকে স্পোকেন ইংলিশ কোর্স কিংবা SAT/TOEFL/IELTS এ ভাল স্কোর করার প্রাণপণ চেষ্টা। দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যাবার ধান্দার পেছনে খরচ হতে থাকে লাখ লাখ টাকা। অনেক সময় সে এতটাই মরিয়া হয়ে উঠে যে অবৈধ পথে বিদেশে যাবার মত বিপজ্জনক পথ বেছে নিতেও সে পিছপা হয় না।
বয়স যখন পঁয়ত্রিশ কোঠা পেরোয় আর সংসার জীবন শুরু হয় তখন তার ধান্ধাও পাল্টে যায়। এখন তার আসল ধান্ধা কিভাবে ধন সম্পদ আরো বাড়ানো যায়। এজন্য বৈধ অবৈধ যেকোন পন্থা অবলম্বন করতে সে রাজি।
সে চিন্তা করতে থাকে তার যখন ৬৫ বছর বয়স হবে তখন সে কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকবে আর তার সন্তানদের জন্য কত বেশি সম্পদ রেখে যেতে পারবে। এখন এটাই তার একমাত্র ‘মাথাব্যাথা’। সে দিনরাত পরিশ্রম করে যাতে করে আরো বেশি টাকা উপার্জন করা যায় এবং ভবিষ্যতের সকল ঝুঁকি ও বিপদাপদ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করা যায়। নামী কোম্পানির শেয়ার কেনা, ব্যাংকে উচ্চ হার সুদে ডিপোজিট একাউন্ট খোলা, জমি কেনা, ব্যাংকলোন নিয়ে এপার্টমেন্ট কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় টাকা খাটানো ইত্যাদি সব উপায়েই সে চেষ্টা করতে থাকে যাতে করে সে আরো বেশি সম্পদশালী হতে পারে। এর কোন শেষ নেই। তার আরো চাই, আরো। একটা ধান্ধা পূরণ হলে তাকে আরেকটা ধান্ধার নেশায় পেয়ে বসে। টাকাই হচ্ছে চূড়ান্ত ধান্ধা। যেন এটা একটা ড্রাগ যা ছাড়া সে বাঁচতে পারেনা। তার সমস্ত চিন্তা, কথা ও কাজের পেছনে একটাই উদ্দেশ্য – টাকা উপার্জন। একটাই মাপকাঠি – আর্থিক লাভক্ষতি। লাভ হলে সে কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করে বা কথা বলে আর লাভের সম্ভাবনা না থাকলে তা করে না।
আর নিজের পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছ থেকে নিজেকে সফল প্রমাণ করার জন্য ক্রমাগত চাপ তো আছেই। যত টাকা আর সম্পদ তত ‘সম্মান, ‘গুরুত্ব’, ‘স্ট্যাটাস’, আর ‘নিরাপত্তা’ – এটাই আজকের সমাজের প্রচলিত ধারণা।
এবার থামুন এবং চিন্তা করুন
আমাদের জীবনের সমস্ত সময় ব্যয় হচ্ছে শুধুমাত্র আমাদের ধান্দাগুলো পূরণের কাজে যুবক-বৃদ্ধ, ধনী-গরিব সবাই এমন একটা কালচারের দাস হয়ে পড়েছি যা আমাদেরকে ব্যস্ত রাখছে বস্তুগত এবং ইন্দ্রিয় সুখ লাভের সার্বক্ষণিক চেষ্টার মধ্যে। আমাদের মধ্যে যে যত বেশি সম্পদ উপার্জন এবং ফূর্তি করতে পেরেছে তাকে তত বেশি সফল বলে মনে করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা যারা এই ধান্দা কালচারের মধ্যে পুরোপুরি ডুবে আছি তারা কিন্তু খুব বেশী চিন্তা-ভাবনা করে এটা গ্রহণ করিনি। জীবনের সফলতার এই ধারণাকে আমরা অন্ধভাবে গ্রহণ করেছি। কখনও প্রশ্ন করিনি এই ধারণাটি কি ঠিক না ভুল? বরং আমরা সমাজে আগে থেকেই যে সব ধান্ধা প্রচলিত আছে সেগুলোকে অন্ধভাবে অনুকরণ করছি মাত্র। আমরা সব সময় সমাজের বাকী লোকদের সাথে নিজেকে তুলনা করি এবং তাদের সাথে ধন সম্পদ উপার্জন আর ভোগ বিলাসের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হই। কিন্তু কখনও জানতেও চেষ্টা করিনা আমাদের সমাজের লোকদের এই চিন্তা ও কাজ কতটুকু যুক্তিযুক্ত?
মানুষ সারা জীবন ধরে শুধুমাত্র বস্তুগত ও ইন্দ্রিয় সুখের জন্য একটার পর একটা ধান্ধার পেছনে ছুটে চলবে, একজন বিবেকবান মানুষের কাছে এটা কখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পশুদের মধ্যেও জৈবিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তি রয়েছে। বেঁচে থাকার জন্য তাদেরকেও খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করতে হয়। তারাও সন্তান জন্ম দেয় এবং বিরূপ পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার সন্ধান করে। কিন্তু তারপরও পশু এবং মানুষের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। প্রাণীরা নিজের অবস্থাকে উন্নত করার জন্য চিন্তা করতে পারে না। তাই আমরা দেখি মানুষের চেয়ে অনেক বড় এবং শক্তিশালী প্রাণীদেরকেও মানুষ পোষ মানায় এবং নিজের কাজে ব্যবহার করে। ফলে মানুষ পৃথিবীতে শাসন করে, প্রাণীরা নয়। মানুষের মধ্যে একটি বিশেষ গুণ থাকার কারণেই মানুষ এটা করতে পারে আর তা হলো তার নিজ ও তার চারপাশের জগতকে নিয়ে চিন্তা করার ক্ষমতা।
মানুষকে অবশ্যই এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে হবে এবং তার চারপাশের জগত, তার নিজের জীবন এবং অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। শুধুমাত্র খাওয়া দাওয়া ভোগ বিলাস আর সন্তান জন্ম দিয়ে পশুর মত সমস্ত জীবন কাটিয়ে দেয়া মানুষের কাজ হতে পারেনা। তাকে অবশ্যই জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান লাভ করতে হবে। সে কিভাবে কোথা থেকে এ পৃথিবীতে এসেছে? তার জীবনের উদ্দেশ্য কি? এই জীবনের পরে কি ঘটবে?
মানুষের কিছু মৌলিক বাস্তবতা আছে যেগুলো সে কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারে না। সে নিজের আকার আকৃতি কিংবা লিঙ্গ নির্ধারণ করতে পারে না। সে অক্সিজেন, খাদ্য-পানীয় ছাড়া বাঁচতে পারে না। নিজের জীবন ও মৃত্যুর ওপরও তার বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা নির্দিষ্ট মুহূর্তে সে মৃত্যূবরণ করবে। প্রতিনিয়ত তার জীবনের শেষ দিন, শেষ মুহূর্তটির দিকে সে এগিয়ে যাচ্ছে। সে এই সময়টিকে এগিয়েও আনতে পারে না, পিছিয়েও দিতে পারে না।
এসব অনস্বীকার্য বাস্তবতা একটা বিষয়কেই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে; তা হলো মানুষ নিজেকে নিজে সৃষ্টি করতে পারে না, বরং মানুষ নিজেই অন্যের দ্বারা সৃষ্ট এবং এমনভাবে তাকে ডিজাইন করা হয়েছে যা সে কিছুতেই পরিবর্তন করতে পারে না।
ইসলাম মানুষকে তার জীবনের মৌলিক প্রশ্নাবলী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার তাগিদ দেয়। পবিত্র কোরআনের শত শত আয়াতে মানুষকে তার চারপাশের বাস্তব জগতকে মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করার জন্য উপদেশ দেয়া হয়েছে। বিশ্বজগত তথা সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র, দিনরাত্রির আবর্তন, প্রাণীকূল, বৃক্ষরাজি, বিভিন্ন বর্ণের মানুষ ও তাদের মুখের ভাষা ইত্যাদি হাজারো বিষয় নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এদের মধ্যেকার জটিল সুনিপুণ ব্যবস্থাপনাকে বিবেচনা করে আল্লাহ মানুষকে চরম সত্যে উপনীত হবার জন্য আহবান করছেন। কোরআনে আয়াতের পর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে মূক, বধির ও অন্ধের মত নিজের চারপাশে ঘটমান বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করার জন্য সতর্ক করে দিয়েছেন।
“নিশ্চয়ই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবারাত্রির আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে সেই সব মানুষদের জন্য যারা চিন্তাশীল।” (সূরা আলি ইমরান:১৯০)
“এবং তার নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে আকাশ ও পৃথিবী, তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র; অবশ্যই এসব কিছুই নিদর্শন সেই সব লোকদের জন্য যারা জ্ঞানী।” (সূরা আর রূম:২২)
ইসলাম পৌরাণিক কল্পকাহিনী কিংবা মানুষের চিন্তাপ্রসূত কুসংস্কারের উপর গড়ে ওঠা কোন জীবনব্যবস্থা নয়। অনুমান অথবা অন্ধ ধারণা নির্ভর তত্ত্বের কোন স্থান ইসলামে নেই।
মহান স্রষ্টা আল্লাহর অস্তিত্ব এবং তার সর্বশেষ পয়গম্বর হিসাবে হযরত মুহাম্মদ (সা) এর নবুওয়তের বুদ্ধিগ্রাহ্য সুনিশ্চিত প্রমাণসহই ইসলামকে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসাবে মানব জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে সতর্ক করেছেন যে আমাদের এই জীবনটাই সবকিছু নয়। মৃত্যুর পর আরও একটি জীবন আছে যেখানে আমাদেরকে এই জীবনের সকল কাজের জবাবদিহি করতে হবে। এটা একটা সুনিশ্চিত বিষয়।
আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি ফূর্তি আর ভোগবিলাস করে কাটিয়ে দেয়ার জন্য এই জীবন সৃষ্টি করেননি। বরং মহান স্রষ্টার উপাসনা করার জন্যই আমাদের জীবন। আর এর মানে হচ্ছে, সকল মানুষের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে বের হয়ে আসা। আজকের দিনে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, যা আমরা করি এবং করিনা আর যে সব ধান্ধায় আমরা দিনরাত ডুবে থাকি এসবই এসেছে আমাদের সমাজের প্রচলিত চিন্তাহীন প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতি থেকে। আমাদের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কি হবে, আমরা যা নিয়ে ব্যস্ত তা আমাদেরকে বাস্তবে কতটা রক্ষা করতে পারে এবং পারবে এসব নিয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে চিন্তা-ভাবনা করিনা বলেই আজকে আমরা এসব তুচ্ছ ধান্ধার পেছনে অন্ধ উম্মাদের মত ছুটে চলেছি। দাসত্ব করছি আমাদের নিজের খেয়াল খুশী কিংবা অন্য মানুষের চিন্তা ও ইচ্ছার। ইসলাম এসেছে মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র আল্লাহর দাসত্বে নিয়োজিত করার জন্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন,
“পার্থিব জীবনতো ক্রীড়া-কৌতুক ব্যতিত কিছুই নয়, যারা সাবধানতা অবলম্বন করে (আল্লাহর ব্যাপারে) তাদের জন্য রয়েছে পরকালে উত্তম প্রতিদান। তবুও কি তোমরা বুঝবে না।” (আল কোরআন-০৬:৩২)
ইসলামে যদিও বা আল্লাহর দাসত্ব করে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনকেই মানব জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসাবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে তারপরেও মানুষের মৌলিক চাহিদা এবং প্রবৃত্তিকে কখনও অস্বীকার করা হয়নি। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তার মধ্যে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা এবং যৌন চাহিদা ও সম্পদ লাভের আকাঙ্ক্ষা রেখে দিয়েছেন। আর এসব মৌলিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি পূরণ করার জন্য ইসলামে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও দিকনির্দেশনা দেয়া আছে। যেমন- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হে বিশ্বাসীগণ, আল্লাহ তোমাদের জন্য যে উত্তম আহারাদি দিয়েছেন তা খাও এবং আল্লাহ নিকট শুকরিয়া আদায় কর, যদি তোমরা শুধুমাত্র তাকেই উপাসনা করে থাক।” (আল কোরআন ২:১৭২)
“আল্লাহ স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ককে এভাবে বর্ণনা করেন, “তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ স্বরূপ আর তোমরাও তাদের জন্য পরিচ্ছদ স্বরূপ।” (আল কোরআন ২:১৮৭)
কিন্তু তাই বলে সব ধরণের কামনা বাসনার যথেচ্ছা পূরণই মানবজীবনের উদ্দেশ্য হতে পারেনা।
আজকের সমাজে ইসলামকে বিশেষ কিছু আচার অনুষ্ঠানের সমষ্টি বলে মনে করা হচ্ছে । আমরা যে বিশ্বাস লালন করি তা আমাদের মধ্যে কোন চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বিবেচনার মাধ্যমে আসেনি, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের অনুকরণ করছি মাত্র। ফলে সারাদিনে বা সারা সপ্তাহে দু’একবার কিছু শব্দ উচ্চারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে আমাদের ইসলাম যার সাথে আমাদের দৈনন্দিন কার্যাবলীর কোন সম্পর্ক নেই। আল্লাহ, রাসূল (সা), আখিরাত, জান্নাত, জাহান্নাম – এ বিষয় গুলো আমাদের সমাজের লোকদের কাছে অনেক দূরবর্তী বিষয়। কারও কারও কাছে দূর অতীতের ইতিহাস বা গল্প মাত্র। তারা মনে করে এগুলোকে গুরুত্ব দেয়া বা না দেয়া যার যার ব্যক্তিগত বিষয়; দৈনন্দিন, সামাজিক, অর্থনৈতিক কার্যাবলীর ক্ষেত্রে এসব বিষয় টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক। ফলে প্রতি শুক্রবারে আমরা যে দলে দলে মসজিদে যাই কিংবা লক্ষ লক্ষ মানুষ রমজানে রোযা রাখে তার কোন প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া সমাজে প্রতিফলিত হয়না। অনেক ক্ষেত্রে আমরা জানিও না কিংবা প্রশ্নও করিনা বছরের পর বছর ধরে এসব আচার অনুষ্ঠান কেনইবা আমরা পালন করছি। যার ফলে আমরা পরিণত হয়েছি ‘মডারেট ফ্রাইডে মুসলিম’ এ। আসলে আমাদের জীবন চলে আমাদের নিজের ধান্দার নিয়ন্ত্রণে, ইসলামের সাথে যার কোন সম্পর্কই নেই।
এখন সময় এসেছে আমাদের প্রকৃত অবস্থা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার। আমাদের নিজেদেরকে প্রশ্ন করা উচিত কেন আমরা আমাদের ধান্ধাগুলোর পেছনে এরকম অন্ধ উম্মাদের মত ছুটে চলেছি। আমরা কি আমাদের জীবন ও মৃত্যুকে পাল্টে দিতে পারি? আমরা কি অমর হতে পারব? আমরা যদি আরও বেশী ধন সম্পদ জড়ো করি তাহলে কি মৃত্যুকে ঠেকাতে পারব? অবশ্যই উত্তর হচ্ছে – না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“অবশ্যই প্রত্যেক আত্মাকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান:১৮৫)
আসুন আমরা এখন থেকেই ইসলামকে বুদ্ধি বিবেচনা ব্যবহার করে জানতে চেষ্টা করি এবং সে অনুযায়ী আমাদের জীবন ও সমাজকে পরিচালনা করতে শুরু করি। এটা আমাদের ব্যক্তিস্বত্ত্বার মধ্যে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনবে এবং সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হে মানুষ, কিসে তোমাকে তোমার মহামহিম পালনকর্তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত করল?” (সূরা আল ইনফিতার:০৬)
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৪ (প্রতিবেশী দেশে দূত প্রেরণ)
যেহেতু, ইসলাম একটি সার্বজনীন দ্বীন এবং এ দ্বীন প্রেরণ করাই হয়েছে মানব জাতির সার্বিক কল্যাণে, তাই হেযাযে ইসলামী দাওয়াত একটা সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর সাথে সাথেই মুহাম্মদ (সা) হেযাযের বাইরে ইসলামের আহবান ছড়িয়ে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কারণ, আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“এবং আমি তোমাকে সমস্ত সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসাবে পাঠিয়েছি।” [সুরা আম্বিয়াঃ ১০৭]
আল্লাহতায়ালা সুরা সাবা-তে আরও বলেছেন,
“এবং আমি তোমাকে সমস্ত মানবজাতির প্রতি সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারী হিসাবে প্রেরণ করেছি।” [সুরা সাবাঃ ২৮]
এছাড়া, আল্লাাহতায়ালা সুরা তওবাতে বলেছেন,
“নিশ্চয়ই তিনি রাসূল পাঠিয়েছেন হেদায়েত ও সত্যদ্বীন সহকারে যেন এই দ্বীন সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী হয়, যদিও মুশরিকরা তা ঘৃণা করে।” [সুরা তওবাঃ ৩৩]
নিজ দেশে ইসলামী দাওয়াতকে শক্তিশালী করা এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা রক্ষায় সামর্থ্য অজর্ন করার পরই আল্লাহর রাসূল (সা) বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ আরম্ভ করেন। তিনি (সা) একে একে বিভিন্ন স্থানে তাঁর দূত পাঠাতে আরম্ভ করলেন। তাঁর শাসন-কর্তৃতের বাইরের সমস্ত আরব ভূ-খন্ডকে তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির আওতায় নিয়ে এসেছিলেন। তারপর, যখন, সমস্ত হেযায অঞ্চলে তাঁর কতর্ত্বৃ প্রতিষ্ঠিত হল, তখন আরবের সীমানার বাইরের যে কোন অঞ্চলের সাথে যোগাযোগকে পররাষ্টনীতি হিসাবে বিবেচনা করা হত। যেমনঃ পারস্য বা রোমান সাম্রাজ্য। ইতিমধ্যে, হুদাইবিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় এবং খায়বারে ইহুদীদের কর্তৃত্ব বিলুপ্ত হবার পর পুরো হেযায অঞ্চলেই মুহাম্মদ (সা)-এর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কারণ, কুরাইশদেরও আসলে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মতো কোন শক্তি ছিল না। এ রকম অবস্থাতেই তিনি (সা) বহির্বিশ্বে তাঁর প্রতিনিধি দল পাঠান। যা হোক, ইতিহাস বলে, ইসলামী রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন দেবার জন্য নিজভূমিতে রাসূল (সা)-এর শাসন-কর্তৃত্ব পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হবার পরই তিনি (সা) বহির্বিশ্বে তাঁর প্রতিনিধি প্রেরণ করেছিলেন।
খায়বার থেকে প্রত্যাবর্তনের একদিন পর রাসূল (সা) সাহাবীদের ডেকে বললেন, “হে আমার লোকসকল! নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা আমাকে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণার্থে প্রেরণ করেছেন। সুতরাং, ঈসা ইবন মারিয়মের হাওয়ারীদের মতো তোমরা আমার বিরুদ্ধাচারন করো না।” তখন সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, “আর কিভাবে হাওয়ারীগণ তার বিরুদ্ধাচারণ করেছিল হে আল্লাহর রাসূল?” তিনি (সা) বললেন, “তিনি তাদের আহবান করেছিলেন, যার দিকে আমি তোমাদের আহবান করছি। কিন্তু, কাউকে নিকটবর্তী কোন স্থানে প্রেরণ করা হলে সে তা মেনে নিত। অথচ, দূরবর্তী স্থানে প্রেরণ করা হলে সে তা অপছন্দ করতো এবং পিছে পড়ে থাকত।”
এরপর তিনি (সা) তাঁর সাহাবীদের বললেন যে তিনি (সা) হিরাক্লিয়াস (রোমান অধিপতি), খসরু (পারস্যের অধিপতি), আল-মাওকিস (মিশরের অধিপতি), আল-হারিছাহ আল-গাচ্ছানী (হীরার অধিপতি), আল-হারিছাহ আল-হিমইয়ারী (ইয়েমেনের অধিপতি) এবং আল-নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার অধিপতি)-কে ইসলামে আহবান জানিয়ে দূত প্রেরণ করতে চান। সাহাবারা এ কথায় সম্মত হলেন এবং রাসূল (সা) এর জন্য ”মুহাম্মদ, আল্লাহর রাসূল”কথাটি খোদাই করা একটি রুপার সীলমোহর তৈরী করলেন। এরপর, তিনি (সা) এ সমস্ত শাসকবর্গকে ইসলামের দিকে আহবান জানিয়ে তাদের কাছে প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। হিরাক্লিয়াসের কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছানোর জন্য দাহিয়াহ ইবন খালিফাহ আল-কালবী, খসরুর কাছে আব্দুল্লাহ ইবন হুযাইফা আল-সাহমী, নাজ্জাশীর কাছে উমর ইবন উমাইয়া আল-দামরী, মুকাওকিসের কাছে হাতিব ইবন আবি বালতা, ওমানের বাদশাহর কাছে ’আমর ইবন আল ’আস আল-সাহমী, আল ইয়ামামাহর বাদশাহর কাছে সুলাইত ইবন ’আমর, বাহরাইনের বাদশাহর কাছে আল-’আলা ইবন আল-হাদারামী, আল-হারিছাহ আল-গাচ্ছানী, তুকহাম আল-শামের বাদশাহর কাছে সুজা ইবন ওয়াহাব আল-আসাদী এবং আল-হারিছাহ আল-হিমইয়ারীর কাছে আল-মুহাজির ইবন উমাইয়া আল-মাখযুমী কে দূত হিসাবে প্রেরণ করলেন।
প্রেরিত দূতেরা একই সাথে যাত্রা শুরু করেন এবং আল্লাহর রাসূল (সা) এর নির্দেশ অনুযায়ী নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছান। প্রেরিত দূতেরা এসব শাসকবর্গের কাছে রাসূল (সা) এর বার্তা পৌঁছে দেন। আল্লাহর রাসুলের আহবানে বেশীর ভাগই শাসকই মোটামুটি ইতিবাচক সাড়া দেয়। আর এদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত রূঢ় ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায়। আরবের শাসকদের মধ্যে, ইয়েমেন ও ওমানের বাদশাহ্ রূঢ় প্রতিক্রিয়া জানায়। বাহরাইনের বাদশাহ ইতিবাচক সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহন করে। আর, ইয়ামামার বাদশাহ বলে, সে ইসলাম গ্রহন করতে প্রস্তুত যদি তাকে শাসক হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। আল্লাহর রাসূল (সা) তার এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন। আর, অনারব শাসকদের মধ্যে, আল্লাহর রাসুলের চিঠি পাঠ করার পর পারস্যের অধিপতি খসরু অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হয়ে সে চিঠি টুকরা টুকরা করে ফেলে। শুধু তাই নয়, হেযাযের নেতার কর্তিত মস্তক তার কাছে হাজির করার জন্য সে তার ইয়েমেনের গর্ভনর বুদহানকে নির্দেশ দেয়।
আল্লাহর রাসূল (সা)-একথা শোনার পর বলেন, “আল্লাহ যেন খসরুর রাজত্ব টুকরা টুকরা করে দেন।” এদিকে, খসরুর নির্দেশ পাবার পর ইয়েমেনের গভর্নর বুদহান ইসলামের ব্যাপারে খোজঁ খবর নেন এবং খুব দ্রুতই ইসলাম গ্রহনের ঘোষনা দেন। তাকে মুহাম্মদ (সা) ইয়েমেনের গভর্নর নিযুক্ত করেন। যদিও তিনি প্রকৃত অর্থে আল-হারিছাহ আল-হিমইয়ারী অর্থাৎ, ইয়েমেনের বাদশাহ ছিলেন না। আর, মিশরের অধিপতি মুকাওকিস দাওয়াতের উত্তরে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর জন্য উপহার পাঠান। নাজ্জাশীর মনোভাবও ছিল ইতিবাচক, বলা হয়ে থাকে যে, নাজ্জাশী আসলে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন। আর, হিরাক্লিয়াস আসলে রাসূল (সা) এর এ আহবানকে এত গুরুত্ব দেয়নি। না সে কোন সৈন্য পাঠানোর ব্যাপারে মনযোগী ছিল, আর না এ ব্যাপারে কিছু বলেছিল। আল-হারিছাহ আল-গাচ্ছানী যখন আরবের এ ধর্ম প্রচারককে শাস্তি দেবার জন্য সৈন্যদল পাঠানোর অনমুতি চায়, তখন সে এর উত্তরে কিছুই বলেনি বরং, গাচ্ছানীকে আল-কুদসে (জেরুজালেম) যাবার নির্দেশ দিয়েছিল।
বহির্বিশ্বে এই দাওয়াতী কার্যক্রমের ফলে, আরবের লোকেরা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে থাকে। তারা দলবদ্ধ হয়ে রাসূল (সা)-এর কাছে ছুটে আসে এবং ইসলাম গ্রহনের ঘোষনা দেয়। আর, অনারবদের সাথে রাসূল (সা) জিহাদ করার ঘোষনা দেন এবং এজন্য তাঁর সৈন্যবাাহিনী প্রস্তুত করতে থাকেন।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২৩ (খায়বারের যুদ্ধ)
আল্লাহর রাসূল (সা) হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর ১৫ দিন মদীনায় অবস্থান করেন। এরপর, তিনি (সা) সাহাবীদের খায়বার আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেন। সে সাথে তিনি (সা) এটাও বলেন যে, শুধু যারা হুদাইবিয়া প্রান্তরে তাঁর সাথে উপস্থিত ছিল তারাই যেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়।
বস্তুতঃ হুদাইবিয়া প্রান্তরে যাত্রা করার পূর্বেই রাসূল (সা) কুরাইশদের সাথে খায়বারের ইহুদী গোত্রগুলোর গোপন আঁতাতের খবর পেয়েছিলেন। মুসলিমদেরকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য তারা একত্রিত হয়ে গোপনে মদীনা আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিল। গোপন এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত হবার পরই তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে যুদ্ধবিরতী চুক্তি সম্পাদন করার লক্ষ্যে মক্কায় শান্তিপূর্ণ সফরের পরিকল্পনা করেন। যেন, কুরাইশ গোত্রের সাথে তাঁর অভিষ্ট সন্ধি হওয়া মাত্রই তিনি (সা) খায়বারের বিশ্বাসঘাতক ইহুদীদের শায়েস্তা করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাই, কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধবিরতী চুক্তির মাধ্যমে যখন ইহুদীরা কুরাইশদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, তার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি (সা) মুসলিমদের খায়বার আক্রমণ করার নির্দেশ দিলেন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন।
আল্লাহর রাসূল (সা) ১৬০০ মুসলিম পদাতিক ও ১০০ জন অশ্বারোহী নিয়ে খায়বারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এদের সকলেই ছিল আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে নিশ্চিত। যাত্রা করার তিনদিনের মধ্যে রাসূল (সা) তাঁর দলবল সহ খায়বার পৌঁছে যান এবং ইহুদীরা তাদের উপস্থিতি টের পাবার আগেই তাদের দূর্গ ঘেরাও করে ফেলেন। যদিও মুসলিমরা রাতেই খায়বারে ইহুদীদের বসতিতে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু, তা সত্তেও তারা আক্রমণ না করে শুধু দূর্গের বাইরে বসেই রাত পার করেছিল। সকালবেলায় ইহুদী গোত্রের কৃষকরা একে একে কোদাল-কাস্তে আর ঝুড়ি হাতে দূর্গের বাইরে বের হয়ে এল। হঠাৎ, দূর্গের পাশে মুসলিমদের দেখতে পেয়ে তারা ভয়ে পেছন ফিরে দৌড়ে পালালো আর চিৎকার করে বলতে লাগল, “মুহাম্মদ এসেছে তার বাহিনী নিয়ে।” তাদের চিৎকার শুনে রাসূল (সা) বললেন, “আল্লাহু আকবর (আল্লাহ মহান)! খায়বারের ইহুদীদের ধ্বংস আসন্ন। আমরা যখন কোন এলাকায় আগমন করি তখনই তাদের দূর্ভাগ্য সূচিত হয়; তাদের সকালটা তাদের জন্য মন্দ, যাদের পূর্বে সতর্ক করা হয়েছিল।”
খায়বারের ইহুদীরা হুদায়বিয়া সন্ধির বিষয়ে অবহিত হবার পর থেকেই মুহাম্মদ (সা)-এর কাছ থেকে আক্রমণের আশঙ্কা করছিল। ইহুদীদেরকে তাদের মিত্রপক্ষ কুরাইশ থেকে বিচ্ছিন্ন করাই যে এ চুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য, তারা এটা পরিস্কার ভাবে বুঝেছিল। নতুন এ বিপদজনক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাদের মধ্য হতে কেউ কেউ ওয়াদি আল-কুরা’ এবং তায়মা’র ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে নতুন মিত্রতা তৈরী করার প্রস্তাবও দিয়েছিল, যেন তারা একত্রিত হয়ে মদীনা আক্রমণ করতে পারে। তাহলে, তাদের নিজেদের রক্ষা করতে আরবদের থলের আর কোন দরকার হত না। বিশেষ করে, এরকম একটা বিপদজনক সময়ে যখন কুরাইশরা আল্লাহর রাসুলের সাথে শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। অন্যান্য ইহুদীরা অবশ্য মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করার সুখস্বপ্নে বিভোর ছিল। তারা আশা করেছিল যে, মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই হয়তো মুসলিমদের ইহুদী বিদ্বেষ দূর হয়ে যাবে। তারা মাঝে মাঝেই একে অপরকে সম্ভাব্য এ বিপদের ব্যাপারে সতর্ক করে দিত। তারা এটাও জানতো যে, মুহাম্মদ (সা) কুরাইশদের সাথে তাদের গোপন চক্রান্তের কথা জানতে পেরেছেন এবং তাদের আক্রমণ করতে একরকম প্রস্তুত হয়েই আছেন। কিন্তু, তাদের নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই, মুসলিমদের কাছ থেকে আকষ্মিক এ আক্রমণের জন্য তারা একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। ফলে, সব পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তারা ঘাতাফান গোত্রের সাহায্য চাইতে বাধ্য হল। তারা তাদের অবস্থানকে সুরক্ষিত করতে ও মুসলিমদের আক্রমণকে প্রতিহত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, মুসলিম সেনাবাহিনীর ত্বড়িৎ আক্রমণের মুখে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।
অবশেষে, তারা মরিয়া হয়ে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সাথে সমঝোতা করার শেষ চেষ্টা করল। তিনি (সা) তাদের জীবন ভিক্ষা দিলেন। শুধু তাই নয়, মুহাম্মদ (সা) তাদের নিজ নিজ গৃহে থাকারও অনুমতি দিলেন। বিজয়ের নীতি অনুসারে সিদ্ধান্ত হল যে, ইহুদীদের জমিজমা ও আঙ্গুরের বাগান মুহাম্মদ (সা)-এর অধিকারে থাকবে। ইহুদীরা তাদের কৃষিক্ষেত ও বাগানে কাজ করতে পারবে তবে, বাৎসরিক উৎপাদিত ফসল ও ফলমূলের অর্ধেক মুসলিমদের দিতে হবে। শেষপর্যন্ত তারা মুহাম্মদ (সা)-এর এ সকল শর্ত মেনে নিয়েই সেখানে বসবাস করতে সম্মত হয়।
এরপর, মুহাম্মদ (সা) সাহাবীদের নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন এবং পরবর্তী বছর কাযা উমরাহ্ আদায় করার পূর্ব পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন। খায়বারে ইহুদীদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব খর্ব করে ইসলামের শাসন-কর্তৃতের কাছে ইহুদীদের নতি স্বীকার করানোর মাধ্যমে বিপদজনক উত্তরাঞ্চল থেকে আল-শাম পর্যন্ত এলাকাকে রাসূল (সা) নিরাপদ এলাকায় পরিণত করেন। যেভাবে, তিনি (সা) হুদাইবিয়ার সন্ধির মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের দক্ষিনাঞ্চলকে করেছিলেন বিপদমুক্ত। প্রকৃতপক্ষে, রাসূল (সা) এই সব কর্মকান্ডই সমস্ত আরব ভূ-খন্ড ও বর্হিবিশ্বে ইসলামের আহবানকে প্রসারিত করার ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছিল।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২২ (হুদাইবিয়ার সন্ধি)
এভাবে, আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় হিজরতের পর একে একে ছয়টি বছর পার হয়ে যায়। ইতিমধ্যে, রাসূল (সা) মদীনায় ইসলামী সমাজের সার্বিক সুসংহত অবস্থা এবং শত্রু মুকাবিলায় তাঁর সৈন্যবাহিনীর শক্তিসামর্থ্য সম্পর্কে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যান। আর, ইসলামী রাষ্ট্রও সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে অন্যতম শক্তি হিসাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। কিন্তু, তা সত্তেও, রাসূল (সা) তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারে নতুন নতুন পদক্ষেপের কথা চিন্তা করতে থাকেন, যাতে একই সাথে ইসলামের আহবানও হয় প্রতিনিয়ত শক্তিশালী, আর শত্রুপক্ষ হয় আরও দূর্বল।
এরমধ্যে, রাসূল (সা) এর কাছে সংবাদ পৌঁছে যে, খায়বার ও মক্কার লোকেরা একত্রিত হয়ে আবারও মুসলিমদের আক্রমণ করার ফন্দি আঁটছে। এ খবর শোনার পর, মক্কার লোকদের নিবৃত করার জন্য তিনি (সা) একটি চমৎকার পরিকল্পনা করেন। এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল খায়বারের ইহুদীদেরকে তাদের মিত্র কুরাইশ গোত্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করা এবং একই সাথে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, যাতে সমস্ত আরব ভূ-খন্ডে রাসূল (সা) এর দাওয়াতী কার্যক্রমের পথ মসৃণ হয়ে যায়। এ লক্ষ্যে, তিনি (সা) তাঁর সাহাবীদের সহ পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করার উদ্দেশ্যে মক্কা যাবার পরিকল্পনা করেন। তিনি (সা) জানতেন যে, যেহেতু আরব গোত্রগুলো পবিত্র মাসে যুদ্ধ করে না, সেহেতু তাঁর জন্য এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। এছাড়া, তিনি (সা) এটাও জানতেন যে, ইতিমধ্যে কুরাইশদের ঐক্যে ফাটল ধরেছে এবং মুসলিমদের সম্পর্কে তাদের মনে যথেষ্ট পরিমাণ ভীতিও জন্মেছে। সুতরাং এ পরিস্থিতিতে, মুসলিমদের ত্বড়িৎ বেগে আক্রমণ করার আগে তারা অবশ্যই দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে। এ সমস্ত কিছু চিন্তা-ভাবনা করেই তিনি (সা) হজ্জ্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, যদি কুরাইশরা তাঁকে উমরাহ করতে বাঁধা দেয়, তাহলে তিনি (সা) এটাকে কুরাইশদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে পারবেন। আর, এর মাধ্যমে দ্বীন ইসলামের আহবানকেও জনসাধারনের কাছে অনেক গ্রহনযোগ্য করতে পারবেন।
এ সমস্ত সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে, আল্লাহর রাসূল (সা) যুল কা’দার পবিত্র মাসে হজ্জ্ব করার ঘোষনা দেন এবং আরবের অন্যান্য গোত্রগুলোকেও তাঁর সাথে শান্তিপুর্ণ এ সফরে অংশ নিতে আহবান করেন। বস্তুতঃ তিনি (সা) যে এবার শুধু হজ্জের উদ্দেশ্যেই মক্কা যাচ্ছেন, আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে নয়, এ বার্তা সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেবার জন্যই তিনি (সা) আরব গোত্রগুলোকে তাঁর সাথে এ পবিত্র কাজে শরীক হতে আহবান করেন। এমনকি, যারা তাঁর দ্বীনের অর্ন্তভূক্ত নয় অর্থাৎ অমুসলিম গোত্রগুলোকেও তিনি (সা) তাঁর সঙ্গী হতে আহবান জানান। যাতে সকলেই পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারে যে, তাঁর যুদ্ধ করার কোন অভিপ্রায় নেই।
এ সফরে রাসূল (সা) নিজে তাঁর মাদী উট কুসউয়া’র পিঠে চড়ে নেতৃত্ব দেন এবং ১৪০০ সাহাবী ও ৭০ টি উট সহ মদীনা ত্যাগ করেন। আল্লাহর পবিত্র ঘর কাবা সফরের এই শান্তিপূর্ণ মনোভাব সকলকে বুঝানোর উদ্দেশ্যে তিনি (সা) ইহরাম বাঁধা অবস্থায় যাত্রা শুরু করেন। মদীনা থেকে ছয় বা সাত মাইল দূরত্বে যুল হালিফাহ্ নামক জায়গায় পৌঁছালে অন্যান্য সাহাবীরাও ইহরাম বাঁধেন এবং ইহরামের কাপড় পড়েন। তারপর, তারা আবার মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কুরাইশরা পূর্বেই শুনেছিল যে, মুহাম্মদ (সা) হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা দিকে আসছেন। কিন্তু, তারা এটা ভেবে ভীত হয় যে, হয়তো মক্কায় প্রবেশের জন্য এটা মুহাম্মদদের নতুন কোন চাল। এ সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিতে না পেরে তারা শেষ পর্যন্ত মক্কা প্রবেশকালে মুহাম্মদ (সা)-কে বাঁধা দেবার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ কাজে কুরাইশরা খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ ও ইকরামাহ্ ইবন আবি জাহল এর নেতৃত্বে দুইশত দুর্দান্ত অশ্বারোহীর একটি দলকে নিযুক্ত করে। মুশরিকদের এ দলটি মদীনা থেকে আগত হজ্জ্বযাত্রীদের বাঁধা প্রদানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যায়। ধি তুহা নামক স্থানে পৌঁছে তারা যাত্রা বিরতী করে এবং হজ্জ্বযাত্রীদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এদিকে, রাসূল (সা) উসফান গ্রামে প্রবেশ করলে কুরাইশদের প্রেরিত এ বাহিনী সম্পর্কে খবর পান। এ গ্রামের কা’ব নামের এক ব্যক্তিকে রাসূল (সা) কুরাইশদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় যে, “কুরাইশরা আপনার আগমনের সংবাদ পেয়ে, বাঘের চামড়া পরিধান করে দুগ্ধবতী উটের পিঠে আপনাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তারা ধি তুহায় যাত্রা বিরতী করে আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে এবং প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তাদের সাথে মুকাবিলার আগপর্যন্ত তারা আপনাকে কোনভাবেই মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। তাদের অশ্বারোহী দলের সাথে রয়েছে খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ, যাকে তারা আগে থেকেই কুরা’আল ঘামিম এলাকায় পাঠিয়ে দিয়েছে।”উসফান থেকে কুরা’আল ঘামিম এর অবস্থান ছিল আট মাইল দূরত্বে।
একথা শোনার পর রাসূল (সা) বললেন, “ধ্বংস হোক কুরাইশরা! যুদ্ধ তাদেরকে আসলে গ্রাস করেছে। কি তাদের এমন ক্ষতি হত যদি তারা আমাদের ও অন্য গোত্রগুলোকে আমাদের হালে ছেড়ে দিত? তাদের অন্তরের অভিলাষ হল, যদি তারা আমাকে হত্যা করতে পারত! যদি আল্লাহতায়ালা আমাকে বিজয়ী করেন তাহলে তারা ইসলামে দলে দলে প্রবেশ করবে। যদি তারা তা না করে তবে শক্তি অর্জন করার পর তারা আমার সাথে যুদ্ধ করতো। সুতরাং, তারা আসলে চায় কি? আল্লাহর কসম, আল্লাহতায়ালা যে কাজের জন্য আমাকে নিযুক্ত করেছেন তার জন্য আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতেও পিছ পা হব না। হয় আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাব।”
এরপর, আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর পরিকল্পনার উপরই অটল থাকলেন এবং গভীর ভাবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। কারণ, এবারে তাঁর কৌশল ছিল শান্তিপূর্ণ এবং যুদ্ধের কোন প্রস্তুতি নিয়েও তিনি (সা) আসেননি। কিন্তু, তাঁর যুদ্ধ করার ইচ্ছা না থাকলেও কুরাইশদের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা এবং এ উদ্দেশ্যেই তারা দলবল পাঠিয়েছে। সুতরাং, তিনি (সা) ভাবতে লাগলেন, তাঁর কি মদীনায় ফিরে যাওয়া উচিত, নাকি পূর্বপরিকল্পনা বাতিল করে যুদ্ধ করা উচিত? তিনি (সা) মুসলিমদের ঈমান সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন। তিনি (সা) এটাও জানতেন যে, যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোন পথ যদি তাঁদের জন্য খোলা না থাকে তাহলে মুসলিমরা নির্দেশ পাওয়া মাত্র যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়তে এতটুকু পিছ পা হবে না।
যাই হোক, অনেক চিন্তা ভাবনার পর রাসূল (সা) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তাঁর আশঙ্কা অনুযায়ী যদি তাঁকে হজ্জ্ব করতে বাঁধা দেওয়াও হয় তবুও তিনি শান্তিপূর্ণ উপায়েই সমস্ত ব্যাপারটি ফয়সালা করবেন। এ ব্যাপারে তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে কোনরকম সংঘর্ষে যাবেন না বা বিরূপ পরিস্থিতিতে জোরপূর্বক হজ্জ্বও করবেন না। কারণ, এবার তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বেরও হননি বা আক্রমণ করার কথা চিন্তাও করেননি। এছাড়া, এবার তাঁর শান্তিপূর্ণ এই পরিকল্পনার প্রকৃত উদ্দেশ্যই ছিল ইসলামের আহবানের মহানুভবতা ও সৌন্দর্যকে কুরাইশদের কাছে তুলে ধরা এবং ইসলামের পক্ষে মক্কায় জনমত তৈরী করা। আর, কুরাইশদের নির্বোধ গোর্য়াতুমি, পথভ্রষ্টতা ও ভয়ঙ্কর আক্রমণাত্মক মনোভাব থেকে ইসলাম যে কতো উপরে সেটাও মক্কার সমাজের মানুষের কাছে তুলে ধরা। কারণ, ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রমকে সঠিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে জনমতের গুরুত্ব অপরিসীম। শুধু তাই নয়, সমাজে ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরীর মাধ্যমেই ইসলামী দাওয়াতের বিস্তৃতি ঘটতে থাকে, ফলে ইসলাম বিজয়ী শক্তি হিসাবে আর্বিভূত হয়। তিনি (সা) ভেবে দেখলেন যে, তিনি (সা) যদি যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে মক্কায় ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরীর পরিকল্পনাটা ভেস্তে যেতে পারে। সুতরাং, তিনি (সা) সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কোন অবস্থাতেই তিনি (সা) কোনরকম সংঘর্ষে যাবেন না এবং তাঁর শান্তিপূর্ণ পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন করবেন।
এ পর্যায়ে, আল্লাহর রাসূল (সা) গভীর ভাবে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে রাসূল (সা) এর দক্ষতা ও বিচক্ষনতা ছিল অতুলনীয়। এ বিচক্ষনতা ও দূরদর্শিতা থেকেই তিনি (সা) তাঁর শান্তিপূর্ণ পুর্বপরিকল্পনায় অটল থাকতে চাচ্ছিলেন। তিনি (সা) কোনভাবেই চাচ্ছিলেন না তার পরিকল্পনা ভেস্তে যাক কিংবা জনমত তৈরী করার চমৎকার এ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাক। কারণ, তাঁকে যদি কোন কারণে যুদ্ধ করতে হয়, তাহলে তাঁর পরিকল্পনা বুমেরাং হয়ে তাঁর কাছেই ফিরে আসবে। তখন কুরাইশরা এ চমৎকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সমস্ত আরবে ভয়ঙ্কর প্রচারনা চালাবে। পরিণতিতে জনমত চলে যাবে তাঁর বিপক্ষে। তিনি (সা) মুসলিমদের ডাকলেন এবং বললেন, “কেউ কি আছে যে আমাদের এমন এক রাস্তা দিয়ে নিয়ে যেতে পারবে সে রাস্তায় কুরাইশ বাহিনীর সাথে মুকাবিলা হবে না?” মুসলিমদের মধ্য হতে একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে এগিয়ে এল এবং তাদেরকে পাহাড়ের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ন পাথুরে গিরিপথের ভেতর দিয়ে নিয়ে চললো যে পর্যন্ত না তারা হুদাইবিয়া নামে মক্কার নিম্নবর্তী এক উপত্যকায় পৌঁছাল। এখানেই রাসূল (সা) তাঁর দলবল সহ অবস্থান নিলেন। খালিদ ও ’ইকরামাহ্ সৈন্যদল মুহাম্মদ (সা) এর দলবলকে হুদাইবিয়া প্রান্তরে দেখে আতঙ্কিত হয়ে মক্কা রক্ষায় দ্রুত সেখানে ফিরে গেল। মুসলিম বাহিনীর এই দুঃসাহসী পদক্ষেপ দেখে পৌত্তলিকদের মেরুদন্ডে যেন আতঙ্কের স্রোত প্রবাহিত হয়ে গেল। তারা নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছিল না, কিভাবে মুসলিমরা এতো দক্ষতা ও চতুরতার সাথে তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে তাদের অরক্ষিত সীমান্তে এসে উপস্থিত হল। এই পুরিস্থিতিতে, কুরাইশরা মক্কার ভেতর সূদৃড় অবস্থান নিল আর রাসূল (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে অবস্থান নিলেন হুদাইবিয়ার প্রান্তরে। দুইপক্ষ এভাবে মুখোমুখি অবস্থায় দিন পার করতে থাকল এবং প্রত্যেকেই ভাবতে লাগলো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পরবর্তী পদক্ষেপের কথা। মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ ভাবল যে, কুরাইশরা তাদের কোন অবস্থাতেই হজ্জ্ব পালন করতে দেবে না। বরং, তাদের সাথে যুদ্ধের জন্যই প্রস্তুতি নেবে। তারা ভেবে দেখল যে, এ অবস্থায় তাদের আসলে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ ব্যতীত কোন পথ খোলা নেই। তাই, তাদের উচিত শত্রুপক্ষের প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে দেয়া, তারপর হজ্জ্ব পালন করা। এর ফলে, কুরাইশদেরকে চরম একটা শিক্ষা দেয়া যাবে।
ইতিমধ্যে, কুরাইশরাও মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার স্বপ্ন বিভোর হল। এমনকি, যদি তারা যুদ্ধ করতে গিয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তবুও। কিন্তু, খুব শীঘই্র তাদের এ সব সুখ স্বপ্ন বুদবুদের মতো মিলিয়ে গেল। কারণ, তারা জানত মুখোমুখি হবার জন্য মুসলিমরা হচ্ছে সবচাইতে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ। তাই, তারা শেষ পর্যন্ত মুসলিমদের পক্ষ থেকেই প্রথম পদক্ষেপের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।
প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে, আল্লাহর রাসূল (সা) ইহরাম বাঁধা অবস্থায় পূর্ব পরিকল্পনার উপরই অটল থাকলেন। হুদাইবিয়ার প্রান্তরে তিনি (সা) শুধু দৃঢ়তার সাথে অবস্থান গ্রহন করলেন। অপেক্ষা করতে লাগলেন কুরাইশদের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। তিনি (সা) এটা খুব ভাল করেই জানতেন যে, কুরাইশরা তাঁর ভয়ে অত্যন্ত ভীত এবং খুব শীঘ্রই তারা তাঁর সাথে হজ্জ্ব পালন বিষয়ে দেনদরবার করার জন্য প্রতিনিধি পাঠাবে। সুতরাং, তিনি (সা) ধৈর্য্য সহকারে কুরাইশদের প্রতিনিধি দলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এরপর, কুরাইশরা প্রথমে খুযায়া গোত্রের কিছু লোক সহ বুদাইল ইবন ওরাকা কে রাসূল (সা) এর কাছে পাঠায়। প্রতিনিধি দল এসে জানতে চায় যে, রাসূল (সা) আসলে কি জন্য মক্কায় আগমন করেছেন। কিছুক্ষন কথাবার্তার পরই তারা নিশ্চিত হয়ে যায় যে. মুসলিমদের মক্কা আক্রমণ করার আসলে কোন উদ্দেশ্য নেই। বরং, তারা পবিত্র কাবাঘরের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করার জন্যই মদীনা থেকে যাত্রা করেছে।
প্রতিনিধি দল কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে ঘটনা বর্ণনা করে এবং পুরো ব্যাপারটি তাদের বুঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু, কুরাইশরা তাদের কথা অবিশ্বাস করে এবং বলে যে, তারা মুহাম্মদ (সা) এর কথায় প্রভাবিত হয়ে গেছে। কুরাইশরা এরপর আরেকটি প্রতিনিধি দল পাঠায়, তারাও তাদের কাছে এসে একই কথাই বলে। এরপর, কুরাইশরা আল-আহবাস (আবিসিনিয়ার অধিবাসী) গোত্রের প্রধান আল-হুলাইসকে রাসূল (সা) এর সাথে দেনদরবার করার জন্য পাঠায়। কুরাইশরা একরকম নিশ্চিত ছিল যে, আল-হুলাইসের মুহাম্মদ (সা) কে নিবৃত করতে পারবে। আসলে, রাসূল (সা) এর বিরুদ্ধে হুলাইসকে ক্ষেপিয়ে তোলাই ছিল তাদের হুলাইসকে পাঠানোর প্রকৃত উদ্দেশ্য। তারা ভেবেছিল, হুলাইস যখন রাসূলুল্লাহর সাথে কোন মীমাংসায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে, তখন মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি তার ঘৃণা আরও বেড়ে যাবে। ফলে, সে মুহাম্মদ (সা) এর আক্রমণ থেকে মক্কা রক্ষা করার ব্যাপারে তার মনোভাব আরও দৃঢ় হবে। যা হোক, মুহাম্মদ (সা) যখন হুলাইসের আসার কথা শুনলেন তিনি (সা) তাদের কুরবানীর পশুগুলোকে মুক্ত করে দিতে বললেন যেন সে বলতে পারে মুসলিমরা হজ্জ্বের জন্যই এসেছে, যুদ্ধের জন্য নয়।
আল-হুলাইস উপত্যকার পাশ থেকে আগত কুরবানীর পশুগুলোকে তার পাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখল। সে আরও দেখল উমরাহ করার জন্য মুসলিমদের প্রস্তুত করা তাঁবুগুলো হজ্জ্বের মতো পবিত্র ইবাদতের আমেজে পরিপূর্ণ হয়ে আছে। তাদেরকে দেখে মনেও হচ্ছে না যে, তারা যুদ্ধ করতে এসেছে। এ সব কিছু দেখে সে এতো অভিভূত হল যে, সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে, মুসলিমরা যুদ্ধ করতে নয় বরং হজ্জ্ব পালনের উদ্দেশ্যেই এসেছে। এমনকি সে মুহাম্মদ (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ না করেই কুরাইশদের কাছে ফিরে গেল এবং তাদেরকে সবকিছু বিস্তারিত বর্ণনা করল। শুধু তাই নয়, ফিরে এসে সে কুরাইশদের ধমক দিয়ে বলল, যেন তারা মুহাম্মদ (সা) এবং কাবার মাঝে বাঁধা হয়ে না দাঁড়ায়। আর, মুসলিমদের নির্বিঘ্নে হজ্জ্ব পালন করতে দেয়া হয়। এর ব্যতিক্রম হলে, সে তাঁর সৈন্যদল প্রত্যাহার করে নেবে। কুরাইশরা তাদের উদ্যত স্বরকে নমনীয় করে হুলাইসকে শান্ত করল। তারা হুলাইসের কাছে আরও ভাল কোন প্রস্তাবের জন্য কিছুটা সময় চেয়ে নিল। হুলাইস এতে সম্মতি দিলে তারা ’উরওয়া ইবন মাস’উদ আল-ছাকাফিকে পরবর্তী প্রতিনিধি হিসাবে পাঠাল এবং তারা ছাকাফিকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করল যে, তারা তার দেয়া সিদ্ধান্তকেই মেনে নেবে। ’উরওয়া ইবন মাস’উদ রাসূল (সা) এর কাছে গিয়ে তাকে হজ্জ্ব না করে মদীনার ফেরত যাবার অনুরোধ করল। কিন্তু, তার সে চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল।
একই সাথে, এটাও স্বীকার করল যে, মুহাম্মদ (সা) এর অবস্থানই সঠিক। তারপর সে কুরাইশদের কাছে ফিরে গিয়ে বললো, “হে কুরাইশরা! আমি খসরুর দরবারে গিয়েছি, কায়সারের দরবারেও গিয়েছি, গিয়েছি নাজ্জাশীর দরবারেও। কিন্তু, পৃথিবীর কোথাও আমি এমন কোন বাদশাহ্ দেখিনি যিনি মুহাম্মদের চাইতে বেশী তাঁর সঙ্গীদের ভালোবাসা পেয়েছেন। যখন তিনি ওজু করেন তখন তাঁর সাহাবারাও সাথে সাথে তা করার জন্য দৌড়ে যায়। যদি তাঁর একটা চুলও পড়ে যায় তবে তারা তা কুড়াবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ছুটে যায়। আমার ধারণা, তারা কোন অবস্থাতেই মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করবে না। সুতরাং, তোমরা কি করবে তা তোমরা নিজেরাই ঠিক কর।”
কিন্তু, উরওয়া ইবন মাস’উদের এ দ্বিধাহীন বক্তব্য শুধু মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি কুরাইশদের বিদ্বেষ, ঘৃণা আর প্রতিহিংসাই বৃদ্ধি করল। তাদের অন্ধ গোঁর্য়াতুমি ও মিথ্যা অহঙ্কার পরবর্তী মধ্যস্থতার সকল পথকে রুদ্ধ করে দিল। তাদের মধ্যকার আলাপ-আলোচনার আর কোন মূল্যই থাকল না। এরপর, রাসূল (সা) তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি (সা) ভাবলেন, হয়ত কুরাইশ প্রতিনিধিরা তাঁর সাথে আলোচনা করার ব্যাপারে আতঙ্ক বোধ করছে। তাই তিনি (সা) তাঁর পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠালেন এবং আশা করলেন হয়ত সে কুরাইশদের সাথে মধ্যস্থতা করতে সমর্থ হবে। কিন্তু, কুরাইশরা রাসূল (সা) এর প্রতিনিধিকে বহনকারী উটের পায়ের রগ কেটে ফেলল এবং দূতকে হত্যা করতে উদ্যত হল। সৌভাগ্যবশতঃ আল-আহবাসের সেনাদল তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসল। মুসলিমদের প্রতি কুরাইশদের বিদ্বেষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং তারা এক পর্যায়ে মুসলিমদের তাঁবুতে পাথর নিক্ষেপ করার জন্য তাদের বখাটে ছেলেদের লেলিয়ে দেয়। কুরাইশদের এ হীন আচরনে মুসলিমরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু রাসূল (সা) তাদেরকে শান্ত করেন। পরদিন, কুরাইশরা মুসলিমদের ছাউনী ঘেরাও করে তাদের প্রহার করার জন্য ৫০ জনের একটি দল পাঠায়। কিন্তু, মুসলিমরা তাদের বন্দী করে রাসূল (সা)এর কাছে নিয়ে যায়। রাসূল (সা) তাদের ক্ষমা করে দেন এবং তাদের ছেড়ে দেবার নির্দেশ দেন।
মুহাম্মদ (সা) এ মহানুভব আচরন মক্কাবাসীদের প্রচন্ড ভাবে নাড়া দেয় এবং এরপর তাদের মুহাম্মদ (সা) এর দাবীর ব্যাপারে আর কোনই সন্দেহ থাকে না। তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, মুহাম্মদ (সা) আসলে প্রথম থেকে সত্য কথাই বলে আসছেন। এ ঘটনা তাদের পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে দিল যে, মুহাম্মদ (সা) আসলে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যেই এসেছেন, যুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে নয়। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে, মুহাম্মদ (সা) মূলতঃ মক্কার জনসাধারনের জনমত তাঁর নিজের পক্ষে আনতে সমর্থ হয়েছিলেন। এরফলে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালো যে, তিনি (সা) যদি তাঁর দলবল নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করতে চান আর কুরাইশরা যদি তাদের মক্কা প্রবেশ কালে বাঁধা দিতে চায়, তবে মক্কার জনগণ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলোই মুহাম্মদ (সা) এর সাহায্যে এগিয়ে আসবে এবং মুসলিমদের সমর্থন করবে। সুতরাং, এ পর্যায়ে কুরাইশরা তাদের উদ্দেশ্যমূলক প্ররোচনা থেকে নিজেদের বিরত করল এবং খুব গুরুত্বের সাথে শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে মনোযোগ দিল। রাসূল (সা) এরপর আরেকজন দূতকে তাঁর পক্ষ থেকে কুরাইশদের নিকট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তিনি (সা) ওমর ইবন খাত্তাবকে মক্কার যাবার নিদের্শ দিলেন। কিন্তু ওমর (রা) তাঁকে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি কুরাইশদের কাছে আমার জীবননাশের আশঙ্কা করছি। কারণ, এখন আমাকে নিরাপত্তা দেবার জন্য বনু আদি ইবন কা’ব আর মক্কায় নেই। আর আপনি কুরাইশদের সাথে আমার শত্রুতা এবং তাদের প্রতি আমার রূঢ় ব্যবহার সম্পর্কেও জানেন। আমি এক্ষেত্রে, আমার পরিবর্তে উসমান ইবন আফফানের নাম প্রস্তাব করতে চাই, যাকে পাঠানো আমার থেকেও বেশী ফলপ্রসু হবে।”
ওমর (রা) এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে রাসূল (সা) উসমান ইবন আফফানকে কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে পাঠিয়ে দেন। উসমান (রা) মক্কায় গিয়ে আল্লাহর রাসুলের বার্তা কুরাইশদের কাছে পৌঁছে দেন। তারা তাঁকে কাবাঘর তাওয়াফ করার প্রস্তাব দিয়ে বলে, “তুমি যদি কাবাঘর প্রদক্ষিন করতে চাও তবে তা করতে পার।”উত্তরে উসমান (রা) বলেন, “আমি ততক্ষন পর্যন্ত তা করব না যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহর রাসূল (সা) তা করেন।”উসমান (রা) এরপর কুরাইশদের সাথে শান্তিচুক্তির বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন, কিন্তু প্রথম পর্যায়ে কুরাইশরা তা পুরোপুরি প্রত্যাখান করে। শান্তিুচুক্তির বিষয়ে এই আলোচনার ক্ষেত্র ছিল ব্যাপক এবং সে সময়ে তা ছিল অত্যন্ত কঠিন। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা শান্তি চুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখানের অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসতে থাকে এবং এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়ায় যাতে উভয়পক্ষের কাছেই তা গ্রহনযোগ্য হয়। একসময় তারা ’উসমান (রা) এর সাথে আলোচনা করতেও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে থাকে এবং তাঁর সাথে একত্রে বসেই অনেক বাকবিতন্ডার পর অবশেষে জটিল এ সমস্যা থেকে পরিত্রানের উপায় খুঁজে বের করে। যার ফলশ্রুতিতে, মুহাম্মদ (সা) এর সাথে তাদের যুদ্ধাবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে।
এদিকে উসমান (রা) যখন মক্কায় তাঁর অবস্থানকে দীর্ঘায়িত করেন এবং মক্কার রাস্তাঘাটের কোথাও তাকে দেখা যায়না, তখন মুসলিম শিবিরে রটে যায় যে, কুরাইশরা তাঁকে হত্যা করেছে। এ সংবাদ শোনার পর, মুসলিমরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে যায় এবং কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যায়। এ পর্যায়ে, রাসূল (সা) আবার নতুন করে তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করেন। আপাতদৃষ্টিতে তাঁর কাছে মনে হয়, দূত হিসাবে মক্কায় গমনের পরও পবিত্র মাসে উসমানকে হত্যা করে কুরাইশরা তাঁর সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এ কারণে, তিনি (সা) ঘোষনা দেন, “শত্রুপক্ষের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা এ স্থান ত্যাগ করব না।”তিনি (সা) সাহাবীদের সকলকে নিয়ে একটি গাছের নীচে দাঁড়ান এবং এ স্থানেই তাদের সকলের কাছ থেকে বাই’য়াত গ্রহন করেন। আমৃত্যু লড়ার শপথ করে তারা রাসূল (সা) এর নিকট বাই’য়াত করেন। বাই’য়াত গ্রহন সম্পন্ন হলে, রাসূল (সা) তাঁর এক হাত দিয়ে আরেক হাত শক্ত করে ধরে উসমান (রা) এর পক্ষে এমন ভাবে বাই’য়াত করেন যে, মনে হয় যেন উসমান (রা) তাঁদের সাথেই আছেন। এ বাই’য়াত পরবর্তীতে বাই’য়াত আল-রিদওয়ান নামে পরিচিত হয়। এসম্পর্কে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন,
“নিশ্চয়ই, আল্লাহ ঈমানদারদের উপর সন্তুষ্ট ছিলেন যখন তারা গাছের নীচে তোমার নিকট বাই’য়াত করেছিল। তিনি জানতেন তাদের হৃদয়ে কি আছে এবং তিনি তাদের জন্য (তাদের অন্তরে) সাকীনাহ (প্রশান্তি ও স্বস্তি) দান করলেন। এবং বিজয়কে নিকটবর্তী করে তিনি তাদের পুরস্কৃত করলেন।” [সুরা ফাতহ্ঃ ১৮]
যখন বাই’য়াত গ্রহন সম্পন্ন হল এবং মুসলিমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল, এ সময়ে মুসলিম শিবিরে খবর পৌঁছাল যে, উসমান (রা) কে হত্যা করা হয়নি। এর পরপরই উসমান (রা) ছাউনীতে ফিরে আসেন এবং কুরাইশদের প্রস্তাব সম্পর্কে রাসূল (সা) কে অবহিত করেন। এরপর, আবারও মুহাম্মদ (সা) এবং কুরাইশদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়। এরপর, কুরাইশরা সুহাইল ইবন আমরকে দুই শিবিরের মধ্যে যুদ্ধবিরতী চুক্তি স্বাক্ষর করার জন্য রাসূল (সা) এর নিকট দূত হিসাবে প্রেরণ করে। কুরাইশদের দূত সেইসাথে মুসলিমদের হজ্জ্ব এবং উমরাহ্ পালন বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা করে। আলোচিত দ্বিতীয় বিষয়টিতে তাদের শর্ত ছিল যে, মুসলিমদের এবার হজ্জ্ব না করেই ফিরে যেতে হবে। কিন্তু, পরবর্তী বছরে তাদের হজ্জের অনমুতি দেয়া হবে।
আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের এ সমস্ত চুক্তি মেনে নিয়েই তাদের সাথে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। কারণ, তিনি (সা) বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনি (সা) যে উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন ইতিমধ্যে তা অজির্ত হয়ে গেছে। সুতরাং, তিনি (সা) এবার পবিত্র ঘর তাওয়াফ করেন বা না করেন তাতে আর কিছুই আসে যায় না। প্রকৃতপক্ষে, ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের পথকে মসৃণ ও বাধামুক্ত করতে এবং ইসলামের সুমহান বাণী আরবের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে তিনি (সা) চেয়েছিলেন খায়বারের বিশ্বাসঘাতক ইহুদী গোত্রগুলোকে পুরোপুরি কুরাইশদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে। কারণ, ইহুদী আর কুরাইশদের এই মৈত্রীই প্রকৃত অর্থে তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তারের পথে বিরাট বাঁধা সৃষ্টি করেছিল আর ইসলাম প্রচার-প্রসারের পথকে করেছিল রুদ্ধ। এ লক্ষ্যেই তিনি (সা) কুরাইশদের সাথে একটি যুদ্ধবিরতী চুক্তি স্বাক্ষর করতে উদগ্রীব ছিলেন যেন কুরাইশদের পক্ষ থেকে কোন ধরনের আক্রমণের আশঙ্কা না থাকে। আর, হজ্জ্ব কিংবা উমরাহ্ পালন করা আসলে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ, সেটা তিনি (সা) পরবর্তী বছরই করতে পারতেন।
যুদ্ধবিরতী চুক্তি এবং এর শর্তাবলীর ব্যাপারে আল্লাহর রাসূল (সা) সুহাইল ইবন ’আমরের সাথে দীর্ঘ সময় যাবত সুক্ষাতিসুক্ষ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। আসলে, এই আলোচনা ছিল খুবই ব্যাপক এবং একটা সমঝোতার জায়গায় এসে দুইপক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার বিষয়টি ছিল খুবই কঠিন কাজ। একেক সময় মনে হচ্ছিল আলোচনা ফলপ্রসু হবে না এবং পুরো ব্যাপারটিই ভেস্তে যাবে। আল্লাহর রাসুলের প্রচন্ড পরিমান রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞা না থাকলে হয়তো পুরো ব্যাপারটি ভেস্তেও যেত। মুসলিমরা খুব কাছ থেকেই পুরো ব্যাপারটি পর্যবেক্ষন করে এবং তারাও ভাবে যে, রাসূল (সা) উমরাহ্ করার বিষয়েই দেনদরবার করছেন। কিন্তু, রাসূল (সা) এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল কুরাইশদের সাথে যুদ্ধবিরতী চুক্তি সম্পাদন করা। যে জন্য, চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে মুসলিমরা বিরক্ত হলেও আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে এটাকেই আল্লাহর রহমত মনে করেন। ফলে, তিনি (সা) চুক্তির প্রতিটি শর্ত ও স্বল্পমেয়াদী সুযোগসুবিধার দিকে লক্ষ্য না করে, সুহাইলের ইচ্ছা অনুযায়ীই আলোচনা চালিয়ে যান এবং শেষ পর্যন্ত, কিছু নির্দিষ্ট শর্তাবলীর ভিত্তিতে উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধবিরতী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
চুক্তির শর্তাবলী মুসলিমদের অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও রাগান্বিত করে। তারা অপমানজনক এ চুক্তি প্রত্যাখান করে কুরাইশদের সাথে যুদ্ধ করাকেই শ্রেয় মনে করে এবং এ জন্য রাসূল (সা) কে বারবার অনুরোধও করে। চুক্তির শর্ত দেখে ওমর (রা) লাফিয়ে উঠে যায় এবং আবু বকর (রা) এর কাছে গিয়ে বলেন, “কেন আমরা এমন সব শর্ত মেনে নিচ্ছি যা আমাদের দ্বীনকে হেয় প্রতিপন্ন করছে?” ওমর (রা) তাঁর সঙ্গে রাসূল (সা) এর কাছে গিয়ে এ চুক্তি বাতিলের দাবীতে আবেদন করার জন্য আবু বকর (রা) কে জোর করতে থাকেন। আবু বকর (রা) তাঁকে এ ধরণের প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখার নিষ্ফল চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ওমর (রা) একাই রাসূল (সা) এর কাছে যান এবং চুক্তির ব্যাপারে তাঁর ক্রোধ ও উষ্মা প্রকাশ করেন। কিন্তু, এ সব কোন কিছুই রাসূল (সা) এর সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করতে পারে না। বরং, তিনি (সা) ইস্পাত কঠিন সংকল্প ও প্রচন্ড মানসিক দৃঢ়তার সাথে তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি (সা) ওমর (রা) কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমি আল্লাহর রাসূল ও তাঁর অনুগত দাস। আমি অবশ্যই তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করে কোন কাজ করব না এবং অবশ্যই তিনি আমাকে অপমানিত ও ক্ষতিগ্রস্থ করবেন না।”
চুক্তিপত্র তৈরী করার জন্য রাসূল (সা) আলী ইবন আবু তালিবকে নিযুক্ত করেন এবং তাঁকে লিখার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “লিখ, শুরু করছি আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু।”এ সময় সুহাইল বাঁধা দিয়ে বলে, “থামো! আমি পরম করুণাময় ও পরম দয়ালু একথা মানতে রাজী নই। বরং, তুমি লিখ, তোমার নামে, হে প্রভু”। রাসূল (সা) আলী (রা) কে তাই লিখার নির্দেশ দিলেন। তারপর তিনি (সা) বললেন, “লিখ, এটা হচ্ছে সেই চুক্তি যা স্বাক্ষরিত হয়েছে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদ ও সুহাইল ইবন আমরের মধ্যে”। এ পর্যায়ে সুহাইল আবারও বাঁধা দিয়ে বললো, “থামো! যদি আমি স্বীকারই করে নিতাম তুমি আল্লাহর রাসূল, তাহলে তোমাদের আমাদের মধ্যে কোন বিরোধই থাকত না। বরং, তুমি তোমার নাম ও তোমার বাবার নাম লিখ।” রাসূল (সা) আলী (রা) কে বললেন, “লিখ, এটা হচ্ছে সেই চুক্তিপত্র, যা মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ, সুহাইল ইবন আমরের সাথে স্বাক্ষর করতে সম্মত হয়েছে।” শুরুতে এ বাক্যগুলি লিখার পর নিম্নোক্ত শর্তাবলীর ভিত্তিতে উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধিপত্র লিখা হয়ঃ
১. যুদ্ধবিরতী সময়কালে উভয়পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা কোনরকম আক্রমণাত্মক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকবে।
২. যদি কুরাইশদের মধ্য হতে কেউ ইসলাম গ্রহন করে এবং গোত্র প্রধানের অনুমতি ব্যতীত মুহাম্মদ (সা) এর নিকট পালিয়ে যায় তবে, তিনি (সা) তাকে কুরাইশদের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন। কিন্তু, মুহাম্মদ (সা) এর নিকট থেকে যদি কেউ কুরাইশদের কাছে গমন করে তবে তারা তাকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।
৩. আরব গোত্রসমূহের মধ্য থেকে যে কেউ যদি স্বাক্ষরিত এ চুক্তির পক্ষে মুহাম্মদ (সা) এর মিত্র হতে চায় তবে, তা তারা পারবে। আবার, যদি কেউ কুরাইশদের মিত্র হতে চায় তবে তাও তারা পারবে।
৪. মুহাম্মদ (সা) ও মুসলিমদের এবার হজ্জ্ব না করেই মদীনায় ফিরে যেতে হবে। সামনের বছর তাদের মক্কায় প্রবেশের ক্ষেত্রে কোন বাঁধা থাকবে না। তবে, তখন তারা মাত্র তিনদিন মক্কায় অবস্থান করতে পারবে। এ সময় তারা কোষবদ্ধ তলোয়ার ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারবে না।
৫. এই চুক্তি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে এবং এ সময়কাল হচ্ছে স্বাক্ষরিত হবার সময় থেকে পরবর্তী দশবছর।
ইতিমধ্যে, এ চুক্তির ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে প্রচন্ড অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরী হয়। তাদের এ ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের ভেতর দিয়েই আল্লাহর রাসূল (সা) সুহাইল ইবন আমরের সাথে এ চুক্তি সম্পাদন করেন। মুসলিম শিবিরে দানা বেঁধে উঠা এ প্রচন্ড উত্তেজনা ও ভয়ানক অসন্তোষের মধ্যে আল্লাহর রাসূলকে রেখে সুহাইল মক্কায় ফিরে যায়। যুদ্ধ করার জন্য মুসলিমদের এতো ব্যাকুলতা ও চুক্তি স্বাক্ষরের পর তাদের চরম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে আল্লাহর রাসূল (সা) ভেতরে ভেতরে খুবই মর্মাহত হন এবং প্রচণ্ড অসহায় বোধ করতে থাকেন। শেষপর্যন্ত, তিনি (সা) তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামাহ্ (রা) এর কাছে তাঁর অন্তরের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট ও হতাশার কথা খুলে বলেন। উম্মে সালামাহ্ (রা) তাঁকে বলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! মুসলিমরা কখনোই আপনার অবাধ্য হবে না। তারা তো শুধু তাদের দ্বীন, আল্লাহর উপর তাদের অবিচল ঈমান ও আপনার আনীত বাণীর ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর। আপনি আপনার মাথা কামিয়ে ফেলুন এবং হাদীর পশুগুলোকে জবাই করে ফেলুন। দেখবেন, মুসলিমরাও সাথে সাথে আপনাকে অনুসরণ করবে। তারপর, তাদের নিয়ে আপনি মদীনায় ফিরে যান।”
উম্মে সালামাহ্ (রা) এর পরামর্শ অনুযায়ী রাসূল (সা) তাঁবু থেকে বেরিয়ে তাঁর মাথা মুড়িয়ে ফেলেন এবং উমরাহ্ আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত করে মানসিক ভাবে প্রশান্তি ও তৃপ্তি বোধ করেন। আল্লাহর রাসূল (সা) কে এ অবস্থায় দেখে মুসলিমরাও শেষপর্যন্ত নিজ নিজ পশু জবাই করার জন্য ছুটে যায় এবং মাথা মুড়িয়ে ফেলে। এরপর, রাসূল (সা) মুসলিমদেরসহ মদীনার পথে যাত্রা করেন। প্রায় অর্ধেক পথ অতিক্রম করার পর আল্লাহতায়ালা সুরা ফাতহ্ নাযিল করেন। আল্লাহর রাসূল সদ্য নাযিলকৃত এ সুরার পুরোটাই সাহাবীদেরকে তিলওয়াত করে শোনান। শুধুমাত্র তখনই মুসলিমরা সত্যিকার ভাবে বলতে পারে যে, হুদাইবিয়া সন্ধির মাধ্যমে আসলে মুসলিমদেরই চুড়ান্ত বিজয় অজির্ত হয়েছে।
মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার পরপরই রাসূল (সা) এবার খায়বারের ইহুদীদের সাথে চুড়ান্ত বোঝাপড়া করে আরব ভূ-খন্ডের বাইরে ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবার পরিকল্পনা করেন। এর মাধ্যমে তিনি (সা) ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রমকেও শক্তিশালী করার চিন্তা করেন। হুদাইবিয়া সন্ধিকে কার্যকরী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে তিনি (সা) একদিকে বর্হিবিশ্বের সাথে সম্পর্ক তৈরীর চেষ্টা করেন। আবার, অন্যদিকে, এ সন্ধির মাধ্যমেই তিনি (সা) আরব ভূ-খন্ডে দাওয়াতী কার্যক্রমের পথে বাধা হয়ে দাড়ানো কিছু ক্ষুদ্র প্রতিরোধ বলয়কে ভেঙ্গে দেন। অতুলনীয় রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদশির্তা থেকে হজ্জ্ব পালন করার উছিলায় আল্লাহর রাসূল (সা) যে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছিলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে তাঁর সে পুরো পরিকল্পনাই তিনি (সা) শেষপর্যন্ত বাস্তবায়ন করেন। লক্ষ্য অর্জনের পথে অনেক বাঁধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্তেও, এ চুক্তির সুবাদেই তিনি (সা) পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর প্রতিটি উদ্দেশ্য হাসিল করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর এ সমস্ত সাফল্য পরবর্তীতে সন্দেহাতীত প্রমাণ করে দেয় যে, হুদাইবিয়া সন্ধি প্রকৃত অর্থেই মুসলিমদের জন্য বিজয়ের বার্তা বহন করে এনেছে। রাসূল (সা) এর অর্জিত কিছু সাফল্য হলঃ
১. হুদাইবিয়া প্রান্তরে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা) সাধারণ ভাবে সমস্ত আরবের মধ্যে এবং বিশেষ করে কুরাইশদের মধ্যে ইসলামের ব্যাপারে জনমত তৈরী করতে পেরেছিলেন। যা প্রকৃত অর্থে আরবদের দৃষ্টিতে মুসলিমদের মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি করেছিল এবং কুরাইশদের মর্যাদাকে করেছিল ক্ষুন্ন ।
২. এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের ঈমানের দৃঢ়তা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হয়েছিলেন। বস্তুতঃ হুদাইবিয়া সন্ধি সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করেছিল যে, মুসলিমদের ঈমান ইস্পাত কঠিন ও অনমনীয়। এছাড়া, দ্বীন রক্ষার খাতিরে তাদের দুঃসাহসী পদক্ষেপ ও স্বতঃস্ফুর্ত আত্মত্যাগের দৃষ্টান্তও বিরল।
৩. এ ঘটনা থেকে মুসলিমরা এ শিক্ষাও লাভ করেছিল যে, ইসলাম প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে দক্ষ ও দূরদর্শী রাজনৈতিক চাল খুবই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
৪. এর ফলে, মক্কায় অবস্থানকারী মুসলিমরা আসলে শত্রুবুহ্যের ভেতরে থেকেই ইসলামী দাওয়াতের ছোট ছোট কেন্দ্র তৈরী করেছিল।
৫. এছাড়া, এ চুক্তির মাধ্যমে এটাও প্রমাণিত হয়েছিল যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গৃহীত সকল পদ্ধতিই একই উৎস, সত্যবাদীতা ও ন্যায়পরায়নতার ভিত্তিতে হতে হবে। তবে, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ও প্রজ্ঞার মাধ্যমেই লক্ষ্য অর্জনের পথ নির্ধারন করতে হবে। এক্ষেত্রে, অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কৌশল হিসাবে, শত্রুপক্ষের কাছে লক্ষ্য অর্জনের উপায় ও প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রাখা যাবে।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২১ (আল-আহযাবের যুদ্ধ)
ওহুদ যুদ্ধের পর অতর্কিত আক্রমণ সহ বিভিন্ন গোত্রের বিরদ্ধে যে সব শাস্তিমূলক পদক্ষেপ রাসূল (সা) নিয়েছিলেন তা মদীনার মুসলিমদের অবস্থানকে পুণরায় উপরে তুলে ধরতে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্বকে সুসংহত করতে গুরুতপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো । আল্লাহর রাসুলের এ সমস্ত সুচিন্তিত পদক্ষেপ মূলতঃ মুসলিমদের প্রভাব বলয়কে বিস্তৃত করে এবং আরব ভূ-খন্ডে রাতারাতি তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। আর, সমস্ত আরব ভূ-খন্ড মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্যের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে যায়। এরপর থেকে আরব গোত্রগুলো তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের গন্ধ পাওয়া মাত্রই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার চাইতে পালিয়ে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করতো। গাতফান ও দুমান আল-জুন্দাল গোত্রের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিলো। ওদিকে, কুরাইশরাও মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্যরে সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছিলো না। এছাড়া, তারা নিজেরা মুসলিমদের মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মনোবলও হারিয়ে ফেলেছিলো। এর চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে বদরের প্রান্তরে দ্বিতীয় যুদ্ধ। যে যুদ্ধে কুরাইশরা ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে পিছু হঠে যায়, এমনকি আর ফিরে আসার সাহসও করে না। এ সমস্ত ঘটনা মদীনার মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে কিছুটা হলেও স্থিতিশীল করে। শত্রুপক্ষের অতর্কিত আক্রমণ থেকে তারা মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয় এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মদীনার সমাজ গঠনে মনোযোগী হয়। এছাড়া, পরিবর্তিত এ নতুন পরিস্থিতি তাদের চলমান জীবনযাত্রাকেও পরিবতর্ন করে দেয়। কারণ, ইতিমধ্যে যুদ্ধলব্ধ মালামাল হিসাবে প্রাপ্ত বনু নাযির গোত্রের জমিজমা, খেজুর বাগান, ঘরবাড়ী ও আসবাবপত্র রাসূল (স) মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছিলেন। যা তাদের জীবনযাত্রায় নতুন সৌভাগ্যের সূচনা করেছিলো। কিন্তু, এসব কোনকিছুই তাদেরকে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি, আর তা হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। কারণ, আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত মুসলিমদের জন্য জিহাদ করা ফরজ করেছেন। যাই হোক, পরিবর্তিত এই নতুন পরিস্থিতি একদিকে মুসলিমদের জীবনযাত্রার মানকে যেমন উন্নত করলো, অন্যদিকে তাদের জীবনে ফিরে আসলো কাঙ্খিত স্থিতিশীলতা।
মদীনায় শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করলেও আল্লাহর রাসূল (স) শত্রুপক্ষের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারে সবসময়ই সর্তক থাকতেন। সমস্ত আরব ভূ-খন্ডের কোথায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে কি ষড়যন্ত্র হচ্ছে কিংবা কারা কি ধরণের পরিকল্পনা করছে এ সমস্ত ব্যাপারে তিনি (স) সবসময়ই খোঁজখবর রাখতেন। খবর সংগ্রহ করার জন্য তিনি সমস্ত আরব উপদ্বীপ সহ এর বাইরের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তচরও নিযুক্ত করেছিলেন। যে কোন ধরনের অতর্কিত আক্রমণ ও সহিংষতা মোকাবিলায় তিনি (স) থাকতেন অসম্ভব রকমের উদ্বিগ্ন। কারণ, একদিকে মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্য যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেইসাথে বাড়ছিলো তাদের শত্রুর সংখ্যা, which was reactionary to the building of an army and a State to be reckoned with. This was particularly the case after ইহুদী গোত্র বনু কাইনুকা ও বনু নাযিরকে মদীনা থেকে বিতাড়ন করা এবং গাতফান, হাদায়েল ও অন্যান্য গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবার পর।
এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, রাসূল (স) শত্রুপক্ষের গতিবিধি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে খবর সংগ্রহ করাকেই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন। কুরাইশরা যখন অন্যান্য গোত্রকে সঙ্গে নিয়ে মদীনা আক্রমণ করতে আসছিলো তখন তিনি এ পদ্ধতিতেই বিপদ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন। আর, নতুন বিপদ মুকাবিলার জন্য নিয়েছিলেন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।
এদিকে, মদীনা থেকে বহিস্কৃত হবার পর ক্ষুব্ধ বনু নাযির গোত্র অপমানের প্রতিশোধ নেবার সুযোগ খুঁজতে থাকে। এ লক্ষ্যে তারা চেষ্টা করে আরবের বিভিন্ন গোত্রকে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক মিলে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে একটি দলও তৈরী করে, যাদের মধ্যে ছিলো হুয়াই ইবন আখতাব, সালাম ইবন আবি আল-হুকাইক এবং কিনানাহ ইবন আবি আল-হুকাইক। আর, বনু ওয়ায়ি’ল গোত্র থেকে ছিলো হাওদাহ ইবন কায়েস এবং আবু ’আম্মার। তারা একত্রিত হয়ে মক্কার কুরাইশদের কাছে যায়। কুরাইশরা হুয়াইকে তার দলবল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, “আমি তাদের খাইবার আর মদীনার মাঝামাঝি এলাকায় রেখে এসেছি এবং মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের আক্রমণ করার জন্য তোমাদের সাহায্যের অপেক্ষায় আছি।” এরপর কুরাইশরা তাকে বনু কুরাইযা গোত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় যে, “বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদ (স)কে বোকা বানানোর উদ্দেশ্যে মদীনাতেই রয়ে গেছে। যখন আক্রমণ হবে তখন তারা তোমাদের মদীনার ভেতর থেকে সাহায্য করবে।” এ পর্যায়ে কুরাইশরা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে ভাবতে থাকে যে, তারা মদীনা আক্রমণ করবে কি করবে না। তারা চিন্তা করে দেখলো যে, আসলে মুহাম্মদ (স) আর তাদের মধ্যে সত্যিকারের কোন বিরোধ নেই। বিরোধের একমাত্র কারণ মুহাম্মদ (স) এর দাওয়াতী কাজ। একসময় তারা এটাও ভাবলো যে, আসলে মুহাম্মদ যা বলে সেটাই কি সঠিক? দ্বিধাদ্বন্দে দোদুল্যমান হয়ে তারা শেষ পর্যন্ত ইহুদীদের জিজ্ঞেস করলো, “হে ইহুদীরা! তোমরা তো আল্লাহর কাছ থেকে পূর্বেই কিতাব পেয়েছো। আর, তোমরা আমাদের আর মুহাম্মদের মধ্যে মতভেদের ব্যাপারেও জানো। তোমরা বল তো আমাদের দ্বীন সঠিক না মুহাম্মদের?” উত্তরে ইহুদীরা বললো, “অবশ্যই তোমাদের দ্বীন মুহাম্মদের আনীত দ্বীনের থেকে অনেক ভালো এবং এ ব্যাপারে তোমাদের দাবীও সঠিক!”
ইহুদীরাও এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতো এবং তারা খুব ভালো করেই জানতো যে, মুহাম্মদ (স) এর দাবী সম্পূর্ন সঠিক। কিন্তু, তারপরেও তারা শুধু তাদের ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে মুসলিমদের উপর চুড়ান্ত এক আঘাত হানার জন্যই আরব গোত্রগুলোকে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছিল। বস্তুতঃ এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করার পরও মূর্তিপূজাকে সঠিক বলে ঘোষণা দেয়া তৌহিদবাদীদের জন্য এক চরম অবমাননাকর কাজ। কিন্তু, তা সত্তেও হীন স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে এ ধরনের ঘৃণ্য কাজের পূণরাবৃত্তি করতেও ইহুদীদের কোন দ্বিধা নেই।
ইহুদীরা যখন নিশ্চিত হয়ে যায় যে, মদীনা আক্রমণ করার জন্য আহবান করা মাত্রই কুরাইশরা দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দেবে, তখন তারা সমর্থনের আশায় কায়েস ঘাইলানের ঘাতাফান গোত্র, বনু মুররাহ থেকে আরম্ভ করে বনু ফাযারাহ, বনু আসজা’, বনু সালিম, বনু সা’দ, বনু আসাদ সহ আরবের যতো গোত্রের মুহাম্মদ (স) এর প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব ছিলো তাদের সকলের কাছে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই কুরাইশদের নেতৃত্বে আরবের বিভিন্ন গোত্র একত্রিত হয়ে মদীনা উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
এ যুদ্ধে কুরাইশরা এগিয়ে যায় আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলো ৪০০০ যোদ্ধা, ৩০০ অশ্বারোহী এবং আরও ১৫০০ উটের পিঠে আরোহনকারী যোদ্ধা। ’উইয়াইনা ইবন হিসন ইবন হুদায়ফার নেতৃত্বে বনু ফাযারাহ্ গোত্রের পক্ষে ছিলো ১০০০ যোদ্ধার এক বিরাট বাহিনী। আসজা’ গোত্র মিশ’আর ইবন রাখাইলাহ্ এবং মররাহ্ গোত্র আল-হারিছাহ্ ইবন ’আউফ এর নেতৃত্বে ৪০০ যোদ্ধা নিয়ে এ যুদ্ধ অংশগ্রহন করে। বনু সালিম এবং বীর মা’ইয়ার লোকেরা ৭০০ যোদ্ধা নিয়ে এ বিশাল বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়। তারা সকলে একত্রিত হবার পর এদের সাথে বনু সা’দ এবং বনু আসাদ গোত্র তাদের দলবল নিয়ে যুক্ত হয়ে এ বাহিনীর শক্তি আরও বৃদ্ধি করে। বিশাল এ সৈন্যদলের মোট সংখ্যা শেষপর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজারে। মিলিত এ সৈন্যবাহিনী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদীনা আক্রমণ করতে এগিয়ে যায়। মুহাম্মদ (স)এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছালে তিনি (স) মদীনার ভেতরেই পরিখা খননের সিদ্ধান্ত নেন। মূলতঃ সালমান ফারসী (রা) পরামর্শেই সাহাবীরা মদীনার চারপাশে পরিখা খননের কাজ শুরু করে এবং মুসলিমদের উৎসাহ দেবার জন্য এ কাজে রাসূল (স) নিজেও অংশগ্রহন করেন। পরকালে জান্নাতের আশায় সাহাবীরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করতে থাকেন। আল্লাহর রাসূল (স)ও এ কাজে তাদের সর্বাত্মক শ্রম দেবার জন্য উৎসাহিত করতে থাকেন। ফলে, মাত্র ছয়দিনের মধ্যেই বিশাল এ পরিখা খননেন কাজ সম্পন্ন হয়। এছাড়া, পরিখার সম্মুখ ভাগে অবস্থিত বাড়ীগুলোকে সুরক্ষিত করা হয় আর পরিখার বাইরের (অর্থাৎ যে বাড়ীগুলো পরিখার বাইরের অংশে ছিলো) বাড়ীগুলোকে জনশূণ্য করা হয়। নারী ও শিশুদের সুরক্ষিত ঘর-বাড়ীগুলোর মধ্যে রাখা হয়। এরপর, আল্লাহর রাসূল (স) ৩০০০ যোদ্ধা সহ শত্রুপক্ষকে মুকাবিলা করতে এগিয়ে যান। তাঁর পেছন দিকে ছিলো সাল উপত্যকা এবং সদ্যসমাপ্ত পরিখাটি ছিলো রাসূল (স) এবং তাঁর শত্রুপক্ষের মাঝামাঝি। এখানেই তিনি (স) দলবল সহ অবস্থান নেন এবং তাঁর জন্য টানানো হয় একটি লাল রঙের তাঁবু।
ওদিকে কুরাইশ ও তাদের মিত্রবাহিনী বিশাল দলবল নিয়ে ওহুদের প্রান্তরে পৌঁছে যায়। তারা ভেবেছিলো হয়ত এখানেই তাদের কাঙ্খিত শত্রুপক্ষের সাথে সাক্ষাৎ হবে। কিন্তু, তাদের অদৃষ্টে তা হবার ছিলো না। বাধ্য হয়ে তারা দলবল নিয়ে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং মদীনায় না পৌঁছা পর্যন্ত তাদের এ যাত্রা অব্যাহত থাকে। মদীনায় পৌঁছে তারা তাদের সামনে বিরাট এক পরিখা দেখে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। কারণ, এ ধরনের কোন আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধকৌশলের সাথে তাদের একেবারেই পরিচয় ছিলো না। এ অবস্থায় তারা মদীনার বাইরে পরিখার অপর পাশে অবস্থান নিতে বাধ্য হয় এবং ভাবতে থাকে তাদের পরবর্তী যুদ্ধ কৌশল। কিন্তু, আবু সুফিয়ান ও তার সাথীরা শীঘই্র বুঝতে পারে এখানে তাদের অপেক্ষার সময় হবে দীর্ঘ। কারণ, এ বিশাল পরিখা অতিক্রম করা তাদের পক্ষে আসলে সম্ভব হবে না। এরকম একটা অমীমাংসিত যুদ্ধাবস্থা তাদের জন্য হয়ে যায় যন্ত্রনাদায়ক। তখন ছিলো শীতকাল, হু হু ঠান্ডা বাতাস সবার গায়ে যেন হুল ফোটাচ্ছিল। এ রকম অসহনীয় অবস্থায় ক্রমশঃ সবাই যুদ্ধের মনোবল হারিয়ে ফেলতে লাগলো এবং ভেতরে ভেতরে বাড়ী ফিরে যাবার জন্য ব্যকুল হয়ে পড়লো। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে, হুয়াই ইবন আখতাব কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের পরামর্শ দেয় যে, বনু কুরাইযা গোত্রকে মুসলিমদের সাথে কৃত শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করে তাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বলা উচিত। কারণ, যদি তা হয় তাহলে বহির্বিশ্বের সাথে মুসলিমদের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং তারা তখন অবলীলায় মদীনা আক্রমণ করতে পারবে।
প্রস্তাবটি কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের খুবই পছন্দ হওয়ায় তারা হুয়াইকে এ প্রস্তাবটি বনু কুরাইযার নেতা কা’ব ইবন আসাদের কাছে উপস্থাপন করার জন্য নিযুক্ত করে। হুয়াই এর আগমনের সংবাদ শুনে কা’ব তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু, কা’ব দরজা খোলা না পর্যন্ত হুয়াই তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। অনেক চেষ্টা-চরিত্রের পর শেষ পর্যন্ত কা’ব তার ঘরের দরজা খুলে দেয়। দরজা খোলার পর হুয়াই বলে, “তোমার উপর সৌভাগ্য বর্ষিত হোক কা’ব! আমি তোমার জন্য বহন করে এনেছি অনন্ত সৌভাগ্য। আর, আমার সাথে রয়েছে এক বিশাল বাহিনী। আমার সাথে রয়েছে কুরাইশ সর্দার ও তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা। আরও রয়েছে ঘাতাফানের সর্দার ও তাদের নেতৃস্থানীয় মানুষেরা। তারা আমাদের সাথে এ মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তারা মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের নিশ্চিহ্ন না করে এখান থেকে যাবে না।” কা’ব ইবন আসাদ তার এ প্রস্তাবে ইতস্তত করছিলো। তার মনে পড়ছিলো মুহাম্মদ (স) এর সত্যবাদিতা ও মহানুভবতার কথা। একই সাথে সে এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকান্ডের পরবর্তী ফলাফল নিয়েও আতঙ্কিত ছিলো। কিন্তু, হুয়াই অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে তার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলো। তাকে স্মরণ করিয়ে দিলো মুহাম্মদ (স)এর ইহুদীদের সাথে কৃত ব্যবহার এর কথা। আবারও তাকে জানালো শত্রু মুকাবিলায় মিত্রবাহিনীর শক্তি সম্পর্কে। শেষ পর্যন্ত হুয়াই এর ইচ্ছারই জয় হলো এবং কা’ব তার প্রস্তাবে সম্মতি দিলো।
এরপর কাফিরদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কা’ব মুসলিমদের সাথে তার কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তার ও মুহাম্মদ (স) এর মধ্যকার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। এরপর সে রাসূল (স) এর অজান্তেই কুরাইশ ও তাদের মিত্রবাহিনীর সাথে যোগ দেয়। এ সংবাদ আল্লাহর রাসূল (স) ও সাহাবাদের কাছে পৌঁছালে তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কায়, রাসূল (স) ’আউস গোত্রের নেতা সা’দ ইবন মু’য়াজ, খাযরাজ গোত্রের নেতা সা’দ ইবন ’উবাদাহ্ এবং তাদের সাথে ’আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহাহ্ ও খাওওয়াত ইবন জুবায়েরকে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করার জন্য পাঠিয়ে দেন। ঘটনা সত্য হলে তিনি (স) সাংকেতিক চিহ্নের মাধ্যমে তাঁকে জানানোর নির্দেশ দেন, যাতে মুসলিমদের মনোবলে কোন ফাটল না ধরে। আর যদি তা না হয়, অর্থাৎ বনু কুরাইযা যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তাহলে তাদের তা উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে বলেন। এ নিদের্শ পাবার পর তারা গিয়ে দেখেন, তারা যতোটা শুনেছিলেন পরিস্থিতি আসলে তার চাইতেও ভয়াবহ।
তারা বনু কুরাইযাকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার অনুরোধ করে। কিন্তু, বনু কুরাইযা এর বিনিময়ে তাদের ভাই বনু নাযিরকে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দাবী করে। সা’দ ইবন মুয়াজ যিনি একসময় বনু কুরাইযার মিত্রপক্ষ ছিলেন, আপ্রাণ চেষ্টা করেন কা’বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেনি। কিন্তু, তার ফলাফল হয় আরও খারাপ। এ পর্যায়ে কা’ব ও তার সঙ্গিরা মুহাম্মদ (স)কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নানারকম কথা বলতে থাকে। তারা বলে, “আল্লাহর রাসূল আবার কে? আমাদের মুহাম্মদ নামে কারও সাথে কখনো কোনরকম চুক্তি ছিলো না।” দূতেরা মুহাম্মদ (স) এর কাছে গিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং সমস্ত ঘটনা তাঁকে অবহিত করেন। এরপর পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর আকার ধারণ করে, আর চারদিকে বিরাজ করতে থাকে মূর্তিমান আতঙ্ক।
এর মধ্যে শত্রুদের সম্মিলিত বাহিনী মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। বনু কুরাইযা গোত্র তাদের মিত্রপক্ষের কাছে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য দশদিনের সময় চেয়ে নেয়। আর, এ সময়ের মধ্যে সম্মিলিত সৈন্যবাহিনী মুসলিমদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করে। মুহাম্মদ (স)কে পরাস্ত করার জন্য তারা তাদের বাহিনীকে তিনভাগে ভাগ করে। ঠিক হয় যে, ইবন আল ’আওয়ার আল-সিলমীর নেতৃত্বাধীন দল উপত্যকার দিক হতে মদীনাকে রুদ্ধ করবে। ’উইয়াইনা ইবন হিসন এগিয়ে যাবে এক পাশ থেকে। আর আবু সুফিয়ান তার দলবল নিয়ে পরিখার সামনের দিক থেকে আক্রমণ চালাবে। এ অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্ক মুসলিমদের গ্রাস করে, যাতে তারা হয়ে পড়ে প্রচন্ড পরিমাণে ভীত । আর, অপরদিকে প্রতিপক্ষের সম্মিলিত বাহিনী আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটতে থাকে। মুসলিমদের চোখে পরিষ্কার ভাবে দৃশ্যমান হয় তাদের শক্তিসামর্থ্য। শত্রুপক্ষ পরিখার দিকে এগুতে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিখা অতিক্রম করতেও সমর্থ হয়। এদের মধ্যে ছিল কুরাইশ গোত্রের কিছু অশ্বারোহী। ’আমর ইবন আবদ , ’ইকরামাহ্ ইবন আবি জাহল এবং দিরার ইবন আল-খাত্তাব পরিখার অপ্রশস্ত একটি অংশের মধ্য দিয়ে ওপারে চলে যায়। তারা তাদের ঘোড়াকে এমন ভাবে প্রহার করে যে, ঘোড়া তাদের সহ সজোরে লাফ দিয়ে পরিখা আর সালের মধ্যবর্তী স্যাঁতস্যঁতে এলাকায় চলে আসে।
শত্রুপক্ষ পরিখার যে অপ্রশস্ত এলাকা দিয়ে এপারে আসার চেষ্টা করছিল ’আলী ইবন আবু তালিব কয়েকজন মুসলিম সহ সে স্থানে অবস্থান নিলেন। ’আলী ইবন আবু তালিব ও তাঁর সঙ্গীরা যখন পথরোধ করে দাঁড়ালো তখন ’আমর ইবন আবদুদ তাদেরকে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য আহবান করলো। ’আলী (রা) তার চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে বললেন, “তুমি আগে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসো।” উত্তরে ’আমর বললো, “হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না।”’আলী (রা) বললেন,“কিন্তু, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই।” এরপর তাদের মধ্যে যুদ্ধ হলো এবং আলী (রা) তাকে হত্যা করে ফেললেন। বাকী অশ্বারোহীরা এ দৃশ্য দেখে ঝড়ের গতিতে পরিখা পার হয়ে ওপারে চলে গেল। কিন্তু, এ দূর্ঘটনা কাফিরদের মনোবলে এতোটুকু ফাটল ধরাতে পারলো না বরং, তারা ক্রুদ্ধ হয়ে আরও দৃঢ়তার সাথে ভয়ঙ্কর আক্রমণের প্রস্তুতি নিলো।
ইতিমধ্যে বনু কুরাইযার উম্মত্ত যোদ্ধারা একে একে তাদের দূর্গ ছেড়ে বের হয়ে মদীনায় প্রবেশ করতে শুরু করলো। আশেপাশের মুসলিমদ বসতিগুলোর মাঝে আতঙ্ক ছড়ানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এ পরিস্থিতিতে মুসলিম বসতিগুলোতে বিরাজ করতে থাকল আতঙ্ক, বিভীষিকা ও চরম উদ্বেগ। কিন্তু, এ উদ্বেগ আল্লাহর রাসূল (স)কে এতোটুকু স্পর্শ করলো না। বরং, তিনি (স) ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
স্বস্তিদায়ক ঘটনা ঘটলো নু’য়াম ইবন মাস’উদ এর মাধ্যমে। তিনি ইতিমধ্যে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন কিন্তু, তার গোত্রের লোকেরা এ সংবাদ জানতো না। মুসলিমদের এ সঙ্কটপূর্ণ সময়ে তিনি আল্লাহর রাসুলের কাছে আসলেন এবং শত্রুদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য তাঁকে একটা উপায় বাতলে দিলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি বনু কুরাইযা গোত্রের নিকট গেলেন। অজ্ঞতার যুগে বনু কুরাইযার ছিলো তার অন্তরঙ্গ বন্ধু, আর তাদের মধ্যে ছিলো চমৎকার সৌহার্দ্যপুর্ণ সম্পর্ক। এ সম্পকের্র সূত্র ধরে তিনি বনু কুরাইযাকে বুঝিয়ে বললেন, যদি ঘাতাফান আর কুরাইশ গোত্র তাদের মুহাম্মদ (স)কে একাকী মুকাবিলার জন্য ফেলে চলে যায় তাহলে তার পরিণতি কি হতে পারে। তিনি এ বিষয়ে যে যুক্তি তুলে ধরলেন তা হলো, কুরাইশ আর ঘাতাফান গোত্র হয়তো এখানে খুব বেশীদিন অবস্থান করবে না, কারণ তারা এ এলাকার বাসিন্দা না। এ অবস্থায় যদি তারা যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বনু কুরাইযা কোনভাবেই মুসলিমদের একক ভাবে মুকাবিলা করতে পারবে না।
সবশেষে তিনি তাদের পরামর্শ দিলেন যে, কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের নেতৃস্থানীয় দু’জনকে তাদের হাতে জিম্মি হিসাবে না রাখা পর্যন্ত তারা যুদ্ধের ময়দানে না যায়। কারণ, জিম্মিদের জন্য তারা এখানে অবস্থান করতে বাধ্য হবে। পরিস্থিতি এ রকম হলেই একমাত্র তাদের মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে সম্মিলিত বাহিনীর সাথে প্রাণপণ যুদ্ধ করা উচিত। কুরাইযা ভেবে দেখলো যে, এটা একটা চমৎকার পরামর্শ। এরপর, নু’য়াম কুরাইশদের গিয়ে বললেন বনু কুরাইযা মুহাম্মদের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। শুধু তাই নয়, তাদের পূর্বের সিদ্ধান্তের জন্য তারা যথেষ্ট লজ্জিত ও অনুতপ্তও হয়েছে। তারা তাদের কর্মফলের প্রায়শ্চিত্য করার লক্ষ্যে কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের নেতৃস্থানীয় দু’জনকে মুসলিমদের হাতে তুলে দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেন তারা তাদের হত্যা করতে পারে। সুতরাং, তারা যদি তোমাদের কাউকে জিম্মি হিসাবে দাবী করে তাহলে কক্ষনো তাদের দাবী মেনে নিও না। আর, খবরদার! তাদের হাতে তোমাদের কাউকে তুলে দিও না। ঘাতাফান গোত্রের কাছে গিয়েও তিনি তাদের একই কথা বললেন।
নু’য়ামের এ কথায় ইহুদীদের ব্যাপারে আরবদের সন্দেহ ঘনীভূত হলো এবং আবু সুফিয়ান কা’ব এর কাছে সংবাদ পাঠাল যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে মুহাম্মদকে অবরোধ করে আছে, সুতরাং বনু কুরাইযা যেন আগামীকালই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এর উত্তরে কা’ব জানাল যে, আগামীকাল হচ্ছে সাববাথ। এদিন তারা যুদ্ধও করে না, কোনও কাজও করে না। এ ধরনের উত্তরে আবু সুফিয়ান খুবই রাগান্বিত হয়ে গেল এবং তার কাছে নু’য়ামে কথাই সত্য মনে হলো। সে আবারও আর একদল বার্তাবাহক পাঠিয়ে জানালো যে, আগামীকালই মুহাম্মদকে আক্রমণ করা খুবই জরুরী। তারা যেন এ সাববাথ পালন না করে অন্যদিন তা পালন করে। বার্তাবাহকরা কুরাইযাকে এটাও জানালো যে, তারা যদি আগামীকাল যুদ্ধ না করে তাহলে তাদের আর সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে কৃত সকল চুক্তি এখানেই শেষ হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত বনু কুরাইযাকে একাকীই মুহাম্মদ (স) এর মুখোমুখি হতে হবে। একথা শোনার পরও কুরাইযা যুদ্ধ না করে তাদের সাববাথ পালনের সিদ্ধান্তেই অটল থাকলো, উপরন্তু, কুরাইশদের কাছে দু’জন জিম্মি দাবী করে বসলো। তাদের এ দাবীর পর নু’য়ামের কথার সত্যতা সম্পর্কে আবু সুফিয়ানের আর কোন সন্দেহ রইলো না। এরপর সে নতুন রনকৌশলের কথা ভাবতে লাগলো। আর, ঘাতাফান গোত্রের সাথে শলা-পরামর্শ করে মুহাম্মদ (স)কে আক্রমণ করার ব্যাপারে দ্বিতীয় চিন্তা করতে থাকল।
সে রাতে আল্লাহতায়ালা তাদের জন্য পাঠালেন তীব্র শীতল ঝড়ো হাওয়া, আর সেই সাথে বজ্রপাত ও বিজলীর চমক। তীব্র আচম্কা ঝড়ে শত্রুপক্ষের তাঁবুগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। এদিক ওদিক ছিট্কে গেল তাদের রান্নার সমস্ত সরঞ্জাম। ভয়াবহ আতঙ্ক তাদের গ্রাস করে ফেললো। প্রতিমূহুর্তে তারা ভাবতে লাগলো, নাজুক এই পরিস্থিতিতে কাজে লাগিয়ে এখনই বুঝি মুহাম্মদ আর তাঁর সঙ্গীরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে তাদের। এরমধ্যে আবার, তুলাইহা চিৎকার করতে লাগলো, “মুহাম্মদ তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য তোমরা পালাও।” একথা শুনে আবু সুফিয়ান ঘোষনা দিল, “কুরাইশরা, তোমরা ক্ষান্ত হও। আমি আর এর মধ্যে নেই।” এরপর তারা যে যা পারলো সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে বাঁচল। ঘাতাফান সহ বাকী সব গোত্রও একই কাজ করলো। সকাল হওয়ার পর দেখা গেল, শত্রুপক্ষ উধাও হয়ে গেছে।
শত্রুপক্ষের এই করুণ পরিণতি দেখার পর আল্লাহর রাসূল (স) মুসলিমদের সহ পরিখা ছেড়ে মদীনায় চলে আসলেন। আর এভাবেই আল্লাহতায়ালা ভয়াবহ শত্রু মুকাবিলা করা থেকে মুসলিমদের মুক্তি দিলেন। এরপর, রাসূল (স) বনু কুরাইযা গোত্রকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র থেকে চিরতরে মুক্তি পাবার বন্দোবস্ত করলেন। কারণ, এরাই হচ্ছে সেই বিশ্বাসঘাতকের দল যারা চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলিয়েছিল আর মুসলিমদের চিরতরে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিল। তিনি (স) মুয়াজ্জিনকে ডেকে নির্দেশ দিলেন যেন সে ঘোষনা দেয়, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুগত সে যেন বনু কুরাইযার আবাসস্থলে না পৌঁছান যে পর্যন্ত আছর নামাজ না পড়ে। রাসূল (স) তাঁর পতাকা হাতে আলী (রা)কে আগে পাঠিয়ে দিলেন এবং তার পিছে পিছে মুসলিম সেনাদল প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে রওনা হল। মুসলিমরা বনু কুরাইযা গোত্রকে পঁচিশ দিন ঘেরাও করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত, ইহুদীরা মুহাম্মদ (স) সাথে আপোষ করে বিষয়টা ফয়সালা করার সিদ্ধান্ত নিল। অনেক বাকবিতন্ডার পর সা’দ ইবন মু’য়াজের মধ্যস্থতাকে তারা মেনে নিল এবং তার দেয়া সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবে বলে ঠিক করল। সা’দ ইবন মু’য়াজ রায় দিলেন যে, “গোত্রের পুরুষদের হত্যা করা হোক। তাদের সমস্ত সম্পত্তি মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হোক আর নারী ও শিশুদের দাস (সাবাইয়া) হিসাবে গ্রহন করা হোক।” পরবর্তীতে সা’দের এ রায়কেই বাস্তবায়ন করা হয়। আর, এভাবেই মদীনা থেকে বনু কুরাইযার অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় আর, মদীনাবাসীও তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র থেকে চিরতরে মুক্তি পায়।
শত্রুপক্ষের সম্মিলিত বিশাল বাহিনীর লজ্জাজনক এ পরাজয় পরবর্তীতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের বড় ধরনের কোন আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়ার সকল সম্ভাবনাকে নির্মূল করে দেয়। আর, বনু কুরাইযার করুণ পরিণতি দেখার পর রাসূল (স)এর সাথে চুক্তি ভঙ্গকারী বিতাড়িত বাকী তিনটি ইহুদী গোত্রও মদীনার আশে-পাশে থাকার সাহস হারিয়ে ফেলে। যার ফলে, মদীনায় আল্লাহর রাসূল (স) ও সাহাবীদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়। আর, আরবের সমস্ত গোত্ররাও মুসলিমদের ব্যাপারে চিরতরে সতর্ক হয়ে যায়।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২০ (বিদ্রোহ দমন)
বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের সংখ্যা ছিলো অতি নগন্য এবং যুদ্ধ সরঞ্জামের দিক থেকেও তারা ছিলো খুবই দূর্বল। কিন্তু, তারপরও, কাফিরদের সাথে মুসলিমের এ প্রথম মুকাবিলায় মুসলিমরা বীরের মতো বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলো। মুসলিমদের এ বীরত্বপূর্ণ বিজয় কাফিরদের আত্মবিশ্বাসের ভীত এতো সাংঘাতিক ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিলো যে, তারা শোকে-দুঃখে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলো। এছাড়া, কুফরশক্তির উপর মুসলিমদের এ বিজয় মদীনার অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ সহ ইহুদীদের নানারকম চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকেও অনেকটা দমিয়ে দিয়েছিলো। এ ঘটনার প্রত্যক্ষ ফল স্বরূপ, কিছু ইহুদী গোত্র মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়, আর কিছু গোত্র মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়। মদীনাতে মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্য ক্রমশঃ বাড়ছিলো, আর কুরাইশরা এক মূহুর্ত সময় নষ্ট না করে অপমানের প্রতিশোধ নেবার পরিকল্পনা আঁটছিলো। পরের বছর ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম তীরন্দাজরা (যারা মুজাহিদদের পেছন থেকে পাহারা দেবার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো) রাসূল (সা) এর নির্দেশ অমান্য করে গণীমতের মালামাল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে গেলো, ঠিক তখনই কুরাইশদের হাতে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার সুবর্ণ সুযোগ এসে গেলো। যুদ্ধে জয়ী হয়ে কুরাইশরা আনন্দে উৎফুল্ল হলো। আর, মুসলিম যোদ্ধারা ভগ্ন হৃদয়ে পরাজিত হয়ে মদীনায় ফিরে আসলো। যদিও যুদ্ধ শেষ হবার পর মুসলিমরা কুরাইশদের হামরা আল-আসাদ পর্যন্ত ধাওয়া করেছিলো (এটি ছিলো মদীনা থেকে প্রায় আট মাইল দূরে)।
ওহুদের প্রান্তরে মুসলিমদের এই পরাজয়ে আরব ভূ-খন্ডে নানারকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মদীনার অভ্যন্তরে বিভিন্ন দল মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্য ও শাসনকর্তৃত্বকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে প্রকাশ্যেই বিদ্রোহ ঘোষনা করে। মদীনার বাইরের কিছু গোত্র, যারা ওহুদের যুেদ্ধর পূর্বে কোনদিন মুসলিমদের সাথে কৃত চুক্তির সীমা অতিক্রম করার কথা চিন্তাও করেনি, তাদের মাঝেও বিদ্রোহের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। ইহুদী ও মদীনার মুনাফিকদের মতো মদীনার বাইরের আরবরাও মুহাম্মদ (স)কে চ্যালেঞ্জ করার কথা ভাবতে থাকে। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন ভাবে মুসলিমদের প্ররোচিত করতে থাকে।
মদীনার ভেতরে-বাইরে শত্রুপক্ষের এ সব পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে রাসূল (সা) শত্রুপক্ষকে মুকাবিলা করার বিষয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, মর্যাদা ও শক্তিসার্মথ্য পুণরুদ্ধারকল্পে তিনি (সা) মুসলিমদের প্রতি অমুসলিমদের যে কোন ধরনের তুচ্ছতাচ্চিল্য ও বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।
ওহুদ যুেদ্ধর একমাস পর আল্লাহর রাসুেলর কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছে যে, বনু আসাদ গোত্র মদীনা আক্রমণ করে শহরের চারিপার্শস্থ চারণভূমির পশুগুলো লুট করার পরিকল্পনা করেছে। এমতাবস্থায়, রাসূল (সা) বনু আসাদ গোত্রকে মদীনা আক্রমণ করার কোন সুযোগ না দিয়ে তার আগেই তাদের আস্তানায় আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। শত্রুপক্ষের আক্রমণের পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দেয়াই ছিলো এ আক্রমণের উদ্দেশ্য। তিনি (সা) আবু সালামাহ ইবন ’আবদ আল-আসাদের নেতৃত্বে ১৫০ জন মুসলিমদের একটি দলকে এ অভিযানে প্রেরণ করেন। এ দলে আবু ’উবাইদাহ ইবনুল যাররাহ, সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস এবং উসাইদ ইবন হুদাইর সহ অনেক খ্যাতনামা যোদ্ধা ছিলো। এ অভিযানকে গোপন রাখা এবং শত্রুপক্ষকে চমকে দেবার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের দিনে লুকিয়ে থেকে রাতে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। সেইসাথে, প্রচলিত পথে যাত্রা না করে ভিন্ন পথ ধরে চলার আদেশ দেন। আবু সালামাহ বনু আসাদ গোত্রের ঘাঁটিতে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত যাত্রা করতে থাকেন। লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর তিনি ভোরবেলায় দলবল সহ বনু আসাদ গোত্রকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন এবং তার সঙ্গীদের জিহাদের নির্দেশ দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর আক্রমণ চালান। মুসলিম সৈন্যদল খুব সহজেই বনু আসাদকে পরাজিত করে এবং যুদ্ধলব্ধ মালামাল সহ বীরের বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে। এভাবে, মুসলিমদের শৌর্য-বীর্য আবারও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ ঘটনার মাধ্যমে প্রকারান্তরে মুসলিমরা অমুসলিমদের ইসলামের শক্তিসামর্থ্যরে কথা মনে করিয়ে দেয়।
এরপর, রাসূল (সা) এর কাছে সংবাদ পৌঁছে যে, খালিদ ইবন সুফিয়ান আল-হনদালি নামে এক পৌত্তলিক ’উরনাহ বা নাখলাহর কাছে অবস্থান গ্রহন করেছে এবং মদীনা আক্রমণের জন্য লোকবল সংগ্রহ করছে। এ সংবাদ শোনার পর, আল্লাহর রাসূল (সা) ’আব্দুল্লাহ ইবন আনিছকে খালিদ ইবন সুফিয়ান সম্পর্কে খোঁজখবর নেবার জন্য প্রেরণ করেন। ’আব্দুল্লাহ যাত্রা শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই খালিদের দেখা পেয়ে যান। খালিদ তাকে জিজ্ঞেস করে যে, সে কে? উত্তরে তিনি বলেন,“আমি আব্দুল্লাহ। আমি একজন আরব। আমি শুনতে পেয়েছি যে তুমি মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য লোক সংগ্রহ করছো। আর এ কারনেই আমি এখানে এসেছি।” খালিদ তার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে। তারপর, তারা দু’জন কথাবার্তা বলতে বলতে সামনের দিকে হাটঁতে থাকে। যখন তারা দু’জন লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে আসে তখন ’আব্দুল্লাহ ইবন আনিছ তলোয়ার দিয়ে খালিদকে তীব্র ভাবে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। তারপর, তিনি মদীনায় ফিরে এসে রাসূল (সা)কে তার অভিযানের কথা বর্ণনা করেন। খালিদের মৃত্যুর সাথে সাথে হাদায়েলের বনু লিহইয়ান গোত্র মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করে। আর এভাবেই, রাসূল (সা) অত্যন্ত সফলতার সাথে খালিদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেন এবং সেইসাথে মদীনার বিভিন্ন প্রান্তরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা বিদ্রোহেরও অবসান হয়।
কিন্তু এ ঘটনার পরেও কিছু আরব গোত্র মুসলিমদের শাসন-কতৃত্বকে তচ্ছু-তাচ্ছিল্য করে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহে লিপ্ত হয়। হাদায়েলের আশেপাশের এলাকার কোন গোত্র থেকে একবার একদল লোক মদীনায় আসে। তারা মুহাম্মদ (সা)কে বলে যে, তারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে জানার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। সুতরাং, তিনি (স) যেন তাদেরকে কুরআন শেখানোর জন্য কিছু সাহাবাকে তাদের গোত্রে পাঠান। একথা শুনে রাসূল (স) বয়োজেষ্ঠ্য ছয়জন সাহাবীকে তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন। যাত্রা শুরু করার পর তারা হাদায়েলের কুপগুলোর কাছাকাছি আল-রাজি নামক এলাকায় পৌঁছালে উক্ত গোত্রের লোকেরা সাহাবীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা হাদায়েলের অধিবাসীদেরকে সাহাবীদের আক্রমণ করার নির্দেশ দেয়। তারপর সেখানকার অধিবাসীরা সাহাবীদের ঘেরাও করে ফেলে এবং তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। মুসলিমরাও জীবন বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করতে থাকে এবং তাদের মধ্যে তিনজন সাহাবী সেখানেই শাহাদাত বরণ করেন। বাকী তিনজনকে তারা বন্দী করে মক্কার কুরাইশদের কাছে বিক্রির জন্য নিয়ে যায়। মক্কা যাত্রাকালে বন্দী সাহাবীদের মধ্য হতে ’আব্দুল্লাহ ইবন তারিক তার তলোয়ারের নাগাল পেয়ে যায় এবং নিজেকে মুক্ত করার জন্য কাফিরদের আক্রমণ করে। কিন্তু, শীঘ্রই কাফিররা তাকে হত্যা করে। অন্য দু’জন বন্দীকে তারা মক্কার পৌত্তলিকদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এদের মধ্যে যায়িদ ইবন আল-দাছনাহকে সাফওয়ান ইবন উমাইয়াহর কাছে বিক্রি করা হয় যেন সে তার পিতা উমাইয়া ইবন খালফের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারে। সাফওয়ান সাহাবী যায়িদকে বলে, “আল্লাহর কসম, তুমি কি চাও না যে আজ তোমার পরিবর্তে যদি মুহাম্মদ আমাদের হাতে বন্দী থাকতো, আমরা তার মাথা কেটে নিতাম আর তুমি তোমার পরিবারের সাথে থাকতে?” এর উত্তরে যায়িদ বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি কক্ষনো ভাবতে পারি না যে মুহাম্মদ যদি আজ আমার জায়গায় থাকতো। আমি ঘরে নিরাপদে বসে থাকবো আর এ অবস্থায় তাঁর গায়ে একটা কাঁটার আঘাতও লাগবে এটা আমি সহ্য করবো না।” একথা শুনে সাফওয়ান আশ্চর্য হয়ে যায়। সে প্রায়ই বলতো, মুহাম্মদের ছাড়া আমি আর কোন মানুষ দেখিনি যে তার সঙ্গীসাথীদের এতো ভালোবাসা পেয়েছে। এরপর, যায়িদ ইবন আল-দাছনাহকে কুরাইশরা হত্যা করে।
দ্বিতীয় বন্দী খুবাইবকে মক্কায় আনার পর কারারুদ্ধ করে রাখা হয় যে পর্যন্ত না কুরাইশরা তাকে নির্মম ভাবে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। মৃত্যুর আগে খুবাইব কুরাইশদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দু’রাকাত নামাজ আদায় করে। অত্যন্ত চমৎকার ভাবে নামাজ আদায় করার পর তিনি কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “যদি না তোমরা ভাবতে আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি তবে আমি আমার নামাজকে আরও দীর্ঘায়িত করতাম।” এরপর কুরাইশরা তাকে কাঠের সাথে শক্ত করে বাঁধে, এ সময় খুবাইব তাদের দিকে তাকিয়ে ক্রোধান্বিত ভাবে চিৎকার করে বলে, “হে আল্লাহ এদের প্রত্যেককে তুমি গুনে গুনে স্মরণে রেখো, তাদের প্রত্যেককে তুমি উপযুক্ত শাস্তি দিও, এদের মধ্যে কাউকে তুমি ছেড়ে দিও না।” উপস্থিত কুরাইশরা খুবাইবের এ কান্না জড়িত প্রার্থনায় ভীত হয়ে পড়ে, তারপর তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে। আল্লাহর রাসূল (স) ও তাঁর সাহাবীগণ ছয়জন সাহাবীর এ নির্মম মৃত্যুতে শোকে কাতর হয়ে পড়েন। মূলতঃ হাদায়েলের অধিবাসীদের জঘন্য পদ্ধতিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা ও সাহাবীদের প্রতি ভয়ঙ্কর অসম্মান প্রদর্শন করাই ছিলো মুসলিমদের তীব্র মনোকষ্টের আসল কারণ।
আল্লাহর রাসূল (স) এইসব বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করতে থাকেন। ভাবতে থাকেন বিদ্রোহ দমনের উপায়। এ সময়ে আবু বারা’ ’আমির ইবন মালিক (বর্শার খেলোয়ার) নামে এক ব্যক্তি মদীনায় আগমন করে। রাসূল (স) সত্যদ্বীনকে তার কাছে ব্যাখ্যা করেন এবং তাকে দ্বীন ইসলামের দিকে আহবান করেন। আবু বারা’ ইসলাম গ্রহন না করলেও ইসলাম গ্রহনের খুব কাছাকাছি পর্যায়ে চলে যায়। এছাড়া, ইসলামের প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষও তার মাঝে কখনো দেখা যায়নি। সে মুহাম্মদ (সা) অনুরোধ করে যে, “আপনি যদি আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে একদল মুসলিমকে নজদ্ এলাকায় ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য পাঠান, তাহলে আশা করা যায়, তারা এ আহবানে সাড়া দেবে।” কিন্তু, সম্প্রতি হাদায়েলের অধিবাসীদের হাতে ছয় সাহাবীর নির্মম ভাবে নিহত হওয়ার ভয়ঙ্কর স্মৃতি স্মরণ করে রাসূল (সা) তার প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করেন। আবু বারা’ শেষ পর্যন্ত নিজে সাহাবীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলে রাসূল (সা) তার প্রস্তাব মেনে নেন। আবু বারা’ রাসূল (সা)কে বলে, “আপনার পক্ষ থেকে একদল মানুষকে আপনি আপনার দ্বীনের দিকে আহবান করার জন্য পাঠিয়ে দেন, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার।” আরব ভূ-খন্ডে আবু বারা’র যথেষ্ট সুনাম ছিলো এবং তার কথার গুরুত্বও ছিলো যথেষ্ট। তাই, তার কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা করা কিংবা তার দেয়া নিরাপত্তায় কারো কোন ক্ষতি হবার সম্ভাবনা ছিলো না।
এসব বিষয় বিবেচনা করে রাসূল (সা) চল্লিশ জন প্রথম শ্রেণীর মুসলিমকে আল-মুনদির ইবন ’আমর এর নেতৃেত্ব নজদ্ এলাকায় পাঠিয়ে দেন। দলটি পথ চলতে চলতে মা’য়ুনার কুপের কাছে পৌঁছালে মুসলিমদের পক্ষ হতে একজন রাসূল (সা) এর চিঠি সহ ’আমর ইবন তুফাইলের সঙ্গে দেখা করতে যায়। ’আমর ইবন তুফাইল দূতকে দেখার সাথে সাথে চিঠি না পড়েই তাকে হত্যা করে। তারপর সে বনু ’আমির গোত্রকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আহবান করে। কিন্তু, বনু ’আমির গোত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অসম্মতি জানিয়ে বলে যে, আবু বারা’ মুসলিমদেরকে নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা তা ভঙ্গ করবে না। তখন, ’আমর সেখানকার অন্য গোত্রগুলোকে যুদ্ধের জন্য আহবান করলে তারা উটের পিঠে চড়ে চারদিক থেকে মুসলিমদের ঘিরে ফেলে। এ অবস্থায় মুসলিমরা যার যার অস্ত্র বের করে তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমৃত্যু কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ ভয়ঙ্কর ঘটনার দু’জন ছাড়া বাকী সমস্ত মুসলিম শহীদ হয়ে যায়। এ সংবাদ মদীনায় পৌঁছানোর পর আল্লাহর রাসূল (স) মানসিক ভাবে সাংঘাতিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং সেই সাথে শোকের সাগরে নিমজ্জিত হন তাঁর সাহাবীরাও।
মদীনার বাইরের আরব গোত্রগুলোর বিদ্রোহ কিভাবে দমন করা যায় তা নিয়ে রাসূল (স) গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন। ভাবতে থাকেন কিভাবে বদরের যুদ্ধে অর্জিত মুসলিমদের প্রভাবপ্রতিপত্তি ও শৌর্য-বীর্য ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায়। একসময় তিনি (সা) অনভুব করেন যে, মদীনার অভ্যন্তরেই আসলে অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। তাই, তিনি (স) প্রথমে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন সমস্যা সমাধানের দিকে মনোযোগী হন। তিনি (স) সিদ্ধান্ত নেন যে, অভ্যন্তরীন সমস্যা সমাধান করার পরই তিনি মদীনার বাইরের গোত্রগুলোর বিদ্রোহ দমনে চিন্তা-ভাবনা করবেন।
ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের পর হাদায়েলের অধিবাসী কর্তৃক ছয় সাহাবীর হত্যাকান্ড এবং বীরে মায়ুনার নৃশংস ঘটনার পর মদীনার মুনাফিক ও ইহুদী গোত্রগুলোর ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। তারা পূণরায় মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে ঘৃন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং মুসলিমদের কর্তৃত্বকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করে। তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে কিভাবে মুসলিমদের একহাত দেখে নেয়া যায়। আল্লাহর রাসূল (স) ধীরে ধীরে তাদের মনোভাব বুঝতে পারেন এবং ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও অবহিত হন। এরপর, রাসূল (স) সাহাবী মুহাম্মদ ইবন মাসলামাহকে ইহুদীদের কাছে পাঠান। ইবন মাসলামাহ ইহুদীদেরকে রাসূল (সা) এর নির্দেশ জানিয়ে দিয়ে বলেন,“আল্লাহর রাসূল আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন এবং তোমাদের মদীনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, তোমরা তাঁর সাথে কৃত চুক্তির ওয়াদা ভঙ্গ করেছো এবং বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা করেছো। তোমাদের মদীনা ত্যাগের জন্য দশদিন সময় দেয়া হলো, এরপর যদি তোমাদের মধ্য হতে কাউকে মদীনায় দেখা যায় তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে।”
’আব্দুল্লাহ ইবন উবাই জোর করে আটকে না রাখলে বনু নাদির গোত্র এ নির্দেশের পরই মদীনা ত্যাগ করতো। এছাড়া, ইহুদীদের নেতা হুবাই ইবন আখতাবও তাদের দূর্গে দৃঢ় ভাবে অবস্থান করার জন্য তাদের পরামর্শ দিতে থাকে। দশদিন অতিক্রম হয়ে যাবার পরও যখন বনু নাদির তাদের দূর্গ ত্যাগ করলো না, তখন আল্লাহর রাসূল (স) দলবল সহ তাদের ঘেরাও করেন এবং যে পর্যন্ত না বনু নাদির রাসূল (সা) এর কাছে তাদের প্রাণ ভিক্ষা চায় সে পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ করেন। মদীনা ত্যাগের সময় আল্লাহর রাসূল (স) উটের পিঠে করে যতোটা মালামাল নিয়ে যাওয়া যায় ততোটা নেয়ার অনুমতিও তাদের দেন। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের জমিজমা, খেজুর বাগান ও অস্ত্রসস্ত্র পেছনে ফেলে মদীনা ত্যাগ করে। রাসূল (স) তাদের ফেলে যাওয়া সম্পদ মুহাজিরদের ভেতরে ভাগ করে দেন। আনসারদের মধ্য হতে শুধু আবু দানাহ এবং সাহল ইবন হানিফ নামে দু’জন সাহাবীকে দরিদ্রতার কারণে বনু নাদিরের সম্পদের অংশ দেয়া হয়েছিলো। বনু নাদির গোত্রকে মদীনা থেকে বিতারনের মাধ্যমে রাসূল (স) মদীনার অভ্যন্তরীন বিদ্রোহকে সাফল্যের সাথে দমন করেন এবং মুসলিমদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করেন।
আল্লাহর রাসুুল (স) এবার ইসলামের পররাষ্ট্রনীতির দিকে নজর দিয়ে কুরাইশদের কাছে প্রতিশ্রুত বদর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু, বদরের প্রান্তরে তিনি (স) শত্রুপক্ষের দেখা পেলেন না। এটা ছিলো ওহুদের যুদ্ধের একবছর পরের ঘটনা। ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের দুঃখজনক পরাজয়ের পর পৌত্তলিকদের সর্দার আবু সুফিয়ান সর্দপে ঘোষণা দিয়েছিলো যে, “এটা হলো বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধ, আগামীবছর বদর প্রান্তরে তোমাদের সাথে আবার সাক্ষাৎ হবে।” রাসূল (স) আবু সুফিয়ানের এ উক্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই, তিনি (স) যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে তিনি (স) ’আব ইবন ’আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুলকে (মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র) মদীনার দায়িত্বে রেখে বদরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। বদরের প্রান্তরে পৌঁছানোর পর তারা কুরাইশদের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। ওদিকে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশরা দুই হাজার যোদ্ধা সহ মক্কা ত্যাগ করলেও খুব শীঘ্রই আবার তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফিরে যায়।
আল্লাহর রাসূল (স) বদরের প্রান্তরে কুরাইশদের জন্য দীর্ঘ আট দিন অপেক্ষা করলেন। কিন্তু, কুরাইশরা আর ফিরে আসলো না। শেষ পর্যন্ত তাঁরা খবর পেলেন যে, কুরাইশরা দলবল সহ মক্কায় ফিরে গেছে। এ সংবাদ পাবার পর তিনি (স) তাঁর সাহাবীদের সহ মদীনায় ফিরে আসলেন, সাথে করে আনলেন বদরের প্রান্তরে ব্যবসা থেকে অজির্ত পর্যাপ্ত মুনাফা। এ যাত্রায় মুসলিমরা কুরাইশদের সাথে কোন যুদ্ধ না করেই বিজয়ী বেশে উৎফুল্ল চিত্তে মদীনায় ফিরে এলো। এর পরপরই রাসূল (স) তাঁর দলবল নিয়ে নজদ এলাকার গাতাফান গোত্রকে আক্রমণ করেন। আক্রমণে হতবিহবল হয়ে গাতাফান গোত্রের লোকেরা তাদের সহায়-সম্পদ ও নারীদের রেখেই পালিয়ে যায়। এসব কিছু সহ মুসলিমরা মদীনায় ফিরে আসে। এরপর রাসূল (স) সিরিয়া ও হেজাজের সীমান্তবর্তী এলাকায় দুমাত আল-জান্দাল গোত্রকে আক্রমণ করেন। এটা আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিলো অন্যান্য গোত্রগুলোকে সর্তক সংকেত দেয়া যারা প্রায়ই মুসলিমদের কাফেলার উপর হামলা করতো। কিন্তু, জুন্দাল গোত্র মুসলিমদের সাথে কোনরকম সংঘর্ষে না গিয়ে ধন-সম্পদ পেছনে ফেলে পালিয়ে যায়। আর মুসলিমরা সেগুলো নিয়ে মদীনায় ফেরত আসে। আল্লাহর রাসূল (স) এর এ সমস্ত আক্রমণের সিদ্ধান্ত ও গৃহীত পদক্ষেপ মূলতঃ মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিলো এবং সমস্ত আরব ও ইহুদী গোত্রগুলোর নিকট মুসলিমদের প্রতাপ-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেছিলো। আর নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের সকল নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।
ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৯ (বনু কুরাইযা গোত্রকে শায়েস্তা)
বদরের যুদ্ধের পূর্ব হতেই ইহুদীরা মুসলিমদের প্রতি সবসময়ই তীব্র হিংসা-বিদ্বেষ পোষন করতো। বদরের প্রান্তরে মুসলিমদের নাটকীয় বিজয়ের পর তাদের বিদ্বেষের মাত্রা চরম আকার ধারণ করলো। মুসলিমদের সাথে কৃত চুক্তির কোন তোয়াক্কা না করেই তারা মুসলিমদের অপদস্ত করার জন্য নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র ও হীন পরিকল্পনা করতে থাকলো। মুসলিমরা তাদের বিরুদ্ধে এ সব ষড়যন্ত্রকে দৃঢ়তার সাথে প্ির তহত করেছিলো এবং অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় এর জবাব দিয়েছিলো। বনু কুরাইযার বাজারে সংঘটিত জঘন্য ঘটনাটিই প্রমাণ করে দেয় যে, মদীনার ইহুদীরা মুসলিমদের উক্তত্য করার জন্য কত হীন পন্থা অবলম্বন করতো।
বনু কুরাইযার বাজারে একবার এক মুসলিম নারী সোনার দোকানে তার গয়না নিয়ে বসেছিলো। এ সময় পেছন থেকে এক ইহুদী এসে তার কাপড়ের এক প্রান্ত খুিঁটর সাথে বেঁধে দেয়। মুসলিম নারীটি যখন উঠে দাঁড়ায় তখন তার কাপড় শরীর থেকে খুলে যায়। মুসলিম নারীকে এরকম একটি অপ্রস্তত অবস্থায় ফেলে উক্ত ইহুদী সহ আশেপাশের ইহুদীরা নির্লজ্জের মতো হাসিতে ফেটে পড়ে। এ অবস্থায় অপমানিত নারীটি সাহায্যের আশায় চিৎকার করতে থাকে। তার ডাকে সাড়া দিয়ে এক মুসলিম সেই বদমাশ ইহুদীকে হত্যা করে ফেলে। এ ঘটনার প্রতিশোধ হিসাবে ইহুদীরা একত্রিত হয়ে উক্ত মুসলিমকে হত্যা করে। পরবর্তীতে, শহীদ হয়ে যাওয়া সে মুসলিমের পরিবার মদীনার মুসলিমদের ব্যাপারটি অবহিত করে তাদের শাস্তির দাবী করে। পরিণতিতে মুসলিম ও ইহুদীদের মধ্যে যুদ্ধ হয়।
আল্লাহর রাসূল (সা) বহুবার তাদের এ ধরনের জঘণ্য প্ররোচনামূলক কাজ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দেন। কিন্তু, তারা সে আদেশ- নিষেধের কোন তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যেই আল্লাহর রাসুলের বিরোধিতা ও তাঁর আদেশ অমান্য করতে থাকে। এ রকম পরিস্থিতিতে, রাসূল (সা) বনু কুরাইযাকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং চারদিক থেকে তাদের আবাসস্থল ঘিরে ফেলেন। মুসলিমদের সাথে পরামর্শ করে তিনি এ গোত্রের সকলকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলতঃ এটা ছিলো তাদের মুসলিমদের সাথে ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা করার উপযুক্ত শাস্তি। এ পর্যায়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবন সলুল, যার ইহুদী ও মুসলিম দু’পক্ষের সাথেই সুসম্পর্ক ছিলো, বারবার ইহুদীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করার জন্য রাসূল (সা) অনুরোধ করতে থাকে। কিন্তু, মুহাম্মদ (সা) তার এ কাতর আবেদনে কোন সাড়া না দিয়ে তাকে উপেক্ষা করেন। কিন্তু, তা সত্ত্বেও, ’আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুল ইহুদীদের প্রাণরক্ষার জন্য ক্ষমা ভিক্ষার আবেদন করতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত, তার আবেদনে সাড়া দিয়ে রাসূল (সা) বনু কুরাইযাকে মদীনা ত্যাগ করে চলে যাবার নির্দেশ দেন। এরপর, বনু কুরাইযা গোত্র মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে উত্তরে আদরাত আল-শামের দিকে চলে যায়।
কেন মিশরে আমেরিকা সফল হতে পারছে না ?

সহিংস অভ্যুত্থানের পরে মিশরে ‘old guard’ এর ফিরে আসার প্রতিক্রিয়া মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যের বাহিরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর লক্ষে লড়াই করতে গিয়ে ওবামা প্রশাসনও প্রচন্ড বিক্ষোভের মাত্রা অনুভব করতে পেরেছে। আরব বসন্ত-২০১১ এর শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর বারবার অবস্থার পরিবর্তনের ফলে আমেরিকার সুযোগগুলো দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এটা এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য আমেরিকার সংশ্লিষ্টতাকে আরো স্পষ্ট করে তোলে।
১৯৭৯ সালে মিশর-ইসরাইল শান্তি চুক্তির পরে মিশর মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান মিত্রশক্তিতে পরিনত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমেরিকা তার মিত্রশক্তির উপর নির্ভর করে। সাধারনত সেনাবাহিনীই সর্বোচ্চ মিত্রশক্তি হিসাবে কাজ করে কারণ তারাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিদ্যমান ক্ষমতাকে সংরক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান শক্তি অর্জন করে রাখে। আর যেহেতু রাজনৈতিক সংস্থাগুলো নামে মাত্র রয়েছে এবং তাদের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার উপর নির্ভর করে, তাই অভ্যুত্থান, বিপ্লব কিংবা বাহ্যিক কোন শক্তি প্রদর্শিত হলে এগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। আরব বসন্ত আমেরিকার জন্য নতুন প্রতিদ্বন্দিতার দ্বার উন্মোচন করেছে, সেক্ষেত্রে আমেরিকা নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত কোন নামে মাত্র এবং অপরিপূর্ণ রাজনৈতিক দলের উপর নির্ভর করবে না তা প্রকাশিত হয়েছে। চাহিদানুরুপ পরিবেশ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে চাপ প্রয়োগ করার জন্যেই সামাজিক ও বেসামরিক শক্তির প্রদর্শনীগুলো বিপ্লবী কর্মকান্ডের দিকে নির্ভর করতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে আবির্ভুত বেসামরিক শক্তিগুলো পরিপূর্ণ আদর্শিক বিস্তৃতি ছাড়াই আমেরিকা বিরোধী মনোভাব পোষন করার ফলে এটা আমেরিকাকে একটা কঠিন অবস্থার সম্মূক্ষীন করেছে। এছাড়াও, অপসারিত রাজনৈতিক সরকার যারা তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিচালনা করতো তারা আমেরিকার প্রভাব বিস্তারের জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষ (যেমন: SCAF) ছাড়া আর অন্য কোন নিরাপদ মাধ্যমই খোলা রাখে নি।
তার উপর, তিয়ানমেন স্কয়ারের নৃশংস হত্যাকান্ডের রক্তাক্ত দৃশ্যপটের অবতারনার পাশাপাশি জাতির (দেশের) প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার অপসারণ (পতন) আমেরিকার জন্য খুবই নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ‘বৈদেশিক সাহায্য আইন ১৯৬১’-এর ৫০৮ ধারা মতে, “যদি কোথাও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে তাহলে সেখানে আমেরিকাকে অবশ্যই সামরিক সাহায্য বন্ধ করতে হবে। ”
এজন্য এতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকে না যে, মিশরীয় সেনাবাহিনীর গণতন্ত্র পূনঃস্থাপনের দাবী যতই সময় যাচ্ছে ততোই ওবামা প্রশাসন সামরিক অভ্যুত্থানের মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো অনুধাবন করতে ব্যর্থ (ধরাশায়ী) হচ্ছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মিশরীয় সেনাবাহিনীকে সাহায্য সহযোগীতা স্থগিত করার ক্ষেত্রে আমেরিকা অনীহা পোষন করছে এবং আজ অবধি দোষারোপমূলক কিছু অলংকারবহুল মন্তব্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামার অভিপ্রায় বিশিষ্ট মন্তব্যগুলো তার অবকাশ সময়ব্যাপী বিপনীকেন্দ্রের আঙ্গুরক্ষেত্র মাত্র। আমেরিকা ও মিশরের মধ্যকার এইসব দুষ্কর্মের সহযোগীতা প্রতিফলিত হয়েছে এবং আমেরিকা তার নীতির মাঝে পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত দেয় নি। এই ‘জটিল পরিস্থিতি’ আমেরিকার জন্য উভয় সংকটাবস্থার সৃষ্টি করেছে যেক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তিত হলে তা তার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে ।
এইসব উপায় (option) গুলো নিম্নরূপ:
১. মিশরীয় সেনাবাহিনী হতে সামরিক সহযোগীতা স্থগিতকরণ:
এটা মূলত এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব বিস্তার করার বিদ্যমান মাধ্যমের সমাপ্তি ঘটাবে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যে কোন শক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অবশিষ্ট না থাকায়, যা কিছু SCAF দ্বারা পরিপূর্ণ হত তা বেসামরিক বা সামাজিক স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠীর মধ্য থেকে আমেরিকা একই ভাবে দালাল নিযুক্ত করবে এটা আর মোটেও সম্ভব নয়।২.সশস্ত্র বাহিনীতে আর্থিক সহযোগীতা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মিশরীয় সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখা:
এটা ‘গণতন্ত্রের উন্নয়ন’-এর নীতি বজায় রাখার যে কোন আশাকে খর্ব করবে যা বুশ প্রশাসনের সেই ‘চরমপন্থা’ দমনের ব্যর্থতার দিকে অনুসরনের সূত্রপাত ঘটাবে। আপাত দৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও এটাই সত্য যে, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষে এই ধরনের কার্যসিদ্ধিমূলক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পৃষ্টপোষক শাসন ব্যবস্থা ও ইসলামকামী ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর মধ্যকার তিক্ততা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির দ্বারা আরো অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।
৩. মুসলিম ব্রাদারহুড এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে আপোষমুলক মধ্যস্থতা সৃষ্টিকরণ:
পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার উপর ভিত্তি করে কার্যসিদ্ধির লক্ষে একটা আপোষমুলক মধ্যস্থতা স্থির করার জন্য রাজনৈতিক অভিনেতাদের সংশ্লিষ্ট হওয়া উভয় দিক থেকেই অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। প্রথমত; বিখ্যাত সিনেটর ম্যাক কেইনের মতো আমেরিকা তার কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা যথেষ্ট হারিয়েছে। পাশাপাশি, মিশরের সংঘর্ষে লিপ্ত প্রত্যেক পক্ষই “আমেরিকা তার প্রতিপক্ষের মদদদাতা”-এমন দাবীর মাধ্যমে সমর্থন সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত; সমাজের ‘ইসলামিস্ট’ ও বেসামরিক শক্তিগুলো এবং দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হাজেম আল-বাবলাউয়ি উভয়েই এ ব্যাপারে জোড় দিয়েছেন যে, ‘সামঞ্জস্য বিধান’ আর বেশিদিন কোন উপায় হতে পারে না। অপূর্ণকালীন অভ্যুত্থানের দ্বারা ঘৃন্য বেসামরিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণশীল মহল ‘old guard’ –এর মধ্যে যে আপোষ-মিমাংসা সম্ভব হয়েছিল তা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। যথাযথ ভাবেই এই সব মতানৈক্য গুলো আপোষ মিমাংসার অন্তর্ভূক্ত ছিল, যার ফলাফল ছিল মেরুকরণ এবং ৩০ জুন এর প্রত্যাশিত নাটকীয় ঘটনাগুলো।
পরিশেষে বলা যায়, আমেরিকা ও মিশরীয় সেনাবাহিনীর মধ্যকার অংশীদারিত্ব সম্পর্ক জড়তা ও আত্মপ্রসাদ দ্বারা ভারী হয়ে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতিকালে এটা এমন এক অবস্থায় দাড়িয়েছে যে, শক্তি ও সামর্থ্যের এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টির পর আমেরিকার জন্য ‘মিশর বিজয়’ পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে, যা তার উত্তরাধিকারীকে রাজ্যদানের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। গ্রহণ করার মত শেষ ৩টি উপায়-ই ওবামার জন্য অনুপযোগী দেখা যাচ্ছে, যেখান থেকে তার প্রশাসন অবশ্যই সেটাকেই পছন্দ করবে যেটাতে নিজ দেশের লাভের (স্বার্থ) বাহিরে সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে। যাইহোক, উপায়গুলোর কথা বাদ দিলেও এ বিষয়টা খুবই স্পষ্ট যে, ‘soft’ power এবং ‘democracy promotion’ করার ভিত্তিতে নির্মিত কৌশল প্রয়োগের অবশিষ্ট স্বপ্নটুকুও আরব মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান থাকা এখন আর কোন ভাবেই সম্ভব নয়।প্রবন্ধটি রেভলুশন অবজারভারে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষন হতে নেয়া এবং কিছুটা পরিমার্জিত
অনুবাদ করেছেন: আফজালুল ইসলাম











