Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২১ (আল-আহযাবের যুদ্ধ)

    ওহুদ যুদ্ধের পর অতর্কিত আক্রমণ সহ বিভিন্ন গোত্রের বিরদ্ধে যে সব শাস্তিমূলক পদক্ষেপ রাসূল (সা) নিয়েছিলেন তা মদীনার মুসলিমদের অবস্থানকে পুণরায় উপরে তুলে ধরতে এবং ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্বকে সুসংহত করতে গুরুতপুর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলো । আল্লাহর রাসুলের এ সমস্ত সুচিন্তিত পদক্ষেপ মূলতঃ মুসলিমদের প্রভাব বলয়কে বিস্তৃত করে এবং আরব ভূ-খন্ডে রাতারাতি তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। আর, সমস্ত আরব ভূ-খন্ড মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্যের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে যায়। এরপর থেকে আরব গোত্রগুলো তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের গন্ধ পাওয়া মাত্রই মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার চাইতে পালিয়ে যাওয়াকেই শ্রেয় মনে করতো। গাতফান ও দুমান আল-জুন্দাল গোত্রের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিলো। ওদিকে, কুরাইশরাও মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্যরে সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছিলো না। এছাড়া, তারা নিজেরা মুসলিমদের মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মনোবলও হারিয়ে ফেলেছিলো। এর চমৎকার উদাহরণ হচ্ছে বদরের প্রান্তরে দ্বিতীয় যুদ্ধ। যে যুদ্ধে কুরাইশরা ভীত ও আতঙ্কিত হয়ে পিছু হঠে যায়, এমনকি আর ফিরে আসার সাহসও করে না। এ সমস্ত ঘটনা মদীনার মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে কিছুটা হলেও স্থিতিশীল করে। শত্রুপক্ষের অতর্কিত আক্রমণ থেকে তারা মোটামুটি নিশ্চিন্ত হয় এবং স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মদীনার সমাজ গঠনে মনোযোগী হয়। এছাড়া, পরিবর্তিত এ নতুন পরিস্থিতি তাদের চলমান জীবনযাত্রাকেও পরিবতর্ন করে দেয়। কারণ, ইতিমধ্যে যুদ্ধলব্ধ মালামাল হিসাবে প্রাপ্ত বনু নাযির গোত্রের জমিজমা, খেজুর বাগান, ঘরবাড়ী ও আসবাবপত্র রাসূল (স) মুহাজিরদের মধ্যে বন্টন করে দিয়েছিলেন। যা তাদের জীবনযাত্রায় নতুন সৌভাগ্যের সূচনা করেছিলো। কিন্তু, এসব কোনকিছুই তাদেরকে মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি, আর তা হলো আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। কারণ, আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত মুসলিমদের জন্য জিহাদ করা ফরজ করেছেন। যাই হোক, পরিবর্তিত এই নতুন পরিস্থিতি একদিকে মুসলিমদের জীবনযাত্রার মানকে যেমন উন্নত করলো, অন্যদিকে তাদের জীবনে ফিরে আসলো কাঙ্খিত স্থিতিশীলতা।

    মদীনায় শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করলেও আল্লাহর রাসূল (স) শত্রুপক্ষের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার ব্যাপারে সবসময়ই সর্তক থাকতেন। সমস্ত আরব ভূ-খন্ডের কোথায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে কি ষড়যন্ত্র হচ্ছে কিংবা কারা কি ধরণের পরিকল্পনা করছে এ সমস্ত ব্যাপারে তিনি (স) সবসময়ই খোঁজখবর রাখতেন। খবর সংগ্রহ করার জন্য তিনি সমস্ত আরব উপদ্বীপ সহ এর বাইরের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তচরও নিযুক্ত করেছিলেন। যে কোন ধরনের অতর্কিত আক্রমণ ও সহিংষতা মোকাবিলায় তিনি (স) থাকতেন অসম্ভব রকমের উদ্বিগ্ন। কারণ, একদিকে মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্য যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছিল সেইসাথে বাড়ছিলো তাদের শত্রুর সংখ্যা, which was reactionary to the building of an army and a State to be reckoned with. This was particularly the case after ইহুদী গোত্র বনু কাইনুকা ও বনু নাযিরকে মদীনা থেকে বিতাড়ন করা এবং গাতফান, হাদায়েল ও অন্যান্য গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবার পর।

    এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, রাসূল (স) শত্রুপক্ষের গতিবিধি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে খবর সংগ্রহ করাকেই সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেন। কুরাইশরা যখন অন্যান্য গোত্রকে সঙ্গে নিয়ে মদীনা আক্রমণ করতে আসছিলো তখন তিনি এ পদ্ধতিতেই বিপদ সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন। আর, নতুন বিপদ মুকাবিলার জন্য নিয়েছিলেন প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি।

    এদিকে, মদীনা থেকে বহিস্কৃত হবার পর ক্ষুব্ধ বনু নাযির গোত্র অপমানের প্রতিশোধ নেবার সুযোগ খুঁজতে থাকে। এ লক্ষ্যে তারা চেষ্টা করে আরবের বিভিন্ন গোত্রকে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলতে। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক মিলে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে একটি দলও তৈরী করে, যাদের মধ্যে ছিলো হুয়াই ইবন আখতাব, সালাম ইবন আবি আল-হুকাইক এবং কিনানাহ ইবন আবি আল-হুকাইক। আর, বনু ওয়ায়ি’ল গোত্র থেকে ছিলো হাওদাহ ইবন কায়েস এবং আবু ’আম্মার। তারা একত্রিত হয়ে মক্কার কুরাইশদের কাছে যায়। কুরাইশরা হুয়াইকে তার দলবল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, “আমি তাদের খাইবার আর মদীনার মাঝামাঝি এলাকায় রেখে এসেছি এবং মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের আক্রমণ করার জন্য তোমাদের সাহায্যের অপেক্ষায় আছি।” এরপর কুরাইশরা তাকে বনু কুরাইযা গোত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় যে, “বনু কুরাইযা গোত্র মুহাম্মদ (স)কে বোকা বানানোর উদ্দেশ্যে মদীনাতেই রয়ে গেছে। যখন আক্রমণ হবে তখন তারা তোমাদের মদীনার ভেতর থেকে সাহায্য করবে।” এ পর্যায়ে কুরাইশরা দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে ভাবতে থাকে যে, তারা মদীনা আক্রমণ করবে কি করবে না। তারা চিন্তা করে দেখলো যে, আসলে মুহাম্মদ (স) আর তাদের মধ্যে সত্যিকারের কোন বিরোধ নেই। বিরোধের একমাত্র কারণ মুহাম্মদ (স) এর দাওয়াতী কাজ। একসময় তারা এটাও ভাবলো যে, আসলে মুহাম্মদ যা বলে সেটাই কি সঠিক? দ্বিধাদ্বন্দে দোদুল্যমান হয়ে তারা শেষ পর্যন্ত ইহুদীদের জিজ্ঞেস করলো, “হে ইহুদীরা! তোমরা তো আল্লাহর কাছ থেকে পূর্বেই কিতাব পেয়েছো। আর, তোমরা আমাদের আর মুহাম্মদের মধ্যে মতভেদের ব্যাপারেও জানো। তোমরা বল তো আমাদের দ্বীন সঠিক না মুহাম্মদের?” উত্তরে ইহুদীরা বললো, “অবশ্যই তোমাদের দ্বীন মুহাম্মদের আনীত দ্বীনের থেকে অনেক ভালো এবং এ ব্যাপারে তোমাদের দাবীও সঠিক!”

    ইহুদীরাও  এক  আল্লাহর  অস্তিত্বে  বিশ্বাস  করতো  এবং  তারা  খুব  ভালো  করেই  জানতো  যে,  মুহাম্মদ (স)  এর  দাবী  সম্পূর্ন  সঠিক।  কিন্তু, তারপরেও তারা শুধু তাদের ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে মুসলিমদের উপর চুড়ান্ত এক আঘাত হানার জন্যই আরব গোত্রগুলোকে মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে উসকে দিচ্ছিল। বস্তুতঃ এক আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করার পরও মূর্তিপূজাকে সঠিক বলে ঘোষণা দেয়া তৌহিদবাদীদের জন্য এক চরম অবমাননাকর কাজ। কিন্তু, তা সত্তেও হীন স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে এ ধরনের ঘৃণ্য কাজের পূণরাবৃত্তি করতেও ইহুদীদের কোন দ্বিধা নেই।

    ইহুদীরা যখন নিশ্চিত হয়ে যায় যে, মদীনা আক্রমণ করার জন্য আহবান করা মাত্রই কুরাইশরা দ্বিধাহীন চিত্তে সাড়া দেবে, তখন তারা সমর্থনের আশায় কায়েস ঘাইলানের ঘাতাফান গোত্র, বনু মুররাহ থেকে আরম্ভ করে বনু ফাযারাহ, বনু আসজা’, বনু সালিম, বনু সা’দ, বনু আসাদ সহ আরবের যতো গোত্রের মুহাম্মদ (স) এর প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব ছিলো তাদের সকলের কাছে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই কুরাইশদের নেতৃত্বে আরবের বিভিন্ন গোত্র একত্রিত হয়ে মদীনা উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

    এ যুদ্ধে কুরাইশরা এগিয়ে যায় আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে। এ সময় তাদের সঙ্গে ছিলো ৪০০০ যোদ্ধা, ৩০০ অশ্বারোহী এবং আরও ১৫০০ উটের পিঠে আরোহনকারী যোদ্ধা। ’উইয়াইনা ইবন হিসন ইবন হুদায়ফার নেতৃত্বে বনু ফাযারাহ্ গোত্রের পক্ষে ছিলো ১০০০ যোদ্ধার এক বিরাট বাহিনী। আসজা’ গোত্র মিশ’আর ইবন রাখাইলাহ্ এবং মররাহ্ গোত্র আল-হারিছাহ্ ইবন ’আউফ এর নেতৃত্বে ৪০০ যোদ্ধা নিয়ে এ যুদ্ধ অংশগ্রহন করে। বনু সালিম এবং বীর মা’ইয়ার লোকেরা ৭০০ যোদ্ধা নিয়ে এ বিশাল বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়। তারা সকলে একত্রিত হবার পর এদের সাথে বনু সা’দ এবং বনু আসাদ গোত্র তাদের দলবল নিয়ে যুক্ত হয়ে এ বাহিনীর শক্তি আরও বৃদ্ধি করে। বিশাল এ সৈন্যদলের মোট সংখ্যা শেষপর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় ১০ হাজারে। মিলিত এ সৈন্যবাহিনী আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে মদীনা আক্রমণ করতে এগিয়ে যায়। মুহাম্মদ (স)এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছালে তিনি (স) মদীনার ভেতরেই পরিখা খননের সিদ্ধান্ত নেন। মূলতঃ সালমান ফারসী (রা) পরামর্শেই সাহাবীরা মদীনার চারপাশে পরিখা খননের কাজ শুরু করে এবং মুসলিমদের উৎসাহ দেবার জন্য এ কাজে রাসূল (স) নিজেও অংশগ্রহন করেন। পরকালে জান্নাতের আশায় সাহাবীরা প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করতে থাকেন। আল্লাহর রাসূল (স)ও এ কাজে তাদের সর্বাত্মক শ্রম দেবার জন্য উৎসাহিত করতে থাকেন। ফলে, মাত্র ছয়দিনের মধ্যেই বিশাল এ পরিখা খননেন কাজ সম্পন্ন হয়। এছাড়া, পরিখার সম্মুখ ভাগে অবস্থিত বাড়ীগুলোকে সুরক্ষিত করা হয় আর পরিখার বাইরের (অর্থাৎ যে বাড়ীগুলো পরিখার বাইরের অংশে ছিলো) বাড়ীগুলোকে জনশূণ্য করা হয়। নারী ও শিশুদের সুরক্ষিত ঘর-বাড়ীগুলোর মধ্যে রাখা হয়। এরপর, আল্লাহর রাসূল (স) ৩০০০ যোদ্ধা সহ শত্রুপক্ষকে মুকাবিলা করতে এগিয়ে যান। তাঁর পেছন দিকে ছিলো সাল উপত্যকা এবং সদ্যসমাপ্ত পরিখাটি ছিলো রাসূল (স) এবং তাঁর শত্রুপক্ষের মাঝামাঝি। এখানেই তিনি (স) দলবল সহ অবস্থান নেন এবং তাঁর জন্য টানানো হয় একটি লাল রঙের তাঁবু।

    ওদিকে কুরাইশ ও তাদের মিত্রবাহিনী বিশাল দলবল নিয়ে ওহুদের প্রান্তরে পৌঁছে যায়। তারা ভেবেছিলো হয়ত এখানেই তাদের কাঙ্খিত শত্রুপক্ষের সাথে সাক্ষাৎ হবে। কিন্তু, তাদের অদৃষ্টে তা হবার ছিলো না। বাধ্য হয়ে তারা দলবল নিয়ে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং মদীনায় না পৌঁছা পর্যন্ত তাদের এ যাত্রা অব্যাহত থাকে। মদীনায় পৌঁছে তারা তাদের সামনে বিরাট এক পরিখা দেখে হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে। কারণ, এ ধরনের কোন আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধকৌশলের সাথে তাদের একেবারেই পরিচয় ছিলো না। এ অবস্থায় তারা মদীনার বাইরে পরিখার অপর পাশে অবস্থান নিতে বাধ্য হয় এবং ভাবতে থাকে তাদের পরবর্তী যুদ্ধ কৌশল। কিন্তু, আবু সুফিয়ান ও তার সাথীরা শীঘই্র বুঝতে পারে এখানে তাদের অপেক্ষার সময় হবে দীর্ঘ। কারণ, এ বিশাল পরিখা অতিক্রম করা তাদের পক্ষে আসলে সম্ভব হবে না। এরকম একটা অমীমাংসিত যুদ্ধাবস্থা তাদের জন্য হয়ে যায় যন্ত্রনাদায়ক। তখন ছিলো শীতকাল, হু হু ঠান্ডা বাতাস সবার গায়ে যেন হুল ফোটাচ্ছিল। এ রকম অসহনীয় অবস্থায় ক্রমশঃ সবাই যুদ্ধের মনোবল হারিয়ে ফেলতে লাগলো এবং ভেতরে ভেতরে বাড়ী ফিরে যাবার জন্য ব্যকুল হয়ে পড়লো। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষন করে, হুয়াই ইবন আখতাব কুরাইশ ও তাদের মিত্রদের পরামর্শ দেয় যে, বনু কুরাইযা গোত্রকে মুসলিমদের সাথে কৃত শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করে তাদের পক্ষে যুদ্ধ করতে বলা উচিত। কারণ, যদি তা হয় তাহলে বহির্বিশ্বের সাথে মুসলিমদের সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং তারা তখন অবলীলায় মদীনা আক্রমণ করতে পারবে।

    প্রস্তাবটি কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের খুবই পছন্দ হওয়ায় তারা হুয়াইকে এ প্রস্তাবটি বনু কুরাইযার নেতা কা’ব ইবন আসাদের কাছে উপস্থাপন করার জন্য নিযুক্ত করে। হুয়াই এর আগমনের সংবাদ শুনে কা’ব তার মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু, কা’ব দরজা খোলা না পর্যন্ত হুয়াই তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। অনেক চেষ্টা-চরিত্রের পর শেষ পর্যন্ত কা’ব তার ঘরের দরজা খুলে দেয়। দরজা খোলার পর হুয়াই বলে, “তোমার উপর সৌভাগ্য বর্ষিত হোক কা’ব! আমি তোমার জন্য বহন করে এনেছি অনন্ত সৌভাগ্য। আর, আমার সাথে রয়েছে এক বিশাল বাহিনী। আমার সাথে রয়েছে কুরাইশ সর্দার ও তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা। আরও রয়েছে ঘাতাফানের সর্দার ও তাদের নেতৃস্থানীয় মানুষেরা। তারা আমাদের সাথে এ মর্মে প্রতিজ্ঞা করেছে যে, তারা মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীদের নিশ্চিহ্ন না করে এখান থেকে যাবে না।” কা’ব ইবন আসাদ তার এ প্রস্তাবে ইতস্তত করছিলো। তার মনে পড়ছিলো মুহাম্মদ (স) এর সত্যবাদিতা ও মহানুভবতার কথা। একই সাথে সে এ ধরনের বিশ্বাসঘাতকতামূলক কর্মকান্ডের পরবর্তী ফলাফল নিয়েও আতঙ্কিত ছিলো। কিন্তু, হুয়াই অত্যন্ত ধূর্ততার সাথে তার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকলো। তাকে স্মরণ করিয়ে দিলো মুহাম্মদ (স)এর ইহুদীদের সাথে কৃত ব্যবহার এর কথা। আবারও তাকে জানালো শত্রু মুকাবিলায় মিত্রবাহিনীর শক্তি সম্পর্কে। শেষ পর্যন্ত হুয়াই এর ইচ্ছারই জয় হলো এবং কা’ব তার প্রস্তাবে সম্মতি দিলো।

    এরপর কাফিরদের পরিকল্পনা অনুযায়ী কা’ব মুসলিমদের সাথে তার কৃত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং তার ও মুহাম্মদ (স) এর মধ্যকার সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। এরপর সে রাসূল (স) এর অজান্তেই কুরাইশ ও তাদের মিত্রবাহিনীর সাথে যোগ দেয়। এ সংবাদ আল্লাহর রাসূল (স) ও সাহাবাদের কাছে পৌঁছালে তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কায়, রাসূল (স) ’আউস গোত্রের নেতা সা’দ ইবন মু’য়াজ, খাযরাজ গোত্রের নেতা সা’দ ইবন ’উবাদাহ্ এবং তাদের সাথে ’আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহাহ্ ও খাওওয়াত ইবন জুবায়েরকে ঘটনার সত্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধান করার জন্য পাঠিয়ে দেন। ঘটনা সত্য হলে তিনি (স) সাংকেতিক চিহ্নের মাধ্যমে তাঁকে জানানোর নির্দেশ দেন, যাতে মুসলিমদের মনোবলে কোন ফাটল না ধরে। আর যদি তা না হয়, অর্থাৎ বনু কুরাইযা যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তাহলে তাদের তা উচ্চস্বরে ঘোষণা করতে বলেন। এ নিদের্শ পাবার পর তারা গিয়ে দেখেন, তারা যতোটা শুনেছিলেন পরিস্থিতি আসলে তার চাইতেও ভয়াবহ।

    তারা বনু কুরাইযাকে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার অনুরোধ করে। কিন্তু, বনু কুরাইযা এর বিনিময়ে তাদের ভাই বনু নাযিরকে মদীনায় প্রত্যাবর্তনের অনুমতি দাবী করে। সা’দ ইবন মুয়াজ যিনি একসময় বনু কুরাইযার মিত্রপক্ষ ছিলেন, আপ্রাণ চেষ্টা করেন কা’বের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারেনি। কিন্তু, তার ফলাফল হয় আরও খারাপ। এ পর্যায়ে কা’ব ও তার সঙ্গিরা মুহাম্মদ (স)কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নানারকম কথা বলতে থাকে। তারা বলে, “আল্লাহর রাসূল আবার কে? আমাদের মুহাম্মদ নামে কারও সাথে কখনো কোনরকম চুক্তি ছিলো না।” দূতেরা মুহাম্মদ (স) এর কাছে গিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং সমস্ত ঘটনা তাঁকে অবহিত করেন। এরপর পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর আকার ধারণ করে, আর চারদিকে বিরাজ করতে থাকে মূর্তিমান আতঙ্ক।

    এর মধ্যে শত্রুদের সম্মিলিত বাহিনী মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। বনু কুরাইযা গোত্র তাদের মিত্রপক্ষের কাছে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য দশদিনের সময় চেয়ে নেয়। আর, এ সময়ের মধ্যে সম্মিলিত সৈন্যবাহিনী মুসলিমদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করে। মুহাম্মদ (স)কে পরাস্ত করার জন্য তারা তাদের বাহিনীকে তিনভাগে ভাগ করে। ঠিক হয় যে, ইবন আল ’আওয়ার আল-সিলমীর নেতৃত্বাধীন দল উপত্যকার দিক হতে মদীনাকে রুদ্ধ করবে। ’উইয়াইনা ইবন হিসন এগিয়ে যাবে এক পাশ থেকে। আর আবু সুফিয়ান তার দলবল নিয়ে পরিখার সামনের দিক থেকে আক্রমণ চালাবে। এ অবস্থায় শ্বাসরুদ্ধকর আতঙ্ক মুসলিমদের গ্রাস করে, যাতে তারা হয়ে পড়ে প্রচন্ড পরিমাণে ভীত । আর, অপরদিকে প্রতিপক্ষের সম্মিলিত বাহিনী আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটতে থাকে। মুসলিমদের চোখে পরিষ্কার ভাবে দৃশ্যমান হয় তাদের শক্তিসামর্থ্য। শত্রুপক্ষ পরিখার দিকে এগুতে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পরিখা অতিক্রম করতেও সমর্থ হয়। এদের মধ্যে ছিল কুরাইশ গোত্রের কিছু অশ্বারোহী। ’আমর ইবন আবদ , ’ইকরামাহ্ ইবন আবি জাহল এবং দিরার ইবন আল-খাত্তাব পরিখার অপ্রশস্ত একটি অংশের মধ্য দিয়ে ওপারে চলে যায়। তারা তাদের ঘোড়াকে এমন ভাবে প্রহার করে যে, ঘোড়া তাদের সহ সজোরে লাফ দিয়ে পরিখা আর সালের মধ্যবর্তী স্যাঁতস্যঁতে এলাকায় চলে আসে।

    শত্রুপক্ষ পরিখার যে অপ্রশস্ত এলাকা দিয়ে এপারে আসার চেষ্টা করছিল ’আলী ইবন আবু তালিব কয়েকজন মুসলিম সহ সে স্থানে অবস্থান নিলেন। ’আলী ইবন আবু তালিব ও তাঁর সঙ্গীরা যখন পথরোধ করে দাঁড়ালো তখন ’আমর ইবন আবদুদ তাদেরকে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য আহবান করলো। ’আলী (রা) তার চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে বললেন, “তুমি আগে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে আসো।” উত্তরে ’আমর বললো, “হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই না।”’আলী (রা) বললেন,“কিন্তু, আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই।” এরপর তাদের মধ্যে যুদ্ধ হলো এবং আলী (রা) তাকে হত্যা করে ফেললেন। বাকী অশ্বারোহীরা এ দৃশ্য দেখে ঝড়ের গতিতে পরিখা পার হয়ে ওপারে চলে গেল। কিন্তু, এ দূর্ঘটনা কাফিরদের মনোবলে এতোটুকু ফাটল ধরাতে পারলো না বরং, তারা ক্রুদ্ধ হয়ে আরও দৃঢ়তার সাথে ভয়ঙ্কর আক্রমণের প্রস্তুতি নিলো।

    ইতিমধ্যে বনু কুরাইযার উম্মত্ত যোদ্ধারা একে একে তাদের দূর্গ ছেড়ে বের হয়ে মদীনায় প্রবেশ করতে শুরু করলো। আশেপাশের মুসলিমদ বসতিগুলোর মাঝে আতঙ্ক ছড়ানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এ পরিস্থিতিতে মুসলিম বসতিগুলোতে বিরাজ করতে থাকল আতঙ্ক, বিভীষিকা ও চরম উদ্বেগ। কিন্তু, এ উদ্বেগ আল্লাহর রাসূল (স)কে এতোটুকু স্পর্শ করলো না। বরং, তিনি (স) ইস্পাত কঠিন মনোবল নিয়ে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।

    স্বস্তিদায়ক ঘটনা ঘটলো নু’য়াম ইবন মাস’উদ এর মাধ্যমে। তিনি ইতিমধ্যে ইসলাম গ্রহন করেছিলেন কিন্তু, তার গোত্রের লোকেরা এ সংবাদ জানতো না। মুসলিমদের এ সঙ্কটপূর্ণ সময়ে তিনি আল্লাহর রাসুলের কাছে আসলেন এবং শত্রুদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য তাঁকে একটা উপায় বাতলে দিলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি বনু কুরাইযা গোত্রের নিকট গেলেন। অজ্ঞতার যুগে বনু কুরাইযার ছিলো তার অন্তরঙ্গ বন্ধু, আর তাদের মধ্যে ছিলো চমৎকার সৌহার্দ্যপুর্ণ সম্পর্ক। এ সম্পকের্র সূত্র ধরে তিনি বনু কুরাইযাকে বুঝিয়ে বললেন, যদি ঘাতাফান আর কুরাইশ গোত্র তাদের মুহাম্মদ (স)কে একাকী মুকাবিলার জন্য ফেলে চলে যায় তাহলে তার পরিণতি কি হতে পারে। তিনি এ বিষয়ে যে যুক্তি তুলে ধরলেন তা হলো, কুরাইশ আর ঘাতাফান গোত্র হয়তো এখানে খুব বেশীদিন অবস্থান করবে না, কারণ তারা এ এলাকার বাসিন্দা না। এ অবস্থায় যদি তারা যুদ্ধ ক্ষেত্র ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে বনু কুরাইযা কোনভাবেই মুসলিমদের একক ভাবে মুকাবিলা করতে পারবে না।

    সবশেষে তিনি তাদের পরামর্শ দিলেন যে, কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের নেতৃস্থানীয় দু’জনকে তাদের হাতে জিম্মি হিসাবে না রাখা পর্যন্ত তারা যুদ্ধের ময়দানে না যায়। কারণ, জিম্মিদের জন্য তারা এখানে অবস্থান করতে বাধ্য হবে। পরিস্থিতি এ রকম হলেই একমাত্র তাদের মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে সম্মিলিত বাহিনীর সাথে প্রাণপণ যুদ্ধ করা উচিত। কুরাইযা ভেবে দেখলো যে, এটা একটা চমৎকার পরামর্শ। এরপর, নু’য়াম কুরাইশদের গিয়ে বললেন বনু কুরাইযা মুহাম্মদের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। শুধু তাই নয়, তাদের পূর্বের সিদ্ধান্তের জন্য তারা যথেষ্ট লজ্জিত ও অনুতপ্তও হয়েছে। তারা তাদের কর্মফলের প্রায়শ্চিত্য করার লক্ষ্যে কুরাইশ ও ঘাতাফান গোত্রের নেতৃস্থানীয় দু’জনকে মুসলিমদের হাতে তুলে দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেন তারা তাদের হত্যা করতে পারে। সুতরাং, তারা যদি তোমাদের কাউকে জিম্মি হিসাবে দাবী করে তাহলে কক্ষনো তাদের দাবী মেনে নিও না। আর, খবরদার! তাদের হাতে তোমাদের কাউকে তুলে দিও না। ঘাতাফান গোত্রের কাছে গিয়েও তিনি তাদের একই কথা বললেন।

    নু’য়ামের এ কথায় ইহুদীদের ব্যাপারে আরবদের সন্দেহ ঘনীভূত হলো এবং আবু সুফিয়ান কা’ব এর কাছে সংবাদ পাঠাল যে, তারা দীর্ঘদিন ধরে মুহাম্মদকে অবরোধ করে আছে, সুতরাং বনু কুরাইযা যেন আগামীকালই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়। এর উত্তরে কা’ব জানাল যে, আগামীকাল হচ্ছে সাববাথ। এদিন তারা যুদ্ধও করে না, কোনও কাজও করে না। এ ধরনের উত্তরে আবু সুফিয়ান খুবই রাগান্বিত হয়ে গেল এবং তার কাছে নু’য়ামে কথাই সত্য মনে হলো। সে আবারও আর একদল বার্তাবাহক পাঠিয়ে জানালো যে, আগামীকালই মুহাম্মদকে আক্রমণ করা খুবই জরুরী। তারা যেন এ সাববাথ পালন না করে অন্যদিন তা পালন করে। বার্তাবাহকরা কুরাইযাকে এটাও জানালো যে, তারা যদি আগামীকাল যুদ্ধ না করে তাহলে তাদের আর সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে কৃত সকল চুক্তি এখানেই শেষ হয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত বনু কুরাইযাকে একাকীই মুহাম্মদ (স) এর মুখোমুখি হতে হবে। একথা শোনার পরও কুরাইযা যুদ্ধ না করে তাদের সাববাথ পালনের সিদ্ধান্তেই অটল থাকলো, উপরন্তু, কুরাইশদের কাছে দু’জন জিম্মি দাবী করে বসলো। তাদের এ দাবীর পর নু’য়ামের কথার সত্যতা সম্পর্কে আবু সুফিয়ানের আর কোন সন্দেহ রইলো না। এরপর সে নতুন রনকৌশলের কথা ভাবতে লাগলো। আর, ঘাতাফান গোত্রের সাথে শলা-পরামর্শ করে মুহাম্মদ (স)কে আক্রমণ করার ব্যাপারে দ্বিতীয় চিন্তা করতে থাকল।

    সে রাতে আল্লাহতায়ালা তাদের জন্য পাঠালেন তীব্র শীতল ঝড়ো হাওয়া, আর সেই সাথে বজ্রপাত ও বিজলীর চমক। তীব্র আচম্কা ঝড়ে শত্রুপক্ষের তাঁবুগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। এদিক ওদিক ছিট্কে গেল তাদের রান্নার সমস্ত সরঞ্জাম। ভয়াবহ আতঙ্ক তাদের গ্রাস করে ফেললো। প্রতিমূহুর্তে তারা ভাবতে লাগলো, নাজুক এই পরিস্থিতিতে কাজে লাগিয়ে এখনই বুঝি মুহাম্মদ আর তাঁর সঙ্গীরা তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে তাদের। এরমধ্যে আবার, তুলাইহা চিৎকার করতে লাগলো, “মুহাম্মদ তোমাদের দিকে ধেয়ে আসছে, প্রাণ বাঁচানোর জন্য তোমরা পালাও।” একথা শুনে আবু সুফিয়ান ঘোষনা দিল, “কুরাইশরা, তোমরা ক্ষান্ত হও। আমি আর এর মধ্যে নেই।” এরপর তারা যে যা পারলো সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে বাঁচল। ঘাতাফান সহ বাকী সব গোত্রও একই কাজ করলো। সকাল হওয়ার পর দেখা গেল, শত্রুপক্ষ উধাও হয়ে গেছে।

    শত্রুপক্ষের এই করুণ পরিণতি দেখার পর আল্লাহর রাসূল (স) মুসলিমদের সহ পরিখা ছেড়ে মদীনায় চলে আসলেন। আর এভাবেই আল্লাহতায়ালা ভয়াবহ শত্রু মুকাবিলা করা থেকে মুসলিমদের মুক্তি দিলেন। এরপর, রাসূল (স) বনু  কুরাইযা গোত্রকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং ইহুদীদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র থেকে চিরতরে মুক্তি পাবার বন্দোবস্ত করলেন। কারণ, এরাই হচ্ছে সেই বিশ্বাসঘাতকের দল যারা চুক্তি ভঙ্গ করে শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলিয়েছিল আর মুসলিমদের চিরতরে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করেছিল। তিনি (স) মুয়াজ্জিনকে ডেকে নির্দেশ দিলেন যেন সে ঘোষনা দেয়, যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অনুগত সে যেন বনু কুরাইযার আবাসস্থলে না পৌঁছান যে পর্যন্ত আছর নামাজ না পড়ে। রাসূল (স) তাঁর পতাকা হাতে আলী (রা)কে আগে পাঠিয়ে দিলেন এবং তার পিছে পিছে মুসলিম সেনাদল প্রচন্ড উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে রওনা হল। মুসলিমরা বনু কুরাইযা গোত্রকে পঁচিশ দিন ঘেরাও করে  রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত, ইহুদীরা মুহাম্মদ (স) সাথে আপোষ করে বিষয়টা ফয়সালা করার সিদ্ধান্ত নিল। অনেক বাকবিতন্ডার পর সা’দ ইবন মু’য়াজের মধ্যস্থতাকে তারা মেনে নিল এবং তার দেয়া সিদ্ধান্ত তারা মেনে নেবে বলে ঠিক করল। সা’দ ইবন মু’য়াজ রায় দিলেন যে, “গোত্রের পুরুষদের হত্যা করা হোক। তাদের সমস্ত সম্পত্তি মুসলিমদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হোক আর নারী ও শিশুদের দাস (সাবাইয়া) হিসাবে গ্রহন করা হোক।” পরবর্তীতে সা’দের এ রায়কেই বাস্তবায়ন করা হয়। আর, এভাবেই মদীনা থেকে বনু কুরাইযার অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় আর, মদীনাবাসীও তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র থেকে চিরতরে মুক্তি পায়।

    শত্রুপক্ষের সম্মিলিত বিশাল বাহিনীর লজ্জাজনক এ পরাজয় পরবর্তীতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের বড় ধরনের কোন আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়ার সকল সম্ভাবনাকে নির্মূল করে দেয়। আর, বনু কুরাইযার করুণ পরিণতি দেখার পর রাসূল (স)এর সাথে চুক্তি ভঙ্গকারী বিতাড়িত বাকী তিনটি ইহুদী গোত্রও মদীনার আশে-পাশে থাকার সাহস হারিয়ে ফেলে। যার ফলে, মদীনায় আল্লাহর রাসূল (স) ও সাহাবীদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়। আর, আরবের সমস্ত গোত্ররাও মুসলিমদের ব্যাপারে চিরতরে সতর্ক হয়ে যায়।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ২০ (বিদ্রোহ দমন)

    বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের সংখ্যা ছিলো অতি নগন্য এবং যুদ্ধ সরঞ্জামের দিক থেকেও তারা ছিলো খুবই দূর্বল। কিন্তু, তারপরও, কাফিরদের সাথে মুসলিমের এ প্রথম মুকাবিলায় মুসলিমরা বীরের মতো বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলো। মুসলিমদের এ বীরত্বপূর্ণ বিজয় কাফিরদের আত্মবিশ্বাসের ভীত এতো সাংঘাতিক ভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিলো যে, তারা শোকে-দুঃখে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েছিলো। এছাড়া, কুফরশক্তির উপর মুসলিমদের এ বিজয় মদীনার অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ সহ ইহুদীদের নানারকম চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকেও অনেকটা দমিয়ে দিয়েছিলো। এ ঘটনার প্রত্যক্ষ ফল স্বরূপ, কিছু ইহুদী গোত্র মুসলিমদের সাথে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়, আর কিছু গোত্র মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়। মদীনাতে মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্য ক্রমশঃ বাড়ছিলো, আর কুরাইশরা এক মূহুর্ত সময় নষ্ট না করে অপমানের প্রতিশোধ নেবার পরিকল্পনা আঁটছিলো। পরের বছর ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলিম  তীরন্দাজরা  (যারা  মুজাহিদদের  পেছন  থেকে  পাহারা  দেবার  দায়িত্বে  নিয়োজিত  ছিলো)  রাসূল  (সা)  এর নির্দেশ  অমান্য  করে গণীমতের মালামাল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে গেলো, ঠিক তখনই কুরাইশদের হাতে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবার সুবর্ণ সুযোগ এসে গেলো। যুদ্ধে জয়ী হয়ে কুরাইশরা আনন্দে উৎফুল্ল হলো। আর, মুসলিম যোদ্ধারা ভগ্ন হৃদয়ে পরাজিত হয়ে মদীনায় ফিরে আসলো। যদিও যুদ্ধ শেষ হবার পর মুসলিমরা কুরাইশদের হামরা আল-আসাদ পর্যন্ত ধাওয়া করেছিলো (এটি ছিলো মদীনা থেকে প্রায় আট মাইল দূরে)।

    ওহুদের প্রান্তরে মুসলিমদের এই পরাজয়ে আরব ভূ-খন্ডে নানারকম প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। মদীনার অভ্যন্তরে বিভিন্ন দল মুসলিমদের শক্তিসামর্থ্য ও  শাসনকর্তৃত্বকে  তুচ্ছতাচ্ছিল্য  করে  প্রকাশ্যেই  বিদ্রোহ  ঘোষনা  করে।  মদীনার  বাইরের  কিছু  গোত্র, যারা ওহুদের যুেদ্ধর পূর্বে কোনদিন মুসলিমদের সাথে কৃত চুক্তির সীমা অতিক্রম করার কথা চিন্তাও করেনি, তাদের মাঝেও বিদ্রোহের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। ইহুদী ও মদীনার মুনাফিকদের মতো মদীনার বাইরের আরবরাও মুহাম্মদ (স)কে চ্যালেঞ্জ করার কথা ভাবতে থাকে। এ লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন ভাবে মুসলিমদের প্ররোচিত করতে থাকে।

    মদীনার ভেতরে-বাইরে শত্রুপক্ষের এ সব পরিকল্পনার কথা জানতে পেরে রাসূল (সা) শত্রুপক্ষকে মুকাবিলা করার বিষয়ে অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি, মর্যাদা ও শক্তিসার্মথ্য পুণরুদ্ধারকল্পে তিনি (সা) মুসলিমদের প্রতি অমুসলিমদের যে কোন ধরনের তুচ্ছতাচ্চিল্য ও বিদ্রোহকে কঠোর হস্তে দমনের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন।

    ওহুদ  যুেদ্ধর  একমাস পর আল্লাহর রাসুেলর কাছে এ মর্মে সংবাদ পৌঁছে যে, বনু আসাদ গোত্র মদীনা আক্রমণ করে শহরের  চারিপার্শস্থ চারণভূমির পশুগুলো লুট করার পরিকল্পনা করেছে। এমতাবস্থায়, রাসূল (সা) বনু আসাদ গোত্রকে মদীনা আক্রমণ করার কোন সুযোগ না দিয়ে তার আগেই তাদের আস্তানায় আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। শত্রুপক্ষের আক্রমণের পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দেয়াই ছিলো এ আক্রমণের উদ্দেশ্য। তিনি (সা) আবু সালামাহ ইবন ’আবদ আল-আসাদের নেতৃত্বে ১৫০ জন মুসলিমদের একটি দলকে এ অভিযানে প্রেরণ করেন। এ দলে আবু ’উবাইদাহ ইবনুল যাররাহ, সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস এবং উসাইদ ইবন হুদাইর সহ অনেক খ্যাতনামা যোদ্ধা ছিলো। এ অভিযানকে গোপন রাখা এবং শত্রুপক্ষকে চমকে দেবার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের দিনে লুকিয়ে থেকে রাতে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। সেইসাথে, প্রচলিত পথে যাত্রা না করে ভিন্ন পথ ধরে চলার আদেশ দেন। আবু সালামাহ বনু আসাদ গোত্রের ঘাঁটিতে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত যাত্রা করতে থাকেন। লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর তিনি ভোরবেলায় দলবল সহ বনু আসাদ গোত্রকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন এবং তার সঙ্গীদের জিহাদের নির্দেশ দিয়ে শত্রুপক্ষের উপর আক্রমণ চালান। মুসলিম সৈন্যদল খুব সহজেই বনু আসাদকে পরাজিত করে এবং যুদ্ধলব্ধ মালামাল সহ বীরের বেশে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে। এভাবে, মুসলিমদের শৌর্য-বীর্য আবারও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ ঘটনার মাধ্যমে প্রকারান্তরে মুসলিমরা অমুসলিমদের ইসলামের শক্তিসামর্থ্যরে কথা মনে করিয়ে দেয়।

    এরপর, রাসূল (সা) এর কাছে সংবাদ পৌঁছে যে, খালিদ ইবন সুফিয়ান আল-হনদালি নামে এক পৌত্তলিক ’উরনাহ বা নাখলাহর কাছে অবস্থান গ্রহন করেছে এবং মদীনা আক্রমণের জন্য লোকবল সংগ্রহ করছে। এ সংবাদ শোনার পর, আল্লাহর রাসূল (সা) ’আব্দুল্লাহ ইবন আনিছকে খালিদ ইবন সুফিয়ান সম্পর্কে খোঁজখবর নেবার জন্য প্রেরণ করেন। ’আব্দুল্লাহ যাত্রা শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই খালিদের দেখা পেয়ে যান। খালিদ তাকে জিজ্ঞেস করে যে, সে কে? উত্তরে তিনি বলেন,“আমি আব্দুল্লাহ। আমি একজন আরব। আমি শুনতে পেয়েছি যে তুমি মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য লোক সংগ্রহ করছো। আর এ কারনেই আমি এখানে এসেছি।” খালিদ তার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করে। তারপর, তারা দু’জন কথাবার্তা বলতে বলতে সামনের দিকে  হাটঁতে থাকে। যখন তারা দু’জন লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে আসে তখন ’আব্দুল্লাহ ইবন আনিছ  তলোয়ার দিয়ে খালিদকে তীব্র ভাবে আঘাত করে তাকে হত্যা করেন। তারপর, তিনি মদীনায় ফিরে এসে রাসূল (সা)কে তার অভিযানের কথা বর্ণনা করেন। খালিদের মৃত্যুর সাথে সাথে হাদায়েলের বনু লিহইয়ান গোত্র মদীনা আক্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করে। আর এভাবেই, রাসূল (সা) অত্যন্ত সফলতার সাথে খালিদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেন এবং সেইসাথে মদীনার বিভিন্ন প্রান্তরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা বিদ্রোহেরও অবসান হয়।

    কিন্তু এ ঘটনার পরেও কিছু আরব গোত্র মুসলিমদের শাসন-কতৃত্বকে তচ্ছু-তাচ্ছিল্য করে তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহে লিপ্ত হয়। হাদায়েলের আশেপাশের এলাকার কোন গোত্র থেকে একবার একদল লোক মদীনায় আসে। তারা মুহাম্মদ (সা)কে বলে যে, তারা দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে জানার ব্যাপারে  খুবই  আগ্রহী। সুতরাং, তিনি (স) যেন তাদেরকে কুরআন শেখানোর জন্য কিছু সাহাবাকে তাদের গোত্রে পাঠান। একথা শুনে রাসূল (স) বয়োজেষ্ঠ্য ছয়জন সাহাবীকে তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দেন। যাত্রা শুরু করার পর তারা হাদায়েলের কুপগুলোর কাছাকাছি আল-রাজি নামক এলাকায় পৌঁছালে উক্ত গোত্রের লোকেরা সাহাবীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা হাদায়েলের অধিবাসীদেরকে সাহাবীদের আক্রমণ করার নির্দেশ দেয়। তারপর সেখানকার অধিবাসীরা সাহাবীদের ঘেরাও করে ফেলে এবং তাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। মুসলিমরাও জীবন বাঁচানোর জন্য যুদ্ধ করতে থাকে এবং তাদের মধ্যে তিনজন সাহাবী সেখানেই শাহাদাত বরণ করেন। বাকী তিনজনকে তারা বন্দী করে মক্কার কুরাইশদের কাছে বিক্রির জন্য নিয়ে যায়। মক্কা যাত্রাকালে বন্দী সাহাবীদের মধ্য হতে ’আব্দুল্লাহ ইবন তারিক তার তলোয়ারের নাগাল  পেয়ে যায় এবং নিজেকে মুক্ত করার জন্য কাফিরদের আক্রমণ করে। কিন্তু, শীঘ্রই কাফিররা তাকে হত্যা করে। অন্য দু’জন বন্দীকে তারা মক্কার পৌত্তলিকদের কাছে বিক্রি করে দেয়। এদের মধ্যে যায়িদ ইবন আল-দাছনাহকে সাফওয়ান ইবন উমাইয়াহর কাছে বিক্রি করা হয় যেন সে তার পিতা উমাইয়া ইবন খালফের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পারে। সাফওয়ান সাহাবী যায়িদকে বলে, “আল্লাহর কসম, তুমি কি চাও না যে আজ তোমার পরিবর্তে যদি মুহাম্মদ আমাদের হাতে বন্দী থাকতো, আমরা তার মাথা কেটে নিতাম আর তুমি তোমার পরিবারের সাথে থাকতে?” এর উত্তরে যায়িদ বলেন, “আল্লাহর কসম, আমি কক্ষনো ভাবতে পারি না যে মুহাম্মদ যদি আজ আমার জায়গায় থাকতো। আমি ঘরে নিরাপদে বসে থাকবো আর এ অবস্থায় তাঁর গায়ে একটা কাঁটার আঘাতও লাগবে এটা আমি সহ্য করবো না।” একথা শুনে সাফওয়ান আশ্চর্য হয়ে যায়। সে প্রায়ই বলতো, মুহাম্মদের ছাড়া আমি আর কোন মানুষ দেখিনি যে তার সঙ্গীসাথীদের এতো ভালোবাসা পেয়েছে। এরপর, যায়িদ ইবন আল-দাছনাহকে কুরাইশরা হত্যা করে।

    দ্বিতীয় বন্দী খুবাইবকে মক্কায় আনার পর কারারুদ্ধ করে রাখা হয় যে পর্যন্ত না কুরাইশরা তাকে নির্মম ভাবে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। মৃত্যুর আগে খুবাইব কুরাইশদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দু’রাকাত নামাজ আদায় করে। অত্যন্ত চমৎকার ভাবে নামাজ আদায় করার পর তিনি কুরাইশদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “যদি না তোমরা ভাবতে আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি তবে আমি আমার নামাজকে আরও দীর্ঘায়িত করতাম।” এরপর কুরাইশরা তাকে কাঠের সাথে শক্ত করে বাঁধে, এ সময় খুবাইব তাদের দিকে তাকিয়ে ক্রোধান্বিত ভাবে চিৎকার করে বলে, “হে আল্লাহ এদের প্রত্যেককে তুমি গুনে গুনে স্মরণে রেখো, তাদের প্রত্যেককে তুমি উপযুক্ত শাস্তি দিও, এদের মধ্যে কাউকে তুমি ছেড়ে দিও না।” উপস্থিত কুরাইশরা খুবাইবের এ কান্না জড়িত প্রার্থনায় ভীত হয়ে পড়ে, তারপর তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে। আল্লাহর রাসূল (স) ও তাঁর সাহাবীগণ ছয়জন সাহাবীর এ নির্মম মৃত্যুতে শোকে কাতর হয়ে পড়েন। মূলতঃ হাদায়েলের অধিবাসীদের জঘন্য পদ্ধতিতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা ও সাহাবীদের প্রতি ভয়ঙ্কর অসম্মান প্রদর্শন করাই ছিলো মুসলিমদের তীব্র মনোকষ্টের আসল কারণ।

    আল্লাহর রাসূল (স) এইসব বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে গভীর ভাবে চিন্তা করতে থাকেন। ভাবতে থাকেন বিদ্রোহ দমনের উপায়। এ সময়ে আবু বারা’ ’আমির ইবন মালিক (বর্শার খেলোয়ার) নামে এক ব্যক্তি মদীনায় আগমন করে। রাসূল (স) সত্যদ্বীনকে তার কাছে ব্যাখ্যা করেন এবং তাকে দ্বীন ইসলামের দিকে আহবান করেন। আবু বারা’ ইসলাম গ্রহন না করলেও ইসলাম গ্রহনের খুব কাছাকাছি পর্যায়ে চলে যায়। এছাড়া, ইসলামের প্রতি কোনরূপ বিদ্বেষও তার মাঝে কখনো দেখা যায়নি। সে মুহাম্মদ (সা) অনুরোধ করে যে, “আপনি যদি আপনার সাহাবীদের মধ্য থেকে একদল মুসলিমকে নজদ্ এলাকায় ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য পাঠান, তাহলে আশা করা যায়, তারা এ আহবানে সাড়া দেবে।” কিন্তু, সম্প্রতি হাদায়েলের অধিবাসীদের  হাতে ছয় সাহাবীর নির্মম ভাবে নিহত হওয়ার ভয়ঙ্কর স্মৃতি স্মরণ করে রাসূল (সা) তার প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করেন। আবু বারা’ শেষ পর্যন্ত নিজে সাহাবীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলে রাসূল (সা) তার প্রস্তাব মেনে নেন। আবু বারা’ রাসূল (সা)কে বলে, “আপনার পক্ষ থেকে একদল মানুষকে আপনি আপনার দ্বীনের দিকে আহবান করার জন্য পাঠিয়ে দেন, তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমার।” আরব ভূ-খন্ডে আবু বারা’র যথেষ্ট সুনাম ছিলো এবং তার কথার গুরুত্বও ছিলো যথেষ্ট। তাই, তার কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার আশঙ্কা করা কিংবা তার দেয়া নিরাপত্তায় কারো কোন ক্ষতি হবার সম্ভাবনা ছিলো না।

    এসব বিষয় বিবেচনা করে রাসূল (সা) চল্লিশ জন প্রথম শ্রেণীর মুসলিমকে আল-মুনদির ইবন ’আমর এর নেতৃেত্ব নজদ্ এলাকায় পাঠিয়ে দেন। দলটি পথ চলতে চলতে মা’য়ুনার কুপের কাছে পৌঁছালে মুসলিমদের পক্ষ হতে একজন রাসূল (সা) এর চিঠি সহ ’আমর ইবন তুফাইলের সঙ্গে দেখা করতে যায়। ’আমর ইবন তুফাইল দূতকে দেখার সাথে সাথে চিঠি না পড়েই তাকে হত্যা করে। তারপর সে বনু ’আমির গোত্রকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আহবান করে। কিন্তু, বনু ’আমির গোত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অসম্মতি জানিয়ে বলে যে, আবু বারা’ মুসলিমদেরকে নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা তা ভঙ্গ করবে না। তখন, ’আমর সেখানকার অন্য গোত্রগুলোকে যুদ্ধের জন্য আহবান করলে তারা উটের পিঠে চড়ে চারদিক থেকে মুসলিমদের ঘিরে ফেলে। এ অবস্থায় মুসলিমরা যার যার অস্ত্র বের করে তাদের সমস্ত শক্তি দিয়ে আমৃত্যু কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এ ভয়ঙ্কর ঘটনার দু’জন ছাড়া বাকী সমস্ত মুসলিম শহীদ হয়ে যায়। এ সংবাদ মদীনায় পৌঁছানোর পর আল্লাহর রাসূল (স) মানসিক ভাবে সাংঘাতিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন এবং সেই সাথে শোকের সাগরে নিমজ্জিত হন তাঁর সাহাবীরাও।

    মদীনার বাইরের আরব গোত্রগুলোর বিদ্রোহ কিভাবে দমন করা যায় তা নিয়ে রাসূল (স) গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকেন। ভাবতে থাকেন কিভাবে বদরের যুদ্ধে অর্জিত মুসলিমদের প্রভাবপ্রতিপত্তি ও শৌর্য-বীর্য ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায়। একসময় তিনি (সা) অনভুব করেন যে, মদীনার অভ্যন্তরেই আসলে অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। তাই, তিনি (স) প্রথমে ইসলামী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন সমস্যা সমাধানের দিকে মনোযোগী হন। তিনি (স) সিদ্ধান্ত নেন যে, অভ্যন্তরীন সমস্যা সমাধান করার পরই তিনি মদীনার বাইরের গোত্রগুলোর বিদ্রোহ দমনে চিন্তা-ভাবনা করবেন।

    ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের পর হাদায়েলের অধিবাসী কর্তৃক ছয় সাহাবীর হত্যাকান্ড এবং বীরে মায়ুনার নৃশংস ঘটনার  পর মদীনার মুনাফিক ও ইহুদী গোত্রগুলোর ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। তারা পূণরায় মুহাম্মদ (স) এর বিরুদ্ধে ঘৃন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং মুসলিমদের কর্তৃত্বকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করে। তারা সুযোগ খুঁজতে থাকে কিভাবে মুসলিমদের একহাত দেখে নেয়া যায়। আল্লাহর রাসূল (স) ধীরে ধীরে তাদের মনোভাব বুঝতে পারেন এবং ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও অবহিত হন। এরপর, রাসূল (স) সাহাবী মুহাম্মদ ইবন মাসলামাহকে ইহুদীদের কাছে পাঠান। ইবন মাসলামাহ ইহুদীদেরকে রাসূল (সা) এর নির্দেশ জানিয়ে দিয়ে বলেন,“আল্লাহর রাসূল আমাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়েছেন এবং তোমাদের মদীনা ছেড়ে চলে যাবার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, তোমরা তাঁর সাথে কৃত চুক্তির ওয়াদা ভঙ্গ করেছো এবং বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করার চেষ্টা করেছো। তোমাদের মদীনা ত্যাগের জন্য দশদিন সময় দেয়া হলো, এরপর যদি তোমাদের মধ্য হতে কাউকে মদীনায় দেখা যায় তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া হবে।”

    ’আব্দুল্লাহ ইবন উবাই জোর করে আটকে না রাখলে বনু নাদির গোত্র এ নির্দেশের পরই মদীনা ত্যাগ করতো। এছাড়া, ইহুদীদের নেতা হুবাই ইবন আখতাবও তাদের দূর্গে দৃঢ় ভাবে অবস্থান করার জন্য তাদের পরামর্শ দিতে থাকে। দশদিন অতিক্রম হয়ে যাবার পরও যখন বনু নাদির তাদের দূর্গ ত্যাগ করলো না, তখন আল্লাহর রাসূল (স) দলবল সহ তাদের ঘেরাও করেন এবং যে পর্যন্ত না বনু নাদির রাসূল (সা) এর কাছে তাদের প্রাণ ভিক্ষা চায় সে পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ করেন। মদীনা ত্যাগের সময় আল্লাহর রাসূল (স) উটের পিঠে করে যতোটা মালামাল নিয়ে যাওয়া যায় ততোটা নেয়ার অনুমতিও তাদের দেন। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের জমিজমা, খেজুর বাগান ও অস্ত্রসস্ত্র পেছনে ফেলে মদীনা ত্যাগ করে। রাসূল (স) তাদের ফেলে যাওয়া সম্পদ মুহাজিরদের ভেতরে ভাগ করে দেন। আনসারদের মধ্য হতে শুধু আবু দানাহ এবং সাহল ইবন হানিফ নামে দু’জন সাহাবীকে দরিদ্রতার কারণে বনু নাদিরের সম্পদের অংশ দেয়া হয়েছিলো। বনু নাদির গোত্রকে মদীনা থেকে বিতারনের মাধ্যমে রাসূল (স) মদীনার অভ্যন্তরীন বিদ্রোহকে সাফল্যের সাথে দমন করেন এবং মুসলিমদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করেন।

    আল্লাহর রাসুুল (স) এবার ইসলামের পররাষ্ট্রনীতির দিকে নজর দিয়ে কুরাইশদের কাছে প্রতিশ্রুত বদর যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু, বদরের প্রান্তরে তিনি (স) শত্রুপক্ষের দেখা পেলেন না। এটা ছিলো ওহুদের যুদ্ধের একবছর পরের ঘটনা। ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের দুঃখজনক পরাজয়ের পর পৌত্তলিকদের সর্দার আবু সুফিয়ান সর্দপে ঘোষণা দিয়েছিলো যে, “এটা হলো বদরের পরাজয়ের প্রতিশোধ, আগামীবছর বদর প্রান্তরে তোমাদের সাথে আবার সাক্ষাৎ হবে।” রাসূল (স) আবু সুফিয়ানের এ উক্তিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই, তিনি (স) যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন। প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে তিনি (স) ’আব ইবন ’আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুলকে (মুনাফিক আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এর পুত্র) মদীনার দায়িত্বে রেখে বদরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। বদরের প্রান্তরে পৌঁছানোর পর তারা কুরাইশদের সাথে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। ওদিকে, আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশরা দুই হাজার যোদ্ধা সহ মক্কা ত্যাগ করলেও খুব শীঘ্রই আবার তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফিরে যায়।

    আল্লাহর রাসূল (স) বদরের প্রান্তরে কুরাইশদের জন্য দীর্ঘ আট দিন অপেক্ষা করলেন। কিন্তু, কুরাইশরা আর ফিরে আসলো না। শেষ পর্যন্ত তাঁরা খবর পেলেন যে, কুরাইশরা দলবল সহ মক্কায় ফিরে গেছে। এ সংবাদ পাবার পর তিনি (স) তাঁর সাহাবীদের সহ মদীনায় ফিরে আসলেন, সাথে করে আনলেন বদরের প্রান্তরে ব্যবসা থেকে অজির্ত পর্যাপ্ত মুনাফা। এ যাত্রায় মুসলিমরা কুরাইশদের সাথে কোন যুদ্ধ না করেই বিজয়ী বেশে  উৎফুল্ল চিত্তে মদীনায় ফিরে এলো। এর পরপরই রাসূল (স) তাঁর দলবল নিয়ে নজদ এলাকার গাতাফান গোত্রকে আক্রমণ করেন। আক্রমণে হতবিহবল হয়ে গাতাফান গোত্রের লোকেরা তাদের সহায়-সম্পদ ও নারীদের রেখেই পালিয়ে যায়। এসব কিছু সহ মুসলিমরা মদীনায় ফিরে আসে। এরপর রাসূল (স) সিরিয়া ও হেজাজের সীমান্তবর্তী এলাকায় দুমাত আল-জান্দাল গোত্রকে আক্রমণ করেন। এটা আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিলো অন্যান্য গোত্রগুলোকে সর্তক সংকেত দেয়া যারা প্রায়ই মুসলিমদের কাফেলার উপর হামলা করতো। কিন্তু, জুন্দাল গোত্র মুসলিমদের সাথে কোনরকম সংঘর্ষে না গিয়ে ধন-সম্পদ পেছনে ফেলে পালিয়ে যায়। আর মুসলিমরা সেগুলো নিয়ে মদীনায় ফেরত আসে। আল্লাহর রাসূল (স) এর এ সমস্ত আক্রমণের সিদ্ধান্ত ও গৃহীত পদক্ষেপ মূলতঃ মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছিলো এবং সমস্ত আরব ও ইহুদী গোত্রগুলোর নিকট মুসলিমদের প্রতাপ-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেছিলো। আর নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো ওহুদের যুদ্ধে মুসলিমদের পরাজয়ের সকল নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৯ (বনু কুরাইযা গোত্রকে শায়েস্তা)

    বদরের যুদ্ধের পূর্ব হতেই ইহুদীরা মুসলিমদের প্রতি সবসময়ই তীব্র হিংসা-বিদ্বেষ পোষন করতো। বদরের প্রান্তরে মুসলিমদের নাটকীয় বিজয়ের পর তাদের বিদ্বেষের মাত্রা চরম আকার ধারণ করলো। মুসলিমদের সাথে কৃত চুক্তির কোন তোয়াক্কা না করেই তারা মুসলিমদের অপদস্ত করার জন্য নিত্যনতুন ষড়যন্ত্র ও হীন পরিকল্পনা করতে থাকলো। মুসলিমরা তাদের বিরুদ্ধে এ সব ষড়যন্ত্রকে দৃঢ়তার সাথে প্ির তহত করেছিলো এবং অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় এর জবাব দিয়েছিলো। বনু কুরাইযার বাজারে সংঘটিত জঘন্য ঘটনাটিই প্রমাণ করে দেয় যে, মদীনার ইহুদীরা মুসলিমদের উক্তত্য করার জন্য কত হীন পন্থা অবলম্বন করতো।

    বনু কুরাইযার বাজারে একবার এক মুসলিম নারী সোনার দোকানে তার গয়না নিয়ে বসেছিলো। এ সময় পেছন থেকে এক ইহুদী এসে তার কাপড়ের এক প্রান্ত খুিঁটর সাথে বেঁধে দেয়। মুসলিম নারীটি যখন উঠে দাঁড়ায় তখন তার কাপড় শরীর থেকে খুলে যায়। মুসলিম নারীকে এরকম একটি অপ্রস্তত অবস্থায় ফেলে উক্ত ইহুদী সহ আশেপাশের ইহুদীরা নির্লজ্জের মতো হাসিতে ফেটে পড়ে। এ অবস্থায় অপমানিত নারীটি সাহায্যের আশায় চিৎকার করতে থাকে। তার ডাকে সাড়া দিয়ে এক মুসলিম সেই বদমাশ ইহুদীকে হত্যা করে ফেলে। এ ঘটনার প্রতিশোধ হিসাবে ইহুদীরা একত্রিত হয়ে উক্ত মুসলিমকে হত্যা করে। পরবর্তীতে, শহীদ হয়ে যাওয়া সে মুসলিমের পরিবার মদীনার মুসলিমদের ব্যাপারটি অবহিত করে তাদের শাস্তির দাবী করে। পরিণতিতে মুসলিম ও ইহুদীদের মধ্যে যুদ্ধ হয়।

    আল্লাহর রাসূল (সা) বহুবার তাদের এ ধরনের জঘণ্য প্ররোচনামূলক কাজ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দেন। কিন্তু, তারা সে আদেশ- নিষেধের কোন তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যেই আল্লাহর রাসুলের বিরোধিতা ও তাঁর আদেশ অমান্য করতে থাকে। এ রকম পরিস্থিতিতে, রাসূল (সা) বনু কুরাইযাকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং চারদিক থেকে তাদের আবাসস্থল ঘিরে ফেলেন। মুসলিমদের সাথে পরামর্শ করে তিনি এ গোত্রের সকলকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। মূলতঃ এটা ছিলো তাদের মুসলিমদের সাথে ক্রমাগত বিশ্বাসঘাতকতা করার উপযুক্ত শাস্তি। এ পর্যায়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবন সলুল, যার ইহুদী ও মুসলিম দু’পক্ষের সাথেই সুসম্পর্ক ছিলো, বারবার ইহুদীদের  প্রতি দয়া প্রদর্শন করার জন্য রাসূল (সা) অনুরোধ করতে থাকে। কিন্তু, মুহাম্মদ (সা) তার এ কাতর আবেদনে কোন সাড়া না দিয়ে তাকে উপেক্ষা করেন। কিন্তু, তা সত্ত্বেও, ’আব্দুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সলুল ইহুদীদের প্রাণরক্ষার জন্য ক্ষমা ভিক্ষার আবেদন করতেই থাকে। শেষ পর্যন্ত, তার আবেদনে সাড়া দিয়ে রাসূল (সা) বনু কুরাইযাকে মদীনা ত্যাগ করে চলে যাবার নির্দেশ দেন। এরপর, বনু কুরাইযা গোত্র মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়ে উত্তরে আদরাত আল-শামের দিকে চলে যায়।

  • কেন মিশরে আমেরিকা সফল হতে পারছে না ?

    কেন মিশরে আমেরিকা সফল হতে পারছে না ?

    সহিংস অভ্যুত্থানের পরে মিশরে ‘old guard’ এর ফিরে আসার প্রতিক্রিয়া মিশর ও মধ্যপ্রাচ্যের বাহিরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর লক্ষে লড়াই করতে গিয়ে ওবামা প্রশাসনও প্রচন্ড বিক্ষোভের মাত্রা অনুভব করতে পেরেছে। আরব বসন্ত-২০১১ এর শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর বারবার অবস্থার পরিবর্তনের ফলে আমেরিকার সুযোগগুলো দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। এটা এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্য আমেরিকার সংশ্লিষ্টতাকে আরো স্পষ্ট করে তোলে।

    ১৯৭৯ সালে মিশর-ইসরাইল শান্তি চুক্তির পরে মিশর মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রধান মিত্রশক্তিতে পরিনত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আমেরিকা তার মিত্রশক্তির উপর নির্ভর করে। সাধারনত সেনাবাহিনীই সর্বোচ্চ মিত্রশক্তি হিসাবে কাজ করে কারণ তারাই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বিদ্যমান ক্ষমতাকে সংরক্ষণ করার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান শক্তি অর্জন করে রাখে। আর যেহেতু রাজনৈতিক সংস্থাগুলো নামে মাত্র রয়েছে এবং তাদের সীমাবদ্ধ ক্ষমতার উপর নির্ভর করে, তাই অভ্যুত্থান, বিপ্লব কিংবা বাহ্যিক কোন শক্তি প্রদর্শিত হলে এগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। আরব বসন্ত আমেরিকার জন্য নতুন প্রতিদ্বন্দিতার দ্বার উন্মোচন করেছে, সেক্ষেত্রে আমেরিকা নতুন রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত কোন নামে মাত্র এবং অপরিপূর্ণ রাজনৈতিক দলের উপর নির্ভর করবে না তা প্রকাশিত হয়েছে। চাহিদানুরুপ পরিবেশ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে চাপ প্রয়োগ করার জন্যেই সামাজিক ও বেসামরিক শক্তির প্রদর্শনীগুলো বিপ্লবী কর্মকান্ডের দিকে নির্ভর করতে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যে আবির্ভুত বেসামরিক শক্তিগুলো পরিপূর্ণ আদর্শিক বিস্তৃতি ছাড়াই আমেরিকা বিরোধী মনোভাব পোষন করার ফলে এটা আমেরিকাকে একটা কঠিন অবস্থার সম্মূক্ষীন করেছে। এছাড়াও, অপসারিত রাজনৈতিক সরকার যারা তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিচালনা করতো তারা আমেরিকার প্রভাব বিস্তারের জন্য সামরিক কর্তৃপক্ষ (যেমন: SCAF) ছাড়া আর অন্য কোন নিরাপদ মাধ্যমই খোলা রাখে নি।

    তার উপর, তিয়ানমেন স্কয়ারের নৃশংস হত্যাকান্ডের রক্তাক্ত দৃশ্যপটের অবতারনার পাশাপাশি জাতির (দেশের) প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচিত সরকার অপসারণ (পতন) আমেরিকার জন্য খুবই নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ‘বৈদেশিক সাহায্য আইন ১৯৬১’-এর ৫০৮ ধারা মতে, “যদি কোথাও সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে তাহলে সেখানে আমেরিকাকে অবশ্যই সামরিক সাহায্য বন্ধ করতে হবে। ”

    এজন্য এতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকে না যে, মিশরীয় সেনাবাহিনীর গণতন্ত্র পূনঃস্থাপনের দাবী যতই সময় যাচ্ছে ততোই ওবামা প্রশাসন সামরিক অভ্যুত্থানের মত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো অনুধাবন করতে ব্যর্থ (ধরাশায়ী) হচ্ছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে মিশরীয় সেনাবাহিনীকে সাহায্য সহযোগীতা স্থগিত করার ক্ষেত্রে আমেরিকা অনীহা পোষন করছে এবং আজ অবধি দোষারোপমূলক কিছু অলংকারবহুল মন্তব্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামার অভিপ্রায় বিশিষ্ট মন্তব্যগুলো তার অবকাশ সময়ব্যাপী বিপনীকেন্দ্রের আঙ্গুরক্ষেত্র মাত্র। আমেরিকা ও মিশরের মধ্যকার এইসব দুষ্কর্মের সহযোগীতা প্রতিফলিত হয়েছে এবং আমেরিকা তার নীতির মাঝে পরিবর্তনের কোন ইঙ্গিত দেয় নি। এই ‘জটিল পরিস্থিতি’ আমেরিকার জন্য উভয় সংকটাবস্থার সৃষ্টি করেছে যেক্ষেত্রে প্রত্যাবর্তিত হলে তা তার জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে ।

    এইসব উপায় (option) গুলো নিম্নরূপ:

    ১. মিশরীয় সেনাবাহিনী হতে সামরিক সহযোগীতা স্থগিতকরণ:
    এটা মূলত এই অঞ্চলে আমেরিকার প্রভাব বিস্তার করার বিদ্যমান মাধ্যমের সমাপ্তি ঘটাবে। পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যে কোন শক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন অবশিষ্ট না থাকায়, যা কিছু SCAF দ্বারা পরিপূর্ণ হত তা বেসামরিক বা সামাজিক স্বার্থন্বেষী গোষ্ঠীর মধ্য থেকে আমেরিকা একই ভাবে দালাল নিযুক্ত করবে এটা আর মোটেও সম্ভব নয়।

    ২.সশস্ত্র বাহিনীতে আর্থিক সহযোগীতা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে মিশরীয় সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক অক্ষুন্ন রাখা:

    এটা ‘গণতন্ত্রের উন্নয়ন’-এর নীতি বজায় রাখার যে কোন আশাকে খর্ব করবে যা বুশ প্রশাসনের সেই ‘চরমপন্থা’ দমনের ব্যর্থতার দিকে অনুসরনের সূত্রপাত ঘটাবে। আপাত দৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও এটাই সত্য যে, স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষে এই ধরনের কার্যসিদ্ধিমূলক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পৃষ্টপোষক শাসন ব্যবস্থা ও ইসলামকামী ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর মধ্যকার তিক্ততা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির দ্বারা আরো অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করবে।

    ৩. মুসলিম ব্রাদারহুড এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে আপোষমুলক মধ্যস্থতা সৃষ্টিকরণ:
    পারস্পরিক ছাড় দেওয়ার উপর ভিত্তি করে কার্যসিদ্ধির লক্ষে একটা আপোষমুলক মধ্যস্থতা স্থির করার জন্য রাজনৈতিক অভিনেতাদের সংশ্লিষ্ট হওয়া উভয় দিক থেকেই অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে। প্রথমত; বিখ্যাত সিনেটর ম্যাক কেইনের মতো আমেরিকা তার কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা যথেষ্ট হারিয়েছে। পাশাপাশি, মিশরের সংঘর্ষে লিপ্ত প্রত্যেক পক্ষই “আমেরিকা তার প্রতিপক্ষের মদদদাতা”-এমন দাবীর মাধ্যমে সমর্থন সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত; সমাজের ‘ইসলামিস্ট’ ও বেসামরিক শক্তিগুলো এবং দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী হাজেম আল-বাবলাউয়ি উভয়েই এ ব্যাপারে জোড় দিয়েছেন যে, ‘সামঞ্জস্য বিধান’ আর বেশিদিন কোন উপায় হতে পারে না। অপূর্ণকালীন অভ্যুত্থানের দ্বারা ঘৃন্য বেসামরিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবং প্রতিক্রিয়াশীল রক্ষণশীল মহল ‘old guard’ –এর মধ্যে যে আপোষ-মিমাংসা সম্ভব হয়েছিল তা ধুলিসাৎ হয়ে গেছে। যথাযথ ভাবেই এই সব মতানৈক্য গুলো আপোষ মিমাংসার অন্তর্ভূক্ত ছিল, যার ফলাফল ছিল মেরুকরণ এবং ৩০ জুন এর প্রত্যাশিত নাটকীয় ঘটনাগুলো।

    পরিশেষে বলা যায়, আমেরিকা ও মিশরীয় সেনাবাহিনীর মধ্যকার অংশীদারিত্ব সম্পর্ক জড়তা ও আত্মপ্রসাদ দ্বারা ভারী হয়ে ফুটে উঠেছে। সম্প্রতিকালে এটা এমন এক অবস্থায় দাড়িয়েছে যে, শক্তি ও সামর্থ্যের এই ধরনের অবস্থা সৃষ্টির পর আমেরিকার জন্য ‘মিশর বিজয়’ পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে দাড়িয়েছে, যা তার উত্তরাধিকারীকে রাজ্যদানের দিকে টেনে নিয়ে যাবে। গ্রহণ করার মত শেষ ৩টি উপায়-ই ওবামার জন্য অনুপযোগী দেখা যাচ্ছে, যেখান থেকে তার প্রশাসন অবশ্যই সেটাকেই পছন্দ করবে যেটাতে নিজ দেশের লাভের (স্বার্থ) বাহিরে সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে। যাইহোক, উপায়গুলোর কথা বাদ দিলেও এ বিষয়টা খুবই স্পষ্ট যে, ‘soft’ power এবং ‘democracy promotion’ করার ভিত্তিতে নির্মিত কৌশল প্রয়োগের অবশিষ্ট স্বপ্নটুকুও আরব মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান থাকা এখন আর কোন ভাবেই সম্ভব নয়।

    প্রবন্ধটি রেভলুশন অবজারভারে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষন হতে নেয়া এবং কিছুটা পরিমার্জিত
    অনুবাদ করেছেন: আফজালুল ইসলাম

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৮ (বদরের যুদ্ধ)

    হিজরী দ্বিতীয় সনের রমজান মাসের ৮ তারিখে রাসূল (সা) তিনশত পাঁচ জন সাহাবী ও সত্তরটি উট নিয়ে কাফিরদের উদ্দেশ্যে অভিযানে বের হন। এ সময় তিনি ’আমর ইবন উম্ম মাখতুমকে নামাজে ইমামতির দায়িত্ব এবং আবু লুবাবাহকে মদীনার দায়িত্বে নিযুক্ত করেন। উটের পিঠে চড়ে রাসূল (সা) এর দলটি আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশদের এক বাণিজ্য কাফেলাকে খুঁজে ফিরছিলো। পথ চলতে চলতে তারা আবু সুফিয়ানের কাফেলা সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে থাকেন। সৈন্যদল দাফরান উপত্যকায় পৌঁছালে রাসূল (সা) সেখানে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তাদের কাছে খবর পৌঁছে যে, মক্কার কুরাইশরা তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে রক্ষা করার জন্য তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। মুসলিমদের কাছে এ খবর পৌঁছার সাথে সাথে অভিযানের গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য সম্পূর্ন ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। কারণ, তখন ব্যাপারটি আর কাফেলাকে ধাওয়া করা নয়, বরং পৌত্তলিক কুরাইশদের সাথে মুসলিমরা মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হবে কি হবে না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহনের পর্যায়ে চলে যায়। আল্লাহর রাসূল (সা) সাহাবাদের সাথে আলোচনা করেন। আবু বকর ও ওমর (রা) যুদ্ধের পক্ষে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন। আল-মিকদাদ ইবন ’আমর উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,“হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সেখানে যান যেখানে আল-াহ আপনাকে আদেশ করেছেন এবং এ যাত্রায় আমরা অবশ্যই আপনার সাথে থাকবো। বনী ইসরাইল জাতির মতো আমরা কখনোই বলবো না যে, হে মুসা, তুমি আর তোমার আল্লাহ গিয়ে যুদ্ধ করো, আর আমরা ঘরে বসে থাকবো। বরং, আমরা বলবো, (হে নবী) তুমি এবং তোমার আল্লাহ যুদ্ধ করো এবং তার সাথে আমরাও যুদ্ধ করবো।” তারপর মুসলিমরা নিশ্চুপ হয়ে যায়। এ অবস্থায় রাসূল (সা) আনসারদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “এবার তোমরা আমাকে কিছু বলো।” একথার মাধ্যমে আসলে তিনি আনসারদের আকাবা উপত্যকায় কৃত তাদের শপথের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন।

    বস্তুতঃ আনসাররা আকাবার প্রান্তরে রাসূল (সা)কে নিরাপত্তা দেবার অঙ্গীকার করেছিলো যেভাবে তারা তাদের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। আবার, অঙ্গীকারের সাথে এ শর্তটিও ছিলো যে, মদীনার বাইরে সংঘটিত কোন যুদ্ধের জন্য তারা দায়ী হবে না। যখন আনসাররা বুঝতে পারলো যে, রাসূল (সা) তাদের মুখ থেকে কিছু শুনতে চাচ্ছেন তখন সা’দ ইবন মু’য়াজ ইসলামের পতাকা দৃঢ় ভাবে আঁকড়ে ঘোষণা করলো যে, “হে আল্লাহর রাসূল! আমার মনে হচ্ছে আপনি আমাদের উদ্দেশ্য করে কিছু বলছেন।” রাসূল (সা) বললেন,“হ্যাঁ, আমি তোমাদের উদ্দেশ্য করেই বলছি।” উত্তরে সা’দ বললো,“আমরা আপনার উপর ঈমান এনেছি, আপনার সত্যতার ঘোষণা দিয়েছি এবং আপনি আমাদের কাছে যে সত্য এনেছেন তার সত্যতার সাক্ষী হয়েছি। এছাড়া, আমরা আপনার কাছে এ মর্মেও অঙ্গীকার করেছি যে, আমরা আপনার আনুগত্য করবো। সুতরাং, আপনার যেখানে ইচছা আপনি সেখানেই যান, আমাদের আপনার সাথেই পাবেন। যিনি আপনাকে প্রেরণ করেছেন সেই সত্তার কসম, যদি আপনি আমাদের সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বলেন তবে, আমরা আপনার সাথে সমুদ্রেও ঝাঁপ দিব। আমাদের মধ্য হতে একজনও এ ব্যাপারে পেছনে পড়ে থাকবে না। আগামীকালও যদি আপনি আমাদের সহ শত্রুপক্ষকে মোকাবিলা করতে চান তবে তাতেও আমাদের কোন আপত্তি নেই। আমরা যোদ্ধা জাতি, আমরা জানি কিভাবে যুদ্ধ করতে হয়। এমনও হতে পারে যে, আল্লাহতায়ালা হয়তো আমাদের মাধ্যমে আপনাকে এমন কিছু দান করবেন যাতে আপনার অন্তর প্রশান্ত হবে। সুতরাং, আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা করে আমাদের নিয়ে এগিয়ে যান।” আল্লাহর রাসূল (সা) সা’দ ইবন মু’য়াজের কথায় অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং বললেন,“তোমরা পরিপূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যাও। আল্লাহতায়ালা আমার কাছে দুটি দলের মধ্যে একটি দলের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর কসম, আমি যেন কাফিরদের বধ্যভূমি দেখতে পাচ্ছি।”

    আল্লাহর রাসূল (সা) বদরের প্রান্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের যাত্রা অব্যাহত রাখলেন। যখন মুসলিমরা বললো যে, শত্রুপক্ষ কাছাকাছি কোথাও অবস্থান করছে, তখন কুরাইশ বাহিনীর খবর সংগ্রহের আশায় হযরত ’আলী, আল-জুবায়ির ইবন ’আওওয়াম এবং সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস সহ কিছু সাহাবী খবরের আশায় বদরের কুপের কাছে গেলেন। তারা কুপের কাছ থেকে দুইজন তরুণ যুবককে পাকড়াও করে ছাউনীতে ফেরত আসলেন। বন্দীদের প্রশ্ন করে তারা জানলেন যে, কুরাইশদের নেতারা নয়শত কিংবা একহাজার সৈন্যদলের একটি বাহিনী সহ তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে রক্ষায় বের হয়েছে। রাসূল (সা) তৎক্ষনাৎ বুঝতে পারলেন যে, তাকে তার সেনাদল অপেক্ষা তিনগুন শত্তিশালী একটি দলকে মুকাবিলা করতে হবে এবং তাদের মুখোমুখি হতে হবে এক ভয়ানক সংঘর্ষের। তিনি (সা) সাহাবীদের জানালেন যে, মক্কা তার কলিজার বড় বড় টুকরাগুলোকে (অর্থাৎ, সবচাইতে যোগ্য সন্তানদের) যুদ্ধের ময়দানে ছুঁড়ে ফেলেছে। সুতরাং, তারা (সাহাবীরা) যেন তাদের চেষ্টার কোন কমতি না করে।

    মুসলিমরা শত্রুপক্ষকে দৃঢ়ভাবে মুকাবিলা জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো। তারপর তারা বদরের কুপের কাছে অবস্থান গ্রহন করে সেখানে একটি পানির কৃত্রিম জলাশয় তৈরী করলো এবং যুদ্ধের কৌশল হিসাবে অন্য সব কুপ গুলো বন্ধ করে দিলো, যাতে তাদের পান করার মতো পর্যাপ্ত পানি থাকলেও শত্রুপক্ষ পান করার জন্য পানি খুঁজে না পায়। সেই সাথে, তারা আল্লাহর রাসূল (সা) এর নিরাপদ অবস্থানের জন্য একটি ছাউনী তৈরী করলো। এরপর, কুরাইশ যোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দানে তাদের অবস্থান নিয়ে নিলো এবং পৌত্তলিক আসওয়াদ ইবন ’আবদ আল আসাদের ইন্ধনেই বদরের যুদ্ধের সূচনা হলো। আল-আসওয়াদ ইবন ’আবদ আল-আসাদ প্রথমে মুসলিমদের তৈরী জলাশয় ধ্বংস করার জন্য এগিয়ে এলো।

    হামযাহ (রা) তাঁর তলোয়ার দিয়ে সজোরে আঘাত করে আসওয়াদের পা দুটি উড়িয়ে দিলেন। পা হারিয়ে আসওয়াদ মাটিতে ধপাস করে পড়ে গেলো আর তার কর্তিত পা থেকে রক্তের বন্যা বইতে লাগলো। এ অবস্থায় হামযাহ (রা) আবারও তাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করলেন এবং জলাশয়ের কাছে তাকে হত্যা করলেন। এরপর, ’উতবাহ ইবন রাবি’য়াহ তার ভাই শায়বা এবং তার পুত্র আল-ওয়ালিদকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে  অগ্রসর  হলো। মুসলিমদের পক্ষ থেকে হামযাহ (রা), আলী (রা) এবং উবাইদাহ  ইবন  আল-হারিছ তাদের  মুকাবিলা  করতে এগিয়ে আসলেন। হামযাহ (রা) খুব সহজেই তাঁর প্রতিপক্ষ শায়বাকে পরাস্ত করে ফেললেন, একই ভাবে আলী (রা)ও তাঁর প্রতিপক্ষ আল-ওয়ালিদকে পর্যুদস্ত করলেন। তারপর, হামযাহ ও আলী (রা) উবাইদাহ (রা) এর সাহায্যে এগিয়ে আসলেন, যিনি তখন কুরাইশ নেতা ওতবার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে লড়ে যাচ্ছিলেন। ওতবাকে খতম করে তারা তাদের আহত সহযোদ্ধা উবাইদাহ (রা)কে যুদ্ধের ময়দান থেকে উদ্ধার করলেন।

    তারপর, রমজান মাসের ১৭ তারিখ শুক্রবার সকালে উভয় পক্ষ পরস্পরের নিকটবর্তী হলো। আল্লাহর রাসূল (সা) মুসলিমদের কাতার সোজা করলেন এবং তাদের যুদ্ধ করতে উদবুদ্ধ করতে থাকলেন। রাসূল (সা) এর কথায় উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম যোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দানে এগিয়ে গেলো। এরপর শুরু হলো ভয়ঙ্কর লড়াই। লড়াইয়ের তীব্রতা এতো বেশী ছিলো যে, মুসলিমদের তলোয়ারের আঘাতে কুরাইশদের মাথা তাদের দেহ থেকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিল। মুসলিমদের আত্মবিশ্বাস ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং তাদের আহাদ! আহাদ! (আল্লাহ এক) ধ্বনিতে বদরের আকাশ, বাতাস ও প্রান্তর মুখরিত হচ্ছিল। আল্লাহর রাসূল (সা) যুদ্ধক্ষেত্রের মাঝামাঝি এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে এক মুঠো নুড়ি পাথর নিয়ে কুরাইশদের দিকে নিক্ষেপ করে বললেন, “তোমাদের মুখ ধুলিধুসরিত হোক!” তারপর তিনি (সা) সাহাবাদের প্রবল পরাক্রমের সাথে শত্রুকে আঘাত করার নির্দেশ দিলেন যে পর্যন্ত না শত্রুরা সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত হয়। অবশেষে, পৌত্তলিকরা পরাজিত হলো। আর বিজয় নির্ধারিত হলো মুসলিমদের জন্য। মুসলিমদের হাতে বহু সংখ্যক কুরাইশ যোদ্ধা ও কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রের নেতা নিহত হলো। বন্দী হলো আরও অনেকে। বাকী কুরাইশরা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে বাঁচলো। আর মুসলিমরা বিজয়ীর বেশে মদীনায় ফিরে আসলো ।

  • সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের ক্রমবর্ধমান হুমকি অপশক্তির পদধ্বনি

    সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের ক্রমবর্ধমান হুমকি অপশক্তির পদধ্বনি

    ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠাকে নস্যাৎ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ দালাল বাশারের বিকল্প তৈরি করাই এর লক্ষ্য

    আসাদ সরকারের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরোধীতার অজুহাতে আমেরিকা এবং তার মিত্রদের কর্তৃক সামরিক অভিযানের প্রচারণা সাম্প্রতিক সময়ে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অভিযানকে তারা “মানবতা ও নৈতিকতা রক্ষার” আবরণে ঢেকে রেখেছে অথচ তারা এসবের তোয়াক্কা করেনা। বাগ্রাম, গুয়ানতানামো এবং আবু গারিব কারাগারগুলোতে…আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স, রাশিয়াসহ সকল কাফের সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো যুগ যুগ ধরে মানবিক এবং নৈতিক মূল্যবোধকে পদদলিত করেছে…আর গুপ্তচরবৃত্তির কথা না হয় বাদই দিলাম! পারমাণবিক এবং জীবাণু অস্ত্রের অপব্যবহার, ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র এবং পৈশাচিক হত্যাকান্ডের প্রতিযোগীতায় তাদের কুখ্যাতি রয়েছে যার নিদর্শন হিরোশিমা-নাগাসাকি থেকে শুরু করে ইরাক এবং আফগানিস্তান, ককেশাস, মালি এবং চেচনিয়াসহ পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তেই ছড়িয়ে আছে।

    শিশু, নারী এবং বয়োবৃদ্ধদেরকে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে হত্যা করতে এই দেশগুলো বিশেষতঃ আমেরিকাই বাশারকে সবচেয়ে সবুজতম সংকেতটি প্রদান করেছিল। এই সংকেত না পেলে যালিম বাশারের আল-গওতায় তা প্রয়োগের কোনো সাহস ছিলনা। আল-গওতার পূর্বেও সে সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে এবং এমনকি আল-গওতার পরেও, যেমন সরকার কর্তৃক সিরিয়ার বিভিন্নস্থানে বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগের খবর আজও প্রকাশিত হয়েছে। আমেরিকা এবং তার সহযোগীদের জ্ঞাতসারে ও অনুমোদনে এসব সংঘটিত হয়েছে।

    সুতরাং মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ববোধের আবরণে ঢাকা এই সেনা অভিযান অত্যন্ত দুর্বল ও সুস্পষ্ট একটি মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে আছে। বিবেকবান, দৃষ্টিসম্পন্ন এবং সুস্থ চিত্তের প্রতিটি মানুষের পক্ষে তা সহজে বোঝা সম্ভব।

    সাম্রাজ্যবাদী কাফেরদের মোড়ল আমেরিকা কর্তৃক ঘোষিত এই সেনাঅভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে চাপ সৃষ্টি করে সিরিয়ার সার্বিক পরিস্থিতির উপর আয়ত্ত প্রতিষ্ঠা করে মেয়াদোত্তীর্ণ দালাল বাশারের বিকল্প দালাল তৈরি করা। কারণ বাশার ও তার তল্পীবাহকদের বিকল্প হিসেবে সৃষ্ট ন্যাশনাল কাউন্সিল এবং কোয়ালিশনকে তারা সিরিয়ার জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য করতে পারেনি। তাদের ভয় সিরিয়ার জনগণ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করে কাফের ও মুনাফিকদের মূলোৎপাটন করবে। আর তাই আমেরিকা ও তার মিত্ররা কিছু নির্দিষ্ট জায়গায় সামরিক হামলা চালিয়ে এই সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করতে চায়, তারপর সরকার ও কোয়ালিশনের মধ্যে সমঝোতাকে গতিশীল করে কম মন্দ চেহারার বাশারের অনুরূপ কোনো দালালকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে চায়!

    হে মুসলিমগণ, হে সিরিয়াবাসী, হে আশ-শামের অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সততা ও নিষ্ঠার সাথে সংগ্রামরত জনগণ:

    যেকোনো মূল্যে এই সামরিক অভিযান ও ধ্বংসযজ্ঞকে প্রতিহত করতে হবে। আপনাদের হাতে বাশারের পরাজয় প্রায় চূড়ান্ত! দ্বীন, জনগণ, জনগণের সম্মান ও সম্পদের রক্ষাকবজ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায় আপনারা সফলতার দ্বারগোড়ায় পৌঁছে গেছেন। ইসলামী শাসনের আদি আবাসস্থল সিরিয়া হেদায়েতপ্রাপ্ত ও ন্যায়ের খোলাফায়ে রাশেদার শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে ইনশা’আল্লাহ্‌!

    ধৈর্য্য ও অবিচলতা সহকারে যালিম ও যুলুমের মোকাবেলা করুন এবং জেনে রাখুন উদ্ধার অভিযানের অজুহাতে সাম্রাজ্যবাদী কাফেরদের প্রবেশ করতে দেয়ার চেয়ে যেকোনো ত্যাগের বিনিময়ে নিজস্ব সক্ষমতায় তা চেষ্টা করা আপনাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম! এটা উদ্ধার নয় আপনাদের জন্য নির্ঘাত আত্মঘাতি অভিযান!

    كَيْفَ وَإِنْ يَظْهَرُوا عَلَيْكُمْ لَا يَرْقُبُوا فِيكُمْ إِلًّا وَلَا ذِمَّةً يُرْضُونَكُمْ بِأَفْوَاهِهِمْ وَتَأْبَى قُلُوبُهُمْ وَأَكْثَرُهُمْ فَاسِقُونَ

    “কিভাবে (তোমরা তাদের বিশ্বাস করো?)! যদি তারা তোমাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তবে তারা পারস্পরিক সম্পর্ক ও কৃত অঙ্গীকারের কোনো তোয়াক্কা করবে না; তারা মুখে তোমাদের তুষ্ট করে যখন তাদের অন্তর ভিনড়ব ইচ্ছা পোষণ করে; তাদের অধিকাংশই পাপাচারী।” [সূরা আত্‌ তওবা : ০৮]

    হে মুসলিমগণ, হে সিরিয়ার ভাইগণ, হে আশ-শামের অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সততা ও নিষ্ঠার সাথে সংগ্রামরত জনগণ:

    আমাদের সমস্যা সমাধানে সাম্রাজ্যবাদী কাফের রাষ্ট্রগুলোর দ্বারস্থ হওয়া একটি গুরুতর ও বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত এবং আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, তাঁর রাসূল (সা) ও ঈমানদারগণের সাথে স্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতার শামীল। এর দ্বারা আপনারা সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ভয়ানক ক্রোধে নিমজ্জিত হবেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاءَ مِنْ دُونِ الْمُؤْمِنِينَ أَتُرِيدُونَ أَنْ تَجْعَلُوا لِلَّهِ عَلَيْكُمْ سُلْطَانًا مُبِينًا

    হে বিশ্বাসীগণ, মুমিনদের পরিবর্তে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা কী তা করে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকট তোমাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট প্রমাণ তুলে দিতে চাও?” [সূরা নিসা : ১৪৪]

    এবং রাসূল (সা) বলেন:

    لَا تَسْتَضِيئُوا بِنَارِ الْمُشْرِكِينَ

    “মুশরিকের আগুন হতে আলো আকাঙ্খা করোনা।” আনাসের বরাত দিয়ে আহ্‌মদ তা বর্ণনা করেছেন। এবং আল-বায়হাকিতে বর্ণিত আছে:

    لاَ تَسْتَضِيئُوا بِنَارِ الْمُشْرِكِينَ

    “মুশরিকদের আগুন হতে আলো আকাঙ্খা করোনা।”

    এবং একইভাবে আল-বুখারী তার ত্বরিক আল-কাবি’র গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মুশরিকদের আগুনকে তোমরা তোমাদের আলো বানিওনা।

    আগুন যুদ্ধের সমার্থক শব্দ এবং হাদীসটিতে রূপক অর্থে মুশরিকদের পাশে যুদ্ধ করা এবং পরামর্শ নেয়াকে বুঝাচ্ছে। সুতরাং হাদীস অনুযায়ী তাদের ব্যবহার করা সুস্পষ্ট নিষেধ। রাসূল (সা) বলেছেন:

    إِنَّا لاَ نَسْتَعِينُ بِمُشْرِكٍ

    “আমরা মুশরিকদের ব্যবহার করিনা।” আহ্‌মাদ এবং আবু-দাউদ হতে বর্ণিত। সুতরাং আমাদের সমস্যা সমাধানে কাফেরদের সেনা অভিযানকে ব্যবহার করা, এমনকি পরামর্শ করাও একটি ভয়াবহ গুনাহ্‌ এবং কখনও সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নয়।

    অথচ আজ অত্যন্ত দুঃখের সাথে আমরা প্রত্যক্ষ করছি একদিকে সাম্রাজ্যবাদীরা সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি-ধামকি দিচ্ছে অন্যদিকে মুসলিম শাসকেরা হাত গুটিয়ে কী হচ্ছে কী হবে সেই তামাশা দেখছে এবং অন্ধ-বধিরের মতো এমন আচরণ করছে যেন তারা সিরিয়ার জনগণের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা দেখতে ও শুনতে পায়না, যেন এসবই ঘটছে তাদের দৃষ্টিসীমার অনেক বাইরে। সুতরাং আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বক্তব্যনুযায়ী এরা সিরিয়ার জনগণের রক্ষাকারী নয়:

    وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ

    “এবং দ্বীনের ব্যাপারে তারা যদি তোমাদের সাহায্য কামনা করে, তবে অবশ্যই তোমরা সাহায্য করবে।” [সূরা আনফাল : ৭২]

    তাদের মধ্যে যদি একবিন্দু লজ্জা অবশিষ্ট থাকে তবে সিরিয়ার ভাইদের রক্ষায় এবং আশ-শামের এই যালিমের কবল থেকে তাদের উদ্ধারে ব্যারাকে অবস্থানরত সেনাবাহিনীগুলোকে প্রেরণ করা তাদের কর্তব্য।

    আল্লাহ্‌’র ইচ্ছায় সিরিয়ার জনগণ তাদের পারিপার্শ্বিক ইসলামী ভু-খন্ডের ভাইদের সহায়তায় এই যালিম শাসককে অপসারণ করে ইসলামের কেন্দ্রস্থল আল-শামে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম এবং এজন্য তাদের সাম্রাজ্যবাদী কাফেরদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নাই। কারণ তাদের হস্তক্ষেপ মানেই ভিন্ন চেহারার একই দালাল শাসকের পুনরাবৃত্তি এবং আরো একবার ইসলামী শাসন দ্বারা আলোকিত হওয়ার সুযোগ থেকে সিরিয়াকে বঞ্চিত করে তাগুতের শাসন ফেরত দেয়া।

    সাম্রাজ্যবাদী কাফেরেরা কোন ভু-খন্ডকে দুর্নীতিগ্রস্ত, বিধ্বস্ত এবং তছনছ না করে প্রবেশ করেনি যার চিহ্ন এখনো বিরাজমান এবং এখনো মুছে যায়নি বরং তাদের বর্বরোচিত হস্তক্ষেপের সাক্ষী হয়ে আছে। এই সামরিক অভিযান এক মারাত্মক বিপর্যয় ও দুর্যোগের প্রতিধ্বনি। সুতরাং একে প্রতিহত করুন। তারা আপনাদেরকে উদ্ধার করবে এটা ভেবে তাদের দ্বারস্ত হওয়া থেকে সাবধান থাকুন। নয়তো পরবর্তীতে এমন আক্ষেপ করবেন যে আক্ষেপ কোনোই কাজে আসবে না।

    فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِيَ بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرٍ مِنْ عِنْدِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ

    বস্তুত অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত লোকদের আপনি তাদের সহযোগীতায় সবচেয়ে অগ্রগামী পাবেন এই বলে যে: “আমরা দুর্ভাগ্যে পতিত হওয়ার আশঙ্কা করি”। কিন্তু সেদিন দূরে নয় যেদিন আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে বিজয় অথবা চূড়ান্ত ফয়সালা প্রকাশিত হবে এবং স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্যে তারা অনুতপ্ত হবে। [সূরা মায়িদাহ্‌ : ৫২]

    إِنَّ فِي هَذَا لَبَلَاغًا لِقَوْمٍ عَابِدِينَ

    “নিশ্চয়ই এতে (কুর’আনে) এবাদতকারী সম্প্রদায়ের জন্যে সতর্কবার্তা রয়েছে।” [সূরা আম্বিয়া : ১০৬]

    ২১ শাওয়া’ল ১৪৩৪ হিজরী
    ২৮ আগষ্ট ২০১৩ খ্রীষ্টাব্দ

  • জন্মপূর্বে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ – ইসলামী শরী’আহর হুকুম

    প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্নভাবে তার কাঙ্খিত সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়েছে এবং অনাকাঙ্খিত সন্তানের জন্ম নিরোধ ও বর্জনের জন্য অতীতে প্রচলিত বহুবিদ উপায়ও অবলম্বন করেছে। আইয়্যামে জাহিলিয়ার যুগে, ছেলে সন্তান খুবই কাঙ্খিত ছিল কেননা সে যুদ্ধ-বিগ্রহে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে এবং তাদের গোত্রকে উন্নতি ও অগ্রগতির দিকে পরিচালিত করবে। অপরদিকে, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত পথিত করে ধ্বংস করা হতো। যেমন: আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “আর যখন কন্যা সন্তানকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি অপরাধে তাকে হত্যা করা হলো।” [সূরা আত-তাকউইর: ৯]

    যখন অনাকাঙ্খিত সন্তান নষ্ট করার অন্যান্য পদ্ধতি উদ্ভাবিত হলো, যেমন: মায়ের গর্ভাশয় পর্যবেক্ষণ করে সন্তানটির লিঙ্গের পরীক্ষা নিরীক্ষা করা, মানুষ তখন সন্তানটি অযাচিত লিঙ্গের হলে গর্ভপাত ঘটিয়ে সন্তানটিকে ধ্বংস করার উপায় অবলম্বন করে।

    পরবর্তীকালে যখন আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি হলো এবং সেই সাথে গর্ভাশয়ে অবস্থিত ভ্রুনটি সহজেই পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ের পদ্ধতি সহজতর হলো তখন তারা উদ্ভাবন করলো যে, জিনের এসিডিক প্রবণতা চূড়ান্তভাবে কন্যা সন্তানের দিকে ধাবিত হয়, অপরদিকে এলকেলিন জিন পুত্র সন্তানের দিকে ধাবিত হয়। ফলে তারা সঙ্গমের পূর্বে নারীর যোনিপথে উপযুক্ত একটি ক্ষারযুক্ত (এলকেলিন) পরিবেশ তৈরীর চেষ্টা করলো। আর এভাবেই তার এলকেলিন ডুশ (Douch) নামে এক রাসায়নিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করল যা একটি ছেলে সন্তানের জন্ম নিশ্চিত করবে।

    পরবর্তীতে তারা খাদ্যভ্যাস নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অবলম্বন করলো যা নারীর দেহে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরীতে সহায়তা করবে। এই গবেষণার মাধ্যমে তারা অনুধাবন করতে পারল যে, খাদ্য প্রক্রিয়া গর্ভাশয়ে অবস্থিত ডিম্বকোষের লিঙ্গ নির্ধারণের প্রবণতাকে দুইভাবে প্রভাবিত করে।

    প্রথমতঃ এই প্রক্রিয়া নারীর যোনিপথে ও গর্ভাশয়ে এসিডিক বা এলকেলিন পরিবেশ তৈরী করে। তারা দেখতে পেল যে, পটাশিয়াম ও সোডিয়াম গর্ভাশয়ের মৌলিক অবস্থাকে এলকেলিনে রূপান্তর করে যা পরবর্তীতে একটি পুত্র সন্তান জন্মের দিকে ধাবিত হয়। অপরদিকে ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালশিয়াম এমন একটি এসিডিক পরিবেশ তৈরী করে যা কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়।

    দ্বিতীয়তঃ খাদ্য প্রক্রিয়া ডিম্বাণু প্রাচীরকে প্রভাবিত করে এবং একে নারী বা পুরুষ যেকোন শুক্রাণু গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। আর এভাবেই তারা দম্পতিদেরকে বিশেষ করে নারীদেরকে পুত্র সন্তান লাভের জন্য বিশেষ এক ধরনের ডায়েট (খাদ্যাভ্যাস) গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করে। যে ডায়েট এলকেলিনের পরিবেশ নিশ্চিত করে যেমনঃ লবনাক্ত গোশত খাওয়া, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করা, মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণ করা, ফলমূল খাওয়া এবং পটাশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। এরূপ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এলকেলিন পরিবেশ নিশ্চিত করবে।

    অপরদিকে যখন কন্যা সন্তানের আকাঙ্খা করা হয় তখন তারা এমন খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ দেয় যা শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করবে যেমনঃ দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ, কম লবন খাওয়া, গোশত পরিহার করা বিশেষ করে লবনাক্ত গোশত, ফলমূল, মসলাযুক্ত ও সুগন্ধিযুক্ত খাবার পরিহার করা এবং ক্যালশিয়াম জাতীয় ঔষধ গ্রহণ করা। ঐ খাদ্যাভ্যাস শরীরে এসিডিক উপাদান তৈরী করে।

    পরবর্তীতে তারা অন্য এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করল যেখানে তারা দেখলো যে, যদি গর্ভাশয়ে নারীর ডিম্বাণুটি পুরুষের শুক্রাণুর আগে প্রবেশ করে অর্থাৎ যখন নারীর ডিম্বাণুটি নির্গত হয় এবং পুরুষের শুক্রাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন আশা করা যায় যে, সন্তানটি পুত্র সন্তান হবে। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে নির্গত হয় এবং নারীর ডিম্বাণুটি তার উপর পতিত হয়ে নিষিক্ত হয় তখন সন্তানটি কন্যা সন্তান হবে বলে ধরে নেয় যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি নারীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পরপরই সঙ্গম করা হয় তবে সন্তানটি খুব সম্ভব পুত্র সন্তান হবে। অন্যাথায় কন্যা সন্তান হবে। অর্থাৎ গর্ভাশয়ে ডিম্বাণু অবস্থানকালে যদি সঙ্গম করা হয় (ডিম্বাশয় থেকে ডিম্ব নির্গত হওয়ার একদিনের মধ্যে) তখন পুত্র সন্তান হবে। আর যদি ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বেই সঙ্গম করা হয় তবে কন্যা সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। ফলে তারা পরামর্শ দেন যে, যদি নিষিক্ত ডিম্বাণুতে অনাকাঙ্খিত সন্তান জন্মের সম্ভাবনা থাকে তবে বীর্যপাতের ঠিক পূর্বমুহুর্তে সঙ্গমের বিরতি টানা বা ‘আজল’ করা (অথবা Contraception ব্যবহার করা) উচিৎ।

    আর যদি কাঙ্খিত সন্তানের সম্ভাবনা থাকে তবে সঙ্গম চালিয়ে যাওয়া উচিৎ। ফলে আজল বা সঙ্গমে বিরতি এবং Contraception সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের একটি মাধ্যমে পরিণত হলো।

    এপদ্ধতি কার্যকর করার জন্য নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার সময়ের উপর দৃষ্টি রাখতে হয় যাতে করে যদি পুত্র সন্তান কাঙ্খিত হয় তাহলে ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পূর্বে যেন সঙ্গম না করা হয় অর্থাৎ গর্ভাশয়ে পুরুষের শুক্রাণু প্রবেশের পর যেন স্ত্রীর ডিম্বাণু নির্গত না হয়। আর এজন্য এসময়ে আজল অথবা Contraception ব্যবহার করা হয় এবং পুরুষকে তার সঙ্গম নিয়ন্ত্রণ করতে হয় যেন গর্ভাশয়ে স্ত্রীর ডিম্বাণু বিদ্যমান থাকাবস্থায় পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হয়।

    অপরদিকে, কন্যা সন্তান কাঙ্খিত হলে স্ত্রীর ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার মুহুর্তে কিংবা তার ঠিক পরপরই যেন সঙ্গম না করা হয় বরং ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার ঠিক পূর্বমুহুতেই যেন সঙ্গম করা হয়। কেননা যদি ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়ের অতি পূর্বেই সঙ্গম হয় তবে ডিম্বাণুটি নিষিক্ত হওয়ার পূবেই পুরুষের শুক্রাণুটি মারা যাবে।

    এ সম্পর্কে রাসূলের (সা) একটি হাদীস আছে। রাসূল (সা) বলেন, “পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে পুরুষের বীর্যের পূর্বে নারীর বীর্য নির্গত হয় এবং কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রে নারীর বীর্যের পূর্বে পুরুষের বীর্য নির্গত হয়।” [বুখারী]

    এই হাদীসটি ইমাম মুসলিমও তার সহিহ গ্রন্থের ব্যাখ্যায় বর্ণনা করেছেন।

    এই হাদীস ব্যাখ্যায় ইমাম মুসলিম (রহ.) হযরত ছাওবান (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীস বর্ণনা করেন। বর্ণনাকারী বলেন, একবার এক ইহুদী ধর্মযাজক রাসূলের (সাঃ) এর নিকট এসে কিছু প্রশ্ন করল। একপর্যায়ে সে পুত্র সন্তানের প্রসঙ্গে আসলো তখন রাসূল (সা) বললেন, “যখন তারা (স্বামী/স্ত্রী) যৌনমিলন করে এবং পুরুষের সারবস্তু (শুক্র) নারীর সারবস্তুর (ডিম্ব) উপর বিজয়ী হয়, তখন তা পুত্র সন্তান হয় আর তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশেই সৃষ্টি হয়। আর যখন নারীর সারবস্তু পুরুষের সারবস্তুর উপর বিজয়ী হয় তখন তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশেই কন্যা সন্তান হয়।”

    পুরুষের শুক্র নারীর ডিম্বের উপর বিজয়ী হওয়ার অর্থ হলো নারীর ডিম্বাণু নির্গত হওয়ার পর পুরুষের শুক্রাণু নির্গত হওয়া। আর এজন্য গর্ভাশয়ে এ দুটি উপাদানের (শুক্র ও ডিম্ব) মধ্যে যে কোন একটিকে আগে থেকেই বিদ্যমান থাকতে হবে। আর তখনই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশে পুত্র সন্তান জন্মলাভ করবে অথবা বিপরীতে কন্যা সন্তান জন্ম নিবে। অর্থাৎ নারীর ডিম্ব পুরুষের শুক্রের উপর বিজয়ী হবে অর্থাৎ তা পুরুষের শুক্রের পরে ও তার উপর বর্তিত হবে।

    অতঃপর তারা এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অবতারণা করল, তা হলো সিলেক্টিভ স্পার্ম ভ্যাকসিনেশন। এই পদ্ধতিতে পুরুষের শুক্রের Y ক্রোমোজোম থেকে X ক্রোমোজোমকে পৃথক করে গর্ভাশয়ের বাইরে একটি টেস্টটিউবে রাখতে হয় এবং পরবর্তীতে তা গভীর পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়।

    বিজ্ঞানীরা এই ধারণায় উপনীত হয়েছেন যে, পুরুষের শুক্রাণুতে Y এবং X উভয় ক্রোমোজোমই বিদ্যমান থাকে (Y পুরুষ ক্রোমোজোম আর X স্ত্রী ক্রোমোজোম) আর নারীর ডিম্বাণুতে শুধু XX ক্রোমোজোম থাকে। তারা উদ্ভাবন করলেন যখন পুরুষের শুক্রাণুর Y ক্রোমোজোমটি নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন YX জিন গঠিত হয় যা পরবর্তীতে পুত্র সন্তানের জন্ম দেয়। অপরদিকে যখন পুরুষের শুক্রাণুর X ক্রোমোজোম নারীর ডিম্বাণুর সংস্পর্শে এসে নিষিক্ত হয় তখন একটি XX জিন গঠিত হয় যার ফলে কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। সে অনুযায়ী X ও Y ক্রোমোজোমকে পৃথক করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। কেউ যদি পুত্র সন্তান চান তাহলে তারা নারীর ডিম্বাণুর সাথে পুরুষের Y ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে একটি টেস্টটিউবে স্থাপন করেন। আর কন্যা সন্তান চাইলে নারীর ডিম্বাণুর সাথে X ক্রোমোজোমকে নিষিক্ত করে টেস্টটিউবে স্থাপন করেন।

    এছাড়া আরও একটি পদ্ধতি আছে যা কিছুটা ভিন্ন মাত্রার। এই পদ্ধতিতে টেস্ট টিউবে ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার পর সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। নিষিক্ত ডিম্বাণুর সাথে YY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় কন্যা সন্তান আর XY ক্রোমোজমের সংস্পর্শে হয় পুত্র সন্তান। অতএব, পুত্র সন্তান চাইলে তার (স্ত্রী) গর্ভাশয়ে XY ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়। অপরদিকে কেউ কন্যা সন্তান চাইলে তার মধ্যে XX ক্রোমোজোম নিষিক্ত ডিম্বাণু স্থাপন করা হয়।

    উভয় পদ্ধতির উদ্দেশ্যই এক, তথাপি প্রথম পদ্ধতিতে নিষিক্ত করার পূর্বে পুরুষের শুক্রাণুটি প্রথমে পরীক্ষা করে X ও Y ক্রোমোজোম পৃথক করা হয় আর দ্বিতীয় পদ্ধতিতে নিষিক্ত ডিম্বাণু পরীক্ষা করে XX (স্ত্রী) বা XY (পুরুষ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

    সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের উপরোক্ত বাস্তবতা উপলদ্ধির পর নিম্নে ইসলামী শারী’আহ্’র হুকুম বর্ণনা করা হলো:

    (ক) গর্ভাবস্থায় কোন সন্তান হত্যা করা হারাম কেননা তা উদ্দেশ্যমূলক ও ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয় যার শাস্তি হলো পরকালে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়া। আর পৃথিবীতে এর শাস্তি হলো নিহতের অভিভাবক যদি ক্ষমা না করেন তবে কিসাস কার্যকর করতে হবে আর নিহতের অভিভাবক ক্ষমা করে দিলে মুক্তিপন প্রদান করতে হবে।

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুসলমানকে হত্যা করে তার পরিণাম হলো জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবে। তার উপর আল্লাহ্’র ক্ষোভ ও অভিশাপ আর তার জন্য রয়েছে ভয়ংকর শাস্তি।” [সূরা নিসা: ৯৪]

    (খ) যদি পিতামাতা গর্ভাশয়ে অবস্থিত কোন ভ্রুনকে অনাকাঙ্খিত মনে করে হত্যা করে অর্থাৎ ভ্রুনটি হলো কন্যা আর পিতা পুত্র সন্তান কামনা করছেন অতঃপর তিনি ভ্রুনটি হত্যা করলেন। এটা সম্পূর্ণভাবে হারাম এবং শাস্তিযোগ্য পাপ।

    বুখারী ও মুসলিম থেকে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, “একবার হুযাইল গোত্রের দুই মহিলার মধ্যে ঝগড়া বাধলো তখন একজন অপরজনকে লক্ষ্য করে একটি পাথর নিক্ষেপ করলো এতে সে মহিলার গর্ভপাত হয়ে গেল। তখন রাসূল (সা) বিচারের রায় দিলেন যে, ভ্রুন হত্যাকারীকে মুক্তিপন হিসেবে একজন পুরুষ বা স্ত্রী দাস/দাসী মুক্ত করতে হবে।”

    (গ) সাময়িকভাবে যৌন মিলন থেকে বিরত থাকা বা যৌনলিমন করার সময় বীর্যপাতের পূর্বে আজল করা, নির্দিষ্ট কোন খাদ্য দ্রব্য গ্রহণ করা, এসিডিক বা এলকেলিন যেকোন ধরনের ঢুশ ব্যবহার করা বা যোনিপথ ধৌত বা পরিস্কার করা এইসব কিছুই জায়েয। এতে কোন ত্রুটি নেই।

    স্ত্রীর যোনিপথের বাইরে বীর্যপাত বা আজল করা সম্পর্কে ইমাম বুখারী (রহ.) আ’তা কর্তৃক যাবির এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেন, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে যখন কুরআন নাযিল হতো তখন আজল করতাম।” ইমাম মুসলিম কর্তৃক এরূপ আরেকটি বর্ণনা পাওয়া যায়, “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে আজল করতাম, তিনি (সা) তা জানতেন এবং আমাদেরকে তা করতে নিষেধ করেননি।”

    খাদ্য বা ঢুশ গ্রহণের ক্ষেত্রে এগুলো খাদ্য, পানীয় ও গোসলের দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত।

    (ঘ) পুরুষের শুক্রাণু থেকে পুরুষ ক্রোমোজোম ও স্ত্রী ক্রোমোজোম আলাদা করা অতঃপর স্ত্রীর ডিম্বাণুকে পুরুষের Y ক্রোমোজোমে রসাথে নিষিক্ত করা (পুত্র সন্তানের ক্ষেত্রে) অথবা X ক্রোমোজোমের সাথে নিষিক্ত করা (কন্যার ক্ষেত্রে) অথবা পুরুষ ও স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে কাঙ্খিত লিঙ্গের ক্রোমোজোমকে গর্ভাশয়ে স্থাপন করা এসকল প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি জায়েয নাই। কেননা এগুলো গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে চিকিৎসা বা গর্ভধারণের উপযোগী করার কোন প্রক্রিয়া নয়। এবং এ পদ্ধতি স্বাভাবিকভাবে কোন পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা স্ত্রীর ডিম্বাশয়কে টেস্টটিউবে নিষিক্ত করণের চিকিৎসা পদ্ধতি বলেও বিবেচিত নয়। এটা বরং নারী ও পুরুষ জিনকে পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া, এটা এমন কোন প্রক্রিয়া নয় যা স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণে অক্ষম কোন নারীকে গর্ভধারণে সক্ষমতা দিবে। সংক্ষেপে এটা কোন চিকিৎসা বা বন্ধাত্ব দূরীকরণের কোন উপায়ও নয়।

    এ প্রক্রিয়াটির বাস্তবায়ন কারো গুপ্তাঙ্গ প্রদর্শন ব্যতিত সম্ভবপর নয়। কেননা স্ত্রী ডিম্বাণু সংগ্রহ করতে ও তা প্রতিস্থাপন করতে অবশ্যই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করতে হবে। এরূপ প্রদর্শন সম্পূর্ণ হারাম এবং শুধুমাত্র চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই যৌনাঙ্গ প্রদর্শন অনুমোদিত অন্য কোন কারণে নয়। যেহেতু উপরোক্ত শুক্রাণু ও ডিম্বাণু পৃথকীকরণ ও নির্ধারণের বিষয়টি চিকিৎসা সংক্রান্ত কোন বিষয় নয় সেহেতু এই উদ্দেশ্যে যৌনাঙ্গ প্রদর্শন জায়েয নেই এবং তা হারাম।

    পরিশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা উচিৎ যা মূলতঃ ইসলামের আকীদা ও বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত। অর্থাৎ এসকল পদ্ধতি ও গবেষণার মানে এই না যে মানুষের সৃষ্টি করার ক্ষমতা আছে, মানুষ শুধু নারী-পুরুষের বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী এবং নিষিক্তকরণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষ্ণ করতে পারে, যেগুলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক সৃষ্ট ও নির্ধারিত এবং তিনি নারী-পুরুষের মধ্যে এই বৈশিষ্টগুলো সন্নিবিহিত করেছেন। মানুষ শুধু এই মহিমান্বিত সৃষ্টিপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতির ব্যাখ্যা প্রদান ও পর্যালোচনা করতে পারে, সে তার তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে বিশেষ কোন খাদ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে পারে। সে হয়তো পুরুষ ক্রোমোজোম থেকে স্ত্রী ক্রোমোজোমকে পৃথক করে স্ত্রীর গর্ভাশয়ের বাইরে নিষিক্ত করে তা গর্ভাশয়ে পুনঃস্থাপন করতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ সকল প্রক্রিয়া কোন আত্মা বা রুহ সৃষ্টি করতে পারবেনা কেননা তা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন কোন কিছু সৃষ্টি করতে মনস্থ হন শুধুমাত্র তখনই সে বস্তুটি অস্তিত্বে আসে আরআল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যদি ইচ্ছা পোষণ না করেন তবে মানুষের সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা সত্বেও কোন কিছুই সৃষ্টি হতে পারবে না। একমাত্র আল্লাহ্ তা’আলা যাকে অস্তিত্বে আনতে চান তাই আসে আর যাকে চান না তা অস্তিত্বে আসতে পারেনা।

    অর্থাৎ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং একমাত্র তিনিই নারী-পুরুষ সৃষ্টি করেন যা পবিত্র কুরআনের অকাট্য দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত; তন্মধ্যে কতিপয় হলো:

    “তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের প্রতিপালক, তিনি ব্যতিত অন্য কোন ইলাহ নেই। তিনি সকল বস্তুর সৃষ্টিকর্তা, অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। আর তিনি সকল বিষয়ের উপর অভিভাবক।” [সূরা আল-আনআম: ১০২]

    “হে মানবজাতি! একটি দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা হয়েছে। সুতরাং সতর্কভাবে তা শ্রবণ কর। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্ ব্যতিত অন্য কোন উপাস্যের দিকে আহ্বান করে, যদি তারা সকলে একটি উদ্দেশ্যে একত্রিত হয় তবুও তারা একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না। আর যদি মাছিটি তাদের কাছ থেকে কোন কিছু ছিনিয়ে নেয় তাদের কোন ক্ষমতা নেই তারা মাছির কাছ থেকে তা উদ্ধার করবে। অনুসন্ধানকারী ও অনুসন্ধানের বস্তু উভয়ই দুর্বল।” [সূরা হজ্জ্ব: ৭৩]

    “নিশ্চয়ই আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সর্বময় মালিক আল্লাহ্ তা’আলা, তিনি যাকে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন, যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা যাকে ইচ্ছা পুত্র কন্যা উভয়ই দান করেন, যাকে ইচ্ছা বন্ধা করেন, নিশ্চয়ই তিনি মহাজ্ঞানী, সর্বশক্তিমান।” [সূরা আশ-শূরা: ৪৯-৫০]

    “নিশ্চয়ই আপনার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ সৃষ্টিকর্তা।” [সূরা হজ্জ্ব: ৮৬]

    “যে সৃষ্টি করে আর যে সৃষ্টি করে না উভয়ই কি সমান? তবুও কি তোমরা বুঝো না।” [সূরা নাহল: ১৭]

    “ইহাই আল্লাহ্’র সৃষ্টি। সুতরাং আমাকে দেখাও যে, তারা (আল্লাহ্ ব্যতিত তোমাদের অন্য উপাস্যগণ) কি সৃষ্টি করেছে? বরং জালিমরা (মুশরিক, পাপাচারী, আল্লাহ্’র একত্ববাদে অবিশ্বাসী) স্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত।” [সূরা লোকমান: ১১]

    “হে মানবজাতি! যদি তোমরা কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দিহান থাকো তবে ভেবে দেখ যে নিশ্চয় আমরাই তো তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর অপবিত্র পানি (শুক্র) থেকে, অতঃপর জমাট রক্ত থেকে, অতঃপর পূর্ণ ও অপূর্ণ মাংসপিন্ড থেকে, তোমাদের নিকট আমাদের কুদরত ব্যক্ত করার জন্য এবং আমরা আমাদের ইচ্ছামত জরায়ুতে নির্দিষ্ট একটি সময় পর্যন্ত রাখি, অতঃপর তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, অতঃপর তোমরা যৌবনে পদার্পন কর, অতঃপর তোমাদের কারো মৃত্যু হয় যৌবনের পূর্বেই আবার তোমাদের কেউ দুর্দশাগ্রস্থ বার্ধক্যে পৌঁছাও ফলে যে বিষয় তার জানা ছিল তাও সে ভুলে যায়, তোমরা ভূমিকে শুষ্কাবস্থায় দেখতে পাও অতঃপর যখন আমরা তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি তখন তা শস্য-শ্যামল হয় এবং আমরা তাতে নানাবিধ সুন্দর উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে থাকি।” [সূরা হজ্জ্বঃ ৫]

    “আর নিশ্চয়ই আমরা মানুষকে মাটির সারবস্তু থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাকে শুক্রাণুরূপে নিরাপদ স্থানে রাখি, অতঃপর শুক্রবিন্দুকে জমাটবাঁধা রক্তে পরিণত করি, অতঃপর সেই জমাটবাঁধা রক্তকে মাংসপিন্ডে পরিণত করি, অতঃপর সেই মাংসপিন্ডকে অস্থিতে রূপান্তর করি, পরে অস্থিকে গোশত দ্বারা ঢেকে দেই, অতঃপর তাকে আমরা স্বতন্ত্র সৃষ্টিতে পরিণত করি। অতএব আল্লাহ্ মহান, উত্তম স্রষ্টা।” [সূরা মু’মিনুনঃ ১২-১৪]

    “হে মানবজাতি! কিসে তোমাদেরকে মহান প্রতিপালকের কাছ থেকে বিরত রেখেছে? যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করে সুঠাম স্বাস্থ্য ও ভারসাম্য দান করেছেন। এবং তিনি যে আকৃতি চেয়েছেন সেই আকৃতিই দিয়েছেন।” [সূরা ইনফিতার: ৬-৮]

    “তিনিই তার ইচ্ছানুযায়ী গর্ভাশয়ে তোমাদের আকৃতি দান করেছেন, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আলি-ইমরান: ৬]

    আকীদা ও বিশ্বাস সংক্রান্ত এ বিষয়গুলো প্রত্যেকেরই মনে রাখা উচিৎ যেন সে হেদায়েত ও সরল সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করুন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই পৃথিবীকে বহুবিধ জ্ঞান ও চিন্তার উপকরণ দিয়ে সুসজ্জিত করে রেখেছেন যা মানুষ জানত না, আর আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকেও বুদ্ধিমত্তা, চিন্তাশক্তি ও কোন বিষয় অনুধাবনের ক্ষমতা দান করেছেন যেন যারা আল্লাহ্’কে বিশ্বাস করে, তারা তাঁর নিকট থেকে উন্নত মর্যাদা লাভ করতে পারে আর যারা আল্লাহ্’কে অস্বীকার করে তারা এ পৃথিবীতে লাঞ্ছনা ও পরকালে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করবে।

    সবশেষে, সকল প্রসংশা বিশ্বজগতের মহান প্রতিপালন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য।

    খিলাফাহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ

  • সিরিয়া: সাম্রাজ্যবাদের লড়াইয়ের নতুন ক্ষেত্র

    সিরিয়া: সাম্রাজ্যবাদের লড়াইয়ের নতুন ক্ষেত্র

    সারা বিশ্বের নজর এখন সিরিয়ার দিকে। দেশি-বিদেশী সমস্ত মিডিয়াতে এই মুহুর্তে আলোচনার বিষয় একটাই আর তা হল কবে আমেরিকা সিরিয়াতে আক্রমন করতে যাচ্ছে। পছন্দের এজেন্টদের ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত করতে লিবিয়াতে যখন ১ মাসের মধ্যেই পশ্চিমারা সামরিক হামলা চালিয়েছে, তখন ২ বছরেরও অধিক সময় ধরে চলা সিরিয় সংঘাতে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু এবং তার চাইতে বহুগুন বেশি সংখ্যকের উদ্ধাস্তু হিসেবে প্রতিবেশি দেশসমূহে আশ্রয়গ্রহণ স্বত্ত্বেও পশ্চিমাদের নীরবতা লক্ষ্যনীয়। তাহলে কেন হঠাৎ আমেরিকা সিরিয়া আক্রমনের তোড়জোড় শুরু করল? কেনই বা এতদিন পশ্চিমারা নীরব ছিল? সম্ভাব্য এই আক্রমনের লক্ষ্য ও পরিনতিই বা কী হতে পারে?

    আমেরিকার মদদে ১৯৭০ সালে বাশার আল-আসাদের পিতা হাফিয কর্তৃক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সিরিয়ার ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়েই মূলত ২য় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সিরিয়াতে মার্কিন প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই থেকে গত চার দশকেরও অধিক সময় ধরে আসাদ পরিবার মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছে। যার মধ্যে ইসরাঈল রাষ্ট্রকে সুরক্ষা প্রদান এবং ইসলামপন্থী দমন প্রধানতম। কিন্তু তিউনিশিয়া থেকে ছড়িয়ে পড়া গণআন্দোলনের ঢেউ সিরিয়াতেও বাশারের ভরকেন্দ্রে ধাক্কা দেয় এবং বাশার তা সামরিক কায়দায় নির্মমভাবে দমনের পথ বেছে নিলে সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র আরব জাহান জুড়েই জনগণের আবেগ ইসলামের পক্ষে হলেও, পশ্চিমারা এই প্রথম স্তম্ভিত ও ভীত হয়ে উঠে সিরিয়ান জনগণকে পশ্চিমা সাহায্য ও গণতন্ত্রের ফর্মূলা প্রত্যাখ্যান করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনমনীয় আত্মত্যাগ করতে দেখে ফলে অনেক চেষ্টা করেও আমেরিকা ও তার পশ্চিমা সহযোগীরা বাশারের বিকল্প কোনো গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সিরিয় জনগণের সামনে উপস্থাপনে বরাবরই ব্যর্থ হয়ে আসছে। ফলে মুখে হাঁকডাক দিলেও তারা বাশারের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর অবস্থান নেয়নি, উপরন্তু বিদ্রোহী যোদ্ধারা আদর্শগতভাবে খিলাফতপন্থী হওয়ায় তাদেরকে সাহায্য করা থেকে বিরত থেকেছে, বরং বাশারকে রাসায়নিক অস্ত্রপ্রয়োগসহ নির্বিচারে মানুষ হত্যা চালিয়ে যেতে দিয়েছে, যাতে সব পক্ষই শেষাবধি পশ্চিমা আপোষ ফর্মূলা মেনে নিতে বাধ্য হয়।

    কিন্তু এদতসত্ত্বেও ইসলামী প্রতিরোধ যোদ্ধারা ইতিমধ্যেই সিরিয়ার বেশিরভাগ অঞ্চল নিজেদের তত্ত্ববধানে নিয়ে আসতে পেরেছে এবং দামেস্ক বিজয়ের মাধ্যমে বাশারের পতন ও খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা উজ্জলতর হতে শুরু করেছে। একদিকে ইরাক-আফগানিস্তানে শোচনীয় পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা পশ্চিমারা নতুন আরেকটি ফ্রন্টে মুসলিমদের মোকাবেলা করার ব্যপারে দ্বিধাগ্রস্থ যা বৃটেনের পার্লামেন্টে ভোটসংখ্যা থেকে প্রতীয়মান, অন্যদিকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফতের পুনরুত্থান ঠেকানো ব্যাপারে ঐক্যমত্য আমেরিকা ও ফ্রান্স নিজস্ব দান্দ্বিক কুটনৈতিক স্বার্থসত্ত্বেও মালি ও সিরিয়াতে পরস্পরকে সমর্থন করছে। আর রাশিয়া ও চীন মূলতঃ আসাদ পরবর্তী সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রভাব খর্ব করে নিজেদের অবস্থান জোরালো করতেই আমেরিকার সাথে দরকষাকষি করছে, তাতার্স নৌ-ঘাঁটি থেকে সকল রুশ অফিসারদের সরিয়ে নেয়া এর সুস্পষ্ট দলীল।

    তাই আসাদ পরবর্তীতে যাতে ইসলামপন্থীরা এককভাবে ক্ষমতার অংশীদার হতে না পারে, সেজন্য যতটা আগ্রাসী হওয়া প্রয়োজন আমেরিকা প্রয়োজনে একাই তা হবে, যদিও তার ক্ষয়িষ্ণু শক্তি ও বিরোধী ব্যাপক বিশ্বজনমত তাকে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগাচ্ছে, যায়েদ বিন ছাবিত (রা) এর বর্ণনায় ইমাম আহমাদ ও তিরমিযি সূত্রে উল্লেখিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,  “আমি দেখেছি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র ফেরেশতারা আল-শাম (বৃহত্তর সিরিয়া)-এর উপর তাদের পাখাসমূহ বিছিয়ে দিয়েছেন”। তাই আজ আমাদের উচিত সিরিয়ার পবিত্র ভূমিতে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চলমান সংগ্রামকে সমর্থন করা এবং এর বিপক্ষে আমেরিকা ও পশ্চিমা কাফেরদের সমস্ত ষড়যন্ত্রকে জনগণের সামনে উন্মোচিত করা, যাতে তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ হয় এবং জমীনে ইসলাম বাস্তবায়ন শুরু হয়।

    আবু আয-যাহরা

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৭ (ইহুদী এবং খ্রীষ্টানদের সাথে বির্তক)

    খুব অল্প সময়ের মধ্যেই অমুসলিমরা মুসলিমদের শক্তিসার্মথ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে যায়। তারা বুঝতে পারে যে, মুসলিমদের শক্তিসার্মথ্য আসলে তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। আর, তারা এটাও বুঝতে পারে যে, যে হৃদয় ইসলামের জন্য সকল প্রকার অত্যাচার নির্যাতনের পথ পাড়ি দিয়েছে সে হৃদয় কখনো দ্বীন ইসলাম রক্ষায় অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করতে পিছপা হবে না। বরং এ হৃদয় সবসময়ই ইসলাম রক্ষায় অবলীলায় জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। এছাড়া, মুসলিমরা এ সময় মদীনায় তাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ ভাবে উপভোগ করছিলো, ইসলামের সমস্ত হুকুম- আহকামকে বাস্তবায়িত করেছিলো এবং প্রতিদিনই দ্বীন ইসলাম নতুন এক উচ্চতায় উঠছিলো যা মুসলিমদের ক্রমশঃ করছিলো আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান ও সত্যিকার অর্থে পরিতৃপ্ত।

    কিন্তু, ইসলামের শত্রুরা কোনভাবেই দ্বীন ইসলাম ও মুসলিমদের ক্রমবর্ধিত এ প্রভাব-প্রতিপত্তিকে সহ্য করতে পারছিলো না, বিশেষ করে মদীনার প্রতিবেশী ইহুদী গোত্রগুলোর মাঝে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ তীব্র ভাবে প্রকাশিত হল। মুসলিমদের ব্যাপারে তাদের ভয়ও ক্রমশ বাড়তে থাকলো। যখন তারা দেখলো যে, মুসলিমরা ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে এবং অসংখ্য মানুষ ইসলামের আহবানে সাড়া দিচ্ছে তখন তারা নতুন করে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবাদের বিপরীতে তাদের অবস্থানকে পূণঃ বিবেচনা করলো। যখন তাদের নিজেদের মধ্য হতেও বেশকিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলো তখন তারা সত্যিকার ভাবে চিন্তিত ও ক্রোধান্বিত হয়ে পড়লো। তারা ভীত হলো এই ভেবে যে, দ্বীন ইসলাম একসময় তাদের মাঝেও প্রবেশ করবে এবং ইহুদী গোত্রগুলোর মধ্যেও ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করবে। এ আশঙ্কায় তারা ইসলাম, ইসলামী আকীদাহ ও ইসলামের হুকুম-আহকামের প্রতি তীব্র আক্রমণের তীর নিক্ষেপ করলো। পরিণতিতে ইহুদী ও মুসলিমদের মাঝে তীব্র বাক-বিতন্ডা ও স্নায়ু যুদ্ধের মাধ্যমে নতুন সংঘাতের সৃষ্টি হলো। বস্তুতঃ ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই বিবাদ ও সংঘাত মক্কার কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের তীব্র সংঘাতের চাইতেও ব্যাপক ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিলো।

    আল্লাহর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীদের সাথে লিপ্ত বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে ইহুদীদের মূল অস্ত্র ছিলো ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা ও পূর্ববর্তী নবীদের সম্পর্কে তাদের গুপ্ত জ্ঞান। তাদের মধ্যে এমন কিছু ধর্মগুরু ছিলো যারা বাহ্যিক ভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিলো। তারা মুসলিমদের সাথে উঠা-বসা করতো এবং পরহেজগারীতার ভান করতো। কিন্তু, অল্পকিছুদিনের মধ্যেই দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে তাদের সন্দেহ, অবিশ্বাস ও দ্বিধা-দ্বন্দ প্রকাশিত হয়ে গেলো। তারা মুহাম্মদ (সা)কে এমন সব প্রশ্ন করতো, যাতে ইসলামের মূল বিশ্বাস এবং ওহীর সত্যতা নিয়ে মুসলিমদের মাঝেও বিভ্রান্তি ও সন্দেহের সৃষ্টি হয় এবং তাদের দৃঢ় বিশ্বাসের ভীত নড়ে যায়।

    আউস ও খাযরাজ গোত্রের মাঝে যারা শুধুমাত্র মুসলিমদের মাঝে শত্রুতা ও সন্দেহ সৃষ্টি করার জন্য ইসলাম গ্রহন করেছিলো, ইহুদীরা তাদের সাথেই দলবদ্ধ হলো। শেষ পর্যন্ত মুসলিম ও ইহুদীদের মধ্যকার এই সংঘাত এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে, শান্তিচুক্তি থাকা সত্ত্বেও প্রায় যুদ্ধ বাঁধার উপক্রম হলো।

    একবার আবু বকর (রা) ইহুদীদের আক্রমণাত্মক কথাবার্তায় প্রচন্ড রাগান্বিত হন এবং তাঁর ক্রোধ দমনে ব্যর্থ হন। এখানে মনে রাখা দরকার যে, আবু বকর (রা) তাঁর অসাধারন প্রজ্ঞা, অসীম ধৈর্য্য ও ঠান্ডা মেজাজের জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। এ ঘটনাটি মুসলিমদের প্রতি ইহুদীদের উদ্ধত্য ও তীব্র ঘৃণার একটি জলজ্যান্ত উদাহারণ। বণির্ত আছে যে, একবার আবু বকর (রা) ফিনহাস নামের এক ইহুদীকে ডেকে তাকে আল্লাহকে ভয় করতে বলেন এবং ইসলাম গ্রহন করার উপদেশ দেন।

    এর জবাবে ফিনহাস বলে,“আমরা আল্লাহর মতো দরিদ্র নই, কারণ তিনি নিজেকে আমাদের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। আমরা তাঁর উপর নির্ভর করি না, কিন্তু তিনি আমাদের উপর নির্ভর করেন। তিনি যদি আমাদের উপর নির্ভর নাই করতেন তবে তিনি আমাদের তাঁকে ঋণ দিতে বলতেন না, যেমনটি তোমাদের নবী বলে থাকেন। তোমাদের নবী তোমাদের সুদ নিতে নিষেধ করেন, কিন্তু আমাদের করেন না। তিনি(আল্লাহতায়ালা)  যদি  সত্যিকার  ভাবেই  অভাবমুক্ত  হতেন  তবে,  আমাদের  জন্য  সুদ  হালাল  করতেন  না। ফিনহাস  এ  বিষয়ে  আল্লাহর নাযিলকৃত নিম্নোক্ত আয়াতটিকে উদ্দেশ্য করে, যেখানে আল্লাহতায়ালা বলেছেন,

    “কে আছে এমন যে আল্লাহকে দেবে উত্তম ঋণ, তবে আল্লাহ তা বহুগুণে বর্ধিত করে দেবেন।” [সুরা বাকারাহঃ ২৪৫]

    আবু বকর (রা) ফিনহাসের এ উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে এতো বেশী রাগান্বিত হয়ে পড়েন যে, তিনি ফিনহাসের মুখে আঘাত করেন এবং বলেন, “সে সত্তার  কসম  যাঁর  হাতে  আমার  ভাগ্য!  ওহে  আল্লাহর  শত্রু,  যদি  আমাদের  মধ্যে  কোনরূপ  চুক্তি  না  থাকতো  তবে  আমি  অবশ্যই  তোকে  হত্যা করতাম।”

    ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই তর্কবিতর্কের উষ্ণতা ক্রমশঃ বাড়তে থাকে এবং এ অবস্থা বেশকিছু সময় ধরে বিরাজ করে। এ পরিস্থিতিতে খ্রীষ্টানদের ষাটজনের একটি দল নজরান থেকে মদীনায় আগমন করে। তারা ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই বিবাদ সম্পর্কে পূর্বেই অবহিত হয়েছিলো। তারা এ আশায় মদীনায় আগমন করেছিলো যে, হয়তো ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এই ফাটল আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে এবং তাদের অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করার জন্য খ্রীষ্টান ধর্মবিশ্বাস এক বিরাট ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে খ্রীষ্টান ধমর্ও ইহুদী ও ইসলাম ধর্মের ছুঁড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে খ্রীষ্টানদের এই দলটি ইহুদী ও মুসলিম উভয়ের সাথেই সম্পর্ক বজায় রেখেছিলো।

    আল্লাহর রাসূল (সা) ইহুদীদের সাথে সাথে তাদেরকেও আহলে কিতাব বলে সম্বোধন করেন এবং উভয় দলকে ইসলামের দিকে আহবান করেন। তিনি (সা) তাদেরকে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে শোনান,

    “বল (হে মুহাম্মদ)! হে আহলে কিতাবগণ, একটি বিষয়ের দিকে আসো যা তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করবো না, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবো না এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাবো না। কিন্তু, যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলঃ “তোমরা সাক্ষী থাকো যে আমরা মুসলিমদের অর্ন্তভূক্ত।” [সুরা আলি ইমরানঃ ৬৪]

    এরপর, ইহুদী ও খ্রীষ্টানরা মুহাম্মদ (সা) কে অন্যান্য নবীদের বিষয়ে প্রশ্ন করতে থাকে। আল্লাহর রাসূল (সা) এর জবাবে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ে শোনান,

    “বল! আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহর উপর এবং যা কিছু নাযিল হয়েছে আমাদের উপর এবং যা কিছু নাযিল হয়েছে ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব এবং তাদের সন্তানদের উপর এবং যা কিছু নাযিল হয়েছে মুসা এবং ঈসার উপর এবং যা কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীদেরকে দেয়া হয়েছে তার উপর। আমরা তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য করি না এবং নিশ্চয়ই আমরা তার প্রতিই অনুগত।” [সুরা বাকারাহঃ ১৩৬]

    এ  কথার পর  ইহুদী ও  খ্রীষ্টানরা  মুহাম্মদ (সা) কে  বলার মতো  আর কিছুই খুঁজে  পেতো না।  বস্তুত  তাদের  অন্তর  রাসূল (সা)  এই যুক্তিকে মেনে নিয়েছিলো এবং সত্য তাদের কাছে দিনের আলোর মতো প্রকাশিত হয়েছিলো। কিন্তু, তারা শুধু তাদের সম্মান, প্রভাব, প্রতিপত্তি এবং সামাজিক পদমর্যাদা হারানোর ভয়ে ইসলাম গ্রহন থেকে নিজেদের বিরত রেখেছিলো এবং তাদের মধ্যে অনেকে এ কথা স্বীকারও করেছিলো। বর্ণিত আছে

    যে, নজরান থেকে আগত আবু হারিছাহ্ নামে এক খ্রীষ্টান দূত, যে ছিল তাদের মধ্যকার একজন প্রসিদ্ধ আলেম, সে তার অন্তরঙ্গ বন্ধুর কাছে একথা স্বীকার করেছিল যে, মুহাম্মদ (সা) যে সত্য কথা বলছে এ ব্যাপারে তার মনে কোন সন্দেহ নেই। তার বন্ধু যখন তাকে জিজ্ঞেস করলো তাহলে কেন সে সত্য জেনেও ইসলাম গ্রহন করছে না? এর উত্তরে সে বলেছিলো,“তারা (রোমান বা বাইজাইন্টাইনরা) আমাদের যেভাবে সম্মানিত করেছে, বিভিন্ন পদমর্যাদায় ভূষিত করেছে, অর্থ-সম্পদ দিয়ে যাচ্ছে, যদি আমি ইসলাম গ্রহন করি, তবে তারা এ সমস্ত কিছু আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবে। কারণ, মুহাম্মদ (সা) যা বলে, তারা এর সম্পূর্ণ বিপরীতম অবস্থানে।” এ ঘটনাই প্রমাণ করে যে, তাদের নিলর্জ্জ স্বাথর্পরতা, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ ও অহেতুক অন্ধ গোর্য়াতুমিই আসলে তাদের ইসলাম গ্রহন করা থেকে বিরত রেখেছিলো। এরপর আল্লাহর রাসূল (সা) খ্রীষ্টান দূতদেরকে মুবাহালার (নিজেদের উপর আল্লাহর ক্রোধ বর্ষণের প্রার্থনা) জন্য প্রকাশ্যে আহবান করেছিলেন, যেন খ্রীষ্টান ও মুসলিমদের মধ্য হতে যারা মিথ্যাবাদী তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে গজব বর্ষিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। তিনি (সা) তাদের উদ্দেশ্যে নীচের আয়াতটি পাঠ করেছিলেন,

    “অতঃপর তোমার নিকট সত্য এসে যাবার পরও যদি এ সম্পর্কে তোমার সাথে কেউ বিবাদ করে, তাহলে বলঃ আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রদের ও তোমাদের পুত্রদের এবং আমাদের স্ত্রীদের ও তোমাদের স্ত্রীদের এবং আমাদের নিজেদের ও তোমাদের নিজেদের। তারপর চলো আমরা সবাই মিলে প্রার্থনা করি এবং তাদের প্রতি আল্লাহর অভিসম্পাত করি যারা মিথ্যাবাদী।” [সুরা ইমরানঃ ৬১]

    এ আহবানের পর তারা (খ্রীষ্টান দূতেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে এবং ঘোষণা দেয় যে, তারা মবাহালায় অংশগ্রহন করবে না এবং মুহাম্মদ (সা) কে তাঁর আনীত দ্বীনের উপরই ছেড়ে দেবে আর, তারাও তাদের দ্বীনকেই আঁকড়ে থাকবে। এছাড়া, তারা মুহাম্মদ (সা) কে অনুরোধ করে যেন, তিনি (সা) তাঁর পক্ষ হতে একজন দায়িত্বশীল মুসলিমকে তাদের নির্দিষ্ট কিছু অর্থনৈতিক বিষয়ে মীমাংসা করার জন্য পাঠিয়ে দেন। এ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে, রাসূল (সা) আবু উবাইদাহ ইবন আল-জাররাহকে ইসলাম দিয়ে তাদের বিচারকার্য পরিচালনা করার জন্য পাঠিয়ে দেন।

    বস্তুতঃ এ পর্যায়ে, ইসলামী দাওয়াতের অপ্রতিরোধ্য গতি, ইসলামী আকীদাহর শক্তি এবং সত্যদ্বীনের শাণিত যুক্তিতর্কের ধার এমন ভাবে প্রকাশিত হতে থাকে যে, মুনাফিক, ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের উত্থাপিত সমস্ত মিথ্যা যুক্তিতর্ক ও অভিযোগ নিমেষেই ধুলিস্যাৎ হয়ে যায়। তাদের ইসলাম বর্হিভূত ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনা খুব দ্রুত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং পরাক্রমশালী অস্তিত্ব ও সঠিক জীবনব্যবস্থা হিসাবে শুধুমাত্র ইসলামই টিকে থাকে। এভাবে, ইসলামের হুকুম-আহকাম সম্পর্কিত সার্বক্ষনিক আলোচনা-পর্যালোচনা, ইসলামের দিকে মানুষকে আহবান ইত্যাদির মাধ্যমে ইসলাম ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরের গভীরে প্রোথিত হতে থাকে। আর, ইসলামের সমুন্নত পতাকাতলে সকল ভ্রান্ত জীবনব্যবস্থা, বিশ্বাস ও শাসনকার্য বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু, এ সবকিছুর পরও মুনাফিক ও ইহুদীদের অন্তরে মুসলিমদের প্রতি তীব্র ঘৃণা, বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসার আগুন দিনে দিনে বাড়তেই থাকে। একথা অনস্বীকার্য যে, মদীনায় ইসলামের শাসন-ক্ষমতা ও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ সে সময় সবকিছুর উপর কর্তৃত্বশীল হয়। এছাড়া, বিভিন্ন ছোট ছোট অভিযানের মাধ্যমে মুসলিমদের প্রদর্শিত শক্তি-সামর্থ্য  ইসলামের শত্রুপক্ষের মুখও মোটামুটি বন্ধ করে দেয়। শেষ পর্যন্ত, মহান আল্লাহতায়ালার বাণীই সকল ভ্রান্ত মতাদর্শের উপর বিজয়ী হয় এবং ইসলামের শত্রুরা বাধ্য হয় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও ইসলামের শাসন-কর্তৃত্বের কাছে সম্পূর্ণ ভাবে নতি স্বীকার করতে।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৬ (মদীনার জীবন)

    ইসলামের রয়েছে একটি নির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা যেটা মূলতঃ রূপ লাভ করছে জীবন সম্পর্কে কিছু বিশেষ ধ্যানধারনার থেকে। এগুলোই হচ্ছে ইসলামী সংস্কৃতির মূল উপাদান, যেটা অন্য যে কোন সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ন ভাবে আলাদা। ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে তিনটি মূল বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়ঃ

    ১.        ইসলামী জীবনব্যবস্থা ইসলামী আকীদাহ বা বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।

    ২.        ইসলামী জীবনব্যবস্থায় মানুষের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় আল্লাহ নির্ধারিত হালাল-হারামের উপর ভিত্তি করে।

    ৩.        আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই এ জীবনব্যবস্থায় সুখের প্রকৃত অর্থ।

    এটাই হচ্ছে ইসলামী জীবনব্যবস্থা এবং এ রকম একটি জীবনই মুসলিমদের এক এবং একমাত্র কাম্য। কিন্তু, এ রকম একটি জীবনব্যবস্থা পেতে হলে মুসলিমদের অবশ্যই দরকার একটি ইসলামী রাষ্ট্র, যা ইসলামকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম-আহকামকে সমাজে সর্বতোভাবে বাস্তবায়ন করবে।

    মুসলিমরা মদীনায় হিজরতের পর ইসলামী আকীদাহর ভিত্তিতে রচিত একটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী জীবন পরিচালনা করেছিলো। আর, এই সময়ই সমাজ জীবন, বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি সম্পকির্ত আয়াত এবং ইবাদত সম্পকির্ত আয়াত নাজিল হয়। হিজরী দ্বিতীয় সালে মুসলিমদের উপর যাকাত ও সিয়াম ফরজ করা হয়। এরপর আজান ফরজ করা হয় এবং মদীনাবাসী বিলাল ইবন রাবি’য়াহ সুললিত কন্ঠে দিনে পাঁচবার আজান শুনতে থাকে। আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় আসার ১৭ মাস পর কিবলার দিক পরিবর্তন করে কাবাকে কিবলা হিসাবে নির্ধারন করা হয়। এরপর একে একে ইবাদত, খাদ্য, মূল্যবোধ, মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করা সম্পর্কিত কুরআনের বিভিন্ন আয়াত নাজিল হতে থাকে। মদ এবং শুকরের মাংস নিষিদ্ধ করা হয় এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ড ও অপরাধীর শাস্তি বিষয়ক আয়াতও এ সময়ে নাজিল হয়। আয়াত নাজিল করা হয় ব্যাবসায়িক লেনদেন বিষয়ে, সব ধরনের সুদ কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। মদীনায় যখনই মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কিত কোন আয়াত নাজিল হতো আল্লাহর রাসূল (সা) আয়াতটিকে মুসলিমদের জন্য ব্যাখ্যা করতেন যেন তারা সে অনুযায়ী তাদের জীবন পরিচালনা করতে পারে। তিনি (সা) মদীনার মুসলিমদের সকল বিষয় দেখাশুনা করতেন, তিনি তাঁর কথা, কাজ ও তাঁর সম্মুখে ঘটিত কাজের ব্যাপারে নীরব থেকে মুসলিমের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ মিটমাট ও সমস্যার সমাধান করতেন। এজন্যই রাসূল (সা) এর কথা, কাজ ও বিশেষ বিষয়ে তাঁর নীরবতা সবই শরীয়াহর উৎস। কারণ, আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা সুরা নাজমে বলেছেন,

    “এবং (তিনি) প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। (এই) কুরআন হলো ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়।” [সুরা নাজমঃ ৩-৪]

    এভাবেই মদীনায় মুসলিমদের জীবন সম্পূর্ন ব্যতিক্রমধর্মী একটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পরিচালিত হতে থাকে, আর এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো পুরোপুরি ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি। আর ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির উপর ভিত্তি করেই একটি ব্যতিক্রমধর্মী সমাজ ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠে। ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও আবেগ অনুভূতি  ক্রমশ বিস্তৃতি লাভ করতে শুরু করে এবং সমাজের সর্বস্তরে ইসলামের হুকুম-আহকামগুলোও পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়িত হয়। দ্বীন ইসলাম সমাজের  মানুষকে দেয় জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান এবং দেয় জীবনের সমস্ত বিষয়ে দিকনিদের্শ না। ইসলামী দাওয়াতের এ পর্যায়টি, যে পর্যায়ে মুসলিমরা ইসলামের উপর পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো তা রাসূল (সা)-কে সত্যিকার ভাবে আনন্দিত করেছিলো। কারণ, এ পর্যায়ে মুসলিমরা নির্ভয়ে এবং কোনরূপ অত্যাচার নির্যাতন ব্যতীতই ব্যক্তিগত ও দলবদ্ধ ভাবে ইসলামের সমস্ত হুকুম-আহকাম মেনে চলতে পারছিলো এবং ইসলাম একটি শক্ত ভিত্তির  উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিলো। তারা তাদের জীবনের সমস্ত সমস্যা আল্লাহতায়ালার হুকুম অনুযায়ী সমাধান করতো, নতুন কোন বিষয়ের অবতারণা হলে তা সবসময়ই তা আল্লাহর রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দিতো এবং তারা কখনোই আল্লাহর নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতো না। শুধু তাই নয়, তারা তাদের প্রতিটি কর্মকান্ডও আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে পরিচালিত করতো আর এতেই তারা সত্যিকারের মানসিক শান্তি ও সুখ লাভ করতো। মুসলিমদের মধ্য হতে অনেকে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহন, কুরআন মুখস্ত করা কিংবা জ্ঞানার্জনের আশায় মুহাম্মদ (সা)-কে ছায়ার মতো অনুসরণ করতো। এভাবে ধীরে ধীরে ইসলাম বিস্তৃতি লাভ করে এবং মুসলিমরাও দিনে দিনে শক্তিশালী হতে থাকে।