Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৫ (দাওয়াতী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সহিংসতা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    মুহাম্মদ (সা) কে যখন আল্লাসে অনুযায়ী দরদাম হাঁকতে পারে? আল্লাহ্ তা’য়ালা প্রথমদিকে রাসূল হিসাবে মনোনিত করেন, তখন মক্কার মুশরিকরা তাকে এবং তাঁর প্রচারিত বানীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। দাওয়াতী কাজের প্রাথমিক দিকে কুরাইশরা তাঁর আহবানকে সাধু-সন্যাসীদের সমগোত্রীয় ভেবে উপেক্ষা করতে থাকে এবং ভাবতে থাকে যে, ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমরা হয়তো ধীরে ধীরে আবার তাদের পূর্বপুরুষের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে। মূলতঃ এই কারনেই কুরাইশরা প্রথমদিকে তাঁর (সা) কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মুহাম্মদ (সা) যখনই কুরাইশদের সম্মুখীন হতেন তারা বলতো, “এই হচ্ছে আবদ আল মুত্তালিবের পুত্র যার উপর কিনা আসমান থেকে ওহী অবতীর্ন হয়।” কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তারা তাঁর প্রচারিত আদর্শের শক্তিতে শঙ্কিত বোধ করতে শুরু করে এবং তাঁর সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রথমদিকে তারা মুহাম্মদ (সা) এর নবুয়তের দাবীকে মিথ্যা বলে উপহাস করে। পরবর্তীতে তারা নবুয়তের প্রমাণ হিসাবে নবী (সা) অলৌকিক নিদর্শন সমূহ উপস্থাপন করতে বলে। তারা বলতে থাকে, মুহাম্মদ যদি সত্য সত্যই আল্লাহর নবী হয়ে থাকে তবে সে কেন সাফা ও মারওয়াকে সোনার পাহাড়ে পরিনত করছে না? কেন তাঁর কাছে আসমান থেকে লিখিত কিতাব নাযিল হচ্ছে না? কেন জিবরাইল মুহাম্মদের সাথে কথা বলে কিন্তু তাদের সামনে উপস্থিত হয় না? কেন সে মৃতকে জীবিত করতে পারে না? কেন সে মক্কাকে পরিবেষ্টনকারী পাহাড়গুলোকে অন্যত্র সরিয়ে দিচ্ছে না? কেন তার সমাজের মানুষের পানির এতো কষ্ট থাকা সত্ত্বেও সে তাদের জন্য জম্‌জম্‌ এর চাইতে ভাল কোন কুপ খনন করে দিচ্ছে না? কেন তাঁর রব তাঁকে দ্রব্যসমূহের মূল্য আগে থেকেই অবহিত করছে না যেন তারা সে অনুযায়ী দরদাম হাঁকতে পারে?

    বেশ কিছুকাল যাবত চলতে থাকে আল্লাহর রাসুলের (সা) বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য মূলক এসব অপপ্রচার। কুরাইশরা নবী (সা)-কে জর্জরিত করতে থাকে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, তিরস্কার আর অত্যাচারে। তা সত্ত্বেও তিনি (সা) অবদমিত কিংবা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে একাগ্রতার সাথে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন এবং সেই সাথে যারা মূর্তিপূজা করে ও মূর্তির কাছে প্রার্থনা করে তাদের র্নিবুদ্ধিতা আর চিন্তার অসারতা সমাজের মানুষের সামনে তুলে ধরে মূর্তিপূজাকে অযৌক্তিক এবং হাস্যকর প্রমাণ করেন।

    তাদের উপাস্য মুর্তির বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ এ প্রচারনা কুরাইশদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, ফলে তারা যে কোনও হীন উপায়ে মুহাম্মদ (সা) এর কার্যকলাপ বন্ধের জন্য সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করে, কিন্তু দাওয়াতী কার্যকলাপ বন্ধের তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কুরাইশরা প্রধানত তিনটি উপায় গ্রহণ করে:

    ১. অত্যাচার

    ২. সমাজের ভিতরে এবং বাইরে মিথ্যা প্রচারনা

    ৩. বয়কট (সমাজচ্যূত করন)

    পারিবারিক নিরাপত্তা পাবার পরও মুহাম্মদ (সা) অত্যাচারের শিকার হন, অত্যাচারিত হন তাঁর (সা) সঙ্গী-সাথীরাও। কুরাইশরা তাদের নির্যাতন করার জন্য ঘৃন্য সকল পদ্ধতি গ্রহন করে এবং এ সকল ঘৃনিত কাজে তারা ব্যাপক পারদর্শিতা অর্জন করে। সত্যদ্বীন থেকে বিচ্যুত করার জন্য আল-ইয়াসির (রা) এর পরিবারকে র্নিমম অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়, কিন্তু এ সমস্ত অত্যাচার শুধুমাত্রই তাদের দৃঢ়তা ও মনোবল বৃদ্ধি করে। কুরাইশরা যখন ইয়াসির (রা) এর পরিবারকে অত্যাচার করছিল, তখন আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের অতিক্রম করছিলেন এবং তিনি (সা) তাদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, “ধৈর্য ধর ইয়াসির পরিবার! তোমাদের পুরস্কার তো জান্নাত। তোমাদের গন্তব্য তো আল্লাহর কাছে।” এর জবাবে ইয়াসির (রা) এর স্ত্রী সুমাইয়া (রা) বলেছিলেন,” হে আল্লাহর রাসুল, আমি তা দেখতে পাচ্ছি।”

    ততদিন পর্যন্ত রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবী (রা)দের উপর কুরাইশদের এ ভয়ংকর অত্যাচার পূর্ণ শক্তিতে চলতে থাকে যতদিন পর্যন্ত না তারা বুঝতে পারে, তাদের সকল প্রচেষ্টা আসলে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এরপর তারা ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করে, যা ছিল মূলতঃ ইসলাম এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারনা যা তারা মক্কা এবং মক্কার বাইরে যেমন, আবিসিনিয়ায় প্রচার করে। এ পদ্ধতি সফল করতে তারা যুক্তি, তর্ক, বিদ্রুপ, মিথ্যা অপবাদ-অভিযোগ সহ সকল রকম পদ্ধতি গ্রহণ করে। তাদের অপপ্রচার ছিল ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস (আকীদাহ্‌) এবং রাসুল (সা)-এর বিরুদ্ধে। কুরাইশরা মুহাম্মদ (সা)-কে নানারকম মিথ্যা অপবাদ এবং অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তাঁকে (সা) সমাজের মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তারা নানারকম পরিকল্পনা এবং কুটকৌশলের আশ্রয় নেয়।

    বিশেষ করে হজ্জের মৌসুমে কুরাইশরা ইসলামকে হীন প্রতিপন্ন করার জন্য খুবই সর্তকতার সাথে প্রস্তুতি নেয়। তারা ওয়ালিদ ইবন মুগীরার সাথে পরামর্শ করে মুহাম্মদ (সা) এর বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক শোক রচনা করে। এরপর তারা মক্কায় হজ্জের উদ্দেশ্যে আগত আরবদের মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে কী বলা যায় এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে। কেউ কেউ প্রস্তাবনা করে, তারা আগত আরবদের মাঝে প্রচার করবে যে মুহাম্মদ (সা) একজন কাহিন (গনক)। কিন্তু ওয়ালিদ ইবন মুগীরা এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয় এ যুক্তিতে যে, মুহাম্মদের বাণী একজন নির্বোধ কাহিনের অসাড় প্রলাপ কিংবা ছন্দময় আবৃত্তির বহু উর্ধে। কেউ কেউ প্রস্তাব করে যে, তারা বলবে মুহাম্মদ একজন কবি। কিন্তু তারা পদ্য রচনার সকল প্রকার এবং রূপ সম্পর্কে খুব ভালই অবহিত ছিল বলে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাবটিও বাতিল করে। অন্যেরা প্রস্তাব করে, তারা প্রচার করবে মুহাম্মদ জিনের আছরগ্রস্থ। কিন্তু, ওয়ালিদ ইবন মুগীরা এ প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় কারণ, মুহাম্মদ (সা) এর আচরন জিনের আছরগ্রস্থ মানুষের মতো নয়। অনেকে আবার মুহাম্মদ (সা)-কে যাদুকর হিসাবে অভিযুক্ত করার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আল-ওয়ালিদ এ প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় কারন মুহাম্মদ (সা) যাদুকরদের মতো গুপ্তবিদ্যার চর্চাও করে না, যেমন, সুপরিচিত গিরায় ফুক দেয়ার প্রথা।

    দীর্ঘ আলোচনার পর তারা একমত হয় যে, তারা প্রচার করবে মুহাম্মদ (সা) কথার মাধ্যমে মানুষকে যাদুগ্রস্থ করে (সিহর আল-বায়ান)। এরপর তারা আরবদের মুহাম্মদের ব্যাপারে সর্তক করার জন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে হজ্জ কাফেলাদের মধ্যে ঢুকে পরে। আল্লাহর রাসুল (সা)-কে তারা কথার যাদুকর হিসাবে মানুষের কাছে উপস্থাপিত করে এবং হজ্জ্ব যাত্রীদের তাঁর (সা) প্রচারিত বাণী শ্রবন করা থেকে বিরত থাকতে আহবান করে। তারা প্রচার করে, মুহাম্মদের প্রচারিত বাণী মানুষকে তার আপন ভাই, বাবা, মা এমনকি তার নিজ পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলে। বস্তুতঃ তাদের এ মিথ্যা অপপ্রচার তাদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়, এবং ইসলামী দাওয়াত ক্রমশ মানুষের অন্তর জয় করতে থাকে। এরপর কুরাইশরা আল নযর ইবন আল-হারিছকে মুহাম্মদ (সা) এর বিরুদ্ধে নিয়োজিত করে। যখনই তিনি (সা) জনগণকে দাওয়াত দিয়ে তাদের আল্লাহর কথা স্মরন করিয়ে দিতেন কিংবা পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর সতর্কবাণীর কথা বলতেন, তখনই নযর ইবন হারিছ সেখানে উপস্থিত হয়ে পারস্যের বাদশাহ্‌ ও তাদের ধর্মের গল্প বলতে শুরু করতো। সে দাবী করতো, “কোন দিক থেকে মুহাম্মদ গল্প বলায় আমার থেকে বেশী পারদর্শী? সে কি আমার মতোই পূর্ববর্তীদের কাহিনী বর্ণনা করে না?” এভাবে কুরাইশরা বিভিন্ন ধরনের গল্পকাহিনী জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে থাকে। তারা মক্কাবাসীদের বলে, আসলে মুহাম্মদ যা বলে এগুলো আল্লাহর বাণী নয়, বরং এগুলো জাবির নামে একজন খ্রীষ্টান তরুণের শেখানো কথা। এই অপপ্রচার চলতে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন,

    “আমরা তো জানি তারা বলে যে, তাকে শিক্ষা দেয় একজন মানুষ; তারা যার কথা বলে তার ভাষা তো আরবী নয়; কিন্তু কোরআনের ভাষা তো বিশুদ্ধ আরবী।” [সুরা নাহল: ১০৩]

    এভাবে সমগ্র আরব উপদ্বীপ জুড়ে চলতে থাকে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং মুসলিমদের উপর অত্যাচার। যখন কুরাইশরা শুনতে পেল কিছু মুসলিম জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হবার ভয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছে, সাথে সাথে তারা আবিসিনিয়াতে তাদের পক্ষ থেকে দু’জন চৌকষ দূত পাঠিয়ে দিল মুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। তাদের আশা ছিল আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাসী হয়ত মুসলিমদের তার দেশ থেকে বের করে দিয়ে মুসলিমদের মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য করবে। কুরাইশরা তাদের পক্ষ থেকে দূত হিসাবে ‘আমর ইবন আল ‘আস ইবন ওয়া’ইল এবং আব্দুলাহ্‌ ইবন রাবি’আহ্‌কে প্রেরণ করে। তারা আবিসিনিয়া গমনের পর বাদশাহ নাজ্জাসীর সভাসদবৃন্দকে উপঢৌকন প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম শরণার্থীদের তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে তাদের সহায়তা কামনা করে। তারা সভাসদবৃন্দকে বলে, “আমাদের জনগণের মধ্য হতে কিছু নির্বোধ লোক আপনাদের বাদশাহর আশ্রয়ে আছে। তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে আবার আপনাদের ধর্মও গ্রহণ করেনি, উপরন্তু তারা এমন এক ধর্মের দিকে মানুষকে আহবান জানাচ্ছে যে ধর্মের ব্যাপারে না আমরা কিছু জানি, না আপনারা জানেন। আমাদের সম্মানিত নেতারা তাদের ফিরিয়ে নেবার জন্য আমাদেরকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। সুতরাং, তাদের আমাদের হাতে তুলে দিন কারণ, নিজ সম্প্রদায়ের লোক হিসাবে তাদের ভুল-ভ্রান্তির ব্যাপারে আমাদেরই পরিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ ধারনা রয়েছে।” মুসলিমরা অনাকাঙ্খিত কিছু বলে ফেলবে এই ভয়ে কুরাইশদের প্রেরিত দূতেরা বার বার এটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছিল যেন, মুসলিম শরনার্থীরা কোনভাবেই বাদশাহর সাথে সাক্ষাৎ না করে। সভাসদবৃন্দ নাজ্জাসীর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং আশ্রয়প্রার্থী মুসলিমদের তাদের নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ফিরিয়ে দেবার আবেদন করে।

    সভাসদবৃন্দের আবেদন শোনার পর নাজ্জাসী আশ্রয়প্রার্থী মুসলিমদের তাঁর দরবারে হাজির হবার নির্দেশ দেন এবং তাদের নিকট হতে তাদের প্রচারিত আদর্শ শুনবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মুসলিমরা তাঁর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি বলেন,”আমার দ্বীন কিংবা অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ না করে তোমরা কোন দ্বীনের দিকে মানুষকে আহবান করছো?” এমতাবস্থায় জা’ফর ইবন আবি তালিব তাদের ইসলাম পূর্ববর্তী অজ্ঞতা এবং তাদের বর্তমান অবস্থার সাথে পূর্বের অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে নাজ্জাসীর প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বাদশাহকে বলেন,”আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাদের অত্যাচার করত। আমাদের উপর ক্ষমতাশীন থাকা অবস্থায় তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আপনার দেশে এসে আপনাকে অন্যদের উপর প্রাধান্য দিয়েছি, আমরা আশা রাখি যে যতদিন আমরা আপনার সাথে রয়েছি, ততদিন আমাদের সাথে অন্যায় আচরন করা হবে না। নাজ্জাশী বললেন, “তোমাদের রাসূল আলাহর নাযিলকৃত যে বাণী প্রচার করছে তার কিছু অংশ কি তোমরা আমাকে শোনাতে পারো?” জবাবে জা’ফর (রা) বললেন, হ্যাঁ, শোনাতে পারি। অতঃপর তিনি সুরা মারিয়মের প্রথম থেকে নিম্নোক্ত আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন যেখানে আল্লাহ বলেছেন,

    “অতঃপর মারিয়ম ঈঙ্গিতে তাঁর সন্তানকে দেখালো। তারা বললো যে, কোলের শিশুর সাথে আমরা কিভাবে কথা বলবো? সে [শিশুটি] বললো, আমি তো আল্লাহর দাস, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি আমাকে তাঁর অনুগ্রহভাজন করেছেন। যতদিন জীবিত থাকি আমাকে নামাজ ও যাকাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। এবং জননীর অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।” [সুরা মারিয়ম: ২৯-৩৩]

    কুরআন তিলওয়াত শুনে সভায় উপস্থিত পাদ্রীরা একযোগে বলে উঠলো, “এ তো সেই একই উৎস থেকে আগত যেখান থেকে এসেছে আমাদের প্রভু ঈসা মসীহ্‌র বাণী।” নাজ্জাশী বললেন,”সত্যিই, মুহাম্মদের বাণী এবং মুসার প্রচারিত বাণী একই উৎস থেকে আগত। তারপর, কুরাইশদের প্রেরিত দূতদ্বয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা এখন যেতে পার। আর আল্লাহর কসম আমি কখনই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেবো না, আর না আমি তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবো।” একথা শোনার পর মক্কা থেকে আগত দুতেরা রাজসভা থেকে বেরিয়ে আসল এবং তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ভিন্ন পথ খুঁজে বেড়াতে লাগল। পরদিন ‘আমর ইবন আল’আস পুনরায় নাজ্জাসীর কাছে গেল এবং বলল, “মুসলিমরা মারিয়ম পুত্র ঈসার নামে জঘন্য কথা বলে, আপনি তাদেরকে ডেকে পাঠান আর জিজ্ঞেস করুন।” তিনি মুসলিমদের ডেকে জিজ্ঞেস করায় জা’ফর বললেন,”আমরা মারিয়ম পুত্র সম্পর্কে তাই বলি যা আমাদের রাসুল (সা) আমাদের শিখিয়েছেন, তিনি (সা) বলেছেন, ঈসা মসীহতো আল্লাহর একজন বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল, তাঁর রুহ্‌ এবং তাঁরই কালিমা, যা তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ফুঁকে দিয়েছেন তাঁর সম্মানিত বান্দা কুমারী মারিয়মের মধ্যে।” নাজ্জাসী নীচু হয়ে একটি লাঠি তুলে নিয়ে মাটির উপর একটি সোজা দাগ দিয়ে বললেন, “তোমাদের দ্বীন আমাদের দ্বীনের মাঝে এই একটি রেখার পার্থক্য ছাড়া আর কিছুই নেই।” অতঃপর তিনি কুরাইশ দুতদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

    শেষ পর্যন্ত ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে কুরাইশদের সকল ষড়যন্ত্র, মিথ্যা অপপ্রচার সবই ব্যর্থ হয় এবং সকল মিথ্যা, অপবাদ, অপপ্রচার আর ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করে রাসূল (সা) প্রচারিত আল্লাহর মহান বাণী তার আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। এরপর কুরাইশরা মুসলিমদের পরাভূত করতে তাদের সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে, যেটা ছিল ‘বয়কট’। তারা সকল গোত্র প্রধানরা একত্রিত হয়ে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর পরিবারকে সামাজিক ভাবে বয়কট করার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এ লক্ষ্যে তারা একটি চুক্তিপত্র প্রণয়ন করে যে, বনু হাশিম এবং বনু আবদ আল মুত্তালিব-এর সাথে কেউ কোনও ধরনের লেন-দেন করবে না, তাদের গোত্রের মেয়েদের না কেউ বিয়ে করবে, না তাদের গোত্রে কেউ নিজের মেয়ে বিয়ে দেবে, না তাদের কাছে কেউ কোনও দ্রব্য বিক্রি করবে, না তাদের কাছ থেকে কেউ কিছু ক্রয় করবে। এ চুক্তির ব্যাপারে একমত হবার পর তারা চুক্তির শর্ত গুলো লিখে চুক্তিপত্রটি কাবার অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে রাখে যেন কেউ চুক্তি ভঙ্গ না করার সাহস করে। তারা ধারনা করে যে, তাদের লক্ষ্য অর্জনে এ পদ্ধতি অপপ্রচার বা নির্যাতনের চাইতে বেশী কার্যকরী হবে এবং এভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে।

    তিন বছর পর্যন্ত চলে কুরাইশদের এই বয়কট। পুরোটা সময় জুড়ে কুরাইশরা আশায় থাকে এবার হয়তো বনু হাশিম আর বনু আবদ আল মুত্তালিব মুহাম্মদকে ত্যাগ করে স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে। ফলশ্রুতিতে সঙ্গী-সাথীহীন মুহাম্মদ পরিণত হবে তাদেরই করুনার পাত্রে। তারা আরও ভাবতে থাকে, হয় তাদের আরোপিত এই বয়কট মুহাম্মদকে দাওয়াতী কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করবে, না হয় মুহাম্মদের আহবানে তাদের দ্বীনের অস্তিত্ব যে হুমকীর সম্মুখীন হয়েছে সেটা বন্ধ হবে। কিন্তু তাদের গৃহীত এ সমস্ত কৌশল মুহাম্মদ (সা)-কে করে তোলে আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী আর দাওয়াতী কাজ চালিয়ে নেবার জন্য সাহাবীদেরও করে পূর্ণ উদ্যমী। মক্কার ভিতরে বাইরে সর্বত্রই ইসলামের আহবান প্রচার এবং প্রসারে কুরাইশদের বয়কট সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হয়। বরং মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বয়কট করার সংবাদ মক্কার বাইরে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় আর এভাবে বিভিন্ন গোত্রের কাছে পৌঁছে যায় ইসলামের আহবান। এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপে ইসলাম একটি আলোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত হয়।

    যাই হোক, মুসলিমদের উপর কোনও রকম দয়া প্রদর্শন ছাড়াই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলতে থাকে এই বয়কট এবং কুরাইশরা চুক্তিবদ্ধ গোত্রের মানুষকে প্রতিটি শর্ত মানতে বাধ্য করে। ফলে, রাসূল (সা) এর পরিবার এবং সাহাবীরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয় এবং গুটি কয়েক সহানুভুতিশীল ব্যক্তির দেয়া নূন্যতম খাদ্যে দিন পার করতে থাকে। এই নির্মম কষ্টকর সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র পবিত্র মাস গুলোই ছিল তাদের জন্য তুলনামূলক ভাবে স্বস্তির সময়, যখন মুহাম্মদ (সা) কাবায় যেতেন, সেখানে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের পথে আহবান করতেন, তাদের দিতেন জান্নাতের সুসংবাদ আর সতর্ক করতেন জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে, তারপর ফিরে আসতেন পার্বত্য উপত্যকায়। এই সমস্ত ঘটনা প্রবাহ ধীরে ধীরে মুহাম্মদ (সা), তাঁর পরিবার এবং সাহাবীদের প্রতি মক্কাবাসীদের অন্তরকে বিগলিত করে। এদের কেউ কেউ মুহাম্মদ (সা) এর আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, আবার কেউ কেউ তাদের গোপনে খাবার সরবরাহ করতে থাকে। হিশাম ইবন ‘আমর নামক এক মক্কাবাসী রাতের অন্ধকারে উট বোঝাই করে খাবার নিয়ে যেত মুসলিমদের জন্য, তারপর পার্বত্য উপত্যকার অভ্যন্তরে যেখানে মুসলিমরা কতো সেখানে ঢুকিয়ে দিত তার উট। এভাবে মুসলিমরা তার সরবরাহ করা খাবার খেতো এবং উটটিও জবাই করে খেয়ে ফেলতো।

    বয়কট কার্যকর থাকাকালীন কষ্টকর এই তিনটি বছর মুসলিমরা অসম্ভব ধৈর্য্যের সাথে অতিবাহিত করে। মূলতঃ এই সময় তারা পার করে রুক্ষ, প্রস্তরময় একটি পথ, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তায়ালা তাদের পরীক্ষা হতে অব্যহতি দেন এবং শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা বয়কট প্রত্যাহার করে।

    কুরাইশদের মধ্য হতে জুহাইর ইবন আবি উমাইয়াহ, হিশাম ইবন ‘আমর, আল মুত’য়িম ইবন ‘আদি, আবু আল বাখতারি ইবন হিশাম এবং জামা’য়াহ ইবন আল আসওয়াদ নামে পাঁচজন তরুণ একত্রিত হয়। ঐ সময়ের অন্য অনেক কুরাইশদের মতো তারাও বয়কট এবং চুক্তিপত্রের ব্যাপারে তাদের বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত তারা অনৈতিক ভাবে মুহাম্মদ (সা) এবং তার সঙ্গী-সাথীদের বয়কটের চুক্তিপত্রটি বাতিলের ব্যাপারে একমত হয়।

    পরদিন জুহাইর কাবাগৃহকে সাতবার প্রদক্ষিন করার পর উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলে,”হে মক্কাবাসী, আমরা কি ভালো খাবো, ভালো কাপড় পরবো আর কোনও রকম ক্রয়-বিক্রয় না করতে পেরে বনু হাশিম গোত্রের লোকেরা কি ধ্বংস হয়ে যাবে? আলাহর কসম এই অন্যায় বয়কট বাতিল আর চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা না পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নেবো না।” খুব নিকটেই ছিল আবু জাহল, সে ক্রোধান্বিত হয়ে বলল, “তুমি মিথ্যাবাদী, আল্লাহর কসম, এই চুক্তিপত্র আমি কখনোই ছিড়ঁবো না।” এই পর্যায়ে মক্কাবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বাকী চারজন জুমা’য়াহ, আবু আল বাখতারি, আল মুত’য়িম এবং হিশাম জুহাইরের সমর্থনে চিৎকার করে উঠে। আবু জাহল তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে পুরো ব্যাপারটিই আসলে পূর্ব পরিকল্পিত এবং আরও খারাপ কিছু ঘটার আশংকায় পিছু হটে যায়। যখন আল মুত’য়িম চুক্তিপত্রটি ছিঁড়ে ফেলার জন্য কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন তারা দেখে “তোমার নামে, হে আল্লাহ” এ বাক্যটি ছাড়া বাকী সবটুকু ইতিমধ্যেই পোকার আক্রমনে নষ্ট হয়ে গেছে।

    শেষ পর্যন্ত আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীরা পুনরায় মক্কায় ফিরে আসে এবং ইসলামী দাওয়াতের পথ রোধ করার কুরাইশদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মক্কায় মুসলিমদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। কুরাইশরা সব রকম উপায়ে ক্রমাগত চেষ্টা করেছিলো মুসলিম এবং তাদের দ্বীনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাড়াঁতে। তারা চেষ্টা করেছিলো মুহাম্মদ (সা) কে দ্বীন প্রচার থেকে বিরত রাখার, কিন্তু সব রকম বাঁধা বিপত্তি সত্ত্বেও আল্লাহর সাহায্যে চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ইসলামী দাওয়াতের আহবান।  

  • শাইখ তাকী উদ্দিন আন-নাবহানীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

    শাইখ তাকী উদ্দিন আন-নাবহানীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

    এটা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লার ইচ্ছা যে আমরা মহাকালের একেবারে শেষ সময় অতিবাহিত করছি। এটা এমন এক যুগ যখন কুফরের কালো রাত এমনভাবে আমাদের ঘিরে রেখেছে যে, যেকোন সৎ লোক শুধুমাত্র পদে পদে ধাক্কা খাবে। আল্লাহ্‌’র জমিনে আল্লাহ্‌র আইন আজকে নির্বাসিত, অথচ অপরাধ ও শোষণের অবাধ চর্চা সবজায়গায়। কিন্তু, ইনশাআল্লাহ্‌, এই কালো রাত একদিন শেষ হবে, খিলাফাহ’র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন দিনের সূর্য উদয় হবে, সেই সাথে যারা নির্ঘুমভাবে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাদের জন্য সুসংবাদ নিয়ে আসবে। এই খিলাফাহ’র ডাক, যা হারিয়ে গিয়েছিল, তা এখন যেকোন মানুষের মুখে, এই খিলাফাহ’র ডাকই এখন নতুন করে উদয় হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, খিলাফাহ’র পতাকার বাহকেরা তারাই যারা এই রাষ্ট্র চালাতে সক্ষম। এরাই হল তারা যারা খুব বেশী সমর্থক পায়নি, এমন কি কাছের মানুষদের থেকেও, কিন্তু ঠিকই তাদের শত্রুরা তাদের অধ্যাবসায় ও ধৈর্যের প্রশংসা করেছে। আর এখন সময় এসেছে খিলাফাহ’র সূর্য সকল অন্ধকার ছিন্ন করার এবং একটি উজ্জ্বল ভোরের আলো নিয়ে আসার।

    আসলে, প্রত্যেক পথে মাইলফলক থাকে, ওই পথে চলতে গেলে যে কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রথম সময়কার দাওয়া’র সাথে তাদের প্রথমদিকের সময়ের দাওয়া মিলিয়ে নিতে পারবে, যখন তাঁরা সন্তুষ্ট হয়ে এটা দেখে যে – তাঁদের কাজের পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাজের পদ্ধতির মত, তখন আসলে তাঁরা আশা করতেই পারে যে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁরা তাই অর্জন করতে যাচ্ছে যা রাসূলুল্লাহ (সা) অর্জন করতে পেরেছেন – তথা ইসলামি রাষ্ট্র, তাঁরা আশা করতেই পারে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর দেওয়া ওয়াদা (খুলাফায়ে রাশিদা) নবুওয়তের আদলের খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদেরকে কবুল করবেন।

    এ প্রবন্ধটি শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি’র জীবনের বৈচিত্রময়তা তুলে ধরার জন্য একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যিনি খিলাফত প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের দলের প্রতিষ্ঠাতা আমীর, যে আন্দোলনের নেতৃত্বে আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি।

    শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি:

    শাইখ তাকি উদ্দিন বিন ইব্রাহিম বিন মুস্তাফা বিন ইসমাইল বিন ইউসুফ আন-নাবহানি ‘আন-নাবহান’ গোত্রের উত্তর ফিলিস্তিনের ‘আজ্জাম’ নামক গ্রামে ১৯১৪ (১৩৩২ হিজরী) সালে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পরিবার জ্ঞান ও তাকওয়ার জন্য পরিচিত ছিল। তাঁর বাবা শাইখ ইব্রাহিম একজন আইনজ্ঞ ও মা’আরিফ মন্ত্রনালয়ের (শিক্ষা ও কলা) ‘উলুম–ই-শরই’ এ বিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর মা ও ‘উলুম–ই-শরই’ এ বিজ্ঞ ছিলেন যা তিনি তাঁর বাবা ইউসুফ আন-নাবাহানি থেকে অর্জন করেছিলেন।

    তাঁর নানা শাইখ ইউসুফ নাবহানি সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী যে তথ্য পাওয়া যায় তা অনেকটা এরকম – “শাইখ ইউসুফ বিন ইসমাইল বিন ইউসুফ বিন হাসসান বিন মোহাম্মাদ আল নাবাহানি আল শাফে’য়ী – ওরফে আবু আল মাহাসিন একজন কবি, সুফি এবং একজন জ্ঞানি ব্যাক্তি ছিলেন। তাঁকে তৎকালীন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিচারক হিসেবে গন্য করা হত। তিনি নাবলুস এলাকার জেনিন শহরের বিচারক হিসেবে দায়িত্বপালন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইস্তানবুল শহরে চলে যান যেখানে মসুল এলাকার কাভি সান্দাক শহরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অতঃপর তিনি আজকিয়া ও আল-কুদস এর আদালতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। তারপর তিনি বেইরুতের আদালতের দায়িত্ব পান। তিনি ৪৮টি বই লিখেন।

    শাইখ তাকিউদ্দিন আন নাবাহানি’র ইসলামি ব্যাক্তিত্বের পিছনে তাঁর পরিবারের ভুমিকা অনন্য। তাই, তিনি মাত্র ১৩ বছরে কোরআন হিফজ করেন। তিনি তাঁর নানার জ্ঞান দ্বারা অতিব অনুপ্রানিত হন এবং তিনি তাঁর নানার জ্ঞানের ভান্ডার থেকে যত বেশী সম্ভব লাভবান হোন। প্রথম থেকেই তাঁর নানা উসমানী খিলাফতের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক দলের অনুসুচনা করেছিলেন তা থেকে তিনি রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন সচেতনতা অর্জন করেন। শাইখ তাকি উদ্দিন তাঁর নানা কর্তৃক আয়োজিত শরয়ী বিধিবিধান সংক্রান্ত আলোচনা/বিতর্ক থেকে অনেক উপক্রিত হোন। তিনি তখন থেকেই তাঁর নানার চোখে অন্যরকম ভাবে ধরা পড়েন এবং তাঁর নানা তাঁর বাবকে রাজি করান উলুম-ই-শরঈ অধ্যয়নের জন্য তাঁকে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে।

    জ্ঞান অর্জন:

    ১৯২৮ সালে শেখ আল আজহার ইউনিভার্সিটিতে (জামেয়াতুল আজহার) অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হোন এবং একই সালে বৃত্তিসহকারে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। তাঁকে সম্মান সূচক ‘শুহাদা আল ঘুরবা’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। তারপর তিনি আল আজহার ইউনিভার্সিটির সংশ্লিষ্ট একটি বিজ্ঞান-কলেজে ভর্তি হোন। তাঁর নানার বিভিন্ন ছাত্র যেমন শাইখ মোহাম্মাদ আল খিজার (র) এর পাঠদানে সর্বদা অংশগ্রহন করতেন। তৎকালীন সময়ে ছাত্রদের জন্য এ ধরণের পাঠ-চক্রে অংশগ্রহণ করার নিয়ম প্রচলিত ছিল, যার কারণে শাইখ তাকি উদ্দিন বিজ্ঞান-কলেজের ছাত্র হওয়ার পরও ইসলামি পাঠ-চক্রে অংশগ্রহন করে যেতেন। তাঁর সহপাঠী এবং শিক্ষকরাও ঈর্ষা করতেন তাঁর গভীর চিন্তা, মতামত এবং কায়রো বা অন্যান্য ইসলামি ভু-খন্ডে বিতর্কের জন্য।

    শাইখ যেসব ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন – আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারমেডিয়েট, আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে ‘শাহাদা তাল ঘুরবা’, কায়রো থেকে আরবি ভাষার ও সাহিত্যে ব্যাচালর ডিগ্রি (গ্র্যাজুয়েশান), আল আজহার ইউনিভার্সিটির সাথে সংশ্লিষ্ট শরয়ী আদালত সম্পর্কিত ইন্সটিটিউট ‘মা’হাদ আল ‘আলা’ থেকে ‘দ্বার আল’ উলুম’ ডিগ্রি, ‘শাহাদা তাল ‘আলামিয়াহ’ – মাস্টার্স ডিগ্রি (পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান) ১৯৩২ সালে।

    শাইখ তাকি’র অফিস সমূহ:

    ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত মা’আরিফ মন্ত্রনালয়ের শরীয়া শিক্ষা বিভাগে কাজ করেন। পরবর্তীতে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং তাঁকে হাইফা নগরীর শরীয়া কোর্টের এটর্নি করে স্তানান্তর করা হয়। অতঃপর ১৯৪৮ সালে তিনি রামাল্লাহ নগরীর আদালতের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ইহুদিদের দ্বারা ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখলের পর তিনি সিরিয়াতে চলে যান কিন্তু একই বছরে তিনি আবার ফিলিস্তিনে ফেরত আসেন এবং আল-কুদস এর শরীয়া কোর্টের বিচারক হিসেবে চাকরি করেন। তারপর তিনি ১৯৫০ সালে শরীয়া হাই কোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। অতঃপর তিনি বিচারক এর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ওমানের উলুম-ই-ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষকতা বেছে নেন। শাইখ ছিলেন জ্ঞানের সাগর এবং প্রায় জ্ঞানের প্রায় সব শাখায় পান্ডিত্যের অধিকারী।

    শাইখের লেখা বইয়ের একটি লিস্ট নিচে দেওয়া হল:

    নিযামুল ইসলাম
    আত-তাকাত্তুল আল-হিজবী
    মাফাহীম
    ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
    ইসলামী সামাজিক ব্যবস্থা
    ইসলামী শাসন ব্যবস্থা
    ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান
    সংবিধানের সূচনা (সারসংক্ষেপ)
    ইসলামী ব্যাক্তিত্ব
    রাজনৈতিক চিন্তা
    উষ্ণ আহবান
    আল-খিলাফাহ
    চিন্তা
    মনের উপস্থিতি (প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব)
    সমাজে কর্তৃত্ব স্থাপন
    যাত্রা শুরুর স্থান
    লিস্লাহ-এ-মিসর
    আল ইত্তিফাকিয়াত আস সানিয়া আল মাস্তিয়া আল সুরইয়া ওয়াল ইয়ামনিয়া
    হাল কাদিহ ফালাস্তিন ‘আলা তারীকাতিল আমরিকিয়া ওয়াল ইংলিজিয়া
    নাজরিয়া আল ফারাঘ আল সিয়াসি হাল মাসরো’ ইজান হাওয়ার

    এছাড়াও তাঁর লেখা শত শত বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুস্তিকা আছে।

    যখন তাঁর বইগুলো নিষিদ্ধ তখন তিনি তার দলের অন্যান্য সদস্যের নামে যেসব বই প্রকাশ করেন তা হল:

    অর্থনৈতিক নীতি
    মারক্সিস্ট কমিউনিসম এর জবাব
    খিলাফাহ যেভাবে ধংস হল
    ইসলামে সাক্ষ্য-প্রমানাদির (বিচারসংক্রান্ত) নিয়মকানুন
    ইসলামে শাস্তি ব্যবস্থা
    নামাজের নিয়মসমুহ
    ইসলামী চিন্তা

    এবং দল প্রতিষ্ঠার আগে তিনি দু’টো বই লিখেছিলেন:

    রিসালাতুল আরব
    আনকাজ ফালাস্তিন

    শাইখের চরিত্র:

    জুহাইর কাহালা (ইসলামি সাইন্স কলেজের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত) কলেজের একজন চাকুরীজীবী ছিলেন যখন শাইখ একই কলেজে চাকরি করেন। শাইখ তাকি সম্পর্কে তিনি বলেন, “শাইখ একজন বুদ্ধিমান, ভদ্র, পরিষ্কার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তাঁর ব্যাক্তিত্ব ছিল আন্তরিক, মহৎ, প্রভাবসম্পন্ন। মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্রে ইহুদি-বসতি’র উপস্থিতি তাঁকে প্রচন্ডভাবে ব্যাথিত করে এবং তাঁকে উদগ্রীব করে তোলে”।

    তিনি মাঝারি উচ্চতার, শক্ত গড়নের, কর্মঠ, প্রাণবন্ত এবং স্পষ্টভাষী বিতার্কিক। তিনি উদাহরনসহ তাঁর যুক্তিগুলো তুলে ধরতেন। তিনি যা হক (সত্য) বলে বিশ্বাস করতেন তাঁর সাথে বিন্দু পরিমাণ দেন-দরবার করতেন না। তাঁর দাড়ি মাঝারি লম্বা ছিল যাতে আধাপাকা চুল ছিল। তাঁর ব্যাক্তিত্ব সম্ভ্রান্ত ছিল এবং তাঁর বক্তব্য অন্যকে প্রভাবিত করত। তাঁর যুক্তি অন্যকে সন্তুষ্ট করত। তিনি লক্ষ্য ছাড়া আন্দোলন, ব্যাক্তিগত আক্রমণ ও উম্মাহ’র স্বার্থ থেকে বিচ্যুত হওয়াকে খুব অপছন্দ করতেন। তিনি মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনে মগ্ন হয়ে যাওয়াকে অবজ্ঞা করতেন। তিনি যেন রাসূলাল্লাহ (সা) এর একটি হাদীসের ঠিক জীবন্ত প্রতিরুপ, যার অর্থ অনেকটা এরকম, “যে ব্যাক্তি মুসলিম উম্মাহ’র স্বার্থে নিজেকে নিযুক্ত করে না, সে তাদের মধ্যে থেকে নয়”। তিনি এই হাদীসটি বার বার ব্যাবহার করতেন এবং দলীল হিসেবে উপস্থাপন করতেন।

    শাইখ তাকি উদ্দিন যে সকল দল বা আন্দোলন ৪র্থ হিজরির পর আবির্ভাব হয়েছিল সেগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছিলেন, এর পিছনে কঠোর পরিশ্রম দিয়েছিলেন। তিনি তাদের কায়দা-কৌশল, চিন্তা-মতবাদ, সমাজে বিস্তার লাভ ও তাদের ব্যার্থতা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি যেহেতু চিন্তা করেছিলেন খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা রাজনৈতিক দল থাকা আত্যাবশ্যকীয়, তিনি এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দল গুলোকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। মোস্তফা কামাল ‘আতা-তুর্ক’ এর হাতে যখন খিলাফাহ ধ্বংস হওয়ার পর বহু ইসলামী আন্দোলন থাকার পরও মুসলিমরা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ব্যার্থ হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভু-খন্ড ইসরাইলিদের দ্বারা দখল হওয়া এবং ব্রিটিশ সরকারের মদদপুষ্ট জর্ডান, ইরাক ও ইজিপ্ট সরকারের সহায়তায় ইহুদি শক্তির সামনে সমগ্র আরবের নিঃসহায় অবস্থা তাঁর উচ্ছ্বাসকে প্রভাবিত করে। তাই তিনি মুসলিমদের পুনঃর্জাগরণের উৎসগুলো খুঁজে বের করা শুরু করেন। প্রথমেই তিনি উম্মাহ’র পুনর্জাগরণ এর ব্যাপারটি অবলম্বন করেন এবং ২টো বই লিখেন: ১) রিসালাতুল আরব; ২) আনকাজ ফালাস্তিন। উভয় বই ১৯৫০ সালে প্রকাশ হয়। বইদুটো শুধুমাত্র চিন্তা, ‘আকীদা, উম্মাহ’র আসল বক্তব্য বা ইসলামের মূল বানী, এবং বইগুলোতে বলা হয় – ইসলামি একমাত্র ভিত্তি যার উপর আরবগণ ভর করে পুনরুজ্জীবিত হবে। আরব জাতীয়তাবাদীদের বানী হতে শেখ এর বানী ভিন্ন ছিল। আরব জাতীয়তাবাদীদের প্রচারিত বক্তব্য উম্মাহের সাথে তথা ইসলামের মূল বক্তব্য থেকে শুধু দূরত্বই বাড়িয়ে দিয়েছে, বরং উম্মাহকে পাশ্চাত্য চিন্তা-চেতনা দিয়ে ব্যস্ত রেখেছে যা ইসলামী ‘আকীদা হতে ভিন্ন। অতঃপর তিনি আরব-জাতীয়তাবাদের চিন্তা-মতবাদ নিয়ে পড়ালেখা করেন এবং তাঁর কাছে যেসকল প্রস্তাব আসত তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করত কিন্তু সেগুলো কখনও তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

    তিনি কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি যেসকল আলেমদের সাথে পরিচয় আছে বা দেখা হয়েছে তাদের সকলের সাথে যোগাযোগ করেছেন। মুসলিম উম্মাহকে পুনরজ্জীবিত করতে এবং উম্মাহ’র পূর্বের গৌরব ফিরিয়ে নিতে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার মতামত তাঁদের সকলের কাছে তুলে ধরেন। এজন্য তিনি সমগ্র ফিলিস্তিন ঘুরে বেড়িয়েছেন খ্যাতিমান আলেমদের এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে তাঁর চিন্তা-মত প্রকাশ করতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি অনেক সেমিনার আয়োজন করতেন, আলেমদের সম্মেলন করতেন। এ সেমিনারগুলোতে তিনি উম্মাহর পুনর্জাগরণের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে আলেমদের সাথে আলোচনা (বা বিতর্ক) করতেন এবং বলতেন যে তাঁরা ভুল পথে হাঁটছেন আর তাঁদের সকল কষ্ট বৃথা যাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাদের সাথে বিতর্ক করতেন তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, জাতীয়তাবাদি বা ইসলামি দলের কর্মকর্তাদের সাথে। তিনি আল আকসা মসজিদ, আল খলীল মসজিদ সহ বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও বিভিন্ন দিবসে আলোচনা করতেন। তিনি প্রায়ই ‘আরব লীগ’ এর বাস্তবতা দেখিয়ে উল্লেখ করতেন যে এটি একটি পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের ফল এবং অনেক পাশ্চাত্য হাতিয়ারের অন্যতম যা দ্বারা মুসলিম ভুখন্ডে তাঁদের আধিপত্য বজায় রাখে। শাইখ পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতেন এবং মুসলিম ও ইসলাম বিরোধি নীল-নকশা উম্মাহ’র সামনে তুলে ধরতেন। তিনি মুসলিমদের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে দিতেন এবং তাঁদের আহবান জানাতেন রাজনৈতিক দল গঠন করতে যার ভিত্তি হবে একমাত্র ইসলাম।

    শাইখ তাকিউদ্দিন ‘প্রতিনিধিগণের সভা’র (যা শুধুমাত্র উপদেষ্টামণ্ডলীর কমিটিই ছিল) নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ধ্যান-ধারনা বা মতামত, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ইসলামী দল গঠনের ব্যাপারে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ইসলামকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা ইত্যাদি কারণে সরকার তাঁর প্রতিকূলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করে।

    কিন্তু এসবের সত্ত্বেও না তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যান, না তিনি দমে গেছেন, বরং তিনি আলোচনা বা বিতর্ক চালিয়ে গেছেন। একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য প্রখ্যাত আলেম, বিচারক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করার মাধ্যমে তিনি অচিরেই সাফল্যের মুখ দেখেন। অতঃপর তিনি এসব সমাজের উচুমাপের লোকদের কাছে একটি কাঠামো ও দল-এর মতবাদ উপস্থাপন করতেন। কিছু আলেম ও কিছু চিন্তাবিদ তাঁর মতবাদের সাথে একমত পোশন করেন এবং তাঁদের সম্মতি প্রকাশ করেন, এভাবে দল প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা একেবারে শীর্ষে পৌছে।

    আল-কুদস, রহমতময় নগরিতেই তার দল এর প্রতিষ্ঠার ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন হয়েছিল, যেখানে শাইখ সুপ্রীম কোর্টে কর্মরত ছিলেন। সেসময়, তিনি বিভিন্ন আলেমদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন শুরু করেন যেমন: কালকিলা শহরের শেখ আহমাদ দা’ওর, ইজিপ্ট এর সায়্যাদান নিমর, রামাল্লাহ শহরের দাউদ হামদান, আল-খলীল শহরের শেখ আব্দুল-কাদিম জাল্লুম, নাবলুসের আদিল, ঘানিম আব্দু, মুনির শাকির, শেখ আ’সাদ বেওয়িয প্রমুখ।

    শুরুতে, প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে শুধু প্রয়োজনুসারে মিটিংগুলো সংঘঠিত হত। বেশিরভাগক্ষেত্রে আল-কুদস এবং আল-খলীল শহরে মিটিংগুলো আয়োজিত হত যার বিষয়বস্তু ছিল মানুষদের দলের চিন্তার দিকে আহবান জানানো। বিতর্কের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ’র গৌরব-উজ্জ্বল ফিরিয়ে আনতে ইসলামি প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ না এ মানুষগুলো একটা রাজনৈতিক দল গঠন করতে শপথ করে।

    ১৭ই নভেম্বর ১৯৫২ সালে, দল এর ৫ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য জর্ডানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে বিধিমতাবেক ‘নো অবজেকসান সার্টিফিকেট’ এর জন্য আবেদন জানান। এই ৫ জন সদস্য হলেন: ১) শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি – নেতা, ২) দাউদ হামদান – উপনেতা ও সচিব, ৩) ঘানিম আব্দুহ – অর্থ সম্পাদক, ৪) আদিল আল নাবলুসি – সদস্য ও ৫) মুনির শাকির – সদস্য। পরবর্তীতে একটি দল গঠনের জন্য তারা অটোমান আইন এর সকল আচরনবিধি সম্পন্ন করেন। দলের এর প্রধান কার্যালয় আল-কুদস এ রাখা হয় এবং যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করে সব অটোমান আইন অনুযায়ী বৈধতা পায়।

    দলের “মৌলিক গঠনতন্ত্র ও তা প্রয়োগের শর্ত” এর দৈনিক আল-সারিহ পত্রিকার ইস্যু ১৭৬ (তারিখ: ১৪ই মার্চ ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে জুমাদ আল আউওাল ১৩৭২ হিজরি) এর প্রকাশনায় একে একটি বৈধ দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর মাধ্যমে তৎকালীন অটোমান আইনে দল তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অধিকার পায়।

    কিন্তু, সরকার ৫ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় এবং তাঁদের ৪ জন কে গ্রেপ্তারের পর জেরা শুরু করে। ২৩শে মার্চ ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই রজব ১৩৭২ হিজরি সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে ঘোষণা করে যে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল এবং এর সদস্যদেরকে সমস্ত কর্মকান্ড বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হল। ১লা এপ্রিলে আল-কুদস এর কার্জ্যালয়ের সকল পোস্টার ও ব্যানার তুলে নেওয়া হয় – সরকারের নির্দেশ অনুসারে।

    যাইহোক, শাইখ তাকি এ ‘নিষিদ্ধ’ কে কোন গুরুত্ব দেয়নি বরং তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যান। তিনি এর প্রচারনার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন যার জন্য এর জন্ম। দাউদ হামদান ও নিমর মিসরি ১৯৫৬ সালে দলের নেতৃত্ব থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নেন, তাঁদের পরিবর্তে শাইখ আব্দুল কাদীম জাল্লুম ও শাইখ আহমাদ দা’উর এর তাঁদের আসনে বসেন। এ প্রখ্যাত আলেমদ্বয় পরবর্তীতে এর নেতৃত্বের হাল ধরেন এবং তাঁদের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে পালন করেন।

    ইসলামী জীবন-ব্যাবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আল-আকসা মসজিদের জামাত আদায় করার স্থানে এ দল মানুষদের পাঠচক্রের আয়োজন শুরু করে। তাঁদের মনোমুগ্ধকর কার্যক্রমের জন্য সরকার সস্তা চাল খেলতে শুরু করে যেন দলটি কখনো শক্তিশালী সংগঠনে রুপ না নেয়। ১৯৫৩ সালের শেষ দিকে, শাইখ তাকি এহেন পরিস্থিতিতে তাঁর স্থান পরিবর্তন করেন।

    ১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে শেখ তাকি সিরিয়াতে পাড়ি জমান, সেখানে সিরিয়ান সরকার দ্বারা গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে লেবাননে পাঠিয়ে দেন কিন্তু লেবানন সরকারও তাঁকে দেশে ঢুকতে বাঁধা দেয়। আল-হারিরের থানার অফিসার ইন চার্জ কে তিনি অনুরোধ করেন তাঁর বন্ধুকে একটি ফোন-কল করার জন্য। অফিসার তাঁকে কল করতে দেয়। তিনি তাঁর বন্ধু মুফতি শেখ হাসসান আল ‘আলা কে ফোন-কল করেন এবং ঘটনা বর্ণনা করেন। শেখ আল ‘আলা সাথে সাথে পদক্ষেপ গ্রহন করেন এবং অফিসার কে ধমক দেন এই বলে যে যদি তিনি শাইখ তাকি কে লেবাননে ঢুকতে না দেন তাহলে তিনি প্রচারনা শুরু করবেন যে লেবাননের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার একজন অন্যদেশের বহিষ্কৃত আলেমকে দেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। লেবানন কর্তৃপক্ষ এটাকে হুমকি হিসেবে নেয় এবং শাইখ তাকিকে লেবাননে প্রবেশ করতে দেন।

    শাইখ তাকি লেবাননে আসার পর তাঁর চিন্তা-মতবাদ প্রচারণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তেমন কোন বাঁধার সম্মুখিন হননি। যখন লেবানন সরকার তাঁর চিন্তা-ধারা’র আসন্ন বিপদকে আঁচ করতে পারলো, তখন শাইখ এর প্রতি কড়াকড়ি আরোপ শুরু করলো। তাই শাইখ বেইরুত থেকে ত্রিপোলিতে চলে যান। শাইখের কাছের বন্ধুদের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি তখন তাঁর সময়ের বেশির ভাগ সময় পড়ালেখায় ব্যয় করতেন। তিনি রেডিও’র মাধ্যমে বিশ্বের খবর নিতেন এবং চমৎকার রাজনৈতিক পর্যালোচনা তৈরি করতেন। তিনি তাঁর নাম ‘তাকি’ অর্থাৎ ‘ধার্মিক’ এর মতই ধার্মিক ছিলেন। তিনি সর্বদা নিজের জিহবা সংযত রাখতেন, চোখ নামিয়ে রাখতেন। তাঁকে কখনও কোন মুসলিমকে অমার্জিত কথা বলতে শোনা যায়নি, কাউকে অপমানিতও করেননি, এমনকি যেসব দা’ইয়ি তাঁর সাথে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করতেন।

    ইরাকে তিনি ‘নুসরাহ’র (সামরিক সমর্থন) প্রতি বেশী নজর দেন। এজন্য তিনি নিজে শেখ আব্দুল কাদিম জাল্লুম এর সাথে বেশ কয়েকবার ইরাকে যান কারণ সেখানে আব্দুল সালাম আরিফ এর মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিত্ব ছিল। ইরাকে তাঁর অনেকগুলো যাত্রার শেষটিতে তিনি গ্রেপ্তার হোন এবং প্রচন্ডভাবে প্রহৃত হোন, শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করা হয়। কিন্তু শাইখের জেরাকারী তাঁর কাছ থেকে কোন তথ্য বের করতে ব্যর্থ হয়। তিনি শুধু এ কথাই বারবার ব্যক্ত করতে থাকেন যে, “একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি চিকিৎসার খোঁজে”। আসলে তিনি ইরাকে গিয়েছিলেন পিছিয়ে পড়া উম্মাহকে পুনর্জাগরণ করতে। ইরাকি কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছ থেকে কোন তথ্য না পেয়ে তাঁকে প্রচন্ডভাবে প্রহার করে ও তাঁর হাত ভেঙ্গে দেয় এবং তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেয়, তখন তাঁর সমস্ত শরীর প্রহারের কারণে রক্তে রঞ্জিত ছিল। তিনি যখনই ইরাকের সীমানা অতিক্রম করলেন, জর্ডানের গোয়েন্দা সংস্থা ইরাকের গোয়েন্দা সংস্থাকে অভিত করলেন যে তিনিই ছিলেন শাইখ তাকি উদ্দিন যাকে ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থা হন্য হয়ে খুজছিলো। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, সময়টা তাঁদের পক্ষে ছিল না, বরং শাইখ ততক্ষণে অনেক দূর পাড়ি দিয়েছেন।

    খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ অটল ছিলেন, তিনি যখন মৃত্যু পথযাত্রী তখন তিনি তাঁর আকাঙ্খিত লক্ষ্যে প্রায় পৌছে যাচ্ছিলেন।

    উম্মাহ এ শাইখকে শেষ বিদায় জানায় শনিবার, ফজরের ওয়াক্তে, ১লা মহররম ১৩৯৮, ১১ই ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে। বস্তুত, তিনি ছিলেন এক মহান নেতা, জ্ঞানের সমুদ্র, সমসাময়িক কালের অন্যতম বিচারক, ইসলামি চিন্তার পুনর্জাগরক, বিংশ শতাব্দির শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, সত্যিকারের মুজতাহিদ এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আলেম। বেইরুতের আল-অযায়ি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। শাইখ তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ও আত্মত্যাগের ফলাফল নিজ জীবনে ভোগ করতে পারেননি। তিনি খিলাফত রাষ্ট্র দেখে যেতে পারেননি যার জন্য দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর উত্তরসূরি, তাঁর সহকর্মী, বিখ্যাত আলেম শাইখ আব্দল কাদীম জাল্লুমের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গেছেন। যদিও শাইখ তাকি খিলাফত রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা ফলাফলে রুপ নেয় ও দল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর মতবাদ সমগ্র বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা পায়। দশ মিলিয়নের মত মানুষ তাঁর মতবাদ গ্রহণ করেছে এবং তাঁর দ্বারা প্রশিক্ষিত ব্যাক্তি সমগ্র বিশ্বে পৌছে যায়। এমনকি আজ যারা শাইখ তাকির মতবাদ গ্রহণ করেছে ও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছে তাঁদের দ্বারা বিশ্বের বিভিন্ন জালেম শাসকের কারাগার আজ পরিপূর্ণ।

    আল্লাহ শাইখের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন, দুনিয়াতে এর পূর্ণ সফলতা দান করুন, তার উপর রহম করুন ও তাকে সর্বোচ্চ জান্নাত দান করুন। আমীন।
  • টিকফা চুক্তি: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক দাসত্বের কৌশলপত্র

    টিকফা চুক্তি: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক দাসত্বের কৌশলপত্র

    গত ১৭ জুন, ২০১৩ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রী পরিষদ সভায় টিকফা চুক্তির খসড়া অনুমোদন হয়। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দাবি করেন- “এ চুক্তির কারণে আমেরিকা আর একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেনা”। যদিও দুই সরকারের কোনো এক পক্ষ এ চুক্তির কোনো ধারা উপধারা বিস্তারিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি শুধুমাত্র কিছু অস্পষ্ট বিবৃতি দেয়া ছাড়া, যেমন: ‘বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তি সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিবে’, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি একটি বিরাট মাইলফলক’ এবং আরো অনেক কিছু। তাই এ চুক্তির বিষয়বস্তু যা প্রকাশিত হয়েছে তার গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। এর জন্য আমরা সাহায্য নিব, টিকফার খসড়া, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে আমেরিকার টিকফা চুক্তির অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের সাথে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এখানে বলে রাখা ভালো ভারত ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টিকফা চুক্তি করেনি। যেহেতু এটি একটি অসম চুক্তি তাই এ চুক্তির আড়ালে আমেরিকার লুকায়িত কর্মপরিকল্পনা এবং এর পরিণতি কী হবে তা এখানে তুলে ধরব।

    বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার (Intellectual Property Rights):

    এ চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ IPR এর নিয়ম মেনে চলতে হবে। যদিও চুক্তিতে উভয় পক্ষের মেনে চলার কথা বলা হয়েছে তবে এটি সত্য বাংলাদেশের মত দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশের নিজ নামে কোনো প্যাটেন্ট নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এই IPR নিয়ম এমনভাবে করে রেখেছে যে সবচাইতে বেশি অর্থ পরিশোধ করবে সেই প্যাটেন্ট পাবে। এতে চুক্তির অন্য পক্ষই সুবিধাটা পাবে।

    কৃষি:

    এই প্যাটেন্ট স্বত্ব আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও দুর্লভ পণ্যের প্যাটেন্ট করে রেখেছে। যার পরবর্তী উৎপাদন, বন্টন ও সংরক্ষণের জন্য আমেরিকার নিকট বিপুল অংকের রয়্যালটি, কপিরাইট ও লাইসেন্স ফি দিতে হবে। এ চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের কৃষি, ফারমাসিউটিকেল, তথ্য প্রযুক্তি খাত ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। 

    প্যাটেন্ট আইন প্রয়োগে আমাদের কৃষি ও প্রাণীজগতের জন্য সংকট বয়ে আনবে। বাংলাদেশ সহ অনেক দেশের প্রাণী ও নানাজাতের উদ্ভিদ বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা প্যাটেন্ট করা। আরা এর বাস্তবায়নে কৃষক বীজ উৎপাদন, স্তূপকরণ, সংরক্ষণ করতে দেয়া হবেনা। কৃষিজাত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে ও দেশকে খাদ্য সংকটের মুখোমুখি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাটেন্ট করা কৃষি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কৃষিতে ভর্তুকি কমাতে বাধ্য করবে। তাই এ প্যাটেন্ট আইন আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিকে করবে সম্পদশালী আর এ দেশের কৃষকদের করবে সর্বহারা। 

    সেবা খাত:

    এই চুক্তি আমাদের অর্থনীতির বৃহত্তম অংশ সেবা খাতের উপর বিরূপ প্রভাবিত ফেলবে। যেখানে আমেরিকার মতো একটি উন্নত অর্থনীতির রয়েছে শক্তিশালী সেবা খাত। টিকফা চুক্তি একবার স্বাক্ষরিত হলে মার্কিন সেবা দানকারী প্রতিষ্টানগুলি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে যা এ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী বহুজাতিক কোম্পানিগুলাকে সেবা খাতে ব্যবসার অনুমতি দিতে বাধ্য ছিল যার ফলে আর্থিক ও টেলিযোগাযোগ খাতে তাদের ব্যাপক আধিপত্য প্রতিষ্টিত হয়েছে। যদি মার্কিনীদের আরো সুবিধা দেয়া হয় এর পরিণতিতে স্থানীয় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলি নির্মূল হয়ে পড়বে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলা তার জায়গা দখল করে নিবে। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কর মুনাফা হারাবে এবং মুনাফা খাত পরিণত হবে কর অব্যাহতির বিষয়ে।

    অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রবল হবে:

    আমেরিকান কোম্পানিগুলা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সহজে প্রবেশের দরুন, বিশেষত আর্থিক খাত, দেশের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে পড়বে যা বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের সময় দেশের অর্থনীতিও সংকটে পরবে। ২০০৬-০৭ এ যখন যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয় ইউরোপের বাজারেও তা আঘাত করে কারণ ইউরোপের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যে জড়িত ছিল। এতে ইউরোপ এ সঙ্কট এড়াতেও পারে নি। যার উত্তম উদাহরণ গ্রীস, এ সংকটের পরিণতিতে গ্রীস কার্যকরভাবে যে কোন প্রকারের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারায় এবং এটি অদ্ভুত হবে না, টিকফার কারণে বাংলাদেশকেও আগামীতে যদি একই ভাগ্য বরণ করতে হয়।

    অন্যান্য:

    • টিকফা চুক্তি বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করবে তৈরী পোষাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে অনুমতি দিতে। যা মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করবে। এতে তৈরী পোশাক শিল্পে চলমান আস্তিরতা আরো বেগবান করবে। সত্যিকার অর্থে আমেরিকান কোম্পানিগুলা তাদের সরকারের সাথে অংশীদার হয়ে বাংলাদেশের পোষাক শ্রমিকদের শোষণই করছে আর টিকফা কোনভাবেই এর প্রতিকার হতে পারনা।
    • এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেশের জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, টেলিযোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে । যা আমাদের অর্থনীতির জন্য হবে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত।
    • চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং ঢালাওভাবে সরকারি খাতগুলিকে বেসরকারিকরণ করতে হবে । যা পরবর্তীতে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা বিলুপ্ত করা হবে।

    সংক্ষেপে, টিকফা চুক্তি মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার এর দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ দেশীয় সকল ব্যবসা, শিল্প এবং বিনিয়োগ সম্পর্কিত নীতিগুলা নিয়ন্ত্রিত হবে। যার ব্যত্যয় ঘটলে তারা রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ করবে।

    আমেরিকার কর্মপরিকল্পনা:

    টিকফা চুক্তির প্রক্রিয়ায় আমেরিকার লুকায়িত এজেন্ডা আমাদের অদূরদর্শী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকবর্গ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অনেক বছর ধরেই এ দেশে জ্বালানি খাতে শেভরন, অক্সিডেন্টাল এর মত বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা ব্যবসা করে সন্তুষ্ট ছিল কিন্তু তারা এখন বাংলাদেশের ঘাড়ে বসে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে মনোযোগ দিয়েছে। টিকফা তারই নীলনকশা বাস্তবায়ন করবে। তাদের এ প্রবণতার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারতের আধিপত্য, যেমন এ্যায়ারটেলের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে অনুপ্রবেশ যা আমেরিকার কাছে খুব বেশি সুখকর নয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে নতুন বাজার খোলা যা তাদের ইরাক আফগানিস্তানের মত অনিঃশেষ যুদ্ধে হাজার হাজার কোটি ডলারের যে ক্ষতি তা পূরণ করতে সহায়তা করবে। তৃতীয়ত, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণটি তা হল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের বাণিজ্যিক ও সামরিক অবস্থান দৃঢ় করা। বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে তাদের এ উদ্দেশ্য হাসিলে সবচাইতে কৌশলগত অবস্থানে আছে।

    ইসলামের দৃষ্টিতে টিকফা চুক্তি:

    ইসলামে পররাষ্ট্র নীতি সহ একটি রাষ্ট্র চালানোর জন্য আবশ্যক সমস্ত ব্যবস্থা আছে । এর স্বরূপ শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রেই পরিপূর্ণভাবে দেখা যাবে। ইসলামে যে কোন চুক্তির সুস্পষ্ট নীতিমালা আছে। সীমিত পরিসরে এখানে আমরা শুধুমাত্র টিকফা সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি নিয়ে আসব।

    ১. ইসলাম অনুযায়ী যেকোন আন্তর্জাতিক চুক্তি যা ইসলাম ও মুসলিমের উপকৃত করে এমন চুক্তির অনুমতি আছে। ইসলাম 

    সে সমস্ত চুক্তি অনুমোদন দেয় না যা মুসলিমদের চাইতে  
    ইসলামের শত্রুদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। টিকফা এমন চুক্তি যা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত আমেরিকার নির্দেশে করা, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে করবে বিদ্ধস্ত এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। এতে কম করে বললেও এটাকে প্রভু-দাস সম্পর্কের চুক্তি বলা চলে।

    আল্লাহ তায়ালা বলেন-

    ……এবং আল্লাহ কখনোই মুমিনদের উপর কাফেরদের কোন পথ (বিজয়) অবশিষ্ট রাখেন না” [সূরা নিসা- ১৪১]

    এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায় মুসলিমদের উপর কাফেরদের কতৃত্ব চলবেনা। টিকফা চুক্তির যতটুকু প্রকাশ পেয়েছে এটি তারই নির্দেশ করছে। অতএব এ ধরনের কোন চুক্তিই করা যাবেনা।

    ২. যে সমস্ত দেশ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত তাদের সাথে চুক্তির অনুমতি ইসলাম দেয়না। আর আমেরিকা শুধু যুদ্ধে লিপ্ত না সম্প্রতি তারা ইরাক ও আফগানিস্তানকে দখলও করে নিয়েছে। ইসলামের পররাষ্ট্র নীতি অনুযায়ী যুদ্ধরত কোন দেশের সাথে কোন প্রকার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া যাবেনা।

    ৩. যে কোন চুক্তি দুপক্ষের স্বাধীন ইচ্ছার ফলে হতে হবে। আর আমেরিকা ক্রমাগত বাংলাদেশকে পীড়াপীড়ি করে যাচ্ছে এ চুক্তি সইয়ে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা জি এস পি সুবিধা বাতিল করে দিবে এমন ভয় ভীতি হুমকি দিয়ে এক প্রকারের চাপের মধ্যে রাখছে। যা এ চুক্তি সইয়ের অনুমোদন দেয়না।

    অতীতে ইসলামিক রাষ্ট্র এই আমেরিকার সাথে কীভাবে আচরণ করত তার ছোট্ট একটা ঘটনা উল্লেখ করি… ভূমধ্য সাগরে নিরাপদে আমেরিকার পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ৫ই জুন, ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার একটি চুক্তি হয় যেখানে আমেরিকাকে কর স্বরূপ ৬,৪২,০০০ গোল্ড ডলার যা বছরান্তে ১২,০০০ উসমানী গোল্ড লিরা উসমানী খিলাফতকে পরিশোধ করতে হয় । আমেরিকার ইতিহাসে এটিই একমাত্র চুক্তি যা অন্য ভাষায় করে অর্থাৎ আরবি চুক্তি সই হয়। অথচ আজকে যে চুক্তি সই হচ্ছে তা অসম চুক্তিই নয় অপমানজনকও বটে। একমাত্র ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্টার মাধ্যমেই মুসলিমদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং বিশ্বের পরাশক্তি হিসাবে ইসলামকে বিজয়ী রাখবে অন্য সকল দ্বীনের উপর।

    আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-

    তিনিই প্রেরন করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) সহকারে, যেন এই দ্বীন অন্যান্য সকল দ্বীনের উপর বিজয় লাভ করেন…” [সূরা আত-তাওবা: ৩৩]  

  • ইলমুল ফিকহ : উৎপত্তি ও বিকাশ

    ইলমুল ফিকহ : উৎপত্তি ও বিকাশ
    ভূমিকা:
    প্রত্যেক জিনিসেরই একটি স্তম্ভ রয়েছে। দ্বীন ইসলামের স্তম্ভ হলো ফিকহ” [হাদীস]
     
    ইসলাম মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বুদ্ধিবৃত্তিক একটি আকীদা প্রদান করে যা তাদের সকল চিন্তা, আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মূলভিত্তি। এরূপ কোন ভিত্তি এমন একটি সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার অস্তিত্ব দাবী করে যার প্রতিটি অংশ হবে মূল আকীদার অনুগামী ও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব, ইসলামী জ্ঞানের এমন একটি শাখার আর্বিভাব অনিবার্য ছিল যা ব্যবহারিক জীবনের এই চাহিদাকে সম্পূর্ণ করবে। “ইলমুল ফিকহ” হচ্ছে ইসলামী জ্ঞানের সেই বিশেষ শাখা।

    ফিকহ এর সংজ্ঞা:

    প্রখ্যাত অভিধান বিশারদ আল্লামা আবুল ফযল জামালুদ্দীন মুহাম্মদ আল মিসরী (রহ) বলেন,

    العلم بالشيء والفهمُ له

    “ফিকহ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, কোন কিছু সম্বন্ধে জানা ও বুঝা।” [লিসানুল আরব]

    ‘ফিকহ’ শব্দটি আল কুরআনে বিশ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। (ফাতাওয়া ও মাসাইল. ১ম খন্ড, ইফাবা প্রকাশিত) যেমন,

    وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

    তাদের (মুমিনদের) প্রত্যেক দল থেকে একটি অংশ কেন বহির্গত হয় না যাতে তারা দ্বীন সম্বন্ধে ফিকহ হাসিল করতে পারে (লি ইয়াতাফাক্বাহু ফিদ-দ্বীন) এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে- যাতে তারা সতর্ক হয়”। (সূরাই তওবা : ১২২)

    হাদীসেও এই শব্দটি বহুল ব্যবহৃত যেমন-

    مَنْ يُرِدْ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ

    আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দ্বীনের ফিকহ (তাফাক্কুহ ফিদ-দ্বীন) দান করেন”। (বুখারী, মুসলিম)

    فَقِيهٌ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابِدٍ

    একজন ফকীহ শয়তানের জন্য হাজার (মূর্খ) আবেদ অপেক্ষা ভয়ংকর” (তিরমিযি) ইত্যাদি।

    অতএব, আভিধানিক অর্থে ‘ফিকহ’ বলতে যে কোন বিষয়ের গভীর জ্ঞানকে বোঝালেও কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ও বিভিন্ন হাদীসে ‘ফিকহ’ বলতে সুনির্দিষ্ট ভাবে দ্বীনের গভীর জ্ঞানকেই বোঝানো হয়েছে। প্রথম যুগে ‘ফিকহ’ বলতে তাই ইসলামী জ্ঞানের বিশেষ কোন শাখাকে বোঝানো হতো না বরং সামগ্রিকভাবে গোটা দ্বীন সম্পর্কিত গভীর জ্ঞানকে বোঝানো হতো। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বীনের প্রতিটি শাখা স্বতন্ত্র ভাবে বিস্তৃত ও বিকশিত হতে থাকলে ‘ফিকহ’ শব্দটি কুরআন-সুন্নাহ থেকে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের হুকুম আগরনের যে বিজ্ঞান কেবল তার জন্যই সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়। অতএব, ইসলামী শরীয়াই’র পরিভাষায় ‘ফিকহ’ হচ্ছে ইসলামী জ্ঞানের সেই বিশেষ শাখা যা শরীয়াহ’র প্রামান্য উৎস থেকে শরীয়াহ’র শাখা-প্রশাখা সম্পর্কিত বিধি বিধান আহরন বা ইস্তিম্বাত (إستنباط) করে। তাই ইমাম শাফিঈ (রহ) ফিকহের সংজ্ঞায় বলেন,

    العلم بالأحكام الشرعية العملية المكتسب من أدلتها التفصيلية

    “শরীয়াহ’র বিস্তারিত প্রামাণাদি থেকে ব্যবহারিক শরীয়াহ’র বিধি-বিধান সম্পন্ধে জ্ঞাত হওয়াকে ফিকহ বলা হয়” [আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু]

    সংক্ষেপে বলা যায় ‘ফিকহ’ হচ্ছে ইসলামী আইন কানুন এবং এ সম্পর্কিত বিজ্ঞান। এই হচ্ছে ফিকহের সংজ্ঞা। আর এ ইলমের লক্ষ্য উদ্দেশ্য যা তা হলো দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সাফল্য অর্জন। এ অর্থেই ইমাম আবু হানীফা (রহ) বলেছেন,

    معرفة النفس مالها وما عليها

    “ফিকহ হচ্ছে নফস এর পরিচয় লাভ করা তথা কি কি তার অনুকূলে (কল্যাণকর) এবং কি কি তার প্রতিকূল (ক্ষতিকর) সে সম্বন্ধে জ্ঞান”।

    এখানে জ্ঞানীগণ নফসের অনুকূলে ও প্রতিকূলের অর্থ করেছেন “যার সাহায্যে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ অর্জন করে আর যার কারণে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। [ঐ]

    শীর্ষস্থানীয় ইমামদের মতে এই হলো ’ফিকহ’ এর সংজ্ঞা আর এই হলো তার উদ্দেশ্য। ফিকহ এর আলোচ্য বিষয়গুলোকে নিম্নোক্ত বিভাগগুলোর অধীনে বিবেচনা করা যায়:

    ইবাদত : যা আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের নিয়ম কানুন বলে দেয়। যেমন- সালাত, সওম, হজ্জ্ব ইত্যাদি।
    মু’আমালাত : সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিধিবিধান। যেমন- কেনাবেচা, ঋণ, ভাড়া, আমানত, জামানত ইত্যাদি।
    মানাকিহাত : মানবের বংশ রক্ষা সংক্রান্ত বিধিবিধান। যেমন- বিয়ে, তালাক, ইদ্দত, অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকার ইত্যাদি।
    উকুবাত : বিভিন্ন অপরাধ। যেমন- চুরি, ব্যভিচার, হত্যা, অপবাদ ইত্যাদির শাস্তি, যেমন- মৃত্যুদন্ড, রক্তপণ ইত্যাদি।
    মুখাসামাত : আদালতি বিষয়ে। যেমন- অভিযোগ, বিচারবিধি, স্বাক্ষ্য প্রমাণ ইত্যাদি।
    হুকুমাত ও খিলাফত : শাসক নির্বাচন, বিদ্রোহ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জিহাদ, সন্ধি, চুক্তি, কর আরোপ ইত্যাদি।

    ‘ফিকহ’ এর উৎপত্তি:

    যেহেতু ‘ফিকহ’ এর মূল উৎস হচ্ছে মানুষের প্রতি শরীয়ত প্রনেতা (অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা)’র আদেশ নিষেধ সম্বলিত বাণী, অতএব তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় যে, নবুয়্যত প্রাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ (সা) এর মক্কী জীবন থেকেই ফিকহ এর যাত্রা শুরু। কিন্তু বস্তুতঃ, মক্কী জীবনে পবিত্র কুরআনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নাযিল হলেও তার খুব সামান্য অংশই ছিল বিধি বিধান সম্বলিত এবং প্রায় সবটুকুই ছিলো দ্বীনের মৌলিক বিষয় বা আকীদা অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, পরকাল, জান্নান, জাহান্নাম এবং দ্বীনের প্রচার সৎগুনাবলীর বিকাশ, সামাজিক কু-প্রথাগুলোর নিন্দা ইত্যাদি বিষয়ে। আহকাম সম্পর্কিত প্রায় সমস্ত আয়াতই তাঁর(সা) মদীনায় হিজরত করার পর থেকে নাযিল হতে থাকে এবং মাদানী জীবনের দশ বছরব্যাপী তা চলতে থাকে। অতএব, আমাদের জন্য এটা বলাই অধিকতর যথার্থ হবে যে, ফিকহের শুরু বা উৎপত্তি হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাদানী জীবনের শুরু থেকে অর্থাৎ প্রথম হিজরী সন হতে। [আস-শাকসিয়্যাহ আল-ইসলামিয়্যাহ]

    ‘ফিকহ’ এর বিকাশ:

    এটি একটি বিস্তৃত বিষয় এবং এই নিবন্ধে আমরা কেবল এর সংক্ষিপ্ত কিছু ধারণা-ই দিতে পারবো। উৎপত্তিকাল থেকে শুরু করে ‘ফিকহ’ এর ক্রমবিকাশকে প্রধান তিনটি পর্যায় বা যুগে ভাগ করা যায়।

    ১. রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগ:

    নিঃসন্দেহে মুমিনদের উপর আল্লাহ ইহসান করেছেন যখন তিনি তাদের মধ্যে পাঠিয়েছেন একজন রাসূল, যিনি তাদেরই অন্তর্ভূক্ত, যিনি আল্লাহর আয়াতগুলো তাদের পড়ে শোনান, তাদের পরিচ্ছন্ন করেন এবং তাদেরকে শেখান কিতাব ও হিকমত।” [সূরা আলে-ইমরান]

    এ যুগের সময়কাল হচ্ছে রাসূলূল্লাহ (সা) এর মদীনায় হিজরত তথা ১ম হিজরী সাল হতে তাঁর ওফাতের সময় অর্থাৎ ১০ম হিজরী সাল পর্যন্ত। এ যুগে ফিকহের যাবতীয় বিষয়ই সরাসরি তাঁর (সা) এর পবিত্র সত্তার  সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তাঁর (সা) কাছে ছিল নাযিলকৃত প্রত্যক্ষ্য ওহী আল-কুরআন আর পরোক্ষ ওহী যা হাদীস রূপে আমাদের কাছে এসেছে। যেকোন বিষয়ে আইন প্রনয়ণ, উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ও যথোপযুক্ত ফতওয়া, ফারাইয, দ্বীনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, কুরআনের হুকুম আহকামের বিস্তৃত ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই ওহীর মাধ্যমে তিনি নিজেই সম্পাদন করতেন, সাহাবা (রা) দের তা শিক্ষা দিতেন এবং বাস্তবে সমাজে প্রয়োগ করে দেখাতেন। সে সময় স্বতন্ত্র ফিকহ শাস্ত্র প্রণয়নের কোন প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। তথাপি, পরবর্তী যুগের ফিকহ শাস্ত্রের সব মৌলিক বিষয়ের গোড়াপত্তন এ যুগেই হয়েছিল। এমনকি, ফিকহের গতিশীলতার প্রধান উপকরণ যে ‘ইজতিহাদ’ ও ‘কিয়াস’ তার শিক্ষাও এ যুগেই। এ বিষয়ে অনেক সহিহ হাদীস বিদ্যমান।

    রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুআয ইবনে জাবাল (রা) কে ইয়েমেনের গভর্ণর করে পাঠানোর সময় তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে মুআয! তুমি কীসের ভিত্তিতে ফায়সালা করবে? (كَيْفَ تَقْضِي) তিনি বললেন, “আল্লাহ’র কিতাব দিয়ে (أَقْضِي بِكِتَابِ اللَّهِ), তিনি (সা) বললেন, “যদি আল্লাহ’র কিতাবে তা না থাকে?” (فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي كِتَابِ اللَّهِ)  তিনি বললেন, “তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নত দিয়ে” (فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ), তিনি (সা)  বললেন, “যদি রাসূলের সুন্নতে তা না থাকে?” (فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ) তিনি বললেন, “তখন আমি ইজতিহাদ করে ‘রায়’ দিবো।” (أَجْتَهِدُ رَأْيِي) তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে এমন পথের সন্ধান দিয়েছেন যাতে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ‘সন্তুষ্ট’ (الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَفَّقَ رَسُولَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِمَا يُرْضِي رَسُولَهُ) [আহমদ] – এটি ইজতিহাদের বৈধতা প্রমাণে ব্যাপক ব্যবহৃত একটি হাদীস। অন্য রেওওয়াতে রয়েছে যে, “হযরত মুআয (রা)  ও আবু মূসা আশ’যারী (রা) কে ইয়ামেনে কাযী হিসেবে প্রেরণ করার সময় অনুরূপ প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেছিলেন, “সুন্নতে কোন নির্দেশ না পেলে আমরা (উদ্ভুত বিষয়টি) একটি বিদ্যমান সাদৃশ্য বিষয়ের উপর কিয়াস করবো এবং যা সত্যের নিকটবর্তী তার উপর আমল করবো”। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের উত্তর সঠিক হয়েছে”।

    সাহাবা (রা) কে তিনি (সা) কিয়াসের মাধ্যমে ইজতিহাদের পদ্ধতি শিখিয়েছেন। যেমন: উমর (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (সা) কে স্ত্রীকে চুম্বনের কারনে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলেন তখন তিনি (সা) বললেন, “তুমি যদি কুলি কর তাতে কি রোজা ভঙ্গ হবে?” [ইবনে হাযম, ইহকাম] এখানে রাসূলুল্লাহ (সা) উমর (রা)-কে কিয়াস বা সাদৃশ্যমূলক তুলনার মাধ্যমে রোজাদারের চুম্বন ও কুলি করার মিল বোঝালেন এবং দেখালেন যে ওটার মতো এটাও রোজা ভঙ্গ করবে না।

    এর পাশাপাশি তিনি সাহাবা (রা) গণকেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইজতিহাদের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন এবং ইজতিহাদের জ্ঞান প্রয়োগ করার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এটা কখনো ঘটেছে তাঁর (সা) এর প্রত্যক্ষ্য শিক্ষার মাধ্যমে আবার কখনো ঘটেছে সাহাবীদের অনুরূপ কোন কাজ শোনার পর তা অনুমোদন ও উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে। সাহাবা (রা) গণ কখনও এমন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতেন যে বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর হুকুম তাদের জানা নেই তাহলে তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর আমলে সমাধানের জন্য পেশ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর জীবদ্দশায় তাঁর (সা) এর কাছ থেকে জেনে নেয়ার সুযোগ আছে এমন কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা কখনোই ইজতিহাদের দ্বারস্থ হননি বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-ই ছিলেন সমাধান। সাহাবা (রা) গণ তাঁর (সা)-এর জীবদ্দশায় এমন কোনো পরিস্থিতিতেই কেবল ইজতিহাদ করেছেন যখন বিধান জানার প্রয়োজন তাৎক্ষনিক ছিলো এবং দূরত্ব বা অন্য কোনো কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে তা উপস্থাপন করার কোন সুযোগ ছিলনা। এরূপ ক্ষেত্রে তাঁরা পরবর্তীতে রাসূল্লাহ (সা) এর সামনে তা পেশ করতেন এর সঠিক জ্ঞানের জন্য। এ বিষয়ে অনেক প্রসিদ্ধ ও সহীহ হাদীস বিদ্যমান। যেমন- রাসূলুল্লাহ (সা) খন্দকের যুদ্ধের দিন সাহাবীদের একটি দলকে বলেছিলেন, “বনি কুরায়জা’র মহল্লায় না পৌছেঁ কেউ আসর পড়বেনা”। পথে আসরের ওয়াক্ত হলে একদল (হাদীসের শাব্দিক নির্দেশ অনুযায়ী) বললো, আমরা সেখানে পৌছার পূর্বে সালাত আদায় করবো না। অন্যদল বললো, তাঁর (সা) ইচ্ছা এটা নয় (অর্থাৎ উক্ত আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাড়াতাড়ি ঐ গোত্রে পৌছা, নামাজ না পড়া নয়), অতএব পথে সালাত পড়ে নাও। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে উভয় দলের ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি দুটোকেই অনুমোদন করেন। [বুখারী, মুসলিম]

    অনুরূপে, আবু দাউদ বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে যে, দুজন সাহাবী সফররত অবস্থায় সালাতের সময় হলে তারা পানির অভাবে তায়াম্মুম করে তা আদায় করেন। অতঃপর সালাতের ওয়াক্ত থাকতেই পানির সন্ধান পাওয়ার পর একজন অযু করে পুনরায় সালাত পড়েন আর দ্বিতীয়জন পুনরায় অযু, সালাত কোনোটাই করেননি। সফর শেষে তাঁর রাসূল (সা) এর কাছে এ ঘটনা জানালে, তিনি যিনি ওযু-সালাত দ্বিতীয়বার করেননি তাকে বললেন, “তুমি সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করেছো, আর তোমার আদায়কৃত সালাত তোমার জন্য যথেষ্ট”, আর দ্বিতীয়জনকে বললেন, “তোমার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।” আর এ মর্মেই বুখারী, মুসলিমে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “যখন হাকিম ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে তখন সে দুটি সওয়াব পায়, (আর) তার সিদ্ধান্ত ভুল হলে সে অন্তঃত একটি সওয়াব পায়”।

    এ সমস্ত হাদীস ও ঘটনার বিবরণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগে উদ্ভুত ব্যবহারিক সমস্যার সমাধানে কুরআন, সুন্নাহ ও এর ভিত্তিতে ইজতিহাদের প্রয়োগের ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের কর্মপন্থার সুস্পষ্ট দলীল।

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগে যেসব সাহাবী (রা) গণ ফতোয়া প্রদানে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন তাদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা) হযরত উমর (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আলী  (রা), হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এবং হযরত যায়িদ বিন ছাবিত (রা) অন্যতম।

    রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগ তথা ‘ফিকহ’ এর উৎপত্তি যুগের কর্মপন্থার উপর ভিত্তি করেই শুরু হয় ফিকহের দ্বিতীয় যুগ।

    ২. সাহাবা (রা) গণের যুগে ফিকহ:

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর ওফাত পরবর্তী সময় অর্থাৎ দশম হিজরী থেকে ফিকহে’র সাহাবা যুগের শুরু। এর ব্যপ্তি ৯০ বা ১০০ হিজরী পর্যন্ত ধরা যায় কারণ এ সময়ের পর কোন অঞ্চলে আর কোন সাহাবী জীবিত ছিলেন না। কুফায় সর্বশেষ সাহাবী মারা যান ৮৬/৮৭ হিজরীতে, মদীনার সর্বশেষ সাহাবী সাহল ইবনে সাদ (রা) ৯১ হিজরীতে, বসরার শেষ সাহাবী আনাস ইবনে মালিক (রা) ৯১ বা ৯৩ হিজরীতে ও দামেস্কের শেষ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ৮৮ হিজরীতে মারা যান। ১০০ হিজরীতে সর্বশেষ সাহাবী আমির ইবনে ওয়াসিলাহ ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বিদায় নেয়ার মধ্য দিয়ে সাহাবা যুগের সমাপ্তি ঘটে।

    সাধারণভাবে এই সুদীর্ঘ সময়ে পুরোটাকে সাহাবা যুগ নাম দিলেও এর মধ্যে প্রধান দুটো ভাগ আছে যা উল্লেখযোগ্যভাবে পরস্পর থেকে পৃথক। এই যুগ বিভাগ দুটি হচ্ছে:

    ক) খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (চল্লিশ হিজরী পর্যন্ত)
    খ) খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী সাহাবাদের (রা)  যুগ ও এর সমান্তরালে তাদের শিক্ষাপ্রাপ্ত তাবঈদের যুগ (চল্লিশ হিজরী হতে একশ হিজরী)

    ক) খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ: (চল্লিশ হিজরী পর্যন্ত)

    আমার পরে তোমরা খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করবে।” [হাদীস]

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর ওফাতের পর খুলাফায়ে রাশেদীনের সোনালী যুগে বিভিন্ন জয়ের মাধ্যমে ইসলাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লে নতুন নতুন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সামনে চলে আসে। ক্রম প্রসারমান সেই সভ্যতার চাহিদা পূরণে এবং বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নবাগত সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর উপর গভীর গবেষনা করার প্রয়োজন তীব্রতর হয় সে প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতেই ‘ফিকহ’ আরো বিকশিত হতে থাকে।

    এ  যুগেই ফিকহ এর তৃতীয় উৎস তথা ইজমা আস সাহাবা অস্তিত্ব লাভ করে। ইজমাকে এ যুগে সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। এজন্য যোগ্যতা সম্পন্ন ও নেতৃস্থানীয় সাহাবা (রা) গণের একটি কমিটি গঠিত হয় আর তাদেরকে যথাসম্ভব খিলাফতের কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করা হয় যাতে করে উদ্ভুত কোন নতুন বিষয়ের ফায়সালা সরাসরি কুরআন – সুন্নাহতে না পাওয়া গেলে তাদের পারস্পরিক পরামর্শ ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে এর ফয়সালা বের করা যায়। উল্লেখ্য যে, সাহাবা (রা) গণ নিজ থেকে কোন ধারণা বা পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে এসব মত দিতেন না বরং কিতাব ও সুন্নাহ’র উপর তাদের সুগভীর জ্ঞান ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাহার্যের ফলে কুরআন-সুন্নাহ থেকে যেকোন বিষয়ে হুকুম আহরণে তাদের যে দক্ষতা তার ব্যবহারেই তাঁরা সম্মিলিত চিন্তা-গবেষণার মাধ্যেমে এরূপ কোন ঐক্যমতে বা ইজমা’য় পৌছাতেন।

    ‘ইজমা আস সাহাবা’ নামক শরীয়াহ’র তৃতীয় মূল উৎস রূপলাভ করা ছাড়াও এ যুগে বিশাল খিলাফতের নানা সমস্যা সমাধানে কুরআন-সুন্নাহ হতে ক্রমাগত অধিক থেকে অধিকতর বিধান আহরণের ফলে প্রথম দুটি উৎস (কুরআন ও সুন্নাহ) হতে বিধান আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কিত জ্ঞান আরো বিকশিত হয় এবং পরবর্তী যুগের ফিকহের জন্য এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা তৈরী হয়। পাশাপাশি যেসব বিষয়ের সমাধান সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ’তে পাওয়া যেতনা এবং যার সমাধানে সাহাবাদের সম্মিলিত কোন সিদ্ধান্ত ও ছিলনা, এরূপ অনেক ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবা (রা) গণ কিয়াসের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন। এভাবে এ যুগে কিয়াসের ব্যবহার আরো ব্যপকতা লাভ করে।

    হযরত আবু বকর (রা) এর যুগ:

    কোন বিষয়ে ফিকহ-এর বিধান আহরণে হযরত আবু বকর যে পদ্ধতি অনুসরণ করতেন, মায়মুন ইবনে মাহরান তা এ ভাবে বর্ণনা করেছেন,

    “আবু বকর (রা)-এর শাসনকালে কোন সমস্যা উপস্থিত হতে তিনি কুরআন খুলে দেখতেন। যদি তাতে সংশ্লিষ্ট বিবাদ মীমাংসার জন্য কিছু পেতেন তবে তার ভিত্তিতে উদ্ভুত বিবাদ মীমাংসা করতেন। যদি কুরআনে এ ব্যাপারে কোন সমাধান না পেতেন তবে তিনি রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মীমাংসা করতেন। যদি সুন্নাহতেও উল্লেখিত বিষয়ে কিছু না পেতেন তাহলে তিনি মুসলিমদের নিকট গিয়ে বলতেন, অমুক অমুক বিষয় আমার নিকট পেশ করা হয়েছে। তোমাদের কারো এ বিষয়ে রাসূল (সা)-এর কোন ফয়সালার কথা জানা আছে কি? ঐ বিষয়ে যদি কেউ তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিত এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সরবরাহে সক্ষম হত তখন হযরত আবু বকর (রা) বলতেন: “আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা যে, তিনি আমাদের মধ্যকার কোন কোন ব্যক্তিকে রাসূলের (সা) নিকট থেকে তাঁর শ্রুত বিষয় স্মরণ রাখার সামর্থ্য দিয়েছেন।”

    যদি তিনি রাসূল (সা)-এর এরূপ কোন সুন্নাহও না পেতেন তাহলে নেতৃস্থানীয় ও উত্তম লোকদের সাথে পরামর্শ করতেন। তারা ঐকমত্যে পৌছালে তার ভিত্তিতে তিনি রায় দিতেন। [ইলমূল মুওয়াকিঈন; সংগ্রহ, ইসলামী উসূলে ফিকহ]

    “ঐভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে সমাধান না পেলে তাঁর ব্যক্তিগত বিচক্ষনতার সাহায্যে ‘নস’ ব্যাখ্যা করে অথবা তার মর্মার্থ থেকে অথবা কেবল ইজতিহাদের ভিত্তিতে তার নিজস্ব মত গঠন করতেন” [হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ]

    যেমন: হযরত আবুবকরের সামনে যখন দাদীর মীরাস সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলো তখন তিনি বললেন যে, এ বিষয়ে কুরআনে কোন নির্দেশ নেই এবং এ বিষয়ে কোন হাদীসও তাঁর জানা নেই, তাই এ বিষয়ে অন্যদের জিজ্ঞাস করতে হবে। অতঃপর যোহরের নামাজের পর তিনি সমবেত লোকদের এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মুগীরা বিন শোবা (রা) ও মুহম্মদ বিন সালামা (রা) দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলেন যে এ বিষয়ে তাদের হাদীস জানা আছে এবং তা হলো রাসূলুল্লাহ (সা) দাদীকে মৃতের রেখে যাওয়া সম্পদের এক ষষ্ঠাংশ দিয়েছেন। অতঃপর আবু বকর (রা) এ অনুযায়ীই ফায়সালা দিলেন।

    এ বর্ণনা হতে ফিকহ এর ব্যাপারে আবু বকর (রা) এর কর্মপন্থা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ যেকোন সমস্যা সমাধান তিনি প্রথমে, কুরআন, তারপর সুন্নাহ, অতঃপর ইজমা-আস-সাহাবা এবং পরিশেষে কিয়াস এর সাহায্য নিতেন। এই কর্মপন্থাই পরবর্তী যুগের জন্য দলীল হয়ে যায়।

    আবু বকর (রা) কৃত ইজতিহাদ:

    যেমন ‘কালালাহ’ শব্দের অর্থ সম্পর্ক তিনি বলেন, “কালালাহ সম্পর্ক আমি যা বললাম তা আমার নিজের রায় এর ভিত্তিতে। আমার মতামত যদি সঠিক হয় তবে তা আল্লাহর কাছ থেকে, আর যদি ভুল হয় তবে তা আমার নিজের ও শয়তানের কাছ থেকে। সেই ব্যক্তিই ‘কালালাহ’ যার পিতা-মাতাও নেই, সন্তানও নেই। তাঁর আরো ইজতিহাদের উদাহরণ হচ্ছে, যাকাত অস্বীকারকারী গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ও পরে ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য বায়তুল মাল থেকে সমান বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি।

    হযরত উমর (রা) এর যুগ:

    হযরত উমর (রা) এর যুগে ফিকহ’ এর অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। তিনি নিজে ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ ফকীহ। তিনি খুব দ্রুত কোন সম্পূরক বিষয়কে মূল বিষয়ের সাথে তুলনা করতে পারতেন। ফলে তিন তাঁর শাসনকালে ইসলামী আইনের এক বিশাল ভান্ডার রেখে যান। বিখ্যাত তাবেঈ ইবরাহীম নখঈ যথার্থই বলেছেন যে, “উমর (রা) শহীদ হওয়ার সথে সাথে ইলমের দশ ভাগের নয় ভাগ দুনিয়া থেকে তিরোহিত হয়ে গেছে” [১১. পূর্বোক্ত]

    ‘ফিকহ’ এর বিষয়ে হযরত উমর (রা) কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতির মধ্যে লক্ষনীয় বিষয় ছেল যে, ফায়সালা গ্রহণের জন্য তিনি সর্বোৎকৃষ্ট উপায় উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে সাহাবীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ করতেন, বিতর্ক সভা করতেন। যখন তাঁর সামনে কোন ফিকহী সমস্যা উপস্থাপন করা হতো তিনি বলতেন, “ডাকো আলীকে ডাকো যায়েদকে” অর্থাৎ অন্যান্য সাহাবা (রা)-দের ডাকতেন, তিনি তাদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং এভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছাতেন।

    মৌলিকভাবে তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি হযরত আবু বকর (রা) এ প্রায় অনুরূপ ছিল। আগত সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান তিনি প্রথমে কুরআন, অতঃপর তাঁর সুন্নাহ’র জ্ঞান ভান্ডারে খুজতেন, যদি সেসব থেকে সরাসরি কিছু না পেতেন এবং বাকী সাহাবীদের কাছ থেকেও তার অজানা কোন হাদীসের সন্ধান না পেতেন তখন সবার সাথে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন অথবা ইজতিহাদ করে রায় দিতেন।

    যেমন : হযরত উমর (রা) নিকট গর্ভস্থ সন্তানের দিয়তের বিষয় উত্থাপিত। তখন মুগীরা ইবনে শোবা (রা) এ বিষয়ক একটি হাদীস জানালে উমর (রা) সে অনুযায়ী ফায়সালা করেন। অনুরূপে অগ্নি পূজকদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করা সম্পর্কে তিনি আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে অবগত হন এবং অতঃপর এর ভিত্তিতে আইন করেন। অনুরূপে স্ত্রী স্বামীর দিয়তের রক্তপন অংশীদারী হবে কিনা এ সম্পর্কে তিনি দাহহাক বিন সুফিয়ান আল-কালাবি (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে অবগত হন এবং বলেন, “যদি আমরা এ হাদীস না শুনতাম, তবে ভিন্ন হুকুম দিতাম।” [১২, রাফউল মালাম, ইবনে তাইমিয়্যাহ]

    অনেক সময় তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাদীস না পেলে ইজতিহাদের  মাধ্যমে রায় দিতেন; কিন্তু পরে এ সম্পর্কে কোন হাদীস জানতে পারলে পূর্ব রায় ত্যাগ করে হাদীস অনুসরে রায় দিতেন। যেমন : হাতের আঙ্গুলের দিয়তের ব্যাপারে তাঁর মত ছিলো, উপকারীতার পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন আঙ্গুলে দিয়ত ও কমবেশী হবে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আবু মুসা (রা) ও ইবনে আব্বাস (রা) হতে সব আঙ্গুলের দিয়ত সমান হওয়া সম্পর্কিত হাদীস শুনে সে অনুযায়ী রায় দেন।

    ‘ফিকহ’ এর ব্যাপারে তাঁর অনুসৃত আরেকটি নীতি হচ্ছ, তাঁর কাছে যদি হাদীসটি বিশুদ্ধ পন্থায় না পৌছাতো তবে তিনি তা গ্রহণ না করে বরং সুস্পষ্ট আয়াত বা হাদীসের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করে রায় দিতেন। এই নীতি পরবর্তীতে ফিকহের অনেক ইমাম আরো সুসংবদ্ধ করেছেন। উদাহরণ: তালাকের পর ইদ্দত কালীন ভরনপোষণ বিষয়ে হযরত উমর (রা) ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা) এর হাদীস বর্জন করেন এবং কিতাবুল্লাহ অনুযায়ী ফায়সালা প্রদান করেন।

    এভবেই উমর (রা) ‘ফিকহ’ এর ব্যাপারে বিভিন্ন নীতিমালার বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বিভিন্ন কাজী ও গভর্ণরদের কাছে চিঠি লিখতেন এবং তারাও তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন বিধান জানতে চেয়ে চিঠি লিখতেন। ঐসব গভর্ণররা নিজেরাই ছিলেন মর্যাদাবান সাহাবী ও শীর্ষস্থানীয় ফকীহ। তাই তারা নিজেরাও প্রয়োজনে বিভিন্ন বিষয়ে ইজতিহাদ করে আইন দিতেন। এভাবেই উমর (রা) এর পুরো খিলাফত জুড়েই ফিকহের ব্যাপক উন্নতি ঘটে।

    হযরত উসমান (রা) এর যুগ:

    হযরত উসমান (রা) কে এই শর্তে খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছিল যে, তিনি কুরআন, সুন্নাহ, ও পূর্ববর্তী দু’ইজন খলীফার অনুসৃত নীতি অনুসরণ করবেন। তাই তার খিলাফত কালে তিনি নিজে কদাচিৎ ইজতিহাদ করতেন বরং অধিকাংশ বিষয়ে পূর্ববর্তী দুই খলীফার সময় নেয়া সিদ্ধান্ত গুলোর বাস্তবায়নকেই প্রাধান্য দিতেন। তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদের উদাহরণ হচ্ছে মিনায় সালাত সংক্ষিপ্ত না করা বিষয়ে তার আমল। তবে তিনি নিজে স্বাধীন ইজতিহাদ কম করলেও পূর্ববর্তী দুই যুগের ন্যায় এ যুগেও সাহাবা (রা) ও বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্ব প্রাপ্ত ওয়ালী ও কাজীরা আগত নতুন নতুন বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমায়ে  সাহাবার ভিত্তিতে সমাধান করে ‘ফিকহ’ এর অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখেন।

    হযরত আলী (রা) এর সময়কাল:

    হযরত আলী (রা) নিজেই ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ। তিনি উমর (রা) এর মতোই কুরআন সুন্নাহর গভীর গবেষণার মাধ্যমে সাধারণ নীতিমালার আলোকে কোন বিশেষ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতেন এবং এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পৌছাতেন। খলীফার দায়িত্ব নেয়ার পূর্বে তিনি ছিলেন মদীনার শ্রেষ্ঠতম বিচারক। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, “রাসূলূল্লাহ (সা) এর সুন্নত সম্পর্কে আলী (রা) অন্য সকলের চেয়ে বেশী জ্ঞানী ছিলেন।”

    তাঁর ইজতিহাদ সমূহে তিনি গভীর ও সূক্ষ্ম কিয়াস প্রয়োগ করতে পারতেন যা পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে মূলনীতি রচনায় দিক-নির্দশনা দেয়। যেমন: তিনি মদ্যপানকারীর ব্যাপারে হদ্দে কায্ফ অর্থাৎ মিথ্যা অপবাদকারীর শাস্তি প্রদানের রায় দেন এ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে যে, যে মাতাল সে যা ইচ্ছা তা ই বলে যা মিথ্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক অতএব তার শাস্তি মিথ্যা অপবাদের শাস্তির অনুরূপ। এই রায়ের ভিত্তি হচ্ছে ফিকহের এই মূলনীতি যে, যা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল তার হুকুম ঘটে যাওয়া বিষয়ের অনুরূপ যেমন এক্ষেত্রে মাতালের মিথ্যা বলার সম্ভাবনা প্রবল এবং সে অনুযায়ী তার শাস্তি।

    অনুরূপে যৌথভাবে হত্যা পরিকল্পনার সাথে জাড়িত একদল লোককে কীভাবে শাস্তি দেয়া হবে এ বিষয়ে তার রায়ে ছিলো তদের সবাইকে হত্যা করা আর এটাকে তিনি চুরির ক্ষেত্রে একদল চোরের প্রত্যেকের হাত কেটে দেয়ার স্বীকৃত সিদ্ধান্ত থেকে কিয়াস করে বের করেছেন।

    এভাবে আলী (রা) তাঁর যুগে বিভিন্ন সামজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ‘ফিকহ’ এর বিধান আহরণে ব্যাপক গবেষণা ও সাদৃশ্যমূলক পদ্ধতি প্রয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যা পরবর্তী যুগে ফিকহের মূলনীতি প্রণয়ণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

    খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ফিকহের বিকাশের মূলদিকগুলো হচ্ছে খলীফা ও সাহাবা (রা) গণ কুরআন-সুন্নাহ’তে বর্ণিত শরীয়াহ’র বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পরকে জিজ্ঞেস করতেন এবং পরস্পররের জানা বিষয় দ্বারা উপকৃত হতেন। তারা যখনি একত্রিত হতেন তখন কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে গবেষণা করতেন এবং কোন একটি বিষয়ের হুকুম অনুসন্ধানের সময়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কারো কোন হাদীস শুনেছেন কিনা তার অনুসন্ধান করতেন। এ নীতির ফলে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্নজনের জানা প্রায় সব হাদীসই জনসমক্ষে চলে এলো এবং অন্যরাও সেটা দ্বারা উপকৃত হবার এবং এর ভিত্তিতে ‘ফিকহ’ আহরণের সুযোগ পেলো সাহাবা (রা) গণের এই অনুসন্ধানী নীতির ফলে ফিকহ-এর অন্যতম উৎস হাদীসের ভান্ডার সমৃদ্ধ হলো এবং সেগুলো পরবর্তী যুগের ফকীহদের কাছেও পৌঁছে গেলো। অনুরূপভাবে তাদের জ্ঞান ও গবেষনার কারণে কুরআনের আহকাম সম্পর্কিত আয়াতগুলো থেকে আহরিত হুকুম এবং আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কিত আলোচনা ব্যাপকতর হলো। উপরন্তু, ফিকহ-এর তৃতীয় উৎস হিসেবে ‘ইজমা আস সাহাবা’ অস্তিত্ব লাভ করলো। ফলে, ‘ইলমুল ফিকহ’ তার মূল উৎসগুলোর যথাযথ বিকশিত রূপ সহ এক বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে পরবর্তী যুগের দিকে এগিয়ে গেল।

    খ) খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী সাহাবা (রা) যুগ এবং এর সমান্তরালে তাবেঈ যুগ: (৪০ হিজরী-১০০ হিজরী)

    এ যুগটি হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর শাসনকাল তথা ৪১ হিজরী এমন হতে প্রথম হিজরী ও শতকের শেষ পর্যন্ত ব্যপ্ত। এ যুগের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সমূহ হচ্ছে:

    ১) জীবিত সাহাবী (রা) গণ আরব ও আরবের বাইরে বিশাল খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েন।

    ২) প্রতিটি অঞ্চলে তাদের কাছ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত তাবঈদের মধ্যে থেকে একদল ফকীহ তৈরী হয়ে যায় নিজ নিজ অঞ্চলে ফিকহ এর জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন।

    ৩) প্রতিটি অঞ্চলে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগে নতুন নতুন যেসব সমস্যা আমলে আসতো উক্ত অঞ্চলের সাহাবী তাঁর নিকট রক্ষিত প্রমাণাদি জ্ঞান (কুরআন-সুন্নাহ) দ্বারা বা প্রমাণিত জ্ঞানের আলোকে এসবের জবাব দিতেন এভাবে কোন বিষয়ে সমাধান পাওয়া না গেলে সে বিষয়ে ইজতিহাদ করে ফায়সালা দিতেন। যেহেতু একজন বা কয়েকজন সাহাবীর পক্ষে সমস্ত হাদীস এবং এর জ্ঞানে পূর্ণাঙ্গ হওয়া সম্ভব ছিলনা আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের চেয়ে অনেক দূরে অবস্থান করায় পূর্বের ন্যায় পারস্পরিক জিজ্ঞাসাও পরামর্শের  মাধ্যমে একে অন্যের নিকট রক্ষিত জ্ঞান বা জ্ঞানের বিশ্লেষণ দ্বারা উপকৃত হবার সুযোগ ছিলনা, ফলে এ যুগে বিভিন্ন অঞ্চলের সাহাবীদের রায়ে উল্লেখযোগ্য মত পার্থক্যের সূচনা হয়। তাদের ছাত্র তাবঈ ফকীহবৃন্দের মাঝে গিয়ে ‘ফিকহ’ এর বিভিন্ন বিষয়ে এই মতপার্থক্য ব্যাপকতর হয়। মতপার্থক্যের আবির্ভাব এ যুগের ফিকহের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

    ৪) এ যুগে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতভেদ ও ধর্মীয় ফেরকা জন্মলাভ করে। এর ফলশ্র“তিতে বিভিন্ন ফেরকা কর্তৃক নিজ নিজ মতের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য এবং আরো নানাবিধ কারণে জাল হাদীসের ব্যাপক প্রচলন ঘটে। ফলে “ফিকহ’ জানার জন্য হাদীস আহরণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ ও বিভিন্ন মূলনীতি প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়।

    এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ যুগেই সংগঠিতভাবে প্রথম দুই যুগের ফিকহের সংকলন ও লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু হয়। এজন্য একে ফিকহ সংকলনের ভিত্তিযুগও বলা যেতে পারে। এ যুগে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন শহরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফাতওয়া সংকলনের জন্য কতিপয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে ঐ শহরের শীার্ষস্থানীয় তাবেঈ ফকীহগণ তাদের শিক্ষক সাহাবীগণ বর্ণিত হাদীস ও ‘ফিকহী’ সিদ্ধান্তসমূহ গ্রন্থনার কাজ শুরু করেন। এসব কেন্দ্রের মধ্যে মক্কা, মদীনা, কূফা, বসরা, সিরিয়া, মিসর ও ইয়েমেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় তাবেঈদের মধ্যে হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব (রহ), আতা ইবনে আবু রাবাহ (রহ), হযরত ইবরাহীম নখঈ (রহ), হযরত শাবী (রহ), হযরত  হাসান বসরী (রহ), হযরত মাকহুল (রহ) প্রমুখ শীর্ষস্থানীয়।

    এদের মধ্যে মদীনার সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব ও কুফার ইবরাঈম নখঈ ছিলেন বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। তাদেরকে কেন্দ্র করে মদীনা ও কূফা উভয় শহরে বিরাট ফকীহ গোষ্ঠী গড়ে উঠে। অসংখ্য লোক তাদের কাছ থেকে ফিকহে’র ইলম লাভ করে। হাফিয ইবনে কায়্যিম এর মতে সাহাবীদের মধ্যে ফতোয়া প্রদানকারী সাহাবারে কিরামের সংখ্যা একশত ত্রিশ এর কিছু বেশী ছিল। [আসারুল ফিকহীল ইসলামী]। তাবেঈ ফকীহগণের উপরোক্ত কর্মপ্রচেষ্টার ফলে এই ত্রিশ জন সাহাবীর (রা) ফতোয়া বা ফিকহী’ মত সংরক্ষণ এবং যেসব মূলনীতির মাধ্যমে তারা এসব সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন তার অনুধাবন সম্ভব হয়।

    এভাবেই, খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী তাবেঈ যুগে শীর্ষস্থানীয় ফকীহদের মাধ্যমে রাসূল (সা) এর যুগ ও সাহাবা (রা) যুগের ‘ফিকহ’ সম্পর্কিত জ্ঞান যথাযোগ্যভাবে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়ে পরবর্তী যুগের নিকট পৌছে এবং ফিকহের পরবর্তী যুগ তথা চূড়ান্ত বিকাশপর্বের সূচনা হয়।

    ৩. তাবঈ-তাবঈন যুগ: ফিকহের চতুর্থ ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশের যুগ:

    خير القرون قرني ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم
    সর্বোত্তম যুগ হচ্ছে আমার যুগ। তারপর এর পরবর্তী যুগ এবং তারপর এর পরবর্তী যুগ” [হাদীস]

    ফিকহের ইতিহাসে এই যুগ সর্বাধিক গৌরবজ্জ্বল যুগ। এ যুগে বিভিন্ন অঞ্চলে ফিকহের আকাশে এমন কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে যারা পূর্ববর্তী তিন যুগের জ্ঞানভান্ডারকে ব্যবহার করে নিজেদের সুউচ্চ প্রতিভা ও মৌলিক চিন্তার মাধ্যমে ‘ইলমুল ফিকহ’ কে ইসলামী  জ্ঞানের একটি পূর্ণাঙ্গ শাখায় রূপদান করেন এবং এ শাস্ত্রের মূলনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাখা প্রশাখা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় প্রায় সকল নীতিমালা প্রনয়ণ করেন। ফলতঃ ‘ফিকহ’ একটি স্বতন্ত্র, সুশৃংখল ও স্বয়সম্পূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ জ্ঞানের মূলসূত্র যদিও তারা তাদের পূর্ববর্তীদের কাছ থেকেই লাভ করেছিলেন কিন্তু তাদের পূর্ববর্তীদের কেউই এটাকে তাদের মতো বিস্তারিত আলোচনা করে যাননি এবং একে পৃথক একটি বিজ্ঞানের রূপ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল নীতিমালার একত্রিত কোনো রূপ দেননি যদিও তারা নিজেরা এগুলো চর্চা করতেন।

    এযুগের ব্যপ্তি হিজরী দ্বিতীয় শতকের শুরু থেকে হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর অর্ধকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ যুগের প্রথমার্ধে আবির্ভাব ঘটে আবু হানীফা (রহ), ইমাম মালিক (রহ), ইমাম শাফিঈ (রহ) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) এর মত  ফিকহের শীর্ষস্থানীয় ইমামগণের। তদুপরি, এ যুগের দ্বিতীয়র্ধে আরো একটি শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানের আর্বিভাবে হয় আর তা হলো হাদীস-বিজ্ঞান। এ সময় ইমাম বুখারী (রহ), ইমাম মুসলিম (রহ) এর মতো শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিসগণের আবির্ভাব হয়, হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয় নীতি তথা উসূলুল হাদীস প্রণীত হয় এবং এসবের ভিত্তিতে সিহাহ সিত্তাহ তথা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের সংকলন কাজ সম্পন্ন হয। এভাবেই ইসলামী জ্ঞানের দু’দুটো শীর্ষশাখার চরম বিকাশের মাধ্যমে এ যুগ এ অনন্য যুগে পরিণত হয়।

    আমরা এ যুগে ফিকহের বিকাশকে এ যুগের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব তথা প্রসিদ্ধ ইমামদের আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করবো, কেননা এযুগের ফিকহের সামগ্রিক অগ্রগতি তাদেরকে কেন্দ্র করেই হয়েছিলো। সময়ানুক্রমিকভাবে আগত ইমাম গণের ফিকহী চিন্তাধারা ও অবদানের বিশ্লেষণ করলেই এ যুগে ফিকহের বিকাশ স্পষ্ট হয়ে যাবে।

    ইমাম আবু হানিফা (রহ) ও ফিকহে তাঁর অবদান:

    “মুসলিম জাতি ফিকহে আবু হানীফার সন্তানতুল্য” [ইমাম শাফেঈ]

    ‘ইমামে আযম’ নামে খ্যাত নুমান ইবনে সাবিত ওরফে আবু হানীফা (রহ) প্রখ্যাত মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে সবার আগে জন্মগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী তাঁর জন্ম ৮০ হিজরীতের কুফা নগরীতে।

    ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে কুফার খ্যাতি আগেই বলা হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা কুফার শীর্ষস্থানীয় তাবিঈ ও তাবে-তাবেঈ গণের কাছে থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে মক্কা মদীনা ও বসরা সফর করেন এবং সেখানকার শীর্ষস্থানীয় তাবঈ মুহাদ্দিস ও ফহীহদের কাছ থেকে হাদীস ও ফিকহ শিক্ষা নেন। ইমাম যাহাবীর মতে কেবল কূফাতেই ইমাম আবু হানীফা ২৯ জন ওস্তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেন যাদের অধিকাংশই ছিলেন বড় বড় তাবেঈ। এদের মধ্যে ইমাম শাবী (রহ), ইমাম হাম্মাদ (রহ) অন্যতম। অন্য আরেক বর্ণনা মতে তিনি কূফায় তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈনসহ ৯৩ জন ওস্তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অজর্ন করেন। আর এভাবে তাদের কাছে সংরক্ষিত পূববর্তী তিন যুগের হাদীস ও ফিকহের বিশাল ভান্ডার তিনি সংগ্রহ করেন এবং তাঁর  অসাধারণ মৌলিক প্রতিভা ও যোগ্যতার মাধ্যমে এসব থেকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা নিয়ে বিভিন্ন নিয়ম-নীতির ভিত্তিতে ফিকহের এক বিশাল ভান্ডার তৈরী করেন এবং একে সুনির্দিষ্ট পন্থায় সংকলিত ও বিন্যস্ত করে ‘ফিকহ’ কে একটি স্বতন্ত্র ও সুবিন্যস্ত শাস্ত্রের রূপ দেন। এ বিষয়ে কোন  মতভেদ নেই যে তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার ফলেই সর্বপ্রথম ‘ফিকহ’ একটি পৃথক ও বিস্তৃত শাস্ত্রের মর্যাদা লাভ করে। তাই ইমাম শাফেঈ (রহ) যথার্থই বলেন,

    الناس في الفقه عيال على أبي حنيفة

    “মুসলিম জাতি ফিকহে আবু হানীফার সন্তানতুল্য” [আসারুল ফিকহীল ইসলামী]

    আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ) বলেন, “ইমাম আবু হানীফা (রহ) ই সর্বপ্রথম এই ইলমে ফিকহ সংকলন করেন এবং তা অধ্যায় হিসেবে বিন্যস্ত করেন। পূর্ববর্তী ফকীহদের কেউই তাকে এ বিষয়ে পিছনে ফেলতে সক্ষম হয়নি।” [মানাকিবে মুওয়াফফিক]

    আবু হানীফা ফিকহ আহরনে তাঁর অনুসৃত নীতি সম্পর্কে নিজে বলেন, “আমরা প্রথমত কিতাবুল্লাহ দ্বারা দলীল গ্রহণ করি। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ হাদীস দ্বারা। তারপর সাহাবায়ে কিরামের ফয়সালা দ্বারা। সাহাবায়ে কিরাম যে বিষয়ে সর্বসম্মত আমরা এর উপরে আমল করি। যদি তাঁদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতপার্থক্য হয়ে যায় তখন আমরা সামগ্রিক ইল্লাতের ভিত্তিতে এক হুকুমকে অন্য হুকুমের উপর কিয়াস করি যতক্ষণ না নসের (কুরআন-সুন্নাহ) অর্থ স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।” [আল-মীযান: ইমাম শারানী]

    তিনি নিজে সুউচ্চ পর্যায়ের মুজতাহিদ হওয়া সত্ত্বেও কোন বিষয়ে সর্বাধিক সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্য এবং একইসাথে ফিকহ চর্চাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য তাঁর সুযোগ্য ও বিশিষ্ট সহচরদের মধ্য থেকে প্রধান চল্লিশজনকে নিয়ে ‘মাজমাউল ফিকহী’ বা ফিকহ পরিষদ’ গঠন করেন। এই চল্লিশজন তৎকালীন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও মুজতাহিদ ছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লামা মুওয়াফফিক মক্কী (রহ) বলেন, “আবু হানীফা (রহ) তাঁর ফিকহী চিন্তাধারা পরস্পর আলোচনা ও পরামর্শের উপর ভিত্তি করে রচনা করেন। মজলিশে শূরার সাথে আলোচনা ব্যতীত তিনি নিজের একার মতে কিছু করতেন না। ফিকহী বোর্ডের সামনে তিনি এক একটি করে মাসআলা পেশ করতেন, সদস্যদের মতামত ও প্রমানাদি শুনতেন ও সবশেষে নিজের দলীল ও যুক্তিসমূহ পেশ করতেন। এভাবে এক এক মাসআলার উপর (প্রয়োজনে) মাসব্যাপী বা এর চেয়েও বেশী সময় পর্যন্ত তিনি বোর্ড সদস্যদের সাথে বিতর্ক চালিয়ে যেতেন। পরিশেষে কোন একটি অভিমতের উপর বোর্ড সদস্যগণ একমত হলে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) তা লিপিবদ্ধ করে নিতেন। এভাবে ফিকহে হানাফী লিপিবদ্ধ হয়” [মানাকিব]

    সবার ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি চলতে থাকতো। এক বর্ণনায় আছে, “তাঁদের মধ্য থেকে একজনও যদি ভিন্নমত পোষণ করতেন তাহলে তিনদিন পর্যন্ত সে বিষয়ের উপর আলোচনা হত”। ইবন আবুল আওয়াম, ইমাম আবু হানীফার অন্যতম প্রধান ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফের (রহ) সূত্রে বর্ণনা করেন,

    “যখন ইমাম আবু হানীফার নিকট কোন মাসআলা উপস্থিত হতো, তখন তিনি তাঁর ছাত্রগণকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, এ বিষয়ে তোমাদের নিকট কী হাদীস ও আসার আছে তা বর্ণনা কর। তারপর যখন আমরা হাদীস ও আসার পেশ করতাম এবং সে ভিত্তিতে নিজেদের রায় দিতাম, তখন তিনি তাঁর মতামত ও ব্যক্ত করতেন। তারপর উভয় পক্ষের মধ্যে যে পক্ষে হাদীস ও আসার অধিক (শক্তিশালী) হতো, সেইসব হাদীস ও আসারই তিনি গ্রহণ করতেন। আর যদি উভয় পক্ষের হাদীস ও আসার সমান সমান হতো, তখন তিনি চিন্তা-গবেষণা করে একটি মতকে গ্রহণ করতেন।”

    এই ‘ফিকহ পরিষদ’ এর তত্ত্বাবধানে বাইশ বছর পর্যন্ত অক্লান্ত সাধনা ও গবেষণার ফলে ৮৩ হাজার মাসআলা সংকলিত ও সন্নিবেশিত হয়। এরপরও মাসআলার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং এভবে ৫ লাখে গিয়ে পৌছায়। আল্লামা খাওয়ারেযমী (রা) স্বাীয় ‘জামেউল মাসাইল’ গ্রন্থে বলেন,

    “বর্ণিত আছে যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর (লিপিবদ্ধকৃত) মাসাইলের সংখ্যা পাঁচ লক্ষে গিয়ে পৌঁছে ছিল। তাঁর ও তাঁর ছাত্রদের গ্রন্থরাজি এর প্রমাণ বহন করে”।

    এভাবে আবু হানীফা (রহ) প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি প্রবর্তন করে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমায়ে সাহাবা, ফাতাওয়ায়ে সাহাবা ও কিয়াসের মাধ্যমে ব্যাপক গবেষণা করে বিষয় ভিত্তিকভাবে ফিকহের এক বিশাল ভান্ডার গড়ে তোলেন এবং ‘ফিকহ’ কে আলাদা এক শাস্ত্রের রূপ দেন।

    ইমাম আবু হানীফা বিপুল সংখ্যক মুজতাহিদ ছাত্র রেখে যান। প্রধান ছাত্রদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হাসান আশ শায়বানী ও ইমাম যুফার অন্যতম। এই তিনজন নিজেরাই মুজতাহিদ মুতলাক ছিলেন এবং স্বতন্ত্র মাযহাব প্রবর্তনের যোগ্যতা রাখতেন কিন্তু তারা নিজেদেরকে তাদের শিক্ষকের মাযহাবের সাথেই সম্পৃক্ত রাখেন। আবু হানীফার পর তাঁর ছাত্ররা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিখ্যাত ছাত্র বৃন্দের মাধ্যমে তাঁর ফিকহী পদ্ধতি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া বিভিন্ন খলীফা, শাসক এর কাযীগণ এই মাযহাবকে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে হিসেবে গ্রহণ করলে এটা মুসলিম জগতের সর্বত্র   বিস্তৃত হয়। ইবনে হাযম (রহ) বলেন,

    “ইসলামের প্রথম যুগে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় দুটি মাযহাব গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচ্য অঞ্চলে হানাফী মাযহাব আর আন্দালুসে-স্পেনে মালিকী মাযহাব।”

    এভাবে মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক লোক এই মাযহাবের অনুসারী হয়ে যায়।

    ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ):

    وإذا ذكر العلماء، فمالك النجم الثاقب
    “যখন আলেমগণের আলোচনা করা হয় তখন মালিক ইবনে আনাসের আলোচনা সবচেয়ে উজ্জল হয়ে উঠে” [ইমাম শাফেঈ]

    আবু আব্দুল্লাহ মালিক ইবনে আনাস (রহ) ৯৩ হিজরীতে মদীনা তাইয়্যেবায় জন্মগ্রহন করেন।

    মদীনার প্রখ্যাত তাবিঈ মুজতাহিদ রবীয়াতুর রায়, প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম যুহরী নাফে (রহ) এবং এরূপ আরো অনেক শ্রেষ্ট ফকীহ ও মুহাদ্দিস তাবেঈন থেকে তিনি হাদীস ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করে এক সময় ‘ইমাম দারুল হিজরত’ ও ‘মদীনার ইমাম’ নামে চতুর্দিকে খ্যাতি অর্জন করেন।

    তাঁর সর্বশ্রেষ্ট কীর্তি তাঁর ‘মুওয়াত্তা’ নামক হাদীস সংকলন যেটা অনেকের মতে বুখারী, মুসলিমের সমপর্যায়ের বিশুদ্ধ হাদীস সংকলন। একই সাথে ‘মুওয়াত্তা’ মালিকী ফিকহের ভিত্তিও বটে। তাই মালিকী ফিকহের আলোচনা ‘মুওয়াত্তা’-কে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।

    ইমাম আওযাঈ (রহ) বলেন যে ইমাম মালিক (রহ) বলেছেন “এই গ্রন্থখানি আমি চল্লিশ বছরে সংকলন করেছি।” তিনি আরো বলেন, “এই গ্রন্থটি সংকলনের পর আমি মদীনার সত্তর জন ফকীহ’র সম্মুখে তা উপস্থাপন করলাম। তাঁরা সবাই আমার সাথে (এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে) ঐক্যমত পোষন করলেন। এ কারনেই আমি গ্রন্থটির নাম রাখলাম “মুওয়াত্তা’।”

    এ সংকলনে তিনি অনেক মুরসাল হাদীসকে স্থান দিয়েছেন। বস্তুতঃ ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর মত তিনিও মুরসাল হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করতেন। ‘মুওয়াত্তা’য় সংকলিত হাদীস ও আমাদের ভিত্তিতেই মালিকী ফিকহ প্রসারিত হয়।

    প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী আব্বাসীয় খলীফা মনসুরের অনুরোধক্রমেই ইমাম মালিক (রহ) ‘মুওয়াত্তা’ সংকলনে হাত দেন। বর্ণিত আছে যে, আব্বাসীয় খলীফা আল মনসুর যখন বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমগণ কর্তৃক ফিকহী বিষয়ে বিভিন্ন সব পার্থক্য লক্ষ্য করলেন তখন তিনি চাইলেন একক কোন হাদীস ও ফিকহ গ্রন্থের ভিত্তিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে। তাই হজ্জ্ব উপলক্ষ্যে মদীনায় এসে খলীফা মনসুর ইমাম মালিককে বললেন, “আমি আপনার ‘আল মুওয়াত্তা’র অনুলিপি প্রস্তুত করিয়ে এবং সেগুলো মুসলিমদের সকল শহরে পাঠিয়ে দিয়ে তাদেরকে এ নির্দেশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এখন থেকে এটারই অনুসরণ করতে হবে এবং একে ত্যাগ করে অন্য কোন মতের অনুসরণ করা যাবে না। ইমাম সুয়ুতীর বর্ণনায় অনুরূপ ঘটনা খলীফা হারুনুর রশিদের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে খলীফা তাঁকে বলেন, “আপনার ‘মুওয়াত্তা’ কাবার গায়ে ঝুলিয়ে দিয়ে লোকদেরকে সকল মতপার্থক্য ত্যাগ করে এর অনুসরন করতে বাধ্য করলে কেমন হয়? জবাবে ইমাম মালিক বলেন, “হে আমীরুল মু’মিনীন! এমনটি করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণের মধ্যেই খুঁটিনাটি বিষয়ে মতপার্থক্য ছিলো। অতঃপর তাঁরা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিভিন্ন শহরে তাঁদের নিজ নিজ মতের অনুসারী লোক সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে লোকদের মধ্যে যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে তা সাহাবা (রহ) গণের থেকেই চলে আসছে।” তার এই উত্তর শুনে খলীফা তাঁর ইচ্ছা দমন করলেন।

    ইমাম মালিক তাঁর ফিকহ এর উৎস হিসেবে কুরআন, সুন্নাহ, মদীনার আলেমদের আমল, কিয়াস ও ইসতিসলাহ কে গ্রহণ করেন, [তারীখে ফিকহে ইসলামী]। মদীনাবাসীদের সম্মিলিত আমলকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং এর বিপরীত খবরে ওয়াহিদ হাদীস বর্জন করতেন। তাঁর নিজের সময়কালেই তাঁর মাযহাব মদীনার প্রধানতম মাযহাবে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে সমগ্র হিজাজেও তা বিস্তার লাভ করে। তাঁর মদীনার ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু মারওয়ান আব্দুল মালিক (রহ)। অন্যান্য অঞ্চল বিশেষত মিসর ও আফ্রিকা থেকে অনেকে তাঁর নিকট ‘ফিকহ’ শিখতে আসতেন। যাদের মাধ্যমে তার মাযহব অন্যান্য অঞ্চলে বিশেষত আফ্রিকায় বিস্তার লাভ করে। তাঁর অনুসারী ছাত্ররা ছাড়াও তাঁর যুগের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বও তাঁর নিকট হাদীস শিখতে আসতেন যাদের মধ্যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ এবং ইমাম শাফিঈ (রহ) অন্যতম।

    ইমাম শাফিঈ (রহ) ও ফিকহে তাঁর অবদান:

    “কালির দোয়াত বহনকারী যে কোন হাদীস বর্ণনাকারী কোন না কোনভাবে ইমাম শাফিঈর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন।” [ইমাম আহমদ]

    আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন ইদরীস ওরফে ইমাম শাফিঈ (রহ) ১৫০ হিজরীতে সিরিয়ার গাযা প্রদেশে জন্মগ্রহন করেন। একই বছর ইমাম আবু হানীফা (রহ) বিদায় নেন।

    ইমাম শাফেঈ প্রথমে মক্কায় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (রহ) ও মুসলিম ইবনে খালিদ আল যিনজী (রহ) এর নিকট থেকে হাদীস ও ফিকহ এর জ্ঞান অর্জন করেন। অতঃপর মদীনায় ইমাম মালিক (রহ) এর কাছ থেকে ‘মুওয়াত্তা’ শিক্ষা নেন। এছাড়াও আরো ৮০ জন ফকীহ ও মুহাদ্দিস থেকে তিনি হাদীস ও ফিকহ শিখেন। অতঃপর ইরাকে গিয়ে আবু হানীফার বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান (রহ) এর কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন। ১৯৫ হিজরীতে তিনি পুনরায় ইরাক যান এং তাঁর ফিকহী চিন্তাধারা পেশ করেন। তাঁর এ সময়ের ফতওয়াগুলো তাঁর ‘কওলে কাদিম’ বা পুরাতন অভিমত নামে পরিচিত। ১৯৮ হিজরীতে তিনি মিসরে চলে যান এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই কাটান। মিসর গমনের পর মক্কা, মদীনা, ইরাক ও মিসরের ঐ সময়ের ফিকহী চিন্তাধারা গভীর ভাবে বিশ্লেষন করে তাঁর নিজস্ব ফিকহী চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয় এবং চিন্তাধারার এই পরিবর্তন তাঁকে তাঁর সর্বশ্রেষ্ট কীর্তি ‘উসূলুল ফিকহ’ তথা ফিকহের মূলনীতি প্রনয়নের দিকে চালিত করে।

    এ বিষয়ে জ্ঞানীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে, ‘উসূল আল ফিকহ’ এর সর্বপ্রথম প্রণেতা হচ্ছেন ইমাম শাফিঈ এবং এ বিষয়ে সর্বপ্রথম প্রণীত গ্রন্থ তাঁর ‘আর-রিসালাহ’। দূর্বল একটি সূত্রে আবু হানীফার ছাত্র আবু ইউসুফ কর্তৃক সর্বপ্রথম উসূল আল ফিকহ বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনার বর্ণনা থাকলেও এর স্বপক্ষে শক্তিশালী কোন প্রমাণ নেই আর গ্রন্থটি পরবর্তীকালে পাওয়াও যায়নি। আয যারকাশী তার আল-বাহরুল মুহীত গ্রন্থে লিখেছেন, “ইমাম শাফিঈ (রহ) প্রথম ব্যক্তি যিনি উসূল আল ফিকহ সম্পর্কে লিখেছেন। ইমাম জুয়াইনী বলেন, “ইমাম শাফিঈ (রহ) এর পূর্বে আর কেউ উসূল সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেননি কিংবা এ বিষয়ে তাঁর মতো এতো বেশী জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন না।”

    বস্তুতঃ প্রাথমিক যুগের ফকীহদের বিভিন্ন ফতোয়া থেকে ধারনা করা যায় যে, এ বিষয়ে বিভিন্ন নীতিমালার জ্ঞান তাদের ছিল, তবে তারা কেউই এসব নীতিমালা সম্পর্কে পৃথকভাবে কোন আলোচনা করেননি বা এ বিষয়ে কোন গ্রন্থনা করেননি। সর্বপ্রথম ইমাম শাফিঈ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেন। তাঁর অন্য কোন অবদান যদি নাও থাকতো তাহলেও কেবল এই এক কারনেই তিনি ফিকহের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতেন।

    যেসব বিষয়ে তাকে ‘উসূলে ফিকহ’ প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা হলো:

    (১) তাঁর পূর্ববর্তী যুগের ইমাম ও ফকীহদের নিকট প্রধানত তাদের নিজ নিজ শহরের আলেমদের সূত্রে প্রাপ্ত হাদীস ও আসারই বর্তমান ছিলো, সকল শহরের বর্ণনা সমূহের কোন একক সংকলন ছিলনা, ফলে বিভিন্ন শহরের ফকীহদের রায়ে ব্যাপক মতপার্থক্য এতো বেশী নজরে আসেনি। শাফিঈর যুগে তিনি তা সংকলিত অবস্থা পান এবং এসবের মাঝে ব্যাপক মতপার্থক্য দেখেন। তাছাড়া পূর্ববর্তী অন্যান্য ইমামরা প্রধানত নিজ শহরেই বাস করতেন কিন্তু ইমাম শাফিঈ এ সময়ে ফিকহের প্রধানতম চারটি কেন্দ্র মক্কা, মদীনা, কুফা ও মিসরে অবস্থান করে জ্ঞানার্জন করায় বিভিন্ন অঞ্চলে ফিকহী চিন্তাধারার পার্থক্য তাঁর নজরে আসে। তাই তিনি এমন কিছু মূলনীতি উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করেন যার ভিত্তিতে সকলেই একই ছক অনুসরণ করে মূল উৎস হতে ফিকহ আহরন করতে পারে যাতে মতভেদ যথাসম্ভব হ্রাস পায়।

    (২) তিনি দেখলেন মদীনা ও কুফার ফকীহরা‘ মুরসাল ও মুনকাতি’ হাদীস দলীল হিসেবে গ্রহণ করছে, ফলে তাদের অনেক বক্তব্যে ত্র“টি প্রবেশ করছে। কেননা বহু মুরসাল হাদীস মুসনাদ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে, ফলে তিনি মুরসাল হাদীস গ্রহণে শর্ত নির্ধারণ করে নীতিমালা প্রণয়ন করেন।

    (৩) তিনি দেখলেন, ফকীহরা দুটি ইখতিলাফপূর্ণ প্রমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে কোনো নির্দিষ্ট বিধি অনুসরন করেননি, যাতে তাদের ইজতিহাদ সমূহ ভ্রান্তি থেকে আরো সুরক্ষিত হতো। কাজেই তিনি এ বিষয়ে মূলনীতি দাঁড় করালেন।

    (৪) তিনি দেখলেন, কোন ইমামের কাছে কোন সুনির্দিষ্ট হাদীস না থাকায় তিনি হয়তো ঐ বিষয়ে ইজতেহাদ করে রায় দিয়েছেন, কিন্তু পরবর্তী যুগে তাঁর অনুসারী ফকীহদের এ বিষয়ে হাদীস নজরে এলেও যথাযথ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তা গ্রহণে মনোনিবেশ না করে, পূর্ববর্তী ইজতিহাদকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, ফলে তিনি এ বিষয়েও মূলনীতি প্রণয়ন করলেন।

    (৫) তাঁর সময়ে সাহাবা (রহ) এর ‘কওল’ বা বানী সর্বাধিক পরিমানে সংগৃহীত ছিলো। তিনি এসব বিশ্লেষণ করে এর বিরাট অংশ সহীহ হাদীস এর বিপরীত পান। কারণ সব হাদীস এককভাবে সব সাহাবীর কাছে পৌছেনি। তাই তিনি এক্ষেত্রে সহীহ হাদীসের বিপরীত সাহাবীদের যেসব বক্তব্য তা গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপারে নীতিমালা তৈরী করেন।

    (৬) তিনি আরো দেখলেন, একদল ফকীহ ‘রায়’ ও ‘কিয়াস’ কে মিশিয়ে ফেলছে অথচ শরীয়ত ‘রায়’-কে নিষেধ করেছে ও ‘কিয়াস’-কে বৈধ ও উত্তম বলেছে। তিনি বলেন, “আমি রায় বলতে কোন যুক্তির ধারনা বা সম্ভাবনাকে কোনো বিধানের ভিত্তি বা কারণ ধরে নেয়া বুঝাচ্ছি। আর কিয়াস বলতে বুঝাচ্ছি কোনো সম্পূর্ণ বিধানের কারণ খুঁজে বের করা এবং সেই কারণের ভিত্তিতে অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ে একই বিধান স্থির করা।” এভাবে তিনি ‘কিয়াস’ এর সঠিক পদ্ধতি বিষয়ে নীতিমালা তৈরী করেন।

    (৭) তিনি দেখলেন, মিসরে লোকেরা কোন বাছবিচার ছাড়াই কঠোরভাবে ইমাম মালিক এর ফিকহ অনুসরন করছে। তিনি ইমাম মালিকের আইন বিষয়ক মতামত সমূহের সমালোচনা মূলক বিশ্লেষণ করে দেখলেন, “কখনো তিনি ঘটনাবিশেষকে গুরুত্ব না দিয়ে সাধারণ নীতিমালার আলোকে মত দিয়েছেন, আবার কখনো সাধারন নীতিমালার গুরুত্ব না দিয়ে ঘটনা বিশেষের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।” তিনি লক্ষ্য করেন, ইমাম মালিক (রহ) কোন সাহাবী বা তাবেঈ প্রদত্ত বক্তব্য বা মদীনাবাসীদের ঐক্যমতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য আরেকটি সহীহ হাদীসকে অগ্রাহ্য করছেন এবং যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ মজুত থাকা অবস্থায় অনেক সময় ‘মাসালিহ-মুরসালাহ’ প্রয়োগ করছেন। আবু হানীফা (রহ)-এর ব্যাপারে তাঁর মত ছিল, “অনেক ক্ষেত্রে তিনি ছোটখাট বিষয় ও বিশেষ কোন বিষয়ের ব্যাপারে তাঁর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন, সেগুলোর    বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন কিন্তু মূলনীতির প্রতি গুরুত্ব দেননি” ইত্যাদি। তাই ইমাম শাফিঈ উপরোক্ত বিষয় সমূহকে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

    উল্লেখিত বিষয়গুলোর ভিত্তিতে ইমাম শাফেঈ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সবচেয়ে বেশী মনোযোগ দিতে হবে আইন প্রনয়নের নীতিমালার সুনির্দিষ্ট করন, সেগুলোর প্রয়োগের জন্য বুনিয়াদী নিয়ম-নীতি প্রণয়ন ও উসূল আল ফিকহের বিকাশ ঘটানোর প্রতি যাতে এসবের সাহায্যে যথার্থ সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ফিকহ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। ‘ফিকহ’-কে হতে হবে উসূলুল ফিকহের বাস্তব প্রতিফলন। এ চিন্তাধারার ভিত্তিতেই তিনি তারা সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর রিসালাহ’ ও পরবর্তীতে ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনা করেন যার মাধ্যমে তিনি ‘উসূল আল ফিকহ’ এর ভিত্তি স্থাপন করেন।

    ইমাম শাফিঈর ‘আর রিসালাহ’তে উপস্থাপিত চিন্তাধারা সমসাময়িক ‘ফিকহী’ গবেষনার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। এরপর দীর্ঘ সময় উসূলুল ফিকহের উপর যা লিখা হয়েছে তা মূলত এই গ্রন্থের টিকা-টিপ্পনী বা এর পক্ষে বা বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা সম্বলিত। অর্থাৎ এটা ঐ যুগের ‘ফিকহী’ গবেষণার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়।

    তবে ইমাম শাফিঈ (রহ) তাঁর উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের মাধ্যমে উসূলুল ফিকহের ভিত্তি স্থাপন করলেও এ দুটো ‘উসূল আল ফিকহ’ বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ট গ্রন্থ নয়, বরং এ বিষয়টি পূর্ণতা লাভ করে তাঁর পরবর্তীকালে প্রধানত তাঁর অনুসারী মুজতাহিদগণের মাধ্যমে। এ বিষয়ে প্রাচীনদের লেখা শ্রেষ্টতম তিনটি বই হচ্ছে- আবু আল হুসাইন মুহাম্মদ বিন আল বসরী’র ‘মু’তামাদ’, ইমামুল হারামাইন রচিত ‘আল বুরহান’, এবং ইমাম গাজ্জালী (রহ) রচিত ‘আল মুস্তাসফা মিন ইলমুল উসূল’। পরবর্তীতে আবুল আল হোসাইন আলী ওরফে ইমাম সাইফুদ্দিন আল আমিদি তাঁর ‘আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম’ নামক বিখ্যাত ও সুবৃহৎ গ্রন্থে উপরোক্ত গ্রন্থত্রয়ের সারবস্তুকে একত্রিত করেন।

    আশ-শাফিঈর এই চিন্তাধারা সমকালীন অন্যান্য মাযহাবের উপর প্রভাব বিস্তার করে। বাকীরাও তখন নিজ নিজ মাযহাবের উসূল প্রণয়নে মনোবিবেশ করে। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এ সমস্ত উসূলই ইমাম শাফিঈ প্রণীত ‘উসূল’ এরই কিছুটা বর্ধিত বা সংক্ষিপ্ত রূপ। যেমন- ইমাম শাফিঈর পরবর্তী হানাফী ফকীহগণ ‘উসূল আল ফিকহ’ রচনায় হাত দেন এবং শাফিঈ উসূলের সাথে এর মৌলিক পার্থক্য খুব কম। পার্থক্য কেবলমাত্র শাখা-প্রশাখা পর্যায়ে বিধান আহরণের ক্ষেত্রে। হানাফীদের রচিত উসূলুল ফিকহের গ্রন্থের মধ্যে আলী বিন মুহাম্মদ আল বাযদাবী (রহ) রচিত ‘উসূল আল বাযদাবী’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। মালিকীদের প্রণীত ‘উসূলুল ফিকহ’ও শাফিঈ’র প্রায় অনুরূপ এবং প্রধান পার্থক্যর মধ্যে ‘মদীনার আলেমদের ঐক্যমত’ শরীয়াহর দলীল না হওয়ার বিষয়ে শাফিঈর মতভেদ উল্লেখযোগ্য। হাম্বলীরাও এই উসূল গ্রহণ করে নিয়েছে, তবে তারা ইজমা’র অর্থ সম্পর্কে ইমাম শাফিঈ’র সাথে মতভেদ করেছে এই বলে যে, একমাত্র গ্রহণযোগ্য ইজমা হচ্ছে ‘ইজমা আস সাহাবা’। যারা তাঁর উসূলকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে সে ধারাটিই শাফিঈ মাযহাব নামে পরিচিত হয়।

    এভাবেই ইমাম শাফিঈ ‘উসূলুল ফিকহ’ একদিকে যেমন তাঁর নিজস্ব মাযহাবের বুনিয়াদ স্থাপন করে, তেমনি অন্যদিকে আর সব মাযহাবের উসূল সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার উপরও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ‘উসূলুল ফিকহ’ এর আর্বিভাবের ফলে মূল উৎস হতে ‘ফিকহ’ আহরনের একটি ছক বা মানদন্ড তৈরী হয় এবং পরবর্তীকালের সকল ‘ফিকহ’ চর্চাকারীদের জন্য একটি সাধারণ পথ তৈরী হয়।

    ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) এবং ফিকহে তাঁর অবদান:

    “আমি বাগদাদে আহমদ বিন হাম্বলের চেয়ে মর্যাদাশীল, অধিক জ্ঞানী, দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত ও অধিক মুত্তাকী আর কাউকে পাইনি।” [ইমাম শাফিঈ]

    আবু আব্দুল্লাহ আহমদ ইবনে (রহ) ১৬৪ হিজরী সনে বাগদাদে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফের কাছে ফিকহ এর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দেস সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রহ) ও শায়খ আব্দুর রাজ্জাক এর কাছ থেকে শিক্ষা নেন। পরবর্তীতে তিনি ইমাম শাফিঈ (রহ) এর কাছ থেকে ‘ফিকহ’ শিক্ষা করেন। এভাবে ফিকহ ও হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে তিনি ‘ইমামুল হাদীস’ এর মর্যাদা লাভ করেন।

    হাম্বলী ফিকহ মূলত শাফেঈ ফিকহের অনুগামী। তাদের উসূলও প্রায় শাফেঈ উসূলই বলা চলে। তবে ইমাম আহমদ হাদীসকে অধিকতর গুরুত্ব দিতেন, ইজমা বলতে ইজমা আস সাহাবাকে সুনির্দিষ্ট করতেন এবং ‘কিয়াস’ যথা সম্ভব পরিহার করতেন। তিনি বলেন, “কোন ব্যক্তি বিশেষের অভিমতের চেয়ে যঈফ-দূর্বল হাদীস আমার নিকট অধিকতর উত্তম”। এ মূলনীতির ফলে তিনি মারফূ অথাব মওকূফ উভয় অবস্থাতেই সহীহ হাদীসকে আমলযোগ্য মনে করতেন। ফলে তাঁর মাযহাবে একই মাসআলায় একাধিক হুকুম পাওয়া যায়। একান্ত বাধ্য হয়ে তিনি কিয়াস করতেন এবং কোন বিষয়ে কোন সাহাবীর রায় পেলে তাকে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দিতেন। তাঁর অনন্য কীর্তি হচ্ছে তাঁর সংকলিত মুসনাদে ইমাম আহমদ যাতে তিনি সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে চল্লিশ হাজার হাদীস সংকলন করেন। ইমাম আহমদ, ‘ফকীহ’র চেয়ে মুহাদ্দিস হিসেবেই বেশী পরিচিত। তাঁর ছাত্রবৃন্দের মাধ্যমে তাঁর মাযহাব বাগদাদ, বসরা, প্রভৃতি জায়গায় বিস্তার লাভ করে।

    উপরোক্ত এই চারজন ইমাম ‘ফিকহে’ তাদের গগনচুম্বী ব্যাক্তিগত অবদানের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক দক্ষ ছাত্র তৈরী করে যান যারা পরবর্তীতে তাদের ফিকহী চিন্তাধারায় সংরক্ষন করে এবং একে মাযহাবের রূপ দেয়। বস্তুত পরবর্তী যুগে এমনকি আজ পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী এই চার ইমামের মাযহাব টিকে থাকার প্রধান কৃতিত্ব তাঁদের ছাত্রদের যারা এটাকে একযুগ থেকে অন্যযুগে বহন করে নিয়ে গেছেন। এই চার জন ছাড়াও ঐ যুগে তাদের সমপর্যায়ের যোগ্যতা সম্পন্ন আরো কিছু মুজতাহিদ ছিলেন যাদের পৃথক মাযহাব ছিলো এবং তাদের বিপুল সংখ্যক অনুসারীও ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের কর্র্ণধার কর্তৃক প্রচারিত না হওয়ায় এবং তাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক ছাত্র না থাকায় তাদের মৃত্যুর কিছুদিন পর ঐসব মাযহাব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য যারা তারা হলেন:

    ১) সিরিয়ার আবু আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ আল আওযাঈ ও তাঁর মাযহাব।
    ২) ইমাম সুফিয়ান ছাওরী ও তাঁর মাযহাব।
    ৩) আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জরীর তাবারী ও তাঁর মাযহাব।
    ৪) ইমাম আবু সুলাইমান দাউদ যাহেরী ও তাঁর মাযহাব। (এই মাযহাবী চিন্তাধারার সাথে মূলধারার প্রধান পার্থক্য ছিলো যে এরা কিয়াসকে শরীয়াহকে উৎস হিসেবে অস্বীকার করতো যদিও তারা ‘কিয়াসে জলী’ বলতে যা বোঝায় ভিন্ন নামে তা অনুসরণ করতো)

    এর মধ্যে প্রথম তিনটি হিজরী প্রায় তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল, অতঃপর বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর চতুর্থটি অর্থাৎ ইমাম দাউদ যাহেরী (রহ) এর মাযহাব ইবনে খালদূনের মতে অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিলো। এসব ছাড়াও আরো কিছু মাযহাব যেমন- ইমাম হাসান বসরী (রহ), ইমাম ইসহাক ইবনে রাওয়াহ (রহ), সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রহ) ও নায়স ইবনে সাদ (রহ) এদের মাযহাবও কিছুকাল পর্যন্ত চালু ছিল। পরবর্তীতে এগুলোর চর্চা ও অনুসরন বন্ধ হয়ে যায় এবং হানাফী. শাফিঈ, মালিকী ও হাম্বলী এই চারটি ‘ফিকহী স্কুল’ অবশিষ্ট থেকে যায়।

    এসবের বাইরে মূলধারা থেকে প্রায় পৃথক একটি ফিকহী চিন্তাধারা যা মাযহাবও সে যুগে গড়ে উঠেছিল যা এখনও বিদ্যমান আছে, আর তা হলো শিয়া মাযহাব। তাঁরা ইমাম জাফের সাদেকের মাযহাব গ্রহন করেছিলো যদিও বস্তুতঃ তাঁরা নিজেদের আকীদার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তার মতের সাথে সত্য-মিথ্যা অনেক কিছু সংযোজন করে। তাদের ফিকহের উৎসের মধ্যে কুরআন, সুন্নাহ’র মত তাদের বারোজন ইমামের বক্তব্যও অন্তর্ভূক্ত অর্থাৎ তাদের বক্তব্যকে তারা কুরআন, সুন্নাহর সমপর্যায়ের আইনগত মর্যাদা দেয় এবং তাদের ইমামদের বর্ণিত হাদীস ছাড়া অন্য কোন হাদীস গ্রহণ করে না। এছাড়া তারা কিয়াসকে শরীয়াহর উৎস হিসেবে অস্বীকার করে, এভাবে তারা প্রধান সমস্ত মাযহাবের চিন্তা থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে ভিন্ন চিন্তা পোষণ করে।

    উপরোক্ত প্রধান প্রধান ‘ফিকহী স্কুল’ ও তাঁদের  প্রবক্তাদের কর্মপ্রচেষ্টার ফলে ফিকহের বিন্যাস উসূলুল ফিকহ প্রণয়ন, হাদীস সংকলন ইত্যাদির মাধ্যমে এ যুগে ফিকহ তাঁর সর্বোচ্চ শিখরে পৌছায়। তাদের বিখ্যাত ছাত্রদের মাধ্যমে অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে যুগের শেষ পর্যায় তথা চতুর্থ হিজরীর মাঝামাঝি পর্যন্ত।

    দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ যুগে মুজতাহিদ সাহাবা ও ইমামগণের ফিকহী বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণ :

    إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ

    যখন হাকিম ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে তখন সে দুটি সওয়াব পায়, (আর) তার সিদ্ধান্ত ভুল হলে সে অন্তঃত একটি সওয়াব পায়” [বুখারী]

    এটি একটি বিস্তৃত বিষয় এবং এ বিষয়ে পূর্ববর্তীরা পৃথক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এমন কি এ বিষয়টি ‘ইলমুল খেলাফ’ বা মতভেদ সম্পর্কিত জ্ঞান নামে পৃথক একটি শাস্ত্রের রূপও গ্রহণ করে। তবে খুঁটিনাটি বিষয় বাদ দিয়ে আমরা কেবল সেই মৌলিক কারণগুলো উপস্থাপন করবে যেগুলোর ভিত্তিতে সাহাবা (রা) যুগ, তাবেঈ যুগ ও তাবে-তাবেঈন যুগ তথা মুজতাহিদ ইমামগণের যুগে ফিকহী বিষয়ে বিভিন্ন মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল যা এখনো বর্তমান। এগুলো হচ্ছে:

    ১) কোন একটি প্রশ্ন বা সমস্যার সমাধান সম্পর্কে হয়তো একজন সাহাবীর উক্ত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কোনো বক্তব্য জানা ছিল পক্ষান্তরে অন্যজনের জানা ছিল না ফলে বাধ্য হয়ে তিনি সে বিষয়ে ইজতিহাদ করে রায় দিয়েছেন। যেমন: পূর্ব উমর (রা)-এর কিছু উদাহরণে এটা দেখা যায়। অনুরূপ ঘটনা মুজতাহিদ ইমামদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে কেননা তারা যাদের কাছ থেকে হাদীস সংগ্রহ করেছেন তাদের নিকট সকল সাহাবী বর্ণিত হাদীস ছিলনা যেহেতু হাদীস সংকলনের যুগ হচ্ছে এর পরবর্তী যুগ। কাজেই এটা স্বাভাবিক ছিলো যে কোন হাদীস হয়তো একজন মক্কাবাসী ইমামের জানা ছিলনা কিন্তু কুফাবাসী ইমামের তা জানা ছিল।

    ২) হয়তো হাদীসটি সাহাবা বা ইমামের নিকট পৌছেছে কিন্তু তা তাঁর কাছে বিভিন্ন করণে নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হয়নি। যেমন-হয়তো হাদীস বর্ননাকারী ইমামের নিকট অজ্ঞাত, বা কোন অভিযোগে অভিযুক্ত বা স্মৃতি শক্তিতে দূর্বল বা হাদীসটি তার কাছে মারফু অবস্থায় পৌছেনি বরং মুনকাতি অবস্থায় পৌছেছে, কিংবা হাদীসের শব্দাবলী (মতন) দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত ছিলনা ইত্যদি। পক্ষান্তরে হয়তো একই হাদীস অন্য ইমামের নিকট নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা মুত্তাসিল সনদে পৌছেছে বা অন্য কোন সনদে পৌছেছে বা এর স্বপক্ষীয় আরো এমন কিছু হাদীস পৌছেছে যার দ্বারা উক্ত হাদীস শুদ্ধ প্রমাণিত হয়। তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের মাঝে এরূপ ঘটনার সংখ্যা অনেক। এরূপ ক্ষেত্রে, যার নিকট হাদীসটি সঠিক পন্থায় পৌছেছে তিনি তা দ্বারা দলীল গ্রহণ করেন পক্ষান্তরে যার নিকট দূর্বল সূত্রে পৌছেছে তিনি তা থেকে দলীল গ্রহণ করেননা। যেমন: ফিতনা ছাড়িয়ে পড়ার হেজাজ, ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের ইমামরা নিজের অঞ্চলে বাইরে অন্য অঞ্চলের হাদীস গ্রহণ করতেন না যদি না তা তাদের নিজেদের অঞ্চলেও তা প্রচলিত না থাকতো কেননা এ বিষয়ে তাঁরা হাদীস জাল হবার আশংকা করতেন।

    ৩) কোন ইমাম খবরে ওয়াহিদের বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে এমন কিছু শর্তারোপ করেন যা অন্যরা করেন না ফলে উভয়ের মধ্যে উক্ত হাদীসের ভিত্তিতে দলীল গ্রহণ করা বিষয়ে মতভেদ হয়। যেমন: কেউ বলেন খবরে ওয়াহিদ কুরআন হাদীস ভিত্তিক হতে হবে, বর্ণনাকারী ফকীহ হতে হবে ইত্যাদি।

    ৪) কিছু বিশেষ ধরণের হাদীস ব্যবহারে দলীল দেয়া কোন কোন ইমামের জন্য দোষণীয় নয় পক্ষান্তরে অন্যদের নিকট তা দোষণীয় ফলে তারা তা বর্জন করেন। যেমন: ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক মুরসাল হাদীস থেকে দলীল নিতেন কিন্তু ইমাম শাফেঈ তা নিতেন না, পক্ষান্তরে ইমাম আহমদ যঈফ হাদীস থেকেও দলীল নিতেন যা অধিকাংশ ইমাম নিতেন না।

    ৫) মতভেদের এটাও কারণ যে, হয়তো ঐ বিষয়ে কোন হাদীস ইমামের জানা ছিল কিন্তু তিনি তা ভুলে গেছেন। ফলে তিনি তা থেকে দলীল গ্রহণ করেননি। যেমন: সফরে কোন ব্যক্তি নাপাক হলে এবং পানি না পাওয়া গেলে কীভাবে নিজেকে পবিত্র করবেন তা উমর (রা) এর জানা ছিল কিন্তু তিনি তা ভুলে যান। পরে আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা) তাকে তা স্মরণ করিয়ে দেন। অনুরূপে, তিনি মোহরের পরিমান ধার্য করে দিতে চাইলে এক মহিলা তাঁর সামনে কুরআনের আয়াত পেশ করেন যা তাঁর নিজেরও জানা ছিল ফলে তিনি ঐ অনুযায়ী রায় দিলেন। অনুরূপে সাহাবী ইবনে উমর যখন বললেন, “রাসূল (সা) একটি উমরা করেছেন রজব মাসে তখন আয়েশা (রা) বললেন, ইবনে উমর ব্যাপারটা ভুলে গেছেন। [জামউল ফাওয়ায়িদ]

    ৬) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কোনো কাজের ধরণ নির্ণয়ে পার্থক্যের দরুণও মতপার্থক্য হতে পারে যদ্বরুন একই কাজকে কেউ মুবাহ আর কেউ সুন্নাহ মনে করতে পারে। যেমন : হজ্জের সফরে রাসুলুল্লাহ (সা) এর আবতাহ উপত্যকায় অবতরণ। একদল সাহাবী এটাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখেন আর অন্য দল বলেন যে তিনি ঘটনাক্রমে সেখানে অবতরণ করেছেন।

    ৭) মতপার্থক্যর আরেকটি কারণ হলো: সংশ্লিষ্ট ইমাম হয়তো হাদীসটি জানেন কিন্তু হাদীসের বক্তব্যের সঠিক উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করেন। যেমন: “মৃত ব্যক্তির পরিবার পরিজন কান্নাকাটি করলে মৃত ব্যক্তিকে আযাব দেযা হয়”-ইবনে উমর বর্ণিত ও হাদীস শুনে আয়েশা (রা) এ হাদীসের প্রকৃত ব্যাপার তুলে ধরেন যা থেকে বুঝা যায় ইবনে উমর হাদীসটির বক্তব্যের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন নি।

    ৮) মতভেদের এটাও একটা কারণ যে, কোন হাদীস থেকে বিধান স্থির করার পিছনে ইল্লত বা কারণ কি ছিল তা নির্ধারণে কখনো কখনো মতানৈক্য হতো। যেমন: কফিন অতিক্রমকালে দাঁড়ানো সম্পর্কিত হাদীসে দাঁড়ানোর কারণ বর্ণনার সাহাবীদের একাধিক ব্যাখ্যা ছিল।

    ৯) কোন ইমাম কতৃক কোন কোন হাদীসে আমল না করার এটাও একটা প্রসিদ্ধ কারণ যে, তার দৃষ্টিতে উক্ত হাদীস আলোচ্য সমস্যার সমাধানে কোন ইঙ্গিত বহন করেনা বা এ আয়াত হাদীস থেকে সুস্পষ্টভাবে এ বিধান আসেনা। এই কারণের অধীনে আরো অনোকগুলো কারণ আছে যার সাথে আরবী ব্যাকরণের অনেক নিয়ম-কানুন ও সংযুক্ত। আম ও খাস নির্ধারণ, কোন বস্তু থেকে বিপরীত বোধগম্য বিষয়কে দলীলরূপে গ্রহণ করা, কোনো কারণ ভিত্তিক আম ঐ কারণের উপর সীমিত থাকা, কেবল আমর বা আদেশবাচক হলেই তা দ্বারা ওয়াজিব প্রতিষ্ঠা হওয়া না হওয়া ইত্যাদি আরো অনেক বিষয় এর অন্তর্ভূক্ত যা নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। উসূল আল ফিকহ-এর বিরোধপূর্ণ মাসআলা গুলোর প্রায় অর্ধেক এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।

    ১০) এটাও মতপার্থক্যের অন্যতম কারণ যে, হয়তো কোন ইমাম কোন হাদীসের উপর আমল বর্জন করেন যেহেতু ঐ মাসআলায় তার কাছে এর বিপক্ষে অন্য দলীল আছে। এক্ষেত্রে উক্ত বিরোধপূর্ণ হাদীস দ্বয়ের ব্যাপারে সামঞ্জস্য বিধানগত মতপার্থক্য তৈরী হয়। কেউ হয়তো একটিকে মূল ধরে আরেকটিকে তা’ওয়ীল করেন, আবার কেউ হয়তো একটিকে মনসুখ আর অন্যটিকে নাসেখ হিসেবে দেখেন ইত্যাদি। ফলে মতপার্থক্য অনিবার্য হয়। মুতআ বিবাহ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা) এর মত বাকীদের বিপরীত হবার কারণ এ শ্রেণীতে পড়ে। অনুরূপে, সালাতে রফউল ইয়াদাইন বিষয়ে হানাফী ও শাফেঈদের মতপার্থক্যও এ বিষয়ের অধীন।

    ১১) মুজতাহিদ ইমামগণের মতপার্থক্যের এটাও একটা অন্যতম  কারণ যে, ইমাম তাঁর প্রণীত উসুলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌছান। এমতবাস্থায় উসূলের যৎসামান্য ভিন্নতায় বিধান আহরণের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা তৈরী হয। যেমন: ইমাম মালিক “মদীনাবাসীদের সম্মিলিতি আমল’ কে হুজ্জত হিসেবে গ্রহণ করায় এর বিপরীত অনেক সহীহ হাদীস তিনি বর্জন করেন কিন্তু অন্যান্য ইমামরা ঐ বিষয়কে হুজ্জত হিসেবে গ্রহণ না করায় তারা এ সমস্ত হাদীসের ভিত্তিতে দলীল গ্রহণ করেন।

    এভাবে বিভিন্ন করণে মুজতাহিদ ইমামদের ফিকহী সিদ্ধান্তে মতপার্থক্য সূচিত হয় যদিও এর প্রায় সবই হচেছ শরীয়াহ’র শাখা-প্রশাখায়, মূল বিষয়গুলিতে নয়। এখানে যেটা সবচেয়ে উলে¬খযোগ্য তা হলো, এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাদের প্রত্যেকের ইজতিহাদকৃত বিষয়ই ‘ইসলামী মত’ কেননা তারা প্রমাণিত ইসলামী পদ্ধতি ব্যবহার করেই এসব সিদ্ধান্তে পৌছেছেন। এ বিষয়ে তাদের সঠিক হওয়া বা ভূল হওয়া নিম্নের হাদীসের অধীন:

    “যখন হাকিম ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে তখন সে দুটি সওয়াব পায়, (আর) তার সিদ্ধান্ত ভুল হলে সে অন্তঃত একটি সওয়াব পায়”।

    ফিকহের স্থবির যুগ:

    হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ফিকহ চর্চায় এক ধরনের স্থবিরতার জন্ম নেয়। এ যুগে ব্যাপকভাবে ইজতিহাদ করা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং উলামা ও সাধারণ মানুষ সবাই বিশিষ্ট ইমামদের ফিকহী চিন্তার অনুসরণ করার মাঝে নিজেদের প্রতিভাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এ সময়ের ফিকহী আলোচনা নতুন কোন দিক নির্দেশনা মূলক না হয়ে বরং পূর্ববর্তীদের রচিত গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও তাতে টিকা-টিপ্পনী সংযোজন এবং পূর্ববর্তী ইমামগণ কর্তৃক মাসয়ালা-মাসায়েলের বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও নিজ নিজ মাযহাবের ইমামদের সমর্থনে ও পক্ষে বিপক্ষে মুনাযারা ও বাহাস বিতর্কের মাঝেই আবর্তিত হতে থাকে। এযুগে ফকীহগণ কদাচিৎ কোন সমস্যায় সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর দ্বারস্থ হতেন বরং স্বীয় মাযহাবের মধ্যেই ঐ সমস্যার সমাধান খুঁজতেন। এ সময় তারা কুরআন-সুন্নাহ’র অধ্যয়নকে স্বীয় মাযহাবের পক্ষ সমর্থনকারী আয়াত-হাদীস অনুসন্ধানের মাঝে সীমিত করেন, ফলে আগত নতুন সমস্যার সমাধান মূল দুটি উৎস থেকে খোঁজার ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের যে শিক্ষা তা চাপা পড়ে। এভাবে এ যুগে ফিকহ এর মূল প্রাণশক্তি স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং কেবল অনুসরণ ও অনুসৃত বিষয়ের ব্যাখা-বিশ্লেষণে পর্যবসিত হয়। তাই এ যুগে ফিকহের স্থবিরতার যুগ। বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তিত্ব ও তাদের কিছু অবদান ছাড়া এযুগে ফিকহের বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হয়ে হিজরী সপ্তম শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত চলে এ যুগ।

    ফিকহের পতন যুগ:

     إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنْ الْعِبَادِ وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالًا فَسُئِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا
    (শেষ যুগে) আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছ থেকে এক টানে ইলম উঠিয়ে নিবেন না, বরং আলেমদের উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই ইলম উঠিয়ে নিবেন। অবশেষে যখন তিনি কোন আলেমই অবশিষ্ট রাখবেন না তখন লোকেরা অজ্ঞ জাহেলদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে।” [বুখারী, মুসলিম]

    স্থবিরতার স্বাভাবিক পরিনতি হিসেবেই ফিকহ তার পতন যুগের দিকে এগিয়ে যায়। হিজরী সপ্তম শতকের প্রারম্ভ থেকে এই যুগের সূচনা হয়। স্থবির যুগের প্রভাবে এ যুগে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা সম্পন্ন প্রজন্মই গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে এযুগে এসে ইজতিহাদ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি মাসআলার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের যে অনুশীলন তাও হারিয়ে যায়। শুরু হয় পূর্ববর্তীদের রেখে যাওয়া জিনিসের খালেস তাকলীদের যুগ। এ যুগে বিভিন্ন মাসআলায় পূর্ববর্তীদের ব্যবহৃত দলীল প্রমাণ উল্লেখ না করেই সরাসরি সেসব মাসআলা লিপিবন্ধ করার প্রচলন হয় এবং জনসাধারণের মাঝে তা প্রচারিত হয়। ফলে, মূল উৎস হতে ফিকহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ফিকহ পরিণত হয় শুষ্ক আইনগ্রন্থে এবং এসবের শিক্ষার মাধ্যমে এমন এক পঙ্গু প্রজন্ম তৈরী হয় যারা ফিকহের বিকাশে ছিল সম্পূর্ণ অক্ষম।

    এ যুগের একদম প্রথমদিকে যদিও বিভিন্ন মাযহাবে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে যাদের অনেকেই ছিলেন স্বাধীন ইজতিহাদের যোগ্যতা সম্পন্ন কিন্তু স্থবিরতা এমন পর্যায়ে পৌছে ছিল যে তা ভাঙ্গার জন্য এই গুটিকয়েক ব্যক্তিত্বের সাময়িক আবির্ভাব যথেষ্ট ছিলনা। এদের মধ্যে  হানাফী মাযহাবের কামাল ইবনে হুমাম (রহ), জামালুদ্দীন যায়লাঈ (রহ), শাফিঈ মাযহাবের ইযযুদ্দীন আবদুস সালাম (রহ), তাকীউদ্দিন সুযুকী (রহ), জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ), মালেকী মাযহাবের আল্লামা ইবনে দাকীকুল ঈদ (রহ) ও হাম্বলী মাযহাবের আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ) ও হাফিয ইবনে কায়্যিম (রহ) উল্লেখযোগ্য। এদের প্রচেষ্টার কিছুকালের জন্য ‘ফিকহ’ এর প্রানবন্ত চর্চা চলে।

    কিন্তু এর পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ফিকহের পতন চলতেই থাকে। তথাপি এ পতন ইসলামের সীমারেখার মধ্যেই ছিল অর্থাৎ এ সময় পর্যন্ত ফিকহের অনুশীলনে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটেনি।

    কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ থেকে পতন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শরীয়াহ’র আইনকে অনৈসলামী আইনের সাথে মিশিয়ে ফেলা শুরু হয় এবং এর যৌথ অনুসরণ চলতে থাকে। এর যাত্রা শুরু হয় ১২৭৪ হিজরীতে যখন উসমানী খিলাফতের অধীনে হুদুদ আইনগুলো পরিবর্তন করে তৎপরিবর্তে উসমানী পেনাল কোর্ড ইস্যু করা হয়। অতঃপর ১২৭৬ হিজরীতে অধিকার ও বাণিজ্য  সম্পর্কিত আইন পাশ করা হয়। এভাবে ইসলামী উৎস ছাড়া অন্যান্য উৎস হতে আইন গ্রহণ করা চলতে থাকে যার মধ্যে দিয়ে  ফিকহের তথা ইসলামী আইনশাস্ত্রের চরম অধঃপতন সূচিত হয়।

    ইসলামী আইনের সাথে অনৈসলামী উৎস হতে আগত এসব আইনের মিশ্রণ চলতে থাকে উসমানী খিলাফতের শেষ তথা ১৯২৪ সাল পর্যন্ত। অবশেষে, ১৯২৪ সালে খিলাফত ব্যবস্থার পতনের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অবির্ভাবের ফলে ইসলামী ফিকহ পুরো পুরি রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং মুসলিম ভূমি গুলো অনৈসলামী আইনের ভিত্তিতে শাসিত হতে শুরু করে- যার মাধ্যমে ফিকহ এর চূড়ান্ত অধঃপতন সম্পূর্ণ হয়। সেই অধঃপতনের ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়ে আরো প্রকট রূপ ধারণ করে চলছে আজ পর্যন্ত।

    ‘ইলমুল ফিকহ’ পুনরুজ্জীবিত করার উপায়:

    تفقهوا قبل أن تسودوا
    তোমরা নেতৃত্ব লাভের আগেই ফিকহ অর্জন করে নাও।” [বুখারী]
    “ফিকহ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর জীবন; ফিকহ ব্যতীত এই উম্মতের জীবন বেঁচে থাকতে পারে না। [আল্লামা শামী]

    যেহেতু ফিকহ হচ্ছে বাস্তব জীবন পরিচালনার আইন কানুন সম্পর্কিত জ্ঞান অতএব জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে কখনোই এর পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়, বরং এই বিচ্ছিন্নতাই ফিকহ এর বর্তমান দুরবস্থার কারণ। বাস্তব জীবন পরিচালনায় যতবেশী ফিকহ ব্যবহৃত হবে ততই প্রয়োজনের তাগিদে এর বিকাশ ঘটতে থাকবে। তাই জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিকহ তথা ইসলামী আইনের প্রয়োগই ফিকহকে পুনরুজ্জীবিত করার একমাত্র পথ। বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র ইসলাম দিয়ে পরিচালিত না হওয়ায় উম্মাহর মাঝে ফিকহ জানার কোন চাহিদা নেই, কেননা এই সম্পর্কিত কোন জ্ঞান ছাড়াই বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রে সে তার সফল প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু ইসলামী আইন দ্বারা পরিচালিত একটি সমাজে জনগন স্বভাবিক প্রয়োজনের তাগিদেই ফিকহক চর্চায় বাধ্য হবে, যুগের নতুন নতুন সমস্যার সমাধানে মূল উৎসগুলোর দ্বারস্থ হবে, ইজতিহাদের চাকাকে সচল করবে আর এভাবেই ফিকহ আবার জীবন্ত হয়ে উঠবে।

    এজন্য প্রথমে প্রয়োজন এমন একটি দল যারা বিশুদ্ধ চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত, যাদের সমস্ত চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতি ফিকহ এর সঠিক চর্চার মাধ্যমে গৃহীত, যারা নিজ দলের অভ্যন্তরে এই সম্পর্কে সঠিক চিন্তার শিক্ষা দেয় এবং উম্মাহর মাঝেও এই চিন্তাকে ছড়িয়ে দেয়। একই সাথে এ দলটি উম্মাহকে এমনটি একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে আহবান জানায় যেখানে সব কিছু পরিচালিত হবে ইসলামী আইন তথা ফিকহ চর্চার মাধ্যমে- যাতে করে উম্মাহ ফিকহ এর বাস্তব উপযোগীতা বুঝতে পারে। এ আহ্বান এবং এর ভিত্তিতে নির্ধারিত তরীকা অনুসরন করে যখন সে রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে তখন নতুন যুগে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুমুখী চাহিদা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করার প্রয়োজনে ফিকহ চর্চায় আবারও গৌরবজ্জ্বল যুগের সূচনা হবে।

    আহমেদ জামাল

  • দালাল সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস

    দালাল সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস

    [১. মিশরের মুরসি সরকারের পতনের পর সৌদি সরকারের ভূমিকায় মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এই দালাল রাজপরিবারের ইতিহাস তাই মুসলিম উম্মাহর জেনে রাখা প্রয়োজন।

    ২. সৌদি রাজপরিবারের সমালোচনাকে ওয়াহাবী মতবাদের সমালোচনা হিসেবে ভেবে যারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, তারা লক্ষ করুন – এই নোটে কোথাও ওয়াহাবী মতবাদের প্রশংসা/সমালোচনা করা হয়নি – এটা এখানে প্রাসঙ্গিকও নয়। এখানে স্রেফ বলা হয়েছে – সৌদ পরিবার মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক উসমানিয়া খিলাফত ভাঙতে ওয়াহাবী মতবাদকে ব্যবহার করেছিল। আর সৌদ পরিবার জেনে-বুঝে দালালি করেছে তৎকালীন বিশ্বমোড়ল ও খিলাফতের শত্রু ব্রিটেনের।

    ৩. মাজারকেন্দ্রিক শিরকের চর্চা আর কবর জিয়ারত এক কথা নয়। মাজারকেন্দ্রিক শিরক পরিত্যাজ্য, কিন্তু কবর জিয়ারত একটি প্রতিষ্ঠিত সুন্নাহ।

    ৪. এই নোটে বহু বই থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে – তবে তথ্যগুলো এতই ব্যাপকভাবে স্বীকৃত যে, কম-বেশি সব তথ্যই Wikipedia-য় আছে। এমন কি, সৌদি দূতাবাসের ওয়েব সাইটেও আছে [অবশ্যই ব্রিটিশদের দালালির বিষয়টি বাদ দিয়ে]:
    http://www.saudiembassy.net/about/country-information/history.aspx

    ৫. যারা সৌদি আরবের ইতিহাস সামগ্রিকভাবে এই বই থেকেই জানতে চান, তারা Cambridge University Press থেকে ২০০২ সালে প্রকাশিত Madawi al-Rasheed-এর লেখা “A History of Saudi Arabia” বইটি পড়তে পারেন। আমি এই বই থেকে সাহায্য নিয়েছি।]

    =======================================
    দালাল সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস – ১
    **********************************

    সৌদি আরব হলো কোনো ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত পৃথিবীর একমাত্র মুসলিম দেশ। অন্য কোনো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কোনো ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

    রিয়াদের নিকটস্থ দিরিয়া নামের একটি কৃষিবসতির প্রধান ছিলেন মুহাম্মদ বিন সৌদ। এই উচ্চাভিলাষী মরুযোদ্ধা ১৭৪৪ সালে আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ বিন ওয়াহাব [ওয়াহাবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা]-এর সাথে মৈত্রী চুক্তি করে “দিরিয়া আমিরাত” গঠন করেন। তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে শিরক-বিদাত পালনের অভিযোগে এই দুজন ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধ শুরু করেন। ওই “দিরিয়া আমিরাত”-ই বিশ্বের প্রথম সৌদি রাজ্য/আমিরাত। মুহাম্মদ বিন সৌদ তার পুত্র আবদুল আজিজের সাথে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মেয়ের বিয়ে দেন। এভাবেই সৌদ পরিবার ও ওয়াহাবী মতবাদের মিলনযাত্রা শুরু হয়।

    ১৭৬৫ সালে মুহাম্মদ বিন সৌদ-এর মৃত্যু হলে তার ছেলে আবদুল আজিজ দিরিয়ায় ক্ষমতাসীন হয়। এই আবদুল আজিজ তত্কালীন বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী মোড়ল ব্রিটেনের সাথে হাত মিলিয়ে তুরস্কের খলিফাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকে। শ্বশুর ইবনে ওয়াহাবের ধর্মীয় মতবাদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তথাকথিত শিরক-বিদাত উচ্ছেদের নামে ব্রিটিশদের সাথে তুর্কি খিলাফত ধ্বংসের কাজে লিপ্ত হয় আবদুল আজিজ।

    ১৭৯২ সালে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মৃত্যু হয়। ১৮০১/২ সালে আবদুল আজিজ তুর্কি খিলাফতের কাছ থেকে ইরাক দখল করে হজরত আলী (রা.) ও হজরত হুসেন (রা.)-এর মাজার শরিফ ভেঙে ফেলে। এর প্রেক্ষিতে ১৮০৩ সালে একজন শিয়া মুসলিম আজিজকে দিরিয়ায় আসরের নামাজরত অবস্থায় হত্যা করে।

    এর পর আবদুল আজিজের ছেলে সৌদ বিন আবদুল আজিজ ক্ষমতায় এসে তুর্কিদের পরাজিত করে ১৮০৩ সালে মক্কা ও ১৮০৪ সালে মদিনা দখল করে নেয়। দুই পবিত্র নগরী দখল করে তারা ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালায়। তারা মক্কা-মদিনার বহু মুসলিমকে হত্যা করে। সবই করা হয় সেই শিরক-বিদাত উচ্ছেদের নামে! ওয়াহাবী মতবাদের ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযানের অজুহাতে তারা বহু সাহাবীর কবরস্থান ধ্বংস করে। এমনকি খোদ মহানবী (সা.)-এর পবিত্র কবরে ছায়াদানকারী মিম্বরগুলোও এরা ভেঙে ফেলে! মহানবী (সা.)-এর পবিত্র রওজাকে তুর্কি খলিফারা যেসব মণি-মুক্তায় সাজিয়েছিলেন, শুদ্ধি অভিযানের নামে সেসবও তুলে ফেলে সৌদ-এর বাহিনী। এসবই চলে ব্রিটিশদের অস্ত্র ও অর্থ সহায়তা নিয়ে।

    ইরাক-মক্কা-মদিনায় সৌদিদের এই ধ্বংসযজ্ঞে তৎকালীন তুর্কি খলিফাগণ ভীষণ রুষ্ট হন। ১৮০৮ সালে খলিফা ২য় মাহমুদ ক্ষমতাসীন হয়ে সৌদিদের দমনে শক্তিশালী সেনাদল পাঠান। ব্রিটিশ বাবারা এবার আর সৌদিদের বাঁচাতে পারেনি। ১৮১৮ সালে সৌদের ছেলে, তৎকালীন সৌদি শাসক আবদুল্লাহ বিন সৌদ তুর্কিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তাকে বন্দী করে ইস্তাম্বুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দুই পবিত্র নগরী ও বহু মসজিদ ধ্বংসের শাস্তি হিসেবে খলিফা ২য় মাহমুদ-এর নির্দেশে আবদুল্লাহ বিন সৌদ ও তার দুই ছেলেকে ইস্তাম্বুলে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ করা হয়।

    এভাবেই প্রথম সৌদি আমিরাত (১৭৪৪-১৮১৮)-এর পতন হয় ও পবিত্র মক্কা-মদিনাসহ আরবে উসমানিয়া খিলাফতের শাসনকর্তৃত্ব ফিরে আসে।

    সৌদ পরিবারের দিরিয়ার আখড়া ১৮১৮ সালে ধ্বংস হয়ে গেলে প্রথম সৌদি আমিরাতের শেষ আমীর আবদুল্লাহর তুর্কি নামের এক পুত্র মরুভূমিতে পালিয়ে যায়। এই তুর্কি বিন আবদুল্লাহ পালিয়ে বনু তামিম গোত্রে আশ্রয় নেয়। পরে ১৮২১ সালে সে আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে এসে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

    ১৮২৪ সালে তুর্কি বিন আবদুল্লাহ উসমানিয়াদের নিয়োজিত মিশরীয়দের হটিয়ে দিরিয়া ও রিয়াদ দখল করে নেয়। রিয়াদকে রাজধানী করে গঠিত এই “নজদ আমিরাত” ইতিহাসে দ্বিতীয় সৌদি রাজ্য নামে পরিচিত। দ্বিতীয় সৌদি রাজ্যটি অবশ্য খুব কম এলাকাই দখলে নিতে পেরেছিল। এটি বেশিদিন টিকেওনি। এই নজদ আমিরাতের প্রধানকে “ইমাম” বলা হত এবং ওয়াহাবী মতাবলম্বীরাই ধর্মীয় বিষয়ে কর্তৃত্বশীল ছিল।

    তবে এবার সৌদ পরিবারে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। কথিত ইমাম তুর্কি বিন আবদুল্লাহকে তাঁর এক জ্ঞাতি ভাই মুশারি বিন আবদুর রহমান বিদ্রোহ করে ১৮৩৪ সালে হত্যা করে। তবে ক্ষমতা পায়নি মুশারি। তুর্কির ছেলে ফয়সাল এরপর নজদ আমিরাতের ইমাম হয়।

    সৌদ পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। অবশেষে ১৮৯১ সালে মুলায়দার যুদ্ধে উসমানিয়াদের অনুগত রাশিদী বাহিনীর হাতে দ্বিতীয় সৌদি আমিরাতের পতন ঘটে। সৌদিদের শেষ ইমাম আবদুর রহমান বিন ফয়সাল তার সাঙ্গোপাঙ্গসহ পালিয়ে যায়।

    বিশাল বালুকাময় রুব আল খালি মরুভূমি পাড়ি দিয়ে আবদুর রহমান তার পুত্র আবদুল আজিজকে [একে মনে রাখুন – পরবর্তী গাদ্দার] নিয়ে দক্ষিণপূর্বে মুররা বেদুইন গোত্রে গিয়ে পালায়। সেখান থেকে তারা বাহরাইনের রাজপরিবারের কাছে গিয়ে কিছুদিন আশ্রয় নেয়। তার পর ১৮৯৩ সালে আবদুর রহমান ও তার পুত্র শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ দালাল কুয়েতি আল-সাবাহ রাজপরিবারের আশ্রয় পায়।

    কুয়েতি রাজপরিবারের সহায়তায় সৌদিরা উসমানিয়া খিলাফতের কর্তৃত্বাধীন নজদে একের পর এক চোরাগুপ্তা হামলা চালাতে থাকে। ওয়াহাবী মতবাদের আলোকে পরিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে এসব হামলা চলতে থাকে। কিন্তু এসব হামলায় সৌদিরা তেমন কোনো বড় সাফল্য পায়নি। ১৯০১ সালে সারিফের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে আবদুর রহমান তার হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধারের সব উদ্যম হারায়।

    …………………….

    দালাল সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস – ২

    ১৮৯৯ সালের জানুয়ারিতে কুয়েতের আমির মুবারক আল সাবাহ ব্রিটেনের সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে কুয়েতকে ব্রিটেনের করদরাজ্য (Protectorate)-এ পরিণত করেন। তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের প্রভাবের বিরুদ্ধেই কুয়েত এই চুক্তি করে ব্রিটেনের সাথে।

    সৌদ পরিবারের লড়াইটিও ছিল উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধেই। তাই ১৯০১ সালে সারিফের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে পিতা আবদুর রহমান হতোদ্যম হলেও পুত্র আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ আবারও আশার আলো দেখে। আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ১৯০১ সালের শেষের দিকে কুয়েতের আমির মুবারকের কাছে উসমানিয়াদের নিয়ন্ত্রিত রিয়াদ আক্রমণের জন্য সাহায্য চায়। ব্রিটিশ মদদপুষ্ট কুয়েত সানন্দে ইবনে সৌদকে ঘোড়া ও অস্ত্র সরবরাহ করে।

    ১৯০২ সালের ১৩ জানুয়ারি ইবনে সৌদ সৈন্যসহ রিয়াদের মাসমাক দুর্গ আক্রমণ করে। মাসমাকের উসমানিয়া অনুগত রাশিদী প্রশাসক ইবনে আজলানকে হত্যা করে সৌদিরা। ইবনে সৌদ যুদ্ধজয় শেষে ইবনে আজলানের ছিন্নমস্তকটি নিয়ে দুর্গশীর্ষে আসে এবং নিচে সমবেত উদ্বিগ্ন রিয়াদবাসীর দিকে ছুঁড়ে মারে।

    https://en.wikipedia.org/wiki/Battle_of_Riyadh_(1902)

    আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের রিয়াদ আমিরাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাসে তৃতীয় সৌদি রাজ্যের সূচনা হয়। এরপর সৌদিরা একে একে রাশিদীদের নজদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হটিয়ে দিতে থাকে। ১৯০৭ সালের মধ্যে সৌদিরা নজদের বিরাট এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয়।

    ১৯০৯ সালে ব্রিটিশরা সামরিক অফিসার William Henry Irvine Shakespear-কে কুয়েতে নিয়োগ দিলে সৌদ পরিবার আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। শেক্সপিয়ারকে ইবনে সৌদ সামরিক উপদেষ্টা বানিয়ে নেয়।

    https://en.wikipedia.org/wiki/William_Henry_Irvine_Shakespear

    ১৯১৩ সালে সৌদিরা উসমানিয়া সৈন্যদের কাছ থেকে পূর্ব আরবের গুরুত্বপূর্ণ মরুদ্যান হাসা শহর দখল করে নেয়। এর পর পার্শ্ববর্তী কাতিফ শহরও সৌদিরা দখলে নেয়।

    পরের বছর ১৯১৪ সালে বিশ্বজুড়ে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ব্রিটেন-ফ্রান্স-রাশিয়ার মিত্রশক্তি জার্মানি-উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। রিয়াদে ব্রিটিশরা শেক্সপিয়ারের মাধ্যমে সৌদিদের সাথে উসমানিয়া অনুগত রাশিদীদের যুদ্ধ লাগায়।

    https://en.wikipedia.org/wiki/Battle_of_Jarrab

    ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে সংঘটিত এই যুদ্ধে রাশিদীরা জয়ী হয় ও শেক্সপিয়ারকে হত্যা করে। রাশিদীরা শেক্সপিয়ারের শিরশ্ছেদ করে ও তার হেলমেট উসমানিয়াদের কাছে হস্তান্তর করে। উসমানিয়ারা সৌদিদের সাথে ব্রিটিশদের সম্পর্কের প্রমাণস্বরূপ শেক্সপিয়ারের হেলমেট মদিনার প্রধান ফটকে ঝুলিয়ে দেখায়।

    শেক্সপিয়ারকে হারিয়ে বিপর্যস্ত ইবনে সৌদ ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে ব্রিটিশদের সাথে দারিন চুক্তি স্বাক্ষর করে। ব্রিটিশদের পক্ষে ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্য প্রধান মেজর জেনারেল স্যার পার্সি কক্স ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি মোতাবেক সৌদি রাজত্ব ব্রিটিশদের করদরাজ্য (Protectorate)-এ পরিণত হয়।

    https://en.wikipedia.org/wiki/Treaty_of_Darin

    …………………….

    দালাল সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস – ৩
    **********************************

    প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন-ফ্রান্স-রাশিয়ার মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জার্মান-উসমানিয়া খিলাফতের দুর্বল অবস্থা ও আল-সৌদ পরিবারের সাথে ব্রিটিশদের সখ্য দেখে চিন্তিত হয়ে ওঠেন মক্কার উসমানিয়া সমর্থিত শাসক হুসাইন বিন আলী।

    ১৯১৫ সালের ১৪ জুলাই থেকে হুসাইন মিশরের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার হেনরি ম্যাকম্যাহনের গোপনে পত্র যোগাযোগ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ১৯১৬ পর্যন্ত এই পত্র আদান-প্রদান চলতে থাকে। উসমানিয়া খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত বিশাল আরব ভূ-খণ্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা মতবিনিময় করে।

    https://en.wikipedia.org/wiki/Hussein-McMahon_Correspondence

    ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মদদে মক্কার শাসক সেই হুসাইন বিন আলী উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ তৈরি করে। ব্রিটিশ সামরিক অফিসার টি.ই. লরেন্সের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় বিশ্বাসঘাতক হুসাইন মিডল-ইস্টার্ন ফ্রন্টে উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুরু করলে বহু উসমানিয়া সৈন্য বন্দী হয় ও অবশেষে উসমানিয়ারা ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়।

    ১৯১৫ সালের ১৪ জুলাই থেকে হুসাইন মিশরের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত স্যার হেনরি ম্যাকম্যাহনের গোপনে পত্র যোগাযোগ শুরু করেন। ৩০ জানুয়ারি ১৯১৬ পর্যন্ত এই পত্র আদান-প্রদান চলতে থাকে। উসমানিয়া খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত বিশাল আরব ভূ-খণ্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা মতবিনিময় করে।

    https://en.wikipedia.org/wiki/Hussein-McMahon_Correspondence

    ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মদদে মক্কার শাসক সেই হুসাইন বিন আলী উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ তৈরি করে। ব্রিটিশ সামরিক অফিসার টি.ই. লরেন্সের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় বিশ্বাসঘাতক হুসাইন মিডল-ইস্টার্ন ফ্রন্টে উসমানিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শুরু করলে বহু উসমানিয়া সৈন্য বন্দী হয় ও অবশেষে উসমানিয়ারা ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হয়।

    ব্রিটিশ সামরিক অফিসার টি.ই. লরেন্স – আরববিশ্বে আরব জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা – হলিউডের বিখ্যাত “Lawrence of Arabia” (১৯৬২) মুভিটি একে নিয়েই নির্মিত।

    ১৩০০ বছর পর মধ্যপ্রাচ্য মুসলিম খিলাফতের হাতছাড়া হয়ে যায়।

    পুরস্কার হিসেবে ব্রিটিশরা ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর হুসাইন বিন আলীর দ্বিতীয় ছেলে আব্দুল্লাহকে জর্ডানের রাজত্ব ও তৃতীয় ছেলে ফয়সালকে ইরাকের রাজত্ব দেয়। হুসাইনকে রাখা হয় হেজাজ (পবিত্র মক্কা-মদিনা ও তাবুক অঞ্চল)-এর শাসক হিসেবে।

    এভাবে ১ম বিশ্বযুদ্ধ আল-সৌদ পরিবারকে কিছুটা বেকায়দায় ফেলে। কেননা ব্রিটিশদের পা-চাটার ক্ষেত্রে তাদের প্রতিপক্ষ হুসাইন পরিবার এগিয়ে যায় এবং যুদ্ধ শেষে হুসাইন ও তার দুই ছেলে মিলে তিন দেশের রাজত্ব পায়। তবে নজদ (রিয়াদ ও তদসংলগ্ন অঞ্চল)-এর শাসক সৌদিরাই থেকে যায়।

    দারিন চুক্তির আওতায় আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ব্রিটিশদের কাছ থেকে বহু অস্ত্র ও মাসে ৫,০০০ পাউন্ড ভাতা (দালালির পুরস্কার) পেতে থাকে।

    তথ্যসূত্র: Abdullah Mohammad Sindi, “The Direct Instruments of Western Control over the Arabs: The Shining Example of the House of Saud”

    যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা ইবনে সৌদকে ১ম বিশ্বযুদ্ধের উদ্বৃত্ত বিপুল গোলাবারুদ দিয়ে দেয়। ওই ব্রিটিশ অস্ত্র ও গোলাবারুদের সম্ভার নিয়ে সৌদিরা ক্রমধ্বংসমান উসমানিয়া খিলাফতের অনুগত রাশিদীদের ওপর দক্ষিণ-পশ্চিম আরব অঞ্চলে আক্রমণ শুরু করে। ১৯২০ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত লড়ে রাশিদীরা শেষ পর্যন্ত সৌদিদের হাতে পুরোপুরি পরাজিত হয়। ফলে আরবে আল-সৌদ পরিবার নিয়ন্ত্রিত ভূ-খণ্ডের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে ওঠে। ইরাকে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত Percy Cox-এর মধ্যস্থতায় ১৯২২ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত Uqair Protocol-এর আওতায় ওই বিশাল অঞ্চলে সৌদি রাজত্ব স্বীকৃতি লাভ করে।

    http://en.wikipedia.org/wiki/Uqair_Protocol_of_1922

    এ-সময় পর্যন্ত আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ কখনোই ব্রিটিশ অনুগত হেজাজের শাসক হুসাইনের সাথে সংঘাতে জড়ায়নি।

    ১৯২৪ সালের ৩ মার্চ আরেক ব্রিটিশ দালাল মুস্তাফা কামাল পাশা তুরস্কে অফিসিয়ালি খিলাফত বিলুপ্ত করে। সারা বিশ্বের মুসলিমদের সাথে মক্কার হুসাইন বিন আলীও মহানবী (সা.) আমল থেকে ১৩০০ বছর পর্যন্ত চলমান মুসলিমদের রাষ্ট্র খিলাফতের পতনে ব্যথিত হন। পৃথিবী থেকে খিলাফত মুছে গেছে, এটা হুসাইনের চেতনায় আঘাত করে। ব্রিটিশদের ক্ষিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা সত্ত্বেও ৫ মার্চ হুসাইন নিজেকে মুসলিমদের খলিফা ঘোষণা করেন।

    ব্যস, এ-সুযোগটিই কাজে লাগায় খিলাফতের দীর্ঘদিনের শত্রু আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। ব্রিটিশরা স্বাভাবিকভাবেই হুসাইনের নিজেকে খলিফা ঘোষণা করা মেনে নেয়নি এবং হেজাজের শাসক হিসেবে হুসাইনের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়।

    আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ কালবিলম্ব না করে হেজাজ আক্রমণ করে এবং ১৯২৫ সালের শেষ নাগাদ পুরো হেজাজ দখলে নিয়ে নেয়। ১৯২৬ সালের ৮ জানুয়ারি আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ মক্কা-মদিনা-জেদ্দার গোত্রীয় নেতাদের সমর্থনে নিজেকে হেজাজের “সুলতান” ঘোষণা করে। ১৯২৭ সালের ২৭ জানুয়ারি ইবনে সৌদ আগের নজদ ও বর্তমান হেজাজ মিলিয়ে Kingdom of Nejd and Hejaz ঘোষণা করে। ৪ মাস পর সেই বছরের ২৭ মে জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটিশরা Kingdom of Nejd and Hejaz-কে স্বাধীন হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

    http://en.wikipedia.org/wiki/Treaty_of_Jeddah_(1927)#1927

    নতুন জেদ্দা চুক্তি, ১৯২৭-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ-সৌদের “Protectorate” স্ট্যাটাসের দারিন চুক্তি, ১৯১৫-এর সমাপ্তি ঘটে।

    পরবর্তী ৫ বছর আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ তার দুই রাজত্বকে আলাদা রেখেই শাসন করে। অবশেষে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইবনে সৌদ তার দুই রাজত্বকে একত্রিত করে তার নিজের ও বংশের পদবি অনুসারে দেশের নাম “Kingdom of Saudi Arabia” (আরবি: المملكة العربية السعودية‎ al-Mamlakah al-‘Arabiyyah as-Su‘ūdiyyah) ঘোষণা করে।

    এভাবেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উসমানিয়া খিলাফতবিরোধী নীতির প্রকাশ্য সমর্থক হিসেবে, পদে পদে ব্রিটিশদের মদদ নিয়ে, দালাল আল-সৌদ পরিবার ১৯৩২ সাল থেকে Kingdom of Saudi Arabia নামে মুসলিমদের পবিত্র ভূমি দখলে রেখে শাসন করে যাচ্ছে।

                                  ……………….      …………………          …………………

    আরো পড়ুন:

    ১. Madawi al-Rasheed-এর লেখা A History of Saudi Arabia:

    ২. প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ মুহাম্মদ সিন্দি রচিত “The Direct Instruments of Western Control over the Arabs: The Shining Example of the House of Saud”:

    ৩. The Reign of Mubarak Al Sabah বইটির লিংক:

    http://books.google.com.bd/books?id=icj1SiWf6YUC&pg=PA73&lpg=PA73&dq=anglo-kuwaiti+agreement+of+1899&source=bl&ots=SwEtAdk9ED&sig=BDWAGPbIVgfgE7zUlkCUksNR9Jo&hl=en&sa=X&ei=UB_tUfv_LcejrQf0_IGgBA&ved=0CD4Q6AEwAg#v=onepage&q=anglo-kuwaiti%20agreement%20of%201899&f=false

    দূরের যাত্রী’র লেখা হতে নেওয়া

  • আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা

    সূচনা:

    তিনটি কারণে ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন।

    এক. ধারণাটি ইসলামি আক্বীদার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন প্রধান ভিত্তি। শাইখ আহমাদ ইবনে আতিক (রহ) বলেন:

    “তাওহীদের বাধ্যবাধকতা এবং এর বিপরীতের নিষেধাজ্ঞার বিষয়টির পরে আল্লাহ্‌র কিতাবে অন্য কোন বিষয়েই ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’-র চেয়ে বেশি প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। অন্য কোন বিষয় এতো পরিষ্কারভাবে ব্যখ্যা করা হয়নি।”

    যদি ওয়ালা’ (আনুগত্য) বলতে আল্লাহ, তার নবী-রাসূলগণ ও মুমিনদের প্রতি নিষ্ঠাপূর্ন ভালোবাসা ও সহযোগিতা প্রকাশকে বোঝায়। অন্যদিকে বারা’ (সম্পর্কচ্ছেদ) বলতে মিথ্যা ও মিথ্যার অনুসারী মানুষদের সাথে শত্রুতা পোষন ও সম্পর্কচ্ছেদ বোঝায়। আর প্রকৃতপক্ষে এসবের উদ্ভব ঈমানের সবচেয়ে মৌলিক বিষয়গুলো থেকেই।

    দুই. মুসলিমরা বর্তমানে এমন একটি কঠিন সঙ্কটপূর্ন সময় পার করছে যখন ইসলামের অনেক মৌলিক ও অপরিহার্য বিষয় বিস্মৃত হয়েছে, ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কিংবা অবহেলা করা হয়েছে। ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’-র বিষয়টি সে ধরনেরই একটি বিষয়। এ কারণে বহু মুসলিমই এখন আর মুমিন ও কাফেরের পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাপারে সচেতন নয়। এর ফলশ্রুতিতে বহু মুসলিমের ঈমান/বিশ্বাস এখন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং কাফেরদের সাথে তারা গভীর বন্ধুত্ব করছে আচরণ, চালচলন ও আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে কাফেরদের অনুকরণ করছে।

    তিন. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র অর্থের সাথে ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’-র বিষয়টি এমন গভীরভাবে সম্পর্কিত যে, এই বিষয়টি কোনো ভূল করলে মূল কালিমার অর্থটিও ভূলভাবে বোঝা হবে।

    ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’-র উপাদানসমূহ বোঝা

    ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’-র ধারণাটি বুঝতে হলে নিচের ছয়টি বিষয় আলোচনা করতে হবে:

    ১. ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র অর্থ:

    এর অর্থ: ‘আল্লাহ ছাড়া আর কারোই উপাসনা পাওয়ার অধিকার নেই। সুতরাং এর মাধ্যমে অন্য সব উপাস্যের উপাসনা বাতিল করা হয়েছে এবং একমাত্র আল্লাহর উপাসনাকেই সত্যায়ন করা হয়েছে।

    শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ) বলেন, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে অন্তরের সুখ নেই বা পূর্ন কোনো আনন্দ নেই। আল্লাহর পাশাপাশি যেসব জিনিসকে ভালোবাসা হয়। সেগুলোকে পুরোপুরি ছুড়ে না ফেলা পর্যন্ত আল্লাহর প্রতি [প্রকৃত] ভালোবাসা পোষন করা কখনোই সম্ভব নয়। এটাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত বাস্তবতা এবং এটাই আল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইবরাহিম (আ)-সহ অন্য সব নবী-রাসূলদের দ্বীন।

    তাই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত বাস্তবতা হল আল্লাহকে ভালবাসা এবং তিনি যেসব কাজ ভালোবাসেন ও যেসব কাজে সন্তুষ্ট হন সেসব কাজ করা।

    আল হাফিয আল হাকামী (রহ) বলেন, কোনো ব্যক্তি যে তার প্রভুকে ভালোবাসে তার নিদর্শন হলো: সে ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর পছন্দকেই প্রাধান্য দেয়, এমনকি যদিও সেটা তার নিজের ইচ্ছার বিপরীত হয়; আল্লাহ যেটাকে ঘৃণা করে, সেও সেটাকে ঘৃণা করে, এমনকি যদিও সেটা তার নিজের ইচ্ছার অনুগামী হয়; আল্লাহ ও তার রাসূল (সা)-এর মিত্রদের প্রতি নিষ্ঠাপূর্ণ ভালবাসা ও সহযোগিতা প্রদর্শন করা; আল্লাহ ও তার রাসূল (সা)-এর প্রতি যারা শত্রুতা প্রদর্শন করে তাদের প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন করা;  আল্লাহর রাসূল (সা)-কে অনুসরণ করা; এবং তাঁর দেখানো পথকে/হেদায়েতকে গ্রহণ করা।

    ইবনুল কাইয়িম (রহ) কবিতা আকারে বলেন,

    সত্যিকারের ভালোবাসার শর্ত হলো
    তুমি যাকে ভালোবাসো তার ভালোবাসার সাথে
    তোমার ভালোবাসা কোনোরকম অবাধ্যতা ছাড়াই
    একমত হয়ে থাকবে।

    তুমি যদি আল্লাহকে ভালোবাসার দাবি কর
    অথচ কাজ কর এর বিপরীতটা
    তাহলে তোমার সেই ভালোবাসা
    আর কিছু নয়, কেবল মিথ্যা ভণিতা

    আল্লাহকে ভালোবাসার নাম করে
    তুমি কি ভালোবাসো তোমার প্রিয়তমের শত্রুদেরও
    প্রতিদানে তুমি ভালোবাসা পেতে চাও? তারপরও?

    আর তুমি তো তাদের সাথে যুদ্ধ কর ও শত্রুতা দেখাও
    যাদেরকে ভালোবাসেন স্বয়ং আল্লাহ।
    হে ভাই, এটা কি সত্যিকারের ভালোবাসা
    নাকি শয়তানের অনুসরন করা?

    কেবলমাত্র আল্লাহকেই এককভাবে বেছে নেয়া ছাড়া
    কোনো ইবাদত নেই;
    পাশাপাশি সারা দেহ-মন
    দীন-হীনভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে তার কাছেই।

    ২. ‘লা ইলাহা ইল্লাহ’-র ঘোষনা করা মানে কয়েকটি ক্ষেত্রে ‘আল ওয়ালা ওয়াল বারা’-র প্রয়োগ থাকা।

    কালিমার মানে হচ্ছে আল্লাহ, তাঁর দ্বীন, তাঁর কিতাব, তাঁর নবী রাসূল ও তাঁর ন্যায়নিষ্ঠ ইবাদতকারীদের প্রতি ওয়ালা (নিষ্ঠাপূর্ন ভালোবাসা ও সহায়তা) প্রদর্শন করা এবং এর পাশাপাশি তাঁদেরকেই ঘনিষ্ঠ মিত্র ও সাহায্যকারী হিসেবে গ্রহণ করা:

    إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ

    নিঃসন্দেহ তোমাদের ওলী হচ্ছেন কেবলমাত্র আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূল, আর যারা ঈমান এনেছে, আর যারা নামায কায়েম করে, আর যাকাত আদায় করে, আর তারা রুকুকারী। [সুরা মায়িদা:৫৫]

    কালিমার মানে হচ্ছে যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুকে উপাসনা করে তাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করা ও যেসব জিনিসকে আল্লাহর পাশাপাশি উপাসনা করা হয় সেগুলোর প্রতি শত্রুতা প্রদর্শন করা।

    قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ

    তোমাদের জন্যে ইব্রাহীম ও তাঁর সঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল: তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদের মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে। [মুমতাহিনা:৪]

    لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ۖ قَد تَّبَيَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَيِّ ۚ فَمَن يَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَيُؤْمِن بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَكَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَىٰ لَا انفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ

    দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়াত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী ‘তাগুত’দেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাংবার নয়। আর আল্লাহ সবই শুনেন এবং জানেন। [বাকারা:২৫৬]

    শাইখ মুহাম্মদ ইবন আবদুল ওয়াহহাব বলেন, জেনে রেখো, আল্লাহর পাশাপাশি যেসব জিনিসের উপাসনা করা হয় সেসব জিনিসকে পরিত্যাগ না করলে কোনো ব্যক্তি ঈমানদার হিসেবে গন্য হতে পারবে না। এই আয়াতই তার প্রমাণ।

    কালিমার মানে হচ্ছে আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি ভালোবাসা পোষন করা:

    اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ ۗ قَلِيلًا مَّا تَذَكَّرُونَ

    ”তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে তোমাদের কাছে যা অবতীর্ণ হয়েছে তা অনুসরণ করো আর তাঁকে বাদ দিয়ে অভিভাবকদের অনুসরণ করো না। অল্পই যা তোমরা মনে রাখো।” [সুরা আরাফ:৩]

    কালিমার মানে হচ্ছে ইসলামবিরোধী আইন ও রায়ের প্রতি শত্রুতা পোষন করা:

    وَمَن يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

    আর যে কেউ ঈমান অস্বীকার করে সে তাহলে তার আচরণ ব্যর্থ করেছে, আর সে পরকালে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যেকার। [সুরা মায়েদা:৫]

    কালিমার মানে হচ্ছে ইসলাম ছাড়া বাকি অন্য সব দ্বীন ত্যাগ করা:

    وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

    যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত। [আলে ইমরান:৮৫]

    ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যা কিছু বাতিল করে এবং যা কিছু সত্যায়ন করে:

    এই কালিমা কিছু বিষয়কে/জিনিসকে বাতিল করে, আবার কিছু বিষয়কে সত্যায়ন করে। এটি চারটি বাতিল করে: আলিহাহ, তাওয়াগীত, আনদাদ এবং আরবাব।

    আলিহাহ: কেউ যদি কোনো বস্তুও ওপর আশা ও ভয় পোষণ করে এই ভেবে যে, ওই বস্তুটি নিজে নিজেই কোনো লাভ বা ক্ষতি ঘটাতে পারে, তাহলে ওই বস্তুটিকে আল্লাহর পাশাপাশি উপাস্য বানিয়ে ফেলা। তাই কালিমা এক্ষেত্রে আল্লাহ ছাড়া আর সবকিছুকেই বাতিল করে দেয়।

    وَإِنْ يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ وَإِنْ يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ

    আল্লাহ আপনাকে কোন কষ্টে ফেললে তিনি ছাড়া মুক্ত করার কেউ নেই। এবং তিনি মঙ্গল চাইলে তা রদ করার কেউ নেই। [সুরা ইউনুস:১০৭]

    তাওয়াগীত: যাকে উপাসনা করা হয় ও যে এতে সন্তুষ্ট, কিংবা যারা কিছু ঐশ্বরিক বৈশিষ্ট্য দাবি করে, যেমন- গায়েব জানার দাবি করা, অথবা আল্লাহর আইনের বিপরীত আইন প্রণয়ন করাকে বৈধ মনে করা, এ ধরনের লোকেরাই সীমালঙ্ঘনকারী (তাওয়াগীত)।

    وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

    প্রত্যেক জাতির কাছে কোন না কোন রাসূল পাঠিয়েছি এই নির্দেশ দিয়ে যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর। [সুরা নাহল:৩৬]

    আনদাদ: যা কিছু কোনো ব্যক্তিকে আল্লাহর আনুগত্য থেকে ফিরিয়ে রাখে, যেমন- পরিবার, সন্তান বা বাড়িঘর, এসব আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বি (আনদাদ) হয়ে দাড়ায়।

    وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا

    কিন্তু মুমিনরা আল্লাহর ভালোবাসায় দৃঢ়। [সুরা বাকারা:১৬৫]

    আরবাব: যারা জেনেশুনে আল্লাহর আইনের বিরুদ্ধে রায় দেয় ও সেসব রায় কার্যকর করা হয়, তাহলে তাদেরকে আল্লাহর পাশাপাশি প্রভু (আরবাব) বানিয়ে ফেলা হয়।

    اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ

    তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে পাদ্রী ও বৈরাগীদেরকে তাদের রব বানিয়ে রেখেছে। [সুরা তাওবাহ:৩১]

    এই কালিমা চারটি বিষয়ের/জিনিসের সত্যতা ঘোষনা করে/স্বীকৃতি দেয়:

    ১) নিষ্ঠা (ইখলাস): আল্লাহই হবেন আমাদের ইবাদতের উদ্দেশ্য এবং আমাদের সকল ইবাদত কেবল তারই প্রতি নিবেদিত হবে।

    وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلَاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ

    তাদেরকে এ ছাড়া আর অন্য কোন কিছুই আদেশ করা হয়নি যে তারা বিশুদ্ধ চিত্তে ও নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ইবাদত করবে, … [বাইয়িনাহ: ৫]

    ২) ভালোবাসা: যে কোনো কিছুর চেয়ে আল্লাহকে বেশি ভালোবাসতে হবে।

    وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَالَّذِينَ آَمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ

    আর মানুষের মধ্যে এমন কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহকে ছাড়া অন্যকে আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাদেরকে এমনভাবে ভালোবাসে যেভাবে আল্লাহকে ভালোবাসা উচিত। [বাকারা:১৬৫]

    ৩) ভয় ও আশা: শ্রদ্ধামিশ্রিত ভয় ও আশা কেবল আল্লাহর প্রতিই থাকতে হবে।

    إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَانُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَهُ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُونِ إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ

    তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকে ভয় করো [এবং আমার অবাধ্য হওয়ার ব্যাপারে সাবধান হও], যদি তোমরা মুমিন হও। [আলে ইমরান:১৭৫]

    فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا

    অতএব যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাৎ লাভের আশা পোষণ করে সে যেন সৎকাজ করতে থাকে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে অংশীদার না বানায়। [কাহফ:১১০]

    ৪) সাহাবাগণ ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ: সাহাবাগণ (রা) কিভাবে এই মহান কালিমাকে বুঝেছিলেন ও এর দাবিগুলো পূরণ করেছিলেন, সেটা ইমাম সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহ (রহ) সুন্দরভাবে ব্যখ্যা করেছেন। মুহম্মদ ইবন আবদুল মালিক আল মুসাইসি বলেন:

    ১৭০ হিজরিতে আমরা সুফিয়ান ইবন উয়াইনাহর সাথে ছিলাম। এক ব্যক্তি তাকে ঈমান সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলো। তিনি জবাব দিলেন, ‘এটা হলো সত্যের স্বীকোরোক্তি ও আমল।’

    লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, এটা কি বাড়ে-কমে?

    তিনি জবাব দিলেন, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা বাড়ে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে এটা কমে; এমনভাবে কমে যে আর এতটুকুই বাকি থাকে [তিনি তার বা হাত দিয়ে তা দেখান]।

    লোকটি প্রশ্ন করলো, ঈমানকে যারা আমলহীন স্বীকরোক্তি বলে তাদেরকে আমরা কিভাবে মোকাবেলা করবো?

    সুফিয়ান জবাব দিলেন, ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলো নির্ধারিত হওয়ার আগে তারা এই কথাটি বলতো। আসলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা)-কে মানবজাতির কাছে এই কথা বলার জন্য পাঠিয়েছেন যে, আল্লাহ ছাড়া আর কারোই উপাসনা পাওয়ার অধিকার নেই এবং আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। মানুষ এটা বলার পর তাদের রক্ত ও সম্পদ (বৈধ কারণ ব্যতিত) নিরাপত্তা পেল এবং তাদের হিসাব হবে আল্লাহর সাথে। যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে নামাজের নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলেন। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজটা কোনোই উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ হাইয়ুল কাইয়ুম এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মদীনায় হিজরতের নির্দেশ দিতে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ কিংবা নামাজ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা) কে বললেন তাদেরকে মক্কায় ফেরার নির্দেশ দিতে যেন তারা তাদের (কাফের) পিতা ও সন্তানদের সাথে ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ করে যতক্ষন না তারা (কাফেররা) সেই কালিমাটি বলে যেটি তারা নিজেরা বলেছে, তাদের সাথে নামাজ পড়ে ও তাদের হিজরতের সাথে যুক্ত হয়। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে প্রথম প্রথম কাজ, নামাজ কিংবা হিজরত কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে এসে আল্লাহকে উপাসনার জন্য কারা তাওয়াফ করে ও দীনহীনভাবে মাথার চুল ছেটে ফেলে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিলেন ও তারা তা পালন করলো। আল্লাহর শপথ, যদি তারা এটা না করত তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত কিংবা পিতার সাথে যুদ্ধ করা কোনটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন তখন তিনি রাসূল (সা)-কে বললেন তাদেরকে নির্দেশ দিতে তারা যেন হিজরত করে গিয়ে নিজেদের সম্পদ থেকে যাকাত প্রদান করে, যাতে সেই সম্পদ পবিত্রতা অর্জন করে। রাসূল (সা) তাদেরকে সেই নির্দেশ দিল এবং তারা তা পালন করলো ……..। আল্লাহর শপথ, তারা যদি এটা না করতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ, তাদের নামাজ, তাদের হিজরত, তাদের পিতাদের সাথে যুদ্ধ কিংবা তাদের তাওয়াফ কোনোটাই তাদের উপকারে আসতো না।

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই বিষয়ে তাদের অন্তরের সত্যতার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেন, যেটা ঈমানের বিধিবিধান ও সীমাগুলোর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হলো, তখন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বললেন:

    الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

    আজ হতে তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম, আমারা নিয়ামতকে সম্পূর্ণ করলাম তোমাদের প্রতি এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। [মায়িদা ৩]

    সুফিয়ান এরপর বললেন, ‘তাই কেউ যদি ঈমানের কোনো একটি অংশ বাদ দেয় তাহলে আমাদের দৃষ্টিতে সে ঈমানহীন (কাফের)। অবশ্য যদি সে আলস্য বা অবহেলার কারণে তা ত্যাগ করে থাকে, তাহলে আমরা তাকে শুধরাবো এবং আমাদের দৃষ্টিতে সে দূর্বল/অপূর্ন ঈমানের অধিকারী। এটাই সুন্নাহ। কেউ এ বিষয়ে কোন কিছু জিজ্ঞাসা করলে এই কথাগুলো আমার বরাত দিয়ে বলবে।

    শাইখ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাব (আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন) বলেন, আমরা যদি এটা পরিষ্কারভাবে বুঝে থাকি তাহলে আমরা দেখব যে, দ্বীন পালনের দাবি করে এমন অনেকেই ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র প্রকৃত অর্থ বোঝেনি। [প্রথম দিককার মুসলিমরা নির্যাতন, বন্দিত্ব, প্রহার ও ইথিওপিয়ায় হিজরতের সময যে অবর্ণনীয় ধৈর্য ধারণ করেছে, এটার সাথে যদি আমরা মনে রাখি যে, রাসূল (সা) মানুষের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন, তাহলে বুঝতে হবে উপায় থাকলে রাসূল (সা) অবশ্যই তার সাহাবীদের বিপদের বোঝা কমানোর পথ বের করতেন।

    [আল্লাহর ইচ্ছা ও সাহায্যে সমাপ্ত]

    মূল: খালিদ আল-গারীব

    প্রথম প্রকাশ: আগষ্ট ২০১৩

  • সিরিয়ার দামেস্ক হতে উম্মাহর এক সিংহের গর্জন

    সিরিয়ার দামেস্ক হতে উম্মাহর এক সিংহের গর্জন

    দামেস্কের বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে নৃশংস হত্যাকান্ড বিষয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

    উম্মাহ্‌’র সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক আশ-শামের জনগণের সাহায্যে এগিয়ে আসার এটাই যথোপযুক্ত সময়!

    এই নরঘাতক [বাশার] এবং তার চক্রান্তের সহযোগী এবং যারা উম্মাহ্‌’র শত্রু পূর্ব-পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ কর্তৃক সরবরাহকৃত রাসায়নিক অস্ত্রের মতো বিভিন্ন মারণাস্ত্র দ্বারা আমাদেরকে হত্যা করেছে, তাদের পরাজিত করার এটাই যথোপযুক্ত সময়!

    শোকার্ত মা আর শ্বাসকষ্টে কাঁতর শিশুদের কান্নার রোল এতটাই প্রবল ছিল যে, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র ও পশ্চিমা মারণাস্ত্রের শিকার নারী-পুরুষ-শিশুর মরদেহের স্তুপে দাঁড়ানো স্বাধীনতাকামী বীর যোদ্ধাগণ এবং এক আল্লাহ্‌’তে বিশ্বাসী উন্নত শিরে শোক প্রকাশকারীগণের গর্জনেও তা শোনা যাচ্ছিল। বাশার এবং মুসলিম বিশ্বের প্রতিটি শাসককে লানত বর্ষণ করতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে তারা আল্লাহ্‌’র নিকট ফরিয়াদ জানাচ্ছে জাহান্নামের আগুনই যেন এদের শেষ ঠিকানা হয়। গওতা আশ-শামের এমনই কোন এক বীরের গর্জনে তাদের জীবন-মরণ দশার চিত্র এভাবেই প্রতিফলিত হয়েছে : “আল্লাহু আকবার তোমাদের উপর হে মুসলিমদের অত্যাচারী শাসকগণ, এগুলো নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মতের লাশ – এরা ইসলামের শহীদ! আল্লাহু আকবার তোমাদের নীরবতার উপর… কোথায় মুসলিম সেনাবাহিনী?” আশ-শামের বিপ্লবে উম্মাহ্‌ ও তার সমর্থন কোথায়? হে মুসলিমগণ, জল্লাদদের ক্ষমতার মসনদকে কাঁপিয়ে তুলতে কখন তোমরা জেগে উঠবে, কখন সেনাবাহিনী প্রেরণ করবে?

    হে ইসলামী উম্মাহ্‌, হে বীর ও সাহসী জনগণ, হে দ্বীন ও দ্বীনের সম্মান রক্ষাকারীগণ:

    একজন কাপুরুষ তার কর্ম দ্বারা পরিচিত যা তারই মতো নীচ ও জঘন্য। সীমালঙ্ঘনকারী এই সরকার ও তার প্রধানের অবস্থা হচ্ছে ঠিক তাই, আর যে কারণে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বক্তব্য অনুযায়ী শ্বিরচ্ছেদ ও অঙ্গচ্ছেদ ছাড়া তাদের প্রতি আর কোন আচরণ নাই :

    ((إنَّمَا جَزَاء الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الأَرْضِ فَسَادًا أَن يُقَتَّلُواْ أَوْ يُصَلَّبُواْ أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُم مِّنْ خِلافٍ أَوْ يُنفَوْا مِنَ الأَرْضِ ذَلِكَ لَهُمْ خِزْيٌ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الآخِرَةِ عَذَابٌ عَظِيمٌ))

    “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হয়েছে এবং দুনিয়ার বুকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করেছে, তাদের শাস্তি হচ্ছে যে তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটা হচ্ছে তাদের জন্যে পার্থিব জীবনের লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে কঠোর শাস্তি।” [আল-মা’য়িদা : ৩৩]

    এই অহংকারী কাপুরুষ বাশার, যে তার পিতার যোগ্য উত্তরসূরী (আল্লাহ্‌’র লানত বর্ষিত হোক তার উপর), এবং তার পিতা রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার পর্যবেক্ষনের নামে একটি ষড়যন্ত্রমূলক আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করেছিল। এ কমিশনটি যেন ছিল দক্ষ পর্যবেক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ নয় বরং তার সবচেয়ে কার্যকরী ব্যবহার তদারকি করার একটি কমিটি! দামেস্কের বিভিন্ন এলাকাজুড়ে পরিচালিত এই হামলা নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়েছে, নজীরবিহীন নিষ্ঠুর ও ব্যাপক এই ধ্বংসযজ্ঞই তার প্রমাণ। কাফিরদের সর্দার, ভন্ড ও নিয়মতান্ত্রিক খুনি আমেরিকার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক নীতিভ্রষ্টতা ইতিমধ্যে এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছেছে? আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ এসব অস্ত্রের আঘাতে শত শত শহীদ হয়েছে, যার অধিকাংশই শিশু যারা প্রচন্ড ব্যাথা আর যন্ত্রনায় গলাকাটা মুরগীর মতো ছটফট করছে। ইয়া আল্লাহ্‌, ইয়া আল্লাহ্‌, হে ইসলামী উম্মাহ্‌, আর কতকাল আপনারা এসব দেখবেন? যতক্ষন আশ-শামের বাকি জনগণকে হত্যা করা হয়? নাকি পশ্চিমা রাসায়নিক অস্ত্রের দূর্বিপাক আরব উপকূল, মিশর এবং আফ্রিকায় গিয়ে পৌঁছায়? “নিরাপদে” থাকা উম্মাহ্‌’র বাকি অংশের কী শুধু তখনই বোধদয় হবে যে নেঁকড়ে ইতিমধ্যে তার বিভিন্ন অংশ খেয়ে ফেলেছে? আফসোস করে তখন তারা বলবে, “হায় আমরা যদি অত্যাচারী শাসক জোটের মোকাবেলার আহ্বান শুধুমাত্র শুনতাম, অনুসরণ করতাম এবং একত্রে অবস্থান গ্রহণ করতাম!”

    হে ব্যারাকে অবস্থানরত মুসলিম সেনাবাহিনী:

    আল্লাহ্‌’র গজব নাযিল হবে যদি আপনারা আশ-শামের জনগণের জন্য এগিয়ে না আসেন এবং তাদের সমর্থন না দেন। হে ক্ষমতা ও সামর্থ্যের অধিকারী মুসলিম উম্মাহ্‌’র সন্তানেরা, আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ভয়ানক ক্রোধ ধেয়ে আসছে। যদি আপনাদের ভেতর বিন্দু পরিমাণ দায়িত্ববোধ থাকে এবং পরকালের অস্তিত্বের ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে এবং এরপরও যদি আমাদের মর্যাদার উৎস এবং নিরাপত্তা দানকারী খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আমাদের সহায়তা না করেন তাহলে দুনিয়াতে আপনারা যেমন হেয় প্রতিপন্ন হবেন এবং ঠিক তেমনি আখিরাতে পতিত হবেন ভয়াবহ আযাবে! সুতরাং এমনভাবে এগিয়ে আসুন যা আপনাদেরকে আপনাদের রবের কঠিন শাস্তি হতে রক্ষা করবে এবং যাতে আপনারা সম্মান লাভ করতে পারেন…নতুবা আপনারা আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল, তাঁর ফেরেশতা এবং জনগণের ক্রোধে নিমজ্জিত হবেন।

    ((وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْر))

    “এবং যদি তারা দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য কামনা করে, তবে অবশ্যই তোমরা সাহায্য করবে।” [আল-আনফাল : ৭২]

    হিসাম আল-বাবা
    ১৪ শাওয়াল, ১৪৩৪ হিজরী
    ২১/০৮/২০১৩

  • প্রশ্ন-উত্তর: মিশর, মালী, সৌদি ও কাতার সংক্রান্ত কিছু ঘটনাবলির বিভ্রান্তি ও এর জবাব

    প্রশ্ন-উত্তর: মিশর, মালী, সৌদি ও কাতার সংক্রান্ত কিছু ঘটনাবলির বিভ্রান্তি ও এর জবাব

    প্রশ্ন:

    সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাবলি আমার কিছু ধারনার মধ্যে বিভ্রান্তির জন্ম দিয়েছে:

    ১. আমরা সবাই জানি, মিশরের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে আমেরিকা। তাই যদি হয়ে থাকে, কেন হচ্ছে সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য এবং কুয়েতের মতো দেশ মিশরকে আর্থিকভাবে সাহায্য করছে যেখানে এইসব দেশ ব্রিটেনের দালালী করে?

    ২. মালীতে বিদ্রোহীদেরকে দমানোর জন্য ফ্রান্সকে সাহায্য করছে মধ্যপ্রাচ্য যদিওবা মালীতে প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে ব্রিটেনের কোন প্রভাব নেই?

    ৩. আরও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের আল-আরাবিয়া চ্যানেল এবং কাতারের আল-জাজিরা চ্যানেল অভিন্ন বিষয়ে একে অপরের বিপরীতমুখী বক্তব্য দিতে দেখা যায় যদিওবা তারা উভয়ই ব্রিটেনের দালালি করে, সেই সাথে কাতারে সাম্প্রতিক যে পরিবর্তনটা হল তাতে কি ব্রিটেনের স্বার্থে কি কোন আঘাত হানবে?

    ৪. এছাড়া আল-জারবা-র মতো সৌদিরা বিভিন্ন জোটে যেরূপ ভূমিকা পালন করে তার ছিটেফোঁটাও কাতারকে পালন করতে দেখা যায়না। এর মাধ্যমে কি এটা প্রতীয়মান হয়না যে, সিরিয়ায় চলমান আন্দোলনের কারণে কাতার দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সৌদিরা শক্ত অবস্থানে পৌঁছচ্ছে?

    ৫. পরিশেষে, মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার মাধ্যমে আমেরিকা কি ‘মডারেট ইসলামিস্ট’দেরকে ক্ষমতায় আনার যে নীল নকশা তৈরি করেছিল তা থেকে কি দূরে সরে গেছে ?

    উত্তর:

    এইসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে ব্রিটেন নীতি বুঝার জন্য সাধারণ কিছু মূলনীতি আমাদের খেয়াল রাখতে হবে:

    ১. বর্তমান ব্রিটেন নিজে আমেরিকার সাথে টেক্কা দেয়ার চেয়ে তার সাথে তাল মিলিয়ে নিজের স্বার্থকে চরিতার্থ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু সে বিভিন্ন ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়ে তার দালাল রাষ্ট্রের মাধ্যমে আমেরিকার স্বার্থে আঘাত হানে অথবা ভাগ বসাতে চায়।

    ২. মূলত ব্রিটেন আমেরিকার সাথে যে সুরে চলতে চায় তার অনুগত রাষ্ট্রগুলোকেও সে একই সুরে আমেরিকার সাথে চলতে বাধ্য করে। যেমন-জর্ডান-আমেরিকা সম্পর্ককে যার মধ্যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই সে সৌহার্দমুলকভাবে দেখবে যদিওবা দিন শেষে জর্ডান, মধ্যপ্রাচ্য ও অন্যান্য রাষ্ট্রের মতো ব্রিটেনের আর একটি পেয়াদা মাত্র। যদিওবা, ব্রিটেন তার কিছু অনুগত রাষ্ট্রকে সরাসরি আমেরিকার বিরূদ্ধাবস্থানের কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন-কাতারের দালালি অন্য রাষ্ট্রের দালালি থেকে ভিন্ন অর্থাৎ এক একটি দালাল রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে……তারমধ্যে বেশিরভাগ আমেরিকার সাথে সৌহার্দমূলক আচরণ করে কিন্তু পর্দার অন্তরালে ঠিকই আমেরিকান স্বার্থের ক্ষতিসাধন করে বা করতে চায় আবার এর মধ্যে অল্প সংখ্যকই সফলতার মুখ দেখে।

    ৩. আমেরিকাকে টেক্কা দেয়ার জন্য ব্রিটেন-ফ্রান্স ভাই-ভাই। ই.উ. নীতির অংশ হিসেবে তারা দু’জনই আমেরিকার বিরুদ্ধে একাত্মতা পোষণ করে যদিওবা ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় যেখানে ব্রিটেন খুব নরম সুরে এবং ফ্রান্স খুব কড়াভাবে তার এজেন্ডাকে তুলে ধরে। এই কারণে ব্রিটেন তার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের দরুন অনেক সময় ফ্রান্সের ছায়াতলে কাজ করে তার নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। এক্ষেত্রে সেই বিখ্যাত প্রবাদই খাটে-“ Britain fights to the last French soldier”। যদিওবা ওই রকম পরিস্থিতি বর্তমান সময়ে আর নেই বললেই চলে কিন্তু ক্ষুদ্র পরিসরে এর ব্যবহার যথেষ্ট।

    ৪. যদিও সৌদি সরকার পরিচালিত হয় ব্রিটেনের দালাল কিং আব্দুল্লাহ দ্বারা তবুও সৌদি রাজপুত্ররা আমেরিকার পা চাটতে ব্যস্ত থাকে যা আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তবায়নে জোরালো ভূমিকা পালন করে।

    উপরউল্লিখিত নির্দেশনার আলোকে আপনার সন্দেহের জায়গাটুকু হয়ত দূরীভূত হতে পারে:

    ক. কাতার প্রশ্নে-সাবেক আমীর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রকাশ্য দালালীর ফলস্বরূপ উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্রিটেনের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাতারকে জোরালো ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। তারা দু’টি মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে:

    ১. মিডিয়া চ্যানেল আল-জাজিরা দিয়ে

    ২. তেলের টাকা দিয়ে ।

    এইগুলোর মাধ্যমে তারা সিরিয়া, ফিলিস্তিন, এমনকি মিশর সহ অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহে আমেরিকার যে এজেন্ডা থাকে তা দমানোর চেষ্টা করে। এইসব করতে গিয়ে আমেরিকার প্রতি ব্রিটেনের শত্রুভাবাপন্নটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল যদিওবা ব্রিটেন উপরে উপরে তেল মারার নীতিতে বিশ্বাসী। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিলো কাতারের আমিরের পরিবর্তন করার যদিওবা তাকে অত দূরে ঠেলে দেওয়া হয়নি, তার স্থলাভিষিক্ত হল তারই দালালির সুযোগ্য পুত্র। তাই কাতারকে নিয়ে ব্রিটেনের নীতির কোন পরিবর্তন হয়নি। যদিওবা বাবার ন্যায় আমেরিকার স্বার্থে আঘাত হানার মত যোগ্যতা ছেলের জন্য অনেক সময়ের ব্যাপার । অর্থাৎ আমেরিকার স্বার্থে আঘাত হা্নার ক্ষেত্রে ব্রিটেন এখন ধীরে চলো নীতিতে বিশ্বাসী।

    খ. এই কারণে কাতারের প্রভাব সবকিছুতে কমে গেছে কেননা পূর্বের সরকারের তুলনায় কম অভিজ্ঞতা সম্পন্ন নতুন সরকারকে রাজনৈতিক বাজারে প্রভাব খাটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবুও কাতার কিন্তু ঠিকই খুব চতুরতা এবং বিদ্বেষমূলকভাবে আমেরিকার স্বার্থে আঘাত হেনে ব্রিটেনের স্বার্থকে চরিতার্থ করার চেষ্টা করছে যদিওবা প্রয়াসটুকু আগের তুলনায় ক্ষীণ। ফলে অন্যান্যদের তুলনায় সিরিয়ায় তাদের প্রভাব কিছুটা কমে গেছে।

    গ. সৌদিআরবের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা বেশি হওয়ায় ব্রিটেন ও আমেরিকা উভয়ই তাকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। যেখানে সৌদি রাজা ব্রিটেনের দালালি করে এবং আমেরিকাও জোরালো চেষ্টা করে সৌদি রাজপুত্রের মাধ্যমে তাদের স্বার্থকে চরিতার্থ করা।

    তাই আল-জারবার যদিও সৌদিআরবের সাথে দহরম-মহরম সম্পর্ক, সে কিন্তু আমেরিকার আর একটি পেয়াদা মাত্র। স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমেরিকার বলয় থেকে বের হওয়া কখনই তার জন্য অত সহজ নয় কেননা দিন শেষে তাকে ক্ষমতায় থাকতে হলে আমেরিকার প্রতি অনুগত হয়ে থাকতে হবে।

    ঘ. মালী এবং এতে মধ্যপ্রাচ্যের সাহায্য প্রশ্নে- আপনি হয়ত জানেন ২২.০৩.২০১২ তারিখের সেনা অভ্যুত্থানের পেছনে দায়ী ছিল আমেরিকা যা ফ্রান্সের জন্য বড় রকমের ধাক্কা ছিল এবং তারপর থেকে ফ্রান্স পুনরায় মালীর কর্তৃত্ব নেয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। মালীতে ব্রিটেনের কোন প্রভাব না থাকা সত্ত্বেও ফ্রান্স আমেরিকার বিরূদ্ধাবস্থান নেয়ায় ব্রিটেন ফ্রান্সকে সাহায্য করে (শত্রুর শত্রু একে অপরের বন্ধু)। তাই, মালীতে ব্রিটেনের দালাল রাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের সাহায্য পরিলক্ষিত হয়।

    ঙ. মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিক এবং জর্ডানের রাজার মিশর পরিদর্শনে ব্রিটেনের অবস্থান ও মিশরকে ব্রিটেনের আর্থিক সাহায্য উপরোল্লিখিত সাধারণ নির্দেশনার পরিপন্থী নয় কেননা মধ্যপ্রাচ্য এবং কাতারের ভূমিকা ভিন্ন হওয়ার একটি কারণ হল ব্রিটেন কোন কোন দেশকে মিশরের কাছে রাখতে চায় আবার কোন কোন দেশকে দূরে রেখে চলমান ঘটনাগুলোকে পর্যবেক্ষণ করে, যাতে করে ব্রিটেনের স্বার্থের অণুকুলে ব্যবস্থা নিতে পারে।

    চ. আমেরিকা কর্তৃক মুরসিকে পরিত্যাগ করার মাধ্যমে ক্ষমতায় ‘মডারেট ইসলামিষ্ট’দের আনার নীতি থেকে সরে যাওয়ার ব্যাপারে বলা যায়, ইস্যুটা আসলে ‘মডারেট ইসলামিষ্ট’দের পরিত্যাগ করা বা না করার নয় বরং মিশরে আমেরিকা তার প্রভাবটা আরও কতটুকু সুসংহত করতে পারছে তার। গত কয়েক দশক ধরেই মিশরে আমেরিকা ভালোই প্রভাব খাটাতে পারতো, তাই সে সর্বদা মিশরে একটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় থাকুক (স্থিতিশীলতা মানে এই মিশরে ভালো পরিস্থিতি বিরাজ করুক তা নয় বরং আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তবায়নে একটি নিরাপদ, অণুকুল ভূমিকে ব্যবহার করতে পারা) কিন্তু ২৫.০১.১১ এর গণজাগরণ আমেরিকাকে বিস্মিত করলো এবং মোবারক এই গণজাগরণকে দমানোর ব্যর্থতার মাধ্যমে সে যখন আমেরিকাকে একটি স্থিতিশীল পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হয় তখন আমেরিকা তার সংগ ত্যাগ করে গণজাগরণের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে তাকে সরিয়ে ক্ষমতায় মুরসীকে নিয়ে আসে। মুরসীকে এই শর্তে ক্ষমতায় বসানো হল যে, সে আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করবে বিশেষ করে ‘Camp David’ চুক্তি বহাল রাখা। আমেরিকা ধরে নিয়েছিলো জনগণের বিশাল সমর্থিত দলের লোক মুরসি মোবারকের মত তাকে নিরাশ করবে না। কিন্তু আমেরিকা আবারও তার এজেন্ডা বাস্তবায়নের অণুকুল পরিবেশ না পেয়ে বড় রকমের ধাক্কা খায় এবং মুরসিকে দৃশ্যপট থেকে সরাতে বাধ্য হয় এবং ০৩.০৭.১৩ তে নতুন সরকার আসার পেছনে আমেরিকা জোরালো ভূমিকা পালন করে।

    তাই কিছু নির্দিষ্ট ফায়দা লুটার জন্য সে ‘মডারেট ইসলামিষ্ট’দের পরিত্যাগ করেছে কিন্তু ক্ষমতায় ‘মডারেট ইসলামিষ্ট’দের আনার নীতি আমেরিকা এখনও বলবত রেখেছে তার এর মাধ্যমে ‘এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করতে চায়’-

    প্রথমত-সেইসব মুসলিমদের চোখে ধুলো দেয়া যারা ইসলামী শাসন চায় যদিওবা ‘মডারেট ইসলামিষ্ট’রা ক্ষমতায় গিয়ে গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্রের কথা বলে বলে মুখে ফেনা তুলে। তারা ইসলামি লেবাস ধারণ করে মুসলিমদের আবেগকে নিয়ে খেলা করে, ক্ষমতায় গিয়ে যারা ইসলামী শাসন তাদের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে ফেলে। এর ফলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করার ব্যাপারে মুসলিমদের শান্ত করে ফেলে, যে ফন্দিটা আমেরিকা সবসময় করে থাকে কেননা খিলাফত আমেরিকার রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

    দ্বিতীয়ত-মুসলিমদের আবেগকে কাজে লাগিয়ে ‘মডারেট ইসলামিষ্ট’রা যাতে আমেরিকার স্বার্থকে আরও সুসংহত করতে পারে। যদি তারা তা করতে ব্যর্থ হয় তবে তাদেরকে পরিত্যাগ করবে যেভাবে মুরসিকে পরিত্যাগ করল এবং অন্য আরেকজনকে তার স্থলাভিষিক্ত করবে বিশেষ করে যখন আমেরিকার দালালি করার লোকের অভাব নেই।

    মিশরের জনগণের সাথে সাথে সমগ্র মুসলিমকে এই উপলব্ধিটা করতে হবে যে, মুরসির সময়েও আমেরিকার প্রভাব ছিল, তার আগেও ছিল, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, অতএব আমেরিকাই হচ্ছে সকল সমস্যার উৎস। তাই যে মুসলিম আল্লাহ এবং রাসূলেকে বিশ্বাস করে তার উচিৎ আমেরিকার প্রভাব বলয় থেকে বের হতে চাইলে এইসব দালালদেরকে সমূলে উৎপাটন করে খিলাফত ব্যবস্থাকে নিয়ে আসা, বিশেষ করে কিনানা বাসীদেরকে সোচ্চার হওয়া যাতে করে তারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে ইহুদিদের পরাজিত করতে পারে, পবিত্র ভূমিকে মুক্ত করে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসতে পারে যেভাবে তার পূর্বেকার প্রজন্ম ক্রুসেডার এবং তাতারদেরকে বিতাড়িত করেছিল এবং এটি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-র জন্য কোন কষ্টের ব্যাপার না।

  • ধর্মনিরপেক্ষতার মুখ ও মুখোশ

    ধর্মনিরপেক্ষতার মুখ ও মুখোশ

    আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যেই দাবি করে, তারা ধর্মনিরপেক্ষ। তাদের ভারতমাতাও প্রকাশ্যেই বলে, বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার চায় ভারত।

    আবার এই আওয়ামী লীগনেত্রী শেখ হাসিনাই দাবি করেন, তারা বাংলাদেশে ইসলামের সেবক! নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান তো বলেছেন, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পক্ষেই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব!

    ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পরে মুখে নিজেদের ইসলামের সেবক দাবিকারী এই শ্রেণির রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কতটুকু ধর্মনিরপেক্ষতা বোঝেন, আর কতটুকুই বা ইসলাম বোঝেন, সেটা একটু খতিয়ে দেখা দরকার।

    Secularism বা ধর্মনিরপেক্ষতা মতবাদটিকে “সকল ধর্মের সমান স্বাধীনতা” বা “সবাই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে” – এই মুখোশে বোঝাতে চান কেউ কেউ। প্রকৃতপক্ষে সেকুলারিজম মানে হলো, ধর্মীয় আইন-কানুন থেকে রাষ্ট্র আলাদা থাকবে।

    Oxford Dictionary-তে সেকুলারিজমকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে: The belief that religion should not be involved in the organisation of society, education, etc. [সমাজের গঠন/সংগঠন, শিক্ষা ইত্যাদিতে ধর্ম যুক্ত হবে না – এই বিশ্বাসের নাম সেকুলারিজম।]

    Wikipedia-তে সেকুলারিজমের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে: Secularism is the principle of separation of government institutions, and the persons mandated to represent the State, from religious institutions and religious dignitaries.

    অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতার পরিষ্কার মানে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ কখনোই “সবাই সবার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে”- এটা নয়। বরং বলা যেতে পারে, ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হলো রাষ্ট্রের দেয়া সীমার মধ্যে ধর্মপালন অর্থাৎ ‘পরাধীনভাবে’ সবাই সবার ধর্ম খণ্ডিত আকারে পালন করবে।

    ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ নাস্তিক লেখক George Jacob Holyoake (১৩ এপ্রিল ১৮১৭ – ২২ জানুয়ারি ১৯০৬) “Secularism” শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।

    ব্রিটিশ নাস্তিক লেখক George Jacob Holyoake (১৩ এপ্রিল ১৮১৭ – ২২ জানুয়ারি ১৯০৬)

    উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের আগে ধর্মরাষ্ট্রই ছিল – রাষ্ট্র থেকে ধর্ম বিচ্ছিন্ন ছিল না। ব্রিটিশরা উপমহাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা চালু করে। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ স্বাধীনের পর এই তিন দেশে অফিসিয়ালি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিটিশদের খ্রিস্টান মিশনারি স্কুলে পড়া তিন কৃতি ছাত্র:

    ১. মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী (ভারত): রাজকোট ইংলিশ স্কুল (পরবর্তীতে আলফ্রেড হাই স্কুল)

    ২. মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (পাকিস্তান): The Cathedral & John Connon School, বোম্বে; খ্রিস্টান মিশনারি সোসাইটি হাই স্কুল, করাচি। [জিন্নাহ সেকুলার ছিলেন; তিনি সেকুলার পাকিস্তানই চেয়েছেন – কোনো ধর্মরাষ্ট্র নয়।]

    ৩. শেখ মুজিবুর রহমান (বাংলাদেশ): খ্রিস্টান মিশনারি হাই স্কুল, গোপালগঞ্জ। এখান থেকেই এন্ট্রান্স পাশ, রাজনীতির হাতেখড়িও এই স্কুলে থাকতেই।

    বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা আমদানি:

    সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারেও জন্ম নিলেও (কলকাতার চন্ডিদাস, গৌরীবালা, অরণ্য কুমারের গল্প সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন) খ্রিস্টান মিশনারীদের সংস্পর্শে শেখ মুজিব আদর্শিকভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। ধর্মকর্মে তাঁর মতি ছিল না – হজ করেননি জীবনে কখনোই। টুপি পরে ফটোও তোলেননি তেমন একটা। তাঁর টুপি পরা একটি ছবি নিচে দিলাম। [নাতি জয় খুব খুশি হবে হয়ত!]

    ইউপিএল থেকে প্রকাশিত শেখ মুজিবের “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”-তে ১৪৮ পৃষ্ঠায় গান্ধী ও সোহরাওয়ার্দীর সাথে ১৯৪৭ সালে তরুণ মুজিবের সাদা-কালো ছবিটিতেও অস্পষ্টভাবে মাথায় টুপি দেখা যায়। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিব কখনোই প্রকাশ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেননি – ওটা ভারতীয়দের আদর্শ বলেই হয়ত।

    ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে তাঁর বিরুদ্ধে ইসলামবিরোধিতার অভিযোগ উঠলে তিনি নিজেকে “ইনসাফের ইসলামে বিশ্বাসী” বলে পরিচয় দেন – ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে নয়।

    মুক্তিযুদ্ধের সময়ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা শোনা যায়নি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে কোথাও এই মতবাদের কথা ছিল না। 

    কিন্তু বাংলাদেশ স্বাধীনের পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরার পথে দিল্লিতে নেমে শেখ মুজিব বলে বসলেন, বাংলাদেশের এই জয় “ধর্মনিরপেক্ষতার বিজয়”!

    এর পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে গান্ধী-নেহরুর ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশে অফিসিয়ালি আমদানি করেন শেখ মুজিব। 

    সেই ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে “রাব্বি জিদনি ইলমা” তুলে দেয়া হয়।

    মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান আর্মিকে সমর্থনের অজুহাতে ১৯৫৯-৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত “ইসলামিক একাডেমি” ১৯৭২ সালে বন্ধ করে দেয়া হয়। [লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Islamic_Foundation_Bangladesh

    “ইসলামিক একাডেমি”-র বিরুদ্ধে রাজনীতিতে ইসলাম ব্যবহার [ধর্মনিরপেক্ষতা পরিপন্থী] করার অভিযোগও করা হয়। 

    পরে মুসলিম বিশ্বে ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য ১৯৭৫ সালের মার্চে “ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ” নামে ওই প্রতিষ্ঠান আবার চালু করেন মুজিব। ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত “সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ” ১ম খণ্ডেও এই তথ্যগুলো আছে। [মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জোরেশোরে দাবি করা হচ্ছে, মুজিব এদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা! শেখ হাসিনাও গত বৃহস্পতিবার ফটিকছড়িতে এটা দাবি করেছেন। সেক্ষেত্রে তাঁর এটাও দাবি করা উচিত যে, তিনিই ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্মাতা! কেননা হাসিনাই তো ওটার নামবদলের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন :-P] 

    ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের পর মুজিবের ভাইস-প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে প্রথম রেডিও ভাষণে বাংলাদেশের নাম “ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ” উল্লেখ করেন। মূলত আনঅফিসিয়ালি “ধর্মনিরপেক্ষতা” তখনই বাংলাদেশ থেকে উঠে যায়। 

    ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানের “ধর্মনিরপেক্ষতা” তুলে দিয়ে “আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” যোগ করেন। ১৯৭৯ সালে তা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত হয়। 

    ২০১০ সালে মহাজোট আমলে সুপ্রীম কোর্ট সেই ৫ম সংশোধনী অনেকাংশে বাতিল করে দেয়। ২০১১ সালে ১৫শ সংশোধনীর মাধ্যমে শেখ হাসিনা তাঁর পিতার অনুসৃত “ধর্মনিরপেক্ষতা” আবার সংবিধানে নিয়ে আসেন।

    ধর্মনিরপেক্ষতা ও শেখ হাসিনা:

    ১৯৯৬ সালে ৭ম সংসদ নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা মাথায় পুরোদস্তুর স্কার্ফ বেঁধে, নিজের মুনাজাতরত ছবি দিয়ে পোস্টার বানিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তবুও তিনি ধর্মনিরপেক্ষই থেকে যান, আর তাঁর প্রতিপক্ষ হয় ধর্মব্যবসায়ী!

    গত ২৯ আগস্ট ২০১৩, বৃহস্পতিবার ফটিকছড়িতে শেখ হাসিনা বলেন, “সেই নূহ নবীর আমল থেকে নৌকায় আশ্রয় দেওয়া হয়েছে মানুষদের। দুর্যোগ দুর্বিপাকে নৌকাই মানুষকে রক্ষা করেছে। নৌকায় ভোট দিয়ে আর্থিকভাবে মানুষ সচ্ছল হয়েছে।” 

    হযরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের নৌকার সাথে নিজের নৌকা প্রতীকের তুলনার পরও তিনি ধর্মনিরপেক্ষ! সেই তিনিই আবার বলেন, “ক্ষমতার মালিক আল্লাহ। আগামীতে দেশের ক্ষমতায় কে যাবে- না যাবে, তা আল্লাহ নির্ধারণ করবেন। …ইসলাম প্রচারে আওয়ামী লীগই কাজ করেছে, অতীতেও করেছে এবং এখনো করছে।”

    এর পর তিনি আবার কুরআন-হাদিস থেকেও ধর্মনিরপেক্ষতার সবক দেন: “পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন। যার ধর্ম সে পালন করবে। বিদায় হজের ভাষণ ও মদিনার সনদেও মহানবী (স.) তা উল্লেখ করেছেন।”

    ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম:

    প্রধানমন্ত্রী যখন আমাদেরকে কুরআন-হাদিস থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা শেখান, তাহলে আমরাও একটু দেখি কুরআন-হাদিস কি আসলেই নাস্তিক George Jacob Holyoake-কের ধর্মনিরপেক্ষতা শেখায় কিনা!

    আগেই বলা হয়েছে, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা। রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের বিচ্ছিন্নতার কোনো বিধান কুরআন-হাদিসে নেই। বরং আল্লাহ বলছেন,

    يٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُواْ ٱدْخُلُواْ فِى ٱلسِّلْمِ كَآفَّةً

    “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর।” [সূরা বাকারা: ২০৮]

    ইবন কাসীর (রহ.) এ-আয়াতের তাফসীরে বর্ণনা করেন, ইবন আব্বাস (রা.) এ-আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেছেন, এ-আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন,

    ادخلوا في شرائع دين محمد صلى الله عليه وسلم ولا تَدَعوا منها شيئًا

    “তোমরা পরিপূর্ণভাবে মুহাম্মদ (সা.)-এর দ্বীনের সমস্ত আইনের আনুগত্য কর এবং সেখান থেকে কোনো কিছুই পরিত্যাগ করো না।”

    এই আয়াতের তাফসীরে মুফতি শাফী (রহ.) বলেন, কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধানের নামই হচ্ছে ইসলাম। কাজেই এর সম্পর্ক বিশ্বাস ও এবাদতের সঙ্গেই হোক কিংবা আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিকতা অথবা রাষ্ট্রের সঙ্গেই হোক অথবা রাজনীতির সঙ্গেই হোক, এর সম্পর্ক বাণিজ্যের সঙ্গেই হোক কিংবা শিল্পের সঙ্গে – ইসলাম যে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা দিয়েছে তোমরা সবাই তারই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। [মা’আরেফুল কুরআন]

    ফটিকছড়িতে ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থনে শেখ হাসিনা কুরআনের আয়াতকে ভুলভাবে প্রয়োগ করেছেন। তিনি বলেছেন, পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন। যার ধর্ম সে পালন করবে।

    আসলে সূরা কাফিরূনের শেষ আয়াত “লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন”-এর অর্থ হলো, “তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।” অর্থটি শেখ হাসিনারই উদ্বোধনকৃত কুরআনের একেবারে বাংলাদেশ সরকার পরিচালিত ওয়েব সাইট থেকে নেয়া! 

    সব তাফসীর গ্রন্থে আছে, মক্কার মূর্তিপূজারীরা মহানবী (সা.)-কে এই শর্তে সমঝোতার প্রস্তাব দেন যে, মহানবী (সা.) একবছর কাফেরদের ধর্মপালন করবেন, কাফেররাও একবছর ইসলাম পালন করবে। এ-ধরনের আরো কিছু শর্তের মাধ্যমে তারা মহানবী (সা.)-র সাথে সমঝোতা করতে চায়। ওই সময় অবতীর্ণ সূরা কাফিরূনের মাধ্যমে আল্লাহ পরিষ্কার জানিয়ে দেন, মহানবী (সা.) কোনোভাবেই তাদের ধর্মের কোনো কিছু গ্রহণ করতে পারেন না:

    “বলুন, হে কাফেররা, আমি ইবাদত করি না তার তোমরা যার ইবাদত কর। এবং তোমরাও ইবাদতকারী তার নও, যার ইবাদত আমি করি এবং আমি তার ইবাদতকারী নই, যার ইবাদত তোমরা কর। তোমরাও তার ইবাদতকারী নও, যার ইবাদত আমি করি। তোমাদের দ্বীন তোমাদের, আমার দ্বীন আমার।”

    সীরাতে ইবনে হিশাম গ্রন্থে [ইসলামিক ফাউন্ডেশন অনূদিত] আছে, মক্কার কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তাদের সাথে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর চাচা আবু তালিবকে বলেন:

    يَا عَمّ، وَاَللّهِ لَوْ وَضَعُوا الشّمْسَ فِي يَمِينِي ، وَالْقَمَرَ فِي يَسَارِي عَلَى أَنْ أَتْرُكَ هَذَا الْأَمْرَ حَتّى يُظْهِرَهُ اللّهُ أَوْ أَهْلِكَ فِيهِ مَا تَرَكْتُهُ

    “হে চাচা, আল্লাহর শপথ, তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য ও বাম হাতে চাঁদও এনে দেয় এই শর্তে যে আমি আমার কাজ পরিত্যাগ করবো, তাহলেও আমি কখনো আমার কাজ বন্ধ করবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ এটিকে বিজয়ী করেন অথবা আমি ধ্বংস হয়ে যাই।”

    তাই কুরআন-হাদিসে শেখ হাসিনার আবদারকৃত “যার ধর্ম সে পালন করবে” এ-রকম কোনো অর্থ “লাকুম দিনুকুম অলিইয়াদিন”-এর পাওয়া যায় না – বরং পাওয়া যায়, কাফেরদের ধর্মকে মেনে না নেয়ার কঠোরতম দৃঢ় সিদ্ধান্ত।

    ……   …….   …….   …….    ……..

    ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশে যারা নিজের খেয়ালখুশি মতো ইসলামের বিধি-বিধানসমূহকে আংশিকভাবে পালন করতে চায়, যারা নিজের খেয়ালখুশি মতো কুরআনের কিছু বিধান মানবে আর কিছু বিধান মানার দাবি তুললে হত্যা-নির্যাতন করবে, তাদেরকে আল্লাহ কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন এই বলে যে, 

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ ٱلْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَآءُ مَن يَفْعَلُ ذٰلِكَ مِنكُمْ إِلاَّ خِزْيٌ فِى ٱلْحَيَاةِ ٱلدُّنْيَا وَيَوْمَ ٱلْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ ٱلّعَذَابِ

    “তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান কর? অতএব তোমাদের মধ্যে যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা আর কিয়ামতের দিন এরা কঠিন শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে।” [সূরা বাকারা : ৮৫]

    মুখে যতই ইসলামের সেবক দাবি করুক, এসব আংশিক ইসলাম বিশ্বাসকারী ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তি পৃথিবীতে লাঞ্ছিত হবেই, আর কিয়ামতে পাবে কঠোর শাস্তি। এটাই মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণা।]

    দূরের যাত্রী
    ৩১ আগস্ট ২০১৩

  • পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা

    জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের ধারণার বশবর্তী হয়ে পশ্চিমারা নিজেদেরকে আইন তৈরির ক্ষমতা প্রদান করেছে। এটা এই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে মানুষ অন্যের তোয়াক্কা না করে এমন জীবনযাপন করবে যাতে সে নিজেকে পরিতুষ্ট করতে পারে; যেখানে তার নিজের খেয়ালখুশীর প্রতিফলন ঘটবে কিন্তু অন্যদের নয়। তারা মনে করে মানুষ এরূপ অধিকার ভোগ করতে পারবে না যদি না সে স্বাধীন হয়। আর এটা থেকেই পাওয়া যায় বিশ্বাস, মালিকানা, মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা। এটা স্বাধীনতার এ ধারণাকে পবিত্র বলে বিবেচনা করে। এই স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অর্থ রয়েছে।

    বিশ্বাসের স্বাধীনতা একজনকে পছন্দসই ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ করে দেয়। অথবা দৈনন্দিন ব্যাপার হলেও তাকে এক বিশ্বাস থেকে অন্য বিশ্বাসে স্থানান্তরিত হওয়াকে অনুমোদন দেয়। এমনকি এটা তাকে ধর্ম পুরোপুরি পরিত্যাগ করতেও সুযোগ দেয়।

    মালিকানার স্বাধীনতা তাকে যে কোন কিছুর, যে কোনভাবে মালিক হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করে। এমনকি এটা তাকে তার সম্পত্তি যেভাবে খুশী সেভাবে হস্তান্তর বা পরিত্যক্ত করবার স্বাধীনতা দেয়। যদি এটি সে তার উত্তরাধিকারকে না দিয়ে প্রিয় পোষা কুকুরকে উপহার হিসেবে দিতে চায় তাহলে কেউ তাতে বাঁধা প্রদান করতে পারবে না।

    মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাকে খেয়ালখুশী মতো, অবাধে ও নিয়ন্ত্রনহীনভাবে সবকিছু বলবার স্বাধীনতা প্রদান করে, হোক সেটা সত্য বা মিথ্যা। তার উপলদ্ধি এবং খেয়ালখুশীর বিরুদ্ধে যায় এরকম যে কোন মতামতকে সে অবজ্ঞা বা সমালোচনা করতে পারে।

    ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কারণে তারা ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন মূল্যবোধ, নৈতিক বাধ্যবাধকতা, আধ্যাত্মিক সীমারেখার দ্বারস্থ হয় না।

    গণতন্ত্রের মৌলিক অপরিহার্যতা স্বাধীনতার এই ধারণা এর পক্ষালম্বনকারীদের এমন এক বোধের দিকে নিয়ে গেছে যা তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম করে দিয়েছে।

    বিশ্বাসের স্বাধীনতা পুঁজিবাদী সমাজে ধর্মের উপর বিশ্বাসের গুরুত্বকে হালকা করে দিয়েছে। তাদের পোষাক পরিবর্তনের মতো ধর্ম পরিবর্তনকে সহজতর করে দিয়েছে। বস্তুবাদী চিন্তার প্রসার ও ধর্মীয় চিন্তাকে গন্ডীভূত করে ফেলবার কারণে নৈতিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। একারণে লোকদের হৃদয় থেকে সমবেদনা উঠে গেছে এবং নেকড়ের মত দূর্বলের উপর সবলের আধিপত্য চলছে।

    মত প্রকাশের স্বাধীনতার কারণে তারা ইচ্ছেমতো যা খুশী বলতে পারে এবং যে কোন কিছুর দিকে লোকদের আহ্বান করতে পারে। সে কারণে তাদের সমাজে সব ধরণের অদ্ভুদ, মিথ্যা, খ্যাঁপাটে ধরণের মতামতের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যে কোন সাধারণ লোক রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে এবং তাকে বিরত করার কোন আইন নেই। যেমন: সালমান রুশদী, যে বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

    মালিকানার স্বাধীনতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লাভ এবং এটা পুঁজিবাদের মধ্যে ভয়াবহতা তৈরি করেছে ও লোকদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা, তাদের সম্পদ হরণ করা, সম্পদকে ব্যবহার করা এবং লোকদের রক্ত শোষণ করার জন্য উপনিবেশবাদকে পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। একারণে অন্যদের সাথে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হয়, মুসলিমদের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসা করতে হয়, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতিসমূহের মধ্যকার যুদ্ধে উস্কানি দিতে হয় যাতে অতি লাভে তাদের নিকট পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা যায়। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ যে কোন ধরণের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত। তবে যদি তারা বাধ্য হয় তাহলে ধর্মকে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ, কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত আচরণকে আঁড়াল করার জন্য নৈতিক ও মানবিক বোধের কথা বলে বেড়ায়।

    ব্যক্তিস্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমাজগুলোকে পশুর সমাজে রূপান্তরিত করেছে। তাদের লাম্পট্য এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, পশুরাও এ অধঃপতিত অবস্থায় কখনও যায়নি। আইনের মাধ্যমে তারা অস্বাভাবিক ও ভ্রান্ত যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দিয়েছে। তাদের মধ্যে এমনসব অভ্যাস দেখা যাবে যা চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে দেখা যায় না। তারা দলগত যৌনাচার ও নিকটাত্মীয় এমনকি মায়ের, বোন ও মেয়ের সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তারা পশুর সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। এ কারণে তাদের এমন রোগ হয়েছে যা আগে কখনওই হয়নি। তাদের সমাজে ভঙ্গুর পরিবার খুব বেশী দেখতে পাওয়া যায় এবং একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানে সব বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া এবং যে কোন ধরণের মূল্যবোধকে গ্রহণ করা ও পরিবারকে ধ্বংস করবার স্বাধীনতা। এইসব স্বাধীনতার নামে সব ধরণের পাপকাজ করা হয় এবং সব নিষিদ্ধ জিনিষকে বৈধতা দেয়া হয়।

    সেকারণে স্বাধীনতার নামে ব্যভিচার, সমকামীতা, সমকামী স্ত্রীলোক, নগ্নতা এবং অ্যালকোহল, যে কোন ঘৃণ্য ও গর্হিত কাজকে অনুসরণ করা যে কোন ধরণের চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বাধীনভাবে করা হয়।

    এগুলোই হলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এগুলো হলো মানুষের প্রবৃত্তির ফসল, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর ঐশী বাণীর এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নেই। কোন ধর্মেরই এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। আমরা যদি গণতন্ত্রের সমর্থক ও চিন্তাবিদদের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব যে, যা তাদের মনে একে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এবং যে পরিস্থিতিতে এর উদ্ভব ঘটেছে তা সত্যিকার অর্থেই একটি কুফর ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিছু লোকের কথার উপর ভিত্তি করে, যেমন: রাজা ১৫তম লুইসের মতে, ‘আমরা স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছ থেকে মুকুট গ্রহণ করি না।’ এবং রাজা ১৪ তম লুইস বলেন, ‘রাজার কর্তৃত্ব আসে স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। স্রষ্টা হলেন এর একচেটিয়া উৎস এবং জনগণ নয়। স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছে রাজাগণ তাদের কর্তৃত্বের জন্য জবাবদিহী করেন না।’ বোদ্ধাগণ জ্যাঁ জ্যাক রুশো’র সামাজিক চুক্তির মতবাদকে ‘ফ্রেঞ্চ ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

    সুতরাং উপরে উল্লেখিত সবকিছু থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি ইসলামের সাথে গণতন্ত্র পুরো মাত্রায় সাংঘর্ষিক। এর উৎস; যা থেকে এটি এসেছে, যে বিশ্বাস থেকে এটি উৎসারিত হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যে চিন্তা ও ব্যবস্থা এটিকে নিয়ে এসেছে তা থেকেও বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

    • যে উৎস থেকে এটি এসেছে সেটি হল মানুষ। তার কাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে বিবেচনার জন্য, হুসন (পছন্দীয়) এবং কুবহ (তিরষ্কারযোগ্য) এর বিষয়ে সে নিজেই শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটা আর কোন কিছুই নয়, বরং তার খেয়ালখুশী ও প্রবত্তির অনুসরণ। এর সৃষ্টির শেকড় হল ইউরোপের দার্শনিকগণ।
    • ইসলামের ক্ষেত্রে তা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি এটা নাযিল করেছেন তার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ (সা) এর উপর। ইসলামে শাসকগণ আইন জারির ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি নয়, শারী’আহ্’র শরণাপন্ন হয়। শারী’আহ্’র বাণীসমূহকে বুঝা পর্যন্ত মনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।
    • যে বিশ্বাস থেকে গণতন্ত্র উৎসারিত হয়, তা হলো জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের বিশ্বাস বা আক্বীদাহ্ এবং এটা এসেছে আপোষমূলক সমাধানের মাধ্যমে। এটা ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং জীবন ও রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাবকে বিলুপ্ত করেছে এবং সর্বোপরি মানুষকে তার নিজের ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।
      ইসলামের ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। এতে ইসলামী আক্বীদাহ্’র আলোকে জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অন্যকথায় ইসলামিক আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত ইসলামী শারী’আহ্ ভিত্তিক হুকুমের মাধ্যমে জীবন পরিচালিত হয়। এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।
    • যে ভিত্তির উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত তা হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। জনগণ হলো সকল ক্ষমতার উৎস। এর উপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তিনটি শক্তির জন্ম দিয়েছে; আইন, নির্বাহী ও বিচারিক ক্ষমতা, যাতে সে এর সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বের বাস্তব প্রয়োগ করতে পারে।
    • ইসলামে শারী’আহ্’র উপর সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত এবং উম্মাহ্’র আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। তবে ইসলাম মুসলিমদের আল্লাহ্ প্রদত্ত আদেশ-নিষেধকে কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং শারী’আহ্গত দলিলের ভাষায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।
    • গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা ও চিন্তা নিয়ে এসেছে যার ভিত্তি মানুষের প্রবৃত্তিজাত এবং তা হলো লাভ। অন্যদিকে ইসলামের আইন প্রক্রিয়া শারী’আহ্ এবং শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত আইনের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ এটি এই নির্দেশিত পথের অনুমোদন ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল।

    গণতন্ত্রের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা থেকে ইসলাম লাভবান হতে পারে; এ ধরণের উক্তি ভিত্তিহীন এবং দলিল নির্ভর নয়। আমরা গণতন্ত্রের কিছু প্রভাব দেখতে পেয়েছি যা এমন এক মন্দ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে যা কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসেনি। মানবতার জন্য আগত সর্বোত্তম উম্মতের গণতন্ত্র থেকে নেওয়ার কিছু নেই। ইসলামের কী এমন কোনো ঘাটতি রয়ে গেছে যে তা পূরণের জন্য গণতন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে?