Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মোড়লরাই মুসলিম বিশ্বে স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে

    পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের মোড়লরাই মুসলিম বিশ্বে স্বৈরতন্ত্র টিকিয়ে রেখেছে

    ২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থানকে গতন্ত্রের বসন্ত, আরবদের বহুদিনের কাঙ্খিত অর্জন ইত্যাদি নানা নামে অভিহিত করেছিল পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব। বিশ্বে যা কিছু ভাল অর্জন সবই তারা গণতান্ত্রিক চেতনার নামে চালিয়ে দেয়। এক বছরের মাথায় সেনা অভ্যুত্থানে মিসরে বিশ্ব স্বীকৃত প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের প্রেসিডেন্ট মুরসির সরকারের পতন ঘটানো হয়েছে। প্রেসিডেন্টের পক্ষে-বিপক্ষে কয়েক দিন ধরে চলা বিক্ষোভের পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান ঘটায়। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট মুরসি ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সাংবিধানিক আদালতের প্রধান বিচারপতি আদলি মানসুরকে মিসরের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে সেনাবাহিনী। একই সাথে দেশটির সংবিধান স্থগিত করা হয়েছে এবং সংসদ ভেঙে দেয়া হয়েছে। সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল আল ফাত্তাহ আল সিসি দেশে আগাম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন। এর আগে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনের দখল নেয় সেনাসদস্যরা। বন্ধ করে দেয় মুরসি সমর্থক গণমাধ্যমগুলোকে।

    দুই বছর আগে কায়রোর তাহরির স্কয়ারে তরুণদের উত্তাল গণআন্দোলন গোটা মিসরে ছড়িয়ে পড়লে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। অবসান ঘটে তার তিন দশকের স্বৈরশাসনের। তার ক্ষমতার উৎসও ছিল মূলত সেনাবাহিনী। মোবারকের পতনের পর ফিল্ড মার্শাল মোহাম্মদ হুসেন তানতাবির নেতৃত্বে সামরিক পরিষদ ক্ষমতা গ্রহণ করে। এরপর দুদফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের জুনে সরকার গঠন করে মুরসির দল ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি। দলটির সঙ্গে মিসরের শক্তিশালী ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, আমেরিকা সমর্থিত সেনাবাহিনী কখনোই যাদের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। সেনা ও সেকুলার দলগুলোর সমর্থিত প্রার্থী আহমদ শফিককে হারিয়ে ৫১ দশমিক ৭৩ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন ড. মুরসি। এর আগে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক নির্বাচনে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি পার্লামেন্টের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ অর্থাৎ ২৩৫টি আসন লাভ করে। ইসলামপন্থী অপর রাজনৈতিক দল আল নূর পার্টি ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ অর্থাৎ ১২১টি আসন লাভ করে। সেকুলার দলগুলো সম্মিলিতভাবে পার্লামেন্টের ১৫ শতাংশ আসন লাভেও ব্যর্থ হয়। পার্লামেন্টে নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করে মোবারকের রাজনৈতিক দলসহ অন্য সেকুলার দলগুলোর গণভিত্তি অনেক দুর্বল।

    হোসনি মোবারকের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার প্রধান একটি নিয়ামক ছিল যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি মিসরের সেনাবাহিনীকে বছরে ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে। মিসরে অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় মার্কিন বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি। এর পেছনের কারণ অবশ্য ১৯৭৯ সালে স্বাক্ষরিত মিসর-ইসরাইল শান্তিচুক্তিকে সমুন্নত রাখা। যাকে আমরা ইসরাঈলকে নিরাপদ রাখা ও মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার স্বার্থে কাজ করার জন্য বাৎসরিক ঘুষ বলতে পারি।

    ইখওয়ানের রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে হোসনি মোবারকের মানবাধিকার বিরোধী দমনমূলক কর্মকাণ্ডে পশ্চিমা দেশগুলো পুরোপুরিভাবে অবগত ছিল। অধিকার হরণ কিংবা নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কখনওই মোবারক সরকারের সমালোচনা বা চাপ প্রয়োগ করেনি। বরং এরা ইসলামপন্থী দলটির ওপর নির্যাতনকে সমর্থন জুগিয়েছে। এখন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের পর একইভাবে পশ্চিমা বিশ্ব নির্লিপ্ত ভূমিকা নিয়েছে। কারণ গণতন্ত্রের চেয়ে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতারোহণ তাদের কাছে বেশি বিপজ্জনক মনে হয়েছে। আরব বসন্তের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব আশা করেছিল সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্টিত হবে কিন্তু ফলাফল হয়েছে উল্টো। প্রমাণ হয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আদর্শ শত বছর পর হলে কথা বলে, মানুষের জীবন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

    আরব বিশ্বে মুসলিম তরুণরা স্বৈরতন্ত্রের জিঞ্জির হতে মুক্তির জন্য যে বিপ্লবের সূচনা করেছিল, সে মুক্তির স্বপ্ন ভঙ্গ হলে তারা চরমপন্থার দিকেও পা বাড়াতে পারে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেহেতু পশ্চিমা সমর্থিত গোষ্ঠি বা সেনাবাহিনী সুযোগ দিচ্ছে না, তারা হয়তো বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার চিন্তা করবে বিকল্প পন্থায়। মজার ব্যপার হলো, বিশ্ব জুড়ে দেখা যায়, সেকুলাররা গণতন্ত্রবাদীদের সমর্থন দেয় কিন্তু মিশরে স্বৈরশাসকদের সমর্থন দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। তাহলে কি তারা স্বৈরতন্ত্রের চেয়ে ইসলামি ব্যবস্থাকে তাদের জন্য বেশি বিপদজনক মনে করে! ব্রাদার হুডের ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি নির্বাচনের আগে শরীয়া আইন, অবৈধ ইসরাঈলের বিরোধিতা ও ইসলামি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার দিয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তারা ঘোষণা দেয় সিভিল স্টেট বা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। তারা নিজেদের কখনো কখনো মডারেট মুসলিম হিসেবেও ঘোষণা করে। তারা ইসরাঈলের সাথে কৃত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির স্বীকৃতিসহ ইসরাঈলকেও স্বীকৃতি দেয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে নিজ দলের মধ্যে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমতে থাকে। জনগণের ইসলামের চাহিদার থেকে দূরে এসেও পশ্চিমা ও তাদের দেশীয় দোসরদের মুরসি সন্তুষ্ট করতে পারেননি। তাই ব্রাদারহুড তথা মুসলিমবিশ্বের অন্যান্য ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সামনেও বড় প্রশ্ন থাকবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নির্বাচন কী তাদের ইসলামি সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিপন্থি? নাকি পশ্চিমা সেকুলার পুঁজিবাদী বিশ্ব চায়- ইসলামপন্থিরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করুক কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ইসলামি আদর্শ যেন বাস্তবায়ন না করে।

    আমরা ৯০-এর দশকে আলজেরিয়ায় দেখেছি যখন ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ার পরও সেনাবাহিনী সে ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করে এবং লিয়ামেন জেরুয়ালের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে, তখন সেকুলার রাজনৈতিক দলগুলো সেনা শাসককে সমর্থন জানিয়েছিল। একই সাথে পশ্চিমা বিশ্বের গণতন্ত্রকে ছুড়ে ফেলে সেনাশাসকের পাশে এসে দাঁড়ায়। লিয়ামিন জেরুয়াল তিন দশক ধরে দেশটিতে একদলীয় শাসন কায়েম করে রেখেছে। নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেয়ার ফল হিসেবে আলজেরিয়ায় জনগণকে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধের মুখে পড়তে হয়েছে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ সশস্ত্র লড়াইয়ে জীবন দিয়েছে। বিখ্যাত চিন্তাবিদ ও কাউন্টার পাঞ্চ- এর লেখক ইসাম আল-আমিন তার সাম্প্রতিক একটি লেখায় লিখেছেন, “আলজেরিয়া ও ফিলিস্তিনের মানুষ যখন ১৯৯২ ও ২০০৬ সালে ইসলামপন্থিদের নির্বাচিত করেছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসলামপন্থিদের বিজয়কে ভিন্ন চোখে দেখেছে। মিশরেও ইসলামপন্থিদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। গত দুই দশকে এটা তৃতীয় বার ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের এরূপ অবস্থান ভবিষ্যতে ইসলামি দলগুলোর সাথে পশ্চিমা বিশ্বের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের নির্ণায়ক হতে পারে।”

    পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠিরা মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদেরকে ক্ষমতায় নিয়ে আসা ও তাদের সব রকমের সহযোগিতা দিয়ে মসনদে টিকিয়ে রাখার বিষয়গুলো আজ বুঝতে আর কারো বাকী নেই। ওসমানীয় খিলাফতের পতনের পর মুসলিম ভূ-খণ্ডগুলো থেকে সম্পদ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য বৃটিশ-ফ্রান্স-আমেরিকা কখনো স্বৈরশাসক আবার কখনো সেনা-স্বৈরশাসক ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। মুসলিম বিশ্বের স্বৈরশাসকদের সঙ্গে আমেরিকার দহরম মহরম সম্পর্কের কথা কারো না জানা নেই। জামাল আব্দুল নাসের, ইসলাম কারিমভ, হোসনে জাইম, করিম কাসেম, হাফিজ আল আসাদ, জেনারেল সুহার্তো, সাদ্দাম, সৌদ বংশের শাসকগণ, গাদ্দাফি, মোবারক, আইয়ুব খান, জিয়াউল হক, মোশাররফদের মতো বর্তমান ও সাবেক স্বৈরশাসকরা আমেরিকা-বৃটেনের-ফ্রান্সের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ইন্ধনে টিকে আছে, টিকে ছিল। তেল সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনায় ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনপ্রিয় মোসাদেক সরকারকে হটিয়ে রেজা শাহ পাহলভীকে ক্ষমতায় বসায়। অনুগত স্বৈরশাসক রেজা শাহ পাহলভীর শাসনামলে সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের নামে আমেরিকা বাৎসরিক ত্রিশ মিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রদান করত।

    ১৯৯৫ সালে ক্লিন্টন এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের একজন অফিসিয়াল নিউইয়র্ক টাইমসে ইন্দোনেশিয়ার স্বৈরশাসক জেনারেল সুহার্তোকে ‘আওয়ার কাইন্ড অফ গাই’ হিসেবে সম্মোধন করেন। এতে সুস্পষ্ট হয় ইন্দোনেশিয়ায় তার আমলের গণহত্যা ও জুলুমের শাসনে তখনকার আমেরিকান এ্যাম্বাসেডরের তথা আমেরিকার অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের প্রতি নগ্ন সমর্থন। ২০ মার্চ, ২০০৩ সালে সাদ্দামের কাছে গণবিধবংসী অস্ত্র আছে এ অযুহাতে হামলা চালিয়ে আজ পুরো জাতিকে ধ্বংসের মহড়ায় আমেরিকান সৈন্যরা মগ্ন। অথচ এই সাদ্দামকে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র দেওয়ার হাজারো প্রমাণ হাজির করা যাবে। দ্যা এল এ টাইমসের ১৯৮৪ সালের এক রিপোর্টে প্রকাশিত হয় ২০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪৫ বেল ও ২১৪ এস টি নামের যুদ্ধে ব্যবহৃত হেলিকপ্টার আমেরিকা সাদ্দামকে হস্তান্তর করে। ১৯৮৮ সালে নিউইয়র্ক টাইমস রিপোর্ট করে ঐ হেলিকপ্টারগুলো ব্যবহার করে কুর্দি দমনে বিষাক্ত গ্যাস ছোড়া হয়।

    তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, ইরান, সিরিয়া, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির ঘটনা প্রবাহ লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এ দেশগুলোর স্বৈরশাসকদের হাত থেকে জনগণকে মুক্ত করা আমেরিকা-বৃটেনের লক্ষ্য নয়। তাই যদি হতো, তাহলে এ দেশগুলোতে কখনো সামরিক শাসক, কখনো স্বৈরশাসক কখনো পুতুল সরকার আবার কখনো তথাকথিত ভঙ্গুর গণতন্ত্র সাম্রাজ্যবাদীরা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় নিয়ে আসত না। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য শুধু এ দেশগুলোর সম্পদকে লুটপাট করা এবং রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল রাখা যাতে করে মুসলিম উম্মাহ যেন কোনোভাবেই বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাবশালী না হয়ে উঠতে পারে। কারণ, মুসলিম বিশ্বে যদি গণপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারগুলো দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকে তাহলে এ সকল জনপ্রিয় সরকার জনগণের চাপে সাম্রাজ্যবাদীদের চাহিদা পুরণ করতে পারেনা। একথার সত্যতা বোঝা যায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে তাকালে। বাংলাদেশে বিএনপি-আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে ভারত-আমেরিকা যে সকল সুযোগ-সুবিধাগুলো চেয়েছিল তা কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপি দিতে পারেনি অথচ ফখরুদ্দিন সরকার সে সকল অনেক সুযোগ-সুবিধা কোনো রূপ দেন-দরবার ছাড়াই দিয়ে দেয়।

    ঐতিহাসিক ও আর্দশিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বলতে হয়, ষোড়শ শতকে ফরাসি বিপ্লবের পর ইউরোপে যখন প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়, মধ্যপ্রাচ্য তথা অর্ধপৃথিবীতে তখনও ইসলামি শাসনের তখন স্বর্ণযুগ চলছিল। হাজার বছরের ক্রুসেডের বারং বার যুদ্ধ ও পরাজয়ের ইতিহাসও হয়তো পশ্চিমারা ভুলতে পারে না। তাদের ধারণা সেকুলার পুঁজিবাদী গণতন্ত্র ধর্মভিত্তিক মুসলিম সমাজে হয়তো মানিয়ে উঠতে পারবে না। তাই মুসলিম বিশ্বেও ১৪০০ বছরের ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার নিরিখে পশ্চিমারা হয়তো ইসলামপন্থি দলগুলোকে সমর্থন দিতে সংকোচ বোধ করে। ঐতিহাসিক ও আর্দশিক এ দ্বন্দ্বের অভিজ্ঞতা মনে হয় ইসলাম ও পুঁজিবাদী সেকুলার গণতন্ত্রের ভবিষ্যত সম্পর্কের রূপ নির্ধারণ করবে।

    খান শরীফুজ্জামান সোহেল
    লেখক ও মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি গবেষক

  • মার্ক্সীয় অর্থনীতির মূলভিত্তি ও চিন্তার ভুল

    মার্ক্সীয় অর্থনীতির মূলভিত্তি ও চিন্তার ভুল

    অর্থনীতিবিষয়ক অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক (Socialist) ধারণার জন্ম হয়েছে বিগত উনিশ শতকে। সমাজতান্ত্রিকরা খুবই কঠোরভাবে পুঁজিবাদী (Capitalist) অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে। সমাজতন্ত্রের এই শক্তিশালী আবির্ভাবের অন্যতম কারণ হল পুঁজিবাদের দ্বারা সৃষ্ট সামাজিক অসমতা।

    সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও প্রভাবশালী হচ্ছে কার্ল মার্ক্সের তত্ত্ব। যার উপর ভিত্তি করে কমিঊনিস্ট পার্টি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান যুগেও তার তত্ত্বের অনেক প্রভাব রয়েছে। তার সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থের নাম হল ‘দাস ক্যাপিটাল’ (পুঁজি) যার মাধ্যমে তিনি পুঁজিবাদী চিন্তাবিদদের আক্রমণ করেন। পুঁজিবাদী অর্থনীতির প্রবক্তা এড্যাম স্মিথ এর মতে, ”কোন পণ্যের মূল্য নির্ভর করে সে পণ্য উৎপাদন করতে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয়িত হয়েছে তার উপর।” অর্থাৎ, যে পণ্য উৎপাদনে দুই ঘন্টা সময় লেগেছে তার মূল্য যা উৎপাদনে এক ঘন্টা সময় লাগে তার চাইতে বেশি। পরবর্তীতে রিকার্ডো এর সাথে সংযোজন করেন, “কোনো পণ্যের মূল্য শুধুমাত্র এটি উৎপাদনে যে পরিমাণ শ্রম বা কাজ হয়েছে তার উপর নির্ভর করে না বরং অতীতে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে এবং উৎপাদনের যন্ত্রপাতি তৈরীতে যে কাজ হয়েছে তার উপরও নির্ভর করে।”

    মূল্যের এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে মার্ক্স ব্যাক্তি মালিকানা ও পুঁজিবাদকে আক্রমণ করেন। তিনি মূল্য নির্ধারণের একমাত্র উৎস হচ্ছে পণ্য উৎপাদনে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয়িত হয়। সুতরাং, শ্রমিকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে যে মূল্যে বিক্রি হচ্ছে তার পূর্ণ দাবিদার হল শ্রমিক নিজে। কিন্তু, পুঁজিবাদী সমাজে মালিকপক্ষ শ্রমিককে সামান্য কিছু মজুরী দিচ্ছে এবং লাভের একটি বিরাট অংশ নিজের পকেটে পুড়ে নিচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা শ্রমিককে শোষণ করছে।

    যে চিন্তার উপর ভিত্তি করে মার্ক্সীয় দর্শন গড়ে উঠেছে তা হল ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ (Historical Evolution) বা অন্যভাবে বলা যায় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (Dialectical Materialism)। এ তত্ত্বের সারাংশ নিম্নে উল্লেখ করা হল

    প্রত্যেক যুগে কোন একটি সমাজ ব্যবস্থা তার অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল স্বরূপ। ব্যবস্থার এই রূপান্তর মূলত বস্তুগত অবস্থা (Material Situation) উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে সংগ্রাম বা দন্দ্বের ফলাফল। ইতিহাস আমাদের বলে, এই সংগ্রামের সমাপ্তি হয় যারা শোষিত এবং সংখ্যায় বেশী তাদের বিজয়ের মধ্য দিয়ে। পূর্ব যুগেও এই দন্দ্ব বিদ্যমান ছিলো স্বাধীন মানুষ এবং দাসের মধ্য, এরপর অভিজাত ও প্রজার মধ্যে, তারপর অভিজাত ও কৃষকের মধ্যে, তারপর বিভিন্ন গোত্র প্রধানদের মধ্যে। এই দ্বন্দ্বে শোষিত শ্রেণী সব সময় শোষক শ্রেণীর উপর জয়ী হবে।

    ফরাসী বিপ্লবের সময় এই সংগ্রাম দন্দ্ব সংগঠিত হয় বুর্জোয়া (পুঁজিপতি) শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে যা মূলত দুটি শ্রেণীর স্বার্থের মাঝে দন্দ্ব এবং এর উৎস অর্থনৈতিক কারণ।

    বর্তমান যুগে, উৎপাদনের উপায় বা হাতিয়ার পরিবর্তিত হয়েছে। উৎপাদন ব্যবস্থা এককেন্দ্রিক হতে বহুকেন্দ্রিক হলেও মালিকানা ব্যবস্থা বা ব্যাক্তিমালিকানার কোন পরিবর্তন হয় নাই। যার ফলে একজন মালিকের অধীনে শ্রম দানকারী অনেক শ্রমিকের এই মালিকানায় কোন অংশ নেই এবং তারা প্রতিনিয়ত শোষণের শিকার হচ্ছে। বাজারে পণ্যের মুল্য ও শ্রমিকের বেতনের এই পার্থক্য মার্ক্সের ভাষায় হল উদ্বৃত্ত মুল্য যা প্রকৃতপক্ষে শ্রমিকের অংশ তা মালিক পক্ষ অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। এই দন্দ্ব চলতে থাকবে যতদিন না মালিকানার ধরণ উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে উপযোগী না হয়। অর্থাৎ ব্যাক্তি মালিকানা সামাজিক মালিকানায় পরিণত না হয় ততদিন। সামাজিক বিবর্তনের সুত্র মতে, এ দন্দ্ব অবশ্যই শোষিত শ্রেণী বিজয়ী হবে।

    পুঁজির মালিকদের পরাজয়ের বীজ বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে নিহিত এবং তাদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকবে। যার কারণ একাগ্রতা সূত্র (Law of Concentration) ও মুক্ত প্রতিযোগিতা পদ্ধতি (Process of Free Competition)। একাগ্রতা সূত্র মতে পুঁজিবাদীর সংখ্যা কমতে থাকবে এবং শ্রমিক শ্রেনীর সংখ্যা বাড়বে। মুক্ত প্রতিযোগিতা সূত্র মতে, উৎপাদন সীমা অতিক্রম করবে এবং উৎপাদনের পরিমান বৃদ্ধি পাবে যা স্বল্প বেতনভোগী শ্রমিকশ্রেনীর ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে হবে। এর ফলে মালিকরা তাদের পুঁজি হারাবে এবং ধীরে ধীরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে। একাগ্রতা সূত্র (Law of Concentration) যদি কেঊ কোন শিল্প যেমন – চকলেট কারখানার নিয়ে গবেষণা করে তবে খেয়াল করবে কারখানার সংখ্যা দিন দিন কমবে অন্যদিকে শ্রমিকদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এভাবে বড় কারখানাগুলো ছোট কারখানাগুলোকে গ্রাস করে নিবে।

    এভাবেই, সংকট তৈরি হবে ও এর পুনরাবৃত্তি হবে যা একসময় পুঁজিবাদের মুল ভিত্তিগুলোকে ধ্বংস করে দিবে। এর মধ্য দিয়ে কমিউনিজমের আবির্ভাব ঘটবে যা ঐতিহাসিক বিবর্তনের সর্বশেষ স্তর কারণ ইহা ব্যাক্তি মালিকানা ধ্বংস করে দিবে এবং এর ফলে কোন শ্রেণী থাকবে না ও দন্দ্ব ও থাকবে না।

    পরিশেষে বলা যায়, সমাজতান্ত্রিকরা সমাজে প্রতিটি ব্যাক্তির মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যেমন – মুনাফার ক্ষেত্রে সাম্যতা, উৎপাদনের ক্ষেত্রে সাম্যতা অর্থাৎ, পরম সাম্যতা প্রতিষ্ঠা। এ ধরনের সাম্যতা অসম্ভব এবং অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই না। কারণ সৃষ্টিগতভাবে মানুষের দৈহিক ও মানসিক সংগঠন ক্ষমতা এক নয় এবং তাদের চাহিদা ও সন্তুষ্টির সীমার মাঝেও পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে, কেউ যদি তাদের মধ্যে সমানভাবে পণ্য ও সেবা বন্টন করে দেয় এরপরও এসব সম্পদ উৎপাদনে ও কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে সমতা বিধান সম্ভব না। তাদের প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের যে পরিমাণ তার ক্ষেত্রেও সমতা বিধান সম্ভব নয়।

    মালিকানা ও উৎপাদনের উপায়ের মধ্যে পার্থক্য খুবই স্বাভাবিক। ব্যক্তি মালিকানার পুরোপুরি বিলুপ্তি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। মালিকানার ইচ্ছা মানুষের বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি হতে উৎসারিত এবং এই প্রকৃতিটিকে ধ্বংস করা সম্ভব নয় কারণ তা মানুষের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। সুতরাং, ব্যাক্তি মালিকানার বিলুপ্তি যা মানুষের প্রবৃত্তির সাথে সাংঘর্ষিক এবং তাকে অশান্তির দিকে ঠেলে দিবে। সুতরাং, এই প্রবৃত্তিকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করার চাইতে তা সংগঠনের চেষ্টা করা উচিত। যেমন – মানুষ কোন কোন সম্পদের মালিক হবে তা নির্ধারণ করা। অন্যদিকে, মানুষের সকল প্রকার সম্পদ অর্জনে যদি সীমারেখা টানা হয় তবে তারা অলস জাতিতে পরিণত হবে।

    তারা বলে, শ্রমিক শ্রেণীর শোষণের সমাধান হল তাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যাতে করে মালিক শ্রেণীর সাথে তাদের দন্দ্ব প্রবল হয় কিন্তু যদি মালিক শ্রেণী তাদের চাহিদা পূরণের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীকে সন্তুষ্ট করে তবে তারা শোষণ অনুভব করতে পারবে না এবং বিবর্তনও হবে না। সুতরাং, উৎপাদন ও বিতরণ এর সংগঠনের সমতা বাস্তবায়নের জন্য দ্বন্ধ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বিবর্তন ঘটানো কখনো সমাধান হতে পারে না বরং সমস্যার প্রকৃতি অনুধাবন করে সঠিক আইনের মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে।

    কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বের মধ্যে ভুলগুলোর তিনটি দিক রয়েছে-

    প্রথমত: মুল্য সম্বন্ধে তার মতবাদের মধ্যে ভ্রান্তি ও মতভেদ রয়েছে। তার মতে মুল্য হচ্ছে কোন পণ্য উৎপাদনে যে পরিমান কাজ বা শ্রম ব্যয়িত হয় তা কিন্তু বাস্তবে তা ঠিক নয়। কাজের পাশাপাশি পণ্যের কাঁচামাল, চাহিদা ও সরবরাহ ইত্যাদি কারণ মুল্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। সুতরাং, মুল্যের একমাত্র উৎস হল ব্যায়িত শ্রম এই ধারণা সঠিক নয় যা পণ্যের প্রকৃতি সম্বন্ধে অনুপযোগী ধারণা।

    দ্বিতীয়ত: তার মতে কোন একটি সময়ে যে সামাজিক কাঠামো তা ঐ সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল এবং ব্যাবস্থার মধ্যে এই বিবর্তন শুধু একটি কারণে সংগঠিত হয় আর তা হল শ্রেণীগুলোর মধ্যে দন্দ্ব যার লক্ষ হল বস্তগত অবস্থার উন্নয়ন। এই মতবাদ ভ্রান্তিমূলক, ভিত্তিহীন এবং অনুমান নির্ভর। ঐতিহাসিক ঘটনা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লষণ করলে তা সহজে অনুধাবন করা যায়। আমরা জানি, রাশিয়ার সমাজতন্ত্রে রূপান্তর কোন বস্তুগত বিবর্তন বা শ্রেণী দন্দ্বের মাধ্যমে সংগঠিত হয় নি। বরং একটি দল রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করে, জনগনের উপর তার চিন্তাকে প্রয়োগ করে এবং ব্যবস্থার পরিবর্তন করে। রাশিয়া যে সকল রাষ্ট্র বিজয় করে তাতে তারা জোরপূর্বক সমাজতন্ত্র চালু করে যা কোন প্রাকৃতিক বিবর্তন নয়। অনুরূপভাবে, তৎকালীন রাশিয়া বা চীন ছিল কৃষি নির্ভর অন্যদিকে জার্মানি, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা ছিল শিল্প কারখানা নির্ভর যেখানে পুঁজির মালিকের সংখ্যা কম ও শ্রমিকের সংখ্যা বেশি ছিল। মার্ক্সের তত্ত্ব মতে, শ্রেনী দ্বন্ধের কারনে রাশিয়ার বিবর্তন না হয়ে ইংল্যান্ড বা আমেরিকার বিবর্তন হওয়ার কথা। কিন্তু এসকল দেশে এখনো পুঁজিবাদ বাস্তবায়িত রয়েছে।

    তৃতীয়ত: একাগ্রতা সূত্র (Law of Concentration) ও মুক্ত প্রতিযোগিতা পদ্ধতি (Process of Free Competition) মতে পুঁজিবাদীদের সংখ্যা কমতে থাকবে এবং শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা বাড়বে। এই তত্ত্বটি সঠিক নয় কারণ উৎপাদন বা কারখানার একাগ্রতা (Concentration) একটি নির্দিষ্ট সীমায় পৌছে বন্ধ হয়ে যাবে এবং তা বিবর্তনের জন্য প্রভাবক হিসাবে আর কাজ করবে না। আরও বলা যায় এর কোন অস্তিত্ব নাই, তা হল কৃষিখাত। তা হলে কিভাবে সমাজে বিবর্তন হবে? যা প্রমাণ করে এই সকল তত্ত্ব ভুল।

    সমাজতন্ত্রে, সমাজের সমস্যার কারণ হিসেবে যে তত্ত্বগুলোর অবতারণা করা হয়েছে তা বাস্তবতার নিরিখে সঠিক নয়। সমাধানগুলো অনুমান নির্ভর যা মানুষের প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৫ (জিহাদের সূচনা)

    মদীনা নামক যে ভূমিকে রাসূল (সা) বসবাস করবার জন্য বেছে নিয়েছিলেন, সেখানে তিনি (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাথে সাথেই ইসলামী হুকুম-আহকামও বাস্তবায়ন করেছিলেন। বস্তুতঃ মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরই আল্লাহর তরফ থেকে হুকুম-আহকামের আয়াত নাযিল হতে থাকে। রাসূল (সা) ইসলামী রাষ্ট্রের মূলভিত্তি এবং মদীনার সমাজকে ইসলামী আকীদাহ ও আইন-কানুনের ভিত্তিতেই শক্তিশালী করেছিলেন এবং মদীনার মুসলিমদের (মুহাজির ও আনসার) মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। এরপর শরীয়াহর মাধ্যমে ইসলামী শাসনব্যবস্থা মদীনার মুসলিমদের জীবনে বাস্তবিক ভাবে অনুপ্রবেশ করে এবং পরবর্তীতে ইসলামী শাসনব্যবস্থার আলোকে গঠিত এই সমাজই সমস্ত পৃথিবীতে ইসলামের বার্তা বহনের গুরুদায়িত্ব পালন করে। The number of Muslims substantially increased and they became a force to be reckoned with, individuals and groups alike embraced Islam every other day, amongst them Jews and others.

    রাসূল (সা) মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তিসামর্থ্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হবার সাথে সাথে সমস্ত আরব ব-দ্বীপে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেবার

    ব্যাপারে মনোযোগী হলেন। একই সাথে তিনি (সা) এটাও বুঝতে পারছিলেন যে, মক্কার কুরাইশরা ইসলামের দাওয়াতী কার্যক্রমের পথে যে কঠিন বাঁধা সৃষ্টি করে রেখেছে সে কঠিনতম বাঁধা অতিক্রম করতে শক্তিপ্রয়োগ অপরিহার্য। কারণ, কুরাইশদের এই প্রবল প্রতিরোধের মুখে শুধুমাত্র বুদ্ধিবৃত্তিক পন্থায় দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা আর অরণ্যে রোদন করা ছিলো আসলে একই কথা।

    রাসূল (সা) যখন মক্কায় তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন তখন তাঁর পক্ষে এ কঠিনতম বাধাঁ অতিক্রম করা ছিলো অসম্ভব। কারণ, তখন না ছিলো ইসলাম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আর না ছিলো বাঁধা অপসারণে প্রয়োজনীয় বস্তুগত শক্তি অর্জনের কোন সুযোগ। কিন্তু, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথেই রাসূল (সা) বস্তুগত এ শক্তি অর্জনের সুযোগ ও ক্ষমতার অধিকারী হন। বাঁধা অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করার সুযোগও তাঁর হাতে এসে যায়। এরপর তিনি (সা) যা করেন, তা হলো মূলতঃ তাঁর সৈন্যবাহিনীকে মুখোমুখি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা এবং দাওয়াতী কার্যক্রম প্রচার প্রসারে নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরী করা। এ কারণেই তিনি (সা) তাঁর দলবলকে বিভিন্ন আরব ভূ-খন্ডের বিভিন্ন স্থানে অতর্কিত অভিযানে পাঠান, যার মধ্যে কোন কোন তিনি নিজেও অংশগ্রহন করেছিলেন। এ সমস্ত অভিযানের উদ্দেশ্যই ছিলো পৌত্তলিকদের মুসলিমদের শক্তিসামর্থ প্রদশর্ন করার মাধ্যমে পৌত্তলিকদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা। এ অভিযানগুলোর মধ্যে সর্বশেষ অভিযান ছিলো ’আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের অভিযান, মূলতঃ এটা ছিলো বদরের যুদ্ধের সূচনা পর্ব।

    হিজরী দ্বিতীয় সালের রজব মাসে মুহাম্মদ (সা) আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বে মুহাজিরদের একটি দলকে অভিযানে পাঠান। তিনি (সা) আব্দুল্লাহ ইবন জাহশকে তাঁর লিখিত একটি চিঠি দেন এবং আদেশ দেন যেন দুই দিনের পথ অতিক্রম করার পূর্বে এটি খোলা না হয়। চিঠি খোলার পর তিনি (সা) আব্দুল্লাহ ইবন জাহশকে তাঁর লিখিত নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করার আদেশ দেন এবং এ আদেশ পালনে তার দলের অন্যান্যদের জোর জবরদস্তি করতে নিষেধ করেন। দুইদিন যাত্রার পর ’আব্দুল্লাহ ইবন জাহশ চিঠি খুলে দেখলেন সেখানে লেখা আছে, “আমার এই চিঠি পড়ার পর তোমরা মক্কা ও তা’য়িফের মধ্যবর্তী স্থান নাখলাহ পর্যন্ত যাত্রা করবে এবং কুরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার জন্য ওৎ থাকবে এবং তারা যা যা কিছু বহন করছে সে সম্পর্কে আমাদের অবহিত করবে”। চিঠি পড়ার পর তিনি চিঠির বিষয়বস্তু ও রাসূল (সা) এর নির্দেশ সম্পর্কে তার সঙ্গীদের অবহিত করেন এবং একই সাথে এটাও জানিয়ে দেন যে, আল্লাহর রাসূল (সা) এ দায়িত্ব পালনে কাউকে জোর জবরদস্তি করতে নিষেধ করেছেন।

    দলের সকলেই অর্পিত দায়িত্ব পালনে সম্মতি প্রকাশ করে এবং গন্তব্যের দিকে দলবদ্ধ ভাবে এগিয়ে যেতে থাকে। একপর্যায়ে সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস আল জুহরি এবং উতবাহ ইবন গাজওয়ান তাদের হারানো উট খুঁজতে গিয়ে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে, তারা দু’জন কুরাইশদের হাতে বন্দী হয়। এদিকে, আব্দুল্লাহ ইবন জাহশ নাখলাহ নামক স্থানে পৌঁছে রাসূল (সা) এর নির্দেশ অনুসারে কুরাইশদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে এবং একপর্যায়ে বাণিজ্য সামগ্রী ভর্তি কুরাইশদের একটি ক্যারাভান তার নজরে আসে। আব্দুল্লাহ ইবন জাহশ কি করবে সেটা নির্ধারণ করার জন্য তার সঙ্গী সাথীদের সাথে পরামর্শ করতে থাকে। কারণ, সেদিন ছিলো রজব মাসের শেষ দিন আর রজব মাস ছিলো যুদ্ধ করার জন্য নিষিদ্ধ মাস। তারা ভাবতে থাকে, যদি তারা কাফেলাকে আক্রমণ করে তবে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করা হবে অথচ আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের এ ব্যাপারে কোন নির্দেশ দেননি। তারা একে অপরকে বলতে থাকে, “আল্লাহর কসম, তোমরা যদি আজ রাতে তাদের ছেড়ে দাও তবে তারা পবিত্র এলাকায় প্রবেশ করবে এবং তোমাদের আক্রমণ থেকে নিরাপদ হয়ে যাবে। আর, যদি তোমরা তাদের হত্যা করো তবে, তোমরা তাদের নিষিদ্ধ মাসে হত্যা করবে”। প্রথমদিকে তারা আক্রমণ করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্থ এবং ভীত থাকলেও পরবর্তীতে তারা শত্রুপক্ষকে আক্রমণ করার জন্য একে অন্যকে উৎসাহিত করে এবং আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলিমদের মধ্য হতে একজন বাণিজ্য কাফেলার নেতা ’আমর ইবন হাদরামিকে লক্ষ্য করে তীর নিক্ষেপ করে এবং তাকে হত্যা করে। শেষ পর্যন্ত তারা কাফেলার দু’জনকে বন্দী করে এবং সমস্ত বাণিজ্য সামগ্রী নিয়ে তারা মদীনায় ফিরে আসে।

    মদীনায় প্রত্যাবর্তন করার পর রাসূল (সা) তাদের বলেন, “আমি তো তোমাদের নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করার কোন নির্দেশ দেইনি”। অতঃপর, তিনি (সা) বন্দী দুজনের ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহন বা যুদ্ধলব্ধ মালামাল থেকে কোনকিছু নিতে অস্বীকার করেন। এটাই ছিলো আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বে অভিযানের সর্বশেষ ফলাফল। যদিও, আল্লাহর রাসূল (সা) এ দলটিকে কুরাইশদের উপর নজরদারি করার জন্য পাঠিয়েছিলেন কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এ ঘটনা নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ, হত্যাকান্ড, শত্রুপক্ষকে যুদ্ধবন্দী হিসাবে মদীনায় নিয়ে আসা এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গণীমতের মাল হিসাবে নিয়ে আসা পর্যন্ত গড়ায়। সুতরাং, এ বিষয়ে ইসলামী শরীয়াহর হুকুম কি হতে পারে?

    বস্তুতঃ এ বিষয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্যই রাসূল (সা) অপেক্ষা করতে থাকেন এবং এ কারণেই তিনি (সা) যুদ্ধবন্দী ও প্রাপ্ত মালামালের ব্যাপারে কোনরকম সিদ্ধান্ত গ্রহনে বিরত থাকেন। অপরদিকে, কুরাইশরা এ ঘটনাকে ইসলাম ও মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে অপপ্রচার করার মোক্ষম সুযোগ হিসাবে লুফে নেয়। তারা সমস্ত আরব গোত্রগুলোর মধ্যে প্রচার করতে থাকে যে, মুহাম্মদ (সা) ও সঙ্গীরা নিষিদ্ধ মাসের পবিত্রতা নষ্ট করেছে, তারা পবিত্র মাসে রক্তপাত করেছে, সম্পদ লুট করেছে এবং কুরাইশদের বন্দী করেছে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে মক্কায় অবস্থিত মুসলিম ও পৌত্তলিক কুরাইশদের মধ্যে বাকবিতন্ডা শুরু হয়। মক্কার মুসলিমরা তাদের মদীনার মুসলিম ভাইদের এ বলে রক্ষা করার চেষ্টা করে যে, মুসলিমরা রজব মাসে নয় বরং শাবান মাসে কাফেলা আক্রমণ করেছে। কিন্তু, ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কুরাইশদের ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারনা দমনে তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অপরদিকে, ইহুদীরাও এ সুযোগের সদ্বব্যবহার করতে থাকে এবং তারা আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের কাজের ব্যাপক সমালোচনা ও তাকে সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করতে শুরু করে। পৌত্তলিক ও ইহুদীদের মিলিত এ অপপ্রচারে মুসলিমরা মারাত্মক ভাবে আক্রান্ত হয়। আর আল্লাহর রাসূল (সা) নীরব থেকে এ ব্যাপারে আল্লাহর সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। অবশেষে, আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা এ বিষয়কে কেন্দ্র করে সুরা বাকারার কয়েকটি আয়াত নাজিল করেন,

    “সম্মানিত মাস সম্পর্কে তোমার কাছে (তারা) জিজ্ঞেস করে যে, তাতে যুদ্ধ করা কেমন? বলে দাও, এতে যুদ্ধ করা ভীষণ বড় পাপ। আর আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা এবং কুফরী করা, মসজিদে হারামের পথে বাঁধা দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদের বহিস্কার করা, আল্লাহর নিকট তার থেকেও বড় পাপ। আর ফিতনা সৃষ্টি করা নরহত্যা অপেক্ষাও মহাপাপ। বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদেরকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে, যদি তা সম্ভব হয়”। [সুরা বাকারাহঃ ২১৭]

    এই আয়াতটি নাজিল হবার পর মুসলিমরা আনন্দে উল্লাসিত হয়ে উঠে এবং রাসূল (সা) তারপর যুদ্ধলব্ধ মালামাল মুসলিমদের মাঝে বিতরণ করে দেন এবং সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস আল জুহরী এবং উতবাহ ইবন গাজওয়ান এর মুক্তির বিনিময়ে কুরাইশ যুদ্ধবন্দীদের মুক্ত করে দেন। বস্তুতঃ কুরআনের এই আয়াতটি কুরাইশদের ইসলামের বিরুদ্ধে সমস্ত অপপ্রচারকে একনিমিষে স্তব্ধ করে দেয়। পবিত্র মাসে যুদ্ধের ব্যাপারে এ আয়াতটি কুরাইশদের প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে এবং একই সাথে এটাও ঘোষণা করে যে, পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা পাপ কিন্তু, আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষকে মসজিদুল হারাম থেকে ফিরিয়ে দেয়া এবং সেখানকার অধিবাসীদের বহিস্কার করা, পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা ও হত্যা করা হতেও গুরুতর পাপ।

    দ্বীন ইসলাম গ্রহন করার কারণে মুসলিমদের উপর কুরাইশদের নির্মম অত্যাচার ও চরম নির্যাতনমূলক আচরন আল্লাহর দৃষ্টিতে ছিলো পবিত্র মাস কিংবা অন্য কোন মাসে যুদ্ধ ও হত্যা অপেক্ষাও গুরুতর ব্যাপার । বস্তুতঃ মক্কায় অবস্থান কালে কুরাইশরা মুসলিমদেরকে দ্বীন ইসলাম থেকে ফেরানোর জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলো এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলো। এ অবস্থায় মুসলিমদের কুরাইশদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ব্যতীত আর কোন পথই খোলা ছিলো না। যদি তা হারাম মাসে হয় তবুও। কুরাইশরাই বস্তুতঃ ইসলামী দাওয়াতের পথে চুড়ান্ত রকমের বাঁধা সৃষ্টি করেছিলো, তারা আরবের জনসাধারনকে ইসলাম গ্রহন করা থেকে বিরত রেখেছিলো, নিজেরা জেনেশুনে আল্লাহকে অস্বীকার করেছিলো, মসজিদুল হারামের পবিত্র এলাকা থেকে সেখানকার অধিবাসীদের বহিস্কার করেছিলো এবং সর্বোপরি ইসলাম গ্রহনের জন্য মুসলিমের উপর প্রচন্ড নির্যাতন চালিয়েছিলো। নিষিদ্ধ মাস কিংবা অন্য যে কোন মাসে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাই ছিলো তাদের কর্মফলের উপযুক্ত প্রতিদান। সুতরাং, ’আব্দুলাহ ইবন জাহশ পবিত্র মাসে কুরাইশদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, তা তাকে বা কোন মুসলিমকেই আসলে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারেনি।

    আর এভাবেই, আব্দুল্লাহ ইবন জাহশের নেতৃত্বে মুসলিমদের এ অভিযান হয়ে গেল ইসলামের ইতিহাসের একটি মাইল ফলক। এ ঘটনাই মূলতঃ ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রম প্রচার-প্রসারে গৃহীত পদ্ধতির ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য একটি দিকনির্দেশনা হয়ে থাকলো। এ অভিযানে ওয়াকিদ ইবন আব্দুল্লাহ আল-তামিমি তীর ছুঁড়ে কুরাইশ কাফেলার সর্দারকে হত্যা করে এবং এটাই ছিলো আল্লাহর পথে কোন মুসলিমের হাতে প্রথম রক্তপাত। জিহাদের আয়াত নাজিলের পূর্ব পর্যন্ত পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা নিষিদ্ধই থাকে। যদিও এ ঘটনার পর এ ব্যাপারে হুকুমটি পরিবতির্ত যায়। বস্তুতঃ উপরোক্ত আয়াতটির মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা পবিত্র মাসে যুদ্ধ করার উপর থেকে পূর্ববর্তী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৪ (জিহাদের প্রস্তুতি)

    মদীনার প্রান্তসীমায় অবস্থিত ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে চুক্তি সম্পন্ন হবার পর রাসূল (সা) যখন বুঝলেন যে, মদীনার নবগঠিত ইসলামী সমাজ দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তখন তিনি জিহাদের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। কারণ, দ্বীন ইসলামের আহবানকে সমস্ত পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে কুফর নিয়ন্ত্রিত ভূমিকে ইসলামের পতাকাতলে নিয়ে আসা ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। আর ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবার এ কাজটি কোন ভাবেই মিশনারীদের কাজের সাথে তুলনীয় নয়। বরং, ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করা, তাদেরকে ইসলামী ধ্যান-ধারণা ও হুকুম-আহকাম শিক্ষা দেয়া ও সমাজের মানুষকে এ আলোকে গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি সমাজ ও রাষ্ট্রে দ্বীন ইসলাম বাস্তবায়নের পথে যে কোন ধরনের বস্তুগত বাঁধা অপসারণ করতে প্রয়োজনীয় বস্তুগত পদক্ষেপ গ্রহন করা।

    বস্তুতঃ মক্কার কুরাইশরা সবসময়ই দ্বীন ইসলাম প্রচারের পথে সর্বাত্মক বস্তুগত বাঁধা তৈরী করেছে, যে কারণে এ বাঁধা অপসারনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা এমনিতেই জরুরী ছিলো। এ চিন্তা মাথায় রেখে এবং একই সাথে মদীনায় সীমানা অতিক্রম করে ইসলামের আহবানকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে রাসূল (সা) তাঁর সৈনাবাহিনী প্রস্তুত করতে শুরু করলেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি (সা) কুরাইশদেরকে চ্যালেঞ্জ করে বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু বাহিনী প্রেরণ করেন যা একই সাথে মদীনার মুনাফিক, ইহুদী ও মদীনার বাইরের ইহুদী গোত্রগুলোকেও সর্তক সংকেত প্রদান করেছিলো। তিনি চারমাসে মদীনার বাইরে তিনটি সৈন্যদল পাঠান।

    তিনি (সা) হামযাহ (রা) এর নেতৃত্বে মুহাজিরদের মধ্য হতে ত্রিশজনের একটি দলকে আল-’ইশয়ের নিকটবর্তী অঞ্চলে পাঠান, এ অভিযানে আনসারদের মধ্য থেকে কেউ অংশগ্রহন করেনি। হামযাহ (রা) তাঁর দলবলসহ সমুদ্র তীরে আবু জাহল ইবন হিশাম ও তার তিনশত সহযাত্রীর মুখোমুখি হলে যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়, কিন্তু মাযদি ইবন ’আমর আল-জুহানি উভয় পক্ষকে যুদ্ধ ব্যতীতই আলাদা করে দেন। এরপর রাসূল (সা) মুহাজিরদের মধ্য হতে ষাট জন অশ্বারোহীকে মুহাম্মদ ইবন ’উবাইদা ইবন আল-হারিছাহর নেতৃত্বে অভিযানে পাঠান। এ অভিযানেও আনসারদের মধ্য হতে কেউ ছিলো না। মুহাম্মদ ইবন ’উবাইদা (রা) রাবিগাহর উপত্যকায় আবু সুফিয়ানের মুখোমুখি হন। আবু সুফিয়ান এ সময় দুশোরও বেশী অশ্বারোহী বাহিনীর নেতৃত্ব দিচ্ছিল। এ অভিযানও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়নি, শুধুমাত্র সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাস ঐদিন শত্রুপক্ষকে উদ্দেশ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করেছিলেন। এছাড়া, আল্লাহর রাসূল (সা) সা’দ ইবন আবি ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে বিশজন অশ্বারোহীকে মক্কার দিকে প্রেরণ করেছিলেন, কিন্তু তারাও কোনরকম যুদ্ধ ব্যতীতই ফিরে আসেন।

    এ অভিযানগুলো মূলতঃ মদীনায় যুদ্ধের একটি আবহ তৈরী করেছিলো এবং রাসূল (সা) এর পরিকল্পিত একের পর এক এই অভিযানগুলো মক্কার কুরাইশদেরকেও যথেষ্ট পরিমাণে শঙ্কিত করেছিলো। কিন্তু, রাসূল (সা) শুধু তাঁর দলবলকে অভিযানে প্রেরণ করেই থেমে থাকেননি বরং, পরবর্তীতে তিনি (সা) নিজেও কুরাইশদের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশগ্রহন করেন। মদীনাতে রাসূল (সা) এর হিজরতের এক বছর পর তিনি (সা) কুরাইশ এবং বনু দামরাহ গোত্রকে অতর্কিত আক্রমণের উদ্দেশ্যে ওয়াদ্দান পর্যন্ত পৌঁছে যান। এ অভিযানে তিনি (সা) কুরাইশদের মুখোমুখি না হলেও বনু দামরাহ গোত্র আল্লাহর রাসুলের সাথে শান্তিচুক্তি করে। এরপর আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার আনসার ও মুহাজিরদের সমন্বয়ে গঠিত দুইশত  যোদ্ধা সহ  অভিযানে বের  হন  এবং  রাদওয়ার  নিকটবর্তী বুয়াত  নামক  স্থানে পৌঁছান। এ  অভিযানের  উদ্দেশ্য  ছিলো  উমাইয়া ইবনে খালফের নেতৃত্বে প্রায় আড়াই হাজার উট এবং একশত যোদ্ধার সম্বন্বয়ে গঠিত পৌত্তলিকদের বাণিজ্য কাফেলাকে ধাওয়া করা। কিন্তু, এ বাণিজ্য

    কাফেলাটি প্রচলিত পথ না ধরে অন্য পথ ধরে যাত্রা করায় আল্লাহর রাসূল (সা) পৌত্তলিকদের এ দলটিকে ধরতে ব্যর্থ হন। বুয়াত অভিযানের তিন মাস পর রাসূল (সা) আবু সালামাহ ইবন ’আবদ আল-আসাদকে মদীনার দায়িত্বে রেখে দু’শোর বেশি মুসলিম সহ আবারও অভিযানে বের হন। তিনি (সা) তাঁর দলবল সহ ইয়ানবু উপত্যকার আল-উশাইরাহ নামক স্থানে পৌঁছান। এ স্থানে তিনি (সা) জমাদিউল আউয়াল মাসে পৌঁছান এবং জমাদিউস সানির কিছুদিন পর্যন্ত এখানে অবস্থান করেন। এ স্থানে তিনি কুরাইশ নেতা আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলাকে ধাওয়া করার জন্য অবস্থান গ্রহন করেন। কিন্তু, এবারও তিনি (সা) তাঁর লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হন। কিন্তু, এ অভিযান একেবারে ব্যর্থ হয়নি, কারণ এই অভিযানে তিনি (সা) বনু মুদলাজ এবং তাদের মিত্র বনু দামরাহর সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন।

    এরপর আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় ফিরে আসার মাত্র দশদিনের মধ্যে কারজ ইবন জাবির আল ফাহরি নামে এক পৌত্তলিক মদীনার চারনভূমি আক্রমণ করে। আল্লাহর রাসূল (সা) সাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে তার খোঁজে বের হন। কারজ ইবন জাবির ছিলো কুরাইশদের মিত্র পক্ষের লোক। আল্লাহর রাসূল (সা) বদরের নিকটবর্তী সাফওয়ান উপত্যকা পর্যন্ত কারজ ইবন জাবিরকে ধাওয়া করেন। কিন্তু, কারজ ইবন জাবির পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এটা ছিলো বদর প্রান্তরে মুসলিমদের প্রথম আক্রমণ।

    এভাবেই আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর গঠিত সৈন্যবাহিনীকে সমস্ত আরব ব-দ্বীপ অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে অভিযানে পাঠিয়ে কুরাইশদের প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন। যদিও এ সকল অভিযানে প্রকৃতপক্ষে কোন যুদ্ধ সংগঠিত হয়নি কিন্তু, তারপরেও এ সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অভিযান থেকে অর্জিত প্রাপ্তি পরবর্তী সময়ের বড় বড় যুদ্ধের পথকে মসৃণ করেছিলো। কারণ, এ সমস্ত অভিযানে মুসলিমদের যে সামরিক প্রশিক্ষণ হয় তা মূলতঃ তাদের যুদ্ধের ময়দানের জন্যই প্রস্তুত করে। এছাড়া, মুসলিমদের ছোট ছোট এ সমস্ত অভিযান মদীনার মুনাফিক ও ইহুদী গোত্রগুলোর মেরুদন্ডে আতঙ্কের স্রোত প্রবাহিত করে, যা তাদের মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ঝামেলা তৈরী করার চিন্তা থেকে বিরত রাখে। কুরাইশদের উদ্দেশ্যে আল্লাহর রাসূল (সা) এর এ প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ যেমন একদিকে পৌত্তলিকদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিলো আবার অন্যদিকে মুসলিমরা মানসিকভাবে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসের সাথে উজ্জীবিত হয়েছিলো। এছাড়া, রাসূল (সা) মদীনা এবং লোহিত সাগর তীরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বসবাসকৃত বিভিন্ন গোত্র যেমন, বনু দামরাহ, বনু মুদলাজ এবং আরও অনেক গোত্রের সাথে মিত্রতার চুক্তি করে কুরাইশদের সিরিয়াগামী বাণিজ্য কাফেলার পথে অনেক বাঁধাবিপত্তিরও সৃষ্টি করেন।

  • মুনকার পরিবর্তনের জন্য শক্তি প্রয়োগ সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল

    মুনকার পরিবর্তনের জন্য শক্তি প্রয়োগ সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল

    মুনকারের অপসারন একটি ফরজ দায়িত্ব এবং একে প্রতিহত করার জন্য শক্তিপ্রয়োগ নির্ভর করে সামর্থ্যের উপরে।

    শরীয়াহ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত এবং নিষিদ্ধ সমস্ত কাজই হচ্ছে মুনকার, যেমন কোন ফরয কাজে অবহেলা করা অথবা কোন হারাম কাজ সম্পাদন করা। মুনকারের অপসারন করা আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্ধারিত হুকুম শর’ঈ যা ব্যক্তিগত, দলগত, সাংগঠনিক, জাতিগত এবং রাষ্ট্রীয় সমস্ত পর্যায়ে সকল মুসলিমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আবু সাঈদ আল খুদরী থেকে মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, “আমি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ কোন মুনকার দেখে তাহলে সে যেন তার হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়, যদি সে তাতে সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন মুখ দিয়ে তা সম্পাদন করে এবং যদি সে তাতেও সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন তার অন্তর দিয়ে তা (প্রত্যাখ্যান) করে এবং এটাই হচ্ছে দূর্বলতম ঈমান”।

    সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে দল বা সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা মুসলিমদের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে একটি ফরয দায়িত্ব। আল্লাহ্‌ বলেন,

    “তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল বের হোক যারা মানুষকে কল্যাণের (খায়ের) দিকে ডাকবে সৎকাজের (মারুফ) আদেশ করবে এবং অসৎকাজের (মুনকার) নিষেধ করবে এবং তারাই হচ্ছে সফলকাম’’। [আলে-ইমরান: ১০৪]

    এই জাতিকে আল্লাহ্‌ শ্রেষ্ঠ জাতির সম্মানে ভূষিত করেছেন যার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণে, যাতে সে সৎকাজের আদেশ করতে পারে, অসৎকাজে নিষেধ করতে পারে এবং আল্লাহর উপরে ঈমান আনতে পারে । তিনি বলেন,

    “তোমরাই হলে শ্রেষ্ঠ জাতি যার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে মানবজাতির কল্যাণে যাতে তোমরা সৎ কাজের আদেশ কর, অসৎ কাজের নিষেধ কর এবং আল্লাহর উপরে ঈমান আন’’। [আলে ইমরান: ১১০]

    সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধকে আল্লাহ মুমিন এবং মুনাফিকের মধ্যে পার্থক্যকারী সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন,

    “মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী একে অপরের হতে, তারা অসৎ কাজের আদেশ করে এবং সৎ কাজে নিষেধ করে’’। [আত তাওবাহ: ৬৭]

    তিনি আরো বলেন,

    “মুমিন নর-নারী একে অন্যের আউলিয়া (সাহায্যকারী, রক্ষক, বন্ধু)। তারা সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজের নিষেধ করে এবং তারা সালাত কায়েম করে”। [আত তাওবাহ: ৭১]

    মুনকারের ব্যাপারে নীরব থাকা এবং তা নির্মূলের লক্ষ্যে কাজ না করার ব্যাপারে আল্লাহ মুসলিমদেরকে শাস্তির ভয় দেখিয়েছেন। হুযাইফা বিন আল ইয়ামান থেকে বর্ণিত যে রাসূল (সা) বলেছেন, “সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে, অন্যথায় আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন, তখন তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে (সাহায্য চাইবে) কিন্তু তিনি সাড়া দিবেন না ।হাইছাম থেকে আরো বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমি রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি, ‘কোন সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে কিছু লোক যদি অন্যায় কাজ সংঘটিত করে এবং সেটা পরিবর্তন করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তারা সেটা না করে তাহলে আল্লাহ্‌ তাদের সবার উপরে আযাব নাযিল করেন”।

    আহমাদ থেকে বর্ণিত যে, রাসূল (সা) বলেছেন, “কিছু বিশেষ লোকের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ্‌ সমস্ত মানুষকে শাস্তি দেন না, যদি না তারা নিজেদের মধ্যে অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখে এবং পরিবর্তন করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা না করে। যদি তারা এরূপ আচরণ করে তাহলে তিনি সেসব বিশেষ লোকের পাশাপাশি অন্যান্য সাধারণ মানুষকেও শাস্তি প্রদান করেন”।

    অতএব কোন মুসলিম যদি তার সামনে কোন অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখে – যেকোনো অপকর্ম- তাহলে তাতে নিষেধ করতে হবে এবং নিজ নিজ সামর্থ্য অনুসারে। আবু সাঈদ আল খুদরী কর্তৃক হাদীসে উল্লেখিত তিনটি পন্থার যেকোনো একটি অনুসারে একে পরিবর্তন করতে হবে, অন্যথায় সে গোনাহগার হবে ।

    মুসলিমরা ইসলামী শাসনব্যবস্থার অধীনে থাকুক অথবা কুফর শাসনব্যবস্থার অধীনে, শাসক ইসলামী শাসনব্যবস্থা যথার্থরুপে বাস্তবায়ন করুক অথবা এর অপপ্রয়োগ করুক- সর্বাবস্থায়ই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ মুসলিমদের উপর ফরয। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে নিষেধের চর্চা রাসুল (সা) এর সময়ে ছিল, সাহাবাদের (রা) সময়ে ছিল, তাবিঈ এবং তাবি-তাবিঈগণের সময়েও ছিল এবং এটা কিয়ামতের আগ পর্যন্ত চলতে থাকবে । ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্র যে কারো দ্বারাই মুনকার সংঘটিত হতে পারে । রাষ্ট্র, ব্যক্তি এবং সংগঠন প্রত্যেকেরই দায়িত্ব হচ্ছে মুনকারকে নিষেধ করা এবং তা পরিবর্তন করা ।

    ইসলামী রাষ্ট্রে মূলত শাসকই হচ্ছেন জনগণের বিষয়াদিকে শরীয়া আইন দ্বারা দেখাশোনা করার জন্য দায়িত্বশীল, অনুরূপভাবে কোন ব্যক্তি বা দল কর্তৃক সংঘটিত মুনকারকে শরীয়া দ্বারা নিষেধ করার জন্যও তিনি দায়িত্বশীল। রাসূল (সা) বলেন, “ইমাম হচ্ছে রাখাল (রক্ষক) এবং সে তার জনগণের জন্য দায়িত্বশীল”। আল্লাহ্‌ তাকে সবধরনের ফরয (আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্দিষ্ট দায়িত্ব সমূহ) পালনের জন্য ব্যক্তি দলের উপর শক্তিপ্রয়োগের ক্ষমতা দিয়েছেন। যদি এসব দায়িত্ব পালন করানোর জন্য তাদের উপর শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে সেটা করতে তিনি বাধ্য। আল্লাহ্‌ তার উপরে এটাও বাধ্যতামূলক করেছেন যে তিনি নিষিদ্ধ কাজ বাস্তবায়ন করা থেকে লোকজনকে প্রতিরোধ করবেন। যদি এসব নিষিদ্ধ কাজ থেকে লোকজনকে সরিয়ে রাখতে তাদের উপর শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে সেটা করতে তিনি বাধ্য । অতএব হাত অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মুনকারের পরিবর্তন এবং প্রতিরোধের জন্য মূলত রাষ্ট্রই হচ্ছে দায়িত্বশীল, কারণ ইসলামের প্রয়োগ এবং ইসলামী আইন মেনে চলতে বাধ্য করার জন্য শক্তি প্রয়োগ উভয়ের জন্য শরীয়াহ মোতাবেক রাষ্ট্র হচ্ছে দায়িত্বশীল ।

    এবার আসা যাক ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত কোন অপকর্মের ব্যাপারে, কোন ব্যক্তি যদি তার সামনে কোন অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখে; যেমন কোন ব্যক্তি কর্তৃক মদ্যপান করা, চুরি করা, কাউকে হত্যার চেষ্টা করা অথবা কোন নারীর সাথে ব্যভিচার করা অথবা অন্য যেকোনো অপকর্ম তাহলে সেসব অপকর্মে নিষেধ করা এবং এগুলোকে পরিবর্তন ও নির্মূল করা তার জন্য একটি বাধ্যবাধকতা; এ কাজে ব্যর্থ হলে সে গোনাহগার হবে। নিজের হাত দ্বারা যদি সে অপকর্মকে নির্মূল করতে সক্ষম হয় অথবা এরূপ সম্ভাবনাও থাকে তাহলে পরিবর্তনের জন্য কাজ শুরু করা এবং তা নির্মূল করা তার জন্য একটি বাধ্যবাধকতা। এভাবেই সে কাউকে মদ্যপান করা অথবা চুরি করা অথবা কাউকে হত্যা করা অথবা কারো সাথে ব্যভিচার করা থেকে বিরত রাখবে। একে নিজের হাত দিয়ে সে প্রতিহত ও নির্মূল করবে কারণ এরূপ করতে সে সক্ষম এবং এর মাধ্যমে সে পালন করবে রাসূল (সা) এর হাদীস, “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কোনো অপকর্ম সংঘটিত হতে দেখ, সে যেন নিজের হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়”।

    হাত অর্থাৎ শক্তিপ্রয়োগের বিষয়টি নির্ভর করে কোন অপকর্মকে পরিবর্তন করার প্রকৃত সামর্থ্যের উপর—এমনকি যদি অপকর্মটি হাত দ্বারা পরিবর্তন ও নির্মূলের সম্ভাবনাও পরিলক্ষিত হয় । যদি অপকর্ম নির্মূলের সামর্থ্য না থাকে তাহলে হাত ব্যবহারের প্রয়োজন নেই কারণ এক্ষেত্রে অপকর্ম পরিবর্তন ও নির্মূলের যে লক্ষ্য তা অর্জিত হবেনা। তার ক্ষেত্র হলো প্রকৃতপক্ষে অপকর্মটি পরিবর্তনের সামর্থ্য ।

    আর এর প্রমাণ হচ্ছে অক্ষমতার ক্ষেত্রে হাদীসটিতে হুকুমের পরিবর্তন অর্থাৎ হাত দিয়ে নিষেধ করা এবং নির্মূল করার সামর্থ্য না থাকলে মুখ দিয়ে নিষেধ করার হুকুম; যেখানে বলা হচ্ছে “যদি সে তাতে সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন মুখ দিয়ে তা নিষেধ করে।” মুখ দিয়ে নিষেধ করাকে অপকর্মের পরিবর্তন হিসেবে গণ্য করা যাবে না বরং এর মানে হচ্ছে অপকর্ম সম্পাদনকারীকে মৌখিকভাবে সতর্ক করা অর্থাৎ অপকর্ম সম্পাদনকে প্রত্যাখ্যান করা। যদি সে মৌখিকভাবে প্রত্যাখ্যান করতে না পারে তাহলে অন্তর দিয়ে অপকর্মটি ঘৃণা করতে হবে এবং সে কোনভাবে একে গ্রহণ করতে পারবেনা।

    এতক্ষণ আলোচনা হলো ব্যক্তি এবং দল কর্তৃক সংঘটিত অপকর্মের ব্যাপারে, যেমন শাসক যদি অন্যায় আচরণ করে অথবা জনগণের সম্পদে অন্যায়ভাবে হস্তক্ষেপ করে অথবা কাউকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অথবা জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে অথবা রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্য পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করে অথবা ইসলামের কোনো হুকুমের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে অথবা অন্য যেকোনো অপকর্ম করে তাহলে তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা, তার অপকর্মকে প্রত্যাখ্যান করা এবং তা পরিবর্তন করা জাতি, সেনাবাহিনী, দল এবং ব্যক্তিগতভাবে সমস্ত মুসলিমের উপর একটি বাধ্যবাধকতা; তারা যদি এ ব্যাপারে নীরবতা অবলম্বন করা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ও তা পরিবর্তনের জন্য কাজ করা থেকে বিরত থাকে তাহলে তারা গুনাহগার হবে।

    শাসকের কিছু অপকর্মের ক্ষেত্রে অন্যায়ের প্রতিবাদ ও পরিবর্তন করার বিষয়টি মুখ দ্বারা সম্পাদন করতে হবে যেমনটি মুসলিম কর্তৃক উম্মে সালমা হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের কিছু নেতা (আমীর) আসবে, যাদের কিছু কাজ তোমরা সত্য বলে স্বীকার করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখ্যান করবে। যারা (অন্যায়কে) ঘৃণা করবে তারা নিজেদেরকে (দায়িত্ব থেকে) মুক্ত করে নিবে এবং যে প্রত্যাখ্যান করবেI সে নিরাপদ, কিন্তু তাদের কি অবস্থা হবে যারা (অন্যায়কে) গ্রহণ করবে এবং অনুসরণ করবে?” আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ হতে আরো বর্ণিত আছে, রাসূল (সা) বলেন, “না, আল্লাহর কসম, তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং অত্যাচারীর হাত চেপে ধরবে এবং তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে ও তাতে স্থির রাখতে প্রকৃত অর্থেই শক্তি প্রয়োগ করবে, নাহলে আল্লাহ তোমাদের কিছু লোকের অন্তরের সাথে অন্যদের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে দিবেন এবং তিনি তোমাদেরকে অভিশাপ দিবেন যেভাবে তাদেরকে দিয়েছিলেন।” অনূরূপভাবে, অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য কথা বলাকে রাসূল (সা) সর্বোত্তম জিহাদ সাব্যস্ত করেছেন। “কোনটি সর্বোত্তম জিহাদ?” এক লোকের এরূপ প্রশ্নের জবাবে রাসূল (সা) বলেন: “অত্যাচারী শাসকের সামনে একটি সত্য কথা বলা”।

    শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্র ছাড়া বাকি সমস্ত হাদীসেই শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহকে নিষেধ করা হয়েছে এবং এই ক্ষেত্রটি হচ্ছে এমন প্রকাশ্যে কুফরে লিপ্ত হওয়া যার ব্যাপারে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে সন্দেহাতীত প্রমান বিদ্যমান; অর্থ্যাৎ যদি সে আল্লাহ’র ওহীজাত আইন পরিত্যাগ করে এবং প্রকাশ্যে কুফর আইন দ্বারা শাসন করে। আউফ বিন মালিক আল আশযায়ী থেকে বর্ণিত, “আমি রাসূল (সা)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের শাসকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন তারা যাদেরকে তোমরা ভালোবাস এবং তারা তোমাদেরকে ভালোবাসে এবং তারা তোমাদের জন্য দুয়া করে এবং তোমরা তাদের জন্য দুয়া কর। এবং তোমাদের শাসকদের মধ্যে নিকৃষ্ঠ হচ্ছে তারা যাদেরকে তোমরা ঘৃণা কর এবং তারা তোমাদেরকে ঘৃণা করে”।তিনি বর্ণনা করেন, “আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করব না?’ তিনি বললেন, ‘না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মাঝে সালাত কায়েম রাখে”। সালাত কায়েম রাখা বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে ইসলামে শাসন কায়েম রাখা; অর্থাৎ অংশবিশেষকে উল্লেখের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করার ভিত্তিতে বুঝানো হয়েছে শর’ঈ আহকাম পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা।

    উম্মে সালামা (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের কিছু নেতা (আমীর) আসবে যাদের কিছু কাজ সত্য বলে স্বীকার করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখান করে। যারা (অন্যায়কে) ঘৃণা করবে সে নিজেকে (দায়িত্ব থেকে) মুক্ত করে নিবে এবং যে প্রত্যাখান করবে সে নিরাপদ, কিন্তু তাদের কী হবে যারা (অন্যায়কে) গ্রহণ করবে এবং অনুসরণ করবে”। তারা বললেন, “আমরা কি তখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব না?” তিনি বললেন, “না, যতক্ষণ তারা সালাত আদায় করে”। অর্থ্যাৎ ‘অংশবিশেষকে উল্লেখের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করার ভিত্তিতে বুঝানো হয়েছে যতক্ষণ তার সালাতসহ সমস্ত শর’ঈ আহকাম বাস্তবায়ন করে। উবাদা বিন আস সামিত হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, “আমরা রাসূল (সা) এর কাছে কিছু বিষয়ে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) দিলাম, কঠিন ও সহজ সমস্ত অবস্থায় (তাঁর প্রতি) শ্রবন ও আনুগত্য করার ব্যাপারে, নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের ক্ষেত্রে (তাঁর আদেশকে) নিজেদের উপরে প্রাধান্য দেওয়ার ব্যাপারে এবং কতৃর্ত্বশীল লোকদের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাদে লিপ্ত না হওয়ার ব্যাপারে যতক্ষণ আমরা এমন প্রকাশ্য কুফর না দেখি যার ব্যাপারে সর্বশক্তিমান আল্লাহর তরফ থেকে প্রমাণ বিদ্যমাণ এবং (বাইয়াত দিলাম) আল্লাহর খাতিরে আমাদের সর্বদা সত্য কথা বলার ব্যাপারে”।

    অতএব তিনি এই তিনটি হাদীস অনুযায়ী শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা নিষিদ্ধ, যদি না সে আল্লাহর ওহী অনুযায়ী শাসন না করে অর্থাৎ শুধুমাত্র তখন যখন সে এমন প্রকাশ্য কুফর আইন দিয়ে শাসন করতে শুরু করে যার কুফর হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহর তরফ থেকে সন্দেহাতীত প্রমাণ বিদ্যমান।

    অতএব, যখন কোন মুসলিম শাসক আল্লাহর ওহী দিয়ে শাসন না করে বরং স্পষ্ট কুফর আইন দিয়ে শাসন করে তখন সমস্ত মুসলিম তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করতে বাধ্য, যার মাধ্যমে তাকে কর্তৃত্ব থেকে অপসারণ করা যায় সেসব কুফর আইন যেগুলো দিয়ে সে শাসন করত সেগুলো অপসারন করা যায় এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইন গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করা যায়। শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের ব্যাপারটি একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে তখনই আরোপ হয় যখন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে এবং কুফর আইন সমূহকে অপসারণ করার সামর্থ্য থাকবে অথবা এরূপ সম্ভাবনা থাকবে কারণ মুনকারকে হাত তথা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবর্তন করার কাজটি নির্ভর করে প্রকৃতপক্ষে সেই সামর্থ উপরে যার মাধ্যমে মুনকারকে অপসারণ করা যায়। মুনকারকে হাত দিয়ে পরিবর্তন করার বাধ্যবাধকতা যে হাদীসটিতে এসেছে তার প্রয়োগ এবং কুফর আইন দিয়ে শাসনকারী শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রহের বাধ্যবাধকতা যে হাদীস দুটিতে এসেছে তারও প্রয়োগ নির্ভর করে প্রকৃত পক্ষে মুনকার ও স্পষ্ট কুফরকে পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগের সামর্থ্যের উপরে অথবা এরূপ সম্ভাবনার উপরে। কিন্তু মুনকার এবং কুফর আইনের পরিবর্তন ও অপসারণের মত পর্যাপ্ত শক্তি প্রয়োগের সামর্থ যদি না থাকে অথবা এরূপ সম্ভাবনা ও না থাকে তাহলে এ থেকে তখন বিরত থাকতে হবে কারণ তখন মুনকার ও কুফর আইন সমূহের প্রকৃত পরিবর্তন এবং অপসারণের সেই উদ্দেশ্য অর্জিত হবে না যার জন্য শরীয়াহ শক্তি প্রয়োগ বাধ্যতা মূলক করেছে । এরূপ পরিস্থিতিতে মুনকারকে নিষেধ করার দায়িত্বটি মুখ দিয়ে পালন করতে হবে, এবং পাশাপাশি সক্ষমতা অর্জনের জন্য অথবা এরূপ সম্ভাবনা সৃষ্টির জন্য শক্তি বৃদ্ধি প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে যাতে মুনকার এবং কুফর আইন সমূহকে প্রকৃত পক্ষে পরিবর্তন করা যায় এবং এরুপ পরিস্থিতিতেই শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। পুরো জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এর সামরিক ক্ষমতা সম্পন্ন সেনাবাহিনী, প্রভাব শক্তি সম্পন্ন বৃহৎ গোত্র সমূহ ও এর সামরিক শক্তিসহ অথবা উম্মাহর মধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তারকারী রাজনৈতিক দল সমূহ – এদের যে কেউ যখন কুফর আইন-কানুন সমূহ দিয়ে শাসনকারী এবং ইসলামের বিধান-সমূহ পরিত্যাগকারী শাসককে অপসারণের সামর্থ অর্জন করে তাহলে সেক্ষেত্রে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে সে শরীয়াহ অনুযায়ী বাধ্য, যাতে তাকে এবং কুফর আইন-কানুন সমুহকে অপসারন করা যায় এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইন-কানুন সমূহকে পুনঃস্থাপন করা যায়।

    ইসলামের দশটি মৌলিক বিধানের মধ্যে এটি হচ্ছে একটি যাকে আমরা পেয়েছি আমাদের উপরে একটি দায়িত্ব হিসেবে, যাতে আমরা এই পথনির্দেশনা অনুসারে গণমানুষকে সচেতন করতে পারি। নিশ্চয় আল্লাহ তার বিষয়কে পূর্ণতা দান করবেন, যদিও অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।

    প্রবন্ধটি ১ জুলাই, ১৯৮৯ (২৮ জুল-কা’দা, ১৪০৯ হি) সালে আরবী ভাষায় প্রকাশিত একটি লেখার অনুবাদ হতে নেয়া হয়েছে

    ————————————————————————————————————————–

    উপরের লেখাটির প্রতিক্রিয়ায় একই বছরে প্রকাশিত একটি  প্রশ্নোত্তর নিম্নে দেয়া হলো:

    প্রশ্নোত্তর: “মুনকার নিষেধ করা একটি দায়িত্ব এবং একে প্রতিহত করার জন্য শক্তি প্রয়োগ নির্ভর করে সামর্থ্যের উপর” লিফলেট সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর

    প্রিয় ভাইয়েরা,

    আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতাহু। “মুনকার নিষেধ করা একটি ফরজ দায়িত্ব এবং একে প্রতিহত করার জন্য শক্তি প্রয়োগ নির্ভর করে সামর্থ্যের উপরে” শিরোনামে প্রকাশিত লিফলেটটি অনেক প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন রকম জিজ্ঞাসা ও সমালোচনার ভিতরে কিছু সমালোচনার বর্ণনা ছিল এরুপ – “হিজব” একটি পথভ্রষ্ট দল, অন্যকিছু সমালোচনার বিষয়বস্তু ছিল – হিজবের নীতিমালা ও কার্যপদ্ধতির আমূল পরিবর্তন এবং নতুন কর্মপদ্ধতির অবলম্বন। এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা এবং সমালোচনা কোন একজন ব্যক্তি বা কোন একটি এলাকা থেকে আসেনি বরং এগুলো এসেছে অনেক লোকের কাছ থেকে এবং অনেক এলাকা থেকে।

    প্রিয় ভাইয়েরা, আমি সততার সাথে বলছি এসব প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা ও সমালোচনা ছিল উপশম দানকারী, প্রশান্তিদায়ক যা আত্মাকে পুলকিত করেছে এবং অন্তরকে আনন্দিত ও প্রশান্তিময় করেছে, কারণ এগুলো চিন্তা ও কাঠামোগত ঐক্যের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিকে প্রমাণিত করেছে এবং এতে শাবাবদের প্রচন্ড সততা, আন্তরিকতা এবং দলকে রক্ষার জন্য প্রবল আগ্রহের বিষয়টিই প্রমাণিত হয়েছে। এতে শাবাব ও নেতা হিসেবে আবশ্যকীয়ভাবে সেসব চিন্তার প্রতি আনুগত্যের বিষয়টি প্রমাণীত হয়েছে যেগুলোতে আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি, যেগুলো আমরা গ্রহণ করেছি এবং যেগুলোর ভিত্তিতে আমরা নিজেদেরকে সংগঠিত করেছি এবং যেগুলো আমরা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহ এবং এ দুটো দ্বারা অনুমোদিত অন্যান্য উৎস থেকে ইজতিহাদের মাধ্যমে বের করেছি। এ গুলোতে যে কোন পরিবর্তন বা পরিমার্জন শুধুমাত্র ওহীজাত প্রমাণের সাপেক্ষেই গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় প্রত্যাখ্যাত-এটিও প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের ও সকলের প্রতি এটি একটি অনুগ্রহ যা চিন্তা ও কাঠামোগত ঐক্যকে নিরাপত্তা প্রদান করে এবং পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে আমাদেরকে রক্ষা করে।

    প্রিয় ভাইয়েরা, এবার আলোচনা করা যাক লিফলেটের বিষয়বস্তু নিয়ে, এটি প্রকাশ করার অনুপ্রেরণা ও উদ্দেশ্য নিয়ে এবং ব্যাখ্যা করা যাক যে এটি আমাদের গৃহীত চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক নয় বা তাতে কোন পরিবর্তন বা পরিমার্জনও করা হয়নি এই লিফলেটের মাধ্যমে।

    কিছু আন্তরিক ইসলামী দলের সাথে আলোচনাকালে আমাদের কিছু শাবাব মুনকার নির্মূলের লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগের শর’ঈ হুকুম সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিল এবং এই প্রশ্নটিই হচ্ছে আলোচ্য লিফলেট প্রকাশের অনুপ্রেরণা। তাদেরকে একটি জবাব প্রেরণ করা হয়েছে যার সাথে ইসলামী জীবনব্যবস্থার পুনরুত্থান ও খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজের সাথে পার্থক্য সূচিত করা হয়েছে, (অর্থাৎ) খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য দলটিকে অবশ্যই রাসূল (সা) এর সীরাত অনুসরণ করতে হবে অর্থাৎ মক্কী জীবনের কর্মপদ্ধতি হতে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত তার (সা) অনুসরণে তিনটি ধাপের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এরপর সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ সম্পর্কে তাদের কাছে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে মুনকারকে নিষেধের হুকুম সম্পর্কিত আলোচনাটি শাবাব ও গণমানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

    শাবাবদের পক্ষ থেকে একই প্রশ্নের জবাব প্রদান এবং তারপর বাকি শাবাব ও জনগণের কাছে তা প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল মূলত এ বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রদান যে, ইসলামী দলসমূহ শক্তি প্রয়োগের বিষয়টিকে যে ভাবে চিন্তা করে ও তা বাস্তবায়ন করে সেটা হাত দিয়ে মুনকার পরিবর্তন সম্পর্কিত হাদীস সমূহের সাথে এবং শাসক যখন স্পষ্ট কুফরে লিপ্ত হয় তখন তার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক বিদ্রোহ সম্পর্কিত হাদীস সমূহের সাথে সাংঘর্ষিক। পাশাপাশি শাবাব পক্ষ যাতে এ ব্যাপারে ইসলামী দলসমূহের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে ও তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পারে এবং সর্বোপরি কুফর আইনসমূহ অপসারণ করে ওহীজাত আইন পুনঃস্থাপনের দায়িত্ব পালনের জন্য উম্মাহকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। অতএব এক্ষেত্রে উপরোক্ত লক্ষ্যগুলো অর্জন ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না।

    অতএব দলের গৃহীত চিন্তা পরিত্যাগ করে নতুন কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা কোনভাবেই উদ্দেশ্য ছিলনা, এমনকি এরূপ চিন্তা কখনো মাথায় আসেনি।

    আমাদের গ্রহণকৃত চিন্তার সাথে লিফলেটের বিষয়বস্তু সামঞ্জস্যতার ব্যাপারে ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:

    ১. ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত মুনকারের ব্যাপারে যখন লিফলেট এ আলোচনা করা হয়েছে, তখন বলা হয়েছে যে একে হাত দিয়ে পরিবর্তন করার দায়িত্ব হচ্ছে রাষ্ট্র ও ব্যাক্তির এবং একাজের জন্য দলের দায়িত্বের কথা বলা হয়নি, কারণ এ ব্যাপারে আমরা যা বুঝি সেটা হচ্ছে ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত মুনকার নির্মূলের দায়িত্ব কোন দলের নয়।

    আবার মুনকার সংঘটনকারী ব্যক্তিকে হাত দিয়ে প্রতিহত করার কথা যখন বলা হয়েছে, তখন সেটিও সুনির্দিষ্ট কিছু মুনকারের জন্য অনুমোদিত। অতএব চুরি করা, ব্যাভিচারে লিপ্ত হওয়া ও হত্যা করা প্রভৃতি যেহেতু মুসলিম ভূখন্ড সমূহে অনুমোদিত নয়, অতএব রাতের বেলায় কাউকে কোনো স্থানে চুরি করতে দেখলে অথবা কোন নারীর সাথে যেনার চেষ্টা করতে দেখলে অথবা কাউকে হত্যার প্রচেষ্টা করতে দেখলে, যে কোন মুসলিমের উপর একটি শর’ঈ দায়িত্ব যে সে একাজগুলো প্রতিহত করবে যদি সে এসব মুনকারকে হাত দিয়ে প্রতিহত করার সামর্থ্য রাখে। যদি সে এগুলো প্রতিহত না করে, তাহলে সে আল্লাহর চোখে গোনাহাগার হবে কারণ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি দায়িত্ব সে পরিত্যাগ করেছে।

    কিন্তু রাষ্ট্রের আইন দ্বারা অনুমোদিত মুনকার সমূহ, যেমন সমাজে নারীর অবাধ চলাফেরা প্রভৃতি ব্যক্তি কর্তৃক সংঘটিত হলেও এগুলোকে শাসক কর্তৃক সংঘটিত মুনকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কারণ এগুলো শাসক কর্তৃক বাস্তবায়িত আইন ও ব্যবস্থার কারণে উদ্ভুত। এসব মুনকার নির্মূলের উপায় হচ্ছে সেই ব্যবস্থাকে নির্মূল করে দেওয়া যা এগুলোকে অনুমোদন দেয়। ব্যক্তি কর্তৃক ব্যাংক ধ্বংস করে দেওয়া, ডিসকো গুঁড়িয়ে দেওয়া অথবা শরঈ পোশাক পরিধান না করে প্রকাশ্য চলাফেরায় নারীদেরকে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে এসব মুনকার নির্মূল সম্ভব নয়।

    প্রয়াত তাকী উদ্দিন আন নাবাহানী (রহ) এর সময়ে একটি প্রশ্নের জবাব (তারিখ অনুল্লেখিত) প্রদান করা হয়েছিল যাতে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ প্রত্যেক মুসলিমের উপর একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং এটি কোন সামষ্টিক দায়িত্ব নয়; জবাবটি ছিল নিম্নরূপ:

    সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ প্রত্যেক মুসলিমের উপর একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং এটি কোন সামষ্টিক দায়িত্ব নয়, কারণ এখানে সৎকাজের প্রকৃতি অনুযায়ী সমস্ত সৎকাজকেই বুঝানো হয়েছে এবং কোন সুনির্দিষ্ট সৎকাজ বা সুনির্দিষ্ট অসৎকাজকে বুঝানো হয়নি। যদি এই বাস্তবতাটি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে থাকে তাহলে আমরা বুঝতে পারব যে এরূপ দায়িত্ব পালনের কোনো শেষ নেই কারণ সর্বযুগে, সর্বত্র এর পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে এবং হাদীসের বর্ণনা সে ব্যক্তির অপরাধ ব্যখ্যা করার জন্য এসেছে যে ব্যক্তি এগুলোকে অবজ্ঞা করল। রাসূল (সা) বলেন, “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ কোন অপকর্ম হতে দেখে সে যেন তাঁর হাত দিয়ে তা পরিবর্তন (প্রতিহত) করে দেয়, যদি তাতে সক্ষম না হয় তাহলে সে যেন তাঁর মুখ দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয় আর যদি সে তাতেও অক্ষম হয় তাহলে সে যেন অন্তর দিয়ে পরিবর্তন (প্রত্যাখ্যান) করে এবং এটাই হচ্ছে সর্বনিম্ন স্তরের ঈমান”। অতএব হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী “তোমাদের মধ্যে যদি কেউ দেখে” অর্থাৎ যে দেখল এটি তাঁর উপরে একটি বাধ্যবাধকতা, এবং তিনি বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে” অর্থাৎ তিনি এরূপ বলেননি “যদি তোমরা (দলবদ্ধভাবে) দেখ”। এবার সেই ব্যক্তির আলোচনায় আসা যাক যে সৎকাজের আদেশ করে এবং অসৎকাজের নিষেধ করে, যদি কোন ব্যক্তি কাউকে আদেশ ও নিষেধ করা সত্ত্বেও আদিষ্ট ব্যক্তি বিরত না হয়, তাহলে তাঁর সাথে পানাহার এবং চলাফেরা করা আদেশকারীর জন্য হারাম হয়ে যাবে যতক্ষণনা আদিষ্ট ব্যক্তি অপকর্ম থেকে বিরত হচ্ছে। কিন্তু এই বিষয়টি ইসলামী জীবনব্যবস্থার পুনর্বহালের কর্মীর (দাঈ’র) ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, অতএব যদি সে কোন মুসলিমকে ইসলামী পুনর্বহালের জন্য কাজ করতে বলে এবং একটি সামষ্টিক দায়িত্ব হিসেবে সর্বোচ্চ সামর্থ্য অনুযায়ী যদি সে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় তাহলে তাঁর সাথে পানাহার এবং চলাফেরা করতে দাঈ’র কোন সমস্যা নেই। কিন্তু ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য পরিচালিত কার্যক্রমের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কিছু কাজ রয়েছে যা সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে যেগুলোর ক্ষেত্রে তাদের জন্য সেই নির্দিষ্ট শর’ঈ হুকুম বিদ্যমান। অতএব, জুলুম পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত অত্যাচারীর হাত শক্তভাবে চেপে ধরে রাখা একটি ব্যক্তিগত দায়িত্ব; কিন্তু ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনর্বহালের জন্য কাজ করা একটি সামষ্টিক দায়িত্ব যদিও এর কিছু কাজ ব্যক্তিগত দায়িত্ব এবং দাওয়াত পৌছে দেওয়া সামষ্টিক দায়িত্ব।

    ২. লিফলেটে শাসক কর্তৃক সংঘটিত মুনকারের আলোচনা এসেছে তিনটি অনুচ্ছেদ, যার শুরু হয়েছিল এভাবে “এবং এগুলো ছিল ব্যক্তি বা দল কর্তৃক সংঘটিত মুনকার; কিন্তু শাসক কর্তৃক সংঘটিত মুনকার……” এবং চতুর্থ অনুচ্ছেদের আগ পর্যন্ত এ আলোচনা চলছিল যার শুরু হয়েছিল এভাবে, “এবং তাঁর সাথে বিদ্রোহ করার বাধ্যবাধকতা নির্ভর করে সামর্থ্যের উপরে” এই বর্ণনা “যুলুম করা সত্ত্বেও শাসকের প্রতি আনুগত্য করা মুসলিমদের জন্য একতী বাধ্যবাধকতা” শিরোনামে প্রকাশিত Dossier (পৃষ্ঠা ৬৫-৭০) এর বর্ণনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্ণনার সামঞ্জস্যতার একটি উদাহরণ হিসেবে আমরা ৬৮ পৃষ্ঠার ২২ নং লাইনটি বিবেচনা করতে পারি, যেখানে বলা হচ্ছে, “হাদীসের অর্থগত নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা, যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া এবং তাঁর কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিবাদে জড়ানোর নির্দেশটি তখনই বৈধ যখন সে প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত হয়। দলীলের শব্দগত (মানতূক) নির্দেশনার মতো অর্থগত (মাফহূম) নির্দেশনাও সমানভাবেই বাধ্যবাধকতা অতএব এসব হাদীস হচ্ছে আমাদের নিকট প্রমাণ যে, আইনপ্রণেতার তরফ থেকে আমরা শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষনা করতে, যুদ্ধে লিপ্ত হতে এবং তাদের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে বিবাদে লিপ্ত হতে বাধ্য যদি প্রকাশ্য কুফর পরিলক্ষিত হয়।

    লিফলেটের সর্বশেষ অনুচ্ছেদ যা থেকে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সূত্রপাত তাঁর শুরু হলো এভাবে “এবং উম্মাহ যদি ঐক্যবদ্ধ হয় …প্রভৃতি” যদি এই বর্ণনাটি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা হয় তাহলে আর কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকবে না। যখন দল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো তখন তাঁর দায়িত্বের সীমারেখা টেনে দেওয়া হলো তিনটি বিষয়ে সামর্থ্য অর্জনের উপরে। প্রথমতঃ যদি সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে তাদের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান থাকে দ্বিতীয়তঃ যদি বৃহৎ গোত্রসমূহের মধ্যে তাদের পর্যাপ্ত প্রভাব বিদ্যমান থাকে। তৃতীয়তঃ যদি উম্মাহর মধ্যে তাদের প্রবল প্রভাব বিদ্যমান থাকে। কোন দলের পক্ষে এই তিনটি বিষয় অর্জন করা কখনই সম্ভব না, যদি না তারা রাজনৈতিক সংগ্রামে অবর্তীণ হয় এবং নুসরাহ খোঁজ করা সহ তিনটি ধাপের ভিতরে দিয়ে অগ্রসর হয়; কারণ নুসরাহ খোঁজ ছাড়া সেনাবাহিনী এবং বৃহৎ গোত্রসমূহের মধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তার করা সম্ভবনা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ব্যতীত উম্মাহর মধ্যে প্রবল প্রভাব বিস্তার সম্ভব না।

    কুফর আইনকানুনসমূহের ধ্বংস এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইনকানুনসমূহকে পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে উম্মাহ ও বৃহৎ গোত্রসমূহ তখনই অগ্রযাত্রা করবে যখন তারা জনমত এবং গণজাগরণ প্রত্যক্ষ করবে। একইভাবে সেনাবাহিনী এবং বৃহৎ গোত্রসমূহের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা যাবেনা, যদিনা তারা এমন একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব পরিচালিত হয় যারা রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডের চর্চা করে।

    প্রদত্ত ব্যাখ্যার আলোকে এটা স্পস্ট যে লিফলেটের বিষয়বস্তু এবং গ্রহণকৃত চিন্তার মধ্যে কোন বৈপরীত্য নেই। যাই হোক বাস্তবতা হলো ১৯৬৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দল নুসরাহ দিতে সামর্থ্যবান ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমেই শক্তি সংগ্রহের প্রচেষ্টায় লিপ্ত যাতে সে কুফর আইনসমূহের পরিবর্তন করতে পারে এবং আল্লাহর ওহীর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে; এবং এ কাজটি দল ব্যবস্থার ভিতরে থেকেই সম্পাদন করে বাইরে থেকে নয় যদিও সমস্ত মুসলিম ভূখন্ডসমূহকে এটা দারুল কুফর হিসেবে বিবেচনা করে দারুল ইসলাম হিসেবে নয়। অতএব দেখা যাচ্ছে এই বাস্তবতা ও অনেক প্রচেষ্টার ভিতর দিয়ে দল যা চর্চা করে এসেছে তাঁর সবকিছু ভুলে যাওয়া হয়েছে এসব প্রশ্ন জিজ্ঞাসা এবং সমালোচনা করার সময়ে ।

    অতএব কুফর আইনসমুহের অপসারণ এবং আল্লাহর নাযিলকৃত আইনকানুন সমূহের পুনঃস্থাপনের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত শক্তি অর্জনের যে বাধ্যবাধকতা, তা রাসূল (সা) এর কর্মপন্থা অনুসারে হিজব সম্পাদন করেছে নুসরাহ খোঁজার ভিতর দিয়ে, দল ও শাবাব এর মধ্যে  সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্ত্রে সজ্জিত করার ভিতর দিয়ে নয়।

    প্রিয় ভাইয়েরা, আপনাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা ও সমালোচনার জবাব আমরা এই চিঠিতে ব্যাখ্যা করেছি। অতএব এটা স্পষ্ট হলো যে এর সাথে আমাদের গ্রহণকৃত চিন্তার কোন বিপরীত নেই এবং আমরা গ্রহণকৃত কর্মপদ্ধতিকে পরিত্যাগ করিনি এবং কোন নতুন পদ্ধতিও গ্রহণ করিনি।

    আমরা দুআ করছি যাতে আল্লাহ তার পক্ষ হতে আমাদেরকে সাহায্য করেন, আমাদেরকে সর্বোত্তম পথে পরিচালিত করেন এবং বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেন, তার দ্বীনের ব্যাপারে যেন তিনি আমাদেরকে সাহায্য করেন এবং তার সাথে সাক্ষাৎলাভের আগ পর্যন্ত আমরা যেন তার দাওয়াত পৌঁছে দিতে পারি, আমাদের কোন কাজ যেন বৃথা না যায়, আমাদের আশা প্রত্যাশাগুলো যেন হতাশায় পর্যবসতি না হয় এবং আমরা যাতে ইখলাসের সাথে নিজেদের কার্যসম্পাদন করতে পারি এবং আমরা যেন দ্রুততার সাথে মুক্তির দিকে অগ্রসর হতে পারি এবং অদুর ভবিষ্যতে তার তরফ থেকে একটি মহান বিজয় দিয়ে সম্মানিত করার জন্য প্রার্থনা করি যার মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত করতে, ইসলামের পতাকা সুউচ্চে তুলে ধরতে এবং নাযিলকৃত শাসনব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করতে সক্ষমতা দান করবেন। এই প্রত্যাশায় আমাদের দুআ শেষ করছি।

    ২৫ মুহাররম, ১৪১০
    ২৬ আগষ্ট, ১৯৮৯

    Visionary 

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১৩ (ইসলামী সমাজ গঠন)

    আল্লাহ তা’য়ালা প্রতিটি মানুষকে দিয়েছেন বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি। এ প্রবৃত্তির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই মানুষ সবসময় একত্রিত হয়ে দলবদ্ধ ভাবে বসবাস করতে চায়। আর দলবদ্ধ মানুষের পরস্পরের উপর নির্ভরশীলতা এবং একে অন্যের সাথে মেলামেশা একটি স্বাভাবিক প্রকৃতিগত ব্যাপার। কিন্তু, শুধুমাত্র কিছু মানুষের দলবদ্ধ ভাবে বসবাসের ব্যাপারটি একটি সমাজ তৈরী করে না। মূলতঃ ততক্ষন পর্যন্ত এই দলবদ্ধ মানুষগুলো একটি সমাজ তৈরী করতে পারে না, যতক্ষন পর্যন্ত না তারা সকলের মাঝে বিদ্যমান একই ধরনের কিছু চিন্তা-ভাবনা দ্বারা পরস্পর আবদ্ধ হয়। একই ধরনের কিছু কারণকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য বিপদজনক বা হুমকি মনে করে থাকে এবং তা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চায়। দলবদ্ধ কিছু মানুষের মধ্যে যদি এ ধরনের একটি সম্পর্ক তৈরী হয়, শুধুমাত্র তখনই সত্যিকার অর্থে একটি সমাজ তৈরী হয়। আবার, নিম্নলিখিত শর্তগুলো পূরণ না হলে সত্যিকারের একটি সুষম সমাজও তৈরী হয় না।

    বস্তুতঃ সুষম সমাজ তৈরীতে সমাজের মানুষের মধ্যে নিম্নলিখিত উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকা প্রয়োজন:

    ১.        সমাজের মানুষের মধ্যে চিন্তার একতা।

    ২.        মানুষে মানুষে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে সর্বসম্মত ভাবে গ্রহন করা না করার জন্য প্রয়োজন আবেগ-অনুভূতির মধ্যে একতা।

    ৩.        সমাজে বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে সমাধান করার জন্যও প্রয়োজন একটি নির্ধারিত সমাজ-ব্যবস্থা।

    তাই, কোন সমাজ সম্পর্কে কোন মতামত বা সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পূর্বে প্রয়োজন সমাজে প্রচলিত ধ্যান-ধারনা, বিদ্যমান আবেগ-অনুভূতি এবং সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর ভাবে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষনা করে সমাজের প্রকৃত চরিত্র অনুধাবনের চেষ্টা করা। মূলতঃ উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলোই নির্ধারন করে দেয় একটি সমাজ থেকে আরেকটি সমাজের পার্থক্য। ব্যাপারটি বোঝার জন্য আমরা রাসূল (সা) হিজরত করার পর মদীনার তৎকালীন সমাজব্যবস্থার উপর আলোকপাত করবো।

    সে সময়ে মদীনার সমাজ তিনটি দলে বিভক্ত ছিলো। একটি হলো আনসার ও মুহাজির নিয়ে গঠিত মুসলিমদের দল, যেটি ছিলো সর্ববৃহৎ। আরেকটি দলে ছিলো আউস ও খাযরাজ গোত্রের মূর্তিপুজারীরা (যারা ইসলাম গ্রহন করেনি) এবং তৃতীয় দলটি ছিলো ইহুদীদের, যারা আবার চারটি উপদলে বিভক্ত ছিলো। এদের মধ্যে একটি দল মদীনায় বসবাস করতো, যারা বনু কায়নুকা গোত্র নামে পরিচিত ছিলো। আর মদীনার বাইরের ইহুদীদের দলগুলো বনু নাদির, খায়বার এবং বনু কুরাইজা নামে পরিচিত ছিলো। প্রকৃতপক্ষে, মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার আগেও সেখানে ইহুদীদের আলাদা সমাজ ছিলো, যা মদীনার তৎকালীন সমাজ থেকে ছিলো একেবারেই ভিন্ন। জীবন সম্পর্কে মদীনার মুশরিক গোত্রগুলো থেকে ইহুদীদের সম্পূর্ন ভিন্ন ধরনের চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারনাই ছিলো এর মূল কারণ। মূলতঃ তারা তাদের নিজস্ব এসব ধ্যান-ধারনার ভিত্তিতেই পরিচালনা করতো তাদের বিভিন্ন কর্মকান্ড। ফলে, ইহুদীরা মদীনার ভেতরে ও এর চারপাশে বসবাস করা সত্বেও কখনই মদীনার সমাজের অংশ হতে পারেনি। আর মুশরিকরা ছিলো সংখ্যালঘু এবং তারা মদীনার প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া ইসলামের আদর্শ দিয়ে ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত ছিলো। এজন্য, ইসলাম গ্রহন না করলেও ইসলামী ধ্যান-ধারনা, আদর্শ এবং ইসলামের শাসন-কর্তৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করা ছিলো তাদের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। আবার ইসলামী আকীদার ভিত্তিতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো ঐক্য। ইসলামই তাদের কর্মকান্ডকে একসুরে বেঁধেছিলো এবং ইসলামের আলোকিত আদর্শই তৈরী করেছিলো তাদের মধ্যে জীবন সম্পর্কে একই ধরনের ধ্যান-ধারনা ও আবেগ-অনুভূতি। তাই এ আদর্শের ভিত্তিতেই তাদের জীবনের প্রতিটি কাজ পরিচালিত হওয়া ও তাদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো তৈরী হওয়াও ছিলো স্বাভাবিক ব্যাপার।

    আল্লাহর রাসূল (সা) ইসলামী আকীদার ভিত্তিতে মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরী করতে শুরু করলেন। তিনি মুসলিমদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সবাইকে আহবান করলেন, যাতে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক, ব্যবসায়িক লেনদেন এবং জীবনের অন্যান্য কর্মকান্ডের উপরও এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিদ্যমান থাকে। এ চিন্তা মাথায় রেখেই তিনি (সা) ’আলী ইবন আবি তালিব, তাঁর চাচা হামযা (রা) এবং তাঁর ক্রীতদাস যায়িদ (রা) এর মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করলেন। একই ভাবে আবু বকর (রা) এবং খারিযাহ ইবন যায়েদও পরস্পরের ভাই হলেন। তারপর তিনি (সা) মুহাজির ও আনসারদের মধ্যেও একই ভাবে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করলেন। এভাবে, ’উমর ইবন আল-খাত্তাব (রা) ও ’উতবাহ ইবন মালিক আল-খাযরাজি পরস্পরের ভাই হলেন। আবার, তালহাহ ইবন ’উবাইদুল্লাহ ও আবু আইয়ুব আল আনসারী এবং ’আবদ আল-রাহমান ইবন ’আওফ ও সা’দ ইবন আল-রাবি’য়াও পরস্পরের ভাই হয়ে গেলেন।

    মদীনার সমাজে এই ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠার ফলাফল বাস্তবিক ভাবে প্রতিফলিত হয়েছিলো। এই ভ্রাতৃত্ববোধের কারণেই মদীনার আনসাররা তাদের মুসলিম  মুহাজির ভাইদের প্রতি প্রদর্শন করেছিলো  অকল্পনীয় উদারতা, যা  আনসার ও মুহাজিরদের সম্পর্ককে করেছিলো সুদৃঢ় ও মজবুত।

    ভ্রাতৃত্বের দাবী অনুযায়ী তারা মুহাজিরদের অর্থ-সম্পদ থেকে শুরু করে সমস্ত কিছুতে অংশীদার করেছিলো। এমনকি তারা একসাথে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কৃষিকাজও করতো। মুহাজিরদের মধ্যে যাদের ব্যবসা করার মতো মনমানষিকতা ছিলো তারা আস্তে আস্তে ব্যবসা-বাণিজ্যে অংশগ্রহন করতে লাগলো। যেমনঃ ’আবদ আর রহমান ইবন ’আউফ বাজারে মাখন বিক্রি করতেন। আর যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে গেল না, তারা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে লাগলো। যেমনঃ আবু বকর ও ’আলী (রা) আনসারদের জমিতে চাষাবাদ করতেন। রাসূল (সা) বললেন, “যার একখন্ড জমি আছে সে যেন তা চাষ করে, অথবা তার ভাইকে চাষ করার জন্য দেয়।”এভাবেই মুসলিমরা জীবিকা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কাজ করতে লাগলো। কিন্তু, তারপরেও মুসলিমদের মধ্যে ছোট একটি দল রয়ে গেলো, যাদের না ছিলো কোন অর্থ, না পেল তারা কোন কাজ আর না ছিলো তাদের কোন থাকার জায়গা। তারা ছিলো খুবই অভাবী, তারা মুহাজির-আনসার কোন দলেরই অর্ন্তভূক্ত ছিলো না। এরা ছিলো মূলতঃ বেদুইন যারা ইসলাম গ্রহন করার পর মদিনায় এসেছিলো। রাসূল (সা) নিজে এদের দায়িত্ব নিলেন, মসজিদের এক অংশে তাদের থাকার  বন্দোবস্ত  করে  দিলেন  এবং  ক্রমে  এরা  আহল  আস  সুফ্ফাহ  নামে  পরিচিতি  লাভ  করলো।  মুসলিমদের  মধ্যে  যাদেরকে  আল্লাহতায়ালা স্বচ্ছলতা দিয়েছিলেন সে সব মহানুভব হৃদয়ের মানুষেরাই এদের প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করতো। এভাবেই আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে স্থিতিশীল করেছিলেন এবং তাদের পরস্পরের সাথে পরস্পরের সম্পর্ককে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। চারিদিকে কুফর পরিবেষ্টিত অবস্থায় মদীনার ইসলামী সমাজ এরকম একটি মজবুত ও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো বলেই তা মুনাফিক ও ইহুদীদের সকল হীন চক্রান্তকে নস্যাৎ করতে সমর্থ হয়েছিলো। মদীনার ইসলামী সমাজ সবসময়ই ঐকবদ্ধ ছিলো এবং রাসূল (সা) মুসলিমদের মধ্যকার এই একতাকে নিশ্চিত করেছিলেন।

    মদীনায় ইসলামী সমাজ গঠনে সেখানকার মুশরিকরা কখনোই কার্যকরী কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রথমদিকে, তারা ইসলামী হুকুম- আহকামের কাছে সম্পূর্ন ভাবে নতি স্বীকার করেছিলো, তারপর আস্তে আস্তে সমাজে তাদের প্রভাব কমতে কমতে একসময় তা সম্পূর্ন ভাবে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো।

    আর, ইহুদীদের সমাজ সবসময়ই মদীনার সমাজ থেকে সম্পূর্ন আলাদা ছিলো, এমনকি ইসলাম আসার পূর্বেও। তারপর মদীনায় যখন ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলো, ইহুদীদের সাথে মদীনার সমাজের এই পার্থক্য আরও ঘনীভূত হলো। তাই, কিছু নির্ধারিত ভিত্তির উপর ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যে একটি পারস্পারিক সম্পর্ক নির্ধারন করা জরুরী হয়ে পড়লো। সুতরাং, সমাজের অন্যান্য সদস্যদের ব্যাপারে মুসলিমদের অবস্থান কি হবে তা রাসূল (সা) নির্ধারন করলেন। এই প্রেক্ষাপটে, রাসূল (সা) মুহাজির ও আনসারদের ব্যাপারে একটি সনদ তৈরী করলেন, যাতে তিনি (সা) ইহুদীদেরকে ধর্মীয় ও সম্পদে অধিকার দিয়ে তাদের সাথে একটি চুক্তি করলেন এবং বিনিময়ে ইহুদী সম্প্রদায়ের জন্য কিছু দায়িত্ব নির্ধারন করে দিলেন। তিনি (সা) চুক্তিপত্রটি এভাবে শুরু করেছিলেন,“এটি হচ্ছে আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে সনদ, যিনি কুরাইশ ও ইয়াসরিবের(মদীনা)  বিশ্বাসী  মুসলিমদের  উপর  কর্তৃত্বশীল  এবং  তাদের  উপরও  যারা  তাদেরকে  অনুসরন  করবে,  তাদের  সাথে  যোগ  দেবে  এবং তাদের সাথে যুদ্ধ করবে। সমস্ত পৃথিবীর মানুষের বিপরীতে তারা হবে একটি জাতি”। তারপর, তিনি (সা) বিশ্বাসীদের মধ্যে কিভাবে সম্পর্ক গঠিত হবে তা উল্লেখ করেন। এছাড়া, তিনি (সা) উক্ত সনদে ইহুদীদের সাথে মুসলিমদের সম্পর্ক কেমন হবে তাও উল্লেখ করে বলেন,“একজন মুসলিম কখনোই কোন অমুসলিমের খাতিরে কোন মুসলিমকে হত্যা করবে না। এমনকি, একজন অবিশ্বাসীকে কোন মুসলিম একজন মুসলিমের বিরুদ্ধে কখনো সাহায্যও করবে না। আল্লাহর সাথে তাদের কৃত চুক্তি এক এবং চুক্তি ভঙ্গকারী দায়ভার গ্রহন করবে। মু’মিনরা হচ্ছে সমস্ত বহিরাগতদের বিরুদ্ধে একে অপরের সাহায্যকারী। ইহুদীদের মধ্য হতে যারা আমাদের অনুসরন করবে তারা সাহায্য ও সমান অধিকার প্রাপ্ত হবে। তাদের ব্যাপারে কোন অন্যায় করা হবে না, না তাদের শত্রুকে কোনরকম সাহায্য করা হবে। মু’মিনদের মধ্যকার শান্তি থাকবে অবিচ্ছেদ্য।  মু’মিনরা যখন  আল্লাহর  রাস্তায়  যুদ্ধ  করবে তখন  কোনরকম  পৃথক  শান্তিচুক্তি  করা  যাবে  না। চুক্তির  শর্ত  অবশ্যই  সবার  জন্য  সমান ভাবে যুক্তিযুক্ত হতে হবে”। এ চুক্তিতে যে সকল ইহুদী গোত্র মদীনার সীমানার বাইরে বাস করতো তাদের কথা বলা হয়নি, বরং যে সব ইহুদী ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হতে চেয়েছিলো শুধু তাদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রদত্ত চুক্তি অনুযায়ী, মদীনায় বসবাসকারী যে কোন ইহুদী ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে মুসলিমদের সমান অধিকার পেয়েছিলো এবং তাদের সাথে মুসলিমদের মতোই ব্যবহার করা হতো। ইসলামী রাষ্ট্রে তাদেরকে জিম্মি (শর্তসাপেক্ষে নাগরিক) হিসাবে বিবেচনা করা হতো। চুক্তিপত্রের পরের দিকে যে সব ইহুদী গোত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদের মধ্যে ছিলো বনু ’আউফ এবং বনু নাজ্জার এবং আরও অনেকে।

    উল্লেখিত ইহুদী গোত্রগুলোর সাথে ইসলামী রাষ্ট্রের সম্পর্ক কেমন হবে তা এ সনদে উল্লেখ করা ছিলো। এখানে পরিষ্কার ভাবে লিখিত ছিলো যে, ইহুদী ও মুসলিমদের মধ্যকার এ সম্পর্ক হবে শুধুমাত্র ইসলামী হুকুম-আহকাম, ইসলামের শাসন-কর্তৃত্ব এবং ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষার উপর ভিত্তি করে। চুক্তির কিছু কিছু শর্ত ছিলো নিম্নরূপঃ

           ১. The close friends of the Jews are as themselves. মুহাম্মদ (সা) এর অনুমতি ছাড়া কেউ মদীনার বাইরে যেতে পারবে না।

           ২. চুক্তিপত্রে উল্লেখিত সকলের জন্য ইয়াসরিব পূণ্যভূমি হিসাবে বিবেচিত হবে।

           ৩. যদি কোন ব্যাপারে কোন মতভেদ বা বিবাদের সৃষ্টি হয়, যা কিনা সমাজে কোন ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে, তবে তা অবশ্যই আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

           ৪. কুরাইশ এবং তাদের সাহায্যকারীদের কোনরকম নিরাপত্তা দেয়া হবে না।

    আল্লাহর রাসুলের তৈরী এ সনদ মদীনার প্রান্তসীমায় বসবাসরত ইহুদী গোত্রগুলোর অবস্থান নির্ধারন করেছিলো। এ সনদ তাদের উপর এ শর্তও আরোপ করেছিলো যে, আল্লাহর রাসূল (সা) অর্থাৎ, ইসলামী রাষ্ট্রের অনুমতি ব্যতীত তারা মদীনার বাইরে যেতে পারবে না। এ চুক্তির মাধ্যমে ইহুদী গোত্রগুলোকে যুদ্ধ বা অন্য কোন গোত্রকে যুদ্ধে সহযোগিতার মাধ্যমে মদীনার পবিত্রতা বা শান্তি নষ্ট করা নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। এছাড়া, ইহুদী গোত্রগুলোর উপর কুরাইশ গোত্র বা কুরাইশদের মিত্রদেরকেও কোনরকম সাহায্য করার ব্যাপারেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিলো। চুক্তি অনুযায়ী, সনদের কোন ব্যাপারে বিবাদের সৃষ্টি হলে তারা তা আল্লাহর রাসূল (সা) এর দিকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য ছিলো। ইহুদীরা এ চুক্তির সকল শর্ত মেনে নিয়েছিলো এবং উল্লেখিত গোত্রগুলোও শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলো। এ গোত্রগুলোর মধ্যে ছিলো বুনু ’আউফ, বন আল-নাজ্জার, বনু আল-হারিছাহ, বনু সায়ি’দাহ, বনু জুশাম, বনু আল-আউস এবং বনু ছালাবাহ। বনু কুরাইজা, বনু আল-নাজির এবং বন কাইনুকা এ সময় এ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলেও পরবর্তীতে তারা স্বেচ্ছায় চুক্তির সকল শর্ত মেনে নিয়েই এতে স্বাক্ষর করেছিলো।

    এ চুক্তির মাধ্যমে রাসূল (সা) নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যকার সম্পর্কগুলো শক্ত ভাবে নিরুপণ করেছিলেন। এছাড়া, ইসলামী রাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী ইহুদী গোত্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্কও দৃঢ় ও সুস্পষ্ট ভাবে বর্ণিত শর্তের ভিত্তিতে রচিত হয়েছিলো। উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামী হুকুম আহকামকেই সব বিচার-ফায়সালার মাপকাঠি হিসাবে ধরা হতো। মূলতঃ এ পর্যায়ে আল্লাহর রাসূল (সা) মোটামুটি ভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে, ইসলামী রাষ্ট্র একটি শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং ইহুদীদের অতর্কিত আক্রমণ ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে নবগঠিত এ রাষ্ট্র কিছুটা নিরাপত্তা লাভ করেছে। সতরাং, এরপর তিনি (সা) ইসলামী দাওয়াতের পথে অবস্থিত বস্তুগত বাঁধা অপসারনে মনোনিবেশ করলেন এবং জিহাদের প্রস্তুতি নিতে থাকলেন।

  • সিরিয়া আক্রমনে ইউরোপের অবস্থান

    সিরিয়া আক্রমনে ইউরোপের অবস্থান

    বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী, ডেভিড ক্যামেরন গত ২৯শে আগষ্ট মানবিকতার দোহাই দিয়ে আবেগপ্রবন আবেদন করা সত্ত্বেও সিরিয়ায় সামরিক সংশ্লিষ্টতার জন্য সংসদীয় অনুমোদন নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। বৈশ্বিক বিষয়াদি, বিশেষ করে সিরিয়ার জন্য যখন আমেরিকা একটি জোট গঠন করতে সচেষ্ট তখন ইউরোপীয় অবস্থান (বিশেষ করে বৃটেন ও ফ্রান্স) অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। যখন আরব বসন্তের বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ঘটনাবলী ক্রমাগতভাবে বিশ্বকে কাঁপিয়ে চলছে, তখন ইউরোপ ও আমেরিকার বিভাজন ও মতানৈক্য আরো প্রকটভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

    বৃটেন ও ফ্রান্স উভয়েরই বিশ্ব ময়দানে বিভিন্ন উচ্চাকাঙ্খা রয়েছে। কিন্তু উভয়েই বিশ্বশক্তি আমেরিকা কর্তৃক পর্যদুস্ত হয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশক্তি হিসেবে উভয়কে প্রতিস্থাপন করে আমেরিকা ও সোভিয়েত রাশিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর উভয় জাতিই আমেরিকার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতার চেষ্টায় রত। এক্ষেত্রে বৃটেন সবসময়ই আমেরিকার সাথে কাজ করার নীতি অবলম্বন করেছে। কখনো আমেরিকার সহযোগী শক্তি হিসেবে, পাশাপাশি কখনো আমেরিকার প্রচেষ্টাকে জটিল, পরিবর্তন কিংবা বিচ্যুত করে দেবার নিমিত্তে। যেখানেই বৃটিশ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সেখানেই তারা আমেরিকার পাশে এসে দাড়িয়েছে। আবার যেখানে তাদের স্বার্থের বিপরীত দেখতে পেয়েছে সেখানেও তারা আমেরিকার সাথে থেকেছে যাতে করে আমেরিকার পরিকল্পনা দূর্বল করে দেয়া যায়। সুতরাং, আপাত দৃষ্টিতে আমেরিকা ও বৃটেনের সম্পর্কে কোনো উত্তেজনা দেখা যায়নি। কিন্তু অভ্যন্তরে তারা সবসময়ই আমেরিকার পরিকল্পনাকে চ্যালেঞ্জ করতে চেষ্টা করেছে। দো গলের আমলে ফ্রান্স আমেরিকাকে একটি হুমকি হিসেবে দেখতো যা প্যারিসকে বিশ্বে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে। সুতরাং, সেসময় তারা প্রকাশ্যে আমেরিকার বিরোধিতা করে। তবে, নিকোলাস সারকোজি ২০০৭ এ ক্ষমতায় এসে বৃটিশ পদ্ধতি অবলম্বন করতে শুরু করে। উদাহরনসরূপ, ফ্রান্স, বৃটেন ও আমেরিকা সকলেই উত্তর কোরিয়া, ইরান ও ফিলিস্তিনের দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের মতো বিভিন্ন বিষয়ের পক্ষে একসাথে কাজ করেছে। আবার, লেবানন, সুদান ও নাইজেরিয়াতে তারা একে অপরের সাথে বিরোধিতা ও প্রতিযোগিতা করেছে।

    আমেরিকা, ফ্রান্স ও বৃটেনের জন্য সিরিয়া নতুন আরেক যুদ্ধক্ষেত্র। শুরুর দিকে আমেরিকা যখন বাশারকে সংস্কারের কথা বলছিল, তখন ইউরোপিয়ানরা তার উচ্ছেদের কথা বলছিল। ২০১১তে হিলারি ক্লিনটন বলেন, “যা আমি বুঝি তা হচ্ছে যে তাদের এখনো সংস্কারের কার্যক্রম নিয়ে আসার সুযোগ রয়েছে। কেউ বিশ্বাস করেনি গাদ্দাফী তা করবে। (তবে) মানুষ আসলেই বিশ্বাস করে যে সিরিয়ার সামনে এগিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য সুযোগ রয়েছে। সুতরাং, আমরা আমাদের মিত্রদের সাথে এক হয়ে ক্রমাগতভাবে এ বিষয়ে জোরালো চাপ প্রয়োগ করে যেতে থাকবো।” অপরদিকে জি-৮ সম্মেলনে ডেভিড ক্যামেরন বলেন, “আসাদের হাত রক্তে রঞ্জিত। এটি অচিন্তনীয় যে এ স্বৈরাচারী এ জাতির ভবিষ্যতে কোনো ভুমিকা নিতে পারবে।” প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্স সিরিয়াকে তার জন্য কেটে নেয় ও আলাওয়ীদের ক্ষমতায় রেখে তাদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সে তার গুরুত্ব হারাতে থাকে এবং সিরিয়া আমেরিকার প্রভাববলয়ে প্রবেশ করে।

    বাশার আল-আসাদের গণহত্যার চিত্র যখন সারা বিশ্বে প্রচারিত হয়, তখন আমেরিকা অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নিতে শুরু করে এবং বিরোধী পক্ষের সাথে আলোচনা শুরু করে। তবে, ২০১২তে লিওন প্যানেট্টা মার্কিন অবস্থান সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেন, “আমি মনে করি যখন আসাদ প্রস্থান করবে – এবং সে প্রস্থান করবে – সে দেশের স্থিতিশীলিতা সংরক্ষন করার চেষ্টা করে। এবং সেধরনের স্থিতিশীলিতা সংরক্ষনের জন্য সবচেয়ে উত্তম পন্থা হলো সিকিউরিটি ফোর্সসহ সেনাবাহিনী ও পুলিশকে রক্ষনাবেক্ষন করা যাতে করে তারা নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে পারে। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ (That’s a key)।” সিরিয়ান ন্যাশনাল কাউন্সিল (যা পরে সিরিয়ান ন্যাশনাল কোয়েলিশনে পরিবর্তিত হয়) সবসময়ই সরকারের সাথে আলাপ চালাতে চেয়েছে যা বরাবরই মার্কিন অবস্থান ছিল। তবে, বৃটেন ও ফ্রান্স উভয়ই আমেরিকা হতে ভিন্ন ধারায় অগ্রসর হয়েছে, যেমন, ‘সিরিয়ার মিত্র’ (Friends of Syria) গ্রুপটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ইউরোপের তত্ত্বাবধানে গাস্সান হিট্টোকে প্রধান করে একটি অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় যা নির্দেশনা দেয় যে আসাদ সরকারের সাথে কোনো বোঝাপড়া হবে না। এটিই সবসময় ইউরোপের অবস্থান ছিল। তবে, এই মধ্যবর্তী সরকার সিরিয়া হতে নির্বাসিত এবং সিরিয়ার অভ্যন্তরে সাংগঠনিকভাবে দূর্বল।

    বিভিন্ন পদক্ষেপের মাধ্যমে আমেরিকা সিরিয়ায় ফ্রান্স ও বৃটেনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাসমূহকে দূর্বল করে দেয়। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ, আসাদের কিছু সহচর রেখে নতুন চেহারা সম্বলিত একটি মধ্যবর্তী সরকার গঠন, ইয়েমেনি মডেল প্রয়োগ, জাতিসংঘের ব্যবহার ইত্যাদি। এসকল প্রচেষ্টার পরও সরকার এখনো টিকে আছে। (আমেরিকার বিপরীতে) ইউরোপ ক্রমাগতভাবে আসাদ সরকারের উচ্ছেদের কথা বলে আসলেও, সম্প্রতি গত ২১ আগষ্ট, আল-ঘুটায় আসাদ সরকার কর্তৃক রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রেক্ষাপটে আমেরিকা তার অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে এবং দ্রুত ভুমধ্যসাগরে তার নৌবাহিনীর চারটি যুদ্ধজাহাজকে সচল করে। এই পরিবর্তিত অবস্থান বৃটেন ও ফ্রান্স কিছুটা অপ্রস্তুত করে যেহেতু আমেরিকা বরাবরই সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে বলে আসছিল। কিন্তু পরিবর্তিত এ অবস্থানের দরুন ফ্রান্স ও বৃটেন আমেরিকার হস্তক্ষেপের এ বাস্তবতা মোকাবেলা করতে বাধ্য হচ্ছে।

    যদিও বৃটেন ও ফ্রান্স আপাত দৃষ্টিতে আমেরিকার সাথে এক হয়ে কাজ করে বলে মনে হয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো বিশ্ব রাজনীতির ময়দানে তারা একে অপরের প্রতিযোগী – সিরিয়া যার নতুন এক অধ্যায়। সিরিয়ার অস্থিতিশীলতা বৃটেন ও ফ্রান্সের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের হৃদয়ে অবস্থিত এ জাতির উপর হস্তক্ষেপ করে ফায়দা হাসিলের মূলত নতুন এক সুযোগ নিয়ে এসেছে। অপরদিকে, আমেরিকা ইউরোপীয়দের বিভিন্ন বাধা পাশ কাটিয়ে সিরিয়াকে নিজের প্রভাববলয়ে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্য কোনো ব্যপারে একমত না হলেও, সিরিয়া যাতে তাদের উভয়ের হাত থেকেই চলে না যায়, সে ব্যাপারেই তারা সকলেই একমত হবে।

    প্রবন্ধটি ভু-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আদনান খান এর একটি বিশ্লেষন হতে নেয়া এবং কিছুটা পরিমার্জিত

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১২ (ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা)

    আল্লাহর রাসূল (সা) অবশেষে মদীনায় এসে পৌঁছালেন এবং বিপুল সংখ্যক মদীনাবাসী তাঁকে সানন্দে বরণ করে নিলো। এদের মধ্যে মুসলিম, ইহুদী ও মূর্তিপূজারী সবধরনের মানুষই ছিলো। মদীনাবাসী অধীর আগ্রহে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো এবং সকলেই সাক্ষী হতে চেয়েছিলো সেই আনন্দঘন মূহুর্তের, যখন আল্লাহর রাসূল (সা) উপস্থিত হবেন তাঁর নতুন আবাসভূমিতে। সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই মুসলিমরা তাকে ঘিরে ধরলো এবং আন্তরিক আথিতেয়তার মাধ্যমে তাঁর সেবাশ্রষশার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো। বস্তুতঃ ইসলামের আহবানকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তারা তাদের জীবন বাজি রাখতেও প্রস্তুত ছিলো।

    আনসারদের মধ্যে সবাই চাচ্ছিলো যেন নবী (সা) তার গৃহেই অবস্থান করে। কিন্তু রাসূল (সা) তাঁর উটনীর রশি ছেড়ে দিলেন। উটনী নিজের ইচ্ছা মতো পথ চলতে চলতে একসময় আমর গোত্রের সন্তান সাহল ও সুহাইলের গুদামঘরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো। পরবর্তীতে রাসূল (সা) এই দুই ইয়াতীম শিশুর কাছ থেকে এ জায়গাটি ক্রয় করে নেন এবং এখানেই তাঁর মসজিদ ও এর চারপাশ ঘিরে তাঁর বাসগৃহ নির্মাণ করেন। মসজিদ ও বাসগৃহ নির্মাণের ক্ষেত্রে রাসূল (সা) খুবই সহজলভ্য ও সাধারন উপকরণ ব্যবহার করায় নির্মাণ কাজ খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। মূলতঃ মসজিদটি ছিলো একটি বড় হলঘর, যার চারপাশ ইটের তৈরী দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিলো। এর ছাদের কিছু অংশ ছিলো খেজুর শাখা দিয়ে আবৃত, আর বাকীটা ছিলো খোলা। মসজিদের কিছু অংশ ব্যবহার করা হতো দরিদ্র ও গৃহহীন মানুষের আশ্রয়স্থল হিসাবে। এশার নামাজের সময় ছাড়া আর কখনোই মসজিদে আলো জ্বালানো হতো না। সাধারনত খড়ের তৈরী মশাল দিয়েই করা হতো এ আলোর ব্যবস্থা।

    রাসূল (সা) এর জন্য তৈরী ঘরগুলোও মসজিদের মতোই সাধারন ছিলো, শুধুমাত্র মসজিদ থেকে একটু বেশী আলোকিত ছিলো। আল্লাহর রাসূল(সা) মসজিদ ও তাঁর গৃহ নির্মাণ এর সময়টুকুতে আবি আইয়ুব খালিদ ইবন যায়িদ আল-আনসারির গৃহে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হবার সাথে সাথেই নিজগৃহে চলে আসলেন। এখানে আসার পর, রাসূল (সা) ভাবতে লাগলেন তাঁর নতুন জীবন সর্ম্পকে, কিভাবে ইসলামী দাওয়াত এক অধ্যায় থেকে অন্য অধ্যায়ে প্রবেশ করলো, একেবারে ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরীর পর্যায় থেকে একটি কুফর সমাজের  সাথে  ইসলামী  আদর্শের  সাংঘর্ষিক  পর্যায়  এবং  সবশেষে  একটি  ইসলামী  সমাজ  যেখানে  মানুষের  উপর  কার্যকরী হবে  ইসলামের বিধিবিধান। তিনি ভাবতে লাগলেন এ নতুন যুগের সূচনা সম্পর্কে, যা তাকে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করার পর্যায় ও অসহনীয় অত্যাচার-নির্যাতন থেকে নিয়ে এসেছে শাসন-কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা অর্জনের পর্যায়ে এবং প্রাপ্য এ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বই এখন ইসলামকে রক্ষা করবে, নিরাপত্তা দেবে এবং ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবে পৃথিবীব্যাপী। মদীনায় আসার পর পরই রাসূল (সা) মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিয়েছিলেন এবং এ মসজিদেই তিনি নামাজ পড়াতেন, সাহাবীদের সাথে আলোচনা ও পরামর্শ করতেন। এখানেই তিনি মদীনার জনসাধারনের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করতেন ও তাদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করতেন। তিনি (সা) এ সকল কাজে আবু বকর (রা) ও ওমর (রা)-কে তাঁর দুই সহকারী হিসাবে নিযুক্ত করলেন, বললেন, “এ পৃথিবীতে আবু বকর ও ওমর হচ্ছে আমার দুই সহকারী”।

    মুসলিমরা সাধারনত সকল বিষয়ে তাঁর কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ এবং জীবনসম্পর্কে সঠিক দিকনির্দেশনা নেবার জন্য রাসূল (সা)-এর চারপাশে সমবেত হতো। এভাবে, তিনি সদ্যগঠিত এ রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, বিচারক এবং সেনাপতির ভূমিকা গ্রহন করলেন। তিনি (সা) মুসলিমদের সব বিষয় সম্পর্কে খোঁজখবর রাখতেন, তাদের মধ্যকার বিভিন্ন ঝগড়া-বিবাদেরও ফয়সালা করতেন, নিযুক্ত করতেন মুসলিম সৈন্যবাহিনীর বিভিন্ন অংশের প্রধান এবং সেনাবাহিনীকে মদীনার বাইরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশনে পাঠাতেন।

    আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার উপস্থিত হবার দিন থেকেই ইসলামী রাষ্ট্রের সূচনা করেছিলেন এবং পুরো সমাজকে পরিবর্তন করে এ রাষ্ট্রকে একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর উদ্যেগ নিয়েছিলেন। একই সাথে এ রাষ্ট্র রক্ষা করা ও দ্বীন ইসলামের আহবান সর্বত্র ছড়িয়ে দেবার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন  প্রয়োজনীয়  সৈন্যবাহিনী।  বস্তুতঃ  এ  সবকিছুর  মাধ্যমেই  তিনি  আল্লাহর  দ্বীনকে  পৃথিবীব্যাপী  বিস্তৃত  করতে  সকল  বস্তুগত  বাঁধা সফলতার সাথে দূর করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১১ (আকাবার দ্বিতীয় শপথ)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    আকাবার প্রথম শপথ ছিলো মুসলিমদের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সাহায্য। কারণ, যদিও এ শপথের সময় মাত্র অল্পকিছু মদীনাবাসী ইসলাম গ্রহন করেছিলো, তারপরও মুসা’ব (রা) এর একনিষ্ঠ প্রচেষ্টার ফলে মাত্র একবছরের মধ্যে মদীনাবাসীর মধ্যে প্রচলিত ভ্রান্ত ও ঘুঁণেধরা ধ্যান-ধারনা ও আবেগ-অনভূতিগুলো পরিবতির্ত হয়ে গিয়েছিলো। যা কিনা মক্কায় এর থেকে অনেক বেশী সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহন করার পরও সম্ভব হয়নি। মক্কার জনগোষ্ঠির একটা বিরাট অংশ নিজেদের ইসলামের আহবান থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলো এবং ইসলামকে সম্পূর্নভাবে প্রত্যাখান করেছিলো, ফলে, সে সমাজকে ইসলামের প্রচারিত আদর্শের সৌন্দর্য তেমন ভাবে নাড়া দিতে পারেনি। অপরদিকে, মদীনার বেশীর ভাগ মানুষই ইসলাম গ্রহণ করেছিলো এবং ইসলামী চিন্তা-চেতনা ও আদর্শ সামগ্রিক ভাবে মদীনাবাসীদের হৃদয়কে প্রচন্ড ভাবে নাড়া দিয়েছিলো, যা পরিবর্তন করেছিলো তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে লালিত ক্ষয়ে যাওয়া ধ্যান-ধারনা ও চিন্তাকে। এ ঘটনা সুস্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করে যে, যখন ব্যক্তিগত ভাবে কিছু সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে এবং তারা সমাজ ও গণমানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তাদের বিশ্বাস বা ঈমান যত দৃঢ়ই হোক না কেন তা সামগ্রিকভাবে সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে না, আর না ইসলামী চিন্তা-চেতনা সমাজের মানুষের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। এ ঘটনা আরও প্রমাণ করে যে, দাওয়াতী কার্যক্রমে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহনকারীর সংখ্যা যত কমই হোক না কেন, মানুষে মানুষে বিদ্যমান সম্পর্কগুলোকে যদি সঠিক চিন্তা-চেতনা ও আবেগ-অনুভূতির মাধ্যমে প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়, তবে এটাই সমাজকে প্রত্যাশিত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করে। এ ঘটনাগুলো থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, যখন কোন সমাজ কুফর ধ্যান-ধারনা ও আদর্শকে শক্তভাবে আকঁড়ে থাকে (যেমন ছিলো মক্কার সমাজ), এ ধরনের সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এ সব চিন্তা-চেতনাকে পরিবর্তন করে সামগ্রিকভাবে সমাজ পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। আবার অপরদিকে, যে সমাজে এ কুফর চিন্তা-চেতনার শেকড়গুলো অপেক্ষাকৃত দূর্বল (যেমনটা ছিলো মদীনার সমাজ), সে সমাজে সামগ্রিকভাবে সমাজের মানুষের ধ্যান-ধারনার পরিবর্তন ঘটানো সহজ যদিও সে সমাজে কুফর বা ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনাগুলো উপস্থিত থাকে।

    মূলতঃ এ কারণেই ইসলামের আহবান মক্কাবাসীর তুলনায় মদীনাবাসীকে অনেক বেশী প্রভাবিত করেছিলো। মদীনার জনগণ এটা বুঝতে পেরেছিলো যে, তাদের মাঝে প্রচলিত ধ্যান-ধারনা ও চিন্তা-চেতনাগুলো অসাড় ও ভ্রান্ত এবং তারা জীবন সম্পর্কে এর বিকল্প কোন আদর্শ বা ধ্যান-ধারনার সন্ধান করছিলো। ঠিক বিপরীতভাবে, মক্কার সমাজের মানুষেরা তাদের মাঝে প্রচলিত ব্যবস্থা বা প্রতিষ্ঠিত আদর্শ নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলো এবং এ ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনাগুলো পরিবর্তিত হয়ে যাবার আশঙ্কায় খুবই ব্যতিব্যস্ত ছিলো। বিশেষ করে, মক্কার নেতৃস্থানীয় কিছু ব্যক্তি যেমন, আবু লাহাব, আবু জাহল এবং আবু সুফিয়ান এর মতো লোকেরা এ ব্যাপারে খুবই সোচ্চার ছিলো। মূলতঃ এ কারনেই মুসা’ব ইবন উমায়ের মদীনাতে খুব অল্প সময়ের মধ্যে সে সমাজের মানুষের কাছ থেকে ব্যাপকভাবে সাড়া পেয়েছিলেন, তিনি গণমানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেছিলেন এবং তাদেরকে সত্য দ্বীনের শিক্ষা ও আইন-কানুনে শিক্ষিত করেছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন মদীনার জনগণের ইসলামের আলোকিত আহবানে দ্রুত সাড়া দেবার ও ইসলাম গ্রহন করার মতো মনমানষিকতা। শুধু তাই নয়, মদীনাবাসীর ছিলো ইসলামী আদর্শকে পরিপূর্ণ জানার ও আল্লাহ প্রদত্ত আইন-কানুনগুলো শেখার একান্ত প্রচেষ্টা, যা মুসা’ব (রা) এর অন্তরকে করেছিলো আনন্দে উদ্ভাসিত। এভাবে, তার চোখের সামনেই মদীনায় মুসলিমদের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো এবং মুসা’ব ইবন উমায়ের দ্বিগুন উৎসাহের সাথে তার দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলেন।

    এরপর যখন হজ্জের মৌসুম আসলো, মুসা’ব (রা) মক্কায় ফিরে আসলেন এবং মুহাম্মদ (সা) এর কাছে মদীনায় মুসলিমদের সংখ্যা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি এবং সেখানে ইসলামের দ্রুত প্রসারের কথা জানালেন। তিনি জানালেন কিভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনার ঘরে ঘরে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে এবং ইসলাম এ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে। তিনি আরও জানালেন মদীনার সমাজে মুসলিমদের শক্তি-সামর্থ্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতার কথা, যা ইসলামকে সে সমাজে প্রভাবশালী অস্তিত্ব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তিনি বললেন, মদীনার কিছু কিছু মুসলিমদের ঈমান এতো দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ যে, তারা এ বছরই মক্কায় আসতে চায়।

    আল্লাহর রাসূল (সা) মুসা’ব ইবন উমায়ের এর কাছ থেকে এ সব সংবাদ শুনে খুবই আনন্দিত হলেন এবং মক্কার সমাজের সাথে মদীনার সমাজের তুলনা করে গভীর ভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন, একনাগারে গত বারোটি বছর ধরে তিনি মক্কার মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করছেন, সম্ভাব্য সকল উপায়ে চেষ্টা করেছেন, তার প্রতিদিনের প্রতিটি মূহুর্ত তিনি দাওয়াতী কাজে ব্যয় করেছেন, প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়েছেন, এ সবকিছু করতে গিয়ে সবধরনের জুলুম, অত্যাচার ও নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু, এতো কিছুর পরও মক্কাবাসী এখনও নিমজ্জিত রয়েছে মিথ্যা অহমিকা আর অন্ধ গোয়ার্তুমির নিকষ কালো অন্ধকারে। মক্কাবাসীর প্রচন্ড নিষ্ঠুর, বরফ কঠিন  ও  অনুশোচনাবিহীন  হৃদয়ে  তার  প্রাণান্তকর  এ  প্রচেষ্টা বিন্দুমাত্র আচঁড় কাটতে পারেনি, বরং  তাদের  দূর্ভেদ্য  অন্তর  পূর্বের মতোই পূর্বপুরুষদের ভ্রান্ত ধ্যান-ধারনায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। মক্কার জনসাধারন ছিলো খুবই রূঢ় প্রকৃতির এবং তাদের অন্তরে মুর্তিপূজার মতো বিকৃত ধ্যান-ধারনার  শেকড়  ছিলো  গভীর  ভাবে  প্রোথিত।  মূলতঃ  এ  কারনেই  তারা  ইসলামের  আলোকিত  আদর্শে  সাড়া  দিতে  ব্যর্থ হয়েছিলো এবং নিমজ্জিত ছিলো শিরকের মতো ভয়ঙ্কর পাপে। অপরদিকে, মদীনার চিত্র ছিলো একেবারেই অন্যরকম। খাযরাজ গোত্রের একদল মানুষ ইসলাম গ্রহন করার পর একবছর পার হতে না হতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো আকাবার প্রথম শপথ। পরবর্তীতে মুসা’ব ইবন উমায়েরের মাত্র একবছরের প্রচেষ্টায় সমস্ত মদীনা ইসলামী ধ্যান-ধারনার আলোকে এমন ভাবে উদ্দীপ্ত হলো যে, এটাই পরবর্তীতে অল্প সময়ের মধ্যে অবিশ্বাস্য সংখ্যক মানুষের ইসলাম গ্রহনের ভিত্তি তৈরী করেছিলো। অন্যদিকে, মক্কায় যারা ইসলাম গ্রহন করেছিলো তাদের মধ্যেই ইসলামের আদর্শ ও চিন্তা-চেতনা সীমাবদ্ধ ছিলো। উপরন্তু, তারা হয়েছিলো কুরাইশদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার। কিন্তু, মদীনাতে ইসলামী আদর্শ বিস্তৃতি লাভ করেছিলো দ্রুত গতিতে আর ইসলাম গ্রহন করায় সেখানকার মুসলিমরা ইহুদী বা কাফিরদের কোনরকম অত্যাচার বা নির্যাতনেরও শিকার হয়নি। মূলতঃ এ অবস্থা মদীনাবাসীর অন্তরে ইসলামকে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করতে সাহায্য করেছিলো এবং মুসলিমদের জন্য উম্মোচিত করেছিলো ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার নতুন দ্বার।

    মুহাম্মদ (সা) এর কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, মদীনাই হতে পারে সেই উজ্জ্বল বর্তিকা যেখান থেকে ইসলামের আদর্শ, ঈমান ও জীবন-ব্যবস্থার আলো বিচ্ছুরিত হতে পারে বিশ্বময়। অতঃপর তিনি (সা) মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নিলেন, যা তাঁর সাহাবীদের তাদের মুসলিম ভাইদের সঙ্গী হবার সু্যোগ করে দিলো, তারা মুক্ত হলেন তাদের উপর আপতিত কুরাইশদের নির্মম অত্যাচার ও নির্যাতন থেকে এবং খুঁজে পেলেন একটি পবিত্র ও নিরাপদ আশ্রয়। রাসূল (সা)-এর এ পদক্ষেপ তাদের দাওয়াতী কার্যক্রমে সম্পুর্ণভাবে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দিলো এবং তারা খুব স্বাভাবিক ভাবেই পরবর্তী পর্যায়ের দিকে অগ্রসর হলেন, যেটা ছিলো মূলতঃ ইসলামকে বাস্তব জীবনে কার্যকরীভাবে প্রয়োগ করা এবং ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার সহায়তায় ইসলামের আহবানকে বলিষ্ঠভাবে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া।

    এখানে এটা বলে রাখা দরকার যে, মুহাম্মদ (সা) দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে যে প্রচণ্ড পরিমাণ বাঁধা-বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা অতিক্রম করার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা কিংবা এ ব্যাপারে চুড়ান্ত ধৈর্য্য ও একনিষ্ঠতার পরিচয় না দিয়েই শুধুমাত্র অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রক্ষা পাবার জন্য মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত গ্রহন করেননি। তিনি মক্কায় দীর্ঘ দশটি বছর প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছেন, দাওয়াতী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য গভীর ভাবে চিন্তা করেছেন। তিনি (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ এজন্য সবরকমের ভয়ঙ্কর অত্যাচার ও নির্যাতনকে হাসিমুখে বরণ করেছেন। কুরাইশদের নিষ্ঠুর অত্যাচার ও প্রবল প্রতিরোধ আল্লাহর রাসূল (সা)-কে এক মূহুতের্র জন্য লক্ষ্যচ্যুত করতে তো পারেইনি, উপরন্তু এ প্রবল প্রতিরোধ তাঁর ঈমানী শক্তি ও আল্লাহর বাণীর প্রতি তাঁর বিশ্বাসকে প্রতিনিয়ত নিয়ে গিয়েছে নতুন এক উচ্চতায়। তিনি (সা) নিশ্চিতভাবেই জানতেন আল্লাহর সাহায্য আসবে এবং এ নিশ্চিত বিশ্বাসই তাকে করেছিলো আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী ও আশাবাদী। শুধু তাই নয়, তাঁর কাছে এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে মক্কাবাসীর হৃদয় আসলে কতো কঠিনভাবে অন্ধ গোয়ার্তুমির মধ্যে নিমজ্জিত, তাদের অন্তর কতো সংকীর্ন এবং সর্বোপরি তারা কতো নিষ্ঠুর ও পথভ্রান্ত। এ বাস্তবতা থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মক্কায় ইসলামের বিজয়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন এবং তাঁর সকল প্রচেষ্টা হবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত। মূলতঃ এ কারনেই মক্কা ত্যাগ করা ও এর বিকল্প কোন স্থানের সন্ধান করা ছিলো খুবই জরুরী। আর তাই, এ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই তিনি (সা) মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। সুতরাং, অত্যাচার বা নির্যাতন নয়, এ কারণগুলোই ছিলো তাঁর ও সাহাবীদের মক্কা থেকে হিজরত করার এক ও একমাত্র কারণ।

    এছাড়া, একই সাথে এটাও সত্য যে, রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদেরকে কুরাইশদের নিষ্ঠুর ও ভয়ঙ্কর অত্যাচার থেকে রক্ষার জন্য তাদের আবিসিনিয়া

    হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ, যদিও নিমর্ম নির্যাতন ও অত্যাচার মুসিলমদের ঈমানী শক্তি ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে দৃঢ় করে, বাতিল শক্তির প্রবল প্রতিরোধ মুসলিমদের আরো প্রত্যয়ী করে তোলে, তারপরও জীবন রক্ষার তাগিদে নির্যাতনস্থল ত্যাগ করার অনুমতিও ইসলাম দিয়েছে। বস্তুতঃ এ দৃঢ় ঈমানী শক্তি থেকেই মুসলিমরা অবলীলায় আল্লাহর জন্য সকল দুঃখ-কষ্টকে তচ্ছু তাচ্ছিল্য করতে পারে। নির্দিধায় তারা উৎসর্গ করতে পারে নিজ জীবন সহ তাদের ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, মানসিক স্বস্তি সহ সবকিছু। কিন্তু, তারপরও কোন কোন সময় বিরতিহীন অসহনীয় অত্যাচার ঈমানদারদের হাঁপিয়ে তোলে। তখন সঙ্গত কারনেই তাদের সকল প্রচেষ্টা দাওয়াতী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা সত্যদ্বীনকে গভীর ভাবে উপলব্ধি করার থেকে, নিজেকে ক্রমাগত অত্যাচার ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। এ কারনেই মুসলিমদের এই জুলুম আর অত্যাচারের রাজত্ব থেকে হিজরত করে পাড়ি জমাতে হয়েছিলো আবিসিনিয়ায়।

    যাই হোক, তাদের দ্বিতীয়বার হিজরত করতে হয়েছিলো সম্পূর্ন ভিন্ন কারণে। বস্তুতঃ দ্বিতীয়বার মুসলিমরা তাদের দ্বীনকে প্রাত্যহিক জীবনে ও সমাজে কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করার জন্যই রাসূল (সা) সহ হিজরত করেছিলো। তারা তৈরী করতে চেয়েছিলো একটি পরিপূর্ণ ইসলামী সমাজ, যেখান থেকে তারা ইসলামের আহবানকে ছড়িয়ে দেবে সারা বিশ্বে। মূলতঃ এ রকম একটি প্রেক্ষাপটেই আল্লাহর রাসূল (সা) সাহাবীদের মদীনায় হিজরত করার বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু, এ সিদ্ধান্ত নেবার পূর্বে তাঁর প্রয়োজন ছিলো হজ্জ্ব করতে আগত মদীনার মুসলিমদের সাথে সাক্ষাৎ করা, দ্বীন ইসলামকে রক্ষা করার জন্য তাদের স্বতঃস্ফুর্ততাকে পরীক্ষা করা এবং সর্বোপরি ইসলামের জন্য তারা কতোটুকু ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত তা পর্যালোচনা করা। তাঁর এটাও নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিলো যে, মদীনার মুসলিমরা তাঁর সঙ্গে আনুগত্যের শপথে আবদ্ধ হবে এবং প্রয়োজনে তাঁর জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত থাকবে, যা মূলতঃ তৈরী করবে একটি ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিভূমি।

    এ অবস্থায় রাসূল (সা) হজ্জ্বযাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। এটা ছিলো ৬২২ খ্রীষ্টাব্দ, দাওয়াতী কার্যক্রমের বারোতম বছর। আগত বিপুল সংখ্যক হজ্জ্বযাত্রীর মধ্যে ৭৫ জন ছিলো মুসলিম (যার মধ্যে ৭২ জন ছিলো পুরুষ এবং ২ জন ছিলো নারী) । এদের মধ্যে একজন নারী ছিলো বনু মাযিন ইবন আল-নাজ্জার গোত্র থেকে আগত নুসাইবা বিনত কা’ব উম্ম আমারাহ্ এবং অন্যজন ছিলো বনু সালামাহ গোত্র থেকে আগত আসমা বিনত আমর ইবন আদি।

    আল্লাহর রাসূল (সা) মুসলিম হজ্জ্বযাত্রীদের এ দলটির সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাদেরকে দ্বিতীয় আনুগত্যের শপথের কথা জানালেন।

    বস্তুতঃ এবারের অঙ্গীকার শুধুমাত্র দাওয়াতী কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও জুলুম-নির্যাতন থেকে নিরাপত্তা প্রদানের ব্যাপার সম্পর্কিত ছিলো না। বরং, এ অঙ্গীকারের সীমানা ছিলো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এটা ছিলো মুসলিমদের সম্ভাব্য সকল আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি তৈরী করার অঙ্গীকার। এটা ছিলো ইসলামের এমন এক কেন্দ্রবিন্দু প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার, যা তৈরী করবে ইসলামী রাষ্ট্র-ব্যবস্থার ভিত্তিভূমি। যে রার্ষ্টের থাকবে নিজেকে রক্ষা করার মতো প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি এবং সে শক্তি দূর করবে দ্বীন ইসলাম প্রচার ও প্রয়োগের পথে ছড়িয়ে থাকা সকল বাঁধা।

    আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের সাথে অঙ্গীকারের ব্যাপারে কথা বললেন, তাদের স্বতঃস্ফুর্ততাকে অনুভব করলেন। আবার, আগত মুসলিমরাও আইয়্যমে তাশরিকের দিনগুলোতে তাঁর সাথে আকাবার উপত্যকায় সাক্ষাৎ করতে সম্মত হলো। তিনি তাদের বললেন, “তোমরা কেউ কাউকে জাগাবে না, না কেউ অনুপস্থিত ব্যক্তির জন্য অপেক্ষা করবে।”তৃতীয় রাত্রি পার হবার পর তারা গোপনে আকাবা উপত্যকায় রাসূল (সা)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য উপস্থিত হলো, যাদের মধ্যে আগত দু’জন মুসলিম নারীও ছিলো। আল্লাহর রাসূল (সা) সেখানে তাঁর চাচা আল-আব্বাসকে নিয়ে উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত মুসলিমরা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো। রাসূল (সা)এর চাচা তখন পর্যন্ত ঈমান না আনলেও তিনি চেয়েছিলেন তার ভাতিজার পূর্ণ নিরাপত্তা। বস্তুতঃ তিনিই প্রথম সংলাপ শুরু করেন এবং বলেন, “হে খাযরাজ সম্প্রদায়ের লোকেরা, তোমরা জানো যে মুহাম্মদের অবস্থান আমাদের কাছে কোথায়। আমরা তাকে এতোদিন পর্যন্ত নিজ সম্প্রদায়ের মানুষ হতে রক্ষা করে এসেছি। তিনি আমাদের মধ্যে পরিপূর্ণ সম্মান ও নিরাপত্তার সাথেই বসবাস করছেন। কিন্তু, এখন তিনি তোমাদের সাথে বসবাস করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদি তোমরা মনে করে থাকো যে, তোমরা তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারবে এবং তাঁর প্রতি কৃত অঙ্গীকার পালন করে তাকে শত্র থেকে নিরাপত্তা দিতে পারবে, তাহলে তোমরা এ দায়িত্ব গ্রহন করো। আর যদি তোমরা মনে করে থাকো যে, তোমরা তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে এবং বিপদে তাঁকে  পরিত্যাগ  করবে,  তবে  তা  এখনই  জানিয়ে  দাও।”  প্রত্তুতরে  তারা  বললো, “আমরা  শুনেছি  আপনি  কি  বলেছেন।  হে  আল্লাহর  রাসূল,  এখন আমরা আপনার কথা শুনতে চাই। আপনি আপনার ও আপনার রবের জন্য যা ইচ্ছা পছন্দ করুন।” রাসূলুল্লাহ (সা) কুরআন তিলওয়াত করার পর তাদের বললেন, “আমি তোমাদের কাছে এই অঙ্গীকার চাই যে, তোমরা আমাকে রক্ষা করবে সেভাবে, যেভাবে তোমরা তোমাদের নারী ও সন্তানদের রক্ষা করো।” আল-বারা (রা) শপথ গ্রহনের জন্য তার হাত উঠালেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমরা আপনার পূর্ণ আনুগত্যের শপথ করছি। আল্লাহর কসম, আমরা হচ্ছি যোদ্ধাজাতি। যুদ্ধ ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বংশ পরম্পরায় আমাদের ধমনীতে প্রবাহিত হয়েছে।”

    আল-বারা (রা) কথার মাঝেই আবু আল-হাইছাম ইবন আল-ছাইহান প্রবেশ করলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের অন্য সম্প্রদায়ের (ইহুদী) সাথে মৈত্রী চুক্তি রয়েছে, আমরা যদি সে চুক্তি ছিন্ন করে আপনার পক্ষ অবলম্বন করি এবং তারপর যদি আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেন, তবে কি আপনি আমাদের ছেড়ে আপনার নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে আসবেন?” এ কথার উত্তরে আল্লাহর রাসূল (সা) হেসে বললেন, “না, এখন থেকে তোমাদের রক্তই আমার রক্ত এবং তোমাদের কাছে যা পবিত্র আমার কাছেও তা পবিত্র। আমি তোমাদের একজন এবং তোমরা আমাদের। আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এবং তাদের সাথে শান্তিচুক্তি করবো যারা তোমাদের সাথে সন্ধি করবে।”অতঃপর আল-’আব্বাস ইবন ’উবাদাহ (রা) বললেন, “হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা, তোমরা কি বুঝতে পারছো তোমরা কোন বিষয়ে সহায়তা দেবার জন্য এ ব্যক্তির সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হচ্ছো? এর অর্থ হচ্ছে যে কোন মূল্যে তাঁর জন্য লড়াই করা। তোমরা যদি সম্পদ হারানোর ভয় করে থাকো, তোমাদের মধ্যে সম্মানিত ব্যক্তিদের নিহত হবার আশঙ্কা করে থাকো, তাহলে এখনই পিছু হটে যাও।

    আল্লাহর কসম, যদি তোমরা তা করো, তবে এ দুনিয়া ও আখেরাতে তোমরা হবে চরম ভাবে লাঞ্চিত। কিন্তু, যদি তোমরা আনুগত্যের শপথ পূর্ণ করো, তবে তোমাদের সম্পদের ক্ষতি বা সম্মানিত ব্যক্তিরা নিহত হলেও এটাই তোমাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে বয়ে নিয়ে আসবে সাফল্য।” মদীনার মুসলিমদের দলটি এ সকল শর্তেই আল্লাহর রাসূল (সা) এর আনুগত্য মেনে নিলো এবং জিজ্ঞেস করলো, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনার আনুগত্য করার বিনিময়ে আমরা কি পাবো?” রাসূলুল্লাহ (সা) দৃঢ় ভাবে উত্তর দিলেন, “জান্নাত।”

    তারা তাদের হাত বাড়ালেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-ও তাঁর হাত বাড়ালেন, অতঃপর তারা এ বলে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর সাথে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন যে, “আমরা এই বলে শপথ গ্রহন করছি যে, আমরা সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ সর্বাবস্থায়ই আপনার আনুগত্য করবো। সর্বদা সত্য কথার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবো এবং আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করতে কারো সামনেই মাথা নত করবো না”। শপথ গ্রহন শেষে আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, “তোমাদের মধ্যে সমাজে নেতৃস্থানীয় যে বারোজন আছে, তাদের আমার কাছে নিয়ে আসো।” তারা খাযরাজ গোত্র থেকে নয়জন এবং আউস গোত্র থেকো তিনজনকে নিয়ে আসলেন। রাসূল (সা) এ সকল গোত্র প্রধানদের বললেন, “তোমরা তোমাদের জনগণের উপর দায়িত্বশীল, যেভাবে ঈসা(আ) ছিলেন তাঁর অনুসারীদের উপর দায়িত্বশীল। আর আমি আমার লোকদের উপর দায়িত্বশীল।”একথা শোনার পর তারা যে যার শয্যায় ফিরে গেলেন, অতঃপর নিজ নিজ ক্যারাভানে পৌঁছে মদীনায় ফিরে আসলেন।

    তারপর, আল্লাহর রাসূল (সা) মুসলিমদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দিলেন এবং মুসলিমরাও এ নির্দেশ অনুযায়ী একাকী কিংবা ছোট ছোট দল গঠন করে মক্কা ত্যাগ করতে শুরু করলো। ইতিমধ্যে কুরাইশদের কাছে শপথ গ্রহনের খবর পৌঁছে গেলে তারা মুসলিমদের হিজরতে বাঁধা দিতে লাগলো। তারা স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের মাঝে এসে দাঁড়ালো যেন তারা মক্কা ত্যাগ না করতে পারে। কিন্তু, তা সত্তেও মুসলিমদের মক্কা থেকে মদীনা যাত্রা অব্যাহত থাকলো। আল্লাহর রাসূল (সা) মক্কায় রয়ে গেলেন এবং তিনি আদৌ মদীনায় যাবেন কিনা এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও কাউকে দিলেন না। কিন্তু, বিভিন্ন ঘটনা থেকে এটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনিও মক্কা ত্যাগ করবেন। মুহাম্মদ (সা) কিছু না বলা পর্যন্ত আবু বকর (রা) তাঁর কাছে হিজরতের অনুমতি চাইতে থাকলেন। এক পর্যায়ে, আল্লাহর রাসূল (সা) বললেন, “এতো তাড়াহুড়ো করো না, এমনও হতে পারে যে আল্লাহ তোমার জন্য একজন সফরসঙ্গী নির্ধারন করে দেবেন।” আবু বকর (রা) তখন বুঝতে পারলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) হিজরত করতে চাচ্ছেন।

    আল্লাহর রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করবেন এটা বুঝতে পেরে কুরাইশরা খুবই চিন্তিত হয়ে গেলো। কারণ, তারা জানতো যে মদীনায় মুসলিমদের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নিঃসন্দেহে সেখানে মুসলিমরা এখন অনেক বেশী শক্তিশালী। তার উপর যদি মক্কার মুসলিমরাও মদীনায় হিজরত করে তবে মুসলিমদের প্রভাব-প্রতিপত্তি স্বভাবতই আরও বৃদ্ধি পাবে। তারা এটাও আশঙ্কা করছিলো যে, রাসূল (সা) যদি কোনভাবে মদীনায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে তাহলে তাদের অস্তিত্ব হবে বিপন্ন। এজন্য তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর মদীনা গমন কিভাবে ঠেকানো যায় তা নিয়ে দিনরাত চিন্তা-ভাবনা করতে লাগলো। আবার চিন্তা করে দেখলো যে, রাসূলুল্লাহ (সা) যদি মক্কায়ও থেকে যায় তাহলেও মদীনার মুসলিমরা তাদের নবীর সম্মান রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হবে কুরাইশদের বিরুদ্ধে। তখন তাদের সংঘবদ্ধ এ শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করা হয়ে যাবে আরেক সমস্যা। সবদিক ভেবেচিন্তে তারা মদীনার মুসলিম, ইসলাম এবং মুহাম্মদের সাথে সম্ভাব্য সকল সংঘর্ষ এড়ানোর লক্ষ্যে আল্লাহর রাসূল (সা)-কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো এবং সেইসাথে নবী (সা)-কে মদীনায় হিজরতে বাঁধা দেবার কৌশল অবলম্বন করলো।

    সীরাতের গ্রন্থগুলোতে ’আয়িশা (রা) এবং আবু উমামাহ ইবন শাম কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, আকাবার উপত্যকায় ৭৩ জন মুসলিম উপস্থিত হয়ে

    যখন মুহাম্মদ (সা)-কে নিরাপত্তা ও সবরকম সহায়তা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ হলো, তখন থেকেই হিজরত করতে চাওয়ায় মক্কার মুসলিমদের উপর কাফিরদের অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা প্রচন্ড আকার ধারণ করলো। কুরাইশরা তাদের যেখানে সেখানে অপমান ও বিভিন্ন ভাবে আক্রমণ করতে লাগলো। তারা এ ব্যাপারে মুহাম্মদ (সা)এর কাছে অভিযোগ করলে তিনি উত্তরে বললেন, “আমাকে তোমাদের হিজরতের জন্য বাসভূমি নির্ধারন করে দেয়া হবে।

    এর কিছুদিন পরেই তিনি অত্যন্ত আনন্দের সাথে বললেন, “আমাকে বলা হয়েছে যেন তোমরা ইয়াসরিবে (মদীনায়) হিজরত করো। যে ব্যক্তি সেখানে যেতে চায় সে যেন নিশ্চিন্তে তার যাত্রা শুরু করে।” এ নির্দেশের পরপরই মুসলিমরা শহর ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো । তারা গোপনে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মক্কা ত্যাগ করতে লাগলো। কিন্তু, আল্লাহর রাসূল (সা) তখনও তাঁর নিজের ব্যাপারে আল্লাহর অনুমতির অপেক্ষা করছিলেন। আবু বকর (রা) তাকে বারবার এ ব্যাপারে প্রশ্ন করায় তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, “এতো তাড়াহুড়ো করো না, এমনও হতে পারে আল্লাহতায়ালা তোমার জন্য একজন সফরসঙ্গী নির্বাচন করে দেবেন”। আবু বকর (রা) মনে মনে প্রত্যাশা করতে লাগলেন যে, আল্লাহ তা’য়ালা হয়তো স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-কেই তাঁর সফরসঙ্গী হিসাবে নির্বাচন করবেন।

    কুরাইশরা মুসলিমদের দলে দলে মক্কা ত্যাগের কথা জানার সাথে সাথেই বুঝতে পারলো যে, খুব শীঘ্রই লড়াই এর ময়দানে তাদের রাসূল (সা)-কে মুকাবিলা করতে হবে। তারা কুরাইশদের দারুল নাদওয়ার পরামর্শ কক্ষে একত্রিত হয়ে কিছুক্ষন তর্কবিতর্কের পর মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যার সিদ্ধান্তে উপনীত হলো। জিবরাইল (আ) মুহাম্মদ (সা)-কে এ ঘটনা অবহিত করলেন এবং তাকে নিজ শয্যায় না ঘুমানোর নির্দেশ দিলেন। সে রাত্রে তিনি(সা) তাঁর শয্যায় ঘুমানো থেকে বিরত থাকলেন এবং এ সময়েই আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের অনুমতি আসলো।

    মদীনায় ইসলামের শক্তিশালী অস্তিত্ব হিসাবে আত্মপ্রকাশ, সেখানকার মানুষের মধ্যে আল্লাহর রাসূল (সা)-কে গ্রহণ করার মতো স্বতঃস্ফুর্ততা এবং সর্বোপরি সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র্ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাই মুহাম্মদ (সা)-কে মদীনায় হিজরত করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। যে কারও এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বা এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করা একেবারেই অনুচিত হবে যে, কুরাইশরা তাকে হত্যা করে ফেলতে পারে এই ভয়ে তিনি (সা) মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। তিনি (সা) তাঁর উপর আপতিত বিপদ-আপদ বা অত্যাচার-নির্যাতন নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত ছিলেন না, বরং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সবসময়ই তাঁর জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। বস্তুতঃ তাঁর হিজরতের মূল উদ্দেশ্যই ছিলো দাওয়াতী কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সেই সাথে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য অর্জনে ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করা। এছাড়া এটাও পরিষ্কার যে, কুরাইশরা মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করতে চেয়েছিলো এই ভয়ে যে, তিনি মদীনায় পৌঁছে গেলে পূর্ণ নিরাপত্তা ও সামরিক শক্তির অধিকারী হবেন। কিন্তু, সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পরও কুরাইশরা তাদের ষড়যন্ত্র সফল করতে ব্যর্থ হলো। রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করলেন এবং তাদের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণিত করে, তাঁর এ হিজরতের ঘটনাই ইসলামের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করলো। এটা মূলতঃ মানুষকে সত্য দ্বীনের পথে আহবানের অধ্যায় থেকে আল্লাহর দ্বীনের আলোকে একটি ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার অধ্যায়ে প্রবেশ করলো। প্রতিষ্ঠিত হলো ইসলামী রাষ্ট্র যেখানে শাসন-কর্তৃত্ব হলো শুধুই আল্লাহর। এছাড়া  ইসলামী  রাষ্ট্র  আল্লাহর  দ্বীনকে  প্রাত্যহিক  জীবনে  বাস্তবভাবে  প্রয়োগ  করে,  যৌক্তিক প্রমাণের মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের পথে আহবান করলো এবং এর সামরিক শক্তি মুসলিমদের রক্ষা করলো সকল প্রকার বিপদ-আপদ এবং শত্রুদের জুলুম-নিপীড়ন ও অত্যাচার থেকে।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ১০ (মদীনায় দাওয়াতী কার্যক্রম)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    আনসারদের যে দলটি রাসূল (সা) এর সাথে আকাবায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলো, তারা মদীনায় ফিরে যাবার পর সেখানকার প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় ইসলামের আহবান। পরবর্তীতে তারা আল্লাহর রাসূল (সা) এর কাছে দ্বীন ও কুরআন শিক্ষার জন্য মদীনায় একজনকে পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে চিঠি প্রেরণ করে। রাসূল (সা) সাধারনত যারা ইসলাম গ্রহন করতো তাদেরকে পরিপূর্ণ ভাবে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করতেন এবং তাদেরকে ব্যক্তিত্বকে ইসলামের আলোকে গঠন করতেন, যেন তারা পুরোপুরি ভাবেই ইসলামের আদর্শকে উপলব্ধি করতে পারে। বস্তুতঃ ইসলামের আলোকে চরিত্র গঠন করা প্রতিটি মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব, কারণ এর উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠে চেতনাদৃপ্ত দৃঢ় ঈমান ও মানুষ বুঝতে পারে ইসলামের অর্ন্তনিহিত আদর্শ এবং ইসলামের আদর্শকে পরিপূর্ণ ভাবে বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা প্রদান করে। মদীনার যে দলটি ইসলাম গ্রহন করেছিলো তারা এটা বুঝতে পেরেছিলো বলেই রাসূল (সা)-কে দ্বীন শিক্ষার জন্য একজন সাহায্যকারী পাঠানোর দাবী করেছিলো। চিঠি পাবার পর, মুহাম্মদ (সা) মদীনায় মুস’আব ইবন উমায়েরকে নও মুসলিমদের দ্বীন শিক্ষার জন্য পাঠান।

    মদীনায় আগমনের পর মুস’আব ইবন উমায়ের আসা’দ ইবন জুরারাহর সাথে জুটিবদ্ধ হয়ে পূর্ণ উদ্যমে দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন। তারা ইসলামের আহবান পৌঁছে দেন মদীনার বিভিন্ন গৃহ থেকে শুরু করে বেদুঈনদের ছাউনীগুলোতে পর্যন্ত। মদীনাবাসীকে কুরআন পাঠ করে শোনান। এভাবে ধীরে ধীরে একজন দু’জন মানুষ ইসলাম গ্রহন করতে শুরু করে। এ অবস্থা চলতে থাকে ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন পর্যন্ত না আউস আল-াহ জাতিভুক্ত খাতমাহ্, ওয়া’লী এবং ওয়াকিফ গোত্র ছাড়া আনসারদের প্রতিটি গৃহে ইসলামের আহবান ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর তিনি রাসূল (সা)-এর কাছে নও মুসলিমদের একত্রিত  করার অনুমতি চেয়ে পত্র লিখেন। রাসূল (সা) তাকে অনুমতি প্রদান করেন এবং বলেন, “ইহুদীরা সাববাথের ঘোষনা দেয়া পর্যন্ত তোমরা অপেক্ষা করবে। তারপর, বিকেলবেলায় আল্লাহর উদ্দেশ্যে সম্মিলিত ভাবে দু’রাকাত নামাজ আদায় করবে এবং  নামাজ  শেষে  তোমার  বক্তব্য (খুতবা)  প্রদান  করব”। রাসূল (সা)  এর  আদেশক্রমে,  মুস’আব  ইবন  উমায়ের  নও  মুসলিমদের  সা’দ  ইবন খায়সামার গৃহে একত্রিত করেন। প্রায় বারোজন মদীনাবাসী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি একটি ছাগল জবাই করে তাদের আপ্যায়ন করেন। ইতিহাস অনুযায়ী মুস’আব ইবন উমায়েরই হচ্ছে প্রথম মুসলিম যিনি জুমার নামাজ প্রতিষ্ঠিত করেন।

    মুস’আব ইবন উমায়ের এভাবে মদীনায় তার দাওয়াতী কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন এবং মদীনাবাসীকে দ্বীন শিক্ষা দিতে থাকেন। একদিন আসা’দ ইবন জুরারাহ মুস’আব ইবন উমায়েরকে সঙ্গে করে বনু আল-আসহাল এবং বনু জা’ফর এর এলাকায় প্রবেশ করে (ঘটনাক্রমে সা’দ ইবন মুয়াজ ছিলো আসা’দ ইবন জুরারার মায়ের সম্পর্কের ভাই)। তারা দু’জন এবং মদীনার আরও কিছু নও মুসলিম বনু জা’ফর গোত্রের এলাকাভুক্ত মারক্ব নামের একটি কুপের পাশে একত্রিত হয়। এ সময়ে সা’দ ইবন মুয়াজ এবং উসাইদ ইবন হুদায়ের ছিলো তাদের নিজ নিজ গোত্রের প্রধান। বনু ’আবদ আল-আসহাল এবং অন্যান্য গোত্রগুলোও তাদের অনুসরনকারী মুর্তিপূজারী ছিলো। যখন সা’দ ইবন মুয়াজ শুনলো যে, মুস’আব ইবন উমায়ের তাদের এলাকায় প্রবেশ করেছে, তখন সাথে সাথে সে উসাইদ ইবন হুদায়েরকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়ে বললো, “যারা আমাদের এলাকায় প্রবেশ করে আমাদের গোত্রের লোকদের বোকা বানাচ্ছে তাদের কাছে যাও। তাদের আমাদের সীমানা থেকে বের করে দিয়ে বলো যেন তারা আর কখনো আমাদের এলাকায় প্রবেশ না করে।”

    সা’দ ইবন মুয়াজ আরও বলে যে, আসা’দ ইবন জুরারার সাথে যদি আমার আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো তবে আমি তোমাকে এ ঝামেলার মধ্যে ঠেলে দিতাম না। কিন্তু, সে আমার সম্পর্কে খালাতো ভাই, তাই আমার পক্ষে তার বিরুদ্ধে কোনকিছু করা সম্ভব নয়। একথা বলার পর, উসাইদ তার বর্শা তুলে নিলেন এবং মুস’আব ইবন উমায়ের এর দলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। আসা’দ উসাইদকে দেখার সাথে সাথে মুস’আবকে বললেন, “এই যে লোকটি তোমার দিকে আসছে সে হলো এ গোত্রের প্রধান। তুমি তাকে আল্লাহ ওয়াস্তে সত্য কথা পরিস্কার ভাবে জানিয়ে দাও”। মুস’আব বললো, “যদি সে আমাদের সাথে বসতে রাজী হয়, তবে আমি তার সাথে কথা বলবো”। উসাইদ ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে তাদের সামনে এসে দাঁড়ালো এবং বললো, “কেন তোমরা আমাদের মধ্যকার দূর্বল লোকদের বিভ্রান্ত করছো? তোমাদের উদ্দেশ্য কি? আমাদেরকে আমাদের বিশ্বাসের উপর ছেড়ে দাও”। মুস’আব বললেন,“আপনি কি আমাদের সাথে বসে একটু আমাদের কথা শুনবেন? যদি আমাদের কথা আপনার ভালো লাগে তাহলে গ্রহন করবেন। আর যদি না ভালো লাগে তাহলে প্রত্যাখান করবেন”। উসাইদ মুস’আব ইবনে উমায়ের এর এ যৌক্তিক প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলেন। তারপর তার বর্শা মাটিতে গেঁথে মসা’বের সামনে বসলেন। মুস’আব (রা) তাকে ইসলামের আদর্শ ও জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করলেন এবং কুরআন তিলওয়াত করে শোনালেন। উপস্থিত মুসলিমদের বর্ণনা অনুযায়ী, “আল্লাহর কসম, সে কিছু বলবার আগেই আমরা ইসলামের দীপ্তি তার চোখেমুখে লক্ষ্য করছিলা”। উসাইদ বললো, “কি চমৎকার কথাই না তোমরা বলছো! তো তোমাদের দ্বীন গ্রহন করতে হলে আমাকে কি করতে হবে?” তারা বললো, “তোমাকে অবশ্যই প্রথমে গোসলের করে পবিত্র হতে হবে, তোমার পোশাক পবিত্র করতে হবে, তারপর সত্যকে সাক্ষী দিয়ে শাহাদাহ পাঠ করার পর দু’রাকাত নামাজ আদায় করতে হবে”। উসাইদ সাথে সাথে তাই করলেন এবং বললেন, “আমার পেছনে আমি এক ব্যক্তিকে রেখে এসেছি, সে যদি তোমাদের দ্বীন গ্রহন করে তবে তার গোত্রের লোকেরাও তাকে অনুসরন করবে। আমি এখনই তাকে তোমাদের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তার নাম হচ্ছে সা’দ ইবন মুয়াজ।”

    উসাইদ তার বর্শা হাতে দ্রুত পায়ে সা’দ ইবন মুয়াজের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন। সা’দ তখন তার গোত্রের লোকদের সাথে বসে আলোচনা করছিলো। যখন সা’দ উসাইদকে আসতে দেখলেন সে বললো, “আল্লাহর কসম, যে উসাইদ এখান থেকে গিয়েছে আর যে ফিরে এসেছে তারা দু’জন এক নয়”। অতঃপর উসাইদ আসার পর তার কাছে সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলেন, বললেন, “আমি দু’ব্যক্তির সাথে কথা বলেছি এবং তাদের মধ্যে কোনরকম খারাপ কোনকিছু দেখতে পাইনি। আমি তাদের কাজে আর অগ্রসর হতে নিষেধ করার পর তারা বলেছে, তুমি যেটা বলবে আমরা সেটাই করবো; তারপর তারা বললো, আসা’দ ইবনে জুরারাহ তোমার খালাতো ভাই হয় এটা জানার পরও বনু হারিছাহ গোত্র তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলো যেন তুমি সমাজের কাছে আত্মীয়ের মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ এবং বিশ্বাসঘাতক হিসাবে প্রমাণিত হও।

    বনু হারিছাহ গোত্র সম্পর্কে একথা শোনার সাথে সাথে সা’দ ইবন মুয়াজ ক্রোধান্বিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। তারপর তার বর্শা হাতে নিয়ে বললো, “আল্লাহর কসম, আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি আসলে তোমার কাজে ব্যর্থ হয়েছো।”তারপর সে মুস’আব এবং আসা’দ এর উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলো। সেখানে গিয়ে সা’দ দেখলো তারা খুব আয়েশের সাথে দলবল নিয়ে সেখানে বসে আছে। সা’দ ইবন মুয়াজ বুঝলো আসলে উসাইদের ইচ্ছা ছিলো সে যেন তাদের কথা শোনে। অত্যন্ত রাগান্বিত আর আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে সে তাদের পাশে গিয়ে দাড়াঁলো এবং আসা’দকে উদ্দেশ্য করে বললো, “শোন আবু উমামা, আমাদের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে সে সম্পর্কের ভিত্তিতেই কি তোমার আমার প্রতি আচরন করা উচিত নয়? তুমি কি আমার বাসভূমিতে এসে এমন কিছু করতে চাও যা আমরা ঘৃণা করি?” ইতিমধ্যে সা’দকে দেখার সাথে সাথে আসা’দ মুস’আবকে বলেছিলো, “হে মুস’আব, আল্লাহর কসম, এই গোত্রগুলো যাকে অনুসরন করে সে নিজেই এখন তোমার সামনে উপস্থিত। সে যদি তোমার অনুসরনকারী হয়, তবে তার গোত্রের কোন লোকই আর পিছে পরে থাকবে না।”মুস’আব তাকে আগের মতোই বললেন, “আপনি কি বসে একটু আমাদের কথা শুনবেন না? যদি আপনার আমাদের কথা ভালো লাগে তাহলে গ্রহন করবেন আর না ভালো লাগলে প্রত্যাখান করবেন।”মুস’আব ইবন উমায়ের এর এ যৌক্তিক প্রস্তাবে সা’দ রাজী হয়ে গেলো এবং তার বর্শা মাটিতে গেঁথে তাদের সামনে বসলো। মুস’আব তাকে ইসলামের আদর্শ ব্যাখ্যা করলেন এবং কুরআন তিলওয়াত করে শোনালেন।

    উপস্থিত মুসলিমদের বণর্না অনুযায়ী, “আল্লাহর কসম, সে কিছু বলবার আগেই আমরা ইসলামের দীপ্তি তার চোখে মুখে দেখতে পাচ্ছিলাম”। উসাইদের মতো একই ভাবে সা’দ বললো, “কি চমৎকার কথাই না তোমরা বলছো! তো তোমাদের দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে আমাকে কি করতে হবে?” মুসলিমরা বললো এজন্য তোমার নিজেকে এবং তোমার পোশাক-পরিচ্ছদকে পবিত্র করতে হবে। তারপর সত্যের সাক্ষ্য হিসাবে শাহাদাহ পাঠ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করতে হবে। একথা শোনার পর সা’দ ইবন মুয়াজ তৎক্ষনাৎ তাই করলো এবং বর্শা হাতে তার গোত্রের লোকদের কাছে ফিরে গেলো। সেখানে উসাইদ ইবন হুদায়ের তার গোত্রের লোকদের সাথে আলোচনা করছিলেন। তারা সা’দকে আসতে দেখে বললো, “আল্লাহর কসম, যে সা’দ আমাদের এখান থেকে গিয়েছে আর যে ফিরে এসেছে তারা দু’জন এক নয়”। গোত্রের লোকেরা তার পথ রোধ করে দাঁড়ালে সা’দ ইবন মুয়াজ তাদের জিজ্ঞেস করলো, “হে বনু আবদ আল-আসহাল, তোমরা তোমাদের উপর আমার কর্তৃত্বকে কিভাবে পরিমাপ করো?” তারা বললো, “আপনি আমাদের গোত্র প্রধান, আমাদের সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে সর্বাপেক্ষা বেশী সজাগ, সবচাইতে ন্যায়বিচারক এবং নেতা হিসাবে সবচেয়ে বেশী সৌভাগ্যবান”। একথা শোনার পর সা’দ বললো, “আমি ততক্ষন পর্যন্ত তোমাদের সাথে কথা বলবো না যতক্ষন পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমান আনো”। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবদ আল-আসহাল গোত্রের সকলে ঈমান আনলো। মুস’আব ইবন উমায়ের তারপর আসা’দ ইবন জুরারাহর গৃহে ফিরে আসলেন এবং তার গৃহেই অতিথি হিসাবে বাস করতে লাগলেন। এর সাথে তিনি তার দাওয়াতী কার্যক্রমও অব্যহত রাখলেন যে পর্যন্ত না আনসারদের প্রতিটি গৃহে অন্তত একজন মুসলিম নারী ও পুরুষ ইসলাম গ্রহন করলো। এভাবে মুস’আব ইবন উমায়ের একবছর মদীনাতে অবস্থান করলেন, আউস ও খাযরাজ গোত্রকে দ্বীন শিক্ষা দিলেন এবং বুক ভরা আনন্দ নিয়ে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন আল্লাহর শাসন-কর্তৃত্ব ও সত্য দ্বীনের সাহায্যকারীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা।

    মুস’আব (রা) সাধারনত মদীনার প্রতিটি গৃহে যেতেন, তাদের সাথে কথা বলতেন এবং তাদের কাছে আল্লাহর রাসূল (সা) এর আহবান পৌঁছে দিতেন। তিনি মদীনার ক্ষেত-ক্ষামারে গিয়ে কৃষকদের সাথে কথা বলতেন এবং তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করতেন। তিনি মদীনার নেতৃস্থানীয় মানুষদের সাথেও বিতর্ক করতেন এবং তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিতেন। দাওয়াতের বিস্তৃতির ব্যাপারে তিনি প্রায়ই কিছু কৌশল অবলম্বন করতেন, যেমনটি তিনি করেছিলেন আসা’দ ইবন জুরারাহর ক্ষেত্রে, যেন সত্য দ্বীনের আহবান সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এ রকম বিভিন্ন কৌশলপূর্ন দাওয়াতী কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি একবছরের মধ্যে সে সমাজের মানুষের মুর্তিপূজার মতো বিকৃত ও ক্ষয়ে যাওয়া ধ্যান-ধারনা ও ভ্রান্ত আবেগ-অনুভূতিগুলোকে পরিবতর্ন করে তাদের মধ্যে তাওহীদ, ঈমান ও ইসলামী চিন্তা-চেতনার বীজ বপন করেছিলেন। যা তাদের অন্তর থেকে শিরক এর সকল শাখা-প্রশাখাকে সমূলে উৎপাটিত করেছিলো এবং তাদের প্রতারনা, ঠকবাজি সহ সকল পাপের  পথ  থেকে  বিরত  রেখেছিলো।  মুস’আব  ইবন  উমায়ের  এবং  ইসলাম  গ্রহনকারী  মুসলিমদের  নিরলস  প্রচেষ্টা  ও  বিভিন্ন  কার্যক্রম মাত্র একবছরের মধ্যে মদীনাবাসীকে শিরকের নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত জনগোষ্ঠি থেকে পরিণত করে ইসলাম গ্রহনকারী জনগোষ্ঠিতে।