তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর পূর্বের লেনদেন, চুক্তি ও বিচারিক রায়ের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত হবে?
পুনঃরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে:
১। পুর্বে যে সকল বিষয়ে বিচার কার্যকর হয়েছে?
২। পুর্বের যেকোন লেনদেন
৩। বর্তমানের যেকোন চুক্তিগুলো কি করা হবে? তা হতে পারে ব্যাক্তি পর্যায়ে বা সরকার পর্যায়ে।খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেকার চুক্তি, লেনদেন ও বিচারিত রায় যা নিষ্পন্ন হয়েছে এবং কার্যকর করা হয়ে গেছে তা খিলাফতের আগের সময়ে বৈধ। খিলাফতের বিচারব্যবস্থা এ ব্যাপারে কোন হস্তক্ষেপ করবে না বা মামলা পুনরায় শুরুও করবে না। এদের ব্যাপারে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর নতুন কোন মামলা গৃহীত হবে না।
তবে দুটি বিষয় এর বাইরে থাকবে;
১) খিলাফতের পূর্বে যে মামলাটি নিষ্পন্ন হয়েছে এবং কার্যকরী হয়েছে যদি এর ধারাবাহিকতা খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পরও রয়ে যায় এবং তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হয়।
২) যদি মামলাটি এমন কারও বিরুদ্ধে হয়ে থাকে যার কারণে মুসলিমগণ ও ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপরোক্ত দুটি বিষয়েরর বাইরে বাকি সব চুক্তি, লেনদেন ও বিচারিত রায় যা নিষ্পন্ন হয়েছে এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেই কার্যকর করা হয়ে গেছে, এগুলো খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর পুনরায় শুরু না করার ব্যাপারে দলীল হল রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা বিজয়ের পর যে বাড়ি থেকে হিজরত করেছিলেন সে বাড়িতে ফেরত যাননি।
যে সব মুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছে ও হিজরত করেছে তাদের ঘরবাড়ি কুরাইশদের নিয়ম অনুসারে তাদের আত্মীয়রা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে যায়। একই ভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) এর ঘরবাড়ি তার আত্মীয় উকাইল ইবনে আবি তালিব উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে যায়। উকাইল রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাড়িগুলো গ্রহণ করে এবং বিক্রি করে । মক্কা বিজয়ের পর সেসময় রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “আপনি কোন বাড়িতে থাকতে চাচ্ছেন?” তিনি (সা:) বললেন, “উকাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?”
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, “উকাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?” উকাইল রাসূলুল্লাহ (সা) বাড়ি বিক্রয় করে দিয়েছে এবং তিনি (সা) এসব চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন নি।
উসামা বিন জায়েদ থেকে আল বুখারী বর্ণনা করেন, ‘মক্কা বিজয়ের দিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘” রাসূলুল্লাহ (সা:), আগামী কাল আপনি কোথায় থাকতে চান?’” নবী(সা) বললেন, ‘”কাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?”
এ ব্যাপারে আরও বর্ণিত আছে যে, আবু আল আস ইবনে আল রাবী ইসলাম গ্রহণ করেন ও মদিনায় হিজরত করেন। তবে তার আগে তার স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করে এবং বদরের পর মদিনায় হিজরত করেন এবং তখনও আল রাবী মক্কায় মুশরিক ছিলেন। মুসলিম হবার পর রাসূলুল্লাহ (সা) আল রাবীর স্ত্রীকে বিবাহ চুক্তি নবায়ন না করেই তার কাছে ফেরত যেতে অনুমতি দেন। এটা ছিল জাহেলিয়াতের সময়কার বিবাহ চুক্তির স্বীকৃতি প্রদান।
ইবনে আব্বাস (রা) এর বরাত দিয়ে ইবনে মাজাহ বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সা) তার কন্যা জায়নাবকে দু’বছরের পর আবু আল আস ইবনে আল রাবী’র কাছে ফেরত পাঠান, প্রথম বিবাহ চুক্তির ভিত্তিতে।”
সুতরাং,
ক. খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর পূর্বেকার যেসব লেনদেন ও মামলার ধারাবাহিকতা রয়ে যায় যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক সেসব সম্পর্কে দলিল হল, লোকদের উপর ইবনে আব্বাসের ঋণের যে সুদ ছিল তা ইসলামী রাষ্ট্রে রাসূলুল্লাহ(সা) মওকুফ করে দিয়েছিলেন এবং তারা কেবলমাত্র আসল পরিশোধ করেছিল। অর্থাৎ দারুল ইসলামে পূর্বেকার প্রাপ্য সুদ বাতিল বলে গণ্য হবে।
সুলায়মান ইবনে আমরুর মাধ্যমে তার পিতা হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেন, আমি বিদায় হজ্বের ভাষণে রাসূলকে (সা:) বলতে শুনেছি, “লক্ষ্য কর! আজ থেকে জাহেলিয়াতের সময়কার যে কোন ধরনের সুদ বাজেয়াপ্ত। তোমরা কেবলমাত্র আসল পাবার দাবী রাখ এবং এ ব্যাপারে কারও প্রতি অন্যায় কর না এবং অন্যায়ের শিকারও না।”
এছাড়াও জাহেলিয়াতের সময় যাদের চারের অধিক স্ত্রী ছিল তাদেরকে চারজন রেখে বাকীদের ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেন যে, “ঘাইলাম ইবনে সালামা ইবনে ছাকাফী যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী ছিল যারাও তার সাথে ইসলাম গ্রহণ করে।”
‘রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে স্ত্রীগণের মধ্য হতে চারজনকে পছন্দ করবার নির্দেশ দেন।’
সুতরাং, পূর্বেকার যেসব চুক্তির ধারাবাহিকতা রয়েছে যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর সেগুলো বাতিল করতে হবে এবং এটা ফরয।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কোন মুসলিম নারী খিলাফতের পূর্বে কোন খ্রিস্টান পুরুষকে বিয়ে করে থাকে, তাহলে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথে শরীয়াহ’র নিয়ম অনুসারে সে বিয়ে বাতিল বলে গণ্য হবে।
খ. যেসব ব্যক্তিবর্গ ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর মামলা করা অনুমোদিত। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা বিজয়ের পর কিছু কিছু কাফেরের রক্তপাতের ক্ষমার ঘোষণা দেন নি যেহেতু তারা জাহেলিয়াতের সময় মুসলমান ও ইসলামদের ক্ষতিসাধন করেছিল। তিনি বলেছেন, তারা যদি কাবার পর্দা ধরে ঝুলেও থাকে তবুও তাদের হত্যা করা হবে।
অথচ তিনি তার আগে বিপরীত ঘোষণা দিয়েছিলেন, “ইসলাম তার পূর্বের যা এসেছে তাকে অপসারণ করেছে“- যা আমরু ইবনে আল আস থেকে আহমদ ও তাবারাণী বর্ণনা করেন। এর অর্থ হল এই হাদীস মুসলমান ও ইসলামের যারা ক্ষতিসাধন করেছিল তারা এর অন্তর্ভুক্ত নয় অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা যাবে। অন্যদিকে যেহেতু রাসূলুল্লাহ(সা) তাদের অনেককে আবার ক্ষমা করে দিয়েছিলেন (যেমন: ইকরিমা বিন আবি জাহল) সেহেতু এর অর্থ হলো যারা মুসলমানদের উপর অত্যাচার করেছে এবং ইসলামের ব্যাপারে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে খলীফা ইচ্ছে করলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে পারেন বা ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
উপরোক্ত দু’টি বিষয় বাদে বাকি সব ক্ষেত্রে যেমন, বিভিন্ন চুক্তি, লেনদেন ও মামলা যা খিলাফতের আগে সম্পন্ন ও কার্যকরী হয়ে গেছে সেসবের ব্যাপারে পুনরায় মামলা হবে না বা বাতিল হবে না।
যেমন, একজন লোক কোন স্কুলের দরজা ভাঙ্গার দায়ে দু’বছরের কারাদণ্ডাদেশ ভোগ করে এবং এ দু’বছর খিলাফত প্রতিষ্ঠার আগেই শেষ হয়ে যায়। নিজেকে নির্দোষ মনে করে খিলাফত আসার পর যদি সে ব্যক্তি তার নামে অভিযোগকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করতে চায় তবে সে মামলা গৃহীত হবে না। কেননা এই ঘটনা, এর বিচার প্রক্রিয়া ও প্রয়োগ খিলাফতের আগেই সুসম্পন্ন হয়েছে। এ বিষয়টি ঐ ব্যক্তিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে পুরষ্কার পাবার আশায় পেশ করতে হবে। কিন্তু যদি এরকম হয় যে, ঐ ব্যক্তিকে দশ বছরের দণ্ডাদেশ প্রদান করা হয় এবং শাস্তিভোগের দু’বছরের মাথায় খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে খলীফা এই মামলাকে পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। এতে হয়তো মামলাটি গোঁড়া থেকেই বাতিল হতে পারে ও তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে দিয়ে অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিতে পারে অথবা যে শাস্তি হয়েছে তা পর্যাপ্ত মনে করেও মুক্তি দিতে পারে।
একইভাবে, বর্তমানে আমদের দেশে তাবেদার সরকারগুলো অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যে সকল চুক্তি করছে যেমন- ভারতের সাথে করা ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট, খণিজ সম্পদকে ব্যাক্তিমালিকানায় প্রদান অথবা আমেরিকার সাথে সেনাবাহিনী বিষয়ক চুক্তি যা মুসলিমদের স্বার্থবিরোধী তা পুনরায় খিলাফত প্রতিষ্ঠা হলে অবশ্যই বাতিল করা হবে। শুধুমাত্র সে সকল চুক্তি যা ইসলামী শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়, তা বহাল রাখা যেতে পারে।
মুরসি পরবর্তী মিশর কোন দিকে যাচ্ছে?

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির ক্ষমতা চ্যুতির পরে, মিশর আবারো অস্থিতিশীল অবস্থায় পরিণত হয়েছে। মুরসির স্বপক্ষে ও বিপক্ষে হাজারো সমর্থক রাস্তায় অবস্থান করছে। তারা পরস্পর এবং সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ায় সহিংস ঘটনার সূত্রপাত ঘটছে। মুরসির সংঘটন, মুসলিম ব্রাদারহুড দেশকে সিরিয়ার মতো সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানকে অভিযুক্ত করেছে। রিপাবলিক গার্ড কম্পাউন্ডের সামনে সেনাবাহিনী কতৃক মুরসির সমর্থক ৫১ জন হত্যা ও ৪৩০ জন আহত হওয়ার পর ব্রাদারহুড এই অভিযোগ তুলল। অপরদিকে সেনাবাহিনী আন্দোলনরত মুরসির সমর্থকদের “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়েছে। বিদ্যমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে তাকালে যে কারো প্রশ্ন জাগবে, কোন দিকে যাচ্ছে মিশর?
মূলত তিনটি কারণের ভিত্তিতে সেকুলার দলগুলো জনগণকে রাস্তায় নামাতে সক্ষম হয়েছে। কারণগুলো হল শোচনীয় অর্থনৈতিক অবস্থা, দেশ পরিচালনায় ব্রাদারহুডের অযোগ্যতা ও আরব বসন্ত পরবর্তী জনগণের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করা। ১৯৫২ সালের সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন জামাল আবদেল নাসের পরবর্তী মিশরের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী একমাত্র ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান। যা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে যখন মিশরের আগের সব প্রেসিডেন্টের সবাই সেনাবাহিনীর সাবেক নেতা। মুসলিম ব্রাদারহুডের উত্থান ছিল মূলত তুরস্কের উসমানীয় খিলাফত ধবংসের প্রতিক্রিয়া স্বরপ। দীর্ঘ ৮৫ বছরের সংগ্রাম, উম্মার ইসলামী আবেগ ও ২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্ত পরবর্তী আমেরিকার মদদপুষ্ট সেনাবাহিনী ব্রাদারহুডের ক্ষমতা আরোহণে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়। মিশরের রাজনীতিতে সেকুল্যার দলগুলোর ভঙ্গুর অবস্থানের কারণে বরাবরি মুসলিম ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান তথা প্রভাব বাড়ুক তা মোটেও চায়না। তাই তারা বিদ্যমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো লিবারাল ইসলামি দলগুলোকে স্বাগত জানাতে আগ্রহী। লিবারাল ইসলামি দলগুলোর রাষ্ট্র নেতৃত্বে আসীন হওয়ায় আমেরিকা মোটেও চিন্তিত নয়, কেননা রাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষমতা সেকুল্যার কতৃপক্ষের হাতেই থাকে। মিশরের ক্ষেত্রে স্পষ্টত তা সেনাবাহিনী ধারণ করে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ পরবর্তী সামরিক জান্তার কোনো ধরনের সমালোচনা না করাই প্রমাণ করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনগণের একাংশের দাবির মুখে সেনাবাহিনীর সামরিক পদক্ষেপে সন্তুষ্ট। মুরসী বিরোধী জনগণের জাগরণকে আমেরিকা মিশরের রাজনীতিতে শুধুমাত্র ব্রাদারহুডকে নয় বরং ইসলামের রাজনৈতিক উত্থানকে ঠেকানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। যদিও এই ধরনের পরিবর্তনে ইসলামপন্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিবে যা মিশরকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে সে ব্যাপারে আমেরিকা ভালোভাবে অবগত আছে। তাহলে কেন যুক্তরাষ্ট্র ও মিশরের সামরিকজান্তা মুরসিকে পরিবর্তনের ঝুঁকি নিল?
সেনাবাহিনীর ক্যুয়ের পেছনে প্রথম সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, রাজনীতিতে তথা সরকার ও প্রাদেশিক প্রশাসনের উপর ব্রাদারহুডের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ঠেকানো। আমেরিকার রাজনৈতিক কৌশলের সাথে একমত অনেকে মনে করেন, ইসলামিস্টদের মধ্যে যারা প্রকৃত পরিবর্তনের কথা বলে তাদেরকে ঠেকাতে হলে, লিবারাল ইসলামিস্টদের সাথে আরো বেশী সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে কিন্তু অনেকে আবার লিবারাল ইসলামিস্টদের অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখে, এই মতের অনুসারীরাও শক্তিশালী। তারা মনে করেন এই ধরনের আন্দোলন প্রায়োগিক (Pragmatic) হলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ক্ষমতা দখল করা এবং গণতন্ত্রকে অপসারণ করা। সেনাবাহিনী মূলত দ্বিতীয় মতের অনুসারী যারা মিশরের তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ইসলামিস্ট প্রভাব দেখতে আগ্রহী নয়। ফলে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তাই মিশরের চলমান রাজনৈতিক সংকট সেনা ক্যুর অনিবার্য ফল যা সেনাবাহিনীকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে।
দ্বিতীয় সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, আমেরিকা মিশরকে সশস্ত্র সংগঠন ও সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘাতের মধ্যদিয়ে দীর্ঘমেয়াদী একটি সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করতে চায়। মুরসি পরবর্তী মিশরের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি বিশেষকরে সেনাবাহিনীর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ থেকে তা সহজে অনুধাবন করা যায়। পশ্চিমারা ভালভাবে বুঝতে পেরেছে রাজনৈতিক ইসলাম জনগণ কতৃক জোরালো সমর্থন পাচ্ছে যা আমরা নব্বইয়ে আলজেরিয়া, ইরাক; ২০০০ সালে পাকিস্তান, সুদান এবং বাংলাদেশ, সিরিয়ায় দেখতে পাচ্ছি। সিনাই উপত্যকার সশস্ত্র সংগঠন গুলো সেনাবাহিনীর উপর আক্রমণ চালানোর খবর আসছে। মিশরের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন যে কোন মুহূর্তে সংঘাতের দিকে চলে যাতে পারে যা ব্রাদারহুডের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নাও হতে পারে।
২০১১ সালে শুরু হওয়া আরব বসন্ত পরবর্তী মিশরের রাজনীতিতে চেহরার পরিবর্তন ছাড়া প্রকৃত পরিবর্তন আনতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। জনগণের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাকে ইসলামি চেহারার মধ্য দিয়ে থামানো হয়েছে। ফলে মিশরের রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার প্রভাব আগের মতো বজায় রয়েছে এবং আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো ও নীতিকে প্রভাবিত করছে। ব্রাদারহুডকে ক্ষমতা আরোহণের রাজনৈতিক ফাঁদে আটকানো হয়েছে যদিও প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতে ছিল না। ফলশ্রুতিতে মুরসির ক্ষমতাচ্যুতি সেনাবাহিনীর মর্জির উপর নির্ভর করে। মিশরের চলমান রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে ব্রাদারহুডের উচিত হবে না সেনাবাহিনীর সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা করা। যে কোনো ধরনের সমঝোতা, মিশরের রাজনীতিতে মুসলিম বাদারহুডের অবস্থানকে দূর্বল করবে। ব্রাদারহুডের উচিত হবে তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্পর্কচ্ছেদ করে জনগণকে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে আহবান করা যা তাকে প্রকৃত ক্ষমতা প্রদান করবে এবং মিশরের অধিকাংশ জনগণকে তার পেছনে পাবে।
(আবু আনাসের লেখা অবলম্বনে)
এম.এম.আলম
ভূরাজনীতি বিশ্লেষকসাম্প্রতিক বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ

بسم الله الرحمن الرحيم
দীর্ঘ সময় যাবৎ বাংলাদেশে অস্থিতিশীল পরিবেশের অবস্থান। কিছুতেই যেন কাটছে না এই অস্থিতিশীলতা। একের পর এক ট্র্যাজেডি, দুর্ঘটনার নামের আড়ালে হত্যাকান্ড, খুন, গুম, ধর্ষণ ছাপিয়ে আসে নিত্যনতুন ইস্যু। বাংলাদেশ যেন আজ ইস্যুবহুল রাষ্ট্রের আঁধারে ডুবে থাকা একটি ভূমি।
প্রতি নির্বাচনের পূর্বেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে যায়, এই বিষয়টি আমাদের কমবেশি জানা। কারণ অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করেই এই উপমহাদেশে সাম্রাজ্যবাদীরা বহু আগে থেকেই তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছে; এ নতুন কিছু নয়।
তবে এইবারে বাংলাদেশের অবস্থা যেন একটু ভিন্ন। প্রতিবার আমরা রাজনৈতিক সংঘাত থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরণের কারসাজি দেখতে পাই, যা কিনা এক কথায় নির্বাচন পূর্ববর্তী মঞ্চ নাটক হিসেবেই সংজ্ঞায়িত। কিন্তু, এইবার যেন আগের মত অবস্থা নেই। এটা সত্য সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে গেছে; মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শুরু করে সবকিছুই আজ পূর্বের সাথে তুলনা করে চলেনা।
তবুও, পূর্বের মত যদি নির্বাচন পূর্ববর্তী পরিস্থিতির সাথে এবারের তুলনা করি, তবে দেখব ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দল তাদের নির্বাচন প্রচারনা বর্তমান সরকারের ৩ বছর পূর্তির পর থেকেই শুরু করেছিল। আমরা জানি এবং এই ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে ধারণা রাখি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে লুটপাটের মূল সময়কাল হল ক্ষমতায় আরোহণের পর প্রথম ৩ বছর; ৪র্থ বছর তথাকথিত সাফল্যসমূহ তুলে ধরার চেষ্টা এবং বিরোধী দলের সাথে খুনসুটির সময়কাল বলা যায়; যদিও এই খুনসুটি প্রথম ৩ বছরে কোন অংশেই কম থাকেনা। আর ৪র্থ বছরের এই প্রচেষ্টায় হল নির্বাচনী প্রচারনার সূত্রপাত।
প্রতি সরকারের আমলেই, এই সময় বিরোধী দল সরকারের দূর্নীতিগুলো তুলে ধরে জনগণের সাথে power achievement-এর খেলা খেলে আর সরকারী দল্কে ফাঁদে ফেলার পাঁয়তারা করতে থাকে। আর একইভাবে সরকারী দল চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে। এগুলো যেন অনেকটা ইঁদুর-বিড়ালের খেলা।
কিন্তু, বাংলাদেশ একটি সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক বা স্বাধীন রাষ্ট্র নয় (যদিও দাবী করা হয়)। একটি পাঁচ মিশালী একটি উজবুকের ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত, যার কিছু পশ্চিমাদের থেকে ধার করে নেওয়া আর কিছু সমাজতন্ত্র থেকে। আবার প্রয়োজনের তাগিদে ইসলাম থেকেও কিছু নেওয়া আছে। আবার, এই রাষ্ট্রটি মূলত পরিচালিত হয় আমেরিকা-বৃটেন সমর্থিত রাজনৈতিক গোষ্ঠী দ্বারা; যারা বাংলাদেশে আওয়ামী-বি.এন.পি নামেই পরিচিত। এই দুই দল ছাড়াও বাংলাদেশে মার্কিন-ভারতের দালালের যথেষ্ট মজুদ রয়েছে।
আর এই ধারাবাহিকতায়, বাংলাদেশে সরকার নির্বাচিত হয় মার্কিন-ভারতের ইশারায়। অর্থ্যাৎ, যে/যারা এই দুই সত্ত্বাকে সন্তুষ্ট করবে, মূলত সে/তারাই নির্বাচনে বিজয়ের সবুজ বাতি দেখতে পায়। আর এই স্তরে মার্কিন-ভারতেরও আভ্যন্তরীন বেশ কিছু বিষয়ে (চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলে নিরাপত্তা) চুক্তি রয়েছে বিধায় বাংলাদেশের ব্যাপারে তাদের ঐক্যমতে পৌঁছানো অস্বাভাবিক হবেনা। এবং এই বিষয়টি তাদের বক্তব্যসমূহেও স্পষ্ট ছিল। এবং এই স্বার্থগত চুক্তি বজায় রেখেই বাংলাদেশে তারা তাদের নব নব দালাল নির্বাচন করে থাকে।
আগেরবারের ধারাবাহিকতার দিকে যদি তাকাই, তবে দেখতে পাব, প্রতিবারই হাসিনা/খালেদা যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, আমেরিকর সাথে চুক্তি করেই এসেছে। অর্থ্যাৎ, আমেরিকার স্বার্থ যে যত বেশী পালনে সচেষ্ট থাকবে, তার নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনা অধিক। আর সেই নিয়মানুসারে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে শাসক পরিবর্তনের ধারা বজায় রয়েছে এবং চলে আসছে নির্বিঘ্নে।
শাসক পরিবর্তনের এই নীতিটা জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়েছে বছরের পর বছরের চালু রাখার মাধ্যমে। এর মাধ্যমে ৫ বছর ধরে দুঃশাসনের প্রেক্ষিতে জনগণের মাঝে সরকার এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি যে ক্ষোভ জন্মে, তা দমিয়ে রাখা হয় পুরনো মুখ নতুন আদলে নিয়ে আসার মাধ্যমে। আবার, কিছু সময় প্রয়োজনের তাগিদে নতুন মুখ নিয়ে আসাও তাদের জন্য জরুরী হয়ে যায়, এবং তারা তাই করে।
এই balancing power by changing face নীতির মাধ্যমে তারা বিগত ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে প্রতারণা করে যাচ্ছে। আর জনগণও প্রতারিত হয়ে আসছে লাগাতারভাবে। সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ ছিল এইরকমই সমঝোতামূলক election এর রূপে selection। আর ক্ষমতায় আসীনের পর থেকেই মোটামুটি সে আমেরিকা-ভারতের এজেন্ডা বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লাগে, যা শুরু হয় পিলখানা হত্যাকান্ড দ্বারা। ক্ষমতায় আরোহণের মাত্র ১০০ দিনের মধ্যেই সে হত্যা করে নিষ্ঠাবান সেনা অফিসারদের; এক ঘৃণ্য চক্রান্ত রচনা করে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ধংসে।
সেনাবাহিনী ধ্বংসের এই চক্রান্ত কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির বা গোত্রের নয়, বরং এটা আমেরিকা-ভারতের এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে common স্বার্থ। বাংলাদেশে প্রভাব নেওার ক্ষেত্রে প্রথম এবং প্রধান বাঁধা হল মুসলিম সেনাবাহিনী; যেই কারণে সেনাবাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের হত্যা করে দূর্বল করে এতে আমেরিকান দালাল তৈরির প্রক্রিয়া চালু করেছে আওয়ামী সরকার। আমরা যদি একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকায়, এই সেনাবাহিনীই বিভিন্ন সময় বাংলাদেশকে ঘিরে ভারতের ভারতের চক্রান্তসমূহ নস্যাৎ করেছে। সেনাবাহিনীর এই অফিসাররাই বাংলাদেশে আমেরিকার এজেন্ডা বাস্তবায়নে মূল অন্তরায়।
আর সেই প্রেক্ষিতেই পিলখানা হত্যাকান্ড এবং সূত্রপাত দালাল তৈরির প্রক্রিয়ার। শুরু হয় একের পর এক মহড়া যৌথ মহড়া আমেরিকান সেনাবাহিনীর সাথে। এবং সমগ্র বিশ্বজুড়ে মুসলিম হত্যাকারী ক্রুসেডার বাহিনী এক প্রকার free access পেয়ে যায় সেনাবাহিনীর উপর। আর মোটামুটি এরপর থেকেই একের পর এক এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু। সেনাবাহিনীর উপর প্রভাব বিস্তারে আমেরিকার সাথে টাইগার শার্ক (সামরিক মহড়া), প্রথমবারের মত ভারতের বি.এস.এফের সাথে বি.জি.বির মহড়া, নৌবাহিনীর সাথে আমেরিকান সেনাবাহিনীর মহড়া, আমেরিকান সেনাবাহিনীর মাসব্যাপী কর্মসূচি (সিলেট), টিপাইমুখ মরণবাঁধ, ট্রানজিট চুক্তি এবং টিকফা।
এছাড়াও সম্পূর্ণ ক্ষমতাকালে মোটামুটি দেশের বিভিন্ন খাতই আমেরিকা-ভারতের হাতেই তুলে দিয়েছে। দেশের খনিজ সম্পদসমূহ তুলে দিয়েছে মার্কিন মুল্লুকের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে। আবার তাদের কাছ থেকেই চড়া দামে দেশের জনগণকে কিনে নিতে হচ্ছে এগুলো। দেশের পাটশিল্প থেকে শুরু করে, চিনিশিল্প, গবাদিপশু প্রকল্প, কৃষিক্ষেত্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে ভারতের সাথে কৃত ওয়াদা পূরণে। তাছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার ধংসে ঘটানো হয়েছে একের পর এক হত্যাকান্ড। আর এই সকল হত্যাকান্ড নামকরণ হয়েছে ট্র্যজেডি হিসেবে।
এই মুহুর্তে বাংলাদেশ আমেরিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১০ সালের পহেলা এপ্রিল প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বিষয়টি উঠে আসে সুস্পষ্টভাবে। ‘Bangladesh : Political and Strategic Developments and US Interests’ রিপোর্টে বলা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। একদিক দিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জঙ্গীবাদবিরোধী ভূমিকা সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা। ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক সম্পর্কোন্নতিরও প্রশংসা করা হয়েছে রিপোর্টে।
এটা ঠিক ঐ সময়টা, যখন বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলাই গণতান্ত্রিক দুঃশাসন দ্বারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন।
কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বক্তব্যটি এই রিপোর্টে লেখা হয়েছে তা হচ্ছে-
‘Bangladesh is situated at the northern extreme of the Bay of Bengal and could potentially be a state of increasing interest in the evolving strategic dynamics between India and China. This importance could be accentuated by the development of Bangladesh’s energy reserves and by regional energy and trade routes to China and India’ (‘বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের একেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত। তাই এখন ভারত ও চীনের মধ্যে কৌশলগত কারণে যে ধরনের গতিশীল সম্পর্কের সূচনা হয়েছে তাতে করে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আমেরিকান স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের জ্বালানি মজুদ বৃদ্ধি পেলে আঞ্চলিক জ্বালানি-ভান্ডার এবং চীন-ভারতের মধ্যেকার বাণিজ্যপথের জন্য ভবিষ্যতে বাংলাদেশের গুরুত্ব আরও বাড়বে।’)
ক্ষমতার দীর্ঘ এই পরিক্রমায় মার্কিন-ভারতের অন্যতম common ইস্যু ছিল ইসলামের উত্থান এবং এর জন্য আন্দোলনকারীদের ঠেকানো। এই অঞ্চলে ইসলামের উত্থান মার্কিন-ভারতীয় দাদাদের মাথাব্যথার মূল কারণ। কারণ, ইসলামই এই অঞ্চল থেকে তাদের স্বার্থ হাসিলে প্রধান অন্তরায়।
আরব জাগরণের পর থেকে আমেরিকা এই অঞ্চলের দিকে পূর্বের তুলনায় অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ ইতিমধ্যেই প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে আরবের অনেক ভূমি থেকে সে বিতাড়িত। আর যেগুলোতে মোটামুটি অবস্থান নিয়ে টিকে আছে বা নতুন দালাল বসাতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলোর স্থানও আজ নড়বড়ে। অর্থ্যাৎ, যেকোন সময় তার বসানো দালালের গদি উলটে যেতে পারে।
এই তাগাদাতে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তার নজর আসে, যদিও এই অঞ্চলের ব্যাপারে তার চক্রান্ত বাস্তবায়ন হয়ে আসছিল। কিন্তু, এই সময়ের পরই আমেরিকা এই অঞ্চলকে ঘিরে তার চক্রান্তের ব্যাপারে তাড়াহুড়া শুরু করে।
ইতিমধ্যে হাসিনার ক্ষমতার ৪ বছরও পার হয়ে যায়। ৪ বছর পার হয়ে যাওয়ার মানেই হল সামনের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। আর এই সময়ে সে প্রস্তুতি হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচার উঠিয়ে আনে, যে বিচারের ধোঁয়া সে উড়িয়েছিল নির্বাচনের আগে। এর উদ্দেশ্য ছিল না বিচার সম্পাদন, বরং এর প্রক্রিয়া বলবৎ রেখে পরবর্তী নির্বাচনেও ইস্যু হিসেবে যুদ্ধাপরাধের বিচারকেই আনা। আর ঠিক তখন থেকেই দেশের পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় অধিক ঘোলাটে হতে থাকে।
এই সময়টায় সবচেয়ে সূক্ষ চাল চালে আমেরিকা, যেখানে আওয়ামী থেকে শুরু বড় বড় রাঘব বোয়ালরাও ধরাশায়ী হয়। আমেরিকা এই ইস্যুতে সুনির্দিষ্ট কোন অবস্থান নেয়নি, যেকারণে শেখ হাসিনা তার পরিবারগত (বি.এন.পি) সমস্যা সমাধানে আমেরিকাকে বাঁধা ভাবেনি, আবার জামায়াতও এই স্থানে তাদের পক্ষে আমেরিকার মৌন সমর্থন ধারণা করছিল। আমেরিকা একদিকে বলছিল, যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়া উচিত, আবার অন্যদিকে এটাও বলছিল যে, এই ইস্যুতে কেউ যেন বাড়াবাড়ি করতে না পারে। ফলশ্রতিতে, আমেরিকার সাথে হাসিনা সরকারের সখ্যতা অটুট থাকে, পাশাপাশি ইসলামের ফ্লেভারে গণতন্ত্র বজায় রাখতে জামায়াতকেও সাথে পায়।
কিন্তু এই স্থানে মূল বাঁধা সৃষ্টি করে আওামীলীগের বংশগত প্রভু বৃটেন। আওয়ামী লীগকে বাগে রেখে আমেরিকা যখন তার একের পর এক স্বার্থ আদায় করে যাচ্ছে, বৃটেন তখনই আওয়ামী লীগকে তার পরম্পরা স্মরণ করিয়ে দিতে শুরু করে। এবং কঠোরভাবে সমালোচনা শুরু করে আওয়ামী শাসনের। আর তখন আওয়ামী সরকারও প্রভুর কঠোর বাক্যে জর্জরিত হয়ে তার পূর্বের অবস্থানে ফিরে আসার দিকে মনোনিবেশ করে।
অন্যদিকে আমেরিকা ভারতের সাথে বি.এন.পির সখ্যতা গড়ে তোলার ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিয়ে ফেলে এবং খালেদা জিয়া ভারতও সফর করে আসে। আমাদের মনে আছে, ভারত সফরে খালেদা অতীতের কথা ভুলে গিয়ে নতুন শুরু ব্যাপারে ভারতকে আশ্বস্ত করে। আর ঠিক এরপর থেকেই বি.এন.পির ভারতের প্রেক্ষিতে তথাকথিত অবস্থান শিথিল দেখাতে শুরু করে; যা ছিল সম্পূর্ণরূপে আমেরিকারই ইশারা।
তবে, এরপরও ভারত এখন পর্যন্ত বি.এন.পির উপর সম্পূর্ণ আস্থা স্থাপনে উদগ্রীব নয়। কারণ, বি.এন.পি টিকে আছে জাতীয়তাবাদী মডারেট ইসলামী দলগুলোকে কেন্দ্র করে। তার নিজস্ব কোন ভিত্তি নেই। জনগণের পক্ষ থেকে যেটুকু ভোট সে পাচ্ছে বলে দেখানো হয়, তার অধিকাংশই জামায়াত বা অন্যন্য ইসলামী দলগুলোর সমর্থকদের ভোট। এক কথায়, চাষের জন্য বি.এন.পির নিজস্ব কোন জমি নেই। আর এটাই ভারতের মূল বাঁধা।
ভারতের জাতীয়তাবাদী ইসলাম বা গণতান্ত্রিক ইসলামের ব্যাপারে কোন অভিজ্ঞতা নেই। এই কারণে ইসলাম নাম শুনলেই সে মোটামুটি আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাই জামায়াত বা অন্যান্য সমমনা গণতন্ত্রের সাথে আঁতাতকারী দলগুলোর ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয়। যদিও, এই দলগুলো পরক্ষোভাবে তার এজেন্ডাই বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। আবার এই ব্যাপারে আমেরিকা সিদ্ধহস্ত। সমগ্র বিশ্বে ইসলামের আন্দোলন সে এই গণতন্ত্রের আড়ালেই কবর দিয়ে রেখেছে। যে কারণে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপারে সে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়, বরং এদের এভাবেই টিকিয়ে রাখতে পারলেই তার চক্রান্ত বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যায়।
কিন্তু স্বার্থগত কারণে ভারত-আমেরিকার মাঝে এই ব্যাপারেও সমঝোতা হয়েছে আগেও এবং এখন যে হবেনা সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। এর পূর্বেও আমেরিকা জামায়াত বা অন্যান্য গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোকে ব্যবহার করেছে, এবং প্রয়োজনে চক্রান্ত বাস্তবায়নে ধারাবাহিকতার তুলনায় ভিন্নতাও ছিল। উদাহরণস্বরূপ ৯৬ এর নির্বাচন কি যথেষ্ট নয়??? এবং এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে এইবারও সমঝোতা হতে পারে এবং এই ক্ষেত্রে বি.এন.পি-এর সাথে বাস্তুহারা জাতীয় পার্টির আঁতাত স্বাভাবিক। পাশাপাশি হেফাযতকেও জুড়ে দিতে পারে ১৮ দলীয় জোটে। অর্থ্যাৎ, উভয় পাশেই মোটামুটি ব্যালেন্স করা।
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে। অনেকেই এই নির্বাচনকে বি.এন.পির জয় বা আওয়ামী লীগের পরাজয় বা জনগণের বর্তমান সরকার তথা আওয়ামী লীগের উপর ক্ষোভ হিসেবেই দেখছে। কিন্তু আমি মনে করি বিষয়টা তেমন নয়।
আমরা যদি ‘০৮ এর নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত আমেরিকার মোটামুটিভাবে বড় অর্জনসমূহ একে একে অর্জন করতে চলেছে। যে এজেন্ডাগুলো বেশ কয়েকবছর ধরে আমেরিকা চেষ্টা করে আসছিল অর্জনের জন্য, কিন্তু বিভিন্ন কারণে সম্ভব হচ্ছিল না; বি.এন.পির তুলনায় আওয়ামী সরকার অধিক ভক্তির সাথে একের পর এক এজেন্ডা বাস্তবায়নে আমেরিকাকে সহায়তা দিয়ে যায়। এবং আমেরিকা বাংলাদেশে তার চক্রান্ত বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বের তুলনায় তুলনামূলকভাবে অগ্রগামী। and this credit goes to awami govt.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আপনি তাদের অনেককে দেখবেন কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করে। তারা নিজেদের জন্য যা পাঠিয়েছে তা অবশ্যই মন্দ। তা এই যে, তাদের প্রতি আল্লাহ ক্রোধান্বিত আছেন এবং তারা চিরকাল আযাবে থাকবে” [আল মায়িদাহ: ৮০]
“যদি তারা আল্লাহ’র প্রতি ও রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করত, তবে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করত না” [আল মায়িদাহ: ৮১]
মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। [আল মুমতাহিনা: ১]
আর এই মূহুর্তে আমেরিকা চাইবেনা এমন কেউ আসুক, যে তার এই এজেন্ডাসমূহ যা অনেকাংশে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রনে ব্যর্থ হওয়ার দরুন এগুলো পন্ড হয়ে যাক, বা বাধাগ্রস্ত হোক। বরং এমন কেউ আসুক যে, এই এজেন্ডা সমূহকে পূর্ণতা দিতে পারে।
আর আমেরিকার ঠিক এই মনোভাব প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই খালেদা মোটামুটি তাকে এই ব্যাপারে আশ্বস্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে। কখনো ওয়াশিংটন পোস্টে, আবার কখনো আমেরিকার সিনেটে প্রতিনিধি কতৃক আহবান জানাচ্ছে আমেরিকাকে বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায়।
অপরদিকে, আওয়ামী লীগও কম যায়না। মোটামুটি তারাও সম্পর্ক অটুট রাখছে মার্কিন মুল্লুকের সাথে যা আমরা দেখতে পাচ্ছি বিগত কয়েক মাসের মধ্যেই আমলা-গামলা সকলের আমেরিকা সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে হয়ে উঠছে। এমনকি সেনাবাহিনী প্রধানও।
সেই অনুসারেই আমেরিকা এবার তার চক্রান্তে ভিন্নতা আনতে পারে। আর এই মুহুর্তে সে যে প্ল্যানটি খেলছে, তা হল ক্ষমতা বন্টন। অর্থ্যাৎ, কর্মসুচি সম্প্রসারণ করে দালালদের স্থান বর্ধন। যেহেতু আওয়ামী-বি.এন.পি উভয়েই আমেরিকার প্রতি loyalty প্রদর্শন করছে, সুতরাং আমেরিকাও এখানে ক্ষমতা ভাগ করেই দিচ্ছে। অর্থ্যাৎ সিটিগুলোতে বি.এন.পির জয় নিশ্চিত করে বি.এন.পিকে আশস্ত করছে, যা আমরা তাদের হম্বিতম্বি কমে যাওয়ার মাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি। আর এই নির্বাচনে আওয়ামী পরাজয়কে অনেকেই বি.এন.পির জয় হিসেবে দেখছে, যেখানে শেখ হাসিনে নিজেই ঘোষণা দিয়েছে যে, শেষ খেলা তার হাতেই থাকবে। ধারণা করা যায়, সিগন্যাল পাওয়া গিয়েছে। আর বি.এন.পি কেও সন্তুষ্ট করা হচ্ছে তাতে। আর এর মধ্যে জামায়াতের সাথে মধ্যস্থতার ব্যাপারটি আগেই উল্লেখ করেছি।
সুতরাং, দিনের শেষে আওয়ামী-বি.এন.পি-জামায়াতের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাঁয়তারাই আমরা দেখতে পাচ্ছি।
“অথচ এরা যদি তোমাদের কাবু করতে পারে, তাহলে এরা শত্রুতে পরিণত হবে, এরা নিজেদের হাত ও কথা দিয়ে তোমাদের অনিষ্ট সাধন করবে, এরা তো এটাই চায় যে, তোমরাও তাদের মত কাফের হয়ে যাও” [আল মুমতাহিনা: ২]
এখন আমরা যদি আলোচনা শুরুতে তাদের যে কমন এজেন্ডা ইয়ে আলোচনা হয়েছে তার দিকে লক্ষ্য করি, তবে দেখব, স্বার্থগত দিকের চেয়েও আমেরিকা-ভারত-বৃটেনের এই কমন এজেন্ডা নিয়েই মাথাব্যাথা বেশি। কারণ, এই কমন এজেন্ডা তথা ইসলামী রাস্ট্র ব্যবস্থা খিলাফাহ’র দাবী এই মুহুর্তে সমগ্র বিশ্বব্যাপী তুঙ্গে পৌঁছেছে। আর আরব থেকে বিতারিত হওয়ার পথে আমেরিকা যখন এশিয়াতে তার অবস্থান শক্ত করার জন্য ব্যতিব্যস্ত, ঠিক সেইসময়েই এই অঞ্চলেই এইধরণের আন্দোলন তার অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরুপ।
এই কারণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পাশাপাশি বাংলাদেশের উপর অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে পঙ্গু করে দেওয়া এবং সামরিক অবস্থানের ব্যাপারেও অত্যন্ত দৃঢ় আমেরিকা। আর এই ক্ষেত্রে ভারত তাকে আঞ্চলিকভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে ধারাবাহিকভাবেই। প্রতি বছর সিঙ্গাপুরে আয়োজিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপগুলোর দিকে তাকালেই আমরা এই ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পারি সহজেই।
তদুপরি আল্লাহ’র ইচ্ছায় এই এশিয়ান sub-continent থেকেও দিন দিন ইসলামী রাস্ট্রের দাবী বৃদ্ধি পাচ্ছে, যে বিষয়টি সর্বশেষ জরিপসমূহের (পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ) মাধ্যমে জানা যায়।
আর এই কারণেই কুফর শক্তিসমূহ ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশকে নিয়ে পূর্বের তুলনায় অধিক চিন্তিত এনং ঐক্যবদ্ধভাবে খিলাফাহ’র প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আইন সংশোধন থেকে শুরু করে, পুলিশ বাহিনীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ, F.B.I এর গোয়েন্দা দপ্তর খোলা ইত্যাদি চক্রান্তকে রূপ দিয়ে যাচ্ছে ইসলামের জন্য আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে।
কিন্তু, তারা ব্যর্থ হয়েছে পূর্বে বারবার, আর এইবারও ব্যর্থ হবে ইন-শা-আল্লাহ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকতৃত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। এরপর যারা অকৃতজ্ঞ হবে, তারাই অবাধ্য” [আন নূর: ৫৫]
তৌসিফ ফারহাদ
সারা বিশ্বে একইসাথে চাঁদ দেখার পক্ষে বিভিন্ন আলেমদের বক্তব্য

সারা বিশ্বে একইসাথে চাঁদ [ইত্তিহাদ উল মাতো’লী] দেখা নিয়ে বিভিন্ন আলেমদের বক্তব্য:
ইমাম আন-নাসাফী (মৃ: ৭০১ হি) বলেন:
وَيَلْزَمُ أَهْلَ الْمَشْرِقِ بِرُؤْيَةِ أَهْلِ الْمَغْرِبِ
পূর্বের বাসিন্দাদের (চাঁদ) দেখা পশ্চিমের বাসিন্দাদের উপর আরোপিত হবে। [বাহরুর রায়েক শরহু কানযিদ দাকায়েক, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ১৮০]ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা গ্রন্থের বলা হচ্ছে-
يشمل كل من بلغه رؤية الهلال من اى بلد او اقليم من غير تحديد مسافة اصلا
অর্থাৎ নব চাঁদ উদিত হওয়ার সংবাদ যতটুকু পৌঁছবে ততটুকু তার আওতাভূক্ত হবে। তা কিছুতেই দূরত্বের কারণে কোন দেশ, মহাদেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না।[ফাতওয়ায়ে ইবনু তাইমিয়্যা, খন্ড-২৫, পৃঃ-১০৭] অথবা [তামামুল মিন্নাহ ১/৩৯৮]
উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম ও গবেষক আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহঃ)-এর ভাষ্য নিম্নরূপ:
“এক শহরের চাঁদ দেখা অন্য সকল শহর বাসীদের জন্য গ্রহণীয় হবে। ঐ শহরগুলোর সঙ্গে চাঁদ দেখা শহরের যত দুরত্বই হোকনা কেন। এমনকি সর্ব পশ্চিমের চাঁদ দেখার সংবাদ সর্ব পূর্বের মানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পৌছলে ঐ দিনই তাদের উপর রোযা রাখা ফরয হবে।”
[বেহেশতী- জেওর, খন্ড-১১, পৃঃ-৫১০]
চার মাযহাবের সমন্বিত ফিকহ গ্রন্থ আল ফিকহ আলা মাযাহাবিল আরবা’য়া নামক গ্রন্থের ভাষ্য হচ্ছে-
“পৃথিবীর কোন এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সকল স্থানেই উক্ত দেখার দ্বারা রোযা ফরয হবে। চাই চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখা যাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক এতে কোন পার্থক্য নেই। তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌছতে হবে। তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি,ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম আহমদ ইবনু হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর মতে চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরয হয়ে যাবে”
(আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৪৪৩) অথবা (আল ফিকহ আলা মাযাহিবিল আরবায়া, খন্ড-১, পৃঃ-৮৭১)
“According to the Hanafia the differences in the horizon will not be taken into consideration, to the extent that if the people of the west sight the moon, it becomes mandatory on the people of the east to follow it, given that the information is verified and authenticated. (Fatawa Darul-Uloom-Deoband vol. 6, pg. 251)
পবিত্র বুখারী শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ বিশ্ব বিখ্যাত কিতাব “ফাতহুল বারী”-তে আল্লামা ইবনু হাজার আল-আসকালানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি লেখেন-
“রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী فلاتصوموا حتى تروه [রোজা রেখ না যতক্ষন না (নতুন চাঁদ) দেখছ] এর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজে চাঁদ দেখতে হবে এমন উদ্দেশ্য নেয়া যাবেনা। বরং পবিত্র বাণীটির উদ্দেশ্য হচ্ছে কিছু ব্যক্তির চাঁদ দেখা। জমহুর ফকীহ গণের মতানুসারে রমযানের চাঁদ একজনের দেখাই যথেষ্ট হবে। যা হানাফী ফকীহগণের মত। আর অন্যদের মতে দু’জনের দেখা যথেষ্ট হবে। এ মতামত অপরিচ্ছন্ন আকাশের ক্ষেত্রে, কিন্তু আকাশ যদি পরিচ্ছন্ন থাকে তাহলে এমন সংখ্যক ব্যক্তির চাঁদ দেখতে হবে যাদের সংখ্যা দ্বারা চাঁদ দেখার সংবাদ প্রমাণিত হবে। যারা এক দেশের দেখা অন্য দেশের জন্য প্রযোজ্য বলে মত প্রকাশ করেছেন এটা তাদের মত। আর যারা প্রত্যেক দেশের জন্য চাঁদ দেখার মত প্রকাশ করেছেন তারা বলেছেন “যতক্ষণ না তাকে দেখবে” এর মাধ্যমে বিশেষ অঞ্চলের মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে। যা অন্য অঞ্চলের মানুষের জন্য প্রযোজ্য নয়। কিন্তু দ্বিতীয় পক্ষের এ মত হাদীসের প্রকাশ্য বক্তব্যের পরিবর্তন। অতএব চাঁদ দেখাকে প্রত্যেক মানুষের সাথে এবং প্রত্যেক দেশের সাথে সীমিত করা যাবে না।”
[ফাতহুল বারী ফি শরহে ছহীহীল বুখারী, খন্ড-৪, পৃঃ-১৫৪]ইমাম নববীর শরহে মুসলিমে এসেছে:
“এবং চাঁদ দেখার প্রমাণ সাপেক্ষে তোমরা রোযা ছাড়, ঈদ কর।” এর অর্থ হলো কিছু মুসলমানের দেখার মাধ্যমে উদয় প্রমাণিত হওয়া। এ শর্ত করা যাবেনা যে প্রত্যেক মানুষেরই চাঁদ দেখতে হবে। বরং যে কোন দেশের যে কোন দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির দেখাই সকল মানুষের জন্য যথেষ্ট হবে। বরং সর্বাধিক বিশুদ্ধ মতে রোযার ক্ষেত্রে একজন সৎ ব্যক্তির দেখাই সকলের আমলের জন্য যথেষ্ট। আর অধিকাংশ ফকীহগণের মতে শাওয়ালের নতুন চাঁদ প্রমাণের জন্য একজনের সাক্ষ্য যথেষ্ট হবেনা।”
[শরহুন নববী আলা মুসলিম]
চাঁদ দেখার ভিন্নতা গ্রহণীয় নয় । বরং প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সমগ্র পৃথিবীতে এক কেন্দ্রিক তারিখ গণনা করে, একই দিনে একই তারিখে আমল করতে হবে । এটাই আমাদের হানাফী মাযহাবের সিদ্ধান্ত । মালেকী এবং হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা । তাদের দলীল হচ্ছে আয়াত ও হাদীসে চাঁদ দেখার সম্বোধন সকলের জন্য আম বা সার্বজনীন যা নামাজের ওয়াক্তের সম্বোধন থেকে আলাদা-
[ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-১০৫] অথবা [ফাতওয়া-ই-শামী, খন্ড-২, পৃঃ-৪৩২]
“ফিকহের প্রতিষ্ঠিত বর্ণনানুযায়ী চাঁদ ঊদয়ের বিভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। ফাতওয়া-ই কাযী খানের ফাতওয়াও অনুরুপ । ফকীহ আবু লাইছও এমনটাই বলেছেন । শামছুল আইম্মা হোলওয়ানী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, যদি পাশ্চাত্যবাসী রমযানের চাঁদ দেখে তবে সে দেখার দ্বারা প্রাচ্য বাসীর জন্য রোযা ওয়াজিব হবে। এমনটাই আছে খুলাছা নামক কিতাবে-“
[ফাতওয়া-ই- আলমগিরী, খন্ড-১, পৃঃ-১৯৮] অথবা [ফাতওয়া-ই- আলমগিরী, খন্ড-৫, পৃঃ-২১৬]
উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা রশীদ আহমদ গাংগুহী (রহঃ)-এর ভাষ্য নিম্নরূপ-
“ফিকহের প্রতিষ্ঠিত মতানুসারে রোযা রাখা ও ঈদ করার ব্যাপারে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। প্রাচ্যবাসীর দেখা দ্বারাই পাশ্চ্যাত্যবাসীর উপর আমল জরুরী হবে।”
[ফাতওয়া-ই-রশিদিয়া, পৃঃ-৪৩৭]
বাংলাদেশের প্রাচীন ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাট হাজারী মাদরাসার শাইখুল হাদীস আল্লামা হাফেজ আবুল হাসান সাহেব তার রচিত মিশকাত শরীফের ব্যাখ্যা গ্রন্থ তানযীমুল আশ্তাতে। যার ভাষ্য নিম্নে উদ্ধৃত হল-
অর্থাৎ চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা ইমাম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর নিকট গ্রহণীয় নয়। শামী কিতাবে এমনটাই রয়েছে। এটাই আমাদের (হানাফীদের) রায়। মালেকী ও হাম্বলী মাযহাবের মতও এটা। অতএব, কোন স্থানে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সর্বত্রই আমল অত্যাবশ্যকীয় হবে।
[তানযীমুল আশ্তাত, খন্ড-১, পৃঃ-৪১]
“Wherever the sighting is confirmed, however far off it may be, even if it were to be thousands of miles; the people of this place will have to abide by that.” [Fatawa Dar ul Uloom Deoband, Vol. 6 page 380, Urdu edition]
উপমহাদেশের অন্যতম ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র “দারুল উলুম দেওবন্দ”-এর গ্রান্ড মুফতি আযিযুর রহমান সাহেব ফাতওয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ-এ লিখেছেন-
অর্থাৎ হানাফী মাযহাব মতে চাঁদের উদয় স্থলের ভিন্নতা গ্রহনীয় নয়। যদি কোন স্থানে শা’বান মাসের ২৯ তারিখে রমযানের চাঁদ দেখা যায় এবং শরয়ীভাবে তা প্রমাণিত হয় তখন ঐ হিসেবেই সকল স্থানে রোযা রাখা অপরিহার্য হয়ে যাবে। যে স্থানের লোকেরা সংবাদ পরে পাওয়ার কারণে শা’বান মাস ৩০ দিন পূর্ণ করে রোযা শুরু করেছে তারাও প্রথমদের সঙ্গে ঈদ করবে এবং প্রথমের একটি রোযা কাযা করবে – [ফাতওয়া-ই-দারুল উলুম দেওবন্দ, খন্ড-৬, পৃঃ-৩৯৮]
প্রশ্ন-উত্তর: বাবার চাচা ও মায়ের মামার সামনে হিজাবের উন্মুক্ততা সংক্রান্ত

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব
প্রশ্ন:
আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
নারীর জন্য কি এটি জরুরী যে সে তার পিতার চাচা ও মায়ের মামার সামনে হিজাব উন্মুক্ত না করে আসবে? আল্লাহ আপনাকে বরকতময় করুন সম্মানিত ভাই আমার।

উত্তর:
ওয়া আলাইকুম আস-সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
পবিত্র আল্লাহ বলেন: [তোমাদের জন্যে হারাম করা হয়েছে তোমাদের মাতা, তোমাদের কন্যা, তোমাদের বোন, তোমাদের ফুফু, তোমাদের খালা, ভ্রাতৃকণ্যা; ভগিনীকণ্যা…] সুতরাং তিনি ব্যক্তির ভাইয়ের কন্যাগণকে হারাম করেছেন এবং তার ভাইয়ের পুত্রগণের কন্যাগণকেও হারাম করেছেন এবং এদের বাইরে এই ধারার বাকি সকলকে হারাম করেছেন। অর্থাৎ, তার ভাইয়ের কন্যাগণের কন্যাগণ, ভাইয়ের পুত্রগণের কন্যাগণের কন্যাগণ, ভাইয়ের কন্যাগণের কন্যাগণের কন্যাগণ, ভাইয়ের পুত্রগণের কন্যাগণের কন্যাগণের কন্যাগণ এবং এইভাবে অন্যান্যগণ। সেই একইভাবে, নারীর বাবার চাচা নারীর মাহরামগণের অন্তর্ভুক্ত কারণ সে (নারী) তার (বাবার চাচার) ভাইয়ের পুত্রের কন্যা।
একইভাবে, আল্লাহ ব্যক্তির জন্য তার বোনের কন্যাগণকে হারাম করেছেন, বোনের পুত্রের কন্যাগণকে হারাম করেছেন…এবং এদের বাইরে এই ধারার বাকি সকলকে হারাম করেছেন। অর্থাৎ, ব্যক্তির বোনের কন্যাগণের কন্যাগণ, তার বোনের পুত্রগণের কন্যাগণের কন্যাগণ এবং এইভাবে অন্যান্যগণ। সেই একইভাবে, নারীর মায়ের মামা নারীর মাহরামগণের অন্তর্ভুক্ত কারণ সে (নারী) তার (মায়ের মামার) বোনের কন্যার কন্যা।
আপনাদের ভাই আতা’ ইবনু খলীল আল-রাশতাহ
২৭ শা’বান, ১৪৩৪ হিজরী
৬ জুলাই, ২০১৩ খৃষ্টাব্দআরবী অংশ:
[উৎস: https://www.facebook.com/photo.php?fbid=184619471706138]
السؤال: السلام عليكم ورحمة الله وبركاته
هل يجب على المرأه أن تكشف الحجاب عن عم الأب وعن خال الأم؟
وبارك الله فيك أخي الفاضل
الجواب:وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
يقول سبحانه (حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالَاتُكُمْ وَبَنَاتُ الْأَخِ وَبَنَاتُ الْأُخْتِ…)، فيحرم على الرجل بنات أخيه، وبنات أبناء أخيه، وجميع السلسلة دون ذلك، أي بنات بنات أخيه، وبنات بنات أبناء أخيه، وبنات بنات بنات أخيه، وبنات بنات بنات أبناء أخيه… وهكذا. ولذلك فإن عم أب المرأة هو من محارم المرأة لأنها بنت ابن أخيه…
وكذلك يحرم على الرجل بنات أخته، وبنات أبناء أخته… وجميع السلسلة دون ذلك، أي بنات بنات أخت الرجل، وبنات بنات أبناء أخته… وهكذا. ولذلك فإن خال أم المرأة هو من محارم المرأة لأنها بنت بنت أخته…
أخوكم عطاء بن خليل أبو الرشتة
27 شعبان 1434هـ
মুরসির পতন

মিশরে মুরসির পতনে যেসব ইসলামপন্থী ব্যথিত হয়েছেন, তাদের আবেগকে সম্মান জানাই।
মুরসির পতনে এটা স্পষ্ট যে, পাকিস্তানের মতো মিশরেও প্রকৃত শাসনকর্তৃত্ব মার্কিনপন্থী সেনাবাহিনীর হাতেই। এছাড়া বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মিডিয়া পশ্চিমাঘেঁষা হওয়ায় মিশরের সর্বময় কর্তৃত্ব পেছন থেকে মার্কিনীদের হাতেই ছিল এবং আছে।
অথচ মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা মুরসি এই মার্কিনীদের খুশি রাখার চেষ্টা কম করেননি। ইসলাম প্রতিষ্ঠার স্লোগান দিয়ে গত ৩০ জুন ২০১২-তে ক্ষমতায় এলেও গত এক বছরে মিশরে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ মুরসি নেননি। বরং এমন একটি সংবিধান গ্রহণ করেছেন যেটি হোসনী মোবারক আমলের মতোই আলংকরিকভাবে ইসলামের কথা বলে – যেমনটা পাকিস্তানের সংবিধানে আছে বা বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীতে ছিল। তার ওপর পর্যটন, নাইটক্লাব ও এলকোহল ইস্যুতে মুরসি প্রশাসনের অবস্থান ছিল ইসলামের ঠিক বিপরীত। এগুলো সবই ছিল পশ্চিমাদের মনঃতুষ্টির প্রচেষ্টা।
ইসলামী আদর্শের দৃষ্টিকোণ থেকে মুরসি সরকারের সবচেয়ে বড় ডিগবাজি ছিল ইসরাইল ইস্যুতে। মার্কিনসহ পশ্চিমাদের মন রাখতে ইসরাইলের সাথে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি নবায়ন করেছেন মুরসি। এক্ষেত্রে মোবারকের সাথে তার কোনো পার্থক্য নেই। অথচ এই ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির বিরুদ্ধে মুরসিসহ ব্রাদারহুড নেতারা জীবনভর কম গলাবাজি করেননি!
ফিলিস্তিনের হামাসের প্রতিও মুরসি তেমন কোনো সহযোগিতার হাত বাড়াননি। গত বছর গাজায় ইসরাইলের ন্যাক্কারজনক অপারেশন পিলার অফ ডিফেন্স চলাকালে মুরসি প্রশাসন কোনোভাবেই হামাসকে প্রতিরোধে সহায়তা করেনি। ওই অপারেশনে হামাসের সামরিক নেতৃত্ব ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পর মুরসি এসেছিলেন স্রেফ যুদ্ধবিরতি করাতে!
ইরানের সাথে প্রত্যাশিত সম্পর্ক উন্নয়ন তো দূরের কথা, বরং শিয়া-সুন্নি বিভেদকে আরো উস্কে দিয়েছে মুরসি প্রশাসন। বোনাস হিসেবে লেবাননের শিয়া মিলিশিয়াদের সাথেও শত্রুতা বাধিয়ে গেছেন মুরসি। ইরান আর মিশরের মিত্রতার পথটি এখন আরো বেশি রুদ্ধ।
মুরসি প্রশাসনের আরো ন্যাক্কারজনক কাজ হলো, পাকিস্তান স্টাইলে সীমান্ত অঞ্চলে তথাকথিত আল-কায়েদাবিরোধী সামরিক অভিযান চালানো! মুরসি শাসনামলে মিশরের সীমান্তবর্তী সিনাই অঞ্চলে সেনাবাহিনী একের পর অভিযান চালিয়ে “Islamic Extremist”-দের দমন করেছে। এসবের মাধ্যমে আসলে তারা ইসরাইলবিরোধী ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গ্রুপগুলোর অস্ত্র সরবরাহের পথটি বন্ধ করেছে।
তাই স্বাভাবিকভাবে মুরসির বিদায়ে ইসরাইলের সবচেয়ে পুরনো ও প্রভাবশালী দৈনিক Haaretz ইসরাইল রক্ষায় মুরসির অবদানকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেছে:
মুরসির বিদায়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামপন্থীদের বোঝা উচিত, ক্ষমতায় যাওয়ার/থাকার জন্য তারা মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তির সাথে যতো বেশি কম্প্রোমাইজ করবেন, ততো বেশি তারা দু’কূলই হারাবেন। আল্লাহর অমোঘ বিধান:
“ইহুদী ও খ্রিস্টানরা কখনই আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্ত না আপনি তাদের জাতির/আদর্শের [مِلَّتَهُم] অনুসরণ করেন।” [আল কুরআন ২: ১২০]
“বস্তুতঃ তারা তো সর্বদাই তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকবে, যাতে করে তোমাদেরকে দ্বীন থেকে ফিরিয়ে দিতে পারে – যদি সম্ভব হয়।” [আল কুরআন ২: ২১৭]
ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম প্রদর্শিত পথেই ক্ষমতায় যেতে হবে – ইসলাম প্রদর্শিত পথে শাসন করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে।
‘দূরের যাত্রী’ কর্তৃক লিখিত প্রবন্ধ হতে.
প্রশ্ন-উত্তর: অনৈসলামিক ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকারের দাবী করা কি বৈধ?

প্রশ্ন: অনৈসলামিক ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকারের দাবী করা কি বৈধ? উদাহারনস্বরূপ, বর্তমান কুফর ব্যবস্থায় আমরা কি কোর্টে বিচারের জন্য যেতে পারি ? যদি যাওয়া যায় তবে তার জন্য কোন শর্ত আছে কি?
উত্তর:
১। কোন ব্যক্তি তার অধিকার আদায়ের জন্য, তা দাবী করতে পারে। যদি তার উপর কোন জুলুম হয়, তবে তা থেকে নিজেকে রক্ষা করা ও নিজেকে সঠিক বলে প্রমাণ করার অধিকার তার আছে। পাশাপাশি এই অধিকারগুলোর দাবী সে নিজে করতে পারে অথবা তার পক্ষ হতে কোন উকিল নিয়োগ করতে পারে।
২। তবে যে অধিকারগুলো সে দাবী করবে তা অবশ্যই শারীয়া কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। এক্ষেত্রে কোনটি জুলুম আর কোনটি অধিকার তা বর্তমান মানবরচিত ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যাবে না।
যেমন ধরুন একজন লোক মদ বিক্রি করলো কিন্তু ক্রেতা তাকে দাম দিলো না সেক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থা অনুসারে মদ বিক্রেতার অধিকার আছে মদের দাম পাবার কিন্তু শরীয়া অনুসারে মদ বিক্রি করাই যেখানে হারাম সেখানে দাম পাওয়ার অধিকার কেউ রাখে না।
অনুরূপভাবে বলা যায়, কোন একটি ব্যাংক তার মক্কেলকে সুদ পরিশোধ করল না সেক্ষেত্রে সেই মক্কেল তার উপর জুলুম করা হয়েছে এ কথা বলে সুদ পাওয়া তার অধিকার এমনটা দাবী করতে পারবে না কারণ সুদ বিষয়টি হারাম। সুতরাং, কোনটি জুলুম বা কোনটি অধিকার তা নির্ধারণ করবে শরীয়া।
৩। শরীয়া কর্তৃক অনুমোদিত অধিকারগুলো দাবী করতে গিয়ে কোন মুসলিম বা তার উকিল বর্তামান বিচার ব্যবস্থার প্রশংসা করতে পারবে না এবং এরূপ করা সম্পূর্ণ হারাম। সে শুধুমাত্র তার অধিকারের পক্ষে ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রমান ও দলীল উপস্থাপন করতে পারবে।
৪। দারুল ইসলাম ও দারুল কুফর নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলিম তার অধিকার আদায় ও জুলুম অপসারণের দাবী করতে পারে। নিম্নে তার দলীলগুলো উপস্থাপন করা হল:
ক) অধিকার বিষয়ক আয়াত-হাদীসগুলো তথা নিজের জীবন রক্ষা, জীবন দিয়ে (শহীদ হয়ে) হলেও নিজের সম্পদ ও সম্মান রক্ষা ইত্যাদি চুক্তির বৈধতা প্রকাশ করে [সর্বোচ্চকে প্রকাশ করে নিম্নতর কোনো কিছুকে বৈধতা প্রদান করা]। এছাড়াও এগুলো কোন নির্দিষ্ট বাস্তবতার সাথে সম্পর্কিত নয় বরং দারুল ইসলাম ও দারুল কুফর উভয়ের জন্য প্রযোজ্য।
খ) কিছু মুসলিম যখন আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন তখন কুরাইশরা নাজ্জাশীকে বলেন তিনি যেন মুসলিমদের কুরাইশদের নিকট হস্তান্তর করে। সে সময় মুসলিমরা নাজ্জাশীকে বলেন কিভাবে কুরাইশরা তাদের উপর জুলুম করেছে এবং কুরাইশদের সকল সকল মিথ্যা দাবীর বিরুদ্ধে প্রমান উপস্থাপন করেন। অর্থাৎ, তারা তাদের অধিকারের দাবী করেন ।
গ) মক্কা বিজয়ের পূর্বে কিছু মুসলিমকে রাসূল (সা) মক্কায় থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন যদিও তখন মদীনায় দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠা হয়েছে এবং অন্যান্য মুসলিমরা সেখানে হিজরত করেছে। যেকোনো সমাজে জীবন যাপনের সাথে অধিকার আদায় ও জুলুমকে অপসারনের বিষয়টি আবশ্যিকভাবে জড়িত। এক্ষেত্রে দারুল ইসলামের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও দারুল কুফরে অবস্থানের অনুমতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে দারুল কুফরে অধিকার ও জুলুম অপসারনের দাবী করা অনুমোদিত এই বিষয়টি [ইকতিদা’ কর্তৃক] নির্দেশিত হয়।আরো পড়ুন: প্রশ্ন-উত্তর: কোন অধিকারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে?
ধ্বংসাত্মক টিকফা চুক্তি!

বাংলাদেশ কি অর্থনৈতিকভাবে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল? তাহলে কেন এই ধ্বংসাত্মক টিকফা চুক্তি!
কথিত আছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার উপর নির্ভরশীল। কিছু লোকের ধারণা যেহেতু তৈরী পোশাক রপ্তানি খাতের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎসগুলির মধ্যে একটি এবং যার অধিকাংশ রপ্তানি হয় আমেরিকায় এছাড়া আমেরিকায় ১ লক্ষেরও বেশী প্রবাসী রয়েছে যারা দেশে রেমিটেন্সে অনেক অবদান রাখছে এতে বিশ্বের পরাশক্তি আমেরিকার প্রতি কোন চ্যালেঞ্জ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব এমনকি আত্মঘাতিও বটে। যদি বাংলাদেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠা হয় তাহলে অর্থনৈতিভাবে অনেক দূরবস্থায় পরতে হবে এমন চিন্তাও বিদ্যমান। মুসলিম হিসাবে আমরা আল্লাহর কাছে বাধ্য এই সাম্রাজ্যবাদী ক্রুসেডারকে প্রতিরোধ করা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন-
“….এবং আল্লাহ তায়ালা কখনোই মুমিনদের উপর কাফেরদের কোন পথ (বিজয়) রাখেননা” [সূরা নিসা: ১৪১]
আমেরিকার সাথে বাংলাদেশের দু’টি প্রধান অর্থনৈতিক সম্পর্ক হল পণ্য বিনিময় ও রেমিটেন্স। আমাদের দেশের সাথে আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটুকু বাস্তব সম্মত, আদৌ কী আমরা তাদের উপর নির্ভরশীল কিনা সে বিষয়ে একটু ভাবার দরকার। পাশাপাশি আদর্শ রাষ্ট্র গঠনের জন্য আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর রাসূলের মাধ্যমে যে বিধিবিধান পাঠিয়েছেন সে বিষয়ে সজাগ হওয়া আবশ্যক।
নির্ভরতার সূচক হিসাবে সারণী থেকে দেখতে পাই মোট GDP-র এক পঞ্চামাংশ আসে রপ্তানী থেকে কিন্তু মোট রপ্তানীর এক পঞ্চামাংশ USA’র জন্য নির্ধারিত। মোট USA’তে রপ্তানী GDP-তে অবদান রাখে ৪%। আমরা দেখি পোষাক খাতে ৫০% যে মূল্য সংযোজন যুক্ত করা হয় তা বিবেচেনা করলে এ অবদান দড়ায় মাত্র ২%। সুতরাং সামষ্টিক দৃষ্টিতে এটাই স্পষ্ট যে USA যদি বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি বন্ধ করে তাতে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে পড়বে তা অনেকটা কাল্পনিক।
একই চিত্র USA থেকে পাঠানো রেমিটেন্স এর ক্ষেত্রে দেখতে পাই। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে ভাল অবদান রাখে। দেখা যায় মোট রেমিটেন্স GDP-র ১০% এর চেয়ে বেশী অবদান রাখে। কিন্তু মোট রেমিটেন্স – ১৪% আসে USA থেকে যা মোট GDP-র ১.৫%। যে কোন বিবেচনায় এটি স্পষ্ট USA থেকে প্রাপ্ত রেমিটেন্স নূন্যতম গুরুত্ব বহন করে। এছাড়াও তথাকথিত সহায়তার নামে যে ঋণ দেয় তা গণনা করারও গুরুত্ব বহন করে না, যেমন ২০১০ সালে মোট GDP–তে ০.১২% যোগ করে।বছর মোট রপ্তানীর মধ্যে USA তে রপ্তানী % GDP-তে রপ্তানী % GDP-তে USA-এ রপ্তানীর অবদান % USA থেকে আসা মোট রেমিটেন্স % GDP-তে রেমিটেন্সের অবদান GDP-তে USA থেকে আসা রেমিটেন্সের অবদান % ২০০৬ ২৭.৯ ১৯.০ ৫.৩ ১৫.১ ৮.৯ ১.৩ ২০০৭ ২৫.৪ ১৯.৮ ৫.০ ১৬.৬ ৯.৬ ১.৬ ২০০৮ ২৩.২ ২০.৩ ৪.৭ ১৭.৬ ১১.৩ ২.০ ২০০৯ ২১.৩ ১৯.৪ ৪.১ ১৪.২ ১২.০ ১.৭ ২০১০ ২৩.২ ১৮.৪ ৪.৩ ১৪.৪ ১১.০ ১.৬ ২০১১ ১৯.৪ ২২.৭ ৪.৪ ১৪.১ ১১.০ ১.৫ মরনঘাতি টিকফা
যুক্তরাষ্ট্র নাছোড়বান্দা। বাংলাদেশকে সে এবার ‘বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার কাঠামোগত চুক্তি’ বা Trade and Investment Cooperation Framework Agreement (TICFA) স্বাক্ষর না করিয়ে ছাড়বে না বলেই মনে হচ্ছে। বিষয়টি গুরুতর! কারণ, এই চুক্তি স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিশ্ব পরিসরে অনুন্নত দেশগুলোর আপেক্ষিক দরকষাকষির ক্ষমতায় এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের ও এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যাবে। ফলে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বহুলাংশে হাতছাড়া হয়ে যাবে। মেলার মানুষকে ভালুক নাচের খেলায় ব্যস্ত রেখে তাদের পকেট কেটে নেয়ার সাজানো জোচ্চুরির মতো রাজনৈতিক সহিংসতা, নৈরাজ্য, অনিশ্চয়তার প্রতি মানুষের মনোযোগ আটকে রেখে আমেরিকা এই ‘টিকফা’ চুক্তি আদায় করার কায়দা করে নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা-বিতর্ক পাশ কাটিয়ে, চুক্তির বিষয়সমূহ বহুলাংশে গোপনীয়তার চাদরে ঢেকে চুক্তিটি সম্পাদন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এক যুগ আগে আমেরিকার উদ্যোগে ২০০১ সালে ‘টিকফা’ ধরনের একটি চুক্তি সম্পর্কে আলোচনা ও চুক্তির খসড়া প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছিল। ১৩টি ধারা ও ৯টি প্রস্তাবনা সম্বলিত এই চুক্তির প্রথম খসড়াটি তৈরি হয়ে যায় ২০০২ সালেই। ২০০৪ সালে ও তারও পরে ২০০৫ সালে খসড়াটিকে সংশোধিত রূপ দেয়া হয়। সে সময় ধারার সংখ্যা কমিয়ে ও প্রস্তাবনার সংখ্যা বাড়িয়ে (মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি আধিপত্যবাদী উদ্দেশ্যগুলোকে প্রস্তাবনার অংশে ঢুকিয়ে সেগুলোকে আড়াল করার জন্য) চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় হয় অবস্থায় দেশের আদর্শিক রাজনৈতিক শক্তি ও ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের একটি অংশের প্রবল প্রতিবাদের মুখে চুক্তিটি তখন সই করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এরপর থেকে এই চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে এসেছে। প্রথমে চুক্তিটির নাম ছিল ‘টিফা’। সেখানে ‘Cooperation’ শব্দটি ছিল না। সমালোচনা এড়িয়ে চুক্তিটি সম্পর্কে ধূম্রজাল সৃষ্টির জন্য তারা ‘সহযোগিতা’ (Cooperation) শব্দটি যোগ করে ‘টিফা’কে ‘টিকফা’ নামকরণ করেছে। শোনা যাচ্ছে, Investment শব্দটি বাদ দিয়ে সেখানে ‘Economic’ শব্দটি ব্যবহার করে চুক্তিটির নাম করা হবে ‘TECA’। এদিকে চাপ প্রয়োগের জন্য তারা বাংলাদেশকে ক্রমাগত হুমকিও দিচ্ছে। ব্ল্যাকমেইলিং-এর ভাষায় এমনও বলেছে যে, এই চুক্তি না করলে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতার ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই ‘টিকফা’ চুক্তির বিষয়বস্তু আসলে কী? তার আসল উদ্দেশ্যই বা কী? ‘টিকফা’ চুক্তির সর্বশেষ খসড়া বয়ানটি যেহেতু গোপন রাখা হয়েছে (স্বচ্ছতার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র সবাইকে সবক দেয়া সত্ত্বেও) তাই এক্ষেত্রে ২০০৫ সালে ‘টিফা’র জন্য প্রণীত খসড়ার বিষয়বস্তু যতোটা জানা গিয়েছিল সেই ভিত্তিতে কথিত ‘টিকফা’ সম্পর্কে পর্যালোচনা করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু তার আগে যুক্তরাষ্ট্র GSP সুবিদা বহাল ও বাতিল নিয়ে টিকফা চুক্তি করিয়ে নেয়ার জন্য যে কূটকৌশল করছে তা বিশ্লেষন করা চাই।
স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যে বাজার-সুবিধা দেয়া হয়, তাকে জিএসপি বলা হয়।
১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই সুবিধা পেয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক খাত এই সুবিধার আওতায় নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাণিজ্য বিষয়ক অফিসের ওয়েবসাইটে তাদের জিএসপি-সুবিধা সম্পর্কে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: ‘১২৭টি সুবিধাভোগী দেশের থেকে আমদানি করা প্রায় পাঁচ হাজারটি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার জন্য এই জিএসপি। এর অন্য উদ্দেশ্য হচ্ছে আমদানি করা পণ্যে মার্কিন সামগ্রী ব্যবহার নিশ্চিত করে মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।…জিএসপির অধীনে যেসব পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, তার মধ্যে আছে: বহু রকম রসায়ন দ্রব্য, খনিজ দ্রব্য, বিল্ডিং স্টোন, জুয়েলারি, বহু রকমের কার্পেট, এবং কিছু কৃষি ও মৎস্যজাত দ্রব্য। যেসব পণ্য জিএসপি শুল্কমুক্ত সুবিধাবহির্ভূত সেগুলোর মধ্যে আছে: বেশির ভাগ বস্ত্র ও পোশাকসামগ্রী, বেশির ভাগ জুতা, হাতব্যাগ ও ব্যাগ।’
বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জিএসপি-সুবিধার বাইরে। বরং সে দেশে গড় আমদানি শুল্ক হার যেখানে শতকরা ১ ভাগের মতো, সেখানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ওপর শুল্কহার শতকরা গড়ে ১৫ ভাগ, কোনো কোনো পণ্যে আরও বেশি। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানির প্রায় শতকরা ২৩ ভাগ গেছে, সেই হিসাবে এ বছরও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে শুল্ক বাবদ প্রদান করেছে কমপক্ষে প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এটা যুক্তরাষ্ট্র থেকে যে ঋণ অনুদান নানাভাবে বাংলাদেশে আসে, তার ছয় গুণেরও বেশি। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে নয়, বাংলাদেশই যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থের জোগান দিচ্ছে প্রতিবছর! এবং যুক্তরাষ্ট্রই মুক্তবাজার নীতিমালা ভঙ্গ করে বাংলাদেশের গার্মেন্টসের ওপর বৈষম্যমূলক শুল্ক আরোপ করে রেখেছে! অর্থাৎ প্রচারণা বা বিশ্বাস যা-ই থাকুক, তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে কোনো বিশেষ সুবিধা পায় না, বরং অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশকে সেখানকার বাজারে প্রবেশ করতে হয়।
গ্লোবাল ওয়ার্কার্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বাণিজ্যবিষয়ক বিশ্লেষক এড গ্রেসার জানান, গত বছর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে তাঁবু, গলফ খেলার সরঞ্জাম, প্লেটসহ প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য রফতানি করেছে। এর ওপর জিএসপি-সুবিধা অনুযায়ী ২০ লাখ ডলার শুল্ক ছাড় পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ৪৯০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ৭৩ কোটি ২০ লাখ ডলার শুল্ক দিয়েছে, যা ২০১২ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে প্রাপ্ত শুল্কের প্রায় দ্বিগুণ। ফ্রান্স ৪ হাজার ১০০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে শুল্ক দিয়েছে মাত্র ৩৮.৩ কোটি ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ প্রভাবাধীন সংস্থা আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলও (আইএমএফ) বলছে, শিল্পায়িত দেশগুলোর বেশির ভাগ আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক কম থাকলেও কৃষি, শ্রমঘন পণ্য যেগুলো গরিব দেশ থেকে আসে, তার অনেকগুলোর ওপরই মার্কিন শুল্কহার অস্বাভাবিক রকম বেশি, গড় শুল্কহারের চেয়ে কখনো কখনো ১০ থেকে ২০ গুণ বেশি। কাপড় ও জুতার ওপর আমদানি শুল্ক শতকরা ১১ থেকে ৪৮ ভাগ। বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের তুলনা করে আইএমএফই স্বীকার করছে যে, যে বছরে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার পণ্য আমদানি বাবদ ৩৩ কোটি ডলার আমদানি শুল্ক আয় করল, সেই বছরেই সমপরিমাণ শুল্ক তারা ফ্রান্সের কাছ থেকে আয় করল ১২ গুণ বেশি। অর্থাৎ তিন হাজার কোটি ডলার পণ্য আমদানির জন্য।
অর্থাৎ ধনী দেশের তুলনায় বাংলাদেশকে ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি শুল্ক দিতে হচ্ছে। এটাই বিশেষ সুবিধা!
অর্থাৎ GSP সুবিধা বাতিল বা বহাল দ্বারা TICFA চুক্তি প্রভাবিত নয় বরং জনগনের মধ্যে ধূম্রজাল ছড়ানো হচ্ছে ।
চুক্তিটির ১৫, ১৬ ও ১৭ নং প্রস্তাবনায় মেধাস্বত্ব অধিকার (Intellectual Property Rights)-TRIPS, আন্তর্জাতিক শ্রমমান সংরক্ষণ, পরিবেশ ও বাণিজ্য স্বার্থকে সমান গুরুত্ব দেয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই চুক্তির ফলে মেধাস্বত্ব অধিকার প্রতিষ্ঠা পেলে তা আমাদের দেশকে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করবে। তথ্য-প্রযুক্তি খাতেই দেশকে সফটওয়্যার লাইসেন্স ফি বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি (৬০ কোটি ডলার) ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। ওষুধ শিল্পকে পেটেন্ট আইনের অধীনে মাশুল দিতে হবে এবং তার ফলে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। তৈরি পোশাক শিল্পকেও ব্র্যান্ড নামে ব্যবহূত এ দেশের তৈরি এক্সেসরিজের জন্য সংশ্লিষ্ট মার্কিন কোম্পানিকে নজরানা দিতে হবে। বাসমতি চাল, চিরতার রস, নিমের দাঁতন ইত্যাদি হেন বস্তু নেই যা আগেভাগেই মার্কিনীসহ বিদেশি কোম্পানিরা পেটেন্ট করে রাখেনি। মেধাস্বত্ব অধিকারের ধারা প্রয়োগ করে তারা এসবকিছুর জন্য রয়েলটি প্রদানে বাংলাদেশকে বাধ্য করার জন্য ‘টিকফা’ চুক্তি স্বাক্ষর করতে এভাবে চাপাচাপি করছে।
বাংলাদেশকে ‘টিকফা’ চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এতো তত্পর হয়েছে কেন? সরাসরি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া ছাড়াও এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আরো একটি গূঢ় উদ্দেশ্য রয়েছে। চুক্তির ১৮ নং প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ একত্রে ‘দোহা ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডার’ সফল বাস্তবায়নে সহযোগিতামূলক প্রয়াস শক্তিশালী করবে।
দোহায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে গৃহীত ‘দোহা ডেভেলপমেন্ট এজেন্ডার’ মূল বিষয়গুলো হলো—অকৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্তকরণ, কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার, মেধাজাত সম্পত্তি অধিকার (ট্রিপস) এবং সার্ভিস বা পরিবেশ খাতে বিনিয়োগ উদারীকরণ ইত্যাদি। কিন্তু এসব বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের স্বার্থ অভিন্ন নয়। বরং এসব ক্ষেত্রে মার্কিন স্বার্থের সাথে বাংলাদেশের স্বার্থের গুরুতর বিরোধ আছে। অথচ এই চুক্তির সুবাদে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে মার্কিনের পক্ষে এবং স্বল্পোন্নত দেশের বিপক্ষে বাংলাদেশকে দাঁড় করানোর সুযোগ পাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারবে। এ কথা সকলেই জানেন যে, বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলো তাদের অভিন্ন ও সাধারণ স্বার্থসংরক্ষণে সম্মিলিতভাবে আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক নানা ফোরামে অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু ‘টিকফা’র মতো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির কারণে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে তা করতে পারবে না। শুধু তাই নয়, ‘টিকফা’ চুক্তির কারণে বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থরক্ষায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বহুপাক্ষিকভাবে প্রচেষ্টা চালাবার সুযোগও বহুলাংশে হারাবে। উপরন্তু বাণিজ্য সমস্যা বহুপক্ষীয়ভাবে সমাধানের বদলে তা মার্কিনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের ফাঁদে পড়বে বাংলাদেশ। দুই পক্ষের মধ্যে এক পক্ষ প্রবল শক্তিশালী হলে দ্বিপাক্ষিক সমস্যার সমাধান স্বাভাবিক কারণেই দুর্বলের নয়, বরং সবলের পক্ষেই যায়। সে কারণে বাংলাদেশকে সব সময়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে।
চুক্তিতে এ কথা আছে যে, দুই পক্ষের মধ্যে কারো বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যদি কোনো এক পক্ষ ব্যর্থ হয় তাহলে অপরপক্ষ তাকে ‘সহযোগিতা’ দিবে। স্পষ্টতই চুক্তির এই ধারাতে বাণিজ্যের পাশাপাশি ‘বিনিয়োগের সুরক্ষার’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিনিয়োগ ও তার সুরক্ষার বিষয়টি প্রায় সর্বাংশে যুক্তরাষ্ট্রের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রে বা অন্য কোনো দেশে বিনিয়োগ করার শক্তি বা ক্ষমতা বাংলাদেশের তেমন নেই। কিন্তু বাংলাদেশে ও সারাবিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র একটি প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ। চুক্তির বিধান অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের সেই বিনিয়োগ সুরক্ষার দায়িত্ব বাংলাদেশের। বাংলাদেশ যদি সে কাজে অপারগতা প্রদর্শন করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ সুরক্ষার কাজে ‘সহযোগিতা’ দিবে। এই ‘সহযোগিতার’ স্বরূপ কি হতে পারে? ধরা যাক, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানির পিএসসি’র মাধ্যমে বিনিয়োগ করলে সেই বিনিয়োগের সুরক্ষা করা বাংলাদেশের কর্তব্য হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে বিষয়টি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্নের সাথে সম্পৃক্ত তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাংলাদেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তার সক্ষমতা বাড়ানোর কাজে ‘সহযোগিতা’ দেয়ার ‘সুযোগ’ খুলে দিবে। চুক্তির এই বিষয়ের সাথে আমরা যদি বঙ্গোপসাগরে মার্কিন নৌ উপস্থিতি, নৌঘাঁটি স্থাপন, বাংলাদেশের অরক্ষিত সমুদ্রসীমা রক্ষার কাজে সহযোগিতা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ সম্পর্কে একদিকে জোরালো মার্কিনী বক্তৃতা-বিবৃতি এবং অন্যদিকে সমুদ্রে তেল-গ্যাস উত্তোলনের জন্য মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো কর্তৃক পিএসসি চুক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্লক ইজারা নিয়ে নেয়ার কথা একসাথে হিসেবে নেই তাহলে কারো পক্ষেই মার্কিন উদ্দেশ্য সম্পর্কে দুয়ে দুয়ে চারের অঙ্ক মিলিয়ে নিতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রাজনৈতিক-সামরিক স্ট্র্যাটেজির প্রধান দিক নির্দেশ হলো- ‘চীনকে নিয়ন্ত্রনে রেখে তাকে নিবৃত করা’ (containing the influence of china)। এজন্য এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাকে সে তার আন্তর্জাতিক তত্পরতার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেছে এবং এখানেই তার বিদেশে অবস্থানরত নৌসেনার বেশিরভাগ মোতায়েন করেছে। বাংলাদেশকে এই স্ট্র্যাটেজিতে আরো শক্ত করে আটকে ফেলাটা যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গ্লোবাল যুদ্ধের’ আঞ্চলিক সহযোগী করাটাও তার আরেকটি উদ্দেশ্য। এসব ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশকে নিজেদের পরিকল্পনায় আরো নিবিড় ও কাঠামোগতভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যই ‘টিকফা’ স্বাক্ষরে যুক্তরাষ্ট্রের এরূপ মরিয়া প্রয়াস। এমনিতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক গোপন সামরিক চুক্তি রয়েছে। এসবের সাথে ‘টিকফা’ স্বাক্ষরিত হলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সাথে সাথে তার নিরাপত্তা গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ হচ্ছে একটি ঘুমন্ত বাঘ। উন্নত দেশের সঙ্গে অনুন্নত দেশের মধ্যে চুক্তিগুলো মূলত করা হয় গরিব দেশের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য। তবে ভাগ্যের বদল হয় না। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের সঙ্গে এবং বিশ্বের অন্যান্য ৭২টি দেশের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ চুক্তি করেছে। তাতে তারা খুব বেশি লাভবান হয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া যায় না। ‘টিকফা’ বা ‘টিফা’ সম্পর্কে সরকারের বক্তব্যে আপাতদৃষ্টিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পররাষ্ট্রনীতিসহ অনেক বিষয় জড়িত। এ ধরনের চুক্তি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলের অংশ হওয়া যে কোনো বিচারেই ক্ষতিকর। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে মার্কিনিদের স্বার্থরক্ষার জন্যই কাজ করতে হবে।
সবশেষ হাসিনার কেবিনেটে পাশ হওয়া টিকফা চুক্তির মূল কথাগুলো এরকম:
[১] চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং সেবা খাতের ঢালাও বেসরকারিকরণ করতে হবে ।
[২] যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধাসমূহ দূর করতে বাংলাদেশ বাধ্য থাকবে ।
[৩] বেসরকারি খাতের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে, (মানে সরকারকে জিরো করে আনার বুদ্ধি)।
[৪] দুই দেশের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কমিশন প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করবে ।
[৫] যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে শুধু সেবা খাতেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করবে / তারা কোনো পণ্য এদেশে উৎপাদন করবে না / সোজা কথা সার্ভিস দিয়ে পয়সা নেয়া ।
[৬] বাংলাদেশের দেশীয় শিল্প বা প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা প্রদানকারী বাণিজ্য সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ নীতি বাতিল করতে হবে অর্থাৎ শিল্পখাত চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে ।
[৭] যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের অর্জিত মুনাফা বা পুঁজির উপর কোনো কর আরোপ করা যাবে না ।
[৮] বিনিয়োগের বিশেষ সুরক্ষা দিতে হবে এবং বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেয়া হলে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ।
[৯] দেশের জ্বালানি গ্যাস বিদ্যুৎ বন্দর টেলিযোগাযোগ শিক্ষা স্বাস্থ্য পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে ।
[১০] কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করতে হবে এবং কৃষি থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে ।[১১] চুক্তি অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে বাংলাদেশ ।
এই সকল উদ্বেগের বিষয় যেমন আমাদের চিন্তিত করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ঠিক একইভাবে এটাও মনে রাখা দরকার USA চাইলেই কোন দেশের সাথে বাণিজ্য বন্ধ রাখতে পারবে না কারণ তার প্রয়োজন বাংলাদেশের মত বৃহৎ জনগোষ্ঠির ভোক্তা শ্রেণী, সস্তা শ্রম ও খনিজ সম্পদের উত্তোলনে বিনিয়োগ এছাড়াও তাদের দেশে বাংলাদেশী যে প্রবাসীরা থাকে তারা তাদের ভোট ব্যাংক যেমন সম্প্রতি বারাক ওবামা ঘোষণা দিয়েছে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করা হবে। অর্থাৎ বর্তমান প্রেক্ষাপটেই তা অসম্ভব খিলাফাহ্ রাষ্ট্রে তো প্রশ্নই আসে না। আসুন খিলাফাহ্ রাষ্ট্র কিভাবে বেকারত্ব ও বৈদেশিক বিনিময়কে পররাষ্ট্র চুক্তি সমাধান করবে তার সংক্ষিপ্ত নমুনা দেখা যাক:
খিলাফত রাষ্ট্রের সংবিধান থেকে:
ধারা ১৮৪
অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে ইসলামীর রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ভর করবে চারটি নীতির উপর। এগুলো হচ্ছে:
১. ইসলামী বিশ্বে বর্তমান রাষ্টগুলোকে এমনভাবে দেখা হবে যেন তারা একটি অভিন্ন রাষ্ট্র আর তাই তারা পররাষ্ট্র নীতির অধীনে পড়বে না। তাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র নীতির বাস্তবতা বিবেচনা করা হবে না। বরং, এ রাষ্টগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি একক রাষ্ট্রে পরিণত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
২. যে সকল রাষ্ট্র অর্থনৈতিক, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক অথবা বন্ধুত্বের চূক্তিতে চূক্তিবদ্ধহবে তাদের প্রতি চূক্তির শর্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। চূক্তিতে উল্লেখিত থাকলে ঐ সকল রাষ্ট্রের নাগরিকদের শুধুমাত্র পরিচয়পত্র দেখিয়ে আমাদের দেশে প্রবেশের অধিকার প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে তাদের পাসপোর্টের প্রয়োজন হবে না। তবে, চূক্তিতে এটি উল্লেখিত থাকতে হবে যে, ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিকগণও ঐ রাষ্ট্রে অনুরূপ প্রবেশের অধিকার রাখবে। ঐ রাষ্ট্রগুলোর সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক শুধুমাত্র কিছু নির্দিষ্ট পণ্য সামগ্রীর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে; এই শর্তে যে, ঐ পণ্য সামগ্রী আমাদের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় এবং এ (অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক) সম্পর্ক ঐ সকল রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে না।
৩. যে সকল রাষ্ট্রের সাথে আমাদের কোন চূক্তি নেই, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র যেমন বৃটেন, আমেরিকা ও ফ্রান্স, এবং ঐ সকল রাষ্ট্র যাদের আমাদের রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা আছে, যেমন রাশিয়া, ঐ সকল রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমাদের সম্পর্ক সম্ভাব্য যুদ্ধ রাষ্ট্র’ হিসাবে বিবেচিত হবে। তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সকল সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে এবং তাদের সাথে আমাদের কোনরূপ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের অনুমতি নেই। যতক্ষণ না তাদের সাথে প্রকৃতপক্ষেই যুদ্ধের সূচনা হয়ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নাগরিকগণ আমাদের রাষ্ট্রে পাসপোর্ট ও ভিসার মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারবে যা প্রতিটি ব্যক্তির প্রতিটি ভ্রমণের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে।
৪. যে সকল রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই আমাদের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় আছে, যেমন, ইসরাইল, তাদের সাথে যুদ্ধাবস্থার ভিত্তিতেই সকল সম্পর্ক তৈরী করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যেন তারা আমাদের সাথে প্রকৃতপক্ষেই যুদ্ধরত অবস্থায় আছে, সেটি যুদ্ধবিরতিই হোক কিংবা অন্য কোন অবস্থাই হোক না কেন। ঐ সকল রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের আমাদের রাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ।
ধারা ১৮৫
সকল সামরিক চূক্তি এবং সন্ধি সম্পর্ণূ রূপে নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রাজনৈতিক চূক্তি ও সমঝোতা যেখানে সেনাঘাঁটি ও বিমানঘাঁটি লিজ দেয়ার বিষয়গুলোও অর্ন্তভূক্ত। তবে, বন্ধুত্ব, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, অর্থব্যবস্থাপনা, সাংস্কৃতিক এবং যুদ্ধবিরতি চূক্তির অনুমতি রয়েছে।- খিলাফাহ্ ব্যবস্থায়, রাষ্ট্র শুধু GDP বৃদ্ধিকে বিবেচনা না করে বরং প্রতিটি ব্যক্তির মৌলিক চাহিদার কথা চিন্তা করে।
- শিক্ষা ব্যবস্তায় এমন নীতি প্রণয়ন করা হবে যা উৎপাদনমুখী।
- রাষ্ট্রের খাস জমি ভূমিহীনদের বন্টন করা হবে এক্ষত্রে খলীফা সেচ ব্যবস্থা, সার, উন্নতমানের বীজ সরবরাহ করা হবে।
- শক্তিশালী উৎপাদন ব্যবস্থায় জাতিকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভর করতে পারে আর খিলাফাহ্ রাষ্ট্র বিশ্বের পরাশক্তি হিসাবে রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক ও জনসম্পদকে ব্যবহার করে শ্রম ও প্রযুক্তি নির্ভর শিল্পায়নের দিকে নিয়ে যাবে।
- রাষ্ট্র একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গঠন করবে যার জন্য প্রচুর যুদ্ধ উপকরন প্রয়োজন এতে শিল্প বিভাগ থাকবে সামরিক বাহিনীর অধীনে যেখানে অন্তর্ভুক্ত থাকবে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, বিমান প্রস্তুতকারী শিল্প ও অন্যান্য ভারী শিল্প কারখানা যেখানে প্রাইভেট সেক্টরকেও বিনিয়োগে উৎসাহী করা হবে।
- যদি কেউ নিজ উদ্যোগে ব্যবসায় শুরু করতে চায় তাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সুদমুক্ত ঋণ দেয়া হবে। এছাড়া লুটপাঠ, দুর্নীতি, রাহাজানি, টোল সংগ্রহের বিরুদ্ধে শরীয়াহ্ প্রদত্ত শাস্তির ব্যবস্তা নিবে।
- বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে US তার কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ডলারকে প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে এতে সে অন্য রাষ্ট্রকে বাধ্য করে ডলার সঞ্চয় করতে এবং যার বিপরীতে দেশীয় মুদ্রা মুদ্রণ করে। খিলাফাহ্ রাষ্ট্র নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন করবে যা মুদ্রিত হবে মূল্যবান ধাতু তথা স্বর্ণ ও রৌপ্যের বিপরীতে এতে মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ উভয়ই সহজ হবে।
- একবার এটিই প্রতিষ্ঠিত হযে গেলে অন্যান্য দেশগুলোও ইসলামি রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য করতে এগিয়ে আসবে যেমনটি অতীতে হয়েছিল।
টিকফা চুক্তির মাধ্যমে এদেশের অর্থনীতির উপরই শুধু নয়, দেশের শ্রম, শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, গাছ-গাছড়া হতে শুরু করে ছোট ছোট জীব-অনুজীব পরযন্ত সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তার করবে আমেরিকা।
দেশের সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক, ব্যাবসা-বাণিজ্য ও শ্রমবাজারের উপর মার্কিন পুজিবাদী কোম্পানিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি বিকল করে এদেশের ইসলাম ও মুসলিমদের এক হাতে শায়েস্তা করে সম্ভাব্য ইসলামী খিলাফতের উত্থান ঠেকানোর নতুন বীজ বপন করবে ক্রুসেডার আমেরিকা।
“তারা যদি তোমাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারে তাহলে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে শত্রুতায় লিপ্ত হবে, তাদের হস্ত ও রসনাসমুহ প্রসাড়িত করে তোমাদের ক্ষতি সাধন করবে, তারা চায় যাতে তোমরা কাফিরদের কাতারে শামিল হও” [সুরা মুমতাহিনা: ২]।
উপরোক্ত বিশ্লেষনের আলোকে এটাই প্রমাণিত যে, বাংলাদেশ USA’র উপর নির্ভরশীল নয় এবং খিলাফা্ত শাসন ব্যবস্থায় পারে বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে স্বয়ংসম্পূর্ন ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। বর্তমান কুফর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমেরিকা বা অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদীদের বলয় থেকে বের হয়ে আসা বা ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। আর এর জন্য প্রয়োজন মুসলিম উম্মাহ্’কে সাথে নিয়ে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্তা ফিরিয়ে নিয়ে আসা। সামগ্রিকভাবে ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিমালা এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নেয়া হবে যেখানে হালাল এবং হারামের নিরিখে শান্তিপূর্ণভাবে ও আনন্দে জীবন ধারণ সম্ভব হবে। এগুলো রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ বন্টনের ব্যবস্থা করবে এবং মানুষকে সম্পদের দাস বানানো ব্যতিরেকে সম্পদকে মানুষের ভৃত্য বানাবে।
হে মুসলিমগণ!!!!
টিকফা চুক্তির ছদ্বাবরণে ক্রুসেডার আমেরিকার দেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারের উপর একচ্ছত্র থাবা বিস্তারের মাধ্যমে এদেশের ইসলাম ও মুসলিমদের উপর সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের পায়তারা রুখে দাড়ান। শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি ও ভারী শিল্পভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশকে একটি নেতৃত্বশীল জাতিতে পরিণত করার লক্ষে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি তুলুন।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন-
“তিনিই প্রেরণ করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) সহকারে, যেন এই দ্বীন অন্যান্য সকল দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন…” [সূরা আত-তাওবা: ৩৩]
আতিক রহমানইসলামী সমাজ ব্যবস্থা

নিম্মোক্ত প্রবন্ধটি সামাজিক ব্যবস্থা সম্বন্ধে মনোনিবেশ করা হয়েছে যা সমাজে সকল নারী পুরুষের মধ্যে সকল ব্যক্তিগত (ঘরে) ও সার্বজনিক (বাহিরে) সম্পর্ক ও একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়াকে সুগঠিত করে। যদিও এটা বুঝা যায় যে ইসলামে সমাজের জন্য ব্যবস্থা সমূহ প্রতিটি একে অপরের সাথে পারস্পরিকভাবে সম্পর্কিত তাই একটি ব্যবস্থা ছাড়া আরেকটি ব্যবস্থা প্রয়োগের চেষ্টা করাটা শুধুমাত্র দুনিয়াবী জীবনে সর্বনাশা পরিনতির সৃষ্টি করেনা বরং আখিরাতেও দূর্দশার কারন হয় এবং এভাবে প্রয়োগ অনৈসলামিক এবং আল্লাহকে রাগান্বিত করে। উদাহারন স্বরুপ সমাজের ভারসাম্য এবং ইসলামী মূল্যবোধকে নিশ্চত করতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিচার ব্যবস্থা নির্দিৃষ্ট করে দিয়েছেন এবং তার উপর ভিত্তি করে শাস্তি দিতে বলেছেন। এ কারণেই, নিম্মোক্ত আয়াতের প্রয়োগটি হদ্দের কঠিন শাস্তির সাথে সম্পর্কিত যা সমাজে গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে সামাজিক ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন:
“এবং যারা অভিযুক্ত করে একজন সম্মানী নারীকে কিন্তু তার পক্ষে চারজন স্বাক্ষী আনতে পারে না তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে এবং আবার কখনও তাদের স্বাক্ষ্য গ্রহণ করা হবেনা। প্রকৃতপক্ষে তারাই হচ্ছে নাফরমান। কিন্তু যারা এরপর তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম মেহেরবান”। [আন নূরঃ ৪-৫]
এই আয়াতটি যথেষ্ট প্রমান ছাড়া কোন নারীর চরিত্রে কালিমা লেপন করে অভিযুক্ত করা সম্বন্ধে আলোকপাত করেছে। এটা সমাজে নারী যে সম্মানজনক সত্ত্বা সেই চিন্তাকে সু-প্রতিষ্ঠিত করে। যদিও তথাকথিত প্রগতিশীল স্বাধীনতাকামী এই সমাজে নারিদের সম্মান রক্ষা সম্বন্ধে কোনো ধারনা আমরা দেখিনা। এই সমাজে নারীর সত্ত্বাগত কোনো মূল্য নেই, আছে বানিজ্যিক মূল্য। নারীদের মর্যাদা আজ ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে পশ্চিমা গণমাধ্যমের পর্দায় এবং মা, কন্যা, বোন অথবা স্ত্রী হিসাবে তাদের ভূমিকা আজ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। আরেকটি উদাহারনের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, সমগ্র বিশ্বে আপাত প্রতীয়মান এই যে ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা না থাকার কারনে সমাজে মানুষের মৌলিক চাহিদা গুলো পূরণ করা যাচ্ছে না, তাই পুরুষের পক্ষে তার পরিবারের ভরণ পোষণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই বর্তমান সমাজের অবস্থা হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী উভয়কে আজ তাদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কাজ করতে হচ্ছে। তাই পরিবারে প্রত্যেকের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে একে অপরের সাথে সমঝোতা করে নিতে হচ্ছে।
খিলাফত ধবংস হওয়ার প্রায় এক শতাব্দী পরও আমরা আজও মুসলিম বিশ্বে ইসলামি সমাজ ব্যবস্থার ছোঁয়া দেখতে পাই। কিন্তু অনৈসলামিক রাষ্ট্র কাঠামোর মাঝে ইসলামের এই সামাজিক মূল্যবোধ গুলো ফিকে হয়ে যাচ্ছে ও তার খাপ খাওয়ানো ব্যবস্থা সবাইকে সুবিধা দিতে পারছে না। পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ইসলামের সম্মানের চোখে নারীকে দেখার বিষয়টাকে ধ্বংস করে নারীকে অপব্যবহারের তীব্র চেষ্ঠা চালাচ্ছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে তাদের স্যাটেলাইট নামক আগ্রাসী দানবের মাধ্যমে এই প্রচন্ড আক্রমনের জলন্ত স্বাক্ষী আরব বিশ্বের দেশগুলো। এটা হয় আমাদেরকে যৌন হতাশার দিকে ঠেলে দেয় অথবা তথাকথিত স্বাধীনতা চর্চাকে উৎসাহিত করে। কিছু দেশে দুটিই সহবস্থান করে, যেমন: তুরস্ক, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান।
নারী পুরুষের সম্পর্কের অব্যবস্থাপনার কারনে সমাজের সামাজিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে যে অপরাধ, অসৎ কাজ সমাজে আমরা দেখতে পাই তার কারন হচ্ছে সেই দূষিত ভিত্তি যার উপর ভিত্তি করে দাড়িয়েছে সামাজিক ব্যবস্থা, আর অন্য সকল ব্যবস্থা। প্রকৃতপক্ষে পুরো ব্যবস্থাই এই দূষিত ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আছে। “সামাজিক অপরাধ” এটা আমরা প্রত্যেক সমাজ বইয়ে দেখতে পাই। এই সমস্যা যতই হোকনা কেন এটাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা হয় এবং কখনও এর কারন হিসেবে ভিত্তিতে যাওয়া হয়না । আমাদের বুঝা উচিত যদি ভিত্তিই খারাপ হয় তাহলে এই ভিত্তি থেকে যা কিছু আসবে সবই খারাপ হবে। এই ধারনাটা সমাজে আমরা দেখিনা। ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, পর্ণোগ্রাফি, ব্যভিচার, অজাচার, বিচ্ছেদের হার বৃদ্ধি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া ও নির্যাতন এই সব কিছুই হচ্ছে মৌলিক সমস্যার উপসর্গ মাত্র।
সকল মুসলিমেরই আজ এই প্রশ্ন করা উচিত যে, আমাদের সমাজ কিসের উপর ভিত্তি করে তৈরি হচ্ছে?
মুসলমানদের অবশ্যই এ ক্ষেত্রে তার বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে এটি বুজতে হবে যে ধর্ম নিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই জীবণ ব্যবস্থা ভ্রান্ত এবং খুঁজে বের করতে হবে ইসলামের সত্যতাকে এবং শুধু মাত্র সেই সমাজ তৈরি করতে হবে যা ইসলামী আকীদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং যেখানে সামাজিকভাবে ইসলামী শরীয়াহর প্রয়োগ হয় যা আমাদেরকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে উভয় জায়গায় সাফল্য ও উন্নতি দান করবে।
একজন মুসলিম এর জীবনে উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর প্রেরিত সকল আইন অনুসরন করে আল্লাহর ইবাদত করা। অন্যদিকে একজন অমুসলিমের জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের খেয়াল খুশির ও প্রবৃত্তিকে অনুসরন করে যতটুকু সম্ভব আত্মতুষ্টি অর্জন করা। উদ্দেশ্যের এই ভিন্নতা থেকে আমাদের নির্দেশ করে এই দুজনের কাজ এবং সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি উভয়ই ভিন্ন হবে এবং সেই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে নারী-পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা দেখা দিবে। সামাজিক ব্যবস্থা সমগ্র মানবজাতির উপকারের জন্য এবং মানবজাতির উন্নয়ন ও উৎপাদনকে নিশ্চিত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে সাজিয়েছেন। এইরুপ কোন ব্যবস্থা ছাড়া আমরা সন্যাসীপনার দিকে ধাবিত হতে পারি এবং নারী পুরুষের সম্পর্কে রক্ষার ক্ষেত্রে দুঃখ দূর্দশা দেখা দিতে পারে। মানুষের মধ্যে আমরা তিন ধরনের সহজাত প্রবৃদ্ধকে দেখতে পাই, এগুলো হল- অসীম কোন কিছুর আরাধনা করার তাড়না, বেচেঁ থাকার তাড়না এবং প্রজননের তাড়না। যদি এই সহজাত প্রবৃত্তি সমুহকে সঠিক ভিত্তি ব্যবহার করে কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রন ও নির্দেশনা দেয়া না যায় তাহলে এইগুলো আমাদের বিভিন্ন সমস্যার দিকে নিয়ে যাবে যা আমরা বর্তমান সমাজে দেখতে পাচ্ছি। প্রজনন প্রবৃত্তি নিজেই মানুষকে বিভিন্ন সম্পর্কের দিকে নিয়ে যায় এবং যা নির্ভর করে নারী পুরুষের ভুমিকার উপর যেমন- মাতা/পিতা, স্বামী/স্ত্রী, পুত্র/কন্যার ভূমিকা। এখানে এদের সম্পর্ক ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হবে।
এটা খুবই কৌতূহলজনক যে, ইসলাম মুসলমানদেরকে তাদের প্রত্যেকের ভূমিকার উপর ভিত্তি করে যে অবস্থার পার্থক্য করে দিয়েছে সেই অবস্থান এখনও সমগ্র মানবজাতি ধরে রেখেছে তবে এই কুফর ব্যবস্থা তাকে স্তব্ধ করে রাখতে চাছে । সন্তান ও পিতা মাতার সম্পর্ক, ভাই ও বোনের সম্পর্ক, স্বামী ও স্ত্রীদের সম্পর্ক সব সম্পর্কই আজ দুটি ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আছে,
১। ধর্মনিরেপেক্ষতার ভ্রান্ত ভিত্তির উপর এবং
২। স্বাধীনতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা নামক ভ্রান্ত ধারনার উপর।
সব সম্পর্কই আজ তৈরি হচ্ছে প্রয়োজন ও প্রবৃত্তির তাড়না এবং ব্যক্তির সীমাবদ্ধ চিন্তার উপর ভিত্তি করে। সমাজের বিভিন্ন মাধ্যম ব্যক্তিকে আহ্বান করছে কিভাবে সে আরেকজনের সাথে আচরণ করবে। যেমন- টেলিভিশন বকতৃতা, সিনেমা, গান, ম্যাগাজিন ইত্যাদির মাধ্যমে বিপরীত লিঙ্গের সাথে কিভাবে আচরন করতে হবে সেই সম্বন্ধে পুঁজিবাদীরা একটি নির্দিষ্ঠ বার্তা দিচ্ছে কারন তারা সমাজে একটি নির্দিষ্ঠ আবহ তৈরি করতে চায়। যেমন Mr Macho অথবা Mr Sensitive আবার একজন নারীর কি ঘরে মনোযোগী হবে নাকি পেশাগত উন্নতির দিকে। এই সকল বার্তা সব সময় সমাজকে একটা সন্দেহজনক অবস্থান এবং অশান্তিতে রাখে। কারন এই বার্তা সব সময় পরিবর্তন হতে থাকে এবং বারবার একটির সাথে আরেকটির সাংঘর্ষ হয়। সরকারেরও হস্তক্ষেপ করতে হয় যখন এইরকম পরিস্থিতি দেখা দেয়। এটা বুঝা যায় যখন কোন একটি পরিস্থিতিতে সরকার পরিকল্পিত প্রচার অভিযান চালায়। যেমন- এইডস্ আতংক। নারীপুরুষের অবাধ মেলামেশার করণে যখন এটা ভীতিকর হয়ে যায় তখন সরকার একজনের সাথে দীর্ঘ সম্পর্কের কথা বলে এবং সরকারের এই নীতি সিনেমা গুলোতে দেখা যায় অর্থাৎ অবাধ সম্পর্কের সিনেমার সংখ্যা কমে যায়।
পশ্চিমা সরকারগুলো সন্তান/পিতা-মাতার সম্পর্কের বিষয়েও আজ হস্তক্ষেপ করে দেখিয়ে দেয় কে সন্তানকে পিটাতে পারবে, সম্প্রতি পিতা-মাতাকে এ সুবিধা দিয়ে একটি আইন পাস হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে বিবাহ বিচ্ছেদের হার তুলনামুকভাবে বাড়ার পর একটি আইন পাস হয় যাতে বিচ্ছেদিত দম্পতিদের মধ্যে কোন পিতা যদি সন্তানের ভরন পোষন না দেয় তবে শিশু সহযোগী সংস্থার তার পিতাকে দৌড়ের উপর রাখবে যদি সে ভরণ পোষণ না দেয়। এই আইন তাদের টক-শো গুলোর একটি প্রধান আলোচনার বিষয়। আবার নারীদের পেশাগত উন্নতি ও পুরুষের সাথে প্রতিযোগিতায় নামানোতে মাতৃত্বের প্রতি নারীদের অনিহার কারনে সরকার আবার অধিক সন্তানধারি মাকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে শিশু জন্মহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এইসব বিকল্প অস্থায়ী ও অনুপযোগী সমাধান আমাদেরকে নির্দেশ করে মানুষ তৈরি এই ব্যবস্থার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা এবং অসম্পূর্ণতা বিরাজ করেছে। যা হচ্ছে, মানুষ যে সীমাবদ্ধ জীব তারই প্রতিফলন।
নারী-পুরুষের ভুমিকা:
নারীরা সব সময় সম্মানের পাত্র এবং অবশ্যই মর্যাদাপূর্ণ। পুরুষের জন্য বাধ্যতামূলক নারীদেরকে মিথ্যা কলংক বা অপবাদ, শোষণ এবং আক্রমন থেকে রক্ষা করা। একজন নারীর প্রধান ভুমিকাই হচ্ছে স্ত্রী এবং মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। তার দায়িত্ব হচ্ছে সন্তানদের দেখাশুনা করা এবং স্বামীর প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। যদিও, এই দায়িত্ব স্বামীকে সন্তানদের দেখাশুনা করা এবং স্ত্রীদের সামাজিক ভূমিকা ও পেশাগত উন্নয়ণকে অস্বীকার করে না। বরঞ্চ ইসলাম উৎসাহিত করে নারীদেরকে সামাজিক ভূমিকা পালনে। যেমন একজন চিকিৎসক হিসেবে, একজন শিক্ষিকা হিসেবে অথবা একজন বিচারক হিসেবে এবং তাকে অনুমতি দেয় সকল প্রকার পেশাগত কাজ করতে যেমন- ব্যবসা, যতক্ষন পর্যন্ত না তা তার প্রাথমিক কর্তব্য ও দায়িত্বের সাথে সাংঘার্ষিক না হয়। নারীরা পরিবারকে দেখভাল করতে পারবে এবং অর্থায়নও করতে পারবে তবে স্ত্রীদেরকে এবং পরিবারকে খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান দেয়া এটা মূলত ফরজ হচ্ছে স্বামীর এবং পিতাদের উপর কোন নারীর নয়।
রাজনৈতিক জীবনে নারী ও পুরুষের ভূমিকা:
নারীরা পুরুষের মতই রাষ্ট্রের চলমান কার্যক্রমের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য রাজনীতিতে অংশগ্রহন করতে পারবে। অনুরূপভাবে, বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে মুসলমান নারীদের উপর ফরজ দায়িত্ব হল দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা এবং দাওয়াত দেওয়া (অমুসলিমদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য এবং মুসলিমদেরকে ইসলাম বুঝার জন্য এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য দাওয়াত দেয়া) এই কারনে আমরা আকাবার বা’আত এ দুইজন মহিলাকে অংশগ্রহন করতে দেখি।
আবার একজন নারী কখনও শাসক হতে অনুমোদন পাবেনা যেমন-খলীফা। অথবা শাসকের পদও দখল করে রাখতে পারবেনা যেমন-প্রদেশ সমূহের ওয়ালী। এটার প্রমান পাই আমরা ইমাম বুখারী কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে আবি বাকরা এর বর্ণনায়, তিনি বললেন “যখন রাসূল (সা) উপর খবর পৌছল পারস্যের ব্যপারে যে তারা রাজার (কিসরা) কণ্যাকে তাদের শাসক হিসাবে নির্বাচিত করেছিল, তিঁনি বললেন “যে লোকেরা নারী দ্বারা শাসিত হয় তারা কখনও উন্নতি করতে পারবেনা।”
নারী-পুরুষ এক নয়:
এটা দৃষ্টত কিছু লোক বলে এটা ইসলামের লিঙ্গ বৈষম্য আচরণ। এটা শুধুমাত্রই ভ্রান্ত নয় এবং এটা পরিপূর্ণ ভাবেই ভুল এবং মূর্খতার একটি চিহ্ন। এটা মুসলমানদের উপরে পশ্চিমা আক্রমণকে আরও স্পষ্ট করে। সমতার পুরো ধারনাটিই একটি ভুল ধারনা যেহেতু প্রকৃতিগতভাবেই নারী-পুরুষ উভয়ই ভিন্ন। ইসলামে একজনকে আরেকজন থেকে অধ:স্তন হিসেবে দেখা হয় না। অন্যদিকে যেটা বিদ্যমান খিষ্ট্রধর্মের মধ্যে। এটাও নয় যে পশ্চিমাদের মত নারীদেরকে অর্থনৈতিক পন্য হিসেবে দেখা হবে। ইসলামের মধ্যে নারী এবং পুরুষের উভয়েরই দায়িত্ব ও ভুমিকা কিছু ক্ষেত্রে একই এবং অন্য কিছু ক্ষেত্রে দায়িত্ব ও ভূমিকা আবার ভিন্ন, যেমন- পুরুষদের উপর ফরয জিহাদ করা এবং পরিবারকে অর্থায়ন করা কিন্তু এটা নারীদের উপর ফরয নয়।
তাই কেউ যদি ইসলামে সমতার ধারনাকে আনতে চায় তাহলে এই সমতা আসবে পুরষ্কার এবং শাস্তির বিষয়ে। যেমন- যদি নারী ও পুরুষ উভয়ই কোন ফরয দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে অথবা কোন হারাম কাজ করে তারা অবশ্যই শাস্তি প্রাপ্ত হবে আল্লাহ তা’আলার কাছ থেকে অথবা ইসলামী রাষ্ট্র থেকে।
“প্রত্যেকেই যারা অণু পরিমান সৎ কাজ অথবা অসৎ কাজ করবে তারা তা দেখতে পাবে” (সূরা আল-জিলজাল: ৭-৮)
নারী-পুরুষ এক সাথে জড়ো হবার আইন (জনজীবনে এবং ব্যক্তিগত জীবনে) (Public Place and Private Place):
পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিদিনই অশালীনতার ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে আর ইসলাম সমাজে বৈধ বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে নারী ও পুরুষের শালীনতাকে নিশ্চিত করে। তাই ইসলামী রাষ্ট্রের মধ্যে অথবা বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া অবস্থায় নারী এবং পুরুষ যদি না তারা মাহরাম (বিবাহ্যোগ্য নয় একজন আরেকজনকে) হয় তবে একসাথে জড়ো হতে পারবেনা জনজীবনে ও ব্যক্তিগত জীবনে।
তবে শরিয়াহ (ইসলামি আইন) জড়ো হবার অনুমোদন দেয় যেমন- শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, ক্রয়-বিক্রয় এবং হজ্ব ইত্যাদি জনবহুল জায়গায়। যদিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জমায়েত হওয়া অনুমোদন করে কোন সুনির্দিষ্ট শিক্ষা এবং কোন বিষয় সম্বন্ধে জানার জন্য। বিনোদনের জন্য একত্রিত হওয়া (বিদ্যালয়,কলেজে,বিশ্ববিদ্যালয়ে) সম্পূর্ণ নিষেধ। অনুরুপভাবে কর্মক্ষেত্রে এবং বাজারেও। ইসলাম জনজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন উভয়কেই সংজ্ঞায়িত ও নিয়ন্ত্রন করে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য ফরয নিজের দৃষ্ঠিকে সংযত রাখা।
“মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাযত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ্ তা অবহিত আছেন”। (সূরা আন-নূর আয়াত-৩০-৩১)
জনজীবনে (Public Place) ও ব্যক্তিগত জীবনে (Private Place) উভয় জায়গায় একজন পুরুষ এবং নারীর জন্য এটা হারাম যে একাকী একটি কক্ষে বসবে সাথে কাউকে নিয়ে যে তাদের মাহরাম নয়।
মুহাম্মদ (সঃ) বলেন, “একজন মহিলার উচিত না একজন পুরুষের সাথে দেখা এবং মেলামেশা করা যদি তার সাথে কোন মাহরাম না থাকে” । এটা পুরুষদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এই দৃষ্ঠি ভঙ্গি পুরো সমাজের চেহারা পাল্টে দেবে যেমন-ইসলামী রাষ্ট্রের গণপরিবহনে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে তেমনি শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষকে আলাদা করা হবে।
মহিলাদের পোশাক পরিধানের আইন:
শরিয়াহ অনুযায়ী নারী পুরুষ উভয়েরই শরীরের নির্দিষ্ঠ অংশ ঢেকে রাখা ফরয যাকে বলে আল-আওরাহ। খোলামেলা ভাবে আকর্ষণ করানোর পশ্চিমা ধারনা সম্পূর্ণ এর বিপরীত এবং যা মানুষকে যৌন হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।
ব্যক্তিগত জীবনে একজন নারী তার স্বামীর সামনে তার আওরাহ ঢেকে না রাখলেও হবে। যেমন- বুক থেকে হাটু পর্যন্ত ঢেকে রাখলে হবে। অতটুকু পর্যন্ত ঢেকে রাখা মহিলার মাহরাম এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
আল্লাহর নির্দেশ মানার জন্য জনজীবনে (Public Place) একজন নারীর উপর ফরয তার আওরাহ কে পরিপূর্ণভাবে ঢেকে ফেলা যেমন-(তার পুরো শরীর, ঘাড়, গলা এবং চুল), তবে মুখ এবং হাত ব্যতীত।
“হে নবী। আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কণ্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্ত্যক্ত করা হবেনা”। (৩৩: ৫৯)
জনজীবনের পোশাকটি মাথা ও গলা সমন্নিত একটি রুমাল দ্বারা আবৃত (খিমার) থাকবে এবং একটি অতিরিক্ত কাপড় (জিলবাব) যেটা সে ঘরে পরিহিত কাপড়ের উপর পড়বে। জিলবাব অবশ্যই ঢিলেঢালা হতে হবে, পাতলা হতে পারবেনা যার ভিতরে সব দেখা যায় এবং অতি উজ্জল/চোখ ধাঁধানো (তাবার্রুজ) হতে পারবেনা।
মহিলাদের সৌন্দর্য্য প্রকাশের ক্ষেত্রে চোখ ধাঁধানো এবং পুরুষদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এমন কোন কিছু সুগন্ধিযুক্ত এমন যার সুগন্ধ আরেকজন অনুভব করতে পারে এমন কোন কিছু জনজীবনে (Public Place) ব্যবহার করা হারাম। রাসূল (সঃ) বলেন “ কোন মহিলা যে এমন সুগন্ধি ব্যবহার করল এবং কোন পুরুষ তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে সুগন্ধি পেল, তাহলে সে মহিলা জেনাহ কারির সমতুল্য হবে”।
বিবাহ:
মানব জাতির মধ্যে ভালবাসা এবং প্রজননের আকাংখা প্রবৃত্তিগতভাবে বিদ্যমান। অ-সাদৃশ্য বিপদগামী ভ্রান্তচিন্তার পশ্চিমারা কোন নিয়ম বা বাধা রাখেনি এই সহজাত প্রবৃত্তিকে ব্যবহার করার জন্য। ইসলাম মানব জাতিকে একটি ব্যবস্থা দিয়েছে এই সহজাত প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রকাশ করার জন্য যেমন-বিবাহ।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“আর এক নিদর্শণ এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সংঙ্গীনিকে সৃষ্ঠি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারষ্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শণ রয়েছে। (৩০:২১)
“তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহহীন, তাদের বিবাহ সম্পাদন করে দাও এবং তোমাদের দাস ও দাসীদের মধ্যে যারা সৎকর্মপরায়ণ, তাদেরও। তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দেবেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ”। (আন নুরঃ ৩২)
ইসলামে কৌমার্য বা চির কুমার বলে কিছু নেই এবং মহিলাদের বিয়ের জন্য জোর করা যাবে বলে বর্তমান সংস্কৃতিতে ও পশ্চিমারা ইসলামের ব্যপারে যে মিথ্যা অপপ্রচারের ছবি আমাদের সামনে অংকন করেছে তা ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত। কোন নারীর ইচ্ছা বা সম্মতি ব্যতিত কোন বিবাহ ইসলামে বৈধ নয়।
পবিত্র কুরআনে বলেছেন যে পুরুষরা নারীদের আদেশ করবে, এইটা তাদেরকে রক্ষা ও আশ্রয়ের বিষয়ে বুঝানো হয়েছে। তাকে শোষণ করার জন্য বুঝানো হয়নি অথবা প্রভু-ভৃত্তের সম্পর্কের মতো বুঝানো হয়নি। বরং স্বামীকে মান্য করা মানে স্বামী যতক্ষণ আল্লাহর আইন মান্য করে আদেশ করবে তা মান্য করার কথা বলা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে মূলসত্য এই যে তাদের মধ্যে ভাল সম্পর্ক থাকতে হবে। রাসূল (সঃ) বলেন “তোমাদের মধ্যে উত্তম সে, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম”।
সে কারণে স্বামীর ভূমিকাও হবে স্ত্রীর প্রতি সন্তোসজনক, তাকে বোঝা, যত্ন করা এবং সম্মান দেয়া। তাই যদি স্বামী স্ত্রীকে এমন কোন কিছূ করার নির্দেশ দেয় যা আল্লাহ এবং শরীআহ আইনের বিরুদ্ধে (যা তার উপর ফরয) তখন তার অবশ্যই স্বামীকে অমান্য করতে হবে।
অন্য সভ্যতায় যেখানে কিছু দূষিত চর্চার কারনে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক অবনতির দিকে যাচ্ছে সেখানে ইসলামে স্ত্রীকে স্বামী মোহরানা দিচ্ছে এবং ঘরের কাজে স্ত্রীকে সাহায্য করতে হলে স্বামী সেই সাহায্য করতে বাধ্য করেছে, যদি না পারে তাহলে গৃহ পরিচারিকা রেখে সাহায্য করার ব্যবস্থা করতে হবে।
ভালবাসা নিয়ে ইসলামি ও পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি:
বর্তমান ভ্রান্ত সমাজ ব্যবস্থায় নারী-পুরুষের সম্পর্ক পরিস্কার ভাবে গড়ে উঠেছে মানুষের শারীরিক চাহিদা এবং আবেগের তাড়নার ভিত্তিতে । ভালবাসা একটা জনপ্রিয় শব্দে পরিণত হয়েছে সকল ভাষাগুলোতে, সকল সম্পর্ক গুলো গড়ে উঠে এটার উপর ভিত্তে করে, কিন্তু কারো কাছে পরিস্কার কোর ধারনা নেই যে এটা কোন মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। এই অসংজ্ঞায়িত আবেগের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা সম্পর্কের ফলাফল আজকে আমাদের কাছে পরিস্কার হয় যখন আমরা দেখি সমাজে বিবাহের বিচ্ছেদের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং মানুষ বিবাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। স্বামী এবং স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হবে এবং পরস্পরের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কি হবে এই সব কিছুই মানুষের মনগড়া নিয়মে চলছে যা তাদেরকে চরম দুঃখ দূর্দশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের গুরুত্বকে তুলে ধরেছে এবং স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের সাথে সম্পর্ক কেমন হবে তার একটি পরিস্কার রুপরেখা দিয়েছে। ইসলাম সকল প্রকার সন্দেহকে দূরে রেখে এবং স্বামী-স্ত্রী উভয়কে সঙ্গত রেখে কাজ করার অনুমতি দেয়, তাদের মধ্যে ভালবাসার বৃদ্ধির জন্য একটি মূলকাঠামো দেয়, যেখানে এই সব কিছুই পশ্চিমারা অসাদৃশ্যভাবে দেয়।
আল্লাহ সুবহানহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে এটাও বলেছেন “স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যে অধিকার আছে স্ত্রীরও স্বামীর প্রতি একই অধিকার রয়েছে নিয়ম অনুযায়ী।” (আল-কুরআন ২:২২৮)
পবিত্র কুরআনে বিশেষ করে সূরা আন-নিসা এবং সূরা নূর এ, রাসূল (সঃ) এর প্রচুর হাদীসে এবং এ সব হতে অনুসৃত ফকীহদের গ্রন্থ সমূহে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা আছে যা সমাজের মৌলিক নীতি হওয়া উচিত এবং পরবর্তী প্রজন্মের উচিত এখান থেকে শুরু করা।
মাতা-পিতার প্রতি দায়িত্ব:
বাবা-মার ভূমিকা বর্তমান সমাজে প্রতিনিয়ত অবনতির দিকে যাচ্ছে। সন্তানরা বলতে শুরু করেছে তারা স্বতন্ত্র এবং তাদেরও অধিকার আছে নিজের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করার, আর সন্তানদের শিষ্ঠাচার শেখানোর জন্য বাবা-মা খুবই ছোট ভূমিকা রাখে। স্বাধীনতার নামে সন্তানরা অহংকারী ও অস্থির হয়ে যাচ্ছে, নিজের আচার ব্যবহারকে নিজেই নিয়ন্ত্রন করতে পারছে না। সাম্প্রতিক সংবাদ পত্রের সংবাদ দেখলেই আমরা বুঝতে পারি শুধু মাত্র অর্থের জন্য সন্তানরা তাদের পিতা মাতাকে মেরে ফেলছে।
আবার সন্তান বড় হয়ে মাতা-পিতার ভরণ-পোষণ দিচ্ছেনা বরং বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে অথবা খবরও নিচ্ছেনা পিতা মাতা কোথায় আছে কেমন আছে।
ইসলামে বাবা-মা এর প্রতি সন্তানদের আচরণ শরীয়াহ এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন- নিম্মোক্ত হাদীসগুলো দেখলে আমরা বুঝতে পারবো বাবা-মায়ের প্রতি আচরণ কেমন হওয়া উচিত।
আবু বাকরা কর্তৃক বণিত রাসূল (সঃ) বলেন “আল্লাহ চাইলে সব গুনাহ (মানুষের গুনাহ) ক্ষমা করে দিতে পারেন শুধু মাত্র পিতা মাতাকে অমান্য করার গুনাহ ছাড়া।”
মৃত্যু আগ পর্যন্ত কেউ যদি এই গুনাহ করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ভাবে তার কাছ থেকে প্রতিশোধ নেবেন।আল-মুগীরা থেকে বর্ণিত রাসূল (সা.) বলেন “খুব শীঘ্রই আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন মাতাকে অমান্য করার জন্য”।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর থেকে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন “আল্লাহর সন্তুষ্টি নির্ভর করে পিতার সন্তুষ্টির উপর এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি নির্ভর করে পিতার অসন্তুষ্টির উপরে” (তিরমিজি)
উপসংহার:
আরও অনেক আইন আছে ইসলামি সমাজ ব্যবস্থাকে ঘিরে, যা এখানে আলোচনা করা হয়নি, এখানে শুধুমাত্র তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। ইসলামের সমাজ ব্যবস্থার আলোচনা অনেক বৃহৎ কারন নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও এর ফলাফল থেকে উঠে আসা প্রতিটি বিষয়েও ইসলামের নির্দেশ রয়েছে।
ভ্রান্ত এবং নষ্ট চিন্তার চর্চা যা পশ্চিমাদের মধ্যে এবং বর্তমানে আমাদের সভ্যতা ও ঐত্যেহ্যের মধ্যে বিদ্যমান তা থেকে বাঁচার জন্য মুসলিম উম্মাহর একান্ত প্রয়োজন ইসলামিক সভ্যতাকে অধ্যায়ন করা ও আকরে ধরা।
পশ্চিমারা যে ব্যধির দিকে আমাদেকে ডাকছে তা থেকে আমাদের নিজেদের কে গুরুত্বের সাথে বের হয়ে আসতে হবে, এবং তাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে ইসলাম কে একমাত্র বিকল্প হিসেবে আহবান করার মাধ্যমে, তাই আমাদের একটা প্রজন্ম তৈরি করতে হবে যারা পুনঃর্জাগরিত হওয়ার আকাংখা রাখে এবং খিলাফতকে চালিয়ে নিয়ে যাবে।
অতএব, পশ্চিমাদের দেয়া ব্যধিগ্রস্থ ব্যবস্তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে আর তা না হলে বর্তমান প্রজন্মই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের ভাবতে হবে কোন ধরনের ভবিষৎ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এই বিকৃত ও অপরাধে ঘেরা সমাজে???
যদিও আমাদের সংগ্রামের ক্ষেত্র বহু তবে এই কাজ গুলো সমাধান করার পদ্ধতি কেবলমাত্র একটি-ই যা কুরআন এবং সুন্নাহর বাস্তবায়ন অর্থাৎ খিলাফত। উম্মাহর খিলাফতের জন্য সংগ্রাম করা প্রয়োজন আল্লাহ সুবহনাহু ওয়া তায়ালা থেকে বিজয় নেওয়ার জন্য এবং ইসলামিক ব্যবস্তকে দেখা জন্য । আল-খিলাফাহ শুধু মাত্র সামাজিক ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করবেনা অন্য সব ব্যবস্থাকেও প্রতিষ্ঠিত করবে যা মুসলিম উম্মাহকে বাধ্য করবে ইসলামি আইন গ্রহণ করতে, ইসলামি বিধি-বিধান রক্ষা করতে এবং তা প্রচার করার জন্য।
আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
আল্লাহর নির্দেশে তারা ওদের হেফাযত করে নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। আল্লাহ্ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা তাদের নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে। (সুরা আর রাদঃ ১১)
আল্লাহ্ উম্মাহকে ইসলাম দিয়ে সম্মানিত করুক এবং দুনিয়াতে উম্মাহকে দৃঢ় পদে প্রতিষ্টিত করুক এবং দুনিয়া ও আখিরাতে এই দ্বীন প্রতিষ্টার মাধ্যমে সফলতা দান করুক। আমীন।
“The Social System” প্রবন্ধ থেকে অনূদিত
এফ রহমানপ্রশ্ন-উত্তর: খলীফা নির্বাচনের জন্য সময়সীমা বেধে দেয়ার দলীল কী?

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব
প্রশ্ন:আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু
হে শায়খ, পূর্ববর্তী খলীফার অব্যাহতির পর তিনদিনের মধ্যে নতুন খলীফা নিয়োগ দেয়া সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করতে চাই। ‘আজহিযাহ’ বইটিতে উল্লেখ রয়েছে যে এই সময়সীমা উমর (রা) সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে নেয়া হয়েছে যেখানে তিনি (রা) তিনদিনের মধ্যে ঐক্যমতে পৌছাতে না পারলে ছয় সাহাবীর মধ্যে অনৈক্যকারীকে হত্যার নির্দেশ দেন। আমার প্রশ্ন হলো কেউ কেউ বলেন, এই রেওয়ায়াত তারীখ আত-তাবারি হতে নেয়া হয়েছে যা দূর্বল (জয়ীফ) শ্রেনীর (বর্ণনার) মধ্যে পড়ে। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? আল্লাহ আপনাকে বরকত ও উত্তম প্রতিদান দান করুন।
আহমাদ নাযিফ
উত্তর:
খলীফা নির্বাচন করার ব্যপারে উমর (রা)-এর তিনদিনের সময়সীমা নির্ধারন করে দেয়া – এ হুকুমুটি একদল সাহাবীর সম্মুখে ঘটেছে এবং একদল সাহাবীর সম্মুখে উমর (রা) সুহাইব (রা) কে বলেন,
صَلِّ بِالنَّاسِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ، وَأَدْخِلْ عَلِيًّا وَعُثْمَانَ وَالزُّبَيْرَ وَسَعْدًا وَعَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ عَوْفٍ وَطَلْحَةَ إِنْ قَدِمَ… وَقُمْ عَلَى رُءُوسِهِمْ، فَإِنِ اجْتَمَعَ خَمْسَةٌ وَرَضُوا رَجُلًا وَأَبَى وَاحِدٌ فَاشْدَخْ رَأْسَهُ أَوِ اضْرِبْ رَأْسَهُ بِالسَّيْف
জনগনকে তিনদিনের জন্য নামাজে নেতৃত্ব দাও এবং আলী, উছমান, আয-যুবাইর, সা’দ, আবদুর রহমান বিন আউফ যদি সে ফেরত আসে ও তালহা – এদেরকে একত্রিত কর। তাদের গর্দানের উপর দন্ডায়মান থাকো এবং যদি পাচজন কারো ব্যাপারে ঐক্যমতে পৌছায় এবং একজন বিরোধিতা করে তবে তার মাথা গুড়িয়ে দাও কিংবা তরবারী দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দাও।
এটি ইবন সাহাবাহ কর্তৃক তারীখ আল-মদীনাতে বর্ণিত হয়েছে, তাবারী তার তারীখ-এ বর্ণনা করেছেন এবং ইবন সা’দ তার আত-তাবাকাত আল-কুবরাতে একই ধরনের বর্ণনা করেছেন। তারা সকলে শুরা সদস্য ও প্রবীন সাহাবী হওয়া সত্ত্বেও এটি ঘটেছে। এটি সাহাবীদের দৃষ্টি ও শ্রবনের সম্মুখেই সংঘটিত হয়েছে এবং কোনো বর্ণনায় আসেনি যে তারা এর বিরোধিতা করেছেন। তাই এটি ইজমা আস-সাহাবাহ রূপে গণ্য হবে এবং এর ভিত্তিতে মুসলিমদের জন্য তিনদিন ও এর রাত্রিসমূহের অধিক সময় খলীফাবিহীন অবস্থায় থাকা বৈধ নয়। এবং ইজমা আস-সাহাবাহ কিতাব ও সুন্নাহর মতোই দলীলের উৎস।
এ কারণে পূর্ববর্তী খলীফার পর তার পদ শূন্য হয়ে পড়লে মুসলিমদের জন্য তিনদিনের বেশি সময় দেয়া হয়নি যদি না অনিবার্য কোনো পরিস্থিতিতে এ লক্ষ্য অর্জনের পরিপন্থি অবস্থাকে প্রতিহত করা সম্ভব না হয়। সেক্ষেত্রে নিজেদেরকে এ কাজে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে অনিবার্য পরিস্থিতিতে অক্ষমতার দরুন এই ফরজ (পরিত্যাগ)-এর অপরাধ হতে পরিত্রান পাওয়া যাবে। ইবন হিব্বান ও ইবন মাজাহ ইবন আব্বাস হতে বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:«إن الله وضع عن أمتي الخطأ، والنسيان، وما استُكْرِهوا عليه»
নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মত হতে তুলে নিয়েছেন – ভুল, ভুলে যাওয়া ও যা তাদের উপর জোর করে আপতিত করা হয়েছে।
আর যদি তারা নিজেদের একাজে ব্যস্ত ও জড়িত না রাখে তবে তারা গুনাহগার হবে যতক্ষন না তারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করছে এবং তখনই তাদের উপর হতে ফরজিয়্যাতের দায়িত্ব অপসারিত হবে। আর খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ না করে তারা যে অপরাধ করেছে তা তাদের উপর হতে অপসারিত হবে না, বরং তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট থাকবে এবং তিনি সে ব্যাপারে তাদের হিসাব নিবেন, অন্য সকল সেই অবাধ্যতার মতোই যা মুসলিম করে যখন সে ফরজ কাজ পরিত্যাগ করে।
আপনাদের ভাই
আতা’ ইবনু খলীল আবু আল-রাশতা
২৫ রজব ১৪৩৪ হিজরী
৪ জুন ২০১৩ খৃষ্টাব্দ
Source: https://www.facebook.com/photo.php?fbid=177555205745898
























