Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৯ (আকাবার প্রথম শপথ)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    আকাবার প্রথম শপথ:

    পরের বছর মদীনা থেকে বারো জনের একটি দল হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে মক্কায় আগমন করে এবং আকাবার উপত্যকায় মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে। এখানেই তারা মুহাম্মদ (সা) এর সাথে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, যা আকাবার প্রথম শপথ নামে পরিচিত । তারা আল্লাহর রাসূল (সা)-কে এ মর্মে অঙ্গীকার দেয় যে, তারা আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন (জিনাহ) করবে না, তাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, প্রতিবেশীর সাথে দূর্ব্যবহার করবে না এবং সর্বাবস্থায় মুহাম্মদ (সা) এর নের্তৃত্ব মেনে নেবে। যদি তারা তাদের শপথ রক্ষা করে তবে পরস্কার স্বরূপ রয়েছে জান্নাত।  কিন্তু, যদি তারা ওয়াদা ভঙ্গ করে তবে আল্লাহ চাইলে তাদের শাস্তি দেবেন অথবা ক্ষমা করবেন।

    রাসূল (সা) এর সাথে এ চুক্তিতে আবদ্ধ হবার পর তারা হজ্জের মৌসুম শেষে মদীনায় ফিরে যায়।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৮ (দাওয়াতী কার্যক্রমের সম্প্রসারণ)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    মুহাম্মদ (সা) বনু সাকিফ এবং তায়েফ গোত্র কর্তৃক নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত এবং হজ্জের মৌসুমে কিন্দা, কালব, বনু ’আ-মির ও বনু হানিফা কর্তৃক সম্পূর্ণ ভাবে প্রত্যাখ্যাত হবার পর থেকেই মূলতঃ আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি কুরাইশদের সহিংসতা চুড়ান্ত আকার ধারন করে। এ অবস্থা কুরাইশদের মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর দলকে সমাজ ও বর্হিজগৎ থেকে আরো বিচ্ছিন্ন করার সুযোগ তৈরী করে দেয়। কিন্তু এ সমস্ত ঘটনা আল্লাহর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীদের দৃঢ় ঈমানে না কোন ফাটল ধরাতে পারে, না তারা আল্লাহর প্রতিশ্রুত বিজয়ের ব্যাপারে কখনো সন্দেহ প্রকাশ করেন। বরং, তারা শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত সত্য পথের উপর অবিচল ভাবে দন্ডায়মান থাকে।

    এভাবে, মুহাম্মদ (সা) তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন এবং পরিণাম নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত না হয়ে যখনই সম্ভব বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে থাকেন। কুরাইশ সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ চেষ্টা করেছে তাঁর আনীত দ্বীনের ভবিষ্যত নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও ঠাট্টা তামাশা করতে, কিন্তু তিনি এসব কটুক্তি বা হীন মন্তব্যে কখনো কান দেননি বা ইসলামের বিজয়ের ব্যাপারে এতোটুকু সন্দেহ প্রকাশ করেননি। তিনি জানতেন আল্লাহতায়ালা তাকে তাঁর রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছেন। তাই, তাঁকে (সা) সবরকম ক্ষতি থেকে রক্ষা করা এবং তাঁর মনোনীত দ্বীনকে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা করা তাঁরই দায়িত্ব। তাই তিনি দাওয়াতী কার্যক্রম সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষা করেছেন।

    সৌভাগ্যবশত ইসলামের বিজয়ের জন্য মুহাম্মদ (সা)-কে খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। হজ্জ্বের মৌসুমে ইয়াসরিব (মদীনা) থেকে আগত আল-খাযরাজ গোত্রের একদল মানুষ যখন আল্লাহর রাসূল (সা) এর আহবানে ইসলাম গ্রহণ করলো তখনই তাঁর আনিত দ্বীনের বিজয়ের লক্ষণগুলো সুস্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত হতে থাকলো।

    আল্লাহর রাসুলের (সা) আহবান শোনার পর তারা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে বলে, “আল্লাহর কসম, এই হচ্ছে সেই নবী যার কথা আমরা ইহুদীদের কাছে শুনেছি এবং আমরা তাঁকে (আল্লাহর রাসূল (সা)-কে) কোন অবস্থাতেই আমাদের পূর্বে তাদের স্বীকৃতি দেবার সুযোগ দেবো না।”এরপর তারা রাসূল (সা)-এর আহবানে সাড়া দেয় এবং ইসলাম গ্রহণ করে। They said to him, “we have left our people (Aws & Khazraj), for no tribes are so divided by hatred and rancor as they. Perhaps Allah will unite them through you, if so, then no man will be mightier than you.”

    ইয়াসরিবে ফিরে যাবার পর তারা নিজ গোত্রের লোকদের মুহাম্মদ (সা) এর কথা জানায় এবং ইসলাম এর দিকে আহবান করে। তারা সেখানকার মানুষের হৃদয় ও অন্তরকে সত্য দ্বীন গ্রহন করার জন্য প্রস্তুত করতে সক্ষম হয় এবং আউস ও খাযরাজ গোত্রের প্রতিটি ঘরে ঘরে মুহাম্মদ (সা) আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৭ ইসলামী দাওয়াতের দুটি পর্যায়

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    মক্কায় মুহাম্মদ (সা)-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের মূলত দুটি পর্যায় রয়েছে। প্রথম পর্যায়ে রাসূল (সা) সাহাবীদের দ্বীন শিক্ষা দেন এবং তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও আত্মিক উন্নতি ঘটান। আর দ্বিতীয় পর্যায়ে দ্বীন ইসলামের প্রচার করেন এবং সেই সাথে শুরু হয় সংগ্রাম। প্রথম পর্যায়ের মূল লক্ষ্য ছিল দ্বীনের এই সম্পর্কে নতুন ধ্যান-ধারণা তাদের অন্তরে দৃঢ় ভাবে প্রোথিত করে সেই আলোকে তাদের চরিত্রকে গড়ে তোলা এবং তাদের সংগটিত করা। আর পরবর্তী  পর্যায়ের  লক্ষ্য ছিল  এই আদর্শ  ভিত্তিক  ধ্যান-ধারণা  গুলোকে  এমন এক  চালিকা  শক্তিতে  পরিণত  করা  যা  সমাজের প্রতিটি স্তরে এগুলোকে বাস্তবায়ন করে সমাজকে একেবারে নতুন করে ঢেলে সাজানো। আসলে বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত যে কোন আদর্শ বা ধ্যান-ধারনাই হলো প্রাণহীন কতগুলো তত্ত্ব কথার সমষ্টি, জীবনে যার কোন বাস্তব প্রভাব নেই। নির্জীব এই সব তত্ত্ব কথাগুলোতে প্রাণের সঞ্চার করতে এবং এগুলো সমাজের প্রতিটি স্তরে কার্যকরী করতে প্রথমে প্রয়োজন এই ধ্যান-ধারণা গুলোকে প্রচন্ড এক চালিকা শক্তিতে পরিণত করা। যা সমাজের মানুষ স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে গ্রহন করবে, এগুলোর গভীরতা অনুভব করবে, প্রচার করবে এবং সর্বোপরি এগুলোর বাস্তবায়নের জন্য সংগ্রাম করতে প্রস্তুত থাকবে। এরকম একটা পরিস্থিতেই কেবল সমাজে নতুন এই আদর্শকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে ।

    মুহাম্মদ (সা) ঠিক এ পদ্ধতিতেই মক্কায় তাঁর দ্বীন প্রচার করেছিলেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেন, ইসলামী ধ্যান-ধারণার আলোকে তাদের চরিত্রকে গড়ে তোলেন এবং তাদেরকে ইসলামের নিয়ম নীতি গুলো শিক্ষা দেন। এ পর্যায়ে তিনি মানুষকে ইসলামী আকীদাহর (বিশ্বাস) ভিত্তিতে একত্রিত করতেন এবং গোপনে তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দিতেন। আল্লাহর রাসূল (সা) বিরতিহীন ভাবে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেন এবং প্রচন্ড নিষ্ঠার সাথে ইসলামের আলোকে তাঁর অনুসারীদের চরিত্র গড়ে তোলেন। তিনি তাদেরকে আল আরকাম (রা)-এর বাড়িতে একত্রিত করতেন অথবা নওমুসলিমের নিজ বাড়িতে বা উপত্যকায় কাউকে পাঠাতেন, যেখানে তারা গোপনে কয়েকজন একত্রিত হয়ে দ্বীন শিক্ষা করতেন। এভাবে তাদের মধ্যে ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাদের পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হয় এবং সবোর্পরি নতুন এই দ্বীনকে তারা এমন ভাবে অনুধাবন করে যে, দ্বীন প্রচারের জন্য তারা সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।

    ইসলামের আদর্শ তাদের হৃদয়ে ও অন্তরে এমন ভাবে প্রোথিত হয়ে যায় যে, তাদের রক্তের প্রতিটি অনু পরমানুর মধ্যে মিশে যায় ইসলামী চিন্তা চেতনা এবং তারা প্রত্যেকে হয়ে যায় দ্বীন ইসলামের জীবন্ত উদাহরন। তাদের প্রতিটি কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রকাশ পেতে থাকে ইসলামের সৌন্দর্য এবং তারা শত চেষ্টার পরও কুরাইশদের কাছ থেকে তাদের ইসলাম গ্রহনের সংবাদ গোপন করতে ব্যর্থ হয়।

    তারা বিশ্বস্ত এবং ইসলাম গ্রহন করার মতো মন-মানষিকতা সম্পন্ন লোকদের সাথে কথা বলতে শুরু করেন। এভাবে, মক্কাবাসীরা তাদের আহবান সম্পর্কে জানতে শুরু করে এবং সমাজে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে শুরু করে। এটা ছিল মূলতঃ দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায় এবং এরপর প্রয়োজন হয় ইসলামী আহবানকে সমাজের মাঝে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে দেয়ার। পরবর্তীতে যখন শুরু হয় ব্যাপক গণসংযোগ এবং ইসলামের আহবান লিপ্ত হয় সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারনার সাথে প্রকাশ্য সংঘর্ষে, মূলতঃ তখন থেকেই ইসলামী দাওয়াত নওমুসলিমদের একত্রিত করে তাদের দ্বীন শিক্ষা দেবার পর্যায় অতিক্রম করে দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে মানুষ ইসলামী আদর্শ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে শুরু করে। ফলে, কিছু মানুষ ইসলামের আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহন করে আর বাকীরা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বস্তুত, কুফর ও বাতিলশক্তির উপর এবং ঈমান এবং ন্যায়পরায়নতা জয়লাভের পূর্বে এ ধরনের সংঘাত অনিবার্য। এছাড়া সত্যকে গ্রহন না করতে মানুষ যতই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হোক না কেন, প্রকৃতপক্ষে, তাদের অন্তর সত্যের অর্নিবান শিখাকে পাশ কাটিয়ে যেতেও পারে না, আবার আলোকিত আদর্শ দিয়ে প্রভাবিত না হয়েও পারে না। না পারে তারা তাদের বিদ্বেষী মনোভাব দিয়ে সত্য বিকাশের পথকে চিরকালের জন্য রুখে দিতে।

    এভাবেই কুফর আর ইসলামের প্রচন্ড রকম পরস্পর বিরোধী ধ্যান-ধারনার মাঝে সংঘাত ও সংঘষের্র মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে ইসলামী দাওয়াতের গণসংযোগ পর্যায়। এ পর্যায় শুরু হয় সেই সময় থেকে যখন আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের সঙ্গে করে এমন ভাবে কাবাঘর প্রদক্ষিন করেন যা মক্কাবাসীদের কাছে ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত। মূলতঃ এই সময় থেকেই রাসূল (সা) কাফিরদের প্রচলিত জীবন-ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকাশ্যে সমাজের মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করেন।

    এ সময় রাসূল (সা)-এর উপর অবতীর্ণ ওহী দ্বারা আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা তাঁর একত্ববাদের ঘোষনা দেন এবং একই সাথে কোরআনের আয়াতের মাধ্যমেই কুফর জীবন-ব্যবস্থা ও মুর্তিপুজাকে বাতিল বলে ঘোষনা করেন। এছাড়া, এ সময়ই আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন সব আয়াত নাজিল হয় যেখানে কাফিরদের অন্ধভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারাকে অনুকরন করাকে তীব্র ভাবে সমালোচনা করা হয়। আয়াত নাজিল হয় সমাজের প্রতারনাপুর্ণ লেনদেনের প্রকৃত চেহারা উম্মোচন করে, যে সকল আয়াতে সুদভিত্তিক লেনদেন এবং ওজনে কম দেয়ার মতো ক্ষয়ে যাওয়া মূল্যবোধকে প্রচন্ড ভাবে আক্রমণ করা হয়। সমাজের মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করার জন্য মুহাম্মদ (সা) তাদের একত্রিত করে তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। এ লক্ষ্যে তিনি তাঁর গোত্রের লোকদের একত্রিত করতেন, তাদের খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানাতেন, তারপর তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং তাদের সহযোগিতা চাইতেন। কিন্তু গোত্রের লোকেরা তাকে প্রত্যাখ্যান করত। তিনি (সা) সাফা পাহাড়ের পাদদেশে মক্কাবাসীদের একত্রিত করে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেছিলেন, কিন্তু তাঁর এ আহবান শুধুইমাত্র কুরাইশ নেতাবৃন্দের বিশেষ করে আবু লাহাবের ক্রোধের কারণ হয়েছিলো। ফলে, আল্লাহর রাসুলের সাথে কুরাইশ সম্প্রদায় ও অন্যান্য আরবের মধ্যকার সম্পর্কের তীক্ষতা আরও গভীর হয়েছিলো। এভাবে সাহাবীদের দার-উল-আরকাম এবং উপত্যকায় গোপনে বিশেষ ভাবে শিক্ষা দেবার সাথে সাথে গণসংযোগের পর্যায়ও দাওয়াতী কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত হলো।

    এভাবে, ইসলামের আহবান শুধুমাত্র যোগ্য এবং সম্ভাবনাময় ব্যক্তিদের পরিবর্তে সাধারন ভাবে সমাজের সমস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। বস্তুতঃ ইসলামের আহবানের শক্তিতে শঙ্কিত হয়ে কুরাইশরা যখন রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীদের দিকে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ আর ঘৃণার বাণ নিক্ষেপ করতে লাগলো, তখনই ইসলামের প্রকাশ্য এ আহবান এবং ইসলামী চেতনাদৃপ্ত ব্যক্তি তৈরীর প্রভাব সমাজে প্রকাশিত হতে লাগলো। ইসলামী আদর্শ বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে যত বেশী শক্তিশালী হয়ে উঠলো, তা ততবেশী কাফিরদের ক্রোধ আর ঘৃণার কারণ হয়ে উঠলো । কাফিররা যখন অনুভব করলো তারা কোনভাবেই মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর প্রচারিত আদর্শকে পাশ কাটাতে পারবে না, তখন তারা ইসলামের আহবান চিরতরে বন্ধ করে দেবার লক্ষ্যে উঠে পড়ে লাগলো। আর সেইসাথে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের প্রতি কাফিরদের অত্যাচার নির্যাতন ধারণ করলো।

    বস্তুতঃ মুসলিমদের প্রকাশ্য জনসম্মুখে আহবান সমাজকে ব্যাপক ভাবে প্রভাবিত করেছিলো। যা দাওয়াতী কার্যক্রমকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সমাজে তৈরী করেছিলো প্রয়োজনীয় জনমত এবং এর সাহায্যেই পরবর্তীতে দাওয়াতের এই কার্যক্রম সমস্ত মক্কাব্যাপী দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিলো। এভাবে যতই দিন যেতে লাগলো মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। ইসলামের ছায়াতলে যেভাবে আসতে লাগলো বঞ্চিত, নির্যাতিত আর নিপীড়িত জনগোষ্ঠি, একই ভাবে সমাজের সম্মানিত ও নেতৃস্থানীয় মানুষ সহ ধনী ব্যবসায়ী শ্রেনীর মানষুও আলোকিত হলো সত্যের আলোয়। বস্তুতঃ তাদের ধনসম্পদ বা ব্যবসা-বাণিজ্য তাদেরকে রাসূল (সা) এর সত্য আহবানে সাড়া দেবার কর্তব্য থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বস্তুতঃ যারা ইসলাম গ্রহন করেছিলো তারা হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছিলো পবিত্রতা, প্রজ্ঞা ও সত্যের সৌন্দর্যকে। যা তাদের মুক্ত করেছিলো  মানবচরিত্রের  অন্ধ  গোয়ার্তুমি  এবং  মিথ্যা  অহমিকার  কলুষতা  থেকে।  ইসলাম  গ্রহন  করার  মূহুর্তেই তারা  বঝুতে  পেরেছিলো  এ আহবানের ন্যায়সঙ্গত ভিত্তি ও আহবানকারীর সত্যনিষ্ঠতা। এভাবে মক্কার প্রতিটি প্রান্তে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে গেল এবং মক্কার নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহন করতে লাগলো। যদিও মক্কাবাসীদের প্রকাশ্যে এবং সমষ্টিগত ভাবে আহবান করার ফলে মুসলিমদের উপর অত্যাচার ও নির্যাতনের মাত্রা তীব্র হয়েছিলো, তবুও মূলতঃ এ প্রকাশ্য আহবানই ইসলামের আহবানকে ব্যাপক বিস্তৃতি লাভে সহায়তা করেছিলো। ইসলামী দাওয়াতের সাফল্য নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের শুধু ক্রোধের কারনই হয়নি, বরং এ সাফল্য তাদের অন্তরে তীব্র প্রতিহিংসার আগুন প্রজ্জ্বলিত করেছিলো। কারণ, আল্লাহর  রাসূল (সা)  মক্কার  সমাজে  শক্তিশালী  ভাবে  প্রতিষ্ঠিত জুলুম-নির্যাতন ও শোষন-বঞ্চনার  মতো অসুস্থ, অনৈতিক ও বিকৃত ধ্যান- ধারনাগুলোকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করেছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে অনমনীয় ভাবে আদর্শিক সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন।

    প্রকাশ্য ভাবে আহবানের এই পর্যায়টি ছিলো মূলতঃ একটি চুড়ান্ত ভাবে পার্থক্যকারী পর্যায়। এর একদিকে ছিলেন আল্লাহর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীবৃন্দ এবং অপরদিকে ছিলো কাফির নেতৃবৃন্দ ও কুরাইশ সম্প্রদায়। যদিও এর মধ্যবর্তী সময় অর্থাৎ, ইসলামী ব্যক্তিত্ব গঠন এবং প্রকাশ্যে গণসংযোগের মধ্যকার সময়টিকেও বিবেচনা করা হয় খুবই নাজুক এবং স্পর্শকাতর হিসাবে, কারণ এই সময় ইসলামের দাওয়াতকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য প্রয়োজন ছিলো প্রচন্ড পরিমাণ প্রজ্ঞা, অন্তর্দৃষ্টি, ধৈয্য এবং সর্বোপরি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার নিপুন ক্ষমতার। কিন্তু, তারপরও প্রকাশ্য গণসংযোগ পর্যায়কেই সবচাইতে কঠিন সময় বলে বিবেচনা করা হয়। কারণ, এ জন্য মুসলিমদের সত্যকে নির্ভয়ে প্রচার করা এবং বাতিল শক্তি ও শাসন-ব্যবস্থাকে সরাসরি অস্বীকার করার মতো প্রচন্ড পরিমাণ সাহস ও পরিণতিতে যে কোন ধরনের পরিণাম মেনে নেবার জন্য মানসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিলো। এটা এ কারনেই যে, মুসলিমদের জন্য দ্বীন এবং ঈমানের পরীক্ষা ছিলো অবধারিত।

    আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবীরা পর্বতসম অত্যাচার, নিপীড়ন, নির্যাতন ও আক্রমন সহ্য করে ঈমানের এ পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হন।

    প্রচন্ড আক্রমনাত্মক ও নিপীড়নমূলক এ অত্যাচারের সম্মুখীন হয়ে মুসলিমদের একটি দল মক্কা ত্যাগ করে আবিসিনিয়ায় চলে যায়, কেউ কেউ নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করে আর কিছু সংখ্যক মুসলিম নির্যাতন সহ্য করে মক্কায়ই থেকে যায়। মুসলিমরা ততক্ষন পর্যন্ত একাগ্রচিত্তে দৃঢ়তা এবং একনিষ্ঠতার সাথে বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে তাদের আন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না ইসলামের আলোকিত আহবান কুফর ধ্যান-ধারনার নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে থাকা মক্কার সমাজকে প্রচন্ড ভাবে আঘাত করে। যদিও মুহাম্মদ (সা)-এর দাওয়াতী কার্যক্রমের প্রথম তিনবছর মূলতঃ আল-আরকাম (রা) এর গৃহেই সীমাবদ্ধ ছিলো এবং এ সময়টাই ছিলো দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায়, কিন্তু তারপরও পরবর্তী আটবছর আল্লাহর রাসূল (সা)কে করতে হয়েছিলো কঠিন সংগ্রাম। বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে নবুওতের সুস্পষ্ট প্রমাণ দেবার পরও পরবর্তী বছরগুলোতে তাকে লিপ্ত হতে হয়েছিলো বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে ভয়াবহ সংগ্রামে। বস্তুতঃ এ সময়টা স্মরণীয় হয়ে আছে এজন্য যে, এ দীর্ঘ আটবছরে কুরাইশরা মুসলিমদের একমহুর্তের জন্য অত্যাচার ও নির্যাতন করা থেকে বিরত হয়নি, না তারা দেখিয়েছিলো মুসলিম ও ইসলামের প্রতি কোনরকমের কোন সহানুভূতি।  মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যকার এই সাংঘষির্ক এবং বিপরীতমুখী অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেই ইসলামের আহবান সমস্ত আরব উপদ্বীপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমস্ত মানুষের কাছে ইসলাম একটি আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। এছাড়া, হজ্জ্ব করতে আগত আরবদের মাধ্যমেও এ আহবান আরব গোত্রগুলোর মাঝে বিস্তৃতি লাভ করে। কিন্তু, এ আরব গোত্রগুলো কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবার আশঙ্কায় ঈমান আনার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ না দেখিয়ে মূলতঃ দর্শকের ভূমিকা পালন করে এবং মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর প্রচারিত আদর্শকে সম্পূর্ন ভাবে পাশ কাটিয়ে যায়। বস্তুতঃ মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের এই ভয়ঙ্কর অবস্থাই দাওয়াতের তৃতীয় পর্যায় অর্থাৎ যে পর্যায় ইসলামকে সম্পূর্ন ভাবে প্রয়োগ করবে তার অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে।

    মক্কাবাসীর ইসলামী দাওয়াতের প্রতি এরূপ বিদ্বেষ ও সহিংসতা ধীরে ধীরে মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার সমস্ত সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেয়।

    উপরন্তু, মুসলিমদের উপর কাফিরদের ক্রমবধর্মান অত্যাচার ও নির্যাতন দাওয়াতী কাযর্ক্রমের পথে বিরাট বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এ অবস্থা আরও জটিল আকার ধারন করে যখন মক্কাবাসী সম্পূর্ণ ভাবে ইসলামকে প্রত্যাখান করে।

  • আমেরিকা কি সিরিয়া আক্রমন করবে?

    আমেরিকা কি সিরিয়া আক্রমন করবে?

    গত বুধবার, ২১ আগষ্ট, সিরিয় সরকার দামেস্কের পাশেই আল-ঘুটায় জনসাধারনের উপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমন চালিয়ে প্রায় ১৭২৯ জনকে হত্যা করে। এর একদিন পরেই ফরাসী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট ফেবিয়াস বলেন, এধরনের আক্রমন প্রমানিত হলে ‘পাল্টা আক্রমন’ (reaction with force)-এর প্রয়োজন হতে পারে। গত শুক্রবার ২৩শে আগষ্টে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সচিব চাক হেজেল বলেন, ক্রুজ মিসাইল দ্বারা সম্ভাব্য আক্রমনের প্রস্তুতির জন্য নৌবাহিনীর কিছু এসেট সিরিয়ার কাছে পৌছানোর আদেশ দিয়েছে পেন্টাগন। এছাড়া বৃটেনও খুব শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেছে যেখানে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে কথা বলেন এবং ঐক্যমতে পৌছান যে এধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিপক্ষে একটি ‘শক্তিশালী জবাব’ (serious response) দিতে হবে। গত রবিবার, ওয়াশিংটনের বেশ কিছু মার্কিন আইনপ্রণেতাগণ মতামত পোষন করেন যে তারা মার্কিন ও এর মিত্রশক্তি কর্তৃক সীমাবদ্ধ সামরিক আক্রমন প্রত্যাশা করেন। সুতরাং, এসবের মধ্যে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠে আসে: আমেরিকা কি সিরিয়া আক্রমন করবে?

    এখানে একটি মূল বিষয় হচ্ছে, এটি খুবই অনাকাঙ্খিত যে আমেরিকা হস্তক্ষেপ করবে এটা না উপলব্ধি করেই আসাদ সরকার ব্যপকভাবে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করবে। প্রথমতঃ আসাদ সরকার ইতোমধ্যে বিদ্রোহীদের আক্রমনের মুখে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দ্বিতীয়তঃ তারা মিডিয়া উত্তেজনা এড়িয়ে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার না করেই বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। আসাদ সরকার ইতিপূর্বেও সল্প আকারে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছে; কিন্তু আমেরিকা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এ থেকে একটি বিষয় বোঝা যায় যে আসাদ সরকার তখনই এধরনের (রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের মতো) গর্হিত কাজে লিপ্ত হবে যখন সে মার্কিন সবুজ সংকেত পাবে যাতে মার্কিন স্বার্থ জড়িত।

    সুতরাং কেন ওয়াশিংটন এধরনের সবুজ সংকেত দেবে যাতে বিশ্ব জনমত উত্তেজিত হবে এবং এ ঘটনায় নিস্ক্রিয়তার দরুন মার্কিন ভাবমূর্তি বিশ্বব্যাপি ক্ষুন্ন হবে? আসাদ সরকার গত ৪৩ বছর মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করে আসছে। আমেরিকার এখনো আসাদ সরকারকে প্রয়োজন যেহেতু সিরিয় বিদ্রোহীদের মাঝে তার স্বার্থ রক্ষাকারী মিত্র খুঁজে বের করা অত্যন্ত দুরূহ বলেই প্রমানিত হয়েছে। এ বিষয়টি পরিস্কারভাবে উচ্চারিত হয়েছে মার্কিন জয়েন্ট চীফ অফ স্টাফ-এর চেয়ারম্যান জেনারেল ডেম্পসের বক্তব্যে যখন তিনি বলেন, আমি মনে করি যে [বিদ্রোহী] অংশই আমরা পছন্দ করি তাদের অবশ্যই তাদের স্বার্থ ও আমাদের স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রস্তুত থাকতে হবে যখন ক্ষমতা তাদের দিকে মোড় নেবে। বর্তমানে, তারা সে অবস্থানে নেই। সুতরাং, আমেরিকা এ ধরনের (রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের) সবুজ সংকেত তখনই দেবে যখন তারা এর ওজর দেখিয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার নিমিত্তে সিরিয়া আক্রমন করতে চাইবে।

    আমেরিকা আসাদ সরকারের প্রতি ইরানি সমর্থন ও সিরিয়ার ভুমিতে হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপের দিকে ভ্রুক্ষেপ করেনি। উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়া সরকারকে ঠেকিয়ে রাখা যতক্ষন না আমেরিকা কোনো ধর্মনিরপেক্ষ বিদ্রোহী দল তৈরি করা যা আসাদ সরকারকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। এ সবকিছুই ব্যর্থ হয়ে আসছে। হিজবুল্লাহ আসাদকে হোমসে কিছুটা শক্তি যুগিয়েছে, কুসাইর শহর দখল করে দিয়েছে ও দামেস্কে সহায়তা করেছে। এসব কিছুই ছিল সীমিত আকারে আর লেবাননে আভ্যন্তরিন বিষয়াদি ও যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক ক্ষতির দরুন তারা ইতোমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়ে। সুতরাং, আমেরিকা সামরিক হস্তক্ষেপ করবে যদি বিদ্রোহীদের চাপে আসাদ সরকার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌছায়।

    বিগত কয়েক সপ্তাহে বিদ্রোহীদের ফিরতি উত্থান হয়েছে। যদিও গত দুবছরে যুদ্ধে এটি প্রথমবরের মতো নয়, কিন্তু এবারের বিশেষত্ব হল সামরিক ঘাটি ও চেকপয়েন্ট হতে বিদ্রোহীদের প্রাপ্ত অস্ত্র। আলেপ্পোর মেনেগ বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রন নিতে গিয়ে বিদ্রোহীরা অসংখ্য অস্ত্র প্রাপ্ত হয়। এর মধ্যে রয়েছে, টি-৭২ ট্যাংক, এন্টি ট্যাংক গান, হেভি মেশিন গানস, ৫৭মিমি এন্টি এয়ারক্রাফ্ট গানস, প্রচুর গ্রেনেড ও গোলাবারুদ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রাপ্তি হল দামেস্কের শহরতলীর অস্ত্র ভান্ডার যেখানে বিদ্রোহীরা শত-শত আধুনিক ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র খুঁজে পেয়েছে যা আসাদের যেকোনো ট্যাংকই ধ্বংস করতে সক্ষম। এসব ক্ষেপনাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে, ফরাসী মিলান টাইপ, রাশিয়ান করনেট, কনকার্স ও ফ্যাজোট টাইপ। এরমধ্যে করনেট সর্বাধুনিক এবং আসাদের যেকোনো আধুনিক ট্যাংক ধ্বংস করতে সক্ষম।

    বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহারের দিক দিয়ে আসাদের শুধুমাত্র দুটি সুবিধা রয়েছে। ভারী সামরিক অস্ত্রাদি ও বিমান। ট্যাংক-বিধ্বংসী ক্ষেপনাস্ত্র ব্যবহার করে বিদ্রোহীরা ভারী অস্ত্রাদির ভান্ডার ও বিমান উড্ডয়নের জন্য ব্যবহৃত এয়ারবেইসগুলো দখল করে নিতে পারবে। তাই, আগামী দিনগুলোতে সিরিয়ার সামরিক-কৌশলগত ভারসাম্য পাল্টে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে – যা মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে। এধরনের মার্কিন হস্তক্ষেপের পেছনে যে উদ্দেশ্যগুলো থাকতে পারে তা নিম্নরূপ:

    ১) যেকোনো বড়মাপের মরনঘাতি অস্ত্রাদি যা বিদ্রোহী হাতে চলে আসতে পারে তা বিনষ্ট করা।
    ২) ভবিষ্যতে জাবহাত আল-নুসরাহ ও একই ধরনের জঙ্গী গ্রুপের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলার সদ্ব্যবহার করা।
    ৩) ভবিষ্যতের কোনো তীব্র অবস্থার জন্য প্রস্তুতি নেয়া বিশেষ করে যদি বর্তমান সরকার যদি পরাভূত হয় এবং বিদ্রোহীরা বর্তমান বিশ্ব অবস্থার প্রভাববলয় থেকে মুক্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করে বিশেষ করে যদি তা হয় একটি ইসলামী রাষ্ট্র।

    আমেরিকা প্রাথমিকভাবে কোনো সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করতে ইচ্ছুক নয়। সুতরাং, জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল ঐক্যমতে পৌছাতে না পারলে, ন্যাটোর সহায়তায় সীমাবদ্ধ কোনো আক্রমন আসতে পারে সিরিয়ায়।

  • সন্তানকে সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দিন

    সন্তানকে সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা দিন

    অনেক কষ্ট করে একটি সন্তানকে ছোট থেকে বড় করার পর তার কাছ থেকে পিতা-মাতা ও অভিভাবকগণ অন্তত: এতোটুকু অবশ্যই আশা করেন যে, তারা যেন তাদেরকে মান্য করে, শ্রদ্ধা করে এবং কখনো তাদের অবাদ্ধাচারণ না করে। কিন্তু আমাদের আজকের সমাজের সম্মানিত অভিভাবকগণ কি তাদের আদরের সন্তানদের কাছ থেকে এমন ন্যুনতম শালীন ও উত্তম ব্যবহার পাচ্ছেন?

    বাস্তবতার আলোকে সত্য কথা বলতে গেলে অধিকাংশ অভিভাবকগণই দু’চোখের পানি ধরে রাখতে পারবেন না। আজকাল অনেককে খুবই দুঃখ ও আক্ষেপ করে বলতে শোনা যায় যে, ‘সন্তান কথা শুনে না। তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করে।’ সাম্প্রতিক সময়ে তো অবস্থা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। সন্তান কর্তৃক আপন পিতাকে হত্যার সংবাদও আসছে। মা’কে মারধরের ঘটনা তো অনুল্লেখ্য !

    কী ভয়াবহ ব্যাপার! একবারও কি আমরা চিন্তা করেছি? যে মা’ এতো কষ্ট করে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছেন। মৃত্যুর চেয়েও কঠিন যন্ত্রণা সহ্য করে প্রসব করেছেন ও লালন-পালন করেছেন। যে বাবা বছরের পর বছর আপন সন্তানের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য তিলে তিলে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। সেই পিতা-মাতা তাদের বার্ধক্যে আপন সন্তান থেকে ন্যুনতম উত্তম ব্যবহারও পাবেন না! একটি সভ্য সমাজ এটা কিভাবে মেনে নিতে পারে? কেন এমনটি হচ্ছে? এতো আদর-যত্নে লালিত সন্তান নিজ বাবা-মা’র সাথে কেন এমন দুর্ব্যবহার করছে? তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখার চেষ্টা করেছি?

    এর মূল কারণ আমরা আমাদের সন্তানের শারীরিক সুস্বাস্থ্য আর ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির জন্য সব কিছু করলেও তাদের নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষার ব্যাপারে উদাসীন। একজন মানব সন্তান হিসেবে তার জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য্য বিষয় ছিলো সবার আগে তাওহীদের জ্ঞান অর্জন করা এবং কুরআন-হাদীসের মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করা। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারেও অমনোযোগী। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম দৈহিক ও শারীরিকভাবে খুবই সুন্দর অবয়ব নিয়ে গড়ে উঠলেও নৈতিক ও মানবিক ক্ষেত্রে থেকে যাচ্ছে অপূর্ণতা। স্রষ্টার সাথে সম্পর্কহীন থাকার কারণে কেবলমাত্র পার্থিব স্বার্থ আর ভোগ-বিলাসই তাদের জীবনের মূল লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে। ফলে এক সময় তারা আর নিজ পিতা-মাতাকেও শ্রদ্ধা ও সম্মান করছে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও পার্থিব স্বার্থ ও পুঁজিবাদী চিন্তার বাইরে নৈতিক ও আদর্শিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মতো ঈমান ও তাওহীদের শিক্ষা নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে কি ভয়াবহ বিপর্যয় যে অপেক্ষা করছে তা আল্লাহই ভালো জানেন।

    আজ এ অবস্থার পরিবর্তন চাইলে সন্তানদের জন্য সবার আগে নৈতিক ও আদর্শিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাল্যকাল থেকেই প্রতিটি মুসলিম শিশু-কিশোরকে ঈমান ও তাওহীদ শিক্ষা দিতে হবে। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তাদের সিলেবাসে ঈমান-আকীদা বিনির্মাণকারী পাঠ্য এবং কুরআন-হাদীসের মৌলিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য করতে হবে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ ব্যাপারে সময় থাকতেই কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার তাওফীক দিন। আমীন।

    ইসহাক খান

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৬ (ইসলামী দাওয়াতের জনসংযোগ পর্যায়)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    আল্লাহর রাসূল (সা) দাওয়াতী জীবনে আপোসের পরিবর্তে সংগ্রামের পথই বেছে নিয়েছিলেন এবং তাঁর দলকে কুরাইশদের সামনে সরাসরি এবং দৃঢ় ভাবে উপস্থাপন করে তাদের দিকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। ফলে, কুরাইশদের উপর এর প্রভাব যা হবার কথা তাই হয়েছিল। ইসলামের এ দৃঢ় আহবানকে অস্বীকার করায় তাদের এর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। এছাড়া ইসলামের আহবানের যে প্রকৃতি ছিল তা স্বভাবতই একে কুরাইশ এবং তৎকালীন সমাজের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত করেছিল। কারণ, এ আহবান ছিল আল্লাহর একত্ববাদকে স্বীকৃতি দেবার, এ আহবান ছিল মূর্তি পূজা ত্যাগ করে শুধুই মাত্র তাঁকে ইবাদত করার আর ক্ষয়ে যাওয়া যে কলুষিত সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে কুরাইশরা বাস করছিল তা পুরোপুরি বদলে ফেলার। মূলতঃ রাসূল (সা) যখন কুরাইশদের চিন্তা-ভাবনার অসারতা প্রমান করেন, তাদের উপাস্য দেব-দেবীকে সমাজে হাস্যকর ভাবে উপস্থাপন করেন, তাদের ক্ষয়ে যাওয়া জীবন ব্যবস্থাকে ছুঁড়ে ফেলে দেন এবং সর্বোপরি তাদের নিপীড়নমূলক সমাজ ব্যবস্থার মুখোশ উম্মোচন করেন তখন স্বভাবতই ইসলাম দাঁড়িয়ে যায় তৎকালীন সমাজের সাথে সাংঘর্ষিক এক অবস্থানে। আল্লাহ তায়ালার নাযিলকৃত আয়াত দিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কুরাইশদের জীবন-ব্যবস্থাকে আক্রমন করতেন। তিনি তাদের শুনাতেন সেই আয়াত যেখানে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,

    “নিশ্চিত ভাবে তোমরা (অবিশ্বাসীরা) এবং তোমরা আল্লাহকে ছাড়া যাদের উপাসনা করো তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন”। [সুরা আল-আম্বিয়া: ৯৮]

    তিনি কঠিন ভাবে সমাজের প্রচলিত শোষনমূলক সুদী ব্যবস্থাকে আক্রমন করতেন।

    “এবং তোমরা সুদ হিসাবে (অন্যদের) যা দিয়ে থাকো, এ আশায় যে তা বৃদ্ধি প্রাপ্ত হবে, আল্লাহর দৃষ্টিতে এতে কোন বৃদ্ধি নেই”। [সুরা আর-রুম: ৩৯]

    তিনি আক্রমন করতেন তাদের যারা মাপে কম দেয়,

    “ধ্বংস তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, যখন তারা অন্যের কাছ থেকে মেপে নেয় পুরোপুরি নেয়, কিন্তু যখন অন্যকে দেয় তখন প্রাপ্যের চাইতে কম দেয়।” (সুরা আল-মুতফফিফিন: ১-৩)

    এর ফলশ্রতিতে কুরাইশরা স্বাভাবিকভাবেই রাসূল (সা)-কে প্রতিহত করার চেষ্টা করে এবং তাঁর ও তাঁর সাহাবীদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এ সংঘর্ষের ফলে তারা ব্যক্তি মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর প্রচারিত দ্বীনকে অপপ্রচার, নিযার্তন, বয়কট সহ বিভিন্ন উপায়ে আক্রমন করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। তাদের এহেন কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল (সা) কোন রকম নমনীয়তা প্রদর্শন না করে তাদের ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যান এবং আল্লাহর আদেশ অনুসারে তাদের ঘুঁণে ধরা কলুষিত আদর্শকে আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন। কুরাইশদের শত অত্যাচার আর নিযার্তন সত্তেও তিনি (সা) কোন রকম আপোষ বা সমঝোতা ছাড়াই সব মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেন, যদিও তাঁর না ছিল নিজেকে রক্ষা করার মতো কোন ব্যবস্থা, না পেয়েছিলেন বাস্তবিকভাবে কোন সাহায্য, না ছিল তাঁর পক্ষে কোন জোট আর না তাঁর কাছে ছিল কোন অস্ত্র। সমাজের দৃষ্টি আকষর্ন করে এবং প্রতিদ্বন্ধি মনোভাব নিয়েই তিনি (সা) নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন। সকল দূর্গম বাঁধা অতিক্রম করে তিনি দৃঢ়তা ও বিশ্বাসের সাথে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহবান করেছিলেন, তিনি (সা) কখনও ক্ষমতাশীন কাউকে দলে ভিড়ানোর জন্য এতোটুকু দূর্বলতাকে প্রশ্রয় দেননি এবং আল্লাহর বাণী প্রচারের জন্য সবসময় যন্ত্রনাদায়ক দূর্গম গিরিপথ অতিক্রম করতে প্রস্তুত ছিলেন। বস্তুতঃ এ কারনেই  কুরাইশরা  তাঁর  এবং  তাঁর  অনুসারীদের পথে যে কঠিনতম প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেছিলো তা তিনি অবলীলায় অতিক্রম করতে পেরেছিলেন।

    আল্লাহর রাসূল (সা) দক্ষতা ও সফলতার সাথে সত্যের আহবান মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার পর মানুষ দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে আসতে

    থাকে আর সত্য তার আপন শক্তিতে পরাজিত করে মিথ্যাকে। এভাবেই ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়তে থাকে আরববাসীদের মধ্যে, বহু মূর্তিপূজারী, খ্রীশ্চিয়ান ধমের্র অনুসারী ইসলামের আলোয় হয় আলোকিত, উপরন্তু কুরাইশদের নেতৃস্থানীয় লোকেরাও গভীর আগ্রহে শুনতে থাকে কুরআনের সুললিত বাণী।

    রাসূল (সা) মক্কায় থাকাকালীন সময়েই আল-তুফাইল ইবন ’আমর আল-দাউসী একবার সেখানে আসেন। তিনি ছিলেন আরবদের মধ্যে সম্মানিত, তীক্ষ ধীশক্তির অধিকারী আর উচুঁ দরের একজন কবি। মক্কায় পা রাখার সাথে সাথেই কুরাইশরা তাকে মুহাম্মদ সম্পর্কে সতর্ক করে দেয় এবং বলে, মুহাম্মদ হচ্ছে একজন ভয়ঙ্কর যাদুকর, তার কথা মানুষকে তার পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলে। তারা খুবই উদ্বিগ্ন ভাবে তাকে বলে যেন সে কোন ভাবেই মুহাম্মদের সাথে কথা না বলে কিংবা তার কথাও না শুনে। এরপর একদিন তুফাইল কাবাগৃহে যান, ঘটনাক্রমে মুহাম্মদ (সা)ও সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তুফাইল তাঁর কিছু কথা শুনলেন এবং আবিষ্কার করলেন এগুলো খুবই চমৎকার। তারপর তিনি নিজেই নিজেকে বলেন,“আল্লাহর শপথ, আমি একজন বুদ্ধিমান মানুষ, একজন কবি, খুব ভালো ভাবেই জানি ভালো আর মন্দের পার্থক্য, তাহলে এই মানুষটি যা বলছে তা শুনতে আমাকে কিসে বাঁধা দিচ্ছে ? যদি তা ভালো হয় তবে আমি অবশ্যই তা গ্রহন করবো আর যদি খারাপ হয় তবে তা ছুঁড়ে ফেলে দেবো।”তারপর তিনি মুহাম্মদ (সা)-কে তাঁর গৃহ পর্যন্ত অনুসরন করেন এবং তাকে তার নিজের সবকথা খুলে বলেন। মুহাম্মদ (সা) তাকে কুরআন তিলওয়াত করে শোনান এবং দ্বীন ইসলামের দিকে আহবান করেন। তুফাইল দ্বিধাহীন চিত্তে সত্যকে আলিঙ্গন করেন এবং মুসলিমদের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যান। এরপর তিনি নিজ গোত্রের লোকদের মাঝে ফিরে যান এবং সেখানে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন।

    নতুন নবী আর্বিভাবের খবর শুনে বিশজন খ্রীশ্চিয়ানের একটি দল মক্কায় আসে মুহাম্মদ (সা) এর সাথে সাক্ষাৎ করতে। রাসূল (সা)-এর আহবান শুনবার পর তাকে সত্য নবী বলে স্বীকৃতি দেয় এবং তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। এই ঘটনা শুনে কুরাইশরা ক্রোধে উম্মত্ত হয়ে পড়ে এবং মক্কা ত্যাগ করার সময় এ দলটির পথ রোধ করে দাঁড়ায়, তারপর ছুঁড়ে দেয় তাদের দিকে তীর্যক আর অপমানজনক মন্তব্য, বলে,“আল্লাহ তোমাদের ধ্বংস করুন! কি জঘন্য খারাপ লোকই না তোমরা। তোমাদের স্বজাতি তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে এই মানুষটির ব্যাপারে খোঁজ খবর নেবার জন্য। আর যেই মাত্র না তোমরা তার সাথে সাক্ষাৎ করলে ওমনি নিজ ধর্ম ত্যাগ করে তাঁর উপর বিশ্বাস স্থাপন করলে!” কিন্তু এ ঘটনা তাদের অবস্থানকে এতোটুকু টলায়মান না করে বরং আল্লাহর উপর তাদের বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় আর মজবুত করে। এভাবে, সমাজে রাসূল (সা) এর প্রভাব যতোই বাড়তে থাকে, মানুষের কুরআনের বাণী শুনবার আগ্রহও ততো গভীর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থা হয় যে, কুরাইশদের মধ্য হতে মুহাম্মদ (সা) এর ঘোরতর শত্রুও কুরআনের বাণী শুনে চমৎকৃত হয়ে ভাবতে থাকে মুহাম্মদ আসলে যা বলে তা সবই সত্য। এবং এ ভাবনা তাদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, তারা লোক চক্ষুর অগোচরে লুকিয়ে লুকিয়ে কুরআন শুনতে শুরু করে।

    মুহাম্মদ (সা) যখন তাঁর গৃহে নামাজ আদায় করতেন তখন আবু সুফিয়ান ইবন হারব, আবু জাহল ’আমর ইবন হিশাম এবং আল-আকনাস ইবন সুরাইক এরা প্রত্যেকেই কুরআন শুনবার আকাঙ্খায় একে অন্যেকে লুকিয়ে সেখানে উপস্থিত হতো। প্রত্যেকেই ছদ্মবেশ ধারন করে এমন এক জায়গায় বসতো যেখান থেকে তারা তিলওয়াত শুনতে পারে। কেউই টের পেতো না অপরজনের উপস্থিতি। আল্লাহর রাসূল (সা) প্রতিদিনই রাতের ইবাদতের জন্য উঠতেন এবং কুরআন তিলওয়াত করতেন। প্রতি রাতেই তারা খুব মনোযোগের সাথে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কুরআন শুনতো যে পর্যন্ত না ভোরের আলো ফুটে উঠে, তারপর তাড়াতাড়ি ছত্রভঙ্গ হয়ে স্থান ত্যাগ করতো। এভাবে একদিন বাড়ি ফিরবার পথে হঠাৎ করেই তাদের একে অন্যের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়, ফলে অপ্রস্তুত হয়ে একজন আরেকজনকে অভিযুক্ত করে বলতে থাকে, “খবরদার এমন কাজ যেন আর না হয়, যদি আমাদের মধ্য হতে কোন দূর্বল চিত্তের নির্বোধ লোক তোমাদের দেখে ফেলে তবে কিন্তু সমাজে তোমাদের অবস্থান হয়ে যাবে নড়বড়ে আর পাল্লা মুহাম্মদের দিকেই ঝুঁকে যাবে।”পরদিন তারা প্রত্যেকেই অনুভব করতে থাকে তাদের পা যেন অনিচ্ছাসত্তেও তাদের চুম্বকের মতো সেদিকেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে তারা কাটিয়েছে গতরাত। তারা তিনজন সেদিন আবারও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনে মুহাম্মদ (সা) এর কন্ঠে কুরআনের সুমধুর বাণী। ভোরবেলা বাড়ি ফেরার পথে আবারও দেখা হয় তাদের, একইভাবে অভিযুক্ত করে তারা একে অন্যেকে, কিন্তু এসব কোন কিছুই তাদের তৃতীয় রাতে সেখানে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে না। শেষ পর্যন্ত তারা যখন বুঝতে পারে মুহাম্মদের প্রচারিত বাণীর প্রতি তাদের অপ্রতিরোধ্য দূর্বলতা তখন তারা দৃঢ়চিত্তে শপথ করে যে সেখানে তারা আর কখনই যাবে না। এ ঘটনাটির ফলে মূলতঃ মুহাম্মদ (সা) এর ব্যাপারে তাদের অন্তরে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম হয়। কিন্তু, এ ঘটনায় মূলতঃ তাদের নিজেদের দূর্বলতা নিজেদের কাছে যেভাবে উম্মোচিত হয়ে পড়ে, গোত্রীয় প্রধান হিসাবে তা মেনে নেয়া তাদের জন্য হয়ে যায় খুবই কষ্টকর। তারা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এটা অন্যদেরকে মুহাম্মদের দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করবে।

    বস্তুতঃ কুরাইশদের তৈরী সবরকম প্রতিবন্ধকতা সত্তেও ইসলামের আলো মক্কার সীমানা ভেদ করে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আশঙ্কাকে সত্যে পরিণত করে ইসলামের আহবান আরব উপদ্বীপের সমস্ত গোত্র গুলোর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে তারা মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে প্রচন্ড আক্রমনাত্মক ভূমিকা গ্রহন করে। ক্রমবর্ধমান নির্যাতন আর আক্রমন যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে থাকে তখন রাসূল (সা) তায়িফ গোত্রের কাছে নুসরাহ (সাহায্য) আর বনু ছাকিফ গোত্রের কাছে নিরাপত্তা চান এই আশায় যে তারা হয়তো ইসলাম গ্রহন করবে। তিনি নিজে তাদেরকে ইসলামের দিকে আহবান করেন, কিন্তু বিনিময়ে তারা মুহাম্মদ (সা) এর সাথে করে প্রচন্ড রূঢ় আর নিমর্ম আচরণ। তাদের লেলিয়ে দেয়া দাস আর বখাটে ছেলেরা মুহাম্মদ (সা) কে নানা রকম কটুক্তি করেই ক্ষান্ত হয় না সেইসাথে অবিরাম ভাবে পাথর নিক্ষেপ করে তাঁর পা থেকে মাথা পর্যন্ত করে ফেলে রক্তাক্ত। এদের নির্মম অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে তিনি (সা) রবি’য়াহর পুত্র শাবিব ও শায়বার খেজুর বাগানে আশ্রয় নেন এবং সেখানে বসে বিষন্ন হৃদয়ে ভাবতে থাকেন ইসলামের দাওয়াত ও তাঁর বর্তমান পরিস্থিতির কথা। তিনি জানতেন নেতৃত্বের দেয়া নিরাপত্তা ব্যতিত তিনি মক্কায় প্রবেশ করতে পারবেন না, একইভাবে তিনি তায়েফেও ফিরে যেতে পারবেন না, বিশেষ করে সেখানে যে আচরণের শিকার হয়েছেন তিনি, এরপর। পাশাপাশি তিনি ফলের বাগানেও থাকতে পারছিলেন না, কারণ তা দুজন কাফিরের মালিকানায় ছিল। প্রচন্ড অসহায় ভাবে তিনি মর্মাহত আর ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে আকাশের দিকে দু’হাত উচুঁ করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন। ব্যথিত হৃদয়ে প্রচন্ড দৃঢ়তার সাথে বলেন,“প্রভু আমার! আমি দূর্বল, অসহায়, সহায় সম্বলহীন, নগন্য। তাই মানুষের উপেক্ষার পাত্র। আমার সকল ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে আমি আজ তোমারই কাছে আবেদন করছি। পরম করুণাময় আমার! তুমিই তো দর্বল আর অসহায়ের আশ্রয়দাতা। তুমি কি এই সব মানুষের নিষ্ঠুরতার উপরই আমাকে ছেড়ে দিচ্ছো প্রভু? যারা আমার অসহায়ত্বের সুযোগ নেয় কিংবা আমার সাথে শত্রুতা করে তুমি কি তাদের দয়ার উপরই কি আমাকে ছেড়ে দিলে? তুমি যদি আমার উপর নারাজ না হয়ে থাকো তবে আমার আর কিছুর পরোয়া নেই। তুমি যদি আমাকে দাও নিরাপত্তা তবে এটুকুই আমার জন্য যথেষ্ট। তুমি আমাকে এমন নিরাপত্তা দাও যেন সকল আধাঁর কেটে গিয়ে আমার চারিদিক হয় আলোকিত। আলোকিত হয় আমার ইহকাল আর পরকাল। তোমার ক্রোধ নয়, আমার উপর করুণা বর্ষিত করো দয়াময়। নিশ্চয়ই তুমিই সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান, নিশ্চয়ই তোমার হাতেই সর্বময় কর্তৃত্ব”।

    পরবর্তীতে রাসূল (সা) আল-মুত’য়িম ইবন ’আদির নিরাপত্তায় মক্কায় ফিরে আসেন। এদিকে কুরাইশদের কানে তায়িফের ঘটনা পৌঁছানোর সাথে সাথে তারা তাদের অত্যাচার আর দূর্ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধি করে এবং তারা মক্কাবাসীদের মুহাম্মদ (সা) আহবানে সাড়া দিতে নিষেধ করে। এ নিষেধাজ্ঞার  ফলে  মক্কাবাসীরা  তাঁর  সাহচার্য  পরিত্যাগ  করে  এবং  তাঁর  আহবান শোনা  থেকে  বিরত  থাকে। এতো  কিছুর  পরও  মুহাম্মদ (সা) বিন্দুমাত্র ভেঙ্গে না পড়ে উৎসবের মাস গুলোতে আগত গোত্রের মানুষদের আল্লাহর দ্বীনের পথে আহবান করতে থাকেন, তাদেরকে ইসলামের

    দাওয়াত দেন এবং নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল হিসাবে তাদের কাছে উপস্থাপন করে তাঁর উপর ঈমান আনতে বলেন। কিন্তু তিনি (সা) প্রতি পদক্ষেপেই হন তাঁর অবিশ্বাসী এবং কুটিল মানসিকতার চাচা আবু লাহাবের নজরদারীর শিকার। সে আগত গোত্রের লোকদের আহবান করে রাসূল (সা)-কে উপেক্ষা করতে, তাঁর কথা না শুনতে কিংবা তাঁর প্রতি মনোযোগ প্রদর্শন না করতে।

    এরপর দাওয়াতী কাজ পরিচালনার জন্য মুহাম্মদ (সা) ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। তিনি (সা) বিভিন্ন গোত্রের আবাসস্থলে যান এবং তাদের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তিনি কিন্দা, কালব, বনু হানিফাহ, এবং বনু ’আমির ইবন সা’সাহ গোত্র গুলোকে আহবান করেন সত্য দ্বীনের পথে। কিন্তু, এরা সকলেই রাসূল (সা) এর আহবানে সাড়া না দিয়ে তিক্ততার সাথে তাঁর বিরোধিতা করে বিশেষ করে বনু হানিফাহ । বনু ’আমির ইবন সা’সাহ তাঁর (সা) মৃত্যুর পর কাঙ্খিত কর্তৃত্বের দাবী করে। তিনি (সা) বলেন, “শাসন-কর্তৃত্ব তো শুধুই আল্লাহর হাতে এবং তিনি যাকে খুশী তাকে তা দান করেন।”একথা শোনার পর বনু ’আমির কোন রকম সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে।

    এভাবে মক্কা ও তায়িফবাসীসহ সকল গোত্রের লোকেরা ইসলাম প্রত্যাখান করে। মক্কায় ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আগত অন্য সকল গোত্রের লোকেরা ক্রমশঃ এইসব ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হয় এবং খুব স্বাভাবিক ভাবেই তারা সরে যায় মুহাম্মদ (সা) থেকে অনেক অনেক দূরে। সমস্ত জায়গা থেকে প্রত্যাখাত মুহাম্মদ (সা) হয়ে পড়েন সম্পূর্ণ একাকী । মক্কাবাসীদের চরম প্রত্যাখান, অবিশ্বাস আর প্রচন্ড বিরোধিতার মুখে তাঁর মক্কায় দ্বীন প্রচারকে ক্রমশঃ কঠিনতর করে তুলে আর মক্কাবাসীদের ইসলাম গ্রহন করার সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে।

  • ইসলামী রাষ্ট্র – পর্ব ৫ (দাওয়াতী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সহিংসতা)

    [নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘আদ-দাওলাতুল ইসলামীয়্যাহ’ (ইসলামী রাষ্ট্র) বইটির খসড়া অনুবাদ-এর একাংশ হতে নেয়া হয়েছে]

    মুহাম্মদ (সা) কে যখন আল্লাসে অনুযায়ী দরদাম হাঁকতে পারে? আল্লাহ্ তা’য়ালা প্রথমদিকে রাসূল হিসাবে মনোনিত করেন, তখন মক্কার মুশরিকরা তাকে এবং তাঁর প্রচারিত বানীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। দাওয়াতী কাজের প্রাথমিক দিকে কুরাইশরা তাঁর আহবানকে সাধু-সন্যাসীদের সমগোত্রীয় ভেবে উপেক্ষা করতে থাকে এবং ভাবতে থাকে যে, ইসলাম গ্রহণকারী মুসলিমরা হয়তো ধীরে ধীরে আবার তাদের পূর্বপুরুষের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে। মূলতঃ এই কারনেই কুরাইশরা প্রথমদিকে তাঁর (সা) কাজে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মুহাম্মদ (সা) যখনই কুরাইশদের সম্মুখীন হতেন তারা বলতো, “এই হচ্ছে আবদ আল মুত্তালিবের পুত্র যার উপর কিনা আসমান থেকে ওহী অবতীর্ন হয়।” কিন্তু অল্প কিছুদিন পরই তারা তাঁর প্রচারিত আদর্শের শক্তিতে শঙ্কিত বোধ করতে শুরু করে এবং তাঁর সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। প্রথমদিকে তারা মুহাম্মদ (সা) এর নবুয়তের দাবীকে মিথ্যা বলে উপহাস করে। পরবর্তীতে তারা নবুয়তের প্রমাণ হিসাবে নবী (সা) অলৌকিক নিদর্শন সমূহ উপস্থাপন করতে বলে। তারা বলতে থাকে, মুহাম্মদ যদি সত্য সত্যই আল্লাহর নবী হয়ে থাকে তবে সে কেন সাফা ও মারওয়াকে সোনার পাহাড়ে পরিনত করছে না? কেন তাঁর কাছে আসমান থেকে লিখিত কিতাব নাযিল হচ্ছে না? কেন জিবরাইল মুহাম্মদের সাথে কথা বলে কিন্তু তাদের সামনে উপস্থিত হয় না? কেন সে মৃতকে জীবিত করতে পারে না? কেন সে মক্কাকে পরিবেষ্টনকারী পাহাড়গুলোকে অন্যত্র সরিয়ে দিচ্ছে না? কেন তার সমাজের মানুষের পানির এতো কষ্ট থাকা সত্ত্বেও সে তাদের জন্য জম্‌জম্‌ এর চাইতে ভাল কোন কুপ খনন করে দিচ্ছে না? কেন তাঁর রব তাঁকে দ্রব্যসমূহের মূল্য আগে থেকেই অবহিত করছে না যেন তারা সে অনুযায়ী দরদাম হাঁকতে পারে?

    বেশ কিছুকাল যাবত চলতে থাকে আল্লাহর রাসুলের (সা) বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য মূলক এসব অপপ্রচার। কুরাইশরা নবী (সা)-কে জর্জরিত করতে থাকে তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, তিরস্কার আর অত্যাচারে। তা সত্ত্বেও তিনি (সা) অবদমিত কিংবা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত না হয়ে একাগ্রতার সাথে মানুষকে ইসলামের দিকে আহবান করতে থাকেন এবং সেই সাথে যারা মূর্তিপূজা করে ও মূর্তির কাছে প্রার্থনা করে তাদের র্নিবুদ্ধিতা আর চিন্তার অসারতা সমাজের মানুষের সামনে তুলে ধরে মূর্তিপূজাকে অযৌক্তিক এবং হাস্যকর প্রমাণ করেন।

    তাদের উপাস্য মুর্তির বিরুদ্ধে যুক্তিপূর্ণ এ প্রচারনা কুরাইশদের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায়, ফলে তারা যে কোনও হীন উপায়ে মুহাম্মদ (সা) এর কার্যকলাপ বন্ধের জন্য সর্বাত্মক শক্তি নিয়োগ করে, কিন্তু দাওয়াতী কার্যকলাপ বন্ধের তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কুরাইশরা প্রধানত তিনটি উপায় গ্রহণ করে:

    ১. অত্যাচার

    ২. সমাজের ভিতরে এবং বাইরে মিথ্যা প্রচারনা

    ৩. বয়কট (সমাজচ্যূত করন)

    পারিবারিক নিরাপত্তা পাবার পরও মুহাম্মদ (সা) অত্যাচারের শিকার হন, অত্যাচারিত হন তাঁর (সা) সঙ্গী-সাথীরাও। কুরাইশরা তাদের নির্যাতন করার জন্য ঘৃন্য সকল পদ্ধতি গ্রহন করে এবং এ সকল ঘৃনিত কাজে তারা ব্যাপক পারদর্শিতা অর্জন করে। সত্যদ্বীন থেকে বিচ্যুত করার জন্য আল-ইয়াসির (রা) এর পরিবারকে র্নিমম অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়, কিন্তু এ সমস্ত অত্যাচার শুধুমাত্রই তাদের দৃঢ়তা ও মনোবল বৃদ্ধি করে। কুরাইশরা যখন ইয়াসির (রা) এর পরিবারকে অত্যাচার করছিল, তখন আল্লাহর রাসূল (সা) তাদের অতিক্রম করছিলেন এবং তিনি (সা) তাদের উদ্দেশ্যে বলছিলেন, “ধৈর্য ধর ইয়াসির পরিবার! তোমাদের পুরস্কার তো জান্নাত। তোমাদের গন্তব্য তো আল্লাহর কাছে।” এর জবাবে ইয়াসির (রা) এর স্ত্রী সুমাইয়া (রা) বলেছিলেন,” হে আল্লাহর রাসুল, আমি তা দেখতে পাচ্ছি।”

    ততদিন পর্যন্ত রাসূল (সা) এবং তাঁর সাহাবী (রা)দের উপর কুরাইশদের এ ভয়ংকর অত্যাচার পূর্ণ শক্তিতে চলতে থাকে যতদিন পর্যন্ত না তারা বুঝতে পারে, তাদের সকল প্রচেষ্টা আসলে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এরপর তারা ইসলামী দাওয়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করে, যা ছিল মূলতঃ ইসলাম এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারনা যা তারা মক্কা এবং মক্কার বাইরে যেমন, আবিসিনিয়ায় প্রচার করে। এ পদ্ধতি সফল করতে তারা যুক্তি, তর্ক, বিদ্রুপ, মিথ্যা অপবাদ-অভিযোগ সহ সকল রকম পদ্ধতি গ্রহণ করে। তাদের অপপ্রচার ছিল ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস (আকীদাহ্‌) এবং রাসুল (সা)-এর বিরুদ্ধে। কুরাইশরা মুহাম্মদ (সা)-কে নানারকম মিথ্যা অপবাদ এবং অভিযোগে অভিযুক্ত করে। তাঁকে (সা) সমাজের মানুষের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য তারা নানারকম পরিকল্পনা এবং কুটকৌশলের আশ্রয় নেয়।

    বিশেষ করে হজ্জের মৌসুমে কুরাইশরা ইসলামকে হীন প্রতিপন্ন করার জন্য খুবই সর্তকতার সাথে প্রস্তুতি নেয়। তারা ওয়ালিদ ইবন মুগীরার সাথে পরামর্শ করে মুহাম্মদ (সা) এর বিরুদ্ধে ব্যঙ্গাত্মক শোক রচনা করে। এরপর তারা মক্কায় হজ্জের উদ্দেশ্যে আগত আরবদের মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে কী বলা যায় এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে। কেউ কেউ প্রস্তাবনা করে, তারা আগত আরবদের মাঝে প্রচার করবে যে মুহাম্মদ (সা) একজন কাহিন (গনক)। কিন্তু ওয়ালিদ ইবন মুগীরা এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয় এ যুক্তিতে যে, মুহাম্মদের বাণী একজন নির্বোধ কাহিনের অসাড় প্রলাপ কিংবা ছন্দময় আবৃত্তির বহু উর্ধে। কেউ কেউ প্রস্তাব করে যে, তারা বলবে মুহাম্মদ একজন কবি। কিন্তু তারা পদ্য রচনার সকল প্রকার এবং রূপ সম্পর্কে খুব ভালই অবহিত ছিল বলে শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাবটিও বাতিল করে। অন্যেরা প্রস্তাব করে, তারা প্রচার করবে মুহাম্মদ জিনের আছরগ্রস্থ। কিন্তু, ওয়ালিদ ইবন মুগীরা এ প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় কারণ, মুহাম্মদ (সা) এর আচরন জিনের আছরগ্রস্থ মানুষের মতো নয়। অনেকে আবার মুহাম্মদ (সা)-কে যাদুকর হিসাবে অভিযুক্ত করার প্রস্তাব দেয়, কিন্তু আল-ওয়ালিদ এ প্রস্তাবও নাকচ করে দেয় কারন মুহাম্মদ (সা) যাদুকরদের মতো গুপ্তবিদ্যার চর্চাও করে না, যেমন, সুপরিচিত গিরায় ফুক দেয়ার প্রথা।

    দীর্ঘ আলোচনার পর তারা একমত হয় যে, তারা প্রচার করবে মুহাম্মদ (সা) কথার মাধ্যমে মানুষকে যাদুগ্রস্থ করে (সিহর আল-বায়ান)। এরপর তারা আরবদের মুহাম্মদের ব্যাপারে সর্তক করার জন্য ছত্রভঙ্গ হয়ে হজ্জ কাফেলাদের মধ্যে ঢুকে পরে। আল্লাহর রাসুল (সা)-কে তারা কথার যাদুকর হিসাবে মানুষের কাছে উপস্থাপিত করে এবং হজ্জ্ব যাত্রীদের তাঁর (সা) প্রচারিত বাণী শ্রবন করা থেকে বিরত থাকতে আহবান করে। তারা প্রচার করে, মুহাম্মদের প্রচারিত বাণী মানুষকে তার আপন ভাই, বাবা, মা এমনকি তার নিজ পরিবার থেকে পৃথক করে ফেলে। বস্তুতঃ তাদের এ মিথ্যা অপপ্রচার তাদের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়, এবং ইসলামী দাওয়াত ক্রমশ মানুষের অন্তর জয় করতে থাকে। এরপর কুরাইশরা আল নযর ইবন আল-হারিছকে মুহাম্মদ (সা) এর বিরুদ্ধে নিয়োজিত করে। যখনই তিনি (সা) জনগণকে দাওয়াত দিয়ে তাদের আল্লাহর কথা স্মরন করিয়ে দিতেন কিংবা পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের প্রতি আল্লাহর সতর্কবাণীর কথা বলতেন, তখনই নযর ইবন হারিছ সেখানে উপস্থিত হয়ে পারস্যের বাদশাহ্‌ ও তাদের ধর্মের গল্প বলতে শুরু করতো। সে দাবী করতো, “কোন দিক থেকে মুহাম্মদ গল্প বলায় আমার থেকে বেশী পারদর্শী? সে কি আমার মতোই পূর্ববর্তীদের কাহিনী বর্ণনা করে না?” এভাবে কুরাইশরা বিভিন্ন ধরনের গল্পকাহিনী জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে থাকে। তারা মক্কাবাসীদের বলে, আসলে মুহাম্মদ যা বলে এগুলো আল্লাহর বাণী নয়, বরং এগুলো জাবির নামে একজন খ্রীষ্টান তরুণের শেখানো কথা। এই অপপ্রচার চলতে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করেন,

    “আমরা তো জানি তারা বলে যে, তাকে শিক্ষা দেয় একজন মানুষ; তারা যার কথা বলে তার ভাষা তো আরবী নয়; কিন্তু কোরআনের ভাষা তো বিশুদ্ধ আরবী।” [সুরা নাহল: ১০৩]

    এভাবে সমগ্র আরব উপদ্বীপ জুড়ে চলতে থাকে ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং মুসলিমদের উপর অত্যাচার। যখন কুরাইশরা শুনতে পেল কিছু মুসলিম জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত হবার ভয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছে, সাথে সাথে তারা আবিসিনিয়াতে তাদের পক্ষ থেকে দু’জন চৌকষ দূত পাঠিয়ে দিল মুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। তাদের আশা ছিল আবিসিনিয়ার শাসক নাজ্জাসী হয়ত মুসলিমদের তার দেশ থেকে বের করে দিয়ে মুসলিমদের মক্কায় ফিরে আসতে বাধ্য করবে। কুরাইশরা তাদের পক্ষ থেকে দূত হিসাবে ‘আমর ইবন আল ‘আস ইবন ওয়া’ইল এবং আব্দুলাহ্‌ ইবন রাবি’আহ্‌কে প্রেরণ করে। তারা আবিসিনিয়া গমনের পর বাদশাহ নাজ্জাসীর সভাসদবৃন্দকে উপঢৌকন প্রদানের মাধ্যমে মুসলিম শরণার্থীদের তাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করার ব্যাপারে তাদের সহায়তা কামনা করে। তারা সভাসদবৃন্দকে বলে, “আমাদের জনগণের মধ্য হতে কিছু নির্বোধ লোক আপনাদের বাদশাহর আশ্রয়ে আছে। তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে আবার আপনাদের ধর্মও গ্রহণ করেনি, উপরন্তু তারা এমন এক ধর্মের দিকে মানুষকে আহবান জানাচ্ছে যে ধর্মের ব্যাপারে না আমরা কিছু জানি, না আপনারা জানেন। আমাদের সম্মানিত নেতারা তাদের ফিরিয়ে নেবার জন্য আমাদেরকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। সুতরাং, তাদের আমাদের হাতে তুলে দিন কারণ, নিজ সম্প্রদায়ের লোক হিসাবে তাদের ভুল-ভ্রান্তির ব্যাপারে আমাদেরই পরিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ ধারনা রয়েছে।” মুসলিমরা অনাকাঙ্খিত কিছু বলে ফেলবে এই ভয়ে কুরাইশদের প্রেরিত দূতেরা বার বার এটা নিশ্চিত করতে চাচ্ছিল যেন, মুসলিম শরনার্থীরা কোনভাবেই বাদশাহর সাথে সাক্ষাৎ না করে। সভাসদবৃন্দ নাজ্জাসীর সাথে সাক্ষাৎ করে এবং আশ্রয়প্রার্থী মুসলিমদের তাদের নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ফিরিয়ে দেবার আবেদন করে।

    সভাসদবৃন্দের আবেদন শোনার পর নাজ্জাসী আশ্রয়প্রার্থী মুসলিমদের তাঁর দরবারে হাজির হবার নির্দেশ দেন এবং তাদের নিকট হতে তাদের প্রচারিত আদর্শ শুনবার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মুসলিমরা তাঁর দরবারে উপস্থিত হলে তিনি বলেন,”আমার দ্বীন কিংবা অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ না করে তোমরা কোন দ্বীনের দিকে মানুষকে আহবান করছো?” এমতাবস্থায় জা’ফর ইবন আবি তালিব তাদের ইসলাম পূর্ববর্তী অজ্ঞতা এবং তাদের বর্তমান অবস্থার সাথে পূর্বের অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে নাজ্জাসীর প্রশ্নের উত্তর দেন। তিনি বাদশাহকে বলেন,”আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাদের অত্যাচার করত। আমাদের উপর ক্ষমতাশীন থাকা অবস্থায় তারা তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং শেষ পর্যন্ত তারা আমাদের ও আমাদের দ্বীনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আপনার দেশে এসে আপনাকে অন্যদের উপর প্রাধান্য দিয়েছি, আমরা আশা রাখি যে যতদিন আমরা আপনার সাথে রয়েছি, ততদিন আমাদের সাথে অন্যায় আচরন করা হবে না। নাজ্জাশী বললেন, “তোমাদের রাসূল আলাহর নাযিলকৃত যে বাণী প্রচার করছে তার কিছু অংশ কি তোমরা আমাকে শোনাতে পারো?” জবাবে জা’ফর (রা) বললেন, হ্যাঁ, শোনাতে পারি। অতঃপর তিনি সুরা মারিয়মের প্রথম থেকে নিম্নোক্ত আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করলেন যেখানে আল্লাহ বলেছেন,

    “অতঃপর মারিয়ম ঈঙ্গিতে তাঁর সন্তানকে দেখালো। তারা বললো যে, কোলের শিশুর সাথে আমরা কিভাবে কথা বলবো? সে [শিশুটি] বললো, আমি তো আল্লাহর দাস, তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন, আমাকে নবী করেছেন। যেখানেই আমি থাকি না কেন, তিনি আমাকে তাঁর অনুগ্রহভাজন করেছেন। যতদিন জীবিত থাকি আমাকে নামাজ ও যাকাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। এবং জননীর অনুগত থাকতে এবং আমাকে তিনি উদ্ধত ও হতভাগ্য করেননি। আমার প্রতি সালাম যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি, যেদিন মৃত্যুবরণ করব এবং যেদিন পুনরুজ্জীবিত হয়ে উত্থিত হব।” [সুরা মারিয়ম: ২৯-৩৩]

    কুরআন তিলওয়াত শুনে সভায় উপস্থিত পাদ্রীরা একযোগে বলে উঠলো, “এ তো সেই একই উৎস থেকে আগত যেখান থেকে এসেছে আমাদের প্রভু ঈসা মসীহ্‌র বাণী।” নাজ্জাশী বললেন,”সত্যিই, মুহাম্মদের বাণী এবং মুসার প্রচারিত বাণী একই উৎস থেকে আগত। তারপর, কুরাইশদের প্রেরিত দূতদ্বয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমরা এখন যেতে পার। আর আল্লাহর কসম আমি কখনই এদেরকে তোমাদের হাতে তুলে দেবো না, আর না আমি তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবো।” একথা শোনার পর মক্কা থেকে আগত দুতেরা রাজসভা থেকে বেরিয়ে আসল এবং তাদের উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ভিন্ন পথ খুঁজে বেড়াতে লাগল। পরদিন ‘আমর ইবন আল’আস পুনরায় নাজ্জাসীর কাছে গেল এবং বলল, “মুসলিমরা মারিয়ম পুত্র ঈসার নামে জঘন্য কথা বলে, আপনি তাদেরকে ডেকে পাঠান আর জিজ্ঞেস করুন।” তিনি মুসলিমদের ডেকে জিজ্ঞেস করায় জা’ফর বললেন,”আমরা মারিয়ম পুত্র সম্পর্কে তাই বলি যা আমাদের রাসুল (সা) আমাদের শিখিয়েছেন, তিনি (সা) বলেছেন, ঈসা মসীহতো আল্লাহর একজন বান্দা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল, তাঁর রুহ্‌ এবং তাঁরই কালিমা, যা তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ফুঁকে দিয়েছেন তাঁর সম্মানিত বান্দা কুমারী মারিয়মের মধ্যে।” নাজ্জাসী নীচু হয়ে একটি লাঠি তুলে নিয়ে মাটির উপর একটি সোজা দাগ দিয়ে বললেন, “তোমাদের দ্বীন আমাদের দ্বীনের মাঝে এই একটি রেখার পার্থক্য ছাড়া আর কিছুই নেই।” অতঃপর তিনি কুরাইশ দুতদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

    শেষ পর্যন্ত ইসলামী দাওয়াতী কার্যক্রম বন্ধ করার লক্ষ্যে কুরাইশদের সকল ষড়যন্ত্র, মিথ্যা অপপ্রচার সবই ব্যর্থ হয় এবং সকল মিথ্যা, অপবাদ, অপপ্রচার আর ষড়যন্ত্রকে পরাভূত করে রাসূল (সা) প্রচারিত আল্লাহর মহান বাণী তার আপন আলোয় উদ্ভাসিত হয়। এরপর কুরাইশরা মুসলিমদের পরাভূত করতে তাদের সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে, যেটা ছিল ‘বয়কট’। তারা সকল গোত্র প্রধানরা একত্রিত হয়ে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর পরিবারকে সামাজিক ভাবে বয়কট করার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। এ লক্ষ্যে তারা একটি চুক্তিপত্র প্রণয়ন করে যে, বনু হাশিম এবং বনু আবদ আল মুত্তালিব-এর সাথে কেউ কোনও ধরনের লেন-দেন করবে না, তাদের গোত্রের মেয়েদের না কেউ বিয়ে করবে, না তাদের গোত্রে কেউ নিজের মেয়ে বিয়ে দেবে, না তাদের কাছে কেউ কোনও দ্রব্য বিক্রি করবে, না তাদের কাছ থেকে কেউ কিছু ক্রয় করবে। এ চুক্তির ব্যাপারে একমত হবার পর তারা চুক্তির শর্ত গুলো লিখে চুক্তিপত্রটি কাবার অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে রাখে যেন কেউ চুক্তি ভঙ্গ না করার সাহস করে। তারা ধারনা করে যে, তাদের লক্ষ্য অর্জনে এ পদ্ধতি অপপ্রচার বা নির্যাতনের চাইতে বেশী কার্যকরী হবে এবং এভাবেই তাদের উদ্দেশ্য সাধিত হবে।

    তিন বছর পর্যন্ত চলে কুরাইশদের এই বয়কট। পুরোটা সময় জুড়ে কুরাইশরা আশায় থাকে এবার হয়তো বনু হাশিম আর বনু আবদ আল মুত্তালিব মুহাম্মদকে ত্যাগ করে স্বধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে। ফলশ্রুতিতে সঙ্গী-সাথীহীন মুহাম্মদ পরিণত হবে তাদেরই করুনার পাত্রে। তারা আরও ভাবতে থাকে, হয় তাদের আরোপিত এই বয়কট মুহাম্মদকে দাওয়াতী কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য করবে, না হয় মুহাম্মদের আহবানে তাদের দ্বীনের অস্তিত্ব যে হুমকীর সম্মুখীন হয়েছে সেটা বন্ধ হবে। কিন্তু তাদের গৃহীত এ সমস্ত কৌশল মুহাম্মদ (সা)-কে করে তোলে আরও দৃঢ়প্রত্যয়ী আর দাওয়াতী কাজ চালিয়ে নেবার জন্য সাহাবীদেরও করে পূর্ণ উদ্যমী। মক্কার ভিতরে বাইরে সর্বত্রই ইসলামের আহবান প্রচার এবং প্রসারে কুরাইশদের বয়কট সম্পূর্ণ ভাবে ব্যর্থ হয়। বরং মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের বয়কট করার সংবাদ মক্কার বাইরে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় আর এভাবে বিভিন্ন গোত্রের কাছে পৌঁছে যায় ইসলামের আহবান। এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপে ইসলাম একটি আলোচনার বিষয় বস্তুতে পরিণত হয়।

    যাই হোক, মুসলিমদের উপর কোনও রকম দয়া প্রদর্শন ছাড়াই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে চলতে থাকে এই বয়কট এবং কুরাইশরা চুক্তিবদ্ধ গোত্রের মানুষকে প্রতিটি শর্ত মানতে বাধ্য করে। ফলে, রাসূল (সা) এর পরিবার এবং সাহাবীরা ক্ষুধা তৃষ্ণায় অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হয় এবং গুটি কয়েক সহানুভুতিশীল ব্যক্তির দেয়া নূন্যতম খাদ্যে দিন পার করতে থাকে। এই নির্মম কষ্টকর সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র পবিত্র মাস গুলোই ছিল তাদের জন্য তুলনামূলক ভাবে স্বস্তির সময়, যখন মুহাম্মদ (সা) কাবায় যেতেন, সেখানে মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের পথে আহবান করতেন, তাদের দিতেন জান্নাতের সুসংবাদ আর সতর্ক করতেন জাহান্নামের ভয়াবহতা সম্পর্কে, তারপর ফিরে আসতেন পার্বত্য উপত্যকায়। এই সমস্ত ঘটনা প্রবাহ ধীরে ধীরে মুহাম্মদ (সা), তাঁর পরিবার এবং সাহাবীদের প্রতি মক্কাবাসীদের অন্তরকে বিগলিত করে। এদের কেউ কেউ মুহাম্মদ (সা) এর আহবানে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে, আবার কেউ কেউ তাদের গোপনে খাবার সরবরাহ করতে থাকে। হিশাম ইবন ‘আমর নামক এক মক্কাবাসী রাতের অন্ধকারে উট বোঝাই করে খাবার নিয়ে যেত মুসলিমদের জন্য, তারপর পার্বত্য উপত্যকার অভ্যন্তরে যেখানে মুসলিমরা কতো সেখানে ঢুকিয়ে দিত তার উট। এভাবে মুসলিমরা তার সরবরাহ করা খাবার খেতো এবং উটটিও জবাই করে খেয়ে ফেলতো।

    বয়কট কার্যকর থাকাকালীন কষ্টকর এই তিনটি বছর মুসলিমরা অসম্ভব ধৈর্য্যের সাথে অতিবাহিত করে। মূলতঃ এই সময় তারা পার করে রুক্ষ, প্রস্তরময় একটি পথ, যে পর্যন্ত না আল্লাহ তায়ালা তাদের পরীক্ষা হতে অব্যহতি দেন এবং শেষ পর্যন্ত কুরাইশরা বয়কট প্রত্যাহার করে।

    কুরাইশদের মধ্য হতে জুহাইর ইবন আবি উমাইয়াহ, হিশাম ইবন ‘আমর, আল মুত’য়িম ইবন ‘আদি, আবু আল বাখতারি ইবন হিশাম এবং জামা’য়াহ ইবন আল আসওয়াদ নামে পাঁচজন তরুণ একত্রিত হয়। ঐ সময়ের অন্য অনেক কুরাইশদের মতো তারাও বয়কট এবং চুক্তিপত্রের ব্যাপারে তাদের বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করে। শেষ পর্যন্ত তারা অনৈতিক ভাবে মুহাম্মদ (সা) এবং তার সঙ্গী-সাথীদের বয়কটের চুক্তিপত্রটি বাতিলের ব্যাপারে একমত হয়।

    পরদিন জুহাইর কাবাগৃহকে সাতবার প্রদক্ষিন করার পর উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলে,”হে মক্কাবাসী, আমরা কি ভালো খাবো, ভালো কাপড় পরবো আর কোনও রকম ক্রয়-বিক্রয় না করতে পেরে বনু হাশিম গোত্রের লোকেরা কি ধ্বংস হয়ে যাবে? আলাহর কসম এই অন্যায় বয়কট বাতিল আর চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেলা না পর্যন্ত আমি বিশ্রাম নেবো না।” খুব নিকটেই ছিল আবু জাহল, সে ক্রোধান্বিত হয়ে বলল, “তুমি মিথ্যাবাদী, আল্লাহর কসম, এই চুক্তিপত্র আমি কখনোই ছিড়ঁবো না।” এই পর্যায়ে মক্কাবাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বাকী চারজন জুমা’য়াহ, আবু আল বাখতারি, আল মুত’য়িম এবং হিশাম জুহাইরের সমর্থনে চিৎকার করে উঠে। আবু জাহল তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে পুরো ব্যাপারটিই আসলে পূর্ব পরিকল্পিত এবং আরও খারাপ কিছু ঘটার আশংকায় পিছু হটে যায়। যখন আল মুত’য়িম চুক্তিপত্রটি ছিঁড়ে ফেলার জন্য কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন তারা দেখে “তোমার নামে, হে আল্লাহ” এ বাক্যটি ছাড়া বাকী সবটুকু ইতিমধ্যেই পোকার আক্রমনে নষ্ট হয়ে গেছে।

    শেষ পর্যন্ত আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবীরা পুনরায় মক্কায় ফিরে আসে এবং ইসলামী দাওয়াতের পথ রোধ করার কুরাইশদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মক্কায় মুসলিমদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। কুরাইশরা সব রকম উপায়ে ক্রমাগত চেষ্টা করেছিলো মুসলিম এবং তাদের দ্বীনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাড়াঁতে। তারা চেষ্টা করেছিলো মুহাম্মদ (সা) কে দ্বীন প্রচার থেকে বিরত রাখার, কিন্তু সব রকম বাঁধা বিপত্তি সত্ত্বেও আল্লাহর সাহায্যে চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল ইসলামী দাওয়াতের আহবান।  

  • শাইখ তাকী উদ্দিন আন-নাবহানীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

    শাইখ তাকী উদ্দিন আন-নাবহানীর সংক্ষিপ্ত জীবনী

    এটা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লার ইচ্ছা যে আমরা মহাকালের একেবারে শেষ সময় অতিবাহিত করছি। এটা এমন এক যুগ যখন কুফরের কালো রাত এমনভাবে আমাদের ঘিরে রেখেছে যে, যেকোন সৎ লোক শুধুমাত্র পদে পদে ধাক্কা খাবে। আল্লাহ্‌’র জমিনে আল্লাহ্‌র আইন আজকে নির্বাসিত, অথচ অপরাধ ও শোষণের অবাধ চর্চা সবজায়গায়। কিন্তু, ইনশাআল্লাহ্‌, এই কালো রাত একদিন শেষ হবে, খিলাফাহ’র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন দিনের সূর্য উদয় হবে, সেই সাথে যারা নির্ঘুমভাবে সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে তাদের জন্য সুসংবাদ নিয়ে আসবে। এই খিলাফাহ’র ডাক, যা হারিয়ে গিয়েছিল, তা এখন যেকোন মানুষের মুখে, এই খিলাফাহ’র ডাকই এখন নতুন করে উদয় হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, খিলাফাহ’র পতাকার বাহকেরা তারাই যারা এই রাষ্ট্র চালাতে সক্ষম। এরাই হল তারা যারা খুব বেশী সমর্থক পায়নি, এমন কি কাছের মানুষদের থেকেও, কিন্তু ঠিকই তাদের শত্রুরা তাদের অধ্যাবসায় ও ধৈর্যের প্রশংসা করেছে। আর এখন সময় এসেছে খিলাফাহ’র সূর্য সকল অন্ধকার ছিন্ন করার এবং একটি উজ্জ্বল ভোরের আলো নিয়ে আসার।

    আসলে, প্রত্যেক পথে মাইলফলক থাকে, ওই পথে চলতে গেলে যে কেউ রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রথম সময়কার দাওয়া’র সাথে তাদের প্রথমদিকের সময়ের দাওয়া মিলিয়ে নিতে পারবে, যখন তাঁরা সন্তুষ্ট হয়ে এটা দেখে যে – তাঁদের কাজের পদ্ধতি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাজের পদ্ধতির মত, তখন আসলে তাঁরা আশা করতেই পারে যে আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁরা তাই অর্জন করতে যাচ্ছে যা রাসূলুল্লাহ (সা) অর্জন করতে পেরেছেন – তথা ইসলামি রাষ্ট্র, তাঁরা আশা করতেই পারে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর দেওয়া ওয়াদা (খুলাফায়ে রাশিদা) নবুওয়তের আদলের খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁদেরকে কবুল করবেন।

    এ প্রবন্ধটি শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি’র জীবনের বৈচিত্রময়তা তুলে ধরার জন্য একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যিনি খিলাফত প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের দলের প্রতিষ্ঠাতা আমীর, যে আন্দোলনের নেতৃত্বে আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে বিজয় পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছি।

    শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি:

    শাইখ তাকি উদ্দিন বিন ইব্রাহিম বিন মুস্তাফা বিন ইসমাইল বিন ইউসুফ আন-নাবহানি ‘আন-নাবহান’ গোত্রের উত্তর ফিলিস্তিনের ‘আজ্জাম’ নামক গ্রামে ১৯১৪ (১৩৩২ হিজরী) সালে জন্ম গ্রহন করেন। তাঁর পরিবার জ্ঞান ও তাকওয়ার জন্য পরিচিত ছিল। তাঁর বাবা শাইখ ইব্রাহিম একজন আইনজ্ঞ ও মা’আরিফ মন্ত্রনালয়ের (শিক্ষা ও কলা) ‘উলুম–ই-শরই’ এ বিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর মা ও ‘উলুম–ই-শরই’ এ বিজ্ঞ ছিলেন যা তিনি তাঁর বাবা ইউসুফ আন-নাবাহানি থেকে অর্জন করেছিলেন।

    তাঁর নানা শাইখ ইউসুফ নাবহানি সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী যে তথ্য পাওয়া যায় তা অনেকটা এরকম – “শাইখ ইউসুফ বিন ইসমাইল বিন ইউসুফ বিন হাসসান বিন মোহাম্মাদ আল নাবাহানি আল শাফে’য়ী – ওরফে আবু আল মাহাসিন একজন কবি, সুফি এবং একজন জ্ঞানি ব্যাক্তি ছিলেন। তাঁকে তৎকালীন সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিচারক হিসেবে গন্য করা হত। তিনি নাবলুস এলাকার জেনিন শহরের বিচারক হিসেবে দায়িত্বপালন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইস্তানবুল শহরে চলে যান যেখানে মসুল এলাকার কাভি সান্দাক শহরে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অতঃপর তিনি আজকিয়া ও আল-কুদস এর আদালতের প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। তারপর তিনি বেইরুতের আদালতের দায়িত্ব পান। তিনি ৪৮টি বই লিখেন।

    শাইখ তাকিউদ্দিন আন নাবাহানি’র ইসলামি ব্যাক্তিত্বের পিছনে তাঁর পরিবারের ভুমিকা অনন্য। তাই, তিনি মাত্র ১৩ বছরে কোরআন হিফজ করেন। তিনি তাঁর নানার জ্ঞান দ্বারা অতিব অনুপ্রানিত হন এবং তিনি তাঁর নানার জ্ঞানের ভান্ডার থেকে যত বেশী সম্ভব লাভবান হোন। প্রথম থেকেই তাঁর নানা উসমানী খিলাফতের পক্ষে যেসব রাজনৈতিক দলের অনুসুচনা করেছিলেন তা থেকে তিনি রাজনৈতিক বোধসম্পন্ন সচেতনতা অর্জন করেন। শাইখ তাকি উদ্দিন তাঁর নানা কর্তৃক আয়োজিত শরয়ী বিধিবিধান সংক্রান্ত আলোচনা/বিতর্ক থেকে অনেক উপক্রিত হোন। তিনি তখন থেকেই তাঁর নানার চোখে অন্যরকম ভাবে ধরা পড়েন এবং তাঁর নানা তাঁর বাবকে রাজি করান উলুম-ই-শরঈ অধ্যয়নের জন্য তাঁকে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে।

    জ্ঞান অর্জন:

    ১৯২৮ সালে শেখ আল আজহার ইউনিভার্সিটিতে (জামেয়াতুল আজহার) অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হোন এবং একই সালে বৃত্তিসহকারে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন। তাঁকে সম্মান সূচক ‘শুহাদা আল ঘুরবা’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। তারপর তিনি আল আজহার ইউনিভার্সিটির সংশ্লিষ্ট একটি বিজ্ঞান-কলেজে ভর্তি হোন। তাঁর নানার বিভিন্ন ছাত্র যেমন শাইখ মোহাম্মাদ আল খিজার (র) এর পাঠদানে সর্বদা অংশগ্রহন করতেন। তৎকালীন সময়ে ছাত্রদের জন্য এ ধরণের পাঠ-চক্রে অংশগ্রহণ করার নিয়ম প্রচলিত ছিল, যার কারণে শাইখ তাকি উদ্দিন বিজ্ঞান-কলেজের ছাত্র হওয়ার পরও ইসলামি পাঠ-চক্রে অংশগ্রহন করে যেতেন। তাঁর সহপাঠী এবং শিক্ষকরাও ঈর্ষা করতেন তাঁর গভীর চিন্তা, মতামত এবং কায়রো বা অন্যান্য ইসলামি ভু-খন্ডে বিতর্কের জন্য।

    শাইখ যেসব ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন – আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারমেডিয়েট, আল আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে ‘শাহাদা তাল ঘুরবা’, কায়রো থেকে আরবি ভাষার ও সাহিত্যে ব্যাচালর ডিগ্রি (গ্র্যাজুয়েশান), আল আজহার ইউনিভার্সিটির সাথে সংশ্লিষ্ট শরয়ী আদালত সম্পর্কিত ইন্সটিটিউট ‘মা’হাদ আল ‘আলা’ থেকে ‘দ্বার আল’ উলুম’ ডিগ্রি, ‘শাহাদা তাল ‘আলামিয়াহ’ – মাস্টার্স ডিগ্রি (পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান) ১৯৩২ সালে।

    শাইখ তাকি’র অফিস সমূহ:

    ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত মা’আরিফ মন্ত্রনালয়ের শরীয়া শিক্ষা বিভাগে কাজ করেন। পরবর্তীতে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং তাঁকে হাইফা নগরীর শরীয়া কোর্টের এটর্নি করে স্তানান্তর করা হয়। অতঃপর ১৯৪৮ সালে তিনি রামাল্লাহ নগরীর আদালতের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। ইহুদিদের দ্বারা ফিলিস্তিন ভূখণ্ড দখলের পর তিনি সিরিয়াতে চলে যান কিন্তু একই বছরে তিনি আবার ফিলিস্তিনে ফেরত আসেন এবং আল-কুদস এর শরীয়া কোর্টের বিচারক হিসেবে চাকরি করেন। তারপর তিনি ১৯৫০ সালে শরীয়া হাই কোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। অতঃপর তিনি বিচারক এর পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং ওমানের উলুম-ই-ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষকতা বেছে নেন। শাইখ ছিলেন জ্ঞানের সাগর এবং প্রায় জ্ঞানের প্রায় সব শাখায় পান্ডিত্যের অধিকারী।

    শাইখের লেখা বইয়ের একটি লিস্ট নিচে দেওয়া হল:

    নিযামুল ইসলাম
    আত-তাকাত্তুল আল-হিজবী
    মাফাহীম
    ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা
    ইসলামী সামাজিক ব্যবস্থা
    ইসলামী শাসন ব্যবস্থা
    ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান
    সংবিধানের সূচনা (সারসংক্ষেপ)
    ইসলামী ব্যাক্তিত্ব
    রাজনৈতিক চিন্তা
    উষ্ণ আহবান
    আল-খিলাফাহ
    চিন্তা
    মনের উপস্থিতি (প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব)
    সমাজে কর্তৃত্ব স্থাপন
    যাত্রা শুরুর স্থান
    লিস্লাহ-এ-মিসর
    আল ইত্তিফাকিয়াত আস সানিয়া আল মাস্তিয়া আল সুরইয়া ওয়াল ইয়ামনিয়া
    হাল কাদিহ ফালাস্তিন ‘আলা তারীকাতিল আমরিকিয়া ওয়াল ইংলিজিয়া
    নাজরিয়া আল ফারাঘ আল সিয়াসি হাল মাসরো’ ইজান হাওয়ার

    এছাড়াও তাঁর লেখা শত শত বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুস্তিকা আছে।

    যখন তাঁর বইগুলো নিষিদ্ধ তখন তিনি তার দলের অন্যান্য সদস্যের নামে যেসব বই প্রকাশ করেন তা হল:

    অর্থনৈতিক নীতি
    মারক্সিস্ট কমিউনিসম এর জবাব
    খিলাফাহ যেভাবে ধংস হল
    ইসলামে সাক্ষ্য-প্রমানাদির (বিচারসংক্রান্ত) নিয়মকানুন
    ইসলামে শাস্তি ব্যবস্থা
    নামাজের নিয়মসমুহ
    ইসলামী চিন্তা

    এবং দল প্রতিষ্ঠার আগে তিনি দু’টো বই লিখেছিলেন:

    রিসালাতুল আরব
    আনকাজ ফালাস্তিন

    শাইখের চরিত্র:

    জুহাইর কাহালা (ইসলামি সাইন্স কলেজের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত) কলেজের একজন চাকুরীজীবী ছিলেন যখন শাইখ একই কলেজে চাকরি করেন। শাইখ তাকি সম্পর্কে তিনি বলেন, “শাইখ একজন বুদ্ধিমান, ভদ্র, পরিষ্কার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। তাঁর ব্যাক্তিত্ব ছিল আন্তরিক, মহৎ, প্রভাবসম্পন্ন। মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্রে ইহুদি-বসতি’র উপস্থিতি তাঁকে প্রচন্ডভাবে ব্যাথিত করে এবং তাঁকে উদগ্রীব করে তোলে”।

    তিনি মাঝারি উচ্চতার, শক্ত গড়নের, কর্মঠ, প্রাণবন্ত এবং স্পষ্টভাষী বিতার্কিক। তিনি উদাহরনসহ তাঁর যুক্তিগুলো তুলে ধরতেন। তিনি যা হক (সত্য) বলে বিশ্বাস করতেন তাঁর সাথে বিন্দু পরিমাণ দেন-দরবার করতেন না। তাঁর দাড়ি মাঝারি লম্বা ছিল যাতে আধাপাকা চুল ছিল। তাঁর ব্যাক্তিত্ব সম্ভ্রান্ত ছিল এবং তাঁর বক্তব্য অন্যকে প্রভাবিত করত। তাঁর যুক্তি অন্যকে সন্তুষ্ট করত। তিনি লক্ষ্য ছাড়া আন্দোলন, ব্যাক্তিগত আক্রমণ ও উম্মাহ’র স্বার্থ থেকে বিচ্যুত হওয়াকে খুব অপছন্দ করতেন। তিনি মানুষের ব্যাক্তিগত জীবনে মগ্ন হয়ে যাওয়াকে অবজ্ঞা করতেন। তিনি যেন রাসূলাল্লাহ (সা) এর একটি হাদীসের ঠিক জীবন্ত প্রতিরুপ, যার অর্থ অনেকটা এরকম, “যে ব্যাক্তি মুসলিম উম্মাহ’র স্বার্থে নিজেকে নিযুক্ত করে না, সে তাদের মধ্যে থেকে নয়”। তিনি এই হাদীসটি বার বার ব্যাবহার করতেন এবং দলীল হিসেবে উপস্থাপন করতেন।

    শাইখ তাকি উদ্দিন যে সকল দল বা আন্দোলন ৪র্থ হিজরির পর আবির্ভাব হয়েছিল সেগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছিলেন, এর পিছনে কঠোর পরিশ্রম দিয়েছিলেন। তিনি তাদের কায়দা-কৌশল, চিন্তা-মতবাদ, সমাজে বিস্তার লাভ ও তাদের ব্যার্থতা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি যেহেতু চিন্তা করেছিলেন খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য একটা রাজনৈতিক দল থাকা আত্যাবশ্যকীয়, তিনি এই দৃষ্টিকোণ থেকেই দল গুলোকে নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। মোস্তফা কামাল ‘আতা-তুর্ক’ এর হাতে যখন খিলাফাহ ধ্বংস হওয়ার পর বহু ইসলামী আন্দোলন থাকার পরও মুসলিমরা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে ব্যার্থ হয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভু-খন্ড ইসরাইলিদের দ্বারা দখল হওয়া এবং ব্রিটিশ সরকারের মদদপুষ্ট জর্ডান, ইরাক ও ইজিপ্ট সরকারের সহায়তায় ইহুদি শক্তির সামনে সমগ্র আরবের নিঃসহায় অবস্থা তাঁর উচ্ছ্বাসকে প্রভাবিত করে। তাই তিনি মুসলিমদের পুনঃর্জাগরণের উৎসগুলো খুঁজে বের করা শুরু করেন। প্রথমেই তিনি উম্মাহ’র পুনর্জাগরণ এর ব্যাপারটি অবলম্বন করেন এবং ২টো বই লিখেন: ১) রিসালাতুল আরব; ২) আনকাজ ফালাস্তিন। উভয় বই ১৯৫০ সালে প্রকাশ হয়। বইদুটো শুধুমাত্র চিন্তা, ‘আকীদা, উম্মাহ’র আসল বক্তব্য বা ইসলামের মূল বানী, এবং বইগুলোতে বলা হয় – ইসলামি একমাত্র ভিত্তি যার উপর আরবগণ ভর করে পুনরুজ্জীবিত হবে। আরব জাতীয়তাবাদীদের বানী হতে শেখ এর বানী ভিন্ন ছিল। আরব জাতীয়তাবাদীদের প্রচারিত বক্তব্য উম্মাহের সাথে তথা ইসলামের মূল বক্তব্য থেকে শুধু দূরত্বই বাড়িয়ে দিয়েছে, বরং উম্মাহকে পাশ্চাত্য চিন্তা-চেতনা দিয়ে ব্যস্ত রেখেছে যা ইসলামী ‘আকীদা হতে ভিন্ন। অতঃপর তিনি আরব-জাতীয়তাবাদের চিন্তা-মতবাদ নিয়ে পড়ালেখা করেন এবং তাঁর কাছে যেসকল প্রস্তাব আসত তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করত কিন্তু সেগুলো কখনও তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।

    তিনি কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি যেসকল আলেমদের সাথে পরিচয় আছে বা দেখা হয়েছে তাদের সকলের সাথে যোগাযোগ করেছেন। মুসলিম উম্মাহকে পুনরজ্জীবিত করতে এবং উম্মাহ’র পূর্বের গৌরব ফিরিয়ে নিতে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার মতামত তাঁদের সকলের কাছে তুলে ধরেন। এজন্য তিনি সমগ্র ফিলিস্তিন ঘুরে বেড়িয়েছেন খ্যাতিমান আলেমদের এবং বুদ্ধিজীবীদের কাছে তাঁর চিন্তা-মত প্রকাশ করতে। এ উদ্দেশ্যে তিনি অনেক সেমিনার আয়োজন করতেন, আলেমদের সম্মেলন করতেন। এ সেমিনারগুলোতে তিনি উম্মাহর পুনর্জাগরণের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে আলেমদের সাথে আলোচনা (বা বিতর্ক) করতেন এবং বলতেন যে তাঁরা ভুল পথে হাঁটছেন আর তাঁদের সকল কষ্ট বৃথা যাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাদের সাথে বিতর্ক করতেন তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক, জাতীয়তাবাদি বা ইসলামি দলের কর্মকর্তাদের সাথে। তিনি আল আকসা মসজিদ, আল খলীল মসজিদ সহ বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ঘটনাবলী ও বিভিন্ন দিবসে আলোচনা করতেন। তিনি প্রায়ই ‘আরব লীগ’ এর বাস্তবতা দেখিয়ে উল্লেখ করতেন যে এটি একটি পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের ফল এবং অনেক পাশ্চাত্য হাতিয়ারের অন্যতম যা দ্বারা মুসলিম ভুখন্ডে তাঁদের আধিপত্য বজায় রাখে। শাইখ পাশ্চাত্য ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করতেন এবং মুসলিম ও ইসলাম বিরোধি নীল-নকশা উম্মাহ’র সামনে তুলে ধরতেন। তিনি মুসলিমদের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে দিতেন এবং তাঁদের আহবান জানাতেন রাজনৈতিক দল গঠন করতে যার ভিত্তি হবে একমাত্র ইসলাম।

    শাইখ তাকিউদ্দিন ‘প্রতিনিধিগণের সভা’র (যা শুধুমাত্র উপদেষ্টামণ্ডলীর কমিটিই ছিল) নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর ধ্যান-ধারনা বা মতামত, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, ইসলামী দল গঠনের ব্যাপারে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ইসলামকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরা ইত্যাদি কারণে সরকার তাঁর প্রতিকূলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করে।

    কিন্তু এসবের সত্ত্বেও না তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে যান, না তিনি দমে গেছেন, বরং তিনি আলোচনা বা বিতর্ক চালিয়ে গেছেন। একটি ইসলামী রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য প্রখ্যাত আলেম, বিচারক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের প্রভাবিত করার মাধ্যমে তিনি অচিরেই সাফল্যের মুখ দেখেন। অতঃপর তিনি এসব সমাজের উচুমাপের লোকদের কাছে একটি কাঠামো ও দল-এর মতবাদ উপস্থাপন করতেন। কিছু আলেম ও কিছু চিন্তাবিদ তাঁর মতবাদের সাথে একমত পোশন করেন এবং তাঁদের সম্মতি প্রকাশ করেন, এভাবে দল প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা একেবারে শীর্ষে পৌছে।

    আল-কুদস, রহমতময় নগরিতেই তার দল এর প্রতিষ্ঠার ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন হয়েছিল, যেখানে শাইখ সুপ্রীম কোর্টে কর্মরত ছিলেন। সেসময়, তিনি বিভিন্ন আলেমদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন শুরু করেন যেমন: কালকিলা শহরের শেখ আহমাদ দা’ওর, ইজিপ্ট এর সায়্যাদান নিমর, রামাল্লাহ শহরের দাউদ হামদান, আল-খলীল শহরের শেখ আব্দুল-কাদিম জাল্লুম, নাবলুসের আদিল, ঘানিম আব্দু, মুনির শাকির, শেখ আ’সাদ বেওয়িয প্রমুখ।

    শুরুতে, প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে শুধু প্রয়োজনুসারে মিটিংগুলো সংঘঠিত হত। বেশিরভাগক্ষেত্রে আল-কুদস এবং আল-খলীল শহরে মিটিংগুলো আয়োজিত হত যার বিষয়বস্তু ছিল মানুষদের দলের চিন্তার দিকে আহবান জানানো। বিতর্কের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ’র গৌরব-উজ্জ্বল ফিরিয়ে আনতে ইসলামি প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এভাবে চলতে থাকে যতক্ষণ না এ মানুষগুলো একটা রাজনৈতিক দল গঠন করতে শপথ করে।

    ১৭ই নভেম্বর ১৯৫২ সালে, দল এর ৫ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য জর্ডানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে বিধিমতাবেক ‘নো অবজেকসান সার্টিফিকেট’ এর জন্য আবেদন জানান। এই ৫ জন সদস্য হলেন: ১) শাইখ তাকি উদ্দিন আন-নাবহানি – নেতা, ২) দাউদ হামদান – উপনেতা ও সচিব, ৩) ঘানিম আব্দুহ – অর্থ সম্পাদক, ৪) আদিল আল নাবলুসি – সদস্য ও ৫) মুনির শাকির – সদস্য। পরবর্তীতে একটি দল গঠনের জন্য তারা অটোমান আইন এর সকল আচরনবিধি সম্পন্ন করেন। দলের এর প্রধান কার্যালয় আল-কুদস এ রাখা হয় এবং যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করে সব অটোমান আইন অনুযায়ী বৈধতা পায়।

    দলের “মৌলিক গঠনতন্ত্র ও তা প্রয়োগের শর্ত” এর দৈনিক আল-সারিহ পত্রিকার ইস্যু ১৭৬ (তারিখ: ১৪ই মার্চ ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে জুমাদ আল আউওাল ১৩৭২ হিজরি) এর প্রকাশনায় একে একটি বৈধ দল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর মাধ্যমে তৎকালীন অটোমান আইনে দল তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অধিকার পায়।

    কিন্তু, সরকার ৫ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় এবং তাঁদের ৪ জন কে গ্রেপ্তারের পর জেরা শুরু করে। ২৩শে মার্চ ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দ, ৭ই রজব ১৩৭২ হিজরি সরকার একটি বিজ্ঞপ্তি জারির মাধ্যমে ঘোষণা করে যে দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল এবং এর সদস্যদেরকে সমস্ত কর্মকান্ড বন্ধ করতে নির্দেশ দেওয়া হল। ১লা এপ্রিলে আল-কুদস এর কার্জ্যালয়ের সকল পোস্টার ও ব্যানার তুলে নেওয়া হয় – সরকারের নির্দেশ অনুসারে।

    যাইহোক, শাইখ তাকি এ ‘নিষিদ্ধ’ কে কোন গুরুত্ব দেয়নি বরং তিনি তাঁর কাজ চালিয়ে যান। তিনি এর প্রচারনার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন যার জন্য এর জন্ম। দাউদ হামদান ও নিমর মিসরি ১৯৫৬ সালে দলের নেতৃত্ব থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নেন, তাঁদের পরিবর্তে শাইখ আব্দুল কাদীম জাল্লুম ও শাইখ আহমাদ দা’উর এর তাঁদের আসনে বসেন। এ প্রখ্যাত আলেমদ্বয় পরবর্তীতে এর নেতৃত্বের হাল ধরেন এবং তাঁদের দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে পালন করেন।

    ইসলামী জীবন-ব্যাবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য আল-আকসা মসজিদের জামাত আদায় করার স্থানে এ দল মানুষদের পাঠচক্রের আয়োজন শুরু করে। তাঁদের মনোমুগ্ধকর কার্যক্রমের জন্য সরকার সস্তা চাল খেলতে শুরু করে যেন দলটি কখনো শক্তিশালী সংগঠনে রুপ না নেয়। ১৯৫৩ সালের শেষ দিকে, শাইখ তাকি এহেন পরিস্থিতিতে তাঁর স্থান পরিবর্তন করেন।

    ১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে শেখ তাকি সিরিয়াতে পাড়ি জমান, সেখানে সিরিয়ান সরকার দ্বারা গ্রেপ্তার হন এবং তাঁকে লেবাননে পাঠিয়ে দেন কিন্তু লেবানন সরকারও তাঁকে দেশে ঢুকতে বাঁধা দেয়। আল-হারিরের থানার অফিসার ইন চার্জ কে তিনি অনুরোধ করেন তাঁর বন্ধুকে একটি ফোন-কল করার জন্য। অফিসার তাঁকে কল করতে দেয়। তিনি তাঁর বন্ধু মুফতি শেখ হাসসান আল ‘আলা কে ফোন-কল করেন এবং ঘটনা বর্ণনা করেন। শেখ আল ‘আলা সাথে সাথে পদক্ষেপ গ্রহন করেন এবং অফিসার কে ধমক দেন এই বলে যে যদি তিনি শাইখ তাকি কে লেবাননে ঢুকতে না দেন তাহলে তিনি প্রচারনা শুরু করবেন যে লেবাননের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার একজন অন্যদেশের বহিষ্কৃত আলেমকে দেশে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। লেবানন কর্তৃপক্ষ এটাকে হুমকি হিসেবে নেয় এবং শাইখ তাকিকে লেবাননে প্রবেশ করতে দেন।

    শাইখ তাকি লেবাননে আসার পর তাঁর চিন্তা-মতবাদ প্রচারণায় নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তেমন কোন বাঁধার সম্মুখিন হননি। যখন লেবানন সরকার তাঁর চিন্তা-ধারা’র আসন্ন বিপদকে আঁচ করতে পারলো, তখন শাইখ এর প্রতি কড়াকড়ি আরোপ শুরু করলো। তাই শাইখ বেইরুত থেকে ত্রিপোলিতে চলে যান। শাইখের কাছের বন্ধুদের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি তখন তাঁর সময়ের বেশির ভাগ সময় পড়ালেখায় ব্যয় করতেন। তিনি রেডিও’র মাধ্যমে বিশ্বের খবর নিতেন এবং চমৎকার রাজনৈতিক পর্যালোচনা তৈরি করতেন। তিনি তাঁর নাম ‘তাকি’ অর্থাৎ ‘ধার্মিক’ এর মতই ধার্মিক ছিলেন। তিনি সর্বদা নিজের জিহবা সংযত রাখতেন, চোখ নামিয়ে রাখতেন। তাঁকে কখনও কোন মুসলিমকে অমার্জিত কথা বলতে শোনা যায়নি, কাউকে অপমানিতও করেননি, এমনকি যেসব দা’ইয়ি তাঁর সাথে ইজতিহাদের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করতেন।

    ইরাকে তিনি ‘নুসরাহ’র (সামরিক সমর্থন) প্রতি বেশী নজর দেন। এজন্য তিনি নিজে শেখ আব্দুল কাদিম জাল্লুম এর সাথে বেশ কয়েকবার ইরাকে যান কারণ সেখানে আব্দুল সালাম আরিফ এর মত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তিত্ব ছিল। ইরাকে তাঁর অনেকগুলো যাত্রার শেষটিতে তিনি গ্রেপ্তার হোন এবং প্রচন্ডভাবে প্রহৃত হোন, শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করা হয়। কিন্তু শাইখের জেরাকারী তাঁর কাছ থেকে কোন তথ্য বের করতে ব্যর্থ হয়। তিনি শুধু এ কথাই বারবার ব্যক্ত করতে থাকেন যে, “একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি চিকিৎসার খোঁজে”। আসলে তিনি ইরাকে গিয়েছিলেন পিছিয়ে পড়া উম্মাহকে পুনর্জাগরণ করতে। ইরাকি কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছ থেকে কোন তথ্য না পেয়ে তাঁকে প্রচন্ডভাবে প্রহার করে ও তাঁর হাত ভেঙ্গে দেয় এবং তাঁকে দেশ থেকে বের করে দেয়, তখন তাঁর সমস্ত শরীর প্রহারের কারণে রক্তে রঞ্জিত ছিল। তিনি যখনই ইরাকের সীমানা অতিক্রম করলেন, জর্ডানের গোয়েন্দা সংস্থা ইরাকের গোয়েন্দা সংস্থাকে অভিত করলেন যে তিনিই ছিলেন শাইখ তাকি উদ্দিন যাকে ইরাকি গোয়েন্দা সংস্থা হন্য হয়ে খুজছিলো। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, সময়টা তাঁদের পক্ষে ছিল না, বরং শাইখ ততক্ষণে অনেক দূর পাড়ি দিয়েছেন।

    খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্য শেখ অটল ছিলেন, তিনি যখন মৃত্যু পথযাত্রী তখন তিনি তাঁর আকাঙ্খিত লক্ষ্যে প্রায় পৌছে যাচ্ছিলেন।

    উম্মাহ এ শাইখকে শেষ বিদায় জানায় শনিবার, ফজরের ওয়াক্তে, ১লা মহররম ১৩৯৮, ১১ই ডিসেম্বর ১৯৭৭ সালে। বস্তুত, তিনি ছিলেন এক মহান নেতা, জ্ঞানের সমুদ্র, সমসাময়িক কালের অন্যতম বিচারক, ইসলামি চিন্তার পুনর্জাগরক, বিংশ শতাব্দির শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, সত্যিকারের মুজতাহিদ এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী আলেম। বেইরুতের আল-অযায়ি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। শাইখ তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ও আত্মত্যাগের ফলাফল নিজ জীবনে ভোগ করতে পারেননি। তিনি খিলাফত রাষ্ট্র দেখে যেতে পারেননি যার জন্য দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর উত্তরসূরি, তাঁর সহকর্মী, বিখ্যাত আলেম শাইখ আব্দল কাদীম জাল্লুমের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে গেছেন। যদিও শাইখ তাকি খিলাফত রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিজের চোখে দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু তাঁর প্রচেষ্টা ফলাফলে রুপ নেয় ও দল পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর মতবাদ সমগ্র বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা পায়। দশ মিলিয়নের মত মানুষ তাঁর মতবাদ গ্রহণ করেছে এবং তাঁর দ্বারা প্রশিক্ষিত ব্যাক্তি সমগ্র বিশ্বে পৌছে যায়। এমনকি আজ যারা শাইখ তাকির মতবাদ গ্রহণ করেছে ও ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছে তাঁদের দ্বারা বিশ্বের বিভিন্ন জালেম শাসকের কারাগার আজ পরিপূর্ণ।

    আল্লাহ শাইখের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন, দুনিয়াতে এর পূর্ণ সফলতা দান করুন, তার উপর রহম করুন ও তাকে সর্বোচ্চ জান্নাত দান করুন। আমীন।
  • টিকফা চুক্তি: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক দাসত্বের কৌশলপত্র

    টিকফা চুক্তি: মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক দাসত্বের কৌশলপত্র

    গত ১৭ জুন, ২০১৩ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রী পরিষদ সভায় টিকফা চুক্তির খসড়া অনুমোদন হয়। মন্ত্রিসভা বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোঃ মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দাবি করেন- “এ চুক্তির কারণে আমেরিকা আর একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেনা”। যদিও দুই সরকারের কোনো এক পক্ষ এ চুক্তির কোনো ধারা উপধারা বিস্তারিতভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করেনি শুধুমাত্র কিছু অস্পষ্ট বিবৃতি দেয়া ছাড়া, যেমন: ‘বাংলাদেশের জন্য এ চুক্তি সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দিবে’, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি একটি বিরাট মাইলফলক’ এবং আরো অনেক কিছু। তাই এ চুক্তির বিষয়বস্তু যা প্রকাশিত হয়েছে তার গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। এর জন্য আমরা সাহায্য নিব, টিকফার খসড়া, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে আমেরিকার টিকফা চুক্তির অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের সাথে তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। এখানে বলে রাখা ভালো ভারত ও চীন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টিকফা চুক্তি করেনি। যেহেতু এটি একটি অসম চুক্তি তাই এ চুক্তির আড়ালে আমেরিকার লুকায়িত কর্মপরিকল্পনা এবং এর পরিণতি কী হবে তা এখানে তুলে ধরব।

    বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার (Intellectual Property Rights):

    এ চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশ IPR এর নিয়ম মেনে চলতে হবে। যদিও চুক্তিতে উভয় পক্ষের মেনে চলার কথা বলা হয়েছে তবে এটি সত্য বাংলাদেশের মত দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশের নিজ নামে কোনো প্যাটেন্ট নেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এই IPR নিয়ম এমনভাবে করে রেখেছে যে সবচাইতে বেশি অর্থ পরিশোধ করবে সেই প্যাটেন্ট পাবে। এতে চুক্তির অন্য পক্ষই সুবিধাটা পাবে।

    কৃষি:

    এই প্যাটেন্ট স্বত্ব আইন অনুযায়ী ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও দুর্লভ পণ্যের প্যাটেন্ট করে রেখেছে। যার পরবর্তী উৎপাদন, বন্টন ও সংরক্ষণের জন্য আমেরিকার নিকট বিপুল অংকের রয়্যালটি, কপিরাইট ও লাইসেন্স ফি দিতে হবে। এ চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশের কৃষি, ফারমাসিউটিকেল, তথ্য প্রযুক্তি খাত ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। 

    প্যাটেন্ট আইন প্রয়োগে আমাদের কৃষি ও প্রাণীজগতের জন্য সংকট বয়ে আনবে। বাংলাদেশ সহ অনেক দেশের প্রাণী ও নানাজাতের উদ্ভিদ বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা প্যাটেন্ট করা। আরা এর বাস্তবায়নে কৃষক বীজ উৎপাদন, স্তূপকরণ, সংরক্ষণ করতে দেয়া হবেনা। কৃষিজাত পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে ও দেশকে খাদ্য সংকটের মুখোমুখি করবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্যাটেন্ট করা কৃষি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে কৃষিতে ভর্তুকি কমাতে বাধ্য করবে। তাই এ প্যাটেন্ট আইন আমেরিকার বহুজাতিক কোম্পানিকে করবে সম্পদশালী আর এ দেশের কৃষকদের করবে সর্বহারা। 

    সেবা খাত:

    এই চুক্তি আমাদের অর্থনীতির বৃহত্তম অংশ সেবা খাতের উপর বিরূপ প্রভাবিত ফেলবে। যেখানে আমেরিকার মতো একটি উন্নত অর্থনীতির রয়েছে শক্তিশালী সেবা খাত। টিকফা চুক্তি একবার স্বাক্ষরিত হলে মার্কিন সেবা দানকারী প্রতিষ্টানগুলি বাংলাদেশের আর্থিক খাতের উপর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হবে যা এ দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাকে হুমকির মুখে ফেলবে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী বহুজাতিক কোম্পানিগুলাকে সেবা খাতে ব্যবসার অনুমতি দিতে বাধ্য ছিল যার ফলে আর্থিক ও টেলিযোগাযোগ খাতে তাদের ব্যাপক আধিপত্য প্রতিষ্টিত হয়েছে। যদি মার্কিনীদের আরো সুবিধা দেয়া হয় এর পরিণতিতে স্থানীয় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলি নির্মূল হয়ে পড়বে এবং মার্কিন কোম্পানিগুলা তার জায়গা দখল করে নিবে। দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কর মুনাফা হারাবে এবং মুনাফা খাত পরিণত হবে কর অব্যাহতির বিষয়ে।

    অর্থনৈতিক সঙ্কট প্রবল হবে:

    আমেরিকান কোম্পানিগুলা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সহজে প্রবেশের দরুন, বিশেষত আর্থিক খাত, দেশের অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনীতির সাথে জড়িয়ে পড়বে যা বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকটের সময় দেশের অর্থনীতিও সংকটে পরবে। ২০০৬-০৭ এ যখন যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখি হয় ইউরোপের বাজারেও তা আঘাত করে কারণ ইউরোপের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্যে জড়িত ছিল। এতে ইউরোপ এ সঙ্কট এড়াতেও পারে নি। যার উত্তম উদাহরণ গ্রীস, এ সংকটের পরিণতিতে গ্রীস কার্যকরভাবে যে কোন প্রকারের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব হারায় এবং এটি অদ্ভুত হবে না, টিকফার কারণে বাংলাদেশকেও আগামীতে যদি একই ভাগ্য বরণ করতে হয়।

    অন্যান্য:

    • টিকফা চুক্তি বাংলাদেশ সরকারকে বাধ্য করবে তৈরী পোষাক কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে অনুমতি দিতে। যা মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করবে। এতে তৈরী পোশাক শিল্পে চলমান আস্তিরতা আরো বেগবান করবে। সত্যিকার অর্থে আমেরিকান কোম্পানিগুলা তাদের সরকারের সাথে অংশীদার হয়ে বাংলাদেশের পোষাক শ্রমিকদের শোষণই করছে আর টিকফা কোনভাবেই এর প্রতিকার হতে পারনা।
    • এ চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেশের জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, বন্দর, টেলিযোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবহন ইত্যাদি খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে । যা আমাদের অর্থনীতির জন্য হবে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত।
    • চুক্তির শর্ত মোতাবেক বাংলাদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে এবং ঢালাওভাবে সরকারি খাতগুলিকে বেসরকারিকরণ করতে হবে । যা পরবর্তীতে আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা বিলুপ্ত করা হবে।

    সংক্ষেপে, টিকফা চুক্তি মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ার এর দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ দেশীয় সকল ব্যবসা, শিল্প এবং বিনিয়োগ সম্পর্কিত নীতিগুলা নিয়ন্ত্রিত হবে। যার ব্যত্যয় ঘটলে তারা রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপ করবে।

    আমেরিকার কর্মপরিকল্পনা:

    টিকফা চুক্তির প্রক্রিয়ায় আমেরিকার লুকায়িত এজেন্ডা আমাদের অদূরদর্শী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকবর্গ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ অনেক বছর ধরেই এ দেশে জ্বালানি খাতে শেভরন, অক্সিডেন্টাল এর মত বহুজাতিক কোম্পানি দ্বারা ব্যবসা করে সন্তুষ্ট ছিল কিন্তু তারা এখন বাংলাদেশের ঘাড়ে বসে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিতে মনোযোগ দিয়েছে। টিকফা তারই নীলনকশা বাস্তবায়ন করবে। তাদের এ প্রবণতার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারতের আধিপত্য, যেমন এ্যায়ারটেলের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে অনুপ্রবেশ যা আমেরিকার কাছে খুব বেশি সুখকর নয়। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে নতুন বাজার খোলা যা তাদের ইরাক আফগানিস্তানের মত অনিঃশেষ যুদ্ধে হাজার হাজার কোটি ডলারের যে ক্ষতি তা পূরণ করতে সহায়তা করবে। তৃতীয়ত, সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণটি তা হল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের বাণিজ্যিক ও সামরিক অবস্থান দৃঢ় করা। বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে তাদের এ উদ্দেশ্য হাসিলে সবচাইতে কৌশলগত অবস্থানে আছে।

    ইসলামের দৃষ্টিতে টিকফা চুক্তি:

    ইসলামে পররাষ্ট্র নীতি সহ একটি রাষ্ট্র চালানোর জন্য আবশ্যক সমস্ত ব্যবস্থা আছে । এর স্বরূপ শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রেই পরিপূর্ণভাবে দেখা যাবে। ইসলামে যে কোন চুক্তির সুস্পষ্ট নীতিমালা আছে। সীমিত পরিসরে এখানে আমরা শুধুমাত্র টিকফা সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি নিয়ে আসব।

    ১. ইসলাম অনুযায়ী যেকোন আন্তর্জাতিক চুক্তি যা ইসলাম ও মুসলিমের উপকৃত করে এমন চুক্তির অনুমতি আছে। ইসলাম 

    সে সমস্ত চুক্তি অনুমোদন দেয় না যা মুসলিমদের চাইতে  
    ইসলামের শত্রুদের সুবিধাজনক অবস্থানে রাখে। টিকফা এমন চুক্তি যা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত আমেরিকার নির্দেশে করা, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে করবে বিদ্ধস্ত এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলবে। এতে কম করে বললেও এটাকে প্রভু-দাস সম্পর্কের চুক্তি বলা চলে।

    আল্লাহ তায়ালা বলেন-

    ……এবং আল্লাহ কখনোই মুমিনদের উপর কাফেরদের কোন পথ (বিজয়) অবশিষ্ট রাখেন না” [সূরা নিসা- ১৪১]

    এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায় মুসলিমদের উপর কাফেরদের কতৃত্ব চলবেনা। টিকফা চুক্তির যতটুকু প্রকাশ পেয়েছে এটি তারই নির্দেশ করছে। অতএব এ ধরনের কোন চুক্তিই করা যাবেনা।

    ২. যে সমস্ত দেশ মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত তাদের সাথে চুক্তির অনুমতি ইসলাম দেয়না। আর আমেরিকা শুধু যুদ্ধে লিপ্ত না সম্প্রতি তারা ইরাক ও আফগানিস্তানকে দখলও করে নিয়েছে। ইসলামের পররাষ্ট্র নীতি অনুযায়ী যুদ্ধরত কোন দেশের সাথে কোন প্রকার চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া যাবেনা।

    ৩. যে কোন চুক্তি দুপক্ষের স্বাধীন ইচ্ছার ফলে হতে হবে। আর আমেরিকা ক্রমাগত বাংলাদেশকে পীড়াপীড়ি করে যাচ্ছে এ চুক্তি সইয়ে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা জি এস পি সুবিধা বাতিল করে দিবে এমন ভয় ভীতি হুমকি দিয়ে এক প্রকারের চাপের মধ্যে রাখছে। যা এ চুক্তি সইয়ের অনুমোদন দেয়না।

    অতীতে ইসলামিক রাষ্ট্র এই আমেরিকার সাথে কীভাবে আচরণ করত তার ছোট্ট একটা ঘটনা উল্লেখ করি… ভূমধ্য সাগরে নিরাপদে আমেরিকার পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য ৫ই জুন, ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার একটি চুক্তি হয় যেখানে আমেরিকাকে কর স্বরূপ ৬,৪২,০০০ গোল্ড ডলার যা বছরান্তে ১২,০০০ উসমানী গোল্ড লিরা উসমানী খিলাফতকে পরিশোধ করতে হয় । আমেরিকার ইতিহাসে এটিই একমাত্র চুক্তি যা অন্য ভাষায় করে অর্থাৎ আরবি চুক্তি সই হয়। অথচ আজকে যে চুক্তি সই হচ্ছে তা অসম চুক্তিই নয় অপমানজনকও বটে। একমাত্র ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্টার মাধ্যমেই মুসলিমদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে পারে এবং বিশ্বের পরাশক্তি হিসাবে ইসলামকে বিজয়ী রাখবে অন্য সকল দ্বীনের উপর।

    আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-

    তিনিই প্রেরন করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) সহকারে, যেন এই দ্বীন অন্যান্য সকল দ্বীনের উপর বিজয় লাভ করেন…” [সূরা আত-তাওবা: ৩৩]  

  • ইলমুল ফিকহ : উৎপত্তি ও বিকাশ

    ইলমুল ফিকহ : উৎপত্তি ও বিকাশ
    ভূমিকা:
    প্রত্যেক জিনিসেরই একটি স্তম্ভ রয়েছে। দ্বীন ইসলামের স্তম্ভ হলো ফিকহ” [হাদীস]
     
    ইসলাম মানুষকে তার জীবন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বুদ্ধিবৃত্তিক একটি আকীদা প্রদান করে যা তাদের সকল চিন্তা, আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মূলভিত্তি। এরূপ কোন ভিত্তি এমন একটি সামগ্রিক জীবন ব্যবস্থার অস্তিত্ব দাবী করে যার প্রতিটি অংশ হবে মূল আকীদার অনুগামী ও তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব, ইসলামী জ্ঞানের এমন একটি শাখার আর্বিভাব অনিবার্য ছিল যা ব্যবহারিক জীবনের এই চাহিদাকে সম্পূর্ণ করবে। “ইলমুল ফিকহ” হচ্ছে ইসলামী জ্ঞানের সেই বিশেষ শাখা।

    ফিকহ এর সংজ্ঞা:

    প্রখ্যাত অভিধান বিশারদ আল্লামা আবুল ফযল জামালুদ্দীন মুহাম্মদ আল মিসরী (রহ) বলেন,

    العلم بالشيء والفهمُ له

    “ফিকহ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো, কোন কিছু সম্বন্ধে জানা ও বুঝা।” [লিসানুল আরব]

    ‘ফিকহ’ শব্দটি আল কুরআনে বিশ স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। (ফাতাওয়া ও মাসাইল. ১ম খন্ড, ইফাবা প্রকাশিত) যেমন,

    وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

    তাদের (মুমিনদের) প্রত্যেক দল থেকে একটি অংশ কেন বহির্গত হয় না যাতে তারা দ্বীন সম্বন্ধে ফিকহ হাসিল করতে পারে (লি ইয়াতাফাক্বাহু ফিদ-দ্বীন) এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে- যাতে তারা সতর্ক হয়”। (সূরাই তওবা : ১২২)

    হাদীসেও এই শব্দটি বহুল ব্যবহৃত যেমন-

    مَنْ يُرِدْ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ

    আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে তিনি দ্বীনের ফিকহ (তাফাক্কুহ ফিদ-দ্বীন) দান করেন”। (বুখারী, মুসলিম)

    فَقِيهٌ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابِدٍ

    একজন ফকীহ শয়তানের জন্য হাজার (মূর্খ) আবেদ অপেক্ষা ভয়ংকর” (তিরমিযি) ইত্যাদি।

    অতএব, আভিধানিক অর্থে ‘ফিকহ’ বলতে যে কোন বিষয়ের গভীর জ্ঞানকে বোঝালেও কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে ও বিভিন্ন হাদীসে ‘ফিকহ’ বলতে সুনির্দিষ্ট ভাবে দ্বীনের গভীর জ্ঞানকেই বোঝানো হয়েছে। প্রথম যুগে ‘ফিকহ’ বলতে তাই ইসলামী জ্ঞানের বিশেষ কোন শাখাকে বোঝানো হতো না বরং সামগ্রিকভাবে গোটা দ্বীন সম্পর্কিত গভীর জ্ঞানকে বোঝানো হতো। কিন্তু পরবর্তীতে দ্বীনের প্রতিটি শাখা স্বতন্ত্র ভাবে বিস্তৃত ও বিকশিত হতে থাকলে ‘ফিকহ’ শব্দটি কুরআন-সুন্নাহ থেকে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের হুকুম আগরনের যে বিজ্ঞান কেবল তার জন্যই সুনির্দিষ্ট হয়ে যায়। অতএব, ইসলামী শরীয়াই’র পরিভাষায় ‘ফিকহ’ হচ্ছে ইসলামী জ্ঞানের সেই বিশেষ শাখা যা শরীয়াহ’র প্রামান্য উৎস থেকে শরীয়াহ’র শাখা-প্রশাখা সম্পর্কিত বিধি বিধান আহরন বা ইস্তিম্বাত (إستنباط) করে। তাই ইমাম শাফিঈ (রহ) ফিকহের সংজ্ঞায় বলেন,

    العلم بالأحكام الشرعية العملية المكتسب من أدلتها التفصيلية

    “শরীয়াহ’র বিস্তারিত প্রামাণাদি থেকে ব্যবহারিক শরীয়াহ’র বিধি-বিধান সম্পন্ধে জ্ঞাত হওয়াকে ফিকহ বলা হয়” [আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু]

    সংক্ষেপে বলা যায় ‘ফিকহ’ হচ্ছে ইসলামী আইন কানুন এবং এ সম্পর্কিত বিজ্ঞান। এই হচ্ছে ফিকহের সংজ্ঞা। আর এ ইলমের লক্ষ্য উদ্দেশ্য যা তা হলো দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতে সাফল্য অর্জন। এ অর্থেই ইমাম আবু হানীফা (রহ) বলেছেন,

    معرفة النفس مالها وما عليها

    “ফিকহ হচ্ছে নফস এর পরিচয় লাভ করা তথা কি কি তার অনুকূলে (কল্যাণকর) এবং কি কি তার প্রতিকূল (ক্ষতিকর) সে সম্বন্ধে জ্ঞান”।

    এখানে জ্ঞানীগণ নফসের অনুকূলে ও প্রতিকূলের অর্থ করেছেন “যার সাহায্যে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে কল্যাণ অর্জন করে আর যার কারণে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। [ঐ]

    শীর্ষস্থানীয় ইমামদের মতে এই হলো ’ফিকহ’ এর সংজ্ঞা আর এই হলো তার উদ্দেশ্য। ফিকহ এর আলোচ্য বিষয়গুলোকে নিম্নোক্ত বিভাগগুলোর অধীনে বিবেচনা করা যায়:

    ইবাদত : যা আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্কের নিয়ম কানুন বলে দেয়। যেমন- সালাত, সওম, হজ্জ্ব ইত্যাদি।
    মু’আমালাত : সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিধিবিধান। যেমন- কেনাবেচা, ঋণ, ভাড়া, আমানত, জামানত ইত্যাদি।
    মানাকিহাত : মানবের বংশ রক্ষা সংক্রান্ত বিধিবিধান। যেমন- বিয়ে, তালাক, ইদ্দত, অভিভাবকত্ব, উত্তরাধিকার ইত্যাদি।
    উকুবাত : বিভিন্ন অপরাধ। যেমন- চুরি, ব্যভিচার, হত্যা, অপবাদ ইত্যাদির শাস্তি, যেমন- মৃত্যুদন্ড, রক্তপণ ইত্যাদি।
    মুখাসামাত : আদালতি বিষয়ে। যেমন- অভিযোগ, বিচারবিধি, স্বাক্ষ্য প্রমাণ ইত্যাদি।
    হুকুমাত ও খিলাফত : শাসক নির্বাচন, বিদ্রোহ, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, জিহাদ, সন্ধি, চুক্তি, কর আরোপ ইত্যাদি।

    ‘ফিকহ’ এর উৎপত্তি:

    যেহেতু ‘ফিকহ’ এর মূল উৎস হচ্ছে মানুষের প্রতি শরীয়ত প্রনেতা (অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা)’র আদেশ নিষেধ সম্বলিত বাণী, অতএব তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় যে, নবুয়্যত প্রাপ্তির পর রাসূলুল্লাহ (সা) এর মক্কী জীবন থেকেই ফিকহ এর যাত্রা শুরু। কিন্তু বস্তুতঃ, মক্কী জীবনে পবিত্র কুরআনের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ নাযিল হলেও তার খুব সামান্য অংশই ছিল বিধি বিধান সম্বলিত এবং প্রায় সবটুকুই ছিলো দ্বীনের মৌলিক বিষয় বা আকীদা অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্ব, একত্ব, পরকাল, জান্নান, জাহান্নাম এবং দ্বীনের প্রচার সৎগুনাবলীর বিকাশ, সামাজিক কু-প্রথাগুলোর নিন্দা ইত্যাদি বিষয়ে। আহকাম সম্পর্কিত প্রায় সমস্ত আয়াতই তাঁর(সা) মদীনায় হিজরত করার পর থেকে নাযিল হতে থাকে এবং মাদানী জীবনের দশ বছরব্যাপী তা চলতে থাকে। অতএব, আমাদের জন্য এটা বলাই অধিকতর যথার্থ হবে যে, ফিকহের শুরু বা উৎপত্তি হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাদানী জীবনের শুরু থেকে অর্থাৎ প্রথম হিজরী সন হতে। [আস-শাকসিয়্যাহ আল-ইসলামিয়্যাহ]

    ‘ফিকহ’ এর বিকাশ:

    এটি একটি বিস্তৃত বিষয় এবং এই নিবন্ধে আমরা কেবল এর সংক্ষিপ্ত কিছু ধারণা-ই দিতে পারবো। উৎপত্তিকাল থেকে শুরু করে ‘ফিকহ’ এর ক্রমবিকাশকে প্রধান তিনটি পর্যায় বা যুগে ভাগ করা যায়।

    ১. রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগ:

    নিঃসন্দেহে মুমিনদের উপর আল্লাহ ইহসান করেছেন যখন তিনি তাদের মধ্যে পাঠিয়েছেন একজন রাসূল, যিনি তাদেরই অন্তর্ভূক্ত, যিনি আল্লাহর আয়াতগুলো তাদের পড়ে শোনান, তাদের পরিচ্ছন্ন করেন এবং তাদেরকে শেখান কিতাব ও হিকমত।” [সূরা আলে-ইমরান]

    এ যুগের সময়কাল হচ্ছে রাসূলূল্লাহ (সা) এর মদীনায় হিজরত তথা ১ম হিজরী সাল হতে তাঁর ওফাতের সময় অর্থাৎ ১০ম হিজরী সাল পর্যন্ত। এ যুগে ফিকহের যাবতীয় বিষয়ই সরাসরি তাঁর (সা) এর পবিত্র সত্তার  সাথে সম্পৃক্ত ছিল। তাঁর (সা) কাছে ছিল নাযিলকৃত প্রত্যক্ষ্য ওহী আল-কুরআন আর পরোক্ষ ওহী যা হাদীস রূপে আমাদের কাছে এসেছে। যেকোন বিষয়ে আইন প্রনয়ণ, উদ্ভূত বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ও যথোপযুক্ত ফতওয়া, ফারাইয, দ্বীনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, কুরআনের হুকুম আহকামের বিস্তৃত ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই ওহীর মাধ্যমে তিনি নিজেই সম্পাদন করতেন, সাহাবা (রা) দের তা শিক্ষা দিতেন এবং বাস্তবে সমাজে প্রয়োগ করে দেখাতেন। সে সময় স্বতন্ত্র ফিকহ শাস্ত্র প্রণয়নের কোন প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। তথাপি, পরবর্তী যুগের ফিকহ শাস্ত্রের সব মৌলিক বিষয়ের গোড়াপত্তন এ যুগেই হয়েছিল। এমনকি, ফিকহের গতিশীলতার প্রধান উপকরণ যে ‘ইজতিহাদ’ ও ‘কিয়াস’ তার শিক্ষাও এ যুগেই। এ বিষয়ে অনেক সহিহ হাদীস বিদ্যমান।

    রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুআয ইবনে জাবাল (রা) কে ইয়েমেনের গভর্ণর করে পাঠানোর সময় তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে মুআয! তুমি কীসের ভিত্তিতে ফায়সালা করবে? (كَيْفَ تَقْضِي) তিনি বললেন, “আল্লাহ’র কিতাব দিয়ে (أَقْضِي بِكِتَابِ اللَّهِ), তিনি (সা) বললেন, “যদি আল্লাহ’র কিতাবে তা না থাকে?” (فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي كِتَابِ اللَّهِ)  তিনি বললেন, “তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নত দিয়ে” (فَبِسُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ), তিনি (সা)  বললেন, “যদি রাসূলের সুন্নতে তা না থাকে?” (فَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِي سُنَّةِ رَسُولِ اللَّهِ) তিনি বললেন, “তখন আমি ইজতিহাদ করে ‘রায়’ দিবো।” (أَجْتَهِدُ رَأْيِي) তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে এমন পথের সন্ধান দিয়েছেন যাতে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল ‘সন্তুষ্ট’ (الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي وَفَّقَ رَسُولَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِمَا يُرْضِي رَسُولَهُ) [আহমদ] – এটি ইজতিহাদের বৈধতা প্রমাণে ব্যাপক ব্যবহৃত একটি হাদীস। অন্য রেওওয়াতে রয়েছে যে, “হযরত মুআয (রা)  ও আবু মূসা আশ’যারী (রা) কে ইয়ামেনে কাযী হিসেবে প্রেরণ করার সময় অনুরূপ প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেছিলেন, “সুন্নতে কোন নির্দেশ না পেলে আমরা (উদ্ভুত বিষয়টি) একটি বিদ্যমান সাদৃশ্য বিষয়ের উপর কিয়াস করবো এবং যা সত্যের নিকটবর্তী তার উপর আমল করবো”। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, “তোমাদের উত্তর সঠিক হয়েছে”।

    সাহাবা (রা) কে তিনি (সা) কিয়াসের মাধ্যমে ইজতিহাদের পদ্ধতি শিখিয়েছেন। যেমন: উমর (রা) যখন রাসূলুল্লাহ (সা) কে স্ত্রীকে চুম্বনের কারনে রোজা ভঙ্গ হবে কিনা তা জিজ্ঞাসা করলেন তখন তিনি (সা) বললেন, “তুমি যদি কুলি কর তাতে কি রোজা ভঙ্গ হবে?” [ইবনে হাযম, ইহকাম] এখানে রাসূলুল্লাহ (সা) উমর (রা)-কে কিয়াস বা সাদৃশ্যমূলক তুলনার মাধ্যমে রোজাদারের চুম্বন ও কুলি করার মিল বোঝালেন এবং দেখালেন যে ওটার মতো এটাও রোজা ভঙ্গ করবে না।

    এর পাশাপাশি তিনি সাহাবা (রা) গণকেও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইজতিহাদের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন এবং ইজতিহাদের জ্ঞান প্রয়োগ করার ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এটা কখনো ঘটেছে তাঁর (সা) এর প্রত্যক্ষ্য শিক্ষার মাধ্যমে আবার কখনো ঘটেছে সাহাবীদের অনুরূপ কোন কাজ শোনার পর তা অনুমোদন ও উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে। সাহাবা (রা) গণ কখনও এমন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতেন যে বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর হুকুম তাদের জানা নেই তাহলে তা রাসূলুল্লাহ (সা) এর আমলে সমাধানের জন্য পেশ করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর জীবদ্দশায় তাঁর (সা) এর কাছ থেকে জেনে নেয়ার সুযোগ আছে এমন কোনো ক্ষেত্রে তাঁরা কখনোই ইজতিহাদের দ্বারস্থ হননি বরং স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা)-ই ছিলেন সমাধান। সাহাবা (রা) গণ তাঁর (সা)-এর জীবদ্দশায় এমন কোনো পরিস্থিতিতেই কেবল ইজতিহাদ করেছেন যখন বিধান জানার প্রয়োজন তাৎক্ষনিক ছিলো এবং দূরত্ব বা অন্য কোনো কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে তা উপস্থাপন করার কোন সুযোগ ছিলনা। এরূপ ক্ষেত্রে তাঁরা পরবর্তীতে রাসূল্লাহ (সা) এর সামনে তা পেশ করতেন এর সঠিক জ্ঞানের জন্য। এ বিষয়ে অনেক প্রসিদ্ধ ও সহীহ হাদীস বিদ্যমান। যেমন- রাসূলুল্লাহ (সা) খন্দকের যুদ্ধের দিন সাহাবীদের একটি দলকে বলেছিলেন, “বনি কুরায়জা’র মহল্লায় না পৌছেঁ কেউ আসর পড়বেনা”। পথে আসরের ওয়াক্ত হলে একদল (হাদীসের শাব্দিক নির্দেশ অনুযায়ী) বললো, আমরা সেখানে পৌছার পূর্বে সালাত আদায় করবো না। অন্যদল বললো, তাঁর (সা) ইচ্ছা এটা নয় (অর্থাৎ উক্ত আদেশের উদ্দেশ্য হচ্ছে তাড়াতাড়ি ঐ গোত্রে পৌছা, নামাজ না পড়া নয়), অতএব পথে সালাত পড়ে নাও। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছে উভয় দলের ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি দুটোকেই অনুমোদন করেন। [বুখারী, মুসলিম]

    অনুরূপে, আবু দাউদ বর্ণিত এক হাদীসে রয়েছে যে, দুজন সাহাবী সফররত অবস্থায় সালাতের সময় হলে তারা পানির অভাবে তায়াম্মুম করে তা আদায় করেন। অতঃপর সালাতের ওয়াক্ত থাকতেই পানির সন্ধান পাওয়ার পর একজন অযু করে পুনরায় সালাত পড়েন আর দ্বিতীয়জন পুনরায় অযু, সালাত কোনোটাই করেননি। সফর শেষে তাঁর রাসূল (সা) এর কাছে এ ঘটনা জানালে, তিনি যিনি ওযু-সালাত দ্বিতীয়বার করেননি তাকে বললেন, “তুমি সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করেছো, আর তোমার আদায়কৃত সালাত তোমার জন্য যথেষ্ট”, আর দ্বিতীয়জনকে বললেন, “তোমার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।” আর এ মর্মেই বুখারী, মুসলিমে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “যখন হাকিম ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে তখন সে দুটি সওয়াব পায়, (আর) তার সিদ্ধান্ত ভুল হলে সে অন্তঃত একটি সওয়াব পায়”।

    এ সমস্ত হাদীস ও ঘটনার বিবরণ রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগে উদ্ভুত ব্যবহারিক সমস্যার সমাধানে কুরআন, সুন্নাহ ও এর ভিত্তিতে ইজতিহাদের প্রয়োগের ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের কর্মপন্থার সুস্পষ্ট দলীল।

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর যুগে যেসব সাহাবী (রা) গণ ফতোয়া প্রদানে শীর্ষস্থানীয় ছিলেন তাদের মধ্যে হযরত আবু বকর (রা) হযরত উমর (রা), হযরত উসমান (রা), হযরত আলী  (রা), হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা), হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) এবং হযরত যায়িদ বিন ছাবিত (রা) অন্যতম।

    রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগ তথা ‘ফিকহ’ এর উৎপত্তি যুগের কর্মপন্থার উপর ভিত্তি করেই শুরু হয় ফিকহের দ্বিতীয় যুগ।

    ২. সাহাবা (রা) গণের যুগে ফিকহ:

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর ওফাত পরবর্তী সময় অর্থাৎ দশম হিজরী থেকে ফিকহে’র সাহাবা যুগের শুরু। এর ব্যপ্তি ৯০ বা ১০০ হিজরী পর্যন্ত ধরা যায় কারণ এ সময়ের পর কোন অঞ্চলে আর কোন সাহাবী জীবিত ছিলেন না। কুফায় সর্বশেষ সাহাবী মারা যান ৮৬/৮৭ হিজরীতে, মদীনার সর্বশেষ সাহাবী সাহল ইবনে সাদ (রা) ৯১ হিজরীতে, বসরার শেষ সাহাবী আনাস ইবনে মালিক (রা) ৯১ বা ৯৩ হিজরীতে ও দামেস্কের শেষ সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) ৮৮ হিজরীতে মারা যান। ১০০ হিজরীতে সর্বশেষ সাহাবী আমির ইবনে ওয়াসিলাহ ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বিদায় নেয়ার মধ্য দিয়ে সাহাবা যুগের সমাপ্তি ঘটে।

    সাধারণভাবে এই সুদীর্ঘ সময়ে পুরোটাকে সাহাবা যুগ নাম দিলেও এর মধ্যে প্রধান দুটো ভাগ আছে যা উল্লেখযোগ্যভাবে পরস্পর থেকে পৃথক। এই যুগ বিভাগ দুটি হচ্ছে:

    ক) খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ (চল্লিশ হিজরী পর্যন্ত)
    খ) খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী সাহাবাদের (রা)  যুগ ও এর সমান্তরালে তাদের শিক্ষাপ্রাপ্ত তাবঈদের যুগ (চল্লিশ হিজরী হতে একশ হিজরী)

    ক) খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ: (চল্লিশ হিজরী পর্যন্ত)

    আমার পরে তোমরা খুলাফায়ে রাশেদীনের অনুসরণ করবে।” [হাদীস]

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর ওফাতের পর খুলাফায়ে রাশেদীনের সোনালী যুগে বিভিন্ন জয়ের মাধ্যমে ইসলাম দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লে নতুন নতুন বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সামনে চলে আসে। ক্রম প্রসারমান সেই সভ্যতার চাহিদা পূরণে এবং বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নবাগত সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য কুরআন ও সুন্নাহর উপর গভীর গবেষনা করার প্রয়োজন তীব্রতর হয় সে প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষিতেই ‘ফিকহ’ আরো বিকশিত হতে থাকে।

    এ  যুগেই ফিকহ এর তৃতীয় উৎস তথা ইজমা আস সাহাবা অস্তিত্ব লাভ করে। ইজমাকে এ যুগে সংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। এজন্য যোগ্যতা সম্পন্ন ও নেতৃস্থানীয় সাহাবা (রা) গণের একটি কমিটি গঠিত হয় আর তাদেরকে যথাসম্ভব খিলাফতের কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করা হয় যাতে করে উদ্ভুত কোন নতুন বিষয়ের ফায়সালা সরাসরি কুরআন – সুন্নাহতে না পাওয়া গেলে তাদের পারস্পরিক পরামর্শ ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে এর ফয়সালা বের করা যায়। উল্লেখ্য যে, সাহাবা (রা) গণ নিজ থেকে কোন ধারণা বা পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে এসব মত দিতেন না বরং কিতাব ও সুন্নাহ’র উপর তাদের সুগভীর জ্ঞান ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাহার্যের ফলে কুরআন-সুন্নাহ থেকে যেকোন বিষয়ে হুকুম আহরণে তাদের যে দক্ষতা তার ব্যবহারেই তাঁরা সম্মিলিত চিন্তা-গবেষণার মাধ্যেমে এরূপ কোন ঐক্যমতে বা ইজমা’য় পৌছাতেন।

    ‘ইজমা আস সাহাবা’ নামক শরীয়াহ’র তৃতীয় মূল উৎস রূপলাভ করা ছাড়াও এ যুগে বিশাল খিলাফতের নানা সমস্যা সমাধানে কুরআন-সুন্নাহ হতে ক্রমাগত অধিক থেকে অধিকতর বিধান আহরণের ফলে প্রথম দুটি উৎস (কুরআন ও সুন্নাহ) হতে বিধান আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কিত জ্ঞান আরো বিকশিত হয় এবং পরবর্তী যুগের ফিকহের জন্য এ বিষয়ে দিক নির্দেশনা তৈরী হয়। পাশাপাশি যেসব বিষয়ের সমাধান সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ’তে পাওয়া যেতনা এবং যার সমাধানে সাহাবাদের সম্মিলিত কোন সিদ্ধান্ত ও ছিলনা, এরূপ অনেক ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবা (রা) গণ কিয়াসের মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হতেন। এভাবে এ যুগে কিয়াসের ব্যবহার আরো ব্যপকতা লাভ করে।

    হযরত আবু বকর (রা) এর যুগ:

    কোন বিষয়ে ফিকহ-এর বিধান আহরণে হযরত আবু বকর যে পদ্ধতি অনুসরণ করতেন, মায়মুন ইবনে মাহরান তা এ ভাবে বর্ণনা করেছেন,

    “আবু বকর (রা)-এর শাসনকালে কোন সমস্যা উপস্থিত হতে তিনি কুরআন খুলে দেখতেন। যদি তাতে সংশ্লিষ্ট বিবাদ মীমাংসার জন্য কিছু পেতেন তবে তার ভিত্তিতে উদ্ভুত বিবাদ মীমাংসা করতেন। যদি কুরআনে এ ব্যাপারে কোন সমাধান না পেতেন তবে তিনি রাসূলের সুন্নাহ মোতাবেক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের মীমাংসা করতেন। যদি সুন্নাহতেও উল্লেখিত বিষয়ে কিছু না পেতেন তাহলে তিনি মুসলিমদের নিকট গিয়ে বলতেন, অমুক অমুক বিষয় আমার নিকট পেশ করা হয়েছে। তোমাদের কারো এ বিষয়ে রাসূল (সা)-এর কোন ফয়সালার কথা জানা আছে কি? ঐ বিষয়ে যদি কেউ তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিত এবং প্রাসঙ্গিক তথ্য সরবরাহে সক্ষম হত তখন হযরত আবু বকর (রা) বলতেন: “আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা যে, তিনি আমাদের মধ্যকার কোন কোন ব্যক্তিকে রাসূলের (সা) নিকট থেকে তাঁর শ্রুত বিষয় স্মরণ রাখার সামর্থ্য দিয়েছেন।”

    যদি তিনি রাসূল (সা)-এর এরূপ কোন সুন্নাহও না পেতেন তাহলে নেতৃস্থানীয় ও উত্তম লোকদের সাথে পরামর্শ করতেন। তারা ঐকমত্যে পৌছালে তার ভিত্তিতে তিনি রায় দিতেন। [ইলমূল মুওয়াকিঈন; সংগ্রহ, ইসলামী উসূলে ফিকহ]

    “ঐভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে সমাধান না পেলে তাঁর ব্যক্তিগত বিচক্ষনতার সাহায্যে ‘নস’ ব্যাখ্যা করে অথবা তার মর্মার্থ থেকে অথবা কেবল ইজতিহাদের ভিত্তিতে তার নিজস্ব মত গঠন করতেন” [হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ]

    যেমন: হযরত আবুবকরের সামনে যখন দাদীর মীরাস সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হলো তখন তিনি বললেন যে, এ বিষয়ে কুরআনে কোন নির্দেশ নেই এবং এ বিষয়ে কোন হাদীসও তাঁর জানা নেই, তাই এ বিষয়ে অন্যদের জিজ্ঞাস করতে হবে। অতঃপর যোহরের নামাজের পর তিনি সমবেত লোকদের এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে মুগীরা বিন শোবা (রা) ও মুহম্মদ বিন সালামা (রা) দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিলেন যে এ বিষয়ে তাদের হাদীস জানা আছে এবং তা হলো রাসূলুল্লাহ (সা) দাদীকে মৃতের রেখে যাওয়া সম্পদের এক ষষ্ঠাংশ দিয়েছেন। অতঃপর আবু বকর (রা) এ অনুযায়ীই ফায়সালা দিলেন।

    এ বর্ণনা হতে ফিকহ এর ব্যাপারে আবু বকর (রা) এর কর্মপন্থা সুস্পষ্ট হয়ে যায়। অর্থাৎ যেকোন সমস্যা সমাধান তিনি প্রথমে, কুরআন, তারপর সুন্নাহ, অতঃপর ইজমা-আস-সাহাবা এবং পরিশেষে কিয়াস এর সাহায্য নিতেন। এই কর্মপন্থাই পরবর্তী যুগের জন্য দলীল হয়ে যায়।

    আবু বকর (রা) কৃত ইজতিহাদ:

    যেমন ‘কালালাহ’ শব্দের অর্থ সম্পর্ক তিনি বলেন, “কালালাহ সম্পর্ক আমি যা বললাম তা আমার নিজের রায় এর ভিত্তিতে। আমার মতামত যদি সঠিক হয় তবে তা আল্লাহর কাছ থেকে, আর যদি ভুল হয় তবে তা আমার নিজের ও শয়তানের কাছ থেকে। সেই ব্যক্তিই ‘কালালাহ’ যার পিতা-মাতাও নেই, সন্তানও নেই। তাঁর আরো ইজতিহাদের উদাহরণ হচ্ছে, যাকাত অস্বীকারকারী গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মক্কা বিজয়ের পূর্বে ও পরে ইসলাম গ্রহণকারীদের জন্য বায়তুল মাল থেকে সমান বৃত্তি প্রদান ইত্যাদি।

    হযরত উমর (রা) এর যুগ:

    হযরত উমর (রা) এর যুগে ফিকহ’ এর অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটে। তিনি নিজে ছিলেন একজন বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ ফকীহ। তিনি খুব দ্রুত কোন সম্পূরক বিষয়কে মূল বিষয়ের সাথে তুলনা করতে পারতেন। ফলে তিন তাঁর শাসনকালে ইসলামী আইনের এক বিশাল ভান্ডার রেখে যান। বিখ্যাত তাবেঈ ইবরাহীম নখঈ যথার্থই বলেছেন যে, “উমর (রা) শহীদ হওয়ার সথে সাথে ইলমের দশ ভাগের নয় ভাগ দুনিয়া থেকে তিরোহিত হয়ে গেছে” [১১. পূর্বোক্ত]

    ‘ফিকহ’ এর বিষয়ে হযরত উমর (রা) কর্তৃক অনুসৃত পদ্ধতির মধ্যে লক্ষনীয় বিষয় ছেল যে, ফায়সালা গ্রহণের জন্য তিনি সর্বোৎকৃষ্ট উপায় উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে সাহাবীদের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরামর্শ করতেন, বিতর্ক সভা করতেন। যখন তাঁর সামনে কোন ফিকহী সমস্যা উপস্থাপন করা হতো তিনি বলতেন, “ডাকো আলীকে ডাকো যায়েদকে” অর্থাৎ অন্যান্য সাহাবা (রা)-দের ডাকতেন, তিনি তাদের সাথে পরামর্শ করতেন এবং এভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছাতেন।

    মৌলিকভাবে তাঁর অনুসৃত পদ্ধতি হযরত আবু বকর (রা) এ প্রায় অনুরূপ ছিল। আগত সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধান তিনি প্রথমে কুরআন, অতঃপর তাঁর সুন্নাহ’র জ্ঞান ভান্ডারে খুজতেন, যদি সেসব থেকে সরাসরি কিছু না পেতেন এবং বাকী সাহাবীদের কাছ থেকেও তার অজানা কোন হাদীসের সন্ধান না পেতেন তখন সবার সাথে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতেন অথবা ইজতিহাদ করে রায় দিতেন।

    যেমন : হযরত উমর (রা) নিকট গর্ভস্থ সন্তানের দিয়তের বিষয় উত্থাপিত। তখন মুগীরা ইবনে শোবা (রা) এ বিষয়ক একটি হাদীস জানালে উমর (রা) সে অনুযায়ী ফায়সালা করেন। অনুরূপে অগ্নি পূজকদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করা সম্পর্কে তিনি আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে অবগত হন এবং অতঃপর এর ভিত্তিতে আইন করেন। অনুরূপে স্ত্রী স্বামীর দিয়তের রক্তপন অংশীদারী হবে কিনা এ সম্পর্কে তিনি দাহহাক বিন সুফিয়ান আল-কালাবি (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে অবগত হন এবং বলেন, “যদি আমরা এ হাদীস না শুনতাম, তবে ভিন্ন হুকুম দিতাম।” [১২, রাফউল মালাম, ইবনে তাইমিয়্যাহ]

    অনেক সময় তিনি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হাদীস না পেলে ইজতিহাদের  মাধ্যমে রায় দিতেন; কিন্তু পরে এ সম্পর্কে কোন হাদীস জানতে পারলে পূর্ব রায় ত্যাগ করে হাদীস অনুসরে রায় দিতেন। যেমন : হাতের আঙ্গুলের দিয়তের ব্যাপারে তাঁর মত ছিলো, উপকারীতার পার্থক্যের কারণে বিভিন্ন আঙ্গুলে দিয়ত ও কমবেশী হবে। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আবু মুসা (রা) ও ইবনে আব্বাস (রা) হতে সব আঙ্গুলের দিয়ত সমান হওয়া সম্পর্কিত হাদীস শুনে সে অনুযায়ী রায় দেন।

    ‘ফিকহ’ এর ব্যাপারে তাঁর অনুসৃত আরেকটি নীতি হচ্ছ, তাঁর কাছে যদি হাদীসটি বিশুদ্ধ পন্থায় না পৌছাতো তবে তিনি তা গ্রহণ না করে বরং সুস্পষ্ট আয়াত বা হাদীসের ভিত্তিতে ইজতিহাদ করে রায় দিতেন। এই নীতি পরবর্তীতে ফিকহের অনেক ইমাম আরো সুসংবদ্ধ করেছেন। উদাহরণ: তালাকের পর ইদ্দত কালীন ভরনপোষণ বিষয়ে হযরত উমর (রা) ফাতেমা বিনতে কায়েস (রা) এর হাদীস বর্জন করেন এবং কিতাবুল্লাহ অনুযায়ী ফায়সালা প্রদান করেন।

    এভবেই উমর (রা) ‘ফিকহ’ এর ব্যাপারে বিভিন্ন নীতিমালার বিষয়ে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বিভিন্ন কাজী ও গভর্ণরদের কাছে চিঠি লিখতেন এবং তারাও তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন বিধান জানতে চেয়ে চিঠি লিখতেন। ঐসব গভর্ণররা নিজেরাই ছিলেন মর্যাদাবান সাহাবী ও শীর্ষস্থানীয় ফকীহ। তাই তারা নিজেরাও প্রয়োজনে বিভিন্ন বিষয়ে ইজতিহাদ করে আইন দিতেন। এভাবেই উমর (রা) এর পুরো খিলাফত জুড়েই ফিকহের ব্যাপক উন্নতি ঘটে।

    হযরত উসমান (রা) এর যুগ:

    হযরত উসমান (রা) কে এই শর্তে খলীফা নিযুক্ত করা হয়েছিল যে, তিনি কুরআন, সুন্নাহ, ও পূর্ববর্তী দু’ইজন খলীফার অনুসৃত নীতি অনুসরণ করবেন। তাই তার খিলাফত কালে তিনি নিজে কদাচিৎ ইজতিহাদ করতেন বরং অধিকাংশ বিষয়ে পূর্ববর্তী দুই খলীফার সময় নেয়া সিদ্ধান্ত গুলোর বাস্তবায়নকেই প্রাধান্য দিতেন। তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদের উদাহরণ হচ্ছে মিনায় সালাত সংক্ষিপ্ত না করা বিষয়ে তার আমল। তবে তিনি নিজে স্বাধীন ইজতিহাদ কম করলেও পূর্ববর্তী দুই যুগের ন্যায় এ যুগেও সাহাবা (রা) ও বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্ব প্রাপ্ত ওয়ালী ও কাজীরা আগত নতুন নতুন বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ ও ইজমায়ে  সাহাবার ভিত্তিতে সমাধান করে ‘ফিকহ’ এর অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখেন।

    হযরত আলী (রা) এর সময়কাল:

    হযরত আলী (রা) নিজেই ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুজতাহিদ। তিনি উমর (রা) এর মতোই কুরআন সুন্নাহর গভীর গবেষণার মাধ্যমে সাধারণ নীতিমালার আলোকে কোন বিশেষ ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতেন এবং এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত পৌছাতেন। খলীফার দায়িত্ব নেয়ার পূর্বে তিনি ছিলেন মদীনার শ্রেষ্ঠতম বিচারক। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, “রাসূলূল্লাহ (সা) এর সুন্নত সম্পর্কে আলী (রা) অন্য সকলের চেয়ে বেশী জ্ঞানী ছিলেন।”

    তাঁর ইজতিহাদ সমূহে তিনি গভীর ও সূক্ষ্ম কিয়াস প্রয়োগ করতে পারতেন যা পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে মূলনীতি রচনায় দিক-নির্দশনা দেয়। যেমন: তিনি মদ্যপানকারীর ব্যাপারে হদ্দে কায্ফ অর্থাৎ মিথ্যা অপবাদকারীর শাস্তি প্রদানের রায় দেন এ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে যে, যে মাতাল সে যা ইচ্ছা তা ই বলে যা মিথ্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক অতএব তার শাস্তি মিথ্যা অপবাদের শাস্তির অনুরূপ। এই রায়ের ভিত্তি হচ্ছে ফিকহের এই মূলনীতি যে, যা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল তার হুকুম ঘটে যাওয়া বিষয়ের অনুরূপ যেমন এক্ষেত্রে মাতালের মিথ্যা বলার সম্ভাবনা প্রবল এবং সে অনুযায়ী তার শাস্তি।

    অনুরূপে যৌথভাবে হত্যা পরিকল্পনার সাথে জাড়িত একদল লোককে কীভাবে শাস্তি দেয়া হবে এ বিষয়ে তার রায়ে ছিলো তদের সবাইকে হত্যা করা আর এটাকে তিনি চুরির ক্ষেত্রে একদল চোরের প্রত্যেকের হাত কেটে দেয়ার স্বীকৃত সিদ্ধান্ত থেকে কিয়াস করে বের করেছেন।

    এভাবে আলী (রা) তাঁর যুগে বিভিন্ন সামজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে ‘ফিকহ’ এর বিধান আহরণে ব্যাপক গবেষণা ও সাদৃশ্যমূলক পদ্ধতি প্রয়োগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন যা পরবর্তী যুগে ফিকহের মূলনীতি প্রণয়ণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

    খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে ফিকহের বিকাশের মূলদিকগুলো হচ্ছে খলীফা ও সাহাবা (রা) গণ কুরআন-সুন্নাহ’তে বর্ণিত শরীয়াহ’র বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পরকে জিজ্ঞেস করতেন এবং পরস্পররের জানা বিষয় দ্বারা উপকৃত হতেন। তারা যখনি একত্রিত হতেন তখন কুরআন-সুন্নাহ নিয়ে গবেষণা করতেন এবং কোন একটি বিষয়ের হুকুম অনুসন্ধানের সময়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কারো কোন হাদীস শুনেছেন কিনা তার অনুসন্ধান করতেন। এ নীতির ফলে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্নজনের জানা প্রায় সব হাদীসই জনসমক্ষে চলে এলো এবং অন্যরাও সেটা দ্বারা উপকৃত হবার এবং এর ভিত্তিতে ‘ফিকহ’ আহরণের সুযোগ পেলো সাহাবা (রা) গণের এই অনুসন্ধানী নীতির ফলে ফিকহ-এর অন্যতম উৎস হাদীসের ভান্ডার সমৃদ্ধ হলো এবং সেগুলো পরবর্তী যুগের ফকীহদের কাছেও পৌঁছে গেলো। অনুরূপভাবে তাদের জ্ঞান ও গবেষনার কারণে কুরআনের আহকাম সম্পর্কিত আয়াতগুলো থেকে আহরিত হুকুম এবং আহরণের পদ্ধতি সম্পর্কিত আলোচনা ব্যাপকতর হলো। উপরন্তু, ফিকহ-এর তৃতীয় উৎস হিসেবে ‘ইজমা আস সাহাবা’ অস্তিত্ব লাভ করলো। ফলে, ‘ইলমুল ফিকহ’ তার মূল উৎসগুলোর যথাযথ বিকশিত রূপ সহ এক বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে পরবর্তী যুগের দিকে এগিয়ে গেল।

    খ) খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী সাহাবা (রা) যুগ এবং এর সমান্তরালে তাবেঈ যুগ: (৪০ হিজরী-১০০ হিজরী)

    এ যুগটি হযরত মুয়াবিয়া (রা) এর শাসনকাল তথা ৪১ হিজরী এমন হতে প্রথম হিজরী ও শতকের শেষ পর্যন্ত ব্যপ্ত। এ যুগের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সমূহ হচ্ছে:

    ১) জীবিত সাহাবী (রা) গণ আরব ও আরবের বাইরে বিশাল খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েন।

    ২) প্রতিটি অঞ্চলে তাদের কাছ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত তাবঈদের মধ্যে থেকে একদল ফকীহ তৈরী হয়ে যায় নিজ নিজ অঞ্চলে ফিকহ এর জন্য বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন।

    ৩) প্রতিটি অঞ্চলে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগে নতুন নতুন যেসব সমস্যা আমলে আসতো উক্ত অঞ্চলের সাহাবী তাঁর নিকট রক্ষিত প্রমাণাদি জ্ঞান (কুরআন-সুন্নাহ) দ্বারা বা প্রমাণিত জ্ঞানের আলোকে এসবের জবাব দিতেন এভাবে কোন বিষয়ে সমাধান পাওয়া না গেলে সে বিষয়ে ইজতিহাদ করে ফায়সালা দিতেন। যেহেতু একজন বা কয়েকজন সাহাবীর পক্ষে সমস্ত হাদীস এবং এর জ্ঞানে পূর্ণাঙ্গ হওয়া সম্ভব ছিলনা আর প্রত্যেকে প্রত্যেকের চেয়ে অনেক দূরে অবস্থান করায় পূর্বের ন্যায় পারস্পরিক জিজ্ঞাসাও পরামর্শের  মাধ্যমে একে অন্যের নিকট রক্ষিত জ্ঞান বা জ্ঞানের বিশ্লেষণ দ্বারা উপকৃত হবার সুযোগ ছিলনা, ফলে এ যুগে বিভিন্ন অঞ্চলের সাহাবীদের রায়ে উল্লেখযোগ্য মত পার্থক্যের সূচনা হয়। তাদের ছাত্র তাবঈ ফকীহবৃন্দের মাঝে গিয়ে ‘ফিকহ’ এর বিভিন্ন বিষয়ে এই মতপার্থক্য ব্যাপকতর হয়। মতপার্থক্যের আবির্ভাব এ যুগের ফিকহের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

    ৪) এ যুগে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতভেদ ও ধর্মীয় ফেরকা জন্মলাভ করে। এর ফলশ্র“তিতে বিভিন্ন ফেরকা কর্তৃক নিজ নিজ মতের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য এবং আরো নানাবিধ কারণে জাল হাদীসের ব্যাপক প্রচলন ঘটে। ফলে “ফিকহ’ জানার জন্য হাদীস আহরণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ ও বিভিন্ন মূলনীতি প্রয়োগের প্রয়োজন দেখা দেয়।

    এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ যুগেই সংগঠিতভাবে প্রথম দুই যুগের ফিকহের সংকলন ও লিপিবদ্ধ করার কাজ শুরু হয়। এজন্য একে ফিকহ সংকলনের ভিত্তিযুগও বলা যেতে পারে। এ যুগে মুসলিম জাহানের বিভিন্ন শহরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফাতওয়া সংকলনের জন্য কতিপয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে ঐ শহরের শীার্ষস্থানীয় তাবেঈ ফকীহগণ তাদের শিক্ষক সাহাবীগণ বর্ণিত হাদীস ও ‘ফিকহী’ সিদ্ধান্তসমূহ গ্রন্থনার কাজ শুরু করেন। এসব কেন্দ্রের মধ্যে মক্কা, মদীনা, কূফা, বসরা, সিরিয়া, মিসর ও ইয়েমেন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব অঞ্চলের শীর্ষস্থানীয় তাবেঈদের মধ্যে হযরত সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব (রহ), আতা ইবনে আবু রাবাহ (রহ), হযরত ইবরাহীম নখঈ (রহ), হযরত শাবী (রহ), হযরত  হাসান বসরী (রহ), হযরত মাকহুল (রহ) প্রমুখ শীর্ষস্থানীয়।

    এদের মধ্যে মদীনার সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব ও কুফার ইবরাঈম নখঈ ছিলেন বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ। তাদেরকে কেন্দ্র করে মদীনা ও কূফা উভয় শহরে বিরাট ফকীহ গোষ্ঠী গড়ে উঠে। অসংখ্য লোক তাদের কাছ থেকে ফিকহে’র ইলম লাভ করে। হাফিয ইবনে কায়্যিম এর মতে সাহাবীদের মধ্যে ফতোয়া প্রদানকারী সাহাবারে কিরামের সংখ্যা একশত ত্রিশ এর কিছু বেশী ছিল। [আসারুল ফিকহীল ইসলামী]। তাবেঈ ফকীহগণের উপরোক্ত কর্মপ্রচেষ্টার ফলে এই ত্রিশ জন সাহাবীর (রা) ফতোয়া বা ফিকহী’ মত সংরক্ষণ এবং যেসব মূলনীতির মাধ্যমে তারা এসব সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন তার অনুধাবন সম্ভব হয়।

    এভাবেই, খুলাফায়ে রাশেদীন পরবর্তী তাবেঈ যুগে শীর্ষস্থানীয় ফকীহদের মাধ্যমে রাসূল (সা) এর যুগ ও সাহাবা (রা) যুগের ‘ফিকহ’ সম্পর্কিত জ্ঞান যথাযোগ্যভাবে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়ে পরবর্তী যুগের নিকট পৌছে এবং ফিকহের পরবর্তী যুগ তথা চূড়ান্ত বিকাশপর্বের সূচনা হয়।

    ৩. তাবঈ-তাবঈন যুগ: ফিকহের চতুর্থ ও পূর্ণাঙ্গ বিকাশের যুগ:

    خير القرون قرني ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم
    সর্বোত্তম যুগ হচ্ছে আমার যুগ। তারপর এর পরবর্তী যুগ এবং তারপর এর পরবর্তী যুগ” [হাদীস]

    ফিকহের ইতিহাসে এই যুগ সর্বাধিক গৌরবজ্জ্বল যুগ। এ যুগে বিভিন্ন অঞ্চলে ফিকহের আকাশে এমন কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে যারা পূর্ববর্তী তিন যুগের জ্ঞানভান্ডারকে ব্যবহার করে নিজেদের সুউচ্চ প্রতিভা ও মৌলিক চিন্তার মাধ্যমে ‘ইলমুল ফিকহ’ কে ইসলামী  জ্ঞানের একটি পূর্ণাঙ্গ শাখায় রূপদান করেন এবং এ শাস্ত্রের মূলনীতি থেকে শুরু করে বিভিন্ন শাখা প্রশাখা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় প্রায় সকল নীতিমালা প্রনয়ণ করেন। ফলতঃ ‘ফিকহ’ একটি স্বতন্ত্র, সুশৃংখল ও স্বয়সম্পূর্ণ বিজ্ঞান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ জ্ঞানের মূলসূত্র যদিও তারা তাদের পূর্ববর্তীদের কাছ থেকেই লাভ করেছিলেন কিন্তু তাদের পূর্ববর্তীদের কেউই এটাকে তাদের মতো বিস্তারিত আলোচনা করে যাননি এবং একে পৃথক একটি বিজ্ঞানের রূপ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সকল নীতিমালার একত্রিত কোনো রূপ দেননি যদিও তারা নিজেরা এগুলো চর্চা করতেন।

    এযুগের ব্যপ্তি হিজরী দ্বিতীয় শতকের শুরু থেকে হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর অর্ধকাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ যুগের প্রথমার্ধে আবির্ভাব ঘটে আবু হানীফা (রহ), ইমাম মালিক (রহ), ইমাম শাফিঈ (রহ) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) এর মত  ফিকহের শীর্ষস্থানীয় ইমামগণের। তদুপরি, এ যুগের দ্বিতীয়র্ধে আরো একটি শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানের আর্বিভাবে হয় আর তা হলো হাদীস-বিজ্ঞান। এ সময় ইমাম বুখারী (রহ), ইমাম মুসলিম (রহ) এর মতো শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিসগণের আবির্ভাব হয়, হাদীসের বিশুদ্ধতা নির্ণয় নীতি তথা উসূলুল হাদীস প্রণীত হয় এবং এসবের ভিত্তিতে সিহাহ সিত্তাহ তথা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থের সংকলন কাজ সম্পন্ন হয। এভাবেই ইসলামী জ্ঞানের দু’দুটো শীর্ষশাখার চরম বিকাশের মাধ্যমে এ যুগ এ অনন্য যুগে পরিণত হয়।

    আমরা এ যুগে ফিকহের বিকাশকে এ যুগের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব তথা প্রসিদ্ধ ইমামদের আলোচনার মাধ্যমে উপস্থাপন করবো, কেননা এযুগের ফিকহের সামগ্রিক অগ্রগতি তাদেরকে কেন্দ্র করেই হয়েছিলো। সময়ানুক্রমিকভাবে আগত ইমাম গণের ফিকহী চিন্তাধারা ও অবদানের বিশ্লেষণ করলেই এ যুগে ফিকহের বিকাশ স্পষ্ট হয়ে যাবে।

    ইমাম আবু হানিফা (রহ) ও ফিকহে তাঁর অবদান:

    “মুসলিম জাতি ফিকহে আবু হানীফার সন্তানতুল্য” [ইমাম শাফেঈ]

    ‘ইমামে আযম’ নামে খ্যাত নুমান ইবনে সাবিত ওরফে আবু হানীফা (রহ) প্রখ্যাত মুজতাহিদ ইমামগণের মধ্যে সবার আগে জন্মগ্রহণ করেন। প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী তাঁর জন্ম ৮০ হিজরীতের কুফা নগরীতে।

    ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে কুফার খ্যাতি আগেই বলা হয়েছে। ইমাম আবু হানীফা কুফার শীর্ষস্থানীয় তাবিঈ ও তাবে-তাবেঈ গণের কাছে থেকে শিক্ষা সমাপ্ত করে মক্কা মদীনা ও বসরা সফর করেন এবং সেখানকার শীর্ষস্থানীয় তাবঈ মুহাদ্দিস ও ফহীহদের কাছ থেকে হাদীস ও ফিকহ শিক্ষা নেন। ইমাম যাহাবীর মতে কেবল কূফাতেই ইমাম আবু হানীফা ২৯ জন ওস্তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেন যাদের অধিকাংশই ছিলেন বড় বড় তাবেঈ। এদের মধ্যে ইমাম শাবী (রহ), ইমাম হাম্মাদ (রহ) অন্যতম। অন্য আরেক বর্ণনা মতে তিনি কূফায় তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈনসহ ৯৩ জন ওস্তাদের কাছ থেকে জ্ঞান অজর্ন করেন। আর এভাবে তাদের কাছে সংরক্ষিত পূববর্তী তিন যুগের হাদীস ও ফিকহের বিশাল ভান্ডার তিনি সংগ্রহ করেন এবং তাঁর  অসাধারণ মৌলিক প্রতিভা ও যোগ্যতার মাধ্যমে এসব থেকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা নিয়ে বিভিন্ন নিয়ম-নীতির ভিত্তিতে ফিকহের এক বিশাল ভান্ডার তৈরী করেন এবং একে সুনির্দিষ্ট পন্থায় সংকলিত ও বিন্যস্ত করে ‘ফিকহ’ কে একটি স্বতন্ত্র ও সুবিন্যস্ত শাস্ত্রের রূপ দেন। এ বিষয়ে কোন  মতভেদ নেই যে তাঁর কর্মপ্রচেষ্টার ফলেই সর্বপ্রথম ‘ফিকহ’ একটি পৃথক ও বিস্তৃত শাস্ত্রের মর্যাদা লাভ করে। তাই ইমাম শাফেঈ (রহ) যথার্থই বলেন,

    الناس في الفقه عيال على أبي حنيفة

    “মুসলিম জাতি ফিকহে আবু হানীফার সন্তানতুল্য” [আসারুল ফিকহীল ইসলামী]

    আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ) বলেন, “ইমাম আবু হানীফা (রহ) ই সর্বপ্রথম এই ইলমে ফিকহ সংকলন করেন এবং তা অধ্যায় হিসেবে বিন্যস্ত করেন। পূর্ববর্তী ফকীহদের কেউই তাকে এ বিষয়ে পিছনে ফেলতে সক্ষম হয়নি।” [মানাকিবে মুওয়াফফিক]

    আবু হানীফা ফিকহ আহরনে তাঁর অনুসৃত নীতি সম্পর্কে নিজে বলেন, “আমরা প্রথমত কিতাবুল্লাহ দ্বারা দলীল গ্রহণ করি। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ হাদীস দ্বারা। তারপর সাহাবায়ে কিরামের ফয়সালা দ্বারা। সাহাবায়ে কিরাম যে বিষয়ে সর্বসম্মত আমরা এর উপরে আমল করি। যদি তাঁদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতপার্থক্য হয়ে যায় তখন আমরা সামগ্রিক ইল্লাতের ভিত্তিতে এক হুকুমকে অন্য হুকুমের উপর কিয়াস করি যতক্ষণ না নসের (কুরআন-সুন্নাহ) অর্থ স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।” [আল-মীযান: ইমাম শারানী]

    তিনি নিজে সুউচ্চ পর্যায়ের মুজতাহিদ হওয়া সত্ত্বেও কোন বিষয়ে সর্বাধিক সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হবার জন্য এবং একইসাথে ফিকহ চর্চাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য তাঁর সুযোগ্য ও বিশিষ্ট সহচরদের মধ্য থেকে প্রধান চল্লিশজনকে নিয়ে ‘মাজমাউল ফিকহী’ বা ফিকহ পরিষদ’ গঠন করেন। এই চল্লিশজন তৎকালীন যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও মুজতাহিদ ছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লামা মুওয়াফফিক মক্কী (রহ) বলেন, “আবু হানীফা (রহ) তাঁর ফিকহী চিন্তাধারা পরস্পর আলোচনা ও পরামর্শের উপর ভিত্তি করে রচনা করেন। মজলিশে শূরার সাথে আলোচনা ব্যতীত তিনি নিজের একার মতে কিছু করতেন না। ফিকহী বোর্ডের সামনে তিনি এক একটি করে মাসআলা পেশ করতেন, সদস্যদের মতামত ও প্রমানাদি শুনতেন ও সবশেষে নিজের দলীল ও যুক্তিসমূহ পেশ করতেন। এভাবে এক এক মাসআলার উপর (প্রয়োজনে) মাসব্যাপী বা এর চেয়েও বেশী সময় পর্যন্ত তিনি বোর্ড সদস্যদের সাথে বিতর্ক চালিয়ে যেতেন। পরিশেষে কোন একটি অভিমতের উপর বোর্ড সদস্যগণ একমত হলে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ) তা লিপিবদ্ধ করে নিতেন। এভাবে ফিকহে হানাফী লিপিবদ্ধ হয়” [মানাকিব]

    সবার ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি চলতে থাকতো। এক বর্ণনায় আছে, “তাঁদের মধ্য থেকে একজনও যদি ভিন্নমত পোষণ করতেন তাহলে তিনদিন পর্যন্ত সে বিষয়ের উপর আলোচনা হত”। ইবন আবুল আওয়াম, ইমাম আবু হানীফার অন্যতম প্রধান ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফের (রহ) সূত্রে বর্ণনা করেন,

    “যখন ইমাম আবু হানীফার নিকট কোন মাসআলা উপস্থিত হতো, তখন তিনি তাঁর ছাত্রগণকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, এ বিষয়ে তোমাদের নিকট কী হাদীস ও আসার আছে তা বর্ণনা কর। তারপর যখন আমরা হাদীস ও আসার পেশ করতাম এবং সে ভিত্তিতে নিজেদের রায় দিতাম, তখন তিনি তাঁর মতামত ও ব্যক্ত করতেন। তারপর উভয় পক্ষের মধ্যে যে পক্ষে হাদীস ও আসার অধিক (শক্তিশালী) হতো, সেইসব হাদীস ও আসারই তিনি গ্রহণ করতেন। আর যদি উভয় পক্ষের হাদীস ও আসার সমান সমান হতো, তখন তিনি চিন্তা-গবেষণা করে একটি মতকে গ্রহণ করতেন।”

    এই ‘ফিকহ পরিষদ’ এর তত্ত্বাবধানে বাইশ বছর পর্যন্ত অক্লান্ত সাধনা ও গবেষণার ফলে ৮৩ হাজার মাসআলা সংকলিত ও সন্নিবেশিত হয়। এরপরও মাসআলার সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং এভবে ৫ লাখে গিয়ে পৌছায়। আল্লামা খাওয়ারেযমী (রা) স্বাীয় ‘জামেউল মাসাইল’ গ্রন্থে বলেন,

    “বর্ণিত আছে যে, ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর (লিপিবদ্ধকৃত) মাসাইলের সংখ্যা পাঁচ লক্ষে গিয়ে পৌঁছে ছিল। তাঁর ও তাঁর ছাত্রদের গ্রন্থরাজি এর প্রমাণ বহন করে”।

    এভাবে আবু হানীফা (রহ) প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি প্রবর্তন করে কুরআন, সুন্নাহ, ইজমায়ে সাহাবা, ফাতাওয়ায়ে সাহাবা ও কিয়াসের মাধ্যমে ব্যাপক গবেষণা করে বিষয় ভিত্তিকভাবে ফিকহের এক বিশাল ভান্ডার গড়ে তোলেন এবং ‘ফিকহ’ কে আলাদা এক শাস্ত্রের রূপ দেন।

    ইমাম আবু হানীফা বিপুল সংখ্যক মুজতাহিদ ছাত্র রেখে যান। প্রধান ছাত্রদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হাসান আশ শায়বানী ও ইমাম যুফার অন্যতম। এই তিনজন নিজেরাই মুজতাহিদ মুতলাক ছিলেন এবং স্বতন্ত্র মাযহাব প্রবর্তনের যোগ্যতা রাখতেন কিন্তু তারা নিজেদেরকে তাদের শিক্ষকের মাযহাবের সাথেই সম্পৃক্ত রাখেন। আবু হানীফার পর তাঁর ছাত্ররা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁর বিখ্যাত ছাত্র বৃন্দের মাধ্যমে তাঁর ফিকহী পদ্ধতি দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া বিভিন্ন খলীফা, শাসক এর কাযীগণ এই মাযহাবকে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার মাধ্যমে হিসেবে গ্রহণ করলে এটা মুসলিম জগতের সর্বত্র   বিস্তৃত হয়। ইবনে হাযম (রহ) বলেন,

    “ইসলামের প্রথম যুগে রাষ্ট্রীয় সহায়তায় দুটি মাযহাব গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাচ্য অঞ্চলে হানাফী মাযহাব আর আন্দালুসে-স্পেনে মালিকী মাযহাব।”

    এভাবে মুসলিম বিশ্বের সর্বাধিক সংখ্যক লোক এই মাযহাবের অনুসারী হয়ে যায়।

    ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ):

    وإذا ذكر العلماء، فمالك النجم الثاقب
    “যখন আলেমগণের আলোচনা করা হয় তখন মালিক ইবনে আনাসের আলোচনা সবচেয়ে উজ্জল হয়ে উঠে” [ইমাম শাফেঈ]

    আবু আব্দুল্লাহ মালিক ইবনে আনাস (রহ) ৯৩ হিজরীতে মদীনা তাইয়্যেবায় জন্মগ্রহন করেন।

    মদীনার প্রখ্যাত তাবিঈ মুজতাহিদ রবীয়াতুর রায়, প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ ইমাম যুহরী নাফে (রহ) এবং এরূপ আরো অনেক শ্রেষ্ট ফকীহ ও মুহাদ্দিস তাবেঈন থেকে তিনি হাদীস ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করে এক সময় ‘ইমাম দারুল হিজরত’ ও ‘মদীনার ইমাম’ নামে চতুর্দিকে খ্যাতি অর্জন করেন।

    তাঁর সর্বশ্রেষ্ট কীর্তি তাঁর ‘মুওয়াত্তা’ নামক হাদীস সংকলন যেটা অনেকের মতে বুখারী, মুসলিমের সমপর্যায়ের বিশুদ্ধ হাদীস সংকলন। একই সাথে ‘মুওয়াত্তা’ মালিকী ফিকহের ভিত্তিও বটে। তাই মালিকী ফিকহের আলোচনা ‘মুওয়াত্তা’-কে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।

    ইমাম আওযাঈ (রহ) বলেন যে ইমাম মালিক (রহ) বলেছেন “এই গ্রন্থখানি আমি চল্লিশ বছরে সংকলন করেছি।” তিনি আরো বলেন, “এই গ্রন্থটি সংকলনের পর আমি মদীনার সত্তর জন ফকীহ’র সম্মুখে তা উপস্থাপন করলাম। তাঁরা সবাই আমার সাথে (এর বিশুদ্ধতার ব্যাপারে) ঐক্যমত পোষন করলেন। এ কারনেই আমি গ্রন্থটির নাম রাখলাম “মুওয়াত্তা’।”

    এ সংকলনে তিনি অনেক মুরসাল হাদীসকে স্থান দিয়েছেন। বস্তুতঃ ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর মত তিনিও মুরসাল হাদীস দ্বারা দলীল গ্রহণ করতেন। ‘মুওয়াত্তা’য় সংকলিত হাদীস ও আমাদের ভিত্তিতেই মালিকী ফিকহ প্রসারিত হয়।

    প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী আব্বাসীয় খলীফা মনসুরের অনুরোধক্রমেই ইমাম মালিক (রহ) ‘মুওয়াত্তা’ সংকলনে হাত দেন। বর্ণিত আছে যে, আব্বাসীয় খলীফা আল মনসুর যখন বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিমগণ কর্তৃক ফিকহী বিষয়ে বিভিন্ন সব পার্থক্য লক্ষ্য করলেন তখন তিনি চাইলেন একক কোন হাদীস ও ফিকহ গ্রন্থের ভিত্তিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে। তাই হজ্জ্ব উপলক্ষ্যে মদীনায় এসে খলীফা মনসুর ইমাম মালিককে বললেন, “আমি আপনার ‘আল মুওয়াত্তা’র অনুলিপি প্রস্তুত করিয়ে এবং সেগুলো মুসলিমদের সকল শহরে পাঠিয়ে দিয়ে তাদেরকে এ নির্দেশ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, এখন থেকে এটারই অনুসরণ করতে হবে এবং একে ত্যাগ করে অন্য কোন মতের অনুসরণ করা যাবে না। ইমাম সুয়ুতীর বর্ণনায় অনুরূপ ঘটনা খলীফা হারুনুর রশিদের ব্যাপারে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে খলীফা তাঁকে বলেন, “আপনার ‘মুওয়াত্তা’ কাবার গায়ে ঝুলিয়ে দিয়ে লোকদেরকে সকল মতপার্থক্য ত্যাগ করে এর অনুসরন করতে বাধ্য করলে কেমন হয়? জবাবে ইমাম মালিক বলেন, “হে আমীরুল মু’মিনীন! এমনটি করবেন না। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণের মধ্যেই খুঁটিনাটি বিষয়ে মতপার্থক্য ছিলো। অতঃপর তাঁরা বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ার ফলে বিভিন্ন শহরে তাঁদের নিজ নিজ মতের অনুসারী লোক সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং বর্তমানে লোকদের মধ্যে যে মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে তা সাহাবা (রহ) গণের থেকেই চলে আসছে।” তার এই উত্তর শুনে খলীফা তাঁর ইচ্ছা দমন করলেন।

    ইমাম মালিক তাঁর ফিকহ এর উৎস হিসেবে কুরআন, সুন্নাহ, মদীনার আলেমদের আমল, কিয়াস ও ইসতিসলাহ কে গ্রহণ করেন, [তারীখে ফিকহে ইসলামী]। মদীনাবাসীদের সম্মিলিত আমলকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন এবং এর বিপরীত খবরে ওয়াহিদ হাদীস বর্জন করতেন। তাঁর নিজের সময়কালেই তাঁর মাযহাব মদীনার প্রধানতম মাযহাবে পরিণত হয় এবং পরবর্তীতে সমগ্র হিজাজেও তা বিস্তার লাভ করে। তাঁর মদীনার ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু মারওয়ান আব্দুল মালিক (রহ)। অন্যান্য অঞ্চল বিশেষত মিসর ও আফ্রিকা থেকে অনেকে তাঁর নিকট ‘ফিকহ’ শিখতে আসতেন। যাদের মাধ্যমে তার মাযহব অন্যান্য অঞ্চলে বিশেষত আফ্রিকায় বিস্তার লাভ করে। তাঁর অনুসারী ছাত্ররা ছাড়াও তাঁর যুগের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্বও তাঁর নিকট হাদীস শিখতে আসতেন যাদের মধ্যে, আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক, ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মাদ এবং ইমাম শাফিঈ (রহ) অন্যতম।

    ইমাম শাফিঈ (রহ) ও ফিকহে তাঁর অবদান:

    “কালির দোয়াত বহনকারী যে কোন হাদীস বর্ণনাকারী কোন না কোনভাবে ইমাম শাফিঈর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন।” [ইমাম আহমদ]

    আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন ইদরীস ওরফে ইমাম শাফিঈ (রহ) ১৫০ হিজরীতে সিরিয়ার গাযা প্রদেশে জন্মগ্রহন করেন। একই বছর ইমাম আবু হানীফা (রহ) বিদায় নেন।

    ইমাম শাফেঈ প্রথমে মক্কায় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ (রহ) ও মুসলিম ইবনে খালিদ আল যিনজী (রহ) এর নিকট থেকে হাদীস ও ফিকহ এর জ্ঞান অর্জন করেন। অতঃপর মদীনায় ইমাম মালিক (রহ) এর কাছ থেকে ‘মুওয়াত্তা’ শিক্ষা নেন। এছাড়াও আরো ৮০ জন ফকীহ ও মুহাদ্দিস থেকে তিনি হাদীস ও ফিকহ শিখেন। অতঃপর ইরাকে গিয়ে আবু হানীফার বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসান (রহ) এর কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করেন। ১৯৫ হিজরীতে তিনি পুনরায় ইরাক যান এং তাঁর ফিকহী চিন্তাধারা পেশ করেন। তাঁর এ সময়ের ফতওয়াগুলো তাঁর ‘কওলে কাদিম’ বা পুরাতন অভিমত নামে পরিচিত। ১৯৮ হিজরীতে তিনি মিসরে চলে যান এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই কাটান। মিসর গমনের পর মক্কা, মদীনা, ইরাক ও মিসরের ঐ সময়ের ফিকহী চিন্তাধারা গভীর ভাবে বিশ্লেষন করে তাঁর নিজস্ব ফিকহী চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয় এবং চিন্তাধারার এই পরিবর্তন তাঁকে তাঁর সর্বশ্রেষ্ট কীর্তি ‘উসূলুল ফিকহ’ তথা ফিকহের মূলনীতি প্রনয়নের দিকে চালিত করে।

    এ বিষয়ে জ্ঞানীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে, ‘উসূল আল ফিকহ’ এর সর্বপ্রথম প্রণেতা হচ্ছেন ইমাম শাফিঈ এবং এ বিষয়ে সর্বপ্রথম প্রণীত গ্রন্থ তাঁর ‘আর-রিসালাহ’। দূর্বল একটি সূত্রে আবু হানীফার ছাত্র আবু ইউসুফ কর্তৃক সর্বপ্রথম উসূল আল ফিকহ বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনার বর্ণনা থাকলেও এর স্বপক্ষে শক্তিশালী কোন প্রমাণ নেই আর গ্রন্থটি পরবর্তীকালে পাওয়াও যায়নি। আয যারকাশী তার আল-বাহরুল মুহীত গ্রন্থে লিখেছেন, “ইমাম শাফিঈ (রহ) প্রথম ব্যক্তি যিনি উসূল আল ফিকহ সম্পর্কে লিখেছেন। ইমাম জুয়াইনী বলেন, “ইমাম শাফিঈ (রহ) এর পূর্বে আর কেউ উসূল সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেননি কিংবা এ বিষয়ে তাঁর মতো এতো বেশী জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন না।”

    বস্তুতঃ প্রাথমিক যুগের ফকীহদের বিভিন্ন ফতোয়া থেকে ধারনা করা যায় যে, এ বিষয়ে বিভিন্ন নীতিমালার জ্ঞান তাদের ছিল, তবে তারা কেউই এসব নীতিমালা সম্পর্কে পৃথকভাবে কোন আলোচনা করেননি বা এ বিষয়ে কোন গ্রন্থনা করেননি। সর্বপ্রথম ইমাম শাফিঈ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেন। তাঁর অন্য কোন অবদান যদি নাও থাকতো তাহলেও কেবল এই এক কারনেই তিনি ফিকহের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতেন।

    যেসব বিষয়ে তাকে ‘উসূলে ফিকহ’ প্রণয়নে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা হলো:

    (১) তাঁর পূর্ববর্তী যুগের ইমাম ও ফকীহদের নিকট প্রধানত তাদের নিজ নিজ শহরের আলেমদের সূত্রে প্রাপ্ত হাদীস ও আসারই বর্তমান ছিলো, সকল শহরের বর্ণনা সমূহের কোন একক সংকলন ছিলনা, ফলে বিভিন্ন শহরের ফকীহদের রায়ে ব্যাপক মতপার্থক্য এতো বেশী নজরে আসেনি। শাফিঈর যুগে তিনি তা সংকলিত অবস্থা পান এবং এসবের মাঝে ব্যাপক মতপার্থক্য দেখেন। তাছাড়া পূর্ববর্তী অন্যান্য ইমামরা প্রধানত নিজ শহরেই বাস করতেন কিন্তু ইমাম শাফিঈ এ সময়ে ফিকহের প্রধানতম চারটি কেন্দ্র মক্কা, মদীনা, কুফা ও মিসরে অবস্থান করে জ্ঞানার্জন করায় বিভিন্ন অঞ্চলে ফিকহী চিন্তাধারার পার্থক্য তাঁর নজরে আসে। তাই তিনি এমন কিছু মূলনীতি উদ্ভাবনে মনোনিবেশ করেন যার ভিত্তিতে সকলেই একই ছক অনুসরণ করে মূল উৎস হতে ফিকহ আহরন করতে পারে যাতে মতভেদ যথাসম্ভব হ্রাস পায়।

    (২) তিনি দেখলেন মদীনা ও কুফার ফকীহরা‘ মুরসাল ও মুনকাতি’ হাদীস দলীল হিসেবে গ্রহণ করছে, ফলে তাদের অনেক বক্তব্যে ত্র“টি প্রবেশ করছে। কেননা বহু মুরসাল হাদীস মুসনাদ হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হচ্ছে, ফলে তিনি মুরসাল হাদীস গ্রহণে শর্ত নির্ধারণ করে নীতিমালা প্রণয়ন করেন।

    (৩) তিনি দেখলেন, ফকীহরা দুটি ইখতিলাফপূর্ণ প্রমাণের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানে কোনো নির্দিষ্ট বিধি অনুসরন করেননি, যাতে তাদের ইজতিহাদ সমূহ ভ্রান্তি থেকে আরো সুরক্ষিত হতো। কাজেই তিনি এ বিষয়ে মূলনীতি দাঁড় করালেন।

    (৪) তিনি দেখলেন, কোন ইমামের কাছে কোন সুনির্দিষ্ট হাদীস না থাকায় তিনি হয়তো ঐ বিষয়ে ইজতেহাদ করে রায় দিয়েছেন, কিন্তু পরবর্তী যুগে তাঁর অনুসারী ফকীহদের এ বিষয়ে হাদীস নজরে এলেও যথাযথ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তা গ্রহণে মনোনিবেশ না করে, পূর্ববর্তী ইজতিহাদকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, ফলে তিনি এ বিষয়েও মূলনীতি প্রণয়ন করলেন।

    (৫) তাঁর সময়ে সাহাবা (রহ) এর ‘কওল’ বা বানী সর্বাধিক পরিমানে সংগৃহীত ছিলো। তিনি এসব বিশ্লেষণ করে এর বিরাট অংশ সহীহ হাদীস এর বিপরীত পান। কারণ সব হাদীস এককভাবে সব সাহাবীর কাছে পৌছেনি। তাই তিনি এক্ষেত্রে সহীহ হাদীসের বিপরীত সাহাবীদের যেসব বক্তব্য তা গ্রহণ-বর্জনের ব্যাপারে নীতিমালা তৈরী করেন।

    (৬) তিনি আরো দেখলেন, একদল ফকীহ ‘রায়’ ও ‘কিয়াস’ কে মিশিয়ে ফেলছে অথচ শরীয়ত ‘রায়’-কে নিষেধ করেছে ও ‘কিয়াস’-কে বৈধ ও উত্তম বলেছে। তিনি বলেন, “আমি রায় বলতে কোন যুক্তির ধারনা বা সম্ভাবনাকে কোনো বিধানের ভিত্তি বা কারণ ধরে নেয়া বুঝাচ্ছি। আর কিয়াস বলতে বুঝাচ্ছি কোনো সম্পূর্ণ বিধানের কারণ খুঁজে বের করা এবং সেই কারণের ভিত্তিতে অনুরূপ অন্যান্য বিষয়ে একই বিধান স্থির করা।” এভাবে তিনি ‘কিয়াস’ এর সঠিক পদ্ধতি বিষয়ে নীতিমালা তৈরী করেন।

    (৭) তিনি দেখলেন, মিসরে লোকেরা কোন বাছবিচার ছাড়াই কঠোরভাবে ইমাম মালিক এর ফিকহ অনুসরন করছে। তিনি ইমাম মালিকের আইন বিষয়ক মতামত সমূহের সমালোচনা মূলক বিশ্লেষণ করে দেখলেন, “কখনো তিনি ঘটনাবিশেষকে গুরুত্ব না দিয়ে সাধারণ নীতিমালার আলোকে মত দিয়েছেন, আবার কখনো সাধারন নীতিমালার গুরুত্ব না দিয়ে ঘটনা বিশেষের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।” তিনি লক্ষ্য করেন, ইমাম মালিক (রহ) কোন সাহাবী বা তাবেঈ প্রদত্ত বক্তব্য বা মদীনাবাসীদের ঐক্যমতকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্য আরেকটি সহীহ হাদীসকে অগ্রাহ্য করছেন এবং যথেষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ মজুত থাকা অবস্থায় অনেক সময় ‘মাসালিহ-মুরসালাহ’ প্রয়োগ করছেন। আবু হানীফা (রহ)-এর ব্যাপারে তাঁর মত ছিল, “অনেক ক্ষেত্রে তিনি ছোটখাট বিষয় ও বিশেষ কোন বিষয়ের ব্যাপারে তাঁর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করেছেন, সেগুলোর    বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন কিন্তু মূলনীতির প্রতি গুরুত্ব দেননি” ইত্যাদি। তাই ইমাম শাফিঈ উপরোক্ত বিষয় সমূহকে কিছু সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অধীনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।

    উল্লেখিত বিষয়গুলোর ভিত্তিতে ইমাম শাফেঈ এ সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সবচেয়ে বেশী মনোযোগ দিতে হবে আইন প্রনয়নের নীতিমালার সুনির্দিষ্ট করন, সেগুলোর প্রয়োগের জন্য বুনিয়াদী নিয়ম-নীতি প্রণয়ন ও উসূল আল ফিকহের বিকাশ ঘটানোর প্রতি যাতে এসবের সাহায্যে যথার্থ সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে ফিকহ সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়। ‘ফিকহ’-কে হতে হবে উসূলুল ফিকহের বাস্তব প্রতিফলন। এ চিন্তাধারার ভিত্তিতেই তিনি তারা সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর রিসালাহ’ ও পরবর্তীতে ‘কিতাবুল উম্ম’ রচনা করেন যার মাধ্যমে তিনি ‘উসূল আল ফিকহ’ এর ভিত্তি স্থাপন করেন।

    ইমাম শাফিঈর ‘আর রিসালাহ’তে উপস্থাপিত চিন্তাধারা সমসাময়িক ‘ফিকহী’ গবেষনার উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। এরপর দীর্ঘ সময় উসূলুল ফিকহের উপর যা লিখা হয়েছে তা মূলত এই গ্রন্থের টিকা-টিপ্পনী বা এর পক্ষে বা বিপক্ষে আলোচনা-সমালোচনা সম্বলিত। অর্থাৎ এটা ঐ যুগের ‘ফিকহী’ গবেষণার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়।

    তবে ইমাম শাফিঈ (রহ) তাঁর উক্ত গ্রন্থদ্বয়ের মাধ্যমে উসূলুল ফিকহের ভিত্তি স্থাপন করলেও এ দুটো ‘উসূল আল ফিকহ’ বিষয়ে সর্বশ্রেষ্ট গ্রন্থ নয়, বরং এ বিষয়টি পূর্ণতা লাভ করে তাঁর পরবর্তীকালে প্রধানত তাঁর অনুসারী মুজতাহিদগণের মাধ্যমে। এ বিষয়ে প্রাচীনদের লেখা শ্রেষ্টতম তিনটি বই হচ্ছে- আবু আল হুসাইন মুহাম্মদ বিন আল বসরী’র ‘মু’তামাদ’, ইমামুল হারামাইন রচিত ‘আল বুরহান’, এবং ইমাম গাজ্জালী (রহ) রচিত ‘আল মুস্তাসফা মিন ইলমুল উসূল’। পরবর্তীতে আবুল আল হোসাইন আলী ওরফে ইমাম সাইফুদ্দিন আল আমিদি তাঁর ‘আল ইহকাম ফি উসুলিল আহকাম’ নামক বিখ্যাত ও সুবৃহৎ গ্রন্থে উপরোক্ত গ্রন্থত্রয়ের সারবস্তুকে একত্রিত করেন।

    আশ-শাফিঈর এই চিন্তাধারা সমকালীন অন্যান্য মাযহাবের উপর প্রভাব বিস্তার করে। বাকীরাও তখন নিজ নিজ মাযহাবের উসূল প্রণয়নে মনোবিবেশ করে। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে এ সমস্ত উসূলই ইমাম শাফিঈ প্রণীত ‘উসূল’ এরই কিছুটা বর্ধিত বা সংক্ষিপ্ত রূপ। যেমন- ইমাম শাফিঈর পরবর্তী হানাফী ফকীহগণ ‘উসূল আল ফিকহ’ রচনায় হাত দেন এবং শাফিঈ উসূলের সাথে এর মৌলিক পার্থক্য খুব কম। পার্থক্য কেবলমাত্র শাখা-প্রশাখা পর্যায়ে বিধান আহরণের ক্ষেত্রে। হানাফীদের রচিত উসূলুল ফিকহের গ্রন্থের মধ্যে আলী বিন মুহাম্মদ আল বাযদাবী (রহ) রচিত ‘উসূল আল বাযদাবী’ অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। মালিকীদের প্রণীত ‘উসূলুল ফিকহ’ও শাফিঈ’র প্রায় অনুরূপ এবং প্রধান পার্থক্যর মধ্যে ‘মদীনার আলেমদের ঐক্যমত’ শরীয়াহর দলীল না হওয়ার বিষয়ে শাফিঈর মতভেদ উল্লেখযোগ্য। হাম্বলীরাও এই উসূল গ্রহণ করে নিয়েছে, তবে তারা ইজমা’র অর্থ সম্পর্কে ইমাম শাফিঈ’র সাথে মতভেদ করেছে এই বলে যে, একমাত্র গ্রহণযোগ্য ইজমা হচ্ছে ‘ইজমা আস সাহাবা’। যারা তাঁর উসূলকে পুরোপুরি গ্রহণ করেছে সে ধারাটিই শাফিঈ মাযহাব নামে পরিচিত হয়।

    এভাবেই ইমাম শাফিঈ ‘উসূলুল ফিকহ’ একদিকে যেমন তাঁর নিজস্ব মাযহাবের বুনিয়াদ স্থাপন করে, তেমনি অন্যদিকে আর সব মাযহাবের উসূল সম্পর্কিত চিন্তাভাবনার উপরও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। ‘উসূলুল ফিকহ’ এর আর্বিভাবের ফলে মূল উৎস হতে ‘ফিকহ’ আহরনের একটি ছক বা মানদন্ড তৈরী হয় এবং পরবর্তীকালের সকল ‘ফিকহ’ চর্চাকারীদের জন্য একটি সাধারণ পথ তৈরী হয়।

    ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ) এবং ফিকহে তাঁর অবদান:

    “আমি বাগদাদে আহমদ বিন হাম্বলের চেয়ে মর্যাদাশীল, অধিক জ্ঞানী, দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত ও অধিক মুত্তাকী আর কাউকে পাইনি।” [ইমাম শাফিঈ]

    আবু আব্দুল্লাহ আহমদ ইবনে (রহ) ১৬৪ হিজরী সনে বাগদাদে জন্মগ্রহন করেন। তিনি ইমাম আবু হানীফা (রহ) এর ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফের কাছে ফিকহ এর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দেস সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রহ) ও শায়খ আব্দুর রাজ্জাক এর কাছ থেকে শিক্ষা নেন। পরবর্তীতে তিনি ইমাম শাফিঈ (রহ) এর কাছ থেকে ‘ফিকহ’ শিক্ষা করেন। এভাবে ফিকহ ও হাদীসের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে তিনি ‘ইমামুল হাদীস’ এর মর্যাদা লাভ করেন।

    হাম্বলী ফিকহ মূলত শাফেঈ ফিকহের অনুগামী। তাদের উসূলও প্রায় শাফেঈ উসূলই বলা চলে। তবে ইমাম আহমদ হাদীসকে অধিকতর গুরুত্ব দিতেন, ইজমা বলতে ইজমা আস সাহাবাকে সুনির্দিষ্ট করতেন এবং ‘কিয়াস’ যথা সম্ভব পরিহার করতেন। তিনি বলেন, “কোন ব্যক্তি বিশেষের অভিমতের চেয়ে যঈফ-দূর্বল হাদীস আমার নিকট অধিকতর উত্তম”। এ মূলনীতির ফলে তিনি মারফূ অথাব মওকূফ উভয় অবস্থাতেই সহীহ হাদীসকে আমলযোগ্য মনে করতেন। ফলে তাঁর মাযহাবে একই মাসআলায় একাধিক হুকুম পাওয়া যায়। একান্ত বাধ্য হয়ে তিনি কিয়াস করতেন এবং কোন বিষয়ে কোন সাহাবীর রায় পেলে তাকে কিয়াসের উপর প্রাধান্য দিতেন। তাঁর অনন্য কীর্তি হচ্ছে তাঁর সংকলিত মুসনাদে ইমাম আহমদ যাতে তিনি সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই করে চল্লিশ হাজার হাদীস সংকলন করেন। ইমাম আহমদ, ‘ফকীহ’র চেয়ে মুহাদ্দিস হিসেবেই বেশী পরিচিত। তাঁর ছাত্রবৃন্দের মাধ্যমে তাঁর মাযহাব বাগদাদ, বসরা, প্রভৃতি জায়গায় বিস্তার লাভ করে।

    উপরোক্ত এই চারজন ইমাম ‘ফিকহে’ তাদের গগনচুম্বী ব্যাক্তিগত অবদানের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক দক্ষ ছাত্র তৈরী করে যান যারা পরবর্তীতে তাদের ফিকহী চিন্তাধারায় সংরক্ষন করে এবং একে মাযহাবের রূপ দেয়। বস্তুত পরবর্তী যুগে এমনকি আজ পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী এই চার ইমামের মাযহাব টিকে থাকার প্রধান কৃতিত্ব তাঁদের ছাত্রদের যারা এটাকে একযুগ থেকে অন্যযুগে বহন করে নিয়ে গেছেন। এই চার জন ছাড়াও ঐ যুগে তাদের সমপর্যায়ের যোগ্যতা সম্পন্ন আরো কিছু মুজতাহিদ ছিলেন যাদের পৃথক মাযহাব ছিলো এবং তাদের বিপুল সংখ্যক অনুসারীও ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের কর্র্ণধার কর্তৃক প্রচারিত না হওয়ায় এবং তাদের পর্যাপ্ত সংখ্যক ছাত্র না থাকায় তাদের মৃত্যুর কিছুদিন পর ঐসব মাযহাব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য যারা তারা হলেন:

    ১) সিরিয়ার আবু আব্দুর রহমান ইবনে মুহাম্মদ আল আওযাঈ ও তাঁর মাযহাব।
    ২) ইমাম সুফিয়ান ছাওরী ও তাঁর মাযহাব।
    ৩) আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জরীর তাবারী ও তাঁর মাযহাব।
    ৪) ইমাম আবু সুলাইমান দাউদ যাহেরী ও তাঁর মাযহাব। (এই মাযহাবী চিন্তাধারার সাথে মূলধারার প্রধান পার্থক্য ছিলো যে এরা কিয়াসকে শরীয়াহকে উৎস হিসেবে অস্বীকার করতো যদিও তারা ‘কিয়াসে জলী’ বলতে যা বোঝায় ভিন্ন নামে তা অনুসরণ করতো)

    এর মধ্যে প্রথম তিনটি হিজরী প্রায় তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল, অতঃপর বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর চতুর্থটি অর্থাৎ ইমাম দাউদ যাহেরী (রহ) এর মাযহাব ইবনে খালদূনের মতে অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিলো। এসব ছাড়াও আরো কিছু মাযহাব যেমন- ইমাম হাসান বসরী (রহ), ইমাম ইসহাক ইবনে রাওয়াহ (রহ), সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা (রহ) ও নায়স ইবনে সাদ (রহ) এদের মাযহাবও কিছুকাল পর্যন্ত চালু ছিল। পরবর্তীতে এগুলোর চর্চা ও অনুসরন বন্ধ হয়ে যায় এবং হানাফী. শাফিঈ, মালিকী ও হাম্বলী এই চারটি ‘ফিকহী স্কুল’ অবশিষ্ট থেকে যায়।

    এসবের বাইরে মূলধারা থেকে প্রায় পৃথক একটি ফিকহী চিন্তাধারা যা মাযহাবও সে যুগে গড়ে উঠেছিল যা এখনও বিদ্যমান আছে, আর তা হলো শিয়া মাযহাব। তাঁরা ইমাম জাফের সাদেকের মাযহাব গ্রহন করেছিলো যদিও বস্তুতঃ তাঁরা নিজেদের আকীদার পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তার মতের সাথে সত্য-মিথ্যা অনেক কিছু সংযোজন করে। তাদের ফিকহের উৎসের মধ্যে কুরআন, সুন্নাহ’র মত তাদের বারোজন ইমামের বক্তব্যও অন্তর্ভূক্ত অর্থাৎ তাদের বক্তব্যকে তারা কুরআন, সুন্নাহর সমপর্যায়ের আইনগত মর্যাদা দেয় এবং তাদের ইমামদের বর্ণিত হাদীস ছাড়া অন্য কোন হাদীস গ্রহণ করে না। এছাড়া তারা কিয়াসকে শরীয়াহর উৎস হিসেবে অস্বীকার করে, এভাবে তারা প্রধান সমস্ত মাযহাবের চিন্তা থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে ভিন্ন চিন্তা পোষণ করে।

    উপরোক্ত প্রধান প্রধান ‘ফিকহী স্কুল’ ও তাঁদের  প্রবক্তাদের কর্মপ্রচেষ্টার ফলে ফিকহের বিন্যাস উসূলুল ফিকহ প্রণয়ন, হাদীস সংকলন ইত্যাদির মাধ্যমে এ যুগে ফিকহ তাঁর সর্বোচ্চ শিখরে পৌছায়। তাদের বিখ্যাত ছাত্রদের মাধ্যমে অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে যুগের শেষ পর্যায় তথা চতুর্থ হিজরীর মাঝামাঝি পর্যন্ত।

    দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ যুগে মুজতাহিদ সাহাবা ও ইমামগণের ফিকহী বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণ :

    إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَصَابَ فَلَهُ أَجْرَانِ وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ ثُمَّ أَخْطَأَ فَلَهُ أَجْرٌ

    যখন হাকিম ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে তখন সে দুটি সওয়াব পায়, (আর) তার সিদ্ধান্ত ভুল হলে সে অন্তঃত একটি সওয়াব পায়” [বুখারী]

    এটি একটি বিস্তৃত বিষয় এবং এ বিষয়ে পূর্ববর্তীরা পৃথক গ্রন্থ রচনা করেছেন। এমন কি এ বিষয়টি ‘ইলমুল খেলাফ’ বা মতভেদ সম্পর্কিত জ্ঞান নামে পৃথক একটি শাস্ত্রের রূপও গ্রহণ করে। তবে খুঁটিনাটি বিষয় বাদ দিয়ে আমরা কেবল সেই মৌলিক কারণগুলো উপস্থাপন করবে যেগুলোর ভিত্তিতে সাহাবা (রা) যুগ, তাবেঈ যুগ ও তাবে-তাবেঈন যুগ তথা মুজতাহিদ ইমামগণের যুগে ফিকহী বিষয়ে বিভিন্ন মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়েছিল যা এখনো বর্তমান। এগুলো হচ্ছে:

    ১) কোন একটি প্রশ্ন বা সমস্যার সমাধান সম্পর্কে হয়তো একজন সাহাবীর উক্ত বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কোনো বক্তব্য জানা ছিল পক্ষান্তরে অন্যজনের জানা ছিল না ফলে বাধ্য হয়ে তিনি সে বিষয়ে ইজতিহাদ করে রায় দিয়েছেন। যেমন: পূর্ব উমর (রা)-এর কিছু উদাহরণে এটা দেখা যায়। অনুরূপ ঘটনা মুজতাহিদ ইমামদের ক্ষেত্রেও ঘটেছে কেননা তারা যাদের কাছ থেকে হাদীস সংগ্রহ করেছেন তাদের নিকট সকল সাহাবী বর্ণিত হাদীস ছিলনা যেহেতু হাদীস সংকলনের যুগ হচ্ছে এর পরবর্তী যুগ। কাজেই এটা স্বাভাবিক ছিলো যে কোন হাদীস হয়তো একজন মক্কাবাসী ইমামের জানা ছিলনা কিন্তু কুফাবাসী ইমামের তা জানা ছিল।

    ২) হয়তো হাদীসটি সাহাবা বা ইমামের নিকট পৌছেছে কিন্তু তা তাঁর কাছে বিভিন্ন করণে নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হয়নি। যেমন-হয়তো হাদীস বর্ননাকারী ইমামের নিকট অজ্ঞাত, বা কোন অভিযোগে অভিযুক্ত বা স্মৃতি শক্তিতে দূর্বল বা হাদীসটি তার কাছে মারফু অবস্থায় পৌছেনি বরং মুনকাতি অবস্থায় পৌছেছে, কিংবা হাদীসের শব্দাবলী (মতন) দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত ছিলনা ইত্যদি। পক্ষান্তরে হয়তো একই হাদীস অন্য ইমামের নিকট নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা মুত্তাসিল সনদে পৌছেছে বা অন্য কোন সনদে পৌছেছে বা এর স্বপক্ষীয় আরো এমন কিছু হাদীস পৌছেছে যার দ্বারা উক্ত হাদীস শুদ্ধ প্রমাণিত হয়। তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের মাঝে এরূপ ঘটনার সংখ্যা অনেক। এরূপ ক্ষেত্রে, যার নিকট হাদীসটি সঠিক পন্থায় পৌছেছে তিনি তা দ্বারা দলীল গ্রহণ করেন পক্ষান্তরে যার নিকট দূর্বল সূত্রে পৌছেছে তিনি তা থেকে দলীল গ্রহণ করেননা। যেমন: ফিতনা ছাড়িয়ে পড়ার হেজাজ, ইরাক, সিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চলের ইমামরা নিজের অঞ্চলে বাইরে অন্য অঞ্চলের হাদীস গ্রহণ করতেন না যদি না তা তাদের নিজেদের অঞ্চলেও তা প্রচলিত না থাকতো কেননা এ বিষয়ে তাঁরা হাদীস জাল হবার আশংকা করতেন।

    ৩) কোন ইমাম খবরে ওয়াহিদের বর্ণনাকারীদের ব্যাপারে এমন কিছু শর্তারোপ করেন যা অন্যরা করেন না ফলে উভয়ের মধ্যে উক্ত হাদীসের ভিত্তিতে দলীল গ্রহণ করা বিষয়ে মতভেদ হয়। যেমন: কেউ বলেন খবরে ওয়াহিদ কুরআন হাদীস ভিত্তিক হতে হবে, বর্ণনাকারী ফকীহ হতে হবে ইত্যাদি।

    ৪) কিছু বিশেষ ধরণের হাদীস ব্যবহারে দলীল দেয়া কোন কোন ইমামের জন্য দোষণীয় নয় পক্ষান্তরে অন্যদের নিকট তা দোষণীয় ফলে তারা তা বর্জন করেন। যেমন: ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম মালিক মুরসাল হাদীস থেকে দলীল নিতেন কিন্তু ইমাম শাফেঈ তা নিতেন না, পক্ষান্তরে ইমাম আহমদ যঈফ হাদীস থেকেও দলীল নিতেন যা অধিকাংশ ইমাম নিতেন না।

    ৫) মতভেদের এটাও কারণ যে, হয়তো ঐ বিষয়ে কোন হাদীস ইমামের জানা ছিল কিন্তু তিনি তা ভুলে গেছেন। ফলে তিনি তা থেকে দলীল গ্রহণ করেননি। যেমন: সফরে কোন ব্যক্তি নাপাক হলে এবং পানি না পাওয়া গেলে কীভাবে নিজেকে পবিত্র করবেন তা উমর (রা) এর জানা ছিল কিন্তু তিনি তা ভুলে যান। পরে আম্মার ইবনে ইয়াসের (রা) তাকে তা স্মরণ করিয়ে দেন। অনুরূপে, তিনি মোহরের পরিমান ধার্য করে দিতে চাইলে এক মহিলা তাঁর সামনে কুরআনের আয়াত পেশ করেন যা তাঁর নিজেরও জানা ছিল ফলে তিনি ঐ অনুযায়ী রায় দিলেন। অনুরূপে সাহাবী ইবনে উমর যখন বললেন, “রাসূল (সা) একটি উমরা করেছেন রজব মাসে তখন আয়েশা (রা) বললেন, ইবনে উমর ব্যাপারটা ভুলে গেছেন। [জামউল ফাওয়ায়িদ]

    ৬) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কোনো কাজের ধরণ নির্ণয়ে পার্থক্যের দরুণও মতপার্থক্য হতে পারে যদ্বরুন একই কাজকে কেউ মুবাহ আর কেউ সুন্নাহ মনে করতে পারে। যেমন : হজ্জের সফরে রাসুলুল্লাহ (সা) এর আবতাহ উপত্যকায় অবতরণ। একদল সাহাবী এটাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখেন আর অন্য দল বলেন যে তিনি ঘটনাক্রমে সেখানে অবতরণ করেছেন।

    ৭) মতপার্থক্যর আরেকটি কারণ হলো: সংশ্লিষ্ট ইমাম হয়তো হাদীসটি জানেন কিন্তু হাদীসের বক্তব্যের সঠিক উদ্দেশ্য বুঝতে ভুল করেন। যেমন: “মৃত ব্যক্তির পরিবার পরিজন কান্নাকাটি করলে মৃত ব্যক্তিকে আযাব দেযা হয়”-ইবনে উমর বর্ণিত ও হাদীস শুনে আয়েশা (রা) এ হাদীসের প্রকৃত ব্যাপার তুলে ধরেন যা থেকে বুঝা যায় ইবনে উমর হাদীসটির বক্তব্যের উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন নি।

    ৮) মতভেদের এটাও একটা কারণ যে, কোন হাদীস থেকে বিধান স্থির করার পিছনে ইল্লত বা কারণ কি ছিল তা নির্ধারণে কখনো কখনো মতানৈক্য হতো। যেমন: কফিন অতিক্রমকালে দাঁড়ানো সম্পর্কিত হাদীসে দাঁড়ানোর কারণ বর্ণনার সাহাবীদের একাধিক ব্যাখ্যা ছিল।

    ৯) কোন ইমাম কতৃক কোন কোন হাদীসে আমল না করার এটাও একটা প্রসিদ্ধ কারণ যে, তার দৃষ্টিতে উক্ত হাদীস আলোচ্য সমস্যার সমাধানে কোন ইঙ্গিত বহন করেনা বা এ আয়াত হাদীস থেকে সুস্পষ্টভাবে এ বিধান আসেনা। এই কারণের অধীনে আরো অনোকগুলো কারণ আছে যার সাথে আরবী ব্যাকরণের অনেক নিয়ম-কানুন ও সংযুক্ত। আম ও খাস নির্ধারণ, কোন বস্তু থেকে বিপরীত বোধগম্য বিষয়কে দলীলরূপে গ্রহণ করা, কোনো কারণ ভিত্তিক আম ঐ কারণের উপর সীমিত থাকা, কেবল আমর বা আদেশবাচক হলেই তা দ্বারা ওয়াজিব প্রতিষ্ঠা হওয়া না হওয়া ইত্যাদি আরো অনেক বিষয় এর অন্তর্ভূক্ত যা নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। উসূল আল ফিকহ-এর বিরোধপূর্ণ মাসআলা গুলোর প্রায় অর্ধেক এই শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত।

    ১০) এটাও মতপার্থক্যের অন্যতম কারণ যে, হয়তো কোন ইমাম কোন হাদীসের উপর আমল বর্জন করেন যেহেতু ঐ মাসআলায় তার কাছে এর বিপক্ষে অন্য দলীল আছে। এক্ষেত্রে উক্ত বিরোধপূর্ণ হাদীস দ্বয়ের ব্যাপারে সামঞ্জস্য বিধানগত মতপার্থক্য তৈরী হয়। কেউ হয়তো একটিকে মূল ধরে আরেকটিকে তা’ওয়ীল করেন, আবার কেউ হয়তো একটিকে মনসুখ আর অন্যটিকে নাসেখ হিসেবে দেখেন ইত্যাদি। ফলে মতপার্থক্য অনিবার্য হয়। মুতআ বিবাহ সম্পর্কে ইবনে আব্বাস (রা) এর মত বাকীদের বিপরীত হবার কারণ এ শ্রেণীতে পড়ে। অনুরূপে, সালাতে রফউল ইয়াদাইন বিষয়ে হানাফী ও শাফেঈদের মতপার্থক্যও এ বিষয়ের অধীন।

    ১১) মুজতাহিদ ইমামগণের মতপার্থক্যের এটাও একটা অন্যতম  কারণ যে, ইমাম তাঁর প্রণীত উসুলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে পৌছান। এমতবাস্থায় উসূলের যৎসামান্য ভিন্নতায় বিধান আহরণের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা তৈরী হয। যেমন: ইমাম মালিক “মদীনাবাসীদের সম্মিলিতি আমল’ কে হুজ্জত হিসেবে গ্রহণ করায় এর বিপরীত অনেক সহীহ হাদীস তিনি বর্জন করেন কিন্তু অন্যান্য ইমামরা ঐ বিষয়কে হুজ্জত হিসেবে গ্রহণ না করায় তারা এ সমস্ত হাদীসের ভিত্তিতে দলীল গ্রহণ করেন।

    এভাবে বিভিন্ন করণে মুজতাহিদ ইমামদের ফিকহী সিদ্ধান্তে মতপার্থক্য সূচিত হয় যদিও এর প্রায় সবই হচেছ শরীয়াহ’র শাখা-প্রশাখায়, মূল বিষয়গুলিতে নয়। এখানে যেটা সবচেয়ে উলে¬খযোগ্য তা হলো, এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও তাদের প্রত্যেকের ইজতিহাদকৃত বিষয়ই ‘ইসলামী মত’ কেননা তারা প্রমাণিত ইসলামী পদ্ধতি ব্যবহার করেই এসব সিদ্ধান্তে পৌছেছেন। এ বিষয়ে তাদের সঠিক হওয়া বা ভূল হওয়া নিম্নের হাদীসের অধীন:

    “যখন হাকিম ইজতিহাদের মাধ্যমে কোন সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে তখন সে দুটি সওয়াব পায়, (আর) তার সিদ্ধান্ত ভুল হলে সে অন্তঃত একটি সওয়াব পায়”।

    ফিকহের স্থবির যুগ:

    হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ফিকহ চর্চায় এক ধরনের স্থবিরতার জন্ম নেয়। এ যুগে ব্যাপকভাবে ইজতিহাদ করা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় এবং উলামা ও সাধারণ মানুষ সবাই বিশিষ্ট ইমামদের ফিকহী চিন্তার অনুসরণ করার মাঝে নিজেদের প্রতিভাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। এ সময়ের ফিকহী আলোচনা নতুন কোন দিক নির্দেশনা মূলক না হয়ে বরং পূর্ববর্তীদের রচিত গ্রন্থের ব্যাখ্যা ও তাতে টিকা-টিপ্পনী সংযোজন এবং পূর্ববর্তী ইমামগণ কর্তৃক মাসয়ালা-মাসায়েলের বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা ও নিজ নিজ মাযহাবের ইমামদের সমর্থনে ও পক্ষে বিপক্ষে মুনাযারা ও বাহাস বিতর্কের মাঝেই আবর্তিত হতে থাকে। এযুগে ফকীহগণ কদাচিৎ কোন সমস্যায় সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর দ্বারস্থ হতেন বরং স্বীয় মাযহাবের মধ্যেই ঐ সমস্যার সমাধান খুঁজতেন। এ সময় তারা কুরআন-সুন্নাহ’র অধ্যয়নকে স্বীয় মাযহাবের পক্ষ সমর্থনকারী আয়াত-হাদীস অনুসন্ধানের মাঝে সীমিত করেন, ফলে আগত নতুন সমস্যার সমাধান মূল দুটি উৎস থেকে খোঁজার ব্যাপারে পূর্ববর্তীদের যে শিক্ষা তা চাপা পড়ে। এভাবে এ যুগে ফিকহ এর মূল প্রাণশক্তি স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং কেবল অনুসরণ ও অনুসৃত বিষয়ের ব্যাখা-বিশ্লেষণে পর্যবসিত হয়। তাই এ যুগে ফিকহের স্থবিরতার যুগ। বিচ্ছিন্ন কিছু ব্যক্তিত্ব ও তাদের কিছু অবদান ছাড়া এযুগে ফিকহের বিশেষ কোন উন্নতি হয়নি। হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হয়ে হিজরী সপ্তম শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত চলে এ যুগ।

    ফিকহের পতন যুগ:

     إِنَّ اللَّهَ لَا يَقْبِضُ الْعِلْمَ انْتِزَاعًا يَنْتَزِعُهُ مِنْ الْعِبَادِ وَلَكِنْ يَقْبِضُ الْعِلْمَ بِقَبْضِ الْعُلَمَاءِ حَتَّى إِذَا لَمْ يُبْقِ عَالِمًا اتَّخَذَ النَّاسُ رُءُوسًا جُهَّالًا فَسُئِلُوا فَأَفْتَوْا بِغَيْرِ عِلْمٍ فَضَلُّوا وَأَضَلُّوا
    (শেষ যুগে) আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছ থেকে এক টানে ইলম উঠিয়ে নিবেন না, বরং আলেমদের উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই ইলম উঠিয়ে নিবেন। অবশেষে যখন তিনি কোন আলেমই অবশিষ্ট রাখবেন না তখন লোকেরা অজ্ঞ জাহেলদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে।” [বুখারী, মুসলিম]

    স্থবিরতার স্বাভাবিক পরিনতি হিসেবেই ফিকহ তার পতন যুগের দিকে এগিয়ে যায়। হিজরী সপ্তম শতকের প্রারম্ভ থেকে এই যুগের সূচনা হয়। স্থবির যুগের প্রভাবে এ যুগে ইজতিহাদ করার যোগ্যতা সম্পন্ন প্রজন্মই গড়ে উঠতে পারেনি। ফলে এযুগে এসে ইজতিহাদ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি মাসআলার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের যে অনুশীলন তাও হারিয়ে যায়। শুরু হয় পূর্ববর্তীদের রেখে যাওয়া জিনিসের খালেস তাকলীদের যুগ। এ যুগে বিভিন্ন মাসআলায় পূর্ববর্তীদের ব্যবহৃত দলীল প্রমাণ উল্লেখ না করেই সরাসরি সেসব মাসআলা লিপিবন্ধ করার প্রচলন হয় এবং জনসাধারণের মাঝে তা প্রচারিত হয়। ফলে, মূল উৎস হতে ফিকহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ফিকহ পরিণত হয় শুষ্ক আইনগ্রন্থে এবং এসবের শিক্ষার মাধ্যমে এমন এক পঙ্গু প্রজন্ম তৈরী হয় যারা ফিকহের বিকাশে ছিল সম্পূর্ণ অক্ষম।

    এ যুগের একদম প্রথমদিকে যদিও বিভিন্ন মাযহাবে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে যাদের অনেকেই ছিলেন স্বাধীন ইজতিহাদের যোগ্যতা সম্পন্ন কিন্তু স্থবিরতা এমন পর্যায়ে পৌছে ছিল যে তা ভাঙ্গার জন্য এই গুটিকয়েক ব্যক্তিত্বের সাময়িক আবির্ভাব যথেষ্ট ছিলনা। এদের মধ্যে  হানাফী মাযহাবের কামাল ইবনে হুমাম (রহ), জামালুদ্দীন যায়লাঈ (রহ), শাফিঈ মাযহাবের ইযযুদ্দীন আবদুস সালাম (রহ), তাকীউদ্দিন সুযুকী (রহ), জালালুদ্দীন সুয়ুতী (রহ), মালেকী মাযহাবের আল্লামা ইবনে দাকীকুল ঈদ (রহ) ও হাম্বলী মাযহাবের আল্লামা ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ) ও হাফিয ইবনে কায়্যিম (রহ) উল্লেখযোগ্য। এদের প্রচেষ্টার কিছুকালের জন্য ‘ফিকহ’ এর প্রানবন্ত চর্চা চলে।

    কিন্তু এর পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ফিকহের পতন চলতেই থাকে। তথাপি এ পতন ইসলামের সীমারেখার মধ্যেই ছিল অর্থাৎ এ সময় পর্যন্ত ফিকহের অনুশীলনে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটেনি।

    কিন্তু ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ থেকে পতন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শরীয়াহ’র আইনকে অনৈসলামী আইনের সাথে মিশিয়ে ফেলা শুরু হয় এবং এর যৌথ অনুসরণ চলতে থাকে। এর যাত্রা শুরু হয় ১২৭৪ হিজরীতে যখন উসমানী খিলাফতের অধীনে হুদুদ আইনগুলো পরিবর্তন করে তৎপরিবর্তে উসমানী পেনাল কোর্ড ইস্যু করা হয়। অতঃপর ১২৭৬ হিজরীতে অধিকার ও বাণিজ্য  সম্পর্কিত আইন পাশ করা হয়। এভাবে ইসলামী উৎস ছাড়া অন্যান্য উৎস হতে আইন গ্রহণ করা চলতে থাকে যার মধ্যে দিয়ে  ফিকহের তথা ইসলামী আইনশাস্ত্রের চরম অধঃপতন সূচিত হয়।

    ইসলামী আইনের সাথে অনৈসলামী উৎস হতে আগত এসব আইনের মিশ্রণ চলতে থাকে উসমানী খিলাফতের শেষ তথা ১৯২৪ সাল পর্যন্ত। অবশেষে, ১৯২৪ সালে খিলাফত ব্যবস্থার পতনের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অবির্ভাবের ফলে ইসলামী ফিকহ পুরো পুরি রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যায় এবং মুসলিম ভূমি গুলো অনৈসলামী আইনের ভিত্তিতে শাসিত হতে শুরু করে- যার মাধ্যমে ফিকহ এর চূড়ান্ত অধঃপতন সম্পূর্ণ হয়। সেই অধঃপতনের ধারাবাহিকতা পরবর্তী সময়ে আরো প্রকট রূপ ধারণ করে চলছে আজ পর্যন্ত।

    ‘ইলমুল ফিকহ’ পুনরুজ্জীবিত করার উপায়:

    تفقهوا قبل أن تسودوا
    তোমরা নেতৃত্ব লাভের আগেই ফিকহ অর্জন করে নাও।” [বুখারী]
    “ফিকহ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর জীবন; ফিকহ ব্যতীত এই উম্মতের জীবন বেঁচে থাকতে পারে না। [আল্লামা শামী]

    যেহেতু ফিকহ হচ্ছে বাস্তব জীবন পরিচালনার আইন কানুন সম্পর্কিত জ্ঞান অতএব জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে কখনোই এর পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়, বরং এই বিচ্ছিন্নতাই ফিকহ এর বর্তমান দুরবস্থার কারণ। বাস্তব জীবন পরিচালনায় যতবেশী ফিকহ ব্যবহৃত হবে ততই প্রয়োজনের তাগিদে এর বিকাশ ঘটতে থাকবে। তাই জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রে ফিকহ তথা ইসলামী আইনের প্রয়োগই ফিকহকে পুনরুজ্জীবিত করার একমাত্র পথ। বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্র ইসলাম দিয়ে পরিচালিত না হওয়ায় উম্মাহর মাঝে ফিকহ জানার কোন চাহিদা নেই, কেননা এই সম্পর্কিত কোন জ্ঞান ছাড়াই বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রে সে তার সফল প্রয়োজন মেটাতে পারে। কিন্তু ইসলামী আইন দ্বারা পরিচালিত একটি সমাজে জনগন স্বভাবিক প্রয়োজনের তাগিদেই ফিকহক চর্চায় বাধ্য হবে, যুগের নতুন নতুন সমস্যার সমাধানে মূল উৎসগুলোর দ্বারস্থ হবে, ইজতিহাদের চাকাকে সচল করবে আর এভাবেই ফিকহ আবার জীবন্ত হয়ে উঠবে।

    এজন্য প্রথমে প্রয়োজন এমন একটি দল যারা বিশুদ্ধ চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত, যাদের সমস্ত চিন্তা ও কর্ম পদ্ধতি ফিকহ এর সঠিক চর্চার মাধ্যমে গৃহীত, যারা নিজ দলের অভ্যন্তরে এই সম্পর্কে সঠিক চিন্তার শিক্ষা দেয় এবং উম্মাহর মাঝেও এই চিন্তাকে ছড়িয়ে দেয়। একই সাথে এ দলটি উম্মাহকে এমনটি একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিকে আহবান জানায় যেখানে সব কিছু পরিচালিত হবে ইসলামী আইন তথা ফিকহ চর্চার মাধ্যমে- যাতে করে উম্মাহ ফিকহ এর বাস্তব উপযোগীতা বুঝতে পারে। এ আহ্বান এবং এর ভিত্তিতে নির্ধারিত তরীকা অনুসরন করে যখন সে রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে তখন নতুন যুগে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের বহুমুখী চাহিদা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সম্পন্ন করার প্রয়োজনে ফিকহ চর্চায় আবারও গৌরবজ্জ্বল যুগের সূচনা হবে।

    আহমেদ জামাল