তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মদীনায় হিজরত
মদীনায় হিজরত দাওয়াতের ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহিষ্ণুতার পর্যায় থেকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়নের পর্যায়ে উন্নীত হবার একটি ধাপ। এটা দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে উন্নিত হওয়া যা মদীনাতে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ইসলাম বহন করেছিলেন। আর তা করা হয়েছিল ইসলাম দ্বারা শাসিত একটি রাষ্ট্রের মাধ্যমে। এ রাষ্ট্র ইসলামকে বাস্তবায়ন করে এবং এর দিকে দলিল প্রমাণসহ আহ্বান করে ও দাওয়াতকে ক্ষমতার সাথে বহন করে যাতে করে বাতিলের অত্যাচার ও ক্ষতির হাত থেকে একে সুরক্ষা দেয়া যায়।
যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনাতে পৌঁছলেন তখন সেখানকার অনেক লোক তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম একটি মসজিদ ণির্মাণ করেছিলেন। এ মসজিদে সালাত আদায় করা হত, পরামর্শ করা হত, লোকদের বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা ও বিবাদ নিরসন করা হত। তিনি (সা) মদীনাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তত করতে লাগলেন। তিনি মদীনার বাইরে অভিযান পরিচালনা করেন ও তাদের নেতৃত্ব নির্ধারণ করে দেন। ইহুদীদের সাথে চুক্তি করেন। সাধারণভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনাতে একজন শাসকের ভূমিকা পালন করেন অর্থাৎ তিনি ছিলেন সেখানকার রাষ্ট্রপ্রধান।
দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার আগে রাসূলুল্লাহ (সা) এ কাজগুলো করেছিলেন। সুতরাং এ থেকে আমরা কী বাধ্যবাধকতার নির্দেশ পাই?
আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) কে পুরোপুরি অনুসরণ করতে বাধ্য এবং তিনি যেভাবে অগ্রসর হয়েছেন আমরাও একইভাবে অগ্রসর হতে বাধ্য। যেহেতু ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরয, সেহেতু এক্ষেত্রেও তাঁর (সা) পদাঙ্ক আমাদের অনুসরণ করতে হবে। তার (সা) ব্যাখ্যামুলক কাযার্বলীতে যে হুকুম পাই তা একই ব্যাখ্যামুলক বিষয়ের জন্য বাধ্যতামুলক হুকুম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এ সম্পর্কে বললেন,
‘বলে দিন: এই আমার পথ। আমি আল্লাহ্র দিকে বুঝে শুনে দাওয়াত দেই— আমি এবং আমার অনুসারীরা।’
(সূরা ইউসুফ: ১০৮)সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাত অনুসরণ করলে আমাদের কাজগুলোকে দুই ধাপে ভাগ করতে বাধ্য:
- ব্যক্তিত্ব গঠন ও (দল) প্রতিষ্ঠার ধাপ
- গণযোগাযোগ এবং সংগ্রামের ধাপ
প্রথম ধাপে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মপন্থা আমরা অনুসরণ করতে বাধ্য। এ ধাপে যারা ইসলামী দাওয়াতের বোঝা বহন করবে তাদেরকে ইসলাম দিয়ে গভীরভাবে বিকাশের ব্যবস্থা ও বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে হবে। এটা সম্ভব হবে খুব ভাল ইসলামী আকলিয়া (মানসিকতা/ধ্যান-ধারনা) ও নাফসিয়া (ঝোঁক/প্রবণতা) গড়ে তুলবার মাধ্যমে। যা করতে হবে গভীরতাসমৃদ্ধ পাঠচক্র বা হালাকা প্রদানের মাধ্যমে, যা রাসূলুল্লাহ করেছিলেন। যার মাঝেই রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলাম গ্রহণের উপযোগীতা দেখতে পেতেন, তার বয়স, পদমর্যাদা, লিঙ্গ, বর্ণ নির্বিশেষে তিনি তাকে আহ্বান করতেন এবং তাদের একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্রমপ্রসারমান হিযবের মধ্যে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদেরকে উপরোক্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে:
- বিকাশের পরিণত অবস্থা, অর্থাৎ তাদের মনস্তত্ত বা আকলিয়া এবং নাফসিয়াহ বা প্রবণতা গড়ে উঠেছে ইসলাম অনুসারে। সুতরাং তারা এখন সমাজের দূষিত চিন্তাগুলোর মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
- কেবলমাত্র নিজেদের মধ্যে গন্ডীভূত রাখবার জন্য তারা দাওয়াতকে গ্রহণ করবে না। সুতরাং তারা যাই জানে তাই ছড়িয়ে দিতে থাকবে। যার মধ্যেই তারা কল্যাণ (খায়ের) দেখতে পাবে তার কাছেই তারা এ দাওয়াত নিয়ে যাবে।
- লোকেরা দাওয়াতকে হৃদয়ঙ্গম করবে, এর উপস্থিতি ও সামষ্টিকতাকে অনুভব করবে।
যখন সাহাবীদের মত এ তিনটি বৈশিষ্ট্য কোন হিজবের মধ্যে দেখা যাবে, তখন সেটি দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হবে ।
এ ধাপে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত দাওয়াতকে জনগনের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং বর্তমান সমাজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে ও তাদের চিন্তা, ঐতিহ্য ও ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তাদের চিন্তার দেউলিয়াত্বের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে এবং বিকল্প ইসলামী চিন্তা, ধারণা ও ব্যবস্থাকে উপস্থাপন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত জড়তাহীনভাবে, অসম সাহসিকতা ও শক্তিমতার সাথে লোকদের আহ্বান করতে আমরা বাধ্য। আমরা এ দাওয়াত পরিত্যাগ করব না ও আত্নসমর্পণও করব না। আমরা তোষামোদ বা আপোষ করব না এবং রীতিনীতি, ঐতিহ্য, ধর্ম, জীবনাদর্শ, শাসক অথবা জনতার ভয়কে উপেক্ষা করব। আমরা এমনভাবে দাওয়াহ বহন করব যাতে নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ইসলামের জন্য হয়ে যায়। জনগন এর সাথে একমত বা দ্বিমত পোষণ করুক না কেন অথবা এটা তাদের ঐতিহ্যের সাথে যাক বা সাংঘর্ষিক হোক এবং জনগন গ্রহণ, প্রত্যাখান বা বিরোধিতা করুক। যতক্ষণ না আদর্শ অনুসারে কাঙ্খিতভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত এর সাথে সংযুক্ত থাকব এবং ধৈর্যধারণ করব। যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত এ সময়েও শাসকগন এ লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে সেহেতু এ দলটিকে এই শাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। আর এটা তখনই সংঘটিত হবে যখন তাদের মুখোশ, দুরভিসন্ধি ও দালালি ও ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়া হবে এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত এসবকে চ্যালেঞ্জ করা হবে। যেভাবে পবিত্র কুরআন আবু লাহাবকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল:
‘আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে, কোন কাজে আসেনি তার ধন—সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে।’
(সূরা লাহাব:১-৩)বানু হাশিম গোত্রে সে সম্মানিত হওয়া সত্ত্বেও এ আয়াত নাজিল হয়েছিল। একইভাবে কুরআনে বানু মাখদুম আল ওয়ালিদ বিন মুগীরাকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘যাকে আমি একা সৃষ্টি করেছি, তাকে একাকী আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাকে বিপুল ধন-সম্পদ দিয়েছি।’
(সূরা আল মুদ্দাসির:১১—১২)অতপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আমি তাকে দাখিল করব প্রজ্জলিত জাহান্নামের আগুনে।’
(সূরা আল মুদ্দাসির: ২৬)তার সম্পর্কে সূরা ক্বলমে বলা হয়েছে:
‘কঠোর স্বভাব, তদুপরি কুখ্যাত’।
(সূরা ক্বলম:১৩)যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আবু জাহেলের ব্যাপারে বলেন,
‘কখনই নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি মস্তকের সামনের কেশগুচ্ছ ধরে হেঁচড়াবই— মিথ্যাচারী, পাপীর কেশগুচ্ছ।’
(সূরা আলাক:১৫—১৬)আমাদের দাওয়াতের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত লোকদের নির্দেশনা দেয়ার মানসিকতা নিয়ে এগুতে হবে। এ ধাপে তিনি (সা) ইসলাম যাতে তাদের জীবনাদর্শ হয়ে যায় ও মুহম্মদ (সা) মিশন যাতে তাদের মিশন হয়ে যায়— সে জন্য সর্বাত্মকভাবে তাদের কাছে ইসলামী আদর্শ ব্যাখা করেছেন। অর্থাৎ আমরা যা বুঝাতে চাই তা যেন লোকেরা গভীর উপলদ্ধির সাথে গ্রহণ করে।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত আজকেও আমরা প্রত্যাখান, প্রতিবন্ধকতা, মিথ্যা অপবাদ, বিতাড়ন, প্রোপাগান্ডা, বয়কটের শিকার হতে পারি।
সাহাবাগন (রা) সেসময় অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন এবং তখন তিনি (সা) প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন,
‘আমি ক্ষমা করে দেবার জন্য আদিষ্ট হয়েছি; সুতরাং লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করো না।’
একইভাবে নুসরাহ খুঁজে পাবার পূর্বে আমরা অস্ত্রধারণ ও ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকব।
রাসূলুল্লাহ (সা) যেমনিভাবে তৃতীয় ধাপে উন্নীত হবার জন্য নুসরাহর সন্ধান করেছিলেন তেমনিভাবে আমরাও ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শাসন করবার জন্য নুসরাহ বা বস্তুগত সমর্থন অনুসন্ধান করতে বাধ্য। এ ধাপ হল ক্ষমতা গ্রহণ ও শাসন করবার ধাপ।
আল ‘আকাবার শপথ
মুস’আব (রা) মক্কায় ফিরে আসলেন। আনসারদের মধ্য থেকে কিছু মুসলিম তাদের তীর্থযাত্রী মুশরিক লোকদের সাথে হজ্জ করবার জন্য এল। তাশরীকের (১০ জিলহজ্জ থেকে শুরু করে ৪ দিন) মাঝামাঝি এক দিনে তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে শপথবদ্ধ হলেন। তাদের মধ্যে তেয়াত্তর জন পুরুষ ও দুইজন নারী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে কেবল তার চাচা ছিলেন। আসাদ বিন জুরারাহ বলেন, ‘ রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আল আব্বাস সর্বপ্রথম কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘হে খাজরাজের লোকেরা! তোমরা মুহম্মদ (সা) সাথে দেখা করে তাকে আমন্ত্রন জানাচ্ছ। মুহম্মদ (সা) তার গোত্রের লোকদের মধ্য থেকে সবচেয়ে সম্মানিত। আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্য হতে যারা তাকে বিশ্বাস করে অথবা না করে, সবাই তার সম্মান ও বংশীয় ধারার জন্য সুরক্ষা দিয়েছে। তোমাদের জন্য মুহম্মদ সবাইকে প্রত্যাখান করেছে। আপনারা যদি ক্ষমতাবান, ধৈর্যশীল, যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হন এবং সব আরবদের ঐক্যবদ্ধ বৈরীতা ও শত্রুতা মোকাবিলায় প্রস্তত থাকেন, তাহলে আপনাদের সদিচ্ছার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন এবং এর উপর দৃঢ় থাকুন। প্রকাশ্যে নিরঙ্কুশভাবে একমত পোষণ করবার পর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবেন না। কারণ সৎ সাক্ষী সর্বোৎকৃষ্ট সাক্ষী।
তারা বলল, ‘আপনি যা বললেন, তা আমরা শুনলাম। কিন্তু হে রাসূলুল্লাহ (সা), আপনি আমাদেরকে আপনার ও আপনার রবের জন্য পছন্দ করুন এবং বলুন আপনার যা ইচ্ছা হয়।’
রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সামনে বক্তব্য দিলেন, কুরআন তেলাওয়াত করে শুনালেন, লোকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করলেন ও ইসলাম গ্রহণের জন্য উৎসাহী করলেন। তাঁর প্রভূকে উপাসনা করা ও তার সাথে কাউকে শরীক না করবার শর্ত দিলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘আমি আপনাদের সমর্থন প্রত্যাশা করছি যে, আমাকে সুরক্ষা দিন যেভাবে আপনারা আপনাদের নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দিয়ে থাকেন।’ (সীরাত ইবনে হিশাম)
আসাদ বিন জুরারাহ আল বারাহ আরও বর্ণণা করেন যে, ‘মা’রুর শপথ গ্রহণের জন্য তার হাত তুলে নিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই, সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে একজন সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আপনাকে আমরা সেভাবে রক্ষা করব যেভাবে আমাদের স্ত্রী ও সন্তানের সুরক্ষা প্রদান করি। হে রাসূলুল্লাহ, সুতরাং আমরা বাইআত প্রদান করলাম। আল্লাহর কসম, আমরা বংশ পরষ্পরায় নেতা থেকে নেতাতে যোদ্ধা ও অস্ত্রচালনায় পারদর্শী।’
যখন আল বারা কথা বলছিল, তখন আবুল হায়সামি ইবনুল তাইহান তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের অন্য লোকদেও (ইহুদী) সাথেও সম্পর্ক রয়েছে। যদি আমরা তাদের প্রতি কঠোর হই এবং সম্ভবত সে সময় আল্লাহ যদি আপনাকে বিজয়ী করেন তাহলে কি আপনি আমাদের প্রত্যাখান করে নিজের লোকদের কাছে ফিরে আসবেন?’ রাসূলুল্লাহ (সা) স্মীত হেসে উত্তর দিলেন,
‘না, রক্ত তো রক্তই; আর রক্তের বদলাও রক্তই। আমি তোমাদের জন্য আর তোমরাও আমার জন্য। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করব আর তোমরা যাদের সাথে সন্ধি চাইবে আমার সন্ধিও তাদের সাথেই।’
(সীরাত ইবনে হিশাম)আসাদ বিন জুরারাহ বর্ণণায় আরও উল্লেখ করেন, ‘‘অতপর তারা বলল, ‘সম্পদের ক্ষতি অথবা আমাদের মধ্যকার সম্ভ্রান্তগন উৎসগীর্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা তাঁকে (সা) বাই’য়াত দিলাম। তারপর আল বারা বললেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ (সা), আপনার হস্ত প্রসারিত করুন।’ এভাবে তিয়াত্তর জন রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতের উপর হাত রেখে বাই’য়াত সম্পন্ন করল। যখন লোকেরা বাই’য়াত দিল এবং তা সুসসম্পন্ন হল তখন শয়তান আল আকাবায় চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হে আখাসীবের (কুরাইশ) লোকেরা, তোমরা কি মুহম্মদ ও তার সাহাবাগন (মুশরিকদের দৃষ্টিতে দ্বীনত্যাগী) কে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একত্র হওয়া পছন্দ কর?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘তোমাদের মধ্য হতে বারজন নেতা নিয়ে আস যারা তাদের লোকদের দায়িত্ব নিবে, যেমন ঈসা বিন মারিয়মের হাওয়ারীয়ন (শীষ্যগন) ; আর আমি আমার লোকদের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল।’ তারা দু’পক্ষ থেকে নুকাবা (নেতা) নির্বাচন করল। এভাবেই পূর্ণাঙ্গ ঈমানী পরিবেশে বাই’য়াত সুসম্পন্ন হল। এ বিষয়ে আল আব্বাস বিন উবাদা রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলেন, ‘সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে একজন সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যদি আপনার ইচ্ছা তাই হয় তাহলে আগামীকালই আমরা মীনাবাসীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে প্রস্তত।’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,
‘আমরা এ ব্যাপারে আদিষ্ট হইনি, সুতরাং তোমরা তোমাদের বাহন উটসমূহের কাছে ফিরে যাও।’
(সীরাত ইবনে হিশাম)হজ্জের মৌসুম শেষ হতে চলল। মক্কার লোকদের কাছে যখন বাই’য়াত খবর পৌছাল তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। ইবনে সা’দ তার ‘আত তাবাকাত’ গ্রন্থে উরওয়া’র বরাতে আয়েশা (রা) এর কাছ থেকে বর্ণণা করেন যে, তারা বলল, ‘যখন সত্তর জন লোক রাসূলুল্লাহ (সা) কে ত্যাগ করল, তখন তিনি বুঝতে পারলেন আল্লাহ তাঁর জন্য সুরক্ষা, যোদ্ধা ও সমর্থন প্রদান করেছেন। তবে মুসলিমদের উপর পরীক্ষা বেড়ে গেল। এ ব্যাপারে সাহাবীগণ (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অভিযোগ করলেন এবং তিনি তাদের হিজরতের অনুমতি দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবা (রা) কে হিজরতের জন্য যে ভূমির কথা জানালেন তা হল ইয়াসরীব বা মদীনা এবং যে হিজরতে আগ্রহী তাকেই অনুমতি দিলেন। তিনি (সা) বললেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, মক্কা থেকে এমন এক ভূমিতে হিজরত করছি যেখানে খেজুর জাতীয় গাছ রয়েছে। আমার মন বলছিল আল ইয়ামা অথবা হাজারের কথা, কিন্তু এটা ছিল আল ইয়াসরীব।’ (বুখারী ও মুসলিম)
অবশ্যই গোত্রসমূহের কাছ থেকে নুসরাহ পাবার প্রচেষ্টা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বায়াতের ঘটনা এসবই প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এমন ক্ষমতার অধিকার খুঁজেছিলেন যা তাঁর দ্বীনকে সহায়তা এবং সুরক্ষা দিতে পারবে। বিষয়টি কেবলমাত্র দাওয়াত বহন বা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সাথে এমন এক ক্ষমতার বিয়য়টি বিজড়িত ছিল যার মাধ্যমে মুসলিমগন আত্নরক্ষা করতে পারবে। বরং এর কলেবর আরও বেড়ে যায়, এটি এমন একটি নিউক্লিয়াস ছিল যাকে কেন্দ্র করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, সমাজে ইসলাম বাস্তবায়িত হবে, যা মানবতার কাছে শাশ্বত বাণী বহন করে এবং সে ক্ষমতা লালন করে যা ইসলামকে সুরক্ষা দেয় এবং এর বিস্তারের পথে আরোপিত সব বস্তুগত প্রতিবন্ধকতাকে অপসারণ করে। এভাবে সম্পদ, স্বদেশ, স্ত্রী ও পরিবার ছেড়ে হিজরত সম্পন্ন হয়। মদীনার হিজরত আবিসিনিয়ার হিজরত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
আবিসিনিয়ায় হিজরত ছিল দ্বীন ও অত্যাচারের ভয়ে কিছু ব্যক্তির নিজ ভূমি থেকে পলায়ন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মক্কায় নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য এমন এক নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন যাতে করে তারা নির্যাতনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত না হয়ে তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং তাদের অন্তরাত্মাসমূহ পূণরায় শক্তিশালী ও দৃঢ়তার সাথে দাওয়াত বহনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। এটা দাওয়াতের পদ্ধতির কোন ধাপ নয় যেখানে মুহাজিরনগণ প্রবাসে থেকে দাওয়াত বহন করতে পারে অথবা প্রবাসী শাসকদের সহায়তা নিয়ে তার মূল ভূমির শাসককে উৎখাত করতে পারে।
দাওয়াতের আহ্বানে মদীনাবাসীর প্রতিক্রিয়া
রাসূলুল্লাহ (সা) গোত্রসমূহকে প্রতিবছর মাজান্না, উ’কাজ এবং মিনায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তার নিজের প্রতি ক্রমাগতভাবে আহ্বান জানাচ্ছিলেন, যাতে করে তিনি তাঁর রবের বাণী নিরাপদে মানুষের দ্বারে পৌঁছে দিতে পারেন এবং এর প্রতিদানে তারা জান্নাত অর্জন করতে পারে। আরবের একটি গোত্রও তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি এবং তিনি নির্যাতিত ও চরিত্র হননের অপচেষ্টার শিকার হয়েছিলেন যতক্ষণ না আল্লাহর ইচ্ছায় দ্বীন বিজয়ী হওয়া, প্রভূর মদদপুষ্ট হওয়া ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হওয়ার সময় এসেছিল। অত:পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা) কে আনসারদের একটি গোত্রের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি (সা) এমন একটি দলের সাথে বসলেন যারা তাদের মাথা মুন্ডন করছিলেন । রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সাথে বসেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি আহ্বান করেন এবং তাদের কোরআন তেলাওয়াত করে শোনান। তারা খুব দ্রুত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর ডাকে সাড়া দেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনেন। Then they went to Madinah and invited their people to Islam; henceforth people started to embrace Islam.
পরের বছর হজ্জ্বের মওসুমে মদীনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের বারজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে আল আকাবা নামক স্থানে দেখা করেন ও ইসলাম গ্রহণ করেন। এটা ছিল আকাবার প্রথম সাক্ষাৎ যেখানে বায়াতুন নিছা বা নারীদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মুসয়াব বিন উমায়ের (রা) কে মদীনায় প্রেরণ করেন। তিনি (সা) মুসায়েব (রা) কে সেখানে কুরআন পাঠ করবার, মদীনাবাসীকে ইসলাম ও দ্বীন শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দেন। তিনি আল মুকরী (তেলাওয়াতকারী) হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং আসাদ বিন জুরারাহ এর সাথে থাকতেন। অতপর উসায়েদ বিন হাদায়ের ও সাদ বিন মুয়া’জ ঈমান আনেন। তারা ছিলেন মদীনায় নেতৃস্থানীয়। যখন পরেরজন ইসলাম গ্রহণ করল তখন তিনি তার জনগণের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমাদের মাঝে আমাকে তোমরা কিভাবে দেখ?’ তারা প্রত্যুত্তরে বলল, ‘আমরা তোমাকে আমাদের অভিভাবক এবং প্রাজ্ঞ ব্যক্তি মনে করি এবং সত্য পথে একজন নেতা ভাবি।’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের পুরুষ এবং নারীগন ততক্ষণ আমার সাথে কথা বলতে পারবে না যতক্ষণ তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর।’ বিকেলের মধ্যে আবদুল আশ-হাল এর বাড়ীতে এমন একজন পুরুষ ও নারী খুঁজে পাওয়া গেল না যে মুসলিম হয়নি।
রাসূলুল্লাহ (সা) কতৃক গোত্রসমূহকে ইসলামের দিকে আহ্বান
যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আবু তালিব ও বিবি খাদিজা (রা) একই বছরে ইন্তেকাল করলেন তখন তাদের মৃত্যুর কারণে তার ভাগ্যাকাশে দূর্যোগের মেঘ আরও ঘনীভূত হল। চাচার মৃত্যুর পর কুরাইশগন রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর নির্যাতনের খড়গহস্ত আরও কঠিনভাবে চালাতে উদ্যত হল। এ ব্যাপারে তিনি (সা) বলতেন,
‘আবু তালিবের মৃত্যুর পর কুরাইশগন যত ঘৃণিত কাজ করেছিল ততটা আর কখনওই করেনি।’
(সীরাতে ইবনে হিশাম)আবু তালিবের মৃত্যুর পর নিজের ও তাঁর লোকদের সুরক্ষা ও নুসরার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বানু সাকিফ গোত্রের কিছু নেতৃস্থানীয় লোকের সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি তাদের সাথে ইসলামকে সমর্থন করা ও এর পাশে দাঁড়ানোর জন্য কথা বলেন, তার গোত্রের যে কেউ তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার জন্য বললেন। তারা এ আহ্বান প্রত্যাখান করেছিল এবং বারণ করা সত্ত্বেও তাদের সাথে যোগাযোগের বিষয়টি গোপন না রেখে প্রকাশ করে দিয়েছিল। বিশেষ প্রহরা ছাড়া মুহম্মদ (সা) মক্কায় প্রবেশ করতে পারেননি।
রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন গোত্রের দরজায় দাঁড়িয়ে আহ্বান জানিয়ে বলতেন,
‘হে অমুক গোত্র! আমি তোমাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর রাসূল। তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। এইসব মূর্তি থেকে যে কোন কিছু গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন এবং আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন ও ঈমান আনুন। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে রক্ষা করুন যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা লোক সামনে তুলে ধরছি।’
(সীরাত ইবনে হিশাম)রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আবু লাহাব ছায়ার মত তাঁর পেছনে লেগে থাকত এবং তিনি যা বলতেন তার জবাব দিত ও প্রত্যাখান করত। কেউ তার কথা গ্রহণ করত না, তারা সাধারণত বলত, ‘তোমার লোকেরা যারা তোমাকে আরও ভাল জানে তারাই তোমাকে অনুসরণ করে না।’
তারা কথা বলত ও তর্ক করত। অন্যদিকে তিনি তাদের সাথে কথা বলতেন এবং আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতেন এই কথা বলে,
”হে আমার প্রভু, যদি তোমার ইচ্ছা থাকত! তারা এটা অপছন্দ করত না। ”
সীরাত ইবনে হিশামে উল্লেখ আছে, আয-জুহরী বর্ণণা করেন যে, মিনাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বানু কিন্দা গোত্রের কাছে তাদের আবাসস্থলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেছেন ও প্রত্যাখাত হলেন। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বানু কা’ব গোত্রের কাছে যান এবং প্রস্তাব দেন। কিন্তু আগের মতই প্রত্যাখাত হন। তারপর তিনি বানু হানিফা গোত্রের কাছে গিয়ে একইভাবে প্রস্তাব দেন এবং তাদের প্রত্যাখান ছিল আরবদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তিনি বানু আমির বিন বানু সা’সা’ এর কাছে গিয়েছিলেন এবং তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন ও নিজেকে উপস্থাপন করেন। বহাইরা বিন ফিরাস নামে তাদের মধ্যকার একজন বলল,
‘আল্লাহর কসম, আমি যদি কুরাইশের এই তরুণকে নিতে পারতাম তাহলে পুরো আরবদের পরাজিত করতে পারতাম।’ সে রাসূলুল্লাহ (সা) কে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি মনে কর, যদি আমরা তোমাকে অনুসরণ করি এবং স্রষ্টা তোমার শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমাকে বিজয় দান করে তবে তোমার পরে আমাদের হাতে ক্ষমতা আসবে?’ নবী (সা) উত্তর দিলেন,
‘ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং তিনি যাকে খুশী তাকে তা দান করেন।’
বহাইরা উত্তর দিল, ‘আমরা তোমাকে রক্ষা করবার জন্য আরবদের কাছে আমাদের গলা উন্মুক্ত করে দেব আর যখন তুমি বিজয়ী হবে তখন ক্ষমতা চলে যাবে অন্য কারও হাতে! তাহলে তোমার ক্ষমতার আমাদের প্রয়োজন নেই!’
রাসূলুল্লাহ (সা) এরকমই করে যেতে থাকলেন। যখন হজ্জের মৌসুমে লোকেরা জমায়েত হত, তিনি (সা) সেখানে উপস্থিত হতেন এবং তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতেন। তিনি (সা) নিজেকে উপস্থাপণ করতেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনা ও রহমত তুলে ধরতেন। যখনই রাসূলুল্লাহ (সা) জানতে পারতেন যে কোন স্বনামধন্য ও সম্মানিত আরব এসেছেন তখনই তিনি কালবিলম্ব না করে তাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দিকে আহ্বান জানাতেন ও তাঁর প্রতি নাজিলকৃত বাণীসমূহ উপস্থাপন করতেন।
ইতিবাচক সাড়া না দিলেও রাসূলুল্লাহ (সা) যে সব গোত্রের সাথে দেখা করেছিলেন, ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং নিজেকে তাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন তারা হল: ১) বানু আ’মির বিন সা’সা’ ২) মুহারিব বিন খাসফাহ ৩) ফাজারাহ ৪) ঘাসান ৫) মুরাহ ৬) হানিফাহ ৭) সুলায়েম ৮) আবাস ৯) বানু নাদর ১০) বানু আল বুকা ১১) কিন্দা ১২) কা’ব ১৩) আল হারিস বিন কা’ব ১৪) উজরাহ ১৫) আল হাদারিমাহ
ইবনে সাদ এর ‘আত তাবাকাত’ শীর্ষক বই অনুসারে এই তালিকা উল্লেখ করা হল।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময়ে গণসংযোগ পর্যায়
কুরাইশদের সাথে দাওয়াত নিয়ে সংঘাত ছিল স্বাভাবিক। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) এই দলটিকে সাহসী ও চ্যালেঞ্জিং পদ্ধতিতে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন। দাওয়াতের প্রকৃতির কারণে মক্কার সমাজ ও কুরাইশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। এ দাওয়াত এক আল্লাহর উপাসনা ও তাওহীদের প্রতি আহ্বান করেছিল এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে বলেছিল ও যে দূনীর্তিগ্রস্ত নষ্ট শাসনব্যবস্থার মধ্যে তারা বসবাস করত তার সমূল উৎপাটন করবার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল। তিনি তাদের স্রষ্টাকে উপহাস করতেন, সস্তা জীবনধারাকে আক্রমণ করতেন এবং তাদের জীবনব্যবস্থার অবৈধ দিকসমূহ উন্মোচন করতেন। তিনি সত্য দিয়ে তাদের চ্যালেঞ্জ করতেন এবং তারাও করত মিথ্যে ও গুজব দ্বারা। তিনি লোকদের সুস্পষ্টভাবে আহ্বান জানাতেন এবং এ আহ্বানে কোন দ্ব্যর্থবোধকতা, নমনীয়তা বা বশ্যতার লেশমাত্রও ছিল না। সব অত্যাচার, প্রত্যাখান, বিতাড়ন, গুজব ও বয়কটকে তোয়াক্কা করে তিনি এসব কিছু করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিলেন এবং ইসলাম প্রসারিত হওয়া শুরু করল।
যখন তাঁর (সা) স্ত্রী ও চাচা মারা গেলেন এবং কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা আরও ঘনীভূত হল তখন তিনি সমর্থন আদায় ও নিরাপত্তার জন্য তায়েফের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এই ভেবে যে, হয়ত তারা ইসলাম গ্রহণ করবে। কিন্তু তারা অকল্পনীয়ভাবে মন্দ আচরণ ও শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে প্রত্যাখান করল। তিনি এমন এক পর্যায়ে এসে উপনীত হলেন যখন নিরাপত্তা ছাড়া মক্কায় প্রবেশ করতে পারছিলেন না। সেদিন তিনি আল মু’তিম বিন ’আদি এর প্রহরায় মক্কায় প্রবেশ করলেন। কুরাইশ কতৃক রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে লাগল এবং প্রত্যাখান এর মাত্রা আরও প্রবল হল। বিরোধীরা তার কথা শুনতে লোকদের বারণ করত এবং এটা খুব বেশী কার্যকর হয়নি। হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন গোত্রের কাছে তিনি যাওয়া শুরু করলেন এবং তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করা শুরু করলেন ও প্রচার করলেন যে, তিনি একজন আল্লাহ প্রেরিত রাসূল ও এতে তাদের বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত। তাঁর চাচা আবু লাহাব সাধারণত তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগ আনত এবং লোকদের তাঁর কথা না শুনবার জন্য উদ্ধুদ্ধ করত। এ প্রচারণার একটা প্রভাব শ্রোতাদের উপর পড়ত, যেমন: তারা মাঝে মাঝে শুনত না। তারপর তিনি গেলেন বানু কিন্দা, বানু কাব, বানু হানিফা, বানু আমি’র বিন সা’সা এর কাছে। কিন্তু কেউ তার কথায় কর্ণপাত করত না। কেউ কেউ বিতৃষ্ণা নিয়ে খুব বাজেভাবে প্রত্যাখান করত। গোত্রসমূহের কাছ থেকে প্রত্যাখানের মাত্রা বেড়ে যাবার আরেকটি প্রধান কারণ হল কুরাইশরা মুহম্মদ (সা) এবং তার সাহায্যকারীকে তাদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করত। ব্যক্তি বা গোত্র হিসেবে লোকেরা আরও ক্রমবর্ধমান হারে রাসূলুল্লাহ (সা) কে প্রত্যাখান করা শুরু করল। তিনি ক্রমেই নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছিলেন এবং মক্কা ও এর আশেপাশে দাওয়াতের কাজ করা কঠিনতর হয়ে যাচ্ছিল। মক্কার সমাজ কুফরী ব্যবস্থার উপর অটল থাকল এবং কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে দৃঢ় থাকল। যখন অত্যাচারের মাত্রা তীব্রতর হয়ে গেল তখন আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) সহ আরও অনেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অস্ত্র ধারণের অনুমতি প্রার্থনা করল। তারা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আগে আমাদের মুশরিক হিসেবে সম্মান ও ক্ষমতা ছিল। আর যখন আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম তখন অপমানিত হচ্ছি।’ রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের নিষেধ করে বললেন,
‘অবশ্যই, আমাকে ক্ষমা করে দেবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সুতরাং লোকদের সাথে যুদ্ধ করো না।’
(আন নাসায়ী ও আল হাকিমে ইবনে আবি হাতিমের বর্ণণায়)এইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় দাওয়াতের দু’টি পর্যায় অতিক্রম করেছেন:
- শিক্ষণ, গঠন বা চিন্তার বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্নিক প্রস্তুতির পর্যায়। এটা হল চিন্তাকে উপলদ্ধি করতে পারা, প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সে চিন্তাকে মজ্জাগত করা এবং তাদের সুসংগঠিত করার পর্যায়।
- দাওয়াতের বিস্তৃতি ও সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায়। এটা হল চিন্তাকে সমাজ পরিচালনার শক্তি হিসেবে সরবরাহ করা, চিন্তাকে প্রয়োগ করে জীবনের মূল ধারায় স্থান করা যাতে সাধারণ জনগন এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, বহন করে এবং প্রতিষ্ঠার পথে সর্বাত্নক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।
প্রথম পর্যায়ের ক্ষেত্রে, এটা হল লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বানের পর্যায় এবং এর চিন্তা দিয়ে তাদের চিন্তার বিকাশ ঘটানো, নিয়মকানুন শিক্ষা দেয়া এবং এমন একটি সংগঠন গড়ে তোলা যারা ইসলামি আক্বীদার ভিত্তিতে এ কাজগুলো করতে পারবে। এ পর্যায়ে দাওযাতকে গোপনে সংগঠিত করতে হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) দাওয়াত থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। তিনি যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। তাদেরকে দারুল আরকামে একত্রিত করে একটি সংগঠনের কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসেছিলেন। এভাবে প্রতিদিন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তাদের মধ্যকার বন্ধন সুদৃঢ় হয়। তাদের মধ্যে বাস্তবতাকে উপলদ্ধি করা এবং কর্মসূচী গ্রহণ ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে কারণে দাওয়াতের জন্য তারা নিজেদের উৎসর্গ করবার জন্য প্রস্তত ছিল। দাওয়াত তাদের হৃদয় ও মনে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। ধমনীতে রক্ত যেভাবে প্রবাহিত হয়েছিল সেভাবে ইসলাম তাদের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছিল। সেকারণে লুকোচুরি, গোপন কাঠামো ও গোপন বৈঠকের মধ্যেও তাদের ভেতরে দাওয়াত লুক্কায়িত ছিল না। বিশ্বাসী ও দাওয়াত গ্রহণের জন্য আগ্রহী লোকদের সাথে তারা এ দাওয়াত নিয়ে যেত। এভাবে লোকেরা তাদের উপস্থিতি ও দাওয়াত বুঝতে পারত। এভাবে দাওয়াতের সূচনা হল। অতপর দাওয়ার প্রকাশ অত্যবশ্যকীয় হয়ে উঠল। কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছিল এর প্রকাশ ও লোকদের সম্বোধন করার জন্য। এভাবে প্রথম ধাপ অতিক্রান্ত হল যেখানে গোপন কাঠামো তৈরি করা ও শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়, যা এই কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করে।
তারপর আরেকটি পর্যায় শুরু হল, যা ছিল গণসংযোগ ও সর্বাত্নক সংগ্রাম পর্যায়। লোকদের এসময় ইসলাম উপলদ্ধি করবার সুযোগ দেয়া হয়। সেকারণে তখন তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং এবিষয়ে আগ্রহী হয়েছে। আবার অন্যদিকে তারা এটাকে প্রত্যাখান ও পরবতীর্তে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং এভাবে এ চিন্তার সাথে দ্বন্দ শুরু হয়েছে। এ দ্বন্দে কুফর ও কুচিন্তা পরাভূত হয়েছে, ঈমান ও সত্য বিজয় হয়েছে এবং সঠিক চিন্তাই প্রবলতর হয়েছে। এভাবে গনসংযোগ শুরু হল এবং একটি চিন্তা ও আরেকটির মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হল, অর্থাৎ এ প্রতিযোগিতা ছিল মুসলিম ও কাফেরদের মধ্যে। এর সূত্রপাত হয়েছিল যখন রাসূলুল্লাহ (সা) গণমানুষের কাছে সাহস ও চ্যালেঞ্জের সাথে দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেয়া শুরু করলেন। তাওহীদের দাওয়াত, মূর্তিপূজা ও শিরকের চিন্তাকে আঘাত এবং কোন চিন্তা ছাড়া পূর্বপুরুষকে অন্ধভাবে অনুকরণ করার বিষয়গুলোকে সমালোচনা করে রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর আয়াত নাজিল হতে লাগল। আয়াতসমূহতে ত্রুটিপূর্ণ বিনিময় ব্যবস্থা, বাণিজ্য এবং মাপে কম দেয়ার সমালোচনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) দলে দলে লোকদের সাথে কথা বলা শুরু করলেন, ইসলামকে গ্রহণ ও সাহায্য করবার জন্য আহ্বান জানালেন। কুরাইশ ও নবী (সা) এর মধ্যকার দ্বন্দ বৃদ্ধি পেল। দাওয়াতের মধ্যে বাড়িতে, পাহাড়ের পাদদেশে, দারুল আরকামে নিবিড় শিক্ষাদান পদ্ধতির পাশাপাশি তখন সামষ্টিক শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ফলে, এটা স্থানান্তরিত হল কিছু সংখ্যক মানুষ যাদের মাঝে কল্যাণ (goodness) ছিল তাদের আহ্বান জানানোর পর্যায় থেকে সমগ্র মানষকে আহবান জানানোর পর্যায়ে। এই সামষ্টিক দাওয়াত ও গনসংযোগ পর্যায় কুরাইশদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করল। সুতরাং তাদের ঘৃণা ঘনীভূত হল এবং তারা ইসলাম নিয়ে ভীত হয়ে পড়ল। দাওয়াতকে বিরোধিতা করবার জন্য তারা ভয়ংকর সব পরিকল্পনা আটতে থাকল; এ পর্যায়ের আগে তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতকে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেনি। সুতরাং মানুষিক ক্লেশ ও জুলুম বাড়তে লাগল। তবে এই সামষ্টিক দাওয়াত এর নিজের উপরে অনেক প্রভাব বিস্তার করল। এর কারণে অনেকে ইসলামের কথা শুনবার সুযোগ পেল এবং আল্লাহর দ্বীনের কথা মক্কাবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভবপর হল। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করল। সামষ্টিক দাওয়াতের কারণে এর কলেবর বাড়ানোর সুযোগ হল। যদিও এ কারণে দাওয়াত বহনকারীদের দূর্ভোগ, অত্যাচার ও নির্যাতন বাড়িয়ে দিল। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) কুরাইশদের অন্যায়, নিষ্ঠুরতা, মক্কার সমাজের দাসত্ব, কাফেরদের করুণ অবস্থা ও কর্মকান্ডের মুখোশ উন্মোচন করছিলেন তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সব পর্যায়সমূহের মধ্যে এ পর্যায়টি রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।
চিন্তা বিকাশের পর্যায় থেকে গনযোগাযোগ পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পর্যায়টি খুব স্পর্শকাতর একটি বিষয়, কারণ এর জন্য প্রজ্ঞা, ধৈর্য, চিন্তার যথার্থতা অপরিহার্য। তবে গনযোগাযোগ পর্যায়টি ছিল সবচেয়ে কঠিন। এর জন্য একজনকে সাহসী, স্পষ্টভাষী এবং ফলাফল বা প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় না নিয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে আসতে হবে। এ ধাপে মুসলিমদের দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ পর্যায়ে ঈমান ও দূর্ভোগ সহ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি বিকশিত হয় এবং সংঘাতের সময়গুলোতে ঐকান্তিকতা গড়ে উঠে।
একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাহাবাদের (রা) নিয়ে এমনভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন যাতে তারা অত্যাচার, দূর্ভোগ ও নির্যাতন সহ্য করতে পারে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবিসিনিয়াতে হিজরত করেছেন, কেউ দ্বীন নিয়ে পালিয়েছেন, কেউ নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন এবং কেউ কেউ অত্যাচার সহ্য করেছেন। মক্কার সমাজকে পরিবর্তনের জন্য তাঁরা যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তবুও অত্যাচারের ভয়াবহতা সফলতার পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল। আরবদের অনেকে দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। কারণ তখন তারা ঈমান গ্রহণ করে কুরাইশদের চটাতে চায়নি। তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ ইসলামকে বাস্তবায়নের স্তরে দাওয়াত মক্কার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা) নুসরা ও সুরক্ষা পাবার জন্য গোত্রসমূহের কাছে যাওয়া শুরু করেন, যাতে করে তিনি তার প্রভূ যা নাজিল করেছেন তা লোকদের কাছে স্পষ্ট করতে পারেন।
রাসূলুল্লাহ (সা)—এর সময়ে ব্যক্তি তৈরির ধাপ
যখন রাসূলুল্লাহ (সা) কে দাওযাতের কাজের দায়িত্ব দেয়া হল তখন তিনি লোকদের সেদিকে আহ্বান জানাতে আরম্ভ করলেন। কেউ কেউ তার আহ্বানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করল এবং কেউ কেউ অবিশ্বাস করল। যখন মক্কায় ইসলাম ব্যাপক পরিচিতি লাভ করল তখন সাধারণ জনতা এটা নিয়ে কথা বলা শুরু করল। রাসূলুল্লাহ (সা) শুরুতে তাদের বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎ করতেন। মক্কায় তিনি লোকদের প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতেন আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী,
‘হে চাদরাবৃত, উঠুন, সতর্ক করুন’।
(সূরা মুদ্দাসির: ১-২)তিনি প্রথমে দলটিকে গোপনে সংঘটিত করেন। সাহাবাগন (রা) তখন লোকালয় থেকে দূরে উপত্যকায় গিয়ে সালাত আদায় করতেন। নতুন কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা) তৎক্ষণাৎ কোরআন শিক্ষা দেয়ার জন্য কাউকে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি যয়নব বিনতে আল খাত্তাব ও তার স্বামী সাইদকে কুরআন শিক্ষার জন্য খাব্বাব বিন আরাতকে তাদের বাড়িতে প্রেরণ করেন। এটি সেই হালাকা বা পাঠদানচক্র ছিল, যেখানে সাইয়্যুদনা ওমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি (সা) আল আরকামের বাড়িটিকে বিশ্বাসীদের কেন্দ্র ও নতুন দাওয়াতের জন্য বিদ্যায়তন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ বাড়ীতে রাসূলুল্লাহ (সা) কুরআন শিক্ষা দিতেন ও সাহাবীদের মুখস্থ ও উপলদ্ধি করবার পরামর্শ দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ততক্ষণ পর্যন্ত সাহাবীদের গোপনে শিক্ষা দিয়ে আসছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত নিম্নের আয়াতটি নাজিল না হয়:
‘অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরওয়া করবেন না।’
(সূরা আল হিজর: ৯৪)শুরুতে রাসূলুল্লাহ (সা) বয়স, সামাজিক পদমর্যাদা, নারী-পুরুষ, বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশের আগে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ, বয়সের প্রায় চলিশজন নারী ও পুরুষ এ দলের সাথে যুক্ত হয়। তারা বিভিন্ন বয়সের হলেও অধিকাংশই ছিল তরুণ। ধনী, দরিদ্র, দূর্বল ও শক্তিশালী সব অংশের প্রতিনিধিত্ব ছিল।
যখন চিন্তা বিকাশের ক্ষেত্রে সাহাবাগন (রা) পরিণত হল, তাদের মনস্বতত্ত (আকলিয়া) সুগঠিত হল অর্থাৎ সেটি ইসলামি হয়ে গেল এবং তাদের নাফসিয়াও ইসলামি হল ও রাসূলুল্লাহ (সা) যখন নিশ্চিত হলেন যে এ দলটি পুরো সমাজকে মোকাবেলা করবার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে তখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ্যে আর্বিভূত হলেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) কে যেদিন দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল সেদিন থেকে ইসলামের দাওয়াত ছিল প্রকাশ্য। মক্কার লোকেরা জানত মুহম্মদ (সা) নতুন দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন এবং অনেক লোক ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে। তারা এটাও জানত যে, নবদীক্ষিত মুসলিমরা এই নতুন দ্বীনের সাথে তাদের সম্পর্ক ও এর প্রতি তাদের আনুগত্যের বিষয়টি গোপন করছে। এ তথ্য জানার অর্থ হল নতুন দাওয়াত ও দাওয়াত গ্রহণকারী নতুন লোকদের সম্পর্কে মক্কাবাসীর একধরনের অনুভূতি ছিল যদিও তারা জানত না কারা মিলিত হচ্ছে এবং কোথায় মিলিত হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইসলামের প্রতি দাওয়াত একেবারে নতুন ছিল না, বরং যা নতুন ছিল তা হল বিশ্বাসীদের নতুন এই দলটির প্রকাশ্যে আর্বিভাব।
যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এ আয়াতটি নাজিল হল:
‘অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরওয়া করবেন না। বিদ্রূপকারীদের জন্যে আমি আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট। যারা আল্লাহ্র সাথে অন্য উপাস্য সাব্যস্ত করে, অতিসত্বর তারা জেনে নেবে।’
(সূরা আল হিজর: ৯৪-৯৬)রাসূলুল্লাহ (সা) প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতের ঘোষণা দিলেন এবং এর মাধ্যমে দাওয়াত ব্যক্তি পর্যায় থেকে গণপর্যায়ে উন্নীত হল। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) আগ্রহী লোকদের গোপনে দাওয়াত করবার পর্যায় থেকে প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে গনসংযোগ পর্যায়ে নিয়ে আসলেন। এটা ছিল ঈমান ও কুফরের মধ্যকার দ্বন্দের সূত্রপাত এবং সঠিক চিন্তা ও ভুল চিন্তার মধ্যকার সংঘাত। সুতরাং দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল। এটি হল গনসংযোগ ও সংগ্রাম করবার পর্যায় এবং সব সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাড়ীতে পাথর ছুড়ে মারা হল। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাড়ীর পথে ময়লা ফেলে রাখত। নবী (সা) এগুলো পরিষ্কার করে সন্তুষ্ট থাকতেন। আবু জাহেল তাদের দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসগীর্কৃত ভেড়ার নাড়িভূড়ি রাসূলুল্লাহ (সা) এর বরাবর ছুড়ে মারে। কিন্তু এসব রাসূলুল্লাহ (সা) এর ধৈর্য এবং সহ্যক্ষমতাই বৃদ্ধি করছিল কেবল । মুসলমানদের সতর্ক করা হচ্ছিল ও ক্ষতিসাধন করা হচ্ছিল। দ্বীন গ্রহণ করবার কারণে প্রত্যেক গোত্রই মুসলিমদের অত্যাচার ও যন্ত্রনা দিতে ঝাপিয়ে পড়েছিল। এ অত্যাচারের শিকার হয়েছিল বিলাল, আম্মার, তার মা ও বাবা এবং আরও অনেকে যারা দূর্ভোগ লাভ ও অকথ্য নির্যাতনের পরও দৃঢ়তার উত্তম দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল।
শুরুতে কাফেররা (কুরাইশগণ) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কথা একজন নেহায়েত ধর্মপ্রচারক বা জ্ঞানী ব্যক্তির ভাবালুতা মনে করে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তারা মনে করত লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করবে। সেকারণে তারা মুহম্মদ (সা) কে দোষারোপ করেনি বা তার থেকে পালাতে চেষ্টা করেনি। যখন তাদের আড্ডার সামনে দিয়ে তিনি যেতেন তখন তারা বলত, ‘এই হল আবদুল মুত্তালিবের সন্তান যে আকাশ থেকে আগত বাণী প্রচার করে।’ রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের দেবতাদের কথা উল্লেখ করে এগুলোকে অসম্মান করলেন, তাদের চিন্তা ও পূর্বপুরুষদের পথভ্রষ্টতার জন্য দোষারোপ করার মাধ্যমে তিনি বিরোধিতা শুরু করলেন ও দ্বন্দে অবতীর্ণ হলেন। অতপর তারা তাকে শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিল এবং বিরোধিতায়, শত্রুতায় এবং সহিংসতায় তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হল।
তার নবুয়্যতের দাবীকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করা হয়েছে। সেকারণে তারা তার আলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপাত্নক উপায়ে অবগত হওয়ার চেষ্টা করল। তারা বলত, ‘তাহলে মুহম্মদ কেন সাফা ও মারওয়া স্বর্ণে রূপান্তরিত করে দিচ্ছে না?’ ‘কেন আকাশ থেকে একটি কিতাব নাজিল হচ্ছে না?’ “Why does Jibreel not appear in front of them?” “Why does he not give life to the dead?” ধীরে ধীরে তারা আরও একগুয়ে হতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর প্রভুর নির্দেশের প্রতি লোকদের আহ্বান অব্যাহত রাখল। কুরাইশরা তাঁকে দাওয়াত থেকে ফেরানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। সাহাবীদের উপর অত্যাচার, প্রপাগান্ডা ও বয়কট এবং এ ধরনের আরও অপচেষ্টা রাসূলুল্লাহ (সা) কে আল্লাহর রজ্জুকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে সাহায্য করেছে এবং দাওয়াতের প্রতি প্রবল আগ্রহী করে তুলেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর উপর অত্যাচারের খবর বিভিন্ন গোত্রের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এবং দাওয়াতের বিষয়টি সাধারণভাবে সবার জানা ছিল। পুরো উপদ্বীপ ইসলাম সম্পর্কে জানত এবং আরোহীরা বিভিন্ন জায়গায় ইসলাম নিয়ে কথা বলত। পবিত্র মাসসমূহ ছাড়া মুসলিমদের লোকদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) কাবার কাছে এসে লোকদের আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানাতেন, তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) পক্ষ থেকে পুরষ্কারের সুসংবাদ জানাতেন এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) শাস্তি ও ক্রোধ থেকে সতর্ক করতেন।
৪র্থ অধ্যায়: যে ভাবে দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠা করতে হয়
আমরা এখন শরীয়া কতৃক নির্ধারিত কর্মপদ্ধতি ও এর বিভিন্ন ধাপ নিয়ে আলোচনা করব যা দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।
আমরা আলোচনাকে প্রধানত দু’টি ভাগে বিভক্ত করব –
- একটি ভাগে থাকবে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পরিবর্তনের পদ্ধতি।
- দ্বিতীয় ভাগে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতিতে একটি দলের পরিবর্তনের কাজের পদ্ধতি আলোচিত হবে।
আজকের পদ্ধতিও হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পদ্ধতির অনুরূপ
সুতরাং, দলটিকে রাসূলুল্লাহ (সা) সে কর্মকান্ডসমূহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে যেগুলো তাকে মদীনাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে গেছে। অবশ্যই পদ্ধতির বিভিন্ন ধাপসমূহ রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে নিতে হবে এবং দাওয়াতের নিয়মসমূহ সেসময়ের বাস্তবতা থেকে বুঝতে হবে। সুতরাং, দাওয়াত ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সাথে এগিয়ে যাবে, শত প্রতিকূলতার মাঝে; কেউ এ প্রতিকূলতা থেকে পরিত্রাণ পাবে না। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর আয়াত নাজিল হচ্ছিল তখন ওয়ারাকা বিন নওফেল বলেছিলেন,
‘তুমি মিথ্যুক হিসেবে সাব্যস্ত হবে, ক্ষতির শিকার হবে, পরবাসে যেতে বাধ্য হবে এবং যুদ্ধের মুখোমুখি হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘তারা কি আমাকে তাড়িয়ে দেবে?’ ওরাকা বললেন, ‘তোমার আগে এমন একজন নবীও আসেনি যারা নির্বাসনে যেতে বাধ্য হননি।’
এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যা বলা হয়েছে। তারা এতে সবর করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌছা পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। নিশ্চয়ই আপনার কাছে পয়গম্বরদের কাহিনী পৌছেছে।’ (সূরা আনআম: ৩৪)
আজকের পদ্ধতিও হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) দেখানো সেই পদ্ধতি। তিনি (সা) মক্কায় দারুল কুফরে বসবাস করতেন। তিনি স্বতপ্রণোদিত হয়ে এমন কিছু কর্মসূচী হাতে নিয়েছিলেন যা তাকে মদীনাতে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। মক্কা থেকে মদীনাতে হিজরতের সময়টি ছিল দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে পরিণত হবার ক্রান্তিকাল।
এখানে একটি প্রশ্ন উত্থিত হয় যে, তাহলে কী এখন দাওয়াত দু’টি পর্যায়ে পরিচালিত হবে, অর্থাৎ মক্কী ও মাদানী পযার্য় ?
উত্তর হল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় দাওয়াত বহন করা হয়েছিল দু’টি পর্যায়ে:
১. মক্কী পর্যায়ে বিশ্বাস ও সামান্য কিছু হুকুম রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর নাজিল হয়েছিল। আইনগতভাবে মুসলিমগন তখন যা নাজিল হত এর বাইরে আর কোন কিছুর জন্য দায়িত্বশীল ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা) কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল লোকদের ক্ষমা করে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপায়ে আহ্বানের করবার জন্য। নিষেধ করা হয়েছিল যে কোনধরনের হিংসাত্নক কর্মকান্ড থেকে বিরত থেকে প্রতিকূল পরিবেশে ধৈর্যধারণ করবার জন্য।
২. মাদানী যুগে বা পর্যায়ে বিশ্বাস সম্পর্কিত বাকী আয়াত ও আহকাম সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা সম্বলিত আয়াত নাজিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ইসলামি আইন বাস্তবায়নের, উকুবাত (শাস্তি) সম্বলিত হুকুমসমূহ প্রতিষ্ঠা করবার, জিহাদ ঘোষণা করবার, নতুন ভূমি জয় করবার এবং লোকদের দেখভাল করবার। এ অবস্থায় মুসলিমগন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অংশের জন্য দায়িত্বশীল হল।
আজকে আমরা মক্কা ও মদীনার হুকুম নির্বিশেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। যে কোন আইনের অবহেলায় জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং তালাক, বিয়ে, ব্যবসা, জিহাদ, রোযা, হজ্জ্ব, শাস্তির বিধান, ভূমি, মালিকানা ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত মদীনায় নাজিলকৃত আয়াত সমূহের ব্যাপারে মুসলিমদের জবাবদিহী করতে হবে। এমন আইন রয়েছে যেগুলো পালনের জন্য মুসলিমদের খলিফা অত্যাবশ্যকীয় এবং কোন মুসলিম ব্যক্তিগতভাবে তা গ্রহণের জন্য দায়িত্বশীল নয়, যেমন: শাস্তির বিধিবিধান, দাওয়াত প্রসারের জন্য আক্রমণাত্নক জিহাদ পরিচালনা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা ও খিলাফতের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমসমূহ। আবার এমন হুকুম রয়েছে যেগুলো খলিফার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এবং পরিস্থিতি নির্বিশেষে মুসলিমদের জন্য পালন করা বাধ্যতামূলক। এগুলো পালনে তারা ব্যর্থ হলে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে হোক সেটা মক্কা বা মদীনায় নাজিলকৃত; এবং ইসলাম সেসব মুসলমানদের জন্য হিজরতকে বাধ্যতামূলক করেছে যারা অবস্থানরত ভূমিতে ব্যক্তিপর্যায়ের হুকুমসমূহ পালন করতে পারছে না। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘যারা নিজের অনিষ্ট করে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে: আল্লাহ পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হল জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান। কিন্তু পুরুষ, নারী ও শিশুদের মধ্যে যারা অসহায়, তারা কোন উপায় করতে পারে না এবং পথও জানে না।’ (সূরা নিসা: ৯৭-৯৮)
সুতরাং আজকের সময়ে মক্কীযুগ বা মাদানীযুগ নিয়ে আলোচনা করা অবান্তর। দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমরা কেবলমাত্র মক্কীযুগে রাসূলুল্লাহ (সা) যে ধাপগুলো অতিক্রম করেছেন সেটা গ্রহণ করব যা কিনা পরবর্তীতে ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পথকে সুগম করেছিল। আর ব্যক্তিগত হুকুম দারুল ইসলাম বা দারুর কুফর নির্বিশেষে সর্বাবস্থায় মুসলিমদের উপর বাধ্যতামূলক।
বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনই কর্মপদ্ধতি বিষয়ক হুকুমগুলোকে ঢেকে দিয়েছে
বাস্তবতার নিরীখে আমরা দেখতে পাই যে, মুসলিমগন ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং পশ্চিমা কাফেররা এক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিয়ে মুসলিমদের ইসলামের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একারণে মুসলিমরা ইসলামকে পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে যা হল দ্বীনকে জীবন থেকে আলাদা করা। যা পশ্চিমাদের জন্য পরবতীর্ ধাপ নিয়ে কাজ করবার পথকে সুগম করেছে, অর্থাৎ তারা ইসলামী খিলাফতকে ধ্বংস করে মুসলিমদের জীবন থেকে ইসলামকে আলাদা করে ফেলল এবং ৫০ টিরও বেশী ক্ষুদ্র অকার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করে ফেলল। তারপর পশ্চিমারা প্রতিটি রাষ্ট্রে একজন করে তাদের প্রতি আজ্ঞাবহ শাসক বসাল যারা সেসব দেশের সম্পদকে পশ্চিমের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে পাহারা দিতে শুরু করল ও এমন ব্যবস্থা করল যাতে জনগন তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে। তারা এ জনগনকে পরিচালনা করবার জন্য নানা ব্যবস্থা প্রদান করল, প্রচারযন্ত্রেকে তাদের চিন্তা প্রসারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করল, ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে পশ্চিমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করবার জন্য পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করে দিল। এসবকিছু মুসলিমদের উপরে পশ্চিমাদের আধিপত্যকে সুনিশ্চিত করল এবং বাস্তব জীবন থেকে ইসলামকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে সমর্থ হল।
এর ফলশ্রম্নতিতে মুসলিমগন আল হাক্ব বা সত্যের সাথে আল বাতিল বা মিথ্যাকে পার্থক্য করবার ক্ষেত্রে সন্দিহান হয়ে পড়লো। তাদের চিন্তা পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হল এবং তাদের জীবনব্যবস্থা পশ্চিমা মডেল অনুযায়ী গড়ে উঠল যেখানে বৈষয়িক স্বার্থ জীবনের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গী হয়ে উঠল। তাদের আবেগ জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিক আবেগের মিশেলে তৈরি হল। একারণে মুসলিমদের পারস্পরিক বন্ধন ছিন্ন হল। মুসলিমগন নিজেদের কুফর ব্যবস্থার কাছে অর্পন করল এবং ইসলামি রাষ্ট্র না থাকার বিষয়টি মেনে নিল। ফলে ইসলাম কিছু ব্যক্তিসর্বস্ব শরীয়া নিয়মনীতিতে পরিণত হল। অন্যকথায় তখন মুসলিমদের জীবনযাত্রা পশ্চিমাদের আদলে গড়ে উঠল যেখানে জীবন হতে দ্বীন বিচ্ছিন্ন। একারণে দুনিয়ার প্রতি মোহ বৃদ্ধি পেল এবং জান্নাত লাভের আকাঙ্খা তিরোহিত হল।
ফলস্বরূপ আল্লাহর বিধান (গজব) মুসলিমদের উপরে পতিত হল। দারিদ্রতা, জুলুম, বঞ্চণা, দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা, হানিকর নৈতিক চরিত্র ও অসুস্থ সম্পর্ক এসবই মুসলিমদের জীবনকে দূর্বিসহ করে তুলল।
এই বাস্তবতায় সঠিক দলটিকে অসুস্থতার মূল কারণ ও এর উপসর্গসমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে জানতে হবে। যারা এই পার্থক্য করতে পারবে না তারা মনে করে যে, দারিদ্রতাই অসুখের মূল কারণ অথবা অসৎ নৈতিক চরিত্র, অজ্ঞতা ইত্যাদিও হতে পারে। তাই তারা সমস্যা সমাধানের জন্য যখন এগিয়ে আসবে তখন সেই সমাধান হবে আংশিক এবং তিনি রোগের মূল চিকিৎসা বাদ দিয়ে কেবল রোগের উপসর্গের চিকিৎসা করবেন। যদি কোন ব্যক্তি গভীরভাবে মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা উপলদ্ধি করবার চেষ্টা করেন, তাহলে দেখবেন যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণেই মুসলিদের জীবনে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের অনুপস্থিতি ঘটেছে। এই রাষ্ট্র না থাকায় তারা আজ অধপতিত, কাফেররা মুসলিমদের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং অজ্ঞতা, দারিদ্র ও জুলুমের মত উপসর্গসমূহ ব্যাপকতা লাভ করেছে। ইসলামের পূণর্জাগরণ ঘটাতে হলে দলটিকে অনুধাবন করতে হবে যে, মুসলিমরা যে দারুল কুফরে এখন বসবাস করে সেটিকে দারুল ইসলামে পরিণত করতে হবে যেখানে মুসলিমগন কেবলমাত্র ইসলামি আইন কানুন দ্বারা শাসিত হবে। এছাড়াও বর্তমান অৈইসলামি সমাজকে ইসলামি সমাজে পরিণত করতে হবে যেখানের মানুষগুলো ইসলামি চিন্তায় বিশ্বাস করে এবং এই আবেগের উপর ভিত্তি করে একীভূত থাকে। ইসলাম দিয়ে তারা শাসন করে ও বিচারের জন্য ইসলামি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে। আর তখনই ইসলাম পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয়।
এভাবে লক্ষ্য সুস্পষ্ট হয় যা হল ইসলামি আক্বীদার উপর ভিত্তি করে দারুল ইসলাম তথা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা যেখানে মুসলিমগন ইসলামি জীবনব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যার ভিত্তি হলো আল্লাহ কতৃক প্রদত্ত হুকুম পালন ও নিষেধাজ্ঞা বর্জন।
দলটি তার লক্ষ্য নির্ধারণের পর এবার সে লক্ষ্য অর্জনের শরীয়া পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে যা মেনে দলটিকে অগ্রসর হতে হবে। এটা বুঝতে হলে আমাদের রাসূলুল্লাহ (সা) এর মক্কীযুগে ফিরে যেতে হবে যখন সেটা ছিল দারুল কুফর এবং রাসুল (স:) তার দাওয়াতকে জনসমক্ষে আনার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। সেখান থেকেই দলটি তার পথের মাইলফলক, কর্মধারা ও এর বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে ধারণা নেবে।
যারা ত্বারিকা (পদ্ধতি) কে উপেক্ষা করে
যে জন্য আমরা ইসলামকে ফিকরা (চিন্তা) এবং ত্বারিকা (পদ্ধতি) এ দুয়ের সমষ্টি হিসেবে দেখাতে বাধ্য হচ্ছি তা হলো এই যে, এভাবে না দেখার কারণে মুসলিমরা অনেক শরীয়া বিধান বর্জন করছে এই বলে যে আমরা এগুলো অনুসরনে বাধ্য নই। তারা এই অজুহাতও দেখায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) অমুক কাজটি অমুক অবস্থা ও পরিস্থিতির কারণে সেসময় করেছিলেন। তাই, যদি সেগুলো আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে আমরা সেগুলো এখন গ্রহণ করব, অন্যথায় পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোন আইন গ্রহণ করব। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই অনেকে ইসলামের পেনাল কোড পরিবর্তনের জন্য আহ্বান করে কেননা তারা মনে করে এগুলো বর্তমান সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তারা চাবুক মারা, পাথর মারা অথবা হাত কাটা এখন আর গ্রহণযোগ্য মনে করে না যেহেতু তাদের মতে এগুলো অনেক নিষ্ঠুর নিয়মকানুন ও পশ্চিমারা এসবকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা মনে করে কেননা এসব তাদের মনে করিয়ে দেয় তাদের ধর্মের কথা যেখানে মধ্যযুগে কঠিন ও নিষ্ঠুর সব নিয়মকানুনের মাধ্যমে মানুষের উপর জুলুম করা হত, সুতরাং এইসব আইন কানুনের কথা বললে মানুষ ইসলাম থেকেও দূরে সরে যাবে। তাই, এইসব আইন কানুনকে জেল ও জরিমানা দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে কোন অসুবিধা নেই। একইভাবে আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ জিহাদের অবলুপ্তির কথা বলে। ইসলাম প্রসারের জন্য যে জিহাদ এসেছিল তা বর্তমানে বিজ্ঞাপন ও প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। বর্তমান সময় হল সংস্কৃতি বিনিময়ের। যেহেতু ইসলামে রয়েছে প্রামাণ্য দলিলাদি ও পরিষ্কার সত্য, সেহেতু কলম, টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে শক্তিপ্রয়োগের চেয়ে বেশী সুফল পাওয়া যাবে। আর শক্তি প্রয়োগ করা হলে হৃদয়সমূহ রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং ঘৃণা ও অসৎ প্রবৃত্তি জাগ্রত হবে। কেউ কেউ জিজিয়াকে বিড়ম্বনাকর ও দ্রোহাত্নক বলে একে পরিত্যাগ করবার পক্ষে মতামত প্রদান করে। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, ইসলামি আইনে খিলাফত ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক নয়। তারা এমন ফতওয়া প্রদান করেছে যা ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটিয়ে আধুনিক শাসনপ্রথা গ্রহণের যৌক্তিকতাকে দৃঢ় করেছে। তাদের মতে ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা জরুরী , কিন্তু যে কাঠামো তা বাস্তবায়ন করে তা নয়, কেননা এই কাঠামো অনেক ধরনের হতে পারে।
এভাবে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ব্যাপারে অনেক প্রস্তাবনা এসেছে, যেমন: ইসলামী বই লেখা, মসজিদ নির্মাণ করা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, মিশনারী স্কুলের আদলে ইসলামি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, লোকদের নৈতিকতার দিকে আহ্বান করা, সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করা বা গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকারের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা ইত্যাদি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষমতা গ্রহণের পদ্ধতি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে।
এভাবে মুসলিমগন আজকে ফিকরাহর সাথে সম্পৃক্ত শরঈ নীতিমালা অস্পষ্ট ও দ্বান্দিক উপায়ে গ্রহণ করছে। সেকারণে তারা ত্বারীকার সাথে যুক্ত শরীয়া নিয়মকানুনকে অবজ্ঞা করছে। এসবই ঘটেছে একারণে যে, তারা পশ্চিম ধ্যানধারণার শিকার হয়ে ইসলামকে পরিষ্কার ও আইনগতভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফলশ্রুতিতে ইসলামের প্রয়োগকে বুঝতে অসমর্থ হয়েছে।
একারণে ফিকরাহ (চিন্তা) ও ত্বারীকা (পদ্ধতি) এর আলোচনা উঠে আসে যাতে করে মুসলিমগন গুরুত্বপূর্ণ শরীয়া নীতিমালাকে অবহেলা না করে যেগুলো পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও আমাদের বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নের জন্য এসেছে। এইসব হুকুমকে অবজ্ঞা করার অর্থ হল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে পরিত্যাগ করা যা একটি অপরাধ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে এর জন্য আমাদের জবাবদিহী করতে হবে।
সেকারণে আমরা এই শ্রেনীবিন্যাসের মধ্যে এসেছি যে, ‘ইসলাম হল ফিকরাহ (চিন্তা) ও ত্বারীকা (পদ্ধতি) এর সমন্বিত রূপ।’ এর মাধ্যমে ইসলাম আরও স্পষ্ট হয়, বুঝতে সহজ ও প্রয়োগ সরলতর হয়। পূর্বে মুসলিমগন এ ধরনের শ্রেণীবিন্যাস করেছিল, যেমন: ইসলাম হল আক্বীদা ও ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, মাতু’মাত (খাদ্যদ্রব্য) এর নিয়ম, মালবুসাত (পরিচ্ছদ), আখলাক (নৈতিকতা) ও ইবাদত (উপাসনা)। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় এগুলো একসাথে সুবিন্যস্ত ছিলনা। তারপর ফকীহগন এগুলো সংগ্রহ ও সুবিন্যস্ত করেছেন এবং বইয়ের অধ্যায়ে স্থান দিয়েছেন যাতে করে মুসলিমরা খুব সহজে এগুলো অনুধাবন ও প্রয়োগ করতে পারে ইত্যাদি।
এই আলোচনার অবতারণা একারণে করা হচ্ছে যাতে মুসলিমগন সুনির্দিষ্ট শরীয়া নিয়ম এমনভাবে গ্রহণ না করে যে প্রয়োজনে সেগুলো পরিবর্তিত, ও বিকৃত করে ফেলে এবং সবশেষে অবহেলা ও পরিত্যাগ করে।
শরীয়া শাস্তিকে আধুনিক শাস্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা অনুমোদিত নয়, একইভাবে খিলাফতকে রিপাবলিকান পদ্ধতি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যাবে না। পশ্চিমা সিভিল আইন ইসলামি আইনের বদলে গ্রহণ করা যাবে না অথবা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষমতা গ্রহণের পদ্ধতির বদলে নিজস্ব আকল বা নিয়মকানুন মানা যাবে না যদিও এ ব্যাপারে অনেক ফতওয়া দেয়া হয়েছে।
সুতরাং, যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা একটি শরীয়া হুকুম, সেহেতু এটি প্রতিষ্ঠা করবার পদ্ধতিও একইভাবে শরীয়া হুকুম। এর অর্থ হল পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট শরীয়ার অন্যান্য নিয়মকানুনের মত এ ব্যাপারে বিস্তারিত দলিলাদি রয়েছে এবং গ্রহণ করবার জন্য এবং তা থেকে বিচ্যুত না হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
কেউ যদি ফিকাহশাস্ত্রের বইগুলোর দিকে তাকায় তাহলে দেখতে পাবে যে, মুসলিম ফকীহগন সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে উকুবাত (শাস্তি), জিহাদ, ইমারাত বা রাষ্ট্র এবং অন্যান্য পদ্ধতিগত হুকুম আলোচনা করেছেন। প্রয়োজন হয়নি বিধায় কেবলমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পদ্ধতি সেখানে আলোচিত হয়নি। এর কারণ হল কালপরিক্রমায় মুসলিমগন এমন কোন পরিস্থিতিতে উপনীত হয়নি যখন একদিনের জন্যও ইসলামি রাষ্ট্র ছিল না। কিন্তু আজকে মুসলিমদের এটি প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি বের করা ও তা গ্রহণ করবার জন্য সব প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করা উচিত। পরিস্থিতি বিবেচনা করে খেয়ালখুশী বা প্রবৃত্তির ভিত্তিতে নয় বরং এটা হওয়া উচিত শরীয় দলিলাদির ভিত্তিতে।
শরীয়া অনুসারে যখন পদ্ধতি আইনসম্মত হয়ে যাবে তখন আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর আদর্শ সেখানে প্রতিফলিত হবে। যখন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে তখন জবাবদিহীতা ও পরামর্শ প্রদানের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ আমীরসহ দলের যে কোন সদস্যকে তখন জবাবদিহী ও উপদেশ প্রদান করা যাবে। বিষয়সমূহ মানুষের মন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক অথবা জীবনের অভিজ্ঞতার দ্বারস্থ করা যাবে না। কর্মপদ্ধতি কখনওই পরীক্ষামূলক বিষয় হওয়া উচিত নয়, বরং এ ব্যাপারে শুধুমাত্র শরীয়ার দ্বারস্থ হওয়া উচিত।
যে ব্যক্তি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে সে স্বভাবতই এটা করবার শরীয়া পদ্ধতি ও বিস্তারিত দলিল সম্পর্কে জানতে চাইবে। সে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে ও লোকদের সেদিকে আহ্বান করবে। এখন জানা দরকার কী সেই শরীয়া কর্মপদ্ধতি যা একজনকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণ করতে হবে? শরীয়া কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাবার আগে একজন মুসলিমকে অবশ্যই আজকে মুসলিমগন কী ধরনের বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছে তা সুনির্দিষ্ট ও গভীরতার সাথে উপলদ্ধি করতে হবে যাতে করে মৌলিক কার্যকারণ বুঝা যায়। এতে করে মৌলিক কার্যকারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় সমাধান করা যাবে। সেকারণে এই সমাধান হবে মৌলিক। যখন বাস্তবতা অনুধাবনে আসবে ও মৌলিক কার্যকারণ বুঝা যাবে তখন শরীয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজতর হবে। এর পরই দলটি তার শরীয়া কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হবে যা তাকে মেনে চলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহকে অনুসরণ করতে হলে তার জীবনকালের কোন সময় বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা নিকটবর্তী তা বিবেচনায় আনতে হবে।








