Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ইসলামে রয়েছে ফিকরাহ (চিন্তা) এবং তরীকা (পদ্ধতি)

    যখন আমরা আল্লাহর হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য পদ্ধতির কথা চিন্তা করব তখন এ ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়া নিয়মকানুন অনুসন্ধান করব যাতে মুসলিমগন পরম করুণাময়ের কাছ থেকে পূর্ণ সচেতনতা, নির্দেশনা ও হেদায়েতের মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারবে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “বলে দিন: এই আমার পথ। আমি আল্লাহ দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই— আমি এবং আমার অনুসারীরা” (সূরা ইউসুফ: ১১২)

    এটা অবশ্যই বলা উচিত হবে না যে, ‘শরীয়ার প্রকৃতিই এমন যে, এটি যে কোন বিষয়ে একটি হুকুমকে আমাদের সম্মুখে পরিষ্কার ভাবে উপস্থাপন করে এবং তারপর তা কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে তা লোকদের মন, পরিস্থিতি কিংবা, স্বার্থরক্ষার জন্য যে পদ্ধতি সুবিধাজনক হয় তার উপর ছেড়ে দেয়।’ এ থেকে বুঝা যেতে পারে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করাকে আমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন। সুতরাং উম্মাহর প্রচেষ্টা ফরয বাস্তবায়নের দিকে থাকা উচিত। কিন্তু, তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি মুসলমানদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে; এমন দাবী করা কোন অবস্থাতেই ঠিক নয়। কারণ, শরীয়া কোন কিছুই মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়নি এবং তার পছন্দের বশবতীর্ করেনি। যদি করত তবে তা হত শরীয়া মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এমন কোন শরীয়া নীতি নেই যেখানে একটি সমস্যার সমাধান উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু, তা বাস্তবায়নের প্রয়োগযোগ্য পদ্ধতি পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং এইসব সমাধানসমূহ এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যাতে তা বাস্তবায়ন করা যায় ও জীবনের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা যায়। সেকারণে ইসলামের হুকুমসমূহের যদি বাস্তব পদ্ধতি না থাকে তাহলে সেগুলো হবে কেবলমাত্র পুস্তকনির্ভর আদর্শ, লোকদের চিন্তা ও কল্পনার বিষয়বস্তু যেখানে লোকজন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করবে এবং এটা ফলদায়ক হবে না।  

    সেকারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার শরীয়ার মধ্যে লোকদের সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। তিনি মানবজীবনের সাথে সম্পৃক্ত সব ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য ব্যবস্থা প্রদান করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামী আক্বীদা এবং তা থেকে উদ্ভুত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের সব প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা পূরণ করেছেন। সুতরাং ইসলাম স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এতেই থেমে থাকেননি, বরং তিনি শরীয় হুকুমগুলোকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করবার জন্য এবং ইসলামকে অবাস্তব দর্শন বা মামুলী কিছু বিধিনিষেধ হিসেবে মনে না করবার জন্য অন্যান্য নীতিমালা নাজিল করেছেন। সেকারণে রাসূলুল্লাহ (সা) এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন না যিনি কেবলমাত্র স্রষ্টার বার্তাবাহক, বরং তিনি একজন শাসক ও আল্লাহর হুকুমসমূহের বাস্তব প্রয়োগকারীও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) কেবলমাত্র এ বিষয়টি পরিষ্কার করেননি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে শুধুমাত্র উপাসনা করতে হবে, বরং তিনি সেটা বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। তিনি লোকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানিয়েছেন এবং সাহাবীদের দলটিকে নিয়ে মক্কায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের জন্য কাজ করেছেন। অবশেষে তিনি ঈমানের ভিত্তিতে সে রাষ্ট্রটি বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছিলেন—যা ইসলামকে বাস্তবায়ন করেছিল এবং ইসলামি আক্বীদা ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যারা গিয়েছিল তাদের শাস্তি দিয়েছিল। তিনি (সা) দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। একারণে আমাদের কাছে ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য নিয়মকানুন রয়েছে, কিভাবে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে সে ব্যাপারেও নির্দেশনা রয়েছে, রয়েছে উকুবাত (শাস্তি) এর হুকুম, জিহাদের হুকুম, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদানের জন্য নিয়মকানুন রয়েছে। এসবই বাস্তব পদ্ধতিগত শরীয়া হুকুম যা শরীয়া দিয়েছে আক্বীদা ও ব্যবস্থাকে রক্ষা করবার জন্য, পরিচালনার জন্য, প্রসারের নিমিত্তে কাজ করবার জন্য এবং এগুলোকে শাশ্বত রূপ দিতে আহ্বান জানাবার জন্য।  

    যদি এসব শরীয়া নীতিমালার মাধ্যমে আক্বীদা ও ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, সংরক্ষণ ও প্রসারের ব্যবস্থা না থাকত তাহলে ইসলাম হত অবরুদ্ধ এবং এটি আমাদের কাছে পৌছাত না এবং প্রসারও লাভ করত না। এটা খ্রীস্টান ধর্মের মত নিছক নীতিকথা সর্বস্ব হত। যেমন: “তোমরা ব্যভীচার করো না এবং প্রতিবেশীর স্ত্রীর প্রতি লোভ করো না”। ইসলাম তখন অন্যান্য ব্যবহারিক চিন্তা দ্বারা ধ্বংস হয়ে যেত বা সমূলে উৎপাটিত হত এবং এটা দিয়ে এমন কিছু করা যেত না যা এর আওতাধীন নয়। অন্যান্য চমকপ্রদ চিন্তার মত এটাও ইতিহাসের পাতায় পুস্তকের গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, যেমনি আছে প্লেটোর “The Republic”।

    উদাহরণস্বরূপ, যেহেতু যিনা ইসলামে হারাম, সেহেতু এর সাথে যুক্ত আরেকটি শরীয়া হুকুম এ অবৈধ সম্পর্ককে বাস্তবে প্রতিরোধ  করে, এবং তাহলো যিনাকারীকে শাস্তি প্রদানের হুকুম, আর এটি বাস্তবায়ন করবে ইসলামী রাষ্ট্র। সুতরাং শরীয়া যিনা সম্পর্কে হুকুম প্রদান করেছে, যেমন আল্লাহ বলেন,

    ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২) 

    তাছাড়া তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যিনাকারীর শাস্তি সম্পর্কেও সুস্পষ্ট হুকুম প্রদান করেন যখন তিনি বলেন,

    ‘ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ করে বেত্রাঘাত কর।’ (সূরা আল নূর: ২)

    তাছাড়া শরীয়া এই হুকুম (শাস্তি) বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীল কতৃপক্ষও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘মুসলিমদের উপর হুদুদ বাস্তবায়ন যতটা সম্ভব কম করবার চেষ্টা করো। যদি তুমি তাকে কোনভাবে বাচিয়ে দিতে পার তবে তাই কর। একজন ইমামের পক্ষে শাস্তি প্রদানে ভুল করবার চেয়ে ক্ষমায় ভুল করা অনেক শ্রেয়।’ (তিরমিযী এবং আল হাকীম)

    সুতরাং শরীয়া ইমামকে এ দায়িত্ব প্রদান করেছে।

    একই কথা সালাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শরীয়া এটা পরিষ্কার করেছে যে, সালাত ফরজ এবং কেউ তা পরিত্যাগ করলে কী শাস্তি হবে। এক্ষেত্রেও এই শাস্তি বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রকে দায়িত্ব দিয়েছে। এভাবে ইসলামের যে কোন হুকুমের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের পদ্ধতিও অন্য একটি হুকুমের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমামকেই এ ব্যাপারে কতৃর্ত্ব প্রদান করা হয়েছে।  

    পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, ইসলামের রয়েছে একটি মৌলিক বিশ্বাস—যা হতে অন্যান্য শাখা বিশ্বাস ও চিন্তা সমূহ উৎসারিত হয়। তাছাড়া এমন চিন্তাসমূহ রয়েছে যা ভাল (খায়ের) ও মন্দকে (শর), হাসান (সুন্দর ও প্রশংসনীয়) এবং কুবহ (অসু্ন্দর ও নিন্দনীয়) কে, মারুফ ও মুনকারকে, হালাল (অনুমোদিত) ও হারামকে (নিষিদ্ধ) সুস্পষ্ট করে। এর ইবাদত (উপাসনা), মু’আমালাত (লেনদেন), মাতু’মাত (খাদ্যদ্রব্য), মালবুসাত (পরিচ্ছদ), আখলাক (নৈতিকতা)এর ব্যাপারে শরীয়া নীতিমালা রয়েছে। এগুলো সবই একটি ইসলামি ও মানবিক সমাজে বসবাসের জন্য অপরিহার্য। ইসলাম যে সমাজের দিকে মানুষকে আহ্বান করে তা সম্পর্কে এগুলো স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করে। এইসব বিশ্বাস, চিন্তুা ও নিয়মকানুনকে আল ফিকরাহ আল ইসলামিয়া (ইসলামি চিন্তা) বলা হয়।    

    শরীয়া নিয়মকানুন যা ইসলামী ফিকরাহকে পূর্ণতা দান করে ও তা প্রতিষ্ঠিত করে, রক্ষা করে ও প্রসার ঘটায় এগুলো হল: শাস্তির বিধান, জিহাদের বিধান, খিলাফতের বিধান, শরীয়ার যে বিধানের কারণে ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয় এবং মারুফ সম্পাদন ও মুনকার নিষিদ্ধ করবার বিধান। এসব সহায়ক শরীয়া বিধিবিধানকে আত তারিকা আল ইসলামিয়া (ইসলামি পদ্ধতি) বলা হয়।  

  • কীভাবে একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠন তৈরী করতে হয়

    একটি সংগঠন বা দল তার শরীয়া লক্ষ্য অর্জনের জন্য শরীয়ার কোন পদ্ধতিকে অনুসরণ করবে?

    এই লক্ষ্যকে উপলদ্ধিতে আনবার জন্য দলটি কী ধরনের শরীয়া নীতিমালা মেনে চলবে?

    দাওয়ার সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক শরীয়া নিয়মের বেলায় দলটির উপলব্ধির ক্ষেত্রে মানদন্ড ও নীতিমালা কি হবে?

    শরীয়া নিয়মনীতিকে দলটি কীভাবে দেখে? এর উৎসসমূহ কী? দলটি কী মনে করে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার একাধিক হুকুম আছে? শরীয়া যেসব বিষয়ে ইক্বতিলাফ বা অনৈক্য রয়েছে সেসব ব্যাপারে দলটির অবস্থান কী?

    চিন্তাকে দলটি কীভাবে দেখে এবং আক্বীদা ও শর’ই হুকুমসমূহ গ্রহণ করবার ক্ষেত্রে চিন্তার ভূমিকা কী?

    বাস্তবতার ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী কী? দলটি কী একে চিন্তার উৎস বা চিন্তার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে?

    লাভের (মাসলাহা) প্রশ্নে দলের অবস্থান কী এবং এটি কী শরীয়া না মনের ভিত্তিতে গৃহীত হয়?

    আমরা যখন দলটির লক্ষ্য, এর কাজ, কাজের পদ্ধতি, চিন্তার প্রক্রিয়া সংজ্ঞায়িত করতে পারব, তারপর খুব সহজেই এর কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠার ভিত্তি জানতে পারব। এরপর আমরা জানতে পারব যদি দলটি পথভ্রষ্ট বা লক্ষ্যচ্যূত হয় তখন কী সংশোধনমূলক পদক্ষেপ বা উপদেশ প্রদান করতে হবে।

    কাজ করবার শরীয়া পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমরা নিজেদের এমন একটি মূলনীতি মনে করিয়ে দেব যে বিষয়ে কারোই অজ্ঞ থাকা সঙ্গত নয়। তা হলো এই যে, মানুষের সম্পর্কে দুনিয়ার কোন ব্যপার হোক বা আখেরাতের কোন ব্যপার হোক অথবা তাদের  ভাল মন্দের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে যত বড় বা বিষয় হোক কোন ব্যাপারেই শরীয়া কোন হুকুম বাদ রাখেনি। সুতরাং মানুষের কাপড় পরিধান বা খোলা, মসজিদ বা বাড়ীতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে প্রস্থান করা, অন্যের সাথে আচরণ, বিয়ে করা, সালাত আদায়, সাওম পালন, কথা বলা বা কাজ করা সব বিষয়ে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে হুকুম প্রদান করেছেন এবং কাজটি সম্পন্ন করবার পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছেন। কাজটি কী বাধ্যতামূলক নাকি বর্জনীয় অথবা মুস্তাহাব বা উৎসাহব্যঞ্জক অথবা অপছন্দনীয় যা থেকে সে বিরত থাকবে নাকি এটি মুবাহ যে ব্যাপারে ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ রয়েছে। এটা মানুষের সব কাজের সাথে সম্পৃক্ত। কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কেও ধারণা দেয়া হয়েছে যদিও এ ব্যাপারে রয়েছে ভিন্নরকমের দৃষ্টিভঙ্গী। আর তা হল সব বস্তুই হালাল সেগুলো ব্যতিত যাদের ব্যাপারে শরীয়ার সুনির্দিষ্ট আপত্তি রয়েছে। সুতরাং এমন কোন কাজ বা বস্তু নেই যেগুলোর বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কোন হুকুম নেই। এটা নিম্নোক্ত দুটি শরীয়া মূলনীতি অনুসারে,

    ‘কাজের ভিত্তি হল শরীয়া নীতিমালা’ এবং

    ‘বস্তু ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল যতক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যাপারে শরীয়ার কোন আপত্তির ব্যাপারে দলিল না পাওয়া যায়।’

  • ইসলামের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতির অপরিহার্যতা

    উপরোক্ত আয়াতে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের অপরিহার্যতা ছাড়া অন্য কোন কিছুর কথা বলা হয়নি। এটি দলের সাধারণ প্রকৃতি ও এর কাজ সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছে। কোন মারুফাত প্রতিষ্ঠা এবং মুনকারাতের মূলোৎপাটিত করার জন্য কাজ করতে হবে তা স্থির করার বেলায় দলটি যে বাস্তবতায় কাজ করবে তার সাথে সম্পর্কযুক্ত যাকে বুঝে নিয়ে দলটি সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় শর’ঈ হুকুম গ্রহণ করবে যাতে করে এই বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা যায়। সুতরাং এই আয়াতের সাথে মিল রেখে যে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং শাসককে জবাবদিহী করবার জন্য কাজ করছে—তার কাজ ও এর দৃষ্টিভঈী কাজের বাস্তবতার সাথে সম্পর্কযুক্ত হবে: তারা শাসকের কাজ পর্যবেক্ষণ করবে ও অবহেলার জন্য সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ও সত্য দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকবার নিমিত্তে তাকে জবাবদিহী করবে, জনগনের মধ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টি করবে এবং শাসকের সাথে ইসলামের দাওয়াত প্রসারের জন্য কাজ করবে। আয়াতের ভিত্তিতে গড়ে উঠা দলটি, যখন কোন খলিফা বা খিলাফত নেই, তখন তার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সংশ্লিষ্ট সকল শরীয়া নির্দেশনা গ্রহণ করবে। শরীয়ার চাহিদা অনুসারে দলটি তার লক্ষ্য নির্ধারণ করবে এবং অত:পর যে পদ্ধতিতে এটি কাজ করবে ও যে চিন্তাকে ধারণ করবে তাকে সুনির্দিষ্ট করবে।

    সুতরাং রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুন একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব অপরিহার্য। দলটির লক্ষ্য, এর কাজ, চিন্তা বিকাশের প্রক্রিয়া ইত্যাদি বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত।

    যেহেতু এখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে আল্লাহর আইন দিয়ে মুসলিমদের শাসন করবার জন্য কোন খলিফা নেই এবং যেসব ভূমিতে মুসলিমগন বসবাস করেন সেগুলো দারুল কুফর, যেসব ব্যবস্থা ও সম্পর্ক দিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো ইসলামকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেনি, সমাজ অৈইসলামি; সেহেতু এমন একটি দলকে থাকতে হবে যাদের কাজ হবে ভূমিসমূহকে দারুল ইসলামে পরিণত করবে, সমাজকে ইসলামী করবে, এমন একটি অবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটাবে যেখানে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধিবিধান অনুসারে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে অর্থাৎ ইসলামি জীবনব্যবস্থার পূণপ্রবর্তন হবে এবং বিশ্বের কাছে দাওয়াত পৌছে দেবে। আর এ লক্ষ্যকে উপলদ্ধি করেই দলটি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

  • দলটির বৈশিষ্ট্য

    খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজের মাধ্যমে যারা পূণার্ঙ্গ ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে এরকম একটি দল থাকা শরীয়াগতভাবে বাধ্যতামূলক। নীচের প্রসিদ্ধ আয়াতের মাধ্যমে এটা অনুধাবন করা যায়:

    ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকবে যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সূরা আল ইমরান: ১০৪)

    উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলমানদের এটা সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা করে দিয়েছেন যে, তাদের মধ্যে কমপক্ষে একটি ইসলামী দল থাকতে হবে যারা মানবজাতিকে কল্যাণের দিকে ডাকবে ও সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজের ব্যাপারে নিষেধ করবে। 

    আদেশ সূচক নির্দেশটি হল:

    ‘এমন একটা দল থাকবে’ যা একটি বাধ্যবাধকতা, কারণ এটা কল্যাণের দিকে আহ্বান, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধের জন্য।

    ‘তোমাদের মধ্যে’ (মিনকুম) এখানে অংশগ্রহনকারী আদেশ (তাবিদ), শরঈ নির্দেশনা (ক্কারিনা) থাকবার কারণে যা বুঝায় যে, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। তবে এটা সবার জন্য প্রয়োগ হবে না। কেননা এর জন্য এ বিষয়ে জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক—যা সবার মধ্যে বিদ্যমান নেই। তাই ‘উম্মাহ’ শব্দটি মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দলের কথা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে—পুরো উম্মাহর কথা বলা হয়নি। নির্দেশটি হল মুসলিমদের মধ্য হতে অবশ্যই একটি ইসলামী দল থাকতে হবে। উম্মাহ শব্দটিকে পবিত্র কুরআনে ‘এক দল লোক’ অর্থে বুঝানো হয়েছে। যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসা (আ) সম্পর্কে বলেন:

    ‘যখন তিনি মাদইয়ানের কুপের ধারে পৌঁছলেন, তখন কুপের কাছে একদল লোককে (উম্মাতান) পেলেন তারা জন্তুদেরকে পানি পান করানোর কাজে রত।’ (সূরা আল কাসাস: ২৩) 

    এখানে যে কোন দলের কথা বলা হয়নি বরং মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দলের কথা বলা হয়েছে যাদের এই আয়াতেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে খায়ের তথা ইসলামের দিকে আহ্বান জানাবার এবং সৎ কাজের (মারুফ) আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের (মুনকার) নিষেধের জন্য। এই বর্ণণার মধ্যে শাসকগনও রয়েছে। কারণ তারা সব মারুফ বা সব মুনকার কাজের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তারা হয় লোকদের ইসলাম বা শরীয়া দিয়ে শাসন করে অথবা এগুলোকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করে এবং তখন তাদের জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দলটি রাজনৈতিক হবে। কারণ এর কাজ শাসকদের [জবাবদিহীতার] সাথে সংশ্লিষ্ট হবে। এই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে শরীয়া প্রদত্ত পদ্ধতি অনুসারে যদি তা বিদ্যমান না থাকে এবং অতপর তাদের অবহেলা ও পথভ্রষ্টতার জন্য জবাবদিহী করতে হবে এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) অনেক হাদীসে এই ফরয ও শাসকদের মধ্যকার সম্পর্ক নিরূপন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, 

    “ঐ সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অতি সত্বর আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাাহ্র শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা।” (আহমাদ ও তিরমিযী)

    তিনি (সা) আরও বলেন,

    ‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।’ (ইবনে মাজাহ ও নাসায়ী)

    তিনি (সা) আরও বলেন,

    “শহীদদের সর্দার হামযা এবং ঐ ব্যক্তিও, সে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে উপদেশ দেওয়ার পর (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে ফেলে।” (হাকিম)

    এছাড়াও রাসূল (সা) বলেন,

    “তোমরা আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা”

    এবং তিনি বললেন,

    ‘‘দ্বীন হল নসীহা বা উপদেশ প্রদান’। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ’কার প্রতি, ইয়া রাসূলুল্লাহ!’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর প্রতি, তার রাসূল, মুসলিম শাসকগন ও তার অধীনস্ত জনগনের প্রতি।’ (মুসলিম)

    একারণে দলটির কাজ হল কল্যাণের দিকে ডাকার পাশাপাশি সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। এর একটি অংশ হল শাসকদের জবাবদিহীতার মুখোমুখি করা এবং শরীয়া অনুসারে শাসন করতে বাধ্য করা। শাসকের সাথে কাজটি সম্পৃক্ত হওয়ায় এটি একটি রাজনৈতিক কর্মকান্ড। সেকারণে এই আয়াতটি ইসলামের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের উপস্থিতির কথা বলে

    বাস্তবতা হল শরীয়ার নিয়মকানুনসমূহের অস্তিত্বের জন্য একজন খলিফার অপরিহার্যতা একটি শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। একারণে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজটিও শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। আর এই কাজের জন্য একটি দল বা সংগঠনের প্রয়োজনীয়তাও একটি শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। কারণ শরীয়ার মূলনীতি হল, ‘ওয়াজিব পালনের জন্য যা করতে হয় তাও ওয়াজিব।’ (মা লা ইয়াতিম্মুল ওয়াজিব ইল্লা বিহী ফাহু’ওয়া ওয়াজিব)

    মূলত: উপরোক্ত মাদানী আয়াতে ইসলামের ভিত্তিতে গঠিত হওয়া একটি রাজনৈতিক দল থাকবার অপরিহার্যতার কথা বলা হয়েছে। এই আয়াত কাজের প্রকৃতিকেও সংজ্ঞায়িত করেছে: যা হল দাওয়াত, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। সে কারণে সুনির্দিষ্টকারী প্রত্যয় ‘আল’ শব্দ উল্লেখিত হয়েছে। ‘আল খায়ের’, ‘আল মারুফ’ এবং ‘আল মুনকার’ হল সুনির্দিষ্টকারী প্রত্যয় যার সার্বজনীনতা উপলদ্ধি করতে হবে। আর, প্রকাশভঙ্গি অনুসারে এই নির্দেশ প্রত্যেক ব্যক্তিকে বুঝিয়েছে এবং বাস্তবায়ন অল্প বা অনেক লোকের মাধ্যমে হতে পারে। সুতরাং এর মধ্যে ব্যক্তি, দল ও শাসকগন তথা সংশ্লিষ্ট সবাই অন্তর্ভুক্ত । অল্প না অনেক—এটি নির্ধারিত হবে শরীয়া এবং দল যা প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য কাজ করছে তা অনুসারে। ব্যক্তিগত ইচ্ছার অধীনে অস্পষ্টভাবে এটি হওয়া সম্ভব নয়। বরং এটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যদি এটি পরিত্যক্ত হয় তাহলে কাজ হওয়া উচিত সংশোধনমূলক, দলকে উপদেশ দিতে হবে যাতে তারা ভ্রান্তিকে স্পষ্ট দেখতে পায় ও পরিত্যাগ করে। সুতরাং এই বিষয়টিও অন্যান্য বিষয়ের মতই শরীয়া দ্বারা নিরূপিত। প্রবৃত্তি, স্বেচ্ছাচারীতা, পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর এটি ছেড়ে দেয়া হয়নি।  

  • ৩য় অধ্যায়: দাওয়াত বহনকারী একটি দল বর্তমান থাকার অপরিহার্যতা

    শরীয়াহ প্রদত্ত দায়িত্ব হিসেবে দলটি সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আমরা এখানে এমন কোন দলের দায়িত্ব নিয়ে আলোকপাত করব না যা আংশিকভাবে শরীয়াহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে, যেমন: দরিদ্র মুসলিমদের সাহায্য করবার জন্য গড়ে উঠা দাতব্য প্রতিষ্ঠান, নির্দেশনা ও উপদেশ দেবার জন্য গড়ে তোলা সংগঠন, মসজিদ নিমাের্ণর জন্য প্রতিষ্ঠান, কুরআন শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। বরং আমরা এমন একটি দল নিয়ে কথা বলব যারা পুরো দ্বীন বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাধে তুলে নেবে। আর এটা করা হবে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যা মুসলিমদের জীবনে ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে। এর দায়িত্ব হবে শরীয়াহ প্রদত্ত সব মারুফাত বাস্তবায়ন করা ও সব মুনকারাতকে দূরীভূত করা। এই রাষ্ট্র তার ভেতরে ইসলামকে বাস্তবায়ন ও এর বাইরে পুরো বিশ্বে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে ইসলামকে জীবনে বাস্তবায়ন করবে।

    ইসলামী রাষ্ট্রের রয়েছে শরীয়াহ প্রদত্ত বিশাল দায়িত্ব যা ইসলামি রাষ্ট্রের উপস্থিতি বাস্তবায়িত থাকলে হয় ও অনুপস্থিতি থাকলে বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিত্যক্ত হয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত দল গঠনের গুরুত্ব তার এই লক্ষ্যের কারণেই। ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে যদি কোন দল রত না হয় তাহলে মুসলিমগন আল্লাহ প্রদত্ত সব ইসলামী গুরুদায়িত্বকে অবহেলা করল এবং এর চেয়ে বড় কোন গুনাহের কাজ আর কিছু হতে পারে না।    

    যখন কোন মুসলিম ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে না তখন কোন যিনাকারী যখন যিনা করে, চোর চুরি করে, শাসক অত্যাচার করে, নারীরা অর্ধনগ্ন অবস্থায় রাস্তায় বের হয়, দূনীর্তি ব্যাপকতর হয়, জিহাদ বন্ধ হয়ে যায়, কাফেররা মুসলিমদের অত্যাচার করে, মুনকার বি¯তৃতি লাভ করে এবং মারুফ সংকীর্ণ হয়ে যায় তখন তার গোনাহ ঐ মুসলিম ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। এর কারণ হল মুসলিমরা আল্লাহ নির্দেশিত খোলাফায়ে রাশেদীন প্রতিষ্ঠার কাজকে অবহেলা করবার কারণে এই মুনাকারাতসমূহ ব্যাপকতা পেয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রত্যেকটি জিনিসকে তার নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করবে, মুসলিমদের জীবনে শরীয়াহকে বাস্তবায়ন করবে, ঈমানকে মুমিনদের হৃদয়ে প্রোথিত করবে এবং তাকওয়া ও ইহসানের ফলকে আবাদ করবে। সুতরাং এই সামষ্টিক কাজটি একটি বাধ্যবাধকতা—যার মাধ্যমে শোচনীয় অবস্থার পরিবর্তন ও এর সংশোধন নির্ভরশীল। এই বাধ্যবাধকতা উম্মাহকে তার পতনের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলবে এবং পথের দিশাপ্রাপ্ত ও অন্য জাতির জন্য আলোর দিশারীরূপে হারানো গৌরব ও ক্ষমতা পুণরুদ্ধার করবে।

    আজকের এ করুণ পরিণতি থেকে উদ্ধার করবে যে বাধ্যবাধকতা, তার চেয়ে বড় পুরষ্কার মুসলিমদের জন্য আর কী হতে পারে? এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘আল্লাহ যখন তোমাদের দ্বারা কোন ব্যক্তিকে হেদায়াত দান করে তখন তা লাল উটের চেয়েও উত্তম।’ (আল বুখারী)

    মুসলিমদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করা ও তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, আর এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রশান্তিদায়ক দ্বীনে প্রবেশের জন্য লোকদের জন্য সব দরজা উন্মুক্ত করার চেয়ে উত্তম কাজ আর কী হতে পারে। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এক ব্যক্তিকে জিহাদের সমতুল্য কোন কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তিনি বললেন, 

    ‘‘না, আমি এর সমতুল্য কোন কিছুকেই মনে করি না।’ তখন তিনি (সা) ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যখন একজন মুজাহিদ জিহাদের জন্য বেরিয়ে পড়ে তখন কি তুমি মসজিদে প্রবেশ করে ক্বিয়াম করতে থাক, কিন্তু ক্লান্ত হও না? রোজা রাখ কিন্তু ইফতার কর না?’ লোকটি তখন বলল, ‘এগুলো না করে কে থাকতে পারে?’’ (বুখারী) 

    রাসূল কী বলেননি,

    ‘সর্বোত্তম জিহাদ হল অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা।’

    রাসূল (সা) কী একথা বলেননি,

    ‘শহীদদের সর্দার হামযা এবং সেই ব্যক্তি যে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের জন্য দাড়াল এবং তাকে হত্যা করা হল।’ (আল হাকীম)

    মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে নীরব থেকে তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে দেয়া কোন মুসলিমের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি নীরব থাকে তাহলে সে তো হাদীসের বর্ণণার মত হতে পারবে না, যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন,

    ‘…. তারা একটি দেহের মত, যখন এর একটি অংশ ব্যাথা পায় তখন পুরো দেহ তাতে সাড়া দেয় ও জ্বর অনুভব করে ও নিঘূর্ম রাত কাটায়।’ (মুসলিম)

    ‘…. এমন একটি প্রাসাদ যেখানে একজন আরেকজনকে শক্তিশালী করে।’

    সুতরাং মুসলিমদের সামনে রয়েছে মহাপুরস্কার অথবা বিশাল পাপ উভয় সুযোগ। আর এটাই ইসলামে (কোন কিছু) ফরয হবার শর্ত। এটি অন্যান্য ফরযের মতই। যখন মুসলিমগন এটা পালন করবে তখন পুরষ্কারপ্রাপ্ত হবে এবং যখন পরিত্যাগ করবে তখন শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।

    আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমরা কোন আংশিক সামষ্টিক ইবাদতের কথা বলছি না যা ইসলামের একটি বা দু’টি হুকুম বাস্তবায়ন করবে। বরং আমরা এমন একটি দাওয়াতের কথা বলছি যা ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে।

  • শাসকদের জবাবদিহী করা

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃক প্রদত্ত ও ব্যাখ্যাকৃত শরীয়া কেবলমাত্র কিছু চিন্তার সমষ্টি নয়, বরং আইনপ্রণেতা এসবকে বাস্তবিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। সেকারণে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বাস্তব হুকুমসমূহ উপস্থাপন করেছেন যাতে এগুলো বাস্তবে অস্তিত্বশীল হয় এবং যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা যাতে বর্জিত হয় ও এসবের বাস্তবায়নের পদ্ধতি হিসেবে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বাতলে দিয়েছেন। শরীয়াকে রক্ষার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাসকদের জন্য আইন দিয়েছেন ও তাকে নির্দেশ এবং বিধিনিষেধ দিয়েছেন যাতে সে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করে ও এর রক্ষক হয়। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) উম্মাহকে শাসকের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকে অবহেলার ক্ষেত্রে জবাবদিহী করতে বলেছেন। ব্যক্তি ও দল উভয়ক্ষেত্রে উম্মাহর কাছ থেকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এটা দাবী করেছেন। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

    “শহীদদের সর্দার হামযা এবং ঐ ব্যক্তিও, সে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে উপদেশ দেওয়ার পর (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে ফেলে।” (হাকিম)

    তিনি (সা) আরও বলেন:

    “অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।” (তিরমিযী)

    তিনি (সা) আরও বলেন:

    ‘আল্লাহর কসম! তোমাদেরকে সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও  অসৎ কাজে নিষেদ প্রদান করতে হবে এবং অত্যাচারী শাসকের হস্তদ্বয় চেপে ধরতে হবে এবং সত্যের ব্যাপারে তাকে বাধ্য ও এর মধ্যে তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।’ (আবু দাউদ ও তিরমিযী)

    সত্যের ব্যাপারে শাসককে বাধ্য ও সত্যের মধ্যে তাকে সীমাবদ্ধ রাখা শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ এ কাজ কোন ব্যক্তি করতে পারবে না এবং এর জন্য অবশ্যই একটি দল প্রয়োজন।

    সাহাবা এবং ইসলামী ফকীহগন একথা নিশ্চিতভাবে জানতেন যে, এ কাজের জন্য ইসলামী রাষ্ট্র হল পূর্বশর্ত। এ রাষ্ট্র অস্তিত্বশীল হলে হুকুমসমূহ বাস্তবায়িত হয়, অন্যথায় সেগুলো হয় না। যখন আবু বকর (রা) কে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সর্ম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘কীভাবে এটি অব্যাহত থাকবে?’ প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত ইমামগন সঠিক পথে থাকবে।’ শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া আল ফাদিল হতে ইয়াদ এবং আহমাদ বিন হাম্বল’ থেকে বরাত দিয়ে বলেন, ‘যদি এমন কোন দোয়া থাকে যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা গ্রহণ করবেন, তিনি তা রেখেছেন সুলতান বা শাসকদের জন্য।’

    ইসলাম সবার জন্য একটি জীবনব্যবস্থা। এর মধ্যে গোটা মানবজাতির জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এর বিশ্বাসসমূহ সার্বজনীন এবং এর ব্যবস্থাপনাও। বিশ্বের দরবারে বহন করবার জন্য এর রয়েছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা দ্বারা ইসলাম বাস্তবায়ন ও দাওয়াতী কাজ করবার একটি পদ্ধতি। এ থেকে বুঝা যায় ইসলামি রাষ্ট্র এর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য কতটা অপরিহার্য। সুতরাং এর কাজ কী? কে রাষ্ট্রের কার্য সম্পাদন করবে যদি তা অস্তিত্বশীল না হয়? কে তাকে সঠিক পথের দিশা দেখাবে যদি তা পথভ্রষ্ট হয়?

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃক রাষ্ট্রের উপর অর্পিত দায়িত্ব হল ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। সুতরাং রাষ্ট্রের কাজ হল দ্বীন বাস্তবায়ন করা-হোক তা ব্যক্তিপর্যায়ের বা সামষ্টিক নিয়মনীতি অথবা ব্যক্তিপর্যায়ের বা সামষ্টিক বাধ্যবাধ৩কতা। দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য এটি দায়িত্বশীল, অর্থাৎ বাস্তবে মারুফ সম্পাদন ও মুনকার অপসারণ করা। যেমন: যদি কোন মুসলিম সালাত আদায় না করে তাহলে রাষ্ট্র তাকে তা করতে নির্দেশ প্রদান করবে; অন্যথায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একইভাবে সে যদি যাকাত প্রদান না করে, হজ্জ পালন না করে বা সাওম পালন না করে অথবা এজাতীয় ব্যক্তিপর্যায়ের বাধ্যবাধকতা পরিত্যাগ করলে রাষ্ট্র এগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করবার দায়িত্ব নেবে এবং নিয়মভঙ্গকারীকে জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসবে। একই কথা সামষ্টিক বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি রাষ্ট্র উম্মাহর জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয় অধিকার সমূহ প্রদান না করে, যেমন: চিকিৎসা, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং অন্যান্য-যেগুলোর জন্য ব্যবস্থাপনা, সমন্বয় ও বন্টন জরুরী সেগুলোর ব্যাপারে তিনি জবাবদিহীতার মুখোমুখি হবেন। একই কথা যেসব বাধ্যবাধকতা জনগনের মধ্যে বি¯তৃত থাকে যেমন: জিহাদ এবং ইজতিহাদ এবং যেগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা খলিফাকে দায়িত্ব ও নির্দেশ প্রদান করেছেন-সেগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আইনপ্রণেতা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছেন। প্রকাশ্য কুফর প্রদর্শন ব্যতিরেকে খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা মুসলমানদের জন্য স্রষ্টা নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন।

    ইসলামি রাষ্ট্রে মৌলিক বিষয় হচ্ছে শরীয়া আইনের ব্যাপারে শাসক হলেন অভিবাবকতুল্য। শরীয়া অনুসারে তিনি হলেন ব্যক্তি বা সামষ্টিক পর্যায়ের যে কোন মুনকারাত প্রতিহত করবার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তি। একারণে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

    ‘ইমাম হলেন রাখাল এবং তিনি তার জনগনের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।’ (মুত্তাফিকুন আলাইহি)

    ব্যক্তি বা সামষ্টিক পর্যায়ে আল্লাহ প্রদত্ত সব নির্দেশনার ব্যাপারে লোকদের বাধ্য করবার ক্ষমতা দিয়ে আল্লাহ শাসকদের দায়বদ্ধ করেছেন। যদি কোন কাজ করবার জন্য বলপ্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে তাহলে খলিফার অধিকার রয়েছে তা করবার। একইভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন লোকদের হারাম করা থেকে নিবৃত করবার জন্য। আর এই নিবৃত করবার জন্য যদি বলপ্রয়োগের প্রয়োজন পড়ে তাহলে তাকে তাই করতে হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্র মুনকারকে বলপূর্বক বা হাত দিয়ে প্রতিহত ও প্রতিরোধ করে। এর কারণ হল শরীয়া অনুসারে, রাষ্ট্র ইসলাম বাস্তবায়ন এবং লোকদের ইসলামী আইন কানুন মানতে বাধ্য করবার ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

    যদি শাসকগন কোন মুনকার করে, যেমন: অবিচার করা, অন্যের সম্পদ অসুদপায়ে জবরদখল করা, জনগনের অধিকার ভূলুন্ঠিত করা, নাগরিকদের অধিকার অবহেলা করা, কোন ফরয সম্পাদনের ব্যর্থ হওয়া, ইসলামের কোন আইনের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়া কিংবা এ জাতীয় কোন মুনকার-তখন সব মুসলিমের উপর ফরয হয়ে যায় তাকে জবাবদিহী করা ও তার মুনকারগুলোকে প্রত্যাখান করা, ব্যক্তি বা দল হিসেবে তার কাজের পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। অন্যথায় তারা নীরবতা পালন করলে এবং মুনকার পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করলে সবাই গোনাহগার হবে।

    যখন শাসক কোন মুনকার করে তখন সেই মুনকারে বাধা প্রদান করা বা তা পরিবর্তন করার উপায় হচ্ছে কথার মাধ্যমে তাকে জবাবদিহী করা । উম্মে সালামা থেকে মুসলিম বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘তোমাদের উপর যারা আমীর নিযুক্ত হবে তারা ভাল কাজ করতে পারে আবার মন্দ কাজও করতে পারে। যারা তাদের মন্দ কাজকে ঘৃণা করবে তারা দায়মুক্ত হবে, যারা সেগুলোকে প্রত্যাখান করবে তারাও নিরাপদ; কিন্তু যারা সেগুলো গ্রহণ করবে বা অনুসরণ করবে তারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।’ (মুসলিম)

    রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে ইবনে মাসউদও অনুরূপ বর্ণণা করেন,

    ‘আল্লাহর কসম, তোমাদেরকে অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজে নিষেধ করতে হবে এবং অত্যাচারী শাসকদের হাত চেপে ধরতে হবে ও সত্যের পথে ফিরে আনবার জন্য তাকে জোর করতে হবে ও সত্যের মধ্যে তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।’

    অন্য একটি বর্ণণায় এ ব্যাপারে বলা হয়,

    ‘অন্যথায় আল্লাহ তোমাদের মধ্য হতে কিছু লোক দ্বারা অন্যদের হৃদয়ে আঘাত করবেন। তারপর তিনি তোমাদের অভিসম্পাত করবেন যেমনি তিনি তাদের করেন।’ (আবু দাউদ)

    একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলাকে সর্বোত্তম জিহাদ বলেছেন। যখন একজন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোন জিহাদ সর্বোত্তম?’ প্রত্যুত্তরে তিনি (সা) বললেন,‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।’ (ইবনে মাজাহ ও নাসায়ী)

    একটি হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত প্রকাশ্য কুফর করছে-যে কুফরের ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। অর্থাৎ তিনি যখন কুফর দিয়ে শাসন করবেন এবং আল্লাহর হুকুমকে প্রকাশ্যে প্রত্যাখান করবেন। আউফ বিন মালিক আল আশযা’য়ী বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    ‘ইমামদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে তারা যাদের তোমরা ভালবাস এবং যারা তোমাদের ভালবাসেন, যাদের জন্য তোমরা প্রার্থনা কর ও যারা তোমাদের জন্য প্রার্থনা করে। অন্যদিকে ইমামদের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট হচ্ছে তারাই যারা তোমাদের অপছন্দ করে ও তোমরা যাদের অপছন্দ কর এবং তোমরা তাদের অভিশাপ দাও ও তারাও তোমাদের অভিশাপ দেয়।’ আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও রাসূলুল্লাহ! আমাদের কী তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা উচিত হবে না?’ তিনি (সা) বলেন, ‘না, ততক্ষণ পর্যন্ত নয় যতক্ষণ তারা সালাত কায়েম রাখে।’ (মুসলিম)

    What is meant by establishing the prayer is ruling by Islam, ie applying the rules of the Shar’a, by indicating the whole through naming the part (bab tasmiyat al-kull bismil juz’a). Umm Salamah narrated that the Rasool of Allah (saw) said,

    “Ameers will be appointed over you, and you will find them doing good deeds as well as bad deeds. The one who hates their bad deeds is absolved from blame, the one who disapproves of their bad deeds is also safe, but the one who approves and follows is doomed.” They said: “Should we not fight them?” He (saw) said: “No as long as they pray.” (মুসলিম)

    উবাদা বিন আস সামিত বর্ণণা করেন যে,

    ‘রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বায়াত দেয়ার জন্য আমাদের আমন্ত্রণ জানালেন-যাতে এর মাধ্যমে তাকে আমরা সুখে দুখে, আনন্দে ও ক্লেশে তার কথা শুনি ও মান্য করি এবং নিজেদের উপরে তাকে প্রাধান্য দেই। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কতৃত্বশীল লোকদের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়ব না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ কতৃক সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত প্রকাশ্য কোন কুফর তাদের দ্বারা সংঘটিত হয়। সর্বাবস্থায় আমরা যাতে হক্ব কথা উচ্চারণ করি এবং আল্লাহর পথে কাজ করবার সময় কোন মিথ্যে দোষারোপকে ভয় না করি।’(মুসলিম)

    হাদীস অনুসারে, শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়া যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ কতৃক প্রমাণিত প্রকাশ্য কুফর করছে-যে কুফরের ব্যাপারে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

    এসবই প্রযোজ্য যখন একজন মুসলিম শাসক অধিষ্ঠিত থাকেন এবং তিনি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন অথবা তিনি যদি স্পষ্ট কুফর দিয়ে শাসন করেন। এমতাবস্থায় উম্মাহকে ব্যক্তি অথবা সামষ্টিক উভয় পর্যায়েই শাসকের পথে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দাড়াতে হবে এবং এমনকি প্রয়োজনে অস্ত্র দিয়ে হলেও তাকে প্রতিরোধ করতে হবে। তাহলে কী অবস্থা হবে যখন কোন মুসলিম শাসক বর্তমান থাকে না বা কোন দারুল ইসলাম অনুপস্থিত থাকে? এমতাবস্থায় এটা স্বাভাবিক যে, আল্লাহর আইন তখন বাজেয়াপ্ত হবে, দূর্নীতি ও দূবৃত্ততা ব্যাপকতা লাভ করবে, অনিয়ম স্বাভাবিক হবে এবং ভ্রান্ত সর্ম্পকের উদ্ভব হবে, মুনকারাত উদ্ভুত ও প্রসার লাভ করবে এবং মারুফ হ্রাস পাবে ও ক্রমেই বিলুপ্ত হবে। মুসলিমগন তখন দূর্বল হবে, তাদের অবস্থান খর্ব হবে ও ক্ষমতা ক্ষয়িষ্ণু হবে। তারা এমন সিংহে পরিণত হবে যা দন্তহীন ও নখরবিহীন। তারা এমন এক দৃশ্যের অবতারণা করবে যার বাস্তবতা নেই-যেমনি খাবারের ছবি ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে পারে না এবং সিংহের ছবি ত্রাস সৃষ্টি করে না। এমতাবস্থায় – বর্তমান বাস্তবতায় – উম্মাহর উচিত খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা যিনি আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসন করবে কারন তার (খলিফার) উপস্থিতি ফরয। এখন প্রশ্ন হল কে খিলাফত প্রতিষ্ঠার দায়ভার কাধে তুলে নিবে এবং এটা কীভাবে করা হবে? সঙ্গত কারণেই এখন ইসলামি একটি দলের অপরিহার্যতার কথা বলতে হয় যারা সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে। 

  • জ্ঞানের অপরিহার্যতা

    এখানে এটা সবার কাছে স্পষ্ট যে, জ্ঞান এবং সমসাময়িক মারুফ ও মুনকার সর্ম্পকে ওলেমাদের পরিষ্কার ধারণা প্রদান, লোকদের মারুফ সম্পাদন ও মুনকার বর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।  

    আলেমগন হল সে ব্যক্তিবর্গ যারা অন্যদের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করে। তাদের ব্যক্তিগত ইবাদতের সাথে সংশ্লিষ্ট জ্ঞানার্জন করা তাদের জন্য ফরয। এর অতিরিক্ত হিসেবে উম্মাহর উপর অর্পিত বাধ্যবাধকতা সর্ম্পকেও তারা জ্ঞান লাভ করে। সুতরাং জ্ঞানার্জন একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা এবং উলেমাগন উম্মাহর পক্ষ থেকে তা সম্পাদন করেন ও এর জন্য তারা যথার্থ পুরষ্কার অর্জন করবেন। এই জ্ঞানার্জন করবার পরও তারা তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব থেকে মাহরুম হতে পারবেন না। অন্যদের মত তাদেরও ব্যক্তি পর্যায়ের ইবাদত সমূহ সম্পাদন করতে হবে। এ দায়িত্বের একটি হল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। যদি কেউ উত্তরাধিকার আইনের উপরে একজন বিশেষষ্ণ হন বা একজন তাফসীরকারক হন অথবা তালাক বা বিয়ের উপর শরঈ নীতিমালার উপরে একজন বিচারক হওয়া সত্তে¡ও তার উপর অর্পিত শরঈ ব্যক্তিগত দায়িত্ব ও পুরো উম্মাহর সাথে সংশ্লিষ্ট সামষ্টিক দায়িত্ব থেকে পরিত্রাণ পাবেন না। কারণ আলেমগন এ উম্মাহর অংশ এবং তাদের কাছে কোন কিছু পৌছার অর্থ হল তা পুরো উম্মাহর কাছে পৌছে যাওয়া। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সাথে আজকে আমরা লক্ষ্য করছি যে, আলেমগন শরঈ এ দায়িত্ব (খিলাফত প্রতিষ্ঠা) পালনে অপারগতা প্রকাশ করছেন। এর জন্য তারা অবশ্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং উম্মাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবেন।

    জ্ঞান হল আনুগত্য ও উপাসনার জন্য। জ্ঞান হল এমন জিনিস যা মানুষকে ত্বাকওয়া বা আল্লাহভীতির দিকে পরিচালিত করে।

    ’আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে।’ (সূরা ফাতির: ২৮)

    ইতিহাসে উলেমাদের আমরা সবকিছুর আগে খুঁজে পাই-হোক সেটা সালাত, জিহাদ, দাওয়াত পরিবহন, শাসকদের জবাবদিহী করা, কুফর ও স্রষ্টাবিহীন চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে। লোকদের সঠিক চিন্তায় উদ্ধুদ্ধ করা ও সে অনুযায়ী কার্যসম্পাদনের ক্ষেত্রে আমরা তাদের অগ্রদূত হিসেবে দেখতে পাই।

    এটা কারও ভাবা ঠিক হবে না যে, ইসলামে উলেমাদের আনুষ্ঠানিক কোন অবস্থান আছে-যা ধর্মীয় পদবি বা অন্য কোন স্বতন্ত্র পদবি। অথবা তাদের জ্ঞানের কারণে লোকদের নির্দেশ দেয় এবং তারা তা মেনে নেয়। বরং তারা অন্য সাধারণ মুসলিমদের মতই। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বর্ণণায় তারা এমনভাবে এসেছেন যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবীগন অর্ন্তভুক্ত হয়েছিলেন।

    শরীয়া ওলেমা ও জ্ঞানের বাধ্যবাধকতা সত্য উপলদ্ধি ও পালনের নিমিত্তে সুনিশ্চিত করেছে। শরীয়ার জন্য তারা হলেন মাধ্যম। তাদের মাধ্যমে মুসলিম তার উপর প্রভূর অধিকার সম্বন্ধে অবগত হয়। তাদের উপস্থিতি হল একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। যদি তাদের উপস্থিতি না থাকে তাহলে পুরো উম্মাহ গুনাহগার হবে। কারণ এ অবস্থায় পুরো উম্মাহ জাহেলিয়াতের মধ্যে পতিত হবে। ফলে ইজতিহাদ হল একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। সুতরাং এরকম একটি সময় কোনক্রমেই থাকা উচিত নয় যখন কোন মুজতাহিদ নেই। আর না হয় পুরো উম্মাহ গোনাহগার হবে।

    আগ্রহের দিক থেকে উম্মাহর স্বাভাবিক প্রবণতা হল উলেমাদের মতামতকে গ্রহণ করা বা গুরুত্ব প্রদান করা। একারণে উলেমাদের কোন ধরনের প্রলোভনে সাড়া দেয়া ঠিক হবে না-পদ বা অবস্থান চাওয়া, সঠিক জ্ঞান না থাকা সত্তেও কোন বিষয়ে ফতওয়া প্রদান করা, নফসের বশবর্তী হয়ে বা শাসককে সন্তুষ্ট করবার জন্য শরীয়াকে অসত্যভাবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। যেহেতু শরীয়ার জ্ঞান হল মারুফ, সেহেতু এক্ষেত্রে মুনকার হল রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা), নেতৃত্বের মনোবাঞ্চা এবং সস্তা সুবিধা খোজা। সেকারণে আজকের দিনে শাসকের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য উলেমাদের ক্রীড়ানক হিসেবে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি পূরণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। একারণে এদের জন্য টাকা ছিটানো হয়, সম্মানিত ইসলামি পন্ডিত হিসেবে পদবী দেয়া হয়। তখন তারা লোকদের জন্য নজীর বা বিশিষ্ট মুফতী হয়ে যান-যাদের কাছে লোকেরা বিভিন্ন বিষয়ের সমাধানের জন্য আসেন। সেকারণে তারা এমন ফতওয়া প্রদান করে যাতে শাসক সন্তুষ্ট হয় এবং আল্লাহর ক্রোধের উদ্রেক করে। শরীয়াকে তারা শাসকের আওতাধীন ও ইচ্ছাধীন করে দেয়। সেকারণে যদি দেখা যায় শাসকগন সুদকে জায়েয ঘোষণা করে, ওলেমাগনও এটাকে জায়েয বলে এবং এর জন্য বাণীকে বিকৃত করবার প্রয়োজন হলে তাই করে ও যেরকম চায় সেরকমভাবে দলিলাদি উপস্থাপন করে। যদি শাসকগন কোন কারণে কাফির রাষ্ট্রের সহায়তা চায় তাহলেও উলেমাগন তাতেও সায় দেয়। যদি শাসকগন ইহুদীদের সাথে শান্তি চায় তারা সেটাতেও সম্মতি প্রদান করে। তারা হল আজ্ঞাবহ ইসলামী পন্ডিত-যাদের সাবধান করতে হবে। উম্মাহকে তাদের কর্মকান্ডসমূহ দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখান করতে হবে এবং শরীয়াকে বিকিয়ে দিয়ে তাদের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখা যাবে না। এই ধরনের লোক যারা নিকৃষ্ট শাসকদের প্রতি সহায়তার হস্ত প্রসারিত করে, তাদের সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন:

    ‘আমার উম্মাহর ব্যাপারে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী ভয় করি তা হল মুনাফেক আলেম ব্যক্তি।’ (মুসনাদে আহমাদ)

    এসব লোকদের প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করতে হবে-যাতে অন্যরা তাদের মিথ্যে ফতওয়ার স্বীকার না হয়। এরা তারাই যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়ার জীবনকে ক্রয় করে নিয়েছে।

    যখন মুসলিম সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও পালন এবং মুনকার পরিত্যাগের আদেশ প্রদান ও বিরত থাকার মাধ্যমে এইসব কার্যাবলী সম্পাদন করে তখন তার ব্যক্তিগত জীবন ভাল হয়। তখন একজন মুসলিম নিজস্ব কলেবরে যেমনি আনুগত্যশীল হয় তেমনি অন্যদেরও এ ব্যাপারে উপদেশ প্রদান করে, একইভাবে সে যখন তার ব্যবসা ও আশেপাশের লোকদের সাথে আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল আচরণ করে তখন দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমরা আগেও বলেছি, দ্বীনের প্রধান লক্ষ্য হল আনুগত্য প্রকাশ করা, সৎ কাজ ও মুনকার বর্জন ও সমাজের কোন দিক যাতে আল্লাহর হুকুম ব্যতিরেকে না চলে-হোক সেটা ব্যক্তি বা সামষ্টিক পর্যায়ের। সমাজ কেবলমাত্র কিছু ব্যক্তির সমষ্টি নয়, বরং এই ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হয়েছে কিছু বিশ্বাসের ভিত্তিতে-যা থেকে জীবনের সবক্ষেত্রের জন্য একটি ব্যবস্থা উদ্ভুত হয়। যদি ব্যক্তিগত দিকটি অর্জিত হয় তাহলে কেবলমাত্র একটি দিক অর্জিত হয়। কিন্তু তারপরেও আরও অনেক দিক রয়ে যায় যে ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার শরণাপন্ন হতে হয়। এসব ব্যক্তিকে খলীফার দ্বারা শাসিত হতে হবে যিনি বাস্তবতায় ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। খলিফা তলোয়ারের দ্বারা এ বাস্তবতা প্রতিস্থাপন করবেন যখন মুসলিমরা এই বাস্তবতায় আল্লাহর ভয়ে স্বেচ্ছায় আওতায় আসবে না। ‘আল্লাহ অবশ্যই শাসক দ্বারা সংযত রাখবেন যা কোরআন দ্বারা সংযত রাখা সম্ভব হয়নি।’ শরীয়া ইসলামী বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত ও বিস্তৃত করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামী রাষ্ট্রকে এর পদ্ধতি হিসেবে সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এ বিষয়টি শরীয়াহ স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতিও উল্লেখ করেছে। ইসলামী রাষ্ট্রকে এই বিশ্বাস সংরক্ষণ, প্রসার ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যেমন: জিহাদ যা ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়ার ব্যাপারে ইসলাম রাষ্ট্রকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং জিহাদের মাধ্যমে দাওয়াত করতে নির্দেশ দিয়েছে। কত সুন্দরই না লাগে যখন ইমাম গাজ্জালী (র) বলেন, ‘অবশ্যই কোরআন এবং সুলতান জমজের মত। কুরআন হল ভিত্তি, সুলতান হল এর রক্ষক। যার কোন ভিত্তি নেই, তা খুব ধ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়; আর যার কোন রক্ষক নেই তা ধ্রুত হারিয়ে যায়।’

  • যারা দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে নিবেদিত

    এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবার পূর্বে আমরা জানার চেষ্টা করব শরীয়ার হুকুম সমূহ বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাদের উপর বর্তায়। উম্মাহর মধ্যে রয়েছে ব্যক্তি, দল ও শাসকবৃন্দ। প্রত্যেক অংশের উপরে রয়েছে শরীয়াহ প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব। তারা যে বিষয়ে নিবেদিত সে বিষয়ে ব্যর্থতার পরিচয় দিলে তাদেরকে উপদেশ, জবাবদিহিতা এবং সংশোধনের আওতায় আনতে হবে। যদি এ বিষয়টি বুঝবার বাস্তবতা আমাদের কাছে পরিষ্কার না হয় তাহলে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ফরয দায়িত্ব পালনে জটিলতার সৃষ্টি হবে। একারণে আমরা নীচের কথাগুলো বলতে পারি।

    শরীয়ার কিছু কিছু দায়িত্ব কেবলমাত্র খলিফার উপরে বর্তায়- এছাড়া অন্য কারও উপর নয়। আরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে যা ব্যক্তির জন্য সুনির্দিষ্ট এবং ব্যক্তি পালনে অপারগ হলে খলিফা সেগুলো পালন করবে। আবার খলিফার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব রয়েছে যা ক্ষেত্র বিশেষে ব্যক্তি সেগুলো পালন করতে পারে। দলের জন্য রয়েছে কিছু নিয়মনীতি।

    ব্যক্তির উপর অর্পিত দায়িত্ব সমূহের মধ্যে রয়েছে: নামাজ পড়া, সাওম পালন করা, হজ্জ পালন করা, যাকাত প্রদান করা এবং নিষিদ্ধ জিনিষ থেকে বিরত থাকা, যেমন: মদ্যপান করা, জুয়া খেলা, সুদ, চুরি, হত্যা, ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ, মিথ্যা, প্রতারণা, গীবত করা ইত্যাদি। মুসলিমগন দারুল কুফর ও দারুল ইসলাম বা ইসলামী এবং কাফের রাষ্ট্র যেখানেই বসবাস করুক না কেন তাদের এগুলো মানতেই হবে। এক্ষেত্রে একজন মুসলিম কেবলমাত্র মক্কা বা কেবলমাত্র মদীনাতে রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবীগন কী কাজ করেছে সে ব্যাপারে চিন্তা করবে না। ইবাদত (উপাসনা), মুয়ামালাত (লেনদেন), মা’তুমাত (খাদ্যদ্রব্য), মালবুসাত (পোষাকপরিচ্ছদ), আখলাক (চরিত্র) এবং অন্যান্য ইসলামী বিশ্বাসসমূহ-এ সব সর্ম্পকিত শরীয়া নীতিমালা ব্যক্তিপর্যায়ের। প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার পরিবার সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করা হবে-যেখানে তিনি একজন ওয়ালী (অভিভাবক)। দারুল কুফরের শাসক যদি কোন মুসলিমকে তার ব্যক্তি পর্যায়ের শরীয় হুকুম পালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে তাহলে রায় হচ্ছে তাকে অবশ্যই অন্য কোন দারুল কুফর বা দারুল ইসলামে হিজরত করতে হবে। এ সর্ম্পকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘যারা নিজের অনিষ্ট করে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখন্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে: আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হল জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান। কিন্তূ পুরুষ, নারী ও শিশুদের মধ্যে যারা অসহায়, তারা কোন উপায় করতে পারে না এবং পথও জানে না।’ (সূরা নিসা: ৯৭-৯৮)

    একজন ব্যক্তির জন্য দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করা মুস্তাহাব (প্রাধিকারযোগ্য) হবে যদিও বা সে শরীয়া দায়িত্ব পালনে সক্ষম হয় অন্যথায় সে  দারুল কুফরকে দারুল ইসলামে পরিণত করবার জন্য সেখানে থাকবে। এটা সর্বজনবিদিত যে, দারুল ইসলাম হল সে রাষ্ট্র যা ইসলাম দিয়ে শাসিত হয় ও এর নিরাপত্তা মুসলিমদের দ্বারা সুনিশ্চিত করা হয়েছে।

    ব্যক্তির উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে খলিফা সে দায়িত্ব পালন করবে এমন দায়িত্বের উদাহরণ হল: একজনের ভরণপোষণ ও দেখভালের দায়িত্ব যখন অপর আরেকজন ব্যক্তির উপর অর্পিত হয় এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তি অপারগ হন তখন খলিফা সে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। কিংবা অধিবাসীরা অপারগ হলে গ্রামে মসজিদ নির্মাণ করা বা শহরে বসতি গড়ে দেয়া….ইত্যাদি।

    কিছু দায়িত্ব রয়েছে যা কেবলমাত্র আমীর বা খলিফার উপর বর্তায় এবং এর জন্য ব্যক্তি কোনভাবেই দায়িত্বশীল নয়। এগুলো হল হুদুদ বাস্তবায়ন করা, জিহাদ ঘোষণা করা, চুক্তি সম্পাদন করা বা আইন গ্রহণ করা এবং অন্যান্য বাধ্যতামূলক কাজসমূহ সম্পাদন করা। উল্লেখিত শরীয়া কর্তব্যসমূহ ও আর কিছু বিষয়ে শাসকগন দায়িত্বশীল। 

    খলিফার উপর অর্পিত কিছু দায়িত্ব ব্যক্তিও পালন করতে পারেন; তা কিছু কিছু ক্ষেত্রে, যেমন: জিহাদ। যদি কাফেরদের দ্বারা মুসলিমগন অকস্মাৎ আক্রান্ত হয়, তখন খলিফার অনুমতির অপেক্ষা না করে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়া মুসলিমদের জন্য ফরয। এমনও হতে পারে সেসময় তাদের কোন খলিফা নেই। শাসক যদি ফাযীরও হন এবং লোকবল সংখ্যায় কম থাকে তারপরেও জিহাদে অংশগ্রহণ করতে হবে। যা হোক মূলকথা হল, মুসলিমরা সর্বশেষ এ বিষয়টি মেনে নেবার সুযোগ নেই, অর্থাৎ খিলাফত থাকবে না এবং তারা ফাযীর নেতার অধীনে  থাকবে।

    দলের উপর অর্পিত শরীয়া দায়িত্ব হল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, শাসকদের জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসা, তাদের সত্যবিমুখতা থেকে ফিরিয়ে হক্বের পথে নিয়ে আসা ইত্যাদি। কোন ইসলামী দল, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর কর্তব্য এর আওতায় পড়ে।

    কাকে কী ধরনের শরীয়া দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে তা পরিষ্কার করা জরুরী। কেননা এ জ্ঞান সর্ম্পকে অজ্ঞতা ও অবহেলা ব্যক্তি বা একটি আন্দোলনকে শরীয়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে প্ররোচিত করতে পারে। এভাবে মুসলিমগন সঠিক দ্বীনের সঠক জ্ঞান ও এর কার্যকর প্রয়োগের ব্যাপারে বিভ্রান্ত হতে পারে। ফলস্বরুপ, মুসলিমরা দায়িত্বের বাধ্যবাধকতাকে অবহেলা করবে এবং মানদুবাত (অনুমোদনযোগ্য কর্মগুলো) নিজের মত করে করবে। কর্তব্যের বিভিন্ন ভাগসমূহ সর্ম্পকে না জানবার কারণে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব ও দলের সদস্য হিসেবে অর্পিত শরীয়া দায়িত্বের বদলে দলটি ব্যক্তিপর্যায়ের দায়িত্ব নিয়ে অধিকতর সচেতন হবে। ইসলামী পন্ডিতগন তখন লোকদের সাথে ব্যক্তিপর্যায়ের শরীয়া দায়িত্ব নিয়েই বেশী আলোচনা করবে, যেমন: সালাত, যাকাত, রোজা অথবা গীবত থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে তারা আলোচনা করবে না, যেমন: ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি একজন ধার্মিক বা ভৎসনাকারী ব্যক্তি হতে পারেন। তবে তিনি এমন কোন রাজনৈতিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন ইসলামী পন্ডিত হবে না যিনি উম্মাহের সাম্প্রতিক সমস্যা নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন এবং এ ব্যাপারে সমাধানে উপনীত হয়েছেন ও এর জন্য কাজে নেমে পড়েছেন।

    প্রত্যেক ভাগের জন্য নির্ধারিত শরীয়া দায়িত্ব অবশ্যই পালিত হতে হবে। দায়িত্বে অবহেলা দেখা দিলে অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ দিতে হবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করতে হবে। যে দায়িত্ব কাউকে দেয়া হয়নি তার জন্য সে জবাবদিহীতার সম্মুখীনও হবে না। সে কারণে শরীয়ার বাস্তবায়নও কেবলমাত্র একটি অংশের উপর বর্তায় না। পুরো উম্মাহকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়াহ বাস্তবায়নের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তি ব্যক্তিপর্যায়ের, দল সামষ্টিক ও খলিফা তার উপর অর্পিত শরীয়া দায়িত্ব যখন সুসম্পন্ন করবে তখন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হবে।

    এখানে আমরা একটি বিষয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই যে, প্রত্যেকটি মুসলিমকে পূর্ণাঙ্গ ও সার্বজনীনভাবে ইসলামের উপর আস্থা স্থাপন করতে হবে। তবে সে তার প্রয়োজন অনুসারে প্রত্যেকটি বিষয় বিস্তারিতভাবে গ্রহণ করবে। ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুসারে এবং দলের সদস্যগন তার কাজের জন্য সামষ্টিকভাবে। এ দায়িত্বসমূহের কোনটির ব্যাপারে তার অবহেলার জন্য সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে জবাবদিহি করবে। তাকে ব্যক্তিগতভাবে শরীয়া দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই কথা খলিফার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ তিনি নিজে সালাত আদায় করেন, সাওম ও হজ্জ পালন করেন, পিতামাতার দেখভাল করেন এবং সুদ ও যিনা থেকে নিবৃত থাকেন। শরীয়া খলিফা হিসেবে তার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তাও তিনি পালন করেন। অর্থাৎ তিনি আইন পাশ করবেন, জিহাদের ঘোষণা দেবেন, মুসলিমদের ভূমি রক্ষা করবেন, আল্লাহর কালাম দিয়ে শাসন করবেন ও হুদুদ বাস্তবায়ন করবেন। এ ব্যাপারে যে কোন অবহেলার জন্য তিনি আখেরাতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হবেন এবং দুনিয়াতে উম্মাহ তাকে জবাবদিহি করবে।

    এই বাস্তবতা মুসলিমদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে কখন মুহাসাবা (জবাবদিহিতা) করতে হয়। এতে করে ব্যক্তি, দল ও খলিফা এমন কোন কিছুর জন্য জবাবদিহিতা সম্মুখীন হবে না যা তার জন্য নয়।

    শরীয়া প্রত্যেক মুসলিমকে তার সক্ষমতা ও জ্ঞান অনুসারে সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধের ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করেছে। মুসলিমকে ব্যক্তি, দল ও শাসক হিসেবে এসব শরীয়া বাধ্যবাধকতা যে কোন পরিস্থিতিতে সম্পন্ন করবার জন্য শরীয়া নির্দেশ প্রদান করেছে। তখন ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক, শাসক ইসলাম দিয়ে অথবা কুফর দিয়ে শাসন করুন না কেন কিংবা শাসকগন ইসলামি আইনের সঠিক প্রয়োগ করুক বা অপপ্রয়োগ করুক না কেন। সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ রাসূলুল্লাহ (সা), সাহাবীগন, তাবেয়ীন ও তাদের অনুসারীদের সময়ে বলবৎ ছিল। ক্বিয়ামতের আগ পর্যন্ত এটা বলবৎ থাকবে।

    নিম্নোাক্ত ব্যাখ্যানুযায়ী, যদি রাষ্ট্রে, ব্যক্তি, দলে এমন কিছু ঘটে যেখানে সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নির্দেশ দেবার বাধ্যবাধকতা দেখা দেয় তবে রাষ্ট্রকে, ব্যক্তিকে এবং দলকে অবশ্যই তা সম্পন্ন করতে হবে।

    ব্যক্তি পর্যায়ে, মুসলিমদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সব হুকুমগুলোর আদেশ করার এবং নিষেধাজ্ঞাসমূহ নিষেধ করার – যদি তাদের সামনে এমন কিছু ঘটে যা এ প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে – বিষয়টি নিজেদের জ্ঞানানুযায়ী করবে। ফলে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদান ফরযে আইন হয়ে যায় এবং না পালন করলে সে গোনাহগার হবে এবং এর জন্য কোন অজুহাত দাঁড় করাতে পারবে না। সেকারণে একজন মুসলিমকে তার প্রতিদিনকার জীবনে নিজের স্ত্রী, সন্তান, আত্বীয়স্বজন, প্রতিবেশী, খরিদ্দার, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা যার সাথেই সাক্ষাৎ হোক না কেন প্রত্যেককেই নসীহা বা সদুপদেশ দিতে হবে যদি সে কোন শরীয়াগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় বা যথার্থভাবে আনুগত্যশীল না হয়। এরূপ না হলে কী উপায় আছে, যেহেতু এমন হতে পারে যে কোন একটি পাপকার্য সংঘটিত হবার বিষয়ে হয়তো সে-ই কেবল জানে। যেমন, এই রকম পরিস্থিতি হতে পারে যখন অপরাধ সংঘটনের সময় সে ও অপরাধী ব্যক্তি ব্যতীত ঐ স্থানে আর কেউ ছিলনা। যদি সে মুসলিম দর্শক ঐ অপরাধীকে সে সময় সদুপদেশ প্রদান না করে, তাহলে সে অপরাধী হবে। কিন্তু এর জন্য অন্য কেউ পাপী হবে না, কারণ সে সময় তারা অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না ও এ ব্যাপারে তারা জ্ঞাতও ছিলেন না। ঐ দর্শকের পরিমন্ডলে যত অপরাধ বা মুনকার সংঘটিত হবে, এর কোনটির জন্য তিনি ব্যতিরেকে আরও কেউ গোনাহগার হবেন না।

    যখন একজন মুসলিম তার নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট আল্লাহ নির্দেশিত হুকুমসমূহ মেনে চলবে অর্থাৎ তার সাথে সম্পৃক্ত সৎ কাজ বা মারুফ সম্পন্ন করবে ও মুনকার বা অসৎ কাজ বর্জন করবে, তখন সে অন্যদেরকে সে হুকুমসমূহ সর্ম্পকে জানাতে পারবে। যদি তিনি এসব হুকুম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাথে গ্রহণ করেন তাহলে তিনি সেভাবে অন্যদের কাছে বহন করতে পারবেন। তিনি যদি একজন মুত্তাকী (যিনি দলিলসহ মতামত প্রদান করেন) হিসেবে এসব গ্রহণ করেন, তখন তিনি সেরকম উচ্চমানসহকারে তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিবেন। আবার তিনি যদি ত্বাকলীদ বা অনুকরণ করে ’আম্মি (সাধারন ব্যক্তি) হিসেবে হুকুম গ্রহণ করেন তাহলে ’আম্মি (সাধারন ব্যক্তি) এর মতই তা বহন করবেন। যদি কোন ব্যক্তি অন্যদের বুঝানোর ব্যাপারে অপারগ ভাবেন তাহলে তাকে এমন কোন ব্যক্তির শরণাপন্ন হতে হবে যার বুঝানোর সক্ষমতা রয়েছে যেমন: কোন ইসলামী চিন্তাবিদ, মুফতী বা এমন কোন দাওয়াত বহনকারী যার এ বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান ও উপলদ্ধি রয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    ‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার আদেশ দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে।’ (সূরা আত তাওবা : ৭১)

    এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:

    ‘সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্খনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।’
    (সূরা মায়েদাহ: ৫)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

    পৌছে দাও যদিও বা তা একটি আয়াত হয়।’ (আল বুখারী)

    তিনি (সা) আরও বলেন,

    ‘আল্লাহ তার সে বান্দার মুখকে উজ্জল করুন, যিনি আমার কথা শুনেছেন, উপলদ্ধি করেছেন এবং এমনভাবে পৌছে দিয়েছেন যে রকম আমি বলেছি। হয়ত যিনি বহন করছেন তিনি একজন ফকীহ নাও হতে পারেন, কিন্তু যার কাছে বহন করা হচ্ছে তিনি বহনকারীর চেয়ে বুঝার ক্ষেত্রে শ্রেয়তর হতে পারেন।’ (আবু দাউদ, তিরমিযী, আহমাদ)

    এভাবে একজন ব্যক্তি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন অর্থাৎ নিজে মারুফ সম্পন্ন করবেন ও মুনকার থেকে বিরত থাকবেন ও অন্যকে এ বিষয়ে উপদেশ প্রদান করবেন।

  • দ্বিতীয় দিক: সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ

    আমরা ইতোমধ্যে বলেছি যে, ইসলাম সব মারুফ ও মুনকারকে আমাদের সামনে পরিষ্কার করেছে এবং একজন মুসলিমকে অবশ্যই সব মারুফ মেনে চলতে হবে এবং মুনকার থেকে বিরত থাকতে হবে। এখানে যে প্রশ্নটি খুব বেশী শোনা যায়, সেটি হল একজন মুসলিমকে সে যেসব মারুফ মেনে চলে তার আদেশ করবে, নাকি এর অধিকাংশ কিংবা কম? একই প্রশ্ন মুনকার থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রেও উত্থিত হয়। 

    এ ব্যাপারে কথা বলবার আগে আমাদের অবশ্যই এ বাস্তবতা বুঝতে হবে যে, শরীয়া এগুলোকে কীভাবে অনুধাবন করতে বলে। শরীয়া মনে করে এমন একটি ইসলামী সমাজ কায়েম হবে যেখানে এমন একটি ধারণাও গ্রহণ করা হবে না যা শরীয়ার ধারণার বিরুদ্ধে যাবে, একটি কর্মকান্ডও গৃহীত হবে না যা শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক হবে। প্রত্যেক মুনকারকে প্রতিরোধ ও শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে। এককথায় হুকুম ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত সব নির্দেশ বাস্তবায়িত হবে। যত মুনকার সংঘটিত হয়েছে এবং হতে পারে সবই প্রতিহত করতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের এ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ কাজটিকে অত্যন্ত মহিমান্বিত করেছেন ও এর জন্য বড় পুরষ্কার বরাদ্দ করেছেন। ইমাম গাজ্জালী (র) তার বই ‘ইয়াহইয়াউল উলুম উদ দ্বীন ’ এ বলেন, ‘আম্মা বাদ, অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজে নিষেধ করা হল দ্বীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদ। এই মিশন দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক নবী রাসূলকে প্রেরণ করেছেন। এ কাজ যখন বন্ধ হয়ে যায় বা অবহেলিত হয় তখন নবুয়্যত পরিত্যক্ত হয়, দ্বীন বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়, দ্বীনহীনতার কার্যকাল বলবৎ হয়, পথভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতা ব্যাপকতর হয়, দূর্নীতি বিস্তার লাভ করে, জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়।’

  • আমলের সাথে জড়িত জ্ঞানার্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরযে আইন

    মুকাল্লাফ (আইনগতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তি) এর ক্ষেত্রে শরীয়া বিধান অনুযায়ী, প্রত্যেক সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের উপর তার জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করা ফরয। কারণ তাকে অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত বিধিনিষেধ অনুযায়ী সব কাজ সম্পন্ন করতে হবে। কিন্তু এটা কখনওই তার কাজের সাথে সম্পৃক্ত শরীয়া জ্ঞান অর্জন ব্যতিরেকে সম্ভবপর নয়। সুতরাং মুসলমানের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া জ্ঞান অর্জন করা ফরযে আইন এবং এটা কখনও সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা নয়। আর এর চেয়ে বেশী কিছুই হল মুস্তাহাব। যখন সে সালাত আদায় করবে তখন তাকে অবশ্যই সালাত আদায়ের পদ্ধতি জানতে হবে। যদি তার সম্পদ নিসাব অতিক্রম করে থাকে ও একবছর পূর্ণ হয় তাকে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে। তাকে অবশ্যই জানতে হবে সম্পদের কত অংশ যাকাত হিসেবে দিতে হবে। সম্পদ স্বর্ণ বা রৌপ্য হলে তাকে অবশ্যই যাকাত দেয়ার পদ্ধতি ও গ্রহীতাদের সর্ম্পকে জানতে হবে। কিন্তু সে যদি ফল বা ফসলের যাকাতের ব্যাপারে কিছু না জানে তাহলে কোন সমস্যা নেই। তবে যদি সে এসব সর্ম্পকে জানে তাহলে সে নেক কাজ করল এবং এর জন্য পুরষ্কৃত হবে। সে যদি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করে তাহলে তাকে শিখতে হবে এটা প্রতিষ্ঠার জন্য কী করতে হবে। সুতরাং সব বাধ্যবাধকতা পালনকারীর দায়িত্ববোধ ও সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত।

    এভাবে একজন মুসলিম তার ঈমানের বিশুদ্ধতা এবং ইসলাম পালনের বাধ্যবাধকতা সর্ম্পকে নিশ্চিত হতে পারে।

    যদি এ বাসনা কেবলমাত্র তার প্রভুর জন্য হয় ও সে সঠিক পথে নির্দেশিত হয় তাহলে সে অবশ্যই এমন একজন করুণাময় প্রভূকে পাবে যিনি আমলসমূহকে কবুল করবেন এবং ক্বিয়ামত দিবসে তাকে রক্ষা করবেন।