তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২তনু হত্যা : পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফল

ঘটনা:
কুমিল্লার সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু’র মৃতদেহ ২০ মার্চ রাত সোয়া দশটার দিকে খুঁজে পান স্বয়ং তনুরই বাবা ইয়ার হোসেন। ইয়ার হোসেন সাহেবের কথায় “একটু উঁচু জায়গায় জঙ্গল ও গাছ গাছালির মধ্যে তনুকে পেলাম। গাছের তলায় ওর মাথা দক্ষিণ দিক আর পা উত্তর দিকে পরে আছে। মাথার নিচটা থেতলে গেছে। পুরো মুখে রক্ত ও আঁছড়ের দাগ। আমরা পাঁচজন মিলে সিএমএইচ-এ নিয়ে যাই।” সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তনুকে মৃত ঘোষনা করেন। এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা এখন সবার মুখে মুখে। ধারনা করা হচ্ছে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য ধর্ষককে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে আন্দোলন চলছে।
বাস্তবতা:
ধর্ষণের মতো বিকৃত মানসিকতার ঘটনা গত কয়েক বছরে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। যার কিছু মিডিয়াতে আসে কিছু আসে না। নারীর প্রতি যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি ধরনের ক্ষেত্রেও এসেছে নিত্যনতুন মাত্রা। গত বছর বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সময় টিএসসিতে প্রকাশ্যে সবার সামনে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। গত ২ বছরে শুধু গণপরিবহনে কমপক্ষে ১৮ জন নারী ধর্ষণ বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- গত বছর রাজধানীতে এক গারো তরুণীকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে চলন্ত অবস্থায় গণধর্ষণ করা হয়। রাজধানীর অদূরে সোনারগাঁর আড়াইহাজারে চলন্ত বাসে এক নারী শ্রমিককে বাস ড্রাইভার ও সহকারীসহ চারজন মিলে গণধর্ষণ করে। সর্বশেষ ৩১ মার্চ টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি বাসে এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৬ মাসের শিশুরাও রেহায় পাচ্ছে না বিকৃত মানসিকতার এই ধর্ষকদের হাত হতে। ব্র্যাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী-২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে ৬৮ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়না। বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে প্রায় ৫ হাজার নারী ও মেয়েশিশু নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে, এডিস নিক্ষেপ, অপহরণ, ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা, পাচার, খুন এবং যৌতুকের জন্য নির্যাতন।
বিষয়টি লক্ষনীয় যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন যেমন পাল্লা দিয়ে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তোড়জোড়ও তথা নারীবাদীদের কলাম লেখনী, নারী সংগঠনের সভা সেমিনার, সরকারের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণলয়ের সচেতনতামুলক প্রকল্পের মাত্রাও বহুগুন বেড়েছে। সমাধান হিসাবে দেওয়া হচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা বুলিসমূহ – নারীকে শিক্ষিত হতে হবে, নারীর সমঅধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে, নারীদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে ও সর্বোপরি নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে ঐ নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। এছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই সমাধানসমূহ গ্রহণের ফলাফল হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নব্বই এর গণঅভ্যত্থানের পর এদেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন নারী। বর্তমানে স্পীকারের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন একজন নারী। নারী শিক্ষার হারও বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় পুরুষের সমান। নারীরা দিনে দিনে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীও হয়ে উঠছে। নারী অধিকার রক্ষাই প্রতিনিয়ত উৎপাদিত ও আমদানী হচ্ছে দেশী বিদেশী এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থা যারা নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রত্যেক সরকারই প্রণয়ন করছে ডজন ডজন আইন। পূর্বের আইন সমুহকে আরো কঠোর করা হচ্ছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো আমাদের সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামীদের পুরস্কৃতও করছে তাদের অবদানের জন্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছেন ড. কামাল হোসেনের মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেন। কারণ তিনি দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতে আইনি লড়াই করেন। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের খসড়া প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। ফতোয়ার বিরুদ্ধে তার মামলা লড়ার কথাও স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার ‘ফরচুন’ সাময়িকী গত ২৪ মার্চ, ২০১৬ নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিশ্বের মহান ৫০ জন নেতার তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে ১০ নম্বরে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে ‘ফরচুন’ বলেছে, তিনি নিজ দেশে নারীদের অধিকার এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে নারীদের আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি তিনি অধিকতর শিক্ষা, আর্থিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিতে কাজ করছেন।
কিন্তু এত কিছুর পরও নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন বন্ধ তো স্বপ্নের বিষয়, কমার কোন লক্ষনই আপাতত: দেখা যাচ্ছেনা। বরং এই নির্যাতনের গ্রাফটা দিন দিন আরো উর্ধ্বগামী হচ্ছে। কারণ আমরা নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হয়েছি।
প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান:
একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় পশ্চিমাদের দেওয়া এই সমাাধানগুলো কত দুর্বল এবং মৌলিকভাবে কত অসার। পরিসংখ্যান বলছে, যেসব দেশ নারী উন্নয়ন সূচক হিসাবে- নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা, শিক্ষা, অধিকার সচেতনতা, নারী ক্ষমতায়নকে মাপকাঠি বিবেচনা করে তারা নারীকে উন্নত জীবন দেওয়াতো দূরের কথা, নিরাপত্তাই দিতে পারেনি।
ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয় (রিপোর্টেড)। ৭৪ শতাংশ নারী দিল্লীতে ২০১২ সালে হয়রানীর শিকার হয়েছে (Hindustan times)। নারী নির্যাতনের প্রতিযোগীতায় অগ্রগামী তারাই যারা যথারীতি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ। যেমন USA এবং UK। পরিসংখ্যানের আলোকে, UK-তে প্রতিদিন ১৬৭ জন নারী ধর্ষিত হয়। USA-তে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে ১ জন নারী, স্বামী কর্তৃক শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়।
UK ২.৫ হাজার স্বীকৃত Pedophiles (শিশু যৌন নির্যাতনকারী) লালন করেছে। বৃটেন প্রতি ২০ জন ১জন নারী ধর্ষিত হয় এবং ১০০ জন ১জন ধর্ষণ হচ্ছে। USA- তে প্রতিদিন ৩ জন নারী তার পার্টনারে কর্তৃক হত্যা হয়। ইউরোপ প্রতি ১০ জনে ১ জন নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয়। USA – তে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে একজন নারী ধর্ষিত হয়। (সুত্র: মাইকেল প্যারেন্টি-২০০০ সালে প্রকাশিত The ugly Truth)
উপরোক্ত পরিসংখ্যানগুলো কি যথেষ্ট নয় এটা বুঝার জন্য যে নারী নির্যাতন বন্ধের যে দাওয়াই পশ্চিমা সমাজ থেকে গ্রহণ করছি তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
অর্থাৎ আমরা সহজে একটা লাইন টানতে পারি যে, ভারত পশ্চিমাদের মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি অনুসরন করেছে যার ফলশ্রুতিতে আজকে ভারতে পশ্চিমা সমাজের ন্যায় নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন চরম পর্যায়ে যেখানে দিল্লীকে বলা হয় ধর্ষনের নগরী। আর আমরাও পশ্চিমাদের অনুসরন করে ভারতের পথেই হাঁটছি। যার নমুনা বাসে গণধর্ষনের মত ঘটনা।
একজন যুবক যখন দিনের পর দিন হলিউড-বলিউডের মুভি, কারিনা-ক্যাটরিনা-সানি লিওনদের আইটেম song, নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে খোলামেলা উপস্থাপন করাকে দেখে, স্মার্ট মোবাইলে কম রেটের ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যাবহারে সহজলভ্য পর্ণ সাইট গুলো বিচরণ করে এবং এরপর রাস্তায় বা ক্যাম্পাসে কোন নারীকে সে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? যেখানে নারীরাও স্বাধীনতার নামে বা অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের উপস্থাপন করছে আকর্ষণীয় রূপে। এক্ষেত্রে নারীদেরকেও বেশি দোষ দেওয়া যায় না। কারণ প্রতিনিয়ত নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নারীদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে পশ্চিমাদের বা ভারতীয় নারীদের মত আধুনিক হতে। ফলশ্রুতিতে আমাদের সামনে একজন নারী উপস্থাপিত হচ্ছে একটি ভোগ্যপণ্য হিসাবে। ফলে পরকীয়া, ধর্ষন এমনকি ৬ মাসের শিশুটিও বাদ যাচ্ছে না পর্ণ দেখায় অভ্যস্ত যুবকটির লোলুপ হাত হতে।
পশ্চিমারা মুনাফা সর্বোচ্চকরন নীতির কারনে যেকোন উপায়কে সঠিক মনে করে। এর জন্য নারীর সম্মান বিক্রি করে মুনাফা আসলেও তারা তা বৈধতা দেয়। তাই পর্ণোগ্রাফি Industry কে West প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সারা বিশ্বে এর প্রচার-প্রসার করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করছে। আর অন্যদিকে নারী মুক্তির বা নারী অধিকারের আন্দোলনকে উৎসাহিত করছে। এটা তাদের স্পষ্ট দ্বৈতনীতি। সর্বোপরি পশ্চিমারা ও আমাদের শাসকগোষ্ঠী নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।
তাই বলা যা যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ হত্যা ও নির্যাতনের মূল কারণ হলো-
– পশ্চিমারা বাংলাদেশে তাদের দালাল শাসকগোষ্ঠী ও বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমে জীবন সম্পর্কে তাদের মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার-প্রসার করেছে এবং সর্বত্র নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে উপস্থাপন করেছে।
– এবং আমরা জনগন না বুঝে তাদেরকে অন্ধ অনুসরণ করছি।
সমাধান:
এক বছর হতে চলল অথচ এখনো গ্রেফতার হয়নি পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির প্রকৃত অপরাধিরা! তাই অনেকে মনে করছেন যে, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দিলে এই ধরনের অপরাধ কমে যাবে। কিন্তু শুধুমাত্র কঠোর শাস্তিই এই সমস্যার সমাধান করবে না। যদিও দোষীদের সনাক্ত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বর্তমান পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথাপি এটা মূল কারণ নয়। তথাপি অনেকেরই প্রতি বছর এমন অপরাধের জন্য যাবৎ জীবন কারাদণ্ড বা বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হচ্ছে। কিন্তু অপরাধ কমার কোন লক্ষন নেই। মূল কারণ বা সমস্যা এটাও না যে আমরা কত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করতে পারলাম। নারীর নিরাপত্তার মুল সমস্যা চিহ্নিত করা না গেলে, প্রত্যেক নারীর জন্যও একজন পুলিশ নিয়োগ করলেও নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করা যাবে না। যার উদাহরণ স্বয়ং নারী পুলিশ পুরুষ পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের করুণ চিত্র আমেরিকা, বৃটেন, ভারত বা বাংলাদেশে কোথাও ব্যতিক্রম নেই।
অনেকে মোল্লাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন যে, পর্দা করলে নারীরা যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন হতে রেহায় পাবে। কিন্তু তনু হত্যার পর অন্যরা বলছে – ‘পোষাক বাঁচাতে পারেনি তনুকে’ বা ‘আরো কত পোষাক পরলে ধর্ষন করা হবে না’। কারণ তনু হিজাব পরতো। এগুলো আসলে ইসলামকে ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র পোষাক পরিবর্তন করে এই ধরনের অপরাধ বন্ধ হবে না। বরং সমাজ থেকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করতে হবে।
এবং সমাধান হিসাবে শুধুমাত্র ইসলামী পোষাক নয় বরং পরিপূর্ণ ইসলামকে গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে যা কেবল একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব।
ইসলাম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে কিভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অর্জনের জন্য। ইসলামই নারীকে দিয়েছে সম্মান, এবং নিরাপত্তা এবং এই উদ্দেশ্যে ইসলাম প্রথমত ব্যক্তি স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয়ত সমাজে আল্লাহ প্রতি আনুগত্য উৎসাহিত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে নারীর প্রতি সঠিক মানসিকতারও দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা যাবে। ইসলাম সমাজে যৌনতার বিস্তারকে নিষিদ্ধ করে, নারীর দেহের সকল ধরনের বস্তুকীকরন এবং শোষন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। নারী পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে কখনও সস্তা করেনা এবং সকল ধরনের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সমাজ থেকে দূর করে। নারী ও পুরুষের একে অপরের প্রতি আকর্ষন বিষয়ক ও সকল চাহিদার পূরণের একমাত্র উপায় হিসাবে বিবাহকে নির্দেশ করে এবং বিবাহের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করে। যা কিনা নারী-পুরুষ ও সমাজকে রক্ষা করে। ইসলাম নারীকে সর্বাধিক সম্মান দিতে উৎসাহিত করে। ইসলাম কখনোই সস্তা দামে নারীর সম্মান বিক্রি করে না। রাসুল (সা:) বলেন- “এই বিশ্ব এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুই মূল্যবান। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান একজন পরহেযগার নারী।”
ইসলাম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তিনি (সা:) আরো বলেন- “এমন একটা সময় আসবে যখন মহিলারা সানা থেকে হাজরে মাউত পর্যন্ত নির্ভয়ে রাতের বেলা পাড়ি দিতে পারবে শুধুমাত্র জীব-জন্তু ও আল্লাহর ভয় তাদের অন্তরে কাজ করবে।” আল্লাহর রহমতে খলীফা ওমর (রা:) এর সময় এই হাদীসের বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় রোমান সীমান্তে কিছু রোমান সৈন্য একজন মুসলিম নারীর কাপড় ধরে টানাটানি করে অপমানিত করলে, সেই নারীর অভিযোগ খলিফার কাছে পৌছলে খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহ সৈন্য বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছিল একজন মুসলিম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার জন্য।
এছাড়া খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। কেউ ব্যভিচার করলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। ফলে ঐ ব্যক্তি ২য়বার অপরাধ করার সুযোগ পাবে না এবং অন্যরা ঐ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না। ১৩০০ বছরের খিলাফতের ইতিহাসে পাথর মেরে হত্যার ঘটনা অনেক বেশি না।
তাই ইসলামি জীবন ব্যবস্থা তথা খিলাফতের অধীনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ সকল ধরনের নির্যাতন বন্ধ হবে কারণ –
– একজন মুসলিম কুরআন-সুন্নাহর সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ। একজন মুসলিম একমাত্র আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর ভয়ে ভীত হয়ে সমাজে নিরাপত্তার হুমকি হতে পারে এরকম ঘৃণ্য কাজ সমূহ থেকে বিরত থাকে।
– পাশাপাশি খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার চালু রাখে, যার ফলে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা হয়।
করণীয়:
রাসূল (সা) বলেছেন,
“যারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলে তাদের সাথে থেকে যারা সেগুলো (আল্লাহর হুকুম)-কে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্ঘন করে, (এরা উভয়ই) যেন তাদের মত যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের অংশে তাদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নীচের অংশে নিজেদের জায়গা করে নেয়। যখন নিচের লোকদের পিপাসা নিবৃত্ত করার প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচের অংশের লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নীচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের কোন সমস্যা করব না।’ এখন যদি উপরের অংশের অধিকারীরা নিচের ডেক’এর লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। অবশ্য তারা (উপরের অংশের লোক) যদি তাদের (নীচের লোকদের)কে এ কাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরের অংশের লোক) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।” (বুখারী )
সুতরাং সমাজ ব্যবস্থার একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজকে এমন সব নির্দিষ্ট কার্যাবলী থেকে বিরত রাখা, যা ঘটলে তা হবে পুরো জাতির জন্য ক্ষতিকর। তাই ধর্ষনের মত বাজে ঘটনার শিকার আমার পরিচিত (মা-বোন-আত্মীয়স্বজন-সহপাঠী) কেউ হওয়ার আগে এ থেকে পরিত্রানের জন্য পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তরুন সমাজকে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং প্রকৃত সমাধান ইসলামিক রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
খিলাফতই ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি

“তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎকাজে আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে”। (আল ইমরানঃ ১১০)
সময়ের শুরু থেকেই যুগে যুগে পথহারা মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ পাক অসংখ্য নবী-রাসূলকে পাঠিয়েছেন। দুনিয়ার যাবতীয় মিথ্যাচার, যুলুম এবং মিথ্যা উপাস্য থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ যাতে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উপাসনা করতে পারে এবং সিরাত্বাল মুস্তাক্বিমের অনুসারী হতে পারে এজন্য পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে আল্লাহ নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন। তৎকালীন আরবের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে যখন মানুষ একত্ববাদের পরিবর্তে মূর্তিপূজা এবং নানারকম অনাচারে ডুবে গিয়েছিল তখন শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর আগমনে পৃথিবীর বিপন্ন মানবতার জন্য এক নতুন আশার সঞ্চার করে। নব্যুয়াত প্রাপ্তির পর মক্কায় দীর্ঘ তের বছর নিরন্তর তাওহীদের দাওয়াত এবং অত্যাচারী শাসকদের যুলুম নির্যাতন তাওহীদের দাওয়াতকে করেছিল আরো বেশি সুসংহত। অবশেষে আল্লাহর সাহায্যে মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম পুরো জাজিরাতুল আরবের এক শক্তিশালী এবং প্রতাপশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে রাসূল (সা) এর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে ইসলাম ইরাক, শাম, পারস্য ও রোমানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখে। উমাইয়া, আব্বাসী এবং উসমানীয় খিলাফতের সময় ইসলাম উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, মরক্কো গ্রীস, সিসিলি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক দিক দিয়ে ইসলাম পৃথিবীর ইতিহাসকে যুগ যুগ ধরে প্রভাবিত করেছে এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীদের জন্য ত্রাতা হিসেবে বরাবর আবির্ভূত হয়েছে।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে ঘটে মুসলিম ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন করে দেয়া সেই ঘটনাটি। ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ, সাম্রাজ্যবাদী সম্মিলিত কুফফার শক্তি ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের নিরন্তর প্রচেষ্ঠায় বিশ্বাসঘাতক মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক তুরষ্কে উসমানীয় খিলাফতের বিলুপ্তি ঘটায়। ১৯২৪ সালের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের দালাল শাসকদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য কৃত্রিম সীমানা এবং অসংখ্য জাতির পিতা যারা কুফফারদের পা চাটতে কোন রকম কার্পণ্য করেনি। তারা মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ যা মুসলিমদের দেহকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত। খিলাফাহ ধ্বংসের পর ১৯৪৮ সালে মুসলিমদের রক্ত দ্বারা বিজিত বায়তুল মাকদিসকে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সেখানে তারা আজ অবধি মুসলিম উম্মাহর হাজার হাজার নিরীহ ভাই-বোনদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে। মূলত খিলাফাহ ধ্বংসের পরবর্তী ইতিহাস মুসলিমদের অপমানকর, লজ্জাজনক এবং দুর্দশার ইতিহাস। ইরাক, আফগানিস্তান, বসনিয়া, চেচনিয়া, গুজরাট, হায়দ্রাবাদের অগণিত শহীদের আত্মদানে মুসলিমরা নীরব দর্শক ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। গুয়ান্তানামো, আবু গারিব কারাগারে আজ উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উপর চরম নির্যাতনের স্টীম রোলার চালানো হচ্ছে।
কুফফাররা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যাবর্তন টের পেয়ে মুসলিমদের উপর অধিক মাত্রায় খড়গহস্ত হয়েছে এবং তাদের অত্যাচারের হাতকে করেছে প্রসারিত। মুসলিম ভূমিগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি আজ তাদের ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সত্যসম্বলিত গ্রন্থ দিয়ে যাতে করে আল্লাহ তোমাকে যা দেখিয়েছেন তা দিয়ে তুমি মানবজাতিকে শাসন করতে পার”। (সূরা নিসাঃ১০৫)
আল্লাহ তায়ালার এ হুকুম পৃথিবীতে বাস্তবায়ন করার যে নির্দেশ তা খিলাফত রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে তার কাঁধে খলিফার বায়াত নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলি মৃত্যু”। (মুসলিম)
আজ মুসলিমরা তাদের দুর্দশার কারণ উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং তারা আবারও সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে যেটি আল্লাহর রাসূল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদীনায়।
মুসলিম ভূমিগুলোর রাজধানীতে আজ আবারো তরুণরা ইসলামের ‘রায়া’ এবং ‘লিওয়া’ হাতে জড়ো হচ্ছে ইসলামের সেই সোনালী ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য যার প্রতিশ্রুতি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) দিয়েছেন।
তিনি (সা) বলেন,
“তোমাদের মধ্যে নব্যুয়াত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন……………তারপর ফিরে আসবে নব্যুয়াতের আদলে খিলাফত” (আহমদ)
ইসলাম এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি
ইসলাম অন্য সবকিছু হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি। এটি মুসলিমদের জন্য এমন এক জীবনপদ্ধতি ধার্য করেছে যার একটি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় ধারা রয়েছে যা পরিবর্তিত কিংবা পরিবর্ধিত হয়না। এটি তাদের এমনভাবে এ জীবনপদ্ধতি অনুযায়ী চলার নির্দেশ করে যাতে তারা এ পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতিতে জীবনধারন করার ব্যাপারে চিন্তা (فكرياً) ও মনন (نفسياً) থেকে স্বস্তি না পায়, এবং এ পদ্ধতি ব্যতিরেকে তারা যেন প্রশান্তি না পায়।
ইসলাম জীবন সম্পর্কে একগুচ্ছ ধারণা (مفاهيم) নিয়ে এসেছে। এটি কিছু সাধারন দিকনির্দেশনা (خطوط عريضة) নিয়ে এসেছে অর্থাৎ, কিছু সর্বজনীন চিন্তা এনেছে যা মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে, মানুষ যত সমস্যার মুখোমুখি হয়, তার প্রত্যেকের সমাধান তা হতে নির্গত করা যায়। এ সকল কিছুই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির (قاعدة فكرية) উপর প্রতিষ্ঠিত; যার উপর জীবনের সকল চিন্তা দাড়াতে পারে এবং তা একটি মানদন্ডে (مقياس) পরিনত হতে পারে। এছাড়াও এটি সমাধানের জন্য আইন-কানুন, চিন্তা ও মতামত এ সকল কিছুই আকীদা হতে নির্গত করে এবং এর সর্বজনীন চিন্তাসমূহ হতে উৎসরিত করে।
এটি মানুষের জন্য চিন্তা নির্ধারিত করে দিয়েছে কিন্তু তার চিন্তাকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।
এটি জীবনের তার আচার-ব্যবহারকে নির্দিষ্ট চিন্তা দিয়ে আবদ্ধ করেছে, কিন্তু এটি মানুষকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।
তাই, দুনিয়ার জীবনের প্রতি মুসলিমের দৃষ্টিভংগি হয় এক সম্ভাবনাময় আশা, এক বাস্তবমুখী গুরতরতা এবং এ দৃষ্টিভংগি জীবনকে সঠিক পরিমাপে মূল্যায়ন করে যাতে একে অর্জন করা যায়, কিন্তু (সে অবগত যে) এটি (মূল) উদ্দেশ্য না, আর না এটি উদ্দেশ্য হবার জন্য উপযুক্ত। সুতরাং, জীবনে চলার পথে সে সংগ্রাম করে, আল্লার পক্ষ হতে তার জীবিকা অর্জন করে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর বান্দাদের দেয়া সুন্দর উপকরণসমূহ ও পবিত্র রিজক থেকে সে উপভোগ করে। তবে সে উপলব্ধি করে যে দুনিয়া ক্ষনস্থায়ী, আর আখিরাত চিরকালের চিরস্থায়ী বাসস্থান।
ইসলামের আইন-কানুনসমূহ মানুষের ব্যাবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে যেভাবে নির্দিষ্ট সমাধান দিয়েছে তেমনি সালাতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া দেখিয়েছে। এ আইনকানুন বিবাহসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিয়েছে, একইভাবে যাকাত (তথা দান-সদকা)-এর ব্যাপারেও সমাধান দিয়েছে। এসব আইনকানুন কিভাবে সম্পদ অর্জন করতে হয় তার যেমন নির্দিষ্ট বিবরন দেয়, একইভাবে কিভাবে তা ব্যয় করা যায় তারও সুনির্দিষ্ট বিবরন দেয়। এসব আইনকানুনে দুআ ও ইবাদাতের বিবরন রয়েছে, আইনী শাস্তিসমূহের (حدود) বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, চুড়ান্ত শাস্তি (جنايات) ও অন্যান্য বিভিন্ন শাস্তির (عقوبات) বিবরন; এছাড়াও এতে (আইন লংঘন করলে) জাহান্নামে শাস্তির বিবরন এবং (আইন অনুযায়ী চললে) জান্নাতে সুখের বিবরন রয়েছে।
এসব আইনকানুন সরকার গঠন ও এর (শাসন) পদ্ধতির নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। এছাড়াও তা ব্যাক্তিকে আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য (এসব) আইনকানুনসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রেষনা যোগায়। এসব আইনকানুন তাকে রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ, জনগণ ও জাতিসমূহের সম্পর্কের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেয় যেভাবে তা মানবজাতির কাছে (ইসলামের) দাওয়া বহন করে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দেয়।
এছাড়াও তা সুউচ্চ (উৎকৃষ্ট) বৈশিষ্ট্য অর্জন করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, একারণে যে তা আল্লাহর তরফ হতে আসা নির্দেশ, একারণে না যে তা মানুষের নিকট পছন্দনীয়।
এভাবেই ইসলাম মানুষের নিজের সাথে ও অন্য মানুষের সাথে সকল সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করার জন্য এসেছে যেভাবে তা তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করে; এসকল কিছুই একই চিন্তা ও সমাধানের ব্যবস্থা হতে। মানুষ, তাই পার্থিব জীবনে এক নির্দিষ্ট প্রেষনায়, এক নির্ধারিত পথে, নিরূপন করা ও মনোনিত এক উদ্দেশ্য অর্জনে অগ্রসর হওয়ার জন্য বাধ্য।
ইসলাম মানুষকে বাধ্য করেছে একমাত্র এই পথের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থেকে (পথ) চলতে। এটি তাকে আখিরাতের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তির ব্যাপারে এবং পাশাপাশি দুনিয়ার কঠোর শাস্তির ব্যাপারেও সতর্ক করেছে; যেখানে দুটোর একটি অনিবার্যভাবে তাদের পাকরাও করবে যদি তারা একচুল পরিমানও বিপথগামী হয়।
এভাবেই একজন মুসলিম জীবনের পথে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়, একটি নির্দিষ্ট পন্থায় জীবনধারন করে, এক নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মধ্যে বিরাজমান থাকে ইসলামী আকীদা গ্রহণের মাধ্যমে এবং আল্লাহর বেঁধে দেয়া আদেশ-নিষেধ মানার বাধ্যবাধকতা যা তাকে ইসলামের আইনের মধ্যে আবদ্ধ রাখে।
জীবন সম্পর্কে এই নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও সুনির্দিষ্ট জীবনপ্রক্রিয়া অনিবার্যভাবেই প্রত্যেক মুসলিমের উপর আরোপিত হবে।
আকীদার ও শরীআহর আইন উভয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয়াদি ইসলাম কিতাব ও সুন্নাহতে দ্ব্যার্থহীন ও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে।
তাই ইসলাম শুধুমাত্র কোনো আধ্যাত্মিক ধর্ম কিংবা কোনো পুরোহিততান্ত্রিক ধারণা না। বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা এবং সকল মুসলিমকে তার জীবনে কেবলমাত্র এ পদ্ধতিতে চলতে হবে।
Taken from the Book “Islamic Thought”
বিদ্যুৎ কি লাভজনক ব্যবসায়িক পণ্য?

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও গবেষণা সংস্থা বিল্ড (বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট) এর সহায়তায় ঢাকার তারা ভরা রেডিসন হোটেলে দুই দিন ব্যাপী বিনিয়োগ সম্মেলনে (২৪ ও ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৬) জ্বালানি খাতে ৩০০ কোটি মার্কিন হলার বিনিয়োগুলো ঘোষণা দিয়েছে সামিট গ্রুপ।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে ভারতের রিলায়েন্স ও আদানী গ্রুপ আলাদা আলাদা ভাবে বাংলাদেশে মোট ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানান। [সূত্র: প্রথম আলো ২৫/১/২০১৬]
একটি ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশে মালিকানার অবাধ স্বাধীনতা স্বীকৃত। তাই বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি বিদ্যুতখাতকে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের মুনাফা অর্জনের আনন্দময় ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। বিদ্যুৎ খাতকে শুধু কিছু কোম্পানির ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিণত করেই সরকার থেমে যায়নি বরং দেশকে বিদ্যুৎ আমদানি নির্ভর করার কাজ অব্যাহত রেখেছে। অবশ্য বর্তমানে জনগণের গণতান্ত্রিক শাসক (আপদ এবং বিপদ) এর প্রতি আস্থা নেই এবং ভাল কিছু আশাও করে না। মুনাফার জন্য বিদ্যুৎ খাতকে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া এমন একটি চিন্তা যা পুঁজিবাদ তার আদর্শিক অবস্থান থেকে সমর্থন করে এবং এই চিন্তাই বাংলাদেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ। যেখান থেকে মুনাফা তুলতে উদগ্রীব সামিট-আদানি-রিলায়েন্স।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তিনটি জিনিসের মাঝে সকল মানুষ শরিক। এগুলো হচ্ছে পানি, ঘাস (চারণভূমি) এবং আগুন।”
বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু সমাজের সকল কিছু সমাজের সকল মানুষের সমানভাবে প্রয়োজন এবং যেগুলোর অভাবে মানুষ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে তা গণ মালিকানাধীন সম্পদ। তাই বিদ্যুতের সামষ্টিক উপযোগিতা(প্রয়োজন) থাকার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সঞ্চালন লাইন/ সরবরাহ তার(supply line) গণমালিকানাধীন সম্পদ।
ইবনে হাম্মাল (রা.) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুল (সা.) এর নিকট মারিব নাম স্থানের কিছু সম্পত্তি অনুদান হিসাবে তাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। রাসুল (সা.) তা তাকে দিয়ে দিলেন। যখন তিনি চলে গেলেন। তখন লোকেরা বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি জানেন? আপনি তাকে কী দিয়েছেন? আপনি তাকে অফুরন্ত পানির উৎস দিয়ে দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন,“এরপর রাসুল (সা.) এটি ফেরত নিয়ে নিলেন।
সুতরাং এমন খনি যাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ মজুদ আছে তা গণমালিকানাধীন সম্পদ যেমনঃ বাংলাদেশে প্রাপ্ত তেল, গ্যাস, কয়লা এবং ইউরেনিয়ামের বড় আকারের খনি।
সুতরাং, বিদ্যুৎ. তেল, গ্যাস, কয়লা তথা জ্বালানি খাত কোনো কোম্পানি কিংবা ব্যক্তির মালিকানায় ছেড়ে দিয়ে মুনাফা অর্জনের আরামদায়ক খাতে পরিণত করা ইসলামে নিষিদ্ধ, কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যা খুবই জনপ্রিয় এবং প্রসিদ্ধ। ইসলামের দৃষ্টিতে গণমালিকানাধীন যৌথভাবে সকল নাগরিকের মালিকানা রয়েছে, এগুলো ব্যবহার করা ব্যক্তির জন্য বৈধ কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে নিতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন: বিদ্যুৎ খাত।
খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার সাথে সাথে খলিফা বিদ্যুৎ খাতে দেশি বিদেশি কোম্পানির মুনাফার উৎস বন্ধ করবেন। খিলাফত রাষ্ট্র সুলভ মূল্যে (উৎপাদন মূল্যে) জনগণকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে যা কৃষি ও শিল্পখাত বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস জনিত কারণে পণ্যমূল্য হ্রাস করবে।
প্রয়োজনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ(হারবি হুকমান রাষ্ট্রে) রপ্তানি করে প্রাপ্ত আয় মুসলমানদের কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হবে। বাইতুল মালে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে অস্ত্র ও সৈন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
আসুন খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে গণসংযোগ অব্যাহত রাখি।
“তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং এরাই সফলকাম।” [সূরা আল ইমরানঃ১০৪]
“(পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়) শিক্ষা ধংসের চাবিকাঠি”

শিক্ষা উন্নয়নের পূর্বশর্ত- এই কথাটি আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত একটি বাক্য। ছোটকাল থেকেই এটা শুনে-বুঝেই বড় হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। এরূপ আরও অনেক মন্ত্র মুখস্থ করতে বড় হওয়া শিশুরা জীবনে উন্নয়ন ঘটাতে দৌড়ঝাঁপ-প্রতিযোগিতা শুরু করেন। শিশু অবস্থায় তাদের ওজনের তুলনায় ব্যাগের ওজন বেশি থাকে আর বড় হলে তাদের জ্ঞানের তুলনায় টাকার ওজন বেশি হয়ে যায়।
প্রতিযোগিতামূলক এই ব্যবস্থাতে শিশু অবস্থায় স্কুলে ভর্তির দৌড়ঝাঁপ এস.এস.সির গণ্ডি পেরুনোর পরও থামেনা কলেজে ভর্তির জন্য এবং এরপর ভার্সিটির ভর্তি তো আছে। লক্ষ্য একটাই, কিছু একটা করা; জীবনে উন্নতি সাধন।
শেয়ার বাজারে শেয়ারের দাম নিম্নগতিতে হলেও উর্ধগতিতে বেড়ে চলেছে এসকল প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ফি। একদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত স্থানের ব্যবস্থা করা হয়না বেসরকারি কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্দেশ্যে এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের থেকে কচলিয়ে টাকা আদায় করা হয়। আর এখানেই উন্নয়নের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় অনেকের আর কঠিন এক হতাশা তাকে গ্রাস করে নেয়। আর টাকার দড়িতে ফাঁসিতে ঝুলে যায় বাংলাদেশ নেভি কলেজের মুন অথবা ঢাকা কলেজের শিমুলের মত অনেকেই। (জানুয়ারী ১ এবং ২, ২০১৬)
ধান মাড়ানোর মেশিনের তুলনাধীন এই শিক্ষাজীবন থেকে যারা বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয় তাদের জন্য এই ব্যবস্থা প্রস্তুত রেখেছে বেকারের জীবন। জীবনে উন্নয়নের জন্য বস্তাভর্তি ডিগ্রি অপেক্ষা যখন মোটা অংকের টাকার হিসাব অধিক সহজ এবং শক্তিশালী, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদালয়ের সুক্তির কাছেও আত্মহত্যায় অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। (২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৫)
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষা বর্তমান প্রজন্মের উন্নয়ন নয়, বরং আত্মহত্যার চাবিকাঠিতে পরিণত হয়েছে। মুন, সুক্তি বা শিমুল ছাড়াও অহরহ প্রতিনিয়তই শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করছে। কারণ পুঁজিবাদী চিন্তাধারা আমাদের চিন্তাকে করে রেখেছে বিষাক্ত। শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে আমাদের শেখানো হচ্ছে একটি ভালো চাকরি, কারিকারি টাকা, গাড়ি-বাড়ি ইত্যাদি… যেকারণে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে এগুলোকে নির্ধারণ করে যখন কেউ আগাচ্ছে, তা অর্জন করতে না পেরে হতাশাগ্রস্থ এক জীবনের সম্মুখীন হয়ে আত্মহত্যা করছে।
সমাধান:
শিক্ষা হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি জাতির অন্তরে তাদের নিজ সংস্কৃতির বীজ বপন করা হয়। খিলাফত রাষ্টড়ব্যব্বস্থায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী আক্বীদাকে উম্মাহ’র অন্তরে প্রোথিতকরণ এবং এর মাধ্যমে প্রজন্মের সঠিক চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠন। এবং শিক্ষার নিশ্চিতকরণের দায়িত্বে থাকবে রাষ্ট্র নিজের। খিলাফত হতাশাজনিত প্রজন্ম উপহার দেয়না, বরং সত্যিকার অর্থে দুনিয়ার আলোবহনকারীদের জন্ম দেয়। ইমাম শাফী এর মত আইনশাস্ত্রবিদ, আল রাযী এর চিকিৎসাবিদ, আল খোয়ারিজমী-এর মত গণিতবিদ(বীজগণিতের জনক) উওহার দেয়। খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দেয় আবু হানিফা এর মত অর্থনীতি ও সমাজবিদ, আল মাসূদীর মতো ভূগোলবিদ এবং জাফর আস-সাদিকের মতো প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ। ইতিহাসের পাতায় পাতায় খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থার আদলে গড়ে ওঠা এইসকল মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম বারবারই উঠে আসে এবং তাদের কাজসমূহ আজও বিশ্বকে আলো দেখিয়ে চলেছে।
আর এভাবেই খিলাফত মুনাফা বা অর্থকে কেন্দ্র করে নয়, বরং আল্লাহ’র সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করেই তার শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজাবে এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবে এই উম্মাহকে, ইন-শা-আল্লাহ।
“যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন”। (সুরা মুজাদিলা- ১১)
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা সরকারের কোন সাফল্য নয়

শীতকালে প্রচুর সবজি বাজারে দেখা যাওয়া কিংবা রাশিয়াতে উদ্ধৃত আলু রপ্তানি করা দেখে আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় এর পেছনে সরকারের নীতিগত কোন অবদান রয়েছে। সরকারের দশ টাকায় কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলা বা সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি কিংবা বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিকে এই উৎপাদনশীলতার কারন হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। কারন যেখানে বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকের নুন আনতে পান্তা ফুরায় সেখানে তাদের উপর “অনিশ্চিত মুনাফার” (যা কিনা নুন কিনতেই ফুরিয়ে যায়) বিনিময়ে ঋণের বোঝা চাপানো হচ্ছে। ২০১৪-২০১৫ সালে বাজেটের ২.১ % বরাদ্ধ রাখা হয়েছে কৃষিতে অপরদিকে জনপ্রশাসন ও জননিরাপওার জন্য বরাদ্ধ প্রায় ৩৫% । যেখানে দেশের ৮০% ভুমি কৃষিতে ব্যবহারযোগ্য সেখানে এইরূপ পরিকল্পনা মূলত কৃষিতে সরকারের উদাসীনতাই প্রমান করে ।২০০৫ সালের দিকেও এদেশের ৮০ভাগ শ্রমজীবী মানুষ কৃষির উপর নির্ভর ছিল অথচ ২০১০ সালে এসে তা দাড়িয়েছে ৪০ ভাগে (সূত্র: উইকিপিডিয়া)। ক্রমাগত প্রবাশীদের পাঠানো অর্থের উপর নির্ভরশীলতা এই হার আরো কমিয়ে আনছে। তারপরেও যথেষ্ট পরিমানে খাদ্যশস্যের যোগান পাওয়ার কারন এই কৃষকদের ঋণের টাকায় উৎপাদন।যেই ঋণের সিংহভাগ যোগানদাতা NGO গুলো। ঋনের সুদের টাকার যোগান দিতেই কৃষকদের পুনরায় ঋণ নিতে হয় ।মুনাফার টাকা ও তাদের সুদ প্রদানেই খরচ হয়ে যায় ।
কৃষিখাতের এই দুরাবস্তা দূর করার একমাত্র উপায় হচ্ছে কৃষকদের আবার কৃষিজমিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। তাদের জন্য অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা, খাস জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বন্টন, অব্যবহত জমি পুর্নবন্টন, বীজ সার ও সেচের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরন, পেটেন্ট বা অধিসত্ব নামক পুজিবাদী ধারনা হতে কৃষি ও কৃষিজাত অন্যান্য পন্যদ্রব্যকে মুক্ত করা।
বিদেশী অধিক ফলনশীল বীজের নামে ব্যবহত হওয়া ক্ষতিকারক বীজের ব্যবহার বন্ধ করা। অধিক উৎপাদনক্ষমতা ও কৃষিজমির জন্য উপকারী বীজের ব্যবহার সুনিশ্চিত করা এবং এসবই সম্ভব এই পুঁজিবাদী অর্থনীতি সমুলে উৎপাটন করে ইসলামী অর্থনীতির প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
“যে আমার বানী (কুরআন) প্রত্যাখ্যান করবে, তার জীবিকা সংর্কীন হবে এবং আমি তাকে পুনরুথান দিবসে অন্ধভাবে তুলব“। (সুরা : তোয়াহা – ১২৪)
অর্থাৎ আল্লাহ এর মনোনীত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রতিষ্টা করার মাধ্যমে রিযিক সম্প্রসারনের ব্যবস্থা করা এই অব্যবস্থা হতে উত্তরণের একমাত্র উপায়। তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত খিলাফত(ইসলামী রাষ্ট্র ) প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা যা আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনের সাফ্যলের নিশ্চয়তা বহন করে।
খাদেমুল আমেরিকার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর তথাকথিত ইসলামিক জোট- পশ্চিমা কুফর শক্তির ঘৃণ্য চক্রান্তের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত

বাস্তবতা:
গত মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর, ২০১৫) সৌদি আরব ৩৪টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর, আফগানিস্তান ও অন্যান্য মুসলিম দেশে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি সামরিক জোটের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং বলে যে, বাংলাদেশ এই জোটে অংশগ্রহনের জন্য আন্তরিকভাবে সম্মত হয়েছে কারণ এটা ‘সহিংস উগ্রবাদের’ বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অন্যকথায়, ইসলামের বিরুদ্ধে যালিম হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কারণ:
মার্কিন নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার পশ্চিমারা শক্তিশালী খিলাফত রাষ্ট্রের দাবিতে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণকে ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে যা সিরিয়াতে তীব্ররূপ ধারন করেছে। সকল বিকল্প ব্যবহার শেষে, অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘৃণ্য মার্কিনীরা এখন শুধু সিরিয়াতেই নয় প্রয়োজনে মুসলিম বিশ্বের যেকোন প্রান্তে সত্যনিষ্ঠ মুসলিমদের জাগরণকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে মুসলিম সেনাবাহিনীর গভীরতর অংশগ্রহণ চাচ্ছে, এবং তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে এই ধরনের সামরিক জোটের উত্থান দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব এশ কার্টার মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে আরও সমর্থন জোগানোর জন্য তার আঞ্চলিক সফরের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার তুরষ্কে ইনকিরলিক বিমানঘাটিতে পৌছানোর পর তৎক্ষণাৎ এই জোট ঘটেেনর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে: “এই জোটকে হুবুহু আমাদের নীতির সাথে এক মনে হচ্ছে, যা আমরা বেশকিছুদিন যাবৎ আকাঙ্খা করছিলাম, যা আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সুন্নী আরব দেশগুলো কর্তৃক অভিযানে বড় অবদান রাখবে।”
সচেতন উম্মাহ’র যা জানা উচিত:
উম্মাহ্’কে পেছন দিক থেকে ছুরিকাঘাত করতে সৌদি রাজতন্ত্র সবসময় কেন্দ্রীয় ভুমিকা পালন করে আসছে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে চক্রান্তের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের মাধ্যমে যার যাত্রা শুধু হয়। এবং এখন ২য় খিলাফতে রাশেদাহ্’র প্রত্যাবর্তন যখন আসন্ন, তখন কৃত্রিমভাবে গঠিত মুসলিম জাতি-রাষ্ট্রসমূহের বিশ্বাসঘাতক শাসকেরা খিলাফতের জন্য উম্মাহ্’র আকাঙ্খা ও সংগ্রামের উপর চরম ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে স্বঘোষিত ‘খাদেমুল হারামাইন’(!)-এর নেতৃত্বের অধীনে একত্রিত হয়েছে।
যখন পশ্চিমাদের জারজ সন্তান ইসরাইল অর্ধশতকেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের রক্তপাত ঘটাচ্ছে, আমাদের প্রথম কিবলা আল আকসাকে অপবিত্র করছে, তখন মুসলিম শাসকেরা তাদের সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে বন্দী করে রেখেছে- যদিও সংখ্যা ও সাহসিকতায় ইয়াহুদীদেরকে তারা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। যখন মূর্তিপূজারী হিন্দুরা মুসলিমদেরকে কসাইয়ের মত হত্যা করেছে এবং উম্মাহ’র সম্মানিত মুসলিম নারীদের অসম্মান করেছে তখন শাসকেরা মুহম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসুরি মুসলিম সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করেনি। যখন মায়ানমারের বৌদ্ধ মুশরেকরা হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করেছে, তাঁদের দেহগুলোকে পুড়িয়ে দিয়েছে মুসলিম শাসকেরা তখন খালিদ বিন ওয়ালিদের উত্তরসুরি মুসলিম সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করেনি। যখন মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মুসলিমদের পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছিল ও তাদেরকে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছিল তখন মুসলিম শাসকেরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে সেখানে প্রেরণ করেনি। যখন আমেরিকা ও পশ্চিমা ক্রুসেডাররা আফগানিস্তান ও ইরাককে দখল করল এবং মুসলিমদের রক্তের বন্যা বইয়ে দিল তখন মুসলিমদের রক্ষায় শাসকেরা সাইয়্যুদনা সুহাদা(শহীদদের সর্দার) হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের উত্তরসুরী মুসলিম সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করেনি, বরং তারা যথাসম্ভব ক্রুসেডারদের সহায়তা করেছে।
যখন নির্যাতিত মুসলিমদের প্রয়োজনে ও জালিম কাফিরদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করার শারী’য়াহগত দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছিল তখন জালিম শাসকগণ নিজস্ব দূর্বলতা ও উপনিবেশিকদের বেঁধে দেয়া সীমান্তের পবিত্রতা লঙ্ঘিত হওয়ার অজুহাত দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু আজকে তাদের সত্যিকারের প্রভূ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা যখন ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছে তখন দূর্বলতা ও ‘পবিত্র’ সীমান্তের অজুহাতকে অতিক্রম করে তারা সাড়া দিয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘…আবার আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত।’ (মুসনাদে আহমদ)
পুরো পৃথিবী এক হয়েও প্রতিশ্রুত খিলাফত ফিরে আসাকে রুখতে পারবে না। কারণ ইতিহাস স্বাক্ষী জালিম ফিরাউন মুসা (আ)এর উত্থানকে প্রতিহত করতে কোন প্রচেষ্টাই বাদ রাখেনি। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নে ছিলেন সবচেয়ে উত্তম কৌশলী। আল্লাহ(সুওতা) বলেন,‘যাদেরকে(বনী ইসরাইলকে) দূর্বল করে রাখা হয়েছিল, আমার ইচছা হল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার, তাদেরকে নেতা করার এবং তাদেরকে উত্তরাধিকারী করার। এবং তাদেরকে ক্ষমতায় আসীন করার এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্য-বাহিনীকে তা দেখিয়ে দেয়ার, যা তারা সেই দূর্বল দলের তরফ থেকে আশংকা করত।’ (সূরা কাসাস:৫-৬)
মুসলিম উম্মাহ ও এর সেনাবাহিনীকে অবশ্যই এসব জালিম বিশ্বাসঘাতক শাসকদের সহযোগী ও সমর্থনকারী হওয়া যাবে না এবং তাদের প্রত্যাখান করতে হবে । মুসলিম সেনাবাহিনীকে অনতিবিলম্বে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হতে হবে এবং সেই অতুলনীয় আল্লাহ’র সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হতে হবে যা তাদের আগে কেবলমাত্র মদীনার আনসারগন অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আল্লাহ(সুওতা) বলেন,
‘হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।’(সূরা মুহম্মদ:৭)
রাফীম আহমেদ
জনসংখ্যার আধিক্য: আশির্বাদ নাকি অভিশাপ!

মা হওয়ার প্রতি উদ্ধুদ্ধ করার জন্য গোটা একদিন ছুটি ধার্য করেছে সরকার। সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থা বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের দম্পতিদের গর্ভধারন করার জন্য আবেদন জানানো হচ্ছে। যেই ভাবে শিশু জন্ম হার কমছে তা ক্রমশ নিন্ম হতে নিন্মগামী হচ্ছে। যা যথেষ্ট চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে সে দেশের সরকারের। দম্পতিদের যৌন সংসর্গ স্থাপনের জন্য বাড়তি ছুটির দিন ধার্য করা হয়েছে। এমনকি বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হচ্ছে “ডু ইট ফর মম, ডু ইট ফর কান্ট্রি”। উপরের তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে ডেনমার্ক সম্পর্কে।
আবার, ডেনমার্কের মতই সন্তান জন্ম দানের জন্য মা-বাবাদের উদ্ধুদ্ধ করতে ২০০৭ সাল হতে ২০১২ সালকে জাতীয় গর্ভধারন দিবস হিসেবে ঘোষনা করেছে রাশিয়া সরকার। এমনকি সন্তান জন্ম গ্রহণে পুরষ্কার ও ঘোষনা করেছে রুশ সরকার।
উপরের দৃশ্যের মত দৃশ্য দেখা যায় উন্নত বিশের দেশ জার্মানী, সুইজারলেন্ড, জাপান এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। যারা সবচেয়ে বড় সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা হলো-জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের নিন্মগতি।
উপরের দৃশ্যপটের ঠিক উল্টো দৃশ্য দেখা যায় বিপুল জনসংখ্যার ভারে নাভিশাস উঠা বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনিশিয়া, পাকিস্তান এর মত দেশ গুলোর। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৭১ সালে ছিল ৭ কোটি, তা এখন এসে দাড়িয়েছে প্রায় ১৬ কোটিতে। ভারতে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটির বেশী।
আমাদের জ্ঞানীগুনী ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদের মতে আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য সার্বিক সমস্যার মূল কারণ হল-অধিক জনসংখ্যা। তাই তাদের প্রধান পরামর্শ হল- একটি সন্তান জন্মদান। এটি বাস্তবায়নের জন্য তাদের সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে জনসংখ্যা কম সমস্যা নিয়ে ভোগা উন্নত (!) দেশ সমূহের বিভিন্ন NGO সংস্থা। এই ছাড়াও বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশ সমূহে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কমানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সামাজিক আন্দোলন, জন্ম বিরতিকরন প্রকল্প, পরিবার পরিকল্পনা সহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রাষ্ট্র ও সহযোগী NGO সমূহ। কম জনসংখ্যা নিয়ে সমস্যা থাকা রাষ্ট্র সমূহ আবার অধিক জনসংখ্যা নিয়ে থাকা রাষ্ট্র সমূহে জনসংখ্যা কমানোর জন্য সহযোগিতা করছে।
আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যার আসল কারণ খুজতে গেলে দেখা যায় জনসংখ্যা নয়, সমস্যা অন্য কোথাও। বাংলাদেশ একটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পর্ন দেশ, তার মানে বর্তমানে উৎপাদিত খাদ্যশস্য বাংলাদেশের সকল জনগনের জন্যই যথেষ্ট, পাশাপাশি বিগত দশকগুলোতে জনসংখ্যার অনুপাতে খাদ্য উৎপাদন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। তবুও বাংলাদেশের ৪০% মানুষ এক বেলা খায় একবেলা উপোস থাকে। কারণ প্রভাবশালী পুঁজিপতি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারক বাহকরাই এই সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের নিয়ন্ত্রন করে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক সকল কর্মকান্ডে পুঁজিবাদী সমাজের পুজিপতিরা দিনদিন লাভবান ও অর্থশালী হন এবং অধিকাংশ জনগণ তাদের দ্বারা নিষ্পেষিত ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখোমুখি হন। অথচ এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য অধিক জনসংখ্যাকেই দায়ী করা হয়। রাষ্ট্র তার জনগনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারার দায়ভার অধিক জনসংখ্যার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এই ছাড়াও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও গণমালিকানাধীন সম্পদ আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক শক্তি লুটে-পুটে নিয়ে যায় এবং দেশের জনগোষ্ঠীকে দূরবস্থার মধ্যে পেলে অধিক জনসংখ্যার দোহাই দেয়।
এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দিকে একটু মনোনিবেশ করলেই দেখা যায় কোথাও অধিক খাদ্য উৎপাদন হয়, আবার কোথাও প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু তা ওই কর্ম করার মত জনবল নেই। আবার জনগোষ্ঠী সমূহকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীতে জাতীয়তাবাদী কৃত্রিম বর্ডার দিয়ে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তাই কোথাও খাদ্যের অভাব নেই কিন্তু খাবার খাওয়ার মানুষ নেই, আবার কোথাও কর্মসংস্থান আছে কিন্তু কর্ম করার মানুষ নেই।
এখন পশ্চিমা সমাজের মানুষের প্রধান চাহিদা হল- ঈন্দ্রিয়গত সুখ। তাই তারা অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত এবং যৌন চাহিদাকে সন্তান জন্ম দানের মাধ্যম মনে না করে শুধুমাত্র পুর্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা তাদের সুখের জন্যে অধিক অর্থের পিছনে ছোটে এবং যত প্রকার ঈন্দ্রিয়গত সুখ রয়েছে তার সবটুকু তারা ভোগ করতে চায়। তাই তারা সুদীর্ঘ সময় সন্তান জন্মদানের যে আকাঙ্খা তা হতে দূরে থাকে এবং বর্তমানে সন্তান জন্মদানের জন্য তাদেরকে বিজ্ঞাপন দিতে হচ্ছে।
তাই বলা যায় যে, জনসংখ্যা সমস্যা নয় বরং আশির্বাদ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এর রহমত সরূপ, যারা আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ভূমিকে উর্বর করে। রাষ্ট্র তার জনগণকে সঠিকভাবে ব্যবহার করবে এবং সঠিকভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিনত করতে পারে। পৃথিবীতে জেলখানার মত জাতীয়তাবাদী বর্ডার দিয়ে আটকে রাখা জনগণকে অবাধ বিচরনের মাধ্যমে যেখানে প্রচুর কর্মসংস্থান রয়েছে সেখানে পৌছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ বাস্তবতা তখনই তৈরি হবে যখন এই জাতীয়তাবাদী চিন্তায় আটকে রাখা বর্ডারকে ভেঙ্গে দেয়া হবে। মুসলিম উম্মাহকে এক জাতি হিসেবে মেনে নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূমিতে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ হতে বের হওয়ার মাধ্যমেই এই উদ্যোগগুলো নেয়া সম্ভব।
সকল প্রাণীকূলের রিজকের দায়িত্ব যেহেতু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিয়ে নিয়েছেন তাই অধিক জনসংখ্যায় রিজকের সমস্যাও হবেনা এবং এটাই একজন মুসলিমের বিশ্বাস।
যেখানে রাসূল (সা) বলেন,
“তোমরা উর্বর নারীদেরকে বিয়ে কর (যেন তারা অধিক সন্তান জন্ম দিতে পারে)।
তিনি (সা) বলেন,
“হাশরের ময়দানে আমি আমার উম্মতের আধিক্য নিয়ে অন্য উম্মতের সাথে গর্ব করব”।
অর্থনৈতিক, সামাজিক যেরকম সমস্যাই হোক না কেন যার মূলে তারা অধিক জনসংখ্যাকে দায়ী করে, এই সকল সমস্যার সমাধান পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমাধান করতে পারবেনা বরং দিন দিন আরোও সমস্যা বৃদ্ধি করবে যা আমরা পশ্চিমা বিশ্ব এর দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। সকল সমস্যার সমাধান একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মনোনিত ব্যবস্থা খিলাফতই দিতে পারে। এবং যা শীঘ্রই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার মুমিনদের দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।
আবদুস সামাদ
বিদেশী নাগরিকের হত্যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অসুস্থ চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ

গত ২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গুলশানের এক সড়কের ফুটপাতে ইতালিয় নাগরিক সিজার তাবেলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর কয়েক দিন যেতে না যেতেই রংপুরে খুন করা হয় জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে। যদিও খুন হত্যা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য একটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। দেশে গড়ে প্রতিদিন ১০টির অধিক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় এর মাঝে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় গড়ে ২-৩ টি। দেশীয় হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও সিজার এবং কুনিও হোশিকে হত্যার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। উত্তেজনা তৈরি হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক যেহেতু তারা দুজনই ছিল দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক। কারা এবং কেন এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত করেছে সে ব্যাপারে নিরাপত্তা বাহিনী এখনো পর্যন্ত কোন পরিষ্কার ধারনা দিতে পারেনি। বরং একেক নিরাপত্তা বাহিনী একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছে এবং এর মাঝে প্রধানমন্ত্রী এটাকে তদন্তের ফলাফল পূর্ব নির্ধারণ সরূপ বিরোধী দলের কাজ বলে মন্তব্য করেছেন। অতীতেও আমারা বিডিআর এ সামরিক বাহীনির ৫৭জন আফিসারের হত্যাকাণ্ড, সাগর-রুনি, মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীসহ বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কোন সুরাহা পাইনি।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার তা হলো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দালাল শাসকেরা যুগ যুগ ধরে দেশের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে সেভাবে বিদেশী সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্স বুঝতে হবে। এই ব্যবস্থার চিন্তার মূলেই রয়েছে যে কোন উপায়ে নিজ বা নিজ দল বা দেশের কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল করা। সেটা হোক অন্য কোন দেশের উপর অন্যায়ভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে বা নিজ দেশের নিরীহ মানুষকে হত্যা করে অথবা ভিনদেশি নাগরিক খুন করে। মানবরচিত এই ব্যবস্থায় নিরাপত্তা শুধুই শাসকবর্গের জন্য। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা যেকোন ধরনের নির্লজ্জ কাজ করতে পিছপা হয়না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মোড়ল স্বয়ং আমেরিকায় প্রতি বছর সিআইএ কর্তৃক বহু দেশের অসংখ্য নাগরিককে হত্যা করে তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কারণে। আবার ব্রিটেন অতীতে তার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চালিয়েছে বহু হত্যাকাণ্ড। তাদের অনুকরনে নব্য আধিপত্যবাদী ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহে “র” এর মাধ্যমে চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে বহু হত্যাকান্ড। আবার আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার জন্য বা টিকে থাকার জন্য দেশের নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে খুন করিয়েছে বহু মানুষ। কুফর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা আশা করা একটি আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। স্বয়ং আমেরিকায় কোন কৃষনাংগ কে হত্যা করা হলে শ্বেতাঙ্গ হত্যাকারীকে নিষ্পাপ বলে মুক্তি দেয়া হয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দালাল শাসকবর্গ কিভাবে জনগণ এবং বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে যেখানে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তার মধ্যে থাকে। এই মানব রচিত ব্যবস্থা এবং এর শাসকবর্গ সারা বিশ্বে মানুষদেরকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইসলাম হচ্ছে একমাত্র শাসনব্যবস্থা যার মাধ্যমে খলীফা খিলাফত রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসরত সকল মুসলিম-অমুসলিম এবং বিদেশী নাগরিকদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। খিলাফত রাষ্ট্রে খলীফার মূল কাজই হল জনগণের দেখাশোনা করা। বর্তমান মেরুদন্ডহীন দালাল শাসকবর্গের মত খলীফা কখনোই কাফেরদের তাবেদারী করবেনা। তার আনুগত্য শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল এবং যে কারো জীবন রক্ষা করল সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করল“। (সূরা মায়িদাহ: ৩২)
খিলাফত রাষ্ট্র পরিচালিত হবে শরীয়াহর মাধ্যমে। খিলাফত রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল অমুসলিম একজন মুসলিম এর মত সকল নাগরিক অধিকার পাবে। খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ সকল রাষ্ট্রের নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। খিলাফত রাষ্ট্রের খলীফা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসকদের মত কৌশলগত বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিজ দেশের নিরীহ মানুষদের হত্যা করার মত জঘন্য কাজ করবে না।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে এক ব্যক্তি যার ব্যাপারে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে মুসলিমদের নির্যাতনের শাস্তি সরূপ মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল যখন উসমান (রা) তাকে নিরাপত্তা দিলেন (একজন মুসলমান কাউকে নিরাপত্তা দিলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া সকল মুসলমানের জন্য ওয়াজিব) এবং সে ক্ষমা চাইতে আসল। রাসূলুল্লাহ (সা) কিছুক্ষণ নিরব থেকে লোকটিকে ক্ষমা করেন। লোকটি চলে যাওয়ার পর রাসূল (সা) সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি চাইছিলাম যে তোমরা কেউ যেন তাকে হত্যা কর“। তখন উমার (রা) বলেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা) আপনি যদি ইশারা করতেন তাহলে আমি তাকে মেরে ফেলতাম। তখন আল্লাহর রাসুল (সা) বললেন, “কোন নবীর জন্য এটা শোভা পায়না যে সে ইশারায় মানুষ হত্যা করবে“। অথচ একজন রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে চাইলেই রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে হত্যা করতে পারতেন।
খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খলীফাগণ অতীতে নির্যাতিত অমুসলিমদের আহবানে সাড়া দিয়ে তাদেরকে রক্ষা করেছিলেন। স্পেনের রাজা রডরিকের জুলুম থেকে তরুণ সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদ স্পেনের অমুসলিমদেরকে রক্ষা করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে রাজা দহিরের অত্যাচারের দরুন মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধ প্রদেশ মুক্ত করেন। ইনশাআল্লাহ অচিরেই আসন্ন খিলাফত এর প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে খলীফা সারা বিশ্বের নির্যাতিত মুসলিম এবং অমুসলিমদেরকে সকল ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“এর দ্বারা আল্লাহ্ যারা তার সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালনা করেন।” (সূরা মায়িদা: ১৬)
দেলোয়ার হোসেন সুমন
পুঁজিবাদি গণতন্ত্রের থাবায় শিক্ষা

১) বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কিছুদিন পর পর বন্ধ করতে হয় কারণ আধিপত্য বিস্তার, হল দখল, এক সংগঠন কর্তৃক অন্য সংগঠন এর ছাত্রকে হত্যা, শিক্ষককে লাঞ্চনা, পরীক্ষা বাতিল ও পেছানোর দাবিতে।
২) আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো আদায় করছে অতিরিক্ত টিউশন ফি, সার্টিফিকেট বিক্রি, মানসম্মত শিক্ষকের অভাব, তার উপর সরকার সময়ে সময়ে যুক্ত করেছ বর্ধিত ভ্যাট ইত্যাদি।
৩) স্কুল কলেজে প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেতন বৃদ্ধিতে শিক্ষকদের কর্ম বিরতি, অতিরিক্ত ফি আদায়, প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা ইত্যাদি।
সমস্যার মূল কারণ:
“লেখা পড়া করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে”,“পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি”। এধরনের বাক্য ছোটবেলা থেকে পুঁজিবাদী এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দিয়ে আমাদের বড় করেছে। তাই বড় হয়ে যখন আমরা বিভিন্ন দায়িত্ব পাই তখন সেই সাফল্য খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠি। উপরে উল্লেখিত সকল সমস্যার মুল হচ্ছে পুঁজি বা অর্থ উপার্জন করার মানসিকতা। কারণ বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে সকলে দেখতে পাই, যার অর্থ বা ক্ষমতা আছে সেই সম্মানিত। তাই সকলে অর্থ বা ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। আর তাইতো একটা জাতির উন্নয়ন এর মুল শক্তি জ্ঞানকে পর্যন্ত পুঁজির একটি মাধ্যম হিসেবে মুল্যায়ন করে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের প্রহর গুনছে।
সমাধান:
সমস্যার মুল কারণ যেহেতু এই পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে এমন একটি ব্যবস্থা আনতে হবে যে ব্যবস্থা জ্ঞান অর্জনকে জাতির উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করবে। আর এটা হল খিলাফাহ ব্যবস্থা। খিলাফাহ ব্যবস্থায় জ্ঞান অর্জন এর মুল লক্ষ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অর্থ বা সম্মান না। কারণ এই ব্যবস্থায় শিক্ষার মুলনীতি হবে ইসলামী আকীদা এর উপর নির্ভর করে। পাঠ্যসূচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে এর মুল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হবার কোন সুযোগ না থাকে। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার যাবতীয় খরচ বহন করবে রাষ্ট্র নিজে (উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত, সম্ভব হলে উচ্চতর শিক্ষা পর্যন্ত) এবং খলীফা এটার পর্যবেক্ষন করবে। তাই কোন প্রকার অনিয়মের সুযোগ নেই। আল্লাহ তা’আলাহ বলেন,
“যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?” (সুরা যুমার- ৯)
“যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন”। (সুরা মুজাদিলা- ১১)
তাই মানুষ নিজের মর্যাদা বাড়াতে বা আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে, আল্লাহকে বুঝতে ও সঠিক উপায়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জ্ঞান অর্জন করবে, অর্থের জন্য নয়। এটি একটি ফরজ দায়িত্ব হিসেবে সবাই পালন করবে। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন,
“প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ”।
তাই আমাদের উচিত জাতি ধ্বংসের এই শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করতে, জাতিকে প্রকৃত মুল্যায়ন করে সেই খিলাফাহ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজে নেমে পড়ি। একমাত্র এই ব্যবস্থাই পারবে একটি উন্নত জ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি উপহার দিতে।
রোকন উদ্দিন























