তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মা’রূফ ও মুনকারের জ্ঞান
মা’রুফের আদেশ ও মুনকারের নিষেধের জন্য এর জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যকীয়। জ্ঞান সবসময় বিধিনিষেধের আগে আসে। জ্ঞান ব্যতিরেকে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সম্ভবপর নয়। সুতরাং একজন মুসলিমের জন্য শরীয়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য?
এটা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, কাজের আগে কাজের ব্যাপারে জ্ঞান অগ্রগন্য। আবার কাজটিও শরীয়া জ্ঞান অনুসারে হতে হবে। আর না হয় কাজ আল্লাহর ইবাদত হবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একজন মুসলিমকে মা’রুফাত পালনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং একারণে এ সর্ম্পকিত জ্ঞান থাকা বাঞ্চণীয়। একইভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একজন মুসলিমকে মুনকারাত থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং একারণে এ সর্ম্পকিত জ্ঞান থাকা বাঞ্চণীয়।
সুতরাং উপাসনা, আনুগত্য ও পালনের জন্য জ্ঞানের অপরিহার্যতা অপরিসীম। নিছক জ্ঞানার্জনের জন্য জ্ঞানার্জন নয়, বরং আনুগত্য ও ইবাদতের জন্য জ্ঞানার্জন জরুরী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
‘বস্তূত: আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাঁদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।’ (সূরা নিসা: ৬৪)
আবদুল্লাহ বিন আল মুবারক (র) এর মতে, ‘আমরা সাধারণত জ্ঞানার্জনের জন্যই জ্ঞান অন্বেষন করি। কিন্তু স্বয়ং জ্ঞানই আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নিমিত্তে হতে নারাজ।’ উপাসনা ও আনুগত্য কেবলমাত্র এ জন্যই। এ দু’বিষয়ের জ্ঞান এর সর্বনিম্ন সীমার মাধ্যমে অর্জন করা যায়, যেমন: তাকলীদ এবং এর সর্বোচ্চ সীমা হল ইজতিহাদ। উভয়ই ভাল যখন তা পালিত হয় ও আনুগত্যের জন্য উপলদ্ধি করা যায়। যে ব্যক্তি সালাত আদায় করে, সে সালাতের রুকন ও শর্তসমূহ পালন করে এবং এ ইবাদতকে প্রতিষ্ঠিত করে সেভাবে যেভাবে করতে বলা হয়েছে। যাহোক বাস্তবতা হচ্ছে, যে ব্যক্তি নিজস্ব ইজতিহাদ এবং জ্ঞান অর্জনের পন্থায় ইবাদত করেনি সে জ্ঞানের উৎকর্ষতা থেকে সীমাবদ্ধ করবে: এই উৎকর্ষই হচ্ছে জ্ঞান যার মাধ্যমে আল্লাহ্ মুসলিমদের বিভিন্ন মাএায় উথান ঘটান। মুকাল্লীদ হিসেবে ইবাদত সম্পন্ন করার অর্থ হল সম্পন্নকারী ব্যক্তি মুত্তাকী ও শরীয়ার জ্ঞানসম্পন্ন যাকে মনে করবে তার কাছ থেকে হুকুম গ্রহণ করবে। অর্থাৎ তার ঐ ইসলামী চিন্তাবিদের প্রতি সন্দেহমুক্ত ধারণা থাকবে যে, তিনি সঠিক ও আল্লাহর আনুগত্যের অধিকতর নিকটবর্তী। একইভাবে একজন মুতাব্বী হিসেবে যিনি ইবাদত করেন তিনি দলিলসহ আরেকজনকে অনুসরণ করেন এবং একারণে তিনিও একজন মুকাল্লীদ। তবে তিনি একজন আম্মী অর্থাৎ দলিল ব্যতিরেকে তাকলীদকারীর চেয়ে উচুস্তরের মুকাল্লীদ। উভয়েই অন্যের কাছ থেকে হুকুমটি গ্রহণ করেছেন এবং আনুগত্য ও ইবাদতকে উপলদ্ধি করেছেন। মুজতাহিদের স্থান সর্বোচ্চ ও পদমর্যাদায় অগ্রগামী। তিনি নিজেই আল্লাহ প্রদত্ত বাণী ও শরীয় দলিল থেকে হুকুম বের করে নিয়ে আসেন।
ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়
ভাবতে খুব আশ্চর্যজনক লাগে যখন লোকজন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে কেউ কেউ ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটিকে সাধারণ শরীয়া দায়িত্ব মনে করে এবং এটিকে অন্য হুকুমের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করে না।
এমনকি আরও বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করা যায় যে, অনেক মুসলিমগন শরীয়া বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীল খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ না করে বর্তমান শাসনব্যবস্থার মধ্যে শরীয়া হুকুম বাস্তবায়ন করতে চায়।
সুতরাং আমরা অবশেষে বলতে পারি যে, সামষ্টিক দায়িত্বসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য বাধ্যবাধকতা হল ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা-যা আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী পরিচালিত হয়। আজকে মুসলিমদের একটি অংশ এ দায়িত্ব পালন করছে। তবে তারা অপরিহার্যতা পূরণে সক্ষম নয়। কেননা ইসলামী রাষ্ট্র এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একারণে পুর্বের আলোচনার মত এ সামষ্টিক বাধ্যবাধকতাটি ব্যক্তিপর্যায়ের বাধ্যবাধকতা হিসেবে পরিগণিত হবে। অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমকে তার সামর্থ অনুযায়ী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে।
সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) সঠিক ও সুনির্ধারিত পদ্ধতি হল যে, মুসলিমগন আল্লাহ নির্দেশিত ফরযে আইনসমূহ সর্ম্পকে শিক্ষা নিবে। সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃক নির্দেশিত নিষেধসমূহ সর্ম্পকেও জ্ঞান অর্জন করবে। তারপর তাকে সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা বা ফরযে ক্বিফায়ার দিকে যেতে হবে এবং তার সামর্থ অনুযায়ী সেগুলো সম্পাদনের অংশগ্রহণ করতে হবে। জ্ঞানার্জনের পর আমাদেরকে সবচেয়ে বড় সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে-যা ইসলামের অধিকাংশ সামষ্টিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের হুকুম বাস্তবায়নের পদ্ধতি।
এইভাবে একজন মুসলিম নিজেকে বিচার দিবসের জন্য প্রস্তুত করে যেখানে সে তার কৃতকর্মের জন্য আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার সামনে জিজ্ঞাসিত হবে। কারণ সে ব্যক্তি পর্যায়ের সকল বাধ্যবাধকতা পালন করেছে ও নিষিদ্ধ কর্মকান্ড থেকে বিরত থেকেছে। তিনি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা পালন করেছেন-যা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অনেক বাধ্যবাধকতা পালন না করার গোনাহ থেকে মুক্ত হয়েছেন। এ উপায়ে মুসলিমগন সব দিক দিয়ে সত্যকে ধারণ করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ সে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে যাতে করে তার ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয। তিনি এমন ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছেন যাতে সমাজের মধ্যে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি অন্যকিছু যা এখন পর্যন্ত গ্রহন করা হয়নি তা হয়ত হবে সামষ্টিক বাধ্যবাধকতার খুবই সামান্য অংশ। এই ধরনের বাধ্যবাধকতার প্রকৃতি সামষ্টিক নয় (যেমন, হাঁচি দিলে কারও জন্য দোয়া করা বা কারও জানাযার নামাজ আদায় করা) বরং ব্যক্তিপর্যায়ের।
সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ফরযে ক্বিফায়া
যেমন ধরা যাক: যখন আমরা ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজটিকে ফরযে ক্বিফায়ার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি, তখন কুরআন ও সুন্নাহের ভিত্তিতেই সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি।
’যেসব লোক আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফায়সালা করে না, তারাই কাফের।’ (সূরা মায়েদাহ:৪৪)
’যেসব লোক আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না তারাই জালেম।’ (সূরা মায়েদাহ:৪৫)
’যারা আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসেক (মিথ্যাবাদী)।’ (সূরা মায়েদাহ:৪৭)
‘অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মনে না করে।….’ (সূরা নিসা:৬৫)
‘আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না….’ (সূরা মায়েদাহ:৪৯)
‘তারা কি জাহেলি যুগের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ্ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?’
(সূরা মায়েদাহ: ৫০)উপরোক্ত আয়াতসমূহ ও কোরআনের এ বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আয়াত ও হাদীসসমূহ প্রমাণ করে ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রের অপরিহার্যতা-যা আল্লাহ নাজিলকৃত বাণী দিয়ে শাসন করবে ।
যেসব আয়াতের মাধ্যমে হুদুদ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে তাদের সংখ্যা অনেক।
‘যে পূরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও…………..।’ (সূরা মায়েদাহ: ৩৮)
‘ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর।’ (সূরা আন নূর: ২)
‘যারা সতী-সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে অতঃপর স্বপক্ষে সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি বেত্রাঘাত করবে…’ (সূরা আন নূর: ৪)
‘সে প্রাণকে হত্যা করো না, যাকে আল্লাহ্ হারাম করেছেন; কিন্তূ ন্যায়ভাবে। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে নিহত হয়, আমি তার উত্তরাধিকারীকে ক্ষমতা দান করি….’ (সূরা বনী ইসরাইল: ৩৩)
‘যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচেছ এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলীতে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে।’ (সূরা মায়েদাহ: ৩৩)
যারা মদ্য পান করে তাদের চাবুক দ্বারা আঘাত করা, বিবাহিত ব্যভিচারীকে পাথর মেরে হত্যা করা, দাঁতের বদলা দাঁত, আঘাতের জন্য ক্বিসাস (অনুরূপ শাস্তি), ক্বিসাসের বদলে অর্থের বিনিময়ে ক্ষতিপূরণ (আরস) এবং শরীয়া’তে যেসব অপরাধের ব্যাপারে নির্ধারিত শাস্তির বিধান নেই সেক্ষেত্রে তা’জীর বাস্তবায়ন করার ব্যাপারেও অসংখ্য হাদীস রয়েছে। এইসব আইন ও হুদুদ-যাদের ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশনা রয়েছে সেসব নির্ভর করছে আল্লাহ আইন দ্বারা পরিচালিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার উপর।
জিহাদ সম্বলিত কোরআনের আয়াতের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়। যেমন:
‘তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে এবং জেহাদ কর আল্লাহর পথে নিজেদের মাল ও জান দিয়ে, ….’
(সূরা তাওবাহ: ৪১)‘তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ্ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।’
(সূরা তাওবাহ:২৯)‘আর মুশরিকদের সাথে তোমরা যুদ্ধ কর সমবেতভাবে, যেমন তারাও তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে যাচেছ সমবেতভাবে।’
(সূরা তাওবাহ: ৩৬)‘আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ভ্রান্তি শেষ হয়ে যায়; এবং আল্লাহর সমস্ত হুকুম প্রতিন্ঠিত হয়ে যায়।’
(সূরা আনফাল: ৩৯)‘আর প্রস্তূত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শুত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপর ও যাদেরকে তোমরা জান না…’ (সূরা তাওবাহ: ৬০)
উপরোক্ত আয়াত ও জিহাদের সাথে সংশিষ্ট অসংখ্য হাদীস অনুসারে জিহাদ করতে হলে আল্লাহর বিধান দ্বারা পরিচালিত ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা অপরিহার্য। এরকম অনেক হাদীস রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে জিহাদ ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং ন্যায়নিষ্ঠ লোকের ন্যায়পরায়ণতা ও ন্যায়হীন লোকের অন্যায় এটাকে বন্ধ করতে পারবে না। অন্য কথায় মুসলমানদেরকে তখনই জিহাদে ঝাপিয়ে পড়তে হবে যখন এ ব্যাপারে আহ্বান করা হবে-তখন ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক এবং জিহাদে আহ্বানকারী আমীর পাপিষ্ঠ বা ত্বাকওয়াসম্পন্ন যাই হোক। তবে এখনকার শাসকগন জিহাদে রত নেই এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবার জন্য তারা কোন নির্দেশও প্রদান করে না। বরং তারা মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করবার জন্য নির্দেশ দেয়। তারা ততক্ষণ পর্যন্ত এটা করতে থাকবে যতক্ষণ না আল্লাহ ও বিচার দিবসে বিশ্বাসীরা জেগে উঠতে পারবে ও কুফরী রাষ্ট্রব্যবস্থাকে উৎপাটন করে আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থা অনুযায়ী একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে।
বিশ্বব্যাপী ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেয়া ও মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে অসংখ্য আয়াত রয়েছে:
‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উ¤মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে …।’ (সূরা আল ইমরান: ১১০)
‘শক্তি ও সম্মান তো আল্লাহ্ তাঁর রসূল ও মুমিনদেরই কিন্তূ ……।’ (সূরা আল মুনাফিকুন: ৮)
‘….. কিছুতেই আল্লাহ্ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না…।’ (সূরা আননিসা: ১৪১)
‘এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও…।’ (সূরা বাক্বারা: ১৪৩)
কীভাবে বিশ্বাসীরা সম্মানিত হবে এবং কাফেররা কোন পথ পাবে না, যখন মুসলিমদের কোন রাষ্ট্র নেই? কীভাবে তারা অন্যজাতিকে সৎকাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে যখন তারা নিজের ঘরে তা করতে অক্ষম। এসব কাজ আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া মোটেই সম্ভব নয়।
মুসলমানদের একজন ইমাম থাকার ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস রয়েছে-যাকে তারা আল্লাহর কিতাব ও সুন্নাহের উপর বায়াত দেবে:
“যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যু বরণ করল যে, তার কাঁধে (কোন খলীফার) বাই‘আত নেই, সে যেন জাহেলী মরণ মরল।” (মুসলিম শরীফ)
‘ইমাম হচ্ছে ঢালস্বরূপ, যার পেছনে থেকে মুসলিমগন জিহাদ করে ও আত্বরক্ষা করে।’ (মুসলিম শরীফ)
‘যদি কোন ব্যক্তি তার আমীরের মধ্যে এমন কিছু দেখে যা ঘৃণ্য, তাহলে সে যাতে এ ব্যাপারে ধৈর্য ধারণ করে। এটা একারণে যে, যদি কোন ব্যক্তি জামায়াত বা দল থেকে নিজেকে এক হাত পরিমাণও সরিয়ে নিল এবং এ অবস্থায় মারা গেল, সে যেন জাহেলিয়াতের সময়কার মৃত্যু বরণ করল।’ (মুসলিম শরীফ)
সাহাবী (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর মৃত্যুর পর একজন উত্তরসুরী খলিফা নির্বাচনের ফরযিয়াতের ব্যাপারে ইজমা বা ঐকমত্যে পৌছেছিলেন। তারা আবু বকর, উমর, উসমান ও আলীকে পর্যায়ক্রমে পূর্ববর্তী খলিফার মৃত্যুর পর তার (রা) স্থলাভিষিক্ত করবার ব্যাপারে একমত ছিলেন। প্রত্যেক সাহাবা তার পুরো জীবন ধরে একজন খলিফা নিয়োগের বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সুনিশ্চিত ছিলেন। কে খলিফা হবেন এ ব্যাপারে তাদের মধ্যে অনৈক্য থাকলেও একজন খলিফা নিয়োগের ব্যাপারে একমত ছিলেন।
একইভাবে মুসলিমদের জীবনের জন্য ইসলামি সমাজে অত্যাবশ্যকীয়, যেমন: শিল্পকারখানা, ঔষধ, হাসপাতাল, গবেষণাগার, জ্বালানী উৎপাদন এবং অন্যান্য সামষ্টিক অপরিহার্যতা অর্জনের ক্ষেত্রেও সব মুসলিম সমান দায়িত্ব পালন করবে। যা হোক এ সমস্ত বিষয়সমূহ একটি পূর্ণাঙ্গ উপায়ে নিশ্চিতকরন যা সমৃদ্ধ ইসলামী জীবনের জন্য অপরিহার্য – যার একদিক নির্ভর করে আল্লাহ্ (সুব) তায়ালার দাসত্ব অন্যদিক নির্ভর করে মুসলিমদের শক্তি সামর্থ ও দাওয়া প্রচারের উপর, তা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ছাড়া পালন সম্ভবপর নয়, যে কাঠামো এ সমস্থ বিষয়াদি ইসলাম এবং তার উদ্দ্যেশ্যের সাথে মিল রেখে কার্যকরভাবে তত্তাবধান করবে।
একইভাবে জনগন যাতে শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা পালনে সচেষ্ট থাকে-এ ব্যাপারে ইসলাম শাসকদের দায়িত্ব প্রদান করেছে। ইসলামী রাষ্ট্র ছাড়া শাসকের সাথে বিজড়িত হুকুমসমূহ অকার্যকর হয়ে পড়ে। আবার জনগন যখন এইসব হুকুমসমূহ পালন করতে যাবে তখন তাদের বাধ্য করবার জন্য রাষ্ট্র ছাড়া তারা কোন শাসক পাবে না। তখন জনগনের দায়িত্বের সাথে সম্পৃক্ত সব হুকুম অকার্যকর হয়ে পড়ে। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মানবজীবনের উপর ইসলামের বাস্তব প্রয়োগের জন্য অন্যতম একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। যখন এ ভিত্তি থাকে না তখন অনেক হুকুমসমূহ বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং ইসলামের অনেক বাণী বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়। মুসলিমরা তখন তাদের সম্মান হারিয়ে ফেলে, ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, তাদের ভূমি বেদখল হয় ও শত্রুগণ আধিপত্য বিস্তার করে ও মুনকারাত বিস্তৃতি লাভ করে-যা আজকে হচ্ছে।
বাধ্যবাধকতার মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা
ফরযসমূহ পালনের ব্যাপারে রয়েছে শরীয়াহ নির্ধারিত অগ্রাধিকার। যখন মুসলিমগন সব ধরনের ফরযে আইন ও ফরযে ক্বিফায়া সঠিকভাবে সুসম্পন্ন করতে পারছে তখন কোন সমস্যা নেই। তবে যখন দ্বন্দ শুরু হয় তখন ফরযে আইন ফরযে ক্বিফায়ার উপরে প্রাধান্য লাভ করে। আবার যদি ফরযে আইন আমলসমূহের মধ্যে দ্বন্দ তৈরি হয় তখন শরীয়ার ভিত্তিতে প্রাধান্য নির্ধারণ করতে হবে, মনের ভিত্তিতে নয়। যেমন পরিবারের নাফাকা (ভরণপোষণ) ঋণ পরিশোধের উপর এবং ঋণ পরিশোধ হজ্জের জন্য টাকা জমা দেয়ার উপর প্রাধান্য লাভ করে। রমযানের রোজা নদরের (প্রতিশ্রুত) রোজার উপর প্রাধান্য লাভ করে। জুম্মার নামায কারও প্রতি প্রতিশ্রুতি রক্ষার উপর প্রাধান্য লাভ করে ইত্যাদি…. ইত্যাদি। ফরযে ক্বিফায়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও যদি কোন দ্বন্দ হয় তখনও শরীয়ার ভিত্তিতে প্রাধান্য নির্ধারণ করতে হবে, মনের ভিত্তিতে নয়। এই ক্ষেত্রটি বিস্তৃত ও জটিল। এর কারণ হল অনেক ফরযে ক্বিফায়া রয়েছে যা সম্পন্ন করা খরচ সাপেক্ষ ও জটিল। আবার কিছু রয়েছে শ্রম ও সময়সাপেক্ষ। সংখ্যায় অনেক হওয়ার কারণে মুসলিমদের পক্ষে সবগুলো পালন করা সম্ভবপর নাও হতে পারে। সে কারণে তাকে কিছুর উপর অন্য কিছু ফরযে ক্বিফায়াকে প্রাধান্য দিতে হবে। কোনগুলো সে প্রতিপালন করবে এবং কোনগুলো সে পরিত্যাগ করবে তা খেয়ালখুশী, আকলী মূল্যায়ন বা ব্যক্তিগত পছন্দ অনুসারে নির্ধারণ করা যাবে না। বরং এটা আইনগতভাবে হতে হবে যেখানে শরীয়াহ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে। যার গুরুত্ব ক্বারা’ঈন (শরীয় দৃষ্টান্ত) থেকে স্পষ্ট হতে হবে।
ফরযে কিফায়া (সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা)
এটা হল সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা যা মুসলমানদের মধ্য হতে যে কেউ সম্পন্ন করলেই হবে। প্রত্যেকের সম্পন্ন করা প্রয়োজনীয় নয়। এ অপরিহার্যতাটি থাকবে কিছু সংখ্যক বা অনেকের উপর । যদি তারা তা না করেন তবে সকল মুসলিম ততক্ষন পর্যন্ত গুনাহগার হবেন যতক্ষন না কাজটি সম্পন্ন হয়। তবে যারা এটি বাস্তবায়নের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করেছে ও পরিশ্রম বিনিয়োগ করেছে তারা এ গোনাহ থেকে মুক্ত হবে। এ কথা কারো মনে করার সুযোগ নেই যে অপর মুসলমানের সাথে গুনাহ্ ভাগাভাগি করার ফলে গুনাহ্ হাল্কা হয়ে যাবে তাই সে সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই পেয়ে যাবে। এটা সত্য নয়, বরং ক্বিয়ামতের দিন তাকে একাই আল্লাহর সম্মুখে দন্ডায়মান হতে হবে। সেকাণে তার অপরাধ তাকেই বহন করতে হবে। এ কারণে আল্লাহ বলেন,
‘কেয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে একাকী অবস্থায় আসবে।’ (সূরা মারইয়াম-৯৫)
বাস্তবতা হচ্ছে, যখন উম্মাহ তার সাথে গোনাহে পতিত হয় তখন এটা ভেবে হয়ত তিনি দুনিয়াতে সন্তুষ্ট ভোগ করবেন, তবে তার আখেরাতের শাস্তি এতে সামান্য পরিমাণেও হালকা হবে না। সুতরাং, আল্লাহর সামনে দন্ডায়মান এবং চক্ষু ও মন নিশ্চুপ হবার পূর্বে যারা কোন অসম্পাদিত বা অপ্রতিষ্ঠিত ফরযে কিফায়ার ব্যাপারে উদাসীন তাদের অনতিবিলম্বে তা সম্পাদন ও প্রতিষ্ঠা করতে আত্মনিয়োগ করতে হবে। সুতরাং যেসব মুসলিম আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলায় বিশ্বাস করে এবং তার সতর্কতায় ভয় করে, সে অবশ্যই তাকে (আল্লাহ) সন্তুষ্ট করতে, জান্নাত লাভ করতে ও জাহান্নামের আগুন থেকে বাচার চেষ্টা করবে। এ ধরনের মুসলমান সামষ্টিক বাধ্যবাধকতাকে তার দায়িত্ব মনে করবে ও তা সম্পাদন করবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালনে ঐ ব্যক্তি ব্রতী হবে ততক্ষণ সে গোনাহগার হতে থাকবে। তবে কিছু লোক যদি কাজটি সম্পন্ন করে ফেলে তাহলে তিনি সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন। সেকারণে মুসলিমদের আল্লাহর প্রদত্ত দায়বদ্ধতা পালনের জন্য ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সচেষ্ট হতে হবে। যেমন: আল্লাহ প্রদত্ত আইন দ্বারা শাসন করা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা, ইজতিহাদ করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। এসবই হল সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা-যা মুসলিমগন সম্পাদন করবার জন্য চেষ্টা করবে এবং অন্যথায় তারা গোনাহগার হবে। যদি উম্মাহের ভেতরে কেউই ইজতিহাদ না করে, তাহলে যে ব্যক্তি ইজতিহাদ ফিরিয়ে নিয়ে আসবার চেষ্টা করছে সে ব্যতিত বাকী সবাই গুনাহগার হবে। ইজতিহাদ ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য কর্মরত লোকদের কাজ অন্যদের পাপমুক্ত করবে না-ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ ইজতিহাদ বাস্তবায়িত না হয়। যখন ইজতিহাদ শুরু হবে তখন সবাই এ ব্যাপারে পাপমুক্ত হয়ে যাবে। একই কথা ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রযোজ্য। খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজের সাথে যুক্ত নয় এমন প্রত্যেক ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে গোনাহগার হবে। এসময় প্রতিষ্ঠার কাজে রত ব্যক্তিদের প্রচেষ্টার কারণে অন্যরা পাপমুক্ত হবে না-যতক্ষণ না খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ’আল ফিকরুল ইসলামী’ (ইসলামী চিন্তা) নামক বইয়ের ‘ফরযে কিফায়া সব মুসলিমের উপর ফরয’ শীর্ষক অধ্যায়ে এ বিষয়ে যে আলোচনা করা হয়েছে তা নিম্নরূপ:
‘যতক্ষণ না যে কাজের জন্য বাধ্যবাধকতা রয়েছে সে কাজটি সম্পন্ন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত বাধ্যবাধকতা থেকে দায়মুক্ত হওয়া যাবে না। যে ব্যক্তি একে অবহেলা করল সে পরিত্যাগের কারণে শাস্তি ভোগ করবে। যখন সে দায়িত্ব পালন করবে তখন দায়মুক্ত হবে। এক্ষেত্রে ফরযে আইন ও ফরযে ক্বিফায়ার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না। সব মুসলিমের উপর এটি তখন ফরয হয়ে যায়। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে………’ (সূরা তাওবাহ: ৪১)
এটি একটি ফরযে ক্বিফায়া এবং এই আমলটি সিদ্ধান্তগ্রহণকারী (তালবান যাজিমান)। সুতরাং ফরযে আইন ও ফরযে ক্বিফায়ার মধ্যে পার্থক্য করা একটি অপরাধ এবং আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার নামান্তর ও আল্লাহর হুকুম মানার ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টি থেকে উদ্ভুত প্রবঞ্চণা। ব্যক্তির উপর দায়িত্বের অব্যাহতির দৃষ্টিতে বলতে গেলে, ফরযে ক্বিফায়া ও ফরযে আইনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কাজটি যতক্ষণ না সম্পন্ন হবে ততক্ষণ কোন ব্যক্তি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে না হোক তা ব্যক্তি পর্যায়ের যেমন: দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা অথবা সব মুসলিমের উপর যেমন: খলিফার প্রতি বায়াত প্রদান করা। এদের কোনটি থেকে দায়মুক্ত হওয়া যাবে না যতক্ষণ না এগুলো প্রতিপালিত হয়, অর্থাৎ নামাজ প্রতিষ্ঠিত হয় ও খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একজন খলিফাকে বায়াত প্রদান করা হয়। সুতরাং ফরযে ক্বিফায়ার দায়বদ্ধতা থেকে প্রত্যেক মুসলিম ততক্ষণ পর্যন্ত অব্যাহতি পাবে না যতক্ষণ কিছু লোক চেষ্টা করতে থাকে এবং পরবর্তীতে সেটি সম্পন্ন হয়ে যায়। কাজটি যতক্ষণ না সম্পন্ন হবে ততক্ষণ প্রত্যেক মুসলিম গোনাহগার হতে থাকবে। সুতরাং ফরযে ক্বিফায়া হল সে ইবাদত যা কেউ আদায় করলে অন্যরা গোনাহমুক্ত হয়ে যাবে-এ কথা বলা স¤পূর্ণরূপে ভুল। বরং ফরযে ক্বিফায়া হল সে ইবাদত যা কেউ সম্পন্ন করবার পর বাকী সবাই গোনাহমুক্ত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে ফরযে ক্বিফায়া হল ফরযে আইনের মতই। সুতরাং খিলাফত প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সব মুসলিমের অর্থাৎ প্রত্যেক মুসলিমের উপর এটা ফরয। খিলাফত বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত এ দায়িত্ব থেকে কোন মুসলিম অব্যাহতি পেতে পারে না। এ ব্যাপারে দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলমানের উপর ও গোনাহগারও প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিম হবে। যে কাজের মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে সে কাজে অংশগ্রহণের আগ পর্যন্ত একজন মুসলিম গোনাহমুক্ত হবে না এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত তাকে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। সুতরাং যে কোন ফরয়ে ক্বিফায়া ততক্ষণ পর্যন্ত ফরযে আইন থাকে যতক্ষণ না উক্ত কাজটি সুসম্পন্ন হয়।’
ফরযে আইন ও ফরয়ে ক্বিফায়ার বিষয়টি আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হওয়ার পর আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার সামনে দোষমুক্ত অবস্থায় দন্তায়মান হবার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তি মুসলিম ফরযে আইন যেমনি বাস্তবায়ন করবে তেমনি ফরযে কিফায়া বাস্তবায়নের জন্যও নিজেকে শরীক করবে।
ফরযে আইন (ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা) ও ফরযে কিফায়া (সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা)
যে ব্যক্তি শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা নিয়ে নিরীক্ষা করবে সে দেখতে পাবে যে, এদের কিছু ব্যক্তিগত ও কিছু সামষ্টিক। ফরযে আইন (ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতা) হল এমন বাধ্যবাধকতা যা প্রত্যেক মুকাল্লীফকে (আইনগতভাবে দায়িত্বশীল ব্যক্তি) অবশ্যই পালন করতে হবে। যদি কোন মুসলিম এই বাধ্যবাধকতাকে ত্যাগ করে তাহলে সে পাপমুক্ত হবে না-যদিও সে ব্যতিত সব মুসলিম এই দায়িত্ব পালন করে। আর যদি কোন মানুষ এই হুকুম না মানে, কিন্তু একমাত্র ঐ ব্যক্তি তা মানে তাহলে সে আল্লাহর দোষারোপ ও পাপমুক্ত হবে। সুতরাং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরযে আইন জানা ও মানা অত্যাবশ্যকীয়। এতে করে সে অভিযোগ এবং বাধ্যকতার স্রষ্টার সামনে বিবেকের পীড়ন থেকে মুক্তি পাবে। ব্যক্তিগত বাধ্যবাধকতার মত ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এর অর্থ হল মুসলমানদের সালাত আদায় করতে হবে, রমযানে রোজা রাখতে হবে, সামর্থবানদের হজ্জ পালন ও যাকাত আদায় করতে হবে এবং বাবা মা’র দেখশোনা করা, হালাল খাদ্য খাওয়া, মন্দ ও হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা, জিনা থেকে দূরে থাকা, মিথ্যা বলা ও গীবত করা এবং এজাতীয় সবকিছু থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ সে সব মারুফাত সম্পন্ন করবে এবং মুনকারাত বর্জন করবে।
প্রথম দিক: আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার
মুসলমানদের আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সব ইসলামি আক্বীদার (আল্লাহ, তার ফেরেশতা, কিতাব, রাসূল, ক্বিয়ামত দিবস এবং ক্বাদা ওয়াল ক্বদর অর্থাৎ ভাল মন্দ আল্লাহর পক্ষ থেকে এবং কুরআন ও হাদীসে সুনিশ্চিত দলিলে যা এসেছে) উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। সুতরাং, ঈমান হল প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরযে আইন (ব্যক্তিগতভাবে ফরয)। তাকে অবশ্যই এই বিষয়গুলোতে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং এগুলোই ভিত্তি। সুতরাং, তাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলায় বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এমনভাবে যে, তিনি সব কিছুর স্রষ্টা এবং তার সমকক্ষ কেউ নেই। নিখুত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ও সব সীমাবদ্ধতামুক্ত সত্তা আমাদের স্রষ্টা। এ মহাবিশ্বে যা আছে, যার উপর জীবন নির্ভরশীল ও মানুষের জন্য প্রয়োজনীয়-তা সবই আল্লাহ আল কাদির এর পক্ষ থেকে। আকাশ ও পৃথিবীর কোন কিছুই তার দৃষ্টির বাইরে নয় এবং কোন কিছুই তার ইচ্ছা ও জ্ঞানের বাইরে যেতে পারে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই একমাত্র সত্তা যাকে উপাসনা করা যায়। কেবলমাত্র তার কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করা যায়, আত্মসমর্পণ করা যায় এবং তার সন্তুষ্টির মধ্যেই প্রশান্তি নিহিত রয়েছে। মুসলমানদের ভেতরে যখন এ বিষয়ে ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে তখন আল্লাহর প্রতি ঈমান পরিপূর্ণ হবে। তাকে আরও বিশ্বাস করতে হবে যে, মুহম্মদ (সা) আল্লাহর রাসূল-যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য দ্বীন ইসলাম নিয়ে এসেছেন। এই দ্বীন আল্লাহ কতৃক অবতীর্ণ, মুহম্মদ (সা) এর বুদ্ধিমত্তা, প্রতিভা থেকে উদ্ভুত কিছু নয়। আর তিনি যে দ্বীন বহন করেছেন তা ছিল অভ্রান্ত। তাকে অবশ্যই আল্লাহর অন্যান্য রাসূলদের, অবতীর্ণ কিতাবের উপর সাধারণভাবে এবং ফেরেশতা, ক্বিয়ামত দিবস, ক্বাদা ওয়াল ক্বদর এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে। এগুলো হল ঈমানের ভিত্তি। যে ব্যক্তি এগুলোর ব্যাপারে স্বীকৃতি দেয় সেই মুসলিম, যদিও সে ব্যক্তির এসবের বিস্তারিত বিষয়ের জ্ঞানে সীমাবদ্ধতা রয়েছে – তবে তা ততদিন পর্যন্ত যতদিন তিনি এমন কোন কাজ বা অন্য কোন বিষয়ে বিশ্বাস করতে শুরু না করেন যা তার ঈমান কে লঙ্ঘন করে। তবে এই ঈমানের হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে , এজন্য সবসময় প্রচেষ্টা ও ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ অব্যাহত রাখতে হবে। যখন বিশ্বাসীরা স্রষ্টার চিরন্তন নিদর্শন ও কোরআন আয়াতসমূহ জানতে পারে তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর তাদের বিশ্বাস দৃঢ় ও শক্তিশালী হয়। মুসলমান যত আল্লাহর সৃষ্টি, সৃষ্টির গঠন, স্রষ্টার ক্ষমতা, তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সর্ম্পকে ভাবে, ততই তার ঈমান বৃদ্ধি পায় ও ঈমানের উৎকর্ষ বিধান হয়। মানুষ যতই তার জন্য প্রদত্ত আল্লাহর নিয়ামত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, ততই সে বিষয়ে উপলদ্ধি শাণিত হবে-যে বিষয়ে আগে সে অবগত ছিল না। এভাবে স্রষ্টার প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্যের মাধ্যমে ইলাহর নৈকট্য অর্জন করা সম্ভব। স্রষ্টা ব্যতিরেকে সবকিছুর সীমাবদ্ধতা নিয়ে মুসলিমরা যত ভাববে, যত বেশী তার প্রয়োজন ও দূর্বলতা নিয়ে চিন্তা করবে ততই সে ইবাদত, আনুগত্য ও আল্লাহর প্রতি নিজেকে আত্মসমর্পণ করতে পারবে।
একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি বিশ্বাসও বাড়ে ও কমে। সুতরাং যতই একজন মুসলিমের কুরআন সর্ম্পকে জ্ঞান বাড়ে, ততই সে উপলদ্ধি করতে পারে যে, এ গ্রন্থটি আল্লাহ ব্যতিত আর কারও কাছ থেকে আসেনি এবং এভাবে মুহম্মদ (সা) যে আল্লাহ প্রেরিত রাসূল সে ব্যাপারে বিশ্বাস দৃঢ়তর হবে। এভাবেই রাসূল (সা) এর সীরাত, তার জীবন, আল্লাহর পথে তার ত্যাগ তিতিক্ষা সর্ম্পকে যত জানবে ততই রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি মহব্বত বাড়বে ও এই বিশাল ব্যক্তিত্বের প্রতি আগ্রহ তত বাড়বে। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি আনুগত্য বৃদ্ধি পাবে ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনে ব্রতী হতে উৎসাহী হবে।
একই কথা বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যখন মুসলিমগন সেই বিচার দিবস সর্ম্পকে ভাববে যে বিচার দিবসের দিন দুশ্চিন্তা শিশুদেরও ভাবিয়ে তুলবে, প্রত্যেক স্নেহশীল মা সন্তানের যত্ন নেয়া ভুলে যাবে, প্রত্যেক গর্ভবতী নারী তার বোঝা ত্যাগ করবে, লোকদের মাতাল মনে হবে। বিচার দিবসের ভয়াবহতা সর্ম্পকে আল্লাহ প্রদত্ত বর্ণণা তাকে ভীত করে তোলে এবং সেদিনের এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তির জন্য পথ খুঁজতে থাকে। মুসলিম ব্যক্তি জান্নাতের বর্ণণা আছে এরূপ আয়াত ও হাদীস যত বেশী পড়বে, জান্নাতে বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত চূড়ান্ত আরাম আয়েস ও চিরস্থায়ী সুখের কথা যত জানবে, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী আরাম আয়েস তার কাছে ক্ষুদ্রতর হতে থাকবে এবং মহিমান্বিত জান্নাতের প্রতি তার আকর্ষণ তীব্রতর হতে থাকবে। এছাড়াও বিশ্বাসীরা দোযখের শাস্তি সর্ম্পকিত কোরআনের আয়াত ও হাদীসগুলো যতই জানবে, জাহান্নামের যন্ত্রনা ও চিরস্থায়ী অগ্নিকুন্ডের ব্যাপারে তার ভীতি তত বেশী হবে। তখন দুনিয়ার জীবনের শাস্তি ও ভয় তার থেকে উবে যায় এবং যদি এ জন্য তাকে অত্যাচারী শাসকের কারাগারে যেতে হয় বা পিঠে চাবুকের আঘাতে জর্জরিত হতে হয় তারপরেও সে তখন দোযখের আগুনে যাওয়ার জন্য দায়ী কারণুলো এড়িয়ে চলে। সুতরাং যখন মুসলিমের হৃদয় ঈমানের সাথে গ্রন্থিত হয়, তখন তার শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আনুগত্য ও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত হয়। আখিরাতের বিষয়টি যত বেশী প্রাধান্য লাভ করবে ততই মু’মিনের কাছে দুনিয়া তুচ্ছ হতে থাকবে। যখন ঈমান শক্তিশালী হয়, ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি ক্রমাগতভাবে শক্তিশালী হতে থাকে এবং বাধাবিপত্তির মুখে কথায় ও কাজে দৃঢ় থাকে।
আল্লাহর প্রতি ঈমানের সাথে সাথে অন্য সব ইলাহ বা কুফরকে পরিত্যাগ করতে হবে-হোক সেটা কোন প্রতিমূর্তি বা চিন্তা। কুরআন মুর্তিপূজারীদের এবং এ ধরনের চিন্তাধারণা পোষণকারীদের ব্যপারে বলেছে:
‘সে বলল: তোমরা স্বহস্ত নির্মিত পাথরের পূজা কর কেন? অথচ আল্লাহ্ তোমাদেরকে এবং তোমরা যা নির্মাণ করছ সবাইকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আস সফফাত: ৯৫-৯৬)
‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ লাত ও ওযযা সম্পর্কে। এবং তৃতীয় আরেকটি মানাত সম্পর্কে? পুত্র-সন্তান কি তোমাদের জন্যে এবং কন্যা-সন্তান আল্লাহর জন্য? এমতাবস্থায় এটা তো হবে খুবই অসংগত বন্টন।’ (সূরা আন নাজম : ১৯-২২)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
‘তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। তাদের কাছে যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন একথা বলা ছাড়া তাদের কোন যুক্তিই থাকে না যে, তোমরা সত্যবাদী হলে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে আস। আপনি বলুন, আল্লাহ্ই তোমাদেরকে জীবন দান করেন, অতঃপর মৃত্যু দেন, অতঃপর তোমাদেরকে কেয়ামতের দিন একত্রিত করবেন, যাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তূ অধিকাংশ মানুষ বোঝে না।’ (সূরা ঝাসিয়া: ২৪-২৬)
সুতরাং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর প্রতি ঈমান আনা অনর্থক ও মিথ্যা। এটা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। ঈমানের জন্য প্রয়োজন চিন্তা ও গভীর উপলদ্ধি। একইভাবে কুফর বর্জনের জন্যও প্রয়োজন চিন্তা ও গভীর উপলদ্ধি। পূর্বোক্ত আয়াতটি মানুষকে চিন্তা করতে উদ্ধুদ্ধ করে এবং কুফরের চিন্তার বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে আহ্বান জানায়-যাতে করে তারা ভুল বুঝতে পারে ও তাগুতকে বর্জন করতে পারে। আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
‘দ্বীনের ব্যাপারে কোন জবরদস্তি বা বাধ্য-বাধকতা নেই। নিঃসন্দেহে হেদায়েত গোমরাহী থেকে পৃথক হয়ে গেছে। এখন যারা গোমরাহকারী ‘তাগুত’ দেরকে মানবে না এবং আল্লাহ্কে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙবার নয়। আর আল্লাহ্ সবই শুনেন এবং জানেন।’ (সূরা বাকারা-২৫৬)
চিন্তা ও গভীর উপলদ্ধি হল আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপনের উপায় ও একইভাবে তাগুত পরিত্যাগের মাধ্যম। শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াবার ও সঠিক নির্দেশ পাবার জন্য একজন মুসলিমের উভয়টিই প্রয়োজন।
প্রত্যেক মুসলিমের ঈমান এর প্রতি তাকে প্রতিশ্রুত করে তোলে। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করল ও মিথ্যাকে পরিত্যাগ করল সে তার মহান প্রভু, সৃষ্টিকর্তা আল কাদির এর নৈকট্য পাবে। সুতরাং সে ব্যক্তি আল্লাহকে ভালবাসবে, ভয় করবে, করুণা ভিক্ষা করবে, তাকে উপাসনা করবে এবং নির্দেশ পালন করবে। এটা মুসলমানের মধ্যে আল্লাহ যা ভালবাসেন তার প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি করে ও আল্লাহ যা ঘৃণা করেন তার প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে। মুসলিম ব্যক্তি তখন আল্লাহর নিয়ামত ও করুণার জন্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। সে এটা করবে না কেন? কারণ সে অনুধাবন করতে পারে যে, সে দূর্বল ও অক্ষম এবং তাকে এমন একজনের কাছে আত্নসমর্পন করতে হবে যে তার দায়িত্ব নিতে যথেষ্ট পারঙ্গম। যদি এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য না হত তাহলে সে পথনির্দেশ পেত না, সঠিক পথের উপরে অবস্থান করত না এবং তার সমস্যাসমূহের ভাল সমাধান হত না। সুতরাং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশ মানার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি ভাল জীবনযাপন করে এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হয়ে সে দূর্দশাগ্রস্ত ও অভিশপ্ত জীবন পায়। এভাবে সে দুনিয়া ও আখিরাত হারায়। সুতরাং ঈমান অবিসংবাদিতভাবে আনুগত্য ও তাকওয়ার দিকে ধাবিত করে। এটা প্রত্যেক মুসলিমকে স্রষ্টার উপাসনা ও আনুগত্যের পথে নিয়ে যায় এবং স্রষ্টার উষ্মার উদ্রেক করে এরকম কাজ থেকে বিরত রাখে এবং স্রষ্টাকে খুশি করবার ব্যাকুলতা সৃষ্টি করে। কী আল্লাহকে সšতুষ্ট করে আর কী তাঁর ক্রোধের উদ্রেক করে? আল্লাহর প্রতি আনুগত্য তাকে সন্তুষ্ট করে-যার মধ্যে মুসলিমদের জন্য হুকুমদাতার নির্ধারিত অসংখ্য মারুফাত রয়েছে। আর আনুগত্যহীনতা স্রষ্টার ক্রোধের উদ্রেক করে-যার মধ্যেও স্রষ্টা নির্ধারিত অনেক মুনকারাত রয়েছে এবং এগুলো থেকে বিরত থাকবার ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
২য় অধ্যায়: দাওয়াত বহনে ঈমানের গুরুত্ব এবং ফরয কাজসমূহের মধ্যে অগ্রাধিকার
মা’রূফাতের সমন্বয়ে ইসলাম গঠিত এবং আল্লাহ একে প্রতিষ্ঠিত করবার ও মুনকারাত থেকে বিরত থাকবার ও অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন।
সর্ব্বোচ্চ এবং সর্বপ্রধান মারুফ হচ্ছে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তায়ালার ঊপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাাস, ইসলামি আকীদার অন্যান্য ভিত্তিসমূহ।
মুনকারাতের চূড়ান্ত পর্যায় হল যে কোন ধরনের কুফরের নগ্ন বহিপ্রকাশ। আল্লাহ একে পরিত্যাগ করার, বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন ও এর ফাঁদে পা না দেবার ব্যাপারে সাবধান করেছেন।
মা’রুফের শ্রেণীবিভাগে ঈমানের পরে তাকওয়া আসে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূল (সা) এর আনুগত্যের মাধ্যমে এটা অনুধাবন করা যায়। এটা হল ঈমানের ফলাফল, এটা তা সম্পূর্ণ করে এবং এর প্রয়োজনের খাতিরে তা আসে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে ভয় করবার অর্থ হল তার ক্রোধ কে এড়িয়ে চলা। আল্লাহর আইনকে গ্রহণ করা ছাড়া এটি সম্ভব নয়। আর এই গ্রহণ করবার বিষয়টি ঈমানের সাথে সর্ম্পকযুক্ত। যখন একজন মুসলমানের ঈমান শক্তিশালী হয়, তখন আনুগত্যের বিষয়টিও শক্তিশালী হয়। যখন ঈমান দূর্বল হয়ে যায় তখন গ্রহণের বিষয়টিও দুর্বল হয়ে যায়। সেকারণে মুসলমানদের ঈমান থাকা এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূল (সা) এর প্রতি আনুগত্যের ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয় এবং সবধরনের কুফর ও আনুগত্যহীনতার পরিচায়ক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকবার নির্দেশ দেয়া হয়।
একজন মুসলমানের ঈমান ও তাকওয়া থাকা এবং কুফর ও পাপ থেকে বিরত থাকা ও এ বিষয়গুলোকে ছড়িয়ে দেয়া কোনক্রমেই সম্ভবপর হবে না যদি না সে লোকদের দাওয়াত দেয় ও ইসলামকে বহন করে; সেই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে যা মুসলিম এবং তাদের আক্বীদা ও তাকওয়াকে রক্ষা করে এবং তাদেরকে কুফর ও আনুগত্যহীনতার ফাঁদ থেকে সুরক্ষা দেয়। এটাই বাস্তবতা ও রাসূল (সা) এর কাজ থেকে এ সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (সা) তার সাহাবীদের কেবলমাত্র ঈমান ও তাকওয়ার নির্দেশ দেননি। বরং তিনি তাদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঈমান ও তাকওয়ার পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন-যে রাষ্ট্র প্রতিটি মুসলিমকে উদ্বুদ্ধ করবার জন্য ঈমান ও তাকওয়ামুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করবে। মদীনা আল মনোয়ারায় রাসূলুল্লাহ (সা) খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এটাই অর্জন করেছিলেন।
সুতরাং, মারূফাতের ফরয দায়িত্ব পালনের জন্য আমাদের অবশ্যই লোকদের কাছে দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। সাথে সাথে আমরা সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্যও লোকদের দাওয়াত দিব-যা এগুলোকে রক্ষা করবে। যে সকল মুনকারাত থেকে দুরে থাকতে হবে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে, তা থেকে পৃথক থাকতে হবে, এবং তাকে বিনাশ করতে হবে এবং যে ব্যক্তি মুনকার সম্পন্ন করবে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে এবং যে ব্যবস্থা এই ধরনের মুনকারাতকে প্রতিষ্ঠিত করে ও সংরক্ষণ করে সেই ব্যবস্থা অপসারণ করতে হবে ।
সুতরাং ‘আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার ’ মুসলমানদের উপর ফরয। তবে আমর বিল মা’রূফের উপদেশ দেবার আগে ঐ ব্যক্তিকে আগে নিজেকে তা মানতে হবে এবং নাহি আ’নিল মুনকারের আদেশ দেবার আগে নিজেকে সে কাজ থেকে বিরত হতে হবে।
একে অপরকে সত্যের ব্যাপারে সতর্ক করা (তাওয়াসী) দাওয়াতের অংশ
কুরআন ও সুন্নাহ দাওয়াতের ধারণাকে একে অপরকে সত্যের ব্যাপারে সতর্ক করা (তাওয়াসী) সাথে সর্ম্পকযুক্ত করেছে, সুসংবাদ প্রদান করা (তাবসীর), লোকদের সতর্ক করা (নসীহা) এবং তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া, আহলে কিতাবদের সাথে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করা, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা। এছাড়াও আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘কসম যুগের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তূ তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পর তাকীদ দেয় সত্যের এবং তাকীদ দেয় সবরের।’ (সূরা আল আসর : ১-৩)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্যে সুসংবাদাতা ও সতর্ককারী রূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’ (সূরা আস সাবা-২৮)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
‘আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদেরকে পরিষ্কার বোঝাতে পারে।’ (সূরা ইব্রাহিম-৪)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
‘এটা (কুরআন) তো কেবল বিশ্বাবাসীদের জন্যে উপদেশ’ (সূরা আত তাকউইর: ২৭)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘এটা আপনার ও আপনার সম্প্রদায়ের জন্যে উল্লেখিত থাকবে এবং শীঘ্রই আপনারা জিজ্ঞাসিত হবেন।’ (সূরা আয যুখরুফ:৪৪)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘…………এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন পছন্দনীয় পন্থায়।’ (সুরা আন নাহল:১২৫)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না ফিতনা শেষ হয়ে যায়; এবং দ্বীন শুধুমাত্র আল্লাহ্ এর জন্য হয়ে যায়।’ (সূরা আল আনফাল-৩৯)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘তিনি তাঁর রাসূলকে পথ নির্দেশ ও সত্যধর্ম নিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে একে সব ধর্মের উপর প্রবল করে দেন যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।’ (সুরা আস সফ: ৯)
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘অবশ্যই দ্বীন হল নসীহা (উপদেশ)। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কার প্রতি ইয়া রাসূলুল্লাহ’। তিনি বললেন, আল্লাহ, তার কিতাব, রাসুলের জন্য, মুসলিমদের নেতা এবং জনসাধারনের প্রতি। (মুত্তাফিকুন আলাইহি)
সুলায়মান বিন বুরাইদাহ তার বাবার বরাত দিয়ে বর্ণণা করেন যে, ‘যখন রাসূলুল্লাহ (সা) কাউকে কোন অভিযান বা সেনাবাহিনীর আমীর হিসেবে নিয়োগ দিতেন তখন তাকে আল্লাহভীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন এবং তার সাথের মুসলমানদের প্রতি সদয় হতে উপদেশ দিতেন। তিনি (সা) বলতেন: আল্লাহর জন্য তার নামে জিহাদ কর। আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদ কর। যখন তুমি মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে তাদের তিন পর্যায়ের কাজের প্রস্তাব দেবে। তারা যদি তিনটির কোন একটিকে গ্রহণ করে তাহলে সেটি মেনে নাও এবং তাদের কোন ক্ষতি করা থেকে বিরত থাক। তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আমন্ত্রন জানাও; যদি তারা প্রস্তাব গ্রহণ করে তাহলে মেনে নাও এবং তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত থাক…..।’ (মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ (সা) আরও বলেন,
‘আল্লাহ যাতে তার মুখ উজ্জ্বল করে দেয় -যে আমার কথা শুনে, সেইরূপ স্মরণে রাখে, বুঝে এবং তা পৌঁছে দেয় । সেক্ষেত্রে কেউ ফকীহ না হয়েও ফিকহ (জ্ঞান) বহন করবে। আবার কেউ কেউ এমন কারও কাছে জ্ঞান বা ফিকহ বহন করে নিয়ে যাবে যে তার চেয়েও বড় ফকীহ।’ (তিরমিযী)
এইভাবে সংশ্লিষ্ট সব আয়াত ও হাদীস যুক্ত করে পুরো বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হয়েছে -যেগুলোর উপজীব্য বিষয় হল দাওয়াত। প্রত্যেক মুসলিম সাধ্য অনুসারে দাওয়াত বহনের কাজ করতে হবে।
আমরা যদি দাওয়াত সংশ্লিষ্ট অন্য আয়াতসমূহের কথা চিন্তা না করে কেবলমাত্র ’ আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার ’ এর আয়াতের দিকে তাকাই তাহলে দেখব যে, ইসলামের এ শক্তিশালী ভিত্তির সাথে প্রত্যেকটি মুসলিম বিজড়িত। আমাদের অণুকরণীয় আদর্শ রাসূল (সা) এর সাথে সম্পৃক্ত একটি আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘……… তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন সৎকর্মের, বারণ করেন অসৎকর্ম থেকে; তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তূ হালাল ঘোষনা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তূসমূহ………’ (সূরা আ’রাফ-১৫৭)
এটা নব্যুয়তের সমাপ্তির কথা বলে। রাসূল (সা) এর মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের ব্যাপারে নির্দেশ দেন, সব ভাল (তাইয়্যিব) জিনিসের অনুমোদন ও অবৈধ (খাবিছ) জিনিষের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দেন।
উম্মাহর সাথে সংশ্লিষ্ট আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সূরা আল ইমরান-১১০)
এখানে উম্মাহ বলতে সব মুসলিম, ব্যক্তিগতভাবে, সামষ্টিক বা দলগতভাবে এবং কতৃত্বশীল লোক সবাইকে বুঝানো হয়েছে এবং সবাইকেই ’ আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার ’ এর ব্যাপারে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
ব্যক্তিপর্যায়ের সাথে সম্পৃক্ত একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন,
‘আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কাজের শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে।’ (সূরা আত তাওবা: ৭১)
ইমাম কুরতুবী বলেন, ‘আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমল বিন মারুফ ও নাহিয়ান মুনকার এর মাধ্যমে ঈমানদার ও মুনাফেকের মধ্যে পার্থক্য করে দিয়েছেন। অর্থাৎ ঈমানদারদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ’আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার ’ এবং এর প্রধান দিক হল ইসলামের দাওয়াত।’ (তাফসীর আল কুরতুবী ৪/১৪৭)
দলগত দাওয়াতের কাজের আয়াতসমূহে দলের কাজ সুস্পষ্ট করা হয়, যেমন:
‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সূরা আল ইমরান:১০৪)
কর্তৃত্বশীল লোকদের সর্ম্পকে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন,
‘তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে কতৃত দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে। প্রত্যেক কর্মের পরিণাম আল্লাহ্ এর এখতিয়ারভূক্ত।’ (সূরা আল হাজ্জ: ৪১)
কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে দাওয়াত ইসলামের প্রতি:
‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের (ইসলামের) প্রতি…..’ (সূরা আল ইমরান:১০৪)
‘যে ব্যক্তি ইসলামের দিকে আহূত হয়েও আল্লাহ্ স¤পর্কে মিথ্যা বলে; তার চাইতে অধিক যালেম আর কে?’
(সূরা আস সফ: ৭)‘আপনি তো তাদেরকে সোজা পথে দাওয়াত দিচেছন’ (সূরা মু’মিনুন: ৭৩
কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে এটি আল্লাহর প্রতি দাওয়াত
‘যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়,……..তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার?’ (সূরা হা-মীম সিজদাহ: ৩৩)
‘বলে দিন: এই আমার পথ। আমি আল্লাহর দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই- আমি এবং আমার অনুসারীরা।’
(সূরা ইউসুফ: ১০৮)কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে এটি আল্লাহর নাযিলকৃত শাসনব্যবস্থার প্রতি দাওয়াত
‘তাদের মধ্যে শাসন করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ্ ও রাসূলের দিকে আহবান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়।’ (সূরা আন নূর: ২৪)
‘মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে শাসন করার জন্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম ও আদেশ মান্য করলাম।’ (সূরা আন নূর: ৫১)
‘…. আল্লাহর কিতাবের প্রতি তাদের আহবান করা হয়েছিল যাতে তাদের মধ্যে মীমাংসা করা যায়। অত:পর তাদের মধ্যে একদল তা অমান্য করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।’ (সূরা আল ইমরান: ২৩)
’ আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার ’ হল ফরযে কিফায়া। কারও কারও জন্য এটি বাধ্যতামূলক। যারা এ দায়িত্ব পালন করবে তাদের জন্য রয়েছে পুরষ্কার এবং যারা তা পালন করবে না তারা ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার আগ পর্যন্ত এর দায়ভার বহন করবে। কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা দাওয়াত বহন করাকে মুক্তির পথ হিসেবে বাধ্যতামূলক করেছেন এবং দাওয়াত ত্যাগ করার ফলাফল যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘অত:পর যখন তারা সেসব বিষয় ভুলে গেল, যা তাদেরকে বুঝানো হয়েছিল, তখন আমি সেসব লোককে মুক্তি দান করলাম যারা মন্দ কাজ থেকে বারণ করত। আর পাকড়াও করলাম, গোনাহগারদেরকে নিকৃষ্ট আযাবের মাধ্যমে তাদের না-ফরমানীর দরুন।’ (সূরা আ’রাফ: ১৬৫)
ঈমান যেমনিভাবে মা’রুফ এর মুখ্য বিষয় ও ভিত্তি, তেমনিভাবে কুফর হল সবচেয়ে বড় মুনকার ও সব মুনকারের ভিত্তি। আনুগত্যের সব কাজ হল এ মুখ্য মা’রুফ থেকে উদ্ভুত মা’রুফাত। আর অবাধ্যতা হল মুখ্য মুনকার থেকে উদ্ভুত মুনকারাত। আল্লাহর আইন দ্বারা শাসন করা হল আনুগত্যের সবচেয়ে বড় স্বাক্ষর-যার মাধ্যমে ঈমান ও আনুগত্যের বিভিন্ন কাজ প্রকাশিত হয় এবং যার মাধ্যমে দাওয়াত বহন করা হয় ও ইসলামের প্রসার ঘটে। অন্যদিকে আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করা অবাধ্যতার চূড়ান্ত পর্যায়-যাতে মানুষের খেয়ালখুশী, প্রবৃত্তি ও পথভ্রষ্টতা প্রতিফলিত হয়।
এই ফরযিয়াত বাস্তবায়নের জন্য একত্র হওয়া ফরয। দ্বীন সর্ম্পকে প্রত্যেক সচেতন মুসলমানের জানা উচিত, সে যখন কোন আয়াত বা হাদীস পাঠ করে-তা শুধু নিজের জন্য নয় বরং সব মুসলিমের জন্য । এমনকি রাসূলের প্রতি জারিকৃত যে কোন নির্দেশও পুরো উম্মাহ’র জন্য প্রযোজ্য হবে যদি তাকে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে এমন প্রমাণ না থাকে। যখন আল্লাহ তাকে (সা) ঈমান, ইবাদত এবং নাযিলকৃত আয়াতসমূহ দিয়ে শাসনের ব্যাপারে কোন নির্দেশ দেন তখন এগুলো সকলের জন্যও প্রযোজ্য।
তাবলীগ দাওয়াতের আরেকটি অংশ
একইভাবে পবিত্র কোরআন দাওয়াতকে লোকদের সম্মুখে ’সাক্ষ্য দান করা’ বলে উল্লেখ করেছে।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘‘এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্যে এবং যাতে রসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্য।’’ (সূরা আল বাক্বারা : ১৪৩)
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘…..বিশ্বাসীরা হল পৃথিবীতে আল্লাহর সাক্ষীদাতা।’ (ইবনে মাজাহ)
তিনি (সা) আরও বলেন,
‘যারা এখানে উপস্থিত আছ (সাক্ষীদাতারূপে), তারা যারা অনুপস্থিত তাদের কাছে পৌছে দাও।’
কুরআন দাওয়াতের কাজকে তাবলীগ (বহন করা) অর্থে উল্লেখ করেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘হে রসূল, পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে। আর যদি আপনি এরূপ না করেন, তবে আপনি তাঁর পয়গাম কিছুই পৌছালেন না। আল্লাহ আপনাকে মানুষের কাছ থেকে রক্ষা করবেন।’ (সূরা মায়েদাহ: ৬৭)
তিনি (সা) বলেন,
‘ পৌঁছে দাও আমার পক্ষ থেকে যদি একটি আয়াতও হয়।’ (বুখারী)








