Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ দাওয়াতের একটি অংশ

    এ ব্যাপারে ইমাম আন নববী (র) তার শরহে সহিহ মুসলিম-এ ’সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ শিরোনামে অধ্যায়ে বলেন,  “এ বিষয়ে অর্থাৎ সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নির্দেশ সম্পর্কে- যা বহুপূর্বে দেখা যেত , কিন্তু বর্তমানে তা পরিত্যাজ্য তবে সামান্যতম কিছু নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়।”

    এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন মন্দ কাজ পরিব্যপ্তি লাভ করে, তখন ভাল ও মন্দ সব ধরনের লোক শাস্তিপ্রাপ্ত হয়। আর এমতাবস্থায় যদি কেউ অত্যাচারী শাসককে মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকবার জন্য উপদেশ না দেয় তাহলে আল্লাহ সবার উপর শাস্তি নাযিল করেন:

    ‘অতএব যারা রাসূলের আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে ¯পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।’ (সূরা নূর: ৬৩)

    যতদিন মানুষ বাঁচে ততদিন ’সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ তার নিজের নিরাপত্তা ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকবার জন্য অপরিহার্য। রাসূল (সা) এ বিষয়টি হাদীসের মাধ্যমে একটি উদাহরণ দিয়ে খুব সুন্দরভাবে ব্যাখা করেছেন:

    “যারা আলাহ্’র হুকুম মেনে চলে আর যারা সেগুলোকে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্ঘন করে, (উভয়ে) যেন তাদের মতো যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নিচের তলায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। যখন নিচের লোকদের পিপাসা মেটানোর প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচতলার লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নিচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের তলার লোকদের কোন সমস্যা করবো না।’ এখন যদি উপরের তলার লোকেরা নিচতলার লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আর তারা যদি তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরতলা) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।” (বুখারী)

    এ হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি সামাজিক নিরাপত্তা ও জীবনের জন্য ’সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এ কাজের গুরুত্ব বুঝার ক্ষেত্রে যে কোন ধরনের আত্মপ্রসাদ সেই জাহাজের নিমজ্জিত লোকদের মত অবস্থা হবে। সে অবস্থায় সবাই সমুদ্রের অতলে নিক্ষিপ্ত হবে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।

    পবিত্র কোরআনও বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে দাওয়াতের গুরুত্ব ও মানুষের জন্য এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। কুরআন কেবলমাত্র দাওয়াতের বিষয়বস্তু তুলে ধরেনি, বরং in addition to ahadeeth (traditions) of the Messenger, এর সাথে সংশ্লিষ্ট আরও অনেক কিছু যা দাওয়াতকে ঘিরে পরিগ্রহ করে তাও উপস্থাপন করেছে। সামগ্রিকভাবে না হলেও এদের কিছু আমরা এখানে উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরবার চেষ্টা করেছি।

    পবিত্র কুরআন দাওয়াতকে ’ আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার ’ বলে সম্বোধন করেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্ম, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (সূরা আল ইমরান: ১১০)

    এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সূরা আল ইমরান: ১০৪)

    এ সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “ঐ সত্বার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অতি সত্বর আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা।” (তিরমিযী)

    এবং তিনি (সা) আরও বলেন,

    “তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।” (মুসলিম, তিরমিযী)

  • ১ম অধ্যায়: ইসলামী দাওয়াত বহন করার গুরুত্ব

    দাওয়াত হচ্ছে আসক্তি ও উৎসাহ তৈরি করবার বিষয়। একজনকে ইসলামের দিকে আহ্বান করবার অর্থ হল আপনি যে বিষয়ে একজনকে আহ্বান করছেন সে বিষয়ে ঝোঁক ও প্রবল ইচ্ছা তৈরি করা। সুতরাং ইসলামের দিকে দাওয়াতের অর্থ কেবলমাত্র কথা বলাই নয়, বরং ঝোঁক ও প্রবল ইচ্ছা তৈরি করবার জন্য কথা বলা ও কর্মকান্ড পরিচালনাকেও বুঝায়। অর্থাৎ দাওয়াত কথা বলা ও কর্মকান্ড উভয়কেই বুঝায়। একজন মুসলিম অবশ্যই নিজ জীবনে ইসলামকে ধারণ করবে এবং বাস্তব উদাহরণ দিয়ে লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বান করবে এবং সত্য উপলদ্ধি থেকে ইসলামের ব্যাপারে সঠিক চিত্র তুলে ধরবে। 

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    ‘তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার যে আল্লাহ এর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন মুসলিম?’ (সূরা হা মীম সিজদাহ-৩৩)

    এবং তিনি আরও বলেন,

    সুতরাং আপনি এর প্রতিই দাওয়াত দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন।’ (সূরা আশ শূরা-১৫)

    সুতরাং আল্লাহর দাওয়াত বহন করা ফরয এবং এটি এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে দাওয়াত বহনকারী আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে। এর মর্যাদা অনেক উচুঁতে এবং এর মাধ্যমেই আল্লাহ তাকে দুনিয়াতে সম্মান দেবেন ও আখিরাতে মুক্তি দেবেন।

    দাওযাত ছিল রাসূলদের মিশন এবং এর মাধ্যমে তারা আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তোমরা আল্লাহ্ এর ইবাদত কর এবং তাগুত থেকে নিরাপদ থাক।’ (সূরা আন নাহল : ৩৬)

    ‘হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদ দাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। এবং আল্লাহর আদেশক্রমে তাঁর দিকে আহ্বায়করূপে এবং উজ্জ্বল প্রদীপরূপে।’ (সূরা আল আহযাব: ৪৫-৪৬)

    সুতরাং আমাদের রাসূল (সা) দাওয়াত বহনকারী ও উম্মাহর জন্য একজন সতর্ককারী ছিলেন। তিনি দুনিয়াতে লোকদের যে দিকে আহ্বান করেছেন সে ব্যাপারে একজন সাক্ষী ছিলেন। সেকারণে তিনি লোকদের এবং আল্লাহকে সাক্ষী হবার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। বিদায় হজ্জের ভাষণে সে কারণে তিনি বলেন,

    ‘…..আমি কি পৌঁছে দেইনি? হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।’ (বুখারী)

    সুতরাং দাওয়াত হল এ উম্মতের জন্য রাসূল প্রদত্ত উপহার এবং আমাদেরকে ইসলামের ভেতরে থাকতে হলে এ উপহারকে সংরক্ষণ করতে হবে।

    এর কারণ হল ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য দাওয়াত দেয়া ব্যতিরেকে এর কার্যকর উপস্থিতি দর্শন করা যাবে না। এবং এই দাওয়াত ছাড়া মানুষের মনের ভেতরের বিদ্যমান অন্ধকার ও বিচ্যুত চিন্তাকে দূরীভূত করতে পারবে না। আবার ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাওয়াত দেয়া ছাড়া ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। ইসলামকে দাওয়াতের মাধ্যমে ছড়িয়ে না দেয়া গেলে তা শক্তিশালীভাবে বিস্তারও লাভ করবে না।

    ইসলামী দাওয়াত না থাকলে দ্বীন এত শক্তিশালী হত না, বিস্তার লাভ করত না, সুরক্ষিত হত না এবং আল্লাহর হুজ্জাত বা প্রমাণ তার সৃষ্টির সামনে প্রতিষ্ঠিত হত না।

    সুতরাং কেবলমাত্র দাওয়াতের মাধ্যমেই ইসলাম তার হৃত গৌরব ও শক্তিশালী অবস্থান ফিরে পেতে পারে এবং এর প্রয়োজনীয়তা আজকের দিনে ভীষণ ভাবে দরকার।

    দাওয়াতের মাধ্যমে সব মানুষের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেয়া এবং জীবনব্যবস্থাকে আল্লাহর জন্য পরিণত করা সম্ভব। পৃথিবীর জন্য আজকে দাওয়াতের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

    ইসলামী দাওয়াতের মাধ্যমে মুসলিমদের দলিলের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় এবং কাফেরদের দলিলের ত্রুটি প্রকাশিত হয় এবং ইসলাম পরিত্যাগের জন্য অবিশ্বাসীরা যেন কোন অজুহাত দাঁড় করবার সুযোগ পায় না। এ সর্ম্পকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    সুসংবাদদাতা ও ভীতি-প্রদর্শনকারী রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি, যাতে রসূলগণের পরে আল্লাহ্ এর প্রতি অপবাদ আরোপ করার মত কোন অবকাশ মানুষের জন্য না থাকে। আল্লাহ্ প্রবল পরাক্রমশীল, প্রাজ্ঞ।’ (সূরা আন নিসা-১৬৫)

    সে কারণে মুসলিমদের কাছে দাওয়াত দেয়ার বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। এ কারণে ইসলামের প্রথম যুগে সাহাবীগন রাসূল (সা) এর সাথে সাথে দাওয়াতের কাজে আত্ননিয়োগ করেন এবং দ্বীনের মতই এটিকে গুরুত্ব প্রদান করেন। যদি ইসলামে দাওয়াত না থাকত, তাহলে ইসলাম আমাদের কাছে পৌছত না এবং কয়েকশত মিলিয়ন লোক এটা গ্রহণের সুযোগ পেত না। সে অবস্থায় ইসলাম কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ (সা) এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। সে কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর সর্বপ্রথম নাযিলকৃত কথাটি ছিল

    ‘পড়’ (সূরা আলাক:১)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাকে পড়তে বলেছেন এবং লোকদের পড়ে শোনাতে বলেছেন।

    প্রথমদিকে নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে একটি ছিল:

    ‘উঠুন, সতর্ক করুন’ (সূরা আল মুদ্দাসির:২)

    সুতরাং, রাসূলুল্লাহ (সা) দাওয়াতের সব উপকরণের দ্বারাই এ কাজটি করেছেন এবং সর্বপ্রথম মুসলমান হিসেবে যাদের পেয়েছেন তারা   তাঁর পর দাওয়াত বহনকারী হিসেবে সবচেয়ে উত্তম ছিলেন। ঐ সকল মুসলিমদের দাওয়াতই পরবর্তীদের নিকট পৌঁছে। এভাবে পূর্বের মত আজকেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দাওয়াত বহন করবার কাজটি করে যেতে হবে।

    পানির সাথে প্রবাহের যে সর্ম্পক দাওয়াতের সাথে ইসলামের সে সর্ম্পক । যেমন: পানি দিয়ে সেচকার্য করা হয়, পিপাসা নিবারণ করা হয় এবং মানুষের আরও অনেক কল্যাণ সাধন করা হয়। কিন্তু এই পানির দায়িত্ব কাউকে নিতে হয়। একইভাবে ইসলাম যা একটি সত্য দ্বীন ও সঠিক জীবনব্যবস্থা-এটাকে এবং এর হককে কাউকে না কাউকে বহন করতে হয়। এতে করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টি ও রেজামন্দি দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ, সেচকার্য পরিচালনা ও সুপথের নিদর্শন পাওয়া যায়।

    সুতরাং ইসলাম ও দাওয়াতের মধ্যকার গভীর সর্ম্পক সুস্পষ্ট।

    একারণে দাওয়াত ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও মৌলিক ভিত্তিসমূহের একটি। ইসলামের বিস্তার ও ইসলাম দ্বারা কাউকে প্রভাবিত করবার জন্য দাওয়াত খুব দরকার। যখন তা শুরু হয় তখন থেকেই দাওয়াতের যুগই ইসলামের যুগ, until Allah (SWT) inherits the earth and those inhabiting it. সে কারণে মুসলমানদের জীবনে দাওয়াতকে অত্যন্ত বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত। মুসলমানদের দাও’য়াতী কাজে আত্ননিয়োগ করতে হবে। এর জন্য সময় ও শক্তি বিনিয়োগ করতে হবে।

  • ইসলামের দাওয়াত

    (নিম্নোক্ত প্রবন্ধটি প্রখ্যাত ইসলামী গবেষক শাইখ আহমদ মাহমুদ কর্তৃক রচিত “Dawah to Islam” বইটির খসড়া অনুবাদ হতে গৃহীত)

    সূচনা

    সকল প্রশংসা জগতসমূহের অধিপতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি এবং সালাম পেশ করছি রাহমাতুল্লীল আলামীন ও সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহম্মদ (সা), তাঁর পবিবার ও তাঁর সাহাবীদের প্রতি এবং যারা বিচার দিবসের আগ পর্যন্ত তাঁকে ইহসানের সাথে অনুসরণ করবেন তাদের প্রতি। অত:পর,

    – ‘ইসলামের দাওয়াত‘ শীর্ষক এই বইয়ে আমরা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। এই বিষয়টি ব্যাপক, অনেক শাখা প্রশাখায় বিস্তৃত ও চিন্তাগ্রাহ্য। এটা এমন এক পথ যা কুসুমাস্তীর্ণ নয় বরং বন্ধুর। আমাদের পূর্ববর্তী আলেম ও মুজতাহিদগন (র) ইবাদত, মুয়ামালাত, বিবাহ, উত্তরাধিকার ইত্যাদির মত এত ব্যাপকভাবে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেননি। ‘ইসলামের প্রতি আহবান‘ এর যে দিকটি নিয়ে আলোচনা বেশী আবর্তিত হয়েছে তা হল, ‘আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার‘ অর্থাৎ ‘সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ‘ ও ব্যক্তিপর্যায়ের দাওয়াত। কারণ তাদের বাস্তবতা এই রকম ছিল না যে, খিলা-ফত রাষ্ট্রব্যবস্থা সমূলে উৎপাটিত হয়েছে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে, শরীয়াহ পরিত্যাক্ত হয়েছে এবং দারুল ইসলাম দারুল কুফর দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব না হলে তারা গবেষণা করতে পারেন না কেননা মুজতাহিদগন কেবলমাত্র বাস্তবে উদ্ভুত সমস্যাই বিবেচনা করেন, কোন আপাত বা কাল্পনিক বিষয় নিয়ে নয়।

    অতএব এই বইয়ে আমরা উক্ত বিষয়ে আলোকপাত করব। আমরা বলতে চাচ্ছি না এটা পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক। তবে এটা অবশ্যই এ বিষয়টিকে প্রবৃত্তির অনুসরণ, যথেচ্ছাচার, অতিরঞ্জিত চিন্তাচেতনা, কুফরের অন্ধ অনুকরণ ইত্যাদি থেকে ইসলামী শরীয়ার মূল ভিত্তির দিকে ফিরিয়ে নেয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

    – দাওয়াতের ফরযিয়্যাত ও মানদুব (সুন্নাহ) বিষয়সমূহ আলোচনার চেয়ে এই বইয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতি নিয়ে বরং বেশী গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। কারণ বর্তমানে অন্য যে কোন বিষয়ের চেয়ে দাওয়াতী কাজ করবার পদ্ধতিগত জ্ঞানই সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

    বইটিতে মূলত ‘খিলা-ফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের পদ্ধতি‘ নিয়েই আলোচনা করা হবে। কারণ আজকের দিনে দাওয়াত বহন করবার ক্ষেত্রে এটাই দাওয়াতের মেরুদন্ড হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। খিলা-ফত রাষ্ট্রব্যবস্থা এখন আর অস্তিত্বশীল নয়- এই বাস্তবতায় আজকের দিনে যখন কোন ইসলামী আহ্বানের শীর্ষে খিলা-ফত রাষ্ট্র পুণ:প্রতিষ্ঠার আহ্বান না থাকে অথবা এটিকে মনোযোগের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত না করা হয় তখন বুঝতে হবে সে আহ্বান আংশিক অথবা বিচ্যুত।

    – বইটি ‘ইসলামের দাওয়াত‘ নিয়েই মূলত আলোকপাত করবে এবং ‘দাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতি‘ বিশেষ করে ‘ইসলামী খিলা-ফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দাওয়াতের কাজ করবার পদ্ধতি‘র উপর আলোচনাকে কেন্দ্রীভূত করবে -যা ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ থেকে উৎসারিত। সেসব মৌলিক বিষয়গুলোও সংক্ষেপে উল্লেখ করা হবে, যদিও এসব মৌলিক বিষয় এই বইয়ের প্রধান প্রতিপাদ্য নয়। যেমন:

    ১. ইসলামী আক্বীদার স্পষ্টতা ও বিশুদ্ধতা – যা ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    ২. ইসলামী আক্বীদার মধ্যে যন্ (অনুমাননির্ভরতা) বা ন্যূনতম যন্ এর সুযোগ নেই বরং তা হতে হবে ক্বাত’ঈ (সুনির্দিষ্ট ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী) হতে হবে। এক্ষেত্রে ত্বাকলীদ বা অন্ধ অনুকরণের সুযোগ নেই। যদি তা না করা হয় তাহলে মুসলিমগন কুসংস্কারকে গ্রহণ করবে ও প্রবঞ্চণার মধ্যে পতিত হবে।

    ৩. আক্বীদার সাথে সর্ম্পকযুক্ত চিন্তার (ভিত্তিসমূহের শাখা) ক্ষেত্রে যৎসামান্য পরিমাণে যন্ বা অনুমাননির্ভরতা এবং ত্বাকলীদ বা অনুকরণ অনুমোদনযোগ্য। শরীয়াহ‘এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

    ৪. শরীয়াহ‘র আইনকানুন সমূহ সরাসরি শরীয়াহর দলিল এর উপর ভিত্তি করে গ্রহন করতে হবে অর্থাৎ কোরআন, সুন্নাহ, সাহাবাগনের ইজমা (ঐকমত্য), শরীয়াহর বর্ণণা থেকে আসা শরই ইল্লাত (ঐশী কারণ) এর উপর ভিত্তি করে কিয়াস। শরীয়াহ‘র দলিল থেকে কেবলমাত্র মুজতাহিদ হুকুম বের করে নিয়ে আসেন। আর মুক্বাল্লিদ (অনুসরণকারী) কে সুনিশ্চিত করতে হবে যে, তিনি যে মুজতাহিদের অনুসরণ করেন তার বক্তব্য তিনি বুঝতে পারছেন।

    ৫. যদি বাধ্যবাধকতার সংখ্যা অনেক বেশী হয়ে যায় এবং সবগুলো পালন করা মুসলমানের জন্য কঠিন হয়ে যায় বা তিনি অপারগ হন, তাহলে তাকে অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বাধ্যবাধকতাটিকে প্রাধান্য দিতে হবে। (এটাও শরীয়া দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে, ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী বা পছন্দের ভিত্তিতে নয়)

    – যখন মুসলিমগন স্বাভাবিক অবস্থায় আছে, অর্থাৎ যখন ইসলামী খিলা-ফত রয়েছে তখন ‘আমর বিন মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার‘ করা এবং রাষ্ট্রের ভেতরকার অমুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের আহ্বানের মাধ্যমে আভ্যন্তরীণভাবে দাওয়াতী কাজ করা হবে। আর রাষ্ট্রের বাইরের অমুসলিমদের প্রামাণ্য দলিল সহকারে ইসলামের দিকে আহ্বান করা হবে। এবং এটা করা হবে খলীফার বিবেচনা অনুসারে জি-হাদের মাধ্যমে।

    আর যখন মুসলিমগন অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে থাকবে, অর্থাৎ খিলা-ফত রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই তখন খিলা-ফত রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে ইসলামী দাওয়াতের কাজ করতে হবে। মুসলমানদের সংস্কার সাধনের জন্য তখন মারুফের আদেশ-মুনকারের নিষেধে, এবং অন্যদিকে ইসলাম গ্রহণের জন্য অমুসলিমদের আহ্বানের কাজটি তখন সঙ্কীর্ণ পরিসরে চলবে। কারণ যখন ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়নের জন্য মুসলিম ভূমিসমূহতে কোন রাষ্ট্র বা কর্তৃত্ব না থাকে তখন সেটি দারুল কুফর হয়ে যায়। তখন মুনকার সংঘটনের বিষয়টি একটি রীতিতে পরিণত হয় এবং সেকারণে সংস্কার সাধনের আংশিক কাজটি অকার্যকর ও অপর্যাপ্ত হয়ে যায়। আমূল পরিবর্তনের কর্মকান্ড তখন শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা হয়ে যায়-যা কুফর ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ইসলামী ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করবে। [খিলা-ফত অনুপস্থিত থাকা অবস্থায়] মুসলিম ভূমির বাইরে অমুসলিমদের দাওয়া করাকে বুঝায় তাদের ইসলাম গ্রহণের জন্য দাওয়াত দেয়া। অনৈসলামী চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং মুসলিম ভূমির বাইরে অবস্থানরত মুসলমানদের প্রচেষ্টাসমূহকে একীভূতকরণের দ্বারা মুসলিম ভূমিতে ইসলামী খিলা-ফত প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার মাধ্যমে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

    – ইসলামের দাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত যে কোন বইয়ে দাওয়াতের মৌলিক নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা থাকা উচিত। এগুলো নিম্নরূপ:

    ১. খিলা-ফতের জন্য কাজ করা এখন ফরযে আইন (প্রত্যেক ব্যক্তির উপর ফরয)। এর জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ ও কর্মতৎপরতা সৃষ্টি করা একান্ত কর্তব্য।

    ২. একাজটি দলগতভাবে হতে হবে এবং ব্যক্তিগতভাবে করবার কোন সুযোগ নেই।

    ৩. এই দলের একজন আমীর থাকবেন যিনি শরীয়া প্রদত্ত ক্ষমতায় বলীয়ান – যার আওতার মধ্যে তাকে মান্য করা হবে।

    ৪. এই দলে পুরুষ ও নারী উভয়ই থাকবে, কেননা দাওয়াত বহন করার ব্যাপারে উভয়ই দায়িত্বশীল।

    ৫. এই দলের সদস্যদের বন্ধনের ভিত্তি হবে ইসলামী আক্বীদা ও চিন্তা।

    ৬. দলটিকে তার কর্মকান্ডের জন্য অবশ্যই ইসলামী চিন্তা, নিয়ম কানুন ও মতামতকে গ্রহণ করবে এবং তাদের আনুগত্য থাকবে আদর্শের প্রতি, কোন ব্যক্তিবিশেষের প্রতি নয়।

    ৭. দলটি অবশ্যই রাজনৈতিক হবে, কারণ এর কাজ হল রাজনৈতিক – যা খিলা-ফত প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতায় যাবে।

    ৮. দলটির কাজ হবে বুদ্ধিবৃত্তিক; সহিংস (Violent) কোন কর্মকান্ডের সাথে এর সম্পৃক্ততা থাকবে না। কারণ ইসলামের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে জনমত তৈরি করে জনগনের সহায়তায় ক্ষমতায় আসাই এ দলের কাজ।

    ৯. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার সাথে কোনরকম ক্ষমতার অংশীদার হওয়া এ দলের জন্য নিষিদ্ধ।

    ১০. বর্তমান কুফর শাসনব্যবস্থার উপর যে কোন ধরনের নির্ভরশীলতা এ দলের জন্য নিষিদ্ধ। কুফর ব্যবস্থা থেকে কোন ধরনের অর্থনৈতিক সাহায্য বা নির্ভরশীলতা অবশ্যই বর্জনীয়।

    – একইভাবে, ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন একটি বইতে দাওয়াত বহন করার পদ্ধতি বিষয়ে আহকামে শরীয়াহ আলোচিত হওয়া উচিত, যেমন:

    ১. বাস্তব মূলনীতির (Practical Principal) অনুসরণ – দাওয়াতের কাজ অন্তসারশূন্য হবে না, বরং সুচিন্তিত হবে। আর এই চিন্তাও কেবলমাত্র অনুমাননির্ভর হবে না, বরং তা আসবে বাস্তব উপলদ্ধি থেকে। এই চিন্তার সাথে কাজ যুক্ত করে একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে অগ্রসর হতে হবে। এই লক্ষ্য, কর্মকান্ড ও চিন্তা সবই ইসলাম থেকে উৎসারিত হতে হবে। আর চূড়ান্ত লক্ষ্য হল ইসলামিক আক্বীদার ভিত্তিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি। এটা দাওয়াত বহনকারীকে ঈমানের পরিবেশে রাখে, তাকে উদ্দীপনা দেয় এবং নিয়ন্ত্রনে রাখে।

    ২. পদ্ধতি ও উপকরণের পার্থক্য সুস্পষ্ট হতে হবে। তরীকাহ বা পদ্ধতি হল শরীয়াহর আহকাম-যা ক্বিয়ামতের দিন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট। ঊসলুব বা উপকরণ হল মুবাহ-যা পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুসারে দাওয়াত বহনকারী গ্রহণ করতে পারে।

    ৩. আহকামে শরীয়ার মতই রাজনৈতিক বাস্তবতার জ্ঞান অপরিহার্য। এর কারণ হল হুকুম শরীয়াহ প্রয়োগ করতে হলে হুকুমে শরীয়াহ ও এর বাস্তবতা বা মানাত (যে বাস্তবতার জন্য হুকুমটি এসেছে) সর্ম্পকে জ্ঞান থাকা দরকার। কেউ যদি শরীয়াহর হুকুম জানে কিন্তু মানাত না জানে, তাহলে সে তা প্রয়োগে ব্যর্থ হবে। এবং আমরা যদি তা বাস্তবায়ন করতে যাই, তবে আমরা ভুল করে ফেলব কারণ আমরা এ হুকুমের বাস্তবতা হতে কোনো পৃথক বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন করে ফেলব। যারা বর্তমান ব্যবস্থার মূলোৎপাটন করে ক্ষমতা গ্রহণ করতে চায় তাদেরকে অবশ্যই কেবলমাত্র আভ্যন্তরীণ নয়, আঞ্চলিক ও আর্ন্তজাতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখতে হবে।

    ৪. কেউ কেউ ভাবতে পারেন, খিলা-ফত প্রতিষ্ঠা ও ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কেবলমাত্র ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদের মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালালেই হবে। কিন্তু এ ধারণা সঠিক নয়। বরং প্রথমে সাধারণ জনগনের কাছে দাওয়াত নিয়ে যেতে হবে। দাওয়াত যখন চিন্তা বিকাশের স্তর থেকে গনসংযোগের পর্যায়ে যাবে এবং সফলভাবে জনগনের সাথে সংযোগ স্থাপনে সমর্থ হবে ও সাধারণ সচেতনতা থেকে ইসলামের পক্ষে জনমত তৈরি হবে তখন দলটি ক্ষমতাধর ও কর্তৃত্বশীল লোকদের কাছে নুসরাহ চাইবে।

    ৫. শরীয়াহ একাধিক কুতলাহ বা দল অনুমোদন করে। তবে শর্ত হল তারা অবশ্যই ইসলামী আক্বীদা ও শরীয়ার ভিত্তিতে গঠিত হবে।

    ৬. যদি একের অধিক রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থেকে থাকে তবে, তাদের প্রত্যেককেই শরীয়াহ হুকুমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যেন তাদের মধ্যকার মতপার্থক্যগুলো আদাব আল ইখতিলাফ বা মতপার্থক্যের নিয়মানুযায়ীই হয়ে থাকে। কোন বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হলেই একজন মুসলিম অপর মুসলিমকে কুফর বা সীমালঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত করবে – এ বিষয়টি অনুমোদিত নয়। কোন মতামতের পক্ষে দূর্বল বা শক্তিশালী দলীল বা দলীলের সাথে সাদৃশ্যতা (শুবহাত আদ দলীল) থাকলে এটি একটি আইনসঙ্গত মতামত। এ ধরনের মতামত অবলম্বনকারীদের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করা যাবে না। দূর্বল দলীল বা দলীলের সাদৃশ্যতার ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে, আপনার মতামত ভুল বা দূর্বল এবং তার সাথে উত্তম নসীহত সহকারে প্রামাণ্য দলিলের ভিত্তিতে আলোচনা করতে পারি। যদি কোন মতামতের শরীয়াহভিত্তিক দলিল না থাকে অথবা সাদৃশ্য না থাকে তাহলে সে মতামতটি অনৈসলামিক (কুফরী মতামত) হবে। সেক্ষেত্রে এই মতামতের বিরুদ্ধাচরণ করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকবে না এবং এ মতাবলম্বীদের এ ব্যাপারে সাবধান করে দেয়া উচিত (যদিও সবসময় কুফরী মতামত অবলম্বনকারীরা কাফের নয়)।

    ৭. যেসব শাসক ইসলামী শরীয়াকে পরিত্যাগ করে এবং চাপ প্রয়োগ না করা সত্ত্বেও অন্য আইন দিয়ে শাসন করে, তাদের অধিকাংশই কাফির-যদিও তারা সালাত আদায় করে, রোজা পালন করে, হজ্জব্রত পালন করে এবং মুসলিম বলে দাবি করে। এর কারণ হচ্ছে তারা ইসলামী আইন না নিয়ে কুফরী আইনকে গ্রহণ করেছে। যদি তারা বিশ্বাস করে যে ইসলামী শরীয়াহ হল সর্বশ্রেষ্ঠ আইন এবং তারা সাময়িকভাবে খেয়ালের বশবর্তী হয়ে তা পরিত্যাগ করে তবে সে জালিম হবে, কিন্তু কাফের হবে না। সে কারণে একজন দাওয়াত বহনকারী কখনওই এ ধরনের শাসককে মেনে নেয়ার ঘোষণা দিতে পারেন না, সমর্থন ব্যক্ত করতে পারবেন না, এমনকি তার ব্যাপারে নীরবতা পালনও করতে পারবে না। কারণ এ ব্যাপারে যে প্রসিদ্ধ হাদীসটি রয়েছে, তা হল:

    “তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্যও না থাকলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (ঘৃণার মাধ্যমে), আর এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।” (মুসলিম, তিরমিযী)

    – ইসলামের দাওয়াত বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে এমন কোন বই দাওয়াতী কাজে রাসুলুল্লাহ (সা) এর অনুসরণ করার ব্যাখ্যায় নিম্ন লিখিত কিছু ইস্যু তুলে ধরবে:

    ১. রাসূলুল্লাহ (সা) কাফেরদেরকে ইসলামে প্রবেশ করবার জন্য আহ্বান জানাতেন। আর আমরা এখন অধিকাংশক্ষেত্রে মুসলিমদের ইসলাম গ্রহণের জন্য আহ্বান জানাই।

    ২. রাসুলুল্লাহ (সা) এমন এক সময়ে দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন যখন পুরো শরীয়াহ অবতীর্ণ হয়নি। এখন আমাদের সামনে সম্পূর্ণ শরীয়াহ রয়েছে। তার মানে রাসূল (সা) অবতীর্ণ না হওয়ার কারণে অনেক হুকুম মক্কায় পালন করতে পারেননি। কিন্তু আমাদেরকে এগুলো মেনে চলতে হবে। আবার কিছু আইন তিনি মেনে চলেছেন যেগুলো পরবর্তীতে রহিত হয়ে গেছে। সে কারণে সেই রহিত আইনসমূহ আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়। যেমন: মক্কায় জি-হাদ আইনসিদ্ধ ছিল না, কিন্তু এটা এখন বৈধ (রক্ষণাত্নক জি-হাদ আজকে আমাদের উপর ফরয এবং এটা রাষ্ট্র না থাকলেও করা যাবে। কেননা এই ধরনের জি-হাদের সাথে রাষ্ট্র বা খিলা-ফত থাকার বিষয়টি বিজড়িত নয়) মক্কায় কেবলমাত্র রাসুলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতের কাজ করা ফরয ছিল, কিন্তু সাহাবাদের জন্য এটা মানদুব ছিল, যেহেতু তখন তারা তাঁর প্রতি কেবল নারীদের বাইয়াতের অনুরূপ বাইয়াতে আবদ্ধ ছিলেন। এ অবস্থা চলতে থাকে যতদিন না দ্বিতীয় আকাবার শপথে আওস ও খাযরায গোত্র বায়াত প্রদান করে। এর পর থেকে শুধুমাত্র রাসূল (সা)ই নয়, বরং সাহাবীদের উপরও দাওয়াতের কাজ করা ফরয হয়ে যায়। আর যা রহিত হয়েছে তা হল মক্কা বিজয়ের পর মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করবার ফরযিয়্যাত।

    ৩. কাজের প্রকারভেদের দিক থেকে মক্কার হুকুমসমূহ অধিকাংশক্ষেত্রে ব্যক্তির সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল এবং মদীনার হুকুমসমূহ শাসকের (খলীফা) দায়িত্বের সাথে সর্ম্পকযুক্ত ছিল। কিছু কিছু নির্দেশ আছে যা কেবলমাত্র শাসকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তির বা দলের ক্ষেত্রে নয়; যেমন: হুদুদ বাস্তবায়ন, জি-হাদ ঘোষণা করা এবং যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্পাদন করা। আবার কিছু কাজ আছে যা ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তি দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর যেখানেই থাকুক, যেমন: ইবাদত (উপাসনা), আখলাক (নৈতিকতা), মাত’উমাত (খাদ্য), মালবুসাত (পোশাক পরিচ্ছদ) এবং মু‘আমালাত (লেনদেন)। আবার কিছু হুকুম রয়েছে যা ব্যক্তি ও শাসক উভযই সম্পাদন করে থাকে, যেমন: মসজিদ নির্মাণ করা, সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা, অসৎ কাজে নিষেধ করা ও দলিলের ভিত্তিতে দাওয়াতী কাজ করা।

    – খিলা-ফত প্রতিষ্ঠা করবার মত কোন লক্ষ্যকে সামনে রেখে যখন কোন দাওয়াত বহনকারী অগ্রসর হয় তখন একটি ইস্যুর সম্মুখীন হয়, তা হল: এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট সময়সীমা আছে কি (দশ, বিশ বা ত্রিশ বছর)? নাকি নেই? এটা থেকে আবার দু‘টি ইস্যুর জন্ম হয়। প্রথমত: এই কাজের প্রকৃতি অনুসারে (শরীয়াহ ও আক্বীদার ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা) এক, দুই বা তিন দশকের মধ্যে কি লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব? কারণ কুতলাহ বা দল যথেচ্ছভাবে কাজ করতে পারে না, বরং কাজের প্রকৃতি অনুসারে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একটি পূর্বনির্ধারিত সময়কালের মধ্যে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। অন্যথায়, বুঝতে হবে কুতলাহ আন্তরিক নয় এবং কোন নির্দেশনা ছাড়াই চলছে। দ্বিতীয়ত: যদি দলটি ব্যর্থ হয় এবং সঙ্গত সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জন করতে না পারে, তাহলে এটা থেকে কি তার পরিকল্পনা ভুল এ সিদ্ধান্তে আসবে এবং তার গৃহীত নীতি কি সংশোধনের উদ্দেশ্যে পর্যালোচনা করবে? অথবা তারা কি এ সিদ্ধান্তে পৌছবে যে, দলটি আল্লাহর প্রতি আন্তরিক নয় এবং একারণে আল্লাহ তাদের মাধ্যমে ইসলামকে বিজয়ী করতে চাচ্ছেন না? এই বই এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করবে।

    – ‘ইসলামের দাওয়াত‘ বইটি কিছু প্রশ্নের জবাব দেবার চেষ্টা করবে, কিছু সন্দেহ দূর করবে এবং কিছু বিষয়ে সঠিক ধারণা তুলে ধরবে। যেমন:

    ১. অনেকে নিম্নের আয়াতটিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে থাকে,

    ‘হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের চিন্তা কর। তোমরা যখন সৎপথে রয়েছ, তখন কেউ পথভ্রান্ত হলে তাতে তোমাদের কোন ক্ষতি নাই। তোমাদের সবাইকে আল্লাহ্‌র কাছে ফিরে যেতে হবে। তখন তিনি তোমাদেরকে বলে দেবেন, যা কিছু তোমরা করতে।‘ (সূরা মায়েদা-১০৫)

    সুতরাং এই আয়াত থেকে অনেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছে যে, মুসলিমগন কেবলমাত্র তার এবং তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ও তাকে অন্য মুসলিমদের কাছে দাওয়াত বহন না করলেও চলবে।

    ২. নিম্নের হাদীসটিকেও অনেকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে:

    ‘এটা ঠিক নয় যে, একজন মু‘মিন নিজেকে অপমানিত করবে। এবং (তা হচ্ছে) এমন দূর্ভোগের মধ্যে নিজেকে ঠেলে দেবে – যা বহনে সে অক্ষম।‘

    এ হাদীস থেকে অনেকে এ সিদ্ধান্তে পৌছে যে, এমন কোন কাজ করা যাবে না যা তাকে কারাভোগ, কর্মস্থল থেকে পদচ্যুতি এবং অত্যাচারী শাসকের রোষানলে পড়তে হয়। সেক্ষেত্রে যদি তাকে দাওয়াতী কাজ থেকে বিরত থেকে অত্যাচারী শাসককে মেনে নিতে হয় তারপরেও।

    ৩. অনেকে হুযায়ফা বিন ইয়ামান (রা) বর্ণিত রাসূল (সা) হাদীসকে ভুল বুঝে থাকে, ‘আমি বললাম: যদি মুসলিমদের কোন জামায়াত বা ইমাম না থাকে তাহলে কী হবে? তখন তিনি (সা) বললেন, “অতপর তুমি এসমস্ত দল গুলিকে পরিত্যাগ করবে, যদিও বা তোমাকে কোন গাছের গুড়ি কামড়ে থাকতে হয় যতক্ষন না তোমার মৃত্যু এসে যায়।”

    লোকেরা এটা থেকে ধারণা করে যে, যখন মুসলিমদের খলীফা থাকবে না তখন মুসলমানদের জন্য খিলা-ফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা ফরয নয়। বরং এ অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে ফেলবে।

    ৪. আবার কেউ কেউ নিচের বিখ্যাত হাদীসকে ভুল বুঝে থাকে

    ‘তোমাদের কাছে এমন একটি দিন বা বছর আসবে না যা তোমাদের রবের সাথে সাক্ষাতের পূর্ব পর্যন্ত আরও বেশী মন্দ হতে থাকবে না।‘ সুতরাং, এটা সেইসব লোকদের নিরাশ, হতাশ ও কর্মবিমুখ করে।

    ৫. আবার অনেকে বলেন যে, পরিবর্তনের দায়িত্ব ইমাম মাহদীর এবং এর জন্য আমরা দায়িত্বশীল নই। ফলে তারা এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে নিষ্ক্রিয় থাকে।

    – এই বইটি এর ভূমিকাতে যেসব ইস্যু তুলে ধরেছে এইরকমের সব বিষয় নিয়ে পরবর্তীতে আলোকপাত করেছে। যদি এতে কোন ঘাটতি থাকে তবে মনে রাখতে হবে কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাই নিখুঁত হতে পারেন। সম্ভবত দ্বিতীয় মুদ্রণে আমরা আল্লাহর কৃপায় আরও সামগ্রিক ও নিঁখুত করবার প্রয়াস নেব। আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার কাছে এই প্রার্থনা করছি যে, তিনি এ বই থেকে মুসলিমদের উপকৃত করবেন এবং এর লেখককে অনেক উত্তম প্রতিদান দিবেন।

    সালাম ও দরুদ পেশ করছি নবী মুহম্মদ (সা), তাঁর পরিবারবর্গ, শেষ দিবসের পূর্ব পর্যন্ত আগত তাঁর অনুসারীদের প্রতি এবং সকল প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার।

  • খিলাফত একটি স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র একটি কুফরী শাসনব্যবস্থা

    খিলাফত একটি স্বতন্ত্র শাসনব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র একটি কুফরী শাসনব্যবস্থা

    সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং হিদায়াত দিয়েছেন। দরুদ এবং সালাম পেশ করছি রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি, যাকে মহান আল্লাহ পুরো বিশ্ববাসীর নিকট রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছেন। আরো সালাম প্রেরণ করছি তাঁর পবিত্র পরিবারের উপর, সাহাবাগণ (রা)-এর উপর এবং পরবর্তীতে যারা তাঁদের অনুসরণ করেছেন।

    আজ আমরা আলোচনা করবো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে, যে বিষয়টি নিয়ে বেশিরভাগ সাধারণ মুসলিম অজ্ঞতার মধ্যে রয়েছেন। সে বিষয়টি হচ্ছে “খিলাফাহ একটি স্বতন্ত্র (Unique) শাসনব্যবস্থা”। এবং আলোচনা শেষে “গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা একটী কুফরী শাসনব্যবস্থা” নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে। চেষ্টা করবো যতটুকু সহজ, সংক্ষিপ্তভাবে ও দলীল সহকারে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা যায়।

    এই আলোচনার উদ্দেশ্য:

    বর্তমান মুসলিম উম্মাহ ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। ধীরে ধীরে তারা ইসলাম ও রাজনৈতিক সচেতন হয়ে উঠছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকার কারণে ইসলামী শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকার কারণে এবং ইসলামী শাসনব্যবস্থা ও মানবরিচত কুফরী ব্যবস্থার মৌলিক কারণগুলো সঠিক চিহ্নিত না করার ফলে তাদের ইসলাম সম্পর্কে আন্তরিক চেষ্টা বিফলে যাচ্ছে। আমার এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, পৃথিবীতে বর্তমানে যত মানবরচিত কুফরী শাসনব্যবস্থা আছে তাঁর সাথে ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফাহ’র মৌলিক যেসব পার্থক্য আছে তা তুলে ধরে যাতে এই উম্মাহ অন্যান্য শাসনব্যবস্থা দ্বারা বিভ্রান্ত হতে না পারে।

    ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফাহ’র সংজ্ঞা:

    শুরুতেই আসা যাক, খিলাফাহ কাকে বলে?

    “ইসলামী শাসনব্যবস্থা বলতে খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে বোঝায়। যা এ মহাবিশ্বের প্রতিপালক মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত এবং রাষ্ট্রের প্রধান খলীফা; যিনি মুসলিমদের বায়াতের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে থাকেন। এই বিষয়ে অকাট্য দলিল হচ্ছে আল্লাহ’র কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ এবং সাহাবাদের (রা) ইজমা (ঐক্যমত)”।

    তাহলে উপরোক্ত এই সংজ্ঞা থেকে আমরা পাচ্ছি,

    • এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক একমাত্র নির্ধারিত শাসনব্যবস্থা।
    • রাষ্ট্রের প্রধান হচ্ছে “খলীফা”
    • খলীফা মুসলিমদের বাইয়াতের মাধ্যমে নিযুক্ত হয়ে থাকেন।
    • খিলাফত থাকার বাধ্যবাধকতা আল্লাহ’র কিতাব, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ ও ইজমা আস-সাহাবা (রা) দ্বারা প্রমাণিত।

    সংক্ষেপে বলা যায়, খিলাফাহ শাসনব্যবস্থায় একজন খলীফা শুধুমাত্র ইসলামী শরীয়াহ(কুর’আন, সুন্নাহ, ইজমা আস-সাহাবা, ক্বিয়াস) দিয়েই শাসন করতে পারবেন। মূলতঃ এই কারণেই পৃথিবীতে যত মানবরচিত কুফরী শাসনব্যবস্থা আছে তার থেকে খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা স্বতন্ত্র। যেসব মানবরচিত ব্যবস্থার সাথে আমরা খিলাফাহ ব্যবস্থাকে গুলিয়ে ফেলি তা নিম্নে দেওয়া হল এবং তাঁদের সাথে খিলাফাহ ব্যবস্থার মৌলিক যে পার্থক্য তা আলোচনা করা হল।

    • খিলাফাহ শাসন কাঠামো রাজতান্ত্রিক নয়।
    •  খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ নয়।
    • খিলাফাহ ফেডারেল রাষ্ট্রও নয়।
    • খিলাফাহ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থাও নয়।
    • খিলাফাহ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও নয়।
    • খিলাফাহ কোন ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়।
    • খিলাফাহ কোন সর্বব্যাপারে নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্র নয়।
    • খিলাফাহ মন্ত্রী-পরিষদ দ্বারা শাসিত কোন ব্যবস্থা নয়।

      আসুন, সংক্ষেপে এগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক।
    • খিলাফাহ শাসন কাঠামো রাজতান্ত্রিক নয়:

    রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় রাজা হচ্ছে সকল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। রাজা যে সিদ্ধান্ত নিবে, সেটাই জনগণের জন্য প্রযোজ্য হয়। রাজার ছেলে রাজার মৃত্যুর পর পরবর্তী রাজা হিসেবে ক্ষমতা ভোগ করে। রাজা যেহেতু নিজেকে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করে তার দরুন সে নিজে আইন প্রণেতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এর ফলে সে নিজেকে সকল আইনের উর্ধে রাখে। এইভাবে তিনি সকল প্রকার জবাবদিহিতা থেকেও মুক্ত থাকেন, যদিও তিনি জনগণের অধিকারসমূহ প্রদান করেন না।

    এখন আসা যাক, খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা এবং রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কোথায়…

    খিলাফাহ রাজতন্ত্র
    এই ব্যবস্থায় সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক থাকেন একমাত্র আল্লাহ।এই ব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে রাজা বা বাদশা নিজেকে দাবি করে।
    এই শাসন ব্যবস্থায় কুর’আন, সুন্নাহ, ইজমা আস-সাহাবা এবং ক্বিয়াস দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়।এই শাসনব্যবস্থায় বাদশা যেহেতু সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে দাবি করে সেহেতু তাঁর বানানো আইন দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হয়।
    খলীফা জবাবদিহিতার উর্ধে নন।বাদশাহ জবাবদিহিতার উর্ধে থাকেন।
    এই ব্যবস্থায় খলীফা নিয়োগের পদ্ধতি হলো জনগণের বাইয়াত।এই ব্যবস্থায় রাজপুত্র উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা পেয়ে থাকেন।
    খলীফা রাষ্ট্রের কোন প্রতীক নন।এই ব্যবস্থায় বাদশাহকে জাতির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

    আশা করা যায়, এই বিষয়টি পরিষ্কার হবে যে, খিলাফাহ শাসন ব্যবস্থা আর রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আলাদা। সুতরাং, খিলাফাহ ব্যবস্থা রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুরূপ নয়।

    • খিলাফাহ ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অনুরূপ নয়:

    সাধারণ অর্থে সাম্রাজ্যবাদ হলো সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্খা। অপর রাজ্য গ্রাস করে রাজ্য জয় করে, সেই অঞ্চলের মানুষকে জোর করে বিদেশি শাসনাধীনে আনা এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে শোষণ করা। যেসব রাষ্ট্র তাদের শাসন ব্যবস্থাতে সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিস্থাপন করে, তারাই সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র।

    ইতিহাসের পাতায় আলেকজান্ডার, চেংগিস খাঁ বা নেপোলিয়ান ছিল অতীতের সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শাসকের উদাহরণ। আর বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। অতীতে উক্ত ব্যক্তিদের সাম্রাজ্য বিস্তারের পিছনে ছিল বংশগত বা ব্যক্তিগত আকাঙ্খা ও উচ্চাভিলাষ। আর বর্তমানে রাষ্ট্রগুলো কর্পোরেট স্বার্থ টিকিয়ে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদী হয়ে উঠে।

    ১৯১৮ সালে ফ্রান্সে লেনিন সাম্রাজ্যবাদকে খুব ছোট একটি সংজ্ঞায় এনেছেন,

    “সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের একচেটিয়া স্তর”। অর্থ্যাৎ এরা সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের মাধ্যমে পুঁজির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এইসব রাষ্ট্রগুলো তাদের ক্ষমতাকে সুসংহত করতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ঔপনিবেশ স্থাপন করে ক্রমাগত শোষণের মাধ্যমে কেন্দ্রকে শক্তিশালী করে। যা আমরা বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানী ইত্যাদি দেশগুলোর প্রকৃতিতে দেখতে পাই।

    খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। খিলাফাহ ব্যবস্থা বিশ্বের স্থানে, বিভিন্ন বর্ণের মানুষদের শাসন করা সত্ত্বেও ইতিহাস থেকে আমরা কখনোই পাই না যে, খিলাফাহ সবসময় কেন্দ্রকে সমৃদ্ধ করেছে। যদিও পুরো রাষ্ট্রই একটি কেন্দ্রের সাথে সম্পৃক্ত ছিল।

    খিলাফাহ রাষ্ট্রের লক্ষ্যই হচ্ছে অধীনস্থ অঞ্চলের জনগণের মাঝে সমতা তৈরি করা। রাষ্ট্রের প্রতিটি জনগণের (মুসলিম ও অমুসলিম) পরিপূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়েছে। পাশাপাশি তাঁদের নাগরিক কর্তব্যও নির্ধারণ করেছে। খিলাফাহ রাষ্ট্র কখনোই তাঁর অধীনস্থ এলাকাগুলোকে ঔপনিবেশ হিসেবে দেখে না এবং এলাকাগুলো থেকে এবং এলাকাগুলো থেকে লুটপাট করে কেন্দ্রকে সমৃদ্ধ করে না। সেই অধীনস্ত এলাকাগুলো কেন্দ্র থেকে এলাকাগুলো থেকে যত দূরেই থাকুক না কেন, তারা যে বর্ণেরও থাকুক না কেন, তাদের কখনোই বিভিন্ন হিসেবে মনে করেনা। খিলাফাহ রাষ্ট্র তাঁর প্রতিটি অঞ্চলের নাগরিককে সমান গুরুত্ব এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মনে করে। খিলাফাহ’র কেন্দ্রে যে নাগরিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করে একইভাবে প্রান্তিক নাগরিকও একই সুবিধা ভোগ করে। ইতিহাস থেকে এরকম অসংখ্য উদাহরণ পেশ করা যায়।

    • খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা ফেডারেল রাষ্ট্রের অনুরূপ নয়:

    ফেডারেল বা প্রাদেশিক রাষ্ট্র বলতে এমন কিছু রাষ্ট্রকে বুঝায় যেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলসমূহ স্বায়ত্বশাসন যোগ করে এবং সাধারণ কিছু নিয়মকানুনের দিকে ঐক্যবদ্ধ থাকে। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ইত্যাদি। এই সব প্রদেশ থেকে যে পরিমাণ ট্যাক্স সংগ্রহ করা হয়, যা ঐ সব প্রদেশেই উন্নয়নের জন্য ব্যয় করা হয়।

    খিলাফাহ রাষ্ট্রে বিভিন্ন প্রদেশ থাকলেও এটা মূলতঃ প্রচলিত ফেডারেল রাষ্ট্র নয়। এটা প্রকৃতপক্ষে ঐক্যবদ্ধ একটি ব্যবস্থা। এই রাষ্ট্রে সব অঞ্চলে প্রয়োজনে তদানুসারে অর্থায়ন করা হয় এবং সে হিসেবে বার্ষিক বাজেট নির্ধারণ করা হয়। সুতরাং, এ ক্ষেত্রেও বলা যায়, খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা ফেডারেল ব্যবস্থা থেকে স্বতন্ত্র।

    • খিলাফাহ কোন প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়:

    মূলতঃ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা (Republican State) এর উদ্ভব হয়েছে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ব্যর্থতা যখন জনগণের কাছে প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল, তখন জনগণের সংগ্রাম এর মাধ্যমে বাদশাহ’র নিকট যে সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল তা তারা নিজেরা নিয়ে নিলো। তারপর থেকেই প্রজারাই দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হলো এবং তাঁদের প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন করতে লাগলো।

    এখানে প্রজা বা জনগণ রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করলেও প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র তারা গঠন করে তা মৌলিকগতভাবে রাজতন্ত্রের সাথে পার্থক্য নেই। সেখানে বাদশাহ ছিল আইন প্রণেতা আর এখানে প্রজারা আইনপ্রণেতা এবং দুটো ব্যবস্থাতেই আইনের উৎস মানুষ।

    খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা যে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে স্বতন্ত্র তা নিম্নের পার্থক্য এর মাধ্যমে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলোঃ

    খিলাফাহ ব্যবস্থা প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থা
    এটি আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক একমাত্র বৈধ ব্যবস্থাএটি মানবরচিত শাসনব্যবস্থা।
    রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা তথা আইন প্রনয়ণের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার। খলীফা শুধুমাত্র একজন আল্লাহ’র প্রতিনিধি।প্রজারাই এখানে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। তারা তাঁদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে থাকে।
    খলীফা শুধুমাত্র আল্লাহ’র প্রতিনিধি এবিং তিনি জাতির বিশেষ কোন প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হন না।প্রজাদের প্রতিনিধি থাকে প্রধানমন্ত্রী বা কেবিনেট সদস্য বা মন্ত্রী-উপদেষ্টা পরিষদ এবং এখানে পুর্বের রাজা বা রাণীকে নেহায়েত প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যেমন: বৃটেন।

    সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, খিলাফাহ ব্যবস্থা একটি Unique ব্যবস্থা যার সাথে প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে কোন সাদৃশ্য নেই।

    • খিলাফাহ কোন যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়:

    যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বলতে যে শাসনব্যবস্থায় একজন ধর্মীয় গুরু থাকেন এবং তিনি তাদের ধর্মীয় কিতাব বলে রাষ্ট্রের সার্বিক ক্ষমতা ভোগ করেন। তাদের পাদ্রী বা বিশপ বলা হয়। তারা রাষ্ট্রের শাসক নির্ধারণ করতেন জনগণের মতামত ছাড়াই। তাছাড়া তারা রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী ঠিক করতেন এবং প্রয়োজনে তাদের ধর্মীয় কিতাবকে সংশোধনী করতেন। এই ধরণের শাসনব্যবস্থা আমরা ফরাসী বিপ্লবের পূর্বে দেখতে পাই।

    খিলাফাহ ব্যবস্থা কখনো যাজক বা মোল্লাতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুরূপ নয়। খিলাফাহ আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক একমাত্র বৈধ ব্যবস্থা। একজন খলীফা শুধুমাত্র আল্লাহ তা’আলার প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর কিতাব ও রাসূল (সা)-এর সুন্নাহ দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। খলীফা কখনোই আল্লাহ’র কিতাবের বাইরে কাজ করবেন না। কিতাব সংশোধন তো প্রশ্নই আসেনা। তাছাড়া, খিলাফাহ ব্যবস্থায় এমন কোন নির্দিষ্ট আলেম বা ধর্মীয় গুরু বা আধ্যাত্মিক গুরু থাকবে না, যে শাসক নির্বাচনে বা নির্ধারণের প্যাটেন্ট পেয়ে থাকে। খলীফা নির্বাচনে পূর্ণ এখতিয়ার থাকবে জনগণের কাছে।

    তাছাড়া, যাজক বা মোল্লাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধর্মীয় গুরু বা নেতা নিজেকে সকল ভুল ও জবাবদিহিতার উপরে রাখতে চান। কারণ, তিনি ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলেই পরিচিত। কিন্তু খিলাফাহ ব্যবস্থাইয় খলীফা আল্লাহ’র প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও “আল্লাহ’র প্রতিনিধি” বা এর বিকৃত ব্যাখ্যা দান করার কোন সুযোগ থাকবে না। এইসব বিকৃত যাজক বা মোল্লাদের আল্লাহ পাক “ইলাহ” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ বলেন,

    “তারা আল্লাহ’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদেরকে নিজেদের ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে”। (সূরা আত-তওবা: ৩১)

    কারণ এইসব ধর্মযাজকরা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন এর ক্ষমতা প্রয়োগ করতো আল্লাহ’র আইনের বিপরীতে। কিন্তু একজন খলীফা এরূপ করার কোন সুযোগই পাবেনা। কারণ,

    “বস্তুত সার্বভৌমত্ব ও শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্য নয়”। (সূরা ইউসুফ: ৪০)

    “তাদের মধ্যে ফয়সালা করুন যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন তা দিয়ে”। (সূরা মায়েদা: ৪৯)

    আরো এমন অসংখ্য আয়াত আছে। উপরোক্ত আয়াত থেকে স্পষ্ট রাসূল (সা)-কে আল্লাহ দুটো পদে অধিকারী করেছিলেন:

          ১. নবুয়্যত ও রিসালাতের পদ

          ২. মুমিনদের নেতার পদ

    যেহেতু রাসূল (সা) এর মাধ্যমে নবুয়্যত ও রিসালাত সমাপ্ত হয়েছে, তাই এখন শুধু অবশিষ্ট আছে মুমিনদের নেতার পদ বা খলীফার পদ। যেটা সুস্পষ্ট একটী মানবীয় পদ। আর এই এই মানবীয় পদ মানুষই বহন করবে। আমাদের মনে রাখা উচিৎ, মানুষ ভুল-ভ্রান্তি বা গুনাহের উর্ধে নয়; যা আমরা খলীফাদের ইতিহাসে দেখতে পাই। সুতরাং, খিলাফাহ একটি মানবীয় রাষ্ট্র এবং খলীফাদেরকে ভুল বা জবাবদিহিতার উর্ধে রাখা যাবে না; যেভাবে যাজকতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমরা দেখেছি। সুতরাং, খিলাফাহ কিছুতেই যাজকতান্ত্রিক বা মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অনুরূপ নয়।

    • খিলাফাহ মন্ত্রী পরিষদ দ্বারা পরিচালিত কোন ব্যবস্থা নয়:

    এই ধরণের শাসনব্যবস্থা মূলতঃ প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বেশি লক্ষণীয়। প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসঙ্কার্যে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন দায়িত্বে বিভিন্ন মন্ত্রীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মিলে মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। কিন্তু এই ধরণের ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অনেক বেশি পাওয়া যায়। যার ফলে জনগণের সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে অএঙ্ক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যা আমরা আমাদের দেশসহ আরো অন্যান্য দেশে দেখতে পাচ্ছি।

    কিন্তু খিলাফাহ ব্যবস্থা মন্ত্রী পরিষদভিত্তিক ব্যবস্থা না করে সম্মিলিতভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করবে। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোকে একটী একক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসে খুব সহজেই সমস্যার সমাধান করা হবে। তাছাড়া খলীফা তাঁর কাজ সহজ করার জন্য প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী নিয়োগ দিতে পারেন।

    সুতরাং, এক্ষেত্রে এটাও নিশ্চিত হওয়া গেল, খিলাফাহ ব্যবস্থা মন্ত্রী পরিষদ দ্বারা পরিচালিত কোন ব্যবস্থা নয়।

    • খিলাফাহ কোন Totalitarian রাষ্ট্র নয়:

    Totalitarian রাষ্ট্র বলতে এমন একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ তার অধীনস্থ প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিষ্টান, দল (রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক)-কে নিজের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে চায়। তাদের উপর গোয়েন্দাবৃত্তির মাধ্যমে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। বর্তমানে আমরা প্রতিটি রাষ্ট্রেই এই ব্যবস্থাকে গ্রহণ করতে দেখছি; বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ইত্যাদি দেশে Totalitarian তত্ত্ব প্রয়োগ হচ্ছে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, তারাই বরং খিলাফাহকে রাষ্ট্র বলে উম্মাহকে বিভ্রান্ত করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছে। খিলাফাহ যে আসলেই এরুপ কিনা তা আমাদের জানা দরকার। আমি সংক্ষেপে বিষয়গুলো তুলে ধরবো।

    ১৯৫৬ সালে দুই মার্কিন ঐতিহাসিক Carl Friedrich এবং Zbigniew Brzezinski তাদের বিখ্যাত বই Totalitarian Dictatorship and Autocracy-তে কমিউনিস্ট নাজিদের রাষ্ট্র যে Totalitarian রাষ্ট্র ছিল তাঁর কিছু ফিচার তুলে ধরেছে। যথাক্রমে,

    •  রাষ্ট্রের আদর্শকে সবার মাঝে চাপিয়ে দেওয়া।
    •  একতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল থাকতে বাধ্য করা।
    • সামরিক বাহিনীতে রাষ্ট্রের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
    • গণমাধ্যমগুলোতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
    • পুলিশি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্র প্রতিটি বিষয়ে তার অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রতিষ্ঠা।

    সংক্ষেপে আলোচনা করলে, খিলাফাহ ব্যবস্থা কখনো তাঁর আদর্শ বা ইসলামকে অন্যদের উপর চাপিয়ে দিবেনা, অতীতেও দেয়নি। খিলাফাহ’র অভ্যন্তরে শুধু যে মুসলিম বসবাস করবে এমন কোন কথা নেই। ইসলামী শারী’আহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। এবং সাবধান করা হয়েছে তার খিয়ানতে না করার জন্য।

    খিলাফাহ কখনো একতান্ত্রিক দল প্রতিষ্ঠা করবে না। খিলাফাহ রাষ্ট্রে অবশ্যই একাধিক ইসলামী রাজনৈতিক দল থাকতে পারবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

    তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকবে যারা মানুষকে কল্যানের দিকে (ইসলামের দিকে) আহ্বান করবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে এবং (যারা এ কাজ করবে) তারা হবে সফলকাম”। (সূরা আল ইমরান: ১০৪)

    খিলাফাহ সেই রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও করবে না। কারণ ইসলামী ব্যবস্থায় কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ থাকবে না। দলগুলো শুধু আল্লাহ সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে।

    খিলাফাহ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রে সেনাবাহিনী থাকবে এবং সেখানে আমীর-উল জিহাদ থাকবে। কিন্তু খলীফা তাঁর শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সেনাবাহিনীর ব্যবহার করতে পারবেন না।

    খিলাফাহ ব্যবস্থা তার রাষ্ট্রের media বা গণব্যবস্থার প্রতি একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে না। রাষ্ট্রে সরকারি বা বেসরকারি গণমাধ্যম থাকতে পারে। বেসরকারি গণমাধ্যমকে অবশ্যই ইসলামী আক্বীদার মৌলিক নীতিমালা পূরণের শর্তে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এতে রাষ্ট্রের অনুমতির প্রয়োজন নেই, শুধু রাষ্ট্রকে অবহিত করলেই চলবে।

    খিলাফাহ কখনো পুলিশি রাষ্ট্র হবে না, অতীতেও ছিল না। খিলাফাহ মূলতঃ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে সমাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। খলীফাহ নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার জন্য বর্তমান সরকারগুলোর মতো পুলিশকে লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত করবে না। তাছাড়া বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে যেভাবে নির্যাতন করা হয়, ইসলাম কখনোই তা অনুমোদন দেয় না। এছাড়াও বর্তমানে যেভাবে নাগরিকদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা হয়, তা খিলাফাহ কখনোই করবে না; কারণ ইসলামে তা হারাম।

    খিলাফাহ কখনোই রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ করবে না। রাষ্ট্র শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে তাঁর অধিকার খাটাবে। তাছাড়া বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যদি ইসলামী আক্বীদাহ’র সাথে সাংঘর্ষিক কিছু না করে, তাহলে রাষ্ট্র সেখানে হাত দিবে না।

    সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে, মার্কিন নীতিনির্ধারকদের দেওয়া Totalitarian রাষ্টের বৈশিষ্ট্য দিয়েও যদি আমরা খিলাফাহ ব্যবস্থাকে মিলিয়ে দেখি তাহলে দেখবো, খিলাফাহ অত্যন্ত স্বতন্ত্র একটি শাসনব্যবস্থা যা অন্যান্য মানবরচিত ব্যবস্থার সাথে তুলনা করা অমূলক।

    • খিলাফাহ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অনুরূপ নয়:

    গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণ সকল সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। এর মাধ্যমে সেই প্রতিনিধিরা সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হয়ে যায়। এরপর তারা সংসদে গিয়ে আইন প্রণয়ন করে। 

    সুতরাং, মৌলিকগত দিক থেকে খিলাফাহ শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে। খিলাফাহ শাসন ব্যবস্থায় সকল সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। তাই, শরীয়ার বাইরে গিয়ে খলীফা একটি আইনও প্রণয়ন করতে পারেনা। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসকরা হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল হিসেবে সাব্যস্ত করতে চায়, যা আমরা বর্তমানে অহরহ দেখতে পাই। সুতরাং, এই প্রেক্ষিতে বলতে গেলে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একটি কুফরী ব্যবস্থা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “এবং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী যারা বিচার ফয়সালা করে না, তারাই কাফের” (সূরা আল মায়েদা: ৪৪)

    “বস্তুত সার্বভৌম ও শাসন কর্তৃত্ব আল্লাহ ছাড়া আর কারো নয়”। (সূরা ইউসুফ: ৪০)

    “কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! তারা কিছুতেই মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের পারস্পরিক বিচার বিসম্বাদের ভার তোমার(হে মুহাম্মদ) উপর ন্যস্ত করে। আর তুমি যা-ই ফয়সালা করবে, সে সম্পর্কে তারা নিজেদের মনে কিছুমাত্র কুন্ঠাবোধও করবে না। বরং এর সামনে নিজদেরকে পূর্ণরূপে সোর্পদ করে দেবে”। (আন-নিসা: ৬৫)

    এইরকম আরো বহু দলিল আছে যা নিশ্চিত করে যে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আল্লাহ তা’আলার।

    এছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয়, যেখানে কোন নারী বা পুরুষ হালাল হারামের প্রতি লক্ষ্য না করেই যা খুশি তাই করতে পারে। গণতন্ত্র ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে ধর্ম ত্যাগের অধিকার প্রদান করে এবং ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বাঁধা আরোপ করে না। এছাড়া মালিকানার স্বাধীনতা মূলত ধনীকে অসৎ ও প্রতারণাপূর্ণ উপায়র দূর্বলকে শোষণ করার অধিকার দেয়। ফলে, ধণীর সম্পদ আরো বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং দরিদ্র আরো বেশি দরিদ্র হতে থাকে। গণতন্ত্র যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয় তা মূলতঃ সত্য বলাকে উৎসাহিত করেনা, বরং উম্মাহ’র পবিত্র আবেগ-অনুভূতিকে নির্মম আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতেই ব্যবহার হয়ে থাকে।

    পরিশেষে একথা বলা যায় যে, গণতন্ত্র একটি কুফরী শাসনব্যবস্থা। এটি এ কারণে নয় যে, এটি মানুষকে শাসক নির্বাচনের ক্ষমতা দেয়। কারণ এটি প্রকৃত অর্থে মূল আলোচ্য বিষয়ও নয়। বরং, এটি এ কারণে যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই হলো মানুষের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতা (Freedom)।

    উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফাহ রাজতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী, ফেডারেল, প্রজাতান্ত্রিক, মন্ত্রী পরিষদভিত্তিক, Totalitarian রাষ্ট্র কিংবা গণতান্ত্রিক বা যাজকতান্ত্রিক কোনটিই নয়। খিলাফাহ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি শাসনব্যবস্থা যা মহান আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত। সুতরাং, আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফীক দান করুন যেন আমরা তাঁর দ্বীন ইসলামকে খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জমীনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, আমীন।

  • নারীর প্রতি সহিংসতা; একই সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে সমাজ: সমাধান কোথায়?

    নারীর প্রতি সহিংসতা; একই সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে সমাজ: সমাধান কোথায়?

    আমাদের আবেগ-আক্রান্ত সমস্যার selective outcry (তনু হত্যা) সমাধানটা কি শুধুমাত্র এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে হবে? সমাজ থেকে যাতে এই সমস্যাগুলো আর উঠে না আসে, আমাদের ওই ভাবে সচেতন হওয়া উচিত নয় কি? আমরা কি শুধু ক্যান্সার থেকে সৃষ্ট লক্ষণগলো তাড়ানোর জন্য সাময়িক হৈচৈ করব? নাকি পুরো ক্যান্সার দুরিকরণে সচেতন হয়ে চেষ্টা করব?

    আমরা যখনই কতগুলো সমস্যা নিয়ে কথা বলি তার শুরুতেই আপনাকে ভাবতে হবে সমস্যাগুলো যেমন- ইভ টিজিং, ধর্ষণ, হত্যা, পরকিয়ার কারণে নিজ সন্তান-স্বামী/স্ত্রী হত্যা…… কেন হচ্ছে? 

    যার কারণে(মানুষ) এই সমস্যা গুলোর সৃষ্টি তার স্বভাবটাই (nature) বা কেমন? 

    মানুষের স্বভাব:

    মানুষের মধ্যে সাধারনত দুটো রুপ বিদ্যমান; একটা organic needs বা জৈবিক চাহিদা যা ক্ষুধা এবং পিপাসার আবরণে প্রকাশ পায়। এ জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য তাকে খেতে হয়। জৈবিক চাহিদা তাকে ভিতর থেকে তাড়িত করে যেমন ক্ষুদা লাগা। এটি পূরণ না হলে সে মারা যায়। যেমন আপনি না খেলে, প্রকৃতির ডাকে সাড়া না দিলে মারা পড়বেন। অর্থাৎ পূরণ হওয়া অপরিহার্য। 

    অপরটি প্রবৃত্তি বা instinct। প্রবৃত্তি বা instinct মানুষের মধ্যে সুপ্তভাবে থাকে যা পূরণ না হলে মানুষ মারা যায় না। কিন্তু সে চিন্তিত হয় প0ড়ে তাড়িত চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত। মানুষের instinct পূরণ না হলে সে মারা যায় না বরং চিন্তিত হয় ,এটি পূরণ হওয়া অপরিহার্য নয়।এটি মানুষের ভিতর থেকে আসেনা বরং বাহির থেকে আসে।

    মানুষের আছে ‘টিকে থাকার প্রবৃত্তি’ (survival instinct), যার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়, ক্রোধ, লালসা, ভয়, আক্রমণ, প্রতিরক্ষা, অহংবোধ প্রভৃতির মাধ্যমে। 

    আর আছে ‘আধ্যাত্মিক প্রবৃত্তি'(religious instinct) – যার প্রকাশ ঘটে যখন মানুষ অসহায় বোধ করে। তখন সে চায় তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, ক্ষমতাধর, কারও নিকট আত্মসমর্পণ করতে, সাহায্য চায়, তার কাছে নিজেকে নিবেদিত করে। সারা জীবন নিজের ইচ্ছাধীন চলার পর বৃদ্ধবয়সে এসে যখন শরীরের দুর্বলতা কাছ থেকে অনুভব করে তখন তার মধ্যে মৃত্যু/ভয়ের জন্ম হয় ফলতঃ সে সৃষ্টার নিকট অসহায় প্রার্থনা করে।

    প্রজনন প্রবৃত্তি (procreation instinct)- যার অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়, মায়া, মমতা, ভালবাসা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ এসবের মাধ্যমে।

    যেমন- procreation বা প্রজনন প্রবৃত্তির কারণে বিপরীত লিঙ্গকে দেখে বিমোহিত হওয়া, তা হতে চিন্তার উদয় ঘটানো, সবশেষে চাহিদা পূরণ না হলে উদ্বিগ্ন হওয়া।

    এগুলো মানুষের প্রবৃত্তিগত বৈশিষ্ট্য। প্রবৃত্তির তাড়না আসে চারপাশ বা REALITY হতে যেমন-প্রজনন প্রবৃত্তি মানুষের ভিতর থেকে আসেনা, আসে বাহিরের কোন ব্যক্তি, বস্তু বা চিন্তা তার ভিতর প্রবেশ করার মাধ্যমে। সুতরাং মানুষ এই প্রভৃত্তির তাড়না অনুভব করেনা যদি না তার সামনে ওই বাস্তবতা সৃষ্টি করা হয়। সেক্ষেত্রে সে উত্তেজিতও হবেনা।

    তাহলে এত অনাচারের কারণ কী? 

    এক কথায় প্রবৃত্তিকে জাগানোর জন্য ওই বাস্তবতা সৃষ্টি করা। যখন একটি সমাজের সমস্ত পরিবেশকে ষড়যন্ত্র করে প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে দেওয়া হয় তখন ওই সমাজের মানুষের চিন্তা, চেতনা, ধারনা ও সময় ব্যস্ত থাকে ঐ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে।

    এখন আপনি যদি আপনার চারপাশে তাকান দেখবেন একটা সেকুলার আইডিওলজি হতে উঠে আসা চিন্তা হতে ব্যবস্থা কিভাবে একটি সমাজকে ব্যস্ত করে রাখে শুধু কিছু প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে। যেমন আপনার হাটার পথে অর্ধনগ্ন বিলবোর্ড, উত্তেজক অশ্লীলতায় ভরা বিজ্ঞাপন, ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে পরিবারগুলোকে ভঙ্গুর করে তোলা, ফ্রি মিক্সিংকে স্বাভাবিক করে তোলা নাটক ও সিনেমা, পর্নগ্রাফি, অস্বাভাবিক সম্পর্ক, টেলিকম কোম্পানির-লাভ SMS রাত জেগে কথা বলার উৎসাহ, বিবাহ কঠিন করে ফেলা ইত্যাদি। অর্থাৎ একটা মানুষের স্বাভাবিক আচরন, চিন্তা, চেতনা, সময় সবকিছুকে ব্যস্ত রাখা প্রজনন প্রভৃত্তিকে জাগিয়ে রাখার মাধ্যমে। 

    ফলে যা ঘটে:

    জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের অর্থায়নে ICDDRB ২০১১ সালে একটি জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪০ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, তাদের বয়স ১৯ বছর হওয়ার আগেই তারা নারী ধর্ষণ করেছে, ৫৭-৬৭ শতাংশ বলেছে, শুধু মজা করার জন্যই তারা নারীদেরকে যৌন হয়রানি করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৬ এই পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ লাখ ৯ হাজার।(সুত্রঃপুলিশ সদর দপ্তর;৮/৪/১৬ by online AMAR DESH)

    যারা জনগণের সম্পদ চুরি করে পশ্চিমা দেশে এক’পা দিয়ে রেখেছেন তারা জেনে খুশি হবেন-২০১৫ সালে নারী লাঞ্চনায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ব্রিটেন, যেখানে প্রতি ১০০জনে ৮৪জন নারী লাঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন। নারী স্বাধীনতার এত উন্মুক্ত প্রদর্শনী তারপরও এই অবস্থা কেনো?আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থা যেখানে ধর্ষণ, হত্যা, নিরাপত্তাহীনতায় আতংকিত হয়ে উঠেছে সেখানে একটা তনু হত্যা অনেক গুলো ডটের মধ্যে একটি ডট মাত্র…………………।(প্রতিদিনকার পত্রিকার শিরোনাম)

    আমাদের নিয়ে খেলছে কারা ? 

    পুঁজিবাদ (capitalism) যেকোন বিষয় হতেই পুঁজি সংগ্রহ করতে চায়। সেটা পুরুষের শুক্রাণু বিক্রি করেই হোক কিংবা নারীর জরায়ু ভাড়া দিয়ে। পুঁজি অর্জনই তার কাছে একমাত্র মুখ্য বিষয়। তাই নারীকেও সে পুঁজি অর্জনের একটি উপকরণ হিসেবে দেখে। নারী হতে পুঁজি অর্জন করতে হলে তার সৌন্দর্য, দেহ – এগুলোকে ব্যবসার পণ্য বানাতে হবে। এক্ষেত্রে কালো মেয়েকে বুঝাতে হবে, তাকে ফর্সা হতে হবে । সাদা মেয়েকে বুঝাতে হবে, তার চামড়া ফ্যাকাসে, তাই রোদে পুড়িয়ে তামাটে করতে হবে, বিক্রি হবে পণ্য, সেজন্য যেতে হবে সমুদ্র সৈকতে,উন্মুক্ত হবে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ । নর-নারীর যে স্বাভাবিক সম্পর্ক তার প্রকাশ ঘটবে শুধুমাত্র যৌনতার আবেশে। অর্থাৎ কিছু স্বাধীনতার কথা বলে পরিপূরকের এক অংশকে(নারী) অর্ধ বা পুরো উলঙ্গ করে অপর অংশের instinct বা প্রবৃত্তিকে উস্কিয়ে দেওয়া । ফলস্বরুপ, একটি মাদকাসক্ত করে রাখা সমাজ থেকে উঠে আসে- প্রতিদিনকার ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, হত্য, সার্বিক অনাচার এবং একটি ভুল আদর্শ পুঁজিবাদের পুঁজি সংগ্রহ। সমাজে বিদ্যমান একটি ভুল আদর্শ (capitalism) ও তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই এসকল সমস্যা ও অরাজকতার একমাত্র কারণ ।

    একজন মানুষকে এইভাবে আসক্ত করে রাখার উদ্দ্যেশ্য একটাই যাতে সে ;তার জীবনের সামগ্রিক লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্যর সন্ধান না করে। সে যাতে চিন্তা না করে তাকে কেও একজন পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যিনি পাঠিয়েছেন তিনি অবশ্যই একটি সুনিয়ন্ত্রিত জীবন পরিচালনার ব্যবস্থাও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবং তার স্রষ্টার পাঠানো ব্যবস্থাটাই বা কি? 

    একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস হতে “জীবনব্যবস্থা” (ideology) ইসলাম যা একমাত্র সমাধান:

    ইসলাম একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোকিত চিন্তা(enlighten thought) যা মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা(idea) দেয়। যা মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি দ্বারা প্রমানিত এবং ফিতরাত বা Instinct এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের যাবতীয় সকল সমস্যার বাস্তবায়ন যোগ্য একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি(method)। সৃষ্টা কতৃক প্রেরণ তাই বাস্তবায়নের ফলে সমস্যার উদ্ভব হয় না।

    কেও যদি আমাদের না বলেন কোন উপায়গুলো অবলম্বন করলে তিনি খুশি হন, সে ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা চেষ্টা করে উনাকে খুশি করতে পারবনা। চেষ্টায় উল্টো রেগে যেতে পারেন। অনুরুপভাবে আমাদের জৈবিক চাহিদা ও instinct গুলো পরিপূর্ণ করতে একটা নির্দেশনা প্রয়োজন। তা অবশ্যই যার sanctify বা গুণগান করা হবে তিনি হতেই আসা জরুরী। যেমন আল্লাহ প্রদত্ত ইসলাম,নির্দেশনা রুপে কুরআন এবং হাদীস, কিভাবে তা পালন করতে হবে তার জন্য রাসূল (সা) দেখিয়ে দেন জৈবিক চাহিদা ও instinct গুলো কিভাবে পূরণ করতে হয়। এর বাইরে কোন উৎস হতে সমস্যার সমাধান করতে গেলেই অরাজকতার সৃষ্টি হবে যা বর্তমানে দৃশ্যমান। 

    ইসলাম মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তি হতে উদ্ভুদ্ধ সমস্যাগুলোকে সুশৃংখল্ভাবে সমাধান করে বিবাহের মাধ্যমে। ইসলাম প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলার উপায় উপকরণগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করে। মানুষের চিন্তা,সময় ও মেধার সঠিক ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। নারী-পুরুষের মধ্যে অ-মাহরামগত (marriageable) সম্পর্ক সীমাবদ্ধ বা নিষিদ্ধ করে। কারণ এই অবৈধ সম্পর্কগুলো মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তিকে উস্কিয়ে দেয় এবং তাকে সীমালংঘনের দিকে নিয়ে যায়। কারণ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ না হলে সে দুঃচিন্তাগ্রস্থ হয়ে উত্তেজিত হয় এবং সর্বশেষ আইন ভঙ্গ করে। ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

    যেমন রাসুল(সা) বলেন-

    “তোমাদের কারো উচিত নয় কোন মহিলার সাথে একাকী দেখা করা, যদি না তার সাথে তার মাহরাম (not marriageable to her) কেও থাকে। “

    এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা: 

    “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।”

    ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এই আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

    রাসূল(সা) বর্ণনা করেছেন: 

    “…চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যান করে।”

    দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।

    সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম।

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    “আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখা”[সুরা নাহলঃ৮৯]

    ইসলামি আকীদা হতে উদ্ভূত, রাসুল (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, ইসলাম বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি খিলাফত ব্যবস্থা। যা অন্যান্য সব ধরণের শাসন ব্যবস্থা হতে ভিন্ন। “খিলাফত” একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এটি ইসলামি আকীদার বাইরে যেকোন দূষিত চিন্তা ও কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করবে।

    ফলতঃ মানুষের জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। সর্বোপরি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন-

    “নিশ্চয়ই, খলীফা হচ্ছেন ঢাল স্বরুপ….”

  • তনু হত্যা : পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফল

    তনু হত্যা : পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফল

    ঘটনা:

    কুমিল্লার সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু’র মৃতদেহ ২০ মার্চ রাত সোয়া দশটার দিকে খুঁজে পান স্বয়ং তনুরই বাবা ইয়ার হোসেন। ইয়ার হোসেন সাহেবের কথায় “একটু উঁচু জায়গায় জঙ্গল ও গাছ গাছালির মধ্যে তনুকে পেলাম। গাছের তলায় ওর মাথা দক্ষিণ দিক আর পা উত্তর দিকে পরে আছে। মাথার নিচটা থেতলে গেছে। পুরো মুখে রক্ত ও আঁছড়ের দাগ। আমরা পাঁচজন মিলে সিএমএইচ-এ নিয়ে যাই।” সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তনুকে মৃত ঘোষনা করেন। এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা এখন সবার মুখে মুখে। ধারনা করা হচ্ছে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য ধর্ষককে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে আন্দোলন চলছে। 

    বাস্তবতা:

    ধর্ষণের মতো বিকৃত মানসিকতার ঘটনা গত কয়েক বছরে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। যার কিছু মিডিয়াতে আসে কিছু আসে না। নারীর প্রতি যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি ধরনের ক্ষেত্রেও এসেছে নিত্যনতুন মাত্রা। গত বছর বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সময় টিএসসিতে প্রকাশ্যে সবার সামনে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। গত ২ বছরে শুধু গণপরিবহনে কমপক্ষে ১৮ জন নারী ধর্ষণ বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- গত বছর রাজধানীতে এক গারো তরুণীকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে চলন্ত অবস্থায় গণধর্ষণ করা হয়। রাজধানীর অদূরে সোনারগাঁর আড়াইহাজারে চলন্ত বাসে এক নারী শ্রমিককে বাস ড্রাইভার ও সহকারীসহ চারজন মিলে গণধর্ষণ করে। সর্বশেষ ৩১ মার্চ টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি বাসে এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৬ মাসের শিশুরাও রেহায় পাচ্ছে না বিকৃত মানসিকতার এই ধর্ষকদের হাত হতে। ব্র্যাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী-২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে ৬৮ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়না। বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে প্রায় ৫ হাজার নারী ও মেয়েশিশু নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে, এডিস নিক্ষেপ, অপহরণ, ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা, পাচার, খুন এবং যৌতুকের জন্য নির্যাতন।

    বিষয়টি লক্ষনীয় যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন যেমন পাল্লা দিয়ে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তোড়জোড়ও তথা নারীবাদীদের কলাম লেখনী, নারী সংগঠনের সভা সেমিনার, সরকারের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণলয়ের সচেতনতামুলক প্রকল্পের মাত্রাও বহুগুন বেড়েছে। সমাধান হিসাবে দেওয়া হচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা বুলিসমূহ – নারীকে শিক্ষিত হতে হবে, নারীর সমঅধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে, নারীদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে ও সর্বোপরি নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে ঐ নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। এছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই সমাধানসমূহ গ্রহণের ফলাফল হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নব্বই এর গণঅভ্যত্থানের পর এদেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন নারী। বর্তমানে স্পীকারের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন একজন নারী। নারী শিক্ষার হারও বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় পুরুষের সমান। নারীরা দিনে দিনে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীও হয়ে উঠছে। নারী অধিকার রক্ষাই প্রতিনিয়ত উৎপাদিত ও আমদানী হচ্ছে দেশী বিদেশী এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থা যারা নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রত্যেক সরকারই প্রণয়ন করছে ডজন ডজন আইন। পূর্বের আইন সমুহকে আরো কঠোর করা হচ্ছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো আমাদের সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামীদের পুরস্কৃতও করছে তাদের অবদানের জন্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছেন ড. কামাল হোসেনের মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেন। কারণ তিনি দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতে আইনি লড়াই করেন। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের খসড়া প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। ফতোয়ার বিরুদ্ধে তার মামলা লড়ার কথাও স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার ‘ফরচুন’ সাময়িকী গত ২৪ মার্চ, ২০১৬ নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিশ্বের মহান ৫০ জন নেতার তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে ১০ নম্বরে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে ‘ফরচুন’ বলেছে, তিনি নিজ দেশে নারীদের অধিকার এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে নারীদের আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি তিনি অধিকতর শিক্ষা, আর্থিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিতে কাজ করছেন।

    কিন্তু এত কিছুর পরও নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন বন্ধ তো স্বপ্নের বিষয়, কমার কোন লক্ষনই আপাতত: দেখা যাচ্ছেনা। বরং এই নির্যাতনের গ্রাফটা দিন দিন আরো উর্ধ্বগামী হচ্ছে। কারণ আমরা নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হয়েছি। 

    প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান:

    একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় পশ্চিমাদের দেওয়া এই সমাাধানগুলো কত দুর্বল এবং মৌলিকভাবে কত অসার। পরিসংখ্যান বলছে, যেসব দেশ নারী উন্নয়ন সূচক হিসাবে- নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা, শিক্ষা, অধিকার সচেতনতা, নারী ক্ষমতায়নকে মাপকাঠি বিবেচনা করে তারা নারীকে উন্নত জীবন দেওয়াতো দূরের কথা, নিরাপত্তাই দিতে পারেনি। 

    ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয় (রিপোর্টেড)। ৭৪ শতাংশ নারী দিল্লীতে ২০১২ সালে হয়রানীর শিকার হয়েছে (Hindustan times)। নারী নির্যাতনের প্রতিযোগীতায় অগ্রগামী তারাই যারা যথারীতি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ। যেমন USA এবং UK। পরিসংখ্যানের আলোকে, UK-তে প্রতিদিন ১৬৭ জন নারী ধর্ষিত হয়। USA-তে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে ১ জন নারী, স্বামী কর্তৃক শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়।

    UK ২.৫ হাজার স্বীকৃত Pedophiles (শিশু যৌন নির্যাতনকারী) লালন করেছে। বৃটেন প্রতি ২০ জন ১জন নারী ধর্ষিত হয় এবং ১০০ জন ১জন ধর্ষণ হচ্ছে। USA- তে প্রতিদিন ৩ জন নারী তার পার্টনারে কর্তৃক হত্যা হয়। ইউরোপ প্রতি ১০ জনে ১ জন নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয়। USA – তে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে একজন নারী ধর্ষিত হয়। (সুত্র: মাইকেল প্যারেন্টি-২০০০ সালে প্রকাশিত The ugly Truth)

    উপরোক্ত পরিসংখ্যানগুলো কি যথেষ্ট নয় এটা বুঝার জন্য যে নারী নির্যাতন বন্ধের যে দাওয়াই পশ্চিমা সমাজ থেকে গ্রহণ করছি তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

    অর্থাৎ আমরা সহজে একটা লাইন টানতে পারি যে, ভারত পশ্চিমাদের মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি অনুসরন করেছে যার ফলশ্রুতিতে আজকে ভারতে পশ্চিমা সমাজের ন্যায় নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন চরম পর্যায়ে যেখানে দিল্লীকে বলা হয় ধর্ষনের নগরী। আর আমরাও পশ্চিমাদের অনুসরন করে ভারতের পথেই হাঁটছি। যার নমুনা বাসে গণধর্ষনের মত ঘটনা।

    একজন যুবক যখন দিনের পর দিন হলিউড-বলিউডের মুভি, কারিনা-ক্যাটরিনা-সানি লিওনদের আইটেম song, নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে খোলামেলা উপস্থাপন করাকে দেখে, স্মার্ট মোবাইলে কম রেটের ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যাবহারে সহজলভ্য পর্ণ সাইট গুলো বিচরণ করে এবং এরপর রাস্তায় বা ক্যাম্পাসে কোন নারীকে সে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? যেখানে নারীরাও স্বাধীনতার নামে বা অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের উপস্থাপন করছে আকর্ষণীয় রূপে। এক্ষেত্রে নারীদেরকেও বেশি দোষ দেওয়া যায় না। কারণ প্রতিনিয়ত নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নারীদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে পশ্চিমাদের বা ভারতীয় নারীদের মত আধুনিক হতে। ফলশ্রুতিতে আমাদের সামনে একজন নারী উপস্থাপিত হচ্ছে একটি ভোগ্যপণ্য হিসাবে। ফলে পরকীয়া, ধর্ষন এমনকি ৬ মাসের শিশুটিও বাদ যাচ্ছে না পর্ণ দেখায় অভ্যস্ত যুবকটির লোলুপ হাত হতে। 

    পশ্চিমারা মুনাফা সর্বোচ্চকরন নীতির কারনে যেকোন উপায়কে সঠিক মনে করে। এর জন্য নারীর সম্মান বিক্রি করে মুনাফা আসলেও তারা তা বৈধতা দেয়। তাই পর্ণোগ্রাফি Industry কে West প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সারা বিশ্বে এর প্রচার-প্রসার করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করছে। আর অন্যদিকে নারী মুক্তির বা নারী অধিকারের আন্দোলনকে উৎসাহিত করছে। এটা তাদের স্পষ্ট দ্বৈতনীতি। সর্বোপরি পশ্চিমারা ও আমাদের শাসকগোষ্ঠী নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।

    তাই বলা যা যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ হত্যা ও নির্যাতনের মূল কারণ হলো- 

    – পশ্চিমারা বাংলাদেশে তাদের দালাল শাসকগোষ্ঠী ও বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমে জীবন সম্পর্কে তাদের মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার-প্রসার করেছে এবং সর্বত্র নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে উপস্থাপন করেছে।

    – এবং আমরা জনগন না বুঝে তাদেরকে অন্ধ অনুসরণ করছি।

    সমাধান:

    এক বছর হতে চলল অথচ এখনো গ্রেফতার হয়নি পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির প্রকৃত অপরাধিরা! তাই অনেকে মনে করছেন যে, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দিলে এই ধরনের অপরাধ কমে যাবে। কিন্তু শুধুমাত্র কঠোর শাস্তিই এই সমস্যার সমাধান করবে না। যদিও দোষীদের সনাক্ত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বর্তমান পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথাপি এটা মূল কারণ নয়। তথাপি অনেকেরই প্রতি বছর এমন অপরাধের জন্য যাবৎ জীবন কারাদণ্ড বা বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হচ্ছে। কিন্তু অপরাধ কমার কোন লক্ষন নেই। মূল কারণ বা সমস্যা এটাও না যে আমরা কত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করতে পারলাম। নারীর নিরাপত্তার মুল সমস্যা চিহ্নিত করা না গেলে, প্রত্যেক নারীর জন্যও একজন পুলিশ নিয়োগ করলেও নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করা যাবে না। যার উদাহরণ স্বয়ং নারী পুলিশ পুরুষ পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের করুণ চিত্র আমেরিকা, বৃটেন, ভারত বা বাংলাদেশে কোথাও ব্যতিক্রম নেই। 

    অনেকে মোল্লাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন যে, পর্দা করলে নারীরা যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন হতে রেহায় পাবে। কিন্তু তনু হত্যার পর অন্যরা বলছে – ‘পোষাক বাঁচাতে পারেনি তনুকে’ বা ‘আরো কত পোষাক পরলে ধর্ষন করা হবে না’। কারণ তনু হিজাব পরতো। এগুলো আসলে ইসলামকে ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র পোষাক পরিবর্তন করে এই ধরনের অপরাধ বন্ধ হবে না। বরং সমাজ থেকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করতে হবে।

    এবং সমাধান হিসাবে শুধুমাত্র ইসলামী পোষাক নয় বরং পরিপূর্ণ ইসলামকে গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে যা কেবল একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব।

    ইসলাম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে কিভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অর্জনের জন্য। ইসলামই নারীকে দিয়েছে সম্মান, এবং নিরাপত্তা এবং এই উদ্দেশ্যে ইসলাম প্রথমত ব্যক্তি স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয়ত সমাজে আল্লাহ প্রতি আনুগত্য উৎসাহিত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে নারীর প্রতি সঠিক মানসিকতারও দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা যাবে। ইসলাম সমাজে যৌনতার বিস্তারকে নিষিদ্ধ করে, নারীর দেহের সকল ধরনের বস্তুকীকরন এবং শোষন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। নারী পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে কখনও সস্তা করেনা এবং সকল ধরনের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সমাজ থেকে দূর করে। নারী ও পুরুষের একে অপরের প্রতি আকর্ষন বিষয়ক ও সকল চাহিদার পূরণের একমাত্র উপায় হিসাবে বিবাহকে নির্দেশ করে এবং বিবাহের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করে। যা কিনা নারী-পুরুষ ও সমাজকে রক্ষা করে। ইসলাম নারীকে সর্বাধিক সম্মান দিতে উৎসাহিত করে। ইসলাম কখনোই সস্তা দামে নারীর সম্মান বিক্রি করে না। রাসুল (সা:) বলেন- “এই বিশ্ব এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুই মূল্যবান। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান একজন পরহেযগার নারী।”

    ইসলাম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তিনি (সা:) আরো বলেন- “এমন একটা সময় আসবে যখন মহিলারা সানা থেকে হাজরে মাউত পর্যন্ত নির্ভয়ে রাতের বেলা পাড়ি দিতে পারবে শুধুমাত্র জীব-জন্তু ও আল্লাহর ভয় তাদের অন্তরে কাজ করবে।” আল্লাহর রহমতে খলীফা ওমর (রা:) এর সময় এই হাদীসের বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় রোমান সীমান্তে কিছু রোমান সৈন্য একজন মুসলিম নারীর কাপড় ধরে টানাটানি করে অপমানিত করলে, সেই নারীর অভিযোগ খলিফার কাছে পৌছলে খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহ সৈন্য বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছিল একজন মুসলিম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার জন্য।

    এছাড়া খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। কেউ ব্যভিচার করলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। ফলে ঐ ব্যক্তি ২য়বার অপরাধ করার সুযোগ পাবে না এবং অন্যরা ঐ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না। ১৩০০ বছরের খিলাফতের ইতিহাসে পাথর মেরে হত্যার ঘটনা অনেক বেশি না।

    তাই ইসলামি জীবন ব্যবস্থা তথা খিলাফতের অধীনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ সকল ধরনের নির্যাতন বন্ধ হবে কারণ –

    – একজন মুসলিম কুরআন-সুন্নাহর সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ। একজন মুসলিম একমাত্র আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর ভয়ে ভীত হয়ে সমাজে নিরাপত্তার হুমকি হতে পারে এরকম ঘৃণ্য কাজ সমূহ থেকে বিরত থাকে।

    – পাশাপাশি খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার চালু রাখে, যার ফলে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা হয়।

    করণীয়:

    রাসূল (সা) বলেছেন,

    “যারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলে তাদের সাথে থেকে যারা সেগুলো (আল্লাহর হুকুম)-কে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্ঘন করে, (এরা উভয়ই) যেন তাদের মত যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের অংশে তাদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নীচের অংশে নিজেদের জায়গা করে নেয়। যখন নিচের লোকদের পিপাসা নিবৃত্ত করার প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচের অংশের লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নীচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের কোন সমস্যা করব না।’ এখন যদি উপরের অংশের অধিকারীরা নিচের ডেক’এর লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। অবশ্য তারা (উপরের অংশের লোক) যদি তাদের (নীচের লোকদের)কে এ কাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরের অংশের লোক) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।” (বুখারী ) 

    সুতরাং সমাজ ব্যবস্থার একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজকে এমন সব নির্দিষ্ট কার্যাবলী থেকে বিরত রাখা, যা ঘটলে তা হবে পুরো জাতির জন্য ক্ষতিকর। তাই ধর্ষনের মত বাজে ঘটনার শিকার আমার পরিচিত (মা-বোন-আত্মীয়স্বজন-সহপাঠী) কেউ হওয়ার আগে এ থেকে পরিত্রানের জন্য পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তরুন সমাজকে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং প্রকৃত সমাধান ইসলামিক রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।

  • খিলাফতই ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি

    খিলাফতই ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি

    “তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎকাজে আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে”। (আল ইমরানঃ ১১০)

    সময়ের শুরু থেকেই যুগে যুগে পথহারা মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ পাক অসংখ্য নবী-রাসূলকে পাঠিয়েছেন। দুনিয়ার যাবতীয় মিথ্যাচার, যুলুম এবং মিথ্যা উপাস্য থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ যাতে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উপাসনা করতে পারে এবং সিরাত্বাল মুস্তাক্বিমের অনুসারী হতে পারে এজন্য পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে আল্লাহ নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন। তৎকালীন আরবের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে যখন মানুষ একত্ববাদের পরিবর্তে মূর্তিপূজা এবং নানারকম অনাচারে ডুবে গিয়েছিল তখন শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর আগমনে পৃথিবীর বিপন্ন মানবতার জন্য এক নতুন আশার সঞ্চার করে। নব্যুয়াত প্রাপ্তির পর মক্কায় দীর্ঘ তের বছর নিরন্তর তাওহীদের দাওয়াত এবং অত্যাচারী শাসকদের যুলুম নির্যাতন তাওহীদের দাওয়াতকে করেছিল আরো বেশি সুসংহত। অবশেষে আল্লাহর সাহায্যে মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম পুরো জাজিরাতুল আরবের এক শক্তিশালী এবং প্রতাপশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে রাসূল (সা) এর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে ইসলাম ইরাক, শাম, পারস্য ও রোমানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখে। উমাইয়া, আব্বাসী এবং উসমানীয় খিলাফতের সময় ইসলাম উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, মরক্কো গ্রীস, সিসিলি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক দিক দিয়ে ইসলাম পৃথিবীর ইতিহাসকে যুগ যুগ ধরে প্রভাবিত করেছে এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীদের জন্য ত্রাতা হিসেবে বরাবর আবির্ভূত হয়েছে।

    কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে ঘটে মুসলিম ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন করে দেয়া সেই ঘটনাটি। ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ, সাম্রাজ্যবাদী সম্মিলিত কুফফার শক্তি ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের নিরন্তর প্রচেষ্ঠায় বিশ্বাসঘাতক মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক তুরষ্কে উসমানীয় খিলাফতের বিলুপ্তি ঘটায়। ১৯২৪ সালের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের দালাল শাসকদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য কৃত্রিম সীমানা এবং অসংখ্য জাতির পিতা যারা কুফফারদের পা চাটতে কোন রকম কার্পণ্য করেনি। তারা মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ যা মুসলিমদের দেহকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত। খিলাফাহ ধ্বংসের পর ১৯৪৮ সালে মুসলিমদের রক্ত দ্বারা বিজিত বায়তুল মাকদিসকে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সেখানে তারা আজ অবধি মুসলিম উম্মাহর হাজার হাজার নিরীহ ভাই-বোনদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে। মূলত খিলাফাহ ধ্বংসের পরবর্তী ইতিহাস মুসলিমদের অপমানকর, লজ্জাজনক এবং দুর্দশার ইতিহাস। ইরাক, আফগানিস্তান, বসনিয়া, চেচনিয়া, গুজরাট, হায়দ্রাবাদের অগণিত শহীদের আত্মদানে মুসলিমরা নীরব দর্শক ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। গুয়ান্তানামো, আবু গারিব কারাগারে আজ উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উপর চরম নির্যাতনের স্টীম রোলার চালানো হচ্ছে।

    কুফফাররা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যাবর্তন টের পেয়ে মুসলিমদের উপর অধিক মাত্রায় খড়গহস্ত হয়েছে এবং তাদের অত্যাচারের হাতকে করেছে প্রসারিত। মুসলিম ভূমিগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি আজ তাদের ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে।

    আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন, 

    “নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সত্যসম্বলিত গ্রন্থ দিয়ে যাতে করে আল্লাহ তোমাকে যা দেখিয়েছেন তা দিয়ে তুমি মানবজাতিকে শাসন করতে পার”। (সূরা নিসাঃ১০৫)

    আল্লাহ তায়ালার এ হুকুম পৃথিবীতে বাস্তবায়ন করার যে নির্দেশ তা খিলাফত রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব নয়।

     রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, 

    “আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে তার কাঁধে খলিফার বায়াত নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলি মৃত্যু”। (মুসলিম)

    আজ মুসলিমরা তাদের দুর্দশার কারণ উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং তারা আবারও সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে যেটি আল্লাহর রাসূল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদীনায়।

    মুসলিম ভূমিগুলোর রাজধানীতে আজ আবারো তরুণরা ইসলামের ‘রায়া’ এবং ‘লিওয়া’ হাতে জড়ো হচ্ছে ইসলামের সেই সোনালী ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য যার প্রতিশ্রুতি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) দিয়েছেন।

    তিনি (সা) বলেন,

    “তোমাদের মধ্যে নব্যুয়াত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন……………তারপর ফিরে আসবে নব্যুয়াতের আদলে খিলাফত” (আহমদ)

  • ইসলাম এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি

    ইসলাম অন্য সবকিছু হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি। এটি মুসলিমদের জন্য এমন এক জীবনপদ্ধতি ধার্য করেছে যার একটি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় ধারা রয়েছে যা পরিবর্তিত কিংবা পরিবর্ধিত হয়না। এটি তাদের এমনভাবে এ জীবনপদ্ধতি অনুযায়ী চলার নির্দেশ করে যাতে তারা এ পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতিতে জীবনধারন করার ব্যাপারে চিন্তা (فكرياً) ও মনন (نفسياً) থেকে স্বস্তি না পায়, এবং এ পদ্ধতি ব্যতিরেকে তারা যেন প্রশান্তি না পায়। 

    ইসলাম জীবন সম্পর্কে একগুচ্ছ ধারণা (مفاهيم) নিয়ে এসেছে। এটি কিছু সাধারন দিকনির্দেশনা (خطوط عريضة) নিয়ে এসেছে অর্থাৎ, কিছু সর্বজনীন চিন্তা এনেছে যা মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে, মানুষ যত সমস্যার মুখোমুখি হয়, তার প্রত্যেকের সমাধান তা হতে নির্গত করা যায়। এ সকল কিছুই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির (قاعدة فكرية) উপর প্রতিষ্ঠিত; যার উপর জীবনের সকল চিন্তা দাড়াতে পারে এবং তা একটি মানদন্ডে (مقياس) পরিনত হতে পারে। এছাড়াও এটি সমাধানের জন্য আইন-কানুন, চিন্তা ও মতামত এ সকল কিছুই আকীদা হতে নির্গত করে এবং এর সর্বজনীন চিন্তাসমূহ হতে উৎসরিত করে।

    এটি মানুষের জন্য চিন্তা নির্ধারিত করে দিয়েছে কিন্তু তার চিন্তাকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।

    এটি জীবনের তার আচার-ব্যবহারকে নির্দিষ্ট চিন্তা দিয়ে আবদ্ধ করেছে, কিন্তু এটি মানুষকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।

    তাই, দুনিয়ার জীবনের প্রতি মুসলিমের দৃষ্টিভংগি হয় এক সম্ভাবনাময় আশা, এক বাস্তবমুখী গুরতরতা এবং এ দৃষ্টিভংগি জীবনকে সঠিক পরিমাপে মূল্যায়ন করে যাতে একে অর্জন করা যায়, কিন্তু (সে অবগত যে) এটি (মূল) উদ্দেশ্য না, আর না এটি উদ্দেশ্য হবার জন্য উপযুক্ত। সুতরাং, জীবনে চলার পথে সে সংগ্রাম করে, আল্লার পক্ষ হতে তার জীবিকা অর্জন করে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর বান্দাদের দেয়া সুন্দর উপকরণসমূহ ও পবিত্র রিজক থেকে সে উপভোগ করে। তবে সে উপলব্ধি করে যে দুনিয়া ক্ষনস্থায়ী, আর আখিরাত চিরকালের চিরস্থায়ী বাসস্থান।

    ইসলামের আইন-কানুনসমূহ মানুষের ব্যাবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে যেভাবে নির্দিষ্ট সমাধান দিয়েছে তেমনি সালাতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া দেখিয়েছে। এ আইনকানুন বিবাহসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিয়েছে, একইভাবে যাকাত (তথা দান-সদকা)-এর ব্যাপারেও সমাধান দিয়েছে। এসব আইনকানুন কিভাবে সম্পদ অর্জন করতে হয় তার যেমন নির্দিষ্ট বিবরন দেয়, একইভাবে কিভাবে তা ব্যয় করা যায় তারও সুনির্দিষ্ট বিবরন দেয়। এসব আইনকানুনে দুআ ও ইবাদাতের বিবরন রয়েছে, আইনী শাস্তিসমূহের (حدود) বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, চুড়ান্ত শাস্তি (جنايات) ও অন্যান্য বিভিন্ন শাস্তির (عقوبات) বিবরন; এছাড়াও এতে (আইন লংঘন করলে) জাহান্নামে শাস্তির বিবরন এবং (আইন অনুযায়ী চললে) জান্নাতে সুখের বিবরন রয়েছে।

    এসব আইনকানুন সরকার গঠন ও এর (শাসন) পদ্ধতির নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। এছাড়াও তা ব্যাক্তিকে আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য (এসব) আইনকানুনসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রেষনা যোগায়। এসব আইনকানুন তাকে রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ, জনগণ ও জাতিসমূহের সম্পর্কের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেয় যেভাবে তা মানবজাতির কাছে (ইসলামের) দাওয়া বহন করে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দেয়।

    এছাড়াও তা সুউচ্চ (উৎকৃষ্ট) বৈশিষ্ট্য অর্জন করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, একারণে যে তা আল্লাহর তরফ হতে আসা নির্দেশ, একারণে না যে তা মানুষের নিকট পছন্দনীয়।

    এভাবেই ইসলাম মানুষের নিজের সাথে ও অন্য মানুষের সাথে সকল সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করার জন্য এসেছে যেভাবে তা তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করে; এসকল কিছুই একই চিন্তা ও সমাধানের ব্যবস্থা হতে। মানুষ, তাই পার্থিব জীবনে এক নির্দিষ্ট প্রেষনায়, এক নির্ধারিত পথে, নিরূপন করা ও মনোনিত এক উদ্দেশ্য অর্জনে অগ্রসর হওয়ার জন্য বাধ্য।

    ইসলাম মানুষকে বাধ্য করেছে একমাত্র এই পথের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থেকে (পথ) চলতে। এটি তাকে আখিরাতের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তির ব্যাপারে এবং পাশাপাশি দুনিয়ার কঠোর শাস্তির ব্যাপারেও সতর্ক করেছে; যেখানে দুটোর একটি অনিবার্যভাবে তাদের পাকরাও করবে যদি তারা একচুল পরিমানও বিপথগামী হয়।

    এভাবেই একজন মুসলিম জীবনের পথে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়, একটি নির্দিষ্ট পন্থায় জীবনধারন করে, এক নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মধ্যে বিরাজমান থাকে ইসলামী আকীদা গ্রহণের মাধ্যমে এবং আল্লাহর বেঁধে দেয়া আদেশ-নিষেধ মানার বাধ্যবাধকতা যা তাকে ইসলামের আইনের মধ্যে আবদ্ধ রাখে।

    জীবন সম্পর্কে এই নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও সুনির্দিষ্ট জীবনপ্রক্রিয়া অনিবার্যভাবেই প্রত্যেক মুসলিমের উপর আরোপিত হবে।

    আকীদার ও শরীআহর আইন উভয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয়াদি ইসলাম কিতাব ও সুন্নাহতে দ্ব্যার্থহীন ও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে।

    তাই ইসলাম শুধুমাত্র কোনো আধ্যাত্মিক ধর্ম কিংবা কোনো পুরোহিততান্ত্রিক ধারণা না। বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা এবং সকল মুসলিমকে তার জীবনে কেবলমাত্র এ পদ্ধতিতে চলতে হবে।

    Taken from the Book “Islamic Thought”

  • বিদ্যুৎ কি লাভজনক ব্যবসায়িক পণ্য?

    বিদ্যুৎ কি লাভজনক ব্যবসায়িক পণ্য?

    প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও গবেষণা সংস্থা বিল্ড (বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট) এর সহায়তায় ঢাকার তারা ভরা রেডিসন হোটেলে দুই দিন ব্যাপী বিনিয়োগ সম্মেলনে (২৪ ও ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৬) জ্বালানি খাতে ৩০০ কোটি মার্কিন হলার বিনিয়োগুলো ঘোষণা দিয়েছে সামিট গ্রুপ।

    সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে ভারতের রিলায়েন্স ও আদানী গ্রুপ আলাদা আলাদা ভাবে বাংলাদেশে মোট ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানান। [সূত্র: প্রথম আলো ২৫/১/২০১৬]

    একটি ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশে মালিকানার অবাধ স্বাধীনতা স্বীকৃত। তাই বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি বিদ্যুতখাতকে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের মুনাফা অর্জনের আনন্দময় ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। বিদ্যুৎ খাতকে শুধু কিছু কোম্পানির ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিণত করেই সরকার থেমে যায়নি বরং দেশকে বিদ্যুৎ আমদানি নির্ভর করার কাজ অব্যাহত রেখেছে। অবশ্য বর্তমানে জনগণের গণতান্ত্রিক শাসক  (আপদ এবং বিপদ) এর প্রতি আস্থা নেই এবং ভাল কিছু আশাও করে না। মুনাফার জন্য বিদ্যুৎ খাতকে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া এমন একটি চিন্তা যা পুঁজিবাদ তার আদর্শিক অবস্থান থেকে সমর্থন করে এবং এই চিন্তাই বাংলাদেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ। যেখান থেকে মুনাফা তুলতে উদগ্রীব সামিট-আদানি-রিলায়েন্স। 

    রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তিনটি জিনিসের মাঝে সকল মানুষ শরিক। এগুলো হচ্ছে পানি, ঘাস (চারণভূমি) এবং আগুন।” 

    বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু সমাজের সকল কিছু সমাজের সকল মানুষের সমানভাবে প্রয়োজন এবং যেগুলোর অভাবে মানুষ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে তা গণ মালিকানাধীন সম্পদ। তাই বিদ্যুতের সামষ্টিক উপযোগিতা(প্রয়োজন) থাকার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সঞ্চালন লাইন/ সরবরাহ তার(supply line) গণমালিকানাধীন সম্পদ। 

    ইবনে হাম্মাল (রা.) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুল (সা.) এর নিকট মারিব নাম স্থানের কিছু সম্পত্তি অনুদান হিসাবে তাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। রাসুল (সা.) তা তাকে দিয়ে দিলেন। যখন তিনি চলে গেলেন। তখন লোকেরা বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি জানেন? আপনি তাকে কী দিয়েছেন? আপনি তাকে অফুরন্ত পানির উৎস দিয়ে দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন,“এরপর রাসুল (সা.) এটি ফেরত নিয়ে নিলেন।

    সুতরাং এমন খনি যাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ মজুদ আছে তা গণমালিকানাধীন সম্পদ যেমনঃ বাংলাদেশে প্রাপ্ত তেল, গ্যাস, কয়লা এবং ইউরেনিয়ামের বড় আকারের খনি।

    সুতরাং, বিদ্যুৎ. তেল, গ্যাস, কয়লা তথা জ্বালানি খাত কোনো কোম্পানি কিংবা ব্যক্তির মালিকানায় ছেড়ে দিয়ে মুনাফা অর্জনের আরামদায়ক খাতে পরিণত করা ইসলামে নিষিদ্ধ, কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যা খুবই জনপ্রিয় এবং প্রসিদ্ধ। ইসলামের দৃষ্টিতে গণমালিকানাধীন যৌথভাবে সকল নাগরিকের মালিকানা রয়েছে, এগুলো ব্যবহার করা ব্যক্তির জন্য বৈধ কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে নিতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন: বিদ্যুৎ খাত।

    খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার সাথে সাথে খলিফা বিদ্যুৎ খাতে দেশি বিদেশি কোম্পানির মুনাফার উৎস বন্ধ করবেন। খিলাফত রাষ্ট্র সুলভ মূল্যে (উৎপাদন মূল্যে) জনগণকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে যা কৃষি ও শিল্পখাত বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস জনিত কারণে পণ্যমূল্য হ্রাস করবে। 

    প্রয়োজনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ(হারবি হুকমান রাষ্ট্রে) রপ্তানি করে প্রাপ্ত আয় মুসলমানদের কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হবে। বাইতুল মালে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে অস্ত্র ও সৈন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।

    আসুন খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে গণসংযোগ অব্যাহত রাখি।

    “তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং এরাই সফলকাম।” [সূরা আল ইমরানঃ১০৪]

  • “(পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়) শিক্ষা ধংসের চাবিকাঠি”

    “(পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়) শিক্ষা ধংসের চাবিকাঠি”

    শিক্ষা উন্নয়নের পূর্বশর্ত- এই কথাটি আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত একটি বাক্য। ছোটকাল থেকেই এটা শুনে-বুঝেই বড় হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। এরূপ আরও অনেক মন্ত্র মুখস্থ করতে বড় হওয়া শিশুরা জীবনে উন্নয়ন ঘটাতে দৌড়ঝাঁপ-প্রতিযোগিতা শুরু করেন। শিশু অবস্থায় তাদের ওজনের তুলনায় ব্যাগের ওজন বেশি থাকে আর বড় হলে তাদের জ্ঞানের তুলনায় টাকার ওজন বেশি হয়ে যায়।

    প্রতিযোগিতামূলক এই ব্যবস্থাতে শিশু অবস্থায় স্কুলে ভর্তির দৌড়ঝাঁপ এস.এস.সির গণ্ডি পেরুনোর পরও থামেনা কলেজে ভর্তির জন্য এবং এরপর ভার্সিটির ভর্তি তো আছে। লক্ষ্য একটাই, কিছু একটা করা; জীবনে উন্নতি সাধন।

    শেয়ার বাজারে শেয়ারের দাম নিম্নগতিতে হলেও উর্ধগতিতে বেড়ে চলেছে এসকল প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ফি। একদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত স্থানের ব্যবস্থা করা হয়না বেসরকারি কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্দেশ্যে এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের থেকে কচলিয়ে টাকা আদায় করা হয়। আর এখানেই উন্নয়নের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় অনেকের আর কঠিন এক হতাশা তাকে গ্রাস করে নেয়। আর টাকার দড়িতে ফাঁসিতে ঝুলে যায় বাংলাদেশ নেভি কলেজের মুন অথবা ঢাকা কলেজের শিমুলের মত অনেকেই। (জানুয়ারী ১ এবং ২, ২০১৬)

    ধান মাড়ানোর মেশিনের তুলনাধীন এই শিক্ষাজীবন থেকে যারা বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয় তাদের জন্য এই ব্যবস্থা প্রস্তুত রেখেছে বেকারের জীবন। জীবনে উন্নয়নের জন্য বস্তাভর্তি ডিগ্রি অপেক্ষা যখন মোটা অংকের টাকার হিসাব অধিক সহজ এবং শক্তিশালী, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদালয়ের সুক্তির কাছেও আত্মহত্যায় অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। (২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৫) 

    পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষা বর্তমান প্রজন্মের উন্নয়ন নয়, বরং আত্মহত্যার চাবিকাঠিতে পরিণত হয়েছে। মুন, সুক্তি বা শিমুল ছাড়াও অহরহ প্রতিনিয়তই শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করছে। কারণ পুঁজিবাদী চিন্তাধারা আমাদের চিন্তাকে করে রেখেছে বিষাক্ত। শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে আমাদের শেখানো হচ্ছে একটি ভালো চাকরি, কারিকারি টাকা, গাড়ি-বাড়ি ইত্যাদি… যেকারণে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে এগুলোকে নির্ধারণ করে যখন কেউ আগাচ্ছে, তা অর্জন করতে না পেরে হতাশাগ্রস্থ এক জীবনের সম্মুখীন হয়ে আত্মহত্যা করছে।

    সমাধান:

    শিক্ষা হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি জাতির অন্তরে তাদের নিজ সংস্কৃতির বীজ বপন করা হয়। খিলাফত রাষ্টড়ব্যব্বস্থায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী আক্বীদাকে উম্মাহ’র অন্তরে প্রোথিতকরণ এবং এর মাধ্যমে প্রজন্মের সঠিক চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠন। এবং শিক্ষার নিশ্চিতকরণের দায়িত্বে থাকবে রাষ্ট্র নিজের। খিলাফত হতাশাজনিত প্রজন্ম উপহার দেয়না, বরং সত্যিকার অর্থে দুনিয়ার আলোবহনকারীদের জন্ম দেয়। ইমাম শাফী এর মত আইনশাস্ত্রবিদ, আল রাযী এর চিকিৎসাবিদ, আল খোয়ারিজমী-এর মত গণিতবিদ(বীজগণিতের জনক) উওহার দেয়। খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দেয় আবু হানিফা এর মত অর্থনীতি ও সমাজবিদ, আল মাসূদীর মতো ভূগোলবিদ এবং জাফর আস-সাদিকের মতো প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ। ইতিহাসের পাতায় পাতায় খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থার আদলে গড়ে ওঠা এইসকল মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম বারবারই উঠে আসে এবং তাদের কাজসমূহ আজও বিশ্বকে আলো দেখিয়ে চলেছে।

    আর এভাবেই খিলাফত মুনাফা বা অর্থকে কেন্দ্র করে নয়, বরং আল্লাহ’র সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করেই তার শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজাবে এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবে এই উম্মাহকে, ইন-শা-আল্লাহ। 

    “যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন”। (সুরা মুজাদিলা- ১১)