Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ভারতীয় পানি আগ্রাসনের এক নতুন অধ্যায়

    ভারতীয় পানি আগ্রাসনের এক নতুন অধ্যায়

    খবর: ভারত ধারাবাহিকভাবে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগুচ্ছে। সমগ্র প্রকল্পের আওতায় ৩৮টি নদ-নদীর মধ্যে আন্তঃসংযোগ ঘটানো হবে। এতে ৩০টি সংযোগ রক্ষাকারী খাল ও ৩৪টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। ভারতের ভিতর দিয়ে আসা ৫৪টি নদীর মধ্যে ভারত ইতিমধ্যে বাঁধ দিয়েছে।

    এই প্রকল্পের মূল বিষয়টি হচ্ছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও উত্তর ভারতের গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে সুদূর দক্ষিণাত্যে এবং পশ্চিমে রাজস্থানে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এই দুই বড় নদী ও তাদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা খাল দ্বারা সংযোগ করে এদিককার পানি ওদিকে নেয়ার এক বিশালকার প্রকল্প হচ্ছে নদী সংযোগ প্রকল্প। এই ভাবে ৩৭টি নদীকে ৩০টি খাল দ্বারা সংযোগ করা হবে। খালগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হবে ১২ হাজার কিলোমিটার। গড়ে একেকটি খাল চারশ কিলোমিটার লম্বা। খালগুলো হবে ৫০ থেকে ১০০ মিটার চওড়া। গভীরতা ছয় মিটার। অর্থাৎ একেকটি খাল যেন একেকটা নদী। বলাই বাহুল্য, এতে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি ধ্বংস হবে।

    ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রথমে তিস্তা ও পরে তিস্তা থেকে ফারাক্কা বাধের উজানে পানি আনা হবে। এখানে ভুলেও ভাবার সুযোগ নেই যে, ফারাক্কা বাধের উজানের অতিরিক্ত পানির ছিটেফোটা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বরং ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে খাল কেটে উড়িষ্যার সুবর্ণ রেখা ও মহা নদীর সাথে সংযোগ করা হবে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আরেকটি অংশ হলো একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে সাবরমতি নদীর পানি দক্ষিণ ভারতে নিয়ে যাওয়া হবে।

    এই প্রকল্পে খাল খননের পাশাপাশি পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হবে এবং সেই পানিকে কোথাও কোথাও নদী প্রবাহের প্রাকৃতিক গতির বিপরীত দিকে জোর করে প্রবাহিত করা হবে। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে বাধ, ব্যারাজ ও জলাধার নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও করা হবে।

    এক কথায় এই প্রকল্প বাংলাদেশকে পানিশূন্য ও মরু অঞ্চলে পরিণত করবে।

    আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে ভারত বহু আগে থেকেই শোষণ চালিয়ে আসছে। সাংস্কৃতিক, অর্থৈনৈতিক এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ এবং এমনকি নদীও ভারত হস্তগত করে চলেছে।

    এই আন্তঃনদী প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষতি নিম্নে উল্লেখ করা হলো,

    ১। ভারত উজানে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধ কুমার, করতোয়া ও মহানন্দা থেকে পানি প্রত্যাহার করলে এই সকল নদী এবং শাখা নদী অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী শুকিয়ে যাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিই বদলে যাবে। শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ মরু প্রান্তরে পরিণত হওয়ার আশংকা আছে।

    ২। নদীতে যতোটুকু ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত পানি থাকবে দিনে দু’বার জোয়ারে, তা সমুদ্রের জোয়ারের পানিকে বাধা দিতে পারবে না। ফলে জোয়ারের লবণাক্ত পানি উত্তরের দিকে উঠে আসবে, এমনকি সিলেট পর্যন্তও আসবে। এতে মিষ্টি পানির অভাব দেখা দেবে। চাষের ও খাবারের পানির অভাব ঘটবে। এতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। মিষ্টি পানির মাছও মারা যাবে। মৎস্যজীবীরা বেকার হবে। মাছে-ভাতে বাঙ্গালির পরিচয় মুছে যাবে।

    ৩। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবে। রিচার্জ হবে না। তাতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।

    ৪। যেটুকু ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যাবে নলকূপের মাধ্যমে, তাতেও আর্সেনিকের পরিমাণ খুব বেশি হবে। ফলে খাবার অযোগ্য হয়ে উঠবে।

    ৫। নদীবাহিত পলি দ্বারা যে নতুন ভূখণ্ড তৈরি হচ্ছে (বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এই ভাবেই গঠিত হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে), সেই ভূমি গঠন বন্ধ হবে। এক কথায় সবুজ বাংলাদেশ মরুদেশে পরিণত হবে।

    ৬। নদী পথ সঙ্কুচিত হবে। ইতোমধ্যেই প্রধানত ফারাক্কা বাধ ও তিস্তার উজানে বাধের কারণে ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নৌপথ ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে ২৪শতে (অর্থাৎ দশমাংশে) নেমে এসেছে।

    একটা কথা বলা হয় যে, বাংলাদেশে নাকি পানির অপচয় হয়। প্রচুর পরিমাণ পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। যারা এমন কথা বলেন, তারা চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করেন। কারণ নদীতে প্রচুর পানি থাকলেই নদী প্রবাহের জোর থাকবে, যা সাগরের জোয়ারের নোনা পানিকে উপরে উঠে আসতে বাধা দেয়। ইতোমধ্যেই ফারাক্কা বাধের কারণে দক্ষিণ বাংলায় জোয়ারের পানি অনেক বেশি ভেতরে প্রবেশ করছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে। যদি কোনোভাবে ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সিলেট পর্যন্ত চলে আসবে। বাংলাদেশে এই প্রকল্পের অন্যান্য আরও ক্ষতিকর দিক আছে।

    ভারতের এমন ঔদ্ধত্যতা কোন নতুন ইস্যু নয়, বরং আমেরিকা-বৃটেনের সবুজ সংকেতের আধারে একের পর এক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে একটি পঙ্গু এবং এর উপর কর্তৃত্ব নেওয়ার লক্ষ্যে এইসকল আগ্রাসন সে নিত্যদিনই চালায়। বিডিআর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে সীমান্তে হত্যা, এবং দেশের অভ্যন্তরে মাদক চালানের মত ঘৃণ্য অপরাধ সে করে আসছে নির্বিঘ্নেই।

    অন্যদিকে এদেশের শাসকগোষ্ঠী ভারতেরই এসকল আগ্রাসনে নিশ্চুপে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে আর জনগণকে উপহার দিচ্ছে “শেখ রাসেল আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ” অথবা বিপিএল। ভারত যখন এদেশের আমাদের রক্ত নিয়ে খেলছে, নির্বোধ শাসকগোষ্ঠী তখন স্কাইপে বসে খেলা দেখে।

    মুসলিমদের উপর এইসকল জুলুমের অবসানের একটিই উপায়; তা হলো ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন। ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফত রাষ্ট্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। রাসূল (সা) প্রতিষ্ঠা পরবর্তী ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বলবৎ ছিল এবং পৃথিবীকে দেখিয়েছে অন্ধকার থেকে আলোতে আসার পথ।

    খিলাফত এমন এক অনন্য শাসনব্যবস্থা, যা সুনিশ্চিতরূপে এর জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চত করে আর এর অসংখ্য উদাহরণ আমরা ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাবো।

    অল্প কিছুকাল পূর্বেও, ১৭৮৫ সালে আজকের সুপার পাওয়ার আমেরিকা তৎকালীন সুপার পাওয়ার খিলাফতের জলসীমানায় প্রবেশ করলে, খিলাফতের নৌবাহিনী তা আটক করে। এবং এই প্রেক্ষিতে ১৭৮৬ সালে ফ্রান্সে তৎকালীন আমেরিকার দূত থমাস জেফারসন ও জন এডামস (ব্রিটেনে তৎকালীন আমেরিকান দূত) লন্ডনে খিলাফতের দূত আবদুর রহমানের সাথে শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে বৈঠক কর। এবং পরবর্তীতে খিলাফতের সাথে আমেরিকা BARBARY TREATY করতে বাধ্য হয়।

    অথচ আজকে সেই খিলাফত শাসন ব্যবস্থার অভাবে আমেরিকা-বৃটেন ও তাদের দোসর ভারত মুসলিমদের জীবন-সম্পদ নিয়ে খেলছে। আর মুসলিম ভূমিসমূহের যালিম শাসকেরা এদের পা-চাটা দালালে পরিণত হয়েছে।

    বাংলাদেশে আজ সেই খিলাফত শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন যা এদেশের জনগণকে মুক্তি দিবে আমেরিকা-ভারতের যুলুমে রচিত গণতান্ত্রিক অন্ধকার কুয়া থেকে এবং রাসূল(সা) এর ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে আবারো উদিত হবে ইসলামের সূর্য।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং নেক কাজ করে, তাদের সাথে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, তিনি জমিনে তাদের অবশ্যই খিলাফত দান করবেন- যেমনিভাবে তিনি তাদের আগের লোকদের খিলাফত দান করেছিলেন”। (আন-নূরঃ ৫৫)

    রাসূল (সা) বলেন: “...এরপর আবারো আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত” (মুসনাদে আহমদ)

  • ‘উন্নয়নের জোয়ার বনাম ক্ষমতা’

    ‘উন্নয়নের জোয়ার বনাম ক্ষমতা’

    বেশ কিছুদিন যাবৎ ঢাকা চট্টগ্রাম সহ সারাদেশের প্রধান প্রধান জনবহুল সড়কগুলোর রাস্তার পাশে বিলবোর্ডগুলোতে একটি বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। আর সেই বিজ্ঞাপনটি হল- “এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ”। যা কিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে পুর্বে আর কখনোই দেখা যায়নি এবং মিডিয়ায় বিভিন্ন নেতা কর্মীদের বক্তব্যে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে যে-“উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে বাংলাদেশ”। সত্যি কথা বলতে গেলে বর্তমান সরকার “উন্নয়নের জোয়ার” নামক শব্দটি ব্যপকভাবেই জনগণের কাছে পৌছাতে পেরেছেন। সরকার মুলত জনগণকে যা বোঝাতে চাচ্ছেন তা হল- “চারিদিকে শুধু উন্নয়ন আর উন্নয়ন হচ্ছে যা কিনা শুধু বর্তমান সরকারের জন্যই সম্ভব হয়েছে এবং যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় না থাকতো, তাহলে এতো দ্রুত গতিতে বাংলাদেশ উন্নতি লাভ করতে পারতোনা। তাই বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন যা কিনা আগে কখনো হয়নি, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হলে জনগণকে অবশ্যই বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখা উচিৎ।”

    আসুন দেখা যাক, উন্নয়নের জোয়ার বলতে সরকার কী বোঝাতে চেয়েছে?-

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের উন্নয়ের মুল মাপকাঠি হল বৈষয়িক উৎপাদন-প্রবৃদ্ধি, এর একটি উদাহরণ হতে পারে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও ফ্লাইওভার নির্মান। তাই যে সরকার এগুলো যত বেশি নির্মান করেছেন, সে তত বেশি উন্নতি করেছেন বলে মনে করা হয়। যদিও এই ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দুর্নীতি (উদাহরণসরূপ, speed money) ও ভোট জালিয়াতি উন্নয়নের অন্তরায় নয়। তাই পুর্ববর্তী সরকারদের সাথে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের পার্থক্য করলে একটা দিকে সরকার এগিয়ে, আর তা হল ফ্লাইওভার নির্মাণ। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান ব্যস্ত সড়কগুলোতে ব্যপকভাবে ফ্লাইওভার নির্মান কাজ শুরু হয়েছে। ফ্লাইওভার নির্মানের কাজ চলার কারনে ব্যাপকভাবে যানযট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে রাস্তার জ্যামে আটকানো জনগন জ্যাম বাধার কারণ খুজতে গিয়ে দেখেন যে ফ্লাইওভার নির্মানকাজ চলছে, অর্থাৎ সরকার উন্নয়ন করছে। এভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যাস্ত সড়কগুলোতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখছে যে সরকার উন্নয়ন করছে। 

    কিছুদিন আগের খবরের কাগজগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে ১ ঘন্টার বৃষ্টিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো তলিয়ে গিয়েছিল, যেটাকে ছোটখাট জোয়ার বলা যেতে পারে। শিশু রাজন হত্যার মত নৃশংস ও জঘন্য হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী RAB কর্তৃক নারায়নগঞ্জে ৭ খুন, সংসদ সদস্যের ছেলের গুলিতে রিক্সাচালক নিহত হওয়া, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধারা অব্যাহত থাকা ও মেডিকেল ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদেরকে পুলিশ বাহিনী দ্বারা আহত করিয়ে মেডিকেলে ভর্তি করানো, সরকার দলীয় সংসদ সদস্যের মুখে নবী-রাসূলের অবমাননা (যা জনগণ আগে কখনো দেখেনি), বিশ্বে তেলের দাম নিন্মমুখী হওয়ার পরও বাংলাদেশে উর্ধমুখী থাকা, উত্তরোত্তর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা ও পাশাপাশি দ্রব্যমুল্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া, মায়ের গর্ভাবস্থায় থাকা অবস্থায় শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি ঘটনাগুলো ঘটেছে। 

    এটা মোটামুটি সকলেই অবগত যে, বাংলাদেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থায় সকল সরকারই তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তাই বর্তমান সরকারও এর ব্যতিক্রম নয় এবং সেটারই ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি ছিল বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার সেই তথাকথিত নির্বাচন। সে গণতান্ত্রিক ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলে সৃষ্ট ভোগবাদী প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ করছে। সরকার ভাল করেই জানে যে, তার জনসম্মতি এখন প্রায় শুন্যের কোটায়। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যে কোন ধরণের গণবিপ্লবকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। তাই জনমনের ক্ষোভ ও আসন্ন যে কোন আন্দোলনের সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখার জন্য সরকার ব্যপকভাবে তার মেকি উন্নয়নের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। মোট কথা, সরকার তার কু-কর্মকে ঢাকার জন্য মেকি উন্নয়ের ছাতা মেলে ধরেছে। তাই সরকারের উন্নয়নের জোয়ারের অন্তরালে মুলত রয়েছে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়াস।

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতায় থাকা শাসকবর্গ নিজের প্রয়োজনমত আইন তৈরি করতে পারে ও প্রশাসনকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে। তাই ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিটি সরকারই তাদের বিরোধী দলকে দমন করতে বিচার ব্যবস্থায় দলীয়করন, আইন সংযোজন ও পরিবর্তন করে থাকে। এখানে আল্লাহ এবং জনগণ কারো কাছেই শাসকের কোন জবাবদিহীতার ভয় থাকেনা। কাগজে-কলমে জনগণের কাছে যে জবাবদিহিতার কথা বলা হয় এ ব্যবস্থায়, ধর্মরিপেক্ষ তাকওয়াহীন পরিবেশের কারণে তা কাগজে-কলমেই রয়ে যায়, বাস্তবতায় প্রবেশ করে না। ফলে এই ব্যবস্থা তার প্রতিটি শাসককেই ক্ষমতালোভী ও স্বেচ্ছাচারী করে তুলে।

    তাই, মানবজাতির জন্য গণতন্ত্র নামক এমন জবাবদিহীতাবিহীন স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থা কখনোই কাম্য নয়। খিলাফতই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যেখানে শাসক আল্লাহ ও জনগণ উভয়ের কাছেই জবাবদিহীতার ভয়ে ভীত থাকে। খিলাফত ব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং আইন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কর্তৃক নির্দিষ্ট হওয়ায় শাসকের সেচ্ছাচারী ও ক্ষমতালোভী হওয়ার কোন সুযোগ নেই। খিলাফতের সোনালী ইতিহাসও আমাদেরকে তাই বলে। খলীফা হযরত ওমর (রা) তার স্বীয় পুত্রকে মদ্যপানের অভিযোগে শাস্তি দিয়েছিলেন এবং তিনি (রা) এমন আল্লাহভীরু আর দায়িত্বশীল ছিলেন যে, তিনি বলতেন,

    “ফুরাত নদীর তীরে (মদীনা থেকে ইরাকের এই নদীর দূরত্ব অনেক) একটি খচ্চরও যদি পা পিছলে পরে (মরে যায়), তবে আমার আশংকা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে জিজ্ঞেস করবেন” 

    সুলতান সালাউদ্দিন আইয়্যুবির মৃত্যুকালে তার কাছে সম্পদ বলতে ছিল শুধু ১ দিরহাম হতে কিছুটা বেশি। খিলাফত ব্যবস্থায় আল্লাহর হুকুম বস্তবায়ন ও তার সন্তুষ্টি অর্জনই মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়ায় শাসকদের না থাকে সম্পদ আহরণের লোভ এবং না থাকে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা। তাছাড়া খিলাফতই হচ্ছে মহান আল্লাহ কর্তৃক একমাত্র মনোনীত শাসন ব্যবস্থা। 

    রাসূল (সা) বলেন:- “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন“। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা) বললেন, “তোমরা একজনের পর একজনের বাই’য়াত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করবেন“।’ 

    এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) (যার জ্ঞানের পরিধি অসীম) নিজেই যেখানে খিলাফত ব্যবস্থাকে মানবজাতির জন্য মনোনীত করেছেন সেখানে অন্য কোন ব্যবস্থার অধীনস্থ থাকা কোন মানুষের জন্যই কাম্য নয়। তাই মানব জাতির কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে প্রতিটি মানুষকেই প্রচলিত সকল ব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করে খিলাফত ব্যবস্থাকে মনেপ্রাণে ধারণ করা ও তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা উচিৎ।

    কুদরত উল্লাহ

  • শিক্ষার উপর ভ্যাট – পুঁজিবাদি অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক শাসনের দেউলিয়াপনা এবং ইসলামি রাষ্ট্র – খিলাফতের সমাধান

    শিক্ষার উপর ভ্যাট – পুঁজিবাদি অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক শাসনের দেউলিয়াপনা এবং ইসলামি রাষ্ট্র – খিলাফতের সমাধান

    শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি জাতি তাঁর সভ্যতা সংস্কৃতি কাল ক্রমে চর্চা, গবেষণা, সভ্যতার বিকাশ ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। আর শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রণীত শিক্ষা নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র তাঁর নিজ সংস্কৃতি, আদর্শ, চিন্তা গুলোকে জনগণের মাঝে প্রোথিত করে এবং একটি আদর্শনির্ভর জাতি গঠনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজের শক্তিমত্তার জানান দেয় ও বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে নিজের আধিপত্যকে বজায় রাখতে সক্ষম হয়। 

    বাংলাদেশ এমনি একটি দেশ। যা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতি ও গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র। আর পুঁজিবাদি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই হল- পুঁজির স্বাধীনতা। যা মালিকানার স্বাধীনতার নামে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সকল বিষয়ে অর্থাৎ খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি সহ সকল বিষয়ে ব্যবসা করার অধিকার দেয়। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের জনগণের মৌলিক প্রয়োজন/অধিকার থেকে শুরু করে সকল প্রয়োজন ও চাহিদা ব্যবসায়ী পণ্যে রূপান্তরিত হয়। আর জনজীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। 

    সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কুফর পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সরকার!! এর প্রণীত বিলাসী বাজেটে সরকার তার আয় ও ব্যয় এর সামঞ্জস্য বিধানের জন্য নানা ভাবে নানা সেবা ও পণ্যের উপর ভ্যাট আরোপ করে। যার মধ্যে অন্যতম- একটি খাত শিক্ষা। যার উপর প্রথমে ১০% এবং পরবর্তীতে চাপের মুখে ৭.৫% ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তে সরকার অটল থাকে। যা ৬০% তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশের শিক্ষার উপর চরম চাপ সৃষ্টি করে। আলোচনায় উঠে আসে- শিক্ষার উপর ভ্যাট ও পাবলিক ও প্রাইভেট শিক্ষা।

    যদিও আপাত দৃষ্টিতে আন্দোলনের মুখে সাম্প্রতিক ভ্যাট বাতিল করা হয়েছে, তবে পুঁজিবাদি ব্যবস্থা এখনো বাতিল হয়নি, যার নিজের ভেতরেই এসব অন্যায় অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেবার বীজ নিহিত। বিগত সময়ের দিকে আলোকপাত করলে আমরা দেখতে পাব- বাংলাদেশের পাবলিক শিক্ষাকে বেসরকারিকরণের এক কৌশলী নীতি নিয়ে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নীতি নির্ধারণ করেছিল এবং তাদের এ ষড়যন্ত্র আজও চলমান। বিশ্বব্যাংক এর পরামর্শ অনুসারে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতকে বেসরকারিকরণ এবং বাজেটে শিক্ষা খাতে ক্রমান্বয়ে বরাদ্ধ কমিয়ে আনা ও না দেয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে শিক্ষার ব্যয় ভার বহনের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মোড়ল, সরকার ও তাদের আজ্ঞাবাহকরা এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য মরিয়া। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য, শিক্ষা কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রতিবেদন, বেসরকারি শিক্ষা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করে বাংলাদেশে সরকারের অনুগত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। একদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেশন জট, কর্মমুখী-কারিগরি শিক্ষা অপ্রতুলতা ও সীমিত আসন; অন্য দিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়বহুল শিক্ষা – উভয়ই রাষ্ট্রের জনগণ ও বিশাল তারুণ্যের জন্য বিষফোড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাঁর উপর সময়ে সময়ে বিভিন্ন ছুটোয় যোগ হচ্ছে টিউশন ফি এর উপর ভ্যাট।

    আমরা দেখতে পাব- বিগত সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন বৃদ্ধি ও সান্ধ্যকালিন কোর্স চালু করার প্রতিবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। আজ একই ভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি এর উপর ভ্যাট আরোপে সচেতন মহলে ও রাজপথে আন্দোলন শুরু হয়। আর অন্য দিকে অতীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন দমনে সরকার পুলিশ বাহিনী দিয়ে মামলা হামলার যে নীতির মাধ্যমে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করেছে আজ ও একই পদ্ধতি ও কৌশল এর মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছে। যদিও আন্দোলন দাবানলের মতো আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে নাকি – এই ভয়ে পরবর্তীতে সরকার (আপাতত) ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এসকল কিছুর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমানিত হয় – শিক্ষা নামক অধিকার এর নিশ্চয়তা দিতে সরকার ব্যর্থ, কিন্তু সে শিক্ষাকে সমাজের অসংখ্য মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের নিকট বিক্রি করে জাতীয় আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সে একধাপ অগ্রসর।

    এ ব্যর্থতা শুধু সরকার বা রাষ্ট্রের নয় বরং এ ব্যর্থতা পুঁজিবাদি অর্থনীতির। পুঁজিবাদী অর্থনীতি তাঁর পুঁজির অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা নীতির ফলে এবং আয়ের উৎস হিসেবে জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজনকে পণ্য বানিয়ে এর উপর ভ্যাট আরোপ করে রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর নীতির ফলে আজ জনজীবন চরম দুর্ভোগ এর মুখোমুখি। 

    পুঁজিবাদ ও এর রাষ্ট্রীয় কাঠামো তথা সরকার যেখানে মানুষকে তাঁর প্রয়োজনীয় অধিকার ও চাহিদা বিনামুল্যে না দিয়ে বরং পণ্য বানিয়ে জনগণের কাছে বিক্রি করে আর নিজের দেউলিয়াপনা কে উন্মোচিত করে। সেখানে ইসলাম তাঁর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের শিক্ষা নিশ্চিত করে ও এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করে।

    খিলাফত রাষ্ট্র কখনই শিক্ষার উপর কোন ধরণের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ তো দূরের কথা, কোন ধরণের টিউশন ফি ধার্য করবে না অর্থাৎ শিক্ষা হবে অধিকার।

    খিলাফত রাষ্ট্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষাদান রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অন্তত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে এটি সবার জন্য বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত যাতে করে সবাই বিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারে।

    খিলাফত রাষ্ট্র বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে, রাষ্ট্রের যথেষ্ট পরিমাণ পাঠাগার এবং পরীক্ষাগার সহ জ্ঞান বৃদ্ধির সুবিধা প্রদান করবে যাতে করে যারা ফিকহ, হাদীস, তাফসীর, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে পারে। এর লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মুজতাহিদ, সৃজনশীল বিজ্ঞানী ও আবিস্কারক তৈরী করা।

    উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে এটা পরিস্কার- আমাদের সরকার সমূহ ও পুঁজিবাদি আদর্শের ব্যর্থতা কোথায়। তাই বাংলাদেশের তারুণ্য নির্ভর শিক্ষার্থীদের বুঝা উচিৎ- ভ্যাট প্রত্যাহার কিংবা ভ্যাট কমানো, প্রত্যাহার করা কিংবা ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর ধার্য করার মধ্য দিয়ে পরোক্ষ ভাবে শিক্ষার্থীদের উপর আরোপের ষড়যন্ত্র কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও খিলাফতের শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত সমাধান।

    আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) বলেছেন-

    যে জ্ঞান অর্জনের কোনো পথে অগ্রসর হয়, আল্লাহ্‌ এর মাধ্যমে তাঁর জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন”।

    মাহবুবুল আলম

  • গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষণই যেন এক কালবেলা…

    গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষণই যেন এক কালবেলা…

    এ মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি খুব আলোচিত একটি ঘটনা হচ্ছে শিশু রাকিব হত্যা। নৃশংস বর্বর এ ঘটনা মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে অথচ মাত্র কিছুদিন পূর্বেই আমরা কেঁপে উঠেছিলাম শিশু রাজনের লোমহর্ষক হত্যা কান্ডের ঘটনায়। খুব কম সময়ের মধ্যে পরপর এরকম বেশ কিছু হত্যা কান্ড অতঃপর পত্রপত্রিকায় তার নিউজ, ইন্টারনেট, টিভি তে আলোচনা, প্রতিক্রিয়া দেখে আমাদের মনে হতে পারে হঠাৎ বুঝি এ ধরনের ঘটনা ব্যপক ভাবে শুরু হয়েছে। আসলে মোটেও তা নয় বরং এটাই এখন এ দেশের, এই সমাজের বাস্তব চিত্র। খুব অল্প সংখ্যক ঘটনাই মিডিয়াতে আসে এবং মানুষ তা জানতে পারে অথচ প্রতিদিনই এমনই অনেক নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটে চলেছে। রাজন হত্যার দু দিন পর চত্তগ্রামে চান্দগা আবাসিক এলাকায় মামার হাতে খুব নিষ্ঠুরভাবে হত্যা হয় ভাগ্নের যা মিডিয়ায় সেভাবে আসেনি। পত্রিকার বরাত দিয়েই জানা যায় এ বছর জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত ছয়মাসে সারা দেশে পিটুনিতে মারা গিয়েছে ৬৯ জন। গড়ে এক মাসে প্রায় ১২ জন। এ কেবল পত্রিকা কর্তৃক লিপিবদ্ধ তথ্য; বাস্তবতা আরো ভয়ানক।আরো একটা বিষয় খুবই ভয়ানক তা হলো হত্যার ধরন এবং হত্যাকারীদের প্রকৃতি। নৃশংসতা আর বর্বরতার প্রতিযোগিতায় যেন নেমেছে মানুষ! আর হত্যাকারীদের তালিকায় এখন হার হামেশাই যোগ হচ্ছে নিজস্ব আত্মীয়- বাবা, মা, মামা, চাচা এবং সাধারণ মানুষ যাদের এ ধরনের কোন ক্রিমিনাল রেকর্ডই নেই। একটি দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা যদি দিন দিন এমন অবস্থার দিকে যেতে থাকে তাহলে বলতেই হয় ধ্বংসের প্রান্ত সীমানায় পৌছে গেছে এ জনপদ। নিজ পিতা যখন তার তিনটি কন্যা সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করে (১৬.০৫.২০১৫), জনগণের রক্ষক সেজে যখন ভক্ষক হয়ে শিশু সাইদ কে হত্যা করা হয় (১৮.০৩.২০১৫), পিটিয়ে খুচিয়ে শিশু রাজনকে (১২.০৭.২০১৫), পায়ুপথে কম্প্রেসার লাগিয়ে যখন শিশু রাকিব কে হত্যা করা হয় (০৫.০৮.২০১৫) তখন আসলেই বলতে হয় দেউলিয়া হয়ে গেছে এ সমাজ… এ যেন এক কালবেলা!

    কিন্তু কেন এই হত্যার মিছিল? কেন ছাত্রদলের গুলাগুলিতে বাবার কোলে বসে থাকা দু বছরের নওশীনের জীবনের প্রদীপ নিভে যায়।কেন ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের গুলাগুলিতে মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ হয় শিশু… কেন এসব অমানবিকতা, পাশবিকতা? কারণ কি শুধু এটা যে আমরা আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি, হয়ে গেছি চিন্তাশুন্য কিংবা আমাদের মানবিক মুল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে ইত্যাদি। আসলে এগুলো কারণ নয় বরং এগুলোও ফলাফল।মূলত এর পেছনে রয়েছে একটি ঘুনে ধরা সভ্যতা, একটি অনাদর্শিক সমাজব্যবস্থা, ভোগবাদী চরম স্বার্থবাদী আর সস্তা ও নষ্ট আবেগের সংস্কৃতি, সর্বোপরি একটি মানব রচিত মতবাদপুষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা।যার অবধারিত ফলাফল আর ফলাফলের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এই হত্যা ধ্বংসের নারকীয় মিছিল!

    পথ কী? পাথেয় কোথায়? কেবল এবং কেবলমাত্র একটি আদর্শিক সমাজ ব্যবস্থাই পারে মানুষ কে মুক্তি দিতে। আর আদর্শিক সমাজের পূর্বশর্ত একটি আদর্শিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।আর সেই একমাত্র আদর্শটি হলো ইসলাম আর রাষ্ট্রটি হলো খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা।একজন খলীফা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ব্যবস্থা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং হক ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলেন। মানুষ সঠিক চিন্তা, আবেগ, মানবিক মুল্যবোধ ও দায়িত্ত্বশীলতা নিয়ে জীবন ধারণ করে।ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষ পায় সঠিক নিরাপত্তা। ইসলামে অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী দেয়া হয়েছে- “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষ কে হত্যা করল সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল” [সুরা মায়িদা: ৩২]।

    শিশু হত্যা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ এমনকি শিশুটি যদি মুশরিক পরিবারেরও হয়। এক যুদ্ধে মুশরিকদের একটি শিশু নিহত হলে রাসুল (সা) তা শুনে খুব মর্মাহত হন। তিনি বলেন-

    এ শিশুরা তোমাদের চেয়েও উত্তম। সাবধান! শিশুদের হত্যা করবে না!” [মুসতাদরাকে হাকিম: ২/১৩৩]।

    বাংলাদেশে এখন মাতৃজঠরেও শিশু নিরাপদ নয়। অথচ ইসলাম এ ব্যপারে কত সচেতন। একবার এক ব্যাভিচারিনী মহিলা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজেকে গর্ভবতী উল্লেখ করলে তার গর্ভস্থ নিরপরাধ শিশুর নিরাপদ প্রসব এবং দুগ্ধকালীন সময় অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত দন্ড কার্যকর করেন নি। [মিশকাত: ২/৩১০]।

    ইসলামী রাষ্ট্র শিশুদের জন্য হবে স্বর্গ রাজ্য। আমাদের প্রিয় রাসূল (সা) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তারা তাঁর সাথে রাস্তার ধুলোয় খেলতো। রাসুল (সা) শিশুদের যত্ন নিতে বলেছেন। ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা কতটা দায়িত্বশীল সকলের নিরাপত্তা আর অধিকারের ব্যপারে তা ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক খলীফা ওমর (রা) থেকে বুঝা যায়- “যদি এই ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি বকরি পা পিছলে পড়ে মারা যায় আমি ওমর ভয় করি আল্লাহ’র কাছে আমাকে এর জবাবদিহি করতে হবে”। সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!

    পুঁজিবাদী ভোগবাদী ব্যবস্থার কম্প্রেসারের বিষবাস্পে ফুলে উঠা মৃতপ্রায় এই কুফরি সভ্যতার পতন ঘটিয়ে শীঘ্রই ফিরে আসবে মানবতার মুক্তির দিশারী ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা। সর্ব দিকে, সপ্ত সুরে আজ কেবলি তার আগমনি ধ্বনি… আর এর জন্য আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার জন্য ঝাপিয়ে পড়তে হবে। আর এ কাজটি আমাদের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয দায়িত্ব।

    তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে”। [বুখারী: ১/৩০৪ ও মুসলিম: ৬/৭]

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে এই মহান দায়িত্ত্ব পালন করার তৌফিক দিন। আমীন।

    রবিউল আলম

  • উপমহাদেশে ইসলামি শাসনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা

    উপমহাদেশে ইসলামি শাসনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম বাঙালী জাতীয়তাবাদ নিয়ে। বাম বুদ্ধিজীবীদের একটি চিন্তা সেকুলার মহলে বেশ জনপ্রিয়ঃ বাঙ্গালী সমাজে ইসলাম ধর্মের প্রভাব হল একটি প্রতিক্রিয়াশীলতার বিষয়, অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে হিন্দুদের দ্বারা অর্থনীতিক নিপীড়ন বাঙালী সমাজে পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে ‘মুসলমানিত্ব’-এর দাবীকে জোরালো করে। বাম দার্শনিকদের চোখে ‘ইসলামী শাসন’-এর বিষয়টি বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে গভীরভাবে প্রথিত না। ওনাদের সাথে আলোচনা করলে এও শুনতে হয় ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ কখনই ‘কেন্দ্রিয় খিলাফতের’ আওতাধীনে ছিল না। আরও একটি ভ্রান্ত ধারণা তারা ছড়ানঃ আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশ *মূলত* এই অঞ্চলের মানুষ (Indigenous people) দ্বারা শাসিত হয়ে এসেছিল যেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনাই মুখ্য ছিল, তারা কখনই খিলাফতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে একীভূত হয়নি। এই আলোচনা গুলো এখনো চালু রয়েছে বাম ও কট্টর জাতীয়তাবাদী সেকুলারদের মহলে কারন তারা প্রমাণ করতে চায় খিলাফত এই অঞ্চলের মানুষের ন্যাচারাল ডিমান্ড হতে পারে না। এই আলোচনাও টেনে আনা হয় বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেছে *শুধুমাত্র* সুফিরা, কিন্তু শাসন ব্যবস্থা হিসেবে (শরিয়াহ কোর্ট/কাজি, প্রশাসনিক অবকাঠামো ইত্যাদি) এই অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ছিল না। এই বিষয়ে জেনুইন গবেষণা করেছিলেন কিছু একাডেমিক যেমন ডঃ মোহর আলি (History of the Muslims of Bengal, Vol 1&2), ডঃ আব্দুল করিম (‘বাংলার ইতিহাস’, ‘বাংলার ইতিহাসঃ সুলতানি আমল’), ডঃ আস্কর ইবন শাইখ (‘বাংলার মুসলিম শাসনকর্তা’)। আমার সংগ্রহে থাকা বইগুলোর আলোকে নীচের তথ্যগুলো তুলে ধরলাম।

    এই উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাব রাসুলের (সা) মক্কী যুগ থেকেই। এটা হয়তো অনেকেই জানে না ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম ছিল ভারতের বর্তমান কেরালা অঞ্চলের পেরুমাল সাম্রাজ্যের শেষ রাজা ‘চেরামান ভারমা পেরুমাল’। সে রাসুলুল্লাহর (সা) ব্যাপারে আরব বণিকদের কাছ থেকে জানতে পেরে ইসলাম কবুল করেন এবং মক্কায় রাসুলের সাথে দেখা করতে যায়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইমাম তাবারি ওনার ‘ফিরদাউসুল হিকাম’-এ উল্লেখ করেন পেরুমাল ১৭ দিন রাসুলের সাথে ছিলেন। তিনি ‘তাজউদ্দীন’ উপাধি লাভ করেন রাসুলের কাছ থেকে এবং সাহাবা মালিক ইবন দিনার (রা) কে সাথে করে কেরালা ফেরত আসার পথে তিনি মারা যান। ‘চেরামান-মালিক মসজিদ’ এখনো কেরালায় রয়েছে অরিজিনাল কাঠামোয়। কিন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ইসলাম প্রচার সম্ভব না দেখে সেই যাত্রায় ইসলাম প্রচার/প্রতিষ্ঠা ভারত উপমহাদেশে থেমে যায়।

    খলিফা উমার (রা) বাহিনী পাঠিয়েছিলেন হিন্দুস্থান জয় করার জন্য, কিন্তু সফলতা পাননি। উসমান (রা) চাওয়া সত্ত্বেও কৌশলগত কারনে এগোন নি। ৬৬০ খ্রিঃ আলির (রা) সময় হারিস ইবন মুররা আল-আবদি হিন্দের কাছের কিছু অঞ্চল দখল করেছিলেন। মুয়াবিয়াও (রা) চেষ্টা চালু রেখেছিলেন কিন্তু সফল হননি। শেষমেশ, ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক এর সময় ১৭ বছরের তরুন যোদ্ধা মুহাম্মাদ বিন কাসিম আল-থাকাফি ভারতে ঢোকেন এবং তার মৃত্যুর পরো ৮৭১ খ্রিঃ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল জয় চালু থাকে। সরাসরি আব্বাসিয় খিলাফতের আওতাধীনে হুকুম শরিয়া প্রতিষ্ঠিত ছিল এই অঞ্চলে। খিলাফত তৎকালীন ভারতীয় শাসকদের বিভিন্ন উপাধি দিয়েছিল যেমন, সুলতান শবুক্তগিন এর জন্য ‘নাসির আদ দাউলা’ এবং সুলতান মাহমুদ এর জন্য ‘ইয়ামিন আদ দাউলা’ এবং ‘আমিন উল মিল্লাত’। ১২১১ থেকে ১২৩৬ খ্রিঃ পর্যন্ত শাসক ছিলেন সুলতান ইলতুতমিশ যিনি আব্বাসি খিলাফাহ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার অনুরধ জানিয়ে খলিফা মুস্তানযির বিল্লাহ এর কাছ থেকে ‘সুলতান-এ-আযম’ উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি মুদ্রা চালু করা শুরু করেছিলেন যেগুলোর এক পাশে থাকতো কলেমা এবং খিলাফতের নাম আর অন্য পাশে থাকতো তার নিজের নাম ‘নাসির-এ-আমির উল মুমিনিন’ (বিশ্বাসীদের নেতার সাহায্যকারী) টাইটেল সহ। খালযি সুলতানাত এর পর তুঘলক সাম্রাজ্যও খিলাফতের সাথে সংযুক্ত ছিল। মুহাম্মাদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) তার আগের শাসকদের সমালোচনা করে (কারন কেউ কেউ স্বাধীন হতে চেয়েছিল) আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাকফি বিল্লাহর সাথে যোগাযোগ করে স্বীকৃতি নেন ‘সুলতান আস-সালাতিন’ হিসেবে। ফিরোজ শাহ তুঘলক তার বই “ফুতুহাত-ই-ফিরোজশাহি” তে উল্লেখ করেছিল তৎকালীন খলিফা তাকে ‘খিলাত’ (robes of honor), ব্যানার, রিং ইত্যাদি পাঠিয়েছিল স্বীকৃতি হিসেবে। মোঘল শাসকদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (মাঝ সময়ের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন আকবরের শাসন) খিলাফতের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিল। হুমাইউন বিখ্যাত ওসমানী খলিফা ‘সুলাইমান দা ম্যাগ্নিফিসেন্ট’ কে চিঠি পাঠিয়েছিল “খিলাফতের মর্যাদার রক্ষাকারী হিসেবে”। এমনকি টিপু সুলতান ১৭৮৭ সালে ওসমানী খলিফা তৃতীয় সেলিম কে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়ে চিঠি দিয়েছিল।

    এই প্রেক্ষাপটের ভেতরেই খিলাফতের সাথে বাংলারও গভীর যোগাযোগ ছিল। গজনীর সুলতান মুহাম্মাদ ঘোরির (যিনি এই উপমহাদেশে কেন্দ্রীয় খিলাফতের স্বীকৃত ওয়ালি ছিলেন) সময় বাংলা বিজয়ের কারনে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজি ঘোরির দিল্লীর প্রতিনিধি কুতুবুদ্দিন আইবেক এর কাছ থেকে ‘খিলাত’ (robe of honor) পেয়েছিল। চার বছরের ভেতর ইখতিয়ার উদ্দিন সমগ্র বাংলায় (লাখনাওয়াতি) ইসলামী শাসন কায়েম করেছিলেন কেন্দ্রীয় খিলাফতের স্বীকৃতি নিয়ে। ইখতিয়ারের পরের শাসকরাও মুদ্রা চালু করেছিলেন যার এক সাইডে কালেমা থাকতো আর অন্য সাইডে থাকতো ‘খলিফার সাহায্যকারী’ টাইটেল। ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার এর সময় থেকে (১২০৩/৪) পুরো সুলতানি আমল (১৫৩৮) পর্যন্ত বাংলার শাসকরা এরকম মুদ্রা চালু করেছিল যার এক সাইডে লেখা থাকতো কালেমা আর অন্য সাইডে থাকতো টাইটেল ‘খলিফার সাহায্যকারী’ (নাসির আমিরুল মুমিনিন)। প্রখ্যাত ইসলামী ঐতিহাসিক হাফেয ইবন হাজার আসকালানি লিখেছিলেন বাংলার এক স্বাধীন নবাব জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ শাহ (১৪১৫-১৪৩১) আব্বাসি খলিফার কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় মিশরের মামলুক সুলতান আল-আশরাফ বারসবে কে উপঢৌকন পাঠিয়েছিল যাতে সে স্বীকৃত পাইয়ে দিয়ে সাহায্য করে।

    তাই বাম বুদ্ধিজীবীদের এই দাবী ডাহা মিথ্যা। বাংলা এবং ভারত অঞ্চল কেন্দ্রীয় খিলাফতের প্রদেশ ছিল। প্রায় ৫শত বছর খিলাফত এখানে শাসন করে গিয়েছিল, অবশ্যই মাঝে মাঝে কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু শরিয়াহ কোর্ট চালু ছিল, খিলাফতের গভর্নরদের দ্বারা এই অঞ্চল শাসিত হতো। বাঙালী মুসলিম সমাজে ইসলাম ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আসেনি, এমনকি শুধু সুফিদের দ্বারাও প্রচার হয়নি, বরং শাসনব্যবস্থা হিসেবে চালু ছিল।

    ইমতিয়াজ সেলিম

  • ভর্তি, নাকি আরেক ভোগান্তি?

    ভর্তি, নাকি আরেক ভোগান্তি?

    এবছর ৬ জুন থেকে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভর্তির ব্যবস্থা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তার দাবি হচ্ছে ছাত্রছাত্রী ও অবিভাবকদের ভোগান্তি কমানো ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা। যার অংশ হিসেবে তিনি টেলিটক সিমের মাধ্যমে এস এম এস ও শিক্ষাবোর্ডের প্রণীত ওয়েবসাইটে রেজিষ্ট্রেশন ও রোল নাম্বার দিয়ে ঢুকে কাঙ্ক্ষিত পাঁচটি কলেজ ও বিষয়ের জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা করে দেন।

    ডিজিটালাইজেশন শব্দটি শুনতে সুন্দর হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা বলেও একটি কথা রয়েছে। তাই আসুন বর্তমান সরকারের ভর্তির ব্যাবস্থাপনার উপর একটু চোখ বুলাই-

    ১. রেজাল্টের ভিক্তিতে ভাল কলেজগুলোতে ভাল ছাত্র-ছাত্রী, মধ্যম মানের কলেজ গুলোতে মধ্যম মানের ছাত্র-ছাত্রী ও নিম্নমানের কলেজগুলোতে নিম্ন মানের ফলাফল করা ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হবে।

    ২. আবেদনকালে ছাত্রছাত্রীরা পাঁচটি কলেজ তাদের পছন্দের তালিকায় রাখলেও কোটা পুর্ণ হয়ে যাবার পর অনেক গোল্ডেন (A+) ধারী ছাত্রছাত্রীও তাদের পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারছে না।

    ৩. কোটা পুর্ণ হয়ে যাবার পর সরকারই নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে, কে কোন কলেজে ভর্তি হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্টকৃত কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছে। যার ফলে অনেক ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকই বোবা কান্না কাঁদছেন।

    ৪. যদিও শিক্ষা নীতিমালার ২৮নং অনুচ্ছেদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো নাগরিককে ‘অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীনে’ আনা যাবে না বলেও উল্লেখ করা রয়েছে, কিন্তু সরকার নিজেদের নীতিমালাই মানছেনা।

    ৫. নতুন নীতিমালায় কোনো কলেজ ভর্তিপরীক্ষা নিতে পারবেনা বলা হলেও তিনটি কলেজের ক্ষেত্রে এই নীতিমালা কার্যকর হচ্ছেনা। কলেজগুলো হচ্ছে- নটরডেম (অধ্যক্ষ: ফাদার হেমন্ত পিয়াস রোজারিও), হলিক্রস (অধ্যক্ষ: সিস্টার শিখা এল গোমেজ) ও সেন্ট জোসেফ কলেজে (অধ্যক্ষ: ব্রাদার রবি ফিউরিফিকেশন)।

    ৬. শুধুমাত্র রোল নাম্বার ও রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে আবেদন করার সুযোগ থাকায় একজনের রোল ও রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে শত্রুতাবসত আরেকজন পুরণ করে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। পরবর্তীতে তা পরিবর্তনের কোন সুযোগ থাকছেনা।

    ৭. অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ও অবিভাবকদের কাছে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট না থাকায় তারা বিভিন্ন দোকানে ভিড় জমায়, ফলে নিম্নমানের কলেজগুলোর সাথে সেসকল দোকানদারদের আর্থিক চুক্তি থাকায় ভালো ফলাফলকৃত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সুকৌশলে নিম্নমানের কলেজে ফেলা হচ্ছে। মুলত তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

    ৮. বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী ও অবিভাবকগণ অভিযোগ করেছেন:- সরকারের প্রণীত নতুন সার্ভার ভিত্তিক ওয়েবসাইট নানান সমস্যায় জর্জরিত। একজন নির্ধারিত পছন্দের পাঁচটি কলেজের জন্য আবেদন করলেও তার কলেজ পড়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত অন্য আরেকটি কলেজে। এমনকি আবার ছাত্র হয়েও কুমিল্লার রিয়াদ নামের এক ছেলের কলেজ দেওয়া হয়েছে সরকারী মহিলা কলেজ! (খবর: কুমিল্লার জমিন, তাং-০২/০৭/২০১৫)।

    ৯. একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পাশ করলেও অনেকেই ভর্তি হতে পারছেন না সেই প্রতিষ্ঠানের কলেজে। এ কারণে ফল প্রকাশের পর থেকেই ভিকারুন্নিসার অনেক ছাত্রী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমাদের এখান থেকে ভালো রেজাল্ট করে এসএসসি পাশ করেছে, কিন্তু বোর্ডের প্রকাশিত তালিকায় তাদের নাম নেই। এখন মেয়েরা অনেক কান্নাকাটি করছে।’

    ১০. এই সমস্যার সমাধান কী তা জিজ্ঞেস করা হলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইন্দুভ’ষন ভৌমিক শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির প্রসঙ্গে বলেন, করার কিছুই নেই। যার যেখানে নাম এসেছে তাকে সেখানেই ভর্তি হতে হবে। তিনি আরো বলেন, তিনি নাকি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বলেছেন এভাবে সমস্যা হবে, কিন্তু তিনি তার কথা শুনেননি। শিক্ষামন্ত্রীও আশ্বস্থ করে যাচ্ছেন যে, অতি শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধান করে দিবেন। যদিও দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি বলতে তিনি শুধুমাত্র (পায়ে এক জোড়া) স্যান্ডেল (থাকাকেই) বুঝেন!

    উপরে উল্লেখিত সমাস্যাগুলোর গভীরে প্রবেশ করলে আমরা দেখবো এগুলো হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার ফসল। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে পুঁজিবাদ এরকম নানান সমস্যা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। পুঁজিবাদ মুলত ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে, যার ফলে এর শিক্ষাব্যবস্থাও Self Interest এর ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হয়। এর শিক্ষা নীতিমালার মুল বিষয়গুলো একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত হয় না। বহুমুখী চিন্তাভাবনার দরুন মানুষের চিন্তাও নানান ধরনের হয়। চিন্তার ঐক্য না থাকায় সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বিভিন্ন হওয়ায় কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর উপচে পড়া ভিড় থাকে অপরদিকে কিছু প্রতিষ্ঠানে এর উল্টো। এই ব্যবস্থার অধীনে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হলেও মানুষের মুল যে উন্নতি অর্থাৎ আলোকিত চিন্তার বিকাশ হয়না এবং মানুষে মানুষে ভাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয়না। পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার শিক্ষানীতি যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তা হল- স্বার্থের ভিত্তিতে সমাজ গঠন। তাই আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনা না করেই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তার ব্যক্তিগত মতকেই পুরো দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

    এই ভোগান্তি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদেরকে এমন একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে যেটি কিনা একটি রাষ্ট্রের অধীনস্থ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই মানের কার্যক্রম নিশ্চিত করবে। যেটি মানুষকে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত না করে আলোকিত চিন্তাধারী হতে সহায়তা করবে। যেটি মানুষে মানুষে ভাতৃত্বের বন্ধন স্থাপিত করবে ও মানুষের আত্মাকে প্রশান্তিতে পরিপুর্ণ করবে।

    একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে পারে শুধুমাত্র সেই ব্যবস্থা যেটি রাসূল (সা) ও তাঁর পরবর্তীতেও হযরত আবু বকর (রা), উমর (রা) দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। সেটি হল মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার মনোনীত খিলাফত ব্যবস্থা।

    মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম, ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়েদা: ০৩)

    মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন-

    আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নযিল করেছি যেটি এমন যে তা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা, হেদায়েত, রহমত এবং মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ। (সুরা নাহল: ৮৯)

    খিলাফত ব্যবস্থায় ইসলামী আকীদাহ্‌ হবে শিক্ষানীতির মুল ভিত্তি। পাঠ্যসুচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে পরিকল্পিত হবে যাতে এই মুল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হবার কোন সুযোগ না থাকে।

    খিলাফত ব্যবস্থায় শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তা ও চরিত্রকে ইসলামী ব্যাক্তিত্বে রুপ দান করা। পাঠ্যসুচীর অন্তর্গত সকল বিষয়েরই এ ভিত্তির উপর গভীরভাবে প্রোথিত থাকা আবশ্যক

    এভাবেই খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজানো হবে, যেটি তাঁর জনগণকে ভোগান্তি নয় বরং দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য উপুযুক্ত করে গড়ে তুলতে সংকল্পবদ্ধ থাকবে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজটি দৃঢ়ভাবে করার তৌফিক দান করুন (আমীন)।

    কুদরত উল্লাহ্‌

  • লুত (আ) ও তার জাতির বর্ণনা

    লুত (আ) ও তার জাতির বর্ণনা

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ

    আর আকাশ ও জমীনের কত নিদর্শনই না তারা অতিক্রম করে যায়, কিন্তু তারা তা হতে উদাসীন“। [সূরা ইউসুফ: ১০৫]

    আমরা অনেকেই জানি ভু-মধ্যসাগরের কাছে এক উপসাগরে অবস্থিত সডম জাতিই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সমকামিতা নামক ব্যাধির জন্ম দেয়। এই সডম শব্দ হতে ইংরেজিতে সডমাইট শব্দটি এসেছে। সমকামিদের এজন্যই অনেকে ‘সডমাইটস’ (ٍsodomites) বলে অভিহিত করে থাকেন। এই পথভ্রষ্ট জাতির কাছেই প্রেরিত হয়েছিলেন আল্লাহর নবী লুত (আ)। তিনি ডেসপারেট চেষ্টা করেও তাদের পতন ঠেকাতে পারেন নি। এ জাতিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কঠিনভাবে শাস্তি দেন, যার বিস্তারিত বর্ণনা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে।

    বলা হয়ে থাকে এ জাতিকে শাস্তি দেয়ার ফলাফল হিসেবে মৃত সাগরের জন্ম, যা বর্তমান জর্ডানে অবস্থিত। যারা মৃত সাগর সম্পর্কে অবগত তারা জানে এটি প্রকৃতির সাধারন নিয়মবিরুদ্ধ একটি সাগর, এতে মানুষ ডুবে না। হতে পারে প্রকৃতির সাধারন নিয়মবিরুদ্ধ আচরনের শাস্তির নিদর্শন হিসেবে এই সাগরকে পরবর্তী জেনারেশনের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

    আসুন আমরা দেখি পবিত্র কুরআনে এ অভিশপ্ত জাতির ব্যাপারে কী বলা হচ্ছে:

    وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ ، إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ

    আর লুতের কথা স্মরণ করো যখন সে তার জাতিকে বললো: তবে কি তোমরা এমন অশ্লীলতার দিকে যাচ্ছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বজগতের কেউ সম্পাদন করেনি। তোমরা তো নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে কামভাব প্রকাশ করে গমন করছো, নিশ্চিতভাবে তোমরা সীমা-অতিক্রমকারী জাতি“। [সূরা আ’রাফ: ৮০-৮১]

    وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ

    আর তার জাতির জবাব কেবল এ-ই ছিল যে তারা বলছিল: (লুত ও তার সঙ্গীদের) এদেরকে তোমাদের এ শহর হতে বহিস্কার করো, এই লোকগুলো বেশি পবিত্র হতে চায়“। [সূরা আ’রাফ: ৮২]

    فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ ، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ

    অতঃপর আমি তাকে ও তার পরিবারকে উদ্ধার করলাম, তার স্ত্রী ব্যতিত, সে পেছনে পরে থাকা লোকদের মধ্যে রয়ে গেল। আর তাদের উপর আমি পাথরের বৃষ্টি বর্ষন করালাম, সুতরাং, দেখো ! অপরাধীদের শাস্তি কিভাবে হয়“। [সূরা আ’রাফ: ৮৩]
    কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা বলেন,

    وَلُوطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الْخَبَائِثَ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ، وَأَدْخَلْنَاهُ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

    আর লুত, তাকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম এবং এমন শহর হতে উদ্ধার করেছিলাম যারা খবিশ (নোংরা) কাজ করতো, নিশ্চয়ই তারা জঘন্য এক পাপাচারি জাতি ছিল। আর লুতকে আমার রহমতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলাম, নিশ্চয়ই সে নেক লোকদের মধ্য হতে ছিল“। [সূরা আম্বিয়া: ৭৪-৭৫]

    অন্যত্র বলা হচ্ছে:

    وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ، أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ

    এবং স্মরণ করো লুত যখন তার জাতির উদ্দেশ্যে বলছিল: তবে কি তোমরা সজ্ঞানে এই অশ্লীল কাজের দিকে গমন করছো? তোমরা তো নারীদের রেখে পুরুষদের দিকে কামভাব প্রকাশ করে গমন করছো, নিশ্চিতই তোমরা এক অজ্ঞ জাতি“। [সূরা নামল: ৫৪-৫৫]

    أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ وَتَقْطَعُونَ السَّبِيلَ وَتَأْتُونَ فِي نَادِيكُمُ الْمُنْكَرَ فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا ائْتِنَا بِعَذَابِ اللَّهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ

    তোমরা কি পুংমৈথুনে লিপ্ত আছো, পথে-ঘাটে রাহাজানি করছো এবং নিজেদের সভা-সমাবেশে গর্হিত কর্ম করছো? তার সম্প্রদায়ের জবাব কেবল এ-ই ছিল যে তারা বলছিল: (পারলে) আল্লাহর শাস্তি নিয়ে আসো, যদি তুমি সত্যবাদীদের মধ্য হতে হও“। [সূরা ‘আনকাবুত: ২৯]

    قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ

    লুত বললো: হে আমার রব, ফাসাদ সৃষ্টিকারী জাতির ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো“। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩০]

    وَلَمَّا أَنْ جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا

    “যখন আমার প্রেরিত (পুরুষরুপী) বার্তাবাহকগণ লূতের কাছে আগমন করল, তখন (তার জাতি হতে) তাদের (সম্ভাব্য বিপদের) কারণে সে বিষন্ন হয়ে পড়ল এবং তার মন সংকীর্ণ হয়ে গেল…”। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৩]

    وَقَالَ هَذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ

    এবং লুত বললো: আজ বড়ই কঠিন দিন” [সূরা হুদ: ৭৭]

    وَجَاءَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَسْتَبْشِرُونَ
    শহরবাসীরা আনন্দ-উল্লাস করতে করতে এসে হাজির হল“। [সূরা হিজর: ৬৭]

    وَجَاءَهُ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ

    “আর তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাড়াহুড়ো করে তার (গৃহ) পানে ছুটে আসতে লাগল। আর এর আগে থেকেই তারা কুকর্ম করে যাচ্ছিল..”। [সূরা হুদ: ৭৮]

    قَالَ يَاقَوْمِ هَؤُلَاءِ بَنَاتِي
    “..(ব্যকুল হয়ে) লুত তাদের বললো: হে লোকসকল, এই তো আমার (শহরের) কন্যারা..”। [সূরা হুদ: ৭৮]

    إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ
    ..যদি তোমরা (একান্ত) কিছু করতেই চাও। [হিজর: ৭১]

    هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ فِي ضَيْفِي

    তারাই তো তোমাদের জন্য পবিত্রতর, সুতরাং, আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো, আর আমার মেহমানের ব্যাপারে (কামাসক্ত হয়ে) আমাকে অপদস্থ করো না“। [সূরা হুদ: ৭৮]

    أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ
    তোমাদের মাঝে কি একজনও ভালো লোক নেই?” [সূরা হুদ: ৭৮]

    قَالُوا أَوَلَمْ نَنْهَكَ عَنِ الْعَالَمِينَ
    “তারা বললো: তোমাকে কি আমরা বিশ্ববাসীর (তথা বহিরাগতদের) ব্যাপারে নিষিদ্ধ করে দেইনি?

    قَالُوا لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنَاتِكَ مِنْ حَقٍّ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا نُرِيدُ
    তারা বলল: (আর) তুমি তো জানই, তোমার (এ শহরের) কন্যাদের নিয়ে আমাদের কোন গরজ নেই। আর আমরা আসলে কি চাই, তাতো তুমি ভালোই জানো“। [সূরা হুদ: ৭৯]

    لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ
    “(হে মুহাম্মাদ), আপনার জীবনের শপথ, তারা তাদের কামাসক্তের নেশায় বুদ হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল
    “। [সূরা হিজর: ৭২]

    قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ
    “লুত বললো: হায় ! তোমাদের মোকাবেলায় যদি আমার কোনো শক্তি থাকতো, অথবা কোনো শক্তি হতে আশ্রয় নিতে পারতাম
    “। [সূরা হুদ: ৮০]

    قَالُوا يَالُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يَصِلُوا إِلَيْكَ
    “মেহমানরা বলে উঠলো: হে লুত, নিশ্চয়ই আমরা তোমার রবের পক্ষ হতে প্রেরিত বার্তাবাহক, (চিন্তা করোনা) তারা তোমার কাছেও ঘেষতে পারবে না..”।
    [সূরা হুদ: ৮১]

    وَقَالُوا لَا تَخَفْ وَلَا تَحْزَنْ إِنَّا مُنَجُّوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَأَتَكَ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ
    “..তারা (বার্তাবাহক ফেরেশতাগণ) বলল, ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে ও আপনার পরিবারবর্গকে রক্ষা করে ছাড়বই আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে ধ্বংস প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত থাকবে
    “। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৩]

    فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِنَ اللَّيْلِ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ
    “সুতরাং, রাতের এক অংশে তোমার পরিবার নিয়ে বের হয়ে পড়, আর তোমাদের কেউ যেন পেছনে না ফেরে..
    “। [সূরা হুদ: ৮১]

    وَامْضُوا حَيْثُ تُؤْمَرُونَ
    “(বরং) যেভাবে আদেশ দেয়া হয়, সেভাবে অগ্রসর হও
    “। [সূরা হিজর: ৬৫]

    إِنَّ مَوْعِدَهُمُ الصُّبْحُ أَلَيْسَ الصُّبْحُ بِقَرِيبٍ
    “..আর তাদের জন্য রইল সকালের প্রতিশ্রুতি। সকাল কি খুব নিকটেই নয়?”
    [সূরা হুদ: ৮১]

    أَنَّ دَابِرَ هَؤُلَاءِ مَقْطُوعٌ مُصْبِحِينَ
    “..সকাল হলেই তাদেরকে সমুলে বিনাশ করে দেয়া হবে
    “। [সূরা হিজর: ৬৬]

    إِنَّا مُنْزِلُونَ عَلَى أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ
    “আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের উপর আকাশ থেকে (আবর্জনাময়) আযাব নাজিল করব তাদের পাপাচারের কারণে
    “। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৪]

    فَأَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَةُ مُشْرِقِينَ ، فَجَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ
    “অতঃপর ভোরের আলো ফোটার সময় এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে এসে পাকড়াও করল। অতঃপর আমি জনপদটিকে উপরকে নিচ করে উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর কঙ্করের পাথর বর্ষণ করলাম
    “।  [সূরা হিজর: ৭৩-৭৪]

    مَنْضُودٍ ، مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ
    “স্তরে স্তরে, যার প্রতিটি (পাথর, কোনটি কার উপর পড়বে তা) তোমার পালনকর্তার নিকট চিহ্নিত ছিল
    “। [সূরা হুদ: ৮২-৮৩]

    وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِقَوْمٍ يَعْقِلُون
    “আর নিশ্চয়ই চিন্তাশীল জাতির জন্য এর মধ্যে একটি নিদর্শন রেখে দিয়েছি
    “। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৫]

    وَتَرَكْنَا فِيهَا آيَةً لِلَّذِينَ يَخَافُونَ الْعَذَابَ الْأَلِيمَ
    “আর যারা যন্ত্রনাদায়ক শাস্তিকে ভয় করে তাদের জন্য সেখানে আমরা নিদর্শন ছেড়ে এসেছি
    “। [যারিয়াত: ৩৭]

    – এই আয়াতটি মৃত সাগরের ব্যাপারে ইংগিত হতে পারে।

    আল্লাহ আমাদের একবিংশ শতাব্দির নব্য কওমে লুত হতে আশ্রয় দান করুন, শক্তি দিয়ে সাহায্য করুন। আমীন।

  • জাতীয় বাজেট, পুঁজিবাদের ভয়াল ছোবল

    জাতীয় বাজেট, পুঁজিবাদের ভয়াল ছোবল

    খবর: জাতীয় সংসদে আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব দিলেন, আকারে তা বিশাল, ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এই বাজেট হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, যা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে জিডিপি যতটা বেড়েছে, বাজেট সেই তুলনায় বাড়েনি, বরং কমেছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।ব্যয় করতে না পারায় অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংশোধন করেছেন। এতে বাজেট হচ্ছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার, যা জিডিপির ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। সংশোধন করায় আগের বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেট খানিকটা মোটাতাজা দেখালেও তা বাস্তবায়ন না করতে পারার সুফল। কেননা, মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় সবগুলো সূচকই নিম্নগামী। যেমন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির আকার ছিল জিডিপির ৬ শতাংশ, হয়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আবার রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আর নতুন বাজেট প্রস্তাব হচ্ছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থমন্ত্রীর সমস্যা বাজেট পরিকল্পনায় নয়, বাজেট বাস্তবায়নে। আপনারা যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের ওপর বোঝা বাড়তে পারে। কারণ, রাজস্ব আয়ের যে পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন, তা আগের তুলনায় ৩০ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘সত্যিই উচ্চাভিলাষী।’ (প্রথম আলো ০৫-০৬-২০১৫)

    সমস্যা:

    – ইনকাম ট্যাক্স এর মত একটি হারাম জিনিস মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন:

    (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ صَاحِبُ مَكْسٍ)

    কর সংগ্রহকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না” [মুসনাদ আহমাদ]

    – পুঁজিবাদী বাজেটে রাজস্বের অন্যতম খাত হল ‘আয় কর’ (ইনকাম ট্যাক্স)। এবার প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত করের বোঝার ভার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের বহন করতে হবে।

    – ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ।

    – ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ

    – যদি কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক ঋণ না পাওয়া যায় তাহলে ভরসা ব্যাংক ব্যবস্থার ঋণ। এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও প্রবল। আর বেসরকারি খাত তো বঞ্চিত হবেই।

    – পুঁজিবাদী আদর্শ সমস্ত কিছু চিন্তা করে লাভের ভিত্তিতে এবং কিভাবে গুটি কয়েক পুঁজিপতিদের বাঁচিয়ে রাখা যায় তার ভিত্তিতে সুতরাং এই লাভ করতে গিয়ে আর পুঁজিপতিদের বাঁচাতে গিয়ে যদি দেশের সাধারন জনগন নির্যাতনের যাঁতাকলে পৃষ্টও হয় তবুও তাদের কিছুই যায় আসে না।

    বাজেট হচ্ছে একটি দেশের বাৎসরিক আয়ব্যয়ের হিসাব নিকাশ। আর এই হিসাব নিকাশে সাধারণ মানুষের জন্য কোন সুখবর নেই। ফলে বাড়তি করের বোঝা নিয়ে এই বাজেট কতটা স্বস্তি দেবে, সেটাই এখন প্রশ্ন। দুই বছর আগে অর্থমন্ত্রী যাকে ‘অশোভনীয় আশাবাদ’ বলেছিলেন, তাকে এবার সংশোধন করে বলেছেন, ‘অশোধনীয় আশাবাদ।’ এই বাজেট কতটা পূরণ করবে তা?

    সমাধান:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:

    তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমিনে রয়েছে সেই সমস্ত”। (সূরা বাকারা: ২৯)

    ইসলামি অর্থ ব্যাবস্থা ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পুরনে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। ইসলামি অর্থনীতি মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে খিলাফত রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পুরনে খলিফাকে বাধ্য করে। রাসূল(সা) বলেন

    বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য একটুকরো কাপড়, আর খাওয়ার জন্য একটুকরো রুটি ও একটু পানি, এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারেনা” (তিরমিজী)

    সুতরাং, চাহিদা নয়, ইসলামের অর্থনীতি জিনিসপত্রের সরবরাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সম্পদের সুষ্ঠ বন্টন কে ইসলাম মূল সমস্যা হিসাবে দেখে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়
    (হাশর: ৭)

    ইসলাম সমস্ত কিছু চিন্তা করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার আদেশ অনুযায়ী হালাল এবং হারামের ভিত্তিতে। এতে না ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধনী ব্যাক্তি না সাধারন জনগণ, সমাজে একটি চমৎকার সমতা বিরাজ করে যা আমারা ১৩০০ বছর খিলাফত শাসন ব্যবস্থায় দেখতে পেয়েছি।

    ইসলাম, খিলাফত সরকারকে কোনো ভিত্তি ছাড়াই ইচ্ছামত টাকা ছাপানোর অনুমতি দেয়না। ফলে সরকারের হাতে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ তথা ইচ্ছা মত সংকোচন ও সম্পসারনের নীতির কোন হাতিয়ার নেই। ইসলাম টাকা ছাপানোর সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম প্রদান করেছে আর তা হল স্বর্ণ ও রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা। স্বর্ণ ও রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থায় সরকার ইচ্ছা মত মুদ্রা সরবরাহ করতে পারেনা তাই মৌলিক ভাবেই এই মুদ্রা ব্যবস্থা স্থিতিশীল। আর স্বর্ণ ও রুপার উভয়ের নিজস্ব মূল্য রয়েছে যা বর্তমানে প্রচলিত মুদ্রার নেই। সুতরাং মুদ্রাস্ফীতি হয়ার কোন ভয় নেই।

    এছাড়া, অসৎ ব্যবসা বা ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট, ভেজাল ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্রের বিচারক কাজী উল মুহতাসিব সবসময় বাজার পরিদর্শন করবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবেন।

    সুতরাং, এই মুহূর্তে জাতির জন্য বাধ্যতাতামুলক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মানব রচিত পুঁজিবাদী আদর্শকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র ব্যাবস্তা এবং তার অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:

    আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের মধ্যে যা আছে তা পরিবর্তন করে
    (সূরা রা’দ: ১১)

    মোহাম্মদ সালাহ্‌উদ্দীন

  • রমজান মাস – মুনাফা নাকি তাকওয়া অর্জনের মাস?

    রমজান মাস – মুনাফা নাকি তাকওয়া অর্জনের মাস?

    রমজান মাস তাই বিভিন্ন মহলে সাড়া পড়ে গেছে,

    ১. কাপড় ব্যবসায়ীরা নতুন মডেলের কাপড় সংগ্রহে ব্যস্ত। সাড়া বছর এই একটি মাসের জন্য তারা অপেক্ষা করে। পুরাতন কাপড় সরিয়ে নতুন কাপড়ে শোরুম সাজাচ্ছে ক্রেতা আকৃষ্টে চলছে বিভিন্ন কৌশল। দাম ও পাওয়া যায় অন্য মাস থেকে দ্বিগুন বা তিনগুন।

    ২. নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এর ব্যবসায়ীরা যেমন: ছোলা, চিনি, খেজুর, বিভিন্ন ডাল, তেল ইত্যাদি মজুদ করা হয়েছে যাতে রমজানে চওড়া দামে বিক্রি করা যায়। দাম বাড়ছে ২-২০ টাকা বেশি। যেন এ মাস না হলে আর কখন?

    ৩. সবজির বাজার তো ২০ থেকে ৩০ টাকার স্থলে ৬০ থেকে ৭০ টাকা করতে হবে, তা না হলে পোষাবে না।

    ৪. বিভিন্ন আফিসে কর্মচারীরা, থানায় পুলিশ, রাস্তায় ট্রাফিকরা কেউ বাদ নেই। এ মাস যেন সোনার হরিণ টাকা আয়ের, এ মাস না হলে পুরো বছরটাই বৃথা।

    এ যেন এক অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের মৌসুম। কিন্তু প্রশ্ন হল এটা কি অর্থ উপার্জনের মাস না অন্য কিছু ? ? ?

    আসুন দেখি এই রোজার ইবাদতের হুকুমদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে কী বলেছেন,

    হে মুমিনগণ ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হল যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা- ১৮৩)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন যেন আমারা আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জন করতে পারি। এই শিক্ষা নিয়ে বাকী সারা বছর যেন মহান আল্লাহর হুকুম মত নিজের ও সমাজের জীবন সাজাতে পারি। এই জন্য রোজা ও রমযান মাস, বৈষয়িক মুনাফা অর্জনের জন্য নয়।

    বর্তমানে রমজান মাসে মুসলমানদের জীবনে দু-মুখো নীতির কারণ হল:

    ১. বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হয়ে গিয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বস্তুগত লাভ-ক্ষতি। যা নগদে পাই তাই লাভ আর না অর্জন করতে পারলে ক্ষতি।

    ২. যেহেতু পুঁজিপতিদের সম্মানে এই সমাজব্যবস্থা তাই তারা যে কোন উপায়ে পুঁজি বৃদ্ধিতে ব্যস্ত। আর সরকারের একটি বড় অংশ যেহেতু ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আর বাকিরা যেহেতু তাদের দ্বারা কোন না কোনভাবে উপকৃত তাই তাদের টিকে থাকতে হলে পুঁজি বৃদ্ধি বা তাদের স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।

    সমাধান:

    – জনগণের মুষ্টিমেয় অংশের স্বার্থ রক্ষাকারী গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অপসারণ করে সর্বসাধারণের স্বার্থ রক্ষাকারী মহান আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যার মাধ্যমে মানুষের জীবনের লক্ষ্য হবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি। আর মানুষের কর্মের ভিত্তি হবে হারাম ও হালালের ভিত্তিতে আল্লাহ্র হুকুম পালন। যা মানুষের মাঝে ইসলামি মানসিকতা তৈরি করবে ও ফলশ্রতিতে তাকওয়া অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে। সমাজে তৈরি হবে ঈমানের পরিবেশ।

    – খিলাফত ব্যবস্থা মজুদদারি বন্ধ করে বাজারে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে যা দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখবে যা অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যকে নির্মূল করে দিবে। খিলাফত রাষ্ট্রের কাজী উল মুহতাসিব যা সবসময় মনিটর করবে।

    – খিলাফত ব্যবস্থার মানদণ্ড যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি তাই খলীফা পণ্যে ভেজাল রোধ ও রমজানকে কেন্দ্র করে অত্যধিক মুনাফা অর্জনের অসুস্থ প্রবনতায় বাধা দিবে ও জনগণকে রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্থাৎ তাকওয়ার পরিবেশ তৈরিতে গণমাধ্যমে ও জনসমাগম স্থলে ও ঘরে ঘরে সচেতনতা তৈরি করবে।

    – খিলাফতই পারে একমাত্র এই দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবস্থা সমূলে ধ্বংস করে সকল প্রকার অনাচার মুক্ত করে একটি নিরাপদ জীবন উপহার দিতে।

    তাই রমজানের প্রকৃত কারণ উপলব্ধি করে আমরা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনি যা রমজানের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের শিখিয়ে সেই কাঙ্খিত তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করবে। রমজান ব্যবসায়ের মাস নয়, তাকওয়ার মাস হিসেবে আবার সমাজে ফিরে আসবে। আল্লাহ্‌ আমাদের খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কর্মী হিসেবে কবুল করুন। আমীন।

  • পুঁজিবাদি সমাজে পারিবারিক সমস্যা ও এর প্রকৃত সমাধান

    পুঁজিবাদি সমাজে পারিবারিক সমস্যা ও এর প্রকৃত সমাধান

    খবর: ‘‘কক্সবাজারের চকরিয়ার বদরল্কালি ইউনিয়নে চৌধুরি পাড়ায় আব্দুল গনি – ফাতেমা বেগম দম্পতির তিন মেয়ে এক ছেলে। গত শুক্রবার তাদের বাসা থেকে তিন মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (৯), শিরোজান্নাত (৯), ও তহুরা জান্নাত (২০) এর গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তিন মেয়ের বাবা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবান বন্দি দিয়ে নিজের মেয়েদের জবাই করে হত্যার কথা স্বীকার করেন। আব্দুল গনি দাবী করেন, স্ত্রী ফাতেমার অনৈতিক সম্পর্কের কারনে চরম মানসিক বিপর্যয়ে পরে তিনি নিজের মেয়েদের হত্যা করেছেন। তার স্ত্রী ফাতেমা ও গনীর বিরুদ্ধে পাল্টা পরকীয়ার অভিযোগ তুলেছেন।’’ (কালের কন্ঠ ২২মে ২০১৫)

    মন্তব্য: পারিবারিক খুন, পরকীয়ার পাশাপাশি আত্বহননের ঘটনায় সমাজে আতংক ছড়িয়ে পরছে। এ রকম একের পর এক ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সমাজবিজ্ঞানী, মনস্তত্ত্ববিদ, অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধীকার কর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন এসব কিছুর প্রধান কারন হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন শিথিল ও দুর্বল হওয়া, আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব, নৈতিক শিক্ষা ও মুল্যবোধের অভাব। যান্ত্রিক এই জীবনে এসবের ফলে বাড়ছে হতাশা। তারা আরো বলছে, পারিবারিক আইন পরিবর্তন ও আরো কঠোর করে অপরাধীদের আরো কঠিন শাস্তি দিলে এ সমস্যার পরিবর্তন হতে পারে। কিন্তু আমরা দেখেছি এই পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার আইন অনেক বার পরিবর্তন করা হয়েছে। তার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন ও রয়েছে। এছাড়া খুন, ধর্ষন, শারীরিক নির্যাতনের জন্য অপরাধীদেরকে ফাসিও দেয়া হচ্ছে, তারপরও সমাধান হয় নি, হচ্ছে না। বরং তা আরো উত্তরোত্তর বৃদ্ধিই পাচ্ছে।

    পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালে পারিবারিক মামলা হয় ১৭ হাজার ৭৫২টি, ২০১১ সালে তা আরো বেড়ে দাড়ায় ২১ হাজার ৩৯৮টি, ২০১২ সালে বেড়ে দারায় ২০ হাজার ৯৪৭ টি, ২০১৩ সালে ১৯ হাজার ৬০৯টি, ২০১৪ সালে বেড়ে দাড়ায় ২১ হাজার ২৯১টি। অর্থাৎ ২০১০-২০১৫ সালের ১৫মে পর্যন্ত শুধু মাত্র পারিবারিক আইনেই মামলা হয়েছে ১লাখ ১৮ হাজার ১৯২ টি। আর হত্যা মামলা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি। পুলিশ দপ্তরের পরিসংখানে দেখা যায় পারিবারিক কলহের জের ধরে প্রতি দিন গড়ে খুন হচ্ছে ১৩ জন, আত্মহত্যা করছে ২৯ জন, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে ৫৭ জন। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এই সকল সমস্যা গুলোর সমাধান করতে গিয়ে আজ বড়ই ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পরেছে। পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারাও তাদের ব্যার্থতা নির্দ্বিধায় স্বীকার করে বলছে “আমরা তো আর পরিবারগুলোর ড্রইংরুমে গিয়ে পাহাড়া দিতে পারব না!” অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ জাবিতে সরকারী দলের এক ছাত্র নেতার সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রিকে টয়লেটে অসামাজিক অবস্থায় পাওয়ার ঘটনায় দেশের ভদ্র পরিবার গুলো যখন লজ্জায় মুখ লুকাচ্ছে, তখন এই সমাজ ব্যবস্থার সর্বোচ্চ শিক্ষা ব্যাক্তিত্ব জাবি ভিসি সাহেব বললেন “এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, এতে বিচলিত হবার কিছু নেই” যেখানে এই সমাজ ব্যবস্থার বাহক সর্বোচ্চ শিক্ষা দাতারা যৌনতাকে পরিবার ও সমাজের জন্য কোন সমস্যাই মনে করেন না সেখানে এই সমাজ ব্যবস্থা কিভাবে আমাদের পারিবারিক সমস্যার সমাধান করবে? আর এভাবেই এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধারক ও বাহক গন সমাধান তো নয়ই বরং আরো উৎসাহিত করে যাচ্ছে সমস্যাগুলোকে।

    এই পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা সম্পদ অর্জনের স্বাধীনতা আর ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা বলে নারী পুরুষ সকলকেই উৎসাহিত করে যাচ্ছে দিনের পর দিন। স্বাধীনতার পিছনে ছুটতে গিয়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে মুক্তি তো পাচ্ছেই না বরং ব্যর্থতা আর হতাশায় অবশেষে ধর্ষণ, খুন আর আত্মহনন কেই শান্তির উপায় হিসাবে গ্রহণ করে নিচ্ছে। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শুধুমাত্র পুঁজি অর্জনের জন্যই দায়বদ্ধ, পারিবারিক শান্তি অর্জনের জন্য নয়। পারিবারিক শান্তি তো দুরের কথা তারা এই পারিবারিক ব্যবস্থাকেই বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এনে দাড় করেছে। এভাবে আর কতদিন? এর কি কোন সমাধান নেই?

    মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    আজকের দিনে আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম, আর আমার নিয়ামত তোমাদের উপর সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য জীবনব্যবস্থা হিসেবে মনোনিত করলাম” (সুরা মায়েদা: ৩)

    ইসলাম ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত জীবনের সকল ক্ষেত্রে পরিপুর্ণ সমাধান দেয়। পারিবারিক সম্পর্কের একমাত্র ভিত্তি হলো আল্লাহ ভীতি। ফলে পরিবারের সকল সদস্য আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে। ইসলাম নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই দৃষ্টি ও লজ্জাস্থান সংযত রাখার নির্দেশ দেয়, ইসলাম যেমন স্বামীর অধিকারে কথা বলে তেমনই স্ত্রীর অধিকার ও নিশ্চিত করার হুকুম করে। ইসলামে যেই নারীর প্রতি তার পিতা দ্বায়িত্বশীল, তার ভাই দ্বায়িত্বশীল, তার স্বামী দ্বায়িত্বশীল, তার সন্তান দ্বায়িত্বশীল সেই নারী কি কখনো নিজেকে অসহায় ভাবতে পারে! আর এভাবেই শরীয়াহ আইন গ্রহণের মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে ওঠে হতাশামুক্ত, শান্তিময় ও পরিপুর্ণ।

    হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেরা বাঁচো এবং তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।” (সুরা আত ত্বাহরীম: ৫)

    পরিবারে শরীয়াহ আইনের বাস্তবায়ন একটি বিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া নয়। পরিবারে ও সমাজে শরীয়াহ আইনের বাস্তবায়নের জন্য সমাজ ব্যবস্থা হিসাবে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা ব্যক্তির মাঝে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলবে, আল্লাহ ভীতি ও তাকওয়া গড়ে তুলবে, জীবনের সর্বশেষ গন্তব্য জান্নাত-জাহান্নাম সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে। আল্লাহর দেয়া এই ক্ষণিকের দুনিয়ায় মরীচিকার মত পুঁজির পিছনে ছুটে চলাকে , মিথ্যা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে তখন তারা তুচ্ছ মনে করবে। আল্লাহর শরীয়াহ আইন দ্বারা নিজের জীবন, পরিবার জীবন পরিচালিত করবে।

    ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা ব্যতিত এই দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। একমাত্র ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই পারে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ জীবনের প্রত্যেক ক্ষেত্রে ইসলামের শরীয়াহ আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে শান্তি নিশ্চিত করতে। সুতরাং পরিবার বা সমাজ জীবনের সকল প্রকার কলহ দূর করতে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই।

    হে ঈমানদারগণ; আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসুলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা (ইসলামের ব্যাপারে) কর্তৃত্বশীল তাদের; অনন্তর যদি তোমরা কোন বিষয়ে পরস্পর দ্বিমত হও, তবে ঐ বিষয়কে আল্লাহ ও তার রাসূলের উপর ছাড়িয়া দাও, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি এবং কিয়ামত দিবসের প্রতি ঈমান রাখ।” (সুরা নিসা: ৫৯)

    আল্লাহ আমাদেরকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে পারিবারিক সকল কলহ থেকে মুক্তি দান করুন। আমিন।