Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • আত-তোঈফা আয-যোহেরা তথা বিজয়ী দল সম্পর্কে ব্যাখ্যা

    আত-তোঈফা আয-যোহেরা তথা বিজয়ী দল সম্পর্কে ব্যাখ্যা

    প্রশ্ন: আত-তোঈফা আয-যোহেরা (বিজয়ী দল) সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে। এ হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা কী? এগুলো কি উসূলের আলেম কিংবা হাদীসের আলেমগণ সম্পর্কে বলা হয়েছে – যেমনটি কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেছেন? এছাড়াও, আমরা মাঝে-মধ্যে শুনি যে অমুক বা তমুক দল হচ্ছে বিজয়ী দল – এক্ষেত্রে আমাদের ব্যাখ্যা কী হওয়া উচিত? আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন।

    উত্তর:

    আলোচনাটি আমি দুটি অংশে করবো,

    ১. প্রথমত এই হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা
    ২. (আমাদের জীবনে) হাদীসগুলোর প্রয়োগ

    বিজয়ী দল (الطائفة الظاهرة) সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস রয়েছে। 

    বুখারীতে বর্ণিত আল মুগীরাহ ইবনে শু’বাহ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

     لاَ يَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ

    “আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল থাকবে যারা বিজয়ী থাকবে, যতক্ষন না তাদের জন্য আল্লাহর আদেশ চলে আসে এবং তারা সেসময় বিজয়ী বেশে থাকবে”।

    মুসলিমে বর্ণিত ছাওবান বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ

    “আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে, যারা তাদের ত্যাগ করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা, যতক্ষন না পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ তাদের উপর এসে পৌঁছায় এবং তারা সে অবস্থায় বিদ্যমান রয়েছে।

    মুসলিমে বর্ণিত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ قَالَ فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ تَعَالَ صَلِّ لَنَا فَيَقُولُ لاَ إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ تَكْرِمَةَ اللَّهِ هَذِهِ الأُمَّةَ

    আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল কিয়ামত পর্যন্ত বিজয়ী বেশে সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে। তিনি (সা) বলেন: অতঃপর ঈসা ইবন মারইয়াম (সা) নেমে আসবেন, অতঃপর তাদের নেতা তাকে বলবে, আসুন, (ইমাম হিসেবে) আমাদের সালাত পড়ান। সে বলবে, নিশ্চয়ই তোমরা একে অপরের উপর নেতৃবৃন্দ, এটি এই উম্মতের জন্য সম্মানস্বরূপ।

    মুসলিমে বর্ণিত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    وَلاَ تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ الْمُسْلِمِينَ يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَة

    মুসলিমদের মধ্য হতে একটি গোষ্ঠী কিয়ামতের আগ পর্যন্ত তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী বেশে সবসময়ই সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে।

    মুসলিমে বর্ণিত উকবা বিন আমের বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    لاَ تَزَالُ عِصَابَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى أَمْرِ اللَّهِ قَاهِرِينَ لِعَدُوِّهِمْ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ حَتَّى تَأْتِيَهُمُ السَّاعَةُ وَهُمْ عَلَى ذَلِكَ

    আমার উম্মত হতে একটি গোষ্ঠী সবসময়ই আল্লাহর আদেশের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না তাদের উপর (কিয়ামতের) সেই সময় এসে পৌঁছায় এবং তারা (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে।

    মুসলিমে বর্ণিত মু’আবিয়াহ বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي قَائِمَةً بِأَمْرِ اللَّهِ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَذَلَهُمْ أَوْ خَالَفَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ ظَاهِرُونَ عَلَى النَّاسِ

    আমার উম্মত হতে একটি দল সবসময়ই আল্লাহর আদেশের উপর কায়েম থাকবে। যারা তাদের পরিত্যাগ কিংবা বিরোধিতা করবে, তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না আল্লাহর আদেশ চলে আসে এবং তারা সেসময় মানুষের উপর বিজয়ী বেশে বিদ্যমান রয়েছে।

    তিরমিযিতে বর্ণিত ছাওবান বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

     لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ يَخْذُلُهُمْ حَتَّى يَأْتِيَ أَمْرُ اللَّهِ

    “আমার উম্মাহর মধ্যে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে, যারা তাদের ত্যাগ করবে তারা তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবেনা, যতক্ষন না পর্যন্ত আল্লাহর আদেশ তাদের উপর এসে পৌঁছায়।

    আবু দাউদে বর্ণিত ইমরান ইবনে হাসসিন বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يُقَاتِلَ آخِرُهُمُ الْمَسِيحَ الدَّجَّالَ

    আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী রইবে, এমনকি তাদের সর্বশেষ অংশ আল-মাসীহ আদ-দাজ্জাল এর সাথে লড়াই করবে। 

    জাবির ইবন আবদুল্লাহ হতে আহমদ বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ

    কিয়ামতের আগ পর্যন্ত আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে।

    আহমদ বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ لَعَدُوِّهِمْ قَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ خَالَفَهُمْ إِلاَّ مَا أَصَابَهُمْ مِنْ لأْوَاءَ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيْنَ هُمْ؟ قَالَ: بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ وَأَكْنَافِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ

    আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর (অটল) থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। কেবলমাত্র (এ পথে) যতটুকু তাদের কষ্ট ভোগ করতে হয় তা ছাড়া যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের অন্য কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, যতক্ষন না তাদের উপর আল্লাহ আদেশ এসে পৌছায় এবং তারা সেসময় (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে। তারা বললো: হে আল্লাহর রাসূল, তারা কোথায় (অবস্থান করবে)? তিনি (সা) বললেন, বাইতুল মাকদিস ও বাইতুল মাকদিসের পরিপার্শ্বে।

    আত-তাবারানি আল-কাবীর এ বর্ণনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    لاَ تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ عَلَى مَنْ يَغْزُوهُمْ قَاهِرِينَ لاَ يَضُرُّهُمْ مَنْ نَاوَأَهُمْ حَتَّى يَأْتِيَهُمْ أَمْرُ اللَّهِ وَهُمْ كَذَلِكَ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَأَيْنَ هُمْ قَالَ بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ

    আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি দল বিজয়ী বেশে সত্যের উপর (অটল) থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরতদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে। যারা তাদের বিরোধিতা করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতিই করতে পারবে না যতক্ষন না তাদের উপর আল্লাহর আদেশ এসে পৌঁছায় এবং তারা (তাদের অবস্থানে) অবিচল রয়েছে। বলা হলো: হে আল্লাহর রাসূল, তারা কোথায় (অবস্থান করবে)? তিনি (সা) বললেন, বাইতুল মাকদিসে।

    আহমদ বর্ণিত আবু উমামা’র হাদীসে বাইতুল মাকদিসের কথা উল্লেখ আছে, এবং একই কথা আত-তাবারানি বর্ণিত একটি অনুরূপ হাদীস উল্লেখ রয়েছে। আর আত তাবারানির আল-আওসাতে আবূ হুরাইরা কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها، وعلى أبواب بيت المقدس وما حوله، لا يضرهم من خذلهم ظاهرين إلى يوم القيامة

    তারা দামেশ্ক এর দরজায় ও এর আশেপাশে যুদ্ধরত অবস্থায় রইবে এবং যুদ্ধরত রইবে বাইতুল মাকদিসের দরজায় ও এর আশেপাশে। তাদের যারা পরিত্যাগ করবে তারা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, তারা কিয়ামত পর্যন্ত বিজয়ী বেশে রইবে। [ফাতহুল-বারি]

    لا تزال عصابة من أمتي يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها وعلى أبواب بيت المقدس وما حولها، لا يضرهم خذلان من خذلهم ظاهرين على الحق إلى أن تقوم الساعة

    আমার উম্মত হতে সবসময়ই একটি গোষ্ঠী দামেশ্ক এর দরজায় ও এর আশেপাশে লড়াই চালিয়ে যাবে এবং লড়াই চালিয়ে যাবে বাইতুল মাকদিসের দরজায় ও এর আশেপাশে। তাদের পরিত্যাগকারীদের পরিত্যাগ তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, (বরং কিয়ামতের) সে সময় কায়েম হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা সত্যের উপর বিজয়ী বেশে (অটল) থাকবে।

    হাদীসগুলোর দিকে তাকালে দেখবো:

    ১. এগুলো উম্মাহ’র একটি অংশের দিকে নির্দেশ করে, সমগ্র উম্মাহ নয়। এটা এই কারণে তা’ঈফা শব্দের ভাষাগত অর্থই হলো কোন কিছুর অংশ এবং প্রত্যেক বিষয়ের একটি অংশকে উক্ত বিষয়ের তা’ঈফা বলা হয়। কামুসে বলা হচ্ছে: (والطائفة من الشيء: القطعة منه) এবং কোন কিছুর তা’ঈফা হলো এর একটি অংশ।

    ২. এটি সত্য তথা ইসলামের উপর দৃঢ় থাকবে। হাদীসগুলোতে আমরা দেখতে পাই, “قائمة بأمر الله” অর্থাৎ আল্লাহ’র আদেশের উপর কায়েম থাকা।

    ৩. তাঁরা সত্যের উপর থেকে আল্লাহ’র পথে লড়াই করবে (يقاتلون على الحق), তাঁরা সত্যের উপর (অটল) থেকে লড়াই করবে (يقاتلون على أمر الله), অর্থাৎ তাঁরা আল্লাহ’র আদেশ অনুযায়ী লড়াই করবে।

    ৪. এই একই শক্তি ও ক্ষমতার বলেই তারা শত্রুর সাথে লড়াই করবে, তাদের চূড়ান্তভাবে পরাভূত করবে এবং স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান বিজয় নিশ্চিত করবে।

    يقاتلون على الحق ظاهرين على من ناوأهم

    তাদের বিরোধীদের উপর বিজয়ী বেশে সবসময়ই সত্যের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে।

    يقاتلون على أمر الله قاهرين لعدوهم

    আল্লাহর আদেশের উপর থেকে লড়াই চালিয়ে যাবে, তাদের শত্রুদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে রইবে।

    ৫. নিশ্চয়ই এই দল, (يقاتلون على أبواب دمشق وما حولها وعلى أبواب بيت المقدس وما حوله) দামেস্কের দুয়ার ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা এবং বাইতুল মাকদিসের দুয়ার ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় লড়াই করবে। অর্থাৎ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং আশ-শাম ও তদসংলগ্ন অঞ্চলে বিজয়ী বেশে আবির্ভুত হবে। 
     
    (হাদীসসমূহ হতে) এসব বর্ণনাসমূহ এই দলের ব্যাপারে এটি নির্দেশ করে, এ দলটি ইসলামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত, তার (তথা ইসলামের) জন্যই যুদ্ধ করবে, এবং শত্রুদের নিশ্চিতরূপে পরাস্ত করার মত ক্ষমতা এদের রয়েছে। রাষ্ট্রের শত্রু ও সেনাবাহিনীর কথা বিবেচনায় রেখে, এই বিজয়ী দলকে অবশ্যই কোনো মুসলিম দেশের মুসলিম সেনাবাহিনী হতে হবে, যা খলীফাহ কিংবা কোনো সেনাপ্রধান দ্বারা পরিচালিত হবে, তারা শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করবে, তাদের উপর বিজয়ীবেশে তাদের পরাভূত করে তাদের উপর কর্তৃত্ব করবে। এবং এটি আশ-শাম এবং তার আশেপাশের এলাকা থেকে শুরু হবে এবং এখান থেকেই রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী শত্রুদের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধ চালিয়ে তাদের হারাবে এবং কর্তৃত্ব করবে। উদাহরণস্বরূপ; এ দল হতে পারে (মুসলিম) রাষ্ট্রের নিজস্ব অংশ ও সেনাবাহিনী যারা শত্রুদের উপর বিজয়ী হবে, তাদের পরাভূত করবে এবং কর্তৃত্ব স্থাপন করবে, অথবা এ দল তাঁরা যারা (মুসলিম) রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর জন্য শত্রুকে পরাভূত করে, বিজয়ী হয়ে দ্বীনের কর্তৃত্ব স্থাপনের কাজ করে চলেছে।

    এটি রাসূল (সা) এবং সাহাবীদের (রা) সময়ে শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব করার বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

    এমনকি এটি ইসলামের স্বর্ণযুগে শত্রুদের হারানো, তাদের উপর কর্তৃত্ব করা এবং এটি প্রত্যেক খলীফাহ এবং মুসলিম সেনাপ্রধান কর্তৃক শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা, তাদের হারানো, পরাস্ত করা কিংবা তাদের উপর কর্তৃত্ব করার বিষয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

    এটা সালাহউদ্দিন ও তাঁর সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্রুসেডারদের হারানোর ঘটনা, এছাড়াও এটি (সাইফুদ্দিন) কুতুয ও (জহির উদ্দিন) বাবর কর্তৃক তাঁতারদের উপর বিজয় লাভ করার ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

    বিষয়টা আমাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, কারণ আমরা একটি শক্তিশালী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি – যা হল একটি সঠিকভাবে পরিচালিত খিলাফাহ — কাফের শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবার জন্য, তাদের পরাস্ত করার জন্য, তাদের উপর কর্তৃত্ব করে বিজয়ী শক্তিরূপে উথিত হবার জন্য। সুতরাং, ইহুদী রাষ্ট্রকে উচ্ছেদ করবে এবং প্রতিশ্রুত রোম বিজয় করবে। এটি হতে পারে এবং এটিই সম্ভাব্য।

    সুতরাং, বিষয়টি সেসব দলের জন্য প্রযোজ্য হবেনা যারা কোন রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিহীন (অবস্থায় রয়েছে) এবং শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছে। কারণ বিজয়ী দল (তথা তাঈফাতুয যাহেরা)-এর বর্ণনা অনুযায়ী তারা শুধুমাত্র শত্রুদের সাথে লড়াই করবে না, বরং শত্রুদের পরাস্তও করবে। আর একটি রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী ব্যতিত শত্রুরাষ্ট্র ও তাদের সেনাবাহিনীকে হারিয়ে, পরাস্ত করে, তাদের উপর কর্তৃত্ব স্থাপন করা সম্ভব নয়। একইভাবে, আলোচ্য বিষয়টি দ্বারা এমন কোন দলকে বোঝায়না যারা একটি ইসলামী রাষ্ট্র – তথা খিলাফত – প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে না, কারণ তারা শত্রুরাষ্ট্র ও (তাদের) সেনাবাহিনীকে পরাভুত করতে পারবে না। শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করা এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব করা— এটিই হল এই বিজয়ী দলের মৌলিক বিবরণ, হোক তা ইতোমধ্যে প্রায়োগিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অথবা (দল কর্তৃক) তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ চলছে।

    এছাড়া এ বিষয়টি হাদীস কিংবা উসূলের আলেমদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবেনা যদিনা তাঁরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করেন, যে রাষ্ট্রটি শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের হারাবে এবং বিজয়ী হবে।

    সহীহ আলা-বুখারীতে বর্ণিত রাসূল (সা) এর হাদীসে,

    لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق يقاتلون وهم أهل العلم

    অর্থ্যাৎ, আমার উম্মতের মধ্যে একটি দল থাকবে যারা সর্বদা সত্যের উপর থেকে লড়াই করে বিজয়ী রইবে এবং তাঁরা হলেন আহলুল-ইলম (তথা আলেমগণ)।

    হাদীসের এই অংশটি (وهم أهل العلم) ‘তাঁরা হলেন আহলুল-ইলম’ হাদীসের বর্ণনাকারীর বক্তব্য, রাসূল (সা) এর নয়। এ ব্যাপারে ফাতহুল বারীতে ইমাম আসকালানি বলেছেন, “বর্ণনায় আসা ‘তাঁরা হলো জ্ঞানের ব্যক্তিগণ’ এটা বর্ণনাকারীর বক্তব্য”।

    উল্লেখ্য যে, যে দলই আন্তরিকভাবে শত্রুদের মোকাবেলা করবে, তাঁরা পুরস্কৃত হবে, যদি তারা শত্রুদের উপর কর্তৃত্ব করতে নাও পারে, তাদের হারাতে না পারে অথবা তাদের উপর বিজয়ী নাও হয়। এমনকি শত্রুর সাথে যুদ্ধটা যদি একাও হয় এবং একনিষ্ঠতার সাথে হয়, তবে তাতেও পুরষ্কার আছে। এবং কোনো দল যদি কোন কল্যাণের কাজে নিয়োজিত থাকে, তাতে পুরস্কার রয়েছে, এমনকি যদি তা যেকোনো একজন ব্যক্তির কাজও হয়। এবং কোন দল যদি ইসলামী জ্ঞানের কাজে নিয়োজিত থাকে, হোক তা উসূল কিংবা হাদিসের জ্ঞান অন্বেষণ, তাতে পুরষ্কার রয়েছে, যদি এসব কাজে শুধুমাত্র একজন ব্যক্তির কৃতিত্বও থাকে। তবে এটি কোনো দলকে সফলকাম দল (তথা তা’ঈফা আয-যাহেরা) হিসেবে বর্ণনা করার বিষয়ের ক্ষেত্র নয়।

    কোন একটি দলকে ‘সফলকাম দল’ (তথা তা’ঈফা আয-যাহেরা) বলার জন্য রাসূল (সা)-এর বর্ণিত হাদীসসমূহের আলোকে তা মিলিয়ে দেখা জরুরী।

    হাদীসগুলোকে একত্রিত করে, অনুধাবন করে যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তা ইতোপূর্বে উল্লেখ্য করা হয়েছে। এবং এটি আমি তারজীহ (outweigh) করেছি এবং সঠিকভাবে মত পোষণ করেছি।

    আর বাক্যাংশে لا يزال ‘সবসময়ই থাকবে’ এর অর্থ এই নয় যে, এর মাঝে কোন বিরতি থাকবেনা, বরং এর মানে হল কেয়ামতের আগ পর্যন্ত তারা ক্রমাগতভাবে শত্রুদের উপর প্রভাবশালী হবে। অর্থাৎ বিষয়টি এরকম নয় যে শত্রুদের উপর তাদের বিজয় কেবলমাত্র একবার এবং এরপর শত্রু ফিরে এসে আমাদের চিরতরে পরাজিত করবে বরং পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত আমাদের বিজয় ক্রমাগত ভাবে চলতে থাকবে। এটিই ঘটেছিল যখন আমরা কুফ্ফারের উপর বিজয়ী ছিলাম, এবং ইসলামের (সোনালী) দিনগুলোতে তাদের উপর জয়লাভ করেছিলাম অতঃপর আমরা (কোনো যুদ্ধে) পরাজিত হতাম এবং আবার জয়ী হতাম এবং এ দিনগুলো আমরা আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী একের পর এক (আবর্তিত বাস্তবতা হিসেবে) পেতাম এবং এরপর ক্রুসেডারদের আগমন ঘটল এবং তারা পরাজিতও হল, এবং এরপর এলো তাতাররা এবং তারাও পরাজিত হল, এবং এরপর আমরা দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম এবং এরপর আমরা আবার ফিরে এলাম এবং কনস্টান্টিনোপল বিজয় করলাম এবং এটি ইস্তাম্বুল (তথা ইস্লাম্বুলে) পরিনত হল……… এবং এটি খিলাফত এর উপর (দায়িত্ব), আল্লাহ্‌র নির্দেশে যখন তা আবার ফিরে আসবে, এটি ইহুদীদের অস্তিত্ব নির্মূল করবে, যা ফিলিস্তিন দখল করে আছে, এবং তা (অর্থাৎ খিলাফত) রোম বিজয় করবে আল্লাহ্‌র নির্দেশে, এবং এই বর্ণিত দল ও এর শেষ সদস্যটি দাজ্জালের সাথে যুদ্ধ করা পর্যন্ত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এখানে এটি উল্লেখ্য যে পুনরুত্থান দিবসের আগে ইসা (আ) এর আগমন সংক্রান্ত হাদীসটিতে বর্ণিত আছে যে, উনি একটি রাষ্ট্র ও একজন আমীর পাবেন, এরপর শত্রুদের উপর তারা সন্দেহাতীত ও সুনিশ্চিতরূপে বিজয় লাভ করবে।

    সুতরাং ‘সবসময়ই থাকবে’ এর অর্থ এটা নয় যে এদের মাঝে কোন বিরতি থাকবেনা, কিন্তু এর অর্থ হল যে পৃথিবীর (আগত সময়কালের) কোনো পর্যায়ই শত্রুদের বিপক্ষে মুসলিমদের বিজয়বিহীন থাকবে না। নিশ্চিতরূপে ও অনুরণিত হয়ে (সারা পৃথিবীতে) পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত তা হতে থাকবে।

    এটি অনেকটি বুখারীতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সেই হাদীসের মতো: 

    لن يزال أمر هذه الأمة مستقيماً حتى تقوم الساعة

    সবসময়ই এই উম্মতের অবস্থা সঠিকরূপে (তথা ন্যায়পরায়নভাবে) কায়েম থাকবে, (কিয়ামতের প্রারম্ভিক ধ্বংসের) সেই সময় আসা পর্যন্ত।

    এর অর্থ এটা নয় যে এই উম্মাহর মধ্যে ন্যায়পরায়ণতা সবসময় থাকবে, যথা, বিবিধ সময় এটি ব্যাহত হয়েছে, যেমন খিলাফাহ ধ্বংসের পর থেকে।

    এর অর্থ হল কিয়ামতের আগ পর্যন্ত এ দুনিয়াতে এই উম্মাহ কখনোই ন্যায়পরায়ণতা ছাড়া থাকবেনা, এই উম্মাহ একেবারেই কুটিল (তথা অন্তঃসারশূণ্য) হয়ে যাবে এবং ন্যায়পরায়ণতায় আর ফিরে আসবেনা – এমনটি নয়। যখন তার খিলাফতের পতন ঘটে তখন তার (ন্যায়পরায়নতার) অবস্থাও প্রস্থান করে, আর পুনরুত্থান দিবসের আগ পর্যন্ত যখনই কুটিলতা ফেরত আসবে, তখনই উম্মাহর মাঝে ন্যায়পরায়নতাও ফিরে আসবে।

    এটিই হচ্ছে উত্তরের প্রথম অংশ, এবং এই বিষয়ে এটিই হল তা যা আমি দলীলের ওজন মাপের মাধ্যমে বের করেছি, তবে এক্ষেত্রে যে অন্য ব্যাখ্যা থাকতে পারে, সে সম্ভাবনা আমি বাতিল করে দিচ্ছি না। তবে দলীলের ওজনের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি এটিই সঠিক।

    আলোচনার দ্বিতীয় অংশ হিসেবে, এই হাদীসগুলোর আমাদের জীবনে প্রয়োগের প্রেক্ষিতে:

    এসকল হাদীসমূহ আমাদের প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা আবশ্যক, যেভাবে সাহাবা (রা) এবং যারা তাদের উত্তমরূপে অনুসরণ করেছেন তাঁরা রাসূল (সা)-এর এই হাদীসসমূহকে দেখেছেন, যেগুলো ওয়াদা করছে এবং সেসব বিষয় অবহিত করছে যা মুসলিমদের জন্য কল্যাণ বহন করে। যথা, যখন তাঁরা কনস্টান্টিনোপল বা রোম জয় সংক্রান্ত হাদীসগুলো শুনতেন বা পড়তেন, তাঁদের মধ্যে সবাই আগ্রহী হয়ে উঠতেন যাতে করে এ ওয়াদা তাঁদের হাতেই পূরণ হয়, যতক্ষণ আল্লাহ্‌ এ রহমত ও অনুগ্রহ প্রথমবারের মতো মুহাম্মদ আল ফাতিহ’র উপর পতিত করার ব্যাপারে সন্তুষ্ট হন, যা পরবর্তীতে ইস্তাম্বুলে পরিনত হয়। সুতরাং যখন তাঁরা এ হাদীস শুনেন তখন তাঁরা এ হাদীসের বাস্তবতাকে আবির্ভুত করার উদ্দেশ্যে পরিশ্রম শুরু করার ব্যপারে একমত হন এবং তাঁরা সে কল্যাণটি অর্জন করতে সক্ষম হন, যেখানে আল্লাহ্‌ তার (রাসূলের মাধ্যমে) কন্সট্যান্টিনোপল বিজয়ের ব্যাপারে বলেন;

    نعم الأمير أميرها ونعم الجيش ذلك الجيش

    “কতই না চমৎকার সেই আমীর এবং সেই সেনাবাহিনী”

    অনেক খলীফা কনস্টান্টিনোপল জয় করতে সেনাবাহিনী পাঠিয়েছেন এবং অনেক সাহাবাও, যতদিন পর্যন্ত না তাঁরা বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। যেমন আবু আইয়ূব (রা) প্রমুখও এই মহান অনুগ্রহ অর্জন করার জন্য এই সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

    এটিই বিজয়ী দলের ব্যাপারে হাদীসের বিষয়। সুতরাং যখন রাসুল (সা) এই ব্যাপারে আমাদের অবহিত করেছেন এবং এর অনুগ্রহ ঘোষণা করেছেন যে তা শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাদের উপর বিজয় লাভ করবে, তাদের পরাস্ত করবে এবং সুনিশ্চিতভাবে তাদের উপর বিজয়ী হবে, তা ইসলামি রাষ্ট্র ও মুসলিম সেনাবাহিনী ছাড়া সম্ভব হবে না, যারা কাফির রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীকে পরাজিত করবে। সুতরাং আমাদের ইসলামী রাষ্ট্র তথা সঠিকপথপ্রাপ্ত খিলাফত প্রতিষ্ঠার পথে অবিরত সহায়তা এবং চেষ্টা ও সংগ্রাম বাড়াতে হবে, যাতে আমরা এই তার সেনাবাহিনীতে থাকতে পারি এবং শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করতে পারি, তাদের পরাস্ত করতে পারি, তাদের উপর বিজয়ী হতে পারি এবং সন্দেহাতীত ও সুনিশ্চিতভাবে তাদের উপর কর্তৃত্ব করতে পারি। সুতরাং, তাহলেই আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে আশা করি যাতে আমরা সে দলের অন্তর্ভুক্ত হই যাদের কথা রাসূল (সা) তাঁর মহান হাদীসে বর্ণনা করেছেন।

    এরপর যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, বিষয়টি এমন নয় যে আমরা অমুক দলকে সফলকাম দল বলবো অথবা আমরা বলবো এই দল কিংবা ঐ দল হচ্ছে বিজয়ী দল। মূল বিষয়টি হচ্ছে, যে বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হতে পছন্দ করে তাকে সে দল সম্পর্কে যা বর্ণনা দেয়া হয়েছে, তা অর্জন করতে কাজ করতে হবে। সুতরাং, তাকে ইসলামী রাষ্ট্র ও ইসলামী সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করতে কাজ করতে হবে যেটা কাফির শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করবে যেমন আমেরিকা, বৃটেন ও ইহুদি ইত্যাদি, এবং তাদের হারাবে, তাদের উপর বিজয়ী হয়ে কর্তৃত্ব স্থাপন করবে। এবং এটিই নির্দেশ করে যে সে ওই বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত, সুতরাং যে ইচ্ছা পোষণ করে যে সে বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হোক, তার যা কিছু আছে তা দিয়ে তাকে কাজ করে যেতে হবে আল্লাহ্‌র অনুমতিক্রমে, শত্রুদের (শক্তি) গুড়িয়ে দেয়া (হাদীসের সেই) বর্ণনা অর্জন করতে, বিজয় লাভ করতে এবং তাদের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করতে।

    আমরা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে দুয়া করি যাতে করে আমরা সেই বিজয়ী দলের অন্তর্ভুক্ত হই, যারা সৎপথপ্রাপ্ত ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রকে প্রত্যক্ষ করবে এবং যাতে করে আমরা ইসলামী সেনাবাহিনীর অংশ হতে পারি যারা শত্রুদের হারাবে, তাদের পরাস্ত করবে এবং তাদের উপর বিজয়ী ও সফলকাম হবে।

    এবং আল্লাহ্‌ তাদেরকেই সাহায্য করেন যারা তাঁকে সাহায্য করে এবং তিনি (القوي) পরম শক্তিশালী, (العزيز) পরাক্রমশালী।

    আতা ইবনু খালীল আবু আর-রাশতা
    ৭ রমজান ১৪২৫
    ২১/১০/২০০৪

  • খিলাফতই নিপীড়িত মুসলিমদের একমাত্র সমাধান

    খিলাফতই নিপীড়িত মুসলিমদের একমাত্র সমাধান

    গত ৮ই মে এখন পর্যন্ত থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকে অন্তত ২ হাজার ৭৩০ জন অভিবাসীদর উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বাইরে সাগরে ভাসমান অবস্থায় আছে আরও প্রায়ই চার হাজার মানুষ, জাতিসংঘের শরনার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR), আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IMO) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে জানা যায় ১১ দিনে প্রায় তিন হাজারেরও অধিক রোহিঙ্গা মুসলিমকে উদ্ধার করা হয়েছে যাদের মধ্যে অনেকেই মারা গেছে, অনেকে মরনাপন্ন অবস্থায়, অনেকে সাগরে নিখোঁজ হয়েছে এবং আরও চার হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা মুসলিম সাগরে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। যাদের মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি শিশু রয়েছে এবং যাদের বয়স ১ বছরেরও নিচে। শত শত মুসলিমকে থাইল্যান্ড ও মালেশিয়াতে জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছে, বহু নারীকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছে। 

    আমাদের জানা উচিত, কারা এই রোহিঙ্গা এবং কেন তারা আজ সাগরে অজানা উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাচ্ছে। মূলত, একহাজার বছর আগে সুদূর আরব থেকে আসা এই মুসলিমরা আজ রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। ১৮০০ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে ব্রিটিশ উপনিবেশের হাতে চলে যায় বর্তমান আরাকান অঞ্চল। যে জায়গায় মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের বসবাস ছিল। তখন থেকেই ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বিভিন্নভাবে এই রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর নির্যাতন চালাতো এবং যা পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা উপমহাদেশকে ভাগ করে দিয়ে চলে যাওয়ার পর আরো প্রকটরূপ ধারন করে। তৎকালীন বার্মা সরকার না তাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছিল না ‘মুসলিমদের রাষ্ট্র’ নামধারী (!) তৎকালীন পাকিস্তান তাদের স্বীকৃতি দেয়। যার দরুন এই রোহিঙ্গা মুসলিমরা মাঝখানে পরে অভিভাবকহীন এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। এক কঠিন কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে শুরু করে, যা আজ অবধি চলছে, না তাদেরকে ঐ সময় উপযুক্ত বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে না আজ কারা হচ্ছে। যার ফলে আজ তাদের এই পরিণতি। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যে অজানা পথে পাড়ি দিচ্ছে। আর দীর্ঘদিন ধরে এই একই অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এই মুসলিম সম্প্রদায়। যখনই তাদের নিয়ে এই রকম সংকট তৈরি হয় তখনই আমরা দেখি জাতিসংঘের (UNHCR) কিংবা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (IMO) বিভিন্ন দেশের প্রতি রোহিঙ্গাদের শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় দেওয়ার প্রস্তাব দেয় কিন্তু কোন দেশই তা পাত্তা দেয়না। কিন্তু এর মাধ্যমে কি তারা মূল সমস্যার কোনো সমাধান করতে চায় নাকি তাদেরকে আরো জটিলতার দিকে ঠেলে দিতে চায় নাকি বিশ্বের কাছে মুরুব্বি সাজতে চায়। আর সম্প্রতি যখন হিংস্র বোদ্ধ ভিক্ষুরা রোহিঙ্গাদের অত্যাচার করতে লাগল, মায়ানমার সেনাবাহিনী তাদের পাইকারি হারে হত্যা করতে লাগল এবং সেসময় বাংলাদেশের যালিম সরকার যখন তাদের আশ্রয় দিতে রাজী হল না, তখন তারা থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, ইন্দেনেশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করে এবং তারই ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমদের গণকবর থাইল্যান্ড-মালেশিয়াতে পাওয়া যাচ্ছে। তখনই মুসলিম বিশ্ব টের পেতে শুরু করে যে এই মুসলিমদের পরিণতি কী হচ্ছে। এমনকি বিশ্ব মুসলিম নেতা নামধারী মাহাতির মোহাম্মদের দেশ মালয়শিয়াও তাদের আশ্রয় দিলনা, দিলনা ইন্দোনেশিয়ার সরকার, যার কারণে হাজার হাজার মুসলিম মৃত্যু বরন করল। পরবর্তিতে যখন বিষয়টি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা-মিডিয়াতে মানবেতরভাবে উপস্থাপিত হলো, তখন ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া ও থাইল্যান্ড সরকার সাময়িক ভাবে তাদের আশ্রয় দেয় যা আদৌতে কোন সমাধান নয়।

    তাহলে প্রশ্ন আসে সমাধান কোথায় এই মুসলিমদের সমাধান? এই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সমাধান দেয় আল্লাহর প্রেরিত ও আমাদের জন্য মনোনীত জীবনবিধান ইসলাম। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “তোমার আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (আল ইমরান, ৩: ১০২)

    অর্থাৎ ঐক্যবদ্ধ থাকা মুসলিম উম্মাহর জন্য ফরয এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হওয়া হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আয়াত ও রাসুল (সা) এর বহু হাদীস থেকে একথা স্পষ্ট যে, মুসলিমরা এক উম্মত অর্থাৎ ভাষা, জাতি-রাষ্ট্র ইত্যাদির ভিত্তিতে মুসলিমদের বিভক্ত করা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-এর নির্দেশনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। রাসূল (সা) জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে বলেন,

    একে ত্যাগ কর, এটা পঁচে গেছে। (বুখারী)

    তৎপরিবর্তে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    “আর এভাবেই আমরা তোমাদেরকে একটি ন্যায়পরায়ণ উম্মত করেছি যাতে তোমরা মানবজাতির জন্য সাক্ষী হতে পারো এবং রাসূ হবে তোমাদের জন্য একমাত্র সাক্ষী (সুরা বাকারা ২:১৪৩)

    কিন্তু ভাইয়েরা আজ আমরা এই সবগুলো কুরআনের আয়াত ও হাদীসের বিপরীতে অবস্থান করছি যার দরুন আমাদের ভাইয়েরা যখন ধুকে ধুকে মরছে তখন আমরা কেউই তাদেরকে আশ্রয় দিচ্ছি না বরং আমরা জাতীয়তাবাদের ভিত্তি থেকে আমরা বলছি আমরা বাংলাদেশি, তারা রোহিঙ্গা অথচ তাদের বিশ্বাস আর আমাদের বিশ্বাসের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই আমরা উভয়ই এক আল্লাহ ও তার রাসূল (সা) কে বিশ্বাস করি।

    তাই একমাত্র শাসনব্যবস্থা খিলাফত ফিরিয়ে আনার মাধ্যমেই আমরা সমগ্র মুসলমান জাতি আবার ঐক্যবদ্ধ হতে পারি এবং এক খলীফার নেতৃত্বে আমরা আমাদের সকল সমস্যার সমাধান আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম দিয়ে করতে পারি। কারণ, রাসূল (সা) বলেন, 

    ‘নিশ্চয়ই, ইমাম (খলীফা) হচ্ছেন ঢাল স্বরূপ যার পেছনে থেকে যুদ্ধ করা হয় এবং যার মাধ্যমে (জনগণ) সুরক্ষা পায়। [মুসলিম]

    তিনি(সা) আরো বলেন, 

    খলীফা হচ্ছে দুনিয়াতে আল্লাহর ছায়া”। (তাবারানী)

    অর্থাৎ খলীফা রোহিঙ্গা মুসলিম ভাইদের বিপদে সবার আগে এগিয়ে যাবে এবং তাদের সকল মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে যেভাবে অতীত খিলাফতের ইতিহাসে খলিফারা যখনি মুসলিম জনগণের সাথে অন্যায় হয়েছে তখনই তাদের রক্ষায় এগিয়ে গিয়েছে, এমনকি অমুসলিমদেরও পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। খলীফা এই রোহিঙ্গা মুসলিম ভাইদেরকে খিলাফাহ্ রাষ্ট্রের পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করবেন এবং তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন সেইভাবে মুসলিম বিশ্বের অব্যবহারিত ও অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকা লক্ষ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা বসবাসের জন্য তাদের মাঝে বণ্টন করে দিবেন, কারণ ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্রে প্রতিটি জমির মালিকের জন্য তার জমির যথাযথ ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এ কাজের জন্য অভাবী ব্যক্তিদের বাইতুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য দেয়া হবে। কেউ যদি তার জমি তিন বছরের অধিক সময় অব্যবহারিত অবস্থায় ফেলে রাখে তবে তার নিকট হতে তা নিয়ে অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে দেয়া হবে।

    ফয়সাল রহমান

  • রুটি রুজির সংগ্রাম, মরে চলি অবিরাম

    রুটি রুজির সংগ্রাম, মরে চলি অবিরাম

    গত ১১ই মে ২০১৫ তারিখে মালয়েশিয়া সমুদ্র উপকূলে চারটি নৌযান থেকে ১ হাজার ৪০০ অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে এরা সবাই মিয়ানমার ও বাংলাদেশের নাগরিক। গত কয়েকদিন ধরেই থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূলের জঙ্গল থেকে এমন কয়েকশত রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি উদ্ধার করা হয়। সম্প্রতি থাই নিরাপত্তারক্ষীদের তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাচারকারীরা অভিবাসীবাসীদের জঙ্গলে গোপন ঘাঁটিতে না এনে সাগরে রাখছে। (সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১২ই মে ২০১৫)

    একাধিক বার্তা সংস্থার খবর অনুযায়ী,  মালয়েশিয়ায় মালাক্কা প্রণালীতে ৭-৮ হাজার অভিবাসী ভাসমান অবস্থায় আটকে রয়েছেন। আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় ইলেকট্রনিক-প্রিন্ট মিডিয়ায় অভিবাসীদের এই জীবন-মৃত্যুর খবর ব্যাপক হারে কভারেজ পাচ্ছে। বাংলাদেশের কক্সবাজার-টেকনাফের উপকূলীয় অঞ্চলে পুলিশের অভিযান, পাচারকারী গ্রেফতারের খবরও পত্রিকায় আসছে। সরকারের ভাষায় দেশের জিডিপি বাড়ছে, দারিদ্র্যের হার কমছে আর দেশ ভাসছে উন্নয়নের জোয়ারে।

    তাহলে দেশের প্রান্তিক গ্রামীণ মানুষগুলো কেন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আশায় জীবন বাজি রাখছে? কেন গভীর সমুদ্রে ভাসছে?

    বাংলাদেশের এই হতদরিদ্র মানুষগুলোর অবৈধ অভিবাসনের একটি অন্যতম কারণ তাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট। বাংলাদেশের পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠী দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগণের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে, ব্যর্থ হয়েছে তাদের মৌলিক চাহিদা মেটাতে। থাইল্যান্ডের গণকবর এই ব্যর্থতারই একটি ফলাফল। পুঁজিবাদে উৎপাদন বৃদ্ধি, জিডিপি বৃদ্ধি মুখ্য বিষয়। দেশের হতদরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এখানে অপ্রয়োজনীয় বিষয়। দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলে এইসকল মানুষ নিজেদের জীবন বাজি রেখে সমুদ্র পাড়ি দিত না। যে মানবরচিত জীবনব্যবস্থা এইসকল সমস্যার মূল কারণ, সেই ব্যবস্থা থেকেই আমরা সমাধান খুঁজতে পারিনা।

    রাসূল (সা) বলেছেন, “ইমাম (খলীফা) হচ্ছেন অভিভাবক এবং তিনি তার জনগণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল”।

    খিলাফত রাষ্ট্র দেশের সকল নাগরিকের কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করবে। রাষ্ট্র যেসকল বাস্তব পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করবে:

    ১. ম্যানুফাকচারিং বা শিল্প উৎপাদন কেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
    ২. প্রতিরক্ষা শিল্পে কর্মসংস্থান
    ৩. কৃষি এবং কৃষি ভিত্তিক শিল্পে কর্মসংস্থান।
    ৪. খাস জমি ভূমিহীন কৃষকের মাঝে বন্টন।
    ৫. অব্যবহৃত জমি পুনর্বন্টন
    ৬. সেনাবাহিনীতে কর্মসংস্থান ইত্যাদি।

    গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অধীনে বাংলাদেশের মানুষ অর্থনৈতিক সচ্ছলতার আশায় অবৈধ অভিবাসী হচ্ছে। ইন-শা-আল্লাহ, খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে মুসলিম নৌবাহিনী থাইল্যান্ডের জনগণকে মুক্ত করতে অগ্রসর হবে। ইসলাম পূর্ব যুগে যে আরবরা সিরিয়ায় ব্যবসা করতে যেত, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেই আরবরা-ই সিরিয়া বিজয় করে এবং সেখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে। তাই একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই বাংলাদেশের জনগণকে সত্যিকার উন্নয়ন এবং মর্যাদার পথ দেখাতে পারে। রুটি-রুজির জন্য নয়, বরং মুসলিম উম্মাহ ইসলামের দা’ওয়াহ নিয়ে থাইল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছাবে, ইন-শা-আল্লাহ!

    ইফতেখার উদ্দিন

  • মুসলিম ভূমিসমূহে পঞ্চাশের অধিক অপ্রয়োজনীয় জাতিরাষ্ট্র ও তাদের দালাল শাসকদের কারণেই মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মুসলিমগণ আজ সমুদ্রে ভেসে চলা ফেনার মত

    মুসলিম ভূমিসমূহে পঞ্চাশের অধিক অপ্রয়োজনীয় জাতিরাষ্ট্র ও তাদের দালাল শাসকদের কারণেই মানবপাচারের শিকার বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা মুসলিমগণ আজ সমুদ্রে ভেসে চলা ফেনার মত

    পত্রিকাগুলোতে মে মাসে মানবপাচার বিষয়ে যেসব খবর আসে:

    ১. থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গলা-পচা ২৬টি লাশরে মধ্যে ১০টি বাংলাদশির, ১৬টি রোহিঙ্গাদের। ওই বন্দশিবিরে দুজন জীবিত থাকাতইে হয়েছে সমস্যা। তাঁরাই জানিয়েছেনে, লাশগুলোর অন্তত ১০টি বাংলাদশির।সেখানকার আরকেটি গণকবরে মেলে ৫০ জনের লাশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই জঙ্গল থেকেই ৩৭ জন বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। (প্রথম আলো, ৫মে, ২০১৫)

    ২.গত মাসে ভূমধ্যসাগরে ৯০০ জন যাত্রী নিয়ে শরণার্থীদের একটি জাহাজ ডুবে যায়। জীবিত উদ্ধার পায় মাত্র ২৮ জন, যাদের একজন বাংলাদেশি; বেশির ভাগই আরব ও আফ্রিকার যুদ্ধবধ্বিস্ত দেশের মানুষ। বাংলাদেশেও কি যুদ্ধ চলছে? তাহলে এ দেশের উদ্বাস্তু মানুষের লাশ কেন সীমান্তে, থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার জঙ্গলে, মধ্যপ্রাচ্যের মরুভূমিতে, গ্রিক ও তুরস্কের র্পবত ও বরফের প্রান্তরে আর মহাসমুদ্রের পানিতে? জাতিসংঘের হিসাবে অভিবাসী শ্রমিক বাদেই গত ৩০ বছরে এ দেশের ১০ লাখের বেশী পুরুষ-নারী-শিশু পাচার হয়ে গেছে বিভিন্ন দেশে।( প্রথম আলো, ৫মে, ২০১৫) 

    ৩. আট বছরে সমুদ্রপথে কমপক্ষে আড়াই লাখ লোক পাচার হয়ে গেছে, এদের মধ্যে কত শত নির্যাতিত ও নিহত হয়েছে, তার কোনো সঠিক হিসাব নেই। (ডেইলি স্টার)

    ৪. উপকূল থেকে অবৈধ অভিবাসী নৌকা তাড়িয়ে দেয়ার জন্য ইন্দোনেশিয়া যুদ্ধ জাহাজ ও যুদ্ধ বিমান মোতায়েন করেছে।(মানবজমিন, ১৯ মে, ২০১৫)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “অচিরেই তোমাদের আক্রমণ করতে লোকেরা একে অপরকে আহ্বান করবে যেভাবে শিকারী প্রাণী শিকারের দিকে অন্য শিকারীদের আহ্বান করে”। কেউ একজন জিজ্ঞেস করলো, সে সময়ে আমাদের সংখ্যা কম হওয়ার কারণে এরূপহবে কি? তিনি (সা) বললেন, “না, সেসময় তোমরা সংখ্যায় হবে অনেক, কিন্তু তোমরা হবে সমুদ্রে ভেসে চলা ফেনার মত…”। (আহমাদ)

    সংকটের কারণ:

    ১. ১৯২৪ সালে খিলাফত ধ্বংসের পর পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলিম বিশ্বকে পঞ্চাশের অধিক অপ্রয়োজনীয় ও দূর্বল ছোট ছোট জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত করেছে। জাতিরাষ্ট্রসমূহের রয়েছে স্বতন্ত্র পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতির পিতা, পাসপোর্ট, জাতীয়তা, সাম্রাজ্যবাদী বা উপনিবেশিকদের বেধে দেয়া রাষ্ট্রীয় সীমানা। যেমন: বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া। খাইরা উম্মাহ’র বিপদে সাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে এ স্বতন্ত্র পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতির পিতা, পাসপোর্ট, জাতীয়তা, সাম্রাজ্যবাদী বা উপনিবেশিকদের বেধে দেয়া রাষ্ট্রীয় সীমানা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে।

    ২. এসব জাতিরাষ্ট্রের মুসলিম শাসকগণ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের দালাল বা এজেন্ট। তাদের জবাবদিহিতা যেমনি মহাবিশ্বের প্রভূ আল্লাহ সুওতার কাছে নয়, তেমনি উম্মাহ’র কাছেও নয়, বরং তাদের জবাবদিহিতা রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী প্রভূ-আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স কিংবা আধিপত্যবাদী শক্তি ভারতের কাছে। সেকারণে এ শাসকগণ জনগনের মৌলিক চাহিদা(অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা) পূরণের জন্য জনগনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে মোটেও সচেষ্ট এবং আন্তরিক নয়। এসব শাসকেরা শাসনকার্যকে ইবাদত মনে করে না, বরং দুনিয়ার ভোগ বিলাস, প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জনের উপায় মনে করে। তাদের কারণে মুসলিম সেনাবাহিনী মজলুম উম্মাহ’র ডাকে সাড়া দিতে পারে না।

    মুসলমিদের সাহায্যের ব্যাপারে রাসূল (সা) বলেন,

    “এক মুসলমান অপর মুসলমানরে ভাই। সে না তার উপর জুলুম করতে পারে, না তাকে বিপদে পরিত্যাগ করে । আর না তাকে শত্রুর কাছে সোর্পদ করতে পারে”

    আর গণ-তান্ত্রিক জালিম শাসক শেখ হাসিনা আল-জাজিরাকে রোহিংগা মুসলিমদের ব্যাপারে বলে,
    “এটা আমাদের র্কতব্য নয়, আমরা এসব বোঝা বহন করতে পারব না”

    সমাধান:

    যা কিছু খাইরা উম্মাহ’র(সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত-যে নবীর উম্মত হওয়ার জন্য অন্য নবীগণ আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’লার কাছে ফরিয়াদ করত। যাদেরকে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন) দায়িত্ব নেয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে মুসলিমদের সেসব কিছুর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে এবং এগুলোর বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করতে হবে ও উম্মাহকে শরী’আহ’র দলিলের ভিত্তিতে সচেতন করতে হবে। যেমন:

    জাতিরাষ্ট্র:

    যার রয়েছে স্বতন্ত্র পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতির পিতা, পাসপোর্ট, জাতীয়তা, সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশিকদের বেধে দেয়া রাষ্ট্রীয় সীমানা। ইসলামিক শরী’আহ অনুসারে এসবই হারাম।

    আবু দাউদ শরীফে র্বণতি আছে, রাসূল(সা) বলেছেন,

    “যে ব্যক্তি জাতীয়তাবাদের দিকে ডাকে, এর সর্মথনে যুদ্ধ করে এবং এর জন্য মৃত্যুবরণ করে; সে আমাদের অর্ন্তভুক্ত নয়।”

    রাসুল(সা) আরো বলেছেন,

    “যে ব্যক্তি একটি অন্ধ পতাকার অধীনে যুদ্ধ করে, তার স্বজাতির সঙ্গে ক্ষুদ্ধ হয় অথবা স্বজাতিকে আহ্বান সাহায্য করে এবং সে কারণইে নিহত হয়, তাহলে সে নিহত হল জাহিলিয়্যাতের মধ্যে” । [মুসলিম]

    জাতিরাষ্ট্র সমূহের সীমানা ভেঙ্গে একজন খলিফার অধীনে একটি অভিন্ন খিলাফত রাষ্ট্রে বসবাস করা মুসলিমদের উপর ফরয। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, “খলিফা হচ্ছেন ঢালস্বরূপ”।

    বিশ্বাস ঘাতক দালাল শাসক: আক্বীদা ও ইসলামিক আবেগের দিক থেকে মুসলিম উম্মাহ এখনও এক। একারণেই পৃথিবীর যে কোন জায়গায় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর উম্মত আক্রান্ত হলে উম্মাহ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। কিন্তু এইসব দালাল শাসকেরা স্বতন্ত্র পতাকা, জাতীয় সংগীত, জাতির পিতা, পাসপোর্ট, জাতীয়তা, সাম্রাজ্যবাদী বা উপনিবেশিকদের বেধে দেয়া রাষ্ট্রীয় সীমানার সংরক্ষক এবং মুসলিম উম্মাহ’র আক্বীদা ও ইসলামিক আবেগের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘হাশরের ময়দানে প্রতিটি বিশ্বাস ঘাতক শাসকেরই তার বিশ্বাসঘাতকতার পরিমাণ অনুযায়ী একটি পতাকা থাকবে, শাসকের চেয়ে ভয়াবহ প্রতারণার বিশ্বাসঘাতক আর কেউ নেই।’ (মুসলিম/বুখারী)

    রাসূলুল্লাহ (সা) ত্বরীকা অনুযায়ী সাধারণ মুসলিম ও সশস্ত্র বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের সহায়তা নিয়ে মুসলিম ভূমিসমূহ থেকে এসব জালিম ও বিশ্বাস ঘাতক শাসকদের মূলোৎপাটন করতে হবে। কারণ এসব মুসলিম শাসক মজলুম রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইলে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, কিন্তু পাঁচহাজার মুসলিম হত্যাকারী নরপশু নরেন্দ্র মোদীকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। এসব শাসক বাঘ রক্ষার জন্য চুক্তি করে, বাঘ সম্মেলন করে, হরিণ রক্ষা করে, ডলফিন রক্ষা করে কিন্তু আশরাফুল মাখলুকাতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ’র ব্যাপারে দায়িত্বজ্ঞানহীন।

    রাফীম আহমেদ

  • বিদেশী মিউচ্যুয়াল ফান্ড আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে…… আসলেই?

    বিদেশী মিউচ্যুয়াল ফান্ড আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে…… আসলেই?

    “Foreign mutual funds……will be to bring in increasing foreign investments, which will then be available as a source of capital, investment in telecom, digitization, and the IT sector and in general (fields) as well.” — Oh really?

    উপরের কথাগুলো বলেছেন সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় [May 7, 2015 in Digital Investment Summit, Dhaka]। তিনি বিদেশী মিউচুয়াল ফান্ডকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে সরাসরি অপারেট করতে দেয়ার নীতি গ্রহন করতে যাচ্ছেন। তার এই নীতির সপক্ষে উপরের যুক্তি তুলে ধরেন। অর্থাৎ তিনি বলেন যে এই মুক্তনীতি আমাদের টেলিকম, ডিজিটাইজেশন, আইটি, এবং সাধারণ খাতে বিনিয়োগের পুঁজি যোগান দিবে। তাই কি? তবে বাস্তবতা একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

    আমাদের মত অনুন্নত অর্থনীতিকে বলা হয় প্রান্তিক বাজার (Frontier Market), আর এই প্রান্তিক বাজার হচ্ছে বৃহত্তর উদীয়মান বাজারের (Emerging Market) অন্তরভুক্ত। এই বাজারগুলোতে সাধারণত উচ্চ ঝুঁকি গ্রহণকারী Hedge Fund এবং Emerging Market Fund গুলোই বিনিয়োগ করে থাকে। অর্থাৎ তাদের বিনিয়োগের উদ্দেশ্যই হয় অগভীর বাজারগুলো থেকে স্বল্প সময়ে অভাবনীয় লাভ অর্জন করা। ফান্ডগুলো তাই Frontier Market-এ কোন দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে যায়না। সর্বোপরি বাজার অগভীর এবং অপক্ক হওয়ায় তারা বাজারকে সহজেই প্রভাবিত করতে পারে। বৃহৎ পুঁজির সক্ষমতার কারণে তারা নানা ম্যানুপুলেটিভ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। বৃহৎ দেশীয় ব্রোকারেজ হাউজ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি এবং মার্চেন্ট ব্যাংক এই বিদেশী ফান্ডের নানাধরনের সুবিধা লাভ করে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই তারা এই বিদেশী ফান্ডের স্বার্থ রক্ষার জন্য সবসময় সচেষ্ট থাকে। প্রয়োজনে তারা গুজব ছড়িয়ে বাজারকে প্রভাবিত করতেও কুণ্ঠিত হয়না।

    আমাদের পুঁজিবাজার কত ক্ষুদ্র এবং অগভীর তা বোঝার জন্য কিছু পরিসংখ্যান দেখা যাক। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সামগ্রিক পুঁজির বাজারমূল্য (Market Capitalization) হচ্ছে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলার। এই অংক আমেরিকার যেকোনো একটি কোম্পানির চেয়ে বহুলাংশে কম। যেমন Du Pont এর Market Capitalization হচ্ছে ৬৪৭ বিলিয়ন ডলার, Apple এর ৬৭৩ বিলিয়ন, Wal-Mart এর ২৭৪ বিলিয়ন, Chevron এর ২২০ বিলিয়ন, Facebook এর ২০৪ বিলিয়ন, এবং Coca Cola এর ১৯৪ বিলিয়ন। অর্থাৎ আমাদের সব কোম্পানির পুঁজি মিলে ওদের যেকোনো একটি কোম্পানির চেয়েও হাস্যকর পর্যায়ের ছোট। আর নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের তুলনায় আমাদের বাজারের মূল্যপরিধি হচ্ছে ০.০০০০০০০০০২৮%!

    আবার একটি Hedge Fund এর পরিমাণও আমাদের বাজারের প্রায় সমান। যেমন, Bridgewater Pure Alpha এর পরিমাণ হচ্ছে ৩৬ বিলিয়ন ডলার এবং Quantum Endowment Fund এর পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ডলার। আমাদের Frontier Market-এ এই ফান্ডগুলোর বিনিয়োগ তাদের মোট পোর্টফলিওর অনুপাতে দশমিকের ঘরে। তাই তাদের এই বিনিয়োগ যদি পুরোটা নষ্টও হয় তবুও তাদের কিছু যায় আসে না। তাদের এই বৃহৎ পুঁজির সক্ষমতা এবং স্বল্পমেয়াদী বিনিয়োগ (Tactical Investment) প্রকৃতির কারণে তারা প্রতিনিয়ত পুঁজি উত্তোলন করে তাদের বেইস কান্ট্রিতে নিয়ে যায়। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের উপর কোন lock-in নাই। অর্থাৎ তারা যেকোনো সময় পুঁজি ফেরত নিতে পারে। শুধুমাত্র Pre-IPO বিনিয়োগের উপর ৬ মাসের Lock-in Period আছে। ফেরত নেবার সময় ডলারের আউট-ফ্লো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইন-ফ্লোর চেয়ে বেশী হয়। কারণ চাঙ্গার সময় শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির হার টাকার দর পতনের চেয়ে বেশী হয়। বিনিয়োগ উত্তলনের সময় বাজার মন্দা থাকলে তারা বাজারে আরও বিনিয়োগ করছে এমন গুজব তাদের স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে ছড়িয়ে বাজারকে চাঙ্গা করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের বাজার গবেষণা-পত্রের মাধ্যমেও তারা বাজারের কনফিডেন্স ধরে রাখে। অথবা কিছু প্রকৃত বিনিয়োগ করে বাজারকে চাঙ্গা করে পূর্ববর্তী বিনিয়োগকে লাভজনাক ভাবে তুলে নেয়। এই সবই সম্ভব হয় তাদের পুঁজির সক্ষমতার কারণে। সুতরাং, বিদেশী ফান্ড আমাদের দীর্ঘমেয়াদী পুঁজি সরাবরহ করবে এমন যুক্তি গ্রহন করা যাচ্ছেনা। বরং আমাদের ডলার রিজার্ভের নেট পজিশন হ্রাস পাবার সম্ভাবনাই বেশী। কারণ স্বল্প সময়ের ভিতর কোন প্রকৃত বিনিয়োগ আয় সৃষ্টি করেনা, বিশেষ করে টেলিকম এবং আইটির মত বৃহৎ বিনিয়োগের জন্য তা আরও সত্য। সর্বোপরি টেলিকম কোন বিদেশী মুদ্রা অর্জনকারী খাত নয়।

    বিদেশী ফান্ডগুলো অনেক ক্ষেত্রে সরকারি নীতিকে তাদের অনুকুলে নেবার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিভিন্ন ধরনের বাজার সমৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের অধীনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ তাদের জন্য সুবিধাজনক নীতি বাস্তবায়ন করে থাকে। বিদেশী ফান্ডের সরাসরি বিনিয়োগের এই সুযোগ সৃষ্টির বর্তমান উদ্যোগ তারই একটা উদাহরণ। অধিকন্তু, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নেতার বক্তব্যের মাধ্যমেও বাজারে কনফিডেন্স সৃষ্টি করা হয়। যেমন জনাব জয়ের এই বক্তব্যের পরে বাজারে চাঙ্গা ভাব দেখা যায়। সরকারকে ম্যনুপুলেট করার এই সুবিধা দেশীয় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নেই।

    বিদেশী ফান্ডগুলো নিজেদের ভিতর যোগাযোগের মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে। যেকারনে তারা সহজেই বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। যেহেতু তারা বিদেশে অবস্থান করে, তাদের এই সিন্ডিকেটের খবর প্রচারিত হয়না। এবং এই ধরনের সিন্ডিকেট বাংলাদেশের আইনি সীমার বাইরে হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোন রকম ব্যবস্থাও নেয়া যায়না। যেমন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ১৯৯৬ সনের শেয়ার কেলেঙ্কারির মূল হোতা হওয়া সত্যেও তাদের বিরুদ্ধে কোন আইনি ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।

    বিদেশী ফান্ডের বিনিয়োগগুলো আলটিমেটলি দেশী সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরই কিনতে হয়। বলাই বাহুল্য যে তা অধিক মূল্যে। বিদেশী ফান্ড শুধু কিছু সময়ের জন্য বাজারে ঢুকে বাজারকে চাঙ্গা করার মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট বা লোভাতুর করে তোলে। তাদের লোভ যখন তুঙ্গে তখন বিদেশী ফান্ডগুলো চতুরতার সাথে তাদের বিনিয়োগ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে আলতো ভাবে গছিয়ে দিয়ে যায়। সাধারণ বিনিয়োগকারীগন কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের হাতে জড় হয় কিছু মূল্যহীন কাগজ। দর পতনের মাধ্যমে তাদের নিঃস্ব হবার প্রক্রিয়াটি শেষ হয়।

    তাবেদার সরকার তখন খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আবার তাদের বিদেশী প্রভুর স্বার্থে নতুন করে কনফিডেন্স গেম খেলতে শুরু করে। ১৯৯৬ থেকে শুরু করে বেশ কয়েকবার আমরা এই একই চিত্র প্রত্যক্ষ করেছি।

    পুঁজিবাজারে পোর্টফলিও বিনিয়োগ সার্বিক অর্থনীতিতে কোন কল্যাণ বয়ে আনেনা। বরং তা প্রকৃত বিনিয়োগের স্পৃহা বিনষ্ট করে এবং অর্থনীতিকে বৈষম্যমূলক ও অস্থিতিশীল করে তোলে। জনাব জয়ের বক্তব্য তাই কোনভাবেই গ্রহন করা গেলনা।

    ইসলাম শুধু এই বিদেশী ফান্ডের বিনিয়োগ নয় বরং সামগ্রিক ভারচ্যুয়াল অর্থনীতির অবসান ঘটাবে। মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য একটি শক্তিশালী ও বণ্টনমূলক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করবে। সমস্ত উম্মাহ সেই দিনের অপেক্ষায় আছে।

    -মাহমুদ সাদিক

  • বর্তমান সরকার ব্যবস্থায় মেয়রের পক্ষে নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়

    বর্তমান সরকার ব্যবস্থায় মেয়রের পক্ষে নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়

    বর্তমান সরকার ব্যবস্থায় মেয়রের পক্ষে নগর উন্নয়ন সম্ভব নয়। শুধুমাত্র খিলাফত ব্যবস্থায় ওয়ালি এবং আমিল (মেয়র) ব্যাবস্থা নগরে প্রকৃত ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম

    আমরা জানি, বাংলাদেশে বর্তমানে মেয়র নির্বাচন ও নিয়োগ হয় স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯ এর মাধ্যমে। যেহেতু, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ চিন্তার মানুষের তৈরি বৈষম্য মূলক ব্যবস্থা যেইখানে ধনী আরো ধনী হয় এবং গরিব আরো নিঃস্ব হয়ে পড়ে এবং জনগণের উপর অন্যায়ভাবে কর আরোপিত হয় সেহেতু কোনো এলাকা/পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করাও জনগণের মাঝে কিছু বৈষম্যের উপর ভিত্তি করে হয়। অর্থাৎ, যে পৌরসভার মানুষজন নিজ যোগ্যতায় তাদের এলাকার উন্নতি সাধন করেছেন এবং দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে গেছেন সেই সব সুবিধাভোগী লোকগণকে আরো কিছু সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকার ঐ পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশন হিসেবে ঘোষণা করেন। সরকার কর্তৃক কোনো এলাকাকে সিটি কর্পোরেশন ঘোষণার জন্য সিটি কর্পোরেশন আইনে উল্লিখিত ৩(৪) নং বিধিতে নিন্মোক্ত বিষয়াদি বিবেচনা করবেন, 

    “স্থানীয় আয়ের উৎস” “এলাকার অথনৈতিক গুরুত্ব” “বিদ্যমান পৌরসভার বার্ষিক আয়”

    অর্থাৎ “তোমরা যদি সরকারকে অর্থ দিতে পার তাহলে সরকার তোমাদের উন্নততর সেবা দিবে না হয় তোমরা অধপতিত অবস্থায় থাক”। বিষয়টা যেন এমন যে সরকার এখানে সেবক নয় বরং মালিক আর জনগণ হল শ্রমিক, শ্রমিক যদি অর্থ দেয় তাহলে মালিক তার যত্ন নিবে না হলে বিতাড়িত করবে।

    আবার যদিও কোন পৌরসভা সিটি কর্পোরেশন হিসেবে ঘোষিত হয় তারপর দেখাযায় এই গণতান্ত্রিক শাসন যন্ত্রের আরও দুর্বলতার কারনে শহরটি লুটপাট ও গণ্ডগোলের আখাড়ায় পরিণত হয় যেমন,

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মেয়রগণ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ায় দেখা যায়, সরকার হয় এক দলের এবং মেয়রগণ হয় অনেক সময় ভিন্ন দলের। ভিন্ন দল হতে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সরকার ঐ মেয়রকে সাহায্য সহযোগিতা তো করেই না বরং মামলা মোকদ্দমা করে ঐ মেয়রকে এলাকা হতে বিতাড়িত করেন এবং তৎপর ঐ সিটি মেয়রকে বরখাস্ত করেন। যা আমরা কিছুদিন আগে রাজশাহী ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনে দেখেছি। যার দরুন এলাকার উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং যেহেতু দেখা যায় একই এলাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বিরোধী দলের আর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (CDA বা রাজউক) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে তৎকারণে তাদের মধ্যে কাজের সময় অসামঞ্জস্য থাকে। এবং একজন আরেকজনের বিরুদ্ধে কাজ করে থাকে। যা আমরা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন-এর মেয়র ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাঝে লক্ষ করেছি। এবং দেখেছি সরকার দলীয় লোক ও মেয়রের মাঝে নগরীতে বিলবোর্ড বাণিজ্য নিয়ে সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে মারামারি করতে।

    ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থায় যেহেতু এটি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) কর্তৃক প্রদেয় একটি ব্যবস্থা এবং যেহেতু আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমি ন্যায়বিচারক” সেই ন্যায়বিচার রাসূলুল্লাহ (সা) যেইভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন আমরা ও ঠিক একই ভাবে আল্লাহর এই জমিনে রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক দেখানো পথে অনুসরণ করব। তাই খিলাফত রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত ভূমিসমূহকে বিভিন্ন উলাইয়্যাহতে (প্রদেশ) বিভক্ত করা হবে। একটি উলাইয়্যাহকে বিভিন্ন ইমালাতে (জেলা) বিভক্ত করা হবে। উলায়্যাহতে দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিকে ওয়ালি এবং ইমালার দায়িত্বে নিযুক্ত ব্যক্তিকে আমিল বা হাকিম বলা হবে।

    অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন অঞ্চলকে বিভক্ত করে যেইভাবে গভর্নর (ওয়ালি) এবং আমিল (মেয়র) নিয়োগ করেছেন। যেমন মুয়াজ ইবনে জাবালকে আল জানাদের ওয়ালি হিসেবে প্রেরণ, জায়েদ বিন লাভি আল আনসারিকে হাদরামউত এর ওয়ালি, আবু মুসা আল আনসারিকে যাবিদ এবং এডেন- এর ওয়ালি, কাতান ইবনে সাসানকে ইয়েমেনের ওয়ালি এবং খালিদ ইবনে সাইদ ইবনে আল আসকে সানার আমিল হিসেবে প্রেরণ করেছেন ঠিক তেমনি আগত খিলাফাহকে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে ওয়ালি ও আমিল নিয়োগ করা হবে এবং তারা পৃথিবীতে সত্য প্রতিষ্ঠিত করবেন ও প্রত্যেকের প্রাপ্য ন্যায্যতা প্রত্যেককেই প্রদান করবেন। সর্বোপরি আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত দ্বীন ইসলাম বাস্তবায়ন করবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন কাউকে ওয়ালি বা আমিল হিসেবে প্রেরণ করতেন এখন বলতেন তাদের প্রতি ভালো আচরণ করিও। কঠিন হইও না তাদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিও না।

    খিলাফাহ্ ব্যবস্থায় আমিল হচ্ছে একটি শাসক এর পদ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো আমিল নির্বাচিত হয় না বরং ওয়ালি (গভর্নর) বা খলিফা আমিলকে নিয়োগ দিবেন যার দরুণ তাদের মধ্যে কখনো বাধানুবাদ হয় না এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে কখনো ইস্তফা হয় না। বরং আমিল একাধারে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন এবং খলিফার অপছন্দনীয় কাজ করলে বা জনগণ থেকে অভিযোগ এলে বা অন্য কোনো কারণে খলিফা আমিলকে বরখাস্ত করার অধিকার রাখায় অতীত ইতিহাসে ও আমিলগণ জনগণের সাথে খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখত এবং জনগণের জন্য সকল ত্যাগ স্বীকার করত।

    রাসূল (সা) আবদু কায়েস গোত্র থেকে অভিযোগ আসায় আবুল আলা ইবনুল হাদরামি কে বাহরাইনের আমিল থেকে বরখাস্ত করেন। পক্ষান্তরে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো মেয়র শুধুমাত্র সরকারের বিরোধিতা না করে এবং এলাকার কোনো কাজ না করে গণতান্ত্রিক আইনে ৫ বছর সে মেয়র হিসেবে থেকে যেতে পারবে। যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র।

    জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে বর্তমান এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উপযুক্ত মতে শুধুমাত্র সরকারের কোনো বিরুদ্ধচারণ না করলে এই মেয়রগণের কোনো রকমের জবাবদিহিতা নাই। অথচ রাসূূল (সা) ইবনুল উতরিয়াকে বনু সালিম গোত্রের সাদাকার উপর আমিল করেন। আমিল করার পর ইবনুল উতরিয়া কাজ শেষ করার পরে রাসুল (সা) এর কাছে এসে বললেন, এইগুলো আপনার জন্য আর এইগুলো আমার জন্য (উনি যা উপহার হিসেবে ঐখানে পেয়েছিলেন) তখন রাসূল (সা) বললেন, তুমি কেন তোমার ঘরে এই উপহার গুলোর জন্য অপেক্ষা করলে না যদি তুমি সত্যবাদী হও। অর্থাৎ, কোনো আমিল তার বেতন এর বাইরে কোনো প্রকার উপহারও নিতে পারবে না কারন জনগণ তার আমিল হওয়ার কারনে উক্ত পদে তাকে উপহার দিয়েছে সে যদি উক্ত পদে না থাকত তাহলে তা সে কখনই তা পেত না। এটাই তো সেই খিলাফাহ ব্যবস্থার আমিল এর পদ যেইটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো কোনো শাসক এর খুশির জন্য কাজ করে না বরং জনগণের মাঝে ন্যায়নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠার জন্য। জনগণের অধিকার যেমন রাসুল (সা) এর নির্দেশনা অনুযায়ী খাদ্য, বস্ত্র, বাস্থান, গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন কেন্দ্র অর্থাৎ সকল মৌলিক ও নাগরিক সুবিধা বিনা মুল্যে বা নামমাত্র সার্ভিস চার্জ প্রদানের মাধ্যমে প্রদান করার জন্য। এবং একাজের জন্য তারা শুধু চায় আল্লাহর সন্তুষ্টি।

    হিমস এর তৎকালীন আমিল আমের ইবনু সাদ বলতেন, ইসলাম ততদিন পর্যন্ত দুর্দমনীয় থাকবে যতদিন পর্যন্ত শাসকগণ শক্তিশালী হবে। শাসকগণের শক্তি মানে এটা বুঝায় না যে, তরবারি দিয়ে হত্যা করা হবে বা চাবুক এর পিটুনি দেওয়া হবে বরং এর মানে হচ্ছে সত্য দিয়ে বিচার করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

    তৌফিক কুরাইশি

  • স্থলসীমান্ত বিল পাস: গণতান্ত্রিক রাজনীতির গরু মেরে জুতা দান

    স্থলসীমান্ত বিল পাস: গণতান্ত্রিক রাজনীতির গরু মেরে জুতা দান

    গত বুধবার ভারতের লোকসভা এবং রাজ্যসভায় স্থলসীমান্ত বিল পাস হয়। ‘৭৪ সালে হওয়া ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির একটি দফা ছিল এই স্থলসীমান্ত নির্ণয় এবং ২০১৫-তে এসে এর বাস্তব রূপ দেখা যায়। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন, ছিটমহলবাসীর পরিচয়, সমুদ্র জয়ের পরে শেখ হাসিনার ভূমি বিজয় শ্লোগানে জয়জয়কার চারদিক। দাবি করা হচ্ছে, এর ফলে বাংলাদেশ-ভারতের বহুদিনকার সীমান্ত বিরোধের অবসান ঘটবে।

    কাঁটাতারে ঘেরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত জেলখানার নাম বাংলাদেশ। ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানোর নামে স্থলসীমান্ত বিল একটি মেকি নাটক ছাড়া আর কিছুই না।

    আমরা দেখি, সেই ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি একটি দাসত্বনামা ছাড়া আর কিছুই নয়। ফারাক্কা মরণবাঁধের দরূন পদ্মার একাংশ আজ মৃত। বছরের পর বছর ধরে, ভারতীয় আগ্রাসন ছাড়া বাংলাদেশ আর কিছুই পায়নি।

    সীমান্ত বিরোধ নিরসনের মিথ্যা আশ্বাস কখনোই সীমান্তে হত্যা করা আমাদের ভাইবোনদের রক্ত মুছতে পারবে না।

    * ২০১১ সালে বিএসএফের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ বাংলাদেশী। এর পরের বছর ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে ৩৬ জন বাংলাদেশী নাগরিক হত্যাকান্ডের শিকার হন। এর মধ্যে ৩৪ জনই বিএসএফের হাতে সরাসরি খুন হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৯৮ জন। এই সময়ে ৬৪ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন।

    * এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মোট এক হাজার ৪৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে সীমান্তে। এর মধ্যে ৯৬৭ জনই বিএসএফের হাতে খুন হয়েছেন। ইতিমধ্যে ফেলানীর বিচারের নামে প্রহসন করায় পশ্চিমবঙ্গের মানবাধিকার সংস্থা মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) তিব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।

    * গত ১০ বছরে ৯২২ জন ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পূর্ববর্তী ১০ বছরে ৯২২ জন বাংলাদেশীকে বিএসএফ হত্যা করেছে বলে রেকর্ড রয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হাতে।

    বিএনপির আমলেও এই সীমান্ত হত্যা উল্লেখযোগ্য:

    বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে ২০০১ সালে-

    *২০০১ সালে ৯৪ জন বাংলাদেশী নাগরিক সীমান্তে খুন হয়েছে.
    *২০০২ সালে ১০৫ জন,
    *২০০৩ সালে ৪৩ জন,
    *২০০৪ সালে ৭৬ জন
    *২০০৫ সলে ১০৪
    *২০০৬ সালে ১৪৬ জন,

    মোট ৫৭০ জন নিহত হন সীমান্তে বিএনপি-জামাত সরকারের আমলে। এছাড়া গত মাসেই (এপ্রিল ২০১৫) আমরা দেখেছি, ধর্ষণের পর হত্যা করে আমাদের ফেরত দেওয়া হয়েছে আমাদেরই এক বোনের গলিত লাশ।

    এই ধরণের চুক্তি কখনোই ছিটমহলবাসীর জীবনে পরিবর্তন আনবে না, নগরজীবনে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ এই গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদেরা শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থের জন্যই রাজনীতি করে। সমুদ্র বিজয়, স্থলসীমান্ত বিজয় ইত্যাদি চটকদার শব্দের আড়ালে আমাদের তারা প্রতিনিয়তই ভারত-আমেরিকার মতো মুশরিক-কাফির রাষ্ট্রের নিকট পরাজিত হয়ে চলেছে। এইসকল কুলাঙ্গারেরা শুধুই তাদের প্রভু আমেরিকা-ভারতের তোষামোদের জন্য নিযুক্ত।

    ভারত-আমেরিকার চক্রান্ত নস্যাতে আমদের প্রয়োজন খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা। কারণ খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থাই ভারত আমেরিকার দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে এই উম্মাহকে রক্ষা করবে। মুসলিমদের উপর যুলুম অত্যাচারের জবাব দেবে ভারত বিজয়ের মাধ্যমে।

    আমরা দেখেছি, ১৩০০ বছরের খিলাফতের শাসনে কিভাবে খলীফা মুসলিমদের অধিকার সংরক্ষণ করেছিল। মুসলিমদের বোনদের সম্মান রক্ষার্থে কিভাবে জবাব দিয়েছিল মুশরিকদের। অধিকার, চাহিদা, নিরাপত্তা বিধানে খিলাফতের শাসনব্যবস্থা ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ; কারণ এর শাসকেরা দায়বদ্ধ থাকে জবাবদিহিতার এবং আল্লাহ’র দাসত্বে।

    সুতরাং, আমাদের জন্য এটাই যথার্থ সময় এইসকল দালাল শাসকদের উৎখাতপূর্বক খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যা আমাদের পুনরায় এই পৃথিবীতে বিজয়ী উম্মাহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে, ইন-শা-আল্লাহ!

    নাঈম বিন হামমাদ তাঁর আল ফিতানে বর্ননা করেছেন যে, আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত, রাসূল(সা) বলেন,

    তোমাদের মধ্যে একটি দল ভারত বিজয় করবে, আল্লাহ তাদের জন্য একে (ভারত) উন্মুক্ত করে দেবেন এর (ভারত) শাসকদের শৃঙ্খলিত করে আনা পর্যন্ত-আল্লাহ তাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন, যখন তারা ভারত থেকে ফিরে আসবে এবং তারা সিরিয়াতে মরিয়ম পুত্রের সাথে সাক্ষাৎ করবে।” (কানজুল উম্মাল)

  • মু’তাজিলাদের উত্থান-পতন

    মু’তাজিলাদের উত্থান-পতন

    অষ্টম শতকের মধ্যভাগে মুসলিমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নতুন এক উচ্চতায় উঠে আসে। বিভিন্ন অঞ্চল বিজয়ের সাথে সাথে সেইসব অঞ্চলের বিভিন্ন সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্রের সংস্পর্শে আসা এর পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল । মূলতঃ মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রীক,লাতিন,পারস্য ও ভারতীয় নানা শাস্ত্র আরবীতে অনূদিত হতে শুরু করে। নানা প্রায়োগিক বিজ্ঞানের সাথে গ্রীসের দার্শনিক সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটোদের দার্শনিক শাস্ত্রও আরবিতে অনূদিত হয়। এই গ্রীক দর্শনের প্রভাবে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানকে কেন্দ্র করে মুসলিম ধর্মশাস্ত্রে নতুন ঘরানার এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হল। এদেরকেই আমরা মুতাজিলা হিসেবে চিনে থাকি।

    মুতাজিলাদের উৎপত্তি:

    মুতাজিলারা এত দ্রুত ও ব্যাপকহারে বিস্তার লাভ করে যে এদের আবির্ভাব ঠিক কোথা থেকে কিভাবে শুরু হয়েছিল তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে মুতাজিলারা গ্রীক দর্শন দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিল। মুতাজিলারা ইসলামের বিভিন্ন প্রসঙ্গ অনুধাবন ও ব্যাখ্যা করতে গ্রীকদের যুক্তিবিদ্যা ও কার্যকরণকে গ্রহণ করে। তারা মনে করতো, সত্য উপলব্ধির জন্য কেবলমাত্র কুরআন ও সুন্নাহ যথেষ্ট নয়। পৃথিবীর নানা বিষয় বুঝতে তারা বুদ্ধি ও যুক্তিকে আসমানি প্রত্যাদেশ (ওহী) এর সাথে এক কাতারে বা কোন কোন ক্ষেত্রে তারও উপরে স্থান দেয়। আল্লাহ সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তি ও যুক্তিবিদ্যার এমন যথেচ্ছা ব্যবহার এর ফলে মূলধারার ইসলামী পণ্ডিতরা একমত হন যে মুতাজিলারা আসলে ইসলাম থেকেই বেরিয়ে গেছে। মুতাজিলাদের চিন্তাধারাকে পাঁচটি মূলনীতির মধ্যে সংক্ষিপ্ত করা যায়:

    ১. আর সব মুসলিমদের মত মুতাজিলারারাও আল্লাহর একত্ববাদ বা তাওহীদের ধারণার উপরে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী তথা সিফতকে আল্লাহর সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে স্বীকার করে না। যেমন: আমরা আল্লাহকে ‘আর –রাহমান’ বা পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু হিসেবে জানি। তারা এইসব গুণাবলীকে অস্বীকার করে এবং বিশ্বাস করে যে আল্লাহর একত্বের ধারণার সাথে এইসব নাম ও গুণাবলীর অন্তর্ভুক্তিকরণ সাংঘর্ষিক। এতে করে আল্লাহর একত্ববাদের বদলে খ্রিস্টানদের ত্রিত্ববাদ ও বহু ঈশ্বরবাদ এর ন্যায় ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়।

    ২. প্রাচীন গ্রীকদের মত মুতাজিলারাও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বিশ্বাস করে। তারা মনে করে যে আল্লাহ মানুষের ভাগ্য পূর্বনির্ধারণ করতে পারেন না। বরং মানুষ আল্লাহর ইচ্ছার বাইরেও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এর ফলে নিজ স্বাধীন ইচ্ছার ফলে কৃতকর্মের ফলস্বরূপ শেষ বিচারের দিন আল্লাহর ন্যায়বিচারের দ্বারা প্রত্যেকের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। মুতাজিলারা তাদের যুক্তি প্রয়োগ করার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে আল্লাহর কোন দয়া বা অনুকম্পা হবে ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন ও তাঁর প্রকৃতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

    ৩. মুতাজিলারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহ পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার করতে বাধ্য।

    ৪. মুতাজিলারা মনে করে যে একজন মুসলিম যদি সর্বোচ্চ পাপ বা কবিরা গুনাহ করে তাওবা করা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে, তবে ঐ ব্যক্তিকে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী-এই দুইয়ের কোনটির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। ঐ লোকের অবস্থান হবে এই দুইয়ের মধ্যবর্তী অবস্থানে এবং আল্লাহ পৃথকভাবে তার বিচার করবেন।

    ৫. রাসূল (সা)-এর বর্ণিত ‘সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ ধারণাকে মুতাজিলারা গ্রহণ করে। এই লক্ষ্যে শক্তিপ্রয়োগকে তারা বৈধ মনে করে, যা মিহনা নামে নতুন এক ধারণার সাথে পরিচিত করায়।

    মিহনা:

    আব্বাসীয় খলিফা আল মামুন মুতাজিলাদের মতবাদকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন। এর ফলশ্রুতিতে মুতাজিলারা রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। বায়তুল হিকমাহ এর প্রতিষ্ঠাতা(এবং তার পরবর্তী খলিফা আল মুতাসিম ও আল ওয়াসিক) এই মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে ভিন্ন মতালম্বীদ আলেমদের উপর নির্যাতন, গ্রেফতার, কারারুদ্ধ এমনকি হত্যাও করতে শুরু করেন। মুতাজিলা মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে বিরুদ্ধ পক্ষকে দমনের এই ধারণা ‘মিহনা’ নামে পরিচিত। মূলত মুতাজিলাদের ধারণা “পবিত্র কুরআন আল্লাহর বাণী নয়, বরং তা সৃষ্ট”কে অস্বীকার করার ফলেই সেই সময়ের আলেমদের উপরে এই নির্যাতনের স্টীমরোলার নেমে আসে।

    অনেক আলেমই পরাস্ত হয়ে এই মতবাদকে স্বীকার করে নেন এবং অনেকে এই প্রসঙ্গে চুপ করে যান। কিন্তু এর প্রতিবাদে সরব হয়ে উঠেন বিখ্যাত হাদিসবিশারদ ও ফকিহ ইমাম আহমেদ ইবন হাম্বল। কুর’আন আল্লাহর বাণী এবং ইসলামের প্রতিষ্ঠিত ক্ল্যাসিক্যাল ধারার ব্যাপারে অটল থাকার কারণে তাঁকে দীর্ঘ সময় কারারুদ্ধ করে রাখা হয় ও অবর্ণনীয় নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়।

    মিহনা’র এই ঘটনা জনরোষের সৃষ্টি করে। বাগদাদের পথে পথে আরম্ভ হওয়া দাঙ্গা আব্বাসীয় খিলাফতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। অবশেষে ৮৪৮ খৃস্টাব্দে খলিফা আল মুতাওয়াক্কিল ‘মিনহা’র সমাপ্তি ঘোষণা করেন ও ইমাম হাম্বলকে মুক্তি প্রদান করেন। কিন্তু ততদিনে মিনহা’র বদৌলতে মুতাজিলা মতবাদের ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। মুতাজিলা মতবাদ প্রতিষ্ঠার এমন নৃশংস কায়দা গোটা মতবাদের অনিবার্য পতনের দিকে নিয়ে যায়। কালের অতলে হারিয়ে যাওয়া এই মতবাদ আর কখনোই গ্রহণযোগ্য মতবাদ হিসেবে উঠে আসতে পারেনি।

    মুতাজিলাদ মতবাদের খণ্ডনে ধর্মতাত্ত্বিক বিকল্প:

    সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে মুতাজিলা মতবাদ নিয়ে যে অসন্তোষের জন্ম নিয়েছিল, সেটা আরও সুদৃঢ় হল যখন আলেমরা কুরআন সুন্নাহ এর আলোকে এইসব মতবাদকে ধূলিসাৎ করে দিলেন। প্রথম আঘাতটি হানেন ইমাম আহমেদ ইবন হাম্বল (রাহ)। তিনি মুতাজিলাদের ‘কালাম’ প্রয়োগের বদলে প্রচলিত ইসলামিক ধারার মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। ইসলামী আকিদাকে বুঝার জন্য তাঁর এই মতামতকে আথারি মতবাদ বলা হয়ে থাকে। তাঁরা আল্লাহ, স্বাধীন ইচ্ছা ও অধিবিদ্যাকে(মেটাফিজিক্স) বুঝবার জন্য নিজেদের আকল বা বুদ্ধিবৃত্তির বদলে কুরআন ও সুন্নাহর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করেন। বলা চলে যে, তাঁরা মুতাজিলাদের মতবাদকে সম্পূর্ণরুপে প্রত্যাখ্যান করে সুদৃঢ়ভাবে ইসলামের প্রচলিত ধারাকে আঁকড়ে ধরেন।

    মুতাজিলাবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে আরও সরাসরি ও কার্যকরী আঘাত করে আশাআরী ও মাতুরিদি ঘরানার আলেমরা। এই দুটি ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা হলেন যথাক্রমে আবু আল-হাসান আল-আশআরী (রাহ) (ইন্তেকাল: ৯৩৬) ও আবু মনসুর আল মাতুরিদি (রাহ) (ইন্তেকাল: ৯৪৪)। তাঁরা ‘কালাম’শাস্ত্র গ্রহণ করেন ঠিক, তবে সেটা কুরআনে বর্ণিত প্রচলিত ইসলামী বিশ্বাসকে ব্যাখ্যা করার জন্য। মুতাজিলারা যেমন কালামশাস্ত্র ব্যবহার করে আসমানি প্রত্যাদেশ বিরোধী নতুন আকিদার উদ্ভাবন করতো, আশআরী ও মাতুরিদিরা তা সর্বতভাবে প্রত্যাখ্যান করতো। আল আশআরী ও আল মাতুরিদি সমসাময়িক কালেই পৃথকভাবে একই উপসংহারে পৌঁছান এবং সমান্তরাল ঘরানার দুটি মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা এক মত পোষণ করেছেন। কিছু গৌণ বিষয়ে তাঁরা দ্বিমত পোষণ করলেও সেগুলো শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থের ব্যাখ্যার কারণেই পার্থক্য।

    দশম ও একাদশ শতাব্দীর মধ্যে এই দুই ঘরানার আলেমগণ দর্শন, যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণে অসামান্য দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁরা কার্যকরণ ও আসমানি প্রত্যাদেশের মধ্যে চমৎকার একটি সমতা বিধান করেন, যা মুতাজিলাদের পক্ষে তৈরি করা সম্ভব হয়নি। তাঁরা যুক্তির ভিত্তিতে এমন কতগুলো ধারাবাহিক কার্যকরণ উপস্থাপন করেন যা মুতাজিলাবাদকে সম্পূর্ণরুপে পরাস্থ করে। যেমন কোরআনের সৃষ্টতা ও আল্লাহর অপরাধীদেরকে ক্ষমা করার অক্ষমতা। উল্লেখিত ঘরানার আলেমরা বলেন যে, আল্লাহর গুণাবলী তাঁকে তাঁর বৈশিষ্ট্য থেকে আলাদা করে না। তাঁরা এটাকে বহুঈশ্বরবাদ তো মনেই করেন না বরং এটি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা স্বীকৃত।

    প্রচলিত ধারানির্ভর কালাম শাস্ত্র প্রয়োগের এগারো শতকের অন্যতম সেরা আশআরী ঘরানার আলেম ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (রাহ) লক্ষ্য করেন যে মুসলিমরা বিভিন্ন প্রকার ভ্রান্ত মতবাদ যেমন: ইসমাইলি শিয়া (যা মিশরের ফাতেমীয় শাসকদের দ্বারা প্রচারিত হয়েছিল) এবং মুতাজিলাবাদ দ্বারা আক্রান্ত। তাই তিনি কালাম শাস্ত্র প্রয়োগের মাধ্যমে প্রচলিত মূলধারার ইসলামকে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন এবং জনসাধারণকে আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজেদের সমর্পণে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থের নাম তাহাফুত আল ফালাসিফাহ (দার্শনিকদের অসংলগ্নতা)। যেখানে তিনি মুতাজিলাবাদ ও অন্যান্য মুসলিম দার্শনিকদেরকে তাদের নিজেদের স্ব স্ব পদ্ধতির মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেন।

    আল-গাজ্জালির উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল তিনি কখনোই মুতাজিলাদেরকে শারীরিকভাবে আঘাত করেননি। লেখালেখির মাধ্যমেই তাদের ভ্রান্ত ধারণার নিরসন ঘটিয়েছেন। আল গাজ্জালির ইন্তেকালের পরে মুতাজিলাবাদ পরিপূর্ণভাবে দূরীভূত হয়নি ঠিক, তবে তারা আর মতবাদকে ছড়ানোরও সুযোগ পায়নি। গ্রহণযোগ্যতার তলানিতে ঠেকে একদা পরাক্রমশালী এই মতবাদ।

    আহল আল-সুন্নত ওয়াল-জামাআ’র সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই আতাহারি, মাতুরিদি ও আশআরী ঘরানার আকিদাকে বৈধ বলেই গ্রহণ করে নিয়েছে। সেই সাথে কালামশাস্ত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপচারিতার মাধ্যমে আকিদাকে গ্রহণ করা সকল সুন্নি মুসলিম উপর বাধ্যতামূলক নয়। ইতিহাসজুড়ে দেখা যায় কেবলমাত্র ভ্রান্ত মতবাদের বেড়াজাল থেকে মুসলিমদেরকে মুক্ত করতেই এই দুইয়ের আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। গত একশ বছরে দেখা গেছে, কিছু মুসলিম ভাই এই কালামশাস্ত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনাকে নবআবিষ্কার তথা বিদআত হিসেবে চিহ্নিত করছেন এবং মুতাজিলাবাদ থেকে পৃথকভাবে বিচার করতে ভুল করছেন। অথচ ইসলামের ইতিহাসে দেখা গেছে কুরআন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করে কালাম শাস্ত্রের প্রয়োগ দোষের কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে কালাম শাস্ত্রকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে আশআরী ও মাতুরিদিরা আলেমরা উম্মাহকে মুতাজিলাদের বিভ্রান্তি থেকে উদ্ধার করেছিলেন।

    Bibliography:
    Al-Ghazali, Abu Hamid, and Richard McCarthy (trans.). Deliverance from Error. Beirut: American University of Beirut, 1980.
    Brown, Jonathan. Misquoting Muhammad: The Challenge and Choices of Interpreting the Prophet’s Legacy. London: Oneworld, 2014.
    Yusuf, Hamza. The Creed of Imam Al-Tahawi. Zaytuna Institute, 2007.

    মূল লেখা: http://lostislamichistory.com/mutazilism/

  • ভারচ্যুয়াল অর্থনীতির সারকথা

    ভারচ্যুয়াল অর্থনীতির সারকথা

    ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির আরকটি প্রবঞ্চনাপূর্ণ উপাখ্যান হচ্ছে ভারচ্যুয়াল অর্থনীতি। সম্পদ ও আয়ের সুষম বণ্টনের যে হটকারি প্রস্তাবনা ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা উপস্থাপন করে, ভারচ্যুয়াল অর্থনীতির পক্ষেও তারা সেই প্রস্তাবনাকেই বর্ধিত করে। তারা মনে করে ব্যবসায়ে লগ্নিকৃত পুঁজিকে (ইকুইটি এবং ঋণ) যদি লেনদেনের জন্য উন্মুক্ত করা হয় তবে উদ্বৃত্ত পুঁজি যথাযথ খাতে প্রবাহিত হবে এবং জাতীয় আয়ের ন্যায্য বণ্টন নিশিচত হবে। দ্বিতীয় আরেকটি ধারনা হচ্ছে বাজারের সব ধরনের গতিপ্রকৃতি অনুমান-পটুতার ভিত্তিতে লাভ অর্জন করার অধিকার সবার আছে। সুতরাং পুঁজি লেনদেনের তারল্য এবং নানা বিশিষ্টের আর্থিকপত্র (Financial Instrument) সৃষ্টির মাধ্যমে বিনিয়োগকারীর যেকোনো অনুমানকে বাস্তবে রূপ দেবার বন্দোবস্ত থাকতে হবে যা বাজারকে পরিণত এবং পূর্ণবিকশিত (Market Completeness) করবে। অধিকন্তু, বিনিয়োগকারীগন তাদের ঝুঁকি গ্রহণের রুচি (Risk Appetite) অনুপাতে বিনিয়োগ ঝুড়ি (Investment Portfolio) কে সাজাতে পারবে এবং যেকোনো সময় তাতে পরিবর্তন ও সামঞ্জস্য বিধান করতে পারবে।

    উপরের চিন্তা থেকে ব্যবসা থেকে পুঁজির চুক্তিকে পৃথক করে তা বাজারজাত করা হয়। পুঁজির ধরন অনুসারে চুক্তিগুলোকে নানা নামে অভিহিত করা হয়। যেমন চুক্তির প্রকৃতি মালিকানা (ইকুইটি) হলে তাকে বলা হয় শেয়ার এবং চুক্তির প্রকৃতি ঋণ হলে তাকে বলা হয় বন্ড, ডিবেঞ্চার ইত্যাদি। যদি চুক্তির প্রকৃতি মালিকানা ও ঋণের বৈশিষ্ট্য মিশ্রিত হয় এবং মালিকানার বৈশিষ্ট্য অধিক প্রকাশ্য হয় তবে তাকে বলা হয় প্রতি-ইকুইটি (Quasi Equity), যেমন প্রেফারড শেয়ার। অপরপক্ষে ঋণের বৈশিষ্ট্য যদি অধিক প্রকাশ্য হয় তবে তাকে বলা হয় প্রতি-ঋণ (Quasi Debt), যেমন কনভার্টিবল বন্ড, পার্টিসিপেটরি বন্ড ইত্যাদি।

    চুক্তিকে বাজারজাতযোগ্য করার জন্য চুক্তির প্রকৃতিতে কিছু মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়। যেমন, কোম্পানির দায়কে সীমিত করা যাতে চুক্তিকারী ব্যক্তির (আরও সঠিকভাবে চুক্তি ক্রয়কারীর) দায় চুক্তি-মুল্যের অতিরিক্ত না হয়। দায় সীমিত থাকার কারণে চুক্তি ক্রয়কারিকে সেই কোম্পানির দায়ের ভার নিতে হয়না। যেকারনে চুক্তির বাজার তারল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত কোম্পানিকে একটি স্বতন্ত্র কৃত্রিম ব্যক্তিসত্ত্বা হিসেবে আইনগত ভিত্তি দেয়া হয়। যেকারনে পুঁজি সরবরাহের চুক্তিগুলো হয় নৈর্ব্যক্তিক। অর্থাৎ চুক্তি হয় নৈর্ব্যক্তিক কোম্পানির সংগে পুঁজির, পুঁজি বিনিয়োগকারীর সংগে নয়। সুতরাং চুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে চুক্তির ক্রেতা এবং বিক্রেতার পরিচিতি বা সংযোগের কোন প্রয়োজন পরে না। যেকারনে চুক্তিটি চুক্তির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে একটি সাধারণ ভোগ্যপণ্যে রূপান্তরিত হয়। চুক্তির এই নৈর্ব্যক্তিকরণ চুক্তিপণ্যের বাজার তারল্য বহুগুণ বৃদ্ধি করে। ইন্টারনেটের ব্যবহার ব্যপক বিস্তৃতি লাভ করায় এই চুক্তিপন্যের লেনদেন তারল্য আরেক দফা বৃদ্ধি করেছে।

    পরবর্তী পর্যায়ে মূল চুক্তিকে অন্তরালে রেখে চুক্তিটি ক্রয় বা বিক্রয়ের ‘প্রতিশ্রুতি’ কেনাবেচা করার বাজার সুবিধা সৃষ্টি করা হয়। অর্থাৎ এই পর্যায়ে এসে চুক্তির ‘প্রতিশ্রুতি’কে চুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে পণ্যের চরিত্র দেয়া হয় এবং তা বাজারজাত করার মাধ্যমে তারল্য বৃদ্ধি করা হয়। আরও খানিকটা অগ্রসর হয়ে প্রতিশ্রুতি ক্রয়-বিক্রয়ের ‘প্রতিশ্রুতি’কেও বাজারজাত করা হয়। এই আর্থিকপত্রগুলো মূলত বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতির উপর একধরনের বাজি (Bet)। এই প্রতিশ্রুতি বাজারের প্রধান কয়েকটি আর্থিকপত্র হচ্ছে অপশন, ফিউচার, সোয়াপ ইত্যাদি। সামগ্রিকভাবে এই পত্রগুলোর বাজারকে বলা হয় Derivatives Market. ডেরিভেটিভস মার্কেটের আর্থিকপত্রগুলো ক্রয় করতে যেহেতু পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করতে হয়না তাই বাজার তারল্য বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।

    ব্যবসা থেকে পুঁজিকে বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে সৃষ্ট এই মেকি অর্থনীতিই হচ্ছে ভারচ্যুয়াল অর্থনীতি। ভারচ্যুয়াল অর্থনীতির প্রক্রিয়াটি আরও জটিল আকার ধারন করে যখন এই আর্থিকপত্র ঋণ নিয়ে ক্রয় করা হয় অথবা ধার করে বিক্রি করা হয়।

    চুক্তিপত্রের (শেয়ার, বন্ড ইত্যাদি) মূল্য নির্ধারণে কোম্পানির ভবিষ্যৎ সম্ভাব্য আয়কে বিবেচনায় নেয়া হয়। সম্ভাব্য আয় অবশ্যই অনিশ্চিত। স্বাভাবিকভাবেই চুক্তিগুলোর মূল্য বিনিয়োগকারীদের উপলব্ধি এবং অনুমানের উপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ মূল্য এবং উপযোগিতা Speculative. সুনির্দিষ্ট কোন মূল্য না থাকার কারণে চুক্তিপত্রের চাহিদা ও যোগান বিনিয়োগকারীদের ধারনার উপর নির্ধারণ হয়। সুতরাং মূল্য নির্ধারণে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ-আচরণ (Investment Behavior) একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই বিনিয়োগ আচরণের উপস্থিতির কারণে আর্থিকপত্রের মূল্য কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়ের চেয়েও বাজারের গতিধারার (Market Trend) উপর অধিক নির্ভর করে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীর লোভ, গুজব, অযৌক্তিক প্রত্যাশা চুক্তিপত্রের মূল্য নির্ধারণে অধিক ভূমিকা রাখে। ডেরিভেটিভস মার্কেটের আর্থিকপত্রগুলোর মূল্য নির্ভর করে চুক্তিপত্রের অনুমিত মুল্যের গতিধারার অনুমানের উপর!

    উপরের এই সবকিছুর যোগফল হিসেবে সৃষ্টি হয় একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, অসার, স্ফীত, এবং বিকারগ্রস্থ অর্থনীতি যেখানে পৃথিবীর প্রকৃত উৎপাদনের কয়েকগুণ লেনদেন হয়! শতশত বিনিয়োগকারী এবং মার্কেট অপারেটর যৌক্তিক চেতনা হারিয়ে মোহাবিষ্টের মত এই অযৌক্তিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপৃত হয়। চুক্তিকে বাজারজাত করার কারণে সেখানে সবারই অংশগ্রহন করা সুগম হয়। যে ব্যক্তি কোনদিন টেক্সটাইল ব্যবসা করার কথা চিন্তাও করেনা সেও স্কোয়ার টেক্সটাইলের একটি শেয়ার কিনে। কারণ শেয়ার কেনা আর প্রকৃত ব্যবসায়ী বিবেচনায় পুঁজি লগ্নি করা এক বিষয় নয়। সুতরাং ভারচ্যুয়াল অর্থনীতি যথাযথ খাতে পুঁজি প্রবাহ ঘটায় এই দাবীটি অশুদ্ধ।

    যোগের দ্বিতীয় ফল হচ্ছে পুঁজিবাজারে একটি সার্বক্ষণিক উত্থান-পতন বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি। এই উত্থান-পতনের প্রক্রিয়ায় দরিদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীগনকে প্রায়ই তাদের সর্বস্ব হারাতে দেখা যায়। বাজারের চরিত্র সম্বন্ধে অজ্ঞ সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদেরকে প্রলুব্ধ করে এখানে টেনে আনা হয়। তারা সরল বিশ্বাসে মৌমাছির মত ভারচ্যুয়াল মধুর পেয়ালায় আছড়ে পড়ে। পুঁজির বিনিয়োগ এবং উত্তোলনের মাধ্যমে বৃহৎ বিনিয়োগকারীগন বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। পুঁজির ক্ষমতাবলে বাজার থেকে তারা তাদের লাভ তুলে নিতে সক্ষম হয়। অপরপক্ষে ক্ষুদ্র পুঁজিগুলো খড়কুটোর মত বৃহৎ পুঁজির স্রোতে হারিয়ে যায়। এভাবেই দরিদ্ররা লুণ্ঠিত হয় এবং সম্পদ বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। একারনেই আমরা প্রায়শই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের নিঃস্ব হতে দেখলেও বৃহৎ বিদেশী বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের খুব কমই নিঃস্ব হতে দেখি। শেয়ার কেনা প্রকৃত ব্যবসায়ে পুঁজি লগ্নির অনুরূপ না হওয়ায় জাতীয় আয়ের যে বণ্টনের কথা বলা হয় তা ভ্রান্ত। পুঁজিবাজারের এই উত্থান-পতন পণ্যবাজারকেও দারুনভাবে প্রভাবিত করে। দেখা যায় পুঁজিবাজার যখন চাঙ্গা থাকে তখন ভোক্তারা তাদের বর্তমান ভোগ হ্রাস করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে যা পণ্যবাজারের প্রান্তিক ব্যবসায়ীদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার পুঁজিবাজারের পতন দ্রুত ঘটার কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দ্রুত পুঁজি হারায়, ফলে পণ্যবাজারে আরেক দফা মন্দা সৃষ্টি করে। সুতরাং পুঁজিবাজার অর্থনীতিকে প্রাণবন্ত করে এ দাবীটি বাস্তবতা বিবর্জিত।

    যোগের তৃতীয় ফল হচ্ছে প্রকৃত বিনিয়োগ হ্রাস। পুঁজিবাজার কিছু বৃহৎ কর্পোরেটকে পুঁজি সংগ্রহে সাহায্য করলেও তা রাষ্ট্রের সার্বিক বিনিয়োগকে বৃদ্ধি করেনা। অর্থাৎ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি এবং সরকারীভাবে এখানে বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করার কারণে জনসাধারণ তাদের উদ্বৃত্ত পুঁজি প্রকৃত ব্যবসায়ে বিনিয়োগ না করে পুঁজিবাজারে প্রবাহিত করে, যা শুধুমাত্র গুটিকয়েক পুঁজিপতিকে তাদের মূলধন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় ব্যপক ব্যক্তি উদ্যোগ এবং নতুন ব্যবসা সৃষ্টির তাড়না হ্রাস পায়। সুতরাং অর্থনৈতিক সম্পদ তার পূর্ণমাত্রায় ব্যবহৃত হতে পারেনা।

    উপরের আলোচনা থেকে এটা বলা যায় যে ভারচ্যুয়াল অর্থনীতি আমাদের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয় বরং মুষ্টিমেয় ধনীর হাতে সম্পদকে কেন্দ্রীভূত করার একটি হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। প্রকারন্তরে এই প্রক্রিয়া একটি শক্তিশালী, স্বনির্ভর ও কাম্য অর্থব্যবস্থা সৃষ্টির একটি বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। সর্বোপরি এটি একটি বাস্তবতা বিবর্জিত প্রহসনমূলক অনুশীলন যা মানুষের কোন মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দেয়না।

    ইসলাম এই অন্যায্য ভারচ্যুয়াল অর্থনীতির অবসান ঘটিয়ে একটি শক্তিশালী ও কল্যাণকর অর্থনীতি গড়ে তুলবে যাতে তার অভ্যন্তরীণ সম্পদের সুস্ঠ ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়। জনসাধারণ প্রকৃত ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত হবার কারণে সার্বিক অর্থনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। ভারচ্যুয়াল অর্থনীতি সৃষ্টির উৎস সমূহ বিলুপ্তির মাধ্যমে ইসলাম এই কাজগুলো সম্পাদন করবে। অর্থাৎ ইসলাম সীমিত দায় কোম্পানি নিষিদ্ধ করে অসীম দায়ের অংশীদারি কারবারকে অনুমোদন দিবে। ব্যবসাকে নৈর্ব্যক্তিক সত্ত্বা হিসেবে কোন আইনি ভিত্তি দিবেনা, ফলে অংশীদারি কারবারের পুঁজিকে ব্যবসা থেকে পৃথক করা যাবেনা।

    ইসলাম বর্তমান ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিষ্পেষণ থেকে মানবতাকে অচিরেই মুক্ত করবে ইনশা’আল্লাহ।

    মাহমুদ সাদিক

  • নাগরিক সমস্যার কারণ ও ইসলামিক সমাধান: প্রেক্ষিত আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন

    নাগরিক সমস্যার কারণ ও ইসলামিক সমাধান: প্রেক্ষিত আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন

    ঢাকা ও চট্রগ্রাম মহানগরে প্রধান প্রধান নাগরিক সমস্যাসমূহ কি কি?

    • পর্যাপ্ত ও যথাযথ রাস্তাঘাটের অভাব
    •  অদক্ষ ও অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়নিষ্কাশন)
    • যানজট ও অপ্রতুল পরিবহন
    • জলাবদ্ধতা, অপরিচ্ছন্নতা

    সমস্যাসমূহের কারণ:
    বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই ঢাকা ও চট্রগ্রাম মহানগরীতে নাগরিক সমস্যাসমূহের প্রধান কারণঃ

    ১. পুঁজিবাদের প্রকৃতিই হল সব নাগরিক সুবিধাকে শাসকশ্রেণীর নাগালের মধ্যে রাখা ও এগুলোকে কেন্দ্রীভূত করা। ঢাকা ও চট্রগ্রামে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভাল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, অফিস -আদালত, সচিবালয়, সশস্ত্রবাহিনীসমূহের সদর দপ্তর, প্রধান বিমানবন্দর, রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, কল কারখানা ইত্যাদি। একারণে গ্রাম থেকে নারী পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, জীবিকা অন্বেষণ ও উন্নত জীবনের আশায় এসব নগরীতে চলে আসছে এবং বিধায় নগরীগুলো আরও বেশী জনাকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এমকি ভিক্ষা করা, রিক্সা চালানো, গৃহকর্মীর কাজ, গার্মেন্টস ও দিনমজুরের কাজের জন্যও গ্রামের লোকজন ঢাকায় আসছে। নাগরিক সুবিধা থেকে শুরু করে শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনগত সেবা, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, কল কারখানা ইত্যাদি বিকেন্দ্রীকরণ না করায় দলে দলে গ্রাম থেকে লোকজন ঢাকা বা চট্রগ্রামে আসছে এবং নাগরিক সমস্যাসমূহকে প্রকট থেকে প্রকটতর করছে।

    ২. কোন মৌলিক চিন্তার ভিত্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গড়ে উঠেনি। সেকারণে এখানকার মূলধারার রাজনীতবিদ ও শাসকগণ আদর্শিকভাবে দেওলিয়া, বিধায় নগরায়ণও অপরিকল্পিত। একসময়ের খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ বা বর্তমান সময়ের নিউইয়র্ক ও লন্ডনের মত কোন মাস্টারপ্লানিং এর মাধ্যমে ঢাকা বা চট্রগ্রাম নগরী গড়ে উঠেনি। এখানে গৃহায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন(রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি, পয়নিষ্কাশন) সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদী নয়। অনেকসময় পুঁজিবাদী হীন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে যথেচ্ছভাবে এগুলো করা হচ্ছে এবং বিধায় যানজট, অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা, জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্নতার সৃষ্টি হচ্ছে।

    সমাধান:

    ১. সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যক্তি পরিবর্তন করে নাগরিক সমস্যার সমাধান করা যাবে না, বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ইসলাম দ্বারা প্রতিস্থাপনই সত্যিকারের সমাধান। এর আগেও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে হানিফ, সাদেক হোসেন খোকা, মহিউদ্দিন চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছিল এবং তারা প্রত্যেকেই ঢাকা ও চট্রগ্রামের নাগরিক সমস্যা সমাধানে কী দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল তা এসব নগরীর যানজট, উন্মুক্ত ডাস্টবিন, মশার উপদ্রব ও সামান্য বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা দেখলেই বোঝা যায়।

    ২. ইসলামে শাসন একটি ফরয ইবাদত হওয়ায় শাসকগণ নাগরিক সুবিধাকে কেন্দ্রীভূত করবে না, বরং খলীফা নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা(অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) এবং উম্মাহ’র অধিকার(চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা) তাদের দৌড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে বাধ্য থাকবেন। খলিফা উমার(রা) বলেছেন, “আমি নির্ঘুম রাত্রি কাটাই এ চিন্তায় যে, মসৃণ না করতে পারার কারণে কোন বকরী বাগদাদের রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়ার সময় তার খোড়ায় চোট পেলে আল্লাহ সুওতা আমাকে হাশরের ময়দানে পাকড়াও করবেন।” যে শাসক বকরী বা ছাগলের চোট নিয়ে এত চিন্তিত তিনি মানুষের অধিকারের ব্যাপারে কতটুকু উদ্বিগ্ন ছিলেন তা বলাই বাহুল্য ।

    ৩. খিলাফত রাষ্ট্রের শাসক উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণ করবেন এবং সেকারণে ঢাকা বা চট্রগ্রামের মত হাতেগোনা দু’একটি নগীর উপর এত চাপ পড়বে না।

    ৪. আদর্শিক সত্তার(ব্যক্তি, দল ও রাষ্ট্র) চিন্তার প্রক্রিয়া হলো: লক্ষ্য ঠিক করা, লক্ষ্য অর্জনের জন্য চিন্তা করা এবং চিন্তার ভিত্তিতে কাজ করা এবং চিন্তার এ প্রক্রিয়াই ফলদায়ক ও টেকসই। খিলাফত রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি থাকায় তা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে যথেচ্ছভাবে উন্নয়ন করবে না এবং সেখানে উন্নয়ন হবে টেকসই ও সুপরিকল্পিত। অর্থাৎ খিলাফত রাষ্ট্র অপিরকল্পিত নগরায়ণ করবে না এবং সেকারণে যানজট, অদক্ষ ও অপ্রতুল অবকাঠামোগত সেবা (বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, পয়নিষ্কাশন), জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছনতার মত সমস্যাগুলো থাকবে না। খিলাফত রাষ্ট্র মধ্যযুগেই বাগদাদ নগরীতে নাগরিকদের জন্য রাস্তায় ল্যাম্পপোস্ট এবং ঘরে ঘরে পাইপের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেছিল যখন ইউরোপের লোকেরা শৌচাগার ও গোসলখানা সর্ম্পকে কোন ধারণাই রাখত না।

    রাফীম আহমেদ