তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
নারীর প্রতি সহিংসতা; একই সমস্যায় ঘুরপাক খাচ্ছে সমাজ: সমাধান কোথায়?

আমাদের আবেগ-আক্রান্ত সমস্যার selective outcry (তনু হত্যা) সমাধানটা কি শুধুমাত্র এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে হবে? সমাজ থেকে যাতে এই সমস্যাগুলো আর উঠে না আসে, আমাদের ওই ভাবে সচেতন হওয়া উচিত নয় কি? আমরা কি শুধু ক্যান্সার থেকে সৃষ্ট লক্ষণগলো তাড়ানোর জন্য সাময়িক হৈচৈ করব? নাকি পুরো ক্যান্সার দুরিকরণে সচেতন হয়ে চেষ্টা করব?
আমরা যখনই কতগুলো সমস্যা নিয়ে কথা বলি তার শুরুতেই আপনাকে ভাবতে হবে সমস্যাগুলো যেমন- ইভ টিজিং, ধর্ষণ, হত্যা, পরকিয়ার কারণে নিজ সন্তান-স্বামী/স্ত্রী হত্যা…… কেন হচ্ছে?
যার কারণে(মানুষ) এই সমস্যা গুলোর সৃষ্টি তার স্বভাবটাই (nature) বা কেমন?
মানুষের স্বভাব:
মানুষের মধ্যে সাধারনত দুটো রুপ বিদ্যমান; একটা organic needs বা জৈবিক চাহিদা যা ক্ষুধা এবং পিপাসার আবরণে প্রকাশ পায়। এ জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য তাকে খেতে হয়। জৈবিক চাহিদা তাকে ভিতর থেকে তাড়িত করে যেমন ক্ষুদা লাগা। এটি পূরণ না হলে সে মারা যায়। যেমন আপনি না খেলে, প্রকৃতির ডাকে সাড়া না দিলে মারা পড়বেন। অর্থাৎ পূরণ হওয়া অপরিহার্য।
অপরটি প্রবৃত্তি বা instinct। প্রবৃত্তি বা instinct মানুষের মধ্যে সুপ্তভাবে থাকে যা পূরণ না হলে মানুষ মারা যায় না। কিন্তু সে চিন্তিত হয় প0ড়ে তাড়িত চাহিদা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত। মানুষের instinct পূরণ না হলে সে মারা যায় না বরং চিন্তিত হয় ,এটি পূরণ হওয়া অপরিহার্য নয়।এটি মানুষের ভিতর থেকে আসেনা বরং বাহির থেকে আসে।
মানুষের আছে ‘টিকে থাকার প্রবৃত্তি’ (survival instinct), যার অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়, ক্রোধ, লালসা, ভয়, আক্রমণ, প্রতিরক্ষা, অহংবোধ প্রভৃতির মাধ্যমে।
আর আছে ‘আধ্যাত্মিক প্রবৃত্তি'(religious instinct) – যার প্রকাশ ঘটে যখন মানুষ অসহায় বোধ করে। তখন সে চায় তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, ক্ষমতাধর, কারও নিকট আত্মসমর্পণ করতে, সাহায্য চায়, তার কাছে নিজেকে নিবেদিত করে। সারা জীবন নিজের ইচ্ছাধীন চলার পর বৃদ্ধবয়সে এসে যখন শরীরের দুর্বলতা কাছ থেকে অনুভব করে তখন তার মধ্যে মৃত্যু/ভয়ের জন্ম হয় ফলতঃ সে সৃষ্টার নিকট অসহায় প্রার্থনা করে।
প্রজনন প্রবৃত্তি (procreation instinct)- যার অভিব্যক্তি প্রকাশিত হয়, মায়া, মমতা, ভালবাসা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ এসবের মাধ্যমে।
যেমন- procreation বা প্রজনন প্রবৃত্তির কারণে বিপরীত লিঙ্গকে দেখে বিমোহিত হওয়া, তা হতে চিন্তার উদয় ঘটানো, সবশেষে চাহিদা পূরণ না হলে উদ্বিগ্ন হওয়া।
এগুলো মানুষের প্রবৃত্তিগত বৈশিষ্ট্য। প্রবৃত্তির তাড়না আসে চারপাশ বা REALITY হতে যেমন-প্রজনন প্রবৃত্তি মানুষের ভিতর থেকে আসেনা, আসে বাহিরের কোন ব্যক্তি, বস্তু বা চিন্তা তার ভিতর প্রবেশ করার মাধ্যমে। সুতরাং মানুষ এই প্রভৃত্তির তাড়না অনুভব করেনা যদি না তার সামনে ওই বাস্তবতা সৃষ্টি করা হয়। সেক্ষেত্রে সে উত্তেজিতও হবেনা।
তাহলে এত অনাচারের কারণ কী?
এক কথায় প্রবৃত্তিকে জাগানোর জন্য ওই বাস্তবতা সৃষ্টি করা। যখন একটি সমাজের সমস্ত পরিবেশকে ষড়যন্ত্র করে প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে দেওয়া হয় তখন ওই সমাজের মানুষের চিন্তা, চেতনা, ধারনা ও সময় ব্যস্ত থাকে ঐ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে।
এখন আপনি যদি আপনার চারপাশে তাকান দেখবেন একটা সেকুলার আইডিওলজি হতে উঠে আসা চিন্তা হতে ব্যবস্থা কিভাবে একটি সমাজকে ব্যস্ত করে রাখে শুধু কিছু প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে ব্যস্ত রাখার মাধ্যমে। যেমন আপনার হাটার পথে অর্ধনগ্ন বিলবোর্ড, উত্তেজক অশ্লীলতায় ভরা বিজ্ঞাপন, ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে পরিবারগুলোকে ভঙ্গুর করে তোলা, ফ্রি মিক্সিংকে স্বাভাবিক করে তোলা নাটক ও সিনেমা, পর্নগ্রাফি, অস্বাভাবিক সম্পর্ক, টেলিকম কোম্পানির-লাভ SMS রাত জেগে কথা বলার উৎসাহ, বিবাহ কঠিন করে ফেলা ইত্যাদি। অর্থাৎ একটা মানুষের স্বাভাবিক আচরন, চিন্তা, চেতনা, সময় সবকিছুকে ব্যস্ত রাখা প্রজনন প্রভৃত্তিকে জাগিয়ে রাখার মাধ্যমে।
ফলে যা ঘটে:
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের অর্থায়নে ICDDRB ২০১১ সালে একটি জরিপ চালায়। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪০ শতাংশ পুরুষ বলেছেন, তাদের বয়স ১৯ বছর হওয়ার আগেই তারা নারী ধর্ষণ করেছে, ৫৭-৬৭ শতাংশ বলেছে, শুধু মজা করার জন্যই তারা নারীদেরকে যৌন হয়রানি করেছে। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের অপরাধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০১৬ এই পাঁচ বছরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ১ লাখ ৯ হাজার।(সুত্রঃপুলিশ সদর দপ্তর;৮/৪/১৬ by online AMAR DESH)
যারা জনগণের সম্পদ চুরি করে পশ্চিমা দেশে এক’পা দিয়ে রেখেছেন তারা জেনে খুশি হবেন-২০১৫ সালে নারী লাঞ্চনায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে ব্রিটেন, যেখানে প্রতি ১০০জনে ৮৪জন নারী লাঞ্চনার স্বীকার হয়েছেন। নারী স্বাধীনতার এত উন্মুক্ত প্রদর্শনী তারপরও এই অবস্থা কেনো?আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থা যেখানে ধর্ষণ, হত্যা, নিরাপত্তাহীনতায় আতংকিত হয়ে উঠেছে সেখানে একটা তনু হত্যা অনেক গুলো ডটের মধ্যে একটি ডট মাত্র…………………।(প্রতিদিনকার পত্রিকার শিরোনাম)
আমাদের নিয়ে খেলছে কারা ?
পুঁজিবাদ (capitalism) যেকোন বিষয় হতেই পুঁজি সংগ্রহ করতে চায়। সেটা পুরুষের শুক্রাণু বিক্রি করেই হোক কিংবা নারীর জরায়ু ভাড়া দিয়ে। পুঁজি অর্জনই তার কাছে একমাত্র মুখ্য বিষয়। তাই নারীকেও সে পুঁজি অর্জনের একটি উপকরণ হিসেবে দেখে। নারী হতে পুঁজি অর্জন করতে হলে তার সৌন্দর্য, দেহ – এগুলোকে ব্যবসার পণ্য বানাতে হবে। এক্ষেত্রে কালো মেয়েকে বুঝাতে হবে, তাকে ফর্সা হতে হবে । সাদা মেয়েকে বুঝাতে হবে, তার চামড়া ফ্যাকাসে, তাই রোদে পুড়িয়ে তামাটে করতে হবে, বিক্রি হবে পণ্য, সেজন্য যেতে হবে সমুদ্র সৈকতে,উন্মুক্ত হবে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ । নর-নারীর যে স্বাভাবিক সম্পর্ক তার প্রকাশ ঘটবে শুধুমাত্র যৌনতার আবেশে। অর্থাৎ কিছু স্বাধীনতার কথা বলে পরিপূরকের এক অংশকে(নারী) অর্ধ বা পুরো উলঙ্গ করে অপর অংশের instinct বা প্রবৃত্তিকে উস্কিয়ে দেওয়া । ফলস্বরুপ, একটি মাদকাসক্ত করে রাখা সমাজ থেকে উঠে আসে- প্রতিদিনকার ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, হত্য, সার্বিক অনাচার এবং একটি ভুল আদর্শ পুঁজিবাদের পুঁজি সংগ্রহ। সমাজে বিদ্যমান একটি ভুল আদর্শ (capitalism) ও তার বাস্তবায়ন পদ্ধতি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই এসকল সমস্যা ও অরাজকতার একমাত্র কারণ ।
একজন মানুষকে এইভাবে আসক্ত করে রাখার উদ্দ্যেশ্য একটাই যাতে সে ;তার জীবনের সামগ্রিক লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্যর সন্ধান না করে। সে যাতে চিন্তা না করে তাকে কেও একজন পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যিনি পাঠিয়েছেন তিনি অবশ্যই একটি সুনিয়ন্ত্রিত জীবন পরিচালনার ব্যবস্থাও নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এবং তার স্রষ্টার পাঠানো ব্যবস্থাটাই বা কি?
একটি বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস হতে “জীবনব্যবস্থা” (ideology) ইসলাম যা একমাত্র সমাধান:
ইসলাম একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোকিত চিন্তা(enlighten thought) যা মানুষ, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক ধারণা(idea) দেয়। যা মানুষের স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি দ্বারা প্রমানিত এবং ফিতরাত বা Instinct এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মানুষের যাবতীয় সকল সমস্যার বাস্তবায়ন যোগ্য একটি সুশৃঙ্খল পদ্ধতি(method)। সৃষ্টা কতৃক প্রেরণ তাই বাস্তবায়নের ফলে সমস্যার উদ্ভব হয় না।
কেও যদি আমাদের না বলেন কোন উপায়গুলো অবলম্বন করলে তিনি খুশি হন, সে ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা চেষ্টা করে উনাকে খুশি করতে পারবনা। চেষ্টায় উল্টো রেগে যেতে পারেন। অনুরুপভাবে আমাদের জৈবিক চাহিদা ও instinct গুলো পরিপূর্ণ করতে একটা নির্দেশনা প্রয়োজন। তা অবশ্যই যার sanctify বা গুণগান করা হবে তিনি হতেই আসা জরুরী। যেমন আল্লাহ প্রদত্ত ইসলাম,নির্দেশনা রুপে কুরআন এবং হাদীস, কিভাবে তা পালন করতে হবে তার জন্য রাসূল (সা) দেখিয়ে দেন জৈবিক চাহিদা ও instinct গুলো কিভাবে পূরণ করতে হয়। এর বাইরে কোন উৎস হতে সমস্যার সমাধান করতে গেলেই অরাজকতার সৃষ্টি হবে যা বর্তমানে দৃশ্যমান।
ইসলাম মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তি হতে উদ্ভুদ্ধ সমস্যাগুলোকে সুশৃংখল্ভাবে সমাধান করে বিবাহের মাধ্যমে। ইসলাম প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলার উপায় উপকরণগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করে। মানুষের চিন্তা,সময় ও মেধার সঠিক ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। নারী-পুরুষের মধ্যে অ-মাহরামগত (marriageable) সম্পর্ক সীমাবদ্ধ বা নিষিদ্ধ করে। কারণ এই অবৈধ সম্পর্কগুলো মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তিকে উস্কিয়ে দেয় এবং তাকে সীমালংঘনের দিকে নিয়ে যায়। কারণ প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণ না হলে সে দুঃচিন্তাগ্রস্থ হয়ে উত্তেজিত হয় এবং সর্বশেষ আইন ভঙ্গ করে। ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
যেমন রাসুল(সা) বলেন-
“তোমাদের কারো উচিত নয় কোন মহিলার সাথে একাকী দেখা করা, যদি না তার সাথে তার মাহরাম (not marriageable to her) কেও থাকে। “
এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা:
“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।”
ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এই আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।
রাসূল(সা) বর্ণনা করেছেন:
“…চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যান করে।”
দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।
সকল সমস্যার একমাত্র সমাধান আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-
“আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখা”[সুরা নাহলঃ৮৯]
ইসলামি আকীদা হতে উদ্ভূত, রাসুল (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, ইসলাম বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি খিলাফত ব্যবস্থা। যা অন্যান্য সব ধরণের শাসন ব্যবস্থা হতে ভিন্ন। “খিলাফত” একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এটি ইসলামি আকীদার বাইরে যেকোন দূষিত চিন্তা ও কর্মকাণ্ডকে প্রতিহত করবে।
ফলতঃ মানুষের জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তিগুলোকে সঠিকভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ করে দেবে। সর্বোপরি নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (সা) বলেন-
“নিশ্চয়ই, খলীফা হচ্ছেন ঢাল স্বরুপ….”।
তনু হত্যা : পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফল

ঘটনা:
কুমিল্লার সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু’র মৃতদেহ ২০ মার্চ রাত সোয়া দশটার দিকে খুঁজে পান স্বয়ং তনুরই বাবা ইয়ার হোসেন। ইয়ার হোসেন সাহেবের কথায় “একটু উঁচু জায়গায় জঙ্গল ও গাছ গাছালির মধ্যে তনুকে পেলাম। গাছের তলায় ওর মাথা দক্ষিণ দিক আর পা উত্তর দিকে পরে আছে। মাথার নিচটা থেতলে গেছে। পুরো মুখে রক্ত ও আঁছড়ের দাগ। আমরা পাঁচজন মিলে সিএমএইচ-এ নিয়ে যাই।” সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার তনুকে মৃত ঘোষনা করেন। এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা এখন সবার মুখে মুখে। ধারনা করা হচ্ছে ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে। এজন্য ধর্ষককে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে আন্দোলন চলছে।
বাস্তবতা:
ধর্ষণের মতো বিকৃত মানসিকতার ঘটনা গত কয়েক বছরে ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। যার কিছু মিডিয়াতে আসে কিছু আসে না। নারীর প্রতি যৌন হয়রানির ঘটনা বাড়ার পাশাপাশি ধরনের ক্ষেত্রেও এসেছে নিত্যনতুন মাত্রা। গত বছর বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের সময় টিএসসিতে প্রকাশ্যে সবার সামনে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। গত ২ বছরে শুধু গণপরিবহনে কমপক্ষে ১৮ জন নারী ধর্ষণ বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- গত বছর রাজধানীতে এক গারো তরুণীকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে চলন্ত অবস্থায় গণধর্ষণ করা হয়। রাজধানীর অদূরে সোনারগাঁর আড়াইহাজারে চলন্ত বাসে এক নারী শ্রমিককে বাস ড্রাইভার ও সহকারীসহ চারজন মিলে গণধর্ষণ করে। সর্বশেষ ৩১ মার্চ টাঙ্গাইলের মধুপুরে একটি বাসে এক নারীকে গণধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ৬ মাসের শিশুরাও রেহায় পাচ্ছে না বিকৃত মানসিকতার এই ধর্ষকদের হাত হতে। ব্র্যাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী-২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। যদিও প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে ৬৮ শতাংশ নির্যাতনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়না। বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে প্রায় ৫ হাজার নারী ও মেয়েশিশু নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব সহিংসতার মধ্যে রয়েছে, এডিস নিক্ষেপ, অপহরণ, ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা, পাচার, খুন এবং যৌতুকের জন্য নির্যাতন।
বিষয়টি লক্ষনীয় যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন যেমন পাল্লা দিয়ে ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তোড়জোড়ও তথা নারীবাদীদের কলাম লেখনী, নারী সংগঠনের সভা সেমিনার, সরকারের মহিলা ও শিশু মন্ত্রণলয়ের সচেতনতামুলক প্রকল্পের মাত্রাও বহুগুন বেড়েছে। সমাধান হিসাবে দেওয়া হচ্ছে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা বুলিসমূহ – নারীকে শিক্ষিত হতে হবে, নারীর সমঅধিকার ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে, নারীদেরকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে ও সর্বোপরি নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে ঐ নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব। এছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করতে হবে। এই সমাধানসমূহ গ্রহণের ফলাফল হিসাবে দেখা যাচ্ছে, নব্বই এর গণঅভ্যত্থানের পর এদেশে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর পদ অলংকৃত করেছেন নারী। বর্তমানে স্পীকারের পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন একজন নারী। নারী শিক্ষার হারও বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রায় পুরুষের সমান। নারীরা দিনে দিনে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বীও হয়ে উঠছে। নারী অধিকার রক্ষাই প্রতিনিয়ত উৎপাদিত ও আমদানী হচ্ছে দেশী বিদেশী এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থা যারা নিরলসভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রত্যেক সরকারই প্রণয়ন করছে ডজন ডজন আইন। পূর্বের আইন সমুহকে আরো কঠোর করা হচ্ছে। পশ্চিমা শক্তিগুলো আমাদের সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগামীদের পুরস্কৃতও করছে তাদের অবদানের জন্য। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ পাচ্ছেন ড. কামাল হোসেনের মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেন। কারণ তিনি দেশের সুবিধাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পক্ষে সর্বোচ্চ আদালতে আইনি লড়াই করেন। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের খসড়া প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। ফতোয়ার বিরুদ্ধে তার মামলা লড়ার কথাও স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার ‘ফরচুন’ সাময়িকী গত ২৪ মার্চ, ২০১৬ নিজস্ব ওয়েবসাইটে বিশ্বের মহান ৫০ জন নেতার তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে ১০ নম্বরে রয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে ‘ফরচুন’ বলেছে, তিনি নিজ দেশে নারীদের অধিকার এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশে নারীদের আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করেছেন। পাশাপাশি তিনি অধিকতর শিক্ষা, আর্থিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দিতে কাজ করছেন।
কিন্তু এত কিছুর পরও নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন বন্ধ তো স্বপ্নের বিষয়, কমার কোন লক্ষনই আপাতত: দেখা যাচ্ছেনা। বরং এই নির্যাতনের গ্রাফটা দিন দিন আরো উর্ধ্বগামী হচ্ছে। কারণ আমরা নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে ব্যর্থ হয়েছি।
প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান:
একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায় পশ্চিমাদের দেওয়া এই সমাাধানগুলো কত দুর্বল এবং মৌলিকভাবে কত অসার। পরিসংখ্যান বলছে, যেসব দেশ নারী উন্নয়ন সূচক হিসাবে- নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতা, শিক্ষা, অধিকার সচেতনতা, নারী ক্ষমতায়নকে মাপকাঠি বিবেচনা করে তারা নারীকে উন্নত জীবন দেওয়াতো দূরের কথা, নিরাপত্তাই দিতে পারেনি।
ভারতে প্রতি ২০ মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয় (রিপোর্টেড)। ৭৪ শতাংশ নারী দিল্লীতে ২০১২ সালে হয়রানীর শিকার হয়েছে (Hindustan times)। নারী নির্যাতনের প্রতিযোগীতায় অগ্রগামী তারাই যারা যথারীতি নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ। যেমন USA এবং UK। পরিসংখ্যানের আলোকে, UK-তে প্রতিদিন ১৬৭ জন নারী ধর্ষিত হয়। USA-তে প্রতি ১৮ সেকেন্ডে ১ জন নারী, স্বামী কর্তৃক শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়।
UK ২.৫ হাজার স্বীকৃত Pedophiles (শিশু যৌন নির্যাতনকারী) লালন করেছে। বৃটেন প্রতি ২০ জন ১জন নারী ধর্ষিত হয় এবং ১০০ জন ১জন ধর্ষণ হচ্ছে। USA- তে প্রতিদিন ৩ জন নারী তার পার্টনারে কর্তৃক হত্যা হয়। ইউরোপ প্রতি ১০ জনে ১ জন নারী যৌন হয়রানীর শিকার হয়। USA – তে প্রতি ৪৫ সেকেন্ডে একজন নারী ধর্ষিত হয়। (সুত্র: মাইকেল প্যারেন্টি-২০০০ সালে প্রকাশিত The ugly Truth)
উপরোক্ত পরিসংখ্যানগুলো কি যথেষ্ট নয় এটা বুঝার জন্য যে নারী নির্যাতন বন্ধের যে দাওয়াই পশ্চিমা সমাজ থেকে গ্রহণ করছি তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।
অর্থাৎ আমরা সহজে একটা লাইন টানতে পারি যে, ভারত পশ্চিমাদের মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতি অনুসরন করেছে যার ফলশ্রুতিতে আজকে ভারতে পশ্চিমা সমাজের ন্যায় নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন চরম পর্যায়ে যেখানে দিল্লীকে বলা হয় ধর্ষনের নগরী। আর আমরাও পশ্চিমাদের অনুসরন করে ভারতের পথেই হাঁটছি। যার নমুনা বাসে গণধর্ষনের মত ঘটনা।
একজন যুবক যখন দিনের পর দিন হলিউড-বলিউডের মুভি, কারিনা-ক্যাটরিনা-সানি লিওনদের আইটেম song, নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনে নারীকে খোলামেলা উপস্থাপন করাকে দেখে, স্মার্ট মোবাইলে কম রেটের ইন্টারনেট প্যাকেজ ব্যাবহারে সহজলভ্য পর্ণ সাইট গুলো বিচরণ করে এবং এরপর রাস্তায় বা ক্যাম্পাসে কোন নারীকে সে কোন দৃষ্টিতে দেখবে? যেখানে নারীরাও স্বাধীনতার নামে বা অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের উপস্থাপন করছে আকর্ষণীয় রূপে। এক্ষেত্রে নারীদেরকেও বেশি দোষ দেওয়া যায় না। কারণ প্রতিনিয়ত নাটক-সিনেমা-বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নারীদেরকে উৎসাহিত করা হচ্ছে পশ্চিমাদের বা ভারতীয় নারীদের মত আধুনিক হতে। ফলশ্রুতিতে আমাদের সামনে একজন নারী উপস্থাপিত হচ্ছে একটি ভোগ্যপণ্য হিসাবে। ফলে পরকীয়া, ধর্ষন এমনকি ৬ মাসের শিশুটিও বাদ যাচ্ছে না পর্ণ দেখায় অভ্যস্ত যুবকটির লোলুপ হাত হতে।
পশ্চিমারা মুনাফা সর্বোচ্চকরন নীতির কারনে যেকোন উপায়কে সঠিক মনে করে। এর জন্য নারীর সম্মান বিক্রি করে মুনাফা আসলেও তারা তা বৈধতা দেয়। তাই পর্ণোগ্রাফি Industry কে West প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সারা বিশ্বে এর প্রচার-প্রসার করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা করছে। আর অন্যদিকে নারী মুক্তির বা নারী অধিকারের আন্দোলনকে উৎসাহিত করছে। এটা তাদের স্পষ্ট দ্বৈতনীতি। সর্বোপরি পশ্চিমারা ও আমাদের শাসকগোষ্ঠী নারীদের সম্মান ও নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ।
তাই বলা যা যে, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ হত্যা ও নির্যাতনের মূল কারণ হলো-
– পশ্চিমারা বাংলাদেশে তাদের দালাল শাসকগোষ্ঠী ও বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমে জীবন সম্পর্কে তাদের মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রচার-প্রসার করেছে এবং সর্বত্র নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসাবে উপস্থাপন করেছে।
– এবং আমরা জনগন না বুঝে তাদেরকে অন্ধ অনুসরণ করছি।
সমাধান:
এক বছর হতে চলল অথচ এখনো গ্রেফতার হয়নি পয়লা বৈশাখে যৌন হয়রানির প্রকৃত অপরাধিরা! তাই অনেকে মনে করছেন যে, প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার করে কঠোর শাস্তি দিলে এই ধরনের অপরাধ কমে যাবে। কিন্তু শুধুমাত্র কঠোর শাস্তিই এই সমস্যার সমাধান করবে না। যদিও দোষীদের সনাক্ত করা ও তাদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বর্তমান পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তথাপি এটা মূল কারণ নয়। তথাপি অনেকেরই প্রতি বছর এমন অপরাধের জন্য যাবৎ জীবন কারাদণ্ড বা বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হচ্ছে। কিন্তু অপরাধ কমার কোন লক্ষন নেই। মূল কারণ বা সমস্যা এটাও না যে আমরা কত আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োগ করতে পারলাম। নারীর নিরাপত্তার মুল সমস্যা চিহ্নিত করা না গেলে, প্রত্যেক নারীর জন্যও একজন পুলিশ নিয়োগ করলেও নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করা যাবে না। যার উদাহরণ স্বয়ং নারী পুলিশ পুরুষ পুলিশ কর্তৃক নির্যাতনের করুণ চিত্র আমেরিকা, বৃটেন, ভারত বা বাংলাদেশে কোথাও ব্যতিক্রম নেই।
অনেকে মোল্লাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলছেন যে, পর্দা করলে নারীরা যৌন হয়রানিসহ নির্যাতন হতে রেহায় পাবে। কিন্তু তনু হত্যার পর অন্যরা বলছে – ‘পোষাক বাঁচাতে পারেনি তনুকে’ বা ‘আরো কত পোষাক পরলে ধর্ষন করা হবে না’। কারণ তনু হিজাব পরতো। এগুলো আসলে ইসলামকে ব্যঙ্গ করে বলা হচ্ছে। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র পোষাক পরিবর্তন করে এই ধরনের অপরাধ বন্ধ হবে না। বরং সমাজ থেকে পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা মূল্যবোধ (জীবনটাকে উপভোগ করা যেকোন উপায়ে), ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করতে হবে।
এবং সমাধান হিসাবে শুধুমাত্র ইসলামী পোষাক নয় বরং পরিপূর্ণ ইসলামকে গ্রহণ করতে হবে। ইসলামী মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা ও সংস্কৃতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে যা কেবল একমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব।
ইসলাম মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে কিভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অর্জনের জন্য। ইসলামই নারীকে দিয়েছে সম্মান, এবং নিরাপত্তা এবং এই উদ্দেশ্যে ইসলাম প্রথমত ব্যক্তি স্বাধীনতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয়ত সমাজে আল্লাহ প্রতি আনুগত্য উৎসাহিত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে নারীর প্রতি সঠিক মানসিকতারও দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করা যাবে। ইসলাম সমাজে যৌনতার বিস্তারকে নিষিদ্ধ করে, নারীর দেহের সকল ধরনের বস্তুকীকরন এবং শোষন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে। নারী পুরুষের মধ্যকার সম্পর্ককে কখনও সস্তা করেনা এবং সকল ধরনের বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক সমাজ থেকে দূর করে। নারী ও পুরুষের একে অপরের প্রতি আকর্ষন বিষয়ক ও সকল চাহিদার পূরণের একমাত্র উপায় হিসাবে বিবাহকে নির্দেশ করে এবং বিবাহের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করে। যা কিনা নারী-পুরুষ ও সমাজকে রক্ষা করে। ইসলাম নারীকে সর্বাধিক সম্মান দিতে উৎসাহিত করে। ইসলাম কখনোই সস্তা দামে নারীর সম্মান বিক্রি করে না। রাসুল (সা:) বলেন- “এই বিশ্ব এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে সবকিছুই মূল্যবান। কিন্তু সবচেয়ে মূল্যবান একজন পরহেযগার নারী।”
ইসলাম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। তিনি (সা:) আরো বলেন- “এমন একটা সময় আসবে যখন মহিলারা সানা থেকে হাজরে মাউত পর্যন্ত নির্ভয়ে রাতের বেলা পাড়ি দিতে পারবে শুধুমাত্র জীব-জন্তু ও আল্লাহর ভয় তাদের অন্তরে কাজ করবে।” আল্লাহর রহমতে খলীফা ওমর (রা:) এর সময় এই হাদীসের বাস্তবতা দেখা গিয়েছিল। আব্বাসীয় খিলাফতের সময় রোমান সীমান্তে কিছু রোমান সৈন্য একজন মুসলিম নারীর কাপড় ধরে টানাটানি করে অপমানিত করলে, সেই নারীর অভিযোগ খলিফার কাছে পৌছলে খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহ সৈন্য বাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছিল একজন মুসলিম নারীর সম্মান ও নিরাপত্তার জন্য।
এছাড়া খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। কেউ ব্যভিচার করলে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। ফলে ঐ ব্যক্তি ২য়বার অপরাধ করার সুযোগ পাবে না এবং অন্যরা ঐ ধরনের অপরাধ করার সাহস পাবে না। ১৩০০ বছরের খিলাফতের ইতিহাসে পাথর মেরে হত্যার ঘটনা অনেক বেশি না।
তাই ইসলামি জীবন ব্যবস্থা তথা খিলাফতের অধীনে নারীর প্রতি যৌন হয়রানিসহ সকল ধরনের নির্যাতন বন্ধ হবে কারণ –
– একজন মুসলিম কুরআন-সুন্নাহর সীমারেখা দ্বারা সীমাবদ্ধ। একজন মুসলিম একমাত্র আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর ভয়ে ভীত হয়ে সমাজে নিরাপত্তার হুমকি হতে পারে এরকম ঘৃণ্য কাজ সমূহ থেকে বিরত থাকে।
– পাশাপাশি খিলাফত রাষ্ট্র কঠোরভাবে কুরআন-সুন্নাহর আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায় বিচার চালু রাখে, যার ফলে সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা হয়।
করণীয়:
রাসূল (সা) বলেছেন,
“যারা আল্লাহর হুকুম মেনে চলে তাদের সাথে থেকে যারা সেগুলো (আল্লাহর হুকুম)-কে নিজেদের প্রবৃত্তির খেয়ালে লঙ্ঘন করে, (এরা উভয়ই) যেন তাদের মত যারা একই জাহাজে আরোহণ করে। তাদের একাংশ জাহাজের উপরের অংশে তাদের জায়গা করে নিয়েছে এবং অন্যরা এর নীচের অংশে নিজেদের জায়গা করে নেয়। যখন নিচের লোকদের পিপাসা নিবৃত্ত করার প্রয়োজন হয় তখন তাদেরকে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের অতিক্রম করে যেতে হয়। (তাই) তারা (নিচের অংশের লোকেরা) নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে নিল, ‘আমরা যদি জাহাজের নীচের দিকে একটা ফুটো করে নিই তাহলে জাহাজের উপরের অংশের লোকদের কোন সমস্যা করব না।’ এখন যদি উপরের অংশের অধিকারীরা নিচের ডেক’এর লোকদেরকে এ কাজ করতে দেয় তবে নিশ্চিতভাবেই তারা সবাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। অবশ্য তারা (উপরের অংশের লোক) যদি তাদের (নীচের লোকদের)কে এ কাজ থেকে বিরত রাখে, (তবে) তারা (উপরের অংশের লোক) রক্ষা পাবে এবং এভাবে (জাহাজের) সবাই রক্ষা পাবে।” (বুখারী )
সুতরাং সমাজ ব্যবস্থার একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজকে এমন সব নির্দিষ্ট কার্যাবলী থেকে বিরত রাখা, যা ঘটলে তা হবে পুরো জাতির জন্য ক্ষতিকর। তাই ধর্ষনের মত বাজে ঘটনার শিকার আমার পরিচিত (মা-বোন-আত্মীয়স্বজন-সহপাঠী) কেউ হওয়ার আগে এ থেকে পরিত্রানের জন্য পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তরুন সমাজকে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং প্রকৃত সমাধান ইসলামিক রাষ্ট্র তথা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে।
খিলাফতই ইসলাম প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি

“তোমরাই সর্বোত্তম জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎকাজে আদেশ করবে এবং অসৎকাজে নিষেধ করবে”। (আল ইমরানঃ ১১০)
সময়ের শুরু থেকেই যুগে যুগে পথহারা মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ পাক অসংখ্য নবী-রাসূলকে পাঠিয়েছেন। দুনিয়ার যাবতীয় মিথ্যাচার, যুলুম এবং মিথ্যা উপাস্য থেকে মুখ ফিরিয়ে মানুষ যাতে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উপাসনা করতে পারে এবং সিরাত্বাল মুস্তাক্বিমের অনুসারী হতে পারে এজন্য পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে আল্লাহ নবী-রাসূলদের পাঠিয়েছেন। তৎকালীন আরবের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন সময়ে যখন মানুষ একত্ববাদের পরিবর্তে মূর্তিপূজা এবং নানারকম অনাচারে ডুবে গিয়েছিল তখন শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) এর আগমনে পৃথিবীর বিপন্ন মানবতার জন্য এক নতুন আশার সঞ্চার করে। নব্যুয়াত প্রাপ্তির পর মক্কায় দীর্ঘ তের বছর নিরন্তর তাওহীদের দাওয়াত এবং অত্যাচারী শাসকদের যুলুম নির্যাতন তাওহীদের দাওয়াতকে করেছিল আরো বেশি সুসংহত। অবশেষে আল্লাহর সাহায্যে মদীনায় ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলাম পুরো জাজিরাতুল আরবের এক শক্তিশালী এবং প্রতাপশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে রাসূল (সা) এর ওফাতের পর খোলাফায়ে রাশেদীনের শাসনামলে ইসলাম ইরাক, শাম, পারস্য ও রোমানের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখে। উমাইয়া, আব্বাসী এবং উসমানীয় খিলাফতের সময় ইসলাম উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, মরক্কো গ্রীস, সিসিলি সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামরিক দিক দিয়ে ইসলাম পৃথিবীর ইতিহাসকে যুগ যুগ ধরে প্রভাবিত করেছে এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীদের জন্য ত্রাতা হিসেবে বরাবর আবির্ভূত হয়েছে।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে ঘটে মুসলিম ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন করে দেয়া সেই ঘটনাটি। ১৯২৪ সালের ৩রা মার্চ, সাম্রাজ্যবাদী সম্মিলিত কুফফার শক্তি ব্রিটেন এবং ফ্রান্সের নিরন্তর প্রচেষ্ঠায় বিশ্বাসঘাতক মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক তুরষ্কে উসমানীয় খিলাফতের বিলুপ্তি ঘটায়। ১৯২৪ সালের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের দালাল শাসকদের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বে সৃষ্টি করেছে অসংখ্য কৃত্রিম সীমানা এবং অসংখ্য জাতির পিতা যারা কুফফারদের পা চাটতে কোন রকম কার্পণ্য করেনি। তারা মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করিয়েছে অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ যা মুসলিমদের দেহকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত। খিলাফাহ ধ্বংসের পর ১৯৪৮ সালে মুসলিমদের রক্ত দ্বারা বিজিত বায়তুল মাকদিসকে ইহুদিদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। সেখানে তারা আজ অবধি মুসলিম উম্মাহর হাজার হাজার নিরীহ ভাই-বোনদের রক্ত নিয়ে হোলি খেলছে। মূলত খিলাফাহ ধ্বংসের পরবর্তী ইতিহাস মুসলিমদের অপমানকর, লজ্জাজনক এবং দুর্দশার ইতিহাস। ইরাক, আফগানিস্তান, বসনিয়া, চেচনিয়া, গুজরাট, হায়দ্রাবাদের অগণিত শহীদের আত্মদানে মুসলিমরা নীরব দর্শক ছাড়া কিছুই করতে পারেনি। গুয়ান্তানামো, আবু গারিব কারাগারে আজ উম্মাহর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের উপর চরম নির্যাতনের স্টীম রোলার চালানো হচ্ছে।
কুফফাররা মুসলিম উম্মাহর প্রত্যাবর্তন টের পেয়ে মুসলিমদের উপর অধিক মাত্রায় খড়গহস্ত হয়েছে এবং তাদের অত্যাচারের হাতকে করেছে প্রসারিত। মুসলিম ভূমিগুলোর রাজনীতি, অর্থনীতি, সমরনীতি আজ তাদের ইশারায় পরিচালিত হচ্ছে।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে পাঠিয়েছি সত্যসম্বলিত গ্রন্থ দিয়ে যাতে করে আল্লাহ তোমাকে যা দেখিয়েছেন তা দিয়ে তুমি মানবজাতিকে শাসন করতে পার”। (সূরা নিসাঃ১০৫)
আল্লাহ তায়ালার এ হুকুম পৃথিবীতে বাস্তবায়ন করার যে নির্দেশ তা খিলাফত রাষ্ট্র ছাড়া সম্ভব নয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“আর যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলো যে তার কাঁধে খলিফার বায়াত নেই তবে তার মৃত্যু হচ্ছে জাহেলি মৃত্যু”। (মুসলিম)
আজ মুসলিমরা তাদের দুর্দশার কারণ উপলব্ধি করতে পেরেছে এবং তারা আবারও সেই রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছে যেটি আল্লাহর রাসূল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদীনায়।
মুসলিম ভূমিগুলোর রাজধানীতে আজ আবারো তরুণরা ইসলামের ‘রায়া’ এবং ‘লিওয়া’ হাতে জড়ো হচ্ছে ইসলামের সেই সোনালী ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনার জন্য যার প্রতিশ্রুতি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) দিয়েছেন।
তিনি (সা) বলেন,
“তোমাদের মধ্যে নব্যুয়াত থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করেন……………তারপর ফিরে আসবে নব্যুয়াতের আদলে খিলাফত” (আহমদ)
ইসলাম এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি
ইসলাম অন্য সবকিছু হতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সুনির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি। এটি মুসলিমদের জন্য এমন এক জীবনপদ্ধতি ধার্য করেছে যার একটি নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় ধারা রয়েছে যা পরিবর্তিত কিংবা পরিবর্ধিত হয়না। এটি তাদের এমনভাবে এ জীবনপদ্ধতি অনুযায়ী চলার নির্দেশ করে যাতে তারা এ পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো পদ্ধতিতে জীবনধারন করার ব্যাপারে চিন্তা (فكرياً) ও মনন (نفسياً) থেকে স্বস্তি না পায়, এবং এ পদ্ধতি ব্যতিরেকে তারা যেন প্রশান্তি না পায়।
ইসলাম জীবন সম্পর্কে একগুচ্ছ ধারণা (مفاهيم) নিয়ে এসেছে। এটি কিছু সাধারন দিকনির্দেশনা (خطوط عريضة) নিয়ে এসেছে অর্থাৎ, কিছু সর্বজনীন চিন্তা এনেছে যা মানুষের জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে, মানুষ যত সমস্যার মুখোমুখি হয়, তার প্রত্যেকের সমাধান তা হতে নির্গত করা যায়। এ সকল কিছুই একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির (قاعدة فكرية) উপর প্রতিষ্ঠিত; যার উপর জীবনের সকল চিন্তা দাড়াতে পারে এবং তা একটি মানদন্ডে (مقياس) পরিনত হতে পারে। এছাড়াও এটি সমাধানের জন্য আইন-কানুন, চিন্তা ও মতামত এ সকল কিছুই আকীদা হতে নির্গত করে এবং এর সর্বজনীন চিন্তাসমূহ হতে উৎসরিত করে।
এটি মানুষের জন্য চিন্তা নির্ধারিত করে দিয়েছে কিন্তু তার চিন্তাকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।
এটি জীবনের তার আচার-ব্যবহারকে নির্দিষ্ট চিন্তা দিয়ে আবদ্ধ করেছে, কিন্তু এটি মানুষকে আবদ্ধ করেনি, বরং মুক্ত করেছে।
তাই, দুনিয়ার জীবনের প্রতি মুসলিমের দৃষ্টিভংগি হয় এক সম্ভাবনাময় আশা, এক বাস্তবমুখী গুরতরতা এবং এ দৃষ্টিভংগি জীবনকে সঠিক পরিমাপে মূল্যায়ন করে যাতে একে অর্জন করা যায়, কিন্তু (সে অবগত যে) এটি (মূল) উদ্দেশ্য না, আর না এটি উদ্দেশ্য হবার জন্য উপযুক্ত। সুতরাং, জীবনে চলার পথে সে সংগ্রাম করে, আল্লার পক্ষ হতে তার জীবিকা অর্জন করে, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর বান্দাদের দেয়া সুন্দর উপকরণসমূহ ও পবিত্র রিজক থেকে সে উপভোগ করে। তবে সে উপলব্ধি করে যে দুনিয়া ক্ষনস্থায়ী, আর আখিরাত চিরকালের চিরস্থায়ী বাসস্থান।
ইসলামের আইন-কানুনসমূহ মানুষের ব্যাবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে যেভাবে নির্দিষ্ট সমাধান দিয়েছে তেমনি সালাতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া দেখিয়েছে। এ আইনকানুন বিবাহসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিয়েছে, একইভাবে যাকাত (তথা দান-সদকা)-এর ব্যাপারেও সমাধান দিয়েছে। এসব আইনকানুন কিভাবে সম্পদ অর্জন করতে হয় তার যেমন নির্দিষ্ট বিবরন দেয়, একইভাবে কিভাবে তা ব্যয় করা যায় তারও সুনির্দিষ্ট বিবরন দেয়। এসব আইনকানুনে দুআ ও ইবাদাতের বিবরন রয়েছে, আইনী শাস্তিসমূহের (حدود) বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে, চুড়ান্ত শাস্তি (جنايات) ও অন্যান্য বিভিন্ন শাস্তির (عقوبات) বিবরন; এছাড়াও এতে (আইন লংঘন করলে) জাহান্নামে শাস্তির বিবরন এবং (আইন অনুযায়ী চললে) জান্নাতে সুখের বিবরন রয়েছে।
এসব আইনকানুন সরকার গঠন ও এর (শাসন) পদ্ধতির নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। এছাড়াও তা ব্যাক্তিকে আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য (এসব) আইনকানুনসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রেষনা যোগায়। এসব আইনকানুন তাকে রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ, জনগণ ও জাতিসমূহের সম্পর্কের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেয় যেভাবে তা মানবজাতির কাছে (ইসলামের) দাওয়া বহন করে নিয়ে যাওয়ার দিকনির্দেশনা দেয়।
এছাড়াও তা সুউচ্চ (উৎকৃষ্ট) বৈশিষ্ট্য অর্জন করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, একারণে যে তা আল্লাহর তরফ হতে আসা নির্দেশ, একারণে না যে তা মানুষের নিকট পছন্দনীয়।
এভাবেই ইসলাম মানুষের নিজের সাথে ও অন্য মানুষের সাথে সকল সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করার জন্য এসেছে যেভাবে তা তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রন করে; এসকল কিছুই একই চিন্তা ও সমাধানের ব্যবস্থা হতে। মানুষ, তাই পার্থিব জীবনে এক নির্দিষ্ট প্রেষনায়, এক নির্ধারিত পথে, নিরূপন করা ও মনোনিত এক উদ্দেশ্য অর্জনে অগ্রসর হওয়ার জন্য বাধ্য।
ইসলাম মানুষকে বাধ্য করেছে একমাত্র এই পথের সীমার মধ্যে আবদ্ধ থেকে (পথ) চলতে। এটি তাকে আখিরাতের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তির ব্যাপারে এবং পাশাপাশি দুনিয়ার কঠোর শাস্তির ব্যাপারেও সতর্ক করেছে; যেখানে দুটোর একটি অনিবার্যভাবে তাদের পাকরাও করবে যদি তারা একচুল পরিমানও বিপথগামী হয়।
এভাবেই একজন মুসলিম জীবনের পথে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে অগ্রসর হয়, একটি নির্দিষ্ট পন্থায় জীবনধারন করে, এক নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় মধ্যে বিরাজমান থাকে ইসলামী আকীদা গ্রহণের মাধ্যমে এবং আল্লাহর বেঁধে দেয়া আদেশ-নিষেধ মানার বাধ্যবাধকতা যা তাকে ইসলামের আইনের মধ্যে আবদ্ধ রাখে।
জীবন সম্পর্কে এই নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও সুনির্দিষ্ট জীবনপ্রক্রিয়া অনিবার্যভাবেই প্রত্যেক মুসলিমের উপর আরোপিত হবে।
আকীদার ও শরীআহর আইন উভয়ের ক্ষেত্রে এসব বিষয়াদি ইসলাম কিতাব ও সুন্নাহতে দ্ব্যার্থহীন ও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছে।
তাই ইসলাম শুধুমাত্র কোনো আধ্যাত্মিক ধর্ম কিংবা কোনো পুরোহিততান্ত্রিক ধারণা না। বরং এটি একটি সুনির্দিষ্ট জীবনব্যবস্থা এবং সকল মুসলিমকে তার জীবনে কেবলমাত্র এ পদ্ধতিতে চলতে হবে।
Taken from the Book “Islamic Thought”
বিদ্যুৎ কি লাভজনক ব্যবসায়িক পণ্য?

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও গবেষণা সংস্থা বিল্ড (বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট) এর সহায়তায় ঢাকার তারা ভরা রেডিসন হোটেলে দুই দিন ব্যাপী বিনিয়োগ সম্মেলনে (২৪ ও ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৬) জ্বালানি খাতে ৩০০ কোটি মার্কিন হলার বিনিয়োগুলো ঘোষণা দিয়েছে সামিট গ্রুপ।
সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে ভারতের রিলায়েন্স ও আদানী গ্রুপ আলাদা আলাদা ভাবে বাংলাদেশে মোট ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা জানান। [সূত্র: প্রথম আলো ২৫/১/২০১৬]
একটি ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশে মালিকানার অবাধ স্বাধীনতা স্বীকৃত। তাই বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি বিদ্যুতখাতকে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের মুনাফা অর্জনের আনন্দময় ক্ষেত্রে পরিণত করেছে। বিদ্যুৎ খাতকে শুধু কিছু কোম্পানির ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিণত করেই সরকার থেমে যায়নি বরং দেশকে বিদ্যুৎ আমদানি নির্ভর করার কাজ অব্যাহত রেখেছে। অবশ্য বর্তমানে জনগণের গণতান্ত্রিক শাসক (আপদ এবং বিপদ) এর প্রতি আস্থা নেই এবং ভাল কিছু আশাও করে না। মুনাফার জন্য বিদ্যুৎ খাতকে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেওয়া এমন একটি চিন্তা যা পুঁজিবাদ তার আদর্শিক অবস্থান থেকে সমর্থন করে এবং এই চিন্তাই বাংলাদেশের চলমান বিদ্যুৎ সংকটের মূল কারণ। যেখান থেকে মুনাফা তুলতে উদগ্রীব সামিট-আদানি-রিলায়েন্স।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তিনটি জিনিসের মাঝে সকল মানুষ শরিক। এগুলো হচ্ছে পানি, ঘাস (চারণভূমি) এবং আগুন।”
বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু সমাজের সকল কিছু সমাজের সকল মানুষের সমানভাবে প্রয়োজন এবং যেগুলোর অভাবে মানুষ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে তা গণ মালিকানাধীন সম্পদ। তাই বিদ্যুতের সামষ্টিক উপযোগিতা(প্রয়োজন) থাকার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট, বিদ্যুতের খুটি, সঞ্চালন লাইন/ সরবরাহ তার(supply line) গণমালিকানাধীন সম্পদ।
ইবনে হাম্মাল (রা.) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুল (সা.) এর নিকট মারিব নাম স্থানের কিছু সম্পত্তি অনুদান হিসাবে তাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। রাসুল (সা.) তা তাকে দিয়ে দিলেন। যখন তিনি চলে গেলেন। তখন লোকেরা বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি জানেন? আপনি তাকে কী দিয়েছেন? আপনি তাকে অফুরন্ত পানির উৎস দিয়ে দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন,“এরপর রাসুল (সা.) এটি ফেরত নিয়ে নিলেন।
সুতরাং এমন খনি যাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ মজুদ আছে তা গণমালিকানাধীন সম্পদ যেমনঃ বাংলাদেশে প্রাপ্ত তেল, গ্যাস, কয়লা এবং ইউরেনিয়ামের বড় আকারের খনি।
সুতরাং, বিদ্যুৎ. তেল, গ্যাস, কয়লা তথা জ্বালানি খাত কোনো কোম্পানি কিংবা ব্যক্তির মালিকানায় ছেড়ে দিয়ে মুনাফা অর্জনের আরামদায়ক খাতে পরিণত করা ইসলামে নিষিদ্ধ, কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যা খুবই জনপ্রিয় এবং প্রসিদ্ধ। ইসলামের দৃষ্টিতে গণমালিকানাধীন যৌথভাবে সকল নাগরিকের মালিকানা রয়েছে, এগুলো ব্যবহার করা ব্যক্তির জন্য বৈধ কিন্তু ব্যক্তিমালিকানায় নিয়ে নিতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন: বিদ্যুৎ খাত।
খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার সাথে সাথে খলিফা বিদ্যুৎ খাতে দেশি বিদেশি কোম্পানির মুনাফার উৎস বন্ধ করবেন। খিলাফত রাষ্ট্র সুলভ মূল্যে (উৎপাদন মূল্যে) জনগণকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে যা কৃষি ও শিল্পখাত বিকাশে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে এবং উৎপাদন খরচ হ্রাস জনিত কারণে পণ্যমূল্য হ্রাস করবে।
প্রয়োজনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ(হারবি হুকমান রাষ্ট্রে) রপ্তানি করে প্রাপ্ত আয় মুসলমানদের কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হবে। বাইতুল মালে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে অস্ত্র ও সৈন্য প্রস্তুতির ক্ষেত্রে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে।
আসুন খিলাফত রাষ্ট্রের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে গণসংযোগ অব্যাহত রাখি।
“তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং এরাই সফলকাম।” [সূরা আল ইমরানঃ১০৪]
“(পুঁজিবাদী ব্যবস্থায়) শিক্ষা ধংসের চাবিকাঠি”

শিক্ষা উন্নয়নের পূর্বশর্ত- এই কথাটি আমাদের সমাজে খুবই প্রচলিত একটি বাক্য। ছোটকাল থেকেই এটা শুনে-বুঝেই বড় হচ্ছে নতুন প্রজন্ম। এরূপ আরও অনেক মন্ত্র মুখস্থ করতে বড় হওয়া শিশুরা জীবনে উন্নয়ন ঘটাতে দৌড়ঝাঁপ-প্রতিযোগিতা শুরু করেন। শিশু অবস্থায় তাদের ওজনের তুলনায় ব্যাগের ওজন বেশি থাকে আর বড় হলে তাদের জ্ঞানের তুলনায় টাকার ওজন বেশি হয়ে যায়।
প্রতিযোগিতামূলক এই ব্যবস্থাতে শিশু অবস্থায় স্কুলে ভর্তির দৌড়ঝাঁপ এস.এস.সির গণ্ডি পেরুনোর পরও থামেনা কলেজে ভর্তির জন্য এবং এরপর ভার্সিটির ভর্তি তো আছে। লক্ষ্য একটাই, কিছু একটা করা; জীবনে উন্নতি সাধন।
শেয়ার বাজারে শেয়ারের দাম নিম্নগতিতে হলেও উর্ধগতিতে বেড়ে চলেছে এসকল প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ফি। একদিকে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত স্থানের ব্যবস্থা করা হয়না বেসরকারি কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্দেশ্যে এবং এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের থেকে কচলিয়ে টাকা আদায় করা হয়। আর এখানেই উন্নয়নের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায় অনেকের আর কঠিন এক হতাশা তাকে গ্রাস করে নেয়। আর টাকার দড়িতে ফাঁসিতে ঝুলে যায় বাংলাদেশ নেভি কলেজের মুন অথবা ঢাকা কলেজের শিমুলের মত অনেকেই। (জানুয়ারী ১ এবং ২, ২০১৬)
ধান মাড়ানোর মেশিনের তুলনাধীন এই শিক্ষাজীবন থেকে যারা বেড়িয়ে আসতে সক্ষম হয় তাদের জন্য এই ব্যবস্থা প্রস্তুত রেখেছে বেকারের জীবন। জীবনে উন্নয়নের জন্য বস্তাভর্তি ডিগ্রি অপেক্ষা যখন মোটা অংকের টাকার হিসাব অধিক সহজ এবং শক্তিশালী, তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদালয়ের সুক্তির কাছেও আত্মহত্যায় অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। (২৯শে ডিসেম্বর, ২০১৫)
পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষা বর্তমান প্রজন্মের উন্নয়ন নয়, বরং আত্মহত্যার চাবিকাঠিতে পরিণত হয়েছে। মুন, সুক্তি বা শিমুল ছাড়াও অহরহ প্রতিনিয়তই শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যা করছে। কারণ পুঁজিবাদী চিন্তাধারা আমাদের চিন্তাকে করে রেখেছে বিষাক্ত। শিক্ষার উদ্দেশ্য হিসেবে আমাদের শেখানো হচ্ছে একটি ভালো চাকরি, কারিকারি টাকা, গাড়ি-বাড়ি ইত্যাদি… যেকারণে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে এগুলোকে নির্ধারণ করে যখন কেউ আগাচ্ছে, তা অর্জন করতে না পেরে হতাশাগ্রস্থ এক জীবনের সম্মুখীন হয়ে আত্মহত্যা করছে।
সমাধান:
শিক্ষা হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি জাতির অন্তরে তাদের নিজ সংস্কৃতির বীজ বপন করা হয়। খিলাফত রাষ্টড়ব্যব্বস্থায় শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসলামী আক্বীদাকে উম্মাহ’র অন্তরে প্রোথিতকরণ এবং এর মাধ্যমে প্রজন্মের সঠিক চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব গঠন। এবং শিক্ষার নিশ্চিতকরণের দায়িত্বে থাকবে রাষ্ট্র নিজের। খিলাফত হতাশাজনিত প্রজন্ম উপহার দেয়না, বরং সত্যিকার অর্থে দুনিয়ার আলোবহনকারীদের জন্ম দেয়। ইমাম শাফী এর মত আইনশাস্ত্রবিদ, আল রাযী এর চিকিৎসাবিদ, আল খোয়ারিজমী-এর মত গণিতবিদ(বীজগণিতের জনক) উওহার দেয়। খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দেয় আবু হানিফা এর মত অর্থনীতি ও সমাজবিদ, আল মাসূদীর মতো ভূগোলবিদ এবং জাফর আস-সাদিকের মতো প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ। ইতিহাসের পাতায় পাতায় খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থার আদলে গড়ে ওঠা এইসকল মুসলিম বিজ্ঞানীদের নাম বারবারই উঠে আসে এবং তাদের কাজসমূহ আজও বিশ্বকে আলো দেখিয়ে চলেছে।
আর এভাবেই খিলাফত মুনাফা বা অর্থকে কেন্দ্র করে নয়, বরং আল্লাহ’র সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করেই তার শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজাবে এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবে এই উম্মাহকে, ইন-শা-আল্লাহ।
“যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন”। (সুরা মুজাদিলা- ১১)
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা সরকারের কোন সাফল্য নয়

শীতকালে প্রচুর সবজি বাজারে দেখা যাওয়া কিংবা রাশিয়াতে উদ্ধৃত আলু রপ্তানি করা দেখে আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় এর পেছনে সরকারের নীতিগত কোন অবদান রয়েছে। সরকারের দশ টাকায় কৃষকের ব্যাংক একাউন্ট খোলা বা সহজ শর্তে ঋণ প্রাপ্তি কিংবা বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিকে এই উৎপাদনশীলতার কারন হিসেবে বিবেচনা করলে ভুল হবে। কারন যেখানে বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষকের নুন আনতে পান্তা ফুরায় সেখানে তাদের উপর “অনিশ্চিত মুনাফার” (যা কিনা নুন কিনতেই ফুরিয়ে যায়) বিনিময়ে ঋণের বোঝা চাপানো হচ্ছে। ২০১৪-২০১৫ সালে বাজেটের ২.১ % বরাদ্ধ রাখা হয়েছে কৃষিতে অপরদিকে জনপ্রশাসন ও জননিরাপওার জন্য বরাদ্ধ প্রায় ৩৫% । যেখানে দেশের ৮০% ভুমি কৃষিতে ব্যবহারযোগ্য সেখানে এইরূপ পরিকল্পনা মূলত কৃষিতে সরকারের উদাসীনতাই প্রমান করে ।২০০৫ সালের দিকেও এদেশের ৮০ভাগ শ্রমজীবী মানুষ কৃষির উপর নির্ভর ছিল অথচ ২০১০ সালে এসে তা দাড়িয়েছে ৪০ ভাগে (সূত্র: উইকিপিডিয়া)। ক্রমাগত প্রবাশীদের পাঠানো অর্থের উপর নির্ভরশীলতা এই হার আরো কমিয়ে আনছে। তারপরেও যথেষ্ট পরিমানে খাদ্যশস্যের যোগান পাওয়ার কারন এই কৃষকদের ঋণের টাকায় উৎপাদন।যেই ঋণের সিংহভাগ যোগানদাতা NGO গুলো। ঋনের সুদের টাকার যোগান দিতেই কৃষকদের পুনরায় ঋণ নিতে হয় ।মুনাফার টাকা ও তাদের সুদ প্রদানেই খরচ হয়ে যায় ।
কৃষিখাতের এই দুরাবস্তা দূর করার একমাত্র উপায় হচ্ছে কৃষকদের আবার কৃষিজমিতে ফিরিয়ে নিয়ে আসা। তাদের জন্য অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা, খাস জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বন্টন, অব্যবহত জমি পুর্নবন্টন, বীজ সার ও সেচের সহজলভ্যতা নিশ্চিতকরন, পেটেন্ট বা অধিসত্ব নামক পুজিবাদী ধারনা হতে কৃষি ও কৃষিজাত অন্যান্য পন্যদ্রব্যকে মুক্ত করা।
বিদেশী অধিক ফলনশীল বীজের নামে ব্যবহত হওয়া ক্ষতিকারক বীজের ব্যবহার বন্ধ করা। অধিক উৎপাদনক্ষমতা ও কৃষিজমির জন্য উপকারী বীজের ব্যবহার সুনিশ্চিত করা এবং এসবই সম্ভব এই পুঁজিবাদী অর্থনীতি সমুলে উৎপাটন করে ইসলামী অর্থনীতির প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-
“যে আমার বানী (কুরআন) প্রত্যাখ্যান করবে, তার জীবিকা সংর্কীন হবে এবং আমি তাকে পুনরুথান দিবসে অন্ধভাবে তুলব“। (সুরা : তোয়াহা – ১২৪)
অর্থাৎ আল্লাহ এর মনোনীত রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রতিষ্টা করার মাধ্যমে রিযিক সম্প্রসারনের ব্যবস্থা করা এই অব্যবস্থা হতে উত্তরণের একমাত্র উপায়। তাই মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত খিলাফত(ইসলামী রাষ্ট্র ) প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা যা আমাদের দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনের সাফ্যলের নিশ্চয়তা বহন করে।
খাদেমুল আমেরিকার নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর তথাকথিত ইসলামিক জোট- পশ্চিমা কুফর শক্তির ঘৃণ্য চক্রান্তের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত

বাস্তবতা:
গত মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর, ২০১৫) সৌদি আরব ৩৪টি মুসলিম দেশের সমন্বয়ে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিশর, আফগানিস্তান ও অন্যান্য মুসলিম দেশে তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একটি সামরিক জোটের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায় এবং বলে যে, বাংলাদেশ এই জোটে অংশগ্রহনের জন্য আন্তরিকভাবে সম্মত হয়েছে কারণ এটা ‘সহিংস উগ্রবাদের’ বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, অন্যকথায়, ইসলামের বিরুদ্ধে যালিম হাসিনার জিরো টলারেন্স নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কারণ:
মার্কিন নেতৃত্বাধীন ক্রুসেডার পশ্চিমারা শক্তিশালী খিলাফত রাষ্ট্রের দাবিতে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের বিশ্বব্যাপী আন্দোলনে অংশগ্রহণকে ঠেকাতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে যা সিরিয়াতে তীব্ররূপ ধারন করেছে। সকল বিকল্প ব্যবহার শেষে, অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘৃণ্য মার্কিনীরা এখন শুধু সিরিয়াতেই নয় প্রয়োজনে মুসলিম বিশ্বের যেকোন প্রান্তে সত্যনিষ্ঠ মুসলিমদের জাগরণকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে মুসলিম সেনাবাহিনীর গভীরতর অংশগ্রহণ চাচ্ছে, এবং তাই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে এই ধরনের সামরিক জোটের উত্থান দেখা যাচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব এশ কার্টার মার্কিন নেতৃত্বাধীন অভিযানে আরও সমর্থন জোগানোর জন্য তার আঞ্চলিক সফরের অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার তুরষ্কে ইনকিরলিক বিমানঘাটিতে পৌছানোর পর তৎক্ষণাৎ এই জোট ঘটেেনর ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে: “এই জোটকে হুবুহু আমাদের নীতির সাথে এক মনে হচ্ছে, যা আমরা বেশকিছুদিন যাবৎ আকাঙ্খা করছিলাম, যা আইএসআইএল-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সুন্নী আরব দেশগুলো কর্তৃক অভিযানে বড় অবদান রাখবে।”
সচেতন উম্মাহ’র যা জানা উচিত:
উম্মাহ্’কে পেছন দিক থেকে ছুরিকাঘাত করতে সৌদি রাজতন্ত্র সবসময় কেন্দ্রীয় ভুমিকা পালন করে আসছে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে চক্রান্তের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংসের মাধ্যমে যার যাত্রা শুধু হয়। এবং এখন ২য় খিলাফতে রাশেদাহ্’র প্রত্যাবর্তন যখন আসন্ন, তখন কৃত্রিমভাবে গঠিত মুসলিম জাতি-রাষ্ট্রসমূহের বিশ্বাসঘাতক শাসকেরা খিলাফতের জন্য উম্মাহ্’র আকাঙ্খা ও সংগ্রামের উপর চরম ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে স্বঘোষিত ‘খাদেমুল হারামাইন’(!)-এর নেতৃত্বের অধীনে একত্রিত হয়েছে।
যখন পশ্চিমাদের জারজ সন্তান ইসরাইল অর্ধশতকেরও বেশী সময় ধরে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের রক্তপাত ঘটাচ্ছে, আমাদের প্রথম কিবলা আল আকসাকে অপবিত্র করছে, তখন মুসলিম শাসকেরা তাদের সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে বন্দী করে রেখেছে- যদিও সংখ্যা ও সাহসিকতায় ইয়াহুদীদেরকে তারা অনেক আগেই অতিক্রম করেছে। যখন মূর্তিপূজারী হিন্দুরা মুসলিমদেরকে কসাইয়ের মত হত্যা করেছে এবং উম্মাহ’র সম্মানিত মুসলিম নারীদের অসম্মান করেছে তখন শাসকেরা মুহম্মদ বিন কাসিমের উত্তরসুরি মুসলিম সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করেনি। যখন মায়ানমারের বৌদ্ধ মুশরেকরা হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করেছে, তাঁদের দেহগুলোকে পুড়িয়ে দিয়েছে মুসলিম শাসকেরা তখন খালিদ বিন ওয়ালিদের উত্তরসুরি মুসলিম সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করেনি। যখন মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মুসলিমদের পুড়িয়ে হত্যা করা হচ্ছিল ও তাদেরকে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছিল তখন মুসলিম শাসকেরা মুসলিম সেনাবাহিনীকে সেখানে প্রেরণ করেনি। যখন আমেরিকা ও পশ্চিমা ক্রুসেডাররা আফগানিস্তান ও ইরাককে দখল করল এবং মুসলিমদের রক্তের বন্যা বইয়ে দিল তখন মুসলিমদের রক্ষায় শাসকেরা সাইয়্যুদনা সুহাদা(শহীদদের সর্দার) হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের উত্তরসুরী মুসলিম সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করেনি, বরং তারা যথাসম্ভব ক্রুসেডারদের সহায়তা করেছে।
যখন নির্যাতিত মুসলিমদের প্রয়োজনে ও জালিম কাফিরদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী প্রেরণ করার শারী’য়াহগত দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছিল তখন জালিম শাসকগণ নিজস্ব দূর্বলতা ও উপনিবেশিকদের বেঁধে দেয়া সীমান্তের পবিত্রতা লঙ্ঘিত হওয়ার অজুহাত দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু আজকে তাদের সত্যিকারের প্রভূ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা যখন ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে নির্দেশ দিয়েছে তখন দূর্বলতা ও ‘পবিত্র’ সীমান্তের অজুহাতকে অতিক্রম করে তারা সাড়া দিয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়ে আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতিশ্রুতি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘…আবার আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত।’ (মুসনাদে আহমদ)
পুরো পৃথিবী এক হয়েও প্রতিশ্রুত খিলাফত ফিরে আসাকে রুখতে পারবে না। কারণ ইতিহাস স্বাক্ষী জালিম ফিরাউন মুসা (আ)এর উত্থানকে প্রতিহত করতে কোন প্রচেষ্টাই বাদ রাখেনি। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর ইচ্ছা বাস্তবায়নে ছিলেন সবচেয়ে উত্তম কৌশলী। আল্লাহ(সুওতা) বলেন,‘যাদেরকে(বনী ইসরাইলকে) দূর্বল করে রাখা হয়েছিল, আমার ইচছা হল তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার, তাদেরকে নেতা করার এবং তাদেরকে উত্তরাধিকারী করার। এবং তাদেরকে ক্ষমতায় আসীন করার এবং ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্য-বাহিনীকে তা দেখিয়ে দেয়ার, যা তারা সেই দূর্বল দলের তরফ থেকে আশংকা করত।’ (সূরা কাসাস:৫-৬)
মুসলিম উম্মাহ ও এর সেনাবাহিনীকে অবশ্যই এসব জালিম বিশ্বাসঘাতক শাসকদের সহযোগী ও সমর্থনকারী হওয়া যাবে না এবং তাদের প্রত্যাখান করতে হবে । মুসলিম সেনাবাহিনীকে অনতিবিলম্বে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় অগ্রসর হতে হবে এবং সেই অতুলনীয় আল্লাহ’র সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হতে হবে যা তাদের আগে কেবলমাত্র মদীনার আনসারগন অর্জন করার সৌভাগ্য লাভ করেছিল। আল্লাহ(সুওতা) বলেন,
‘হে বিশ্বাসীগণ! যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।’(সূরা মুহম্মদ:৭)
রাফীম আহমেদ
জনসংখ্যার আধিক্য: আশির্বাদ নাকি অভিশাপ!

মা হওয়ার প্রতি উদ্ধুদ্ধ করার জন্য গোটা একদিন ছুটি ধার্য করেছে সরকার। সরকারী ও বেসরকারী বিভিন্ন সংস্থা বিজ্ঞাপন দিয়ে দেশের দম্পতিদের গর্ভধারন করার জন্য আবেদন জানানো হচ্ছে। যেই ভাবে শিশু জন্ম হার কমছে তা ক্রমশ নিন্ম হতে নিন্মগামী হচ্ছে। যা যথেষ্ট চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে সে দেশের সরকারের। দম্পতিদের যৌন সংসর্গ স্থাপনের জন্য বাড়তি ছুটির দিন ধার্য করা হয়েছে। এমনকি বিজ্ঞাপন দিয়ে বলা হচ্ছে “ডু ইট ফর মম, ডু ইট ফর কান্ট্রি”। উপরের তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে ডেনমার্ক সম্পর্কে।
আবার, ডেনমার্কের মতই সন্তান জন্ম দানের জন্য মা-বাবাদের উদ্ধুদ্ধ করতে ২০০৭ সাল হতে ২০১২ সালকে জাতীয় গর্ভধারন দিবস হিসেবে ঘোষনা করেছে রাশিয়া সরকার। এমনকি সন্তান জন্ম গ্রহণে পুরষ্কার ও ঘোষনা করেছে রুশ সরকার।
উপরের দৃশ্যের মত দৃশ্য দেখা যায় উন্নত বিশের দেশ জার্মানী, সুইজারলেন্ড, জাপান এবং পূর্ব ইউরোপের কিছু রাষ্ট্র। যারা সবচেয়ে বড় সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা হলো-জনসংখ্যার বৃদ্ধির হারের নিন্মগতি।
উপরের দৃশ্যপটের ঠিক উল্টো দৃশ্য দেখা যায় বিপুল জনসংখ্যার ভারে নাভিশাস উঠা বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনিশিয়া, পাকিস্তান এর মত দেশ গুলোর। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৭১ সালে ছিল ৭ কোটি, তা এখন এসে দাড়িয়েছে প্রায় ১৬ কোটিতে। ভারতে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটির বেশী।
আমাদের জ্ঞানীগুনী ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদের মতে আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য সার্বিক সমস্যার মূল কারণ হল-অধিক জনসংখ্যা। তাই তাদের প্রধান পরামর্শ হল- একটি সন্তান জন্মদান। এটি বাস্তবায়নের জন্য তাদের সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে জনসংখ্যা কম সমস্যা নিয়ে ভোগা উন্নত (!) দেশ সমূহের বিভিন্ন NGO সংস্থা। এই ছাড়াও বেশি জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশ সমূহে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কমানোর জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সামাজিক আন্দোলন, জন্ম বিরতিকরন প্রকল্প, পরিবার পরিকল্পনা সহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে রাষ্ট্র ও সহযোগী NGO সমূহ। কম জনসংখ্যা নিয়ে সমস্যা থাকা রাষ্ট্র সমূহ আবার অধিক জনসংখ্যা নিয়ে থাকা রাষ্ট্র সমূহে জনসংখ্যা কমানোর জন্য সহযোগিতা করছে।
আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক সমস্যার আসল কারণ খুজতে গেলে দেখা যায় জনসংখ্যা নয়, সমস্যা অন্য কোথাও। বাংলাদেশ একটি খাদ্যে স্বয়ংসম্পর্ন দেশ, তার মানে বর্তমানে উৎপাদিত খাদ্যশস্য বাংলাদেশের সকল জনগনের জন্যই যথেষ্ট, পাশাপাশি বিগত দশকগুলোতে জনসংখ্যার অনুপাতে খাদ্য উৎপাদন পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। তবুও বাংলাদেশের ৪০% মানুষ এক বেলা খায় একবেলা উপোস থাকে। কারণ প্রভাবশালী পুঁজিপতি ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারক বাহকরাই এই সকল অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের নিয়ন্ত্রন করে। ফলশ্রুতিতে অর্থনৈতিক সকল কর্মকান্ডে পুঁজিবাদী সমাজের পুজিপতিরা দিনদিন লাভবান ও অর্থশালী হন এবং অধিকাংশ জনগণ তাদের দ্বারা নিষ্পেষিত ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মুখোমুখি হন। অথচ এই অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য অধিক জনসংখ্যাকেই দায়ী করা হয়। রাষ্ট্র তার জনগনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে না পারার দায়ভার অধিক জনসংখ্যার উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। এই ছাড়াও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও গণমালিকানাধীন সম্পদ আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী রাজনৈতিক শক্তি লুটে-পুটে নিয়ে যায় এবং দেশের জনগোষ্ঠীকে দূরবস্থার মধ্যে পেলে অধিক জনসংখ্যার দোহাই দেয়।
এছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দিকে একটু মনোনিবেশ করলেই দেখা যায় কোথাও অধিক খাদ্য উৎপাদন হয়, আবার কোথাও প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু তা ওই কর্ম করার মত জনবল নেই। আবার জনগোষ্ঠী সমূহকে ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীতে জাতীয়তাবাদী কৃত্রিম বর্ডার দিয়ে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। তাই কোথাও খাদ্যের অভাব নেই কিন্তু খাবার খাওয়ার মানুষ নেই, আবার কোথাও কর্মসংস্থান আছে কিন্তু কর্ম করার মানুষ নেই।
এখন পশ্চিমা সমাজের মানুষের প্রধান চাহিদা হল- ঈন্দ্রিয়গত সুখ। তাই তারা অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত এবং যৌন চাহিদাকে সন্তান জন্ম দানের মাধ্যম মনে না করে শুধুমাত্র পুর্তির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা তাদের সুখের জন্যে অধিক অর্থের পিছনে ছোটে এবং যত প্রকার ঈন্দ্রিয়গত সুখ রয়েছে তার সবটুকু তারা ভোগ করতে চায়। তাই তারা সুদীর্ঘ সময় সন্তান জন্মদানের যে আকাঙ্খা তা হতে দূরে থাকে এবং বর্তমানে সন্তান জন্মদানের জন্য তাদেরকে বিজ্ঞাপন দিতে হচ্ছে।
তাই বলা যায় যে, জনসংখ্যা সমস্যা নয় বরং আশির্বাদ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এর রহমত সরূপ, যারা আল্লাহর সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ভূমিকে উর্বর করে। রাষ্ট্র তার জনগণকে সঠিকভাবে ব্যবহার করবে এবং সঠিকভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে সম্পদে পরিনত করতে পারে। পৃথিবীতে জেলখানার মত জাতীয়তাবাদী বর্ডার দিয়ে আটকে রাখা জনগণকে অবাধ বিচরনের মাধ্যমে যেখানে প্রচুর কর্মসংস্থান রয়েছে সেখানে পৌছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ বাস্তবতা তখনই তৈরি হবে যখন এই জাতীয়তাবাদী চিন্তায় আটকে রাখা বর্ডারকে ভেঙ্গে দেয়া হবে। মুসলিম উম্মাহকে এক জাতি হিসেবে মেনে নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন ভূমিতে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেয়া হবে। পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সমাজ হতে বের হওয়ার মাধ্যমেই এই উদ্যোগগুলো নেয়া সম্ভব।
সকল প্রাণীকূলের রিজকের দায়িত্ব যেহেতু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিয়ে নিয়েছেন তাই অধিক জনসংখ্যায় রিজকের সমস্যাও হবেনা এবং এটাই একজন মুসলিমের বিশ্বাস।
যেখানে রাসূল (সা) বলেন,
“তোমরা উর্বর নারীদেরকে বিয়ে কর (যেন তারা অধিক সন্তান জন্ম দিতে পারে)।
তিনি (সা) বলেন,
“হাশরের ময়দানে আমি আমার উম্মতের আধিক্য নিয়ে অন্য উম্মতের সাথে গর্ব করব”।
অর্থনৈতিক, সামাজিক যেরকম সমস্যাই হোক না কেন যার মূলে তারা অধিক জনসংখ্যাকে দায়ী করে, এই সকল সমস্যার সমাধান পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমাধান করতে পারবেনা বরং দিন দিন আরোও সমস্যা বৃদ্ধি করবে যা আমরা পশ্চিমা বিশ্ব এর দিকে তাকালেই বুঝতে পারি। সকল সমস্যার সমাধান একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মনোনিত ব্যবস্থা খিলাফতই দিতে পারে। এবং যা শীঘ্রই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার মুমিনদের দান করবেন, ইনশাআল্লাহ।
আবদুস সামাদ
বিদেশী নাগরিকের হত্যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অসুস্থ চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ

গত ২৮শে সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গুলশানের এক সড়কের ফুটপাতে ইতালিয় নাগরিক সিজার তাবেলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর কয়েক দিন যেতে না যেতেই রংপুরে খুন করা হয় জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে। যদিও খুন হত্যা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য একটি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। দেশে গড়ে প্রতিদিন ১০টির অধিক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় এর মাঝে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয় গড়ে ২-৩ টি। দেশীয় হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে তেমন আলোচনা না হলেও সিজার এবং কুনিও হোশিকে হত্যার পর দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। উত্তেজনা তৈরি হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক যেহেতু তারা দুজনই ছিল দুটি ভিন্ন রাষ্ট্রের নাগরিক। কারা এবং কেন এই হত্যাকাণ্ডগুলো সংগঠিত করেছে সে ব্যাপারে নিরাপত্তা বাহিনী এখনো পর্যন্ত কোন পরিষ্কার ধারনা দিতে পারেনি। বরং একেক নিরাপত্তা বাহিনী একেক রকম বক্তব্য দিচ্ছে এবং এর মাঝে প্রধানমন্ত্রী এটাকে তদন্তের ফলাফল পূর্ব নির্ধারণ সরূপ বিরোধী দলের কাজ বলে মন্তব্য করেছেন। অতীতেও আমারা বিডিআর এ সামরিক বাহীনির ৫৭জন আফিসারের হত্যাকাণ্ড, সাগর-রুনি, মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীসহ বহু রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের কোন সুরাহা পাইনি।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার তা হলো গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দালাল শাসকেরা যুগ যুগ ধরে দেশের মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে সেভাবে বিদেশী সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বুঝতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্স বুঝতে হবে। এই ব্যবস্থার চিন্তার মূলেই রয়েছে যে কোন উপায়ে নিজ বা নিজ দল বা দেশের কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিল করা। সেটা হোক অন্য কোন দেশের উপর অন্যায়ভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে বা নিজ দেশের নিরীহ মানুষকে হত্যা করে অথবা ভিনদেশি নাগরিক খুন করে। মানবরচিত এই ব্যবস্থায় নিরাপত্তা শুধুই শাসকবর্গের জন্য। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তারা যেকোন ধরনের নির্লজ্জ কাজ করতে পিছপা হয়না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মোড়ল স্বয়ং আমেরিকায় প্রতি বছর সিআইএ কর্তৃক বহু দেশের অসংখ্য নাগরিককে হত্যা করে তাদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের কারণে। আবার ব্রিটেন অতীতে তার গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে চালিয়েছে বহু হত্যাকাণ্ড। তাদের অনুকরনে নব্য আধিপত্যবাদী ভারত তার প্রতিবেশী রাষ্ট্র সমূহে “র” এর মাধ্যমে চালিয়েছে এবং চালাচ্ছে বহু হত্যাকান্ড। আবার আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার জন্য বা টিকে থাকার জন্য দেশের নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে খুন করিয়েছে বহু মানুষ। কুফর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা আশা করা একটি আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। স্বয়ং আমেরিকায় কোন কৃষনাংগ কে হত্যা করা হলে শ্বেতাঙ্গ হত্যাকারীকে নিষ্পাপ বলে মুক্তি দেয়া হয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দালাল শাসকবর্গ কিভাবে জনগণ এবং বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে যেখানে তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তার মধ্যে থাকে। এই মানব রচিত ব্যবস্থা এবং এর শাসকবর্গ সারা বিশ্বে মানুষদেরকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইসলাম হচ্ছে একমাত্র শাসনব্যবস্থা যার মাধ্যমে খলীফা খিলাফত রাষ্ট্রের মধ্যে বসবাসরত সকল মুসলিম-অমুসলিম এবং বিদেশী নাগরিকদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। খিলাফত রাষ্ট্রে খলীফার মূল কাজই হল জনগণের দেখাশোনা করা। বর্তমান মেরুদন্ডহীন দালাল শাসকবর্গের মত খলীফা কখনোই কাফেরদের তাবেদারী করবেনা। তার আনুগত্য শুধুমাত্র আল্লাহর কাছে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করল সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল এবং যে কারো জীবন রক্ষা করল সে যেন সকল মানুষের জীবন রক্ষা করল“। (সূরা মায়িদাহ: ৩২)
খিলাফত রাষ্ট্র পরিচালিত হবে শরীয়াহর মাধ্যমে। খিলাফত রাষ্ট্রে বসবাসরত সকল অমুসলিম একজন মুসলিম এর মত সকল নাগরিক অধিকার পাবে। খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ সকল রাষ্ট্রের নাগরিকদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। খিলাফত রাষ্ট্রের খলীফা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসকদের মত কৌশলগত বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিজ দেশের নিরীহ মানুষদের হত্যা করার মত জঘন্য কাজ করবে না।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা:) এর কাছে এক ব্যক্তি যার ব্যাপারে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে মুসলিমদের নির্যাতনের শাস্তি সরূপ মৃত্যু পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল যখন উসমান (রা) তাকে নিরাপত্তা দিলেন (একজন মুসলমান কাউকে নিরাপত্তা দিলে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া সকল মুসলমানের জন্য ওয়াজিব) এবং সে ক্ষমা চাইতে আসল। রাসূলুল্লাহ (সা) কিছুক্ষণ নিরব থেকে লোকটিকে ক্ষমা করেন। লোকটি চলে যাওয়ার পর রাসূল (সা) সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, “আমি চাইছিলাম যে তোমরা কেউ যেন তাকে হত্যা কর“। তখন উমার (রা) বলেছিলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা) আপনি যদি ইশারা করতেন তাহলে আমি তাকে মেরে ফেলতাম। তখন আল্লাহর রাসুল (সা) বললেন, “কোন নবীর জন্য এটা শোভা পায়না যে সে ইশারায় মানুষ হত্যা করবে“। অথচ একজন রাষ্ট্র প্রধান হিসেবে চাইলেই রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে হত্যা করতে পারতেন।
খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খলীফাগণ অতীতে নির্যাতিত অমুসলিমদের আহবানে সাড়া দিয়ে তাদেরকে রক্ষা করেছিলেন। স্পেনের রাজা রডরিকের জুলুম থেকে তরুণ সেনাপতি তারেক বিন যিয়াদ স্পেনের অমুসলিমদেরকে রক্ষা করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে রাজা দহিরের অত্যাচারের দরুন মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধ প্রদেশ মুক্ত করেন। ইনশাআল্লাহ অচিরেই আসন্ন খিলাফত এর প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে খলীফা সারা বিশ্বের নির্যাতিত মুসলিম এবং অমুসলিমদেরকে সকল ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
“এর দ্বারা আল্লাহ্ যারা তার সন্তুষ্টি কামনা করে, তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশ দ্বারা অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে আনয়ন করেন এবং সরল পথে পরিচালনা করেন।” (সূরা মায়িদা: ১৬)
দেলোয়ার হোসেন সুমন

















