Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • পুঁজিবাদি গণতন্ত্রের থাবায় শিক্ষা

    পুঁজিবাদি গণতন্ত্রের থাবায় শিক্ষা

    ১) বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কিছুদিন পর পর বন্ধ করতে হয় কারণ আধিপত্য বিস্তার, হল দখল, এক সংগঠন কর্তৃক অন্য সংগঠন এর ছাত্রকে হত্যা, শিক্ষককে লাঞ্চনা, পরীক্ষা বাতিল ও পেছানোর দাবিতে।

    ২) আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গুলো আদায় করছে অতিরিক্ত টিউশন ফি, সার্টিফিকেট বিক্রি, মানসম্মত শিক্ষকের অভাব, তার উপর সরকার সময়ে সময়ে যুক্ত করেছ বর্ধিত ভ্যাট ইত্যাদি।

    ৩) স্কুল কলেজে প্রশ্নপত্র ফাঁস, বেতন বৃদ্ধিতে শিক্ষকদের কর্ম বিরতি, অতিরিক্ত ফি আদায়, প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করা ইত্যাদি।

    সমস্যার মূল কারণ:

    “লেখা পড়া করে যে গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে”,“পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি”। এধরনের বাক্য ছোটবেলা থেকে পুঁজিবাদী এই শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দিয়ে আমাদের বড় করেছে। তাই বড় হয়ে যখন আমরা বিভিন্ন দায়িত্ব পাই তখন সেই সাফল্য খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে উঠি। উপরে উল্লেখিত সকল সমস্যার মুল হচ্ছে পুঁজি বা অর্থ উপার্জন করার মানসিকতা। কারণ বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে সকলে দেখতে পাই, যার অর্থ বা ক্ষমতা আছে সেই সম্মানিত। তাই সকলে অর্থ বা ক্ষমতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। আর তাইতো একটা জাতির উন্নয়ন এর মুল শক্তি জ্ঞানকে পর্যন্ত পুঁজির একটি মাধ্যম হিসেবে মুল্যায়ন করে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থা আজ ধ্বংসের প্রহর গুনছে।

    সমাধান:

    সমস্যার মুল কারণ যেহেতু এই পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাই এই ব্যবস্থার পরিবর্তন করে এমন একটি ব্যবস্থা আনতে হবে যে ব্যবস্থা জ্ঞান অর্জনকে জাতির উন্নয়ন হিসেবে বিবেচনা করবে। আর এটা হল খিলাফাহ ব্যবস্থা। খিলাফাহ ব্যবস্থায় জ্ঞান অর্জন এর মুল লক্ষ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, অর্থ বা সম্মান না। কারণ এই ব্যবস্থায় শিক্ষার মুলনীতি হবে ইসলামী আকীদা এর উপর নির্ভর করে। পাঠ্যসূচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে এর মুল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হবার কোন সুযোগ না থাকে। ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষার যাবতীয় খরচ বহন করবে রাষ্ট্র নিজে (উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত, সম্ভব হলে উচ্চতর শিক্ষা পর্যন্ত) এবং খলীফা এটার পর্যবেক্ষন করবে। তাই কোন প্রকার অনিয়মের সুযোগ নেই। আল্লাহ তা’আলাহ বলেন,

    যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান?” (সুরা যুমার- ৯)

    যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহু মর্যাদায় উন্নত করবেন”। (সুরা মুজাদিলা- ১১)

    তাই মানুষ নিজের মর্যাদা বাড়াতে বা আল্লাহর কাছে সম্মানিত হতে, আল্লাহকে বুঝতে ও সঠিক উপায়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জ্ঞান অর্জন করবে, অর্থের জন্য নয়। এটি একটি ফরজ দায়িত্ব হিসেবে সবাই পালন করবে। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন,

    প্রত্যেক নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরজ”।

    তাই আমাদের উচিত জাতি ধ্বংসের এই শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করতে, জাতিকে প্রকৃত মুল্যায়ন করে সেই খিলাফাহ ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কাজে নেমে পড়ি। একমাত্র এই ব্যবস্থাই পারবে একটি উন্নত জ্ঞান সমৃদ্ধ জাতি উপহার দিতে।

    রোকন উদ্দিন

  • ভারতীয় পানি আগ্রাসনের এক নতুন অধ্যায়

    ভারতীয় পানি আগ্রাসনের এক নতুন অধ্যায়

    খবর: ভারত ধারাবাহিকভাবে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে এগুচ্ছে। সমগ্র প্রকল্পের আওতায় ৩৮টি নদ-নদীর মধ্যে আন্তঃসংযোগ ঘটানো হবে। এতে ৩০টি সংযোগ রক্ষাকারী খাল ও ৩৪টি বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। ভারতের ভিতর দিয়ে আসা ৫৪টি নদীর মধ্যে ভারত ইতিমধ্যে বাঁধ দিয়েছে।

    এই প্রকল্পের মূল বিষয়টি হচ্ছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রহ্মপুত্র ও উত্তর ভারতের গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে সুদূর দক্ষিণাত্যে এবং পশ্চিমে রাজস্থানে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র এই দুই বড় নদী ও তাদের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা খাল দ্বারা সংযোগ করে এদিককার পানি ওদিকে নেয়ার এক বিশালকার প্রকল্প হচ্ছে নদী সংযোগ প্রকল্প। এই ভাবে ৩৭টি নদীকে ৩০টি খাল দ্বারা সংযোগ করা হবে। খালগুলোর মোট দৈর্ঘ্য হবে ১২ হাজার কিলোমিটার। গড়ে একেকটি খাল চারশ কিলোমিটার লম্বা। খালগুলো হবে ৫০ থেকে ১০০ মিটার চওড়া। গভীরতা ছয় মিটার। অর্থাৎ একেকটি খাল যেন একেকটা নদী। বলাই বাহুল্য, এতে বিপুল পরিমাণ কৃষি জমি ধ্বংস হবে।

    ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রথমে তিস্তা ও পরে তিস্তা থেকে ফারাক্কা বাধের উজানে পানি আনা হবে। এখানে ভুলেও ভাবার সুযোগ নেই যে, ফারাক্কা বাধের উজানের অতিরিক্ত পানির ছিটেফোটা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। বরং ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে খাল কেটে উড়িষ্যার সুবর্ণ রেখা ও মহা নদীর সাথে সংযোগ করা হবে। ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের আরেকটি অংশ হলো একটি সংযোগ খালের মাধ্যমে সাবরমতি নদীর পানি দক্ষিণ ভারতে নিয়ে যাওয়া হবে।

    এই প্রকল্পে খাল খননের পাশাপাশি পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হবে এবং সেই পানিকে কোথাও কোথাও নদী প্রবাহের প্রাকৃতিক গতির বিপরীত দিকে জোর করে প্রবাহিত করা হবে। এ জন্য বিভিন্ন স্থানে বাধ, ব্যারাজ ও জলাধার নির্মাণ করা হবে। তাছাড়া জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রও করা হবে।

    এক কথায় এই প্রকল্প বাংলাদেশকে পানিশূন্য ও মরু অঞ্চলে পরিণত করবে।

    আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে ভারত বহু আগে থেকেই শোষণ চালিয়ে আসছে। সাংস্কৃতিক, অর্থৈনৈতিক এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের ধারাবাহিকতা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ এবং এমনকি নদীও ভারত হস্তগত করে চলেছে।

    এই আন্তঃনদী প্রকল্পের ফলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য ক্ষতি নিম্নে উল্লেখ করা হলো,

    ১। ভারত উজানে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধ কুমার, করতোয়া ও মহানন্দা থেকে পানি প্রত্যাহার করলে এই সকল নদী এবং শাখা নদী অর্থাৎ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী শুকিয়ে যাবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতিই বদলে যাবে। শস্য শ্যামলা বাংলাদেশ মরু প্রান্তরে পরিণত হওয়ার আশংকা আছে।

    ২। নদীতে যতোটুকু ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত পানি থাকবে দিনে দু’বার জোয়ারে, তা সমুদ্রের জোয়ারের পানিকে বাধা দিতে পারবে না। ফলে জোয়ারের লবণাক্ত পানি উত্তরের দিকে উঠে আসবে, এমনকি সিলেট পর্যন্তও আসবে। এতে মিষ্টি পানির অভাব দেখা দেবে। চাষের ও খাবারের পানির অভাব ঘটবে। এতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে। মিষ্টি পানির মাছও মারা যাবে। মৎস্যজীবীরা বেকার হবে। মাছে-ভাতে বাঙ্গালির পরিচয় মুছে যাবে।

    ৩। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাবে। রিচার্জ হবে না। তাতেও মরু প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।

    ৪। যেটুকু ভূগর্ভস্থ পানি পাওয়া যাবে নলকূপের মাধ্যমে, তাতেও আর্সেনিকের পরিমাণ খুব বেশি হবে। ফলে খাবার অযোগ্য হয়ে উঠবে।

    ৫। নদীবাহিত পলি দ্বারা যে নতুন ভূখণ্ড তৈরি হচ্ছে (বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল এই ভাবেই গঠিত হয়েছিল প্রাগৈতিহাসিক যুগে), সেই ভূমি গঠন বন্ধ হবে। এক কথায় সবুজ বাংলাদেশ মরুদেশে পরিণত হবে।

    ৬। নদী পথ সঙ্কুচিত হবে। ইতোমধ্যেই প্রধানত ফারাক্কা বাধ ও তিস্তার উজানে বাধের কারণে ১৯৭১ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে নৌপথ ২৪ হাজার কিলোমিটার থেকে ২৪শতে (অর্থাৎ দশমাংশে) নেমে এসেছে।

    একটা কথা বলা হয় যে, বাংলাদেশে নাকি পানির অপচয় হয়। প্রচুর পরিমাণ পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। যারা এমন কথা বলেন, তারা চরম অজ্ঞতাই প্রকাশ করেন। কারণ নদীতে প্রচুর পানি থাকলেই নদী প্রবাহের জোর থাকবে, যা সাগরের জোয়ারের নোনা পানিকে উপরে উঠে আসতে বাধা দেয়। ইতোমধ্যেই ফারাক্কা বাধের কারণে দক্ষিণ বাংলায় জোয়ারের পানি অনেক বেশি ভেতরে প্রবেশ করছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষের জমি নষ্ট হচ্ছে। যদি কোনোভাবে ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি সিলেট পর্যন্ত চলে আসবে। বাংলাদেশে এই প্রকল্পের অন্যান্য আরও ক্ষতিকর দিক আছে।

    ভারতের এমন ঔদ্ধত্যতা কোন নতুন ইস্যু নয়, বরং আমেরিকা-বৃটেনের সবুজ সংকেতের আধারে একের পর এক আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে একটি পঙ্গু এবং এর উপর কর্তৃত্ব নেওয়ার লক্ষ্যে এইসকল আগ্রাসন সে নিত্যদিনই চালায়। বিডিআর হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে সীমান্তে হত্যা, এবং দেশের অভ্যন্তরে মাদক চালানের মত ঘৃণ্য অপরাধ সে করে আসছে নির্বিঘ্নেই।

    অন্যদিকে এদেশের শাসকগোষ্ঠী ভারতেরই এসকল আগ্রাসনে নিশ্চুপে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে আর জনগণকে উপহার দিচ্ছে “শেখ রাসেল আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ” অথবা বিপিএল। ভারত যখন এদেশের আমাদের রক্ত নিয়ে খেলছে, নির্বোধ শাসকগোষ্ঠী তখন স্কাইপে বসে খেলা দেখে।

    মুসলিমদের উপর এইসকল জুলুমের অবসানের একটিই উপায়; তা হলো ইসলামের দিকে প্রত্যাবর্তন। ইসলামী শাসনব্যবস্থা তথা খিলাফত রাষ্ট্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে। রাসূল (সা) প্রতিষ্ঠা পরবর্তী ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বলবৎ ছিল এবং পৃথিবীকে দেখিয়েছে অন্ধকার থেকে আলোতে আসার পথ।

    খিলাফত এমন এক অনন্য শাসনব্যবস্থা, যা সুনিশ্চিতরূপে এর জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চত করে আর এর অসংখ্য উদাহরণ আমরা ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাবো।

    অল্প কিছুকাল পূর্বেও, ১৭৮৫ সালে আজকের সুপার পাওয়ার আমেরিকা তৎকালীন সুপার পাওয়ার খিলাফতের জলসীমানায় প্রবেশ করলে, খিলাফতের নৌবাহিনী তা আটক করে। এবং এই প্রেক্ষিতে ১৭৮৬ সালে ফ্রান্সে তৎকালীন আমেরিকার দূত থমাস জেফারসন ও জন এডামস (ব্রিটেনে তৎকালীন আমেরিকান দূত) লন্ডনে খিলাফতের দূত আবদুর রহমানের সাথে শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে বৈঠক কর। এবং পরবর্তীতে খিলাফতের সাথে আমেরিকা BARBARY TREATY করতে বাধ্য হয়।

    অথচ আজকে সেই খিলাফত শাসন ব্যবস্থার অভাবে আমেরিকা-বৃটেন ও তাদের দোসর ভারত মুসলিমদের জীবন-সম্পদ নিয়ে খেলছে। আর মুসলিম ভূমিসমূহের যালিম শাসকেরা এদের পা-চাটা দালালে পরিণত হয়েছে।

    বাংলাদেশে আজ সেই খিলাফত শাসনব্যবস্থার প্রয়োজন যা এদেশের জনগণকে মুক্তি দিবে আমেরিকা-ভারতের যুলুমে রচিত গণতান্ত্রিক অন্ধকার কুয়া থেকে এবং রাসূল(সা) এর ভবিষ্যৎবাণী অনুসারে আবারো উদিত হবে ইসলামের সূর্য।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:

    তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে এবং নেক কাজ করে, তাদের সাথে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, তিনি জমিনে তাদের অবশ্যই খিলাফত দান করবেন- যেমনিভাবে তিনি তাদের আগের লোকদের খিলাফত দান করেছিলেন”। (আন-নূরঃ ৫৫)

    রাসূল (সা) বলেন: “...এরপর আবারো আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত” (মুসনাদে আহমদ)

  • ‘উন্নয়নের জোয়ার বনাম ক্ষমতা’

    ‘উন্নয়নের জোয়ার বনাম ক্ষমতা’

    বেশ কিছুদিন যাবৎ ঢাকা চট্টগ্রাম সহ সারাদেশের প্রধান প্রধান জনবহুল সড়কগুলোর রাস্তার পাশে বিলবোর্ডগুলোতে একটি বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। আর সেই বিজ্ঞাপনটি হল- “এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ”। যা কিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে পুর্বে আর কখনোই দেখা যায়নি এবং মিডিয়ায় বিভিন্ন নেতা কর্মীদের বক্তব্যে প্রায়ই শোনা যাচ্ছে যে-“উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে বাংলাদেশ”। সত্যি কথা বলতে গেলে বর্তমান সরকার “উন্নয়নের জোয়ার” নামক শব্দটি ব্যপকভাবেই জনগণের কাছে পৌছাতে পেরেছেন। সরকার মুলত জনগণকে যা বোঝাতে চাচ্ছেন তা হল- “চারিদিকে শুধু উন্নয়ন আর উন্নয়ন হচ্ছে যা কিনা শুধু বর্তমান সরকারের জন্যই সম্ভব হয়েছে এবং যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় না থাকতো, তাহলে এতো দ্রুত গতিতে বাংলাদেশ উন্নতি লাভ করতে পারতোনা। তাই বাংলাদেশের এই অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন যা কিনা আগে কখনো হয়নি, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হলে জনগণকে অবশ্যই বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় রাখা উচিৎ।”

    আসুন দেখা যাক, উন্নয়নের জোয়ার বলতে সরকার কী বোঝাতে চেয়েছে?-

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পূর্ববর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের উন্নয়ের মুল মাপকাঠি হল বৈষয়িক উৎপাদন-প্রবৃদ্ধি, এর একটি উদাহরণ হতে পারে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও ফ্লাইওভার নির্মান। তাই যে সরকার এগুলো যত বেশি নির্মান করেছেন, সে তত বেশি উন্নতি করেছেন বলে মনে করা হয়। যদিও এই ব্যবস্থায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দুর্নীতি (উদাহরণসরূপ, speed money) ও ভোট জালিয়াতি উন্নয়নের অন্তরায় নয়। তাই পুর্ববর্তী সরকারদের সাথে বর্তমান সরকারের উন্নয়নের পার্থক্য করলে একটা দিকে সরকার এগিয়ে, আর তা হল ফ্লাইওভার নির্মাণ। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান ব্যস্ত সড়কগুলোতে ব্যপকভাবে ফ্লাইওভার নির্মান কাজ শুরু হয়েছে। ফ্লাইওভার নির্মানের কাজ চলার কারনে ব্যাপকভাবে যানযট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে রাস্তার জ্যামে আটকানো জনগন জ্যাম বাধার কারণ খুজতে গিয়ে দেখেন যে ফ্লাইওভার নির্মানকাজ চলছে, অর্থাৎ সরকার উন্নয়ন করছে। এভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ব্যাস্ত সড়কগুলোতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ দেখছে যে সরকার উন্নয়ন করছে। 

    কিছুদিন আগের খবরের কাগজগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাব যে ১ ঘন্টার বৃষ্টিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো তলিয়ে গিয়েছিল, যেটাকে ছোটখাট জোয়ার বলা যেতে পারে। শিশু রাজন হত্যার মত নৃশংস ও জঘন্য হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী RAB কর্তৃক নারায়নগঞ্জে ৭ খুন, সংসদ সদস্যের ছেলের গুলিতে রিক্সাচালক নিহত হওয়া, শিক্ষাব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ধারা অব্যাহত থাকা ও মেডিকেল ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদেরকে পুলিশ বাহিনী দ্বারা আহত করিয়ে মেডিকেলে ভর্তি করানো, সরকার দলীয় সংসদ সদস্যের মুখে নবী-রাসূলের অবমাননা (যা জনগণ আগে কখনো দেখেনি), বিশ্বে তেলের দাম নিন্মমুখী হওয়ার পরও বাংলাদেশে উর্ধমুখী থাকা, উত্তরোত্তর প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি করা ও পাশাপাশি দ্রব্যমুল্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া, মায়ের গর্ভাবস্থায় থাকা অবস্থায় শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়া ইত্যাদি ঘটনাগুলো ঘটেছে। 

    এটা মোটামুটি সকলেই অবগত যে, বাংলাদেশের প্রচলিত শাসন ব্যবস্থায় সকল সরকারই তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। তাই বর্তমান সরকারও এর ব্যতিক্রম নয় এবং সেটারই ধারাবাহিকতার প্রতিচ্ছবি ছিল বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় আসার সেই তথাকথিত নির্বাচন। সে গণতান্ত্রিক ভোগবাদী সমাজ ব্যবস্থার ফলে সৃষ্ট ভোগবাদী প্রবণতারই বহিঃপ্রকাশ করছে। সরকার ভাল করেই জানে যে, তার জনসম্মতি এখন প্রায় শুন্যের কোটায়। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য যে কোন ধরণের গণবিপ্লবকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। তাই জনমনের ক্ষোভ ও আসন্ন যে কোন আন্দোলনের সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখার জন্য সরকার ব্যপকভাবে তার মেকি উন্নয়নের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। মোট কথা, সরকার তার কু-কর্মকে ঢাকার জন্য মেকি উন্নয়ের ছাতা মেলে ধরেছে। তাই সরকারের উন্নয়নের জোয়ারের অন্তরালে মুলত রয়েছে ক্ষমতা ধরে রাখার প্রয়াস।

    গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতায় থাকা শাসকবর্গ নিজের প্রয়োজনমত আইন তৈরি করতে পারে ও প্রশাসনকে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে। তাই ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিটি সরকারই তাদের বিরোধী দলকে দমন করতে বিচার ব্যবস্থায় দলীয়করন, আইন সংযোজন ও পরিবর্তন করে থাকে। এখানে আল্লাহ এবং জনগণ কারো কাছেই শাসকের কোন জবাবদিহীতার ভয় থাকেনা। কাগজে-কলমে জনগণের কাছে যে জবাবদিহিতার কথা বলা হয় এ ব্যবস্থায়, ধর্মরিপেক্ষ তাকওয়াহীন পরিবেশের কারণে তা কাগজে-কলমেই রয়ে যায়, বাস্তবতায় প্রবেশ করে না। ফলে এই ব্যবস্থা তার প্রতিটি শাসককেই ক্ষমতালোভী ও স্বেচ্ছাচারী করে তুলে।

    তাই, মানবজাতির জন্য গণতন্ত্র নামক এমন জবাবদিহীতাবিহীন স্বেচ্ছাচারী শাসন ব্যবস্থা কখনোই কাম্য নয়। খিলাফতই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যেখানে শাসক আল্লাহ ও জনগণ উভয়ের কাছেই জবাবদিহীতার ভয়ে ভীত থাকে। খিলাফত ব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং আইন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কর্তৃক নির্দিষ্ট হওয়ায় শাসকের সেচ্ছাচারী ও ক্ষমতালোভী হওয়ার কোন সুযোগ নেই। খিলাফতের সোনালী ইতিহাসও আমাদেরকে তাই বলে। খলীফা হযরত ওমর (রা) তার স্বীয় পুত্রকে মদ্যপানের অভিযোগে শাস্তি দিয়েছিলেন এবং তিনি (রা) এমন আল্লাহভীরু আর দায়িত্বশীল ছিলেন যে, তিনি বলতেন,

    “ফুরাত নদীর তীরে (মদীনা থেকে ইরাকের এই নদীর দূরত্ব অনেক) একটি খচ্চরও যদি পা পিছলে পরে (মরে যায়), তবে আমার আশংকা কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা’আলা আমাকে জিজ্ঞেস করবেন” 

    সুলতান সালাউদ্দিন আইয়্যুবির মৃত্যুকালে তার কাছে সম্পদ বলতে ছিল শুধু ১ দিরহাম হতে কিছুটা বেশি। খিলাফত ব্যবস্থায় আল্লাহর হুকুম বস্তবায়ন ও তার সন্তুষ্টি অর্জনই মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়ায় শাসকদের না থাকে সম্পদ আহরণের লোভ এবং না থাকে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা। তাছাড়া খিলাফতই হচ্ছে মহান আল্লাহ কর্তৃক একমাত্র মনোনীত শাসন ব্যবস্থা। 

    রাসূল (সা) বলেন:- “বনী ইসরাইলকে শাসন করতেন নবীগণ। যখন এক নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন তাঁর স্থলে অন্য নবী আসতেন, কিন্তু আমার পর আর কোনও নবী নেই। শীঘ্রই অনেক সংখ্যক খলীফা আসবেন“। তাঁরা (রা) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা) বললেন, “তোমরা একজনের পর একজনের বাই’য়াত পূর্ণ করবে, তাদের হক আদায় করবে। অবশ্যই আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) তাদেরকে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের ব্যাপারে জবাবদিহি করবেন“।’ 

    এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) (যার জ্ঞানের পরিধি অসীম) নিজেই যেখানে খিলাফত ব্যবস্থাকে মানবজাতির জন্য মনোনীত করেছেন সেখানে অন্য কোন ব্যবস্থার অধীনস্থ থাকা কোন মানুষের জন্যই কাম্য নয়। তাই মানব জাতির কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে প্রতিটি মানুষকেই প্রচলিত সকল ব্যবস্থাকে পরিত্যাগ করে খিলাফত ব্যবস্থাকে মনেপ্রাণে ধারণ করা ও তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা উচিৎ।

    কুদরত উল্লাহ

  • শিক্ষার উপর ভ্যাট – পুঁজিবাদি অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক শাসনের দেউলিয়াপনা এবং ইসলামি রাষ্ট্র – খিলাফতের সমাধান

    শিক্ষার উপর ভ্যাট – পুঁজিবাদি অর্থনীতি ও গণতান্ত্রিক শাসনের দেউলিয়াপনা এবং ইসলামি রাষ্ট্র – খিলাফতের সমাধান

    শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি জাতি তাঁর সভ্যতা সংস্কৃতি কাল ক্রমে চর্চা, গবেষণা, সভ্যতার বিকাশ ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। আর শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রণীত শিক্ষা নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্র তাঁর নিজ সংস্কৃতি, আদর্শ, চিন্তা গুলোকে জনগণের মাঝে প্রোথিত করে এবং একটি আদর্শনির্ভর জাতি গঠনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব দরবারে নিজের শক্তিমত্তার জানান দেয় ও বৈশ্বিক নীতি নির্ধারণে নিজের আধিপত্যকে বজায় রাখতে সক্ষম হয়। 

    বাংলাদেশ এমনি একটি দেশ। যা পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক নীতি ও গণতান্ত্রিক শাসন কাঠামো দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র। আর পুঁজিবাদি অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই হল- পুঁজির স্বাধীনতা। যা মালিকানার স্বাধীনতার নামে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সকল বিষয়ে অর্থাৎ খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি সহ সকল বিষয়ে ব্যবসা করার অধিকার দেয়। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের জনগণের মৌলিক প্রয়োজন/অধিকার থেকে শুরু করে সকল প্রয়োজন ও চাহিদা ব্যবসায়ী পণ্যে রূপান্তরিত হয়। আর জনজীবনে নেমে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। 

    সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের কুফর পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক সরকার!! এর প্রণীত বিলাসী বাজেটে সরকার তার আয় ও ব্যয় এর সামঞ্জস্য বিধানের জন্য নানা ভাবে নানা সেবা ও পণ্যের উপর ভ্যাট আরোপ করে। যার মধ্যে অন্যতম- একটি খাত শিক্ষা। যার উপর প্রথমে ১০% এবং পরবর্তীতে চাপের মুখে ৭.৫% ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্তে সরকার অটল থাকে। যা ৬০% তারুণ্য নির্ভর বাংলাদেশের শিক্ষার উপর চরম চাপ সৃষ্টি করে। আলোচনায় উঠে আসে- শিক্ষার উপর ভ্যাট ও পাবলিক ও প্রাইভেট শিক্ষা।

    যদিও আপাত দৃষ্টিতে আন্দোলনের মুখে সাম্প্রতিক ভ্যাট বাতিল করা হয়েছে, তবে পুঁজিবাদি ব্যবস্থা এখনো বাতিল হয়নি, যার নিজের ভেতরেই এসব অন্যায় অর্থনৈতিক বোঝা চাপিয়ে দেবার বীজ নিহিত। বিগত সময়ের দিকে আলোকপাত করলে আমরা দেখতে পাব- বাংলাদেশের পাবলিক শিক্ষাকে বেসরকারিকরণের এক কৌশলী নীতি নিয়ে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন নীতি নির্ধারণ করেছিল এবং তাদের এ ষড়যন্ত্র আজও চলমান। বিশ্বব্যাংক এর পরামর্শ অনুসারে বাংলাদেশের শিক্ষা খাতকে বেসরকারিকরণ এবং বাজেটে শিক্ষা খাতে ক্রমান্বয়ে বরাদ্ধ কমিয়ে আনা ও না দেয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক উৎস থেকে শিক্ষার ব্যয় ভার বহনের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সান্ধ্যকালীন শিক্ষা কর্মসূচি পরিচালনার মধ্য দিয়ে পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মোড়ল, সরকার ও তাদের আজ্ঞাবাহকরা এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য মরিয়া। ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্য, শিক্ষা কর্মসূচি নিয়ে নানা প্রতিবেদন, বেসরকারি শিক্ষা উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা ও রাজনৈতিক বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করে বাংলাদেশে সরকারের অনুগত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। একদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেশন জট, কর্মমুখী-কারিগরি শিক্ষা অপ্রতুলতা ও সীমিত আসন; অন্য দিকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যয়বহুল শিক্ষা – উভয়ই রাষ্ট্রের জনগণ ও বিশাল তারুণ্যের জন্য বিষফোড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। তাঁর উপর সময়ে সময়ে বিভিন্ন ছুটোয় যোগ হচ্ছে টিউশন ফি এর উপর ভ্যাট।

    আমরা দেখতে পাব- বিগত সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বেতন বৃদ্ধি ও সান্ধ্যকালিন কোর্স চালু করার প্রতিবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। আজ একই ভাবে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি এর উপর ভ্যাট আরোপে সচেতন মহলে ও রাজপথে আন্দোলন শুরু হয়। আর অন্য দিকে অতীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন দমনে সরকার পুলিশ বাহিনী দিয়ে মামলা হামলার যে নীতির মাধ্যমে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করেছে আজ ও একই পদ্ধতি ও কৌশল এর মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছে। যদিও আন্দোলন দাবানলের মতো আরো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে নাকি – এই ভয়ে পরবর্তীতে সরকার (আপাতত) ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এসকল কিছুর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমানিত হয় – শিক্ষা নামক অধিকার এর নিশ্চয়তা দিতে সরকার ব্যর্থ, কিন্তু সে শিক্ষাকে সমাজের অসংখ্য মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানদের নিকট বিক্রি করে জাতীয় আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সে একধাপ অগ্রসর।

    এ ব্যর্থতা শুধু সরকার বা রাষ্ট্রের নয় বরং এ ব্যর্থতা পুঁজিবাদি অর্থনীতির। পুঁজিবাদী অর্থনীতি তাঁর পুঁজির অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা নীতির ফলে এবং আয়ের উৎস হিসেবে জনগণের চাহিদা ও প্রয়োজনকে পণ্য বানিয়ে এর উপর ভ্যাট আরোপ করে রাষ্ট্রের আয় বাড়ানোর নীতির ফলে আজ জনজীবন চরম দুর্ভোগ এর মুখোমুখি। 

    পুঁজিবাদ ও এর রাষ্ট্রীয় কাঠামো তথা সরকার যেখানে মানুষকে তাঁর প্রয়োজনীয় অধিকার ও চাহিদা বিনামুল্যে না দিয়ে বরং পণ্য বানিয়ে জনগণের কাছে বিক্রি করে আর নিজের দেউলিয়াপনা কে উন্মোচিত করে। সেখানে ইসলাম তাঁর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের শিক্ষা নিশ্চিত করে ও এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করে।

    খিলাফত রাষ্ট্র কখনই শিক্ষার উপর কোন ধরণের মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপ তো দূরের কথা, কোন ধরণের টিউশন ফি ধার্য করবে না অর্থাৎ শিক্ষা হবে অধিকার।

    খিলাফত রাষ্ট্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রতিটি ব্যক্তিকে জীবন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় শিক্ষাদান রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। অন্তত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে এটি সবার জন্য বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে। রাষ্ট্রের সর্বাত্মক চেষ্টা করা উচিত যাতে করে সবাই বিনামূল্যে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ অব্যাহত রাখতে পারে।

    খিলাফত রাষ্ট্র বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে, রাষ্ট্রের যথেষ্ট পরিমাণ পাঠাগার এবং পরীক্ষাগার সহ জ্ঞান বৃদ্ধির সুবিধা প্রদান করবে যাতে করে যারা ফিকহ, হাদীস, তাফসীর, চিকিৎসা, প্রকৌশল, রসায়নবিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা অব্যাহত রাখতে পারে। এর লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে মুজতাহিদ, সৃজনশীল বিজ্ঞানী ও আবিস্কারক তৈরী করা।

    উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে এটা পরিস্কার- আমাদের সরকার সমূহ ও পুঁজিবাদি আদর্শের ব্যর্থতা কোথায়। তাই বাংলাদেশের তারুণ্য নির্ভর শিক্ষার্থীদের বুঝা উচিৎ- ভ্যাট প্রত্যাহার কিংবা ভ্যাট কমানো, প্রত্যাহার করা কিংবা ভ্যাট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উপর ধার্য করার মধ্য দিয়ে পরোক্ষ ভাবে শিক্ষার্থীদের উপর আরোপের ষড়যন্ত্র কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং ইসলামি রাষ্ট্র তথা খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও খিলাফতের শিক্ষা নীতি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শিক্ষাকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত সমাধান।

    আল্লাহ্‌র রাসূল (সা) বলেছেন-

    যে জ্ঞান অর্জনের কোনো পথে অগ্রসর হয়, আল্লাহ্‌ এর মাধ্যমে তাঁর জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন”।

    মাহবুবুল আলম

  • গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষণই যেন এক কালবেলা…

    গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষণই যেন এক কালবেলা…

    এ মুহূর্তে বাংলাদেশে একটি খুব আলোচিত একটি ঘটনা হচ্ছে শিশু রাকিব হত্যা। নৃশংস বর্বর এ ঘটনা মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে অথচ মাত্র কিছুদিন পূর্বেই আমরা কেঁপে উঠেছিলাম শিশু রাজনের লোমহর্ষক হত্যা কান্ডের ঘটনায়। খুব কম সময়ের মধ্যে পরপর এরকম বেশ কিছু হত্যা কান্ড অতঃপর পত্রপত্রিকায় তার নিউজ, ইন্টারনেট, টিভি তে আলোচনা, প্রতিক্রিয়া দেখে আমাদের মনে হতে পারে হঠাৎ বুঝি এ ধরনের ঘটনা ব্যপক ভাবে শুরু হয়েছে। আসলে মোটেও তা নয় বরং এটাই এখন এ দেশের, এই সমাজের বাস্তব চিত্র। খুব অল্প সংখ্যক ঘটনাই মিডিয়াতে আসে এবং মানুষ তা জানতে পারে অথচ প্রতিদিনই এমনই অনেক নৃশংস হত্যাকান্ড ঘটে চলেছে। রাজন হত্যার দু দিন পর চত্তগ্রামে চান্দগা আবাসিক এলাকায় মামার হাতে খুব নিষ্ঠুরভাবে হত্যা হয় ভাগ্নের যা মিডিয়ায় সেভাবে আসেনি। পত্রিকার বরাত দিয়েই জানা যায় এ বছর জানুয়ারী থেকে জুন পর্যন্ত ছয়মাসে সারা দেশে পিটুনিতে মারা গিয়েছে ৬৯ জন। গড়ে এক মাসে প্রায় ১২ জন। এ কেবল পত্রিকা কর্তৃক লিপিবদ্ধ তথ্য; বাস্তবতা আরো ভয়ানক।আরো একটা বিষয় খুবই ভয়ানক তা হলো হত্যার ধরন এবং হত্যাকারীদের প্রকৃতি। নৃশংসতা আর বর্বরতার প্রতিযোগিতায় যেন নেমেছে মানুষ! আর হত্যাকারীদের তালিকায় এখন হার হামেশাই যোগ হচ্ছে নিজস্ব আত্মীয়- বাবা, মা, মামা, চাচা এবং সাধারণ মানুষ যাদের এ ধরনের কোন ক্রিমিনাল রেকর্ডই নেই। একটি দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা যদি দিন দিন এমন অবস্থার দিকে যেতে থাকে তাহলে বলতেই হয় ধ্বংসের প্রান্ত সীমানায় পৌছে গেছে এ জনপদ। নিজ পিতা যখন তার তিনটি কন্যা সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করে (১৬.০৫.২০১৫), জনগণের রক্ষক সেজে যখন ভক্ষক হয়ে শিশু সাইদ কে হত্যা করা হয় (১৮.০৩.২০১৫), পিটিয়ে খুচিয়ে শিশু রাজনকে (১২.০৭.২০১৫), পায়ুপথে কম্প্রেসার লাগিয়ে যখন শিশু রাকিব কে হত্যা করা হয় (০৫.০৮.২০১৫) তখন আসলেই বলতে হয় দেউলিয়া হয়ে গেছে এ সমাজ… এ যেন এক কালবেলা!

    কিন্তু কেন এই হত্যার মিছিল? কেন ছাত্রদলের গুলাগুলিতে বাবার কোলে বসে থাকা দু বছরের নওশীনের জীবনের প্রদীপ নিভে যায়।কেন ছাত্রলীগের সোনার ছেলেদের গুলাগুলিতে মায়ের গর্ভে গুলিবিদ্ধ হয় শিশু… কেন এসব অমানবিকতা, পাশবিকতা? কারণ কি শুধু এটা যে আমরা আমাদের মনুষ্যত্ব হারিয়ে ফেলেছি, হয়ে গেছি চিন্তাশুন্য কিংবা আমাদের মানবিক মুল্যবোধের অবক্ষয় হয়েছে ইত্যাদি। আসলে এগুলো কারণ নয় বরং এগুলোও ফলাফল।মূলত এর পেছনে রয়েছে একটি ঘুনে ধরা সভ্যতা, একটি অনাদর্শিক সমাজব্যবস্থা, ভোগবাদী চরম স্বার্থবাদী আর সস্তা ও নষ্ট আবেগের সংস্কৃতি, সর্বোপরি একটি মানব রচিত মতবাদপুষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা।যার অবধারিত ফলাফল আর ফলাফলের প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এই হত্যা ধ্বংসের নারকীয় মিছিল!

    পথ কী? পাথেয় কোথায়? কেবল এবং কেবলমাত্র একটি আদর্শিক সমাজ ব্যবস্থাই পারে মানুষ কে মুক্তি দিতে। আর আদর্শিক সমাজের পূর্বশর্ত একটি আদর্শিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা।আর সেই একমাত্র আদর্শটি হলো ইসলাম আর রাষ্ট্রটি হলো খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা।একজন খলীফা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ব্যবস্থা অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং হক ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলেন। মানুষ সঠিক চিন্তা, আবেগ, মানবিক মুল্যবোধ ও দায়িত্ত্বশীলতা নিয়ে জীবন ধারণ করে।ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সকল মানুষ পায় সঠিক নিরাপত্তা। ইসলামে অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যার ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারী দেয়া হয়েছে- “যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে একজন মানুষ কে হত্যা করল সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল” [সুরা মায়িদা: ৩২]।

    শিশু হত্যা ইসলামের দৃষ্টিতে জঘন্যতম অপরাধ এমনকি শিশুটি যদি মুশরিক পরিবারেরও হয়। এক যুদ্ধে মুশরিকদের একটি শিশু নিহত হলে রাসুল (সা) তা শুনে খুব মর্মাহত হন। তিনি বলেন-

    এ শিশুরা তোমাদের চেয়েও উত্তম। সাবধান! শিশুদের হত্যা করবে না!” [মুসতাদরাকে হাকিম: ২/১৩৩]।

    বাংলাদেশে এখন মাতৃজঠরেও শিশু নিরাপদ নয়। অথচ ইসলাম এ ব্যপারে কত সচেতন। একবার এক ব্যাভিচারিনী মহিলা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজেকে গর্ভবতী উল্লেখ করলে তার গর্ভস্থ নিরপরাধ শিশুর নিরাপদ প্রসব এবং দুগ্ধকালীন সময় অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত দন্ড কার্যকর করেন নি। [মিশকাত: ২/৩১০]।

    ইসলামী রাষ্ট্র শিশুদের জন্য হবে স্বর্গ রাজ্য। আমাদের প্রিয় রাসূল (সা) শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তারা তাঁর সাথে রাস্তার ধুলোয় খেলতো। রাসুল (সা) শিশুদের যত্ন নিতে বলেছেন। ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা কতটা দায়িত্বশীল সকলের নিরাপত্তা আর অধিকারের ব্যপারে তা ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক খলীফা ওমর (রা) থেকে বুঝা যায়- “যদি এই ফোরাত নদীর তীরে যদি একটি বকরি পা পিছলে পড়ে মারা যায় আমি ওমর ভয় করি আল্লাহ’র কাছে আমাকে এর জবাবদিহি করতে হবে”। সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!

    পুঁজিবাদী ভোগবাদী ব্যবস্থার কম্প্রেসারের বিষবাস্পে ফুলে উঠা মৃতপ্রায় এই কুফরি সভ্যতার পতন ঘটিয়ে শীঘ্রই ফিরে আসবে মানবতার মুক্তির দিশারী ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থা। সর্ব দিকে, সপ্ত সুরে আজ কেবলি তার আগমনি ধ্বনি… আর এর জন্য আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করার জন্য ঝাপিয়ে পড়তে হবে। আর এ কাজটি আমাদের উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয দায়িত্ব।

    তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হবে”। [বুখারী: ১/৩০৪ ও মুসলিম: ৬/৭]

    আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে এই মহান দায়িত্ত্ব পালন করার তৌফিক দিন। আমীন।

    রবিউল আলম

  • উপমহাদেশে ইসলামি শাসনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা

    উপমহাদেশে ইসলামি শাসনের ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকার পড়ছিলাম বাঙালী জাতীয়তাবাদ নিয়ে। বাম বুদ্ধিজীবীদের একটি চিন্তা সেকুলার মহলে বেশ জনপ্রিয়ঃ বাঙ্গালী সমাজে ইসলাম ধর্মের প্রভাব হল একটি প্রতিক্রিয়াশীলতার বিষয়, অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে হিন্দুদের দ্বারা অর্থনীতিক নিপীড়ন বাঙালী সমাজে পাকিস্তান আন্দোলনের মাধ্যমে ‘মুসলমানিত্ব’-এর দাবীকে জোরালো করে। বাম দার্শনিকদের চোখে ‘ইসলামী শাসন’-এর বিষয়টি বাঙ্গালী মুসলিম সমাজে গভীরভাবে প্রথিত না। ওনাদের সাথে আলোচনা করলে এও শুনতে হয় ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ কখনই ‘কেন্দ্রিয় খিলাফতের’ আওতাধীনে ছিল না। আরও একটি ভ্রান্ত ধারণা তারা ছড়ানঃ আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশ *মূলত* এই অঞ্চলের মানুষ (Indigenous people) দ্বারা শাসিত হয়ে এসেছিল যেখানে জাতীয়তাবাদী চেতনাই মুখ্য ছিল, তারা কখনই খিলাফতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সাথে একীভূত হয়নি। এই আলোচনা গুলো এখনো চালু রয়েছে বাম ও কট্টর জাতীয়তাবাদী সেকুলারদের মহলে কারন তারা প্রমাণ করতে চায় খিলাফত এই অঞ্চলের মানুষের ন্যাচারাল ডিমান্ড হতে পারে না। এই আলোচনাও টেনে আনা হয় বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেছে *শুধুমাত্র* সুফিরা, কিন্তু শাসন ব্যবস্থা হিসেবে (শরিয়াহ কোর্ট/কাজি, প্রশাসনিক অবকাঠামো ইত্যাদি) এই অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ছিল না। এই বিষয়ে জেনুইন গবেষণা করেছিলেন কিছু একাডেমিক যেমন ডঃ মোহর আলি (History of the Muslims of Bengal, Vol 1&2), ডঃ আব্দুল করিম (‘বাংলার ইতিহাস’, ‘বাংলার ইতিহাসঃ সুলতানি আমল’), ডঃ আস্কর ইবন শাইখ (‘বাংলার মুসলিম শাসনকর্তা’)। আমার সংগ্রহে থাকা বইগুলোর আলোকে নীচের তথ্যগুলো তুলে ধরলাম।

    এই উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাব রাসুলের (সা) মক্কী যুগ থেকেই। এটা হয়তো অনেকেই জানে না ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম ছিল ভারতের বর্তমান কেরালা অঞ্চলের পেরুমাল সাম্রাজ্যের শেষ রাজা ‘চেরামান ভারমা পেরুমাল’। সে রাসুলুল্লাহর (সা) ব্যাপারে আরব বণিকদের কাছ থেকে জানতে পেরে ইসলাম কবুল করেন এবং মক্কায় রাসুলের সাথে দেখা করতে যায়। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইমাম তাবারি ওনার ‘ফিরদাউসুল হিকাম’-এ উল্লেখ করেন পেরুমাল ১৭ দিন রাসুলের সাথে ছিলেন। তিনি ‘তাজউদ্দীন’ উপাধি লাভ করেন রাসুলের কাছ থেকে এবং সাহাবা মালিক ইবন দিনার (রা) কে সাথে করে কেরালা ফেরত আসার পথে তিনি মারা যান। ‘চেরামান-মালিক মসজিদ’ এখনো কেরালায় রয়েছে অরিজিনাল কাঠামোয়। কিন্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ইসলাম প্রচার সম্ভব না দেখে সেই যাত্রায় ইসলাম প্রচার/প্রতিষ্ঠা ভারত উপমহাদেশে থেমে যায়।

    খলিফা উমার (রা) বাহিনী পাঠিয়েছিলেন হিন্দুস্থান জয় করার জন্য, কিন্তু সফলতা পাননি। উসমান (রা) চাওয়া সত্ত্বেও কৌশলগত কারনে এগোন নি। ৬৬০ খ্রিঃ আলির (রা) সময় হারিস ইবন মুররা আল-আবদি হিন্দের কাছের কিছু অঞ্চল দখল করেছিলেন। মুয়াবিয়াও (রা) চেষ্টা চালু রেখেছিলেন কিন্তু সফল হননি। শেষমেশ, ৭১১ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক এর সময় ১৭ বছরের তরুন যোদ্ধা মুহাম্মাদ বিন কাসিম আল-থাকাফি ভারতে ঢোকেন এবং তার মৃত্যুর পরো ৮৭১ খ্রিঃ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল জয় চালু থাকে। সরাসরি আব্বাসিয় খিলাফতের আওতাধীনে হুকুম শরিয়া প্রতিষ্ঠিত ছিল এই অঞ্চলে। খিলাফত তৎকালীন ভারতীয় শাসকদের বিভিন্ন উপাধি দিয়েছিল যেমন, সুলতান শবুক্তগিন এর জন্য ‘নাসির আদ দাউলা’ এবং সুলতান মাহমুদ এর জন্য ‘ইয়ামিন আদ দাউলা’ এবং ‘আমিন উল মিল্লাত’। ১২১১ থেকে ১২৩৬ খ্রিঃ পর্যন্ত শাসক ছিলেন সুলতান ইলতুতমিশ যিনি আব্বাসি খিলাফাহ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার অনুরধ জানিয়ে খলিফা মুস্তানযির বিল্লাহ এর কাছ থেকে ‘সুলতান-এ-আযম’ উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি মুদ্রা চালু করা শুরু করেছিলেন যেগুলোর এক পাশে থাকতো কলেমা এবং খিলাফতের নাম আর অন্য পাশে থাকতো তার নিজের নাম ‘নাসির-এ-আমির উল মুমিনিন’ (বিশ্বাসীদের নেতার সাহায্যকারী) টাইটেল সহ। খালযি সুলতানাত এর পর তুঘলক সাম্রাজ্যও খিলাফতের সাথে সংযুক্ত ছিল। মুহাম্মাদ বিন তুঘলক (১৩২৫-১৩৫১) তার আগের শাসকদের সমালোচনা করে (কারন কেউ কেউ স্বাধীন হতে চেয়েছিল) আব্বাসি খলিফা আল-মুস্তাকফি বিল্লাহর সাথে যোগাযোগ করে স্বীকৃতি নেন ‘সুলতান আস-সালাতিন’ হিসেবে। ফিরোজ শাহ তুঘলক তার বই “ফুতুহাত-ই-ফিরোজশাহি” তে উল্লেখ করেছিল তৎকালীন খলিফা তাকে ‘খিলাত’ (robes of honor), ব্যানার, রিং ইত্যাদি পাঠিয়েছিল স্বীকৃতি হিসেবে। মোঘল শাসকদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (মাঝ সময়ের কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন আকবরের শাসন) খিলাফতের সাথে তাদের সুসম্পর্ক ছিল। হুমাইউন বিখ্যাত ওসমানী খলিফা ‘সুলাইমান দা ম্যাগ্নিফিসেন্ট’ কে চিঠি পাঠিয়েছিল “খিলাফতের মর্যাদার রক্ষাকারী হিসেবে”। এমনকি টিপু সুলতান ১৭৮৭ সালে ওসমানী খলিফা তৃতীয় সেলিম কে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়ে চিঠি দিয়েছিল।

    এই প্রেক্ষাপটের ভেতরেই খিলাফতের সাথে বাংলারও গভীর যোগাযোগ ছিল। গজনীর সুলতান মুহাম্মাদ ঘোরির (যিনি এই উপমহাদেশে কেন্দ্রীয় খিলাফতের স্বীকৃত ওয়ালি ছিলেন) সময় বাংলা বিজয়ের কারনে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজি ঘোরির দিল্লীর প্রতিনিধি কুতুবুদ্দিন আইবেক এর কাছ থেকে ‘খিলাত’ (robe of honor) পেয়েছিল। চার বছরের ভেতর ইখতিয়ার উদ্দিন সমগ্র বাংলায় (লাখনাওয়াতি) ইসলামী শাসন কায়েম করেছিলেন কেন্দ্রীয় খিলাফতের স্বীকৃতি নিয়ে। ইখতিয়ারের পরের শাসকরাও মুদ্রা চালু করেছিলেন যার এক সাইডে কালেমা থাকতো আর অন্য সাইডে থাকতো ‘খলিফার সাহায্যকারী’ টাইটেল। ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার এর সময় থেকে (১২০৩/৪) পুরো সুলতানি আমল (১৫৩৮) পর্যন্ত বাংলার শাসকরা এরকম মুদ্রা চালু করেছিল যার এক সাইডে লেখা থাকতো কালেমা আর অন্য সাইডে থাকতো টাইটেল ‘খলিফার সাহায্যকারী’ (নাসির আমিরুল মুমিনিন)। প্রখ্যাত ইসলামী ঐতিহাসিক হাফেয ইবন হাজার আসকালানি লিখেছিলেন বাংলার এক স্বাধীন নবাব জালালুদ্দিন মুহাম্মাদ শাহ (১৪১৫-১৪৩১) আব্বাসি খলিফার কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় মিশরের মামলুক সুলতান আল-আশরাফ বারসবে কে উপঢৌকন পাঠিয়েছিল যাতে সে স্বীকৃত পাইয়ে দিয়ে সাহায্য করে।

    তাই বাম বুদ্ধিজীবীদের এই দাবী ডাহা মিথ্যা। বাংলা এবং ভারত অঞ্চল কেন্দ্রীয় খিলাফতের প্রদেশ ছিল। প্রায় ৫শত বছর খিলাফত এখানে শাসন করে গিয়েছিল, অবশ্যই মাঝে মাঝে কিছু দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু শরিয়াহ কোর্ট চালু ছিল, খিলাফতের গভর্নরদের দ্বারা এই অঞ্চল শাসিত হতো। বাঙালী মুসলিম সমাজে ইসলাম ব্রিটিশদের ষড়যন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে আসেনি, এমনকি শুধু সুফিদের দ্বারাও প্রচার হয়নি, বরং শাসনব্যবস্থা হিসেবে চালু ছিল।

    ইমতিয়াজ সেলিম

  • ভর্তি, নাকি আরেক ভোগান্তি?

    ভর্তি, নাকি আরেক ভোগান্তি?

    এবছর ৬ জুন থেকে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভর্তির ব্যবস্থা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। তার দাবি হচ্ছে ছাত্রছাত্রী ও অবিভাবকদের ভোগান্তি কমানো ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশন করা। যার অংশ হিসেবে তিনি টেলিটক সিমের মাধ্যমে এস এম এস ও শিক্ষাবোর্ডের প্রণীত ওয়েবসাইটে রেজিষ্ট্রেশন ও রোল নাম্বার দিয়ে ঢুকে কাঙ্ক্ষিত পাঁচটি কলেজ ও বিষয়ের জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা করে দেন।

    ডিজিটালাইজেশন শব্দটি শুনতে সুন্দর হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনা বলেও একটি কথা রয়েছে। তাই আসুন বর্তমান সরকারের ভর্তির ব্যাবস্থাপনার উপর একটু চোখ বুলাই-

    ১. রেজাল্টের ভিক্তিতে ভাল কলেজগুলোতে ভাল ছাত্র-ছাত্রী, মধ্যম মানের কলেজ গুলোতে মধ্যম মানের ছাত্র-ছাত্রী ও নিম্নমানের কলেজগুলোতে নিম্ন মানের ফলাফল করা ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হবে।

    ২. আবেদনকালে ছাত্রছাত্রীরা পাঁচটি কলেজ তাদের পছন্দের তালিকায় রাখলেও কোটা পুর্ণ হয়ে যাবার পর অনেক গোল্ডেন (A+) ধারী ছাত্রছাত্রীও তাদের পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারছে না।

    ৩. কোটা পুর্ণ হয়ে যাবার পর সরকারই নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে, কে কোন কলেজে ভর্তি হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্টকৃত কলেজে ভর্তি হতে বাধ্য হচ্ছে। যার ফলে অনেক ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকই বোবা কান্না কাঁদছেন।

    ৪. যদিও শিক্ষা নীতিমালার ২৮নং অনুচ্ছেদে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কোনো নাগরিককে ‘অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীনে’ আনা যাবে না বলেও উল্লেখ করা রয়েছে, কিন্তু সরকার নিজেদের নীতিমালাই মানছেনা।

    ৫. নতুন নীতিমালায় কোনো কলেজ ভর্তিপরীক্ষা নিতে পারবেনা বলা হলেও তিনটি কলেজের ক্ষেত্রে এই নীতিমালা কার্যকর হচ্ছেনা। কলেজগুলো হচ্ছে- নটরডেম (অধ্যক্ষ: ফাদার হেমন্ত পিয়াস রোজারিও), হলিক্রস (অধ্যক্ষ: সিস্টার শিখা এল গোমেজ) ও সেন্ট জোসেফ কলেজে (অধ্যক্ষ: ব্রাদার রবি ফিউরিফিকেশন)।

    ৬. শুধুমাত্র রোল নাম্বার ও রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে আবেদন করার সুযোগ থাকায় একজনের রোল ও রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে শত্রুতাবসত আরেকজন পুরণ করে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। পরবর্তীতে তা পরিবর্তনের কোন সুযোগ থাকছেনা।

    ৭. অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী ও অবিভাবকদের কাছে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট না থাকায় তারা বিভিন্ন দোকানে ভিড় জমায়, ফলে নিম্নমানের কলেজগুলোর সাথে সেসকল দোকানদারদের আর্থিক চুক্তি থাকায় ভালো ফলাফলকৃত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে সুকৌশলে নিম্নমানের কলেজে ফেলা হচ্ছে। মুলত তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

    ৮. বিভিন্ন গণমাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী ও অবিভাবকগণ অভিযোগ করেছেন:- সরকারের প্রণীত নতুন সার্ভার ভিত্তিক ওয়েবসাইট নানান সমস্যায় জর্জরিত। একজন নির্ধারিত পছন্দের পাঁচটি কলেজের জন্য আবেদন করলেও তার কলেজ পড়েছে অনাকাঙ্ক্ষিত অন্য আরেকটি কলেজে। এমনকি আবার ছাত্র হয়েও কুমিল্লার রিয়াদ নামের এক ছেলের কলেজ দেওয়া হয়েছে সরকারী মহিলা কলেজ! (খবর: কুমিল্লার জমিন, তাং-০২/০৭/২০১৫)।

    ৯. একই প্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি পাশ করলেও অনেকেই ভর্তি হতে পারছেন না সেই প্রতিষ্ঠানের কলেজে। এ কারণে ফল প্রকাশের পর থেকেই ভিকারুন্নিসার অনেক ছাত্রী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ভিকারুন্নিসা নুন স্কুল এ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সুফিয়া আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমাদের এখান থেকে ভালো রেজাল্ট করে এসএসসি পাশ করেছে, কিন্তু বোর্ডের প্রকাশিত তালিকায় তাদের নাম নেই। এখন মেয়েরা অনেক কান্নাকাটি করছে।’

    ১০. এই সমস্যার সমাধান কী তা জিজ্ঞেস করা হলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ইন্দুভ’ষন ভৌমিক শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির প্রসঙ্গে বলেন, করার কিছুই নেই। যার যেখানে নাম এসেছে তাকে সেখানেই ভর্তি হতে হবে। তিনি আরো বলেন, তিনি নাকি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বলেছেন এভাবে সমস্যা হবে, কিন্তু তিনি তার কথা শুনেননি। শিক্ষামন্ত্রীও আশ্বস্থ করে যাচ্ছেন যে, অতি শীঘ্রই এই সমস্যার সমাধান করে দিবেন। যদিও দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি বলতে তিনি শুধুমাত্র (পায়ে এক জোড়া) স্যান্ডেল (থাকাকেই) বুঝেন!

    উপরে উল্লেখিত সমাস্যাগুলোর গভীরে প্রবেশ করলে আমরা দেখবো এগুলো হচ্ছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তিতে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থার ফসল। শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, সমাজের প্রতিটি অঙ্গনে পুঁজিবাদ এরকম নানান সমস্যা সৃষ্টি করে যাচ্ছে। পুঁজিবাদ মুলত ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে, যার ফলে এর শিক্ষাব্যবস্থাও Self Interest এর ভিত্তিতেই প্রণয়ন করা হয়। এর শিক্ষা নীতিমালার মুল বিষয়গুলো একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত হয় না। বহুমুখী চিন্তাভাবনার দরুন মানুষের চিন্তাও নানান ধরনের হয়। চিন্তার ঐক্য না থাকায় সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান বিভিন্ন হওয়ায় কিছু নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর উপচে পড়া ভিড় থাকে অপরদিকে কিছু প্রতিষ্ঠানে এর উল্টো। এই ব্যবস্থার অধীনে প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অন্যান্য বিষয়ে দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হলেও মানুষের মুল যে উন্নতি অর্থাৎ আলোকিত চিন্তার বিকাশ হয়না এবং মানুষে মানুষে ভাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয়না। পুঁজিবাদী ব্যাবস্থার শিক্ষানীতি যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তা হল- স্বার্থের ভিত্তিতে সমাজ গঠন। তাই আমাদের শিক্ষামন্ত্রী ১৬ কোটি মানুষের স্বার্থ বিবেচনা না করেই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে তার ব্যক্তিগত মতকেই পুরো দেশবাসীর উপর চাপিয়ে দিয়েছেন।

    এই ভোগান্তি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদেরকে এমন একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে যেটি কিনা একটি রাষ্ট্রের অধীনস্থ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই মানের কার্যক্রম নিশ্চিত করবে। যেটি মানুষকে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত না করে আলোকিত চিন্তাধারী হতে সহায়তা করবে। যেটি মানুষে মানুষে ভাতৃত্বের বন্ধন স্থাপিত করবে ও মানুষের আত্মাকে প্রশান্তিতে পরিপুর্ণ করবে।

    একটি আদর্শ হতে উদ্ভুত শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে পারে শুধুমাত্র সেই ব্যবস্থা যেটি রাসূল (সা) ও তাঁর পরবর্তীতেও হযরত আবু বকর (রা), উমর (রা) দেখিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। সেটি হল মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার মনোনীত খিলাফত ব্যবস্থা।

    মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণ করলাম, ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা আল-মায়েদা: ০৩)

    মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরো বলেন-

    আমি আপনার প্রতি গ্রন্থ নযিল করেছি যেটি এমন যে তা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট বর্ণনা, হেদায়েত, রহমত এবং মুসলিমদের জন্য সুসংবাদ। (সুরা নাহল: ৮৯)

    খিলাফত ব্যবস্থায় ইসলামী আকীদাহ্‌ হবে শিক্ষানীতির মুল ভিত্তি। পাঠ্যসুচী এবং শিক্ষার পদ্ধতি এমনভাবে পরিকল্পিত হবে যাতে এই মুল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হবার কোন সুযোগ না থাকে।

    খিলাফত ব্যবস্থায় শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির চিন্তা ও চরিত্রকে ইসলামী ব্যাক্তিত্বে রুপ দান করা। পাঠ্যসুচীর অন্তর্গত সকল বিষয়েরই এ ভিত্তির উপর গভীরভাবে প্রোথিত থাকা আবশ্যক

    এভাবেই খিলাফতের শিক্ষাব্যবস্থাকে সাজানো হবে, যেটি তাঁর জনগণকে ভোগান্তি নয় বরং দুনিয়া এবং আখিরাতের জন্য উপুযুক্ত করে গড়ে তুলতে সংকল্পবদ্ধ থাকবে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজটি দৃঢ়ভাবে করার তৌফিক দান করুন (আমীন)।

    কুদরত উল্লাহ্‌

  • লুত (আ) ও তার জাতির বর্ণনা

    লুত (আ) ও তার জাতির বর্ণনা

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ

    আর আকাশ ও জমীনের কত নিদর্শনই না তারা অতিক্রম করে যায়, কিন্তু তারা তা হতে উদাসীন“। [সূরা ইউসুফ: ১০৫]

    আমরা অনেকেই জানি ভু-মধ্যসাগরের কাছে এক উপসাগরে অবস্থিত সডম জাতিই পৃথিবীতে সর্বপ্রথম সমকামিতা নামক ব্যাধির জন্ম দেয়। এই সডম শব্দ হতে ইংরেজিতে সডমাইট শব্দটি এসেছে। সমকামিদের এজন্যই অনেকে ‘সডমাইটস’ (ٍsodomites) বলে অভিহিত করে থাকেন। এই পথভ্রষ্ট জাতির কাছেই প্রেরিত হয়েছিলেন আল্লাহর নবী লুত (আ)। তিনি ডেসপারেট চেষ্টা করেও তাদের পতন ঠেকাতে পারেন নি। এ জাতিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কঠিনভাবে শাস্তি দেন, যার বিস্তারিত বর্ণনা পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে।

    বলা হয়ে থাকে এ জাতিকে শাস্তি দেয়ার ফলাফল হিসেবে মৃত সাগরের জন্ম, যা বর্তমান জর্ডানে অবস্থিত। যারা মৃত সাগর সম্পর্কে অবগত তারা জানে এটি প্রকৃতির সাধারন নিয়মবিরুদ্ধ একটি সাগর, এতে মানুষ ডুবে না। হতে পারে প্রকৃতির সাধারন নিয়মবিরুদ্ধ আচরনের শাস্তির নিদর্শন হিসেবে এই সাগরকে পরবর্তী জেনারেশনের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।

    আসুন আমরা দেখি পবিত্র কুরআনে এ অভিশপ্ত জাতির ব্যাপারে কী বলা হচ্ছে:

    وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ ، إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ مُسْرِفُونَ

    আর লুতের কথা স্মরণ করো যখন সে তার জাতিকে বললো: তবে কি তোমরা এমন অশ্লীলতার দিকে যাচ্ছো যা তোমাদের পূর্বে বিশ্বজগতের কেউ সম্পাদন করেনি। তোমরা তো নারীদের ছেড়ে পুরুষদের কাছে কামভাব প্রকাশ করে গমন করছো, নিশ্চিতভাবে তোমরা সীমা-অতিক্রমকারী জাতি“। [সূরা আ’রাফ: ৮০-৮১]

    وَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا أَخْرِجُوهُمْ مِنْ قَرْيَتِكُمْ إِنَّهُمْ أُنَاسٌ يَتَطَهَّرُونَ

    আর তার জাতির জবাব কেবল এ-ই ছিল যে তারা বলছিল: (লুত ও তার সঙ্গীদের) এদেরকে তোমাদের এ শহর হতে বহিস্কার করো, এই লোকগুলো বেশি পবিত্র হতে চায়“। [সূরা আ’রাফ: ৮২]

    فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ ، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُجْرِمِينَ

    অতঃপর আমি তাকে ও তার পরিবারকে উদ্ধার করলাম, তার স্ত্রী ব্যতিত, সে পেছনে পরে থাকা লোকদের মধ্যে রয়ে গেল। আর তাদের উপর আমি পাথরের বৃষ্টি বর্ষন করালাম, সুতরাং, দেখো ! অপরাধীদের শাস্তি কিভাবে হয়“। [সূরা আ’রাফ: ৮৩]
    কুরআনের অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা বলেন,

    وَلُوطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَتْ تَعْمَلُ الْخَبَائِثَ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ، وَأَدْخَلْنَاهُ فِي رَحْمَتِنَا إِنَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

    আর লুত, তাকে আমি প্রজ্ঞা ও জ্ঞান দান করেছিলাম এবং এমন শহর হতে উদ্ধার করেছিলাম যারা খবিশ (নোংরা) কাজ করতো, নিশ্চয়ই তারা জঘন্য এক পাপাচারি জাতি ছিল। আর লুতকে আমার রহমতের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করলাম, নিশ্চয়ই সে নেক লোকদের মধ্য হতে ছিল“। [সূরা আম্বিয়া: ৭৪-৭৫]

    অন্যত্র বলা হচ্ছে:

    وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ أَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ وَأَنْتُمْ تُبْصِرُونَ، أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ شَهْوَةً مِنْ دُونِ النِّسَاءِ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ تَجْهَلُونَ

    এবং স্মরণ করো লুত যখন তার জাতির উদ্দেশ্যে বলছিল: তবে কি তোমরা সজ্ঞানে এই অশ্লীল কাজের দিকে গমন করছো? তোমরা তো নারীদের রেখে পুরুষদের দিকে কামভাব প্রকাশ করে গমন করছো, নিশ্চিতই তোমরা এক অজ্ঞ জাতি“। [সূরা নামল: ৫৪-৫৫]

    أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ وَتَقْطَعُونَ السَّبِيلَ وَتَأْتُونَ فِي نَادِيكُمُ الْمُنْكَرَ فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا ائْتِنَا بِعَذَابِ اللَّهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ

    তোমরা কি পুংমৈথুনে লিপ্ত আছো, পথে-ঘাটে রাহাজানি করছো এবং নিজেদের সভা-সমাবেশে গর্হিত কর্ম করছো? তার সম্প্রদায়ের জবাব কেবল এ-ই ছিল যে তারা বলছিল: (পারলে) আল্লাহর শাস্তি নিয়ে আসো, যদি তুমি সত্যবাদীদের মধ্য হতে হও“। [সূরা ‘আনকাবুত: ২৯]

    قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ

    লুত বললো: হে আমার রব, ফাসাদ সৃষ্টিকারী জাতির ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করো“। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩০]

    وَلَمَّا أَنْ جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا

    “যখন আমার প্রেরিত (পুরুষরুপী) বার্তাবাহকগণ লূতের কাছে আগমন করল, তখন (তার জাতি হতে) তাদের (সম্ভাব্য বিপদের) কারণে সে বিষন্ন হয়ে পড়ল এবং তার মন সংকীর্ণ হয়ে গেল…”। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৩]

    وَقَالَ هَذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ

    এবং লুত বললো: আজ বড়ই কঠিন দিন” [সূরা হুদ: ৭৭]

    وَجَاءَ أَهْلُ الْمَدِينَةِ يَسْتَبْشِرُونَ
    শহরবাসীরা আনন্দ-উল্লাস করতে করতে এসে হাজির হল“। [সূরা হিজর: ৬৭]

    وَجَاءَهُ قَوْمُهُ يُهْرَعُونَ إِلَيْهِ وَمِنْ قَبْلُ كَانُوا يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ

    “আর তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাড়াহুড়ো করে তার (গৃহ) পানে ছুটে আসতে লাগল। আর এর আগে থেকেই তারা কুকর্ম করে যাচ্ছিল..”। [সূরা হুদ: ৭৮]

    قَالَ يَاقَوْمِ هَؤُلَاءِ بَنَاتِي
    “..(ব্যকুল হয়ে) লুত তাদের বললো: হে লোকসকল, এই তো আমার (শহরের) কন্যারা..”। [সূরা হুদ: ৭৮]

    إِنْ كُنْتُمْ فَاعِلِينَ
    ..যদি তোমরা (একান্ত) কিছু করতেই চাও। [হিজর: ৭১]

    هُنَّ أَطْهَرُ لَكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَلَا تُخْزُونِ فِي ضَيْفِي

    তারাই তো তোমাদের জন্য পবিত্রতর, সুতরাং, আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো, আর আমার মেহমানের ব্যাপারে (কামাসক্ত হয়ে) আমাকে অপদস্থ করো না“। [সূরা হুদ: ৭৮]

    أَلَيْسَ مِنْكُمْ رَجُلٌ رَشِيدٌ
    তোমাদের মাঝে কি একজনও ভালো লোক নেই?” [সূরা হুদ: ৭৮]

    قَالُوا أَوَلَمْ نَنْهَكَ عَنِ الْعَالَمِينَ
    “তারা বললো: তোমাকে কি আমরা বিশ্ববাসীর (তথা বহিরাগতদের) ব্যাপারে নিষিদ্ধ করে দেইনি?

    قَالُوا لَقَدْ عَلِمْتَ مَا لَنَا فِي بَنَاتِكَ مِنْ حَقٍّ وَإِنَّكَ لَتَعْلَمُ مَا نُرِيدُ
    তারা বলল: (আর) তুমি তো জানই, তোমার (এ শহরের) কন্যাদের নিয়ে আমাদের কোন গরজ নেই। আর আমরা আসলে কি চাই, তাতো তুমি ভালোই জানো“। [সূরা হুদ: ৭৯]

    لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ
    “(হে মুহাম্মাদ), আপনার জীবনের শপথ, তারা তাদের কামাসক্তের নেশায় বুদ হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল
    “। [সূরা হিজর: ৭২]

    قَالَ لَوْ أَنَّ لِي بِكُمْ قُوَّةً أَوْ آوِي إِلَى رُكْنٍ شَدِيدٍ
    “লুত বললো: হায় ! তোমাদের মোকাবেলায় যদি আমার কোনো শক্তি থাকতো, অথবা কোনো শক্তি হতে আশ্রয় নিতে পারতাম
    “। [সূরা হুদ: ৮০]

    قَالُوا يَالُوطُ إِنَّا رُسُلُ رَبِّكَ لَنْ يَصِلُوا إِلَيْكَ
    “মেহমানরা বলে উঠলো: হে লুত, নিশ্চয়ই আমরা তোমার রবের পক্ষ হতে প্রেরিত বার্তাবাহক, (চিন্তা করোনা) তারা তোমার কাছেও ঘেষতে পারবে না..”।
    [সূরা হুদ: ৮১]

    وَقَالُوا لَا تَخَفْ وَلَا تَحْزَنْ إِنَّا مُنَجُّوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَأَتَكَ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ
    “..তারা (বার্তাবাহক ফেরেশতাগণ) বলল, ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে ও আপনার পরিবারবর্গকে রক্ষা করে ছাড়বই আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে ধ্বংস প্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত থাকবে
    “। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৩]

    فَأَسْرِ بِأَهْلِكَ بِقِطْعٍ مِنَ اللَّيْلِ وَلَا يَلْتَفِتْ مِنْكُمْ أَحَدٌ
    “সুতরাং, রাতের এক অংশে তোমার পরিবার নিয়ে বের হয়ে পড়, আর তোমাদের কেউ যেন পেছনে না ফেরে..
    “। [সূরা হুদ: ৮১]

    وَامْضُوا حَيْثُ تُؤْمَرُونَ
    “(বরং) যেভাবে আদেশ দেয়া হয়, সেভাবে অগ্রসর হও
    “। [সূরা হিজর: ৬৫]

    إِنَّ مَوْعِدَهُمُ الصُّبْحُ أَلَيْسَ الصُّبْحُ بِقَرِيبٍ
    “..আর তাদের জন্য রইল সকালের প্রতিশ্রুতি। সকাল কি খুব নিকটেই নয়?”
    [সূরা হুদ: ৮১]

    أَنَّ دَابِرَ هَؤُلَاءِ مَقْطُوعٌ مُصْبِحِينَ
    “..সকাল হলেই তাদেরকে সমুলে বিনাশ করে দেয়া হবে
    “। [সূরা হিজর: ৬৬]

    إِنَّا مُنْزِلُونَ عَلَى أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ
    “আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের উপর আকাশ থেকে (আবর্জনাময়) আযাব নাজিল করব তাদের পাপাচারের কারণে
    “। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৪]

    فَأَخَذَتْهُمُ الصَّيْحَةُ مُشْرِقِينَ ، فَجَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ حِجَارَةً مِنْ سِجِّيلٍ
    “অতঃপর ভোরের আলো ফোটার সময় এক বিকট আওয়াজ তাদেরকে এসে পাকড়াও করল। অতঃপর আমি জনপদটিকে উপরকে নিচ করে উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর কঙ্করের পাথর বর্ষণ করলাম
    “।  [সূরা হিজর: ৭৩-৭৪]

    مَنْضُودٍ ، مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ
    “স্তরে স্তরে, যার প্রতিটি (পাথর, কোনটি কার উপর পড়বে তা) তোমার পালনকর্তার নিকট চিহ্নিত ছিল
    “। [সূরা হুদ: ৮২-৮৩]

    وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آيَةً بَيِّنَةً لِقَوْمٍ يَعْقِلُون
    “আর নিশ্চয়ই চিন্তাশীল জাতির জন্য এর মধ্যে একটি নিদর্শন রেখে দিয়েছি
    “। [সূরা ‘আনকাবুত: ৩৫]

    وَتَرَكْنَا فِيهَا آيَةً لِلَّذِينَ يَخَافُونَ الْعَذَابَ الْأَلِيمَ
    “আর যারা যন্ত্রনাদায়ক শাস্তিকে ভয় করে তাদের জন্য সেখানে আমরা নিদর্শন ছেড়ে এসেছি
    “। [যারিয়াত: ৩৭]

    – এই আয়াতটি মৃত সাগরের ব্যাপারে ইংগিত হতে পারে।

    আল্লাহ আমাদের একবিংশ শতাব্দির নব্য কওমে লুত হতে আশ্রয় দান করুন, শক্তি দিয়ে সাহায্য করুন। আমীন।

  • জাতীয় বাজেট, পুঁজিবাদের ভয়াল ছোবল

    জাতীয় বাজেট, পুঁজিবাদের ভয়াল ছোবল

    খবর: জাতীয় সংসদে আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট প্রস্তাব দিলেন, আকারে তা বিশাল, ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এই বাজেট হচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা, যা ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে জিডিপি যতটা বেড়েছে, বাজেট সেই তুলনায় বাড়েনি, বরং কমেছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদায়ী অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ।ব্যয় করতে না পারায় অর্থমন্ত্রী চলতি অর্থবছরের বাজেটে বড় ধরনের সংশোধন করেছেন। এতে বাজেট হচ্ছে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার, যা জিডিপির ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। সংশোধন করায় আগের বাজেটের তুলনায় নতুন বাজেট খানিকটা মোটাতাজা দেখালেও তা বাস্তবায়ন না করতে পারার সুফল। কেননা, মূল বাজেটের তুলনায় প্রায় সবগুলো সূচকই নিম্নগামী। যেমন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির আকার ছিল জিডিপির ৬ শতাংশ, হয়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আবার রাজস্ব আয়ের পরিকল্পনা ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। আর নতুন বাজেট প্রস্তাব হচ্ছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১২ দশমিক ১ শতাংশ। অর্থমন্ত্রীর সমস্যা বাজেট পরিকল্পনায় নয়, বাজেট বাস্তবায়নে। আপনারা যাঁরা নিয়মিত কর দেন, তাঁদের ওপর বোঝা বাড়তে পারে। কারণ, রাজস্ব আয়ের যে পরিকল্পনা অর্থমন্ত্রী নিয়েছেন, তা আগের তুলনায় ৩০ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘সত্যিই উচ্চাভিলাষী।’ (প্রথম আলো ০৫-০৬-২০১৫)

    সমস্যা:

    – ইনকাম ট্যাক্স এর মত একটি হারাম জিনিস মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন:

    (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ صَاحِبُ مَكْسٍ)

    কর সংগ্রহকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না” [মুসনাদ আহমাদ]

    – পুঁজিবাদী বাজেটে রাজস্বের অন্যতম খাত হল ‘আয় কর’ (ইনকাম ট্যাক্স)। এবার প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত করের বোঝার ভার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের বহন করতে হবে।

    – ২৪ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ।

    – ৫৬ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ

    – যদি কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক ঋণ না পাওয়া যায় তাহলে ভরসা ব্যাংক ব্যবস্থার ঋণ। এতে মূল্যস্ফীতির আশঙ্কাও প্রবল। আর বেসরকারি খাত তো বঞ্চিত হবেই।

    – পুঁজিবাদী আদর্শ সমস্ত কিছু চিন্তা করে লাভের ভিত্তিতে এবং কিভাবে গুটি কয়েক পুঁজিপতিদের বাঁচিয়ে রাখা যায় তার ভিত্তিতে সুতরাং এই লাভ করতে গিয়ে আর পুঁজিপতিদের বাঁচাতে গিয়ে যদি দেশের সাধারন জনগন নির্যাতনের যাঁতাকলে পৃষ্টও হয় তবুও তাদের কিছুই যায় আসে না।

    বাজেট হচ্ছে একটি দেশের বাৎসরিক আয়ব্যয়ের হিসাব নিকাশ। আর এই হিসাব নিকাশে সাধারণ মানুষের জন্য কোন সুখবর নেই। ফলে বাড়তি করের বোঝা নিয়ে এই বাজেট কতটা স্বস্তি দেবে, সেটাই এখন প্রশ্ন। দুই বছর আগে অর্থমন্ত্রী যাকে ‘অশোভনীয় আশাবাদ’ বলেছিলেন, তাকে এবার সংশোধন করে বলেছেন, ‘অশোধনীয় আশাবাদ।’ এই বাজেট কতটা পূরণ করবে তা?

    সমাধান:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:

    তিনিই সেই সত্তা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমিনে রয়েছে সেই সমস্ত”। (সূরা বাকারা: ২৯)

    ইসলামি অর্থ ব্যাবস্থা ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পুরনে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়। ইসলামি অর্থনীতি মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে খিলাফত রাষ্ট্রের সকল নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পুরনে খলিফাকে বাধ্য করে। রাসূল(সা) বলেন

    বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষার জন্য একটুকরো কাপড়, আর খাওয়ার জন্য একটুকরো রুটি ও একটু পানি, এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারেনা” (তিরমিজী)

    সুতরাং, চাহিদা নয়, ইসলামের অর্থনীতি জিনিসপত্রের সরবরাহকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সম্পদের সুষ্ঠ বন্টন কে ইসলাম মূল সমস্যা হিসাবে দেখে। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    যেন সম্পদ তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়
    (হাশর: ৭)

    ইসলাম সমস্ত কিছু চিন্তা করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার আদেশ অনুযায়ী হালাল এবং হারামের ভিত্তিতে। এতে না ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধনী ব্যাক্তি না সাধারন জনগণ, সমাজে একটি চমৎকার সমতা বিরাজ করে যা আমারা ১৩০০ বছর খিলাফত শাসন ব্যবস্থায় দেখতে পেয়েছি।

    ইসলাম, খিলাফত সরকারকে কোনো ভিত্তি ছাড়াই ইচ্ছামত টাকা ছাপানোর অনুমতি দেয়না। ফলে সরকারের হাতে মুদ্রা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ তথা ইচ্ছা মত সংকোচন ও সম্পসারনের নীতির কোন হাতিয়ার নেই। ইসলাম টাকা ছাপানোর সুনির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম প্রদান করেছে আর তা হল স্বর্ণ ও রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থা। স্বর্ণ ও রৌপ্যভিত্তিক মুদ্রা ব্যবস্থায় সরকার ইচ্ছা মত মুদ্রা সরবরাহ করতে পারেনা তাই মৌলিক ভাবেই এই মুদ্রা ব্যবস্থা স্থিতিশীল। আর স্বর্ণ ও রুপার উভয়ের নিজস্ব মূল্য রয়েছে যা বর্তমানে প্রচলিত মুদ্রার নেই। সুতরাং মুদ্রাস্ফীতি হয়ার কোন ভয় নেই।

    এছাড়া, অসৎ ব্যবসা বা ব্যবসায়ী, সিন্ডিকেট, ভেজাল ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন করার জন্য খিলাফত রাষ্ট্রের বিচারক কাজী উল মুহতাসিব সবসময় বাজার পরিদর্শন করবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবেন।

    সুতরাং, এই মুহূর্তে জাতির জন্য বাধ্যতাতামুলক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে মানব রচিত পুঁজিবাদী আদর্শকে আস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র ব্যাবস্তা এবং তার অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন:

    আল্লাহ কোন জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের মধ্যে যা আছে তা পরিবর্তন করে
    (সূরা রা’দ: ১১)

    মোহাম্মদ সালাহ্‌উদ্দীন

  • রমজান মাস – মুনাফা নাকি তাকওয়া অর্জনের মাস?

    রমজান মাস – মুনাফা নাকি তাকওয়া অর্জনের মাস?

    রমজান মাস তাই বিভিন্ন মহলে সাড়া পড়ে গেছে,

    ১. কাপড় ব্যবসায়ীরা নতুন মডেলের কাপড় সংগ্রহে ব্যস্ত। সাড়া বছর এই একটি মাসের জন্য তারা অপেক্ষা করে। পুরাতন কাপড় সরিয়ে নতুন কাপড়ে শোরুম সাজাচ্ছে ক্রেতা আকৃষ্টে চলছে বিভিন্ন কৌশল। দাম ও পাওয়া যায় অন্য মাস থেকে দ্বিগুন বা তিনগুন।

    ২. নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস এর ব্যবসায়ীরা যেমন: ছোলা, চিনি, খেজুর, বিভিন্ন ডাল, তেল ইত্যাদি মজুদ করা হয়েছে যাতে রমজানে চওড়া দামে বিক্রি করা যায়। দাম বাড়ছে ২-২০ টাকা বেশি। যেন এ মাস না হলে আর কখন?

    ৩. সবজির বাজার তো ২০ থেকে ৩০ টাকার স্থলে ৬০ থেকে ৭০ টাকা করতে হবে, তা না হলে পোষাবে না।

    ৪. বিভিন্ন আফিসে কর্মচারীরা, থানায় পুলিশ, রাস্তায় ট্রাফিকরা কেউ বাদ নেই। এ মাস যেন সোনার হরিণ টাকা আয়ের, এ মাস না হলে পুরো বছরটাই বৃথা।

    এ যেন এক অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের মৌসুম। কিন্তু প্রশ্ন হল এটা কি অর্থ উপার্জনের মাস না অন্য কিছু ? ? ?

    আসুন দেখি এই রোজার ইবাদতের হুকুমদাতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে কী বলেছেন,

    হে মুমিনগণ ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হল যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার। (সূরা বাকারা- ১৮৩)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা আমাদের উপর রোজা ফরজ করেছেন যেন আমারা আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জন করতে পারি। এই শিক্ষা নিয়ে বাকী সারা বছর যেন মহান আল্লাহর হুকুম মত নিজের ও সমাজের জীবন সাজাতে পারি। এই জন্য রোজা ও রমযান মাস, বৈষয়িক মুনাফা অর্জনের জন্য নয়।

    বর্তমানে রমজান মাসে মুসলমানদের জীবনে দু-মুখো নীতির কারণ হল:

    ১. বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হয়ে গিয়েছে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বস্তুগত লাভ-ক্ষতি। যা নগদে পাই তাই লাভ আর না অর্জন করতে পারলে ক্ষতি।

    ২. যেহেতু পুঁজিপতিদের সম্মানে এই সমাজব্যবস্থা তাই তারা যে কোন উপায়ে পুঁজি বৃদ্ধিতে ব্যস্ত। আর সরকারের একটি বড় অংশ যেহেতু ব্যবসার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আর বাকিরা যেহেতু তাদের দ্বারা কোন না কোনভাবে উপকৃত তাই তাদের টিকে থাকতে হলে পুঁজি বৃদ্ধি বা তাদের স্বার্থ রক্ষা করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।

    সমাধান:

    – জনগণের মুষ্টিমেয় অংশের স্বার্থ রক্ষাকারী গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অপসারণ করে সর্বসাধারণের স্বার্থ রক্ষাকারী মহান আল্লাহ্‌ প্রদত্ত ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা তথা খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যার মাধ্যমে মানুষের জীবনের লক্ষ্য হবে আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি। আর মানুষের কর্মের ভিত্তি হবে হারাম ও হালালের ভিত্তিতে আল্লাহ্র হুকুম পালন। যা মানুষের মাঝে ইসলামি মানসিকতা তৈরি করবে ও ফলশ্রতিতে তাকওয়া অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে। সমাজে তৈরি হবে ঈমানের পরিবেশ।

    – খিলাফত ব্যবস্থা মজুদদারি বন্ধ করে বাজারে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে যা দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখবে যা অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যকে নির্মূল করে দিবে। খিলাফত রাষ্ট্রের কাজী উল মুহতাসিব যা সবসময় মনিটর করবে।

    – খিলাফত ব্যবস্থার মানদণ্ড যেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি তাই খলীফা পণ্যে ভেজাল রোধ ও রমজানকে কেন্দ্র করে অত্যধিক মুনাফা অর্জনের অসুস্থ প্রবনতায় বাধা দিবে ও জনগণকে রমজানের প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্থাৎ তাকওয়ার পরিবেশ তৈরিতে গণমাধ্যমে ও জনসমাগম স্থলে ও ঘরে ঘরে সচেতনতা তৈরি করবে।

    – খিলাফতই পারে একমাত্র এই দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবস্থা সমূলে ধ্বংস করে সকল প্রকার অনাচার মুক্ত করে একটি নিরাপদ জীবন উপহার দিতে।

    তাই রমজানের প্রকৃত কারণ উপলব্ধি করে আমরা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা পরিবর্তন করে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনি যা রমজানের প্রকৃত শিক্ষা আমাদের শিখিয়ে সেই কাঙ্খিত তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করবে। রমজান ব্যবসায়ের মাস নয়, তাকওয়ার মাস হিসেবে আবার সমাজে ফিরে আসবে। আল্লাহ্‌ আমাদের খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কর্মী হিসেবে কবুল করুন। আমীন।