Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ৬ষ্ঠ অধ্যায়: আহকাম (হুকুম) বুঝবার জন্য ইসলামের পদ্ধতি

    দ্বীন প্রতিষ্ঠার সাথে সম্পর্কিত সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ সংক্রান্ত দায়িত্ব বহন শরী’আহ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় জ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। এটি একারণে যে, আমরা ইতোমধ্যে আলোচনা করেছি জ্ঞান ছাড়া কোন কাজের মূল্য নেই এবং জ্ঞান ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি আন্তরিক সদিচ্ছা ছাড়া কোন ইবাদতের মূল্য নেই।

    সুতরাং দলের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া জ্ঞানের সীমা কতটুকু? কোন বিকাশ প্রক্রিয়ার (culturing process) মাধ্যমে দলটি গঠিত হবে এবং কিসের ভিত্তিতে এর শাবাবগন ও উম্মাহ তৈরি হবে?

    উপযুক্ত শরীয়া জ্ঞানের ভিত্তিতে সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ সংঘটিত হয়, যা দলটিকে গ্রহণ করতে হবে। যদি দলটি এমন কিছু গ্রহণ করে যা শরী’আর সাথে সাংঘর্ষিক, তাহরে সে ব্যাপারে সদুপদেশ দিতে হবে। যদি বিচ্যুত হয় তাহলে সংশোধন করতে হবে। যে শরীয় বাধ্যবাধকতা দলটির জন্য বাধ্যতামূলক তা অন্যদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মূল বিষয় হল গ্রহণ ও অনুসরণ, বিচ্যুতির কোন সুযোগ নেই। উপদেশ প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রত্যেকের জন্য আসা উচিত। 

    এ পর্যায়ে এটা বলে রাখতে হবে যে, যে কোন শরীয় হুকুম বের করবার জন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, এটা হতে পারে দাওয়াত, ইবাদত (উপাসনা), মু’আমালাত (লেনদেন), উকুবাত (শাস্তি), মাত’উমাত (খাদ্যদ্রব্য), মালবুসাত (পরিচ্ছদ) অথবা আখলাক (নৈতিকতা)…..

    মুসলিমদের প্রজ্ঞা বা বুদ্ধিদীপ্ততার জন্য নয়, বরং ইসলাম এবং এর প্রকৃতির দ্বারা এই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিটি নির্দেশিত হয়েছে। এটা এ কারণে যে, ইসলামী আক্বীদার নির্দেশ হচ্ছে, একজন মুসলিম শরীয়ার বাইরে থেকে একটিমাত্র হুকুমও গ্রহণ করবে না। কিতাবের (shariah text) সিন্ধান্তঅনুযায়ী যে সীমারেখা টানা আছে তাকে অবশ্যই সে সীমারেখার মধ্যে অবস্থান করতে হবে। সুতরাং ইসলামের এমন পদ্ধতি থাকা দরকার যা এই নির্দেশনাকে সুরক্ষা দিবে, উপলদ্ধিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রন করবে যাতে যা নাজিল হয়েছে তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যাতে এর আক্বীদার দৃষ্টিভঙ্গি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় এবং এর শর্তসমূহ হচ্ছে সমন্বিত। 

    ইজতিহাদের এই সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তা দলের বিকাশের (culturing process) সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা উচিত। এই পদ্ধতি আইন অবরোহনের ক্ষেত্রে নির্দেশনা প্রদান করে। যদি অবরোহণের পদ্ধতি সঠিক হয় তাহলে এমন শরীয়া হুকুম পাওয়া যাবে যেখানে সবচেয়ে কম সন্দেহ থাকবে এবং একজন এর জন্য পুরষ্কৃত হবে। অন্যথায় সঠিক শরীয়া পদ্ধতির ভিত্তিতে গড়ে না উঠা মতামত শরীয়া মতামত বিবেচিত হতে পারে না, যদিও বা কেউ ভুলভাবে একে শরীয়া মতামত বলে আখ্যা দিতে পারে। এর কারণ হলো, বিবেচ্য বিষয় নাম নয়, বরং বাস্তবতা। সুতরাং এটা বাধ্যতামূলক। 

    অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে আজকে এ পদ্ধতির অনুসরণ করা বড়ই প্রয়োজন। এটা মুসলিমদের পশ্চিমা চিন্তাধারা ও এর পদ্ধতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়া থেকে বিরত রাখবে। এটা এ সময়ের একটি ব্যধি যা দ্বারা অনেকে আক্রান্ত হয়েছে। আর এদের একটি অংশ হল উলেমাগণ। এ কারণে তাদের ইজতিহাদ ও ফতওয়া মূল নিয়ন্ত্রক  (dawaabit (regulators)) থেকে অনেক দূরে, যেখানে তারা ঐশী নির্দেশনার দাসত্ব না করে পশ্চিমা খেয়ালখুশীর দাসত্ব করে।

    সুতরাং শরীয়ার দৃষ্টিতে ইজতিহাদের একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে এবং এর উপর মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে যদিও তাদের ইজতিহাদ ভিন্ন হতে পারে। এখানে আমরা বিষয়টি সার্বজনীনভাবে উপস্থাপন করব। এটা সালাফ বা পূর্ববতীর্দের পদ্ধতি ছিল, একই ধারায় ক্বিয়ামতের আগ পর্যন্ত খালাফ বা পরবতীর্দেরও এবং তার পরবতীর্দেরও পদ্ধতি হিসেবে থাকবে।

  • শাসকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ কি পরিবর্তনের সঠিক পদ্ধতি যা অনুসরণে আমরা কি বাধ্য?

    তারা দলিল হিসেবে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন না করলে ’অসৎ শাসক’দের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) এর অস্ত্রধারণ করবার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন।

    এ অবস্থার প্রতিক্রিয়ায় বলতে চাই যে, অমত পোষণ করলেনও এ ধরনের চিন্তা যারা পোষণ করে তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এটুকু বলব যে, আলোচ্য হুকুমের মানাত (যে বাস্তবতার জন্য হুকুমটি এসেছে) বুঝতে পারলে হাদীসটি হৃদয়ঙ্গম করাও সহজতর হবে। এ হাদীসটি মূলত দার ঊল ইসলামের ইমাম এর বিষয়ে যাকে আইনগতভাবে শরঈ বায়া’আত দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ মুসলিমদের বায়া’আতের মাধ্যমে তিনি একজন ইমাম হয়েছেন। আর এই ইমাম যে ভূমিকে শাসন করেন তাকে দার ঊল ইসলাম বলা হয়। অর্থাৎ এ ভূমি ইসলাম দ্বারা শাসিত হয় এবং এর নিরাপত্তা কেবলমাত্র মুসলিমদের হাতেই ন্যস্ত। মুসলিমগণ তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য। যদি সে শাসক আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করবার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করেন এবং প্রকাশ্যে কুফর আইন দিয়ে জনগনকে পরিচালনা করতে থাকেন এমনকি যদি সেটি একটিও হুকুম হয় যে ব্যাপারে সুবহাত দলিলও বা শারী’য় দলিলের সাথে সাদৃশ্য খুজে পাওয়া না যায় তখন প্রয়োজনে মুসলিমদের অস্ত্র ধারণ করে তাকে উৎখাত করতে হবে। নিম্নে বর্ণিত এ হাদীসটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। এটি বর্ণণা করেছেন আউফ বিন মালিক আল আসযা’য়ী, যিনি বলেন, 

    ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি, ‘শাসকদের মধ্যে তারাই সর্বশ্রেষ্ঠ যাদের তোমরা ভালবাস ও যারা তোমাদের ভালবাসে; যাদের জন্য তোমরা প্রার্থনা কর ও যারা তোমাদের জন্য প্রার্থনা করে এবং সবচেয়ে মন্দ শাসক হল তারাই যাদের তোমরা অভিশাপ দাও ও যারা তোমাদের অভিশাপ দেয়।’ তারা বললো, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কি তরবারীর বলে তাদেরকে অপসারন করব না?’ তিনি বললেন ‘না। যতক্ষন পর্যন্ত তারা তোমাদের মাঝে সালাত কায়েম রাখবে।”
    (মুসলিম)

    এখানে সালাত কায়েম করা বলতে পুরো শারীয়া বাস্তবায়নকেই বুঝায় ‘বাব তাসমিয়াতুল কুল বি ইসমিল জু’ঝা’ (একটি অংশ বুঝানোর মাধ্যমে পুরো জিনিসটিকে বুঝানো)।

    দার উল কুফরের শাসকদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। সে শাসক মুসলিমদের ইমাম নয়। কারণ সে শরীয়া পদ্ধতি অনুসারে শাসক হিসেবে আসীন হয়নি। বাধ্যবাধকতা হওয়া সত্তেও সে কখনোই ইসলামী আইন তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করবার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি প্রদান করেনি।

    যখন আমরা বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি এখন পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় অস্ত্র ধারণ করা যথেষ্ট নয়। এটা এখন কেবল শাসকদের পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ইসলাম দ্বারা শাসন করার বিষয়। সুতরাং কে এই দায়িত্ব পালন করবে? এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ ব্যক্তি ও একটি ইসলামী রাজনৈতিক মাধ্যম। ইসলাম দিয়ে শাসন করবার বিষয়টি এত সহজ নয় যে, এ দায়িত্ব কোন সেনাপ্রধান বহন করতে পারবেন, তিনি সামরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত দক্ষ হলেও ও ইসলামের দিক দিয়ে আন্তরিক হলেও। এর জন্য দরকার অভিজ্ঞতা, উপলদ্ধি, উদ্বুদ্ধকরণ এবং স্বাতন্ত্রমন্ডিত শরীয়ার জ্ঞান।     

    কেবল রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতি নীচের সব কিছু নিশ্চিত করে:   

    •  ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের আগে আসাধারণ মুসলিম রাজনীতিবিদ ও নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, যাদের রয়েছে দীর্ঘদিনের দাওয়াতের অভিজ্ঞতা। যিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে অপরাজেয় থাকবার জন্য কূটকৌশল ও সূক্ষ্ণ চিন্তার অধিকারী হয়ে উঠেন। তখন তিনি রাষ্ট্রটিকে রক্ষা করবার সক্ষমতা অর্জন করতে পারবেন ও বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে পথপ্রদর্শক ও পথপ্রদর্শিত, নব্যুয়তের আদলে খোলাফায়ে রাশেদীন হিসেবে পরিগণিত করতে পারবেন। 
    • এ পদ্ধতি আন্তরিক শাবাব তৈরি করে যারা রাষ্ট্র কায়েমের আগে দাওয়াতের বোঝা বহন করবে। দাওয়াতের ব্যাপারে ওয়াকিবহাল অন্যান্য মুসলিমদের সাথে নিয়ে এই ইসলামী রাজনৈতিক মাধ্যম (Islamic political medium) থেকে এমন লোক তৈরি করবে যাদের মধ্য থেকে ওয়ালী (গভর্ণর), আমীরুল জিহাদ, প্রতিনিধি এবং অন্য রাষ্ট্রে ইসলাম নিয়ে যাবে এমন দাওয়াত বহনকারী হবেন।
    • এটা এমন জনপ্রিয় ভিত্তি তৈরি করবে যারা ইসলাম ও রাষ্ট্রকে গ্রহণ (embrace) করবে এবং রক্ষা করবে। 
    • এটা সুপ্রশিক্ষিত ক্ষমতাধর লোক তৈরি করবে। সাধারণ জনগন বিরুদ্ধাচরণ না করে তাদের সাথে থেকে শক্তি বৃদ্ধি করবে। কেননা তারা (জনগন) বুঝতে পারবে শাসক, শাসনযন্ত্র এবং যে ক্ষমতার উপর তারা (শাসক) নির্ভর করে তা তাদের (জনগন) জন্য একটি শক্তি এবং এ এমন এক দায়িত্ব যা ইসলাম প্রয়োগ ও দ্বীনকে বুলন্দ করবার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশ।   

    তাছাড়া সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য দরকার টাকা, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ। এটা আন্দোলনের জন্য অতিরিক্ত বোঝা হয়ে যাবে যা অন্যদের উপর নির্ভরশীল হতে প্ররোচিত করবে। এটাই ব্যর্থতার প্রথম সোপান। মুসলিমগন এ পথে প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং নিজেদের অনেক ক্ষতিসাধন করেছে। এটা আর উল্লেখের প্রয়োজন নেই যে,  ’চেষ্টা করে দেখা যাক’ (try out) একটি ভ্রমাত্বক অভিব্যক্তি।

    যখন আমরা বলি অস্ত্রধারণ করা শরীয় পদ্ধতি নয়, তখন মোটেও সেইসব শাসকদের ছাড় দেয়া হয় না যারা মুসলিমদের তোয়াক্কা করে না। বরং আমরা দ্বীনের ভেতর কিছু আন্তরিক ভাইদের তাদের বর্তমান কাজকে পরিত্যাগ করতে বলি যাতে তাদের প্রচেষ্টাকে শরীয়া কাজে একীভূত করতে পারি। আমরা তাদের মক্কীযুগে কিছু সাহাবীর অস্ত্র ধারণ করা বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) এর নিষেধাজ্ঞা মনে করিয়ে দিতে চাই, যখন তিনি (সা) বলেছিলেন,

    ‘আমি ক্ষমা করবার জন্য আদিষ্ট হয়েছি, সুতরাং যুদ্ধ করো না।’
    (সীরাত ইবনে হিসাম)

    এছাড়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে নাজিল করেন যে,

    ‘তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ, নামায কায়েম কর এবং যাকাত দিতে থাক?  অতঃপর যখন তাদের প্রতি জেহাদের নির্দেশ দেয়া হল,…..।’
    (সূরা নিসা: ৭৭)

    একইভাবে আমরা আরও শক্তিশালী শরীয় দলিল দেখাতে পারব যার মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে বলা সম্ভব যে, দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এর সাথে কোন কিছু যুক্ত করা, বাদ দেয়া, পরিবর্তন করা, সংশোধন দাওয়াত, দল ও ইসলামি উম্মাহের উপর কুপ্রভাব ফেলবে। নবী (সা) এর সুন্নাহকে পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের জন্য এ কারণে শরী’আর সঠিক অধ্যয়ন ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতির আনুগত্য করার উপর আমরা গুরুত্ব আরোপ করতে চাই। এটা কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য যিনি আমাদের সঠিক পথ দেখান।

  • কারও কারও মতে রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাতের যথার্থতা যাচাই করা হয়নি

    এর অর্থ হল, যে বিষয়ের দলিল প্রমাণিত নয় সেটি মানতে আমরা বাধ্য নই। ফলে আমরা সে অনুযায়ী কাজও করতে পারি না। তারা মনে করে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য মক্কী জীবনে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাজকে অনুসরণ না করবার ব্যাপারে তাদের মতামতের পক্ষে এটি একটি দলিল।

    এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিক্রিয়ায় আমরা বলতে পারি, সীরাত হল বর্ণণা ও ঘটনার সংগ্রহ যে ব্যাপারে নিরীক্ষা ও দালিলিক প্রমাণ অত্যাবশ্যকীয়। যেহেতু এটা রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেহেতু তা ওহীর অংশ। সুতরাং মুসলিমদের মুস্তফা (সা) এর সীরাতের ব্যাপারে এমনভাবে সচেতন থাকতে হবে যেভাবে তারা কোরআন ও হাদীসের ব্যাপারে সচেতন থাকে। সীরাতে মক্কী জীবনের কাজ বলতে রাসূলুল্লাহ (সা) সেখানে অবস্থানকালে যা করেছিলেন তাকেই বুঝায় যখন তিনি মদীনাতে দার-উল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করেছিলেন। যাদের সীরাতের যথার্থতা নিয়ে কাজ করবার সক্ষমতা আছে, যদি তারা তা না করে অথবা অন্যদের এ ব্যাপারে উৎসাহ না দেয় তাহলে তারা গোনাহগার হবে।

    এটা খুবই অদ্ভুত যে, যারা এরকম দাবী করে তারা সবাই হাদীস গবেষক ও নিরীক্ষক। এমনভাবে এ দৃষ্টিভঙ্গিকে উপস্থাপন করে যেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ থেকে তারা দায়মুক্ত। অবস্থা এমন যেন, তারা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী উপসংহারে উপনীত হয়েছে।

    এ মুসলিমগন কি ভুলে গেছে যে, অন্যান্য মুসলিমদের মতই তারা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে দায়িত্বশীল? এটা তাদেরকে সীরাত অধ্যয়ন ও নিরীক্ষণকে বাধ্যতামূলক করেছে। যদি বাস্তবতা তাদের আংশিক শরীয়া বিষয়গুলোর ব্যাপারে হাদীস পরীক্ষা করতে প্রচেষ্টা চালাতে উদ্ধুদ্ধ করে, (এর জন্য তারা ধন্যবাদ পাবে, এ বিষয়ে তারা জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে এবং এ পথে অনেক সময় ব্যয় করেছে), তাহলে দ্বীন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনুধাবন করার পর তারা কী পরিমাণ গবেষণা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে বাধ্য?

    যদি সীরাতের কোন বর্ণণার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ না থাকে তাহলে এমন কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাবে না যে, বিশেষ কোন সীরাত গ্রন্থের সব বর্ণণা গ্রহণ করা যাবে না।

    ইতিহাসের যে শাখায় সীরাত লেখকগন কাজ করেছেন সেখানে মুহাদ্দীসীনদের পদ্ধতির মত সাবধানতা অবলম্বন করেননি। এমনকি বর্ণণাকারী বা সংগ্রাহকের বিশ্বস্ততা, বর্ণিত বিষয়ের যথার্থতা, বাহুল্যতা এবং সঞ্চারণে বীতস্পৃহা সম্পর্কে সাবধানতা অবলম্বন করা হয়নি। এটা হাদীস বিশারদ ও সীরাতের যাচাইমূলক কাজের সাথে জড়িত যারা তাদের আত্নপ্রসাদপূর্ন করে তুলে।

    আসল ব্যাপারটি হল, মুহাদ্দিসগন ও হাদীস বিশেষজ্ঞগন নিজেরা যে তথ্যনুসন্ধান এবং সঞ্চারন (transmit) করেন তা-ই হাদীস বিজ্ঞানের (science of hadith) জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়। সীরাত বিজ্ঞান একটি দিক থেকে এ জিনিসটি (বর্ণণার বিশুদ্ধতা) দাবী করে, আর সেটা হলো রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবী (রা) এর জীবনের সাথে সম্পৃক্ত বিবরণ। অপরদিকে, যে বিষয়টি রাসূল(স:) এবং তাঁর সাহাবা (রা:)-গণের সাথে সম্পৃক্ত নয় সে বিষয়ে নমনীয়তা এ সম্পর্কিত জ্ঞান কে ক্ষুন্ন করে না।

    ঘটনাপ্রবাহ অনেক বেশী এবং অনেক সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। সেকারণে সীরাত লেখক ও ঐতিহাসিকগন মুহাদ্দিসীগণের পদ্ধতির উপর নির্ভর করলে এত ঘটনাকে বেষ্টন করতে পারবে না। সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যে ব্যাপারে মুসলিমদের সচেতন থাকা উচিত। কারণ এতে রয়েছে তাঁর উক্তি, কাজ, সম্মতি ও বৈশিষ্ট্য। এসবই কোরআনের মত আইনের অংশ। নবীর সীরাত আইনের একটি উপাদান বিধায় হাদীসের অংশ। নবী (সা) এর পক্ষ থেকে যা দালিলিক প্রমাণসহ পাওয়া যায় তাই শরীয় হুকুম। কারণ এটি সুন্নাহ থেকে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা) কে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    ‘তাদের জন্যে রসূলুল্লাহ্র মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।’
    (সূরা আল আহযাব: ২১)

    সুতরাং সীরাতের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করা ও গুরুত্ব প্রদান করা শরীয়া বিষয়।

    পূর্বে সীরাত সরবরাহের পদ্ধতি হিসেবে কেবলমাত্র বর্ণণার উপর নির্ভর করা হত। ঐতিহাসিকগন মৌখিভাবে তা সঞ্চালিত করা শুরু করলেন। যে প্রথম প্রজন্ম রাসূলুল্লাহ (সা) কে প্রত্যক্ষ করেছে ও তার ব্যাপারে শুনেছে তারা অন্যদের কাছে এ ব্যাপারে তথ্য সঞ্চালিত করেছে। পরের প্রজন্মের কেউ কেউ এগুলো মিশ্রভাবে লিখে সংরক্ষণ করেছিল যেগুলো আমরা এখন হাদীস গ্রন্থ হিসেবে পাই। দ্বিতীয় শতাব্দীতে আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ সীরাত বিষয়ক কিছু বর্ণণা সংকলন করে একীভূত করেন। সংকলনের সময় তারা হাদীসের মত সঞ্চালক এবং এসব সঞ্চালকগণ যাদের থেকে সংগ্রহ করেছেন তাদের নামও উল্লেখ করেন। সেকারণে হাদীসবেত্তা ও ইসনাদ (বর্ণণাকারীদের ধারাবাহিকতা) নিরীক্ষকগণ গ্রহণযোগ্য ও প্রামাণিক সীরাত বর্ণণা থেকে বর্ণণাকারী ও বর্ণণাকারীদের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে দূর্বল ও প্রত্যাখানযোগ্য অংশগুলো খুজে বের করেন। প্রামাণিক সীরাত থেকে এভাবে বর্ণণার সময় নির্ভর করা হয়। নতুন কোন বিষয়ের অবতারণা করা প্রধান ইস্যু নয়, বরং রাসূলুল্লাহ (সা) এর কথা ও কাজের বর্ণণার নিভূর্লতা ও সঠিকতা নিরূপণ করা অতি প্রয়োজনীয়। তবে কিছু সচেতন মানুষ সীরাত পরীক্ষা করে দেখেছে। সুতরাং যে দল বা সংগঠনটি রাসূলুল্লাহ (সা) এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের অবশ্যই প্রামাণ্য দলিল নির্ভর সীরাত পরখ করে দেখতে হবে।

    তাছাড়া, সীরাতের বইগুলোতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অমত সত্তেও হাদীসের গ্রন্থ ও কুরআনের মত দাওয়াতের বিভিন্ন পর্যায় ও কর্মকান্ডের বর্ণণায় অভিন্নতা রয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কুরআন দাওয়াতের অনেক বিষয় বিস্তারিতভাবে আমাদের সামনে এমভাবে তুলে ধরেছে যে, এ বিষয়ে একটি সঠিক চিত্র পাওয়া যায়। কুরআন প্রয়োজনীয় অনেক কিছু সুস্পষ্ট ও সঠিকভাবে উপস্থাপন করেছে।

    উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ (সা) মিথ্যা বিশ্বাস, মূর্তিপূজা, নাস্তিক্যবাদ, ইহুদীবাদ, জাদুবিদ্যা, গোত্রবাদকে আক্রমণ করেছিলেন। কন্যা সন্তান জীবন্ত পুতে ফেলা, ঊসীলা হিসেবে মাদী উট চারণভূমিতে ছেড়ে দেওয়া, কোন প্রানীর জমজ বাচ্চা হলে মুর্তির উদ্দেশ্যে কোরবানী দেওয়া, শরনিক্ষেপ করা ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি (সা) তাদের ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে আক্রমণ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাদের নাম উল্লেখ করে বর্ণণা দেন ও দাওয়াতের ব্যাপারে তাদের ষড়যন্ত্র উন্মোচন করেন। দলটিকে অবশ্যই এগুলো গ্রহণ করতে হবে। গ্রহণের সময় কাজের মৌলিকতা এবং এর সাধারণ অর্থের দিকে খেয়াল খেয়াল করতে হবে, বিস্তারিতভাবে উপকরণ বা ধরণ নয়। সেকারণে দলটি ভুল চিন্তা, অসঠিক ধারণা ও ইসলাম বিরোধী ঐতিহ্য ও রীতিনীতির বিরুদ্ধাচরণ করবে। এটা শাসকদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, তাদের মুখোশ ও ষড়যন্ত্র উন্মোচন করবে, ইসলামের চিন্তা ও হুকুমসমূহকে পরিষ্কার করে তুলে ধরবে, লোকদের এদিকে আহ্বান করবে ও তাদের জীবনে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমন্ত্রণ জানাবে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) নিরস্ত্র ও প্রতিরক্ষাহীন অবস্থায় এগুলো মোকাবেলা করেছেন এবং তখন কোন পক্ষ অবলম্বন করেননি, কারও প্রতি নতজানু হননি এবং কোন আপোষ করেননি। তিনি সব লোভনীয় প্রস্তাব ও হুমকিকে অবজ্ঞা করেছেন এবং ধৈয্যের্র সাথে তার প্রভূর পথের উপর অটল ছিলেন। কোরআন আমাদের এ ব্যাপারে অবহিত করেছে এবং এ কারণে দলটি যখন কাজ করবে তখন এ নির্দেশনা মেনে চলবে। 

    এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি আল্লাহ নাজিল করেন,

    “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়” আয়াত থেকে নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, এর আগে দাওয়াত প্রকাশ্য ছিল না, বরং তা ছিল গোপনীয় যা প্রকাশ্য দাওয়াতের পূর্বের ধাপ।

    এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘যাতে আপনি মক্কাবাসী ও পার্শ্ববর্তীদেরকে ভয় প্রদর্শন করেন।’
    (সূরা আল আনআম: ৯২)

    এ আদেশ মক্কার বাইরে দাওয়াকে বিস্তৃত করবার নির্দেশনা প্রদান করে। পবিত্র কোরআন মোহাজেরীদের হিজরত ও আনসারদের নুসরার ব্যাপারে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

    সুতরাং কুরআন হল প্রথম নির্দেশিকা। মক্কীযুগে মুসলিমদের বর্ণণার বিষয়ে অসংখ্য হাদীস রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বুখারী ‘কীভাবে নবী (সা) এবং তাঁর অনুসারীদের সাথে মক্কার মুশরিকরা আচরণ করেছিল’ শিরোনামে আলোচনা করেছেন। তিনি খাব্বাব বিন আল আরাতের (রা) হাদীস বর্ণণা করেন যখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে প্রার্থনা করবার অনুরোধ নিয়ে এসেছিলেন যাতে মুসলিমগন বিজয় লাভ করে। তিনি কুরাইশ নেতাদের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা) এর দোয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন নবী (সা) কীভাবে তায়েফের লোকদের দ্বারা নির্মম আচরনের শিকার হয়েছিলেন। আমরা হাদীসের অন্যান্য গ্রন্থেও এরকম বর্ণণা পাই। অতএব আমরা এমন কোন বিষয়ের হুকুম পালন  করছি পারি না যার পক্ষে কোন বর্ণনা নেই।

    এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সব সীরাত রচয়িতারা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য যা অন্যান্য চিন্তাবিদদের দ্বারা সমর্থিত।

    • ইবনে ইসহাক (৮৫—১৫২ হিজরী) ‘আল মাগাজী’ (সামরিক অভিযান) নামে একটি বই লিখেন। আয জুহরী তার সম্পর্কে বলেন, ‘যে ব্যাক্তি মাগাজী (সামরিক অভিযান) সম্পর্কে জানতে চায় সে যেন ইবনে ইসহাক পড়েন। শা’ফেঈ তার সম্পর্কে বলেন, ‘কেউ যদি মাগাজীর উপরে একজন বিশেষজ্ঞ হতে চান তিনি পুরোপুরি মুহম্মদ বিন ইসহাকের উপর নির্ভর করতে পারেন।’ বুখারী তাকে তার তারিখ গ্রন্থে উল্লেখ করেন।
    • ইবনে সাদ (১৬৮—২৩০ হিজরী) ও তার বই আত তাবাকাত (প্রজন্ম)। আল খতীব আল বাগদাদী তার সম্পর্কে বলেন, ‘আমাদের জন্য মুহম্মদ বিন সা’দ একজন বিশ্বাসভাজন লোক। কেননা বর্ণণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকেন বলে তার হাদীসসমূহ বিশ্বাসযোগ্য।’ ইবনে খালি­কান বলেন, ‘তিনি সৎ ও বিশ্বস্ত।’ ইবনে হাজার তার সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি ছিলেন অন্যতম একজন মহান ও নির্ভরযোগ্য হুফফাজ (যারা হাদীস মুখস্থ করেন) এবং সমালোচক।’
    • আত তাবারী (২২৪—৩১০ হিজরী) লিখিত বইয়ের নাম ‘রাসূলগণ ও রাজাদের ইতিহাস’ (তারিখ আর রুসুল ওয়াল মুলূক)—যার মাধ্যমে তিনি ইসনাদ (বর্ণণার ধারাবাহিকতা) এর পদ্ধতি বিধৃত করেন। আল খতীব আল বাগদাদী তার সম্পর্কে বলেন, ‘তিনি সুনান(হাদীস), তাদের বর্ণণার ধারবাহিকতা, জাল হাদীস থেকে সহীহ হাদীস পৃথকীকরণ, লোকদের ইতিহাস ও খবারখবরের বিষয়ে ভাল জ্ঞান রাখতেন।’ অধিকাংশ হাদীসের ক্ষেত্রে মুহাদ্দীসীনদের পদ্ধতি অনুসরণ করে তিনি তারিখ লিখেন। তিনি হাদীসের একটি বই সংকলন করেন, যার নাম ‘তাহজীবুল আতাহার ওয়া তাফসীল আস সাবিত’আন রাসূলুল্লাহি (সা) মিনাল আখবার’ (রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কিত বর্ণণার পর্যালোচনা এবং প্রামাণিক তথ্যাদির বিস্তারিত আলোচনা)। ইবনে আসাকীর এ সম্পর্কে বলেন, ‘এটি একটি অসাধারণ বই, যেখানে তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রত্যেকটি প্রামাণিক হাদীস নিয়ে লিখেছেন।’
    • একইভাবে ইবনে কাসীর এবং আয জাহাবীকে হাদীসের উপর বিশেষজ্ঞ ভাবা হয়।
  • কিছু মুসলিম মনে করে, (আনুষ্ঠানিক) ইবাদত করাটাই হলো প্রয়োজনীয় কাজ; ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা নয়

    তারা আরও বলে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি ইবাদতের দিকে আহ্বান করেছেন, কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে নয় অথবা আল্লাহর প্রতি ইবাদত হল কেন্দ্রীয় ইস্যু, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়; কিংবা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা জরুরী নয় যতটা জরুরী আল্লাহর ইবাদত করা। তাদের দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তারা এ জাতীয় আরো কিছু কথা বলে থাকে ।

    এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অবশ্যই ইবাদতের বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করব এবং দেখাব কীভাবে তা অর্জন করতে হয়।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষকে ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং মানুষকে সৃষ্টির অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হল ইবাদত করা। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ এর অর্থ হল, আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে উপাস্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। আর এ কথার ব্যতিক্রম যে কোন কিছুই মিথ্যা ও অবশ্যই পরিত্যাজ্য এবং মানুষ এ ব্যাপারে অবশ্যই সাক্ষ্য দেবে। “Muhammad Rasoolullah”, means that the worship and obedience should be according to what only Muhammad (SAW), the Rasool of Allah, has brought and man must testify to this.

    সুতরাং, ইবাদাহ বা উপাসনা হল কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য। আর এটা ততক্ষণ পর্যন্ত করা যাবে না যতক্ষণ না আল্লাহ সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিচ্ছেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) তা প্রদর্শন করেছেন। আর এ বাণীটি আমাদের জীবনে যে কোন কথা ও কাজে মনে রাখতে হবে।

    যখন একজন মুসলিম তার বাস্তবতায় নিজের কোন চাহিদা মেটাবার জন্য বা কোন মূল্যবোধের তাগিদে কোন কাজ করে তখন সে কেবলমাত্র তার চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করবার উদ্দেশ্য নিয়ে অগ্রসর হয়, এবং যা সম্পন্ন করা যায় একাধিকভাবে। 

    শরীয়াগত পদ্ধতিতে এ চাহিদা পূরণ করা এবং এ সীমার মধ্যে অবস্থান করা ও এ কাজকে আল্লাহর বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত করার নামই হল ইবাদত।

    প্রতিটি কাজের পিছনে কাজ করে ইচ্ছা ও চাহিদার সন্তুষ্টি, আর মানুষের প্রয়োজন নানাদিকের সাথে সম্পর্কযুক্ত, এটা সহজাত যে তার এ ক্রিয়াকলাপ জীবনের সবদিকই আচ্ছাদিত করে।

    সুতরাং ইবাদত হল সে কাজ যা মানুষ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশ ও নিষেধ মেনে করে থাকে এবং এটা কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি ঈমানের ভিত্তিতে হতে হবে। আর এর মাধ্যমেই ইবাদতের পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত হয় এবং এ ইবাদত মানুষের সব কাজকে বেষ্টন করে।

    কাউকে ‘আল্লাহর উপাসনা’ করতে বলার অর্থ কেবলমাত্র সালাত আদায়, যাকাত প্রদান, হজ্জ সম্পাদন বা ফকীহগন যেগুলোকে ইবাদত বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন সেগুলো করা বুঝায় না, বরং সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলার নামই হল ইবাদত।

    সুতরাং যে কোন কাজের মূল হল আল্লাহর প্রতি ঈমান। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের দিকে সব কাজকে ধাবিত করার জন্যই ইবাদত। সুতরাং পুরো দ্বীন হল ইবাদাহ এবং ইবাদাহ অর্থ হল সমর্পণ করা। আর আল্লাহর কাছে মানুষকে সমর্পণ করবার অর্থ হল তার ইবাদত করা, তার আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, তাকে সর্বজ্ঞ ও সর্বসচেতন হিসেবে মেনে নেয়া, সন্তুষ্টির সাথে সর্বান্তকরণে তার কাছে আত্মসমর্পণ করা।

    সেকারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইবাদত করা ও তাঁকে মান্য করবার অংশ হল সালাত আদায়, যাকাত প্রদান ও ক্বিয়াম বা রাত জেগে ইবাদত করবার পাশাপাশি সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করা, কুফর ও নিফাক (মুনাফেক) এর বিরুদ্ধে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে অংশগ্রহণ করা, মুসলিমদের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করা, সব লোকদের কাছে দাওয়াতের প্রসার ঘটানো এবং মুসলিমদের সুরক্ষা প্রদান করা।

    আল্লাহর প্রতি উপাসনার মধ্যে মানুষের সব কাজই অন্তর্ভুক্ত যা মানুষ তার বাস্তবতা অনুসারে পালন করে থাকে। যদি এমন হয় কোন মুসলিম সালাত আদায় করছে না, তাহলে তখন সালাতের দিকে আহ্বান করা হল ইবাদত। একইভাবে সাওম পালনের জন্য আহ্বান করা ইবাদত, শরী’আহ অনুযায়ী ক্রয় বিক্রয় করবার আহ্বান জানানোর নামও ইবাদত। আল্লাহর প্রতি ঈমানই হল সব ইবাদতের মূল। সেকারণে কাউকে যখন সালাত আদায় বা সাওম পালনের দিকে আহ্বান জানানো হয় তখন যাকে আহ্বান করা হয় তার ঈমানী চেতনাকে আগে জাগ্রত করতে হবে এবং এই ঈমানকে কাজের প্রতিশ্রুতি ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিণত করতে হবে।

    একইভাবে লোকদের ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করবার দিকে আহ্বান করাও আল্লাহর নির্দেশ এবং এগুলো আমাদের মানতে হবে। এগুলো সে-ই পালন করবে যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। সে কারণে এগুলোর দিকে আহ্বান করার আগে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের দিকে আহ্বান করতে হবে। এভাবে এ ব্যাপারে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইবাদত উপলদ্ধি হবে।

    মুসলিমরা আজকাল কুফরী ব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করে যার হুকুমসমূহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছ থেকে উৎসারিত নয় এবং এর মধ্যে থেকে তারা ইসলামী জীবনব্যবস্থা চর্চা করতে পারে না। এমতাবস্থায় দ্বীন প্রতিষ্ঠার আহ্বান অবশ্যই আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াত দেয়া বুঝায় এবং এ দিকেই মনোযোগ আকর্ষণ করা ও প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

    সুতরাং আমাদের যুগের সমস্যার সাথে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বানকে সম্পর্কযুক্ত করতে হবে। আর এটি প্রতিফলিত হয় যখন ইসলামি জীবনধারা পূণপ্রবর্তনের দিকে কেউ আহ্বান করে।  কেবলমাত্র তখনই আল্লাহর ইবাদত পূর্ণাঙ্গরূপে করা সম্ভবপর হবে। সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের দিকে আহ্বানের অর্থ হল দ্বীন প্রতিষ্ঠার দিকে আহ্বান করা যা একটি ইবাদত এবং এ দাওয়াতও একটি ইবাদতের দিকে আহ্বান। কারণ এটি আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার একটি হুকুম যার প্রতি আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আল্লাহর ইবাদতের ব্যাপারে আত্নতুষ্টি থেকে কোন মুসলিম এটাকে অবহেলা করে। সুতরাং বিভিন্ন লোক কতৃক এ বিষয়টি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা সঠিক নয়। কারণ তারা এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা আল্লাহর ইবাদতের সাথে সাংঘর্ষিক। আর এ ধরনের মন্তব্য করা বা দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা কুরআনের একটি অংশের উপর আক্রমণের নামান্তর এবং এটা করা হারাম।

  • কিছু মুসলিম বলে যে, খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার কাজের বাধ্যবাধকতা কেবলমাত্র শাসক ও তাদের পারিষদবর্গকে আহবানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত

    মালা’আ হল একটি জনগোষ্ঠীর প্রধান। তাদের হাতে জনগনের সব বিষয় থাকে এবং তারা সব সময় শাসকদের চারপাশে থাকে। যদি তাদের ক্ষেত্রে দাওয়াত সফল হয় তাহলে ইসলামের সুবিধা হবে, সমাজকে সহজেই পরিবর্তন করা সম্ভব হবে। যে বিষয়টি দাওয়াত কেবলমাত্র শাসকশ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবার উপলদ্ধি তৈরি করেছে তা হল, সাধারণ জনগনকে দাওয়াত প্রদান করবার মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজ করা শুরু করলে তা তাদের জন্য শাসক কতৃক লাঞ্চণা বয়ে নিয়ে আসবে। তারা এমন বোঝায় ভারাক্রান্ত হয়ে যাবে, যা বহনে তারা অক্ষম এবং মুসলিমদের এ অবস্থায় পর্যবসিত হওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘মুসলিমদের নিজেদের অবমানিত করা উচিত নয়।’ যখন তাঁকে (সা) জিজ্ঞেস করা হল, ‘কীভাবে একজন নিজেকে অবমানিত করে?’ তিনি (সা) বলেন, ‘নিজেকে এমন ক্লেশের মধ্যে ঠেলে দিয়ে যা বহনে সে অক্ষম।’
    (আহমেদ, তিরমিযী এবং ইবনে মাজাহ)

    কেউ যদি যে পরিবেশে সমাজ পরিবর্তনের দাওয়াতের উত্থান ঘটে সে বাস্তবতা অধ্যয়ন করে, তাহলে দেখতে পাবে যে, তা এমন একটা সময়ে হয় যখন সমাজে থাকে অবিচার, নৈতিক অবক্ষয়, ধ্বংস, দূর্দশা এবং প্রতিকূলতা। সমাজে এসবই হয়ে থাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ও তাঁর সার্বভৌমত্বের প্রতি ঈমানের অভাবের কারনে, এজন্য অতীতে নবীরা এবং আমাদের মহান রাসূল (সা) প্রথমেই দাওয়াত দিতেন ঈমান ও আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ইবাদতের প্রতি।  

    অতীতে এবং আজকেও সমাজ শাসক ও তাদের পারিষদবর্গের দ্বারা পরিচালিত হয়। তারা নিজের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য মনগড়া আইন ও মিথ্যা আক্বীদাভিত্তিক চিন্তা ধারণ করে। নিজের স্বার্থ ও সামাজিক মর্যাদার জন্য তারা এসব মিথ্যা বিশ্বাসকে রক্ষা করে। এ কারণে ইসলামের দাওয়াতের কথা প্রথমবার শুনবার পর একজন বিচক্ষণ বেদুইন নিম্নের গভীর ও সঠিক মন্তব্যটি করেছিল যে,‘অবশ্যই এটা এমন একটি বিষয় যা শাসকদের বিরাগভাজন হওয়ার কারণ।’ সমাজের লোকেরা নিজেদের সমাজের শাসক ও তাদের পারিষদগবর্গের কাছে সমর্পন করে। একটি প্রতিক্রিয়া তৈরির বদলে তারা প্রভাবিত হয়। ঘৃণা করা সত্তেও তারা তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য করে। কারণ তারা জানে শাসকদের এ অবিচারের মূলোৎপাটন করা সহজসাধ্য নয়।    

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যখন কোন নবী বা রাসূল প্রেরণ করেন তা হয় তাদের লোকদের সত্য পথ নির্দেশ করবার জন্য। যারা এ ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এবং নবী রাসূলদের বিপক্ষে অবস্থান নেয় তারা হল এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ শাসক ও তাদের পারিষদবর্গ। মালা’আ গণ শাসকদের সাহায্যকারী। তারা স্বার্থলিপ্সু, ধনী ও অমিতব্যয়ী। তারা জনগনের নেতা ও প্রধান যারা শাসকদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাহক হয়ে উঠে। শাসকগণ তাদের উপর নির্ভর করে ও সাহায্য প্রার্থনা করে। তারা এমনসব লোক যাদের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন যে, যারা আল্লাহর নবীদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তাদের মধ্যে তারা সম্মুখে থাকবে। কারণ তাদের হৃদয় টাকা ও পদমর্যাদার প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে এবং স্বার্থের সাথে তাদের পদমর্যাদা সম্পর্কিত। সেকারণে যখনই আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি দাওয়াতের কথা আসে তখনই তারা চিন্তা করে যে, এটা তাদের স্বার্থ ও পদমর্যাদার পথে অন্তরায়। তারা দাওয়াতের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং শাসকদের দাওয়াতকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও নির্মূল করতে প্ররোচিত করে। পাপ ও পঙ্কিলতার কারনে শাসক তাদের উপদেশ গ্রহণ করে। এ কারণে অবধারিতভাবে আল্লাহর নবীগণ ও মা’লার পাশে থাকা শাসকদের সাথে সংঘাত হয়েছে। আল্লাহর নবী, শাসক ও তাদের পারিষদবর্গদের মধ্যে সাধারণ লোকদের হৃদয় জয় করবার জন্য রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার প্রতিযোগিতা হত। নবীগণ সত্য দিয়ে লোকদের আহ্বান করতেন। কিন্তু তারা ছিলেন দূর্বল, অরক্ষিত। কেবলমাত্র সত্য উচ্চারণের ক্ষমতা দিয়ে মানুষের হৃদয় মন জয় করে নিয়েছিলেন। শাসক ও তাদের পারিষদবর্গ প্রথমদিকে এ আহ্বানের বিরুদ্ধে অসত্য যুক্তি উপস্থাপন করে বলত এগুলো জাদুকরী মন্ত্র, পৌরাণিক গল্প, সত্য ধারণকারীরা মিথ্যাবাদী, বিশ্বাসীরা বোকা অথবা হীন মানসিকতাসম্পন্ন। যখন এ পদ্ধতি কাজ না করত তখন নির্যাতন, বিতাড়ন, গ্রেফতার ও হত্যার পথ বেছে নেয়া হত। নবী ও তাঁর অনুসারীদের সাথে শাসক, তাদের পারিষদবর্গ ও রাজার ধর্ম অনুসারীদের মধ্যে সর্বাত্নক যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। কুরআন বারংবার এ বিষয়টিকে একটি আইন বলে উল্লেখ করেছে।

    সেকারণে আমরা দেখতে পাই যে, সাইয়্যিদিনা নুহ (আ) যখন লোকদের দাওয়াত দিচ্ছিলেন তখন সর্বপ্রথম বাধা এসেছিল এই পারিষদবর্গের কাছ থেকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘নিশ্চয় আমি নুহকে তার সম্প্রদায়ের প্রতি পাঠিয়েছি। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহ্‌র এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। আমি তোমাদের জন্যে একটি মহাদিবসের শাস্তির আশঙ্কা করি। তার সম্প্রদায়ের সর্দাররা বলল: আমরা তোমাকে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতার মাঝে দেখতে পাচ্ছি। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়, আমি কখনও ভ্রান্ত নই; কিন্তু আমি বিশ্ব প্রতিপালকের রাসূল।’
    (সূরা আ’রাফ: ৫৯-৬১)

    সাইয়্যিদিনা হুদ (আ) তার কওম আ’দকে আহ্বান করেছিলেন। লোকদের মধ্যে নেতাগন সর্বপ্রথম এ দাওয়াতকে প্রত্যাখান করেছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘আদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই হুদকে। সে বলল:  হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহ্‌র এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তার সম্প্রদায়ের সর্দাররা বলল: আমরা তোমাকে নির্বোধ দেখতে পাচ্ছি এবং আমরা তোমাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।’
    (সূরা আ’রাফ: ৬৫-৬৬)

    সাইয়্যিদিনা সালেহ (আ) তার কওম সামুদকে আহ্বান করেছিলেন। লোকদের মধ্যে নেতাগন সর্বপ্রথম এ দাওয়াতকে প্রত্যাখান করেছিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে প্রেরণ করেছি তাদের ভাই সালেহকে। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহ্‌র এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই……।’
    (সূরা আ’রাফ: ৭৩)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,

    ‘তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক সর্দাররা ঈমানদার দরিদ্রদেরকে জিজ্ঞেস করল: তোমরা কি বিশ্বাস কর যে, সালেহকে তার প্রতিপালক প্রেরণ করেছেন? তারা বলল: আমরা তো তার আনীত বিষয়ের প্রতি বিশ্বাসী। দাম্ভিকরা বলল: তোমরা যে বিশ্বাস স্থাপন করেছ, আমরা তাতে অস্বীকৃত।’
    (সূরা আ’রাফ: ৭৫-৭৬)

    একইভাবে সাইয়্যিদিনা শোয়াইব (আ) মাদাইনের লোদের যখন আহ্বান করেছিলেন তখন নেতৃস্থানীয় লোকেরা অত্যন্ত ঔদ্ধ্যতের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    ‘আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোয়ায়েবকে প্রেরণ করেছি। সে বলল: হে আমার সম্প্রদায়। তোমরা আল্লাহ্‌র এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নাই…।’
    (সূরা আ’রাফ: ৮৫)

    এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘তার সম্প্রদায়ের দাম্ভিক সর্দাররা বলল: হে শোয়ায়েব, আমরা অবশ্যই তোমাকে এবং তোমার সাথে বিশ্বাস স্থাপনকারীদেরকে শহর থেকে বের করে দেব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে।’
    (সূরা আ’রাফ: ৮৮)

    যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাইয়্যিদিনা মুসা (আ) কে ফিরাউন ও তার পারিষদবর্গের কাছে প্রেরণ করলেন, তখন তারা তাকে প্রত্যাখান করল ও মুসার সঙ্গীদের ভয় পেল এবং তাঁকে হত্যা করবার জন্য পরামর্শ দিল। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘অতঃপর আমি তাদের পরে মূসাকে পাঠিয়েছি নিদর্শনাবলি দিয়ে ফেরাউন ও তার সভাসদদের নিকট। বস্তুত ওরা তার মোকাবেলায় কুফরী করেছে। সুতরাং চেয়ে দেখ, কি পরিণতি হয়েছে অনাচারীদের।’
    (সূরা আ’রাফ: ১০৩)

    এবং আল্লাহ বলেন,

    ‘ফেরাউনের সাঙ্গ-পাঙ্গরা বলতে লাগল, নিশ্চয় লোকটি বিজ্ঞ যাদুকর।’
    (সূরা আ’রাফ: ১০৯)

    ‘ফেরাউনের সম্প্রদায়ের সর্দাররা বলল, তুমি কি এমনি ছেড়ে দেবে মূসা ও তার সম্প্রদায়কে। দেশময় হৈচৈ করার জন্য এবং তোমাকে ও তোমার দেব-দেবীকে বাতিল করে দেবার জন্য।’
    (সূরা আ’রাফ: ১২৭) 

    ‘আর কেউ ঈমান আনল না মূসার প্রতি তার কওমের কতিপয় বালক ছাড়া ফেরাউন ও তার সর্দারদের ভয়ে যে, এরা না আবার কোন বিপদে ফেলে দেয়। ফেরাউন দেশময় কর্তৃত্বের শিখরে আরোহণ করেছিল। আর সে তার হাত ছেড়ে রেখেছিল।’
    (সূরা ইউনুস: ৮৩)

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাত অন্যান্য নবী রাসূল (সা) এর চেয়ে ব্যতিক্রম কিছু ছিল না। দাওয়াতের গতিকে মন্থর এবং লোকদের দাওয়াত শোনা ও গ্রহণের ব্যাপারে বিতস্পৃহ করবার জন্য ব্যাপক নির্যাতন ও বিশ্বাসীদের উপর অত্যাচার চালানো হয়। বিশ্বাসীরা ভাবত ঈমানের জন্য নিজের লোকদের দ্বারা অত্যাচারিত হতে হবে। যে বিশ্বাস স্থাপন করতে চাইত সে ভেবে নিত যে, পূর্বের বিশ্বাসীদের মতই তার অবস্থাও করুণ হবে। বিশ্বাসী ও মা’লা নেতৃত্বাধীন তাদের অনুসারীদের মধ্যকার বিবাদ পর্যায়ক্রমিক সফলতার মাধ্যমে চলত। অতপর একসময় তাগুতের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গেল। পরবতীর্তে দাওয়াত বহনকারীরা ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরে।

    ইবনে মাসঊদের বরাত গিয়ে সহীহ বুখারীতে বলা হয়েছে: 

    ‘যখন রাসূলুল্লাহ (সা) সিজদারত অবস্থায় তখন একদা কুরাইশের লোকেরা তার চারপাশে ছিল। এমতাবস্থায় উকবা বিন আবি মু’ইত উটের নাড়িভূড়ি নিয়ে এল এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর নিক্ষেপ করল। নবী (সা) তাঁর মাথা উঠালেন না। ফাতিমা (রা) দৌড়ে এলেন এবং নবী (সা) এর পিঠ থেকে উটের নাড়িভূড়ি সরালেন এবং যারা এ কাজটি করেছে তাদের অভিসম্পাত করলেন। নবী (সা) বললেন, ‘হে আল্লাহ! কুরাইশদের নেতা (মা’লা) আবু জাহেল বিন হিশাম, উতবা বিন রাবিয়্যাহ এবং উমাইয়্যা বিন খালাফ…..কে উঠিয়ে নাও।’ ইবনে মাসুদ অন্য একটি বর্ণণায় বলেন, ‘আমি তাদের বদরের দিন নিহত হতে দেখেছি এবং কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।’

    মক্কায় কেবল একজন নেতা ছিল না, অনেক মা’লা ছিল। এই লোকগুলো রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতকে বিরোধিতা করেছিল এবং লোকদের এ পথ থেকে বিভ্রান্ত করবার অপচেষ্টা করেছে।

    অন্যান্য নবীদের কেবলমাত্র তাদের লোকদের কাছে প্রেরণ করা হত, কিন্তু মুহম্মদ (সা) এর দাওয়াত গোটা মানবতার জন্য।

    কুরাইশদের পারিষদবর্গ দাওয়াতের কাজে ব্যাপক প্রত্যাখান ও বাধা সৃষ্টি করা শুরু করা সত্তেও দাওয়াত কেবলমাত্র তাদের মাঝেই পরিগ্রহ করেনি। দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) কোন বৈষম্য করেননি। গরীব-ধনী, প্রভূ-ক্রীতদাস কারও ক্ষেত্রে তিনি ভেদাভেদ করেননি। তারপরেও ইবনে উম্মে মাকতুম (রা) এর মত একজন অন্ধ দরিদ্র ব্যক্তির প্রতি ভ্রম্নকুঞ্চিত করবার কারণে তাঁকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে। তিনি নেতাদের কাছে দাওয়াত নিয়ে যাবার জন্য অত্যন্ত ব্যাকুল ছিলেন এই আশায় যে, তারা ঈমান গ্রহণ করলে তাদের অনুসারীরাও ঈমান গ্রহণ করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃক রাসূলুল্লাহ (সা) কে সতর্ক করা সত্ত্বেও নেতৃস্থানীয় লোকদের প্রতি দাওয়াত বন্ধ হয়নি। কারণ এ তিরষ্কার ছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। আহ্বানের দৃষ্টিভঙ্গিতে নেতাদের প্রতি দাওয়াত ও সাধারণ জনগনের প্রতি দাওয়াত একইরকম।

    সীরাত থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নেতা ও প্রধানদের কাছে কেবলমাত্র তাদের পদমর্যাদার কারণে দাওয়াত নিয়ে যাননি, বরং তারা বিশ্বাসী হলে তাদের অনুসারীরাও বিশ্বাসী হবে এ আশা থেকে তিনি (সা) দাওয়াত দিয়েছিলেন। এ কারণে দাওয়াতের আওতার মধ্যে সবাই অন্তর্ভুক্ত।

    এছাড়াও এমন লোক দাওয়াত গ্রহণ করেছিল যারা লোকদের নেতা ছিল না, যেমন: বিলাল, আম্মার (রা) এবং তাঁর মা ও বাবা। একই কথা শোয়াইব ও সালমান (রা) এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; কারণ তারা কেউ কুরাইশ নেতা ছিলেন না। আবার আমীর বিন ফুহাইরা, উম্মে আবিস, জুনাইরাহ, আন নাহদিয়্যা ও তাঁর কন্যা এবং বানু মু’মিল এর ক্রীতদাসী এর ক্ষেত্রেও এ কথা খাটে। কারণ আবু বকর (রা) ও প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণকারীরা তাঁদের সবাইকে দাসত্ব মুক্ত করেছিলেন।

    রাসূলুল্লাহ (সা) প্রাথমিকভাবে তাদেরই দাওয়াত দিয়েছিলেন যাদের মধ্যে খায়ের ছিল। অতপর তিনি সবার কাছে গিয়েছিলেন। তরুণ ও বৃদ্ধরা সাধারণত সে আহ্বানে সাড়া দিয়েছিল। সাধারণ ও সম্মানিত লোকেরাও সাড়া দিয়েছিল।

    দাওয়াতের পাত্র অনুসন্ধান করবার ক্ষেত্রে কোন সীমাবদ্ধতা নেই। এর মধ্যে সব ধরনের লোকেরাই থাকবে। আর পদ্ধতি হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতির কোন বিকল্প নেই যার মাধ্যমে তিনি দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

  • ৫ম অধ্যায়: যেসব পদ্ধতি শরী’য়া পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক

    আমরা ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মপদ্ধতি, তা অনুসরণ করা ও এ পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার গুরুত্ব উপস্থাপন করেছি। তবে আমরা দেখতে পাই কিছু ইসলামি দল ও চিন্তাবিদগন এ পদ্ধতি ব্যতিরেকে অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। যাইহোক যারাই এসব পদ্ধতি গ্রহণ করছেন, আমাদেরকে সে বিষয়ে অবশ্যই আলোচনা করতে হবে। দ্রুত পরীক্ষা করে এ বিষয়ে এমনভাবে অজ্ঞানতার পদার্কে উন্মোচন করতে হবে যাতে মুসলিমগণ অবিরতভাবে হতবুদ্ধি না হয় এবং গোলকধাঁধায় হারিয়ে না যায় অথবা দাওয়াত বহনের ক্ষেত্রে সন্দিহান না থাকে। নিম্নে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি উপস্থাপন করব।  

  • শরীয় হুকুমসমূহ কী নিরীক্ষামূলক?

    দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে:

    কিছু লোক আছে যারা ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের কাজকে নিরীক্ষামূলক হিসেবে নিয়েছে এবং এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিরীক্ষামূলক পরিকল্পনা থেকে উদ্ভুত দাওয়াতের মাধ্যমে এগুবে বলে মনে করে। কিন্তু প্রশ্ন হল এ বিষয়ে এভাবে চূড়ান্ত কিছু বলা কী সমীচীন?

    পদ্ধতিকে নিরীক্ষামূলক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা অপাংক্তেয়। এর অর্থ ‘শারী’য় পদ্ধতি’ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

    ইসলামে যে কোন কাজের পদ্ধতি শরীয় হুকুম দ্বারা স্বীকৃত যা এর দলিলের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভর করে। দলটি শরীয়া গ্রহণে যেমনি বাধ্য তেমনি এইসব দলিল গ্রহণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বাধ্যবাধকতা এবং প্রমাণিত কোন শরীয় হুকুম থেকে চ্যুত হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ তাদের নেই। সুতরাং এটা লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূণ নিরীক্ষামূলক (যদি পরীক্ষামূলকভাবে কার্যসম্পাদনের পর সাফল্য পাওয়া যায় তবে সেটাই পদ্ধতি এবং অন্যথায় অন্য কোন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে) কোন বিষয় নয়।

    শরীয় যে কোন হুকুমের ধারক হল শরীয় পদ্ধতি যা ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল লক্ষ্য অর্জন করা। আর তা হল ইসলামি জীবনধারা পূণপ্রবর্তন। এই হুকুম দলিলের শক্তিমত্তার উপর নির্ভর করে। এগুলো গ্রহণ ও আস্থাভাজন থাকবার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপাসনা করে থাকে। ঐ ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত এটাকে পরিবর্তন করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য শক্তিশালী দলিল আছে বলে সুনিশ্চিত হওয়া যায়।

    একজনকে অবশ্যই শরীয়াগত পদ্ধতিতে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করতে হবে। বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা অনুযায়ী কাজ করা এবং  শরীয় পদ্ধতিতে কাজ করা কখনওই এক বিষয় নয়। ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা থেকে নেয়া সমাধানে লোকজন যে কোন কাজকে সাফল্য বা ব্যর্থতা অথবা লক্ষ্য অর্জন হওয়া বা না হওয়ার ভিত্তিতে উপলদ্ধি করে থাকে।

    গ্রহণের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা এমন যে, কোনটিই তাদের জন্য চূড়ান্ত সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন অবিরত পরিবর্তন ও বিবর্তন। যে কোন পদক্ষেপই তারা গ্রহণ করুক না কেন সেটা নিরীক্ষামূলক। অবশ্য পশ্চিমা সব আইনই নিরীক্ষামূলক। তাদের জন্য একটি পদক্ষেপ সঠিক বা ভুল তা যাচাইয়ের একমাত্র পদ্ধতি হল তা বাস্তবায়নের পর লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য বা বিফলতার উপর। এ বাস্তবতা ইসলামের সাথে এ প্রকৃতির কারণেই সম্পূর্ণরূপে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। ইসলামের পদ্ধতি আল্লাহ প্রদত্ত যিনি আল আলীম (সবজান্তা) এবং আল খাবীর (সর্বসচেতন)। যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয়া দলিলের উপর নির্ভর করে ততক্ষণ পর্যন্ত এটি নিভূর্ল ও পূর্ণাঙ্গ। এর নিভূর্লতা উৎসারিত হয় শরীয় দলিলের নিভূর্লতা এবং ইসতিদলাল (সংশে­ষণ) থেকে। কোনক্রমেই ফলাফলের উপর এটি নির্ভরশীল নয়। অতএব দলিলের প্রতি আনুগত্য হচ্ছে ভিত্তি, যে ভিত্তি থেকে কাজের মূল্যায়ন হয়। কাজের পদ্ধতির ক্ষেত্রে ফলাফল বলতে বুঝায় ক্ষমতা গ্রহণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠা। আর এ বিষয়টি সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকতৃর্ত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না।’
    (সূরা নূর: ৫৫)

    ‘হে বিশ্বাসীগণ। যদি তোমরা আল্লাহ্কে সাহায্য কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।’
    (সূরা মুহম্মদ: ৭)

    যদি ফলাফল না পাওয়া যায়, তাহলে একজন কোনক্রমেই এ পদ্ধতিকে অবজ্ঞা করতে পারবে না বা এটিকে অন্য কোন কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না বা এটাকে ব্যর্থ ঘোষণা করতে পারবে না। বরং পদ্ধতির হুকুমটি আরও study and review  করে দেখা উচিত। কোন শরীয় হুকুমকে পরিত্যাগ করা যাবে না যদি না দলটি বুঝতে পারে তারা হুকুমটি বুঝতে ভুল করেছিল। যদি দলটি ভুল না পায় তাহলে ঐ বিশেষ হুকুমের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব মতামতের উপর দৃঢ় থাকতে হবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সবর করতে হবে যতক্ষণ না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিজয় দান করেন। অথবা বিষয়টি এমন হতে পারে যা ‘বিজয়ের বিলম্ব’ সুত্রের কারনে প্রলম্বিত হচ্ছে, যা থেকে নবীরা পর্যন্ত রেহাই পাননি। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    ‘এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান বুঝি মিথ্যায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌছে।’
    (সূরা ইউসুফ: ১১০) 

    অবশ্যই এ কাজটি ব্যাপক ক্লান্তিকর ও কষ্টকর ও ব্যাপক প্রচেষ্টা সাপেক্ষ। দলটি যে শাসকদের মুখোমুখি হচ্ছে তার চেয়ে দলটির ক্ষমতা অনেক কম। কাজের সাফল্য কখনওই সময়সাপেক্ষ নয় যে, একটি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর সাফল্য না আসলে আমরা ধরে নেই যে এটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বরং এটি চিন্তার পরিশুদ্ধতা, চিন্তাধারণকারীদের দৃঢ়তা এবং জনগনের গ্রহণের সার্বজনীনতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন এই পূর্বশর্তগুলো পূরণ হবে তখন একজন ধরে নিতে পারে যে দলটি রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত নুসরা অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিজয়ী হবে। এ ব্যাপারে মূল্যায়ন হল যে, বিজয় কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে আসে। দলটি মূল্যায়ন করবে হুকুম ও দলিলের শক্তিমত্তার সম্ভাব্যতার ব্যাপারে।        

    যদি বিজয়ের শর্তসমূহ পূরণ করা যায়, তাহলে এটা আসবে। অন্যথায় এটা প্রলম্বিত হবে। বিজয় আসবার ক্ষেত্রে বিলম্ব বিফলতার নামান্তর নয়। হতে পারে যে, প্রস্তুতি ও তৎপরতার মাত্রা সন্তোষজনক নয় এবং তা বাড়াতে হবে। দল বা দলের শাবাবদের জন্য এ প্রলম্বন একটি পরীক্ষা হতে পারে যে, কেউ কি এ কারণে ভগ্নমনোরথ হয়ে পরিত্যাগ করে প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে সরে এসেছে নাকি দৃঢ় থেকেছে? যে কোন পরিস্থিতিতে পূর্ণমূল্যায়ন করতে হবে। যদি পদ্ধতি পরিবর্তন করবার মত কোন যুক্তিসংগত কারণ দলটি খুজে না পায়, তাহলে কেবলমাত্র বিলম্বজনিত কারণে পদ্ধতি পরিবর্তন করা যাবে না। দলটিকে এর ধরন ও উপকরণকে বারংবার পরীক্ষা করে দেখতে হবে। আর অনুমোদিত এবং সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ধরন ও উপকরণকে গ্রহণ করতে হবে। সুতরাং বিজয়ের বিলম্ব মানে বিফলতা নয়। তাছাড়া এমন কোন শরীয় বিধান নেই যে, একটি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে উদ্দেশ্য হাসিল করতে হবে।   

    অবশ্যই পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট হুকুম ও চিন্তার সঠিকতার বিষয়টিতে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। এ চিন্তা দিয়েই শাবাবগন ও উম্মাহ প্রস্তত হবে। যদি দলটি এই চিন্তা ও হুকুমসমূহকে বিশুদ্ধ মনে করে সঠিক ধরন ও উপকরণকে গ্রহণ করে ধৈয্যের্র উপর দৃঢ় থাকে, তাহলে বিলম্বের জন্য চিন্তা ও হুকুম পরিবর্তন অনুমোদিত নয়।     

    পরিবর্তনের বিষয়টি ব্যক্তি নয় উম্মাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত। একজন ব্যক্তিকে পরিবর্তনের চেয়ে সমাজ পরিবর্তনের কৌশল অনেক জটিল। সুতরাং এর গতি শ-থ এবং সহজে অনুধাবন করা যায় না। তবে সে অনুধাবন করতে পারে যার রয়েছে দূরদৃষ্টিমূলক চিন্তা এবং সঠিক পৃষ্টপোষকতা। এর অর্থ এই নয় যে, যখন কোন ব্যক্তি লক্ষ্যটাকে মাথায় নিয়ে কাজ করবে তখন তার মনোবৃত্তি এই হবে যে, সে সাফল্য অর্জন করতে পারবে না অথবা সাফল্য অর্জিত হবে ভবিষ্যত প্রজন্মের হাতে। বরং তাদেরকে এই মনোবৃত্তি পোষণ করতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবী (রা) এর মত তাদের হাতেই ইনশাআল্লাহ খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তারা এর সাক্ষী হবে। একজন ব্যক্তির জীবন সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ হতে পারে। সুতরাং বিজয়ের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির জন্য নয় বরং পুরো দলের জন্য। তারা সেই বিশ্বাসীদের দল যাদের পৃথিবীতে ইসতিখলাফ বা সাফল্যের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ কাজের সময় একজন ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যু হতে পারে, দলের আমীর মারা যেতে পারেন, কেউ কেউ এ পথ থেকে ছিটকে যেতে পারেন; কিন্তু প্রতিশ্রুতি ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত দলটি আল্লাহর নির্দেশ পালনে তৎপর থাকবে। বিজয় বিলম্বিত হোক বা না হোক, এ দলের কাছে বিজয়ের বিষয় আসবে। এ বিষয়ের জ্ঞানের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ছাড়া আর কেউ দায়িত্বশীল নয়। কিন্তু দলটি কেবলমাত্র সঠিক পদ্ধতি গ্রহণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

    সুতরাং কারও বলা ঠিক হবে না শরীয় হুকুম এমন একটি নিরীক্ষামূলক বিষয় যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি অনুভূত না হলে আমরা একে ব্যর্থতা বলে গন্য করব এবং অন্য একটি নিরীক্ষামূলক পদ্ধতি দ্বারা এটিকে প্রতিস্থাপন করব। যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয় দলিল দ্বারা পদ্ধতিটি সুপ্রমাণিত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ এ ধরনের কথা বলবার এখতিয়ার রাখেন না। তবে ধরন ও উপকরণের ক্ষেত্রে নিরীক্ষা চালানো সঠিক।

  • আজকাল কিছু মুসলিম তরীকার সাথে ধরনকে (উসলুব) গুলিয়ে ফেলে

    এ ধরনের সন্দেহ কিছু মুসলিমের মধ্যে সৃষ্টি হবার কারণ হল তারা মনে করে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় থেকে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্নতর। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় সমাজের বিভক্তি ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের, অর্থাৎ বংশ এবং গোত্র। আজকে এ বিভক্তি আরও জটিল ও পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি রাষ্ট্রের সাথে আগের গোত্র সমূহের তুলনা করা চলে, যার জনসংখ্যা ছিল হাজার হাজার। এখন এ সংখ্যা মিলিয়ন মিলিয়ন। তখন দাওয়াত ছিল লোকদের কুফর থেকে ইসলাম গ্রহণের জন্য। আর আজকে দাওয়াত করা হয় মুসলিমদের ইসলামী জীবনধারা পুণপ্রবর্তনের জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় সুপার পাওয়ার পারস্য ও রোমানরা মক্কায় তার দাওয়াতে হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু আজকের দিনে শাসকেরা পশ্চিমাদের আজ্ঞাবহ ও পুতুল মাত্র। এখন সুপার পাওয়ারগুলোই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে….ইত্যাদি ইত্যাদি।

    বিভ্রান্ত লোকেরা আরও বলে, ‘আমরা কীভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) কে মানবো যখন অনেক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে গেছে? যদি পরিবর্তিত না হই তাহলে সেটা হবে কঠোরতা ও অনমনীয়তা। আমরা এভাবে কিছু গ্রহণ করতে বাধ্য নই। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল দাওয়াতের বৃহত্তর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে লক্ষ্য রাখা, অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দ্বারা এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং আল্লাহর দাসত্ব বা উবুদিয়্যাহ উপলদ্ধি করা।’

    এই ইস্যুটিকে কীভাবে দেখতে হবে তা ব্যাখ্যা করতে হবে, এভাবে শরীয় হুকুম নাজিল হয়েছিল বিভিন্ন বাস্তবতায় পরিপ্রেক্ষিতে। যখন বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে গেছে তখন এর সাথে বিজড়িত হুকুম পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যদি বাস্তবতা পরিবর্তিত না হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে শরীয় হুকুম অপরিবর্তিত থাকবে। বাস্তবতার ক্ষেত্রে এর বাহ্যিক দিকে খেয়াল না রেখে এর মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।   

    সমাজ হল কিছু লোকের সমষ্টি যাদের রয়েছে সাধারণ ধারণা, এ সাধারণ ধারণা হতে কিছু আবেগ ও এর সাথে একমত সবকিছুকে সমর্থন করার বিষয় উৎসারিত হয়, এবং এ সাধারণ ধারণা হতে কিছু ক্ষোভের বিষয় উৎসারিত হয় যখন কোন কিছু এর বিরুদ্ধে যায়। অতপর একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় যা এই চিন্তা বা ধারণাকে বাস্তবায়ন করে এবং এর কোনরকম ব্যাত্যয়কে প্রতিহত করে। সুতরাং লোকেরা এমনভাবে জীবনযাপন করে যে তারা পুরো বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে এবং এ ব্যাপারে তারা সন্তুষ্ট।    

    সমাজের বাস্তবতা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এটা হতে পারে প্রাথমিক পর্যায়ের বা জটিল। কিন্তু প্রত্যেক জনসমষ্টিই একটি সাধারণ চিন্তা ও আবেগের ভিত্তিতে একত্রিত হয় এবং শাসিত হয় এমন একটি ব্যবস্থা দ্বারা যা ঐ চিন্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। হতে পারে এ জনসমষ্টি একটি রাষ্ট্র বা গোত্র এবং সংখ্যায় হাজার হাজার বা মিলিয়ন মিলিয়ন। রাষ্ট্র বা গোত্র নির্বিশেষে এটি একটি সমাজ। কারণ উভয়ক্ষেত্রেই সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি রয়েছে এবং এটি পরিবর্তিত হয়নি। 

    রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলামি চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিলেন। ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শরীয় পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। তার সমস্ত কর্মকান্ড সেদিকেই লক্ষ্য করে ঠিক করা হয়েছিল। মদীনাতে তিনি প্রত্যেকটি বিশ্বাসী ব্যক্তিকে গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মনের ভেতরে তিনি ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক চিন্তা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যা একটি সুষম আবেগের সৃষ্টি করেছিল। তিনি সেখানে হিজরত করলেন ও ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলেন এবং এভাবে ইসলামি সমাজ কায়েম হল। শুরুতে এটি সহজ অবয়বে ছিল এবং তারপর একটি সমাজে রূপান্তরিত হয় যা পরিচালনার জন্য একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে। 

    এখন ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুপার পাওয়ারগুলো যেভাবে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে আগে সেভাবে হস্তক্ষেপ করেনি, এর জবাবে আমরা বলতে চাই, একারণে পদ্ধতির কোন পরিবর্তন হতে পারে না। তবে এটা পদ্ধতির অনুসরণকে আরও কঠিনতর করে ফেলেছে। এর জন্য প্রয়োজন বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এনে অতিরিক্ত বিকাশ প্রক্রিয়া ও নিবিড় দাওয়াত চালু রাখা। একারণে দলটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে যায়। সুতরাং তাদেরকে মোকাবেলা করবার জন্য সুপার-পাওয়ারগুলোর পরিকল্পনা ও পুতুল শাসকগুলোর মাধ্যমে যে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে চায় তা বুঝতে হবে।   

    রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কাতে কেবলমাত্র ঈমান ও সামান্য কিছু শরীয় আহকাম ব্যাপারে আহ্বান করেছিলেন এ দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে চাই, সামান্য কিছু হলেও তিনি শরীয় আহকাম ব্যাপারে আহ্বান করেছিলেন। এছাড়াও আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, মক্কায় দাওয়াতের উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম গ্রহণের জন্য লোকদের আহ্বান। কিন্তু আজকে মুসলিমদের দাওয়াত দেয়া হচ্ছে যাদের রয়েছে ইসলামি আক্বীদা এবং নাজিলকৃত সব শরীয় হুকুম। সেকারণে মুসলিমগন আজ আল্লাহর কাছে কেবলমাত্র ঈমান নয় পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সুতরাং মক্কার একজন মুসলিম তার মৃত্যুর আগে সে পর্যন্ত নাজিল হওয়া হুকুমের জন্য দায়িত্বশীল। আজকে যে মুসলিম মারা যাচ্ছে সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে পুরো ইসলামের ব্যাপারে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হবে। সে কারণে আজকের আহ্বান হতে হবে পূর্ণাঙ্গ এবং ইসলামি জীবনধারা পূণরায় শুরু করবার জন্য, কেবলমাত্র ঈমানের দাওয়াত নয়। কারণ এটা কোন নতুন দ্বীনের আহ্বান নয়।      

    এছাড়া মুসলিম উম্মাহর দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে, আক্বীদা থেকে বিচ্যুত হওয়া এখন মুসলিম উম্মাহর সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হল এই আক্বীদার সাথে জীবনের চিন্তা ও আইনী ব্যবস্থার সম্পর্ক উপলদ্ধি করতে না পারা। এভাবে আক্বিদা তার প্রাণশক্তি হারিয়ে বসেছে। এসবই সম্ভব হয়েছে মুসলিমদের উপর পশ্চিমা চিন্তার প্রভাব বিস্তার করবার কারণে। পশ্চিমা কাফের রাষ্ট্রগুলো নতজানু শাসকদের ক্ষমতায় বসানো, শিক্ষা ব্যবস্থা ও মিডিয়ায় প্রচারণার মাধ্যমে এসব চিন্তার বিস্তার ঘটায়, সংরক্ষণ করে এবং এগুলো বলবৎ ও এর প্রতি আকর্ষণ বজায় রাখবার জন্য কাজ করে। 

    সুতরাং আমাদের দাওয়াতে ইসলামকে সঠিকভাবে, পূর্ণাঙ্গরূপে ও সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে যার আক্বীদা ও ঈমান মৌলিক চিন্তা হিসেব আবিভূর্ত হবে, যা হতে হুকুম উৎসারিত হয় ও যার উপর ভিত্তি করে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারিত হয়। তারপর আক্বীদার মাধ্যমে জীবনের চিন্তাসমূহকে ব্যাখ্যা করতে হবে। এটা সম্ভব হবে তখনই যখন আমরা আহ্বান করব আল্লাহসুবহানহুতায়ালাই একমাত্র স্রষ্টা ও আল মুদাব্বির (সব বিষয়ের পালনকর্তা), বিচার দিবসের মালিক এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সব বিষয়ের জন্য তার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এভাবে যখন ঈমান ও হুকুম সমুহ মুসলিমদের জন্য অবশ্য কর্তব্য তা ব্যাখ্যা করা হয় তখন সত্যের ক্ষমতা ও এর প্রাণশক্তি তাদের কাছে পরিস্ফুট হয়ে উঠে, এবং ইসলাম বুঝা ও এর আহ্বান করার কাজে দাওয়াতকারী দলের শক্তিমত্তা এবং দলের পরিবর্তনের সক্ষমতা সবার কাছে পরিস্ফুট হয়ে উঠে।        

    সেকারণে আজকে দাওয়াত হল ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুসলিমদের ইসলামি জীবনধারায় ফিরে আসার জন্য আহ্বান করা। এ দাওয়াতের ভিত্তি হবে ইসলামি আক্বীদা, এবং এর রাজনৈতিক চিন্তার উপস্থাপন করতে হবে যাতে মুসলিমরা আল্লাহর নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী এটিকে জীবনের সব কাজের নিয়ন্ত্রক হিসেবে গ্রহণ করে।     

    সুতরাং যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হল বাহ্যিক রূপ। মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সুতরাং ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়নের হুকুম এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজের পদ্ধতির হুকুম মোটেও পরিবর্তিত হয়নি। 

  • তরীকাহ (পদ্ধতি) এবং উসলূব (ধরন)

    তরীকাহ (পদ্ধতি) এবং উসলূব (ধরন)

    এখন যে প্রশ্নটি উত্থিত হয়, তা হল, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় যা বলেছিলেন এবং করেছিলেন তা কি ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিনা এবং একারণে এটা মানতে আমরা বাধ্য অথবা এমন কোন কাজ বা কর্ম করেছেন কিনা যা ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এবং যেগুলো একজন অনুসরণ করতে বাধ্য নয়?

    এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পদ্ধতি, উপকরণ ও ধরনের প্রশ্ন আসে।

    আরেকটি প্রশ্ন উত্থিত হয়, তা হল, পদ্ধতি (যা হল কিছু শর’ঈ হুকুমের সমষ্টি কিন্তু উপকরণ নয়) নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো যাবে কিনা এবং যদি পরীক্ষার পর এটা কোন ফল দেয় তাহলে এটা সঠিক, অন্যথায় নয়?

    প্রথম বিষয়টির ক্ষেত্রে

    আমরা নিম্নোক্তভাবে বলতে পারি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করতে বলেছেন অর্থাৎ তিনি যা বলেছেন এবং করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। এটি ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়।’
    (সূরা আন নাজম: ৩-৪)

    এবং তিনি বলেন,

    ” রাসূল তোমাদেরকে যা (‘মা’) দেন তা গ্রহণ কর এবং যা (‘মা’) তিনি নিষেধ করেন তা বর্জন কর ”
    (আল কুরআন, ৫৯:৭)

    এখানে ‘মা’ শব্দটি সাধারণ অর্থে (সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ব্যবহৃত হয়েছে। অথার্ৎ রাসূল (সা) আমাদের জন্য কোন কিছু নিয়ে এসেছেন কিন্তু তা আমাদের পালন করা লাগবে না এমন কিছুই নেই; যতক্ষণ না শারী’আহ কোন ব্যতিক্রম নির্দেশ করে।

    নির্দিষ্ট রকমের কিছু কথা এবং কাজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে যেসব ক্ষেত্রে রাসূল(সা) কে অনুসরণ না করলেও চলে বলে প্রমাণ রয়েছে। যেমন:

    – রাসূলুল্লাহ (সা) নিম্নের হাদীস:

    ‘দুনিয়াবি বিষয়ে তোমরা আমার চেয়ে বেশী জ্ঞান রাখ।’

    সুতরাং দুনিয়াবি বিষয়, যেমন: কৃষি, উৎপাদন, আবিষ্কার, চিকিৎসাশাস্ত্র ও প্রকৌশল ইত্যাদি বিষয়ক technical জ্ঞান ওহীর অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাধ্যমে আমাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, এসব ক্ষেত্রে তিনি যে কোন সাধারণ মানুষের মতই। খেজুর গাছের পরাগায়ন সম্পর্কিত তাঁর ঘটনাটির মধ্য দিয়েই বিষয়টি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।

    • কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো একান্তভাবেই তাঁর জন্য এবং অন্য কেউ এ ব্যাপারে অংশীদার নয়। যেমন, তাহাজ্জুদ পড়া তাঁর উপর ফরয ছিল, রাতের বেলাতেও রোযা অব্যাহত রাখা এবং চারের অধিক বিয়ে করবার অনুমতি ছিল। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করা অনুমোদিত নয়।
    • যেসব কাজ মানুষ হিসেবে তাঁর স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল, যেমন: দাড়ানো, বসা, হাটা, খাওয়া, পান করা ইত্যাদি। এটা নিঃসন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, এসবই উম্মাহর জন্য মুবাহ (অনুমোদিত) হিসেবে পরিগণিত।
    • বিভিন্ন শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য রাসূল (সা) উপযুক্ত ধরন (উসলূব) এবং উপকরণ (ওয়াসিলা) ব্যবহার করতেন। শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এই শরঈ হুকুম কিভাবে অর্থাৎ কোন ধরন এবং উপকরণের সাহায্যে বাস্তবায়ন করতে হবে তা একজন মানুষ হিসেবে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়; যাতে সে ধরন ও উপকরণ বাস্তবসম্মত হয় এবং যদি কোন হারামের দিকে পরিচালিত না করে। 

    উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যখন বলেন:

    “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।”
    (সূরা আল হিজর: ৯৪)

    একটি শরঈ হুকুম যাকে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু কিভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে সে বিষয়টিকে শরীয়া স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন, কারণ এই হুকুমের বিরুদ্ধে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। কিন্তু যে উপায়ে তিনি (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন সেটা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক ছিলনা। অতএব ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূলকে (সা) অনুসরণকারী দলের জন্যও এই কাজটি বাধ্যতামূলক নয়। রাসূল (সা) সাফা পাহাড়ের উপরে উঠে লোকদের আহ্বান করেছিলেন, লোকজনকে খাবারের দাওয়াত দিয়েছিলেন, মুসলিমদেরকে সাথে নিয়ে দুটো সারিতে করে কাবা প্রদক্ষিণ করেছিলেন, এগুলো ছিল মূলত শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত কিছু ধরন অর্থাৎ এগুলো ছিল প্রকৃত (আসল) হুকুম ‘প্রকাশ্যে ঘোষণা দান’ এর সাথে সম্পর্কিত কিছু সহায়ক কাজ। নীতিগতভাবে এ জাতীয় ধরনসমূহ অনুমোদিত। বিষয়টিকে শরীয়া স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করে  দলের হাতে ছেড়ে দিয়েছে যাতে তারা সবচেয়ে উপযুক্ত ধরনসমূহকে বেছে নিতে পারে।

    উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যখন বলেন :

    “আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজেদের শক্তি-সামর্থের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে যাতে আল্লাহ এবং তোমাদের শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পার।”
    (সূরা আনফাল: ৬০)

    তখন প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তাঁর এই নির্দেশ হচ্ছে একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করতে হবে অর্থাৎ বিষয়টি ফরয এবং এর বিরুদ্ধে যাওয়া হারাম। এই আয়াতে প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার ইল্ল­হ (শরঈ কারণ) হচ্ছে  শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা। কিন্তু উপকরণের(ঘোড়া) বিষয়টি এখানে বাধ্যতামূলক নয়। যেকোন উপকরণ যা এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে সেটাই এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। জিহাদের জন্য উপযুক্ত উপকরণ যুগের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে আসছে। এজন্য শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপকরণ বেছে নিতে হবে। জিহাদের জন্য বা আল্লাহর শত্রু এবং  মুনাফিকদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত  করে তোলার জন্য বর্তমান সময়ে প্রয়োজন হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের (শরীয়া নির্ধারিত সীমার মধ্যে)। অতএব শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অর্থাৎ নির্দিষ্ট বিষয়টিতে আল্লাহর সরাসরি মন্তব্য রয়েছে বলে এটিই হচেছ প্রকৃত (আসল) হুকুম। আর ধরন (উসলূব) হচ্ছে  প্রকৃত (আসল) হুকুমকে বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত আংশিক হুকুম। এ বিষয়টি হচ্ছে মুবাহ এবং উপযুক্ত ধরনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    উপকরণ হচ্ছে সেই বস্তু যার সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয়। নীতিগতভাবে বিষয়টি মুবাহ (অনুমোদিত) এবং উপযুক্ত উপকরণ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    অতএব উপরোক্ত ব্যতিক্রমসমূহ এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় ছাড়া মতাদর্শ  বা শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অন্য যেকোন বিষয় যা রাসূল (সা) এর সাথে সম্পর্কিত সেটা মক্কায় নাযিল হোক অথবা মদীনায়, সেটা আক্বীদার সাথে সম্পর্কিত হোক অথবা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত সবকিছুকেই ওহী হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং এগুলোকে তা’সী (অনুসরণীয়) বিষয় হিসেবে মেনে নিতে হবে।

    যদি কেউ রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের দাওয়াতকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে তিনি শরঈ হুকুম হিসেবে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করেছিলেন যেগুলোকে বর্তমানে বাদ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই বরং এগুলোকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। অনুরূপভাবে তিনি(সা) এমন অনেক কাজ করেছেন যেগুলোকে উসলুব বা ধরনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা যায়। পাশাপাশি তিনি (সা) শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপযুক্ত উপকরণও ব্যবহার করেছেন। অতএব কোন বিষয়গুলো পদ্ধতি (তরীকাহ) এবং কোন বিষয়গুলো ধরন (উসলূব) বা উপকরণ (ওয়াসিলা), এ দু’ধরণের বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝা প্রয়োজন, যাতে দল বুঝতে পারে কোন বিষয়টি তাকে আবশ্যই পালন করতে হবে এবং কোন বিষয়টি তার সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    পুরো পদ্ধতিকে (তরীকাহ) ধরন হিসেবে গণ্য করার কোন সুযোগ নেই যার ফলে মনে হবে পরিস্থিতির আলোকে দল যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কারণ এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত শরঈ হুকুমকে তাচ্ছিল্য করা হবে এবং শরঈ হুকুমকে মনগড়া কার্যক্রম দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হবে। বিষয়টিকে আরো ভালভাবে পরিষ্কার করার জন্য নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

    – আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়”
    (সূরা আল হিজর: ৯৪)

    প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া, আল্লাহর তরফ থেকে রাসূল (সা) এর প্রতি একটি নির্দেশ। এই নির্দেশটি দুটো শরঈ হুকুমকে উপস্থাপন করছে। প্রথমটি হচ্ছে এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশ্য দাওয়াতের অনুপস্থিতি এবং দ্বিতীয়টি হচেছ এই আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা। প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টিকে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মান্য করা ছিল রাসূল (সা) এর জন্য বাধ্যতামূলক। এটিই হচ্ছে শরঈ হুকুম, যা শরী’আহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। এই কাজটি করার সিদ্ধান্ত  রাসূল (সা) তাঁর নিজস্ব ইচ্ছার কারণে গ্রহণ করেননি, অতএব এই কাজের অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র এই কথা “যা আপনাকে আদেশ করা হয়” এর মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে বিষয়টি আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    “তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ (যুদ্ধ করা থেকে) এবং সালাত কায়েম কর”
    (সূরা আন নিসা: ৭৭)

    আবার কাফিরদের দুর্ব্যবহারের জবাবে অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের মোকাবেলা করার অনুমতি প্রার্থনা করলে আব্দুর রাহমান বিন আল আওফ (রা)-কে রাসূল(সা) বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট অতএব তোমরা লোকজনের সাথে যুদ্ধ করোনা।”
    [ইবনে আবি হাতিম,আন-নাসাঈ এবং আল-হাকিম থেকে বর্ণিত]।

    পরবতীর্তে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় আল্লাহর তরফ থেকে ওহী নাজিল হয়,

    “যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে কাফিররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে (মুমিনদেরকে) সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম।”
    (সূরা হজ্জ:৩৯)

    উপরোক্ত দলিলগুলো থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে প্রথমে যুদ্ধের অনুমতি ছিলনা, কিন্তু পরবতীর্তে তা দেওয়া হয়; যেহেতু এই অনুমতি আল্লাহর তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এটি একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করা আবশ্যক। স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে রাসূল (সা) সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করা থেকে বিরত ছিলেন বিষয়টি এরকম কিছু ছিলনা বরং বিষয়টি ছিল ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত যার আনুগত্য করা ছিল আবশ্যকীয় কর্তব্য। রাসূল (সা) যেভাবে একাজ করা থেকে বিরত ছিলেন ঠিক তেমনিভাবে তাঁর অনুসরণে নিজেদেরকে বিরত রাখাটা আমাদের জন্যও বাধ্যতামূলক। 

    • অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন বিভিন্ন গোত্রের নিকট নুসরাহ (খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত সাহায্য) খুঁজতে  যেতেন তখন তিনি (সা) বলতেন :

    “হে অমুক এবং অমুক গোত্র, প্রকৃতপক্ষে আমি আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত একজন রাসূল। তিনি তোমাদেরকে আদেশ করছেন যাতে তোমরা তাঁর ইবাদত কর এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না কর, তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য যেসব মূর্তির পূজা কর সেগুলোকে পরিত্যাগ কর, আমার উপর তোমরা ঈমান আন এবং আমাকে তোমরা সুরক্ষা প্রদান কর (অন্য এক বর্ণনায় ‘সমর্থন কর’) যাতে আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তা আমি পৌঁছে দিতে পারি।’
    [সীরাতে ইবনে হিশাম]

    এই হাদীসের মাধ্যমে রাসূল(সা) পরিষ্কার করে দিচেছন যে বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম; অর্থাৎ এক্ষেত্রে রাসূল(সা) ওহীর অনুসরণ করছিলেন মাত্র। গোত্রগুলোর কাছ থেকে অসংখ্যবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও এবং অত্যন্ত রূঢ় ও কর্কশ ব্যবহার পাওয়া সত্ত্বেও নুসরাহ খোঁজার ক্ষেত্রে রাসূল(সা) এর অটল থাকাটাই প্রমাণ করে যে, এ বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম।

    এগুলো হচ্ছে পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত শরঈ হুকুমের কিছু উদাহরণ। যেসব উপকরণ এবং ধরনের সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং এক্ষেত্রে শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমরা স্বাধীন।                                                   

    সুতরাং দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত লোক করে গড়ে তোলার জন্য রাসূল (সা) মুমিনদেরকে নিয়ে দারুল আরকামে অথবা তাঁদের কারো বাসায় অথবা উপত্যকায় গিয়ে বসতেন এবং তাঁদেরকে ইসলামের শিক্ষায় দীক্ষিত করতেন। একটি শরঈ হুকুম হিসেবে আমাদেরকেও অবশ্যই এই দায়িত্বটি পালন করতে হবে। এবং এ কাজের জন্য উপযুক্ত ধরন প্রয়োগ করতে হবে। এজন্য উপযুক্ত ধরন হিসেবে একদল লোক অথবা কোন পরিবারকে বেছে নিতে হবে যাতে তাদেরকে ইসলামের সুষ্ঠু শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যায়। তাদের জন্য সাপ্তাহিক একটি সময় নির্ধারিত করতে হবে এবং সেই নির্দিষ্ট সময়ে পরিবার অথবা দলটির নির্দিষ্ট লোকজনকে একত্রে জড়ো হতে হবে। দাওয়াতী কাজে নিযুক্ত তরুণদের মনে যাতে ইসলামের শিক্ষা সুষ্ঠুভাবে গেঁথে দেওয়া যায় সেজন্য উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে। এ সমস্ত বিষয়গুলো নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত লোক করে গড়ে তোলার শরঈ হুকুমের বাস্তবতার আলোকে আমরা এ বিষয়গুলো নির্ধারণ করব যাতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

    রাসূল (সা) নিজেকে এবং তাঁর দাওয়াতকে মক্কার বাজারে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করতেন। এ কাজটি করার সময় আমাদেরকে উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে; যেমন যথার্থ বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে অথবা বিভিন্ন সামাজিক সমাবেশ, উৎসব বা আনন্দ-বেদনার সময় জনগণের কাছে নিজেদের ধ্যান-ধারণাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বই, ম্যাগাজিন, লিফলেট, ক্যাসেট অথবা সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা যায়, এসমস্ত ধরন বা উপকরণের প্রত্যেকটিই জায়েয।

    অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন নুসরাহ খোঁজার জন্য তায়েফে গিয়েছিলেন তখন তিনি পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন, নাকি ঘোড়ার পিঠে চড়েছিলেন নাকি অন্য কোন উপায় অবলম্বন করেছিলেন সেগুলোর অনুসরণ করাটা আমাদের জন্য আবশ্যক কিছু না। এ জাতীয় উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরীয়া কোন স্পষ্ট নির্দেশনা না দিয়ে বরং আমাদের সিদ্ধান্তের উপর তা ছেড়ে দিয়েছে।

    আমাদের জানা আবশ্যক যে রাসূল (সা) এর তরীকাহ ছিল মূলত ওহী দ্বারা নিধার্রিত অনেকগুলো শরঈ হুকমের সমষ্টি যা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। শরঈ হুকুমের প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যে বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয় সেগুলো হল ধরন বা উপকরণ। এ বিষয়গুলোকে নিধার্রণ করা যেমন রাসূল(সা) এর সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে ঠিক তেমনিভাবে এ বিষয়গুলোকে নিধার্রণ করাটা আমাদের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    প্রকৃতপক্ষে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করা একটি শরঈ হুকুম। এমন অনেক লোক আছে যারা ভাবে যে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার তরীকাহ ব্যাপারটি ধরনের অন্তর্ভুক্ত এবং এজন্য তারা যেকোন ধরনের কাজ করার ব্যাপারে স্বাধীন। উদাহরণস্বরূপ দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে তারা গরীবদেরকে সাহায্য করে, মানুষের আখলাক ঠিক করার কথা বলে, হাসপাতাল বা স্কুল তৈরি করে, ভাল কাজ করার কথা বলে, কেউ শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয় আবার কেউ বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দাবী তোলে। এ সমস্ত কাজের প্রত্যেকটাই হচ্ছে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল্লাহর সরাসরি নির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালিত রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ডের অনুসরণ থেকে সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। আল্লাহর হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণাদানের কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণাদানের কাজ করাটা আমাদের জন্যও ফরয;যদি তা না করি তাহলে আমরা পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত হব। রাসূল (সা) যেভাবে অস্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন এবং মুসলিমদেরকে অস্ত্র বহনের অনুমতি দেননি ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরকেও তা মেনে চলতে হবে। পরিস্থিতি যদি ভিন্নও হয় তবু আমাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে নুসরাহ খঁুজতে হবে যেমনভাবে রাসূল (সা) তা খুঁজেছিলেন। সাধারণভাবে বলা যায় পদ্ধতির ধাপসমূহ যেভাবে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন সেগুলো আমাদের জন্যও অপরিবর্তিত থাকবে। সেগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করা অথবা সেগুলোর অনুসরণ না করা হবে শরঈ হুকুমের লঙ্ঘন।

    তরীকাহর ব্যাপারে নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন সুযোগ আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। উদ্দেশ্য কি হবে এবং সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য তরীকাহ কি হবেÑদুটো বিষয়ই শরীয়া নির্ধারিত করে দিয়েছে; অতএব এসব বিষয়ে আনুগত্য করা ছাড়া আমাদের অন্য কোন বিকল্প নেই।

    পদ্ধতির ধাপসমূহ নির্ধারণ করার এখতিয়ার কেবলমাত্র শরঈ দলীলসমূহেরই (কুরআন ও সুন্নাহ) রয়েছে। এ ধাপসমূহ নির্ধারণ করার জন্য আমরা নিজেদের মন, পরিস্থিতি অথবা জনস্বার্থকে বিবেচনা করার অধিকার রাখি না।

    মানুষের খেয়াল-খুশী বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা থেকে নয়,বরং শরঈ দলীলসমূহের অর্থ বুঝতে হয় তার ভাষাগত নির্দেশনা থেকে। আমাদের ইচ্ছাগুলোকে শরঈ হুকুমের অনুসরণে সাজাতে হবে; কারণ বাধ্যতামূলকভাবে সেগুলো অনুসরণের মধ্য দিয়েই কেবল আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব।

    রাসূল (সা) এর তরীকাহকে বুঝা, এ তরীকাহ নিয়ে তিনি (সা) যেভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন তার পুরো আনুগত্য করা এবং তাঁর কাজের ধাপসমূহকে এবং প্রত্যেকটি ধাপে কৃত কাজগুলোকে সঠিকভাবে আদায় করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক।

    সুতরাং দল গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (ব্যক্তিগতভাবে লোকজনের সাথে দেখা করা, তাঁর উপর যারা ঈমান আনতেন তাঁদেরকে গোপনে একত্রে জড়ো করে তাঁদের চিন্তা—চেতনা গঠনের দিকে মনোযোগ দেয়া) করেছিলেন। এ সমস্ত কাজের ভিত্তিকে(আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কারণ শরঈ হুকুম হিসেবে তা আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। পাশাপাশি এ সমস্ত কাজ বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ আমাদেরকে বেছে নিতে হবে।

    একইভাবে জনমত গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণাদান, কুফরী চিন্তা এবং প্রথার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শতশত আয়াত নাযিল হওয়া, নাম সহকারে অথবা পরোক্ষ বর্ণনার মাধ্যমে কুরাইশ নেতাদেরকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করা এবং বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করা) করেছিলেন। এক্ষেত্রেও শরঈ হুকুম হিসেবে এসব কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদেরকে প্রথম পর্যায় অর্থাৎ দল গঠনের পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সাথে আরো নতুন কিছু কর্মকাণ্ড যোগ করতে হবে, যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা, ইসলামের ভিত্তিতে উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোরালো অবস্থান গ্রহণ, ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী কাফির শক্তিসমূহ এবং তাদের আস্থাভাজন দালাল শাসকদের ষড়যন্ত্রগুলোকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা প্রভৃতি। কারণ রাসূল (সা) ঠিক এরূপই করেছিলেন। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য তখন আমরা প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ বেছে নিব।

    প্রকৃতপক্ষে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের (শরঈ তরীকাহর) অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) যখন তাঁর এই তরীকাহর সূচনা করেছিলেন এবং এই তরীকাহর আলোকে কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন তখন তিনি অনেক অপমান, দুর্বলতা, সন্ত্রাস এবং ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবুও তিনি দৃঢ় সংকল্পের সাথে অবিরাম কাজ করে গিয়েছিলেন। রাসূল (সা) এর নিকট আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর হুকুম আসত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি কঠোর সংগ্রাম করতেন। কোন ব্যক্তি নবীর (সা) সঠিক পথের অনুসরণ থেকে অনেক দূরে সরে যায় যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর এই আয়াত সে শুনে

    “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়”
    (সূরা আল হিজর: ৯৪)

    যেখানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে (সা) নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তিনি  শুধুমাত্র আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং সেই ব্যক্তি দেখে যে রাসূল (সা) তাঁর নিজের ইচ্ছানুসারে নয় বরং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন; তারপরও সে বলে:“এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছুনা।” যদি এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না’ই হতো তবে রাসূল (সা) কেন সে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যেখানে তিনি (সা) কাফিরদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং তাদের উপাস্য দেব-দেবীদের,তাদের নেতৃবৃন্দের,তাদের প্রথার এবং তাদের চিন্তাসমূহের বিরোধিতা প্রকাশ্যে করেছিলেন যার প্রতিটা বিষয়ই কুরআনের নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। অথচ তিনি চাইলে তোষামোদের মাধ্যমে শাসকদের সন্তুষ্ট করতে পারতেন অথবা বিদ্যমান প্রথায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারতেন যার ফলে তাদের কাছ থেকে তিনি মর্যাদা লাভ করতে পারতেন। যদি তিনি (সা) তা করতেন তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি (সা) তাঁর রবের হুকুমের অবাধ্য হতেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কুরআন নাযিল হত এবং রাসূল (সা) নিজেকে তার মধ্যে সমর্পণ করতেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    “উঠুন এবং সতর্ক করুন!”
    (সূরা আল মুদ্দাসির:২)।

    তিনি (সা) নেতৃবৃন্দকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করলেন যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।

    “আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে!”
    (সূরা লাহাব : ১)

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে রাসূলের (সা) পক্ষাবলম্বন করলেন:

    “আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।”
    (সূরা আল কলম: ২)

    কুরআনে কাফিরদের মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে:

    “তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন তবে তারাও নমনীয় হবে।”
    (সূরা আল কলম: ৯)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং উম্মুল-কুরা অর্থাৎ মক্কা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লোকজনকে সতর্ক করেন। পাশাপাশি তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে (সা) এবং যাঁরা তাঁর (সা) সাথে ছিলেন তাঁদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দাওয়াতের কাজে অস্ত্র বহন না করতে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল এবং রাসূল (সা) সে অনুযায়ী আমল করছিলেন মাত্র। যে বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না তার জন্য কি এর চেয়ে বেশি প্রমাণের প্রয়োজন আছে?

    কেউ যদি বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না বরং ঐচ্ছিক তাহলে তার মানে দাঁড়াবে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে যা কিছু হুকুম করছিলেন রাসূল (সা) সম্পূর্ণরূপে অথবা আংশিকভাবে সেসব আয়াতের অবাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সেক্ষেত্রে যা কিছু নাযিল হচ্ছিল তিনি তাঁর অনুগত ছিলেন না। অতএব তখন বিষয়টি আমাদের জন্যও ঐচ্ছিক বলে বিবেচিত হবে যে, আমরা কি রাসূল(সা) এর তরীকাহ অনুসরণ করব নাকি অন্য কোন তরীকাহ? প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি যা রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ড এবং তাঁর সমাজ পরিবর্তনের পদ্ধতির সঠিক উপলদ্ধি থেকে অনেক দূরে।

  • নুসরাহ বা বস্তুগত সমর্থন অনুসন্ধান

    এবার আসা যাক পদ্ধতিগত নিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রসঙ্গে আর তা হল নুসরাহ বা বস্তুগত সমর্থন। এটা নিয়ে সাবধানতার সাথে বিশে­ষণ করে দেখা যাক আমাদের কী অনুসরণ করা উচিত, বিশেষ করে আমরা যখন দেখতে পাই যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করেন তারা নুসরাহর বিষয়টি অত্যন্ত কম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। তারা মনে করে এটি একটি side বিষয় বা এর ইসনাদ (বর্ণণার সূত্র) ততটা শক্তিশালী নয় বিধায় এটি গ্রহণ করবার প্রয়োজন নেই। তারা কেবল এখানেই থেমে থাকে না। বরং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সবগুলো সীরাতে সামান্য কিছু ব্যত্যয় ছাড়া সুস্পষ্ট বর্ণণা থাকা সত্তেও এ বিধান ও যারা এর অনুসরণ করে তাদের কটাক্ষ করা হয়। যদিও সীরাতের এসব লেখকগণের কারোরই বর্তমানে অস্তিত্বশীল দলগুলোর সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না।

    পবিত্র কুরআন তাদের সম্পর্কে বলেছে, 

    ‘সাহায্য সহায়তা দিয়েছে’
    (সূরা আনফাল:৭২)

    এবং তাদের আখ্যায়িত করেছে

    ‘আনসার (সাহায্যকারী)’
    (সূরা তাওবাহ: ১০০)

    এ বর্ণণা ছিল অত্যন্ত প্রশংসার ও উন্নত আঙ্কিকের, যার মাধ্যমে তাদের বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাত বিশে­ষণ করলে দেখতে পাব যে, তিনি ক্ষমতাধর নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন। একটির পর একটি গোত্রের কাছ থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা পাওয়া সত্তেও তিনি এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বারংবার নুসরাহ অনুসন্ধান করছিলেন এবং এ ব্যাপারে দমে যাননি। ইবনে সা’দ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, যতগুলো গোত্রের কাছে তিনি (সা) গিয়েছিলেন তার সংখ্যা পনের এর কম নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই অধ্যাবসায় থেকে আমরা যা পাই তা হল, নুসরাহ অনুসন্ধান করা ছিল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে নবী (সা) এর প্রতি একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা। 

    পবিত্র কোরআন এ সাহায্যকারীদের ‘আনসার’ বলে আখ্যা দিয়েছে, যা এর আরেকটি daleel। কোরআনে একাধিক জায়গায় তাদের প্রশংসা করা হয়েছে ও আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। ‘মুহাজেরীন’ (অভিবাসী) দের পরেই তাদের অবস্থান।

    নুসরাহ সম্পর্কিত বর্ণণা থেকে বুঝা যায় যে, এটি একটি শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা। সে কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    ‘হে অমুক ও অমুক গোত্র। আমি তোমাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর রাসূল (সা)। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন  ইবাদত করবার ও তার সাথে কাউকে শরীক না করবার…..আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে ও আস্থা রাখবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে সমর্থন প্রদান করবে যতক্ষণ না আমি আল্লাহ প্রদত্ত হুকুমসমূহ লোকদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছি।’
    (সীরাত ইবনে হিশাম)

    এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূলুল্লাহ (সা) পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি নির্দেশনা—যা শরীয় একটি হুকুম। আর এর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ style অনুসরণ করতে হবে। এটা এমন কোন ঠুনকো বিষয় নয় যে, চাইলেই পরিবর্তন করা যাবে। 

    এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) ও যাদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করা হয়েছিল তাদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল অথবা দ্বিতীয় আকাবার শপথে তার (সা) ও বাই’য়াত প্রদানকারীদের মধ্যকার যে সংলাপ হয়েছিল—তা থেকে বুঝা যায় নবী (সা) একটি লক্ষ্যে এ কাজে (নুসরাহ অনুসন্ধান) অগ্রসর হয়েছিলেন ও এ কাজের উপর দৃঢ় ছিলেন;  অর্থাৎ দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও এমন এক entity প্রতিষ্ঠার জন্য যা দ্বীনকে বাস্তবায়ন, সুরক্ষা প্রদান ও বিস্তারের কাজ করবে। সুতরাং কীভাবে আমরা এটিকে অবজ্ঞা করি যখন এর মাধ্যমে দাওয়াত একটি পর্যায় থেকে আরেকটি পর্যায়ে উন্নীত হয় ও একটি ভূমিতে একটি ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন ও প্রসারের সুযোগ সৃষ্টি করে। তাহলে এ অবজ্ঞা কার স্বার্থে?    

    • কুফফারগণ বুঝতে পেরেছিল যে, এ কাজের পেছনে রয়েছে একটি অঙ্গীকার ও দ্বীন বিজয়ের বীজ। একারণে আমরা দেখতে পাই বানু আমীর গোত্র বুঝতে পেরেছিল এ বিষয়টি ক্ষমতার সাথে বিজড়িত। মক্কার কুফফারগণের কাছে যখন দ্বিতীয় আকাবার খবর পৌঁছায় তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল। তারা বলেছিল, ’হে খাজরাজের লোকেরা! আমাদের কাছে খবর আছে যে, তোমরা আমাদের সাথীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছ এবং তাকে আমাদের থেকে নিয়ে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ করেছ।’ আমরা দেখতে পাই শয়তান সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলেছিল, ‘হে আখাসীবের (কুরাইশ) লোকেরা, তোমরা কি মুহম্মদ ও তার সাহাবাগন (মুশরিকদের দৃষ্টিতে দ্বীনত্যাগী) কে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একত্র হওয়া পছন্দ কর?’

    দ্বিতীয় আকাবার শপথের সময় আল বারা বলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ, সুতরাং আমরা বাই’আত প্রদান করলাম। আল্লাহর কসম, আমরা বংশ পরষ্পরায় নেতা থেকে নেতাতে যোদ্ধা ও অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ও সুসজ্জিত।’ আবুল হায়সামি ইবনুল তাইহান বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের অন্যদের লোকদেও (ইহুদী) সাথেও সম্পর্ক রয়েছে। যদি আমরা তাদের প্রতি কঠোর হই এবং সম্ভবত সে সময় আল্লাহ যদি আপনাকে বিজয়ী করেন তাহলে কি আপনি আমাদের প্রত্যাখান করে নিজের লোকদের কাছে ফিরে আসবেন?’ আসাদ বিন জুরারাহ বলেন, ‘আজ তাকে নেওয়া মানে সকল আরবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করা, তোমাদের মধ্যকার সম্ভ্রান্তগন কতল হওয়া এবং তলওয়ারেরে তিক্ত স্বাদ নেওয়া।

    এ বিষয়ে আল আব্বাস বিন উবাদা রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলেন, ‘সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে একজন সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যদি আপনার ইচ্ছা তাই হয় তাহলে আগামীকালই আমরা মীনাবাসীর বিরুদ্ধে অস্র ধারণ করতে প্রস্তত।’

    আল হায়সামীর প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তর দিলেন,

    ‘না, রক্ত তো রক্তই; আর রক্তের বদলা রক্তই। আমি তোমাদের জন্য আর তোমরাও আমার জন্য। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করব আর তোমরা যাদের সাথে সন্ধি চাইবে আমার সন্ধিও তাদের সাথেই।’

    আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে বলেন যে, তাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাহায্য, ক্ষমতাশালী লোক, সমরাস্ত্র ও সমর্থন দিয়ে সন্তুষ্ট করেছিলেন।

    ইবনে হিশাম রাসূলুল্লাহ (সা) এর নুসরাহ অনুসন্ধান নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ যখন তার নবী (সা) কে শক্তিশালী ও দ্বীনকে বুলন্দ করতে চাইলেন তখন আনসারদের মধ্য হতে এই লোকগুলোকে দিয়ে সহায়তা করলেন।’ 

    এসব মন্তব্য থেকে এই হুকুমের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় এবং একজন ইসলামের দিকে আহ্বান করার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে সে দ্বীনকে সমর্থন করল এরূপ ব্যাখ্যা বা নির্দেশনার ভ্রান্তি থেকে মুক্ত রাখে। বাই’আত, ইজাহার উদ দীন (দ্বীনের বিজয় কবুল করা); নাসর (সমর্থন), যুদ্ধ; বিশিষ্টজনেরা হত্যার সম্মুখীন হবে; তলোয়ারের আঘাতে তারা ঘায়েল হবে; এটা সব আরবের বিরুদ্ধে যাবে; তাদের এমনভাবে সুরক্ষা দেয়া উচিত যেভাবে নারী ও শিশুদের দেয়া হয়, এসব অভিব্যক্তি থেকে বুঝা যায় কীভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন। তিনি তা করেছিলেন সুরক্ষার খাতিরে এবং এমনকি প্রয়োজনে দ্বীন বহনের জন্য শক্তি প্রয়োগের নিমিত্তে ও এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবার জন্য যা দ্বীন ও এর অনুসারীদের রক্ষা করবে। সাথে সাথে এর হুকুমসমূহ বাস্তবায়ন ও বিশ্বের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেবার কাজ করবে।

    এ বাস্তবতায় একজন বুঝতে পারবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিম্নলিখিত কাজগুলো করেছিলেন:  

    • তিনি ব্যক্তির নিরাপত্তা ও দাওয়াতের সুরক্ষার জন্য সমর্থন অনুসন্ধান চেয়েছিলেন। এটা মুশরিকদের কাছ থেকে চাওয়া যায় যেমনিভাবে তার চাচা তাকে সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন অর্থাৎ তার উপর আপতিত যে কোন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এটা মু’তীম বিন আদি’র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা তিনি (সা) তায়েফ থেকে আদি’র সহায়তায় মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। সুরক্ষার বিষয়টিকে মুসলিমদের দ্বীনের সাথে আপোষ করবার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। দাওয়াতের গতি কিছুটা শ­থ করতে অনুরোধ করায় রাসূলুল্লাহ (সা) তার চাচাকে বলেছিলেন,

    আল্লাহর কসম, হে আমার চাচা! যদি তারা দাওয়াতকে পরিত্যাগ করবার জন্য আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তারপরেও আমি দ্বীনকে পরিত্যাগ করব না যতক্ষণ না আল্লাহ এ দ্বীনকে বিজয়ী করে বা এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি নিহত হই।’
    (সীরাত ইবনে হিশাম)

    • রাসূলুল্লাহ (সা) সাধারণত নেতাদের সাথে যোগাযোগ করতেন এই কামনায় যে, তারা ঈমান আনলে তাদের অনুসরণকারী সাধারণ লোকেরাও ঈমান আনবে। দাওয়াত প্রসারণকে সহজতর করা ও গ্রহযোগ্য করবার জন্য তিনি এটা করেছিলেন। এটা দাওয়াতের জনপ্রিয়তার ভিত্তি (কাই’দাহ শাবিয়্যাহ, popular base) তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল।
    • রাসূলুল্লাহ (সা) ক্ষমতাধর লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন এই শর্তে যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে, যে রকমটি ঘটেছিল আল আকাবার দ্বিতীয় শপথের ক্ষেত্রে। 

    নুসরাহ অনুসন্ধান করা হয়েছিল ক্ষমতাধর লোকদের কাছ থেকে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় এমনসব ক্ষমতাবান লোকদের কাছে নুসরাহ সন্ধান করা হয়েছিল যাদের রয়েছে নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তা। সেসময় নেতারাই শাসক ছিল; তারা আবার সেনাবাহিনীর প্রধানও ছিল এবং তাদের মতামতের উপর জনগন আস্থাশীল ছিল। 

    আজকের দিনে শাসকেরা বলপ্রয়োগে ক্ষমতায় আসীন হয় এবং তারা অজনপ্রিয়। আবার অনেকসময় জনপ্রিয়তা যা দেখা যায় তা প্রকৃত চিত্র নয়। এক্ষেত্রে আমাদের তাই করতে হবে যা রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন। সুতরাং আমরা সমাজে প্রভাবশালী এমনসব লোকদের সাথে যোগাযোগ করব যাদের মাধ্যমে তাদের অনুগামী অন্য লোকদের কাছে পৌঁছানো সহজতর হয়, যাতে করে জনপ্রিয়তার ভিত্তিমূল অর্জিত হয়। আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হবার লক্ষ্যে ক্ষমতাশালী লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করব, যেমন: সামরিক বাহিনীর অফিসার। তাছাড়া যখন দলের সদস্যদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায় তখন তাদের বন্ধু ও আত্নীয়স্বজনদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করা দোষণীয় নয় এই শর্তে যে এর ফলে দাওয়াকারীর ঈমান কোনরূপ চাপ বা আপোষের সম্মুখীন হবে না। এভাবে বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করতে হবে।       

    আর এটাই হল রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতি এবং আমরা তাকে অনুসরণ করতে এই পদ্ধতি গ্রহণে বাধ্য। অর্থাৎ আমরা নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করব: 

    ১. (দলের) শাবাবদের এমনভাবে প্রস্তত করা যাতে তাদের হাতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের হাতে মোহাজেরীনদের গড়ে তুলেছিলেন, যারা মক্কায় দাওয়াতের কাজ করেছিলেন এবং নবী (সা) এর সাথে ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং তারপরে উম্মাহকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

    ২. সাধারণ সচেতনতার ভিত্তিতে চিন্তার পক্ষে জনমত তৈরী করা অর্থাৎ এমন জনপ্রিয় ভিত্তি যা শাসনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুকে গ্রহণ করতে চায় না ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ামাত্র একে বরণ করে নেবার ইতিবাচক প্রবণতা দেখায়। আর এ অবস্থা পুরোপুরি মদীনার জনগনের মতই যখন তারা ইসলাম দাবী করেছিল এবং এটাকে সুরক্ষা দেবার জন্য এগিয়ে এসেছিল।

    ৩.ক্ষমতাধর লোকদের কাছ থেকে নুসরাহ অনুসন্ধান, যার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তগত করা যায়।

    যখন উপরোক্ত বিষয়গুলো সুসম্পাদিত হবে তখন আমরাও সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারব যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি শরী’য়াহ আকড়ে ধরবার কারণে বিশ্বাসীদের বিজয় দান করবেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    ‘মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।’
    (সূরা রূম: ৪৭)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    ‘আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহ্‌র সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, শক্তিধর।’
    (সূরা হজ্জ্ব: ৪০)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকতৃর্ত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়—ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না।’
    (সূরা নূর: ৫৫)