Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • রাসূলুল্লাহ (সা)—এর সময়ে ব্যক্তি তৈরির ধাপ

    যখন রাসূলুল্লাহ (সা) কে দাওযাতের কাজের দায়িত্ব দেয়া হল তখন তিনি লোকদের সেদিকে আহ্বান জানাতে আরম্ভ করলেন। কেউ কেউ তার আহ্বানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করল এবং কেউ কেউ অবিশ্বাস করল। যখন মক্কায় ইসলাম ব্যাপক পরিচিতি লাভ করল তখন সাধারণ জনতা এটা নিয়ে কথা বলা শুরু করল। রাসূলুল্লাহ (সা) শুরুতে তাদের বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎ করতেন। মক্কায় তিনি লোকদের প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতেন আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী,

    ‘হে চাদরাবৃত, উঠুন, সতর্ক করুন’।
    (সূরা মুদ্দাসির: ১-২)

    তিনি প্রথমে দলটিকে গোপনে সংঘটিত করেন। সাহাবাগন (রা) তখন লোকালয় থেকে দূরে উপত্যকায় গিয়ে সালাত আদায় করতেন। নতুন কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূলুল্লাহ (সা) তৎক্ষণাৎ কোরআন শিক্ষা দেয়ার জন্য কাউকে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি যয়নব বিনতে আল খাত্তাব ও তার স্বামী  সাইদকে কুরআন শিক্ষার জন্য খাব্বাব বিন আরাতকে তাদের বাড়িতে প্রেরণ করেন। এটি সেই হালাকা বা পাঠদানচক্র ছিল, যেখানে সাইয়্যুদনা ওমর (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি (সা) আল আরকামের বাড়িটিকে বিশ্বাসীদের কেন্দ্র ও নতুন দাওয়াতের জন্য বিদ্যায়তন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এ বাড়ীতে রাসূলুল্লাহ (সা) কুরআন শিক্ষা দিতেন ও সাহাবীদের মুখস্থ ও উপলদ্ধি করবার পরামর্শ দিতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ততক্ষণ পর্যন্ত সাহাবীদের গোপনে শিক্ষা দিয়ে আসছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত নিম্নের আয়াতটি নাজিল না হয়:

    ‘অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরওয়া করবেন না।’
    (সূরা আল হিজর: ৯৪)

    শুরুতে রাসূলুল্লাহ (সা) বয়স, সামাজিক পদমর্যাদা, নারী-পুরুষ, বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে দ্বীন গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহীদের কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশের আগে ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ, বয়সের প্রায় চলি­শজন নারী ও পুরুষ এ দলের সাথে যুক্ত হয়। তারা বিভিন্ন বয়সের হলেও অধিকাংশই ছিল তরুণ। ধনী, দরিদ্র, দূর্বল ও শক্তিশালী সব অংশের প্রতিনিধিত্ব ছিল।

    যখন চিন্তা বিকাশের ক্ষেত্রে সাহাবাগন (রা) পরিণত হল, তাদের মনস্বতত্ত (আকলিয়া) সুগঠিত হল অর্থাৎ সেটি ইসলামি হয়ে গেল এবং তাদের নাফসিয়াও ইসলামি হল ও রাসূলুল্লাহ (সা) যখন নিশ্চিত হলেন যে এ দলটি পুরো সমাজকে মোকাবেলা করবার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছে তখন তিনি আল্লাহর নির্দেশে প্রকাশ্যে আর্বিভূত হলেন।

    রাসূলুল্লাহ (সা) কে যেদিন দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল সেদিন থেকে ইসলামের দাওয়াত ছিল প্রকাশ্য। মক্কার লোকেরা জানত মুহম্মদ (সা) নতুন দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন এবং অনেক লোক ইসলামে দীক্ষিত হচ্ছে। তারা এটাও জানত যে, নবদীক্ষিত মুসলিমরা এই নতুন দ্বীনের সাথে তাদের সম্পর্ক ও এর প্রতি তাদের আনুগত্যের বিষয়টি গোপন করছে। এ তথ্য জানার অর্থ হল নতুন দাওয়াত ও দাওয়াত গ্রহণকারী নতুন লোকদের সম্পর্কে মক্কাবাসীর একধরনের অনুভূতি ছিল যদিও তারা জানত না কারা মিলিত হচ্ছে এবং কোথায় মিলিত হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর ইসলামের প্রতি দাওয়াত একেবারে নতুন ছিল না, বরং যা নতুন ছিল তা হল বিশ্বাসীদের নতুন এই দলটির প্রকাশ্যে আর্বিভাব।

    যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রতি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এ আয়াতটি নাজিল হল:

    ‘অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরওয়া করবেন না। বিদ্রূপকারীদের জন্যে আমি আপনার পক্ষ থেকে যথেষ্ট। যারা আল্লাহ্‌র সাথে অন্য উপাস্য সাব্যস্ত করে, অতিসত্বর তারা জেনে নেবে।’
    (সূরা আল হিজর: ৯৪-৯৬)

    রাসূলুল্লাহ (সা) প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতের ঘোষণা দিলেন এবং এর মাধ্যমে দাওয়াত ব্যক্তি পর্যায় থেকে গণপর্যায়ে উন্নীত হল। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা) আগ্রহী লোকদের গোপনে দাওয়াত করবার পর্যায় থেকে প্রকাশ্য ঘোষণার মাধ্যমে গনসংযোগ পর্যায়ে নিয়ে আসলেন। এটা ছিল ঈমান ও কুফরের মধ্যকার দ্বন্দের সূত্রপাত এবং সঠিক চিন্তা ও ভুল চিন্তার মধ্যকার সংঘাত। সুতরাং দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হল। এটি হল গনসংযোগ ও সংগ্রাম করবার পর্যায় এবং সব সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাড়ীতে পাথর ছুড়ে মারা হল। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল রাসূলুল্লাহ (সা) এর বাড়ীর পথে ময়লা ফেলে রাখত। নবী (সা) এগুলো পরিষ্কার করে সন্তুষ্ট থাকতেন। আবু জাহেল তাদের দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসগীর্কৃত ভেড়ার নাড়িভূড়ি রাসূলুল্লাহ (সা) এর বরাবর ছুড়ে মারে। কিন্তু এসব রাসূলুল্লাহ (সা) এর ধৈর্য এবং সহ্যক্ষমতাই বৃদ্ধি করছিল কেবল । মুসলমানদের সতর্ক করা হচ্ছিল ও ক্ষতিসাধন করা হচ্ছিল। দ্বীন গ্রহণ করবার কারণে প্রত্যেক গোত্রই মুসলিমদের অত্যাচার ও যন্ত্রনা দিতে ঝাপিয়ে পড়েছিল। এ অত্যাচারের শিকার হয়েছিল বিলাল, আম্মার, তার মা ও বাবা এবং আরও অনেকে যারা দূর্ভোগ লাভ ও অকথ্য নির্যাতনের পরও দৃঢ়তার উত্তম দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল। 

    শুরুতে কাফেররা (কুরাইশগণ) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কথা একজন নেহায়েত ধর্মপ্রচারক বা জ্ঞানী ব্যক্তির ভাবালুতা মনে করে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। তারা মনে করত লোকেরা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে অবশ্যই প্রত্যাবর্তন করবে। সেকারণে তারা মুহম্মদ (সা) কে দোষারোপ করেনি বা তার থেকে পালাতে চেষ্টা করেনি। যখন তাদের আড্ডার সামনে দিয়ে তিনি যেতেন তখন তারা বলত, ‘এই হল আবদুল মুত্তালিবের সন্তান যে আকাশ থেকে আগত বাণী প্রচার করে।’ রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের দেবতাদের কথা উল্লেখ করে এগুলোকে অসম্মান করলেন, তাদের চিন্তা ও পূর্বপুরুষদের পথভ্রষ্টতার জন্য দোষারোপ করার মাধ্যমে তিনি বিরোধিতা শুরু করলেন ও দ্বন্দে অবতীর্ণ  হলেন। অতপর তারা তাকে শত্রু হিসেবে ঘোষণা দিল এবং বিরোধিতায়, শত্রুতায় এবং সহিংসতায় তাঁর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হল।

    তার নবুয়্যতের দাবীকে মিথ্যে প্রতিপন্ন করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করবার চেষ্টা করা হয়েছে। সেকারণে তারা তার আলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপাত্নক উপায়ে অবগত হওয়ার চেষ্টা করল। তারা বলত, ‘তাহলে মুহম্মদ কেন সাফা ও মারওয়া স্বর্ণে রূপান্তরিত করে দিচ্ছে না?’ ‘কেন আকাশ থেকে একটি কিতাব নাজিল হচ্ছে না?’ “Why does Jibreel not appear in front of them?” “Why does he not give life to the dead?”  ধীরে ধীরে তারা আরও একগুয়ে হতে লাগল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর প্রভুর নির্দেশের প্রতি লোকদের আহ্বান অব্যাহত রাখল। কুরাইশরা তাঁকে দাওয়াত থেকে ফেরানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেছে। সাহাবীদের উপর অত্যাচার, প্রপাগান্ডা ও বয়কট এবং এ ধরনের আরও অপচেষ্টা রাসূলুল্লাহ (সা) কে আল্লাহর রজ্জুকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে সাহায্য করেছে এবং দাওয়াতের প্রতি প্রবল আগ্রহী করে তুলেছে।  

    রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর উপর অত্যাচারের খবর বিভিন্ন গোত্রের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এবং দাওয়াতের বিষয়টি সাধারণভাবে সবার জানা ছিল। পুরো উপদ্বীপ ইসলাম সম্পর্কে জানত এবং আরোহীরা বিভিন্ন জায়গায় ইসলাম নিয়ে কথা বলত। পবিত্র মাসসমূহ ছাড়া মুসলিমদের লোকদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ ছিল না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) কাবার কাছে এসে লোকদের আল্লাহর দ্বীনের প্রতি আহ্বান জানাতেন, তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) পক্ষ থেকে পুরষ্কারের সুসংবাদ জানাতেন এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) শাস্তি ও ক্রোধ থেকে সতর্ক করতেন।  

  • ৪র্থ অধ্যায়: যে ভাবে দারুল ইসলাম (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠা করতে হয়

    আমরা এখন শরীয়া কতৃক নির্ধারিত কর্মপদ্ধতি ও এর বিভিন্ন ধাপ নিয়ে আলোচনা করব যা দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।

    আমরা আলোচনাকে প্রধানত দু’টি ভাগে বিভক্ত করব –

    • একটি ভাগে থাকবে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পরিবর্তনের পদ্ধতি।
    • দ্বিতীয় ভাগে রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতিতে একটি দলের পরিবর্তনের কাজের পদ্ধতি আলোচিত হবে।
  • আজকের পদ্ধতিও হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পদ্ধতির অনুরূপ

    সুতরাং, দলটিকে রাসূলুল্লাহ (সা) সে কর্মকান্ডসমূহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে যেগুলো তাকে মদীনাতে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে গেছে। অবশ্যই পদ্ধতির বিভিন্ন ধাপসমূহ রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে নিতে হবে এবং দাওয়াতের নিয়মসমূহ সেসময়ের বাস্তবতা থেকে বুঝতে হবে। সুতরাং, দাওয়াত ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের সাথে এগিয়ে যাবে, শত প্রতিকূলতার মাঝে; কেউ এ প্রতিকূলতা থেকে পরিত্রাণ পাবে না। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর আয়াত নাজিল হচ্ছিল তখন ওয়ারাকা বিন নওফেল বলেছিলেন,

    তুমি মিথ্যুক হিসেবে সাব্যস্ত হবে, ক্ষতির শিকার হবে, পরবাসে যেতে বাধ্য হবে এবং যুদ্ধের মুখোমুখি হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘তারা কি আমাকে তাড়িয়ে দেবে?’ ওরাকা বললেন, ‘তোমার আগে এমন একজন নবীও আসেনি যারা নির্বাসনে যেতে বাধ্য হননি।’

    এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,   

    ‘আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যা বলা হয়েছে। তারা এতে সবর করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌছা পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারে না। নিশ্চয়ই আপনার কাছে পয়গম্বরদের কাহিনী পৌছেছে।’ (সূরা আনআম: ৩৪)

    আজকের পদ্ধতিও হবে রাসূলুল্লাহ (সা.) দেখানো সেই পদ্ধতি। তিনি (সা) মক্কায় দারুল কুফরে বসবাস করতেন। তিনি স্বতপ্রণোদিত হয়ে এমন কিছু কর্মসূচী হাতে নিয়েছিলেন যা তাকে মদীনাতে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। মক্কা থেকে মদীনাতে হিজরতের সময়টি ছিল দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে পরিণত হবার ক্রান্তিকাল।

    এখানে একটি প্রশ্ন উত্থিত হয় যে, তাহলে কী এখন দাওয়াত দু’টি পর্যায়ে পরিচালিত হবে, অর্থাৎ মক্কী ও মাদানী পযার্য় ?

    উত্তর হল এই যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় দাওয়াত বহন করা হয়েছিল দু’টি পর্যায়ে:

    ১. মক্কী পর্যায়ে বিশ্বাস ও সামান্য কিছু হুকুম রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর নাজিল হয়েছিল। আইনগতভাবে মুসলিমগন তখন যা নাজিল হত এর বাইরে আর কোন কিছুর জন্য দায়িত্বশীল ছিল না। রাসূলুল্লাহ (সা) কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল লোকদের ক্ষমা করে প্রজ্ঞা ও উত্তম উপায়ে আহ্বানের করবার জন্য। নিষেধ করা হয়েছিল যে কোনধরনের হিংসাত্নক কর্মকান্ড থেকে বিরত থেকে প্রতিকূল পরিবেশে ধৈর্যধারণ করবার জন্য।

    ২. মাদানী যুগে বা পর্যায়ে বিশ্বাস সম্পর্কিত বাকী আয়াত ও আহকাম সম্পর্কিত পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা সম্বলিত আয়াত নাজিল হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) কে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ইসলামি আইন বাস্তবায়নের, উকুবাত (শাস্তি) সম্বলিত হুকুমসমূহ প্রতিষ্ঠা করবার, জিহাদ ঘোষণা করবার, নতুন ভূমি জয় করবার এবং লোকদের দেখভাল করবার। এ অবস্থায় মুসলিমগন ইসলামের পূর্ণাঙ্গ অংশের জন্য দায়িত্বশীল হল।

    আজকে আমরা মক্কা ও মদীনার হুকুম নির্বিশেষে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। যে কোন আইনের অবহেলায় জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং তালাক, বিয়ে, ব্যবসা, জিহাদ, রোযা, হজ্জ্ব, শাস্তির বিধান, ভূমি, মালিকানা ইত্যাদির সাথে সম্পৃক্ত মদীনায় নাজিলকৃত আয়াত সমূহের ব্যাপারে মুসলিমদের জবাবদিহী করতে হবে। এমন আইন রয়েছে যেগুলো পালনের জন্য মুসলিমদের খলিফা অত্যাবশ্যকীয় এবং কোন মুসলিম ব্যক্তিগতভাবে তা গ্রহণের জন্য দায়িত্বশীল নয়, যেমন: শাস্তির বিধিবিধান, দাওয়াত প্রসারের জন্য আক্রমণাত্নক জিহাদ পরিচালনা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সাথে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা ও খিলাফতের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমসমূহ। আবার এমন হুকুম রয়েছে যেগুলো খলিফার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় এবং পরিস্থিতি নির্বিশেষে মুসলিমদের জন্য পালন করা বাধ্যতামূলক। এগুলো পালনে তারা ব্যর্থ হলে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে হোক সেটা মক্কা বা মদীনায় নাজিলকৃত; এবং ইসলাম সেসব মুসলমানদের জন্য হিজরতকে বাধ্যতামূলক করেছে যারা অবস্থানরত ভূমিতে ব্যক্তিপর্যায়ের হুকুমসমূহ পালন করতে পারছে না। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘যারা নিজের অনিষ্ট করে, ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে: আল্লাহ পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে? অতএব, এদের বাসস্থান হল জাহান্নাম এবং তা অত্যন্ত মন্দ স্থান। কিন্তু পুরুষ, নারী ও  শিশুদের মধ্যে যারা অসহায়, তারা কোন উপায় করতে পারে না এবং পথও জানে না।’ (সূরা নিসা: ৯৭-৯৮)

    সুতরাং আজকের সময়ে মক্কীযুগ বা মাদানীযুগ নিয়ে আলোচনা করা অবান্তর। দাওয়াতের ক্ষেত্রে আমরা কেবলমাত্র মক্কীযুগে রাসূলুল্লাহ (সা) যে ধাপগুলো অতিক্রম করেছেন সেটা গ্রহণ করব যা কিনা পরবর্তীতে ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পথকে সুগম করেছিল। আর ব্যক্তিগত হুকুম দারুল ইসলাম বা দারুর কুফর নির্বিশেষে সর্বাবস্থায় মুসলিমদের উপর বাধ্যতামূলক।

  • বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনই কর্মপদ্ধতি বিষয়ক হুকুমগুলোকে ঢেকে দিয়েছে

    বাস্তবতার নিরীখে আমরা দেখতে পাই যে, মুসলিমগন ব্যাপক বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের শিকার হয়েছে এবং পশ্চিমা কাফেররা এক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতার পরিচয় দিয়ে মুসলিমদের ইসলামের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। একারণে মুসলিমরা ইসলামকে পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে যা হল দ্বীনকে জীবন থেকে আলাদা করা। যা পশ্চিমাদের জন্য পরবতীর্ ধাপ নিয়ে কাজ করবার পথকে সুগম করেছে, অর্থাৎ তারা ইসলামী খিলাফতকে ধ্বংস করে মুসলিমদের জীবন থেকে ইসলামকে আলাদা করে ফেলল এবং ৫০ টিরও বেশী ক্ষুদ্র অকার্যকর স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত করে ফেলল। তারপর পশ্চিমারা প্রতিটি রাষ্ট্রে একজন করে তাদের প্রতি আজ্ঞাবহ শাসক বসাল যারা সেসব দেশের সম্পদকে পশ্চিমের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে পাহারা দিতে শুরু করল ও এমন ব্যবস্থা করল যাতে জনগন তাদের উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে। তারা এ জনগনকে পরিচালনা করবার জন্য নানা ব্যবস্থা প্রদান করল, প্রচারযন্ত্রেকে তাদের চিন্তা প্রসারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করল, ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে পশ্চিমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করবার জন্য পাঠ্যসূচী প্রণয়ন করে দিল। এসবকিছু মুসলিমদের উপরে পশ্চিমাদের আধিপত্যকে সুনিশ্চিত করল এবং বাস্তব জীবন থেকে ইসলামকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে সমর্থ হল।  

    এর ফলশ্রম্নতিতে মুসলিমগন আল হাক্ব বা সত্যের সাথে আল বাতিল বা মিথ্যাকে পার্থক্য করবার ক্ষেত্রে সন্দিহান হয়ে পড়লো। তাদের চিন্তা পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হল এবং তাদের জীবনব্যবস্থা পশ্চিমা মডেল অনুযায়ী গড়ে উঠল যেখানে বৈষয়িক স্বার্থ জীবনের প্রধান দৃষ্টিভঙ্গী হয়ে উঠল। তাদের আবেগ জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিক আবেগের মিশেলে তৈরি হল। একারণে মুসলিমদের পারস্পরিক বন্ধন ছিন্ন হল। মুসলিমগন নিজেদের কুফর ব্যবস্থার কাছে অর্পন করল এবং ইসলামি রাষ্ট্র না থাকার বিষয়টি মেনে নিল। ফলে ইসলাম কিছু ব্যক্তিসর্বস্ব শরীয়া নিয়মনীতিতে পরিণত হল। অন্যকথায় তখন মুসলিমদের জীবনযাত্রা পশ্চিমাদের আদলে গড়ে উঠল যেখানে জীবন হতে দ্বীন বিচ্ছিন্ন। একারণে দুনিয়ার প্রতি মোহ বৃদ্ধি পেল এবং জান্নাত লাভের আকাঙ্খা তিরোহিত হল।

    ফলস্বরূপ আল্লাহর বিধান (গজব) মুসলিমদের উপরে পতিত হল। দারিদ্রতা, জুলুম, বঞ্চণা, দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতা, হানিকর নৈতিক চরিত্র ও অসুস্থ সম্পর্ক এসবই মুসলিমদের জীবনকে দূর্বিসহ করে তুলল। 

    এই বাস্তবতায় সঠিক দলটিকে অসুস্থতার মূল কারণ ও এর উপসর্গসমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে জানতে হবে। যারা এই পার্থক্য করতে পারবে না তারা মনে করে যে, দারিদ্রতাই অসুখের মূল কারণ অথবা অসৎ নৈতিক চরিত্র, অজ্ঞতা ইত্যাদিও হতে পারে। তাই তারা সমস্যা সমাধানের জন্য যখন এগিয়ে আসবে তখন সেই সমাধান হবে আংশিক এবং তিনি রোগের মূল চিকিৎসা বাদ দিয়ে কেবল রোগের উপসর্গের চিকিৎসা করবেন। যদি কোন ব্যক্তি গভীরভাবে মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা উপলদ্ধি করবার চেষ্টা করেন, তাহলে দেখবেন যে, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণেই মুসলিদের জীবনে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের অনুপস্থিতি ঘটেছে। এই রাষ্ট্র না থাকায় তারা আজ অধপতিত, কাফেররা মুসলিমদের উপর আধিপত্য বিস্তার করেছে এবং অজ্ঞতা, দারিদ্র ও জুলুমের মত উপসর্গসমূহ ব্যাপকতা লাভ করেছে। ইসলামের পূণর্জাগরণ ঘটাতে হলে দলটিকে অনুধাবন করতে হবে যে, মুসলিমরা যে দারুল কুফরে এখন বসবাস করে সেটিকে দারুল ইসলামে পরিণত করতে হবে যেখানে মুসলিমগন কেবলমাত্র ইসলামি আইন কানুন দ্বারা শাসিত হবে। এছাড়াও বর্তমান অৈইসলামি সমাজকে ইসলামি সমাজে পরিণত করতে হবে যেখানের মানুষগুলো ইসলামি চিন্তায় বিশ্বাস করে এবং এই আবেগের উপর ভিত্তি করে একীভূত থাকে। ইসলাম দিয়ে তারা শাসন করে ও বিচারের জন্য ইসলামি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে। আর তখনই ইসলাম পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয়।  

    এভাবে লক্ষ্য সুস্পষ্ট হয় যা হল ইসলামি আক্বীদার উপর ভিত্তি করে দারুল ইসলাম তথা ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা যেখানে মুসলিমগন ইসলামি জীবনব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যার ভিত্তি হলো আল্লাহ কতৃক প্রদত্ত হুকুম পালন ও নিষেধাজ্ঞা বর্জন।

    দলটি তার লক্ষ্য নির্ধারণের পর এবার সে লক্ষ্য অর্জনের শরীয়া পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে যা মেনে দলটিকে অগ্রসর হতে হবে। এটা বুঝতে হলে আমাদের রাসূলুল্লাহ (সা) এর মক্কীযুগে ফিরে যেতে হবে যখন সেটা ছিল দারুল কুফর এবং রাসুল (স:) তার দাওয়াতকে জনসমক্ষে আনার জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। সেখান থেকেই দলটি তার পথের মাইলফলক, কর্মধারা ও এর বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে ধারণা নেবে। 

  • যারা ত্বারিকা (পদ্ধতি) কে উপেক্ষা করে

    যে জন্য আমরা ইসলামকে ফিকরা (চিন্তা) এবং ত্বারিকা (পদ্ধতি) এ দুয়ের সমষ্টি হিসেবে দেখাতে বাধ্য হচ্ছি তা হলো এই যে, এভাবে না দেখার কারণে মুসলিমরা অনেক শরীয়া বিধান বর্জন করছে এই বলে যে আমরা এগুলো অনুসরনে বাধ্য নই। তারা এই অজুহাতও দেখায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) অমুক কাজটি অমুক অবস্থা ও পরিস্থিতির কারণে সেসময় করেছিলেন। তাই, যদি সেগুলো আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তাহলে আমরা সেগুলো এখন গ্রহণ করব, অন্যথায় পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্য কোন আইন গ্রহণ করব। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই অনেকে ইসলামের পেনাল কোড পরিবর্তনের জন্য আহ্বান করে কেননা তারা মনে করে এগুলো বর্তমান সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তারা চাবুক মারা, পাথর মারা অথবা হাত কাটা এখন আর গ্রহণযোগ্য মনে করে না যেহেতু তাদের মতে এগুলো অনেক নিষ্ঠুর নিয়মকানুন ও পশ্চিমারা এসবকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা মনে করে কেননা এসব তাদের মনে করিয়ে দেয় তাদের ধর্মের কথা যেখানে মধ্যযুগে কঠিন ও নিষ্ঠুর সব নিয়মকানুনের মাধ্যমে মানুষের উপর জুলুম করা হত, সুতরাং এইসব আইন কানুনের কথা বললে মানুষ ইসলাম থেকেও দূরে সরে যাবে। তাই, এইসব আইন কানুনকে জেল ও জরিমানা দিয়ে প্রতিস্থাপন করলে কোন অসুবিধা নেই। একইভাবে আমরা দেখতে পাই কেউ কেউ জিহাদের অবলুপ্তির কথা বলে। ইসলাম প্রসারের জন্য যে জিহাদ এসেছিল তা বর্তমানে বিজ্ঞাপন ও প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে। বর্তমান সময় হল সংস্কৃতি বিনিময়ের। যেহেতু ইসলামে রয়েছে প্রামাণ্য দলিলাদি ও পরিষ্কার সত্য, সেহেতু কলম, টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে শক্তিপ্রয়োগের চেয়ে বেশী সুফল পাওয়া যাবে। আর শক্তি প্রয়োগ করা হলে হৃদয়সমূহ রুদ্ধ হয়ে যাবে এবং ঘৃণা ও অসৎ প্রবৃত্তি জাগ্রত হবে। কেউ কেউ জিজিয়াকে বিড়ম্বনাকর ও দ্রোহাত্নক বলে একে পরিত্যাগ করবার পক্ষে মতামত প্রদান করে। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন, ইসলামি আইনে খিলাফত ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক নয়। তারা এমন ফতওয়া প্রদান করেছে যা ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার অবলুপ্তি ঘটিয়ে আধুনিক শাসনপ্রথা গ্রহণের যৌক্তিকতাকে দৃঢ় করেছে। তাদের মতে ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা জরুরী , কিন্তু যে কাঠামো তা বাস্তবায়ন করে তা নয়, কেননা এই কাঠামো অনেক ধরনের হতে পারে।

    এভাবে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ব্যাপারে অনেক প্রস্তাবনা এসেছে, যেমন: ইসলামী বই লেখা, মসজিদ নির্মাণ করা, দাতব্য প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা, মিশনারী স্কুলের আদলে ইসলামি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, লোকদের নৈতিকতার দিকে আহ্বান করা, সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনা করা বা গনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকারের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা ইত্যাদি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষমতা গ্রহণের পদ্ধতি বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে।    

    এভাবে মুসলিমগন আজকে ফিকরাহর সাথে সম্পৃক্ত শরঈ নীতিমালা অস্পষ্ট ও দ্বান্দিক উপায়ে গ্রহণ করছে। সেকারণে তারা ত্বারীকার সাথে যুক্ত শরীয়া নিয়মকানুনকে অবজ্ঞা করছে। এসবই ঘটেছে একারণে যে, তারা পশ্চিম ধ্যানধারণার শিকার হয়ে ইসলামকে পরিষ্কার ও আইনগতভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে এবং ফলশ্রুতিতে ইসলামের প্রয়োগকে বুঝতে অসমর্থ হয়েছে।

    একারণে ফিকরাহ (চিন্তা) ও ত্বারীকা (পদ্ধতি) এর আলোচনা উঠে আসে যাতে করে মুসলিমগন গুরুত্বপূর্ণ শরীয়া নীতিমালাকে অবহেলা না করে যেগুলো পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও আমাদের বাস্তব জীবনে বাস্তবায়নের জন্য এসেছে। এইসব হুকুমকে অবজ্ঞা করার অর্থ হল ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকে পরিত্যাগ করা যা একটি অপরাধ এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে এর জন্য আমাদের জবাবদিহী করতে হবে।

    সেকারণে আমরা এই শ্রেনীবিন্যাসের মধ্যে এসেছি যে, ‘ইসলাম হল ফিকরাহ (চিন্তা) ও ত্বারীকা (পদ্ধতি) এর সমন্বিত রূপ।’ এর মাধ্যমে ইসলাম আরও স্পষ্ট হয়, বুঝতে সহজ ও প্রয়োগ সরলতর হয়। পূর্বে মুসলিমগন এ ধরনের শ্রেণীবিন্যাস করেছিল, যেমন: ইসলাম হল আক্বীদা ও ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, মাতু’মাত (খাদ্যদ্রব্য) এর নিয়ম, মালবুসাত (পরিচ্ছদ), আখলাক (নৈতিকতা) ও ইবাদত (উপাসনা)। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় এগুলো একসাথে সুবিন্যস্ত ছিলনা। তারপর ফকীহগন এগুলো সংগ্রহ ও সুবিন্যস্ত করেছেন এবং বইয়ের অধ্যায়ে স্থান দিয়েছেন যাতে করে মুসলিমরা খুব সহজে এগুলো অনুধাবন ও প্রয়োগ করতে পারে ইত্যাদি।

    এই আলোচনার অবতারণা একারণে করা হচ্ছে যাতে মুসলিমগন সুনির্দিষ্ট শরীয়া নিয়ম এমনভাবে গ্রহণ না করে যে প্রয়োজনে সেগুলো পরিবর্তিত, ও বিকৃত করে ফেলে এবং সবশেষে অবহেলা ও পরিত্যাগ করে।

    শরীয়া শাস্তিকে আধুনিক শাস্তি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা অনুমোদিত নয়, একইভাবে খিলাফতকে রিপাবলিকান পদ্ধতি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যাবে না। পশ্চিমা সিভিল আইন ইসলামি আইনের বদলে গ্রহণ করা যাবে না অথবা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষমতা গ্রহণের পদ্ধতির বদলে নিজস্ব আকল বা নিয়মকানুন মানা যাবে না যদিও এ ব্যাপারে অনেক ফতওয়া দেয়া হয়েছে।

    সুতরাং, যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা একটি শরীয়া হুকুম, সেহেতু এটি প্রতিষ্ঠা করবার পদ্ধতিও একইভাবে শরীয়া হুকুম। এর অর্থ হল পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট শরীয়ার অন্যান্য নিয়মকানুনের মত এ ব্যাপারে বিস্তারিত দলিলাদি রয়েছে এবং গ্রহণ করবার জন্য এবং তা থেকে বিচ্যুত না হওয়ার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

    কেউ যদি ফিকাহশাস্ত্রের বইগুলোর দিকে তাকায় তাহলে দেখতে পাবে যে, মুসলিম ফকীহগন সুনির্দিষ্ট অধ্যায়ে বিস্তারিতভাবে উকুবাত (শাস্তি), জিহাদ, ইমারাত বা রাষ্ট্র এবং অন্যান্য পদ্ধতিগত হুকুম আলোচনা করেছেন। প্রয়োজন হয়নি বিধায় কেবলমাত্র ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের পদ্ধতি সেখানে আলোচিত হয়নি। এর কারণ হল কালপরিক্রমায় মুসলিমগন এমন কোন পরিস্থিতিতে উপনীত হয়নি যখন একদিনের জন্যও ইসলামি রাষ্ট্র ছিল না। কিন্তু আজকে মুসলিমদের এটি প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি বের করা ও তা গ্রহণ করবার জন্য সব প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করা উচিত। পরিস্থিতি বিবেচনা করে খেয়ালখুশী বা প্রবৃত্তির ভিত্তিতে নয় বরং এটা হওয়া উচিত শরীয় দলিলাদির ভিত্তিতে।

    শরীয়া অনুসারে যখন পদ্ধতি আইনসম্মত হয়ে যাবে তখন আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর আদর্শ সেখানে প্রতিফলিত হবে। যখন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে তখন জবাবদিহীতা ও পরামর্শ প্রদানের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ আমীরসহ দলের যে কোন সদস্যকে তখন জবাবদিহী ও উপদেশ প্রদান করা যাবে। বিষয়সমূহ মানুষের মন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক অথবা জীবনের অভিজ্ঞতার দ্বারস্থ করা যাবে না। কর্মপদ্ধতি কখনওই পরীক্ষামূলক বিষয় হওয়া উচিত নয়, বরং এ ব্যাপারে শুধুমাত্র শরীয়ার দ্বারস্থ হওয়া উচিত।

    যে ব্যক্তি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করবে সে স্বভাবতই এটা করবার শরীয়া পদ্ধতি ও বিস্তারিত দলিল সম্পর্কে জানতে চাইবে। সে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে ও লোকদের সেদিকে আহ্বান করবে। এখন জানা দরকার কী সেই শরীয়া কর্মপদ্ধতি যা একজনকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণ করতে হবে? শরীয়া কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাবার আগে একজন মুসলিমকে অবশ্যই আজকে মুসলিমগন কী ধরনের বাস্তবতার মধ্যে বসবাস করছে তা সুনির্দিষ্ট ও গভীরতার সাথে উপলদ্ধি করতে হবে যাতে করে মৌলিক কার্যকারণ বুঝা যায়। এতে করে মৌলিক কার্যকারণের সাথে সংশ্লিষ্ট সব বিষয় সমাধান করা যাবে। সেকারণে এই সমাধান হবে মৌলিক। যখন বাস্তবতা অনুধাবনে আসবে ও মৌলিক কার্যকারণ বুঝা যাবে তখন শরীয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা সহজতর হবে। এর পরই দলটি তার শরীয়া কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হবে যা তাকে মেনে চলতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সুন্নাহকে অনুসরণ করতে হলে তার জীবনকালের কোন সময় বর্তমান পরিস্থিতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা নিকটবর্তী তা বিবেচনায় আনতে হবে।

  • ইসলামে রয়েছে ফিকরাহ (চিন্তা) এবং তরীকা (পদ্ধতি)

    যখন আমরা আল্লাহর হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য পদ্ধতির কথা চিন্তা করব তখন এ ব্যাপারে আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়া নিয়মকানুন অনুসন্ধান করব যাতে মুসলিমগন পরম করুণাময়ের কাছ থেকে পূর্ণ সচেতনতা, নির্দেশনা ও হেদায়েতের মাধ্যমে অগ্রসর হতে পারবে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “বলে দিন: এই আমার পথ। আমি আল্লাহ দিকে বুঝে সুঝে দাওয়াত দেই— আমি এবং আমার অনুসারীরা” (সূরা ইউসুফ: ১১২)

    এটা অবশ্যই বলা উচিত হবে না যে, ‘শরীয়ার প্রকৃতিই এমন যে, এটি যে কোন বিষয়ে একটি হুকুমকে আমাদের সম্মুখে পরিষ্কার ভাবে উপস্থাপন করে এবং তারপর তা কিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে তা লোকদের মন, পরিস্থিতি কিংবা, স্বার্থরক্ষার জন্য যে পদ্ধতি সুবিধাজনক হয় তার উপর ছেড়ে দেয়।’ এ থেকে বুঝা যেতে পারে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামী রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করাকে আমাদের জন্য ফরয করে দিয়েছেন। সুতরাং উম্মাহর প্রচেষ্টা ফরয বাস্তবায়নের দিকে থাকা উচিত। কিন্তু, তা বাস্তবায়নের পদ্ধতি মুসলমানদের উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে; এমন দাবী করা কোন অবস্থাতেই ঠিক নয়। কারণ, শরীয়া কোন কিছুই মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়নি এবং তার পছন্দের বশবতীর্ করেনি। যদি করত তবে তা হত শরীয়া মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক। এমন কোন শরীয়া নীতি নেই যেখানে একটি সমস্যার সমাধান উপস্থাপন করা হয়েছে কিন্তু, তা বাস্তবায়নের প্রয়োগযোগ্য পদ্ধতি পরিষ্কার ও পূর্ণাঙ্গভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং এইসব সমাধানসমূহ এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যাতে তা বাস্তবায়ন করা যায় ও জীবনের বাস্তবতায় প্রয়োগ করা যায়। সেকারণে ইসলামের হুকুমসমূহের যদি বাস্তব পদ্ধতি না থাকে তাহলে সেগুলো হবে কেবলমাত্র পুস্তকনির্ভর আদর্শ, লোকদের চিন্তা ও কল্পনার বিষয়বস্তু যেখানে লোকজন বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার মাধ্যমে প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করবে এবং এটা ফলদায়ক হবে না।  

    সেকারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার শরীয়ার মধ্যে লোকদের সমস্যার সমাধান দিয়েছেন। তিনি মানবজীবনের সাথে সম্পৃক্ত সব ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্য ব্যবস্থা প্রদান করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামী আক্বীদা এবং তা থেকে উদ্ভুত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের সব প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদা পূরণ করেছেন। সুতরাং ইসলাম স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এতেই থেমে থাকেননি, বরং তিনি শরীয় হুকুমগুলোকে বাস্তব ভাবে প্রয়োগ করবার জন্য এবং ইসলামকে অবাস্তব দর্শন বা মামুলী কিছু বিধিনিষেধ হিসেবে মনে না করবার জন্য অন্যান্য নীতিমালা নাজিল করেছেন। সেকারণে রাসূলুল্লাহ (সা) এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন না যিনি কেবলমাত্র স্রষ্টার বার্তাবাহক, বরং তিনি একজন শাসক ও আল্লাহর হুকুমসমূহের বাস্তব প্রয়োগকারীও ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) কেবলমাত্র এ বিষয়টি পরিষ্কার করেননি যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে শুধুমাত্র উপাসনা করতে হবে, বরং তিনি সেটা বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। তিনি লোকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানিয়েছেন এবং সাহাবীদের দলটিকে নিয়ে মক্কায় একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের জন্য কাজ করেছেন। অবশেষে তিনি ঈমানের ভিত্তিতে সে রাষ্ট্রটি বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছিলেন—যা ইসলামকে বাস্তবায়ন করেছিল এবং ইসলামি আক্বীদা ও ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যারা গিয়েছিল তাদের শাস্তি দিয়েছিল। তিনি (সা) দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছেন। একারণে আমাদের কাছে ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য নিয়মকানুন রয়েছে, কিভাবে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে সে ব্যাপারেও নির্দেশনা রয়েছে, রয়েছে উকুবাত (শাস্তি) এর হুকুম, জিহাদের হুকুম, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ প্রদানের জন্য নিয়মকানুন রয়েছে। এসবই বাস্তব পদ্ধতিগত শরীয়া হুকুম যা শরীয়া দিয়েছে আক্বীদা ও ব্যবস্থাকে রক্ষা করবার জন্য, পরিচালনার জন্য, প্রসারের নিমিত্তে কাজ করবার জন্য এবং এগুলোকে শাশ্বত রূপ দিতে আহ্বান জানাবার জন্য।  

    যদি এসব শরীয়া নীতিমালার মাধ্যমে আক্বীদা ও ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, সংরক্ষণ ও প্রসারের ব্যবস্থা না থাকত তাহলে ইসলাম হত অবরুদ্ধ এবং এটি আমাদের কাছে পৌছাত না এবং প্রসারও লাভ করত না। এটা খ্রীস্টান ধর্মের মত নিছক নীতিকথা সর্বস্ব হত। যেমন: “তোমরা ব্যভীচার করো না এবং প্রতিবেশীর স্ত্রীর প্রতি লোভ করো না”। ইসলাম তখন অন্যান্য ব্যবহারিক চিন্তা দ্বারা ধ্বংস হয়ে যেত বা সমূলে উৎপাটিত হত এবং এটা দিয়ে এমন কিছু করা যেত না যা এর আওতাধীন নয়। অন্যান্য চমকপ্রদ চিন্তার মত এটাও ইতিহাসের পাতায় পুস্তকের গন্ডীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত, যেমনি আছে প্লেটোর “The Republic”।

    উদাহরণস্বরূপ, যেহেতু যিনা ইসলামে হারাম, সেহেতু এর সাথে যুক্ত আরেকটি শরীয়া হুকুম এ অবৈধ সম্পর্ককে বাস্তবে প্রতিরোধ  করে, এবং তাহলো যিনাকারীকে শাস্তি প্রদানের হুকুম, আর এটি বাস্তবায়ন করবে ইসলামী রাষ্ট্র। সুতরাং শরীয়া যিনা সম্পর্কে হুকুম প্রদান করেছে, যেমন আল্লাহ বলেন,

    ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।’ (সূরা বনী ইসরাইল: ৩২) 

    তাছাড়া তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যিনাকারীর শাস্তি সম্পর্কেও সুস্পষ্ট হুকুম প্রদান করেন যখন তিনি বলেন,

    ‘ব্যভিচারিণী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ, তাদের প্রত্যেককে একশ করে বেত্রাঘাত কর।’ (সূরা আল নূর: ২)

    তাছাড়া শরীয়া এই হুকুম (শাস্তি) বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বশীল কতৃপক্ষও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যেমন রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘মুসলিমদের উপর হুদুদ বাস্তবায়ন যতটা সম্ভব কম করবার চেষ্টা করো। যদি তুমি তাকে কোনভাবে বাচিয়ে দিতে পার তবে তাই কর। একজন ইমামের পক্ষে শাস্তি প্রদানে ভুল করবার চেয়ে ক্ষমায় ভুল করা অনেক শ্রেয়।’ (তিরমিযী এবং আল হাকীম)

    সুতরাং শরীয়া ইমামকে এ দায়িত্ব প্রদান করেছে।

    একই কথা সালাতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। শরীয়া এটা পরিষ্কার করেছে যে, সালাত ফরজ এবং কেউ তা পরিত্যাগ করলে কী শাস্তি হবে। এক্ষেত্রেও এই শাস্তি বাস্তবায়নের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রকে দায়িত্ব দিয়েছে। এভাবে ইসলামের যে কোন হুকুমের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের পদ্ধতিও অন্য একটি হুকুমের মাধ্যমে পরিষ্কার করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইমামকেই এ ব্যাপারে কতৃর্ত্ব প্রদান করা হয়েছে।  

    পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই, ইসলামের রয়েছে একটি মৌলিক বিশ্বাস—যা হতে অন্যান্য শাখা বিশ্বাস ও চিন্তা সমূহ উৎসারিত হয়। তাছাড়া এমন চিন্তাসমূহ রয়েছে যা ভাল (খায়ের) ও মন্দকে (শর), হাসান (সুন্দর ও প্রশংসনীয়) এবং কুবহ (অসু্ন্দর ও নিন্দনীয়) কে, মারুফ ও মুনকারকে, হালাল (অনুমোদিত) ও হারামকে (নিষিদ্ধ) সুস্পষ্ট করে। এর ইবাদত (উপাসনা), মু’আমালাত (লেনদেন), মাতু’মাত (খাদ্যদ্রব্য), মালবুসাত (পরিচ্ছদ), আখলাক (নৈতিকতা)এর ব্যাপারে শরীয়া নীতিমালা রয়েছে। এগুলো সবই একটি ইসলামি ও মানবিক সমাজে বসবাসের জন্য অপরিহার্য। ইসলাম যে সমাজের দিকে মানুষকে আহ্বান করে তা সম্পর্কে এগুলো স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করে। এইসব বিশ্বাস, চিন্তুা ও নিয়মকানুনকে আল ফিকরাহ আল ইসলামিয়া (ইসলামি চিন্তা) বলা হয়।    

    শরীয়া নিয়মকানুন যা ইসলামী ফিকরাহকে পূর্ণতা দান করে ও তা প্রতিষ্ঠিত করে, রক্ষা করে ও প্রসার ঘটায় এগুলো হল: শাস্তির বিধান, জিহাদের বিধান, খিলাফতের বিধান, শরীয়ার যে বিধানের কারণে ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয় এবং মারুফ সম্পাদন ও মুনকার নিষিদ্ধ করবার বিধান। এসব সহায়ক শরীয়া বিধিবিধানকে আত তারিকা আল ইসলামিয়া (ইসলামি পদ্ধতি) বলা হয়।  

  • কীভাবে একটি রাজনৈতিক দল বা সংগঠন তৈরী করতে হয়

    একটি সংগঠন বা দল তার শরীয়া লক্ষ্য অর্জনের জন্য শরীয়ার কোন পদ্ধতিকে অনুসরণ করবে?

    এই লক্ষ্যকে উপলদ্ধিতে আনবার জন্য দলটি কী ধরনের শরীয়া নীতিমালা মেনে চলবে?

    দাওয়ার সংশ্লিষ্ট বিপুলসংখ্যক শরীয়া নিয়মের বেলায় দলটির উপলব্ধির ক্ষেত্রে মানদন্ড ও নীতিমালা কি হবে?

    শরীয়া নিয়মনীতিকে দলটি কীভাবে দেখে? এর উৎসসমূহ কী? দলটি কী মনে করে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলার একাধিক হুকুম আছে? শরীয়া যেসব বিষয়ে ইক্বতিলাফ বা অনৈক্য রয়েছে সেসব ব্যাপারে দলটির অবস্থান কী?

    চিন্তাকে দলটি কীভাবে দেখে এবং আক্বীদা ও শর’ই হুকুমসমূহ গ্রহণ করবার ক্ষেত্রে চিন্তার ভূমিকা কী?

    বাস্তবতার ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী কী? দলটি কী একে চিন্তার উৎস বা চিন্তার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে?

    লাভের (মাসলাহা) প্রশ্নে দলের অবস্থান কী এবং এটি কী শরীয়া না মনের ভিত্তিতে গৃহীত হয়?

    আমরা যখন দলটির লক্ষ্য, এর কাজ, কাজের পদ্ধতি, চিন্তার প্রক্রিয়া সংজ্ঞায়িত করতে পারব, তারপর খুব সহজেই এর কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠার ভিত্তি জানতে পারব। এরপর আমরা জানতে পারব যদি দলটি পথভ্রষ্ট বা লক্ষ্যচ্যূত হয় তখন কী সংশোধনমূলক পদক্ষেপ বা উপদেশ প্রদান করতে হবে।

    কাজ করবার শরীয়া পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমরা নিজেদের এমন একটি মূলনীতি মনে করিয়ে দেব যে বিষয়ে কারোই অজ্ঞ থাকা সঙ্গত নয়। তা হলো এই যে, মানুষের সম্পর্কে দুনিয়ার কোন ব্যপার হোক বা আখেরাতের কোন ব্যপার হোক অথবা তাদের  ভাল মন্দের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে যত বড় বা বিষয় হোক কোন ব্যাপারেই শরীয়া কোন হুকুম বাদ রাখেনি। সুতরাং মানুষের কাপড় পরিধান বা খোলা, মসজিদ বা বাড়ীতে প্রবেশ করা বা সেখান থেকে প্রস্থান করা, অন্যের সাথে আচরণ, বিয়ে করা, সালাত আদায়, সাওম পালন, কথা বলা বা কাজ করা সব বিষয়ে আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে হুকুম প্রদান করেছেন এবং কাজটি সম্পন্ন করবার পদ্ধতিও বাতলে দিয়েছেন। কাজটি কী বাধ্যতামূলক নাকি বর্জনীয় অথবা মুস্তাহাব বা উৎসাহব্যঞ্জক অথবা অপছন্দনীয় যা থেকে সে বিরত থাকবে নাকি এটি মুবাহ যে ব্যাপারে ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দ রয়েছে। এটা মানুষের সব কাজের সাথে সম্পৃক্ত। কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন বস্তু সম্পর্কেও ধারণা দেয়া হয়েছে যদিও এ ব্যাপারে রয়েছে ভিন্নরকমের দৃষ্টিভঙ্গী। আর তা হল সব বস্তুই হালাল সেগুলো ব্যতিত যাদের ব্যাপারে শরীয়ার সুনির্দিষ্ট আপত্তি রয়েছে। সুতরাং এমন কোন কাজ বা বস্তু নেই যেগুলোর বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কোন হুকুম নেই। এটা নিম্নোক্ত দুটি শরীয়া মূলনীতি অনুসারে,

    ‘কাজের ভিত্তি হল শরীয়া নীতিমালা’ এবং

    ‘বস্তু ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল যতক্ষণ পর্যন্ত এ ব্যাপারে শরীয়ার কোন আপত্তির ব্যাপারে দলিল না পাওয়া যায়।’

  • ইসলামের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক দলের উপস্থিতির অপরিহার্যতা

    উপরোক্ত আয়াতে একটি ইসলামী রাজনৈতিক দলের অপরিহার্যতা ছাড়া অন্য কোন কিছুর কথা বলা হয়নি। এটি দলের সাধারণ প্রকৃতি ও এর কাজ সম্পর্কেও ধারণা দিয়েছে। কোন মারুফাত প্রতিষ্ঠা এবং মুনকারাতের মূলোৎপাটিত করার জন্য কাজ করতে হবে তা স্থির করার বেলায় দলটি যে বাস্তবতায় কাজ করবে তার সাথে সম্পর্কযুক্ত যাকে বুঝে নিয়ে দলটি সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় শর’ঈ হুকুম গ্রহণ করবে যাতে করে এই বাস্তবতাকে পরিবর্তন করা যায়। সুতরাং এই আয়াতের সাথে মিল রেখে যে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং শাসককে জবাবদিহী করবার জন্য কাজ করছে—তার কাজ ও এর দৃষ্টিভঈী কাজের বাস্তবতার সাথে সম্পর্কযুক্ত হবে: তারা শাসকের কাজ পর্যবেক্ষণ করবে ও অবহেলার জন্য সত্যের প্রতি নিষ্ঠাবান ও সত্য দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকবার নিমিত্তে তাকে জবাবদিহী করবে, জনগনের মধ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টি করবে এবং শাসকের সাথে ইসলামের দাওয়াত প্রসারের জন্য কাজ করবে। আয়াতের ভিত্তিতে গড়ে উঠা দলটি, যখন কোন খলিফা বা খিলাফত নেই, তখন তার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সংশ্লিষ্ট সকল শরীয়া নির্দেশনা গ্রহণ করবে। শরীয়ার চাহিদা অনুসারে দলটি তার লক্ষ্য নির্ধারণ করবে এবং অত:পর যে পদ্ধতিতে এটি কাজ করবে ও যে চিন্তাকে ধারণ করবে তাকে সুনির্দিষ্ট করবে।

    সুতরাং রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুন একটি রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব অপরিহার্য। দলটির লক্ষ্য, এর কাজ, চিন্তা বিকাশের প্রক্রিয়া ইত্যাদি বাস্তবতার সাথে সম্পৃক্ত।

    যেহেতু এখন আমরা এমন এক সময়ে বাস করি যেখানে আল্লাহর আইন দিয়ে মুসলিমদের শাসন করবার জন্য কোন খলিফা নেই এবং যেসব ভূমিতে মুসলিমগন বসবাস করেন সেগুলো দারুল কুফর, যেসব ব্যবস্থা ও সম্পর্ক দিয়ে সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো ইসলামকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেনি, সমাজ অৈইসলামি; সেহেতু এমন একটি দলকে থাকতে হবে যাদের কাজ হবে ভূমিসমূহকে দারুল ইসলামে পরিণত করবে, সমাজকে ইসলামী করবে, এমন একটি অবস্থার প্রত্যাবর্তন ঘটাবে যেখানে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধিবিধান অনুসারে শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হবে অর্থাৎ ইসলামি জীবনব্যবস্থার পূণপ্রবর্তন হবে এবং বিশ্বের কাছে দাওয়াত পৌছে দেবে। আর এ লক্ষ্যকে উপলদ্ধি করেই দলটি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

  • দলটির বৈশিষ্ট্য

    খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজের মাধ্যমে যারা পূণার্ঙ্গ ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে এরকম একটি দল থাকা শরীয়াগতভাবে বাধ্যতামূলক। নীচের প্রসিদ্ধ আয়াতের মাধ্যমে এটা অনুধাবন করা যায়:

    ‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকবে যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।’ (সূরা আল ইমরান: ১০৪)

    উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলমানদের এটা সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা করে দিয়েছেন যে, তাদের মধ্যে কমপক্ষে একটি ইসলামী দল থাকতে হবে যারা মানবজাতিকে কল্যাণের দিকে ডাকবে ও সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজের ব্যাপারে নিষেধ করবে। 

    আদেশ সূচক নির্দেশটি হল:

    ‘এমন একটা দল থাকবে’ যা একটি বাধ্যবাধকতা, কারণ এটা কল্যাণের দিকে আহ্বান, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধের জন্য।

    ‘তোমাদের মধ্যে’ (মিনকুম) এখানে অংশগ্রহনকারী আদেশ (তাবিদ), শরঈ নির্দেশনা (ক্কারিনা) থাকবার কারণে যা বুঝায় যে, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ একটি সামষ্টিক বাধ্যবাধকতা। তবে এটা সবার জন্য প্রয়োগ হবে না। কেননা এর জন্য এ বিষয়ে জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক—যা সবার মধ্যে বিদ্যমান নেই। তাই ‘উম্মাহ’ শব্দটি মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দলের কথা বুঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে—পুরো উম্মাহর কথা বলা হয়নি। নির্দেশটি হল মুসলিমদের মধ্য হতে অবশ্যই একটি ইসলামী দল থাকতে হবে। উম্মাহ শব্দটিকে পবিত্র কুরআনে ‘এক দল লোক’ অর্থে বুঝানো হয়েছে। যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসা (আ) সম্পর্কে বলেন:

    ‘যখন তিনি মাদইয়ানের কুপের ধারে পৌঁছলেন, তখন কুপের কাছে একদল লোককে (উম্মাতান) পেলেন তারা জন্তুদেরকে পানি পান করানোর কাজে রত।’ (সূরা আল কাসাস: ২৩) 

    এখানে যে কোন দলের কথা বলা হয়নি বরং মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দলের কথা বলা হয়েছে যাদের এই আয়াতেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে খায়ের তথা ইসলামের দিকে আহ্বান জানাবার এবং সৎ কাজের (মারুফ) আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের (মুনকার) নিষেধের জন্য। এই বর্ণণার মধ্যে শাসকগনও রয়েছে। কারণ তারা সব মারুফ বা সব মুনকার কাজের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব প্রদান করেন। তারা হয় লোকদের ইসলাম বা শরীয়া দিয়ে শাসন করে অথবা এগুলোকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করে এবং তখন তাদের জবাবদিহীতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দলটি রাজনৈতিক হবে। কারণ এর কাজ শাসকদের [জবাবদিহীতার] সাথে সংশ্লিষ্ট হবে। এই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে শরীয়া প্রদত্ত পদ্ধতি অনুসারে যদি তা বিদ্যমান না থাকে এবং অতপর তাদের অবহেলা ও পথভ্রষ্টতার জন্য জবাবদিহী করতে হবে এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) অনেক হাদীসে এই ফরয ও শাসকদের মধ্যকার সম্পর্ক নিরূপন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, 

    “ঐ সত্ত্বার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অতি সত্বর আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাাহ্র শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা।” (আহমাদ ও তিরমিযী)

    তিনি (সা) আরও বলেন,

    ‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।’ (ইবনে মাজাহ ও নাসায়ী)

    তিনি (সা) আরও বলেন,

    “শহীদদের সর্দার হামযা এবং ঐ ব্যক্তিও, সে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাড়িয়ে উপদেশ দেওয়ার পর (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে ফেলে।” (হাকিম)

    এছাড়াও রাসূল (সা) বলেন,

    “তোমরা আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) কর। অন্যথায় তোমরা তাকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবেনা”

    এবং তিনি বললেন,

    ‘‘দ্বীন হল নসীহা বা উপদেশ প্রদান’। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ’কার প্রতি, ইয়া রাসূলুল্লাহ!’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর প্রতি, তার রাসূল, মুসলিম শাসকগন ও তার অধীনস্ত জনগনের প্রতি।’ (মুসলিম)

    একারণে দলটির কাজ হল কল্যাণের দিকে ডাকার পাশাপাশি সৎ কাজের আদেশ প্রদান করা ও অসৎ কাজে নিষেধ করা। এর একটি অংশ হল শাসকদের জবাবদিহীতার মুখোমুখি করা এবং শরীয়া অনুসারে শাসন করতে বাধ্য করা। শাসকের সাথে কাজটি সম্পৃক্ত হওয়ায় এটি একটি রাজনৈতিক কর্মকান্ড। সেকারণে এই আয়াতটি ইসলামের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের উপস্থিতির কথা বলে

    বাস্তবতা হল শরীয়ার নিয়মকানুনসমূহের অস্তিত্বের জন্য একজন খলিফার অপরিহার্যতা একটি শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। একারণে খিলাফত প্রতিষ্ঠার কাজটিও শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। আর এই কাজের জন্য একটি দল বা সংগঠনের প্রয়োজনীয়তাও একটি শরীয়া নির্ধারিত বাধ্যবাধকতা। কারণ শরীয়ার মূলনীতি হল, ‘ওয়াজিব পালনের জন্য যা করতে হয় তাও ওয়াজিব।’ (মা লা ইয়াতিম্মুল ওয়াজিব ইল্লা বিহী ফাহু’ওয়া ওয়াজিব)

    মূলত: উপরোক্ত মাদানী আয়াতে ইসলামের ভিত্তিতে গঠিত হওয়া একটি রাজনৈতিক দল থাকবার অপরিহার্যতার কথা বলা হয়েছে। এই আয়াত কাজের প্রকৃতিকেও সংজ্ঞায়িত করেছে: যা হল দাওয়াত, সৎ কাজের আদেশ প্রদান ও অসৎ কাজের নিষেধ করা। সে কারণে সুনির্দিষ্টকারী প্রত্যয় ‘আল’ শব্দ উল্লেখিত হয়েছে। ‘আল খায়ের’, ‘আল মারুফ’ এবং ‘আল মুনকার’ হল সুনির্দিষ্টকারী প্রত্যয় যার সার্বজনীনতা উপলদ্ধি করতে হবে। আর, প্রকাশভঙ্গি অনুসারে এই নির্দেশ প্রত্যেক ব্যক্তিকে বুঝিয়েছে এবং বাস্তবায়ন অল্প বা অনেক লোকের মাধ্যমে হতে পারে। সুতরাং এর মধ্যে ব্যক্তি, দল ও শাসকগন তথা সংশ্লিষ্ট সবাই অন্তর্ভুক্ত । অল্প না অনেক—এটি নির্ধারিত হবে শরীয়া এবং দল যা প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য কাজ করছে তা অনুসারে। ব্যক্তিগত ইচ্ছার অধীনে অস্পষ্টভাবে এটি হওয়া সম্ভব নয়। বরং এটি সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে, যদি এটি পরিত্যক্ত হয় তাহলে কাজ হওয়া উচিত সংশোধনমূলক, দলকে উপদেশ দিতে হবে যাতে তারা ভ্রান্তিকে স্পষ্ট দেখতে পায় ও পরিত্যাগ করে। সুতরাং এই বিষয়টিও অন্যান্য বিষয়ের মতই শরীয়া দ্বারা নিরূপিত। প্রবৃত্তি, স্বেচ্ছাচারীতা, পরিস্থিতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের উপর এটি ছেড়ে দেয়া হয়নি।  

  • ৩য় অধ্যায়: দাওয়াত বহনকারী একটি দল বর্তমান থাকার অপরিহার্যতা

    শরীয়াহ প্রদত্ত দায়িত্ব হিসেবে দলটি সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে। আমরা এখানে এমন কোন দলের দায়িত্ব নিয়ে আলোকপাত করব না যা আংশিকভাবে শরীয়াহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে, যেমন: দরিদ্র মুসলিমদের সাহায্য করবার জন্য গড়ে উঠা দাতব্য প্রতিষ্ঠান, নির্দেশনা ও উপদেশ দেবার জন্য গড়ে তোলা সংগঠন, মসজিদ নিমাের্ণর জন্য প্রতিষ্ঠান, কুরআন শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। বরং আমরা এমন একটি দল নিয়ে কথা বলব যারা পুরো দ্বীন বাস্তবায়নের দায়িত্ব কাধে তুলে নেবে। আর এটা করা হবে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যা মুসলিমদের জীবনে ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে। এর দায়িত্ব হবে শরীয়াহ প্রদত্ত সব মারুফাত বাস্তবায়ন করা ও সব মুনকারাতকে দূরীভূত করা। এই রাষ্ট্র তার ভেতরে ইসলামকে বাস্তবায়ন ও এর বাইরে পুরো বিশ্বে ইসলামকে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে ইসলামকে জীবনে বাস্তবায়ন করবে।

    ইসলামী রাষ্ট্রের রয়েছে শরীয়াহ প্রদত্ত বিশাল দায়িত্ব যা ইসলামি রাষ্ট্রের উপস্থিতি বাস্তবায়িত থাকলে হয় ও অনুপস্থিতি থাকলে বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিত্যক্ত হয়। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে নিয়োজিত দল গঠনের গুরুত্ব তার এই লক্ষ্যের কারণেই। ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে যদি কোন দল রত না হয় তাহলে মুসলিমগন আল্লাহ প্রদত্ত সব ইসলামী গুরুদায়িত্বকে অবহেলা করল এবং এর চেয়ে বড় কোন গুনাহের কাজ আর কিছু হতে পারে না।    

    যখন কোন মুসলিম ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে না তখন কোন যিনাকারী যখন যিনা করে, চোর চুরি করে, শাসক অত্যাচার করে, নারীরা অর্ধনগ্ন অবস্থায় রাস্তায় বের হয়, দূনীর্তি ব্যাপকতর হয়, জিহাদ বন্ধ হয়ে যায়, কাফেররা মুসলিমদের অত্যাচার করে, মুনকার বি¯তৃতি লাভ করে এবং মারুফ সংকীর্ণ হয়ে যায় তখন তার গোনাহ ঐ মুসলিম ব্যক্তিকেই বহন করতে হবে। এর কারণ হল মুসলিমরা আল্লাহ নির্দেশিত খোলাফায়ে রাশেদীন প্রতিষ্ঠার কাজকে অবহেলা করবার কারণে এই মুনাকারাতসমূহ ব্যাপকতা পেয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রত্যেকটি জিনিসকে তার নির্ধারিত জায়গায় স্থাপন করবে, মুসলিমদের জীবনে শরীয়াহকে বাস্তবায়ন করবে, ঈমানকে মুমিনদের হৃদয়ে প্রোথিত করবে এবং তাকওয়া ও ইহসানের ফলকে আবাদ করবে। সুতরাং এই সামষ্টিক কাজটি একটি বাধ্যবাধকতা—যার মাধ্যমে শোচনীয় অবস্থার পরিবর্তন ও এর সংশোধন নির্ভরশীল। এই বাধ্যবাধকতা উম্মাহকে তার পতনের অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলবে এবং পথের দিশাপ্রাপ্ত ও অন্য জাতির জন্য আলোর দিশারীরূপে হারানো গৌরব ও ক্ষমতা পুণরুদ্ধার করবে।

    আজকের এ করুণ পরিণতি থেকে উদ্ধার করবে যে বাধ্যবাধকতা, তার চেয়ে বড় পুরষ্কার মুসলিমদের জন্য আর কী হতে পারে? এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘আল্লাহ যখন তোমাদের দ্বারা কোন ব্যক্তিকে হেদায়াত দান করে তখন তা লাল উটের চেয়েও উত্তম।’ (আল বুখারী)

    মুসলিমদের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করা ও তাদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা, আর এর মাধ্যমে আল্লাহর প্রশান্তিদায়ক দ্বীনে প্রবেশের জন্য লোকদের জন্য সব দরজা উন্মুক্ত করার চেয়ে উত্তম কাজ আর কী হতে পারে। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এক ব্যক্তিকে জিহাদের সমতুল্য কোন কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, তখন তিনি বললেন, 

    ‘‘না, আমি এর সমতুল্য কোন কিছুকেই মনে করি না।’ তখন তিনি (সা) ঐ ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যখন একজন মুজাহিদ জিহাদের জন্য বেরিয়ে পড়ে তখন কি তুমি মসজিদে প্রবেশ করে ক্বিয়াম করতে থাক, কিন্তু ক্লান্ত হও না? রোজা রাখ কিন্তু ইফতার কর না?’ লোকটি তখন বলল, ‘এগুলো না করে কে থাকতে পারে?’’ (বুখারী) 

    রাসূল কী বলেননি,

    ‘সর্বোত্তম জিহাদ হল অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সত্য কথা বলা।’

    রাসূল (সা) কী একথা বলেননি,

    ‘শহীদদের সর্দার হামযা এবং সেই ব্যক্তি যে অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের জন্য দাড়াল এবং তাকে হত্যা করা হল।’ (আল হাকীম)

    মুসলিমদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে নীরব থেকে তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে দেয়া কোন মুসলিমের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি নীরব থাকে তাহলে সে তো হাদীসের বর্ণণার মত হতে পারবে না, যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন,

    ‘…. তারা একটি দেহের মত, যখন এর একটি অংশ ব্যাথা পায় তখন পুরো দেহ তাতে সাড়া দেয় ও জ্বর অনুভব করে ও নিঘূর্ম রাত কাটায়।’ (মুসলিম)

    ‘…. এমন একটি প্রাসাদ যেখানে একজন আরেকজনকে শক্তিশালী করে।’

    সুতরাং মুসলিমদের সামনে রয়েছে মহাপুরস্কার অথবা বিশাল পাপ উভয় সুযোগ। আর এটাই ইসলামে (কোন কিছু) ফরয হবার শর্ত। এটি অন্যান্য ফরযের মতই। যখন মুসলিমগন এটা পালন করবে তখন পুরষ্কারপ্রাপ্ত হবে এবং যখন পরিত্যাগ করবে তখন শাস্তিপ্রাপ্ত হবে।

    আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমরা কোন আংশিক সামষ্টিক ইবাদতের কথা বলছি না যা ইসলামের একটি বা দু’টি হুকুম বাস্তবায়ন করবে। বরং আমরা এমন একটি দাওয়াতের কথা বলছি যা ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে বাস্তবায়ন করবে।