তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
৯ম অধ্যায়: একাধিক ইসলামী দল বা আন্দোলন থাকা কি বৈধ?
এই বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে কোনো আন্দোলন বা দলের কর্মসূচীর জন্য একটি সামগ্রিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে আমরা চেষ্টা করেছি। বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আমরা একে ভারাক্রান্ত করে তুলিনি বরং যেসব মৌলিক বিষয় অবশ্যই মেনে চলতে হবে সেগুলো আমরা বর্ণনা করেছি এবং বিস্তারিত বর্ণনার বিষয়টি দল ও এর মুজতাহিদগণের উপর ছেড়ে দিয়েছি। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এমন অনেক কর্মপ্রচেষ্টা বিদ্যমান, যেগুলো কোনো সঠিক ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত না। অনেক দলের ক্ষেত্রে বলা যায় যে তারা শরীআ’হ’র প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ পূরণ করেনি। আংশিক কাজ করতে ইচ্ছুক এমন কিছু মুসলিমের সমষ্টি ছাড়া তারা আর কিছুই না। এমনকি তারা আংশিক সমস্যাসমূহের সমাধানও করতে পারে না এবং শরীয়াহ’র সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করতেও ব্যর্থ। ফলে তারা ইসলামকে এমনভাবে বহন করেনা যা ইসলামী উম্মাহর দৈনন্দিন জীবনে ইসলামকে ফিরিয়ে আনবে। এ ধরনের দল এতটা ব্যাপকমাত্রায় বিদ্যমান যে কোনো একটি দেশে হয়ত এরকম শতশত দল রয়েছে। তারা হাটবাজারের মতো গড়ে উঠছে যেখানে লোকজন তাদের শক্তি খরচ করছে এবং এভাবে তারা সঠিক দিকনির্দেশনা ও কর্মকাণ্ড থেকে লোকজনকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এরকম অসংখ্য দৃষ্টি আকর্ষণকারী দলের (সংস্থা) মধ্যে কেবলমাত্র কয়েকটি দলের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, তারা ইসলামের উদ্দেশ্যসমূহ এবং সেগুলো অর্জনের প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। যেসব দল আমাদের দৃষ্টিতে হাটবাজারের মতো গড়ে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে সেগুলো বাদ দিয়ে যদি আমরা সেসব বৃহৎ দলের কথা চিন্তা করি যারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং দায়িত্বপালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ তাহলে অবশ্যই একটি প্রশ্ন উত্থাপন করতে হয়; শরীয়াহ কি একটিমাত্র দলের নির্দেশ দেয়, যা প্রয়োজনীয় সকল বিষয়কে অনুধাবন করে এবং সেগুলোকে সম্পাদন করে? নাকি শরীয়াহ একাধিক দলের অনুমতি দেয় যারা শরীয়াহ’র নীতির অধীনে পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করবে? আংশিক কর্মকাণ্ড এবং পরিপূর্ণ ও সুষম কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কী? আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রচেষ্টাসমূহের ব্যাপারে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কী?
এক বা একাধিক ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে এবং বিপক্ষে প্রচুর মতামত তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় ইসলামী কর্মকাণ্ড একক হওয়া বাধ্যতামূলক, আবার অনেকে মনে করেন একাধিক দল থাকার বিষয়টি অনুমোদিত। যদি এই আলোচনার গৌণ বিষয়গুলোকে আমরা ভিত্তির আলোকে চিন্তা করি, তাহলে শরঈ প্রমাণাদি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মতামতকে আমরা পৃথকভাবে চিনতে পারব যেভাবে আমরা গম থেকে তুষকে পৃথকভাবে চিনি।
যারা মনে করেন ‘ইসলামী কর্মকাণ্ড একক হওয়া বাধ্যতামূলক’ তারা মূলত দুটো কারণে তা মনে করেন।
প্রথমত, ইসলামী কর্মকাণ্ডের ঐক্য একটি ফরয বিষয়।
দ্বিতীয়ত, ইসলামী কর্মকাণ্ডের ঐক্য একটি সাংগঠনিক অপরিহার্যতা।
১. নিম্নোক্ত দলীলসমূহের আলোকে তারা একে একটি শরঈ বাধ্যবাধকতা বলে মনে করেন:
ক) প্রকৃতপক্ষে সমস্ত মুসলিম এবং উম্মাহকে এক থাকতে হবে। কারণ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত এবং আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব (একমাত্র) আমারই ইবাদাত কর।”
(আল কুরআন ২১:৯২)তিনি আরো বলেন:
“এবং নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত এবং আমি তোমদের পালনকর্তা, অতএব আমাকেই ভয় কর।”
(আল কুরআন ২৩:৫২)“পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি দিক থেকে মুমিনগণ একটি দেহের মতো। যদি কোনো অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয় তাহলে পুরো দেহ নিদ্রাহীনতা ও জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ে।”
(বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ থেকে বর্ণিত)খ) প্রকৃতপক্ষে আমাদের ঐক্যের ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে এবং বিচ্ছিন্নতাকে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“আর তাদের মতো হয়োনা, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে তাদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর আযাব।”
(আল কুরআন ৩:১০৫)তিনি আরো বলেন:
“নিশ্চয়ই যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ড বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে, তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দিবেন যা কিছু তারা করে থাকে।”
(আল কুরআন ৬:১৫৯)গ) প্রকৃতপক্ষে আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন দলে বিভক্ত না থেকে জামাতবদ্ধ হয়ে থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, রাসূল (সা) বলেন;
“এমন একটা সময় আসবে যখন প্রচুর ভুল-ভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং কোনো বিষয়ে উম্মাহ একত্রিত হয়ে যাওয়ার পর যদি অন্য কেউ তাদেরকে বিভক্ত করতে আসে তাহলে তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত কর; সে যেই হোকনা কেন।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত] রাসূল (সা) আরো বলেন:“রাসূল (সা) আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা তাকে বাইআত দিলাম। তিনি আমাদের কাছে এই মর্মে বাইআত দিতে বললেন যে আমরা দুঃখ-কষ্টের দিনে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কথা শুনব ও তাঁকে মান্য করব এবং আমরা কর্তৃত্বশীল লোকজনের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাদে লিপ্ত হবনা যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এমন প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত হচ্ছে যার ব্যাপারে আমাদের নিকট আল্লাহর তরফ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেন:
“জামাআত হচ্ছে রহমত এবং বিভক্তি হচ্ছে আযাব।”
[ইমাম আহমদ থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেন:
“জামাআতের সাথে আছে আল্লাহর হাত।”
[তিরিমিযি এবং নাসাঈ হতে বর্ণিত]২. সাংগঠনিক এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে ঐক্যবদ্ধ থাকার বহুবিধ প্রয়োজন রয়েছে:
ক) ইসলামী পরিবর্তন একটি কঠিন কাজ, কারণ বিদ্যমান জাহেলি শক্তিগুলোকে তাদের অবস্থান থেকে উপড়ে ফেলা কোনো সহজ ব্যাপার না। সামাজিক চিন্তা, কর্মকাণ্ড এবং ব্যবস্থার উপরে ইসলামের কর্তৃত্বের জন্য বিভিন্ন দলকে বিচ্ছিন্ন না রেখে একটি একক সত্তায় রূপান্তরিত করতে আমরা বাধ্য।
খ) ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দুষ্কর্মের আতাঁত আমাদেরকে বাধ্য করে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়ে তাদের মুখোমুখী হতে। যেহেতু, বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন শক্তিসমূহ পরস্পরকে সাহায্য করছে এবং নিজেদের সামরিক শক্তিকে এক করছে সেহেতু তাদের সহজ শিকারে পরিণত না হওয়ার জন্য এবং বিচ্ছিন্ন ও পদদলিত না হওয়ার জন্য মুসলিম বিশ্বের ইসলামী শক্তিগুলোকে ঐক্যের দিকে ডাকাটা কি অধিক কল্যাণকর হবেনা?
আদর্শিকভাবে যদি ইসলামী কর্মকাণ্ডসমূহের ঐক্য একটি শরঈ বাধ্যবাধকতা না হতো তাহলেও তা এজন্য বাধ্যতামূলক হতো যাতে ইসলামের ভবিষ্যৎ রক্ষা পায় এবং দমন, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ইসলামী কর্মকাণ্ড রক্ষা পায়।
গ) মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান বিভিন্ন ইসলামবিদ্বেষী স্থানীয় শক্তি ও দলসমূহ শক্তিশালী জোট গঠন করছে। এসমস্ত জোট সমস্ত পর্যায়ে গবেষণা, পর্যবেক্ষণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রস্তুতি গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। এই বাস্তবতার আলোকে চিন্তা করলে কোন বিষয়টি মুসলিমদের জন্য অধিক যুক্তসঙ্গত হবে ইসলামী শক্তিসমূহের খণ্ড-বিখণ্ড ও বিক্ষিপ্ত থাকা? নাকি তাদের ঐক্য ও সংহতিকে নষ্ট করতে চায় যেসব বিষয় ও কারণ সেগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া?
এসব বিষয় এবং এরকম অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করলে এমন একটি বৈশ্বিক আন্দোলন যা সমস্ত পর্যায়ে চিন্তা, সাংগঠনিক কার্যক্রম, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে তা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনোরকম সন্দেহ, অনিচ্ছা বা দ্বিধার বিন্দুমাত্র অবকাশ থাকেনা।
এসমস্ত প্রমাণ ও যুক্তির আলোকেই এরূপ দাবি করা হয়ে থাকে যে, ইসলামী কর্মকাণ্ডের ঐক্য একটি বাধ্যবাধকতা এবং বিভিন্ন দলে বিভক্তি হওয়া নিষিদ্ধ। এসব প্রমাণাদি বাস্তবতার আলোকে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা বোঝার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই ইসলামের নির্ধারিত ইজতিহাদের পদ্ধতি অনুযায়ী অগ্রসর হতে হবে।
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, মুসলিমরা বর্তমানে যে বাস্তবতায় বসবাস করছে তা হচ্ছে দারুল কুফর এবং একে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত করা মুসলিমদের জন্য ফরয। আমরা এ-ও আলোচনা করেছি যে এই বিষয়টি উপলব্ধি করে এমন একটি দল থাকা অপরিহার্য যা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে রাসূল (সা)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।
এই মতটিকে যারা ধারণ করে তাদের উপস্থাপিত প্রমাণাদির ব্যাপারে বিস্তারিত শরঈ আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা সেই দলটির বাস্তবতা আলোচনা করতে চাই যা এই কাজে জড়িত হবে। এটি কি পুরো মুসলিম সম্প্রদায় নাকি মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশবিশেষ? অন্যভাবে বলতে গেলে এটি কি মুসলিমদের মধ্য থেকে বের হওয়া একটি দল?
বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা বলে থাকি যে, আল্লাহ মুসলিমদের উপরে বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন যেগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে আমরা বাধ্য। এসব বাধ্যবাধকতাসমূহের মধ্যে কিছু হচ্ছে ব্যক্তিগত যেগুলো পালন করতে প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তিগতভাবে বাধ্য এবং এগুলো পালন না করার আগ পর্যন্ত কোনো মুসলিম অপরাধ থেকে মুক্ত নয়। অন্যকিছু বাধ্যবাধকতা আছে যেগুলো পালন করার জন্য দলের প্রয়োজন। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দ্বিতীয় ধরনের বাধ্যবাধকতা। আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়াহ প্রতিষ্ঠিত করা এমন একটি ফরয যা কোনো ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে করা সম্ভব না বরং এর জন্য প্রয়োজন লোকজনের একত্রিত হওয়া এবং গণমানুষের ইচ্ছাকে এক করা।
নিম্নোক্ত মূলনীতি অনুযায়ী বিষয়টি বুঝা যায়:
“কোনো ওয়াজিব পালনের জন্য যা প্রয়োজন তা নিজেও ওয়াজিব।”
ফরযে কিফায়াসমূহের মধ্যে এটি অন্যতম একটি ফরয এবং একে অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে ব্যক্তি একে অবহেলা করবে সে বড় ধরনের গোনাহে লিপ্ত হবে। যাইহোক, বিষয়টির প্রকৃতিই এরকম যে একে প্রতিষ্ঠার জন্য সমস্ত মুসলিমের প্রয়োজন নেই বরং মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দল যারা এ কাজটি আদায়ের মতো সামর্থ্য রাখে তারাই এ কাজের জন্য পর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হবে। এই ফরযটি আদায়ের লক্ষ্যে যে দলটি কাজ করবে তার সদস্যরা গোনাহ থেকে মুক্ত থাকলেও যারা কাজটি আদায় করবেনা তারা গোনাহ থেকে মুক্ত থাকবে না।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে মুসলিমদের মধ্য থেকে দলটি বের হয়েছে সেই উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য অথার্ৎ খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য দলটি সংগ্রাম করবে এবং এজন্য দলটিকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রহণকৃত প্রয়োজনীয় চিন্তা ও আহাকামের ভুল বা যথার্থতার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
পুরো মুসলিম উম্মাহ এই দলটির অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ এমন অনেক মুসলিম আছে যারা এর সাথে সম্পৃক্ত না। হতে পারে, যে তারা অন্যকোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত (একাধিক দলের বৈধতা সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে আলোচনা করব) অথবা কোনো দলের সাথেই সম্পৃক্ত না।
এই দলটি খলিফা নয় এবং খলিফার স্থলাভিষিক্ত হতেও পারে না। খলিফার জন্য নির্ধারিত আহকাম দলটির জন্য প্রযোজ্য না এবং খলিফার হাতে ন্যস্ত দায়িত্বসমূহ বাস্তবাবয়ন করার অধিকারও নেই দলটির।
বরং এটি কেবলমাত্র মুসলিমদের মধ্য থেকে বের হওয়া একটি দল এবং সামগ্রিকভাবে পুরো ইসলামী উম্মত হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায় (জামা’আতুল মুসলিমীন) যার অন্তভূর্ক্ত হচ্ছে বিভিন্ন দল, ব্যক্তিবর্গ এবং খলিফা।
ইসলামী উম্মত বলতে বোঝানো হয় মুসলিম সম্প্রদায়কে যারা শরঈ হুকুমের মাধ্যমে নয় বরং ইসলামী আক্বীদাহ’র মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ। মুসলিমরা ফুরু (মৌলিক হুকুমের সাথে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক হুকুমসমূহ) এর ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করতে পারে এবং এতে তাদের ভ্রাতৃত্ববোধে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। আহকাম যদি ভ্রাতৃত্ববোধের কারণ হতো তাহলে সেক্ষেত্রে কোনো মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই হতো না। ব্যক্তিগতভাবে অথবা দলীয়ভাবে যদি মুসলিমরা ইসলামী আক্বীদাহ’কে পরিত্যাগ করে তাহলে তাদেরকে ইসলামী উম্মতের বাইরের লোক হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং তাদের পরিণতি হবে আগুন। রাসূল (সা)-এর হাদিসে এই বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে:
“যে ব্যক্তি দ্বীন পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।” [বুখারী ও মুসলিম থেকে বর্ণিত] অর্থাৎ এখানে মুসলিম সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন বলে বোঝানো হয়েছে। রাসূল (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদিসটিতেও একই বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে;
“আমার উম্মত ৭৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। একটি দল বাদে বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে।” তারা জিজ্ঞাসা করলেন: “সেই দলটি কারা, ইয়া রাসূলুল্লাহ?” তিনি (সা) বললেন: “আমি এবং আমরা সাহাবারা যার উপরে আছি (তার উপরে যারা থাকবে)।”
[আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ এবং ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]মুসলিম সম্প্রদায় হচ্ছে ইসলামী উম্মত যারা অন্যসব লোকের বাইরে আলাদা একটি উম্মত। মুসলিমদের রক্ত এবং সম্পদ হচ্ছে একটি একক বিষয়। জ্ঞান ও ইজতিহাদের দিক থেকে এদের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও এরা পরস্পর সহাবস্থান করে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে একটি একক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
অতএব, জামাআতুল মুসলিমীন (মুসলিম সম্প্রদায়) এবং মুসলিমদের মধ্যকার একটি দলের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট দলীলগুলোকে মুসলিমদের মধ্যকার কোনো দলের উপর আরোপ করা বিভ্রান্তিকর।
এজন্যই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত এবং আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব কেবলমাত্র আমারই ইবাদাত কর।”
(আল কুরআন ২১:৯২)তিনি আরো বলেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমাকেই ভয় করো।”
(আল কুরআন ২৩:৫২)রাসূল (সা) বলেন:
“পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিতে মুমিনগণ একটি দেহের মতো। যদি শরীরের কোনো অংশ ব্যথা পায় তবে পুরো দেহই নিদ্রাহীনতা এবং জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ে।”
[বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ থেকে বর্ণিত]এসমস্ত আয়াতে মুসলিমদের মধ্যকার কোনো দলকে বুঝানো হয়নি বরং পুরো ইসলামী উম্মতকে বোঝানো হয়েছে। যদি কোনো দল মনে করে যে তার কর্মকাণ্ড হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর কর্মকাণ্ড তাহলে সেটা হবে তার অদ্ভূত চিন্তা এবং স্পষ্ট বিভ্রান্তি; ফলশ্রম্নতিতে যে তার সাথে কাজ করবেনা তাকে সে নিজের ভাই বলে গণ্য করবে না; বরং দ্বীন পরিত্যাগকারী, মুসলিমদের জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন এবং জাহান্নামের পথযাত্রী বলে মনে করবে এবং এসব চিন্তা মোটেই সামান্য কোনো ব্যাপার না।
একাধিক দলের উপস্থিতিকে যারা নিষিদ্ধ বলে মনে করে তারা মূলত নিচের দলীলগুলোকে উপস্থাপন করে থাকে:
“আর তাদের মতো হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা শুরু করেছে তাদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর আযাব।”
(আল কুরআন ৩:১০৫)“নিশ্চয়ই যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দিবেন যা কিছু তারা করে থাকে।”
(আল কুরআন ৬:১৫৯)এই দলীলগুলোও সেই বাস্তবতায় প্রয়োগ করা হয়নি যার জন্য এগুলো এসেছে।
দল সম্পর্কিত বিষয়ে এই আয়াত দুটোর কিছুই বলার নেই। শরঈ আহকামের সাথে এই আয়াতদ্বয়ের কোনো সম্পর্ক নেই বরং সম্পর্ক হচ্ছে আক্বীদাহ’র সাথে। ‘তাদের মতো হয়োনা যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা শুরু করেছে’এর তাফসীরে বলা হয়েছে বিশুদ্ধ আক্বীদাহ ও স্পষ্ট প্রমাণের কথা। এখানে ইহুদী এবং খ্রিস্টানদেরকে বোঝানো হয়েছে:
“তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।” ইমাম আল বাইদাবী এই আয়াত সম্পর্কে বলেন:
‘তাদের মতো হয়োনা যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।’ এর অর্থ হচ্ছে ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের মতো যারা তাওহীদের ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছিল………………………………………………………… যেমনটি বলা হয়েছে
‘স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার’ পরেও।’ সত্যকে উপস্থাপনকারী নিদর্শন ও প্রমাণের ব্যাপারে অবশ্যই একমত থাকতে হবে। এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট যে উসূল (বিশ্বাস) এর ক্ষেত্রে বিভক্তি নিষিদ্ধ, ফুরু (আহকাম)-এর ক্ষেত্রে নয়; যা রাসূল (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদীসটি থেকে বুঝা যাচ্ছে:
“কেউ যদি সঠিক ইজতিহাদ করে তাহলে সে দুটো সওয়াব পাবে আর কেউ যদি ভুল করে তাহলে সে একটি সওয়াব পাবে।” এবং
‘তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব’ এই আয়াতটি হচ্ছে তাদের জন্য ভীতিপ্রদর্শন যারা বিভক্ত হয়েছে এবং এদেরকে যারা অনুসরণ করে তাদের জন্য সতর্কবাণী।”
অন্যভাবে বলতে গেলে, যে দলটি পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে সে অন্যান্য দল থেকে শরঈ আহকামের দিক থেকে স্বতন্ত্র। এটি অন্যদের থেকে পৃথক এবং অন্যরা এর থেকে পৃথক কেবলমাত্র শরঈ আহকামের দিক থেকে। এটি মুসলিমদের একটি দল যার আক্বীদাহ হচ্ছে ইসলামি। অন্যান্যদের সাথে এর পার্থক্য আক্বীদাহ’র ক্ষেত্রে নয় বরং আহকামের ক্ষেত্রে। অতএব, এই আয়াত অনুযায়ী একজন লোক তখনই দ্বীন থেকে বের হয়ে যায় যখন সে মুসলিমদের আক্বীদাহ’র বিরুদ্ধে চলে যায় কিন্তু আহকামের ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করলে তা হবেনা। অতএব, ইজতিহাদের ভিন্নতার ব্যাপারে এ আয়াতের কিছুই বলার নেই।
কেউ যদি বলে যে, আয়াতটি আম (সার্বজনীন) এবং এজন্য ‘সুনির্দিষ্ট কারণের পরিবর্তে অর্থের সার্বজনীনতাকে বিবেচনা করতে হবে’, তাহলে জবাবে আমরা বলব ‘সার্বজনীনতা কখনো সে বিষয়ের বাইরে যায়না যে বিষয়ের জন্য আয়াতটি নাযিল হয়েছে।’ কেবলমাত্র ভিন্ন আক্বীদাহ’র ব্যাপারেই আয়াতটির সার্বজনীনতা প্রযোজ্য। এটি আলোচনার একটি দিক। অন্য একটি দিক হচ্ছে তাদের এই মত সেসব হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক যেগুলো ইজতিহাদী মতভেদকে অনুমোদন করে। তৃতীয় দিকটি হচ্ছে তাদের এই মতের অর্থ হবে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মানে দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
দ্বিতীয় আয়াত
“নিশ্চয়ই যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ড—বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দিবেন যা কিছু তারা করে থাকে।” (আল কুরআন ৬:১৫৯) এর ব্যাপারে ইবনে কাছীর বর্ণনা করেন; [মুজাহিদ, কাতাদাহ, আদ—দাহ্হাক এবং আস সুদ্দী বলেন: ‘আয়াতটি ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।’ আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা) তাকে বলেছেন:
“তারা বিদআতের অনুসারী এবং তারা হচ্ছে শিয়া (সম্প্রদায়)” অর্থাৎ এসব সম্প্রদায় হচ্ছে মিলাল (ভিন্ন ধর্ম) ও নিহাল (ভিন্ন আক্বীদাহ) এবং খেয়াল-খুশী ও পথভ্রষ্টতার অনুসারী। হামযা ও আল কাসাই থেকে জানা যায় যে, আয়াতটির ব্যাপারে আলি বিন আবু তালিব বলেন:
‘নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে’ এর অর্থ হচ্ছে নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দ্বীনকে পরিত্যাগ করেছে এবং তারা হচ্ছে ইহুদী ও খ্রিস্টান;
‘তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই’ আল বাইদাবী বলেন: [অর্থাৎ তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তাদের কেউ ঈমান আনল, কেউ কুফরে লিপ্ত হল আর এভাবেই বিভক্তির সূচনা হলো ]
প্রকৃতপক্ষে, ফুরু (হুকুম) এবং আক্বীদাহ’র ক্ষেত্রে মতভেদ দুটো ভিন্ন বিষয়। আক্বীদাহ সংক্রান্ত এসব প্রমাণ এবং এরকম অন্যান্য প্রমাণের ক্ষেত্রে মতভেদ করা হারাম, যাতে আমরা ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মতো না হয়ে পড়ি কারণ তারা নিজেদের নবীদের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছিল, নিজেদের দ্বীনকে বিদআত ও পথভ্রষ্টতা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছিল এবং ভিন্ন সম্প্রদায় অর্থাৎ মিলাল ও নিহাল-এ পরিণত হয়েছিল। এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে:
“কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের কেউ ঈমান এনেছে এবং অন্যরা কাফির হয়ে গেছে।”
(আল কুরআন ২:২৫৩)অতএব, এটি ঈমান ও কুফরের বিষয়। দলীল ও এর অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে ভিন্নতার কারণে ফুরু (আহকাম)-এর ক্ষেত্রে সৃষ্ট মতভেদকে অনুমোদন করা হয়েছে এরকম প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে, তবে এর বাইরের অন্য কোনো বিষয়কে অনুমোদন করা হয়নি। মুসলিম উলেমাদের কাছে এই বিষয়টি শহড়হি known to necessity। শরঈ আহকামের ভিত্তিতে গঠিত একাধিক দলের উপস্থিতিকে নিষিদ্ধ করার জন্য আক্বীদাহ’র ক্ষেত্রে মতভেদ নিষিদ্ধ হওয়ার দলীলগুলোকে ব্যবহার করা খুবই সাদামাটা এবং ঠুনকো পর্যায়ের কাজ।
নিচের দলীলগুলোর বিষয়:
“একসময় বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি ছড়িয়ে পড়বে, সুতরাং কোনো বিষয়ে উম্মতের লোকজন একমত হয়ে যাবার পর যদি কেউ তোমাদেরকে বিভক্ত করতে আসে তাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত কর, সে যে-ই হোকনা কেন।” এবং
“যে বিভক্তির সৃষ্টি করে যে আমাদের কেউ না” এবং
“রাসূল (সা) আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা তাঁর (সা) নিকট বাইআত দিলাম। তিনি আমাদের কাছ থেকে এই মর্মে বাইআত চাইলেন যাতে আমরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, কঠিন ও দুঃসহ পরিস্থিতিতে তাঁর (সা)-এর কথা শুনি ও তাঁকে (সা) মান্য করি এবং ততক্ষণ পর্যন্ত কর্তৃত্বশীল লোকদের সাথে বিবাদে না জড়াই যতক্ষণ না তাদেরকে এমন প্রকাশ্য কুফরে (কুফরে বুআহ) লিপ্ত হতে দেখি যার ব্যাপারে আমাদের নিকট আল্লাহর তরফ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ আছে।”
এই দলীলগুলো খলিফা, তার নিকট বাইআত, তার প্রতি আনুগত্য এবং প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত না হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সাথে সম্পর্কিত।
কেউ যদি উম্মাহকে বিভক্ত করার ইচ্ছা নিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসে তাহলে তাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতে বলা হয়েছে সে যে-ই হোকনা কেন। মুসলিমদের মধ্যকার কোনো দলের সাথে এসব দলীলের দূরবর্তী বা নিকটবর্তী কোনো সম্পর্ক নেই। খলিফার জন্য প্রযোজ্য হুকুমসমূহ দলের জন্য প্রযোজ্য নয় এবং দল খলিফার স্থলাভিষিক্তও হতে পারে না বরং এটি কেবল খলিফাকে অস্তিত্বে আনতে এবং তাকে জবাবদিহি করার জন্য কাজ করে।
“আল্লাহর হাত রয়েছে জামাআতের সাথে” এবং
“জামাআত হচ্ছে রহমত এবং বিভক্তি হচ্ছে আযাব” একাধিক দলের উপস্থিতি নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে এসব হাদীসের কোনো সম্পর্ক নেই। মুসলিম সম্প্রদায় অথবা কোনো মুসলিম দলের ছায়ায় থেকে মুসলিমরা আল্লাহর রহমতকে অনুভব করবে। বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তি থাকলে শয়তান মুসলিমদের নিকটবর্তী হয়; এ ব্যাপারে রাসূল (সা) বলেন:
“প্রকৃতপক্ষে, কোনো বিচ্ছিন্ন ভেড়াই নেকড়ের শিকারে পরিণত হয়।” ফলে এর সাথে শাস্তির বিষয়টি জড়িত। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে ইসলামী কর্মকাণ্ডসমূহকে এক করে ফেলার জন্য কোনোরূপ নির্দেশনাই নেই হাদীসদ্বয়ের মানতুক (শব্দ) এবং মাফহুম (অর্থ)-এর মধ্যে।
একাধিক দলের উপস্থিতিকে নিষিদ্ধ বলে প্রমাণ করতে এসব শরঈ দলীলই ব্যবহৃত হয় অথচ এদের কোনোটাই এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এছাড়া একাধিক দল না রাখতে যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে এবং যেসব নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবৃত হয়েছে এদের কোনোটার জন্য কোনোকিছুকে প্রতিরোধ, নিষিদ্ধ বা বাধ্যতামূলক করা যাবে না। বরং কোনোকিছুকে প্রতিরোধ, নিষিদ্ধ বা বাধ্যতামূলক করে কেবল শরীআ’হ। খারাপ পরিস্থিতি এবং এর বিস্তৃতি ও প্রভাবকে যথার্থরূপে বুঝতে হবে এবং তারপরে শরীয়াহ’র মধ্যে দলীল খুঁজতে হবে যেগুলো পরিস্থিতিকে সমাধান করার জন্য কোনোকিছুকে বাধ্যতামূলক বা নিষিদ্ধ করবে। অতএব, পরিস্থিতি থেকে কোনো শরঈ হুকুম গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
৮ম অধ্যায়: দলের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনাসমূহ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা
যেকোনো ধরনের দল হলেই চলবে এমন ধারণা শরীআ’হ দেয় না। বরং শরীয়াহ এমন একটি দল প্রতিষ্ঠার দাবী করে যার উদ্দেশ্য হবে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। নিচের দলীলটি আমাদেরকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন;
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকবে যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।”
(আল কুরআন ৩:১০৪)ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে এমন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করতে শরীয়াহ আমাদেরকে বাধ্য করে যে দলটি তাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য অর্থাৎ ইসলামের আধিপত্য ও প্রতিষ্ঠালাভ এবং ক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তা ও শরঈ হুকুম বহন করবে। নিছক দল গঠনের জন্যই দল গঠন করতে বলা হয়নি বরং দলের উদ্দেশ্য যা হচ্ছে দাওয়াত এবং সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ তা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। একইভাবে কেবল দাওয়াত ও সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের জন্যই তা করতে বলা হয়নি বরং যে উদ্দেশ্যে দাওয়াত ও সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের দায়িত্বটি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে তা হল আধিপত্য ও ক্ষমতা অর্জন এবং তা সুসংহতকরণ।
রাসূল (সা) বলেছেন;
“পৃথিবীর যেকোনো অংশে যদি তিনজন লোক থাকে, তাহলে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমির (নেতা) নিযুক্ত না করে থাকাটা তাদের জন্য বৈধ হবে না।”
[আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]যেকোনো সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মুসলিমদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা একজন আমীরের নেতৃত্বে তা সম্পাদন করে। যেসমস্ত লোকের উপরে, যেসব বিষয়ের জন্য তিনি আমীর নিযুক্ত হয়েছেন সেসব বিষয়ে তার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। আমীরের নির্দেশ মতো দলটিকে চলতে হবে যাতে সামষ্টিক কাজের একটি শরীয়তসম্মত পরিণতি অর্জন করা যায়।
— যেহেতু মুসলিমদের উপরে আল্লাহ এমন অনেক দায়িত্ব ফরয করেছেন যেগুলো কেবলমাত্র খলিফাই সম্পাদন করতে পারেন সেহেতু এসব ফরয আদায়ের জন্য একজন খলিফা নিযুক্ত করা অপরিহার্য। আবার যেহেতু কোনো দল ছাড়া খলিফার নিয়োগ ও খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না, সেহেতু এমন একটি দল যার উদ্দেশ্য হবে খলিফা ও খিলাফত প্রতিষ্ঠা তার অস্তিত্ব অপরিহার্য। কারণ শরীয়াহ’র একটি মৌলিক নীতিমালা হচ্ছে:
“কোনো ওয়াজিব পালন করতে যা প্রয়োজন তা নিজেও ওয়াজিব।”
আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হলো যে নির্দিষ্ট শর’ঈ উদ্দেশ্যের সঙ্গে দলটির অস্তিত্ব অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। অতএব নিছক ইসলামের দাওয়াত বহন করে অথবা কেবল বার্তাবহনের জন্যই তা বহন করে এমনকোনো দলের কথা বলা হয় নি। বরং দল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে মুসলিমদের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। কারণ ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ের সমস্ত ইসলামী হুকুম বাস্তবায়নের শরঈ পদ্ধতি হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র। অতএব এমন একটি দলের অস্তিত্ব অপরিহার্য যা তার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পূরণ করবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত দলটি তার প্রয়োজনীয় দায়িত্বগুলো পূরণ করতে সক্ষম না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে:
— দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তা, শরঈ হুকুম ও মতামত দলটিকে গ্রহণ করতে হবে এবং কথা, কাজ ও চিন্তায় সেগুলোর অনুসরণ করতে হবে। এসব বিষয় গ্রহণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে দলের ঐক্য রক্ষা করা। যদি প্রতিষ্ঠিত দলটির সদস্যগণ ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা ও ইজতিহাদ গ্রহণ করে তাহলে দলটি ভাঙনের মুখে পড়বে এবং তা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে যদিও তারা সাধারণভাবে নিজেদের উদ্দেশ্য ও ইসলামের ব্যাপারে একমত থাকে। এমনকি এসব খণ্ডদলের ভিতরে আরো অনেক উপদল তৈরি হবে। ফলে তখন ফরয দায়িত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যদের নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর পরিবর্তে তারা নিজেদের মধ্যে দাওয়াতের সূচনা করবে। তারা একে অন্যের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হবে এবং প্রত্যেকটা উপখণ্ডই চাইবে তাদের চিন্তা পুরো দলের নেতৃত্ব দিক। এজন্য নির্দিষ্ট চিন্তা গ্রহণ এবং এর বৈধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দলের ঐক্য বজায় রাখা শরীয়াহ’র দৃষ্টিতে একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত চিন্তা গ্রহণ এবং সেগুলো মেনে চলতে শাবাবদেরকে বাধ্য করা ছাড়া অন্যকিছুর মাধ্যমে দলের ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব না। সুতরাং ‘কোনো ওয়াজিব পালন করতে যা প্রয়োজন তা নিজেও ওয়াজিব’ এই নীতির আলোকে প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহকে গ্রহণ করতে হবে।
দলটি তার দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য যেসব প্রয়োজনীয় চিন্তা, হুকুম ও মতামত গ্রহণ করে সেগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয়তসম্মত হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত দলের উপরে শাবাবদের আস্থা থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের চিন্তাসমূহ মেনে নেওয়ার জন্য শাবাবদের বাধ্য করা একটি বৈধ বিষয়, কারণ মুসলিমদের জন্য এই বিষয়টি বৈধ যে, সে নিজের মতামত ত্যাগ করে অন্যের মত অনুযায়ী কাজ করতে পারবে। এজন্যই উসমান বিন আফফান (রা) এই শর্তে খলিফা হিসেবে বাইয়াত নিয়েছিলেন যে তিনি নিজস্ব ইজতিহাদ পরিত্যাগ করবেন এবং আবু বকর ও উমর (রা)-এর ইজতিহাদ গ্রহণ করবেন যদিও সেগুলো তার ইজতিহাদের সঙ্গে না মিলে। এই বিষয়টি সাহাবীগণ (রা) মেনে নিয়েছিলেন এবং তাঁরা তাঁকে বাইয়াত দিয়েছিলেন। তবে এই বিষয়টি ফরয নয় বরং মুবাহ, যা আলী (রা) এর ঘটনাটি দ্বারা প্রমাণিত। কারণ তিনি আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর ইজতিহাদ গ্রহণের বিনিময়ে নিজের ইজতিহাদ পরিত্যাগ করতে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও কোনো একজন সাহাবীও এতে আপত্তি করেননি। এছাড়া আশ—শাবী কর্তৃক সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, আবু মুসা (রা) আলী (রা)-এর মতের জন্য নিজের মত, যাইদ (রা) উবাই বিন কাব (রা)-এর মতের জন্য নিজের মত এবং আবদুল্লাহ (রা) উমর (রা)-এর মতের জন্য নিজের মত পরিত্যাগ করতেন। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে আবু বকর (রা) এবং উমর (রা) নিজেদের মত পরিত্যাগ করতেন আলী (রা)-এর মতের জন্য। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে , অন্যকোনো মুজতাহিদের প্রতি আস্থার কারণে তার মত গ্রহণ করে নিজের মত পরিত্যাগ করা কোনো মুজতাহিদের জন্য অনুমোদিত। দলের শাবাবদেরকে অবশ্যই এই দুটো ধারণা মেনে চলতে হবে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগগত দিক থেকে একটি দেহের মতো আচরণ করতে হবে।
— দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য যেভাবে সে প্রয়োজনীয় শরঈ হুকুম গ্রহণ করে, সেগুলোকে সম্পাদন করার জন্য ঠিক তেমনিভাবে অবশ্যই তাকে ধরন (style)সম্পর্কিত হুকুমও নির্ধারণ করতে হবে। ধরন (style) বলতে সেই উপায়কে বোঝানো হচ্ছে যার মাধ্যমে শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়িত হয়। এটি একটি হুকুম যা এমন কোনো মৌলিক হুকুমের সঙ্গে সম্পর্কিত যার স্বপক্ষে দলীল বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, রাসূল (সা)-এর অনুসরণে দলের শাবাবদের চিন্তা-চেতনাকে খুব ভালোভাবে গড়ে তুলতে হবে। এটি হচ্ছে একটি শর’ঈ হুকুম যা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কিন্তু কোন উপায়ে? কীভাবে এই শরঈ হুকুম বাস্তবায়িত হবে? একটি নির্দিষ্ট ধরনের সাহায্যে এই শরঈ হুকুম পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে হালাকাহ (পাঠচক্র) অথবা উশার (পরিবার) প্রভৃতি হতে পারে প্রয়োজনীয় ধরন (style)।
অতএব, যুক্তিসম্মত উপায়ে ধরন (style) নির্ধারণ করতে হবে যাতে এর সাহায্যে সর্বোত্তম উপায়ে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। মূলনীতি অনুযায়ী এই হুকুমটি হচ্ছে মুবাহ। শরীয়াহ আদেশ করেছে শর’ঈ হুকুমটির ব্যাপারে কিন্তু তা বাস্তবায়নের ধরনটি (style) ছেড়ে দিয়েছে মুসলিমদের উপরে।
কোনো একটি হুকুমের জন্য যেহেতু বিভিন্ন ধরন (style) রয়েছে সেহেতু একটি নির্দিষ্ট ধরন (style) গ্রহণ করতে এবং দলটি শাবাবদেরকে সে অনুযায়ী পরিচালিত করবে । অতএব দলটিকে একটি ধরন গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে সে শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়ন করবে। এক্ষেত্রে মূল কাজটি যে পর্যায়ের হুকুম, ধরনটির (style) হুকুমও তাই হবে। অন্যভাবে বলা যায়, শরঈ হুকুমটি যে পর্যায়ের বাধ্যবাধকতা ধরনটিও (style) সে পর্যায়ের বাধ্যবাধকতা।
যখন দলটি উত্তমরুপে বিকশিত চিন্তা-চেতনা (culture) গড়ে তোলার জন্য হালাকাহকে একটি ধরন (style) হিসেবে গ্রহণ করবে, তখন অবশ্যই একে একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ধরনটিকে (style) গ্রহণ করার সময় দলটিকে অবশ্যই এর উদ্দেশ্যের দিকে নজর দিতে হবে যা হচ্ছে উত্তমপন্থায় বিকাশক্রিয়াকে (culture) গড়ে তোলা। অতএব, ধরন হিসেবে হালাকাহকে গ্রহণ করলে এর উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয়ই গ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, হালাকাহতে কত লোক থাকবে তা হালাকাহ’র উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যদি লোকসংখ্যা বেশি হয় তাহলে উত্তমভাবে চিন্তা—চেতনা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি লোকসংখ্যা কম হয় তাহলে অনেক বেশি হালাকাহ হয়ে যাওয়ার ফলে তা উদ্দেশ্যের জন্য বোঝা এবং বাধাস্বরূপ হবে। কোনোরকম সংখ্যাধিক্য বা অপর্যাপ্ততা না রেখে লোকসংখ্যা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে তা চিন্তাভাবনা গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সুতরাং লোকসংখ্যা নির্ধারণের বিষয়টি যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। অনুরূপভাবে হালাকাহ’র সময়কাল এমন হতে হবে যাতে চিন্তাগুলোকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য ছাত্ররা নিজেদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, অন্যথায় বোঝার বিষয়টি অপর্যাপ্ত থেকে যাবে। সময় খুব সংক্ষিপ্ত হলে চিন্তাগুলোকে পুরোপুরি উপস্থাপন করা সম্ভব হবেনা। কতদিন পরপর হালাকাহ নিতে হবে? এটা কি প্রতিদিনই হবে, সপ্তাহে একবার হবে নাকি দুসপ্তাহে একবার হবে ? দাওয়াতের ব্যবহারিক বিষয়ের পথে যেন হালাকাহ বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। শাবাব যেন দাওয়াত বাদ দিয়ে কেবল শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যে ব্যস্ত না হয়ে পড়ে। শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য এভাবে উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে যাতে সেগুলো শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। ধরনের ব্যাপারে যে বিষয়গুলো এখানে বলা হলো সেগুলো উপকরণের বেলায়ও অনেকটাই প্রযোজ্য। কাজের চাহিদা অনুযায়ী আমীর চাইলে ধরন ও উপকরণ পরিবর্তন করতে পারেন।
— দলটি যেহেতু বিশাল বিস্তৃত ভূখণ্ডে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং অনেকগুলো দেশে পৌঁছাবে সেহেতু এর কর্মকাণ্ডের পরিধির দাবি অনুযায়ী একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন, যার মাধ্যমে দলটি দাওয়াত পরিচালনা করবে এবং কাজের সমস্ত উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করবে। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাটি দাওয়াতের আন্দোলনকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত করবে। এটি শাবাবদেরকে গড়ে তোলার বিষয়টি দেখাশোনা করবে এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি সাধারণ ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। এটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে সংগঠিত করবে। উম্মাহ্র কাছে দলটি এমন একটি সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হবে যা তার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অতএব, একটি সুসংগঠিত কাঠামোর প্রয়োজন অপরিহার্য যা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে। ফলে কাজের অগ্রগতিকে সে পর্যবেক্ষণ করবে এবং অর্জিত সাফল্যকে ধরে রাখবে।
অতএব দলটিকে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা অথবা একটি সুসংগঠিত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যা সফলতার সঙ্গে দাওয়াত পরিচালনার মাধ্যমে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাকে সাহায্য করবে।
দলটিকে কিছু প্রশাসনিক নিয়মকানুন গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে দলের সদস্যবৃন্দকে এবং দল কতৃর্ক পরিচালিত আন্দোলনকে সংগঠিত করা যাবে। এতে আমীরের ক্ষমতা, সে কীভাবে দল পরিচালনা করবে এবং কীভাবে নির্বাচিত হবে সেসব বিষয় নির্ধারিত থাকবে। বিভিন্ন এলাকা এবং প্রদেশের দায়িত্বশীলদেরকে কে বা কারা নিয়োগ দিবে এবং তাদের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে-এ বিষয়গুলো এতে বর্ণিত থাকতে হবে। নির্দিষ্ট নিয়মকানুন হিযবের সমস্ত কাজের প্রশাসনিক বিষয়কে সংগঠিত করবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের চূড়ান্ত ক্ষমতাকে নির্ধারিত করবে।
কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ সম্পর্কিত হুকুম থাকতে হবে এসব নিয়মকানুনের মধ্যে। গ্রহণকৃত প্রশাসনিক ব্যবস্থার আনুগত্য করা ততক্ষণ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক যতক্ষণ পর্যন্ত আমীর এগুলোকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন, কারণ আমীরের আনুগত্য করা ওয়াজিব।
— গ্রহণকৃত বিষয়ের আনুগত্য করতে প্রত্যেকেই বাধ্য। অতএব কেউ তা লঙ্ঘন করলে দল তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিবে? এই লঙ্ঘনের জন্য কি তাকে তিরস্কার করা হবে, নাকি কোনো প্রশাসনিক শাস্তি দেয়া হবে?
যারা গ্রহণকৃত হুকুম লঙ্ঘন করে অথবা নির্ধারিত শর’ঈ পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দলটি বাধ্য। আমীরের অবাধ্যতার জন্য এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বৈধ। শরঈ হুকুম অনুযায়ী যেহেতু আমীর থাকা বাধ্যতামূলক সেহেতু তার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক এবং যেসব দায়িত্বের জন্য সে আমীর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে সেসব ব্যাপারে তার অবাধ্য হওয়া নিষিদ্ধ ; অন্যথায় দলের আমীর থাকার কোনো মানে হয় না।
রাসূল (সা) বলেন;
“যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে যেন আল্লাহর আনুগত্য করল এবং যে আমাকে অমান্য করল সে যেন আল্লাহকে অমান্য করল। যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল সে যেন আমার আনুগত্য করল এবং যে ব্যক্তি আমীরকে অমান্য করল সে যেন আমাকে অমান্য করল।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]আন্দোলনরত প্রত্যেক সদস্যই আমীরের প্রশাসনিক শাস্তির আওতাধীন থাকবে, এমনকি যদি সে একেবারে কনিষ্ঠ সদস্যও হয়। এসব শাস্তি দেয়া হবে গ্রহণকৃত বিষয়ের লঙ্ঘনের ফলে। গ্রহণকৃত শরঈ হুকুম অথবা ধরনকে যে লঙ্ঘন করে অথবা প্রশাসন বা প্রশাসনিক নিয়ম যে অমান্য করে অথবা নিজের ক্ষমতার সীমালঙ্ঘন করে তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
এভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর সঙ্গে একটি সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামো যুক্ত করতে হবে যা পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড ও হুকুমের চিন্তাগুলোকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে। সাংগঠনিক বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করার কারণে অনেক ইসলামী এবং অৈইসলামি সংগঠনকে আমরা ব্যর্থ হয়ে যেতে দেখেছি।
যদি গ্রহণ করার (adoption) বিষয়ের দিকে দলটি যথার্থ মনোযোগ দেয় না তাহলে দলের মধ্যে মহামারী আকারে মতানৈক্য ছড়িয়ে পড়বে, সে বিশৃঙ্খলভাবে অগ্রসর হবে এবং বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়বে, দলের জবাবদিহিতা থাকবে না। এই বিষয়টি লক্ষ্য অর্জনের পথে দলের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
যদি বৈধ এবং স্থির শর্তসাপেক্ষে দলের সদস্য এবং দায়িত্বশীল লোক নিয়োগ না করে বরং বিভিন্ন কারণ যেমন কার সঙ্গে কার সম্পর্ক আছে অথবা কার সামাজিক মর্যাদা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে তার উপরে ভিত্তি করে নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্বের বণ্টন হবে ত্রুটিপূর্ণ এবং সদস্যগণ বিশেষ অবস্থান পাওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
এট স্বাভাবিক যে, যদি একটি সাধারণ গঠনতান্ত্রিক নিয়ম না থাকে যা প্রত্যেক সদস্যের জন্য প্রযোজ্য, তাহলে জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি হবে এবং সমতা ও নিরপেক্ষতা হারিয়ে যাবে।
স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণকৃত বিষয়ের বড় ধরনের লঙ্ঘন এবং ছোট ধরনের লঙ্ঘনের মধ্যে পার্থক্য রেখে যদি গঠনতন্ত্রে শাস্তির বিধান না থাকে , তাহলে কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে অবাধ্যতা দেখা দিবে এবং ভুলের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
অতএব, কার্যকরী আন্দোলনের জন্য সাংগঠনিক দিক এবং সঠিকভাবে দল গঠন প্রক্রিয়ার দিকে যথার্থ মনোযোগ দিতে হবে যাতে দাওয়াতের চিন্তাসমূহকে এবং শাবাবগণকে ঠিকভাবে সংগঠিত করা যায় এবং কার্যক্রম পরিচালনায় বেশি সুবিধা হয়। যে উদ্দেশ্যে দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার সঙ্গে দলের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
দলের সাংগঠনিক দিকটিকে গৌণ বিবেচনা করলে চলবেনা বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দল যদি সুসংগঠিত না হয় এবং প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন গ্রহণ না করে অথবা গ্রহণকৃত নিয়মকানুনগুলোকে বাধ্যতামূলক হিসেবে মেনে না নেয় তাহলে যে সাফল্য দল অর্জন করবে তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
উপরন্তু দলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছু অর্থনৈতিক দায়িত্ব বহন করা দলটির জন্য বাধ্যতামূলক। কারণ কিছু শাবাবকে দলের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষভাবে নিয়োগ দিতে হবে যেগুলো পালন করতে গেলে পরিবহন খরচ, প্রিন্টিং খরচ অথবা দাওয়াতের প্রয়োজনে অন্যান্য খরচ লাগবে। এসব খরচ দলকে অর্থাৎ দলের শাবাবদেরকেই বহন করতে হবে। দাওয়াতের জন্য যে স্বয়ং নিজেকে উৎসর্গ করেছে তার জন্য এটা অধিকতর সহজ যে, এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ আর্থিক সহায়তা সে প্রদান করবে।
দলের বাইরে যাতে হাত প্রসারিত করতে না হয় সেদিকে দলকে দৃষ্টি রাখতে হবে চাই সে কোনো ব্যক্তির নিকট হোক বা দলের কোনো নিকট বা কোনো সরকারের নিকট। এভাবেই দলকে অগ্রসর হতে হবে। দাওয়াতের শত্রুরা অর্থের প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে দলকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে, এজন্য তারা প্রথমে আপাতঃ দৃষ্টিতে নির্দোষ আর্থিক সাহায্য দিতে শুরু করে। কিন্তু খুব দ্রুতই এই সাহায্যদান কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়।
আক্বীদাহ’র গুরুত্ব
যেহেতু ইসলামী আক্বীদাহ হচ্ছে দলটির কাজের প্রেরণা এবং আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা এর উদ্দেশ্য সেহেতু দলটির জন্য বাধ্যতামূলক নিজের বিকাশক্রিয়া (culture) কে এমনভাবে গ্রহণ করা যার সঙ্গে আক্বীদাহ’র জোরোলো সম্পর্ক থাকবে। যার লক্ষ্য হবে দলের কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, উদ্বেগ, আন্তরিকতা, তীব্র ভালোবাসা, আগ্রহ এবং ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা। এটি মুসলিমদের মধ্যে চলার পথে দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতাও জাগিয়ে তুলবে । দাওয়াত বহনকারীকে এটি এমনভাবে গড়ে তুলবে যাতে সে লোকজনের প্রশংসার জন্য বসে থাকবে না বরং সে তার রব ও সেইদিনের ভয় করবে যেদিন দুশ্চিন্তায় মানুষের চেহারা বিমর্ষ হবে। রবের সন্তুষ্টি ও আখিরাতের পরম সুখ লাভের জন্য সে পার্থিব যন্ত্রণা গ্রহণ করতে এবং দুনিয়ার সুখ ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে প্রস্তুত থাকবে। বিকাশক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে আক্বীদাহ’কে গ্রহণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে লোকজনের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত করতে আক্বীদাহ’কে ব্যবহার করা এবং এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে কৃত অত্যাচারের বিরুদ্ধে জন্মানো ঘৃণা, অবজ্ঞা থেকে মুক্তি অথবা পরিস্থিতিকে উন্নত করার মানসিকতাকে ব্যবহার না করা। বরং যে বিষয়টি মুসলিমদেরকে দাওয়াত দিতে এবং অন্যান্য মুসলিমদেরকে তা গ্রহণ করতে চালিত করবে তা হচ্ছে তাদের ঈমানের চিন্তা এবং এটাই ইসলামের প্রকৃত পথ।
উপরন্তু ঈমানের চিন্তাসমূহকে (পরিবর্তন সূচিত করার জন্য যা দলটি ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে) এবং দলের গ্রহণকৃত বিকাশক্রিয়াকে (culture) এমনভাবে পৌঁছে দিতে হবে যাতে উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব হয়।
আক্বীদাহ’কে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে তা এই উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হয়।
গ্রহণকৃত শরঈ হুকুমকে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে এগুলোর উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়।
বাস্তবতা সম্পর্কিত জ্ঞান এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে উদ্দেশ্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে তা সহায়ক হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে দলের বিকাশ প্রক্রিয়াকে ইসলামী আক্বীদাহ’র সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে হবে। শরীআহ’র দলীলাদি দ্বারা এগুলো সমর্থিত হতে হবে এবং এমনভাবে পৌঁছাতে হবে এগুলোকে যাতে এরা শরঈ উদ্দেশ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। আর তা (শরঈ উদ্দেশ্য) হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবে আল্লাহর দাসত্বের অনুভূতি অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি প্রদান। আর দলের শাবাবদেরকে এই উপলদ্ধির ভিত্তিতেই গড়ে তুলতে হবে।
যেহেতু ইসলামী আক্বীদাহ’র দৃষ্টান্ত হচ্ছে শরীরের জন্য মাথাস্বরূপ এবং অঙ্গসমূহের মধ্যে হৃদপিণ্ডস্বরূপ; যেহেতু এটি হচ্ছে সমস্ত বিষয়ের ভিত্তিস্বরূপ এবং এর উপরেই সবকিছু নির্ভরশীল সেহেতু একে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে তা নিম্নোক্ত লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে পারে:
— আল্লাহকে ইবাদাতের যোগ্য একমাত্র সত্তা হিসেবে এবং বিধানের উৎস হিসেবে মেনে নিতে তা মানুষকে পরিচালিত করবে। তিনি বাদে অন্য কারো এই অধিকার নেই। তিনিই একমাত্র রব এবং একমাত্র খালিক (সৃষ্টিকর্তা)। তিনি সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞাত ও বিধানদাতা যিনি সমস্ত বিষয়কে পরিচালনা করেন। যেহেতু প্রকৃতিগতভাবে মানুষ নিজেকে দুর্বল, সীমাবদ্ধ, চাহিদাসম্পন্ন এবং নির্ভরশীল বলে অনুভব করে সেহেতু সে তাকে সঠিকপথে পরিচালিত করার জন্য এবং গভীর অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসার জন্য এই ইলাহের নিকট আত্মসমর্পণ করে। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁকে (সা) মনোনীত করেছেন যিনি তাঁর রবের ইচ্ছানুযায়ী তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন। তিনি (সা) তাঁর রবের পক্ষ থেকে যা কিছু আমাদেরকে পৌঁছে দেন তার আনুগত্য করতে আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি (সা) নিষ্পাপ, যার প্রতি আল্লাহ পুরো মানবজাতির জন্য একটি বার্তা হিসেবে কুরআন নাযিল করেছেন। এটি এসেছে অন্তরসমূহের জন্য পথনির্দেশনা, আলোকবর্তিকা, রহমত, তিরস্কার এবং নিরাময়কারী হিসেবে। যারা ঈমান আনে ও আনুগত্য করে তাদের জন্য তিনি (আল্লাহ) অনন্তসুখের প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছেন এবং যারা প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। অতএব, রাসূলুল্লাহ (সা) যে বার্তা নিয়ে এসেছেন সে অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদাত করার জন্যই কেবল মানুুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
— জীবনের পূর্বে কী ছিল, সেই বিষয়টি মুসলিমদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে কারণ এর মাধ্যমে ইসলাম মানবজাতিকে একটি বন্ধনে আবদ্ধ করে যা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা এবং সমস্ত বিষয়ের পরিচালনাকারী হিসেবে আল্লাহর উপরে ঈমান। জীবনের পরে কী আছে তার মাধ্যমেও তাকে ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ করে যা হচ্ছে বা’থ (পুনরুত্থান), নুশূর (একত্রিতকরণ), হিসাব, সাওয়াব এবং ইকাব (শাস্তি)। এ বিষয়গুলো এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে এগুলোর মধ্যকার সম্পর্কটি উপস্থাপিত হয়। এই বন্ধনকে যে ছিন্ন করে এবং আলাদা করে ফেলে তার মন্তব্য কোনো স্পষ্ট প্রমাণ বা তথ্যের উপরে ভিত্তিশীল থাকবেনা। বরং এগুলো হবে কুফরী মন্তব্য।
— একে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে তা উম্মাহকে পুনর্জাগরিত করে এবং বিশ্বে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে তাকে চালিত করে।
— সমসাময়িক কুফর চিন্তাসমূহের মোকাবেলায় এই চিন্তার যথার্থতা মুসলিমদের কাছে বুঝাতে হবে। পঁুজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, অথবা দেশাত্মবোধ থেকে জন্ম নেওয়া বর্তমান চিন্তাসমূহের ভ্রান্তি উন্মোচন করার মাধ্যমে এটি অর্জিত হবে। ইসলাম ও এসব চিন্তার মধ্যকার পার্থক্য বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এটা সম্ভব হবে; ফলে আমরা দুটো বিষয় অর্জন করতে পারব: প্রথমত; এসব চিন্তা ও এগুলোর উপরে ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যসব চিন্তার খণ্ডন এবং দ্বিতীয়ত; এই বিষয়টিকে তুলে ধরা যে ইসলাম হচ্ছে পুরো মানবজাতির জন্য একমাত্র উপযুক্ত সমাধান (এর আক্বীদাহ ও ব্যবস্থার সার্বজনীন প্রকৃতির কারণে)। পরবর্তীতে সেই রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে আমরা ইসলামের সঠিকত্ব প্রমাণ করতে পারব যা ইসলামকে উপস্থাপন করবে। এক্ষেত্রে কাফেরদের বিভিন্ন শ্লোগান, চমকপ্রদ প্রপাগাণ্ডা ও বিলবোর্ড এবং কাফের ঔপনিবেশিক শক্তি কর্তৃক মুসলিমদের মনে স্থাপিত ভ্রান্ত দাবীসমূহকে দূর করার জন্য দলটি কাজ করবে। উদাহরণস্বরূপ কিছু শ্লোগান তুলে ধরা হল: ‘চিন্তা ও সংস্কৃতির স্বাধীনতা’, ‘সীজারের প্রাপ্য সীজারকে দাও এবং সৃষ্টিকর্তার প্রাপ্য সৃষ্টিকর্তাকে’, ‘আমাদের মাতৃভূমি সবসময় সত্যের উপরেই থাকে’, ‘নির্যাতনকারী হোক অথবা নির্যাতিত নিজের ভাইকে সাহায্য কর’ (প্রাক ইসলামী যুগের ধারণা অনুসারে) প্রভৃতি। মুসলিমদের মন ও জীবন থেকে পাশ্চাত্য চিন্তাসমূহের প্রভাবকে দূর করতে হবে। এজন্য ‘শরীআহ’র উন্নয়ন’, ‘শরীআহ’র আধুনিকায়ন’, ‘যুগের চাহিদা পূরণে শরীআহ’র নমনীয়তা’ (পাশ্চাত্যের ধারণা অনুযায়ী) এবং ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’, ‘দ্বীনের মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই,’ ‘এই বিষয়টি প্রত্যাখ্যাত নয় যে, সময় ও স্থানের সঙ্গে হুকুম পরিবর্তিত হয়’ প্রভৃতি ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠা চিন্তাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে উদ্দেশ্য অর্জন করতে হবে। এসমস্ত শ্লোগান দূর করার পাশাপাশি দলটিকে বিকল্প চিন্তাভাবনা প্রোথিত করতে হবে যেগুলো ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ এর ভিত্তিতে এবং এ থেকেই উৎসারিত।
শরীয়াহ থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ এই কথাটি জ্ঞান ও কর্মের দিকে দিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশুদ্ধ হবেনা যতক্ষণ না অন্যসব চিন্তাকে পরিত্যাগ করা হচ্ছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন;
“যারা গোমরাহকারী তাগুতদেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙ্গবার নয়।”
(আল কুরআন ২:২৫৬)প্রথমে আল্লাহ তাগুতের সঙ্গে কুফর (অস্বীকার) করতে বললেন, যাতে কুফর বা শিরকের কোনো ছাপ অন্তরে না থাকে এবং তারপরে বিশুদ্ধ অবস্থায় অন্তরে ঈমান আসে যাতে তার অবস্থা এমন হয় যে ব্যক্তি কোনো বিশ্বস্ত হাতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“জেনে রাখুন (হে মুহাম্মাদ), আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই।”
(আল কুরআন ৪৭:১৯)‘কোনো ইলাহ নেই’ এর অর্থ হচ্ছে জ্ঞানার্জন ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে যে ইলাহ কেবলমাত্র একজনই রয়েছেন যার একক আনুগত্য করতে হবে। এছাড়া তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) যখন বলেন,
‘আল্লাহ ছাড়া’ তখন এর মানে হচ্ছে ইলাহ হিসেবে একমাত্র আল্লাহকে মেনে নেওয়া। এটি এককভাবে আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে এবং অন্য সবাইকে প্রত্যাখ্যান করতে বলে। আরবি ভাষায় এটি হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী ধরনের দৃঢ়তাসূচক বাক্য যাকে এখানে ‘সীমিত করা’ অর্থে বুঝানো হয়েছে। ফলে সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধের চিন্তা আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না অথবা এগুলো কোনো সঠিক চিন্তাও নয়। বরং এগুলো হচ্ছে নষ্ট ও ভ্রান্ত চিন্তা। এগুলো মানুষের শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না বরং দুর্দশা বয়ে আনে। আল্লাহর দ্বীন ও শরীআ’হ ব্যতীত হিদায়াত, আলোকিত পথ ও নিরাময়কারী অন্যকিছু নেই।
দলের কর্মীদেরকে ইসলামী ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদেরকে সঠিক ইসলামী বৈশিষ্ট্য (criteria) শেখাতে হবে, শরীআহ’র আনুগত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং এর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা দ্বারা এদের অন্তরকে পূর্ণ করতে হবে এবং কোনো সিদ্ধান্তের জন্য এর দিকে ফিরে আসার প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যকিছুর দিকে ফিরে যাওয়ার প্রতি ঘৃণা দ্বারা এদের অন্তরকে পূর্ণ করতে হবে। ফলে কোনো বিষয় বুঝার ক্ষেত্রে তারা যেন শরীয়াহ’র বৈশিষ্ট্য (criteria) ও চিন্তা দ্বারা পরিচালিত হয় এবং তাদের প্রবৃত্তিসমূহ ইসলামের অনুগামী হয়। ইসলাম যা পছন্দ করে তারা যেন তা পছন্দ করে এবং ইসলাম যা ঘৃণা করে তারা যেন তা ঘৃণা করে।
এই বিকাশক্রিয়ার (culture) দ্বারা শাবাবদেরকে গড়ে তোলার জন্য দলটিকে বিভিন্ন পাঠচক্র আয়োজন করতে হবে যাতে এর শাবাবরা নেতৃত্বের জন্য এবং বাস্তবিক ক্ষেত্রে দাওয়াতের জন্য প্রস্তুত হতে পারে যার ফলে লোকজন সেসব চিন্তাকে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। দলটি চিন্তার সাহায্যে বাস্তবতাকে বুঝবে এবং শাবাবদের কাছে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করবে যার মাধ্যমে সে চিন্তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। এটা তখন শাবাবদের জন্য পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে কীভাবে বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হয় এবং কীভাবে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক সংজ্ঞা যেগুলো বাস্তবতার ব্যাখ্যাদানকারী এবং মানাত যার উপরে শরঈ হুকুম প্রযোজ্য হবে সেগুলো নির্ধারণ করা যায়। দলটি যখন চিন্তা, প্রবৃত্তি, জৈবিক চাহিদা, পুনর্জাগরণ, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা প্রভৃতি বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করে তখন সে তা এজন্য করে যাতে সে এগুলোর বাস্তবতা বুঝতে পারে, কারণ এসব বিষয়ের সঙ্গে অনেক শরঈ হুকুম জড়িত।
শর’ঈ দলীল থেকে শর’ঈ হুকুম বের করার জন্য দলটি প্রচেষ্টা নিবে। বাস্তব সমস্যার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিষয় সে বের করবে এবং সেগুলোর সমাধান দিবে। এজন্য দলটিকে সেসব বিষয়ের প্রত্যেকটাই গ্রহণ করতে হবে যেগুলোর মাধ্যমে সে শর’ঈ গ্রন্থসমূহ বুঝতে এবং দলটি নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হুকুম বুঝতে সক্ষম হবে। ইসতিদলাল (হুকুম বের করা) এর পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে দলটিকে যাতে এর শাবাব ও মুসলিমগণ তা শিখতে পারে এবং শরীয়াহ’কে বোঝা ও আহকাম বের করার সঠিক ইসলামী পদ্ধতি তারা অনুধাবন করতে পারে।
গ্রহণকৃত বিকাশক্রিয়া (culture) শাবাবদের কাছে পৌঁছানোর জন্য দলটিকে সবোর্চ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে যাতে বিষয়টি যেন ব্যবহারিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। কারণ নিছক জ্ঞানার্জন, তথ্যবহুল হওয়া অথবা শাবাবদেরকে প্রচণ্ড শিক্ষিত করে তোলা এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য নয়। বরং এসব চিন্তাভাবনার উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা এবং উম্মাহর মধ্যে এসব চিন্তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করা যাতে এগুলোকে উপস্থাপনকারী একটি কর্তৃপক্ষ সে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
এসব বিকাশক্রিয়াকে (culture) বিস্তারিত ও ব্যবহারিকভাবে যথার্থ উপায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দলটিকে চেষ্টা করতে হবে। কথা ও কাজের মধ্যে গরমিল করা যাবে না। কারণ দলটি যদি সত্যের শিক্ষা দেয় কিন্তু বিপরীত কাজ করে তাহলে তাতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ক্রোধের উদ্রেক ঘটাবে।
গ্রহণকৃত বিকাশক্রিয়ার (culture) আলোকে শাবাবদেরকে গড়ে তুলতে হবে এবং এসব চিন্তা তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দিতে হবে। ইসলামের মৌলিক চিন্তাসমূহ গ্রহণ করার পরে উম্মাহর মধ্যে এগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ওয়াঈ আম (সাধারণ সচেতনতা) এর ভিত্তিতে ফিকরাহ (চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণা) এর জন্য রায় আম (জনমত) গড়ে ওঠে। আক্বীদাহ’র চিন্তাভাবনাসমূহ এবং উম্মাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত শর’ঈ হুকুমের মৌলিক নীতিমালাসমূহ এমনভাবে গ্রহণ করতে হবে দলটিকে যাতে তা উম্মাহকে একটি লক্ষ্যের উপরে এক করে যা হচ্ছে আল্লাহর শরীআহ’র সার্বভৌমত্ব। এভাবেই উম্মাহ সঠিক পথে যাত্রা শুরু করবে এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য পুনরায় অগ্রসর হবে যা সে অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে।
এসব মৌলিক চিন্তা এবং শরঈ হুকুমের মৌলিক নীতিমালার ফলে আইন প্রদান ও ইবাদাতের বিষয়টি কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই সংরক্ষিত হবে এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকার কেবলমাত্র রাসূল (সা)-এর জন্যই সংরক্ষিত হবে। এসব মৌলিক বিষয় লোকজনের মধ্যে জান্নাতের আগ্রহ ও জাহান্নামের ভয় সৃষ্টি করবে এবং তাদেরকে এটা বুঝতে সাহায্য করবে যে ইসলামের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম একটি ফরয হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা; কারণ এর উপরে অনেকগুলো ফরয নির্ভরশীল। এতে উম্মাহ বুঝতে পারবে যে অন্যসব লোকের বাইরে তারা একটি উম্মত এবং কোনো বংশ বা রাষ্ট্রের সীমানা তাদেরকে পৃথক করতে পারেনা। মুসলিমরা একটি ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ যাকে কোনো জাতীয়তাবাদী বা দেশাত্মবোধক বন্ধন ছিন্ন করতে পারে না। আল্লাহর শরীয়াহ’র প্রতি অবহেলার ফলেই মুসলমানরা বর্তমানে অপমানিত ও লজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। মুসলিমদেরকে তাদের রবের শরীয়াহ’র আনুগত্য করতে হবে এবং দলীল না জেনে তাদের পক্ষে কোনো কাজ করা উচিত হবেনা।
ইসলামী হুকুমতের অস্তিত্বে আসা এবং তাতে ফলধারণের জন্য এসব চিন্তা উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।
যেসব বিষয় আমরা উল্লেখ করেছি তার সবগুলোই দলের বিকাশক্রিয়ার (culture) অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। শরীয়াহ’র নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে একটি উপযুক্ত রাস্তা তৈরি করা যাতে আমরা চিন্তাভাবনাগুলোকে নির্ধারণ করতে পারি এবং সেই ভিত্তি ঠিক করতে পারি যার আলোকে এসব বিকাশ প্রক্রিয়াসমুহ (culture) গ্রহণ করা হবে।
যথেষ্ট শক্তিশালী চিন্তা, মতামত ও শর’ঈ হুকুম দলটিকে নির্ধারণ করতে হবে যাতে সে নিজেকে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য নিয়ে যেতে পারে এবং দাওয়াতের দায়িত্ব বহনকারীদের মধ্যে পূর্ন মনোযোগের সৃষ্টি করতে পারে। উম্মাহর মধ্যে জনমত গড়ে তোলার জন্যও এসব চিন্তাও প্রয়োজনীয়। দলটি যে ফিকরাহ (ধারণা) এর উপরে প্রতিষ্ঠিত তা উম্মাহকে গ্রহণ করাতে এগুলো কাজে লাগবে।
উল্লিখিত পরিকাঠামো দলটিকে বজায় রাখতে হবে। এই বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে যদি দলটি সমর্থ হয় তাহলে মৌলিক বিষয়ের শাখা-প্রশাখা থেকে উদ্ভূত কম গুরুত্বপূর্ণ হুকুমসমূহ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সে কিছু ভুল করলে, অথবা অন্যান্য দলের সঙ্গে সে মতভেদ করলে অথবা অন্যান্য দল তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করলে তা তেমন ক্ষতিকর হবেনা। কারণ এটি একটি অপরিহার্য এবং অনিবার্য বিষয়।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার শরীআহ’র সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিশ্বের বাকি অংশে দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য অর্জনের জন্য এসমস্ত বিকাশক্রিয়া (culture) দলটির জন্য অপরিহার্য। প্রকৃতপক্ষে সফলতা দেয়ার মালিকতো কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাাহু তায়ালা।
৭ম অধ্যায়: দলের বিকাশ প্রক্রিয়া (Culture)
উম্মাহর দরকার হচ্ছে বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের, আর পরিবর্তনের জন্য আবশ্যক হল ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক কাঠোমোর মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। সুতরাং কাঠামোটির সঠিক বৈশিষ্ট্য ও গাঠনিক উপাদানগুলোর বিষয়ে এবং পূর্ববর্তী কাঠামোগুলোর সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা অপরিহার্য, যাতে সেসবের ব্যর্থতার কারণ বুঝা সম্ভব হয় এবং তা এড়িয়ে চলা যায়। এজন্য কাঠামোগত দিকটি পর্যবেক্ষন করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দিকটি কায়দা বা ধরনের (style) অন্তর্গত একটি বিষয়। কায়দা বা ধরনের বিষয়টি মূলত মুসলিমদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যাতে কাজের যথার্থতা ও উপযুক্ততা অনুযায়ী তারা তা নির্ধারণ করে। এই বিষয়টি দলীয় কৃষ্টির বা সংস্কৃতির একটি অংশ।
— যে সমাজে মুসলিমরা বাস করে তাতে যেহেতু বিভিন্ন চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থার মিশ্রণ রয়েছে সেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজ; এর বাস্তবতা, উপাদান, এতে প্রভাব সৃষ্টিকারী বিষয়সমূহ এবং একে পরিবর্তন করার উপায় নিয়ে কথা বলতে হবে যাতে চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থার দিক দিয়ে সুসংহত ইসলামী সমাজ নির্মাণ করা যায়।
— যেহেতু ব্যক্তির বাস্তবতা থেকে সমাজের বাস্তবতা ভিন্ন, সেহেতু ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত গাঠনিক বিষয়াদি সমাজের গাঠনিক বিষয়াদি থেকে ভিন্ন। অতএব ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত শর’ঈ হুকুম সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত শর’ঈ হুকুম থেকে ভিন্ন।
— যেহেতু সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে দলটির কর্মকাণ্ড জড়িত সেহেতু এই বাস্তবতায় কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তা ও শরঈ হুকুম দলটিকে বিস্তারিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি এ কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত হুকুমসমূহকে গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সে ব্যক্তিসাধারণ এবং জনগণকে নির্দেশনা দিবে। গ্রহণকৃত এসব হুকুম তার জন্য সামষ্টিক দায়িত্ব হতে পারে যেগুলোর অবজ্ঞা করার কোনো অজুহাত তার নেই অথবা এগুলো তার ব্যক্তিগত দায়িত্বও হতে পারে, যেগুলোর আনুগত্য করতে দল তাকে আহ্বান করছে যেমন: লেনদেন, ইবাদত এবং নৈতিকতা যেগুলো ইসলামী আক্বীদাহ থেকে উৎসারিত এবং তার দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা।
— মুসলিমদের চিন্তার ব্যবহার যেহেতু বর্তমানে পাশ্চাত্য দ্বারা প্রভাবিত এবং চিন্তার সাহায্যেই তারা স্বার্থ নির্ধারণ করছে সেহেতু রাসূল (সা)-এর সর্বোত্তম অনুসরণ এবং শরীয়াহ’র সবচেয়ে সঠিক আনুগত্যের জন্য চিন্তা ও এর উপাদান নিয়ে আমাদেরকে চিন্তাভাবনা করতে হবে যাতে আক্বীদাহ, শরঈ আহকাম অথবা বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করার ক্ষেত্রে চিন্তা ব্যবহারের সীমা কতটুকু এবং কীভাবে তা ব্যবহার করতে হবে সেটি আমরা জানতে পারি।
— যেহেতু আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে শাসন এবং দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত সেহেতু মক্কায় রাসূল (সা) কীভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং কোন কোন কর্মকাণ্ডের ফলে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে সম্পর্কিত জ্ঞান আমাদেরকে অর্জন করতে হবে। এ জ্ঞান অর্জনের পর আমাদের অবশ্যই তা দ্বারা পরিচলিত হতে হবে। রাসূল (সা)-এর কর্মকাণ্ডকে যথার্থরূপে অনুসরণের জন্য পদ্ধতি সংক্রান্ত হুকুম এবং ধরন ও উপকরণ সম্পর্কিত হুকুমের পার্থক্য আমাদেরকে ভালোভাবে বুঝতে হবে।
— যেহেতু দলের কাজ হচ্ছে আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে পরিচালিত হয় এমন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা, সেহেতু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শাসকদের কর্মকাণ্ডকে, শাসকদের বাস্তবতাকে এবং শাসকদের সাথে তাদের মিত্রদের সম্পর্কের প্রকৃতিকে বোঝা আমাদের জন্য অপরিহার্য। শাসকদের কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণকারী পরাশক্তিসমূহের গৃহীত বিভিন্ন নীতিমালা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ এবং তাদের পরিকল্পনাগুলোকে জনসমক্ষে প্রকাশ করাটাও আমাদের জন্য জরুরী।
— যেহেতু মুসলিম ভূখণ্ডসমূহ পাশ্চাত্য ব্যবস্থা বিশেষত পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থাসমূহ দ্বারা পরিচালিত সেজন্য ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের মতাদর্শ, আক্বীদাহ এবং এগুলোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা চিন্তা ও ব্যবস্থা নিয়ে আমাদেরকে পর্যালোচনা করতে হবে।
— ইসলামের বাস্তবায়ন এবং একে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যেহেতু শরীয়াহ’র উদ্দেশ্য সেহেতু শাসনব্যবস্থা, ইসলামী রাষ্ট্র, এর গঠনতন্ত্র ও প্রকৃতি, এর স্তম্ভসমূহ, সংবিধান এবং ইসলামী রাষ্ট্রে যেসব বিষয় বাস্তবায়িত হবে তার উপরে একটি সাধারণ ধারণা অর্জন করা অত্যাবশ্যক। আমাদেরকে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাসমূহের গঠনতন্ত্রও পরীক্ষা করতে হবে যাতে এগুলো থেকে নিজেদেরকে আমরা পৃথক করতে পারি এবং তা দ্বারা প্রভাবিত না হই। পাশাপাশি আমাদেরকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে।
এভাবে দলটিকে এর বিকাশ প্রক্রিয়ার (culture) উপকরণসমূহ (topics) চিহ্নিত করবে এবং যাতে সেগুলো অনুযায়ী কাজ করা যায় এবং জনসাধারনকে এ কাজের প্রতি জরুরীভাবে আহবান করে ইসলামি জীবনব্যবস্থা পুন:প্রচলন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা যায়। খিলাফত রাষ্ট্র ইসলাম দিয়ে মুসলিম ও অমুসলিমদেরকে শাসন করবে এবং দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে এর বার্তা বিশ্বের নিকট পৌঁছে দিবে।
ক্বিয়াস আক্বলী (যুক্তির ভিত্তিতে ক্বিয়াস নির্ধারণ)
আক্বল সাদৃশ্যতাপূর্ণ ও তুলনীয় বস্তু সম্পর্কে একই ধরনের নিয়ম প্রদান করে। সেকারণে এমন দু’টি বিষয়ের মধ্যে স্বরূপতা আনা হয় যেগুলোর মধ্যে সাদৃশ্যতা রয়েছে। এবং আক্বল ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম প্রদান করে।
এ অবস্থা ক্বিয়াস শরী’আহ এর সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ শরী’আহ একই ধরনের বিষয়ে ভিন্ন ধরনের হুকুম প্রদান করেছে এবং ভিন্ন ধরনের বিষয়ে একই হুকুম প্রদান করেছে। শরী’আহ একই বিষয়কে দু’ভাবে দেখেছে, যেমন: দু’টি ভিন্ন সময়কে। লাইলাতুল ক্বদরকে অন্যান্য রাতের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একই ধরনের স্থানকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছে, মক্কাকে মদীনার উপর এবং মদীনাকে অন্যান্য স্থানের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সালাতের ক্ষেত্রে চার রাকাআত এর নামাজ ও তিন রাকাআতের মধ্যে পার্থক্য করেছে, শরী’আহ চার রাকআতকে ছোট করে দুই রাকআত করবার অনুমতি দিলেও তিন বা দুই রাকআতকে সংক্ষিপ্ত করবার অনুমতি দেয়নি। আক্বল এ ধরনের তুলনা করতে সক্ষম নয়। বীর্য স্খলনের ক্ষেত্রে শরী’আহ গোসলের বিধান দিয়েছে যদিও এটা পবিত্র। অন্যদিকে মাজিহ বা বীর্য স্খলনপূর্ব তরল অপবিত্র হওয়া সত্তেও এর নিঃসরণের পর ওযুর বিধান প্রদান করেছে যদিও বীর্য ও মাজিহ একই স্থান হতে নিঃসৃত হয়। তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য ইদ্দত বা অপেক্ষমান সময় তিন মাসিক চক্র করেছে, অন্যদিকে বিধবা নারীর জন্য তা চারমাস দশদিন যদিও এক্ষেত্রে জরায়ুর অবস্থা একই থাকে। পরিষ্কারের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা পানি ও ধুলাকে একই মর্যাদা প্রদান করেছে যদিও পানি ধুলা পরিষ্কার করে। এটা ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ ও হত্যার বদলে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে যদিও তিনটি ভিন্ন ধরনের অপরাধ।
এছাড়াও শরী’আহ এমন সব বিষয়ে হুকুম প্রদান করেছে যে বিষয়ে আক্বলের ভিত্তিতে কিছু বলার নেই। যেমন: এটা স্বর্ণের দ্বারা স্বর্ণ বিক্রিকে নিষিদ্ধ করেছে, যদি সমভাবে অথবা বাকীতে না হয়। এটা ছেলেদের স্বর্ণ পরিধান করতে নিষেধ করেছে, কিন্তু মেয়েদের অনুমতি দিয়েছে। একই কথা রেশমী কাপড়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটা সুদকে হারাম করেছে এবং ব্যবসাকে করেছে হালাল। এটা অসিয়তের সাক্ষী হিসেবে কাফেরদের অনুমোদন দিয়েছে কিন্তু আবার প্রত্যাহারকৃত তালাকের ক্ষেত্রে এ শর্ত জুড়ে দিয়েছে যে সাক্ষী হতে হবে মুসলিম।
এ কারণে আলী (রা) বলেছেন, ‘যদি দ্বীন কোন ব্যক্তির মতামতের ভিত্তিতে করা হত, তাহলে মাসহ করবার ক্ষেত্রে পায়ের উপরের চেয়ে নীচের অংশটিই বেশী পছন্দনীয় ছিল।’
সুতরাং যে দলটি ইসলামি জীবনধারা ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য কাজ করছে তাদের অবশ্যই এই মূলনীতিগুলোকে বুঝতে হবে। দলটি কীভাবে বাস্তবতা অনুধাবন করবে এবং তা তুলে ধরবে এটা অবশ্যই দলটি বিকাশ প্রক্রিয়ার মধ্যে উপস্থাপন করবে যাতে সদস্যগন বুঝতে পারে। এটা অবশ্যই শরীয়া উৎস ও উসুলী মূলনীতিগুলোকে সংজ্ঞায়িত করবে এবং গ্রহণ করবে ও শাবাবদের এর ভিত্তিতে বিকশিত করবে। কারণ এসব মূলনীতির উপর ভিত্তি করে তাদের মনস্তত্বকে গঠন করতে হবে। এটা বিকাশ প্রক্রিয়ারও অংশ হবে। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও উসুলী বিকাশ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা অপরিহার্য যা ওহীর বিশুদ্ধতা ও চিন্তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং এমন বাহুল্যতাকে দূরীভূত করবে যা ওহীকে অ¯পষ্ট করে তোলে, যেমন: এরকম মূলনীতি, ‘এটা পরিত্যাজ্য নয় যে, সময় ও পাত্রভেদে হুকুম পরিবর্তন হয়’ এবং এর সার্বিক অর্থ যা দাঁড়ায় তা হলো ‘প্রয়োজন হারামকে জায়েয করে’ এবং ‘দ্বীন উদার ও বিবর্তনযোগ্য’ কিংবা ‘যেখানে সুবিধা পরিলক্ষিত হয় সেটাই হলো আল্লাহর বিধান।’
কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত শরীয়া হুকুম গ্রহণ ও পালন, এগুলোকে নির্দেশনা ও আলোকিত চিন্তা হিসেবে গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই দলটি তার নিজস্ব উসুলের মধ্যে এগুলোকে গ্রহণ করবে, যা এর দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রন করবে ও শরী’আহকে হৃদয়ঙ্গম করতে সহায়তা করবে এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সুনিশ্চিত করবে।
একটি ইস্যূতে একাধিক ইজতিহাদ থাকতে পারে। বিতর্কিত ইস্যুগুলো থেকে দলিলের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে দলটি তার জন্য শরীয় হুকুম গ্রহণ করবে এবং এগুলোর সাথে স্থির থাকবে। এরপর দলটি তার উসুলী মূলনীতি ও ফুরু বা শাখা সম্বন্ধীয় মূলনীতি ঘোষণা করবে। এর মাধ্যমে শাবাবদের বিকশিত করবে, জীবনকে এগিয়ে নিবে এবং এটা ব্যবহার করে আলোচনা করবে। নিজে গ্রহণ করেছে বিধায় এটি দলিল ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে অন্যদের তা গ্রহণের জন্য হৃদয় জয় করবে। বিকাশ প্রক্রিয়া অনুসারে অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করবে; অন্যথায় সে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে এবং পথিমধ্যে দিক হারিয়ে ফেলবে।
সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া হুকুম জানার আগে এ বিষয়ে শরীয়ার উৎস ও ঊসুল অধ্যয়ন করতে হবে। দলটি তার কাজ পরিচালনার সময় অনেক দূর্ভোগ ও জটিলতার সম্মুখীন হবে। যদি এটা শক্তিশালী দলিলের ভিত্তিতে নিষ্ঠার সাথে কোন উসুল গ্রহণ না করে, তাহলে এটি দোদুল্যমান হবে এবং গৃহীত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে ক্রমাগত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাবে। তারা বর্তমান দূষিত শাসনব্যবস্থার ভেতরে গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে যা কিনা ছিল দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ও প্রতিবন্ধক। যখন তারা গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে তখন বর্তমান ব্যবস্থার সাথে ইসলামী শুরা ব্যবস্থার সাদৃশ্যতা খুজে পায়। ‘পূর্ববতীর্ নবীদের শরী’আহ তাদের জন্যও শরী’আহ’ এ যুক্তিতে তারা পূর্ববতীর্ নবীদের শরী’আহ থেকে গ্রহণ করে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করে। সঠিক শরীয়া পদ্ধতি অনুসরণ না করবার কারণে এভাবে ক্রমাগত পরিবর্তনের মত জটিলতায় উপনীত হয়। অথবা দলটি এমনও দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহন করতে পারে যে, বিভিন্ন সংস্থা গঠন করে তারা বাস্তবতা পরিবর্তনের সুযোগ পাবে, ফলে পদ্ধতির বদলে উপায়ের চিন্তায় তাদের মন আচ্ছন্ন থাকে। অথবা এমনকি তারা শরীয়া পদ্ধতির অনুসরণ না করে অস্ত্রধারণ করতে পারে; কারণ বাস্তবতা তাদের সেদিকে ধাবিত করে।
সুতরাং উসুল ও ঊৎস গ্রহণ, এবং ইজতিহাদের নির্ধারিত পদ্ধতির অনুসরণের মাধ্যমে দলটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাঙ্খিত পথে অটল থাকবে এবং বাস্তবতা, পরিস্থিতি কিংবা স্বার্থ যেদিকে উদ্দীপিত করে সেদিকে ধাবিত হবে না।
এভাবে দলটি আইনগত চিন্তার পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করবার পর এর কাজের পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করবে। অন্যথায় এটি বহুপথে বিচ্যুত হয়ে যাবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়ে ধ্বংস ডেকে আনে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের প্রতি সুদৃষ্টি দেন না।
দলটি এর বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণের উৎসকে সুনির্দিষ্ট করবার পর এইসব উৎস ও গৃহীত উসুলের ভিত্তিতে বিকাশের চিন্তাগুলোকে সংজ্ঞায়িত করবে।
উৎস ও উসুল অধ্যয়নের ক্ষেত্রে দলটি অবশ্যই সুনিশ্চিত করবে যে, শরী’আহ উপলদ্ধির ক্ষেত্রে দলটি অবিশুদ্ধ চিন্তা ও অন্য চিন্তার সাথে গুলিয়ে ফেলার মত ভুল থেকে মুক্ত। ওহীকে অবিশুদ্ধ করে এমন সব কিছুকে দূরীভূত করবার জন্য এটা প্রচেষ্টা চালাবে এবং শরী’আহ বোঝার ক্ষেত্রে খেয়াল খুশীর অনুগামী না হবার জোর প্রচেষ্টা চালাবে এবং মনকে বিধি বিধান নিয়ন্ত্রনের কোন অনুমতি দিবে না। উসুল এবং উৎস অধ্যয়ন ছাড়া দলীয় বিকাশের চিন্তাগুলোর চর্চা সম্ভব নয়।
এরপর দলটিকে ফিরতে হবে ও অনুশীলন করতে হবে সেই বাস্তবতার প্রতি যেখানে উম্মাহ বসবাস করে, যা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এইভাবে এটা বর্তমান চিন্তা, আবেগ, ও ব্যবস্থা নিয়ে অধ্যয়ন করবে, যাতে বুঝতে পারে, এ সম¯ত চিন্তা ও ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগনের গ্রহনযোগ্যতা ও প্রতিক্রিয়া কতটুকু। উম্মাহ কুফর চিন্তা দ্বারা আকর্ষিত, যেগুলোকে কাফেররা উম্মাহর স্বাস্থ্যের পূনরুদ্বারের শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। রাজনৈতিকভাবে উম্মাহ পুতুল শাসক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যাদেরকে উপনিবেশবাদীরা মুসলিমদের উপর চাপিয়েছে, যাতে করে উম্মাহর সম্পদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করা যায় এবং যে কোন আন্তরিক কর্মকান্ড যা তাদের উপনিবেশবাদীতাকে হুমকির মুখে ফেলবে তার প্রতিহত করা যায়। অধ্যবধি পশ্চিমা কাফির উপনিবেশবাদীরা সচেতন যে কোন সামষ্টিক আন্দোলনের ব্যপারে যা তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখোমুখি করবে, তাই সে জনগনের মধ্যে সামষ্ঠিক বা দলীয় কর্মকান্ড সম্পর্কে দূরে রাখার চিন্তা ছড়ায়। পরিবর্তে সে উৎসাহ প্রদান করে সমিতি মূলক কর্মকান্ডে যা চাক্রিক (peripheral) সমস্যার সমাধান দেয় যেমন দারিদ্র নিরসন ও মন্দ নৈতিকতা।
পশ্চিমা কাফিররা মুসলিমদের তাদের দীনই মানুষের সমস্যার একমাত্র সমাধান সেসম্পর্কে আত্নবিশ্বাসকেও সন্দিহান করে তুলেছে, যখন তারা (পশ্চিমা কাফিররা) আকীদাকে (মুসলিমদের) জীবন থেকে পৃথক করেছে, এই পৃথকীকরন তাদের উপর বল প্রয়োগ করে চাপিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রেও বাধা দিেচ্ছে।
এজন্যই দলটি গভীর ও সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট উপায়ে বিরাজমান বাস্তবতা, চিন্তা, আবেগ এবং ব্যবস্থাসমূহ অধ্যয়নে বাধ্য। এটা এই কারনে যে, যে ভূমির উপর সে দাড়িয়ে আছে সেই ভূমিটির প্রকৃতি, কেমন করে এর উপর সে হাটবে ,বাধা দূর করার ক্ষেত্রে কি কি হাতিয়ার প্রয়োজন, আর উর্বরতার জন্য কি কি জিনিস দরকার অথবা উর্বরতা ফিরিয়ে আনার জন্য কোন উপাদান প্রয়োজন, তা উপলদ্ধি করার জন্য। তাই অবশ্যই প্রথমে একজনকে বা¯তবতা বুঝতে হবে। এটা দলটির সংস্কৃতির (culture) গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে, কারন এটা দলটির নিকট পরিস্কার থাকতে হবে এবং এটা অবশ্যই শাবাব এবং জনগনের নিকট পরিস্কার থাকতে হবে যাতে তারা এ প্রসঙ্গে অজ্ঞ না থাকে, এবং তারা এরপরে এর সমাধানের সঠিকতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে।
যে বাস্তবতায় উম্মাহ রয়েছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনেতিক এবর্ং সামাজিক বা¯তবতা অনুধাবনের পর, দলটিকে পূর্বেলিখিত উৎস ও উসুল অনুসরন করে চিন্তা, মতামত এবং শরীয়া বিধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে। যে পদ্ধতিতে দলটি এ চিন্তা, মতামত ও শরীয়া বিধানে (method) পৌছেছে তা শাবাব এবং জনগনের কাছে পরিস্কার থাকতে হবে। কারণ এটাই দলটির শাবাবদের মধ্যে দৃঢ়বিশ্বাস, সচেতন মনোভাব এবং ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরী করবে গভীরভাবে, যা সাধারনভাবে উম্মাহর মাঝেও তৈরী হবে।
আল মাসলাহাহ (জনস্বার্থ)
মাসলাহাহ মানে হল কোন উপযোগিতা অর্জন করা বা ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকা। এটা মনের ভিত্তিতে হতে পারে আবার শরী’আহ দ্বারা ঠিক করা হতে পারে। যদি মানুষের মনকে এ ব্যাপারে দায়িত্ব দেয়া হয় তাহলে মানুষের পক্ষে সত্যিকারের উপযোগিতা খুজে বের করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে যাবে। কারণ আমাদের মন সীমিত। মানুষের মন তার সব প্রয়োজন ও বাস্তবতাকে ধারণ করতে পারে না। সেকারণে সে তার জন্য সঠিক উপযোগিতা নির্ধারণ করতে সক্ষম নয় যেহেতু কোন একটি জিনিস উপকারী না ক্ষতিকর এ বিষয়ের বাস্তবতাকে মানুষ সঠিকভাবে উপলদ্ধি করতে পারে না। স্রষ্টা ব্যতিত আর কেউ মানুষের বাস্তবতা সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখে না। কোনটা কীভাবে হলে মানুষের স্বার্থ রক্ষিত হবে তা মানুষের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহনাহানাহুতায়ালা ব্যতিত আর কেউ নির্ধারণ করতে পারে না। মানুষ হয়ত কোন একটি জিনিসকে তার জন্য উপকারী বা ক্ষতিকর মনে করতে পারে কিন্তু এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত জ্ঞানলাভ করতে পারবে না। সেকারণে অনুমাননির্ভরতার উপর ভিত্তি করে কোনটি উপকারী, এ ব্যাপারে মনের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়া হলে তা বিপজ্জনক এবং মানুষের জন্য তা ধ্বংস নিয়ে আসে। কোন কিছুকে হয়ত সে ক্ষতিকারক ভাবতে পারে কিন্তু পরে এটি তার জন্য উপকারী প্রমান হতে পারে। সেক্ষেত্রে সে একটি ভাল জিনিসকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখল। আবার কোন কিছুকে হয়ত সে ভাল ভাবতে পারে এবং পরে এটি ক্ষতিকারক বলে আবিভূর্ত হতে পারে এবং এভাবে সে নিজের জন্য ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসে। আজকে মন যে জিনিসটাকে ক্ষতিকারক ভাবে আগামীদিন সেটিকেই উপকারী বলে রায় দিতে পারে। অনুরূপে, আজকে যে জিনিসকে ক্ষতিকারক মনে হচ্ছে গতকাল হয়ত সেটি উপকারী ভাবা হয়েছিল। এ ধরনের পরষ্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত দেয়া ঠিক নয়। আর ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থায় এ ধরনের পরিস্থিতি একটি স্বাভাবিক বিষয়। আইন প্রণেতা হিসেবে মানুষ তার নিজের জন্য ভাল কিছু করার চেষ্টা করে। সে কারণে আমরা দেখি সমস্যার সমাধানকল্পে ব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নয়ন সাধনের জন্য পরিবর্তন ও সংশোধন হতেই থাকে। কারণ হল বাস্তবে তারা কোন জিনিস বা কাজের ক্ষেত্রে এমন কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না যা চূড়ান্ত ও সঠিক । সে কারণে যাদের ব্যবস্থা সুদৃঢ় ও স্থির তাদেরকে তারা এর জন্য দোষারোপ করে। কাফেরদের এ প্রবণতা দ্বারা আমরা মুসলিমদের আক্রান্ত হতে দেখি। নিজেদের এবং দ্বীনের ব্যাপারে তখন তারা আত্মরক্ষামূলক হয়ে উঠে এবং ইসলামের প্রকৃতির ব্যাপারে তাদের চিন্তা সঠিক উপলদ্ধি থেকে অনেক দূরবর্তী হবার কারণে তারা ইসলামের শত্রুদের চিন্তার প্রক্রিয়াকে ধারণ করে ক্রমান্বয়ে তাদের নিকটবর্তী হতে থাকে।
স্রষ্টাই একমাত্র সত্তা যিনি মানুষের বিষয়সমূহ বিবেচনায় আনতে পারেন এবং জৈবিক চাহিদা ও প্রবৃত্তি থেকে উদ্ভুত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারেন এবং সঙ্গতভাবে এগুলো মেটাবার ব্যবস্থাপনা প্রদান করতে পারেন। যেহেতু মানুষের এসব বাস্তবতা সুনির্দিষ্ট এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয় না সেহেতু সমাধানও অপরিবর্তনীয় ও সুনির্দিষ্ট। একজন পুরুষ মানুষকে স্বাভাবিক প্রবণতার কারণেই একজন নারীর দ্বারস্থ হতে হয়। যেহেতু মানব মানবীর অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তাগুলো পরিবর্তনশীল নয় সেহেতু তাদের মধ্যকার সম্পর্কও অপরিবর্তনীয়। এটা কখনওই গ্রহণযোগ্য হবে না যদি আমরা মানব মানবীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ব্যবস্থাপনা প্রদান করি এবং একটি নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হবার পর উন্নয়নের সাথে সাথে তাদের বাস্তবতা পরিবর্তিত না হওয়া সত্তেও সে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করি।
যেমন, মদের বাস্তবতা একই রকম আছে এবং এতে কোন পরিবর্তন হয়নি। তাহলে এ ব্যাপারে হুকুম পরিবর্তন করা হবে কেন?
জুয়া খেলার বাস্তবতাও একই রকম ও অপরিবর্তনীয় আছে। তাহলে এ ব্যাপারে হুকুম পরিবর্তন করার কারণ কি? এ ধরনের আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।
সেকারণে ‘ক্রমউন্নয়ন’, ‘উদারতা’ এবং ‘আধুনিকতা’ এগুলো হল মানবরচিত ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য, যা সত্যের দিকে ধাবিত করে না। তারা একটি পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ক্রমাগত যেতে থাকে, যা একটি সঠিক ব্যবস্থার দিকে মানুষ নিজেকে পরিচালিত করবার যে ব্যর্থতা বা অক্ষমতা তাকেই প্রকাশ করে। এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া একটি নিশ্চিত অক্ষমতা হওয়া সত্তেও তারা একে ক্রমবিবর্তন বলে অভিহিত করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই ঐ মূলনীতিটি প্রত্যাখ্যান করা ঊচিত যা মানুষ শরীয়া থেকে ঊদ্ভুত বলে দাবী করে, যাতে বলা হয় ”সময় এবং স্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে হুকুমেরও পরিবর্তন ঘটবে”। এ মূলনীতিটি অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করা ঊচিত।
সুতরাং কোন একটি বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার হুকুম একটিই এবং তা একাধিক হতে পারে না। যদি এর বাস্তবতা পরিবর্তন হয়ে যায়, তাহলে বাস্তবতার পরিবর্তনের সাথে সাথে ঐ হুকুমও পরিবর্তিত হয়ে যায়। সেকারণে আঙ্গুর অনুমোদিত, কিন্তু যখন স্বীয় বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে তা মদে রূপান্তরিত হয়, তখন এ সম্পর্কিত হুকুম পরিবর্তিত হয়ে তা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। আবার যখন অ্যালকোহল ভিনেগারে রূপান্তরিত হয়, তখন তা অন্য একটি হুকেুম পরিবর্তিত হয় অর্থাৎ অনুমোদিত হয়। সুতরাং এখানে সময় বা স্থানের কোন বিবেচনা নেই। এরকম কিছু নেই যা এক জায়গায় অনুমোদিত এবং অন্য জায়গায় নিষিদ্ধ অথবা উল্টো করে বললে কোন জায়গার নিষিদ্ধ কিছু অন্য এক জায়গায় অনুমোদিত হতে পারে না। শরীয়া হুকুমের উপর সময় ও স্থানের কোন প্রভাব নেই।
অতীতে যে ঘটনাগুলো ঘটে গেছে, বর্তমানে যে সমস্যাসমূহ দেখা দিচ্ছে বা ভবিষ্যতে যে সমস্যাগুলো হতে পারে ইসলামী শরী’আহ-এর মধ্যে তার সবগুলোর সমাধানই রয়েছে । এমন কোন ঘটনা ঘটতে পারে না বা সমস্যা হতে পারে না যে বিষয়ে শরী’আহ’র কোন হুকুম নেই। ইসলামী শরী’আহ মানুষের সব কাজকে পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিকভাবে বেষ্টন করে। এ সম্পর্কে তিনি ( সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যাতে রয়েছে প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনা’
(সূরা নাহল: ৮৯)সুতরাং শরী’আহ একটি বিষয় বা কাজের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসের মাধ্যমে দলিলাদি দিয়েছে অথবা এ বিষয়ে আইনের জন্য ইল্লা-হ বা ঐশী কারণ বিধৃত করেছে। এ ইল্লা-হ শরীয়াগত এবং কখনওই ইল্লা-হ আকলিয়া বা প্রবৃত্তিপ্রসূত নয়। এখানে আমাদের শরীয় ক্বিয়াস এবং আকলিয়াগত ক্বিয়াসের মধ্যে পার্থক্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
শরী’য়াহ বুঝার নিয়মসমূহ
দলটি শরী’য়াহ’র উৎস সুনির্দিষ্ট করবার পর কীভাবে এসব উৎস থেকে শরী’য়াহ গ্রহণ ও এগুলোকে ব্যবহার করবে তা উপলদ্ধি করবে। অন্য কথায়, এটি এমন নীতিমালা (কাওয়া’ইদ) বুঝার দিকে মনোনিবেশ করবে যেগুলোর মাধ্যমে একজন উৎস থেকে আহকাম বের করে নিয়ে আসতে পারে। এটা নিঃসন্দেহাতীত যে, যখন একজন ইসলামী চিন্তাবিদ একটি শরী’য়া হুকুম বের করবার জন্য মনস্থির করে তখন তার মনে উসুলের নীতিমালাসমূহ থাকে যেগুলোর ভিত্তিতে সে একটি হুকুম প্রণয়ন করে। এমন কোন জ্ঞান নেই যার কোন মূলনীতি নেই, হতে পারে সেটি লিখিত অথবা অলিখিত।
শরীয়া যে কোন বর্ণণা হতে পারে আম বা সার্বজনীন, খাস বা সুনির্দিষ্ট, মুজমাল বা সংক্ষিপ্ত, মুফাসসাল বা বি¯তৃত, মুতলাক বা চূড়ান্ত, মুক্বায়েদ বা সীমিত, আওয়ামীর বা নির্দেশ, নাওয়াহী বা নিষেধাষ্ণা, মাফহুম আল মুয়াফাক্বাহ বা সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ, মাফহুম আল মুখালাফাহ বা বিপরীতার্থক অর্থ, মানতুক বা প্রকাশিত অর্থ, মাফহুম বা অপ্রকাশিত অর্থ, বর্ণিত বিষয়ের মা’কুল বা যুক্তি, খবর আল ওয়াহিদ বা একক বর্ণণা এবং কখন তা দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে আর কখন যাবে না ও এরকম অনেককিছু। দলটি তার আইনগত মূলনীতিকে চূড়ান্ত করবে, গ্রহণ করবে এবং অন্যদের কাছে উপস্থাপন করবে।
উল্লেখিত ঊসুলের মূলনীতিসমূহের অধিকাংশই বিতর্কিত। এটা সর্বজনবিদিত যে, প্রতিটি মূলনীতির আবার অনেক শাখা প্রশাখা রয়েছে। যেহেতু এগুলো বিতর্কিত সেহেতু এগুলোকে বিতর্কিত অবস্থা থেকে দূরে রাখতে হবে। দলটি যা সঠিক মনে করে এর ভিত্তিতেই এগুলো করতে হবে। উসুলের মূলনীতি বুঝবার পর শাখাসমূহ মূলনীতি অনুসারে উপলদ্ধি করা যায়।
উসুল ও এর মূলনীতি সম্পর্কে জানবার পর দলটি শরীয়াকে এর উৎস থেকে বুঝবার মত সক্ষমতা অর্জন করবে। এর পর ইজতিহাদের পরিচিত পদ্ধতি ব্যতিরেকে আর কিছু গ্রহণের কোন সুযোগ দলটির নেই। এটিই দলটিকে অন্যদের থেকে আলাদা করবে। আর এটাকে দলটি তার শাবাবদের বিকশিত (Culturing) করবার মাধ্যমে লোকদের কাছে নিয়ে যাবে। আর এটিই প্রথম জিনিস যার উপর দলটি প্রতিষ্ঠিত হবে।
অবশ্যই একজন মুজতাহিদের কাজ অনেকটা ডাক্তারের মত। প্রথমে তাকে রোগীর হাল, তবিয়ত সম্পর্কে জানতে হবে এবং তার অবস্থা বর্ণণা করতে হবে। অতপর তিনি রোগীর ভাষ্য অনুসারে মৌলিক অসুস্থতা নির্ণয় করবেন এবং এক্ষেত্রে অন্যান্য উপসর্গ দ্বারা বিভ্রান্ত হবেন না। অতপর তার শিক্ষা অর্জনের সময়কার জ্ঞানের শরণাপন্ন হবেন এবং এমন বইপত্রের দ্বারস্থ হবেন যেগুলো তাকে সমাধান বের করবার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। এরপরই তিনি সমাধান তথা ঔষধ দিবেন। অন্য কথায়, তিনি বর্ণিত বিষয়ের সাহায্য নিয়ে সমাধানটি বিধৃত করবেন। যদি কোন দল পরিবর্তন চায় এবং এটি ইসলামী হয় তাহলে অবশ্যই তারা ইসলামের ভিত্তিতে পরিবর্তনের জন্য কাজ করবে। পরিবর্তন অবশ্যই শরীয়া দলিলের ভিত্তিতে হতে হবে এবং কোন ব্যক্তিগত খেয়ালখুশী, মতামত, যৌক্তিকভাবে প্রাপ্ত সুবিধাদি, বাস্তবতা বা অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নয়। বরং একমাত্র শরী’য়াহই হবে যা দলের জন্য হুকুম শরীয়াহকে নিয়ন্ত্রন করবে। মুসলিমদের স্বার্থ শরী’আহ দ্বারা সংজ্ঞায়িত; কারণ শরীয়াহ একে সংজ্ঞায়িত করেছে। একারণে মাসলাহাহ বা স্বার্থের ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটু বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
শরী’য়াহর উৎস
যেহেতু প্রতিটি হুকুমকে একটি সঠিক উৎস থেকে আসতে হবে সেহেতু উৎস অধ্যয়ন করবার পর সে সম্পর্কে যথার্থ উপলদ্ধি তৈরির পরই তা গ্রহণ করতে হবে। এটা সর্বজনবিদিত যে, ইসলামি আইনের প্রধান উৎস হল কুরআন ও সুন্নাহ, যেগুলোর ব্যাপারে কোনরূপ মতানৈক্য নেই। লদ্ধ উৎসসমূহ হল, ইজমা, ক্বিয়াস, ইসতিহসান (আইনগত প্রাধান্য), মাজহাব আস সাহাবা (সাহাবীদের মতামত), শা’রা মান কাবলানা (পূর্ববর্তীদের শরীয়াহ), এ সবগুলোর ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে । উৎস সম্পর্কে অন্তর্নিহিত দৃষ্টিভঙ্গি দলের শরীয়া গ্রহণ সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়।
এটা সর্বজনবিদিত যে, লদ্ধ উৎসসমূহ নির্ভর করে সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদির উপর। সুতরাং, যদি কোন কিছু চূড়ান্তভাবে শরীয়ার উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়, তাহলে এটাকে কোরআন ও সুন্নাহ থেকে আসতে হবে। অন্য কথায়, দু’টি প্রধান উৎস অন্য একটি বিশেষ উৎসকে গ্রহণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। শরীয়া উৎস তাক্বলীদের মাধ্যমে গ্রহণ করা যথেষ্ট নয়। শরীয়া উৎস মৌলিক বিষয়, এবং একারণে এগুলোকে চূড়ান্ত হতে হবে এবং আমরা জানি তাক্বলীদ নিশ্চয়তার দিকে পরিচালিত করে না।
উৎস সুনির্ধারিত হবার পর আমরা বুঝতে পারব জলের কোন ধারা থেকে তারা পান করতে পারবে এবং পারবে না। উৎসকে সংজ্ঞায়িত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা উৎস নির্ধারণে একটি ভুল হলে পুরো হুকুমের মধ্যে গলদ চলে আসবে। শরীয়া উৎস সংজ্ঞায়িত হবার পর দলটি তার কাজের সাথে বিজড়িত শরীয়া হুকুম অবরোহণ করবে। শরীয়া উৎস নির্ধারণ না করে দাওয়াতের কাজ করা যে কোন দলের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়।
ভাল মনে করে সব লদ্ধ শরীয়া উৎস গ্রহণ করাও গ্রহণযোগ্য নয়। যদি দলটি এরকম কিছু করে তাহলে তারা ভাল ও মন্দ দু’টোই গ্রহণ করবে। এতে করে শরী’আহ বাস্তবতা, মানুষের মন, প্রবৃত্তি, আবেগ ও স্বার্থের কাছে দায়বদ্ধ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় দলিল সমূহ কেবলমাত্র এইসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্যই ব্যবহার করা হয় এবং শরী’য়াহর দাবীর বিপরীতে অবস্থান নেয়।
নীতিগতভাবে, বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য মতামত প্রদানের আগে দলটিকে অবশ্যই উৎসসমূহ সুনির্দিষ্ট করা উচিত। উৎসের ক্ষেত্রে কখনওই বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া চলবে না। বরং উৎসসমূহকে প্রতিষ্ঠা অথবা ভুল প্রমাণ করবার জন্য কেবলমাত্র নাজিলকৃত ওহী ও এদের চূড়ান্ত নির্দেশনা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত। তাছাড়া যেসব উৎসকে দলটি প্রতিষ্ঠিত করবে সেগুলোকে তার নিজের জন্য উসুল হিসেবে গ্রহণ করবে এবং অন্যদের এ ব্যাপারে বাধ্য করবে না। বরং তারা অন্যদের সাথে প্রমাণ ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে তাদের কাছে চূড়ান্ত বলে বিবেচিত মতামত নিয়ে আলোচনা করবে। যদি দলটি নিজেদের উৎসকে অন্যদের জন্য বাধ্যতামূলক ভাবে, তাহলে সেটি তাদের এবং অন্যদের সমস্যার কারণ হবে।
শরী’য়াহ উপলদ্ধি করা
চিন্তাকে ব্যবহার করে বাস্তবতাকে প্রকৃতভাবে বুঝবার পর শরীয়া দলিল থেকে উৎসারিত শরীয় হুকুম বাস্তবতায় প্রয়োগের জন্য উদ্ভুত হয়। চিন্তাকে সমাধান বের করবার জন্য উৎস হিসেবে গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়। এখানে চিন্তার কাজ হল শরীয়া দলিলে থাকা শরীয়া সমাধান উপলদ্ধি করা।
শরীয়া বুঝতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে দলটি কোন উৎস থেকে শরীয়া এবং ঊসুলী মূলনীতি গ্রহণ করে এবং কিসের দ্বারা দলটি মন্দ অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চায়। এভাবে, জনগনের সামনে নিয়ে যাবার জন্য বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে এবং ইজতিহাদি প্রক্রিয়ার যথার্থ জ্ঞান অর্থাৎ অবরোহণের প্রক্রিয়া সম্পর্কিত জ্ঞান রাখবে।
মানাত (বাস্তবতা) উপলদ্ধি
আহকাম বুঝবার জন্য ইসলামি পদ্ধতির ভিত্তি হল: সমস্যাকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করা, এর মর্মোদ্ধার করা, সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া দলিল এবং সবশেষে এই শরীয়া দলিল থেকে হুকুম বের করে নিয়ে আসা।
সুতরাং পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করা একটি দলের উপস্থিতি এটি যে বাস্তবতায় আছে তার সাথে সম্পর্কযুক্ত। কেননা এ বাস্তবতার নিরীখেই দলটিকে ঐ বাস্তবতা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় শরীয়া হুকুম বের করতে হবে।
আর কোন বিষয়ের বাস্তবতা বুঝতে হলে একজনকে ঐ বিষয়টি গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে।
শরী’আহ বুঝতে হলে প্রথমেই এর উৎস সুনির্দিষ্ট করতে হবে এবং উসুল ও মূলনীতি গ্রহণ করতে হবে যার ভিত্তিতে হুকুসমূহ বের করে আনতে হবে। হুকুম আহরণের এই প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য একজন মুজতাহিদ প্রয়োজন, যিনি যে কোন হুকুমকে তার বাস্তবতা অনুসারে প্রয়োগ করতে পারবেন এবং ইল্লাহ বা ঐশী কারণ অনুসারে কার্যকর করতে পারবেন।
সুতরাং একটি দল বা হিজবের উত্থান বাস্তবতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। দলটি বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে। সে কারণে এর চিন্তা ও পরিবর্তনের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। সে কারণে দলকে বাস্তবতা গভীরভাবে ও সুনির্দিষ্টভাবে উপলদ্ধি করতে হবে এবং যে সমস্যা সমাধান করা হবে তা খুঁজে বের করতে হবে। অগণিত সমস্যা রয়েছে। সেকারণে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যকার পার্থক্য অনুধাবন করতে পারতে হবে। একজনকে যেমনি মূল সমস্যা বুঝতে হবে তেমনি মূল সমস্যা থেকে উদ্ভুত শাখা সমস্যাগুলোও বুঝবার মত সক্ষমতা থাকতে হবে। এর মাধ্যমে একটি সমস্যা ও এর আপাত উপস্থিতির মধ্যকার পার্থক্য প্রতীয়মান হবে অর্থাৎ অসুস্থতার মূল কারণ ও সেকারণে সৃষ্ট উপসর্গের মধ্যকার পার্থক্য বুঝা যাবে। মূল কারণ সনাক্ত হবার পর একজন এর প্রতিকারের জন্য প্রচেষ্টা চালাবে।
এখানে আমরা একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ ডাক্তারের সাথে তুলনা করতে পারি, যিনি রোগের মূল কারণ উপলদ্ধি না করে উদ্ভুত উপসর্গ দ্বারা প্রতারিত হন না। যেমন: কোন লোকের পেটের অসুখ আছে এবং একারণে প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তার চামড়ায় ফুসকুড়ি সহ জ্বর হল। যদি সে ডাক্তার কেবলমাত্র চামড়ায় ফুসকুড়ি সহ জ্বরের চিকিৎসার জন্য ঔষধ প্রদান করেন কিন্তু পেটের অসুখের জন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন, তাহলে এ চিকিৎসা নিশ্চিতভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে। সে কারণে চিকিৎসককে প্রথমে মূল সমস্যার প্রতিবিধান করতে হবে, অর্থাৎ পেটের ব্যাধি। যদি তা করা হয় তাহলেই কেবলমাত্র উপসর্গসহ মূল অসুখের প্রতিকার করা হবে। মূল চিকিৎসার পরে ডাক্তার উদ্ভুত উপসর্গগুলোর জন্য প্রয়োজনে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেবে। তবে স্বাভাবিকভাবে উদ্ভুত উপসর্গগুলো মূল সমস্যার সাথে সাথে উপশম হয়ে যাবার কথা। আর না হলে পরবতীর্তে এগুলো চিকিৎসা করা যাবে। যদি সেটার প্রয়োজন হয় তাহলে সেটা হবে একটি আংশিক কাজ।
একই কথা আমরা যে বাস্তবতায় বাস করি সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমরা জানি, বাস্তবে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়েছে এবং এসব সমস্যা থেকে কিছু উদ্ভুত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। একটি বড় মৌলিক সমস্যা যা আজকে উম্মাহকে ক্লিষ্ট করে তুলেছে তা হল মুসলিমদের জীবনে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের অনুপস্থিতি। এটি থেকে অনেক উদ্ভুত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, যেমন: অবিচার থেকে উদ্ভুত দারিদ্রতা, অজ্ঞানতা, অনৈতিক কাজের বি¯তৃতি এবং অবৈধ সম্পর্কের প্রাধান্য। এর মূল কারণ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কোরআনে বলেন,
‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে।’
(সূরা ত্বোয়াহা: ১২৪)এই আংশিক সমস্যাসমূহ মূল একটি সমস্যা বা বাস্তবতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। যদি এই বাস্তবতার পরিবর্তন না হয় তাহলে এক্ষেত্রে টেকসই ও মৌলিক পরিবর্তন সংঘটিত হবে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বর্ণিত কুপ্রভাব থেকে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত বের হতে পারবে না যতক্ষণ না আল্লাহর আদেশ নিষেধের ভিত্তিতে ইসলামি আক্বীদাকে রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে গ্রহণ করে জীবনধারা পূণপ্রবর্তন হবে।
সুতরাং শিক্ষা, নৈতিকতা বা অর্থনৈতিক সংকট মৌলিক সমস্যা নয়। মুসলিমদের অধিকার পুণরুদ্ধার বা তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থাকে শক্তিশালী করাও মৌলিক সমস্যা নয়। বরং আক্বীদা ও বাস্তবতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মৌলিক সমস্যা হল আল হাকিমিয়্যাহ বা সার্বভৌমত্ব। এই সার্বভৌমত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার জন্য। সে কারণে আমাদেরকে ইসলামের সমাধানের উপর মুসলিমদের ভেতরে আত্নবিশ্বাস তৈরি করতে হবে। আমরা অবশ্যই তাদের হৃদয়ে হৃত আক্বীদা, আক্বীদা থেকে উদ্ভুত ব্যবস্থা জীবনে ফিরিয়ে আনবার জন্য সদিচ্ছা ফিরিয়ে আনবার জন্য প্রচেষ্টা চালাব যাতে করে তারা জান্নাত লাভ, জাহান্নামকে ভয় করে ও এর শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করে, ইসলামি আক্বীদার ভিত্তিতে মুসলিমদের বর্তমান করুণ অবস্থা তথা পুরো মানবতা সম্পর্কে সচেতন হয়।
এ উপলদ্ধি থেকে দলটি মৌলিক সমস্যাকে সংজ্ঞায়িত করবে এবং সুনির্দিষ্টভাবে জানবে যখন এ রোগের চিকিৎসা হবে তখন সব উদ্ভুত উপসর্গ দূরীভূত হবে। সুতরাং বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতার গুরুত্ব এখন সুস্পষ্ট।
একে উসুলী চিন্তাবিদগন মানাত বলে থাকেন। শারীয়া প্রমাণাদি নিয়ে আসবার আগে মানাত বা বাস্তবতাকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করা বাধ্যতামূলক।
বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং তা বুঝা এর সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমের চেয়ে কঠিন। এর জন্য দরকার যথার্থতা। কারণ যদি আমরা বাস্তবতা বুঝতে ভুল করি এবং এই ভ্রান্তি মনের উপর কোন ছাপ ফেলে তাহলে স্বভাবতই আমরা এমন দলিল উপস্থাপন করব যা হৃদয়নিবেশিত ভাবরাশিতে থাকা চ্যুত বাস্তবতাকে উপস্থাপন করবে। কখনওই আসল বাস্তবতাকে নয়। অর্থাৎ আমরা এমন দলিল উপস্থাপন করব যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বাস্তবতা বুঝার জন্য চিন্তার ব্যবহার অপরিহার্য। বাস্তবতাকে চিন্তার উৎস হিসেবে নির্ধারণ করা অনুমোদিত নয়। এমন কোন সমাধান গ্রহণ করা অনুমোদিত নয় যা বাস্তবতা থেকে উদ্ভুত। সেকারণে বাস্তবতাকে এর মত করেই বুঝতে হবে।








