Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ৫ম অধ্যায়: যেসব পদ্ধতি শরী’য়া পদ্ধতির সাথে সাংঘর্ষিক

    আমরা ইতোমধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মপদ্ধতি, তা অনুসরণ করা ও এ পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়ার গুরুত্ব উপস্থাপন করেছি। তবে আমরা দেখতে পাই কিছু ইসলামি দল ও চিন্তাবিদগন এ পদ্ধতি ব্যতিরেকে অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করছেন। যাইহোক যারাই এসব পদ্ধতি গ্রহণ করছেন, আমাদেরকে সে বিষয়ে অবশ্যই আলোচনা করতে হবে। দ্রুত পরীক্ষা করে এ বিষয়ে এমনভাবে অজ্ঞানতার পদার্কে উন্মোচন করতে হবে যাতে মুসলিমগণ অবিরতভাবে হতবুদ্ধি না হয় এবং গোলকধাঁধায় হারিয়ে না যায় অথবা দাওয়াত বহনের ক্ষেত্রে সন্দিহান না থাকে। নিম্নে আমরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি উপস্থাপন করব।  

  • শরীয় হুকুমসমূহ কী নিরীক্ষামূলক?

    দ্বিতীয় প্রশ্নের ক্ষেত্রে:

    কিছু লোক আছে যারা ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়নের কাজকে নিরীক্ষামূলক হিসেবে নিয়েছে এবং এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিরীক্ষামূলক পরিকল্পনা থেকে উদ্ভুত দাওয়াতের মাধ্যমে এগুবে বলে মনে করে। কিন্তু প্রশ্ন হল এ বিষয়ে এভাবে চূড়ান্ত কিছু বলা কী সমীচীন?

    পদ্ধতিকে নিরীক্ষামূলক বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা অপাংক্তেয়। এর অর্থ ‘শারী’য় পদ্ধতি’ এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

    ইসলামে যে কোন কাজের পদ্ধতি শরীয় হুকুম দ্বারা স্বীকৃত যা এর দলিলের বিশুদ্ধতার উপর নির্ভর করে। দলটি শরীয়া গ্রহণে যেমনি বাধ্য তেমনি এইসব দলিল গ্রহণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বাধ্যবাধকতা এবং প্রমাণিত কোন শরীয় হুকুম থেকে চ্যুত হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ তাদের নেই। সুতরাং এটা লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূণ নিরীক্ষামূলক (যদি পরীক্ষামূলকভাবে কার্যসম্পাদনের পর সাফল্য পাওয়া যায় তবে সেটাই পদ্ধতি এবং অন্যথায় অন্য কোন পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে) কোন বিষয় নয়।

    শরীয় যে কোন হুকুমের ধারক হল শরীয় পদ্ধতি যা ইতোমধ্যে আলোচিত হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হল লক্ষ্য অর্জন করা। আর তা হল ইসলামি জীবনধারা পূণপ্রবর্তন। এই হুকুম দলিলের শক্তিমত্তার উপর নির্ভর করে। এগুলো গ্রহণ ও আস্থাভাজন থাকবার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপাসনা করে থাকে। ঐ ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত এটাকে পরিবর্তন করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য শক্তিশালী দলিল আছে বলে সুনিশ্চিত হওয়া যায়।

    একজনকে অবশ্যই শরীয়াগত পদ্ধতিতে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করতে হবে। বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা অনুযায়ী কাজ করা এবং  শরীয় পদ্ধতিতে কাজ করা কখনওই এক বিষয় নয়। ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা থেকে নেয়া সমাধানে লোকজন যে কোন কাজকে সাফল্য বা ব্যর্থতা অথবা লক্ষ্য অর্জন হওয়া বা না হওয়ার ভিত্তিতে উপলদ্ধি করে থাকে।

    গ্রহণের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা এমন যে, কোনটিই তাদের জন্য চূড়ান্ত সমাধান নয়। এর জন্য প্রয়োজন অবিরত পরিবর্তন ও বিবর্তন। যে কোন পদক্ষেপই তারা গ্রহণ করুক না কেন সেটা নিরীক্ষামূলক। অবশ্য পশ্চিমা সব আইনই নিরীক্ষামূলক। তাদের জন্য একটি পদক্ষেপ সঠিক বা ভুল তা যাচাইয়ের একমাত্র পদ্ধতি হল তা বাস্তবায়নের পর লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য বা বিফলতার উপর। এ বাস্তবতা ইসলামের সাথে এ প্রকৃতির কারণেই সম্পূর্ণরূপে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। ইসলামের পদ্ধতি আল্লাহ প্রদত্ত যিনি আল আলীম (সবজান্তা) এবং আল খাবীর (সর্বসচেতন)। যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয়া দলিলের উপর নির্ভর করে ততক্ষণ পর্যন্ত এটি নিভূর্ল ও পূর্ণাঙ্গ। এর নিভূর্লতা উৎসারিত হয় শরীয় দলিলের নিভূর্লতা এবং ইসতিদলাল (সংশে­ষণ) থেকে। কোনক্রমেই ফলাফলের উপর এটি নির্ভরশীল নয়। অতএব দলিলের প্রতি আনুগত্য হচ্ছে ভিত্তি, যে ভিত্তি থেকে কাজের মূল্যায়ন হয়। কাজের পদ্ধতির ক্ষেত্রে ফলাফল বলতে বুঝায় ক্ষমতা গ্রহণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠা। আর এ বিষয়টি সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকতৃর্ত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়-ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে শান্তি দান করবেন। তারা আমার এবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না।’
    (সূরা নূর: ৫৫)

    ‘হে বিশ্বাসীগণ। যদি তোমরা আল্লাহ্কে সাহায্য কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন।’
    (সূরা মুহম্মদ: ৭)

    যদি ফলাফল না পাওয়া যায়, তাহলে একজন কোনক্রমেই এ পদ্ধতিকে অবজ্ঞা করতে পারবে না বা এটিকে অন্য কোন কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না বা এটাকে ব্যর্থ ঘোষণা করতে পারবে না। বরং পদ্ধতির হুকুমটি আরও study and review  করে দেখা উচিত। কোন শরীয় হুকুমকে পরিত্যাগ করা যাবে না যদি না দলটি বুঝতে পারে তারা হুকুমটি বুঝতে ভুল করেছিল। যদি দলটি ভুল না পায় তাহলে ঐ বিশেষ হুকুমের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব মতামতের উপর দৃঢ় থাকতে হবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সবর করতে হবে যতক্ষণ না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বিজয় দান করেন। অথবা বিষয়টি এমন হতে পারে যা ‘বিজয়ের বিলম্ব’ সুত্রের কারনে প্রলম্বিত হচ্ছে, যা থেকে নবীরা পর্যন্ত রেহাই পাননি। এ সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    ‘এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান বুঝি মিথ্যায় পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌছে।’
    (সূরা ইউসুফ: ১১০) 

    অবশ্যই এ কাজটি ব্যাপক ক্লান্তিকর ও কষ্টকর ও ব্যাপক প্রচেষ্টা সাপেক্ষ। দলটি যে শাসকদের মুখোমুখি হচ্ছে তার চেয়ে দলটির ক্ষমতা অনেক কম। কাজের সাফল্য কখনওই সময়সাপেক্ষ নয় যে, একটি নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর সাফল্য না আসলে আমরা ধরে নেই যে এটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। বরং এটি চিন্তার পরিশুদ্ধতা, চিন্তাধারণকারীদের দৃঢ়তা এবং জনগনের গ্রহণের সার্বজনীনতার সাথে সম্পর্কযুক্ত। যখন এই পূর্বশর্তগুলো পূরণ হবে তখন একজন ধরে নিতে পারে যে দলটি রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত নুসরা অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিজয়ী হবে। এ ব্যাপারে মূল্যায়ন হল যে, বিজয় কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে আসে। দলটি মূল্যায়ন করবে হুকুম ও দলিলের শক্তিমত্তার সম্ভাব্যতার ব্যাপারে।        

    যদি বিজয়ের শর্তসমূহ পূরণ করা যায়, তাহলে এটা আসবে। অন্যথায় এটা প্রলম্বিত হবে। বিজয় আসবার ক্ষেত্রে বিলম্ব বিফলতার নামান্তর নয়। হতে পারে যে, প্রস্তুতি ও তৎপরতার মাত্রা সন্তোষজনক নয় এবং তা বাড়াতে হবে। দল বা দলের শাবাবদের জন্য এ প্রলম্বন একটি পরীক্ষা হতে পারে যে, কেউ কি এ কারণে ভগ্নমনোরথ হয়ে পরিত্যাগ করে প্রতিশ্রুতি থেকে দূরে সরে এসেছে নাকি দৃঢ় থেকেছে? যে কোন পরিস্থিতিতে পূর্ণমূল্যায়ন করতে হবে। যদি পদ্ধতি পরিবর্তন করবার মত কোন যুক্তিসংগত কারণ দলটি খুজে না পায়, তাহলে কেবলমাত্র বিলম্বজনিত কারণে পদ্ধতি পরিবর্তন করা যাবে না। দলটিকে এর ধরন ও উপকরণকে বারংবার পরীক্ষা করে দেখতে হবে। আর অনুমোদিত এবং সর্বাপেক্ষা কার্যকরী ধরন ও উপকরণকে গ্রহণ করতে হবে। সুতরাং বিজয়ের বিলম্ব মানে বিফলতা নয়। তাছাড়া এমন কোন শরীয় বিধান নেই যে, একটি নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে উদ্দেশ্য হাসিল করতে হবে।   

    অবশ্যই পদ্ধতি সংশ্লিষ্ট হুকুম ও চিন্তার সঠিকতার বিষয়টিতে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। এ চিন্তা দিয়েই শাবাবগন ও উম্মাহ প্রস্তত হবে। যদি দলটি এই চিন্তা ও হুকুমসমূহকে বিশুদ্ধ মনে করে সঠিক ধরন ও উপকরণকে গ্রহণ করে ধৈয্যের্র উপর দৃঢ় থাকে, তাহলে বিলম্বের জন্য চিন্তা ও হুকুম পরিবর্তন অনুমোদিত নয়।     

    পরিবর্তনের বিষয়টি ব্যক্তি নয় উম্মাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত। একজন ব্যক্তিকে পরিবর্তনের চেয়ে সমাজ পরিবর্তনের কৌশল অনেক জটিল। সুতরাং এর গতি শ-থ এবং সহজে অনুধাবন করা যায় না। তবে সে অনুধাবন করতে পারে যার রয়েছে দূরদৃষ্টিমূলক চিন্তা এবং সঠিক পৃষ্টপোষকতা। এর অর্থ এই নয় যে, যখন কোন ব্যক্তি লক্ষ্যটাকে মাথায় নিয়ে কাজ করবে তখন তার মনোবৃত্তি এই হবে যে, সে সাফল্য অর্জন করতে পারবে না অথবা সাফল্য অর্জিত হবে ভবিষ্যত প্রজন্মের হাতে। বরং তাদেরকে এই মনোবৃত্তি পোষণ করতে হবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবী (রা) এর মত তাদের হাতেই ইনশাআল্লাহ খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তারা এর সাক্ষী হবে। একজন ব্যক্তির জীবন সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ হতে পারে। সুতরাং বিজয়ের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির জন্য নয় বরং পুরো দলের জন্য। তারা সেই বিশ্বাসীদের দল যাদের পৃথিবীতে ইসতিখলাফ বা সাফল্যের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ কাজের সময় একজন ব্যক্তিবিশেষের মৃত্যু হতে পারে, দলের আমীর মারা যেতে পারেন, কেউ কেউ এ পথ থেকে ছিটকে যেতে পারেন; কিন্তু প্রতিশ্রুতি ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত দলটি আল্লাহর নির্দেশ পালনে তৎপর থাকবে। বিজয় বিলম্বিত হোক বা না হোক, এ দলের কাছে বিজয়ের বিষয় আসবে। এ বিষয়ের জ্ঞানের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ছাড়া আর কেউ দায়িত্বশীল নয়। কিন্তু দলটি কেবলমাত্র সঠিক পদ্ধতি গ্রহণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল।

    সুতরাং কারও বলা ঠিক হবে না শরীয় হুকুম এমন একটি নিরীক্ষামূলক বিষয় যে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষ্য অর্জনের বিষয়টি অনুভূত না হলে আমরা একে ব্যর্থতা বলে গন্য করব এবং অন্য একটি নিরীক্ষামূলক পদ্ধতি দ্বারা এটিকে প্রতিস্থাপন করব। যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয় দলিল দ্বারা পদ্ধতিটি সুপ্রমাণিত থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত কেউ এ ধরনের কথা বলবার এখতিয়ার রাখেন না। তবে ধরন ও উপকরণের ক্ষেত্রে নিরীক্ষা চালানো সঠিক।

  • আজকাল কিছু মুসলিম তরীকার সাথে ধরনকে (উসলুব) গুলিয়ে ফেলে

    এ ধরনের সন্দেহ কিছু মুসলিমের মধ্যে সৃষ্টি হবার কারণ হল তারা মনে করে, রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় থেকে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্নতর। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় সমাজের বিভক্তি ছিল প্রাথমিক পর্যায়ের, অর্থাৎ বংশ এবং গোত্র। আজকে এ বিভক্তি আরও জটিল ও পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি রাষ্ট্রের সাথে আগের গোত্র সমূহের তুলনা করা চলে, যার জনসংখ্যা ছিল হাজার হাজার। এখন এ সংখ্যা মিলিয়ন মিলিয়ন। তখন দাওয়াত ছিল লোকদের কুফর থেকে ইসলাম গ্রহণের জন্য। আর আজকে দাওয়াত করা হয় মুসলিমদের ইসলামী জীবনধারা পুণপ্রবর্তনের জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় সুপার পাওয়ার পারস্য ও রোমানরা মক্কায় তার দাওয়াতে হস্তক্ষেপ করেনি। কিন্তু আজকের দিনে শাসকেরা পশ্চিমাদের আজ্ঞাবহ ও পুতুল মাত্র। এখন সুপার পাওয়ারগুলোই ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে….ইত্যাদি ইত্যাদি।

    বিভ্রান্ত লোকেরা আরও বলে, ‘আমরা কীভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) কে মানবো যখন অনেক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে গেছে? যদি পরিবর্তিত না হই তাহলে সেটা হবে কঠোরতা ও অনমনীয়তা। আমরা এভাবে কিছু গ্রহণ করতে বাধ্য নই। যা গুরুত্বপূর্ণ তা হল দাওয়াতের বৃহত্তর উদ্দেশ্য সম্বন্ধে লক্ষ্য রাখা, অর্থাৎ ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা দ্বারা এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং আল্লাহর দাসত্ব বা উবুদিয়্যাহ উপলদ্ধি করা।’

    এই ইস্যুটিকে কীভাবে দেখতে হবে তা ব্যাখ্যা করতে হবে, এভাবে শরীয় হুকুম নাজিল হয়েছিল বিভিন্ন বাস্তবতায় পরিপ্রেক্ষিতে। যখন বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে গেছে তখন এর সাথে বিজড়িত হুকুম পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যদি বাস্তবতা পরিবর্তিত না হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে শরীয় হুকুম অপরিবর্তিত থাকবে। বাস্তবতার ক্ষেত্রে এর বাহ্যিক দিকে খেয়াল না রেখে এর মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।   

    সমাজ হল কিছু লোকের সমষ্টি যাদের রয়েছে সাধারণ ধারণা, এ সাধারণ ধারণা হতে কিছু আবেগ ও এর সাথে একমত সবকিছুকে সমর্থন করার বিষয় উৎসারিত হয়, এবং এ সাধারণ ধারণা হতে কিছু ক্ষোভের বিষয় উৎসারিত হয় যখন কোন কিছু এর বিরুদ্ধে যায়। অতপর একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় যা এই চিন্তা বা ধারণাকে বাস্তবায়ন করে এবং এর কোনরকম ব্যাত্যয়কে প্রতিহত করে। সুতরাং লোকেরা এমনভাবে জীবনযাপন করে যে তারা পুরো বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে এবং এ ব্যাপারে তারা সন্তুষ্ট।    

    সমাজের বাস্তবতা বিভিন্ন রকমের হতে পারে। এটা হতে পারে প্রাথমিক পর্যায়ের বা জটিল। কিন্তু প্রত্যেক জনসমষ্টিই একটি সাধারণ চিন্তা ও আবেগের ভিত্তিতে একত্রিত হয় এবং শাসিত হয় এমন একটি ব্যবস্থা দ্বারা যা ঐ চিন্তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। হতে পারে এ জনসমষ্টি একটি রাষ্ট্র বা গোত্র এবং সংখ্যায় হাজার হাজার বা মিলিয়ন মিলিয়ন। রাষ্ট্র বা গোত্র নির্বিশেষে এটি একটি সমাজ। কারণ উভয়ক্ষেত্রেই সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি রয়েছে এবং এটি পরিবর্তিত হয়নি। 

    রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলামি চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিলেন। ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি শরীয় পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। তার সমস্ত কর্মকান্ড সেদিকেই লক্ষ্য করে ঠিক করা হয়েছিল। মদীনাতে তিনি প্রত্যেকটি বিশ্বাসী ব্যক্তিকে গড়ে তুলেছিলেন। তাদের মনের ভেতরে তিনি ইসলাম সম্পর্কে মৌলিক চিন্তা প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যা একটি সুষম আবেগের সৃষ্টি করেছিল। তিনি সেখানে হিজরত করলেন ও ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলেন এবং এভাবে ইসলামি সমাজ কায়েম হল। শুরুতে এটি সহজ অবয়বে ছিল এবং তারপর একটি সমাজে রূপান্তরিত হয় যা পরিচালনার জন্য একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে। 

    এখন ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সুপার পাওয়ারগুলো যেভাবে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে আগে সেভাবে হস্তক্ষেপ করেনি, এর জবাবে আমরা বলতে চাই, একারণে পদ্ধতির কোন পরিবর্তন হতে পারে না। তবে এটা পদ্ধতির অনুসরণকে আরও কঠিনতর করে ফেলেছে। এর জন্য প্রয়োজন বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় এনে অতিরিক্ত বিকাশ প্রক্রিয়া ও নিবিড় দাওয়াত চালু রাখা। একারণে দলটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে যায়। সুতরাং তাদেরকে মোকাবেলা করবার জন্য সুপার-পাওয়ারগুলোর পরিকল্পনা ও পুতুল শাসকগুলোর মাধ্যমে যে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে চায় তা বুঝতে হবে।   

    রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কাতে কেবলমাত্র ঈমান ও সামান্য কিছু শরীয় আহকাম ব্যাপারে আহ্বান করেছিলেন এ দাবীর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বলতে চাই, সামান্য কিছু হলেও তিনি শরীয় আহকাম ব্যাপারে আহ্বান করেছিলেন। এছাড়াও আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, মক্কায় দাওয়াতের উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম গ্রহণের জন্য লোকদের আহ্বান। কিন্তু আজকে মুসলিমদের দাওয়াত দেয়া হচ্ছে যাদের রয়েছে ইসলামি আক্বীদা এবং নাজিলকৃত সব শরীয় হুকুম। সেকারণে মুসলিমগন আজ আল্লাহর কাছে কেবলমাত্র ঈমান নয় পূর্ণাঙ্গ ইসলামের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। সুতরাং মক্কার একজন মুসলিম তার মৃত্যুর আগে সে পর্যন্ত নাজিল হওয়া হুকুমের জন্য দায়িত্বশীল। আজকে যে মুসলিম মারা যাচ্ছে সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে পুরো ইসলামের ব্যাপারে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হবে। সে কারণে আজকের আহ্বান হতে হবে পূর্ণাঙ্গ এবং ইসলামি জীবনধারা পূণরায় শুরু করবার জন্য, কেবলমাত্র ঈমানের দাওয়াত নয়। কারণ এটা কোন নতুন দ্বীনের আহ্বান নয়।      

    এছাড়া মুসলিম উম্মাহর দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে যে কেউ বুঝতে পারবে যে, আক্বীদা থেকে বিচ্যুত হওয়া এখন মুসলিম উম্মাহর সমস্যা নয়, বরং সমস্যা হল এই আক্বীদার সাথে জীবনের চিন্তা ও আইনী ব্যবস্থার সম্পর্ক উপলদ্ধি করতে না পারা। এভাবে আক্বিদা তার প্রাণশক্তি হারিয়ে বসেছে। এসবই সম্ভব হয়েছে মুসলিমদের উপর পশ্চিমা চিন্তার প্রভাব বিস্তার করবার কারণে। পশ্চিমা কাফের রাষ্ট্রগুলো নতজানু শাসকদের ক্ষমতায় বসানো, শিক্ষা ব্যবস্থা ও মিডিয়ায় প্রচারণার মাধ্যমে এসব চিন্তার বিস্তার ঘটায়, সংরক্ষণ করে এবং এগুলো বলবৎ ও এর প্রতি আকর্ষণ বজায় রাখবার জন্য কাজ করে। 

    সুতরাং আমাদের দাওয়াতে ইসলামকে সঠিকভাবে, পূর্ণাঙ্গরূপে ও সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে যার আক্বীদা ও ঈমান মৌলিক চিন্তা হিসেব আবিভূর্ত হবে, যা হতে হুকুম উৎসারিত হয় ও যার উপর ভিত্তি করে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারিত হয়। তারপর আক্বীদার মাধ্যমে জীবনের চিন্তাসমূহকে ব্যাখ্যা করতে হবে। এটা সম্ভব হবে তখনই যখন আমরা আহ্বান করব আল্লাহসুবহানহুতায়ালাই একমাত্র স্রষ্টা ও আল মুদাব্বির (সব বিষয়ের পালনকর্তা), বিচার দিবসের মালিক এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সব বিষয়ের জন্য তার কাছেই আমাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। এভাবে যখন ঈমান ও হুকুম সমুহ মুসলিমদের জন্য অবশ্য কর্তব্য তা ব্যাখ্যা করা হয় তখন সত্যের ক্ষমতা ও এর প্রাণশক্তি তাদের কাছে পরিস্ফুট হয়ে উঠে, এবং ইসলাম বুঝা ও এর আহ্বান করার কাজে দাওয়াতকারী দলের শক্তিমত্তা এবং দলের পরিবর্তনের সক্ষমতা সবার কাছে পরিস্ফুট হয়ে উঠে।        

    সেকারণে আজকে দাওয়াত হল ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মুসলিমদের ইসলামি জীবনধারায় ফিরে আসার জন্য আহ্বান করা। এ দাওয়াতের ভিত্তি হবে ইসলামি আক্বীদা, এবং এর রাজনৈতিক চিন্তার উপস্থাপন করতে হবে যাতে মুসলিমরা আল্লাহর নির্দেশ ও নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী এটিকে জীবনের সব কাজের নিয়ন্ত্রক হিসেবে গ্রহণ করে।     

    সুতরাং যা পরিবর্তিত হয়েছে তা হল বাহ্যিক রূপ। মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। সুতরাং ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়নের হুকুম এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজের পদ্ধতির হুকুম মোটেও পরিবর্তিত হয়নি। 

  • তরীকাহ (পদ্ধতি) এবং উসলূব (ধরন)

    তরীকাহ (পদ্ধতি) এবং উসলূব (ধরন)

    এখন যে প্রশ্নটি উত্থিত হয়, তা হল, রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় যা বলেছিলেন এবং করেছিলেন তা কি ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিনা এবং একারণে এটা মানতে আমরা বাধ্য অথবা এমন কোন কাজ বা কর্ম করেছেন কিনা যা ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় এবং যেগুলো একজন অনুসরণ করতে বাধ্য নয়?

    এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই পদ্ধতি, উপকরণ ও ধরনের প্রশ্ন আসে।

    আরেকটি প্রশ্ন উত্থিত হয়, তা হল, পদ্ধতি (যা হল কিছু শর’ঈ হুকুমের সমষ্টি কিন্তু উপকরণ নয়) নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানো যাবে কিনা এবং যদি পরীক্ষার পর এটা কোন ফল দেয় তাহলে এটা সঠিক, অন্যথায় নয়?

    প্রথম বিষয়টির ক্ষেত্রে

    আমরা নিম্নোক্তভাবে বলতে পারি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করতে বলেছেন অর্থাৎ তিনি যা বলেছেন এবং করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘এবং প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। এটি ওহী, যা প্রত্যাদেশ হয়।’
    (সূরা আন নাজম: ৩-৪)

    এবং তিনি বলেন,

    ” রাসূল তোমাদেরকে যা (‘মা’) দেন তা গ্রহণ কর এবং যা (‘মা’) তিনি নিষেধ করেন তা বর্জন কর ”
    (আল কুরআন, ৫৯:৭)

    এখানে ‘মা’ শব্দটি সাধারণ অর্থে (সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ব্যবহৃত হয়েছে। অথার্ৎ রাসূল (সা) আমাদের জন্য কোন কিছু নিয়ে এসেছেন কিন্তু তা আমাদের পালন করা লাগবে না এমন কিছুই নেই; যতক্ষণ না শারী’আহ কোন ব্যতিক্রম নির্দেশ করে।

    নির্দিষ্ট রকমের কিছু কথা এবং কাজের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে যেসব ক্ষেত্রে রাসূল(সা) কে অনুসরণ না করলেও চলে বলে প্রমাণ রয়েছে। যেমন:

    – রাসূলুল্লাহ (সা) নিম্নের হাদীস:

    ‘দুনিয়াবি বিষয়ে তোমরা আমার চেয়ে বেশী জ্ঞান রাখ।’

    সুতরাং দুনিয়াবি বিষয়, যেমন: কৃষি, উৎপাদন, আবিষ্কার, চিকিৎসাশাস্ত্র ও প্রকৌশল ইত্যাদি বিষয়ক technical জ্ঞান ওহীর অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাধ্যমে আমাদের বুঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, এসব ক্ষেত্রে তিনি যে কোন সাধারণ মানুষের মতই। খেজুর গাছের পরাগায়ন সম্পর্কিত তাঁর ঘটনাটির মধ্য দিয়েই বিষয়টি আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।

    • কিছু কাজ রয়েছে যেগুলো একান্তভাবেই তাঁর জন্য এবং অন্য কেউ এ ব্যাপারে অংশীদার নয়। যেমন, তাহাজ্জুদ পড়া তাঁর উপর ফরয ছিল, রাতের বেলাতেও রোযা অব্যাহত রাখা এবং চারের অধিক বিয়ে করবার অনুমতি ছিল। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করা অনুমোদিত নয়।
    • যেসব কাজ মানুষ হিসেবে তাঁর স্বাভাবিক প্রবণতা ছিল, যেমন: দাড়ানো, বসা, হাটা, খাওয়া, পান করা ইত্যাদি। এটা নিঃসন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, এসবই উম্মাহর জন্য মুবাহ (অনুমোদিত) হিসেবে পরিগণিত।
    • বিভিন্ন শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য রাসূল (সা) উপযুক্ত ধরন (উসলূব) এবং উপকরণ (ওয়াসিলা) ব্যবহার করতেন। শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু এই শরঈ হুকুম কিভাবে অর্থাৎ কোন ধরন এবং উপকরণের সাহায্যে বাস্তবায়ন করতে হবে তা একজন মানুষ হিসেবে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়; যাতে সে ধরন ও উপকরণ বাস্তবসম্মত হয় এবং যদি কোন হারামের দিকে পরিচালিত না করে। 

    উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যখন বলেন:

    “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।”
    (সূরা আল হিজর: ৯৪)

    একটি শরঈ হুকুম যাকে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু কিভাবে তা বাস্তবায়ন করতে হবে সে বিষয়টিকে শরীয়া স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি। আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন, কারণ এই হুকুমের বিরুদ্ধে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। কিন্তু যে উপায়ে তিনি (সা) প্রকাশ্যে ঘোষণার কাজটি সম্পাদন করেছিলেন সেটা তাঁর জন্য বাধ্যতামূলক ছিলনা। অতএব ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূলকে (সা) অনুসরণকারী দলের জন্যও এই কাজটি বাধ্যতামূলক নয়। রাসূল (সা) সাফা পাহাড়ের উপরে উঠে লোকদের আহ্বান করেছিলেন, লোকজনকে খাবারের দাওয়াত দিয়েছিলেন, মুসলিমদেরকে সাথে নিয়ে দুটো সারিতে করে কাবা প্রদক্ষিণ করেছিলেন, এগুলো ছিল মূলত শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত কিছু ধরন অর্থাৎ এগুলো ছিল প্রকৃত (আসল) হুকুম ‘প্রকাশ্যে ঘোষণা দান’ এর সাথে সম্পর্কিত কিছু সহায়ক কাজ। নীতিগতভাবে এ জাতীয় ধরনসমূহ অনুমোদিত। বিষয়টিকে শরীয়া স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত না করে  দলের হাতে ছেড়ে দিয়েছে যাতে তারা সবচেয়ে উপযুক্ত ধরনসমূহকে বেছে নিতে পারে।

    উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যখন বলেন :

    “আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যা কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজেদের শক্তি-সামর্থের মধ্য থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে যাতে আল্লাহ এবং তোমাদের শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে পার।”
    (সূরা আনফাল: ৬০)

    তখন প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য তাঁর এই নির্দেশ হচ্ছে একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করতে হবে অর্থাৎ বিষয়টি ফরয এবং এর বিরুদ্ধে যাওয়া হারাম। এই আয়াতে প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার ইল্ল­হ (শরঈ কারণ) হচ্ছে  শত্রুদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলা। কিন্তু উপকরণের(ঘোড়া) বিষয়টি এখানে বাধ্যতামূলক নয়। যেকোন উপকরণ যা এই উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারবে সেটাই এক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে। জিহাদের জন্য উপযুক্ত উপকরণ যুগের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়ে আসছে। এজন্য শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপকরণ বেছে নিতে হবে। জিহাদের জন্য বা আল্লাহর শত্রু এবং  মুনাফিকদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত  করে তোলার জন্য বর্তমান সময়ে প্রয়োজন হচ্ছে আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের (শরীয়া নির্ধারিত সীমার মধ্যে)। অতএব শরঈ হুকুম হচ্ছে আল্লাহর হুকুম অর্থাৎ নির্দিষ্ট বিষয়টিতে আল্লাহর সরাসরি মন্তব্য রয়েছে বলে এটিই হচেছ প্রকৃত (আসল) হুকুম। আর ধরন (উসলূব) হচ্ছে  প্রকৃত (আসল) হুকুমকে বাস্তবায়নের সাথে সম্পর্কিত আংশিক হুকুম। এ বিষয়টি হচ্ছে মুবাহ এবং উপযুক্ত ধরনকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    উপকরণ হচ্ছে সেই বস্তু যার সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয়। নীতিগতভাবে বিষয়টি মুবাহ (অনুমোদিত) এবং উপযুক্ত উপকরণ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    অতএব উপরোক্ত ব্যতিক্রমসমূহ এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় ছাড়া মতাদর্শ  বা শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন সংক্রান্ত অন্য যেকোন বিষয় যা রাসূল (সা) এর সাথে সম্পর্কিত সেটা মক্কায় নাযিল হোক অথবা মদীনায়, সেটা আক্বীদার সাথে সম্পর্কিত হোক অথবা ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত সবকিছুকেই ওহী হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং এগুলোকে তা’সী (অনুসরণীয়) বিষয় হিসেবে মেনে নিতে হবে।

    যদি কেউ রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের দাওয়াতকে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে তিনি শরঈ হুকুম হিসেবে বিভিন্ন কাজ সম্পাদন করেছিলেন যেগুলোকে বর্তমানে বাদ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই বরং এগুলোকে অবশ্যই আদায় করতে হবে। অনুরূপভাবে তিনি(সা) এমন অনেক কাজ করেছেন যেগুলোকে উসলুব বা ধরনের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা যায়। পাশাপাশি তিনি (সা) শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উপযুক্ত উপকরণও ব্যবহার করেছেন। অতএব কোন বিষয়গুলো পদ্ধতি (তরীকাহ) এবং কোন বিষয়গুলো ধরন (উসলূব) বা উপকরণ (ওয়াসিলা), এ দু’ধরণের বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য বুঝা প্রয়োজন, যাতে দল বুঝতে পারে কোন বিষয়টি তাকে আবশ্যই পালন করতে হবে এবং কোন বিষয়টি তার সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    পুরো পদ্ধতিকে (তরীকাহ) ধরন হিসেবে গণ্য করার কোন সুযোগ নেই যার ফলে মনে হবে পরিস্থিতির আলোকে দল যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কারণ এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির ফলে পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত শরঈ হুকুমকে তাচ্ছিল্য করা হবে এবং শরঈ হুকুমকে মনগড়া কার্যক্রম দ্বারা প্রতিস্থাপিত করা হবে। বিষয়টিকে আরো ভালভাবে পরিষ্কার করার জন্য নিচে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো:

    – আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়”
    (সূরা আল হিজর: ৯৪)

    প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়া, আল্লাহর তরফ থেকে রাসূল (সা) এর প্রতি একটি নির্দেশ। এই নির্দেশটি দুটো শরঈ হুকুমকে উপস্থাপন করছে। প্রথমটি হচ্ছে এই আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশ্য দাওয়াতের অনুপস্থিতি এবং দ্বিতীয়টি হচেছ এই আয়াত নাযিল হওয়ার সাথে সাথে প্রকাশ্য দাওয়াতের সূচনা। প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়া বা না দেওয়ার বিষয়টিকে রাসূল (সা) এর ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণা দেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুম মান্য করা ছিল রাসূল (সা) এর জন্য বাধ্যতামূলক। এটিই হচ্ছে শরঈ হুকুম, যা শরী’আহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছে। এই কাজটি করার সিদ্ধান্ত  রাসূল (সা) তাঁর নিজস্ব ইচ্ছার কারণে গ্রহণ করেননি, অতএব এই কাজের অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র এই কথা “যা আপনাকে আদেশ করা হয়” এর মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে বিষয়টি আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    “তুমি কি সেসব লোককে দেখনি, যাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে, তোমরা নিজেদের হাতকে সংযত রাখ (যুদ্ধ করা থেকে) এবং সালাত কায়েম কর”
    (সূরা আন নিসা: ৭৭)

    আবার কাফিরদের দুর্ব্যবহারের জবাবে অস্ত্রের মাধ্যমে তাদের মোকাবেলা করার অনুমতি প্রার্থনা করলে আব্দুর রাহমান বিন আল আওফ (রা)-কে রাসূল(সা) বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আমি ক্ষমার জন্য আদিষ্ট অতএব তোমরা লোকজনের সাথে যুদ্ধ করোনা।”
    [ইবনে আবি হাতিম,আন-নাসাঈ এবং আল-হাকিম থেকে বর্ণিত]।

    পরবতীর্তে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতের সময় আল্লাহর তরফ থেকে ওহী নাজিল হয়,

    “যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হল তাদেরকে যাদের সাথে কাফিররা যুদ্ধ করে; কারণ তাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে (মুমিনদেরকে) সাহায্য করতে অবশ্যই সক্ষম।”
    (সূরা হজ্জ:৩৯)

    উপরোক্ত দলিলগুলো থেকে এটা প্রমাণিত হয় যে প্রথমে যুদ্ধের অনুমতি ছিলনা, কিন্তু পরবতীর্তে তা দেওয়া হয়; যেহেতু এই অনুমতি আল্লাহর তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে, সেহেতু এটি একটি শরঈ হুকুম যার আনুগত্য করা আবশ্যক। স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে রাসূল (সা) সশস্ত্র পন্থা অবলম্বন করা থেকে বিরত ছিলেন বিষয়টি এরকম কিছু ছিলনা বরং বিষয়টি ছিল ওহীর মাধ্যমে নির্ধারিত যার আনুগত্য করা ছিল আবশ্যকীয় কর্তব্য। রাসূল (সা) যেভাবে একাজ করা থেকে বিরত ছিলেন ঠিক তেমনিভাবে তাঁর অনুসরণে নিজেদেরকে বিরত রাখাটা আমাদের জন্যও বাধ্যতামূলক। 

    • অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন বিভিন্ন গোত্রের নিকট নুসরাহ (খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় বস্তুগত সাহায্য) খুঁজতে  যেতেন তখন তিনি (সা) বলতেন :

    “হে অমুক এবং অমুক গোত্র, প্রকৃতপক্ষে আমি আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত একজন রাসূল। তিনি তোমাদেরকে আদেশ করছেন যাতে তোমরা তাঁর ইবাদত কর এবং এ ব্যাপারে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না কর, তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য যেসব মূর্তির পূজা কর সেগুলোকে পরিত্যাগ কর, আমার উপর তোমরা ঈমান আন এবং আমাকে তোমরা সুরক্ষা প্রদান কর (অন্য এক বর্ণনায় ‘সমর্থন কর’) যাতে আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তা আমি পৌঁছে দিতে পারি।’
    [সীরাতে ইবনে হিশাম]

    এই হাদীসের মাধ্যমে রাসূল(সা) পরিষ্কার করে দিচেছন যে বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম; অর্থাৎ এক্ষেত্রে রাসূল(সা) ওহীর অনুসরণ করছিলেন মাত্র। গোত্রগুলোর কাছ থেকে অসংখ্যবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও এবং অত্যন্ত রূঢ় ও কর্কশ ব্যবহার পাওয়া সত্ত্বেও নুসরাহ খোঁজার ক্ষেত্রে রাসূল(সা) এর অটল থাকাটাই প্রমাণ করে যে, এ বিষয়টি ছিল আল্লাহর তরফ থেকে একটি হুকুম।

    এগুলো হচ্ছে পদ্ধতির সাথে সম্পৃক্ত শরঈ হুকুমের কিছু উদাহরণ। যেসব উপকরণ এবং ধরনের সাহায্যে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা হয় সেগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং এক্ষেত্রে শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমরা স্বাধীন।                                                   

    সুতরাং দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত লোক করে গড়ে তোলার জন্য রাসূল (সা) মুমিনদেরকে নিয়ে দারুল আরকামে অথবা তাঁদের কারো বাসায় অথবা উপত্যকায় গিয়ে বসতেন এবং তাঁদেরকে ইসলামের শিক্ষায় দীক্ষিত করতেন। একটি শরঈ হুকুম হিসেবে আমাদেরকেও অবশ্যই এই দায়িত্বটি পালন করতে হবে। এবং এ কাজের জন্য উপযুক্ত ধরন প্রয়োগ করতে হবে। এজন্য উপযুক্ত ধরন হিসেবে একদল লোক অথবা কোন পরিবারকে বেছে নিতে হবে যাতে তাদেরকে ইসলামের সুষ্ঠু শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যায়। তাদের জন্য সাপ্তাহিক একটি সময় নির্ধারিত করতে হবে এবং সেই নির্দিষ্ট সময়ে পরিবার অথবা দলটির নির্দিষ্ট লোকজনকে একত্রে জড়ো হতে হবে। দাওয়াতী কাজে নিযুক্ত তরুণদের মনে যাতে ইসলামের শিক্ষা সুষ্ঠুভাবে গেঁথে দেওয়া যায় সেজন্য উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে। এ সমস্ত বিষয়গুলো নির্ধারণের দায়িত্ব আমাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দাওয়াতী কাজের উপযুক্ত লোক করে গড়ে তোলার শরঈ হুকুমের বাস্তবতার আলোকে আমরা এ বিষয়গুলো নির্ধারণ করব যাতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

    রাসূল (সা) নিজেকে এবং তাঁর দাওয়াতকে মক্কার বাজারে প্রকাশ্যে উপস্থাপন করতেন। এ কাজটি করার সময় আমাদেরকে উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে; যেমন যথার্থ বক্তব্য উপস্থাপন করতে হবে অথবা বিভিন্ন সামাজিক সমাবেশ, উৎসব বা আনন্দ-বেদনার সময় জনগণের কাছে নিজেদের ধ্যান-ধারণাগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বই, ম্যাগাজিন, লিফলেট, ক্যাসেট অথবা সরাসরি কথা বলার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জন করা যায়, এসমস্ত ধরন বা উপকরণের প্রত্যেকটিই জায়েয।

    অনুরূপভাবে রাসূল (সা) যখন নুসরাহ খোঁজার জন্য তায়েফে গিয়েছিলেন তখন তিনি পায়ে হেঁটে গিয়েছিলেন, নাকি ঘোড়ার পিঠে চড়েছিলেন নাকি অন্য কোন উপায় অবলম্বন করেছিলেন সেগুলোর অনুসরণ করাটা আমাদের জন্য আবশ্যক কিছু না। এ জাতীয় উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে শরীয়া কোন স্পষ্ট নির্দেশনা না দিয়ে বরং আমাদের সিদ্ধান্তের উপর তা ছেড়ে দিয়েছে।

    আমাদের জানা আবশ্যক যে রাসূল (সা) এর তরীকাহ ছিল মূলত ওহী দ্বারা নিধার্রিত অনেকগুলো শরঈ হুকমের সমষ্টি যা থেকে চুল পরিমাণ বিচ্যুত হওয়াও তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিলনা। শরঈ হুকুমের প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে যে বিষয়গুলো পরিবর্তিত হয় সেগুলো হল ধরন বা উপকরণ। এ বিষয়গুলোকে নিধার্রণ করা যেমন রাসূল(সা) এর সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানে ঠিক তেমনিভাবে এ বিষয়গুলোকে নিধার্রণ করাটা আমাদের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

    প্রকৃতপক্ষে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করা একটি শরঈ হুকুম। এমন অনেক লোক আছে যারা ভাবে যে দারুল ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার তরীকাহ ব্যাপারটি ধরনের অন্তর্ভুক্ত এবং এজন্য তারা যেকোন ধরনের কাজ করার ব্যাপারে স্বাধীন। উদাহরণস্বরূপ দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে তারা গরীবদেরকে সাহায্য করে, মানুষের আখলাক ঠিক করার কথা বলে, হাসপাতাল বা স্কুল তৈরি করে, ভাল কাজ করার কথা বলে, কেউ শাসকদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দেয় আবার কেউ বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দাবী তোলে। এ সমস্ত কাজের প্রত্যেকটাই হচ্ছে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল্লাহর সরাসরি নির্দেশনার মাধ্যমে পরিচালিত রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ডের অনুসরণ থেকে সুস্পষ্ট বিচ্যুতি। আল্লাহর হুকুমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাসূল (সা) যেভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণাদানের কাজটি সম্পন্ন করেছিলেন ঠিক তেমনিভাবে প্রকাশ্যে ঘোষণাদানের কাজ করাটা আমাদের জন্যও ফরয;যদি তা না করি তাহলে আমরা পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভূক্ত হব। রাসূল (সা) যেভাবে অস্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত ছিলেন এবং মুসলিমদেরকে অস্ত্র বহনের অনুমতি দেননি ঠিক তেমনিভাবে আমাদেরকেও তা মেনে চলতে হবে। পরিস্থিতি যদি ভিন্নও হয় তবু আমাদেরকে ঠিক তেমনিভাবে নুসরাহ খঁুজতে হবে যেমনভাবে রাসূল (সা) তা খুঁজেছিলেন। সাধারণভাবে বলা যায় পদ্ধতির ধাপসমূহ যেভাবে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে নির্ধারিত করে দিয়েছিলেন সেগুলো আমাদের জন্যও অপরিবর্তিত থাকবে। সেগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক কাজ করা অথবা সেগুলোর অনুসরণ না করা হবে শরঈ হুকুমের লঙ্ঘন।

    তরীকাহর ব্যাপারে নিজেদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোন সুযোগ আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। উদ্দেশ্য কি হবে এবং সেই উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্য তরীকাহ কি হবেÑদুটো বিষয়ই শরীয়া নির্ধারিত করে দিয়েছে; অতএব এসব বিষয়ে আনুগত্য করা ছাড়া আমাদের অন্য কোন বিকল্প নেই।

    পদ্ধতির ধাপসমূহ নির্ধারণ করার এখতিয়ার কেবলমাত্র শরঈ দলীলসমূহেরই (কুরআন ও সুন্নাহ) রয়েছে। এ ধাপসমূহ নির্ধারণ করার জন্য আমরা নিজেদের মন, পরিস্থিতি অথবা জনস্বার্থকে বিবেচনা করার অধিকার রাখি না।

    মানুষের খেয়াল-খুশী বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা থেকে নয়,বরং শরঈ দলীলসমূহের অর্থ বুঝতে হয় তার ভাষাগত নির্দেশনা থেকে। আমাদের ইচ্ছাগুলোকে শরঈ হুকুমের অনুসরণে সাজাতে হবে; কারণ বাধ্যতামূলকভাবে সেগুলো অনুসরণের মধ্য দিয়েই কেবল আমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারব।

    রাসূল (সা) এর তরীকাহকে বুঝা, এ তরীকাহ নিয়ে তিনি (সা) যেভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন তার পুরো আনুগত্য করা এবং তাঁর কাজের ধাপসমূহকে এবং প্রত্যেকটি ধাপে কৃত কাজগুলোকে সঠিকভাবে আদায় করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক।

    সুতরাং দল গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (ব্যক্তিগতভাবে লোকজনের সাথে দেখা করা, তাঁর উপর যারা ঈমান আনতেন তাঁদেরকে গোপনে একত্রে জড়ো করে তাঁদের চিন্তা—চেতনা গঠনের দিকে মনোযোগ দেয়া) করেছিলেন। এ সমস্ত কাজের ভিত্তিকে(আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। কারণ শরঈ হুকুম হিসেবে তা আল্লাহর তরফ থেকে এসেছে। পাশাপাশি এ সমস্ত কাজ বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ধরন এবং উপকরণ আমাদেরকে বেছে নিতে হবে।

    একইভাবে জনমত গঠনের পর্যায়ে রাসূল (সা) বিভিন্ন কাজ সম্পাদন (প্রকাশ্যে দাওয়াতের ঘোষণাদান, কুফরী চিন্তা এবং প্রথার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক শতশত আয়াত নাযিল হওয়া, নাম সহকারে অথবা পরোক্ষ বর্ণনার মাধ্যমে কুরাইশ নেতাদেরকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করা এবং বিভিন্ন গোত্রের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করা) করেছিলেন। এক্ষেত্রেও শরঈ হুকুম হিসেবে এসব কাজের ভিত্তিকে (আসল) অনুসরণ করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। দ্বিতীয় পর্যায়ে আমাদেরকে প্রথম পর্যায় অর্থাৎ দল গঠনের পর্যায়ের কর্মকাণ্ডের সাথে আরো নতুন কিছু কর্মকাণ্ড যোগ করতে হবে, যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা, ইসলামের ভিত্তিতে উম্মাহর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে জোরালো অবস্থান গ্রহণ, ঔপনিবেশিক বা সাম্রাজ্যবাদী কাফির শক্তিসমূহ এবং তাদের আস্থাভাজন দালাল শাসকদের ষড়যন্ত্রগুলোকে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা প্রভৃতি। কারণ রাসূল (সা) ঠিক এরূপই করেছিলেন। এ সমস্ত কর্মকাণ্ড সম্পাদনের জন্য তখন আমরা প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ বেছে নিব।

    প্রকৃতপক্ষে, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদেরকে রাসূল (সা) এর মক্কী জীবনের (শরঈ তরীকাহর) অনুসরণ করতে হবে। রাসূল (সা) যখন তাঁর এই তরীকাহর সূচনা করেছিলেন এবং এই তরীকাহর আলোকে কর্মকাণ্ড শুরু করেছিলেন তখন তিনি অনেক অপমান, দুর্বলতা, সন্ত্রাস এবং ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবুও তিনি দৃঢ় সংকল্পের সাথে অবিরাম কাজ করে গিয়েছিলেন। রাসূল (সা) এর নিকট আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর হুকুম আসত এবং তা বাস্তবায়নের জন্য তিনি কঠোর সংগ্রাম করতেন। কোন ব্যক্তি নবীর (সা) সঠিক পথের অনুসরণ থেকে অনেক দূরে সরে যায় যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর এই আয়াত সে শুনে

    “অতএব আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দিন যা আপনাকে আদেশ করা হয়”
    (সূরা আল হিজর: ৯৪)

    যেখানে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে (সা) নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তিনি  শুধুমাত্র আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং সেই ব্যক্তি দেখে যে রাসূল (সা) তাঁর নিজের ইচ্ছানুসারে নয় বরং আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এর আদেশ অনুযায়ী প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন; তারপরও সে বলে:“এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছুনা।” যদি এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না’ই হতো তবে রাসূল (সা) কেন সে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন যেখানে তিনি (সা) কাফিরদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং তাদের উপাস্য দেব-দেবীদের,তাদের নেতৃবৃন্দের,তাদের প্রথার এবং তাদের চিন্তাসমূহের বিরোধিতা প্রকাশ্যে করেছিলেন যার প্রতিটা বিষয়ই কুরআনের নির্দেশনার মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। অথচ তিনি চাইলে তোষামোদের মাধ্যমে শাসকদের সন্তুষ্ট করতে পারতেন অথবা বিদ্যমান প্রথায় নিজেকে সমর্পণ করতে পারতেন যার ফলে তাদের কাছ থেকে তিনি মর্যাদা লাভ করতে পারতেন। যদি তিনি (সা) তা করতেন তাহলে প্রকৃতপক্ষে তিনি (সা) তাঁর রবের হুকুমের অবাধ্য হতেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কুরআন নাযিল হত এবং রাসূল (সা) নিজেকে তার মধ্যে সমর্পণ করতেন। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    “উঠুন এবং সতর্ক করুন!”
    (সূরা আল মুদ্দাসির:২)।

    তিনি (সা) নেতৃবৃন্দকে আক্রমণ (মৌখিকভাবে) করলেন যা পূর্বে বর্ণিত হয়েছে।

    “আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে!”
    (সূরা লাহাব : ১)

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে রাসূলের (সা) পক্ষাবলম্বন করলেন:

    “আপনার পালনকর্তার অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।”
    (সূরা আল কলম: ২)

    কুরআনে কাফিরদের মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা করা হয়েছে:

    “তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন তবে তারাও নমনীয় হবে।”
    (সূরা আল কলম: ৯)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন এবং উম্মুল-কুরা অর্থাৎ মক্কা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের লোকজনকে সতর্ক করেন। পাশাপাশি তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর রাসূলকে (সা) এবং যাঁরা তাঁর (সা) সাথে ছিলেন তাঁদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন দাওয়াতের কাজে অস্ত্র বহন না করতে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যে তখন কুরআন নাযিল হচ্ছিল এবং রাসূল (সা) সে অনুযায়ী আমল করছিলেন মাত্র। যে বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না তার জন্য কি এর চেয়ে বেশি প্রমাণের প্রয়োজন আছে?

    কেউ যদি বলে এই তরীকাহর অনুসরণ করাটা বাধ্যতামূলক কিছু না বরং ঐচ্ছিক তাহলে তার মানে দাঁড়াবে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে যা কিছু হুকুম করছিলেন রাসূল (সা) সম্পূর্ণরূপে অথবা আংশিকভাবে সেসব আয়াতের অবাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সেক্ষেত্রে যা কিছু নাযিল হচ্ছিল তিনি তাঁর অনুগত ছিলেন না। অতএব তখন বিষয়টি আমাদের জন্যও ঐচ্ছিক বলে বিবেচিত হবে যে, আমরা কি রাসূল(সা) এর তরীকাহ অনুসরণ করব নাকি অন্য কোন তরীকাহ? প্রকৃতপক্ষে এটি হচ্ছে এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি যা রাসূল (সা) এর কর্মকাণ্ড এবং তাঁর সমাজ পরিবর্তনের পদ্ধতির সঠিক উপলদ্ধি থেকে অনেক দূরে।

  • নুসরাহ বা বস্তুগত সমর্থন অনুসন্ধান

    এবার আসা যাক পদ্ধতিগত নিয়মের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান প্রসঙ্গে আর তা হল নুসরাহ বা বস্তুগত সমর্থন। এটা নিয়ে সাবধানতার সাথে বিশে­ষণ করে দেখা যাক আমাদের কী অনুসরণ করা উচিত, বিশেষ করে আমরা যখন দেখতে পাই যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যারা কাজ করেন তারা নুসরাহর বিষয়টি অত্যন্ত কম গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। তারা মনে করে এটি একটি side বিষয় বা এর ইসনাদ (বর্ণণার সূত্র) ততটা শক্তিশালী নয় বিধায় এটি গ্রহণ করবার প্রয়োজন নেই। তারা কেবল এখানেই থেমে থাকে না। বরং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সবগুলো সীরাতে সামান্য কিছু ব্যত্যয় ছাড়া সুস্পষ্ট বর্ণণা থাকা সত্তেও এ বিধান ও যারা এর অনুসরণ করে তাদের কটাক্ষ করা হয়। যদিও সীরাতের এসব লেখকগণের কারোরই বর্তমানে অস্তিত্বশীল দলগুলোর সাথে বিন্দুমাত্র সম্পর্ক ছিল না।

    পবিত্র কুরআন তাদের সম্পর্কে বলেছে, 

    ‘সাহায্য সহায়তা দিয়েছে’
    (সূরা আনফাল:৭২)

    এবং তাদের আখ্যায়িত করেছে

    ‘আনসার (সাহায্যকারী)’
    (সূরা তাওবাহ: ১০০)

    এ বর্ণণা ছিল অত্যন্ত প্রশংসার ও উন্নত আঙ্কিকের, যার মাধ্যমে তাদের বৈশিষ্ট্য প্রতিফলিত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাত বিশে­ষণ করলে দেখতে পাব যে, তিনি ক্ষমতাধর নেতৃস্থানীয় লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন। একটির পর একটি গোত্রের কাছ থেকে তিক্ত অভিজ্ঞতা পাওয়া সত্তেও তিনি এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বারংবার নুসরাহ অনুসন্ধান করছিলেন এবং এ ব্যাপারে দমে যাননি। ইবনে সা’দ তাঁর তাবাকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, যতগুলো গোত্রের কাছে তিনি (সা) গিয়েছিলেন তার সংখ্যা পনের এর কম নয়। রাসূলুল্লাহ (সা) এর এই অধ্যাবসায় থেকে আমরা যা পাই তা হল, নুসরাহ অনুসন্ধান করা ছিল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে নবী (সা) এর প্রতি একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা। 

    পবিত্র কোরআন এ সাহায্যকারীদের ‘আনসার’ বলে আখ্যা দিয়েছে, যা এর আরেকটি daleel। কোরআনে একাধিক জায়গায় তাদের প্রশংসা করা হয়েছে ও আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের ক্ষমা ঘোষণা করেছেন। ‘মুহাজেরীন’ (অভিবাসী) দের পরেই তাদের অবস্থান।

    নুসরাহ সম্পর্কিত বর্ণণা থেকে বুঝা যায় যে, এটি একটি শরীয়াগত বাধ্যবাধকতা। সে কারণে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    ‘হে অমুক ও অমুক গোত্র। আমি তোমাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর রাসূল (সা)। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন  ইবাদত করবার ও তার সাথে কাউকে শরীক না করবার…..আমার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে ও আস্থা রাখবে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে সমর্থন প্রদান করবে যতক্ষণ না আমি আল্লাহ প্রদত্ত হুকুমসমূহ লোকদের কাছে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছি।’
    (সীরাত ইবনে হিশাম)

    এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূলুল্লাহ (সা) পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি নির্দেশনা—যা শরীয় একটি হুকুম। আর এর বাস্তবায়নের জন্য যথাযথ style অনুসরণ করতে হবে। এটা এমন কোন ঠুনকো বিষয় নয় যে, চাইলেই পরিবর্তন করা যাবে। 

    এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা) ও যাদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করা হয়েছিল তাদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল অথবা দ্বিতীয় আকাবার শপথে তার (সা) ও বাই’য়াত প্রদানকারীদের মধ্যকার যে সংলাপ হয়েছিল—তা থেকে বুঝা যায় নবী (সা) একটি লক্ষ্যে এ কাজে (নুসরাহ অনুসন্ধান) অগ্রসর হয়েছিলেন ও এ কাজের উপর দৃঢ় ছিলেন;  অর্থাৎ দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও এমন এক entity প্রতিষ্ঠার জন্য যা দ্বীনকে বাস্তবায়ন, সুরক্ষা প্রদান ও বিস্তারের কাজ করবে। সুতরাং কীভাবে আমরা এটিকে অবজ্ঞা করি যখন এর মাধ্যমে দাওয়াত একটি পর্যায় থেকে আরেকটি পর্যায়ে উন্নীত হয় ও একটি ভূমিতে একটি ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন ও প্রসারের সুযোগ সৃষ্টি করে। তাহলে এ অবজ্ঞা কার স্বার্থে?    

    • কুফফারগণ বুঝতে পেরেছিল যে, এ কাজের পেছনে রয়েছে একটি অঙ্গীকার ও দ্বীন বিজয়ের বীজ। একারণে আমরা দেখতে পাই বানু আমীর গোত্র বুঝতে পেরেছিল এ বিষয়টি ক্ষমতার সাথে বিজড়িত। মক্কার কুফফারগণের কাছে যখন দ্বিতীয় আকাবার খবর পৌঁছায় তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল। তারা বলেছিল, ’হে খাজরাজের লোকেরা! আমাদের কাছে খবর আছে যে, তোমরা আমাদের সাথীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছ এবং তাকে আমাদের থেকে নিয়ে গিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ করেছ।’ আমরা দেখতে পাই শয়তান সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলেছিল, ‘হে আখাসীবের (কুরাইশ) লোকেরা, তোমরা কি মুহম্মদ ও তার সাহাবাগন (মুশরিকদের দৃষ্টিতে দ্বীনত্যাগী) কে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একত্র হওয়া পছন্দ কর?’

    দ্বিতীয় আকাবার শপথের সময় আল বারা বলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ, সুতরাং আমরা বাই’আত প্রদান করলাম। আল্লাহর কসম, আমরা বংশ পরষ্পরায় নেতা থেকে নেতাতে যোদ্ধা ও অস্ত্র চালনায় পারদর্শী ও সুসজ্জিত।’ আবুল হায়সামি ইবনুল তাইহান বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের অন্যদের লোকদেও (ইহুদী) সাথেও সম্পর্ক রয়েছে। যদি আমরা তাদের প্রতি কঠোর হই এবং সম্ভবত সে সময় আল্লাহ যদি আপনাকে বিজয়ী করেন তাহলে কি আপনি আমাদের প্রত্যাখান করে নিজের লোকদের কাছে ফিরে আসবেন?’ আসাদ বিন জুরারাহ বলেন, ‘আজ তাকে নেওয়া মানে সকল আরবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করা, তোমাদের মধ্যকার সম্ভ্রান্তগন কতল হওয়া এবং তলওয়ারেরে তিক্ত স্বাদ নেওয়া।

    এ বিষয়ে আল আব্বাস বিন উবাদা রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলেন, ‘সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে একজন সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যদি আপনার ইচ্ছা তাই হয় তাহলে আগামীকালই আমরা মীনাবাসীর বিরুদ্ধে অস্র ধারণ করতে প্রস্তত।’

    আল হায়সামীর প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তর দিলেন,

    ‘না, রক্ত তো রক্তই; আর রক্তের বদলা রক্তই। আমি তোমাদের জন্য আর তোমরাও আমার জন্য। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করব আর তোমরা যাদের সাথে সন্ধি চাইবে আমার সন্ধিও তাদের সাথেই।’

    আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে বলেন যে, তাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাহায্য, ক্ষমতাশালী লোক, সমরাস্ত্র ও সমর্থন দিয়ে সন্তুষ্ট করেছিলেন।

    ইবনে হিশাম রাসূলুল্লাহ (সা) এর নুসরাহ অনুসন্ধান নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, ‘আল্লাহ যখন তার নবী (সা) কে শক্তিশালী ও দ্বীনকে বুলন্দ করতে চাইলেন তখন আনসারদের মধ্য হতে এই লোকগুলোকে দিয়ে সহায়তা করলেন।’ 

    এসব মন্তব্য থেকে এই হুকুমের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায় এবং একজন ইসলামের দিকে আহ্বান করার পরিপ্রেক্ষিতে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলে সে দ্বীনকে সমর্থন করল এরূপ ব্যাখ্যা বা নির্দেশনার ভ্রান্তি থেকে মুক্ত রাখে। বাই’আত, ইজাহার উদ দীন (দ্বীনের বিজয় কবুল করা); নাসর (সমর্থন), যুদ্ধ; বিশিষ্টজনেরা হত্যার সম্মুখীন হবে; তলোয়ারের আঘাতে তারা ঘায়েল হবে; এটা সব আরবের বিরুদ্ধে যাবে; তাদের এমনভাবে সুরক্ষা দেয়া উচিত যেভাবে নারী ও শিশুদের দেয়া হয়, এসব অভিব্যক্তি থেকে বুঝা যায় কীভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন। তিনি তা করেছিলেন সুরক্ষার খাতিরে এবং এমনকি প্রয়োজনে দ্বীন বহনের জন্য শক্তি প্রয়োগের নিমিত্তে ও এমন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবার জন্য যা দ্বীন ও এর অনুসারীদের রক্ষা করবে। সাথে সাথে এর হুকুমসমূহ বাস্তবায়ন ও বিশ্বের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দেবার কাজ করবে।

    এ বাস্তবতায় একজন বুঝতে পারবে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিম্নলিখিত কাজগুলো করেছিলেন:  

    • তিনি ব্যক্তির নিরাপত্তা ও দাওয়াতের সুরক্ষার জন্য সমর্থন অনুসন্ধান চেয়েছিলেন। এটা মুশরিকদের কাছ থেকে চাওয়া যায় যেমনিভাবে তার চাচা তাকে সুরক্ষা প্রদান করেছিলেন অর্থাৎ তার উপর আপতিত যে কোন ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এটা মু’তীম বিন আদি’র ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কেননা তিনি (সা) তায়েফ থেকে আদি’র সহায়তায় মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। সুরক্ষার বিষয়টিকে মুসলিমদের দ্বীনের সাথে আপোষ করবার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। দাওয়াতের গতি কিছুটা শ­থ করতে অনুরোধ করায় রাসূলুল্লাহ (সা) তার চাচাকে বলেছিলেন,

    আল্লাহর কসম, হে আমার চাচা! যদি তারা দাওয়াতকে পরিত্যাগ করবার জন্য আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চন্দ্র এনে দেয়, তারপরেও আমি দ্বীনকে পরিত্যাগ করব না যতক্ষণ না আল্লাহ এ দ্বীনকে বিজয়ী করে বা এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি নিহত হই।’
    (সীরাত ইবনে হিশাম)

    • রাসূলুল্লাহ (সা) সাধারণত নেতাদের সাথে যোগাযোগ করতেন এই কামনায় যে, তারা ঈমান আনলে তাদের অনুসরণকারী সাধারণ লোকেরাও ঈমান আনবে। দাওয়াত প্রসারণকে সহজতর করা ও গ্রহযোগ্য করবার জন্য তিনি এটা করেছিলেন। এটা দাওয়াতের জনপ্রিয়তার ভিত্তি (কাই’দাহ শাবিয়্যাহ, popular base) তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল।
    • রাসূলুল্লাহ (সা) ক্ষমতাধর লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করেছিলেন এই শর্তে যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে, যে রকমটি ঘটেছিল আল আকাবার দ্বিতীয় শপথের ক্ষেত্রে। 

    নুসরাহ অনুসন্ধান করা হয়েছিল ক্ষমতাধর লোকদের কাছ থেকে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময় এমনসব ক্ষমতাবান লোকদের কাছে নুসরাহ সন্ধান করা হয়েছিল যাদের রয়েছে নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তা। সেসময় নেতারাই শাসক ছিল; তারা আবার সেনাবাহিনীর প্রধানও ছিল এবং তাদের মতামতের উপর জনগন আস্থাশীল ছিল। 

    আজকের দিনে শাসকেরা বলপ্রয়োগে ক্ষমতায় আসীন হয় এবং তারা অজনপ্রিয়। আবার অনেকসময় জনপ্রিয়তা যা দেখা যায় তা প্রকৃত চিত্র নয়। এক্ষেত্রে আমাদের তাই করতে হবে যা রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন। সুতরাং আমরা সমাজে প্রভাবশালী এমনসব লোকদের সাথে যোগাযোগ করব যাদের মাধ্যমে তাদের অনুগামী অন্য লোকদের কাছে পৌঁছানো সহজতর হয়, যাতে করে জনপ্রিয়তার ভিত্তিমূল অর্জিত হয়। আর রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হবার লক্ষ্যে ক্ষমতাশালী লোকদের কাছে নুসরাহ অনুসন্ধান করব, যেমন: সামরিক বাহিনীর অফিসার। তাছাড়া যখন দলের সদস্যদের উপর অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে যায় তখন তাদের বন্ধু ও আত্নীয়স্বজনদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করা দোষণীয় নয় এই শর্তে যে এর ফলে দাওয়াকারীর ঈমান কোনরূপ চাপ বা আপোষের সম্মুখীন হবে না। এভাবে বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করতে হবে।       

    আর এটাই হল রাসূলুল্লাহ (সা) এর পদ্ধতি এবং আমরা তাকে অনুসরণ করতে এই পদ্ধতি গ্রহণে বাধ্য। অর্থাৎ আমরা নিম্নোক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করব: 

    ১. (দলের) শাবাবদের এমনভাবে প্রস্তত করা যাতে তাদের হাতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজের হাতে মোহাজেরীনদের গড়ে তুলেছিলেন, যারা মক্কায় দাওয়াতের কাজ করেছিলেন এবং নবী (সা) এর সাথে ইসলামি রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করেছিলেন এবং তারপরে উম্মাহকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

    ২. সাধারণ সচেতনতার ভিত্তিতে চিন্তার পক্ষে জনমত তৈরী করা অর্থাৎ এমন জনপ্রিয় ভিত্তি যা শাসনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুকে গ্রহণ করতে চায় না ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ামাত্র একে বরণ করে নেবার ইতিবাচক প্রবণতা দেখায়। আর এ অবস্থা পুরোপুরি মদীনার জনগনের মতই যখন তারা ইসলাম দাবী করেছিল এবং এটাকে সুরক্ষা দেবার জন্য এগিয়ে এসেছিল।

    ৩.ক্ষমতাধর লোকদের কাছ থেকে নুসরাহ অনুসন্ধান, যার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তগত করা যায়।

    যখন উপরোক্ত বিষয়গুলো সুসম্পাদিত হবে তখন আমরাও সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারব যেভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তিনি শরী’য়াহ আকড়ে ধরবার কারণে বিশ্বাসীদের বিজয় দান করবেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    ‘মুমিনদের সাহায্য করা আমার দায়িত্ব।’
    (সূরা রূম: ৪৭)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    ‘আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহ্‌র সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, শক্তিধর।’
    (সূরা হজ্জ্ব: ৪০)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    ‘তোমাদের মধ্যে যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন। যেমন তিনি শাসনকতৃর্ত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের ধর্মকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়—ভীতির পরিবর্তে অবশ্যই তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না।’
    (সূরা নূর: ৫৫)

  • মদীনায় হিজরত

    মদীনায় হিজরত দাওয়াতের ক্ষেত্রে আলোচনা ও সহিষ্ণুতার পর্যায় থেকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়নের পর্যায়ে উন্নীত হবার একটি ধাপ। এটা দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে উন্নিত হওয়া যা মদীনাতে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সেখানে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ইসলাম বহন করেছিলেন। আর তা করা হয়েছিল ইসলাম দ্বারা শাসিত একটি রাষ্ট্রের মাধ্যমে। এ রাষ্ট্র ইসলামকে বাস্তবায়ন করে এবং এর দিকে দলিল প্রমাণসহ আহ্বান করে ও দাওয়াতকে ক্ষমতার সাথে বহন করে যাতে করে বাতিলের অত্যাচার ও ক্ষতির হাত থেকে একে সুরক্ষা দেয়া যায়।

    যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনাতে পৌঁছলেন তখন সেখানকার অনেক লোক তাঁকে সাদরে গ্রহণ করেছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) সর্বপ্রথম একটি মসজিদ ণির্মাণ করেছিলেন। এ মসজিদে সালাত আদায় করা হত, পরামর্শ করা হত, লোকদের বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা ও বিবাদ নিরসন করা হত। তিনি (সা) মদীনাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তত করতে লাগলেন। তিনি মদীনার বাইরে অভিযান পরিচালনা করেন ও তাদের নেতৃত্ব নির্ধারণ করে দেন। ইহুদীদের সাথে চুক্তি করেন। সাধারণভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনাতে একজন শাসকের ভূমিকা পালন করেন অর্থাৎ তিনি ছিলেন সেখানকার রাষ্ট্রপ্রধান।

    দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার আগে রাসূলুল্লাহ (সা) এ কাজগুলো করেছিলেন। সুতরাং এ থেকে আমরা কী বাধ্যবাধকতার নির্দেশ পাই?

    আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) কে পুরোপুরি অনুসরণ করতে বাধ্য এবং তিনি যেভাবে অগ্রসর হয়েছেন আমরাও একইভাবে অগ্রসর হতে বাধ্য। যেহেতু ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরয, সেহেতু এক্ষেত্রেও তাঁর (সা) পদাঙ্ক আমাদের অনুসরণ করতে হবে। তার (সা) ব্যাখ্যামুলক কাযার্বলীতে যে হুকুম পাই তা একই ব্যাখ্যামুলক বিষয়ের জন্য বাধ্যতামুলক হুকুম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এ সম্পর্কে বললেন,

    ‘বলে দিন: এই আমার পথ। আমি আল্লাহ্‌র দিকে বুঝে শুনে দাওয়াত দেই— আমি এবং আমার অনুসারীরা।’
    (সূরা ইউসুফ: ১০৮)

    সুতরাং রাসূলুল্লাহ (সা) এর সীরাত অনুসরণ করলে আমাদের কাজগুলোকে দুই ধাপে ভাগ করতে বাধ্য:

    • ব্যক্তিত্ব গঠন ও (দল) প্রতিষ্ঠার ধাপ
    • গণযোগাযোগ এবং সংগ্রামের ধাপ

    প্রথম ধাপে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কর্মপন্থা আমরা অনুসরণ করতে বাধ্য। এ ধাপে যারা ইসলামী দাওয়াতের বোঝা বহন করবে তাদেরকে ইসলাম দিয়ে গভীরভাবে বিকাশের ব্যবস্থা ও বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে হবে। এটা সম্ভব হবে খুব ভাল ইসলামী আকলিয়া (মানসিকতা/ধ্যান-ধারনা) ও নাফসিয়া (ঝোঁক/প্রবণতা) গড়ে তুলবার মাধ্যমে। যা করতে হবে গভীরতাসমৃদ্ধ পাঠচক্র বা হালাকা প্রদানের মাধ্যমে, যা রাসূলুল্লাহ করেছিলেন। যার মাঝেই রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলাম গ্রহণের উপযোগীতা দেখতে পেতেন, তার বয়স, পদমর্যাদা, লিঙ্গ, বর্ণ নির্বিশেষে তিনি তাকে আহ্বান করতেন এবং তাদের একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতেন। যতক্ষণ না পর্যন্ত ক্রমপ্রসারমান হিযবের মধ্যে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদেরকে উপরোক্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে:  

    • বিকাশের পরিণত অবস্থা, অর্থাৎ তাদের মনস্তত্ত বা আকলিয়া এবং নাফসিয়াহ বা প্রবণতা গড়ে উঠেছে ইসলাম অনুসারে। সুতরাং তারা এখন সমাজের দূষিত চিন্তাগুলোর মোকাবেলা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
    • কেবলমাত্র নিজেদের মধ্যে গন্ডীভূত রাখবার জন্য তারা দাওয়াতকে গ্রহণ করবে না। সুতরাং তারা যাই জানে তাই ছড়িয়ে দিতে থাকবে। যার মধ্যেই তারা কল্যাণ (খায়ের) দেখতে পাবে তার কাছেই তারা এ দাওয়াত নিয়ে যাবে।
    • লোকেরা দাওয়াতকে হৃদয়ঙ্গম করবে, এর উপস্থিতি ও সামষ্টিকতাকে অনুভব করবে।

    যখন সাহাবীদের মত এ তিনটি বৈশিষ্ট্য কোন হিজবের মধ্যে দেখা যাবে, তখন সেটি দ্বিতীয় ধাপে অগ্রসর হবে ।

    এ ধাপে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত দাওয়াতকে জনগনের কাছে নিয়ে যেতে হবে এবং বর্তমান সমাজের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে ও তাদের চিন্তা, ঐতিহ্য ও ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। তাদের চিন্তার দেউলিয়াত্বের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে এবং বিকল্প ইসলামী চিন্তা, ধারণা ও ব্যবস্থাকে উপস্থাপন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত জড়তাহীনভাবে, অসম সাহসিকতা ও শক্তিমতার সাথে লোকদের আহ্বান করতে আমরা বাধ্য। আমরা এ দাওয়াত পরিত্যাগ করব না ও আত্নসমর্পণও করব না। আমরা তোষামোদ বা আপোষ করব না এবং রীতিনীতি, ঐতিহ্য, ধর্ম, জীবনাদর্শ, শাসক অথবা জনতার ভয়কে উপেক্ষা করব। আমরা এমনভাবে দাওয়াহ বহন করব যাতে নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ইসলামের জন্য হয়ে যায়। জনগন এর সাথে একমত বা দ্বিমত পোষণ করুক না কেন অথবা এটা তাদের ঐতিহ্যের সাথে যাক বা সাংঘর্ষিক হোক এবং জনগন গ্রহণ, প্রত্যাখান বা বিরোধিতা করুক। যতক্ষণ না আদর্শ অনুসারে কাঙ্খিতভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত এর সাথে সংযুক্ত থাকব এবং ধৈর্যধারণ করব। যেহেতু রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত এ সময়েও শাসকগন এ লক্ষ্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াবে সেহেতু এ দলটিকে এই শাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। আর এটা তখনই সংঘটিত হবে যখন তাদের মুখোশ, দুরভিসন্ধি ও দালালি ও ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়া হবে এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত এসবকে চ্যালেঞ্জ করা হবে। যেভাবে পবিত্র কুরআন আবু লাহাবকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিল:  

    ‘আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে, কোন কাজে আসেনি তার ধন—সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে।’
    (সূরা লাহাব:১-৩)

    বানু হাশিম গোত্রে সে সম্মানিত হওয়া সত্ত্বেও এ আয়াত নাজিল হয়েছিল। একইভাবে কুরআনে বানু মাখদুম আল ওয়ালিদ বিন মুগীরাকে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    ‘যাকে আমি একা সৃষ্টি করেছি, তাকে একাকী আমার হাতে ছেড়ে দিন। আমি তাকে বিপুল ধন-সম্পদ দিয়েছি।’
    (সূরা আল মুদ্দাসির:১১—১২)

    অতপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘আমি তাকে দাখিল করব প্রজ্জলিত জাহান্নামের আগুনে।’
    (সূরা আল মুদ্দাসির: ২৬)

    তার সম্পর্কে সূরা ক্বলমে বলা হয়েছে:

    ‘কঠোর স্বভাব, তদুপরি কুখ্যাত’
    (সূরা ক্বলম:১৩)

    যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আবু জাহেলের ব্যাপারে বলেন,

    ‘কখনই নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি মস্তকের সামনের কেশগুচ্ছ ধরে হেঁচড়াবই— মিথ্যাচারী, পাপীর কেশগুচ্ছ।’
    (সূরা আলাক:১৫—১৬)

    আমাদের দাওয়াতের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত লোকদের নির্দেশনা দেয়ার মানসিকতা নিয়ে এগুতে হবে। এ ধাপে তিনি (সা) ইসলাম যাতে তাদের জীবনাদর্শ হয়ে যায় ও মুহম্মদ (সা) মিশন যাতে তাদের মিশন হয়ে যায়— সে জন্য সর্বাত্মকভাবে তাদের কাছে ইসলামী আদর্শ ব্যাখা করেছেন। অর্থাৎ আমরা যা বুঝাতে চাই তা যেন লোকেরা গভীর উপলদ্ধির সাথে গ্রহণ করে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর মত আজকেও আমরা প্রত্যাখান, প্রতিবন্ধকতা, মিথ্যা অপবাদ, বিতাড়ন, প্রোপাগান্ডা, বয়কটের শিকার হতে পারি।

    সাহাবাগন (রা) সেসময় অস্ত্র হাতে তুলে নেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন এবং তখন তিনি (সা) প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন,

    ‘আমি ক্ষমা করে দেবার জন্য আদিষ্ট হয়েছি; সুতরাং লোকদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করো না।’

    একইভাবে নুসরাহ খুঁজে পাবার পূর্বে আমরা অস্ত্রধারণ ও ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকব। 

    রাসূলুল্লাহ (সা) যেমনিভাবে তৃতীয় ধাপে উন্নীত হবার জন্য নুসরাহর সন্ধান করেছিলেন তেমনিভাবে আমরাও ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শাসন করবার জন্য নুসরাহ বা বস্তুগত সমর্থন অনুসন্ধান করতে বাধ্য। এ ধাপ হল ক্ষমতা গ্রহণ ও শাসন করবার ধাপ।

  • আল ‘আকাবার শপথ

    মুস’আব (রা)  মক্কায় ফিরে আসলেন। আনসারদের মধ্য থেকে কিছু মুসলিম তাদের তীর্থযাত্রী মুশরিক লোকদের সাথে হজ্জ করবার জন্য এল। তাশরীকের (১০ জিলহজ্জ থেকে শুরু করে ৪ দিন) মাঝামাঝি এক দিনে তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে শপথবদ্ধ হলেন। তাদের মধ্যে তেয়াত্তর জন পুরুষ ও দুইজন নারী ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে কেবল তার চাচা ছিলেন। আসাদ বিন জুরারাহ বলেন, ‘ রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আল আব্বাস সর্বপ্রথম কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘হে খাজরাজের লোকেরা! তোমরা মুহম্মদ (সা) সাথে দেখা করে তাকে আমন্ত্রন জানাচ্ছ। মুহম্মদ (সা) তার গোত্রের লোকদের মধ্য থেকে সবচেয়ে সম্মানিত। আল্লাহর কসম! আমাদের মধ্য হতে যারা তাকে বিশ্বাস করে অথবা না করে, সবাই তার সম্মান ও বংশীয় ধারার জন্য সুরক্ষা দিয়েছে। তোমাদের জন্য মুহম্মদ সবাইকে প্রত্যাখান করেছে। আপনারা যদি ক্ষমতাবান, ধৈর্যশীল, যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হন এবং সব আরবদের ঐক্যবদ্ধ বৈরীতা ও শত্রুতা মোকাবিলায় প্রস্তত থাকেন, তাহলে আপনাদের সদিচ্ছার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিন এবং এর উপর দৃঢ় থাকুন। প্রকাশ্যে নিরঙ্কুশভাবে একমত পোষণ করবার পর পরস্পর বিচ্ছিন্ন হবেন না। কারণ সৎ সাক্ষী সর্বোৎকৃষ্ট সাক্ষী।

    তারা বলল, ‘আপনি যা বললেন, তা আমরা শুনলাম। কিন্তু হে রাসূলুল্লাহ (সা), আপনি আমাদেরকে আপনার ও আপনার রবের জন্য পছন্দ করুন এবং বলুন আপনার যা ইচ্ছা হয়।’ 

    রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সামনে বক্তব্য দিলেন, কুরআন তেলাওয়াত করে শুনালেন, লোকদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করলেন ও ইসলাম গ্রহণের জন্য উৎসাহী করলেন। তাঁর প্রভূকে উপাসনা করা ও তার সাথে কাউকে শরীক না করবার শর্ত দিলেন। তারপর তিনি বললেন, ‘আমি আপনাদের সমর্থন প্রত্যাশা করছি যে, আমাকে সুরক্ষা দিন যেভাবে আপনারা আপনাদের নারী ও শিশুদের সুরক্ষা দিয়ে থাকেন।’ (সীরাত ইবনে হিশাম)

    আসাদ বিন জুরারাহ আল বারাহ আরও বর্ণণা করেন যে, ‘মা’রুর শপথ গ্রহণের জন্য তার হাত তুলে নিয়ে বললেন, ‘অবশ্যই, সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে একজন সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, আপনাকে আমরা সেভাবে রক্ষা করব যেভাবে আমাদের স্ত্রী ও সন্তানের সুরক্ষা প্রদান করি। হে রাসূলুল্লাহ, সুতরাং আমরা বাইআত প্রদান করলাম। আল্লাহর কসম, আমরা বংশ পরষ্পরায় নেতা থেকে নেতাতে যোদ্ধা ও অস্ত্রচালনায় পারদর্শী।’

    যখন আল বারা কথা বলছিল, তখন আবুল হায়সামি ইবনুল তাইহান তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমাদের অন্য লোকদেও (ইহুদী) সাথেও সম্পর্ক রয়েছে। যদি আমরা তাদের প্রতি কঠোর হই এবং সম্ভবত সে সময় আল্লাহ যদি আপনাকে বিজয়ী করেন তাহলে কি আপনি আমাদের প্রত্যাখান করে নিজের লোকদের কাছে ফিরে আসবেন?’ রাসূলুল্লাহ (সা) স্মীত হেসে উত্তর দিলেন,

    ‘না, রক্ত তো রক্তই; আর রক্তের বদলাও রক্তই। আমি তোমাদের জন্য আর তোমরাও আমার জন্য। তোমরা যাদের সাথে যুদ্ধ করবে আমিও তাদের সাথে যুদ্ধ করব আর তোমরা যাদের সাথে সন্ধি চাইবে আমার সন্ধিও তাদের সাথেই।’
    (সীরাত ইবনে হিশাম)

    আসাদ বিন জুরারাহ বর্ণণায় আরও উল্লেখ করেন, ‘‘অতপর তারা বলল, ‘সম্পদের ক্ষতি অথবা আমাদের মধ্যকার সম্ভ্রান্তগন উৎসগীর্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা তাঁকে (সা) বাই’য়াত দিলাম। তারপর আল বারা বললেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ (সা), আপনার হস্ত প্রসারিত করুন।’ এভাবে তিয়াত্তর জন রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতের উপর হাত রেখে বাই’য়াত সম্পন্ন করল। যখন লোকেরা বাই’য়াত দিল এবং তা সুসসম্পন্ন হল তখন শয়তান আল আকাবায় চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হে আখাসীবের (কুরাইশ) লোকেরা, তোমরা কি মুহম্মদ ও তার সাহাবাগন (মুশরিকদের দৃষ্টিতে দ্বীনত্যাগী) কে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য একত্র হওয়া পছন্দ কর?’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, ‘তোমাদের মধ্য হতে বারজন নেতা নিয়ে আস যারা তাদের লোকদের দায়িত্ব নিবে, যেমন ঈসা বিন মারিয়মের হাওয়ারীয়ন (শীষ্যগন) ; আর আমি আমার লোকদের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল।’ তারা দু’পক্ষ থেকে নুকাবা (নেতা) নির্বাচন করল। এভাবেই পূর্ণাঙ্গ ঈমানী পরিবেশে বাই’য়াত সুসম্পন্ন হল। এ বিষয়ে আল আব্বাস বিন উবাদা রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলেন, ‘সেই সত্তার কসম যিনি আপনাকে একজন সত্য নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যদি আপনার ইচ্ছা তাই হয় তাহলে আগামীকালই আমরা মীনাবাসীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে প্রস্তত।’ রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,

    ‘আমরা এ ব্যাপারে আদিষ্ট হইনি, সুতরাং তোমরা তোমাদের বাহন উটসমূহের কাছে ফিরে যাও।’
    (সীরাত ইবনে হিশাম)

    হজ্জের মৌসুম শেষ হতে চলল। মক্কার লোকদের কাছে যখন বাই’য়াত খবর পৌছাল তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। ইবনে সা’দ তার ‘আত তাবাকাত’ গ্রন্থে উরওয়া’র বরাতে আয়েশা (রা) এর কাছ থেকে বর্ণণা করেন যে, তারা বলল, ‘যখন সত্তর জন লোক রাসূলুল্লাহ (সা) কে ত্যাগ করল, তখন তিনি বুঝতে পারলেন আল্লাহ তাঁর জন্য সুরক্ষা, যোদ্ধা ও সমর্থন প্রদান করেছেন। তবে মুসলিমদের উপর পরীক্ষা বেড়ে গেল। এ ব্যাপারে সাহাবীগণ (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অভিযোগ করলেন এবং তিনি তাদের হিজরতের অনুমতি দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবা (রা) কে হিজরতের জন্য যে ভূমির কথা জানালেন তা হল ইয়াসরীব বা মদীনা এবং যে হিজরতে আগ্রহী তাকেই অনুমতি দিলেন। তিনি (সা) বললেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখলাম, মক্কা থেকে এমন এক ভূমিতে হিজরত করছি যেখানে খেজুর জাতীয় গাছ রয়েছে। আমার মন বলছিল আল ইয়ামা অথবা হাজারের কথা, কিন্তু এটা ছিল আল ইয়াসরীব।’ (বুখারী ও মুসলিম)

    অবশ্যই গোত্রসমূহের কাছ থেকে নুসরাহ পাবার প্রচেষ্টা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় বায়াতের ঘটনা এসবই প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) এমন ক্ষমতার অধিকার খুঁজেছিলেন যা তাঁর দ্বীনকে সহায়তা এবং সুরক্ষা দিতে পারবে। বিষয়টি কেবলমাত্র দাওয়াত বহন বা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সাথে এমন এক ক্ষমতার বিয়য়টি বিজড়িত ছিল যার মাধ্যমে মুসলিমগন আত্নরক্ষা করতে পারবে। বরং এর কলেবর আরও বেড়ে যায়, এটি এমন একটি নিউক্লিয়াস ছিল যাকে কেন্দ্র করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, সমাজে ইসলাম বাস্তবায়িত হবে, যা মানবতার কাছে শাশ্বত বাণী বহন করে এবং সে ক্ষমতা লালন করে যা ইসলামকে সুরক্ষা দেয় এবং এর বিস্তারের পথে আরোপিত সব বস্তুগত প্রতিবন্ধকতাকে অপসারণ করে। এভাবে সম্পদ, স্বদেশ, স্ত্রী ও পরিবার ছেড়ে হিজরত সম্পন্ন হয়। মদীনার হিজরত আবিসিনিয়ার হিজরত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।

    আবিসিনিয়ায় হিজরত ছিল দ্বীন ও অত্যাচারের ভয়ে কিছু ব্যক্তির নিজ ভূমি থেকে পলায়ন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মক্কায় নির্যাতিত মুসলিমদের জন্য এমন এক নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন যাতে করে তারা নির্যাতনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত না হয়ে তাদের অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং তাদের অন্তরাত্মাসমূহ পূণরায় শক্তিশালী ও দৃঢ়তার সাথে দাওয়াত বহনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। এটা দাওয়াতের পদ্ধতির কোন ধাপ নয় যেখানে মুহাজিরনগণ প্রবাসে থেকে দাওয়াত বহন করতে পারে অথবা প্রবাসী শাসকদের সহায়তা নিয়ে তার মূল ভূমির শাসককে উৎখাত করতে পারে।

  • দাওয়াতের আহ্বানে মদীনাবাসীর প্রতিক্রিয়া

    রাসূলুল্লাহ (সা) গোত্রসমূহকে প্রতিবছর মাজান্না, উ’কাজ এবং মিনায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তার নিজের প্রতি ক্রমাগতভাবে আহ্বান জানাচ্ছিলেন, যাতে করে তিনি তাঁর রবের বাণী নিরাপদে মানুষের দ্বারে পৌঁছে দিতে পারেন এবং এর প্রতিদানে তারা জান্নাত অর্জন করতে পারে। আরবের একটি গোত্রও তাঁর আহ্বানে সাড়া দেয়নি এবং তিনি নির্যাতিত ও চরিত্র হননের অপচেষ্টার শিকার হয়েছিলেন যতক্ষণ না আল্লাহর ইচ্ছায় দ্বীন বিজয়ী হওয়া, প্রভূর মদদপুষ্ট হওয়া ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হওয়ার সময় এসেছিল। অত:পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা) কে আনসারদের একটি গোত্রের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি (সা) এমন একটি দলের সাথে বসলেন যারা তাদের মাথা মুন্ডন করছিলেন । রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সাথে বসেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি আহ্বান করেন এবং তাদের কোরআন তেলাওয়াত করে শোনান। তারা খুব দ্রুত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও রাসূলুল্লাহ (সা) এর ডাকে সাড়া দেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনেন। Then they went to Madinah and invited their people to Islam; henceforth people started to embrace Islam.

    পরের বছর হজ্জ্বের মওসুমে মদীনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের বারজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা) এর সাথে আল আকাবা নামক স্থানে দেখা করেন ও ইসলাম গ্রহণ করেন। এটা ছিল আকাবার প্রথম সাক্ষাৎ যেখানে বায়াতুন নিছা বা নারীদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাদের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মুসয়াব বিন উমায়ের (রা) কে মদীনায় প্রেরণ করেন। তিনি (সা) মুসায়েব (রা) কে সেখানে কুরআন পাঠ করবার, মদীনাবাসীকে ইসলাম ও দ্বীন শিক্ষা দেয়ার নির্দেশ দেন। তিনি আল মুকরী (তেলাওয়াতকারী) হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং আসাদ বিন জুরারাহ এর সাথে থাকতেন। অতপর উসায়েদ বিন হাদায়ের ও সাদ বিন মুয়া’জ ঈমান আনেন। তারা ছিলেন মদীনায় নেতৃস্থানীয়। যখন পরেরজন ইসলাম গ্রহণ করল তখন তিনি তার জনগণের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমাদের মাঝে আমাকে তোমরা কিভাবে দেখ?’ তারা প্রত্যুত্তরে বলল, ‘আমরা তোমাকে আমাদের অভিভাবক এবং প্রাজ্ঞ ব্যক্তি মনে করি এবং সত্য পথে একজন নেতা ভাবি।’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের পুরুষ এবং নারীগন ততক্ষণ আমার সাথে কথা বলতে পারবে না যতক্ষণ তোমরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর।’ বিকেলের মধ্যে আবদুল আশ-হাল এর বাড়ীতে এমন একজন পুরুষ ও নারী খুঁজে পাওয়া গেল না যে মুসলিম হয়নি।

  • রাসূলুল্লাহ (সা) কতৃক গোত্রসমূহকে ইসলামের দিকে আহ্বান

    যখন রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আবু তালিব ও বিবি খাদিজা (রা) একই বছরে ইন্তেকাল করলেন তখন তাদের মৃত্যুর কারণে তার ভাগ্যাকাশে দূর্যোগের মেঘ আরও ঘনীভূত হল। চাচার মৃত্যুর পর কুরাইশগন রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর নির্যাতনের খড়গহস্ত আরও কঠিনভাবে চালাতে উদ্যত হল। এ ব্যাপারে তিনি (সা) বলতেন,

    ‘আবু তালিবের মৃত্যুর পর কুরাইশগন যত ঘৃণিত কাজ করেছিল ততটা আর কখনওই করেনি।’
    (সীরাতে ইবনে হিশাম)

    আবু তালিবের মৃত্যুর পর নিজের ও তাঁর লোকদের সুরক্ষা ও নুসরার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা) তায়েফ গিয়েছিলেন। এ বিষয়ে তিনি বানু সাকিফ গোত্রের কিছু নেতৃস্থানীয় লোকের সাথে দেখা করেছিলেন। তিনি তাদের সাথে ইসলামকে সমর্থন করা ও এর পাশে দাঁড়ানোর জন্য কথা বলেন, তার গোত্রের  যে কেউ তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবার জন্য বললেন। তারা এ আহ্বান প্রত্যাখান করেছিল এবং বারণ করা সত্ত্বেও তাদের সাথে যোগাযোগের বিষয়টি গোপন না রেখে প্রকাশ করে দিয়েছিল। বিশেষ প্রহরা ছাড়া মুহম্মদ (সা) মক্কায় প্রবেশ করতে পারেননি।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বিভিন্ন গোত্রের দরজায় দাঁড়িয়ে আহ্বান জানিয়ে বলতেন,

    ‘হে অমুক গোত্র! আমি তোমাদের কাছে প্রেরিত আল্লাহর রাসূল। তিনি নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আল্লাহর উপাসনা করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না। এইসব মূর্তি থেকে যে কোন কিছু গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন এবং আমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন ও ঈমান আনুন। ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে রক্ষা করুন যতক্ষণ না আল্লাহ আমাকে যা দিয়ে পাঠিয়েছেন তা লোক সামনে তুলে ধরছি।’
    (সীরাত ইবনে হিশাম)

    রাসূলুল্লাহ (সা) এর চাচা আবু লাহাব ছায়ার মত তাঁর পেছনে লেগে থাকত এবং তিনি যা বলতেন তার জবাব দিত ও প্রত্যাখান করত। কেউ তার কথা গ্রহণ করত না, তারা সাধারণত বলত, ‘তোমার লোকেরা যারা তোমাকে আরও ভাল জানে তারাই তোমাকে অনুসরণ করে না।’

    তারা কথা বলত ও তর্ক করত। অন্যদিকে তিনি তাদের সাথে কথা বলতেন এবং আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতেন এই কথা বলে,

    ”হে আমার প্রভু, যদি তোমার ইচ্ছা থাকত! তারা এটা অপছন্দ করত না। ”

    সীরাত ইবনে হিশামে উল্লেখ আছে, আয-জুহরী বর্ণণা করেন যে, মিনাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বানু কিন্দা গোত্রের কাছে তাদের আবাসস্থলে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেছেন ও প্রত্যাখাত হলেন। তিনি আরও বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বানু কা’ব গোত্রের কাছে যান এবং প্রস্তাব দেন। কিন্তু আগের মতই প্রত্যাখাত হন। তারপর তিনি বানু হানিফা গোত্রের কাছে গিয়ে একইভাবে প্রস্তাব দেন এবং তাদের প্রত্যাখান ছিল আরবদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট। তিনি বানু আমির বিন বানু সা’সা’ এর কাছে গিয়েছিলেন এবং তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করেন ও নিজেকে উপস্থাপন করেন। বহাইরা বিন ফিরাস নামে তাদের মধ্যকার একজন বলল,

    ‘আল্লাহর কসম, আমি যদি কুরাইশের এই তরুণকে নিতে পারতাম তাহলে পুরো আরবদের পরাজিত করতে পারতাম।’ সে রাসূলুল্লাহ (সা) কে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি মনে কর, যদি আমরা তোমাকে অনুসরণ করি এবং স্রষ্টা তোমার শত্রুদের বিরুদ্ধে তোমাকে বিজয় দান করে তবে তোমার পরে আমাদের হাতে ক্ষমতা আসবে?’ নবী (সা) উত্তর দিলেন,  

    ‘ক্ষমতার মালিক আল্লাহ এবং তিনি যাকে খুশী তাকে তা দান করেন।’

    বহাইরা উত্তর দিল, ‘আমরা তোমাকে রক্ষা করবার জন্য আরবদের কাছে আমাদের গলা উন্মুক্ত করে দেব আর যখন তুমি বিজয়ী হবে তখন ক্ষমতা চলে যাবে অন্য কারও হাতে! তাহলে তোমার ক্ষমতার আমাদের প্রয়োজন নেই!’

    রাসূলুল্লাহ (সা) এরকমই করে যেতে থাকলেন। যখন হজ্জের মৌসুমে লোকেরা জমায়েত হত, তিনি (সা) সেখানে উপস্থিত হতেন এবং তাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাতেন। তিনি (সা) নিজেকে উপস্থাপণ করতেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনা ও রহমত তুলে ধরতেন। যখনই রাসূলুল্লাহ (সা) জানতে পারতেন যে কোন স্বনামধন্য ও সম্মানিত আরব এসেছেন তখনই তিনি কালবিলম্ব না করে তাকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দিকে আহ্বান জানাতেন ও তাঁর প্রতি নাজিলকৃত বাণীসমূহ উপস্থাপন করতেন।

    ইতিবাচক সাড়া না দিলেও রাসূলুল্লাহ (সা) যে সব গোত্রের সাথে দেখা করেছিলেন, ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং নিজেকে তাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন তারা হল: ১) বানু আ’মির বিন সা’সা’ ২) মুহারিব বিন খাসফাহ ৩) ফাজারাহ ৪) ঘাসান ৫) মুরাহ ৬) হানিফাহ ৭) সুলায়েম ৮) আবাস ৯) বানু নাদর ১০) বানু আল বুকা ১১) কিন্দা ১২) কা’ব ১৩) আল হারিস বিন কা’ব ১৪) উজরাহ ১৫) আল হাদারিমাহ

    ইবনে সাদ এর ‘আত তাবাকাত’ শীর্ষক বই অনুসারে এই তালিকা উল্লেখ করা হল।

  • রাসূলুল্লাহ (সা) এর সময়ে গণসংযোগ পর্যায়

    কুরাইশদের সাথে দাওয়াত নিয়ে সংঘাত ছিল স্বাভাবিক। কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) এই দলটিকে সাহসী ও চ্যালেঞ্জিং পদ্ধতিতে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন। দাওয়াতের প্রকৃতির কারণে মক্কার সমাজ ও কুরাইশদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। এ দাওয়াত এক আল্লাহর উপাসনা ও তাওহীদের প্রতি আহ্বান করেছিল এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে বলেছিল ও যে দূনীর্তিগ্রস্ত নষ্ট শাসনব্যবস্থার মধ্যে তারা বসবাস করত তার সমূল উৎপাটন করবার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল। তিনি তাদের স্রষ্টাকে উপহাস করতেন, সস্তা জীবনধারাকে আক্রমণ করতেন এবং তাদের জীবনব্যবস্থার অবৈধ দিকসমূহ উন্মোচন করতেন। তিনি সত্য দিয়ে তাদের চ্যালেঞ্জ করতেন এবং তারাও করত মিথ্যে ও গুজব দ্বারা। তিনি লোকদের সুস্পষ্টভাবে আহ্বান জানাতেন এবং এ আহ্বানে কোন দ্ব্যর্থবোধকতা, নমনীয়তা বা বশ্যতার লেশমাত্রও ছিল না। সব অত্যাচার, প্রত্যাখান, বিতাড়ন, গুজব ও বয়কটকে তোয়াক্কা করে তিনি এসব কিছু করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) লোকদের কাছে দাওয়াত পৌঁছে দিলেন এবং ইসলাম প্রসারিত হওয়া শুরু করল।

    যখন তাঁর (সা) স্ত্রী ও চাচা মারা গেলেন এবং কুরাইশদের অত্যাচারের মাত্রা আরও ঘনীভূত হল তখন তিনি সমর্থন আদায় ও নিরাপত্তার জন্য তায়েফের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন এই ভেবে যে, হয়ত তারা ইসলাম গ্রহণ করবে। কিন্তু তারা অকল্পনীয়ভাবে মন্দ আচরণ ও শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে প্রত্যাখান করল। তিনি এমন এক পর্যায়ে এসে উপনীত হলেন যখন নিরাপত্তা ছাড়া মক্কায় প্রবেশ করতে পারছিলেন না। সেদিন তিনি আল মু’তিম বিন ’আদি এর প্রহরায় মক্কায় প্রবেশ করলেন। কুরাইশ কতৃক রাসূলুল্লাহ (সা) এর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে লাগল এবং প্রত্যাখান এর মাত্রা আরও প্রবল হল। বিরোধীরা তার কথা শুনতে লোকদের বারণ করত এবং এটা খুব বেশী কার্যকর হয়নি। হজ্জের মৌসুমে বিভিন্ন গোত্রের কাছে তিনি যাওয়া শুরু করলেন এবং তাদের ইসলামের দিকে আহ্বান করা শুরু করলেন ও প্রচার করলেন যে, তিনি একজন আল্লাহ প্রেরিত রাসূল ও এতে তাদের বিশ্বাস স্থাপন করা উচিত। তাঁর চাচা আবু লাহাব সাধারণত তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মিথ্যাচারের অভিযোগ আনত এবং লোকদের তাঁর কথা না শুনবার জন্য উদ্ধুদ্ধ করত। এ প্রচারণার একটা প্রভাব শ্রোতাদের উপর পড়ত, যেমন: তারা মাঝে মাঝে শুনত না। তারপর তিনি গেলেন বানু কিন্দা, বানু কাব, বানু হানিফা, বানু আমি’র বিন সা’সা এর কাছে। কিন্তু কেউ তার কথায় কর্ণপাত করত না। কেউ কেউ বিতৃষ্ণা নিয়ে খুব বাজেভাবে প্রত্যাখান করত। গোত্রসমূহের কাছ থেকে প্রত্যাখানের মাত্রা বেড়ে যাবার আরেকটি প্রধান কারণ হল কুরাইশরা মুহম্মদ (সা) এবং তার সাহায্যকারীকে তাদের শত্রু  হিসেবে বিবেচনা করত। ব্যক্তি বা গোত্র হিসেবে লোকেরা আরও ক্রমবর্ধমান হারে রাসূলুল্লাহ (সা) কে প্রত্যাখান করা শুরু করল। তিনি ক্রমেই নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছিলেন এবং মক্কা ও এর আশেপাশে দাওয়াতের কাজ করা কঠিনতর হয়ে যাচ্ছিল। মক্কার সমাজ কুফরী ব্যবস্থার উপর অটল থাকল এবং কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে দৃঢ় থাকল। যখন অত্যাচারের মাত্রা তীব্রতর হয়ে গেল তখন আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) সহ আরও অনেকে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে অস্ত্র ধারণের অনুমতি প্রার্থনা করল। তারা বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আগে আমাদের মুশরিক হিসেবে সম্মান ও ক্ষমতা ছিল। আর যখন আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম তখন অপমানিত হচ্ছি।’ রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের নিষেধ করে বললেন, 

    ‘অবশ্যই, আমাকে ক্ষমা করে দেবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সুতরাং লোকদের সাথে যুদ্ধ করো না।’
    (আন নাসায়ী ও আল হাকিমে ইবনে আবি হাতিমের বর্ণণায়)

    এইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কায় দাওয়াতের দু’টি পর্যায় অতিক্রম করেছেন:

    • শিক্ষণ, গঠন বা চিন্তার বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্নিক প্রস্তুতির পর্যায়। এটা হল চিন্তাকে উপলদ্ধি করতে পারা, প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সে চিন্তাকে মজ্জাগত করা এবং তাদের সুসংগঠিত করার পর্যায়।
    • দাওয়াতের বিস্তৃতি ও সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার পর্যায়। এটা হল চিন্তাকে সমাজ পরিচালনার শক্তি হিসেবে সরবরাহ করা, চিন্তাকে প্রয়োগ করে জীবনের মূল ধারায় স্থান করা যাতে সাধারণ জনগন এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করে, বহন করে এবং প্রতিষ্ঠার পথে সর্বাত্নক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।      

    প্রথম পর্যায়ের ক্ষেত্রে, এটা হল লোকদের ইসলামের দিকে আহ্বানের পর্যায় এবং এর চিন্তা দিয়ে তাদের চিন্তার বিকাশ ঘটানো, নিয়মকানুন শিক্ষা দেয়া এবং এমন একটি সংগঠন গড়ে তোলা যারা ইসলামি আক্বীদার ভিত্তিতে এ কাজগুলো করতে পারবে। এ পর্যায়ে দাওযাতকে গোপনে সংগঠিত করতে হয়। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) দাওয়াত থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। তিনি যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন তাদের চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছেন। তাদেরকে দারুল আরকামে একত্রিত করে একটি সংগঠনের কাঠামোর ভেতরে নিয়ে এসেছিলেন। এভাবে প্রতিদিন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং তাদের মধ্যকার বন্ধন সুদৃঢ় হয়। তাদের মধ্যে বাস্তবতাকে উপলদ্ধি করা এবং কর্মসূচী গ্রহণ ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে কারণে দাওয়াতের জন্য তারা নিজেদের উৎসর্গ করবার জন্য প্রস্তত ছিল। দাওয়াত তাদের হৃদয় ও মনে গভীরভাবে প্রোথিত ছিল। ধমনীতে রক্ত যেভাবে প্রবাহিত হয়েছিল সেভাবে ইসলাম তাদের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছিল। সেকারণে  লুকোচুরি, গোপন কাঠামো ও গোপন বৈঠকের মধ্যেও তাদের ভেতরে দাওয়াত লুক্কায়িত ছিল না। বিশ্বাসী ও দাওয়াত গ্রহণের জন্য আগ্রহী লোকদের সাথে তারা এ দাওয়াত নিয়ে যেত। এভাবে লোকেরা তাদের উপস্থিতি ও দাওয়াত বুঝতে পারত। এভাবে দাওয়াতের সূচনা হল। অতপর দাওয়ার প্রকাশ অত্যবশ্যকীয় হয়ে উঠল। কিছু কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছিল এর প্রকাশ ও লোকদের সম্বোধন করার জন্য।  এভাবে প্রথম ধাপ অতিক্রান্ত হল যেখানে গোপন কাঠামো তৈরি করা ও শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়, যা এই কাঠামো তৈরিতে সাহায্য করে।     

    তারপর আরেকটি পর্যায় শুরু হল, যা ছিল গণসংযোগ ও সর্বাত্নক সংগ্রাম পর্যায়। লোকদের এসময় ইসলাম উপলদ্ধি করবার সুযোগ দেয়া হয়। সেকারণে তখন তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে এবং এবিষয়ে আগ্রহী হয়েছে। আবার অন্যদিকে তারা এটাকে প্রত্যাখান ও পরবতীর্তে চ্যালেঞ্জ করেছে এবং এভাবে এ চিন্তার সাথে দ্বন্দ শুরু হয়েছে। এ দ্বন্দে কুফর ও কুচিন্তা পরাভূত হয়েছে, ঈমান ও সত্য বিজয় হয়েছে এবং সঠিক চিন্তাই প্রবলতর হয়েছে। এভাবে গনসংযোগ শুরু হল এবং একটি চিন্তা ও আরেকটির মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হল, অর্থাৎ এ প্রতিযোগিতা ছিল মুসলিম ও কাফেরদের মধ্যে। এর সূত্রপাত হয়েছিল যখন রাসূলুল্লাহ (সা) গণমানুষের কাছে সাহস ও চ্যালেঞ্জের সাথে দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেয়া শুরু করলেন। তাওহীদের দাওয়াত, মূর্তিপূজা ও শিরকের চিন্তাকে আঘাত এবং কোন চিন্তা ছাড়া পূর্বপুরুষকে অন্ধভাবে অনুকরণ করার বিষয়গুলোকে সমালোচনা করে রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর আয়াত নাজিল হতে লাগল। আয়াতসমূহতে ত্রুটিপূর্ণ বিনিময় ব্যবস্থা, বাণিজ্য এবং মাপে কম দেয়ার সমালোচনা করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) দলে দলে লোকদের সাথে কথা বলা শুরু করলেন, ইসলামকে গ্রহণ ও সাহায্য করবার জন্য আহ্বান জানালেন। কুরাইশ ও নবী (সা) এর মধ্যকার দ্বন্দ বৃদ্ধি পেল। দাওয়াতের মধ্যে বাড়িতে, পাহাড়ের পাদদেশে, দারুল আরকামে নিবিড় শিক্ষাদান পদ্ধতির পাশাপাশি তখন সামষ্টিক শিক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। ফলে, এটা স্থানান্তরিত হল কিছু সংখ্যক মানুষ যাদের মাঝে কল্যাণ (goodness) ছিল তাদের আহ্বান জানানোর পর্যায় থেকে সমগ্র মানষকে আহবান জানানোর পর্যায়ে। এই সামষ্টিক দাওয়াত ও গনসংযোগ পর্যায় কুরাইশদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করল। সুতরাং তাদের ঘৃণা ঘনীভূত হল এবং তারা ইসলাম নিয়ে ভীত হয়ে পড়ল। দাওয়াতকে বিরোধিতা করবার জন্য তারা ভয়ংকর সব পরিকল্পনা আটতে থাকল; এ পর্যায়ের আগে তারা রাসূলুল্লাহ (সা) এর দাওয়াতকে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেনি। সুতরাং মানুষিক ক্লেশ ও জুলুম বাড়তে লাগল। তবে এই সামষ্টিক দাওয়াত এর নিজের উপরে অনেক প্রভাব বিস্তার করল। এর কারণে অনেকে ইসলামের কথা শুনবার সুযোগ পেল এবং আল্লাহর দ্বীনের কথা মক্কাবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভবপর হল। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করল। সামষ্টিক দাওয়াতের কারণে এর কলেবর বাড়ানোর সুযোগ হল। যদিও এ কারণে দাওয়াত বহনকারীদের দূর্ভোগ, অত্যাচার ও নির্যাতন বাড়িয়ে দিল। যখন রাসূলুল্লাহ (সা) কুরাইশদের অন্যায়, নিষ্ঠুরতা, মক্কার সমাজের দাসত্ব, কাফেরদের করুণ অবস্থা ও কর্মকান্ডের মুখোশ উন্মোচন করছিলেন তখন তারা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। সব পর্যায়সমূহের মধ্যে এ পর্যায়টি রাসূলুল্লাহ (সা) ও তার সাহাবীদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।            

    চিন্তা বিকাশের পর্যায় থেকে গনযোগাযোগ পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার পর্যায়টি খুব স্পর্শকাতর একটি বিষয়, কারণ এর জন্য প্রজ্ঞা, ধৈর্য, চিন্তার যথার্থতা অপরিহার্য। তবে গনযোগাযোগ পর্যায়টি ছিল সবচেয়ে কঠিন। এর জন্য একজনকে সাহসী, স্পষ্টভাষী এবং ফলাফল বা প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনায় না নিয়ে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের মানসিকতা নিয়ে আসতে হবে। এ ধাপে মুসলিমদের দ্বীন থেকে বের হয়ে যাবার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এ পর্যায়ে ঈমান ও দূর্ভোগ সহ্য করার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি বিকশিত হয় এবং সংঘাতের সময়গুলোতে ঐকান্তিকতা গড়ে উঠে।    

    একইভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাহাবাদের (রা) নিয়ে এমনভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন যাতে তারা অত্যাচার, দূর্ভোগ ও নির্যাতন সহ্য করতে পারে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবিসিনিয়াতে হিজরত করেছেন, কেউ দ্বীন নিয়ে পালিয়েছেন, কেউ নির্যাতনের কারণে মারা গেছেন এবং কেউ কেউ অত্যাচার সহ্য করেছেন। মক্কার সমাজকে পরিবর্তনের জন্য তাঁরা যথেষ্ট সময় নিয়ে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তবুও অত্যাচারের ভয়াবহতা সফলতার পথে বাধা হয়ে দাড়িয়েছিল। আরবদের অনেকে দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। কারণ তখন তারা ঈমান গ্রহণ করে কুরাইশদের চটাতে চায়নি। তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ ইসলামকে বাস্তবায়নের স্তরে দাওয়াত মক্কার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ (সা) নুসরা ও সুরক্ষা পাবার জন্য গোত্রসমূহের কাছে যাওয়া শুরু করেন, যাতে করে তিনি তার প্রভূ যা নাজিল করেছেন তা লোকদের কাছে স্পষ্ট করতে পারেন।