তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ পশ্চিমা সভ্যতার ফলাফল নয়
এরকম ধারণা বিরাজমান রয়েছে যে পশ্চিমাদের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন গণতন্ত্রের বাস্তবায়নের ফসল। অথচ এর পক্ষালম্বনকারীরা বাস্তব চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞ। এর কারণ বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত আবিষ্কারসমূহ কোন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সংযুক্ত নয় বরং এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত মানুষের চিন্তাশক্তি দ্বারা কোনকিছু অর্জনের ক্ষমতা। যে কোনো পুঁজিবাদী, সমাজতান্ত্রিক বা মুসলিম ব্যক্তি যে তার মনকে মুক্তভাবে চলতে দেয় সেই এটা অর্জন করতে পারে। কোন ধর্ম বা জীবনব্যবস্থার এক্ষেত্রে কোন প্রভাব নেই, যদি না বিশেষ কোন আদর্শ বিজ্ঞানকে অনুমোদন দেয় ও মানুষের মনের ব্যবহারকে বৈধতা দেয় অথবা এটি পূর্বের গীর্জার মত এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। এটা সর্বজনবিদিত যে, ইসলামী আদর্শ কেবলমাত্র পরীক্ষা করা ও বস্তুসমূহকে সম্পর্কে জানার বিষয়টিকেই অনুমোদন দেয়নি বরং আদর্শের সার্বভৌমত্বের রক্ষায় প্রয়োজনীয় বস্তুগত সামর্থ্য অর্জনকে বাধ্যতামূলক করেছে।
পশ্চিমারা তাদের মন্দ পণ্য আমাদের কাছে উপস্থাপন করছে, যেমনঃ গণতন্ত্র, যা আমাদের অনুসরণ করতে শারী’আহ্ নিষেধ করেছে। অন্যদিকে অন্য পণ্যসমূহ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যেমন: বিজ্ঞান ও নতুন আবিষ্কার, যে ব্যাপারে শারী’আহ্’র কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ ক্ষমতা অর্জনের সমস্ত উপকরণকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পশ্চিমাদের কাজ থেকে বুঝা যায় যে, তারা এসব সচেতনভাবেই করছে। অতএব কিছু কিছু ইসলামী দলের এ ব্যাপারে অন্ধ হওয়াকে কি অনুমোদিত?
এটা পরিষ্কার যে বলে গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে, সে গণতন্ত্রও বুঝেনি কিংবা ইসলামও বুঝেনি।
পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা

জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের ধারণার বশবর্তী হয়ে পশ্চিমারা নিজেদেরকে আইন তৈরির ক্ষমতা প্রদান করেছে। এটা এই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে মানুষ অন্যের তোয়াক্কা না করে এমন জীবনযাপন করবে যাতে সে নিজেকে পরিতুষ্ট করতে পারে; যেখানে তার নিজের খেয়ালখুশীর প্রতিফলন ঘটবে কিন্তু অন্যদের নয়। তারা মনে করে মানুষ এরূপ অধিকার ভোগ করতে পারবে না যদি না সে স্বাধীন হয়। আর এটা থেকেই পাওয়া যায় বিশ্বাস, মালিকানা, মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা। এটা স্বাধীনতার এ ধারণাকে পবিত্র বলে বিবেচনা করে। এই স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অর্থ রয়েছে।
বিশ্বাসের স্বাধীনতা একজনকে পছন্দসই ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ করে দেয়। অথবা দৈনন্দিন ব্যাপার হলেও তাকে এক বিশ্বাস থেকে অন্য বিশ্বাসে স্থানান্তরিত হওয়াকে অনুমোদন দেয়। এমনকি এটা তাকে ধর্ম পুরোপুরি পরিত্যাগ করতেও সুযোগ দেয়।
মালিকানার স্বাধীনতা তাকে যে কোন কিছুর, যে কোনভাবে মালিক হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করে। এমনকি এটা তাকে তার সম্পত্তি যেভাবে খুশী সেভাবে হস্তান্তর বা পরিত্যক্ত করবার স্বাধীনতা দেয়। যদি এটি সে তার উত্তরাধিকারকে না দিয়ে প্রিয় পোষা কুকুরকে উপহার হিসেবে দিতে চায় তাহলে কেউ তাতে বাঁধা প্রদান করতে পারবে না।
মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাকে খেয়ালখুশী মতো, অবাধে ও নিয়ন্ত্রনহীনভাবে সবকিছু বলবার স্বাধীনতা প্রদান করে, হোক সেটা সত্য বা মিথ্যা। তার উপলদ্ধি এবং খেয়ালখুশীর বিরুদ্ধে যায় এরকম যে কোন মতামতকে সে অবজ্ঞা বা সমালোচনা করতে পারে।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কারণে তারা ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন মূল্যবোধ, নৈতিক বাধ্যবাধকতা, আধ্যাত্মিক সীমারেখার দ্বারস্থ হয় না।
গণতন্ত্রের মৌলিক অপরিহার্যতা স্বাধীনতার এই ধারণা এর পক্ষালম্বনকারীদের এমন এক বোধের দিকে নিয়ে গেছে যা তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম করে দিয়েছে।
বিশ্বাসের স্বাধীনতা পুঁজিবাদী সমাজে ধর্মের উপর বিশ্বাসের গুরুত্বকে হালকা করে দিয়েছে। তাদের পোষাক পরিবর্তনের মতো ধর্ম পরিবর্তনকে সহজতর করে দিয়েছে। বস্তুবাদী চিন্তার প্রসার ও ধমীর্য় চিন্তাকে গন্ডীভূত করে ফেলবার কারণে নৈতিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। একারণে লোকদের হৃদয় থেকে সমবেদনা উঠে গেছে এবং নেকড়ের মত দূর্বলের উপর সবলের আধিপত্য চলছে।
মত প্রকাশের স্বাধীনতার কারণে তারা ইচ্ছেমতো যা খুশী বলতে পারে এবং যে কোন কিছুর দিকে লোকদের আহ্বান করতে পারে। সে কারণে তাদের সমাজে সব ধরণের অদ্ভুদ, মিথ্যা, খেপাটে ধরণের মতামতের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যে কোন সাধারণ লোক রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে এবং তাকে বিরত করার কোন আইন নেই। যেমন: সালমান রুশদী, যে বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।
মালিকানার স্বাধীনতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লাভ এবং এটা পুঁজিবাদের মধ্যে ভয়াবহতা তৈরি করেছে ও লোকদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা, তাদের সম্পদ হরণ করা, সম্পদকে ব্যবহার করা এবং লোকদের রক্ত শোষণ করার জন্য উপনিবেশবাদকে পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। একারণে অন্যদের সাথে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হয়, মুসলিমদের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসা করতে হয়, বিভিন্ন স¤প্রদায় ও জাতিসমূহের মধ্যকার যুদ্ধে উস্কানি দিতে হয় যাতে অতি লাভে তাদের নিকট পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা যায়। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ যে কোন ধরণের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত। তবে যদি তারা বাধ্য হয় তাহলে ধর্মকে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ, কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত আচরণকে আঁড়াল করার জন্য নৈতিক ও মানবিক বোধের কথা বলে বেড়ায়।
ব্যক্তিস্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমাজগুলোকে পশুর সমাজে রূপান্তরিত করেছে। তাদের লাম্পট্য এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, পশুরাও এ অধঃপতিত অবস্থায় কখনও যায়নি। আইনের মাধ্যমে তারা অস্বাভাবিক ও ভ্রান্ত যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দিয়েছে। তাদের মধ্যে এমনসব অভ্যাস দেখা যাবে যা চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে দেখা যায় না। তারা দলগত যৌনাচার ও নিকটাত্নীয় এমনকি মায়ের, বোন ও মেয়ের সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তারা পশুর সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। এ কারণে তাদের এমন রোগ হয়েছে যা আগে কখনওই হয়নি। তাদের সমাজে ভঙ্গুর পরিবার খুব বেশী দেখতে পাওয়া যায় এবং একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানে সব বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া এবং যে কোন ধরণের মূল্যবোধকে গ্রহণ করা ও পরিবারকে ধ্বংস করবার স্বাধীনতা। এইসব স্বাধীনতার নামে সব ধরণের পাপকাজ করা হয় এবং সব নিষিদ্ধ জিনিষকে বৈধতা দেয়া হয়।
সেকারণে স্বাধীনতার নামে ব্যভিচার, সমকামীতা, সমকামী স্ত্রীলোক, নগ্নতা এবং অ্যালকোহল, যে কোন ঘৃণ্য ও গর্হিত কাজকে অনুসরণ করা যে কোন ধরণের চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বাধীনভাবে করা হয়।
এগুলোই হলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এগুলো হলো মানুষের প্রবৃত্তির ফসল, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর ঐশী বাণীর এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নেই। কোন ধর্মেরই এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। আমরা যদি গণতন্ত্রের সমর্থক ও চিন্তাবিদদের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব যে, যা তাদের মনে একে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এবং যে পরিস্থিতিতে এর উদ্ভব ঘটেছে তা সত্যিকার অর্থেই একটি কুফর ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিছু লোকের কথার উপর ভিত্তি করে, যেমন: রাজা ১৫তম লুইসের মতে, ‘আমরা স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছ থেকে মুকুট গ্রহণ করি না।’ এবং রাজা ১৪ তম লুইস বলেন, ‘রাজার কতৃর্ত্ব আসে স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। স্রষ্টা হলেন এর একচেটিয়া উৎস এবং জনগণ নয়। স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছে রাজাগণ তাদের কর্তৃত্বের জন্য জবাবদিহী করেন না।’ বোদ্ধাগণ জ্যাঁ জ্যাক রুশো’র সামাজিক চুক্তির মতবাদকে ‘ফ্রেঞ্চ ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সুতরাং উপরে উল্লেখিত সবকিছু থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি ইসলামের সাথে গণতন্ত্র পুরো মাত্রায় সাংঘর্ষিক। এর উৎস যা থেকে এটি এসেছে, যে বিশ্বাস থেকে এটি উৎসারিত হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যে চিন্তা ও ব্যবস্থা এটিকে নিয়ে এসেছে তা থেকেও বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
— যে উৎস থেকে এটি এসেছে সেটি হল মানুষ। তার কাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে বিবেচনার জন্য, হুস্ন (পছন্দীয়) এবং কুব্হ (তিরষ্কারযোগ্য) এর বিষয়ে সে নিজেই শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটা আর কোন কিছুই নয়, বরং তার খেয়ালখুশী ও প্রবত্তির অনুসরণ। এর সৃষ্টির শেকড় হল ইউরোপের দার্শনিকগণ।
ইসলামের ক্ষেত্রে তা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি এটা নাযিল করেছেন তার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল মুহম্মদ (সা) এর উপর। ইসলামে শাসকগণ আইন জারির ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি নয়, শারী’আহ্’র শরণাপন্ন হয়। শারী’আহ্’র বাণীসমূহকে বুঝা পর্যন্ত মনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।— যে বিশ্বাস থেকে গণতন্ত্র উৎসারিত হয়, তা হলো জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের বিশ্বাস বা আক্বীদাহ্ এবং এটা এসেছে আপোষমূলক সমাধানের মাধ্যমে। এটা ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং জীবন ও রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাবকে বিলুপ্ত করেছে এবং সর্বোপরি মানুষকে তার নিজের ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।
ইসলামের ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। এতে ইসলামী আক্বীদাহ্’র আলোকে জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অন্যকথায় ইসলামি আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত ইসলামী শারী’আহ্ ভিত্তিক হুকুমের মাধ্যমে জীবন পরিচালিত হয়। এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।— যে ভিত্তির উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত তা হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। জনগণ হলো সকল ক্ষমতার উৎস। এর উপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তিনটি শক্তির জন্ম দিয়েছে; আইন, নির্বাহী ও বিচারিক ক্ষমতা, যাতে সে এর সার্বভৌমত্ব ও কতৃর্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ করতে পারে।
ইসলামে শারী’আহ্’র উপর সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত এবং উম্মাহ্’র আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। তবে ইসলাম মুসলিমদের আল্লাহ্ প্রদত্ত আদেশ—নিষেধকে কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং শারী’আহ্গত দলিলের ভাষায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।— গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা ও চিন্তা নিয়ে এসেছে যার ভিত্তি মানুষের প্রবৃত্তিজাত এবং তা হলো লাভ। অন্যদিকে ইসলামের আইন প্রক্রিয়া শারী’আহ্ এবং শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত আইনের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ এটি এই নির্দেশিত পথের অনুমোদন ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল।
— গণতন্ত্রের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা থেকে ইসলাম লাভবান হতে পারে; এ ধরণের উক্তি ভিত্তিহীন এবং দলিল নির্ভর নয়। আমরা গণতন্ত্রের কিছু প্রভাব দেখতে পেয়েছি যা এমন এক মন্দ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে যা কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসেনি। মানবতার জন্য আগত সবোর্ত্তম উম্মতের গণতন্ত্র থেকে নেওয়ার কিছু নেই। ইসলামের কী এমন কোনো ঘাটতি রয়ে গেছে যে তা পূরণের জন্য গণতন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে।
তা-গূত কী?
ইসলামের দৃষ্টিতে বিচারের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও নিকট শরণাপন্ন হওয়াকে তাগুতের নিকট শরণাপন্ন হওয়া বুঝায়।
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার উপর নাযিল হয়েছে, এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল হয়েছে, তার উপর তারা ঈমান এনেছে, এবং তারা বিবাদমান বিষয়গুলোর মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায় অথচ তা প্রত্যাখ্যানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
(সূরা আন নিসা: ৬০)তাগুতের শাসন মানেই জাহেলিয়াতের শাসন। এর প্রতিটি আইন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে সাংঘর্ষিক। ইবনে আল-কাইয়্যিম তার রচিত গ্রন্থ আ’লাম আল-মুয়াক্কি’ন এ বলেন, “বান্দা যখন কোনকিছুর ইবাদত, কাউকে অনুসরণ কিংবা মান্য করার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে তখন এইরকম প্রতিটি কর্মকান্ডই তাগুতের মধ্যে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেকের জন্য তাগুত সেটাই যার নিকট সে আল্লাহ্ ও রাসূলকে বাদ দিয়ে বিচারের শরণাপন্ন হয়, অথবা আল্লাহ্ বাদ দিয়ে যার উপাসনা করা হয়, অথবা আল্লাহ্’র কাছ থেকে প্রাপ্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে যার অনুসরণ করা হয়, অথবা এমন কিছুকে মান্য করা যা আল্লাহ্’র প্রতি আনুগত্য থেকে উৎপত্তি হয়নি।”
যে তাগুতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে পবিত্র কুর’আনের দৃষ্টিতে তার ঈমান কোনো বাস্তবতা নয় বরং নিছক দাবী বা ভন্ডামী মাত্র। এছাড়াও কুর’আন তাগুতকে ঈমানের শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়েছে যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“যে তাগুতকে অবিশ্বাস করলো এবং আল্লাহ্ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো, সে এমন সুদৃঢ় হাতলকে ধারণ করলো যা ভাঙবার নয়।”
[সূরা বাক্বারা: ২৫৬]সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মৃত্যুর পর, ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ্’কে অবশ্যই মানবজাতির স্বাক্ষী হয়ে থাকতে হবে। সে কারণে কুর’আন যা বলেছে, ঠিক তাই এ উম্মাহ্’র মানবতাকে বলা উচিত,
“একমাত্র আল্লাহ্’র ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো।”
[সূরা নাহল: ৩৬]সুতরাং জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের চিন্তা, এবং তা থেকে উৎসারিত সকল চিন্তা, যেমন গণতন্ত্র তাগুতের চিন্তা। ইসলাম আমাদেরকে তা প্রত্যাখান ও পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছে।
এটাই হলো গণতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী। আর এগুলো পৃথিবীতে বাস্তবায়নের ফলে যে ফলাফল তৈরি হবে তা কী এমন সম্মানজনক ও সুন্দর ব্যবস্থা হবে যার ছায়াতলে মানুষ বসবাস করতে পছন্দ করবে নাকি এমন মন্দ ব্যবস্থা হবে যার প্রয়োগে মানুষ অন্তঃসারশূন্য ও ক্ষতিকারক জীবনে পতিত হবে এবং তার আগুন দ্বারা নিয়ে দগ্ধ হবে।
গণতন্ত্র
পশ্চিমা সভ্যতা দুনিয়া থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই চিন্তা ও ভিত্তিতে বিশ্বাসের দরুণ পশ্চিমারা জনগণের জীবন থেকে দ্বীনের প্রতিটি প্রভাব বিনষ্ট করেছে। এর অনুকরণে তারা মৌলিক চিন্তার আদলে এর উপর ভিত্তি করে জীবন সম্পর্কিত সকল চিন্তা ও সমাধান বিকশিত করেছে। অতএব গণতন্ত্রের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের উপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কর্তৃত্বের পরিবর্তে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে নিজেদের কাজের মাপকাঠি হিসেবে তারা স্বার্থকে গ্রহণ করলো এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ঈন্দ্রীয়গত পরিতুষ্টিকে সুখ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলো। এটাই ছিল ব্যক্তিপূঁজার চিন্তা পরবর্তীতে ব্যক্তিস্বাধীনতার পূঁজার দিকে ধাবিত করে। এসব চিন্তার উপরে ভিত্তি করেই পাশ্চাত্য সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং পাশাপাশি এসব চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক সকর চিন্তার বিরোধিতা করেছে। এসব চিন্তা গ্রহণের ফলে নিজেদের সন্ধানকৃত সুখের পরিবর্তে পাশ্চাত্য কেবল দুর্ভোগেরই শিকার হয়েছে। এরূপ ঘটাই স্বাভাবিক কারণ মানুষ হচ্ছে দুর্বল যে নিজের বা অন্যের জন্য আইন প্রণয়নের যোগ্যতা রাখেনা। যে সমাজে স্বার্থপরতা প্রবল থাকে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার কর্তৃত্ব থাকে সেরকম একটি সমাজ কেবল পাশবিকই হতে পারে যেখানে জংলী আইনকানুনের রাজত্ব থাকে।
এরপর পশ্চিমারা মনকে স্বাধীন রাজত্ব প্রদান করলো। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে তারা মনোনিবেশের ফলে তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করলো। এভাবে যখন সে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলো তখন পৃথিবীর উপর সে সত্যের জোরে নয় বরং ক্ষমতার জোরে আধিপত্য বিস্তার করলো। প্রথমে বস্তুগতভাবে ও পরবতীর্তে বুদ্ধিবৃত্তিভাবে সে নিজেকে পৃথিবীর উপর চাপিয়ে দিল। অন্যভাবে বলতে গেলে, একটি দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তারা প্রথমে এমন শাসকবর্গকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলো যারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং সেজন্য উপযোগী ব্যবস্থাও আরোপ করবে। এমন মিডিয়া ও পাঠ্যসূচী প্রতিষ্ঠা করলো যা তাদের চিন্তা ও জীবনব্যবস্থার পক্ষে প্রচারণা চালাবে। জনগণকে তারা উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করলো যে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী তাদেরকে ক্ষমতাধর অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে।
তখন সে নিজের স্বার্থের অনুকূলে পুরো পৃথিবীকে বিভক্ত করে ফেললো। শিল্পোন্নত, উৎপাদনশীল, শক্তিশালী, আধিপত্যবাদী এবং ঔপনিবেশিবাদী রাষ্ট্রগুলোকে তারা আধুনিক ও প্রগতিশীলদের কাতারে ফেললো। এবং অবশিষ্ট দরিদ্র, পরনির্ভরশীল, দুর্বল এবং নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোকে তারা পশ্চাৎপদদের কাতারে ফেললো। এই বিভক্তিকে আরও গভীর করা, এবং এসব রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি কিংবা চলমান পরিস্থিতি অসঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো পরিবর্তনের চেষ্টাকে প্রতিরোধ করলো।
তারপর তারা নিজেদের দেশে ব্যক্তিস্বাধীনতার দরজা খুলে দিল এবং জনগণকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা উপভোগের সুযোগ করে দিল। বৈষম্য বজায় রেখে জনগণকে মৌলিক চাহিদা ও পাশাপাশি ভোগবিলাসের চাহিদা পূরণের সুযোগ করে দিল। একই সময়ে এসব দরিদ্র দেশসমূহ যাতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বস্তুগত উন্নতি সাধন করতে না পারে এজন্য তারা এসব জাতিকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হতে বঞ্চিত রাখলো। মৌলিক শিল্প কাঠামো গড়তে বাঁধা প্রদান করেছে যাতে অতি প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদার জন্যেও এসব দেশকে পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। এসব দেশকে দুর্বল করার মাধ্যমে তারা এগুলোকে নিজেদের বাজারে পরিণত করলো। এসব দেশের জনগণকে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করলো। আর এজন্যেই শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে নিজেদের উপনিবেশ বানাতে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এই দ্বন্দ্ব আবার এ পর্যায়ের না যে তাদের একে অপরের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত। বরং তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের পরিণতি হচ্ছে এসব দরিদ্র দেশের জনগণ একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত, অথবা ঐ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনহীন বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও বিপ্লবের উৎপত্তি। ফলে এসব রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং জনগণের ভিতরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। না বললে নয় যে এর মাধ্যমে তারা এসব দেশের জনগণের ভেতর বর্ণবাদ, গোত্রবাদ এবং জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়েছে।
অনুরূপভাবে, পাশ্চাত্য দেশসমূহ নিজেদের জনগণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা যেমন ঔষধ, শিক্ষা, বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা প্রভৃতি বিষয় সরবরাহ করেছে অথচ অন্যান্য দেশে এসব বিষয়কে নিষেধ করেছে।
উপনিবেশীকরণের বিভিন্ন উপকরণ হিসেবে পাশ্চাত্য কিছু বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান যেমনঃ আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বব্যাংক ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত থামানোর জন্য অথবা দরিদ্র দেশগুলোতে দেওয়া ত্রাণের নিরাপত্তার জন্য তারা আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনী গঠন করেছে। গরিব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান যেমন সেভ দি চিলড্রেন এবং মেডিসিন সানস ফ্রন্টিয়ারস প্রতিষ্ঠা করেছে।
প্রকৃতপক্ষে, জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ এবং এ থেকে উদ্ভূত স্বার্থের ধারণা থেকে পাশ্চাত্য উপনিবেশকরণের ধারণা প্রবল হয়েছে। তবে এই উপনিবেশীকরণ বর্তমানে তার আদিম চেহারায় আর নেই। বরং তা চিন্তা, উপকরণ ও ধরণ পাল্টে এক গুপ্ত উপনিবেশবাদে পরিণত করা হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এটি করুণা এবং ভিতরগতভাবে যুলুম। এভাবেই পশ্চিমারা বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে এবং নিজেদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে জনগণ তাদেরকে একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ বলে ভাবতে শুরু করে এবং মুসলিমরা তাদেরকে কিবলা বানিয়ে মাথানত করে। তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার চিন্তা থেকে এরূপ দাবি করার মতো বড় প্রতারণা এবং মুনাফিকী আর কী হতে পারে? পাশ্চাত্যের পছন্দকৃত স্বর্গে (?) যারা বাস করতে চায় তাদের জন্য পাশ্চাত্য হচ্ছে আশ্রয় ও করুণা। পাশাপাশি উপনিবেশিকতাবাদের প্রকৃত চেহারা যা হচ্ছে জনগণকে শোষণ করা ও তাদের সম্পদ অন্যায়রূপে দখল করা, তাদেরকে দুর্বল করে রাখা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদেরকে পশ্চাৎপদ করে রাখা, নিজেদের সম্পদের জন্য তাদেরকে স্থায়ী বাজারে পরিণত করা এবং পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের যে কারণ সেগুলোকে তারা গোপন করেছে। পাশ্চাত্যের সভ্যতা এবং এর উপনিবেশিকতাবাদের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, আলোচনার সুবিধার্থে যার কিছু অংশ আমরা উপস্থাপন করেছি মাত্র।
হ্যা, ঠিক এভাবেই পশ্চিমারা সত্যকে বিকৃত করেছে, বিষয়বস্তুকে উল্টে ফেলেছে এবং নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন বিষয়কে জনগণের প্রকৃত উপলব্ধি থেকে অন্ধকারে রেখেছে। ফলে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা জনগণকে প্রভাবিত করতে লাগলো, যার মধ্যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ অন্যতম। শ্লোগাণটি ‘শক্তিশালীর যুক্তি শক্তিশালী’ এবং ‘দুর্বলের যুক্তি দুর্বল’ এই মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।
আদর্শিক দল বা গোষ্ঠীর মূল ভূমিকা এখানেই যাতে সবকিছুই তার প্রকৃত অবস্থায় ফিরে আসে, দৃষ্টিভঙ্গী ঠিক হয় এবং প্রতারণা বন্ধ হয়। দল যদি বাস্তবতা দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে সে সঠিক উপলব্ধি হারিয়ে ফেলবে এবং এমন সমাধানের প্রস্তাব দিবে যা সাধারণত তার শত্রুরা দিয়ে থাকে। তবে দল যদি বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং সমাধান খুঁজতে সঠিক প্রক্রিয়ায় শারী’আহ্’কে অনুসরণ করতে পারে তাহলে জনগণের সামনে সে সঠিক সমাধান উপস্থাপন করতে পারবে এবং জনগণকে পাশ্চাত্যের নষ্ট চিন্তা থেকে ইসলামের আলোকিত চিন্তায় আনতে সক্ষম হবে।
উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে বিভিন্ন দেশকে বস্তুগত অগ্রগতির উপকরণ অর্জনে বাঁধাপ্রদান এবং নিজেদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জ্ঞানচর্চার ব্যাপক স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যমে পশ্চিমারা তাদের ক্ষমতাধর অবস্থা ধরে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে, তাদের মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের পিছনে গণতন্ত্র নয় বরং দায়ী হচ্ছে তাদের ঔপনিবেশিকতাবাদ, বিভিন্ন জাতিসমূহের রক্তশোষণ এবং সম্পদ লুণ্ঠন।
আর গণতন্ত্র কী ও তা বাস্তবায়নের পরিণতি কী; তা এক ভিন্ন আলোচনা।
পাশ্চাত্যে ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ এই ধারণাটি জন্ম হয়েছে জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে চার্চের হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগের কারণে। এসব হস্তক্ষেপ ধর্মের নামে চালানো হলেও এসব ব্যাপারে ধর্মের কোনো মন্তব্য ছিলনা। কারণ খ্রিস্টান ধর্মে পার্থিব বিষয়সমূহের জন্য কোনো আইনকানুন নেই। ধর্মের নামে পাদ্রীগণ বিভিন্ন অন্যায় আইনকানুন তৈরি করেছিল যার ফলে কিছু বিশেষ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়; এর মধ্যে একটি ছিল ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা এবং অন্যটি ছিল ধর্মকে স্বীকার করা কিন্তু জীবন থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। প্রথম প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে এর শাসনে জনগণ পিষ্ট হয় এবং কয়েক দশক যেতে না যেতে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে যা ধ্বংসের পথে এগুচ্ছে। যার নমূনা চিন্তা এবং বাস্তবতার নিরিখে সুস্পষ্ট।
‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ এই ধারণাটি ধর্মকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে মানুষকে আইন প্রণয়নের অধিকার দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে স্বীকার করে নেয়া সত্ত্বেও তারা একে এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় পরিণত করেছে যাতে এর কোন বক্তব্য কিংবা প্রভাব সমাজের উপর না পড়ে। সমাজের বিষয়ে যার কিছু বলার নেই এবং যা সমাজে কোনো প্রভাবও রাখতে পারবেনা। তাদের জন্য এটা ভুল নয় যদি কেউ আল্লাহ্, যীশু, বুদ্ধ বা অন্য কোন ব্যক্তির উপাসনা করে। এমনকি ধর্ম হতে উদ্ভুত নয় এমন বিশ্বাসে কেউ বিশ্বাসী হওয়াটাও তাদের দৃষ্টিতে দোষের নয়। কিন্তু সর্বদা মানুষকে সকল বিষয়ের একমাত্র ব্যবস্থাপক মানতে হবে। তাদের দৃষ্টিতে এ বিষয়টির সাথে কোন আপোষ-আলোচনার সুযোগ নাই। তাদের মতে মানুষ নিজেই নিজের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা করবে এবং তার প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্টির ব্যবস্থা করবে। এ চিন্তা থেকে গণতন্ত্রের ধারণা উদ্ভুত হয়েছে যার অর্থ ‘জনগণের শাসন, জনগণের দ্বারা শাসন এবং জনগণের জন্য শাসন।’
‘জনগণের শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ নিজেই নিজের প্রভূ অর্থাৎ আইন তৈরি করবে অর্থাৎ বিধানদাতা।
‘জনগণের দ্বারা শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন দ্বারা শাসন করবে।
এবং ‘জনগণের জন্য শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন কতৃর্ক শাসিত হবে।
তাদের মতে তিন ধরনের কতৃর্পক্ষের আবির্ভাব ঘটে,
১. আইন তৈরির জন্য কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ আইন ও কানুন তৈরি, এগুলো সংশোধন, রহিতকরণ এবং প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করে।
২. নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ সাধারণ আইন বা জনগণের সাধারণ ইচ্ছা ও আইন কতৃর্পক্ষ কতৃর্ক প্রণীত আইন প্রয়োগ করে।
৩. বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য কতৃর্পক্ষ। এটি আইনী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আইন ও কানুন দ্বারা তার সামনে উত্থাপিত যে কোন বিষয়ের বিচারকার্য সম্পাদন করে।
এগুলো হলো গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এটা বলা সম্ভবপর যে, অন্যদের থেকে পার্থক্যকারী এই রকম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আদর্শের নামই হল গণতন্ত্র। এর যে কোনটি বাদ পড়েছে এমন কোন ব্যবস্থার নাম গণতন্ত্র নয়। এই বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। একে গণতান্ত্রিক চিন্তার প্রাথমিক অবলম্বন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সুতরাং ইসলামে কি গণতন্ত্র আছে? গণতন্ত্রের এ উপরিল্লিখ বৈশিষ্ট্য কি ইসলামে বিদ্যমান? যদি এ বাস্তবতা ইসলামে বিদ্যমান থাকে তখনই আমরা বলতে পারি, ‘গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে’ এবং ‘খোলাফায়ে রাশেদীনগণ সর্বপ্রথম গণতন্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন’ এবং ‘গণতন্ত্র হলো সে হারানো সম্পদ যা পুনরায় আমাদের কাছে ফিরে এসেছে?’ আর যদি তা বিদ্যমান না থাকে তাহলে গণতন্ত্র মোটেও ইসলাম থেকে আসেনি। কাজেই আমাদেরকে অবশ্যই গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের মতামত জানতে হবে।
নিশ্চয়ই গণতন্ত্র সেই মতাদর্শের ভিত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যে মতাদর্শের ভিত্তি হচ্ছে জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ। এ ভিত্তি হতে গণতন্ত্র জন্ম লাভ করেছে এবং একই আইন গ্রহণ করেছে। এটি পরিত্যাজ্য একটি ভিত্তির শাখা, এবং এই ভিত্তির উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী কাফের হিসেবে গণ্য। এটা সর্বজনবিদিত, ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ মুসলিমদের মৌলিক বিশ্বাস ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ এর পরিপন্থী। মুসলিমদের জন্য আক্বীদা হতে উদ্ভুত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তা হচ্ছে:
“নিশ্চয় আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ব্যতীত আর কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না।
[সূরা ইউসুফ: ৪০]তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) বক্তব্যের
“…কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না।” এর অর্থ হল সারা জাহানের প্রভূর প্রদত্ত হুকুমের ক্ষেত্রে অধিকাংশ লোকের মতামতের কোন মূল্য নেই এবং আইন তৈরির ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র। সুতরাং ইসলামী ব্যবস্থায় সর্বশেষ কথা কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য। আদেশ, নিষেধ, অনুমোদন, নিষিধাজ্ঞা প্রদান কেবলমাত্র সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে মহান, সর্বজ্ঞানী, সব বিষয়ে প্রাজ্ঞ সত্ত্বার জন্য; এছাড়া আর কারও জন্য নয়। কোন ব্যক্তি বা দলের আল্লাহ্’র সাথে এ ব্যাপারে সামান্যতম হিস্যাও নেই।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হলেন সে সত্ত্বা যিনি রায় দিয়েছেন,
“নিশ্চয়ই আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্।”
(সূরা ইউসুফ: ৪০)এবং আল্লাহ্’র রায়ের ব্যাত্যয় ঘটানোর অধিকার কারও নেই,
“তার নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই।”
(সূরা রা’দ: ৪১)তাহলে কী করে গণতন্ত্রের কালো রাত্রির সাথে ইসলামের জ্যোতিময় দিনের তুলনা চলে? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর সুস্পষ্ট আয়াতে উল্লেখ করেছেন,
“আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর কথাবার্তা বলে।”
(সূরা আল আনআম: ১১৬)তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
“…হয়তো তোমরা এমন বিষয়কে অপছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য কল্যানকর এবং এমন বিষয়কে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য অকল্যানকর। এবং আল্লাহ্ জানেন কিন্তু তোমরা জানো না।”
(সূরা বাক্বারা: ২১৬)বিচ্যুতি ও আপোষের ব্যাপারে সতর্ক থাকা
কোনো আদর্শিক ফিকরাহ্’র (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) উপরে প্রতিষ্ঠিত দল যখন বাস্তবতার মোকাবিলা করতে মাঠে নামে তখন তার উপর অনেক ঝড়-ঝাঁপটা আসে এবং তাকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে চায়। এই আন্দোলনটির প্রতি শাসকবর্গের আচরণ হবে অন্যান্য আন্দোলন থেকে পৃথক। কারণ অন্যান্য আন্দোলনগুলো আংশিক চিন্তা উপস্থাপন করে, যার ফলে তারা শাসকের জন্য মোটেও হুমকি হিসেবে কাজ করেনা। বরং শাসকবর্গ কতৃর্ক সংঘটিত বিভিন্ন ত্রুটি ও অপূর্ণতার খালি জায়গাগুলো পূরণ করে দেয়। কিন্তু আদর্শিক ফিকরাহ’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত চরম আন্দোলনটি নিজস্ব ভিত্তির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ের মোকাবিলা করে এবং কোনো জোড়াতালি দেওয়া সমাধানকে মেনে নেয়না অথবা পরিস্থিতির সাথেও তাল মেলায়না। না তারা কোনো আংশিক সমাধান মেনে নেয় আর না শাসকবর্গ কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যার সংস্কার করে। সামগ্রিক পরিবর্তন অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই দাওয়াহ্ ত্যাগ করাকে তারা মেনে নেয় না। না তারা ভিত্তিকে বাদ দিয়ে ভিত্তি থেকে উৎসারিত পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করাকে মেনে নেয়। ফলে এটা স্বাভাবিক এমন সংগঠনকে একটি নজিরবিহীন প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুক্ষীন হতে হবে। সামগ্রিক পরিবর্তনের পথকে সংগঠনটি যত বেশী অনুসরণ করবে এর প্রতি শাসকগোষ্ঠীর শত্রুতা ও বিরোধীতাও তত বেশী জোরালো হবে।
এই বিরোধিতার তীব্রতার পরিমান এতো বেশীও হতে পারে যা সহ্য করার ক্ষমতা দাওয়াহ্ বহনকারীগণ মাঝেমধ্যে হারিয়ে ফেলতে পারেন। এবং দাওয়াহ্’র বক্তব্যের তীব্রতাকে খানিকটা হালকা করার জন্য সংগঠনের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন। যখন সে প্রত্যক্ষ করবে সবাই তাকে ও তার এই আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছে তখন এই দাওয়াহ্ অব্যাহত রাখার কাজ তার নিকট অত্যন্ত কঠিন মনে হবে এবং তার সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়বে। সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে যখন তার পার্থিব স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তখন সে নিজেকে প্ররোচিত করবে এবং কাজ ছেড়ে দিতে চেষ্টা করবে। তখন সে দলের উপর চাপ প্রয়োগ করবে যাতে দল পরিবর্তনের আহবানের পরিবর্তে সংস্কারের আহবান জানায়। দল যদি তার আহ্বানে সাড়া দেয় তাহলে সে দলে সাথে থাকবে। এভাবে নিজের দাবি অনুযায়ী সে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যই কাজ করবে এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও শাসকবর্গ উভয়কেই সন্তুষ্ট করবে। কিন্তু দল যদি তার এই চাপ প্রত্যাখ্যান করে দলের সামগ্রিক এবং মৌলিক কাজে অটল থাকে তাহলে সে দল ছেড়ে যাবে। অতএব, দল এক্ষেত্রে দুটো বিপদের সম্মুখীন হবে; একটি আভ্যন্তরীণ যা আসবে সেসব শা’বাবদের তরফ থেকে যাদের মনোবল প্রচন্ড ঝড়-ঝাঁপটা আসার পূর্বেই ভেঙে পড়েছে এবং আরেকটি শাসকগোষ্ঠী তরফ থেকে যারা সামগ্রিক পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গী ধারণকারী দাওয়াহ্ বহনকারীদের সহ্য করতে পারে না।
একপর্যায়ে দল এবং শাসকবৃন্দের মধ্যে দরকষাকষি শুরু হবে। তখন দলের নিকট বিভিন্ন প্রস্তাব আসা শুরু করবে এবং ভয়-ভীতি আর প্রলোভন সমন্বিত একটি ‘মূলা ঝুলানো’ তত্ত্ব প্রয়োগ করা হবে। এটা সর্বজনবিদিত ব্যবসার ক্ষেত্রে দরকষাকষি প্রযোজ্য; সুতরাং দল যখন দর-কষাকষিতে নামে তখন তা হয় তার দায়িত্বকে বিক্রি এবং উম্মাহ্’কে অপমানিত করার মতো অবস্থা। অন্যথায় একে শাসকগোষ্ঠীর আগুনে দগ্ধ ও তার শিখায় ঝলসাতে হয়।
অতএব, সঠিক আদর্শিক ফিকরাহ্ এমন একটি আদর্শিক দলের দাবি করে যার নেতৃত্ব এবং সদস্যগণ শারী’আহ্’র কতৃর্ত্বকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, ধৈর্য, ত্যাগ স্বীকার, পরার্থবাদ এবং এ সমস্ত বিষয়েও তারা সচেতন। পরিণতির আশংকায় যে কোন প্রলোভনের হাতছানিতে সাড়া দেওয়া থেকে তাদের অবশ্যই তাদেরকে বিরত থাকতে হবে যাতে তারা বিচ্যুত হয়ে না পড়ে এবং তাদের মনোবল না ভেঙে যায়। দলটি যদি এমন একটি সুরক্ষিত পদ্ধতিতে অগ্রসর হতে চায় যাতে তার কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং কোনোরূপ পরিবর্তনের জোয়ারে ভেসে না যায় অথবা দলটিকে নিয়ে লোকজন কোনোরকম খেলায় লিপ্ত হতে না পারে, সেজন্য দলটিকে অবশ্যই প্রতিটি চিন্তাকে বা শারী’আহ্ হুকুমকে দৃঢ়ভাবে ইসলামী আক্বীদাহ্’র সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। যদি কখনো লক্ষ্য অর্জনের পথে দাওয়াত বহনকারীর ব্যক্তিগত স্বার্থ বা সুবিধার সাথে দাওয়াহ্’র দৃঢ়তা ও ধৈর্যে্যর সংঘাত বাঁধে তাহলে অবশ্যই দাওয়াহ্’কে সর্বাবস্থায় প্রাধান্য দিতে হবে। যার ফলে তখন এই চিন্তাটি দুষ্কর্মের দিকে ধাবিতকারী শয়তান ও নফসের প্ররোচনার পথে একটি দূর্বেধ্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।
কাঁদার মধ্যে সংগঠনটির তরী ডুবে যাওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক পরিণতির হাত হতে বাঁচাতে হলে, তার নিকট নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় কিছু মূলনীতি বিদ্যমান থাকতে হবে যা দলের চিন্তা ও চিন্তার প্রক্রিয়াকে নির্ধারণ করবে। যা দলটিকে তার গৃহীত হুকুম শারী’আহ্’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে। নতুন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়নের নামে এসব মূলনীতি থেকে সে কখনোই বিচ্যুত হতে পারবে না।
ফলে সঠিক নির্দেশনা, সঠিক অনুসরণ এবং সঠিক জ্ঞান দলটিকে পরিশুদ্ধ করবে এবং দলের সদস্যদের অন্তরকে যেকোনো ক্রটি-বিচ্যুতি এবং দোষ থেকে মুক্ত করবে এবং তাদের ঈমানকে মজবুত করবে।
এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী মুমিনগণ ছাড়া আর কারও পক্ষে দৃঢ় থাকা অসম্ভব। এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুক্ষীন হওয়ার পর যারা টিকে রইবে, তাদের ঈমান সেইভাবে খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হবে যেভাবে আগুন দ্বারা সোনা খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হয়।
দল যখন তার গৃহীত নিয়ম নীতিমালাকে হারিয়ে ফেলে তখন সে কর্মসূচী প্রত্যাহার, রদবদল, পিছু হটা, অসঙ্গতিতে ভুগবে। পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা কঠিন পরিস্থিতিতে কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সংগঠনকে পরিবর্তন সাধনে তাড়িত করে অথবা জনগণের নিকট দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের পক্ষে ন্যায্যতা কিংবা শারী’আহ্’র বাইরে গিয়ে ব্যাখ্যা উপস্থাপনের দিকে ধাবিত করে।
দল যখন আপোষ করবে, সত্যকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ না করে আংশিকভাবে গ্রহণ করবে এবং সামগ্রিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা ও মৌলিক কাজকে পরিত্যাগ করবে তখন সে তার ধারণকৃত একমাত্র শক্তিকে হারিয়ে ফেলবে। তখন সে আর কোনো অনন্য ও স্বতন্ত্র দল হিসেবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে সে পরাজিত হবে এবং শত্রুপক্ষ বিজয়ী হবে যদিও তখন সে ইসলামের দিকে আহবান করে এবং ইসলামকে একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করে। এর কারণ তার আহ্বান বিকৃত এবং প্রচলিত ব্যবস্থার জন্য সুবিধাজনক হয়ে গেছে। এবং পরিবর্তনের রাস্তায় সহযোগী হওয়ার পরিবর্তে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। এই ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, রাসূল (সা) এবং রাসূল (সা) পরবর্তী উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন:
“…এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ্ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।”
(সুরা মায়েদা: ৪৯)তাছাড়া সাইয়্যিদুনা উমর (রা) তার নিযুক্ত বিচারক শুরায়হ্’কে বলেছেন : “কেউ যাতে তোমাকে নির্ধারিত এ পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।”
দলের মধ্যে বিদ্যমান সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হচ্ছে তার ফিকরাহ্ (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ)। যদি দল একে সংরক্ষণ করে এবং আপোষের পরিবেশ থেকে রক্ষা করে, পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে এর উপরে অটল থাকে এবং রাসূল (সা) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাহলে রাসূল (সা) এর মতো তারাও মুমিনদের একটি দল প্রস্তুত করতে পারবে এবং আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে উম্মতকেও রাজি করাতে পারবে। এসব বিষয় প্রস্তুত করার পরে সে পরিস্থিতিকে দাওয়াহ্’র অনুকূলে নিয়ে আসতে পারবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
ইসলামী চিন্তাসমূহ সত্যের দাওয়াহ্ বহনকারী ব্যক্তিদের জন্য এমন এক নিয়ামত যা তাদেরকে পরিস্থিতি কতৃর্ক সৃষ্ট চাপ মোকাবেলায় আসল মৌলিক চিন্তাসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইসলামী চিন্তাসমূহের উপর অটল থাকার দাবি জানায়। পরিস্থিতি সৃষ্ট চাপের মুখে ‘চাহিদানুযায়ী সবই গ্রহণযোগ্য’, ‘ততটুকুই উপস্থাপন কর যতটুকু বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ’, ‘দাবির আংশিক উপস্থাপন কর’, ‘আংশিক সমাধান গ্রহণ কর’ এ ধরনের মানসিকতা পোষণ করা দলের জন্য কোনভাবেই মানানসই না। এসব চিন্তাকে ব্যবহার করা নয় বরং এগুলোর মূলোৎপাটনের জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এগুলো পাশ্চাত্যের চিন্তার ধরণ যা দ্বারা তারা আমাদের চিন্তার উপর আগ্রাসন চালিয়েছে। এসব চিন্তার সাথে সামগ্রিকভাবে ভিন্নমত পোষণকারী ইসলামী চিন্তা এসব কুফর চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে ও এগুলোকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য কাজ করছে, এবং ইসলাম ও ইসলামের চিন্তার প্রক্রিয়া বলবৎ করার জন্য কাজ করছে। অতএব যে পরিবর্তন চায় এবং পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে তাকে অবশ্যই প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করতে হবে।
ফিকরাহ্’র বিশুদ্ধতা ও স্পষ্টতার উপরে জোর দিতে এবং তা বজায় রাখতে কোন কোন বিষয়ের দিকে দলটিকে নজর দিতে হবে সেগুলো উপস্থাপনের পর এবার আমরা পাশ্চাত্যের কাফিরদের কতৃর্ক প্রস্তাবিত দুটি চিন্তা নিয়ে আলোচনা করব। এসব চিন্তার প্রতি আমাদের শাসকবর্গ প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ এবং এগুলোর মাধ্যমেই তারা মুসলিমদের উপর নির্যাতন চালায়। দুর্ভাগ্যবশত ইসলামের জন্য কাজ করে এমন কিছু ইসলামী দল এবং পাশ্চত্য চিন্তা গ্রহণের জন্য সবসময় উৎসাহ যোগায় এমন কিছু মুসলিম লেখক এসব চিন্তাকে দ্রুত গ্রহণ করে ফেলেছে। চিন্তা দুটির মধ্যে একটি হচ্ছে গণতন্ত্র এসেছে ইসলাম থেকে এবং গণতন্ত্রই শূ’রা। এমনকি শব্দের পুনর্মিলন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দরুন একজন লেখক একে শূ’রাক্রেসি বা শূ’রাতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। অপর চিন্তাটি হচ্ছে কতিপয় মুসলিম এবং ইসলামী আন্দোলন কতৃর্ক কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করার পক্ষে সাফাই গাওয়া। উপরোক্ত আলোচনাটিতে অগ্রসর হওয়ার শুরুতেই আমরা যেসব মূলনীতি উল্লে¬খ করেছি তার আলোকে আমরা যাচাই করবো কোন বাস্তবতায় গণতন্ত্র প্রয়োগযোগ্য, গণতন্ত্রের বাস্তবতা কী এবং শারী’আহ্’তে এমনকোনো বাস্তবতা আছে কিনা যা গণতন্ত্রের বাস্তবতার সাথে সদৃশপূর্ণ।
১১তম অধ্যায়: চিন্তা (Idea) ও পদ্ধতি (Method) হিসেবে আদর্শের প্রতি আনুগত্য
যখন পশ্চিমা কাফেররা তাদের জীবনব্যবস্থাকে এমনভাবে চাপিয়ে দিতে সক্ষম হলো যাতে তা জনগণ অনুসরণ করে, তখন মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনযাপনগত অবস্থান কারও নিকট আর ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রইলো না। মুসলিমরা আক্বীদাহ্’র সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তাসমূহ দ্বারা নিজেদের জীবন পরিচালিত করতে লাগলো। উম্মাহ্ কখনও যেসব বিজাতীয় চিন্তাসমূহকে গ্রহণ করেনি, তা হতে উৎসারিত পশ্চিমা জীবনদর্শনের সাথে ইসলামী আক্বীদা’হ্ হতে উৎসারিত চিন্তাসমূহের সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টার ফলে মুসলিমরা তাদের সঠিক পরিচিতি ও ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে ফেললো। অজ্ঞতা ও সবকিছু নিজেদের ভিত্তি হতে গ্রহণের অক্ষমতাই এসব ভ্রান্তচিন্তা বিস্তার লাভের জন্য দায়ী। তারা ইসলাম এবং ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ দুটি বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করলো। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থকে তারা শারীআহ্’র উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেললো। যেকোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে এবং যেকোন মনগড়া জিনিসের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। পরিণতিতে জনগণের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবন পরস্পরবিরোধী বিষয়ে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। রাজনৈতিক শক্তিগুলো মুসলিমদের প্রকৃত চিন্তাগুলোকে মূল্যায়ন না করে বিজাতীয় চিন্তাসমূহের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হয়ে পড়লো।
এরকম এক প্রতিকূল পরিবেশে বিদেশী কাফিরদের কতৃর্ক আকৃতি দেয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস, বিপথগামী আবেগের সমন্বয়ে গঠিত সম্প্রদায়কে মোকাবিলার লক্ষ্যে ইসলামী দল ও সংগঠনসমূহ যাত্রা শুরু করে।
এসবের প্রতিষেধক কিংবা নিরাময় এসব দল কিংবা সংগঠনের কাছে থাকা উচিত ছিল। জনগণকে দহনকারী বিভিন্ন বাঁকা পথের পাশে জনগণের অনুসরণীয় একটি সোজা পথনির্দেশনা উপস্থাপন করা উচিত ছিল। জনগণকে তাদের বলা উচিত ছিল,
“নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তাহলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে।”
(সুরা আনআম: ১৫৩)এসব দল কিংবা সংগঠন এমন যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল যা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। এসব যোগ্যতাসমূহ হচ্ছে চিন্তার স্বচ্ছতা, লক্ষ্য অর্জনের স্পৃহা, সচেতন একটি জনগোষ্ঠী প্রস্তুত করা, উম্মাহ্’কে প্রস্তুত করা এবং পদ্ধতি (Method) সংক্রান্ত প্রতিটি হুকুমের প্রতি আনুগত্য।
দলটি চিন্তাকে (Idea) সবোর্চ্চ গুরুত্ব দিবে। দলের দৃষ্টিতে চিন্তা হচ্ছে সেই সত্য যার দিকে জনগণ ফিরে আসা উচিত, এবং এটা হচ্ছে পথনির্দেশ যা মানবজাতির চলার পথকে আলোকিত করবে। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমতস্বরুপ। এটা মানুষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রবৃত্তিজাত চাহিদা থেকে বের করে নিয়ে আসবে। এটা মানুষের সামঞ্জস্যপূর্ণ, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা মনকে ও আত্মাকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। এটি জীবনে সুখ বয়ে আনে এবং আশা জাগায়। এতে রয়েছে সেই গভীরতা ও পরিপূর্ণতা যা জীবন সম্পর্কে মানুষের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সামর্থ্য রাখে এবং এই জীবনের আগের ও পরের বাস্তবতার সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করে। সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করে, ফলে মানুষ তার এই জীবনের সঠিক উদ্দেশ্য কী তা উপলব্দি করতে সক্ষম হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক প্রশান্তিময় জীবনের স্বাদ পায়।
এই চিন্তা ধারণকারী দলটি এটাও বিশ্বাস করে যে যখন এই চিন্তা সমাজে বিদ্যমান থাকেনা তখন কোনোরকম বাধা ছাড়াই মুনকার ও মিথ্যাচার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ তার খেয়ালখুশীর অনুসরণ করা শুরু করে, যুলুম সংঘটিত হয় এবং জাহেলিয়াত বিস্তার লাভ করে। তখন সংকীর্ণ এক কঠিন জীবন মানুষকে নিদ্রাহীন করে তুলে, তাদেরকে কখনোই সন্তুষ্ট চিত্তে পাওয়া যায় না। না তাদের আচরণ থাকে স্বাভাবিক কিংবা অন্তরে কোনো প্রশান্তি।
দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে হবে এর চিন্তার (ফিকরাহ) দিকে মনোযোগ দেওয়া কারণ এটিই দলের আত্মা এবং তার অস্তিত্বের কারণ। এর যত্ন নেওয়া, বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং অন্যকিছুর মিশ্রণ থেকে একে রক্ষা করার জন্য দলটির কাজ করতে হবে। অন্যান্য বিজাতীয় কুফর চিন্তা যাতে এর সাথে মিশ্রিত হতে না পারে সে বিষয়টি দলকে নিশ্চিত করতে হবে এবং বিজাতীয় কুফর চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সকল আহ্বান ও ধারণা থেকে একে স্বতন্ত্র রাখতে হবে। চিন্তার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হলে দলটির নিকট তার লক্ষ্য (Vision) পরিষ্কার থাকতে হবে। লক্ষ্যের (Vision) স্পষ্টতার জন্য প্রয়োজন সঠিক ইজতিহাদ লব্দ শারী’আহ্ হুকুম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান; এক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুমকে অবশ্যই ইসলামী আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে হতে হবে।
চিন্তাগুলো (Idea) যখন তার স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা এবং স্বাতন্ত্র্যতা হারিয়ে ফেলে তখন এটি নিজের বিশেষত্বও হারিয়ে ফেলে এবং এটা তখন আর আলোকবর্তিতা, হিদায়াত বা রহমত হিসেবে গণ্য হয়না। দলটি তখন নিজের অস্তিত্বে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলে এবং তথাকথিত অন্যান্য আন্দোলনের মতো হয়ে পড়ে; বাস্তবতার নিকট এমনভাবে পরাজিত হয় যে বাস্তবতাকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে নিজেই বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং বাস্তবতাকে যথার্থরূপে পরিবর্তন করার পরিবর্তে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যায়।
দলের কর্মীদের মধ্যে চিন্তাসমূহ (Idea) যত স্বচ্ছ হবে ততই তা স্বচ্ছতার সাথে জনগণের নিকট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। চিন্তার (Idea) স্বচ্ছতা থেকেই উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা লাভ করে। শারী’আহ্’র অন্যান্য হুকুমের মতো এই উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়াও শারী’আহ্’র বিভিন্ন হুকুম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
আদর্শিক দল সর্বাবস্থায় আদর্শের আনুগত্য করে। আর এই কারণে আদর্শিক ফিকরাহতে (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) বিশ্বাসী ও এর আহ্বানকারীদের এর অনুমোদন ব্যতীরেকে অন্য কোন উৎস থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। যেহেতু এটি একটি মৌলিক চিন্তা, সুতরাং এটি যেকোনো বিষয়কে তার গোঁড়া থেকে গবেষণা করে এবং মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র উত্তর প্রদান করে। ফলে জীবন সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের সমাধান এই মৌলিক চিন্তা থেকে গ্রহণ করা হয় এবং তা হতে উৎসারিত হয়। তখন মানুষের জীবনদর্শন, জীবনের প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী এবং প্রতিটি কর্মকান্ডের মাপকাঠি তার জীবন সম্পর্কে মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যতা লাভ করে।
ইসলামের কাঠামোটি পূর্ণাঙ্গ এবং এতে এমনকি একটি ইটও ফাঁকা নেই। এর সবকিছু একটি অপরটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারণ এগুলো এমন এক অপরিবর্তনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি থেকে উৎসারিত যা মানবজীবনের স্বাভাবিক আচরণ এবং সৃষ্টি জগতের নিয়ম সম্মত।
সুতরাং ইসলামে বিশ্বাসীদের লাভ-ক্ষতির পরিবর্তে হালাল-হারামই হবে কাজের মাপকাঠি এবং প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী। কারণ লাভ-ক্ষতি সেই চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেই চিন্তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পরিবর্তে মানুষকে বিধানদাতা মনে করে। জীবনে সর্বোচ্চ ভোগ-বিলাসের সাথে একজন মুসলিমের সুখ সম্পৃক্ত নয় বরং তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সন্তুষ্টির সাথে সম্পৃক্ত। অবাধ স্বাধীনতার চিন্তা যা মানুষকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে তার বিপরীতে একজন মুসলিমের জীবন হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সার্বভৌমত্বের অধীন ও তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণকারী। ভিত্তিকে যদি কেউ গ্রহণ করে তাহলে তা থেকে উৎসারিত সবকিছুকে তার গ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি পরিবর্তন চায় তাহলে ভিত্তি দিয়েই তাকে শুরু করতে হবে এবং সকল পারিপার্শ্বিক চিন্তাগুলোকে ভিত্তির সাথে সমন্বয় বিধান করতে হবে। এই হচ্ছে আদর্শিক ফিকরাহ ও আদর্শিক দাওয়াত যা নিয়ে দলটিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। সুতরাং মুসলিমরা, তাদের ব্যবস্থাসমূহ কিংবা বিভিন্ন সংগঠন ইসলামের সাথে অন্যকিছুর মিশ্রণ ঘটাবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপভাবে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যদি অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি শারী’আহ্’কে একটি উৎস হিসেবে কিংবা শারী’আহ্’র পাশাপাশি অন্যান্য উৎসকে সংমিশ্রণ করে গ্রহণ করে তবে তাও গ্রহণযোগ্য হবে না। ইসলামী দলগুলো যদি ইসলামের বহির্ভূত পাশ্চাত্যের কুফর চিন্তাগুলোকে ইসলামের সাথে সংমিশ্রণ করে তাও গ্রহণযোগ্য হবেনা। এটা সুস্পষ্ট পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নয় যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বান্দা তা কখনোই মেনে নেন না।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত ইবাদত বা আনুগত্যের যোগ্য অন্য কোনো সত্ত্বা নেই, এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী দলগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুনের জন্য পূর্ব কিংবা পশ্চিম কোনোদিকের দ্বারস্ত হওয়াই বৈধ নয়। সকল চিন্তাই যেন আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত হয়, এগুলো যেন নির্ভরযোগ্য শারী’আহ্ দলিলের আলোকে হয় এবং বিস্তারিত দলিলাদি থেকে ইজতিহাদপ্রসূত হয়, এসব বিষয়কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটি কীভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, কারণ জীবন সম্পর্কে সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা ‘সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই এবং জীবন নিছক বস্তুমাত্র’। গণতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটিও কীভাবে ইসলামে সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যেখানে এই ব্যবস্থাটি ‘দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথকীকরণ’, এই কুফর বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। অনুরূপভাবে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ ইসলাম থেকে এসেছে, এরূপ দৃষ্টিভঙ্গীও কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে যেখানে গোত্রপ্রীতি থেকে জন্ম নেওয়া এসব চিন্তা ইসলামের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য ও পরিত্যাজ্য?
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত আর কোনো বিধানদাতা নেই, এই চিন্তাটি কীভাবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অন্যদের সাথে আমাদের অংশগ্রহণ করা উচিত অথবা আমাদের সাথে অন্যদের অংশগ্রহণ করা উচিত এমন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে?
বিশ্বজগতের প্রতিপালকের আনুগত্য, দাসত্ব ও ইবাদতের ধারণার উপরে প্রতিষ্ঠিত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ কীভাবে পাশ্চাত্য ব্যবস্থার স্বাধীনতার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, যা সকল বিষয়ে একমাত্র মানুষকে সার্বভৌম মনে করে? সে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ততটুকুই আত্মসমর্পণ করে যতটুকু তার খেয়াল-খুশী, ইচ্ছা ও স্বার্থের অনুকূল হয় ।
প্রকৃতপক্ষে, ইসলামে আক্বীদাহ্’কে রক্ষা করার অর্থ হচ্ছে তা থেকে উৎসারিত সমস্ত কিছুকে রক্ষা করা। অন্যথায় সামঞ্জস্যতা বিধানের অতল গহ্বরে দলের চরিত্র তলিয়ে যাবে; যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর বান্দাগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না।
স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, স্বাতন্ত্র্যতা এবং স্বচ্ছতার দিক দিয়ে চিন্তাটিকে সংরক্ষণের জন্য একে বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ও পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণের হাত থেকে দূরে রাখতে হবে এবং যেকোনো মিথ্যা, বিকৃতি ও বাগাড়ম্বরতা থেকে একে পবিত্র রাখতে হবে।
দাওয়াত বহনকারীগণ যেমন নিজস্ব লক্ষ্য অনুযায়ী সমাজ পরিবর্তন করতে চায় ঠিক তেমনিভাবে সমাজও তার নিজস্ব ভ্রান্ত ধারনা ও চিন্তা, রাজনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো আঁকড়ে রাখতে চায়, যা পরিবর্তন প্রত্যাশী সংগঠন এবং দাওয়াহ্ বহনকারীদের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে।
১০ম অধ্যায়: ক্রমান্বয়ে ইসলামের বাস্তবায়ন
ক্রমাণ্বয়ে বা ধাপে ধাপে ইসলামকে বাস্তবায়নের যে দূষিত চিন্তাটি সমাজে বিদ্যমান সেটি এবং তা থেকে উদ্ভূত অন্যসব দূষিত চিন্তা যেমন বিদ্যমান ব্যবস্থাসমূহে অংশগ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে আমরা এখানে আলোকপাত করতে চাই, সেগুলোর প্রতি ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চাই এবং এসব চিন্তার ভ্রান্তি সম্পর্কে উম্মাহকে সচেতন করতে চাই। সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টারত কিছু দলের লোক মানুষের মনে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য এরকম একটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে থাকে যে, ইসলাম থেকে গণতন্ত্র এসেছে ।এর কারণ হচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে এ জাতীয় চিন্তার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে।
অতএব প্রথমেই আমাদের বোঝা দরকার, ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে কি বোঝায়? যারা এই চিন্তাকে ধারণ করে তাদের মতে এতে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে? এই চিন্তাকে ধারণ করার পেছনে কি যুক্তি রয়েছে? এবং এ ব্যাপারে শরঈ হুকুম কি?
যখন মুসলিমরা আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল, বস্তুগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ল এবং রাজনৈতিকভাবে অধ:পতনের চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে পৌঁছাল তখন এই অধ:পতিত অবস্থার ছাপ তাদের চিন্তার মধ্যেও ফুটতে শুরু করল। যারা তখন ইসলামের আনুগত্যের দাবী করত তাদের চিন্তার মধ্যে ইসলামের সত্যতা এবং জীবন সম্পর্কে ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির কোন প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যেতনা; বরং তাদের চিন্তার মধ্যে ইসলামের সত্যতা এবং জীবন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ভুল এবং দুর্বল ধারণার প্রতিফলন দেখা যেত। কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ যখন মুসলিমদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল তখন নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী মুসলিমদেরকে পরিবর্তন করার এবং নিজেদের কুফরী ধ্যান-ধারণা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার সামর্থ্য অর্জন করল। তারা তাদের বিজাতীয় চিন্তাসমূহ মুসলিমদের অন্তরে প্রোথিত করে দিল যেগুলো ভিন্ন স্বাদের ফল বহন করে এবং ইসলামের শত্রুদের মুখে সুন্দর শোনায় ও তাদের জিহ্বার মিষ্টতা বাড়ায়। ফলাফল যায় কাফিরদের পক্ষে এবং এই ঘটনার জন্য ইসলাম দায়ী ছিলনা বরং দায়ী ছিল ইসলামের অনুসারীদের স্পষ্ট আনুগত্য ও সঠিক জ্ঞানের অভাব। যেসব মুসলিম এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করছিল তারা একদিকে বাস্তবতার দ্বারা এবং অন্যদিকে পার্থিব স্বার্থ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। যাইহোক তাদের এসব ভুল প্রচেষ্টা এবং খোঁড়া পদক্ষেপ দ্রুতই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল এবং কুফরের নিকট চরমভাবে আত্মসমর্পণ করল। ফলে আমাদের ভূমিগুলোতে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা অথবা প্রতিরোধ ছাড়াই কুফর অবাধে বিচরণ করতে লাগল। এখন প্রশ্ন হল কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ কিভাবে ইসলামকে আক্রমণ করল? এবং তখন মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
কাফির সাম্রাজ্যবাদীরা এই বলে ইসলামকে আক্রমণ করল যে ইসলাম যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং জীবনের সমস্যাসমূহের সমাধান দিতে সক্ষম নয়। জবাবে মুসলিমরা এমনসব সমাধান বের করতে শুরু করল যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি এবং ইসলামের ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক সেহেতু তারা এই বৈপরীত্যকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করতে লাগল। নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে তারা বিভিন্ন ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল যা থেকে পরবর্তীতে আরো অনেক ভুল ধ্যান-ধারণা এবং বৈশিষ্ট্য জন্ম নেয়। সেসব ভুল ধ্যান-ধারণা এবং বৈশিষ্ট্যসমূহকে তখন ইসলামী শরীয়াহর উপর আরোপ করা শুরু হল যার উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ও পুঁজিবাদের সামঞ্জস্যতা বিধানের মাধ্যমে এটা প্রমাণ করা যে ইসলাম যুগের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ফলাফল দাঁড়াল এরূপ যে এসব সমাধানকে ইসলামী চিন্তা, মৌলিক নীতিমালা এবং বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হলো; এগুলো ব্যবহার করে ইসলামকে বোঝার চেষ্টা করা হতে লাগল যদিও এসব চিন্তাকে গ্রহণ করার মানে হচ্ছে বাস্তবে ইসলামকে পরিত্যাগ করা এবং পুঁজিবাদের অনুসরণ করা। সামঞ্জস্যতা বিধান এবং এ চিন্তা দ্বারা আক্রান্ত যেকোন ধ্যান-ধারণার দিকে আহ্বান ছিল প্রকৃতপক্ষে কুফরের গ্রহণ এবং ইসলামের বর্জন। এর মাধ্যমে মুসলিমদেরকে আহ্বান করা হয় যাতে তারা কুফরী চিন্তাসমূহকে গ্রহণ করে এবং ইসলামের প্রকৃত দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে।
অতএব অধ:পতনের যুগে উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য গৃহীত এসব চিন্তা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলল। ফলে উম্মাহকে চূড়ান্ত অধ:পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে তারা ব্যর্থ হল কারণ তারা নিজেরাই সেই অধ:পতিত অবস্থায় নিমজ্জিত ছিল।
ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে হোক অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে লোকজনের মুখে এমনসব কথা শোনা যেতে লাগল যা ছিল ইসলামী শরীয়ার জন্য লজ্জাজনক। তারা দাবী করতে লাগল রাসূল (সা) এর চৌদ্দশত বছর পরে সেই সনাতন মানসিকতা নিয়ে ইসলামকে ব্যখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। তাদের মতে আমাদের উচিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য নিজেদেরকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করা যাতে ইসলাম আবারো নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে। তারা বলতে লাগল ইসলামকে আধুনিকভাবে সজ্জিত করতে হবে এবং এর মধ্যে আধুনিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটাতে হবে যাতে অন্তর আবারো এতে আস্থা ফিরে পায়। একে অস্পষ্টতা থেকে এবং লোকজনের অভিযোগ থেকে বের করে আনতে হবে। ফলে ইসলামের পুরানো চেহারা আর জীবিত রইলনা।
যাইহোক এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কিছু মুসলিম বিভিন্ন নতুন চিন্তার উদ্ভাবন শুরু করল। তারা নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক নীতিমালা উদ্ভাবন করল, এগুলোকে সংজ্ঞায়িত করল এবং জীবনকে নতুন পথে পরিচালিত করল। এগুলোই হচ্ছে অধ:পতিত যুগের চিন্তা যেগুলোর জন্ম হয়েছে আমাদের ভূখণ্ডগুলোতে পাশ্চাত্যের নষ্ট চিন্তাসমূহের উত্থানকালে। তখনকার মুসলিমরা ভাবতে লাগল যে ইসলাম যাতে যুগের চাহিদা পূরণ করতে পারে সেজন্য যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং পাশ্চাতের আধিপত্য বিস্তারকারী চিন্তাসমূহ থেকে সুবিধা গ্রহণ করা তাদের জন্য একটি শরঈ দায়িত্ব।
এই নতুন বিন্যাসকে ধারণকারী অনেক চিন্তা সামনে আসতে শুরু করল যেমন; “ধর্ম হচ্ছে একটি নমনীয় এবং পরিবর্তনশীল বিষয়”, “গ্রহণ কর এবং চাহিদা পূর্ণ কর”, “সেসব বিষয় গ্রহণ কর যেগুলো শরীয়তসম্মত অথবা যেগুলো শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়”, “সেটি গ্রহণ কর যেটি তুলনামূলকভাবে কম খারাপ বা কম ক্ষতিকর”, “যদি পুরো বিষয়টিকে গ্রহণ করতে না পার তাহলে এর অধিকাংশকে ছুঁড়ে ফেলোনা”, “ইসলামকে ক্রমান্বয়ে গ্রহণ কর”, “এই বিষয়টি প্রত্যাখ্যাত নয় যে সময় এবং স্থানভেদে হুকুমের পরিবর্তন হয়” “যেখানে সুবিধা বিদ্যমান সেটিই হচ্ছে আল্লাহর শরীয়াহ”। আধুনিক ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য যারা আহ্বান করত এসব চিন্তা এবং এজাতীয় চিন্তাসমূহ ছিল তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান বা মৌলিক নীতিমালা। বিশ্বব্যাপী এসব চিন্তা ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রদূত ছিল freemason জামালউদ্দিন আফগানী এবং শায়খুল ইসলাম নামে পরিচিত তার ছাত্র freemason মুহাম্মাদ আবদুহু।
অন্তরে খারাপ ইচ্ছা এবং কুপরিকল্পনা নিয়ে লোকজন এসব কথা বলতে লাগল যাতে তারা মুসলিমদেরকে তাদের শক্তির উৎস থেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে পারে, তাদেরকে দুর্বল করে ফেলতে পারে এবং এভাবে আবারো আল্লাহর হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত করা থেকে বিরত রাখতে পারে।
অন্তরে সদুদ্দেশ্য এবং ভাল পরিকল্পনা নিয়েও কিছু লোক এসব কথা বলছিল কারণ তারা ভাবছিল উম্মাহর অধ:পতনের ফলে মুসলিমদের অসুস্থতার আরোগ্যকারী ওষুধ হিসেবে এসব চিন্তা কাজ করবে।
সদুদ্দেশ্যে বলা হোক অথবা অসদুদ্দেশ্যে এসব চিন্তার ফলাফল ছিল একই রকম। যাই হোক আমরা দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফিরদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মুসলিমদেরকে সচেতন করে দিতে চাই এবং তাদেরকে উপদেশ দিতে চাই এসব দূষিত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দেয়ার জন্য যেগুলোর ভ্রান্তি বাস্তবে প্রমাণিত। কারণ এগুলো কোন মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনা এবং কোন অমঙ্গলও দূর করতে পারেনা। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ আমাদেরকে পৃথিবীর সবচেযে সমৃদ্ধতম জাতিতে পরিণত করেছেন কারণ আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই ইসলামে আছে যার বাইরে অন্যকিছুর দরকার নেই আমাদের। ইসলামের প্রকৃতিই আমাদেরকে একটি পদ্ধতির সন্ধান দেয় এবং বাধ্য করে সে অনুযায়ী বিধিবিধান নেয়ার জন্য। জীবনের সমস্যাসমূহের সমাধানের জন্য আল্লাহ দ্বীন ইসলাম নাযিল করেছেন এবং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে শুধুমাত্র ইজতিহাদের মাধ্যমে শরীয়াহ দলীলসমূহ থেকে আল্লাহর হুকুমসমূহ জেনে নেয়া, অন্য কোথাও থেকে নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক নীতিমালাসমূহকে অবশ্যই শরীয়াহর দলীলাদি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে কারণ শরীয়াহ দলীলসমূহেরই বিস্তারিত প্রমাণাদি বিদ্যমান। ইজতিহাদের প্রক্রিয়া একটি নির্ধারিত বিষয় যা সবসময় একই রকম থাকবে এবং একে কোন ভাবে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এই ভিত্তি থেকেই আমাদের অগ্রযাত্রার সূচনা হবে যা আমাদের পূর্বেও ঠিক একইভাবে শুরু হয়েছিল।
কিছু নিয়ন্ত্রিত শর’ঈ চিন্তা এবং মৌলিক নীতিমালা উল্লেখ করা প্রয়োজন যেগুলো দ্বারা অবশ্যই আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রিত হতে হবে যাতে সেগুলো আমাদের সঠিক পথের নির্দেশনা দিতে পারে এবং সঠিকভাবে বিন্যস্ত করতে পারে ফলে তখন আমরা সে অনুযায়ী কাজ করতে পারব। উদাহরণ স্বরুপ “যেখানে শরঈ হুকুম বিদ্যমান সেটাই স্বার্থ এবং এর বিপরীত নয়”, “কাজের ভিত্তি অবশ্যই শরঈ হুকুম দ্বারা সীমাবদ্ধ হতে হবে”, “নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ না থাকলেই কেবল কোন বস্তু মুবাহ (অনুমোদিত) বলে গণ্য হবে”, “হাসান (প্রশংসনীয়) হচ্ছে তাই যাকে শরীয়াহ হাসান সাব্যস্ত করেছে এবং কাবীহ (নিন্দনীয়) হচ্ছে তাই যাকে শরীয়াহ কাবীহ সাব্যস্ত করেছে ”, “ভাল হচ্ছে তাই যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং খারাপ হচ্ছে তাই যা আল্লাহকে রাগান্বিত করে”, “শরীয়াহর উপরে অন্যকিছুর প্রাধান্য নেই”, “যে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে পড়বে তিনি তাদের জীবনকে সংকীর্ণ এবং কঠিন করে দিবেন”, “অন্য সমস্ত জাতির বাইরে মুসলিসমরা হচ্ছে একটি স্বতন্ত্র জাতি”, “ স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রকে ইসলাম অনুমোদন করে না”, “ ইসলাম একটি স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থা যা অন্যসব জীবনব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন।”
কিছু শরঈ মূলনীতির সাথে নিজেদেরকে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা যাতে পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলগণের অনুসরণ করতে পারি এবং তাদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে ইবতিদায় (বিদআতে) লিপ্ত হয়ে না যাই। কারণ প্রত্যেকটা বিদআতই (দ্বীনের মাঝে নতুন সংযোজন) প্রত্যাখ্যাত।
রাসূল (সা) বলেছেন:
“আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো বিপথে যাবেনা। একটি স্পষ্ট বিষয় আল্লাহর কিতাব এবং অন্যটি তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।”
[সীরাতে ইবনে হিশাম]এখানে কখনো শব্দটি দ্বারা পরবর্তী যুগের লোকজনকেও অন্তভূর্ক্ত করে নেওয়া হয়েছে যারা বিপথে যাবেনা; ফলে আমরাও এর অন্তর্ভূক্ত হচ্ছি।
তিনি (সা) বলেছেন:
“আমার উম্মত ৭৩টি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্য থেকে একটি বাদে বাকি সবগুলো জাহান্নামে যাবে।‘ তাঁরা (সাহাবীরা) জিজ্ঞেস করলেন; ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ তারা কারা’? তিনি (সা) বললেন: ‘আমি এবং আমার সাহাবীরা আজকে যে পথের উপরে আছি (সে পথের উপরে যারা থাকবে তারা)।’”
[আবু দাউদ,আত-তিরমিযি,ইবনে মাজাহ এবং ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেছেন:
“আমি তোমাদের জন্য উজ্জ্বল প্রমাণ রেখে যাচ্ছি। আমার পরে পথভ্রষ্টরা ব্যতীত অন্য কেউ তা থেকে বিচ্যুত হবেনা।”
[ইবনে মাজাহ এবং ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেছেন:
“আমার প্রজন্মের লোকেরা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম, তারপরে এদের পরবর্তীগণ এবং তারপরে তাদের পরবর্তীগণ…।”
[মুসলিম হতে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেছেন:
“…তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘজীবী হবে নিশ্চিতভাবেই তারা অনেক বিতর্ক দেখতে পাবে। নতুন উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাক কারণ প্রত্যেকটা নতুন বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেকটা বিদআতই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়…নিজেদেরকে আমার সুন্নাহর উপরে এবং সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহর উপরে রাখ তাদেরকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর।”
[আবু দাউদ এবং আত-তিরমিযি থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) আরো বলেছেন:
“যে কাজ আমাদের বিষয়ের (দ্বীনের) মধ্য থেকে নয় তা প্রত্যাখ্যাত।” [বুখারী এবং মুসলিম থেকে বর্ণিত]
এই হাদীসগুলো আমাদেরকে কল্যাণের (খায়র) অনুসরণ করতে এবং বিদআতের ব্যপারে সতর্ক থাকতে আহ্বান করে। কল্যাণের (খায়র) অনুসরণ করলে তা রাসূল (সা) এর যুগ থেকে অধিক বিচ্যুতির সম্ভাবনাকে দুর্বল করে ফেলে। এ থেকে এই অনুভূতির জন্ম হয় যে যুগ যত পরবর্তী হবে তত কঠোর এবং জোরালোভাবে আনুগত্য করতে হবে আমাদের, সত্যের সন্ধানে অধিক মনোযোগী হতে হবে এবং আরো বেশি আন্তরিক হতে হবে। কারণ আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে যাতে আমরা রাসূল(সা) এর সুন্নাহর উপরে ও সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহর উপরে এবং রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবাদের (রা) সুন্নাহর উপরে থাকি। সুতরাং আমরা নতুন বিষয়ের উদ্ভাবন করবনা এবং নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ের অনুসরণও করবনা, কারণ যারা এরূপ করে তারা প্রত্যাখ্যাত। অতএব প্রশ্ন হলো আজকের দিনে এসব বিষয় নিশ্চিত করার উপায় কি?
— ইসলামী আক্বীদাকে নিজেদের অন্তরে স্পষ্টভাবে ও বিশুদ্ধরূপে সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের এবং এটা যাতে কোন অস্পষ্ট বিষয় দ্বারা প্রভাবিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
— ইসলামের পবিত্র এবং বিশুদ্ধ উৎস থেকেই নিজেদের তৃষ্ণা মিটাতে হবে আমাদের।
— হুকুম বের করার যে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি আছে তা অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের কারণ এটা শরঈ হুকুমসমূহকে লোকজনের খেয়াল-খুশী এবং ব্যক্তিগত মতামতসমূহ থেকে রক্ষা করে।
— ইসলামকে নিজেদের জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করতে হবে আমাদের; নিজেদের উপরে, নিজেদের সন্তানদের উপরে, পার্থিব যেকোন সুবিধার উপরে এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপরে তাকে স্থান দিতে হবে; যাতে আল্লাহর কথাগুলো জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) উপরে অন্য কিছুকেই আমরা প্রাধান্য না দেই এবং সেই অবস্থানে থাকি যে অবস্থানে সালফে-সালেহীন (পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলগণের) এর যুগে মুসলিমরা ছিল।
— নিজেদের অন্তর থেকে কুফরের সমস্ত আবর্জনাময় চিন্তা আমাদেরকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে এবং এর চাকচিক্য ও উত্তেজনা থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে ঠিক তেমনিভাবে যেমনভাবে সাহাবা (রা) গণ ইসলামের প্রবেশদ্বারে জাহিলিয়াতের সমস্ত আবর্জনাময় চিন্তা পরিত্যাগ করে পবিত্র এবং আল্লাহভীরু হিসেবে এতে প্রবেশ করেছিলেন।
আর এসব বিষয় পালনের জন্য আমাদেরকে পূর্ববর্তী যুগের দিকেই ফিরে যেতে হবে কারণ উম্মাহর পরবর্তী যুগে এমন কিছু পাওয়া যাবেনা যা পূর্ববর্তী যুগের চাইতে উত্তম। মুসলিমদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটি একটি অপরিহার্য বিষয়। তাদের নিকটবর্তী হওয়া অথবা দূরবর্তী হওয়ার উপর নির্ভর করেই আমাদের অবস্থা ভাল নাকি খারাপ তা বুঝা যাবে।
উপরোক্ত আলোচনার পর এখন পরিষ্কারভাবে বুঝা যাবে ক্রমধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে কি বোঝায়? যারা এই চিন্তাকে ধারণ করে তাদের মতে এতে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে? এই চিন্তাকে ধারণ করার পেছনে কি যুক্তি রয়েছে? এবং এ ব্যাপারে শরঈ হুকুম কি?
ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে বোঝায় কোন নির্দিষ্ট শরঈ হুকুমকে একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা। একে তারা বলে মারহালিয়্যাহ। এক্ষেত্রে প্রথমে মুসলিমরা এমন একটি হুকুমের দিকে ডাকে যা নিজে শরীয়তসম্মত নয় কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে এটি বিদ্যমান হুকুমের চাইতে শরঈ হুকুমের অধিক নিকটবর্তী। তারপরে তারা শরীয়তসম্মত নয় কিন্তু বিদ্যমান হুকুমের চাইতে শরঈ হুকুমের অধিক নিকটবর্তী হুকুমটিকে ক্রমধাপে পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে প্রকৃত শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করার দিকে আহ্বান করতে থাকে। তারপরে শরীয়তসম্মত নয় এমন একটি হুকুম থেকে অন্য একটি হুকুম যা নিজে শরীয়তসম্মত নয় কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে বিদ্যমান হুকুমের চাইতে শরঈ হুকুমের অধিক নিকটবর্তী, তাতে পরিবর্তন করে অথবা পরিবর্তন করার আহ্বান জানাতে থাকে যতক্ষণনা তাদের দৃষ্টিতে যা প্রকৃত শরঈ হুকুম তা বাস্তবায়ন করতে পারছে।
এর মানে হচ্ছে অল্পকিছু শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা এবং বাদবাকি কুফরী হুকুম বাস্তবায়িত হওয়ার ব্যাপারে ততক্ষণ নীরব থাকা যতক্ষণনা শরীয়াহ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
ধাপেধাপে ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য কোন নির্দিষ্ট ধাপসংখ্যা নেই। এমনকি যারা এর পক্ষে কথা বলে তাদের মতে এর জন্য কোন নির্দিষ্ট নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিও নেই। একটি হুকুম বাস্তবায়িত করতে একটি, দুটি, তিনটি এমনকি এর চাইতেও বেশি ধাপের প্রয়োজন হতে পারে। এই ধরনের ক্রমান্বয়িকতার ক্ষেত্রে ধাপসংখ্যা নির্ধারণের উপর পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাব সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান। ধাপসংখ্যা অল্পকিছু অথবা অনেকগুলো হতে পারে এবং প্রতিটা ধাপ বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
আক্বীদাগত বিষয়ে ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন ধারণাটি প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে; যেমন ইসলাম থেকে সমাজতন্ত্র এসেছে অথবা ইসলাম থেকে গণতন্ত্র এসেছে এই মন্তব্যগুলোকে সমর্থন করা। শরঈ হুকুমগুলোও এর অন্তভূর্ক্ত হতে পারে যেমন এই বিষয়টিকে অনুমোদন করা যে একজন নারী হাঁটুর সামান্য নিচ পর্যন্ত কাপড় পরবে এবং প্রকৃত শর’ঈ হুকুম অনুযায়ী পোশাক পরিধানের জন্য সে কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যাবে। আবার ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত বিষয়ের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে যেমন শরীয়ার দৃষ্টিতে হারাম হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করা এমনকি যারা ক্রমান্বয়িকতার পক্ষে কথা বলে তাদের মতেও বিষয়টি হারাম। যাই হোক তারা এরূপ দাবী করেনা যে এ বিষয়ের বাস্তবায়নই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য বরং কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে ইসলামী শাসনব্যবস্থা অর্জনই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য এবং এটিই হচ্ছে প্রকৃত শরঈ হুকুম যা আমাদের উপর একটি বাধ্যবাধকতা। এর ফলে দেখা যাবে তারা চেষ্টা করছে নির্দিষ্ট কয়েকটি শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করতে এবং বিদ্যমান বাদবাকি অনৈসলামী হুকুমসমূহের বাস্তবায়িত থাকার ব্যাপারে এই আশায় নীরব থাকতে যে একসময় শরঈ হুকুমসমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে সেগুলোর প্রভাব বেড়ে যাবে এবং তাদেরই সংখ্যার আধিক্য থাকবে;তারপরে তা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং এভাবে চলতে থাকবে।অথবা এই বিষয়টি দাওয়াতের ক্ষেত্রেও হতে পারে যখন লোকজনকে তারা এসব বিষয় বাস্তবায়নের দিকে ডাকে তখন।সুতরাং ক্রমান্বয়িকতার ধারণায় যারা বিশ্বাসী তারা লোকজনকে তাদের এই ধারণার দিকে ডাকার জন্য এজাতীয় ধরনসমূহ ব্যবহার করে থাকে।এসব ধারণার দিকে যারা লোকজনকে ডাকে তারা অনেকক্ষেত্রে এতটা আল্লাহভীরু হয়ে থাকে যে নিজেদের দায়িত্বের ব্যাপারে কোনরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন করেনা কিন্তু তারপরও বিষয়টিকে গ্রহণ করে অন্যদের সুবিধা বিবেচনা করে।কারণ তারা ভাবে এরূপ না করলে লোকজন ইসলামের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করবে; ফলে কোন কিছু না পাওয়ার চাইতে কিছু পাওয়াটাকেই তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে।
ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বা মারহালিয়্যাহ এর পক্ষের যুক্তিসমূহ এবং সেগুলোর খণ্ডন প্রসঙ্গে এবার আসা যাক। যারা এভাবে অগ্রসর হওয়ার পক্ষপাতী তারা কিছু যুক্তির উপরে নির্ভর করে যেগুলোর ব্যাপারে তারা মনে করে যে এগুলো তাদের চিন্তা এবং দাওয়াতের পক্ষে সমর্থনকারী।ফলে তারা যা করতে চাচ্ছে তার পক্ষে যুক্তি হিসেবে এগুলোকে উপস্থাপন করে থাকে যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এক্ষেত্রে দলীলসমূহ এবং তাদের সঠিক নির্দেশনার অনুগত থাকেনি বরং নিজেদের ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য তারা এসব দলীলকে ভুলভাবে ব্যবহার করেছে Ñযা আমরা সামনে দেখতে পাব।নিচে তাদের সেসব যুক্তিসমূহ এবং সেগুলোর খণ্ডন নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১ম যুক্তি ও এর খন্ডন
তাদের মতে আল্লাহ সুদ (রিবা) একবারে হারাম করেননি বরং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ধাপে ধাপে তা নিষিদ্ধ করেছেন। যেমন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এই আশায় তোমরা উপহার(রিবা) হিসেবে যা কিছু দাও আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায়না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দিয়ে থাকে, অতএব, তারাই দ্বিগুণ লাভ করবে।” (আল-কুরআন ৩০:৩৯)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়োনা।” (আল-কুরআন ৩:১৩০)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।” (আল-কুরআন ২:২৭৮)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তারা সুদ গ্রহণ করত অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল” (আল-কুরআন ৪:১৬১)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেন:
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (আল-কুরআন ২:২৭৫)
এসব আয়াতের প্রেক্ষিতে যারা ক্রমধাপে ইসলাম বাস্তবায়নের সুযোগ খুঁজে তারা বলে, প্রথম আয়াতে সুদ ছিল মুবাহ। সরল সুদকে বৈধ রেখে চক্রবৃদ্ধির সুদকে নিষিদ্ধ করা হয় দ্বিতীয় আয়াতে এবং পরবর্তীতে সরল সুদকেও নিষিদ্ধ করা হয় তৃতীয় আয়াতের মাধ্যমে।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর।” (আল-কুরআন ২:২৭৮)
তাদের মতে চতুর্থ আয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার সুচনা হয়েছিল প্রথমে পরোক্ষ উপদেশদানের মাধ্যমে অর্থাৎ ইহুদীদেরকে সম্বোধিত করার মাধ্যমে এবং এক্ষেত্রে আল্লাহ কোন স্পষ্ট নির্দেশনা দেননি। ধাপে ধাপে বিভিন্ন আয়াত নাযিলের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সুদকে নিষেধ করেন তাঁর এ কথার মাধ্যমে—
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম” (আল-কুরআন ২:২৭৫)
কেউ যদি উপরোক্ত আয়াতসমুহের সঠিক ফিক্হের (আইনগত জ্ঞান) অনুসন্ধান করে, তাহলে দেখতে পাবে এক্ষেত্রে ক্রমান্বয়িকতার ধারণার কোন সত্যতা নেই।
— প্রথম আয়াতটি সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে কোনভাবেই সম্পৃক্ত নয় বরং এর বিষয়বস্তু হচ্ছে উপহার সামগ্রী। আয়াতটির মানে হচ্ছে কেউ যদি কাউকে কিছু উপহার দেয় এবং বিনিময়ে তার চাইতে বেশি কিছু আশা করে অথবা তা ফিরিয়ে দেয়ার দাবী জানায় তাহলে আল্লাহর কাছে এর কোন বৃদ্ধি নেই অর্থাৎ আল্লাহ তাকে এর জন্য কোন পুরস্কার দিবেন না। রাসূল (সা) বলেন:
“কেউ যদি তার হালাল উপার্জন থেকে খেজুরের সমপরিমাণ কিছু দান করে এবং আল্লাহ হালাল ছাড়া অন্যকিছু কবুল করেননা, তিনি তখন সেটা তার ডান হাতে ধারণ করেন এবং দানকারীর জন্য তা বাড়াতে থাকেন যতক্ষণ না তা পাহাড়সম হয়ে যায় যেমনভাবে তোমরা তোমাদের ছোট্ট অশ্বকে প্রতিপালন করতে থাক।” [বুখারী থেকে বর্ণিত]
এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (র) বলেন: “তোমরা উপহার (রিবা) হিসেবে যা কিছু দাও।” (আল কুরআন ৩০:৩৯) এর অর্থ হচ্ছে যদি কেউ কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয় এরং বিনিময়ে এর চাইতে বেশি কিছু আশা করে তাহলে আল্লাহর কাছ থেকে তার বেশি কিছু পাওয়ার নেই এবং এজন্য সে পুরস্কৃত ও হবেনা। যাইহোক এতে তার গোনাহ ও হবেনা। এ অর্থেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে (আল-কুরতুবী থেকে বর্ণিত)। ইবনে কাছীর (র) এ আয়াত সম্পর্কে বলেন কেউ যদি উপহার হিসেবে কাউকে কিছু দেয় এবং বিনিময়ে সে উত্তম কিছু আশা করে তাহলে এজন্য সে আল্লাহর কাছ থেকে কোনরকম পুরস্কার পাবে না। ইবনে অব্বাস, মুজাহিদ, আদ-দাহহাক, কাতাদাহ, ইকরামাহ, মুহাম্মদ বিন কাব এবং আশ-শাবী প্রমুখ এর নিকট থেকে এরকম ব্যাখ্যাই এসেছে আয়াতটি সম্পর্কে। এ ধরনের কাজ হচ্ছে মুবাহ (অনুমোদিত)।
ইবনে আব্বাস বলেন; “সুদ (রিবা) দু ধরনের; একটি হচ্ছে অবৈধ যা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে এবং অন্যটিতে ক্ষতির কিছু নেই যেখানে একজন কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয় এবং বিনিময়ে তার কাছ থেকে বহুগুণ আশা করে।”
— এবার দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাপারে আসা যাক:
“তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়োনা।” (আল-কুরআন ৩:১৩০) চক্রবৃদ্ধির সুদপ্রথা নিষিদ্ধ করার জন্য এ আয়াতটি নাযিল করা হয়েছিল,যা ছিল জাহিলি যুগের একটি বাস্তবতা। এখানে এমন কোন নির্দেশনা নেই যা থেকে এটা বুঝা যাবে যে সুদকে সীমিতভাবে (অর্থাৎ সরল সুদকে বৈধ রেখে কেবল চক্রবৃদ্ধির সুদকে) নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মুফাস্সিরগণের মতে (তাফসীরকার) সুদ নিষিদ্ধ করা হয় সুরা বাক্বারাহ তে এবং এটি ছিল মদীনায় নাযিলকৃত প্রথম সুরা। বহুগুণের সুদ নিষিদ্ধ করা হয় যে সুরাতে অর্থাৎ আলি ইমরানে তা নাযিল হয় সুরা বাক্বারাহ এর পরে। সুতরাং স্বল্পমাত্রার সুদকে আল্লাহ বৈধতা দিয়েছেন এরকম যেকোন ধারণাকে খণ্ডন করে এই ঘটনাটি। স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে যে, সুদ সম্পর্কিত আলি ইমরানের আয়াতটি কোন ক্রমান্বয়িকতার ফসল ছিল না বরং তা ছিল কাফিরদের সুদ চর্চার স্বভাবিক অভ্যাসের একটি উল্লেখমাত্র। সুতরাং সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার হুকুম প্রথমেই নাযিল হয়েছিল।
— এবার তৃতীয় আয়াতের প্রসঙ্গে আসা যাক:
“হে ঈমানদারগণ,তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে,তা পরিত্যাগ কর,যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।” (আল-কুরআন ২:২৭৮) এই আয়াতের অর্থ এরকম কিছু নয় যে, প্রথমদিকে মুসলিমদের জন্য স্বল্পমাত্রার সুদ গ্রহণের অনুমোদন ছিল যা পরবর্তীতে নিষিদ্ধ করা হয়। বরং এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তাদের ব্যাপারে যারা ইসলামে নতুন এসেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তারা সুদের উপর টাকা ধার দিত। সুদের অংশবিশেষ তারা ইতিমধ্যেই গ্রহণ করে ফেলেছিল এবং কিছু অংশ বাকি ছিল। এজন্য যে অংশ তারা গ্রহণ করে ফেলেছে সেটি আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তাআলা) মাফ করে দিয়েছেন এবং যা বাকি আছে তা গ্রহণ করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। এই বিষয়টি আল্লাহর নিম্নোক্ত কথার দ্বারাও সমর্থিত:
“অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে নিজেদের মূলধন পেয়ে যাবে।” (আল-কুরআন ২:২৭৯) অনুরূপভাবে রাসূল (সা) এর নিম্নোক্ত হাদিস:
“জাহিলি যুগের সুদকে সমাপ্ত করা হয়েছে সম্পূর্ণরূপে এবং প্রথমে আমি যে সুদের সমাপ্তি ঘটিয়েছি তা হচ্ছে আল—আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদ।” [সীরাতে ইবনে হিশাম]
— সবশেষে চতুর্থ আয়াতের প্রসঙ্গে আসা যাক:
“তারা সুদ গ্রহণ করত অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল” (আল-কুরআন ৪:১৬১) এখানে সূদ বলতে ঘুষ এবং অন্যান্য একই রকমের হারাম অর্থের কথা বোঝানো হয়েছে, যা ইহুদীরা গ্রহণ করতো, যেমনটি আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“(তারা) হারাম ভক্ষণ করে।” (আল-কুরআন ৫:৪২)
এখানে সুদকে শর’ঈ অর্থে বুঝানো হয় নি।
অতএব এ সম্পর্কিত বিধানের শুরু থেকেই সুদ নিষিদ্ধ ছিল এবং এমন কোন নির্দেশনা নেই যা থেকে বুঝা যাবে যে সুদ ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেশকিছু প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিতরূপেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে যে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে ক্রমান্বয়িকতার কোন সম্পর্ক নেই।
২য় যুক্তি ও এর খন্ডন
তাদের মতে আল্লাহ ধাপে ধাপে মদ নিষিদ্ধ করেছেন।তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।” (আল-কুরআন ২:২১৯)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“হে ঈমানদারগণ তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাজের ধারে কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ।” (আল-কুরআন ৪:৪৩)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, আল-আনসাব (দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু), আল-আযলাম (ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ) এগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া অন্য কিছুনা। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবেনা ?” (আল-কুরআন ৫:৯০-৯১)
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির ধারণায় যারা বিশ্বাসী তারা এসব আয়াতের প্রেক্ষিতে বলে থাকে যে শুরুতে মদ অনুমোদিত ছিল যা প্রথম আয়াত থেকে প্রমাণিত। পরবর্তীতে এই অনুমোদনকে সীমিত করা হয় এই আয়াতের মাধ্যমে
“হে ঈমানদারগণ তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাজের ধারে কাছেও যেওনা।” (আল-কুরআন ৪:৪৩) এবং এই সীমিত অনুমোদনকে সর্বশেষে নিষিদ্ধ করা হয়।
আইনগত দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে যদি কেউ এই আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করে তাহলে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার কোন ক্রমান্বয়িকতা দেখতে পাবেনা। বরং বাস্তবতা হচ্ছে নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে মদের ব্যপারে কোন শর’ঈ হুকুমই ছিলনা। অন্যভাবে বলা যায় মদ্যপান তখন একটি অনুমোদিত বিষয় ছিল যদিও তখন মুসলিমরা মদ্যপান অব্যাহত রেখেছিল তৃতীয় আয়াত নযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত। এই ধারণাটি উমর (রা) এর নিম্নেক্ত ঘটনাটির মাধ্যমেও সমর্থিত; তিনি বলেছিলেন: “হে আল্লাহ! তুমি মদের ব্যপারে আমাদেরকে স্পষ্ট ধারণা দাও কারণ তা আমাদের সম্পদ কেড়ে নেয় এবং মানসিকতাকে নষ্ট করে ফেলে।” জবাবে তখন এই আয়াত নাযিল হয়:
“তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে” (আল-কুরআন ২:২১৯) উমর(রা) দুআ করেছিলেন এবং তার কাছে এই আয়াত পাঠ করে শোনানো হয়েছিল। তিনি আবারো বললেন “হে আল্লাহ তুমি মদের ব্যপারে আমাদেরকে স্পষ্ট নির্দেশনা দাও।” জবাবে তখন এই আয়াত নাযিল হয়:
“হে ঈমানদারগণ তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাজের ধারে কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ।” (আল-কুরআন ৪:৪৩) উমর (রা) দুআ করেছিলেন এবং তার কাছে এই আয়াত পাঠ করে শোনানো হয়েছিল। তিনি আবারো বললেন “হে আল্লাহ তুমি মদের ব্যাপারে আমাদেরকে স্পষ্ট নির্দেশনা দাও” জবাবে তখন এই আয়াত নাযিল হয়:
“হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, আল-আনসাব (দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু), আল-আযলাম (ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ) এগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া অন্য কিছুনা। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক।”
(আল-কুরআন ৫:৯০)অতএব উমর (রা) এভাবেই দুআ করে যেতে থাকলেন যতক্ষণ না নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:
“অতএব, তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবেনা?” (আল-কুরআন ৫:৯১) জবাবে উমর (রা) বললেন: “আমরা নিবৃত্ত হলাম! আমরা নিবৃত্ত হলাম!” [আহমাদ , তিরমিযী, নাসাঈ, এবং আবু দাউদ থেকে বর্ণিত]
উমর (রা) মদের ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকলেন যা উপরে উল্লেখিত তৃতীয় আয়াত নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত মুসলিমদের জন্য বৈধ ছিল। তিনি (রা) তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) কাছে প্রথম এবং দ্বিতীয় আয়াত নাযিল হওয়ার পরও দু’আ করা অব্যাহত রাখলেন যার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয় যে, তৃতীয় আয়াত নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত মদ্যপান মুবাহ (অনুমোদিত) ছিল।
দ্বিতীয় আয়াতের মূল বিষয় ছিল সালাত, মদ্যপান নয়। অর্থাৎ এ আয়াতটি সালাতের সাথে সম্পর্কিত। কেউ যদি এই আয়াতের ফিক্হ ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে এখানে সালাতের সময় কাউকে মদ্যপান করতে নিষেধ করা হচ্ছেনা বরং নিষেধ করা হচ্ছে মদ্যপ অবস্থায় সালাত আদায় করতে যাতে মুসলিমরা বুঝতে পারে তারা কি তিলাওয়াত করছে। এই আয়াত নাযিল হওয়ার পরে কোন মুসলিমকে যদি দেখা যেত এমন অবস্থায় সালাত আদায় করছে যখন তার মুখ থেকে মদের গন্ধ আসছে অথবা সে তার সাথে মদের ভিস্তি (পানীয় বহনের জন্য ব্যবহৃত চামড়ার ব্যাগ) বহন করছে বা সে নির্দিষ্ট পরিমাণের মদ পান করেছে যা তার চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করেনি তাহলে সেক্ষেত্রে দোষের কিছু ছিল না।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ মদ্যপানকে তিরস্কার করেছেন কারণ তা ক্ষতিকর। দ্বিতীয় আয়াতে মদ্যপ অবস্থায় সালাত আদায় নিষিদ্ধ করা হয় এবং তৃতীয় আয়াতে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়। এই ঘটনাকে কোনভাবেই ক্রমান্বয়িক বলা যায় না কারণ সূরা আল মায়িদাহতে নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে মদ নিষিদ্ধ করার পরে রাসূল (সা) অথবা সাহাবা (রা) অথবা তাবিঈন অথবা অথবা তাদের পরবর্তীদেব মধ্যে কেউ কখনোই মদ্যপানকে অনুমোদন দেয় নি। মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদগণদের মধ্যে এবং মুজাতাহিদীনের মধ্যেও কেউ কখনোই কোন ফিকহের কিতাবে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়িকতার কথা বলেননি। যখন পূর্ণ উদ্যমে ইসলামের বিজয় চলছিল, নতুন নতুন ভূথণ্ড ইসলামের অধীনে আসছিল এবং লোকজন দলে দলে দ্বীনের মধ্যে দাখিল হচ্ছিল তখন বিজয়ী মুসলিমদের কেউই নওমুসলিমদের নতুন ইসলামে আসার দিকে ভ্রম্নক্ষেপ করেননি অথবা তাদের মদ্যপানের ব্যপারেও নীরব থাকেননি। যেসব মুসলিম বিজিত ভূখন্ডে গিয়েছিলেন তারা নওমুসলিমদের জন্য সেসব ধাপ পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি মদ্যপান নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে যেসব ধাপ পার করা হয়েছিল। যদিও হয়তো সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী কারো কারো কাছে ক্রমান্বয়িকতা দরকারী ছিল বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাদের কাছে এর কোন তাৎপর্যই ছিলনা। আমাদের প্রাথমিক যুগের ইমামদের কেউই এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ধারণার সাথে পরিচিত ছিলেননা বরং এটি হচ্ছে একটি নতুন আলোচনা যা দু:সহ বাস্তবতা এবং যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির কারণে কিছু তথাকথিত চিন্তাবিদ উদ্ভাবন করেছেন। তারা নির্দিষ্ট কিছু হুকুমের ক্ষেত্রে নয় বরং পুরো দ্বীনের জন্যই এই ধারণাটিকে একটি চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। রাসূল (সা) যথার্থই বলেছেন:
“…তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘজীবী হবে নিশ্চিতভাবেই তারা অনেক বিতর্ক দেখতে পাবে। নতুন উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাক কারণ প্রত্যেকটা নতুন বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেকটা বিদআতই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়…নিজেদেরকে আমার সুন্নাহর উপরে এবং সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহর উপরে রাখ, তাদেরকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর।” [আবু দাউদ এবং আত-তিরমিযি থেকে বর্ণিত]
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা ধাপে ধাপে বাস্তবানের পক্ষে কথা বলে তাদের জন্য কি এটা বৈধ হবে যে তারা ধাপে ধাপে আসা কোন হুকুমের সর্বশেষ হুকুমকে গ্রহণ না করে বরং পূর্বের কোন হুকুমকে গ্রহণ করতে পারবে?
নিশ্চিতভাবেই এর উত্তর হচ্ছে; ‘ না ’। কারণ শরীয়া মদ্যপানকে সুনির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে পূর্ববর্তী কোন হুকুম মেনে চলার অনুমোদন আমাদেরকে দেয়া হয়নি কারণ শরীআ’হ যা করতে নিষেধ করেছে আমাদেরকে তা অবশ্যই মানতে হবে। এটাই ছিল সালাফ (পূর্ববর্তীদের) এবং খালাফ (পরবর্তীদের) উভয় প্রজন্মের অবস্থান। মদের ব্যাপারেও একই হুকুম বিদ্যমান। এই হুকুমটি কখনো বিন্দুমাত্রও পরিবর্তিত হবেনা এবং যে মদ্যপান করবে তার অপরাধও কিছুমাত্র কমবেনা।
৩য় যুক্তি ও এর খণ্ডন
তাদের মতে শরীআ’হ দাসপ্রথার বিষয়টিকে ধাপে ধাপে সমাধান করেছে। এই মতটি সঠিক নয় কারণ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) দাসদের অস্তিত্বকে নিষিদ্ধ করেননি বরং এ থেকে উত্তরণের একটি পথ খুলে দিয়েছেন। যদি তারা আবারো অস্তিত্বলাভ করে তাহলে এ সম্পর্কিত আহকামও ফিরে আসবে এবং দ্বিতীয়বারের মত দাসদের অস্তিত্ব চোখ পড়বে।
চতুর্থ যুক্তি ও এর খণ্ডন
তাদের মতে কুরআন একবারে নাযিল হয়নি বরং ধীরে ধীরে খণ্ড খণ্ড আকারে এসেছে যা থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এর জবাব হচ্ছে আল্লাহ বিভিন্ন পরিস্থিতি ও ঘটনা অনুযায়ী কুরআন নাযিল করতেন যাতে মুমিনদের অন্তর শক্তিশালী হয়। প্রথমে ঈমানের বিষয়ে নাযিল হতো। এজন্য প্রথমে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা হয়েছিল এবং পরে হালাম-হারামের আলোচনা এসেছিল। কিন্তু এর মানে এই না যে নাযিলকৃত বিষয়ের অংশবিশেষ গ্রহণ করতে হবে এবং বাকি বিষয় ছেড়ে দিতে হবে। যেসব বিষয় নাযিল হয়েছিল তার পুরোটার ব্যাপারেই মুসলিমরা দায়িত্বশীল ছিল তখন এবং এর বাইরে তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল না। যখন শুধুমাত্র ঈমানের বিষয়ে নাযিল হয়েছিল কিন্তু কোনো হুকুম নাযিল হয়নি তখন শর’ঈ দলীলের মাধ্যমে আসা বিস্তারিত বিবরণের পুরো ইসলামের ব্যাপারেই মুসলিমরা দায়িত্বশীল ছিল। সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক যেকোনো পরিস্থিতিতেই ব্যক্তিগত শর’ঈ হুকুমের ব্যাপারে মুসলিমরা দায়িত্বশীল থাকে। যেসব শর’ঈ হুকুম ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত সেগুলো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। অতএব শর’ঈ দলীলের বিস্তারিত নির্দেশনাই মুসলিমদের কর্মকাণ্ডকে নির্ধারণ করে, অন্যকিছু না। সুতরাং, পিছনের দিকে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের হাতে আর নেই।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে কী বুঝায়? এতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এর পক্ষে কী যুক্তি রয়েছে সেগুলো পর্যবেক্ষণের পর এবার আমরা চিন্তার শরঈ প্রক্রিয়া অনুযায়ী সঠিক শরঈ মতের ব্যাখ্যা দিব।
আমরা সঠিক মতের কাছাকাছি কোনো মতের ব্যাপারে বলছি না বরং সঠিক মতের ব্যাপারেই বলছি, কারণ ক্রমান্বয়ে ইসলাম বাস্তবায়নের ধারণাটি শরীআ’হর মধ্যে নেই এবং ভুলভাবে একে শরীআ’হতে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো সুযোগও নেই। ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন এবং এটি একটি শর’ঈ পদ্ধতি কিনা এর সঙ্গে এই আলোচনাটি যতটুকু সম্পর্কিত তার চাইতে বেশী সম্পর্কিত চিন্তার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে যাকে শরীআহ কোনোভাবেই অনুমোদন করে না।
কারণ, ইসলামের একটি প্রকৃতি আছে যা অন্যসব কিছু থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। ওহীর অনুসরণের উপরেই ইসলামের প্রকৃতি পুরোপুরি নির্ভরশীল, অন্যদিকে মানুষের উদ্ভাবন ও অভিজ্ঞতার উপরে মানবরচিত ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভরশীল এবং এই উদ্ভাবন ও অভিজ্ঞতা যত শক্তিশালীই হোক না কেন মানুষের সমস্যার সঠিক সমাধান দেওয়ার জন্য তা অপর্যাপ্ত।
যখন মুসলিমরা শরীআ’হর আনুগত্য করে তখন আনুগত্যের ভিত্তি হিসেবে আল্লাহর উপর ঈমানকে মেনে নিতে হবে, নতুবা তাদের আনুগত্য গ্রহণযোগ্য হবে না। যখন সে অন্যদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করে তখন তার এই আহ্বানের ভিত্তি হতে হবে আল্লাহর উপরে ঈমান নতুবা তার আহ্বান গ্রহণযোগ্য হবে না। বিষয়টি প্রাথমিকভাবে ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তারপরে সঠিক আনুগত্যের সঙ্গে।
মুসলিমরা যদি সত্য ও সঠিক পথে নিজেদেরকে এবং ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে এসবের আধ্যাত্মিক ভিত্তি ঊপলদ্ধি করতে হবে, যার ঊপায় হচ্ছে প্রথমে একে প্রতিষ্ঠিত করা এবং অতঃপর এর পরিচর্যা করা। তখন ইসলামের আনুগত্য করা তার জন্য সহজতর হবে চাই তা বাস্তবতা, স্বভাব বা লোকজনের ইচ্ছার অনুকূলে হোক অথবা প্রতিকূলে। আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে গ্রহণ না করলে মুসলিমরা গুনাহগার হবে যদিও বা তা কুফরী না হয়। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামের একটি আধ্যাত্মিক ভিত্তি আছে যা হচ্ছে আল্লাহর উপরে ঈমান এবং এ থেকে এটা বোঝা যায় না কোনো হুকুম সত্যের কতটুকু নিকটবর্তী অথবা কতটুকু দূরবর্তী। বরং কোনো হুকুমকে যদি আমরা এই ভিত্তির আলোকে বিবেচনা করি তাহলে বুঝতে পারব তা এই ভিত্তির কতটুকু নিকটবর্তী অথবা দূরবর্তী।
যারা এই ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলে এবার তাদেরকে আমরা কিছু প্রশ্ন করতে চাই; এই আহবানের আধ্যাত্মিক ভিত্তি কি? এর পিছনে আল্লাহর নির্দেশ কোথায় বিদ্যমান? রাসূল (সা.) কখন এই বিষয়টিকে গ্রহণ করেছেন যদিও তাঁর (সা.) মক্কা বা মদিনায় এর প্রয়োজন ছিল ।
নুসরাহ খোঁজার সময় রাসূল (সা.) কি বনি আমর বিন সা’সা গোত্রকে বলেননি, “বিষয়টি (কতৃর্ত্ব) আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।” [সীরাতে ইবনে হিশাম] অথচ সে সময় দাওয়াতের জন্য সাহায্য তাঁর (সা.) জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। তারা রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নিজেদের হাতে কর্তৃত্ব চেয়েছিল। তখন কি তিনি পারতেন না তাদের অনুরোধকে মেনে নিতে এবং পরবর্তীতে ঈমান আনার পরে তাদের এই অনুরোধকে পরিবর্তন করে দিতে? এটাই কি সত্য দাওয়াত ও আল্লাহর হুকুম ছিলনা যার ফলে কোনোরকম তোষামোদ বা আপোষ ছাড়াই রাসূল (সা.) সততার সঙ্গে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন, যাতে যারা থাকে তার যেন স্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে টিকে থাকে আর যারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে তারা যেন স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়?
চাচা আবু তালিব যখন দাওয়াতি কাজে আপোষ করতে বললেন এবং তার কাঁধে অসহনীয় বোঝা না চাপাতে বললেন তখন কি রাসূল (সা.) বলেননি যে; “আল্লাহর শপথ, চাচা! যদি তারা আমার ডানহাতে সূর্য ও বামহাতে চন্দ্র এনে দেয় যাতে আমি বিষয়টি ছেড়ে দেই তবুও আমি ক্ষান্ত হব না যতক্ষণ না আল্লাহ একে বিজয়ী করেন অথবা একাজ করতে গিয়ে আমার মৃত্যু হয়।” [সিরাতে ইবনে হিশাম] এই দলিল থেকে দেখা যাচ্ছে রাসূল (সা.) ন্যূনতম পরিমাণ আপোষও করেননি এবং তিনি দাওয়াতের জন্য সবোর্ত্তম উদাহরণ রেখে গেছেন। তিনি (সা.) কোনোরকম আপোষ বা তোষামোদ করেননি, তাদের সঙ্গে তাল মিলাননি, বিনা আপত্তিতে প্রার্থনা করেননি। বরং তার দাওয়াত ছিল প্রকাশ্য ও সাহসিকতাপূর্ণ কারণ এর ফলে সত্য চিন্তার জয় হবে এবং মিথ্যা পরাজিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কি মুসলিমদেরকে সেই স্থান থেকে হিজরত করতে নির্দেশ দেননি যেখানে তারা তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বাধ্যতামূলক নির্দেশ মানতে পারছিল না? তিনি কি সেখানে থাকতে তাদেরকে নিষেধ করেননি যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যারা নিজেদের অনিষ্ট করে (কারণ হিজরত বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও তারা কাফিরদের মধ্যেই বসবাস করছিল) ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় অবস্থায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে: আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিলনা যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে?”
(আল কুরআন ৪:৯৭)এমনকোনো ভূখণ্ড যেখানে মুসলিমরা তাদের দ্বীন কায়েম করতে সক্ষম না সেখানে থাকার উপর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত একটি ইজমা বর্ণনা করেছেন ইবনে কাছির।
রাসূল (সা.) কি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” দিয়েই তাঁর দাওয়াতের সূচনা করেননি এবং লোকজনকে এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেননি? কোনোরকম পরিবর্তন ছাড়াই এটি ছিল তাঁর (সা.) শেষ বক্তব্যও। তিনি কি শুরুতে অল্প কিছু হাল্কা কথা দিয়ে শুরু করেছিলেন এবং ক্রমান্বয়ে তা বর্ধিত করেছেন? নাকি এটাই ছিল তাঁর (সা) প্রথম এবং শেষ আহবান।
যাকাত প্রদান যারা বন্ধ করে দিয়েছিল আবু বকর (রা.) কি কোনোরকম দেরি করা ছাড়া অথবা তাদেরকে সন্তুষ্ট করা ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি? তখন তিনি সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেছেন:
“আল্লাহর কসম, রাসূল (সা.)-কে তারা যা দিত যদি তার চাইতে একটা উটের রশিও আমাকে কম দেয় তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” তখন এভাবেই তিনি সাড়া দিয়েছিলেন যদিও মুসলিমরা সেসময় মুরতাদ হয়ে যাওয়া এবং বিদ্রোহের সূচনা করার মতো কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা দেখতে পাচ্ছিল।
প্রথম যুগের যেসব মুসলিম দাওয়াতি কাজ করতেন তারা কি কখনো এই ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়নের ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন? তারা কি এই চিন্তাটিকে সেসব ভূখণ্ডে বাস্তবায়ন করেছিলেন যেগুলো বিজিত হয়েছিল এবং দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়েছিল? প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ ইসলামে নতুন দাখিল হওয়া লোকজনের পরিস্থিতিকে বিবেচনা করেননি এবং তাদেরকে মদ্যপান করার সুযোগ দেননি, ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি যতদিনে তারা মদ্য না করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, সুদ খেতে এবং নারীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনেরও সুযোগ দেননি। বরং তারা ইসলামে পুরোপুরি প্রবেশ করেছিলেন এবং সুদ, ব্যভিচার, মদ্যপান ও অন্যসবকিছু যেগুলোর ব্যাপরে আল্লাহ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত ছিলেন। অনুরূপভাবে অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও মুসলিমরা সমস্ত শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়ন করেছিলেন সেগুলো আলাদা ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে হোক, সামষ্টিকভাবে হোক, তাদের নিজস্ব বিষয়াদিতে হোক অথবা তাদের অংশবিশেষ আদয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে যায় এমনক্ষেত্রেই হোক।
ইসলামি ফিকহের প্রকৃত বইসমূহে কি এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে? আমাদের প্রাথমিক দিক্কার নির্ভরযোগ্য ফকিহ ও মুজতাহিদগণ কি ক্রমান্বয়িকতার ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেছেন, যদিও আমরা জানি যে, তারা শরিআ’হর কুল্লিয়াত (সামগ্রিকতা) ও জুযিয়াত (শাখা) নিয়ে বিস্তারিত অলোচনা করেছেন?
শরীআ’হ সামগ্রিকভাবে এই বিষয়ের নির্দেশনা দেয় যে দাওয়াতের বাধ্যবাধকতা সততার সঙ্গে আদায় করতে হবে এবং সরলপথের উপরে থাকতে হবে;
“সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি নিজের বান্দার প্রতি এ গ্রন্থ নাযিল করেছেন এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি।”
(আল-কুরআন ১৮:১)আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিররা চায় আমরা আপোষ করি এবং তাদের সঙ্গে ঐক্যমতে পৌঁছাই। তারা চায় আমরা সত্যকে পরিত্যাগ করি এবং প্রকৃত সমাধানের এক চতুর্থাংশ অথবা অর্ধেক গ্রহণ করি। তারা চেষ্টা করে যাতে আমরা কুফরি কর্মকাণ্ডের সূচনা করি। এ ব্যাপারে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশতঃ চায় যে, মুসলিম হওয়ার পর তোমাদেরকে কোনোরকম কাফির বানিয়ে দেয় ……। (আল-কুরআন ২:১০৯)
এবং শেষে চেষ্টা করবে তাদের আইনকানুন গ্রহণ করাতে। এ ব্যাপারে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন, তবে তারাও নমনীয় হবে।” (আল-কুরআন ৬৮:৯)
“অতএব আপনি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবে না।” (আল-কুরআন ৬৮:৮)
পথভ্রষ্ট লোকদের প্রতি ঝুঁকে পড়ার ব্যাপারে আমাদের রব আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন:
“আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো বন্ধু নেই, আর কোথাও সাহায্যও পাবে না।” (আল কুরআন ১১:১১৩)
প্রকৃত ঈমানের দিকে সঠিক দাওয়াত মুসলিমদের আনুগত্যকে পূর্ণতাদান করে যদিও সে ইসলামে নতুন দাখিল হয় এবং এর আনুগত্য করে থাকে। দাওয়াত বহনকারী হিসেবে আমাদের উপরে এটা বাধ্যতামূলক যে আমরা নিজেদের অন্তরে ঈমানকে প্রোথিত করব এবং নিজেদেরকে এর জন্য উৎসর্গ করব যতক্ষণনা সবোর্ত্তম আনুগত্য ও তাকওয়ার সঙ্গে তা ফল দিতে শুরু করবে। ইসলামি রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন অবশ্যই তা এমনসব লোকদের হাতে হবে না যার ইসলামি ধারণাশূন্য ও পাশ্চাত্যের ধারণায় পূর্ণ। এটি এমনসব লোকদের দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত হবে না যাদের মধ্যে দাওয়াতের কোনো প্রতিফলন হয়নি, দাওয়াত তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারেনি এবং তারা একে গ্রহণ করেনি। বরং পূর্বে আমরা যা বলেছি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে সাধারণ গণজাগরণের মাধ্যমে সৃষ্ট জনমতের উপর ভিত্তি করে যা ইসলামের ধারণা এবং এর দ্বারা শাসিত হওয়ার ধারণাকে গ্রহণ করবে। মানুষের অন্তর ও মনকে ইসলামের কাছে টানার অজুহাতে ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন ধারণাকে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই, আর না আছে মানবীয় দুর্বলতার কাছে মাথানত করার অথবা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার, কারণ আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন মানুষের অন্তর ও মন এবং পরিস্থিতিকে ইসলাম অনুযায়ী পরিবর্তন করার জন্য।
যদি আমরা কুরআনের দিকে ফিরে যাই এবং এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করি তাহলে দেখতে পাব এতে সেসব নির্দেশ দেওয়া আছে তা চূড়ান্ত এবং ক্রমান্বয়িকতার ধারণাটি পাশ্চাত্যের বিজাতীয় চিন্তাসমূহ থেকে তথাকথিত উলেমাদের দ্বারা মিথ্যা এবং ভ্রান্ততার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে।
যখনই কোনো আয়াত নাযিল হতো তখনই রাসূল (সা.) এবং তাঁর (সা.) সঙ্গের মুসলিমগণ কোনোরকম বিলম্ব না করে তা বাস্তবায়নের জন্য ছুটতেন। যেকোনো নাযিলকৃত হুকুমের বাস্তবায়ন কেবল এজন্য বাধ্যতামূলক ছিল যে তা নাযিল হয়েছে। যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এই আয়াতটি নাযিল করলেন;
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” (আল—কুরআন ৫:৩)
তখনই মুসলিমরা পুরো ইসলামের বাস্তবায়নের জন্য বাধ্য হয়ে পড়ল, তা আক্বিদা, ইবাদাত, আখলাক, মুআমালাতের ক্ষেত্রে হোক অথবা বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক ব্যবস্থা অথবা পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত হুকুমের ক্ষেত্রে হোক অথবা সন্ধি ও যুদ্ধের সময়েই হোকনা কেন।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (আল কুরআন ৫৯:৭)
অর্থাৎ রাসূল (সা.) যেসব বিষয় নিয়ে এসেছেন সেগুলো গ্রহণ করতে ও সে অনুযায়ী আমল করতে এবং তিনি (সা.) যেসব বিষয়কে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকতে ও দূরত্ব বজায় রাখতে। কারণ এই আয়াতে ‘মা’ শব্দটি আম (সাধারণ) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সমস্ত ফরযকে বাধ্যতামূলকভাবে আদায় এবং সমস্ত হারাম থেকে বিরত থাকার ও দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত। আয়াতের শেষদিকে উপস্থাপিত ক্বারিনা (নির্দেশনার)-এর ফলে আয়াতে উল্লিখিত বিষয়ের গ্রহণ বা বর্জন আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক, কারণ এই ক্বারিনাতে তাকওয়া অবলম্বনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আয়াত অনুযায়ী যে কাজ করবে না তার জন্য ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবাণী রয়েছে।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন;
“আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক বিষয়াদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছন, সেই অনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমনকোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।” (আল কুরআন ৫:৪৯)
এই আয়াতটি রাসূল (সা.) ও তাঁর পরবর্তী মুসলিমগণকে আল্লাহর নাযিলকৃত সমস্ত হুকুম অনুযায়ী শাসন করতে চূড়ান্ত নির্দেশ দিচ্ছে, তা আদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে হোক অথবা নিষেধ সংক্রান্ত বিষয়ে। এটি রাসূল (সা.) ও তাঁর (সা.) পরবর্তী মুসলিমদেরকে লোকজনের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ এবং তাদের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ থেকে বিরত থাকারও নির্দেশ দিচ্ছে।
পাশাপাশি এটি রাসূল (সা.) ও তাঁর (সা.) পরবর্তী মুসলিমদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছে আল্লাহর নাযিলকৃত কিছু বিষয়ের বাস্তবায়ন থেকে লোকজন তাদেরকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করবে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“যারা আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী শাসন করেনা তারাই কাফির।” (আল-কুরআন ৫:৪৪)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করে না তারাই যালিম।” (আল-কুরআন ৫:৪৫)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করে না তারাই ফাসিক।” (আল-কুরআন ৫:৪৫)
আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী শাসন করেনা তাদেরকে এসব আয়াতে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কাফির, যালিম ও ফাসিক সাব্যস্ত করেছেন। কারণ এখানে উল্লিখিত ‘মা’ শব্দটি আম (সাধারণ) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, ফলে এতে আল্লাহর নাযিলকৃত আদেশ ও নিষেধ সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উপরোক্ত সমস্ত বর্ণনা থেকে কোনোরকম দ্ব্যর্থতা ছাড়া নিশ্চিতভাবেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে কোনোরকম বিলম্ব, গড়িমসি অথবা ক্রমান্বয়িকতা ছাড়া ইসলামের সমস্ত হুকুম বাস্তবায়ন করতে ব্যক্তিগতভাবে, দলীয়ভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিমরা বাধ্য। ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এসব হুকুম বাস্তবায়ন না করার কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হবে না।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন নীতিটি ইসলামের হুকুমের সঙ্গে পুরোপুরিই সাংঘর্ষিক। ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্র হিসেবে যদি আল্লাহর কিছু হুকুম কেউ বাস্তবায়ন করে এবং বাকিগুলো ছেড়ে দেয় তাহলে সে আল্লাহর দৃষ্টিতে অপরাধী বলে গণ্য হবে।
কোনো ওয়াজিব বিষয় ওয়াজিবই থাকে যার উপরে আমল করা বাধ্যতামূলক এবং কোনো হারাম বিষয় হারামই থাকে যা থেকে দূরে থাকা বাধ্যতামূলক। যখন সাকিফের প্রতিনিধি রাসূল (সা.)-কে অনুরোধ করেছিল তিন বছর পর্যন্ত আল-লাত এর মূর্তি না ভাঙতে অথবা ইসলাম গ্রহণের বিনিময়ে সালাত আদায় করা থেকে অব্যাহতি দিতে। তিনি (সা.) তাদের এসব প্রস্তাবে সম্মত হননি এবং পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কোনোরকম বিলম্ব ছাড়াই মূর্তিগুলো ভাঙতে এবং সালাত আদায় করতে তিনি জোর দিলেন।
যেসব শাসক ইসলামের হুকুম বাস্তবায়ন করেনা অথবা যেসব শাসক সেগুলো থেকে অল্পকিছু বাস্তবায়ন করে আল্লাহ তাদেরকে কাফির আখ্যা দিয়েছেন। এই বিষয়টি তখন প্রযোজ্য যখন সে এগুলোর উপযুক্ততায় বিশ্বাস করেনা। উপযুক্ততায় বিশ্বাস করে ইসলামের সমস্ত হুকুম বাস্তবায়ন করে না অথবা কিছু হুকুম বাস্তবায়ন করে তাহলে সে যালিম বা ফাসিক বলে গণ্য হবে।
যদি কোনো শাসক প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত (যার ব্যাপারে আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের কাছে বুরহান স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে) তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং তরবারি উন্মুক্ত করাকে রাসূল (সা.) আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন। অর্থাৎ তারা যদি কুফরি আইন দিয়ে শাসন করে এবং এগুলোর কুফর হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ না থাকে তাহলে এসব আইন অল্পসংখ্যক নাকি অধিক তা বিবেচনা করার কোনো প্রয়োজন নেই। উবাদাহ বিন সামিত থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণিত হচ্ছে:
“কর্তৃত্বশীল লোকদের সঙ্গে তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাদে জড়াবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে এমন প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত হতে দেখেছ যার ব্যাপারে তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে বুরহান (স্পষ্ট প্রমাণ) আছে।” [মুসলিম থেকে বর্ণিত]
অতএব ইসলামের হুকুম বাস্তবায়নে কোনোরকম আত্মসন্তুষ্টিতে ভোগা অথবা ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন অবলম্বন করার সুযোগ নেই, কারণ দুটো ওয়াজিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, দুটো হারামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই এবং দুটো হুকুমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহর সমস্ত হুকুমই একসমান। এদের সবগুলোকে একসঙ্গেই প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে হবে কোনোরকম বিরতি, বিলম্ব অথবা কোন প্রকার ধাপছাড়া। নাহলে আমাদের উপরে আল্লাহর নিম্নোক্ত কথাটি প্রযোজ্য হবে:
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং বাকি অংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে তাদের জন্য দুর্গতি ছাড়া আর কোনো পার্থক্য নেই। আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেওয়া হবে।” (আল-কুরআন ২:৮৫)
কোনো মুসলিম, সে শাসক হোক অথবা কোনো সাধারণ ব্যক্তি, শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়িত না করার কোনো অজুহাতই তার কাজে আসবেনা, যদিনা শর’ঈ দলিলসমূহে তার পক্ষে কোনো শর’ঈ রুখসাত (বাধ্যতামূলক কাজ থেকে অব্যাহতির সুযোগ) বিদ্যমান থাকে। প্রকৃত এবং অনুভবযোগ্য দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট অক্ষমতা যেমন জবরদস্তি ক্ষেত্রে অর্থাৎ কাউকে জবরদস্তি করে কোনো হারাম করতে বাধ্য করা হলে অথবা যে পরিস্থিতিতে রাসূল (সা.) মদিনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ গাতফান গোত্রকে দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন অথবা যখন একজন খলিফা বিদ্রোহীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন অথবা যখন অবরোধকালে মৃত্যুর আশংকা থাকলে হারাম গোশত খাওয়া বৈধ হয়ে যায়, এসব বিষয়কে শর’ঈ রুখসাত হিসেবে গণ্য করা যায়।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন অনুসরণ থেকে আমরা যা বুঝতে পারছি, যারা এর পক্ষে কথা বলে তাদের মধ্যে এই ধারণাটির জন্ম হয়েছে পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত চাপের ফলে। এরকম চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তারা এর পক্ষে প্রমাণ খুঁজতে শুরু করেছে যাতে এই পদ্ধতিতে দাওয়াত দেওয়ার জন্য তারা যুক্তি ও অনুমোদন প্রদর্শন করতে পারে। অর্থাৎ প্রথমে তাদের মধ্যে ধারণাটির জন্ম হয়েছে এবং পরবর্তীতে ধারণাটিকে সংরক্ষণের জন্য তারা শরিয়াকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যাতে এর পক্ষে শর’ঈ দলিল উপস্থাপন করতে পারে। এটই হল বিচ্যুতির সূচনা। যেসব মুসলিম এই ধারণাটিকে গ্রহণ করেছে তাদের প্রতি আমাদের উপদেশ হচ্ছে তারা যেন নিজেদের মধ্যকার দুর্বলতাকে অপসারণ করে। শরীআ’হর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এরূপ হতে হবে যেন তারা আল্লাহর উপরে ভরসা করে এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) উপরে মজবুত ঈমান রাখে যিনি সমস্ত বিষয়কে তাদেরকে দান করেন। তাদেরকে এরূপই হতে হবে যাতে তারা এই ঈমান নিয়ে কঠোর বাস্তবতা ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। তার এই ঈমান তার মধ্যে উন্নত অনুভূতির সৃষ্টি করবে এবং পরিস্থিতির তোয়াক্কা করবে না। শরীআ’হর সঠিক সীমানাতে অবস্থান এবং প্রকৃত আনুগত্যের মাধ্যমেই লোকজনকে ইসলামের দিকে ডাকতে হবে, কোন ধাপ গ্রহন করা ছাড়াই এই কাজটি সম্পাদন করতে হবে।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান হচ্ছে ইসলাম ভিন্ন অন্যকিছুর দিকে আহবান, যা হারাম। এর ভিত্তিতে যখন কোনো বিষয়ের দিকে অমুসলিম ও ত্রুটিপূর্ণ মুসলিমদেরকে আহবান করা হয় তারা সেগুলো গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। এই দ্বিধাগ্রস্ততার দায়ভার তাদেরই যারা ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান করে। কারণ, তাদের কাছে প্রকৃত ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়নি এবং এই উপস্থাপনার ভিত্তি ইসলামের আধ্যত্মিক ভিত্তি অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ও সকল বিষয়ের নিয়ন্ত্রণকারী আল্লাহর উপরে ঈমান এবং যে ভিত্তিতে শর’ঈ হুকুম গ্রহণ করা হয় তা থেকে অনেক দূরে। ফলে আল্লাহর হুজ্জাহ (প্রমাণ) তাদের বিরুদ্ধে যায় যারা ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান করে; তাদের বিরুদ্ধে যায়না যাদেরকে আহবান করা হয়েছে।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবানের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ ও আধিপত্য বিস্তার যার মাধ্যমে ইসলামের আংশিক বাস্তবায়নের পথ সুগম হয় এবং এক্ষেত্রে তাদের অজুহাত হচ্ছে শরীআ’হর পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নের মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্য তাদের নেই। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) আামাদেরকে যা দিয়েছেন সেগুলোর সামনে নতুন কিছু উপস্থাপন না করতে অথবা সেগুলো থেকে বিচ্যুত না হতে আমাদেরকে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষের যাবতীয় সমস্যার সমাধান যিনি দেন, তিনি হচ্ছেন মানুষের রব, সর্বজ্ঞানী, সমস্ত খবরের অধিকারী এবং যিনি জানেন তিনি কি সৃষ্টি করেছেন। ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবানের সময় একজন মুসলিম কীভাবে নিজেকে এই অনুমতি দেয় যে সে আইন প্রণয়নের এই প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহণ করে? একজন দাঈর (দাওয়াত বহনকারী) প্রকৃত অবস্থান হচ্ছে সে কেবল সমাধানকে কার্যকর করা ও বহন করার মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখবে এবং একে প্রণয়ন করতে যাবে না ।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান দা’ঈকে একটি নষ্ট চিন্তার পথ প্রদর্শন করে যার ভিত্তিতে যে লোকজনকে আহবান করে। ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবানের ফলে কেউ যদি এর দ্বারা প্রভাবিত হয় তাহলে তা তার চিন্তার প্রক্রিয়াকে দূষিত করে দিবে, যা অন্যান্য দূষিত চিন্তার মতোই পরিবর্তন করা জরুরী। যেহেতু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চিন্তার প্রক্রিয়াই শুরুতে আসে সেহেতু চিন্তা পরিবর্তন করার চেয়ে চিন্তার প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ না একটি সাধারণ উপায়ে উম্মাহর চিন্তার প্রক্রিয়াকে আমরা পরিবর্তন করতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত উম্মাহর অবস্থার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হবে না। যে দূষিত প্রক্রিয়ায় সে চিন্তা করে এবং লোকজনকে আহবান করে তা প্রতিস্থাপন করে সেখানে চিন্তার সঠিক প্রক্রিয়াকে বসাতে হবে।
কর্মকান্ড কি আংশিক হবে নাকি ব্যাপক এবং ভারসাম্যপূর্ণ হবে?
কিছু মুসলিম কর্মী আছেন যারা ইসলামী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সমন্বিত এবং সুষম পদক্ষেপ গ্রহণ করার একটি ধারণা উপস্থাপন করেন আবার অনেকে আংশিক কর্মকাণ্ড জোরালোভাবে পরিচালনা করার কথা বলেন।
সমন্বিত পদক্ষেপ বলতে বুঝানো হয় অন্যান্য বিষয় ও দিক বাদ দিয়ে কেবল কোনো একটি আংশিক বিষয় বা দিকের উপরে কর্মকাণ্ডকে সীমিত না করা। ইসলামী পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে ইবাদাত সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। নবুয়্যতের যুগে ইসলামের প্রথমদিককার কর্মকাণ্ড ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। রাসূল (সা) তখন ইসলামের সমস্ত দিকের অনুসরণ করছিলেন। কর্মক্ষেত্রে অথবা নৈতিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, তিনি ছিলেন একজন মুরব্বী, শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি ছিলেন শিক্ষক, জিহাদের ময়দানে ছিলেন নেতৃত্বদানকারী, পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ছিলেন উপদেষ্টা। ইসলামী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বত্র রাসূল (সা)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে আমরা বাধ্য এবং এক্ষেত্রে তাঁর (সা) অনুসরণ করা বা না করার বিষয়টি আমাদের ইচ্ছার উপরে নির্ভরশীল না।
অন্যদিকে ইসলামী কর্মকাণ্ডের আংশিক দিক হচ্ছে ইসলামের কোনো একটি দিকের মধ্যে নিজেদেরকে সীমিত রাখা। তারা শুধুমাত্র এরই অনুসরণ করে, একে অতিক্রম করেনা। তারা শুধুমাত্র এই আংশিক কাজের উপরেই আস্থা রাখে, অন্যকিছুর উপরে না। আংশিক কর্মকাণ্ডের ফলে বিভিন্ন দল সৃষ্টি হয়, কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিভক্তি আসে এবং লোকজনের কর্মপ্রচেষ্টা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। বনী ইসরাঈলের আংশিক কর্মকাণ্ডকে কুরআন প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনো পথই নেই। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেওয়া হবে।”
(আল কুরআন ২:৮৫)এই বিষয়ের পক্ষালম্বনকারীরা আরো বলে থাকে যে, জাহিলিয়্যিাতের ঐক্যবদ্ধ চ্যালেঞ্জ আমাদেরকে বাধ্য করে সমন্বিত কর্মকাণ্ড গ্রহণ করতে।
মুসলিম কর্মীদের এই দলটি মনে করে ইসলামী কর্মকাণ্ডের সমস্ত দিককে গুরুত্ব অনুযায়ী সুষম ও সমন্বিতভাবে পালন করতে হবে, না হলে কিছু বিষয়ে অপর্যাপ্ততা থেকে যাবে এবং অন্যান্য বিষয়ে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। এই সমন্বিতকরণের ক্ষেত্রে প্রাধান্যদানের যুক্তি বিবেচনা করতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সমন্বিতকরণের ধারণাটি পুরো ইসলামের সাথেই জড়িত। এজন্য দলটির কর্মকাণ্ডকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। সুতরাং সমন্বিতকরণের বিষয়টি আমাদের কাছে দাবী করে প্রত্যেকের নিজস্ব গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুযায়ী সমস্ত বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া। এক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত কিছু করার প্রয়োজন নেই তাহলে তা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, আবার কোনো বিষয় অপর্যাপ্ত থাকলে সেটাও ত্রুটিপূর্ণ হবে।
সমন্বয় ও সুষমকরণের নিয়মসমূহ বিভিন্ন বস্তু ও কাজের প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মুসলিম-অমুসলিম সবাই এই নিয়মসমূহকে প্রত্যক্ষ করেছে। ফলে তারা নিজেদের জীবনে এসব নিয়মের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং এগুলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, যাতে কাঙ্ক্ষিত পরিণতি অর্জন করা যায়।
যাই হোক, কেউ লক্ষ্য করলে দেখতে পাবে, বস্তুর সমন্বয় ও ভারসাম্য আনয়নের সিদ্ধান্ত মনের উপরে নির্ভরশীল কিন্তু কাজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি এর বিপরীত অর্থাৎ এটি শরীয়াহ’র উপরে নির্ভরশীল।
কারণ, বস্তুর বাস্তবতা ও বাস্তবতার উপাদানসমূহ এবং এদের নির্দিষ্ট অনুপাত-এগুলো মন উপলব্ধি করতে পারে। এই বিষয়টি বিশেষজ্ঞগণ ভালো বুঝতে পারেন; এক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর নিম্নোক্ত হাদীসটি প্রযোজ্য:
“দুনিয়ার ব্যাপারে তোমরা আমার চাইতে অধিক জ্ঞানী।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]অতএব, কৃষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং মেকানিক প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রের নিয়ম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। প্রত্যেকেই এই সমন্বয় ও সুষমকরণের নিয়মগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।
কিন্তু কাজের বিষয়টি আল্লাহ কর্তৃক র্নিধারিত এবং এক্ষেত্রে রাসূল (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদীসটি প্রযোজ্য,
“যেকোনো কাজ যা আমাদের বিষয়ের (দ্বীনের) মধ্য থেকে না, সেটা প্রত্যাখ্যাত।”
[বুখারী ও মুসলিম থেকে বর্ণিত]নিম্নোক্ত শরঈ মূলনীতিটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য:
‘প্রকৃতপক্ষে, কাজের আনুগত্য করতে হবে শরঈ হুকুম অনুযায়ী।’ কারণ কোনো কাজ হাসান (ভালো) নাকি কুবহ্ (তিরস্কারযোগ্য) সেটা খোদ কাজ থেকে নয় বরং কাজের ব্যাপারে মানুষের ধারণার সাহায্যে ঠিক করা হয়। কোনো মুসলিম যেসব চিন্তায় বিশ্বাস করে সেগুলোর সাহায্যে সে তার কাজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যদি আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী কাজটি সম্পাদিত হয় তাহলে সেটা হাসান (ভালো), অন্যথায় কুবহ্ (তিরস্কারযোগ্য)। শরীয়াহ মূলনীতি অনুযায়ী: ‘শরীয়াহ যাকে হাসান সাব্যস্ত করেছে সেটাই হাসান এবং শরীয়াহ যাকে কুবহ্ সাব্যস্ত করেছে সেটাই কুবহ্।
ফলে কোনো মুসলিম যখন বস্তুর সমন্বয় ও ভারসাম্য আনয়নের চিন্তা করে তখন সে অন্যান্য মানুষের মতোই নিজের মনের উপরে নির্ভর করে। কিন্তু যখন কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন আসে, তখন সেটা অবশ্যই শরঈ হুকুম অনুযায়ী হতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন কাজের সমন্বয় ও সুষমকরণের জন্য কোনোরকম বাড়াবাড়ি ছাড়াই শরঈ দিক থেকে কাজের বিশালত্ব আগে বুঝতে হবে। এজন্য নিচের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করতে হবে;
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা এবং সমস্ত মুসলিম অর্থাৎ ইসলামী উম্মতকে পুরো ইসলামের দায়িত্ব নিতে হবে।
ব্যক্তি, দল এবং খলিফার সমন্বয় হচ্ছে ইসলামী উম্মত। এদের প্রত্যেকের জন্যই নির্দিষ্ট হুকুম রয়েছে।
ফলে ব্যক্তিগতভাবে মুসলিমরা সেসব দায়িত্ব পালন করে যেগুলো শরীয়াহ তার উপরে ন্যস্ত করেছে। দল তার নিজস্ব দায়িত্ব পালন করে। খলিফা সেসব দায়িত্ব পালন করে যেগুলোর জন্য সে খলিফা হিসেবে নির্দেশপ্রাপ্ত।
দল এবং খলিফার মতো মুসলিমগণও যদি ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের পালনীয় কর্তব্যসমূহ পূরণ করে, তাহলে কাজ পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হবে। বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনে যদি (ব্যক্তি, দল বা খলিফার) কেউ কোনোরকম শৈথিল্য প্রদর্শন করে, তাহলে দায়িত্ব পালনে অবহেলাকরী হিসেবে সে অপরাধী হবে।
খলিফা ছাড়া পুরো ইসলাম পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান থাকতে পারেনা। যেহেতু দ্বীনের অনেক হুকুম খলিফার অস্তিত্বের উপরে নির্ভরশীল, সেহেতু তার অস্তিত্বে থাকা এবং তাকে অস্তিত্বে আনার জন্য কাজ করা ফরয। ফলে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কাজ করতে হবে দলটিকে। একে বলা হয় ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার কাজ। দলটির কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে এটিই শরীয়াহ প্রত্যাশা করে এবং এটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন নয়, পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের কাজ সে বাস্তবায়ন করতে পারে না এবং এই দায়িত্বটি তার উপরে ন্যস্তও না। বরং এমন অনেক হুকুম রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়ন করা এর জন্য হারাম। উদাহরণস্বরূপ, হুদুদ এমন একটি বিষয়। অতএব, দলটি খলিফার ভূমিকা পালন করতে পারে না বরং খলিফা যাতে নিজের দায়িত্ব সম্পাদন করতে পারে সেজন্য সে খলিফাকে অস্তিত্বে আনার জন্য কাজ করে।
“জনগণের জন্য আমীর হচ্ছে মেষপালকের মতো যে তার পালের জন্য দায়িত্বশীল।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]“…প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]একটি বিষয়ের দিকে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, মুসলিমরা পুরো ইসলামের উপরে বিশ্বাস করে, এবং এর দিকে সাধারণভাবে ডাকে। তবে সে শুধুমাত্র সেসব বিষয়ই পালন করে যেগুলো ব্যক্তি হিসেবে তার কাছ থেকে শরীয়াহ দাবী করে এবং যে দলের সাথে সে কাজ করে সেই দলটি তার কাছ থেকে যা দাবী করে। এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে পালন না করলে আল্লাহ তাকে জবাবদিহি করবেন। অনুরূপভাবে ব্যক্তি হিসেবে খলিফার কাছ থেকে শরীয়াহ যা দাবী করে সেগুলো সে পালন করবে। অতএব তাকে সালাত আদায় করতে হবে, সিয়াম পালন করতে হবে, হজ্জ্ব পালন করতে হবে, যাকাত দিতে হবে, মা-বাবার দেখাশোনা করতে হবে এবং ব্যভিচার, সুদ, মিথ্যা বলা ও প্রতারণা থেকে বিরত থাকতে হবে। খলিফা হিসেবে শরীয়াহ তার কাছ থেকে যা দাবী করে সেগুলোও তাকে পালন করতে হবে। ফলে তিনি আইন জারি করবেন, জিহাদ ঘোষণা করবেন, মুসলিমদেরকে রক্ষা করবেন, আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে শাসন করবেন এবং হুদুদ প্রয়োগ করবেন। এসমস্ত বিষয়ে কোনোরকম শৈথিল্য প্রদর্শন করলে আল্লাহ তাকে জবাবদিহি করবেন।
উল্লিখিত বাস্তবতার জন্যই শরঈ হুকুমসমূহ এসেছে। এই বিষয়টি দলের নিকট স্পষ্ট থাকা উচিত, যাতে সে বুঝতে পারে কোন কাজটি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কোন কাজটি দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। অতএব, খলিফার জন্য যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো দল সম্পাদন করতে পারে না। দল যদি নিজের বাস্তবতাকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে তাহলে সে তার দায়িত্বগুলো নির্ধারণ করতে পারবে এবং সেগুলোর জন্যই তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সমন্বিতকরণের বিষয়টি চিন্তা করলে আমাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্তেই আসতে হবে।
নিজের দায়িত্বসমূহ নির্ধারণ করার পরে যদি দলটি নির্ধারিত কাজসমূহের কোনো একটির মধ্যে নিজেকে সীমিত রেখে অন্যগুলোকে বাদ দিয়ে দেয় অথবা কোনো একটি বিষয়ের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দেয় এবং অন্যগুলোকে তেমন গুরুত্ব না দেয় অথবা দায়িত্বসমূহের মধ্যে প্রাধান্যদান না করে তাহলে সে দায়িত্বসমূহের মধ্যে সুষমকরণে ব্যর্থ হবে। তবে এক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে প্রাধান্যদানের বিষয়টি মন নয় বরং শরীয়াহ নির্ধারণ করে। অতএব, দলটির কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক এবং সে ঐ মতাদর্শকে ইসলামী উম্মতের উপরে বাস্তবায়িত করতে চায় যার আলোকে সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দাওয়াতের ক্ষেত্রে আক্বীদাহ’র অবস্থান হচ্ছে সর্বাগ্রে, কারণ এটিই সেই ভিত্তি যা থেকে প্রত্যেকটা শাখা বের হয়েছে এবং সমস্ত শরঈ আহকাম এর সাথে সম্পৃক্ত। খিলাফত প্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার গুরুত্ব অনেক বেশি কারণ, এর উপরে প্রচুর আহকাম নির্ভরশীল এবং এজন্য এটি ‘ফরযসমূহের মুকুট’ হিসেবে পরিচিত।
অতএব, দলটি যদি এই দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে সমন্বয় ও ভারসাম্য আনয়নের জন্য সংগ্রাম করে তাহলে সে এমনকিছুর জন্য নিজেকে চালনা করবে যা আল্লাহ নির্ধারণ করেননি। তখন সে অপর্যাপ্ততা এবং অসমতার অভিযোগ করবে যেমনভাবে সে একাধিক দল থাকার বিষয়ে অভিযোগ করে। তখন সে এমন একটি দলে পরিণত হবে যে অভিযোগ করে ও হতাশা ব্যক্ত করে এবং নিজের পথ হারিয়ে ফেলে, কারণ সে নিজের দিক নির্দেশনার কম্পাস হারিয়ে ফেলেছে।
ইসলামী ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য যদি হয় ইবাদাতের পদ্ধতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সামরিক ব্যবস্থা প্রভৃতির সমন্বয় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় এসব ব্যবস্থার সাথে দলটির সম্পর্ক কী? দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যখন আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন বিভিন্ন ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ভূমি ও মালিকানা, উৎপাদন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত শরঈ আহকাম রয়েছে। অন্যান্য হুকুমের পাশাপাশি এসব হুকুমসমূহ বিধানদাতা খলিফার হাতে ন্যস্ত করেছেন। এসমস্ত বিষয় দেখাশোনা করার দায়িত্ব দলের নয় বরং খলিফার।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় শরীয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা এবং স্তম্ভসমূহের উপর ভিত্তি করে; যেমন: খলিফা, মুওয়ায়িন (সহযোগী) থেকে শুরু করে ওয়ালি (গভর্ণর), কাজী (বিচারক), প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং মজলিস আল উম্মাহ (উম্মাহ কাউন্সিল) পর্যন্ত। খলিফা, মুওয়ায়িন এবং ওয়ালী প্রত্যেকেরই কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতা আছে। সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার নিজস্ব কর্মক্ষেত্র রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এসমস্ত বিষয়ে দলের কি করার আছে?
ইসলামী সেনাবাহিনী ও এর প্রস্তুতিকে অবশ্যই বিশ্বের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ এর জন্যই একে গঠন করা হয়েছে। এর প্রস্তুতি কেবলমাত্র কৌশলগত দিক যেমন: কীভাবে মেশিনগান ঠিকঠাক করতে হবে, ব্যবহার করতে হবে অথবা কীভাবে গ্রেনেড ছুঁড়তে হবে এতটুকু পর্যায়ে থাকলে চলবেনা বরং একে অবশ্যই বৈশ্বিক পর্যায়ে থাকতে হবে। কিছু অস্ত্র আছে যেগুলো ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা যাবে আবার কিছু অস্ত্র আছে যেগুলো কেবলমাত্র রাষ্ট্র ব্যবহার করতে পারবে। এজন্য প্রশিক্ষণকে সর্বাধুনিক পর্যায়ে রাখতে ট্যাংক, সাঁজোয়া বাহিনী, বিমান বাহিনী এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি ও মহাশূন্যযান প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণদান অপরিহার্য। গবেষণাগার, অস্ত্রকারখানা, বিমানবন্দর, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রভৃতি এবং এগুলোর বাইরেও আরো অনেককিছু নির্মাণ করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এসমস্ত বিষয়ে দলের কী করার আছে? রাসূল (সা) যখন সাহাবাগণকে (রা) প্রস্তুত করতেন ও প্রশিক্ষণ দিতেন তখন তিনি কোনো একটা দলের দায়িত্বশীল হিসেবে তা করেননি বরং একটা রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে এগুলো করেছেন। অতএব, এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই এক্ষেত্রে রাসূল (সা)-কে অনুসরণ করতে হবে।
এসমস্ত ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করা নিজের দায়িত্ব বলে মনে করা দলটির জন্য উচিত নয়; বরং দলটির কাজ হচ্ছে খলিফাকে অস্তিত্বে আনা যিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে এগুলোকে বাস্তবায়ন করবেন। উম্মাহ যদি খলিফাকে অস্তিত্বে আনার কাজকে অবহেলা করে এবং খলিফার কাজগুলোকে নিজেরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে তাহলে এর মাধ্যমে শরীয়াহ’কে বিকৃত করা হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যদি দলটিকে তৌফিক দেন তাহলে তারা যেসব আহকামের মাধ্যমে লোকজনের উপরে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে ইচ্ছুক সেগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে গ্রহণ করতে দলটি বাধ্য। এ লক্ষ্যে দলটি ইসলামী ব্যবস্থার কাঠামো এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। জনগণের নিকট ইসলামী আহকামের একটি সাধারণ চিত্র উপস্থাপন করবে দলটি, যাতে জনগণ এসব সমস্যা সমাধানে দলের সামর্থ্যকে অনুভব করে। তখন তারা বিশুদ্ধ শরঈ আহকাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাতের দিকে অগ্রসর হবে এবং আল্লাহর রহমতকে অনুভব করবে।
এবার তাদের ব্যাপারে আসা যাক, যারা শরীয়াহ’র ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে কাজ করার পক্ষপাতী। যদি তারা কোনো দাতব্য সংস্থা হয় অথবা নৈতিক সংগঠন হয় অথবা এমন কোনো সংগঠন হয় যারা কোনো একটিমাত্র শরঈ হুকুম যেমন কুরআন শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত সংগঠন হয় তাহলে এগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে যতক্ষণ পর্যন্ত এর সদস্যগণ কোনো একটি শরঈ হুকুমের ভিত্তিতে এক থাকে। তবে যদি তারা এরূপ দাবী করে যে তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবে তাহলে সেক্ষেত্রে আমরা বলব যে তারা পরিকল্পিত শরঈ তরীকাহ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তখন তাদের এই আংশিক কর্মকাণ্ড অবশ্যই বর্জনীয় হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নাযিলকৃত আহকাম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে যে দলটি কর্মরত তাকে অবশ্যই তার প্রয়োজনীয় কর্তব্যসমূহ পালন করতে হবে; যেমন সে খলিফার দায়িত্বসমূহ গ্রহণ করবে না। অথবা ব্যক্তিবিশেষের হুকুমসমূহকে নিজের জন্য গ্রহণ করবেনা অথবা নিজেকে পুরো ইসলামী উম্মত বলেও মনে করবেনা বরং নিজেকে মুসলিম উম্মতের মধ্যকার একটি দল বলে মনে করবে এবং আল্লাহর আহকাম প্রতিষ্ঠিত করা ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করাকে নিজের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করবে। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তখন সে প্রয়োজনীয় সবকিছু গ্রহণ করবে, যেমন: সে ইসলামী আক্বীদাহ’র সঠিক রূপটিকে এবং এর সাথে সম্পর্কিত চিন্তাগুলোকে গ্রহণ করবে এবং গ্রহণকৃত আক্বীদাহ’র আলোকে এর শাবাবদেরকে গড়ে তুলবে। উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি, জনগণকে শাসন করার জন্য নির্দিষ্ট সংবিধান এবং মুসলিমদের মধ্যে বিদ্যমান ভ্রান্ত চিন্তাসমূহের ভ্রান্ততা দূর করে শুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তাসমূহ দলটিকে গ্রহণ করতে হবে। দলের সাথে যারা কাজ করে তারা যেন নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয়াদি যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে একজন পরহেযগার মুসলিম হতে পারে সে বিষয়টিও দলের নজরে থাকতে হবে। যার ফলে আক্বীদাহ, ইবাদাত, সামাজিক লেনদেন এবং নৈতিকতা প্রভৃতি বিষয়ে সে প্রয়োজনীয় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার উপরে দলটিকে focus করতে হবে যার সমস্ত সম্পর্ক হবে ইসলামের ভিত্তিতে এবং যার নিরাপত্তা রক্ষিত হবে খিলাফত রাষ্ট্রের মাধ্যমে। শাসকশ্রেণী এবং তাদের প্রভুদের কর্মকাণ্ড দলটিকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যাতে সে বুঝতে পারে মুসলিমদের জন্য কোন কোন ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। দলটিকে এসব বিষয় জনগণের সামনে উন্মোচন করতে হবে এবং উম্মাহর জন্য যা কল্যাণকর অর্থাৎ শরঈ আহকাম তা নিজস্ব অবস্থান থেকে দলটিকে গ্রহণ করতে হবে। এসব তাগুত যারা মুসলিমদের সাথে নিষ্ঠুরভাবে আচরণ করে তাদের কাছ থেকে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা দখল করে নেওয়ার জন্য দলটিকে কাজ করতে হবে। যদি এসব বিষয় যথাযথভাবে দলটি পালন করে তাহলে সে তার দায়িত্ব পরিপূর্ণ করবে।
দলটির চিন্তাভাবনাসমূহ বিস্তৃত হতে হবে এবং এর কর্মক্ষেত্র হতে হবে প্রসারিত। এজন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই দলটিকে সম্পাদন করতে হবে এবং বাস্তবে এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে অনেক বিষয়। প্রয়োজনীয় সমতা বিধান করে দলটিকে এর কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে হবে; অতএব সে শরীরচর্চা বা নৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো সংগঠন হবেনা … বরং অবশ্যই এটি এর রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অব্যাহত রাখবে। অতএব, এর চিন্তাভাবনাসমূহ হবে উম্মাহর বিষয়সমূহ দেখাশোনা করা এবং উম্মাহর স্বার্থসমূহ সংরক্ষণ করা।
অতএব, পূর্ববর্ণিত উপায়ে আংশিক কার্যক্রম অবশ্যই পরিত্যাজ্য। দলের জন্য নির্ধারিত এবং অনির্ধারিত সমস্ত কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকভিত্তিতে বাস্তবায়নের চিন্তাও একটি ভুল চিন্তা যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
আন্দোলন কি আঞ্চলিক হবে নাকি বৈশ্বিক?
যেহেতু সমগ্র পৃথিবীর জন্য ইসলাম একটি দ্বীন হিসেবে এসেছে এবং মুহাম্মাদ (সা) পুরো মানবজাতির জন্য নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন সেজন্য কিছু মুসলিম প্রস্তাব করে যে ইসলামী আন্দোলনকেও বৈশ্বিক হতে হবে। এছাড়া বাস্তবতা বিবেচনা করলেও দেখা যায় ইসলামী আন্দোলনকে বৈশ্বিক বিভিন্ন আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উপরন্তু, ইসলামী পরিবর্তন সূচিত করার লক্ষ্যে যে বিশাল কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন সেজন্যও প্রয়োজন বৈশ্বিক আন্দোলন। যারা এরূপ ধারণা পোষণ করে তারা প্রমাণ হিসেবে কুরআনের এ আয়াতগুলো উদ্ধৃত করে:
“এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্যে এবং রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্যে।”
(আল কুরআন ২:১৪৩)“বলে দিন (হে মুহাম্মাদ): ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রাসূল।”
(আল কুরআন ৭:১৫৮)“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানেনা।”
(আল কুরআন ৩৪:২৮)এজন্যই আমরা দেখি রাসূল (সা) পুরো মানবজাতি, প্রত্যেকটা শক্তি ও দল এবং রাজার নিকট তাঁর দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন। তিনি নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার রাজা), হিরাক্লিয়াস (রোমের সম্রাট), মুকাওকিস (মিশরের সম্রাট) এবং কিসরা (পারস্যের সম্রাট) সবার নিকট পত্র পাঠিয়েছিলেন। এজন্য ইসলামী কর্মকাণ্ডকে কোনো একটি দোকান বা মাঠে বিচ্ছিন্নভাবে রেখে দেয়া যায়না। যার ফলে ইসলামী কর্মকাণ্ড কেবল একটি উপত্যকা থেকে উঠে আসা আর্তচিৎকার বলে মনে না হয়।
প্রকৃতপক্ষে, আক্বীদাহ এবং ব্যবস্থার দিক থেকে ইসলাম একটি বৈশ্বিক দ্বীন।
মূল্যহীন তরল (শুক্রাণু) থেকে সৃষ্ট এবং দুর্বল ও চাহিদাসম্পন্ন মানবজাতি অবশ্যই ফিরে যাবে সেই মহান সত্তার নিকট যিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, সমস্ত বিষয়ের পরিচালনাকারী এবং সর্বজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞাত। আল্লাহই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই পুরো মানবজাতির রব। পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের সাথে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য জড়িত, যা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত। জীবনের পরের ঘটনাসমূহ অর্থাৎ পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম এবং ঈমান ও কুফর, আনুগত্য ও অবাধ্যতার প্রতিদান প্রভৃতি বিষয়ের সাথেও তার অস্তিত্ব জড়িত। আক্বীদাহ’র সত্যতার প্রমাণ অবশ্যই সঞ্চালিত হতে হবে এবং সকলের নিকট তা পৌঁছাতে হবে;
“যাতে যেসব লোক নিহত হওয়ার ছিল তারা (ঈমান প্রত্যাখ্যানের ফলে) নিহত হয় প্রমাণ প্রতিষ্ঠার পর এবং যাদের বাঁচার ছিল তারা বেঁচে থাকে প্রমাণ প্রতিষ্ঠার পরে।”
(আল কুরআন ৮:৪২)ইসলামী আক্বীদাহ থেকে উৎসারিত যে জীবনব্যবস্থা আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন সেটা বর্ণ, গোত্র বা অবস্থানের ঊর্ধ্বে সমস্ত মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম হচ্ছে একটি বৈশ্বিক জীবনব্যবস্থা। অতএব, ইসলামকে প্রতিষ্ঠার যে বীজ বপন করা হবে তা যেন হয় একটি বৈশ্বিক বীজ— সেজন্য ইসলাম আমাদেরকে বাধ্য করে। ইসলাম দলটিকে বাধ্য করে যাতে সে এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। ফলে দলটি নিজেদের কর্মকাণ্ডকে সংকীর্ণরূপে দেখতে পারে না অথবা কোনো একটি দেশে এর কর্মকাণ্ডকে সে সীমিতও করতে পারে না। কোনো গেঁাজামিল দেওয়া অথবা ক্রমান্বয়িক প্রস্তাবনাও সে গ্রহণ করতে পারে না যার ফলে সত্যকে আংশিকভাবে গ্রহণ করবে এবং সত্যের চরম রূপ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে। বরং দলটিকে এটা এভাবে দেখতে হবে যে সে কুফরের নষ্টামি এবং শিরকের বিভ্রান্তি থেকে মানবজাতিকে একক সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অতীতে লোকজন মনে করত যে, মূর্তি মানুষের মঙ্গল করে এবং মঙ্গল-অমঙ্গলের বিষয়টি মূর্তির হাতেই নিহিত। বর্তমানে কিছু নির্দিষ্ট চিন্তাকে মানুষ কল্যাণ আনয়নকারী বলে মনে করে এবং অন্য চিন্তাকে ক্ষতিকর বলে মনে করে। এসমস্ত বিষয় বিবেচনায় রেখে দলটিকে প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা গ্রহণ করতে হবে— যার উপর ভিত্তি করে নিজেদের কর্মকাণ্ড এবং চলার পথ তাকে স্থির করতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে যদি দলটি ধৈর্যে্যর সাথে এবং কোনোরূপ বিচ্যুতি প্রদর্শন না করে, দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় পথ না চলে, আপোষ না করে এবং নমনীয়তা প্রদর্শন না করে, তাহলে আল্লাহ দলটিকে সেরকমভাবে প্রস্তুত করবেন যা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে এই দায়িত্বকে বৈশ্বিকভাবে পালন করতে সক্ষম হয়। চিন্তার দিক থেকে দলটি বৈশ্বিক, কিন্তু কাজের দিক থেকে বাস্তবিকভাবে চিন্তা করতে গেলে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে এবং এর বাইরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। অতএব, এই বিশাল দায়িত্বটি খিলাফত রাষ্ট্রের কাজ।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। বর্তমানে মুসলিমরা যেসব ভূখণ্ডে বাস করছে সেগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হয়েছে এবং এসব ভূখণ্ডের মুসলিমরা প্রায় একইরকম পরিবেশে আছে। ফলে কোনো সুসংগঠিত কর্মকাণ্ড যদি এসব ভূখণ্ডে বিস্তার লাভ করতে চায় তাহলে এর পদ্ধতি পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই, যদিও এসব রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সামান্য কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। দলটির বিস্তৃতি একে শক্তিশালী করে তুলবে, এর সচেতনাকে বৃদ্ধি করবে এবং একে আরো কার্যকর করে তুলবে। কোনো ভূখণ্ডে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের বিস্তৃতির জন্যও তা সহায়ক হবে। ফলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরের দায়িত্ব বহন করতে দলটির জন্য তা সহায়ক হবে এবং রাষ্ট্রের জন্য বৈশ্বিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ সহজতর হবে। উভয় পরিস্থিতিতেই দলটিকে নির্ভর করতে হবে আল্লাহর সাহায্যের উপরে।
একাধিক দলের বৈধতা
এই বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে একাধিক দলের বৈধতাকে যেসব দলীলের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয় সেগুলোকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এর ফলে অন্যান্য যেসব মত একাধিক দলের উপস্থিতিকে অনুমোদন করে সেগুলোও বৈধ হয়ে যায়নি। কারণ কোনো বিষয় অবৈধ হলেই বিপরীত বিষয়টি বৈধ বলে প্রমাণিত হয়ে যায়না। এর জন্য এমনসব দলীলের প্রয়োজন যেগুলো ইসতিদলাল ও ইসতিনবাদের যথার্থতাকে প্রমাণ করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এক্ষেত্রে কী কী দলীল বিদ্যমান?
অসংখ্য দলীল রয়েছে যেগুলো ফুরু’র (আহকাম) ক্ষেত্রে মতভেদকে অনুমোদন করে, উসূলের (আক্বীদাহ) ক্ষেত্রে নয়। ফুরু সংক্রান্ত মতভেদকে অনুমোদনের ব্যাপারে সুন্নাহ’তে নির্দেশনা আছে। এজন্যই আমরা দেখি সাহাবীদেরকে (রা), তাবিঈন এবং সলফে-সালেহীন (পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল) উলেমাদেরকে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করতে। মতভেদ নিষিদ্ধ হওয়ার দলীলগুলো এসেছে মূলত কাফিরদের মতভেদ সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থাৎ দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহে, ফুরু’র ক্ষেত্রে নয়। উদাহরণস্বরূপ, নবীগণ, পুনরুত্থান, জীবন, মৃত্যু এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের ব্যাপারে তাদের মতভেদ ছিল যার ফলে তারা ভিন্ন সম্প্রদায়, দল এবং মিলাল ও নিহালে পরিবর্তিত হলো। তাদের নবীদের নিকট আল্লাহ যে সত্য প্রেরণ করেছিলেন সেগুলো থেকে তারা অনেকদূরে সরে গিয়েছিল এবং নবীদের অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছিল। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“অতঃপর তাদের মধ্যে দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করল। সুতরাং, মহাদিবস আগমনকালে তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।”
(আল কুরআন ১৯:৩৭)এজন্য কাফিরদের অনুরূপ মতভেদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
পরিখার যুদ্ধের দিন সাহাবীদের ভিন্ন ভিন্ন মতকে রাসূল (সা) অনুমোদন করেছিলেন। তিনি (সা) বলেছিলেন:
“যে শুনে এবং আনুগত্য করে, সে যেন বনী কোরাইযা না পৌঁছে আসরের সালাত আদায় না করে।”
[সীরাতে ইবনে হিশাম]এই হাদিসটি থেকে নিচের বিষয়গুলো প্রতিপাদন করা যায়:
১) মুজতাহিদ ভুল করতে পারেন আবার সঠিক সিদ্ধান্তেও পৌঁছতে পারেন। অর্থাৎ মুজতাহিদ হওয়ার মানে এই না যে সে কোনো ভুল করতে পারবে না।
২) মুজতাহিদ কর্তৃক প্রতিপাদিত হুকুম হচ্ছে একটি শরঈ হুকুম, এমনকি যদি তা ভুলও হয়।
৩) মুজতাহিদ জেনেশুনে কোনো ভুল করেন না, তবে নিজের ভুল সম্পর্কে যদি জানতে পারেন তাহলে ভুলের মধ্যে থাকার কোনো সুযোগও তার নেই। নিজের দৃষ্টিতে তার সিদ্ধান্ত অন্যদের চাইতে শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হওয়াতেই তিনি ঐ মতটি পোষণ করেন।
৪) মুজতাহিদ আল্লাহ কর্তৃক পুরস্কৃত হবেন; তবে ভুল বা সঠিক হওয়ার কারণে পুরস্কার ভিন্ন হবে।
এ ব্যাপারে ইমামগণ একমত যে, ফিকহের কোনো সংশয়যুক্ত বিষয়ের শরঈ হুকুম প্রতিপাদনের ক্ষেত্রে ভুল হলে মুজতাহিদ গোনাহগার হবেন না।
আল কুরতুবী (র) তাঁর তাফসীরে বলেন; “ঐক্যবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিষয়ের হুকুমের ব্যাপারে সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ ছিল।” আল-বাগদাদী তার ‘আল ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ’ গ্রন্থে উমর বিন আব্দুল আযীয এর একটি মন্তব্য বিবৃত করেছেন: “মুহাম্মদ (সা)-এর আসহাব (রা) যদি মতভেদ না করতেন তাহলে আমি সন্তুষ্ট হতে পারতাম না, কারণ সেক্ষেত্রে আমাদের জন্যও (মতভেদ করার) সুযোগ থাকতনা।”
বিখ্যাত অনেক মুসলিম উলেমা তাদের গ্রন্থে মতভেদের কারণসমূহ বিবৃত করেছেন।
তাদের অন্যতম একটি হচ্ছে, কোনোকিছু বুঝার ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষমতা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানুষে মানুষে ভিন্ন হয়। মানুষের ক্ষমতা ভিন্ন হওয়াতে তাদের সিদ্ধান্তেও ভিন্নতা আসে। এজন্যই সাহাবাদের (রা) যুগ থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন ইজতিহাদ এবং ভিন্ন ভিন্ন ইসতিম্বাত চলে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে শরীয়াহ’র প্রকৃতি যার জন্য মানুষ ভিন্নমতে উপনীত হয় এবং এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর করুণা।
— কিরাআতের (পঠন পদ্ধতি) ভিন্নতার কারণেও সিদ্ধান্তে ভিন্নতা আসে। কোনো মুজতাহিদ যেভাবে পড়েছেন সে আলোকেই তিনি চিন্তা করবেন। এরূপ মতভেদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওযু সংক্রান্ত একটি আয়াত যার আলোকে প্রশ্ন ওঠেছে পায়ের পাতা কি ধুতে হবে নাকি মুছে ফেললেই হবে?
— কিছু হাদীসের ব্যাপারে উলেমা এবং ফুকাহগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হাদীসকে গ্রহণ বা বর্জন করার যে পদ্ধতি কোনো ইমাম প্রয়োগ করেন তার আলোকে কোনো হাদীস একজনের দৃষ্টিতে সহীহ হলেও তা অন্যজনের দৃষ্টিতে সেরূপ নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মুরসাল হাদীসের বিষয়টি দেখা যেতে পারে। এই উম্মতের ইমামগণের মধ্যে মুহাদ্দিস (হাদিস বিশেষজ্ঞ), উসূলী আলেম (আইনশাস্ত্রের ভিত্তি নিয়ে যারা আলোচনা করেন) এবং ফকীহদের (আইনজ্ঞ) মধ্যে মুরসাল হাদীসকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ একে দলীল হিসেবে ব্যবহার করেছেন আর কেউ কেউ মুনকাতী হাদীস (যে হাদীসের বর্ণনাকারীদের ধারার মধ্যে কোথাও ফাঁকা আছে) বলে একে ব্যবহার করেননি।
— মতভেদের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে দলীলসমূহের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক বিষয়াদি। উদাহরণস্বরূপ, কিছু দলীলে চিকিৎসাকার্যে নাজাস (অপবিত্র কিছু) এবং হারাম উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যেমন:
“প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ রোগ এবং এর প্রতিকার উভয়ই দিয়েছেন এবং প্রত্যেক রোগের জন্যই তিনি এর প্রতিকার দিয়েছেন। অতএব, হারাম কিছু দিয়ে প্রতিকার করো না।”
[আবু দাউদ কর্তৃক বর্ণিত]অন্যদিকে কিছু দলীলে আবার নাজাস অথবা হারাম উপকরণ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যেমন:
“রাসূল (সা) আব্দুর রহমান বিন আওফ এবং আয—যুবাইরকে সিল্ক পরিধানের অনুমতি দিয়েছিলেন কারণ তারা চর্মরোগে ভুগছিলেন।” এছাড়া নিচের হাদীসটি
“মুসলিমগণ ওষুধ হিসেবে উটের মূত্র ব্যবহার করতেন এবং এতে দোষের কিছু আছে বলে মনে করতেন না।”
[বুখারী থেকে বর্ণিত]— যখন কোনো বিষয়ে স্পষ্ট দলীল থাকে না তখন সে বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হুকুম বের করার জন্য প্রয়োজন ইজতিহাদের এবং ইজতিহাদ হচ্ছে একটি অনুমানমুলক সিদ্ধান্ত যাতে মতভেদের সুযোগ থাকতে পারে।
— মতভেদের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে অর্থের দিক থেকে আরবি ভাষার ব্যাপকতা। ইশতিরাক (ভিন্নার্থবোধক সমোচ্চারণ শব্দ), হাকীকাহ (আক্ষরিক অর্থ), মাজায (উপমা), মুতলাক (চরম) এবং মুকাইয়্যাদ (সীমিত), আম (সার্বজনীন) এবং খাস (সুনির্দিষ্ট) প্রভৃতি বিষয়ের উপস্থিতিই হচ্ছে এর প্রমাণ। কুরআন নাযিল হওয়ার ভাষা আরবির প্রকৃতিই হচ্ছে এরকম যে এর প্রকাশভঙ্গি এবং বাক্যপ্রকরণ (সিনট্যাক্স) এর কারণে তা বিভিন্ন অর্থ এবং বৈচিত্র্যময় নির্দেশনার জন্ম দেয়।
ফলে তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের ব্যাপারে আল্লাহর এই আয়াত:
“আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন কুরু পর্যন্ত।”
(আল কুরআন ২:২২৮)এখানে ব্যবহৃত কুরু শব্দটির অর্থ আরবিতে হতে পারে পবিত্র অথবা ঋতুস্রাবকালীন সময়। প্রশ্ন হচ্ছে এখানে কোন অর্থটিকে বোঝানো হয়েছে? এজন্য এই বিষয়টিতে ফুকাহাগণের মতভেদ করার অন্যতম একটি কারণ এটি।
সাধারণভাবে বলতে গেলে এটিই হচ্ছে এ সংক্রান্ত শরঈ আলোচনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে তাদের কোনো একটিও কি আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে? অর্থাৎ শরঈ আহকামের ব্যাপারে মতভেদ করার যে সুযোগ শরীয়াহ অনুমোদন করেছে তার আলোকে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কর্মরত একাধিক আন্দোলন বা দলের বিষয়টি কি অনুমোদিত হয়? নাকি এ বিষয়ের নিজস্ব কিছু সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি বিদ্যমান যেগুলো একে মূল নিয়ম থেকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে?
মৌলিক নিয়মসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বাদে শরঈ দলীলের অন্য যেসব জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই জ্ঞানকে অন্যান্য বিষয়ের শরঈ জ্ঞানের মতই ভিন্নভাবে বোঝার সুযোগ আছে। যেহেতু দলটি কর্তৃক গ্রহণকৃত শরঈ হুকুম হচ্ছে কিছু প্রতিপাদিত হুকুম সেহেতু সেগুলো ভুল বা সঠিক দুটোই হতে পারে। কোনো মুসলিম যদি দেখে যে একটি দলের চিন্তায় প্রচুর ভুল রয়েছে তাহলে সেই দলের সাথে কাজ করা তার জন্য উচিত হবে না। বরং তখন দলটিকে উপদেশ দিতে হবে এবং এমন একটি দলের খেঁাজ করতে হবে যার সাথে কাজ করার মাধ্যমে সে আল্লাহর নিকট নিজেকে গোনাহমুক্ত রাখতে পারে। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে মানবীয় প্রকৃতি, উলেমাগণের ভিন্নমত এবং শরীয়াহ ও আরবি ভাষার প্রকৃতি থেকে বোঝা যায় যে ভিন্নমতে পৌঁছার বিষয়টি অনুমোদিত। আর এ কারণেই একাধিক দল অস্তিত্বে আসতে পারে। তবে এই বিষয়টি ততক্ষণ পর্যন্ত দোষের কিছু না যতক্ষণ পর্যন্ত তা শুধুমাত্র জ্ঞানের ক্ষেত্রে মতভেদ সংক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে যে দলটি সত্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী তার সাথে কাজ করা ফরয।
এছাড়া নিচের আয়াতটি:
“আর তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল বের হোক যারা মানুষকে খায়র (ইসলাম) এর দিকে ডাকবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজের নিষেধ করবে। আর এরাই হচ্ছে সফলকাম।”
(আল কুরআন ৩:১০৪)এই আয়াতটি কমপক্ষে এমন একটি দল প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিচ্ছে যার কাজ হবে: খায়র (ইসলাম)-এর দিকে ডাকা, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজের নিষেধ করা। এই আয়াতটি কেবলমাত্র একটি দলের উপস্থিতিকে বুঝাচ্ছে না; যদি তাই হতো তাহলে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলতেন: ‘উম্মাহ ওয়াহিদা (এক উম্মত)’। বরং এখানে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে কাজের ধরন সম্পর্কে যা হচ্ছে দাওয়াত দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজের নিষেধ করা। এটি ফরযে কিফায়া যা বাস্তবায়নের জন্য কমপক্ষে একটি দলের প্রয়োজন। ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে একাধিক দল সৃষ্টি হলে তাতে দোষের কিছু নেই। এই ধরনের নির্দেশনা শতশত আয়াত ও হাদীসে বিদ্যমান আছে। উদাহরণস্বরূপ নিচের হাদীসটি;
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুনকার সংঘটিত হতে দেখে তাহলে সে যেন নিজের হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়…” যা কোনো একটি মুনকারকে বুঝাচ্ছে না বরং মুনকারের ধরন সম্পর্কে বুঝাচ্ছে।
Abu al-A’la al-Mawdudi (may Allah have mercy on him) mentioned the following in his book ‘Islamic concepts regarding religion and state’ under the chapter on: The obligation of enjoning the ma’roof and forbidding the munkar; “What is apparant from the partative in the ayah;
‘আর তোমাদের মধ্যে থেকে বের হোক একটি দল যারা মানুষকে খায়র (ইসলাম)-এর দিকে ডাকবে।’ তার অর্থ এই না যে, ইসলামের দিকে ডাকা, সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজের নিষেধ করার ফরয দায়িত্বটি কেবলমাত্র একটি দলের এবং এই দলের বাইরের মুসলিমদের জন্য এই কাজগুলো ফরয না। বরং এর মানে হচ্ছে উম্মাহর মধ্যে কমপক্ষে এমন একটি দল সবসময়ই থাকা ফরয যা হক্ব ও খায়র-এর আলোকবর্তিকাকে রক্ষা করবে এবং অন্যায় ও বিভ্রান্তির অন্ধকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। যদি উম্মাহর মধ্যে এরকম কোনো একটি দলও বিদ্যমান না থাকে তাহলে মানবজাতির জন্য উত্থানকৃত সর্বোত্তম উম্মত আল্লাহর অভিশাপ ও ভয়ঙ্কর শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।”
পূর্বে আমরা যা বর্ণনা করেছি তার আলোকে বলা যায়:
আমাদেরকে এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে যে শরীয়াহ যা অনুমোদন করেছে তা হচ্ছে আমাদের জন্য অনুগ্রহস্বরূপ। যদি এটি কোনো বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তা কেবল মুসলিমদের ভুল বোঝার পরিণতি, অন্য কিছু না। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, দুজন মহান ইমামের উন্নত ফিকহ আমাদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। ‘শুযূর আয-যাহাব’ (স্বর্ণখণ্ড)-এ বর্ণিত আছে, ইমাম শাফেঈর ছাত্ররা একদিন তার নিকট এসে অভিযোগ করল তিনি কিভাবে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সাথে দেখা করেন যেখানে ইমাম হাম্বলের ছাত্ররা তাদের সাথে ভিন্নমতের বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ ব্যাপারে শাফেঈ বলেন:
তারা বলল; ‘আহমাদ আপনার সাথে দেখা করে এবং আপনি তার সাথে দেখা করেন’,
আমি বললাম, ‘তার গৃহে কল্যাণ আছে। যদি তিনি আমার সাথে দেখা করেন তাহলে তাকে ধন্যবাদ আর যদি আমি তার সাথে দেখা করি তাহলে সেটা তারই বদান্যতা। উভয়ক্ষেত্রেই প্রশংসা তার।’
একই ধরনের ঘটনা ইমাম আহমাদ এবং তার ছাত্রদের মধ্যে ঘটেছিল। ইমাম আহমাদ তখন তার ছাত্রদেরকে বললেন;
“যদি আমাদের বংশ ভিন্ন হয় তাহলে যে জ্ঞানটি আমাদেরকে এক করবে তা হচ্ছে আমরা একই পিতা থেকে এসেছি; যদি আমরা ভিন্ন সমুদ্রের পানি হই, তাহলে বুঝতে হবে যে আমরা একই উৎস থেকে নিঃসৃত বিশুদ্ধ পানি।”
— শরীয়াহ’র প্রকৃতি এবং মানবীয় প্রকৃতির বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে যদি কেউ মনে করে যে, সে কোনো কাজের ব্যাপারে সমস্ত মুসলিমকে এক করে ফেলবে তাহলে তাকে আমরা সেই কথাটি বলতে চাই যেই কথাটি ইমাম মালিক হারুনুর রশীদকে বলেছিলেন, যখন হারুনুর রশীদ মালিকের জ্ঞান ও মাযহাবকে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, একে লোকজনের উপরে বাধ্যতামূলক করতে চেয়েছিলেন এবং অন্যদের জ্ঞানকে নিষিদ্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন; “লোকজনের জন্য সংকীর্ণ করে দিওনা, যখন আল্লাহ তাদেরকে প্রশস্ততা দিয়েছেন।”
— যখন কুফর রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রযন্ত্র দেখতে পায় কোনো এক বা একাধিক দল আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে ও জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে তখন তারা চায় এসব দলকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে দিতে অথবা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঠিক দলগুলোকে ব্যর্থ করে দিতে। যদি আমরা ধরে নিই যে একাধিক দলের বিষয়টি অনুমোদিত নয় তাহলে সঠিক দলটিকে অন্যান্য দলের সাথে এক হয়ে যেতে হবে এবং ফলে ভালো ও খারাপের সংমিশ্রণ ঘটবে। কিন্তু শরীয়াহ’র নির্দেশ হচ্ছে বিপরীত অর্থাৎ আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে খারাপকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে এবং উত্তমকে সাথে রাখতে যাতে লোকজন উপকৃত হয়।
— যেহেতু এই প্রস্তাবনাটি (ইসলামী কর্মকাণ্ডসমূহকে এক করে ফেলার বাধ্যবাধকতা এবং একাধিক দলের উপস্থিতিকে নিষিদ্ধ করা) শরীয়াহ, মানবীয় প্রকৃতি এবং যে ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে তার প্রকৃতিগত বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সেহেতু এই প্রস্তাবনাটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে থাকলে আমরা এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ খিলাফত প্রতিষ্ঠা থেকে দূরে সরে থাকব। মুসলিমরা যতক্ষণ এক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ সাহায্য করবেন না, এই মন্তব্য ভিত্তিহীন এবং অগ্রহণযোগ্য। বরং আল্লাহ মুসলিমদেরকে ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্য করেন না যতক্ষণ না তারা শরীয়াহ’র আনুগত্য করছে, আল্লাহর রজ্জুকে অঁাকড়ে ধরছে এবং তাঁর (সুবহানাহু তায়ালার ) নির্দেশগুলো পূরণ করছে। এক্ষেত্রে যদি তারা সংখ্যায় অল্প হয় তবুও তাদেরকে আল্লাহ সাহায্য করবেন। কারণ সত্যের ব্যাপারে প্রতিশ্রম্নতিশীল একজন লোকই অনেক বেশি বলে গণ্য এবং বিপরীতে ভ্রান্ত পথের অনুসারী অনেক হলেও তারা সমুদ্রের ফেনার মতো বলে বিবেচিত।
এই বিষয়ে একটি কথা না বললেই নয় যে, খলিফা এবং ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে মুসলিমদেরকে এক করার সবচেয়ে বড় দিক এবং এটি ছাড়া কোনো একত্রীকরণ সম্ভব না। ভিন্ন ভিন্ন সিদ্বান্ত থাকতে পারে কিন্তু আমরা খলিফার আনুগত্য করতে নির্দেশপ্রাপ্ত। ইমাম কোনো হুকুম গ্রহণ করে এবং গ্রহণকৃত হুকুমের সাহায্যে মুসলিমদের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করে কিন্তু তিনি ভিন্নমতকে প্রতিরোধ বা নিষিদ্ধ করেন না। মুসলিমরা তার নির্দেশ প্রকাশ্যে এবং গোপনে মানতে বাধ্য। কোনো দলের আমীরের নির্দেশ দলের ভিতরের সবাই মানতে বাধ্য এবং তিনি বৃহৎ পরিসরে সমস্ত মুসলিমের সমস্যার সমাধান না করলেও দলের সদস্যদের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করেন।









