তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২১১তম অধ্যায়: চিন্তা (Idea) ও পদ্ধতি (Method) হিসেবে আদর্শের প্রতি আনুগত্য
যখন পশ্চিমা কাফেররা তাদের জীবনব্যবস্থাকে এমনভাবে চাপিয়ে দিতে সক্ষম হলো যাতে তা জনগণ অনুসরণ করে, তখন মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনযাপনগত অবস্থান কারও নিকট আর ঈর্ষণীয় পর্যায়ে রইলো না। মুসলিমরা আক্বীদাহ্’র সাথে সাংঘর্ষিক চিন্তাসমূহ দ্বারা নিজেদের জীবন পরিচালিত করতে লাগলো। উম্মাহ্ কখনও যেসব বিজাতীয় চিন্তাসমূহকে গ্রহণ করেনি, তা হতে উৎসারিত পশ্চিমা জীবনদর্শনের সাথে ইসলামী আক্বীদা’হ্ হতে উৎসারিত চিন্তাসমূহের সামঞ্জস্যবিধানের চেষ্টার ফলে মুসলিমরা তাদের সঠিক পরিচিতি ও ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে ফেললো। অজ্ঞতা ও সবকিছু নিজেদের ভিত্তি হতে গ্রহণের অক্ষমতাই এসব ভ্রান্তচিন্তা বিস্তার লাভের জন্য দায়ী। তারা ইসলাম এবং ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ দুটি বিষয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধানের চেষ্টা করলো। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থকে তারা শারীআহ্’র উদ্দেশ্য বানিয়ে ফেললো। যেকোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে এবং যেকোন মনগড়া জিনিসের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করাতে তাদের কোনো আপত্তি ছিল না। পরিণতিতে জনগণের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবন পরস্পরবিরোধী বিষয়ে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। রাজনৈতিক শক্তিগুলো মুসলিমদের প্রকৃত চিন্তাগুলোকে মূল্যায়ন না করে বিজাতীয় চিন্তাসমূহের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী হয়ে পড়লো।
এরকম এক প্রতিকূল পরিবেশে বিদেশী কাফিরদের কতৃর্ক আকৃতি দেয়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভ্রান্ত চিন্তা ও বিশ্বাস, বিপথগামী আবেগের সমন্বয়ে গঠিত সম্প্রদায়কে মোকাবিলার লক্ষ্যে ইসলামী দল ও সংগঠনসমূহ যাত্রা শুরু করে।
এসবের প্রতিষেধক কিংবা নিরাময় এসব দল কিংবা সংগঠনের কাছে থাকা উচিত ছিল। জনগণকে দহনকারী বিভিন্ন বাঁকা পথের পাশে জনগণের অনুসরণীয় একটি সোজা পথনির্দেশনা উপস্থাপন করা উচিত ছিল। জনগণকে তাদের বলা উচিত ছিল,
“নিশ্চিত এটি আমার সরল পথ। অতএব, এ পথে চল এবং অন্যান্য পথে চলো না। তাহলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিবে।”
(সুরা আনআম: ১৫৩)এসব দল কিংবা সংগঠন এমন যোগ্যতা সম্পন্ন হওয়া উচিত ছিল যা তাদের লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হয়। এসব যোগ্যতাসমূহ হচ্ছে চিন্তার স্বচ্ছতা, লক্ষ্য অর্জনের স্পৃহা, সচেতন একটি জনগোষ্ঠী প্রস্তুত করা, উম্মাহ্’কে প্রস্তুত করা এবং পদ্ধতি (Method) সংক্রান্ত প্রতিটি হুকুমের প্রতি আনুগত্য।
দলটি চিন্তাকে (Idea) সবোর্চ্চ গুরুত্ব দিবে। দলের দৃষ্টিতে চিন্তা হচ্ছে সেই সত্য যার দিকে জনগণ ফিরে আসা উচিত, এবং এটা হচ্ছে পথনির্দেশ যা মানবজাতির চলার পথকে আলোকিত করবে। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে বান্দাদের জন্য রহমতস্বরুপ। এটা মানুষকে অন্ধকারাচ্ছন্ন প্রবৃত্তিজাত চাহিদা থেকে বের করে নিয়ে আসবে। এটা মানুষের সামঞ্জস্যপূর্ণ, মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, যা মনকে ও আত্মাকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে তোলে। এটি জীবনে সুখ বয়ে আনে এবং আশা জাগায়। এতে রয়েছে সেই গভীরতা ও পরিপূর্ণতা যা জীবন সম্পর্কে মানুষের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সামর্থ্য রাখে এবং এই জীবনের আগের ও পরের বাস্তবতার সাথে মানুষকে সম্পৃক্ত করে। সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের সঠিক সম্পর্ক স্থাপন করে, ফলে মানুষ তার এই জীবনের সঠিক উদ্দেশ্য কী তা উপলব্দি করতে সক্ষম হয় এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক প্রশান্তিময় জীবনের স্বাদ পায়।
এই চিন্তা ধারণকারী দলটি এটাও বিশ্বাস করে যে যখন এই চিন্তা সমাজে বিদ্যমান থাকেনা তখন কোনোরকম বাধা ছাড়াই মুনকার ও মিথ্যাচার চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে, মানুষ তার খেয়ালখুশীর অনুসরণ করা শুরু করে, যুলুম সংঘটিত হয় এবং জাহেলিয়াত বিস্তার লাভ করে। তখন সংকীর্ণ এক কঠিন জীবন মানুষকে নিদ্রাহীন করে তুলে, তাদেরকে কখনোই সন্তুষ্ট চিত্তে পাওয়া যায় না। না তাদের আচরণ থাকে স্বাভাবিক কিংবা অন্তরে কোনো প্রশান্তি।
দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে হবে এর চিন্তার (ফিকরাহ) দিকে মনোযোগ দেওয়া কারণ এটিই দলের আত্মা এবং তার অস্তিত্বের কারণ। এর যত্ন নেওয়া, বিশুদ্ধতা বজায় রাখা এবং অন্যকিছুর মিশ্রণ থেকে একে রক্ষা করার জন্য দলটির কাজ করতে হবে। অন্যান্য বিজাতীয় কুফর চিন্তা যাতে এর সাথে মিশ্রিত হতে না পারে সে বিষয়টি দলকে নিশ্চিত করতে হবে এবং বিজাতীয় কুফর চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠা সকল আহ্বান ও ধারণা থেকে একে স্বতন্ত্র রাখতে হবে। চিন্তার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হলে দলটির নিকট তার লক্ষ্য (Vision) পরিষ্কার থাকতে হবে। লক্ষ্যের (Vision) স্পষ্টতার জন্য প্রয়োজন সঠিক ইজতিহাদ লব্দ শারী’আহ্ হুকুম সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান; এক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুমকে অবশ্যই ইসলামী আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে হতে হবে।
চিন্তাগুলো (Idea) যখন তার স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা ও স্বচ্ছতা এবং স্বাতন্ত্র্যতা হারিয়ে ফেলে তখন এটি নিজের বিশেষত্বও হারিয়ে ফেলে এবং এটা তখন আর আলোকবর্তিতা, হিদায়াত বা রহমত হিসেবে গণ্য হয়না। দলটি তখন নিজের অস্তিত্বে থাকার কারণ হারিয়ে ফেলে এবং তথাকথিত অন্যান্য আন্দোলনের মতো হয়ে পড়ে; বাস্তবতার নিকট এমনভাবে পরাজিত হয় যে বাস্তবতাকে প্রভাবিত করার পরিবর্তে নিজেই বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে এবং বাস্তবতাকে যথার্থরূপে পরিবর্তন করার পরিবর্তে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যায়।
দলের কর্মীদের মধ্যে চিন্তাসমূহ (Idea) যত স্বচ্ছ হবে ততই তা স্বচ্ছতার সাথে জনগণের নিকট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। চিন্তার (Idea) স্বচ্ছতা থেকেই উদ্দেশ্য স্বচ্ছতা লাভ করে। শারী’আহ্’র অন্যান্য হুকুমের মতো এই উদ্দেশ্য অর্জনের প্রক্রিয়াও শারী’আহ্’র বিভিন্ন হুকুম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
আদর্শিক দল সর্বাবস্থায় আদর্শের আনুগত্য করে। আর এই কারণে আদর্শিক ফিকরাহতে (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) বিশ্বাসী ও এর আহ্বানকারীদের এর অনুমোদন ব্যতীরেকে অন্য কোন উৎস থেকে কোনো কিছু গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। যেহেতু এটি একটি মৌলিক চিন্তা, সুতরাং এটি যেকোনো বিষয়কে তার গোঁড়া থেকে গবেষণা করে এবং মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র উত্তর প্রদান করে। ফলে জীবন সম্পর্কিত সকল প্রশ্নের সমাধান এই মৌলিক চিন্তা থেকে গ্রহণ করা হয় এবং তা হতে উৎসারিত হয়। তখন মানুষের জীবনদর্শন, জীবনের প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী এবং প্রতিটি কর্মকান্ডের মাপকাঠি তার জীবন সম্পর্কে মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সামঞ্জস্যতা লাভ করে।
ইসলামের কাঠামোটি পূর্ণাঙ্গ এবং এতে এমনকি একটি ইটও ফাঁকা নেই। এর সবকিছু একটি অপরটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারণ এগুলো এমন এক অপরিবর্তনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি থেকে উৎসারিত যা মানবজীবনের স্বাভাবিক আচরণ এবং সৃষ্টি জগতের নিয়ম সম্মত।
সুতরাং ইসলামে বিশ্বাসীদের লাভ-ক্ষতির পরিবর্তে হালাল-হারামই হবে কাজের মাপকাঠি এবং প্রতিটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী। কারণ লাভ-ক্ষতি সেই চিন্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেই চিন্তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পরিবর্তে মানুষকে বিধানদাতা মনে করে। জীবনে সর্বোচ্চ ভোগ-বিলাসের সাথে একজন মুসলিমের সুখ সম্পৃক্ত নয় বরং তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সন্তুষ্টির সাথে সম্পৃক্ত। অবাধ স্বাধীনতার চিন্তা যা মানুষকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলে তার বিপরীতে একজন মুসলিমের জীবন হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সার্বভৌমত্বের অধীন ও তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণকারী। ভিত্তিকে যদি কেউ গ্রহণ করে তাহলে তা থেকে উৎসারিত সবকিছুকে তার গ্রহণ করতে হবে। কেউ যদি পরিবর্তন চায় তাহলে ভিত্তি দিয়েই তাকে শুরু করতে হবে এবং সকল পারিপার্শ্বিক চিন্তাগুলোকে ভিত্তির সাথে সমন্বয় বিধান করতে হবে। এই হচ্ছে আদর্শিক ফিকরাহ ও আদর্শিক দাওয়াত যা নিয়ে দলটিকে যাত্রা শুরু করতে হবে। সুতরাং মুসলিমরা, তাদের ব্যবস্থাসমূহ কিংবা বিভিন্ন সংগঠন ইসলামের সাথে অন্যকিছুর মিশ্রণ ঘটাবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। অনুরূপভাবে, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী যদি অন্যান্য উৎসের পাশাপাশি শারী’আহ্’কে একটি উৎস হিসেবে কিংবা শারী’আহ্’র পাশাপাশি অন্যান্য উৎসকে সংমিশ্রণ করে গ্রহণ করে তবে তাও গ্রহণযোগ্য হবে না। ইসলামী দলগুলো যদি ইসলামের বহির্ভূত পাশ্চাত্যের কুফর চিন্তাগুলোকে ইসলামের সাথে সংমিশ্রণ করে তাও গ্রহণযোগ্য হবেনা। এটা সুস্পষ্ট পরাজয় ছাড়া আর কিছুই নয় যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বান্দা তা কখনোই মেনে নেন না।
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত ইবাদত বা আনুগত্যের যোগ্য অন্য কোনো সত্ত্বা নেই, এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী দলগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুনের জন্য পূর্ব কিংবা পশ্চিম কোনোদিকের দ্বারস্ত হওয়াই বৈধ নয়। সকল চিন্তাই যেন আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত হয়, এগুলো যেন নির্ভরযোগ্য শারী’আহ্ দলিলের আলোকে হয় এবং বিস্তারিত দলিলাদি থেকে ইজতিহাদপ্রসূত হয়, এসব বিষয়কে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটি কীভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, কারণ জীবন সম্পর্কে সমাজতন্ত্রের ব্যাখ্যা ‘সৃষ্টিকর্তা বলতে কিছু নেই এবং জীবন নিছক বস্তুমাত্র’। গণতন্ত্রের উৎপত্তি ইসলাম থেকে, এই বক্তব্যটিও কীভাবে ইসলামে সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে পারে যেখানে এই ব্যবস্থাটি ‘দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথকীকরণ’, এই কুফর বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। অনুরূপভাবে দেশপ্রেম বা জাতীয়তাবাদ ইসলাম থেকে এসেছে, এরূপ দৃষ্টিভঙ্গীও কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে যেখানে গোত্রপ্রীতি থেকে জন্ম নেওয়া এসব চিন্তা ইসলামের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য ও পরিত্যাজ্য?
‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ যার অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ব্যতীত আর কোনো বিধানদাতা নেই, এই চিন্তাটি কীভাবে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে অন্যদের সাথে আমাদের অংশগ্রহণ করা উচিত অথবা আমাদের সাথে অন্যদের অংশগ্রহণ করা উচিত এমন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে?
বিশ্বজগতের প্রতিপালকের আনুগত্য, দাসত্ব ও ইবাদতের ধারণার উপরে প্রতিষ্ঠিত ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ কীভাবে পাশ্চাত্য ব্যবস্থার স্বাধীনতার ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে, যা সকল বিষয়ে একমাত্র মানুষকে সার্বভৌম মনে করে? সে সৃষ্টিকর্তার প্রতি ততটুকুই আত্মসমর্পণ করে যতটুকু তার খেয়াল-খুশী, ইচ্ছা ও স্বার্থের অনুকূল হয় ।
প্রকৃতপক্ষে, ইসলামে আক্বীদাহ্’কে রক্ষা করার অর্থ হচ্ছে তা থেকে উৎসারিত সমস্ত কিছুকে রক্ষা করা। অন্যথায় সামঞ্জস্যতা বিধানের অতল গহ্বরে দলের চরিত্র তলিয়ে যাবে; যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর বান্দাগণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেন না।
স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, স্বাতন্ত্র্যতা এবং স্বচ্ছতার দিক দিয়ে চিন্তাটিকে সংরক্ষণের জন্য একে বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া ও পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণের হাত থেকে দূরে রাখতে হবে এবং যেকোনো মিথ্যা, বিকৃতি ও বাগাড়ম্বরতা থেকে একে পবিত্র রাখতে হবে।
দাওয়াত বহনকারীগণ যেমন নিজস্ব লক্ষ্য অনুযায়ী সমাজ পরিবর্তন করতে চায় ঠিক তেমনিভাবে সমাজও তার নিজস্ব ভ্রান্ত ধারনা ও চিন্তা, রাজনৈতিক অবস্থা এবং সামাজিক কাঠামো আঁকড়ে রাখতে চায়, যা পরিবর্তন প্রত্যাশী সংগঠন এবং দাওয়াহ্ বহনকারীদের উপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করে।
১০ম অধ্যায়: ক্রমান্বয়ে ইসলামের বাস্তবায়ন
ক্রমাণ্বয়ে বা ধাপে ধাপে ইসলামকে বাস্তবায়নের যে দূষিত চিন্তাটি সমাজে বিদ্যমান সেটি এবং তা থেকে উদ্ভূত অন্যসব দূষিত চিন্তা যেমন বিদ্যমান ব্যবস্থাসমূহে অংশগ্রহণ প্রভৃতি বিষয়ে আমরা এখানে আলোকপাত করতে চাই, সেগুলোর প্রতি ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে চাই এবং এসব চিন্তার ভ্রান্তি সম্পর্কে উম্মাহকে সচেতন করতে চাই। সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টারত কিছু দলের লোক মানুষের মনে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য এরকম একটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে থাকে যে, ইসলাম থেকে গণতন্ত্র এসেছে ।এর কারণ হচ্ছে তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে এ জাতীয় চিন্তার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে।
অতএব প্রথমেই আমাদের বোঝা দরকার, ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে কি বোঝায়? যারা এই চিন্তাকে ধারণ করে তাদের মতে এতে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে? এই চিন্তাকে ধারণ করার পেছনে কি যুক্তি রয়েছে? এবং এ ব্যাপারে শরঈ হুকুম কি?
যখন মুসলিমরা আধ্যাত্মিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল, বস্তুগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতার দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ল এবং রাজনৈতিকভাবে অধ:পতনের চূড়ান্ত সীমায় গিয়ে পৌঁছাল তখন এই অধ:পতিত অবস্থার ছাপ তাদের চিন্তার মধ্যেও ফুটতে শুরু করল। যারা তখন ইসলামের আনুগত্যের দাবী করত তাদের চিন্তার মধ্যে ইসলামের সত্যতা এবং জীবন সম্পর্কে ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির কোন প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যেতনা; বরং তাদের চিন্তার মধ্যে ইসলামের সত্যতা এবং জীবন সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ভুল এবং দুর্বল ধারণার প্রতিফলন দেখা যেত। কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ যখন মুসলিমদের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল তখন নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী মুসলিমদেরকে পরিবর্তন করার এবং নিজেদের কুফরী ধ্যান-ধারণা ও বৈশিষ্ট্যসমূহ মুসলিমদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার সামর্থ্য অর্জন করল। তারা তাদের বিজাতীয় চিন্তাসমূহ মুসলিমদের অন্তরে প্রোথিত করে দিল যেগুলো ভিন্ন স্বাদের ফল বহন করে এবং ইসলামের শত্রুদের মুখে সুন্দর শোনায় ও তাদের জিহ্বার মিষ্টতা বাড়ায়। ফলাফল যায় কাফিরদের পক্ষে এবং এই ঘটনার জন্য ইসলাম দায়ী ছিলনা বরং দায়ী ছিল ইসলামের অনুসারীদের স্পষ্ট আনুগত্য ও সঠিক জ্ঞানের অভাব। যেসব মুসলিম এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করছিল তারা একদিকে বাস্তবতার দ্বারা এবং অন্যদিকে পার্থিব স্বার্থ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। যাইহোক তাদের এসব ভুল প্রচেষ্টা এবং খোঁড়া পদক্ষেপ দ্রুতই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল এবং কুফরের নিকট চরমভাবে আত্মসমর্পণ করল। ফলে আমাদের ভূমিগুলোতে কোনরকম প্রতিবন্ধকতা অথবা প্রতিরোধ ছাড়াই কুফর অবাধে বিচরণ করতে লাগল। এখন প্রশ্ন হল কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ কিভাবে ইসলামকে আক্রমণ করল? এবং তখন মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
কাফির সাম্রাজ্যবাদীরা এই বলে ইসলামকে আক্রমণ করল যে ইসলাম যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং জীবনের সমস্যাসমূহের সমাধান দিতে সক্ষম নয়। জবাবে মুসলিমরা এমনসব সমাধান বের করতে শুরু করল যা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। যেহেতু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি এবং ইসলামের ভিত্তি সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক সেহেতু তারা এই বৈপরীত্যকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করতে লাগল। নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে তারা বিভিন্ন ভ্রান্ত ব্যাখ্যা দিতে শুরু করল যা থেকে পরবর্তীতে আরো অনেক ভুল ধ্যান-ধারণা এবং বৈশিষ্ট্য জন্ম নেয়। সেসব ভুল ধ্যান-ধারণা এবং বৈশিষ্ট্যসমূহকে তখন ইসলামী শরীয়াহর উপর আরোপ করা শুরু হল যার উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম ও পুঁজিবাদের সামঞ্জস্যতা বিধানের মাধ্যমে এটা প্রমাণ করা যে ইসলাম যুগের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ফলাফল দাঁড়াল এরূপ যে এসব সমাধানকে ইসলামী চিন্তা, মৌলিক নীতিমালা এবং বৈশিষ্ট্য হিসেবে গ্রহণ করা হলো; এগুলো ব্যবহার করে ইসলামকে বোঝার চেষ্টা করা হতে লাগল যদিও এসব চিন্তাকে গ্রহণ করার মানে হচ্ছে বাস্তবে ইসলামকে পরিত্যাগ করা এবং পুঁজিবাদের অনুসরণ করা। সামঞ্জস্যতা বিধান এবং এ চিন্তা দ্বারা আক্রান্ত যেকোন ধ্যান-ধারণার দিকে আহ্বান ছিল প্রকৃতপক্ষে কুফরের গ্রহণ এবং ইসলামের বর্জন। এর মাধ্যমে মুসলিমদেরকে আহ্বান করা হয় যাতে তারা কুফরী চিন্তাসমূহকে গ্রহণ করে এবং ইসলামের প্রকৃত দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে।
অতএব অধ:পতনের যুগে উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য গৃহীত এসব চিন্তা পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তুলল। ফলে উম্মাহকে চূড়ান্ত অধ:পতনের হাত থেকে রক্ষা করতে তারা ব্যর্থ হল কারণ তারা নিজেরাই সেই অধ:পতিত অবস্থায় নিমজ্জিত ছিল।
ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে হোক অথবা অনিচ্ছাকৃতভাবে লোকজনের মুখে এমনসব কথা শোনা যেতে লাগল যা ছিল ইসলামী শরীয়ার জন্য লজ্জাজনক। তারা দাবী করতে লাগল রাসূল (সা) এর চৌদ্দশত বছর পরে সেই সনাতন মানসিকতা নিয়ে ইসলামকে ব্যখ্যা করা নিষ্প্রয়োজন। তাদের মতে আমাদের উচিত পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য নিজেদেরকে এমনভাবে আধুনিকায়ন করা যাতে ইসলাম আবারো নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে। তারা বলতে লাগল ইসলামকে আধুনিকভাবে সজ্জিত করতে হবে এবং এর মধ্যে আধুনিক চিন্তাধারার অনুপ্রবেশ ঘটাতে হবে যাতে অন্তর আবারো এতে আস্থা ফিরে পায়। একে অস্পষ্টতা থেকে এবং লোকজনের অভিযোগ থেকে বের করে আনতে হবে। ফলে ইসলামের পুরানো চেহারা আর জীবিত রইলনা।
যাইহোক এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কিছু মুসলিম বিভিন্ন নতুন চিন্তার উদ্ভাবন শুরু করল। তারা নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক নীতিমালা উদ্ভাবন করল, এগুলোকে সংজ্ঞায়িত করল এবং জীবনকে নতুন পথে পরিচালিত করল। এগুলোই হচ্ছে অধ:পতিত যুগের চিন্তা যেগুলোর জন্ম হয়েছে আমাদের ভূখণ্ডগুলোতে পাশ্চাত্যের নষ্ট চিন্তাসমূহের উত্থানকালে। তখনকার মুসলিমরা ভাবতে লাগল যে ইসলাম যাতে যুগের চাহিদা পূরণ করতে পারে সেজন্য যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা এবং পাশ্চাতের আধিপত্য বিস্তারকারী চিন্তাসমূহ থেকে সুবিধা গ্রহণ করা তাদের জন্য একটি শরঈ দায়িত্ব।
এই নতুন বিন্যাসকে ধারণকারী অনেক চিন্তা সামনে আসতে শুরু করল যেমন; “ধর্ম হচ্ছে একটি নমনীয় এবং পরিবর্তনশীল বিষয়”, “গ্রহণ কর এবং চাহিদা পূর্ণ কর”, “সেসব বিষয় গ্রহণ কর যেগুলো শরীয়তসম্মত অথবা যেগুলো শরীয়ার সাথে সাংঘর্ষিক নয়”, “সেটি গ্রহণ কর যেটি তুলনামূলকভাবে কম খারাপ বা কম ক্ষতিকর”, “যদি পুরো বিষয়টিকে গ্রহণ করতে না পার তাহলে এর অধিকাংশকে ছুঁড়ে ফেলোনা”, “ইসলামকে ক্রমান্বয়ে গ্রহণ কর”, “এই বিষয়টি প্রত্যাখ্যাত নয় যে সময় এবং স্থানভেদে হুকুমের পরিবর্তন হয়” “যেখানে সুবিধা বিদ্যমান সেটিই হচ্ছে আল্লাহর শরীয়াহ”। আধুনিক ইসলামী পুনর্জাগরণের জন্য যারা আহ্বান করত এসব চিন্তা এবং এজাতীয় চিন্তাসমূহ ছিল তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান বা মৌলিক নীতিমালা। বিশ্বব্যাপী এসব চিন্তা ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে অগ্রদূত ছিল freemason জামালউদ্দিন আফগানী এবং শায়খুল ইসলাম নামে পরিচিত তার ছাত্র freemason মুহাম্মাদ আবদুহু।
অন্তরে খারাপ ইচ্ছা এবং কুপরিকল্পনা নিয়ে লোকজন এসব কথা বলতে লাগল যাতে তারা মুসলিমদেরকে তাদের শক্তির উৎস থেকে দূরে সরিয়ে ফেলতে পারে, তাদেরকে দুর্বল করে ফেলতে পারে এবং এভাবে আবারো আল্লাহর হুকুমকে প্রতিষ্ঠিত করা থেকে বিরত রাখতে পারে।
অন্তরে সদুদ্দেশ্য এবং ভাল পরিকল্পনা নিয়েও কিছু লোক এসব কথা বলছিল কারণ তারা ভাবছিল উম্মাহর অধ:পতনের ফলে মুসলিমদের অসুস্থতার আরোগ্যকারী ওষুধ হিসেবে এসব চিন্তা কাজ করবে।
সদুদ্দেশ্যে বলা হোক অথবা অসদুদ্দেশ্যে এসব চিন্তার ফলাফল ছিল একই রকম। যাই হোক আমরা দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফিরদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মুসলিমদেরকে সচেতন করে দিতে চাই এবং তাদেরকে উপদেশ দিতে চাই এসব দূষিত চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দেয়ার জন্য যেগুলোর ভ্রান্তি বাস্তবে প্রমাণিত। কারণ এগুলো কোন মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনা এবং কোন অমঙ্গলও দূর করতে পারেনা। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ আমাদেরকে পৃথিবীর সবচেযে সমৃদ্ধতম জাতিতে পরিণত করেছেন কারণ আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুই ইসলামে আছে যার বাইরে অন্যকিছুর দরকার নেই আমাদের। ইসলামের প্রকৃতিই আমাদেরকে একটি পদ্ধতির সন্ধান দেয় এবং বাধ্য করে সে অনুযায়ী বিধিবিধান নেয়ার জন্য। জীবনের সমস্যাসমূহের সমাধানের জন্য আল্লাহ দ্বীন ইসলাম নাযিল করেছেন এবং আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে শুধুমাত্র ইজতিহাদের মাধ্যমে শরীয়াহ দলীলসমূহ থেকে আল্লাহর হুকুমসমূহ জেনে নেয়া, অন্য কোথাও থেকে নয়। বুদ্ধিবৃত্তিক নীতিমালাসমূহকে অবশ্যই শরীয়াহর দলীলাদি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে কারণ শরীয়াহ দলীলসমূহেরই বিস্তারিত প্রমাণাদি বিদ্যমান। ইজতিহাদের প্রক্রিয়া একটি নির্ধারিত বিষয় যা সবসময় একই রকম থাকবে এবং একে কোন ভাবে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এই ভিত্তি থেকেই আমাদের অগ্রযাত্রার সূচনা হবে যা আমাদের পূর্বেও ঠিক একইভাবে শুরু হয়েছিল।
কিছু নিয়ন্ত্রিত শর’ঈ চিন্তা এবং মৌলিক নীতিমালা উল্লেখ করা প্রয়োজন যেগুলো দ্বারা অবশ্যই আমাদের মনকে নিয়ন্ত্রিত হতে হবে যাতে সেগুলো আমাদের সঠিক পথের নির্দেশনা দিতে পারে এবং সঠিকভাবে বিন্যস্ত করতে পারে ফলে তখন আমরা সে অনুযায়ী কাজ করতে পারব। উদাহরণ স্বরুপ “যেখানে শরঈ হুকুম বিদ্যমান সেটাই স্বার্থ এবং এর বিপরীত নয়”, “কাজের ভিত্তি অবশ্যই শরঈ হুকুম দ্বারা সীমাবদ্ধ হতে হবে”, “নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ না থাকলেই কেবল কোন বস্তু মুবাহ (অনুমোদিত) বলে গণ্য হবে”, “হাসান (প্রশংসনীয়) হচ্ছে তাই যাকে শরীয়াহ হাসান সাব্যস্ত করেছে এবং কাবীহ (নিন্দনীয়) হচ্ছে তাই যাকে শরীয়াহ কাবীহ সাব্যস্ত করেছে ”, “ভাল হচ্ছে তাই যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং খারাপ হচ্ছে তাই যা আল্লাহকে রাগান্বিত করে”, “শরীয়াহর উপরে অন্যকিছুর প্রাধান্য নেই”, “যে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে পড়বে তিনি তাদের জীবনকে সংকীর্ণ এবং কঠিন করে দিবেন”, “অন্য সমস্ত জাতির বাইরে মুসলিসমরা হচ্ছে একটি স্বতন্ত্র জাতি”, “ স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রকে ইসলাম অনুমোদন করে না”, “ ইসলাম একটি স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থা যা অন্যসব জীবনব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি ভিন্ন।”
কিছু শরঈ মূলনীতির সাথে নিজেদেরকে পরিচিত করানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে আমরা যাতে পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলগণের অনুসরণ করতে পারি এবং তাদের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে ইবতিদায় (বিদআতে) লিপ্ত হয়ে না যাই। কারণ প্রত্যেকটা বিদআতই (দ্বীনের মাঝে নতুন সংযোজন) প্রত্যাখ্যাত।
রাসূল (সা) বলেছেন:
“আমি তোমাদের মধ্যে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলে তোমরা কখনো বিপথে যাবেনা। একটি স্পষ্ট বিষয় আল্লাহর কিতাব এবং অন্যটি তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।”
[সীরাতে ইবনে হিশাম]এখানে কখনো শব্দটি দ্বারা পরবর্তী যুগের লোকজনকেও অন্তভূর্ক্ত করে নেওয়া হয়েছে যারা বিপথে যাবেনা; ফলে আমরাও এর অন্তর্ভূক্ত হচ্ছি।
তিনি (সা) বলেছেন:
“আমার উম্মত ৭৩টি ফিরকায় বিভক্ত হবে। তাদের মধ্য থেকে একটি বাদে বাকি সবগুলো জাহান্নামে যাবে।‘ তাঁরা (সাহাবীরা) জিজ্ঞেস করলেন; ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ তারা কারা’? তিনি (সা) বললেন: ‘আমি এবং আমার সাহাবীরা আজকে যে পথের উপরে আছি (সে পথের উপরে যারা থাকবে তারা)।’”
[আবু দাউদ,আত-তিরমিযি,ইবনে মাজাহ এবং ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেছেন:
“আমি তোমাদের জন্য উজ্জ্বল প্রমাণ রেখে যাচ্ছি। আমার পরে পথভ্রষ্টরা ব্যতীত অন্য কেউ তা থেকে বিচ্যুত হবেনা।”
[ইবনে মাজাহ এবং ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেছেন:
“আমার প্রজন্মের লোকেরা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম, তারপরে এদের পরবর্তীগণ এবং তারপরে তাদের পরবর্তীগণ…।”
[মুসলিম হতে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেছেন:
“…তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘজীবী হবে নিশ্চিতভাবেই তারা অনেক বিতর্ক দেখতে পাবে। নতুন উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাক কারণ প্রত্যেকটা নতুন বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেকটা বিদআতই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়…নিজেদেরকে আমার সুন্নাহর উপরে এবং সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহর উপরে রাখ তাদেরকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর।”
[আবু দাউদ এবং আত-তিরমিযি থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) আরো বলেছেন:
“যে কাজ আমাদের বিষয়ের (দ্বীনের) মধ্য থেকে নয় তা প্রত্যাখ্যাত।” [বুখারী এবং মুসলিম থেকে বর্ণিত]
এই হাদীসগুলো আমাদেরকে কল্যাণের (খায়র) অনুসরণ করতে এবং বিদআতের ব্যপারে সতর্ক থাকতে আহ্বান করে। কল্যাণের (খায়র) অনুসরণ করলে তা রাসূল (সা) এর যুগ থেকে অধিক বিচ্যুতির সম্ভাবনাকে দুর্বল করে ফেলে। এ থেকে এই অনুভূতির জন্ম হয় যে যুগ যত পরবর্তী হবে তত কঠোর এবং জোরালোভাবে আনুগত্য করতে হবে আমাদের, সত্যের সন্ধানে অধিক মনোযোগী হতে হবে এবং আরো বেশি আন্তরিক হতে হবে। কারণ আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে যাতে আমরা রাসূল(সা) এর সুন্নাহর উপরে ও সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহর উপরে এবং রাসূল (সা) ও তাঁর সাহাবাদের (রা) সুন্নাহর উপরে থাকি। সুতরাং আমরা নতুন বিষয়ের উদ্ভাবন করবনা এবং নতুন উদ্ভাবিত বিষয়ের অনুসরণও করবনা, কারণ যারা এরূপ করে তারা প্রত্যাখ্যাত। অতএব প্রশ্ন হলো আজকের দিনে এসব বিষয় নিশ্চিত করার উপায় কি?
— ইসলামী আক্বীদাকে নিজেদের অন্তরে স্পষ্টভাবে ও বিশুদ্ধরূপে সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের এবং এটা যাতে কোন অস্পষ্ট বিষয় দ্বারা প্রভাবিত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
— ইসলামের পবিত্র এবং বিশুদ্ধ উৎস থেকেই নিজেদের তৃষ্ণা মিটাতে হবে আমাদের।
— হুকুম বের করার যে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি আছে তা অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে আমাদের কারণ এটা শরঈ হুকুমসমূহকে লোকজনের খেয়াল-খুশী এবং ব্যক্তিগত মতামতসমূহ থেকে রক্ষা করে।
— ইসলামকে নিজেদের জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করতে হবে আমাদের; নিজেদের উপরে, নিজেদের সন্তানদের উপরে, পার্থিব যেকোন সুবিধার উপরে এবং নিজেদের ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপরে তাকে স্থান দিতে হবে; যাতে আল্লাহর কথাগুলো জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) উপরে অন্য কিছুকেই আমরা প্রাধান্য না দেই এবং সেই অবস্থানে থাকি যে অবস্থানে সালফে-সালেহীন (পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলগণের) এর যুগে মুসলিমরা ছিল।
— নিজেদের অন্তর থেকে কুফরের সমস্ত আবর্জনাময় চিন্তা আমাদেরকে ঝেড়ে ফেলে দিতে হবে এবং এর চাকচিক্য ও উত্তেজনা থেকে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে ঠিক তেমনিভাবে যেমনভাবে সাহাবা (রা) গণ ইসলামের প্রবেশদ্বারে জাহিলিয়াতের সমস্ত আবর্জনাময় চিন্তা পরিত্যাগ করে পবিত্র এবং আল্লাহভীরু হিসেবে এতে প্রবেশ করেছিলেন।
আর এসব বিষয় পালনের জন্য আমাদেরকে পূর্ববর্তী যুগের দিকেই ফিরে যেতে হবে কারণ উম্মাহর পরবর্তী যুগে এমন কিছু পাওয়া যাবেনা যা পূর্ববর্তী যুগের চাইতে উত্তম। মুসলিমদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটি একটি অপরিহার্য বিষয়। তাদের নিকটবর্তী হওয়া অথবা দূরবর্তী হওয়ার উপর নির্ভর করেই আমাদের অবস্থা ভাল নাকি খারাপ তা বুঝা যাবে।
উপরোক্ত আলোচনার পর এখন পরিষ্কারভাবে বুঝা যাবে ক্রমধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে কি বোঝায়? যারা এই চিন্তাকে ধারণ করে তাদের মতে এতে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভূক্ত রয়েছে? এই চিন্তাকে ধারণ করার পেছনে কি যুক্তি রয়েছে? এবং এ ব্যাপারে শরঈ হুকুম কি?
ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে বোঝায় কোন নির্দিষ্ট শরঈ হুকুমকে একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করা। একে তারা বলে মারহালিয়্যাহ। এক্ষেত্রে প্রথমে মুসলিমরা এমন একটি হুকুমের দিকে ডাকে যা নিজে শরীয়তসম্মত নয় কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে এটি বিদ্যমান হুকুমের চাইতে শরঈ হুকুমের অধিক নিকটবর্তী। তারপরে তারা শরীয়তসম্মত নয় কিন্তু বিদ্যমান হুকুমের চাইতে শরঈ হুকুমের অধিক নিকটবর্তী হুকুমটিকে ক্রমধাপে পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে প্রকৃত শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করার দিকে আহ্বান করতে থাকে। তারপরে শরীয়তসম্মত নয় এমন একটি হুকুম থেকে অন্য একটি হুকুম যা নিজে শরীয়তসম্মত নয় কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে বিদ্যমান হুকুমের চাইতে শরঈ হুকুমের অধিক নিকটবর্তী, তাতে পরিবর্তন করে অথবা পরিবর্তন করার আহ্বান জানাতে থাকে যতক্ষণনা তাদের দৃষ্টিতে যা প্রকৃত শরঈ হুকুম তা বাস্তবায়ন করতে পারছে।
এর মানে হচ্ছে অল্পকিছু শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা এবং বাদবাকি কুফরী হুকুম বাস্তবায়িত হওয়ার ব্যাপারে ততক্ষণ নীরব থাকা যতক্ষণনা শরীয়াহ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
ধাপেধাপে ইসলাম বাস্তবায়নের জন্য কোন নির্দিষ্ট ধাপসংখ্যা নেই। এমনকি যারা এর পক্ষে কথা বলে তাদের মতে এর জন্য কোন নির্দিষ্ট নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিও নেই। একটি হুকুম বাস্তবায়িত করতে একটি, দুটি, তিনটি এমনকি এর চাইতেও বেশি ধাপের প্রয়োজন হতে পারে। এই ধরনের ক্রমান্বয়িকতার ক্ষেত্রে ধাপসংখ্যা নির্ধারণের উপর পরিবেশ পরিস্থিতির প্রভাব সুস্পষ্টরূপে বিদ্যমান। ধাপসংখ্যা অল্পকিছু অথবা অনেকগুলো হতে পারে এবং প্রতিটা ধাপ বাস্তবায়নের জন্য স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।
আক্বীদাগত বিষয়ে ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন ধারণাটি প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে; যেমন ইসলাম থেকে সমাজতন্ত্র এসেছে অথবা ইসলাম থেকে গণতন্ত্র এসেছে এই মন্তব্যগুলোকে সমর্থন করা। শরঈ হুকুমগুলোও এর অন্তভূর্ক্ত হতে পারে যেমন এই বিষয়টিকে অনুমোদন করা যে একজন নারী হাঁটুর সামান্য নিচ পর্যন্ত কাপড় পরবে এবং প্রকৃত শর’ঈ হুকুম অনুযায়ী পোশাক পরিধানের জন্য সে কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে যাবে। আবার ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কিত বিষয়ের ক্ষেত্রেও এটি হতে পারে যেমন শরীয়ার দৃষ্টিতে হারাম হওয়া সত্ত্বেও বিদ্যমান ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করা এমনকি যারা ক্রমান্বয়িকতার পক্ষে কথা বলে তাদের মতেও বিষয়টি হারাম। যাই হোক তারা এরূপ দাবী করেনা যে এ বিষয়ের বাস্তবায়নই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য বরং কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে ইসলামী শাসনব্যবস্থা অর্জনই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য এবং এটিই হচ্ছে প্রকৃত শরঈ হুকুম যা আমাদের উপর একটি বাধ্যবাধকতা। এর ফলে দেখা যাবে তারা চেষ্টা করছে নির্দিষ্ট কয়েকটি শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করতে এবং বিদ্যমান বাদবাকি অনৈসলামী হুকুমসমূহের বাস্তবায়িত থাকার ব্যাপারে এই আশায় নীরব থাকতে যে একসময় শরঈ হুকুমসমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে সেগুলোর প্রভাব বেড়ে যাবে এবং তাদেরই সংখ্যার আধিক্য থাকবে;তারপরে তা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং এভাবে চলতে থাকবে।অথবা এই বিষয়টি দাওয়াতের ক্ষেত্রেও হতে পারে যখন লোকজনকে তারা এসব বিষয় বাস্তবায়নের দিকে ডাকে তখন।সুতরাং ক্রমান্বয়িকতার ধারণায় যারা বিশ্বাসী তারা লোকজনকে তাদের এই ধারণার দিকে ডাকার জন্য এজাতীয় ধরনসমূহ ব্যবহার করে থাকে।এসব ধারণার দিকে যারা লোকজনকে ডাকে তারা অনেকক্ষেত্রে এতটা আল্লাহভীরু হয়ে থাকে যে নিজেদের দায়িত্বের ব্যাপারে কোনরূপ শৈথিল্য প্রদর্শন করেনা কিন্তু তারপরও বিষয়টিকে গ্রহণ করে অন্যদের সুবিধা বিবেচনা করে।কারণ তারা ভাবে এরূপ না করলে লোকজন ইসলামের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করবে; ফলে কোন কিছু না পাওয়ার চাইতে কিছু পাওয়াটাকেই তারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে।
ধাপেধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বা মারহালিয়্যাহ এর পক্ষের যুক্তিসমূহ এবং সেগুলোর খণ্ডন প্রসঙ্গে এবার আসা যাক। যারা এভাবে অগ্রসর হওয়ার পক্ষপাতী তারা কিছু যুক্তির উপরে নির্ভর করে যেগুলোর ব্যাপারে তারা মনে করে যে এগুলো তাদের চিন্তা এবং দাওয়াতের পক্ষে সমর্থনকারী।ফলে তারা যা করতে চাচ্ছে তার পক্ষে যুক্তি হিসেবে এগুলোকে উপস্থাপন করে থাকে যদিও প্রকৃতপক্ষে তারা এক্ষেত্রে দলীলসমূহ এবং তাদের সঠিক নির্দেশনার অনুগত থাকেনি বরং নিজেদের ইচ্ছা বাস্তবায়নের জন্য তারা এসব দলীলকে ভুলভাবে ব্যবহার করেছে Ñযা আমরা সামনে দেখতে পাব।নিচে তাদের সেসব যুক্তিসমূহ এবং সেগুলোর খণ্ডন নিয়ে আলোচনা করা হলো।
১ম যুক্তি ও এর খন্ডন
তাদের মতে আল্লাহ সুদ (রিবা) একবারে হারাম করেননি বরং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ধাপে ধাপে তা নিষিদ্ধ করেছেন। যেমন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“মানুষের ধন-সম্পদে তোমাদের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি পাবে এই আশায় তোমরা উপহার(রিবা) হিসেবে যা কিছু দাও আল্লাহর কাছে তা বৃদ্ধি পায়না। পক্ষান্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পবিত্র অন্তরে যারা দিয়ে থাকে, অতএব, তারাই দ্বিগুণ লাভ করবে।” (আল-কুরআন ৩০:৩৯)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়োনা।” (আল-কুরআন ৩:১৩০)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।” (আল-কুরআন ২:২৭৮)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তারা সুদ গ্রহণ করত অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল” (আল-কুরআন ৪:১৬১)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেন:
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (আল-কুরআন ২:২৭৫)
এসব আয়াতের প্রেক্ষিতে যারা ক্রমধাপে ইসলাম বাস্তবায়নের সুযোগ খুঁজে তারা বলে, প্রথম আয়াতে সুদ ছিল মুবাহ। সরল সুদকে বৈধ রেখে চক্রবৃদ্ধির সুদকে নিষিদ্ধ করা হয় দ্বিতীয় আয়াতে এবং পরবর্তীতে সরল সুদকেও নিষিদ্ধ করা হয় তৃতীয় আয়াতের মাধ্যমে।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ কর।” (আল-কুরআন ২:২৭৮)
তাদের মতে চতুর্থ আয়াত দ্বারা এটা প্রমাণিত যে, সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার সুচনা হয়েছিল প্রথমে পরোক্ষ উপদেশদানের মাধ্যমে অর্থাৎ ইহুদীদেরকে সম্বোধিত করার মাধ্যমে এবং এক্ষেত্রে আল্লাহ কোন স্পষ্ট নির্দেশনা দেননি। ধাপে ধাপে বিভিন্ন আয়াত নাযিলের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সুদকে নিষেধ করেন তাঁর এ কথার মাধ্যমে—
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম” (আল-কুরআন ২:২৭৫)
কেউ যদি উপরোক্ত আয়াতসমুহের সঠিক ফিক্হের (আইনগত জ্ঞান) অনুসন্ধান করে, তাহলে দেখতে পাবে এক্ষেত্রে ক্রমান্বয়িকতার ধারণার কোন সত্যতা নেই।
— প্রথম আয়াতটি সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে কোনভাবেই সম্পৃক্ত নয় বরং এর বিষয়বস্তু হচ্ছে উপহার সামগ্রী। আয়াতটির মানে হচ্ছে কেউ যদি কাউকে কিছু উপহার দেয় এবং বিনিময়ে তার চাইতে বেশি কিছু আশা করে অথবা তা ফিরিয়ে দেয়ার দাবী জানায় তাহলে আল্লাহর কাছে এর কোন বৃদ্ধি নেই অর্থাৎ আল্লাহ তাকে এর জন্য কোন পুরস্কার দিবেন না। রাসূল (সা) বলেন:
“কেউ যদি তার হালাল উপার্জন থেকে খেজুরের সমপরিমাণ কিছু দান করে এবং আল্লাহ হালাল ছাড়া অন্যকিছু কবুল করেননা, তিনি তখন সেটা তার ডান হাতে ধারণ করেন এবং দানকারীর জন্য তা বাড়াতে থাকেন যতক্ষণ না তা পাহাড়সম হয়ে যায় যেমনভাবে তোমরা তোমাদের ছোট্ট অশ্বকে প্রতিপালন করতে থাক।” [বুখারী থেকে বর্ণিত]
এ ব্যাপারে ইবনে আব্বাস (র) বলেন: “তোমরা উপহার (রিবা) হিসেবে যা কিছু দাও।” (আল কুরআন ৩০:৩৯) এর অর্থ হচ্ছে যদি কেউ কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয় এরং বিনিময়ে এর চাইতে বেশি কিছু আশা করে তাহলে আল্লাহর কাছ থেকে তার বেশি কিছু পাওয়ার নেই এবং এজন্য সে পুরস্কৃত ও হবেনা। যাইহোক এতে তার গোনাহ ও হবেনা। এ অর্থেই আয়াতটি নাযিল হয়েছে (আল-কুরতুবী থেকে বর্ণিত)। ইবনে কাছীর (র) এ আয়াত সম্পর্কে বলেন কেউ যদি উপহার হিসেবে কাউকে কিছু দেয় এবং বিনিময়ে সে উত্তম কিছু আশা করে তাহলে এজন্য সে আল্লাহর কাছ থেকে কোনরকম পুরস্কার পাবে না। ইবনে অব্বাস, মুজাহিদ, আদ-দাহহাক, কাতাদাহ, ইকরামাহ, মুহাম্মদ বিন কাব এবং আশ-শাবী প্রমুখ এর নিকট থেকে এরকম ব্যাখ্যাই এসেছে আয়াতটি সম্পর্কে। এ ধরনের কাজ হচ্ছে মুবাহ (অনুমোদিত)।
ইবনে আব্বাস বলেন; “সুদ (রিবা) দু ধরনের; একটি হচ্ছে অবৈধ যা ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে এবং অন্যটিতে ক্ষতির কিছু নেই যেখানে একজন কাউকে উপহার হিসেবে কিছু দেয় এবং বিনিময়ে তার কাছ থেকে বহুগুণ আশা করে।”
— এবার দ্বিতীয় আয়াতের ব্যাপারে আসা যাক:
“তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়োনা।” (আল-কুরআন ৩:১৩০) চক্রবৃদ্ধির সুদপ্রথা নিষিদ্ধ করার জন্য এ আয়াতটি নাযিল করা হয়েছিল,যা ছিল জাহিলি যুগের একটি বাস্তবতা। এখানে এমন কোন নির্দেশনা নেই যা থেকে এটা বুঝা যাবে যে সুদকে সীমিতভাবে (অর্থাৎ সরল সুদকে বৈধ রেখে কেবল চক্রবৃদ্ধির সুদকে) নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মুফাস্সিরগণের মতে (তাফসীরকার) সুদ নিষিদ্ধ করা হয় সুরা বাক্বারাহ তে এবং এটি ছিল মদীনায় নাযিলকৃত প্রথম সুরা। বহুগুণের সুদ নিষিদ্ধ করা হয় যে সুরাতে অর্থাৎ আলি ইমরানে তা নাযিল হয় সুরা বাক্বারাহ এর পরে। সুতরাং স্বল্পমাত্রার সুদকে আল্লাহ বৈধতা দিয়েছেন এরকম যেকোন ধারণাকে খণ্ডন করে এই ঘটনাটি। স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে যে, সুদ সম্পর্কিত আলি ইমরানের আয়াতটি কোন ক্রমান্বয়িকতার ফসল ছিল না বরং তা ছিল কাফিরদের সুদ চর্চার স্বভাবিক অভ্যাসের একটি উল্লেখমাত্র। সুতরাং সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার হুকুম প্রথমেই নাযিল হয়েছিল।
— এবার তৃতীয় আয়াতের প্রসঙ্গে আসা যাক:
“হে ঈমানদারগণ,তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে,তা পরিত্যাগ কর,যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাক।” (আল-কুরআন ২:২৭৮) এই আয়াতের অর্থ এরকম কিছু নয় যে, প্রথমদিকে মুসলিমদের জন্য স্বল্পমাত্রার সুদ গ্রহণের অনুমোদন ছিল যা পরবর্তীতে নিষিদ্ধ করা হয়। বরং এই আয়াতটি নাযিল হয়েছিল তাদের ব্যাপারে যারা ইসলামে নতুন এসেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তারা সুদের উপর টাকা ধার দিত। সুদের অংশবিশেষ তারা ইতিমধ্যেই গ্রহণ করে ফেলেছিল এবং কিছু অংশ বাকি ছিল। এজন্য যে অংশ তারা গ্রহণ করে ফেলেছে সেটি আল্লাহ(সুবহানাহু ওয়া তাআলা) মাফ করে দিয়েছেন এবং যা বাকি আছে তা গ্রহণ করতে নিষেধ করে দিয়েছেন। এই বিষয়টি আল্লাহর নিম্নোক্ত কথার দ্বারাও সমর্থিত:
“অতঃপর যদি তোমরা পরিত্যাগ না কর, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়ে যাও কিন্তু যদি তোমরা তওবা কর, তবে নিজেদের মূলধন পেয়ে যাবে।” (আল-কুরআন ২:২৭৯) অনুরূপভাবে রাসূল (সা) এর নিম্নোক্ত হাদিস:
“জাহিলি যুগের সুদকে সমাপ্ত করা হয়েছে সম্পূর্ণরূপে এবং প্রথমে আমি যে সুদের সমাপ্তি ঘটিয়েছি তা হচ্ছে আল—আব্বাস বিন আব্দুল মুত্তালিবের সুদ।” [সীরাতে ইবনে হিশাম]
— সবশেষে চতুর্থ আয়াতের প্রসঙ্গে আসা যাক:
“তারা সুদ গ্রহণ করত অথচ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল” (আল-কুরআন ৪:১৬১) এখানে সূদ বলতে ঘুষ এবং অন্যান্য একই রকমের হারাম অর্থের কথা বোঝানো হয়েছে, যা ইহুদীরা গ্রহণ করতো, যেমনটি আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“(তারা) হারাম ভক্ষণ করে।” (আল-কুরআন ৫:৪২)
এখানে সুদকে শর’ঈ অর্থে বুঝানো হয় নি।
অতএব এ সম্পর্কিত বিধানের শুরু থেকেই সুদ নিষিদ্ধ ছিল এবং এমন কোন নির্দেশনা নেই যা থেকে বুঝা যাবে যে সুদ ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বেশকিছু প্রমাণের মাধ্যমে নিশ্চিতরূপেই বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে যে সুদ নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে ক্রমান্বয়িকতার কোন সম্পর্ক নেই।
২য় যুক্তি ও এর খন্ডন
তাদের মতে আল্লাহ ধাপে ধাপে মদ নিষিদ্ধ করেছেন।তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দাও এতদুভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্যে উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়।” (আল-কুরআন ২:২১৯)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“হে ঈমানদারগণ তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাজের ধারে কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ।” (আল-কুরআন ৪:৪৩)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, আল-আনসাব (দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু), আল-আযলাম (ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ) এগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া অন্য কিছুনা। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবেনা ?” (আল-কুরআন ৫:৯০-৯১)
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির ধারণায় যারা বিশ্বাসী তারা এসব আয়াতের প্রেক্ষিতে বলে থাকে যে শুরুতে মদ অনুমোদিত ছিল যা প্রথম আয়াত থেকে প্রমাণিত। পরবর্তীতে এই অনুমোদনকে সীমিত করা হয় এই আয়াতের মাধ্যমে
“হে ঈমানদারগণ তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাজের ধারে কাছেও যেওনা।” (আল-কুরআন ৪:৪৩) এবং এই সীমিত অনুমোদনকে সর্বশেষে নিষিদ্ধ করা হয়।
আইনগত দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে যদি কেউ এই আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা করে তাহলে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার কোন ক্রমান্বয়িকতা দেখতে পাবেনা। বরং বাস্তবতা হচ্ছে নিষিদ্ধ হওয়ার পূর্বে মদের ব্যপারে কোন শর’ঈ হুকুমই ছিলনা। অন্যভাবে বলা যায় মদ্যপান তখন একটি অনুমোদিত বিষয় ছিল যদিও তখন মুসলিমরা মদ্যপান অব্যাহত রেখেছিল তৃতীয় আয়াত নযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত। এই ধারণাটি উমর (রা) এর নিম্নেক্ত ঘটনাটির মাধ্যমেও সমর্থিত; তিনি বলেছিলেন: “হে আল্লাহ! তুমি মদের ব্যপারে আমাদেরকে স্পষ্ট ধারণা দাও কারণ তা আমাদের সম্পদ কেড়ে নেয় এবং মানসিকতাকে নষ্ট করে ফেলে।” জবাবে তখন এই আয়াত নাযিল হয়:
“তারা তোমাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে” (আল-কুরআন ২:২১৯) উমর(রা) দুআ করেছিলেন এবং তার কাছে এই আয়াত পাঠ করে শোনানো হয়েছিল। তিনি আবারো বললেন “হে আল্লাহ তুমি মদের ব্যপারে আমাদেরকে স্পষ্ট নির্দেশনা দাও।” জবাবে তখন এই আয়াত নাযিল হয়:
“হে ঈমানদারগণ তোমরা যখন নেশাগ্রস্ত থাক, তখন নামাজের ধারে কাছেও যেওনা, যতক্ষণ না বুঝতে সক্ষম হও যা কিছু তোমরা বলছ।” (আল-কুরআন ৪:৪৩) উমর (রা) দুআ করেছিলেন এবং তার কাছে এই আয়াত পাঠ করে শোনানো হয়েছিল। তিনি আবারো বললেন “হে আল্লাহ তুমি মদের ব্যাপারে আমাদেরকে স্পষ্ট নির্দেশনা দাও” জবাবে তখন এই আয়াত নাযিল হয়:
“হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, আল-আনসাব (দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত পশু), আল-আযলাম (ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ) এগুলো শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া অন্য কিছুনা। অতএব এগুলো থেকে বেঁচে থাক।”
(আল-কুরআন ৫:৯০)অতএব উমর (রা) এভাবেই দুআ করে যেতে থাকলেন যতক্ষণ না নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল হয়:
“অতএব, তোমরা এখনও কি নিবৃত্ত হবেনা?” (আল-কুরআন ৫:৯১) জবাবে উমর (রা) বললেন: “আমরা নিবৃত্ত হলাম! আমরা নিবৃত্ত হলাম!” [আহমাদ , তিরমিযী, নাসাঈ, এবং আবু দাউদ থেকে বর্ণিত]
উমর (রা) মদের ব্যাপারে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দু’আ করতে থাকলেন যা উপরে উল্লেখিত তৃতীয় আয়াত নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত মুসলিমদের জন্য বৈধ ছিল। তিনি (রা) তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) কাছে প্রথম এবং দ্বিতীয় আয়াত নাযিল হওয়ার পরও দু’আ করা অব্যাহত রাখলেন যার মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয় যে, তৃতীয় আয়াত নাযিল হওয়ার আগ পর্যন্ত মদ্যপান মুবাহ (অনুমোদিত) ছিল।
দ্বিতীয় আয়াতের মূল বিষয় ছিল সালাত, মদ্যপান নয়। অর্থাৎ এ আয়াতটি সালাতের সাথে সম্পর্কিত। কেউ যদি এই আয়াতের ফিক্হ ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে দেখতে পাবে এখানে সালাতের সময় কাউকে মদ্যপান করতে নিষেধ করা হচ্ছেনা বরং নিষেধ করা হচ্ছে মদ্যপ অবস্থায় সালাত আদায় করতে যাতে মুসলিমরা বুঝতে পারে তারা কি তিলাওয়াত করছে। এই আয়াত নাযিল হওয়ার পরে কোন মুসলিমকে যদি দেখা যেত এমন অবস্থায় সালাত আদায় করছে যখন তার মুখ থেকে মদের গন্ধ আসছে অথবা সে তার সাথে মদের ভিস্তি (পানীয় বহনের জন্য ব্যবহৃত চামড়ার ব্যাগ) বহন করছে বা সে নির্দিষ্ট পরিমাণের মদ পান করেছে যা তার চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করেনি তাহলে সেক্ষেত্রে দোষের কিছু ছিল না।
প্রথম আয়াতে আল্লাহ মদ্যপানকে তিরস্কার করেছেন কারণ তা ক্ষতিকর। দ্বিতীয় আয়াতে মদ্যপ অবস্থায় সালাত আদায় নিষিদ্ধ করা হয় এবং তৃতীয় আয়াতে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়। এই ঘটনাকে কোনভাবেই ক্রমান্বয়িক বলা যায় না কারণ সূরা আল মায়িদাহতে নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে মদ নিষিদ্ধ করার পরে রাসূল (সা) অথবা সাহাবা (রা) অথবা তাবিঈন অথবা অথবা তাদের পরবর্তীদেব মধ্যে কেউ কখনোই মদ্যপানকে অনুমোদন দেয় নি। মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদগণদের মধ্যে এবং মুজাতাহিদীনের মধ্যেও কেউ কখনোই কোন ফিকহের কিতাবে মদ নিষিদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়িকতার কথা বলেননি। যখন পূর্ণ উদ্যমে ইসলামের বিজয় চলছিল, নতুন নতুন ভূথণ্ড ইসলামের অধীনে আসছিল এবং লোকজন দলে দলে দ্বীনের মধ্যে দাখিল হচ্ছিল তখন বিজয়ী মুসলিমদের কেউই নওমুসলিমদের নতুন ইসলামে আসার দিকে ভ্রম্নক্ষেপ করেননি অথবা তাদের মদ্যপানের ব্যপারেও নীরব থাকেননি। যেসব মুসলিম বিজিত ভূখন্ডে গিয়েছিলেন তারা নওমুসলিমদের জন্য সেসব ধাপ পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি মদ্যপান নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে যেসব ধাপ পার করা হয়েছিল। যদিও হয়তো সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনুযায়ী কারো কারো কাছে ক্রমান্বয়িকতা দরকারী ছিল বলে মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তাদের কাছে এর কোন তাৎপর্যই ছিলনা। আমাদের প্রাথমিক যুগের ইমামদের কেউই এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন ধারণার সাথে পরিচিত ছিলেননা বরং এটি হচ্ছে একটি নতুন আলোচনা যা দু:সহ বাস্তবতা এবং যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির কারণে কিছু তথাকথিত চিন্তাবিদ উদ্ভাবন করেছেন। তারা নির্দিষ্ট কিছু হুকুমের ক্ষেত্রে নয় বরং পুরো দ্বীনের জন্যই এই ধারণাটিকে একটি চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। রাসূল (সা) যথার্থই বলেছেন:
“…তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘজীবী হবে নিশ্চিতভাবেই তারা অনেক বিতর্ক দেখতে পাবে। নতুন উদ্ভাবিত বিষয় সম্পর্কে সতর্ক থাক কারণ প্রত্যেকটা নতুন বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেকটা বিদআতই জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়…নিজেদেরকে আমার সুন্নাহর উপরে এবং সৎপথপ্রাপ্ত খলিফাদের সুন্নাহর উপরে রাখ, তাদেরকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধর।” [আবু দাউদ এবং আত-তিরমিযি থেকে বর্ণিত]
এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা ধাপে ধাপে বাস্তবানের পক্ষে কথা বলে তাদের জন্য কি এটা বৈধ হবে যে তারা ধাপে ধাপে আসা কোন হুকুমের সর্বশেষ হুকুমকে গ্রহণ না করে বরং পূর্বের কোন হুকুমকে গ্রহণ করতে পারবে?
নিশ্চিতভাবেই এর উত্তর হচ্ছে; ‘ না ’। কারণ শরীয়া মদ্যপানকে সুনির্দিষ্টভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে পূর্ববর্তী কোন হুকুম মেনে চলার অনুমোদন আমাদেরকে দেয়া হয়নি কারণ শরীআ’হ যা করতে নিষেধ করেছে আমাদেরকে তা অবশ্যই মানতে হবে। এটাই ছিল সালাফ (পূর্ববর্তীদের) এবং খালাফ (পরবর্তীদের) উভয় প্রজন্মের অবস্থান। মদের ব্যাপারেও একই হুকুম বিদ্যমান। এই হুকুমটি কখনো বিন্দুমাত্রও পরিবর্তিত হবেনা এবং যে মদ্যপান করবে তার অপরাধও কিছুমাত্র কমবেনা।
৩য় যুক্তি ও এর খণ্ডন
তাদের মতে শরীআ’হ দাসপ্রথার বিষয়টিকে ধাপে ধাপে সমাধান করেছে। এই মতটি সঠিক নয় কারণ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) দাসদের অস্তিত্বকে নিষিদ্ধ করেননি বরং এ থেকে উত্তরণের একটি পথ খুলে দিয়েছেন। যদি তারা আবারো অস্তিত্বলাভ করে তাহলে এ সম্পর্কিত আহকামও ফিরে আসবে এবং দ্বিতীয়বারের মত দাসদের অস্তিত্ব চোখ পড়বে।
চতুর্থ যুক্তি ও এর খণ্ডন
তাদের মতে কুরআন একবারে নাযিল হয়নি বরং ধীরে ধীরে খণ্ড খণ্ড আকারে এসেছে যা থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এর জবাব হচ্ছে আল্লাহ বিভিন্ন পরিস্থিতি ও ঘটনা অনুযায়ী কুরআন নাযিল করতেন যাতে মুমিনদের অন্তর শক্তিশালী হয়। প্রথমে ঈমানের বিষয়ে নাযিল হতো। এজন্য প্রথমে জান্নাত-জাহান্নামের আলোচনা হয়েছিল এবং পরে হালাম-হারামের আলোচনা এসেছিল। কিন্তু এর মানে এই না যে নাযিলকৃত বিষয়ের অংশবিশেষ গ্রহণ করতে হবে এবং বাকি বিষয় ছেড়ে দিতে হবে। যেসব বিষয় নাযিল হয়েছিল তার পুরোটার ব্যাপারেই মুসলিমরা দায়িত্বশীল ছিল তখন এবং এর বাইরে তাদের কোনো দায়িত্ব ছিল না। যখন শুধুমাত্র ঈমানের বিষয়ে নাযিল হয়েছিল কিন্তু কোনো হুকুম নাযিল হয়নি তখন শর’ঈ দলীলের মাধ্যমে আসা বিস্তারিত বিবরণের পুরো ইসলামের ব্যাপারেই মুসলিমরা দায়িত্বশীল ছিল। সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্র থাকুক বা না থাকুক যেকোনো পরিস্থিতিতেই ব্যক্তিগত শর’ঈ হুকুমের ব্যাপারে মুসলিমরা দায়িত্বশীল থাকে। যেসব শর’ঈ হুকুম ইসলামী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত সেগুলো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। অতএব শর’ঈ দলীলের বিস্তারিত নির্দেশনাই মুসলিমদের কর্মকাণ্ডকে নির্ধারণ করে, অন্যকিছু না। সুতরাং, পিছনের দিকে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের হাতে আর নেই।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন বলতে কী বুঝায়? এতে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং এর পক্ষে কী যুক্তি রয়েছে সেগুলো পর্যবেক্ষণের পর এবার আমরা চিন্তার শরঈ প্রক্রিয়া অনুযায়ী সঠিক শরঈ মতের ব্যাখ্যা দিব।
আমরা সঠিক মতের কাছাকাছি কোনো মতের ব্যাপারে বলছি না বরং সঠিক মতের ব্যাপারেই বলছি, কারণ ক্রমান্বয়ে ইসলাম বাস্তবায়নের ধারণাটি শরীআ’হর মধ্যে নেই এবং ভুলভাবে একে শরীআ’হতে অন্তর্ভুক্ত করার কোনো সুযোগও নেই। ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন এবং এটি একটি শর’ঈ পদ্ধতি কিনা এর সঙ্গে এই আলোচনাটি যতটুকু সম্পর্কিত তার চাইতে বেশী সম্পর্কিত চিন্তার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে যাকে শরীআহ কোনোভাবেই অনুমোদন করে না।
কারণ, ইসলামের একটি প্রকৃতি আছে যা অন্যসব কিছু থেকে পুরোপুরি ভিন্ন। ওহীর অনুসরণের উপরেই ইসলামের প্রকৃতি পুরোপুরি নির্ভরশীল, অন্যদিকে মানুষের উদ্ভাবন ও অভিজ্ঞতার উপরে মানবরচিত ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভরশীল এবং এই উদ্ভাবন ও অভিজ্ঞতা যত শক্তিশালীই হোক না কেন মানুষের সমস্যার সঠিক সমাধান দেওয়ার জন্য তা অপর্যাপ্ত।
যখন মুসলিমরা শরীআ’হর আনুগত্য করে তখন আনুগত্যের ভিত্তি হিসেবে আল্লাহর উপর ঈমানকে মেনে নিতে হবে, নতুবা তাদের আনুগত্য গ্রহণযোগ্য হবে না। যখন সে অন্যদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করে তখন তার এই আহ্বানের ভিত্তি হতে হবে আল্লাহর উপরে ঈমান নতুবা তার আহ্বান গ্রহণযোগ্য হবে না। বিষয়টি প্রাথমিকভাবে ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং তারপরে সঠিক আনুগত্যের সঙ্গে।
মুসলিমরা যদি সত্য ও সঠিক পথে নিজেদেরকে এবং ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করতে চায় তাহলে অবশ্যই তাকে এসবের আধ্যাত্মিক ভিত্তি ঊপলদ্ধি করতে হবে, যার ঊপায় হচ্ছে প্রথমে একে প্রতিষ্ঠিত করা এবং অতঃপর এর পরিচর্যা করা। তখন ইসলামের আনুগত্য করা তার জন্য সহজতর হবে চাই তা বাস্তবতা, স্বভাব বা লোকজনের ইচ্ছার অনুকূলে হোক অথবা প্রতিকূলে। আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে গ্রহণ না করলে মুসলিমরা গুনাহগার হবে যদিও বা তা কুফরী না হয়। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামের একটি আধ্যাত্মিক ভিত্তি আছে যা হচ্ছে আল্লাহর উপরে ঈমান এবং এ থেকে এটা বোঝা যায় না কোনো হুকুম সত্যের কতটুকু নিকটবর্তী অথবা কতটুকু দূরবর্তী। বরং কোনো হুকুমকে যদি আমরা এই ভিত্তির আলোকে বিবেচনা করি তাহলে বুঝতে পারব তা এই ভিত্তির কতটুকু নিকটবর্তী অথবা দূরবর্তী।
যারা এই ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলে এবার তাদেরকে আমরা কিছু প্রশ্ন করতে চাই; এই আহবানের আধ্যাত্মিক ভিত্তি কি? এর পিছনে আল্লাহর নির্দেশ কোথায় বিদ্যমান? রাসূল (সা.) কখন এই বিষয়টিকে গ্রহণ করেছেন যদিও তাঁর (সা.) মক্কা বা মদিনায় এর প্রয়োজন ছিল ।
নুসরাহ খোঁজার সময় রাসূল (সা.) কি বনি আমর বিন সা’সা গোত্রকে বলেননি, “বিষয়টি (কতৃর্ত্ব) আল্লাহর হাতে, তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন।” [সীরাতে ইবনে হিশাম] অথচ সে সময় দাওয়াতের জন্য সাহায্য তাঁর (সা.) জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। তারা রাসূল (সা.)-এর ইন্তেকালের পর নিজেদের হাতে কর্তৃত্ব চেয়েছিল। তখন কি তিনি পারতেন না তাদের অনুরোধকে মেনে নিতে এবং পরবর্তীতে ঈমান আনার পরে তাদের এই অনুরোধকে পরিবর্তন করে দিতে? এটাই কি সত্য দাওয়াত ও আল্লাহর হুকুম ছিলনা যার ফলে কোনোরকম তোষামোদ বা আপোষ ছাড়াই রাসূল (সা.) সততার সঙ্গে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলেন, যাতে যারা থাকে তার যেন স্পষ্ট প্রমাণ পেয়ে টিকে থাকে আর যারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে তারা যেন স্পষ্ট প্রমাণ পেয়েই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়?
চাচা আবু তালিব যখন দাওয়াতি কাজে আপোষ করতে বললেন এবং তার কাঁধে অসহনীয় বোঝা না চাপাতে বললেন তখন কি রাসূল (সা.) বলেননি যে; “আল্লাহর শপথ, চাচা! যদি তারা আমার ডানহাতে সূর্য ও বামহাতে চন্দ্র এনে দেয় যাতে আমি বিষয়টি ছেড়ে দেই তবুও আমি ক্ষান্ত হব না যতক্ষণ না আল্লাহ একে বিজয়ী করেন অথবা একাজ করতে গিয়ে আমার মৃত্যু হয়।” [সিরাতে ইবনে হিশাম] এই দলিল থেকে দেখা যাচ্ছে রাসূল (সা.) ন্যূনতম পরিমাণ আপোষও করেননি এবং তিনি দাওয়াতের জন্য সবোর্ত্তম উদাহরণ রেখে গেছেন। তিনি (সা.) কোনোরকম আপোষ বা তোষামোদ করেননি, তাদের সঙ্গে তাল মিলাননি, বিনা আপত্তিতে প্রার্থনা করেননি। বরং তার দাওয়াত ছিল প্রকাশ্য ও সাহসিকতাপূর্ণ কারণ এর ফলে সত্য চিন্তার জয় হবে এবং মিথ্যা পরাজিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কি মুসলিমদেরকে সেই স্থান থেকে হিজরত করতে নির্দেশ দেননি যেখানে তারা তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বাধ্যতামূলক নির্দেশ মানতে পারছিল না? তিনি কি সেখানে থাকতে তাদেরকে নিষেধ করেননি যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যারা নিজেদের অনিষ্ট করে (কারণ হিজরত বাধ্যতামূলক হওয়া সত্ত্বেও তারা কাফিরদের মধ্যেই বসবাস করছিল) ফেরেশতারা তাদের প্রাণ হরণ করে বলে, তোমরা কি অবস্থায় ছিলে? তারা বলে: এ ভূখণ্ডে আমরা অসহায় অবস্থায় ছিলাম। ফেরেশতারা বলে: আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিলনা যে, তোমরা দেশত্যাগ করে সেখানে চলে যেতে?”
(আল কুরআন ৪:৯৭)এমনকোনো ভূখণ্ড যেখানে মুসলিমরা তাদের দ্বীন কায়েম করতে সক্ষম না সেখানে থাকার উপর নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত একটি ইজমা বর্ণনা করেছেন ইবনে কাছির।
রাসূল (সা.) কি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মোহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” দিয়েই তাঁর দাওয়াতের সূচনা করেননি এবং লোকজনকে এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করেননি? কোনোরকম পরিবর্তন ছাড়াই এটি ছিল তাঁর (সা.) শেষ বক্তব্যও। তিনি কি শুরুতে অল্প কিছু হাল্কা কথা দিয়ে শুরু করেছিলেন এবং ক্রমান্বয়ে তা বর্ধিত করেছেন? নাকি এটাই ছিল তাঁর (সা) প্রথম এবং শেষ আহবান।
যাকাত প্রদান যারা বন্ধ করে দিয়েছিল আবু বকর (রা.) কি কোনোরকম দেরি করা ছাড়া অথবা তাদেরকে সন্তুষ্ট করা ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেননি? তখন তিনি সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেছেন:
“আল্লাহর কসম, রাসূল (সা.)-কে তারা যা দিত যদি তার চাইতে একটা উটের রশিও আমাকে কম দেয় তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব।” তখন এভাবেই তিনি সাড়া দিয়েছিলেন যদিও মুসলিমরা সেসময় মুরতাদ হয়ে যাওয়া এবং বিদ্রোহের সূচনা করার মতো কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা দেখতে পাচ্ছিল।
প্রথম যুগের যেসব মুসলিম দাওয়াতি কাজ করতেন তারা কি কখনো এই ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়নের ব্যাপারে কিছু বলেছিলেন? তারা কি এই চিন্তাটিকে সেসব ভূখণ্ডে বাস্তবায়ন করেছিলেন যেগুলো বিজিত হয়েছিল এবং দারুল কুফর থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়েছিল? প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ ইসলামে নতুন দাখিল হওয়া লোকজনের পরিস্থিতিকে বিবেচনা করেননি এবং তাদেরকে মদ্যপান করার সুযোগ দেননি, ততদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করেননি যতদিনে তারা মদ্য না করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, সুদ খেতে এবং নারীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনেরও সুযোগ দেননি। বরং তারা ইসলামে পুরোপুরি প্রবেশ করেছিলেন এবং সুদ, ব্যভিচার, মদ্যপান ও অন্যসবকিছু যেগুলোর ব্যাপরে আল্লাহ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত ছিলেন। অনুরূপভাবে অমুসলিমদের ক্ষেত্রেও মুসলিমরা সমস্ত শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়ন করেছিলেন সেগুলো আলাদা ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে হোক, সামষ্টিকভাবে হোক, তাদের নিজস্ব বিষয়াদিতে হোক অথবা তাদের অংশবিশেষ আদয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে যায় এমনক্ষেত্রেই হোক।
ইসলামি ফিকহের প্রকৃত বইসমূহে কি এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে? আমাদের প্রাথমিক দিক্কার নির্ভরযোগ্য ফকিহ ও মুজতাহিদগণ কি ক্রমান্বয়িকতার ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেছেন, যদিও আমরা জানি যে, তারা শরিআ’হর কুল্লিয়াত (সামগ্রিকতা) ও জুযিয়াত (শাখা) নিয়ে বিস্তারিত অলোচনা করেছেন?
শরীআ’হ সামগ্রিকভাবে এই বিষয়ের নির্দেশনা দেয় যে দাওয়াতের বাধ্যবাধকতা সততার সঙ্গে আদায় করতে হবে এবং সরলপথের উপরে থাকতে হবে;
“সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি নিজের বান্দার প্রতি এ গ্রন্থ নাযিল করেছেন এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি।”
(আল-কুরআন ১৮:১)আল্লাহ আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফিররা চায় আমরা আপোষ করি এবং তাদের সঙ্গে ঐক্যমতে পৌঁছাই। তারা চায় আমরা সত্যকে পরিত্যাগ করি এবং প্রকৃত সমাধানের এক চতুর্থাংশ অথবা অর্ধেক গ্রহণ করি। তারা চেষ্টা করে যাতে আমরা কুফরি কর্মকাণ্ডের সূচনা করি। এ ব্যাপারে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“আহলে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসাবশতঃ চায় যে, মুসলিম হওয়ার পর তোমাদেরকে কোনোরকম কাফির বানিয়ে দেয় ……। (আল-কুরআন ২:১০৯)
এবং শেষে চেষ্টা করবে তাদের আইনকানুন গ্রহণ করাতে। এ ব্যাপারে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“তারা চায় যদি আপনি নমনীয় হন, তবে তারাও নমনীয় হবে।” (আল-কুরআন ৬৮:৯)
“অতএব আপনি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবে না।” (আল-কুরআন ৬৮:৮)
পথভ্রষ্ট লোকদের প্রতি ঝুঁকে পড়ার ব্যাপারে আমাদের রব আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন:
“আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো বন্ধু নেই, আর কোথাও সাহায্যও পাবে না।” (আল কুরআন ১১:১১৩)
প্রকৃত ঈমানের দিকে সঠিক দাওয়াত মুসলিমদের আনুগত্যকে পূর্ণতাদান করে যদিও সে ইসলামে নতুন দাখিল হয় এবং এর আনুগত্য করে থাকে। দাওয়াত বহনকারী হিসেবে আমাদের উপরে এটা বাধ্যতামূলক যে আমরা নিজেদের অন্তরে ঈমানকে প্রোথিত করব এবং নিজেদেরকে এর জন্য উৎসর্গ করব যতক্ষণনা সবোর্ত্তম আনুগত্য ও তাকওয়ার সঙ্গে তা ফল দিতে শুরু করবে। ইসলামি রাষ্ট্র যখন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন অবশ্যই তা এমনসব লোকদের হাতে হবে না যার ইসলামি ধারণাশূন্য ও পাশ্চাত্যের ধারণায় পূর্ণ। এটি এমনসব লোকদের দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত হবে না যাদের মধ্যে দাওয়াতের কোনো প্রতিফলন হয়নি, দাওয়াত তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারেনি এবং তারা একে গ্রহণ করেনি। বরং পূর্বে আমরা যা বলেছি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে সাধারণ গণজাগরণের মাধ্যমে সৃষ্ট জনমতের উপর ভিত্তি করে যা ইসলামের ধারণা এবং এর দ্বারা শাসিত হওয়ার ধারণাকে গ্রহণ করবে। মানুষের অন্তর ও মনকে ইসলামের কাছে টানার অজুহাতে ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন ধারণাকে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই, আর না আছে মানবীয় দুর্বলতার কাছে মাথানত করার অথবা পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার, কারণ আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন মানুষের অন্তর ও মন এবং পরিস্থিতিকে ইসলাম অনুযায়ী পরিবর্তন করার জন্য।
যদি আমরা কুরআনের দিকে ফিরে যাই এবং এর আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করি তাহলে দেখতে পাব এতে সেসব নির্দেশ দেওয়া আছে তা চূড়ান্ত এবং ক্রমান্বয়িকতার ধারণাটি পাশ্চাত্যের বিজাতীয় চিন্তাসমূহ থেকে তথাকথিত উলেমাদের দ্বারা মিথ্যা এবং ভ্রান্ততার মাধ্যমে আমাদের মধ্যে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে।
যখনই কোনো আয়াত নাযিল হতো তখনই রাসূল (সা.) এবং তাঁর (সা.) সঙ্গের মুসলিমগণ কোনোরকম বিলম্ব না করে তা বাস্তবায়নের জন্য ছুটতেন। যেকোনো নাযিলকৃত হুকুমের বাস্তবায়ন কেবল এজন্য বাধ্যতামূলক ছিল যে তা নাযিল হয়েছে। যখন আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এই আয়াতটি নাযিল করলেন;
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” (আল—কুরআন ৫:৩)
তখনই মুসলিমরা পুরো ইসলামের বাস্তবায়নের জন্য বাধ্য হয়ে পড়ল, তা আক্বিদা, ইবাদাত, আখলাক, মুআমালাতের ক্ষেত্রে হোক অথবা বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক ব্যবস্থা অথবা পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কিত হুকুমের ক্ষেত্রে হোক অথবা সন্ধি ও যুদ্ধের সময়েই হোকনা কেন।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেন,
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” (আল কুরআন ৫৯:৭)
অর্থাৎ রাসূল (সা.) যেসব বিষয় নিয়ে এসেছেন সেগুলো গ্রহণ করতে ও সে অনুযায়ী আমল করতে এবং তিনি (সা.) যেসব বিষয়কে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকতে ও দূরত্ব বজায় রাখতে। কারণ এই আয়াতে ‘মা’ শব্দটি আম (সাধারণ) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সমস্ত ফরযকে বাধ্যতামূলকভাবে আদায় এবং সমস্ত হারাম থেকে বিরত থাকার ও দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি এতে অন্তর্ভুক্ত। আয়াতের শেষদিকে উপস্থাপিত ক্বারিনা (নির্দেশনার)-এর ফলে আয়াতে উল্লিখিত বিষয়ের গ্রহণ বা বর্জন আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক, কারণ এই ক্বারিনাতে তাকওয়া অবলম্বনের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আয়াত অনুযায়ী যে কাজ করবে না তার জন্য ভয়াবহ শাস্তির সতর্কবাণী রয়েছে।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন;
“আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক বিষয়াদিতে আল্লাহ যা নাযিল করেছন, সেই অনুযায়ী ফয়সালা করুন; তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না এবং তাদের থেকে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমনকোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।” (আল কুরআন ৫:৪৯)
এই আয়াতটি রাসূল (সা.) ও তাঁর পরবর্তী মুসলিমগণকে আল্লাহর নাযিলকৃত সমস্ত হুকুম অনুযায়ী শাসন করতে চূড়ান্ত নির্দেশ দিচ্ছে, তা আদেশ সংক্রান্ত বিষয়ে হোক অথবা নিষেধ সংক্রান্ত বিষয়ে। এটি রাসূল (সা.) ও তাঁর (সা.) পরবর্তী মুসলিমদেরকে লোকজনের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ এবং তাদের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ থেকে বিরত থাকারও নির্দেশ দিচ্ছে।
পাশাপাশি এটি রাসূল (সা.) ও তাঁর (সা.) পরবর্তী মুসলিমদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছে আল্লাহর নাযিলকৃত কিছু বিষয়ের বাস্তবায়ন থেকে লোকজন তাদেরকে সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করবে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“যারা আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী শাসন করেনা তারাই কাফির।” (আল-কুরআন ৫:৪৪)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করে না তারাই যালিম।” (আল-কুরআন ৫:৪৫)
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যারা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন করে না তারাই ফাসিক।” (আল-কুরআন ৫:৪৫)
আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী শাসন করেনা তাদেরকে এসব আয়াতে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কাফির, যালিম ও ফাসিক সাব্যস্ত করেছেন। কারণ এখানে উল্লিখিত ‘মা’ শব্দটি আম (সাধারণ) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, ফলে এতে আল্লাহর নাযিলকৃত আদেশ ও নিষেধ সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উপরোক্ত সমস্ত বর্ণনা থেকে কোনোরকম দ্ব্যর্থতা ছাড়া নিশ্চিতভাবেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে কোনোরকম বিলম্ব, গড়িমসি অথবা ক্রমান্বয়িকতা ছাড়া ইসলামের সমস্ত হুকুম বাস্তবায়ন করতে ব্যক্তিগতভাবে, দলীয়ভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিমরা বাধ্য। ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এসব হুকুম বাস্তবায়ন না করার কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হবে না।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন নীতিটি ইসলামের হুকুমের সঙ্গে পুরোপুরিই সাংঘর্ষিক। ব্যক্তি, দল বা রাষ্ট্র হিসেবে যদি আল্লাহর কিছু হুকুম কেউ বাস্তবায়ন করে এবং বাকিগুলো ছেড়ে দেয় তাহলে সে আল্লাহর দৃষ্টিতে অপরাধী বলে গণ্য হবে।
কোনো ওয়াজিব বিষয় ওয়াজিবই থাকে যার উপরে আমল করা বাধ্যতামূলক এবং কোনো হারাম বিষয় হারামই থাকে যা থেকে দূরে থাকা বাধ্যতামূলক। যখন সাকিফের প্রতিনিধি রাসূল (সা.)-কে অনুরোধ করেছিল তিন বছর পর্যন্ত আল-লাত এর মূর্তি না ভাঙতে অথবা ইসলাম গ্রহণের বিনিময়ে সালাত আদায় করা থেকে অব্যাহতি দিতে। তিনি (সা.) তাদের এসব প্রস্তাবে সম্মত হননি এবং পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। কোনোরকম বিলম্ব ছাড়াই মূর্তিগুলো ভাঙতে এবং সালাত আদায় করতে তিনি জোর দিলেন।
যেসব শাসক ইসলামের হুকুম বাস্তবায়ন করেনা অথবা যেসব শাসক সেগুলো থেকে অল্পকিছু বাস্তবায়ন করে আল্লাহ তাদেরকে কাফির আখ্যা দিয়েছেন। এই বিষয়টি তখন প্রযোজ্য যখন সে এগুলোর উপযুক্ততায় বিশ্বাস করেনা। উপযুক্ততায় বিশ্বাস করে ইসলামের সমস্ত হুকুম বাস্তবায়ন করে না অথবা কিছু হুকুম বাস্তবায়ন করে তাহলে সে যালিম বা ফাসিক বলে গণ্য হবে।
যদি কোনো শাসক প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত (যার ব্যাপারে আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের কাছে বুরহান স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে) তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা এবং তরবারি উন্মুক্ত করাকে রাসূল (সা.) আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেছেন। অর্থাৎ তারা যদি কুফরি আইন দিয়ে শাসন করে এবং এগুলোর কুফর হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ না থাকে তাহলে এসব আইন অল্পসংখ্যক নাকি অধিক তা বিবেচনা করার কোনো প্রয়োজন নেই। উবাদাহ বিন সামিত থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে বিষয়টি প্রমাণিত হচ্ছে:
“কর্তৃত্বশীল লোকদের সঙ্গে তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাদে জড়াবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমরা তাদেরকে এমন প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত হতে দেখেছ যার ব্যাপারে তোমাদের কাছে আল্লাহর তরফ থেকে বুরহান (স্পষ্ট প্রমাণ) আছে।” [মুসলিম থেকে বর্ণিত]
অতএব ইসলামের হুকুম বাস্তবায়নে কোনোরকম আত্মসন্তুষ্টিতে ভোগা অথবা ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন অবলম্বন করার সুযোগ নেই, কারণ দুটো ওয়াজিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, দুটো হারামের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই এবং দুটো হুকুমের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহর সমস্ত হুকুমই একসমান। এদের সবগুলোকে একসঙ্গেই প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন করতে হবে কোনোরকম বিরতি, বিলম্ব অথবা কোন প্রকার ধাপছাড়া। নাহলে আমাদের উপরে আল্লাহর নিম্নোক্ত কথাটি প্রযোজ্য হবে:
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং বাকি অংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে তাদের জন্য দুর্গতি ছাড়া আর কোনো পার্থক্য নেই। আর কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেওয়া হবে।” (আল-কুরআন ২:৮৫)
কোনো মুসলিম, সে শাসক হোক অথবা কোনো সাধারণ ব্যক্তি, শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়িত না করার কোনো অজুহাতই তার কাজে আসবেনা, যদিনা শর’ঈ দলিলসমূহে তার পক্ষে কোনো শর’ঈ রুখসাত (বাধ্যতামূলক কাজ থেকে অব্যাহতির সুযোগ) বিদ্যমান থাকে। প্রকৃত এবং অনুভবযোগ্য দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট অক্ষমতা যেমন জবরদস্তি ক্ষেত্রে অর্থাৎ কাউকে জবরদস্তি করে কোনো হারাম করতে বাধ্য করা হলে অথবা যে পরিস্থিতিতে রাসূল (সা.) মদিনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ গাতফান গোত্রকে দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন অথবা যখন একজন খলিফা বিদ্রোহীদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে চেয়েছিলেন অথবা যখন অবরোধকালে মৃত্যুর আশংকা থাকলে হারাম গোশত খাওয়া বৈধ হয়ে যায়, এসব বিষয়কে শর’ঈ রুখসাত হিসেবে গণ্য করা যায়।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন অনুসরণ থেকে আমরা যা বুঝতে পারছি, যারা এর পক্ষে কথা বলে তাদের মধ্যে এই ধারণাটির জন্ম হয়েছে পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত চাপের ফলে। এরকম চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তারা এর পক্ষে প্রমাণ খুঁজতে শুরু করেছে যাতে এই পদ্ধতিতে দাওয়াত দেওয়ার জন্য তারা যুক্তি ও অনুমোদন প্রদর্শন করতে পারে। অর্থাৎ প্রথমে তাদের মধ্যে ধারণাটির জন্ম হয়েছে এবং পরবর্তীতে ধারণাটিকে সংরক্ষণের জন্য তারা শরিয়াকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যাতে এর পক্ষে শর’ঈ দলিল উপস্থাপন করতে পারে। এটই হল বিচ্যুতির সূচনা। যেসব মুসলিম এই ধারণাটিকে গ্রহণ করেছে তাদের প্রতি আমাদের উপদেশ হচ্ছে তারা যেন নিজেদের মধ্যকার দুর্বলতাকে অপসারণ করে। শরীআ’হর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এরূপ হতে হবে যেন তারা আল্লাহর উপরে ভরসা করে এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) উপরে মজবুত ঈমান রাখে যিনি সমস্ত বিষয়কে তাদেরকে দান করেন। তাদেরকে এরূপই হতে হবে যাতে তারা এই ঈমান নিয়ে কঠোর বাস্তবতা ও ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারে। তার এই ঈমান তার মধ্যে উন্নত অনুভূতির সৃষ্টি করবে এবং পরিস্থিতির তোয়াক্কা করবে না। শরীআ’হর সঠিক সীমানাতে অবস্থান এবং প্রকৃত আনুগত্যের মাধ্যমেই লোকজনকে ইসলামের দিকে ডাকতে হবে, কোন ধাপ গ্রহন করা ছাড়াই এই কাজটি সম্পাদন করতে হবে।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান হচ্ছে ইসলাম ভিন্ন অন্যকিছুর দিকে আহবান, যা হারাম। এর ভিত্তিতে যখন কোনো বিষয়ের দিকে অমুসলিম ও ত্রুটিপূর্ণ মুসলিমদেরকে আহবান করা হয় তারা সেগুলো গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। এই দ্বিধাগ্রস্ততার দায়ভার তাদেরই যারা ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান করে। কারণ, তাদের কাছে প্রকৃত ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়নি এবং এই উপস্থাপনার ভিত্তি ইসলামের আধ্যত্মিক ভিত্তি অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ও সকল বিষয়ের নিয়ন্ত্রণকারী আল্লাহর উপরে ঈমান এবং যে ভিত্তিতে শর’ঈ হুকুম গ্রহণ করা হয় তা থেকে অনেক দূরে। ফলে আল্লাহর হুজ্জাহ (প্রমাণ) তাদের বিরুদ্ধে যায় যারা ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান করে; তাদের বিরুদ্ধে যায়না যাদেরকে আহবান করা হয়েছে।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবানের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ ও আধিপত্য বিস্তার যার মাধ্যমে ইসলামের আংশিক বাস্তবায়নের পথ সুগম হয় এবং এক্ষেত্রে তাদের অজুহাত হচ্ছে শরীআ’হর পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নের মতো পর্যাপ্ত সামর্থ্য তাদের নেই। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা.) আামাদেরকে যা দিয়েছেন সেগুলোর সামনে নতুন কিছু উপস্থাপন না করতে অথবা সেগুলো থেকে বিচ্যুত না হতে আমাদেরকে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। মানুষের যাবতীয় সমস্যার সমাধান যিনি দেন, তিনি হচ্ছেন মানুষের রব, সর্বজ্ঞানী, সমস্ত খবরের অধিকারী এবং যিনি জানেন তিনি কি সৃষ্টি করেছেন। ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবানের সময় একজন মুসলিম কীভাবে নিজেকে এই অনুমতি দেয় যে সে আইন প্রণয়নের এই প্রক্রিয়াতে অংশগ্রহণ করে? একজন দাঈর (দাওয়াত বহনকারী) প্রকৃত অবস্থান হচ্ছে সে কেবল সমাধানকে কার্যকর করা ও বহন করার মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখবে এবং একে প্রণয়ন করতে যাবে না ।
ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবান দা’ঈকে একটি নষ্ট চিন্তার পথ প্রদর্শন করে যার ভিত্তিতে যে লোকজনকে আহবান করে। ধাপে ধাপে ইসলামের বাস্তবায়ন পদ্ধতির দিকে আহবানের ফলে কেউ যদি এর দ্বারা প্রভাবিত হয় তাহলে তা তার চিন্তার প্রক্রিয়াকে দূষিত করে দিবে, যা অন্যান্য দূষিত চিন্তার মতোই পরিবর্তন করা জরুরী। যেহেতু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে চিন্তার প্রক্রিয়াই শুরুতে আসে সেহেতু চিন্তা পরিবর্তন করার চেয়ে চিন্তার প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যতক্ষণ না একটি সাধারণ উপায়ে উম্মাহর চিন্তার প্রক্রিয়াকে আমরা পরিবর্তন করতে পারছি ততক্ষণ পর্যন্ত উম্মাহর অবস্থার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিবর্তন সাধিত হবে না। যে দূষিত প্রক্রিয়ায় সে চিন্তা করে এবং লোকজনকে আহবান করে তা প্রতিস্থাপন করে সেখানে চিন্তার সঠিক প্রক্রিয়াকে বসাতে হবে।
কর্মকান্ড কি আংশিক হবে নাকি ব্যাপক এবং ভারসাম্যপূর্ণ হবে?
কিছু মুসলিম কর্মী আছেন যারা ইসলামী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সমন্বিত এবং সুষম পদক্ষেপ গ্রহণ করার একটি ধারণা উপস্থাপন করেন আবার অনেকে আংশিক কর্মকাণ্ড জোরালোভাবে পরিচালনা করার কথা বলেন।
সমন্বিত পদক্ষেপ বলতে বুঝানো হয় অন্যান্য বিষয় ও দিক বাদ দিয়ে কেবল কোনো একটি আংশিক বিষয় বা দিকের উপরে কর্মকাণ্ডকে সীমিত না করা। ইসলামী পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে ইবাদাত সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যবস্থা বিদ্যমান। নবুয়্যতের যুগে ইসলামের প্রথমদিককার কর্মকাণ্ড ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। রাসূল (সা) তখন ইসলামের সমস্ত দিকের অনুসরণ করছিলেন। কর্মক্ষেত্রে অথবা নৈতিক শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, তিনি ছিলেন একজন মুরব্বী, শিক্ষাক্ষেত্রে তিনি ছিলেন শিক্ষক, জিহাদের ময়দানে ছিলেন নেতৃত্বদানকারী, পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ছিলেন উপদেষ্টা। ইসলামী কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সর্বত্র রাসূল (সা)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে আমরা বাধ্য এবং এক্ষেত্রে তাঁর (সা) অনুসরণ করা বা না করার বিষয়টি আমাদের ইচ্ছার উপরে নির্ভরশীল না।
অন্যদিকে ইসলামী কর্মকাণ্ডের আংশিক দিক হচ্ছে ইসলামের কোনো একটি দিকের মধ্যে নিজেদেরকে সীমিত রাখা। তারা শুধুমাত্র এরই অনুসরণ করে, একে অতিক্রম করেনা। তারা শুধুমাত্র এই আংশিক কাজের উপরেই আস্থা রাখে, অন্যকিছুর উপরে না। আংশিক কর্মকাণ্ডের ফলে বিভিন্ন দল সৃষ্টি হয়, কর্মকাণ্ডের মধ্যে বিভক্তি আসে এবং লোকজনের কর্মপ্রচেষ্টা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। বনী ইসরাঈলের আংশিক কর্মকাণ্ডকে কুরআন প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনো পথই নেই। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেওয়া হবে।”
(আল কুরআন ২:৮৫)এই বিষয়ের পক্ষালম্বনকারীরা আরো বলে থাকে যে, জাহিলিয়্যিাতের ঐক্যবদ্ধ চ্যালেঞ্জ আমাদেরকে বাধ্য করে সমন্বিত কর্মকাণ্ড গ্রহণ করতে।
মুসলিম কর্মীদের এই দলটি মনে করে ইসলামী কর্মকাণ্ডের সমস্ত দিককে গুরুত্ব অনুযায়ী সুষম ও সমন্বিতভাবে পালন করতে হবে, না হলে কিছু বিষয়ে অপর্যাপ্ততা থেকে যাবে এবং অন্যান্য বিষয়ে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। এই সমন্বিতকরণের ক্ষেত্রে প্রাধান্যদানের যুক্তি বিবেচনা করতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, সমন্বিতকরণের ধারণাটি পুরো ইসলামের সাথেই জড়িত। এজন্য দলটির কর্মকাণ্ডকেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে হবে। সুতরাং সমন্বিতকরণের বিষয়টি আমাদের কাছে দাবী করে প্রত্যেকের নিজস্ব গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুযায়ী সমস্ত বিষয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া। এক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত কিছু করার প্রয়োজন নেই তাহলে তা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে, আবার কোনো বিষয় অপর্যাপ্ত থাকলে সেটাও ত্রুটিপূর্ণ হবে।
সমন্বয় ও সুষমকরণের নিয়মসমূহ বিভিন্ন বস্তু ও কাজের প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। মুসলিম-অমুসলিম সবাই এই নিয়মসমূহকে প্রত্যক্ষ করেছে। ফলে তারা নিজেদের জীবনে এসব নিয়মের গুরুত্ব উপলব্ধি করে এবং এগুলোকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, যাতে কাঙ্ক্ষিত পরিণতি অর্জন করা যায়।
যাই হোক, কেউ লক্ষ্য করলে দেখতে পাবে, বস্তুর সমন্বয় ও ভারসাম্য আনয়নের সিদ্ধান্ত মনের উপরে নির্ভরশীল কিন্তু কাজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি এর বিপরীত অর্থাৎ এটি শরীয়াহ’র উপরে নির্ভরশীল।
কারণ, বস্তুর বাস্তবতা ও বাস্তবতার উপাদানসমূহ এবং এদের নির্দিষ্ট অনুপাত-এগুলো মন উপলব্ধি করতে পারে। এই বিষয়টি বিশেষজ্ঞগণ ভালো বুঝতে পারেন; এক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর নিম্নোক্ত হাদীসটি প্রযোজ্য:
“দুনিয়ার ব্যাপারে তোমরা আমার চাইতে অধিক জ্ঞানী।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]অতএব, কৃষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং মেকানিক প্রত্যেকে নিজ নিজ ক্ষেত্রের নিয়ম সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ। প্রত্যেকেই এই সমন্বয় ও সুষমকরণের নিয়মগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।
কিন্তু কাজের বিষয়টি আল্লাহ কর্তৃক র্নিধারিত এবং এক্ষেত্রে রাসূল (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদীসটি প্রযোজ্য,
“যেকোনো কাজ যা আমাদের বিষয়ের (দ্বীনের) মধ্য থেকে না, সেটা প্রত্যাখ্যাত।”
[বুখারী ও মুসলিম থেকে বর্ণিত]নিম্নোক্ত শরঈ মূলনীতিটি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য:
‘প্রকৃতপক্ষে, কাজের আনুগত্য করতে হবে শরঈ হুকুম অনুযায়ী।’ কারণ কোনো কাজ হাসান (ভালো) নাকি কুবহ্ (তিরস্কারযোগ্য) সেটা খোদ কাজ থেকে নয় বরং কাজের ব্যাপারে মানুষের ধারণার সাহায্যে ঠিক করা হয়। কোনো মুসলিম যেসব চিন্তায় বিশ্বাস করে সেগুলোর সাহায্যে সে তার কাজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যদি আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী কাজটি সম্পাদিত হয় তাহলে সেটা হাসান (ভালো), অন্যথায় কুবহ্ (তিরস্কারযোগ্য)। শরীয়াহ মূলনীতি অনুযায়ী: ‘শরীয়াহ যাকে হাসান সাব্যস্ত করেছে সেটাই হাসান এবং শরীয়াহ যাকে কুবহ্ সাব্যস্ত করেছে সেটাই কুবহ্।
ফলে কোনো মুসলিম যখন বস্তুর সমন্বয় ও ভারসাম্য আনয়নের চিন্তা করে তখন সে অন্যান্য মানুষের মতোই নিজের মনের উপরে নির্ভর করে। কিন্তু যখন কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন আসে, তখন সেটা অবশ্যই শরঈ হুকুম অনুযায়ী হতে হবে।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন কাজের সমন্বয় ও সুষমকরণের জন্য কোনোরকম বাড়াবাড়ি ছাড়াই শরঈ দিক থেকে কাজের বিশালত্ব আগে বুঝতে হবে। এজন্য নিচের বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করতে হবে;
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা এবং সমস্ত মুসলিম অর্থাৎ ইসলামী উম্মতকে পুরো ইসলামের দায়িত্ব নিতে হবে।
ব্যক্তি, দল এবং খলিফার সমন্বয় হচ্ছে ইসলামী উম্মত। এদের প্রত্যেকের জন্যই নির্দিষ্ট হুকুম রয়েছে।
ফলে ব্যক্তিগতভাবে মুসলিমরা সেসব দায়িত্ব পালন করে যেগুলো শরীয়াহ তার উপরে ন্যস্ত করেছে। দল তার নিজস্ব দায়িত্ব পালন করে। খলিফা সেসব দায়িত্ব পালন করে যেগুলোর জন্য সে খলিফা হিসেবে নির্দেশপ্রাপ্ত।
দল এবং খলিফার মতো মুসলিমগণও যদি ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের পালনীয় কর্তব্যসমূহ পূরণ করে, তাহলে কাজ পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণরূপে সম্পন্ন হবে। বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনে যদি (ব্যক্তি, দল বা খলিফার) কেউ কোনোরকম শৈথিল্য প্রদর্শন করে, তাহলে দায়িত্ব পালনে অবহেলাকরী হিসেবে সে অপরাধী হবে।
খলিফা ছাড়া পুরো ইসলাম পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান থাকতে পারেনা। যেহেতু দ্বীনের অনেক হুকুম খলিফার অস্তিত্বের উপরে নির্ভরশীল, সেহেতু তার অস্তিত্বে থাকা এবং তাকে অস্তিত্বে আনার জন্য কাজ করা ফরয। ফলে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পুরো দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কাজ করতে হবে দলটিকে। একে বলা হয় ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার কাজ। দলটির কাছ থেকে সম্পূর্ণরূপে এটিই শরীয়াহ প্রত্যাশা করে এবং এটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন নয়, পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের কাজ সে বাস্তবায়ন করতে পারে না এবং এই দায়িত্বটি তার উপরে ন্যস্তও না। বরং এমন অনেক হুকুম রয়েছে যেগুলো বাস্তবায়ন করা এর জন্য হারাম। উদাহরণস্বরূপ, হুদুদ এমন একটি বিষয়। অতএব, দলটি খলিফার ভূমিকা পালন করতে পারে না বরং খলিফা যাতে নিজের দায়িত্ব সম্পাদন করতে পারে সেজন্য সে খলিফাকে অস্তিত্বে আনার জন্য কাজ করে।
“জনগণের জন্য আমীর হচ্ছে মেষপালকের মতো যে তার পালের জন্য দায়িত্বশীল।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]“…প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]একটি বিষয়ের দিকে আমরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই যে, মুসলিমরা পুরো ইসলামের উপরে বিশ্বাস করে, এবং এর দিকে সাধারণভাবে ডাকে। তবে সে শুধুমাত্র সেসব বিষয়ই পালন করে যেগুলো ব্যক্তি হিসেবে তার কাছ থেকে শরীয়াহ দাবী করে এবং যে দলের সাথে সে কাজ করে সেই দলটি তার কাছ থেকে যা দাবী করে। এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে পালন না করলে আল্লাহ তাকে জবাবদিহি করবেন। অনুরূপভাবে ব্যক্তি হিসেবে খলিফার কাছ থেকে শরীয়াহ যা দাবী করে সেগুলো সে পালন করবে। অতএব তাকে সালাত আদায় করতে হবে, সিয়াম পালন করতে হবে, হজ্জ্ব পালন করতে হবে, যাকাত দিতে হবে, মা-বাবার দেখাশোনা করতে হবে এবং ব্যভিচার, সুদ, মিথ্যা বলা ও প্রতারণা থেকে বিরত থাকতে হবে। খলিফা হিসেবে শরীয়াহ তার কাছ থেকে যা দাবী করে সেগুলোও তাকে পালন করতে হবে। ফলে তিনি আইন জারি করবেন, জিহাদ ঘোষণা করবেন, মুসলিমদেরকে রক্ষা করবেন, আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে শাসন করবেন এবং হুদুদ প্রয়োগ করবেন। এসমস্ত বিষয়ে কোনোরকম শৈথিল্য প্রদর্শন করলে আল্লাহ তাকে জবাবদিহি করবেন।
উল্লিখিত বাস্তবতার জন্যই শরঈ হুকুমসমূহ এসেছে। এই বিষয়টি দলের নিকট স্পষ্ট থাকা উচিত, যাতে সে বুঝতে পারে কোন কাজটি তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কোন কাজটি দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা। অতএব, খলিফার জন্য যেসব কাজ রয়েছে সেগুলো দল সম্পাদন করতে পারে না। দল যদি নিজের বাস্তবতাকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে তাহলে সে তার দায়িত্বগুলো নির্ধারণ করতে পারবে এবং সেগুলোর জন্যই তাকে জবাবদিহি করতে হবে। সমন্বিতকরণের বিষয়টি চিন্তা করলে আমাদেরকে এরূপ সিদ্ধান্তেই আসতে হবে।
নিজের দায়িত্বসমূহ নির্ধারণ করার পরে যদি দলটি নির্ধারিত কাজসমূহের কোনো একটির মধ্যে নিজেকে সীমিত রেখে অন্যগুলোকে বাদ দিয়ে দেয় অথবা কোনো একটি বিষয়ের দিকে তীক্ষ্ণ নজর দেয় এবং অন্যগুলোকে তেমন গুরুত্ব না দেয় অথবা দায়িত্বসমূহের মধ্যে প্রাধান্যদান না করে তাহলে সে দায়িত্বসমূহের মধ্যে সুষমকরণে ব্যর্থ হবে। তবে এক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে প্রাধান্যদানের বিষয়টি মন নয় বরং শরীয়াহ নির্ধারণ করে। অতএব, দলটির কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক এবং সে ঐ মতাদর্শকে ইসলামী উম্মতের উপরে বাস্তবায়িত করতে চায় যার আলোকে সে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দাওয়াতের ক্ষেত্রে আক্বীদাহ’র অবস্থান হচ্ছে সর্বাগ্রে, কারণ এটিই সেই ভিত্তি যা থেকে প্রত্যেকটা শাখা বের হয়েছে এবং সমস্ত শরঈ আহকাম এর সাথে সম্পৃক্ত। খিলাফত প্রতিষ্ঠার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার গুরুত্ব অনেক বেশি কারণ, এর উপরে প্রচুর আহকাম নির্ভরশীল এবং এজন্য এটি ‘ফরযসমূহের মুকুট’ হিসেবে পরিচিত।
অতএব, দলটি যদি এই দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে সমন্বয় ও ভারসাম্য আনয়নের জন্য সংগ্রাম করে তাহলে সে এমনকিছুর জন্য নিজেকে চালনা করবে যা আল্লাহ নির্ধারণ করেননি। তখন সে অপর্যাপ্ততা এবং অসমতার অভিযোগ করবে যেমনভাবে সে একাধিক দল থাকার বিষয়ে অভিযোগ করে। তখন সে এমন একটি দলে পরিণত হবে যে অভিযোগ করে ও হতাশা ব্যক্ত করে এবং নিজের পথ হারিয়ে ফেলে, কারণ সে নিজের দিক নির্দেশনার কম্পাস হারিয়ে ফেলেছে।
ইসলামী ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য যদি হয় ইবাদাতের পদ্ধতি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, সামাজিক ব্যবস্থা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও সামরিক ব্যবস্থা প্রভৃতির সমন্বয় তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় এসব ব্যবস্থার সাথে দলটির সম্পর্ক কী? দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। যখন আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত হবে তখন বিভিন্ন ইসলামী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে ভূমি ও মালিকানা, উৎপাদন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কিত শরঈ আহকাম রয়েছে। অন্যান্য হুকুমের পাশাপাশি এসব হুকুমসমূহ বিধানদাতা খলিফার হাতে ন্যস্ত করেছেন। এসমস্ত বিষয় দেখাশোনা করার দায়িত্ব দলের নয় বরং খলিফার।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় শরীয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা এবং স্তম্ভসমূহের উপর ভিত্তি করে; যেমন: খলিফা, মুওয়ায়িন (সহযোগী) থেকে শুরু করে ওয়ালি (গভর্ণর), কাজী (বিচারক), প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং মজলিস আল উম্মাহ (উম্মাহ কাউন্সিল) পর্যন্ত। খলিফা, মুওয়ায়িন এবং ওয়ালী প্রত্যেকেরই কিছু নির্দিষ্ট ক্ষমতা আছে। সেনাবাহিনী এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার নিজস্ব কর্মক্ষেত্র রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে এসমস্ত বিষয়ে দলের কি করার আছে?
ইসলামী সেনাবাহিনী ও এর প্রস্তুতিকে অবশ্যই বিশ্বের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে হবে, কারণ এর জন্যই একে গঠন করা হয়েছে। এর প্রস্তুতি কেবলমাত্র কৌশলগত দিক যেমন: কীভাবে মেশিনগান ঠিকঠাক করতে হবে, ব্যবহার করতে হবে অথবা কীভাবে গ্রেনেড ছুঁড়তে হবে এতটুকু পর্যায়ে থাকলে চলবেনা বরং একে অবশ্যই বৈশ্বিক পর্যায়ে থাকতে হবে। কিছু অস্ত্র আছে যেগুলো ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা যাবে আবার কিছু অস্ত্র আছে যেগুলো কেবলমাত্র রাষ্ট্র ব্যবহার করতে পারবে। এজন্য প্রশিক্ষণকে সর্বাধুনিক পর্যায়ে রাখতে ট্যাংক, সাঁজোয়া বাহিনী, বিমান বাহিনী এবং পারমাণবিক প্রযুক্তি ও মহাশূন্যযান প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণদান অপরিহার্য। গবেষণাগার, অস্ত্রকারখানা, বিমানবন্দর, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রভৃতি এবং এগুলোর বাইরেও আরো অনেককিছু নির্মাণ করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এসমস্ত বিষয়ে দলের কী করার আছে? রাসূল (সা) যখন সাহাবাগণকে (রা) প্রস্তুত করতেন ও প্রশিক্ষণ দিতেন তখন তিনি কোনো একটা দলের দায়িত্বশীল হিসেবে তা করেননি বরং একটা রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে এগুলো করেছেন। অতএব, এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকেই এক্ষেত্রে রাসূল (সা)-কে অনুসরণ করতে হবে।
এসমস্ত ব্যবস্থাকে বাস্তবায়ন করা নিজের দায়িত্ব বলে মনে করা দলটির জন্য উচিত নয়; বরং দলটির কাজ হচ্ছে খলিফাকে অস্তিত্বে আনা যিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে এগুলোকে বাস্তবায়ন করবেন। উম্মাহ যদি খলিফাকে অস্তিত্বে আনার কাজকে অবহেলা করে এবং খলিফার কাজগুলোকে নিজেরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে তাহলে এর মাধ্যমে শরীয়াহ’কে বিকৃত করা হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যদি দলটিকে তৌফিক দেন তাহলে তারা যেসব আহকামের মাধ্যমে লোকজনের উপরে এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে ইচ্ছুক সেগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিক উপায়ে গ্রহণ করতে দলটি বাধ্য। এ লক্ষ্যে দলটি ইসলামী ব্যবস্থার কাঠামো এবং ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধানের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। জনগণের নিকট ইসলামী আহকামের একটি সাধারণ চিত্র উপস্থাপন করবে দলটি, যাতে জনগণ এসব সমস্যা সমাধানে দলের সামর্থ্যকে অনুভব করে। তখন তারা বিশুদ্ধ শরঈ আহকাম বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদাতের দিকে অগ্রসর হবে এবং আল্লাহর রহমতকে অনুভব করবে।
এবার তাদের ব্যাপারে আসা যাক, যারা শরীয়াহ’র ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে কাজ করার পক্ষপাতী। যদি তারা কোনো দাতব্য সংস্থা হয় অথবা নৈতিক সংগঠন হয় অথবা এমন কোনো সংগঠন হয় যারা কোনো একটিমাত্র শরঈ হুকুম যেমন কুরআন শিক্ষাদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত সংগঠন হয় তাহলে এগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হবে যতক্ষণ পর্যন্ত এর সদস্যগণ কোনো একটি শরঈ হুকুমের ভিত্তিতে এক থাকে। তবে যদি তারা এরূপ দাবী করে যে তাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবে তাহলে সেক্ষেত্রে আমরা বলব যে তারা পরিকল্পিত শরঈ তরীকাহ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে এবং তখন তাদের এই আংশিক কর্মকাণ্ড অবশ্যই বর্জনীয় হবে।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার নাযিলকৃত আহকাম পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে যে দলটি কর্মরত তাকে অবশ্যই তার প্রয়োজনীয় কর্তব্যসমূহ পালন করতে হবে; যেমন সে খলিফার দায়িত্বসমূহ গ্রহণ করবে না। অথবা ব্যক্তিবিশেষের হুকুমসমূহকে নিজের জন্য গ্রহণ করবেনা অথবা নিজেকে পুরো ইসলামী উম্মত বলেও মনে করবেনা বরং নিজেকে মুসলিম উম্মতের মধ্যকার একটি দল বলে মনে করবে এবং আল্লাহর আহকাম প্রতিষ্ঠিত করা ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করাকে নিজের উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করবে। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তখন সে প্রয়োজনীয় সবকিছু গ্রহণ করবে, যেমন: সে ইসলামী আক্বীদাহ’র সঠিক রূপটিকে এবং এর সাথে সম্পর্কিত চিন্তাগুলোকে গ্রহণ করবে এবং গ্রহণকৃত আক্বীদাহ’র আলোকে এর শাবাবদেরকে গড়ে তুলবে। উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় পদ্ধতি, জনগণকে শাসন করার জন্য নির্দিষ্ট সংবিধান এবং মুসলিমদের মধ্যে বিদ্যমান ভ্রান্ত চিন্তাসমূহের ভ্রান্ততা দূর করে শুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তাসমূহ দলটিকে গ্রহণ করতে হবে। দলের সাথে যারা কাজ করে তারা যেন নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয়াদি যথাযথভাবে পালন করার মাধ্যমে একজন পরহেযগার মুসলিম হতে পারে সে বিষয়টিও দলের নজরে থাকতে হবে। যার ফলে আক্বীদাহ, ইবাদাত, সামাজিক লেনদেন এবং নৈতিকতা প্রভৃতি বিষয়ে সে প্রয়োজনীয় সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠার উপরে দলটিকে focus করতে হবে যার সমস্ত সম্পর্ক হবে ইসলামের ভিত্তিতে এবং যার নিরাপত্তা রক্ষিত হবে খিলাফত রাষ্ট্রের মাধ্যমে। শাসকশ্রেণী এবং তাদের প্রভুদের কর্মকাণ্ড দলটিকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে যাতে সে বুঝতে পারে মুসলিমদের জন্য কোন কোন ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে। দলটিকে এসব বিষয় জনগণের সামনে উন্মোচন করতে হবে এবং উম্মাহর জন্য যা কল্যাণকর অর্থাৎ শরঈ আহকাম তা নিজস্ব অবস্থান থেকে দলটিকে গ্রহণ করতে হবে। এসব তাগুত যারা মুসলিমদের সাথে নিষ্ঠুরভাবে আচরণ করে তাদের কাছ থেকে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা দখল করে নেওয়ার জন্য দলটিকে কাজ করতে হবে। যদি এসব বিষয় যথাযথভাবে দলটি পালন করে তাহলে সে তার দায়িত্ব পরিপূর্ণ করবে।
দলটির চিন্তাভাবনাসমূহ বিস্তৃত হতে হবে এবং এর কর্মক্ষেত্র হতে হবে প্রসারিত। এজন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই দলটিকে সম্পাদন করতে হবে এবং বাস্তবে এর অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে অনেক বিষয়। প্রয়োজনীয় সমতা বিধান করে দলটিকে এর কর্মকাণ্ড সম্পাদন করতে হবে; অতএব সে শরীরচর্চা বা নৈতিক বা অর্থনৈতিক কোনো সংগঠন হবেনা … বরং অবশ্যই এটি এর রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অব্যাহত রাখবে। অতএব, এর চিন্তাভাবনাসমূহ হবে উম্মাহর বিষয়সমূহ দেখাশোনা করা এবং উম্মাহর স্বার্থসমূহ সংরক্ষণ করা।
অতএব, পূর্ববর্ণিত উপায়ে আংশিক কার্যক্রম অবশ্যই পরিত্যাজ্য। দলের জন্য নির্ধারিত এবং অনির্ধারিত সমস্ত কর্মকাণ্ডকে ব্যাপকভিত্তিতে বাস্তবায়নের চিন্তাও একটি ভুল চিন্তা যা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
আন্দোলন কি আঞ্চলিক হবে নাকি বৈশ্বিক?
যেহেতু সমগ্র পৃথিবীর জন্য ইসলাম একটি দ্বীন হিসেবে এসেছে এবং মুহাম্মাদ (সা) পুরো মানবজাতির জন্য নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন সেজন্য কিছু মুসলিম প্রস্তাব করে যে ইসলামী আন্দোলনকেও বৈশ্বিক হতে হবে। এছাড়া বাস্তবতা বিবেচনা করলেও দেখা যায় ইসলামী আন্দোলনকে বৈশ্বিক বিভিন্ন আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। উপরন্তু, ইসলামী পরিবর্তন সূচিত করার লক্ষ্যে যে বিশাল কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন সেজন্যও প্রয়োজন বৈশ্বিক আন্দোলন। যারা এরূপ ধারণা পোষণ করে তারা প্রমাণ হিসেবে কুরআনের এ আয়াতগুলো উদ্ধৃত করে:
“এমনিভাবে আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী সম্প্রদায় করেছি যাতে করে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমণ্ডলীর জন্যে এবং রাসূল সাক্ষ্যদাতা হন তোমাদের জন্যে।”
(আল কুরআন ২:১৪৩)“বলে দিন (হে মুহাম্মাদ): ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমাদের সবার প্রতি আমি আল্লাহ প্রেরিত রাসূল।”
(আল কুরআন ৭:১৫৮)“আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে পাঠিয়েছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানেনা।”
(আল কুরআন ৩৪:২৮)এজন্যই আমরা দেখি রাসূল (সা) পুরো মানবজাতি, প্রত্যেকটা শক্তি ও দল এবং রাজার নিকট তাঁর দাওয়াত পৌঁছিয়েছেন। তিনি নাজ্জাশী (আবিসিনিয়ার রাজা), হিরাক্লিয়াস (রোমের সম্রাট), মুকাওকিস (মিশরের সম্রাট) এবং কিসরা (পারস্যের সম্রাট) সবার নিকট পত্র পাঠিয়েছিলেন। এজন্য ইসলামী কর্মকাণ্ডকে কোনো একটি দোকান বা মাঠে বিচ্ছিন্নভাবে রেখে দেয়া যায়না। যার ফলে ইসলামী কর্মকাণ্ড কেবল একটি উপত্যকা থেকে উঠে আসা আর্তচিৎকার বলে মনে না হয়।
প্রকৃতপক্ষে, আক্বীদাহ এবং ব্যবস্থার দিক থেকে ইসলাম একটি বৈশ্বিক দ্বীন।
মূল্যহীন তরল (শুক্রাণু) থেকে সৃষ্ট এবং দুর্বল ও চাহিদাসম্পন্ন মানবজাতি অবশ্যই ফিরে যাবে সেই মহান সত্তার নিকট যিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, সমস্ত বিষয়ের পরিচালনাকারী এবং সর্বজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞাত। আল্লাহই মানুষের সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিই পুরো মানবজাতির রব। পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্বের সাথে তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য জড়িত, যা হচ্ছে আল্লাহর ইবাদাত। জীবনের পরের ঘটনাসমূহ অর্থাৎ পুনরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম এবং ঈমান ও কুফর, আনুগত্য ও অবাধ্যতার প্রতিদান প্রভৃতি বিষয়ের সাথেও তার অস্তিত্ব জড়িত। আক্বীদাহ’র সত্যতার প্রমাণ অবশ্যই সঞ্চালিত হতে হবে এবং সকলের নিকট তা পৌঁছাতে হবে;
“যাতে যেসব লোক নিহত হওয়ার ছিল তারা (ঈমান প্রত্যাখ্যানের ফলে) নিহত হয় প্রমাণ প্রতিষ্ঠার পর এবং যাদের বাঁচার ছিল তারা বেঁচে থাকে প্রমাণ প্রতিষ্ঠার পরে।”
(আল কুরআন ৮:৪২)ইসলামী আক্বীদাহ থেকে উৎসারিত যে জীবনব্যবস্থা আল্লাহ তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন সেটা বর্ণ, গোত্র বা অবস্থানের ঊর্ধ্বে সমস্ত মানুষের জন্যই প্রযোজ্য। প্রকৃতপক্ষে, ইসলাম হচ্ছে একটি বৈশ্বিক জীবনব্যবস্থা। অতএব, ইসলামকে প্রতিষ্ঠার যে বীজ বপন করা হবে তা যেন হয় একটি বৈশ্বিক বীজ— সেজন্য ইসলাম আমাদেরকে বাধ্য করে। ইসলাম দলটিকে বাধ্য করে যাতে সে এই দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। ফলে দলটি নিজেদের কর্মকাণ্ডকে সংকীর্ণরূপে দেখতে পারে না অথবা কোনো একটি দেশে এর কর্মকাণ্ডকে সে সীমিতও করতে পারে না। কোনো গেঁাজামিল দেওয়া অথবা ক্রমান্বয়িক প্রস্তাবনাও সে গ্রহণ করতে পারে না যার ফলে সত্যকে আংশিকভাবে গ্রহণ করবে এবং সত্যের চরম রূপ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবে। বরং দলটিকে এটা এভাবে দেখতে হবে যে সে কুফরের নষ্টামি এবং শিরকের বিভ্রান্তি থেকে মানবজাতিকে একক সত্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অতীতে লোকজন মনে করত যে, মূর্তি মানুষের মঙ্গল করে এবং মঙ্গল-অমঙ্গলের বিষয়টি মূর্তির হাতেই নিহিত। বর্তমানে কিছু নির্দিষ্ট চিন্তাকে মানুষ কল্যাণ আনয়নকারী বলে মনে করে এবং অন্য চিন্তাকে ক্ষতিকর বলে মনে করে। এসমস্ত বিষয় বিবেচনায় রেখে দলটিকে প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনা গ্রহণ করতে হবে— যার উপর ভিত্তি করে নিজেদের কর্মকাণ্ড এবং চলার পথ তাকে স্থির করতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতিতে যদি দলটি ধৈর্যে্যর সাথে এবং কোনোরূপ বিচ্যুতি প্রদর্শন না করে, দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় পথ না চলে, আপোষ না করে এবং নমনীয়তা প্রদর্শন না করে, তাহলে আল্লাহ দলটিকে সেরকমভাবে প্রস্তুত করবেন যা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরে এই দায়িত্বকে বৈশ্বিকভাবে পালন করতে সক্ষম হয়। চিন্তার দিক থেকে দলটি বৈশ্বিক, কিন্তু কাজের দিক থেকে বাস্তবিকভাবে চিন্তা করতে গেলে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে এবং এর বাইরে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব না। অতএব, এই বিশাল দায়িত্বটি খিলাফত রাষ্ট্রের কাজ।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। বর্তমানে মুসলিমরা যেসব ভূখণ্ডে বাস করছে সেগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হয়েছে এবং এসব ভূখণ্ডের মুসলিমরা প্রায় একইরকম পরিবেশে আছে। ফলে কোনো সুসংগঠিত কর্মকাণ্ড যদি এসব ভূখণ্ডে বিস্তার লাভ করতে চায় তাহলে এর পদ্ধতি পরিবর্তনের কোনো প্রয়োজন নেই, যদিও এসব রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সামান্য কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। দলটির বিস্তৃতি একে শক্তিশালী করে তুলবে, এর সচেতনাকে বৃদ্ধি করবে এবং একে আরো কার্যকর করে তুলবে। কোনো ভূখণ্ডে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রের বিস্তৃতির জন্যও তা সহায়ক হবে। ফলে খিলাফত প্রতিষ্ঠার পরের দায়িত্ব বহন করতে দলটির জন্য তা সহায়ক হবে এবং রাষ্ট্রের জন্য বৈশ্বিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ সহজতর হবে। উভয় পরিস্থিতিতেই দলটিকে নির্ভর করতে হবে আল্লাহর সাহায্যের উপরে।
একাধিক দলের বৈধতা
এই বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে একাধিক দলের বৈধতাকে যেসব দলীলের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয় সেগুলোকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এর ফলে অন্যান্য যেসব মত একাধিক দলের উপস্থিতিকে অনুমোদন করে সেগুলোও বৈধ হয়ে যায়নি। কারণ কোনো বিষয় অবৈধ হলেই বিপরীত বিষয়টি বৈধ বলে প্রমাণিত হয়ে যায়না। এর জন্য এমনসব দলীলের প্রয়োজন যেগুলো ইসতিদলাল ও ইসতিনবাদের যথার্থতাকে প্রমাণ করে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এক্ষেত্রে কী কী দলীল বিদ্যমান?
অসংখ্য দলীল রয়েছে যেগুলো ফুরু’র (আহকাম) ক্ষেত্রে মতভেদকে অনুমোদন করে, উসূলের (আক্বীদাহ) ক্ষেত্রে নয়। ফুরু সংক্রান্ত মতভেদকে অনুমোদনের ব্যাপারে সুন্নাহ’তে নির্দেশনা আছে। এজন্যই আমরা দেখি সাহাবীদেরকে (রা), তাবিঈন এবং সলফে-সালেহীন (পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল) উলেমাদেরকে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করতে। মতভেদ নিষিদ্ধ হওয়ার দলীলগুলো এসেছে মূলত কাফিরদের মতভেদ সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থাৎ দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহে, ফুরু’র ক্ষেত্রে নয়। উদাহরণস্বরূপ, নবীগণ, পুনরুত্থান, জীবন, মৃত্যু এবং পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের ব্যাপারে তাদের মতভেদ ছিল যার ফলে তারা ভিন্ন সম্প্রদায়, দল এবং মিলাল ও নিহালে পরিবর্তিত হলো। তাদের নবীদের নিকট আল্লাহ যে সত্য প্রেরণ করেছিলেন সেগুলো থেকে তারা অনেকদূরে সরে গিয়েছিল এবং নবীদের অনুসারীদেরকে পথভ্রষ্ট করে দিয়েছিল। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“অতঃপর তাদের মধ্যে দলগুলো পৃথক পৃথক পথ অবলম্বন করল। সুতরাং, মহাদিবস আগমনকালে তাদের জন্য রয়েছে ধ্বংস।”
(আল কুরআন ১৯:৩৭)এজন্য কাফিরদের অনুরূপ মতভেদের ব্যাপারে আল্লাহ আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন।
পরিখার যুদ্ধের দিন সাহাবীদের ভিন্ন ভিন্ন মতকে রাসূল (সা) অনুমোদন করেছিলেন। তিনি (সা) বলেছিলেন:
“যে শুনে এবং আনুগত্য করে, সে যেন বনী কোরাইযা না পৌঁছে আসরের সালাত আদায় না করে।”
[সীরাতে ইবনে হিশাম]এই হাদিসটি থেকে নিচের বিষয়গুলো প্রতিপাদন করা যায়:
১) মুজতাহিদ ভুল করতে পারেন আবার সঠিক সিদ্ধান্তেও পৌঁছতে পারেন। অর্থাৎ মুজতাহিদ হওয়ার মানে এই না যে সে কোনো ভুল করতে পারবে না।
২) মুজতাহিদ কর্তৃক প্রতিপাদিত হুকুম হচ্ছে একটি শরঈ হুকুম, এমনকি যদি তা ভুলও হয়।
৩) মুজতাহিদ জেনেশুনে কোনো ভুল করেন না, তবে নিজের ভুল সম্পর্কে যদি জানতে পারেন তাহলে ভুলের মধ্যে থাকার কোনো সুযোগও তার নেই। নিজের দৃষ্টিতে তার সিদ্ধান্ত অন্যদের চাইতে শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হওয়াতেই তিনি ঐ মতটি পোষণ করেন।
৪) মুজতাহিদ আল্লাহ কর্তৃক পুরস্কৃত হবেন; তবে ভুল বা সঠিক হওয়ার কারণে পুরস্কার ভিন্ন হবে।
এ ব্যাপারে ইমামগণ একমত যে, ফিকহের কোনো সংশয়যুক্ত বিষয়ের শরঈ হুকুম প্রতিপাদনের ক্ষেত্রে ভুল হলে মুজতাহিদ গোনাহগার হবেন না।
আল কুরতুবী (র) তাঁর তাফসীরে বলেন; “ঐক্যবদ্ধ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন বিষয়ের হুকুমের ব্যাপারে সাহাবীদের মধ্যে মতভেদ ছিল।” আল-বাগদাদী তার ‘আল ফকীহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ’ গ্রন্থে উমর বিন আব্দুল আযীয এর একটি মন্তব্য বিবৃত করেছেন: “মুহাম্মদ (সা)-এর আসহাব (রা) যদি মতভেদ না করতেন তাহলে আমি সন্তুষ্ট হতে পারতাম না, কারণ সেক্ষেত্রে আমাদের জন্যও (মতভেদ করার) সুযোগ থাকতনা।”
বিখ্যাত অনেক মুসলিম উলেমা তাদের গ্রন্থে মতভেদের কারণসমূহ বিবৃত করেছেন।
তাদের অন্যতম একটি হচ্ছে, কোনোকিছু বুঝার ক্ষেত্রে মানুষের ক্ষমতা মানবীয় বৈশিষ্ট্যের কারণেই মানুষে মানুষে ভিন্ন হয়। মানুষের ক্ষমতা ভিন্ন হওয়াতে তাদের সিদ্ধান্তেও ভিন্নতা আসে। এজন্যই সাহাবাদের (রা) যুগ থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন ইজতিহাদ এবং ভিন্ন ভিন্ন ইসতিম্বাত চলে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। এর অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে শরীয়াহ’র প্রকৃতি যার জন্য মানুষ ভিন্নমতে উপনীত হয় এবং এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর করুণা।
— কিরাআতের (পঠন পদ্ধতি) ভিন্নতার কারণেও সিদ্ধান্তে ভিন্নতা আসে। কোনো মুজতাহিদ যেভাবে পড়েছেন সে আলোকেই তিনি চিন্তা করবেন। এরূপ মতভেদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে ওযু সংক্রান্ত একটি আয়াত যার আলোকে প্রশ্ন ওঠেছে পায়ের পাতা কি ধুতে হবে নাকি মুছে ফেললেই হবে?
— কিছু হাদীসের ব্যাপারে উলেমা এবং ফুকাহগণের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। হাদীসকে গ্রহণ বা বর্জন করার যে পদ্ধতি কোনো ইমাম প্রয়োগ করেন তার আলোকে কোনো হাদীস একজনের দৃষ্টিতে সহীহ হলেও তা অন্যজনের দৃষ্টিতে সেরূপ নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মুরসাল হাদীসের বিষয়টি দেখা যেতে পারে। এই উম্মতের ইমামগণের মধ্যে মুহাদ্দিস (হাদিস বিশেষজ্ঞ), উসূলী আলেম (আইনশাস্ত্রের ভিত্তি নিয়ে যারা আলোচনা করেন) এবং ফকীহদের (আইনজ্ঞ) মধ্যে মুরসাল হাদীসকে দলীল হিসেবে ব্যবহার করা নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ একে দলীল হিসেবে ব্যবহার করেছেন আর কেউ কেউ মুনকাতী হাদীস (যে হাদীসের বর্ণনাকারীদের ধারার মধ্যে কোথাও ফাঁকা আছে) বলে একে ব্যবহার করেননি।
— মতভেদের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে দলীলসমূহের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক বিষয়াদি। উদাহরণস্বরূপ, কিছু দলীলে চিকিৎসাকার্যে নাজাস (অপবিত্র কিছু) এবং হারাম উপকরণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যেমন:
“প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ রোগ এবং এর প্রতিকার উভয়ই দিয়েছেন এবং প্রত্যেক রোগের জন্যই তিনি এর প্রতিকার দিয়েছেন। অতএব, হারাম কিছু দিয়ে প্রতিকার করো না।”
[আবু দাউদ কর্তৃক বর্ণিত]অন্যদিকে কিছু দলীলে আবার নাজাস অথবা হারাম উপকরণ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যেমন:
“রাসূল (সা) আব্দুর রহমান বিন আওফ এবং আয—যুবাইরকে সিল্ক পরিধানের অনুমতি দিয়েছিলেন কারণ তারা চর্মরোগে ভুগছিলেন।” এছাড়া নিচের হাদীসটি
“মুসলিমগণ ওষুধ হিসেবে উটের মূত্র ব্যবহার করতেন এবং এতে দোষের কিছু আছে বলে মনে করতেন না।”
[বুখারী থেকে বর্ণিত]— যখন কোনো বিষয়ে স্পষ্ট দলীল থাকে না তখন সে বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হুকুম বের করার জন্য প্রয়োজন ইজতিহাদের এবং ইজতিহাদ হচ্ছে একটি অনুমানমুলক সিদ্ধান্ত যাতে মতভেদের সুযোগ থাকতে পারে।
— মতভেদের অন্যতম একটি কারণ হচ্ছে অর্থের দিক থেকে আরবি ভাষার ব্যাপকতা। ইশতিরাক (ভিন্নার্থবোধক সমোচ্চারণ শব্দ), হাকীকাহ (আক্ষরিক অর্থ), মাজায (উপমা), মুতলাক (চরম) এবং মুকাইয়্যাদ (সীমিত), আম (সার্বজনীন) এবং খাস (সুনির্দিষ্ট) প্রভৃতি বিষয়ের উপস্থিতিই হচ্ছে এর প্রমাণ। কুরআন নাযিল হওয়ার ভাষা আরবির প্রকৃতিই হচ্ছে এরকম যে এর প্রকাশভঙ্গি এবং বাক্যপ্রকরণ (সিনট্যাক্স) এর কারণে তা বিভিন্ন অর্থ এবং বৈচিত্র্যময় নির্দেশনার জন্ম দেয়।
ফলে তালাকপ্রাপ্তা মহিলাদের ব্যাপারে আল্লাহর এই আয়াত:
“আর তালাকপ্রাপ্তা নারী নিজেকে অপেক্ষায় রাখবে তিন কুরু পর্যন্ত।”
(আল কুরআন ২:২২৮)এখানে ব্যবহৃত কুরু শব্দটির অর্থ আরবিতে হতে পারে পবিত্র অথবা ঋতুস্রাবকালীন সময়। প্রশ্ন হচ্ছে এখানে কোন অর্থটিকে বোঝানো হয়েছে? এজন্য এই বিষয়টিতে ফুকাহাগণের মতভেদ করার অন্যতম একটি কারণ এটি।
সাধারণভাবে বলতে গেলে এটিই হচ্ছে এ সংক্রান্ত শরঈ আলোচনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে তাদের কোনো একটিও কি আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে? অর্থাৎ শরঈ আহকামের ব্যাপারে মতভেদ করার যে সুযোগ শরীয়াহ অনুমোদন করেছে তার আলোকে সমাজ পরিবর্তনের জন্য কর্মরত একাধিক আন্দোলন বা দলের বিষয়টি কি অনুমোদিত হয়? নাকি এ বিষয়ের নিজস্ব কিছু সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদি বিদ্যমান যেগুলো একে মূল নিয়ম থেকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে?
মৌলিক নিয়মসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি বাদে শরঈ দলীলের অন্য যেসব জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই জ্ঞানকে অন্যান্য বিষয়ের শরঈ জ্ঞানের মতই ভিন্নভাবে বোঝার সুযোগ আছে। যেহেতু দলটি কর্তৃক গ্রহণকৃত শরঈ হুকুম হচ্ছে কিছু প্রতিপাদিত হুকুম সেহেতু সেগুলো ভুল বা সঠিক দুটোই হতে পারে। কোনো মুসলিম যদি দেখে যে একটি দলের চিন্তায় প্রচুর ভুল রয়েছে তাহলে সেই দলের সাথে কাজ করা তার জন্য উচিত হবে না। বরং তখন দলটিকে উপদেশ দিতে হবে এবং এমন একটি দলের খেঁাজ করতে হবে যার সাথে কাজ করার মাধ্যমে সে আল্লাহর নিকট নিজেকে গোনাহমুক্ত রাখতে পারে। আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে মানবীয় প্রকৃতি, উলেমাগণের ভিন্নমত এবং শরীয়াহ ও আরবি ভাষার প্রকৃতি থেকে বোঝা যায় যে ভিন্নমতে পৌঁছার বিষয়টি অনুমোদিত। আর এ কারণেই একাধিক দল অস্তিত্বে আসতে পারে। তবে এই বিষয়টি ততক্ষণ পর্যন্ত দোষের কিছু না যতক্ষণ পর্যন্ত তা শুধুমাত্র জ্ঞানের ক্ষেত্রে মতভেদ সংক্রান্ত হয়। এক্ষেত্রে যে দলটি সত্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী তার সাথে কাজ করা ফরয।
এছাড়া নিচের আয়াতটি:
“আর তোমাদের মধ্য থেকে একটি দল বের হোক যারা মানুষকে খায়র (ইসলাম) এর দিকে ডাকবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজের নিষেধ করবে। আর এরাই হচ্ছে সফলকাম।”
(আল কুরআন ৩:১০৪)এই আয়াতটি কমপক্ষে এমন একটি দল প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিচ্ছে যার কাজ হবে: খায়র (ইসলাম)-এর দিকে ডাকা, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজের নিষেধ করা। এই আয়াতটি কেবলমাত্র একটি দলের উপস্থিতিকে বুঝাচ্ছে না; যদি তাই হতো তাহলে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলতেন: ‘উম্মাহ ওয়াহিদা (এক উম্মত)’। বরং এখানে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে কাজের ধরন সম্পর্কে যা হচ্ছে দাওয়াত দেওয়া, সৎকাজের আদেশ করা এবং অসৎকাজের নিষেধ করা। এটি ফরযে কিফায়া যা বাস্তবায়নের জন্য কমপক্ষে একটি দলের প্রয়োজন। ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে একাধিক দল সৃষ্টি হলে তাতে দোষের কিছু নেই। এই ধরনের নির্দেশনা শতশত আয়াত ও হাদীসে বিদ্যমান আছে। উদাহরণস্বরূপ নিচের হাদীসটি;
“তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুনকার সংঘটিত হতে দেখে তাহলে সে যেন নিজের হাত দিয়ে তা পরিবর্তন করে দেয়…” যা কোনো একটি মুনকারকে বুঝাচ্ছে না বরং মুনকারের ধরন সম্পর্কে বুঝাচ্ছে।
Abu al-A’la al-Mawdudi (may Allah have mercy on him) mentioned the following in his book ‘Islamic concepts regarding religion and state’ under the chapter on: The obligation of enjoning the ma’roof and forbidding the munkar; “What is apparant from the partative in the ayah;
‘আর তোমাদের মধ্যে থেকে বের হোক একটি দল যারা মানুষকে খায়র (ইসলাম)-এর দিকে ডাকবে।’ তার অর্থ এই না যে, ইসলামের দিকে ডাকা, সৎকাজের আদেশ করা ও অসৎকাজের নিষেধ করার ফরয দায়িত্বটি কেবলমাত্র একটি দলের এবং এই দলের বাইরের মুসলিমদের জন্য এই কাজগুলো ফরয না। বরং এর মানে হচ্ছে উম্মাহর মধ্যে কমপক্ষে এমন একটি দল সবসময়ই থাকা ফরয যা হক্ব ও খায়র-এর আলোকবর্তিকাকে রক্ষা করবে এবং অন্যায় ও বিভ্রান্তির অন্ধকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে। যদি উম্মাহর মধ্যে এরকম কোনো একটি দলও বিদ্যমান না থাকে তাহলে মানবজাতির জন্য উত্থানকৃত সর্বোত্তম উম্মত আল্লাহর অভিশাপ ও ভয়ঙ্কর শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না।”
পূর্বে আমরা যা বর্ণনা করেছি তার আলোকে বলা যায়:
আমাদেরকে এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে যে শরীয়াহ যা অনুমোদন করেছে তা হচ্ছে আমাদের জন্য অনুগ্রহস্বরূপ। যদি এটি কোনো বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তাহলে তা কেবল মুসলিমদের ভুল বোঝার পরিণতি, অন্য কিছু না। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, দুজন মহান ইমামের উন্নত ফিকহ আমাদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত। ‘শুযূর আয-যাহাব’ (স্বর্ণখণ্ড)-এ বর্ণিত আছে, ইমাম শাফেঈর ছাত্ররা একদিন তার নিকট এসে অভিযোগ করল তিনি কিভাবে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের সাথে দেখা করেন যেখানে ইমাম হাম্বলের ছাত্ররা তাদের সাথে ভিন্নমতের বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়। এ ব্যাপারে শাফেঈ বলেন:
তারা বলল; ‘আহমাদ আপনার সাথে দেখা করে এবং আপনি তার সাথে দেখা করেন’,
আমি বললাম, ‘তার গৃহে কল্যাণ আছে। যদি তিনি আমার সাথে দেখা করেন তাহলে তাকে ধন্যবাদ আর যদি আমি তার সাথে দেখা করি তাহলে সেটা তারই বদান্যতা। উভয়ক্ষেত্রেই প্রশংসা তার।’
একই ধরনের ঘটনা ইমাম আহমাদ এবং তার ছাত্রদের মধ্যে ঘটেছিল। ইমাম আহমাদ তখন তার ছাত্রদেরকে বললেন;
“যদি আমাদের বংশ ভিন্ন হয় তাহলে যে জ্ঞানটি আমাদেরকে এক করবে তা হচ্ছে আমরা একই পিতা থেকে এসেছি; যদি আমরা ভিন্ন সমুদ্রের পানি হই, তাহলে বুঝতে হবে যে আমরা একই উৎস থেকে নিঃসৃত বিশুদ্ধ পানি।”
— শরীয়াহ’র প্রকৃতি এবং মানবীয় প্রকৃতির বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে যদি কেউ মনে করে যে, সে কোনো কাজের ব্যাপারে সমস্ত মুসলিমকে এক করে ফেলবে তাহলে তাকে আমরা সেই কথাটি বলতে চাই যেই কথাটি ইমাম মালিক হারুনুর রশীদকে বলেছিলেন, যখন হারুনুর রশীদ মালিকের জ্ঞান ও মাযহাবকে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন, একে লোকজনের উপরে বাধ্যতামূলক করতে চেয়েছিলেন এবং অন্যদের জ্ঞানকে নিষিদ্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন; “লোকজনের জন্য সংকীর্ণ করে দিওনা, যখন আল্লাহ তাদেরকে প্রশস্ততা দিয়েছেন।”
— যখন কুফর রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রযন্ত্র দেখতে পায় কোনো এক বা একাধিক দল আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করছে ও জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে তখন তারা চায় এসব দলকে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে দিতে অথবা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন দল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঠিক দলগুলোকে ব্যর্থ করে দিতে। যদি আমরা ধরে নিই যে একাধিক দলের বিষয়টি অনুমোদিত নয় তাহলে সঠিক দলটিকে অন্যান্য দলের সাথে এক হয়ে যেতে হবে এবং ফলে ভালো ও খারাপের সংমিশ্রণ ঘটবে। কিন্তু শরীয়াহ’র নির্দেশ হচ্ছে বিপরীত অর্থাৎ আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে খারাপকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে এবং উত্তমকে সাথে রাখতে যাতে লোকজন উপকৃত হয়।
— যেহেতু এই প্রস্তাবনাটি (ইসলামী কর্মকাণ্ডসমূহকে এক করে ফেলার বাধ্যবাধকতা এবং একাধিক দলের উপস্থিতিকে নিষিদ্ধ করা) শরীয়াহ, মানবীয় প্রকৃতি এবং যে ভাষায় কুরআন নাযিল হয়েছে তার প্রকৃতিগত বাস্তবতার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সেহেতু এই প্রস্তাবনাটি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে থাকলে আমরা এর চাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ খিলাফত প্রতিষ্ঠা থেকে দূরে সরে থাকব। মুসলিমরা যতক্ষণ এক না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ সাহায্য করবেন না, এই মন্তব্য ভিত্তিহীন এবং অগ্রহণযোগ্য। বরং আল্লাহ মুসলিমদেরকে ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্য করেন না যতক্ষণ না তারা শরীয়াহ’র আনুগত্য করছে, আল্লাহর রজ্জুকে অঁাকড়ে ধরছে এবং তাঁর (সুবহানাহু তায়ালার ) নির্দেশগুলো পূরণ করছে। এক্ষেত্রে যদি তারা সংখ্যায় অল্প হয় তবুও তাদেরকে আল্লাহ সাহায্য করবেন। কারণ সত্যের ব্যাপারে প্রতিশ্রম্নতিশীল একজন লোকই অনেক বেশি বলে গণ্য এবং বিপরীতে ভ্রান্ত পথের অনুসারী অনেক হলেও তারা সমুদ্রের ফেনার মতো বলে বিবেচিত।
এই বিষয়ে একটি কথা না বললেই নয় যে, খলিফা এবং ইসলামী রাষ্ট্র হচ্ছে মুসলিমদেরকে এক করার সবচেয়ে বড় দিক এবং এটি ছাড়া কোনো একত্রীকরণ সম্ভব না। ভিন্ন ভিন্ন সিদ্বান্ত থাকতে পারে কিন্তু আমরা খলিফার আনুগত্য করতে নির্দেশপ্রাপ্ত। ইমাম কোনো হুকুম গ্রহণ করে এবং গ্রহণকৃত হুকুমের সাহায্যে মুসলিমদের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করে কিন্তু তিনি ভিন্নমতকে প্রতিরোধ বা নিষিদ্ধ করেন না। মুসলিমরা তার নির্দেশ প্রকাশ্যে এবং গোপনে মানতে বাধ্য। কোনো দলের আমীরের নির্দেশ দলের ভিতরের সবাই মানতে বাধ্য এবং তিনি বৃহৎ পরিসরে সমস্ত মুসলিমের সমস্যার সমাধান না করলেও দলের সদস্যদের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করেন।
৯ম অধ্যায়: একাধিক ইসলামী দল বা আন্দোলন থাকা কি বৈধ?
এই বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে কোনো আন্দোলন বা দলের কর্মসূচীর জন্য একটি সামগ্রিক এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করতে আমরা চেষ্টা করেছি। বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আমরা একে ভারাক্রান্ত করে তুলিনি বরং যেসব মৌলিক বিষয় অবশ্যই মেনে চলতে হবে সেগুলো আমরা বর্ণনা করেছি এবং বিস্তারিত বর্ণনার বিষয়টি দল ও এর মুজতাহিদগণের উপর ছেড়ে দিয়েছি। বর্তমানে এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এমন অনেক কর্মপ্রচেষ্টা বিদ্যমান, যেগুলো কোনো সঠিক ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত না। অনেক দলের ক্ষেত্রে বলা যায় যে তারা শরীআ’হ’র প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ পূরণ করেনি। আংশিক কাজ করতে ইচ্ছুক এমন কিছু মুসলিমের সমষ্টি ছাড়া তারা আর কিছুই না। এমনকি তারা আংশিক সমস্যাসমূহের সমাধানও করতে পারে না এবং শরীয়াহ’র সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করতেও ব্যর্থ। ফলে তারা ইসলামকে এমনভাবে বহন করেনা যা ইসলামী উম্মাহর দৈনন্দিন জীবনে ইসলামকে ফিরিয়ে আনবে। এ ধরনের দল এতটা ব্যাপকমাত্রায় বিদ্যমান যে কোনো একটি দেশে হয়ত এরকম শতশত দল রয়েছে। তারা হাটবাজারের মতো গড়ে উঠছে যেখানে লোকজন তাদের শক্তি খরচ করছে এবং এভাবে তারা সঠিক দিকনির্দেশনা ও কর্মকাণ্ড থেকে লোকজনকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এরকম অসংখ্য দৃষ্টি আকর্ষণকারী দলের (সংস্থা) মধ্যে কেবলমাত্র কয়েকটি দলের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, তারা ইসলামের উদ্দেশ্যসমূহ এবং সেগুলো অর্জনের প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। যেসব দল আমাদের দৃষ্টিতে হাটবাজারের মতো গড়ে উঠেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে সেগুলো বাদ দিয়ে যদি আমরা সেসব বৃহৎ দলের কথা চিন্তা করি যারা দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এবং দায়িত্বপালনে স্বয়ংসম্পূর্ণ তাহলে অবশ্যই একটি প্রশ্ন উত্থাপন করতে হয়; শরীয়াহ কি একটিমাত্র দলের নির্দেশ দেয়, যা প্রয়োজনীয় সকল বিষয়কে অনুধাবন করে এবং সেগুলোকে সম্পাদন করে? নাকি শরীয়াহ একাধিক দলের অনুমতি দেয় যারা শরীয়াহ’র নীতির অধীনে পরিবর্তন আনার জন্য কাজ করবে? আংশিক কর্মকাণ্ড এবং পরিপূর্ণ ও সুষম কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কী? আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রচেষ্টাসমূহের ব্যাপারে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি কী?
এক বা একাধিক ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে এবং বিপক্ষে প্রচুর মতামত তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রয়োজনীয় ইসলামী কর্মকাণ্ড একক হওয়া বাধ্যতামূলক, আবার অনেকে মনে করেন একাধিক দল থাকার বিষয়টি অনুমোদিত। যদি এই আলোচনার গৌণ বিষয়গুলোকে আমরা ভিত্তির আলোকে চিন্তা করি, তাহলে শরঈ প্রমাণাদি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মতামতকে আমরা পৃথকভাবে চিনতে পারব যেভাবে আমরা গম থেকে তুষকে পৃথকভাবে চিনি।
যারা মনে করেন ‘ইসলামী কর্মকাণ্ড একক হওয়া বাধ্যতামূলক’ তারা মূলত দুটো কারণে তা মনে করেন।
প্রথমত, ইসলামী কর্মকাণ্ডের ঐক্য একটি ফরয বিষয়।
দ্বিতীয়ত, ইসলামী কর্মকাণ্ডের ঐক্য একটি সাংগঠনিক অপরিহার্যতা।
১. নিম্নোক্ত দলীলসমূহের আলোকে তারা একে একটি শরঈ বাধ্যবাধকতা বলে মনে করেন:
ক) প্রকৃতপক্ষে সমস্ত মুসলিম এবং উম্মাহকে এক থাকতে হবে। কারণ আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত এবং আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব (একমাত্র) আমারই ইবাদাত কর।”
(আল কুরআন ২১:৯২)তিনি আরো বলেন:
“এবং নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত এবং আমি তোমদের পালনকর্তা, অতএব আমাকেই ভয় কর।”
(আল কুরআন ২৩:৫২)“পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি দিক থেকে মুমিনগণ একটি দেহের মতো। যদি কোনো অংশ আঘাতপ্রাপ্ত হয় তাহলে পুরো দেহ নিদ্রাহীনতা ও জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ে।”
(বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ থেকে বর্ণিত)খ) প্রকৃতপক্ষে আমাদের ঐক্যের ব্যাপারে জোর দেওয়া হয়েছে এবং বিচ্ছিন্নতাকে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“আর তাদের মতো হয়োনা, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে তাদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর আযাব।”
(আল কুরআন ৩:১০৫)তিনি আরো বলেন:
“নিশ্চয়ই যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ড বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে, তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দিবেন যা কিছু তারা করে থাকে।”
(আল কুরআন ৬:১৫৯)গ) প্রকৃতপক্ষে আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন দলে বিভক্ত না থেকে জামাতবদ্ধ হয়ে থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, রাসূল (সা) বলেন;
“এমন একটা সময় আসবে যখন প্রচুর ভুল-ভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং কোনো বিষয়ে উম্মাহ একত্রিত হয়ে যাওয়ার পর যদি অন্য কেউ তাদেরকে বিভক্ত করতে আসে তাহলে তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত কর; সে যেই হোকনা কেন।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত] রাসূল (সা) আরো বলেন:“রাসূল (সা) আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা তাকে বাইআত দিলাম। তিনি আমাদের কাছে এই মর্মে বাইআত দিতে বললেন যে আমরা দুঃখ-কষ্টের দিনে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাঁর কথা শুনব ও তাঁকে মান্য করব এবং আমরা কর্তৃত্বশীল লোকজনের সাথে ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাদে লিপ্ত হবনা যতক্ষণ পর্যন্ত তারা এমন প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত হচ্ছে যার ব্যাপারে আমাদের নিকট আল্লাহর তরফ থেকে সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেন:
“জামাআত হচ্ছে রহমত এবং বিভক্তি হচ্ছে আযাব।”
[ইমাম আহমদ থেকে বর্ণিত]তিনি (সা) বলেন:
“জামাআতের সাথে আছে আল্লাহর হাত।”
[তিরিমিযি এবং নাসাঈ হতে বর্ণিত]২. সাংগঠনিক এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে ঐক্যবদ্ধ থাকার বহুবিধ প্রয়োজন রয়েছে:
ক) ইসলামী পরিবর্তন একটি কঠিন কাজ, কারণ বিদ্যমান জাহেলি শক্তিগুলোকে তাদের অবস্থান থেকে উপড়ে ফেলা কোনো সহজ ব্যাপার না। সামাজিক চিন্তা, কর্মকাণ্ড এবং ব্যবস্থার উপরে ইসলামের কর্তৃত্বের জন্য বিভিন্ন দলকে বিচ্ছিন্ন না রেখে একটি একক সত্তায় রূপান্তরিত করতে আমরা বাধ্য।
খ) ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দুষ্কর্মের আতাঁত আমাদেরকে বাধ্য করে ঐক্যবদ্ধভাবে অবস্থান নিয়ে তাদের মুখোমুখী হতে। যেহেতু, বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন শক্তিসমূহ পরস্পরকে সাহায্য করছে এবং নিজেদের সামরিক শক্তিকে এক করছে সেহেতু তাদের সহজ শিকারে পরিণত না হওয়ার জন্য এবং বিচ্ছিন্ন ও পদদলিত না হওয়ার জন্য মুসলিম বিশ্বের ইসলামী শক্তিগুলোকে ঐক্যের দিকে ডাকাটা কি অধিক কল্যাণকর হবেনা?
আদর্শিকভাবে যদি ইসলামী কর্মকাণ্ডসমূহের ঐক্য একটি শরঈ বাধ্যবাধকতা না হতো তাহলেও তা এজন্য বাধ্যতামূলক হতো যাতে ইসলামের ভবিষ্যৎ রক্ষা পায় এবং দমন, নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে ইসলামী কর্মকাণ্ড রক্ষা পায়।
গ) মুসলিম বিশ্বে বিদ্যমান বিভিন্ন ইসলামবিদ্বেষী স্থানীয় শক্তি ও দলসমূহ শক্তিশালী জোট গঠন করছে। এসমস্ত জোট সমস্ত পর্যায়ে গবেষণা, পর্যবেক্ষণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রস্তুতি গ্রহণ অব্যাহত রেখেছে। এই বাস্তবতার আলোকে চিন্তা করলে কোন বিষয়টি মুসলিমদের জন্য অধিক যুক্তসঙ্গত হবে ইসলামী শক্তিসমূহের খণ্ড-বিখণ্ড ও বিক্ষিপ্ত থাকা? নাকি তাদের ঐক্য ও সংহতিকে নষ্ট করতে চায় যেসব বিষয় ও কারণ সেগুলোর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নেওয়া?
এসব বিষয় এবং এরকম অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করলে এমন একটি বৈশ্বিক আন্দোলন যা সমস্ত পর্যায়ে চিন্তা, সাংগঠনিক কার্যক্রম, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রস্তুতি গ্রহণের ক্ষেত্রে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারবে তা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কোনোরকম সন্দেহ, অনিচ্ছা বা দ্বিধার বিন্দুমাত্র অবকাশ থাকেনা।
এসমস্ত প্রমাণ ও যুক্তির আলোকেই এরূপ দাবি করা হয়ে থাকে যে, ইসলামী কর্মকাণ্ডের ঐক্য একটি বাধ্যবাধকতা এবং বিভিন্ন দলে বিভক্তি হওয়া নিষিদ্ধ। এসব প্রমাণাদি বাস্তবতার আলোকে কতটুকু গ্রহণযোগ্য তা বোঝার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই ইসলামের নির্ধারিত ইজতিহাদের পদ্ধতি অনুযায়ী অগ্রসর হতে হবে।
আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, মুসলিমরা বর্তমানে যে বাস্তবতায় বসবাস করছে তা হচ্ছে দারুল কুফর এবং একে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত করা মুসলিমদের জন্য ফরয। আমরা এ-ও আলোচনা করেছি যে এই বিষয়টি উপলব্ধি করে এমন একটি দল থাকা অপরিহার্য যা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে রাসূল (সা)-এর পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।
এই মতটিকে যারা ধারণ করে তাদের উপস্থাপিত প্রমাণাদির ব্যাপারে বিস্তারিত শরঈ আলোচনায় যাওয়ার আগে আমরা সেই দলটির বাস্তবতা আলোচনা করতে চাই যা এই কাজে জড়িত হবে। এটি কি পুরো মুসলিম সম্প্রদায় নাকি মুসলিম সম্প্রদায়ের অংশবিশেষ? অন্যভাবে বলতে গেলে এটি কি মুসলিমদের মধ্য থেকে বের হওয়া একটি দল?
বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা বলে থাকি যে, আল্লাহ মুসলিমদের উপরে বিভিন্ন বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন যেগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে আমরা বাধ্য। এসব বাধ্যবাধকতাসমূহের মধ্যে কিছু হচ্ছে ব্যক্তিগত যেগুলো পালন করতে প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তিগতভাবে বাধ্য এবং এগুলো পালন না করার আগ পর্যন্ত কোনো মুসলিম অপরাধ থেকে মুক্ত নয়। অন্যকিছু বাধ্যবাধকতা আছে যেগুলো পালন করার জন্য দলের প্রয়োজন। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি দ্বিতীয় ধরনের বাধ্যবাধকতা। আল্লাহ প্রদত্ত শরীয়াহ প্রতিষ্ঠিত করা এমন একটি ফরয যা কোনো ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে করা সম্ভব না বরং এর জন্য প্রয়োজন লোকজনের একত্রিত হওয়া এবং গণমানুষের ইচ্ছাকে এক করা।
নিম্নোক্ত মূলনীতি অনুযায়ী বিষয়টি বুঝা যায়:
“কোনো ওয়াজিব পালনের জন্য যা প্রয়োজন তা নিজেও ওয়াজিব।”
ফরযে কিফায়াসমূহের মধ্যে এটি অন্যতম একটি ফরয এবং একে অবশ্যই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যে ব্যক্তি একে অবহেলা করবে সে বড় ধরনের গোনাহে লিপ্ত হবে। যাইহোক, বিষয়টির প্রকৃতিই এরকম যে একে প্রতিষ্ঠার জন্য সমস্ত মুসলিমের প্রয়োজন নেই বরং মুসলিমদের মধ্য হতে একটি দল যারা এ কাজটি আদায়ের মতো সামর্থ্য রাখে তারাই এ কাজের জন্য পর্যাপ্ত বলে বিবেচিত হবে। এই ফরযটি আদায়ের লক্ষ্যে যে দলটি কাজ করবে তার সদস্যরা গোনাহ থেকে মুক্ত থাকলেও যারা কাজটি আদায় করবেনা তারা গোনাহ থেকে মুক্ত থাকবে না।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে মুসলিমদের মধ্য থেকে দলটি বের হয়েছে সেই উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য অথার্ৎ খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য দলটি সংগ্রাম করবে এবং এজন্য দলটিকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রহণকৃত প্রয়োজনীয় চিন্তা ও আহাকামের ভুল বা যথার্থতার জন্য জবাবদিহি করতে হবে।
পুরো মুসলিম উম্মাহ এই দলটির অন্তর্ভুক্ত নয়, কারণ এমন অনেক মুসলিম আছে যারা এর সাথে সম্পৃক্ত না। হতে পারে, যে তারা অন্যকোনো দলের সাথে সম্পৃক্ত (একাধিক দলের বৈধতা সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে আলোচনা করব) অথবা কোনো দলের সাথেই সম্পৃক্ত না।
এই দলটি খলিফা নয় এবং খলিফার স্থলাভিষিক্ত হতেও পারে না। খলিফার জন্য নির্ধারিত আহকাম দলটির জন্য প্রযোজ্য না এবং খলিফার হাতে ন্যস্ত দায়িত্বসমূহ বাস্তবাবয়ন করার অধিকারও নেই দলটির।
বরং এটি কেবলমাত্র মুসলিমদের মধ্য থেকে বের হওয়া একটি দল এবং সামগ্রিকভাবে পুরো ইসলামী উম্মত হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায় (জামা’আতুল মুসলিমীন) যার অন্তভূর্ক্ত হচ্ছে বিভিন্ন দল, ব্যক্তিবর্গ এবং খলিফা।
ইসলামী উম্মত বলতে বোঝানো হয় মুসলিম সম্প্রদায়কে যারা শরঈ হুকুমের মাধ্যমে নয় বরং ইসলামী আক্বীদাহ’র মাধ্যমে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ। মুসলিমরা ফুরু (মৌলিক হুকুমের সাথে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক হুকুমসমূহ) এর ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করতে পারে এবং এতে তাদের ভ্রাতৃত্ববোধে কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ে না। আহকাম যদি ভ্রাতৃত্ববোধের কারণ হতো তাহলে সেক্ষেত্রে কোনো মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই হতো না। ব্যক্তিগতভাবে অথবা দলীয়ভাবে যদি মুসলিমরা ইসলামী আক্বীদাহ’কে পরিত্যাগ করে তাহলে তাদেরকে ইসলামী উম্মতের বাইরের লোক হিসেবে গণ্য করতে হবে এবং তাদের পরিণতি হবে আগুন। রাসূল (সা)-এর হাদিসে এই বিষয়টিই বোঝানো হয়েছে:
“যে ব্যক্তি দ্বীন পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।” [বুখারী ও মুসলিম থেকে বর্ণিত] অর্থাৎ এখানে মুসলিম সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন বলে বোঝানো হয়েছে। রাসূল (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদিসটিতেও একই বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে;
“আমার উম্মত ৭৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। একটি দল বাদে বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে।” তারা জিজ্ঞাসা করলেন: “সেই দলটি কারা, ইয়া রাসূলুল্লাহ?” তিনি (সা) বললেন: “আমি এবং আমরা সাহাবারা যার উপরে আছি (তার উপরে যারা থাকবে)।”
[আবু দাউদ, তিরমিযি, ইবনে মাজাহ এবং ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]মুসলিম সম্প্রদায় হচ্ছে ইসলামী উম্মত যারা অন্যসব লোকের বাইরে আলাদা একটি উম্মত। মুসলিমদের রক্ত এবং সম্পদ হচ্ছে একটি একক বিষয়। জ্ঞান ও ইজতিহাদের দিক থেকে এদের মধ্যে ভিন্নতা থাকলেও এরা পরস্পর সহাবস্থান করে এবং অন্যদের বিরুদ্ধে একটি একক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
অতএব, জামাআতুল মুসলিমীন (মুসলিম সম্প্রদায়) এবং মুসলিমদের মধ্যকার একটি দলের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট দলীলগুলোকে মুসলিমদের মধ্যকার কোনো দলের উপর আরোপ করা বিভ্রান্তিকর।
এজন্যই আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত এবং আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব কেবলমাত্র আমারই ইবাদাত কর।”
(আল কুরআন ২১:৯২)তিনি আরো বলেন:
“নিশ্চয়ই তোমাদের এই উম্মত হচ্ছে একটিই উম্মত আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব আমাকেই ভয় করো।”
(আল কুরআন ২৩:৫২)রাসূল (সা) বলেন:
“পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিতে মুমিনগণ একটি দেহের মতো। যদি শরীরের কোনো অংশ ব্যথা পায় তবে পুরো দেহই নিদ্রাহীনতা এবং জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়ে।”
[বুখারী, মুসলিম ও আহমাদ থেকে বর্ণিত]এসমস্ত আয়াতে মুসলিমদের মধ্যকার কোনো দলকে বুঝানো হয়নি বরং পুরো ইসলামী উম্মতকে বোঝানো হয়েছে। যদি কোনো দল মনে করে যে তার কর্মকাণ্ড হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর কর্মকাণ্ড তাহলে সেটা হবে তার অদ্ভূত চিন্তা এবং স্পষ্ট বিভ্রান্তি; ফলশ্রম্নতিতে যে তার সাথে কাজ করবেনা তাকে সে নিজের ভাই বলে গণ্য করবে না; বরং দ্বীন পরিত্যাগকারী, মুসলিমদের জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন এবং জাহান্নামের পথযাত্রী বলে মনে করবে এবং এসব চিন্তা মোটেই সামান্য কোনো ব্যাপার না।
একাধিক দলের উপস্থিতিকে যারা নিষিদ্ধ বলে মনে করে তারা মূলত নিচের দলীলগুলোকে উপস্থাপন করে থাকে:
“আর তাদের মতো হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা শুরু করেছে তাদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর আযাব।”
(আল কুরআন ৩:১০৫)“নিশ্চয়ই যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দিবেন যা কিছু তারা করে থাকে।”
(আল কুরআন ৬:১৫৯)এই দলীলগুলোও সেই বাস্তবতায় প্রয়োগ করা হয়নি যার জন্য এগুলো এসেছে।
দল সম্পর্কিত বিষয়ে এই আয়াত দুটোর কিছুই বলার নেই। শরঈ আহকামের সাথে এই আয়াতদ্বয়ের কোনো সম্পর্ক নেই বরং সম্পর্ক হচ্ছে আক্বীদাহ’র সাথে। ‘তাদের মতো হয়োনা যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পরও বিরোধিতা শুরু করেছে’এর তাফসীরে বলা হয়েছে বিশুদ্ধ আক্বীদাহ ও স্পষ্ট প্রমাণের কথা। এখানে ইহুদী এবং খ্রিস্টানদেরকে বোঝানো হয়েছে:
“তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।” ইমাম আল বাইদাবী এই আয়াত সম্পর্কে বলেন:
‘তাদের মতো হয়োনা যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।’ এর অর্থ হচ্ছে ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের মতো যারা তাওহীদের ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেছিল………………………………………………………… যেমনটি বলা হয়েছে
‘স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার’ পরেও।’ সত্যকে উপস্থাপনকারী নিদর্শন ও প্রমাণের ব্যাপারে অবশ্যই একমত থাকতে হবে। এই বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট যে উসূল (বিশ্বাস) এর ক্ষেত্রে বিভক্তি নিষিদ্ধ, ফুরু (আহকাম)-এর ক্ষেত্রে নয়; যা রাসূল (সা)-এর নিম্নোক্ত হাদীসটি থেকে বুঝা যাচ্ছে:
“কেউ যদি সঠিক ইজতিহাদ করে তাহলে সে দুটো সওয়াব পাবে আর কেউ যদি ভুল করে তাহলে সে একটি সওয়াব পাবে।” এবং
‘তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব’ এই আয়াতটি হচ্ছে তাদের জন্য ভীতিপ্রদর্শন যারা বিভক্ত হয়েছে এবং এদেরকে যারা অনুসরণ করে তাদের জন্য সতর্কবাণী।”
অন্যভাবে বলতে গেলে, যে দলটি পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে সে অন্যান্য দল থেকে শরঈ আহকামের দিক থেকে স্বতন্ত্র। এটি অন্যদের থেকে পৃথক এবং অন্যরা এর থেকে পৃথক কেবলমাত্র শরঈ আহকামের দিক থেকে। এটি মুসলিমদের একটি দল যার আক্বীদাহ হচ্ছে ইসলামি। অন্যান্যদের সাথে এর পার্থক্য আক্বীদাহ’র ক্ষেত্রে নয় বরং আহকামের ক্ষেত্রে। অতএব, এই আয়াত অনুযায়ী একজন লোক তখনই দ্বীন থেকে বের হয়ে যায় যখন সে মুসলিমদের আক্বীদাহ’র বিরুদ্ধে চলে যায় কিন্তু আহকামের ক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করলে তা হবেনা। অতএব, ইজতিহাদের ভিন্নতার ব্যাপারে এ আয়াতের কিছুই বলার নেই।
কেউ যদি বলে যে, আয়াতটি আম (সার্বজনীন) এবং এজন্য ‘সুনির্দিষ্ট কারণের পরিবর্তে অর্থের সার্বজনীনতাকে বিবেচনা করতে হবে’, তাহলে জবাবে আমরা বলব ‘সার্বজনীনতা কখনো সে বিষয়ের বাইরে যায়না যে বিষয়ের জন্য আয়াতটি নাযিল হয়েছে।’ কেবলমাত্র ভিন্ন আক্বীদাহ’র ব্যাপারেই আয়াতটির সার্বজনীনতা প্রযোজ্য। এটি আলোচনার একটি দিক। অন্য একটি দিক হচ্ছে তাদের এই মত সেসব হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক যেগুলো ইজতিহাদী মতভেদকে অনুমোদন করে। তৃতীয় দিকটি হচ্ছে তাদের এই মতের অর্থ হবে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মানে দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া।
দ্বিতীয় আয়াত
“নিশ্চয়ই যারা স্বীয় দ্বীনকে খণ্ড—বিখণ্ড করেছে এবং অনেক দলে বিভক্ত হয়ে গেছে তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয়টি আল্লাহ তাআলার নিকট সমর্পিত। অতঃপর তিনি বলে দিবেন যা কিছু তারা করে থাকে।” (আল কুরআন ৬:১৫৯) এর ব্যাপারে ইবনে কাছীর বর্ণনা করেন; [মুজাহিদ, কাতাদাহ, আদ—দাহ্হাক এবং আস সুদ্দী বলেন: ‘আয়াতটি ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের ব্যাপারে নাযিল হয়েছে।’ আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে রাসূল (সা) তাকে বলেছেন:
“তারা বিদআতের অনুসারী এবং তারা হচ্ছে শিয়া (সম্প্রদায়)” অর্থাৎ এসব সম্প্রদায় হচ্ছে মিলাল (ভিন্ন ধর্ম) ও নিহাল (ভিন্ন আক্বীদাহ) এবং খেয়াল-খুশী ও পথভ্রষ্টতার অনুসারী। হামযা ও আল কাসাই থেকে জানা যায় যে, আয়াতটির ব্যাপারে আলি বিন আবু তালিব বলেন:
‘নিশ্চয়ই যারা নিজেদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে’ এর অর্থ হচ্ছে নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা দ্বীনকে পরিত্যাগ করেছে এবং তারা হচ্ছে ইহুদী ও খ্রিস্টান;
‘তাদের সাথে (হে মুহাম্মাদ) আপনার কোনো সম্পর্ক নেই’ আল বাইদাবী বলেন: [অর্থাৎ তারা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তাদের কেউ ঈমান আনল, কেউ কুফরে লিপ্ত হল আর এভাবেই বিভক্তির সূচনা হলো ]
প্রকৃতপক্ষে, ফুরু (হুকুম) এবং আক্বীদাহ’র ক্ষেত্রে মতভেদ দুটো ভিন্ন বিষয়। আক্বীদাহ সংক্রান্ত এসব প্রমাণ এবং এরকম অন্যান্য প্রমাণের ক্ষেত্রে মতভেদ করা হারাম, যাতে আমরা ইহুদী ও খ্রিস্টানদের মতো না হয়ে পড়ি কারণ তারা নিজেদের নবীদের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেছিল, নিজেদের দ্বীনকে বিদআত ও পথভ্রষ্টতা দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছিল এবং ভিন্ন সম্প্রদায় অর্থাৎ মিলাল ও নিহাল-এ পরিণত হয়েছিল। এই বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত আয়াতে:
“কিন্তু তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের কেউ ঈমান এনেছে এবং অন্যরা কাফির হয়ে গেছে।”
(আল কুরআন ২:২৫৩)অতএব, এটি ঈমান ও কুফরের বিষয়। দলীল ও এর অর্থ বোঝার ক্ষেত্রে ভিন্নতার কারণে ফুরু (আহকাম)-এর ক্ষেত্রে সৃষ্ট মতভেদকে অনুমোদন করা হয়েছে এরকম প্রচুর দৃষ্টান্ত রয়েছে, তবে এর বাইরের অন্য কোনো বিষয়কে অনুমোদন করা হয়নি। মুসলিম উলেমাদের কাছে এই বিষয়টি শহড়হি known to necessity। শরঈ আহকামের ভিত্তিতে গঠিত একাধিক দলের উপস্থিতিকে নিষিদ্ধ করার জন্য আক্বীদাহ’র ক্ষেত্রে মতভেদ নিষিদ্ধ হওয়ার দলীলগুলোকে ব্যবহার করা খুবই সাদামাটা এবং ঠুনকো পর্যায়ের কাজ।
নিচের দলীলগুলোর বিষয়:
“একসময় বিভ্রান্তি ও বিচ্যুতি ছড়িয়ে পড়বে, সুতরাং কোনো বিষয়ে উম্মতের লোকজন একমত হয়ে যাবার পর যদি কেউ তোমাদেরকে বিভক্ত করতে আসে তাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত কর, সে যে-ই হোকনা কেন।” এবং
“যে বিভক্তির সৃষ্টি করে যে আমাদের কেউ না” এবং
“রাসূল (সা) আমাদেরকে ডাকলেন এবং আমরা তাঁর (সা) নিকট বাইআত দিলাম। তিনি আমাদের কাছ থেকে এই মর্মে বাইআত চাইলেন যাতে আমরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, কঠিন ও দুঃসহ পরিস্থিতিতে তাঁর (সা)-এর কথা শুনি ও তাঁকে (সা) মান্য করি এবং ততক্ষণ পর্যন্ত কর্তৃত্বশীল লোকদের সাথে বিবাদে না জড়াই যতক্ষণ না তাদেরকে এমন প্রকাশ্য কুফরে (কুফরে বুআহ) লিপ্ত হতে দেখি যার ব্যাপারে আমাদের নিকট আল্লাহর তরফ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ আছে।”
এই দলীলগুলো খলিফা, তার নিকট বাইআত, তার প্রতি আনুগত্য এবং প্রকাশ্য কুফরে লিপ্ত না হলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সাথে সম্পর্কিত।
কেউ যদি উম্মাহকে বিভক্ত করার ইচ্ছা নিয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসে তাহলে তাকে তলোয়ার দিয়ে আঘাত করতে বলা হয়েছে সে যে-ই হোকনা কেন। মুসলিমদের মধ্যকার কোনো দলের সাথে এসব দলীলের দূরবর্তী বা নিকটবর্তী কোনো সম্পর্ক নেই। খলিফার জন্য প্রযোজ্য হুকুমসমূহ দলের জন্য প্রযোজ্য নয় এবং দল খলিফার স্থলাভিষিক্তও হতে পারে না বরং এটি কেবল খলিফাকে অস্তিত্বে আনতে এবং তাকে জবাবদিহি করার জন্য কাজ করে।
“আল্লাহর হাত রয়েছে জামাআতের সাথে” এবং
“জামাআত হচ্ছে রহমত এবং বিভক্তি হচ্ছে আযাব” একাধিক দলের উপস্থিতি নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে এসব হাদীসের কোনো সম্পর্ক নেই। মুসলিম সম্প্রদায় অথবা কোনো মুসলিম দলের ছায়ায় থেকে মুসলিমরা আল্লাহর রহমতকে অনুভব করবে। বিচ্ছিন্নতা ও বিভক্তি থাকলে শয়তান মুসলিমদের নিকটবর্তী হয়; এ ব্যাপারে রাসূল (সা) বলেন:
“প্রকৃতপক্ষে, কোনো বিচ্ছিন্ন ভেড়াই নেকড়ের শিকারে পরিণত হয়।” ফলে এর সাথে শাস্তির বিষয়টি জড়িত। আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করতে ইসলামী কর্মকাণ্ডসমূহকে এক করে ফেলার জন্য কোনোরূপ নির্দেশনাই নেই হাদীসদ্বয়ের মানতুক (শব্দ) এবং মাফহুম (অর্থ)-এর মধ্যে।
একাধিক দলের উপস্থিতিকে নিষিদ্ধ বলে প্রমাণ করতে এসব শরঈ দলীলই ব্যবহৃত হয় অথচ এদের কোনোটাই এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
এছাড়া একাধিক দল না রাখতে যেসব বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে এবং যেসব নেতিবাচক প্রভাবের কথা বিবৃত হয়েছে এদের কোনোটার জন্য কোনোকিছুকে প্রতিরোধ, নিষিদ্ধ বা বাধ্যতামূলক করা যাবে না। বরং কোনোকিছুকে প্রতিরোধ, নিষিদ্ধ বা বাধ্যতামূলক করে কেবল শরীআ’হ। খারাপ পরিস্থিতি এবং এর বিস্তৃতি ও প্রভাবকে যথার্থরূপে বুঝতে হবে এবং তারপরে শরীয়াহ’র মধ্যে দলীল খুঁজতে হবে যেগুলো পরিস্থিতিকে সমাধান করার জন্য কোনোকিছুকে বাধ্যতামূলক বা নিষিদ্ধ করবে। অতএব, পরিস্থিতি থেকে কোনো শরঈ হুকুম গ্রহণ করার সুযোগ নেই।
৮ম অধ্যায়: দলের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তাভাবনাসমূহ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা
যেকোনো ধরনের দল হলেই চলবে এমন ধারণা শরীআ’হ দেয় না। বরং শরীয়াহ এমন একটি দল প্রতিষ্ঠার দাবী করে যার উদ্দেশ্য হবে একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। নিচের দলীলটি আমাদেরকে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা দেয়। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন;
“আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকবে যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম।”
(আল কুরআন ৩:১০৪)ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে এমন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করতে শরীয়াহ আমাদেরকে বাধ্য করে যে দলটি তাকে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য অর্থাৎ ইসলামের আধিপত্য ও প্রতিষ্ঠালাভ এবং ক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তা ও শরঈ হুকুম বহন করবে। নিছক দল গঠনের জন্যই দল গঠন করতে বলা হয়নি বরং দলের উদ্দেশ্য যা হচ্ছে দাওয়াত এবং সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ তা বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। একইভাবে কেবল দাওয়াত ও সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের জন্যই তা করতে বলা হয়নি বরং যে উদ্দেশ্যে দাওয়াত ও সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের দায়িত্বটি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে তা হল আধিপত্য ও ক্ষমতা অর্জন এবং তা সুসংহতকরণ।
রাসূল (সা) বলেছেন;
“পৃথিবীর যেকোনো অংশে যদি তিনজন লোক থাকে, তাহলে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে আমির (নেতা) নিযুক্ত না করে থাকাটা তাদের জন্য বৈধ হবে না।”
[আহমাদ ইবনে হাম্বল থেকে বর্ণিত]যেকোনো সামষ্টিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে মুসলিমদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা একজন আমীরের নেতৃত্বে তা সম্পাদন করে। যেসমস্ত লোকের উপরে, যেসব বিষয়ের জন্য তিনি আমীর নিযুক্ত হয়েছেন সেসব বিষয়ে তার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক। আমীরের নির্দেশ মতো দলটিকে চলতে হবে যাতে সামষ্টিক কাজের একটি শরীয়তসম্মত পরিণতি অর্জন করা যায়।
— যেহেতু মুসলিমদের উপরে আল্লাহ এমন অনেক দায়িত্ব ফরয করেছেন যেগুলো কেবলমাত্র খলিফাই সম্পাদন করতে পারেন সেহেতু এসব ফরয আদায়ের জন্য একজন খলিফা নিযুক্ত করা অপরিহার্য। আবার যেহেতু কোনো দল ছাড়া খলিফার নিয়োগ ও খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না, সেহেতু এমন একটি দল যার উদ্দেশ্য হবে খলিফা ও খিলাফত প্রতিষ্ঠা তার অস্তিত্ব অপরিহার্য। কারণ শরীয়াহ’র একটি মৌলিক নীতিমালা হচ্ছে:
“কোনো ওয়াজিব পালন করতে যা প্রয়োজন তা নিজেও ওয়াজিব।”
আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হলো যে নির্দিষ্ট শর’ঈ উদ্দেশ্যের সঙ্গে দলটির অস্তিত্ব অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। অতএব নিছক ইসলামের দাওয়াত বহন করে অথবা কেবল বার্তাবহনের জন্যই তা বহন করে এমনকোনো দলের কথা বলা হয় নি। বরং দল প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হবে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে মুসলিমদের জীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। কারণ ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ের সমস্ত ইসলামী হুকুম বাস্তবায়নের শরঈ পদ্ধতি হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র। অতএব এমন একটি দলের অস্তিত্ব অপরিহার্য যা তার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য পূরণ করবে।
যতক্ষণ পর্যন্ত দলটি তার প্রয়োজনীয় দায়িত্বগুলো পূরণ করতে সক্ষম না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে নিচের বিষয়গুলো অবশ্যই মেনে চলতে হবে:
— দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তা, শরঈ হুকুম ও মতামত দলটিকে গ্রহণ করতে হবে এবং কথা, কাজ ও চিন্তায় সেগুলোর অনুসরণ করতে হবে। এসব বিষয় গ্রহণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে দলের ঐক্য রক্ষা করা। যদি প্রতিষ্ঠিত দলটির সদস্যগণ ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা ও ইজতিহাদ গ্রহণ করে তাহলে দলটি ভাঙনের মুখে পড়বে এবং তা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যাবে যদিও তারা সাধারণভাবে নিজেদের উদ্দেশ্য ও ইসলামের ব্যাপারে একমত থাকে। এমনকি এসব খণ্ডদলের ভিতরে আরো অনেক উপদল তৈরি হবে। ফলে তখন ফরয দায়িত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যদের নিকট দাওয়াত পৌঁছানোর পরিবর্তে তারা নিজেদের মধ্যে দাওয়াতের সূচনা করবে। তারা একে অন্যের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হবে এবং প্রত্যেকটা উপখণ্ডই চাইবে তাদের চিন্তা পুরো দলের নেতৃত্ব দিক। এজন্য নির্দিষ্ট চিন্তা গ্রহণ এবং এর বৈধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দলের ঐক্য বজায় রাখা শরীয়াহ’র দৃষ্টিতে একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। এক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত চিন্তা গ্রহণ এবং সেগুলো মেনে চলতে শাবাবদেরকে বাধ্য করা ছাড়া অন্যকিছুর মাধ্যমে দলের ঐক্য বজায় রাখা সম্ভব না। সুতরাং ‘কোনো ওয়াজিব পালন করতে যা প্রয়োজন তা নিজেও ওয়াজিব’ এই নীতির আলোকে প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহকে গ্রহণ করতে হবে।
দলটি তার দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য যেসব প্রয়োজনীয় চিন্তা, হুকুম ও মতামত গ্রহণ করে সেগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত শরীয়তসম্মত হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত দলের উপরে শাবাবদের আস্থা থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত বিভিন্ন কাজের চিন্তাসমূহ মেনে নেওয়ার জন্য শাবাবদের বাধ্য করা একটি বৈধ বিষয়, কারণ মুসলিমদের জন্য এই বিষয়টি বৈধ যে, সে নিজের মতামত ত্যাগ করে অন্যের মত অনুযায়ী কাজ করতে পারবে। এজন্যই উসমান বিন আফফান (রা) এই শর্তে খলিফা হিসেবে বাইয়াত নিয়েছিলেন যে তিনি নিজস্ব ইজতিহাদ পরিত্যাগ করবেন এবং আবু বকর ও উমর (রা)-এর ইজতিহাদ গ্রহণ করবেন যদিও সেগুলো তার ইজতিহাদের সঙ্গে না মিলে। এই বিষয়টি সাহাবীগণ (রা) মেনে নিয়েছিলেন এবং তাঁরা তাঁকে বাইয়াত দিয়েছিলেন। তবে এই বিষয়টি ফরয নয় বরং মুবাহ, যা আলী (রা) এর ঘটনাটি দ্বারা প্রমাণিত। কারণ তিনি আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-এর ইজতিহাদ গ্রহণের বিনিময়ে নিজের ইজতিহাদ পরিত্যাগ করতে রাজি না হওয়া সত্ত্বেও কোনো একজন সাহাবীও এতে আপত্তি করেননি। এছাড়া আশ—শাবী কর্তৃক সহীহ সনদে বর্ণিত আছে যে, আবু মুসা (রা) আলী (রা)-এর মতের জন্য নিজের মত, যাইদ (রা) উবাই বিন কাব (রা)-এর মতের জন্য নিজের মত এবং আবদুল্লাহ (রা) উমর (রা)-এর মতের জন্য নিজের মত পরিত্যাগ করতেন। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে আবু বকর (রা) এবং উমর (রা) নিজেদের মত পরিত্যাগ করতেন আলী (রা)-এর মতের জন্য। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে , অন্যকোনো মুজতাহিদের প্রতি আস্থার কারণে তার মত গ্রহণ করে নিজের মত পরিত্যাগ করা কোনো মুজতাহিদের জন্য অনুমোদিত। দলের শাবাবদেরকে অবশ্যই এই দুটো ধারণা মেনে চলতে হবে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও আবেগগত দিক থেকে একটি দেহের মতো আচরণ করতে হবে।
— দলের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার জন্য যেভাবে সে প্রয়োজনীয় শরঈ হুকুম গ্রহণ করে, সেগুলোকে সম্পাদন করার জন্য ঠিক তেমনিভাবে অবশ্যই তাকে ধরন (style)সম্পর্কিত হুকুমও নির্ধারণ করতে হবে। ধরন (style) বলতে সেই উপায়কে বোঝানো হচ্ছে যার মাধ্যমে শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়িত হয়। এটি একটি হুকুম যা এমন কোনো মৌলিক হুকুমের সঙ্গে সম্পর্কিত যার স্বপক্ষে দলীল বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, রাসূল (সা)-এর অনুসরণে দলের শাবাবদের চিন্তা-চেতনাকে খুব ভালোভাবে গড়ে তুলতে হবে। এটি হচ্ছে একটি শর’ঈ হুকুম যা অবশ্যই মেনে চলতে হবে। কিন্তু কোন উপায়ে? কীভাবে এই শরঈ হুকুম বাস্তবায়িত হবে? একটি নির্দিষ্ট ধরনের সাহায্যে এই শরঈ হুকুম পালন করতে হবে। এক্ষেত্রে হালাকাহ (পাঠচক্র) অথবা উশার (পরিবার) প্রভৃতি হতে পারে প্রয়োজনীয় ধরন (style)।
অতএব, যুক্তিসম্মত উপায়ে ধরন (style) নির্ধারণ করতে হবে যাতে এর সাহায্যে সর্বোত্তম উপায়ে শরঈ হুকুম বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। মূলনীতি অনুযায়ী এই হুকুমটি হচ্ছে মুবাহ। শরীয়াহ আদেশ করেছে শর’ঈ হুকুমটির ব্যাপারে কিন্তু তা বাস্তবায়নের ধরনটি (style) ছেড়ে দিয়েছে মুসলিমদের উপরে।
কোনো একটি হুকুমের জন্য যেহেতু বিভিন্ন ধরন (style) রয়েছে সেহেতু একটি নির্দিষ্ট ধরন (style) গ্রহণ করতে এবং দলটি শাবাবদেরকে সে অনুযায়ী পরিচালিত করবে । অতএব দলটিকে একটি ধরন গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে সে শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়ন করবে। এক্ষেত্রে মূল কাজটি যে পর্যায়ের হুকুম, ধরনটির (style) হুকুমও তাই হবে। অন্যভাবে বলা যায়, শরঈ হুকুমটি যে পর্যায়ের বাধ্যবাধকতা ধরনটিও (style) সে পর্যায়ের বাধ্যবাধকতা।
যখন দলটি উত্তমরুপে বিকশিত চিন্তা-চেতনা (culture) গড়ে তোলার জন্য হালাকাহকে একটি ধরন (style) হিসেবে গ্রহণ করবে, তখন অবশ্যই একে একটি বাধ্যবাধকতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। ধরনটিকে (style) গ্রহণ করার সময় দলটিকে অবশ্যই এর উদ্দেশ্যের দিকে নজর দিতে হবে যা হচ্ছে উত্তমপন্থায় বিকাশক্রিয়াকে (culture) গড়ে তোলা। অতএব, ধরন হিসেবে হালাকাহকে গ্রহণ করলে এর উদ্দেশ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয়ই গ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, হালাকাহতে কত লোক থাকবে তা হালাকাহ’র উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। যদি লোকসংখ্যা বেশি হয় তাহলে উত্তমভাবে চিন্তা—চেতনা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি লোকসংখ্যা কম হয় তাহলে অনেক বেশি হালাকাহ হয়ে যাওয়ার ফলে তা উদ্দেশ্যের জন্য বোঝা এবং বাধাস্বরূপ হবে। কোনোরকম সংখ্যাধিক্য বা অপর্যাপ্ততা না রেখে লোকসংখ্যা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে যাতে তা চিন্তাভাবনা গঠন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। সুতরাং লোকসংখ্যা নির্ধারণের বিষয়টি যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। অনুরূপভাবে হালাকাহ’র সময়কাল এমন হতে হবে যাতে চিন্তাগুলোকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য ছাত্ররা নিজেদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে, অন্যথায় বোঝার বিষয়টি অপর্যাপ্ত থেকে যাবে। সময় খুব সংক্ষিপ্ত হলে চিন্তাগুলোকে পুরোপুরি উপস্থাপন করা সম্ভব হবেনা। কতদিন পরপর হালাকাহ নিতে হবে? এটা কি প্রতিদিনই হবে, সপ্তাহে একবার হবে নাকি দুসপ্তাহে একবার হবে ? দাওয়াতের ব্যবহারিক বিষয়ের পথে যেন হালাকাহ বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। শাবাব যেন দাওয়াত বাদ দিয়ে কেবল শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যে ব্যস্ত না হয়ে পড়ে। শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য এভাবে উপযুক্ত ধরন বেছে নিতে হবে যাতে সেগুলো শরঈ হুকুম বাস্তবায়নের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। ধরনের ব্যাপারে যে বিষয়গুলো এখানে বলা হলো সেগুলো উপকরণের বেলায়ও অনেকটাই প্রযোজ্য। কাজের চাহিদা অনুযায়ী আমীর চাইলে ধরন ও উপকরণ পরিবর্তন করতে পারেন।
— দলটি যেহেতু বিশাল বিস্তৃত ভূখণ্ডে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং অনেকগুলো দেশে পৌঁছাবে সেহেতু এর কর্মকাণ্ডের পরিধির দাবি অনুযায়ী একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন, যার মাধ্যমে দলটি দাওয়াত পরিচালনা করবে এবং কাজের সমস্ত উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন করবে। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থাটি দাওয়াতের আন্দোলনকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রিত করবে। এটি শাবাবদেরকে গড়ে তোলার বিষয়টি দেখাশোনা করবে এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য একটি সাধারণ ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। এটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে সংগঠিত করবে। উম্মাহ্র কাছে দলটি এমন একটি সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হবে যা তার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অতএব, একটি সুসংগঠিত কাঠামোর প্রয়োজন অপরিহার্য যা তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করবে। ফলে কাজের অগ্রগতিকে সে পর্যবেক্ষণ করবে এবং অর্জিত সাফল্যকে ধরে রাখবে।
অতএব দলটিকে একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা অথবা একটি সুসংগঠিত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যা সফলতার সঙ্গে দাওয়াত পরিচালনার মাধ্যমে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাকে সাহায্য করবে।
দলটিকে কিছু প্রশাসনিক নিয়মকানুন গ্রহণ করতে হবে যার মাধ্যমে দলের সদস্যবৃন্দকে এবং দল কতৃর্ক পরিচালিত আন্দোলনকে সংগঠিত করা যাবে। এতে আমীরের ক্ষমতা, সে কীভাবে দল পরিচালনা করবে এবং কীভাবে নির্বাচিত হবে সেসব বিষয় নির্ধারিত থাকবে। বিভিন্ন এলাকা এবং প্রদেশের দায়িত্বশীলদেরকে কে বা কারা নিয়োগ দিবে এবং তাদের ক্ষমতা কতটুকু থাকবে-এ বিষয়গুলো এতে বর্ণিত থাকতে হবে। নির্দিষ্ট নিয়মকানুন হিযবের সমস্ত কাজের প্রশাসনিক বিষয়কে সংগঠিত করবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের চূড়ান্ত ক্ষমতাকে নির্ধারিত করবে।
কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত শর’ঈ হুকুম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ধরন ও উপকরণ সম্পর্কিত হুকুম থাকতে হবে এসব নিয়মকানুনের মধ্যে। গ্রহণকৃত প্রশাসনিক ব্যবস্থার আনুগত্য করা ততক্ষণ পর্যন্ত বাধ্যতামূলক যতক্ষণ পর্যন্ত আমীর এগুলোকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেন, কারণ আমীরের আনুগত্য করা ওয়াজিব।
— গ্রহণকৃত বিষয়ের আনুগত্য করতে প্রত্যেকেই বাধ্য। অতএব কেউ তা লঙ্ঘন করলে দল তার বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিবে? এই লঙ্ঘনের জন্য কি তাকে তিরস্কার করা হবে, নাকি কোনো প্রশাসনিক শাস্তি দেয়া হবে?
যারা গ্রহণকৃত হুকুম লঙ্ঘন করে অথবা নির্ধারিত শর’ঈ পথ থেকে বিচ্যুত হয় তাদের ব্যাপারে প্রশাসনিকভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দলটি বাধ্য। আমীরের অবাধ্যতার জন্য এ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বৈধ। শরঈ হুকুম অনুযায়ী যেহেতু আমীর থাকা বাধ্যতামূলক সেহেতু তার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক এবং যেসব দায়িত্বের জন্য সে আমীর হিসেবে নিযুক্ত হয়েছে সেসব ব্যাপারে তার অবাধ্য হওয়া নিষিদ্ধ ; অন্যথায় দলের আমীর থাকার কোনো মানে হয় না।
রাসূল (সা) বলেন;
“যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল সে যেন আল্লাহর আনুগত্য করল এবং যে আমাকে অমান্য করল সে যেন আল্লাহকে অমান্য করল। যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য করল সে যেন আমার আনুগত্য করল এবং যে ব্যক্তি আমীরকে অমান্য করল সে যেন আমাকে অমান্য করল।”
[মুসলিম থেকে বর্ণিত]আন্দোলনরত প্রত্যেক সদস্যই আমীরের প্রশাসনিক শাস্তির আওতাধীন থাকবে, এমনকি যদি সে একেবারে কনিষ্ঠ সদস্যও হয়। এসব শাস্তি দেয়া হবে গ্রহণকৃত বিষয়ের লঙ্ঘনের ফলে। গ্রহণকৃত শরঈ হুকুম অথবা ধরনকে যে লঙ্ঘন করে অথবা প্রশাসন বা প্রশাসনিক নিয়ম যে অমান্য করে অথবা নিজের ক্ষমতার সীমালঙ্ঘন করে তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
এভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর সঙ্গে একটি সুশৃঙ্খল সাংগঠনিক কাঠামো যুক্ত করতে হবে যা পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত কর্মকাণ্ড ও হুকুমের চিন্তাগুলোকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে। সাংগঠনিক বিষয়ের দিকে দৃষ্টিপাত না করার কারণে অনেক ইসলামী এবং অৈইসলামি সংগঠনকে আমরা ব্যর্থ হয়ে যেতে দেখেছি।
যদি গ্রহণ করার (adoption) বিষয়ের দিকে দলটি যথার্থ মনোযোগ দেয় না তাহলে দলের মধ্যে মহামারী আকারে মতানৈক্য ছড়িয়ে পড়বে, সে বিশৃঙ্খলভাবে অগ্রসর হবে এবং বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়বে, দলের জবাবদিহিতা থাকবে না। এই বিষয়টি লক্ষ্য অর্জনের পথে দলের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
যদি বৈধ এবং স্থির শর্তসাপেক্ষে দলের সদস্য এবং দায়িত্বশীল লোক নিয়োগ না করে বরং বিভিন্ন কারণ যেমন কার সঙ্গে কার সম্পর্ক আছে অথবা কার সামাজিক মর্যাদা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে তার উপরে ভিত্তি করে নিয়োগ দেওয়া হয় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্বের বণ্টন হবে ত্রুটিপূর্ণ এবং সদস্যগণ বিশেষ অবস্থান পাওয়ার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
এট স্বাভাবিক যে, যদি একটি সাধারণ গঠনতান্ত্রিক নিয়ম না থাকে যা প্রত্যেক সদস্যের জন্য প্রযোজ্য, তাহলে জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি হবে এবং সমতা ও নিরপেক্ষতা হারিয়ে যাবে।
স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণকৃত বিষয়ের বড় ধরনের লঙ্ঘন এবং ছোট ধরনের লঙ্ঘনের মধ্যে পার্থক্য রেখে যদি গঠনতন্ত্রে শাস্তির বিধান না থাকে , তাহলে কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে অবাধ্যতা দেখা দিবে এবং ভুলের পরিমাণ বেড়ে যাবে।
অতএব, কার্যকরী আন্দোলনের জন্য সাংগঠনিক দিক এবং সঠিকভাবে দল গঠন প্রক্রিয়ার দিকে যথার্থ মনোযোগ দিতে হবে যাতে দাওয়াতের চিন্তাসমূহকে এবং শাবাবগণকে ঠিকভাবে সংগঠিত করা যায় এবং কার্যক্রম পরিচালনায় বেশি সুবিধা হয়। যে উদ্দেশ্যে দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার সঙ্গে দলের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
দলের সাংগঠনিক দিকটিকে গৌণ বিবেচনা করলে চলবেনা বরং এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দল যদি সুসংগঠিত না হয় এবং প্রয়োজনীয় নিয়মকানুন গ্রহণ না করে অথবা গ্রহণকৃত নিয়মকানুনগুলোকে বাধ্যতামূলক হিসেবে মেনে না নেয় তাহলে যে সাফল্য দল অর্জন করবে তা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
উপরন্তু দলের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কিছু অর্থনৈতিক দায়িত্ব বহন করা দলটির জন্য বাধ্যতামূলক। কারণ কিছু শাবাবকে দলের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষভাবে নিয়োগ দিতে হবে যেগুলো পালন করতে গেলে পরিবহন খরচ, প্রিন্টিং খরচ অথবা দাওয়াতের প্রয়োজনে অন্যান্য খরচ লাগবে। এসব খরচ দলকে অর্থাৎ দলের শাবাবদেরকেই বহন করতে হবে। দাওয়াতের জন্য যে স্বয়ং নিজেকে উৎসর্গ করেছে তার জন্য এটা অধিকতর সহজ যে, এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ আর্থিক সহায়তা সে প্রদান করবে।
দলের বাইরে যাতে হাত প্রসারিত করতে না হয় সেদিকে দলকে দৃষ্টি রাখতে হবে চাই সে কোনো ব্যক্তির নিকট হোক বা দলের কোনো নিকট বা কোনো সরকারের নিকট। এভাবেই দলকে অগ্রসর হতে হবে। দাওয়াতের শত্রুরা অর্থের প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে দলকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে, এজন্য তারা প্রথমে আপাতঃ দৃষ্টিতে নির্দোষ আর্থিক সাহায্য দিতে শুরু করে। কিন্তু খুব দ্রুতই এই সাহায্যদান কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহৃত হয়।
আক্বীদাহ’র গুরুত্ব
যেহেতু ইসলামী আক্বীদাহ হচ্ছে দলটির কাজের প্রেরণা এবং আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা এর উদ্দেশ্য সেহেতু দলটির জন্য বাধ্যতামূলক নিজের বিকাশক্রিয়া (culture) কে এমনভাবে গ্রহণ করা যার সঙ্গে আক্বীদাহ’র জোরোলো সম্পর্ক থাকবে। যার লক্ষ্য হবে দলের কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, উদ্বেগ, আন্তরিকতা, তীব্র ভালোবাসা, আগ্রহ এবং ত্যাগের মানসিকতা গড়ে তোলা। এটি মুসলিমদের মধ্যে চলার পথে দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতাও জাগিয়ে তুলবে । দাওয়াত বহনকারীকে এটি এমনভাবে গড়ে তুলবে যাতে সে লোকজনের প্রশংসার জন্য বসে থাকবে না বরং সে তার রব ও সেইদিনের ভয় করবে যেদিন দুশ্চিন্তায় মানুষের চেহারা বিমর্ষ হবে। রবের সন্তুষ্টি ও আখিরাতের পরম সুখ লাভের জন্য সে পার্থিব যন্ত্রণা গ্রহণ করতে এবং দুনিয়ার সুখ ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে প্রস্তুত থাকবে। বিকাশক্রিয়ার ভিত্তি হিসেবে আক্বীদাহ’কে গ্রহণ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে লোকজনের মধ্যে পরিবর্তন সূচিত করতে আক্বীদাহ’কে ব্যবহার করা এবং এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে কৃত অত্যাচারের বিরুদ্ধে জন্মানো ঘৃণা, অবজ্ঞা থেকে মুক্তি অথবা পরিস্থিতিকে উন্নত করার মানসিকতাকে ব্যবহার না করা। বরং যে বিষয়টি মুসলিমদেরকে দাওয়াত দিতে এবং অন্যান্য মুসলিমদেরকে তা গ্রহণ করতে চালিত করবে তা হচ্ছে তাদের ঈমানের চিন্তা এবং এটাই ইসলামের প্রকৃত পথ।
উপরন্তু ঈমানের চিন্তাসমূহকে (পরিবর্তন সূচিত করার জন্য যা দলটি ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে) এবং দলের গ্রহণকৃত বিকাশক্রিয়াকে (culture) এমনভাবে পৌঁছে দিতে হবে যাতে উদ্দেশ্য পূরণ সম্ভব হয়।
আক্বীদাহ’কে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে তা এই উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক হয়।
গ্রহণকৃত শরঈ হুকুমকে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে এগুলোর উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়।
বাস্তবতা সম্পর্কিত জ্ঞান এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে উদ্দেশ্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে তা সহায়ক হয়।
সংক্ষেপে বলতে গেলে দলের বিকাশ প্রক্রিয়াকে ইসলামী আক্বীদাহ’র সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে হবে। শরীআহ’র দলীলাদি দ্বারা এগুলো সমর্থিত হতে হবে এবং এমনভাবে পৌঁছাতে হবে এগুলোকে যাতে এরা শরঈ উদ্দেশ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। আর তা (শরঈ উদ্দেশ্য) হল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবে আল্লাহর দাসত্বের অনুভূতি অর্থাৎ আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি প্রদান। আর দলের শাবাবদেরকে এই উপলদ্ধির ভিত্তিতেই গড়ে তুলতে হবে।
যেহেতু ইসলামী আক্বীদাহ’র দৃষ্টান্ত হচ্ছে শরীরের জন্য মাথাস্বরূপ এবং অঙ্গসমূহের মধ্যে হৃদপিণ্ডস্বরূপ; যেহেতু এটি হচ্ছে সমস্ত বিষয়ের ভিত্তিস্বরূপ এবং এর উপরেই সবকিছু নির্ভরশীল সেহেতু একে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে তা নিম্নোক্ত লক্ষ্যসমূহ অর্জন করতে পারে:
— আল্লাহকে ইবাদাতের যোগ্য একমাত্র সত্তা হিসেবে এবং বিধানের উৎস হিসেবে মেনে নিতে তা মানুষকে পরিচালিত করবে। তিনি বাদে অন্য কারো এই অধিকার নেই। তিনিই একমাত্র রব এবং একমাত্র খালিক (সৃষ্টিকর্তা)। তিনি সর্বজ্ঞানী, সর্বজ্ঞাত ও বিধানদাতা যিনি সমস্ত বিষয়কে পরিচালনা করেন। যেহেতু প্রকৃতিগতভাবে মানুষ নিজেকে দুর্বল, সীমাবদ্ধ, চাহিদাসম্পন্ন এবং নির্ভরশীল বলে অনুভব করে সেহেতু সে তাকে সঠিকপথে পরিচালিত করার জন্য এবং গভীর অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসার জন্য এই ইলাহের নিকট আত্মসমর্পণ করে। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন এবং বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁকে (সা) মনোনীত করেছেন যিনি তাঁর রবের ইচ্ছানুযায়ী তাদেরকে শান্তির পথে পরিচালিত করেন। তিনি (সা) তাঁর রবের পক্ষ থেকে যা কিছু আমাদেরকে পৌঁছে দেন তার আনুগত্য করতে আল্লাহ আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি (সা) নিষ্পাপ, যার প্রতি আল্লাহ পুরো মানবজাতির জন্য একটি বার্তা হিসেবে কুরআন নাযিল করেছেন। এটি এসেছে অন্তরসমূহের জন্য পথনির্দেশনা, আলোকবর্তিকা, রহমত, তিরস্কার এবং নিরাময়কারী হিসেবে। যারা ঈমান আনে ও আনুগত্য করে তাদের জন্য তিনি (আল্লাহ) অনন্তসুখের প্রতিশ্রম্নতি দিয়েছেন এবং যারা প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়েছেন। অতএব, রাসূলুল্লাহ (সা) যে বার্তা নিয়ে এসেছেন সে অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদাত করার জন্যই কেবল মানুুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে।
— জীবনের পূর্বে কী ছিল, সেই বিষয়টি মুসলিমদের কাছে পরিষ্কার করতে হবে কারণ এর মাধ্যমে ইসলাম মানবজাতিকে একটি বন্ধনে আবদ্ধ করে যা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা এবং সমস্ত বিষয়ের পরিচালনাকারী হিসেবে আল্লাহর উপরে ঈমান। জীবনের পরে কী আছে তার মাধ্যমেও তাকে ঈমানের বন্ধনে আবদ্ধ করে যা হচ্ছে বা’থ (পুনরুত্থান), নুশূর (একত্রিতকরণ), হিসাব, সাওয়াব এবং ইকাব (শাস্তি)। এ বিষয়গুলো এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে এগুলোর মধ্যকার সম্পর্কটি উপস্থাপিত হয়। এই বন্ধনকে যে ছিন্ন করে এবং আলাদা করে ফেলে তার মন্তব্য কোনো স্পষ্ট প্রমাণ বা তথ্যের উপরে ভিত্তিশীল থাকবেনা। বরং এগুলো হবে কুফরী মন্তব্য।
— একে এমনভাবে পৌঁছাতে হবে যাতে তা উম্মাহকে পুনর্জাগরিত করে এবং বিশ্বে ইসলাম ছড়িয়ে দিতে তাকে চালিত করে।
— সমসাময়িক কুফর চিন্তাসমূহের মোকাবেলায় এই চিন্তার যথার্থতা মুসলিমদের কাছে বুঝাতে হবে। পঁুজিবাদ, জাতীয়তাবাদ, অথবা দেশাত্মবোধ থেকে জন্ম নেওয়া বর্তমান চিন্তাসমূহের ভ্রান্তি উন্মোচন করার মাধ্যমে এটি অর্জিত হবে। ইসলাম ও এসব চিন্তার মধ্যকার পার্থক্য বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে এটা সম্ভব হবে; ফলে আমরা দুটো বিষয় অর্জন করতে পারব: প্রথমত; এসব চিন্তা ও এগুলোর উপরে ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে থাকা অন্যসব চিন্তার খণ্ডন এবং দ্বিতীয়ত; এই বিষয়টিকে তুলে ধরা যে ইসলাম হচ্ছে পুরো মানবজাতির জন্য একমাত্র উপযুক্ত সমাধান (এর আক্বীদাহ ও ব্যবস্থার সার্বজনীন প্রকৃতির কারণে)। পরবর্তীতে সেই রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে আমরা ইসলামের সঠিকত্ব প্রমাণ করতে পারব যা ইসলামকে উপস্থাপন করবে। এক্ষেত্রে কাফেরদের বিভিন্ন শ্লোগান, চমকপ্রদ প্রপাগাণ্ডা ও বিলবোর্ড এবং কাফের ঔপনিবেশিক শক্তি কর্তৃক মুসলিমদের মনে স্থাপিত ভ্রান্ত দাবীসমূহকে দূর করার জন্য দলটি কাজ করবে। উদাহরণস্বরূপ কিছু শ্লোগান তুলে ধরা হল: ‘চিন্তা ও সংস্কৃতির স্বাধীনতা’, ‘সীজারের প্রাপ্য সীজারকে দাও এবং সৃষ্টিকর্তার প্রাপ্য সৃষ্টিকর্তাকে’, ‘আমাদের মাতৃভূমি সবসময় সত্যের উপরেই থাকে’, ‘নির্যাতনকারী হোক অথবা নির্যাতিত নিজের ভাইকে সাহায্য কর’ (প্রাক ইসলামী যুগের ধারণা অনুসারে) প্রভৃতি। মুসলিমদের মন ও জীবন থেকে পাশ্চাত্য চিন্তাসমূহের প্রভাবকে দূর করতে হবে। এজন্য ‘শরীআহ’র উন্নয়ন’, ‘শরীআহ’র আধুনিকায়ন’, ‘যুগের চাহিদা পূরণে শরীআহ’র নমনীয়তা’ (পাশ্চাত্যের ধারণা অনুযায়ী) এবং ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’, ‘দ্বীনের মধ্যে কোনো রাজনীতি নেই,’ ‘এই বিষয়টি প্রত্যাখ্যাত নয় যে, সময় ও স্থানের সঙ্গে হুকুম পরিবর্তিত হয়’ প্রভৃতি ধারণার ভিত্তিতে গড়ে উঠা চিন্তাগুলোকে প্রত্যাখ্যান করার মাধ্যমে উদ্দেশ্য অর্জন করতে হবে। এসমস্ত শ্লোগান দূর করার পাশাপাশি দলটিকে বিকল্প চিন্তাভাবনা প্রোথিত করতে হবে যেগুলো ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ এর ভিত্তিতে এবং এ থেকেই উৎসারিত।
শরীয়াহ থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ এই কথাটি জ্ঞান ও কর্মের দিকে দিয়ে ততক্ষণ পর্যন্ত বিশুদ্ধ হবেনা যতক্ষণ না অন্যসব চিন্তাকে পরিত্যাগ করা হচ্ছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন;
“যারা গোমরাহকারী তাগুতদেরকে মানবে না এবং আল্লাহতে বিশ্বাস স্থাপন করবে, সে ধারণ করে নিয়েছে সুদৃঢ় হাতল যা ভাঙ্গবার নয়।”
(আল কুরআন ২:২৫৬)প্রথমে আল্লাহ তাগুতের সঙ্গে কুফর (অস্বীকার) করতে বললেন, যাতে কুফর বা শিরকের কোনো ছাপ অন্তরে না থাকে এবং তারপরে বিশুদ্ধ অবস্থায় অন্তরে ঈমান আসে যাতে তার অবস্থা এমন হয় যে ব্যক্তি কোনো বিশ্বস্ত হাতকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
“জেনে রাখুন (হে মুহাম্মাদ), আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই।”
(আল কুরআন ৪৭:১৯)‘কোনো ইলাহ নেই’ এর অর্থ হচ্ছে জ্ঞানার্জন ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে যে ইলাহ কেবলমাত্র একজনই রয়েছেন যার একক আনুগত্য করতে হবে। এছাড়া তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) যখন বলেন,
‘আল্লাহ ছাড়া’ তখন এর মানে হচ্ছে ইলাহ হিসেবে একমাত্র আল্লাহকে মেনে নেওয়া। এটি এককভাবে আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে এবং অন্য সবাইকে প্রত্যাখ্যান করতে বলে। আরবি ভাষায় এটি হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী ধরনের দৃঢ়তাসূচক বাক্য যাকে এখানে ‘সীমিত করা’ অর্থে বুঝানো হয়েছে। ফলে সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও দেশাত্মবোধের চিন্তা আমাদেরকে রক্ষা করতে পারবে না অথবা এগুলো কোনো সঠিক চিন্তাও নয়। বরং এগুলো হচ্ছে নষ্ট ও ভ্রান্ত চিন্তা। এগুলো মানুষের শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না বরং দুর্দশা বয়ে আনে। আল্লাহর দ্বীন ও শরীআ’হ ব্যতীত হিদায়াত, আলোকিত পথ ও নিরাময়কারী অন্যকিছু নেই।
দলের কর্মীদেরকে ইসলামী ব্যক্তি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদেরকে সঠিক ইসলামী বৈশিষ্ট্য (criteria) শেখাতে হবে, শরীআহ’র আনুগত্যের প্রতি ভালোবাসা এবং এর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ঘৃণা দ্বারা এদের অন্তরকে পূর্ণ করতে হবে এবং কোনো সিদ্ধান্তের জন্য এর দিকে ফিরে আসার প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যকিছুর দিকে ফিরে যাওয়ার প্রতি ঘৃণা দ্বারা এদের অন্তরকে পূর্ণ করতে হবে। ফলে কোনো বিষয় বুঝার ক্ষেত্রে তারা যেন শরীয়াহ’র বৈশিষ্ট্য (criteria) ও চিন্তা দ্বারা পরিচালিত হয় এবং তাদের প্রবৃত্তিসমূহ ইসলামের অনুগামী হয়। ইসলাম যা পছন্দ করে তারা যেন তা পছন্দ করে এবং ইসলাম যা ঘৃণা করে তারা যেন তা ঘৃণা করে।
এই বিকাশক্রিয়ার (culture) দ্বারা শাবাবদেরকে গড়ে তোলার জন্য দলটিকে বিভিন্ন পাঠচক্র আয়োজন করতে হবে যাতে এর শাবাবরা নেতৃত্বের জন্য এবং বাস্তবিক ক্ষেত্রে দাওয়াতের জন্য প্রস্তুত হতে পারে যার ফলে লোকজন সেসব চিন্তাকে গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ হবে। দলটি চিন্তার সাহায্যে বাস্তবতাকে বুঝবে এবং শাবাবদের কাছে সেই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করবে যার মাধ্যমে সে চিন্তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। এটা তখন শাবাবদের জন্য পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে কীভাবে বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে হয় এবং কীভাবে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক সংজ্ঞা যেগুলো বাস্তবতার ব্যাখ্যাদানকারী এবং মানাত যার উপরে শরঈ হুকুম প্রযোজ্য হবে সেগুলো নির্ধারণ করা যায়। দলটি যখন চিন্তা, প্রবৃত্তি, জৈবিক চাহিদা, পুনর্জাগরণ, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতা প্রভৃতি বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করে তখন সে তা এজন্য করে যাতে সে এগুলোর বাস্তবতা বুঝতে পারে, কারণ এসব বিষয়ের সঙ্গে অনেক শরঈ হুকুম জড়িত।
শর’ঈ দলীল থেকে শর’ঈ হুকুম বের করার জন্য দলটি প্রচেষ্টা নিবে। বাস্তব সমস্যার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন বিষয় সে বের করবে এবং সেগুলোর সমাধান দিবে। এজন্য দলটিকে সেসব বিষয়ের প্রত্যেকটাই গ্রহণ করতে হবে যেগুলোর মাধ্যমে সে শর’ঈ গ্রন্থসমূহ বুঝতে এবং দলটি নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হুকুম বুঝতে সক্ষম হবে। ইসতিদলাল (হুকুম বের করা) এর পদ্ধতি স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে দলটিকে যাতে এর শাবাব ও মুসলিমগণ তা শিখতে পারে এবং শরীয়াহ’কে বোঝা ও আহকাম বের করার সঠিক ইসলামী পদ্ধতি তারা অনুধাবন করতে পারে।
গ্রহণকৃত বিকাশক্রিয়া (culture) শাবাবদের কাছে পৌঁছানোর জন্য দলটিকে সবোর্চ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে যাতে বিষয়টি যেন ব্যবহারিকভাবে বাস্তবায়িত হয়। কারণ নিছক জ্ঞানার্জন, তথ্যবহুল হওয়া অথবা শাবাবদেরকে প্রচণ্ড শিক্ষিত করে তোলা এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য নয়। বরং এসব চিন্তাভাবনার উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের সূচনা করা এবং উম্মাহর মধ্যে এসব চিন্তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করা যাতে এগুলোকে উপস্থাপনকারী একটি কর্তৃপক্ষ সে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
এসব বিকাশক্রিয়াকে (culture) বিস্তারিত ও ব্যবহারিকভাবে যথার্থ উপায়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দলটিকে চেষ্টা করতে হবে। কথা ও কাজের মধ্যে গরমিল করা যাবে না। কারণ দলটি যদি সত্যের শিক্ষা দেয় কিন্তু বিপরীত কাজ করে তাহলে তাতে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ক্রোধের উদ্রেক ঘটাবে।
গ্রহণকৃত বিকাশক্রিয়ার (culture) আলোকে শাবাবদেরকে গড়ে তুলতে হবে এবং এসব চিন্তা তাদের অন্তরে বদ্ধমূল করে দিতে হবে। ইসলামের মৌলিক চিন্তাসমূহ গ্রহণ করার পরে উম্মাহর মধ্যে এগুলোকে ছড়িয়ে দিতে হবে যাতে ওয়াঈ আম (সাধারণ সচেতনতা) এর ভিত্তিতে ফিকরাহ (চিন্তাভাবনা ও ধ্যানধারণা) এর জন্য রায় আম (জনমত) গড়ে ওঠে। আক্বীদাহ’র চিন্তাভাবনাসমূহ এবং উম্মাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত শর’ঈ হুকুমের মৌলিক নীতিমালাসমূহ এমনভাবে গ্রহণ করতে হবে দলটিকে যাতে তা উম্মাহকে একটি লক্ষ্যের উপরে এক করে যা হচ্ছে আল্লাহর শরীআহ’র সার্বভৌমত্ব। এভাবেই উম্মাহ সঠিক পথে যাত্রা শুরু করবে এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ফিরে পাওয়ার জন্য পুনরায় অগ্রসর হবে যা সে অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে।
এসব মৌলিক চিন্তা এবং শরঈ হুকুমের মৌলিক নীতিমালার ফলে আইন প্রদান ও ইবাদাতের বিষয়টি কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই সংরক্ষিত হবে এবং অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকার কেবলমাত্র রাসূল (সা)-এর জন্যই সংরক্ষিত হবে। এসব মৌলিক বিষয় লোকজনের মধ্যে জান্নাতের আগ্রহ ও জাহান্নামের ভয় সৃষ্টি করবে এবং তাদেরকে এটা বুঝতে সাহায্য করবে যে ইসলামের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অন্যতম একটি ফরয হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা; কারণ এর উপরে অনেকগুলো ফরয নির্ভরশীল। এতে উম্মাহ বুঝতে পারবে যে অন্যসব লোকের বাইরে তারা একটি উম্মত এবং কোনো বংশ বা রাষ্ট্রের সীমানা তাদেরকে পৃথক করতে পারেনা। মুসলিমরা একটি ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ যাকে কোনো জাতীয়তাবাদী বা দেশাত্মবোধক বন্ধন ছিন্ন করতে পারে না। আল্লাহর শরীয়াহ’র প্রতি অবহেলার ফলেই মুসলমানরা বর্তমানে অপমানিত ও লজ্জিত অবস্থায় রয়েছে। মুসলিমদেরকে তাদের রবের শরীয়াহ’র আনুগত্য করতে হবে এবং দলীল না জেনে তাদের পক্ষে কোনো কাজ করা উচিত হবেনা।
ইসলামী হুকুমতের অস্তিত্বে আসা এবং তাতে ফলধারণের জন্য এসব চিন্তা উর্বর ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে।
যেসব বিষয় আমরা উল্লেখ করেছি তার সবগুলোই দলের বিকাশক্রিয়ার (culture) অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। শরীয়াহ’র নির্দেশনা অনুযায়ী আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে একটি উপযুক্ত রাস্তা তৈরি করা যাতে আমরা চিন্তাভাবনাগুলোকে নির্ধারণ করতে পারি এবং সেই ভিত্তি ঠিক করতে পারি যার আলোকে এসব বিকাশ প্রক্রিয়াসমুহ (culture) গ্রহণ করা হবে।
যথেষ্ট শক্তিশালী চিন্তা, মতামত ও শর’ঈ হুকুম দলটিকে নির্ধারণ করতে হবে যাতে সে নিজেকে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য নিয়ে যেতে পারে এবং দাওয়াতের দায়িত্ব বহনকারীদের মধ্যে পূর্ন মনোযোগের সৃষ্টি করতে পারে। উম্মাহর মধ্যে জনমত গড়ে তোলার জন্যও এসব চিন্তাও প্রয়োজনীয়। দলটি যে ফিকরাহ (ধারণা) এর উপরে প্রতিষ্ঠিত তা উম্মাহকে গ্রহণ করাতে এগুলো কাজে লাগবে।
উল্লিখিত পরিকাঠামো দলটিকে বজায় রাখতে হবে। এই বিষয়গুলো নির্ধারণ করতে যদি দলটি সমর্থ হয় তাহলে মৌলিক বিষয়ের শাখা-প্রশাখা থেকে উদ্ভূত কম গুরুত্বপূর্ণ হুকুমসমূহ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সে কিছু ভুল করলে, অথবা অন্যান্য দলের সঙ্গে সে মতভেদ করলে অথবা অন্যান্য দল তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করলে তা তেমন ক্ষতিকর হবেনা। কারণ এটি একটি অপরিহার্য এবং অনিবার্য বিষয়।
আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার শরীআহ’র সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত করা এবং বিশ্বের বাকি অংশে দাওয়াতকে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য অর্জনের জন্য এসমস্ত বিকাশক্রিয়া (culture) দলটির জন্য অপরিহার্য। প্রকৃতপক্ষে সফলতা দেয়ার মালিকতো কেবলমাত্র আল্লাহ সুবহানাাহু তায়ালা।
৭ম অধ্যায়: দলের বিকাশ প্রক্রিয়া (Culture)
উম্মাহর দরকার হচ্ছে বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের, আর পরিবর্তনের জন্য আবশ্যক হল ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কোনো রাজনৈতিক কাঠোমোর মাধ্যমে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। সুতরাং কাঠামোটির সঠিক বৈশিষ্ট্য ও গাঠনিক উপাদানগুলোর বিষয়ে এবং পূর্ববর্তী কাঠামোগুলোর সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করা অপরিহার্য, যাতে সেসবের ব্যর্থতার কারণ বুঝা সম্ভব হয় এবং তা এড়িয়ে চলা যায়। এজন্য কাঠামোগত দিকটি পর্যবেক্ষন করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দিকটি কায়দা বা ধরনের (style) অন্তর্গত একটি বিষয়। কায়দা বা ধরনের বিষয়টি মূলত মুসলিমদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে যাতে কাজের যথার্থতা ও উপযুক্ততা অনুযায়ী তারা তা নির্ধারণ করে। এই বিষয়টি দলীয় কৃষ্টির বা সংস্কৃতির একটি অংশ।
— যে সমাজে মুসলিমরা বাস করে তাতে যেহেতু বিভিন্ন চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থার মিশ্রণ রয়েছে সেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজ; এর বাস্তবতা, উপাদান, এতে প্রভাব সৃষ্টিকারী বিষয়সমূহ এবং একে পরিবর্তন করার উপায় নিয়ে কথা বলতে হবে যাতে চিন্তা, আবেগ ও ব্যবস্থার দিক দিয়ে সুসংহত ইসলামী সমাজ নির্মাণ করা যায়।
— যেহেতু ব্যক্তির বাস্তবতা থেকে সমাজের বাস্তবতা ভিন্ন, সেহেতু ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত গাঠনিক বিষয়াদি সমাজের গাঠনিক বিষয়াদি থেকে ভিন্ন। অতএব ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত শর’ঈ হুকুম সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত শর’ঈ হুকুম থেকে ভিন্ন।
— যেহেতু সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে দলটির কর্মকাণ্ড জড়িত সেহেতু এই বাস্তবতায় কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তা ও শরঈ হুকুম দলটিকে বিস্তারিতভাবে গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি এ কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত হুকুমসমূহকে গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতার ব্যাপারে সে ব্যক্তিসাধারণ এবং জনগণকে নির্দেশনা দিবে। গ্রহণকৃত এসব হুকুম তার জন্য সামষ্টিক দায়িত্ব হতে পারে যেগুলোর অবজ্ঞা করার কোনো অজুহাত তার নেই অথবা এগুলো তার ব্যক্তিগত দায়িত্বও হতে পারে, যেগুলোর আনুগত্য করতে দল তাকে আহ্বান করছে যেমন: লেনদেন, ইবাদত এবং নৈতিকতা যেগুলো ইসলামী আক্বীদাহ থেকে উৎসারিত এবং তার দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা।
— মুসলিমদের চিন্তার ব্যবহার যেহেতু বর্তমানে পাশ্চাত্য দ্বারা প্রভাবিত এবং চিন্তার সাহায্যেই তারা স্বার্থ নির্ধারণ করছে সেহেতু রাসূল (সা)-এর সর্বোত্তম অনুসরণ এবং শরীয়াহ’র সবচেয়ে সঠিক আনুগত্যের জন্য চিন্তা ও এর উপাদান নিয়ে আমাদেরকে চিন্তাভাবনা করতে হবে যাতে আক্বীদাহ, শরঈ আহকাম অথবা বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করার ক্ষেত্রে চিন্তা ব্যবহারের সীমা কতটুকু এবং কীভাবে তা ব্যবহার করতে হবে সেটি আমরা জানতে পারি।
— যেহেতু আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে শাসন এবং দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিষয়টি সম্পর্কিত সেহেতু মক্কায় রাসূল (সা) কীভাবে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং কোন কোন কর্মকাণ্ডের ফলে মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে সম্পর্কিত জ্ঞান আমাদেরকে অর্জন করতে হবে। এ জ্ঞান অর্জনের পর আমাদের অবশ্যই তা দ্বারা পরিচলিত হতে হবে। রাসূল (সা)-এর কর্মকাণ্ডকে যথার্থরূপে অনুসরণের জন্য পদ্ধতি সংক্রান্ত হুকুম এবং ধরন ও উপকরণ সম্পর্কিত হুকুমের পার্থক্য আমাদেরকে ভালোভাবে বুঝতে হবে।
— যেহেতু দলের কাজ হচ্ছে আল্লাহর নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে পরিচালিত হয় এমন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে পরিবর্তন করা, সেহেতু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে শাসকদের কর্মকাণ্ডকে, শাসকদের বাস্তবতাকে এবং শাসকদের সাথে তাদের মিত্রদের সম্পর্কের প্রকৃতিকে বোঝা আমাদের জন্য অপরিহার্য। শাসকদের কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণকারী পরাশক্তিসমূহের গৃহীত বিভিন্ন নীতিমালা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ এবং তাদের পরিকল্পনাগুলোকে জনসমক্ষে প্রকাশ করাটাও আমাদের জন্য জরুরী।
— যেহেতু মুসলিম ভূখণ্ডসমূহ পাশ্চাত্য ব্যবস্থা বিশেষত পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বৃদ্ধিবৃত্তিক ব্যবস্থাসমূহ দ্বারা পরিচালিত সেজন্য ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের মতাদর্শ, আক্বীদাহ এবং এগুলোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা চিন্তা ও ব্যবস্থা নিয়ে আমাদেরকে পর্যালোচনা করতে হবে।
— ইসলামের বাস্তবায়ন এবং একে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যেহেতু শরীয়াহ’র উদ্দেশ্য সেহেতু শাসনব্যবস্থা, ইসলামী রাষ্ট্র, এর গঠনতন্ত্র ও প্রকৃতি, এর স্তম্ভসমূহ, সংবিধান এবং ইসলামী রাষ্ট্রে যেসব বিষয় বাস্তবায়িত হবে তার উপরে একটি সাধারণ ধারণা অর্জন করা অত্যাবশ্যক। আমাদেরকে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাসমূহের গঠনতন্ত্রও পরীক্ষা করতে হবে যাতে এগুলো থেকে নিজেদেরকে আমরা পৃথক করতে পারি এবং তা দ্বারা প্রভাবিত না হই। পাশাপাশি আমাদেরকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন যার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে।
এভাবে দলটিকে এর বিকাশ প্রক্রিয়ার (culture) উপকরণসমূহ (topics) চিহ্নিত করবে এবং যাতে সেগুলো অনুযায়ী কাজ করা যায় এবং জনসাধারনকে এ কাজের প্রতি জরুরীভাবে আহবান করে ইসলামি জীবনব্যবস্থা পুন:প্রচলন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা যায়। খিলাফত রাষ্ট্র ইসলাম দিয়ে মুসলিম ও অমুসলিমদেরকে শাসন করবে এবং দাওয়াত ও জিহাদের মাধ্যমে এর বার্তা বিশ্বের নিকট পৌঁছে দিবে।
ক্বিয়াস আক্বলী (যুক্তির ভিত্তিতে ক্বিয়াস নির্ধারণ)
আক্বল সাদৃশ্যতাপূর্ণ ও তুলনীয় বস্তু সম্পর্কে একই ধরনের নিয়ম প্রদান করে। সেকারণে এমন দু’টি বিষয়ের মধ্যে স্বরূপতা আনা হয় যেগুলোর মধ্যে সাদৃশ্যতা রয়েছে। এবং আক্বল ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম প্রদান করে।
এ অবস্থা ক্বিয়াস শরী’আহ এর সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ শরী’আহ একই ধরনের বিষয়ে ভিন্ন ধরনের হুকুম প্রদান করেছে এবং ভিন্ন ধরনের বিষয়ে একই হুকুম প্রদান করেছে। শরী’আহ একই বিষয়কে দু’ভাবে দেখেছে, যেমন: দু’টি ভিন্ন সময়কে। লাইলাতুল ক্বদরকে অন্যান্য রাতের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একই ধরনের স্থানকে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছে, মক্কাকে মদীনার উপর এবং মদীনাকে অন্যান্য স্থানের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। সালাতের ক্ষেত্রে চার রাকাআত এর নামাজ ও তিন রাকাআতের মধ্যে পার্থক্য করেছে, শরী’আহ চার রাকআতকে ছোট করে দুই রাকআত করবার অনুমতি দিলেও তিন বা দুই রাকআতকে সংক্ষিপ্ত করবার অনুমতি দেয়নি। আক্বল এ ধরনের তুলনা করতে সক্ষম নয়। বীর্য স্খলনের ক্ষেত্রে শরী’আহ গোসলের বিধান দিয়েছে যদিও এটা পবিত্র। অন্যদিকে মাজিহ বা বীর্য স্খলনপূর্ব তরল অপবিত্র হওয়া সত্তেও এর নিঃসরণের পর ওযুর বিধান প্রদান করেছে যদিও বীর্য ও মাজিহ একই স্থান হতে নিঃসৃত হয়। তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য ইদ্দত বা অপেক্ষমান সময় তিন মাসিক চক্র করেছে, অন্যদিকে বিধবা নারীর জন্য তা চারমাস দশদিন যদিও এক্ষেত্রে জরায়ুর অবস্থা একই থাকে। পরিষ্কারের দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা পানি ও ধুলাকে একই মর্যাদা প্রদান করেছে যদিও পানি ধুলা পরিষ্কার করে। এটা ব্যভিচার, ধর্মত্যাগ ও হত্যার বদলে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে যদিও তিনটি ভিন্ন ধরনের অপরাধ।
এছাড়াও শরী’আহ এমন সব বিষয়ে হুকুম প্রদান করেছে যে বিষয়ে আক্বলের ভিত্তিতে কিছু বলার নেই। যেমন: এটা স্বর্ণের দ্বারা স্বর্ণ বিক্রিকে নিষিদ্ধ করেছে, যদি সমভাবে অথবা বাকীতে না হয়। এটা ছেলেদের স্বর্ণ পরিধান করতে নিষেধ করেছে, কিন্তু মেয়েদের অনুমতি দিয়েছে। একই কথা রেশমী কাপড়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এটা সুদকে হারাম করেছে এবং ব্যবসাকে করেছে হালাল। এটা অসিয়তের সাক্ষী হিসেবে কাফেরদের অনুমোদন দিয়েছে কিন্তু আবার প্রত্যাহারকৃত তালাকের ক্ষেত্রে এ শর্ত জুড়ে দিয়েছে যে সাক্ষী হতে হবে মুসলিম।
এ কারণে আলী (রা) বলেছেন, ‘যদি দ্বীন কোন ব্যক্তির মতামতের ভিত্তিতে করা হত, তাহলে মাসহ করবার ক্ষেত্রে পায়ের উপরের চেয়ে নীচের অংশটিই বেশী পছন্দনীয় ছিল।’
সুতরাং যে দলটি ইসলামি জীবনধারা ফিরিয়ে নিয়ে আসবার জন্য কাজ করছে তাদের অবশ্যই এই মূলনীতিগুলোকে বুঝতে হবে। দলটি কীভাবে বাস্তবতা অনুধাবন করবে এবং তা তুলে ধরবে এটা অবশ্যই দলটি বিকাশ প্রক্রিয়ার মধ্যে উপস্থাপন করবে যাতে সদস্যগন বুঝতে পারে। এটা অবশ্যই শরীয়া উৎস ও উসুলী মূলনীতিগুলোকে সংজ্ঞায়িত করবে এবং গ্রহণ করবে ও শাবাবদের এর ভিত্তিতে বিকশিত করবে। কারণ এসব মূলনীতির উপর ভিত্তি করে তাদের মনস্তত্বকে গঠন করতে হবে। এটা বিকাশ প্রক্রিয়ারও অংশ হবে। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও উসুলী বিকাশ প্রক্রিয়া গ্রহণ করা অপরিহার্য যা ওহীর বিশুদ্ধতা ও চিন্তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং এমন বাহুল্যতাকে দূরীভূত করবে যা ওহীকে অ¯পষ্ট করে তোলে, যেমন: এরকম মূলনীতি, ‘এটা পরিত্যাজ্য নয় যে, সময় ও পাত্রভেদে হুকুম পরিবর্তন হয়’ এবং এর সার্বিক অর্থ যা দাঁড়ায় তা হলো ‘প্রয়োজন হারামকে জায়েয করে’ এবং ‘দ্বীন উদার ও বিবর্তনযোগ্য’ কিংবা ‘যেখানে সুবিধা পরিলক্ষিত হয় সেটাই হলো আল্লাহর বিধান।’
কাজের সাথে সম্পর্কযুক্ত শরীয়া হুকুম গ্রহণ ও পালন, এগুলোকে নির্দেশনা ও আলোকিত চিন্তা হিসেবে গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই দলটি তার নিজস্ব উসুলের মধ্যে এগুলোকে গ্রহণ করবে, যা এর দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রন করবে ও শরী’আহকে হৃদয়ঙ্গম করতে সহায়তা করবে এবং সর্বোপরি আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সুনিশ্চিত করবে।
একটি ইস্যূতে একাধিক ইজতিহাদ থাকতে পারে। বিতর্কিত ইস্যুগুলো থেকে দলিলের বিশুদ্ধতার ভিত্তিতে দলটি তার জন্য শরীয় হুকুম গ্রহণ করবে এবং এগুলোর সাথে স্থির থাকবে। এরপর দলটি তার উসুলী মূলনীতি ও ফুরু বা শাখা সম্বন্ধীয় মূলনীতি ঘোষণা করবে। এর মাধ্যমে শাবাবদের বিকশিত করবে, জীবনকে এগিয়ে নিবে এবং এটা ব্যবহার করে আলোচনা করবে। নিজে গ্রহণ করেছে বিধায় এটি দলিল ও উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে অন্যদের তা গ্রহণের জন্য হৃদয় জয় করবে। বিকাশ প্রক্রিয়া অনুসারে অভিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ করবে; অন্যথায় সে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে এবং পথিমধ্যে দিক হারিয়ে ফেলবে।
সমাজ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় শরীয়া হুকুম জানার আগে এ বিষয়ে শরীয়ার উৎস ও ঊসুল অধ্যয়ন করতে হবে। দলটি তার কাজ পরিচালনার সময় অনেক দূর্ভোগ ও জটিলতার সম্মুখীন হবে। যদি এটা শক্তিশালী দলিলের ভিত্তিতে নিষ্ঠার সাথে কোন উসুল গ্রহণ না করে, তাহলে এটি দোদুল্যমান হবে এবং গৃহীত বিষয়সমূহের ক্ষেত্রে ক্রমাগত পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাবে। তারা বর্তমান দূষিত শাসনব্যবস্থার ভেতরে গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে যা কিনা ছিল দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ও প্রতিবন্ধক। যখন তারা গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে তখন বর্তমান ব্যবস্থার সাথে ইসলামী শুরা ব্যবস্থার সাদৃশ্যতা খুজে পায়। ‘পূর্ববতীর্ নবীদের শরী’আহ তাদের জন্যও শরী’আহ’ এ যুক্তিতে তারা পূর্ববতীর্ নবীদের শরী’আহ থেকে গ্রহণ করে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রদান করে। সঠিক শরীয়া পদ্ধতি অনুসরণ না করবার কারণে এভাবে ক্রমাগত পরিবর্তনের মত জটিলতায় উপনীত হয়। অথবা দলটি এমনও দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহন করতে পারে যে, বিভিন্ন সংস্থা গঠন করে তারা বাস্তবতা পরিবর্তনের সুযোগ পাবে, ফলে পদ্ধতির বদলে উপায়ের চিন্তায় তাদের মন আচ্ছন্ন থাকে। অথবা এমনকি তারা শরীয়া পদ্ধতির অনুসরণ না করে অস্ত্রধারণ করতে পারে; কারণ বাস্তবতা তাদের সেদিকে ধাবিত করে।
সুতরাং উসুল ও ঊৎস গ্রহণ, এবং ইজতিহাদের নির্ধারিত পদ্ধতির অনুসরণের মাধ্যমে দলটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাঙ্খিত পথে অটল থাকবে এবং বাস্তবতা, পরিস্থিতি কিংবা স্বার্থ যেদিকে উদ্দীপিত করে সেদিকে ধাবিত হবে না।
এভাবে দলটি আইনগত চিন্তার পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করবার পর এর কাজের পদ্ধতিকে সংজ্ঞায়িত করবে। অন্যথায় এটি বহুপথে বিচ্যুত হয়ে যাবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়ে ধ্বংস ডেকে আনে আল্লাহসুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের প্রতি সুদৃষ্টি দেন না।
দলটি এর বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণের উৎসকে সুনির্দিষ্ট করবার পর এইসব উৎস ও গৃহীত উসুলের ভিত্তিতে বিকাশের চিন্তাগুলোকে সংজ্ঞায়িত করবে।
উৎস ও উসুল অধ্যয়নের ক্ষেত্রে দলটি অবশ্যই সুনিশ্চিত করবে যে, শরী’আহ উপলদ্ধির ক্ষেত্রে দলটি অবিশুদ্ধ চিন্তা ও অন্য চিন্তার সাথে গুলিয়ে ফেলার মত ভুল থেকে মুক্ত। ওহীকে অবিশুদ্ধ করে এমন সব কিছুকে দূরীভূত করবার জন্য এটা প্রচেষ্টা চালাবে এবং শরী’আহ বোঝার ক্ষেত্রে খেয়াল খুশীর অনুগামী না হবার জোর প্রচেষ্টা চালাবে এবং মনকে বিধি বিধান নিয়ন্ত্রনের কোন অনুমতি দিবে না। উসুল এবং উৎস অধ্যয়ন ছাড়া দলীয় বিকাশের চিন্তাগুলোর চর্চা সম্ভব নয়।
এরপর দলটিকে ফিরতে হবে ও অনুশীলন করতে হবে সেই বাস্তবতার প্রতি যেখানে উম্মাহ বসবাস করে, যা পূর্বে উল্লেখ করেছি। এইভাবে এটা বর্তমান চিন্তা, আবেগ, ও ব্যবস্থা নিয়ে অধ্যয়ন করবে, যাতে বুঝতে পারে, এ সম¯ত চিন্তা ও ব্যবস্থা সম্পর্কে জনগনের গ্রহনযোগ্যতা ও প্রতিক্রিয়া কতটুকু। উম্মাহ কুফর চিন্তা দ্বারা আকর্ষিত, যেগুলোকে কাফেররা উম্মাহর স্বাস্থ্যের পূনরুদ্বারের শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। রাজনৈতিকভাবে উম্মাহ পুতুল শাসক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যাদেরকে উপনিবেশবাদীরা মুসলিমদের উপর চাপিয়েছে, যাতে করে উম্মাহর সম্পদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করা যায় এবং যে কোন আন্তরিক কর্মকান্ড যা তাদের উপনিবেশবাদীতাকে হুমকির মুখে ফেলবে তার প্রতিহত করা যায়। অধ্যবধি পশ্চিমা কাফির উপনিবেশবাদীরা সচেতন যে কোন সামষ্টিক আন্দোলনের ব্যপারে যা তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখোমুখি করবে, তাই সে জনগনের মধ্যে সামষ্ঠিক বা দলীয় কর্মকান্ড সম্পর্কে দূরে রাখার চিন্তা ছড়ায়। পরিবর্তে সে উৎসাহ প্রদান করে সমিতি মূলক কর্মকান্ডে যা চাক্রিক (peripheral) সমস্যার সমাধান দেয় যেমন দারিদ্র নিরসন ও মন্দ নৈতিকতা।
পশ্চিমা কাফিররা মুসলিমদের তাদের দীনই মানুষের সমস্যার একমাত্র সমাধান সেসম্পর্কে আত্নবিশ্বাসকেও সন্দিহান করে তুলেছে, যখন তারা (পশ্চিমা কাফিররা) আকীদাকে (মুসলিমদের) জীবন থেকে পৃথক করেছে, এই পৃথকীকরন তাদের উপর বল প্রয়োগ করে চাপিয়ে দিয়েছে এবং তাদেরকে এ ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রেও বাধা দিেচ্ছে।
এজন্যই দলটি গভীর ও সুনির্দিষ্ট সুস্পষ্ট উপায়ে বিরাজমান বাস্তবতা, চিন্তা, আবেগ এবং ব্যবস্থাসমূহ অধ্যয়নে বাধ্য। এটা এই কারনে যে, যে ভূমির উপর সে দাড়িয়ে আছে সেই ভূমিটির প্রকৃতি, কেমন করে এর উপর সে হাটবে ,বাধা দূর করার ক্ষেত্রে কি কি হাতিয়ার প্রয়োজন, আর উর্বরতার জন্য কি কি জিনিস দরকার অথবা উর্বরতা ফিরিয়ে আনার জন্য কোন উপাদান প্রয়োজন, তা উপলদ্ধি করার জন্য। তাই অবশ্যই প্রথমে একজনকে বা¯তবতা বুঝতে হবে। এটা দলটির সংস্কৃতির (culture) গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে, কারন এটা দলটির নিকট পরিস্কার থাকতে হবে এবং এটা অবশ্যই শাবাব এবং জনগনের নিকট পরিস্কার থাকতে হবে যাতে তারা এ প্রসঙ্গে অজ্ঞ না থাকে, এবং তারা এরপরে এর সমাধানের সঠিকতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারবে।
যে বাস্তবতায় উম্মাহ রয়েছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনেতিক এবর্ং সামাজিক বা¯তবতা অনুধাবনের পর, দলটিকে পূর্বেলিখিত উৎস ও উসুল অনুসরন করে চিন্তা, মতামত এবং শরীয়া বিধানের দিকে অগ্রসর হতে হবে। যে পদ্ধতিতে দলটি এ চিন্তা, মতামত ও শরীয়া বিধানে (method) পৌছেছে তা শাবাব এবং জনগনের কাছে পরিস্কার থাকতে হবে। কারণ এটাই দলটির শাবাবদের মধ্যে দৃঢ়বিশ্বাস, সচেতন মনোভাব এবং ইসলামী ব্যক্তিত্ব তৈরী করবে গভীরভাবে, যা সাধারনভাবে উম্মাহর মাঝেও তৈরী হবে।














