তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
১৮তম অধ্যায়: উদারপন্থা ও চরমপন্থা

পশ্চিমাদের ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক ও পরিমন্ডল রয়েছে, বাস্তব জীবন থেকে ইসলামের দূরত্ব সৃষ্টির জন্য এই সবগুলোকে প্রয়োগ করা হয়। এই প্রপাগান্ডা কেবল এর ভাবমূর্তিকে খাটো করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর উদ্দেশ্য ছিল খিলাফতকে ধ্বংস করা, এর হুকুমসমূহকে অকার্যকর করা এবং ইসলামকে প্রাচীনকালের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা। ইসলাম যাতে পুরো পৃথিবীকে আবারও নেতৃত্ব দিতে না পারে সেটাকে লক্ষ্য করেই এরূপ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তারা সার্বক্ষনিকভাবে ইসলামকে ভয় পায়। সে কারণে তাদের ষড়যন্ত্রও এক মুহুর্তের জন্য থেমে নেই কারণ যদি তাদের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যায় এবং মুসলিমরা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায়।
পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে মুসলিমরা এমন এক জাতি যারা ইসলাম দ্বারা বাঁচতে চায় এবং গোটা মানব জাতির জন্য সর্বাবস্থায় উপযোগী এই চিরন্তন দ্বীনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হতে তাদের হৃদয় সর্বদাই হতে মরিয়া হয়ে থাকে। তাদের কৌশলগত বিভিন্ন স্থানসমুহকে যদি তারা একটি একক রাষ্ট্রের অধীনস্থ করে কৌশলগত স্থানে পরিণত হয় তবে তারা বিভিন্ন মহাদেশকে কব্জা করবে এবং কতৃর্ত্ব নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তারা সুপার পাওয়ার হওয়ার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশী সম্পদের অধিকারী যা তাদেরকে একটি নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রে পরিণত করবে। তাদের জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। শত্রুদের দুশ্চিন্তা এবং বিচলিত হওয়ার আরও কারণ হলো যদি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের বিজয় দান করেন, তাহলে মুসলিমরা যে শুধু কাফিরদের ভূমি ও অন্যান্য সম্পদ দখল করে নিবে তা নয়, বরং তারা মানুষের হৃদয়কে দখল করে নিবে যার ফলে সব মানুষ কুফরীর অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোকবর্তিকার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। কারণ মুসলিমরা মনে করে এ পৃথিবী এবং তার মধ্যকার সব কিছুর চেয়ে কাউকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসা অধিকতর মূল্যবান।
আর এই কারণে ইসলামী শাসন এবং নিজ জাতি ও অন্যান্য জাতির উপর থেকে পশ্চিমাদের প্রভাব অপসারণে নিয়োজিত নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। আর ইসলামের ব্যাপারে তাদের ভীতি অনুযায়ী আনুপাতিক হারে তাদের ষড়যন্ত্রের মাত্রাও বেড়ে চলেছে।
ইসলাম আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কতৃর্ক মনোনিত সত্য দ্বীন না হলে এতদিনে তা সম্পূর্ণ মুছে যেতো, বিলুপ্ত হতো এবং পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতো। তবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইচ্ছাই প্রাধান্য পেয়েছে এবং তাঁর প্রতিশ্রুতিই কার্যকর। মুসলিমদের চরম অধঃপতনের সময়েও তারা তাদের দ্বীনের প্রতি অনুগত ছিল। তবে পশ্চিমারা মুসলিমদের ভ্রান্ত মানদন্ড গ্রহণ করা, চিন্তাকে ত্রুটিপূর্ণ করা ও মানসিকতাকে কলুষিত করতে সমর্থ্য হয়েছিল। আর এই কারণে পশ্চিমারা প্রথম ক্রুসেড থেকে অনুধাবন করতে পেরেছিল যে, মুসলিমদের হৃদয়ে ইসলাম খুব ভালভাবে প্রোথিত হয়েছে এবং সমূল উৎপাটনের যে কোন অপচেষ্টার চেয়ে তা অধিকতর শক্তিশালী। সে কারণে দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্রুসেডের সময় তারা কৌশল পরিবর্তন করে, যার কুফল এখনও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি: যেখানে তারা মুসলিমদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করার পরিকল্পনা করে এবং তাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানদন্ডের প্রসার ঘটাতে শুরু করে যাতে তাদের বস্তুগত সার্বিক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য প্রথমে তারা মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বকে পাকাপোক্ত করলো এবং বস্তুগত নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে তা বজায় রাখলো। অতঃপর তারা এমন শাসকদের মুসলিমদের উপর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করালো যারা দূষিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। রাষ্ট্রকে এর সাথে সম্পৃক্ত করে নিজস্ব স্বার্থে তারা পুরো পৃথিবীকে একটি কোম্পানীর মত একমুখী করে তুললো যেন পশ্চিমারা অর্থলগ্নিকারী ও উৎপাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং অন্য রাষ্ট্রগুলো শ্রমিক ও ভোক্তা শ্রেণীতে পরিণত হয়। এরপর তারা পুরো বিশ্বকে প্রচারমাধ্যমের নেটওয়ার্ক দ্বারা এমনভাবে আচ্ছাদিত করলো যেন অন্য রাষ্ট্রের প্রচারমাধ্যমগুলো এদের অধীনস্থ হয়ে থাকে। এসব প্রচেষ্টার পেছনে তাদের কামনা ছিল, তারা যা লিখবে আমরা তাই পড়বো, তারা যা বহন করবে আমরা তাই শুনবো, তারা যা প্রচার করবে আমরা তাই প্রত্যক্ষ করব এবং একমাত্র তাদের ইচ্ছেমতো সবকিছু আমরা অনুধাবন করবো ও কথা বলবো। এটা ছিল নব্য উন্নততর ঔপনিবেশবাদ। পুরনো ঔপনিবেশবাদের চেয়ে এটা ভয়ঙ্কর ও মারাত্নক। পুরনো ঔপনিবেশবাদ বাহ্যিকভাবে পদানত করতো। আর নব্য ঔপনিবেশবাদ কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে একজনকে ভেতরে ও বাইরে থেকে সার্বিকভাবে গ্রাস করে ও চূড়ান্ত পদানত করে।
এমনকি আমাদের দ্বীনকে বুঝার ক্ষেত্রে পশ্চিমারা তাদের পছন্দমতো পদ্ধতিকে নির্ধারণ করলো। যে এই দৃষ্টিভঙ্গী বিচ্যুত হলো তার বিরুদ্ধে পশ্চিমারা তাদের মিডিয়া প্রপাগান্ডা করতে আঁটঘাঁট বেঁধে নেমে পড়লো। অর্থাৎ তারা ইসলামকে একটি অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা শুরু করলো এবং এর ঐতিহ্য, নিয়মনীতি ও ঐক্যমতকে ভাঁঙ্গার চেষ্টা করলো। তারা ইসলামের সাথে চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার লেবেল এটে দিলো। তারা দ্বীনকে মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেখানোর চেষ্টা করলো যে এটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অন্ধকারের মধ্যেই থাকতে পছন্দ করে। এবং এটা আক্রমণাত্নক ও প্রকাশভঙ্গীর দিক থেকে বিদ্বেষভাবাপন্ন যা ঘৃণা ছড়ায়। মূল চিত্রকে বিকৃত করে ও সত্যকে গোপন করার পর বিভিন্ন শাসন দ্বারা তারা এটাকে আঘাত করলো এবং এমনভাবে আঘাত করলো যেন এটাই এর প্রাপ্য ছিল। লোকদের অজ্ঞতার উপর নির্ভর করে তারা এগুলো করলো এবং এতে সহায়তা করলো এমন কিছু বুদ্ধিজীবি যারা পশ্চিমাদের সবকিছুতেই গুণমুগ্ধ ছিল।
বর্তমানে উম্মাহ্’র জাগরণের কারণে দ্বীনের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র কঠিন হয়ে পড়েছে। উম্মাহ্ আজ পশ্চিমাদের, এসব শাসকদের এবং তাদের তল্পীবাহক তথাকথিত উলামাদের একই চোখে দেখা শুরু করেছে; শয়তান হিসেবে এবং শাসকদের শয়তানের অনুসারী হিসেবে। আর এইসব তথাকথিত পন্ডিতেরা রাতারাতি এ অবস্থানে পৌঁছাতে পারতো না, যদি না তারা একই হারে শাসকদের সম্মুখে ইসলামের সম্মানকে বিকিয়ে দিত। এরা অধঃপতিত পন্ডিত। এই অধঃপতনের দিন যেদিন শেষ হবে সেদিন তাদেরও সমাপ্তি ঘটবে। সঠিক ইসলামী পূণর্জাগরণের ধারকগণ সাদামাটা পোশাকে আর্বিভূত হতে পারেন, কিন্তু তারা সৎ ও আল্লাহভীরু।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি যখন পশ্চিমারা ও শাসকগণ ইসলামী শাসন ফিরে আসার ভয়ে ভীত। তাই তারা সকল প্রকার ইসলামী আন্দোলনকে হুমকি হিসেবে গণ্য করে এবং এগুলোকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে ও এগুলোর উপর সকল ধরনের দোষ চাপাতে মিডিয়াকে ব্যবহার করছে, প্রপাগান্ডা অব্যাহত রেখেছে এবং তাদের পোষ্য তথাকথিত উলামাদের ব্যবহার করছে। এবং শুধুমাত্র ইসলামী শাসনের দিকে আহ্বানকারী আন্দোলনসমূহকে তারা সন্ত্রাসী বা চরমপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করছে। কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ, এবং কিছু জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক লেখক চরমপন্থা পরিত্যাগ করে উদারপন্থার দিকে আহ্বানের জন্য বক্তব্য প্রদান ও বই লিখেছেন। কেবলমাত্র পশ্চিমাদের সন্তুষ্টির জন্যই তারা এ অবস্থান নিয়েছেন। মুসলিম পন্ডিতরা যদি এতে অংশগ্রহণ না করতেন এবং পশ্চিমাদের অবস্থান বৈধ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা না করতেন তবে আমরা তাদের কাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতামনা। কেননা জনগণের কাছে এসব লোকদের কোন মূল্য নেই, বরং তারা তাদের কাছে শাসকদের মতোই। অনেক সময় তাদের এ আক্রমণ তাদের নিজেদের দিকেই ফিরে আসে। এমনকি উম্মাহ্ এসব পন্ডিত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তাদের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, কারণ তারা তাদের অবস্থানের পক্ষে প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন অজুহাত দাঁড় করায়, এবং মনগড়া ফতোয়ার মাধ্যমে শারী’আহ্’র প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির ব্যাত্যয় ঘটায়। তাদের ফতোয়া ইসলামের সাথে শুধু সাংঘর্ষিকই নয় বরং দালিলিকভাবে প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য অকাট্য শারী’আহ্ দলিলকেও তারা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছে। এমনকি তাদের কিছু কিছু ফতোয়া এমন যার কারণে অসৎ কাজের আদেশ প্রদান করা হয় এবং সৎ কাজের নিষেধাষ্ণা দেয়া হয় (আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের এই অনিষ্ট থেকে মুক্ত রাখুন!)। এসব আলেমাগণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নন, বরং কেবলমাত্র শাসক ও তাদের প্রভূদের সন্তুষ্ট করার জন্য ইসলাম থেকে অনেক দূরে থেকে এসব চিন্তা উপস্থাপন করেন। যখন তারা মুসলিমদের জন্য উৎকন্ঠা প্রকাশ করেন এবং ইসলামী দাওয়াহ্ নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন তখন উম্মাহ্ তাদের চিন্তার গলদ ধরে ফেলে এবং তাদের সমর্থকদের পথভ্রষ্টতা অনুধাবন করে।
এ ভূমিকার পর যে জিনিসটি অনুধাবন করা জরুরী, তা হলো ‘চরমপন্থা এবং উদারপন্থা’ বিষয়ক আলোচনার যৌক্তিকতা। আমরা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিষয়টিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করবো যাতে মুসলিমরা কোন দ্বন্দ্ব ছাড়া সত্যকে উপলদ্ধি করতে পারে। কেননা শুধু আবেগ সত্যকে হৃদয়াঙ্গম করার জন্য যথেষ্ট নয়। পূর্বের মতো আমরা শারী’আহ্’র মূলনীতি অনুসারে এ বিষয়ে আলোকপাত করবো যাতে তা ইসলামী আক্বীদার ভিত্তিতে গড়ে উঠা বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
মানব জীবনের সামগ্রিক অবস্থাকে সুবিন্যস্ত করতে ইসলাম এসেছে। সুতরাং এতে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে, যেমন: আখলাক বা চরিত্র, মা’তুমাত বা খাদ্যদ্রব্য এবং মালবুসাত বা পরিচ্ছদ। এতে ব্যক্তির সাথে সমাজের অন্যান্য ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে, যেমন: মু’আমালাত বা সামাজিক আচার ব্যবহার এবং উকুবাত বা শাস্তি। এবং এতে ব্যক্তির সাথে স্রষ্টার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা রয়েছে, যেমন: আক্বাইদ বা বিশ্বাস এবং ইবাদত বা উপাসনা। কেননা মানুষের যেকোন কাজের সমাধানের ক্ষেত্রে ইসলাম পূণার্ঙ্গ। এটি একটি সামগ্রিক চিন্তা যা থেকে মানব জীবনের সকল সমস্যা সমাধান পাওয়া যায়।
তাছাড়া ইসলামের গঠন পূণার্ঙ্গ ও সামগ্রিক যা একটি বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং এ বিশ্বাস থেকে সকল চিন্তা ও সমাধান উৎসারিত হয়। আর তাই এর চিন্তা, বিশ্বাস এবং মাপকাঠি এর মৌলিক চিন্তার মতই একই প্রকৃতির। এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যায়, আল্লাহ্’র উপর মুসলিমদের ঈমানের উপর ভিত্তি করে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত এবং তিনি হলেন আল খালিক বা স্রষ্টা, আল মুদাব্বির বা সববিষয়ের নিয়ন্ত্রণকারী। আর এ বিষয়ে মানুষ হলো দূর্বল, পরনির্ভরশীল, মুখাপেক্ষী, অভাবী ও সমাধান প্রদানের ক্ষেত্রে অক্ষম। সে কারণে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা), রাসূল (সা)-কে এই শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রেরণ করলেন যে, আল্লাহ্ হলেন আল মাবুদ বা উপাসনার জন্য একমাত্র যোগ্য সত্ত্বা এবং কীভাবে তাঁর উপাসনা করতে হবে এবং তাঁর ইবাদত পালন করা ও না করার সাথে কিভাবে আখিরাতের সওয়াব বা পুরষ্কার এবং ইক্বাদ বা শাস্তি জড়িত। এটি মুসলিমদের যেকোন কাজের জন্য একটি প্রক্রিয়া সুনির্ধারিত করে দেয় এবং তা হলো হালাল এবং হারাম। সে কারণে তার মন যথেচ্ছভাবে আচরণ করে না বা আইনপ্রণেতা বনে যায় না অথবা শারী’আহ্ বাণীর সাথে কোন মনগড়া আইনকে যুক্ত করে না। বরং শারী’আহ্ কী বলেছে সেটাকে হৃদয়াঙ্গম করার চেষ্টা করে মাত্র। শারী’আহ্ গ্রহণ করতে হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে, আর এখানে মানুষের কাজ হলো এগুলোকে গ্রহণ করার জন্য সঠিকভাবে বুঝা। বুঝার ক্ষেত্রে সঠিক বা ভুল হতে পারে। উভয়ক্ষেত্রে ইজতিহাদের সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সে পুরষ্কৃত হবে। ইসলাম মুসলিমদের দলিল প্রমাণের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার উপর জোর দেয়। এজন্য ইল্ম আল হাদীস বা হাদীস সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞানের উত্থান হয়েছে এবং সর্বোপরী এ সচেতনতা থেকে উসূল আল ফিকহ্ উৎপত্তি লাভ করেছে। এর কিছু কিছু মূলনীতি ইতিমধ্যে সংরক্ষিত হয়েছে, যেমন: ‘আল্লাহ্ হলেন হাকিম বা বিচারক’, ‘শারী’আহ্ দলিলের গ্রহণযোগ্যতাই হলো কাজ বা যেকোন কিছুর ভিত্তি’, ‘শারী’আহ্ যাকে সুন্দর বলে তাই সুন্দর এবং যাকে কুৎসিত বলে তাই কুৎসিত’, ‘ভাল তাই যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং মন্দ তাই যা তাকে অসন্তুষ্ট করে।’ আমরা এটাও দেখতে পাই যে, মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী সুখ হচ্ছে যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদার প্রশান্তি হচ্ছে আল্লাহ্’র প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর প্রদত্ত শারী’আহ্ অনুসরণের মধ্যে। এজন্য আমরা দেখতে পাই, সামগ্রিক কাঠামোগত দিক থেকে ইসলাম পরিপূর্ণ এবং এর সকল চিন্তা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ও একটি ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। আর এই ভিত্তি যা কিছুকে বৈধতা দেয় তাই গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় নয়।
আদর্শ হিসেবে ইসলামের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য পুজিবাদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। কেননা এটি একটি আদর্শিক চিন্তা এবং এর বুদ্ধিবৃত্তিক গঠনও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং হয় একে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় পরিপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হবে। দ্বীনকে জীবন থেকে পৃথকীকরণের মৌলিক চিন্তা থেকে পুজিবাদের সমাধানসমূহ উৎসারিত এবং এর উপর ভিত্তি করে সমস্ত চিন্তা গঠিত হয়েছে। আপোষের ভিত্তি উপর প্রতিষ্ঠিত, দ্বীনকে জীবন থেকে পৃথকীকরণের এই মৌলিক চিন্তা মানুষকে তার নিজের প্রভু বানায়। নিজেকে নিজের প্রভূ বানাতে হলে এবং চার ধরনের স্বাধীনতার পথকে অবরুদ্ধ হওয়া থেকে মুক্ত হতে হলে, তার উপর অন্য কারো অভিভাবকত্বকে অস্বীকার করতে হবে। আর এভাবেই স্বাধীনতার চিন্তা জাগ্রত হয়, যা একটি বিশেষ অর্থ বহন করে। নিজেই নিজের প্রভূ বনে যাওয়ার অর্থ হলো কোনরকম বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়া শুধুমাত্র নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে কোন ধর্ম কিংবা অন্যকোন উৎস থেকে মৌলিক চাহিদাসমূহের নিরাপত্তার বিধি-বিধানসমূহ গ্রহণ করা। আর এভাবেই গণতন্ত্রের ধারণা ব্যুৎপত্তি লাভ করে। যে ব্যক্তি দ্বীনকে জীবন থেকে পৃথকীকরণের মৌলিক চিন্তাকে গ্রহণ করেছে সে সর্বোচ্চ পরিমাণে ইন্দ্রিয় সন্তুষ্টিকে সুখ বলে সংজ্ঞায়িত করবে। প্রবৃত্তি নিজেই আইন প্রণেতা হবার দরুণ স্বার্থ হাসিল করাই হয়ে পড়ে যেকোন কাজের লক্ষ্য।
যখন চিন্তা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন এটি অন্য কোন চিন্তার মিশ্রণকে সাধুবাদ জানায় না। শারী’আহ্ পরিভাষায় মিশ্রণ হলো শিরক, হয় এটা কুফর অথবা গুণাহ্।
গণতন্ত্র মানুষের শাসন আর ইসলাম হলো শারী’আহ্’র শাসন, তাই ইসলাম যেমন গণতন্ত্রকে গ্রহণ করে না, ঠিক একইভাবে পুঁজিবাদী চিন্তাও ইসলামকে গ্রহণ করে না কারণ তাহলে তা হবে গণতন্ত্র ও তা থেকে উদ্ভুত সব চিন্তাকে অবলুপ্ত করা। একারণে পশ্চিমারা ক্ষমতা গ্রহণের জন্য সামগ্রিক ইসলামের দিকে আহ্বানকারী ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে এধরনের আন্দোলন ভয়ঙ্কর যা তাদেরকে তাদের ভিত্তিমূল থেকে অপসারণ করবে। এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই পশ্চিমারা এধরনের আন্দোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, আগ্রাসন চালায়, চিরশত্রু মনে করে এবং বিভিন্ন লেবেল এটে দেয়। পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে এরাই মৌলবাদী, কারণ এরা এমন একটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত যা তাদের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত নয়, এরাই চরমপন্থী কেননা এরা তাদের সাথে আপোষ করতে চায় না, এরাই উগ্রপন্থী কেননা এরা তাদের আহ্বানকে সম্মান দেখায় না এবং তাদের অস্তিত্বকে বিবেচনা করেনা। যদি আমরা এ বিষয়টি নীরিক্ষা করি তবে দেখব যে তারা অন্যদেরকে যে কাজের লেবেল দিচ্ছে তারা নিজেরাই বরং সেসব কাজে লিপ্ত এবং এসব লেবেল তাদের নিজেদের উপরই প্রযোজ্য। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গীর বিচারে তারা মৌলবাদী, কেননা তারা একটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত যার উপর তাদের বিশ্বাস রয়েছে এবং এর বিপরীত অন্যকোন কিছুকে তারা এর উপর প্রাধান্য দিতে প্রস্তুতি নয়, যদিও মুখে তারা বলে গণতন্ত্রে জনগণের পছন্দ অনুসারে যে কেউ ক্ষমতায় আসতে পারে। তাছাড়া তারাই চরমপন্থী, সন্ত্রাসী, উগ্রপন্থী কারণ তারা রাজনৈতিক ইসলামের অস্তিত্বকে মেনে নেয় না, অথবা এর সাথে আলোচনায় বসে না, এমন কি এর সাধারণ বিষয়সমূহকে নিয়েও নয়। এভাবে কতবার পশ্চিমারা তাদের জীবনব্যবস্থাকে নিয়ে দ্বন্দে জড়াবে এবং অন্যের প্রতিকৃতিতে ঝাঁপ দিবে? এটা কী ধরনের গণতন্ত্র যে তারা নির্বাচন বাতিল করে দেয় যা কিনা তাদের দৃষ্টিতে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিফলনের পথ এবং একনায়কন্ত্র কায়েম করে?
তাই আমরা যখন কোন চিন্তাকে সঠিক অথবা ভ্রান্ত এরূপ রায় দিব তখন এর ভিত্তিকে আলোচনায় আনতে হবে এবং এই ভিত্তি দিয়ে একে নিরীক্ষণ ও বিচার বিবেচনা করতে হবে। একটি আংশিক চিন্তাকে অন্য একটি চিন্তার ভিত্তি দিয়ে নিরীক্ষা করা সঠিক নয়। আমরা কখনো বলতে পারবো না যে, ইসলামে সুখ হলো ইন্দ্রিয়গত পরিতুষ্টি। অথবা বলতে পারবো না মুসলিমগণ পশ্চিমাদের মতো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। কারণ ইসলাম এসবের সাথে একাত্নবোধ করে না অথবা এসবকে গ্রহণ করে না। যে ব্যক্তি ইসলামকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে সে অবশ্যই যা কিছু ইসলাম থেকে উদ্ভুত তাকেই গ্রহণ করবে এবং ইসলামকে পূর্ণাঙ্গরূপে গ্রহণ করবে। কেননা এর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করা পুরোটাকে প্রত্যাখ্যান করার শামিল। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিয়দংশ বিশ্বাস করো এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস করো। যারা এরূপ করে, পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে।”
(সূরা বাক্বারা:৮৫)এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমরা পশ্চিমাদের এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি যে, ইসলাম একটি উদার দ্বীন এবং এটা কট্টরপন্থাকে অস্বীকার করে। কথাটি শুনতে মিষ্টি হলেও এতে পশ্চিমাদের কু অভিপ্রায় রয়েছে। কারণ তারা তাদের ভ্রান্ত চিন্তার উপর ভিত্তি করেই এসব মন্তব্য করে থাকে।
তাই তাতারুফ (কট্টরপন্থা), ঘুলুও (অতিরিক্ত), ইসরাফ (অতিরঞ্জিত করা) অথবা ইফরাত (অসংযম) এমন কিছু শব্দ যেগুলোর রয়েছে শারী’আহ্গত অর্থ। যদি একজন মুসলিম এর সাথে অমত পোষণ করে তবে সে গুণাহ্গার হবে। একইভাবে ই’তিদাল (উদারীকরণ), ইক্বতিসাদ (মধ্যপন্থা অবলম্বন), ইসতিকামাহ ( সোজা পথ) এবং ওয়াসাতিয়্যাহ (উদারীকরণ) শব্দসমূহেরও একই শারী’আহ্গত অর্থ রয়েছে এবং তা অনুযায়ী এগুলোকে মুসলিমদের গ্রহণ করতে হবে। একই কথা তাফরীত (অবহেলা) এবং তাসাহুল (উদাসীন্যতা) এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা যখন এগুলো সম্পর্কে শারী’আহ্গত নিয়মনীতিসমূহ জানার চেষ্টা করবো তখন কখনওই পুজিবাদীদের বিশ্বাস ও মাপকাঠির ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হবো না। কারণ তা হারাম। তাছাড়া তা পশ্চিমাদের এবং তাদের চিন্তাকে তুষ্ট করে, এবং ইসলাম ও ইসলামী চিন্তাসমূহের মূল্যায়নে ইসলাম ব্যাতীত অন্যকিছুকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে।
অনেক শারী’আহ্ নিয়ম রয়েছে যেগুলোকে মুসলিমদের গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় পরিত্যাগ করলে সে গুণাহ্গার হবে। পশ্চিমারা এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী পোষণকারীদের কট্টরপন্থী, মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করে। আল্লাহ্’র রাস্তায় জিহাদ করা, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, মা’রুফ এর আদেশ প্রদান করা ও মুনকারকে নিষেধ করা যেখানে শাসকরাও যুক্ত রয়েছেন, কুফরের বিরুদ্ধাচরণ করা, দাওয়াহ্’র দায়িত্ব বহন করা, গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করা, সুদকে নিষিদ্ধ করা, নারীদের হিজাব পরিধান করা প্রভৃতি বাধ্যতামূক কাজকে অবশ্যই মুসলিমদের সম্পাদন করতে হবে। আমরা কি এগুলোকে পশ্চিমা নষ্ট ও ভ্রান্ত চিন্তা দ্বারা মূল্যায়ন করবো, যা এখনও পর্যন্ত তাদের নিজেদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি আর অন্যদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনার চিন্তা তো সুদূর পরাহত? তাছাড়া মুসলিমগণ কি এমন কোন কিছুর পক্ষাবলম্বন করবে যে ব্যাপারে পশ্চিমারা অবস্থান নিয়েছে?
এজন্য কট্টরপন্থা বা উদারপন্থা বুঝার ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই পশ্চিমাদের চিন্তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। দ্বীনের ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপকে অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর এ কারণেই শুরু থেকে এই আলোচনা শারী’আহ্’র ভিত্তিতে অগ্রসর হয়নি। কেননা এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান যাকে পশ্চিমাদের অনুকূলে উম্মাহ্’র ভেতরে সুরঙ্গ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এবং এই আলোচনার মাধ্যমে মুসলিমদের মনোবৃত্তির ভেতর পশ্চিমা ঔপনিবেশবাদী চিন্তার ধারবাহিকতা বলবৎ থাকে।
এখন আমরা একটি শারী’আহ্ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এ বিষয়ে ইসলাম কী বলে তা বুঝার চেষ্টা করবো যাতে তা দাওয়াহ্’র জন্য সুবিধাজনক হয় এবং আমাদেরকে আল্লাহ্’র আরও নিকটবর্তী করে।
আল মুগহালাহ (কট্টরপন্থা) অথবা ঘুলুহ (অতিরিক্ততা) হলো কোন কিছুকে বাড়িয়ে বলা বা অতিরঞ্জিত করা। দ্বীনের মধ্যে মুগহালাহ হলো হুকুমের সীমাকে অতিক্রম করার ক্ষেত্রে দৃঢ় থাকা বা অটল থাকা। একে ইফরাতও বলা হয়। মুগহালাহ-এর বিপরীত হল তাফরীত বা উদাসীনতা, যা ‘ফারাতাহ্’ শব্দ থেকে উদ্ভুত, ফারতানের ক্ষেত্রে, যার অর্থ হলো পেছনে পড়া, অপচয় করা এবং এর প্রতি শৈথিল্যতা প্রদর্শন করা। দ্বীনের ব্যাপারে তাফরীত অর্থ হলো এর হুকুম সম্পর্কে অবহেলা করা, এর হক্ক আদায় না করা এবং এ দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যতা প্রদর্শন করা। এ থেকেই এ কথার উৎপত্তি হয়েছে যে, ‘লা ইফরাত ওয়া লা তাফরিত ফিল ইসলাম’ অর্থাৎ ইসলামে বাড়াবাড়ি কিংবা উদাসীনতা কোনটাই নাই।
ইক্বতিসাদ বা মধ্যপন্থা হলো তাওয়াস্সুত (মাঝখানে অবস্থান নেয়া), ই’তিদাল (উদারতা), রুশদ (প্রত্যক্ষতা), এবং ইসতিক্বামাহ (দৃঢ়পদতা)। দ্বীনের মধ্যে মু’তাদিল হলো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশসমূহ মেনে চলে এবং এটা থেকে তাফরীত বা ইফরাতের দিকে বিচ্যুত হয় না। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“তারা মধ্যপন্থা (ইক্বতিসাদ) অবলম্বনকারীদের অন্তর্গত, কিন্তু তাদের অনেকেই মন্দ কাজে লিপ্ত।”
(সূরা আল মা’’য়িদা: ৬৬)এর তাফসীর হলো এটি একটি উম্মাহ্ মুতা’দিলা, যে তার প্রভূর আদেশ মেনে চলছে অর্থাৎ আল্লাহ্’র আদেশ মানার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করছে। আর ফাইওয়ুমি তার ‘আল মিসবাহ আল মুনির’ এ উল্লেখ করেন যে, “কাসাদাহ ফিল আমর কাসদান অর্থ হলো হুকুমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দলিলটি অন্বেষণ করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং সীমা অতিক্রম না করা।”
কেউ এই সংজ্ঞাকে নিরীক্ষা করলে বুঝবে যে, মুসলিমদের অবশ্যই আল্লাহ্ প্রদত্ত হুদুদ বা সীমাকে গ্রহণ করতে হবে এবং তা অতিক্রম করা যাবে না। তাকে আরও মু’তাদিলান হতে হবে অর্থাৎ হুকুম পালনের ক্ষেত্রে মুতাক্বিমান বা দৃঢ় হতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“বল, ‘আমি আল্লাহ্’র উপর ঈমান এনেছি এবং অতঃপর তাঁর পথের উপর ইসতাক্বিম বা দৃঢ় আছি।’’ [মুসলিম এবং অন্যান্য]; অর্থাৎ যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন তা গ্রহণ করেছি এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকেছি। ‘ফাসতাক্বিম’ অর্থ হল ইত্ত্বাকী (আল্লাহ্’র ভয়) এবং বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“সুতরাং আপনি এর প্রতিই দাওয়াহ্ দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন”।
(সূরা আশ শূরা: ১৫)সুতরাং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যিনি হুকুম করেন এবং মুসলিমগণ সে আদেশ গ্রহণ করেন ও মেনে চলেন। মুসলিমদের নিজের পক্ষে তাক্বওয়ার পথ ও সহজ সরল পথ সম্পর্কে জানা সম্ভব নয়। যদি সে নিজেকে অনুসরণ করে তাহলে সে তার প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করলো। আর যে প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে সে পথভ্রষ্ট। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ মান্য করা ও এই সীমার মধ্যে নিজেকে গন্ডীভূত রাখা ছাড়া আর কোন ইসতিক্বমাহ নেই। এ সীমাকে অতিক্রমের কোন সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে সামান্য বেশী বা সামান্য কম করার অবকাশ নাই। আর এটা বুঝতে হলে আমাদের আগের মতো মূল ভিত্তির দিকে ফেরত যেতে হবে।
মুসলিমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং ইসলাম প্রদত্ত সকল সমাধানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে যা মানুষের ফিতরাতের (বৈশিষ্ট্য) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই মানুষের এই ফিতরাত সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী অবগত, তিনিই এই বৈশিষ্ট্যকে সুসজ্জিত করেছেন এবং মানুষের কল্যাণের জন্য যা প্রয়োজন তাই করেছেন। একই সময়ে একজন মুসলিম বিশ্বাস করে, অন্য ধর্ম ও জীবনব্যবস্থা সমাধান হিসেবে আমাদের সামনে যা নিয়ে এসেছে তা সীমাবদ্ধ, ভ্রান্ত ও পথচ্যুত এবং এগুলো মানুষের জন্য দূর্ভোগ ব্যতিরেকে শান্তি বয়ে আনেনি। এর কারণ খুব সহজ, যেহেতু মানুষ স্বভাবতই অক্ষম, মুখাপেক্ষী, দূর্বল, সীমাবদ্ধ, যার মন মানুষের বাস্তবতার সবকিছুকে পরিগ্রহ করতে অক্ষম, তাই এগুলো যুৎসই সমাধানও প্রদান করতে পারে না; অথবা এসব ধর্মের উৎস স্রষ্টার পক্ষ থেকে হলেও, এগুলো ছিল নিদিষ্ট কিছু জাতির জন্য সবার জন্য এগুলো প্রযোজ্য নয়। তাছাড়া মানুষ এসবের সাথে ব্যাপক মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে এগুলোকে পরিবর্তন করে ফেলেছে।
একারণে ঐশী বিধান হিসেবে ইসলাম অন্যান্য মতাদর্শ ও ধর্ম থেকে পৃথক, যা মানুষের সব বিষয়ে সমাধান এমনভাবে প্রদান করে যাতে উভয় জগতে সুখ নিশ্চিত হয়।
“এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করবো। সে বলবে: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ্ বলবেন, এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।”
(সূরা ত্বোয়া হা: ১২৪-১২৬);সুতরাং যে ব্যক্তি এ দুনিয়াতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশনা মেনে চলে না সে অন্ধ, সঠিক রাস্তা থেকে বিচ্যুত এবং সত্য প্রত্যাখ্যানকারী।
এছাড়া আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজে দ্বীনকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এগুলো বিলুপ্ত হওয়া ও পরিবর্তিত বা অসত্য পরিবেশনা থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“নিশ্চয়ই, আমি নিজেই এই কুর’আন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি নিজেই তা হেফাযত করবো।”
(সূরা হিজর: ৯)তবে তা বুঝার ক্ষেত্রে কারও বিচ্যুতিকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) হেফাযতের ওয়াদা করেননি। কিতাবের সুরক্ষা ও বিশুদ্ধতা বজায় রাখা আমাদের জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে একটি দলিল। কেউ পথচ্যুত বা ধ্বংস হতে পারে। কিতাবের এমন ব্যাখ্যা দিতে পারে যা মূল অর্থের সাথে সাংঘর্ষিক, নতুন কিছু যুক্ত করতে পারে এবং অর্থকে অসংলগ্নও করতে পারে। কিন্তু এসবই হবে বুঝার ভুল, এর কোনকিছুই মূল কিতাবের বাণীসমূহের সাথে সম্পর্কিত নয়। তাই মুসলিমদের সত্যিকারের ঈমানদার হতে হবে যাতে শরী’আহ্’র হুকুমসমূহকে তারা ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে, সর্বজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞাত আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশের উপর দৃঢ় ও অবিচল থাকতে পারে এবং এক ইঞ্চিও পথভ্রষ্ট না হয়।
ইসলাম সব কিছু নির্ধারণ করে এবং মুসলিমগণ ইসলাম যা নির্ধারণ করে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। মানবজাতি নিজের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে না। মানুষের বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতার গভীরতা, ঈমানের শক্তিমত্তা এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় নয়। আইনের প্রক্রিয়ায় মানুষকে অবশ্যই আল্লাহ্ প্রদত্ত কিতাবের দ্বারস্ত হতেই হবে, যদি সে ব্যক্তিটি স্বয়ং আবু বকর সিদ্দিক হয়। খিলাফতের দায়িত্ব পালনকালে প্রথম বক্তৃতার সময় তিনি এটাই বুঝাতে চেয়েছিলেন, “আমাকে ততক্ষন পর্যন্ত আনুগত্য করো যতক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহ্’র আনুগত্য করি এবং আমি যদি আল্লাহকে না মানি তাহলে তোমাদের আনুগত্যের প্রতি আমার কোন অধিকার নেই। অবশ্যই আমি একজন নিছক অনুসরণকারী, কিন্তু নতুন কোন কিছুর উদ্ভাবক নই।”
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“আনুগত্য করো কিন্তু নতুন কিছু বের করো না, আর তোমাদের যা যথেষ্ট তা সঠিক পরিমাণেই দেয়া হয়েছে।”
আর এ ধরনের চিন্তা কেবলমাত্র আমরা মুসলিমদের মাঝেই দেখতে পাই, অন্য কারও মধ্যে নয়। কারণ অন্যরা নিজেরাই নিজেদের সমস্যা সমাধান করে। এই কারণে ইসলাম মৌলিকভাবে অন্যদের চেয়ে আলাদা।
একইভাবে মুসলিমগণ অনুসরণ করতে বাধ্য এবং তাদের উদ্ভাবনের বদলে অনুসরণই করা উচিত।
আমরা যদি দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাব যে, মহানবী (সা) এর উপর এটা নাযিলের সময় হতে আজ পর্যন্ত কিছু কিছু মুসলিমের দ্বীনের প্রতি ভালবাসার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার দাবি করে যে তারা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে সবচেয়ে শক্তভাবে ইবাদত করতে সক্ষম। তারা অন্যদের সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ইবাদতকে খাটো দৃষ্টিতে দেখে, কারণ তাদের ধারণা শারী’আহ্ তাদের কাছে যতটুকু দাবি করেছে তারা তার চেয়ে বেশী করতে সক্ষম। তারা ইবাদতের পরিমাণের দিক থেকে নিজেদেরকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তারা নফস বা প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে দলিলের তোয়াক্কা না করে উপাসনার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। বিষয়টি এমনভাবে সীমা অতিক্রম করেছে যেন তারা অন্যের উপর তা চাপিয়ে দিতে চায় এবং কেউ অনুসরণ না করলে তাকে তারা ইবাদতের ক্ষেত্রে কম যত্নশীল বলে আখ্যায়িত করে। আমরা দেখতে পাই, এরকম কঠোর ও অনমনীয় চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এসব লোকেরা কথা ও কাজে শারী’আহ্ দলিলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর দ্বীনের প্রতি ভালবাসা থেকে এরূপ করলেও এটা হারাম। কারণ এর মাধ্যমে দ্বীনের পরিবর্তন সাধিত হয় এবং সর্বজ্ঞানী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কর্তৃক নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করা হয়। সুতরাং, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হচ্ছেন এমন একজন সত্ত্বা যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আমরা তার জ্ঞানের পরিসীমা সম্পর্কে অবগত নই এবং তার অপরিহার্যতার বাস্তবতা সম্পর্কেও আমরা ওয়াকিবহাল নই, বরং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সব কিছুকে পরিগ্রহ করে আছেন। যেহেতু আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অনুগ্রহ কামনা করি সেহেতু তাঁর আদেশের উপর দৃঢ় ও প্রতিষ্ঠিত থাকাই এক্ষেত্রে এ উদ্দেশ্য হাসিলের একমাত্র পন্থা। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর জ্ঞানের প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন,
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সুক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত।”
(সূরা আল মূলক: ১৪)বুখারী উল্লেখ করেন যে, আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিশেষ বিবেচনায় কিছু কাজ করতেন এবং কিছু লোক এক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করত না। নবী (সা) এ বিষয়ে জানতে পেরে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রশংসাপূর্বক বলেন, “কিছু লোকের আমি যা করি তা পালন করার ক্ষেত্রে কী হল? আল্লাহ্’র কসম, আল্লাহ্ সম্পর্কে আমি সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখি এবং তাঁকে ভয় করার ক্ষেত্রে আমি তাদের চেয়ে অগ্রগামী।” এখানে অতিরঞ্জিত করার ব্যাপারে সাবধান বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে এবং ইসলাম থেকে বিনয়ের সাথে গ্রহণ করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে।
বুখারী উল্লেখ করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“দ্বীন সহজ। কারও দ্বীনের ব্যাপারে কঠিন হওয়া উচিত নয়, সুতরাং সঠিক পন্থা অবলম্বন কর এবং যথা সম্ভব এর নিকটবর্তী থাকার চেষ্টা কর, সুসংবাদ দাও, গুদওয়া’হ (ফজরের পরের সকাল) এর সঠিক ব্যবহার কর। দ্রুত বের হয়ে যাও এবং সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আস। জুলজাহ (সন্ধ্যার প্রারম্ভিক সময়কাল) এর কিছু সময় ভ্রমণে ব্যয় কর।” আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, “সঠিক পথের নিকটবর্তী হও, দ্রুত বের হয়ে যাও এবং সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আস এবং রাতের প্রারম্ভিক কিছু সময়ের সদ্ব্যবহার কর। মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে পারবে।”
যে শুভ ইচ্ছা কোন ব্যক্তিকে কঠোর হওয়া বা অতিরিক্ত করার প্রতি প্রবৃত্ত করে, আল বুখারী ও মুসলিম থেকে আনাস (রা) উদ্ভৃতি অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইবাদতের আধিক্য ও তাদের কমের কারণে একদল লোকের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে জানতে পারলেন। যারা বলল, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে কতদূরে রয়েছি যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার সব গোনাহ মাফ করে দিয়েছেন।’ সে কারণে তারা একত্রে শপথ নিল যে, রাতসমূহে তারা ক্বিয়াম করবে, সব দিন রোজা রাখবে এবং নারীদের সাথে কোনরূপ সম্পর্ক রাখবে না। রাসূল (সা) তাদের বললেন, “তোমরাই কি সেই ব্যক্তি যারা এরূপ বলেছ? অবশ্যই আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে অধিকতর ভয় করি এবং অধিকতর তাক্বওয়া প্রদর্শন করি। কিন্তু আমি রোজা রাখি এবং তা ভঙ্গ করি। আমি প্রার্থনা করি এবং রাতে ঘুমাই এবং নারীদের বিবাহ করি।” অতঃপর তিনি এই বলে হাদীসটি শেষ করলেন,
“যে আমার সুন্নাহ্ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমার অন্তভুর্ক্ত নয়।”
এটা থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এমন কোন কিছু গ্রহণ করেন না যা তাঁর কাছ থেকে আসেনি। যা মানুষ সংযোগ করে বা উদ্ভাবন করে তা কখনওই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নৈকট্য অর্জনের পাথেয় হতে পারে না। আবু দাউদ তার সুনানে এক ব্যক্তি সম্পর্কে উল্লেখ করেন, যিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)! কোন ব্যক্তি যদি সবদিন রোজা রাখে সেটা কেমন হবে?” প্রতুত্তরে রাসূল (সা) বলেন, “বিষয়টি অনেকটা এই রকম যে, সে কোন রোজা রাখেওনি বা ভঙ্গও করেনি।”
ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, একবার এক ব্যক্তি তাঁকে এসে বলল যে তার মা পায়ে হেঁটে হজ্জ্ব করার প্রতিজ্ঞা করেছে। তিনি (সা) বলেন,
“তাকে বাহন ব্যবহার করতে বলো, হাঁটার ব্যাপারে আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে তার জন্য কোন নির্দেশ নেই।”
বুখারী ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, “যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) খুতবা দিচ্ছিলেন তখন তারা দেখল একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। রাসূল (সা) তার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তারা বলল, ‘আবু ইসরাইল নাদারাহ আল্লাহ্’র কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন যে, সে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং বসবে না, সে কখনওই ছায়ায় বসে না, কথা বলে না এবং রোজা পালন করে। রাসুল (সা) বলেন, “তাকে কথা বলতে বল, ছায়ায় আশ্রয় নিতে বল, বসতে বল এবং রোজা পূর্ণ করতে বল।”
অতিরঞ্জিত করা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং মুসলিম বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে বলেন,
“আল মুতানাত্তিনুন বা একগুয়ে লোক ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।” তিনি এটা তিনবার বললেন। আহমেদ, আন নাসা’ঈ এবং ইবনে মাজাহ্ উল্লেখ করেন এবং ইবনে মাজাহ্’র ভাষায় করা হয় যে, “হে লোকেরা! ঘুলুহ বা দ্বীনের মধ্যে বাহুল্যতার ব্যাপারে সাবধান হও। অবশ্যই তোমাদের আগে যারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তারা ঘুলুহ বা বাহুল্যতার কারণেই হয়েছে।”
দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জিতকারীদের মতো উদাসীনরাও একই দোষে দুষ্ট। এধরনের লোকেরা দ্বীনের মূলে বিশ্বাস স্থাপন করে কিন্তু দায়িত্ব পালনের বেলায় উদাসীন, ভয়াবহ বিভিন্ন গুণাহে্ লিপ্ত, মনে মনে ফন্দি এটেছে যে মৃত্যুর আগে অনুতপ্ত হয়ে গুণাহ্ মাফ করিয়ে নেবে। এমন যেন তারা গায়েব এবং আজল সম্পর্কে অবগত। এটা সুস্পষ্ট হারাম। সর্বোচ্চ আনুগত্যের সাথে মুসলিমদের অতি সত্তর পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম গ্রহণ করা উচিত। অন্যথায় তাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সহজ সরল পথ থেকে বিচ্যুত ধরা হবে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা), বাহুল্যতা ও অতিরঞ্জিত করার ব্যাপারে যেমন ব্যক্তিকে সতর্ক করেছেন ঠিক তেমনি দল, রাষ্ট্র ও উলামাদেরও সতর্ক করেছেন। আজকে আমরা, দাওয়াহ্বহনকারী এবং তাদের চিন্তাবিদ অনেকের মাঝে ইসলামের প্রতি ভালবাসা, দ্বীনের ভাবমূর্তিকে উজ্জল করতে অণুপ্রাণিত হয়ে দ্বীনকে সহজ ও কঠোরতা মুক্ত হিসেবে প্রমাণিত করার নিমিত্তে এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে দেখি। তারা সীমাকে অতিক্রম করে এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর প্রদর্শিত দৃঢ় পথ থেকে বিচ্যুত হয়, অনেক আহ্কামকে অবহেলা করে এবং এমন মতামত প্রদান করে যার সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্ক নেই। এসব কিছুই তারা করে সময় ও বাস্তবতার সাথে ইসলামের একাত্নতা পোষণ করানোর জন্য যতক্ষন না তারা এই পর্যায়ে চলে যায় যে তারা উম্মাহ্’র কাছে স্বীকৃত ও গৃহীত শারী’আহ্’র ষ্পষ্ট বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে। গ্রন্থের দুরবর্তী ব্যাখ্যাকেও তারা উল্লেখ করে না। তারা এমন মতামত পোষণ করে যে, মুরতাদকে হত্যা করা হবে না, যদিও এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“যে দ্বীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা কর।”
[বুখারী এবং আহমদ]এ ব্যাপারে তাদের যুক্তি হলো, যে বাস্তবতা ও পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এরূপ বলেছিলেন, সে বাস্তবতা বা পরিপ্রেক্ষিত এখন বিরাজ করছে না। এরূপ অবস্থানের কারণ হলো তারা ধর্মীয় স্বাধীনতায় ধ্বজাধারী পশ্চিমাদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দ্বীনকে ব্যাখ্যা করে। তারা এমন দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে নারীরা ইমামতের (খিলাফত) দায়িত্ব পালন করতে পারবে যদিও এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্পষ্ট হাদীস রয়েছে, “নারীকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দানকারীরা কখনোই সফল হবে না।” [বুখারী, আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ]
তারা বলে, এরূপ বলা হয়েছে কেবলমাত্র একটি বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সার্বজনীনভাবে নয়। পশ্চিমাদের মতই ইসলাম নারীদের সম্মান করে এরূপ ভাবমূর্তি প্রদর্শনের জন্য তারা এটি বলে থাকে। এছাড়াও প্রচন্ড কঠিন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কারণে তারা সুদকে মেনে নেবার ব্যাপারে অনুমোদন দিয়েছে।
এসবই ইসলামের হক্বকে ভূলুন্ঠিত করেছে এবং দেখানোর চেষ্টা করছে যে ইসলাম মানবজীবনের সবকিছু নিয়ে সমাধান দিতে সক্ষম নয়। তাদের প্রদর্শিত দূর্বলতা ইসলামের নয় বরং তাদের নিজেদের। তাফরীত বা অবহেলার পেছনে যে ইস্যুসমূহ কাজ করে ইফরাত বা বাহুল্যতার পেছনে একই ইস্যুগুলো কাজ করে, অর্থাৎ দ্বীন সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা। একারণে দ্বীনের মধ্যে এ দু’ধরনের লোক, যারা অবহেলা করে এবং বাহুল্যতা প্রদর্শন করে, তারা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলছে। উভয়েই তাদের প্রবৃত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রথমটি হলো নিজের প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করা, দ্বিতীয়টি হলো মানুষকে সন্তুষ্ট করার পাঁয়তারা। কোথাও আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে সন্তুষ্ট করার কোন প্রচেষ্টা নেই।
এই দু’টি অবস্থানের ভিত্তিতে বাহুল্যতা ও অবহেলাকে বর্জন করে আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশকে মেনে নিতে বাধ্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বক্তব্য থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যেখানে তিনি বলেছেন,
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সুক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত।”
(সূরা আল মূলক: ১৪)অন্য কথায়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই উম্মাহ্কে মানবজাতির জন্য স্বাক্ষীরূপে নির্ধারণ করেছেন, যেভাবে নবী (সা) তাঁর উম্মতের জন্য স্বাক্ষীরূপে নির্ধারিত হয়েছেন। এ কারণে এই উম্মাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সম্মানিত। মানবজাতির মাঝে এর অবস্থান পর্বতের চূড়ার মতই, যেখানে সে সর্বোচ্চ ও কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে। আমরা পশ্চিমাদের মতো করে এই আয়াতকে ব্যাখ্যা করি না, যা আপোষের ভিত্তিতে সমাধানের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। আগের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, এটা হারাম। আক্বীদা আপোষের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে না। কেননা এটা নিজেই কুফর। একটি হলো ঈমান এবং অন্যটি কুফর, একটি আলো ও অন্যটি অন্ধকার, একটি সঠিক নির্দেশনা এবং অন্যটি ভুল। শরী’আহগত আইনের ক্ষেত্রে আমরা পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত করেছি যে আল্লাহ্ ব্যতিত আর কোন আইন প্রণেতা, বিচারক নেই। আর কেউ নেই যে তার রায়কে উল্টাতে পারে। কারণ তিনিই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।
উদারপন্থা ও চরমপন্থার ব্যাপারে এটাই হলো পশ্চিমাদের উপলদ্ধি। আর বর্ণিত বিষয়গুলো হলো ইসলামের উপলদ্ধি। পশ্চিমাদের এ ধরনের অবস্থান নেয়ার পেছনে কারণ হলো তারা সত্যিকারের ইসলামকে তাদের অস্তিত্ব ও ঔপনিবেশবাদের জন্য ধ্বংসাত্নক মনে করে। সুতরাং এভাবে কী আমরা মুসলিমদের কাঁধের উপর দিয়ে পশ্চিমাদের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দেব? পশ্চিমাদের সাহায্য করার অর্থ হলো যারা ইসলামের জন্য কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে কাজ করা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“সুতরাং আপনি এর প্রতিই দাওয়াহ্ দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন; আপনি তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করবেন না।”
(সূরা আশ শূরা: ১৫)তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“অতএব, তুমি এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে সবাই সোজা পথে চলে যাও, যেমন তোমায় হুকুম দেয়া হয়েছে এবং সীমালঙ্ঘন করবে না, তোমরা যা কিছু করছো, নিশ্চয় তিনি তার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুন পাকড়াও করবে। আর আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের কোন বন্ধু নাই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না।”
(সূরা হুদ: ১১২-১১৩)আমাদের হৃদয় এ দ্বীনের কল্যাণ চায় এবং এর বিজয় কামনা করে। দ্বীনের জন্য যাতে আমাদের হৃদয় ও মন খুলে যায় আল্লাহ্’র কাছে সে তাওফীক আমরা চাই। আমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণ চাই তা অন্যদের জন্যও কামনা করি। আমরা আল্লাহ্’র কাছে প্রার্থনা করি যাতে আমাদের উপদেশসমূহ বারিধারার মত সবার হৃদয় ও মনকে পূণর্জাগরিত করে এবং কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই আমাদের সঠিক পথের দিশা দেখাতে পারেন।
সমাপ্ত
১৭তম অধ্যায়: ইসলাম গ্রহণের পরও কি রাসূলুল্লাহ্ (সা) নাজ্জাশীকে কুফর শাসনের অনুমোদন দিয়েছিলেন?

যারা ইসলামের দাওয়াহ্ সঠিকভাবে বহন করতে চায় এবং দলীয় কিংবা ব্যক্তি জীবনে একে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে, তারা কুফর শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের নামে কখনওই এতে অংশগ্রহণ করতে পারে না। কারণ কুফর ব্যবস্থা ও আইন-কানুনসমূহ বাস্তবায়নকারী কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তা কেবল শক্তিশালীই হয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সমর্থনে যেসব দলিল পেশ করা হয় তা একধরনের আত্নপ্রবঞ্চণা, তারও আগে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও মুমিনদের সাথে প্রবঞ্চণার নামান্তরমাত্র। বিশেষত: যখন তা হয় অর্থ ও প্রামাণ্যতার দিক থেকে অকাট্য শারী’আহ্ দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক।
অর্থ ও প্রামাণ্যতার দিক থেকে অকাট্য শারী’আহ্ দলিলের বিরোধীতার সমর্থনে শারী’আহ্’কে বিবেচনায় না এনে মনগড়া মাসলাহা (Interest) অবলম্বন করা একজন দাওয়াহ্ বহনকারীর জন্য অবশ্যই কঠিন পরীক্ষা ও ভয়াবহ গুণাহ্। অন্যকথায়, অর্থ ও প্রামাণ্যতার দিক থেকে অকাট্য শারী’আহ্ দলিল সর্বদা কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ তা সত্ত্বেও, আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা বাদ দিয়ে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সমর্থনে এমনকিছুর অবলম্বন করা যেখানে সুবহাত আদ-দলিল (দলিলের আভাস) নাই, তাও ভয়াবহ গুণাহে্র কাজ। এসব দলিল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করতে বাধ্য করে এবং যা তার পক্ষ থেকে নয় তা দিয়ে শাসন করার বিষয়টিকে নিষিদ্ধ করে।
তারা আন নাজ্জাশীর ঘটনাকে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে, যার মৃত্যুর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের কাছে ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তার সালাতুল জানাযাও আদায় করেছিলেন। তারা বলে যে, নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং পূর্বে যে শাসনব্যবস্থা দিয়ে শাসন করেছিল তা অব্যাহত রেখেছিল; অর্থাৎ সে শাসনব্যবস্থা ছিল অনৈসলামী। এর প্রমাণের জন্য তারা বুখারী শরীফে নাজ্জাশীর মৃত্যু ও জানাযার নামাযের ব্যাপারে বর্ণিত ছয়টি হাদীসকে তুলে ধরে। এদের তিনটি জাবির বিন আবদুল্লাহ আল আনসারী এবং অপর তিনটি আবু হুরাইরা (রা) কতৃর্ক বর্ণিত। যদিও এ ছয়টি হাদীস কুফর আইন কানুন দ্বারা পরিচালিত কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দলিল হতে পারেনা।
নীচের অনুচ্ছেদগুলোতে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে:
যখন বুখারী এ হাদীসগুলো বর্ণনা করেন তখন এদের পাঁচটিকে ‘বাব মাউত আন-নাজ্জাশী’ (নাজ্জাশীর মৃত্যু বিষয়ক অধ্যায়) এবং ষষ্ঠটিকে তিনি ‘বাব আল জানাইয়েয’ (জানাযার নামাজের অধ্যায়) এ স্থান দেন। এ ছয়টি হাদীসই নাজ্জাশীর মৃত্যু সম্পর্কিত, যেগুলোর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের তার মৃত্যু সম্পর্কে অবগত করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, তিনি একজন ধার্মিক লোক ছিলেন এবং তাদের ভাই ও তাকে যাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ক্ষমা করে দেন সেজন্য দো’আ করার নির্দেশ দেন এবং নবী (সা) এর সাথে জানাযার নামাজ পড়তে নির্দেশ দেন। এটা থেকে বুঝা যায় তিনি একজন মুসলিম ছিলেন।
ইবনে হাজার আল আসকালানী তার ‘ফাত উল বারী’ (সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা)-তে নাজ্জাশীর ইসলাম ধর্মে রূপান্তরিত হওয়া নিয়ে আলোচনা না করে বরং ‘আন নাজ্জাশীর মৃত্যু’ শিরোনামে বুখারীর বর্ণনার উপর মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ আছে যে আল বুখারী নাজ্জাশীর ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়ে কিছু বর্ণনা করেছেন বরং তিনি তার মৃত্যু খবরটিই তুলে ধরেছেন। কারণ তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টির চেয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মৃত্যুর বিষয়টিই উঠে এসেছে। সুতরাং বুখারী নাজ্জাশীর মৃত্যুর ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন এজন্য যাতে তার জানাযার নামাজ আদায় করা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।”
বুখারী বর্ণিত হাদীসের বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওহীর মাধ্যমে যেদিন নাজ্জাশী মারা যান সেদিন তার মৃত্যু ও ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অবগত হন। এ থেকে আরও বুঝা যায় সাহাবাগণ এ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না যদি না রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের এ ব্যাপারে অবহিত করতেন। সে কারণে জাবির (রা) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়,
“যখন নাজ্জাশী মারা গেল তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, ‘আজকে একজন ধার্মিক লোক মারা গেল। সুতরাং তোমাদের ভাই আসিমাহ এর জন্য দাঁড়াও এবং প্রার্থনা কর’।”
আবু হুরাইরা (রা) কতৃর্ক বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে,
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে হাবাশার শাসক নাজ্জাশী যেদিন মারা যান সেদিন তার মৃত্যুর ব্যাপারে অবহিত করেন।” এ থেকেও বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদেরকে যেদিন নাজ্জাশী মারা যায় সেদিন ওহীর মাধ্যমে তার মৃত্যু ও ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অবগত করেন।
জাবির বিন আবদুল্লাহ’র বর্ণনা অনুসারে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের বলেন,
“আজকে একজন ধার্মিক লোক মারা গেল।”
এবং
“দাঁড়াও এবং তোমাদের ভাই আসীমাহ্’র জন্য দোয়া করো।”
এ থেকে বুঝা যায় যে তারা ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জানতো না। যদি তারা এটা আগে জানতো তাহলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এভাবে বলার প্রয়োজন ছিল না যে,
“একজন ধার্মিক লোক”
“তোমাদের ভাই”
এর কারণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণত যখন কোন সাহাবী মারা যেত তখন তাদের জানাযার নামাজের জন্য এভাবে আহ্বান করতেন না।
এসব হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, নাজ্জাশী তার মৃত্যুর সামান্য কিছুদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কবে করেছিলেন এ সম্পর্কে কোন ধারণা পাওয়া যায় না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওহীর মাধ্যমে যেদিন নাজ্জাশী মারা যান সেদিন তার মৃত্যু ও ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অবগত হন। অন্য কোন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে অবগত হয়েছেন, এ ব্যাপারে কোন অকাট্য দলিল নেই।
এই ছয়টি হাদীসে বর্ণনার মধ্যে এমন কোন ইঙ্গিত নেই যা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে এই নাজ্জাশীই সেই নাজ্জাশী যার নিকট সাহাবীগণ হাবাশা বা ইথিওপিয়ায় হিজরত করেছিলেন। একইভাবে এরকমের কোন ইঙ্গিত নেই যে তিনি সেই নাজ্জাশী যার কাছে ইসলাম গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। এর কারণ হলো ’নাজ্জাশী’ শব্দটি কোন ব্যক্তির নামবাচক শব্দ নয়। বরং ইমাম নববীর ‘শরহে সহীহ মুসলিম’ এর দ্বিতীয় খন্ড এবং ইবনে হাজার আল ’আসকালানী-এর ’আল ইসাবা’এর তৃতীয় খন্ড অনুসারে এটি হলো যারা হাবাশা শাসন করতেন এরকম সবার লকব বা উপাধিসূচক একটি শব্দ।
সহীহ মুসলিমের দ্বাদশ খন্ডে ইমাম নববী মন্তব্য করেন যে হিজরতের ষষ্ঠ বছরের শেষের দিকে হুদাইবিয়ার অভিযান থেকে ফিরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যার কাছে ইসলাম গ্রহণের জন্য পত্র পাঠিয়েছিলেন আর যার জন্য জানাযার নামাজ পড়েছিলেন, তারা উভয়ই এক নাজ্জাশী নয়। এ ব্যাপারে হাদীসের ভাষ্য নিম্নরূপ:
“আনাস (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) কিসরা, কায়সার, নাজ্জাশী ও প্রত্যেক যালিম শাসকের নিকট আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি ঈমান আনার জন্য পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি সে নাজ্জাশী ছিলেন না, যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামাজ আদায় করেন।”
সুতরাং এ হাদীস থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামায পড়েছিলেন, তার কাছে আশ্রয়ের জন্য সাহাবীগণ হিজরত করেননি এবং তিনি সে ব্যক্তিও নন যার কাছে হিজরতের ষষ্ঠ বছরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলাম গ্রহণের জন্য পত্র প্রেরণ করেছিলেন। বরং যে নাজ্জাশীর জন্য জানাযার নামাজ পড়া হয়েছিল তিনি ক্ষমতায় আসেন নাজ্জাশীর (যার নিকট ইসলাম গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমর বিন উমাইয়া আদ-দামরির মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েছিলেন) মৃত্যুর পর। পত্র গ্রহণকারী নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেননি। যদি করতেন তাহলে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মাধ্যমে এ বিষয়ে অবগত হতেন এবং তার জন্য জানাযা পড়তেন। জাফর বিন আবি তালিব এবং অন্যান্য হিজরতকারীগণ তাহলে এ বিষয়ে জানতে পারতেন। কারণ মক্কা বিজয়ের পর সপ্তম হিজরীতে তারা ফিরে আসেন অর্থাৎ চিঠি প্রেরণের পরের বছর। যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করতেন তাহলে তা হতো মুসলিমদের জন্য আনন্দের ও উদযাপনের একটি বিষয়, বিশেষ করে খায়বার বিজয়ের পর। অবশ্যই তিনি (সা) নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি সাহাবাদের জানাতেন, শুধু জাফরের (রা) আগমনকে ঘিরে তার মন্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখতেন না;
“আমি জানি না কী আমাকে বেশী আনন্দ দিয়েছে; খায়বার বিজয় নাকি জা’ফরের আগমন।”
(সীরাত ইবনে হিশাম)তিনি (সা) হয়তো যোগ করতেন, ‘নাকি নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণ।’ কিন্তু তিনি (সা) হাদীসের মধ্যে নাজ্জাশীর নাম উল্লেখ করেননি যদিও অবস্থাপ্রেক্ষিতে তা জরুরী ছিল যদি নাজ্জাশী তাঁর (সা) দাওয়াহ্ কবুল ও ইসলাম গ্রহণ করতেন।
যারা ধারনা করেন, যে নাজ্জাশীর কাছে মুসলিমগণ আশ্রয় গ্রহণের জন্য হিজরত করেছিলেন, যে নাজ্জাশীর কাছে রাসূল (সা) ষষ্ঠ হিজরীর শেষের দিকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামাজ পড়েছিলেন, এই তিন নাজ্জাশী একই ব্যক্তি, তারা ভুল করছেন। কারণ তিনি (সা) হিজরতকারী সাহাবীদের (রা) উদ্দেশ্য করে নাজ্জাশীর ব্যাপারে মুল্যায়ন করে বলেছিলেন, “তিনি এমন একজন রাজা যার অধীনে কেউই অত্যাচারিত হয় না এবং তার ভূমি হলো ন্যায়ের ভূমি।” (ইবনে হিশাম); এবং যেসব মুসলিম সেখানে হিজরত করেছিলেন তারা সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা পেয়েছিলেন এবং নির্বিঘ্নে ইবাদত করতে পেরেছিলেন। তিনি তাদেরকে তার পরিষদবর্গের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কুরাইশদের দু’জন প্রতিনিধির কাছে সমর্পণ করেননি। তিনি তাদের উভয়পক্ষকে এ বলে প্রতিহত, সুরক্ষা প্রদান ও নিরাপত্তা বিধান করেছিলেন যে, ‘আপনারা আমার দেশে নিরাপদ এবং যারা আশ্রয়প্রাপ্তদের ক্ষতি করবে তারাই শাস্তির আওতায় আসবে।’ জাফরের উত্তরের কারণে তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। যখন নাজ্জাশী সাহাবাদের প্রশ্ন করেছিলেন যে, মুহম্মদ (সা) তোমাদের জন্য কী নিয়ে এসেছে এবং প্রত্যুত্তরে জাফর (রা) বলেছিলেন, “অবশ্যই তিনি (সা) যা এনেছেন এবং ঈসা (আঃ) যা নিয়ে এসেছিলেন তা একই প্রদীপ থেকে উৎসারিত।” জাফরের এ উত্তরের উপর মন্তব্য করা ছাড়াও দ্বিতীয় দিন তিনি ঈসার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গী জানতে চাওয়ার পর মাটি থেকে একটি লাঠি উঠিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম ঈসা ইবনে মারিয়ম এর ব্যাপারে তোমরা এই লাঠির প্রস্থের চেয়ে একটুও বাড়িয়ে বলোনি।’ (সীরাত ইবনে হিশাম); এ ঘটনা থেকে তারা মনে করে যে, নাজ্জাশী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, যদিও তা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কোন ভাষ্য দ্বারা সমর্থিত নয়। একইভাবে হিজরতকারীদের মধ্যে একজন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর বিবি উম্মে সালামাও ইসলাম ধর্ম গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। যখন তিনি নাজ্জাশী ও তার দেশে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে বর্ণনা করেন তখন উল্লেখ করেন যে, “যখন আমরা হাবাশার ভূমিতে প্রবেশ করি তখন আমরা নাজ্জাশীর মতো সর্বোত্তম প্রতিবেশীকে পেয়েছিলাম। আমরা দ্বীনের ব্যাপারে সেখানে নিরাপদ অনুভব করেছিলাম এবং কোনরূপ ক্ষতির সম্মুখীন না হয়ে আল্লাহ্’র উপাসনা করতে পারছিলাম এবং অপছন্দনীয় কোন কিছুই শুনতে পাইনি….” তিনি আরও বলেন, “যতক্ষণ না একজন লোক হাবাশায় এসে তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করলো ততক্ষণ আমরা এ অবস্থায় চলছিলাম।” তিনি বললেন, নাজ্জাশী যেভাবে আমাদের অধিকারগুলো দিয়েছিল সেভাবে যদি ঐ লোকটি যে তাকে পরাস্ত করতে চেয়েছিল আমাদের তা না দেয় এ ভয়টা ছাড়া অন্য কোন ভয় আমাদের আমাদের আচ্ছন্ন করেনি। তিনি বলেন, “যখন আল্লাহ্ নাজ্জাশীকে তার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় দান করলেন ও তার ভূমিকে আরও শক্তিশালী করলেন, আল্লাহ্’র কসম সে সময়ের মতো আনন্দিত আমরা আর কখনওই হইনি।” “নাজ্জাশী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসলেন এবং তখন নিজ দেশে তার কতৃর্ত্ব আরো বৃদ্ধি পেল এবং হাবাশার রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড আরও ভালভাবে পরিচালিত হতে লাগল। মক্কায় অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমরা নাজ্জাশীর কাছাকাছিই সবচেয়ে ভাল বাড়িতে ছিলাম।” (সীরাত ইবনে হিসাম); উম্মে সালামা বর্ণিত এ হাদীস প্রমাণ করে না যে, নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
এটা হলো একটি দৃষ্টিকোণ থেকে। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, যারা বলে, যে নাজ্জাশীর জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রার্থনা করেছিলেন, যার কাছে মুহাজিরগণ আশ্রয় লাভ করেছিলেন এবং যার কাছে ইসলাম গ্রহণের জন্য পত্র পাঠানো হয়েছিল, তিনজনই একই ব্যক্তি তারা হয়তো সহীহ মুসলিমের আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসটির সাথে সুপরিচিত নয়:
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) কিসরা, কায়সার, নাজ্জাশী ও প্রত্যেক যালিম শাসকের নিকট আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি ঈমান আনার জন্য পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি সে নাজ্জাশী ছিলেন না, যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামাজ আদায় করেন।”
মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ লিখিত ‘নবীর সময়কার রাজনৈতিক দলিলপত্র’ শীর্ষক বইয়ে উল্লেখিত দু’টি চিঠির বিষয়ে বলা হয়েছে যে, নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে একটি পত্র লিখেছিলেন যেখানে তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তিনি (সা) অনুমতি দিলে নাজ্জাশী রাসূল (সা) এর সাথে দেখা করতে প্রস্তত বলেও অবহিত করেন ও তিনি তার পুত্র আরহা বিন আল আসাম বিন আবহার-কে প্রেরণ করেন এবং চিঠিটি যখন প্রেরণ করা হয় যখন রাসুল (সা) মক্কায় অবস্থান করছিলেন।
দ্বিতীয় চিঠির ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয় যে, নাজ্জাশী হাবাশা ত্যাগকৃত সাহাবাদের কাছে মদীনায় অবস্থানরত রাসূলুল্লাহর জন্য পত্রটি দিয়ে দেন। এই দু’টি চিঠির ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কোনো হাদীস গ্রন্থে কোনো উল্লেখ নেই। ‘নবীর সময়কার রাজনৈতিক দলিলপত্র’ বইয়ের রচয়িতা উল্লেখ করেন যে, তিনি এহেন তথ্যাদি তাবারী, কালকাসান্দি, ইবনে কাসির এবং অন্যান্য ইতিহাস বই থেকে সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেননি যে, এগুলো কোন হাদীসের বই থেকে সংগ্রহ করেছেন। ইতিহাসের বইসমূহ অকাট্য নয়, কেননা এগুলোর ক্ষেত্রে হাদীসের মত বর্ণনার সূত্রসমূহ পরীক্ষিত নয়। তারা রাতের অন্ধকারে কাঠ সংগ্রহকারীর মতোই তথ্যসমূহ সংগ্রহ করে থাকে যেন সেই সংগ্রাহক গাছের ডাল নাকি সাপ সংগ্রহ করছে এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। একারণে এ দু’টি চিঠির কোনো মূল্য নেই। এগুলো আনাস বিন মালিকের (রা) বর্ণিত হাদীস, নাজ্জাশীর ব্যাপারে উম্মে সালামার বক্তব্য ও হাবাশায় আশ্রয়রত মুহাজিরীনদের বক্তব্য, যাদের মধ্যে জাফর (রা) ছিলেন সর্বশেষ এবং তিনি বলেননি যে, নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যদিও জাফর হিজরতের সপ্তম বছরে বিভিন্ন শাসক নিকট পত্র প্রেরণ ও খায়বার বিজয়ের পর ফিরে এসেছিলেন। অতএব ঐ দু’টি চিঠি সঠিক হতে পারে না। উপরের সবকিছুর ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট যে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিল ও যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামায আদায় করেছিলেন এবং যার কাছে মুহাজিরীনগণ হিজরত করেছিলেন তারা একই ব্যক্তি নয়। আবার তিনি সেই ব্যক্তিও নন যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রন জানিয়ে হিজরী ষষ্ঠ সালের শেষের ও সপ্তম সালের শুরুর দিকের মাঝামাঝি সময়ে আমরু বিন উমাইয়াহ আদ দামরি মারফত পত্র পাঠিয়েছিলেন। বরং যার জন্য জানাযার নামাজ পড়া হয়েছিল তিনি সে নাজ্জাশী যিনি ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট হতে পত্রগ্রহণকারী নাজ্জাশীর মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন।
যে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি হিজরতের সপ্তম বছরে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এর কারণ হলো হুদাইবিয়ার অভিযাত্রা শেষ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নাজ্জাশী সহ অন্যান্য শাসকদের কাছে তাঁর বার্তাবাহককে প্রেরণ করেন। এটা ছিল হিজরী ষষ্ঠ সালের শেষ মাস, অর্থাৎ জিলক্বদ। এ নাজ্জাশী সপ্তম বছরে মারা যান এবং এর মধ্যে ইসলাম গ্রহণকারী নাজ্জাশী ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তার জন্যই রাসূল (সা) জানাযার নামাজ আদায় করেন। আর এই নাজ্জাশী মারা গিয়েছিলেন অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই যা আল বায়হাকী তার ‘দালাইল আন নব্যুয়্যাত’-এ উল্লেখ করেন।
সুতরাং তার ক্ষমতা গ্রহণ, ইসলাম গ্রহণ এবং মৃত্যুবরণ, সবই একটি স্বল্প সময়ের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং কেউ এ ব্যাপারে জ্ঞাত ছিল না, এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা)ও নন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার ইসলাম গ্রহণ ও মৃত্যুর বিষয়টি তিনি যেদিন মারা যান সেদিনই ওহীর মাধ্যমে অবগত হন যা আমরা বুখারী কর্তৃক বর্ণিত নাজ্জাশীর মৃত্যু সংক্রান্ত ছয়টি হাদীস থেকে জানতে পারি। ইসলাম গ্রহণ ও মৃত্যুর মধ্যবতীর্ স্বল্প সময়ের মধ্যে তার পক্ষে ইসলামের আইন-কানুন সমূহ জানা সম্ভব ছিল না। ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে কোন ধারণা না থাকায় তিনি নাজ্জাশীর কর্তব্য সম্বন্ধে জানাতে পারেননি।
সেকারণে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছে তা অনুসারে শাসন না করে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে এটাকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সুতরাং তাদের যুক্তি অসার প্রমাণিত হলো।
১৬তম অধ্যায়: খন্ডিত সংস্কার ও আমূল সংস্কার

মুসলিমদের আজকের এ করুণ দশায় অবস্থার পরিবর্তন ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মত উত্তম বিকল্পের জন্য কাজ করতে অনেক ইসলামী আন্দোলনের উন্মেষ ঘটেছে। এ আন্দোলনগুলো মূলত দু’ধরনের। প্রথম ধরনের আন্দোলন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দাওয়াহ্’র ক্ষেত্রে সংস্কারমূলক পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। সুতরাং তারা, যা ধ্বংস হয়েছে তা ঠিক করার চেষ্টা করে এবং যা দূষিত হয়ে গেছে তার সংস্কার সাধনের চেষ্টা করে। দ্বিতীয় ধরনের আন্দোলন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পথের উপর নির্ভর করে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হল, ভিত্তিমূল যেখানে দূনীর্তিগ্রস্ত হয়ে গেছে সেখানে সংস্কার সাধন করে বাস্তবে তেমন কোন সুফল পাওয়া যাবে না, তাই খন্ডিত সংস্কার আদৌ কোন কাজে আসবে না।
এ দুই আন্দোলনের চিন্তার পার্থক্যের দরুণ বাস্তবতাকে বিশ্লেষণের ও এর প্রতি আচরণের প্রক্রিয়া ভিন্ন হয়ে গেছে। ফলত: কাজের প্রক্রিয়া ও দাওয়াহ্’র পদ্ধতিও ভিন্ন ।
সুতরাং এ ব্যাপারে শারী’আহ্’র দৃষ্টিভঙ্গি কী?
শারী’আহ্ আইন উপলদ্ধি করতে হলে আমাদের ইসলামী চিন্তার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এর কারণ হল ভিত্তি নিয়ে আলোচনা না করলে শারী’আহ্ হুকুমের ব্যাপারে জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়।
শারী’আহ্ পদ্ধতি অনুযায়ী অগ্রসর হতে হলে আমাদের সামনের উপস্থিত বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারনা থাকতে হবে, সেই বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শারী’আহ্ দলিলসমূহ অনুসন্ধান করতে হবে এবং অতঃপর এগুলোকে আইনগত প্রক্রিয়ায় বুঝতে হবে।
এটা সর্বজনবিদিত যে, পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম সংস্কার পদ্ধতির কথা বলে যখন সংস্কার কার্যত অপরিহার্য হয়ে পড়ে এবং পরিবর্তন পদ্ধতির কথা বলে যখন পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সুতরাং শারী’আহ্’র দৃষ্টিতে বর্তমান বাস্তবতায় কি করা প্রয়োজন?
আমাদের কী সংস্কার প্রয়োজন নাকি আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন?
উভয়ক্ষেত্রে রায় নিতে হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছ থেকে এবং এর ভিত্তি হতে হবে শারী’আহ্ দলিল। যে বাস্তবতাকে পরিবর্তন বা সংস্কার করা হবে তার উপর মুলতঃ দাওয়াহ্’র প্রকার (সংস্কার নাকি পরিবর্তন) নির্ভর করে।
পরিবর্তনের ক্ষেত্রে হোক সেটা ব্যক্তির চিন্তা পরিবর্তন অথবা তার অবস্থা পরিবর্তন অথবা সমাজের পরির্বতন অথবা মানুষের বা জাতির পরিবর্তন, মুলতঃ এটা শুরু হওয়া উচিত মানুষ, সমাজ ও তার অবস্থা যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সেটা থেকে। কারণ এই ভিত্তি থেকেই মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রনকারী সকল বিশ্বাস ও চিন্তা উদ্ভুত হয়। এই ভিত্তি এবং তা সংশ্লিষ্ট আংশিক ও পারিপার্শ্বিক সকল চিন্তার উপর নির্ভর করে মানবজাতির সুখ-দুঃখ, পুনর্জাগরণ কিংবা অধঃপতন।
মুসলিম ও ইসলামী সমাজ যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তা হল ইসলামী আক্বীদা। মুসলিমের অথবা ইসলামী রাষ্ট্রের কোন কার্যক্রম এই আক্বীদা এবং এর আওতা থেকে একচুল বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নাই।
ইসলাহ্ বা সংস্কারের মধ্যে তাগীর বা পরিবর্তনও অন্তর্ভুক্ত। যদি ভিত্তি ঠিক থাকে তবে এটা কেবলমাত্র শাখা-প্রশাখা নিয়ে কাজ করে, মৌলিক ভিত্তি নিয়ে নয়। অন্যথায় এটা ভিত্তিকেই সঠিক ও পরিশুদ্ধ করার কাজ করে।
যদি ভিত্তি ঠিক থাকে কিন্তু এতে কিছু অস্পষ্টতা থাকে অথবা কোন চিন্তা দ্বারা এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও তা প্রাধান্য বিস্তার করে, সেক্ষেত্রে কাজটি হবে সংস্কারমূলক কিন্তু পরিবর্তনমূলক নয়। মূল ভিত্তিতে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে আনাই হবে আসল কাজ এবং এর মাধ্যমে এটি শক্তিশালী হবে। এতে করে শাখাপ্রশাখাসমূহেও এ পরিবর্তনের ছোঁয়া টের পাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত একজন মুসলিমকে দাওয়াহ্’র বেলায় তার ঈমানকে বিশুদ্ধ করা এবং তার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার দাওয়াহ্ করতে হবে যাতে সে সঠিক পথে আসে এবং তার চারিত্রিক ত্রুটি দূর হয়। আবার গুনাহগার মুসলিমকে দাওয়াহ্ প্রদানের ক্ষেত্রে তার ঈমান বৃদ্ধির দিকে শ্রম দিতে হবে যাতে তার ভেতর আবেগের সঞ্চার ঘটে যা তাকে তাক্বওয়া বৃদ্ধির দিকে ধাবিত করে এবং গুনাহ্ দিকে ধাবিত হওয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কোন মুসলিমের জন্য যা প্রযোজ্য ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যও তা প্রযোজ্য। উদাহরনস্বরূপ যখন আমরা কোন কাফিরকে ইসলামের দাওয়াহ্ দিব তখন তা হবে পরিবর্তনের দাওয়াহ্। কারণ তার বিশ্বাসের ভিত্তি এবং তার উপর প্রতিষ্ঠিত ও উৎসারিত সবকিছুই ভুল। সুতরাং সঠিক ভিত্তি দিয়ে একে সরাতে হবে। তাই ভিত্তিকে পাশ কাটিয়ে শুরুতেই আমরা একজন কাফিরকে নামাযের দাওয়াহ্ দেই না। এটাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) করেছেন এবং এটাই বাস্তবতায় পরিলক্ষিত। একজন কাফিরের সকল কাজই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিকট অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য, তা এখন যত ভালোই হোক না কেন এবং কোন কাফিরই তার কর্মগুণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না কারণ তার কোন কর্মই আল্লাহ্ প্রদত্ত ঈমানের উপর ভিত্তি করে সম্পাদিত হয়নি। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“এবং আমি তাদের (কাফির, মুশরিক) কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণারূপ করে দিব।”
(সূরা আল-ফুরকান: ২৩)একইভাবে যদি একজন মুসলিম ঈমান ত্যাগ করে মুরতাদ হয় তবে তার সমস্ত কর্মই বৃথা হয়ে যাবে। সুতরাং, ঈমান হচ্ছে সমস্ত কর্মের মূল ভিত্তি।
যখন আমরা একজন মুসলিমকে দাওয়াহ্ করব তখন তা হবে সংস্কারমূলক। কারণ তার মূল ভিত্তি ঠিক আছে। তাকে দাওয়াহ্ করতে হবে যাতে সে ত্রুটিমুক্ত হয় এবং যে কারণে সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং নিষ্ঠা দূর্বল হয়েছে, সে কারণ দুর করা যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত ভিত্তি ঠিক আছে ততক্ষণ পর্যন্ত এর উপর নির্ভর করে তাকে বিকশিত করা, শক্তিশালী করা, ফলপ্রসূ করা ও বিশুদ্ধ করা সম্ভব হবে। এর ফলে সে সঠিক পথে যাবে এবং প্রকৃত নিষ্ঠা অর্জন করবে। যদি কোন মুসলিম মদ খায়, যিনাহ্ করে, চুরি করে, সুদ খায় এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুণঃপ্রতিষ্ঠার দাওয়াহ্’কে অবহেলা করে তাহলে তার ঈমানকে পরিশুদ্ধ করলেই সে পরিশুদ্ধ হবে। সে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্কে স্মরণ করবে, যিনি জীবনের সবকিছুর পরিচালক, যাকে উপাসনা ও মান্য করা হয়। তার অপরাধ কত ছোট সেদিকে সে লক্ষ্য করবে না, বরং লক্ষ্য করবে যে স্রষ্টা কত মহান। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সে স্রষ্টার আদেশ-নিষেধ মান্য করবে। তাকে অবশ্যই খারাপ কাজের পরিমাণ সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, অর্থাৎ প্রজ্জলিত আগুনের কথা। অন্যদিকে, ভাল কাজের পুরষ্কারের কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ পরকালে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পুরষ্কারের কথা। সুতরাং একজনকে বিচার দিবসের ভয়াবহতা ও জাহান্নামের কঠিন আযাব এবং জান্নাতের নেয়ামত সম্পর্কে মনোযোগী হতে হবে। এভাবে তার মধ্যে ঈমানের ভাব জাগ্রত হবে এবং আনুগত্যের দিকে ছুটে যাওয়া ও গুনাহ্ থেকে মুক্ত হবার জন্য সে তৎপর হবে। এ পদ্ধতি ছাড়া মুসলিমদের সংশোধন করা যাবে না। সে কারণে আজকে আমাদের দাওয়াহ্’র মধ্যে ব্যক্তি মুসলিমকে মুসলিম বিবেচনায় এনে তাদের চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং আচরণকে সংস্কার করতে হবে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয় সংবিধানের মাধ্যমে এবং এই সংবিধান একটি উৎসের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে এবং এই উৎস আবার একটি ভিত্তির উপর অবস্থান করছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। রাষ্ট্র কি ইসলামী আক্বীদার উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে এবং কেবলমাত্র কুর’আন ও সুন্নাহ্তে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেটি কী আইনের উৎস হিসেবে নেয়া হয়েছে? সংবিধানের কানুনসমূহ কী নাযিলকৃত আদেশ থেকে বিচ্যুত হয়েছে কিনা? যদি এগুলোর উত্তর ইতিবাচক হয় তাহলে রাষ্ট্রটি ইসলামী রাষ্ট্র।
যদি ইসলামী রাষ্ট্রে দূনীর্তি ও অপপ্রয়োগ ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে তখন সে অবস্থায় পরিবর্তন নয়, সংস্কার প্রয়োজন। এ অবস্থা ওসমানিয়া খিলাফতের শেষের দিকে দেখা গিয়েছিল। এর সংস্কার অপরিহার্য এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পশ্চিমা কুফরদের তা ধ্বংসে সহযোগিতা করা কোনক্রমেই অনুমোদিত নয়। কিন্তু এটাই করেছিল (হিজাযের) তথাকথিত শরীফ হুসেইন।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি ইসলামী আক্বীদা’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং এই অনৈসলামী আক্বীদা’র উপর ভিত্তি করে যদি তার সংবিধান, ব্যবস্থা ও আইন প্রতিষ্ঠিত হয় তবে সংস্কার নয়, পরিবর্তন প্রয়োজন। মুসলিমগণ আজকে এ ধরনের রাষ্ট্রে বসবাস করছে। এ রাষ্ট্রসমূহ অনৈইসলামি। কারণ তাদের ব্যবস্থাপনা ইসলামী শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত হয়নি, যদিও তারা বলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। কেননা এক্ষেত্রে কোন নাম বা উক্তি বিষয় নয় বরং এর অর্থ ও বাস্তবায়নই মুখ্য।
সুতরাং মুসলিমদের পরিচালনাকারী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধান, কেবলমাত্র কুর’আন ও সুন্নাহ্’র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়। এই কারণে বাস্তবতা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে সার্বিক পরিবর্তনে ধাবিত হতে, আংশিক নয় এবং এই পরিবর্তন হচ্ছে শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ও বুনিয়াদের মৌলিক পরিবর্তন। এই বাস্তবতাকে কখনওই দায়সারা গোছের সংস্কারমূলক কাজ দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না, বরং এটা সামগ্রিক, মৌলিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ভিত্তিতে হতে হবে। অন্যকোন ভিত্তির উপর নির্ভর করে অন্যকোন পথে এটা করা অনুমোদিত নয়। প্রকারান্তরে এটা কুফরী ব্যবস্থাকে মেনে নেয়ার শামিল এবং বাস্তবতার নিরীখে শারী’আহ্ বিবর্জিত দাবি কেননা বাস্তবতা হল আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা বাদ দিয়ে অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসনকার্য পরিচালিত হচ্ছে। সেই কারণে আমরা দেখতে পাই, বর্তমান প্রচলিত শাসনব্যবস্থার সাথে অংশগ্রহণকৃত দলসমূহ মূলত সহাবস্থান করছে ও সেখানে নিজেদের একটি অবস্থান করে নেয়ার জন্য প্রচেষ্টায় রত। যে বাস্তবতায় তারা সংস্কার সাধন করতে চায় তাতে এই প্রচেষ্টা নেহায়েত আংশিক; কেননা তাদের কর্মসূচী আংশিক। তারা সাদৃশ্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করে এবং এটাকে তাদের ও ব্যবস্থার মধ্যে সংলাপের সূচনা হিসেবে মনে করে। তারা ইসলামী রঙে দেশকে রাঙানোর চেষ্টা করে যদিও এর নির্যাস হচ্ছে অনৈসলামী আর একে তারা ইসলামের ছদ্মাবরনে প্রদর্শন করে যদিও এই রং এর নির্যাসের কাছাকাছি পৌঁছে না।
পরিবর্তনের জন্য দাওয়াহ্ বহনকারীগণ অন্যদের থেকে সবদিক থেকে আলাদা, তাদের আচরণ এবং যে বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য তারা কাজ করছে। কারণ তাদের সকল চিন্তা তাদের বিশ্বাসের সাথে যুক্ত। ভিত্তির (ভিন্নতার) কারণেই বর্তমান বাস্তবতাকে তারা প্রত্যাখান করে। ভিত্তিকে প্রত্যাখ্যানের কারণে যা কিছু এই ভিত্তি থেকে উৎসারিত হয় তাও তারা প্রত্যাখ্যান করে, যদিও কিছু আংশিক বিষয়ে উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
তাই তারা সরাসরি এ প্রক্রিয়াকে উপস্থাপন করে, এই মডেলের সামগ্রিক চিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরে যা তাদের মন-মগজে বিদ্যমান। এই মডেল তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবীদের সময়ে নিয়ে যায়। তারা যে বাস্তবতায় বসবাস করে সেটাকে এর ভিত্তিসহ সমালোচনা করে। সেকারণে সব দেশে এ দলের আচরণ একই রকম। কারণ বিভিন্ন দেশে কাফের উপনিবেশবাদীরা মুসলিমদের যে বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে তা একই ও সাদৃশ্যপূর্ণ এবং এজন্য এর সমাধানও একই।
পশ্চিমারা তাদের উপনিবেশবাদের শুরু থেকেই মুসলিমদের কুর’আন ও সুন্নাহ্ যাতে তাদের আইনের উৎস হিসেবে কাজ করতে না পারে সেবিষয়ে সচেষ্ট ছিল। আর এটা তখনই সম্ভব হয়েছে যখন ইসলামী দ্বীনকে জীবনের বাস্তবতা ও এর সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে এবং এভাবে তারা সফলও হয়েছে। আর এই পরিণতি ছিল আমাদের জন্য ভয়াবহ। আজকে বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনগুলো যেভাবে পশ্চিমাদের তৈরি কৃত্রিম বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত নিয়ে তা ভাবতে অবাক লাগে; তারা সমূল এসবকে উৎপাটনের বদলে এগুলোকে সংস্কারের জন্য কাজ করে। অবশ্যই এ খন্ডিত সংস্কারমূলক কাজ বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে না। যারা বাস্তবতাকে উপলদ্ধি করতে অক্ষম, তারা এর নিয়মকানুনও বুঝতে পারবে না। সেকারণে তারা অবশ্যই কাজের সত্যিকারের পদ্ধতি ও সুন্নাহ্ থেকে বিচ্যুত হবে।
যারা আজকের দিনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রতি মানুষকে আহ্বান করেন তারা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এই হাদীসটি ভুলে যাবে না, যেখানে বলা হয়েছে:
“…. অতঃপর আবার আসবে খিলাফত নব্যুয়তের আদলে।”
[মুসনাদে আহমদ]যারা নব্যুয়তের আদলে খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রত্যাবর্তন চায় তাদের অবশ্যই মানবশ্রেষ্ঠ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সীরাত অনুসরণ করা ছাড়া আর কোন পথ নেই, যাঁর প্রচেষ্টায় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাহায্য ফলদায়ক হয়েছিল এবং এর ফলে মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম এই উম্মাহ্ অস্তিত্ব লাভ করেছে। নবীদের (আ) জীবন এবং তাদের অনুসারীদের জীবন একই সুতায় বাঁধা। আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে প্রার্থনা করি যেন আমরা এই সুঁতার একটি অংশ হতে পারি। সে কারণে আমরা আল মুস্তাফা (সা)-এর জীবনকে অনুসরণ করব এবং মানুষ আমাদেরকে এ বিষয়ে অনুসরণ করবে, আর আমরা সকলে মিলে একত্রিত হব সর্বোত্তম কাজ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্য।
ভিন্ন বিষয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ হুকুম

ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে অনেক সময় শারী’আহ্ একই প্রকার হুকুম প্রদান করেছে, যদিও মানব যুক্তি ঠিক তার উল্টো কাজ করে। শারী’আহ্ পবিত্র হওয়ার ক্ষেত্রে পানি এবং ধুলাকে একই মর্যাদায় স্থান দিয়েছে, যদিও পানি পরিষ্কার করে অথচ ধুলা অপরিষ্কার করে। এটা স্বর্ণ এবং গমের ক্ষেত্রে রিবা আল-ফাদল (অতিরিক্ত পরিমাণ) কে নিষিদ্ধ করেছে, যদিও এদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটা যিনাহ্ এবং মুরতাদ (দ্বীনত্যাগ) এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড বিধান করেছে অথচ অপরাধ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটা মুসলিম ও অমুসলিমদের সুরক্ষা দিয়েছে যদিও বিশ্বাসের দিক থেকে তারা ভিন্ন। কোন নারীর উপর যিনাহ্’র দায় চাপানো মিথ্যা অভিযুক্তকারী এবং মদ পানকারী উভয়কেই ৮০টি দোররা মারার হুকুম দিয়েছে অথচ দুটি কাজের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সুতরাং এরকম অনেক কাজ রয়েছে যেগুলো ভিন্ন এবং কোনক্রমেই এদেরকে একত্রে বিবেচনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু শারী’আহ্ তাদের জন্য একই হুকুম বিধান করেছে। যদি এগুলোকে মানুষের চিন্তার উপর ছেড়ে দেয়া হতো তাহলে মানুষ এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম নিয়ে আসতো এবং ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপটের কারণে একই হুকুম বের করতে পারতো না। সুতরাং, এটাও সাদৃশ্যতা বিবেচনা নির্ভর অকার্যকর এই পদ্ধতির স্বরূপ উন্মোচন করে।
এছাড়াও শারী’আহ্ কতৃর্ক আরও অনেক হুকুম প্রদত্ত হয়েছে যেখানে মানুষের চিন্তা বা যুক্তির কোন ভূমিকা নেই। শারী’আহ্ ব্যবসাকে বৈধতা দিয়েছে কিন্তু সুদকে হারাম করেছে যদিও তাদের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে এবং উভয়ই ব্যবসা। ইহা ধর্ষনের স্বাক্ষী হিসেবে ৪ জনকে নির্ধারন করেছে অথচ হত্যার জন্য ২ জন, যদিও ধর্ষণের চেয়ে হত্যা অনেক নৃশংস অপরাধ। বাতিলযোগ্য তালাকের বেলায় স্বাক্ষী একজন মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক কিন্তু অর্পিত সম্পত্তির বিচারাধীন মামলায় একজন কাফিরের স্বাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। একজন মুক্ত কিন্তু কুৎসিত নারী যার প্রতি আকর্ষন না জন্মানোটাই স্বাভাবিক তার প্রতিও দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখতে বলা হয়েছে কিন্তু একজন জারিয়াহ্ (সুদর্শনা দাসী) এর ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা নাই। খুফ্ফাইন (চামড়ার মোজা) এর উপরের অংশ মাসেহ্ করা বাধ্যতামূলক কিন্তু নীচের অংশ নয় অথচ নীচের অংশ মাসেহ্ করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এ ব্যাপারে সাইয়্যিদুনা আলী (রা) বলেন, “দ্বীন যদি যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতো তাহলে মোজার নীচের অংশ উপরের অংশের চেয়ে মাসেহ্-এর বেশী দাবীদার।”
এ কারণেই হয়ত বিখ্যাত কবি আবুল ‘আলা আল-মা’র্রি বলতে বাধ্য হয়েছিল,
“একটি হাতের দিয়তের (ক্ষতিপূরণ) জন্য শত শত স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়,
কী করে এটা সিকি স্বর্ণমুদ্রার কারণে কাটা যায়?”
অন্য কথায়, কেউ কারও হাত নষ্ট করলে তার দিয়ত বা ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০০ দিনার স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়, তাহলে মাত্র সিকি স্বর্ণমুদ্রা চুরির কারণে কীভাবে একটি হাত কাটা যায়?
যুক্তি কখনো সিকি পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা চুরির দায়ে কারো হাত কাটাকে ঠিক মনে করেনা। যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করার অর্থ শারী’আহ্’র ভিত্তিতে বিচারকে অগ্রাহ্য করা। যদি মানুষকে শারী’আহ্’র সামগ্রিকতা থেকে, অথবা জাহির আন-নাস (শারী’আহ্’র বাহ্যিক বক্তব্য) থেকে, অথবা দু’টি হুকুমের সাদৃশ্যতা থেকে প্রাপ্ত ক্বিয়াসের (তুলনামূলক বিবেচনা) অস্তিত্ব উপলদ্ধির মাধ্যমে ইল্লাহ্ (ঐশী কারণ) বের করার দায়িত্ব দেয়া হতো তবে মানুষ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃর্ক অনুমোদিত অধিকাংশ বিষয়কে নিষিদ্ধ করে দিত এবং নিষেধসমুহকে অনুমোদন দিয়ে দিত। তাই শারী’আহ্ প্রদত্ত পদ্ধতি ছাড়া ক্বিয়াস অনুমোদিত নয়। অন্যকথায় শারী’আহ্’র উৎসে উল্লেখিত ইল্লাহ্ ছাড়া বৈধ ক্বিয়াস হতে পারে না। শারী’আহ্ ইল্লাহ্ বিবর্জিত কোন বাণী থেকে ক্বিয়াস করা অসম্ভব। এ ব্যপারে মনগড়া কোন ইল্লাহ্ দেয়া যায় না এবং শর’ঈ ইল্লাহ্ উল্লেখিত ও চিহ্নিত না থাকলে আমরা নিজ থেকে কোন শর’ঈ ইল্লাহ্ আরোপ করতে পারিনা। সে কারণে ফকীহ্গণ শারী’আহ্ থেকে কীভাবে ইল্লাহ্ বের করতে হবে তা দেখিয়েছেন। তারা বলেন ইল্লাহ্ পাওয়া যাবে হয় দলিলে (Text) নির্দেশিত শারা’হাতান (দলিলের সুস্পষ্টতা (Explicitly)) বা দালালাতান (অর্থের সুস্পষ্টতা (Meaning)) বা ইসতিম্বাতান (সিদ্ধান্তগ্রহণ (Deduction)) না হয় ক্বিয়াসান (সাদৃশ্যতা বিবেচনা (Analogy)) এর মাধ্যমে । (দ্রষ্টব্য: বিস্তারিত জানতে উসুল সম্পর্কিত বই দেখুন)।
যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ক্বিয়াস ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন তখন তিনি এর ধরনও সুনির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ্ বিন আয জুবায়ের হতে আহমেদ ও নাসায়ী বর্ণনা করেন যে,
“খাতা’য়াম থেকে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আসলেন এবং বললেন, ‘আমার বাবা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তার উপর হজ্জ্ব ফরয হয়েছে; কিন্তু তিনি উটের পিঠে চড়তে পারেন না। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ্ব সম্পাদন করতে পারি?’ তিনি (সা) বললেন, ‘তুমি কি বড় ছেলে?’ সে বলল, ‘হ্যা’। তিনি (সা) বললেন, ‘ধর, তোমার বাবার একটি ঋণ আছে এবং তুমি যদি তার পক্ষ থেকে সেটি পরিশোধ কর সেটি কী যথেষ্ট হবে?’ সে বলল, ‘হ্যা’। তিনি (সা) বললেন, ‘তাহলে তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্জও পালন করতে পার’।”
হজ্জ একটি ইবাদত আর ঋণ পরিশোধ একটি মু’আমালাত (লেনদেন) এবং যা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তথাপি উভয়টিকে ঋণ বিবেচনায় হজ্জ্ব পালন ও ঋণ পরিশোধ একই কাতারে ফেলা হয়েছে এবং এজন্য ঋণ পরিশোধের মত ছেলেকে বাবার পক্ষ থেকে হজ্জ্ব পালন করতে বলা হয়েছে। এখানে আল্লাহ্’র প্রতি ঋণকে মানুষের ঋণের সাথে তুলনা করে বিষয়টিকে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যদি আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর পক্ষ থেকে বিষয়টি না আসতো তবে মানুষের চিন্তা কোনদিনও এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম ছিল না।
কোন হুকুমের পেছনে তা’লীল (কারণ) হল সে হুকুমটি কেন এসেছে তা পরিষ্কারভাবে বুঝার একটি দলিল। এর মানে যেখানে ইল্লাহ্ উপস্থিত সেখানেই কেবল তা অনুসরণ করা উচিত। আর এটাই ক্বিয়াস। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিড়াল সম্পর্কে বলেন,
“বিড়ালের লালা নাজাস (অপবিত্র) নয়।” সাথে সাথে তার কারণ উল্লেখ করে তিনি (সা) বলেন,
“কারণ এটি তোমাদের গৃহে আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে অর্থাৎ গৃহপালিত।”
(বুখারী ও মুসলিম)এর ভিত্তিতে বলা যায়, যে সকল প্রাণী গৃহের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে তার লালা অপবিত্র হবে না, যদি না বিপরীত দলিল পাওয়া যায়। তদ্রুপ রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“দৃষ্টির কারণে কোন গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশে অনুমতি অত্যাবশ্যক।”
(বুখারী ও মুসলিম)এর অর্থ হল গৃহে প্রবেশের আগে মুসলিমগণ অবশ্যই অনুমতি নিবে। কারণ ঘরের রয়েছে নিজস্ব পবিত্রতা ও একে আওড়া বলে পরিগণিত করা হয়। অনুমতি ছাড়া গৃহে প্রবেশের বিধান না থাকার কারণ হল নিষিদ্ধ কিছুর দিকে চোখ পড়া থেকে বিরত থাকা। তাঁর (সা) ভাষায়, “মিন আজলিন নাজর” (দৃষ্টির কারণ) হচ্ছে ইল্লাহ্ অর্থাৎ অনুমতি প্রার্থনার পেছনে শারী’আহ্ কারণ। এজন্য কোন মুসলিমের নিজ গৃহে প্রবেশে অনুমতির প্রয়োজন নাই। যেহেতু এ ব্যাপারে ইল্লাহ্ অনুপস্থিত সেহেতু হুকুমও অনুপস্থিত। অন্যথায় হুকুম আগেরটি, যেমন তার বাসায় যদি কোন মেহমান বা এ জাতীয় কেউ এসে থাকে। সুতরাং যখন ইল্লাহ্ ফিরে আসে তখনও হুকুমও আসে। সুতরাং হুকুমের উপস্থিতি ইল্লাহ্’র সাথে সম্পর্কিত।
এই কারণে ক্বিয়াস একটি সংবেদনশীল ইস্যু। এটা বোঝা উচিত যে, ক্বিয়াস হল সেসব বুদ্ধিমান লোকের জন্য যারা শারী’আহ্ দলিল, হুকুম ও প্রেক্ষাপট বুঝতে সক্ষম। এটা কখনোই কোন ব্যক্তির কাছে আশা করা যায় না যে, সে খেয়াল-খুশি বা প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে ক্বিয়াস করবে। এটা সেসব ব্যক্তির জন্য সুনির্ধারিত যাদের রয়েছে গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং উপলদ্ধি। অন্যথায় সেটা হবে আল্লাহ্’র হুকুমকে বিনষ্ট করার উপকরণ এবং তা থেকে পরিষ্কার বিচ্যুতির কারণ। ইমাম শাফি’ঈ (রহ) বলেন, “ক্বিয়াস করা ততক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির দায়িত্বের মধ্যে পড়বে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে পূর্ববর্তী সুনান সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানবান হবে এবং সালাফদের উক্তি ও আরবী ভাষা যথার্থভাবে বুঝতে পারবে। তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা উন্নত হতে হবে যাতে সে সন্দেহযুক্ত (বা সাদৃশ্যপূর্ণ) বিষয়সমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং রায় প্রদানের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে। যারা তার মতামতের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে তাদের কথা শুনতে আপত্তি করে না, কারণ তারা হয়ত এমন কিছু মনে করিয়ে দিবে যা সে ভুলে গেছে অথবা তার এমন কোন ভুলকে ধরিয়ে দিবে যা সে সঠিক ভেবেছিল। ক্বিয়াসের যথোপযুক্ত ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট উপলদ্ধি। ক্বিয়াসকে ব্যবহার করে একটি হুকুম বের করার কাজ একজন মুজতাহিদ ছাড়া আর কারও জন্য বৈধ নয়।
আমাদের উল্লেখিত উপরে সবগুলো দলিলই যারা কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায় এবং পক্ষপাতিত্ব করে, তাদের অবস্থানের দূর্বলতা ও অসারতাকেই প্রমাণ করেছে। এখন জানা দরকার এ বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট মতামত কি, যার জন্য ইজতিহাদের কোন প্রয়োজন নাই?
আক্বীদাসহ সমস্ত শারী’আহ্-ই এক আল্লাহ্’র উপর বিশ্বাস ও একমাত্র তাঁর ইবাদতের উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘লা ইলাহা’ এর অর্থ হল স্বর্গীয় মহিমা, ইবাদত ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবাইকে অস্বীকার করা। ‘ইল্লাল্লাহ্’ অর্থ একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে এসব কাজের জন্য সুনিশ্চিতভাবে মেনে নেয়া। তিনি হলেন ইলাহ্, শাশ্বত এবং ইবাদত ও আইন প্রণয়ণের একমাত্র মালিক। ইবাদত ও আত্নসমর্পণ একমাত্র তাঁর কাছে এবং শারী’আহ্ সম্পর্কিত জ্ঞান এসেছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মাধ্যমে। দু’টি স্বাক্ষ্যের দ্বিতীয়টির অর্থ হল মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্’র রাসূল। সে কারণে আইনগত বিষয়ে কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কেই অনুকরণ ও অনুসরণ করা উচিত।
এমনকি উসূল আল ফিক্হ ওহীর উৎসকে সংজ্ঞায়িত করার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যাতে এটা ছাড়া অন্য কোন উৎস থেকে বিধান না নেয়া হয়। এটা ইসতিম্বাত-এর মূলনীতিকে ঠিক করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালায় যাতে এতে শারী’আহ্ বহিভুর্ত কিছু অনুপ্রবেশ করতে না পারে। এজন্যই উসূল আল ফিক্হ সর্বপ্রথম যা আলোচনা করে তা হচ্ছে, হাকিম হলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং বিধান দেবার অধিকার শুধু তাঁর। শারী’আহ্’র নাযিলকৃত বাণী ছাড়া কোন হুকুমের বৈধতা নেই এবং শারী’আহ্’র বাইরেও কিছু নেই ।
তারপর একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইবাদত করা, তার প্রতি নিজেকে আত্নসমর্পণ করা ও তাকে ছাড়া আর কাউকে আইনদাতা হিসেবে মেনে না নেয়ার ব্যবহারিক ব্যাখ্যা প্রদান করার জন্য আসে ফিক্হ।
কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অর্থ হল ঐশী ব্যবস্থার পাশাপাশি কুফর ব্যবস্থাকে মেনে নেবার আহ্বান। অর্থাৎ, শর’ঈ বহির্ভূত হুকুমের আইনপ্রণেতাদের শর’ঈ হুকুমের আইনপ্রণেতার পাশাপাশি মেনে নেয়া। যার অর্থ হল আইনের উৎসের বহুত্বকে মেনে নেয়া। তাহলে আল্লাহ্’র একত্ববাদ কোথায় থাকল, যিনিই কেবল প্রকাশ্য ও গোপনে একমাত্র উপাসনার যোগ্য?
শিরক যেমন নিষিদ্ধ ঠিক তেমনি আইন প্রণয়নে তাঁর অংশীদারিত্বও নিষিদ্ধ।
সুতরাং শারী’আহ্ তার সামগ্রিকতা দিয়ে জাহেলী ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করাকে হারাম করেছে।
সীরাত থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাওয়াহ্’র মাধ্যমে নিঃসন্দেহাতীতভাবে বুঝা যায় যে, উপস্থাপনের রীতিটি ছিল মৌলিক এবং তা ঐ বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। যে কাজ বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে পারে তার মাধ্যমেই কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটতে পারে।. রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর দাওয়াহ্’র মধ্যে মক্কার কাফেরদের শিরকের কোন প্রভাব পড়েনি। তিনি তাদের ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে তোয়াক্কা করেন নি কিংবা সে সময় লোকদের মানা বা না মানা তার কাজে কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করেনি। তৎকালীণ সমাজপতিদের তিনি কখনও তোষামোদ করেন নি, যদিও মক্কাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর দাওয়াহ্ ছিল প্রবল। তিনি প্রকাশ্যে জনসম্মুখে বলেছেন, “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহম্মদ (সা) আল্লাহ্’র প্রেরিত রাসূল”, যা বাস্তবিকভাবেই ইসলামের সামগ্রিকতাকে ধারণ করে এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন বিশ্বাস বা শারীআহ্-কে প্রত্যাখান করে। এর ভিত্তিতে এই শাহাদাহ্-কে মক্কার অন্যান্য কাফির নেতৃবৃন্দের সাথে আবু জাহল প্রত্যাখ্যান করল। একই ভিত্তির উপর দাড়িয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কালো-সাদা, মুক্ত-দাস, ধনী-গরীব, আরব-অনারব, মূর্তিপূজারী-আহলে কিতাব, সবাইকে লক্ষ্য করে এই শাহাদাহ্’র বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের সমালোচনা করে তাদের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন এবং চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। প্রত্যুত্তরে তারা ছিল শত্রুভাবাপন্ন। তারা তাঁর সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল এবং তাকে (সা) আহ্বান জানিয়েছিল যাতে তিনি তাদের ব্যাপারে চুপ থাকেন এবং ফলে তারাও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারে নীরব থাকতে পারেন। তাদের ইচ্ছা এরকম ছিল যে, যদি রাসূল (সা) আপোষ করেন তাহলে তারাও আপোষরফা করে নিবে। তিনি (সা) তা গ্রহণ করেননি এবং দাওয়াহ্’র সময় তার উপর আসা অত্যাচার এবং সাহাবীদের (রা) উপর নির্যাতনের সময় ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। বিশ্বাসীরাও এসময় ধৈর্য ধারণ করেছিল। তাদের সবার ধৈর্য ছিল দাওয়াহ্’র সত্যবাদিতা ও তাদের উচ্চারণের স্মারক। এছাড়াও দাওয়াহ্’র কঠিন সময়ে যখন কোন সাহায্যকারী ছিল না তখন তিনি (সা) দ্বীনকে সহায়তার (নুসরাহ্) আহ্বান নিয়ে বনু শা’শার কাছে যাবার পর তারা যে শর্ত দিয়েছিল তাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা রাসূল (সা) কে নুসরাহ্ (শাসনক্ষমতা অর্জনে সহায়তা) প্রদানে প্রস্তুত ছিল এই শর্তে যে, তাঁর (সা) মৃত্যুর পর কর্তৃত্ব কেবলমাত্র তাদের হবে। তিনি (সা) এরূপ বলেননি যে এটি একটি সুযোগ যা থেকে উপকার পাওয়া যাবে, যেহেতু তাঁর সামনে অন্য সকল দরজাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বরং তিনি একজন শিক্ষক, নেতা, দাওয়াহ্ বহনকারী ও পথপ্রদর্শক হিসেবে তাদেরকে এবং তাদের মাধ্যমে আমাদেরকেও জানালেন যে,
“কর্তৃত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এবং তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা প্রদান করেন।”
এর দ্বারা তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, কর্তৃত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এবং এতে কেউ শরীক নয়। কেবলমাত্র আল্লাহ্ যাকে পছন্দ করেন তাকেই তা প্রদান করেন এবং তখন কারও কোন কিছু বলার থাকে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সহায়তা ও ফিকরার দৃঢ়তার উপর ভরসা ছাড়া আর কোন কিছুর উপর নির্ভর না করেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাওয়াহ্ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। দাওয়াহ্ তখনই তার লক্ষ্যে পৌঁছালো যখন মদীনাতে আল্লাহ্’র ইচ্ছায় মদীনাবাসীর হৃদয়-মন খুলে যাবার দরুণ মুহম্মদ (সা)-কে সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হল। তারা কেবলমাত্র আল্লাহ্’র উপরই নির্ভর করেছিল, তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেছিল এবং চিন্তার বিশুদ্ধতা, উপলদ্ধির স্বচ্ছতা, পদ্ধতির বিশুদ্ধতা ও কর্মকান্ডের সঠিকতা বজায় রেখেছিল।
এখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আইন ছাড়া অন্য আইন দিয়ে শাসনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আলোচনার শেষের দিকে আমরা বর্তমান শাসনব্যবস্থার বাস্তবতা ও এতে অংশীদার হওয়ার স্বরূপ উপস্থাপন করব। তারপর আমরা এটি নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কুর’আনের আয়াত ও সহীহ্ হাদীস উল্লেখ করব এবং কোন প্রকার ব্যাখ্যা ছাড়াই এ প্রসঙ্গে সমাপ্তি টানব কারণ আয়াতগুলো তাদের অর্থের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট।
যেকোন দেশের সংবিধান একটি সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হোক সেটা গণতান্ত্রিক বা ইসলামী, যাতে কোন আইন এই সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস ও ভিত্তি ব্যতিরেকে অন্য কিছু থেকে উৎসারিত না হতে পারে।
সুতরাং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনকে অবশ্যই এর ভিত্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব জনগণের জন্য। জনগণ তাদের নির্বাচিত একটি এসেম্বলীর মাধ্যমে তার নিজের আইন তৈরি করে এবং একে বলা হয় পার্লামেন্ট বা সংসদ। শাসন করার ক্ষেত্রে এটা জনগণ প্রদত্ত নির্বাহী ক্ষমতাবলে আইন প্রণয়ন করে থাকে। সরকারকে জনগণের শাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য সংসদকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে সরকারকে আস্থা ভোটের মাধ্যমে পরীক্ষা করা যায়। আস্থা ভোট ব্যাতিরেকে এটা বৈধতা পায় না। একে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে সে সরকারের কর্মকান্ডের নিরীক্ষা, নিয়ন্ত্রন ও জবাবদিহীতা করতে পারে। একইভাবে সরকার আইন ভঙ্গ করলে বা সংবিধানের রীতিনীতির বাইরে কিছু করলে এটি পুরো সরকার বা বিশেষ কোন মন্ত্রনালয় থেকে আস্থা উঠিয়ে নিতে পারে।
সুতরাং এ ব্যবস্থায় সরকারের কাজের ভিত্তি হল গণতন্ত্র, কোনক্রমেই ইসলাম নয়। আমরা ইতিমধ্যে পূর্বের এক আলোচনায় বলেছি যে, ইসলাম এমন কোন কাজকে গ্রহণ করে না যার কোন আধ্যাত্মিক ভিত্তি নাই অর্থাৎ এটা হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ঈমান।
এ ব্যবস্থার রয়েছে একটি সামগ্রিক কাঠামো যেমনি রয়েছে তাদের একক ভিত্তি। যে কর্মসূচী তারা বাস্তবায়ন করতে চায় তাও একটি এবং তা সম্পাদন করে থাকে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে। একটি মন্ত্রনালয়ের কর্মসূচী সাথে অন্য মন্ত্রনালয়ের কর্মসূচীর সুসামঞ্জস্যতা থাকতে হবে। সরকারই একসাথে এ নীতিকে নিয়মে পরিণত করে। অনেক কন্ঠের মাঝে একা একজন মুসলিম মন্ত্রীর কন্ঠে কিছুই হবে না, বরং সম্মিলিত কন্ঠের মাধ্যমে যে মত জন্ম নেয় তা দ্বারা রাষ্ট্রপতি সংবিধান ও এর মূলনীতির ভিত্তিতে আইনের রূপরেখা তৈরী করেন। এটি হল আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি। তবে এর চিন্তা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সরকারের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের সভাসদগণ বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীদের নির্বাচিত হবার আগেই সরকারের কর্মসূচী নির্ধারণ করে থাকেন। মন্ত্রীদের এই পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা ছাড়া আর কোন ফুরসৎ থাকে না। তার মন্ত্রনালয়ের জন্য আলাদা করে কোন কর্মসূচী গ্রহণের সুযোগ নেই।
তাছাড়া মন্ত্রীর দায়দায়িত্ব হল একটি যৌথ দায়িত্ব। এর অর্থ হল যখন সরকার কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই প্রাধান্য পায়। অর্থাৎ, একজন মন্ত্রী অন্য মন্ত্রীর কাজে হস্তক্ষেপ করে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরে। এভাবে একজন মুসলিম মন্ত্রী সব ব্যাপারে দায়বহন করে সেটা তার মন্ত্রনালয় থেকে উদ্ভুত বা সম্পর্কিত বিষয় হোক অথবা অন্য কারো মন্ত্রনালয়ের ব্যাপারে হোক। এমতাবস্থায় সে বাইরে থেকে এবং জনসম্মুখে সরকারের যে কোন কর্মসূচীর পক্ষাবলম্বন করতে বাধ্য, যদিও সে মন্ত্রনালয়ের ভেতরে এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছিল। এখানে একজন মনে করতে পারে যে, মুসলিম মন্ত্রীগণ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোন কিছুর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। এধরনের বিষয় সত্যিই অগভীর চিন্তার ফল। মন্ত্রী সংসদ সদস্য থেকে ভিন্ন। সুতরাং, বাস্তবায়ন নয়, বরং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করেন যারা তাকে নির্বাচিত করেছে। তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন অথবা পুজিবাদী ব্যবস্থায় বামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। কিন্তু, একজন মন্ত্রীকে কখনোই মন্ত্রনালয়ে আনা হয় না বিরোধিতা করবার জন্য। যদি করে তাহলে বিরোধিতার জন্য তাকে মন্ত্রীসভার বাইরে অবস্থান নিতে হবে। সুতরাং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের বা তার কর্মসূচীর বিরোধিতাকারী কেউই এর ভেতরে থাকতে পারেন না বা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। যদি সে ভুলক্রমে প্রবেশ করেও থাকে তাহলে তাকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হয়। সরকার আসে শাসন ও বাস্তবায়ন করতে। তাদের কিছু নীতিমালা থাকে যা তারা বাস্তবায়ন করতে চায়। পরষ্পরবিরোধীদের সমন্বয়ে তা হতে পারেনা। যে কেউ এ নীতির বাইরে যাবে তাকে প্রধানমন্ত্রী অথবা অন্যদের সমন্বিত আমন্ত্রনে বেরিয়ে যেতে হবে। এমপিরা ব্যক্তিগতভাবে তার উপর থেকে আস্থা তুলে নিবে এবং সরকারের কার্যক্রম চলতে থাকবে।
এখানে একটি কথা বলা অপরিহার্য যে, কুফর শাসনব্যবস্থার মন্ত্রীসভায় মুসলিমদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের বর্তমান সংবিধান ও এটি যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাকে বৈধতা দেয়া হয়। উপরে উল্লেখিত তাদের এরূপ বিরোধীতা ভিত্তিমূল থেকে ঐ (কুফর) ব্যবস্থার বিরোধিতা নয়, বরং এ হচ্ছে ব্যবস্থার ভেতরে স্থান নিয়ে বিরোধীতা যা কিনা এমনধরণের বিরোধীতা যাতে ঐ (কুফর) ব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে মেনে নিয়ে কেবল শাখা-প্রশাখা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করা হয়।
তাছাড়া যখন কোন মন্ত্রনালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট আইন গৃহীত হয় তখন তা ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ বা কার্যকারিতায় আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তিনটি পক্ষ থেকে অনুমোদন ও স্বাক্ষর না পাওয়া যায়। এরা হলেন রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী। এর অর্থ হল মুসলিম মন্ত্রী তার ইচ্ছা অনুযায়ী মন্ত্রনালয় চালাতে পারেন না ও বাস্তবসম্মত আইনও জারি করতে পারেন না।
এ থেকে আমরা কিছু বিষয় স্পষ্ট হতে পারি:
— যে সব আইন দ্বারা শাসক শাসন করে সেগুলোর আধ্যাত্মিক ভিত্তি (যা হলো আল্লাহ্’র উপর বিশ্বাস) নেই কিন্তু গণতান্ত্রিক ভিত্তি রয়েছে, যেখানে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক কিন্তু আল্লাহ্ নন।
— সরকার হল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ শাসন ও নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সংবিধানের অনুশাসন কায়েম করে থাকে। মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীসহ পুরো সরকারের প্রত্যেকেই সংবিধানের হুকুম মেনে চলতে বাধ্য; অন্যথায় এটা ভঙ্গের অভিযোগে তারা অভিযুক্ত হবে।
— মুসলিম মন্ত্রীসহ কোন মন্ত্রীই তার মন্ত্রনালয়ের জন্য স্বতন্ত্রভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারেন না। বরং তিনি রাষ্ট্রের প্রধানসহ সামগ্রিকভাবে যে কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় সেটাই বাস্তবায়ন করেন।
— প্রত্যেক মন্ত্রী সরকারের যে কোন কর্মকান্ড ও সিদ্ধান্তের দায়বহন করে। কারণ আইন অনুসারে মন্ত্রীপরিষদ সামষ্টিকভাবে ও যৌথভাবে দায়িত্বশীল।
সংক্ষেপে বলা যায় যে, এ ব্যবস্থায় কেউ মন্ত্রীপরিষদ ব্যতিরেকে এককভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের এখতিয়ার রাখেন না। আর এটাই হল এসব সরকারের বাস্তবতা। এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুর’আনে অনেক আয়াত রয়েছে।
— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এটা বাধ্যতামূলক করেছেন যে, হুকুম দেবার মালিক কেবলমাত্র তিনি, যা একটি ভিত্তি এবং এই ভিত্তি থেকেই আইন উৎসারিত হয়। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার (মুহাম্মদ (সা)) উপর ন্যস্ত না করে এবং কোনরূপ সঙ্কীর্ণতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সন্তুষ্ট চিত্তে তোমার (মুহাম্মদ (সা)) সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।”
(আন-নিসা: আয়াত ৬৫)তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত আসার পর তাতে ভিন্নতা পোষণ করা মু’মিন পুরুষ কিংবা নারী কারও ক্ষেত্রেই সঙ্গত নয়।”
(সূরা আল আহ্যাব: ৩৬)— আল্লাহ্ এটা বাধ্য করেছেন যে, শাসককে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে।
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কতৃর্ত্বশীল তাদের।”
(সূরা আন নিসা: ৫৯)— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম শাসকদের ইসলাম দিয়ে শাসন করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করুন…. ।”
(সূরা মায়িদাহ্ : ৪৯)আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম শাসকদের ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন না করার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন, যদি তা মাত্র একটি আইনও হয়। তাই তিনি বলেন,
“…যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ্ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৯)তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যারা কুফর দিয়ে শাসন করে তাদের সাথে তলোয়ারী দিয়ে ফায়সালা করার জন্য। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে ফাযির শাসকদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ারী ধরা যাবে কিনা? উত্তরে তিনি বলেন,
“যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা (তার) প্রকাশ্য কুফরী দেখতে পাও যাতে তোমাদের পক্ষে তোমাদের কাছে আল্লাহ্ প্রদত্ত প্রমাণ থাকে।”
(মুসলিম)— তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাসকদের উপদেষ্টা ও পরিষদবর্গকে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুর অনুসরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে (উপদেষ্টা, সাহায্যকারী, রক্ষাকারী) গ্রহণ করো না।”
(সূরা আল ইমরান: ১১৮)— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের ইসলামের দ্বারস্থ হতে বলেছেন এবং এ ব্যাপারে তাগুতকে পরিত্যাগ করতে বলেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, যে ব্যক্তি এটা না করে সে সত্যিকারের ঈমানদার নয়। তিনি বলেন,
“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে সেই সব বিষয়ের উপর তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তারা (বিরোধপূর্ণ বিষয়ের) মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায়, অথচ তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
(সূরা নিসা: ৬০)— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।
“হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ্ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।”
(সূরা মুমতাহিনা: ১৩)এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে তোমাদের বন্ধুরূপে গ্রহন করো না। তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারা তাদেরই অন্তভুর্ক্ত। আল্লাহ্ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। বস্তুত, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে: আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ্ বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন, ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য সেদিন অনুতপ্ত হবে।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৫১-৫২)এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, আজকের দিনে শাসকরা ইহুদী বা খ্রীস্টান নয়। প্রকৃত অর্থে তারা ইহুদী বা খ্রীস্টানদের প্রতি অনুগত। যে এই শাসকদের আনুগত্য করে সে যেন তাদেরই আনুগত্য করে যাদের প্রতি ঐ শাসকরা অনুগত।
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর যারা কাফের তারা পারস্পরিক সহযোগী বন্ধু। তোমরাও যদি তা না কর (অর্থাৎ এক খিলাফতের অধীনে পরস্পর ঐক্যবদ্ধ না হও) তাহলে দুনিয়ার বুকে ফিত্না (যুদ্ধ, বিগ্রহ) ও যুলুম বিস্তার লাভ করবে এবং দুষ্কর্ম ও দূর্নীতি ছেয়ে যাবে ।”
(সূরা আনফাল: ৭৩)এথানে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের প্রতি অনুগত না হবার অর্থ এটা নয় যে তারা ব্যতীত অন্যদের আনুগত্য করা যাবে। বরং এখানে ইস্যুটি হল যে বা যা কিছু ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তার সাথে সম্পর্ক না রাখা। তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকার অর্থ হল তাদের সাথে চিন্তা, ব্যবহার প্রভৃতি ক্ষেত্রে কোনরূপ সম্পর্ক না রাখা এবং তাদের পক্ষ থেকে কোন কিছু গ্রহণ না করা যতক্ষণ পর্যন্ত এর ভিত্তি হল কুফর। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইব্রাহীম (আ:) এর মুখ দিয়ে বলেন,
“তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহ্’র পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানিনা। তোমরা এক আল্লাহ্’র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে……”
(মুমতাহিনা: ৪)ওয়ালা (আনুগত্য) কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, তাঁর রাসূল (সা) ও মু’মিনদের প্রতি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর যারা আল্লাহ্, তাঁর রসুল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহ্’র দল এবং তারাই বিজয়ী।”
(সূরা মায়িদাহ্ : ৫৬)এখানে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বিষয়টি গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে আমরা ঐ ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছি। কেউ বলতে পারে, আমরা আনুগত্যের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র মডেলটিকে (প্রভাব বিস্তার করার আগ পর্যন্ত আনুগত্য দেখাই) অনুসরণ করি কিন্তু আমাদের মন তাদের কাজগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে। সত্য কথা হল আনুগত্য হল এমন একটি বিষয় যেখানে শরীর ও মনের অংশীদারিত্ব রয়েছে। আমরা অবশ্যই এসব শাসক যা করে তা হাত, জিহ্বা ও হৃদয় দিয়ে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য, যখন সে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, হৃদয় দিয়ে ঘৃণা করা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর এবং এর পরে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যাদের হৃদয় ঈমানের দূর্বলমত স্তরে রয়েছে তারা তাদের কাজ ও বক্তব্যের মাধ্যমে অনৈইসলামি শাসনকে সমর্থন দেয়া উচিত নয়। যারা এর ব্যাত্যয় ঘটায় তারা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে অমান্য করছে ও পাপে লিপ্ত আছে যদিও তারা মনে মনে একে প্রত্যাখ্যান করে। আর যদি তাদের মনও এটা অনুমোদন করে নেয় তাহলেতো তারা কুফরে লিপ্ত। যারা আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসনকারীদের সাথে অংশগ্রহণ করে তাদের সম্পর্কে একজন সর্বনিম্ন এতটুকু বলতে পারে যে, সে ব্যক্তি ফাসিক (পাপাচারী), যালিম বা যুলুমকারী এবং আ’সী বা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অবাধ্য।
সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ে ভিন্ন হুকুম

সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়বস্তুর মধ্যে ভিন্নতার উদাহরণ হিসেবে যেমন আমরা বলতে পারি শারী’আহ্ স্থান-কালের মধ্যে পার্থক্য বিধান করেছে যদিও মুসলিমদের কাছে মর্যাদার দৃষ্টিকোনে সব স্থান-কাল একই। যেমন শারী’আহ্ লাইলাতুল ক্বদরের রাতকে অন্যান্য রাতের উপর মর্যাদা দিয়েছে, মক্কাকে মদীনার উপর এবং মদীনাকে অন্যান্য শহরসমূহের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। কছর (সংক্ষিপ্ত) নামাযের ক্ষেত্রে পার্থক্য বিধান করেছে, যেমন: ৪ রাকাত নামায সংক্ষিপ্ত করা যায়, কিন্তু ৩ বা ২ রাকাতে যায় না। এটা মনি (বীর্য) এবং মাজিহ (প্রাকবীর্য তরল) এর মধ্যে পার্থক্য করেছে। একই স্থান হতে নির্গত হওয়া সত্ত্বেও মনি (বীর্য) পাক এবং মাজিহ (প্রাকবীর্য তরল) নাপাক। স্বেচ্ছায় মনি নির্গত হলে গোসলকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং রোজা ভঙ্গের কারণ বলা হয়েছে, কিন্তু একই স্থান থেকে নির্গত হওয়া সত্ত্বেও মাজিহ বের হবার ক্ষেত্রে এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। শারী’আহ্ মেয়ে বাচ্চার মুত্র দ্বারা পরিধেয় বস্ত্র নোংরা হলে তা পবিত্রকরণে ধোয়াকে বাধ্যতামূলক করেছে, কিন্তু ছেলে বাচ্চার মুত্র দ্বারা পরিধেয় বস্ত্র নোংরা হলে তা পবিত্রকরণে পানি ছিটানোকে যথেষ্ট করেছে। শারী’আহ্ ঋতুবতী (Menstruating) নারীর জন্য (বাদ যাওয়া) রোযা কাযা করাকে বাধ্যতামূলক করেছে কিন্তু (বাদ যাওয়া) সালাতকে নয়। ৩ দিরহাম চুরি করলে হাত কাটার বিধান দিলেও অবৈধ পন্থায় অর্জিত বিপুল সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির হাত কাটতে বলেনি। এটা তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য ইদ্দতকালীন সময় ৩টি মাসিক (Menstrual) চক্র বেঁধে দিয়েছে অথচ বিধবা নারীর জন্য তা ৪ মাস ১০ দিন, যদিও উভয়ের রেহম (জরায়ু) এর অবস্থা একই। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। যদি এ বিষয়গুলোর হুকুম অনুসন্ধানে মানব চিন্তার উপর ছেড়ে দেয়া হতো তাহলে আমরা তাদেরকে অনেক ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনিত হতে দেখতাম। এবং তারা এমন হুকুমসমূহ নিয়ে আসত যা শারী’আহ্’র সম্পূর্ণ বিপরীত এবং সাংঘর্ষিক। শারী’আহ্ কতৃর্ক প্রত্যেকটি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম প্রদান প্রমাণ করে যে তাদের সাদৃশ্যতা বিবেচনা করে হুকুম বের করার নব্য এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভ্রান্ত।
১৫তম অধ্যায়: হারামের মাধ্যমে হালালে পৌঁছানো যায় না (উদ্দেশ্য পদ্ধতির ন্যায্যতা প্রমান করে না)

কিছু কিছু মুসলিমের চিন্তা যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতা (Rational Analogy) দ্বারা প্রভাবিত। এই সাদৃশ্যতা বিবেচনায় তারা শারী’আহ্ প্রদত্ত ইঙ্গিত অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দলিলে উল্লেখিত ইল্লাহ্ (হুকুমের পেছনে ঐশী বা শারী’আহ্ প্রদত্ত কারণ) এর উপর নির্ভর করে না। তাদের মতে চিন্তা ব্যবহার করে সমগ্র শারী’আহ্ হতে যুক্তিনির্ভর ক্বিয়াস (Rational Qiyas) অনুধাবন করা যায়, তার জন্য নির্দিষ্ট কোন দলিলের প্রয়োজন নাই। শারী’আহ্ প্রদত্ত সুস্পষ্ট কোন ইঙ্গিত ছাড়াই এক হুকুমের সাথে অন্য হুকুমের সাদৃশ্যতা বিবেচনা করে মানব চিন্তা তা অনুধাবনে সক্ষম। শারী’আহ্ হুকুম ও অন্যান্য হুকুমের মধ্যে মাসলাহা’র (সুবিধা) ভিত্তিতে প্রাধান্য বিবেচনা করেও তা উপলদ্ধি করা সম্ভব।
উপরের যুক্তিগুলো কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দৃষ্টিতে সমস্ত শারী’আহ্ আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবন, চিন্তা, বংশীয় ধারা এবং সম্পদের সুরক্ষার দিকে ইঙ্গিত দিয়েছে। সুতরাং যা কিছু এই পাঁচ বিষয়ের সুরক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট তাই শারী’আহ্’র নির্দেশনা, শারী’আহ্ দলীলে তা উল্লেখ না থাকুক কিংবা তা বিবেচনায় কোন শারী’আহ্ ইল্লাহ্ (ঐশী কারণ) না থাকুক। দুটি বিষয়ের মধ্যে তুলনামূলক সাদৃশ্যতা বিবেচনা করার কারণেই তারা এরুপ করে থাকে। তাদের আরও যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু জরুরী প্রয়োজনে শারী’আহ্ হারাম কিছু ভক্ষণ ও মদ পান করাকে বৈধতা দিয়েছে সেহেতু দুটি বিষয়ের মধ্যে সাদৃশ্যতা বিবেচনা করে জরুরী প্রয়োজনে সুদের সম্পৃক্ততাও অনুমোদিত।
এ ধরনের বোধ সঠিক চিন্তার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও বৈপরীত্যপূর্ণ। এ ধরণের পদ্ধতির ধরণ হতে এর অসততার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং এ ধরনের পদ্ধতির উপর না নির্ভর করা যায়, না গ্রহন করা যায়। কারণ যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার ক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়সমূহকে এক জায়গায় এনে তাকে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়সমূহ হতে আলাদা রাখতে হয়। কিন্তু আমরা দেখি শারী’আহ্ একই ধরনের অনেক বিষয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রায় দিয়েছে এবং অন্যদিকে একাধিক ভিন্ন বিষয়ে একই প্রকার রায় দিয়েছে। তাছাড়া এটা এমন কিছু বিধানও দিয়েছে যা আমাদের চিন্তার আওয়ার বাইরে। তাই এই পদ্ধতিকে সমূলে প্রত্যাখ্যানে এতটুকুই যথেষ্ট।
১৪তম অধ্যায়: মাসলাহা’র (সুবিধা) দোহাই দিয়ে হারামকে অনুমোদন দেয়া

শারীআহ্ কিছু বিষয়কে আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে আর কিছু বিষয়কে নিষেধ করেছে। কোনভাবেই তার রদবদল, পরিবর্তন ও বিকৃত করা আমাদের জন্য বৈধ নয়। সর্বজ্ঞানী আইনপ্রণেতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শুধুমাত্র যেখানে প্রয়োজন সেখানেই রুখসাহ্-কে (অব্যহতি) অনুমোদন দিয়েছেন। সুতরাং শয়তান বা মানুষের প্রবৃত্তি সুবিধার দোহাই দিয়ে যতই এতে প্ররোচনা দিক না কেন, যে স্থানে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) রুখসাহ্ (অব্যহতি) প্রদান করেননি সে স্থানে তাঁর হুকুমকে পাশ কাটানোর কোন অনুমোদন নাই। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত রুখসাহ্ ব্যতীত বাধ্যতামূলক হুকুমসমূহ পরিত্যাগ করাকে অনুমোদন দেয় আর নিষেধ অমান্য করাকে বৈধতা দান করে সে কাফির কিংবা অজ্ঞ ফাসিকদের অন্তর্ভূক্ত।
কিছু বিপথগামী ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে যে মাসলাহা হচ্ছে ক্ষমতার অংশীদারিত্বের দলিল;
তাদের মতে, মাসলাহা হলো সে সমস্ত কর্মকান্ড যা থেকে মুলতঃ অধিকাংশ এমনকি বেশীরভাগ সময়ই ব্যক্তি বা জনগণের কল্যান সাধিত হয়। তাদের মতে ওলেমাগণ শারীআহ্ পর্যবেক্ষন করে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন যে শারীআহ্’কে এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে দুনিয়া এবং আখিরাতে বান্দার কল্যান সাধিত হয়।
তারা মাসালিহ্ মুরসালাহ্ (অসজ্ঞায়িত বিষয়সমূহের কল্যাণ) সম্পর্কিত উদাহরণ ও যে ভিত্তির উপর তা প্রতিষ্ঠিত তা উদ্ধৃত করে। তারা বলে যে ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের দলিল মাসালিহ্ মুরসালাহ্’র ভিত্তিতে সম্ভব নয়। কারণ সুস্পষ্ট দলিলাদির মাধ্যমে এটা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত যে, জাহেলী ব্যবস্থায় শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করা গুনাহে্র কাজ। বরং এখানে লদ্ধ বিষয়টির ভিত্তি হলো, দু’টি ভাল কাজের মধ্যে উত্তমটি পছন্দ করা এবং দু’টি খারাপ কাজের মধ্যে অপেক্ষাকৃত মন্দটি চিহ্নিত করা; দু’টি সুবিধার মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাটি বর্জন করে অধিকতর সুবিধাটি গ্রহণ করা এবং দু’টি ক্ষতিকর বিষয়ের মধ্যে অধিকতর ক্ষতিকর বিষয়টি বর্জন করে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর বিষয়টি গ্রহণ করা ।
তারা বলে, শারীআহ্ প্রদর্শিত এই পথের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যেমন, সামান্য কিছু উপকারীতা সত্ত্বেও ইসলাম মদ ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করার কারণ হলো সামান্য উপকারীতার তুলনায় বিরাট ক্ষতি গুরুত্বপূর্ণ। জিহাদের মাধ্যমে বিশ্বাসীদের জান ও মালের ক্ষয়-ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু এর মাধ্যমে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নৈকট্য লাভের মধ্য দিয়ে বান্দার কল্যান সাধিত হয় তাই জিহাদকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তাদের ভাষায়, ইসলামের ইতিহাসে শাসক ও আলেমগণ ইসলামের অগ্রযাত্রায় এ পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। একারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাবাকে ভেঙে ফেলে তা ইব্রাহীমী ভিত্তির উপর পুনঃনির্মাণ থেকে বিরত থেকেছেন, যদিও এতে ধমীর্য় সুবিধা ছিল। কেননা কাবা পুনঃনির্মাণ করলে যতটা লাভ হবে ক্ষতি হবে তার চেয়ে বেশী। তিনি (সা) তাঁর বিবি আয়েশা (রা.) কে বলেন,
“যদি কাবা তোমাদের (যারা অতিসম্প্রতি জাহেলিয়াত ত্যাগ করে এসেছে) সম্প্রদায়ের অংশ না হতো তবে আমি তা ভেঁঙ্গে এর দুটো দরজা করে দিতাম।”
[তিরমিযী ও নাসা’ঈর সূত্রে বর্ণিত]তারা এরূপ আরও অনেক উদাহরণ নিয়ে আসে;
এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তারা বলে যে নিঃসন্দেহে জাহেলী সরকারে অংশগ্রহণ করা অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষয়। এ সরকারগুলো তাগুতের হুকুম বাস্তবায়ন করে এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা) হুকুম থেকে বিচ্যুত হয় ও বিবাদে লিপ্ত হয়।
“হুকুম (বিধান বা আইন) দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ্।”
(সূরা-ইউসুফ: ৪০)“তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না।”
(সূরা কাহাফ: ২৬)এতদসত্ত্বেও তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ক্ষমতার ভাগাভাগির কারণে ইসলাম, মুসলিম, ইসলামী দলগুলোর জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক ফায়দা রয়েছে যা তাগুত দূরীকরণে এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর সঠিক চিত্রটি তুলে ধরতে তাদের কিছু উক্তি তুলে ধরা যাক। যখন তাদের চিন্তার পদ্ধতি ও মতামতগুলো খন্ডন হয়ে যাবে তখন আমরা সহজেই বুঝতে পারব যে শারীআহ্ পদ্ধতি থেকে তারা কতদূরে অবস্থান করছে। তাদের বক্তব্য নিম্নরূপঃ
— জাহেলী শাসনব্যবস্থায় কোন মুসলিমের অংশগ্রহণ তাকে একটি বড় দ্বন্দের দিকে ঠেলে দেয়। মুসলিমদের তাগুত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উচিত। তাহলে কী করে সে তাগুত প্রতিষ্ঠাকারীদের সাথে থাকতে পারে? যেসব মুসলিম নিজেদের ঈমানদার বলে দাবী করে এবং পরবতীর্তে আইনের জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হয় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের ব্যাপারে বলেন,
“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি নাযিল হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল হয়েছে, সে সমস্ত বিষয়ের উপর আমরা ঈমান এনেছি আর বিরোধপূর্ণ বিষয়ে তারা শয়তানের শরণাপন্ন হয়, অথচ তাকে প্রত্যাখ্যানের জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
(সূরা নিসা: ৬০)— তাগুতের প্রতি আনুগত্য করা আইনগতভাবে আল্লাহ্’র আদেশের বিরুদ্ধে যায় এবং সেক্ষেত্রে আল্লাহ্’কে ইলাহ্ মানার বদলে তাদেরকে ইলাহ্ মানা বুঝায়। তিনি সুবহানাহু তা’আলা আহলে কিতাবদের সম্পর্কে বলেন,
“তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে আল্লাহ্ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের ইবাদতের জন্য।”
(সূরা আত্—তাওবা: ৩১)রাসূল (সা) আদি বিন হাতিম (রা) এর নিকট এগুলোকে ইলাহ্ হিসেবে গ্রহণের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এমন অবস্থায় তাদেরকে মান্য করা যখন তারা আল্লাহ্ কতৃর্ক নির্দেশিত হালালকে হারাম আর হারামকে হালাল হিসেবে গণ্য করে।
— আজকাল আমরা দেখতে পাই শাসকগণ সরল প্রকৃতির ও সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করতে কিছু সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন মুসলিমকে কিছু পদে নিয়োগ দিয়ে তাদের কুশাসনকে শোভামন্ডিত করার চেষ্টা করে, যাতে তারা যুক্তি দাঁড় করাতে পারে যদি তারা ভ্রান্ত হতো তাহলে অমুক এবং অমুক কোনভাবেই তাদের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে আসত না ।
— এবং তারপর অত্যন্ত জগণ্যভাবে এসব শাসকেরা মুসলিম মন্ত্রীদের দিয়ে অন্যায় ও নিষ্ঠুর আইনসমূহ পাস করিয়ে নেয় এবং কার্যসিদ্ধির পর তাদেরকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতই ছুড়ে ফেলে দেয়।
— ক্ষমতার ভাগাভাগি প্রতি আসক্তি হলো যালিম শাসকের নিদর্শন। আল্লাহ্ সুবহানাহু তাআ’লা আমাদের এ ব্যাপারে সাবধান করে বলেছেন যে,
“আর যালিমদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ো না। নতুবা জাহান্নামের আগুণ তোমাদের পাকড়াও করবে।”
(সূরা হুদ: ১১৩)এছাড়াও ক্ষমতার ভাগাভাগি জাহেল শাসকদের শাসনকালকে প্রলম্বিত করে।
— আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট, যারা এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে তারা এমন সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেন,
“এবং যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই কাফের।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)এবং;
“এবং যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই যালেম।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৫)এবং;
“এবং যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই ফাসেক।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৭)উল্লেখিত প্রতিটি বিষয়ের কোনটিই এ ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব ও দাওয়াহ্ বহনকারীদের কাছে অপরিচিত বিষয় নয়। উল্লেখিত স্পষ্ট আয়াতগুলো হতে দিক নির্দেশনাও গোপন নয়।
এতদসত্ত্বেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে ক্ষমতার ভাগাভাগি ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন এবং মুসলিমদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। এমনকি এর দ্বারা তাগুত অপসারিত হবে এবং সত্য বুলন্দিত হবে। ক্ষমতার ভাগাভাগি থেকে ইসলামী আন্দোলনগুলো তথাকথিত কী কী সুবিধা লাভ করতে পারে তার সারমর্ম নিম্নরূপ:
১. দরজার ওপাশে কী হচ্ছে এ ব্যাপারে ধারণালাভের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া ও ব্যর্থ করা।
২. লোকদের এটা বুঝতে দেয়া দলটি শাসন করতে সক্ষম এবং এটি দরবেশদের একটি সংঘ নয়।
৩. ইসলামের ব্যাপারে আত্নবিশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে আসা এই অর্থে যে, এটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সার্বজনীন বিষয়সমূহ সমাধান দিতে সক্ষম।
৪. শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক কাজের জন্য দলটির অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করা।
৫. বর্তমান শাসনব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়ে এর ক্ষতি থেকে আন্দোলনকে রক্ষা করা।
৬. বিশেষ ইসলামী ব্যক্তি ও কর্মীদের সরকারী বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে তোলা যায়।
৭. একটি ইসলামী দলের ভেতর থেকে এমন কিছু ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে আসা যারা লোকদের মধ্যে উচ্চপদে আসীন হবে। তারাই দল এবং এর সদস্যদের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করবে।
৮. ইসলামী কেন্দ্রসমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি করে কুফরী কেন্দ্রসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করা।
৯. রাজনীতিতে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গড়ে তোলা এবং শেখানো কীভাবে এ ব্যবস্থার দোষণীয় বিষয়গুলো বর্জন করা যায়।
১০. শাসনব্যবস্থায় সুনামের মাধ্যমে দলের সুনাম বৃদ্ধি করা।
১১. যদি দলটি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব না নেয়, তাহলে ইসলামের শত্রু কেউ অংশগ্রহণ করবে এবং তারা ইসলামী আন্দোলনকে আক্রমণ করার জন্য এবং ইসলাম ও মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সমস্ত শক্তি নিয়োগ করবে।
আমরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গী কিছুটা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি। যদিও আমাদের বক্তব্য কেবলমাত্র বক্তব্য দেয়ার জন্য নয়, বরং যুক্তিখন্ডনের জন্য। পরিষ্কারভাবে এর আসল প্রকৃতি তুলে ধরা এবং আল্লাহ্’র দ্বীন থেকে তারা কতটা বিচ্যুত হওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে তা বুঝার জন্য। তারা যখন কোনো ফাতওয়া বা রায় দেয় তখন তা দুনিয়া ও আখেরাতের অধিপতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) হক ও নির্দেশের প্রতি কোনরূপ শ্রদ্ধা সৃষ্টির বদলে মুসলিমদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আর সেজন্যই তাদের দৃষ্টিভঙ্গী অকাট্য দলিলসম্পন্ন শারী’আহ্’র সাথে কী পরিমাণ সাংঘর্ষিক সেটা মুসলিমদের বুঝানো প্রয়োজন এবং ইসলামের সঠিক ইসতিম্বাতের (মাসআ’লা আহরণ)পদ্ধতি গ্রহণ থেকে তারা কতটা বিচ্যুত তাও আমাদের জানা প্রয়োজন; এবং দেখানো প্রয়োজন তাদের নতুন আবিষ্কৃত পদ্ধতি যা মুসলিমদের অধঃপতনের সময়কার একটি স্মারক যখন তারা পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল যাতে করে আমরা তাদের চিন্তা বিশদভাবে বুঝতে পারি এবং খন্ডন করতে পারি ও তাদের চিন্তার পদ্ধতিকে উপলদ্ধি করতে পারি এবং তা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারি।
একটি সুস্পষ্ট ও অকাট্য শারী’আহগত হুকুম হচ্ছে সুদ খাওয়া যাবে না, যে ব্যাপারে কোনরূপ ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এটাকে নিষিদ্ধ করেছেন যখন তিনি বলেন,
“আল্লাহ্ ব্যবসাকে করেছেন হালাল আর সুদকে করেছেন হারাম।”
(সূরা বাক্বারা: ২৭৫)এগুলো হল অকাট্য শারী’ঈ দৃষ্টান্ত যে ব্যাপারে কঠিনভাবে বলা হয়েছে, যেমন যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“আল্লাহ্ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-খয়রাতকে বর্ধিত করেন।”
(সূরা বাক্বারা: ২৭৬)যারা সুদের সাথে সম্পর্ক রাখে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন এবং একে যুদ্ধের ঘোষণার শামীল হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন,
“হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ্’কে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া রয়েছে তা পরিত্যাগ কর যদি তোমরা মু’মিন হও। অতঃপর যদি তোমরা তা না কর তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও….”
(সূরা বাক্বারা : ২৭৮—২৭৯)যারা সুদ খায় তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে ঐ ব্যক্তির ন্যয়, যাকে শয়তান আছর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়।”
(সূরা বাক্বারা: ২৭৫)রাসূলুল্লাহ্ (সা) এটা ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং একে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাথে শিরক হিসেবে দেখিয়েছেন:
“সাত ধরনের মুবিকাত (ভয়ঙ্কর গুণাহ্’র কাজ) থেকে বিরত থাক। তারা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেগুলো কী ইয়া রাসূলুল্লাহ্?’ তিনি (সা) বললেন, ‘আল্লাহ্’র সাথে শিরক করা, যাদু, বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পত্তি ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসা, মু’মিনা সৎ সতী-সাধ্বী নারীর উপর অপবাদ আরোপ করা’।”
এতদসত্ত্বে আমরা দেখি যে তারা তাদের অনুসৃত পদ্ধতি অনুসারে বলে, সুদ অনুমোদিত! তাহলে এই সুস্পষ্ট ও অকাট্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কী হল? এই সাবধান বাণী ও ভীতি প্রদর্শনের কী হবে? এ পদ্ধতির মাধ্যমে তারা আল্লাহ্ প্রদত্ত হুকুম পরিবর্তন ও সংশোধন করছে, শারী’আহ্’র গায়ে কালিমালেপন করছে, দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে অবহেলা প্রদর্শন করাকে স্বাভাবিক করে ফেলছে এবং এটাকে মুসলিমদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করছে।
একইভাবে আল্লাহ্ যা দিয়ে নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করা হল ফরয। তাদের সুপারিশক্রমেই বলা যায় যে, আইন তৈরির বিষয়টি কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য রাখাটাই বাধ্যতামূলক। এতদসত্ত্বেও তাদের তৈরি করা পদ্ধতি অনুসারে, তারা মুসলিমদের কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অনুমোদন দিচ্ছে। নিজেদের ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও চিন্তাবিদ হিসেবে দাবি করলেও তারা সত্য থেকে কতটুকু বিচ্যুত তা আমরা দেখিয়েছি যদিও নেতাদের তাদের অনুসারীদের নিকট মিথ্যা বলা কোনভাবেই কাম্য নয়।
তারা নিজেরাই বলে,
— এটা সন্দেহাতীত যে জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ আমাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। সরকারগুলো তাগুতের হুকুম বাস্তবায়ন করে এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হুকুম থেকে বিচ্যুত হয় ও তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করে।
— জাহেলী শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের অংশগ্রহণ তাদের একটি বড় দ্বন্দের দিকে ঠেলে দেয়। মুসলিমদের তাগুত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উচিত। তাহলে কী করে একজন তাগুত প্রতিষ্ঠাকারীদের সাথে থাকতে পারে?
— তাগুতের প্রতি আনুগত্য করা আইনগতভাবে আল্লাহ্’র আদেশের বিরুদ্ধে যায় এবং সেক্ষেত্রে আল্লাহ্’কে ইলাহ্ মানার বদলে তাদেরকে ইলাহ্ মানা বুঝায়।
— আজকাল আমরা দেখতে পাই শাসকগণ সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ ও সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করার জন্য কিছু মর্যাদাবান মুসলিমকে অলংকারিক কিছু পদে নিয়োগ দেন যারা ঐ সব শাসকদের দুঃশাসনকে বৈধতা দেয়। তখন শাসকেরা বলে যে, যদি তারা মিথ্যের মধ্যে থাকতেন তাহলে অমুক এবং অমুক কোনভাবেই তাদের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে আসত না।
— পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন সেসব শাসকরা মুসলিম মন্ত্রীদের দিয়ে অন্যায় ও নিষ্ঠুর আইনসমূহ পাস করিয়ে নেয় এবং কার্যসিদ্ধির পর সেসব ব্যক্তিদের তারা অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতই ছুড়ে ফেলে দেয়।
— ক্ষমতার ভাগাভাগি হল অবিচারকারী শাসকদের প্রতি মন্দ প্রবণতার উজ্জল দৃষ্টান্ত।
— এছাড়াও ক্ষমতার ভাগাভাগি জাহেল শাসকদের কার্যকালকে প্রলম্বিত করে।
আমাদের জন্য এটুকু জানা যথেষ্ট যে, যে ব্যক্তি এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে তারা এমন সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“…তারাই কাফের।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)“… তারাই যালেম।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৫)“…তারাই ফাসেক।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৭)এতদসত্ত্বেও তারা এহেন মতামত বা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। আল্লাহ্’র দ্বীনের বিরুদ্ধে কীভাবে তারা এরকম ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে! আরও ঘৃণ্য বিষয় হচ্ছে, তারা কেবল নিজেরাই ইসলামের হুকুমসমূহকে অমান্য করে না বরং অন্যদেরকেও অমান্য করতে উৎসাহী করে তোলে। এটা অবশ্যই একটি ভয়াবহ গুণাহ্।
শারী’আহগত হুকুমকে তারা কীভাবে অমান্য করেছে সেটা উপস্থাপনের পর আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই কুফর শাসব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা কী অর্জন করবে? আমরা ভেবেছিলাম এই দাওয়াহ্’র বিরুদ্ধে তাদের পূর্বসর্তকতা উপস্থাপনের পর তারা শারী’আহ্ উপেক্ষিত এসব ভ্রান্ত সুবিধাবাদী চিন্তাসমূহ উল্লেখ করবে কিন্তু এটা বুঝতে পারার মতো তারা যথেষ্ট চতুর ছিল যে, এসব পরিত্যাজ্য যুক্তি এবং অথর্ব চিন্তা দ্বারা নিঃসন্দেহে শারী’আহ্ লঙ্ঘিত হবে এবং আল্লাহ্’র শত্রুরা সুবিধা পাবে। আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ দানকারী তাদের এসব ‘অভিনব’ চিন্তা না মুসলিমদেরকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে লাভবান করেছে, না তাদেরকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, না বিজয়কে নিকটবর্তী করেছে এবং না বাস্তবতাকে সামান্যতম পরিবর্তন করেছে। বরং প্রাপ্তিটা হয়েছে ঠিক তার উল্টো। যার সত্যতা বাস্তবতা থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান।
জাহেল শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের কী সুবিধা হয়েছে এ ব্যাপারে তাদের ১১ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। আল্লাহ্’র কসম! একবার এগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায় যে এর বিশাল গুণাহ্’র তুলনায় এর প্রাপ্তি কত সামান্য। এর কয়েকটিকে পরীক্ষা করে দেখা যাক:
— শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক কাজের জন্য দলটির অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করা।
— বিশেষ ইসলামী ব্যক্তিদের সরকারী বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে তোলা।
— রাজনীতিতে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গড়ে তোলা এবং তাদের শেখানো কীভাবে এ ব্যবস্থার দোষণীয় বিষয়গুলো বর্জন করা যায়।
এ তিনটি অনুচ্ছেদ একটি বিষয়ের সাথে বিজড়িত। এ তিনটিকে একটি অনুচ্ছেদে রাখলেই বরং বেশী উপযোগী যদি না কেউ এর স্বপক্ষে অনেক বেশী যুক্তি তুলে ধরতে চায়। এটাও জানা দরকার যে, এ বিষয়ে কে কতটুকু কথা বলতে পারল তা নয়, বরং সত্যিকারের যথার্থতাই এখানে মুখ্য। এ অনুচ্ছেদগুলো কী ধারনাভিত্তিক সুবিধার বিনিময়ে মুসলিমদের আল্লাহ্’র হুকুম অমান্য করতে বৈধতা প্রদান করে? কোনো আন্দোলনের কর্মীদের প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ করে তোলার জন্য আল্লাহ্’র ক্রোধের এই পথ ছাড়া কি অন্য কোনো পথ নেই? শারী’আহ্ পদ্ধতি অনুসরণ করলে কী এ প্রশিক্ষণে ঘাটতি হতো? যে ইসলামী আন্দোলন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পদ্ধতিকে অনুসরন করে বৈধভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে তারাও তাদের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করতে পারে, শাসকদের বাস্তবতার সাথে পরিচিতি হতে পারে, কুফর রাষ্ট্রের সাথে এই শাসকদের সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে পারে এবং তাদের নানা কৌশল ও শঠতা ধরতে পারে । একজন দাওয়াহ্ বহনকারী কি মদখোরকে তার মদ খাওয়া পরিত্যাগ করার ব্যাপারে আহ্বান করতে অক্ষম? নাকি এর জন্য দাওয়াহ্ বহনকারীকে পানশালায় প্রবেশ করতে হবে, মদ পানকারীর সাথে তাকেও পান করতে হবে এবং এরপর তা ছেড়ে দিবে যাতে করে এ পদ্ধতির মাধ্যমে মদ পানকারী মনে করে যে, সেও চাইলে মদ পান ছাড়তে পারে। আল্লাহ্’র কসম! যারা এমন পদ্ধতিতে কাজ করে তাদের মন কতটাই না দূর্বল! তারা কী করে নিজেদের জন্য আল্লাহ্’র আইন পরিবর্তন করাকে অনুমোদন করে!
(জাহেল শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুবিধা হিসেবে) অতঃপর তাদের উল্লেখিত আরও তিনটি অনুচ্ছেদ—
— বর্তমান শাসনব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়ে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া।
— দরজার ওপাশে কী হচ্ছে এ ব্যাপারে ধারণালাভের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া এবং একে ব্যর্থ করে দেয়া।
— যদি দলটি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব না নেয়, তাহলে ইসলামের শত্রু কেউ অংশগ্রহণ করবে এবং তারা ইসলামী আন্দোলনকে আক্রমণ করার জন্য এবং ইসলাম ও মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করবে।
এখানে আমরা তিনটি অনুচ্ছেদ দেখতে পাই যা একটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। তা হল বর্তমান শাসনব্যবস্থার কুফল থেকে নিজেকে হেফাযত করা এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করা। এ বিষয়ে আমরা তাদের সাথে একমত পোষণ না করেও তাদের মূলনীতি অনুসারে বিবেচনা করে ও তাদের উপস্থাপিত বাস্তবতার দৃষ্টিতেই বলতে পারি তারা কী আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন না করে উম্মাহ্’কে এবং নিজেদেরকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে? তাদের নিজেদের ভাষায়, শাসকগণ মুসলিম মন্ত্রীদের নিয়োগ দেন যাতে করে তাদের শাসনব্যবস্থা প্রলম্বিত হয়, তাদের পরিকল্পনাগুলোকে পাশ করিয়ে নেয়া যায় এবং জনগণের সামনে তাদের ভাবমূর্তিকে উন্নত করা যায়। আর শাসকদের চাওয়া পাওয়া বাস্তবায়িত হওয়ার পর খেজুরের বীচির মতই তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। তাহলে কীভাবে ক্ষতি ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পাওয়া গেল? মুসলিমগণ ঐ শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করায় সে শাসনব্যবস্থার ভাবমূর্তি উন্নত হলেও অংশগ্রহণকারীদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় এবং জনগণ ঐ শাসনব্যবস্থা ও এতে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের একই দৃষ্টিতে বিচার করে।
অতঃপর নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদ দুটিকেও একটি অনুচ্ছেদের আওতায় উপস্থাপন করা যায়:
— লোকদের এটা বুঝতে দেয়া যে দলটি শাসন করতে সক্ষম।
— ইসলামের ব্যাপারে আত্নবিশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে আসা এই অর্থে যে, এটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সার্বিক বিষয়সমূহের সমাধান দিতে সক্ষম।
দলটি এ ধরনের ভাবমূর্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে না। বরং এটা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করবে যা অনুসরণীয় নয়। বান্তবতা হল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যদি এসব দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধাচরণকারী খাঁটি ও সচেতন ইসলামী আন্দোলন এবং আন্তরিকতাসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদগণ না থাকত তাহলে যারা এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে বিদ্যমান শাসনের ওকালতি করছে তাদের কারণে ইসলাম ইতিমধ্যে মানুষের অন্তর থেকে খসে পড়তো। যেসব দল ও এর চিন্তাবিদগণ এই শাসকদের আনুকূল্যে আয়েশী জীবনযাপন করে, তাদের মিথ্যা নেতৃত্বের জাঁকজমক পরিবেষ্টিত থাকে, তাদের সাথে অহংকার ঔদ্ধত্যের ঘ্রাণ নেয় তারা আর যেসব আন্দোলন বা ইসলামী চিন্তাবিদগণ কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ওয়াস্তে সত্যের দিকে আহ্বান করে ও তা ধারণ করে এবং এ বিষয়ে কারও নিন্দার পরোয়া করে না তাদের মধ্যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর বান্দাদের দৃষ্টিতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। তাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলেও তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীই স্মরণ করিয়ে দেয়,
“অতএব আপনি সবর করুন (হে মুহাম্মদ) যেমন উচ্চ সাহসী পয়গম্বরগণ সবর করেছেন।”
(সূরা আল আহক্বাফ: ৩৫)“আপনি আপনার পালনকর্তার নির্দেশের অপেক্ষায় সবর করুন (হে মুহাম্মদ) । আপনি আমার দৃষ্টির সামনে আছেন।”
(সূরা আত তূর: ৪৮)“অতএব আপনি সবর করুন (হে মুহাম্মদ) । নিশ্চয় আল্লাহ্’র ওয়াদা সত্য।”
(সূরা মুমিনুন: ৫৫)এ দুইয়ের দৃষ্টান্ত কি একই রকম?
তাদের পরবর্তী চারটি অনুচ্ছেদকেও একটি অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা যায়:
— ইসলামী একটি দলের ভেতর থেকে এমন কিছু ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে আসা যারা লোকদের মধ্যে উচ্চপদে আসীন হবে। তারাই দল এবং এর সদস্যদের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করবে।
— ইসলামী কেন্দ্রসমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি করে কুফরী কেন্দ্রসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করা।
— রাজনীতিতে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গড়ে তোলা এবং শেখানো কীভাবে এ ব্যবস্থার দোষণীয় বিষয়গুলো বর্জন করা যায়।
— শাসনকতৃর্ত্বের সুনামের মাধ্যমে দলের সুনাম বৃদ্ধি করা।
এ বক্তব্যসমূহ এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী পোষণকারীদের চিন্তার ক্ষুদ্রতাকেই প্রমাণ করে। এ ধরনের ফলাফল কী আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না এবং যালিমুন বা অবিচারী, ফাসিকুন বা মিথ্যাবাদী এবং অত্যাচারীদের দোসর হবার ঝুঁকি বাড়ায় না? কোনো আন্দোলন কি এ অবস্থায় পতিত না হয়ে কাজগুলো করতে পারে না? আমরা কখনই মনে করিনা যে কোনো দল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আনুগত্য না করে এবং জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে এসব লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে, বরং ঐ দলের জন্য ফলাফল এর উল্টোই হবে এবং দাওয়াহ্ ও ইসলামের ঊপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে।
উপরোক্ত দৃষ্টিভঙ্গী পোষণকারীরা যদি তাদের এসব কাজের যৌক্তিকতা দেখাতে ১১টি অনুচ্ছেদ বা কারণের আবতারণা করে থাকে তবে তাদের বাতিল চিন্তার ধারা অনুসরণ করে আমরাও এরূপ কাজের ফলে সৃষ্ট অসংখ্য ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা দেখাতে পারি। যেমন:
— এ পদ্ধতির অনুসরণকারী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ও সদস্যগণ মুনাফিকীর শিক্ষা লাভ করে। যেসব শাসকরা তাদের জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে উদ্ধুদ্ধ করে তাদের সামনে যখন তারা যায় তখন তারা এমনকিছুই বলে যা সেসব শাসকদের সন্তুষ্ট করে। যখন তারা জনগণের সামনে যায় তখন অন্যকিছু বলে এবং তাদের বুঝানোর চেষ্টা করে যে, তারা শাসনব্যবস্থা ও শাসকদের কাছে যাচ্ছে যাতে করে শাসনক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে।
— দলটির আচরণ সামগ্রিক পরিবর্তনমুখী হওয়ার বদলে হালকা, আত্মতুষ্টিমূলক ও নমনীয় হয়ে যায়।
— শাসনব্যবস্থার অধিকারীরা আন্দোলনকারীদের সংখ্যা সম্বন্ধে ধারণা লাভের সুযোগ পায় যাতে করে তারা এবং তাদের গোপন বিষয়সমূহ জানতে পারে। দলের সদস্যদের মধ্যকার পার্থক্যকে শাসকরা খুঁজে বের করতে পারে এবং এ বিভেদকে আরও শক্তিশালী এবং অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করে। এভাবে দলটিকে সহজেই নিয়ন্ত্রন করতে পারে এবং যখন প্রয়োজন তখন ভাঁঙ্গন সৃষ্টি করতে পারে।
— এই সমস্ত দলগুলোর দাওয়াহ্ শাসকদের শাসনের (সমালোচনার) মধ্যে সীমাবদ্ধ যা শাসকদের জন্য কোনো বিপদজ্জনক বিষয় নয় এবং তারা (ইসলামের) মূখ্য বিষয়ে নীরব থাকে যা দাওয়াহ্ ও ইসলাম সম্পর্কে ভুল দৃষ্টিভঙ্গী প্রদান করে।
— যখন একটি শাসনব্যবস্থা কোন ইসলামী আন্দোলনকে তার ভেতরে কাজ করবার সুযোগ দেয় তখন সে দলটিকে নিজের কাজ করার জন্য শাসনকতৃর্ত্বের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরির অনুমতি নিতে হয় এবং এভাবে দলটি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আটকা পড়ে যায়, কারণ তখন একটি ভীতি কাজ করে যে, শাসনকতৃর্ত্ব হয়ত এসব প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিবে এবং বাজেয়াপ্ত করবে। সে কারণে তারা এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা যা সরকারকে নাখোশ করে এবং ফলে তা অবসানের সিদ্ধান্তও নিতে পারেনা।
— এসব তথাকথিত ইসলামী আন্দোলনগুলো জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পদ্ধতির অনুসারী সঠিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর উপর মৌলবাদী বা ধর্মান্ধ আখ্যা দিয়ে দমন-নিপীড়ন চালানোর সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে যারা শাসন কাজে সহযোগীতা করে তারা আলোকিত ও উদারমনা হিসেবে পরিগণিত হয়। এটা সত্যিই অদ্ভুত একটি ব্যাপার। এই উদার আচরণকারীরা যুক্তি উপস্থাপন করে যে, পদ্ধতিগত কারণেই তারা অনেক বেশী সহনশীল যেজন্য শাসকরা তাদের প্রতি সহযোগীতার হাত প্রসারিত করতে পারে এবং তারা বাদে অন্যরা ধর্মান্ধ।
— এ ধরনের ইসলামী দলের ধারণা বাস্তবতার সাথে মিল রেখে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, অমুসলিম জিম্মিদের কাছ থেকে জিযিয়া না নেওয়া, জিম্মি বলে তাদের অসন্তুোষকে উস্কে না দেয়া। এছাড়াও তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হল গণতন্ত্র তাদেরই একটি সম্পদ যা তাদের কাছেই আবার ফিরে এসেছে অথবা সুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোনো কিছু দিয়ে পরিচালিত যে শাসনব্যবস্থা তাতে অংশগ্রহণ করাও এর আরেকটি উদাহরণ।
— এটা (বিদ্যমান) শাসনকার্যকালকে আরো দীর্ঘ করে।
— (বিদ্যমান) শাসনব্যবস্থার একটি সুন্দর ভাবমূর্তি তুলে ধরে।
— লোকদের মন থেকে তখনই ইসলাম সম্পর্কিত বিষয়াদি হারিয়ে যেতে থাকে যখন তারা দেখে যে, এ শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলাম তাদের কিছুই দিতে পারছে না, বিশেষ করে তারা যখন আল মান্না ওয়া সালওয়া বা সবধরনের ঐশ্বর্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেয়। এটা প্রমাণ করে যে তারা সমস্যাসমূহের সমাধান সঠিক উপায়ে দিতে অক্ষম। ফলে এধরনের আন্দোলন অনুসরণীয় দৃষ্টান্তের বদলে নোংরা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।
— আন্দোলনের কমীর্গণের নৈতিক অধঃপতন ঘটে কারণ তাদের নিকট শাসকের অবৈধ কর্মকান্ড এবং তার যথার্থতার সমালোচনার বদলে দলের কর্মকান্ডের যুক্তি যথার্থতা তুলে ধরে দাওয়াহ্ বহন করাটাই মূখ্য বিষয় হয়ে পড়ে।
— শাসকরা যখন অন্য দলের দাওয়াহ্ বহনকারীদের উপর দমন-নিপীড়ন চালায় বা এর সদস্যদের গ্রেফতার করে তখন তারা পুরোপুরি নিশ্চুপ থাকে, এমনকি শাসকদের খুশি করার জন্য বা তাদের অনুরোধে এরূপ আন্দোলন অন্য (ইসলামী) আন্দোলনের কর্মীদের উপর হামলা চালায় যেমনি আজকাল মিশরে ঘটছে।
— এধরনের আচরণ পুরো দলটিকে শারী’আহ্ গ্রহণ করার বদলে সুবিধাবাদী করে তোলে। শারী’আহ্’র সাথে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক হলেও যদি কোন কাজ সুবিধা বয়ে নিয়ে আসে তবে তাই সম্পাদিত হবে। মুসলিমদের কাছে তখন লাভের বিষয়টি শারী’আহ্’র চেয়ে প্রিয় হয়ে যায়। সুতরাং এরকম আরও অনেক কারণ রয়েছে যা দ্বীন ও দাওয়াহ্’র ক্ষতি করছে।
আমরা এসব কিছুই বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরেছি, শারী’আহ্’র ভিত্তিতে নয়, যাতে করে আমরা দেখাতে পারি যে তাদের অবলম্বিত পথ অনুযায়ীও যদি আমরা তাদের চিন্তার পদ্ধতিকে বিবেচনা করে দেখি তবে তা থেকে দাওয়াহ্ ও ইসলামের জন্য কুফল ছাড়া আর কিছু দৃষ্ট হয়না। এটি একটি নিষ্ফল চিন্তা যে ব্যাপারে শারী’আহ্’র কোন অনুমোদন নেই।
শারী’আহ্ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান এটা করতে আমাদের বাধা দেয় যে আমরা (কেবল) বাস্তবতার বিচারে কোন একটি চিন্তার ভ্রান্তি তুলে ধরবো বা বুদ্ধিবৃত্তির বিচারে শারী’আহ্’র কোন বিষয়কে পরিত্যাগ করবো। আমরা তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করে আলোচনার সূত্রপাত করেছি শুধু এজন্য যাতে করে তাদের মুখের কথা দিয়েই তাদের ভুল দেখিয়ে দেয়া যায় ও তাদের নিজস্ব মানদন্ড দিয়েই তাদের কথার অসারতা প্রমাণ করা যায়। তবে আমরাসহ সব সচেতন ও আন্তরিক মুসলিম এটা জানে যে, কোন কাজ বা কথা গ্রহণ বা বর্জনের মানদন্ড হল শারী’আহ্। যেহেতু এটাই মূল ব্যাপার, অতএব যেসব শারী’আহগত দলিল তারা উল্লেখ করেছে যা তারা নিজেরা জানে এবং অন্যরাও জানে সেগুলোই তাদের মতামত ও উপলদ্ধিকে খন্ডানোর জন্য যথেষ্ট যদিওবা তারা আরও ঊদাহরণ নিয়ে আসতে পারে। সমস্যাটি অনেক উদাহরণ দেখানোর বিষয় নয়, বরং চিন্তার পদ্ধতি সম্পর্কিত।
(শারী’আহ্’র ঐ প্রমাণগুলো) তারা জানে বলে (দাবী করলেও) তাদের সেকথা আমরা মেনে নেব না। তাদেরকে তা মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই তাও নয়। কেননা, এসব শারী’আহ্ দলিলের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তারা যেসব কারণ উল্লেখ করেছে সেগুলোর দোহাই দিয়ে এ দলিলগুলোকে তারা গ্রহণ করেনি। এটা অনুমোদিত নয়; পাশাপাশি এটি দ্বীনের ব্যাপারে উদ্ধ্যত্বপূর্ণ আচরণ এবং সুস্পষ্ট ও সঠিক হুকুমের বিষয়ে চরম অবহেলা। আর তাদের চিন্তার পিছনে কিছু ইসলামী চিন্তাবিদের বক্তব্য, যা কিনা এমনিতেও এই বাস্তবতার উপর প্রযোজ্য নয় তা দলিল হিসেবে উপস্থাপন করার বিষয়ে আমরা বলবো, কোন মানুষের বক্তব্য শারী’আহ্’র দলিল হতে পারে না। যেটা একমাত্র বিবেচ্য তা হলো দলিল এবং ইসতিদ’লাল বা লদ্ধ বিষয়ের যথার্থতা। যদি তারা বলে অমুক ও অমুক ব্যক্তি বলেন, তখন আমরা বলি এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) যা বলেন তাই চূড়ান্ত এবং মুহকাম (সুস্পষ্ট ও অরহিত)। কোন একজন ব্যক্তির কথায় আল্লাহ্ এবং তার রাসূল (সা) এর বাণী কি রহিত হয়ে যাবে? এ পদ্ধতির পক্ষালম্বনকারীদের মাথায় লাভের চিন্তা এতটাই প্রাধান্য বিস্তার করে যে তাদের দাওয়াহ্’র ব্যবসায়ী বলাই সঙ্গত। অবশ্য ব্যবসায়ীরা সর্বদা লাভের আশায়ই ব্যবসা করে থাকে, লোকসানের জন্য নয়।
তাদের চিন্তার দূষণ আরো যেভাবে বুঝা যায় তা হলো তারা নিয়মবহির্ভূত ক্বিয়াসের উপর ভরসা করে যা সুবিধাকে প্রাধান্য দেয়ার ভিত্তিতে যুক্তি দিয়ে শারী’আহ্’র বিধানকে ব্যাখ্যার মাধ্যমে লদ্ধ। এটা তাদের নুতন ইসতিম্বাতের দিকে ধাবিত করে যে ব্যাপারে ইসলামী উম্মাহ্ ও চিন্তাবিদগণ ওয়াকিফহাল ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রদর্শিত এবং উম্মাহ্’র সব উলামাগণ (সালাফ আস সালীহ বা নেককার পূর্বসূরী) কর্তৃক অনুসৃত এবং তাদেরকে যারা ইহসান বা সৎ কাজের ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন, তাদের গৃহীত সঠিক ইসতিম্বাদের পদ্ধতিকে তারা পরিত্যাগ করেছে। তাদের কোনো আলোচনার মধ্যে এ ধরনের সুশৃঙ্খল ও যথার্থ শারী’আহগত পদ্ধতির উল্লেখ নেই। তারা পশ্চিমা পদ্ধতি অর্থাৎ বুদ্ধিজাত সাদৃশ্যতা এবং লাভকে মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করে। নিম্নের হাদীসটি যথার্থভাবে তাদের জন্যই প্রযোজ্য:
“তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘজীবী হবে তারা অনেক মতপার্থক্য লক্ষ্য করবে। নতুন জিনিসের ব্যাপারে সাবধান হও, প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআত (নবপ্রচলন) এবং প্রত্যেক বিদআতই জাহান্নামের আগুনের দিকে যাবে।” (তিরমিযী ও আবু দাউদ)
তাদের ভাষ্য অনুসারে, ইসলাম মদ ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করেছে যদিও মানুষ এগুলো থেকে কিছু উপকারিতা পেয়ে থাকে। সে কারণে বড় উপকারিতাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মদ ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিশ্বাসীদের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও শারী’আহ্ জিহাদকে বাধ্যতামূলক করেছে। এর কারণ হলো জিহাদ মানুষের রবের নিকট ও মানবজাতির জন্য মঙ্গলজনক।
ধমীর্য় গুরুত্ব থাকার পরও রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাবা’কে ধ্বংস করে ইব্রাহীম (আ) এর ভিত্তির উপর তা পূনঃনির্মাণ করার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেছিলেন। কারণ কাবা’র কাঠামোগত সংস্কার করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হতো বেশী।
এর উপর ভিত্তি করে তারা বলে যে, জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা সত্যিই বড় ক্ষতির কারণ। তবে আন্দোলনটি কিছু পরিস্থিতিতে মনে করতে পারে যে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসলাম, মুসলিম ও ইসলামী আন্দোলনকে লাভবান করবে। এর মাধ্যমে তাগুত দূরীভূত হবে এবং সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
তারা তাদের চিন্তাকে আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে যা থেকে উপলদ্ধি করা যায় যে এ চিন্তাকে তারা তাদের মর্মমূলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শারী’আহ্’র বাণীকে এরকম পন্থায় উপলদ্ধি করে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হুকুমসমূহ বের করা খুবই বেদনাদায়ক। পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের এই যুগে লাভ-লোকসানের সাথে তুলনা করে লব্দ এসব চিন্তা বর্তমান যুগে আমাদের বেদনাকে আরও বহুমাত্রায় বৃদ্ধি করেছে। পূর্বে ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সুশৃংখল নীতিমালাকে অনুসরণ করতেন, যেখানে মানুষের বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ ছিলনা বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত নিয়মকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হতো, যা আমরা খুব দ্রুতই ব্যাখ্যা করব ইনশা’আল্লাহ্। অপরদিকে, আমরা দেখি কিছু মুসলিম নতুন আবিষ্কৃত এই পদ্ধতির দ্বারা আইন তৈরির একটি দরজাকে উন্মোচন করে এবং এতে প্রবেশ করে। কোনো কাজের লাভ বা ক্ষতি বের করার ক্ষেত্রে তারা তাদের খেয়ালখুশী বা প্রবৃত্তির বশবতীর্ হয় এবং এ পদ্ধতিকে গ্রহণ করে। বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যখন একটি উপকার, সংশ্লিষ্ট ক্ষতিকে ছাড়িয়ে যায় তখন কাজটি অনুমোদিত। আবার যখন ক্ষতি, সংশ্লিষ্ট উপকারকে অতিক্রম করে তখন কাজটি পরিত্যাজ্য। এ নতুন আবিষ্কৃত পদ্ধতি অনুসারে মানুষ তার খেয়াল ও প্রবৃত্তির বশবতীর্ হয়ে আইনপ্রণেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
উল্লেখিত পদ্ধতিতে কোনো কর্মের হুকুম বের করতে তারা শারী’আহ্’র বাণীকে উপরে উল্লেখিত পদ্ধতিতে খেয়াল-খুশিমতো ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে। এটাই পশ্চিমাদের চিন্তা পদ্ধতি। পশ্চিমারা এ ধরনের চিন্তার উপর নির্ভর করে থাকে।
যাইহোক এ পদ্ধতি মুসলিমদেরকে লাভ-ক্ষতির উপাসক বানায়, আল্লাহ্’র আদেশের নয়। এটা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যেখানে লাভ অকাট্য শারী’আহ্’র হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায় এবং লাভ-ক্ষতির মাপকাঠিকে প্রাপ্ত হুকুমসমূহ দ্বারা শারী’আহ্’র হুকুমসমূহ বাতিল হয়ে যায়।
শারী’আহ্’র হুকুমসমূহের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হয় সুসংজ্ঞায়িত মূলনীতির মাধ্যমে। যে মুসলিম এটাকে সঠিকভাবে অনুসরণ করেন তিনি সত্যিকার অর্থে আল্লাহ্’র বান্দা এবং তাঁর হুকুমের প্রতি আনুগত্যশীল। হুকুম বের করার সঠিক পদ্ধতির মাধ্যমে লদ্ধ শারী’আহ্’ই আল্লাহ্’র হুকুম। আর এটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব হবে না যতক্ষণ না সে ব্যক্তি ক্বিয়াসের জন্য শারী’আহগত ইল্লাহ্ বা কারণের উপর নির্ভর করবে।
ভাল ও মন্দ, আকর্ষণীয় ও অনাকর্ষণীয়, হালাল ও হারামকে সংজ্ঞায়িত করার এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র। এটা কখনওই মানুষের হাতে অর্পণ করা হয়নি। যদি মানুষকে এ অধিকার দেয়া হতো তাহলে শুরু থেকেই তাকে আইন প্রণয়নের সুযোগ দেয়া হতো। শারী’আহ্ মানুষের কর্মকান্ডজনিত হুকুমের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতো না। এবং মানব জীবনের সব কাজের নিয়ন্ত্রক এবং সংগঠক শুধুমাত্র আল্লাহ্ এটা বিশ্বাস না করে মুসলিমদের শুধু এতটুকু বিশ্বাস করলে হতো যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তা।
সমগ্র মুসলিম যুগ ধরেই ইসতিম্বাতের শারী’আহগত পদ্ধতির উপর নির্ভর করে হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে। আমাদের বিশিষ্ট বিচারকগণ এই পদ্ধতি অনুসরণ করে সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে ব্যক্তির এ ব্যাপারে জ্ঞান রয়েছে এবং নিজেকে এইসব মূলনীতির আওতায় রাখে তার জন্য এটা একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।
এই নবআবিষ্কৃত পদ্ধতির দূর্বলতা হলো, এগুলো শারী’আহ্’র অকাট্য হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক। যদি পদ্ধতিটি সঠিক হতো তাহলে এর মাধ্যমে লদ্ধ হুকুমসমূহ অবশ্যই শারী’আহ্’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো। এটা স্বয়ং এবং এটা যে প্রভাব তৈরী করে উভয়ই প্রমাণ করে যে, এ পদ্ধতিটি ত্রুটিপূর্ণ। নিম্নের কিছু উদাহরণ ব্যাপারটি আরো পরিষ্কারভাবে বুঝতে সহায়তা করবে:
— বৈধ উপায়ে দাওয়াহ্’র জন্য প্রয়োজন সৎ স্পষ্টবাদিতা, সাহস, শক্তি এবং চিন্তা। একজনকে অবশ্যই যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে এবং দ্বন্দে অবতীর্ণ হতে হবে যাতে পরিস্থিতির কোনরকম তোয়াক্কা না করে এর অসত্যতা স্পষ্ট করে তোলা যায়। এর জন্য প্রয়োজন কেবলমাত্র ইসলামী জীবনব্যবস্থার প্রতি নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব, যদিও এটা অধিকাংশ লোকের মতামত বা ঐতিহ্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয় অথবা তারা এর গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান বা বিরোধিতা করে। দাওয়াহ্ বহনকারী ব্যক্তি লোকদের ও ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করে না। এভাবেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে সত্যের দাওয়াহ্ দিতেন তার উপর বিশ্বাস করে আহ্বান অব্যাহত রাখতেন। এসময় তিনি কোনো প্রথা, ঐতিহ্য, ধর্ম, বিশ্বাস, শাসক ও জনগণকে তোয়াক্কা না করে পুরো পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি ইসলামের বাণী ব্যতিরেকে অন্য কোনো দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেননি। ইবনে হিশাম উল্লেখ করেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরাইশদের চ্যালেঞ্জ করেন তখন তাদের দেবতাসমূহকে অপদস্থ করেছিলেন, তাদের মানসিকতাকে কটাক্ষ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন পথভ্রষ্ট। কুরাইশগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তার বিরোধিতা ও শত্রুতায় একতাবদ্ধ হয়েছিল। এভাবেই মুসলিমদের আজকে দাওয়াহ্ বহন করা উচিত। যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে অনুসরণ করতে চায় তারা যাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা’র নিম্নের আয়াতকে মনে রাখে:
“বলুন (হে মুহাম্মদ)! এটাই আমার পথ। ‘আমি পূর্ণ সচেতনতার সাথে আল্লাহ্’র দিকে আহ্বান জানাই, আমি এবং আমার অনুসারীরা।”
(সূরা ইউসুফ: ১০৮)এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু জিনিস রেখে যাচ্ছি যদি তা তোমরা ধারণ করো তাহলে কখনও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না। এটি হলো সুস্পষ্ট বিষয়: আল্লাহ্’র কিতাব ও তাঁর প্রেরিত রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্।”
(সীরাতে ইবনে হিশাম)এবং যারা সালাফ আস সালিহ’দের পথ ও তাদের কথা অনুসরণ করে তারা বলে “বিষয়ের (দ্বীনের) সমাপ্তি ভাল হতে পারে না, যদি না যার মাধ্যমে এর শুরুটা ভাল হয়েছিল, তা না থাকে”, আর এ ধরনের দাওয়াহ্’তে তা মানতেই হবে।
বর্তমানে শারী’আহ্ কতৃর্ক অননুমোদিত এই নতুন ও নবআবিষ্কৃত পদ্ধতির অনুসারীদের বক্তব্য হচ্ছে অধিকতর সুবিধা সবচেয়ে উপযোগী ও সর্বোত্তম চিন্তার দিকে ঈঙ্গিত প্রদান করে এবং তারা ইস্যুসমূহকে হিকমাহ্’র (প্রজ্ঞা) সাথে উপস্থাপন করে এবং সর্বোত্তম পন্থায় আহ্বান করে। এটা তাদের কর্মপদ্ধতি, এটা কখনোই শারী’আহগত কোনো পদ্ধতি নয়। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দাওয়াহ্’র প্রতিবন্ধক সববিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে দাওয়াহ্’র লাভ কি? এর মাধ্যমে অন্যদের হৃদয় উন্মুক্ত নাকি বন্ধ হয়? অন্যদের সাথে মৌলিক মতপার্থক্যের ভিন্নতা প্রকাশের দরকার কি? অন্যদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয়াটাই কি ভাল নয় এবং এটাই হল তাদের হৃদয় মনে জায়গা করে নেয়ার অন্যতম প্রধান কৌশলগত দিক? তাদের আরও বক্তব্য হচ্ছে, যখন তারা আমাদের ও তাদের মাঝে বড় কোন মতপার্থক্য খুঁজে পাবে না তখন কি তারা আমাদের আরও নিকটবর্তী হবে না? শাসকের বিরোধীতা করা এবং উম্মাহ্’র সম্মুখে তাদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা উন্মোচন করা কি দাওয়াহ্’র স্বার্থের আনুকুল্য? তাদের ক্ষিপ্ত করা এবং তাদের মন্দ দিকসমূহ উন্মোচন করার চেয়ে তাদের নিকটবর্তী ও বন্ধুসুলভ হওয়াই কি বেশী ভাল নয়? হয়ত এতে তারা তাদের খুব কাছে আসবে এবং তাদেরকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে আসবে যাতে দাওয়াহ্ লাভবান হবে এবং সবাই এর সুফল ভোগ করবে। সম্ভবত এভাবে তারা ক্ষমতায় পৌঁছে যাবে। আর একারণেই তারা এটা নিশ্চিত করতে চায় যে, তারা শাসকগোষ্ঠীর জন্য ভয়ের কারণ না এবং তাদেরকে নিকটবর্তী হতে দিলে তারা ক্ষতির কারণ হবে না। এখানেই তোষামোদের অধ্যায়ের শুরু এবং যা সঠিক পদ্ধতি থেকে যোজন যোজন দূরে। এছাড়া এটি হল শাসকদের তুষ্ট করার সূচনা, তাদের কর্মকান্ডের মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেয়া, তাদের প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে নীরব থাকা, শাসকদের উষ্মা সৃষ্টি করে না এমনসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা, কথা বলা এবং উম্মাহ্’কে সাবধান করা উচিত এমনসব অপরিহার্য বিষয়কে অবহেলা করা এবং সত্যের সাথে আপোষকারী এজাতীয় আরও অনেক কথা ও কাজে ব্যস্ত থাকা। এসব কিছুর পেছনে দায়ী তাদের চিন্তার পদ্ধতির পরিবর্তন।
— নবী (সা)-এর জ্ঞানের উত্তরসুরী ইসলামী চিন্তাবিদগণের উপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হক্ব হচ্ছে তারা মুজাহিদীনদের মধ্যে সামনের সারিতে থাকবেন, সত্য উচ্চারণ করবেন, তা ধারণ করবেন এবং শাসকদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরে তাদের সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হবেন। অন্যকথায় তারা অবশ্যই জ্ঞান, মিহরাব ও যুদ্ধের ইমাম হবেন। সালাফ আস সালিহগণ এরুপ ছিলেন। এ নবআবিষ্কৃত পদ্ধতিতে আমরা দেখতে পাই যে, এমন এক নতুন উপলদ্ধি তৈরি হয়েছে যা পূর্বের ইসলামী চিন্তাবিদদের চিন্তার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তাদের চিন্তা কথার মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। তারা বলে যদি আমাদের চিন্তাবিদগণ হক্ব কথা বলতে গিয়ে গ্রেফতার অথবা মারা যান তাহলে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবে? উম্মাহ্ এতে করে যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা এর লাভের চেয়ে অনেক গুণ বেশী। তাহলে কেন আমরা উম্মাহ্’কে এসব চিন্তাবিদের ঊপকার থেকে বঞ্চিত করব?
— অনুরূপভাবে, সংসদীয় নির্বাচনের অংশগ্রহণ করা কিছু শর্তের ভিত্তিতে অনুমোদিত: প্রার্থীকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে এবং তাকে ইসলামী শাসনের প্রতি আনুগত্যশীল থাকতে হবে। তিনি অবশ্যই কুফর আইনকে মেনে নেবে না বরং খন্ডন করবেন এবং শারী’আহ্ আইনকে এর বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করবেন। তিনি নির্বাচিত করতে পারবেন না একজন অমুসলিম প্রেসিডেন্টকে কিংবা এমন একটি সরকারকে যার ভিত্তি কুফর। সরকারকে আস্থা ভোট দেয়া তার জন্য অনুমোদিত নয়, বরং তিনি তা প্রতিরোধ করবেন। কারণ সরকার ইসলামের ভিত্তিতে গঠিত হয়নি। আর এটাই হল সুস্পষ্ট শারী’আহ্ আইন।
তবে আমরা এই নবআবিষ্কৃত পদ্ধতি অনুসারে দেখতে পাই যে, মুসলিমদের এমন কাউকে নির্বাচিত করার অনুমোদন দেয়া হয় যিনি শারী’আহ্ দিয়ে শাসন, জবাবদিহিতা ও শাসক নির্বাচন করেন না । বরং তারা খ্রিস্টান প্রার্থীদের নির্বাচনও মেনে নেন এবং নির্বাচনী তালিকায় অংশগ্রহনের জন্য তাদের সম্মতি দেন এ অজুহাতে যে, আইন প্রত্যেক অঞ্চলে এমপি সংখ্যা নির্ধারন করে দিয়েছে। মুসলিমরা নির্বাচিত করুক বা না করুক এভাবে খ্রিস্টান প্রার্থী বিজয়ী হয়। তাই তাদের দৃষ্টিতে প্রতিদ্বন্ধি পক্ষের লোকেরা তাকে নির্বাচিত করার চেয়ে মুসলিমদের জন্য উত্তম হলো তাদের জন্য অধিক উপকারী কাউকে নির্বাচিত করা।
এ কারণে এ পদ্ধতির সমর্থকগণ যত বেশী যুক্তি নিয়ে অগ্রসর হয় ততবেশী তারা সত্য থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।
ইসলামের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে থাকা এই নবআবিষ্কৃত ও নতুন মানসিকতার সমর্থকদের এটা বোঝা উচিত যে তাদের মানসিকতা ও আচরণের সাথে ইসলামের কোনো সম্পৃক্ততা নাই এবং এ ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত। তারা যা প্রতিষ্ঠা করেছে সে ব্যাপারে তাদের অনুতপ্ত হওয়া উচিত। ইসলামী দাওয়াহ্’তে তাদের প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু তার আগে প্রথমে তাদেরকে এ মানসিকতা ও আচরণ হতে বের হয়ে আসতে হবে যাতে তারা আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে অন্যকিছু দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনাকারী শাসকগোষ্ঠীকে পরিত্যাগ করে ইসলামী শাসনের সমর্থক হয়।
মহাবিশ্বের অধিপতি একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হচ্ছেন লাভ-ক্ষতির অকাট্য সংজ্ঞা প্রদানের মালিক। তিনি ছাড়া আর কেউই কোনটি আমাদের জন্য কল্যাণকর এবং কোনটি অকল্যাণকর তা বলতে পারে না। যদি কোন মানুষ তা পারতো তবে সে আইনপ্রণেতার স্থান পেত এবং মানুষের জীবনযাপনের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে দ্বীনের কোনো প্রয়োজন ছিলনা। সেকারণে ইসলাম মুসলিমদের জন্য তাদের প্রভূর শারী’আহ্’কে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করেছে। শারী’আহ্ যা বলে তাই আমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যা নিষেধ করে তাই অকল্যাণকর। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কিছুকে আমাদের জন্য কল্যাণকর বা ক্ষতিকর বলতে পারি না যতক্ষণ না এ ব্যাপারে কোনো হুকুম জারি হয়। এর আগে এটা খুঁজে বের করা আমাদের আয়ত্তাধীন নয়। কারণ মনের এমন কোন মানদন্ড নেই যার ভিত্তিতে যে ভাল বা খায়ের, মন্দ বা শা’র এবং হাসান বা সুন্দর ও কুব্হ বা নিন্দনীয় এর মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে। সুতরাং আমাদের রয়েছে শারী’আহগত নীতিমালা, ‘যেখানে আমরা আল্লাহ্’র শারী’আহ্ পাই সেখানেই রয়েছে কল্যাণ।’ তাদের সেই মূলনীতি যাতে তারা বলে, ‘যেখানে মানুষের উপকারিতা রয়েছে সেখানেই আল্লাহ্’র আইন’ এ ধারণাটি ভুল। এ ব্যাপারে নীচের আয়াতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা উল্লেখ করেন,
“তোমাদের উপর জিহাদ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের নিকট অপছন্দনীয়; এবং হয়তো তোমরা এমনকিছুকে অপছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আর এমনকিছুকে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য অকল্যানকর। বস্তুত, আল্লাহ্ যা জানেন তা তোমরা জান না।”
(সূরা বাক্বারা: ২১৬)এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আয়াতটি বুঝতে পারি,
“তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ।”
(সূরা আল আ’রাফ: ১৫৭)তাইয়্যিব বা ভাল হলো সেটিই যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হালাল করেছেন এবং তিনি আমাদের এ ব্যাপারে অবহিত করার আগে আমরা এ ব্যাপারে জানতাম না। খাবিস বা খারাপ হলো সে জিনিস যা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা নিষিদ্ধ করেছেন এবং আমরা এ ব্যাপারে কখনওই জানতে পারতাম না যদি না তিনি তা নিষিদ্ধ করতেন। এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের মন বুঝতে পারে কোনটি হালাল যেজন্য তিনি তা অনুমোদন করেন এবং মন যেটিকে হারাম বলে তিনি তা নিষেধ করেন।
যখন তারা বলে দু’টি ভাল জিনিসের মধ্যে শ্রেয়তর, দু’টি মন্দ জিনিসের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম দোষযুক্ত এবং দু’টি উপকারের মধ্যে উত্তমটি ও দু’টি ক্ষতির মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিটি বেছে নেয়া যায় এই বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে ভুল এবং এটা শারী’আহ্’র জন্য সত্যিই বিপদজনক। এটা মাসালিহ্ মুরসালাহ্’র বিষয়ে মতামতের চেয়েও ভয়াবহ। এটা একারণে যে, মাসালিহ্’র ভিত্তিতে তারা তখনই কাজ করে যখন বাস্তবতা শারী’আহ্’র দিক নির্দেশনা বর্হিভূত হয়, কিন্তু উপরোক্ত বক্তব্য অনুযায়ী তারা আল্লাহ্’র হুকুমকে পর্যন্ত বদলাতে পারে, প্রবৃত্তিকে এগুলো রহিত করতে অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে তারা হারামকে অনুমোদন দেয় এবং হালালকে বাতিল করে দেয়। এটা দ্বীনের জন্য ক্ষতিকারক এবং ভয়ংকর কার্যপদ্ধতি। একারণে তাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গী সত্য থেকে অনেক দূরে।
এতক্ষন আমরা যা উপস্থাপন করলাম তাতে দেখতে পাই যে তাদের উসুল বা মুলনীতিগুলো একটি আরেকটির সহযোগী যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আইনের মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে চায়, কেননা তারা শারী’আহ্’র মূলনীতির বদলে তাদের মন প্রদত্ত যুক্তিকে গ্রহণ করেছে এবং শারী’আহ্ যা চায় তা নয় বরং তারা যা চায় তাতে পৌঁছাতে তারা শারী’আহ্ প্রদত্ত চিন্তাপদ্ধতির বদলে যুক্তিনির্ভর চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়েছে। সে কারণে যৌক্তিক সাদৃশ্যতা হলো সব আলোচনায় তাদের পথনির্দেশক মূলনীতি। যদিও বিধানদাতা (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) মুসলিমদের জন্য যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতা অনুসরণকে নিষিদ্ধ করেছেন। কারণ এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বিরুদ্ধে যায় এবং কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অনুমোদন দেয় ও এটা সত্য এবং যথার্থতা থেকে বিচ্যুত হয়ে একজনকে খেয়ালখুশী ও প্রবণতার দিকে ধাবিত করে। তাদের আলোচনা হলো তাগুতের সাথে মধ্যস্থতা করা যা আমাদের প্রত্যাখান করতে বলা হয়েছে। কারণ তাগুত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাজিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুর সাথে মধ্যস্থতা করে।
পরিশেষে আমরা অবশ্যই যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতা এবং শারী’আহগত সাদৃশ্যতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরবো যাতে যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার কুফল তুলে ধরা যায় এবং শারী’আহগত সাদৃশ্যতার গুরুত্ব তুলে ধরা যায় এবং এভাবে আমরা আমাদের নিজেদের, উম্মাহ ও সমগ্র মানবজাতিকে হেফাজত করতে পারি।
ঐসব মুসলিমগণ শারী’আহ্ হুকুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে যৌক্তিক মানদন্ডের ভিত্তিতে উপলদ্ধ অধিকতর লাভের দিকে ধাবিত হয়। যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তারা শারী’আহ্ হুকুম থেকে প্রাপ্ত লাভ এবং এ থেকে উদ্ভুত ক্ষতির মধ্যে তুলনা করে । তাদের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী যদি এতে ক্ষতির পরিমান বেশী দেখা যায় তাহলে তারা যুক্তির ভিত্তিতে যে হুকুমটি নিলে বেশী লাভ হবে তা গ্রহণ করে ঐ বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত সংশ্লিষ্ট শারী’আহ্ হুকুমকে পরিত্যাগ করে। যদি শারী’আহ্ হুকুমের মধ্যে উপকারের পরিমাণ বেশী থাকে তাহলে তারা সেটা গ্রহণ করে, তবে আল্লাহ্’র হুকুম হিসেবে নয় বরং তাদের মন সম্মত বলে। এটা একটি বিপজ্জনক বিষয় এবং এ ব্যাপারে কারও নীরব থাকা কাম্য নয়। কারণ এটা মন ও প্রবৃত্তিকে শারী’আহ্’র অভিভাবক বানায় এবং মনকে আল্লাহ্’র হুকুমের উপর হস্তক্ষেপকারী বানায় এবং শারী’আহ্’র উপর প্রাধান্য দেয়। আর এটাই মানবরচিত আইন। আর এটাই তাদের এই বিষয়ে প্রদত্ত মতামতসমূহ যে শারী’আহ্’র সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক তার ব্যাখ্যা দেয়। তাই শুধু পার্থক্য এটা নয় যে তাদের মতামত অনুমোদিত না অনঅনুমোদিত কিংবা আল্লাহ্’র বিধান বাদে দিয়ে শাসন ক্ষমতায় অংশগ্রহন করা না করার বিষয়, বরং পার্থক্য হলো চিন্তার পদ্ধতিতে; কারণ এর দ্বারাই তারা শারী’আহ্বহির্ভূত হুকুম, যুক্তিনির্ভর হুকুম, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নাযিল বর্হিভূত হুকুম ও প্রত্যাখ্যাত তাগুতের হুকুমের নিকটবর্তী হয়।
একারণে আমরা বলি যে, এ ধরনের উপলদ্ধি সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরবতীর্ অথবা বিপরীত। এর স্বরূপই এর অসারতাকে তুলে ধরে। এর উপর নির্ভর করা বা এর ভিত্তিকে হুকুম গ্রহণ করা সঠিক নয়। কারণ লাভ-লোকসানের অকাট্য সংজ্ঞা কেবলমাত্র জগতসমূহের অধিপতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্যই নির্ধারিত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ছাড়া অন্য কেউ জানে এরকম কোন লাভ বা ক্ষতি থেকে বিরত থাকার মধ্যে আমাদের জন্য কি উপকার রয়েছে? আর যদি এটা সম্ভব হতো তাহলে মানুষ নিজেই আইনপ্রণেতা হতো। মানুষের জীবনের সামগ্রিক বিষয়াবলীর ব্যবস্থাপনার জন্য ঐশী ব্যবস্থার অপরিহার্যতার কথা বিবেচনায় রেখেই ইসলাম মুসলিমদের জন্য তাদের প্রভূর শারী’আহ্কে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করেছে। সে কারণে শারী’আহ্ আমাদের যা করতে বলেছে তাই আমাদের জন্য কল্যাণকর আর যা পরিত্যাগ করতে বলেছে তাই ক্ষতিকর। আল্লাহ্’র নির্দেশ বা নাযিল করা হুকুম ব্যাতিরেকে কোন কিছুর দ্বারা কল্যাণ বা ক্ষতি সম্পর্কে আমাদের জানা নাই। এর পূর্বে এ ব্যাপারে কোন কিছু সংজ্ঞায়িত করতে আমরা অক্ষম।
যখন মানুষ আইন প্রণয়ন করে তখন সে যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার পথ অনুসরণ করে, যেখানে সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ের জন্য একই রকম হুকুম আসে এবং বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম আসে। যখন আমরা ইসলামী শারী’আহ্’র দিকে লক্ষ্য করি তখন দেখি যে, এর প্রবক্তা সর্বজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞাত স্রষ্টা সাদৃশ্যপূর্ণ অনেক বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ে একইরকম হুকুম দিয়েছেন। এটা যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার বিপরীত। এটা এমন সব হুকুম দিয়েছে যেখানে মন কোন ভূমিকা রাখে না। আর এটাই ঐসব লোকদের জন্য নবআবিষ্কৃত পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যানের জন্য যথেষ্ট।
১৩তম অধ্যায়: সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ:) এবং কুফর ব্যবস্থার অধীনে শাসন
সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, তিনি (আ) এমন একটি জাহেলী সমাজে বসবাস করতেন যেখানে শিরকী বিশ্বাসের কতৃর্ত্ব ছিল। সমাজটির নৈতিক বিপর্যয়ও ছিল ব্যাপক। লোভ এবং অবিচার এতই বিস্তার লাভ করেছিল যে সেই সমাজের লোকেরা ইউসুফ (আ)-এর নিষ্পাপ চরিত্রের নিদর্শন পেয়ে তাকে কারাবন্দি করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইউসুফ (আ) এর সততা ও স্বপ্নের সুব্যাখ্যা দেয়ার বিষয়টি উপলদ্ধি করে রাজা তাকে কারামুক্ত করেন এবং নিজের নিকটবর্তী করেন। সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) রাজাকে বলেছিলেন তাকে যেন কোষাগারের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং রাজা তাঁর অনুরোধ রেখেছিলেন। তাই তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ইউসুফ (আ) জাহেলী শাসন ও শাসনব্যবস্থার মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা ছিল বনী ইসরাইলের শারী’আহ্’র বিপরীত। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তিনি (আ) রাজার দ্বীনের (ব্যবস্থার) অথার্ৎ রাজার শাসন ও কতৃর্ত্বের উপর বহাল ছিলেন, এমনকি তিনি (আ) নিজের ভাইকে তাঁর নিকটে রাখতে কৌশল হিসেবে ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ উল্লেখ করেন। ভাইয়ের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ দায়ের করার পুরো ঘটনাটিই ছিল তাঁর একটি কৌশল কারণ ইয়াকুব (আ) শারী’আহ্ মোতাবেক চোরকে দাসত্ব বরণ করতে হতো।
তারা আরও বলে বিষয়টি যে শুধুমাত্র সাইয়্যিদূনা ইউসুফ (আ)-এর জন্যই প্রযোজ্য এটা বলা যাবে না কারণ তা বলার জন্য দলিল প্রয়োজন। কারণ মৌলিকভাবে নবীগণ (আ) এবং তাঁদের (আ) নির্দেশিত পথের ব্যাপারে যাই উল্লেখ আছে তাই আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।
তাছাড়া তারা আরো বলে কারও এ দাবীও করা উচিত নয় যে এটা আমাদের পূর্ববতীর্গণের জন্য প্রযোজ্য শারী’আহ্ হতে এসেছে, কারণ শাসন সংক্রান্ত বিষয়টি শারী’আহ্’র ফুরু (শাখা) হতে উৎসারিত হয়নি যেখানে ভিন্নতার অবকাশ থাকবে বরং তা উসূল হতে উৎসারিত যেখানে সকলের ঐক্যমত্য রয়েছে। তাছাড়া সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) জানতেন যে,
“হুকুম একমাত্র আল্লাহ্’র।”
(সূরা ইউসুফ: ৪০),এবং তা জানা সত্ত্বেও তিনি (আ) রাজার শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।
সূরা ইউসুফের এ বিষয় সংক্রান্ত আয়াতগুলো অধ্যয়ন করলে লক্ষ্য করা যায় যে নিম্নোক্ত আয়াত দু’টির উপর ভিত্তি করে তারা কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বৈধতার পক্ষে মতামত দেয়,
“সে বাদশাহ্’র আইনে নিজ ভাইকে কখনও দাসত্বে দিতে পারত না, যদি আল্লাহ্ না চাইতেন।”
(সূরা ইউসুফ: ৭৬)এবং
“(ইউসুফ) বলল: আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন।”
(সূরা ইউসুফ: ৫৫)তারা বিষয়টিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যাতে তা তাদের মতামতের সাথে মিলে যায়। তারা ভুলে গেল সেসব মূলনীতির কথা যেগুলোর উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত যা তাদের মতের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং সেইসব আয়াতগুলোকে পাশ কাটিয়ে গেল যা তাদের এই ব্যাখ্যার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তারা নবীদের নিষ্পাপতার বিষয়টিও ভুলে গেল। যদি এ আয়াত দুটির ব্যাপারে তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয় তবে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) সম্পর্কিত তাদের সকল ব্যাখ্যাও ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হবে।
নবীগণ আল্লাহ্’র সকর সৃষ্টির মাঝে পবিত্রতম এবং তারা নির্বাচিত। স্বীয় দ্বীনকে বিস্তৃত করার জন্যই তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাদের (আ) নির্বাচিত করেছেন। তারা (আ) ছিলেন তাদের স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য সঠিক দৃষ্টান্ত ও অনুসরণীয় আদর্শ। কারণ তারা (আ) আল্লাহ্’র হুকুমকে সর্বোত্তম উপায়ে পালন করেছেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদেরকে সমস্ত গুণাহ্ এবং প্রলোভন হতে পবিত্র রেখেছেন, এবং তাদেরকে সত্যের উপর অবিচল রেখেছেন এবং তাদের সাহায্য করেছেন। সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) ছিলেন সেই বাছাইকৃতদেরই একজন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একাধিক আয়াতে তাঁর প্রশংসা ও তারিফ করেছেন।
“এমনিভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন এবং পূর্ণ করবেন স্বীয় অনুগ্রহ….”
(সূরা ইউসুফ: ৬)“যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে গেল, তখন তাকে প্রজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি দান করলাম। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে প্রতিদান দেই।”
(সূরা ইউসুফ: ২২)“এটা ছিল এজন্য যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ ও নির্লজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয়ই সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন।”
(সূরা ইউসুফ: ২৪)“এমনিভাবে আমি ইউসুফকে (মিশরের) ভূখন্ডে ক্ষমতা দান করলাম। সে তথায় যেখানে ইচ্ছা স্থান করে নিতে পারত। আমি স্বীয় রহমত যাকে ইচ্ছা পৌঁছে দেই এবং আমি পুণ্যবানদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না।”
(সূরা ইউসুফ: ৫৬)আল্লাহ্’র নিকট তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ের দাওয়াহ্ বহনকারী ছিলেন। পবিত্র কুর’আনে উল্লেখ আছে যে যখন কয়েদখানায় তার সহকয়েদীরা তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইল তখন তিনি বলেলেন,
“হে কারাগারের সঙ্গীরা। পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, নাকি পরাক্রমশালী এক আল্লাহ্? তোমরা আল্লাহ্’কে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের এবাদত করছো, যেগুলো (অজ্ঞতাবশত) তোমাদের ও তোমাদের বাপ-দাদাদের সাব্যস্ত করে নেয়া। অথচ এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন দলীল-প্রমাণ নাযিল করেননি। আল্লাহ্ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও এবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”
(সূরা ইউসুফ: ৩৯-৪০)তিনি ছিলেন পরিশুদ্ধ, আল্লাহ্’র প্রতি আনুগত্যশীল এবং তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতেন। সে কারণে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে নারীদের ও আল আযিযের স্ত্রীর কূটকৌশল থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং যা পবিত্র কুর’আনে বর্ণিত আছে,
“ইউসুফ বলল: হে প্রতিপালক, তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করে, তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার উপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তভুর্ক্ত হয়ে যাব। অতঃপর তার প্রতিপালক তার দো’আ কবুল করে নিলেন। অতঃপর তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।”
(সূরা ইউসুফ: ৩২-৩৪)লোকেরা তাঁর ধর্মপরায়ণতা, সততা ও মহত্ত্ব পরীক্ষা করেছে। কয়েদখানায় তার দু’জন সহচর বলেছিল,
“আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলুন। আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখতে পাচ্ছি।”
(সূরা ইউসুফ: ৩৬)রাজা স্বপ্ন দেখার পর দুই বন্দীর একজন যিনি মুক্ত হয়েছিলেন তিনি ইউসুফ (আ)-কে বললেন,
“হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী।”
[সূরা ইউসুফ: ৪৬]নির্দোষিতা প্রমাণের আগে কারাগার থেকে মুক্তির প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করায় তাঁর সম্পর্কে নারীগণ বলল,
“তারা বলল: ‘আশ্চর্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র মাহাত্ম্য! আমরা তো তাঁর উপর কোন পাপ কিংবা এ ধরণের কোন অভিযোগই দেখতে পাইনি!’ (একথা শুনে) আযীযের স্ত্রী বলল: ‘এখন (যখন) সত্য প্রকাশিত হয়েই গেছে, (তখন আমাকেও বলতে হয়, আসলে) আমিই তাঁর কাছে অসৎ কাজ কামনা করেছিলাম, অবশ্যই সে ছিল সত্যবাদীদের একজন।”
(সূরা ইউসুফ: ৫১)ইউসুফ (আ) এর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে রাজা বললেন,
“বাদশাহ্ বলল: তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখব।”
(সূরা ইউসুফ: ৫৪)তাঁর ভাইকে নেয়ার সিদ্ধান্তের পর, ভাই বলল,
“সুতরাং আপনি আমাদের একজনকে তাঁর বদলে রেখে দিন। আমরা আপনাকে অনুগ্রহশীল ব্যক্তিদের একজন দেখতে পাচ্ছি।”
(সূরা ইউসুফ: ৭৮)সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) তাক্ওয়া, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও পাপ থেকে মুক্ত থাকার কারণে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে যে রহমত দিয়েছেন তা তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন,
“বললেন: আমিই ইউসুফ এবং এই হল আমার সহোদর ভাই। আল্লাহ্ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয়ই যে তাক্ওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, আল্লাহ্ এহেন সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।”
(সূরা ইউসুফ: ৯০)যার ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজে এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারী সকলেই সাক্ষ্য প্রদান করছেন তাকে কিভাবে কিছু মুসলিম অভিযুক্ত করে? পবিত্র কুর’আনে তিনি রাজার আইন দিয়ে শাসন করেছেন এ ব্যাপারে একটি দৃষ্টান্তও উল্লেখ নেই। তিনি যে আইন দিয়ে শাসন করেছেন তার সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতটি বাদে আরও কোনকিছু উল্লেখ নেই,
“তারা বলল: এর শাস্তি এই যে, যার রসদপত্র থেকে তা পাওয়া যাবে, এর প্রতিদানে সে দাসত্বে যাবে।”
(সূরা ইউসুফ: ৭৫)এই হুকুমটি ছিল ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ অনুসারে। তিনি আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসন করেছেন এ ব্যাপারে কোন দৃষ্টান্ত বা জ্ঞান কারও জানা নেই। তাদের সন্দেহযুক্ত যুক্তি নিম্নোক্ত আয়াত থেকে আসে:
“সে বাদশাহ্ আইনে আপন ভাইকে কখনও দাসত্বে দিতে পারত না, কিন্তু আল্লাহ্ যদি ইচ্ছা করেন।”
(সূরা ইউসুফ: ৭৬)যখন এ আয়াতটির সঠিক তাফসীর করা হয় তখন সব সুবাহ বা সন্দেহ দূর হয় এবং তাদের দাবী অযৌক্তিক প্রমাণিত হয়।
এই পদ্ধতির পক্ষালম্বনকারীরা আয়াতটিকে দ্বান্দিক মনে করে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যা তাদের অবস্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তাদের ব্যাখ্যা ছিল নিম্নরূপ-
দূর্ভিক্ষের বছর, লোকেরা প্রতিটি এলাকা থেকে ইউসুফ (আ) কাছে আসা শুরু করল যাতে করে সংরক্ষিত ফসল থেকে তারা কিছু পায় এবং রাজা এগুলো বন্টনের দায়িত্ব ইউসুফ (আ) এর উপর ন্যস্ত করেছিলেন। তাঁর ভাইয়েরা আসল। যদিও ভাইয়েরা তাকে সনাক্ত করতে পারেনি, কিন্তু তিনি ঠিকই ভাইদের সনাক্ত করতে পারলেন। তিনি তার ছোট ভাইকে বললেন যে তিনি তাদের ভাই। তিনি তাঁর ভাইয়ের জন্য একটি কৌশল আঁটলেন। সবার অগোচরে একটি পানপাত্র বা সিকায়াহ তার ভাইয়ের উটের জিনের মধ্যে পুরে দিলেন। অতঃপর তিনি ঘোষণা করে দিলেন যে পানপাত্রটি চুরি গেছে এবং কেউ বলল ঐ উটের বহরের কেউ এটি চুরি করেছে। যে তা খুঁজে বের করবে তাকে একটি শস্যবাহী উট দ্বারা পুরষ্কৃত করা হবে। ইউসুফ (আ)-এর ভাইয়েরা এ দাবীকে তীব্রভাবে প্রত্যাখান করল। যারা বিতরণকার্য তত্ত্বাবধান করছিলেন তারা বললেন,
“…….যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও, তবে যে চুরি করেছে তার কি শাস্তি?”
(সূরা ইউসুফ: ৭৪)ইউসুফ (আ)-এর ভাইগণ বললেন,
“…….শাস্তি হচ্ছে, যার রসদপত্রের মাঝে তা পাওয়া যাবে, প্রতিদানে সে দাসত্বে যাবে।”
(সূরা ইউসুফ: ৭৫);অর্থাৎ চুরির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবে। আর এটা ছিল ইয়াকুব (আ) এর শারী’আহ্ মোতাবেক শাস্তি। সে কারণে ইউসুফ (আ) তার ভাইয়ের তল্পিতল্পা খোঁজার আগে অন্যদের তল্পিতল্পা খোঁজা শুরু করলেন। অতঃপর তার ভাইয়ের থলে থেকে এটি উদ্ধার করা হল এবং নিয়ম অনুসারে তাকে দাসত্ব বরণ করতে হল। তারপর ইউসুফ (আ) সম্পর্কে আয়াতটি বর্ণিত হয়েছে,
“সে বাদশাহ্’র প্রচলিত আইনানুযায়ী তাঁর ভাইকে তাঁর নিকটে রাখতে পারত না।”
(সূরা ইউসুফ: ৭৬);কেউ কেউ এটাকে রাজার শারী’আহ্ (আইন) বা নিযাম (জীবন ব্যবস্থা) বলে ব্যাখ্যা করে থাকে। এর অর্থ হল মিশরের রাজার একটি শারী’আহ্ বা ব্যবস্থা ছিল এবং সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) তা দ্বারা পরিচালিত হতেন। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণে তিনি কৌশলের আশ্রয় নিলেন যাতে তাঁর ভাইকে তাঁর কাছে রেখে দেয়া যায়। সে কারণে তিনি একটি শিষ্টাচারসম্মত কৌশলের আশ্রয় নিলেন এবং অভিযুক্তকেই তার শাস্তির ব্যাপারে মতামত দিতে বললেন। তিনি রাজার আইনানুসারে এ অপরাধের শাস্তি কি মোটেও তা বর্ণনা করেননি। বরং তিনি ভাইদের মুখ দিয়ে ইয়াকুব (আ)-এর আইনানুসারে রায় বের করে নিয়ে এসেছেন যাতে নিজ ভাইকে নিজের কাছে রাখা যায়।
আয়াতের এহেন ব্যাখ্যাই তাদেরকে উপরোক্ত উপলদ্ধিতে আসতে সহায়তা করেছে।
আমরা যদি আরবীতে ‘দ্বীন’ শব্দটির উপর আলোকপাত করি তাহলে দেখতে পাব যে, এটি একটি সার্বজনীন শব্দ যার একাধিক অর্থ রয়েছে। লিসান আল আরব (আরবদের ভাষা) ভাষাকোষ অনুসারে ‘দ্বীন’ বলতে বুঝায় বলপ্রয়োগের শাসন এবং আনুগত্য। সুতরাং ‘দ্বীনতুহুম ফা দ্বানও’ অর্থ হল ‘আমি তাদেরকে বাধ্য করলাম, তারা আমাকে আনুগত্য করল।’ দ্বীন বলতে আরও বুঝায় পুরষ্কার ও মূল্যবান বস্তু। ‘আমি তাকে পুরষ্কৃত করলাম’ এটা ব্যক্ত করতে আপনি বলতে পারেন, ‘তার দ্বীনুন কাজের জন্য দ্বীনতুহু’। আবার ‘ইয়াওম আল-দ্বীন’ অর্থ হল ‘বিচার দিবস’। ‘দ্বীন’ বলতে জবাবদিহী করাকেও বোঝায়। যেমন: আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“যিনি বিচার দিবসের মালিক।”
(সূরা ফাতিহা : ৪)দ্বীন এর আরেকটি অর্থ হল শারী’আহ্ এবং সুলতান। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না সমস্ত ফিত্না দূর হয়, এবং আল্লাহ্’র সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়।”
(সূরা আনফাল: ৩৯)দ্বীন শব্দের আরও অর্থ হল অবমাননা বা দাসত্ব বরণ করা এবং ‘মাদ্বীন’ অর্থ হল দাস। আল-মাদ্বীনা মানে অধীনস্থ জাতি। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন, “আমরা কি মাদ্বীনুন?” [আল কুর’আন- ৩৭: ৫৩] যার অর্থ ‘অধিকার লাভ’।
একইভাবে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) অন্যত্র বলেন,
“যদি তোমাদের হিসাব-কিতাব না হওয়াই ঠিক হয়, তবে তোমরা একে (আত্মাকে) ফিরিয়ে দাও না কেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও?”
[সূরা আল ওয়াক্বিয়াহ্: ৮৬-৮৭];এখানেও মাদ্বীনান অর্থ হল ‘অধিকার প্রাপ্ত হওয়া’।
‘দ্বীন’ এর এরকম আরও অনেক অর্থ রয়েছে।
সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন অর্থটি বুঝিয়েছেন? এই অর্থগুলোর মধ্যে থেকে কোনও একটি অর্থ গ্রহণ করতে হলে সেই সুনির্দিষ্ট অর্থের প্রতি ইঙ্গিতদানকারী ক্বারিনা (নির্দেশক) প্রয়োজন। যদি কেউ তা না করে তার মত ও দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ গ্রহণ করে; নিজের খেয়াল-খুশিকে শারী’আহ্’র উপর স্থান প্রদান করে তবে তার অসৎ উদ্দেশ্য উন্মোচিত হবে। অন্যদিকে যিনি শারী’আহ্ ক্বারা’ইন (নির্দেশনা) কতৃর্ক দিকনির্দেশনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সীমাবব্ধ থেকে অর্থ গ্রহণ করেন, তিনি শারী’আহ্’কে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং প্রভূর হুকুম পালন করেছেন বলে গণ্য হবেন। সুতরাং বুঝা দরকার যে এসব একাধিক অর্থের মধ্যে কোন অর্থটি আসলে ঊদ্দেশ্য?
আমরা যদি বলি দ্বীন শব্দটি এখানে শারী’আহ্ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে আমাদের জানা উচিত শারী’আহ্’র নির্দেশনা এমন যেকোন ধরনের ব্যাখ্যা হতে আমাদের বিরত থাকতে বলেছে, যে ব্যাখ্যা মনে করে যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেছেন। কারণ তা নবীগণ(আ) এবং বিশ্বাসীগণদের জন্য হারাম করা হয়েছে, এবং তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃর্ক প্রেরিত বাণীর প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক যে বাণী একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইবাদত ও দাসত্বের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং তা আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র মালিক একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-এই বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।”
(সূরা আম্বিয়া: ২৫)একই কথা ইউসুফ (আ) এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যখন তিনিও বলেন,
“আল্লাহ্ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”
(সূরা ইউসুফ: ৪০)এটা অসম্ভব যে তিনি এ আয়াতের ব্যাত্যয় ঘটিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রভূর হুকুমকে মেনে নিয়েছেন। একই অবস্থা আমরা সাইয়্যিদুনা শোয়াইব (আ) এর ক্ষেত্রেও দেখতে পাই, যখন তিনি বলেন,
“আর আমি চাই না যে তোমাদেরকে যা ছাড়াতে চাই পরে নিজেই সে কাজে লিপ্ত হব, আমিতো যথাসাধ্য শোধরাতে চাই। আল্লাহ্’র মদদ দ্বারাই কিন্তু কাজ হয়ে থাকে, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি এবং তাঁরই প্রতি ফিরে যাই।”
(সূরা হুদ: ৮৮)আল কুরতুবীর মতে এ আয়াতের তাফসীর হল আমি নিজে যা করি সে সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করতে পারি না যেমনিভাবে আমি তোমাদের যা করার আদেশ দেই তা পরিত্যাগ করি না।
‘দ্বীন’ শব্দের অভিপ্রেত অর্থ যদি ’দাসত্ব’ নেয়া হয় যার মানে হচ্ছে তার ভাই ‘মাদ্বীনান’ অর্থাৎ মালিকবিহীন দাসে পরিণত হয়েছে তাহলে এই অর্থ পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ যাতে ইউসুফ (আ) এর ভাইয়ের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে চোরকে দাসত্বে আবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং আয়াতটির অর্থ দাঁড়ায় এই যে, রাজা কতৃর্ক দাসে পরিণত না হলে অর্থাৎ মাদ্বীন (মালিকানাধীন দাস) না হলে তিনি তাঁর ভাইকে নিতে পারতেন না যদি না আল্লাহ্ ইচ্ছা করতেন। আর এই অর্থই সত্যের খুব কাছাকাছি। এমন কোন শারী’আহ্ ইঙ্গিত নেই যা এরূপ অর্থের অন্তরায় হতে পারে। বরং আয়াতে এর আগে যা এসেছিল তার সাথে এটা সঙ্গতিপূর্ণ এবং এটা প্রমাণ করে যে, সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) একজন মুহসীন বা সৎকর্মশীল, মুখলেসীন বা আল্লাহ্’র প্রতি আন্তরিক যেমনটি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন। লোকেরা যে বিষয়ে স্বাক্ষ্য দিয়েছে এটা তার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
সেকারণে এরকম তাফসীর প্রত্যাখাত হবে যা নবীদের নিষ্পাপতা ও পাপ থেকে পবিত্র হওয়ার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক এবং যার মানে দাঁড়ায় তারা যা বলেন তা করেন না।
রাজার প্রতি সাইয়্যুদনা ইউসুফ (আ)-এর বক্তব্যের তাফসিরের বেলায়,
“(ইউসুফ) বলল: আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান।”
(সূরা ইউসুফ: ৫৫)এর তাফসীর প্রসঙ্গে তারা বলতে চায়, তিনি অর্থমন্ত্রী হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন এবং এ পদে তাকে বহালের সময় তিনি ইয়াকুব (আ) এর শারী’আহ্ প্রয়োগ করেননি, বরং রাজার ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছেন যা ন্যায়বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলনা।
এটি একটি বিশাল পদস্খলন ও সত্য বিচ্যুতি। বিষয়টিতে সঠিক পথনির্দেশনা পেতে হলে আমাদেরকে নিম্নে বর্ণিত কিছু ইস্যুর সাথে পরিচিত হওয়া খুবই জরুরী।
— সেসময়ের শাসব্যবস্থাটি ছিল রাজতান্ত্রিক যেখানে রাজা তার নিজের আদেশ ও মতামতের ভিত্তিতে রাজ্য পরিচালনা করতেন। ইতিহাসে দু’ধরনের রাজতান্ত্রিক শাসব্যবস্থা দেখা যায়:
— রাজতন্ত্রের নির্বাহী ব্যবস্থায় রাজা তার মতামত ও হুকুমের মাধ্যমে রাজ্য পরিচালনা করেন। লোকদের তাই মানতে হয় যা কিছুকে রাজা উপযুক্ত মনে করেন এবং কেউ তার বিচারকে পরিবর্তন করতে পারেন না। আইন, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ সবই থাকে তার করতলগত। তিনি নিজে তার সহকারীদের নিয়োগ দেন এবং যখন খুশী তখন অপসারণ করেন। আনুগত্য ও ঘনিষ্টতার উপর নির্ভর করে অথবা তাদের যথার্থ বিচার ও সুপরিকল্পনার জন্য তিনি তাদের এ পদে নিযুক্ত করেন। এইসব সহকারীদের আনুগত্য ও বাধ্যতাই মুক্তভাবে শাসন করবার জন্য যথেষ্ট এবং তখন তারা নিজেদের হুকুম ও মতামতের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করতে পারেন। অর্থাৎ ক্ষুদ্র পরিসরে তারা প্রত্যেকেই আলাদাভাবে একেকজন রাজা।
— সীমাবদ্ধ নির্বাহী ক্ষমতাচর্চার মাধ্যমে রাজতন্ত্র। এ ব্যবস্থায় রাজা একজন প্রকৃত রাজার বদলে একটি প্রতিচ্ছবি হয়েই থাকেন যেখানে তার নিরঙ্কুশ কোন ক্ষমতা থাকে না। এক্ষেত্রে রাজা নন, সংবিধান ও কানুনের উপর সার্বভৌমত্বের দায়িত্ব অর্পিত থাকে। রাজাকে ছাড়াই আইনপ্রণেতাগণ আইন প্রণয়ন করেন। এমন নির্বাহী কাঠামো থাকে যারা সংবিধান ও কানুন বাস্তবায়ন করে থাকেন। এছাড়াও এমন বিচার কাঠামো থাকে যারা রাজা ব্যতিরেকে বিবাদ মিমাংসা করেন এবং লোকদের মধ্যে বিরোধের অবসান ঘটান। এ ধরনের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাপকতা পায় যখন গণতন্ত্র বিস্তৃতি লাভ করে। আর এটাই হল সীমাবদ্ধ বা সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। ইউসুফ (আ) এর সময়ে মিশরে তাহলে এই দু’টির মধ্যে কী ধরনের রাজতন্ত্র বলবৎ ছিল?
কেউ এ বিষয়টি কল্পনাও করতে পারবে না যে সেসময় মিশরের রাজা কোন ব্যবস্থা বা সংবিধানের অনুগত ছিলেন। ‘দ্বীন আল মালিক’ বলতে তারা বুঝায় তা নয় বরং রাজার আইনকেই বোঝানো হয়। শাসকের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রনকারী আজকের রাজতন্ত্র ও ইউসুফ (আ)-এর সময়কার রাজতন্ত্রের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়ার ভিত্তিতে যে মতামত তা সঠিক মতামত থেকে বিচ্যুত এবং এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ সাদৃশ্যতা।
কোষাগারের দায়িত্ব প্রদান করতে রাজার প্রতি সাইয়িু্যদুনা ইউসুফ (আ)-এর অনুরোধ এবং এ ব্যাপারে রাজার সম্মতির সাথে শাসনের কোনরূপ সম্পর্ক বিদ্যমান নেই। বরং কুর’আন এ বিষয়টিকে স্বপ্নের বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে এবং এর বাইরে আর কিছুই নয়। এটা ফসলের উৎপাদন, ফসল কাটার বছর, খরার বছর এবং এ ব্যাপারে করণীয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সেকারণে তিনি বাহুল্য বর্জন করে অর্পিত বিশ্বাসে আস্থা রেখে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) কে ময়দা মজুদ করবার দায়িত্ব নিতে এবং খরার বছরের জন্য ফসল কাটার বছরে বন্টনের ব্যবস্থা করবার আদেশ করেন। এটা ছিল একটি কঠিন কাজ এবং এটা ইউসুফ (আ)-এর মত কোন দক্ষ, বিশ্বস্ত, সচেতন এবং জ্ঞানী ব্যক্তি ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের সাথে যা হয়েছে তা আলোচ্য ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমাদের এ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোন সুযোগ নেই এবং সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর দায়দায়িত্ব পর্যন্ত একে বিস্তৃত করবার কোন সুযোগ নেই। আমরা এ কথা বলার অধিকার রাখি না যে সম্পদ সংগ্রহ করা এবং তা রাজার পরিষদবর্গ, পরিবার, সেনাবাহিনী ও নাগরিকদের জন্য ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ ব্যতিরেকে রাজার ব্যবস্থা অনুযায়ী ব্যায় করা ছিল তাঁর দায়িত্ব। কিতাবের বাণীর এহেন ব্যাখা দেয়ার জন্য দলিল প্রয়োজন।
মুলতঃ রাজা ইউসুফ (আ)-এর বিচক্ষণ রায়, বিষয়াদি পর্যালোচনার ক্ষমতা ও দক্ষতার বিষয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। আর এটাই ইউসুফ (আ) কে রাজার অত্যন্ত নিকটে নিয়ে এসেছিল এবং এতো বড় দায়িত্বে নিযুক্ত হবার সুযোগ করে দিয়েছিল যা স্বপ্ন দেখার পর থেকেই তার (রাজার) মনে আসন গেড়েছিল। অতএব এটা গুরুত্বপূর্ণ যে ইউসুফ (আ) অন্য কারো হস্তক্ষেপ ছাড়াই এ সুযোগ লাভ করেছিলেন।
কেঊ হয়ত এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) কেবলমাত্র রাজার স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করেননি। বরং তিনি এ ব্যাপারে বিকল্প ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সংস্থার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন। এটাই গুদামজাত পণ্যের দেখাশুনার দায়িত্ব প্রদান করতে ও এ ব্যাপারে তাকে স্বাধীন ক্ষমতা প্রদানে রাজাকে আস্থাশীল করেছে। রাজা ইউসুফ (আ) কে এমনটা বলেননি যে তার একটি শারী’আহ্ বা ব্যবস্থা রয়েছে এবং এটা দিয়েই পরিচালিত হতে হবে। বরং রাজা ইউসুফ (আ) এর স্বপ্নের ব্যাখ্যা এবং এ ব্যাপারে তার সমাধানকে গ্রহণ করেছেন। ফলে রাজা উপযুক্ত মনে করেই তাকে ফসল বন্টন ও মজুদের দায়িত্ব দেন।
এটা অনস্বীকার্য যে খরার বছরের পর ইউসুফ (আ)-এর কাছে জনগণকে দুভীর্ক্ষ থেকে উদ্ধারের জন্য আসতে হয়েছে। এটাও অবধারিত যে সুবিচার ও সঠিক বন্টনের জন্য তার সুখ্যাতি দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটা রাজার সাথে তার সম্পর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে ও তাকে আরও নিকটে নিয়ে এসেছে। হয়ত এটাই তাকে আজিজ হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে যেমনটি তার ভাইদের কথায় পাওয়া যায়।
“হে ভূমির অধিপতি (হে আযীয)।”
(সূরা ইউসুফ : ৮৮);সেই রাজা যার কাছে তার পিতামাতাকে মরুভূমি থেকে আসতে হয়েছে।
তিনি রবের নিকট দু’আ করলেন এবং বললেন;
“হে আমার রব! তুমি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছ……।”
(সূরা ইউসুফ: ১০১)অতঃপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“সে তার পিতামাতাকে উচ্চাসনে বসালো…।”
(সূরা ইউসুফ: ১০০);এর অর্থ হল তাকে কর্তৃত্বও দেয়া হয়েছিল।
পবিত্র কুর’আন এর বর্ণনানুসারে একমাত্র আইন যা ইউসুফ (আ) বাস্তবায়ন করেছিলেন তা হলো ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ অনুসারে তার ভাইকে দাস হিসেবে গ্রহণ করা। যদি রাজার কোন সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সেটা না গ্রহণ করার মাধ্যমে তিনি রাজকীয় ব্যবস্থার ব্যাত্যয় ঘটালেন কেন?
এটা কল্পনা করা সম্ভব নয় যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) শারী’আহ্’র বিন্দুমাত্র ব্যাত্যয় ঘটিয়েছেন। কারণ তিনি হলেন মাসুম বা ভুলের উর্ধ্বে এবং তাঁর রব তাকে মুহসীন বা উত্তম, আন্তরিক ও ধার্মিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যিনি প্রেমের চেয়ে কারাভোগকে অির্ধক প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি কারাগারের ভেতরে দাওয়াহ্’র কাজ করতেন। তিনি নিজেকে নিরাপরাধ প্রমাণ না করে কারাগার থেকে বের হতে চাননি। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর সততা ও দক্ষতার কারণে আযীয পত্নী হতে শুরু করে শহরের নারীগণ, কারাগারে তাঁর দুই সাথী, রাজার, এমনকি পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে তাঁর ভাইগণ পর্যন্ত তৎকালীন সমাজের সকর কাফেরদের প্রসংশা অর্জন করেছিলেন।
এটা উল্লেখযোগ্য যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর অবস্থা ও রাজার রাষ্ট্রবিষয়ক তাফসীর এসবই হল তাফসির জান্নি (ধারণামূলক ব্যাখ্যা (Speculative interpretation))। যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তারা আসুক না কেন সবই অসাঢ়। সুতরাং রাজা কি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন নাকি কাফের রয়ে গিয়েছিলেন, নাকি রাজার মৃত্যু বা অপসারণের পর রাজর্ষিক দায়িত্ব ইউসুফ (আ)-এর উপর অর্পিত হয়েছিল, নাকি পূর্বের আযিযের মৃত্যু বা অপসারণের পর তিনি কি আযিয হয়েছিলেন-এসব সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বক্তব্য হল :
“সে বাদশাহ্ আইনে নিজ ভাইকে দাসত্বে নিতে পারত না।”
[সূরা ইউসুফ: ৭৬],অথবা তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) বক্তব্যের ব্যাখ্যা,
“আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন……।”
[সূরা ইউসুফ : ৫৫];এসব প্রশ্নের সব উত্তরই ধারণামূলক (Speculative)। কারণ পবিত্র কুর’আন এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে উত্তরের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করেনি। এছাড়া এ বিস্তারিত বিষয়গুলো আইন হিসেবে মেনে নেয়া আমাদের জন্য অপরিহার্যও নয়। আমাদের ব্যাখ্যাও এর ব্যতিক্রম নয়, যেহেতু এটাও অন্যান্য ধারণামূলক (Speculative) ব্যাখ্যার মতোই ভিন্নরুপের আরেকটি ব্যাখ্যা মাত্র। তবে আমাদের ব্যাখ্যাটি অন্যান্য ব্যাখ্যার চেয়ে এদিক থেকে অনন্য যে এটা তাক্বওয়া ও ঈমানের ভিত্তিতে নবীদের যথার্থতা তুলে ধরে এবং নবীদের নিষ্পাপতার সাথেও সাংঘর্ষিক নয় যা কিনা দ্বীনের অন্যতম ভিত্তি। একটি ব্যাখ্যা সত্য হতে কতটা বিচ্যুত হতে পারে যার নমূনা ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি যখন তা স্বয়ং ইউসুফ (আ) মুখ হতে নিসৃত অকাট্য বক্তব্য যা তিনি শিরকের আক্বীদা বর্জনের জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন তার সাথে সাংঘর্ষিক হয় এবং বিচার-ফয়সালায় শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রতি মুখাপেক্ষিতাকে বর্জন করে? এভাবে অগ্রসর হয়ে ইউসুফ (আ) এর পরিস্থিতি সুস্পষ্ট করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি অবস্থায় উপনীত হতে পারি যেখান থেকে কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের পক্ষে কোন সমর্থন পাওয়া যায় না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীই হলো শারী’আহ্’র হুকুম, কোন ধারণানির্ভর (Speculative) হুকুম নয়। এটা দলিলের অর্থ ও সত্যতার বিচারে অকাট্য।
কেউ হয়ত বলতে পারে যে ইউসুফ (আ) আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নির্দেশ মোতাবেকই রাজার ব্যবস্থা অনুসারে শাসন করেছিলেন এবং এতে তাঁর রবের ইচ্ছাই প্রতিফলিত হয়েছে। এর উত্তরে বলা যায়, হয় এই কুফর ব্যবস্থা দিয়ে শাসন করার অনুমোদন সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর জন্য সুনির্দিষ্ট ছিল, না হয় তা ছিল সার্বজনীন?
যদি এটা শুধুমাত্র সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর জন্য সুনির্দিষ্ট হয়ে থাকে তাহলে এটা আমাদের জন্য অনুমোদিত নয়। সে কারণে এটা আমাদের জন্য দলিল বা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে না।
দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, যদি এটা তৎকালীন সময়ের সার্বজনীন হয়ে থাকে তাহলে এটা এমন একটি হুকুম যা পূর্ববর্তীগণের শারী’আহ্’র বর্ণনা হিসেবে আমাদের নিকট এসেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পূর্ববতীর্গণদের শারী’আহ্ কি আমাদের জন্য প্রযোজ্য? একদল ফিক্হ ও উসূলবিদগণ নিম্নোক্ত উসুলী মূলনীতিটি বর্ণনা করেছেন,
“পূর্ববতীর্গণদের শারী’আহ্, আমাদের জন্য শারী’আহ্ নয়।”
এ ব্যাপারে অনেক দলিল পেশ করা যায়, যার মাধ্যমে দেখানো যাবে যে মুহম্মদ (সা) আনীত ব্যবস্থা পূর্ববর্তী সকল শারী’আহ্’র হুকুমকে রহিত করেছে এবং কিছু হুকুমকে ব্যাখ্যাসহ রহিত করেছে। আমরা যদি এই চিন্তাবিদদের মতামতকে গ্রহণ করি, তাহলে ইউসুফ (আ)-এর সময়কে কিংবা অন্যকোন নবীর (আ) সময়কে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা বা অনুসরণ করা অনুমোদিত নয়। আরেকদল ফিক্হ ও উসুলবিদ নিম্নোক্ত মূলনীতিটি বর্ণনা করেছেন,
“পূর্ববতীর্গণদের শারী’আহ্ ততক্ষণ আমাদের জন্য শারী’আহ্ হয়ে থাকবে যতক্ষন না তা রহিত হয়।” এসব চিন্তাবিদগণ তাদের আইনগত কারণও উল্লেখ করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, যদি পূর্ববতীর্দের আইনের মধ্যে আমাদের কোন উপকারীতা না থাকত তবে সেগুলো পবিত্র কুর’আনে বর্ণিত হতো না। তারা আরও বলে থাকেন যে পবিত্র কুর’আন পূর্ববর্তী শারী’আহ্’র হুকুমকে হঠাৎ রহিত করেনি। তারা বলেন যে, পূর্ববতীর্দের ব্যাপারে পবিত্র কুর’আন এবং হাদীসে যা বলা হয়েছে তা আমাদের জন্যও প্রযোজ্য যদি না নতুন কোন আইন দ্বারা সেগুলো রহিত কিংবা প্রতিস্থাপিত হয়।
যখন এই মূলনীতিকে আমরা আলোচ্য বিষয়ে প্রয়োগ করি তখন আমরা কি পাই? আমাদের শারী’আহ্ কী আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা বাদ দিয়ে অন্য কিছু দিয়ে শাসন করাকে অবৈধ করেনি? পবিত্র কুর’আন বা মুহাম্মদ (সা), শাসনের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ (সা)-এর শারী’আহ্ হতে চুল পরিমাণ বিচ্যুতির ব্যাপারে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেনি?
অবশ্যই মুহম্মদ (সা)-এর শারী’আহ্ আমাদের বিচার-মীমাংসার ক্ষেত্রে সেটি ছাড়া অন্যকোন কিছুর নিকট দ্বারস্থ হতে নিষেধ করেছে। কুফর ও জাহেলিয়াতের কাছ থেকে যেকোন হুকুম নেয়া থেকে বিরত থাকবার জন্য অকাট্যভাবে নিষেধ করা হয়েছে। যদি এটা দাবি করা হয় যে এটা সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর সময়ে বৈধ ছিল, তাদেরকে আমরা বলতে চাই যদি তাদের কথা মেনেও নেয়া হয় তারপরেও কুর’আনের শারী’আহ্ মোতাবেক এটা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ (রহিত)।
যারা বলেন যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করার দৃষ্টিভঙ্গী উসূল থেকে উৎসারিত, শাখা থেকে নয়, তাদের এ মতটিও সঠিক নয়। কারণ বিশ্বাসের জায়গা হল চিন্তায় এবং শারী’আহ্গত হুকুমের জায়গা হল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। আক্বীদা হল শারী’আহ্’র ভিত্তি এবং শারী’আহ্গত হুকুম হল আক্বীদার ফসল।
বান্দার কাজের সাথে সম্পর্কিত শারী’আহ্গত হুকুমের দু’টি দিক রয়েছে :
১. বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিশ্বাসগত দিক যা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।
এই ক্ষেত্রটি আক্বীদার সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং দলিল ক্বাতী’ঈ (অকাট্য) কিংবা জান্নি (ধারণামূলক) যাই হোক এর অস্বীকার কুফরী বা পাপের দিকে ধাবিত করবে।
— ব্যবহারিক দিক যা কার্যসম্পাদনের সাথে সম্পর্কযুক্ত।
যেমন: সালাত হল ফরয এবং এটাকে ফরয হিসেবেই বিশ্বাস করতে হবে। এটাকে ফরয হিসেবে বিশ্বাস না করা কুফরী।
আবার, (আমলের ক্ষেত্রে) সালাত হল ফরয এবং এটাকে ফরয হিসেবেই পালন করতে হবে। এটা ফরয হিসেবে পালন না করা গুনাহ্।
মদ খাওয়া হারাম এবং এর হারাম হওয়াটা অবশ্যই মেনে নিতে হবে। আর এটাকে অনুমোদিত বলা কুফরী।
আবার, মদ হারাম এবং এটা পান করা পরিত্যাজ্য। কাজেই (আমলের ক্ষেত্রে) মদপান একটি গুনাহ্।
একইভাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আইন দিয়ে শাসন করা ফরয। আর এটাকে মেনে নেয়া ঈমানের সাথে সম্পর্কিত যা অকাট্য দলিল থেকে উদ্ভুত। একে কার্যকর করার ক্ষেত্রে এটা হল তা’আহ্ বা আনুগত্য এবং কার্যকর না করা হল মা’সিয়াহ্ বা গুনাহ্। সুতরাং আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা না করাটা কুফর হিসেবে গণ্য হবে যদি আল্লাহ্’র ওহী দ্বারা শাসনের উপর বিশ্বাস স্থাপন না করা হয় কিংবা তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। আর যদি আল্লাহ্’র ওহী দ্বারা শাসনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা হয় কিন্তু তা কার্যকর না করা হয় তবে তা গুনাহ্ (কাফের হবে না) হিসেবে গণ্য হবে। সুতরাং আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করা একটি উসুলী ঐক্যমত-এ বক্তব্য প্রথম দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে এবং এটা সঠিক। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে (ব্যবহারিক দিক) এটা শারী’আহ্ এবং এর প্রয়োগের ব্যাপার। অন্য কথায়, এটা ফুরু বা শাখা-প্রশাখার সাথে সম্পর্কিত, উসুল বা ভিত্তির সাথে নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই এটা আলোচনার ইস্যু হয়ে দাড়িয়েছে যে এটা কি আমাদের পূর্ববর্তী শারী’আহ্’তে ছিল কি না?
এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমরা বলতে পারি যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেননি এবং ঐভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা অনুমোদিত নয়। যেসব লোকেরা বিষয়টিকে অন্যভাবে নিয়েছে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যাত, এমনকি তাদের নিজেদের যুক্তির দিক থেকে দেখলেও। এর কারণ হল আলেমগণ শা’রা মান কাবলানা বা পূর্ববতীর্গণের শারী’আহ্’র ব্যাপারে দু’টি মত পোষণ করেছেন। একটির মতে, পূর্ববতীর্দের শারী’আহ্ আমাদের জন্য শারী’আহ্ নয়। সুতরাং এ উপলদ্ধি অনুসারে, জাহেল ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অনুমোদন প্রত্যাখাত। অন্য একটি অংশের মতামত হল, পূর্ববতীর্দের শারী’আহ্ ততক্ষণ আমাদের জন্য শারী’আহ্ হিসেবে থাকবে যতক্ষণ না সেটি রহিত হবে। অনেক আয়াত, আক্বীদা ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাজের মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা প্রতিষ্ঠিত করা যায় সে পদ্ধতি বলে দেয়া হয়েছে এবং এসব মূলনীতি অনুসারে কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা অনুমোদিত নয়। বরং ইসলাম সামগ্রিকভাবেই এ ধরনের চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। অন্য কথায়, যদি জাহেল শাসনব্যবস্থায় অংশ নেয়া পূর্ববতীর্দের শারী’আহ্ হয়েও থাকে, তবে আমাদের শারী’আহ্ অসংখ্য দলিলের মাধ্যমে এটাকে রহিত করে দিয়েছে।
নবীদের জীবন এবং তাদের প্রতি নাযিলকৃত নির্দেশনা সম্পর্কে (আল-কুর’আনে) যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার ঊদ্দেশ্য হল (সেসব বিষয়ে) তাদেরকে অনুকরণ ও অনুসরণ করা, এ কথাটির ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
আক্বীদার ক্ষেত্রে সব নবী একই দাওয়াত দিয়েছেন। সবাই লোকদেরকে আল্লাহ্, তার একত্ববাদ, আল খালিক্ব বা স্রষ্টা, আল মুদাব্বির বা সবকিছুর পরিচালনাকারী এ দিকে আহ্বান করেছেন। তারা ফেরেশতা, আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূল ও শেষ বিচার দিনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য লোকদের দাওয়াত দিয়েছেন,
“আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।”
(সূরা আম্বিয়া: ২৫)দাওয়াহ্ বহন, বহনের সময় দূর্ভোগ, ক্ষতি ও নির্যাতন ভোগ করা, আল্লাহ্’র জন্য ধৈর্যধারণ করা ও তাঁর পথে ত্যাগ স্বীকার করা প্রভৃতি ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে সাদৃশ্যতা পাওয়া যায়। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তারা ধৈয্য ধারণ করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছানো পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ্’র বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। আপনার কাছে পয়গম্বরদের কিছু কাহিনী এসে পৌঁছেছে।”
(সূরা আল আনআম: ৩৪)তিনি আরও বলেন,
“আপনাকে তো তাই বলা হয়, যা বলা হতো পূর্ববর্তী রাসূলগণকে।”
(সূরা হামীম সিজদাহ্: ৪৩)গ্রহণ ও আনুগত্য করার বেলায় তাদের লোকদের বলার ক্ষেত্রেও সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।
“বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহ্’র নির্দেশানুযায়ী তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।”
(সূরা নিসা: ৬৪)তাদের দাওয়াহ্’কে অবিশ্বাস করা ও প্রত্যাখানের দিক থেকে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হায় মানবজাতি! তাদের কাছে এমন কোন রাসূলই আগমন করেনি যাদেরকে তারা বিদ্রুপ করেনি।”
(সূরা ইয়াসীন: ৩০)এবং তিনি আরও বলেন,
“কাফেররা পয়গম্বরগণদের বলেছিল: ‘আমরা তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।’ তখন তাদের কাছে তাদের প্রতিপালক ওহী প্রেরণ করলেন যে, ‘আমি যালিমদের অবশ্যই ধ্বংস করব। তাদের পর তোমাদেরকে ভূখন্ডে প্রতিষ্ঠিত করব। এটা ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।”
(সূরা ইবরাহীম : ১৩-১৪)অবশেষে তাদের দ্বীনকে বিজয়ী করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান ভুল হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আর নাফরমান জাতির উপর থেকে আমার আযাব কখনোই রোধ হবে না।”
(সূরা ইউসুফ: ১১০)এভাবে দাওয়াহ্’র ক্ষেত্রে বিভিন্ন পয়গম্বরগণ একইরকম ছিলেন, যার কিছু ঊদাহরণ আমরা উপস্থাপন করেছি। যারা আগে এসেছিলেন তাদের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এগুলো এজন্যই বিধৃত করেছেন যাতে এগুলো থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, সতর্ক হতে পারি, ঈমানকে বুলন্দ করতে পারি, দৃঢ়চেতা হই ও ধৈর্যকে বাড়াতে পারি। তারা আমাদের আরও দেখিয়েছেন যে, আক্বীদার দিক থেকে, সর্বজ্ঞানী এবং সবজান্তার (আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) পথে অটল থাকার বিষয়ে এবং এই কাজের ফলাফলের দিক থেকে তাদের দাওয়াহ্’র ধারা সবসময় একইরকম। এ বিষয়ক আয়াতগুলো এসেছে যাতে দাওয়াহ্’র পথ আলোকিত হয় এবং এ পথে লোকদের বিরোধীতা, কুফর ও ঈমানের মধ্যকার প্রচন্ড বৈরীতা এবং অবিরাম কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যাবার বিষয়ে আমরা ওয়াকিবহাল থাকি। এসব আমাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রতি ওয়া’লা বা আনুগত্য এবং বা’রা বা শিরক থেকে মুক্ত থাকবার শিক্ষা দেয় এবং ঈমানের পরীক্ষার পর ঐশী হস্তক্ষেপসহ আরও অনেক ব্যাপারে আমাদের ওয়াকিবহাল করে।
যাই হোক, (সত্যের পথে) দৃঢ়তা প্রদর্শনের বিষয়ে আমাদের পূর্ববর্তী নবীগণদের জীবনচরিত অনুসরণ করা উচিত। বিধানের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক নবীকে পৃথক পৃথক ব্যবস্থা দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“প্রত্যেকের (নবীগণ) জন্য, আমি শারী’আহ্ ও মিনহায (পদ্ধতি) নির্ধারণ করে দিয়েছি।”
(সূরা আল মায়েদা: ৪৮)এর কারণ হলো অন্যান্য নবীদের কেবলমাত্র তার লোকদের জন্য এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। তাঁর বাণীই চূড়ান্ত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের তাদের নিজস্ব ধর্মকে পরিত্যাগ করে এ ধর্মকে অনুসরণ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্’র নিকট মনোনীত দ্বীন একমাত্র ইসলাম।”
[সূরা আল-ইমরান: ১৯]এবং তিনি বলেন,
“এবং যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যাতীত অন্য কোন দ্বীনের তালাশ করে কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থ।”
[সূরা আল-ইমরান: ৮৫]“আমি আপনার প্রতি (হে মুহাম্মদ) সত্যসহকারে এই কিতাব (কুর’আন) নাযিল করেছি যা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।”
[সূরা মায়িদাহ্: ৪৮]এছাড়া সাইয়্যিদুনা মুহম্মদ (সা) এর উপর নাযিলকৃত বাণীর প্রকৃতি ভিন্ন ছিল, কেননা তা ছিল চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ। ইসলামী রাষ্ট্র এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং শারী’আহ্ রক্ষা, প্রয়োগ ও প্রসারের জন্য পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। অন্যান্য নবীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে তাদের দাওয়াহ্ অন্যদের বাদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর অর্থ হলো তাদের দাওয়াহ্ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এটা ইসলামের মত নয় যার হুকুম সব সময় ও অঞ্চলের জন্য উপযোগী। এই পার্থক্য ইসলাম ও অন্যান্য ব্যবস্থার মধ্যে সাদৃশ্য অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে অন্তরায়। এটা মুসলিমদের কেবলমাত্র ইসলাম থেকে সমাধান নিতে বাধ্য করে, কারণ এর হুকুমসমূহের সাথে এর প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সম্পর্ক রয়েছে। এ ব্যাপারে সাইয়্যিদুনা ঈসা (আ) এর উদাহরণ দেখা যেতে পারে। তা ছিল সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যবস্থা হতে আলাদা। কেননা সেটা ছিল কেবল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বাণী সম্বলিত যেখানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোন আহ্বান অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এছাড়াও এটা ছিল কেবল বণী ইসরাঈলের জন্য সুনির্দিষ্ট। তাহলে কীভাবে শারী’আহ্ হুকুমসমূহ তুলনীয় হবে?
এটা দুঃখজনক যে দ্বীনের সুস্পষ্ট বিষয়সমূহকে নিয়ে আমাদের কথা বলতে হচ্ছে। এতে বোঝা যায় বর্তমানে দাওয়াহ্’র স্তর কতটা অধঃপতিত হয়েছে। আমরা পবিত্র কুর’আনে সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা)-কে যা বলা হয়েছে তা বলতে পারি:
“বলুন: ‘এটাই আমার পথ; আমি পরিপূর্ণ জ্ঞান অনুসারে আল্লাহ্’র দিকে মানুষকে আহ্বান করি, আমি এবং আমার অনুসারীগণ…।”
[সূরা ইউসুফ: ১০৮]“(মিশরের) রাজার আইন অনুযায়ী সে তাঁর ভাইকে রেখে (দাসত্বে) দিতে পারত না, তবে আল্লাহ্ চাইলে ভিন্ন কথা।”
[সূরা ইউসুফ: ৭৬]“(ইউসুফ) বললেন: আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান।”
[সূরা ইউসুফ: ৫৫]“আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলকেই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই এবাদত কর।”
[সূরা আম্বিয়া: ২৫]“আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তারা ধৈয্য ধারণ করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছানো পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ্’র বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। আপনার কাছে পয়গম্বরদের কিছু কাহিনী এসে পৌঁছেছে।”
[সূরা আল আনআম: ৩৪]“বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহ্’র নির্দেশানুযায়ী তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।”
[সূরা আন-নিসা: ৬৪]“আপনি তাদের কাছে সে জনপদের অধিবাসীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করুন, যখন সেখানে রাসূলগণ আগমন করেছিলেন।”
[সূরা ইয়াসীন: ৩০]“কাফেররা পয়গম্বরগণদের বলেছিল: ‘আমরা তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।’ তখন তাদের কাছে তাদের প্রতিপালক ওহী প্রেরণ করলেন যে, ‘আমি যালিমদের অবশ্যই ধ্বংস করব। তাদের পর তোমাদেরকে ভূখন্ডে প্রতিষ্ঠিত করব। এটা ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।”
[সূরা ইবরাহীম: ১৩-১৪]“এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান ভুল হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আর নাফরমান জাতির উপর থেকে আমার আযাব কখনোই রোধ হবে না।”
[সূরা ইউসুফ: ১১০]১২তম অধ্যায়: কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ
দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ পূর্ণ করেছেন।
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“এবং সত্য ও ইনসাফ (এর আলোকে) আপনার ররের কথাগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাঁর কথা পরিবর্তন করার কেউ নেই। এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
(সূরা আল আনআম: ১১৫)নিশ্চয়ই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করা বান্দার প্রতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র একটি বিশেষ রহমত। কুর’আনকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সুরক্ষিত করেছেন এবং পরিবর্তন ও রদবদল হতে নিরাপদ রেখেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“নিশ্চয়ই সন্দেহাতীতভাবে আমি কুর’আন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি তা সংরক্ষন করবো।”
[সূরা হিজর: ৯]তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) একে সংরক্ষণ করেছেন যাতে তা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য প্রমাণ হয়ে থাকে।
যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা) পৃথিবীতে নাযিলকৃত সর্বশেষ আসমানী ওহী গ্রহণ করেছেন সেহেতু তাঁর পর আল্লাহ্’র নির্দেশ মোতাবেক কুর’আন এবং সুন্নাহ্’কে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরে নবুয়্যতের দায়িত্ব সর্বোত্তম পন্থায় পালন করতে মুসলিমরা বাধ্য। আর তা করলে তখন আমরা দাবি করতে পারবো যে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের প্রদর্শিত পথের উপর রয়েছি। যার স্বপক্ষে অসংখ্য দলিল আছে।
মানুষের চিন্তা ও সহজাত প্রবৃত্তি (ফিতরাহ্) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সত্য এই দ্বীনের দাওয়াহ্ বহন করতে গিয়ে মুসলিমদের যেহেতু অন্যান্য জাতির সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল সেহেতু অন্যান্য জাতিগুলো পাল্টাপাল্টি কিংবা আত্মরক্ষার খাতিরে তাদের বিশ্বাসকে মুসলিমদের সামনে উপস্থাপন করেছিল। না বুঝে কখনও কখনও কিছু মুসলিম এসব চিন্তাসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের চিন্তা ও দাওয়াহ্’তে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যদিও তার ঠিক পরই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃর্ক মনোনিত দ্বীনের মিনার এবং পথিকৃত সম্মানিত আলেমগণ মুসলিমদের সতর্ক করা শুরু করেন। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং তারা দ্বীনকে কুফরের সংমিশ্রণের হতে মুক্ত করতে সক্ষম হন। তারা জাল দলিলসমুহকে রুখে দিয়ে প্রতারণামূলক কর্মকান্ডকে ব্যর্থ করে দেন। ফলে দ্বীন তার ঔজ্জ্বল্যতা ফিরে পায়। বর্তমান ক্ষতিকর পরিস্থিতি পূর্বে এভাবেই কখনো ভালো কখনো খারাপ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সুতরাং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
প্রাথমিক স্বর্ণযুগে ইসলামকে ফিরিয়ে আনতে তৎকালীন ভালো অবস্থার পেছনে কারণগুলো অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি।
ইসলামকে সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে, ইসলাম বহির্ভূত যেকোনো চিন্তা সংযোজনের প্রতারণামূলক অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করতে হলে প্রথমেই আমাদের উত্তরাধীকার সূত্রে প্রাপ্ত পশ্চিমা দুষিত মানসিকতা হতে মুক্ত হতে হবে। যে মানসিকতা লাভ-ক্ষতি আর খেয়াল-খুশিকে দাওয়াহ্ পরিচালনার মাপকাঠিতে পরিণত করে ফলে আমরা এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়কে গ্রহণ এবং অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয়কে বর্জন করছি। তারপর এই দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে শারী’আহ্ দলীলের ব্যাখ্যা দিচ্ছি। এবং শেষে এর যথার্থতা সমর্থনে বিভিন্ন দলীল পেশ করছি। হুকুম শুধুমাত্র একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এটাই সঠিক ইসলামী মানসিকতা। সুতরাং নিজের পছন্দ-অপছন্দ এবং ইচ্ছানুযায়ী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বিধানকে অনুধাবনের চেষ্টা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের খেয়ালখুশির প্রাধান্যও গ্রহণযোগ্য নয়। শত্রুর ভয়, গণবিচ্ছিন্নতা, শাসকগোষ্ঠীর ইসলামবিরোধী অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতির ভয়ে ভীত হওয়াটা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়। ঠিক তেমনি অবস্থার দোহাই দিয়ে দাওয়াহ্ বহনকারীর দায়িত্বকে হালকা করাটাও গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সব জানেন এবং সব বিষয়ের খবর রাখেন। তিনি মানুষের প্রকৃতি, প্রয়োজন, সামর্থ্য, বাস্তব জীবন, শত্রু ও শত্রুকে মোকাবেলা এবং তদুপরী সকল বিষয়ে সম্যক অবগত।
আমরা ইতিমধ্যে বর্ণনা করেছি যে ইজতিহাদের সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে প্রথমে সমস্যার বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা। তারপর শারী’আহ্ দলীলের নির্দেশনা অনুযায়ী উক্ত সমস্যাটির সমাধান বের করা। আর এই প্রক্রিয়ায় বর্তমান বাস্তবতায় যেকোনো সমস্যা সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হুকুমসমুহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। অন্যভাবে বললে এ প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে আমরা বলতে সক্ষম হবো বিদ্যমান কোন সমস্যার প্রতি শারী’আহ্’র হুকুম কি, পাশাপাশি এই হুকুম পালনের পথে প্রতিবন্ধক পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পরিস্থিতি, বাঁধা-বিপত্তি এবং এই হুকুম হতে ঈস্পিত স্বার্থ অর্জন ইত্যাদির ব্যাপারে শারী’আহ্ দৃষ্টিভঙ্গী। এ বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না, এবং আল্লাহ্’কে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছু শোনেন ও জানেন।”
(সূরা আল-হুজুরাত: ১)তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,
“আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত আসার পর তাতে ভিন্নতা পোষণ করা মু’মিন পুরুষ কিংবা নারী কারও ক্ষেত্রেই সঙ্গত নয়। এবং যে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।”
(সূরা আল আহযাব: ৩৬)ভিন্ন এই দুই মানসিকতাই মুলতঃ বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে আল্লাহ্’র হুকুম বোঝার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য তৈরি করে।
পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত মানসিকতা পরিস্থিতি-পারিপার্শ্বিক অবস্থা, লাভ-ক্ষতির আশংকা ইত্যাদি ভিত্তিহীন মিথ্যা অজুহাতে শারী’আহ্’র অকাট্য অনেক দলিলকে পরিত্যাগ এবং প্রত্যাখ্যান করেছে। ঊদাহরণস্বরূপ সুদকে সুস্পষ্ট হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর কারণ বা ব্যাখ্যা খোঁজার কোনো অবকাশ নাই; অথচ বাস্তবতা, পরিস্থিতি, লাভ-ক্ষতির হিসাব কিংবা পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা সুদের লেনদেনকে বৈধতা দানে ভিন্ন হুকুম নিয়ে হাজির হয়েছে।
এ ধরনের মানসিকতার উপর কিছু দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা এমন কিছু হুকুম নিয়ে এসেছে যা শারী’আহ্ অনুমোদিত নয় বরং চরম সাংঘর্ষিক। এই কারণে পুরোপুরি বিপরীতধর্মী হওয়া সত্ত্বেও তারা দাবি করে গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে যা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। তারা আরও দাবি করে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা শারী’আহ্ অনুমোদিত এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনকারী দলসমূহের জন্য এটাই একমাত্র অবশিষ্ট পথ। যদিও তা পবিত্র কুর’আনের আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুন্নাহ্’র সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
যখন আমরা ধাপে ধাপে ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন বা এর আহ্বান নিয়ে আলোচনা করছি তখন মুলত আমরা একই সাথে তা সংশ্লিষ্ট চিন্তাগুলোর অসাড়তা ও দুষণ নিয়েও আলোচনা করছি, যেমন: কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ। এ বিষয় নিয়ে বিদ্যমান সন্দেহ নিরসন এবং এসব কুফর চিন্তাসমুহ প্রচার করার পক্ষে যাতে কোনো অজুহাত অবশিষ্ট না থাকে সে লক্ষ্যে এখন আমরা এই উল্লেখিত বিষয়টির উপর আলোকপাত করবো।
আমরা আরও জানি এসব দলগুলো কতৃর্ক ধারণকৃত পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত দুষিত কুফর মানসিকতা যদি পরিশোধিত না হয় তাহলে আমাদের এসব উপদেশ কোনও কাজেই আসবে না। যেমন যদি আমরা তাদেরকে বুঝাতে সক্ষমও হই যে ক্ষমতা ভাগাভাগি একটি কুফর দুষিত চিন্তা কিন্তু তাদের যদি মানসিকতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে তখন তারা এই চিন্তার বিকল্প খুঁজতে একই মানসিকতাকে প্রয়োগ করবে। সুতরাং আমাদের এমন মানসিকতার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে যা শারী’আহ্ অনুমোদিত নয়। পথভ্রষ্ট চিন্তাগুলোর জন্ম লাভে এ ধরনের মানসিকতাগুলো উর্বর ভুমি হিসেবে কাজ করে।
বর্তমান সময়ে ক্ষমতার ভাগাভাগি বলতে কি বুঝায় এবং এর যথার্থতার প্রতি এর পক্ষালম্বনকারীরা কি যুক্তি উপস্থাপন করে?
ক্ষমতা ভাগাভাগি বলতে তারা বুঝায় এমন এক শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা যার ভিত্তি ইসলাম নয় এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা। আর তাই নিজেদের ও নিজেদের মতামতকে ক্ষমতার স্বাদ দিতে তারা গণতান্ত্রিক খেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পার্লামেন্টে প্রবেশ করে এবং কল্পনা করে এভাবে কোনও এক সময়ে তারা সম্পূর্ণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে। যা হবে ক্রমাণ্বয়ে বা ধাপে ধাপে এবং তাদের মতে ইসলাম একে অনুমোদন দেয়।
তাদের মতে ক্ষমতা ভাগাভাগির যৌক্তিকতা শারী’আহ্ ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দ্বারা অনুমোদিত। তাদের পক্ষ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোন থেকে প্রদত্ত যুক্তি :
— বর্তমান যুগে ইসলামকে ঐতিহাসিক রূপে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। কারণ ইসলামী বিশ্বের সব অঞ্চল এখন বিস্ময়কর বস্তুগত ও অবস্তুগত (সম্মান, প্রভাব ইত্যাদি) ক্ষমতার অধিকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ন্ত্রিত। ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসমূহকে তারা পর্যবেক্ষণ করছে এবং তাদেরকে সীমাবদ্ধ গণ্ডীর মধ্যে রাখতে ও তাদের সাফল্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে। আর এই কারণে তাদের মতে অতীতের সাথে বর্তমানের সাদৃশ্যতা অনুসন্ধান করা বাস্তবসম্মত নয়।
— অতীতে সব মুসলিমদের সম্পৃক্ততায় ইসলামী দাওয়াহ্ সংগঠিত হতো অথচ বর্তমানে গুটি কয়েক গোষ্ঠীকে এই আন্দোলনে পাওয়া যাচ্ছে। আর অধিকাংশ মুসলিম এই নেতৃত্বের আওতার বাইরে থাকায় জাহেল সরকারগুলো এর নানামুখী সুবিধা লুটে নিচ্ছে এবং যা আন্দোলনকে কঠিন পরিস্থিতিতে পতিত করেছে। এজন্য আধুনিক ইসলামী আন্দোলনগুলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুসরণ করছে।
প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। যার মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক খেলা অথবা সেনা অভ্যূত্থান অথবা সশস্ত্র গণবিপ্লব।
যেহেতু আধুনিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর জন্য সেনা অভ্যূত্থানের লক্ষ্যে নিজ দেশের সেনাবাহিনীর ভেতর সমর্থন তৈরির সকল দরজা বন্ধ এবং চারিদিকে স্বৈরাচারী শাসকের কারণে গণবিপ্লবের দরজাও বন্ধ, তাই এখন তাদের জন্য একটি পথটিই অবশিষ্ট আছে যে পথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কাজ করছে। যা তাদের অনৈসলামী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দিকে ধাবিত করে।
তারা আরও যোগ করে: ইসলামী আন্দোলনগুলো যে মহান আদর্শকে সামনে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা অর্জন করতে হলে এর সাথে সাংঘর্ষিক পার্শ্বিক বিষয়গুলোকে এখন আমাদের পাশ কাটাতে হবে। কারণ জুজ’ঈ বা আংশিক বিষয়ের সাথে যদি কু’ল্লী বা সামগ্রিক বিষয়ের দ্বন্দ্ব হয় তাহলে কু’ল্লীকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইসলামী শারী’আহ্’র বাস্তবতা এবং এর উদার দৃষ্টিভঙ্গী ঊপলদ্ধি করা সম্ভব হবে না যদি আংশিক বিষয়ের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে মূল লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়। একইভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও মুসলিমদের সব সময় কঠিন এবং কেবলমাত্র একটি পথেই সীমাবদ্ধ থাকা ঠিক নয়। যদি প্রথম রাস্তাটি প্রয়োগ করা সম্ভব না হয় তখন দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ইত্যাদি রাস্তাগুলো প্রয়োগ করা যায়। এমনকি কোন এক পর্যায়ে চারটি পথেই একসঙ্গে কাজ করা যায় যতক্ষন না উত্তম পথটি বের হয়ে আসে।
উল্লেখিত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির উপর আলোচনা
শারী’আহ্ হুকুম থেকে বিচ্যুততে উপস্থাপিত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি থেকে তাদের ইসলামী শিক্ষার অজ্ঞতা পরিষ্কার প্রতীয়মান যদিও তারা মুখে উসূল ও শারী’আহ্’র কথা বলে। শারী’আহ্ হুকুম বের করা কিংবা এমনকি শুধুমাত্র শারী’আহ্ হুকুম জানার প্রক্রিয়া কি সে সম্পর্কেও তাদের নূন্যতম ইসলামী জ্ঞান নেই। তারা পদ্ধতি (Method) ও ধরণ (Style) আলাদা করতে পারে না। ‘শারী’আহ্ নমনীয়’ এই চিন্তার প্রভাব এবং যুগের সাথে তাল মেলানোর অজুহাত তাদেরকে শারী’আহ্ হুকুম এবং শারী’আহ্ হুকুমকে শারী’আহ্ বহিভূর্ত হুকুম দ্বারা পরিবর্তনের প্রতি বার বার প্রেরণা যোগায়।
যুগের সাথে অনেক কিছু পাল্টে গেছে এই অজুহাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি ও শারী’আহ্ পরিত্যাগ করার অজুহাতটি মোটেও গ্রহণযোগ্য ও সঠিক নয় বরং এতে সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাই পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠে। কেননা সমাজের বাস্তবতা অনুধাবনে এর মৌলিক উপাদনসমূহ গুরুত্বপূর্ণ, এর পরিবর্তনশীল ঊপাদান নয়। গোত্রতান্ত্রিক, সরল অথবা জটিল রাষ্ট্রকাঠামো, গণতান্ত্রিক অথবা একনায়কতান্ত্রিক বিভিন্ন সমাজের বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে কিন্তু প্রত্যেকটি সমাজের গঠনের মৌলিক উপাদান (জনগণ, চিন্তা, আবেগ এবং ব্যবস্থা) একই। সে কারণে মৌলিক উপাদানগুলোকেই বিবেচনা করতে হবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কোন প্রয়োজন নাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সমাজের ভ্রান্ত চিন্তা, ভ্রান্ত ধারণা এবং ভ্রান্ত রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করে সমাজ পরিবর্তন করা শারী’আহ্ হুকুম। সুতরাং এটি একটি প্রতিষ্ঠিত কাজ। মুলত চিন্তার পার্থক্যই সমাজের পার্থক্য; কোথাও দেশপ্রেম বা সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের উপর তৈরি সমাজ অথবা কোথাও আদর্শিক পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে তৈরি সমাজ। এটা সর্বজনবিদিত যে আদর্শিক চিন্তা অন্য সব চিন্তার চেয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং একে ছুঁড়ে ফেলা কঠিন কাজ। আর তাই সমাজভেদে চিন্তার পার্থক্যের কারণে কোথাও পরিবর্তনের কাজ সহজ কোথাও কঠিন কিন্তু পদ্ধতি একই এবং অপরিবর্তনীয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সময়ের গোত্রতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং আমাদের বর্তমান সরল বা জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থার পার্থক্য হয়তো আমাদের সমাজ পরিবর্তনের কাজকে সহজ কিংবা কঠিনতর করবে কিন্তু পদ্ধতির নিয়মে কোন পরিবর্তন আসবে না। প্রতিটি রাষ্ট্রকেই তার নিরাপত্তা ও অবস্থান সুসংহতকরণে সেনাবাহিনী হোক কিংবা অনুরূপ কোন গোষ্ঠী হোক কারও না কারও উপর নির্ভর করতেই হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ ধরণের গোষ্ঠীর নিকট নুসরাহ্ চেয়েছিলেন। তিনি (সা) যখন একটি নতুন সমাজ গঠনের কাজ শুরু করেন তখন তিনি (সা) সমাজের মৌলিক উপাদানের উপর মনোনিবেশ করেন। তিনি (সা) দৃঢ় ঈমানসম্পন্ন দাওয়াহ্ বহন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরিচালনায় সক্ষম (মুহাজিরীন) একটি গোষ্ঠিকে প্রস্তুত করেন এবং দাওয়াহ্ ও দাওয়াহ্ বহনকারীদের গ্রহণকারী এবং রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম ক্ষমতার অধিকারী (আনসার) একটি জনপ্রিয় ভিত্তি (Popular Base) তৈরি করেন। তাই নুসরাহ্ অনুসন্ধান করা ক্ষমতায় যাওয়ার পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) নুসরাহ্ অনুসন্ধানের সময় অনেক প্রতিকূলতা, সংকটের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এ পদ্ধতির উপর অটল ছিলেন। যারা মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাজের পদ্ধতিকে নিরীক্ষা করেছে তারা দেখবে যে তিনি (সা) পরিবর্তনের জন্য সমাজের ভিত্তিগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। স্থান, কাল এবং অঞ্চলভেদেও তার পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়নি। কারণ অঞ্চল বা সমাজভেদে পার্থক্য মানে কাঠামোর পার্থক্য মৌলিক উপাদানের নয়। এ পার্থক্য কাজকে সহজ বা কঠিন করে মাত্র।
শারী’আহ্’র নমনীয় এ ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে নমনীয়তার অজুহাতে শারী’আহ্’কে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শারী’আহ্’কে সম্পূর্ণ করেছেন। মানব জীবনের নতুন-পুরাতন সকল সমস্যার সমাধান এতে রয়েছে। তবে সমাধানগুলো হুকুম একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এই ভিত্তি থেকে উৎসারিত নিয়মতান্ত্রিক কিছু উসূল (মূলনীতি)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।
শারী’আহ্ অনেক বিস্তৃত, এ দৃষ্টিভঙ্গীর দোহাই দিয়ে আল্লাহ্’র বাণীকে পরিত্যাগ করা কিংবা শারী’আহ্ বহির্ভূত বিষয়বস্তুর প্রবেশ করানোর চেষ্টা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে শারী’আহ্’র কিছু বিষয়কে পরিত্যাগ করেছেন। তাদের মতে যেহেতু শারী’আহ্’র শাস্তির উদ্দেশ্যই হলো অপরাধকে নিরুৎসাহিত করা সেহেতু যা কিছু অপরাধকে নিরুৎসাহিত করে তাই শারী’আহ্’তে গ্রহণযোগ্য। যেহেতু শারী’আহ্’র শাস্তিসমূহ যুগের সাথে মানানসই হচ্ছে না, এবং মানুষ চিন্তা-চেতনা দিয়ে তা প্রত্যাখান করেছে সেহেতু আমরা একই উদ্দেশ্য অর্জিত হয় এমন শারী’আহ্ বহির্ভূত শাস্তিকেও গ্রহণ করতে পারি। আর শারীআ’হ্ নমনীয় ও বিবর্তনযোগ্য বলেই এটা সম্ভব।
তারা আরও বলে যেহেতু জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ইসলাম প্রচারের জন্য এবং জিহাদ ছাড়াও অন্য অনেক উপায় যেমন: রেডিও, টেলিভিশন, অন্যান্য প্রচারমাধ্যমসহ আধুনিক সভ্যতার অনেক উপকরণের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার সম্ভব, সেহেতু এসব আধুনিক মাধ্যমকে জিহাদের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। শারীআ’হ্ যদি নমনীয় ও বিবর্তনযোগ্য না হতো তাহলে আমরা এরূপ করতে পারতাম না।
ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ক্ষেত্রে তারা মনে করে, যে পদ্ধতি ব্যবহার করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে, সেটাই অনুসরণ করা উচিত। কেবল একটি পথে পড়ে থাকা এবং এর বাইরে না যাওয়াটা অপরিহার্য নয়। তাদের মতে অনমনীয় ও দৃঢ় মনোভাব ইসলামের উদার, নমনীয় ও বিবর্তনশীল প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এতে কঠোরতা রাখেননি।
সুতরাং এরূপ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ‘শারী’আহ্’কে নমনীয়’ বলা হারাম। কারণ এটা দ্বীনের হুকুমসমূহকে বাতিল করে দেয় এবং এটা ইসলামের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। বরং এটি পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত এবং তাদের চিন্তার অনুকরণ।
আর সামগ্রিক বিষয়ের সাথে আংশিক বিষয়ের দ্বন্দ্বে সামগ্রিককে গুরুত্ব দিতে হবে; তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীটিও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে উসূলী চিন্তাবিদদের সামঞ্জস্যতা আছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে উসূলী চিন্তাবিদগণ যে অর্থে এই মুলনীতিকে ব্যবহার করেন তারা তা করে না। তাদের চিন্তা ও কর্মের মাপকাঠির বেহাল দশার এটি আরেকটি নমূনা। তাই সমস্ত শারী’আহ্’কে নমনীয় আখ্যা দিতে কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে শারী’আহ্’র উদারতা ও নমনীয়তাকে উদাহরণ হিসেবে হাজির করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এ বিষয়ে সবশেষে বলা দরকার শারী’আহ্’র হুকুম বুঝবার ক্ষেত্রে যুক্তি প্রয়োগের কোন সুযোগই ইসলামে নেই। উসুলী চিন্তাবিদগণের বর্ণনা মতে বাস্তবতা থেকে হুকুমের মানাত (Object) পাওয়া যায়, ফরজ বা হারামের নির্দেশনা নয়। তাই বাস্তবতাকে এর মত করেই বুঝতে হবে। তারপর শারী’আহ্ দলিলের আলোকে হুকুম বের করতে হবে। সুতরাং নীতিগতভাবে যৌক্তিক বিবেচনা মূল্যহীন।
আর ক্ষমতার ভাগাভাগিতে শারী’আহ্’র যৌক্তিকতার বিষয়ে শারী’আহ্ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র দ্বীন ব্যতীত অন্যকোনও দ্বীন দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণকে স্পষ্ট নিষেধ করেছে। এর বেশকিছু কারণ রয়েছে।
— আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিধান দ্বারা যারা শাসনকার্য পরিচালনা না করাকে সুস্পষ্টভাবে কুফর (অবিশ্বাসী), যুলুম (অবিচার) এবং ফিসক (পাপাচারী) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই কাফের।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই জালিম।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৫)তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই ফাসেক।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৭)— হাকিমিয়্যাহ বা সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“হুকুম একমাত্র আল্লাহ্’র। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা শুধুমাত্র তারই ইবাদত করবে।”
(সূরা ইউসুফ: ৪০)— এছাড়া আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র শারী’আহ্ বাদ দিয়ে অন্যকোনও আইন বা বিধানের শরণাপন্ন হওয়াকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং একে ঈমান বিরোধী কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার (মুহাম্মদ (সা)) উপর ন্যস্ত না করে।”
(সূরা আন নিসা: ৬৫)— আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছুর শরণাপন্ন হওয়ায় তিনি মুনাফেকদের সমালোচনা করেছেন :
“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার প্রতি অবতীর্র্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে সেই সব বিষয়ের উপর তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তারা (বিরোধপূর্ণ বিষয়ের) মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায়, অথচ তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
(সূরা নিসা: ৬০)— আল্লাহ্’র আইনের উপর অন্য কারও আইনকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। যে তা করলো সে মূলত আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হুকুমের উপর জাহেলিয়াতকে প্রাধান্য দিল।
“তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ্ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?”
(সূরা মায়িদাহ্: ৫০)মূলত এটাই হুকুম। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে মন্ত্রীসভায় অংশগ্রহণ করা নিম্নোক্ত দলিলের কারণে মৌলিক হুকুমের একটি ব্যতিক্রম।
১. (সমকালীন) শাসনব্যবস্থায় ইউসুফ (আ:) এর অংশগ্রহণ
২. আন-নাজ্জাশীর অবস্থা
৩. আল-মাসলাহা (জনস্বার্থ)
গণতন্ত্র, শূ’রা নয়
নিজেদেরকে জ্ঞানী বলে দাবিকারী কিছু লোক যখন বলে, ইসলামের শুরু গণতন্ত্র দিয়ে আর শেষ একনায়কতন্ত্র দিয়ে, তখন তা শুনে একজন হাসবে না কাঁদবে তা ঠিক করতে পারে না। তারা প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিম্নোক্ত আয়াতটি উল্লেখ করে:
“কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ভরসা করুন।”
(সূরা আলি ইমরান: ১৫৯)আমাদের আলোচনার সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি চিন্তা নিয়ে এখনও আলোকপাত করা বাকী রয়েছে, আর তা হলো কিছু লোকের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র ইসলাম দ্বারা অনুমোদিত যেহেতু কুর’আন ও সুন্নাহ্’তে শূ’রার বিষয়টি পরোক্ষভাবে এসেছে। তারা বলে গণতন্ত্র শূ’রা ছাড়া আর কিছুই নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনগণের মতামতের উপর এবং ইসলামও আমাদেরকে জনগণের মতামত নিতে বলেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন,
“কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন।”
(সূরা আলি ইমরান: ১৫৯)এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেছেন,
“এবং যারা পার¯পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে।”
[সূরা আশ শূরা: ৩৮]এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিভিন্ন বাস্তবিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে প্রতিনিয়ত তাঁর সাহাবীদের সাথে আলোচনা করেছেন এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেছন। যেহেতু এটা পবিত্র কুর’আনের নির্দেশনা ও রাসূলুল্লাহ (সা) তা অনুসরণ করেছেন সেহেতু মুসলিমদের এটা অনুসরণ করা উচিত। তারা আরও বলে শূ’রা এবং গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য হল শব্দার্থগত। অর্থ এক হলে ভিন্ন নাম কোন সমস্যা না।
আমরা জানি বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর লোকজন গণতন্ত্রের আহ্বান জানাচ্ছে। এদের মধ্যে একটি অংশ হচ্ছে জেনে বুঝে প্রতারণাকারী আর আরেকটি নিষ্ঠাবান অংশ কিন্তু অজ্ঞ কারণ তারা না বুঝে গণতন্ত্রের আহ্বান করছে। এসব নিষ্ঠাবান আন্তরিক গোষ্ঠীকে অবশ্যই এসব চিন্তাগুলো থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে নতুবা তাদের উদাহরণ হবে ঐ ব্যক্তির মতো যে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহ্’র ইবাদত করে কিন্তু গুনাহ্’র ভাগীদার হয়। অনুতপ্ত হওয়া, নিয়ন্ত্রন বজায় রাখা এবং (বিশ্বাসের) প্রতিফলন ঘটানো, এগুলো নিষ্ঠাবান ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য।
এ ধরণের লোকেরা এক সময় বলেছিল সমাজতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে এবং মুহম্মদ (সা) তাদের ইমাম। তাহলে সেই দূর্গন্ধময় সমাজতন্ত্র যখন এখন বিলুপ্ত হয়ে গেলো, এখন তাদের উত্তর কী? একইভাবে গণতন্ত্র আজ যখন মৃত্যুর শেষযন্ত্রনায় কাঁতড়াচ্ছে তখন এর আহ্বানকারীদের আর কী আশা আছে? এ ধরণের চিন্তা ইসলাম নয় গণতন্ত্রের কল্যাণের জন্য। তারা এর প্রতারণা উন্মোচনের বদলে একে সর্বোচ্চ চিন্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে। পায়ের নীচে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার বদলে একে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিয়ে এবং শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির আলোকে জীবন ব্যবস্থাকে রূপদান করলেই কেবল এটা সুস্পষ্ট হবে যে আমরা তাঁর হুকুমকে সঠিকভাবে অনুবাধন করেছি। এটা এমন একটি দলের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব যারা সঠিক জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত এবং প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সচেতন, এবং বিশ্বাসের দিক থেকে আলোকিত, শারী’আহ্ হুকুমের ব্যাপারে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এবং সকল ভিন্ন প্রকৃতির চিন্তা-চেতনা ও বিজাতীয় ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ বর্জনকারী। এরা বাস্তবতার কাছে কখনও মাথানত করে না এবং পরিস্থিতির প্রভাবমুক্ত থাকে।















