ভিন্ন বিষয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ হুকুম

ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে অনেক সময় শারী’আহ্ একই প্রকার হুকুম প্রদান করেছে, যদিও মানব যুক্তি ঠিক তার উল্টো কাজ করে। শারী’আহ্ পবিত্র হওয়ার ক্ষেত্রে পানি এবং ধুলাকে একই মর্যাদায় স্থান দিয়েছে, যদিও পানি পরিষ্কার করে অথচ ধুলা অপরিষ্কার করে। এটা স্বর্ণ এবং গমের ক্ষেত্রে রিবা আল-ফাদল (অতিরিক্ত পরিমাণ) কে নিষিদ্ধ করেছে, যদিও এদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটা যিনাহ্ এবং মুরতাদ (দ্বীনত্যাগ) এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড বিধান করেছে অথচ অপরাধ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটা মুসলিম ও অমুসলিমদের সুরক্ষা দিয়েছে যদিও বিশ্বাসের দিক থেকে তারা ভিন্ন। কোন নারীর উপর যিনাহ্’র দায় চাপানো মিথ্যা অভিযুক্তকারী এবং মদ পানকারী উভয়কেই ৮০টি দোররা মারার হুকুম দিয়েছে অথচ দুটি কাজের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সুতরাং এরকম অনেক কাজ রয়েছে যেগুলো ভিন্ন এবং কোনক্রমেই এদেরকে একত্রে বিবেচনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু শারী’আহ্ তাদের জন্য একই হুকুম বিধান করেছে। যদি এগুলোকে মানুষের চিন্তার উপর ছেড়ে দেয়া হতো তাহলে মানুষ এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম নিয়ে আসতো এবং ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপটের কারণে একই হুকুম বের করতে পারতো না। সুতরাং, এটাও সাদৃশ্যতা বিবেচনা নির্ভর অকার্যকর এই পদ্ধতির স্বরূপ উন্মোচন করে।

এছাড়াও শারী’আহ্ কতৃর্ক আরও অনেক হুকুম প্রদত্ত হয়েছে যেখানে মানুষের চিন্তা বা যুক্তির কোন ভূমিকা নেই। শারী’আহ্ ব্যবসাকে বৈধতা দিয়েছে কিন্তু সুদকে হারাম করেছে যদিও তাদের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে এবং উভয়ই ব্যবসা। ইহা ধর্ষনের স্বাক্ষী হিসেবে ৪ জনকে নির্ধারন করেছে অথচ হত্যার জন্য ২ জন, যদিও ধর্ষণের চেয়ে হত্যা অনেক নৃশংস অপরাধ। বাতিলযোগ্য তালাকের বেলায় স্বাক্ষী একজন মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক কিন্তু অর্পিত সম্পত্তির বিচারাধীন মামলায় একজন কাফিরের স্বাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। একজন মুক্ত কিন্তু কুৎসিত নারী যার প্রতি আকর্ষন না জন্মানোটাই স্বাভাবিক তার প্রতিও দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখতে বলা হয়েছে কিন্তু একজন জারিয়াহ্ (সুদর্শনা দাসী) এর ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা নাই। খুফ্ফাইন (চামড়ার মোজা) এর উপরের অংশ মাসেহ্ করা বাধ্যতামূলক কিন্তু নীচের অংশ নয় অথচ নীচের অংশ মাসেহ্ করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এ ব্যাপারে সাইয়্যিদুনা আলী (রা) বলেন, “দ্বীন যদি যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতো তাহলে মোজার নীচের অংশ উপরের অংশের চেয়ে মাসেহ্-এর বেশী দাবীদার।”

এ কারণেই হয়ত বিখ্যাত কবি আবুল ‘আলা আল-মা’র্রি বলতে বাধ্য হয়েছিল,

“একটি হাতের দিয়তের (ক্ষতিপূরণ) জন্য শত শত স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়,

কী করে এটা সিকি স্বর্ণমুদ্রার কারণে কাটা যায়?”

অন্য কথায়, কেউ কারও হাত নষ্ট করলে তার দিয়ত বা ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০০ দিনার স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়, তাহলে মাত্র সিকি স্বর্ণমুদ্রা চুরির কারণে কীভাবে একটি হাত কাটা যায়?

যুক্তি কখনো সিকি পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা চুরির দায়ে কারো হাত কাটাকে ঠিক মনে করেনা। যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করার অর্থ শারী’আহ্’র ভিত্তিতে বিচারকে অগ্রাহ্য করা। যদি মানুষকে শারী’আহ্’র সামগ্রিকতা থেকে, অথবা জাহির আন-নাস (শারী’আহ্’র বাহ্যিক বক্তব্য) থেকে, অথবা দু’টি হুকুমের সাদৃশ্যতা থেকে প্রাপ্ত ক্বিয়াসের (তুলনামূলক বিবেচনা) অস্তিত্ব উপলদ্ধির মাধ্যমে ইল্লাহ্ (ঐশী কারণ) বের করার দায়িত্ব দেয়া হতো তবে মানুষ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃর্ক অনুমোদিত অধিকাংশ বিষয়কে নিষিদ্ধ করে দিত এবং নিষেধসমুহকে অনুমোদন দিয়ে দিত। তাই শারী’আহ্ প্রদত্ত পদ্ধতি ছাড়া ক্বিয়াস অনুমোদিত নয়। অন্যকথায় শারী’আহ্’র উৎসে উল্লেখিত ইল্লাহ্ ছাড়া বৈধ ক্বিয়াস হতে পারে না। শারী’আহ্ ইল্লাহ্ বিবর্জিত কোন বাণী থেকে ক্বিয়াস করা অসম্ভব। এ ব্যপারে মনগড়া কোন ইল্লাহ্ দেয়া যায় না এবং শর’ঈ ইল্লাহ্ উল্লেখিত ও চিহ্নিত না থাকলে আমরা নিজ থেকে কোন শর’ঈ ইল্লাহ্ আরোপ করতে পারিনা। সে কারণে ফকীহ্গণ শারী’আহ্ থেকে কীভাবে ইল্লাহ্ বের করতে হবে তা দেখিয়েছেন। তারা বলেন ইল্লাহ্ পাওয়া যাবে হয় দলিলে (Text) নির্দেশিত শারা’হাতান (দলিলের সুস্পষ্টতা (Explicitly)) বা দালালাতান (অর্থের সুস্পষ্টতা (Meaning)) বা ইসতিম্বাতান (সিদ্ধান্তগ্রহণ (Deduction)) না হয় ক্বিয়াসান (সাদৃশ্যতা বিবেচনা (Analogy)) এর মাধ্যমে । (দ্রষ্টব্য: বিস্তারিত জানতে উসুল সম্পর্কিত বই দেখুন)।

যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ক্বিয়াস ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন তখন তিনি এর ধরনও সুনির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ্ বিন আয জুবায়ের হতে আহমেদ ও নাসায়ী বর্ণনা করেন যে,

“খাতা’য়াম থেকে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আসলেন এবং বললেন, ‘আমার বাবা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তার উপর হজ্জ্ব ফরয হয়েছে; কিন্তু তিনি উটের পিঠে চড়তে পারেন না। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ্ব সম্পাদন করতে পারি?’ তিনি (সা) বললেন, ‘তুমি কি বড় ছেলে?’ সে বলল, ‘হ্যা’। তিনি (সা) বললেন, ‘ধর, তোমার বাবার একটি ঋণ আছে এবং তুমি যদি তার পক্ষ থেকে সেটি পরিশোধ কর সেটি কী যথেষ্ট হবে?’ সে বলল, ‘হ্যা’। তিনি (সা) বললেন, ‘তাহলে তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্জও পালন করতে পার’।

হজ্জ একটি ইবাদত আর ঋণ পরিশোধ একটি মু’আমালাত (লেনদেন) এবং যা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তথাপি উভয়টিকে ঋণ বিবেচনায় হজ্জ্ব পালন ও ঋণ পরিশোধ একই কাতারে ফেলা হয়েছে এবং এজন্য ঋণ পরিশোধের মত ছেলেকে বাবার পক্ষ থেকে হজ্জ্ব পালন করতে বলা হয়েছে।  এখানে আল্লাহ্’র প্রতি ঋণকে মানুষের ঋণের সাথে তুলনা করে বিষয়টিকে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যদি আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর পক্ষ থেকে বিষয়টি না আসতো তবে মানুষের চিন্তা কোনদিনও এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম ছিল না। 

কোন হুকুমের পেছনে তা’লীল (কারণ) হল সে হুকুমটি কেন এসেছে তা পরিষ্কারভাবে বুঝার একটি দলিল। এর মানে যেখানে ইল্লাহ্ উপস্থিত সেখানেই কেবল তা অনুসরণ করা উচিত। আর এটাই ক্বিয়াস। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিড়াল সম্পর্কে বলেন,

“বিড়ালের লালা নাজাস (অপবিত্র) নয়।” সাথে সাথে তার কারণ উল্লেখ করে তিনি (সা) বলেন,

“কারণ এটি তোমাদের গৃহে আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে অর্থাৎ গৃহপালিত।”
(বুখারী ও মুসলিম)

এর ভিত্তিতে বলা যায়, যে সকল প্রাণী গৃহের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে তার লালা অপবিত্র হবে না, যদি না বিপরীত দলিল পাওয়া যায়। তদ্রুপ রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,

“দৃষ্টির কারণে কোন গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশে অনুমতি অত্যাবশ্যক।”
(বুখারী ও মুসলিম)

এর অর্থ হল গৃহে প্রবেশের আগে মুসলিমগণ অবশ্যই অনুমতি নিবে। কারণ ঘরের রয়েছে নিজস্ব পবিত্রতা ও একে আওড়া বলে পরিগণিত করা হয়। অনুমতি ছাড়া গৃহে প্রবেশের বিধান না থাকার কারণ হল নিষিদ্ধ কিছুর দিকে চোখ পড়া থেকে বিরত থাকা। তাঁর (সা) ভাষায়, “মিন আজলিন নাজর” (দৃষ্টির কারণ) হচ্ছে ইল্লাহ্ অর্থাৎ অনুমতি প্রার্থনার পেছনে শারী’আহ্ কারণ। এজন্য কোন মুসলিমের নিজ গৃহে প্রবেশে অনুমতির প্রয়োজন নাই। যেহেতু এ ব্যাপারে ইল্লাহ্ অনুপস্থিত সেহেতু হুকুমও অনুপস্থিত। অন্যথায় হুকুম আগেরটি, যেমন তার বাসায় যদি কোন মেহমান বা এ জাতীয় কেউ এসে থাকে। সুতরাং যখন ইল্লাহ্ ফিরে আসে তখনও হুকুমও আসে। সুতরাং হুকুমের উপস্থিতি ইল্লাহ্’র সাথে সম্পর্কিত।

এই কারণে ক্বিয়াস একটি সংবেদনশীল ইস্যু। এটা বোঝা উচিত যে, ক্বিয়াস হল সেসব বুদ্ধিমান লোকের জন্য যারা শারী’আহ্ দলিল, হুকুম ও প্রেক্ষাপট বুঝতে সক্ষম। এটা কখনোই কোন ব্যক্তির কাছে আশা করা যায় না যে, সে খেয়াল-খুশি বা প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে ক্বিয়াস করবে। এটা সেসব ব্যক্তির জন্য সুনির্ধারিত যাদের রয়েছে গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং উপলদ্ধি। অন্যথায় সেটা হবে আল্লাহ্’র হুকুমকে বিনষ্ট করার উপকরণ এবং তা থেকে পরিষ্কার বিচ্যুতির কারণ। ইমাম শাফি’ঈ (রহ) বলেন, “ক্বিয়াস করা ততক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির দায়িত্বের মধ্যে পড়বে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে পূর্ববর্তী সুনান সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানবান হবে এবং সালাফদের উক্তি ও আরবী ভাষা যথার্থভাবে বুঝতে পারবে। তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা উন্নত হতে হবে যাতে সে সন্দেহযুক্ত (বা সাদৃশ্যপূর্ণ) বিষয়সমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং রায় প্রদানের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে। যারা তার মতামতের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে তাদের কথা শুনতে আপত্তি করে না, কারণ তারা হয়ত এমন কিছু মনে করিয়ে দিবে যা সে ভুলে গেছে অথবা তার এমন কোন ভুলকে ধরিয়ে দিবে যা সে সঠিক ভেবেছিল। ক্বিয়াসের যথোপযুক্ত ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট উপলদ্ধি। ক্বিয়াসকে ব্যবহার করে একটি হুকুম বের করার কাজ একজন মুজতাহিদ ছাড়া আর কারও জন্য বৈধ নয়।

আমাদের উল্লেখিত উপরে সবগুলো দলিলই যারা কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায় এবং পক্ষপাতিত্ব করে, তাদের অবস্থানের দূর্বলতা ও অসারতাকেই প্রমাণ করেছে। এখন জানা দরকার এ বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট মতামত কি, যার জন্য ইজতিহাদের কোন প্রয়োজন নাই? 

আক্বীদাসহ সমস্ত শারী’আহ্-ই এক আল্লাহ্’র উপর বিশ্বাস ও একমাত্র তাঁর ইবাদতের উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘লা ইলাহা’ এর অর্থ হল স্বর্গীয় মহিমা, ইবাদত ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবাইকে অস্বীকার করা। ‘ইল্লাল্লাহ্’ অর্থ একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে এসব কাজের জন্য সুনিশ্চিতভাবে মেনে নেয়া। তিনি হলেন ইলাহ্, শাশ্বত এবং ইবাদত ও আইন প্রণয়ণের একমাত্র মালিক। ইবাদত ও আত্নসমর্পণ একমাত্র তাঁর কাছে এবং শারী’আহ্ সম্পর্কিত জ্ঞান এসেছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মাধ্যমে। দু’টি স্বাক্ষ্যের দ্বিতীয়টির অর্থ হল মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্’র রাসূল। সে কারণে আইনগত বিষয়ে কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কেই অনুকরণ ও অনুসরণ করা উচিত।

এমনকি উসূল আল ফিক্হ ওহীর উৎসকে সংজ্ঞায়িত করার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যাতে এটা ছাড়া অন্য কোন উৎস থেকে বিধান না নেয়া হয়। এটা ইসতিম্বাত-এর মূলনীতিকে ঠিক করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালায় যাতে এতে শারী’আহ্ বহিভুর্ত কিছু অনুপ্রবেশ করতে না পারে। এজন্যই উসূল আল ফিক্হ সর্বপ্রথম যা আলোচনা করে তা হচ্ছে, হাকিম হলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং বিধান দেবার অধিকার শুধু তাঁর। শারী’আহ্’র নাযিলকৃত বাণী ছাড়া কোন হুকুমের বৈধতা নেই এবং শারী’আহ্’র বাইরেও কিছু নেই ।

তারপর একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইবাদত করা, তার প্রতি নিজেকে আত্নসমর্পণ করা ও তাকে ছাড়া আর কাউকে আইনদাতা হিসেবে মেনে না নেয়ার ব্যবহারিক ব্যাখ্যা প্রদান করার জন্য আসে ফিক্হ।

কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অর্থ হল ঐশী ব্যবস্থার পাশাপাশি কুফর ব্যবস্থাকে মেনে নেবার আহ্বান। অর্থাৎ, শর’ঈ বহির্ভূত হুকুমের আইনপ্রণেতাদের শর’ঈ হুকুমের আইনপ্রণেতার পাশাপাশি মেনে নেয়া। যার অর্থ হল আইনের উৎসের বহুত্বকে মেনে নেয়া। তাহলে আল্লাহ্’র একত্ববাদ কোথায় থাকল, যিনিই কেবল প্রকাশ্য ও গোপনে একমাত্র উপাসনার যোগ্য?

শিরক যেমন নিষিদ্ধ ঠিক তেমনি আইন প্রণয়নে তাঁর অংশীদারিত্বও নিষিদ্ধ।

সুতরাং শারী’আহ্ তার সামগ্রিকতা দিয়ে জাহেলী ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করাকে হারাম করেছে।

সীরাত থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাওয়াহ্’র মাধ্যমে নিঃসন্দেহাতীতভাবে বুঝা যায় যে, উপস্থাপনের রীতিটি ছিল মৌলিক এবং তা ঐ বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। যে কাজ বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে পারে তার মাধ্যমেই কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটতে পারে।. রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর দাওয়াহ্’র মধ্যে মক্কার কাফেরদের শিরকের কোন প্রভাব পড়েনি। তিনি তাদের ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে তোয়াক্কা করেন নি কিংবা সে সময় লোকদের মানা বা না মানা তার কাজে কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করেনি। তৎকালীণ সমাজপতিদের তিনি কখনও তোষামোদ করেন নি, যদিও মক্কাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর দাওয়াহ্ ছিল প্রবল। তিনি প্রকাশ্যে জনসম্মুখে বলেছেন, “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহম্মদ (সা) আল্লাহ্’র প্রেরিত রাসূল”, যা বাস্তবিকভাবেই ইসলামের সামগ্রিকতাকে ধারণ করে এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন বিশ্বাস বা শারীআহ্-কে প্রত্যাখান করে। এর ভিত্তিতে এই শাহাদাহ্-কে মক্কার অন্যান্য কাফির নেতৃবৃন্দের সাথে আবু জাহল প্রত্যাখ্যান করল। একই ভিত্তির উপর দাড়িয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কালো-সাদা, মুক্ত-দাস, ধনী-গরীব, আরব-অনারব, মূর্তিপূজারী-আহলে কিতাব, সবাইকে লক্ষ্য করে এই শাহাদাহ্’র বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের সমালোচনা করে তাদের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন এবং চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। প্রত্যুত্তরে তারা ছিল শত্রুভাবাপন্ন। তারা তাঁর সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল এবং তাকে (সা) আহ্বান জানিয়েছিল যাতে তিনি তাদের ব্যাপারে চুপ থাকেন এবং ফলে তারাও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারে নীরব থাকতে পারেন। তাদের ইচ্ছা এরকম ছিল যে, যদি রাসূল (সা) আপোষ করেন তাহলে তারাও আপোষরফা করে নিবে। তিনি (সা) তা গ্রহণ করেননি এবং দাওয়াহ্’র সময় তার উপর আসা অত্যাচার এবং সাহাবীদের (রা) উপর নির্যাতনের সময় ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। বিশ্বাসীরাও এসময় ধৈর্য ধারণ করেছিল। তাদের সবার ধৈর্য ছিল দাওয়াহ্’র সত্যবাদিতা ও তাদের উচ্চারণের স্মারক। এছাড়াও দাওয়াহ্’র কঠিন সময়ে যখন কোন সাহায্যকারী ছিল না তখন তিনি (সা) দ্বীনকে সহায়তার (নুসরাহ্) আহ্বান নিয়ে বনু শা’শার কাছে যাবার পর তারা যে শর্ত দিয়েছিল তাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা রাসূল (সা) কে নুসরাহ্ (শাসনক্ষমতা অর্জনে সহায়তা) প্রদানে প্রস্তুত ছিল এই শর্তে যে, তাঁর (সা) মৃত্যুর পর কর্তৃত্ব কেবলমাত্র তাদের হবে। তিনি (সা) এরূপ বলেননি যে এটি একটি সুযোগ যা থেকে উপকার পাওয়া যাবে, যেহেতু তাঁর সামনে অন্য সকল দরজাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বরং তিনি একজন শিক্ষক, নেতা, দাওয়াহ্ বহনকারী ও পথপ্রদর্শক হিসেবে তাদেরকে এবং তাদের মাধ্যমে আমাদেরকেও জানালেন যে,

“কর্তৃত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এবং তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা প্রদান করেন।”

এর দ্বারা তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, কর্তৃত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এবং এতে কেউ শরীক নয়। কেবলমাত্র আল্লাহ্ যাকে পছন্দ করেন তাকেই তা প্রদান করেন এবং তখন কারও কোন কিছু বলার থাকে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সহায়তা ও ফিকরার দৃঢ়তার উপর ভরসা ছাড়া আর কোন কিছুর উপর নির্ভর না করেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাওয়াহ্ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। দাওয়াহ্ তখনই তার লক্ষ্যে পৌঁছালো যখন মদীনাতে আল্লাহ্’র ইচ্ছায় মদীনাবাসীর হৃদয়-মন খুলে যাবার দরুণ মুহম্মদ (সা)-কে সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হল। তারা কেবলমাত্র আল্লাহ্’র উপরই নির্ভর করেছিল, তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেছিল এবং চিন্তার বিশুদ্ধতা, উপলদ্ধির স্বচ্ছতা, পদ্ধতির বিশুদ্ধতা ও কর্মকান্ডের সঠিকতা বজায় রেখেছিল।

এখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আইন ছাড়া অন্য আইন দিয়ে শাসনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আলোচনার শেষের দিকে আমরা বর্তমান শাসনব্যবস্থার বাস্তবতা ও এতে অংশীদার হওয়ার স্বরূপ উপস্থাপন করব। তারপর আমরা এটি নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কুর’আনের আয়াত ও সহীহ্ হাদীস উল্লেখ করব এবং কোন প্রকার ব্যাখ্যা ছাড়াই এ প্রসঙ্গে সমাপ্তি টানব কারণ আয়াতগুলো তাদের অর্থের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট।

যেকোন দেশের সংবিধান একটি সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হোক সেটা গণতান্ত্রিক বা ইসলামী, যাতে কোন আইন এই সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস ও ভিত্তি ব্যতিরেকে অন্য কিছু থেকে উৎসারিত না হতে পারে।

সুতরাং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনকে অবশ্যই এর ভিত্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব জনগণের জন্য। জনগণ তাদের নির্বাচিত একটি এসেম্বলীর মাধ্যমে তার নিজের আইন তৈরি করে এবং একে বলা হয় পার্লামেন্ট বা সংসদ। শাসন করার ক্ষেত্রে এটা জনগণ প্রদত্ত নির্বাহী ক্ষমতাবলে আইন প্রণয়ন করে থাকে। সরকারকে জনগণের শাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য সংসদকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে সরকারকে আস্থা ভোটের মাধ্যমে পরীক্ষা করা যায়। আস্থা ভোট ব্যাতিরেকে এটা বৈধতা পায় না। একে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে সে সরকারের কর্মকান্ডের নিরীক্ষা, নিয়ন্ত্রন ও জবাবদিহীতা করতে পারে। একইভাবে সরকার আইন ভঙ্গ করলে বা সংবিধানের রীতিনীতির বাইরে কিছু করলে এটি পুরো সরকার বা বিশেষ কোন মন্ত্রনালয় থেকে আস্থা উঠিয়ে নিতে পারে।

সুতরাং এ ব্যবস্থায় সরকারের কাজের ভিত্তি হল গণতন্ত্র, কোনক্রমেই ইসলাম নয়। আমরা ইতিমধ্যে পূর্বের এক আলোচনায় বলেছি যে, ইসলাম এমন কোন কাজকে গ্রহণ করে না যার কোন আধ্যাত্মিক ভিত্তি নাই অর্থাৎ এটা হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ঈমান।

এ ব্যবস্থার রয়েছে একটি সামগ্রিক কাঠামো যেমনি রয়েছে তাদের একক ভিত্তি। যে কর্মসূচী তারা বাস্তবায়ন করতে চায় তাও একটি এবং তা সম্পাদন করে থাকে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে। একটি মন্ত্রনালয়ের কর্মসূচী সাথে অন্য মন্ত্রনালয়ের কর্মসূচীর সুসামঞ্জস্যতা থাকতে হবে। সরকারই একসাথে এ নীতিকে নিয়মে পরিণত করে। অনেক কন্ঠের মাঝে একা একজন মুসলিম মন্ত্রীর কন্ঠে কিছুই হবে না, বরং সম্মিলিত কন্ঠের মাধ্যমে যে মত জন্ম নেয় তা দ্বারা রাষ্ট্রপতি সংবিধান ও এর মূলনীতির ভিত্তিতে আইনের রূপরেখা তৈরী করেন। এটি হল আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি। তবে এর চিন্তা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সরকারের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের সভাসদগণ বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীদের নির্বাচিত হবার আগেই সরকারের কর্মসূচী নির্ধারণ করে থাকেন। মন্ত্রীদের এই পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা ছাড়া আর কোন ফুরসৎ থাকে না। তার মন্ত্রনালয়ের জন্য আলাদা করে কোন কর্মসূচী গ্রহণের সুযোগ নেই।

তাছাড়া মন্ত্রীর দায়দায়িত্ব হল একটি যৌথ দায়িত্ব। এর অর্থ হল যখন সরকার কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই প্রাধান্য পায়। অর্থাৎ,  একজন মন্ত্রী অন্য মন্ত্রীর কাজে হস্তক্ষেপ করে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরে। এভাবে একজন মুসলিম মন্ত্রী সব ব্যাপারে দায়বহন করে  সেটা তার মন্ত্রনালয় থেকে উদ্ভুত বা সম্পর্কিত বিষয় হোক অথবা অন্য কারো মন্ত্রনালয়ের ব্যাপারে হোক। এমতাবস্থায় সে বাইরে থেকে এবং জনসম্মুখে সরকারের যে কোন কর্মসূচীর পক্ষাবলম্বন করতে বাধ্য, যদিও সে মন্ত্রনালয়ের ভেতরে এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছিল। এখানে একজন মনে করতে পারে যে, মুসলিম মন্ত্রীগণ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোন কিছুর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। এধরনের বিষয় সত্যিই অগভীর চিন্তার ফল। মন্ত্রী সংসদ সদস্য থেকে ভিন্ন। সুতরাং, বাস্তবায়ন নয়, বরং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করেন যারা তাকে নির্বাচিত করেছে। তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন অথবা পুজিবাদী ব্যবস্থায় বামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। কিন্তু, একজন মন্ত্রীকে কখনোই মন্ত্রনালয়ে আনা হয় না বিরোধিতা করবার জন্য। যদি করে তাহলে বিরোধিতার জন্য তাকে মন্ত্রীসভার বাইরে অবস্থান নিতে হবে। সুতরাং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের বা তার কর্মসূচীর বিরোধিতাকারী কেউই এর ভেতরে থাকতে পারেন না বা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। যদি সে ভুলক্রমে প্রবেশ করেও থাকে তাহলে তাকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হয়। সরকার আসে শাসন ও বাস্তবায়ন করতে। তাদের কিছু নীতিমালা থাকে যা তারা বাস্তবায়ন করতে চায়। পরষ্পরবিরোধীদের সমন্বয়ে তা হতে পারেনা। যে কেউ এ নীতির বাইরে যাবে তাকে প্রধানমন্ত্রী অথবা অন্যদের সমন্বিত আমন্ত্রনে বেরিয়ে যেতে হবে। এমপিরা ব্যক্তিগতভাবে তার উপর থেকে আস্থা তুলে নিবে এবং সরকারের কার্যক্রম চলতে থাকবে।

এখানে একটি কথা বলা অপরিহার্য যে, কুফর শাসনব্যবস্থার মন্ত্রীসভায় মুসলিমদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের বর্তমান সংবিধান ও এটি যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাকে বৈধতা দেয়া হয়। উপরে উল্লেখিত তাদের এরূপ বিরোধীতা ভিত্তিমূল থেকে ঐ (কুফর) ব্যবস্থার বিরোধিতা নয়, বরং এ হচ্ছে ব্যবস্থার ভেতরে স্থান নিয়ে বিরোধীতা যা কিনা এমনধরণের বিরোধীতা যাতে ঐ (কুফর) ব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে মেনে নিয়ে কেবল শাখা-প্রশাখা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করা হয়।

তাছাড়া যখন কোন মন্ত্রনালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট আইন গৃহীত হয় তখন তা ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ বা কার্যকারিতায় আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তিনটি পক্ষ থেকে অনুমোদন ও স্বাক্ষর না পাওয়া যায়। এরা হলেন রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী। এর অর্থ হল মুসলিম মন্ত্রী তার ইচ্ছা অনুযায়ী মন্ত্রনালয় চালাতে পারেন না ও বাস্তবসম্মত আইনও জারি করতে পারেন না।

এ থেকে আমরা কিছু বিষয় স্পষ্ট হতে পারি:

— যে সব আইন দ্বারা শাসক শাসন করে সেগুলোর আধ্যাত্মিক ভিত্তি (যা হলো আল্লাহ্’র উপর বিশ্বাস) নেই কিন্তু গণতান্ত্রিক ভিত্তি রয়েছে, যেখানে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক কিন্তু আল্লাহ্ নন।

— সরকার হল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ শাসন ও নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সংবিধানের অনুশাসন কায়েম করে থাকে। মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীসহ পুরো সরকারের প্রত্যেকেই সংবিধানের হুকুম মেনে চলতে বাধ্য; অন্যথায় এটা ভঙ্গের অভিযোগে তারা অভিযুক্ত হবে।

— মুসলিম মন্ত্রীসহ কোন মন্ত্রীই তার মন্ত্রনালয়ের জন্য স্বতন্ত্রভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারেন না। বরং তিনি রাষ্ট্রের প্রধানসহ সামগ্রিকভাবে যে কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় সেটাই বাস্তবায়ন করেন।

— প্রত্যেক মন্ত্রী সরকারের যে কোন কর্মকান্ড ও সিদ্ধান্তের দায়বহন করে। কারণ আইন অনুসারে মন্ত্রীপরিষদ সামষ্টিকভাবে ও যৌথভাবে দায়িত্বশীল।

সংক্ষেপে বলা যায় যে, এ ব্যবস্থায় কেউ মন্ত্রীপরিষদ ব্যতিরেকে এককভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের এখতিয়ার রাখেন না। আর এটাই হল এসব সরকারের বাস্তবতা। এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুর’আনে অনেক আয়াত রয়েছে।

— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এটা বাধ্যতামূলক করেছেন যে, হুকুম দেবার মালিক কেবলমাত্র তিনি, যা একটি ভিত্তি এবং এই ভিত্তি থেকেই আইন উৎসারিত হয়। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার (মুহাম্মদ (সা)) উপর ন্যস্ত না করে এবং কোনরূপ সঙ্কীর্ণতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সন্তুষ্ট চিত্তে তোমার (মুহাম্মদ (সা)) সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।”
(আন-নিসা: আয়াত ৬৫)

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত আসার পর তাতে ভিন্নতা পোষণ করা মু’মিন পুরুষ কিংবা নারী কারও ক্ষেত্রেই সঙ্গত নয়।”
(সূরা আল আহ্যাব: ৩৬)

— আল্লাহ্ এটা বাধ্য করেছেন যে, শাসককে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে।

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কতৃর্ত্বশীল তাদের।”
(সূরা আন নিসা: ৫৯)

— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম শাসকদের ইসলাম দিয়ে শাসন করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করুন…. ।”
(সূরা মায়িদাহ্ : ৪৯)

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম শাসকদের ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন না করার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন, যদি তা মাত্র একটি আইনও হয়। তাই তিনি বলেন,

“…যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ্ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৯)

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যারা কুফর দিয়ে শাসন করে তাদের সাথে তলোয়ারী দিয়ে ফায়সালা করার জন্য। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে ফাযির শাসকদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ারী ধরা যাবে কিনা? উত্তরে তিনি বলেন,

“যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা (তার) প্রকাশ্য কুফরী দেখতে পাও যাতে তোমাদের পক্ষে তোমাদের কাছে আল্লাহ্ প্রদত্ত প্রমাণ থাকে।”
(মুসলিম)

— তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাসকদের উপদেষ্টা ও পরিষদবর্গকে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুর অনুসরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে (উপদেষ্টা, সাহায্যকারী, রক্ষাকারী) গ্রহণ করো না।”
(সূরা আল ইমরান: ১১৮)

— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের ইসলামের দ্বারস্থ হতে বলেছেন এবং এ ব্যাপারে তাগুতকে পরিত্যাগ করতে বলেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, যে ব্যক্তি এটা না করে সে সত্যিকারের ঈমানদার নয়। তিনি বলেন,

“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে সেই সব বিষয়ের উপর তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তারা (বিরোধপূর্ণ বিষয়ের) মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায়, অথচ তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
(সূরা নিসা: ৬০)

— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।

“হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ্ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।”
(সূরা মুমতাহিনা: ১৩)

এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,

“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে তোমাদের বন্ধুরূপে গ্রহন করো না। তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারা তাদেরই অন্তভুর্ক্ত। আল্লাহ্ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। বস্তুত, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে: আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ্ বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন, ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য সেদিন অনুতপ্ত হবে।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৫১-৫২)

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, আজকের দিনে শাসকরা ইহুদী বা খ্রীস্টান নয়। প্রকৃত অর্থে তারা ইহুদী বা খ্রীস্টানদের প্রতি অনুগত। যে এই শাসকদের আনুগত্য করে সে যেন তাদেরই আনুগত্য করে যাদের প্রতি ঐ শাসকরা অনুগত।

তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আর যারা কাফের তারা পারস্পরিক সহযোগী বন্ধু। তোমরাও যদি তা না কর (অর্থাৎ এক খিলাফতের অধীনে পরস্পর ঐক্যবদ্ধ না হও) তাহলে দুনিয়ার বুকে ফিত্না (যুদ্ধ, বিগ্রহ) ও যুলুম বিস্তার লাভ করবে এবং দুষ্কর্ম ও দূর্নীতি ছেয়ে যাবে ।”
(সূরা আনফাল: ৭৩)

এথানে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের প্রতি অনুগত না হবার অর্থ এটা নয় যে তারা ব্যতীত অন্যদের আনুগত্য করা যাবে। বরং এখানে ইস্যুটি হল যে বা যা কিছু ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তার সাথে সম্পর্ক না রাখা। তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকার অর্থ হল তাদের সাথে চিন্তা, ব্যবহার প্রভৃতি ক্ষেত্রে কোনরূপ সম্পর্ক না রাখা এবং তাদের পক্ষ থেকে কোন কিছু গ্রহণ না করা যতক্ষণ পর্যন্ত এর ভিত্তি হল কুফর। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইব্রাহীম (আ:) এর মুখ দিয়ে বলেন,

“তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহ্’র পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানিনা। তোমরা এক আল্লাহ্’র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে……”
(মুমতাহিনা: ৪)

ওয়ালা (আনুগত্য) কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, তাঁর রাসূল (সা) ও মু’মিনদের প্রতি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

“আর যারা আল্লাহ্, তাঁর রসুল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহ্’র দল এবং তারাই বিজয়ী।”
(সূরা মায়িদাহ্ : ৫৬)

এখানে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বিষয়টি গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে আমরা ঐ ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছি। কেউ বলতে পারে, আমরা আনুগত্যের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র মডেলটিকে (প্রভাব বিস্তার করার আগ পর্যন্ত আনুগত্য দেখাই) অনুসরণ করি কিন্তু আমাদের মন তাদের কাজগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে। সত্য কথা হল আনুগত্য হল এমন একটি বিষয় যেখানে শরীর ও মনের অংশীদারিত্ব রয়েছে। আমরা অবশ্যই এসব শাসক যা করে তা হাত, জিহ্বা ও হৃদয় দিয়ে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য, যখন সে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, হৃদয় দিয়ে ঘৃণা করা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর এবং এর পরে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যাদের হৃদয় ঈমানের দূর্বলমত স্তরে রয়েছে তারা তাদের কাজ ও বক্তব্যের মাধ্যমে অনৈইসলামি শাসনকে সমর্থন দেয়া উচিত নয়। যারা এর ব্যাত্যয় ঘটায় তারা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে অমান্য করছে ও পাপে লিপ্ত আছে যদিও তারা মনে মনে একে প্রত্যাখ্যান করে। আর যদি তাদের মনও এটা অনুমোদন করে নেয় তাহলেতো তারা কুফরে লিপ্ত। যারা আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসনকারীদের সাথে অংশগ্রহণ করে তাদের সম্পর্কে একজন সর্বনিম্ন এতটুকু বলতে পারে যে, সে ব্যক্তি ফাসিক (পাপাচারী), যালিম বা যুলুমকারী এবং আ’সী বা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অবাধ্য।

Print Friendly, PDF & Email

Leave a Reply