Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ১৫তম অধ্যায়: হারামের মাধ্যমে হালালে পৌঁছানো যায় না (উদ্দেশ্য পদ্ধতির ন্যায্যতা প্রমান করে না)

    ১৫তম অধ্যায়: হারামের মাধ্যমে হালালে পৌঁছানো যায় না (উদ্দেশ্য পদ্ধতির ন্যায্যতা প্রমান করে না)

    কিছু কিছু মুসলিমের চিন্তা যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতা (Rational Analogy) দ্বারা প্রভাবিত। এই সাদৃশ্যতা বিবেচনায় তারা শারী’আহ্ প্রদত্ত ইঙ্গিত অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দলিলে উল্লেখিত ইল্লাহ্ (হুকুমের পেছনে ঐশী বা শারী’আহ্ প্রদত্ত কারণ) এর উপর নির্ভর করে না। তাদের মতে চিন্তা ব্যবহার করে সমগ্র শারী’আহ্ হতে যুক্তিনির্ভর ক্বিয়াস (Rational Qiyas) অনুধাবন করা যায়, তার জন্য নির্দিষ্ট কোন দলিলের প্রয়োজন নাই। শারী’আহ্ প্রদত্ত সুস্পষ্ট কোন ইঙ্গিত ছাড়াই এক হুকুমের সাথে অন্য হুকুমের সাদৃশ্যতা বিবেচনা করে মানব চিন্তা তা অনুধাবনে সক্ষম। শারী’আহ্ হুকুম ও অন্যান্য হুকুমের মধ্যে মাসলাহা’র (সুবিধা) ভিত্তিতে প্রাধান্য বিবেচনা করেও তা উপলদ্ধি করা সম্ভব।

    উপরের যুক্তিগুলো কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দৃষ্টিতে সমস্ত শারী’আহ্ আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, জীবন, চিন্তা, বংশীয় ধারা এবং সম্পদের সুরক্ষার দিকে ইঙ্গিত দিয়েছে। সুতরাং যা কিছু এই পাঁচ বিষয়ের সুরক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট তাই শারী’আহ্’র নির্দেশনা, শারী’আহ্ দলীলে তা উল্লেখ না থাকুক কিংবা তা বিবেচনায় কোন শারী’আহ্ ইল্লাহ্ (ঐশী কারণ) না থাকুক। দুটি বিষয়ের মধ্যে তুলনামূলক সাদৃশ্যতা বিবেচনা করার কারণেই তারা এরুপ করে থাকে। তাদের আরও যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু জরুরী প্রয়োজনে শারী’আহ্ হারাম কিছু ভক্ষণ ও মদ পান করাকে বৈধতা দিয়েছে সেহেতু দুটি বিষয়ের মধ্যে সাদৃশ্যতা বিবেচনা করে জরুরী প্রয়োজনে সুদের সম্পৃক্ততাও অনুমোদিত।

    এ ধরনের বোধ সঠিক চিন্তার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক ও বৈপরীত্যপূর্ণ। এ ধরণের পদ্ধতির ধরণ হতে এর অসততার প্রমাণ পাওয়া যায় এবং এ ধরনের পদ্ধতির উপর না নির্ভর করা যায়, না গ্রহন করা যায়। কারণ যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার ক্ষেত্রে সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়সমূহকে এক জায়গায় এনে তাকে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়সমূহ হতে আলাদা রাখতে হয়। কিন্তু আমরা দেখি শারী’আহ্ একই ধরনের অনেক বিষয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রায় দিয়েছে এবং অন্যদিকে একাধিক ভিন্ন বিষয়ে একই প্রকার রায় দিয়েছে। তাছাড়া এটা এমন কিছু বিধানও দিয়েছে যা আমাদের চিন্তার আওয়ার বাইরে। তাই এই পদ্ধতিকে সমূলে প্রত্যাখ্যানে এতটুকুই যথেষ্ট।

  • ১৪তম অধ্যায়: মাসলাহা’র (সুবিধা) দোহাই দিয়ে হারামকে অনুমোদন দেয়া

    ১৪তম অধ্যায়: মাসলাহা’র (সুবিধা) দোহাই দিয়ে হারামকে অনুমোদন দেয়া

    শারীআহ্ কিছু বিষয়কে আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে আর কিছু বিষয়কে নিষেধ করেছে। কোনভাবেই তার রদবদল, পরিবর্তন ও বিকৃত করা আমাদের জন্য বৈধ নয়। সর্বজ্ঞানী আইনপ্রণেতা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শুধুমাত্র যেখানে প্রয়োজন সেখানেই রুখসাহ্-কে (অব্যহতি) অনুমোদন দিয়েছেন। সুতরাং শয়তান বা মানুষের প্রবৃত্তি সুবিধার দোহাই দিয়ে যতই এতে প্ররোচনা দিক না কেন, যে স্থানে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) রুখসাহ্ (অব্যহতি) প্রদান করেননি সে স্থানে তাঁর হুকুমকে পাশ কাটানোর কোন অনুমোদন নাই। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত রুখসাহ্ ব্যতীত বাধ্যতামূলক হুকুমসমূহ পরিত্যাগ করাকে অনুমোদন দেয় আর নিষেধ অমান্য করাকে বৈধতা দান করে সে কাফির কিংবা অজ্ঞ ফাসিকদের অন্তর্ভূক্ত।

    কিছু বিপথগামী ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছে যে মাসলাহা হচ্ছে ক্ষমতার অংশীদারিত্বের দলিল;

    তাদের মতে, মাসলাহা হলো সে সমস্ত কর্মকান্ড যা থেকে মুলতঃ অধিকাংশ এমনকি বেশীরভাগ সময়ই ব্যক্তি বা জনগণের কল্যান সাধিত হয়। তাদের মতে ওলেমাগণ শারীআহ্ পর্যবেক্ষন করে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন যে শারীআহ্’কে এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে দুনিয়া এবং আখিরাতে বান্দার কল্যান সাধিত হয়।

    তারা মাসালিহ্ মুরসালাহ্ (অসজ্ঞায়িত বিষয়সমূহের কল্যাণ) সম্পর্কিত উদাহরণ ও যে ভিত্তির উপর তা প্রতিষ্ঠিত তা উদ্ধৃত করে। তারা বলে যে ক্ষমতায় অংশীদারিত্বের দলিল মাসালিহ্ মুরসালাহ্’র ভিত্তিতে সম্ভব নয়। কারণ সুস্পষ্ট দলিলাদির মাধ্যমে এটা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত যে, জাহেলী ব্যবস্থায় শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করা গুনাহে্র কাজ। বরং এখানে লদ্ধ বিষয়টির ভিত্তি হলো, দু’টি ভাল কাজের মধ্যে উত্তমটি পছন্দ করা এবং দু’টি খারাপ কাজের মধ্যে অপেক্ষাকৃত মন্দটি চিহ্নিত করা; দু’টি সুবিধার মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম সুবিধাটি বর্জন করে অধিকতর সুবিধাটি গ্রহণ করা এবং দু’টি ক্ষতিকর বিষয়ের মধ্যে অধিকতর ক্ষতিকর বিষয়টি বর্জন করে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিকর বিষয়টি গ্রহণ করা ।

    তারা বলে, শারীআহ্ প্রদর্শিত এই পথের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যেমন, সামান্য কিছু উপকারীতা সত্ত্বেও ইসলাম মদ ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করার কারণ হলো সামান্য উপকারীতার তুলনায় বিরাট ক্ষতি গুরুত্বপূর্ণ। জিহাদের মাধ্যমে বিশ্বাসীদের জান ও মালের ক্ষয়-ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও যেহেতু এর মাধ্যমে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নৈকট্য লাভের মধ্য দিয়ে বান্দার কল্যান সাধিত হয় তাই জিহাদকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

    তাদের ভাষায়, ইসলামের ইতিহাসে শাসক ও আলেমগণ ইসলামের অগ্রযাত্রায় এ পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। একারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাবাকে ভেঙে ফেলে তা ইব্রাহীমী ভিত্তির উপর পুনঃনির্মাণ থেকে বিরত থেকেছেন, যদিও এতে ধমীর্য় সুবিধা ছিল। কেননা কাবা পুনঃনির্মাণ করলে যতটা লাভ হবে ক্ষতি হবে তার চেয়ে বেশী।  তিনি (সা) তাঁর বিবি আয়েশা (রা.) কে বলেন,

    “যদি কাবা তোমাদের (যারা অতিসম্প্রতি জাহেলিয়াত ত্যাগ করে এসেছে) সম্প্রদায়ের অংশ না হতো তবে আমি তা ভেঁঙ্গে এর দুটো দরজা করে দিতাম।”
    [তিরমিযী ও নাসা’ঈর সূত্রে বর্ণিত]

    তারা এরূপ আরও অনেক উদাহরণ নিয়ে আসে;

    এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তারা বলে যে নিঃসন্দেহে জাহেলী সরকারে অংশগ্রহণ করা অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষয়। এ সরকারগুলো তাগুতের হুকুম বাস্তবায়ন করে এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা) হুকুম থেকে বিচ্যুত হয় ও বিবাদে লিপ্ত হয়।

    “হুকুম (বিধান বা আইন) দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ্।”
    (সূরা-ইউসুফ: ৪০)

    “তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না।”
    (সূরা কাহাফ: ২৬)

    এতদসত্ত্বেও তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ক্ষমতার ভাগাভাগির কারণে ইসলাম, মুসলিম, ইসলামী দলগুলোর জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক ফায়দা রয়েছে যা তাগুত দূরীকরণে এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর সঠিক চিত্রটি তুলে ধরতে তাদের কিছু উক্তি তুলে ধরা যাক। যখন তাদের চিন্তার পদ্ধতি ও মতামতগুলো খন্ডন হয়ে যাবে তখন আমরা সহজেই বুঝতে পারব যে শারীআহ্ পদ্ধতি থেকে তারা কতদূরে অবস্থান করছে। তাদের বক্তব্য নিম্নরূপঃ

    — জাহেলী শাসনব্যবস্থায় কোন মুসলিমের অংশগ্রহণ তাকে একটি বড় দ্বন্দের দিকে ঠেলে দেয়। মুসলিমদের তাগুত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উচিত। তাহলে কী করে সে তাগুত প্রতিষ্ঠাকারীদের সাথে থাকতে পারে? যেসব মুসলিম নিজেদের ঈমানদার বলে দাবী করে এবং পরবতীর্তে আইনের জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হয় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের ব্যাপারে বলেন,

    “আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি নাযিল হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল হয়েছে, সে সমস্ত বিষয়ের উপর আমরা ঈমান এনেছি আর বিরোধপূর্ণ বিষয়ে তারা শয়তানের শরণাপন্ন হয়, অথচ তাকে প্রত্যাখ্যানের জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
    (সূরা নিসা: ৬০)

    — তাগুতের প্রতি আনুগত্য করা আইনগতভাবে আল্লাহ্’র আদেশের বিরুদ্ধে যায় এবং সেক্ষেত্রে আল্লাহ্’কে ইলাহ্ মানার বদলে তাদেরকে ইলাহ্ মানা বুঝায়। তিনি সুবহানাহু তা’আলা আহলে কিতাবদের সম্পর্কে বলেন,

    “তারা তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদিগকে তাদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে আল্লাহ্ ব্যতীত এবং মরিয়মের পুত্রকেও। অথচ তারা আদিষ্ট ছিল একমাত্র মাবুদের ইবাদতের জন্য।”
    (সূরা আত্—তাওবা: ৩১)

    রাসূল (সা) আদি বিন হাতিম (রা) এর নিকট এগুলোকে ইলাহ্ হিসেবে গ্রহণের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, এমন অবস্থায় তাদেরকে মান্য করা যখন তারা আল্লাহ্ কতৃর্ক নির্দেশিত হালালকে হারাম আর হারামকে হালাল হিসেবে গণ্য করে।

    — আজকাল আমরা দেখতে পাই শাসকগণ সরল প্রকৃতির ও সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করতে কিছু সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন মুসলিমকে কিছু পদে নিয়োগ দিয়ে তাদের কুশাসনকে শোভামন্ডিত করার চেষ্টা করে, যাতে তারা যুক্তি দাঁড় করাতে পারে যদি তারা ভ্রান্ত হতো তাহলে অমুক এবং অমুক কোনভাবেই তাদের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে আসত না ।

    — এবং তারপর অত্যন্ত জগণ্যভাবে এসব শাসকেরা মুসলিম মন্ত্রীদের দিয়ে অন্যায় ও নিষ্ঠুর আইনসমূহ পাস করিয়ে নেয় এবং কার্যসিদ্ধির পর তাদেরকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতই ছুড়ে ফেলে দেয়।

    — ক্ষমতার ভাগাভাগি প্রতি আসক্তি হলো যালিম শাসকের নিদর্শন। আল্লাহ্ সুবহানাহু তাআ’লা আমাদের এ ব্যাপারে সাবধান করে বলেছেন যে,

    “আর যালিমদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ো না। নতুবা জাহান্নামের আগুণ তোমাদের পাকড়াও করবে।”
    (সূরা হুদ: ১১৩)

    এছাড়াও ক্ষমতার ভাগাভাগি জাহেল শাসকদের শাসনকালকে প্রলম্বিত করে।

    — আমাদের জন্য এতটুকু জানাই যথেষ্ট, যারা এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে তারা এমন সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেন,

    “এবং যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই কাফের।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)

    এবং;

    “এবং যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই যালেম।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৫)

    এবং;

    “এবং যারা আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই ফাসেক।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৭)

    উল্লেখিত প্রতিটি বিষয়ের কোনটিই এ ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব ও দাওয়াহ্ বহনকারীদের কাছে অপরিচিত বিষয় নয়। উল্লেখিত স্পষ্ট আয়াতগুলো হতে দিক নির্দেশনাও গোপন নয়।

    এতদসত্ত্বেও তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হচ্ছে ক্ষমতার ভাগাভাগি ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন এবং মুসলিমদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। এমনকি এর দ্বারা তাগুত অপসারিত হবে এবং সত্য বুলন্দিত হবে। ক্ষমতার ভাগাভাগি থেকে ইসলামী আন্দোলনগুলো তথাকথিত কী কী সুবিধা লাভ করতে পারে তার সারমর্ম নিম্নরূপ:

    ১. দরজার ওপাশে কী হচ্ছে এ ব্যাপারে ধারণালাভের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া ও ব্যর্থ করা।

    ২. লোকদের এটা বুঝতে দেয়া দলটি শাসন করতে সক্ষম এবং এটি দরবেশদের একটি সংঘ নয়।

    ৩. ইসলামের ব্যাপারে আত্নবিশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে আসা এই অর্থে যে, এটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সার্বজনীন বিষয়সমূহ সমাধান দিতে সক্ষম।

    ৪. শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক কাজের জন্য দলটির অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করা।

    ৫. বর্তমান শাসনব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়ে এর ক্ষতি থেকে আন্দোলনকে রক্ষা করা।

    ৬. বিশেষ ইসলামী ব্যক্তি ও কর্মীদের সরকারী বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে তোলা যায়।

    ৭. একটি ইসলামী দলের ভেতর থেকে এমন কিছু ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে আসা যারা লোকদের মধ্যে উচ্চপদে আসীন হবে। তারাই দল এবং এর সদস্যদের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করবে।

    ৮. ইসলামী কেন্দ্রসমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি করে কুফরী কেন্দ্রসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করা।

    ৯. রাজনীতিতে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গড়ে তোলা এবং শেখানো কীভাবে এ ব্যবস্থার দোষণীয় বিষয়গুলো বর্জন করা যায়।

    ১০. শাসনব্যবস্থায় সুনামের মাধ্যমে দলের সুনাম বৃদ্ধি করা।

    ১১. যদি দলটি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব না নেয়, তাহলে ইসলামের শত্রু কেউ অংশগ্রহণ করবে এবং তারা ইসলামী আন্দোলনকে আক্রমণ করার জন্য এবং ইসলাম ও মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সমস্ত শক্তি নিয়োগ করবে। 

    আমরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গী কিছুটা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছি। যদিও আমাদের বক্তব্য কেবলমাত্র বক্তব্য দেয়ার জন্য নয়, বরং যুক্তিখন্ডনের জন্য। পরিষ্কারভাবে এর আসল প্রকৃতি তুলে ধরা এবং আল্লাহ্’র দ্বীন থেকে তারা কতটা বিচ্যুত হওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে তা বুঝার জন্য। তারা যখন কোনো ফাতওয়া বা রায় দেয় তখন তা দুনিয়া ও আখেরাতের অধিপতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ক্রোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলার) হক ও নির্দেশের প্রতি কোনরূপ শ্রদ্ধা সৃষ্টির বদলে মুসলিমদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আর সেজন্যই তাদের দৃষ্টিভঙ্গী অকাট্য দলিলসম্পন্ন শারী’আহ্’র সাথে কী পরিমাণ সাংঘর্ষিক সেটা মুসলিমদের বুঝানো প্রয়োজন এবং ইসলামের সঠিক ইসতিম্বাতের (মাসআ’লা আহরণ)পদ্ধতি গ্রহণ থেকে তারা কতটা বিচ্যুত তাও আমাদের জানা প্রয়োজন; এবং দেখানো প্রয়োজন তাদের নতুন আবিষ্কৃত পদ্ধতি যা মুসলিমদের অধঃপতনের সময়কার একটি স্মারক যখন তারা পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল যাতে করে আমরা তাদের চিন্তা বিশদভাবে বুঝতে পারি এবং খন্ডন করতে পারি ও তাদের চিন্তার পদ্ধতিকে উপলদ্ধি করতে পারি এবং তা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারি।

    একটি সুস্পষ্ট ও অকাট্য শারী’আহগত হুকুম হচ্ছে সুদ খাওয়া যাবে না, যে ব্যাপারে কোনরূপ ইজতিহাদ গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এটাকে নিষিদ্ধ করেছেন যখন তিনি বলেন,

    “আল্লাহ্ ব্যবসাকে করেছেন হালাল আর সুদকে করেছেন হারাম।”
    (সূরা বাক্বারা: ২৭৫)  

    এগুলো হল অকাট্য শারী’ঈ দৃষ্টান্ত যে ব্যাপারে কঠিনভাবে বলা হয়েছে, যেমন যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “আল্লাহ্ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দান-খয়রাতকে বর্ধিত করেন।”
    (সূরা বাক্বারা: ২৭৬)

    যারা সুদের সাথে সম্পর্ক রাখে তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন এবং একে যুদ্ধের ঘোষণার শামীল হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন,

    “হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ্’কে ভয় কর এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া রয়েছে তা পরিত্যাগ কর যদি তোমরা মু’মিন হও। অতঃপর যদি তোমরা তা না কর তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও….”
    (সূরা বাক্বারা : ২৭৮—২৭৯)

    যারা সুদ খায় তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে ঐ ব্যক্তির ন্যয়, যাকে শয়তান আছর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়।”
    (সূরা বাক্বারা: ২৭৫)

    রাসূলুল্লাহ্ (সা) এটা ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং একে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাথে শিরক হিসেবে দেখিয়েছেন:

    “সাত ধরনের মুবিকাত (ভয়ঙ্কর গুণাহ্’র কাজ) থেকে বিরত থাক। তারা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘সেগুলো কী ইয়া রাসূলুল্লাহ্?’ তিনি (সা) বললেন, ‘আল্লাহ্’র সাথে শিরক করা, যাদু, বিনা কারণে কাউকে হত্যা করা, সুদ খাওয়া, এতিমের সম্পত্তি ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে আসা, মু’মিনা সৎ সতী-সাধ্বী নারীর উপর অপবাদ আরোপ করা’।”

    এতদসত্ত্বে আমরা দেখি যে তারা তাদের অনুসৃত পদ্ধতি অনুসারে বলে, সুদ অনুমোদিত! তাহলে এই সুস্পষ্ট ও অকাট্য নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কী হল? এই সাবধান বাণী ও ভীতি প্রদর্শনের কী হবে?  এ পদ্ধতির মাধ্যমে তারা আল্লাহ্ প্রদত্ত হুকুম পরিবর্তন ও সংশোধন করছে, শারী’আহ্’র গায়ে কালিমালেপন করছে, দ্বীনের বিভিন্ন বিষয়ে অবহেলা প্রদর্শন করাকে স্বাভাবিক করে ফেলছে এবং এটাকে মুসলিমদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উপস্থাপন করছে।

    একইভাবে আল্লাহ্ যা দিয়ে নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করা হল ফরয। তাদের সুপারিশক্রমেই বলা যায় যে, আইন তৈরির বিষয়টি কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য রাখাটাই বাধ্যতামূলক। এতদসত্ত্বেও তাদের তৈরি করা পদ্ধতি অনুসারে, তারা মুসলিমদের কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অনুমোদন দিচ্ছে। নিজেদের ইসলামী আন্দোলনের নেতা ও চিন্তাবিদ হিসেবে দাবি করলেও তারা সত্য থেকে কতটুকু বিচ্যুত তা আমরা দেখিয়েছি যদিও নেতাদের তাদের অনুসারীদের নিকট মিথ্যা বলা কোনভাবেই কাম্য নয়।

    তারা নিজেরাই বলে,

    — এটা সন্দেহাতীত যে জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ আমাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। সরকারগুলো তাগুতের হুকুম বাস্তবায়ন করে এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হুকুম থেকে বিচ্যুত হয় ও তাঁর হুকুমের বিরুদ্ধাচরণ করে।

    — জাহেলী শাসনব্যবস্থায় মুসলিমদের অংশগ্রহণ তাদের একটি বড় দ্বন্দের দিকে ঠেলে দেয়। মুসলিমদের তাগুত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উচিত। তাহলে কী করে একজন তাগুত প্রতিষ্ঠাকারীদের সাথে থাকতে পারে?

    — তাগুতের প্রতি আনুগত্য করা আইনগতভাবে আল্লাহ্’র আদেশের বিরুদ্ধে যায় এবং সেক্ষেত্রে আল্লাহ্’কে ইলাহ্ মানার বদলে তাদেরকে ইলাহ্ মানা বুঝায়।

    — আজকাল আমরা দেখতে পাই শাসকগণ সহজ সরল প্রকৃতির মানুষ ও সাধারণ জনগণকে প্রতারিত করার জন্য কিছু মর্যাদাবান মুসলিমকে অলংকারিক কিছু পদে নিয়োগ দেন যারা ঐ সব শাসকদের দুঃশাসনকে বৈধতা দেয়। তখন শাসকেরা বলে যে, যদি তারা মিথ্যের মধ্যে থাকতেন তাহলে অমুক এবং অমুক কোনভাবেই তাদের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগিতে আসত না।

    — পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় যখন সেসব শাসকরা মুসলিম মন্ত্রীদের দিয়ে অন্যায় ও নিষ্ঠুর আইনসমূহ পাস করিয়ে নেয় এবং কার্যসিদ্ধির পর সেসব ব্যক্তিদের তারা অপ্রয়োজনীয় বস্তুর মতই ছুড়ে ফেলে দেয়।

    — ক্ষমতার ভাগাভাগি হল অবিচারকারী শাসকদের প্রতি মন্দ প্রবণতার উজ্জল দৃষ্টান্ত।

    — এছাড়াও ক্ষমতার ভাগাভাগি জাহেল শাসকদের কার্যকালকে প্রলম্বিত করে।

    আমাদের জন্য এটুকু জানা যথেষ্ট যে, যে ব্যক্তি এ ধরনের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে তারা এমন সব লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “…তারাই কাফের।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)

    “… তারাই যালেম।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৫)

    “…তারাই ফাসেক।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৭)

    এতদসত্ত্বেও তারা এহেন মতামত বা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। আল্লাহ্’র দ্বীনের বিরুদ্ধে কীভাবে তারা এরকম ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে! আরও ঘৃণ্য বিষয় হচ্ছে, তারা কেবল নিজেরাই ইসলামের হুকুমসমূহকে অমান্য করে না বরং অন্যদেরকেও অমান্য করতে উৎসাহী করে তোলে। এটা অবশ্যই একটি ভয়াবহ গুণাহ্।

    শারী’আহগত হুকুমকে তারা কীভাবে অমান্য করেছে সেটা উপস্থাপনের পর আমরা জিজ্ঞেস করতে চাই কুফর শাসব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা কী অর্জন করবে? আমরা ভেবেছিলাম এই দাওয়াহ্’র বিরুদ্ধে তাদের পূর্বসর্তকতা উপস্থাপনের পর তারা শারী’আহ্ উপেক্ষিত এসব ভ্রান্ত সুবিধাবাদী চিন্তাসমূহ উল্লেখ করবে কিন্তু এটা বুঝতে পারার মতো তারা যথেষ্ট চতুর ছিল যে, এসব পরিত্যাজ্য যুক্তি এবং অথর্ব চিন্তা দ্বারা নিঃসন্দেহে শারী’আহ্ লঙ্ঘিত হবে এবং আল্লাহ্’র শত্রুরা সুবিধা পাবে। আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ দানকারী তাদের এসব ‘অভিনব’ চিন্তা না মুসলিমদেরকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে লাভবান করেছে, না তাদেরকে সত্যের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, না বিজয়কে নিকটবর্তী করেছে এবং না বাস্তবতাকে সামান্যতম পরিবর্তন করেছে। বরং প্রাপ্তিটা হয়েছে ঠিক তার উল্টো। যার সত্যতা বাস্তবতা থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান।

    জাহেল শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের কী সুবিধা হয়েছে এ ব্যাপারে তাদের ১১ টি অনুচ্ছেদ রয়েছে। আল্লাহ্’র কসম! একবার এগুলোর দিকে তাকালেই বুঝা যায় যে এর বিশাল গুণাহ্’র তুলনায় এর প্রাপ্তি কত সামান্য। এর কয়েকটিকে পরীক্ষা করে দেখা যাক:

    — শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক কাজের জন্য দলটির অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি করা।

    — বিশেষ ইসলামী ব্যক্তিদের সরকারী বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত করে তোলা।

    — রাজনীতিতে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গড়ে তোলা এবং তাদের শেখানো কীভাবে এ ব্যবস্থার দোষণীয় বিষয়গুলো বর্জন করা যায়।

    এ তিনটি অনুচ্ছেদ একটি বিষয়ের সাথে বিজড়িত। এ তিনটিকে একটি অনুচ্ছেদে রাখলেই বরং বেশী উপযোগী যদি না কেউ এর স্বপক্ষে অনেক বেশী যুক্তি তুলে ধরতে চায়। এটাও জানা দরকার যে, এ বিষয়ে কে কতটুকু কথা বলতে পারল তা নয়, বরং সত্যিকারের যথার্থতাই এখানে মুখ্য। এ অনুচ্ছেদগুলো কী ধারনাভিত্তিক সুবিধার বিনিময়ে মুসলিমদের আল্লাহ্’র হুকুম অমান্য করতে বৈধতা প্রদান করে? কোনো আন্দোলনের কর্মীদের প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ করে তোলার জন্য আল্লাহ্’র ক্রোধের এই পথ ছাড়া কি অন্য কোনো পথ নেই? শারী’আহ্ পদ্ধতি অনুসরণ করলে কী এ প্রশিক্ষণে ঘাটতি হতো? যে ইসলামী আন্দোলন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পদ্ধতিকে অনুসরন করে বৈধভাবে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করে তারাও তাদের অভিজ্ঞতা বৃদ্ধি  করতে পারে, শাসকদের বাস্তবতার সাথে পরিচিতি হতে পারে, কুফর রাষ্ট্রের সাথে এই শাসকদের সম্পর্কের গভীরতা বুঝতে পারে এবং তাদের নানা কৌশল ও শঠতা ধরতে পারে । একজন দাওয়াহ্ বহনকারী কি মদখোরকে তার মদ খাওয়া পরিত্যাগ করার ব্যাপারে আহ্বান করতে অক্ষম? নাকি এর জন্য দাওয়াহ্ বহনকারীকে পানশালায় প্রবেশ করতে হবে, মদ পানকারীর সাথে তাকেও পান করতে হবে এবং এরপর তা ছেড়ে দিবে যাতে করে এ পদ্ধতির মাধ্যমে মদ পানকারী মনে করে যে, সেও চাইলে মদ পান ছাড়তে পারে। আল্লাহ্’র কসম! যারা এমন পদ্ধতিতে কাজ করে তাদের মন কতটাই না দূর্বল! তারা কী করে নিজেদের জন্য আল্লাহ্’র আইন পরিবর্তন করাকে অনুমোদন করে!

    (জাহেল শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সুবিধা হিসেবে) অতঃপর তাদের উল্লেখিত আরও তিনটি অনুচ্ছেদ—

    — বর্তমান শাসনব্যবস্থার সাথে পরিচিত হয়ে এর ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়া।

    — দরজার ওপাশে কী হচ্ছে এ ব্যাপারে ধারণালাভের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রুখে দেয়া এবং একে ব্যর্থ করে দেয়া।

    — যদি দলটি ক্ষমতার অংশীদারিত্ব না নেয়, তাহলে ইসলামের শত্রু কেউ অংশগ্রহণ করবে এবং তারা ইসলামী আন্দোলনকে আক্রমণ করার জন্য এবং ইসলাম ও মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করতে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করবে। 

    এখানে আমরা তিনটি অনুচ্ছেদ দেখতে পাই যা একটি বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। তা হল বর্তমান শাসনব্যবস্থার কুফল থেকে নিজেকে হেফাযত করা এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করা। এ বিষয়ে আমরা তাদের সাথে একমত পোষণ না করেও তাদের মূলনীতি অনুসারে বিবেচনা করে ও তাদের উপস্থাপিত বাস্তবতার দৃষ্টিতেই বলতে পারি তারা কী আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন না করে উম্মাহ্’কে এবং নিজেদেরকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে? তাদের নিজেদের ভাষায়, শাসকগণ মুসলিম মন্ত্রীদের নিয়োগ দেন যাতে করে তাদের শাসনব্যবস্থা প্রলম্বিত হয়, তাদের পরিকল্পনাগুলোকে পাশ করিয়ে নেয়া যায় এবং জনগণের সামনে তাদের ভাবমূর্তিকে উন্নত করা যায়। আর শাসকদের চাওয়া পাওয়া বাস্তবায়িত হওয়ার পর খেজুরের বীচির মতই তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়। তাহলে কীভাবে ক্ষতি ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা পাওয়া গেল? মুসলিমগণ ঐ শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করায় সে শাসনব্যবস্থার ভাবমূর্তি উন্নত হলেও অংশগ্রহণকারীদের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় এবং জনগণ ঐ শাসনব্যবস্থা ও এতে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের একই দৃষ্টিতে বিচার করে।

    অতঃপর নিম্নবর্ণিত অনুচ্ছেদ দুটিকেও একটি অনুচ্ছেদের আওতায় উপস্থাপন করা যায়:

    — লোকদের এটা বুঝতে দেয়া যে দলটি শাসন করতে সক্ষম।

    — ইসলামের ব্যাপারে আত্নবিশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে আসা এই অর্থে যে, এটি মানুষের ব্যক্তিগত ও সার্বিক বিষয়সমূহের সমাধান দিতে সক্ষম।

    দলটি এ ধরনের ভাবমূর্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম হবে না। বরং এটা একটি খারাপ দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করবে যা অনুসরণীয় নয়। বান্তবতা হল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। যদি এসব দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধাচরণকারী খাঁটি ও সচেতন ইসলামী আন্দোলন এবং আন্তরিকতাসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদগণ না থাকত তাহলে যারা এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গীর মাধ্যমে বিদ্যমান শাসনের ওকালতি করছে তাদের কারণে ইসলাম ইতিমধ্যে মানুষের অন্তর থেকে খসে পড়তো। যেসব দল ও এর চিন্তাবিদগণ এই শাসকদের আনুকূল্যে আয়েশী জীবনযাপন করে, তাদের মিথ্যা নেতৃত্বের জাঁকজমক পরিবেষ্টিত থাকে, তাদের সাথে অহংকার ঔদ্ধত্যের ঘ্রাণ নেয় তারা আর যেসব আন্দোলন বা ইসলামী চিন্তাবিদগণ কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ওয়াস্তে সত্যের দিকে আহ্বান করে ও তা ধারণ করে এবং এ বিষয়ে কারও নিন্দার পরোয়া করে না তাদের মধ্যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর বান্দাদের দৃষ্টিতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। তাদেরকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলেও তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীই স্মরণ করিয়ে দেয়,

    “অতএব আপনি সবর করুন (হে মুহাম্মদ) যেমন উচ্চ সাহসী পয়গম্বরগণ সবর করেছেন।”
    (সূরা আল আহক্বাফ: ৩৫)

    “আপনি আপনার পালনকর্তার নির্দেশের অপেক্ষায় সবর করুন (হে মুহাম্মদ) । আপনি আমার দৃষ্টির সামনে আছেন।”
    (সূরা আত তূর: ৪৮)

    “অতএব আপনি সবর করুন (হে মুহাম্মদ) । নিশ্চয় আল্লাহ্’র ওয়াদা সত্য।”
    (সূরা মুমিনুন: ৫৫)

    এ দুইয়ের দৃষ্টান্ত কি একই রকম?

    তাদের পরবর্তী চারটি অনুচ্ছেদকেও একটি অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা যায়:

    — ইসলামী একটি দলের ভেতর থেকে এমন কিছু ব্যক্তিকে বের করে নিয়ে আসা যারা লোকদের মধ্যে উচ্চপদে আসীন হবে। তারাই দল এবং এর সদস্যদের অধিকাংশ সমস্যার সমাধান করবে।

    — ইসলামী কেন্দ্রসমূহের সংখ্যা বৃদ্ধি করে কুফরী কেন্দ্রসমূহের বিরুদ্ধে লড়াই পরিচালনা করা।

    — রাজনীতিতে ইসলামী ব্যক্তিত্বদের গড়ে তোলা এবং শেখানো কীভাবে এ ব্যবস্থার দোষণীয় বিষয়গুলো বর্জন করা যায়।

    — শাসনকতৃর্ত্বের সুনামের মাধ্যমে দলের সুনাম বৃদ্ধি করা।

    এ বক্তব্যসমূহ এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী পোষণকারীদের চিন্তার ক্ষুদ্রতাকেই প্রমাণ করে। এ ধরনের ফলাফল কী আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না এবং যালিমুন বা অবিচারী, ফাসিকুন বা মিথ্যাবাদী এবং অত্যাচারীদের দোসর হবার ঝুঁকি বাড়ায় না? কোনো আন্দোলন কি এ অবস্থায় পতিত না হয়ে কাজগুলো করতে পারে না? আমরা কখনই মনে করিনা যে কোনো দল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আনুগত্য না করে এবং জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে এসব লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে, বরং ঐ দলের জন্য ফলাফল এর উল্টোই হবে এবং দাওয়াহ্ ও ইসলামের ঊপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে।

    উপরোক্ত দৃষ্টিভঙ্গী পোষণকারীরা যদি তাদের এসব কাজের যৌক্তিকতা দেখাতে ১১টি অনুচ্ছেদ বা কারণের আবতারণা করে থাকে তবে তাদের বাতিল চিন্তার ধারা অনুসরণ করে আমরাও এরূপ কাজের ফলে সৃষ্ট অসংখ্য ঝুঁকি ও প্রতিবন্ধকতা দেখাতে পারি। যেমন:

    — এ পদ্ধতির অনুসরণকারী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ও সদস্যগণ মুনাফিকীর শিক্ষা লাভ করে। যেসব শাসকরা তাদের জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের ব্যাপারে উদ্ধুদ্ধ করে তাদের সামনে যখন তারা যায় তখন তারা এমনকিছুই বলে যা সেসব শাসকদের সন্তুষ্ট করে। যখন তারা জনগণের সামনে যায় তখন অন্যকিছু বলে এবং তাদের বুঝানোর চেষ্টা করে যে, তারা শাসনব্যবস্থা ও শাসকদের কাছে যাচ্ছে যাতে করে শাসনক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে।

    — দলটির আচরণ সামগ্রিক পরিবর্তনমুখী হওয়ার বদলে হালকা, আত্মতুষ্টিমূলক ও নমনীয় হয়ে যায়।

    — শাসনব্যবস্থার অধিকারীরা আন্দোলনকারীদের সংখ্যা সম্বন্ধে ধারণা লাভের সুযোগ পায় যাতে করে তারা এবং তাদের গোপন বিষয়সমূহ জানতে পারে। দলের সদস্যদের মধ্যকার পার্থক্যকে শাসকরা খুঁজে বের করতে পারে এবং এ বিভেদকে আরও শক্তিশালী এবং অব্যাহত রাখতে উৎসাহিত করে। এভাবে দলটিকে সহজেই নিয়ন্ত্রন করতে পারে এবং যখন প্রয়োজন তখন ভাঁঙ্গন সৃষ্টি করতে পারে।

    — এই সমস্ত দলগুলোর দাওয়াহ্ শাসকদের শাসনের (সমালোচনার) মধ্যে সীমাবদ্ধ যা শাসকদের জন্য কোনো বিপদজ্জনক বিষয় নয় এবং তারা (ইসলামের) মূখ্য বিষয়ে নীরব থাকে যা দাওয়াহ্ ও ইসলাম সম্পর্কে ভুল দৃষ্টিভঙ্গী প্রদান করে।

    — যখন একটি শাসনব্যবস্থা কোন ইসলামী আন্দোলনকে তার ভেতরে কাজ করবার সুযোগ দেয় তখন সে দলটিকে নিজের কাজ করার জন্য শাসনকতৃর্ত্বের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তৈরির অনুমতি নিতে হয় এবং এভাবে দলটি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আটকা পড়ে যায়, কারণ তখন একটি ভীতি কাজ করে যে, শাসনকতৃর্ত্ব হয়ত এসব প্রতিষ্ঠানকে তাদের নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিবে এবং বাজেয়াপ্ত করবে। সে কারণে তারা এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা যা সরকারকে নাখোশ করে এবং ফলে তা অবসানের সিদ্ধান্তও নিতে পারেনা।

    — এসব তথাকথিত ইসলামী আন্দোলনগুলো জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পদ্ধতির অনুসারী সঠিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর উপর মৌলবাদী বা ধর্মান্ধ আখ্যা দিয়ে দমন-নিপীড়ন চালানোর সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে যারা শাসন কাজে সহযোগীতা করে তারা আলোকিত ও উদারমনা হিসেবে পরিগণিত হয়। এটা সত্যিই অদ্ভুত একটি ব্যাপার। এই উদার আচরণকারীরা যুক্তি উপস্থাপন করে যে, পদ্ধতিগত কারণেই তারা অনেক বেশী সহনশীল যেজন্য শাসকরা তাদের প্রতি সহযোগীতার হাত প্রসারিত করতে পারে এবং তারা বাদে অন্যরা ধর্মান্ধ।

    — এ ধরনের ইসলামী দলের ধারণা বাস্তবতার সাথে মিল রেখে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, অমুসলিম জিম্মিদের কাছ থেকে জিযিয়া না নেওয়া, জিম্মি বলে তাদের অসন্তুোষকে উস্কে না দেয়া। এছাড়াও তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হল গণতন্ত্র তাদেরই একটি সম্পদ যা তাদের কাছেই আবার ফিরে এসেছে অথবা সুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোনো কিছু দিয়ে পরিচালিত যে শাসনব্যবস্থা তাতে অংশগ্রহণ করাও এর আরেকটি উদাহরণ।

    — এটা (বিদ্যমান) শাসনকার্যকালকে আরো দীর্ঘ করে।

    — (বিদ্যমান) শাসনব্যবস্থার একটি সুন্দর ভাবমূর্তি তুলে ধরে।

    — লোকদের মন থেকে তখনই ইসলাম সম্পর্কিত বিষয়াদি হারিয়ে যেতে থাকে যখন তারা দেখে যে, এ শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলাম তাদের কিছুই দিতে পারছে না, বিশেষ করে তারা যখন আল মান্না ওয়া সালওয়া বা সবধরনের ঐশ্বর্যের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেয়। এটা প্রমাণ করে যে তারা সমস্যাসমূহের সমাধান সঠিক উপায়ে দিতে অক্ষম। ফলে এধরনের আন্দোলন অনুসরণীয় দৃষ্টান্তের বদলে নোংরা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।

    — আন্দোলনের কমীর্গণের নৈতিক অধঃপতন ঘটে কারণ তাদের নিকট শাসকের অবৈধ কর্মকান্ড এবং তার যথার্থতার সমালোচনার বদলে দলের কর্মকান্ডের যুক্তি যথার্থতা তুলে ধরে দাওয়াহ্ বহন করাটাই মূখ্য বিষয় হয়ে পড়ে।

    — শাসকরা যখন অন্য দলের দাওয়াহ্ বহনকারীদের উপর দমন-নিপীড়ন চালায় বা এর সদস্যদের গ্রেফতার করে তখন তারা পুরোপুরি নিশ্চুপ থাকে, এমনকি শাসকদের খুশি করার জন্য বা তাদের অনুরোধে এরূপ আন্দোলন অন্য (ইসলামী) আন্দোলনের কর্মীদের উপর হামলা চালায় যেমনি আজকাল মিশরে ঘটছে।

    — এধরনের আচরণ পুরো দলটিকে শারী’আহ্ গ্রহণ করার বদলে সুবিধাবাদী করে তোলে। শারী’আহ্’র সাথে সুস্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক হলেও যদি কোন কাজ সুবিধা বয়ে নিয়ে আসে তবে তাই সম্পাদিত হবে। মুসলিমদের কাছে তখন লাভের বিষয়টি শারী’আহ্’র চেয়ে প্রিয় হয়ে যায়। সুতরাং এরকম আরও অনেক কারণ রয়েছে যা দ্বীন ও দাওয়াহ্’র ক্ষতি করছে।

    আমরা এসব কিছুই বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরেছি, শারী’আহ্’র ভিত্তিতে নয়, যাতে করে আমরা দেখাতে পারি যে তাদের অবলম্বিত পথ অনুযায়ীও যদি আমরা তাদের চিন্তার পদ্ধতিকে বিবেচনা করে দেখি তবে তা থেকে দাওয়াহ্ ও ইসলামের জন্য কুফল ছাড়া আর কিছু দৃষ্ট হয়না। এটি একটি নিষ্ফল চিন্তা যে ব্যাপারে শারী’আহ্’র কোন অনুমোদন নেই।

    শারী’আহ্ সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান এটা করতে আমাদের বাধা দেয় যে আমরা (কেবল) বাস্তবতার বিচারে কোন একটি চিন্তার ভ্রান্তি তুলে ধরবো বা বুদ্ধিবৃত্তির বিচারে শারী’আহ্’র কোন বিষয়কে পরিত্যাগ করবো। আমরা তাদের পদ্ধতি অনুসরণ করে আলোচনার সূত্রপাত করেছি শুধু এজন্য যাতে করে তাদের মুখের কথা দিয়েই তাদের ভুল দেখিয়ে দেয়া যায় ও তাদের নিজস্ব মানদন্ড দিয়েই তাদের কথার অসারতা প্রমাণ করা যায়। তবে আমরাসহ সব সচেতন ও আন্তরিক মুসলিম এটা জানে যে, কোন কাজ বা কথা গ্রহণ বা বর্জনের মানদন্ড হল শারী’আহ্। যেহেতু এটাই মূল ব্যাপার, অতএব যেসব শারী’আহগত দলিল তারা উল্লেখ করেছে যা তারা নিজেরা জানে এবং অন্যরাও জানে  সেগুলোই তাদের মতামত ও উপলদ্ধিকে খন্ডানোর জন্য যথেষ্ট যদিওবা তারা আরও ঊদাহরণ নিয়ে আসতে পারে। সমস্যাটি অনেক উদাহরণ দেখানোর বিষয় নয়, বরং চিন্তার পদ্ধতি সম্পর্কিত।

    (শারী’আহ্’র ঐ প্রমাণগুলো) তারা জানে বলে (দাবী করলেও) তাদের  সেকথা আমরা মেনে নেব না। তাদেরকে তা মনে করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নেই তাও নয়। কেননা, এসব শারী’আহ্ দলিলের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও তারা যেসব কারণ উল্লেখ করেছে সেগুলোর দোহাই দিয়ে এ দলিলগুলোকে তারা  গ্রহণ করেনি। এটা অনুমোদিত নয়; পাশাপাশি এটি দ্বীনের ব্যাপারে উদ্ধ্যত্বপূর্ণ আচরণ এবং সুস্পষ্ট ও সঠিক হুকুমের বিষয়ে চরম অবহেলা। আর তাদের চিন্তার পিছনে কিছু ইসলামী চিন্তাবিদের বক্তব্য, যা কিনা এমনিতেও এই বাস্তবতার উপর প্রযোজ্য নয় তা  দলিল হিসেবে উপস্থাপন করার বিষয়ে আমরা বলবো, কোন মানুষের বক্তব্য শারী’আহ্’র দলিল হতে পারে না। যেটা একমাত্র  বিবেচ্য তা হলো  দলিল এবং ইসতিদ’লাল বা লদ্ধ বিষয়ের যথার্থতা। যদি তারা বলে অমুক ও অমুক ব্যক্তি বলেন, তখন আমরা বলি এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) যা বলেন তাই চূড়ান্ত এবং মুহকাম (সুস্পষ্ট ও অরহিত)। কোন একজন ব্যক্তির কথায় আল্লাহ্ এবং তার রাসূল (সা) এর বাণী কি রহিত হয়ে যাবে? এ পদ্ধতির পক্ষালম্বনকারীদের মাথায় লাভের চিন্তা এতটাই প্রাধান্য বিস্তার করে যে তাদের দাওয়াহ্’র ব্যবসায়ী বলাই সঙ্গত। অবশ্য ব্যবসায়ীরা সর্বদা লাভের আশায়ই ব্যবসা করে থাকে, লোকসানের জন্য নয়।

    তাদের চিন্তার দূষণ আরো যেভাবে বুঝা যায় তা হলো তারা নিয়মবহির্ভূত ক্বিয়াসের উপর ভরসা করে যা সুবিধাকে প্রাধান্য দেয়ার ভিত্তিতে যুক্তি দিয়ে শারী’আহ্’র বিধানকে ব্যাখ্যার মাধ্যমে লদ্ধ। এটা তাদের নুতন ইসতিম্বাতের দিকে ধাবিত করে যে ব্যাপারে ইসলামী উম্মাহ্ ও চিন্তাবিদগণ ওয়াকিফহাল ছিলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রদর্শিত এবং উম্মাহ্’র সব উলামাগণ (সালাফ আস সালীহ বা নেককার পূর্বসূরী) কর্তৃক অনুসৃত এবং তাদেরকে যারা ইহসান বা সৎ কাজের ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছেন, তাদের গৃহীত সঠিক ইসতিম্বাদের পদ্ধতিকে তারা পরিত্যাগ করেছে। তাদের কোনো আলোচনার মধ্যে এ ধরনের সুশৃঙ্খল ও যথার্থ শারী’আহগত পদ্ধতির উল্লেখ নেই। তারা পশ্চিমা পদ্ধতি অর্থাৎ বুদ্ধিজাত সাদৃশ্যতা এবং লাভকে মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করে। নিম্নের হাদীসটি যথার্থভাবে তাদের জন্যই প্রযোজ্য:

    “তোমাদের মধ্যে যারা দীর্ঘজীবী হবে তারা অনেক মতপার্থক্য লক্ষ্য করবে। নতুন জিনিসের ব্যাপারে সাবধান হও, প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআত (নবপ্রচলন) এবং প্রত্যেক বিদআতই জাহান্নামের আগুনের দিকে যাবে।” (তিরমিযী ও আবু দাউদ)

    তাদের ভাষ্য অনুসারে, ইসলাম মদ ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করেছে যদিও মানুষ এগুলো থেকে কিছু উপকারিতা পেয়ে থাকে। সে কারণে বড় উপকারিতাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মদ ও জুয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

    বিশ্বাসীদের জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও শারী’আহ্ জিহাদকে বাধ্যতামূলক করেছে। এর কারণ হলো জিহাদ মানুষের রবের নিকট ও মানবজাতির জন্য মঙ্গলজনক।

    ধমীর্য় গুরুত্ব থাকার পরও রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাবা’কে ধ্বংস করে ইব্রাহীম (আ) এর ভিত্তির উপর তা পূনঃনির্মাণ করার পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেছিলেন। কারণ কাবা’র কাঠামোগত সংস্কার করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি হতো বেশী।

    এর উপর ভিত্তি করে তারা বলে যে, জাহেলী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা সত্যিই বড় ক্ষতির কারণ। তবে আন্দোলনটি কিছু পরিস্থিতিতে মনে করতে পারে যে, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইসলাম, মুসলিম ও ইসলামী আন্দোলনকে লাভবান করবে। এর মাধ্যমে তাগুত দূরীভূত হবে এবং সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।

    তারা তাদের চিন্তাকে আরেকটি দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে যা থেকে উপলদ্ধি করা যায় যে এ চিন্তাকে তারা তাদের মর্মমূলে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

    শারী’আহ্’র বাণীকে এরকম পন্থায় উপলদ্ধি করে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হুকুমসমূহ বের করা খুবই বেদনাদায়ক। পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের এই যুগে লাভ-লোকসানের সাথে তুলনা করে লব্দ এসব চিন্তা বর্তমান যুগে আমাদের বেদনাকে আরও বহুমাত্রায় বৃদ্ধি করেছে। পূর্বে ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সুশৃংখল নীতিমালাকে অনুসরণ করতেন, যেখানে মানুষের বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ ছিলনা বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত নিয়মকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হতো, যা আমরা খুব দ্রুতই ব্যাখ্যা করব ইনশা’আল্লাহ্। অপরদিকে, আমরা দেখি কিছু মুসলিম নতুন আবিষ্কৃত এই পদ্ধতির দ্বারা আইন তৈরির একটি দরজাকে উন্মোচন করে এবং এতে প্রবেশ করে। কোনো কাজের লাভ বা ক্ষতি বের করার ক্ষেত্রে তারা তাদের খেয়ালখুশী বা প্রবৃত্তির বশবতীর্ হয় এবং এ পদ্ধতিকে গ্রহণ করে। বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যখন একটি উপকার, সংশ্লিষ্ট ক্ষতিকে ছাড়িয়ে যায় তখন কাজটি অনুমোদিত। আবার যখন ক্ষতি, সংশ্লিষ্ট উপকারকে অতিক্রম করে তখন কাজটি পরিত্যাজ্য। এ নতুন আবিষ্কৃত পদ্ধতি অনুসারে মানুষ তার খেয়াল ও প্রবৃত্তির বশবতীর্ হয়ে আইনপ্রণেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।

    উল্লেখিত পদ্ধতিতে কোনো কর্মের হুকুম বের করতে তারা শারী’আহ্’র বাণীকে উপরে উল্লেখিত পদ্ধতিতে খেয়াল-খুশিমতো ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করে। এটাই পশ্চিমাদের চিন্তা পদ্ধতি। পশ্চিমারা এ ধরনের চিন্তার উপর নির্ভর করে থাকে।

    যাইহোক এ পদ্ধতি মুসলিমদেরকে লাভ-ক্ষতির উপাসক বানায়, আল্লাহ্’র আদেশের নয়। এটা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যেখানে লাভ অকাট্য শারী’আহ্’র হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায় এবং লাভ-ক্ষতির মাপকাঠিকে প্রাপ্ত হুকুমসমূহ দ্বারা শারী’আহ্’র হুকুমসমূহ বাতিল হয়ে যায়।

    শারী’আহ্’র হুকুমসমূহের ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হয় সুসংজ্ঞায়িত মূলনীতির মাধ্যমে। যে মুসলিম এটাকে সঠিকভাবে অনুসরণ করেন তিনি সত্যিকার অর্থে আল্লাহ্’র বান্দা এবং তাঁর হুকুমের প্রতি আনুগত্যশীল। হুকুম বের করার সঠিক পদ্ধতির মাধ্যমে লদ্ধ শারী’আহ্’ই আল্লাহ্’র হুকুম। আর এটা ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব হবে না যতক্ষণ না সে ব্যক্তি ক্বিয়াসের জন্য শারী’আহগত ইল্লাহ্ বা কারণের উপর নির্ভর করবে।

    ভাল ও মন্দ, আকর্ষণীয় ও অনাকর্ষণীয়, হালাল ও হারামকে সংজ্ঞায়িত করার এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র। এটা কখনওই মানুষের হাতে অর্পণ করা হয়নি। যদি মানুষকে এ অধিকার দেয়া হতো তাহলে শুরু থেকেই তাকে আইন প্রণয়নের সুযোগ দেয়া হতো। শারী’আহ্ মানুষের কর্মকান্ডজনিত হুকুমের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতো না। এবং মানব জীবনের সব কাজের নিয়ন্ত্রক এবং সংগঠক শুধুমাত্র আল্লাহ্ এটা বিশ্বাস না করে মুসলিমদের শুধু এতটুকু বিশ্বাস করলে হতো যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তা।

    সমগ্র মুসলিম যুগ ধরেই ইসতিম্বাতের শারী’আহগত পদ্ধতির উপর নির্ভর করে হাজার হাজার বই লেখা হয়েছে। আমাদের বিশিষ্ট বিচারকগণ এই পদ্ধতি অনুসরণ করে সব সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যে ব্যক্তির এ ব্যাপারে জ্ঞান রয়েছে এবং নিজেকে এইসব মূলনীতির আওতায় রাখে তার জন্য এটা একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি।

    এই নবআবিষ্কৃত পদ্ধতির দূর্বলতা হলো, এগুলো শারী’আহ্’র অকাট্য হুকুমের সাথে সাংঘর্ষিক। যদি পদ্ধতিটি সঠিক হতো তাহলে এর মাধ্যমে লদ্ধ হুকুমসমূহ অবশ্যই শারী’আহ্’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো। এটা স্বয়ং এবং এটা যে প্রভাব তৈরী করে উভয়ই প্রমাণ করে যে, এ পদ্ধতিটি ত্রুটিপূর্ণ। নিম্নের কিছু উদাহরণ ব্যাপারটি আরো পরিষ্কারভাবে বুঝতে সহায়তা করবে:

    — বৈধ উপায়ে দাওয়াহ্’র জন্য প্রয়োজন সৎ স্পষ্টবাদিতা, সাহস, শক্তি এবং চিন্তা। একজনকে অবশ্যই যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তাকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে এবং দ্বন্দে অবতীর্ণ হতে হবে যাতে পরিস্থিতির কোনরকম তোয়াক্কা না করে এর অসত্যতা স্পষ্ট করে তোলা যায়। এর জন্য প্রয়োজন কেবলমাত্র ইসলামী জীবনব্যবস্থার প্রতি নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব, যদিও এটা অধিকাংশ লোকের মতামত বা ঐতিহ্যের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয় অথবা তারা এর গ্রহণ, প্রত্যাখ্যান বা বিরোধিতা করে। দাওয়াহ্ বহনকারী ব্যক্তি লোকদের ও ক্ষমতাসীনদের তোষামোদ করে না। এভাবেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে সত্যের দাওয়াহ্ দিতেন তার উপর বিশ্বাস করে আহ্বান অব্যাহত রাখতেন। এসময় তিনি কোনো প্রথা, ঐতিহ্য, ধর্ম, বিশ্বাস, শাসক ও জনগণকে তোয়াক্কা না করে পুরো পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তিনি ইসলামের বাণী ব্যতিরেকে অন্য কোনো দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেননি। ইবনে হিশাম উল্লেখ করেন, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরাইশদের চ্যালেঞ্জ করেন তখন তাদের দেবতাসমূহকে অপদস্থ করেছিলেন, তাদের মানসিকতাকে কটাক্ষ করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন পথভ্রষ্ট। কুরাইশগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এবং তার বিরোধিতা ও শত্রুতায় একতাবদ্ধ হয়েছিল। এভাবেই মুসলিমদের আজকে দাওয়াহ্ বহন করা উচিত। যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে অনুসরণ করতে চায় তারা যাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা’র নিম্নের আয়াতকে মনে রাখে:

    “বলুন (হে মুহাম্মদ)! এটাই আমার পথ। ‘আমি পূর্ণ সচেতনতার সাথে আল্লাহ্’র দিকে আহ্বান জানাই, আমি এবং আমার অনুসারীরা।”
    (সূরা ইউসুফ: ১০৮)

    এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,

    “আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু জিনিস রেখে যাচ্ছি যদি তা তোমরা ধারণ করো তাহলে কখনও ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে না। এটি হলো সুস্পষ্ট বিষয়: আল্লাহ্’র কিতাব ও তাঁর প্রেরিত রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্।”
    (সীরাতে ইবনে হিশাম)

    এবং যারা সালাফ আস সালিহ’দের পথ ও তাদের কথা অনুসরণ করে তারা বলে “বিষয়ের (দ্বীনের) সমাপ্তি ভাল হতে পারে না, যদি না যার মাধ্যমে এর শুরুটা ভাল হয়েছিল, তা না থাকে”, আর এ ধরনের দাওয়াহ্’তে তা মানতেই হবে।

    বর্তমানে শারী’আহ্ কতৃর্ক অননুমোদিত এই নতুন ও নবআবিষ্কৃত পদ্ধতির অনুসারীদের বক্তব্য হচ্ছে অধিকতর সুবিধা সবচেয়ে উপযোগী ও সর্বোত্তম চিন্তার দিকে ঈঙ্গিত প্রদান করে এবং তারা ইস্যুসমূহকে হিকমাহ্’র (প্রজ্ঞা) সাথে উপস্থাপন করে এবং সর্বোত্তম পন্থায় আহ্বান করে। এটা তাদের কর্মপদ্ধতি, এটা কখনোই শারী’আহগত কোনো পদ্ধতি নয়। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দাওয়াহ্’র প্রতিবন্ধক সববিষয়কে চ্যালেঞ্জ করে দাওয়াহ্’র লাভ কি? এর মাধ্যমে অন্যদের হৃদয় উন্মুক্ত নাকি বন্ধ হয়? অন্যদের সাথে মৌলিক মতপার্থক্যের ভিন্নতা প্রকাশের দরকার কি? অন্যদের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেয়াটাই কি ভাল নয় এবং এটাই হল তাদের হৃদয় মনে জায়গা করে নেয়ার অন্যতম প্রধান কৌশলগত দিক? তাদের আরও বক্তব্য হচ্ছে, যখন তারা আমাদের ও তাদের মাঝে বড় কোন মতপার্থক্য খুঁজে পাবে না তখন কি তারা আমাদের আরও নিকটবর্তী হবে না? শাসকের বিরোধীতা করা এবং উম্মাহ্’র সম্মুখে তাদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা উন্মোচন করা কি দাওয়াহ্’র স্বার্থের আনুকুল্য? তাদের ক্ষিপ্ত করা এবং তাদের মন্দ দিকসমূহ উন্মোচন করার চেয়ে তাদের নিকটবর্তী ও বন্ধুসুলভ হওয়াই কি বেশী ভাল নয়? হয়ত এতে তারা তাদের খুব কাছে আসবে এবং তাদেরকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে আসবে যাতে দাওয়াহ্ লাভবান হবে এবং সবাই এর সুফল ভোগ করবে। সম্ভবত এভাবে তারা ক্ষমতায় পৌঁছে যাবে। আর একারণেই তারা এটা নিশ্চিত করতে চায় যে, তারা শাসকগোষ্ঠীর জন্য ভয়ের কারণ না এবং তাদেরকে নিকটবর্তী হতে দিলে তারা ক্ষতির কারণ হবে না। এখানেই তোষামোদের অধ্যায়ের শুরু এবং যা সঠিক পদ্ধতি থেকে যোজন যোজন দূরে। এছাড়া এটি হল শাসকদের তুষ্ট করার সূচনা, তাদের কর্মকান্ডের মিথ্যা স্বাক্ষ্য দেয়া, তাদের প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের ব্যাপারে নীরব থাকা, শাসকদের উষ্মা সৃষ্টি করে না এমনসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা, কথা বলা এবং উম্মাহ্’কে সাবধান করা উচিত এমনসব অপরিহার্য বিষয়কে অবহেলা করা এবং সত্যের সাথে আপোষকারী এজাতীয় আরও অনেক কথা ও কাজে ব্যস্ত থাকা। এসব কিছুর পেছনে দায়ী তাদের চিন্তার পদ্ধতির পরিবর্তন।

    — নবী (সা)-এর জ্ঞানের উত্তরসুরী ইসলামী চিন্তাবিদগণের উপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হক্ব হচ্ছে তারা মুজাহিদীনদের মধ্যে সামনের সারিতে থাকবেন, সত্য উচ্চারণ করবেন, তা ধারণ করবেন এবং শাসকদের ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরে তাদের সাথে দ্বন্দে লিপ্ত হবেন। অন্যকথায় তারা অবশ্যই জ্ঞান, মিহরাব ও যুদ্ধের ইমাম হবেন। সালাফ আস সালিহগণ এরুপ ছিলেন। এ নবআবিষ্কৃত পদ্ধতিতে আমরা দেখতে পাই যে, এমন এক নতুন উপলদ্ধি তৈরি হয়েছে যা পূর্বের ইসলামী চিন্তাবিদদের চিন্তার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তাদের চিন্তা কথার মাধ্যমেই প্রতিফলিত হয়। তারা বলে যদি আমাদের চিন্তাবিদগণ হক্ব কথা বলতে গিয়ে গ্রেফতার অথবা মারা যান তাহলে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবে? উম্মাহ্ এতে করে যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা এর লাভের চেয়ে অনেক গুণ বেশী। তাহলে কেন আমরা উম্মাহ্’কে এসব চিন্তাবিদের ঊপকার থেকে বঞ্চিত করব?

    — অনুরূপভাবে, সংসদীয় নির্বাচনের অংশগ্রহণ করা কিছু শর্তের ভিত্তিতে অনুমোদিত: প্রার্থীকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে এবং তাকে ইসলামী শাসনের প্রতি আনুগত্যশীল থাকতে হবে। তিনি অবশ্যই কুফর আইনকে মেনে নেবে না বরং খন্ডন করবেন এবং শারী’আহ্ আইনকে এর বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করবেন। তিনি নির্বাচিত করতে পারবেন না একজন অমুসলিম প্রেসিডেন্টকে কিংবা এমন একটি সরকারকে যার ভিত্তি কুফর। সরকারকে আস্থা ভোট দেয়া তার জন্য অনুমোদিত নয়, বরং তিনি তা প্রতিরোধ করবেন। কারণ সরকার ইসলামের ভিত্তিতে গঠিত হয়নি। আর এটাই হল সুস্পষ্ট শারী’আহ্ আইন।

    তবে আমরা এই নবআবিষ্কৃত পদ্ধতি অনুসারে দেখতে পাই যে, মুসলিমদের এমন কাউকে নির্বাচিত করার অনুমোদন দেয়া হয় যিনি শারী’আহ্ দিয়ে শাসন, জবাবদিহিতা ও শাসক নির্বাচন করেন না । বরং তারা খ্রিস্টান প্রার্থীদের নির্বাচনও মেনে নেন এবং নির্বাচনী তালিকায় অংশগ্রহনের জন্য তাদের সম্মতি দেন এ অজুহাতে যে, আইন প্রত্যেক অঞ্চলে এমপি সংখ্যা নির্ধারন করে দিয়েছে। মুসলিমরা নির্বাচিত করুক বা না করুক এভাবে খ্রিস্টান প্রার্থী বিজয়ী হয়। তাই তাদের দৃষ্টিতে প্রতিদ্বন্ধি পক্ষের লোকেরা তাকে নির্বাচিত করার চেয়ে মুসলিমদের জন্য উত্তম হলো তাদের জন্য অধিক উপকারী কাউকে নির্বাচিত করা।

    এ কারণে এ পদ্ধতির সমর্থকগণ যত বেশী যুক্তি নিয়ে অগ্রসর হয় ততবেশী তারা সত্য থেকে দূরে সরে যেতে থাকে।

    ইসলামের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে থাকা এই নবআবিষ্কৃত ও নতুন মানসিকতার সমর্থকদের এটা বোঝা উচিত যে তাদের মানসিকতা ও আচরণের সাথে ইসলামের কোনো সম্পৃক্ততা নাই এবং এ ব্যাপারে সাবধান হওয়া উচিত। তারা যা প্রতিষ্ঠা করেছে সে ব্যাপারে তাদের অনুতপ্ত হওয়া উচিত। ইসলামী দাওয়াহ্’তে তাদের প্রয়োজন রয়েছে কিন্তু তার আগে প্রথমে তাদেরকে এ মানসিকতা ও আচরণ হতে বের হয়ে আসতে হবে যাতে তারা আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিধান বাদ দিয়ে অন্যকিছু দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনাকারী শাসকগোষ্ঠীকে পরিত্যাগ করে ইসলামী শাসনের সমর্থক হয়।

    মহাবিশ্বের অধিপতি একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হচ্ছেন লাভ-ক্ষতির অকাট্য সংজ্ঞা প্রদানের মালিক। তিনি ছাড়া আর কেউই কোনটি আমাদের জন্য কল্যাণকর এবং কোনটি অকল্যাণকর তা বলতে পারে না। যদি কোন মানুষ তা পারতো তবে সে আইনপ্রণেতার স্থান পেত এবং মানুষের জীবনযাপনের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে দ্বীনের কোনো প্রয়োজন ছিলনা। সেকারণে ইসলাম মুসলিমদের জন্য তাদের প্রভূর শারী’আহ্’কে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করেছে। শারী’আহ্ যা বলে তাই আমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যা নিষেধ করে তাই অকল্যাণকর। আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কিছুকে আমাদের জন্য কল্যাণকর বা ক্ষতিকর বলতে পারি না যতক্ষণ না এ ব্যাপারে কোনো হুকুম জারি হয়। এর আগে এটা খুঁজে বের করা আমাদের আয়ত্তাধীন নয়। কারণ মনের এমন কোন মানদন্ড নেই যার ভিত্তিতে যে ভাল বা খায়ের, মন্দ বা শা’র এবং হাসান বা সুন্দর ও কুব্হ বা নিন্দনীয় এর মধ্যে পার্থক্য করা যেতে পারে। সুতরাং আমাদের রয়েছে শারী’আহগত নীতিমালা, ‘যেখানে আমরা আল্লাহ্’র শারী’আহ্ পাই সেখানেই রয়েছে কল্যাণ।’ তাদের সেই মূলনীতি যাতে তারা বলে, ‘যেখানে মানুষের উপকারিতা রয়েছে সেখানেই আল্লাহ্’র আইন’ এ ধারণাটি ভুল। এ ব্যাপারে নীচের আয়াতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা উল্লেখ করেন,

    “তোমাদের উপর জিহাদ ফরয করা হয়েছে, অথচ তা তোমাদের নিকট অপছন্দনীয়; এবং হয়তো তোমরা এমনকিছুকে অপছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, আর এমনকিছুকে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য অকল্যানকর। বস্তুত, আল্লাহ্ যা জানেন তা তোমরা জান না।”
    (সূরা বাক্বারা: ২১৬)

    এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আয়াতটি বুঝতে পারি,

    “তাদের জন্য যাবতীয় পবিত্র বস্তু হালাল ঘোষণা করেন ও নিষিদ্ধ করেন হারাম বস্তুসমূহ।”
    (সূরা আল আ’রাফ: ১৫৭)

    তাইয়্যিব বা ভাল হলো সেটিই যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হালাল করেছেন এবং তিনি আমাদের এ ব্যাপারে অবহিত করার আগে আমরা এ ব্যাপারে জানতাম না। খাবিস বা খারাপ হলো সে জিনিস যা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা নিষিদ্ধ করেছেন এবং আমরা এ ব্যাপারে কখনওই জানতে পারতাম না যদি না তিনি তা নিষিদ্ধ করতেন। এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের মন বুঝতে পারে কোনটি হালাল যেজন্য তিনি তা অনুমোদন করেন এবং মন যেটিকে হারাম বলে তিনি তা নিষেধ করেন।

    যখন তারা বলে দু’টি ভাল জিনিসের মধ্যে শ্রেয়তর, দু’টি মন্দ জিনিসের মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম দোষযুক্ত এবং দু’টি উপকারের মধ্যে উত্তমটি ও দু’টি ক্ষতির মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতিটি বেছে নেয়া যায় এই বক্তব্য সম্পূর্ণরূপে ভুল এবং এটা শারী’আহ্’র জন্য সত্যিই বিপদজনক। এটা মাসালিহ্ মুরসালাহ্’র বিষয়ে মতামতের চেয়েও ভয়াবহ। এটা একারণে যে, মাসালিহ্’র ভিত্তিতে তারা তখনই কাজ করে যখন বাস্তবতা শারী’আহ্’র দিক নির্দেশনা বর্হিভূত হয়, কিন্তু উপরোক্ত বক্তব্য অনুযায়ী তারা আল্লাহ্’র হুকুমকে পর্যন্ত বদলাতে পারে, প্রবৃত্তিকে এগুলো রহিত করতে অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে তারা হারামকে অনুমোদন দেয় এবং হালালকে বাতিল করে দেয়। এটা দ্বীনের জন্য ক্ষতিকারক এবং ভয়ংকর কার্যপদ্ধতি। একারণে তাদের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গী সত্য থেকে অনেক দূরে।

    এতক্ষন আমরা যা উপস্থাপন করলাম তাতে দেখতে পাই যে তাদের উসুল বা মুলনীতিগুলো একটি আরেকটির সহযোগী যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আইনের মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে চায়, কেননা তারা শারী’আহ্’র মূলনীতির বদলে তাদের মন প্রদত্ত যুক্তিকে গ্রহণ করেছে এবং শারী’আহ্ যা চায় তা নয় বরং তারা যা চায় তাতে পৌঁছাতে তারা শারী’আহ্ প্রদত্ত চিন্তাপদ্ধতির বদলে যুক্তিনির্ভর চিন্তাকে প্রাধান্য দিয়েছে। সে কারণে যৌক্তিক সাদৃশ্যতা হলো সব আলোচনায় তাদের পথনির্দেশক মূলনীতি। যদিও বিধানদাতা (আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) মুসলিমদের জন্য যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতা অনুসরণকে নিষিদ্ধ করেছেন। কারণ এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বিরুদ্ধে যায় এবং কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অনুমোদন দেয় ও এটা সত্য এবং যথার্থতা থেকে বিচ্যুত হয়ে একজনকে খেয়ালখুশী ও প্রবণতার দিকে ধাবিত করে। তাদের আলোচনা হলো তাগুতের সাথে মধ্যস্থতা করা যা আমাদের প্রত্যাখান করতে বলা হয়েছে। কারণ তাগুত আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাজিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুর সাথে মধ্যস্থতা করে।

    পরিশেষে আমরা অবশ্যই যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতা এবং শারী’আহগত সাদৃশ্যতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরবো যাতে যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার কুফল তুলে ধরা যায় এবং শারী’আহগত সাদৃশ্যতার গুরুত্ব তুলে ধরা যায় এবং এভাবে আমরা আমাদের নিজেদের, উম্মাহ ও সমগ্র মানবজাতিকে হেফাজত করতে পারি।

    ঐসব মুসলিমগণ শারী’আহ্ হুকুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে যৌক্তিক মানদন্ডের ভিত্তিতে উপলদ্ধ অধিকতর লাভের দিকে ধাবিত হয়। যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে তারা শারী’আহ্ হুকুম থেকে প্রাপ্ত লাভ এবং এ থেকে উদ্ভুত ক্ষতির মধ্যে তুলনা করে । তাদের দৃষ্টিভঙ্গী অনুযায়ী যদি এতে ক্ষতির পরিমান বেশী দেখা যায় তাহলে তারা যুক্তির ভিত্তিতে যে হুকুমটি নিলে বেশী লাভ হবে তা গ্রহণ করে ঐ বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত সংশ্লিষ্ট শারী’আহ্ হুকুমকে পরিত্যাগ করে। যদি শারী’আহ্ হুকুমের মধ্যে উপকারের পরিমাণ বেশী থাকে তাহলে তারা সেটা গ্রহণ করে, তবে আল্লাহ্’র হুকুম হিসেবে নয় বরং তাদের মন সম্মত বলে। এটা একটি বিপজ্জনক বিষয় এবং এ ব্যাপারে কারও নীরব থাকা কাম্য নয়। কারণ এটা মন ও প্রবৃত্তিকে শারী’আহ্’র অভিভাবক বানায় এবং মনকে আল্লাহ্’র হুকুমের উপর হস্তক্ষেপকারী বানায় এবং শারী’আহ্’র উপর প্রাধান্য দেয়। আর এটাই মানবরচিত আইন। আর এটাই তাদের এই বিষয়ে প্রদত্ত মতামতসমূহ যে শারী’আহ্’র সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক তার ব্যাখ্যা দেয়। তাই শুধু পার্থক্য এটা নয় যে তাদের মতামত অনুমোদিত না অনঅনুমোদিত কিংবা আল্লাহ্’র বিধান বাদে দিয়ে শাসন ক্ষমতায় অংশগ্রহন করা না করার বিষয়, বরং পার্থক্য হলো চিন্তার পদ্ধতিতে; কারণ এর দ্বারাই তারা শারী’আহ্বহির্ভূত হুকুম, যুক্তিনির্ভর হুকুম, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নাযিল বর্হিভূত হুকুম ও প্রত্যাখ্যাত তাগুতের হুকুমের নিকটবর্তী হয়।

    একারণে আমরা বলি যে, এ ধরনের উপলদ্ধি সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরবতীর্ অথবা বিপরীত। এর স্বরূপই এর অসারতাকে তুলে ধরে। এর উপর নির্ভর করা বা এর ভিত্তিকে হুকুম গ্রহণ করা সঠিক নয়। কারণ লাভ-লোকসানের অকাট্য সংজ্ঞা কেবলমাত্র জগতসমূহের অধিপতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্যই নির্ধারিত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ছাড়া অন্য কেউ জানে এরকম কোন লাভ বা ক্ষতি থেকে বিরত থাকার মধ্যে আমাদের জন্য কি উপকার রয়েছে? আর যদি এটা সম্ভব হতো তাহলে মানুষ নিজেই আইনপ্রণেতা হতো। মানুষের জীবনের সামগ্রিক বিষয়াবলীর ব্যবস্থাপনার জন্য ঐশী ব্যবস্থার অপরিহার্যতার কথা বিবেচনায় রেখেই ইসলাম মুসলিমদের জন্য তাদের প্রভূর শারী’আহ্কে গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক করেছে। সে কারণে শারী’আহ্ আমাদের যা করতে বলেছে তাই আমাদের জন্য কল্যাণকর আর যা পরিত্যাগ করতে বলেছে তাই ক্ষতিকর। আল্লাহ্’র নির্দেশ বা নাযিল করা হুকুম ব্যাতিরেকে কোন কিছুর দ্বারা কল্যাণ বা ক্ষতি সম্পর্কে আমাদের জানা নাই। এর পূর্বে এ ব্যাপারে কোন কিছু সংজ্ঞায়িত করতে আমরা অক্ষম।

    যখন মানুষ আইন প্রণয়ন করে তখন সে যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার পথ অনুসরণ করে, যেখানে সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ের জন্য একই রকম হুকুম আসে এবং বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম আসে। যখন আমরা ইসলামী শারী’আহ্’র দিকে লক্ষ্য করি তখন দেখি যে, এর প্রবক্তা সর্বজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞাত স্রষ্টা সাদৃশ্যপূর্ণ অনেক বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ে একইরকম হুকুম দিয়েছেন। এটা যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার বিপরীত। এটা এমন সব হুকুম দিয়েছে যেখানে মন কোন ভূমিকা রাখে না। আর এটাই ঐসব লোকদের জন্য নবআবিষ্কৃত পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যানের জন্য যথেষ্ট।   

  • ১৩তম অধ্যায়: সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ:) এবং কুফর ব্যবস্থার অধীনে শাসন

    সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) সম্পর্কে তাদের বক্তব্য হচ্ছে, তিনি (আ) এমন একটি জাহেলী সমাজে বসবাস করতেন যেখানে শিরকী বিশ্বাসের কতৃর্ত্ব ছিল। সমাজটির নৈতিক বিপর্যয়ও ছিল ব্যাপক। লোভ এবং অবিচার এতই বিস্তার লাভ করেছিল যে সেই সমাজের লোকেরা ইউসুফ (আ)-এর নিষ্পাপ চরিত্রের নিদর্শন পেয়ে তাকে কারাবন্দি করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইউসুফ (আ) এর সততা ও স্বপ্নের সুব্যাখ্যা দেয়ার বিষয়টি উপলদ্ধি করে রাজা তাকে কারামুক্ত করেন এবং নিজের নিকটবর্তী করেন। সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) রাজাকে বলেছিলেন তাকে যেন কোষাগারের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং রাজা তাঁর অনুরোধ রেখেছিলেন। তাই তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ইউসুফ (আ) জাহেলী শাসন ও শাসনব্যবস্থার মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যা ছিল বনী ইসরাইলের শারী’আহ্’র বিপরীত। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তিনি (আ) রাজার দ্বীনের (ব্যবস্থার) অথার্ৎ রাজার শাসন ও কতৃর্ত্বের উপর বহাল ছিলেন, এমনকি তিনি (আ) নিজের ভাইকে তাঁর নিকটে রাখতে কৌশল হিসেবে ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ উল্লেখ করেন। ভাইয়ের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ দায়ের করার পুরো ঘটনাটিই ছিল তাঁর একটি কৌশল কারণ ইয়াকুব (আ) শারী’আহ্ মোতাবেক চোরকে দাসত্ব বরণ করতে হতো।

    তারা আরও বলে বিষয়টি যে শুধুমাত্র সাইয়্যিদূনা ইউসুফ (আ)-এর জন্যই প্রযোজ্য এটা বলা যাবে না কারণ তা বলার জন্য দলিল প্রয়োজন। কারণ মৌলিকভাবে নবীগণ (আ) এবং তাঁদের (আ) নির্দেশিত পথের ব্যাপারে যাই উল্লেখ আছে তাই আমাদের জন্য অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।

    তাছাড়া তারা আরো বলে কারও এ দাবীও করা উচিত নয় যে এটা আমাদের পূর্ববতীর্গণের জন্য প্রযোজ্য শারী’আহ্ হতে এসেছে, কারণ শাসন সংক্রান্ত বিষয়টি শারী’আহ্’র ফুরু (শাখা) হতে উৎসারিত হয়নি যেখানে ভিন্নতার অবকাশ থাকবে বরং তা উসূল হতে উৎসারিত যেখানে সকলের ঐক্যমত্য রয়েছে। তাছাড়া সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) জানতেন যে,

    “হুকুম একমাত্র আল্লাহ্’র।”
    (সূরা ইউসুফ: ৪০),

    এবং তা জানা সত্ত্বেও তিনি (আ) রাজার শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।

    সূরা ইউসুফের এ বিষয় সংক্রান্ত আয়াতগুলো অধ্যয়ন করলে লক্ষ্য করা যায় যে নিম্নোক্ত আয়াত দু’টির উপর ভিত্তি করে তারা কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের  বৈধতার পক্ষে মতামত দেয়,

    “সে বাদশাহ্’র আইনে নিজ ভাইকে কখনও দাসত্বে দিতে পারত না, যদি আল্লাহ্ না চাইতেন।”
    (সূরা ইউসুফ: ৭৬)

    এবং

    “(ইউসুফ) বলল: আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন।”
    (সূরা ইউসুফ: ৫৫)

    তারা বিষয়টিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যাতে তা তাদের মতামতের সাথে মিলে যায়। তারা ভুলে গেল সেসব মূলনীতির কথা যেগুলোর উপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত যা তাদের মতের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং সেইসব আয়াতগুলোকে পাশ কাটিয়ে গেল যা তাদের এই ব্যাখ্যার সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। তারা নবীদের নিষ্পাপতার বিষয়টিও ভুলে গেল। যদি এ আয়াত দুটির ব্যাপারে তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যা ভ্রান্ত প্রমাণিত হয় তবে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) সম্পর্কিত তাদের সকল ব্যাখ্যাও ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হবে।

    নবীগণ আল্লাহ্’র সকর সৃষ্টির মাঝে পবিত্রতম এবং তারা নির্বাচিত। স্বীয় দ্বীনকে বিস্তৃত করার জন্যই তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাদের (আ) নির্বাচিত করেছেন। তারা (আ) ছিলেন তাদের স্বীয় সম্প্রদায়ের লোকদের জন্য সঠিক দৃষ্টান্ত ও অনুসরণীয় আদর্শ। কারণ তারা (আ) আল্লাহ্’র হুকুমকে সর্বোত্তম উপায়ে পালন করেছেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদেরকে সমস্ত গুণাহ্ এবং প্রলোভন হতে পবিত্র রেখেছেন, এবং তাদেরকে সত্যের উপর অবিচল রেখেছেন এবং তাদের সাহায্য করেছেন। সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) ছিলেন সেই বাছাইকৃতদেরই একজন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা একাধিক আয়াতে তাঁর প্রশংসা ও তারিফ করেছেন।

    “এমনিভাবে তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগুঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন এবং পূর্ণ করবেন স্বীয় অনুগ্রহ….”
    (সূরা ইউসুফ: ৬)

    “যখন সে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে গেল, তখন তাকে প্রজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি দান করলাম। এভাবেই আমি সৎকর্মপরায়ণদেরকে প্রতিদান দেই।”
    (সূরা ইউসুফ: ২২)

    “এটা ছিল এজন্য যাতে আমি তার কাছ থেকে মন্দ ও নির্লজ্জ বিষয় সরিয়ে দেই। নিশ্চয়ই সে আমার মনোনীত বান্দাদের একজন।”
    (সূরা ইউসুফ: ২৪)

    “এমনিভাবে আমি ইউসুফকে (মিশরের) ভূখন্ডে ক্ষমতা দান করলাম। সে তথায় যেখানে ইচ্ছা স্থান করে নিতে পারত। আমি স্বীয় রহমত যাকে ইচ্ছা পৌঁছে দেই এবং আমি পুণ্যবানদের প্রতিদান বিনষ্ট করি না।”
    (সূরা ইউসুফ: ৫৬)

    আল্লাহ্’র নিকট তিনি সর্বোচ্চ পর্যায়ের দাওয়াহ্ বহনকারী ছিলেন। পবিত্র কুর’আনে উল্লেখ আছে যে যখন কয়েদখানায় তার সহকয়েদীরা তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে চাইল তখন তিনি বলেলেন,

    “হে কারাগারের সঙ্গীরা। পৃথক পৃথক অনেক উপাস্য ভাল, নাকি পরাক্রমশালী এক আল্লাহ্? তোমরা আল্লাহ্’কে ছেড়ে নিছক কতগুলো নামের এবাদত করছো, যেগুলো (অজ্ঞতাবশত) তোমাদের ও তোমাদের বাপ-দাদাদের সাব্যস্ত করে নেয়া। অথচ এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন দলীল-প্রমাণ নাযিল করেননি। আল্লাহ্ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও এবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”
    (সূরা ইউসুফ: ৩৯-৪০)

    তিনি ছিলেন পরিশুদ্ধ, আল্লাহ্’র প্রতি আনুগত্যশীল এবং তার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করতেন। সে কারণে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে নারীদের ও আল আযিযের স্ত্রীর কূটকৌশল থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং যা পবিত্র কুর’আনে বর্ণিত আছে,

    “ইউসুফ বলল: হে প্রতিপালক, তারা আমাকে যে কাজের দিকে আহ্বান করে, তার চাইতে আমি কারাগারই পছন্দ করি। যদি আপনি তাদের চক্রান্ত আমার উপর থেকে প্রতিহত না করেন, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ব এবং অজ্ঞদের অন্তভুর্ক্ত হয়ে যাব। অতঃপর তার প্রতিপালক তার দো’আ কবুল করে নিলেন। অতঃপর তাদের চক্রান্ত প্রতিহত করলেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।”
    (সূরা ইউসুফ: ৩২-৩৪)

    লোকেরা তাঁর ধর্মপরায়ণতা, সততা ও মহত্ত্ব পরীক্ষা করেছে। কয়েদখানায় তার দু’জন সহচর বলেছিল,

    “আমাদেরকে এর ব্যাখ্যা বলুন। আমরা আপনাকে সৎকর্মশীল দেখতে পাচ্ছি।”
    (সূরা ইউসুফ: ৩৬)

    রাজা স্বপ্ন দেখার পর দুই বন্দীর একজন যিনি মুক্ত হয়েছিলেন তিনি ইউসুফ (আ)-কে বললেন,

    “হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী।”
    [সূরা ইউসুফ: ৪৬]

    নির্দোষিতা প্রমাণের আগে কারাগার থেকে মুক্তির প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করায় তাঁর সম্পর্কে নারীগণ বলল,

    “তারা বলল: ‘আশ্চর্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র মাহাত্ম্য! আমরা তো তাঁর উপর কোন পাপ কিংবা এ ধরণের কোন অভিযোগই দেখতে পাইনি!’ (একথা শুনে) আযীযের স্ত্রী বলল: ‘এখন (যখন) সত্য প্রকাশিত হয়েই গেছে, (তখন আমাকেও বলতে হয়, আসলে) আমিই তাঁর কাছে অসৎ কাজ কামনা করেছিলাম, অবশ্যই সে ছিল সত্যবাদীদের একজন।”
    (সূরা ইউসুফ: ৫১)

    ইউসুফ (আ) এর প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে রাজা বললেন,

    “বাদশাহ্ বলল: তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে নিজের বিশ্বস্ত সহচর করে রাখব।”
    (সূরা ইউসুফ: ৫৪)

    তাঁর ভাইকে নেয়ার সিদ্ধান্তের পর, ভাই বলল,

    “সুতরাং আপনি আমাদের একজনকে তাঁর বদলে রেখে দিন। আমরা আপনাকে অনুগ্রহশীল ব্যক্তিদের একজন দেখতে পাচ্ছি।”
    (সূরা ইউসুফ: ৭৮)

    সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) তাক্ওয়া, দৃঢ়তা, আনুগত্য ও পাপ থেকে মুক্ত থাকার কারণে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে যে রহমত দিয়েছেন তা তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন,

    “বললেন: আমিই ইউসুফ এবং এই হল আমার সহোদর ভাই। আল্লাহ্ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। নিশ্চয়ই যে তাক্ওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, আল্লাহ্ এহেন সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।”
    (সূরা ইউসুফ: ৯০)

    যার ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজে এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারী সকলেই সাক্ষ্য প্রদান করছেন তাকে কিভাবে কিছু মুসলিম অভিযুক্ত করে? পবিত্র কুর’আনে তিনি রাজার আইন দিয়ে শাসন করেছেন এ ব্যাপারে একটি দৃষ্টান্তও উল্লেখ নেই। তিনি যে আইন দিয়ে শাসন করেছেন তার সম্পর্কে নিম্নোক্ত আয়াতটি বাদে আরও কোনকিছু উল্লেখ নেই,

    “তারা বলল: এর শাস্তি এই যে, যার রসদপত্র থেকে তা পাওয়া যাবে, এর প্রতিদানে সে দাসত্বে যাবে।”
    (সূরা ইউসুফ: ৭৫)

    এই হুকুমটি ছিল ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ অনুসারে। তিনি আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসন করেছেন এ ব্যাপারে কোন দৃষ্টান্ত বা জ্ঞান কারও জানা নেই। তাদের সন্দেহযুক্ত যুক্তি নিম্নোক্ত আয়াত থেকে আসে:

    “সে বাদশাহ্ আইনে আপন ভাইকে কখনও দাসত্বে দিতে পারত না, কিন্তু আল্লাহ্ যদি ইচ্ছা করেন।”
    (সূরা ইউসুফ: ৭৬)

    যখন এ আয়াতটির সঠিক তাফসীর করা হয় তখন সব সুবাহ বা সন্দেহ দূর হয় এবং তাদের দাবী অযৌক্তিক প্রমাণিত হয়।

    এই পদ্ধতির পক্ষালম্বনকারীরা আয়াতটিকে দ্বান্দিক মনে করে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যা তাদের অবস্থানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তাদের ব্যাখ্যা ছিল নিম্নরূপ-

    দূর্ভিক্ষের বছর, লোকেরা প্রতিটি এলাকা থেকে ইউসুফ (আ) কাছে আসা শুরু করল যাতে করে সংরক্ষিত ফসল থেকে তারা কিছু পায় এবং রাজা এগুলো বন্টনের দায়িত্ব ইউসুফ (আ) এর উপর ন্যস্ত করেছিলেন। তাঁর ভাইয়েরা আসল। যদিও ভাইয়েরা তাকে সনাক্ত করতে পারেনি, কিন্তু তিনি ঠিকই ভাইদের সনাক্ত করতে পারলেন। তিনি তার ছোট ভাইকে বললেন যে তিনি তাদের ভাই। তিনি তাঁর ভাইয়ের জন্য একটি কৌশল আঁটলেন। সবার অগোচরে একটি পানপাত্র বা সিকায়াহ তার ভাইয়ের উটের জিনের মধ্যে পুরে দিলেন। অতঃপর তিনি ঘোষণা করে দিলেন যে পানপাত্রটি চুরি গেছে এবং কেউ বলল ঐ উটের বহরের কেউ এটি চুরি করেছে। যে তা খুঁজে বের করবে তাকে একটি শস্যবাহী উট দ্বারা পুরষ্কৃত করা হবে। ইউসুফ (আ)-এর ভাইয়েরা এ দাবীকে তীব্রভাবে প্রত্যাখান করল। যারা বিতরণকার্য তত্ত্বাবধান করছিলেন তারা বললেন,

    “…….যদি তোমরা মিথ্যাবাদী হও, তবে যে চুরি করেছে তার কি শাস্তি?”
    (সূরা ইউসুফ: ৭৪)

    ইউসুফ (আ)-এর ভাইগণ বললেন,

    “…….শাস্তি হচ্ছে, যার রসদপত্রের মাঝে তা পাওয়া যাবে, প্রতিদানে সে দাসত্বে যাবে।”
    (সূরা ইউসুফ: ৭৫);

    অর্থাৎ চুরির দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবে। আর এটা ছিল ইয়াকুব (আ) এর শারী’আহ্ মোতাবেক শাস্তি। সে কারণে ইউসুফ (আ) তার ভাইয়ের তল্পিতল্পা খোঁজার আগে অন্যদের তল্পিতল্পা খোঁজা শুরু করলেন। অতঃপর তার ভাইয়ের থলে থেকে এটি উদ্ধার করা হল এবং নিয়ম অনুসারে তাকে দাসত্ব বরণ করতে হল। তারপর ইউসুফ (আ) সম্পর্কে আয়াতটি বর্ণিত হয়েছে,

    “সে বাদশাহ্’র প্রচলিত আইনানুযায়ী তাঁর ভাইকে তাঁর নিকটে রাখতে পারত না।”
    (সূরা ইউসুফ: ৭৬);

    কেউ কেউ এটাকে রাজার শারী’আহ্ (আইন) বা নিযাম (জীবন ব্যবস্থা) বলে ব্যাখ্যা করে থাকে। এর অর্থ হল মিশরের রাজার একটি শারী’আহ্ বা ব্যবস্থা ছিল এবং সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) তা দ্বারা পরিচালিত হতেন। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণে তিনি কৌশলের আশ্রয় নিলেন যাতে তাঁর ভাইকে তাঁর কাছে রেখে দেয়া যায়। সে কারণে তিনি একটি শিষ্টাচারসম্মত কৌশলের আশ্রয় নিলেন এবং অভিযুক্তকেই তার শাস্তির ব্যাপারে মতামত দিতে বললেন। তিনি রাজার আইনানুসারে এ অপরাধের শাস্তি কি মোটেও তা বর্ণনা করেননি। বরং তিনি ভাইদের মুখ দিয়ে ইয়াকুব (আ)-এর আইনানুসারে রায় বের করে নিয়ে এসেছেন যাতে নিজ ভাইকে নিজের কাছে রাখা যায়।

    আয়াতের এহেন ব্যাখ্যাই তাদেরকে উপরোক্ত উপলদ্ধিতে আসতে সহায়তা করেছে।

    আমরা যদি আরবীতে ‘দ্বীন’ শব্দটির উপর আলোকপাত করি তাহলে দেখতে পাব যে, এটি একটি সার্বজনীন শব্দ যার একাধিক অর্থ রয়েছে। লিসান আল আরব (আরবদের ভাষা) ভাষাকোষ অনুসারে ‘দ্বীন’ বলতে বুঝায় বলপ্রয়োগের শাসন এবং আনুগত্য। সুতরাং ‘দ্বীনতুহুম ফা দ্বানও’ অর্থ হল ‘আমি তাদেরকে বাধ্য করলাম, তারা আমাকে আনুগত্য করল।’ দ্বীন বলতে আরও বুঝায় পুরষ্কার ও মূল্যবান বস্তু। ‘আমি তাকে পুরষ্কৃত করলাম’ এটা ব্যক্ত করতে আপনি বলতে পারেন, ‘তার দ্বীনুন কাজের জন্য দ্বীনতুহু’।  আবার ‘ইয়াওম আল-দ্বীন’ অর্থ হল ‘বিচার দিবস’। ‘দ্বীন’ বলতে জবাবদিহী করাকেও বোঝায়। যেমন: আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “যিনি বিচার দিবসের মালিক।”
    (সূরা ফাতিহা : ৪)

    দ্বীন এর আরেকটি অর্থ হল শারী’আহ্ এবং সুলতান। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “আর তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাক যতক্ষণ না সমস্ত ফিত্না দূর হয়, এবং আল্লাহ্’র সমস্ত হুকুম প্রতিষ্ঠিত হয়।”
    (সূরা আনফাল: ৩৯)

    দ্বীন শব্দের আরও অর্থ হল অবমাননা বা দাসত্ব বরণ করা এবং ‘মাদ্বীন’ অর্থ হল দাস। আল-মাদ্বীনা মানে অধীনস্থ জাতি। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন, “আমরা কি মাদ্বীনুন?” [আল কুর’আন- ৩৭: ৫৩] যার অর্থ ‘অধিকার লাভ’।

    একইভাবে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) অন্যত্র বলেন,

    “যদি তোমাদের হিসাব-কিতাব না হওয়াই ঠিক হয়, তবে তোমরা একে (আত্মাকে) ফিরিয়ে দাও না কেন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও?”
    [সূরা আল ওয়াক্বিয়াহ্: ৮৬-৮৭];

    এখানেও মাদ্বীনান অর্থ হল ‘অধিকার প্রাপ্ত হওয়া’।

    ‘দ্বীন’ এর এরকম আরও অনেক অর্থ রয়েছে।

    সুতরাং এ আয়াতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন অর্থটি বুঝিয়েছেন? এই অর্থগুলোর মধ্যে থেকে কোনও একটি অর্থ গ্রহণ করতে হলে সেই সুনির্দিষ্ট  অর্থের প্রতি ইঙ্গিতদানকারী ক্বারিনা (নির্দেশক) প্রয়োজন। যদি কেউ তা না করে তার মত ও দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে অর্থ গ্রহণ করে; নিজের খেয়াল-খুশিকে শারী’আহ্’র উপর স্থান প্রদান করে তবে তার অসৎ উদ্দেশ্য উন্মোচিত হবে। অন্যদিকে যিনি শারী’আহ্ ক্বারা’ইন (নির্দেশনা) কতৃর্ক দিকনির্দেশনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং সীমাবব্ধ থেকে অর্থ গ্রহণ করেন, তিনি শারী’আহ্’কে বিচারক হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং প্রভূর হুকুম পালন করেছেন বলে গণ্য হবেন। সুতরাং বুঝা দরকার যে এসব একাধিক অর্থের মধ্যে কোন অর্থটি আসলে ঊদ্দেশ্য?

    আমরা যদি বলি দ্বীন শব্দটি এখানে শারী’আহ্ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, তবে আমাদের জানা উচিত শারী’আহ্’র নির্দেশনা এমন যেকোন ধরনের ব্যাখ্যা হতে আমাদের বিরত থাকতে বলেছে, যে ব্যাখ্যা মনে করে যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেছেন। কারণ তা নবীগণ(আ) এবং বিশ্বাসীগণদের জন্য হারাম করা হয়েছে, এবং তা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃর্ক প্রেরিত বাণীর প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক যে বাণী একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইবাদত ও দাসত্বের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং তা আইন প্রণয়নের একচ্ছত্র মালিক একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-এই বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।”
    (সূরা আম্বিয়া: ২৫)

    একই কথা ইউসুফ (আ) এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যখন তিনিও বলেন,

    “আল্লাহ্ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”
    (সূরা ইউসুফ: ৪০)

    এটা অসম্ভব যে তিনি এ আয়াতের ব্যাত্যয় ঘটিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রভূর হুকুমকে মেনে নিয়েছেন। একই অবস্থা আমরা সাইয়্যিদুনা শোয়াইব (আ) এর ক্ষেত্রেও দেখতে পাই, যখন তিনি বলেন,

    “আর আমি চাই না যে তোমাদেরকে যা ছাড়াতে চাই পরে নিজেই সে কাজে লিপ্ত হব, আমিতো যথাসাধ্য শোধরাতে চাই। আল্লাহ্’র মদদ দ্বারাই কিন্তু কাজ হয়ে থাকে, আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি এবং তাঁরই প্রতি ফিরে যাই।”
    (সূরা হুদ: ৮৮)

    আল কুরতুবীর মতে এ আয়াতের তাফসীর হল আমি নিজে যা করি সে সম্পর্কে তোমাদের নিষেধ করতে পারি না যেমনিভাবে আমি তোমাদের যা করার আদেশ দেই তা পরিত্যাগ করি না।

    ‘দ্বীন’ শব্দের অভিপ্রেত অর্থ যদি ’দাসত্ব’ নেয়া হয় যার মানে হচ্ছে তার ভাই ‘মাদ্বীনান’ অর্থাৎ মালিকবিহীন দাসে পরিণত হয়েছে তাহলে এই অর্থ পূর্ববর্তী আয়াতের সাথে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ যাতে ইউসুফ (আ) এর ভাইয়ের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে চোরকে দাসত্বে আবদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং আয়াতটির অর্থ দাঁড়ায় এই যে, রাজা কতৃর্ক দাসে পরিণত না হলে অর্থাৎ মাদ্বীন (মালিকানাধীন দাস) না হলে তিনি তাঁর ভাইকে নিতে পারতেন না যদি না আল্লাহ্ ইচ্ছা করতেন। আর এই অর্থই সত্যের খুব কাছাকাছি। এমন কোন শারী’আহ্ ইঙ্গিত নেই যা এরূপ অর্থের অন্তরায় হতে পারে। বরং আয়াতে এর আগে যা এসেছিল তার সাথে এটা সঙ্গতিপূর্ণ এবং এটা প্রমাণ করে যে, সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) একজন মুহসীন বা সৎকর্মশীল, মুখলেসীন বা আল্লাহ্’র প্রতি আন্তরিক যেমনটি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন। লোকেরা যে বিষয়ে স্বাক্ষ্য দিয়েছে এটা তার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ।

    সেকারণে এরকম তাফসীর প্রত্যাখাত হবে যা নবীদের নিষ্পাপতা ও পাপ থেকে পবিত্র হওয়ার ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক এবং যার মানে দাঁড়ায় তারা যা বলেন তা করেন না।

    রাজার প্রতি সাইয়্যুদনা ইউসুফ (আ)-এর বক্তব্যের তাফসিরের বেলায়,

    “(ইউসুফ) বলল: আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান।”
    (সূরা ইউসুফ: ৫৫)

    এর তাফসীর প্রসঙ্গে তারা বলতে চায়, তিনি অর্থমন্ত্রী হওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন এবং এ পদে তাকে বহালের সময় তিনি ইয়াকুব (আ) এর শারী’আহ্ প্রয়োগ করেননি, বরং রাজার ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছেন যা ন্যায়বিচারের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলনা।

    এটি একটি বিশাল পদস্খলন ও সত্য বিচ্যুতি। বিষয়টিতে সঠিক পথনির্দেশনা পেতে হলে আমাদেরকে নিম্নে বর্ণিত কিছু ইস্যুর সাথে পরিচিত হওয়া খুবই জরুরী।

    — সেসময়ের শাসব্যবস্থাটি ছিল রাজতান্ত্রিক যেখানে রাজা তার নিজের আদেশ ও মতামতের ভিত্তিতে রাজ্য পরিচালনা করতেন। ইতিহাসে দু’ধরনের রাজতান্ত্রিক শাসব্যবস্থা দেখা যায়:

    — রাজতন্ত্রের নির্বাহী ব্যবস্থায় রাজা তার মতামত ও হুকুমের মাধ্যমে রাজ্য পরিচালনা করেন। লোকদের তাই মানতে হয় যা কিছুকে রাজা উপযুক্ত মনে করেন এবং কেউ তার বিচারকে পরিবর্তন করতে পারেন না। আইন, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ সবই থাকে তার করতলগত। তিনি নিজে তার সহকারীদের নিয়োগ দেন এবং যখন খুশী তখন অপসারণ করেন। আনুগত্য ও ঘনিষ্টতার উপর নির্ভর করে অথবা তাদের যথার্থ বিচার ও সুপরিকল্পনার জন্য তিনি তাদের এ পদে নিযুক্ত করেন। এইসব সহকারীদের আনুগত্য ও বাধ্যতাই মুক্তভাবে শাসন করবার জন্য যথেষ্ট এবং তখন তারা নিজেদের হুকুম ও মতামতের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করতে পারেন। অর্থাৎ ক্ষুদ্র পরিসরে তারা প্রত্যেকেই আলাদাভাবে একেকজন রাজা।

    — সীমাবদ্ধ নির্বাহী ক্ষমতাচর্চার মাধ্যমে রাজতন্ত্র। এ ব্যবস্থায় রাজা একজন প্রকৃত রাজার বদলে একটি প্রতিচ্ছবি হয়েই থাকেন যেখানে তার নিরঙ্কুশ কোন ক্ষমতা থাকে না। এক্ষেত্রে রাজা নন, সংবিধান ও কানুনের উপর সার্বভৌমত্বের দায়িত্ব অর্পিত থাকে। রাজাকে ছাড়াই আইনপ্রণেতাগণ আইন প্রণয়ন করেন। এমন নির্বাহী কাঠামো থাকে যারা সংবিধান ও কানুন বাস্তবায়ন করে থাকেন। এছাড়াও এমন বিচার কাঠামো থাকে যারা রাজা ব্যতিরেকে বিবাদ মিমাংসা করেন এবং লোকদের মধ্যে বিরোধের অবসান ঘটান। এ ধরনের রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাপকতা পায় যখন গণতন্ত্র বিস্তৃতি লাভ করে। আর এটাই হল সীমাবদ্ধ বা সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। ইউসুফ (আ) এর সময়ে মিশরে তাহলে এই দু’টির মধ্যে কী ধরনের রাজতন্ত্র বলবৎ ছিল?

    কেউ এ বিষয়টি কল্পনাও করতে পারবে না যে সেসময় মিশরের রাজা কোন ব্যবস্থা বা সংবিধানের অনুগত ছিলেন। ‘দ্বীন আল মালিক’ বলতে তারা বুঝায় তা নয় বরং রাজার আইনকেই বোঝানো হয়। শাসকের কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রনকারী আজকের রাজতন্ত্র ও ইউসুফ (আ)-এর সময়কার রাজতন্ত্রের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়ার ভিত্তিতে যে মতামত তা সঠিক মতামত থেকে বিচ্যুত এবং এটি একটি ত্রুটিপূর্ণ সাদৃশ্যতা।

    কোষাগারের দায়িত্ব প্রদান করতে রাজার প্রতি সাইয়িু্যদুনা ইউসুফ (আ)-এর অনুরোধ এবং এ ব্যাপারে রাজার সম্মতির সাথে শাসনের কোনরূপ সম্পর্ক বিদ্যমান নেই। বরং কুর’আন এ বিষয়টিকে স্বপ্নের বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছে এবং এর বাইরে আর কিছুই নয়। এটা ফসলের উৎপাদন, ফসল কাটার বছর, খরার বছর এবং এ ব্যাপারে করণীয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত। সেকারণে তিনি বাহুল্য বর্জন করে অর্পিত বিশ্বাসে আস্থা রেখে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) কে ময়দা মজুদ করবার দায়িত্ব নিতে এবং খরার বছরের জন্য ফসল কাটার বছরে বন্টনের ব্যবস্থা করবার আদেশ করেন। এটা ছিল একটি কঠিন কাজ এবং এটা ইউসুফ (আ)-এর মত কোন দক্ষ, বিশ্বস্ত, সচেতন এবং জ্ঞানী ব্যক্তি ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের সাথে যা হয়েছে তা আলোচ্য ঘটনার সাথে সম্পর্কযুক্ত। আমাদের এ থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোন সুযোগ নেই এবং সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর দায়দায়িত্ব পর্যন্ত একে বিস্তৃত করবার কোন সুযোগ নেই। আমরা এ কথা বলার অধিকার রাখি না যে সম্পদ সংগ্রহ করা এবং তা রাজার পরিষদবর্গ, পরিবার, সেনাবাহিনী ও নাগরিকদের জন্য ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ ব্যতিরেকে রাজার ব্যবস্থা অনুযায়ী ব্যায় করা ছিল তাঁর দায়িত্ব। কিতাবের বাণীর এহেন ব্যাখা দেয়ার জন্য দলিল প্রয়োজন।

    মুলতঃ রাজা ইউসুফ (আ)-এর বিচক্ষণ রায়, বিষয়াদি পর্যালোচনার ক্ষমতা ও দক্ষতার বিষয়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। আর এটাই ইউসুফ (আ) কে রাজার অত্যন্ত নিকটে নিয়ে এসেছিল এবং এতো বড় দায়িত্বে নিযুক্ত হবার সুযোগ করে দিয়েছিল যা স্বপ্ন দেখার পর থেকেই তার (রাজার) মনে আসন গেড়েছিল। অতএব এটা গুরুত্বপূর্ণ যে ইউসুফ (আ) অন্য কারো হস্তক্ষেপ ছাড়াই এ সুযোগ লাভ করেছিলেন।  

    কেঊ হয়ত এভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) কেবলমাত্র রাজার স্বপ্নকে ব্যাখ্যা করেননি। বরং তিনি এ ব্যাপারে বিকল্প ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় সংস্থার ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন। এটাই গুদামজাত পণ্যের দেখাশুনার দায়িত্ব প্রদান করতে ও এ ব্যাপারে তাকে স্বাধীন ক্ষমতা প্রদানে রাজাকে আস্থাশীল করেছে। রাজা ইউসুফ (আ) কে এমনটা বলেননি যে তার একটি শারী’আহ্ বা ব্যবস্থা রয়েছে এবং এটা দিয়েই পরিচালিত হতে হবে। বরং রাজা ইউসুফ (আ) এর স্বপ্নের ব্যাখ্যা এবং এ ব্যাপারে তার সমাধানকে গ্রহণ করেছেন। ফলে রাজা উপযুক্ত মনে করেই তাকে ফসল বন্টন ও মজুদের দায়িত্ব দেন।

    এটা অনস্বীকার্য যে খরার বছরের পর ইউসুফ (আ)-এর কাছে জনগণকে দুভীর্ক্ষ থেকে উদ্ধারের জন্য আসতে হয়েছে। এটাও অবধারিত যে সুবিচার ও সঠিক বন্টনের জন্য তার সুখ্যাতি দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল। এটা রাজার সাথে তার সম্পর্ককে আরও ঘনীভূত করেছে ও তাকে আরও নিকটে নিয়ে এসেছে। হয়ত এটাই তাকে আজিজ হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে যেমনটি তার ভাইদের কথায় পাওয়া যায়।

    “হে ভূমির অধিপতি (হে আযীয)।”
    (সূরা ইউসুফ : ৮৮);

    সেই রাজা যার কাছে তার পিতামাতাকে মরুভূমি থেকে আসতে হয়েছে।

    তিনি রবের নিকট দু’আ করলেন এবং বললেন;

    “হে আমার রব! তুমি আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছ……।”
    (সূরা ইউসুফ: ১০১)

    অতঃপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “সে তার পিতামাতাকে উচ্চাসনে বসালো…।”
    (সূরা ইউসুফ: ১০০);

    এর অর্থ হল তাকে কর্তৃত্বও দেয়া হয়েছিল।

    পবিত্র কুর’আন এর বর্ণনানুসারে একমাত্র আইন যা ইউসুফ (আ) বাস্তবায়ন করেছিলেন তা হলো ইয়াকুব (আ)-এর শারী’আহ্ অনুসারে তার ভাইকে দাস হিসেবে গ্রহণ করা। যদি রাজার কোন সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সেটা না গ্রহণ করার মাধ্যমে তিনি রাজকীয় ব্যবস্থার ব্যাত্যয় ঘটালেন কেন?

    এটা কল্পনা করা সম্ভব নয় যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) শারী’আহ্’র বিন্দুমাত্র ব্যাত্যয় ঘটিয়েছেন। কারণ তিনি হলেন মাসুম বা ভুলের উর্ধ্বে এবং তাঁর রব তাকে মুহসীন বা উত্তম, আন্তরিক ও ধার্মিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যিনি প্রেমের চেয়ে কারাভোগকে অির্ধক প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি কারাগারের ভেতরে দাওয়াহ্’র কাজ করতেন। তিনি নিজেকে নিরাপরাধ প্রমাণ না করে কারাগার থেকে বের হতে চাননি। তিনি সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর সততা ও দক্ষতার কারণে আযীয পত্নী হতে শুরু করে শহরের নারীগণ, কারাগারে তাঁর দুই সাথী, রাজার, এমনকি পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার পূর্বে তাঁর ভাইগণ পর্যন্ত তৎকালীন সমাজের সকর কাফেরদের প্রসংশা অর্জন করেছিলেন।

    এটা উল্লেখযোগ্য যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর অবস্থা ও রাজার রাষ্ট্রবিষয়ক তাফসীর এসবই হল তাফসির জান্নি (ধারণামূলক ব্যাখ্যা (Speculative interpretation))। যে দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তারা আসুক না কেন সবই অসাঢ়। সুতরাং রাজা কি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন নাকি কাফের রয়ে গিয়েছিলেন, নাকি রাজার মৃত্যু বা অপসারণের পর রাজর্ষিক দায়িত্ব ইউসুফ (আ)-এর উপর অর্পিত হয়েছিল, নাকি পূর্বের আযিযের মৃত্যু বা অপসারণের পর তিনি কি আযিয হয়েছিলেন-এসব সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বক্তব্য হল :

    “সে বাদশাহ্ আইনে নিজ ভাইকে দাসত্বে নিতে পারত না।”
    [সূরা ইউসুফ: ৭৬],

    অথবা তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) বক্তব্যের ব্যাখ্যা,

    “আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন……।”
    [সূরা ইউসুফ : ৫৫];

    এসব প্রশ্নের সব উত্তরই ধারণামূলক (Speculative)। কারণ পবিত্র কুর’আন এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে উত্তরের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করেনি। এছাড়া এ বিস্তারিত বিষয়গুলো আইন হিসেবে মেনে নেয়া আমাদের জন্য অপরিহার্যও নয়। আমাদের ব্যাখ্যাও এর ব্যতিক্রম নয়, যেহেতু এটাও অন্যান্য ধারণামূলক (Speculative) ব্যাখ্যার মতোই ভিন্নরুপের আরেকটি ব্যাখ্যা মাত্র। তবে আমাদের ব্যাখ্যাটি অন্যান্য ব্যাখ্যার চেয়ে এদিক থেকে অনন্য যে এটা তাক্বওয়া ও ঈমানের ভিত্তিতে নবীদের যথার্থতা তুলে ধরে এবং নবীদের নিষ্পাপতার সাথেও সাংঘর্ষিক নয় যা কিনা দ্বীনের অন্যতম ভিত্তি। একটি ব্যাখ্যা সত্য হতে কতটা বিচ্যুত হতে পারে যার নমূনা ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি যখন তা স্বয়ং ইউসুফ (আ) মুখ হতে নিসৃত অকাট্য বক্তব্য যা তিনি শিরকের আক্বীদা বর্জনের জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন তার সাথে সাংঘর্ষিক হয় এবং বিচার-ফয়সালায় শুধুমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রতি মুখাপেক্ষিতাকে বর্জন করে? এভাবে অগ্রসর হয়ে ইউসুফ (আ) এর পরিস্থিতি সুস্পষ্ট করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি অবস্থায় উপনীত হতে পারি যেখান থেকে কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের পক্ষে কোন সমর্থন পাওয়া যায় না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীই হলো শারী’আহ্’র হুকুম, কোন ধারণানির্ভর (Speculative) হুকুম নয়। এটা দলিলের অর্থ ও সত্যতার বিচারে অকাট্য।

    কেউ হয়ত বলতে পারে যে ইউসুফ (আ) আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র  নির্দেশ মোতাবেকই রাজার ব্যবস্থা অনুসারে শাসন করেছিলেন এবং এতে তাঁর রবের ইচ্ছাই প্রতিফলিত হয়েছে। এর উত্তরে বলা যায়, হয় এই কুফর ব্যবস্থা দিয়ে শাসন করার অনুমোদন সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর জন্য সুনির্দিষ্ট ছিল, না হয় তা ছিল সার্বজনীন?

    যদি এটা শুধুমাত্র সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর জন্য সুনির্দিষ্ট হয়ে থাকে তাহলে এটা আমাদের জন্য অনুমোদিত নয়। সে কারণে এটা আমাদের জন্য দলিল বা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে না।

    দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, যদি এটা তৎকালীন সময়ের সার্বজনীন হয়ে থাকে তাহলে এটা এমন একটি হুকুম যা পূর্ববর্তীগণের শারী’আহ্’র বর্ণনা হিসেবে আমাদের নিকট এসেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পূর্ববতীর্গণদের শারী’আহ্ কি আমাদের জন্য প্রযোজ্য? একদল ফিক্হ ও উসূলবিদগণ নিম্নোক্ত উসুলী মূলনীতিটি বর্ণনা করেছেন,

    “পূর্ববতীর্গণদের শারী’আহ্, আমাদের জন্য শারী’আহ্ নয়।”

    এ ব্যাপারে অনেক দলিল পেশ করা যায়, যার মাধ্যমে দেখানো যাবে যে মুহম্মদ (সা) আনীত ব্যবস্থা পূর্ববর্তী সকল শারী’আহ্’র হুকুমকে রহিত করেছে এবং কিছু হুকুমকে ব্যাখ্যাসহ রহিত করেছে। আমরা যদি এই চিন্তাবিদদের মতামতকে গ্রহণ করি, তাহলে ইউসুফ (আ)-এর সময়কে কিংবা অন্যকোন নবীর (আ) সময়কে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা বা অনুসরণ করা অনুমোদিত নয়। আরেকদল ফিক্হ ও উসুলবিদ নিম্নোক্ত মূলনীতিটি বর্ণনা করেছেন,

    “পূর্ববতীর্গণদের শারী’আহ্ ততক্ষণ আমাদের জন্য শারী’আহ্ হয়ে থাকবে যতক্ষন না তা রহিত হয়।” এসব চিন্তাবিদগণ তাদের আইনগত কারণও উল্লেখ করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, যদি পূর্ববতীর্দের আইনের মধ্যে আমাদের কোন উপকারীতা না থাকত তবে সেগুলো পবিত্র কুর’আনে বর্ণিত হতো না। তারা আরও বলে থাকেন যে পবিত্র কুর’আন পূর্ববর্তী শারী’আহ্’র হুকুমকে হঠাৎ রহিত করেনি। তারা বলেন যে, পূর্ববতীর্দের ব্যাপারে পবিত্র কুর’আন এবং হাদীসে যা বলা হয়েছে তা আমাদের জন্যও প্রযোজ্য যদি না নতুন কোন আইন দ্বারা সেগুলো রহিত কিংবা প্রতিস্থাপিত হয়।

    যখন এই মূলনীতিকে আমরা আলোচ্য বিষয়ে প্রয়োগ করি তখন আমরা কি পাই? আমাদের শারী’আহ্ কী আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা বাদ দিয়ে অন্য কিছু দিয়ে শাসন করাকে অবৈধ করেনি? পবিত্র কুর’আন বা মুহাম্মদ (সা), শাসনের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ (সা)-এর শারী’আহ্ হতে চুল পরিমাণ বিচ্যুতির ব্যাপারে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেনি?

    অবশ্যই মুহম্মদ (সা)-এর শারী’আহ্ আমাদের বিচার-মীমাংসার ক্ষেত্রে সেটি ছাড়া অন্যকোন কিছুর নিকট দ্বারস্থ হতে নিষেধ করেছে। কুফর ও জাহেলিয়াতের কাছ থেকে যেকোন হুকুম নেয়া থেকে বিরত থাকবার জন্য অকাট্যভাবে নিষেধ করা হয়েছে। যদি এটা দাবি করা হয় যে এটা সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ)-এর সময়ে বৈধ ছিল, তাদেরকে আমরা বলতে চাই যদি তাদের কথা মেনেও নেয়া হয় তারপরেও কুর’আনের শারী’আহ্ মোতাবেক এটা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ (রহিত)।

    যারা বলেন যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করার দৃষ্টিভঙ্গী উসূল থেকে উৎসারিত, শাখা থেকে নয়, তাদের এ মতটিও সঠিক নয়। কারণ বিশ্বাসের জায়গা হল চিন্তায় এবং শারী’আহ্গত হুকুমের জায়গা হল অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। আক্বীদা হল শারী’আহ্’র ভিত্তি এবং শারী’আহ্গত হুকুম হল আক্বীদার ফসল।

    বান্দার কাজের সাথে সম্পর্কিত শারী’আহ্গত হুকুমের দু’টি দিক রয়েছে :

    ১. বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিশ্বাসগত দিক যা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।

    এই ক্ষেত্রটি আক্বীদার সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং দলিল ক্বাতী’ঈ (অকাট্য) কিংবা জান্নি (ধারণামূলক) যাই হোক এর অস্বীকার কুফরী বা পাপের দিকে ধাবিত করবে।

    — ব্যবহারিক দিক যা কার্যসম্পাদনের সাথে সম্পর্কযুক্ত।

    যেমন: সালাত হল ফরয এবং এটাকে ফরয হিসেবেই বিশ্বাস করতে হবে। এটাকে ফরয হিসেবে বিশ্বাস না করা কুফরী।

    আবার, (আমলের ক্ষেত্রে) সালাত হল ফরয এবং এটাকে ফরয হিসেবেই পালন করতে হবে। এটা ফরয হিসেবে পালন না করা গুনাহ্।        

    মদ খাওয়া হারাম এবং এর হারাম হওয়াটা অবশ্যই মেনে নিতে হবে। আর এটাকে অনুমোদিত বলা কুফরী।

    আবার, মদ হারাম এবং এটা পান করা পরিত্যাজ্য। কাজেই (আমলের ক্ষেত্রে) মদপান একটি গুনাহ্।

    একইভাবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আইন দিয়ে শাসন করা ফরয। আর এটাকে মেনে নেয়া ঈমানের সাথে সম্পর্কিত যা অকাট্য দলিল থেকে উদ্ভুত। একে কার্যকর করার ক্ষেত্রে এটা হল তা’আহ্ বা আনুগত্য এবং কার্যকর না করা হল মা’সিয়াহ্ বা গুনাহ্। সুতরাং আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী শাসনকার্য পরিচালনা না করাটা কুফর হিসেবে গণ্য হবে যদি আল্লাহ্’র ওহী দ্বারা শাসনের উপর বিশ্বাস স্থাপন না করা হয় কিংবা তা প্রত্যাখ্যান করা হয়। আর যদি আল্লাহ্’র ওহী দ্বারা শাসনের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা হয় কিন্তু তা কার্যকর না করা হয় তবে তা গুনাহ্ (কাফের হবে না) হিসেবে গণ্য হবে। সুতরাং আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করা একটি উসুলী ঐক্যমত-এ বক্তব্য প্রথম দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে এবং এটা সঠিক। দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে (ব্যবহারিক দিক) এটা শারী’আহ্ এবং এর প্রয়োগের ব্যাপার। অন্য কথায়, এটা ফুরু বা শাখা-প্রশাখার সাথে সম্পর্কিত, উসুল বা ভিত্তির সাথে নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই এটা আলোচনার ইস্যু হয়ে দাড়িয়েছে যে এটা কি আমাদের পূর্ববর্তী শারী’আহ্’তে ছিল কি না?

    এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমরা বলতে পারি যে সাইয়্যিদুনা ইউসুফ (আ) শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করেননি এবং ঐভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা অনুমোদিত নয়। যেসব লোকেরা বিষয়টিকে অন্যভাবে নিয়েছে তাদের দাবি প্রত্যাখ্যাত, এমনকি তাদের নিজেদের যুক্তির দিক থেকে দেখলেও। এর কারণ হল আলেমগণ শা’রা মান কাবলানা বা পূর্ববতীর্গণের শারী’আহ্’র ব্যাপারে দু’টি মত পোষণ করেছেন। একটির মতে, পূর্ববতীর্দের শারী’আহ্ আমাদের জন্য শারী’আহ্ নয়। সুতরাং এ উপলদ্ধি অনুসারে, জাহেল ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অনুমোদন প্রত্যাখাত। অন্য একটি অংশের মতামত হল, পূর্ববতীর্দের শারী’আহ্ ততক্ষণ আমাদের জন্য শারী’আহ্ হিসেবে থাকবে যতক্ষণ না সেটি রহিত হবে। অনেক আয়াত, আক্বীদা ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাজের মাধ্যমে কীভাবে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা প্রতিষ্ঠিত করা যায় সে পদ্ধতি বলে দেয়া হয়েছে এবং এসব মূলনীতি অনুসারে কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা অনুমোদিত নয়। বরং ইসলাম সামগ্রিকভাবেই এ ধরনের চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। অন্য কথায়, যদি জাহেল শাসনব্যবস্থায় অংশ নেয়া পূর্ববতীর্দের শারী’আহ্ হয়েও থাকে, তবে আমাদের শারী’আহ্ অসংখ্য দলিলের মাধ্যমে এটাকে রহিত করে দিয়েছে।

    নবীদের জীবন এবং তাদের প্রতি নাযিলকৃত নির্দেশনা সম্পর্কে (আল-কুর’আনে) যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার ঊদ্দেশ্য হল (সেসব বিষয়ে) তাদেরকে অনুকরণ ও অনুসরণ করা, এ কথাটির ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

    আক্বীদার ক্ষেত্রে সব নবী একই দাওয়াত দিয়েছেন। সবাই লোকদেরকে আল্লাহ্, তার একত্ববাদ, আল খালিক্ব বা স্রষ্টা, আল মুদাব্বির বা সবকিছুর পরিচালনাকারী এ দিকে আহ্বান করেছেন। তারা ফেরেশতা, আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূল ও শেষ বিচার দিনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য লোকদের দাওয়াত দিয়েছেন,

    “আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।”
    (সূরা আম্বিয়া: ২৫)

    দাওয়াহ্ বহন, বহনের সময় দূর্ভোগ, ক্ষতি ও নির্যাতন ভোগ করা, আল্লাহ্’র জন্য ধৈর্যধারণ করা ও তাঁর পথে ত্যাগ স্বীকার করা প্রভৃতি ক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে সাদৃশ্যতা পাওয়া যায়। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তারা ধৈয্য ধারণ করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছানো পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ্’র বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। আপনার কাছে পয়গম্বরদের কিছু কাহিনী এসে পৌঁছেছে।”
    (সূরা আল আনআম: ৩৪)

    তিনি আরও বলেন,

    “আপনাকে তো তাই বলা হয়, যা বলা হতো পূর্ববর্তী রাসূলগণকে।”
    (সূরা হামীম সিজদাহ্: ৪৩)

    গ্রহণ ও আনুগত্য করার বেলায় তাদের লোকদের বলার ক্ষেত্রেও সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়।

    “বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহ্’র নির্দেশানুযায়ী তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।”
    (সূরা নিসা: ৬৪)

    তাদের দাওয়াহ্’কে অবিশ্বাস করা ও প্রত্যাখানের দিক থেকে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “হায় মানবজাতি! তাদের কাছে এমন কোন রাসূলই আগমন করেনি যাদেরকে তারা বিদ্রুপ করেনি।”
    (সূরা ইয়াসীন: ৩০)

    এবং তিনি আরও বলেন,

    “কাফেররা পয়গম্বরগণদের বলেছিল: ‘আমরা তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।’ তখন তাদের কাছে তাদের প্রতিপালক ওহী প্রেরণ করলেন যে, ‘আমি যালিমদের অবশ্যই ধ্বংস করব। তাদের পর তোমাদেরকে ভূখন্ডে প্রতিষ্ঠিত করব। এটা ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।”
    (সূরা ইবরাহীম : ১৩-১৪)

    অবশেষে তাদের দ্বীনকে বিজয়ী করা হয়েছে। এক্ষেত্রেও তাদের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান ভুল হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আর নাফরমান জাতির উপর থেকে আমার আযাব কখনোই রোধ হবে না।”
    (সূরা ইউসুফ: ১১০)

    এভাবে দাওয়াহ্’র ক্ষেত্রে বিভিন্ন পয়গম্বরগণ একইরকম ছিলেন, যার কিছু ঊদাহরণ আমরা উপস্থাপন করেছি। যারা আগে এসেছিলেন তাদের অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এগুলো এজন্যই বিধৃত করেছেন যাতে এগুলো থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি, সতর্ক হতে পারি, ঈমানকে বুলন্দ করতে পারি, দৃঢ়চেতা হই ও ধৈর্যকে বাড়াতে পারি। তারা আমাদের আরও দেখিয়েছেন যে, আক্বীদার দিক থেকে, সর্বজ্ঞানী এবং সবজান্তার (আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) পথে অটল থাকার বিষয়ে এবং এই কাজের ফলাফলের দিক থেকে তাদের দাওয়াহ্’র ধারা সবসময় একইরকম।  এ বিষয়ক আয়াতগুলো এসেছে যাতে দাওয়াহ্’র পথ আলোকিত হয় এবং এ পথে লোকদের বিরোধীতা, কুফর ও ঈমানের মধ্যকার প্রচন্ড বৈরীতা এবং অবিরাম কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যাবার বিষয়ে আমরা ওয়াকিবহাল থাকি। এসব আমাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রতি ওয়া’লা বা আনুগত্য এবং বা’রা বা শিরক থেকে মুক্ত থাকবার শিক্ষা দেয় এবং ঈমানের পরীক্ষার পর ঐশী হস্তক্ষেপসহ আরও অনেক ব্যাপারে আমাদের ওয়াকিবহাল করে।

    যাই হোক, (সত্যের পথে) দৃঢ়তা প্রদর্শনের বিষয়ে আমাদের পূর্ববর্তী নবীগণদের জীবনচরিত অনুসরণ করা উচিত। বিধানের ক্ষেত্রে তাদের অনুসরণ করা যাবে না। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রত্যেক নবীকে পৃথক পৃথক ব্যবস্থা দিয়ে পাঠিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “প্রত্যেকের (নবীগণ) জন্য, আমি শারী’আহ্ ও মিনহায (পদ্ধতি) নির্ধারণ করে দিয়েছি।”
    (সূরা আল মায়েদা: ৪৮)

    এর কারণ হলো অন্যান্য নবীদের কেবলমাত্র তার লোকদের জন্য এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য প্রেরণ করা হয়েছে। তাঁর বাণীই চূড়ান্ত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের তাদের নিজস্ব ধর্মকে পরিত্যাগ করে এ ধর্মকে অনুসরণ করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ্’র নিকট মনোনীত দ্বীন একমাত্র ইসলাম।”
    [সূরা আল-ইমরান: ১৯]

    এবং তিনি বলেন,

    “এবং যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যাতীত অন্য কোন দ্বীনের তালাশ করে কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থ।”
    [সূরা আল-ইমরান: ৮৫]

    “আমি আপনার প্রতি (হে মুহাম্মদ) সত্যসহকারে এই কিতাব (কুর’আন) নাযিল করেছি যা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণকারী।”
    [সূরা মায়িদাহ্: ৪৮]

    এছাড়া সাইয়্যিদুনা মুহম্মদ (সা) এর উপর নাযিলকৃত বাণীর প্রকৃতি ভিন্ন ছিল, কেননা তা ছিল চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ। ইসলামী রাষ্ট্র এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং শারী’আহ্ রক্ষা, প্রয়োগ ও প্রসারের জন্য পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। অন্যান্য নবীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে তাদের দাওয়াহ্ অন্যদের বাদ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এর অর্থ হলো তাদের দাওয়াহ্ একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এটা ইসলামের মত নয় যার হুকুম সব সময় ও অঞ্চলের জন্য উপযোগী। এই পার্থক্য ইসলাম ও অন্যান্য ব্যবস্থার মধ্যে সাদৃশ্য অনুসন্ধান করার ক্ষেত্রে অন্তরায়। এটা মুসলিমদের কেবলমাত্র ইসলাম থেকে সমাধান নিতে বাধ্য করে, কারণ এর হুকুমসমূহের সাথে এর প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সম্পর্ক রয়েছে। এ ব্যাপারে সাইয়্যিদুনা ঈসা (আ) এর উদাহরণ দেখা যেতে পারে। তা ছিল সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা)-এর ব্যবস্থা হতে আলাদা। কেননা সেটা ছিল কেবল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বাণী সম্বলিত যেখানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কোন আহ্বান অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এছাড়াও এটা ছিল কেবল বণী ইসরাঈলের জন্য সুনির্দিষ্ট। তাহলে কীভাবে শারী’আহ্ হুকুমসমূহ তুলনীয় হবে?

    এটা দুঃখজনক যে দ্বীনের সুস্পষ্ট বিষয়সমূহকে নিয়ে আমাদের কথা বলতে হচ্ছে। এতে বোঝা যায় বর্তমানে দাওয়াহ্’র স্তর কতটা অধঃপতিত হয়েছে। আমরা পবিত্র কুর’আনে সাইয়্যিদুনা মুহাম্মদ (সা)-কে যা বলা হয়েছে তা বলতে পারি:

    “বলুন: ‘এটাই আমার পথ; আমি পরিপূর্ণ জ্ঞান অনুসারে আল্লাহ্’র দিকে মানুষকে আহ্বান করি, আমি এবং আমার অনুসারীগণ…।”
    [সূরা ইউসুফ: ১০৮]

    “(মিশরের) রাজার আইন অনুযায়ী সে তাঁর ভাইকে রেখে (দাসত্বে) দিতে পারত না, তবে আল্লাহ্ চাইলে ভিন্ন কথা।”
    [সূরা ইউসুফ: ৭৬]

    “(ইউসুফ) বললেন: আমাকে দেশের কোষাগারের দায়িত্বে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান।”
    [সূরা ইউসুফ: ৫৫]

    “আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলকেই প্রেরণ করেছি, তাকে এ আদেশই প্রেরণ করেছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন উপাস্য নেই। সুতরাং আমারই এবাদত কর।”
    [সূরা আম্বিয়া: ২৫]

    “আপনার পূর্ববর্তী অনেক পয়গম্বরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তারা ধৈয্য ধারণ করেছেন। তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছানো পর্যন্ত তারা নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ্’র বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। আপনার কাছে পয়গম্বরদের কিছু কাহিনী এসে পৌঁছেছে।”
    [সূরা আল আনআম: ৩৪]

    “বস্তুত আমি একমাত্র এই উদ্দেশ্যেই রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহ্’র নির্দেশানুযায়ী তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়।”
    [সূরা আন-নিসা: ৬৪]

    “আপনি তাদের কাছে সে জনপদের অধিবাসীদের দৃষ্টান্ত বর্ণনা করুন, যখন সেখানে রাসূলগণ আগমন করেছিলেন।”
    [সূরা ইয়াসীন: ৩০]

    “কাফেররা পয়গম্বরগণদের বলেছিল: ‘আমরা তোমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মে ফিরে আসবে।’ তখন তাদের কাছে তাদের প্রতিপালক ওহী প্রেরণ করলেন যে, ‘আমি যালিমদের অবশ্যই ধ্বংস করব। তাদের পর তোমাদেরকে ভূখন্ডে প্রতিষ্ঠিত করব। এটা ঐ ব্যক্তির জন্য, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।”
    [সূরা ইবরাহীম: ১৩-১৪]

    “এমনকি যখন পয়গম্বরগণ নৈরাশ্যে পতিত হয়ে যেতেন, এমনকি এরূপ ধারণা করতে শুরু করতেন যে, তাদের অনুমান ভুল হয়েছিল, তখন তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে। অতঃপর আমি যাদের চেয়েছি তারা উদ্ধার পেয়েছে। আর নাফরমান জাতির উপর থেকে আমার আযাব কখনোই রোধ হবে না।”
    [সূরা ইউসুফ: ১১০]

  • ১২তম অধ্যায়: কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ

    দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বান্দার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ পূর্ণ করেছেন।

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “এবং সত্য ও ইনসাফ (এর আলোকে) আপনার ররের কথাগুলো পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। তাঁর কথা পরিবর্তন করার কেউ নেই। এবং তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
    (সূরা আল আনআম: ১১৫)

    নিশ্চয়ই দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করা বান্দার প্রতি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র একটি বিশেষ রহমত। কুর’আনকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সুরক্ষিত করেছেন এবং পরিবর্তন ও রদবদল হতে নিরাপদ রেখেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “নিশ্চয়ই সন্দেহাতীতভাবে আমি কুর’আন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি তা সংরক্ষন করবো।”
    [সূরা হিজর: ৯]

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) একে সংরক্ষণ করেছেন যাতে তা কেয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য প্রমাণ হয়ে থাকে।

    যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা) পৃথিবীতে নাযিলকৃত সর্বশেষ আসমানী ওহী গ্রহণ করেছেন সেহেতু তাঁর পর আল্লাহ্’র নির্দেশ মোতাবেক কুর’আন এবং সুন্নাহ্’কে দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধরে নবুয়্যতের দায়িত্ব সর্বোত্তম পন্থায় পালন করতে মুসলিমরা বাধ্য। আর তা করলে তখন আমরা দাবি করতে পারবো যে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণের প্রদর্শিত পথের উপর রয়েছি। যার স্বপক্ষে অসংখ্য দলিল আছে।

    মানুষের চিন্তা ও সহজাত প্রবৃত্তি (ফিতরাহ্) সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সত্য এই দ্বীনের দাওয়াহ্ বহন করতে গিয়ে মুসলিমদের যেহেতু অন্যান্য জাতির সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল সেহেতু অন্যান্য জাতিগুলো পাল্টাপাল্টি কিংবা আত্মরক্ষার খাতিরে তাদের বিশ্বাসকে মুসলিমদের সামনে উপস্থাপন করেছিল। না বুঝে কখনও কখনও কিছু মুসলিম এসব চিন্তাসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের চিন্তা ও দাওয়াহ্’তে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যদিও তার ঠিক পরই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃর্ক মনোনিত দ্বীনের মিনার এবং পথিকৃত সম্মানিত আলেমগণ মুসলিমদের সতর্ক করা শুরু করেন। সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং তারা দ্বীনকে কুফরের সংমিশ্রণের হতে মুক্ত করতে সক্ষম হন। তারা জাল দলিলসমুহকে রুখে দিয়ে প্রতারণামূলক কর্মকান্ডকে ব্যর্থ করে দেন। ফলে দ্বীন তার ঔজ্জ্বল্যতা ফিরে পায়। বর্তমান ক্ষতিকর পরিস্থিতি পূর্বে এভাবেই কখনো ভালো কখনো খারাপ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সুতরাং  এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

    প্রাথমিক স্বর্ণযুগে ইসলামকে ফিরিয়ে আনতে তৎকালীন ভালো অবস্থার পেছনে কারণগুলো অনুসন্ধান করা এখন সময়ের দাবি।

    ইসলামকে সকল সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে, ইসলাম বহির্ভূত যেকোনো চিন্তা সংযোজনের প্রতারণামূলক অপচেষ্টাকে ব্যর্থ করতে হলে প্রথমেই আমাদের উত্তরাধীকার সূত্রে প্রাপ্ত পশ্চিমা দুষিত মানসিকতা হতে মুক্ত হতে হবে। যে মানসিকতা লাভ-ক্ষতি আর খেয়াল-খুশিকে দাওয়াহ্ পরিচালনার মাপকাঠিতে পরিণত করে ফলে আমরা এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বিষয়কে গ্রহণ এবং অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয়কে বর্জন করছি। তারপর এই দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে শারী’আহ্ দলীলের ব্যাখ্যা দিচ্ছি। এবং শেষে এর যথার্থতা সমর্থনে বিভিন্ন দলীল পেশ করছি। হুকুম শুধুমাত্র একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এটাই সঠিক ইসলামী মানসিকতা। সুতরাং নিজের পছন্দ-অপছন্দ এবং ইচ্ছানুযায়ী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বিধানকে অনুধাবনের চেষ্টা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের খেয়ালখুশির প্রাধান্যও গ্রহণযোগ্য নয়। শত্রুর ভয়, গণবিচ্ছিন্নতা, শাসকগোষ্ঠীর ইসলামবিরোধী অবস্থান এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও পরিস্থিতির ভয়ে ভীত হওয়াটা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়। ঠিক তেমনি অবস্থার দোহাই দিয়ে দাওয়াহ্ বহনকারীর দায়িত্বকে হালকা করাটাও গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সব জানেন এবং সব বিষয়ের খবর রাখেন। তিনি মানুষের প্রকৃতি, প্রয়োজন, সামর্থ্য, বাস্তব জীবন, শত্রু ও শত্রুকে মোকাবেলা এবং তদুপরী সকল বিষয়ে সম্যক অবগত।

    আমরা ইতিমধ্যে বর্ণনা করেছি যে ইজতিহাদের সঠিক পদ্ধতি হচ্ছে প্রথমে সমস্যার বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করা। তারপর শারী’আহ্ দলীলের নির্দেশনা অনুযায়ী উক্ত সমস্যাটির সমাধান বের করা। আর এই প্রক্রিয়ায় বর্তমান বাস্তবতায় যেকোনো সমস্যা সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হুকুমসমুহ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। অন্যভাবে বললে এ প্রক্রিয়ায় অগ্রসর হলে আমরা বলতে সক্ষম হবো বিদ্যমান কোন সমস্যার প্রতি শারী’আহ্’র হুকুম কি, পাশাপাশি এই হুকুম পালনের পথে প্রতিবন্ধক পারিপার্শ্বিক অবস্থা, পরিস্থিতি, বাঁধা-বিপত্তি এবং এই হুকুম হতে ঈস্পিত স্বার্থ অর্জন ইত্যাদির ব্যাপারে শারী’আহ্ দৃষ্টিভঙ্গী। এ বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়ো না, এবং আল্লাহ্’কে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছু শোনেন ও জানেন।”
    (সূরা আল-হুজুরাত: ১)

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,

    “আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত আসার পর তাতে ভিন্নতা পোষণ করা মু’মিন পুরুষ কিংবা নারী কারও ক্ষেত্রেই সঙ্গত নয়। এবং যে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়।”
    (সূরা আল আহযাব: ৩৬)

    ভিন্ন এই দুই মানসিকতাই মুলতঃ বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে আল্লাহ্’র হুকুম বোঝার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য তৈরি করে।

    পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত মানসিকতা পরিস্থিতি-পারিপার্শ্বিক অবস্থা, লাভ-ক্ষতির আশংকা ইত্যাদি ভিত্তিহীন মিথ্যা অজুহাতে শারী’আহ্’র অকাট্য অনেক দলিলকে পরিত্যাগ এবং প্রত্যাখ্যান করেছে। ঊদাহরণস্বরূপ সুদকে সুস্পষ্ট হারাম ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর কারণ বা ব্যাখ্যা খোঁজার কোনো অবকাশ নাই; অথচ বাস্তবতা, পরিস্থিতি, লাভ-ক্ষতির হিসাব কিংবা পারিপার্শ্বিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তারা সুদের লেনদেনকে বৈধতা দানে ভিন্ন হুকুম নিয়ে হাজির হয়েছে।

    এ ধরনের মানসিকতার উপর কিছু দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং তারা এমন কিছু হুকুম নিয়ে এসেছে যা শারী’আহ্ অনুমোদিত নয় বরং চরম সাংঘর্ষিক। এই কারণে পুরোপুরি বিপরীতধর্মী হওয়া সত্ত্বেও তারা দাবি করে গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে যা আমরা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। তারা আরও দাবি করে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা শারী’আহ্ অনুমোদিত এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনকারী দলসমূহের জন্য এটাই একমাত্র অবশিষ্ট পথ। যদিও তা পবিত্র কুর’আনের আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুন্নাহ্’র সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

    যখন আমরা ধাপে ধাপে ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন বা এর আহ্বান নিয়ে আলোচনা করছি তখন মুলত আমরা একই সাথে তা সংশ্লিষ্ট চিন্তাগুলোর অসাড়তা ও দুষণ নিয়েও আলোচনা করছি, যেমন: কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ। এ বিষয় নিয়ে বিদ্যমান সন্দেহ নিরসন এবং এসব কুফর চিন্তাসমুহ প্রচার করার পক্ষে যাতে কোনো অজুহাত অবশিষ্ট না থাকে সে লক্ষ্যে এখন আমরা এই উল্লেখিত বিষয়টির উপর আলোকপাত করবো।

    আমরা আরও জানি এসব দলগুলো কতৃর্ক ধারণকৃত পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত দুষিত কুফর মানসিকতা যদি পরিশোধিত না হয় তাহলে আমাদের এসব উপদেশ কোনও কাজেই আসবে না। যেমন যদি আমরা তাদেরকে বুঝাতে সক্ষমও হই যে ক্ষমতা ভাগাভাগি একটি কুফর দুষিত চিন্তা কিন্তু তাদের যদি মানসিকতা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে তখন তারা এই চিন্তার বিকল্প খুঁজতে একই মানসিকতাকে প্রয়োগ করবে। সুতরাং আমাদের এমন মানসিকতার ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে যা শারী’আহ্ অনুমোদিত নয়। পথভ্রষ্ট চিন্তাগুলোর জন্ম লাভে এ ধরনের মানসিকতাগুলো উর্বর ভুমি হিসেবে কাজ করে।

    বর্তমান সময়ে ক্ষমতার ভাগাভাগি বলতে কি বুঝায় এবং এর যথার্থতার প্রতি এর পক্ষালম্বনকারীরা কি যুক্তি উপস্থাপন করে?

    ক্ষমতা ভাগাভাগি বলতে তারা বুঝায় এমন এক শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা যার ভিত্তি ইসলাম নয় এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা। আর তাই নিজেদের ও নিজেদের মতামতকে ক্ষমতার স্বাদ দিতে তারা গণতান্ত্রিক খেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে পার্লামেন্টে প্রবেশ করে এবং কল্পনা করে এভাবে কোনও এক সময়ে তারা সম্পূর্ণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে। যা হবে ক্রমাণ্বয়ে বা ধাপে ধাপে এবং তাদের মতে ইসলাম একে অনুমোদন দেয়। 

    তাদের মতে ক্ষমতা ভাগাভাগির যৌক্তিকতা শারী’আহ্ ও বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি দ্বারা অনুমোদিত। তাদের পক্ষ থেকে বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোন থেকে প্রদত্ত যুক্তি :

    — বর্তমান যুগে ইসলামকে ঐতিহাসিক রূপে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। কারণ ইসলামী বিশ্বের সব অঞ্চল এখন বিস্ময়কর বস্তুগত ও অবস্তুগত (সম্মান, প্রভাব ইত্যাদি) ক্ষমতার অধিকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ন্ত্রিত। ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনসমূহকে তারা পর্যবেক্ষণ করছে এবং তাদেরকে সীমাবদ্ধ গণ্ডীর মধ্যে রাখতে ও তাদের সাফল্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টির প্রয়াস চালাচ্ছে। আর এই কারণে তাদের মতে অতীতের সাথে বর্তমানের সাদৃশ্যতা অনুসন্ধান করা বাস্তবসম্মত নয়।

    — অতীতে সব মুসলিমদের সম্পৃক্ততায় ইসলামী দাওয়াহ্ সংগঠিত হতো অথচ বর্তমানে গুটি কয়েক গোষ্ঠীকে এই আন্দোলনে পাওয়া যাচ্ছে। আর অধিকাংশ মুসলিম এই নেতৃত্বের আওতার বাইরে থাকায় জাহেল সরকারগুলো এর নানামুখী সুবিধা লুটে নিচ্ছে এবং যা আন্দোলনকে কঠিন পরিস্থিতিতে পতিত করেছে। এজন্য আধুনিক ইসলামী আন্দোলনগুলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুসরণ করছে।

    প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। যার মধ্যে রয়েছে গণতান্ত্রিক খেলা অথবা সেনা অভ্যূত্থান অথবা সশস্ত্র গণবিপ্লব।

    যেহেতু আধুনিক ইসলামী আন্দোলনগুলোর জন্য সেনা অভ্যূত্থানের লক্ষ্যে নিজ দেশের সেনাবাহিনীর ভেতর সমর্থন তৈরির সকল দরজা বন্ধ এবং চারিদিকে স্বৈরাচারী শাসকের কারণে গণবিপ্লবের দরজাও বন্ধ, তাই এখন তাদের জন্য একটি পথটিই অবশিষ্ট আছে যে পথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো কাজ করছে। যা তাদের অনৈসলামী শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দিকে ধাবিত করে।

    তারা আরও যোগ করে: ইসলামী আন্দোলনগুলো যে মহান আদর্শকে সামনে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা অর্জন করতে হলে এর সাথে সাংঘর্ষিক পার্শ্বিক বিষয়গুলোকে এখন আমাদের পাশ কাটাতে হবে। কারণ জুজ’ঈ বা আংশিক বিষয়ের সাথে যদি কু’ল্লী বা সামগ্রিক বিষয়ের দ্বন্দ্ব হয় তাহলে কু’ল্লীকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইসলামী শারী’আহ্’র বাস্তবতা এবং এর উদার দৃষ্টিভঙ্গী ঊপলদ্ধি করা সম্ভব হবে না যদি আংশিক বিষয়ের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে মূল লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়। একইভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও মুসলিমদের সব সময় কঠিন এবং কেবলমাত্র একটি পথেই সীমাবদ্ধ থাকা ঠিক নয়। যদি প্রথম রাস্তাটি প্রয়োগ করা সম্ভব না হয় তখন দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ইত্যাদি রাস্তাগুলো প্রয়োগ করা যায়। এমনকি কোন এক পর্যায়ে চারটি পথেই একসঙ্গে কাজ করা যায় যতক্ষন না উত্তম পথটি বের হয়ে আসে।

    উল্লেখিত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তির উপর আলোচনা

    শারী’আহ্ হুকুম থেকে বিচ্যুততে উপস্থাপিত বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি থেকে তাদের ইসলামী শিক্ষার অজ্ঞতা পরিষ্কার প্রতীয়মান যদিও তারা মুখে উসূল ও শারী’আহ্’র কথা বলে। শারী’আহ্ হুকুম বের করা কিংবা এমনকি শুধুমাত্র শারী’আহ্ হুকুম জানার প্রক্রিয়া কি সে সম্পর্কেও তাদের নূন্যতম ইসলামী জ্ঞান নেই। তারা পদ্ধতি (Method) ও ধরণ (Style) আলাদা করতে পারে না। ‘শারী’আহ্ নমনীয়’ এই চিন্তার প্রভাব এবং যুগের সাথে তাল মেলানোর অজুহাত তাদেরকে শারী’আহ্ হুকুম এবং শারী’আহ্ হুকুমকে শারী’আহ্ বহিভূর্ত হুকুম দ্বারা পরিবর্তনের প্রতি বার বার প্রেরণা যোগায়।

    যুগের সাথে অনেক কিছু পাল্টে গেছে এই অজুহাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি ও শারী’আহ্ পরিত্যাগ করার অজুহাতটি মোটেও গ্রহণযোগ্য ও সঠিক নয় বরং এতে সমাজের বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতাই পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠে। কেননা সমাজের বাস্তবতা অনুধাবনে এর মৌলিক উপাদনসমূহ গুরুত্বপূর্ণ, এর পরিবর্তনশীল ঊপাদান নয়। গোত্রতান্ত্রিক, সরল অথবা জটিল রাষ্ট্রকাঠামো, গণতান্ত্রিক অথবা একনায়কতান্ত্রিক বিভিন্ন সমাজের বিভিন্ন রূপ থাকতে পারে কিন্তু প্রত্যেকটি সমাজের গঠনের মৌলিক উপাদান (জনগণ, চিন্তা, আবেগ এবং ব্যবস্থা) একই। সে কারণে মৌলিক উপাদানগুলোকেই বিবেচনা করতে হবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির কোন প্রয়োজন নাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সমাজের ভ্রান্ত চিন্তা, ভ্রান্ত ধারণা এবং ভ্রান্ত রীতিনীতি ও ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করে সমাজ পরিবর্তন করা শারী’আহ্ হুকুম। সুতরাং এটি একটি প্রতিষ্ঠিত কাজ। মুলত চিন্তার পার্থক্যই সমাজের পার্থক্য; কোথাও দেশপ্রেম বা সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের উপর তৈরি সমাজ অথবা কোথাও আদর্শিক পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে তৈরি সমাজ। এটা সর্বজনবিদিত যে আদর্শিক চিন্তা অন্য সব চিন্তার চেয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং একে ছুঁড়ে ফেলা কঠিন কাজ। আর তাই সমাজভেদে চিন্তার পার্থক্যের কারণে কোথাও পরিবর্তনের কাজ সহজ কোথাও কঠিন কিন্তু পদ্ধতি একই এবং অপরিবর্তনীয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সময়ের গোত্রতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা এবং আমাদের বর্তমান সরল বা জটিল রাষ্ট্রব্যবস্থার পার্থক্য হয়তো আমাদের সমাজ পরিবর্তনের কাজকে সহজ কিংবা কঠিনতর করবে কিন্তু পদ্ধতির নিয়মে কোন পরিবর্তন আসবে না। প্রতিটি রাষ্ট্রকেই তার নিরাপত্তা ও অবস্থান সুসংহতকরণে সেনাবাহিনী হোক কিংবা অনুরূপ কোন গোষ্ঠী হোক কারও না কারও উপর নির্ভর করতেই হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ ধরণের গোষ্ঠীর নিকট নুসরাহ্ চেয়েছিলেন। তিনি (সা) যখন একটি নতুন সমাজ গঠনের কাজ শুরু করেন তখন তিনি (সা) সমাজের মৌলিক উপাদানের উপর মনোনিবেশ করেন। তিনি (সা) দৃঢ় ঈমানসম্পন্ন দাওয়াহ্ বহন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পরিচালনায় সক্ষম (মুহাজিরীন) একটি গোষ্ঠিকে প্রস্তুত করেন এবং দাওয়াহ্ ও দাওয়াহ্ বহনকারীদের গ্রহণকারী এবং রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম ক্ষমতার অধিকারী (আনসার) একটি জনপ্রিয় ভিত্তি (Popular Base) তৈরি করেন। তাই নুসরাহ্ অনুসন্ধান করা ক্ষমতায় যাওয়ার পদ্ধতি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) নুসরাহ্ অনুসন্ধানের সময় অনেক প্রতিকূলতা, সংকটের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও এ পদ্ধতির উপর অটল ছিলেন। যারা মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাজের পদ্ধতিকে নিরীক্ষা করেছে তারা দেখবে যে তিনি (সা) পরিবর্তনের জন্য সমাজের ভিত্তিগুলো নিয়ে কাজ করেছেন। স্থান, কাল এবং অঞ্চলভেদেও তার পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়নি। কারণ অঞ্চল বা সমাজভেদে পার্থক্য মানে কাঠামোর পার্থক্য মৌলিক উপাদানের নয়। এ পার্থক্য কাজকে সহজ বা কঠিন করে মাত্র।

    শারী’আহ্’র নমনীয় এ ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে নমনীয়তার অজুহাতে শারী’আহ্’কে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শারী’আহ্’কে সম্পূর্ণ করেছেন। মানব জীবনের নতুন-পুরাতন সকল সমস্যার সমাধান এতে রয়েছে। তবে সমাধানগুলো হুকুম একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এই ভিত্তি থেকে উৎসারিত নিয়মতান্ত্রিক কিছু উসূল (মূলনীতি)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।

    শারী’আহ্ অনেক বিস্তৃত, এ দৃষ্টিভঙ্গীর দোহাই দিয়ে আল্লাহ্’র বাণীকে পরিত্যাগ করা কিংবা শারী’আহ্ বহির্ভূত বিষয়বস্তুর প্রবেশ করানোর চেষ্টা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে শারী’আহ্’র কিছু বিষয়কে পরিত্যাগ করেছেন। তাদের মতে যেহেতু শারী’আহ্’র শাস্তির উদ্দেশ্যই হলো অপরাধকে নিরুৎসাহিত করা সেহেতু যা কিছু অপরাধকে নিরুৎসাহিত করে তাই শারী’আহ্’তে গ্রহণযোগ্য। যেহেতু শারী’আহ্’র শাস্তিসমূহ যুগের সাথে মানানসই হচ্ছে না, এবং মানুষ চিন্তা-চেতনা দিয়ে তা প্রত্যাখান করেছে সেহেতু আমরা একই উদ্দেশ্য অর্জিত হয় এমন শারী’আহ্ বহির্ভূত শাস্তিকেও গ্রহণ করতে পারি। আর শারীআ’হ্ নমনীয় ও বিবর্তনযোগ্য বলেই এটা সম্ভব।

    তারা আরও বলে যেহেতু জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ইসলাম প্রচারের জন্য এবং জিহাদ ছাড়াও অন্য অনেক উপায় যেমন: রেডিও, টেলিভিশন, অন্যান্য প্রচারমাধ্যমসহ আধুনিক সভ্যতার অনেক উপকরণের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার সম্ভব, সেহেতু এসব আধুনিক মাধ্যমকে জিহাদের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। শারীআ’হ্ যদি নমনীয় ও বিবর্তনযোগ্য না হতো তাহলে আমরা এরূপ করতে পারতাম না।

    ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতির ক্ষেত্রে তারা মনে করে, যে পদ্ধতি ব্যবহার করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে, সেটাই অনুসরণ করা উচিত। কেবল একটি পথে পড়ে থাকা এবং এর বাইরে না যাওয়াটা অপরিহার্য নয়। তাদের মতে অনমনীয় ও দৃঢ় মনোভাব ইসলামের উদার, নমনীয় ও বিবর্তনশীল প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এতে কঠোরতা রাখেননি।

    সুতরাং এরূপ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ‘শারী’আহ্’কে নমনীয়’ বলা হারাম। কারণ এটা দ্বীনের হুকুমসমূহকে বাতিল করে দেয় এবং এটা ইসলামের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। বরং এটি পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত এবং তাদের চিন্তার অনুকরণ।

    আর সামগ্রিক বিষয়ের সাথে আংশিক বিষয়ের দ্বন্দ্বে সামগ্রিককে গুরুত্ব দিতে হবে; তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীটিও ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কারণ আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে উসূলী চিন্তাবিদদের সামঞ্জস্যতা আছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে উসূলী চিন্তাবিদগণ যে অর্থে এই মুলনীতিকে ব্যবহার করেন তারা তা করে না। তাদের চিন্তা ও কর্মের মাপকাঠির বেহাল দশার এটি আরেকটি নমূনা। তাই সমস্ত শারী’আহ্’কে নমনীয় আখ্যা দিতে কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে শারী’আহ্’র উদারতা ও নমনীয়তাকে উদাহরণ হিসেবে হাজির করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

    এ বিষয়ে সবশেষে বলা দরকার শারী’আহ্’র হুকুম বুঝবার ক্ষেত্রে যুক্তি প্রয়োগের কোন সুযোগই ইসলামে নেই। উসুলী চিন্তাবিদগণের বর্ণনা মতে বাস্তবতা থেকে হুকুমের মানাত (Object) পাওয়া যায়, ফরজ বা হারামের নির্দেশনা নয়। তাই বাস্তবতাকে এর মত করেই বুঝতে হবে। তারপর শারী’আহ্ দলিলের আলোকে হুকুম বের করতে হবে। সুতরাং নীতিগতভাবে যৌক্তিক বিবেচনা মূল্যহীন।

    আর ক্ষমতার ভাগাভাগিতে শারী’আহ্’র যৌক্তিকতার বিষয়ে শারী’আহ্ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র দ্বীন ব্যতীত অন্যকোনও দ্বীন দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণকে স্পষ্ট নিষেধ করেছে। এর বেশকিছু কারণ রয়েছে।

    — আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিধান দ্বারা যারা শাসনকার্য পরিচালনা না করাকে সুস্পষ্টভাবে কুফর (অবিশ্বাসী), যুলুম (অবিচার) এবং ফিসক (পাপাচারী) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই কাফের।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই জালিম।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৫)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “এবং যারা আমার প্রদত্ত বিধান দ্বারা শাসনকার্য পরিচালনা করে না তারাই ফাসেক।”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৪৭)

    — হাকিমিয়্যাহ বা সার্বভৌমত্ব একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “হুকুম একমাত্র আল্লাহ্’র। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা শুধুমাত্র তারই ইবাদত করবে।”
    (সূরা ইউসুফ: ৪০)

    — এছাড়া আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র শারী’আহ্ বাদ দিয়ে অন্যকোনও আইন বা বিধানের শরণাপন্ন হওয়াকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং একে ঈমান বিরোধী কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার (মুহাম্মদ (সা)) উপর ন্যস্ত না করে।”
    (সূরা আন নিসা: ৬৫)

    — আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছুর শরণাপন্ন হওয়ায় তিনি মুনাফেকদের সমালোচনা করেছেন :

    “আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার প্রতি অবতীর্র্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে সেই সব বিষয়ের উপর তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তারা (বিরোধপূর্ণ বিষয়ের) মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায়, অথচ তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
    (সূরা নিসা: ৬০)

    — আল্লাহ্’র আইনের উপর অন্য কারও আইনকে প্রাধান্য দেয়া যাবে না। যে তা করলো সে মূলত আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হুকুমের উপর জাহেলিয়াতকে প্রাধান্য দিল।

    “তারা কি জাহেলিয়াত আমলের ফয়সালা কামনা করে? আল্লাহ্ অপেক্ষা বিশ্বাসীদের জন্যে উত্তম ফয়সালাকারী কে?”
    (সূরা মায়িদাহ্: ৫০)

    মূলত এটাই হুকুম। কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে মন্ত্রীসভায় অংশগ্রহণ করা নিম্নোক্ত দলিলের কারণে মৌলিক হুকুমের একটি ব্যতিক্রম।

    ১. (সমকালীন) শাসনব্যবস্থায় ইউসুফ (আ:) এর অংশগ্রহণ

    ২. আন-নাজ্জাশীর অবস্থা

    ৩. আল-মাসলাহা (জনস্বার্থ)

  • গণতন্ত্র, শূ’রা নয়

    নিজেদেরকে জ্ঞানী বলে দাবিকারী কিছু লোক যখন বলে, ইসলামের শুরু গণতন্ত্র দিয়ে আর শেষ একনায়কতন্ত্র দিয়ে, তখন তা শুনে একজন হাসবে না কাঁদবে তা ঠিক করতে পারে না। তারা প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিম্নোক্ত আয়াতটি উল্লেখ করে:

    “কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ভরসা করুন।”
    (সূরা আলি ইমরান: ১৫৯)

    আমাদের আলোচনার সাথে সম্পর্কযুক্ত একটি চিন্তা নিয়ে এখনও আলোকপাত করা বাকী রয়েছে, আর তা হলো কিছু লোকের দৃষ্টিতে গণতন্ত্র ইসলাম দ্বারা অনুমোদিত যেহেতু কুর’আন ও সুন্নাহ্’তে শূ’রার বিষয়টি পরোক্ষভাবে এসেছে। তারা বলে গণতন্ত্র শূ’রা ছাড়া আর কিছুই নয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জনগণের মতামতের উপর এবং ইসলামও আমাদেরকে জনগণের মতামত নিতে বলেছে। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন,

    “কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন।”
    (সূরা আলি ইমরান: ১৫৯)

    এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেছেন,

    “এবং যারা পার¯পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে।”
    [সূরা আশ শূরা: ৩৮]

    এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিভিন্ন বাস্তবিক, রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ে প্রতিনিয়ত তাঁর সাহাবীদের সাথে আলোচনা করেছেন এবং তাদের মতামত গ্রহণ করেছন। যেহেতু এটা পবিত্র কুর’আনের নির্দেশনা ও রাসূলুল্লাহ (সা) তা অনুসরণ করেছেন সেহেতু মুসলিমদের এটা অনুসরণ করা উচিত। তারা আরও বলে শূ’রা এবং গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য হল শব্দার্থগত। অর্থ এক হলে ভিন্ন নাম কোন সমস্যা না।

    আমরা জানি বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর লোকজন গণতন্ত্রের আহ্বান জানাচ্ছে। এদের মধ্যে একটি অংশ হচ্ছে জেনে বুঝে প্রতারণাকারী আর আরেকটি নিষ্ঠাবান অংশ কিন্তু অজ্ঞ কারণ তারা না বুঝে গণতন্ত্রের আহ্বান করছে। এসব নিষ্ঠাবান আন্তরিক গোষ্ঠীকে অবশ্যই এসব চিন্তাগুলো থেকে দুরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে নতুবা তাদের উদাহরণ হবে ঐ ব্যক্তির মতো যে অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহ্’র ইবাদত করে কিন্তু গুনাহ্’র ভাগীদার হয়। অনুতপ্ত হওয়া, নিয়ন্ত্রন বজায় রাখা এবং (বিশ্বাসের) প্রতিফলন ঘটানো, এগুলো নিষ্ঠাবান ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য।

    এ ধরণের লোকেরা এক সময় বলেছিল সমাজতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে এবং মুহম্মদ (সা) তাদের ইমাম। তাহলে সেই দূর্গন্ধময় সমাজতন্ত্র যখন এখন বিলুপ্ত হয়ে গেলো, এখন তাদের উত্তর কী? একইভাবে গণতন্ত্র আজ যখন মৃত্যুর শেষযন্ত্রনায় কাঁতড়াচ্ছে তখন এর আহ্বানকারীদের আর কী আশা আছে? এ ধরণের চিন্তা ইসলাম নয় গণতন্ত্রের কল্যাণের জন্য। তারা এর প্রতারণা উন্মোচনের বদলে একে সর্বোচ্চ চিন্তা হিসেবে গ্রহণ করেছে। পায়ের নীচে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলার বদলে একে জনগণের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীকে সর্বোচ্চ আসনে স্থান দিয়ে এবং শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির আলোকে জীবন ব্যবস্থাকে রূপদান করলেই কেবল এটা সুস্পষ্ট হবে যে আমরা তাঁর হুকুমকে সঠিকভাবে অনুবাধন করেছি। এটা এমন একটি দলের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব যারা সঠিক জ্ঞান দ্বারা পরিচালিত এবং প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যের ব্যাপারে সচেতন, এবং বিশ্বাসের দিক থেকে আলোকিত, শারী’আহ্ হুকুমের ব্যাপারে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এবং সকল ভিন্ন প্রকৃতির চিন্তা-চেতনা ও বিজাতীয় ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ বর্জনকারী। এরা বাস্তবতার কাছে কখনও মাথানত করে না এবং পরিস্থিতির প্রভাবমুক্ত থাকে। 

  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ পশ্চিমা সভ্যতার ফলাফল নয়

    এরকম ধারণা বিরাজমান রয়েছে যে পশ্চিমাদের বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন গণতন্ত্রের বাস্তবায়নের ফসল। অথচ এর পক্ষালম্বনকারীরা বাস্তব চিত্র সম্পর্কে অজ্ঞ। এর কারণ বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রাপ্ত আবিষ্কারসমূহ কোন দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সংযুক্ত নয় বরং এটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত মানুষের চিন্তাশক্তি দ্বারা কোনকিছু অর্জনের ক্ষমতা। যে কোনো পুঁজিবাদী, সমাজতান্ত্রিক বা মুসলিম ব্যক্তি যে তার মনকে মুক্তভাবে চলতে দেয় সেই এটা অর্জন করতে পারে। কোন ধর্ম বা জীবনব্যবস্থার এক্ষেত্রে কোন প্রভাব নেই, যদি না বিশেষ কোন আদর্শ বিজ্ঞানকে অনুমোদন দেয় ও মানুষের মনের ব্যবহারকে বৈধতা দেয় অথবা এটি পূর্বের গীর্জার মত এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। এটা সর্বজনবিদিত যে, ইসলামী আদর্শ কেবলমাত্র পরীক্ষা করা ও বস্তুসমূহকে সম্পর্কে জানার বিষয়টিকেই অনুমোদন দেয়নি বরং আদর্শের সার্বভৌমত্বের রক্ষায় প্রয়োজনীয় বস্তুগত সামর্থ্য অর্জনকে বাধ্যতামূলক করেছে।

    পশ্চিমারা তাদের মন্দ পণ্য আমাদের কাছে উপস্থাপন করছে, যেমনঃ গণতন্ত্র, যা আমাদের অনুসরণ করতে শারী’আহ্ নিষেধ করেছে। অন্যদিকে অন্য পণ্যসমূহ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, যেমন: বিজ্ঞান ও নতুন আবিষ্কার, যে ব্যাপারে শারী’আহ্’র কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কারণ ক্ষমতা অর্জনের সমস্ত উপকরণকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পশ্চিমাদের কাজ থেকে বুঝা যায় যে, তারা এসব সচেতনভাবেই করছে। অতএব কিছু কিছু ইসলামী  দলের এ ব্যাপারে অন্ধ হওয়াকে কি অনুমোদিত?

    এটা পরিষ্কার যে বলে গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে, সে গণতন্ত্রও বুঝেনি কিংবা ইসলামও বুঝেনি।

  • পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা

    পশ্চিমা সমাজে স্বাধীনতা

    জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের ধারণার বশবর্তী হয়ে পশ্চিমারা নিজেদেরকে আইন তৈরির ক্ষমতা প্রদান করেছে। এটা এই দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে মানুষ অন্যের তোয়াক্কা না করে এমন জীবনযাপন করবে যাতে সে নিজেকে পরিতুষ্ট করতে পারে; যেখানে তার নিজের খেয়ালখুশীর প্রতিফলন ঘটবে কিন্তু অন্যদের নয়। তারা মনে করে মানুষ এরূপ অধিকার ভোগ করতে পারবে না যদি না সে স্বাধীন হয়। আর এটা থেকেই পাওয়া যায় বিশ্বাস, মালিকানা, মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণা। এটা স্বাধীনতার এ ধারণাকে পবিত্র বলে বিবেচনা করে। এই স্বাধীনতার সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অর্থ রয়েছে।

    বিশ্বাসের স্বাধীনতা একজনকে পছন্দসই ধর্ম বেছে নেয়ার সুযোগ করে দেয়। অথবা দৈনন্দিন ব্যাপার হলেও তাকে এক বিশ্বাস থেকে অন্য বিশ্বাসে স্থানান্তরিত হওয়াকে অনুমোদন দেয়। এমনকি এটা তাকে ধর্ম পুরোপুরি পরিত্যাগ করতেও সুযোগ দেয়।

    মালিকানার স্বাধীনতা তাকে যে কোন কিছুর, যে কোনভাবে মালিক হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান করে। এমনকি এটা তাকে তার সম্পত্তি যেভাবে খুশী সেভাবে হস্তান্তর বা পরিত্যক্ত করবার স্বাধীনতা দেয়। যদি এটি সে তার উত্তরাধিকারকে না দিয়ে প্রিয় পোষা কুকুরকে উপহার হিসেবে দিতে চায় তাহলে কেউ তাতে বাঁধা প্রদান করতে পারবে না।

    মত প্রকাশের স্বাধীনতা তাকে খেয়ালখুশী মতো, অবাধে ও নিয়ন্ত্রনহীনভাবে সবকিছু বলবার স্বাধীনতা প্রদান করে, হোক সেটা সত্য বা মিথ্যা। তার উপলদ্ধি এবং খেয়ালখুশীর বিরুদ্ধে যায় এরকম যে কোন মতামতকে সে অবজ্ঞা বা সমালোচনা করতে পারে।

    ব্যক্তিগত স্বাধীনতার কারণে তারা ব্যক্তিগত বিষয়াবলীর ক্ষেত্রে কোন মূল্যবোধ, নৈতিক বাধ্যবাধকতা, আধ্যাত্মিক সীমারেখার দ্বারস্থ হয় না।

    গণতন্ত্রের মৌলিক অপরিহার্যতা স্বাধীনতার এই ধারণা এর পক্ষালম্বনকারীদের এমন এক বোধের দিকে নিয়ে গেছে যা তাদেরকে পশুর চেয়ে অধম করে দিয়েছে।

    বিশ্বাসের স্বাধীনতা পুঁজিবাদী সমাজে ধর্মের উপর বিশ্বাসের গুরুত্বকে হালকা করে দিয়েছে। তাদের পোষাক পরিবর্তনের মতো ধর্ম পরিবর্তনকে সহজতর করে দিয়েছে। বস্তুবাদী চিন্তার প্রসার ও ধমীর্য় চিন্তাকে গন্ডীভূত করে ফেলবার কারণে নৈতিক, মানবিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। একারণে লোকদের হৃদয় থেকে সমবেদনা উঠে গেছে এবং নেকড়ের মত দূর্বলের উপর সবলের আধিপত্য চলছে।

    মত প্রকাশের স্বাধীনতার কারণে তারা ইচ্ছেমতো যা খুশী বলতে পারে এবং যে কোন কিছুর দিকে লোকদের আহ্বান করতে পারে। সে কারণে তাদের সমাজে সব ধরণের অদ্ভুদ, মিথ্যা, খেপাটে ধরণের মতামতের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। যে কোন সাধারণ লোক রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে এবং তাকে বিরত করার কোন আইন নেই। যেমন: সালমান রুশদী, যে বিশ্বাসের স্বাধীনতাকে অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতায় সে আশ্রয় গ্রহণ করেছে।

    মালিকানার স্বাধীনতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো লাভ এবং এটা পুঁজিবাদের মধ্যে ভয়াবহতা তৈরি করেছে ও লোকদের ভবিষ্যত নির্ধারণ করা, তাদের সম্পদ হরণ করা, সম্পদকে ব্যবহার করা এবং লোকদের রক্ত শোষণ করার জন্য উপনিবেশবাদকে পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। একারণে অন্যদের সাথে হারাম উপার্জনের মাধ্যমে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হতে হয়, মুসলিমদের রক্তের বিনিময়ে ব্যবসা করতে হয়, বিভিন্ন স¤প্রদায় ও জাতিসমূহের মধ্যকার যুদ্ধে উস্কানি দিতে হয় যাতে অতি লাভে তাদের নিকট পণ্য ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করা যায়। এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ যে কোন ধরণের আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিবর্জিত। তবে যদি তারা বাধ্য হয় তাহলে ধর্মকে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ, কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত আচরণকে আঁড়াল করার জন্য নৈতিক ও মানবিক বোধের কথা বলে বেড়ায়।

    ব্যক্তিস্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সমাজগুলোকে পশুর সমাজে রূপান্তরিত করেছে। তাদের লাম্পট্য এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, পশুরাও এ অধঃপতিত অবস্থায় কখনও যায়নি। আইনের মাধ্যমে তারা অস্বাভাবিক ও ভ্রান্ত যৌন সম্পর্ককে বৈধতা দিয়েছে। তাদের মধ্যে এমনসব অভ্যাস দেখা যাবে যা চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে দেখা যায় না। তারা দলগত যৌনাচার ও নিকটাত্নীয় এমনকি মায়ের, বোন ও মেয়ের সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। তারা পশুর সাথেও যৌনাচারে লিপ্ত হয়। এ কারণে তাদের এমন রোগ হয়েছে যা আগে কখনওই হয়নি। তাদের সমাজে ভঙ্গুর পরিবার খুব বেশী দেখতে পাওয়া যায় এবং একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সম্মানবোধ হারিয়ে গেছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা মানে সব বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া এবং যে কোন ধরণের মূল্যবোধকে গ্রহণ করা ও পরিবারকে ধ্বংস করবার স্বাধীনতা। এইসব স্বাধীনতার নামে সব ধরণের পাপকাজ করা হয় এবং সব নিষিদ্ধ জিনিষকে বৈধতা দেয়া হয়।

    সেকারণে স্বাধীনতার নামে ব্যভিচার, সমকামীতা, সমকামী স্ত্রীলোক, নগ্নতা এবং অ্যালকোহল, যে কোন ঘৃণ্য ও গর্হিত কাজকে অনুসরণ করা যে কোন ধরণের চাপ বা বাধ্যবাধকতা ছাড়া স্বাধীনভাবে করা হয়।

    এগুলোই হলো গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ প্রভাব। এগুলো হলো মানুষের প্রবৃত্তির ফসল, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং তাঁর ঐশী বাণীর এক্ষেত্রে কোন ভূমিকা নেই। কোন ধর্মেরই এ ব্যাপারে কিছু করার নেই। আমরা যদি গণতন্ত্রের সমর্থক ও চিন্তাবিদদের দিকে লক্ষ্য করি, তাহলে দেখব যে, যা তাদের মনে একে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে এবং যে পরিস্থিতিতে এর উদ্ভব ঘটেছে তা সত্যিকার অর্থেই একটি কুফর ভিত্তির উপর স্থাপিত হয়েছে। আর এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিছু লোকের কথার উপর ভিত্তি করে, যেমন: রাজা ১৫তম লুইসের মতে, ‘আমরা স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছ থেকে মুকুট গ্রহণ করি না।’ এবং রাজা ১৪ তম লুইস বলেন, ‘রাজার কতৃর্ত্ব আসে স্রষ্টার প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। স্রষ্টা হলেন এর একচেটিয়া উৎস এবং জনগণ নয়। স্রষ্টা ছাড়া আর কারও কাছে রাজাগণ তাদের কর্তৃত্বের জন্য জবাবদিহী করেন না।’ বোদ্ধাগণ জ্যাঁ জ্যাক রুশো’র সামাজিক চুক্তির মতবাদকে ‘ফ্রেঞ্চ ধর্মনিরপেক্ষ বিপ্লব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

    সুতরাং উপরে উল্লেখিত সবকিছু থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারি ইসলামের সাথে গণতন্ত্র পুরো মাত্রায় সাংঘর্ষিক। এর উৎস যা থেকে এটি এসেছে, যে বিশ্বাস থেকে এটি উৎসারিত হয়েছে, যে ভিত্তির উপর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যে চিন্তা ও ব্যবস্থা এটিকে নিয়ে এসেছে তা থেকেও বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

    — যে উৎস থেকে এটি এসেছে সেটি হল মানুষ। তার কাজ ও বিভিন্ন বিষয়ে বিবেচনার জন্য, হুস্ন (পছন্দীয়) এবং কুব্হ (তিরষ্কারযোগ্য) এর বিষয়ে সে নিজেই শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটা আর কোন কিছুই নয়, বরং তার খেয়ালখুশী ও প্রবত্তির অনুসরণ। এর সৃষ্টির শেকড় হল ইউরোপের দার্শনিকগণ।
    ইসলামের ক্ষেত্রে তা গণতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত। এটা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে এসেছে। তিনি এটা নাযিল করেছেন তার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল মুহম্মদ (সা) এর উপর। ইসলামে শাসকগণ আইন জারির ক্ষেত্রে তার প্রবৃত্তি নয়, শারী’আহ্’র শরণাপন্ন হয়। শারী’আহ্’র বাণীসমূহকে বুঝা পর্যন্ত মনের ব্যবহার সীমাবদ্ধ রাখতে হয়।

    — যে বিশ্বাস থেকে গণতন্ত্র উৎসারিত হয়, তা হলো জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের বিশ্বাস বা আক্বীদাহ্ এবং এটা এসেছে আপোষমূলক সমাধানের মাধ্যমে। এটা ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেনি, বরং জীবন ও রাষ্ট্রের উপর এর প্রভাবকে বিলুপ্ত করেছে এবং সর্বোপরি মানুষকে তার নিজের ব্যবস্থা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে। 
    ইসলামের ক্ষেত্রে এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র পাওয়া যায়। এতে ইসলামী আক্বীদাহ্’র আলোকে জীবনের সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হয় এবং রাষ্ট্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ ও নিষেধ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। অন্যকথায় ইসলামি আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত ইসলামী শারী’আহ্ ভিত্তিক হুকুমের মাধ্যমে জীবন পরিচালিত হয়। এই আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতেই এর সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয়েছে।

    — যে ভিত্তির উপর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত তা হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। জনগণ হলো সকল ক্ষমতার উৎস। এর উপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তিনটি শক্তির জন্ম দিয়েছে; আইন, নির্বাহী ও বিচারিক ক্ষমতা, যাতে সে এর সার্বভৌমত্ব ও কতৃর্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ করতে পারে।
    ইসলামে শারী’আহ্’র উপর সার্বভৌমত্ব ন্যস্ত এবং উম্মাহ্’র আইন তৈরির ক্ষমতা নেই। তবে ইসলাম মুসলিমদের আল্লাহ্ প্রদত্ত আদেশ—নিষেধকে কার্যকর করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে এবং শারী’আহ্গত দলিলের ভাষায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

    — গণতন্ত্র এমন এক ব্যবস্থা ও চিন্তা নিয়ে এসেছে যার ভিত্তি মানুষের প্রবৃত্তিজাত এবং তা হলো লাভ। অন্যদিকে ইসলামের আইন প্রক্রিয়া শারী’আহ্ এবং শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত আইনের উপর নির্ভরশীল অর্থাৎ এটি এই নির্দেশিত পথের অনুমোদন ও অনুসরণের উপর নির্ভরশীল।

    — গণতন্ত্রের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা থেকে ইসলাম লাভবান হতে পারে; এ ধরণের উক্তি ভিত্তিহীন এবং দলিল নির্ভর নয়। আমরা গণতন্ত্রের কিছু প্রভাব দেখতে পেয়েছি যা এমন এক মন্দ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটিয়েছে যা কোনো কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসেনি। মানবতার জন্য আগত সবোর্ত্তম উম্মতের গণতন্ত্র থেকে নেওয়ার কিছু নেই। ইসলামের কী এমন কোনো ঘাটতি রয়ে গেছে যে তা পূরণের জন্য গণতন্ত্রের মুখাপেক্ষী হতে হবে।

  • তা-গূত কী?

    ইসলামের দৃষ্টিতে বিচারের জন্য আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও নিকট শরণাপন্ন হওয়াকে তাগুতের নিকট শরণাপন্ন হওয়া বুঝায়।

    তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    “আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার উপর নাযিল হয়েছে, এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল হয়েছে, তার উপর তারা ঈমান এনেছে, এবং তারা বিবাদমান বিষয়গুলোর মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায় অথচ তা প্রত্যাখ্যানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
    (সূরা আন নিসা: ৬০)

    তাগুতের শাসন মানেই জাহেলিয়াতের শাসন। এর প্রতিটি আইন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে সাংঘর্ষিক। ইবনে আল-কাইয়্যিম তার রচিত গ্রন্থ আ’লাম আল-মুয়াক্কি’ন এ বলেন, “বান্দা যখন কোনকিছুর ইবাদত, কাউকে অনুসরণ কিংবা মান্য করার ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করে তখন এইরকম প্রতিটি কর্মকান্ডই তাগুতের মধ্যে পড়ে। সুতরাং প্রত্যেকের জন্য তাগুত সেটাই যার নিকট সে আল্লাহ্ ও রাসূলকে বাদ দিয়ে বিচারের শরণাপন্ন হয়, অথবা আল্লাহ্ বাদ দিয়ে যার উপাসনা করা হয়, অথবা আল্লাহ্’র কাছ থেকে প্রাপ্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে যার অনুসরণ করা হয়, অথবা এমন কিছুকে মান্য করা যা আল্লাহ্’র প্রতি আনুগত্য থেকে উৎপত্তি হয়নি।”

    যে তাগুতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে পবিত্র কুর’আনের দৃষ্টিতে তার ঈমান কোনো বাস্তবতা নয় বরং নিছক দাবী বা ভন্ডামী মাত্র। এছাড়াও কুর’আন তাগুতকে ঈমানের শত্রু হিসেবে আখ্যা দিয়েছে যখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

    “যে তাগুতকে অবিশ্বাস করলো এবং আল্লাহ্ প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলো, সে এমন সুদৃঢ় হাতলকে ধারণ করলো যা ভাঙবার নয়।”
    [সূরা বাক্বারা: ২৫৬]

    সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মৃত্যুর পর, ক্বিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ্’কে অবশ্যই মানবজাতির স্বাক্ষী হয়ে থাকতে হবে। সে কারণে কুর’আন যা বলেছে, ঠিক তাই এ উম্মাহ্’র মানবতাকে বলা উচিত,

    “একমাত্র আল্লাহ্’র ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো।”
    [সূরা নাহল: ৩৬]

    সুতরাং জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণের চিন্তা, এবং তা থেকে উৎসারিত সকল চিন্তা, যেমন গণতন্ত্র তাগুতের চিন্তা। ইসলাম আমাদেরকে তা প্রত্যাখান ও পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছে।

    এটাই হলো গণতন্ত্র এবং তা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী। আর এগুলো পৃথিবীতে বাস্তবায়নের ফলে যে ফলাফল তৈরি হবে তা কী এমন সম্মানজনক ও সুন্দর ব্যবস্থা হবে যার ছায়াতলে মানুষ বসবাস করতে পছন্দ করবে নাকি এমন মন্দ ব্যবস্থা হবে যার প্রয়োগে মানুষ অন্তঃসারশূন্য ও ক্ষতিকারক জীবনে পতিত হবে এবং তার আগুন দ্বারা নিয়ে দগ্ধ হবে।

  • গণতন্ত্র

    পশ্চিমা সভ্যতা দুনিয়া থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই চিন্তা ও ভিত্তিতে বিশ্বাসের দরুণ পশ্চিমারা জনগণের জীবন থেকে দ্বীনের প্রতিটি প্রভাব বিনষ্ট করেছে। এর অনুকরণে তারা মৌলিক চিন্তার আদলে এর উপর ভিত্তি করে জীবন সম্পর্কিত সকল চিন্তা ও সমাধান বিকশিত করেছে। অতএব গণতন্ত্রের মাধ্যমে মানুষ নিজেদের উপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কর্তৃত্বের পরিবর্তে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে নিজেদের কাজের মাপকাঠি হিসেবে তারা স্বার্থকে গ্রহণ করলো এবং সর্বোচ্চ মাত্রার ঈন্দ্রীয়গত পরিতুষ্টিকে সুখ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলো। এটাই ছিল ব্যক্তিপূঁজার চিন্তা পরবর্তীতে ব্যক্তিস্বাধীনতার পূঁজার দিকে ধাবিত করে। এসব চিন্তার উপরে ভিত্তি করেই পাশ্চাত্য সভ্যতা গড়ে উঠেছে এবং পাশাপাশি এসব চিন্তার সাথে সাংঘর্ষিক সকর চিন্তার বিরোধিতা করেছে। এসব চিন্তা গ্রহণের ফলে নিজেদের সন্ধানকৃত সুখের পরিবর্তে পাশ্চাত্য কেবল দুর্ভোগেরই শিকার হয়েছে। এরূপ ঘটাই স্বাভাবিক কারণ মানুষ হচ্ছে দুর্বল যে নিজের বা অন্যের জন্য আইন প্রণয়নের যোগ্যতা রাখেনা। যে সমাজে স্বার্থপরতা প্রবল থাকে এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার কর্তৃত্ব থাকে সেরকম একটি সমাজ কেবল পাশবিকই হতে পারে যেখানে জংলী আইনকানুনের রাজত্ব থাকে।

    এরপর পশ্চিমারা মনকে স্বাধীন রাজত্ব প্রদান করলো। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবনে তারা মনোনিবেশের ফলে তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করলো। এভাবে যখন সে ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠলো তখন পৃথিবীর উপর সে সত্যের জোরে নয় বরং ক্ষমতার জোরে আধিপত্য বিস্তার করলো। প্রথমে বস্তুগতভাবে ও পরবতীর্তে বুদ্ধিবৃত্তিভাবে সে নিজেকে পৃথিবীর উপর চাপিয়ে দিল। অন্যভাবে বলতে গেলে, একটি দেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তারা প্রথমে এমন শাসকবর্গকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করলো যারা তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং সেজন্য উপযোগী ব্যবস্থাও আরোপ করবে। এমন মিডিয়া ও পাঠ্যসূচী প্রতিষ্ঠা করলো যা তাদের চিন্তা ও জীবনব্যবস্থার পক্ষে প্রচারণা চালাবে। জনগণকে তারা উপলব্ধি করানোর চেষ্টা করলো যে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী তাদেরকে ক্ষমতাধর অবস্থায় পৌঁছে দিয়েছে।

    তখন সে নিজের স্বার্থের অনুকূলে পুরো পৃথিবীকে বিভক্ত করে ফেললো। শিল্পোন্নত, উৎপাদনশীল, শক্তিশালী, আধিপত্যবাদী এবং ঔপনিবেশিবাদী রাষ্ট্রগুলোকে তারা আধুনিক ও প্রগতিশীলদের কাতারে ফেললো। এবং অবশিষ্ট দরিদ্র, পরনির্ভরশীল, দুর্বল এবং নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোকে তারা পশ্চাৎপদদের কাতারে ফেললো। এই বিভক্তিকে আরও গভীর করা, এবং এসব রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি কিংবা চলমান পরিস্থিতি অসঙ্গতিপূর্ণ যেকোনো পরিবর্তনের চেষ্টাকে প্রতিরোধ করলো।

    তারপর তারা নিজেদের দেশে ব্যক্তিস্বাধীনতার দরজা খুলে দিল এবং জনগণকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা উপভোগের সুযোগ করে দিল। বৈষম্য বজায় রেখে জনগণকে মৌলিক চাহিদা ও পাশাপাশি ভোগবিলাসের চাহিদা পূরণের সুযোগ করে দিল। একই সময়ে এসব দরিদ্র দেশসমূহ যাতে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে বস্তুগত উন্নতি সাধন করতে না পারে এজন্য তারা এসব জাতিকে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান হতে বঞ্চিত রাখলো। মৌলিক শিল্প কাঠামো গড়তে বাঁধা প্রদান করেছে যাতে অতি প্রয়োজনীয় মৌলিক চাহিদার জন্যেও এসব দেশকে পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। এসব দেশকে দুর্বল করার মাধ্যমে তারা এগুলোকে নিজেদের বাজারে পরিণত করলো। এসব দেশের জনগণকে তারা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত করলো। আর এজন্যেই শিল্পোন্নত ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে নিজেদের উপনিবেশ বানাতে পরস্পরের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত। এই দ্বন্দ্ব আবার এ পর্যায়ের না যে তাদের একে অপরের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত। বরং তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের পরিণতি হচ্ছে এসব দরিদ্র দেশের জনগণ একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত, অথবা ঐ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রনহীন বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও বিপ্লবের উৎপত্তি। ফলে এসব রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয় এবং জনগণের ভিতরে ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। না বললে নয় যে এর মাধ্যমে তারা এসব দেশের জনগণের ভেতর বর্ণবাদ, গোত্রবাদ এবং জাতীয়তাবাদকে উস্কে দিয়েছে।          

    অনুরূপভাবে, পাশ্চাত্য দেশসমূহ নিজেদের জনগণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা যেমন ঔষধ, শিক্ষা, বেকার ভাতা, বার্ধক্য ভাতা প্রভৃতি বিষয় সরবরাহ করেছে অথচ অন্যান্য দেশে এসব বিষয়কে নিষেধ করেছে।

    উপনিবেশীকরণের বিভিন্ন উপকরণ হিসেবে পাশ্চাত্য কিছু বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান যেমনঃ আন্তর্জাতিক আদালত, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, বিশ্বব্যাংক ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব-সংঘাত থামানোর জন্য অথবা দরিদ্র দেশগুলোতে দেওয়া ত্রাণের নিরাপত্তার জন্য তারা আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনী গঠন করেছে। গরিব দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয় পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং তাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান যেমন সেভ দি চিলড্রেন এবং মেডিসিন সানস ফ্রন্টিয়ারস প্রতিষ্ঠা করেছে।

    প্রকৃতপক্ষে, জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ এবং এ থেকে উদ্ভূত স্বার্থের ধারণা থেকে পাশ্চাত্য উপনিবেশকরণের ধারণা প্রবল হয়েছে। তবে এই উপনিবেশীকরণ বর্তমানে তার আদিম চেহারায় আর নেই। বরং তা চিন্তা, উপকরণ ও ধরণ পাল্টে এক গুপ্ত উপনিবেশবাদে পরিণত করা হয়েছে। বাহ্যিকভাবে এটি করুণা এবং ভিতরগতভাবে যুলুম। এভাবেই পশ্চিমারা বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে এবং নিজেদেরকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে জনগণ তাদেরকে একমাত্র অনুকরণীয় আদর্শ বলে ভাবতে শুরু করে এবং মুসলিমরা তাদেরকে কিবলা বানিয়ে মাথানত করে। তাদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে গণতন্ত্র ও ব্যক্তিস্বাধীনতার চিন্তা থেকে এরূপ দাবি করার মতো বড় প্রতারণা এবং মুনাফিকী আর কী হতে পারে? পাশ্চাত্যের পছন্দকৃত স্বর্গে (?) যারা বাস করতে চায় তাদের জন্য পাশ্চাত্য হচ্ছে আশ্রয় ও করুণা। পাশাপাশি উপনিবেশিকতাবাদের প্রকৃত চেহারা যা হচ্ছে জনগণকে শোষণ করা ও তাদের সম্পদ অন্যায়রূপে দখল করা, তাদেরকে দুর্বল করে রাখা, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদেরকে পশ্চাৎপদ করে রাখা, নিজেদের সম্পদের জন্য তাদেরকে স্থায়ী বাজারে পরিণত করা এবং পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের যে কারণ সেগুলোকে তারা গোপন করেছে। পাশ্চাত্যের সভ্যতা এবং এর উপনিবেশিকতাবাদের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, আলোচনার সুবিধার্থে যার কিছু অংশ আমরা উপস্থাপন করেছি মাত্র।

    হ্যা, ঠিক এভাবেই পশ্চিমারা সত্যকে বিকৃত করেছে, বিষয়বস্তুকে উল্টে ফেলেছে এবং নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী বিভিন্ন বিষয়কে জনগণের প্রকৃত উপলব্ধি থেকে অন্ধকারে রেখেছে। ফলে বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক চিন্তা জনগণকে প্রভাবিত করতে লাগলো, যার মধ্যে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ অন্যতম। শ্লোগাণটি ‘শক্তিশালীর যুক্তি শক্তিশালী’ এবং ‘দুর্বলের যুক্তি দুর্বল’ এই মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

    আদর্শিক দল বা গোষ্ঠীর মূল ভূমিকা এখানেই যাতে সবকিছুই তার প্রকৃত অবস্থায় ফিরে আসে, দৃষ্টিভঙ্গী ঠিক হয় এবং প্রতারণা বন্ধ হয়। দল যদি বাস্তবতা দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে সে সঠিক উপলব্ধি হারিয়ে ফেলবে এবং এমন সমাধানের প্রস্তাব দিবে যা সাধারণত তার শত্রুরা দিয়ে থাকে। তবে দল যদি বাস্তবতাকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং সমাধান খুঁজতে সঠিক প্রক্রিয়ায় শারী’আহ্’কে অনুসরণ করতে পারে তাহলে জনগণের সামনে সে সঠিক সমাধান উপস্থাপন করতে পারবে এবং জনগণকে পাশ্চাত্যের নষ্ট চিন্তা থেকে ইসলামের আলোকিত চিন্তায় আনতে সক্ষম হবে।

    উপরের সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে বিভিন্ন দেশকে বস্তুগত অগ্রগতির উপকরণ অর্জনে বাঁধাপ্রদান এবং নিজেদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে জ্ঞানচর্চার ব্যাপক স্বাধীনতা প্রদানের মাধ্যমে পশ্চিমারা তাদের ক্ষমতাধর অবস্থা ধরে রেখেছে। প্রকৃতপক্ষে, তাদের মাত্রাতিরিক্ত সম্পদের পিছনে গণতন্ত্র নয় বরং দায়ী হচ্ছে তাদের ঔপনিবেশিকতাবাদ, বিভিন্ন জাতিসমূহের রক্তশোষণ এবং সম্পদ লুণ্ঠন।

    আর গণতন্ত্র কী ও তা বাস্তবায়নের পরিণতি কী; তা এক ভিন্ন আলোচনা।

    পাশ্চাত্যে ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ এই ধারণাটি জন্ম হয়েছে জীবনের বিভিন্ন বিষয়ে চার্চের হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট দুর্ভোগের কারণে। এসব হস্তক্ষেপ ধর্মের নামে চালানো হলেও এসব ব্যাপারে ধর্মের কোনো মন্তব্য ছিলনা। কারণ খ্রিস্টান ধর্মে পার্থিব বিষয়সমূহের জন্য কোনো আইনকানুন নেই। ধর্মের নামে পাদ্রীগণ বিভিন্ন অন্যায় আইনকানুন তৈরি করেছিল যার ফলে কিছু বিশেষ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়; এর মধ্যে একটি ছিল ধর্মকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা এবং অন্যটি ছিল ধর্মকে স্বীকার করা কিন্তু জীবন থেকে একে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। প্রথম প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে এর শাসনে জনগণ পিষ্ট হয় এবং কয়েক দশক যেতে না যেতে তা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা চিন্তাগুলোর উপর ভর করে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শাসনের উত্থান ঘটে যা ধ্বংসের পথে এগুচ্ছে। যার নমূনা চিন্তা এবং বাস্তবতার নিরিখে সুস্পষ্ট।

    ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’ এই ধারণাটি ধর্মকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে মানুষকে আইন প্রণয়নের অধিকার দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তার ধারণাকে স্বীকার করে নেয়া সত্ত্বেও তারা একে এমন একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় পরিণত করেছে যাতে এর কোন বক্তব্য কিংবা প্রভাব সমাজের উপর না পড়ে। সমাজের বিষয়ে যার কিছু বলার নেই এবং যা সমাজে কোনো প্রভাবও রাখতে পারবেনা। তাদের জন্য এটা ভুল নয় যদি কেউ আল্লাহ্, যীশু, বুদ্ধ বা অন্য কোন ব্যক্তির উপাসনা করে। এমনকি ধর্ম হতে উদ্ভুত নয় এমন বিশ্বাসে কেউ বিশ্বাসী হওয়াটাও তাদের দৃষ্টিতে দোষের নয়। কিন্তু সর্বদা মানুষকে সকল বিষয়ের একমাত্র ব্যবস্থাপক মানতে হবে। তাদের দৃষ্টিতে এ বিষয়টির সাথে কোন আপোষ-আলোচনার সুযোগ নাই। তাদের মতে মানুষ নিজেই নিজের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা করবে এবং তার প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্টির ব্যবস্থা করবে। এ চিন্তা থেকে গণতন্ত্রের ধারণা উদ্ভুত হয়েছে যার অর্থ ‘জনগণের শাসন, জনগণের দ্বারা শাসন এবং জনগণের জন্য শাসন।’

    ‘জনগণের শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ নিজেই নিজের প্রভূ অর্থাৎ আইন তৈরি করবে অর্থাৎ বিধানদাতা।

    ‘জনগণের দ্বারা শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন দ্বারা শাসন করবে।

    এবং ‘জনগণের জন্য শাসন’ বলতে বুঝায় জনগণ তার প্রণীত আইন কতৃর্ক শাসিত হবে।

    তাদের মতে তিন ধরনের কতৃর্পক্ষের আবির্ভাব ঘটে,

    ১. আইন তৈরির জন্য কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ আইন ও কানুন তৈরি, এগুলো সংশোধন, রহিতকরণ এবং প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ  করে।

    ২. নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ সাধারণ আইন বা জনগণের সাধারণ ইচ্ছা ও আইন কতৃর্পক্ষ কতৃর্ক প্রণীত আইন প্রয়োগ করে।

    ৩. বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য কতৃর্পক্ষ। এটি আইনী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রণীত আইন ও কানুন দ্বারা তার সামনে উত্থাপিত যে কোন বিষয়ের বিচারকার্য সম্পাদন করে।

    এগুলো হলো গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এটা বলা সম্ভবপর যে, অন্যদের থেকে পার্থক্যকারী এই রকম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আদর্শের নামই হল গণতন্ত্র। এর যে কোনটি বাদ পড়েছে এমন কোন ব্যবস্থার নাম গণতন্ত্র নয়। এই বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মানুষের সার্বভৌমত্ব। একে গণতান্ত্রিক চিন্তার প্রাথমিক অবলম্বন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মেরুদন্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

    সুতরাং ইসলামে কি গণতন্ত্র আছে? গণতন্ত্রের এ উপরিল্লিখ বৈশিষ্ট্য কি ইসলামে বিদ্যমান? যদি এ বাস্তবতা ইসলামে বিদ্যমান থাকে তখনই আমরা বলতে পারি, ‘গণতন্ত্র ইসলাম থেকে এসেছে’ এবং ‘খোলাফায়ে রাশেদীনগণ সর্বপ্রথম গণতন্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন’ এবং ‘গণতন্ত্র হলো সে হারানো সম্পদ যা পুনরায় আমাদের কাছে ফিরে এসেছে?’ আর যদি তা বিদ্যমান না থাকে তাহলে গণতন্ত্র মোটেও ইসলাম থেকে আসেনি। কাজেই আমাদেরকে অবশ্যই গণতন্ত্র সম্পর্কে ইসলামের মতামত জানতে হবে।

    নিশ্চয়ই গণতন্ত্র সেই মতাদর্শের ভিত্তির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যে মতাদর্শের ভিত্তি হচ্ছে জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকীকরণ। এ ভিত্তি হতে গণতন্ত্র জন্ম লাভ করেছে এবং একই আইন গ্রহণ করেছে। এটি পরিত্যাজ্য একটি ভিত্তির শাখা, এবং এই ভিত্তির উপর বিশ্বাস স্থাপনকারী কাফের হিসেবে গণ্য। এটা সর্বজনবিদিত, ‘জীবন থেকে দ্বীনের পৃথকীকরণ’  মুসলিমদের মৌলিক বিশ্বাস ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্’ এর পরিপন্থী। মুসলিমদের জন্য আক্বীদা হতে উদ্ভুত এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ চিন্তা হচ্ছে:

    “নিশ্চয় আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ব্যতীত আর কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না।
    [সূরা ইউসুফ: ৪০]

    তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র) বক্তব্যের

    “…কিন্তু অধিকাংশ লোকই তা জানে না।” এর অর্থ হল সারা জাহানের প্রভূর প্রদত্ত হুকুমের ক্ষেত্রে অধিকাংশ লোকের মতামতের কোন মূল্য নেই এবং আইন তৈরির ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র। সুতরাং ইসলামী ব্যবস্থায় সর্বশেষ কথা কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র জন্য। আদেশ, নিষেধ, অনুমোদন, নিষিধাজ্ঞা প্রদান কেবলমাত্র সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে মহান, সর্বজ্ঞানী, সব বিষয়ে প্রাজ্ঞ সত্ত্বার জন্য; এছাড়া আর কারও জন্য নয়। কোন ব্যক্তি বা দলের আল্লাহ্’র সাথে এ ব্যাপারে সামান্যতম হিস্যাও নেই।

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হলেন সে সত্ত্বা যিনি রায় দিয়েছেন,

    “নিশ্চয়ই আইন প্রণয়নের মালিক একমাত্র আল্লাহ্।”
    (সূরা ইউসুফ: ৪০)

    এবং আল্লাহ্’র রায়ের ব্যাত্যয় ঘটানোর অধিকার কারও নেই,

    “তার নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেউ নেই।”
    (সূরা রা’দ: ৪১)

    তাহলে কী করে গণতন্ত্রের কালো রাত্রির সাথে ইসলামের জ্যোতিময় দিনের তুলনা চলে? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর সুস্পষ্ট আয়াতে উল্লেখ করেছেন,

    “আর যদি আপনি পৃথিবীর অধিকাংশ লোকের কথা মেনে নেন, তবে তারা আপনাকে আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী করে দেবে। তারা শুধু অলীক কল্পনার অনুসরণ করে এবং সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর কথাবার্তা বলে।”
    (সূরা আল আনআম: ১১৬)

    তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,

    “…হয়তো তোমরা এমন বিষয়কে অপছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য কল্যানকর এবং এমন বিষয়কে পছন্দ করছো যা তোমাদের জন্য অকল্যানকর। এবং আল্লাহ্ জানেন কিন্তু তোমরা জানো না।”
    (সূরা বাক্বারা: ২১৬)

  • বিচ্যুতি ও আপোষের ব্যাপারে সতর্ক থাকা

    কোনো আদর্শিক ফিকরাহ্’র (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ) উপরে প্রতিষ্ঠিত দল যখন বাস্তবতার মোকাবিলা করতে মাঠে নামে তখন তার উপর অনেক ঝড়-ঝাঁপটা আসে এবং তাকে শিকড় থেকে উপড়ে ফেলতে চায়। এই আন্দোলনটির প্রতি শাসকবর্গের আচরণ হবে অন্যান্য আন্দোলন থেকে পৃথক। কারণ অন্যান্য আন্দোলনগুলো আংশিক চিন্তা উপস্থাপন করে, যার ফলে তারা শাসকের জন্য মোটেও হুমকি হিসেবে কাজ করেনা। বরং শাসকবর্গ কতৃর্ক সংঘটিত বিভিন্ন ত্রুটি ও অপূর্ণতার খালি জায়গাগুলো পূরণ করে দেয়। কিন্তু আদর্শিক ফিকরাহ’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত চরম আন্দোলনটি নিজস্ব ভিত্তির আলোকে বিভিন্ন বিষয়ের মোকাবিলা করে এবং কোনো জোড়াতালি দেওয়া সমাধানকে মেনে নেয়না অথবা পরিস্থিতির সাথেও তাল মেলায়না। না তারা কোনো আংশিক সমাধান মেনে নেয় আর না শাসকবর্গ কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যার সংস্কার করে। সামগ্রিক পরিবর্তন অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এই দাওয়াহ্ ত্যাগ করাকে তারা মেনে নেয় না। না তারা ভিত্তিকে বাদ দিয়ে ভিত্তি থেকে উৎসারিত পারিপার্শ্বিক বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করাকে মেনে নেয়। ফলে এটা স্বাভাবিক এমন সংগঠনকে একটি নজিরবিহীন প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুক্ষীন হতে হবে। সামগ্রিক পরিবর্তনের পথকে সংগঠনটি যত বেশী অনুসরণ করবে এর প্রতি শাসকগোষ্ঠীর শত্রুতা ও বিরোধীতাও তত বেশী জোরালো হবে।

    এই বিরোধিতার তীব্রতার পরিমান এতো বেশীও হতে পারে যা সহ্য করার ক্ষমতা দাওয়াহ্ বহনকারীগণ মাঝেমধ্যে হারিয়ে ফেলতে পারেন। এবং দাওয়াহ্’র বক্তব্যের তীব্রতাকে খানিকটা হালকা করার জন্য সংগঠনের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারেন। যখন সে প্রত্যক্ষ করবে সবাই তাকে ও তার এই আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করেছে তখন এই দাওয়াহ্ অব্যাহত রাখার কাজ তার নিকট অত্যন্ত কঠিন মনে হবে এবং তার সংকল্প দুর্বল হয়ে পড়বে। সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থাকায় উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে যখন তার পার্থিব স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তখন সে নিজেকে প্ররোচিত করবে এবং কাজ ছেড়ে দিতে চেষ্টা করবে। তখন সে দলের উপর চাপ প্রয়োগ করবে যাতে দল পরিবর্তনের আহবানের পরিবর্তে সংস্কারের আহবান জানায়। দল যদি তার আহ্বানে সাড়া দেয় তাহলে সে দলে সাথে থাকবে। এভাবে নিজের দাবি অনুযায়ী সে দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যই কাজ করবে এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও শাসকবর্গ উভয়কেই সন্তুষ্ট করবে। কিন্তু দল যদি তার এই চাপ প্রত্যাখ্যান করে দলের সামগ্রিক এবং মৌলিক কাজে অটল থাকে তাহলে সে দল ছেড়ে যাবে। অতএব, দল এক্ষেত্রে দুটো বিপদের সম্মুখীন হবে; একটি আভ্যন্তরীণ যা আসবে সেসব শা’বাবদের তরফ থেকে যাদের মনোবল প্রচন্ড ঝড়-ঝাঁপটা আসার পূর্বেই ভেঙে পড়েছে এবং আরেকটি শাসকগোষ্ঠী তরফ থেকে যারা সামগ্রিক পরিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গী ধারণকারী দাওয়াহ্ বহনকারীদের সহ্য করতে পারে না।

    একপর্যায়ে দল এবং শাসকবৃন্দের মধ্যে দরকষাকষি শুরু হবে। তখন দলের নিকট বিভিন্ন প্রস্তাব আসা শুরু করবে এবং ভয়-ভীতি আর প্রলোভন সমন্বিত একটি ‘মূলা ঝুলানো’ তত্ত্ব প্রয়োগ করা হবে। এটা সর্বজনবিদিত ব্যবসার ক্ষেত্রে দরকষাকষি প্রযোজ্য; সুতরাং দল যখন দর-কষাকষিতে নামে তখন তা হয় তার দায়িত্বকে বিক্রি এবং উম্মাহ্’কে অপমানিত করার মতো অবস্থা। অন্যথায় একে শাসকগোষ্ঠীর আগুনে দগ্ধ ও তার শিখায় ঝলসাতে হয়।

    অতএব, সঠিক আদর্শিক ফিকরাহ্ এমন একটি আদর্শিক দলের দাবি করে যার নেতৃত্ব এবং সদস্যগণ শারী’আহ্’র কতৃর্ত্বকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। স্পষ্টতা, বিশুদ্ধতা, ধৈর্য, ত্যাগ স্বীকার, পরার্থবাদ এবং এ সমস্ত বিষয়েও তারা সচেতন। পরিণতির আশংকায় যে কোন প্রলোভনের হাতছানিতে সাড়া দেওয়া থেকে তাদের অবশ্যই তাদেরকে বিরত থাকতে হবে যাতে তারা বিচ্যুত হয়ে না পড়ে এবং তাদের মনোবল না ভেঙে যায়। দলটি যদি এমন একটি সুরক্ষিত পদ্ধতিতে অগ্রসর হতে চায় যাতে তার কর্মকান্ড সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং কোনোরূপ পরিবর্তনের জোয়ারে ভেসে না যায় অথবা দলটিকে নিয়ে লোকজন কোনোরকম খেলায় লিপ্ত হতে না পারে, সেজন্য দলটিকে অবশ্যই প্রতিটি চিন্তাকে বা শারী’আহ্ হুকুমকে দৃঢ়ভাবে ইসলামী আক্বীদাহ্’র সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। যদি কখনো লক্ষ্য অর্জনের পথে দাওয়াত বহনকারীর ব্যক্তিগত স্বার্থ বা সুবিধার সাথে দাওয়াহ্’র দৃঢ়তা ও ধৈর্যে্যর সংঘাত বাঁধে তাহলে অবশ্যই দাওয়াহ্’কে সর্বাবস্থায় প্রাধান্য দিতে হবে। যার ফলে তখন এই চিন্তাটি দুষ্কর্মের দিকে ধাবিতকারী শয়তান ও নফসের প্ররোচনার পথে একটি দূর্বেধ্য বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে।

    কাঁদার মধ্যে সংগঠনটির তরী ডুবে যাওয়ার মতো ন্যাক্কারজনক পরিণতির হাত হতে বাঁচাতে হলে, তার নিকট নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় কিছু মূলনীতি বিদ্যমান থাকতে হবে যা দলের চিন্তা ও চিন্তার প্রক্রিয়াকে নির্ধারণ করবে। যা দলটিকে তার গৃহীত হুকুম শারী’আহ্’র মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে। নতুন ব্যাখ্যা বা মূল্যায়নের নামে এসব মূলনীতি থেকে সে কখনোই বিচ্যুত হতে পারবে না।

    ফলে সঠিক নির্দেশনা, সঠিক অনুসরণ এবং সঠিক জ্ঞান দলটিকে পরিশুদ্ধ করবে এবং দলের সদস্যদের অন্তরকে যেকোনো ক্রটি-বিচ্যুতি এবং দোষ থেকে মুক্ত করবে এবং তাদের ঈমানকে মজবুত করবে।

    এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে দৃঢ় সংকল্পের অধিকারী মুমিনগণ ছাড়া আর কারও পক্ষে দৃঢ় থাকা অসম্ভব। এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুক্ষীন হওয়ার পর যারা টিকে রইবে, তাদের ঈমান সেইভাবে খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হবে যেভাবে আগুন দ্বারা সোনা খাদমুক্ত হয়ে পরিশুদ্ধ হয়।

    দল যখন তার গৃহীত নিয়ম নীতিমালাকে হারিয়ে ফেলে তখন সে কর্মসূচী প্রত্যাহার, রদবদল, পিছু হটা, অসঙ্গতিতে ভুগবে। পদ্ধতি ও উদ্দেশ্যের অস্পষ্টতা ও অস্বচ্ছতা কঠিন পরিস্থিতিতে কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সংগঠনকে পরিবর্তন সাধনে তাড়িত করে অথবা জনগণের নিকট দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের পক্ষে ন্যায্যতা কিংবা শারী’আহ্’র বাইরে গিয়ে ব্যাখ্যা উপস্থাপনের দিকে ধাবিত করে।

    দল যখন আপোষ করবে, সত্যকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ না করে আংশিকভাবে গ্রহণ করবে এবং সামগ্রিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা ও মৌলিক কাজকে পরিত্যাগ করবে তখন সে তার ধারণকৃত একমাত্র শক্তিকে হারিয়ে ফেলবে। তখন সে আর কোনো অনন্য ও স্বতন্ত্র দল হিসেবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারবেনা। বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামে সে পরাজিত হবে এবং শত্রুপক্ষ বিজয়ী হবে যদিও তখন সে ইসলামের দিকে আহবান করে এবং ইসলামকে একমাত্র সমাধান হিসেবে উপস্থাপন করে। এর কারণ তার আহ্বান বিকৃত এবং প্রচলিত ব্যবস্থার জন্য সুবিধাজনক হয়ে গেছে। এবং পরিবর্তনের রাস্তায় সহযোগী হওয়ার পরিবর্তে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে। এই ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, রাসূল (সা) এবং রাসূল (সা) পরবর্তী উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন:

    “…এবং তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ্ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।”
    (সুরা মায়েদা: ৪৯)

    তাছাড়া সাইয়্যিদুনা উমর (রা) তার নিযুক্ত বিচারক শুরায়হ্’কে বলেছেন : “কেউ যাতে তোমাকে নির্ধারিত এ পথ থেকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।”

    দলের মধ্যে বিদ্যমান সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র হচ্ছে তার ফিকরাহ্ (আক্বীদা ও সমাধান সম্বলিত চিন্তাসমূহ)। যদি দল একে সংরক্ষণ করে এবং আপোষের পরিবেশ থেকে রক্ষা করে, পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে এর উপরে অটল থাকে এবং রাসূল (সা) এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাহলে রাসূল (সা) এর মতো তারাও মুমিনদের একটি দল প্রস্তুত করতে পারবে এবং আল্লাহ্’র নাযিলকৃত বিষয়াদি দিয়ে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা মেনে নিতে উম্মতকেও রাজি করাতে পারবে। এসব বিষয় প্রস্তুত করার পরে সে পরিস্থিতিকে দাওয়াহ্’র অনুকূলে নিয়ে আসতে পারবে এবং ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

    ইসলামী চিন্তাসমূহ সত্যের দাওয়াহ্ বহনকারী ব্যক্তিদের জন্য এমন এক নিয়ামত যা তাদেরকে পরিস্থিতি কতৃর্ক সৃষ্ট চাপ মোকাবেলায় আসল মৌলিক চিন্তাসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইসলামী চিন্তাসমূহের উপর অটল থাকার দাবি জানায়। পরিস্থিতি সৃষ্ট চাপের মুখে ‘চাহিদানুযায়ী সবই গ্রহণযোগ্য’, ‘ততটুকুই উপস্থাপন কর যতটুকু বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ’, ‘দাবির আংশিক উপস্থাপন কর’, ‘আংশিক সমাধান গ্রহণ কর’ এ ধরনের মানসিকতা পোষণ করা দলের জন্য কোনভাবেই মানানসই না। এসব চিন্তাকে ব্যবহার করা নয় বরং এগুলোর মূলোৎপাটনের জন্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এগুলো পাশ্চাত্যের চিন্তার ধরণ যা দ্বারা তারা আমাদের চিন্তার উপর আগ্রাসন চালিয়েছে। এসব চিন্তার সাথে সামগ্রিকভাবে ভিন্নমত পোষণকারী ইসলামী চিন্তা এসব কুফর চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে ও এগুলোকে সমূলে উপড়ে ফেলার জন্য কাজ করছে, এবং ইসলাম ও ইসলামের চিন্তার প্রক্রিয়া বলবৎ করার জন্য কাজ করছে। অতএব যে পরিবর্তন চায় এবং পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে তাকে অবশ্যই প্রথমে নিজেকে দিয়ে শুরু করতে হবে।

    ফিকরাহ্’র বিশুদ্ধতা ও স্পষ্টতার উপরে জোর দিতে এবং তা বজায় রাখতে কোন কোন বিষয়ের দিকে দলটিকে নজর দিতে হবে সেগুলো উপস্থাপনের পর এবার আমরা পাশ্চাত্যের কাফিরদের কতৃর্ক প্রস্তাবিত দুটি চিন্তা নিয়ে আলোচনা করব। এসব চিন্তার প্রতি আমাদের শাসকবর্গ প্রতিশ্রম্নতিবদ্ধ এবং এগুলোর মাধ্যমেই তারা মুসলিমদের উপর নির্যাতন চালায়। দুর্ভাগ্যবশত ইসলামের জন্য কাজ করে এমন কিছু ইসলামী দল এবং পাশ্চত্য চিন্তা গ্রহণের জন্য সবসময় উৎসাহ যোগায় এমন কিছু মুসলিম লেখক এসব চিন্তাকে দ্রুত গ্রহণ করে ফেলেছে। চিন্তা দুটির মধ্যে একটি হচ্ছে গণতন্ত্র এসেছে ইসলাম থেকে এবং গণতন্ত্রই শূ’রা। এমনকি শব্দের পুনর্মিলন ও বুদ্ধিবৃত্তিক অসততার দরুন একজন লেখক একে শূ’রাক্রেসি বা শূ’রাতন্ত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। অপর চিন্তাটি হচ্ছে কতিপয় মুসলিম এবং ইসলামী আন্দোলন কতৃর্ক কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করার পক্ষে সাফাই গাওয়া। উপরোক্ত আলোচনাটিতে অগ্রসর হওয়ার শুরুতেই আমরা যেসব মূলনীতি উল্লে¬খ করেছি তার আলোকে আমরা যাচাই করবো কোন বাস্তবতায় গণতন্ত্র প্রয়োগযোগ্য, গণতন্ত্রের বাস্তবতা কী এবং শারী’আহ্’তে এমনকোনো বাস্তবতা আছে কিনা যা গণতন্ত্রের বাস্তবতার সাথে সদৃশপূর্ণ।