তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি কী হবে: তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ নাকি ইসলাম?

জন্মলগ থেকেই বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে, কখনও আওয়ামী লীগ কর্তৃক তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, আবার কখনও বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি কর্তৃক অন্যান্য শ্লোগাণের নামে। তথাপিও মহান ইসলামী উম্মাহ্’র অংশ, এদেশের মুসলিমদেরকে বিশ্বব্যাপী ইসলামী জাগরণ হতে বিচ্ছিন্ন রাখা যায়নি। এবং বিশেষ করে, এই শতাব্দীর শুরু থেকে রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ইসলামের পক্ষে গণজোয়ার, ব্যাপক প্রসার ও জনসমর্থন, এবং ইসলামী রাজনৈতিক কর্মকান্ড প্রচন্ড গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে; এবং ইসলামী শাসনের (খিলাফত) দাবী একটি গণদাবীতে পরিণত হয়েছে। যা নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ক্রুসেডার শক্তিসমূহ, মার্কিন ও তার মিত্ররা, এবং তাদের দুর্নীতিগ্রস্ত দালাল শাসকেরা শঙ্কিত; এবং ইসলাম যাতে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না পারে সেজন্য তারা একত্রে কাজ করেছে, ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করাসহ কোনো প্রচেষ্টাই বাদ রাখেনি। তারপরও এই গণজোয়ারকে তারা দাবিয়ে রাখতে পারেনি। বরং ইসলামের অগ্রযাত্রা এবং ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার কাজ সকল বাধা পেরিয়ে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছে। তাই যখন গুলশান হামলা সংঘটিত হলো, তখন ইসলামের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধকে একটি নতুন গতি প্রদান করতে তারা এটাকে বিশাল সুযোগ হিসেবে লুফে নিল।
প্রথমত, তারা ইসলাম এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠার সত্যনিষ্ঠ ইসলামী রাজনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো আরম্ভ করল; ইসলাম এবং ইসলামী শাসনকে চিন্তাশূণ্য হত্যাকান্ড, সহিংসতা এবং আইএসআইএসের সাথে জড়িয়ে – যে কিনা হিংস্রতা ও নৃসংশতায় বিশ্বব্যাপী কুখ্যাতি অর্জন করেছে। শেখ হাসিনা ইসলামের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “তরুণদের ধর্ম দ্বারা মগজধোলাই করা হয়েছে” এবং তার মার্কিন প্রভুরা বাংলাদেশে আইএসআইএসের উপস্থিতি প্রমাণে তাদের প্রচেষ্টায় একধাপ এগিয়ে গেল। অথচ, বাস্তবতা হচ্ছে গুলশান হামলার সঙ্গে ইসলামের ন্যূনতমও কোনো সম্পর্ক নাই এবং এধরনের হামলা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সচেতন রাজনীতিক ও নাগরিক মাত্রই বুঝতে সক্ষম যে, আইএসআইএস সংগঠনটি মার্কিনীদের স্বার্থ ও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে। ইরাককে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বিভক্ত করতে মার্কিনীরা মসুলে তাদের উপস্থিতির সুযোগ করে দিয়েছিল। এবং সিরিয়ায় মার্কিন দালাল কসাই বাশার আল আসাদকে সমর্থন এবং সেখানকার বিদ্রোহী জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে তাদেরকে ব্যবহার করছে। সিরিয়ার জনগণ যখন বাশারকে অপসারণ করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, ঠিক তখনই আইএসআইএসের উত্থান ঘটে; এবং তারপর তারা নিজেদেরকে খিলাফত হিসেবে ঘোষণা দেয়, যদিও তা শারী’আহ্ কর্তৃক গ্রহণযোগ্য কোনো ইসলামী রাষ্ট্র নয়, বরং এটা খিলাফত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, যালিম হাসিনা ও তার সরকার দেশের মুসলিমদের এমনভাবে আতঙ্কিত করা শুরু করে যা নজীরবিহীন। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বাড়ীওয়ালা, ভাড়াটিয়া, ব্যাচেলর, মহিলা এবং উলামাগণসহ পুরো সমাজ তাদের এই ক্রমবর্ধমান যুলুমের লক্ষ্যবস্তু ও শিকারে পরিণত হয়েছে। জনমনে আতঙ্ক তৈরি ও ভীতি সঞ্চার করতে তারা দমনমূলক আইন প্রয়োগ করছে, যাতে এর মাধ্যমে তারা ইসলামী শাসনের দাবীকে দমন করতে পারে, ইসলামী রাজনৈতিক কর্মকান্ড হতে জনগণকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে এবং ইসলামী রাজনৈতিক আহ্বানের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। এবং এই সরকারের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুরা তাদের প্রতি হাসিনার আনুগত্য ও দাসত্ব এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার বিদ্বেষী কর্মকান্ডের সন্তুষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বিভিন্ন পুরষ্কারে ভূষিত করছে, যেমন: এজেন্ট অব চেইঞ্জ।
তৃতীয়ত, তারা ধমনিরপেক্ষতাবাদকে সমাজের মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে এর পক্ষে আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান যুলুমকে জনগণের ঘাড়ের উপর উন্মুক্ত তরবারির মত ধরে রেখে বলা হচ্ছে, “ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে গ্রহণ করো, নতুবা!” সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্র – রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইজিপি, র্যাবের ডিজি এবং বিকিয়ে যাওয়া কিছু বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব…সকলেই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছে, দাবী করছে যে এটাই হচ্ছে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নতির একমাত্র পথ এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে অবশ্যই এই ভিত্তির উপর দৃঢ়ভাবে ধরে রাখতে হবে। এমনকি তারা জনগণের ব্যক্তি জীবনের সঠিক ইসলামী আচার-আচরণের প্রতি চোখ রাঙিয়েছে, যেগুলো তাদের দৃষ্টিতে একজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তির মত নয়। সঠিক আরবী উচ্চারণের সাথে “সালাম” প্রদানকারী ব্যক্তিকে তারা সন্দেহের দৃষ্টিতে রাখতে বলছে। ছেলের গার্লফ্রেন্ড না থাকলে পিতামাতাকে তার কর্মকান্ডের উপর নজর রাখতে বলা হচ্ছে। যারা পূর্বে নামায আদায় ও ইসলাম পালন করতো না কিন্তু হঠাৎ করে নামায আদায় ও ইসলাম পালন শুরু করেছে, তাদের উপর নজর রাখতে বলছে।
أُوْلَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوْا الضَّلاَلَةَ بِالْهُدَى فَمَا رَبِحَتْ تِجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ
“তারাই সে সমস্ত লোক যারা সঠিক পথের বিনিময়ে ভুল পথকে খরিদ করেছে, সুতরাং তারা তাদের এ ব্যবসায় লাভবান হতে পারেনি। এবং তারা হিদায়াত প্রাপ্ত নয়।” [সূরা আল-বাকারাহ : ১৬]
ধমনিরপেক্ষতাবাদ হচ্ছে পশ্চিমা কুফর আদশের (পুঁজিবাদ) বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি (আক্বীদাহ্)। এই মতবাদ রাষ্ট্র ও জীবনের যাবতীয় বিষয়াবলী তথা শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি হতে সকল ধর্মের (ইসলামসহ) পৃথকীকরণের কথা বলে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ অনুযায়ী স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস হচ্ছে একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং এটিকে রাষ্ট্রের বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়া যাবে না। এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল চিন্তা, কারণ হয় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অস্তিত্ব বিদ্যমান অথবা নাই। যদি তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান না থাকে তাহলে তাঁকে ব্যক্তি জীবনেও বিশ্বাস করা সঠিক হবে না। আর যদি তাঁর অস্তিত্ব বিদ্যমান থাকে (যা হচ্ছে একটি ধ্রুব সত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণিত) তাহলে জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তিনিই বিধান প্রদান করবেন, হোক সেটা ব্যক্তিগত কিংবা রাষ্ট্রীয়। এজন্যই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
(أَلاَ لَهُ الْخَلْقُ وَالأَمْرُ)
“নিশ্চয়ই সৃষ্টি করা এবং আদেশ দান করা শুধুমাত্র তাঁর কাজ” [সূরা আল-আ’রাফ : ৫৪]।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা অথচ আইনপ্রণেতা অন্যকেউ, ইসলাম এই চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে,
(إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلَّهِ)
“আল্লাহ ছাড়া আর কারও বিধান দেয়ার ক্ষমতা নেই।” [সূরা ইউসুফ : ৪০]
ইসলামের বক্তব্য হচ্ছে,
(وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالأَرْضِ)
“আর আসমান এবং জমিনের যাবতীয় কর্তৃত্ব শুধু আল্লাহ্’র জন্য” [সূরা আলি-ইমরান : ১৮৯]।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের মত নয় যারা বলে যে, “রাজার যা প্রাপ্য রাজাকে দাও এবং ঈশ্বরের যা প্রাপ্য ঈশ্বরকে দাও।” বরং, রাজা, তার সিংহাসন, তার রাজত্ব এবং এর অন্তর্ভূক্ত সবকিছুই আল্লাহ্’র নিদের্শের আওতাধীন বিষয়। ইসলাম এটা গ্রহণ করে না যে, শুধুমাত্র মসজিদগুলো আল্লাহ্’র জন্য এবং সমগ্র রাষ্ট্র হচ্ছে শেখ হাসিনার জন্য। এটাও গ্রহণ করে না যে, শুধুমাত্র নামায ও রোযা সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আল্লাহ্’র এবং সরকার, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা, ইত্যাদি সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা শেখ হাসিনার। এই ধরনের চিন্তাকে গ্রহণ করা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাথে শরিক করার শামিল,
أَمْ لَهُمْ شُرَكَاءُ شَرَعُوا لَهُمْ مِنَ الدِّينِ مَا لَمْ يَأْذَنْ بِهِ اللَّهُ
“তাদের কি আল্লাহ্’র সাথে এমন কোনো শরিক রয়েছে, যারা তাদের জন্য জীবনব্যবস্থা প্রণয়ন করে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি?” [সূরা আশ-শুরা : ২১]
আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা দাবী করে যে, রাষ্ট্র যদি একটি ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা হবে অন্যান্য ধর্মের লোকদের উপর অত্যাচারের কারণ। ইসলামের ক্ষেত্রে সেই দাবী অপ্রযোজ্য ও ভিত্তিহীন। কারণ, সকল ধর্মের জনগণ ইসলামী শাসনের অধীনে একত্রে বসবাস করেছিল এবং করবে, এবং কাউকে তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি পালনে বাধা প্রদান করা হয়নি এবং হবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন,
اِنَّهُ مَنْ کَانَ عَلَی یَهُودِیَّتِهِ أَوْ نَصْرَانِیَّتِهِ فَاِنَّهُ لَا یُفْتَنُ عَنْهَا
“যে ব্যক্তি ইহুদী ধর্মের উপর রয়েছে এবং যে ব্যক্তি খৃষ্টান ধর্মের উপর রয়েছে, তাদের কাউকেই তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ত্যাগে বাধ্য করা যাবে না।” [আবু উবাইদ. কিতাবুল আমওয়াল]
এবং তিনি (সা:) বলেন,
أَلاَ مَنْ ظَلَمَ مُعَاهِدًا أَوِ انْتَقَصَهُ أَوْ كَلَّفَهُ فَوْقَ طَاقَتِهِ أَوْ أَخَذَ مِنْهُ شَيْئًا بِغَيْرِ طِيبِ نَفْسٍ فَأَنَا حَجِيجُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“যদি কেউ ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত অমুসলিম ব্যক্তির সাথে অন্যায় আচরণ করে অথবা তার কোন অধিকারকে খর্ব করে অথবা তার উপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেয় অথবা সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কোনো কিছু কেড়ে নেয়, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে অবস্থান নিব।” [আবু দাউদ, বায়হাকী]
আর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সমর্থনে তারা সূরা আল-কাফিরূনের “লাকুম দ্বীনুকুম অলিয়াদ্বীন” অর্থাৎ “তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য এবং আমার ধর্ম আমার জন্য” আয়াতকে উদ্ধৃতি করে, কিন্তু এই আয়াতের অর্থ তারা যা দাবী করে তার বিপরীত। তারা বলে বেড়ায় যে, এই আয়াতের অর্থ “ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার” এবং রাষ্ট্র কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর প্রতিষ্ঠিত হবেনা। এই পবিত্র আয়াতের সঠিক অর্থ হচ্ছে, ইসলাম কাফেরদের ধর্ম বিশ্বাস হতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও আলাদা। এই আয়াতটি নাযিল হয় যখন মক্কার গোত্র প্রধানরা ইসলাম এবং তাদের ধর্মের মধ্যে আপোষের প্রস্তাব দেয় তখন কুফরকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান স্বরূপ। তিনি (সা:) তাদের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং ইসলামকে মানবজাতির জন্য একমাত্র সঠিক জীবনব্যবস্থা হিসেবে বিজয়ী করা পযন্ত ইসলামের রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। যেমন তিনি (সা:) বলেছেন,
لو وضعوا الشمس في يميني والقمر في يساري على أن أترك هذا الأمر حتى يظهره الله أو أهلك فيه ما تركته
“আল্লাহ্’র কসম, যদি তারা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দিত যাতে আমি এই কাজকে পরিত্যাগ করি তবুও আমি তা পরিত্যাগ করতাম না যতক্ষণ না আল্লাহ্ এই দ্বীনকে বিজয়ী করেন অথবা আমি একাজ করতে করতে মৃত্যুবরণ করি।” [সীরাতে ইবন হিশাম, সীরাতে ইবন কাছীর, আর-রাহীকুল মাখতূম]
ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সুতরাং এটাকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে কুফর। মুসলিমদের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে বিশ্বাস করা, গ্রহণ করা, এর প্রতি আহ্বান করা, এর প্রচার করা, এর দ্বারা জীবন পরিচালনা করা, এর দ্বারা শাসিত হওয়াকে মেনে নেয়া নিষিদ্ধ। ইসলাম মুসলিমদেরকে তাদের বিষয়াদির বিচার-ফয়সালায় ইসলামী শাসন ব্যতীত অন্যকিছুর অবলম্বন করাকে নিষিদ্ধ করেছে।
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ يَزْعُمُونَ أَنَّهُمْ آمَنُوا بِمَا أُنزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنزِلَ مِنْ قَبْلِكَ يُرِيدُونَ أَنْ يَتَحَاكَمُوا إِلَى الطَّاغُوتِ وَقَدْ أُمِرُوا أَنْ يَكْفُرُوا بِهِ
“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যে, যা আপনার প্রতি এবং যা আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি নাযিল হয়েছে আমরা সে বিষয়ের উপর ঈমান আনলাম, অথচ তারা বিবাদমান বিষয়ে তাগুতের (কুফর শাসনব্যবস্থার বিচারক, শাসক, নেতৃবৃন্দ) শরণাপন্ন হয়, যদিও তাদেরকে তা প্রত্যাখ্যানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” [সূরা আন-নিসা : ৬০]
ইসলাম, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা হিসেবে খিলাফত ব্যবস্থাকে গ্রহণের জন্য মুসলিমদের নির্দেশ প্রদান করেছে। যেমন হাদীসে বর্ণিত আছে,
كَانَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ تَسُوسُهُمُ الأَنْبِيَاءُ كُلَّمَا هَلَكَ نَبِىٌّ خَلَفَهُ نَبِىٌّ وَإِنَّهُ لاَ نَبِىَّ بَعْدِى وَسَتَكُونُ خُلَفَاءُ فَتَكْثُرُ قَالُوا فَمَا تَأْمُرُنَا قَالَ فُوا بِبَيْعَةِ الأَوَّلِ فَالأَوَّلِ
“বনী ইসরাঈলকে যুগে যুগে নবীগণ শাসন করতেন। যখন একজন নবী মৃত্যুবরণ করতেন তখন অন্য নবী তাঁর স্থলাভিষিক্ত হতেন, কিন্তু আমার পরে আর কোনো নবী নেই। শীঘ্রই খলিফাগণ আসবে এবং তারা সংখ্যায় হবে অনেক।” তাঁরা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন তখন আপনি আমাদের কী করতে আদেশ করেন? তিনি (সা:) বললেন, “তোমরা একজনের পর একজনের প্রতি বাই’আত প্রদান করবে...” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]
আমরা আপনাদেরকে আহ্বান জানাচ্ছি, হে মুসলিমগণ! রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে কুফর ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে প্রত্যাখ্যান করুন, এর দ্বারা শাসিত হওয়াকে নীরবে মেনে নিবেন না, বর্তমান সরকারকে অপসারণ করে ইসলামের ভিত্তিতে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করুন, যে রাষ্ট্র আপনাদের সকল বিষয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বিধান অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করবে, আপনাদের জন্য দুনিয়া এবং আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনবে, ইনশা’আল্লাহ।
وَمَنْ أَحْسَنُ مِنْ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ
“এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপনকারীদের জন্য আল্লাহ্ অপেক্ষা উত্তম ফয়সালাকারী কে?” [সূরা আল-মা’য়িদাহ্ : ৫০]
আশুরা শুধুমাত্র শোক আর বিশ্লেষণের জন্য নয়

:: আশুরা শুধুমাত্র শোক আর বিশ্লেষণের জন্য নয়; বরং নব্য ফিরাউন (আমেরিকা) ও মুসলিম ভূমিসমূহে তার সহকারী হামান আর কারুনদের উৎখাত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই দিনের মূল শিক্ষা ::
মহররম মাস এবং বিশেষ করে আশুরার দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য খুবই পবিত্র এবং পাশাপাশি ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপুর্ন। বেশ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার অবতারনা এই মাসেই হয়েছিল যা চিরকাল মুসলিম উম্মাহর জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। আশুরা বলতে আমরা অনেকেই শুধু কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকেই স্মরণ করি কিন্তু এই ঘটনা সম্পর্কে অবগত নই যে এই মহররমেই আল্লাহ সুবহানাওয়াতা’লা মুসা (আ) কে বিজয় দান করেছিলেন অত্যাচারী যালেম ফিরাউনের বিরুদ্ধে। তাই এটি শুধু শোকের মাস নয়, বরং যুলুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংকল্পবদ্ধ হওয়ার মাস। ঐতিহাসিক কারণ ছাড়াও কুরআন এবং সুন্নাহতে এই মাসকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন:
“১২ মাস এর বছরের ভেতর ৪টি হল পবিত্র। ধারাবাহিক তিনটি মাস – যু’ল কা’দা, যু’ল হিজ্জা এবং মহররম, এবং রজব মুদার যেটি জুমাদিল আখির এবং শা’বান এর মাঝখানে অবস্থান করে” [বুখারি # ২৯৫৮]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুরআনে মহররম সহ উপরোক্ত মাসগুলোকে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করে বলেন:
“অতএব তোমরা এই মাসগুলোতে (দ্বীনের বিরুদ্ধাচরণ ও এই মাসগুলোর সম্মানহানি করে এমন কাজ করে) নিজেদের ক্ষতিসাধন করো না” [সুরা তওবাহ: ৩৬]
ইবনে আব্বাস (রা) এই “নিজেদের ক্ষতিসাধন করো না” আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন এই চারটি মাসকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র ঘোষণা করেছেন। তাই এই মাসগুলোতে নিজেদের (আল্লাহর বিরুদ্ধাচার করার মাধ্যমে) ক্ষতি করা হবে খুবই গুরুতর অপরাধ এবং অন্যদিকে ন্যায়ের কাজের সাওয়াবও হবে অনেক বেশী। তাই এই আশুরার দিনে যেমন আমরা রোজা রেখে সাওয়াব হাসিল করার চেষ্টা করছি, ঠিক তেমনি খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফরয কাজে গাফিলতি করে আমরা নিজেদের ক্ষতিসাধন করছি।
আমরা যখন কারবালা প্রান্তরে ইমাম হুসেইন (রা) এর করুণ ঘটনা নিয়ে মর্মাহত হই, আমাদের এই চিন্তা করা উচিৎ কী কারণে আল্লাহর রাসুলের (সা) কলিজার টুকরা হুসেইন (রা) নিজের জীবন বিলিয়ে দিলেন। যেখানে শুধুমাত্র ভুলভাবে খলীফা নিয়োগ দেয়ার কারণে প্রিয় হুসাইন নিজের জীবন আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করে দিলেন সেখানে আমরা আজ ৯০ বছর পার করে দিয়েছি খিলাফত বিহীন অবস্থায়; ভুলভাবে খলীফা নিয়োগ তো পরের বিষয়! খিলাফত যে প্রকৃতপক্ষে মুসলিম উম্মাহর জন্য জীবনমরণ (Life and Death) একটি বিষয় সেটির শিক্ষা আমরা আশুরার দিনে ইমাম হুসেনের আত্মত্যাগ থেকে পাই। খিলাফত যাতে কলুষিত না হতে পারে তার জন্য তিনি শুধু নিজের নয় বরং তার সন্তানকেও আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেছিলেন কিন্তু তারপরও পিছপা হননি। তাই কারবালা আমাদের শিক্ষা দেয় যালিমের শাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে খিলাফতের পক্ষে লড়তে এবং প্রয়োজনে নিজেদের সর্বস্ব উৎসর্গ করতে।
মহররমের এই মাস আমাদের আরও স্মরণ করিয়ে দেয় মুসা (আ) এর সংগ্রাম ফিরাউন ও তার সহকারী হামান-কারুনদের বিরুদ্ধে। তাদের যুলুমের মাত্রা যখন বেড়ে গিয়েছিল এবং তারা যখন নিজেদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ভাবা শুরু করেছিল, ঠিক তখনি মুসা (আ) বনি ইসরায়েলিদের নিয়ে ফিরাউনের শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। ফিরাউন যেভাবে নিজেকে খোদা ভাবতো ঠিক সেভাবে আজকের নব্য-ফেরাউন আমেরিকাও আবির্ভূত হয়েছে যুলুমের খড়গ নিয়ে। আর আমেরিকার হামান-কারুনদের ভেতর রয়েছে মুসলিম ভূমিসমূহের শাসকরা। বাংলাদেশের দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখবো খুনি হাসিনাও আজ দেশকে ধ্বংসের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে এবং তার খোদা আমেরিকার বলে বলীয়ান হয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। তাই মহররম ও আশুরার শিক্ষা এই হওয়া উচিৎ যে আমরা সেই একই পথে হাঁটবো যে পথে মুসা (আ) হেঁটেছিলেন এবং বনী ইসরায়েলকে জুলুমের নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছিলেন। নব্য-ফেরাউনি শাসনব্যবস্থা তথা পুঁজিবাদী গণতন্ত্রকে উৎখাত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মধ্যেই রয়েছে মহররমের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন।
ইসলাম কিভাবে সুশাসন নিশ্চিত করে

“যারা আল্লাহ’কে ছেড়ে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তাদের দৃষ্টান্ত ঐ মাকড়সার ন্যায়, যেটি একটি ঘর বানিয়েছে; এবং নিঃসন্দেহে সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই অধিক দুর্বল। যদি তারা জানত।” [সূরা আনকাবুত : ৪১]
আমরা সকলেই মুসলিম দেশসমূহের এবং অন্যান্য দেশের জনগণের অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছি। বর্তমানে পুরো বিশ্বজুড়ে মুসলিম, অমুসলিম নির্বিশেষে সকলেই যে অবিচারের সম্মুখীন হচ্ছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আর এই অবিচারের ব্যাপকতা অর্থনীতি, শিক্ষা এবং অধিকার হতে শুরু করে অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেও পরিব্যপ্ত হয়েছে।
সমগ্র বিশ্বেই এই ভয়াবহ অবস্থার মাত্রা একইরকম।
জনগণের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তোলার কাজে এই গণতান্ত্রিক ব্যবসা পুরোপুরিভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। মুসলিম হিসেবে আমার এবং আমাদের সকলের আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) যা বলেছেন তা উপলব্ধি করা উচিত:
“এবং আমি আপনার প্রতি কিতাব (কুর’আন) নাযিল করেছি যা প্রত্যেক বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা; যা হেদায়েত, রহমত ও সুসংবাদ মুসলিমদের জন্য।” [সূরা নাহ্ল : ৮৯]
বর্তমানে যখন পশ্চিমা গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদরা ইসলামকে দমনমূলক, হিংস্র এবং সর্বগ্রাসী ব্যবস্থা হিসেবে ক্রমাগত আক্রমণ করে যাচ্ছে, তখন এটা গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা ইসলামকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করব এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করে দেব। এবং, স্পষ্টভাবে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য এই সমস্যার ইসলামী সমাধান, কিংবা এই পরিস্থিতির প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা আবশ্যক।
এসব সমস্যার জন্য প্রদত্ত ইসলামী সমাধানকে আমি সুনির্দিষ্ট মানদন্ডের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করব যা যেকোন সভ্য সমাজের থাকা উচিত:
১. যেকোন সমাজে নেতৃবৃন্দ অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে এবং তারা তাদের সকল কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে।
২. সংবিধানের আনুগত্যকারী সকল রাজনৈতিক দলকে বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার আওতার মধ্যে কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে।
৩. শুধুমাত্র ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব না করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত সকল মানুষের স্বার্থ দেখাশোনা করা।
৪. শাসনকার্যে নিয়োজিত নির্বাহী হতে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হতে হবে যা তাদেরকে বিচারের সম্মুখীন করতে পারবে।
৫. জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ – সক্ষম কিংবা অক্ষম – নির্বিশেষে সকল নাগরিক রাষ্ট্রের অধীনে সমান অধিকার ভোগ করবে।
৬. কোন ব্যক্তি কিংবা দল আইনের উর্দ্ধে নয়।
৭. বিধিবহির্ভূত গ্রেফতার, অন্তরীণ, নির্যাতন এবং অস্বাভাবিক শাস্তি প্রদান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
পশ্চিমা রাজনৈতিক মূল্যবোধসমূহ এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ সার্বজনীন নয় এবং সুশাসনের মানদন্ড পূরণে সেগুলো সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। নিজেদের নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিতের বিষয়ে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতার দম্ভোক্তি করা সাজে না, কারণ বর্তমান বাস্ত্মবতায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই অধিকার লঙ্ঘনের মারাত্মক সব ঘটনাসমূহ ঘটছে, যার মধ্যে রয়েছে নির্যাতন অনুমোদন, হুমকি ও নজরদারির মধ্যে সমাজের মানুষের দিনাতিপাত এবং ভূলুন্ঠিত অধিকার। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকারসমূহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে জালিম শাসকগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।
আসুন, এবার আমরা ইসলামী ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করি।
সর্বপ্রথমে আমি বলতে চাই যে: “সুশাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ সুনির্ধারিত ও বিস্ত্মারিত এবং ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধীনে সেগুলো এককভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।”সুতরাং, ইসলামী ব্যবস্থায় সুশাসন বলতে কী বোঝায়? “এটা সরকারের সুনির্ধারিত কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি শাসনব্যবস্থা যেখানে খলিফা (শাসক) জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী শারী’আহ্ অনুসারে তাদের বিষয়াদি দেখাশোনা করার জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন”।
“যে কারও জন্য এরূপ চিন্তা শুরু করা ভুল হবে যে খিলাফত, কিংবা এখানে আমি যা আলোচনা করছি তা আই.এস.আই.এস-এর মতো দলসমূহ ইসলামী রাষ্ট্র বা দৌলাহ্ ইসলামিয়াহ্’র নামে যা দাবী করছে তা একই বিষয়”, তারা শুধুমাত্র খিলাফত নামটি হাইজ্যাক করেছে এবং তাদের নিজস্ব প্রকল্পের গায়ে সেঁটে দিয়েছে। আর এর সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।
ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার কয়েকটি মৌলিক মূলনীতি রয়েছে; এগুলোর মধ্য হতে দুটি মূলনীতি নিম্নরূপ:
১. শুধুমাত্র ঐশ্বরিক উৎসসমূহ, অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহ, ইজ্মা আস্-সাহাবা (সাহাবীদের ঐক্যমত্য) এবং ক্বিয়াস (তুলনীয় সাদৃশ্য) হতে আইন উদ্ভত হয়ে থাকে।
২. কর্তৃত্ব জনগণের হাতে থাকে।
প্রথম মূলনীতিটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের বিপরীত, আর দ্বিতীয় মূলনীতিটি স্বৈরতন্ত্রের বুনিয়াদী বৈশিষ্ট্যের মূলে আঘাত হানে।
এর অর্থ হচ্ছে যে, জনগণই শাসনের কর্তৃত্ব ধারণ করে এবং তারা শাসকের (খলিফার) সাথে এরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হয় যে শাসক তাদেরকে কুর’আন ও ‘র ভিত্তিতে শাসন করবে, এই চুক্তি বা বাই’আহ্ এটা নির্দেশ করে যে – শাসক যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআন ও সুন্নাহ্ অনুযায়ী জনগণকে শাসন করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে শাসন করতে পারবে। সুতরাং, জনগণের পক্ষ হতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে শাসক নিয়োগ করা হয়।
জনগণের পক্ষ হতে শাসকের প্রতি অবশ্যই সমর্থন থাকতে হবে, নতুবা সে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। সুতরাং, সে নিজেকে জনগণের উপর শাসক হিসেবে চাপিয়ে দিতে পারবে না। খিলাফত রাষ্ট কোন ধরনের ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্র নয় যা ধর্মীয় ক্ষমতাবলে জনসাধারণের উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়।
নিম্নোক্ত সাতটি আলোচ্য বিষয়ের ভিত্তিতে ইসলামী ব্যবস্থার সুশাসনকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে :
১. যেকোন সমাজে নেতৃবৃন্দ অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে এবং তারা তাদের সকল কাজের জন্য জবাবদিহিতার সম্মুখীন হবে
ইসলামী রাষ্ট্রে একটি উম্মুক্ত ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয় এবং তিনি তার সকল কাজের জন্য সরাসরি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন।
কিভাবে এই জবাবদিহিতা বজায় থাকবে?
একটি স্পন্দনশীল জাগ্রত সমাজ ও রাজনৈতিক দল, স্বাধীন আদালতসহ শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানসমূহের উপস্থিতি এবং সুদৃঢ় মূল্যবোধসমূহের মাধ্যমে এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়।
সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের (আমর বিল্ মা’রুফ্ ওয়া নাহি আনিল মুন্কার) বিষয়ে অনেকগুলো প্রসিদ্ধ ইসলামী দলিল রয়েছে যেগুলোতে শাসককে জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা বিদ্যমান।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তাঁর কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ, হয় তুমি সৎকাজের আদেশ কর এবং অসৎকাজের নিষেধ কর, নতুবা শীঘ্রই আল্লাহ (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) নিশ্চিতভাবেই তোমার উপর শাস্তি পাঠাবেন। তখন তুমি মিনতি করবে, কিন্তু তা গ্রহণ করা হবে না।” (আত-তিরমিযী)
খিলাফত রাষ্ট্রে ‘অন্যায় কাজের আদালত (মাহ্কামাত্ উল্ মাযালিম)’ নামে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থাকবে, যেটি রাষ্ট্রের প্রধান, তার সহকারী কিংবা প্রাদেশিক গভর্ণরদের বিরুদ্ধে আনীত যেকোন অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি, এই আদালত শাসনকার্য নির্বাহীদের যেকোন সিদ্ধান্ত নিজ উদ্যোগে তদন্ত করে দেখার অধিকার সংরক্ষণ করে, যদিওবা কোন ব্যক্তি সে বিষয়ে কোন অভিযোগ দাখিল না করে থাকে।
২. সংবিধানের আনুগত্যকারী সকল রাজনৈতিক দলকে বিধিবদ্ধ ব্যবস্থার আওতার মধ্যে কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে
অনেক মানুষই সৌদি ও ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ মনে করে। কিন্তু, আমাদের বুঝতে হবে যে এই দুটি দেশ ইসলামী রাষ্ট্র নয়, শুধুমাত্র তাদের জনগণ হচ্ছে মুসলিম। সৌদিতে রাজতন্ত্র এবং ইরানে সমন্বিতভাবে কপট-ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও দিব্যতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যমান।
বেশিরভাগ রাষ্ট্রের মতো ইসলামী শাসন কাঠামোও নির্দেশ করে যে, রাষ্ট্রের একটি লিখিত সংবিধান থাকা উচিত যা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করবে এবং সেটার আলোকেই ব্যক্তিদেরকে এবং রাজনৈতিক দলসমূহকে সাংবিধানিক গঠনপ্রণালী অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হবে। কিন্তু, ইসলামী সংবিধান অবশ্যই মুক্তবাজার পুঁজিবাদ ও সামাজিক উদারনীতি প্রচারকারী অন্যান্য সংবিধান হতে ভিন্ন হবে। যাহোক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের সংবিধানসমূহও (লিখিত কিংবা উহ্য) প্রতিটি ব্যক্তি ও দলকে একই রাজনৈতিক নিয়ম ও ব্যবস্থার মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে বাধ্য করে থাকে, এই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামী ব্যবস্থা ভিন্ন নয়।
কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে যে- পশ্চিমা দেশসমূহে কি রাজনৈতিক দলসমূহ ও জনগণ তাদের সরকারকে জবাবদিহি করতে পারে না? এর উত্তর একইসঙ্গে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ দুটোই। পশ্চিমা দেশসমূহের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যাবে যে, ৯/১১-এর ঘটনার পরে যেসব ব্যক্তি তাদের মৌলিক চিন্ত্মাসমূহকে চ্যালেঞ্জ করা শুরম্ন করেছে সেসব মানুষের প্রতি বৃহত্তর পরিসরে অসহনশীলতা প্রদর্শন করা হচ্ছে। এডওয়াড স্নোডেন ও জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ-এর মতো কেউ যখনই দমনমূলক আইনের বিপক্ষে মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছে তখন তার প্রতি আমেরিকার সরকার কিরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা লক্ষ্য করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শাসকদেরকে এবং তাদের নেয়া সিদ্ধান্তের জবাবদিহি করাকে শুধুমাত্র উৎসাহ প্রদান করা হয়নি, বরং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কুর’আনে আল্লাহ (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“তোমাদের মাঝে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে এবং সৎ কাজের নির্দেশ দিবে আর অসৎ কাজে নিষেধ করবে এবং এরাই সফলকাম।” [সূরা আলি ইমরান : ১০৪],
এর অর্থ হচ্ছে যে – উম্মাহ্’র মধ্যে এমন দল থাকতে হবে যেটি শাসককে জবাবদিহি করবে। আমরা এটাও জানি যে, ইসলামের ইতিহাসে শাসককে জবাবদিহিতার, বিতর্কের এবং আলোচনার দীর্ঘ বিবরণী রয়েছে।
সুলাইমান বিন্ আব্দুল মালিক-এর শিবিরে একজন আরব বেদুঈন প্রবেশ করেছিল এবং বলেছিল: “হে আমীরুল মু’মিনিন, আমি আপনার সাথে এমনভাবে কথা বলতে যাচ্ছি যা আপনি অপছন্দ করা সত্ত্বেও সহ্য করুন, কারণ যদি আপনি এটা গ্রহণ করেন তবে আমার এই কথার মধ্যে এমন কিছু আছে যা আপনি পছন্দ করবেন। তখন তিনি বলেছিলেন:। অতঃপর সে বলেছিল: “বল”
“হে বিশ্বাসীদের আমির, এমন সব ব্যক্তি দ্বারা আপনি পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন যারা আখিরাতের বিনিময়ে দুনিয়াকে ক্রয় করেছে এবং তাদের রব ক্রোধের বিনিময়ে আপনার সন্তুষ্টি কিনেছে, তারা আল্লাহ্র (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) চেয়ে আপনাকে বেশি ভয় করে, তারা তাদের আখিরাতকে ধ্বংস করেছে ও দুনিয়াকে সাজিয়েছে এবং তারা আখিরাতের সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং দুনিয়ার সাথে শান্তি স্থাপন করেছে। সুতরাং, আল্লাহ্ (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) আপনার উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা দিয়ে তাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করবেন না, কারণ তারা বিশ্বাসের অমর্যাদা করবে এবং উম্মাহ্কে অধঃপতিত না করে থামবে না। এর কারণ হল, তাদের অপরাধের জন্য আপনি দায়ী এবং তারা আপনার অপরাধের জন্য দায়ী নয়। সুতরাং, আপনার নিজের আখিরাত ধ্বংস করে তাদের দুনিয়াকে সুন্দর বানাবেন না, কারণ মানুষের মধ্য হতে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে অন্যায় কাজ করে যে অপরের দুনিয়ার জন্য নিজের আখিরাতকে বিক্রি করে।”
সুলায়মান বলেছিলেন: “তোমাকে আমি বলতে চাই যে, তুমি তোমার জবানকে মুক্ত করে দিয়েছ এবং তোমার জবান তোমার তলোয়ারের চেয়ে অধিক ধারালো”। সে উত্তরে বলেছিল: “জ্বী আমিরুল মু’মিনিন, কিন্তু আমার এই জবান আপনার পক্ষে, বিপক্ষে নয়।” অতঃপর সুলায়মান জিজ্ঞেস করেছিলেন: “এ বিষয়ে তোমার নিজের জন্য চাওয়ার মতো কোন কিছু আছে কি?” সে উত্তরে বলেছিল: “সকলের জন্য বরাদ্দকৃত সাধারণ সুযোগ-সুবিধা ব্যতিরেকে আমি নিজের জন্য আলাদা করে কিছুই চাই না।” এরপর সে উঠে দাঁড়ালো এবং চলে গেল।
অতঃপর সুলাইমান বলেছিলেন: “এই ব্যক্তির পছন্দের জন্য সকল মহিমা আল্লাহ্’র (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা), তার প্রকৃতি কতই না সম্মানজনক এবং তার হৃদয় কতই না পরিপূর্ণ, তার জবান কতই না তীক্ষ্ন এবং তার উদ্দেশ্য কতই না পবিত্র, এবং তার আত্মা কতই না চমৎকার!!”
৩. শুধুমাত্র ক্ষুদ্র অভিজাত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব না করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের উচিত সকল মানুষের স্বার্থ দেখাশোনা করা
দুনীতি সৃষ্টিতে, সামাজিক মূল্যবোধসমূহের অধঃপতনে এবং বৈশিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীনতায় পশ্চিমা অথ ও রাজনীতির মিশণ বিশাল ভূমিকা রেখেছে, কারণ সমগ্র বিশ্বজুড়েই সম্পদের দখল নিয়ে অব্যাহতভাবে যুদ্ধ চলছে।
ইসলামী ব্যবস্থা রাজনীতি হতে অর্থকে অপসারণ করে।
এবার নির্বাচনসমূহের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রতি চার বা পাঁচ বছরে (যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই বছরে ‘হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভ’ নির্বাচনে) রাজনীতিতে অর্থের অধিকতর ব্যবহারকে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের বিপুল পরিমাণ তহবিল সংগ্রহ করতে বাধ্য করে, যাতে করে তারা পুনঃনির্বাচিত হতে পারে কিংবা ক্ষমতা হারানোর পূর্বে নিজেদের সম্পদ যত বেশি সম্ভব বাড়িয়ে নিতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১২ সালের নির্বাচনে ওবামার নির্বাচনী প্রচারণায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছিল, যার অধিকাংশই কর্পোরেট হাউজ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসমূহ জুগিয়েছিল। ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার একটি বিশাল অংকের অর্থ। বিশ্বে দশটি দেশ রয়েছে যাদের বার্ষিক জিডিপি ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা তার চেয়ে কম।
অন্যদিকে, যদিওবা ইসলামী ব্যবস্থার অধীনে প্রত্যেকটি মানুষই যে সকল ধরনের প্রলোভন হতে মুক্ত হবে তা নয়, তবে এধরনের পুনঃপুনঃ নির্বাচনী রঙ্গভূমি এড়ানোর মাধ্যমে রাজনীতি হতে অর্থ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ সক্রিয়ভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়।
এছাড়াও, প্রগতিপন্থী পশ্চিমা দেশসমূহে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র একীভূত হয়ে আছে এবং রাজনীতিবিদদের একটি শ্রেণী তৈরী হয়েছে, যারা হয় ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিগ্রস্থ কিংবা ব্যবসায়িক শ্রেণীর সাথে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ। আর, ইসলামের রাজনৈতিক আদর্শে এ ধরনের কোন প্রভাব অনুমোদিত নয় এবং এতে সম্পর্কসমূহ ও প্রভাবের চারপাশে শক্ত বিধিনিষেধ আরোপিত হয়।
ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বৃহৎ ব্যবসার চেয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যাকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়।
এর পাশাপাশি, শাসন করার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনকারী যেকোন ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে খলিফাকে তার পদে দায়িত্ব পালনের জন্য অনুমতি দেয়া হবে না, কিংবা তাকে তার পদ হতে অপসারণ করা হবে।
৪. শাসনকার্যে নিয়োজিত নির্বাহী হতে বিচার ব্যবস্থা স্বাধীন হতে হবে যা নির্বাহীগণকে বিচারের সম্মুখীন করতে পারবে
বিচারকবৃন্দ ও আদালতসমূহ রাষ্ট্রপ্রধান ও শাসনকার্যে নিয়োজিত নির্বাহীগণ হতে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীন হবে এবং তারা খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে। সেইসাথে, কোন নির্বাহীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট বিচারককে ততক্ষণ পর্যন্ত বরখাস্ত করা যাবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তদন্ত সমাপ্ত হয়।
৫. কোন ব্যক্তি কিংবা দল আইনের উর্দ্ধে নয়
রাষ্ট্রপ্রধান, তাদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ কিংবা কোন ধর্মীয় পন্ডিত – কেউই আইনের উর্দ্ধে নয়। কেউ দায়মুক্ত নয়, এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যেখানে ক্ষমতাশালী ও বিত্তবানদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার অন্ধ, সেখানে ঐতিহাসিকভাবে ইসলামী আদালতসমূহ দুর্বল, সংখ্যালঘু ও কম বিত্তবানদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।
এর কারণ ছিল মুসলিম ও বোখারী শরীফে উলেখিত রাসূলুলাহ (সাঃ)-এর হাদিস, যেখানে চুরির অপরাধে অভিযুক্ত একজন অভিজাত মহিলার মামলায় মধ্যস্থতা করে দেয়ার জন্য তাঁর (সা.) নিকট আবেদন জানানো হয়েছিল, তিনি (সা.) বলেছিলেন:
“তোমাদের পূর্বে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে, কারণ যখন কোন অভিজাত ব্যক্তি চুরি করত তখন তারা তাকে মুক্ত করে দিত, কিন্তু যদি কোন দুর্বল ব্যক্তি চুরি করত তবে তারা তার উপর আইনসঙ্গত শাস্তি কার্যকর করতো। আল্লাহ্’র শপথ, যদি মুহাম্মদের (সা.) কন্যা ফাতিমাও চুরি করতো তবে মুহাম্মদ (সা.) তার হস্ত কর্তন করতো!”
৬. জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ – সক্ষম কিংবা অক্ষম – নির্বিশেষে সকল নাগরিক রাষ্ট্রের অধীনে সমান অধিকার ভোগ করবে
ইসলাম কোন নাগরিককে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা অক্ষমতার ভিত্তিতে কোন ধরনের বৈষম্য করে না এবং মুসলিমরা কোন ধরনের বিশেষ সুবিধা ভোগ করে না। এক্ষেত্রে এটি একটি সাধারণ অভিযোগ যার কোন ভিত্তি নেই। খিলাফত রাষ্ট্র ঐশ্বরিক বিধান অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে সকল অমুসলিম নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করে থাকে। খিলাফত রাষ্ট্র তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসমূহের এবং তাদের উপসনালয়সমূহের সুরক্ষা দিয়ে থাকে। আইন, বিচার এবং বিভিন্ন বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা, কিংবা এ ধরনের কোন কিছুর ক্ষেত্রে নাগরিকদের মধ্যে কোন ধরনের বৈষম্য করা রাষ্ট্রের জন্য নিষিদ্ধ। বরং, প্রত্যেক নাগরিকের সাথে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমান আচরণ করা হয়।
আলাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“আর যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে” (সূরা নিসা: ৫৮),
এবং তিনি (সুব্হানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:
“এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রম্নতা যেন তোমাদের কখনও ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার কর, এটাই তাক্বওয়ার নিকটতর।” (সূরা মায়িদাহ: ৮)
এছাড়াও, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন:
“যে অন্যায়ভাবে একজন চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিকে হত্যা করে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না; আর জান্নাতের সুগন্ধ একশত বৎসর হাঁটার দূরত্ব থেকেও পাওয়া যায়।” (তিরমিযি)
ইহুদী ও খ্রিষ্টানদেরকে সুরক্ষা প্রদানের বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত এবং এর উদাহরণ হচ্ছে ইসলামী স্পেন; এছাড়াও ইস্তাম্বুল কর্তৃক ইহুদীদেরকে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল, যা তদন্ত চলাকালীন সময়ে লিখিত নথি হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
ইসলামী শাসনামলের প্রাথমিক যুগের একটি বিখ্যাত মামলায় একজন অমুসলিম তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধানকে একটি সম্পত্তির ব্যাপারে আদালতে নিয়ে যায় এবং সে মামলাটিতে জয়লাভ করে।
যেকোন বিশ্বাসে বিশ্বাসী অমুসলিমদের (কিংবা অবিশ্বাসী) জন্য ইসলামী ব্যবস্থার মধ্যে ভীতিকর কিছু নেই, বরং অনেক ব্যক্তিই প্রত্যক্ষ করছে যে পশ্চিমা সমাজসমূহ ক্রমবর্ধমান হারে বস্তুবাদ ও রাজনৈতিক দুর্নীতির পঙ্কিলতায় ডুবে যাচ্ছে, আর এসব ব্যক্তিরা এর বিকল্প হিসেবে ইসলামী আদশ সম্পকে জেনে অবাক হতে পারে।
৭. বিধিবহির্ভুত গ্রেফতার, অন্তরীণ, নির্যাতন এবং অস্বাভাবিক শাস্তি প্রদান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ
ইসলাম বিধিবহির্ভূত গ্রেফতার কিংবা নির্যাতন করায়, অথবা অস্বাভাবাবিক শাস্তি প্রদান বা অন্তরীণ রাখায় বিশ্বাস করে না। প্রত্যেক ব্যক্তির এই অধিকার রয়েছে যে তাকে নিরপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং এর সাথে সাথে তার নিজস্ব গোপনীয়তা রক্ষার ও ন্যায়বিচার পাবার অধিকার রয়েছে। জনসাধারণের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রের একক কোন আধিপত্য নেই।
দ্বিতীয় খলিফা সাইয়্যিদিনা উমর (রা.)-এর একটি ঘটনা ইতিহাসে পাওয়া যায়: “একদিন হোমস্ শহরের আমিল (শহরের মেয়র) উমায়ের ইবনু সাদ্ সম্পর্কে একটি খবর তাঁর (রা.) নিকট পৌঁছায়। উমায়ের ইবনু সাদ্ হোমস্ শহরের অধিবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন: “যতদিন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী থাকবে ততদিন পর্যন্ত্ম ইসলাম শক্তিশালী থাকবে এবং কর্তৃপক্ষের শক্তি তলোয়ার দিয়ে হত্যা কিংবা চাবুকের আঘাতের মাধ্যমে আসে না, বরং সততার সহিত বিচারের মাধ্যমে ও ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী হয়ে থাকে”। এটা শুনে উমর (রা.) বলেছিলেন:
“মুসলিমদের বিষয়াদি দেখাশোনা করার কাজে আমাকে সহযোগিতা করার জন্য উমায়ের ইবনু সাদ্-এর মতো একজন মানুষ যদি আমার সাথে থাকত”।
মুসলিম বিশ্বে এবং পশ্চিমা দেশগুলোতে গুপ্তচরবৃত্তি মহামারির আকার ধারন করেছে।
ইসলাম রাষ্টকে তার নাগরিকদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করাকে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কর্তৃক নাযিলকৃত আয়াতের মাধ্যমে মুসলিমদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করাকে হারাম করা হয়েছে: “এবং তোমরা একে অপরের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করো না” (সূরা হুজুরাত: ১২)। গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়ে এটি একটি সাধারণ নিষেধাজ্ঞা…… এটা আল-মুকদাদ্ এবং আবু উমামা হতে বর্ণিত হাদিস দ্বারা নিশ্চিত হয়েছে যা আহ্মদ ও আবু দাউদ উভয়ে উল্লেখ করেছেন। বর্ণনাটিতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন: “আমির যদি লোকদের মধ্যে সন্দেহের অনুসন্ধান করে তবে সে তাদের অধঃপতিত করতে পারে” (আবু দাউদ, সুনান #৪৮৮৯ এবং আল-হাইসামি, মাযমা’ আল যাওয়া’ইদ্, খন্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ২১৮)।
এছাড়াও, ইসলামে নির্যাতন ও অবমাননাকর আচরণের উপর সাংবিধানিকভাবেই পরিষ্কার নিষেধাজ্ঞা রয়েছে যা সাধারণ জনগণের সাথে সাথে পুলিশ বাহিনী, সামরিক বাহিনী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপরেও প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে হুকুমটি হচ্ছে: “প্রাথমিকভাবে প্রতিটি ব্যক্তি নির্দোষ হিসেবে বিবেচিত হবে। আদালতের রায় ব্যতিত কোন ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া যাবে না। কাউকে নির্যাতন করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ; এবং যে নির্যাতন করবে তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে।”
সবশেষে, ইসলামী শাসনব্যবস্থা হচ্ছে অপরিবর্তনীয়, তুলনাহীন, কার্যকর এবং এটাতে এমন একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো বিদ্যমান যাতে সুশাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ ঐশ্বরিক উৎসের ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে এবং এটাই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যা মানবজাতির জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
আবু খালেদ আল-হিজাজী
গুলশান ৭৯ নম্বর – “আদর্শিক ফোড়া”র শিকার বাংলাদেশ”

গুলশান ৭৯ নম্বর রোডের ক্যাফেতে রক্তের বন্যা বয়ে গেল। এর আগে যা যা নিয়ে লিখেছি, এই ঘটনা তারই চলমান প্রবাহ মাত্র। কিছুদিন আগেই আদর্শিক যুদ্ধের (Ideological Conflict) পুণরাবির্ভাব নিয়ে লিখেছিলাম ( http://goo.gl/hKkyOd ), যেখানে বলেছিলাম যে পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তাবিদ এবং ভূরাজনীতি বিশারদরা কিভাবে চিন্তা করছেন সামনের দিনগুলি নিয়ে। তারা সামনের দিনগুলিতে বিশ্বের Balance of Power-এ ব্যাপক পরিবর্তনের আশংকা করছেন বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তথা পশ্চিমা বিশ্বকে ‘উদ্ভট’ সব কৌশল অবলম্বন করার উপদেশ দিচ্ছেন। ‘উদ্ভট’ বলছি আসলে সেগুলি উদ্ভট বলে নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছে সেগুলি উদ্ভট ঠেকবে সেজন্যে। যেমন – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুখে অন্য কথা বললেও দুনিয়ার উল্লেখযোগ্য কিছু স্থানে সে আসলে স্থিতিশীলতা চায় না। স্থিতিশীলতা হচ্ছে একটা শক্তিশালী জাতি গড়ে ওঠার পূর্বশর্ত। স্থিতিশীল জাতিই চিন্তা করে ঠান্ডা মাথায় নিজেদের চিন্তার বিকাশের পথে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিন্তু সেই জাতি যদি অবাঞ্ছিত কোন কাজে ব্যস্ত থাকে, তাহলে সে চিন্তা করার সময়ও পাবে না এবং তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ভিত্তিগুলিও হবে দুর্বল। এই প্রেক্ষাপটেই আজকে গুলশান ৭৯ নম্বর রোডের ঘটনার মূল্যায়ন করা চেষ্টা করবো।
.গুলশান ৭৯ নম্বর – প্রাসঙ্গিক আলোচনা
.গুলশানের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কিছু কথা বলতেই হয়। তবে সবকিছু প্রাসঙ্গিক নয় বিধায় সবকিছু নিয়ে কথা বলবো না। আর circumstantial evidence নিয়ে এখানে বেশি কথা বলতে চাই না, কারণ এগুলি manipulate করা সম্ভব। যেসব ব্যাপার ভূরাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে, শুধু সেসব ব্যাপার নিয়েই কথা বলবো।
প্রথমতঃ এটা বুঝতে বাকি থাকে না যে এই অপারেশনে “বিদেশী” হওয়াটাই টার্গেট হবার মূল শর্ত ছিল। বিভিন্ন জাতীয়তার মানুষ হত্যা হওয়াটা সেটাই প্রমাণ করে। এখানে বিশেষ কোন শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করা বা বিশ্বের সকল সমস্যার মূল বলে ধমকি দেবার মতো কোন রাজনৈতিক মেসেজ ছিল না। অর্থাৎ আক্রমণটা বিশ্ব-নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে ছিল না।
দ্বিতীয়তঃ এক ঘন্টার মাঝে অপারেশন শেষ করে না ফেলে একটা জিম্মি সিচুয়েশনের অবতারণা করে সেটাকে ১০ ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখার কি মানে দাঁড়ায়? কেউ কেউ কথা তুলবেন যে আইন-শৃংখলা বাহিনী ১০ ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখেছে। কিন্তু যে প্রশ্ন কেউ করবে না তা হলো, জিম্মিকারীদের কি খেয়ে কাজ ছিল না যে ১০ ঘন্টা বসে থাকবে? তারা যদি জানতোই যে তারা মারা পড়বে, তাহলে ১০ ঘন্টা ওখানে বসে ঘুমিয়ে তাদের লাভ কি ছিল? যদি সবাইকে মেরেই ফেলা হবে, তাহলে এত ঘন্টা ঝুলিয়ে রেখে কিছু লোকের মুখে কথা তুলে দেয়া কেন? কিছু সমালোচক এখন কি করলে কি হতে পারতো, বা কখন কি করা উচিত ছিল, বা কোনটা করা ঠিক হয়নি, এগুলি নিয়ে কথা বলার সুযোগ তৈরি করা কেন? এক্ষেত্রে কথা বলার সুযোগ নিয়ে কে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ পাচ্ছে? জিম্মিকারীরা সেই চাপ সৃষ্টিকারীদের পক্ষেই কাজ করেছে।
তৃতীয়তঃ বাংলাদেশ কোন পর্যটন কেন্দ্র নয়। এদেশে যে বিদেশীরা আসে, তার ৯০%-এরও বেশি আসে কাজ করতে। বিদেশীরা এদেশে আসেন বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের জন্যে। কাজের ফাঁকে এরা দেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে আসে। যদি এদেশে বিদেশীদের উপরে হামলা হয়, তাহলে এদেশের পর্যটন শিল্পের কিছু হবে না, বরং অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হত্যাকান্ডের শিকার জাপানিরা মেট্রো-রেল প্রজেক্টে কাজ করছিলেন আর ইটালিয়ানরা গার্মেন্টস ব্যবসায়ে ছিলেন; অর্থাৎ সকলেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এখানে এসেছিলেন। আরও নয়জন তাবেলা আর আরও সাতজন কুনিওকে হত্যা করা কেন? এই দু’টি দেশতো যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে’ প্রথম সারির অংশগ্রহণকারী দেশ নয়। তাহলে এই দেশগুলিকে কেন টার্গেট করা? ইটালিয়ান এবং জাপানিরা তো অর্থনৈতিক কাজে এখানে আসে। এদের হত্যার মাধ্যমে এদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য কি? কি হাসিল হবে এতে?
.চতুর্থতঃ বাংলাদেশ তথা ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার একটা প্রয়াস মনে হতে পারে এটা। “আল্লাহু আকবার” কথাটাকে কলুষিত করে বেসামরিক বিদেশী হত্যা করে ইসলামকে বাজে ভাবে বাকি বিশ্বের সন্মুখে তুলে ধরার একটা ব্যর্থ প্রয়াস এটা। পশ্চিমা বিশ্বের মানুষই যেখানে প্রতিদিন ইসলামের মাঝে তাদের জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়ে ইসলামকে আলিঙ্গন করছে, সেখানে এধরনের কার্যকলাপের মাধ্যমে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো hawk-দের আকৃষ্ট করা ছাড়া আর কি অর্জন করা সম্ভব? ইসলামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চেষ্টা নয়, বরং পশ্চিমের hawk-দের মুখে কথা তুলে দেয়াটাই এর মূল উদ্দেশ্য। আর এর সাথে সাথে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ওইসব hawk-দের এজেন্টরা সক্রিয় হবে।
.বাংলাদেশের উপরে চাপ সৃষ্টির রেসিপি…
.লম্বা সময়ে ওখানে বসে থাকার জন্যে পশ্চিমের এজেন্টরা এখন সুযোগ পাবে এই অপারেশনের সমস্যাগুলির কথা বলে একটা বিভেদ সৃষ্টি করার। আর একইসাথে এদেশে অর্থনৈতিক কাজে আসা বিদেশীদের টার্গেট করে দেশের অর্থনীতির উপরে চাপ সৃষ্টি করে কিছু শর্ত চাপানোর কাজ চলবে। ঠিক যেমনটি ছয় মাস আগেই হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট এবং ফুটবল দলের ট্যুর নিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি করে। এবং বিমানে পণ্য রপ্তানির উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিশেষ শর্তগুলি চাপানোর কাজ না হবে, ততক্ষণ চাপ অব্যাহত থাকবে।
.এখানে প্রকৃতপক্ষে রেস্টুরেন্টের মানুষগুলিকে জিম্মি করা হয়নি, বরং পশ্চিমের হাতে বাংলাদেশকে জিম্মি করার পথ তৈরি করা হয়েছে। পশ্চিমারা বাংলাদেশের উপরে চাপ সৃষ্টি করে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করবে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, কূটনৈতিক, নিরাপত্তা, ইত্যাদি ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করাটাই তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। মূল উদ্দেশ্য হলো আদর্শিক, যেটা বাস্তবায়নের জন্যেই বরং এই চাপ সৃষ্টি করা।
.যাদের নাম দিয়ে এসব কর্মকান্ড চালানো হচ্ছে তারা যে প্রকৃতপক্ষে অন্য কারো সৃষ্টি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো এদের পক্ষে বর্তমান বিশ্বের কোন সমস্যার সমাধানই দেয়া সম্ভব নয়। ইসলাম কি করে বিশ্বের নেতৃত্ব দেবার ক্ষমতা রাখে, তা তাদের জানা নেই। তাদেরকে যদি আমরা জিজ্ঞেস করি যে বিশ্বের অর্থনৈতিক সমস্যার কি করে সমাধান করবেন? সবার জন্যে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন কি করে? অথবা মার্কিন ডলার বা বিশ্ব ব্যাংককে কি করে মোকাবিলা করবেন? আন্তর্জাতিক আইন বা সমুদ্র আইন বা আকাশপথ ব্যবহারের আইনের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেবেন? অথবা বিশ্বকূটনীতি কোন ভিত্তির উপরে চলবে? ইত্যাদি কোন প্রশ্নেরই উত্তর তাদের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। পশ্চিমা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যে এদের তৈরি করা হয়নি; তাই এদের কাছে কোন সমস্যারই সমাধান নেই। এদের তৈরি করা হচ্ছে ধর্মান্ধ হিসেবে; আদর্শিক চিন্তার অনুসারী হিসেবে নয়। ইসলাম যে একটা আদর্শ, সেটাই এদের কাছে কোনদিন পরিষ্কার করা হবে না। কারণ সেটা হলে তো গেম নষ্ট হয়ে যাবে; সেম-সাইড গোল হবে!
.আদর্শিক শক্তির কার্যকলাপ বোঝার সময় হয়েছে
.যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব আদর্শিক দিক থেকে চিন্তা করে। তারা তাদের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করতে সবকিছু করে এবং করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চায় না পৃথিবীর কোথাও তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি হোক। যেখানেই সেই প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শের গন্ধ সে পাবে, সেখানেই সে ঝামেলার সৃষ্টি করবে। ‘জঙ্গী-জঙ্গী’ খেলাটাও এই আদর্শিক যুদ্ধেরই অংশ। এর মাধ্যমে চ্যালেঞ্জার আদর্শকে খারাপভাবে উপস্থাপনের চেষ্টাই শুধু করা হয়না, একইসাথে সেই আদর্শের রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া নষ্ট করা হয়। একটা ভুল আদর্শকে would-be রিক্রুটদের কাছে তুলে ধরা হয়, যাতে তারা সঠিক রাস্তা থেকে সরে আসে। আর একইসাথে ওই বেঠিক রাস্তায় গমনকারীদের ধ্বংস করার জন্যে ওই দেশের মানুষকেই ট্রেনিং দেয়া হয়, টাকাপয়সা দেয়া হয়, অস্ত্রসস্ত্র দেয়া হয়। আক্রান্ত দেশ এসব কাজে এতটাই ব্যস্ত থাকবে যে অন্য কোন কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা হারাবে। আর চাপের মুখে তাদেরকে পশ্চিমাদের হাত ধরে সাহায্য চাইতে বাধ্য করা হবে। এই কাহিনী কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নয়। এগুলি মার্কিনীরা ঠান্ডা যুদ্ধের সময় দেশে দেশে করেছে; এদেশেও করেছে। আবারও করতে যাচ্ছে।
১৯৭০-এর দশকে এই দেশে একটা বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করা হয়, যারা কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িত হতে যাওয়া (would-be communist) শিক্ষিত এবং মেধাবী তরুণদের দলে ভেড়াতো। এরা নিজেদের বাম বলে দাবি করলেও এরা আসলে কমিউনিজমের আদর্শকে অন্য দিকে নেওয়ার চেষ্টায় ছিল, যে দিকে গেলে কমিউনিজমের উদ্দেশ্য সফল হবে না। তারা এক সশস্ত্র সংগ্রামে এই তরুণদের জড়িত করেছিল, যেই সংগ্রামের প্রকৃতপক্ষে কোন উদ্দেশ্য আজ অবধি কেউ বের করতে পারেনি। কোন নির্দিষ্ট প্ল্যান ছাড়াই এরা বছরের পর বছর সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়। এই সশস্ত্র সংগ্রামকে প্রতিরোধ করতে বিশেষ বাহিনীও তৈরি করা হয়, যেটাতে পশ্চিমাদের ছায়া সমর্থন ছিল। অর্থাৎ সংঘাতের উভয় পক্ষেই পশ্চিমাদের ইন্ধন ছিল। এভাবে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণদেরকে আলাদা করে ফায়ারিং স্কোয়াডে নেবার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী আদর্শ কমিউনিজমকে ঠেকানো যায়। হাজার হাজার তরুনকে এভাবে বলি দেয়া হয়।
.১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে পশ্চিমাদের আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বী যে ইসলাম তা এখন মোটামুটি সবাই বুঝতে পারছেন। মুসলিম দেশগুলির জনসংখ্যা বৃদ্ধি যে পশ্চিমা আদর্শের প্রতি হুমকিস্বরূপ, তা এর আগেও লিখেছি। বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার বাইপ্রোডাক্ট হচ্ছে বিরাট সংখ্যক তরুণ (প্রধানতঃ ১৫ থেকে ২৪ বছর), যারা কিনা যেকোন আন্দোলনে সামনে থাকে, কারণ তাদের রক্ত গরম এবং কর্মশক্তি প্রচুর। যেহেতু জনগণকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের একটা প্রসেসের মাঝ দিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাই এটা তাদের জানা ছিল যে কিছুকাল পরেই মুসলিম সমাজে তরুণদের সংখ্যা কমতে থাকবে। তখন সেই জাতি আস্তে আস্তে পশ্চিমাদের হুমকি হিসেবে থাকবে না। সেই সময়টা পার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই আদর্শিক দ্বন্দ্ব লাগিয়ে রেখে জেনারেশনটা নষ্ট করাই উদ্দেশ্য।
এ এক “আদর্শিক ফোড়া” মাত্র
জঙ্গীবাদ বা এধরনের কার্যকলাপ হলো “আদর্শিক ফোড়া” (Ideological Furuncle)। আইসিস-ও এই একই ফোড়ার অংশ। এক আদর্শিক শক্তি অন্য আদর্শের উত্থান ঠেকাতে এরকম “ফোড়া”র জন্ম দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগেই ব্রিটিশরা চিন্তা করতে শুরু করে যে মধ্যপ্রাচ্যে একটা ইহুদী রাষ্ট্র তৈরি করে দেয়া যাক, যা কিনা বাকি জীবন মুসলিমদের শরীরে “ফোড়া”র মতো কাজ করবে। সারাজীবন এই “ফোড়া” চুলকাতে তার দুই হাত ব্যস্ত থাকবে। আর পশ্চিমারাও এই “ফোড়া”কে জিইয়ে রাখবে ইন্ধন যুগিয়ে। আর মুসলিমদের আলাদা করে দুর্বল করে রাখা হবে, যাতে তারা এই “ফোড়া”কে কেটে ফেলতে না পারে। আর “ফোড়া” নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নিজেদের শক্তিশালী করে একত্রিত করার কোন সুযোগই যেন তারা না পায়। ১৯০৫ সাল থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হেনরি ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান। ইহুদী রাষ্ট্র তৈরি করার আদর্শিক পটভূমি তার ১৯০৭ সালের ‘ক্যাম্পবেল-ব্যানারম্যান রিপোর্টে’র কিছু কথার মাঝে খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। বলা বাহুল্য যে তিনি যেসময় এই কথাগুলি বলেছিলেন, তখন জেরুজালেম মুসলিমদের হাতেই ছিল (১১৮৭ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত একনাগারে ৭৩১ বছর)। ব্রিটিশরা মুসলিমদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করেছিল ১৯১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর, অর্থাৎ আরও ১০ বছর পর। এরপর প্রায় তিন দশক ধরে প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে এখানে ইহুদী রাষ্ট্র ঘোষণার (১৯৪৮) ভিত্তি তৈরি করা হয়। যাই হোক, তার কথাগুলি ছিল –
“There are people who control spacious territories teeming with manifest and hidden resources. They dominate the intersections of world routes. Their lands were the cradle of human civilizations and religions. These people have one faith, one language, one history and the same aspirations. No natural barriers can isolate these people from one another… if per chance, this nation were to be unified into one state, it would then take the fate of the world into its hands and would separate Europe from the rest of the world. Taking these considerations seriously, a foreign body should be planted in the heart of this nation to prevent the convergence of its wings in such a way that it could exhaust its powers in never-ending wars. It could also serve as a springboard for the West to gain its coveted objects.”
“আদর্শিক ফোড়া”র সমাধান কোথায়?
যারা পশ্চিমাদের কর্মকান্ড নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে থাকেন, তাদেরকে ভুল পথে প্রবাহিত করারও পদ্ধতি আছে। একটা কনসেপ্ট রয়েছে, যেটাকে মানুষ conspiracy theory বলে জানে। যখনই কেউ পশ্চিমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ করবে, তখনই তাকে এমন একটা থিওরি ধরিয়ে দেয়া, যাতে সে খেই হারিয়ে ফেলে এবং কোন সমাধান খুঁজে না পায়। এভাবে সে সবকিছুকেই conspiracy theory বলা শুরু করবে, এমনকি আসলে ঘটে যাওয়া কোন ব্যাপারকেও সে তা-ই মনে করতে থাকবে। একটা ঘটনার পিছনে ৪/৫টা conspiracy theory বানালে শেষ পর্যন্ত সবাই confused হয়ে পড়বে এবং ওই ব্যাপারটা সম্পর্কে বিরক্ত হয়ে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। এভাবে চোখের সামনে থাকার পরেও সত্যকে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। আদর্শিক শক্তির ক্ষমতা যাতে মানুষ উপলব্ধি করতে না পারে, সেজন্যে আদর্শিক কার্যকলাপকে conspiracy theory-র মাঝে ফেলে দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাখাটা নিয়ন্ত্রণের একটা পদ্ধতি।
আদর্শিক চিন্তা কতটা শক্তিশালী, তার কিছু উদাহরণ এর আগের লেখাগুলিতে দিয়েছি। আজ আরেকটি দিচ্ছি। ১৯৬২ সালের ‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’ সম্পর্কে কেউ কেউ জেনে থাকবেন। প্রায় সবাই মনে করেন যে সেটার কারণে দুনিয়া পারমাণবিক যুদ্ধের খুব কাছে চলে গিয়েছিল। আসলে এটা ছিল ব্রিটেনকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বের করে দেবার জন্যে মার্কিনীদের সাথে সোভিয়েতদের একটা সমন্বিত চেষ্টা, যা অনেকটাই সফল হয়েছিল। এরপর থেকে ব্রিটেনকে বের করে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির লড়াইয়ে নেমেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। থার্ড পার্টকে বের করে দেয়াই ছিল উদ্দেশ্য। এগুলি আদর্শিক চিন্তার ফলাফল, যা বেশিরভাগ মানুষের কাছে conspiracy theory হিসেবেও পৌঁছবে না, বোঝা তো দূরে থাকুক! আদর্শিক গেম হচ্ছে সবচাইতে বড় গেম; এগুলি জাতীয়তার গেম থেকে অনেক অনেক উপরে। ভূরাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আদর্শিক শক্তিরা। তাই ভূরাজনীতি বুঝতে হলে আদর্শিক গেম বুঝতে হবে। একুশ শতকে এসে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন, সেটা বুঝতেও এই গেম বুঝতে হবে; নাহলে হিসেব মিলবে না কিছুতেই! এখন আর ‘বুঝি না ভাই’ বলে হা করে চেয়ে থাকার সময় নেই। গুলশানের ঘটনা মানুষের ঘোর কাটানো যথেষ্ট হওয়া উচিত।
গুলশান ৭৯ নম্বরের কাহিনী হলো আরেক “আদর্শিক ফোড়া”র কাহিনী। আমাদের আজকে যেটা বুঝতে হবে তা হলো আমরা কিভাবে এই “ফোড়া” নির্মূল করবো তা নয়, বরং কি কারণে জোর করে এই ফোড়া তৈরি করার চেষ্টা চলছে সেটা। সেই কারণখানা বুঝতে পারার মাঝেই আছে ফোড়া নির্মূলের চিকিতসা। কারণখানা না বুঝে ফোড়া নির্মূলের চেষ্টা সফল হবে না কোনদিনই। আদর্শিক আক্রমণকে আদর্শ দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে, নাহলে ফোড়া চুলকাতে চুলকাতেই সারাজীবন পার করতে হবে।
Writer: Ahmed Sharif, Strategic Affairs Analyst.
Shared by: Bangladesh Defenceকুরআন-এর সাত হরফে নাযিল হওয়া

আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন: “এই কুরআন সাতটি ভিন্ন হরফে নাযিল হয়েছে, সুতরাং কুরআন হতে যা তোমাদের জন্য সহজতর হয় তা পাঠ কর“। [মুত্তাফাকুন আলাইহি]
তিনি (সা) আরো বলেছেন: “জিবরাঈল আমাকে একটি পদ্ধতি শিখিয়েছে এবং আমি তা অনুশীলন করতে থাকা অবস্থায় সে আমাকে আরো (পদ্ধতি) শিখিয়েছে। আমি তার কাছে আরো প্রত্যাশা করতে থাকি এবং সেও বাড়াতে থাকে যতক্ষন না (সর্বমোট) সাতটি হরফ হয়“। [বুখারী]
সাত হরফ-এর অর্থের ব্যাপারে আলেমগণ মতবিভেদ করেছেন, তাদের মধ্যে কেউ উপনীত হয়েছেন, এটি মুতাওয়াতির পঠনে ভাষার প্রাঞ্জলতার মতভিন্নতা এবং সাতটি ভাষ্যে তা সংরক্ষিত হওয়া। (যেমন), ই’রাবের ভিন্নতা, (শব্দের) বেশি কিংবা কম হওয়া, কিংবা দ্রুততা কিংবা বিলম্ব হওয়া, পাক খাওয়া কিংবা পরিবর্তন হওয়া, শব্দের বিভিন্ন রূপ যেমন, সরু হওয়া কিংবা গুরুত্বারোপ করা, প্রবণ হওয়া কিংবা উন্মুক্ত হওয়া। তাদের মধ্যে কেউ কেউ উপনীত হয়েছেন যে এগুলো আরব ভাষ্য যা মুতাওয়াতির পঠন দ্বারা সাব্যস্ত নয়।
অনেক গভীর পর্যালোচনা করার পর, অধিকতর শক্তির বিবেচনায় আমার উপলব্ধি অনুযায়ী ‘সাত হরফ’ আরবদের বিভিন্ন গোত্রের উপভাষা (লাহাজাত) যা হতে মৌলিকভাবে আরবী ভাষাকে নেওয়া হয়েছে এবং যা কুরআন নাযিল হবার সময়ে আরবীর প্রাঞ্জলতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। এর কারণ হচ্ছে কুরআনের পঠন মুতাওয়াতির হওয়া আরবদের গোত্রসমূহ হতে পৃথক কোনো বাস্তবতা ছিল না (অর্থাৎ, বিভিন্ন গোত্রের উপভাষাতেই সেসব গোত্রের ব্যক্তিগণ কর্তৃক কুরআন মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত হয়েছে)। কুরআন নাযিলের সময় সাতটি সুপরিচিত প্রাঞ্জল আরবী উপভাষা ছিল, যা হলো:
১) কুরাইশ
২) তামিম
৩) কায়েস
৪) আসাদ
৫) হুযাইল
৬) কিনানাহ
৭) তা’ঈ
সুতরাং, এ বিষয়ে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালি বুঝ বলে আমি মনে করি অর্থাৎ, সাত হরফ হচ্ছে উপরিউক্ত সাতটি গোত্রের উপভাষা। তবে এক্ষেত্রে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ যে কুরআন এ সাত গোত্রের ভাষার যেকোন শব্দ দ্বারা পড়া যাবে এমনটি নয়, কেবলমাত্র যেসব বর্ণনা নবী (সা)-এর নিকট হতে মুতাওয়াতিরভাবে আমাদের কাছে এসে পৌছেছে সেগুলোই পাঠ করা যাবে। কারণ মুতাওয়াতির বর্ণনার বাইরের কোনো বর্ণনার পঠন কুরআন বলে বিবেচিত হবে না।
[Taken from the Q&A of Sheikh ‘Ata ibn Khaleel al-Rashta]
১৮তম অধ্যায়: উদারপন্থা ও চরমপন্থা

পশ্চিমাদের ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিক ও পরিমন্ডল রয়েছে, বাস্তব জীবন থেকে ইসলামের দূরত্ব সৃষ্টির জন্য এই সবগুলোকে প্রয়োগ করা হয়। এই প্রপাগান্ডা কেবল এর ভাবমূর্তিকে খাটো করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর উদ্দেশ্য ছিল খিলাফতকে ধ্বংস করা, এর হুকুমসমূহকে অকার্যকর করা এবং ইসলামকে প্রাচীনকালের বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করা। ইসলাম যাতে পুরো পৃথিবীকে আবারও নেতৃত্ব দিতে না পারে সেটাকে লক্ষ্য করেই এরূপ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তারা সার্বক্ষনিকভাবে ইসলামকে ভয় পায়। সে কারণে তাদের ষড়যন্ত্রও এক মুহুর্তের জন্য থেমে নেই কারণ যদি তাদের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যায় এবং মুসলিমরা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায়।
পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে মুসলিমরা এমন এক জাতি যারা ইসলাম দ্বারা বাঁচতে চায় এবং গোটা মানব জাতির জন্য সর্বাবস্থায় উপযোগী এই চিরন্তন দ্বীনের অধীনে ঐক্যবদ্ধ হতে তাদের হৃদয় সর্বদাই হতে মরিয়া হয়ে থাকে। তাদের কৌশলগত বিভিন্ন স্থানসমুহকে যদি তারা একটি একক রাষ্ট্রের অধীনস্থ করে কৌশলগত স্থানে পরিণত হয় তবে তারা বিভিন্ন মহাদেশকে কব্জা করবে এবং কতৃর্ত্ব নিয়ে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। তারা সুপার পাওয়ার হওয়ার জন্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশী সম্পদের অধিকারী যা তাদেরকে একটি নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রে পরিণত করবে। তাদের জনসংখ্যা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ। শত্রুদের দুশ্চিন্তা এবং বিচলিত হওয়ার আরও কারণ হলো যদি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের বিজয় দান করেন, তাহলে মুসলিমরা যে শুধু কাফিরদের ভূমি ও অন্যান্য সম্পদ দখল করে নিবে তা নয়, বরং তারা মানুষের হৃদয়কে দখল করে নিবে যার ফলে সব মানুষ কুফরীর অন্ধকার থেকে ইসলামের আলোকবর্তিকার দিকে প্রত্যাবর্তন করবে। কারণ মুসলিমরা মনে করে এ পৃথিবী এবং তার মধ্যকার সব কিছুর চেয়ে কাউকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসা অধিকতর মূল্যবান।
আর এই কারণে ইসলামী শাসন এবং নিজ জাতি ও অন্যান্য জাতির উপর থেকে পশ্চিমাদের প্রভাব অপসারণে নিয়োজিত নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্র প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। আর ইসলামের ব্যাপারে তাদের ভীতি অনুযায়ী আনুপাতিক হারে তাদের ষড়যন্ত্রের মাত্রাও বেড়ে চলেছে।
ইসলাম আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কতৃর্ক মনোনিত সত্য দ্বীন না হলে এতদিনে তা সম্পূর্ণ মুছে যেতো, বিলুপ্ত হতো এবং পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতো। তবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইচ্ছাই প্রাধান্য পেয়েছে এবং তাঁর প্রতিশ্রুতিই কার্যকর। মুসলিমদের চরম অধঃপতনের সময়েও তারা তাদের দ্বীনের প্রতি অনুগত ছিল। তবে পশ্চিমারা মুসলিমদের ভ্রান্ত মানদন্ড গ্রহণ করা, চিন্তাকে ত্রুটিপূর্ণ করা ও মানসিকতাকে কলুষিত করতে সমর্থ্য হয়েছিল। আর এই কারণে পশ্চিমারা প্রথম ক্রুসেড থেকে অনুধাবন করতে পেরেছিল যে, মুসলিমদের হৃদয়ে ইসলাম খুব ভালভাবে প্রোথিত হয়েছে এবং সমূল উৎপাটনের যে কোন অপচেষ্টার চেয়ে তা অধিকতর শক্তিশালী। সে কারণে দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্রুসেডের সময় তারা কৌশল পরিবর্তন করে, যার কুফল এখনও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি: যেখানে তারা মুসলিমদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করার পরিকল্পনা করে এবং তাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানদন্ডের প্রসার ঘটাতে শুরু করে যাতে তাদের বস্তুগত সার্বিক নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্য প্রথমে তারা মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্বকে পাকাপোক্ত করলো এবং বস্তুগত নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে তা বজায় রাখলো। অতঃপর তারা এমন শাসকদের মুসলিমদের উপর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করালো যারা দূষিত বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। রাষ্ট্রকে এর সাথে সম্পৃক্ত করে নিজস্ব স্বার্থে তারা পুরো পৃথিবীকে একটি কোম্পানীর মত একমুখী করে তুললো যেন পশ্চিমারা অর্থলগ্নিকারী ও উৎপাদকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় এবং অন্য রাষ্ট্রগুলো শ্রমিক ও ভোক্তা শ্রেণীতে পরিণত হয়। এরপর তারা পুরো বিশ্বকে প্রচারমাধ্যমের নেটওয়ার্ক দ্বারা এমনভাবে আচ্ছাদিত করলো যেন অন্য রাষ্ট্রের প্রচারমাধ্যমগুলো এদের অধীনস্থ হয়ে থাকে। এসব প্রচেষ্টার পেছনে তাদের কামনা ছিল, তারা যা লিখবে আমরা তাই পড়বো, তারা যা বহন করবে আমরা তাই শুনবো, তারা যা প্রচার করবে আমরা তাই প্রত্যক্ষ করব এবং একমাত্র তাদের ইচ্ছেমতো সবকিছু আমরা অনুধাবন করবো ও কথা বলবো। এটা ছিল নব্য উন্নততর ঔপনিবেশবাদ। পুরনো ঔপনিবেশবাদের চেয়ে এটা ভয়ঙ্কর ও মারাত্নক। পুরনো ঔপনিবেশবাদ বাহ্যিকভাবে পদানত করতো। আর নব্য ঔপনিবেশবাদ কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে একজনকে ভেতরে ও বাইরে থেকে সার্বিকভাবে গ্রাস করে ও চূড়ান্ত পদানত করে।
এমনকি আমাদের দ্বীনকে বুঝার ক্ষেত্রে পশ্চিমারা তাদের পছন্দমতো পদ্ধতিকে নির্ধারণ করলো। যে এই দৃষ্টিভঙ্গী বিচ্যুত হলো তার বিরুদ্ধে পশ্চিমারা তাদের মিডিয়া প্রপাগান্ডা করতে আঁটঘাঁট বেঁধে নেমে পড়লো। অর্থাৎ তারা ইসলামকে একটি অস্বাভাবিক পদ্ধতিতে ব্যাখ্যা করা শুরু করলো এবং এর ঐতিহ্য, নিয়মনীতি ও ঐক্যমতকে ভাঁঙ্গার চেষ্টা করলো। তারা ইসলামের সাথে চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার লেবেল এটে দিলো। তারা দ্বীনকে মানবতার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেখানোর চেষ্টা করলো যে এটি অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অন্ধকারের মধ্যেই থাকতে পছন্দ করে। এবং এটা আক্রমণাত্নক ও প্রকাশভঙ্গীর দিক থেকে বিদ্বেষভাবাপন্ন যা ঘৃণা ছড়ায়। মূল চিত্রকে বিকৃত করে ও সত্যকে গোপন করার পর বিভিন্ন শাসন দ্বারা তারা এটাকে আঘাত করলো এবং এমনভাবে আঘাত করলো যেন এটাই এর প্রাপ্য ছিল। লোকদের অজ্ঞতার উপর নির্ভর করে তারা এগুলো করলো এবং এতে সহায়তা করলো এমন কিছু বুদ্ধিজীবি যারা পশ্চিমাদের সবকিছুতেই গুণমুগ্ধ ছিল।
বর্তমানে উম্মাহ্’র জাগরণের কারণে দ্বীনের বিরুদ্ধে তাদের ষড়যন্ত্র কঠিন হয়ে পড়েছে। উম্মাহ্ আজ পশ্চিমাদের, এসব শাসকদের এবং তাদের তল্পীবাহক তথাকথিত উলামাদের একই চোখে দেখা শুরু করেছে; শয়তান হিসেবে এবং শাসকদের শয়তানের অনুসারী হিসেবে। আর এইসব তথাকথিত পন্ডিতেরা রাতারাতি এ অবস্থানে পৌঁছাতে পারতো না, যদি না তারা একই হারে শাসকদের সম্মুখে ইসলামের সম্মানকে বিকিয়ে দিত। এরা অধঃপতিত পন্ডিত। এই অধঃপতনের দিন যেদিন শেষ হবে সেদিন তাদেরও সমাপ্তি ঘটবে। সঠিক ইসলামী পূণর্জাগরণের ধারকগণ সাদামাটা পোশাকে আর্বিভূত হতে পারেন, কিন্তু তারা সৎ ও আল্লাহভীরু।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি যখন পশ্চিমারা ও শাসকগণ ইসলামী শাসন ফিরে আসার ভয়ে ভীত। তাই তারা সকল প্রকার ইসলামী আন্দোলনকে হুমকি হিসেবে গণ্য করে এবং এগুলোকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে ও এগুলোর উপর সকল ধরনের দোষ চাপাতে মিডিয়াকে ব্যবহার করছে, প্রপাগান্ডা অব্যাহত রেখেছে এবং তাদের পোষ্য তথাকথিত উলামাদের ব্যবহার করছে। এবং শুধুমাত্র ইসলামী শাসনের দিকে আহ্বানকারী আন্দোলনসমূহকে তারা সন্ত্রাসী বা চরমপন্থী হিসেবে আখ্যায়িত করছে। কিছু মুসলিম চিন্তাবিদ, এবং কিছু জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক লেখক চরমপন্থা পরিত্যাগ করে উদারপন্থার দিকে আহ্বানের জন্য বক্তব্য প্রদান ও বই লিখেছেন। কেবলমাত্র পশ্চিমাদের সন্তুষ্টির জন্যই তারা এ অবস্থান নিয়েছেন। মুসলিম পন্ডিতরা যদি এতে অংশগ্রহণ না করতেন এবং পশ্চিমাদের অবস্থান বৈধ ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা না করতেন তবে আমরা তাদের কাজের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিতামনা। কেননা জনগণের কাছে এসব লোকদের কোন মূল্য নেই, বরং তারা তাদের কাছে শাসকদের মতোই। অনেক সময় তাদের এ আক্রমণ তাদের নিজেদের দিকেই ফিরে আসে। এমনকি উম্মাহ্ এসব পন্ডিত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং তাদের প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, কারণ তারা তাদের অবস্থানের পক্ষে প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন অজুহাত দাঁড় করায়, এবং মনগড়া ফতোয়ার মাধ্যমে শারী’আহ্’র প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির ব্যাত্যয় ঘটায়। তাদের ফতোয়া ইসলামের সাথে শুধু সাংঘর্ষিকই নয় বরং দালিলিকভাবে প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য অকাট্য শারী’আহ্ দলিলকেও তারা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছে। এমনকি তাদের কিছু কিছু ফতোয়া এমন যার কারণে অসৎ কাজের আদেশ প্রদান করা হয় এবং সৎ কাজের নিষেধাষ্ণা দেয়া হয় (আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের এই অনিষ্ট থেকে মুক্ত রাখুন!)। এসব আলেমাগণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নন, বরং কেবলমাত্র শাসক ও তাদের প্রভূদের সন্তুষ্ট করার জন্য ইসলাম থেকে অনেক দূরে থেকে এসব চিন্তা উপস্থাপন করেন। যখন তারা মুসলিমদের জন্য উৎকন্ঠা প্রকাশ করেন এবং ইসলামী দাওয়াহ্ নিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেন তখন উম্মাহ্ তাদের চিন্তার গলদ ধরে ফেলে এবং তাদের সমর্থকদের পথভ্রষ্টতা অনুধাবন করে।
এ ভূমিকার পর যে জিনিসটি অনুধাবন করা জরুরী, তা হলো ‘চরমপন্থা এবং উদারপন্থা’ বিষয়ক আলোচনার যৌক্তিকতা। আমরা ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিষয়টিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করবো যাতে মুসলিমরা কোন দ্বন্দ্ব ছাড়া সত্যকে উপলদ্ধি করতে পারে। কেননা শুধু আবেগ সত্যকে হৃদয়াঙ্গম করার জন্য যথেষ্ট নয়। পূর্বের মতো আমরা শারী’আহ্’র মূলনীতি অনুসারে এ বিষয়ে আলোকপাত করবো যাতে তা ইসলামী আক্বীদার ভিত্তিতে গড়ে উঠা বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।
মানব জীবনের সামগ্রিক অবস্থাকে সুবিন্যস্ত করতে ইসলাম এসেছে। সুতরাং এতে ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে, যেমন: আখলাক বা চরিত্র, মা’তুমাত বা খাদ্যদ্রব্য এবং মালবুসাত বা পরিচ্ছদ। এতে ব্যক্তির সাথে সমাজের অন্যান্য ব্যক্তির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে, যেমন: মু’আমালাত বা সামাজিক আচার ব্যবহার এবং উকুবাত বা শাস্তি। এবং এতে ব্যক্তির সাথে স্রষ্টার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা রয়েছে, যেমন: আক্বাইদ বা বিশ্বাস এবং ইবাদত বা উপাসনা। কেননা মানুষের যেকোন কাজের সমাধানের ক্ষেত্রে ইসলাম পূণার্ঙ্গ। এটি একটি সামগ্রিক চিন্তা যা থেকে মানব জীবনের সকল সমস্যা সমাধান পাওয়া যায়।
তাছাড়া ইসলামের গঠন পূণার্ঙ্গ ও সামগ্রিক যা একটি বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং এ বিশ্বাস থেকে সকল চিন্তা ও সমাধান উৎসারিত হয়। আর তাই এর চিন্তা, বিশ্বাস এবং মাপকাঠি এর মৌলিক চিন্তার মতই একই প্রকৃতির। এর ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যায়, আল্লাহ্’র উপর মুসলিমদের ঈমানের উপর ভিত্তি করে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত এবং তিনি হলেন আল খালিক বা স্রষ্টা, আল মুদাব্বির বা সববিষয়ের নিয়ন্ত্রণকারী। আর এ বিষয়ে মানুষ হলো দূর্বল, পরনির্ভরশীল, মুখাপেক্ষী, অভাবী ও সমাধান প্রদানের ক্ষেত্রে অক্ষম। সে কারণে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা), রাসূল (সা)-কে এই শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রেরণ করলেন যে, আল্লাহ্ হলেন আল মাবুদ বা উপাসনার জন্য একমাত্র যোগ্য সত্ত্বা এবং কীভাবে তাঁর উপাসনা করতে হবে এবং তাঁর ইবাদত পালন করা ও না করার সাথে কিভাবে আখিরাতের সওয়াব বা পুরষ্কার এবং ইক্বাদ বা শাস্তি জড়িত। এটি মুসলিমদের যেকোন কাজের জন্য একটি প্রক্রিয়া সুনির্ধারিত করে দেয় এবং তা হলো হালাল এবং হারাম। সে কারণে তার মন যথেচ্ছভাবে আচরণ করে না বা আইনপ্রণেতা বনে যায় না অথবা শারী’আহ্ বাণীর সাথে কোন মনগড়া আইনকে যুক্ত করে না। বরং শারী’আহ্ কী বলেছে সেটাকে হৃদয়াঙ্গম করার চেষ্টা করে মাত্র। শারী’আহ্ গ্রহণ করতে হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে, আর এখানে মানুষের কাজ হলো এগুলোকে গ্রহণ করার জন্য সঠিকভাবে বুঝা। বুঝার ক্ষেত্রে সঠিক বা ভুল হতে পারে। উভয়ক্ষেত্রে ইজতিহাদের সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে সে পুরষ্কৃত হবে। ইসলাম মুসলিমদের দলিল প্রমাণের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত হওয়ার উপর জোর দেয়। এজন্য ইল্ম আল হাদীস বা হাদীস সম্পর্কিত বিশেষ জ্ঞানের উত্থান হয়েছে এবং সর্বোপরী এ সচেতনতা থেকে উসূল আল ফিকহ্ উৎপত্তি লাভ করেছে। এর কিছু কিছু মূলনীতি ইতিমধ্যে সংরক্ষিত হয়েছে, যেমন: ‘আল্লাহ্ হলেন হাকিম বা বিচারক’, ‘শারী’আহ্ দলিলের গ্রহণযোগ্যতাই হলো কাজ বা যেকোন কিছুর ভিত্তি’, ‘শারী’আহ্ যাকে সুন্দর বলে তাই সুন্দর এবং যাকে কুৎসিত বলে তাই কুৎসিত’, ‘ভাল তাই যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং মন্দ তাই যা তাকে অসন্তুষ্ট করে।’ আমরা এটাও দেখতে পাই যে, মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী সুখ হচ্ছে যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদার প্রশান্তি হচ্ছে আল্লাহ্’র প্রতি বিশ্বাস ও তাঁর প্রদত্ত শারী’আহ্ অনুসরণের মধ্যে। এজন্য আমরা দেখতে পাই, সামগ্রিক কাঠামোগত দিক থেকে ইসলাম পরিপূর্ণ এবং এর সকল চিন্তা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ও একটি ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত। আর এই ভিত্তি যা কিছুকে বৈধতা দেয় তাই গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় নয়।
আদর্শ হিসেবে ইসলামের ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য পুজিবাদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। কেননা এটি একটি আদর্শিক চিন্তা এবং এর বুদ্ধিবৃত্তিক গঠনও সুসামঞ্জস্যপূর্ণ। সুতরাং হয় একে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় পরিপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে হবে। দ্বীনকে জীবন থেকে পৃথকীকরণের মৌলিক চিন্তা থেকে পুজিবাদের সমাধানসমূহ উৎসারিত এবং এর উপর ভিত্তি করে সমস্ত চিন্তা গঠিত হয়েছে। আপোষের ভিত্তি উপর প্রতিষ্ঠিত, দ্বীনকে জীবন থেকে পৃথকীকরণের এই মৌলিক চিন্তা মানুষকে তার নিজের প্রভু বানায়। নিজেকে নিজের প্রভূ বানাতে হলে এবং চার ধরনের স্বাধীনতার পথকে অবরুদ্ধ হওয়া থেকে মুক্ত হতে হলে, তার উপর অন্য কারো অভিভাবকত্বকে অস্বীকার করতে হবে। আর এভাবেই স্বাধীনতার চিন্তা জাগ্রত হয়, যা একটি বিশেষ অর্থ বহন করে। নিজেই নিজের প্রভূ বনে যাওয়ার অর্থ হলো কোনরকম বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়া শুধুমাত্র নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে কোন ধর্ম কিংবা অন্যকোন উৎস থেকে মৌলিক চাহিদাসমূহের নিরাপত্তার বিধি-বিধানসমূহ গ্রহণ করা। আর এভাবেই গণতন্ত্রের ধারণা ব্যুৎপত্তি লাভ করে। যে ব্যক্তি দ্বীনকে জীবন থেকে পৃথকীকরণের মৌলিক চিন্তাকে গ্রহণ করেছে সে সর্বোচ্চ পরিমাণে ইন্দ্রিয় সন্তুষ্টিকে সুখ বলে সংজ্ঞায়িত করবে। প্রবৃত্তি নিজেই আইন প্রণেতা হবার দরুণ স্বার্থ হাসিল করাই হয়ে পড়ে যেকোন কাজের লক্ষ্য।
যখন চিন্তা সুসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তখন এটি অন্য কোন চিন্তার মিশ্রণকে সাধুবাদ জানায় না। শারী’আহ্ পরিভাষায় মিশ্রণ হলো শিরক, হয় এটা কুফর অথবা গুণাহ্।
গণতন্ত্র মানুষের শাসন আর ইসলাম হলো শারী’আহ্’র শাসন, তাই ইসলাম যেমন গণতন্ত্রকে গ্রহণ করে না, ঠিক একইভাবে পুঁজিবাদী চিন্তাও ইসলামকে গ্রহণ করে না কারণ তাহলে তা হবে গণতন্ত্র ও তা থেকে উদ্ভুত সব চিন্তাকে অবলুপ্ত করা। একারণে পশ্চিমারা ক্ষমতা গ্রহণের জন্য সামগ্রিক ইসলামের দিকে আহ্বানকারী ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে এধরনের আন্দোলন ভয়ঙ্কর যা তাদেরকে তাদের ভিত্তিমূল থেকে অপসারণ করবে। এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকেই পশ্চিমারা এধরনের আন্দোলনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, আগ্রাসন চালায়, চিরশত্রু মনে করে এবং বিভিন্ন লেবেল এটে দেয়। পশ্চিমাদের দৃষ্টিতে এরাই মৌলবাদী, কারণ এরা এমন একটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত যা তাদের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত নয়, এরাই চরমপন্থী কেননা এরা তাদের সাথে আপোষ করতে চায় না, এরাই উগ্রপন্থী কেননা এরা তাদের আহ্বানকে সম্মান দেখায় না এবং তাদের অস্তিত্বকে বিবেচনা করেনা। যদি আমরা এ বিষয়টি নীরিক্ষা করি তবে দেখব যে তারা অন্যদেরকে যে কাজের লেবেল দিচ্ছে তারা নিজেরাই বরং সেসব কাজে লিপ্ত এবং এসব লেবেল তাদের নিজেদের উপরই প্রযোজ্য। পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গীর বিচারে তারা মৌলবাদী, কেননা তারা একটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত যার উপর তাদের বিশ্বাস রয়েছে এবং এর বিপরীত অন্যকোন কিছুকে তারা এর উপর প্রাধান্য দিতে প্রস্তুতি নয়, যদিও মুখে তারা বলে গণতন্ত্রে জনগণের পছন্দ অনুসারে যে কেউ ক্ষমতায় আসতে পারে। তাছাড়া তারাই চরমপন্থী, সন্ত্রাসী, উগ্রপন্থী কারণ তারা রাজনৈতিক ইসলামের অস্তিত্বকে মেনে নেয় না, অথবা এর সাথে আলোচনায় বসে না, এমন কি এর সাধারণ বিষয়সমূহকে নিয়েও নয়। এভাবে কতবার পশ্চিমারা তাদের জীবনব্যবস্থাকে নিয়ে দ্বন্দে জড়াবে এবং অন্যের প্রতিকৃতিতে ঝাঁপ দিবে? এটা কী ধরনের গণতন্ত্র যে তারা নির্বাচন বাতিল করে দেয় যা কিনা তাদের দৃষ্টিতে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিফলনের পথ এবং একনায়কন্ত্র কায়েম করে?
তাই আমরা যখন কোন চিন্তাকে সঠিক অথবা ভ্রান্ত এরূপ রায় দিব তখন এর ভিত্তিকে আলোচনায় আনতে হবে এবং এই ভিত্তি দিয়ে একে নিরীক্ষণ ও বিচার বিবেচনা করতে হবে। একটি আংশিক চিন্তাকে অন্য একটি চিন্তার ভিত্তি দিয়ে নিরীক্ষা করা সঠিক নয়। আমরা কখনো বলতে পারবো না যে, ইসলামে সুখ হলো ইন্দ্রিয়গত পরিতুষ্টি। অথবা বলতে পারবো না মুসলিমগণ পশ্চিমাদের মতো স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। কারণ ইসলাম এসবের সাথে একাত্নবোধ করে না অথবা এসবকে গ্রহণ করে না। যে ব্যক্তি ইসলামকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে সে অবশ্যই যা কিছু ইসলাম থেকে উদ্ভুত তাকেই গ্রহণ করবে এবং ইসলামকে পূর্ণাঙ্গরূপে গ্রহণ করবে। কেননা এর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করা পুরোটাকে প্রত্যাখ্যান করার শামিল। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“তবে কি তোমরা কিতাবের কিয়দংশ বিশ্বাস করো এবং কিয়দংশ অবিশ্বাস করো। যারা এরূপ করে, পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে।”
(সূরা বাক্বারা:৮৫)এ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে আমরা পশ্চিমাদের এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারি যে, ইসলাম একটি উদার দ্বীন এবং এটা কট্টরপন্থাকে অস্বীকার করে। কথাটি শুনতে মিষ্টি হলেও এতে পশ্চিমাদের কু অভিপ্রায় রয়েছে। কারণ তারা তাদের ভ্রান্ত চিন্তার উপর ভিত্তি করেই এসব মন্তব্য করে থাকে।
তাই তাতারুফ (কট্টরপন্থা), ঘুলুও (অতিরিক্ত), ইসরাফ (অতিরঞ্জিত করা) অথবা ইফরাত (অসংযম) এমন কিছু শব্দ যেগুলোর রয়েছে শারী’আহ্গত অর্থ। যদি একজন মুসলিম এর সাথে অমত পোষণ করে তবে সে গুণাহ্গার হবে। একইভাবে ই’তিদাল (উদারীকরণ), ইক্বতিসাদ (মধ্যপন্থা অবলম্বন), ইসতিকামাহ ( সোজা পথ) এবং ওয়াসাতিয়্যাহ (উদারীকরণ) শব্দসমূহেরও একই শারী’আহ্গত অর্থ রয়েছে এবং তা অনুযায়ী এগুলোকে মুসলিমদের গ্রহণ করতে হবে। একই কথা তাফরীত (অবহেলা) এবং তাসাহুল (উদাসীন্যতা) এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা যখন এগুলো সম্পর্কে শারী’আহ্গত নিয়মনীতিসমূহ জানার চেষ্টা করবো তখন কখনওই পুজিবাদীদের বিশ্বাস ও মাপকাঠির ভিত্তিতে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হবো না। কারণ তা হারাম। তাছাড়া তা পশ্চিমাদের এবং তাদের চিন্তাকে তুষ্ট করে, এবং ইসলাম ও ইসলামী চিন্তাসমূহের মূল্যায়নে ইসলাম ব্যাতীত অন্যকিছুকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে।
অনেক শারী’আহ্ নিয়ম রয়েছে যেগুলোকে মুসলিমদের গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় পরিত্যাগ করলে সে গুণাহ্গার হবে। পশ্চিমারা এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী পোষণকারীদের কট্টরপন্থী, মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করে। আল্লাহ্’র রাস্তায় জিহাদ করা, খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা, মা’রুফ এর আদেশ প্রদান করা ও মুনকারকে নিষেধ করা যেখানে শাসকরাও যুক্ত রয়েছেন, কুফরের বিরুদ্ধাচরণ করা, দাওয়াহ্’র দায়িত্ব বহন করা, গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করা, সুদকে নিষিদ্ধ করা, নারীদের হিজাব পরিধান করা প্রভৃতি বাধ্যতামূক কাজকে অবশ্যই মুসলিমদের সম্পাদন করতে হবে। আমরা কি এগুলোকে পশ্চিমা নষ্ট ও ভ্রান্ত চিন্তা দ্বারা মূল্যায়ন করবো, যা এখনও পর্যন্ত তাদের নিজেদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারেনি আর অন্যদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনার চিন্তা তো সুদূর পরাহত? তাছাড়া মুসলিমগণ কি এমন কোন কিছুর পক্ষাবলম্বন করবে যে ব্যাপারে পশ্চিমারা অবস্থান নিয়েছে?
এজন্য কট্টরপন্থা বা উদারপন্থা বুঝার ক্ষেত্রে আমাদেরকে অবশ্যই পশ্চিমাদের চিন্তাকে পরিত্যাগ করতে হবে। দ্বীনের ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপকে অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আর এ কারণেই শুরু থেকে এই আলোচনা শারী’আহ্’র ভিত্তিতে অগ্রসর হয়নি। কেননা এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান যাকে পশ্চিমাদের অনুকূলে উম্মাহ্’র ভেতরে সুরঙ্গ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এবং এই আলোচনার মাধ্যমে মুসলিমদের মনোবৃত্তির ভেতর পশ্চিমা ঔপনিবেশবাদী চিন্তার ধারবাহিকতা বলবৎ থাকে।
এখন আমরা একটি শারী’আহ্ দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এ বিষয়ে ইসলাম কী বলে তা বুঝার চেষ্টা করবো যাতে তা দাওয়াহ্’র জন্য সুবিধাজনক হয় এবং আমাদেরকে আল্লাহ্’র আরও নিকটবর্তী করে।
আল মুগহালাহ (কট্টরপন্থা) অথবা ঘুলুহ (অতিরিক্ততা) হলো কোন কিছুকে বাড়িয়ে বলা বা অতিরঞ্জিত করা। দ্বীনের মধ্যে মুগহালাহ হলো হুকুমের সীমাকে অতিক্রম করার ক্ষেত্রে দৃঢ় থাকা বা অটল থাকা। একে ইফরাতও বলা হয়। মুগহালাহ-এর বিপরীত হল তাফরীত বা উদাসীনতা, যা ‘ফারাতাহ্’ শব্দ থেকে উদ্ভুত, ফারতানের ক্ষেত্রে, যার অর্থ হলো পেছনে পড়া, অপচয় করা এবং এর প্রতি শৈথিল্যতা প্রদর্শন করা। দ্বীনের ব্যাপারে তাফরীত অর্থ হলো এর হুকুম সম্পর্কে অবহেলা করা, এর হক্ক আদায় না করা এবং এ দায়িত্ব পালনে শৈথিল্যতা প্রদর্শন করা। এ থেকেই এ কথার উৎপত্তি হয়েছে যে, ‘লা ইফরাত ওয়া লা তাফরিত ফিল ইসলাম’ অর্থাৎ ইসলামে বাড়াবাড়ি কিংবা উদাসীনতা কোনটাই নাই।
ইক্বতিসাদ বা মধ্যপন্থা হলো তাওয়াস্সুত (মাঝখানে অবস্থান নেয়া), ই’তিদাল (উদারতা), রুশদ (প্রত্যক্ষতা), এবং ইসতিক্বামাহ (দৃঢ়পদতা)। দ্বীনের মধ্যে মু’তাদিল হলো সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশসমূহ মেনে চলে এবং এটা থেকে তাফরীত বা ইফরাতের দিকে বিচ্যুত হয় না। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“তারা মধ্যপন্থা (ইক্বতিসাদ) অবলম্বনকারীদের অন্তর্গত, কিন্তু তাদের অনেকেই মন্দ কাজে লিপ্ত।”
(সূরা আল মা’’য়িদা: ৬৬)এর তাফসীর হলো এটি একটি উম্মাহ্ মুতা’দিলা, যে তার প্রভূর আদেশ মেনে চলছে অর্থাৎ আল্লাহ্’র আদেশ মানার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করছে। আর ফাইওয়ুমি তার ‘আল মিসবাহ আল মুনির’ এ উল্লেখ করেন যে, “কাসাদাহ ফিল আমর কাসদান অর্থ হলো হুকুমের ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দলিলটি অন্বেষণ করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা এবং সীমা অতিক্রম না করা।”
কেউ এই সংজ্ঞাকে নিরীক্ষা করলে বুঝবে যে, মুসলিমদের অবশ্যই আল্লাহ্ প্রদত্ত হুদুদ বা সীমাকে গ্রহণ করতে হবে এবং তা অতিক্রম করা যাবে না। তাকে আরও মু’তাদিলান হতে হবে অর্থাৎ হুকুম পালনের ক্ষেত্রে মুতাক্বিমান বা দৃঢ় হতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“বল, ‘আমি আল্লাহ্’র উপর ঈমান এনেছি এবং অতঃপর তাঁর পথের উপর ইসতাক্বিম বা দৃঢ় আছি।’’ [মুসলিম এবং অন্যান্য]; অর্থাৎ যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নির্দেশ দিয়েছেন তা গ্রহণ করেছি এবং যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকেছি। ‘ফাসতাক্বিম’ অর্থ হল ইত্ত্বাকী (আল্লাহ্’র ভয়) এবং বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“সুতরাং আপনি এর প্রতিই দাওয়াহ্ দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন”।
(সূরা আশ শূরা: ১৫)সুতরাং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যিনি হুকুম করেন এবং মুসলিমগণ সে আদেশ গ্রহণ করেন ও মেনে চলেন। মুসলিমদের নিজের পক্ষে তাক্বওয়ার পথ ও সহজ সরল পথ সম্পর্কে জানা সম্ভব নয়। যদি সে নিজেকে অনুসরণ করে তাহলে সে তার প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করলো। আর যে প্রবৃত্তিকে অনুসরণ করে সে পথভ্রষ্ট। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশ মান্য করা ও এই সীমার মধ্যে নিজেকে গন্ডীভূত রাখা ছাড়া আর কোন ইসতিক্বমাহ নেই। এ সীমাকে অতিক্রমের কোন সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে সামান্য বেশী বা সামান্য কম করার অবকাশ নাই। আর এটা বুঝতে হলে আমাদের আগের মতো মূল ভিত্তির দিকে ফেরত যেতে হবে।
মুসলিমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং ইসলাম প্রদত্ত সকল সমাধানের উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে যা মানুষের ফিতরাতের (বৈশিষ্ট্য) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই মানুষের এই ফিতরাত সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী অবগত, তিনিই এই বৈশিষ্ট্যকে সুসজ্জিত করেছেন এবং মানুষের কল্যাণের জন্য যা প্রয়োজন তাই করেছেন। একই সময়ে একজন মুসলিম বিশ্বাস করে, অন্য ধর্ম ও জীবনব্যবস্থা সমাধান হিসেবে আমাদের সামনে যা নিয়ে এসেছে তা সীমাবদ্ধ, ভ্রান্ত ও পথচ্যুত এবং এগুলো মানুষের জন্য দূর্ভোগ ব্যতিরেকে শান্তি বয়ে আনেনি। এর কারণ খুব সহজ, যেহেতু মানুষ স্বভাবতই অক্ষম, মুখাপেক্ষী, দূর্বল, সীমাবদ্ধ, যার মন মানুষের বাস্তবতার সবকিছুকে পরিগ্রহ করতে অক্ষম, তাই এগুলো যুৎসই সমাধানও প্রদান করতে পারে না; অথবা এসব ধর্মের উৎস স্রষ্টার পক্ষ থেকে হলেও, এগুলো ছিল নিদিষ্ট কিছু জাতির জন্য সবার জন্য এগুলো প্রযোজ্য নয়। তাছাড়া মানুষ এসবের সাথে ব্যাপক মিথ্যার মিশ্রণ ঘটিয়ে এগুলোকে পরিবর্তন করে ফেলেছে।
একারণে ঐশী বিধান হিসেবে ইসলাম অন্যান্য মতাদর্শ ও ধর্ম থেকে পৃথক, যা মানুষের সব বিষয়ে সমাধান এমনভাবে প্রদান করে যাতে উভয় জগতে সুখ নিশ্চিত হয়।
“এবং যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করবো। সে বলবে: হে আমার প্রতিপালক, আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো চক্ষুষ্মান ছিলাম। আল্লাহ্ বলবেন, এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল, অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব।”
(সূরা ত্বোয়া হা: ১২৪-১২৬);সুতরাং যে ব্যক্তি এ দুনিয়াতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশনা মেনে চলে না সে অন্ধ, সঠিক রাস্তা থেকে বিচ্যুত এবং সত্য প্রত্যাখ্যানকারী।
এছাড়া আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজে দ্বীনকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এগুলো বিলুপ্ত হওয়া ও পরিবর্তিত বা অসত্য পরিবেশনা থেকে রক্ষা করেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“নিশ্চয়ই, আমি নিজেই এই কুর’আন নাযিল করেছি এবং নিশ্চয়ই আমি নিজেই তা হেফাযত করবো।”
(সূরা হিজর: ৯)তবে তা বুঝার ক্ষেত্রে কারও বিচ্যুতিকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) হেফাযতের ওয়াদা করেননি। কিতাবের সুরক্ষা ও বিশুদ্ধতা বজায় রাখা আমাদের জন্য আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকে একটি দলিল। কেউ পথচ্যুত বা ধ্বংস হতে পারে। কিতাবের এমন ব্যাখ্যা দিতে পারে যা মূল অর্থের সাথে সাংঘর্ষিক, নতুন কিছু যুক্ত করতে পারে এবং অর্থকে অসংলগ্নও করতে পারে। কিন্তু এসবই হবে বুঝার ভুল, এর কোনকিছুই মূল কিতাবের বাণীসমূহের সাথে সম্পর্কিত নয়। তাই মুসলিমদের সত্যিকারের ঈমানদার হতে হবে যাতে শরী’আহ্’র হুকুমসমূহকে তারা ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে, সর্বজ্ঞানী ও সর্বজ্ঞাত আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আদেশের উপর দৃঢ় ও অবিচল থাকতে পারে এবং এক ইঞ্চিও পথভ্রষ্ট না হয়।
ইসলাম সব কিছু নির্ধারণ করে এবং মুসলিমগণ ইসলাম যা নির্ধারণ করে তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করে। মানবজাতি নিজের জন্য আইন প্রণয়ন করতে পারে না। মানুষের বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতার গভীরতা, ঈমানের শক্তিমত্তা এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় নয়। আইনের প্রক্রিয়ায় মানুষকে অবশ্যই আল্লাহ্ প্রদত্ত কিতাবের দ্বারস্ত হতেই হবে, যদি সে ব্যক্তিটি স্বয়ং আবু বকর সিদ্দিক হয়। খিলাফতের দায়িত্ব পালনকালে প্রথম বক্তৃতার সময় তিনি এটাই বুঝাতে চেয়েছিলেন, “আমাকে ততক্ষন পর্যন্ত আনুগত্য করো যতক্ষণ আমি তোমাদের ব্যাপারে আল্লাহ্’র আনুগত্য করি এবং আমি যদি আল্লাহকে না মানি তাহলে তোমাদের আনুগত্যের প্রতি আমার কোন অধিকার নেই। অবশ্যই আমি একজন নিছক অনুসরণকারী, কিন্তু নতুন কোন কিছুর উদ্ভাবক নই।”
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“আনুগত্য করো কিন্তু নতুন কিছু বের করো না, আর তোমাদের যা যথেষ্ট তা সঠিক পরিমাণেই দেয়া হয়েছে।”
আর এ ধরনের চিন্তা কেবলমাত্র আমরা মুসলিমদের মাঝেই দেখতে পাই, অন্য কারও মধ্যে নয়। কারণ অন্যরা নিজেরাই নিজেদের সমস্যা সমাধান করে। এই কারণে ইসলাম মৌলিকভাবে অন্যদের চেয়ে আলাদা।
একইভাবে মুসলিমগণ অনুসরণ করতে বাধ্য এবং তাদের উদ্ভাবনের বদলে অনুসরণই করা উচিত।
আমরা যদি দ্বীন পালনের ক্ষেত্রে মুসলিমদের অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখতে পাব যে, মহানবী (সা) এর উপর এটা নাযিলের সময় হতে আজ পর্যন্ত কিছু কিছু মুসলিমের দ্বীনের প্রতি ভালবাসার সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার দাবি করে যে তারা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গী অনুসারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে সবচেয়ে শক্তভাবে ইবাদত করতে সক্ষম। তারা অন্যদের সঠিক ও নিয়ন্ত্রিত ইবাদতকে খাটো দৃষ্টিতে দেখে, কারণ তাদের ধারণা শারী’আহ্ তাদের কাছে যতটুকু দাবি করেছে তারা তার চেয়ে বেশী করতে সক্ষম। তারা ইবাদতের পরিমাণের দিক থেকে নিজেদেরকে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তারা নফস বা প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে দলিলের তোয়াক্কা না করে উপাসনার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। বিষয়টি এমনভাবে সীমা অতিক্রম করেছে যেন তারা অন্যের উপর তা চাপিয়ে দিতে চায় এবং কেউ অনুসরণ না করলে তাকে তারা ইবাদতের ক্ষেত্রে কম যত্নশীল বলে আখ্যায়িত করে। আমরা দেখতে পাই, এরকম কঠোর ও অনমনীয় চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এসব লোকেরা কথা ও কাজে শারী’আহ্ দলিলের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও তাঁর দ্বীনের প্রতি ভালবাসা থেকে এরূপ করলেও এটা হারাম। কারণ এর মাধ্যমে দ্বীনের পরিবর্তন সাধিত হয় এবং সর্বজ্ঞানী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কর্তৃক নির্ধারিত সীমাকে অতিক্রম করা হয়। সুতরাং, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা হচ্ছেন এমন একজন সত্ত্বা যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং আমরা তার জ্ঞানের পরিসীমা সম্পর্কে অবগত নই এবং তার অপরিহার্যতার বাস্তবতা সম্পর্কেও আমরা ওয়াকিবহাল নই, বরং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সব কিছুকে পরিগ্রহ করে আছেন। যেহেতু আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অনুগ্রহ কামনা করি সেহেতু তাঁর আদেশের উপর দৃঢ় ও প্রতিষ্ঠিত থাকাই এক্ষেত্রে এ উদ্দেশ্য হাসিলের একমাত্র পন্থা। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তাঁর জ্ঞানের প্রতি আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন,
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সুক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত।”
(সূরা আল মূলক: ১৪)বুখারী উল্লেখ করেন যে, আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিশেষ বিবেচনায় কিছু কাজ করতেন এবং কিছু লোক এক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করত না। নবী (সা) এ বিষয়ে জানতে পেরে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রশংসাপূর্বক বলেন, “কিছু লোকের আমি যা করি তা পালন করার ক্ষেত্রে কী হল? আল্লাহ্’র কসম, আল্লাহ্ সম্পর্কে আমি সবচেয়ে বেশী জ্ঞান রাখি এবং তাঁকে ভয় করার ক্ষেত্রে আমি তাদের চেয়ে অগ্রগামী।” এখানে অতিরঞ্জিত করার ব্যাপারে সাবধান বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে এবং ইসলাম থেকে বিনয়ের সাথে গ্রহণ করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছে।
বুখারী উল্লেখ করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“দ্বীন সহজ। কারও দ্বীনের ব্যাপারে কঠিন হওয়া উচিত নয়, সুতরাং সঠিক পন্থা অবলম্বন কর এবং যথা সম্ভব এর নিকটবর্তী থাকার চেষ্টা কর, সুসংবাদ দাও, গুদওয়া’হ (ফজরের পরের সকাল) এর সঠিক ব্যবহার কর। দ্রুত বের হয়ে যাও এবং সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আস। জুলজাহ (সন্ধ্যার প্রারম্ভিক সময়কাল) এর কিছু সময় ভ্রমণে ব্যয় কর।” আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, “সঠিক পথের নিকটবর্তী হও, দ্রুত বের হয়ে যাও এবং সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আস এবং রাতের প্রারম্ভিক কিছু সময়ের সদ্ব্যবহার কর। মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, মধ্যপন্থা অবলম্বন কর, তাহলেই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছতে পারবে।”
যে শুভ ইচ্ছা কোন ব্যক্তিকে কঠোর হওয়া বা অতিরিক্ত করার প্রতি প্রবৃত্ত করে, আল বুখারী ও মুসলিম থেকে আনাস (রা) উদ্ভৃতি অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইবাদতের আধিক্য ও তাদের কমের কারণে একদল লোকের দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে জানতে পারলেন। যারা বলল, ‘আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে কতদূরে রয়েছি যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার সব গোনাহ মাফ করে দিয়েছেন।’ সে কারণে তারা একত্রে শপথ নিল যে, রাতসমূহে তারা ক্বিয়াম করবে, সব দিন রোজা রাখবে এবং নারীদের সাথে কোনরূপ সম্পর্ক রাখবে না। রাসূল (সা) তাদের বললেন, “তোমরাই কি সেই ব্যক্তি যারা এরূপ বলেছ? অবশ্যই আমি তোমাদের চেয়ে আল্লাহকে অধিকতর ভয় করি এবং অধিকতর তাক্বওয়া প্রদর্শন করি। কিন্তু আমি রোজা রাখি এবং তা ভঙ্গ করি। আমি প্রার্থনা করি এবং রাতে ঘুমাই এবং নারীদের বিবাহ করি।” অতঃপর তিনি এই বলে হাদীসটি শেষ করলেন,
“যে আমার সুন্নাহ্ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমার অন্তভুর্ক্ত নয়।”
এটা থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এমন কোন কিছু গ্রহণ করেন না যা তাঁর কাছ থেকে আসেনি। যা মানুষ সংযোগ করে বা উদ্ভাবন করে তা কখনওই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নৈকট্য অর্জনের পাথেয় হতে পারে না। আবু দাউদ তার সুনানে এক ব্যক্তি সম্পর্কে উল্লেখ করেন, যিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)! কোন ব্যক্তি যদি সবদিন রোজা রাখে সেটা কেমন হবে?” প্রতুত্তরে রাসূল (সা) বলেন, “বিষয়টি অনেকটা এই রকম যে, সে কোন রোজা রাখেওনি বা ভঙ্গও করেনি।”
ইমাম আহমদ বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, একবার এক ব্যক্তি তাঁকে এসে বলল যে তার মা পায়ে হেঁটে হজ্জ্ব করার প্রতিজ্ঞা করেছে। তিনি (সা) বলেন,
“তাকে বাহন ব্যবহার করতে বলো, হাঁটার ব্যাপারে আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে তার জন্য কোন নির্দেশ নেই।”
বুখারী ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, “যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) খুতবা দিচ্ছিলেন তখন তারা দেখল একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে। রাসূল (সা) তার ব্যাপারে জানতে চাইলেন। তারা বলল, ‘আবু ইসরাইল নাদারাহ আল্লাহ্’র কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছেন যে, সে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং বসবে না, সে কখনওই ছায়ায় বসে না, কথা বলে না এবং রোজা পালন করে। রাসুল (সা) বলেন, “তাকে কথা বলতে বল, ছায়ায় আশ্রয় নিতে বল, বসতে বল এবং রোজা পূর্ণ করতে বল।”
অতিরঞ্জিত করা মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় এবং মুসলিম বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে বলেন,
“আল মুতানাত্তিনুন বা একগুয়ে লোক ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।” তিনি এটা তিনবার বললেন। আহমেদ, আন নাসা’ঈ এবং ইবনে মাজাহ্ উল্লেখ করেন এবং ইবনে মাজাহ্’র ভাষায় করা হয় যে, “হে লোকেরা! ঘুলুহ বা দ্বীনের মধ্যে বাহুল্যতার ব্যাপারে সাবধান হও। অবশ্যই তোমাদের আগে যারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তারা ঘুলুহ বা বাহুল্যতার কারণেই হয়েছে।”
দ্বীনের ব্যাপারে অতিরঞ্জিতকারীদের মতো উদাসীনরাও একই দোষে দুষ্ট। এধরনের লোকেরা দ্বীনের মূলে বিশ্বাস স্থাপন করে কিন্তু দায়িত্ব পালনের বেলায় উদাসীন, ভয়াবহ বিভিন্ন গুণাহে্ লিপ্ত, মনে মনে ফন্দি এটেছে যে মৃত্যুর আগে অনুতপ্ত হয়ে গুণাহ্ মাফ করিয়ে নেবে। এমন যেন তারা গায়েব এবং আজল সম্পর্কে অবগত। এটা সুস্পষ্ট হারাম। সর্বোচ্চ আনুগত্যের সাথে মুসলিমদের অতি সত্তর পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলাম গ্রহণ করা উচিত। অন্যথায় তাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সহজ সরল পথ থেকে বিচ্যুত ধরা হবে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা), বাহুল্যতা ও অতিরঞ্জিত করার ব্যাপারে যেমন ব্যক্তিকে সতর্ক করেছেন ঠিক তেমনি দল, রাষ্ট্র ও উলামাদেরও সতর্ক করেছেন। আজকে আমরা, দাওয়াহ্বহনকারী এবং তাদের চিন্তাবিদ অনেকের মাঝে ইসলামের প্রতি ভালবাসা, দ্বীনের ভাবমূর্তিকে উজ্জল করতে অণুপ্রাণিত হয়ে দ্বীনকে সহজ ও কঠোরতা মুক্ত হিসেবে প্রমাণিত করার নিমিত্তে এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে দেখি। তারা সীমাকে অতিক্রম করে এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর প্রদর্শিত দৃঢ় পথ থেকে বিচ্যুত হয়, অনেক আহ্কামকে অবহেলা করে এবং এমন মতামত প্রদান করে যার সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্ক নেই। এসব কিছুই তারা করে সময় ও বাস্তবতার সাথে ইসলামের একাত্নতা পোষণ করানোর জন্য যতক্ষন না তারা এই পর্যায়ে চলে যায় যে তারা উম্মাহ্’র কাছে স্বীকৃত ও গৃহীত শারী’আহ্’র ষ্পষ্ট বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে। গ্রন্থের দুরবর্তী ব্যাখ্যাকেও তারা উল্লেখ করে না। তারা এমন মতামত পোষণ করে যে, মুরতাদকে হত্যা করা হবে না, যদিও এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“যে দ্বীন পরিবর্তন করে, তাকে হত্যা কর।”
[বুখারী এবং আহমদ]এ ব্যাপারে তাদের যুক্তি হলো, যে বাস্তবতা ও পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এরূপ বলেছিলেন, সে বাস্তবতা বা পরিপ্রেক্ষিত এখন বিরাজ করছে না। এরূপ অবস্থানের কারণ হলো তারা ধর্মীয় স্বাধীনতায় ধ্বজাধারী পশ্চিমাদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে দ্বীনকে ব্যাখ্যা করে। তারা এমন দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে যে নারীরা ইমামতের (খিলাফত) দায়িত্ব পালন করতে পারবে যদিও এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্পষ্ট হাদীস রয়েছে, “নারীকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দানকারীরা কখনোই সফল হবে না।” [বুখারী, আহমদ, তিরমিযী, নাসাঈ]
তারা বলে, এরূপ বলা হয়েছে কেবলমাত্র একটি বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সার্বজনীনভাবে নয়। পশ্চিমাদের মতই ইসলাম নারীদের সম্মান করে এরূপ ভাবমূর্তি প্রদর্শনের জন্য তারা এটি বলে থাকে। এছাড়াও প্রচন্ড কঠিন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কারণে তারা সুদকে মেনে নেবার ব্যাপারে অনুমোদন দিয়েছে।
এসবই ইসলামের হক্বকে ভূলুন্ঠিত করেছে এবং দেখানোর চেষ্টা করছে যে ইসলাম মানবজীবনের সবকিছু নিয়ে সমাধান দিতে সক্ষম নয়। তাদের প্রদর্শিত দূর্বলতা ইসলামের নয় বরং তাদের নিজেদের। তাফরীত বা অবহেলার পেছনে যে ইস্যুসমূহ কাজ করে ইফরাত বা বাহুল্যতার পেছনে একই ইস্যুগুলো কাজ করে, অর্থাৎ দ্বীন সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা। একারণে দ্বীনের মধ্যে এ দু’ধরনের লোক, যারা অবহেলা করে এবং বাহুল্যতা প্রদর্শন করে, তারা নিজেদের ধ্বংস করে ফেলছে। উভয়েই তাদের প্রবৃত্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রথমটি হলো নিজের প্রবৃত্তিকে সন্তুষ্ট করা, দ্বিতীয়টি হলো মানুষকে সন্তুষ্ট করার পাঁয়তারা। কোথাও আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে সন্তুষ্ট করার কোন প্রচেষ্টা নেই।
এই দু’টি অবস্থানের ভিত্তিতে বাহুল্যতা ও অবহেলাকে বর্জন করে আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশকে মেনে নিতে বাধ্য। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বক্তব্য থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি, যেখানে তিনি বলেছেন,
“যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সুক্ষ্মজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত।”
(সূরা আল মূলক: ১৪)অন্য কথায়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই উম্মাহ্কে মানবজাতির জন্য স্বাক্ষীরূপে নির্ধারণ করেছেন, যেভাবে নবী (সা) তাঁর উম্মতের জন্য স্বাক্ষীরূপে নির্ধারিত হয়েছেন। এ কারণে এই উম্মাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সম্মানিত। মানবজাতির মাঝে এর অবস্থান পর্বতের চূড়ার মতই, যেখানে সে সর্বোচ্চ ও কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে। আমরা পশ্চিমাদের মতো করে এই আয়াতকে ব্যাখ্যা করি না, যা আপোষের ভিত্তিতে সমাধানের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়েছে। আগের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা বলতে পারি যে, এটা হারাম। আক্বীদা আপোষের ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে না। কেননা এটা নিজেই কুফর। একটি হলো ঈমান এবং অন্যটি কুফর, একটি আলো ও অন্যটি অন্ধকার, একটি সঠিক নির্দেশনা এবং অন্যটি ভুল। শরী’আহগত আইনের ক্ষেত্রে আমরা পূর্বেই প্রতিষ্ঠিত করেছি যে আল্লাহ্ ব্যতিত আর কোন আইন প্রণেতা, বিচারক নেই। আর কেউ নেই যে তার রায়কে উল্টাতে পারে। কারণ তিনিই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক।
উদারপন্থা ও চরমপন্থার ব্যাপারে এটাই হলো পশ্চিমাদের উপলদ্ধি। আর বর্ণিত বিষয়গুলো হলো ইসলামের উপলদ্ধি। পশ্চিমাদের এ ধরনের অবস্থান নেয়ার পেছনে কারণ হলো তারা সত্যিকারের ইসলামকে তাদের অস্তিত্ব ও ঔপনিবেশবাদের জন্য ধ্বংসাত্নক মনে করে। সুতরাং এভাবে কী আমরা মুসলিমদের কাঁধের উপর দিয়ে পশ্চিমাদের হাতে সব ক্ষমতা তুলে দেব? পশ্চিমাদের সাহায্য করার অর্থ হলো যারা ইসলামের জন্য কাজ করে তাদের বিরুদ্ধে কাজ করা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“সুতরাং আপনি এর প্রতিই দাওয়াহ্ দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল থাকুন; আপনি তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করবেন না।”
(সূরা আশ শূরা: ১৫)তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“অতএব, তুমি এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে সবাই সোজা পথে চলে যাও, যেমন তোমায় হুকুম দেয়া হয়েছে এবং সীমালঙ্ঘন করবে না, তোমরা যা কিছু করছো, নিশ্চয় তিনি তার প্রতি দৃষ্টি রাখেন। আর পাপিষ্ঠদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুন পাকড়াও করবে। আর আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের কোন বন্ধু নাই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না।”
(সূরা হুদ: ১১২-১১৩)আমাদের হৃদয় এ দ্বীনের কল্যাণ চায় এবং এর বিজয় কামনা করে। দ্বীনের জন্য যাতে আমাদের হৃদয় ও মন খুলে যায় আল্লাহ্’র কাছে সে তাওফীক আমরা চাই। আমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণ চাই তা অন্যদের জন্যও কামনা করি। আমরা আল্লাহ্’র কাছে প্রার্থনা করি যাতে আমাদের উপদেশসমূহ বারিধারার মত সবার হৃদয় ও মনকে পূণর্জাগরিত করে এবং কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাই আমাদের সঠিক পথের দিশা দেখাতে পারেন।
সমাপ্ত
১৭তম অধ্যায়: ইসলাম গ্রহণের পরও কি রাসূলুল্লাহ্ (সা) নাজ্জাশীকে কুফর শাসনের অনুমোদন দিয়েছিলেন?

যারা ইসলামের দাওয়াহ্ সঠিকভাবে বহন করতে চায় এবং দলীয় কিংবা ব্যক্তি জীবনে একে প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে, তারা কুফর শাসনব্যবস্থা ধ্বংসের নামে কখনওই এতে অংশগ্রহণ করতে পারে না। কারণ কুফর ব্যবস্থা ও আইন-কানুনসমূহ বাস্তবায়নকারী কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তা কেবল শক্তিশালীই হয়, ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সমর্থনে যেসব দলিল পেশ করা হয় তা একধরনের আত্নপ্রবঞ্চণা, তারও আগে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ও মুমিনদের সাথে প্রবঞ্চণার নামান্তরমাত্র। বিশেষত: যখন তা হয় অর্থ ও প্রামাণ্যতার দিক থেকে অকাট্য শারী’আহ্ দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক।
অর্থ ও প্রামাণ্যতার দিক থেকে অকাট্য শারী’আহ্ দলিলের বিরোধীতার সমর্থনে শারী’আহ্’কে বিবেচনায় না এনে মনগড়া মাসলাহা (Interest) অবলম্বন করা একজন দাওয়াহ্ বহনকারীর জন্য অবশ্যই কঠিন পরীক্ষা ও ভয়াবহ গুণাহ্। অন্যকথায়, অর্থ ও প্রামাণ্যতার দিক থেকে অকাট্য শারী’আহ্ দলিল সর্বদা কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সাথে সাংঘর্ষিক। অথচ তা সত্ত্বেও, আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা বাদ দিয়ে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের সমর্থনে এমনকিছুর অবলম্বন করা যেখানে সুবহাত আদ-দলিল (দলিলের আভাস) নাই, তাও ভয়াবহ গুণাহে্র কাজ। এসব দলিল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে শাসন করতে বাধ্য করে এবং যা তার পক্ষ থেকে নয় তা দিয়ে শাসন করার বিষয়টিকে নিষিদ্ধ করে।
তারা আন নাজ্জাশীর ঘটনাকে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে, যার মৃত্যুর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের কাছে ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তার সালাতুল জানাযাও আদায় করেছিলেন। তারা বলে যে, নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং পূর্বে যে শাসনব্যবস্থা দিয়ে শাসন করেছিল তা অব্যাহত রেখেছিল; অর্থাৎ সে শাসনব্যবস্থা ছিল অনৈসলামী। এর প্রমাণের জন্য তারা বুখারী শরীফে নাজ্জাশীর মৃত্যু ও জানাযার নামাযের ব্যাপারে বর্ণিত ছয়টি হাদীসকে তুলে ধরে। এদের তিনটি জাবির বিন আবদুল্লাহ আল আনসারী এবং অপর তিনটি আবু হুরাইরা (রা) কতৃর্ক বর্ণিত। যদিও এ ছয়টি হাদীস কুফর আইন কানুন দ্বারা পরিচালিত কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের দলিল হতে পারেনা।
নীচের অনুচ্ছেদগুলোতে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে:
যখন বুখারী এ হাদীসগুলো বর্ণনা করেন তখন এদের পাঁচটিকে ‘বাব মাউত আন-নাজ্জাশী’ (নাজ্জাশীর মৃত্যু বিষয়ক অধ্যায়) এবং ষষ্ঠটিকে তিনি ‘বাব আল জানাইয়েয’ (জানাযার নামাজের অধ্যায়) এ স্থান দেন। এ ছয়টি হাদীসই নাজ্জাশীর মৃত্যু সম্পর্কিত, যেগুলোর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের তার মৃত্যু সম্পর্কে অবগত করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে, তিনি একজন ধার্মিক লোক ছিলেন এবং তাদের ভাই ও তাকে যাতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ক্ষমা করে দেন সেজন্য দো’আ করার নির্দেশ দেন এবং নবী (সা) এর সাথে জানাযার নামাজ পড়তে নির্দেশ দেন। এটা থেকে বুঝা যায় তিনি একজন মুসলিম ছিলেন।
ইবনে হাজার আল আসকালানী তার ‘ফাত উল বারী’ (সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা)-তে নাজ্জাশীর ইসলাম ধর্মে রূপান্তরিত হওয়া নিয়ে আলোচনা না করে বরং ‘আন নাজ্জাশীর মৃত্যু’ শিরোনামে বুখারীর বর্ণনার উপর মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ আছে যে আল বুখারী নাজ্জাশীর ইসলামে ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়ে কিছু বর্ণনা করেছেন বরং তিনি তার মৃত্যু খবরটিই তুলে ধরেছেন। কারণ তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টির চেয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মৃত্যুর বিষয়টিই উঠে এসেছে। সুতরাং বুখারী নাজ্জাশীর মৃত্যুর ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন এজন্য যাতে তার জানাযার নামাজ আদায় করা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।”
বুখারী বর্ণিত হাদীসের বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওহীর মাধ্যমে যেদিন নাজ্জাশী মারা যান সেদিন তার মৃত্যু ও ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অবগত হন। এ থেকে আরও বুঝা যায় সাহাবাগণ এ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না যদি না রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের এ ব্যাপারে অবহিত করতেন। সে কারণে জাবির (রা) বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ করা হয়,
“যখন নাজ্জাশী মারা গেল তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, ‘আজকে একজন ধার্মিক লোক মারা গেল। সুতরাং তোমাদের ভাই আসিমাহ এর জন্য দাঁড়াও এবং প্রার্থনা কর’।”
আবু হুরাইরা (রা) কতৃর্ক বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে,
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে হাবাশার শাসক নাজ্জাশী যেদিন মারা যান সেদিন তার মৃত্যুর ব্যাপারে অবহিত করেন।” এ থেকেও বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদেরকে যেদিন নাজ্জাশী মারা যায় সেদিন ওহীর মাধ্যমে তার মৃত্যু ও ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অবগত করেন।
জাবির বিন আবদুল্লাহ’র বর্ণনা অনুসারে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের বলেন,
“আজকে একজন ধার্মিক লোক মারা গেল।”
এবং
“দাঁড়াও এবং তোমাদের ভাই আসীমাহ্’র জন্য দোয়া করো।”
এ থেকে বুঝা যায় যে তারা ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জানতো না। যদি তারা এটা আগে জানতো তাহলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এভাবে বলার প্রয়োজন ছিল না যে,
“একজন ধার্মিক লোক”
“তোমাদের ভাই”
এর কারণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণত যখন কোন সাহাবী মারা যেত তখন তাদের জানাযার নামাজের জন্য এভাবে আহ্বান করতেন না।
এসব হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, নাজ্জাশী তার মৃত্যুর সামান্য কিছুদিন আগে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কবে করেছিলেন এ সম্পর্কে কোন ধারণা পাওয়া যায় না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওহীর মাধ্যমে যেদিন নাজ্জাশী মারা যান সেদিন তার মৃত্যু ও ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অবগত হন। অন্য কোন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে অবগত হয়েছেন, এ ব্যাপারে কোন অকাট্য দলিল নেই।
এই ছয়টি হাদীসে বর্ণনার মধ্যে এমন কোন ইঙ্গিত নেই যা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবে যে এই নাজ্জাশীই সেই নাজ্জাশী যার নিকট সাহাবীগণ হাবাশা বা ইথিওপিয়ায় হিজরত করেছিলেন। একইভাবে এরকমের কোন ইঙ্গিত নেই যে তিনি সেই নাজ্জাশী যার কাছে ইসলাম গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। এর কারণ হলো ’নাজ্জাশী’ শব্দটি কোন ব্যক্তির নামবাচক শব্দ নয়। বরং ইমাম নববীর ‘শরহে সহীহ মুসলিম’ এর দ্বিতীয় খন্ড এবং ইবনে হাজার আল ’আসকালানী-এর ’আল ইসাবা’এর তৃতীয় খন্ড অনুসারে এটি হলো যারা হাবাশা শাসন করতেন এরকম সবার লকব বা উপাধিসূচক একটি শব্দ।
সহীহ মুসলিমের দ্বাদশ খন্ডে ইমাম নববী মন্তব্য করেন যে হিজরতের ষষ্ঠ বছরের শেষের দিকে হুদাইবিয়ার অভিযান থেকে ফিরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যার কাছে ইসলাম গ্রহণের জন্য পত্র পাঠিয়েছিলেন আর যার জন্য জানাযার নামাজ পড়েছিলেন, তারা উভয়ই এক নাজ্জাশী নয়। এ ব্যাপারে হাদীসের ভাষ্য নিম্নরূপ:
“আনাস (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) কিসরা, কায়সার, নাজ্জাশী ও প্রত্যেক যালিম শাসকের নিকট আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি ঈমান আনার জন্য পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি সে নাজ্জাশী ছিলেন না, যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামাজ আদায় করেন।”
সুতরাং এ হাদীস থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামায পড়েছিলেন, তার কাছে আশ্রয়ের জন্য সাহাবীগণ হিজরত করেননি এবং তিনি সে ব্যক্তিও নন যার কাছে হিজরতের ষষ্ঠ বছরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলাম গ্রহণের জন্য পত্র প্রেরণ করেছিলেন। বরং যে নাজ্জাশীর জন্য জানাযার নামাজ পড়া হয়েছিল তিনি ক্ষমতায় আসেন নাজ্জাশীর (যার নিকট ইসলাম গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমর বিন উমাইয়া আদ-দামরির মাধ্যমে চিঠি পাঠিয়েছিলেন) মৃত্যুর পর। পত্র গ্রহণকারী নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেননি। যদি করতেন তাহলে সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মাধ্যমে এ বিষয়ে অবগত হতেন এবং তার জন্য জানাযা পড়তেন। জাফর বিন আবি তালিব এবং অন্যান্য হিজরতকারীগণ তাহলে এ বিষয়ে জানতে পারতেন। কারণ মক্কা বিজয়ের পর সপ্তম হিজরীতে তারা ফিরে আসেন অর্থাৎ চিঠি প্রেরণের পরের বছর। যদি তিনি ইসলাম গ্রহণ করতেন তাহলে তা হতো মুসলিমদের জন্য আনন্দের ও উদযাপনের একটি বিষয়, বিশেষ করে খায়বার বিজয়ের পর। অবশ্যই তিনি (সা) নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি সাহাবাদের জানাতেন, শুধু জাফরের (রা) আগমনকে ঘিরে তার মন্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখতেন না;
“আমি জানি না কী আমাকে বেশী আনন্দ দিয়েছে; খায়বার বিজয় নাকি জা’ফরের আগমন।”
(সীরাত ইবনে হিশাম)তিনি (সা) হয়তো যোগ করতেন, ‘নাকি নাজ্জাশীর ইসলাম গ্রহণ।’ কিন্তু তিনি (সা) হাদীসের মধ্যে নাজ্জাশীর নাম উল্লেখ করেননি যদিও অবস্থাপ্রেক্ষিতে তা জরুরী ছিল যদি নাজ্জাশী তাঁর (সা) দাওয়াহ্ কবুল ও ইসলাম গ্রহণ করতেন।
যারা ধারনা করেন, যে নাজ্জাশীর কাছে মুসলিমগণ আশ্রয় গ্রহণের জন্য হিজরত করেছিলেন, যে নাজ্জাশীর কাছে রাসূল (সা) ষষ্ঠ হিজরীর শেষের দিকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন এবং যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামাজ পড়েছিলেন, এই তিন নাজ্জাশী একই ব্যক্তি, তারা ভুল করছেন। কারণ তিনি (সা) হিজরতকারী সাহাবীদের (রা) উদ্দেশ্য করে নাজ্জাশীর ব্যাপারে মুল্যায়ন করে বলেছিলেন, “তিনি এমন একজন রাজা যার অধীনে কেউই অত্যাচারিত হয় না এবং তার ভূমি হলো ন্যায়ের ভূমি।” (ইবনে হিশাম); এবং যেসব মুসলিম সেখানে হিজরত করেছিলেন তারা সর্বোচ্চ সুরক্ষা ও নিরাপত্তা পেয়েছিলেন এবং নির্বিঘ্নে ইবাদত করতে পেরেছিলেন। তিনি তাদেরকে তার পরিষদবর্গের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে কুরাইশদের দু’জন প্রতিনিধির কাছে সমর্পণ করেননি। তিনি তাদের উভয়পক্ষকে এ বলে প্রতিহত, সুরক্ষা প্রদান ও নিরাপত্তা বিধান করেছিলেন যে, ‘আপনারা আমার দেশে নিরাপদ এবং যারা আশ্রয়প্রাপ্তদের ক্ষতি করবে তারাই শাস্তির আওতায় আসবে।’ জাফরের উত্তরের কারণে তিনি এ ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। যখন নাজ্জাশী সাহাবাদের প্রশ্ন করেছিলেন যে, মুহম্মদ (সা) তোমাদের জন্য কী নিয়ে এসেছে এবং প্রত্যুত্তরে জাফর (রা) বলেছিলেন, “অবশ্যই তিনি (সা) যা এনেছেন এবং ঈসা (আঃ) যা নিয়ে এসেছিলেন তা একই প্রদীপ থেকে উৎসারিত।” জাফরের এ উত্তরের উপর মন্তব্য করা ছাড়াও দ্বিতীয় দিন তিনি ঈসার ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গী জানতে চাওয়ার পর মাটি থেকে একটি লাঠি উঠিয়ে বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম ঈসা ইবনে মারিয়ম এর ব্যাপারে তোমরা এই লাঠির প্রস্থের চেয়ে একটুও বাড়িয়ে বলোনি।’ (সীরাত ইবনে হিশাম); এ ঘটনা থেকে তারা মনে করে যে, নাজ্জাশী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, যদিও তা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কোন ভাষ্য দ্বারা সমর্থিত নয়। একইভাবে হিজরতকারীদের মধ্যে একজন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর বিবি উম্মে সালামাও ইসলাম ধর্ম গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। যখন তিনি নাজ্জাশী ও তার দেশে কী ঘটেছিল সে সম্পর্কে বর্ণনা করেন তখন উল্লেখ করেন যে, “যখন আমরা হাবাশার ভূমিতে প্রবেশ করি তখন আমরা নাজ্জাশীর মতো সর্বোত্তম প্রতিবেশীকে পেয়েছিলাম। আমরা দ্বীনের ব্যাপারে সেখানে নিরাপদ অনুভব করেছিলাম এবং কোনরূপ ক্ষতির সম্মুখীন না হয়ে আল্লাহ্’র উপাসনা করতে পারছিলাম এবং অপছন্দনীয় কোন কিছুই শুনতে পাইনি….” তিনি আরও বলেন, “যতক্ষণ না একজন লোক হাবাশায় এসে তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করলো ততক্ষণ আমরা এ অবস্থায় চলছিলাম।” তিনি বললেন, নাজ্জাশী যেভাবে আমাদের অধিকারগুলো দিয়েছিল সেভাবে যদি ঐ লোকটি যে তাকে পরাস্ত করতে চেয়েছিল আমাদের তা না দেয় এ ভয়টা ছাড়া অন্য কোন ভয় আমাদের আমাদের আচ্ছন্ন করেনি। তিনি বলেন, “যখন আল্লাহ্ নাজ্জাশীকে তার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় দান করলেন ও তার ভূমিকে আরও শক্তিশালী করলেন, আল্লাহ্’র কসম সে সময়ের মতো আনন্দিত আমরা আর কখনওই হইনি।” “নাজ্জাশী যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসলেন এবং তখন নিজ দেশে তার কতৃর্ত্ব আরো বৃদ্ধি পেল এবং হাবাশার রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড আরও ভালভাবে পরিচালিত হতে লাগল। মক্কায় অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে পৌঁছার আগ পর্যন্ত আমরা নাজ্জাশীর কাছাকাছিই সবচেয়ে ভাল বাড়িতে ছিলাম।” (সীরাত ইবনে হিসাম); উম্মে সালামা বর্ণিত এ হাদীস প্রমাণ করে না যে, নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
এটা হলো একটি দৃষ্টিকোণ থেকে। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, যারা বলে, যে নাজ্জাশীর জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রার্থনা করেছিলেন, যার কাছে মুহাজিরগণ আশ্রয় লাভ করেছিলেন এবং যার কাছে ইসলাম গ্রহণের জন্য পত্র পাঠানো হয়েছিল, তিনজনই একই ব্যক্তি তারা হয়তো সহীহ মুসলিমের আনাস বিন মালিক (রা) বর্ণিত নিম্নোক্ত হাদীসটির সাথে সুপরিচিত নয়:
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) কিসরা, কায়সার, নাজ্জাশী ও প্রত্যেক যালিম শাসকের নিকট আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রতি ঈমান আনার জন্য পত্র প্রেরণ করেন। কিন্তু তিনি সে নাজ্জাশী ছিলেন না, যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামাজ আদায় করেন।”
মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ লিখিত ‘নবীর সময়কার রাজনৈতিক দলিলপত্র’ শীর্ষক বইয়ে উল্লেখিত দু’টি চিঠির বিষয়ে বলা হয়েছে যে, নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে একটি পত্র লিখেছিলেন যেখানে তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তিনি (সা) অনুমতি দিলে নাজ্জাশী রাসূল (সা) এর সাথে দেখা করতে প্রস্তত বলেও অবহিত করেন ও তিনি তার পুত্র আরহা বিন আল আসাম বিন আবহার-কে প্রেরণ করেন এবং চিঠিটি যখন প্রেরণ করা হয় যখন রাসুল (সা) মক্কায় অবস্থান করছিলেন।
দ্বিতীয় চিঠির ক্ষেত্রে উল্লেখ করা হয় যে, নাজ্জাশী হাবাশা ত্যাগকৃত সাহাবাদের কাছে মদীনায় অবস্থানরত রাসূলুল্লাহর জন্য পত্রটি দিয়ে দেন। এই দু’টি চিঠির ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য কোনো হাদীস গ্রন্থে কোনো উল্লেখ নেই। ‘নবীর সময়কার রাজনৈতিক দলিলপত্র’ বইয়ের রচয়িতা উল্লেখ করেন যে, তিনি এহেন তথ্যাদি তাবারী, কালকাসান্দি, ইবনে কাসির এবং অন্যান্য ইতিহাস বই থেকে সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেননি যে, এগুলো কোন হাদীসের বই থেকে সংগ্রহ করেছেন। ইতিহাসের বইসমূহ অকাট্য নয়, কেননা এগুলোর ক্ষেত্রে হাদীসের মত বর্ণনার সূত্রসমূহ পরীক্ষিত নয়। তারা রাতের অন্ধকারে কাঠ সংগ্রহকারীর মতোই তথ্যসমূহ সংগ্রহ করে থাকে যেন সেই সংগ্রাহক গাছের ডাল নাকি সাপ সংগ্রহ করছে এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয়। একারণে এ দু’টি চিঠির কোনো মূল্য নেই। এগুলো আনাস বিন মালিকের (রা) বর্ণিত হাদীস, নাজ্জাশীর ব্যাপারে উম্মে সালামার বক্তব্য ও হাবাশায় আশ্রয়রত মুহাজিরীনদের বক্তব্য, যাদের মধ্যে জাফর (রা) ছিলেন সর্বশেষ এবং তিনি বলেননি যে, নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যদিও জাফর হিজরতের সপ্তম বছরে বিভিন্ন শাসক নিকট পত্র প্রেরণ ও খায়বার বিজয়ের পর ফিরে এসেছিলেন। অতএব ঐ দু’টি চিঠি সঠিক হতে পারে না। উপরের সবকিছুর ভিত্তিতে এটা স্পষ্ট যে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিল ও যার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) জানাযার নামায আদায় করেছিলেন এবং যার কাছে মুহাজিরীনগণ হিজরত করেছিলেন তারা একই ব্যক্তি নয়। আবার তিনি সেই ব্যক্তিও নন যার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলাম গ্রহণের আমন্ত্রন জানিয়ে হিজরী ষষ্ঠ সালের শেষের ও সপ্তম সালের শুরুর দিকের মাঝামাঝি সময়ে আমরু বিন উমাইয়াহ আদ দামরি মারফত পত্র পাঠিয়েছিলেন। বরং যার জন্য জানাযার নামাজ পড়া হয়েছিল তিনি সে নাজ্জাশী যিনি ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট হতে পত্রগ্রহণকারী নাজ্জাশীর মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করেন।
যে নাজ্জাশী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তিনি হিজরতের সপ্তম বছরে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এর কারণ হলো হুদাইবিয়ার অভিযাত্রা শেষ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নাজ্জাশী সহ অন্যান্য শাসকদের কাছে তাঁর বার্তাবাহককে প্রেরণ করেন। এটা ছিল হিজরী ষষ্ঠ সালের শেষ মাস, অর্থাৎ জিলক্বদ। এ নাজ্জাশী সপ্তম বছরে মারা যান এবং এর মধ্যে ইসলাম গ্রহণকারী নাজ্জাশী ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং তার জন্যই রাসূল (সা) জানাযার নামাজ আদায় করেন। আর এই নাজ্জাশী মারা গিয়েছিলেন অষ্টম হিজরীতে মক্কা বিজয়ের পূর্বেই যা আল বায়হাকী তার ‘দালাইল আন নব্যুয়্যাত’-এ উল্লেখ করেন।
সুতরাং তার ক্ষমতা গ্রহণ, ইসলাম গ্রহণ এবং মৃত্যুবরণ, সবই একটি স্বল্প সময়ের মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং কেউ এ ব্যাপারে জ্ঞাত ছিল না, এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা)ও নন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার ইসলাম গ্রহণ ও মৃত্যুর বিষয়টি তিনি যেদিন মারা যান সেদিনই ওহীর মাধ্যমে অবগত হন যা আমরা বুখারী কর্তৃক বর্ণিত নাজ্জাশীর মৃত্যু সংক্রান্ত ছয়টি হাদীস থেকে জানতে পারি। ইসলাম গ্রহণ ও মৃত্যুর মধ্যবতীর্ স্বল্প সময়ের মধ্যে তার পক্ষে ইসলামের আইন-কানুন সমূহ জানা সম্ভব ছিল না। ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে কোন ধারণা না থাকায় তিনি নাজ্জাশীর কর্তব্য সম্বন্ধে জানাতে পারেননি।
সেকারণে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছে তা অনুসারে শাসন না করে কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে এটাকে দলিল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। সুতরাং তাদের যুক্তি অসার প্রমাণিত হলো।
১৬তম অধ্যায়: খন্ডিত সংস্কার ও আমূল সংস্কার

মুসলিমদের আজকের এ করুণ দশায় অবস্থার পরিবর্তন ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মত উত্তম বিকল্পের জন্য কাজ করতে অনেক ইসলামী আন্দোলনের উন্মেষ ঘটেছে। এ আন্দোলনগুলো মূলত দু’ধরনের। প্রথম ধরনের আন্দোলন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার দাওয়াহ্’র ক্ষেত্রে সংস্কারমূলক পদ্ধতির উপর নির্ভর করে। সুতরাং তারা, যা ধ্বংস হয়েছে তা ঠিক করার চেষ্টা করে এবং যা দূষিত হয়ে গেছে তার সংস্কার সাধনের চেষ্টা করে। দ্বিতীয় ধরনের আন্দোলন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পথের উপর নির্ভর করে এবং তাদের দৃষ্টিভঙ্গী হল, ভিত্তিমূল যেখানে দূনীর্তিগ্রস্ত হয়ে গেছে সেখানে সংস্কার সাধন করে বাস্তবে তেমন কোন সুফল পাওয়া যাবে না, তাই খন্ডিত সংস্কার আদৌ কোন কাজে আসবে না।
এ দুই আন্দোলনের চিন্তার পার্থক্যের দরুণ বাস্তবতাকে বিশ্লেষণের ও এর প্রতি আচরণের প্রক্রিয়া ভিন্ন হয়ে গেছে। ফলত: কাজের প্রক্রিয়া ও দাওয়াহ্’র পদ্ধতিও ভিন্ন ।
সুতরাং এ ব্যাপারে শারী’আহ্’র দৃষ্টিভঙ্গি কী?
শারী’আহ্ আইন উপলদ্ধি করতে হলে আমাদের ইসলামী চিন্তার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এর কারণ হল ভিত্তি নিয়ে আলোচনা না করলে শারী’আহ্ হুকুমের ব্যাপারে জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়।
শারী’আহ্ পদ্ধতি অনুযায়ী অগ্রসর হতে হলে আমাদের সামনের উপস্থিত বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের সুস্পষ্ট ধারনা থাকতে হবে, সেই বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শারী’আহ্ দলিলসমূহ অনুসন্ধান করতে হবে এবং অতঃপর এগুলোকে আইনগত প্রক্রিয়ায় বুঝতে হবে।
এটা সর্বজনবিদিত যে, পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম সংস্কার পদ্ধতির কথা বলে যখন সংস্কার কার্যত অপরিহার্য হয়ে পড়ে এবং পরিবর্তন পদ্ধতির কথা বলে যখন পরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সুতরাং শারী’আহ্’র দৃষ্টিতে বর্তমান বাস্তবতায় কি করা প্রয়োজন?
আমাদের কী সংস্কার প্রয়োজন নাকি আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন?
উভয়ক্ষেত্রে রায় নিতে হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছ থেকে এবং এর ভিত্তি হতে হবে শারী’আহ্ দলিল। যে বাস্তবতাকে পরিবর্তন বা সংস্কার করা হবে তার উপর মুলতঃ দাওয়াহ্’র প্রকার (সংস্কার নাকি পরিবর্তন) নির্ভর করে।
পরিবর্তনের ক্ষেত্রে হোক সেটা ব্যক্তির চিন্তা পরিবর্তন অথবা তার অবস্থা পরিবর্তন অথবা সমাজের পরির্বতন অথবা মানুষের বা জাতির পরিবর্তন, মুলতঃ এটা শুরু হওয়া উচিত মানুষ, সমাজ ও তার অবস্থা যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সেটা থেকে। কারণ এই ভিত্তি থেকেই মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রনকারী সকল বিশ্বাস ও চিন্তা উদ্ভুত হয়। এই ভিত্তি এবং তা সংশ্লিষ্ট আংশিক ও পারিপার্শ্বিক সকল চিন্তার উপর নির্ভর করে মানবজাতির সুখ-দুঃখ, পুনর্জাগরণ কিংবা অধঃপতন।
মুসলিম ও ইসলামী সমাজ যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তা হল ইসলামী আক্বীদা। মুসলিমের অথবা ইসলামী রাষ্ট্রের কোন কার্যক্রম এই আক্বীদা এবং এর আওতা থেকে একচুল বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ নাই।
ইসলাহ্ বা সংস্কারের মধ্যে তাগীর বা পরিবর্তনও অন্তর্ভুক্ত। যদি ভিত্তি ঠিক থাকে তবে এটা কেবলমাত্র শাখা-প্রশাখা নিয়ে কাজ করে, মৌলিক ভিত্তি নিয়ে নয়। অন্যথায় এটা ভিত্তিকেই সঠিক ও পরিশুদ্ধ করার কাজ করে।
যদি ভিত্তি ঠিক থাকে কিন্তু এতে কিছু অস্পষ্টতা থাকে অথবা কোন চিন্তা দ্বারা এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও তা প্রাধান্য বিস্তার করে, সেক্ষেত্রে কাজটি হবে সংস্কারমূলক কিন্তু পরিবর্তনমূলক নয়। মূল ভিত্তিতে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধতা ফিরিয়ে আনাই হবে আসল কাজ এবং এর মাধ্যমে এটি শক্তিশালী হবে। এতে করে শাখাপ্রশাখাসমূহেও এ পরিবর্তনের ছোঁয়া টের পাওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত একজন মুসলিমকে দাওয়াহ্’র বেলায় তার ঈমানকে বিশুদ্ধ করা এবং তার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করার দাওয়াহ্ করতে হবে যাতে সে সঠিক পথে আসে এবং তার চারিত্রিক ত্রুটি দূর হয়। আবার গুনাহগার মুসলিমকে দাওয়াহ্ প্রদানের ক্ষেত্রে তার ঈমান বৃদ্ধির দিকে শ্রম দিতে হবে যাতে তার ভেতর আবেগের সঞ্চার ঘটে যা তাকে তাক্বওয়া বৃদ্ধির দিকে ধাবিত করে এবং গুনাহ্ দিকে ধাবিত হওয়ায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কোন মুসলিমের জন্য যা প্রযোজ্য ইসলামী রাষ্ট্রের জন্যও তা প্রযোজ্য। উদাহরনস্বরূপ যখন আমরা কোন কাফিরকে ইসলামের দাওয়াহ্ দিব তখন তা হবে পরিবর্তনের দাওয়াহ্। কারণ তার বিশ্বাসের ভিত্তি এবং তার উপর প্রতিষ্ঠিত ও উৎসারিত সবকিছুই ভুল। সুতরাং সঠিক ভিত্তি দিয়ে একে সরাতে হবে। তাই ভিত্তিকে পাশ কাটিয়ে শুরুতেই আমরা একজন কাফিরকে নামাযের দাওয়াহ্ দেই না। এটাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) করেছেন এবং এটাই বাস্তবতায় পরিলক্ষিত। একজন কাফিরের সকল কাজই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিকট অবৈধ ও অগ্রহণযোগ্য, তা এখন যত ভালোই হোক না কেন এবং কোন কাফিরই তার কর্মগুণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না কারণ তার কোন কর্মই আল্লাহ্ প্রদত্ত ঈমানের উপর ভিত্তি করে সম্পাদিত হয়নি। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“এবং আমি তাদের (কাফির, মুশরিক) কৃতকর্মের প্রতি মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলিকণারূপ করে দিব।”
(সূরা আল-ফুরকান: ২৩)একইভাবে যদি একজন মুসলিম ঈমান ত্যাগ করে মুরতাদ হয় তবে তার সমস্ত কর্মই বৃথা হয়ে যাবে। সুতরাং, ঈমান হচ্ছে সমস্ত কর্মের মূল ভিত্তি।
যখন আমরা একজন মুসলিমকে দাওয়াহ্ করব তখন তা হবে সংস্কারমূলক। কারণ তার মূল ভিত্তি ঠিক আছে। তাকে দাওয়াহ্ করতে হবে যাতে সে ত্রুটিমুক্ত হয় এবং যে কারণে সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং নিষ্ঠা দূর্বল হয়েছে, সে কারণ দুর করা যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত ভিত্তি ঠিক আছে ততক্ষণ পর্যন্ত এর উপর নির্ভর করে তাকে বিকশিত করা, শক্তিশালী করা, ফলপ্রসূ করা ও বিশুদ্ধ করা সম্ভব হবে। এর ফলে সে সঠিক পথে যাবে এবং প্রকৃত নিষ্ঠা অর্জন করবে। যদি কোন মুসলিম মদ খায়, যিনাহ্ করে, চুরি করে, সুদ খায় এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থা পুণঃপ্রতিষ্ঠার দাওয়াহ্’কে অবহেলা করে তাহলে তার ঈমানকে পরিশুদ্ধ করলেই সে পরিশুদ্ধ হবে। সে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্কে স্মরণ করবে, যিনি জীবনের সবকিছুর পরিচালক, যাকে উপাসনা ও মান্য করা হয়। তার অপরাধ কত ছোট সেদিকে সে লক্ষ্য করবে না, বরং লক্ষ্য করবে যে স্রষ্টা কত মহান। দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে সে স্রষ্টার আদেশ-নিষেধ মান্য করবে। তাকে অবশ্যই খারাপ কাজের পরিমাণ সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, অর্থাৎ প্রজ্জলিত আগুনের কথা। অন্যদিকে, ভাল কাজের পুরষ্কারের কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ পরকালে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পুরষ্কারের কথা। সুতরাং একজনকে বিচার দিবসের ভয়াবহতা ও জাহান্নামের কঠিন আযাব এবং জান্নাতের নেয়ামত সম্পর্কে মনোযোগী হতে হবে। এভাবে তার মধ্যে ঈমানের ভাব জাগ্রত হবে এবং আনুগত্যের দিকে ছুটে যাওয়া ও গুনাহ্ থেকে মুক্ত হবার জন্য সে তৎপর হবে। এ পদ্ধতি ছাড়া মুসলিমদের সংশোধন করা যাবে না। সে কারণে আজকে আমাদের দাওয়াহ্’র মধ্যে ব্যক্তি মুসলিমকে মুসলিম বিবেচনায় এনে তাদের চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে এবং আচরণকে সংস্কার করতে হবে।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয় সংবিধানের মাধ্যমে এবং এই সংবিধান একটি উৎসের উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে এবং এই উৎস আবার একটি ভিত্তির উপর অবস্থান করছে। এ বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হবে। রাষ্ট্র কি ইসলামী আক্বীদার উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে এবং কেবলমাত্র কুর’আন ও সুন্নাহ্তে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেটি কী আইনের উৎস হিসেবে নেয়া হয়েছে? সংবিধানের কানুনসমূহ কী নাযিলকৃত আদেশ থেকে বিচ্যুত হয়েছে কিনা? যদি এগুলোর উত্তর ইতিবাচক হয় তাহলে রাষ্ট্রটি ইসলামী রাষ্ট্র।
যদি ইসলামী রাষ্ট্রে দূনীর্তি ও অপপ্রয়োগ ব্যাপক বিস্তৃতি লাভ করে তখন সে অবস্থায় পরিবর্তন নয়, সংস্কার প্রয়োজন। এ অবস্থা ওসমানিয়া খিলাফতের শেষের দিকে দেখা গিয়েছিল। এর সংস্কার অপরিহার্য এবং এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে পশ্চিমা কুফরদের তা ধ্বংসে সহযোগিতা করা কোনক্রমেই অনুমোদিত নয়। কিন্তু এটাই করেছিল (হিজাযের) তথাকথিত শরীফ হুসেইন।
কিন্তু রাষ্ট্র যদি ইসলামী আক্বীদা’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত না হয় এবং এই অনৈসলামী আক্বীদা’র উপর ভিত্তি করে যদি তার সংবিধান, ব্যবস্থা ও আইন প্রতিষ্ঠিত হয় তবে সংস্কার নয়, পরিবর্তন প্রয়োজন। মুসলিমগণ আজকে এ ধরনের রাষ্ট্রে বসবাস করছে। এ রাষ্ট্রসমূহ অনৈইসলামি। কারণ তাদের ব্যবস্থাপনা ইসলামী শারী’আহ্ থেকে উৎসারিত হয়নি, যদিও তারা বলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। কেননা এক্ষেত্রে কোন নাম বা উক্তি বিষয় নয় বরং এর অর্থ ও বাস্তবায়নই মুখ্য।
সুতরাং মুসলিমদের পরিচালনাকারী রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধান, কেবলমাত্র কুর’আন ও সুন্নাহ্’র উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত নয়। এই কারণে বাস্তবতা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে সার্বিক পরিবর্তনে ধাবিত হতে, আংশিক নয় এবং এই পরিবর্তন হচ্ছে শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি ও বুনিয়াদের মৌলিক পরিবর্তন। এই বাস্তবতাকে কখনওই দায়সারা গোছের সংস্কারমূলক কাজ দিয়ে পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না, বরং এটা সামগ্রিক, মৌলিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ভিত্তিতে হতে হবে। অন্যকোন ভিত্তির উপর নির্ভর করে অন্যকোন পথে এটা করা অনুমোদিত নয়। প্রকারান্তরে এটা কুফরী ব্যবস্থাকে মেনে নেয়ার শামিল এবং বাস্তবতার নিরীখে শারী’আহ্ বিবর্জিত দাবি কেননা বাস্তবতা হল আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা বাদ দিয়ে অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসনকার্য পরিচালিত হচ্ছে। সেই কারণে আমরা দেখতে পাই, বর্তমান প্রচলিত শাসনব্যবস্থার সাথে অংশগ্রহণকৃত দলসমূহ মূলত সহাবস্থান করছে ও সেখানে নিজেদের একটি অবস্থান করে নেয়ার জন্য প্রচেষ্টায় রত। যে বাস্তবতায় তারা সংস্কার সাধন করতে চায় তাতে এই প্রচেষ্টা নেহায়েত আংশিক; কেননা তাদের কর্মসূচী আংশিক। তারা সাদৃশ্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক তৈরি করে এবং এটাকে তাদের ও ব্যবস্থার মধ্যে সংলাপের সূচনা হিসেবে মনে করে। তারা ইসলামী রঙে দেশকে রাঙানোর চেষ্টা করে যদিও এর নির্যাস হচ্ছে অনৈসলামী আর একে তারা ইসলামের ছদ্মাবরনে প্রদর্শন করে যদিও এই রং এর নির্যাসের কাছাকাছি পৌঁছে না।
পরিবর্তনের জন্য দাওয়াহ্ বহনকারীগণ অন্যদের থেকে সবদিক থেকে আলাদা, তাদের আচরণ এবং যে বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য তারা কাজ করছে। কারণ তাদের সকল চিন্তা তাদের বিশ্বাসের সাথে যুক্ত। ভিত্তির (ভিন্নতার) কারণেই বর্তমান বাস্তবতাকে তারা প্রত্যাখান করে। ভিত্তিকে প্রত্যাখ্যানের কারণে যা কিছু এই ভিত্তি থেকে উৎসারিত হয় তাও তারা প্রত্যাখ্যান করে, যদিও কিছু আংশিক বিষয়ে উভয়ের মধ্যে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়।
তাই তারা সরাসরি এ প্রক্রিয়াকে উপস্থাপন করে, এই মডেলের সামগ্রিক চিত্র জনগণের কাছে তুলে ধরে যা তাদের মন-মগজে বিদ্যমান। এই মডেল তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবীদের সময়ে নিয়ে যায়। তারা যে বাস্তবতায় বসবাস করে সেটাকে এর ভিত্তিসহ সমালোচনা করে। সেকারণে সব দেশে এ দলের আচরণ একই রকম। কারণ বিভিন্ন দেশে কাফের উপনিবেশবাদীরা মুসলিমদের যে বাস্তবতার দিকে ঠেলে দিয়েছে তা একই ও সাদৃশ্যপূর্ণ এবং এজন্য এর সমাধানও একই।
পশ্চিমারা তাদের উপনিবেশবাদের শুরু থেকেই মুসলিমদের কুর’আন ও সুন্নাহ্ যাতে তাদের আইনের উৎস হিসেবে কাজ করতে না পারে সেবিষয়ে সচেষ্ট ছিল। আর এটা তখনই সম্ভব হয়েছে যখন ইসলামী দ্বীনকে জীবনের বাস্তবতা ও এর সংগঠন থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে এবং এভাবে তারা সফলও হয়েছে। আর এই পরিণতি ছিল আমাদের জন্য ভয়াবহ। আজকে বিভিন্ন ইসলামী আন্দোলনগুলো যেভাবে পশ্চিমাদের তৈরি কৃত্রিম বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত নিয়ে তা ভাবতে অবাক লাগে; তারা সমূল এসবকে উৎপাটনের বদলে এগুলোকে সংস্কারের জন্য কাজ করে। অবশ্যই এ খন্ডিত সংস্কারমূলক কাজ বাস্তবতাকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হবে না। যারা বাস্তবতাকে উপলদ্ধি করতে অক্ষম, তারা এর নিয়মকানুনও বুঝতে পারবে না। সেকারণে তারা অবশ্যই কাজের সত্যিকারের পদ্ধতি ও সুন্নাহ্ থেকে বিচ্যুত হবে।
যারা আজকের দিনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র প্রতি মানুষকে আহ্বান করেন তারা অবশ্যই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এই হাদীসটি ভুলে যাবে না, যেখানে বলা হয়েছে:
“…. অতঃপর আবার আসবে খিলাফত নব্যুয়তের আদলে।”
[মুসনাদে আহমদ]যারা নব্যুয়তের আদলে খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রত্যাবর্তন চায় তাদের অবশ্যই মানবশ্রেষ্ঠ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সীরাত অনুসরণ করা ছাড়া আর কোন পথ নেই, যাঁর প্রচেষ্টায় আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাহায্য ফলদায়ক হয়েছিল এবং এর ফলে মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম এই উম্মাহ্ অস্তিত্ব লাভ করেছে। নবীদের (আ) জীবন এবং তাদের অনুসারীদের জীবন একই সুতায় বাঁধা। আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে প্রার্থনা করি যেন আমরা এই সুঁতার একটি অংশ হতে পারি। সে কারণে আমরা আল মুস্তাফা (সা)-এর জীবনকে অনুসরণ করব এবং মানুষ আমাদেরকে এ বিষয়ে অনুসরণ করবে, আর আমরা সকলে মিলে একত্রিত হব সর্বোত্তম কাজ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্য।
ভিন্ন বিষয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ হুকুম

ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে অনেক সময় শারী’আহ্ একই প্রকার হুকুম প্রদান করেছে, যদিও মানব যুক্তি ঠিক তার উল্টো কাজ করে। শারী’আহ্ পবিত্র হওয়ার ক্ষেত্রে পানি এবং ধুলাকে একই মর্যাদায় স্থান দিয়েছে, যদিও পানি পরিষ্কার করে অথচ ধুলা অপরিষ্কার করে। এটা স্বর্ণ এবং গমের ক্ষেত্রে রিবা আল-ফাদল (অতিরিক্ত পরিমাণ) কে নিষিদ্ধ করেছে, যদিও এদের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটা যিনাহ্ এবং মুরতাদ (দ্বীনত্যাগ) এর শাস্তি মৃত্যুদন্ড বিধান করেছে অথচ অপরাধ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এটা মুসলিম ও অমুসলিমদের সুরক্ষা দিয়েছে যদিও বিশ্বাসের দিক থেকে তারা ভিন্ন। কোন নারীর উপর যিনাহ্’র দায় চাপানো মিথ্যা অভিযুক্তকারী এবং মদ পানকারী উভয়কেই ৮০টি দোররা মারার হুকুম দিয়েছে অথচ দুটি কাজের প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সুতরাং এরকম অনেক কাজ রয়েছে যেগুলো ভিন্ন এবং কোনক্রমেই এদেরকে একত্রে বিবেচনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু শারী’আহ্ তাদের জন্য একই হুকুম বিধান করেছে। যদি এগুলোকে মানুষের চিন্তার উপর ছেড়ে দেয়া হতো তাহলে মানুষ এ ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম নিয়ে আসতো এবং ভিন্ন বিষয়ে ভিন্ন বাস্তবতা ও প্রেক্ষাপটের কারণে একই হুকুম বের করতে পারতো না। সুতরাং, এটাও সাদৃশ্যতা বিবেচনা নির্ভর অকার্যকর এই পদ্ধতির স্বরূপ উন্মোচন করে।
এছাড়াও শারী’আহ্ কতৃর্ক আরও অনেক হুকুম প্রদত্ত হয়েছে যেখানে মানুষের চিন্তা বা যুক্তির কোন ভূমিকা নেই। শারী’আহ্ ব্যবসাকে বৈধতা দিয়েছে কিন্তু সুদকে হারাম করেছে যদিও তাদের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে এবং উভয়ই ব্যবসা। ইহা ধর্ষনের স্বাক্ষী হিসেবে ৪ জনকে নির্ধারন করেছে অথচ হত্যার জন্য ২ জন, যদিও ধর্ষণের চেয়ে হত্যা অনেক নৃশংস অপরাধ। বাতিলযোগ্য তালাকের বেলায় স্বাক্ষী একজন মুসলিম হওয়া বাধ্যতামূলক কিন্তু অর্পিত সম্পত্তির বিচারাধীন মামলায় একজন কাফিরের স্বাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য। একজন মুক্ত কিন্তু কুৎসিত নারী যার প্রতি আকর্ষন না জন্মানোটাই স্বাভাবিক তার প্রতিও দৃষ্টি নিম্নমুখী রাখতে বলা হয়েছে কিন্তু একজন জারিয়াহ্ (সুদর্শনা দাসী) এর ক্ষেত্রে এই বাধ্যবাধকতা নাই। খুফ্ফাইন (চামড়ার মোজা) এর উপরের অংশ মাসেহ্ করা বাধ্যতামূলক কিন্তু নীচের অংশ নয় অথচ নীচের অংশ মাসেহ্ করাটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। এ ব্যাপারে সাইয়্যিদুনা আলী (রা) বলেন, “দ্বীন যদি যুক্তিনির্ভর সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত হতো তাহলে মোজার নীচের অংশ উপরের অংশের চেয়ে মাসেহ্-এর বেশী দাবীদার।”
এ কারণেই হয়ত বিখ্যাত কবি আবুল ‘আলা আল-মা’র্রি বলতে বাধ্য হয়েছিল,
“একটি হাতের দিয়তের (ক্ষতিপূরণ) জন্য শত শত স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়,
কী করে এটা সিকি স্বর্ণমুদ্রার কারণে কাটা যায়?”
অন্য কথায়, কেউ কারও হাত নষ্ট করলে তার দিয়ত বা ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০০ দিনার স্বর্ণমুদ্রা দিতে হয়, তাহলে মাত্র সিকি স্বর্ণমুদ্রা চুরির কারণে কীভাবে একটি হাত কাটা যায়?
যুক্তি কখনো সিকি পরিমাণ স্বর্ণমুদ্রা চুরির দায়ে কারো হাত কাটাকে ঠিক মনে করেনা। যুক্তির ভিত্তিতে বিচার করার অর্থ শারী’আহ্’র ভিত্তিতে বিচারকে অগ্রাহ্য করা। যদি মানুষকে শারী’আহ্’র সামগ্রিকতা থেকে, অথবা জাহির আন-নাস (শারী’আহ্’র বাহ্যিক বক্তব্য) থেকে, অথবা দু’টি হুকুমের সাদৃশ্যতা থেকে প্রাপ্ত ক্বিয়াসের (তুলনামূলক বিবেচনা) অস্তিত্ব উপলদ্ধির মাধ্যমে ইল্লাহ্ (ঐশী কারণ) বের করার দায়িত্ব দেয়া হতো তবে মানুষ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কতৃর্ক অনুমোদিত অধিকাংশ বিষয়কে নিষিদ্ধ করে দিত এবং নিষেধসমুহকে অনুমোদন দিয়ে দিত। তাই শারী’আহ্ প্রদত্ত পদ্ধতি ছাড়া ক্বিয়াস অনুমোদিত নয়। অন্যকথায় শারী’আহ্’র উৎসে উল্লেখিত ইল্লাহ্ ছাড়া বৈধ ক্বিয়াস হতে পারে না। শারী’আহ্ ইল্লাহ্ বিবর্জিত কোন বাণী থেকে ক্বিয়াস করা অসম্ভব। এ ব্যপারে মনগড়া কোন ইল্লাহ্ দেয়া যায় না এবং শর’ঈ ইল্লাহ্ উল্লেখিত ও চিহ্নিত না থাকলে আমরা নিজ থেকে কোন শর’ঈ ইল্লাহ্ আরোপ করতে পারিনা। সে কারণে ফকীহ্গণ শারী’আহ্ থেকে কীভাবে ইল্লাহ্ বের করতে হবে তা দেখিয়েছেন। তারা বলেন ইল্লাহ্ পাওয়া যাবে হয় দলিলে (Text) নির্দেশিত শারা’হাতান (দলিলের সুস্পষ্টতা (Explicitly)) বা দালালাতান (অর্থের সুস্পষ্টতা (Meaning)) বা ইসতিম্বাতান (সিদ্ধান্তগ্রহণ (Deduction)) না হয় ক্বিয়াসান (সাদৃশ্যতা বিবেচনা (Analogy)) এর মাধ্যমে । (দ্রষ্টব্য: বিস্তারিত জানতে উসুল সম্পর্কিত বই দেখুন)।
যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ক্বিয়াস ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন তখন তিনি এর ধরনও সুনির্ধারিত করে দিয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ্ বিন আয জুবায়ের হতে আহমেদ ও নাসায়ী বর্ণনা করেন যে,
“খাতা’য়াম থেকে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আসলেন এবং বললেন, ‘আমার বাবা ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তার উপর হজ্জ্ব ফরয হয়েছে; কিন্তু তিনি উটের পিঠে চড়তে পারেন না। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ্ব সম্পাদন করতে পারি?’ তিনি (সা) বললেন, ‘তুমি কি বড় ছেলে?’ সে বলল, ‘হ্যা’। তিনি (সা) বললেন, ‘ধর, তোমার বাবার একটি ঋণ আছে এবং তুমি যদি তার পক্ষ থেকে সেটি পরিশোধ কর সেটি কী যথেষ্ট হবে?’ সে বলল, ‘হ্যা’। তিনি (সা) বললেন, ‘তাহলে তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্জও পালন করতে পার’।”
হজ্জ একটি ইবাদত আর ঋণ পরিশোধ একটি মু’আমালাত (লেনদেন) এবং যা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তথাপি উভয়টিকে ঋণ বিবেচনায় হজ্জ্ব পালন ও ঋণ পরিশোধ একই কাতারে ফেলা হয়েছে এবং এজন্য ঋণ পরিশোধের মত ছেলেকে বাবার পক্ষ থেকে হজ্জ্ব পালন করতে বলা হয়েছে। এখানে আল্লাহ্’র প্রতি ঋণকে মানুষের ঋণের সাথে তুলনা করে বিষয়টিকে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। যদি আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর পক্ষ থেকে বিষয়টি না আসতো তবে মানুষের চিন্তা কোনদিনও এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সক্ষম ছিল না।
কোন হুকুমের পেছনে তা’লীল (কারণ) হল সে হুকুমটি কেন এসেছে তা পরিষ্কারভাবে বুঝার একটি দলিল। এর মানে যেখানে ইল্লাহ্ উপস্থিত সেখানেই কেবল তা অনুসরণ করা উচিত। আর এটাই ক্বিয়াস। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিড়াল সম্পর্কে বলেন,
“বিড়ালের লালা নাজাস (অপবিত্র) নয়।” সাথে সাথে তার কারণ উল্লেখ করে তিনি (সা) বলেন,
“কারণ এটি তোমাদের গৃহে আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে অর্থাৎ গৃহপালিত।”
(বুখারী ও মুসলিম)এর ভিত্তিতে বলা যায়, যে সকল প্রাণী গৃহের আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে তার লালা অপবিত্র হবে না, যদি না বিপরীত দলিল পাওয়া যায়। তদ্রুপ রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“দৃষ্টির কারণে কোন গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশে অনুমতি অত্যাবশ্যক।”
(বুখারী ও মুসলিম)এর অর্থ হল গৃহে প্রবেশের আগে মুসলিমগণ অবশ্যই অনুমতি নিবে। কারণ ঘরের রয়েছে নিজস্ব পবিত্রতা ও একে আওড়া বলে পরিগণিত করা হয়। অনুমতি ছাড়া গৃহে প্রবেশের বিধান না থাকার কারণ হল নিষিদ্ধ কিছুর দিকে চোখ পড়া থেকে বিরত থাকা। তাঁর (সা) ভাষায়, “মিন আজলিন নাজর” (দৃষ্টির কারণ) হচ্ছে ইল্লাহ্ অর্থাৎ অনুমতি প্রার্থনার পেছনে শারী’আহ্ কারণ। এজন্য কোন মুসলিমের নিজ গৃহে প্রবেশে অনুমতির প্রয়োজন নাই। যেহেতু এ ব্যাপারে ইল্লাহ্ অনুপস্থিত সেহেতু হুকুমও অনুপস্থিত। অন্যথায় হুকুম আগেরটি, যেমন তার বাসায় যদি কোন মেহমান বা এ জাতীয় কেউ এসে থাকে। সুতরাং যখন ইল্লাহ্ ফিরে আসে তখনও হুকুমও আসে। সুতরাং হুকুমের উপস্থিতি ইল্লাহ্’র সাথে সম্পর্কিত।
এই কারণে ক্বিয়াস একটি সংবেদনশীল ইস্যু। এটা বোঝা উচিত যে, ক্বিয়াস হল সেসব বুদ্ধিমান লোকের জন্য যারা শারী’আহ্ দলিল, হুকুম ও প্রেক্ষাপট বুঝতে সক্ষম। এটা কখনোই কোন ব্যক্তির কাছে আশা করা যায় না যে, সে খেয়াল-খুশি বা প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে ক্বিয়াস করবে। এটা সেসব ব্যক্তির জন্য সুনির্ধারিত যাদের রয়েছে গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং উপলদ্ধি। অন্যথায় সেটা হবে আল্লাহ্’র হুকুমকে বিনষ্ট করার উপকরণ এবং তা থেকে পরিষ্কার বিচ্যুতির কারণ। ইমাম শাফি’ঈ (রহ) বলেন, “ক্বিয়াস করা ততক্ষণ পর্যন্ত একজন ব্যক্তির দায়িত্বের মধ্যে পড়বে না যতক্ষণ পর্যন্ত না সে পূর্ববর্তী সুনান সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞানবান হবে এবং সালাফদের উক্তি ও আরবী ভাষা যথার্থভাবে বুঝতে পারবে। তার বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থা উন্নত হতে হবে যাতে সে সন্দেহযুক্ত (বা সাদৃশ্যপূর্ণ) বিষয়সমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে এবং রায় প্রদানের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়ো না করে। যারা তার মতামতের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে তাদের কথা শুনতে আপত্তি করে না, কারণ তারা হয়ত এমন কিছু মনে করিয়ে দিবে যা সে ভুলে গেছে অথবা তার এমন কোন ভুলকে ধরিয়ে দিবে যা সে সঠিক ভেবেছিল। ক্বিয়াসের যথোপযুক্ত ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট উপলদ্ধি। ক্বিয়াসকে ব্যবহার করে একটি হুকুম বের করার কাজ একজন মুজতাহিদ ছাড়া আর কারও জন্য বৈধ নয়।
আমাদের উল্লেখিত উপরে সবগুলো দলিলই যারা কুফর শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি দাঁড় করায় এবং পক্ষপাতিত্ব করে, তাদের অবস্থানের দূর্বলতা ও অসারতাকেই প্রমাণ করেছে। এখন জানা দরকার এ বিষয়ে ইসলামের সুনির্দিষ্ট মতামত কি, যার জন্য ইজতিহাদের কোন প্রয়োজন নাই?
আক্বীদাসহ সমস্ত শারী’আহ্-ই এক আল্লাহ্’র উপর বিশ্বাস ও একমাত্র তাঁর ইবাদতের উপর প্রতিষ্ঠিত। ‘লা ইলাহা’ এর অর্থ হল স্বর্গীয় মহিমা, ইবাদত ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সবাইকে অস্বীকার করা। ‘ইল্লাল্লাহ্’ অর্থ একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে এসব কাজের জন্য সুনিশ্চিতভাবে মেনে নেয়া। তিনি হলেন ইলাহ্, শাশ্বত এবং ইবাদত ও আইন প্রণয়ণের একমাত্র মালিক। ইবাদত ও আত্নসমর্পণ একমাত্র তাঁর কাছে এবং শারী’আহ্ সম্পর্কিত জ্ঞান এসেছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মাধ্যমে। দু’টি স্বাক্ষ্যের দ্বিতীয়টির অর্থ হল মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্’র রাসূল। সে কারণে আইনগত বিষয়ে কেবলমাত্র রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কেই অনুকরণ ও অনুসরণ করা উচিত।
এমনকি উসূল আল ফিক্হ ওহীর উৎসকে সংজ্ঞায়িত করার ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত যাতে এটা ছাড়া অন্য কোন উৎস থেকে বিধান না নেয়া হয়। এটা ইসতিম্বাত-এর মূলনীতিকে ঠিক করে দেয়ার প্রচেষ্টা চালায় যাতে এতে শারী’আহ্ বহিভুর্ত কিছু অনুপ্রবেশ করতে না পারে। এজন্যই উসূল আল ফিক্হ সর্বপ্রথম যা আলোচনা করে তা হচ্ছে, হাকিম হলো আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এবং বিধান দেবার অধিকার শুধু তাঁর। শারী’আহ্’র নাযিলকৃত বাণী ছাড়া কোন হুকুমের বৈধতা নেই এবং শারী’আহ্’র বাইরেও কিছু নেই ।
তারপর একমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইবাদত করা, তার প্রতি নিজেকে আত্নসমর্পণ করা ও তাকে ছাড়া আর কাউকে আইনদাতা হিসেবে মেনে না নেয়ার ব্যবহারিক ব্যাখ্যা প্রদান করার জন্য আসে ফিক্হ।
কুফর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের অর্থ হল ঐশী ব্যবস্থার পাশাপাশি কুফর ব্যবস্থাকে মেনে নেবার আহ্বান। অর্থাৎ, শর’ঈ বহির্ভূত হুকুমের আইনপ্রণেতাদের শর’ঈ হুকুমের আইনপ্রণেতার পাশাপাশি মেনে নেয়া। যার অর্থ হল আইনের উৎসের বহুত্বকে মেনে নেয়া। তাহলে আল্লাহ্’র একত্ববাদ কোথায় থাকল, যিনিই কেবল প্রকাশ্য ও গোপনে একমাত্র উপাসনার যোগ্য?
শিরক যেমন নিষিদ্ধ ঠিক তেমনি আইন প্রণয়নে তাঁর অংশীদারিত্বও নিষিদ্ধ।
সুতরাং শারী’আহ্ তার সামগ্রিকতা দিয়ে জাহেলী ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করাকে হারাম করেছে।
সীরাত থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাওয়াহ্’র মাধ্যমে নিঃসন্দেহাতীতভাবে বুঝা যায় যে, উপস্থাপনের রীতিটি ছিল মৌলিক এবং তা ঐ বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল না। যে কাজ বাস্তবতাকে প্রভাবিত করতে পারে তার মাধ্যমেই কাঙ্খিত পরিবর্তন ঘটতে পারে।. রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর দাওয়াহ্’র মধ্যে মক্কার কাফেরদের শিরকের কোন প্রভাব পড়েনি। তিনি তাদের ঐতিহ্য ও রীতিনীতিকে তোয়াক্কা করেন নি কিংবা সে সময় লোকদের মানা বা না মানা তার কাজে কোনরূপ প্রভাব বিস্তার করেনি। তৎকালীণ সমাজপতিদের তিনি কখনও তোষামোদ করেন নি, যদিও মক্কাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর দাওয়াহ্ ছিল প্রবল। তিনি প্রকাশ্যে জনসম্মুখে বলেছেন, “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহম্মদ (সা) আল্লাহ্’র প্রেরিত রাসূল”, যা বাস্তবিকভাবেই ইসলামের সামগ্রিকতাকে ধারণ করে এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোন বিশ্বাস বা শারীআহ্-কে প্রত্যাখান করে। এর ভিত্তিতে এই শাহাদাহ্-কে মক্কার অন্যান্য কাফির নেতৃবৃন্দের সাথে আবু জাহল প্রত্যাখ্যান করল। একই ভিত্তির উপর দাড়িয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কালো-সাদা, মুক্ত-দাস, ধনী-গরীব, আরব-অনারব, মূর্তিপূজারী-আহলে কিতাব, সবাইকে লক্ষ্য করে এই শাহাদাহ্’র বাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের সমালোচনা করে তাদের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন এবং চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। প্রত্যুত্তরে তারা ছিল শত্রুভাবাপন্ন। তারা তাঁর সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল এবং তাকে (সা) আহ্বান জানিয়েছিল যাতে তিনি তাদের ব্যাপারে চুপ থাকেন এবং ফলে তারাও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারে নীরব থাকতে পারেন। তাদের ইচ্ছা এরকম ছিল যে, যদি রাসূল (সা) আপোষ করেন তাহলে তারাও আপোষরফা করে নিবে। তিনি (সা) তা গ্রহণ করেননি এবং দাওয়াহ্’র সময় তার উপর আসা অত্যাচার এবং সাহাবীদের (রা) উপর নির্যাতনের সময় ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। বিশ্বাসীরাও এসময় ধৈর্য ধারণ করেছিল। তাদের সবার ধৈর্য ছিল দাওয়াহ্’র সত্যবাদিতা ও তাদের উচ্চারণের স্মারক। এছাড়াও দাওয়াহ্’র কঠিন সময়ে যখন কোন সাহায্যকারী ছিল না তখন তিনি (সা) দ্বীনকে সহায়তার (নুসরাহ্) আহ্বান নিয়ে বনু শা’শার কাছে যাবার পর তারা যে শর্ত দিয়েছিল তাও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারা রাসূল (সা) কে নুসরাহ্ (শাসনক্ষমতা অর্জনে সহায়তা) প্রদানে প্রস্তুত ছিল এই শর্তে যে, তাঁর (সা) মৃত্যুর পর কর্তৃত্ব কেবলমাত্র তাদের হবে। তিনি (সা) এরূপ বলেননি যে এটি একটি সুযোগ যা থেকে উপকার পাওয়া যাবে, যেহেতু তাঁর সামনে অন্য সকল দরজাই বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বরং তিনি একজন শিক্ষক, নেতা, দাওয়াহ্ বহনকারী ও পথপ্রদর্শক হিসেবে তাদেরকে এবং তাদের মাধ্যমে আমাদেরকেও জানালেন যে,
“কর্তৃত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এবং তিনি যাকে ইচ্ছা তাকে তা প্রদান করেন।”
এর দ্বারা তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, কর্তৃত্ব কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এবং এতে কেউ শরীক নয়। কেবলমাত্র আল্লাহ্ যাকে পছন্দ করেন তাকেই তা প্রদান করেন এবং তখন কারও কোন কিছু বলার থাকে না। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সহায়তা ও ফিকরার দৃঢ়তার উপর ভরসা ছাড়া আর কোন কিছুর উপর নির্ভর না করেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাওয়াহ্ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন। দাওয়াহ্ তখনই তার লক্ষ্যে পৌঁছালো যখন মদীনাতে আল্লাহ্’র ইচ্ছায় মদীনাবাসীর হৃদয়-মন খুলে যাবার দরুণ মুহম্মদ (সা)-কে সহায়তা ও সমর্থন প্রদানের মাধ্যমে দারুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হল। তারা কেবলমাত্র আল্লাহ্’র উপরই নির্ভর করেছিল, তাঁর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করেছিল এবং চিন্তার বিশুদ্ধতা, উপলদ্ধির স্বচ্ছতা, পদ্ধতির বিশুদ্ধতা ও কর্মকান্ডের সঠিকতা বজায় রেখেছিল।
এখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র আইন ছাড়া অন্য আইন দিয়ে শাসনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আলোচনার শেষের দিকে আমরা বর্তমান শাসনব্যবস্থার বাস্তবতা ও এতে অংশীদার হওয়ার স্বরূপ উপস্থাপন করব। তারপর আমরা এটি নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কুর’আনের আয়াত ও সহীহ্ হাদীস উল্লেখ করব এবং কোন প্রকার ব্যাখ্যা ছাড়াই এ প্রসঙ্গে সমাপ্তি টানব কারণ আয়াতগুলো তাদের অর্থের দিক থেকে সুনির্দিষ্ট।
যেকোন দেশের সংবিধান একটি সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হোক সেটা গণতান্ত্রিক বা ইসলামী, যাতে কোন আইন এই সুনির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস ও ভিত্তি ব্যতিরেকে অন্য কিছু থেকে উৎসারিত না হতে পারে।
সুতরাং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনকে অবশ্যই এর ভিত্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব জনগণের জন্য। জনগণ তাদের নির্বাচিত একটি এসেম্বলীর মাধ্যমে তার নিজের আইন তৈরি করে এবং একে বলা হয় পার্লামেন্ট বা সংসদ। শাসন করার ক্ষেত্রে এটা জনগণ প্রদত্ত নির্বাহী ক্ষমতাবলে আইন প্রণয়ন করে থাকে। সরকারকে জনগণের শাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য সংসদকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে সরকারকে আস্থা ভোটের মাধ্যমে পরীক্ষা করা যায়। আস্থা ভোট ব্যাতিরেকে এটা বৈধতা পায় না। একে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে যাতে সে সরকারের কর্মকান্ডের নিরীক্ষা, নিয়ন্ত্রন ও জবাবদিহীতা করতে পারে। একইভাবে সরকার আইন ভঙ্গ করলে বা সংবিধানের রীতিনীতির বাইরে কিছু করলে এটি পুরো সরকার বা বিশেষ কোন মন্ত্রনালয় থেকে আস্থা উঠিয়ে নিতে পারে।
সুতরাং এ ব্যবস্থায় সরকারের কাজের ভিত্তি হল গণতন্ত্র, কোনক্রমেই ইসলাম নয়। আমরা ইতিমধ্যে পূর্বের এক আলোচনায় বলেছি যে, ইসলাম এমন কোন কাজকে গ্রহণ করে না যার কোন আধ্যাত্মিক ভিত্তি নাই অর্থাৎ এটা হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ঈমান।
এ ব্যবস্থার রয়েছে একটি সামগ্রিক কাঠামো যেমনি রয়েছে তাদের একক ভিত্তি। যে কর্মসূচী তারা বাস্তবায়ন করতে চায় তাও একটি এবং তা সম্পাদন করে থাকে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে। একটি মন্ত্রনালয়ের কর্মসূচী সাথে অন্য মন্ত্রনালয়ের কর্মসূচীর সুসামঞ্জস্যতা থাকতে হবে। সরকারই একসাথে এ নীতিকে নিয়মে পরিণত করে। অনেক কন্ঠের মাঝে একা একজন মুসলিম মন্ত্রীর কন্ঠে কিছুই হবে না, বরং সম্মিলিত কন্ঠের মাধ্যমে যে মত জন্ম নেয় তা দ্বারা রাষ্ট্রপতি সংবিধান ও এর মূলনীতির ভিত্তিতে আইনের রূপরেখা তৈরী করেন। এটি হল আইনগত দৃষ্টিভঙ্গি। তবে এর চিন্তা ও বাস্তবায়নের পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। সরকারের নেতৃবৃন্দ এবং তাদের সভাসদগণ বিভিন্ন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীদের নির্বাচিত হবার আগেই সরকারের কর্মসূচী নির্ধারণ করে থাকেন। মন্ত্রীদের এই পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করা ছাড়া আর কোন ফুরসৎ থাকে না। তার মন্ত্রনালয়ের জন্য আলাদা করে কোন কর্মসূচী গ্রহণের সুযোগ নেই।
তাছাড়া মন্ত্রীর দায়দায়িত্ব হল একটি যৌথ দায়িত্ব। এর অর্থ হল যখন সরকার কোন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতই প্রাধান্য পায়। অর্থাৎ, একজন মন্ত্রী অন্য মন্ত্রীর কাজে হস্তক্ষেপ করে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তার দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরে। এভাবে একজন মুসলিম মন্ত্রী সব ব্যাপারে দায়বহন করে সেটা তার মন্ত্রনালয় থেকে উদ্ভুত বা সম্পর্কিত বিষয় হোক অথবা অন্য কারো মন্ত্রনালয়ের ব্যাপারে হোক। এমতাবস্থায় সে বাইরে থেকে এবং জনসম্মুখে সরকারের যে কোন কর্মসূচীর পক্ষাবলম্বন করতে বাধ্য, যদিও সে মন্ত্রনালয়ের ভেতরে এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছিল। এখানে একজন মনে করতে পারে যে, মুসলিম মন্ত্রীগণ ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক যে কোন কিছুর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। এধরনের বিষয় সত্যিই অগভীর চিন্তার ফল। মন্ত্রী সংসদ সদস্য থেকে ভিন্ন। সুতরাং, বাস্তবায়ন নয়, বরং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য তাদেরকে প্রতিনিধিত্ব করেন যারা তাকে নির্বাচিত করেছে। তিনি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন অথবা পুজিবাদী ব্যবস্থায় বামপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। কিন্তু, একজন মন্ত্রীকে কখনোই মন্ত্রনালয়ে আনা হয় না বিরোধিতা করবার জন্য। যদি করে তাহলে বিরোধিতার জন্য তাকে মন্ত্রীসভার বাইরে অবস্থান নিতে হবে। সুতরাং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের বা তার কর্মসূচীর বিরোধিতাকারী কেউই এর ভেতরে থাকতে পারেন না বা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি নেই। যদি সে ভুলক্রমে প্রবেশ করেও থাকে তাহলে তাকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হয়। সরকার আসে শাসন ও বাস্তবায়ন করতে। তাদের কিছু নীতিমালা থাকে যা তারা বাস্তবায়ন করতে চায়। পরষ্পরবিরোধীদের সমন্বয়ে তা হতে পারেনা। যে কেউ এ নীতির বাইরে যাবে তাকে প্রধানমন্ত্রী অথবা অন্যদের সমন্বিত আমন্ত্রনে বেরিয়ে যেতে হবে। এমপিরা ব্যক্তিগতভাবে তার উপর থেকে আস্থা তুলে নিবে এবং সরকারের কার্যক্রম চলতে থাকবে।
এখানে একটি কথা বলা অপরিহার্য যে, কুফর শাসনব্যবস্থার মন্ত্রীসভায় মুসলিমদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের বর্তমান সংবিধান ও এটি যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তাকে বৈধতা দেয়া হয়। উপরে উল্লেখিত তাদের এরূপ বিরোধীতা ভিত্তিমূল থেকে ঐ (কুফর) ব্যবস্থার বিরোধিতা নয়, বরং এ হচ্ছে ব্যবস্থার ভেতরে স্থান নিয়ে বিরোধীতা যা কিনা এমনধরণের বিরোধীতা যাতে ঐ (কুফর) ব্যবস্থার মূল ভিত্তিকে মেনে নিয়ে কেবল শাখা-প্রশাখা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করা হয়।
তাছাড়া যখন কোন মন্ত্রনালয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট আইন গৃহীত হয় তখন তা ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ বা কার্যকারিতায় আসবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তিনটি পক্ষ থেকে অনুমোদন ও স্বাক্ষর না পাওয়া যায়। এরা হলেন রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী। এর অর্থ হল মুসলিম মন্ত্রী তার ইচ্ছা অনুযায়ী মন্ত্রনালয় চালাতে পারেন না ও বাস্তবসম্মত আইনও জারি করতে পারেন না।
এ থেকে আমরা কিছু বিষয় স্পষ্ট হতে পারি:
— যে সব আইন দ্বারা শাসক শাসন করে সেগুলোর আধ্যাত্মিক ভিত্তি (যা হলো আল্লাহ্’র উপর বিশ্বাস) নেই কিন্তু গণতান্ত্রিক ভিত্তি রয়েছে, যেখানে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক কিন্তু আল্লাহ্ নন।
— সরকার হল নির্বাহী কর্তৃপক্ষ। এ কর্তৃপক্ষ শাসন ও নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে সংবিধানের অনুশাসন কায়েম করে থাকে। মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীসহ পুরো সরকারের প্রত্যেকেই সংবিধানের হুকুম মেনে চলতে বাধ্য; অন্যথায় এটা ভঙ্গের অভিযোগে তারা অভিযুক্ত হবে।
— মুসলিম মন্ত্রীসহ কোন মন্ত্রীই তার মন্ত্রনালয়ের জন্য স্বতন্ত্রভাবে কর্মসূচী গ্রহণ করতে পারেন না। বরং তিনি রাষ্ট্রের প্রধানসহ সামগ্রিকভাবে যে কর্মসূচী গ্রহণ করা হয় সেটাই বাস্তবায়ন করেন।
— প্রত্যেক মন্ত্রী সরকারের যে কোন কর্মকান্ড ও সিদ্ধান্তের দায়বহন করে। কারণ আইন অনুসারে মন্ত্রীপরিষদ সামষ্টিকভাবে ও যৌথভাবে দায়িত্বশীল।
সংক্ষেপে বলা যায় যে, এ ব্যবস্থায় কেউ মন্ত্রীপরিষদ ব্যতিরেকে এককভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের এখতিয়ার রাখেন না। আর এটাই হল এসব সরকারের বাস্তবতা। এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে পবিত্র কুর’আনে অনেক আয়াত রয়েছে।
— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এটা বাধ্যতামূলক করেছেন যে, হুকুম দেবার মালিক কেবলমাত্র তিনি, যা একটি ভিত্তি এবং এই ভিত্তি থেকেই আইন উৎসারিত হয়। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“কিন্তু না, তোমার রবের শপথ! ততক্ষণ পর্যন্ত তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার তোমার (মুহাম্মদ (সা)) উপর ন্যস্ত না করে এবং কোনরূপ সঙ্কীর্ণতা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই সন্তুষ্ট চিত্তে তোমার (মুহাম্মদ (সা)) সিদ্ধান্ত মেনে নেয়।”
(আন-নিসা: আয়াত ৬৫)তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ের সিদ্ধান্ত আসার পর তাতে ভিন্নতা পোষণ করা মু’মিন পুরুষ কিংবা নারী কারও ক্ষেত্রেই সঙ্গত নয়।”
(সূরা আল আহ্যাব: ৩৬)— আল্লাহ্ এটা বাধ্য করেছেন যে, শাসককে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে।
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কতৃর্ত্বশীল তাদের।”
(সূরা আন নিসা: ৫৯)— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম শাসকদের ইসলাম দিয়ে শাসন করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর আমি আদেশ করছি যে, আপনি তাদের পারস্পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করুন…. ।”
(সূরা মায়িদাহ্ : ৪৯)আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম শাসকদের ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন না করার ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন, যদি তা মাত্র একটি আইনও হয়। তাই তিনি বলেন,
“…যেন তারা আপনাকে এমন কোন নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ্ আপনার প্রতি নাযিল করেছেন।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৪৯)তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যারা কুফর দিয়ে শাসন করে তাদের সাথে তলোয়ারী দিয়ে ফায়সালা করার জন্য। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে ফাযির শাসকদের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে, তাদের বিরুদ্ধে তলোয়ারী ধরা যাবে কিনা? উত্তরে তিনি বলেন,
“যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা (তার) প্রকাশ্য কুফরী দেখতে পাও যাতে তোমাদের পক্ষে তোমাদের কাছে আল্লাহ্ প্রদত্ত প্রমাণ থাকে।”
(মুসলিম)— তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাসকদের উপদেষ্টা ও পরিষদবর্গকে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুর অনুসরণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা মুমিন ব্যতীত অন্য কাউকে অন্তরঙ্গরূপে (উপদেষ্টা, সাহায্যকারী, রক্ষাকারী) গ্রহণ করো না।”
(সূরা আল ইমরান: ১১৮)— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের ইসলামের দ্বারস্থ হতে বলেছেন এবং এ ব্যাপারে তাগুতকে পরিত্যাগ করতে বলেছেন। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, যে ব্যক্তি এটা না করে সে সত্যিকারের ঈমানদার নয়। তিনি বলেন,
“আপনি কি তাদেরকে প্রত্যক্ষ করেননি যারা দাবী করে যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে সেই সব বিষয়ের উপর তারা ঈমান এনেছে কিন্তু তারা (বিরোধপূর্ণ বিষয়ের) মিমাংসার জন্য তাগুতের শরণাপন্ন হতে চায়, অথচ তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।”
(সূরা নিসা: ৬০)— আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।
“হে বিশ্বাসীগণ! আল্লাহ্ যে জাতির প্রতি রুষ্ট, তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করো না। তারা পরকাল সম্পর্কে নিরাশ হয়ে গেছে যেমন কবরস্থ কাফেররা নিরাশ হয়ে গেছে।”
(সূরা মুমতাহিনা: ১৩)এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ইহুদী ও খ্রীষ্টানদেরকে তোমাদের বন্ধুরূপে গ্রহন করো না। তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, তারা তাদেরই অন্তভুর্ক্ত। আল্লাহ্ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না। বস্তুত, যাদের অন্তরে রোগ রয়েছে, তাদেরকে আপনি দেখবেন, দৌড়ে গিয়ে তাদেরই মধ্যে প্রবেশ করে। তারা বলে: আমরা আশঙ্কা করি, পাছে না আমরা কোন দুর্ঘটনায় পতিত হই। অতএব, সেদিন দূরে নয়, যেদিন আল্লাহ্ বিজয় প্রকাশ করবেন অথবা নিজের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশ দেবেন, ফলে তারা স্বীয় গোপন মনোভাবের জন্য সেদিন অনুতপ্ত হবে।”
(সূরা মায়িদাহ্: ৫১-৫২)এখানে প্রশ্ন আসতে পারে যে, আজকের দিনে শাসকরা ইহুদী বা খ্রীস্টান নয়। প্রকৃত অর্থে তারা ইহুদী বা খ্রীস্টানদের প্রতি অনুগত। যে এই শাসকদের আনুগত্য করে সে যেন তাদেরই আনুগত্য করে যাদের প্রতি ঐ শাসকরা অনুগত।
তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর যারা কাফের তারা পারস্পরিক সহযোগী বন্ধু। তোমরাও যদি তা না কর (অর্থাৎ এক খিলাফতের অধীনে পরস্পর ঐক্যবদ্ধ না হও) তাহলে দুনিয়ার বুকে ফিত্না (যুদ্ধ, বিগ্রহ) ও যুলুম বিস্তার লাভ করবে এবং দুষ্কর্ম ও দূর্নীতি ছেয়ে যাবে ।”
(সূরা আনফাল: ৭৩)এথানে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল, ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের প্রতি অনুগত না হবার অর্থ এটা নয় যে তারা ব্যতীত অন্যদের আনুগত্য করা যাবে। বরং এখানে ইস্যুটি হল যে বা যা কিছু ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক তার সাথে সম্পর্ক না রাখা। তাদের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকার অর্থ হল তাদের সাথে চিন্তা, ব্যবহার প্রভৃতি ক্ষেত্রে কোনরূপ সম্পর্ক না রাখা এবং তাদের পক্ষ থেকে কোন কিছু গ্রহণ না করা যতক্ষণ পর্যন্ত এর ভিত্তি হল কুফর। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইব্রাহীম (আ:) এর মুখ দিয়ে বলেন,
“তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহ্’র পরিবর্তে যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানিনা। তোমরা এক আল্লাহ্’র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে……”
(মুমতাহিনা: ৪)ওয়ালা (আনুগত্য) কেবলমাত্র আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, তাঁর রাসূল (সা) ও মু’মিনদের প্রতি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর যারা আল্লাহ্, তাঁর রসুল এবং বিশ্বাসীদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহ্’র দল এবং তারাই বিজয়ী।”
(সূরা মায়িদাহ্ : ৫৬)এখানে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে যে, শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণের বিষয়টি গ্রহণ করার অর্থ এই নয় যে আমরা ঐ ব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য দেখাচ্ছি। কেউ বলতে পারে, আমরা আনুগত্যের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র মডেলটিকে (প্রভাব বিস্তার করার আগ পর্যন্ত আনুগত্য দেখাই) অনুসরণ করি কিন্তু আমাদের মন তাদের কাজগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে। সত্য কথা হল আনুগত্য হল এমন একটি বিষয় যেখানে শরীর ও মনের অংশীদারিত্ব রয়েছে। আমরা অবশ্যই এসব শাসক যা করে তা হাত, জিহ্বা ও হৃদয় দিয়ে প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য, যখন সে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে শাসন করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, হৃদয় দিয়ে ঘৃণা করা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর এবং এর পরে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যাদের হৃদয় ঈমানের দূর্বলমত স্তরে রয়েছে তারা তাদের কাজ ও বক্তব্যের মাধ্যমে অনৈইসলামি শাসনকে সমর্থন দেয়া উচিত নয়। যারা এর ব্যাত্যয় ঘটায় তারা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে অমান্য করছে ও পাপে লিপ্ত আছে যদিও তারা মনে মনে একে প্রত্যাখ্যান করে। আর যদি তাদের মনও এটা অনুমোদন করে নেয় তাহলেতো তারা কুফরে লিপ্ত। যারা আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছু দিয়ে শাসনকারীদের সাথে অংশগ্রহণ করে তাদের সম্পর্কে একজন সর্বনিম্ন এতটুকু বলতে পারে যে, সে ব্যক্তি ফাসিক (পাপাচারী), যালিম বা যুলুমকারী এবং আ’সী বা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার অবাধ্য।
সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়ে ভিন্ন হুকুম

সাদৃশ্যপূর্ণ বিষয়বস্তুর মধ্যে ভিন্নতার উদাহরণ হিসেবে যেমন আমরা বলতে পারি শারী’আহ্ স্থান-কালের মধ্যে পার্থক্য বিধান করেছে যদিও মুসলিমদের কাছে মর্যাদার দৃষ্টিকোনে সব স্থান-কাল একই। যেমন শারী’আহ্ লাইলাতুল ক্বদরের রাতকে অন্যান্য রাতের উপর মর্যাদা দিয়েছে, মক্কাকে মদীনার উপর এবং মদীনাকে অন্যান্য শহরসমূহের উপর প্রাধান্য দিয়েছে। কছর (সংক্ষিপ্ত) নামাযের ক্ষেত্রে পার্থক্য বিধান করেছে, যেমন: ৪ রাকাত নামায সংক্ষিপ্ত করা যায়, কিন্তু ৩ বা ২ রাকাতে যায় না। এটা মনি (বীর্য) এবং মাজিহ (প্রাকবীর্য তরল) এর মধ্যে পার্থক্য করেছে। একই স্থান হতে নির্গত হওয়া সত্ত্বেও মনি (বীর্য) পাক এবং মাজিহ (প্রাকবীর্য তরল) নাপাক। স্বেচ্ছায় মনি নির্গত হলে গোসলকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং রোজা ভঙ্গের কারণ বলা হয়েছে, কিন্তু একই স্থান থেকে নির্গত হওয়া সত্ত্বেও মাজিহ বের হবার ক্ষেত্রে এ হুকুম প্রযোজ্য নয়। শারী’আহ্ মেয়ে বাচ্চার মুত্র দ্বারা পরিধেয় বস্ত্র নোংরা হলে তা পবিত্রকরণে ধোয়াকে বাধ্যতামূলক করেছে, কিন্তু ছেলে বাচ্চার মুত্র দ্বারা পরিধেয় বস্ত্র নোংরা হলে তা পবিত্রকরণে পানি ছিটানোকে যথেষ্ট করেছে। শারী’আহ্ ঋতুবতী (Menstruating) নারীর জন্য (বাদ যাওয়া) রোযা কাযা করাকে বাধ্যতামূলক করেছে কিন্তু (বাদ যাওয়া) সালাতকে নয়। ৩ দিরহাম চুরি করলে হাত কাটার বিধান দিলেও অবৈধ পন্থায় অর্জিত বিপুল সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির হাত কাটতে বলেনি। এটা তালাকপ্রাপ্ত নারীর জন্য ইদ্দতকালীন সময় ৩টি মাসিক (Menstrual) চক্র বেঁধে দিয়েছে অথচ বিধবা নারীর জন্য তা ৪ মাস ১০ দিন, যদিও উভয়ের রেহম (জরায়ু) এর অবস্থা একই। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যায়। যদি এ বিষয়গুলোর হুকুম অনুসন্ধানে মানব চিন্তার উপর ছেড়ে দেয়া হতো তাহলে আমরা তাদেরকে অনেক ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে উপনিত হতে দেখতাম। এবং তারা এমন হুকুমসমূহ নিয়ে আসত যা শারী’আহ্’র সম্পূর্ণ বিপরীত এবং সাংঘর্ষিক। শারী’আহ্ কতৃর্ক প্রত্যেকটি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হুকুম প্রদান প্রমাণ করে যে তাদের সাদৃশ্যতা বিবেচনা করে হুকুম বের করার নব্য এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও ভ্রান্ত।
























