Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • তুফাইল ইবন ’আমর আদ–দাওসী (রা)

    তুফাইল ইবন ’আমর আদ–দাওসী (রা)

    নাম তাঁর তুফাইল। ‘যুন-নূর’ উপাধি। ‘দাওস’ গোত্রের সন্তান হওয়ার কারণে দাওসী বলা হয়। কবীলা-দাওস ইয়ামনে বসবাসকালী একটি শক্তিশালী গোত্র। তিনি ছিলেন এ গোত্রের ‘রয়িস’ বা সরদার। ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল তাঁর পেশা। এ কারণে মাঝে মধ্যে তাঁকে মক্কায় আসা-যাওয়া করতে হতো।

    তুফাইল ছিলেন জাহিলী যুগের আরবের সম্ভ্রান্ত ও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তিবর্গের অন্যতম। তাঁর ‍চুলো থেকে হাঁড়ি কখনো নামতো না। অতিথির জন্য তাঁর বাড়ীর দরজা থাকতো সর্বদা উন্মুক্ত।

    তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধা, প্রখর বুদ্ধিমত্তা, সহজাত কাব্য প্রতিভা ও সূক্ষ্ণ অনুভূতির অধিকারী। ভাষার মধুরতা, তিক্ততা ও ভাষার ইন্দ্রজাল সম্পর্কে তিনি ছিলেন সুবিজ্ঞ।

    একবার তুফাইল ইবন ’আমর ব্যবসা উপলক্ষে তাঁর গোত্রের আবাসস্থল তিহামা অঞ্চল থেকে মক্কায় উপস্থিত হলেন। মক্কায় তখন রাসূলুল্লাহ সা. ও কুরাইশদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে। দু’টি দলই নিজ নিজ মতের সমর্থক সংগ্রহে তৎপর। একদিকে রাসূল সা. আহ্‌বানে জানাচ্ছেন মানুষকে তাঁর প্রভূর দিকে। অন্যদিকে কাফিররা সব ধরণের উপায়-উপকরণ প্রয়োগ করে মানুষকে তাঁর থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। বলা চলে, তিনি সম্পূর্ণ অনভিপ্রেতভাবে এ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লেন। কারণ, তিনি তো এ উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেননি। ইতিপূর্বে মুহাম্মাদ ও কুরাইশদের এ দ্বন্দ্বের কথা তাঁর মনে একবারও উদয় হয়নি। এ সংঘাতের সাথে তাঁর জীবনের এক অভিনব কাহিনী জড়িত আছে। তিনি বলেন, ‘আমি মক্কায় প্রবেশ করলাম। কুরাইশ নেতৃবৃন্দ আমাকে দেখেই এগিয়ে এসে সর্বোত্তম সম্ভাষণে আমাকে স্বগত জানালো। আমাকে তারা তাদের সর্বাধিক সম্মানিত বাড়ীতে আশ্রয় দিল। তারপর তাদের নেতৃবৃন্দ ও জ্ঞানী-গুণীরা আমার কাছে এসে বললোঃ ‘তুফাইল, আপনি এসেছেন আমাদের এ আবাসভূমিতে। এ লোকটি, যে নিজেকে একজন নবী বলে মনে করে, আমাদের সকল ব্যাপারে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে, আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে। আমাদের ভয় হচ্ছে, আপনিও তার কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে পড়েন এবং আপনার নেতৃত্বে আপনার গোত্রেও আমাদের মত একই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে না উঠে। সুতরাং আপনি এই লোকটির সাথে কোন রকম আলাপ-আলোচনা করবেন না, তার কোন কথায় কান দেবেন না। কারণ, তার কথা যাদুর মত কাজ করে। সে বিভেদ সৃষ্টি করে দেয় পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।’

    তুফাইল বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তারা আমার কাছে রাসূলুল্লাহ সা. সম্পর্কে অভিনব কাহিনী ও তাঁর নানা রকম আশ্চর্য কার্যাবলী বর্ণনা করে আমাকে ও আমার গোত্রকে সতর্ক করে দিল। সুতরাং আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, তাঁর কাছে আমি ঘেঁষবোনা, তাঁর সাথে কথা বলবো না বা তাঁর কোন কথাও শুনবো না। সে সময় আমরা কা’বার তাওয়াফ করতাম এবং সেখানে রক্ষিত মূর্তিসমূহের পূজাও করতাম। যখন আমি কা’বার তাওয়াফ ও মূর্তি পূজার জন্য মসজিদের উদ্দেশ্যে বের হলাম, আমার দু’কানে ভালো করে তুলো ভরে নিলাম যাতে কোনভাবেই মুহাম্মাদের সা. কথা আমার কানে প্রবেশ করতে না পারে।

    মাসজিদুল হারামে ঢুকেই আমি দেখতে পেলাম তিনি কা’বার পাশেই নামাযে দাঁড়িয়ে। তবে তাঁর সে নামায আমাদের নামাযের মত, তাঁর সে ইবাদাত আমাদের ইবাদাতের মত ছিল না। এ দৃশ্য আমাকে পুলকিত করলো, তাঁর সে ইবাদাত আমাকে আন্দোলিত করলো। আমার ইচ্ছে হলো তাঁর নিকটে যাই। অনিচ্ছাসত্ত্বেও এক পা দু’পা করে তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। আল্লাহর ইচ্ছে ছিল তাঁর কিছু কথা আমার কানে পৌঁছে দেয়া। তাই, কানে তুলো ভরা সত্ত্বেও তাঁর কিছু উত্তম বাণী আমি শুনতে পেলাম। মনে মনে বললামঃ ‘তুফাইল, তোর মা নিপাত যাক, তুই একজন বুদ্ধিমান কবি। ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা তোর আছে। এ লোকটির কথা শুনতে তোর বাধা কিসে? যদি সে ভালো কথা বলে, গ্রহণ করবি, আর মন্দ হলে প্রত্যাখ্যান করবি।’

    তুফাইল বলেন, আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। নামায শেষ করে রাসূলুল্লাহ সা. বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলেন। আমিও তঁঅকে অনুসরণ করে তাঁর বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছলাম। বললামঃ ইয়া মুহাম্মাদ, আপনার কাওমের লোকেরা আপনার সম্পর্কে এইসব কথা আমাকে বলেছে। তারা আমাকে আপনার সম্পর্কে এত ভয় দেখিয়েছে যে আপনার কোন কথা যাতে আমার কানে ঢুকতে না পারে সেজন্য আমি কানে তুলো ভরে নিয়েছি। তা সত্ত্বেও আল্লাহ তায়ালা আপনার কিছু কথা না শুনিয়ে ছাড়লেন না। যা শুনেছি, ভালোই মনে হয়েছে। আপনি আপনার ব্যাপারটি আমার কাছে একটু খুলে বলুন। তিনি তাঁর বক্তব্য সুষ্ঠুভাবে বলার পর সূরা ইখলাস ও সূরা আল-ফালাক তিলাওয়াত করে আমাকে শুনালেন। সত্যি কথা বলতে কি, এর থেকে সুন্দর কথা ও অনুপম বিষয় আর কখনো আমি শুনিনি। সেই মুহূর্তে আমার হাত তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলাম এবং কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ পাঠ করে ইসলামের ঘোষণা দিলাম।

    ইসলাম গ্রহণের পর মক্কার কুরাইশরা তাঁকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। তখন তিনি তাদেরকে উদ্দেশ্য করে সুন্দর একটি কবিতা রচনা করেন। কুরাইশদের নিন্দা, আল্লাহর একত্ব ও রাসূলুল্লাহর সা. প্রশংসা- এই ছিল সেই কবিতার বিষয়বস্তু। ইবন হাজার আলইসাবা গ্রন্থে গ্রন্থে তার কয়েকটি চরণ সংকলন করেছেন।

    তুফাইল বলেন, তারপর আমি মক্কায় বেশ কিছুদিন অবস্থঅন করে ইসলামের বিধি-বিধান শিক্ষা করলাম, সাধ্যানুযায়ী কুরআনের কিছূ অংশও হিফজ করলাম। আমি আমার গোত্রে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

    আমার প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে আমার বৃদ্ধ পিতা দৌঁড়ে এলেন। আমি বললামঃ আব্বা, আপনি আমার থেকে দূরে থাকুন। আমি আপনার কেউ নই বা আপনি আমার কেউ নন।

    এ কথা শুনে তিনি বললেনঃ এ কথা কেন, বেটা? বললামঃ আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, মুহাম্মাদের সা. দ্বীনের অনুসারী হয়েছি। বললেনঃ বেটা, তোমার দ্বীনই আমার দ্বীন। বললামঃ যান, গোসল করে পবিত্র পোশাক পরে আমার কাছে আসুন। যা আমি শিখেছি, আপনাকে শেখাবো। তিনি চলে গেলেন। গোসল করে পবিত্র পোশাক পরে আমার কাছে ফিরে এলে আমি তাঁর কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলাম। তিনি সাথে সাথে ইসলাম কবুল করলেন। তারপর এলো আমার সহধর্মিনী। তাকেও আমি দূরে সরে যেতে বললাম। ‘আপনার প্রতি আমার মা-বাবা কুরবান হোক’- এ কথা বলে সে এর কারণ জানতে চায়। আমি বললামঃ ইসলাম তোমার ও আমার মধ্যকার সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে। আমি ইসলাম গ্রহণ করে দ্বীনে মুহাম্মাদীর অনুসারী হয়েছি। সে বললোঃ তাহলে আপনার দ্বীনই আমার দ্বীন। বললামঃ যুশশারা ঝর্ণার পানি দিয়ে গোসল করে পবিত্র হয়ে এসো। (‘যুশশারা দাওস গোত্রের দেবীমূর্তি তার পাশেই ছিল পাহাড়  থেকে প্রবাহিত একটি ঝর্ণা) সে বললোঃ আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক, ধর্ম ত্যাগের ব্যাপারে আপনি কি যুশ-শারাকে একটুও ভয় পাচ্ছেন না? বললামঃ ‘যুশ-শারা ও তুমি নিপাত যাও। যাও, সেখানে গিয়ে মানুষের ভীড় থেকে একটু দূরে থেকে গোসল করে এসো। এই বধির প্রস্তর-মূর্তি তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না, সে যিম্মাদারী আমি নিলাম। সে চলে গেল একটু পরে গোসল সেরে ফিরে এলো। আমি তার সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলাম। সে সানন্দে ইসলাম গ্রহণ করলো। তারপর আমি দাওস গোত্রের সকল মানুষের সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করলাম। কিন্তু একমাত্র আবু হুরাইরা ছাড়া প্রত্যেকেই ইতস্ততঃ ভাব প্রকাশ করলো। দাওস গোত্রের মধ্যে একমাত্র তিনিই খুব তাড়াতাড়ি ইসলাম গ্রহণ করেন।

    তুফাইল রা. বলেন, ‘অতঃপর আমি মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হলাম। এবার আমার সঙ্গে আবু হুরাইরা। রাসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেঃ তুফাইল, তোমার পেছনের খবর কি? বললামঃ ‘তাদের অন্তরে মরচে পড়ে গেছে, তারা মারাত্মক কুফরীতে লিপ্ত। দাওস গোত্রের ওপর পাপাচার ও নাফরমানী ভর করে বসেছে।’

    আমার এ কথা শোনার পর রাসূলুল্লাহ সা. উঠে দাঁড়ালেন তারপর অজু করে নামায আদায় করলেন এবং আকাশের দিকে হাত উঠালেন। আবু হুরাইরা বলেন, আমি যখন রাসূলুল্লাহকে সা. এমনকি করতে দেখলাম, আমার ভয় হলো এই ভেবে যে, তিনি হয়তো আমার গোত্রের ওপর বদদুআ করবেন, আর তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। মনে মনে আমি বললামঃ আল্লাহ আমার কাওমকে হিফাজত করুন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনলামঃ ‘হে আল্লাহ, দাওস কবীলাকে তুমি হিদায়াত দান কর’, এভাবে তিনি তিনবার বললেন। তারপর তুফাইলের দিকে ফিরে বললেনঃ এবার তুমি তোমার কাওমের কাছে ফিরে যাও। তাদের সাথে কোমল আচরণ কর এবং তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দাও।’

    রাসুল সা. যখন দাওস গোত্রের জন্য হাত উঠিয়ে দুআ করছিলেন, তুফাইল বললেনঃ ‘আমি এমনটি চাইনে।’ এ কথা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ তোদের মধ্যে তোমার মত আরো অনেক লোক আছে।’ কথিত আছে, জুনদুব ইবন ’আমর আদ-দাওসী জাহিলী যুগেই বলতেনঃ এ সৃষ্টি জগতের একজন স্রষ্টা নিশ্চয়ই আছেন, তবে তিনি কে, তা আমরা জানিনে। রাসূলুল্লাহর সা. আবির্ভাবের খবর শুনে তিনি ৭৫ জন লোকসহ মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

    তুফাইল বলেন, আমি ফিরে এসে দাওস কবীলায় ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্মনিয়োগ করলাম। এ দিকে রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করলেন। একে একে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। তারপর আমি রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হলাম, আমার সঙ্গে তখন দাওস কবীলার আশিটি পরিবার। তারা সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছে। আমাদের দেখে রাসূল সা. ভীষণ খুশী হলেন এবং খাইবারের গণীমতের অংশও তিনি আমাদের দিলেন। আমরা বললাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, এখন থেকে যত যুদ্ধে আপনি অংশ নেবেন, দক্ষিণ ভাগের দায়িত্ব থাকবে আমাদের ওপর।’ তুফাইল বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর সঙ্গে থেকে গেলাম। অবশেষে আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায় মক্কা বিজয় হলো।

    তুফাইল রা. তার গোত্রের উপাস্য যুল-কাফ্‌ফাইন মূর্তিটি ভস্মিভূত করে দেন। সাথে সাথে দাওস গোত্রের অবশিষ্ট শিরকও নিঃশেষ হয়ে যায়, তাদের সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে। এদিকে রাসূল সা. তায়িফ অভিযানে রওয়ানা হয়েছে। তুফাইল রা. তাঁর গোত্রের আরো চারশ’ সশস্ত্র লোককে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তায়িফে মিলিত হন। তুফাইল ছিলেন তাঁর দলটির অধিনায়ক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার পতাকাবাহী হবে কে?’ তিনি বললেন, ‘নুমান ইবন রাবিয়া যেহেতু দীর্ঘকাল যাবত এ দায়িত্ব পালন করে আসছে, তাই এ ক্ষেত্রেও সে এ দায়িত্বটি পালন করবে।’ রাসূল সা. তাঁর এ যুক্তি পছন্দ করলেন।

    এরপর থেকে রাসূলুল্লাহ সা. যতদিন জীবিত ছিলেন তুফাইল ইবন আমর তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে ছিলেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীকের খিলাফাতকালে তিনি তাঁর জীবন, তরবারি ও সন্তান-সন্ততি সবই খলীফার আনুগত্যে উৎসর্গ করেন। রিদ্দার যুদ্ধের আগুন চারদিকে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলে তিনি ভণ্ডনবী মুসাইলামা আল-কাজ্জাবের বিরুদ্ধে প্রেরিত একটি বাহিনীর অগ্রসৈনিক হিসেবে পুত্র আমরকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তিনি যখন ইয়ামামার পথে, তখন একটি স্বপ্ন দেখলেন। সঙ্গী-সাথীদের কাছে তিনি এর ব্যাখ্যা চাইলেন। সঙ্গীরা জিজ্ঞেস করলে, ‘কি দেখেছো?’ তিনি বললেন, ‘দেখেছি, আমার মাথা ন্যাড়া করা হয়েছে, একটি পাখী আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল, আমার স্ত্রী আমাকে তাঁর পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল, আমার পুত্র আমর আমাকে দ্রুত টেনে বের করতে চাইলো; কিন্তু তার ও আমার মধ্যে প্রাচীর খাড়া হয়ে গেল।’

    তাঁরা মন্তব্য করলেন, ‘স্বপ্নটি ভালো।’ তুফাইল বলেন, ‘তবে আমি স্বপ্নের তাবীর করলাম এভাবেঃ ন্যাড়া মাথার অর্থ ঘাড় থেকে আমার মাথা বিচ্ছিন্ন হবে। মুখ থেকে পাখী বের হওয়ার অর্থ আমার রূহটি বের হয়ে যাবে। স্ত্রীর পেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়ার অর্থ মাটি খুড়ে কবর তৈরী করে আমাকে দাফন করা হবে। আমার প্রবল বাসনা, আমি যেন শহীদের মৃত্যু বরণ করতে পারি। আর আমার পুত্র ’আমর, সেও আমার মত শাহাদাত চাইবে; কিন্তু একটু দেরীতে সে তা লাভ করবে।’ তাঁর এ ব্যাখ্যা সত্যে পরিণত হয়েছি। হিজরী ১১ সনে ইয়ামামার যুদ্ধে এই মহান সাহাবী বীরত্বের সাথে লড়াই করেন এবং যুদ্ধের ময়দানেই শাহাদাত বরণ করেন। এ যুদ্ধে তাঁর একমাত্র পুত্র ’আমরের ডান হাতে কব্‌জিটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন। এভাবে তিনি যুদ্ধের ময়দানে নিজের হাতটি ও পিতাকে হারিয়ে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

    দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের রা. খিলাফাতকালে একবার ’আমর ইবন তুফাইল এলেন তাঁর কাছে। খরীফার জন্য খাবার উপস্থিত হলে তিনি তাঁর কাছে উপবিষ্ট সকলকে আহ্‌বান জানালেন খাবারের জন্য। সকলে সাড়া দিলেও ’আমর সাড়া দিলেন না। খলীফা তাঁকে বললেন, ‘তোমার কী হলো? সম্ভবতঃ হাতে জন্য লজ্জা পাচ্ছ?’ ’আমর বললেন, ‘হ্যা, তাই।’ খলীফা বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমার ঐ কাটা হাতটি দিয়ে এ খাবার ঘেঁটে না দেওয়া পর্যন্ত আমি মুখে দেবনা। আল্লাহর কসম, একমাত্র তুমি ছাড়া মুসিলম উম্মাহর মধ্যে এমন আর কেউ নেই যার এক অংশ জান্নাতে। অর্থাৎ তোমার হাতটি।’ পিতার মৃত্যুর পর সব সময় তিনি শাহাদাতের স্বপ্ন দেখতেন। অবশেষে হিজরী ১৫ সনে রোমান বাহিনীর সাথে ইয়ারমুকের প্রান্তরে মুসলমানদের যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয় সেখানে তাঁর এ স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়। এভাবে বাপ-বেটা দু’জনেই শাহাদাতের গৌরব অর্জন করেন।

    মক্কায় রাসূলুল্লাহ সা. ও মুসলমানদের ওপর যখন যুলুম-অত্যাচারের মাত্রা চরমে পৌঁছে, তখন একদিন তুফাইল প্রস্তাব দিলেন রাসূলকে সা. তাঁদের গোত্রে হিজরাত করে তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গে আশ্রয় নেওয়ার জন্য। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. হিফাজতের পূর্ণ যিম্মাদারীর আশ্বাসও তাঁকে দান করেন। কিন্তু এ গৌরব আল্লাহ তায়ালা মদীনার আনসারদের ভাগ্যে নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তাই তিনি তুফাইলের আহ্‌বানে সাড়া দেননি।

    ইসলাম গ্রহণের পর স্বীয় গোত্রে ইসলামী দাওয়াত ও তাবলীগে ব্যস্ত থাকায় রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্যে দীর্ঘদিন কাটাবার সুযোগ তিনি পাননি। তবে তাঁরই চেষ্টায় গোটা দাওস গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

  • আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা)

    আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম (রা)

    মুয়ায্‌যিনুর রাসূল হযরত আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম সেই মহান সাহাবী যাঁর জন্য সপ্তম আকাশের ওপর থেকে নবী করীমকে সা. তিরস্কার করা হয়েছে এবং যাঁর শানে আল্লাহর নিকট থেকে হযরত জিবরীল আ. অহী নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট অবতরণ করেছেন। তিনি সেই গর্বিত মহাপুরুষ যাঁর সম্পর্কে আল-কুরআনের সর্বমোট ষোলটি আয়াত নাযিল হয়েছে।

    মদীনাবাসীরা তাঁকে ডাকতেন আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম বলে। তবে ইরাকীদের নিকট তিনি ‘উমার ইবন উম্মে মাকতুম’ নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন মক্কার কুরাইশ গোত্রের সন্তান। রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল। তিনি ছিলেন উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদীজা বিনতু খুওয়ালিদের মামাতো ভাই। তাঁর পিতা কায়েস বিন যায়িদ ও মাতা আতিকা বিনতু আবদিল্লাহ। আবদুল্লাহকে অন্ধ অবস্থায় প্রসব করেনে, এ কারণে মা ‘আতিকা উম্মু মাকতুম’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। মাকতুম অর্থ অন্ধ এবং উম্মু মাকতুম- অন্ধের মা।

    বাহ্যিক চক্ষু তাঁর ছিল না। তবে একটি তীক্ষ্ণ অন্তর্চক্ষু তিনি লাভ করেছিলেন। মক্কায় ইসলামের আলোকরশ্মি আত্মপ্রকাশের সূচনা কালটি তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আল্লাহ তা’আলা তাঁর অন্তর্চক্ষু উন্মুক্ত করে দেন। তিনি ঈমান আনেন। এভাবে তিনি হলেন ইসলামের প্রথম পর্বের বিশ্বাসীদের অন্যতম। মক্কার মুসলমানদের কুরবানী, ত্যাগ-তিতিক্ষা, ধৈর্য্য ও দৃঢ়তার অংশীদার ছিলেন তিনিও। অন্যদের মত তিনিও শিকার হয়েছিলেন কুরাইশদের অত্যাচার ও উৎপীড়নের। তাদের হাজারো জুলুম-অত্যাচারে তিনি একটুও দমেননি, একটুও সাহসহারা হননি, অথবা বলা যায়, তাঁর ঈমান কখনো দুর্বল হয়ে পড়েনি। তাদের জুলুম-অত্যাচার যতই বৃদ্ধি পেয়েছিল, তিনিও তত বেশী করে আল্লাহর-দ্বীনকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কিতাবের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছিল, শরীয়াতের সমঝও বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং রাসূলুল্লাহর সা. নিকট তাঁর সময় অসময়ে যাতায়াতও বেড়ে গিয়েছিল।

    রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি তাঁর ভক্তি-ভালোবাসা ও পবিত্র কুরআন হিফ্‌জ করার প্রতি তাঁর আগ্রহ এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে, এ ব্যাপারে প্রতিটি সুযোগকে তিনি গনিমত মনে করতেন এবং প্রতিটি মুহূর্তে কাজে লাগাতেন। আগ্রহের আতিশয্যের কারণে অনেক সময় রাসূলুল্লাহর সা. নিজের জন্য এমনকি অন্যের জন্য নির্ধারিত সময়টুকুতেও তিনি ভাগ বসাতেন।

    এটা সেই সময়ের কথা যখন রাসূলুল্লাহর সা. মক্কার কুরাইশ নেতৃবর্গের ভীষণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে তিনি দারুণ আগ্রহী। একদিন তিনি মিলিত হলেন, ‘উতবা ইবন রাবীয়া, শায়বা ইবন রাবীয়া, আমর ইবন হিশাম উরফে আবু জাহল, উমাইয়া ইবন খালফ এবং খালিদ সাইফুল্লাহর পিতা ওয়ালিদ ইবন মুগীরার সাথে। তিনি একেক জনের কাছে যাচ্ছেন, শলাপরামর্শ করছেন এবং তাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছেন। তিনি আশা করছেন, তারা তাঁর দাওয়াত কবুল করুক অথবা কমপক্ষে তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ওপর অত্যাচার-উৎপীড়ন থেকে বিরত থাকুক। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি ব্যস্ত, এমন সময় সম্পূর্ণ অনাহূতভঅবে আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম এসে হাজির। বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তার কিছু আমাকে শিখিয়ে দিন। রাসূল সা. তাঁর কথায় বিশেষ একটা গুরুত্ব না দিয়ে কুরাইশ নেতৃবর্গের পতি মনোযোগী থাকলেন। এই আশা ও বিশ্বাস নিয়ে যে, তারা ইসলাম গ্রহণ করবে এবং তাতে আল্লাহর দ্বীনের সম্মান বৃদ্ধি পাবে ও দাওয়াতী কাজের সুবিধা হবে। রাসূলুল্লাহ সা. তাদের সাথে আলোচনা-পরামর্শ শেষ করে যেইনা গৃহের দিকে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়েছেন অমনি আল্লাহ তা’আলা তাঁকে পাকড়াও করলেন। তিরস্কার করে অহী নাযিল করলেনঃ

    ‘সে ভ্রু কুঞ্চিত করলো এবং মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ তার নিকট অন্ধ লোকটি এলো। তুমি কেমন করে জানবে- সে হয়তো পরিশুদ্ধ হতো অথবা উপদেশ গ্রহণ করতো। ফলে উপদেশ তার উপকারে আসতো। পক্ষান্তরে যে পরওয়া করেনা, তুমি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছো। অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোন দায়িত্ব নেই। অন্যদিকে যে তোমার দিকে ছুটে এলো, আর সে সশংকচিত্ত, তাকে তুমি অবজ্ঞা করলে। না, এরূপ আচরণ অনুচিত। এ তো উপদেশবাণী। যে ইচ্ছে করবে স্মরণ রাখবে। তা আছে মহান লিপিসমূহে, যা উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন, পবিত্র, মহান, পূত-চরিত্র লিপিকর হস্তে লিপিবদ্ধ।’ (আবাসাঃ ১৬)

    এই অন্ধ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুমের শানে মোট ষোলটি আয়াত সহ হযরত জিবরীল আল-আমীন সেদিন অবতরণ করেছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. অন্তঃকরণে। আয়াতগুলি আজ পর্যন্ত পঠিত হয়ে আসছে এবং যতদিন এ ধরাপৃষ্ঠে মানব জাতির জীবনধারা অব্যাহত থাকবে ততদিন তা পঠিত হবে। সেই দিন থেকে রাসূল সা. আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুমকে বিশেষ সমাদর করতেন। তিনি এলে ডেকে কাছে বসাতেন, কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন এবং তাঁর কিছু প্রয়োজন থাকলে তা পূরণ করতেন। হযরত আয়িশা রা. তাঁকে লেবু ও মধুর সরবত বানিয়ে পান করাতেন, তিনি বলেনঃ ‘আয়াত নাযিল হওয়ার পর এ ছিল তাঁর জন্য নির্ধারিত।’ এত আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ, তিনি তো সেই ব্যক্তি যাঁর কারণে সপ্তম আকাশের ওপর থেকে তাঁকে কঠোর ভাষায় তিরস্কার করা হয়েছে।

    রাসূল সা. ও মুসলমানদের ওপর কুরাইশদের কঠোরতা ও অত্যাচারের মাত্রা যখন সীমা ছেড়ে গেল, আল্লাহ তা’আলা মুসলমানদেরকে হিজরাতের অনুমতি প্রদান করলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম ছিলেন তাঁদেরই একজন যারা খুব দ্রুত দ্বীনের খাতিরে দেশ ত্যাগ করেছিলেন। তিনি এবং হযরত মুসয়াব ইবন ’উমাইর রা. সাহাবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম মক্কা থেকে মদীনায় উপনীত হন। আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম মদীনায় পৌঁছে বন্ধু মুসয়াব ইবন উমাইরকে সঙ্গে নিয়ে মানুষের বাড়ীতে যেয়ে যেয়ে কুরআন ও আল্লাহর দ্বীন শিক্ষা দিতে শুরু করেন। হযরত বাররা ইবন আবিব রা. বলেনঃ ‘রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম হিজরাত করে মদীনায় আমাদের নিকট আসনে মুসয়াব ইবন উমাইর ও ইবন উম্মে মাকতুম রা.। তাঁরা মদীনায় এসেই আমাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতে আরম্ভ করেন।’

    রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করে এলেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম ও বিলাল ইবন রাবাহকে মুসলমানদের মুয়ায্‌যিন নিয়োগ করেন। তাঁরা দু’জন ছিলেন মুসলিম উম্মাতের প্রথম মুয়ায্‌যিন। এভাবে তাঁরা প্রতিদিন পাঁচবার কালেমাতুত তাওহীদের প্রচার, মানুষকে সৎকর্মের দিকে আহ্‌বান ও কল্যাণের প্রতি উৎসাহদানের দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে থাকেন। বিলাল আযান দিতেন, আর ইবন উম্মে মাকতুম দিতেন ইকামাত। মাঝে মাঝে আযান দিতেন ইবন উম্মে মাকতুম, আর ইকামাতে দিতেন বিলাল রা.। রমযান মাসে তাঁরা অন্য একটি কাজও করতেন। মদীনার মুসলমানরা তাঁদের একজনের আযান শুনে সেহরী খাওয়া শুরু করতেন এবং অন্যজনের আযান শুনে খাওয়া বন্ধ করতেন। বিলালের আযান শুনে লোকেরা সেহরীর জন্য জেগে উঠতো। এদিকে আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম প্রতীক্ষায় থাকতেন সুবহে সাদিকের সুবহে সাদিক হওয়ার সাথে সাথে তিনি আযান দিতেন, আর সে আযান ‍শুনে লোকেরা খাওয়া বন্ধ করতো।

    রাসূলুল্লাহর সা. হিজরাতের যুদ্ধ-বিগ্রহের পালা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু ইবন উম্মে মাকতুম স্বীয় অক্ষমতার কারণে জিহাদে অংশগ্রহণে অপারগ ছিলেন। বদর যুদ্ধের পর আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় নবীর ওপর কিছু আয়াত নাযিল করেন। আয়াতগুলি মুজাহিদদের সুমহান মর্যাদা ও জিহাদ থেকে বিমুখ হয়ে যারা গৃহে অবস্থান করেন, তাদের ওপর মুজাহিদদের প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষিত হয়। আয়াতগুলির বিষয়বস্তু ইবন উম্মে মাকতুমের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। মুজাহিদদের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে তিনি ভীষণ ব্যথিত হন। যখন এ আয়াত নাযিল হলোঃ

    ‘গৃহে অবস্থানকারী মু’মিনগণ এবং আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদগণ সমমর্যাদার অধিকারী হবে না।’ রাসূলুল্লাহ সা. কাতিবে অহী হযরত যায়িদ বিন সাবিতকে রা. আয়াতটি লিখতে বললেন। এমন সময় ইবন উম্মে মাকতুম সেখানে পৌঁছলেন। আরজ করলেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, সক্ষম হলে আমিও তো জিহাদে অংশগ্রহণ করে মুজাহিদদের মর্যাদা লাভ করতে পারতাম।’

    তারপর অত্যন্ত বিনীতভাবে আল্লাহর নিকট দু’আ করলেনঃ ‘হে আল্লাহ আমার অপারগতা সম্পর্কে অহী নাযিল করুন, হে আল্লাহ আমার ওজর সম্পর্কে অহী নাযিল করুন।’ তাঁর এ আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর নিকট এতই মনঃপূত হয়েছিল যে, সঙ্গে সঙ্গে অহী নাযিল করে অনন্তকালের জন্য জগতের সকল অক্ষম ব্যক্তিদের জিহাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দান করেন।

    নাযিল হয়ঃ

    لَّا يَسْتَوِي الْقَاعِدُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ وَالْمُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنفُسِهِمْ

    ‘ওজরগ্রস্তরা ছাড়া যেসব মুসলমান গৃহে অবস্থান করে, মর্যাদায় তারা তাদের সমকক্ষ নয়, যারা জান মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে।’ এখানে [غَيْرُ أُولِي الضَّرَرِ ] বাক্যাংশ দ্বারা সকল অক্ষম ব্যক্তিকে জিহাদের হুকুম থেকে ব্যতিক্রম ঘোষণা করা হয়েছে।

    তবে এই হুকুমের কারণে তাঁর জিহাদে গমনের উৎসাহ কমার পরিবর্তে আরো বৃদ্ধি পেল। তাঁর মহান অন্তঃকরণ অক্ষমদের সাথে ঘরে বসে থাকতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ, মহান অন্তঃকরণ সর্বদাই মহৎ কাজ ছাড়া পরিতুষ্ট হতে পারে না। ইবন হাজার আসকিলানী আল ইসাবা গ্রন্থে বলেনঃ অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও তিনি কখনও কখনও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন। মানুষকে তিনি বলতেন, ‘আমার হাতে পতাকা দিয়ে তোমরা আমাকে দু’সারির মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দাও। আমি অন্ধ, পালানোর কোন ভয় নেই।’

    হযরত ইবন উম্মে মাকতুম যদিও অক্ষমতার কারণে জিহাদের মর্যাদা লাভে বঞ্চিত ছিলেন, তবে তার থেকে বড় গৌরব ও সম্মান তিনি অর্জন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. যখন নেতৃস্থানীয় মুহাজির ও আনসারদের সঙ্গে নিয়ে মদীনার বাইরে কোন অভিযানে গমন করতেন, তখন ইবন উম্মে মাকতুমকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন। এ সময় তিনি মসজিদে নববীতে নামাযের ইমামতির দায়্ত্ব পালন করতেন। সুতরাং আবওয়ার, বাওয়াত, যুল আসীর, জুহাইনা, সুয়াইক, গাতফান, হামরাউল আসাদ, নাজরান, যাতুর রুকা প্রভৃতি অভিযানের সময় মোট তের বার এ গৌরব তিনি অর্জন করেন। বদর যুদ্ধের সময় কিছুদিন তিনি এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরে হযরত আবু লুবাবাকে এ দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

    রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর থেকে হযরত উমারের রা. খিলাফত কালের শেষ পর্যন্ত তাঁর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। কেবল এতটুকু জানা যায় যে, তিনি কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে মুসলিম বাহিনীর পতাকা সমুন্নত রেখেছিলেন। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মতে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। তবে ইবন সা’দ তাঁর ‘তাবাকাতে’ যুবাইর ইবন বাককারের সূত্রে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি কাদেসিয়ার যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। অধিকাংশ সীরাত লেখক এই বর্ণনাকে অধিকতর সহীহ মনে করেছেন।

    চতুর্দশ হিজরী সনে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রা. সিদ্ধান্ত নিলেন পারস্য বাহিনীর সাথে একটি চূড়ান্ত যুদ্ধের। তিনি বিভিন্ন প্রদেশের ওয়ালীদের লিখলেনঃ

    ‘যার একখানা হাতিয়ার, একটি ঘোড়া বা উষ্ট্রী অথবা বুদ্ধিমত্তা আছে, এমন কাউকে বাদ দিবে না। তাদের প্রত্যেককে আমার নিকট জলদি পাঠিয়ে দেবে।’

    মুসলিম জনগণ হযরত ফারুকে আজমের এ আহ্‌বানে ব্যাপকভাবে সাড়া দিল। চতুর্দিক থেকে মানুষ বন্যার স্রোতের ন্যায় মদীনার দিকে আসতে লাগলো। অন্ধ আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুমও ঘরে বসে থাকতে পারলেন না। তিনি মুজাহিদদের কাতারে শামিল হয়ে চলে এলেন মদীনায়। খলীফা উমার রা. এই বিশাল বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করলেন হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসকে রা.। যাত্রাকালে খলীফা তাঁকে নানা বিষয়ে উপদেশ দান করে বিদায় জানালেন।

    মুসলিম বাহিনী যখন কাদেসিয়ায় পৌঁছলো, হযরত আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম বর্ম পরে যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে সামনে এলেন এবং মুসলিম বাহিনীর আলাম বা পতাকা বহনের দায়িত্বটি তাঁকে দেয়ার আহ্‌বান জানালেন। বললেনঃ হয় এ পতাকা সমুন্নত রাখবো, নয় মৃত্যুবরণ করবো।

    এই কাদেসিয়া প্রান্তরে মুসলিম ও পারস্য বাহিনীর মধ্যে যে প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় বিশ্বের সমর ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে। অবশেষে চূড়ান্ত যুদ্ধের তৃতীয় দিনে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের মাধ্যমে তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য ও সর্বাধিক গৌরবময় সিংহাসনের পতন ঘটে। আর সেইসাথে তাওহীদের পতাকা পত্‌ পত্‌ করে উড়তে থাকে এই সুবিশাল পৌত্তলিক ভূমিতে। অসংখ্য শহীদের প্রাণের বিনিময়ে এ মহাবিজয় অর্জিত হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাকতুমও ছিলেন সেই অগনিত শহীদদের একজন। যুদ্ধশেষে দেখা গেল রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় তিনি মুসলমানদের পতাকাটি জড়িয়ে ধরে মাটিতে পড়ে আছে।

    ইবন উম্মে মাকতুম ছিলেন অন্ধ। মসজিদে নববী থেকে তাঁর বাড়ীটিও ছিল একটু দূরে। পথে নালা নর্দমা ঝোপ জংগল পড়তো। সব সময়ের জন্য কোন সাহায্যকারীও তাঁর ছিলনা। এত অসুবিধা সত্ত্বেও নিয়মিত মসজিদে নববীতে এসে নামায আদায় করতেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেনঃ একদিন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি একজন অন্ধ, আমার বাড়ীটিও মসজিদ থেকে বেশ দূরে, আমাকে পথ দেখিয়ে নেওয়ার জন্য একজন লোকও আছে তবে সে আমার মনঃপূত নয়। এমতাবস্থায় আপনি আমাকে ঘরে নামায পড়ার অনুমতি দেবেন কি? তিনি বললেনঃ ‘তুমি আযান শুনতে পাও?’ বললামঃ হ্যাঁ। বললেনঃ তোমার জন্য আমি কোন অনুমতির পথ দেখতে পাচ্ছিনা। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বাড়ী ও মসজিদের মধ্যে খেজুর বাগান ও ঝোপ-জংগল রয়েছে। সব সময় পথ দেখানো লোকও আমি রাখতে পারিনে। এমতাবস্থায় আমি কি ঘরে নামায আদায় করতে পারি? তিনি বললেনঃ তুমি কি ইকামাতে শুনতে পাও? বললামঃ হ্যাঁ, রাসূল সা. বললেনঃ তা হলে তুমি মসজিদে এসেই নামায আদায় করো। (হায়াতুস সাহাবা, ৩য়, ১২১) আযান ও ইকামতের আওয়াজ তাঁর ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতো এ কারণে তিনি অন্ধ হওয়া সত্ত্বেও ঘরে নামায আদায়ের অনুমতি পাননি। হযরত উমার রা. তাঁর খিলাফতকালে তাঁকে একজন রাহনুমা (পথ প্রদর্শক) দিয়েছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উম্মে মাকতুম ছিলেন পবিত্র কুরআনের হাফেজ। হযরত আনাস ও যার বিন জাইশ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তাহজীবুল কামাল, ২৮৯)

  • উসামা ইবন যায়িদ (রা)

    উসামা ইবন যায়িদ (রা)

    হিজরাতের পূর্বে মক্কায় নবুওয়াতের সপ্তম বছর চলছে। রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সাহাবীরা তখন কুরাইশদের চরম বাড়াবাড়ির শিকার। ইসলামী দাওয়াতের কঠিন দায়িত্ব ও বোঝা পালন করতে গিয়ে পদে পদে তিনি নানা রকম দুঃখ বেদনা ও মুসীবতের সম্মুখীন হচ্ছেন। এমন সময় তাঁর জীবনে একটু খুশির আলোক আভা দেখা দিল। সুসংবাদ দানকারী খুশীর বার্তা নিয়ে এলো, ‘উম্মু আয়মন’ একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেছেন। রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র মুখমণ্ডল আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। সেই সৌভাগ্যবান নবজাতক, যার ধরাপৃষ্ঠে আগমণ সংবাদে আল্লাহর রাসূল সা. এত উৎফুল্ল হয়েছিলেন, তিনি উসামা ইবন যায়িদ।

    শিশুটির ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদে রাসূলুল্লাহর সা. এত উৎফুল্ল হওয়াতে সাহাবীরা কিন্তু বিস্মিত হননি। কারণ, রাসূলুল্লাহর সা. নিকট শিশুটির মাতা-পিতার স্থান সম্পর্কে সবাই অবগত ছিলেন। শিশুটির মা ‘বারাকা আল হাবাশিয়্য’- যিনি ‘উম্মু আয়মন’ নামে পরিচিত। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. জননী হযরত আমিনার দাসী। তাঁর জীবনকালে এবং ওয়াফাতের পরও এ মহিলা রাসূলুল্লাহকে সা. প্রতিপালন করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. দুনিয়াতে চোখ মেলে তাঁকেই মা বলে বুঝতে শেখেন। অত্যন্ত গভীর ও অকৃত্রিমভাবে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে ভালোবাসতেন। প্রায়ই তিনি বলতেনঃ ‘আমার মায়ের পর ইনিই আমার মা এবং আমার আহলদের অবশিষ্ট ব্যক্তি। এ সম্মানিত মহিলাই হচ্ছেন এ নবজাতকের গৌরবান্বিত মা।

    শিশুটির পিতা হলেন রাসূলুল্লাহর সা. স্নেহভাজন, ইসলাম-পূর্ব যুগের ধর্মপুত্র, বিশ্বস্ত সঙ্গী, ইসলামের পর রাসূলুল্লাহর সা. সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি- যায়িদ ইবন হারিসা রা.।

    রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মক্কার সমগ্র মুসলিম সমাজ শিশুটির ভূমিষ্ঠ হওয়ার সংবাদে উৎফুল্ল হয়েছিল। শিশুর পিতাকে যেমন তারা উপাধি দিয়েছিল ‘হিববু রাসুলিল্লাহ’, তেমনি তারা তাকে উপাধি দিল ‘ইবনুল হিব্‌ব’ বা রাসূলুল্লাহর সা. প্রীতিভাজনের পুত্র। তাদের এ উপাধি দান কিন্তু যথার্থই হয়েছিল। রাসূল সা. তাকে এত অধিক ভালোবেসেছিলেন যে, তা দেখে বিশ্ববাসীর ঈর্ষা হয়। উসামা ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. দৌহিত্র হাসান ইবন ফাতিমার সমবয়সী। হাসান ছিলেন তাঁর নানা রাসূলুল্লাহর সা. মত দারুণ সুন্দর। আর উসামা ছিলেন তাঁর হাবশী মা’র হাবশী মা’র মত কালো ও খাঁদা নাক বিশিষ্ট। কিন্তু রাসূল সা. তাদের দু’জনকে স্নেহ ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে মোটেই কম বেশী করতেন না। তিনি উসামাকে বসাতেন এক উরুর ওপর এবং হাসানকে অন্য উরুর ওপর। তারপর দু’জনকে একসাথে বুকের মাঝে চেপে ধরে বলতেনঃ ‘হে আল্লাহ, আমি তাদের দু’জনকে ভালোবাসি, তুমিও তাদের উভয়কে ভালোবাস।’

    শিশু উসামার প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. স্নেহ ও ভালোবাসা কত গভীর ও প্রবল ছিল তা বুঝা যায় একটি ঘটনা দ্বারা। শিশু উসামা একবার দরজার চৌকাঠে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল। তার কপাল কেটে রক্ত বের হতে লাগলো। রাসুল সা. প্রথমে হযরত আয়িশাকে রা. রক্ত মুছে দিতে বললেন। কিন্তু তাতে স্বস্তি পেলেন না। তিনি নিজেই উঠে গিয়ে রক্ত মুছে ক্ষতস্থানে চুমু দিতে লাগলেন এবং মিষ্টি মধুর ও দরদ মিশ্রিত কথা বলে তাকে শান্ত করতে লাগলেন।

    শৈশবের মত যৌবনেও উসামা রাসূলুল্লাহর সা. ভালোবাসা লাভ করেন। একবার কুরাইশদের অন্যতম নেতা হাকীম ইবন হিযাম ইয়ামনের ‘যী ইয়াযিন’ বাদশার একখানা মূল্যবান চাদর ইয়ামন থেকে পঞ্চাশ দীনার দিয়ে খরীদ করেন। চাদরখানি তিনি রাসূলুল্লাহকে সা. উপহার দিতে চাইলে তিনি গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ, হাকীম তখনও মুশরিক ছিলেন। তবে রাসূল সা. তাঁর নিকট থেকে অর্থের বিনিময়ে চাদরখানি খরিদ করেন। এক জুমআর দিন একবার মাত্র সে চাদরখানি রাসূল সা. পরেন। তারপর তিনি তা উসামার গায়ে পরিয়ে দেন। উসামা সে চাদরখানি প’রে তার সমবয়সী মুহাজির ও আনসার যুবকদের সাথে সকাল সন্ধ্যা ঘুরে বেড়াতেন।

    যৌবনে উসামার মধ্যে এমন সব চারিত্রিক সৌন্দর্য ও গুণাবলী বিকশিত হলো যা সহজেই রাসূলুল্লাহর সা. স্নেহ ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তীক্ষ্ণ মেধা, দুঃসাহস, বিচক্ষণতা, পূতঃপবিত্র চরিত্র এবং তাকওয়া ও পরহিযগারী ছিল তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

    উহুদ যুদ্ধের দিন উসামা তাঁর সমবয়সী আরো কতিপয় কিশোর সাহাবীর সাথে উপস্থিত হলেন রাসূলুল্লাহর সা. সামনে। তাদের সবার ইচ্ছা জিহাদে অংশগ্রহণ করা। রাসূলুল্লাহ সা. তাদের মধ্য থেকে কয়েক জনকে নির্বাচন করলেন এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার কারণে অন্যদের ফিরিয়ে দিলেন। উসামা প্রত্যাখ্যাত হয়ে বাড়ীতে ফিরছেন। চোখ দু’টি তাঁর পানিতে টলমল। তাঁর ব্যথা, রাসূলুল্লাহর সা. পতাকাতলে জিহাদের সুযোগ থেকে তিনি বঞ্চিত হলেন।

    খন্দকের যুদ্ধ সমুপস্থিত। উসামাও হাজির। তাঁর সাথে আরো কয়েকজন কিশোর সাহাবী। রাসূলুল্লাহ সা. সৈনিক বাছাই করছেন। উহুদের মত এবারো তাঁকে ছোট বলে বাদ দেওয়া না হয়, এজন্য পায়ের আাঙ্গুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর আগ্রহ দেখে রাসূলুল্লাহর সা. অন্তর নরম হলো। তাকে নির্বাচন করলেন। তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে উসামা চললেন জিহাদে। তিনি তখন ১২/১৩ বছরের এক কিশোর।

    কোন কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে, অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার কারণে প্রথম পর্যায়ের অভিযান সমূহে তিনি অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি। ‘হারকা’ অভিযানে তিনি সর্বপ্রথম অংশগ্রহণ করেন। সাত অথবা আট হিজরীতে এ অভিযান পরিচালিত হয়। তখন তাঁর বয়স চৌদ্দ। কিন্ত তাঁর সীমাহীন যোগ্যতার কারণে রাসূল সা. তাঁকে অভিযানের নেতৃত্ব দান করেন। এ অভিযানের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেনঃ ‘রাসূল সা. আমাদেরকে ‘হারকা’র দিকে পাঠালেন। শত্রুরা পরাজিত হয়ে পালাতে শুরু করলো। আমি এক আনসারী সিপাহীর সাথে পলায়নরত এক সৈনিকের পিছু ধাওয়া করলাম। যখন সে আমাদের নাগালের মধ্যে এসে গেল, জোরে জোরে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে উঠলো। তার এ ঘোষণায় আনসারী হাত গুটিয়ে নিল; কিন্তু আমি বর্শা ছুড়ে তাকে গেঁথে ফেললাম। সে মারা গেল। অভিযান থেকে ফেরার পর বিষয়টি রাসূলুল্লাহর সা. কর্ণগোচর হলো। তিনি আমাকে বললেনঃ উসামা, কালিমা তাইয়্যেবা পড়ার পর তুমি একটি লোককে হত্যা করেছ। আমি বললাম, প্রাণ বাঁচানোর জন্য সে এমনটি করেছে। তিনি আমার কথায় কান দিলেন না। একই কথা বার বার আওড়াতে লাগলেন। আমি তখন এত অনুতপ্ত হলাম যে, মনে মনে বললাম, ‘হায়! আজকের পূর্বে যদি আমি ইসলাম গ্রহণ না করতাম।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা. তাঁকে বলেনঃ ‘তুমি তার অন্তর ফেঁড়ে দেখলে না কেন?’

    হুনাইনের যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয়ে পালাতে লাগলো। উসামা তখন রাসূলুল্লাহর সা. চাচা আব্বাস, আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিসসহ মাত্র ছ’জন সাহাবীর সাথে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে অটল হয়ে রুখে দাঁড়ালেন। বীর বিশ্বাসীদের ক্ষুদ্র এই দলটির সাহায্যে রাসূলুল্লাহ সা. সেদিন নিশ্চিত পরাজয়কে বিজয়ের রূপদান করেন এবং পলায়নরত মুসলিম বাহিনীকে মুশরিক বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা করেন।

    মক্কা নিজয়েও উসামা ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গী। রাসূলুল্লাহর সা সাথে একই বাহনে সওয়ার হয়ে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেন। রাসূলুল্লাহর সা. সাথে উসামা, বিলাল ও উসমান ইবন তালহা এ তিন ব্যক্তিই সেদিন কা’বার অভ্যন্তরে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। এ চারজনের পরই কা’বার দ্বার রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

    উসামা তাঁর পিতা সেনাপতি যায়িদ ইবন হারিসার সাথে মুতা অভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তখন তার বয়স আঠারো বছরেরও কম। এ যুদ্ধে তিনি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন পিতার শাহাদাত। তবে তিনি মুষড়ে পড়েননি। পিতার শাহাদাত বরণের পর যথাক্রমে জা’ফর ইবন আবী তালিব ও আব্দুল্লাহ ইবন রাওয়াহার নেতৃত্বে বাহাদুরের মত লড়াই করেন। যায়িদের মত এ সেনাপতিও শাহাদাত বরণ করলে তিনি সেনাপতি খালিদ ইবন ওয়ালিদের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন এবং মুসলিম বাহিনীকে রোমান বাহিনীর পাঞ্জা থেকে উদ্ধার করেন। মূতার প্রান্তরে পিতা যায়িদের মরদেহ আল্লাহর হাওয়ালা করে যে ঘোড়ার ওপর তিনি শহীদ হয়েছিলেন, তার ওপর সওয়াব হয়ে তিনি মদীনায় ফিরে এলেন।

    একাদশ হিজরীতে রাসূল সা. রোমান বাহিনীর সাতে একটা চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। হযরত আবু বকর, ‘উমার, সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ প্রমুখ প্রথম কাতারের সমর বিশারদ সাহাবী এ বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হলেন। রাসূল সা. উসামা বিন যায়িদকে এ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিয়োগ করেন। তখন তাঁর বয়স বিশের কাছাকাছি। রাসূল সা. গাযা উপত্যকার নিকটবর্তী ‘বালকা’ ও ‘দারুম আল কিলয়ার’ আশে পাশে সীমান্তে ছাউনি ফেলার নির্দেশ দিলেন।

    বাহিনী যাত্রার জন্য প্রস্তুত হলো। এদিকে রাসূল সা. পীড়িত হয়ে পড়লেন। রাসূলুল্লাহর সা. রোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাহিনীসহ তিনি যাত্রাবিরতি করে মদীনার উপকণ্ঠে ‘জুরুফ’ নামক স্থানে প্রতীক্ষা করতে থাকেন। সেখান থেকে প্রতিদিন তিনি রাসূলুল্লাহকে সা. দেখতে আসতেন। উসামা বলেন ‘রাসূলুল্লাহর সা. রোগ বৃদ্ধি পেলে আমি দেখতে গেলাম। আরো অনেকে আমার সঙ্গে ছিলেন। ঘরে প্রবেশ করে দেখলাম, রাসূল সা. চুপ করে আছেন। রোগের প্রচণ্ডতায় তিনি কথা বলতে পারছেন না। আমাকে দেখে প্রথমে তিনি আসমানের দিকে হাত উঠালেন, তারপর আমার শরীরের ওপর হাত রাখলেন। আমি বুঝলাম, তিনি আমার জন্য দু’আ করছেন।’

    রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকাল হলো। খবর পেয়ে তিনি মদীনায় ছুটে এলেন এবং কাফন দাফনে অংশগ্রহণ করলেন। রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র মরদেহ কবরে নামানোর সৌভাগ্যও তিনি লাভ করেন।

    হযরত আবু বকর রা. খলীফা নির্বাচিত হলেন। তিনি উসামাকে যাত্রার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু আনসারদের ছোট্ট একটি দল মনে করলেন এ মুহূর্তে বাহিনীর যাত্রা একটু বিলম্ব করা উচিত। এ ব্যাপারে খলীফার সাথে কথা বরার জন্য তাঁরা হযরত উমারকে রা. অনুরোধ করলেন। তাঁরা উমারকে এ কথাও বললেন, যদি তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, তাহলে অন্ততঃ তাঁকে অনুরোধ করবেন, উসামা থেকে একজন অধিক বয়সের লোককে যেন আমাদের সেনাপতি নিয়োগ করে।

    হযরত আবু বকর বসে ছিলেন। হযরত ’উমারের রা. মুখে আনসারদের বক্তব্য শোনার সাথে সাথে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং ফারুকে আযমের দাড়ি মুট করে ধরে উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠলেনঃ ‘ওহে খাত্তাবের পুত্র! আপনার মা নিপাত যাক! আপনি আমাকে নির্দেশ দিচ্ছেন রাসূলুল্লাহর সা. নিয়োগ করা ব্যক্তিকে অপসারণ  করতে? আল্লাহর কসম, আমার দ্বারা কক্ষণো তা হবেনা।’

    ’উমার রা. ফিরে এলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, সমাচার কি? বললেনঃ তোমাদের সকলের মা নিপাত যাক! তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের খলীফার নিকট থেকে অনেক কিছুই আমাকে শুনতে হলো।

    যুবক কমাণ্ডারের নেতৃত্বে বাহিনী মদীনা থেকে রওয়ানা হলো। খলীফা আবু বকর রা. চললেন কিছুদূর এগিয়ে দিতে। উসামা ঘোড়ার পিঠে, খলীফা পায়ে হেঁটে। উসামা বললেনঃ ‘হে রাসূলুল্লাহ সা. খলীফা! আল্লাহর কসম, হয় আপনি ঘোড়ায় উঠুন, না হয় আমি নেমে পড়ি।’ খলীফা বললেনঃ ‘আল্লাহর কসম, তুমিও নামবে না, আমিও উঠবো না। কিছুক্ষণ আল্লাহর পথে আমার পদযুগল ধুলিমলিন হতে দোষ কি?’ তারপর উসামাকে বললেনঃ ‘তোমার দ্বীন, তোমার আমানতদারী এবং তোমার কাজের সমাপ্তি আল্লাহর কাছে ন্যস্ত করলাম। রাসূলুল্লাহ সা. যে নির্দেশ তোমাকে দিয়েছেন, তা কার্যকর করা উপদেশ তোমাকে দিচ্ছি।’ তারপর উসামার দিকে একটু ঝুঁকে বললেনঃ ‘তুমি যদি ’উমারের দ্বারা আমাকে সাহায্য করা ভালো মনে কর, তাকে আমার কাছে থেকে যাওয়ার অনুমতি দাও।’ উসামা আবু বকরের আবেদন মঞ্জুর করলেন। উমারকে মদীনায় খলীফার সঙ্গে থাকার অনুমতি দিলেন।

    উসামা রাসূলুল্লাহর সা. আদেশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেন। মুসলিম অশ্বারোহী বাহিনী ফিলিস্তিনের ‘বালকা’ ও ‘কিলায়াতুত দারুম’ সীমান্ত পদানত করে। ফলে এ অঞ্চল থেকে মুসলমানদের জন্য রোমান ভীতি চিরতরে দূরীভূত হয় এবং গোটা সিরিয়া, মিসর ও উত্তর আফ্রিকাসহ কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ ভূভাগের বিজয়দ্বার উন্মুক্ত হয়।

    এ অভিযানে তিনি তাঁর পিতার হত্যাকারীকে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেন। যে ঘোড়ার ওপর তাঁর পিতা শহীদ হয়েছিলেন, তার পিঠে বিপুল পরিমাণ গণিমাতের ধন সম্পদ বোঝাই করে তিনি বিজয়ীর বেশে মদীনায় ফিরে এলেন। খলীফা আবু বকর রা. মুহাজির ও আনসারদের বিরাট একটি দল সহ মদীনার উপকণ্ঠে তাঁকে স্বগত জানান। উসামা মদীনায় পৌঁছে মসজিদে নববীতে দু’রাকায়াত নামায আদায় করে বাড়ী যান। ঐতিহাসিকরা তাঁর এ বিজয় সম্পর্কে মন্তব্য করেছেনঃ ‘উসামার বাহিনী অপেক্ষা অধিকতর নিরাপদ ও গণিমাত লাভকারী অন্য কোন বাহিনী আর দেখা যায়নি।’

    রাসূলুল্লাহর সা. অর্পিত দায়িত্ব যথাযথ পালন এবং প্রখর ব্যক্তিত্বের জন্য উসামা মুসলিম সমাজের ব্যাপক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা লাভ করেছিলেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার রা. নিজ পুত্র হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার অপেক্ষা উসামার ভাতা বেশী নির্ধারণ করেন। হযরত আবদুল্লাহ ক্ষব্ধ হয়ে অভিযোগ করেনঃ ‘আব্বা, উসামার ভাতা চার হাজার, আর আমার ভাতা তিন হাজার। আমার পিতা অপেক্ষা তাঁর পিতা অধিক মর্যাদাবান ছিলেন না এবং আমার থেকেও তাঁর মার্যাদা বেশী নয়।’ জবাবে হযরত উমার বলেনঃ ‘আফসোস! তোমার পিতার চেয়ে তার পিতা রাসূলুল্লাহর সা. অধিক প্রিয় ছিলেন এবং তোমার থেকেও সে রাসূলুল্লাহর সা. বেশী প্রিয় ছিল।’ হযরত আবদুল্লাহ রা. আর কোন উচ্চবাচ্য করেননি।

    উসামার সাথে খলীফা ’উমারের দেখা হলেই বলতেনঃ ‘স্বাগতম, আমার আমীর।’ এমন সম্বোধনে কেউ বিস্মিত হলে তিনি বলতেনঃ ‘রাসূলুল্লাহ সা. তাকে আমার আমীর বা নেতা বানিয়েছিলেন।

    হযরত উসমানের রা. খিলাফতকালে ফিতনা-ফাসাদের আশংকায় রাষ্ট্রীয় কোন দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। তবে হিতাকাংখী মুসলিম হিসাবে সর্বদা খলীফাকে সৎ পরামর্শ দিতেন এবং গোপনে গণ-অসন্তোষের বিষয়ে খলীফার সাথে আলোচনা করতেন।

    হযরত উসমানের শাহাদাতের পর যখন বিশৃংখলা দেখা দিল, তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা অবলম্বন করলেন। হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার বিরোধ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকলেন। এ সময় হযরত আলীকে একবার তিনি বলে পাঠালেন, ‘আপনি যদি বাঘের চোয়ালের মধ্যে ঢুকতেন, আমিও সন্তুষ্টচিত্তে ঢুকে যেতাম। কিন্তু এ ব্যাপারে অংশগ্রহণের আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।’ মুসলমানদের রক্তপাতের ভয়ে যদিও তিনি এ দ্বন্দ্বে জড়াতে চাননি, তবে তিনি আলীকে রা. সত্যপন্থী বলে মনে করতেন। এ কারণে, আলীকে সাহায্য না করার জন্য শেষ জীবনে তাওবাহ করেছেন।

    হযরত উসামা প্রতিপালিত হয়েছিলেন নবীগৃহে। এ কারণে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া তাঁর উচিত ছিল। রাসূলুল্লাহর সা. ওয়াফাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র আঠারো বছর। বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহর সা. দীর্ঘ সাহচর্য লাভের সুযোগ তিনি পাননি। এ কারণে, এ ক্ষেত্রে তিনি আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবন উমার প্রমুখ বিদ্বান সাহাবীদের মত আশানুরূপ সাফল্য লাভ করেননি। তা সত্ত্বেও যা তিনি অর্জন করেছিলেন তা মোটেও অকিঞ্চিৎকর নয়। তিনি নবীর সা. বহু বাণী স্মৃতিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। বিশিষ্ট সাহাবীরাও মাঝে মাঝে শরীয়াতের নির্দেশ জানার জন্য তাঁর শরণাপন্ন হতেন। হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস ‘তাউন’ বা প্লেগ সম্পর্কে শরীয়াতের কোন নির্দেশ না পেয়ে উসামাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তাউন’ বা প্লেগ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে কিছু শুনেছেন কি? তিনি এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. একটি বাণী সা’দের নিকট বর্ণনা করেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সর্বমোট একশ’ আটাশটি। তন্মধ্যে পনেরটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছেন। হযরত হাসান, মুহাম্মাদ ইবন আব্বাস, আবু হুরাইরা, কুরাইব, আবু উসমান নাহদী, ’আমর ইবন উসমান, আবু ওয়ায়িল, আমের ইবন সা’দ, হাসান বসরী রা. প্রমুখ সাহাবী ও তাবঈ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

    যেহেতু নবীগৃতে তিনি প্রতিপালিত হয়েছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. নিকট তাঁর যাতায়াত ছিল অবাধ, এ কারণে নবীর সা. শিক্ষার যথেষ্ট প্রভাব তাঁর ওপর পড়েছিল। অধিকাংশ সফরে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে একই বাহনে আরোহী হওয়ার সৌভাগ্য তিনি লাভ করেছিলেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমাতের সুযোগও বেশী পরিমাণে লাভ করেন। অজু ও পাক পবিত্রতার পানি তিনিই অধিকাংশ সময় এগিয়ে দিতেন।

    অল্প বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ সা. বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। ইফ্‌ক বা হযরত আয়িশার রা. প্রতি মুনাফিকদের বানোয়াট ও অশালীন উক্তি ছড়িয়ে পড়লে রাসূল সা. ঘনিষ্ঠ যে দু’ব্যক্তির সাথে এ ব্যাপারে পরামর্শ করেন, তারা ছিলেন হযরত আলী ও উসামা রা.।

    এ মহান সেনানায়ক হযরত মুয়াবিয়ার খিলাফত কালের শেষ দিকে হিজরী ৫৪ সনে ৬০ বছর বয়সে মদীনায় ইনতিকাল করেন।

  • সালমান আল–ফারেসী (রা)

    সালমান আল–ফারেসী (রা)

    রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘সালমান নবী পরিবারেরই একজন।’

    এটি একজন সত্য-সন্ধানী ও আল্লাহকে পাওয়ার অভিলাষী এক ব্যক্তির জীবন কথা। তিনি হযরত সালমান আল-ফারেসী। সালমান আল-ফারেসীর যবানেই তাঁর সেই সত্য প্রাপ্তির চমকপ্রদ বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেনঃ

    আমি তখন পারস্যের ইসফাহার অঞ্চলের একজন পারসী নওজোয়ান। আমার গ্রামটির নাম ‘জায়্যান’। বাবা ছিলেন গ্রামের দাহকান-সর্দার। সর্বাধিক ধনবান ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। জন্মের পর থেকেই আমি ছিলাম তাঁর কাছে আল্লাহর সৃষ্টিজগতের মধ্যে সবচে বেশি প্রিয়। আমার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার প্রতি তাঁর স্নেহ ও ভালবাসাও বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে কোন অমঙ্গলের আশংকায় তিনি আমাকে মেয়েদের মত ঘরে আবদ্ধ করে রাখেন।

    আমার বাবা-মার মাজুসী ধর্মে আমি কঠোর সাধনা শুরু করলাম এবং আমাদের উপাস্য আগুনের তত্ত্বাবধায়কের পদটি খুব তাড়াতাড়ি অর্জন করলাম। রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা উপাসনার সেই আগুন জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্বটি আমার ওপর অর্পিত হয়।

    আমার বাবা ছিলেন বিরাট ভূ-সম্পত্তির মালিক। তিনি নিজেই তা দেখাশুনা করতেন। তাতে আমাদের প্রচুর শস্য উৎপন্ন হতো। একদিন কোন কারণবশত তিনি বাড়িতে আটকে গেলেন, গ্রামের খামারটি দেখাশুনার জন্য যেতে পারলেন না। আমাকে ডেকে তিনি বললেনঃ

    ‘বেটা, তুমি তো দেখতেই পাচ্ছো, বিশেষ কারণে আজ আমি খামারে যেতে পারছিনা। আজ বরং তুমি একটু সেখানে যাও এবং আমার তরফ থেকে সেখানকার কাজকর্ম তদারক কর।’

    আমি খামারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। পথে খৃষ্টানদের একটি গীর্জার পাশ দিয়ে যাবার সময় তাদের কিছু কথার আওয়ায আমার কানে ভেসে এলো। তারা তখন প্রার্থনা করছিলো। এ আওয়াযই আমাকে সচেতন করে তোলে।

    দীর্ঘদিন ঘরে আবদ্ধ থাকার কারণে খৃষ্টান অথবা অন্য কোন ধর্মাবলম্বীদের সম্পর্কে আমার কোন জ্ঞানই ছিল না। তাদের কথার আওয়ায শুনে তারা কি করছে তা দেখার জন্য আমি গীর্জার অভ্যন্তরে প্রবেশ করলাম। গভীরভাবে তাদেরকে আমি নিরীক্ষণ করলাম। তাদের প্রার্থনা পদ্ধতি আমার খুবই ভালো লাগলো এবং আমি তাদের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। মনে মনে বললামঃ আমরা যে ধর্মের অনুসারী তা থেকে এ ধর্ম অতি উত্তম। আমি খামারে না গিয়ে সে দিনটি তাদের সাথেই কাটিয়ে দিলাম। তাদেরকে জিজ্ঞেস করলামঃ

    – এ ধর্মের মূল উৎস কোথায়?

    – শামে।

    সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। আমি বাড়িতে ফিরে আসলাম। সারাদিন আমি কি কি করেছি, বাবা তা আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন।

    বললামঃ ‘বাবা কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় দেখতে পেলাম তারা তাদের উপাসনালয়ে প্রার্থনা করছে। তাদের ধর্মের যেসব ক্রিয়াকাণ্ড আমি প্রত্যক্ষ করেছি তা আমার খুবই ভালো লেগেছে। বেলা ডোবা পর্যন্ত আমি তাদের সাথেই কাটিয়ে দিয়েছি।’ আমার কথা শুনে বাবা শংকিত হয়ে পড়লেন। তিনি বললেনঃ

    ‘বেটা, সে ধর্মে কোন কল্যাণ নেই, তোমার ও তোমার পিতৃপুরুষের ধর্ম তা থেকেও উত্তম।’ বললাম, ‘আল্লাহর শপথ, কখনো তা নয়। তাদের ধর্ম আমাদের ধর্ম থেকেও উত্তম।’

    আমার কথা শুনে বাবা ভীত হয়ে পড়লেন এবং আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করতে পারি বলে তিনি আশংকা করলেন। তাই আমার পায়ে বেড়ী লাগিয়ে ঘরে বন্দী করে রাখলেন।

    আমি সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিলাম। কিছুদিনের মধ্যেই সে সুযোগ এসে গেল। গোপনে খৃস্টানদের কাছে এই বলে সংবাদ পাঠালাম যে, শাম অভিমুখী কোন কাফিলা তাদের কাছে এলে তারা যেন আমাকে খবর দেয়।

    কিছুদিনের মধ্যেই শাম অভিমুখী  একটি কাফিলা তাদের কাছে এলো। তারা আমাকে সংবাদ দিল। আমি আমার বন্দীদশা তেকে পালিয়ে গোপনে তাদের সাথে বেরিয়ে পড়লাম। তারা আমাকে শামে পৌঁছে দিল। শামে পৌঁছে আমি জিজ্ঞেস করলামঃ

    – এ ধর্মের সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী ব্যক্তি কে?

    তারা বললোঃ বিশপ, গীর্জার পুরোহিত।

    আমি তাঁর কাছে গেলাম। বললামঃ আমি খৃষ্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি। আমার ইচ্ছা, আপনার সাহচর্যে থেকে আপনার খিদমত করা, আপনার নিকট থেকে শিক্ষালাভ ও আপনার সাথে প্রার্থনা করা। তিনি বললেনঃ ভেতরে এসো।

    আমি ভেতরে ঢুকে তার কাছে গেলাম এবং তার খিদমত শুরু করে দিলাম। কিছুদিন যেতে না যেতেই আমি বুঝতে পারলাম লোকটি অসৎ। কারণ সে তার সঙ্গী সাথীদেরকে দান-খয়রাতের নির্দেশ দেয়, সওয়াব লাভের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে; কিন্তু যখন তারা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার জন্য তার হাতে কিছু তুলে দেয়, তখন সে নিজেই তা আত্মসাত করে এবং নিজের জন্য পুঞ্জিভূত করে রাখে। গরীব মিসকীনদের সে কিছুই দেয় না। এভাবে সে সাত কলস স্বর্ণ পুঞ্জিভূত করে।

    তার এ চারিত্রিক অধপতন দেখে আমি তাকে ভীষণ ঘৃণা করতাম। কিছু দিনের মধ্যেই লোকটি মারা গেল। এলাকার খৃষ্টান সম্প্রদায় তাকে দাফনের জন্য সমবেত হলো। তাদেরকে আমি বললামঃ তোমাদের এ বন্ধুটি খুবই অসৎ প্রকৃতির লোক ছিল। তোমাদের সে দান খয়রাতের নির্দেশ দিত এবং সেজন্য তোমাদেরকে অনুপ্রাণিত করতো। কিন্তু তোমরা যখন তা তার হাতে তুলে দিতে সে সবই আত্মসাত করতো। গরীব-মিসকীনদের কিছুই দিত না।

    তারা জিজ্ঞেস করলোঃ তুমি তা কেমন করে জানলে?

    বললামঃ তোমাদেরকে আমি তার পুঞ্জিভূত সম্পদের গোপন ভাণ্ডার দেখাচ্ছি।

    তারা বললোঃ ঠিক আছে, তাই দেখাও।

    আমি তাদেরকে গোপন ভাণ্ডারটি দেখিয়ে দিলে তারা সেখান থেকে সাত কলস সোনা-চান্দি উদ্ধার করে। এ দেখে তারা বললোঃ

    – আল্লাহর কসম আমরা তাকে দাফন করবো না।

    তাকে তারা শুলিতে লটকিয়ে পাথর মেরে তার দেহ জর্জরিত করে দিল। কিছুদিন যেতে না যেতেই তারা অন্য এক  ব্যক্তিকে তার স্থলাভিষিক্ত করলো। আমি তাঁরও সাহচর্য গ্রহণ করলাম। এ লোকটি অপেক্ষা দুনিয়ার প্রতি অধিক উদাসীন, আখিরাতের প্রতি অধিক অনুরাগী ও রাতদিন ইবাদতের প্রতি বেশী নিষ্ঠাবান কোন লোক আমি এর আগে দেখিনি। আমি তাঁকে অত্যধিক ভালোবাসতাম। একটা দীর্ঘ সময় তাঁর সাথে আমি কাটালাম। যখন তাঁর মরণ সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, আমি তাঁকে বললামঃ

    – জনাব, আপনার মৃত্যুর পর কার সাহচর্যে কাটাবার উপদেশ দিচ্ছেন আমাকে?

    বললেনঃ বেটা আমি যে সত্যকে আঁকড়ে রেখেছিলাম, এখানে সে সত্যের ধারক আর কাউকে আমি জানিনা। তবে মাওসেলে এক ব্যক্তি আছে, নাম তাঁর অমুক, তিনি এ সত্যের এক বিন্দুও পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করেননি। তুমি তাঁর সাহচর্য অবলম্বন করো

    আমার সে বন্ধুটির মৃত্যুর পর মাওসেলে গিয়ে তাঁর বর্ণিত লোকটিকে আমি খুঁজে বের করি। আমি তাঁকে আমার সব কথা খুলে বলি। একথাও তাঁকে আমি বলি যে, অমুক ব্যক্তি তাঁর অন্তিম সময়ে আমাকে আপনার সাহচর্য অবলম্বনের কথা বলে গেছেন। আর তিনি আমাকে একথাও বলে গেছেন যে, তিনি যে সত্যের ওপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, আপনি সে সত্যকেই গভীরভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। আমার কথা শুনে তিনি বললেনঃ তুমি আমার কাছে থাক।

    আমি তাঁর কাছে থেকে গেলাম। তাঁর চালচলন আমার ভালোই লাগলো। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মারা গেলেন। তাঁর মরণ সময় নিকটবর্তী হলে আমি তাঁকে বললামঃ

    – জনাব, আপনি দেখতেই পাচ্ছেন, আল্লাহর ফায়সালা আপনার কাছে এসে গেছে। আর আমার ব্যাপারটি তো আপনি অবগত আছেন। এখন আমাকে কার কাছে যাওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন?

    বললেনঃ বেটা, আমরা যে জিনিসের ওপর ছিলাম, তার ওপর অটল আছে এমন কাউকে তো আমি জানিনা। তবে ‘নাস্‌সিবীনে’ অমুক নামে এক ব্যক্তি আছেন, তুমি তাঁর সাথে মিলতে পার।

    তাঁকে কবর দেওয়ার পর আমি নাস্‌সিবীনের সেই লোকটির সাথে সাক্ষাত করলাম এবং আমার সমস্ত কাহিনী তাঁকে খুলে বললাম। তিনি আমাকে তাঁর কাছে থেকে যেতে বললেন। আমি থেকে গেলাম। এ ব্যক্তিকেও পূর্ববর্তী দু’বন্ধুর মত নিষ্কলুষ চরিত্রের দেখতে পেলাম। আল্লাহ কি মহিমা, অল্পদিনের মধ্যে তিনি মারা গেলেন। অন্তিম সময়ে তাঁকে আমি বললামঃ আমার সম্পর্কে আপনি মোটামুটি সব কথা জানেন। এখন আমাকে কার কাছে যেতে বলেন?

    তিনি বললেনঃ অমুন নামে ‘আম্মুরিয়াতে’ এক লোক আছেন, তুমি তাঁরই সুহবত অবলম্বন করবে। এছাড়া আমাদের এ সত্যের ওপর অবশিষ্ট আর কাউকে তো আমি জানিনা। তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে আমি আমার সব কথা বললাম।

    আমার কথা শুনে তিনি বললেনঃ আমার কাছে থাক। আল্লাহর কসম, তাঁর কাছে থেকে আমি দেখতে পেলাম তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সঙ্গীদের মত একই মত ও পথের অনুসারী। তাঁর কাছে থাকাকালেই আমি অনেকগুলি গরু ও ছাগলের অধিকারী হয়েছিলাম।

    কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর পূর্ববর্তী সঙ্গীদের যে পরিণতি দেখেছিলাম, সেই একই পরিণতি তাঁরও ভাগ্যে আমি দেখতে পেলাম। তাঁর জীবনের অন্তিম সময়ে আমি তাঁকে বললামঃ আমার অবস্থা তো আপনি ভালোই জানেন। এখন আমাকে কি করতে বলেন, কার কাছে যেতে পরামর্শ দেন?

    বললেনঃ বৎস! আমরা যে সত্যকে ধরে রেখেছিলাম, সে সত্যের ওপর ভূ-পৃষ্ঠে জন্য কোন ব্যক্তি অবশিষ্ট আছে বলে আমার জানা নেই। তবে, অদূর ভবিষ্যতে আরব দেশে একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ইবরাহীমের দ্বীন নতুনভাবে নিয়ে আসবেন। তিনি তাঁর জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বড় বড় কালো পাথরের যমীনের মাঝখানে খেজুর উদ্যানবিশিষ্ট ভূমির দিকে হিজরাত করবেন। দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্ট কিছু নিদর্শনও তাঁর থাকবে। তিনি হাদিয়ার জিনিস তো খাবেন; কিন্তু সাদকার জিনিস খাবেন না। তাঁর দু’কাঁধের মাঝখানে নুওয়াতের মোহর থাকবে। তুমি পারলে সে দেশে যাও।

    এরপর তিনি মারা গেলেন। আমি আরো কিছুদিন আম্মুরিয়াতে কাটালাম। একদিন সেখানে ‘কালব’ গোত্রের কিছু আরব ব্যবসায়ী এলো। আমি তাদেরকে বললামঃ আপনারা যদি আমাকে সঙ্গে করে আরব দেশে নিয়ে যান, বিনিময়ে আমি আপনাদেরকে আমার এ গরু ছাগলগুলি দিয়ে দেব। তাঁরা বললেনঃ ঠিক আছে, আমরা তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব।

    আমি তাঁদেরকে গুরু-ছাগলগুলি দিয়ে দিলাম। তাঁরা আমাকে সঙ্গে নিয়ে চললেন। যখন আমরা মদীনা ও শামে’র মধ্যবর্তী ‘ওয়াদী আল-কুরা’ নামক স্থানে পৌঁছলাম, তখন তাঁরা আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এক ইহুদীর কাছে আমাকে বিক্রি করে দিল। আমি তার দাসত্ব শুরু করে দিলাম। অল্পদিনের মধ্যেই বনী কুরাইজা গোত্রের তার এক চাচাতো ভাই আমাকে খরীদ করে এবং আমাকে ‘ইয়াসরিবে’ (মদীনা) নিয়ে আসে। এখানে আমি আম্মুরিয়ার বন্ধুটির বর্ণিত সেই খেজুর গাছ দেখতে পেলাম এবং তিনি স্থানটির যে বর্ণনা দিয়েছিলেন, সে অনুযায়ী শহরটিকে চিনতে পারলাম। এখানে আমি আমার মনিবের কাছে কাটাতে লাগলাম।

    নবী সা. তখন মক্কায় দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন। কিন্তু দাস হিসাবে সব সময় কাজে ব্যস্ত থাকায় তাঁর সম্পর্কে কোন কথা বা আলোচনা আমার কানে পৌঁছেনি। কিছুদিনের মধ্যে রাসূল সা. মক্কা থেকে হিজরাত করে ইয়াসরিবে এলেন। আমি তখন একটি খেজুর গাছের মাথায় উঠে কি যেন কাজ করছিলাম, আমার মনিব গাছের নীচেই বসে ছিলো এমন সময় তার এক ভাতিজা এসে তাকে বললোঃ

    আল্লাহ বনী কায়লাকে (আউস ও খাজরাজ গোত্র) ধ্বংস করুন। কসম খোদার, তারা এখন কুবাতে মক্কা থেকে আজই  আগত এক ব্যক্তির কাছে সমবেত হয়েছে, যে কিনা নিজেকে নবী বলে মনে করে।

    তার কথাগুলি আমার কানে যেতেই আমার গায়ে যেন জ্বর এসে গেল। আমি ভীষণভাবে কাঁপতে শুরু করলাম। আমার ভয় হলো, গাছের নীচে বসা আমার মনিবের ঘাড়ের ওপর ধপাস করে পড়ে না যাই। তাড়াতাড়ি আমি গাছ থেকে নেমে এলাম এবং সেই লোকটিকে বললামঃ

    – তুমি কি বললে? কথাগুলি আমার কাছে আবার বলো তো।

    আমার কথা শুনে আমার মনিব রেগে ফেটে পড়লো এবং আমার গালে সজোরে এক থাপ্‌পড় বসিয়ে দিয়ে বললোঃ

    – এর সাথে তোমার সম্পর্ক কি? যাও, তুমি যা করছিলে তাই কর।

    সেদিন সন্ধ্যায় আমার সংগৃহীত খেজুর থেকে কিছু খেজুর নিয়ে রাসূল সা. যেখানে অবস্থান করছিলেন সেদিকে রওয়ানা হলাম। রাসূলের সা. নিকট পৌঁছে তাঁকে বললামঃ

    – আমি শুনেছি আপনি একজন পূর্ণবান ব্যক্তি। আপনার কিছু সহায়-সম্বলহীন সঙ্গী-সাথী আছেন। এ সামান্য কিছু জিনিস সদকার উদ্দেশ্যে আমার কাছে জমা ছিল, আমি দেখলাম অন্যদের তুলনায় আপনারাই এগুলি পাওয়ার অধিক উপযুক্ত। এ কথা বলে খেজুরগুলি তাঁর দিকে এগিয়ে দিলাম। তিনি সঙ্গীদের বললেনঃ তোমরা খাও। কিন্তু তিনি নিজের হাতটি গুটিয়ে নিলেন, কিছুই খেলেন না। মনে মনে আমি বললামঃ এ হলো একটি।

    সেদিন আমি ফিরে এলাম। আমি আবারও কিছু খেজুর জমা করতে লাগলাম। রাসূল সা. কুবা থেকে মদীনায় এলেন। আমি একদিন খেজুরগুলি নিয়ে তাঁর কাছে গিয়ে বললামঃ ‘আমি দেখেছি, আপনি সদকার জিনিস খাননা। তাই এবার কিছু হাদিয়া নিয়ে এসেছি, আপনাকে দেয়ার উদ্দেশ্যে।’ এবার তিনি নিজে খেলেন এবং সঙ্গীদের আহ্‌বান জানালেন তাঁরাও তাঁর সাথে খেলেন। আমি মনে মনে বললামঃ এ হলো দ্বিতীয়টি।

    তারপর অন্য একদিন আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গেলাম। তিনি তখন ‘বাকী আল-গারকাদ’ গোরস্থানে তাঁর এক সঙ্গীকে দাফন করছিলেন। আমি দেখলাম, তিনি গায়ে ‘শামলা’ (এক ধরণের ঢিলা পোশাক) জড়িয়ে বসে আছেন। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তারপর আমি তাঁর পেছনের দিকে দৃষ্টি ঘোরাতে লাগলাম। আমি খুঁজতে লাগলাম, আমার সেই আম্মুরিয়ার বন্ধুটির বর্ণিত নবুওয়াতের মোহরটি।

    রাসূলসা. আমাকে তাঁর পিঠের দিকে ঘন ঘন তাকাতে দেখে আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন। তিনি তাঁর পিঠের চাদরটি সরিয়ে নিলেন এবং আমি মোহরটি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। আমি তখন পরিস্কারভাবে তাঁকে চিনতে পারলাম এবং হুমড়ি খেয়ে পড়ে তাঁকে চুমুতে ভরে দিলাম ও কেঁদে চোখের পানিতে বুক ভাসালাম। আমার এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেনঃ

    – তোমার খবর কি?

    আমি সব কাহিনী খুলে বললাম। তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং আমার মুখ দিয়েই এ কাহিনীটা তাঁর সঙ্গীদের শোনাতে চাইলেন। আমি তাঁদেরকে শোনালাম। তাঁরা অবাক হয়ে গেলেন, খুবই আনন্দিত হলেন।

    দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার কারণে সালমান রা. রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বদর ও উহুদের যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। ফলে তিনি খুবই মর্মজ্বালা ভোগ করতে থাকেন। সালমান বলেনঃ ‘একদিন রাসূল সা. আমাকে ডেকে বললেনঃ ‍তুমি তোমার মনিবের সাথে মুকাতাবা (চুক্তি)কর। আমি চুক্তি করলাম, তাকে আমি তিনশ’ খেজুরের চারা লাগিয়ে দেব এবং সেই সাথে চল্লিশ ‘উকিয়া স্বর্ণও দেব। আর বিনিময়ে আমি মুক্তি লাভ করবো। আমি রাসূলুল্লাহর সা. এ চুক্তির কথা অবহিত করলাম। তিনি সাহাবীদেরকে ডেকে বললেনঃ তোমরা তোমাদের এ ভাইকে সাহায্য কর। তারা প্রত্যেকেই আমাকে পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশটি করে যে যা পারলেন চারা দিলেন। এভাবে আমার তিনশ’ চারা সংগ্রহ হয়ে গেল। তারপর আমি রাসূলের সা. নির্দেশে গর্ত খুড়লাম। তিনি নিজেই একদিন আমার সাথে সেখানে গেলেন। আমি তাঁর হাতে একটি করে চারা তুলে দিলাম, আর তিনি সেটা রোপন করলেন। আল্লাহর কসম, তাঁর একটি চারাও মারা যায়নি। (ঐতিহাসিকরা বলছেন, সালামান রা. একটি মাত্র চারা রোপন করেছিলেন, আর সেটাই মারা যায়। বাকী সবগুলিই রাসূলসা. রোপন করেছিলেন এবং সবগুলিই বেঁচে যায়।।) এভাবে আমি আমার চুক্তির একাংশ পূরণ করলাম, বাকী থাকলো অর্থ।

    একদিন রাসূল সা. আমাকে ডেকে মুরগীর ডিমের মত দেখতে স্বর্ণজাতীয় কিছু পদার্থ আমার হাতে দিয়ে বললেন, যাও, তোমার চুক্তি মুতাবিক পরিশোধ কর। আমি বললাম,এতে কি তা পরিশোধ হবে? তিনি বরলেনঃ ‘ধর, আল্লাহ এতেই পরিশোধ করবেন।’ আল্লাহর কসম, আমরা ওজন করে দেখলাম তাতে চল্লিশ উকিয়াই আছে।

    এভাবে সালমান রা. তার চুক্তি পূরণ করে মুক্তিলাভ করেন। গোলামী থেকে মুক্ত হয়ে হযরত সালমান রা. মুসলমানদের সাথে বসবাস করতে থাকেন। তখন তাঁর কোন ঘর-বাড়ী চিল না। রাসুলসা. অন্যান্য মুহাজিরদের মত প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী আবু দারদার রা. সাথে তাঁর মুওয়াখাত বা ভ্রাতু-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। গোলামীর কারণে হযরত সালমান রা. বদর ও উহুদ যুদ্ধে শরীক হতে পারেননি। গোলামী থেকে মুক্ত হওয়ার পর খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয। এ যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে পূর্ববর্তী দু’টি যুদ্ধে অনুপস্থিতির ক্ষতি পুষিয়ে নেন। সারা আরবের বিভিন্ন গোত্র কুরাইশদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মদীনা আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। খবর পেয়ে রাসূল সা. সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন। অনেকে অনেক রকম পরামর্শ দেন। হযরত সালমান বলেন, পারস্যে পরিখা খনন করে নগরের হিফাজত করা হয়। মদীনার অরক্ষিত দিকে পরিখা খনন করে নগরীর হিফাজত করা সমীচীন। এ পরামর্শ রাসূলুল্লাহর সা. মনঃপূত হয়। মদীনার পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে সুদীর্ঘ পরিখা খনন করে বিশাল কুরাইশ বাহিনীর আক্রমণ সহজে প্রতিরোধ করা হয়। রাসুল সা. নিজেও এই পরিখা বা খন্দক খননের কাজে অংশগ্রহণ করেন। কুরাইশ বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে এসে এ অপূর্ব রণ-কৌশল দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। ২১/২২ দিন মদীনা অবরোধ করে বসে থাকার পর শেষে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। খন্দকের পর যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে হযরত সালমান অংগ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর হযরত সালমান বেশ কিছুদিন মদনিায় অবস্থান করেন। সম্ভবতঃ হযরত আবু বকরের রা. খিলাফতের শেষে অথবা হযরত ’উমারের খিলাফতের প্রথম দিকে তিনি ইরাকে এবং তাঁর দ্বীনী ভাই আবু দারদা রা. সিরিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। তিনি হযরত উমারের যুগে ইরান বিজয়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। মুসিলম মুজাহিদদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধ করেন। জালুলু বিজয়েও তিনি অংশগ্রহণ করেন। হযরত উমার রা. তঁঅকে মাদায়েনের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। হযরত উসমানের খিলাফতাকলে ইনতিকাল করেন।

    ইসলম গ্রহণের পর হযরত সালমানের জীবনের বেশির ভাগ সময় অতিবাহিত হয় রাসূলুল্লাহর সা. সুহবতে। এ কারণে তিনি ইলম ও মা’রেফাতে বিশেষ পারদর্শিতা লাভ করেন। হযরত আলীকে রা. তাঁর ইল্‌ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বলেনঃ ‘সালমান ইলম ও হিকমতের ক্ষেত্রে লুকমান হাকীমের সমতুল্য।’ অন্য একটি বর্ণনা মতে তিনি বলেনঃ ‘ইলমে আউয়াল ও ইলমে আখের সকল ইলমের আলিম ছিলেন তিনি।’ ইলমে আখের অর্থ কুরআনের ইলম। আরবে তার কোন আত্মীয় ও খান্দান ছিল না, তাই রাসূল সা. তাঁকে আহলে বাইতের সদস্য বলে ঘোষণা করেন। হযরত মুয়াজ বিন জাবাল, যিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট আলিম ও মুজতাহিদ সাহাবী, বলেনঃ চার ব্যক্তি থেকে ইলম হাসিল করবে। সেই চারজনের একজন সালমান।

    হযরত সালমান থেকে ষাটটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তার মধ্যে তিনটি মুত্তাফাক আলাইহি, একটি মুসলিম ও তিনটি বুখারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন। আবু সাঈদ খুদরী, আবুত তুফাইল, ইবন আব্বাস, আউস বিন মালিক ও ইবন আজযা রা. প্রমুখ বিশিষ্ট সাহাবী তাঁর ছাত্র ছিলেন।

    হযরত সালমান সেইসব বিশিষ্ট সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত যাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. বিশেষ নৈকট্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। হযরত আয়িশা রা. বলেনঃ ‘রাসূল সা. যেদিন রাতে সালমানের সাথে নিভৃতে আলোচনা করতে বসতেন, আমরা তাঁর স্ত্রীরা ধারণা করতাম সালমান হযতো আজ আমাদের রাতের সান্নিধ্যটুকু কেড়ে নেবে।’

    যুহুদ ও তাকওয়ার তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা। ক্ষণিকের মুসাফির হিসেবে তিনি জীবন যাপন করেছেন। জীবনে কোন বাড়ী তৈরী করেননি। কোথাও কোন প্রাচীর বা গাছের ছায়া পেলে সেখানেই শুয়ে যেতেন। এক ব্যক্তি তাঁর কাছে ইজাযত চাইলো, তাঁকে একটি ঘর বানিয়ে দেওয়ার। তিনি নিষেধ করলেন। বার বার পীড়াপীড়িতে শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেমন ঘর বানাবে? লোকটি বললোঃ এত ছোট যে, দাঁড়ালে মাথায় চাল বেঁধে যাবে এবং শুয়ে পড়লে দেয়ালে পা ঠেকে যাবে। এ কথায় তিনি রাজী হলেন। তাঁর জন্য একটি ঝুপড়ি ঘর তৈরী করা হয়। হযরত হাসান রা. বলেনঃ ‘সালমান যখন পাঁচ হাজার দিরহাম ভাতা পেতেন, তিরিশ হাজার লোকের উপর প্রভুত্ব করতেন তখনও তাঁর একটি মাত্র ‘আবা’ ছিল। তার মধ্যে ভরে তিনি কাঠ সংগ্রহ করতেন। ঘুমানোর সময় আবাটির এক পাশ গায়ে দিতেন এবং অন্য পাশ বিছাতেন।’

    হযরত সালমান রা. যখন অন্তিম রোগ শয্যায়, হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্‌কাস রা. তাঁকে দেখতে যান। সালমান রা. কাঁদতে শুরু করলেন। সা’দ বললেনঃ আবু আবদিল্লাহ, কাঁদছেন কেন? রাসুল সা. তো আপনার প্রতি সন্তুষ্ট অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। হাউজে কাওসারের নিকট তাঁর সাথে আপনি মিলিত হবেন। বললেনঃ আমি মরণ ভয়ে কাদঁছিনে। কান্নার কারণ হচ্ছে, রাসূল সা. আমাদের নিকট থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন, আমাদের সাজ-সরঞ্জাম যেন একজন মুসাফিরের সাজ-সরঞ্জাম থেকে বেশি না হয়। অথচ আমার কাছে এতগুলি জিনিসপত্র জমা হয়ে গেছে। সা’দ বলেনঃ সেই জিনিসগুলি একটি বড় পিয়ালা, তামার একটি থালা ও একটি পনির পাত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।

  • আবু যার আল–গিফারী (রা)

    আবু যার আল–গিফারী (রা)

    বাইরের জগতের সাথে মক্কার সংযুক্তি ঘটিয়েছে যে ‘অদ্দান’ উপত্যকাটি, সেখানেই ছিল ‘গিফার’ গোত্রের বসতি। মক্কার কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলা ওখান দিয়ে সিরিয়া যাতায়াত করত। এসব  কাফিলার নিরাপত্তার বিনিময়ে যে সামান্য অর্থ লাভ করতো তা দিয়েই তারা জীবিকা নির্বাহ করতো। ডাকাতি, রাহাজানিও ছিল তাদের পেশা। যখন কোন বাণিজ্য কাফিলা তাদের দাবী অনুযায়ী খাদ্যসামগ্রী বা অর্থ আদায় করত না তখন তারা লুটতরাজ চালাতো।

    জুনদুন ইবন জুনাদাহ, আবু যার নামেই যিনি পরিচিত- তিনিও ছিলেন এ কবীলারই সন্তান। বাল্যকাল থেকেই তিনি অসীম সাহস, প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও দূরদৃষ্টির জন্য ছিলেন সকলের থেকে স্বতন্ত্র। জাহিলী যুগে জীবনের প্রথম ভাগে তাঁর পেশাও ছিল রাহাজানি। ‘গিফার’ গোত্রের একজন দুঃসাহসী ডাকাত হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তবে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর জীবনে ঘটে গেল এক বিপ্লব। তাঁর গোত্রীয় লোকেরা এক আল্লাহ ছাড়া যে সকল মূর্তির পূজা করত, তাতে তিনি গভীর ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন। সমগ্র আরব বিশ্বে সে সময় যে ধর্মীয় অনাচার, অন্ধ বিশ্বাস ও কুসংস্কারের সয়লাব চলছিল তা তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। তিনি অধীরভাবে অপেক্ষা করতে থাকেন এমন একজন নবীর, যিনি মানুষের বুদ্ধি-বিবেক ও অন্তরকে পরিচ্ছন্ন করে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে তাদের নিয়ে আসবেন।

    তিনি রাহাজানি পরিত্যাগ করে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদাতের দিকে ঝুঁকে পড়েন, যখন সমগ্র আরব দেশ গুমরাহীর অতল গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল। হযরত আবু মা’শার বলেনঃ ‘আবু যার জাহিলী যুগেই মুওয়াহহিদ বা একত্ববাদী ছিলেন। এক আল্লাহ ছাড়া কাকেও তিনি উপাস্য বলে বিশ্বাস করতেন না, অন্য কোন মূর্তি বা দেবদেবীর পূজাও করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ও আল্লাহর ইবাদাত মানুষের কাছে পরিচিত ছিল। এ কারণে যে ব্যক্তি সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর সা. আবির্ভাবের সংবাদ তাঁকে দিয়েছিল, বলেছিলঃ

    ‘‘আবু যার, তোমার মত মক্কার এক ব্যক্তি ‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে থাকেন।’’

    তিনি কেবল মুখে মুখেই তাওহীদে বিশ্বাসী ছিলেন না, সেই জাহিলী যুগে নামাযও আদায় করতেন। এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সাক্ষাতের তিন বছর পূর্ব থেকেই নামায আদায় করতাম।’ লোকেরা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কাকে উদ্দেশ্য করে?’ বললেনঃ ‘আল্লাহকে।’ আবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘কোন দিকে মুখ করে?’ বলেছিলেনঃ ‘যে দিকে আল্লাহ ইচ্ছা করতেন।’

    তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটিও বেশ চমকপ্রদ। ইবন হাজার আলইসাবা গ্রন্থে তাঁর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করেছেন। সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়, তিনি তাঁর গোত্রের সাথে বসবাস করছিলেন। একদিন সংবাদ পেলেন, মক্কায় এক নতুন নবীর আবির্ভাব হয়েছে। তিনি তাঁর ভাই আনিসকে ডেকে বললেনঃ ‘তুমি একটু মক্কায় যাবে। সেখানে যিনি নিজেকে নবী বলে দাবি করেন এবং আসমান থেকে তাঁর কাছে ওহী আসে বলে প্রচার করে থাকেন, তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করবে, তাঁর মুখের কিছু কথা শুনবে। তারপর ফিরে এসে আমাকে অবহিত করবে।’

    আনিস মক্কায় চলে গেলেন। রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী শ্রবণ করে নিজ গোত্রে ফিরে এলেন। আবু যার খবর পেয়ে তখুনি ছুটে গেলেন আনিসের কাছে। অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে নতুন নবী সম্পর্কে নানা কথা তাকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন। আনিস বললেনঃ

    – ‘কসম আল্লাহর। আমি তো লোকটিকে দেখলাম, মানুষকে তিনি মহৎ চরিত্রের দিকে আহবান জানাচ্ছেন। আর এমন সব কথা বলেন যা কাব্য বলেও মনে হলো না।’

    – ‘মানুষ তাঁর সম্পর্কে কী বলাবলি করে?’

    – ‘কেউ বলে তিনি একজন যাদুকর, কেউ বলে গণক, আবার কেউ বলে কবি।’

    – ‘আল্লাহর কসম! তুমি আমার তৃষ্ণা মেটাতে পারলে না, আমার আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম হলে না। তুমি কি পারবে আমার পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে, যাতে আমি মক্কায় গিয়ে স্বচক্ষেই তাঁর অবস্থা দেখে আসতে পারি?’

    – ‘নিশ্চয়ই। তবে আপনি মক্কাবাসীদের সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন।’

    পরদিন প্রত্যুষে আবু যার চললেন মক্কার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিলেন কিছু পাথেয় ও এক মশক পানি। সর্বদা তিনি শঙ্কিত, ভীতচকিত। না জানি কেউ জেনে ফেলে তাঁর উদ্দেশ্য। এ অবস্থায় তিনি পৌঁছলেন মক্কায়। কোন ব্যক্তির কাছে মুহাম্মাদ সা. সম্পর্কে কোন কথা জিজ্ঞেস করা তিনি সমীচীন মনে করলেন না। কারণ, তাঁর জানা নেই এ জিজ্ঞাসিত ব্যক্তিটি মুহাম্মাদের সা. বন্ধু না শত্রু।

    দিনটি কেটে গেল। রাতের আঁধার নেমে এল। তিনি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। বিশ্রামের উদ্দেশ্যে তিনি শুয়ে পড়লেন মাসজিদুল হারামের এক কোণে। আলী ইবন আবী তালিব যাচ্ছিলেন সে পথ দিয়েই। দেখেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, লোকটি মুসাফির। ডাকলে, ‘আসুন আমার বাড়ীতে।’ আবু যার গেলেন তাঁর সাথে এবং সেখানেই রাতটি কাটিয়ে দিলেন। সকাল বেলা পানির মশক ও খাবারের পুটলিটি হাতে নিয়ে আবার ফিরে এলেন মসজিদে। তবে দু’জনের একজনও একে অপরকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না।

    পরের দিনটিও কেটে গেল। কিন্তু নবীর সঙ্গে পরিচয় হলো না। আজও তিনি মাসজিদেই শুয়ে পড়লেন। আজও  আলী রা. আবার সে পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন। বললেনঃ ব্যাপার কি, লোকটি আজও  তাঁর গন্তব্যস্থল চিনতে পারেনি? তিনি তাকে আবার সঙ্গে করে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। এ রাতটিও সেখানে কেটে গেল। এদিনও কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করলেন না। একইভাবে তৃতীয় রাতটি নেমে এলো। আলী রা. আজ বললেনঃ

    – ‘বলুন তো আপনি কি উদ্দেশ্যে মক্কায় এসেছেন?’

    তিনি বললেন, ‘আপনি যদি আমার কাছে অঙ্গীকার করেন আমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের দিকে আমাকে পথ দেখাবেন, তাহলে আমি বলতে পারি।’ আলী রা. অঙ্গীকার করলেন।

    আবু যার বললেনঃ

    ‘আমি অনেক দূর থেকে মক্কায় এসেছি, নতুন নবীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এবং তিনি যেসব কথা বলেন তার কিছু শুনতে।’

    আলীর রা. মুখমণ্ডল আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ‘আল্লাহর কসম, তিনি নিশ্চিত সত্য নবী।’ একথা বলে তিনি নানাভাবে নবীর সা. পরিচয় দিলেন। তিনি আরও বললেন, ‘‘সকালে আমি যেখানে যাই, আপনি আমাকে অনুসরণ করবেন। যদি আমি আপনার জন্য আশংকাজনক কোন কিছু লক্ষ্য করি তাহলে প্রস্রাবের ভান করে দাঁড়িয়ে যাব। আবার যখন চলবো, আমাকে অনুসরণ করে চলতে থাকবেন। এভাবে আমি যেখানে প্রবেশ করি আপনিও সেখানে প্রবেশ করবেন।’’

    প্রিয় নবীর দর্শন লাভ ও তাঁর ওপর অবতীর্ণ প্রত্যাদেশ শ্রবণ করার প্রবল আগ্রহ ও উৎকণ্ঠায় আবু যার সারাটি রাত বিছানায় স্থির হতে পারলেন না। পরদিন সকালে মেহমান সঙ্গে করে আলী রা. চললেন রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীর দিকে। আবু যার তাঁর পেছনে পেছনে। পথের আশপাশের কোন কিছুর প্রতি তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। এভাবে তাঁরা পৌঁছলেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট। আবু যার সালাম করলেন।

    – ‘আস-সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল সা. জবাব দিলেন,

    – ‘ওয়া আলাইকাস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।’

    এভাবে আবু যার সর্বপ্রথম ইসলামী কায়দায় রাসূলুল্লাহকে সা. সালাম পেশ করার গৌরব অর্জন করেন। অতঃপর সালাম বিনিময়ের এ পদ্ধতিই গৃহীত ও প্রচারিত হয়।

    রাসূল সা. আবু যারকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন এবং কুরআনের কিছু আয়াতও তিলাওয়াত করে শুনালেন। সেখানে বসেই আবু যার কালেমায়ে তাওহীদ পাঠ করে নতুন দ্বীনের মধ্যে প্রবেশের ঘোষণা দিলেন।

    এর পরের ঘটনা আবু যার এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গে আমি মক্কায় অবস্থান  করতে লাগলাম। তিনি আমাকে ইসলামের নানান বিষয় শিক্ষা দিলেন, কুরআনের কিছু আয়াত পাঠের প্রশিক্ষণও দিলেন। আমাকে বললেনঃ ‘মক্কায় কারও কাছে তোমার ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করবে না। কেউ জানতে পেলে আমি তোমার জীবনের আশংকা করছি।’

    বললাম, ‘যার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ করে বলছি, আমি মক্কা ছেড়ে যাবনা, যতক্ষণ না মাসজিদে গিয়ে কুরাইশদের মাঝে প্রকাশ্যে সত্যের দাওয়াত দিচ্ছি।’ রাসূল সা. চুপ হয়ে গেলেন।

    আমি মাসজিদে এলাম। কুরাইশরা তখন একত্রে বসে গল্প গুজব করছে। আমি তাদের মাঝখানে হাজির হয়ে যতদূর সমস্ত উচ্চকণ্ঠে সম্বোধন করে বললাম, ‘‘কুরাইশ গোত্রের লোকেরা! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ সা. আল্লাহর রাসূল।’’

    আমার কথাগুলি তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই তারা ভীত-চকিত হয়ে পড়লো। একযোগে তারা লাফিয়ে উঠে বললঃ এই ধর্মত্যাগীকে ধর। তারা দৌড়ে এসে আমাকে বেদম প্রহার শুরু করলো। রাসূলের সা. চাচা আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব দেখে চিনতে পারলেন। তাদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তিনি আমার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়লেন। তারপর তাদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা নিপাত যাও! গিফারী গোত্রের এবং তোমাদের বাণিজ্য কাফিলর গমনাগমন পথের লোককে হত্যা করছো? তারা আমাকে ছেড়ে দিল।

    একটু সুস্থ হয়ে আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে ফিরে গেলাম। আমার অবস্থা দেখে তিনি বললেন, ‘তোমাকে ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলাম না?’ বললাম, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! নিজের মধ্যে আমি প্রবল ইচ্ছা অনুভব করছিলাম। সে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছি মাত্র।’ তিনি বললেন, ‘‘তোমার গোত্রের কাছে ফিরে যাও। যা দেখে গেলে এবং যা কিছু শুনে গেলে তাদের অবহিত করবে, তাদের আল্লাহর দিকে আহ্‌বান জানাবে। হতে পারে আল্লাহ তোমার দ্বারা তাদের উপকৃত করবেন এবং তোমাকে প্রতিদান দেবেন। যখন তুমি জানবে, আমি প্রকাশ্যে দাওয়াত দিচ্ছি, আমার কাছে চলে আসবে।’’

    আমি ফিরে এলাম আমার গোত্রীয় লোকদের আবাসভূমিতে। আমার ভাই আনিস এলো আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। সে জিজ্ঞেস করলোঃ ‘কি করলেন?’ বললাম, ‘ইসলাম গ্রহণ করে বিশ্বাসী হয়েছি।’ তক্ষুণি আল্লাহ তাঁর অন্তর-দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন। সে বলল, ‘আপনার দ্বীন প্রত্যাখ্যান করার ইচ্ছা আমার নেই। আমি ইসলাম গ্রহণ করে বিশ্বাসী হলাম।’ তারপর আমরা দু’ভাই একত্রে আমাদের মায়ের কাছে গিয়ে তাঁকেও ইসলামের দাওয়াত দিলাম।’ ‘তোমাদের দু’ভাইয়ের দ্বীনের প্রতি আমার কোন অনীহা নেই’- একথা বলে তিনিও ইসলাম কবুল করার ঘোষণা দিলেন।

    সেইদিন থেকে এই বিশ্বাসী পরিবার নিরলসভাবে গিফার গোত্রের মানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে থাকে। এ কাজে কখনও তারা হতাশ হননি, কখনও মনোবল হারাননি। তাঁদের আপ্রাণ চেষ্টায় এ গোত্রের বিপুল সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাদের মধ্যে নামাযের জামায়াত প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এক দল লোক বলে, আমরা আমাদের ধর্মের ওপর অটল থাকবো। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় এলো আমরা ইসলাম গ্রহণ করবো। রাসূলের সা. মদীনায় হিজরতের পর তারাও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এ গিফার গোত্র সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘‘গিফার গোত্র- আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেছেন, আর আসলাম গোত্র- আল্লাহ তাদের শান্তি ও নিরাপত্তা দিয়েছেন।’’

    আবু যার মক্কা ফিরে এসে গোত্রীয় লোকদের সাথে মরুভূমিতে অবস্থান করতে থাকেন। একে একে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। অতঃপর তিনি মদীনায় এলেন এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য অবলম্বন করলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে আবেদন করলেন তাঁর খিদমতের সুযোগ দানের জন্য। তাঁর এ আবেদন মঞ্জুর করা হল। মদীনায় অবস্থানকালে সবটুকু সময় তিনি অতিবাহিত করতেন রাসূলুল্লাহর সা. সেবায়। এটাই ছিল তাঁর সর্বাধিক প্রিয় কাজ। তিনি নিজেই বলতেনঃ

    ‘‘রাসূলুল্লাহর সা. খিদমত করতাম, আর অবসর সময়ে মসজিদে এসে বিশ্রাম নিতাম।’’

    ইবন ইসহাক বলেনঃ আবু যার হিজরাত করে মদীনায় এলে রাসুল সা. মুনজির ইবন ’আমর ও আবু যারের মধ্যে ভ্রাতৃ-সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছিলেন। তবে এ ব্যাপারে ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর মত হল, আবু যার মীরাসের আয়াত নাযিল হওয়ার পর মদীনায় হিজরাত করে এসেছিলেন। সুতরাং ভ্রাতৃ-সম্পর্ক স্থাপনের নিয়মটি রহিত হয়ে গিয়েছিল।

    রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গে তাঁর যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না। তবে তাবুক যুদ্ধে অংশগ্রহণের একটি ঘটনা আল্লামা ইবন হাজার আসকিলানী- আলইসাবা গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের সূত্রে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. যখন তাবুকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, তখন লোকেরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধে গমনের ব্যাপারে ইতঃস্তত ভাব প্রকাশ করতে লাগলো। কোন ব্যক্তিকে দেখা না গেলে সাহাবীরা বলতেন ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, অমুক আসেনি।’ জবাবে তিনি বলতেন, ‘যদি তার উদ্দেশ্য মহৎ হয় তাহলে শিগগিরই আল্লাহ তাকে তোমাদের সাথে মিলিত করবেন। অন্যথায় আল্লাহ তাকে তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে তার দিক থেকে তোমাদের নিরাপদ করেছেন।’ এক সময় আবু যারের নামটি উল্লেখ করে বলা হল ‘সেও পিঠটান দিয়েছে।’ প্রকৃত ঘটনা হল, তাঁর উটটি ছিল মন্থরগতি। প্রথমে তিনি উটটিকে দ্রুত চালাবার চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে জিনিসপত্র নামিয়ে নিজের কাঁধে উঠিয়ে পায়ে হাঁটা শুরু করেন এবং অগ্রবর্তী মানযিলে রাসূলুল্লাহ সা. সাথে মিলিত হন। এক সাহাবী দূর থেকে তাঁকে দেখে বলে উঠলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, রাস্তা দিয়ে কে যেন একজন আসছে।’ তিনি বললেনঃ ‘আবু যারই হবে।’ লোকেরা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করে চিনতে পার। বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহর কসম, এতো আবু যারই।’ তিনি বললেনঃ

    ‘আল্লাহ আবু যারের ওপর রহম করুন। সে একাকী চলে, একাকীই মরবে, কিয়ামাতের দিন একাই উঠবে।’ (তারীখুল ইসলামঃ আল্লামা জাহাবী, ৩য় খণ্ড) রাসূলুল্লাহর সা. ভবিষ্যদ্বানীটি অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

    হযরত আবু যার ছিলেন প্রকৃতিগতভাবেই সরল, সাদাসিধে, দুনিয়া বিরাগী ও নির্জনতা-প্রিয় স্বভাবের। এ কারণে রাসূলে পাক সা. তাঁর লকব দিয়েছিলেন- ‘মসিহুল ইসলাম’। রাসূলের সা. ওফাতের পর তিনি দুনিয়ার সাথে একেবারেই সম্পর্কহীন হয়ে পড়েন। প্রিয় নবীর বিচ্ছেদে তাঁর অন্তর অভ্যন্তরে যে দাহ শুরু হয়েছিল তা আর কখনও প্রশমিত হয়নি। এ কারণে হযরত আবু বকরের ইনতিকালে তাঁর ভগ্ন হৃদয় আরও চুরমার হয়ে যায়। তাঁর দৃষ্টিতে তখন মদীনার সুশোভিত উদ্যানটি পত্র-পল্লবহীন বলে প্রতিভাত হয়। তিনি মদীনা ত্যাগ করে শামে (সিরিয়া) প্রবাসী হন।

    আবু বকর ও উমারের রা. খিলাফতকাল পর্যন্ত ইসলামের সহজ ও সরল জীবন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। বিজয় ও ইসলামী খিলাফতের বিস্তৃতির সাথে যখন ধন ও ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য দেখা দেয় তখন স্বাভাবিকভাবেই চাকচিক্য ও জৌলুস সে স্থান দখল করে নেয়। হযরত উসমানের রা. যুগেই বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে শানশওকাতের সূচনা হয়। সাধারণ জনজীবনে এর কিছুটা প্রভাব পড়ে। তাদের মধ্যে নবীর সা. আমলের সরলতার পরিবর্তে ভোগ ও বিলাসিতার ছাপ ফুটে ওঠে। আবু যার মানুষের কাছে নবীর সা. আমলের সেই সহজ সরল আড়ম্বরহীন জীবনধারার অনুসরণ আশা করতেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল সকলেই তাঁর মন ধন-দৌলতের প্রতি সম্পূর্ণ নিরাসক্ত হউক। তাঁর আল্লাহ নির্ভর বিশ্বাস ও মতবাদে আগামীকালের জন্য কোন কিছুই আজ সঞ্চয় করা যাবে না। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যকে অভুক্ত ও উলংগ রেখে সম্পদ পুঞ্জিভূত করার কোন অধিকার কোন মুসলিমের নেই। হযরত মুআবিয়া রা. ও অন্যান্য আমীরগণ মনে করতেন সম্পদশালী লোকদের ওপর আল্লাহ যে যাকাত ফরয করেছেন তা সঠিকভাবে আদায় করার পর অতিরিক্ত অর্থ জমা করার ইখতিয়ার প্রতিটি মুসলিমের আছে। এ মতপার্থক্য বৃদ্ধি পেয়ে শেষ পর্যন্ত ঝগড়া ও বচসার রূপ লাভ করে। আবু যার অত্যন্ত নির্ভীকভাবে ঐ সকল ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের অধিকারী হওয়ার কারণে তাদের কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতের লক্ষ্যবস্তু বলে গণ্য করতে থাকেন।

    وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُم بِعَذَابٍ أَلِيمٍ

    – ‘আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জিভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করেনা তাদের মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও।’ (আত্ তাওবাহঃ ৩৪)

    এ আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে ইয়াহুদী ও নাসারাদের আলোচনা এসেছে। এ কারণে আমীর মুআবিয়ার বক্তব্য ছিল, এ আয়াতের সম্পর্ক ঐ সব বিধর্মীদের সাথে। আর আবু যার মনে করেন, আয়াতটির উদ্দেশ্য মুসলিম অমুসলিম সকলেই। দ্বিতীয়তঃ আবু যার আল্লাহর পথে ব্যয় না করার অর্থ এই বুঝাতেন যে, সে নিজের ধন সম্পদ আল্লাহর পথে সম্পূর্ণরূপে বিলিয়ে দেয় না। আর আমীর মুআবিয়ার ধারণা ছিল এটা কেবল যাকাতের সাথে সম্পৃক্ত। এভাবে হযরত আবু যার স্বীয় চিন্তা-দর্শন ও মত অনুযায়ী অত্যন্ত কঠোরভাবে সমালোচনা আরম্ভ করেন। হযরত মুআবিয়া রা. মনে করেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে শামে যে কোন সময় বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তিনি খলীফা উসমানকে রা. নাজুক অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করলেন এবং অনুরোধ করলেন তিনি যেন আবয যারকে মদীনায় তলব করেন। হযরত উসমান তাঁকে মদীনায় ডেকে পাঠান।

    একদিন আবু যার বসে আছেন। তাঁরই সামনে খলীফা ’উসমান রা. কা’বকে রা. জিজ্ঞেস করলেন, ‘যে ব্যক্তি সম্পদ পুঞ্জিভুত করে, তার যাকাত দেয় এবং আল্লাহর পথে ব্যয়ও করে- এমন ব্যক্তি সম্পর্কে আপনি কী ধারণা পোষণ করেন?’ কা’ব রা. বললেনঃ ‘এ ব্যক্তি সম্পর্কে ভালো আশা পোষণ করা যায়।’ এ কথা শুনে আবু যার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। কা’বের মাথার ওপর হাতে লাঠিটি তুলে ধরে বললেন, ‘ইয়াহুদী নারীর সন্তান, (কা’ব ইয়াহুদীর সন্তান ছিলেন) তুমি এর মর্ম কি বুঝবে। কিয়ামাতের দিন এমন ব্যক্তির অন্তরকেও বৃশ্চিক দংশন করবে।’ হযরত উসমান শেষ পর্যন্ত আবু যারকে বললেন, ‘আপনি আমার কাছে থাকুন, দুগ্ধবতী উটনী প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যায় আপনার দরজায় হাজির হবে।’ জবাবে তিনি বললেনঃ ‘তোমার এ দুনিয়ার কোন প্রয়োজন আমার নেই।’ এ কথা বলে তিনি চলে গেলেন। অবশেষে হযরত উসমান তাঁকে অনুরোধ জানালেন, মদীনা থেকে বহুদূরে মরুভূমির মাঝখানে ‘রাবজা’ নামক স্থানে গিয়ে বসবাস করার জন্য। অনেকে মতে তিনি স্বেচ্ছায় সেখানে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। লোকালয়ে থেকে বহুদূরে নির্জন প্রান্তরে ভোগ বিলাসী জীবনকে পরিহার করে আল্লাহর রাসূলের সা. পরকাল-আসক্ত জীবনকে কঠোরভাবে অনুসরণ করে আমরণ সেখানে পড়ে থাকেন। হযরত আবু যারের ওফাতের কাহিনীটাও অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং চমকপ্রদও বটে। হিজরী ৩১ মতান্তরে ৩২ সনের তিনি ‘রাবজা’র মরুভূমিতে ইনতিকাল করেন। তাঁর সহধর্মিনী তাঁর অন্তিমকালীন অবস্থা বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ

    ‘‘আবু যারের অবস্থা যখন খুবই খারাপ হয়ে পড়লো, আমি তখন কাঁদতে শুরু করলাম। তিনি বললেন, কাঁদছো কেন? বললামঃ এক নির্জন মরুভূমিতে আপনি পরকালের দিকে যাত্রা করছেন। এখানে আমার ও আপনার ব্যবহৃত বস্ত্র ছাড়া অতিরিক্ত এমন বস্ত্র নেই যা দ্বারা আপনার কাফন  দেওয়া যেতে পারে। তিনি বললেনঃ কান্না থামাও। তোমাকে একটি সুসংবাদ দিচ্ছি। রাসূল সা.-কে আমি বলতে শুনেছি, ‘যে মুসলিমের দুই অথবা তিনটি সন্তান মৃত্যুবরণ করেছে, জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য তাই-ই যথেষ্ট। তিনি কতিপয় লোকের সামনে, তার মধ্যে আমিও ছিলাম, বলেছিলেনঃ তোমাদের মধ্যে একজন মরুভূমিতে মৃত্যুবরণ করবে এবং তার মরণ সময়ে মুসলিমদের একটি দল সেখানে অকস্মাৎ উপস্থিত হবে।’ আমি ছাড়া সেই লোকগুলির সকলেই লোকালয়ে ইন্তিকাল করেছে। এখন একমাত্র আমিই বেঁচে আছি। তাই নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, সে ব্যক্তি আমি। আমি কসম করে বলছি, আমি মিথ্যা বলছিনা এবং যিনি এ কথা বলেছিলেন তিনিও কোন মিথ্যা বলেননি। তুমি রাস্তার দিকে চেয়ে দেখ গায়েবী সাহায্য অবশ্যই এসে যাচ্ছে।’ আমি বললামঃ ‘এখন তো হাজীদেরও প্রত্যাবর্তন শেষ হয়েছে, রাস্তায়ও লোক চলাচল বন্ধ।’ তিনি বললেন, ‘না’ তুমি যেয়ে দেখ।’ সুতরাং এক দিকে গৌড়ে গিয়ে টিলার ওপর উঠে দূরে তাকিয়ে দেখছিলাম, অপর দিকে ছুটে এসে তাঁর শুশ্রুষা করছিলাম। এরূপ ছুটাছুটি ও অনুসন্ধান চলছিল। এমন সময় দূরে কিছু আরোহী দৃষ্টিগোচর হলো। আমি তাদেরকে ইশারা করলে তারা দ্রুতগতিতে আমার নিকট এসে থেমে গেল। আবু যার সম্পর্কে তারা প্রশ্ন করলো, ‘ইনি কে?’ বললামঃ ‘আবু যার।’ ‘রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী?’ বললামঃ ‘হাঁ।’ ‘মা বাবা কুরবান হউক’- একথা বলে তারা আবু যারের কাছে গেল। আবু যার প্রথমে তাদেরকে রাসূলের সা. ভবিষ্যৎ বাণী শানালেন। তারপর অসিয়ত করলেন, ‘যদি আমার নিকট অথবা আমার স্ত্রীর নিকট থেকে কাফনের পরিমাণ কাপড় পাওয়া যায় তাহলে তা দিয়েই আমাকে দাফন দেবে।’ তারপর তাদেরকে কসম দিলেন, যে ব্যক্তি সরকারের ক্ষুদ্রতম পদেও অধিষ্ঠিত সে যেন তাঁকে কাফন না পরায়। ঘটনাক্রমে এক আনসারী যুবক ছাড়া তাদের মধ্যে অন্য সকলেই কোন না কোন সরকারী দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। আবু যার তাকেই কাফন পরাবার অনুমতি দিয়েছিলেন। এ কাফিলাটি ছিল ইয়ামনী। তারা কুফা থেকে আসছিল। আর তাদের সাথে ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা.। এ কাফিলার সাথে তিনি ইরাক যাচ্ছিলেন। তিনিই আবু যারের জানাযার ইমামতি করেন এবং সকলে মিলে তাঁকে ‘রাবজার’ মরুভূমিতে দাফন করেন।’

    হযরত আবু যার থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট আটাশ। তন্মধ্যে বারোটি হাদীস মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছে। দু’টি বুখারী ও সাতটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদের তুলনায় তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এত কম হওয়ার কারণ তিনি সবসময় চুপচাপ থাকতেন, নির্জনতা পছন্দ করতেন এবং মানুষের সাথে মেলামেশা কম করতেন। এ কারণে তাঁর জ্ঞানের তেমন প্রচার হয়নি। অথচ হযরত আনাস ইবন মালিক, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস প্রমুখের ন্যায় বিদ্বান সাহাবীগণ তাঁর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেছেন। ইবন আসাকির তাঁর তারীখে দিমাশক গ্রন্থে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

    হযরত আীকে রা. আবু যারের জ্ঞানের পরিধি সম্পর্কে ‍জিজ্ঞেস করা হয়েছিল। তিনি বললেন, ‘এমন জ্ঞান তিনি লাভ করেছেন যা মানুষ অর্জন করতে অক্ষম। তারপর সে জ্ঞান আগুনে সেক দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে কিন্ত তা থেকে কোন খাদ বের হয়নি।’ এ মহান সাধক ও দুনিয়া নিরাসক্ত সাহাবী সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, ‘আসমানের নীচে ও যমীনের ওপরে আবু যার সর্বাধিক সত্যবাদী ব্যক্তি।’

    হযরত উসমানের খিলাফতকালে আবু যার একবার হজ্জে গেলেন। এক ব্যক্তি এসে বলল, ‘উসমান মিনায় অবস্থানকালে চার রাকা’আত নামায আদায় করেছেন (অর্থাৎ কসর করেননি)।’ বিষয়টি তাঁর মনঃপুত হলো না। অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নিন্দা করে বললেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা., আবু বকর ও উমারের পেছনে আমি নামায আদায় করেছি। তাঁরা সকলে দু’ রাকা’আত  পড়েছেন।’ একথা বলার পর তিনি নিজেই ইমামতি করলেন এবং চার রাকা’আতই আদায় করলেন। লোকেরা বলল, ‘আপনিইতো আমীরুল মু’মিনীনের সমালোচনা করলেন আর এখন নিজেই চার রাকাআত আদায় করলেন।’ তিনি বললেন, ‘‘মতভেদ খুবই খারাপ বিষয়। রাসূল সা. বলেছেন, ‘আমার পরে যারা আমীর হবে তাদের অপমান করবেনা। যে ব্যক্তি তাদের অপমান করার ইচ্ছা করবে সে ইসলামের সুদৃঢ় রজ্জু স্বীয় কাঁধ থেকে ছুড়ে ফেলবে এবং নিজের জন্য তাওবার দরজা বন্ধ করে দেবে।’’ (মুসনাদে আহমাদ, /১৬৫)

    রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর যখনই পবিত্র নামটি তাঁর জিহ্বায় এসে যেত, চোখ থেকে অঝোরে অশ্রুধারা প্রবাহিত হতো। আহনাফ বিন কায়েস বর্ণনা করে, ‘‘আমি একবার বাইতুল মাকদাসে এক ব্যক্তিকে একের পর এক সাজদাহ করতে দেখলাম। এতে আমার অন্তরে এক বিশেষ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হল। আমি যখন দ্বিতীয়বার তার কাছে গেলাম, জিজ্ঞেস করলাম ‘আপনি কি বলতে পারেন আমি জোড় না বেজোড় নামায আদায় করেছি?’ তিনি বললেন, ‘আমি না জানলেও আল্লাহ নিশ্চয়ই জানেন।’ তারপর বললেনঃ ‘আমার বন্ধু আবুল কাসিম আমাকে বলেছেন’ এতটুকু বলেই তিনি কাঁদতে লাগলেন। তারপর বললেন, ‘আমার বন্ধু আবুল কাসিম আমাকে বলেছেন।’ এবারও কান্নায় কণ্ঠরোধ হয়ে গেল। অবশেষে নিজেকে সম্বরণ করে নিয়ে বললেনঃ ‘আমার বন্ধু আবুল কাসিম সা. বলেছেনঃ যে বান্দা আল্লাহকে একটি সাজদাহ করে, আল্লাহ তার একটি দরজা বৃদ্ধি করেন এবং তার একটি পাপ মোচন করে একটি নেকী লিপিবদ্ধ করেন।’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কে?’ তিনি বললেনঃ ‘আবু যার- রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী।’’

    একদিন এক ব্যক্তি আবু যারের নিকট এলো। সে তাঁর ঘরের চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখলো। গৃহস্থালীর কোন সামগ্রী দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করলো,

    – ‘আবু যার, আপনার সামান-পত্র কোথায়?

    – ‘আখিরাতে আমার একটি বাড়ী আছে। আমার সব উৎকৃষ্ট সামগ্রী সেখানেই পাঠিয়ে দিই।’

    একদা সিরিয়ার আমীর তাঁর নিকট তিনশ’ দীনার পাঠালেন। আর বলে পাঠালেন, এ দ্বারা আপনি আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করুন। ‘শামের আমীর কি আমার থেকে অধিকতর নীচ কোন আল্লাহর বান্দাকে পেলনা?’- একথা বলে তিনি দীনারগুলি ফেরত পাঠালেন।

  • আবু হুরাইরা আদ–দাওসী (রা)

    আবু হুরাইরা আদ–দাওসী (রা)

    আবু হুরাইরা, এ নামটি জানে না মুসলিম জাতির মধ্যে এমন কেউ কি আছে? ইসলামপূর্ব জাহিলী যুগে লোকে তাঁকে ডাকতো- ‘আবদু শামস’ বলে। পরবর্তীকালে আল্লাহ তা’আলা যখন ইসলামের দিকে হিদায়াত দান করে তাঁর ওপর অনুগ্রহ করলেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সাক্ষাৎ দানে মাধ্যমে তাঁকে গৌরবান্বিত করলেন, রাসূল সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘নাম কি?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘আবদু শামস (অরুন দাস)।’

    রাসূল সা. বললেন, ‘না আজ  থেকে তোমার নাম আবদুর রহমান।’

    আবু হুরাইরা রা. বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার নামে কোরবান হোক। আমার নাম আজ  থেকে আবদুর রহমান-ই হবে।’

    ‘আবু হুরাইরা’ তাঁর কুনিয়াত বা উপনাম। ছোট বেলায় একটি বিড়াল শাবকের সাথে তিনি সবসময় খেলতেন। তা দেখে সাথীরা তাঁর নাম দেন আবু হুরাইরা (বিড়াল শাবকওয়ালা)। আস্তে আস্তে এ নামেই তিনি সকলের মাঝে পরিচিত হন এবং তাঁর আসল নামটি ঢাকা পড়ে যায়। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যখন তাঁর সম্পর্ক গভীর হয় তখন মাঝে মাঝে তিনি আদর করে ডাকতেন ‘আবু হিররিন’। তাই তিনি আবু হুরাইরার পরিবর্তে আবু হিররিন নামটিকেই প্রাধান্য দেন। তিনি বলতেনঃ আমার হাবীব আল্লাহর রাসূল আমাকে এ নামেই ডেকেছেন। তাছাড়া হিররুন পুং লিঙ্গ এবং হুরাইরা স্ত্রী লিঙ্গ।

    আবু হুরাইরা ইসলামে দীক্ষিত হন প্রখ্যাত সাহাবী তুফায়িল ইবন আমর আদ-দাওসীর হাতে। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি স্বীয় দাওস গোত্রের সাথেই অবস্থান করতে থাকেন। ষষ্ঠ হিজরী সনে তাঁর গোত্রের একটি প্রতিনিধিদলের সাথে তিনিও এলেন মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সাক্ষাৎ করতে। আমর ইবনূর গালাস বলেন, মদীনায় তাঁর প্রথম আগমন হয় খাইবার বিজেয়র বছর সপ্তম হিজরীর মুহাররাম মাসে।

    মদীনা আসার পর দাওস গোত্রের এ যুবক নিরবচ্ছিন্নভাবে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমত ও সাহচর্য অবলম্বন করেন। রাত-দিন চব্বিশ ঘন্টা মসজিদেই অবস্থান করতে থাকেন। সব সময় রাসূলুল্লাহর সা. কাছ থেকে তালীম ও তারবিয়াত লাভ করতেন এবং তাঁরই ইমামতিতে নামায আদায় করতেন। রসালের সা. জীবদ্দশায় তাঁর স্ত্রী বা সন্তান সন্ততি ছিল না। একমাত্র তাঁর বৃদ্ধা মা ছিলেন। তখনও তিনি পৌত্তলিকতার ওপর অটল। আবু হুরাইরা স্নেহময়ী মাকে সর্বদা দাওয়াত দিতেন, আর তিনি অস্বীকার করতেন। এতে তিনি গভীর ব্যথা ও দুঃখ অনুভব করতেন। একদিন তিনি মাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পতি ঈমান আনার আহ্‌বান জানালে তিনি নবী সা. সম্পর্কে এমন অশ্রাব্য কথা বলেন যাতে আবু হুরাইরা ভীষণ মর্মাহত হন। কাঁদতে কাঁদতে তখনই রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হন। রাসূল সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কাঁদছো কেন?’

    তিনি বললেন, ‘আমি সব সময় আমার মাকে ইসলামের দাওয়াত দিই, আর তিনি অস্বীকার করেন। প্রতিদিনকার মত আজও  আমি তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম, তিনি আমাকে আপনার সম্পর্কে এমন কিছু কথা বললেন যে আমাকে ভীষণ পীড়া দিয়েছে। ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি আবু হুরাইরার মায়ের অন্তরটি ইসলামের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করুন।’ রাসূল সা. দু’আ করলেন।

    আবু হুরাইরা বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহর সা. দরবার থেকে বাড়ীতে ফিরে গেলাম। দেখি ঘরের দরজাটি বন্ধ, তবে ভেতরে পানি পড়ার শব্দ শুনা যাচ্ছে। আমি ভেতরে প্রবেশ করতে যাব এমন সময় মা বললেন, ‘আবু হুরাইরা, একটু অপেক্ষা কর’ একথা বলে তিনি কাপড় ঠিকঠাক করে নিলেন। তারপর আমাকে ভেতরে ডাকলেন। আমি প্রবেশ করলাম। তখনই তিনি পাঠ করতে লাগলেন! ‘‘আশহাদু আন-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।’’

    আমি আবার রাসূলুল্লাহর সা. কাছে ফিরে গেলাম। আনন্দে তখন আমি কাঁদছি, যেমন কিছুক্ষণ আগে দুঃখে কেঁদেছিলাম। বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, সুসংবাদ! মহান আল্লাহ আপনার দু’আ কবূল করেছেন, তিনি আবু হুরাইরার মাকে হিদায়াত দান করেছেন, আবু হুরাইরার মা ইসলাম গ্রহণ করেছেন।’

    আবু হুরাইরা রাসূলকে সা. ভালোবাসতেন। সে ভালোবাসা ছিল গভীর। তিনি রাসূলের সা. দিকে এক দু’বার মাত্র তাকিয়ে পরিতৃপ্ত হতেন না। তিনি বলতেন, ‘রাসূল সা. অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর ও দীপ্তিমান কোন কিছু আমি দেখিনি। তাঁর চেহারায় যেন সূর্যের কিরণ ঝলমল করতে থাকে।’

    তিনি নবীর সা. সাহাবী হওয়ায় মর্যাদা লাভ করেছেন এবং তাঁর দ্বীনের অনুসারী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন, এজন্য তিনি সব সময় মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতেন। বলতেন, ‘আবু হুরাইরাকে যিনি ইসলামের দিকে হিদায়াত দিয়েছেন, সকল প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর। আর সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আবু হুরাইরাকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন এবং নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর সাহচর্য দান করে অনুগ্রহ করেছেন। ‘

    আবু হুরাইরা রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি যেমন নিবেদিত ছিলেন, তেমনি ছিলেন জ্ঞানের প্রতিও কুরবান। জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞানচর্চা তাঁর অভ্যাস ও প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছিল। যায়িদ বিন সাবিত রা. বলেনঃ

    একদিন আবু হুরাইরা, আমাদের এক বন্ধু ও আমি মসজিদে আল্লাহর কাছে দু’আ করছিলাম। এমন সময় রাসূলকে সা. আমরা দেখতে পেলাম। তিনি এগিয়ে এসে আমাদের মাঝখানে বসলেন আমরা সবাই চুপ করে গেলাম। তিনি বললেন, ‘তোমরা তোমাদের কাজ আবার শুরু কর।’ আমি ও আমার বন্ধুটি আবু হুরাইরার আগেই আল্লাহর কাছে দু’আ করলাম। রাসূল সা. আমাদের দু’আর সাথে সাথে আমীন বললেন। তারপর আবু হুরাইরা দু’আ করলেনঃ

    ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে চাই, আমার দু’বন্ধু যা কিছু চেয়েছে। আর সেইসাথে চাই এমন জ্ঞান যা কখনও ভুলে না যাই।’ এবারও রাসূল সা. আমীন বললেন। আমরা দু’জনও বললাম, ‘আমরাও চাই ভুলে না যাই এমন জ্ঞান।’ রাসূল সা. বললেন, ‘দাওস গোত্রের এ লোকটি এক্ষেত্রে তোমাদের দু’জনকে হারিয়ে দিয়েছে।’

    আবু হুরাইরা নিজের জন্য যেমন জ্ঞান ভালোবাসতেন, তেমনি অপরের জন্যও। ইতিহাসে এ সম্পর্কিত একটি চমকপ্রদ ঘটনার উল্লেখ আছে। একদিন তিনি মদীনার বাজারে গেলেন। সেখানে বেচা-কেনা, লেন-দেন ইত্যাদির মধ্যে মানুষের নিমগ্নতা দেখে বিস্মিত হলেন। থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ওহে মদীনাবাসী, তোমরা দারুণভাবে বঞ্চিত।’ লোকরা জিজ্ঞেস করলো, ‘আবু হুরাইরা, আপনি আমাদের বঞ্চনার কি দেখলেন?’

    তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহর সা. মীরাস (উত্তরাধিকার) বণ্টিত হচ্ছে, আর তোমরা এখানে বসে আছ? সেখানে গিয়ে তোমাদের নিজ নিজ অংশগুলি নিয়ে নাও না কেন?’

    তারা বলল, ‘কোথায়?’

    তিনি বললেন, ‘মসজিদে’।

    লোকেরা মসজিদের দিকে ছুটে গেল। আবু হুরাইরা তাদের অপেক্ষায় সেখানে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর তারা ফিরে এসে বলল, ‘আবু হুরাইরা, আমরা তো মসজিদে গিয়েছি, ভেতরেও প্রবেশ করেছি, কিন্তু কোন কিছু বণ্টন হচ্ছে এমন তো দেখলাম না।’

    তিনি বললেন, ‘মসজিদে তোমরা কাউকে দেখনি?’

    তারা বলল, ‘অবশ্যই দেখেছি, কিছু লোক নামাযে দণ্ডায়মান, কিছু লোক কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল এবং কিছু লোক হারাম-হালাল সম্পর্কে পরস্পর আলোচনারত।’

    তিনি বললেন, ‘তোমাদের ধ্বংস হোক, এ-ই তো রাসূলুল্লাহর সা. মীরাস।’

    আবু হুরাইরা মুসলিম উম্মাহর জন্য নবীর হাজার হাজার হাদীস স্মৃতিতে ধারণ করে সংরক্ষণ করে গেছেন। সহীহ বুখারীতে আবু হুরাইরা থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে একমাত্র আবদুল্লাহ ইবন উমার ব্যতীত আর কেউ আমার থেকে বেশি হাদীস বর্ণনাকারী নেই। আর তাও এজন্য যে, তিনি হাদীস লিখতেন, আর আমি লিখতাম না।’

    রাসূলুল্লাহ সা. থেকে এত বেশী হাদীস বর্ণনার ব্যাপারটি অনেকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতো। তাই তিনি বলেন, ‘তোমরা হয়তো মনে করছো আমি খুব বেশি হাদীস বর্ণনা করি। আমি ছিলাম রিক্তহস্ত, দরিদ্র, পেটে পাথর বেঁধে সর্বদা রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্যে কাটাতাম। আর মুহাজিররা ব্যস্ত থাকতো তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যে এবং আনসাররা তাদের ধন-সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণে।’ তিনি আরও বলেন, ‘‘একদিন আমি বললামঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনার অনেক কথাই শুনি, কিন্তু তার অনেক কিছুই ভুলে যাই।’ একথা শুনে রাসুল সা. বললেন, ‘তোমার চাদরটি মেলে ধর।’ আমি মেলে ধরলাম। তারপর বললেনঃ তোমার বুকের সাথে লেপ্টে ধর। আমি লেপ্টে ধরলাম। এরপর থেকে আর কোন কথাই আমি ভুলিনি।’’ ইমাম বুখারী বলেনঃ আটশ’রও বেশী সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে যাঁরা তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাদের মধ্যে ইবন আব্বাস, ইবন উমার, জাবির, আনাস, ওয়াসিলা রা. প্রমুখ বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

    জ্ঞান অর্জনের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ এবং রাসূলের সা. মজলিসে উপস্থিতির ব্যাপারে অত্যধিক গুরুত্ব প্রদানের কারণে জীবনে তিনি এত ক্ষুধা ও দারিদ্র সহ্য করেছেন যে তার সমকালীনদের মধ্যে কেউ তা করেননি। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছেনঃ

    ‘‘মাঝে মাঝে আমি এত ক্ষুধার্ত হয়ে পড়তাম যে, কষ্ট সহ্য করতে না পেরে রাসূলুল্লাহর কোন কোন সাহাবীর নিকট কুরআনের কোন একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম অথচ আমি তা জানতাম। আমার উদ্দেশ্য হত, হয়ত তিনি আমার এ অবস্থা দেখতে পেয়ে আমাকে সঙ্গে করে তাঁর বাড়ীতে নিয়ে আহার করাবেন।

    একদিন আমার ভীষণ ক্ষুধা পেল। ক্ষুধার যন্ত্রণায় আমি পেটে একটি পাথর বেঁধে নিলাম তারপর সাহাবীদের গমনাগমন পথে বসলাম। আবু বকরকে যেতে দেখে তাঁকে একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। মনে করেছিলাম, তিনি আমাকে তাঁর সাথে যেতে বলবেন। কিন্তু তিনি ডাকলেন না।

    তারপর এলেন উমার ইবনুল খাত্তাব। তাঁকেও একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনিও কিছু বললেন না। সবশেষে এলেন রাসূল সা.। তিনি আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা অনুভব করলেন। বললেন, আবু হুরাইরা? বললাম লাব্বাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ একথা বলে পেছনে পেছনে আমি তাঁর বাড়ীতে গিয়ে ঢুকলাম। রাসূল সা. বাড়ীতে ঢুকে এক পেয়োলা দুধ দেখতে পেলেন। বাড়ীর লোকদের জিজ্ঞেস কররেনঃ ‘দুধ কোথা থেকে এসেছে?’

    তাঁরা বললেন, ‘আপনার জন্য অমুক পাঠিয়েছে।’ রাসূল সা. বললেন, ‘আবু হুরাইরা তুমি আহলুস সুফফার নিকট গিয়ে তাদের একত্রিত কর।’ একথা বলার পর আমি খুবই মনক্ষুণ্ন হয়েছিলাম। আমি মনে মনে বলেছিলামঃ মাত্র এক পেয়ালা দুধ, আহলুস সুফফার এতগুলি লোকের কি হবে? আমি চাচ্ছিলাম, প্রথমে আমি পেট ভরে পান করি, তারপর তাদের কাছে যাই। যাইহোক, আমি আহলুস সুফফার কাছে গেলাম এবং তাদের ডেকে একত্র করলাম। তারা সমবেত হয়ে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে বসলে তিনি বললেনঃ

    আবু হুরাইরা, তুমি পেয়ালাটি নিয়ে তাদের হাতে দাও। আমি এক এক করে সবার হাতে দিলাম এবং তারা সবাই পান করে পরিতৃপ্ত হল। তারপর পেয়ালাটি হাতে নিয়ে আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে ফিরে এলাম। তিনি মাথা উঁচু করে আমার দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বললেনঃ

    ‘তুমি আর আমিই বাকী আছি।’ বললামঃ ‘সাদাকাতা ইয়া রাসূলুল্লাহ- সত্যই বলেছেন, হে আল্লাহর রাসূল।’ তিনি বললেন, ‘তুমি পান কর’। আমি পান করলাম। তিনি বললেন, ‘আরও পান কর।’ আমি আরও  পান করলাম। এভাবে তিনি বার বার পান করতে বরলে, আর আমি বার বার পান করলাম। শেষে আমি বললা, ‘যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছে, তাঁর শপথ, আমি আর পান করতে পারছিনে।’ অতঃপর রাসূল সা. পেয়ালাটি হাতে নিয়ে বাকীটুকু পান করলেন।

    এত চরম দারিদ্র্য ও দুরবস্থার মধ্যে আবু হুরাইরাকে অবশ্য বেশি দিন থাকতে হয়নি। অল্প কালের মধ্যেই মুসলমানদের হাতে ধন ও ঐশ্বর্য আসে। চতুর্দিক থেকে প্রবহমান গতিতে গনিমাতের মাল মুসলমানদের হাতে আসতে থাকে। আবু হুরাইরা অর্থ, বাড়ী, ভূ-সম্পত্তি, স্ত্রী ও সন্তানাদি- সবকিছুর অধিকারী হন। কিন্তু এসব তাঁর মহান অন্তকরণের ওপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি তাঁর অতীত দিনের কথা একদিনের জন্যেও ভুলেননি। সবসময় তিনি বলতেনঃ

    ‘‘ইয়াতীম অবস্থায় বড় হয়েছি, রিক্ত হস্তে হিজরাত করেছি। পেটেভাতে, বুসরা বিনতু গাযওয়ানের মজদুরী খেটেছি। তারা যখন কোথাও তাঁবু ফেলত, তাদের নানা রকম ফুটফরমাশ পালন করতাম আর যখন তারা বাহনে আরোহন করত, তাদের উটগুলি তাড়িয়ে নিতাম। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা বুসরাকে আমার স্ত্রী হিসাবে দান করেন। সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তাঁর দ্বীনকে শক্তিশালী করেছেন এবং আবু হুরাইরাকে সে দ্বীনের একজন নেতা বানিয়ে দিয়েছেন।’’

    দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার রা. আবু হুরাইরাকে বাহরাইনের শাসক নিযুক্ত করেছিলেন। পরে তাঁকে অপসারণ করেন। তারপর আবার নিযুক্ত করতে চাইলে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এবং মদীনা ত্যাগ করে আকীক নামক স্থানে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন।

    হযরত মুয়াবিয়ার শাসনামলে আবু হুরাইরা একাধিকবার মদীনার শাসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। তবে শাসন ক্ষমতা তাঁর স্বভাবগত মহত্ব, উদারতা ও অল্পেতুষ্টি ইত্যাদি গুণাবলীতে কোন পরিবর্তন সৃষ্টি করতে পারেনি।

    আবু হুরাইরা তখন মদীনার শাসক। নিজ পরিবারের জন্য কাঠের বোঝা পিঠে চাপিয়ে মদীনার একটি রাস্তা দিয়ে তিনি চলছেন। পথে সা’লাবা ইবন মালিকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করার সময় বললেন, ‘সা’লাবা, আমীরের জন্য পথটা একটু ছেড়ে দাও।’ সা’লাবা বললেন, ‘আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। এত প্রশস্ত পথ দিয়েও আপনি যেতে পারছেন না?’ তিনি বললেন, ‘তোমাদের আমীর ও তার পিঠের বোঝাটির জন্য পথটা প্রশস্ত করে দাও।’

    অগাধ জ্ঞান, সীমাহীন বিনয় ও উদারতার সাথে আবু হুরাইরার মধ্যে তাকওয়া ও আল্লাহপ্রীতির এক পরম সম্মিলন ঘটেছিল। তিনি দিনে রোযা রাখতেন, রাতের তিন ভাগের প্রথম ভাগ নামাযে অতিবাহিত করতেন। তারপর স্ত্রীকে ডেকে দিতেন। তিনি রাতের দ্বিতীয় ভাগ নামাযে কাটিয়ে তাঁদের কন্যাকে জাগিয়ে দিতেন। কন্যা রাতের বাকী অংশটুকু নামাযে দাঁড়িয়ে অতিবাহিত করতেন। এভাবে তাঁর বাড়ীতে সমগ্র রাতের মধ্যে ইবাদত কখনও বন্ধ হতো না।

    ইকরিমা বলেন, আবু হুরাইরা প্রতিদিন বার হাজার বার তাসবীহ পাঠ করতেন। তিনি বলতেনঃ ‘আমি আমার প্রতিদিনের পাপের সমপরিমাণ তাসবিহ পাঠ করে থাকি।’

    আবু হুরাইরার একটি নিগ্রো দাসী ছিল। একদিন তার আচরণে তিনি ও তাঁর পরিবারবর্গ খুবই ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি তাকে প্রহার করতে উদ্যত হলেন। চাবুকটি উঠিয়ে আবার থেমে গেলেন। বললেন, ‘কিয়ামতের দিন যদি এর বদলার ভয় না করতাম তাহলে চাবুক মেরে তোমাকে কষ্ট দিতাম, যেমন তুমি আমাদের দিয়েছ। তবে তোমাকে আমি এমন একজনের কাছে বিক্রি করবো যিনি আমাকে তোমার ন্যায্য মূল্যই দেবেন। আর আমিও এ মূল্যেরই অধিকতর মুখাপেক্ষী। যাও আল্লাহর ওয়াস্তে তোমাকে আমি আযাদ করে দিলাম।’

    আবু হুরাইরার মেয়ে একদিন বললেন, ‘আব্বা, অন্য মেয়েরা আমাকে লজ্জা দেয়। তারা বলে তোমার আব্বা তোমাকে সোনার গহনা বানিয়ে দেন না কেন?’

    তিনি বললেন, ‘বেটি, তাদের তুমি বলো, আমার আব্বা জাহান্নামের লেলিহান শিখার ভয় করেন।’ মেয়েকে সোনার গহনা না দেওয়ার কারণ ধন-সম্পদের প্রতি তাঁর লালসা ও কৃপণতা নয়। তিনি তো আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার ব্যাপারে সবসময় ছিলেন দরাজ-হস্ত। তাঁর দানশীলতা সম্পর্কে ইতিহাসে অনেক কথাই আছে। একদিন মারওয়ান ইবনুল হিকাম একশ’ দিনার আবু হুরাইরার কাছে পাঠালেন। কিন্তু পরের দিনই মারওয়ান আবার লোক পাঠিয়ে জানালেন, ‘আমার চাকরটি ভুলক্রমে দিনারগুলি আপনাকে দিয়ে এসেছে, ওগুলি আমি আপনাকে দিতে চাইনি, বরং অন্য এক ব্যক্তিকে দিতে চেয়েছিলাম’। একথা শুনে আবু হুরাইরা লজ্জা ও বিস্ময়ের সাথে বললেনঃ

    ‘আমি তো সেগুলি আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে ফেলেছি। রাত পোহানো পর্যন্ত একটি দিনারও আমার কাছে ছিলনা। আগামীতে বাইতুল মাল থেকে যখন আমার ভাতা দেওয়া হবে, সেখান থেকে নিয়ে নেবেন।’ আসলে তাঁকে পরীক্ষার উদ্দেশ্যেই এমনটি করেছিলেন।

    মা যতদিন জীবিত ছিলেন আবু হুরাইরা তাঁর সাথে সর্বদা সদাচরণ করেছেন। তিনি যখন বাড়ী থেকে বের হতেন, মায়ের ঘরের দরজায় গিয়ে বলতেন, ‘মা’ আস্‌সালামু আলাইকা ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।’

    জবাবে মা বলতেন, ‘প্রিয় সন্তান, ওয়া আলাইকাস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।’

    সালাম বিনিময়ের পর আবু হুরাইরা বলতেন, ‘আল্লাহ আপনার ওপর দয়া ও অনুগ্রহ করুন, যেমন আপনি করেছেন ছোট্ট বেলায় আমার উপর।’ মা বলতেন, ‘বড় হয়ে আমার সাথে তুমি যে সদাচরণ করেছ তার বিনিময়ে আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন।’ বাড়ীতে প্রত্যাবর্তনের পর মাতা-পুত্রের মধ্যে এরূপ দু’আ ও সালাম বিনিময় হতো।

    আবু হুরাইরা নিজে যেমন মুরুব্বিজনদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন, তেমনি সকলকে তিনি উপদেশ দিতেন মাতাপিতার সাথে সদাচরণের, আত্মীয় স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক কায়েম রাখার। একদিন তিনি দেখতে পেলেন, দু’জন লোক রাস্তা দিয়ে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন অন্যজন থেকে অধিকতর বয়স্ক। কনিষ্ঠজনকে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘সঙ্গের লোকটি তোমার কি হয়?’

    সে বলল ‘আব্বা’।

    তিনি বললেন, ‘তুমি কখনও তার নাম ধরে ডাকবে না, তাঁর আগে আগে চলবে না এবং তাঁর বসার আগে কোথাও বসবে না।’

    অন্তিম রোগ শয্যায় তিনি আকুল হয়ে কাঁদছেন। জিজ্ঞেস করা হলো কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, ‘তোমাদের এ দুনিয়ার জন্য আমি কাঁদছি না। কাঁদছি, দীর্ঘ ভ্রমণ ও স্বল্প পাথেয়র কথা চিন্তা করে। যে রাস্তাটি জান্নাতে বা জাহান্নামে গিয়ে পৌঁছেছে, আমি এখন সে রাস্তার শেষ মাথায় এসে দাঁড়িয়েছি। জানিনে, আমি সেই দু’টি রাস্তার কোনটিতে যাব।’

    অন্তিম রোগ শয্যায় তিনি শায়িত। মারওয়ান ইবনুল হিকাম তাঁকে দেখতে এলেন। বললেন, ‘আবু হুরাইরা, আল্লাহ আপনাকে শিফা দান করুন।’

    উত্তরে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ, আমি আপনার দিদার ভালবাসি, আপনিও আমার দিদার পছন্দ করুন এবং আমার জন্য তা তাড়াতাড়ি করুন।’

    মারওয়ান তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বের হতে না হতেই তিনি শ্বেস নিঃস্বাস ত্যাগ করেন।

    ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বলেন, ‘ওয়ালিদ বিন উকবা’ আসরের নামাযের পর তাঁর জানাযার নামাযের ইমামতি করেন। হযরত ইবন উমার, আবু সাঈদ খুদরী রা. প্রমুখ সাহাবী তাঁর জানাযায় উপস্থিত ছিলেন।

    ওয়ালিদ তাঁর মৃত্যুর খবর হযরত মুয়াবিয়ারকে অবহিত করলে তিনি তাঁকে লিখেন, তাঁর উত্তরাধিকারীদের খুজে বের করে দশ হাজার দিরহাম দাও এবং তাঁর প্রতিবেশীদের সাথে সদাচরণ কর। কারণ, উসমানের গৃহবন্দী অবস্থায় তিনি তাঁকে সাহায্য করেছিলেন।

    আল্লাম ইবন হাজার আসকিলানী ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থে আবু সুলাইমানের সূত্রে উল্লেখ করেছেন, আবু হুরাইরা আটাত্তর বছর জীবন লাভ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহর সা. জীবন কালে তাঁর বয়স হয়েছিল তিরিশ বছরের কিছু বেশি। অনেকে মতে হিজরী ৫৫ হিজরীতে ইনতিকাল করেন; কিন্তু ওয়াকিদীর মতে তাঁর মৃত্যুসন ৫৯ হিজরী। তবে ইমাম বুখারীর মতে তাঁর মৃত্যুসন হিজরীর ৫৭।

  • আল–আরকাম ইবন আবিল আরকাম (রা)

    আল–আরকাম ইবন আবিল আরকাম (রা)

    নাম আবু আবদিল্লাহ আল আরকাম। পিতা আবূল আরকাম আবদু মান্নাফ, মাতা উমাইমা।

    হযরত আরকামের খান্দান জাহিলী যুগের আরবে বিশেষ মর্যাদা ও ক্ষমতার অধিকারী ছিল। তাঁর দাদা আবু জুনদুব আসাদ ইবন আবদিল্লাহ তার যুগে মক্কার একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন।

    হযরত আরকাম এগারো অথবা বারো জনের পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। আলবিদায়া গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আবু বকর ইসলাম গ্রহণের পর উসমান ইবন আফ্‌ফান, তালহা ইবন উবাইদিল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সা’দ ইবন আবী ওয়াক্‌কাসের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। তাঁরা সকলে সাথে সাথে এ দাওয়াত কবুল করেন। পরদিন তিনি উসমান ইবন মাজউন, আবু উবাইদা এবং আল-আরকাম ইবন আবিল আরকামকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হন। তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

    হযরত আরকাম যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন রাসূলুল্লাহর সা. সহ সকল মুসলমানের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। মক্কার পৌত্তলিক শক্তি চাচ্ছিল, শক্তি অর্জনের পূর্বেই এ আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে। কিন্তু ইসলাম তো নিশ্চিহ্ন হওয়ার জন্য আসেনি। ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আরকামের বাড়ীটি ইসলামের গোপন ঘাঁটিতে পরিণত হয়। ইসলামের প্রথম পর্যায়ের ইতিহাস আলোচনা করতে গেলেই ঘুরেফিরে ‘দারুল আরকাম’ বা আরকামের বাড়ীর কথাটি আমাদের সামনে আসে। ইসলামের দাওয়াত ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ বাড়িটির এক মহান ভূমিকা রয়েছে। রাসূল সা. এ বাড়ীতে অবস্থান নিয়ে কুরাইশদের নজর এড়িয়ে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। তখন পর্যন্ত মুষ্টিমেয় যে ক’জন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাঁরা এখানে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মিলিত হতেন। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সা. ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে এখান থেকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। এ ঐতিহাসিক বাড়িতে বেশ কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ যে ব্যক্তি এ বাড়ীতে ইসলামের ঘোষনা দেন, তিনি হলেন উমার ইবনূল খাত্তাব রা.। ‘হায়াতুস সাহাবা’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, মুসলমানদের সংখ্যা যখন ৩৮ জনে উন্নীত হলো, আবু বকর ও অন্যরা তখন রাসূলুল্লাহকে সা. চাপ দিলেন প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য। তাঁদের দাবীর মুখে রাসূল সা. রাজী হলেন। তাঁরা আরকামের বাড়ী থেকে বেরিয়ে মসজিদে হারামে বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে পড়লেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী হযরত আবু বকর কা’বার চত্বরে উপস্থিত কুরাইশদের সম্বোধন করে ভাষন দিতে দাঁড়ালেন। তাদের সামনে ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরতেই কুরাইশ গুণ্ডারা একযোগে আবু বকরের ওপর হামলা চালিয়ে আঘাত হানতে থাকে। নরাধম উতবা পায়ের জুতো খুলে হযরত আবু বকরকে জুতো-পেটা করলো। আবু বকরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লো। আবু বকরের গোত্র বনু তাইম তাঁকে বাচানোর জন্য এগিয়ে এলো। আবু বকর চেতনা ফিরে পেয়েই রাসূলুললাহ সা. অবস্থা জিজ্ঞেস করলেন। তাঁর মা উম্মুল খায়েরকে পাঠালেন উম্মুল জামিলে কাছে রাসূলুল্লাহর সা. খবর জানার জন্য। উম্মুল জামীল এসে চুপে চুপে খবর দিলেন, রাসূল সা. নিরাপদে আছেন। অতঃপর রাতের অন্ধকারে তাঁরা তিনজন গোপনে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পৌঁছেন। এখানে রাসূলুল্লাহর সা. দু’আর বরকতে হযরত আবু বকরের জননী উম্মুল খায়ের ইসলাম গ্রহণ করেন। সেখানে তাঁরা এক মাস অবস্থান করেন। এর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা ৪০ এ পৌঁছে যায়। যেদিন আবু বকর রা. আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দিতে গিয়ে মার খেয়েছিলেন, ঘটনাক্রমে সেদিনই হযরত হামযা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

    ইসলামপূর্ব যুগে রাসূলুল্লাহ সা. নেতৃত্বে মক্কায় ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে যে কল্যাণ সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, আরকাম ছিলেন তার অন্যতম সদস্য।

    নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে হিজরাতের আদেশ হলে অন্যান্য সাহাবীদের সাথে হযরত আরকাম মদীনায় পৌঁছেন। হযরত আবু তালহা ইবন সাহলের সাথে তাঁর ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য রাসূল সা. তাঁকে মদীনার বনু যারাইক মহল্লায় এক খণ্ড ভূমি দান করেন।

    হক ও বাতিলের প্রথম সংঘর্ষ বদর-যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ যুদ্ধে রাসূল সা. তাঁকে একখানি তরবারি দান করেন। উহুদ, খন্দক, খাইবারসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে অংশগ্রহণ করে বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। রাসূল সা. তাঁকে যাকাত আদায়কারী হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন।

    হিজরী ৫৩/৫৫ সনে ৮৩ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে অসিয়ত করে যান, হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস তাঁর জানাযার নামায পড়াবেন। কিন্তু হযরত সা’দ মদীনা থেকে একটু দূরে ‘আকীক’ নামক স্থানে ছিলেন। তাঁর উপস্থিত হতে একটু বিলম্ব হলে মদীনার তৎকালীন ওয়ালী মারওয়ান ইবন হিকাম প্রতিবাদ করে বলেন, এক ব্যক্তির প্রতীক্ষায় জানাযা কতক্ষণ পড়ে থাকবে। তিনি ইচ্ছা করলেন, নিজেই এগিয়ে গিয়ে জানাযার ইমামতি শুরু করে দেন। কিন্তু উবাইদুল্লাহ ইবন আরকাম অনুমতি দিলেন না। বনী মাখযুম গোত্রও উবাইদুল্লাহর সাহায্য ও সমর্থনে এগিয়ে আসে। বাকবিতণ্ডা চলছে, এমন সময় হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস রা. এসে উপস্থিত হলেন। তিনি জানাযার নামায পড়ালেন এবং লাশ মদীনার বাকী গোরস্থানে দাফন করা হলো।

    তাকওয়া, দ্বীনদারী, দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসের প্রতি অনীহা ও সততা ছিল হযরত আরকামের চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইবাদাত ও শববিদারীর প্রতি ছিল তাঁর প্রবল আকর্ষণ। একবার তিনি বাইতুল মাকদাস সফরের ইচ্ছা করলেন। সফরের প্রস্তুতি শেষ করে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে এলেন বিদায় নিতে। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে, না অন্য কোন প্রয়োজনে? উত্তরে আরকাম বললেন, ‘আমার মা-বাবা, আপনার প্রতি কুরবান হোক, অন্য কোন প্রয়োজন নেই। শুধু বাইতুল মাকদাসে নামায আদায় করতে চাই।’ ইরশাদ হলো, ‘আমার এ মসজিদের একটি নামায একমাত্র মসজিদে হারাম ছাড় অন্য যে কোন মসজিদের হাজার নামায অপেক্ষা উত্তম।’ একথা শোনামাত্র হযরত আরকাম বসে পড়েন এবং সফরের ইরাদা করেন।

    হযরত আরকামের মূল পেশা ছিল ব্যবসা বাণিজ্য। হিজরাতের পর তিনি মদীনায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। মক্কার ঐতিহাসি বাড়ীটি তিনি সন্তান-সন্ততিদের জন্য ওয়াক্‌ফ করে যান। দীর্ঘ দিন যাবত এ বাড়ীটি ভ্রমণকারীদের দর্শনস্থল হিসাবে বিবেচিত হতো।

    হযরত আরকামের এ বাড়িটি ছিল সাফা পাহাড়ের পাদদেশে। সাফা ও মারওয়ার মাঝখানে সাঈ’ করার সময় ঠিক বাড়িটির দরজার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে হতো। আব্বাসী খলিফা মানসুরের সময়-১৪০ হিজরী পর্যন্ত বাড়ীটি অবিকৃত অবস্থায় ছিল। কিন্তু এ বছরই মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন হাসান মদীনায় আব্বাসী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। হযরত আরকামের পৌত্র আবদুল্লাহ ইবন ’উসমানও ছিলেন এ বিদ্রোহের একজন সমর্থন ও সহযোগী। এ কারণে খলীফা মানসুরের নির্দেশে শিহাব উদ্দীন ইবন আবদে বরকে পাঠালেন আবদুল্লাহর কাছে এই বাড়িটি ক্রয়ের প্রস্তাব দিয়ে। আবদুল্লাহ প্রথমতঃ বিক্রী করতে অস্বীকার করেছিলেন; কিন্তু কয়েদ থেকে মুক্তির শর্তে এবং উচ্চ মূল্যেল লোভে শেষ পর্যন্ত বিক্রী করতে সম্মত হন। মানসুর সতেরো হাজার দীনারের বিনিময়ে এ মহান, কল্যাণময় ঐতিহাসিক বাড়িটির মালিকানা লাভ করেন। বাড়ীটির অন্য শরীকরা প্রথমতঃ রাজী না হলেও আস্তে আস্তে তাঁরাও রাজী হয়ে যান।

    খলীফা মানুসরের পর খলীফা মাহদী এ বাড়ীটি তাঁর প্রিয়তমা দাসী খায়যুরানকে দান করেন। তিনি বাড়িটির পুরনো কাঠামো ভেঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন অট্টালিকা তৈরী করেন। এভাবে যুগে যুগে এ বাড়িটির সংস্কার সাধিত হয় এবং ধীরে ধীরে এই মহান গৃহটি যেখানে ইসলামের সংকট পর্বে আল্লাহর রাসূল সা. ও মুসলমানরা আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অহী ও ফিরিশতাদের অবতরণ স্থল ছিল, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায।

  • আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)

    আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা)

    রাসূলুল্লাহ সা. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. সম্পর্কে বলেছেনঃ ‘যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করে আনন্দ পেতে চায়, যেমন তা অবতীর্ণ হয়েছে- সে যেন ইবন উম্মু আবদের পাঠের অনুসরণে কুরআন পাঠ করে।’

    এটা সেই সময়ের কথা যখন তিনি একজন কিশোর মাত্র, তখনও যৌবনে পদার্পণ করেননি। কুরাইশ গোত্রের এক সর্দার ’উকবা ইবন আবু মু’ইতের একপাল ছাগল নিয়ে তিনি মক্কার গিরিপথগুলোতে চরিয়ে বেড়াতেন। লোকের তাঁকে ‘ইবন উম্মু আবদ’ বলে ডাকতো। তবে তাঁর নাম আবদুল্লাহ, পিতার নাম মাসউদ, কুনিয়াত আবু আবদির রহমান এবং মাতার নাম উম্মু আবদ।

    তাঁর গোত্রে যে একজন নবীর আবির্ভাব ‍ঘটেছে, সে সম্পর্কে নানা খবর এ কিশোর ছেলে সবসময় শুনতেন। তবে অল্প বয়স এবং বেশীরভাগ সময় মক্কার সমাজ জীবন থেকে দূরে অবস্থানের কারণে সে সম্পর্কে তিনি গুরুত্ব দিতেন না। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে উঠে ’উকবার ছাগলের পাল নিয়ে বের হয়ে যেতেন আর সন্ধ্যায় ফিরতেন।

    একদিন এ কিশোর ছেলেটি দেখতে পেলেন, দু’জন বয়স্ক লোক, যাদের চেহারায় আত্মমর্যাদার ছাপ বিরাজমান, দূর থেকে তাঁর দিকেই এগিয়ে আসছেন। তাঁরা ছিলেন এত পরিশ্রান্ত ও পিপাসার্ত যে, তাঁদের ঠোঁট ও গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। নিকটে এসে লোক দু’টি সালাম জানিয়ে বললেন, ‘বৎস! এ ছাগলগুলি থেকে কিছু দুধ দুইয়ে আমাদেরকে দাও। আমরা পান করে পিপাসা নিবৃত্ত করি এবং আমাদের শুকনা গলা একটু ভিজিয়ে নেই।’

    ছেলেটি বললঃ ‘এ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। ছাগলগুলি তো আমার নয। আমি এগুলির রাখাল ও আমানতদার মাত্র।’ লোক দু’টি তার কথায় অসন্তুষ্ট হলেন না, বরং তাদের মুখ মণ্ডলে এক উৎফুল্লতার ছাপ ফুটে উঠলো। তাদের একজন আবার বললেনঃ ‘তাহলে এমন একটি ছাগী আমাকে দাও যা এখনও পাঠার সংস্পর্শে আসেনি।’ ছেলেটি নিকটেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছোট্ট ছাগীর দিকে ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন। লোকটি এগিয়ে গিয়ে ছাগীটি ধরে ফেলেন এবং ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম’ বলে হাত দিয়ে ধরে তার ওলান মলতে লাগলেন। অবাক বিস্ময়ে ছেলেটি এ দৃশ্য দেখে মনে মনে বললেনঃ ‘কখনও পাঠার সংস্পর্শে আসেনি এমন ছোট ছাগী কি দুধ দেয়? কিন্তু কি আশ্চর্য! কিছুক্ষনের মধ্যেই ছাগীর ওলানটি ফুলে ওঠে এবং প্রচুর পরিমাণ দুধ বের হতে থাকে। দ্বিতীয় লোকটি গর্তবিশিষ্ট পাথর উঠিয়ে নিয়ে বাঁটের নীচে ধরে তাতে দুধ ভর্তি করেন। তারপর তাঁরা উভয়ে পান করেন এবং ছেলেটিকেও তাদের সাথে পান করালেন। ইবন মাসউদ বলেনঃ আমি যা দেখছিলাম তা সবই আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল। আমরা সবাই যখন পরিতৃপ্ত হলাম তখন সেই পূণ্যবান লোকটি ছাগীর ওলানটি লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘চুপসে যাও।’ আর অমনি সেটি পূর্বের ন্যায় চুপসে গেল। তারপর আমি সেই পূণ্যবান লেকটিকে অনুরোধ করলামঃ ‘আপনি যে কথাগুলি উচ্চারণ করলেন, তা আমাকে শিখিয়ে দিন।’ বললেন, ‘তুমি তো শিক্ষাপ্রাপ্ত বালক।’

    ইসলামের সাথে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের পরিচিতির এটাই হলো প্রথম কাহিনী। এ মহাপূণ্যবান ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর তাঁর সঙ্গীটি ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা.। কুরাইশদের অত্যাচার উৎপীড়ন থেকে বাঁচার জন্য এ সময় তাঁরা মক্কার নির্জন গিরিপথ সমূহে আশ্রয় নিয়েছিলেন। রাসূল সা. ও তাঁর সঙ্গীকে যেমন ছেলেটির ভালো লেগেছিল তেমনি তাঁদের কাছেও ছেলেটির আচরণ, আমানতদারী ও বিচক্ষণতা খুব চমৎকার মনে হয়েছিল। তাঁরা ছেলেটির মধ্যে কল্যাণ ও মংগলের শুভলক্ষণ প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

    এ ঘটনার অল্প কিছুদিন পর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নিজেকে রাসূলুল্লাহর সা. একজন খাদিম হিসাবে উৎসর্গ করেন। রাসূল সা.ও তাকে খাদিম হিসাবে নিয়োগ করেন। সেইদিন থেকে এ সৌভাগ্যবান বালক ছাগলের রাখালী থেকে সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠতম মানুষের খাদিমে পরিণত হন।

    আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ছায়ার মত নিজের মনিবকে অনুসরণ করেন। সফরে বা ইকামতে, গৃহের অভ্যন্তরে বা বাইরে সব সময় তিনি তাঁর সাথে সাথে থাকতেন। রাসূল সা. ঘুমালে তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতেন, গোসলের সময় পর্দা করতেন, বাইরে যাবার সময় জুতো পয়ে দিতেন, ঘরে প্রবেশের সময় জুতো খুলে দিতেন এবং তাঁর লাঠি ও মিসওয়াক বহন করতেন। তিনি যখন হুজরায় অবস্থান করতেন তখনও তাঁর কাছে যাতায়াত করতেন। রাসূল সা. তাঁকে যখনই ইচ্ছা তাঁর কামরায় প্রবেশ এবং কোন প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংকোচ না করে তাঁর সকল বিষয় অবগত হওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন। এ কারণে তাকে ‘সাহিবুস সির’ বা রাসূলুল্লাহর সা. সকল গোপন বিষয়ের অধিকারী বলা হয।

    আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ নবী-গৃহে প্রতিপালিত হন, তাঁকে অনুসরণ করেন এবং তাঁরই মত আচার-আচরণ, ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হন। এ কারণে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘হিদায়াত প্রাপ্তি, আচার-আচরণ ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনিই হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উত্তম ব্যক্তি।’

    ইবনে মাসউদ খোদ রাসূলাল্লাহর সা. শিক্ষালয়ে শিক্ষালাভ করেন। তাই সাহাবীদের মধ্যে যারা কুরআনের সবচেয়ে ভালো পাঠক, তার ভাব ও অর্থের সবচেয়ে বেশীল সমঝদার এবং আল্লাহর আইন ও বিধি-বিধানের সবচেয়ে বেশী অভিজ্ঞ, তিনি ছিলেন তাঁদেরই একজন।

    একবার হযরত উমার রা. আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে বললোঃ ‘আমীরুল মুমিনীন! আমি কুফা থেকে এসেছি। সেখানে আমি দেখে এসছি, এক ব্যক্তি নিজের স্মৃতি থেকেই মানুষকে কুরআন শিখাচ্ছেন।’ একথা শুনে তিনি এত রাগান্বিত হলেন যে, সচরাচর তাঁকে তেমন রাগ করতে দেখা যায় না। তিনি উটের হাওদার অভ্যন্তরে রাগে ফুলতে থাকেন। তারপর প্রশ্ন করেন- তোমার ধ্বংস হোক! কে সে লোকটি?’

    – ‘আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ।’

    জ্বলন্ত আগুনে পানি ঢেলে দিলে যে অবস্থা হয়, ইবন মাসউদের নাম শুনে তাঁরও সে অবস্থা হলো। তাঁর রাগ পড়ে গেল। তিনি স্বাভাবিক অবস্তা ফিরে পেলেন। তারপর বললেনঃ তোমার ধ্বংস হোক! আল্লাহর কসম, এ কাজের জন্য তাঁর চেয়ে অধিক যোগ্য কোন ব্যক্তি বেঁচে আছে কিনা আমি জানিনা। এ ব্যাপারে তোমাকে আমি একটি ঘটনা বলছি।’ উমার রা. বলতে লাগলেন- ‘‘একদিন রাতের বেলা রাসূল সা. আবু বকরের সাথে কথাবার্তা বলছিলেন। তাঁরা মুসলমানদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। আমিও তাঁদের সাথে ছিলাম। কিছু সময় পর রাসূল সা. বের হলেন, আমরাও তাঁর সাথে বেরুলাম। বেরিয়েই আমরা দেখতে পেলাম, এক ব্যক্তি মসজিদে নামাযে দাঁড়িয়ে; কিন্তু আমরা তাঁকে চিনতে পারলাম না। রাসূল সা. দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাঁর কুরআন তিলাওয়াত শুনলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেনঃ ‘যে ব্যক্তি বিশুদ্ধভাবে কুরআন পাঠ করে আনন্দ পেতে চায়, যেমন তা অবতীর্ণ হয়েছে, সে যেন ইবন উম্মু আবদের পাঠের অনুরূপ কুরআন পাঠ করে।’ এরপর আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বসে দু’আ শুরু করলেন রাসূল সা. আস্তে আস্তে তাঁকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেনঃ ‘চাও, দেওয়া হবে, চাও, দেওয়া হবে।’

    উমার রা. বলেন, আমি মনে মনে বললাম, আল্লাহর কসম, আমি আগামীকাল প্রত্যুষেই আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের নিকট গিয়ে তাঁর দু’আ সম্পর্কে রাসূলের সা. মন্তব্যের সুসংবাদটি তাঁকে দিব। সকাল সকাল আমি তার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি আবু বকর সিদ্দীক রা. আমার আগেই তাঁর কাছে পৌঁছে গেছেন এবং তাঁকে সুসংবাদটি দিয়ে ফেলেছেন। সত্যিই যখনই কোন সৎকাজে আবু বকরের সাথে আমি প্রতিযোগিতা করেছি তখন তিনিই প্রতিটি ক্ষেত্রে বিজয়ী হয়েছেন।

    আল্লাহর কিতাব কুরআনের জ্ঞানে তিনি কতখানি পারদর্শী ছিলেন সে সম্পর্কে তাঁর নিজের একটি মন্তব্য এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি বলেন, ‘‘যিনি ‍ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই সেই আল্লাহর কসম! আল্লাহর কিতাবের এমন কোন একটি আয়াত নাযিল হয়নি যে সম্পর্কে আমি জানিনা যে, তা কোথায় নাযিল হয়েছে এবং কি সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে আমার থেকে অধিক পারদর্শী কোন ব্যক্তির কথা আমি যদি জানতে পারি এবং তাঁর কাছে পৌঁছা সম্ভব হয়, তাহলে আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হই।’

    নিজের সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ যে কথাটি বলেছেন তাতে অতিরঞ্জন নেই। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা পাঠকদের কাছে তুলে ধরা সমীচীন বলে মনে করি। একবার হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রা. কোন এক সফরে রাত্রিবেলা একটি অপরিচিত কাফিলার সাক্ষাত লাভ করেন। রাতের ঘোর অন্ধকারে কাফিলার কোন লোকজনকে দেখা যাচ্ছিল না। ঘটনাক্রমে সেই কাফিলায় আবদুল্লাহ ইবন মাসউদও ছিলেন; কিন্তু উমার রা. তা জানতেন না। উমার রা. একজন লোককে তাদেরকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে বললেন, কাফিলা কোথা থেকে আসছে? অন্য কাফিলা থেকে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ জবাব দিলেন-

    – ‘আমীক উপত্যকা থেকে।’

    – ‘কোথায় যাচ্ছে?’

    – ‘ইলাল বাইতিল আতীক- বাইতুল আতীকে (অর্থাৎ কাবা শরীফে)।’ জবাব শুনে উমার রা. বললেনঃ ‘নিশ্চয় তাদেরমধ্যে কোন আলিম ব্যক্তি আছেন।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘কুরআনের শ্রেষ্ঠতম আয়াত কোনটি?’

    – ‘আল্লাহু লাইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুম, লা তাখুজুহু সিনাতুন ওয়ালা নাওম- সেই চিরন্তন চিরঞ্জীব সত্তা আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই। তন্দ্রাও তাকে স্পর্শ করেনা এবং নিদ্রাও তাঁকে পায়না।’

    – ‘সর্বাধিক ন্যায়-নীতির ভাব প্রকাশক আয়াত কোনটি?’

    – ইন্নাল্লাহা ইয়া’মুরু বিল আদলি ওয়াল ইহসানি ওয়া ইতায়িজিল কুরবা- আল্লাহ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, পরোপকার এবং নিকটতম আত্মীয়-স্বজনদেরকে দান করার নির্দেশ দিচ্ছেন। আবার প্রশ্ন হলোঃ

    – ‘সর্বাধিক ব্যাপক অর্থবোধক আয়াত কোনটি?’

    – ‘ফামাই ইয়া’মাল মিসকালা জাররাতিন খাইরাই য়ারাহ, ওয়ামাই ইয়া’মাল মিসকালা জার্‌রাতিন শাররাই য়ারাহ’- ‘যে ব্যক্তি এক বিন্দু পরিমাণ সৎকজ করবে সে তার বিনিময় লাভ করবে, তেমনিভাবে যে ব্যক্তি এক বিন্দু পরিমাণ অসৎকাজ করবে তার বিনিময়ও সে লাভ করবে।’

    – ‘সর্বাধিক ভীতিপ্রদ আয়াত কোনটি?’

    – ‘লাইসা বআমানিয়্যিকুম ওয়ালা আমানিয়্যি আহলিল কিতাবি মান ই’মাল সুআন ইউজযা বিহি ওয়ালা ইয়াজিদ লাহু মিন দুনিল্লাহ ওয়ালিয়্যান ওয়ালা নাসীরান’- ‘না তোমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী, আর না আহলি কিতাবদের কামনা-বাসনা অনুযায়ী সবকিছু হবে। যে ব্যক্তি খারাপ কাজ করবে তাঁকে তাঁর প্রতিফল ভোগ করতে হবে। আর আল্লাহ ছাড়া তার জেন্য আর কোন অভিভাবকও পাবেনা এবং কোন সাহায্যকারীও না।’

    ‘সর্বঅধিক আশার সঞ্চারকারী আয়াত কোনটি?’

    – ‘কুল ইয়া ’ইবাদিল্লাজীনা আসরাফু ’আলা আনফুসিহিম লা-তাকনাতু মির রাহমাতিল্লাহু ইন্নাল্লাহা ইয়াগফিরজ্জুনুবা জামীয়া। ইন্নাহু হুয়াল গাফুরুর রাহীম’- ‘হে নবী আপনি বলুন। হে আমার বান্দারা, যারা নিজের ওপর বাড়াবাড়ি করছো, আল্লাহর হমত ও করুণা থেকে নিরাশ হয়োনা। নিশ্চয় আল্লাহ সব পাপই ক্ষমা করে দেবেন। তিনিই তো গাফুরুর রাহীম।’

    – ‘আচ্ছা আপনাদের মাঝে কি আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ আছে?’

    – হ্যাঁ।’

    আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ কেবল একজন ভালো ক্বারী, আলিম, আবিদ ও যাহিদিই ছিলেন না, সেইভাবে তিনি ছিলেন একজন কর্মঠ ও বিচক্ষণ ব্যক্তি এবং কঠিন বিপদ মুহূর্তে অগ্রগামী একজন মুজাহিদ। তাঁর জন্য এ গৌরবটুকুই যথেষ্ট যে, রাসূলুল্লাহর সা. পর তিনিই ভূ-পৃষ্ঠের প্রথম মুসলিম যিনি প্রকাশ্যে কুরাইশদের মাঝে কুরআন পাঠ করেছিলেন।

    রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীরা একদিন মক্কায় একত্রিত হলেন। তাঁরা তখন সংখ্যায় অল্প ও দুর্বল। নিজেদের মধ্যে তাঁরা বলাবলি করলেন, ‘আল্লাহর শপথ, প্রকাশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে কুরাইশদেরকে কখনও শুনানো হয়নি। তাদেরকে কুরআন শোনাতে পারে এমন কে আছে?’

    আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বললেনঃ ‘আমিই তাদেরকে শোনাবো।’ অন্যরা বললেন, ‘তোমার ব্যাপারে আমাদের ভয় হচ্ছে। আমরা এমন এক ব্যক্তিকে চাই, যার লোকজন আছে, কুরাইশরা তার ওপর কোনরূপ অত্যাচার করতে চাইলে তারা তখন বাধা দিতে পারবে।’ ইবনে মাসউদ বললেন, ‘আমাকে অনুমতি দিন। আল্লাহ আমাকে হিফাজত করবেন।’ একথা বলে তিনি মসজিদের দিকে রওয়ানা হলেন এবং মধ্যাহ্নের কিছু আগে মাকামে ইবরাহীমে এসে পৌছলেন। তিনি মাকামে ইবরাহীমের নিকট দাঁড়িয়ে জোরে জোরে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেনঃ ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রহীম। আররাহমানু আল্লামাল কুরআন, খালাকাল ইনসানা আল্লামাহুল বায়ান……।’

    তিনি তিলাওয়াতে করে যেতে লাগলেন। কুরাইশরা শুনে ক্ষণিকের জন্য চিন্তা করলো। তারপর একে অপরকে প্রশ্ন করলো, ‘ইবন উম্মু আবদ কি বলে? তার সর্বনাশ হোক! মুহাম্মাদ যা বলে তাই তো সে পাঠ করছে।’ তারা সবাই উঠে তাঁর দিকে ধেয়ে গেল এবং তাঁর মুখে নির্দয়ভাবে মারতে লাগলো। এ অবস্থায় আল্লাহ যতটুকু চাইলেন ততটুকু তিনি তিলাওয়াত করলেন। তারপর রক্তাক্ত দেহে সঙ্গীদের কাছে ফিরে এলেন। তাঁরা বললেন, ‘আমরা এরই আশংকা করছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আল্লাহর শত্রুরা এখন আমার কাছে অতি তুচ্ছ যা আগে ছিলনা। আপনারা চাইলে আগামী কালও আমি এমনটি করতে পারি।’ তাঁরা বললেন, ‘না, যথেষ্ট হয়েছে। তাদের অপছন্দনীয় কথা তুমি তাদেরকে শুনিয়ে দিয়েছ।’ হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ ইসলাম গ্রহণ করার পর কুরাইশদের অত্যাচারের শিকারে পরিণত হন। বাধ্য হয়ে দুইবার হাবশায় হিজরাত করেন।অবশেষে মাদীনায় চিরদিনের জন্য হিজরাত করে চলে যান। মদীনায় প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী হযরত মুয়াজ ইবন জাবালের অতিথি হন। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আসার পর তাঁদের দু’জনের মধ্যে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন এবং তাঁর বসবাসের জন্য মসজিদে নববীর পাশে একখণ্ড ভূমি দান করেন

    রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সকল গুরুত্বপূর্ণ ‍যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে দু’জন আনসারী যুবক ইসলামের কট্টর দুশমন আবু জাহলকে হত্যা করে ময়দানে ফেলে আসে। যুদ্ধশেষে রাসূল সা. বললেনঃ ‘কেউ যেয়ে আবু জাহলের অবস্থা একটু দেখে আস তো।’ আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ দৌড়ে চলে গেলেন। আবু জাহলের প্রাণস্পন্দন তখনও থেমে যায়নি। আবদুল্লাহ তার দাড়ি সজোরে মুট করে ধরে বললেনঃ ‘বল, তুই আবু জাহল কিনা।’

    উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া, খাইবারসহ মক্কা বিজয়েও তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথী ছিলেন। হুনাইন যুদ্ধে কাফিরদের অতর্কিত আক্রমণে দশ হাজারের মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। মাত্র আশিজন যোদ্ধা নিজেদের জীবনকে বাজি রেখে রাসূলুল্লাহর সা. চতুষ্পার্শে অটল থাকেন। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ সেই আশিজনের একজন। এ যুদ্ধে রাসূল সা. মুশরিক বাহিনীকে লক্ষ্য করে যে এক মুঠো ধূলো নিক্ষেপ করেছিলেন, রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তা তুলে দিয়েছিলেন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ।

    রাসূলুল্লাহ সা. ওফাতের পর দীর্ঘদিন যাবত সকল কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকেন। তবে হযরত উমারের রা. খিলাফতকালে হিজরী ১৫ সনে তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। জিহাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ইয়ারমুক যুদ্ধে বেরিয়ে পড়েন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন।

    হিজরী ২০ সনের খলীফা উমার রা. তাঁকে কুফার কাজী নিয়োগ করেন। কাজীর দায়িত্ব ছাড়াও বায়তুল মাল, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং কুফার ওয়ালীর উযীরের দায়িত্বও তাঁর ওপর ন্যস্ত করা হয়।

    পুরো দশ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এতগুলি দায়িত্ব তিনি পালন করেন। এ দীর্ঘ সময়ে খলীফা উমারের রা. শাহাদাত বরণ, হযরত উসমানের খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণসহ কুফার ওয়ালীর রদবদল হয়েছে, কিন্তু আবদুল্লাহ বিন মাসউদ স্বীয় পদে বহাল থাকেন। খলীফা উসমানের খিলাফতের শেষ পর্বে আবদুল্লাহকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি সঙ্গীসাথী ও পরিবার পরিচনসহ কুফা থেকে হিজাযের দিকে যাত্রা করেন। পথে মরুভূমিতে ‘রাবজা’ নামক স্থানে পৌঁছে জানতে পারেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু যার গিফার রা. সেখানে অন্তিম শয্যায়। তাঁর পৌঁছার অল্পক্ষণ পরেই আবু যার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ তাঁর জানাযার নামসাযে ইমামতি করেন এবং কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করেন। সেখান থেকে তিনি মক্কা চলে যান এবং উমরা আদায় করে মদীনায় পৌঁছেন। বাকী জীবন মদীনায় চুপচাপ কাটিয়ে দেন।

    হিজরী ৩২ সনে আবদুল্লাহর বয়স যখন ষাট বছরের ওপরে, হঠাৎ একদিন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলতে লাগলো, ‘আল্লাহ আমাকে আপনার জানাযা থেকে বঞ্চিত না করুন। গতরাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি, রাসূল সা. একটি মিম্বরের ওপর আর আপনি তাঁর সামনে। তিনি আপনাকে বলছেন, ‘ইবন মাসউদ, আমার পরে তোমাকে ভীষণ কষ্ট দেওয়া হয়েছে। এস, আমার কাছে চলে এস। এ স্বপ্ন সত্যে পরিণত হল। এ অল্প কিছুদিন পরেই তিনি রোগে আক্রান্ত হন এবং সেই রোগেই মারা যান।

    হযরত উসমানের রা. খিলাফতকালে পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন। তিনি যখন অন্তিম রোগ শয্যায়, তখন উসমান রা. একদিন তাঁকে দেখতে গেলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ

    – ‘আপনার অভিযোগ কিসের বিরুদ্ধে?’

    – ‘আমার পাপের বিরুদ্ধে।’

    – ‘আপনার চাওয়ার কিছু আছে কি?’

    – ‘আমার রবের রহমত বা করুণা।’

    – ‘বহু বছর যাবত আপনার ভাতা নিচ্ছেন না, তাকি আবার দেয়ার নির্দেশ দেব?’

    – ‘আমার কোন প্রয়োজন নেই।’

    – ‘আপনার মৃত্যুর পর আপনার কন্যাদের প্রয়োজনে আসবে।’

    – ‘আপনি কি আমার কন্যাদের দারিদ্রের ব্যাপারে ভীত হচ্ছেন? আমি তো তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি, তারা যেন প্রত্যেক রাতে সূরা ওয়াকিয়া পাঠ করে। কারণ আমি রাসূকে সা. বলতে শুনেছিঃ ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়া পাঠ করবে, কখনও দারিদ্র তাকে স্পর্শ করবে না।’

    দিনশেষে রাত্রি নেমে এলো, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ তাঁর রফীকে ’আলা- শ্রেষ্ঠতম বন্ধুর সাথে মিলিত হলেন। খলীফা উসমান তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং হযরত উসমান ইবন মাজউনের রা. পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।

  • আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)

    আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা)

    আবদুল্লাহ নাম, আবুল আব্বাস কুনিয়াত। পিতা আব্বাস, মাতা উম্মুল ফাদল লুবাবা। কুরাইশ বংশের হাশেমী শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত মায়মুনা রা. তাঁর আপন খালা।

    মহান সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রা. নানা দিক থেকেই সম্মান ও গৌরবের অধিকারী ছিলেন। রক্ত-সম্পর্কের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই। অগাধ জ্ঞান পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি আরব জাতি তথা উম্মাতে মুহাম্মাদীর ‘হাবর ও বাহর’ (পূণ্যবান জ্ঞানী ও সমুদ্র) উপাধি লাভ করেছিলেন। তাকওয়া ও পরহিযগারীর তিনি ছিলেন বাস্তব নমুনা। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি দিনে রোযাদার, রাতে ইবাদাত গোযার এবং রাতের শেষে প্রহরে তাওবাহ ও ইসতিগফারকারী। আল্লাহর ভয়ে তিনি এত বেশী কাঁদতেন যে, অশ্রুধারা তাঁর গণ্ডদ্বয়ে দু’টি রেখার সৃষ্টি করেছিল।

    ইনি সেই আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস যাঁকে উম্মাতে মুহাম্মাদীর রাব্বানী (আল্লাহকে জেনেছে এমন জ্ঞানী) বলা হয়েছে। আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআন সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী, তার ব্যাখ্যা ও ভাব সম্পর্কে অধিক পারদর্শী এবং তার রহস্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি।

    রাসূলুল্লাহর সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের তিন বছর পূর্বে তিনি মক্কার শিয়াবে আবী তালিবে জন্মগ্রহণ করেন। কুরাইশরা তাঁর গোত্র বনু হাশিমকে বয়কট করার কারণে তারা তখন শিয়াবে আবী তালিবে জীবন যাপন করছিল। রাসূলুল্লাহ সা. ওফাতের সময় তিনি তের বছরের একজন কিশোর মাত্র। এতদসত্ত্বেও তিনি রাসূলুল্লাহর সা. এক হাজার ছ’শ’ ষাটটি বাণী বা হাদীস স্মৃতিতে সংরক্ষণ করে মুসলিম জাতির বিশেষ কল্যাণ সাধন করেন, সহীহুল বুখারী  সহীহ মুসলিমে যার অনেকগুলিই বর্ণিত হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ পিতা হযরত আব্বাস দৃশ্যতঃ মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে হিজরী ৮ম সনে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবন সাদের বর্ণনা মতে উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজার পর উম্মুল ফাদলই মহিলাদের মধ্যে সর্বপ্রথম ঈমান আনেন। তাই হযরত আবদুল্লাহ জন্মের পর থেকেই তাওহীদের পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং বুদ্ধি বিবেক হওয়ার পর এক মজবুত ঈমানের অধিকারী মুসলমান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

    তাঁর মা প্রখ্যাত সাহাবিয়্যা উম্মুল ফাদল লুবাবা বিনতুল হারিস আল-হিলালিয়্যা আবদুল্লাহ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁকে কোলে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে যায়। রাসূল সা. নিজের পবিত্র মুখ থেকে একটু থু থু নিয়ে শিশু আবদুল্লাহর মুখে দিয়ে তাঁর তাহনীক করেন। এভাবে তার পেটে পার্থিব কোন বস্তু প্রবেশের পূর্বেই রাসূলে পাকের পবিত্র ও কল্যাণময় থু থু প্রবিষ্ট হয়। আর সেইসাথে প্রবেশ করে তাকওয়া ও হিকমাত।

    তাঁর পিতা হযরত ’আব্বাস হিজরী ৮ম সনে মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে সপরিবারে মদীনায় হিজরাত করেন। আবদুল্লাহর বয়স তখন এগারো বছরের বেশী হবে না। কিন্তু তখনও তিনি অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্যে কাটাতেন। একবার বাড়ী ফিরে এসে তিনি বর্ণনা করেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এমন এক ব্যক্তিকে দেখেছি, যাকে আমি চিনিনে।’ হযরত আব্বাস একথা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ব্যক্ত করলে রাসূল সা. আবদুল্লাহকে ডেকে নিজের কোলে বসান এবং মাথায় হাত বুলিয়ে দু’আ করেন; ‘হে আল্লাহ, তাকে বরকত দিন এবং তার থেকে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন।’

    সাত বছর থেকেই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সেবা ও খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন। অজুর প্রয়োজন হলে তিনি পানির ব্যবস্থা করতেন, নামাযে দাঁড়ালে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে ইকদেতা করতেন এবং সফরে রওয়ানা হলে তিনি তাঁর বাহনের পেছনে আরোহন করে তাঁর সফরসঙ্গী হতেন। এভাবে ছায়ার ন্যায় তিনি তাঁকে অনুসরণ করতেন এবং নিজের মধ্যে সর্বদা বহন করে নিয়ে বেড়াতেন একটি সজাগ অন্তঃকরণ, পরিচ্ছন্ন মস্তিষ্ক এবং আধুনিক যুগের যাবতীয় রেকর্ডিং যন্ত্রপাতি থেকে অধিক শক্তিশালী একটি স্মৃতিশক্তি।

    হযরত আবদুল্লাহ যদিও স্বভাবগতভাবেই ছিলেন শান্তশিষ্ট, বুদ্ধিমান ও চালাক, তবুও তিনি জীবনের যে অধ্যায় রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য লাভের সুযোগ লাভ করেন মূলতঃ সে বিষয়টি মানুষের জীবনের খেলাধূলার সময়। তিনি স্মৃতিচারণ করেছেনঃ আমি অন্য ছেলেদের সাথে গলিতে, রাস্তা-ঘাটে খেলা করতাম। একদিন পেছনের দিক থেকে রাসূলুল্লাহকে সা. আসতে দেখলাম। আমি তাড়াতাড়ি একটি বাড়ীর দরজার আড়ালে দিয়ে পালালাম। কিন্তু তিনি আমাকে ধরে ফেললেন। আমার মাথায় হাত রেখে বললেনঃ ‘যাও, মুয়াবিয়াকে ডেকে আন।’ মুয়াবিয়া ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. কাতিব বা সেক্রেটারী। আমি দৌড়ে তাঁর কাছে গিয়ে বললামঃ ‘চলুন, রাসূল সা. আপনাকে ডাকছেন।’

    উম্মুল মু’মিনীন হযরত মায়মূনা রা. হযরত আবদুল্লাহর খালা হওয়ার কারনে অধিকাংশ সময়ে তাঁর কাছে কাটাতেন। অনেক সময় রাতে তাঁর ঘরেই শুয়ে পড়তেন। এ কারণে খুব নিকট খেলে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য লাভে তিনি ধন্য হয়েছেন। রাতে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তাহাজ্জুদ নামায আদায় ও তাঁর অজুর পানি এগিয়ে দেওয়ার সুযোগও লাভ করেছেন। একবার হযরত মায়মূনার ঘরে তাহাজ্জুদ নামাযে রাসূলুল্লাহর সা. বাম দিকে দাঁড়িয়ে গেলে তিনি আবদুল্লাহর মাথা ধরে ডান দিকে দাঁড় করিয়ে দেন।

    হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস নিজের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ একদিন রাসূলুল্লাহ সা. অজু-করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। আমি দ্রুত পানির ব্যবস্থা করে দিলাম। আমার কাজে তিনি খুব খুশী হলেন। নামাযে যখন দাঁড়ালেন তখন আমাকে তাঁর পাশে দাঁড়াবার জন্য ইংগিত করলেন। কিন্তু আমি তাঁর পেছনে দাঁড়ালাম। নামায শেষ করে আমার দিকে ফিরে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবদুল্লাহ আমার পাশে দাঁড়াতে কিসে তোমাকে বিরত রাখলো?’ বললামঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার দৃষ্টিতে আপনি মহা সম্মানিত এবং আপনি এতই মর্যাদাবান যে, আমি আপনার পাশাপাশি হওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করিনি।’ সাথে সাথে তিনি আকাশের দিকে দু’হাত তুলে দু’আ করলেন, ‘আল্লাহুম্মা আতিহিল হিকমাহ্‌’- ‘আল্লাহ, আপনি তাকে হিকমাত বা বিজ্ঞান দান করুন।’ আর একবার রাতের বেলা রাসূলুল্লাহর সা. অজুর পানি এগিয়ে দিলে তিনি আবদুল্লাহর জন্য দু’আ করেন এই বলেঃ ‘আল্লাহুম্মা ফাক্‌কিহ্‌হু ফিদদীন ওয়া আল্লিমহুত তাবীল- হে আল্লাহ, তাকে দ্বীনের ফকীহ বানিয়ে দাও, তাকে তাবীল বা ব্যাখ্যা পদ্ধতি শিখাও।’

    আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় নবীর এ দু’আ কবুল করেন এবং হাশেমী বালককে এত অধিক জ্ঞান দান করেন যে, বড় বড় জ্ঞানীদের তিনি ঈর্ষার পাত্রে পরিণত হন। তাঁর অগাঘ জ্ঞান তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার বিচিত্র ঘটনাবলী ইতিহাস ও জীবনী গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে।

    রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের সময় আবদুল্লাহর বয়স মাত্র তের বছর। এর সোয়া দুই বছর পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর ইনতিকাল করেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত ’উমারের খিলাফতকালে তিনি যৌবনে পদার্পণ করেন। খলীফা ’উমার রা. তাঁকে স্বীয় সান্নিধ্যে তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাকে গুরুত্বপূর্ণ মজলিসে বড় বড় সাহাবীদের সাথে বসার অনুমতি দিতেন। বদরী সাহাবীদের সাথেও বসার অনুমতি তাঁকে দেওয়া হয়। মুহাদ্দিস ইবন আবদিল বার বলেনঃ ‘উমার ইবন আব্বাসকে ভালোবাসতেন এবং তাঁকে সান্নিধ্য দান করতেন।

    তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের রা. যুগে হিজরী ২৭ সনে মিসরের ওয়ালী আবদুল্লাহ ইবন আবী সারাহর নেতৃত্বে আফ্রিকায় একটি অভিযান পরিচালিত হয়। হযরত আব্দুল্লাহ মদীনা থেকে একটি বাহিনী নিয়ে এ অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং মুসলিম পক্ষের দূত হিসাবে আফ্রিকার বাদশাহ জারজীরের সাথে আলোচনা করেন। বাদশাহ তাঁর প্রখর মেধা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে মন্তব্য করেনঃ ‘আমার ধারণা, আপনি আরবদের একজন মহাজ্ঞানী ব্যক্তি।’

    হিজরী ৩৫ সনে হযরত উসমান রা. বিদ্রোহীদের দ্বারা গৃহবন্দী হলে তিনি আবদুল্লাহকে স্বীয় প্রতিনিধি হিসাবে আমীরে হজ্জ নিয়োগ করে মক্কায় পাঠান। সে বছর তারই নেতৃত্বে হজ্জ অনুষ্ঠিত হয়। হজ্জ থেকে যখন মদীনায় ফিরে আসলেন, মদীনা তখন উত্তপ্ত। খলীফা উসমান রা. বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদাত বরণ করেছেন এবং মদীনা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। তাঁরা খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণের জন্য হযরত আলীকে চাপ দিচ্ছে। হযরত আলী রা. আবদুল্লাহর সাথে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। আবদুল্লাহ পরিস্থিতির বিস্তারিত বিশ্লেষণের পর দয়িত্বভার গ্রহণ না করার জন্য আলীকে রা. পরামর্শ দেন। হযরত আলী দায়িত্ব গ্রহণ করলে যেসব পরিস্থিতির উদ্ভব হবে বলে তিনি ধারণা করেন, পরবর্তীকালে তা সবই সত্যে পরিণত হয়।

    উটের যুদ্ধে হযরত আবদুল্লাহ হযরত আীলর পক্ষে হিজাযী বাহিনীর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। হযরত আলী তাঁকে বসরার ওয়ালী নিয়োগ করেন। বসরা থেকে একটি বাহিনী নিয়ে তিনি সিফফিনের যুদ্ধে আলীর রা. পক্ষে অংশগ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে, হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার রা. মধ্যে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয। সিফ্‌ফিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হযরত আলী রা. হযরত আবদুল্লাহকে তাঁর পক্ষে সালিশ নিযুক্ত করতে চান, কিন্তু অন্যদের আপত্তির কারণে তাঁর সে চাওয়া বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

    হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার রা. মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের সময় আলীর রা. কিছু সঙ্গী যখন তাঁকে ছেড়ে চলে গেল, তখন আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস আলীকে বললেন, ‘আমীরুল মুমিনীন, আপনি আমাকে তাঁদের কাছে গিয়ে একটু কথা বলার অনুমতি দিন।’ তিনি বললেন, ‘আমি তাদের পক্ষ থেকে আপনার ওপর যে কোন ধরনের বাড়াবাড়ির আশংকা করছি।’ আবদুল্লাহ বললেন, ‘ইনশাআল্লাহ তেমন কিছু হবে না।’

    আবদুল্লাহ তাদের কাছে গিয়ে উপলব্ধি করলেন তাদের চেয়ে এত বেশী একাগ্রচিত্তে ইবাদাতে নিমগ্ন অন্য কোন সম্প্রদায় ইতিপূর্বে আর কখনও তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়নি। তারা বলল, ‘ইবন আব্বাস, আপনাকে খোশ আমদেদ! তবে আপনি কি জন্য এসেছেন?’ বললেন, ‘আপনাদের সাথে কিছু আলোচনার জন্য।’ তাদের কেউ কেউ বলল, ‘এর সাথে আলোচনার প্রয়োজন নেই।’ তবে কেউ কেউ বলল, ‘ঠিক আছে, বলুন, আপনার কথা আমরা শুনি।’ তিনি বলেলেন, ‘রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই, তাঁর জামাই এবং তাঁর ওপর প্রথম পর্যায়ে ঈমান পোষণকারী ব্যক্তি অর্থাৎ আলীর প্রতি এমন চরম মনোভাব পোষণ করছেন কেন?’ তারা বলল, ‘আমরা তাঁর তিনটি কাজের বদলা নিতে চাই।’ তিনি বরলেন, ‘সে তিনটি কাজ কি কি?’ তারা বলল,

    ১. সিফফিনের যুদ্ধক্ষেত্রে আবু মুসা আশয়ারী ও আমর ইবনুল আসকে শালিশ নিযুক্ত করে তিনি আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক নিযুক্ত করেছেন।

    ২. আয়িশা ও মুয়াবিয়ার সাথে তিনি যুদ্ধ করেছেন, কিন্ত‍ু তাদের ধন-সম্পদ গণিমাত হিসাবে এবং যুদ্ধবন্দীদেরকে দাস-দাসী হিসাবেও গ্রহণ করেননি।

    ৩. মুসলমানরা তাঁর হাতে বাইয়াত গ্রহণ করে তাঁকে আমীর হিসাবে মেনে নেওয়া সত্ত্বেও তিনি ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি পরিহার করেছেন।

    জবাবে ইবন আব্বাস বললেন,

    ‘যদি আমি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের হাদীস থেকে এমন কিছু কথা আপনাদের সামনে পেশ করতে পারি যা আপনারা অস্বীকার করতে পারেন না, তাহলে আপনারা যে বিশ্বাসের ওপর আছেন তা থেকে কি প্রত্যাবর্তন করবেন?’ তাঁরা সম্মতিসূচক জবাব দিলে তিনি বললেন,

    ‘আপনাদের অভিযোগ, তিনি দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে বিচারক বিযুক্ত করে অপরাধ করেছেন। অথচ আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ

    ‘‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইহরাম অবস্থায় শিকার করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ যদি স্বেচ্ছায় কোন কিচু শিকার করে, তাহলে তোমাদের অন্তর্গত দুইজন সুবিচারক সে সম্পর্কে যে আদেশ করে সে অনুযায়ী অনুরূপ একটি পশু বিনিময় হিসাবে কাবায় উপস্থিত করবে।’’ (আলমায়িদাঃ ৯৫)

    ‘আল্লাহর নামে আমি শপথ করে বলছি, চার দিরহাম মূল্যের একটি নিহত খরগোশের ব্যাপারে বিচারক নিয়োগ করা থেকে মানুষের রক্ত ও জীবন রক্ষা এবং তাদের পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসার উদ্দেশ্যে মানুষকে বিচারক নিয়োগ করা অধিক যুক্তিসংগত নয় কি?’

    তারা বলল, ‘হাঁ, মানুষের রক্তের নিরাপত্তা ও তাদের পারস্পরিক বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য বিচারক নিয়োগ অধিক সংগত।’ ইবন আব্বাস বললেন, ‘আমরা তাহলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ।’

    ইবন আব্বাস বললেন, ‘আপনারা বলছেন, আলী ‍যুদ্ধ করেছেন আয়িশা ও মুয়াবিয়ার বিরুদ্ধে, কিন্তু তাদের বন্দী করে দাস-দাসী বানাননি। আপনারা কি চান আপনাদের মা আয়িশাকে দাসী বানানো হোক এবং অন্যান্য দাসীদের সাথে যেমন আচরণ করা হয় তাঁর সাথেও তেমন করা হোক? উত্তরে যদি হাঁ বলেন তাহলে আপনারা কাফির হয়ে যাবেন। (কারণ শরীয়াতে দাসীর সাথে স্ত্রীর ন্যায় আচরণ বৈধ)’

    আর যদি বলেন, ‘আয়িশা’ আমাদের মা নন, তাহলেও আপনারা কাফির হবেন। কারণ, আল্লাহ বলছেনঃ

    ‘‘নবী মুমিনদের ওপর তাদের নিজেদের অপেক্ষা অধিকতর স্নেহশীল এবং তাঁর সহধর্মিনীগণ তাদের জননী।’’ (সূরা আলআহযাবঃ ৩৬)

    ‘এখন এ দুটি জবাবের যে কোন একটি আপনারা বেছে নিন।’ তারপর তিনি বললেন, ‘আমরা তাহলে এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?’ তারা বলল, ‘হাঁ।’

    সবশেষে তিনি বললেন, ‘‘আলী ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধিটি পরিহার করেছেন, আপনারা এ অভিযোগ তুলেছেন। অথচ হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়ে রাসূলুল্লাহ সা. ও মক্কার মুশরিকদের মধ্যে যে চুক্তিটি সম্পাদিত হয়, তাতে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.’ বাক্যটি লেখা হলে কুরাইশরা বলেছিলঃ আমরা যদি বিশ্বাসই করতাম আপনি আল্লাহর রাসূল, তাহলে আমরা আপনার কা’বা শরীফে পৌঁছার পথে প্রতিবন্ধক হতাম না বা আপনার সাথে সংঘর্ষেও লিপ্ত হতাম না। আপনি বরং এ বাক্যটির পরিবর্তে ‘মুহাম্মাদ ইবনু আবদিল্লাহ’ কথাটি লিখুন। সেদিন কিন্তু রাসূল সা. এ কথা বলতে বলতে তাদের দাবী মেনে নিয়েছিলেন- ‘আল্লাহর কসম, আমি সুনিশ্চিতভাবে বলছি, আমি আল্লাহর রাসূল- তা তোমরা আমাকে যতই অস্বীকার করনা কেন।’ আলী ঠিক একই কারণে ‘আমীরুল মুমিনীন’ লকবটি পরিহার করেছেন। কারণ, মুয়াবিয়া যদি তাঁকে ‘আমীরুল মুমিনীন’ বলে স্বীকারই করে নিতেন তাহলে তো কোন বিরোধই থাকতো না।’’ একথার পর তিনি বললেন, ‘তাহলে আমরা এ ব্যাপারেও সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম?’ তারা বলল, ‘হাঁ।’

    হযরত আলীর পক্ষত্যাগীদের সাথে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসের এ জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় তাঁরা তৃপ্ত হল এবং তাঁর বলিষ্ঠ যুক্তিকে তাঁরা অকুণ্ঠচিত্তে মেনে নিল। এ সাক্ষাতকারের পর বিশ হাজার লোক আবার আলীর দলে প্রত্যাবর্তন করে এবং অবশিষ্ট চার হাজার লোক আলীর শত্রুতার হঠকারী সিদ্ধান্তে অটল থাকে।

    চরমপন্থী খারেজীদের সাথে ‘নাহরাওয়ান’ নামক স্থানে হযরত আলীর রা. যে যুদ্ধ হয়। আবদুল্লাহ বসরা থেকে সাত হাজার সৈন্যসহ এ যুদ্ধে যোগদান করেন। হযরত আলী বসরার সাথে অধিকৃত সমগ্র ইরানেও আবদুল্লাহকে ওয়ালী নিয়োগ করেন। তিনি ইরানের খারেজী বিদ্রোহ নির্মূল করেন।

    একটি বর্ণনা মতে, আলীর রা. খিলাফতকালেই হযরত আবদুল্লাহ বসরার গভর্নরের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করে মক্কায় চলে যান। কারণ স্বরুপ বলা হয়েছে, বসরার কাজী আবূর আসওয়াদ দুয়ালী ও তাঁর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন। তবে অন্য একটি বর্ণনা মতে, তিনি হযরত আলীর রা. খিলাফতের শেষ পর্যন্ত বসরার ওয়ালীর দায়িত্ব পালন করেন এবং হযরত মুয়াবিয়ার রা. খিলাফতের সূচনাতে তিনি মক্কায় চলে যান এবং নির্জনে বসবাস করতে থাকেন।

    হযরত ইমাম হুসাইন রা. কুফাবাসীদের আমন্ত্রণে যখন মদীনা থেকে মক্কা হয়ে কুফায় রওয়ানা হচ্ছিলেন, হযরত আবদুল্লাহ তাঁকে কুফাবাসীদের গাদ্দারীর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কারবালার ইমাম হুসাইনের সপরিবারে শাহাদাত বরণে হযরত আবদুল্লাহ ভীষণ আঘাত পান। মক্কায় অবস্থান করলেও হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের রা. হাতে বাইয়াত করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তাঁকে খিলাফতের হকদার বলে মনে করতেন। বুখারী শরীফের একটি হাদীসের ভিত্তিতে একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কারণে তাঁর মক্কায় অবস্থান কিছুটা কষ্টকর হয়ে পড়ে। তিনি তায়েফে চলে যান। শেষ জীবনে অসুস্থ হয়ে যান এবং তায়েফেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

    হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস জ্ঞানার্জনের জন্য অক্লান্ত সাধনা ও পরিশ্রম করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি সব ধরণের পথ ও পন্থা অবলম্বন করেন। রাসূলের সা. জীবদ্দশায় তিনি তাঁর অমিয় ঝর্ণাধারা থেকে দু’টি অঞ্জলি ভরে গ্রহণ করেন এবং তাঁর ওফাতের পর বিশিষ্ট সাহাবীদের নিকট থেকে জ্ঞানতৃষ্ণা মেটাতে থাকেন। জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে তিনি যে কত বিনয়ী ও কষ্টসহহিষ্ণু ছিলেন তাঁর নিজের একটি বর্ণনা থেকেই তা অনুমান করা যায়। তিনি বলেনঃ

    ‘‘আমি যখনই অবগত হয়েছি, রাসূলুল্লাহর সা. কোন সাহাবীর নিকট তাঁর একটি হাদীস সংরক্ষিত আছে, আমি তাঁর ঘরের দরজায় উপনীত হয়েছি। মধ্যাহ্নকালীন বিশ্রামের সময় উপস্থিত হলে তাঁর দরজার সামনে চাদর বিছিয়ে শুয়ে পড়েছি। বাতাস ধূলাবালি উড়িয়ে আমার জামা-কাপড় ও শরীর হয়তো একাকার করে ফেলেছে। অথচ আমি সাক্ষাতের অনুমতি চাইলে তখনই অনুমতি দিতেন। শুধুমাত্র তাঁকে প্রশ্ন করার উদ্দেশ্যেই আমি এমনটি করেছি। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে আমার এ দুরবস্থা দেখে বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. চাচাতো ভাই, আপনি কি উদ্দেশ্যে এসেছেন? আমাকে খবর দেননি কেন, আমি নিজেই গিয়ে দেখা করে আসতাম। বলেছি, আপনার নিকট আমারই আসা উচিত। কারণ জ্ঞান এসে গ্রহণ করার বস্তু, গিয়ে দেয়ার বস্তু নয়। তারপর তাঁকে আমি হাদীস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি।’’

    জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে ইবন আব্বাস ছিলেন বিনয়ী। তিনি জ্ঞানীদের উপযুক্ত কদরও করতেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। একদিন কাতিবে ওহী ও বিচার, ফিকাহ, কিরায়াত ও ফারায়েজ শাস্ত্রে মদীনাবাসী পণ্ডিতদের নেতা যায়িদ বিন সাবিত রা. তাঁর বাহনের পিঠে আরোহন করবেন, এমন সময় হাশেমী যুবক আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস মনিবের সামনে দাসের দাঁড়াবার ভংগিতে তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং বাহনের লাগাম ও জিনটি ধরে তাঁকে আরোহণ করতে সাহায্য করলেন। যায়িদ রা. তাঁকে বললেন, ‘রাসূলের সা. চাচাতো ভাই, এ আপনি কি করছেন, ছেড়ে দিন।’ ইবন আব্বাস বললেন, ‘আমাদের উলামা ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে এরূপ আচরণ করার জন্যই আমরা আদিষ্ট হয়েছি।’ যায়িদ রা,. বললেন, ‘আপনার একটি হাত বাড়িয়ে দিন।’ তিনি একখানা হাত বাড়িয়ে দিলে যায়িদ রা. ঝুঁকে পড়ে তাতে চুমু খেলেন এবং বললেন, ‘আমাদের নবী-পরিবারের লোকদের সাথে এরূপ আচরণ করার জন্যও আমরা আদিষ্ট হয়েছি।’

    জ্ঞান অন্বেষণে হযরত ইবন ইবন আব্বাসের অভ্যাস, একাগ্রতা কর্মপদ্ধতি দেখে সে যুগের বড় বড় জ্ঞানী ও মনীষীরা চরম বিস্ময়বোধ করেছেন। ‘মাসরুক ইবনুল আজদা’- একজন শ্রেষ্ঠ তাবেয়ী, বলেন, ‘‘আমি যখন ইবন আব্বাসকে দেখলাম, বললাম, ‘সুন্দরতম ব্যক্তি।’ যখন তিনি কথা বললেন, বললাম, ‘সর্বোত্তম প্রাঞ্জলভাষী’ এবং যখন তিনি আলোচনা করলেন, বললাম, ‘সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি।’’

    জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে যখন তিনি কিছুটা আত্মতৃপ্তি অনুভব করলেন তখন মানুষকে শিক্ষাদানের ব্রত কাঁধে তুলে নিলেন। আর তখন থেকেই তাঁর বাড়িটি একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। যে অর্থে আজ আমরা বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটি ব্যবহার করে থাকি সে অর্থে তার বাড়ীটিকে বিশ্ববিদ্যালয় বললে অত্যুক্তি হয়না। তবে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ইবন আব্বাস বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে পার্থক্য এখানে যে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকেন বহু শিক্ষক আর সেখানে ছিলেন একজন শিক্ষক। তিনি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু।

    ইবন আব্বাসের এক সঙ্গী বর্ণনা করেন, ‘আমি ইবন আব্বাসের এমন একটি মাহফিল দেখেছি যা গোটা কুরাইশ গোত্রের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। দেখলাম তাঁর বাড়ীর সম্মুখের রাস্তাটি লোকে লোকারণ্য। আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বাড়ীর দরজায় মানুষের প্রচণ্ড ভীড়ের কথা জানালাম। তিনি অজুর জন্য পানি আনালেন। অজু করলেন। তারপর বসে বললেনঃ ‘তুমি বাইরে গিয়ে অপেক্ষমান লোকদের বল, যারা কুরআন ও কিরায়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাও, ভেতরে যাও।’ আমি বেরিয়ে গিয়ে তাদেরকে একথা বললাম। বলার পর এত বিপুল সংখ্যক লোক ভেতরে প্রবেশ করল যে, কক্ষটি এমনকি সম্পূর্ণ বাড়ীটি পূর্ণ হয়ে গেল। তারা যা কিছু জানতে চাইলো তিনি তাদেরকে অবহিত করলেন। তারপর বললেন, তোমাদের অপেক্ষমান ভাইদের জন্য পথ ছেড়ে দাও।’ তারা চলে গেল।

    অতঃপর তিনি আমাকে বললেন, ‘বাইরে গিয়ে বল, যারা কুরআনের তাফসীর ও তাবীল সম্পর্কে জানতে চাও, ভেতরে যাও।’ আমি বেরিয়ে গিয়ে তাদেরকে একথা বললাম। বলার পর লোকে ঘর ভরে গেল। তাদের সব জিজ্ঞাসারই তিনি জবাব দিলেন এবং অতিরিক্ত অনেক কিছুই অবহিত করলেন। তারপর বললেন, ‘তোমাদের অপেক্ষমান ভাইদের জন্য পথ ছেড়ে দাও।’ তারা বেরিয়ে গেল।

    তিনি আমাকে আবার বললেন, ‘তুমি বাইরে ‍গিয়ে যারা হালাল, হারাম ও ফিকাহ সম্পর্কে জানতে চায় তাদেরকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও।’ আমি বেরিয়ে গিয়ে তাদেরকে পাঠালাম। তাদের সংখ্যাও এত ছিল যে ঘরটি সম্পূর্ণরূপে ভরে গেল। তাদের সকল জিজ্ঞাসার জবাব দানের পর তাদেরকে পরবর্তী লোকদের জন্য স্থান ছেড়ে দিতে বললেন। তারা চলে গেল।

    তিনি আমাকে আবার পাঠালেন এবং ফারায়েজ ও তৎসংক্রান্ত মাসলা-মাসায়েল সম্পর্কে যারা জানতে চায় তাদেরকে আহ্‌বান জানালেন। এবারও ঘরটি ভরে গেল। তাদের সকল জিজ্ঞাসার সন্তোষজনক জবাব দানের পর পরবর্তী লোকদের জন্য স্থান ছেড়ে দিতে বললেন। তারা চলে গেল। তিনি আমাকে আবার পাঠালেন। বললেন, ‘যারা আরবী ভাসা, কবিতা এবং আরবদের বিস্ময়কর সাহিত্য সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক তাদেরকে পাঠিয়ে দাও।’ আমি তাদেরকে পাঠালাম। এবারো ঘর ভরে গেল। তিনি তাদের সব প্রশ্নের জবাব দিয়ে তুষ্ট করে বিদায় দিলেন। বর্ণনাকারী মন্তব্য করেন, ‘সমগ্র কুরাইশ গোত্রের গৌরব ও গর্বের জন্য এই একটিমাত্র সমাবেশই যথেষ্ট।’

    এমন ভীড়ের কারণেই ইবন আব্বাস পরবর্তীকালে একেকটি বিষয়ের জন্য সপ্তাহের একটি দিন নির্ধারণ করেছিলেন। ফিকাহ্‌, মাগাযী, কবিতা, প্রাচীন আরবের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দিতে তিনি আলোচনা করতেন। তাঁর এসব আলোচনার মজলিসে যত বড় জ্ঞানীই উপস্থিত হতেন না কেন, তিনি পরিতৃপ্ত হয়ে ফিরতেন।

    হযরত ইবন আব্বাস তাঁর অপরিসীম জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির কল্যাণে অল্পবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও খিলাফতে রাশেদার মজলিসে শূরার সদস্য হওয়ার গৌরব লাভ করেছিলেন। হযরত উমার রা. কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে প্রবীণ ও বিদ্বান সাহাবীদের আহ্‌বান জানাতেন। সেই সাথে আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকেও ডেকে পাঠাতেন। তিনি উপস্থিত হলে হযরত উমার তাঁর যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করে বলতেন, ‘আমরা এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছি, তুমি ও তোমার মত আর যারা আছ সমাধান বের কর।’

    একবার প্রবীণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবীদের মজলিসে হযরত উমার অন্যদের তুলনায় আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকে একটু বেশী গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিলেন। তখন আবদুল্লাহ একজন যুবক। এ ব্যাপারে তিনি প্রবীণ সাহাবীদের সমালোচনার সম্মুখীন হন। কেউ কেউ বলেন, ‘আমাদেরও তো তার বয়সী ছেলে ও নাতিরা রয়েছে, আমরাও তো তাদেরকে নিয়ে আসতে পারি।’ হযরত উমার তখন কুরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করে আবদুল্লাহকে পরীক্ষা করেন। সে পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন। তখন উমার বলে, ‘আবদুল্লাহ তো বুদ্ধদের মত যুবক। তার আছে একটি জিজ্ঞাসু যবান ও সচেতন অন্তঃকরণ।’

    হিশাম ইবন উরওয়া তাঁর পিতা উরওয়াহকে ইবন আব্বাসের জ্ঞানের গভীরতা ও তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘ইবন আব্বাসের তুল্য জ্ঞানী লোক আমার নযরে পড়েনি।’

    আমর ইবন হাবশী বলেন, ‘আমি ইবন উমারকে একটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ তুমি ইবন আব্বাসের কাছে যাও এবং তাকেও জিজ্ঞেস কর। কারণ মুহাম্মাদের সা. ওপর যা কিছু অবতীর্ণ হয়েছে সে সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যাঁরা অবশিষ্ট আছেন তাঁদের মধ্যে তিনিই অধিক জ্ঞানী।’’

    তাফসীর শাস্ত্র ও অন্যান্য ইসলামী বিষয়সমূহে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের মূলে ছিল প্রথমত তাঁর রাসূলে করীমের সা. সান্নিধ্য লাভ ও সেবার সুযোগ। দ্বিতীয়ত তাঁর জন্য রাসূলুল্লাহর সা. দু’আ। তৃতীয়তঃ জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাঁর অপরিসীম আগ্রহ এবং অক্লান্ত চেষ্টা সাধনা।

    যায়িদ ইবন সাবিত মারা গেলে হযরত আবু হুরাইরা মন্তব্য করেছিলেন ‘এই উম্মাতের বিজ্ঞ আলিম মৃত্যুবরণ করলেন এবং আশা করি আল্লাহতা’আলা আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করবেন।’

    হযরত ইবন আব্বাস বিশিষ্ট ছাত্র ও ব্যক্তিদের শিক্ষাদানের সাথে সাথে সাধারণ লোকদের সম্পর্কেও সচেতন ছিলেন। মাঝে মাঝে বিশেষ মাহফিলের মাধ্যমে তিনি জনসাধারণকে ওয়াজ-নসিহত করতেন।

    নিজে না করে অন্যকে করতে বলেন, ইবন আব্বাস এ ধরণের লোক ছিলেন না। তিনি ছিলেন দিনে রোযাদার ও রাতে ইবাদাত গোযার। আবদুল্লাহ ইবন মুলাইকা বলেন ‘‘একবার আমি ইবন আব্বাসের সাথে মক্কা থেকে মদীনা পর্যন্ত সফর করলাম। বিশ্রামের জন্য যখনই কোথাও তাঁবু গেড়েছি, রাতের একটি বিশেষ অংশ তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাটিয়ে দিতেন। অথচ অন্য সফরসঙ্গীরা তখন ক্লান্তি ও শ্রান্তিতে গভীর ঘুমে অচেতন। একদিন রাত্রে একাগ্রচিত্তে তাঁকে আমি পাঠ করতে শুনলামঃ

    وَجَاءَتْ سَكْرَةُ الْمَوْتِ بِالْحَقِّ ۖ ذَٰلِكَ مَا كُنتَ مِنْهُ تَحِيدُ

    ‘এবং মৃত্যুর বিকার সত্যভাবেই সমুপস্থিত। এ হচ্ছে তা-ই যা থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াতে।’ (ক্বাফঃ ১৯)

    বারবার তিনি এ আয়াতটি আওড়াচ্ছেন আর কাঁদছেন। সুবহে সাদিক পর্যন্ত তিনি এভাবে কাটিয়ে দিলেন।’’

    ৬৮ হিজরী মুতাবিক ৬৮৬/৮৮ খ্রীস্টাব্দে তায়েফ নগরে তিনি ইনতিকাল করেন। ওফাতের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল একাত্তর বছর। মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যা তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। তায়েফ নগরে ‘মসজিদে ইবন আব্বাস’ নামক বিশাল মসজিদটি আজও  তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে। এ মসজিদেরই পেছনের দিকে এক পাশে এ মহান সাহাবীর কবর। তাঁকে কবরে সমাহিত করার পর কুরআনের এ আয়াতটি পঠিত হয়েছিলঃ

    يَا أَيَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّةُ – ارْجِعِي إِلَىٰ رَبِّكِ رَاضِيَةً مَّرْضِيَّةً – فَادْخُلِي فِي عِبَادِي – وَادْخُلِي جَنَّتِي –

    ‘হে পরিতুষ্ট আত্মা! তুমি প্রসন্ন ও সন্তুষ্ট অবস্থায় তোমার প্রতিপালকের দিকে প্রত্যাবর্তন কর। অতঃপর আমার বান্দাগণের মধ্যে প্রবিষ্ট হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’ (আলফজরঃ ২৭৩০)

  • যায়িদ ইবন হারিসা (রা)

    যায়িদ ইবন হারিসা (রা)

    আবু উসামা যায়িদ নাম। হিব্‌বু রাসূলিল্লাহ (রাসূলুল্লহার প্রীতিভাজন) তাঁর উপাধি, পিতা হারিসা এবং মাতা সু’দা বিনতু সা’লাবা।

    সু’দা বিনতু সা’লাবা তাঁর শিশু পুত্র যায়িদকে সঙ্গে করে পিতৃ গোত্র বনী মা’নের নিকট যাওয়ার জন্য যাত্রা করলেন। পিতৃ-গোত্রে পৌঁছার পূর্বেই একদিন রাতে বনী কায়নের লুটেরা দল তাঁদের তাঁবু আক্রমণ করে ধন সম্পদ, উট ইত্যাদি লুণ্ঠন এবং শিশুদের বন্দী করে নিয়ে যায়। এই বন্দী শিশুদের মধ্যে তাঁর পুত্র যায়িদ ইবন হারিসাও ছিলেন।

    যায়িদের বয়স তখন আট বছর। লুটেরা দল তাঁকে বিক্রির উদ্দেশ্যে ‘উকাজ’ মেলায় নিয়ে যায়, হাকীম ইবন হিযাম ইবন খুয়াইলিদ নামে এক কুরাইশ নেতা চার শো’ দিরহামে তাঁকে খরীদ করেন। তাঁর সাথে আরো কিছু দাস খরীদ করে তিনি মক্কায় ফিরে আসেন।

    হাকীম ইবন হিযামের প্রত্যাবর্তনের খবর শুনে তাঁর ফুফু খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ দেখা করতে আসেন। ফুফুকে তিনি বলেনঃ ফুফু উকাজ থেকে আমি বেশ কিছু দাস খরীদ করে এনেছি। এদের মধ্যে যেটা আপনার পসন্দ হয় বেছে নিন। আপনাকে হাদিয়া হিসাবে দান করলাম।

    হযরত খাদীজা দাসগুলির চেহারা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করার পর যায়িদ ইবন হারিসাকে চয়ন করলেন। কারণ, তিনি যায়িদের চেহারায় তীক্ষ্ণ মেধা ও বুদ্ধির ছাপ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি তাঁকে সঙ্গে করে বাড়ীতে নিয়ে এলেন।

    এ ঘটনার কিছু দিন পর মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর সাথে খাদীজা পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি স্বামীকে কিছু উপহার দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। প্রিয় ক্রীতদাস যায়িদ ইবন হাসিরা অপেক্ষা অধিকতর সুন্দর কোন জিনিস তিনি খুঁজে পেলেন না। এ ক্রীতদাসটিকেই তিনি স্বামীর হাতে তুলে দিলেন।

    এ সৌভাগ্যবান বালক ক্রীতদাস মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। তাঁর মহান সাহচর্য লাভ করে উত্তম চারিত্রিক সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলেন। এ দিকে তাঁর স্নেহময়ী জননী পুত্র শোকে অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর চোখের পানি কখনও শুকাতো না। রাতের ঘুম তাঁর হারাম হয়ে গিয়েছিল। তাঁর বড় দুঃখ ছিল, তাঁর ছেলেটি বেঁচে আছে না ডাকাতদের হাতে মারা পড়েছে, এ কথাটি তিনি জানতেন না। তাই তিনি খুব হতাশ হয়ে পড়তেন। তাঁর পিতা হারিসা সম্বাব্য সব স্থানে হারানো ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। পরিচিত অপরিচিত, প্রতিটি মানুষের কাছে ছেলের সন্ধান জানতে চাইতেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন বিশিষ্ট কবি। এ সময় রচিত বহু কবিতায় তাঁর পুত্র হারানোর বেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। এমনি একটি কবিতায় তিনি বলেন-

    ‘‘যায়িদের জন্য আমি কাঁদছি, জানিনে তার কি হয়েছে,

    সে কি জীবিত?

    তবে তো ফেরার আশা আছে, নাকি মারা গেছে

    আল্লাহর কসম! আমি জানিনে, অথচ জিজ্ঞেস করে চলেছি।

    তোমাকে অপহরণ করেছে সমতল ভূমির লোকেরা, না পার্বত্য ভূমির?

    উদয়ের সময় সূর্য স্মরণ  করিয়ে দেয় তার কথা, আর যখন

    অস্ত যায়, নতুন করে মনে করে দেয়।

    আমি দেশ থেকে দেশান্তরে তোমার সন্ধানে

    উট হাঁকিয়ে ফিরবো, কখনও আমি ক্লান্ত হবো না,

    আমার বাহন উটও না। আমার জীবন থাকুক বা মৃত্যু আসুক।

    প্রতিটি মানুষই তো মরণশীল- যত আশার পেছনেই দৌড়াক না কেন।’’

    এই হজ্জ মৌসুমে যায়িদের গোত্রের কতিপয় লোক হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় এলো। কা’বার চতুর্দিকে তাওয়াফ করার সময় তারা যায়িদের মুখোমুখি হলো। তারা পরস্পর পরস্পরকে চিনতে পেরে কুশল বিনিময় করলো। লোকগুলি হজ্জ আদায়ের পর গৃহে প্রত্যাবর্তন করে যায়িদের পিতা হারিসাকে তার হারানো ছেলের সন্ধান দিল।

    ছেলের সন্ধান পেয়ে হারিসা সফরের প্রস্তুতি নিলেন। কলিজার টুকরা, চোখের পুত্তলি যায়িদের মুক্তিপণের অর্থও বাহনে উঠালেন। সফরসঙ্গী হলেন হারিসার ভাই কা’ব। তাঁরা মক্কার পথে বিরামহীন চলার পর মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর কাছে পৌঁছলেন এবং বললেনঃ

    ‘ওহে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর! আপনারা আল্লাহর ঘরের প্রতিবেশী। অসহায়ের সাহায্যকারী, ক্ষুধার্তকে অন্নদানকারী ও আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয় দানকারী। আপনার কাছে আমাদের যে ছেলেটি আছে তার ব্যাপারে আমরা এসেছি। তার মুক্তিপণও সঙ্গে নিয়ে এসেছি। আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন এবং আপনার ইচ্ছামত তার মুক্তিপণ নির্ধারণ করুন।’

    মুহাম্মাদ সা. বললেনঃ ‘আপনারা কোন্‌ ছেলের কথা বলছেন?

    – আপনার দাস যায়িদ ইবন হারিসা।

    – মুক্তিপণের চেয়ে উত্তম কিছু আপনাদের জন্য নির্ধারণ করি, তা-কি আপনারা চান?

    – কী তা?

    – আমি তাকে আপনাদের সামনে ডাকছি। স্বেচ্ছায় সে নির্ধারণ করুক, আমার সাথে থাকবে, না আপনাদের সাথে যাবে, যদি আপনাদের সাথে যেতে চায়, মুক্তিপণ ছাড়া তাকে নিয়ে যাবেন। আর আমার সাথে থাকতে চাইলে আমার করার কিছুই নেই।

    তারা সায় দিয়ে বললঃ আপনি অত্যন্ত ন্যায় বিচারের কথা বলেছেন।

    মুহাম্মাদ সা. যায়িদকে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’ব্যক্তি কারা?

    বললঃ ইনি আমার পিতা হারিসা ইবন শুরাহবীল। আর উনি আমার চাচা কা’ব।

    বললেনঃ ‘তুমি ইচ্ছা করলে তাঁদের সাথে যেতে পার, আর ইচ্ছা করলে আমার সাথেও থেকে যেতে পার।’

    কোন রকম ইতস্ততঃ না করে সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেনঃ ‘আমি আপনার সাথেই থাকবো।’

    তাঁর পিতা বললেনঃ ‘যায়িদ, তোমার সর্বনাশ হোক! পিতা-মাতাকে ছেড়ে তুমি দাসত্ব বেছে নিলে?’

    তিনি বললেনঃ ‘এ ব্যক্তির মাঝে আমি এমন কিছু দেখেছি, যাতে আমি কখনও তাকে ছেড়ে যেতে পারিনে।’

    যায়িদের এ সিদ্ধান্তের পর মুহাম্মাদ সা. তাঁর হাত ধরে কা’বার কাছে নিয়ে আসেন এবং হাজরে আসওয়াদের পাশে দাঁড়িয়ে উপস্থিত কুরাইশদের লক্ষ্য করে ঘোষণা করেনঃ ‘ওহে কুরাইশ জনমণ্ডলী! তোমরা সাক্ষী থাক, আজ থেকে যায়িদ আমার ছেলে। সে হবে আমার এবং আমি হবো তার উত্তরাধিকারী।’

    এ ঘোষণায় যায়িদের বাবা-চাচা খুব খুশী হলেন। তাঁরা তাঁকে মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহর নিকট রেখে প্রশান্ত চিত্তে দেশে ফিরে গেলেন। সেই দিন থেকে যায়িদ ইবন হারিসা হলেন যায়িদ ইবন মুহাম্মাদ। সবাই তাঁকে মুহাম্মাদের ছেলে হিসেবেই সম্বোধন করতো। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা সূরা আহযাবের- ‘তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক’- এ আয়াত নাযিল করে ধর্মপুত্র গ্রহণের প্রথা বাতিল করেন। অতঃপর আবার তিনি যায়িদ ইবন হারিসা নামে পরিচিতি লাভ করেন।

    যায়িদ নিজের পিতা-মাতাকে ছেড়ে মুহাম্মাদকে সা. যখন বেছে নিয়েছিলেন, তখন জানতেন না কি জিতই না তিনি জিতেছেন। স্বীয় পরিবার-পরিজন ও গোত্রকে ছেড়ে যে মনিবকে তিনি চয়ন করলেন, তিনিই যে, সাইয়্যেদুল আওয়ালীন ওয়াল আখিরীন এবং সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রাসূল, এর কোন কিছুই তিনি জানতেন না। তার মনে তখন একটি বারের জন্যও এ চিন্তা উদয় হয়নি যে, এ বিশ্বে এমন একটি রাষ্ট্র কায়েম হবে যা পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত সর্বত্র কল্যাণ ও ন্যায়বিচারে পূর্ণ হয়ে যাবে এবং তিনিই হবেন সেই কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। না, এর কোন কিছুই তখন যায়িদের চিন্তা ও কল্পনায় আসেনি। সবই আল্লাহর অনুগ্রহ। যাকে ইচ্ছা তিনি অঢেল দান করেন।

    এ ঘটনার মাত্র কয়েক বছর পর মুহাম্মাদ সা. নবুওয়াত লাভ করেন। যায়িদ হলেন পুরুষ দাসদের মধ্যে প্রথম বিশ্বাসী। পরবর্তীকালে তিনি হলেন রাসূলুল্লাহর সা. বিশ্বাসভাজন আমীন, তাঁর সেনাবাহিনীর কমাণ্ডার এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে মদীনার অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক।

    যায়িদ যেমন পিতা-মাতাকে ছেড়ে রাসূলকে সা. বেছে নেন, তেমনি রাসূলও সা. তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসলেন এবং তাঁকে আপন সন্তান ও পরিবারবর্গের মধ্যে শামিল করে নেন। যায়িদ দূরে গেলে তিনি উৎকণ্ঠিত হতেন, ফিরে এলে উৎফুল্ল হতেন এবং এত আনন্দের সাথে তাঁকে গ্রহণ করতেন যে অন্য কারো সাক্ষাতের সময় তেমন দেখা যেত না। কোন এক অভিযান শেষে হযরত যায়িদ মদীনায় ফিরে এলে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে যেভাবে গ্রহণ করেছিলেন, তার একটি বর্ণনা দিয়েছেন হযরত আয়িশা রা.।

    তিনি বলেন-

    ‘যায়িদ ইবন হারিসা মদীনায় ফিরে এলো। রাসূলুল্লাহ সা. তখন আমার ঘরে। সে দরজার কড়া নাড়লো। রাসূল সা. প্রায় খালি গায়ে উঠে দাঁড়ালেন। তখন তাঁর দেহে নাভী থেকে হাঁটু পর্যন্ত একপ্রস্থ কাপড় ছাড়া কিছু ছিল না। এ অবস্থায় কাপড় টানতে টানতে দরজার দিকে দৌড়ে গেলেন। তাঁর সাথে গলাগলি করলেন ও চুমু খেলেন। আল্লাহর কসম, এর আগে বা পরে আর কখনও রাসূলুল্লাহকে সা. এমন খালিগায়ে আমি দেখিনি।’

    যায়িদের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. গভীর ভালোবাসার কথা মুসলিম জনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে লোকে তাকে ‘যায়িদ আল হুব্ব’ বলে সম্বোধন করতো এবং তাঁর উপাধি হয় ‘হিব্বু রাসূলিল্লাহ’ বা রাসূলুল্লাহর প্রীতিভাজন।

    হযরত হামযা রা. ইসলাম গ্রহণ করলে রাসূল সা. তাঁর সাথে যায়িদের ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। তাঁদের দু’জনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। এমন কি হামযা কখনও সফরে গেলে তাঁর দ্বীনি ভাই যায়িদকে অসী বানিয়ে যেতেন।

    ‘উম্মু আয়মন’ নামে রাসূলুল্লাহর সা. এক দাসী ছিলেন। একদিন তিনি সাহাবীদের বললেনঃ কেউ যদি কোন জান্নাতী মেয়েকে বিয়ে করতে চায়, সে উম্মু আয়মনকে বিয়ে করুক। হযরত যায়িদ আল্লাহর রাসূলকে সা. খুশী করার জন্য তাঁকে বিয়ে করেন। তাঁরই গর্ভে প্রখ্যাত সেনানায়ক হযরত উসামা ইবন যায়িদ মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।

    মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের পর তিনি হযরত কুলসুম ইবন হিদ্‌মের মেহমান হন। হযরত উসাইদ ইবন হুদাইবের রা. সাথে তাঁর ভ্রাতৃ-সম্পর্ক কায়েম হয়। এত দিন তিনি নবী পরিবারের একজন সদস্য হিসাবে একসঙ্গে থাকতেন। এখানে আসার পর তাঁকে পৃথক বাড়ী করে দেওয়া হয় এবং রাসূলুল্লাহর সা. আপন ফুফাতো বোন জয়নব বিনতু জাহাশের সাথে তার বিয়ে হয়। কিন্তু যয়নবের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তিনি তালাক দেন। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে রাসূলুল্লাহ সা. যয়নবকে বিয়ে করেন।

    হযরত যায়িদ ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীরন্দায। বদর থেকে মূতা পর্যন্ত সকল অভিযানেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। একমাত্র ‘মাররে ইয়াসী’ অভিযানে যোগদান করতে পারেননি। এ যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান।

    হিজরী অষ্টম সনে একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটে গেল। এ বছর রাসূল সা. ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্রসহ হারিস ইবন উমাইর আল-আযদীকে বসরার শাসকের নিকট পাঠান। হারিস জর্দানের পূর্ব সীমান্তের ‘মূতা’ নামক স্থানে পৌঁছলে গাস্‌সানী সম্রাটের একজন শাসক শুরাহ্‌বীল ইবন ‘আমর পথ রোধ করে তাঁকে বন্দী করে। তারপর তাঁকে হত্যা করে। রাসূল সা. ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন। কারণ, এর আগে আর কোন দূত এভাবে নিহত হয়নি। রাসূল সা. মূতায় অভিযান পরিচালনার জন্য তিন হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রস্তুত করলেন এবং পরিচালনার দায়িত্ব দিলেন হযরত যায়িদ ইবন হারিসার হাতে। রওয়ানার পূর্ব মুহূর্তে রাসূল সা. উপদেশ দিলেনঃ ‘যদি যায়িদ শহীদ হয়, দলটির পরবর্তী পরিচালক হবে জা’ফর ইবন আবী তালিব। জা’ফর শহীদ হলে পরিচালক হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। সেও যদি শহীদ হয় তাহলে তারা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে পরিচালক নির্বাচন করে নেবে।’

    যায়িদের নেতৃত্বে বাহিনীকে মদীনা থেকে যাত্রা করে জর্দানের পূর্ব সীমানারত ‘মায়ান’ নামক স্থানে পৌঁছলো। রোম সম্রাট হিরাক্‌ল গাস্‌সানীদের পক্ষে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এক লাখ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলো। তার সাথে যোগ দিল পৌত্তলিক আরবদের আরও এক লাখ সৈন্য। এ সম্মিলিত বাহিনী মুসলিম বাহিনীর অনতি দূরে অবস্থান গ্রহণ করলো। ‘মায়ানে’ মুসলিম বাহিনী দু’রাত অবস্থান করে করণীয় বিষয় সম্পর্কে পরামর্শ করলেন। কেউ বললেন, পত্র মারফত শত্রু বাহিনীর সংখ্যা রাসূলুল্লাহ সা. কে অবহিত করে পরবর্তী নির্দেশের প্রতীক্ষায় থাকা উচিত। কেউ বললেন, আমরা সংখ্যা, শক্তি বা আধিক্যের দ্বারা লড়াই করিনা। আমরা লড়াই করি এ দ্বীনের দ্বারা। যে উদ্দেশ্যে তোমরা বের হয়েছো, সেজন্য এগিয়ে চলো। হয় কামিয়াবী না হয় শাহাদাত- এর যে কোন একটি সাফল্য তোমরা লাভ করবে।

    অতঃপর এই দুই অসম বাহিনী মুখোমুখি সংঘর্ষে অবতীর্ণ হলো। দু’লাখ সৈন্যের বিরুদ্ধে মাত্র তিন হাজার সৈন্যের বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে রোমান বাহিনী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। তাদের অন্তরে ভীতিরও সঞ্চার হলো।

    যায়িদ ইবন হারিসা রাসূলুল্লাহর সা. পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য যে বীরত্ব সহকারে লড়াই করেন তার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। তীর ও বর্শার অসংখ্য আঘাতে তাঁর দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। অবশেষে, তিনি রণক্ষেত্রে ঢলে পড়েন। তারপর একে একে জাফর ইবন আবী তালিব ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা তুলে নেন এবং বীরত্বের সাথে শাহাদাত বরণ করেন। অতঃপর মুসলিম বাহিনীর সম্মিলিত সিদ্ধান্তে খালিদ ইবন ওয়ালিদ কমাণ্ডার নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন নও মুসলিম। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী অনিবার্য পরাজয় ও ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়। এভাবে নবম হিজরীতে ৫৪ অথবা ৫৫ বছরে বয়সে হযরত যায়িদ শাহাদাত বরণ করেন।

    মূতার দুঃখজনক সংবাদ রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পৌঁছলে তিনি এতই শোকাতুর হয়ে পড়েন যে, আর কখনও তেমন শোকাভিভূত হতে দেখা যায়নি। তিনি শহীদ কমাণ্ডারদের বাড়ী গিয়ে তাদের পরিবারবর্গকে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। যায়িদের বাড়ী পৌঁছলে তাঁর ছোট্ট মেয়েটি কাঁদতে কাঁদতে রাসূলকে সা. জড়িয়ে ধরে এবং রাসূল সা. উচ্চস্বরে কেঁদে ফেলেন। তাঁর এ অবস্থা দেখে সা’দ ইবন উবাদা বলে ওঠেনঃ ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, একি?

    তিনি বলেনঃ ‘এ হচ্ছে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।’

    রাসূল সা. বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে যায়িদের অল্পবয়স্ক পুত্র উসামাকে পিতৃ হত্যার বদলা নেওয়ার জন্য এক বাহিনী সহকারে পাঠান। এত অল্পবয়স্ক ব্যক্তির নেতৃত্ব অনেকের পছন্দ হলো না। রাসূল সা. একথা জানতে পেরে বললেনঃ ‘তোমরা পূর্বে তার পিতার নেতৃত্বের সমালোচনা করেছিলে। এখন তার পুত্রের নেতৃত্বে সন্তুষ্ট হতে পারছো না। আল্লাহর কসম। যায়িদ নেতা হওয়ার যোগ্য ছিল এবং সে ছিল আমার সর্বাধিক প্রিয়। তারপর আমার সবচেয়ে প্রিয় তাঁর পুত্র উসামা।’ উসামা ছিলেন পিতার উপযুক্ত সন্তান। পিতৃহত্যার উপযুক্ত বদলা নিয়ে তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

    রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি ভক্তি, ভালোবাসা, আনুগত্য ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনই ছিল হযরত যায়িদের জীবনের একমাত্র ব্রত। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় একথার প্রমাণ পাওয়া যায়। হযরত উম্মু আয়মন রা. ছিলেন বেশী বয়সের প্রায় বৃদ্ধা, বাহ্যিক রূপহীনা এক নারী। শুধু রাসূলকে সা. খুশী করার উদ্দেশ্যেই হযরত যায়িদ রা. তাঁকে বিয়ে করেন। হযরত যয়নাবের রা. সাথে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে তিনি নিজেই আবার যয়নাবের রা. কাছে রাসূলুল্লাহর সা. বিয়ের পয়গাম উত্থাপন করেন। শুধুমাত্র এজন্য যে, রাসূল সা. তাঁকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। এ কারণে হযরত যয়নাবের রা. প্রতি সম্মানের খাতিরে তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাননি। অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে শুধু প্রস্তাবটি পেশ করেছিলেন। (মুসলিম)

    হযরত যায়িদ ও তাঁর সন্তানদের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. সীমাহীন ভালোবাসা লক্ষ্য করে হযরত আয়িশা রা. বলতেনঃ ‘যদি যায়িদ জীবিত থাকতেন, রাসূল সা. মৃত্যুর পর হয়তো তাকেই স্থলাভিষিক্ত করে যেতেন।’