তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মারসাদ ইবন আবী মারসাদ আল গানাবী (রা)

মারসাদের পিতার নাম আবু মারসাদ কান্নায ইবন হুসাইন। মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই পিতা পুত্র উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বদর যুদ্ধের পূর্বেই হিজরাত করে মদীনায় চলে যান। মারসাদ মক্কায় হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিবের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন এবং মদীনায় হিজরাতের পর রাসূল সা: তাকে প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী উবাদা ইবন সামিতের ভাই আউস ইবন সামিতের সাথে মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। (তাবাকাত-৩/৪৮. আল ইসাবা-৩/৩৯৮)
হযরত মারসাদ ও পিতা আবু মারসাদ কান্নায বদর যুদ্ধের বীরযোদ্ধা। এ যুদ্ধে মারসাদ ‘সাবাল’ নামক একটি ঘোড়ার পিঠে সাওয়ার হয়ে রাসূলুল্লাহর সা: পাশপাশি অত্যন্ত বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করেন। উহুদ যুদ্ধেও তিনি যোগদান করেন। (তাবাকাত-৩/৪৮, সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৬৬)।
জাহিলী যুগে মক্কার ‘ইনাক’ নাম্নী এক পতিতার সাথে মারসাদের সম্পর্ক ছিল। ইসলামে ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি সেই পতিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ও সাহসী, সে জন্য যে সকল মুসলমান মক্কায় কাফিরদের হাতে বন্দী অবস্থায় নির্যাতন ভোগ করতো রাসূল সা: তাদেরকে মক্কা থেকে গোপনে মদীনায় নিয়ে আসার দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করেন। এ উদ্দেশ্যে একবার তিনি মক্কায় যান। রাতটি ছিল চন্দ্রলোকিত। তিনি চুপিসারে মক্কার একটি গলি দিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় তার সেই পুরাতন প্রেয়সী ‘ইনাক’ তাকে দেখে ফেলে এবং ডাক দেয়। তিনি থেমে যান। সে অত্যন্ত মিষ্টি মধুর ভঙ্গিতে স্বাগতম জানায় এবং সেই রাতটি তার সাথে কাটাবার প্রলোভন দেয়। মারসাদ বলেন, ‘ইনাক, আল্লাহ এখন ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেছেন। তার এমন নিরস উত্তরে ইনাক দারুণ চোট পায়। সে তখন প্রতিশোধ স্পৃহায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মানুষকে মারসাদের আগমনের কথা জানিয়ে দেয়। আটজন লোক তাকে ধাওয়া করে। তিনি একটি নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে পড়েন। শত্রুরা তাকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে গেলে তিনি গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে সোজা মদীনার পথ ধরেন। মদীনায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহর নিকট উপস্থিত হয়ে আরজ করেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইনাকের সাথে আমার বিয়েটা দিয়ে দিন। রাসূল সা: কোন উত্তর না দিয়ে চুপ থাকলেন। এর পরই সূরা নূরের এ আয়াতটি নাযিল হয়:
‘ ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকে বিয়ে করবে এবং ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করবে। বিশ্বাসীদের জন্য এগুলি হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। (সূরা নূর: ২)
উদাল ও কা-রা গোত্রের কতিপয় লোক উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায় আসে। তারা রাসূলুল্লাহর সা: দরবারে হাজির হয়ে আরজ করে, আমাদের গোত্রের কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে, আপনি আমাদের সাথে এমন কিছু লোক পাঠান যারা তাদেরকে দ্বীন ও কুরআন শিক্ষা দিতে পারে। ইবন ইসহাকের বর্ণনা মতে, নবী করীম সা: মারসাদ ইবন আবী মারসাদের (রা) নেতৃত্বে ছয় ব্যক্তিকে পাঠান। তবে বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে আসিম ইবন সাবিতের নেতৃত্বে রাসূল সা: দশ ব্যক্তিকে পাঠান। তাদের মধ্যে মারসাদও একজন। দলটি যখন বনু হুজাইলের জলাশয় ‘রাজী’ নামক স্থানে পৌঁছে তখন উদাল ও কা-রার লোকগুলি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে চিতকার শুরু করে দেয়। বনু হুজাইলের লোকেরা কোষমুক্ত তরবারি হাতে ছুটে এসে দলটিকে ঘিরে ফেলে। সাহাবায়ে কিরাম ঘোড়ার ওপর সাওয়ার ছিলেন। তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। কিন্তু বনু হুজাইল বললো: আমরা তোমাদের হত্যা করতে চাইনে। তোমাদের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের নিকট থেকে শুধু কিছু অর্থ আদায় করা আমাদের উদ্দেশ্যে। তোমরা নিজেরাই আমাদের কাছে চলে এস, আমরা অঙ্গিকার করছি।
মারসাদ, খালিদ ও আসিম বললেন, আমরা মুশরিকদের অঙ্গিকারে বিশ্বাস করি না। এ কথা বলে তারা যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। অন্য দিকে তাদের অপর তিন সাথী খুবাইব, যায়িদ ও আবদুল্লাহ ইবন তারিক একটু বিনয়ী ভাব দেখিয়ে তাদের হাতে ধরা দেন। যখন শত্রু পক্ষ তাদের হাত পা বাঁধতে শুরু করে তখন আবদুল্লাহ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এটা হলো তোমাদের প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। তারা আবদুল্লাহকে ‘জাহরান’ নাম স্থানে পাথর মেরে শহীদ করে। অত:পর তারা খুবাইব ও যায়িদকে নিয়ে মক্কায় উপস্থিত হয়। কুরাইশদের হাতে বনু হুজাইলের দুই ব্যক্তি বন্দী ছিল। তারা এদের দুজনের বিনিময়ে তাদের দুজনকে ছাড়িয়ে নেয়। উকবা ইবন হারিস ইবন আমির তার পিতা হারিসের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য খুবাইবকে গ্রহণ করে। হযরত খুবাইব (রা) বদর যুদ্ধে হারিসকে হত্যা করেন। অন্যদিকে সাফওয়ান ইবন উমাইয়া তার পিতা উমাইয়া ইবন খালাফের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে যায়িদকে হাতে নেয়। এ ভাবে কুরাইশদের প্রতিশোধ স্পৃহার শিকার হয়ে তারা দুজনই অত্যন্ত অসহায় ও নির্মম ভাবে মক্কায় শাহাদত বরণ করেন। ইতিহাসে এই ঘটনাকে ‘ওয়াকিতু ইউম আল রাজী’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইবন সাদ বলেন, ‘রাজী’ এর এই ঘটনাটি ঘটে রাসূল সা: এর মদীনায় হিজরাতের ছত্রিশ মাসের মাথায় সফর মাসে। (তাবাকাত-৩/৪৮)।আসাহুস সীয়ার-১৬০), সীরাতু ইবন হিশাম-১৬৯-১৭৪)।
হযরত মারসাদ (রা) এর যোগ্যতা ও মর্যাদার জন্য এই ঘটনাই যথেষ্ট যে, খোদ রাসূলে কারীম সা: তাকে দ্বীনের মুআল্লিম বা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করেছেন। যেহেতু হযরত রাসূলে কারীমের সা: জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন সেহেতু তার ইলমী যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ হয়নি। তবুও হাদীসের গ্রন্থ সমূহ তার থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে একেবারে শূন্য নয়। আহমাদ ইবন সিনান আল কাত্তান তার মুসনাদে ইমাম বাগাবী ও হাকেম তাদের মুসতাদরিকে এবং তাবারানী তার ‘আওসাতে’ মারসাদ থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল ইসাবা-৩/৩৯৮)।
মিসতাহ ইবন উসাসা (রা)

প্রকৃত নাম আউফ, ডাক নাম আবু আব্বাদ, এবং লকব বা উপাধি মিসতাহ। পিতা উসাসা ইবন আব্বাদ এবং মা হযরত আবু বকরের খালা মতান্তরে খালাত বোন। মাতা পিতা দুজনেই ইসলামের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-৩/৪০৮)
মিসতাহ ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল সা: তার ও যায়েদ ইবন মুযায়্যিনের মধ্যে ভাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। তার হিজরাতের সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা যায় না। তবে তিনি বদর যুদ্ধের পূর্বেই হিজরাত করে মদীনায় চলে যান এবং বদর যুদ্ধে তার যোগদানের কথা ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থ সমূহে পাওয়া যায়। বনী মুসতালিক যুদ্ধে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। এ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে, ইফক, বা উম্মুল মুমিনীন আয়িশার (রা) প্রতি অপবাদের ঘটনাটি ঘটে। মুনাফিকরা যখন অপবাদটি ছড়িয়ে দেয় তখন তাতে কিছু নিষ্ঠাবান মুমিন সাহাবীও জড়িয়ে পড়েন। মিসতাহ এই দলেরই একজন।
‘ওয়াকিয়া ই ইফক’ নামে প্রসিদ্ধ ঘটনাটির প্রতি পবিত্র কুরআনের সূরা নূর এর ১১ নং আয়াত সহ কয়েকটি আয়াতে ইংগিত করা হয়েছে। সংক্ষেপে ঘটনাটি এই: উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) বনু মুসতালিকের যুদ্ধে (৬ হিজরী) রাসূলুল্লাহর সা: সংগে ছিলেন। মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে তারা এক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। আয়িশা (রা) শিবির হতে কিছু দূরে বাহ্যক্রিয়া সম্পাদনের জন্য যান। তখন তার গলার হারটি সেখানে পড়ে গেলে তিনি তা খুঁজতে থাকেন। এদিকে তার হাওদা পর্দায় ঘেরা থাকায় তিনি ভেতরে আছেন মনে করে কাফিলা সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে যায়। পশ্চাতবর্তী রক্ষী সাফওয়ান (রা) তাকে দেখতে পেয়ে নিজের উটের পিঠে উঠিয়ে নেন এবং উটের রশি ধরে পায়ে হেটে কাফিলার সাথে মিলিত হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাই নানা অপবাদ ছড়াতে থাকে। সূরা নূরের আয়াতগুলিতে আয়িশার (রা) পবিত্রতার ঘোষণা করা হয় এবং অপবাদ রটনাকারীদের কঠোর শাস্তির কথা ব্যক্ত করা হয়।
যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে মিসতা ঘটনাটি তার মায়ের কাছে বর্ণনা করেন। মিসতাহর মা আবার একদিন রাতে কোন কাজে আয়িশার (রা) বাড়ীতে যান। আয়িশা তখন পিতৃগৃহে মায়ের কাছে। ততকালীন আবরে বাড়ীতে পেশাব পায়খানার স্থায়ী কোন জায়গা নির্দিষ্ট থাকতো না। মেয়েরা সাধারণত: রাতে বাড়ীর বাইরে মরু ভূমিতে গিয়ে বাহ্যক্রিয়া সম্পন্ন করতো। আয়িশা (রা) মিসতার মাকে সংগে করে বাড়ীর বাইরে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করতে যান। পথে মিসতাহর মা নিজের আঁচলে জড়িয়ে হোঁচট খান। হোচট খাওয়ার পর আরবের প্রথা অনুযায়ী তার মুখ থেকে বেরিয়ে যায় ‘মিসতাহর ধ্বংস হোক।’ এতে আয়িশা আপত্তি জানিয়ে বলেন, একজন মুহাজির মুসলমান, যিনি বদরে যুদ্ধ করেছেন তাকে এভাবে বদদুআ করছেন? মিসতাহর মা তখন বললেন: আবু বকরের মেয়ে, তুমি কি কিছু শোননি? তখন মিসতার মা তাকে পুরো ঘটনা বলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/২৯৯-৩০০) (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৮৭)।
দরিদ্র মিসতাহ ছিলেন হযরত আবু বকরের (রা) খালাত ভাই। আবু বকর (রা) সব সময় তার সাথে ভালো ব্যবহার ও আর্থিক সাহায্য করতেন। যখন তিনি ‘ইফক’ এর ঘটনার সাথে মিসতাহর জড়িত থাকার কথা জানতে পারলেন এবং কুরআন তাদের প্রচারণাকে মিথ্যা অপবাদ হিসেবে ঘোষণা করলো তখন আবু বকর মিসতাহকে সাহায্য দান বন্ধ করে দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, এখন থেকে আমি মিসতাহর জন্য এক কপর্দকও ব্যয় করবো না। তখন সূরা নূরের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়: ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয় ও স্বজন অভাবগ্রস্থকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহ ত্যাগ করেছে তাদেরকে কিছুই দেবে না। তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে এবং তাদের দোষ ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা নূর-২২)।
আয়াত নাযিল হওয়ার পর হযরত আবু বকর (রা) আবার আগের মত সাহায্য দিতে শুরু করেন। বুখারী ও মুসলিমে আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়। (আল ইসাবা-৩/৪০৮)।
তবে যেহেতু একজন সতী সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপের ঘটনায় তিনি জড়িত হয়ে পড়েছিলেন এবং কুরআনও তাদের জন্য নিম্নোক্ত শাস্তির বিধান ঘোষণা করেছিল: যারা সতী সাধ্বী রমণীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি কশাঘাত করবে।’ (সূরা নূর-৪) এ কারণে অন্যদের সাথে তাকেও এ শাস্তি দান করা হয়। মিসতার সাথে আর যে কজন নিষ্ঠাবান বিখ্যাত সাহাবী শাস্তি ভোগ করেন তারা হলেন- হযরত হাসসান বিন সাবিত ও উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশের বোন হামনা বিনতু জাহাশ (রা)। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩০২)। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯০)।
আমাদের স্মরণ রাখতেহবে, হযরত মিসতাহর (রা) মত যে সকল নিষ্ঠাবান সাহাবী ‘ইফক’ এর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, তারা নিতান্তই মুনাফিকদের প্রচারণার শিকার হয়েছিলেন। অন্যথায় হযরত মিসতাহর (রা) মত ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এতে জড়িয়ে পড়তে পারেন না। তাছাড়া তারা তাওবাহ করেছেন এবং শাস্তিও মাথা পেতে নিয়েছেন। আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা), আবু বকর (রা), তথা গোটা মুসলিম উম্মাহ তাদের ক্ষমা করেছেন। সুতরাং এখন তাদের প্রতি কোন রকম বিদ্বেষ পোষণ করা ঈমানের পরিপন্থী কাজ হবে। হযরত মিসতাহর (রা) সবচেয়ে বড় পরিচয় হযরত আয়িশার (রা) মন্তব্যে ফুটে উঠেছে। তিনি প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী, গৃহত্যাগী মুহাজির এবং বদর যুদ্ধের একজন মুজাহিদ। আর এদের প্রশংসায় পবিত্র কুরআনের কত আয়াতই না নাযিল হয়েছে।
হযরত মিসতাহ কখন ইনতিকাল করেন সে বিষয়ে মতভেদ আছে। একটি মতে হিজরী ৩৪ সনে হযরত উসমানের খিলাফতকালে তিনি ইনতিকাল করেন। অপর একটি মতে হিজরী ৩৭ সনে সিফফীনে হযরত আলী (রা) এর পক্ষে যুদ্ধ করার পর সেই বছর মারা যান। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। (উসুদুল গাবা-৪/ ৩৫৫, আল ইসাবা-৩/৪০৮, তাবাকাত-৩/৫২)।
আমর ইবন উমাইয়া (রা)

নাম আমর কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু উমাইয়া। পিতার নাম উমাইয়া। বনী কিনানা গোত্রের সন্তান। ইবন হিশাম তাকে রাসূলুল্লাহর সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির কাছাকাছি সময়ের জাহিলী আরবের একজন শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ব্যক্তিরূপে উল্লেখ করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনাও বর্ণনা করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/২০৪,২০৭)। তিনি বদর ও উহুদ যুদ্ধে মক্কার পৌত্তলিকদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। উহুদের পরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরাত করেন।
ইসলাম গ্রহণের পর সর্ব প্রথম বীরে মাউনা এর ঘটনায় অংশ গ্রহণ করেন। ঘটনাটি ছিল এই রকম: উহুদ যুদ্ধের পর চতুর্থ মাসে নাজদের বনী কিলাব গোত্রের সরদার আবু বারা আমের ইবন মালেক ইবন জাফর মুলায়িবুল আসিন্নাহ মদীনায় হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমতে হাজির হয়। রাসূল সা: তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। সে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি না করে বললো: আপনি যদি নাজদবাসী কিলাব গোত্রের নিকট আপনার কিছু সংগী পাঠাতেন তাহলে তারা হয়তো ইসলাম গ্রহণ করতো। রাসূল সা: বললেন: নাজদীদের ব্যাপারে আমার শংকা হয়। কিন্তু আবু বারা প্রেরিত দলটির নিরাপত্তা পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করায় রাসূল সা: মুনজির ইবন্ আমেরের নেতৃত্বে চল্লিশ মতান্তরে সত্তর জনের একটি দল পাঠিয়ে দেন। তারা ‘বীরেমাউনা’ নামক স্থানে পৌঁছে তাবু ফেলে অবস্থান করতে থাকেন এবং ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত রাসূল সা: এর পত্রটি হারাম ইবন মালজানের মাধ্যমে আমের ইবন তুফাইলের নিকট পৌঁছে দেন।
আমের ইবন তুফাইল দূত হারামকে হত্যা করে এবং আসিয়্যা, রা’ল, জাকওয়ান প্রভৃতি গোত্রে মুসলিম দলটির বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দ্রুত বেরিয়ে পড়ার ঘোষণা দেয়। তারা সমবেত হয়। এদিকে হারামের ফিরতে দেরী দেখে মুসলমানরা তার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। কিছু দূর যেতেই তারা রা’ল,জাকওয়ান প্রভৃতি গোত্রের মুখোমুখি হয়। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম দলটির ওপর আক্রমণ চালিয়ে সকলকে হত্যা করে। একমাত্র আমর ইবন উমাইয়া প্রাণে রক্ষা পান। তিনি শত্রু বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাকে আমের ইবন তুফাইলের সামনে আনা হলো। যখন সে জানতে পেল আমর ইবন উমাইয়া মুদার গোত্রের লোক তখন তাকে এই কথা বলে ছেড়ে দিল যে, আমার মার একটি দাস মুক্ত করার মান্নত ছিল। তবে অপমানের চিহ্ন সরূপ তার মাথার সামনের দিকের চুল কেটে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/১৮৪,১৮৫)।
এই বীরে মাউনার ঘটনায় প্রখ্যাত সাহাবী আমের ইবন ফুহাইরাও শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আমর ইবন উমাইয়াকে বন্দী করে যখন আমের ইবন তুফাইলের সামনে আনা হলো তখন সে আমের ইবন ফুহাইরার লাশের দিকে ইঙ্গিত করে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল: এই লোকটি কে? আমর ইবন উমাইয়া বললেন: আমের ইবন ফুহাইরা। তখন আমের ইবন তুফাইল বলেছিল: আমি দেখলাম, সে নিহত হওয়ার পর তার লাশ শূন্যে আকাশের দিকে বহুদূর উঠে গেল, তারপর আবার তা নেমে এল। (হায়াতুসসাহাবা-৩/৫৯৫)
আমর ইবন উমাইয়া বীরে মাউনার শত্রুদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে মদীনার দিকে চলার পথে যখন ‘কারকারা’ নামক স্থানে পৌঁছেন তখন বিপরীত দিক থেকে আগত দুজন লোকের সাথে তার দেখা হয়। তিনি যে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন লোক দুটিও সেখানে এসে বসলো। তাদের সাথে আলাপ পরিচয়ে আমর ইবন উমাইয়া যখন জানতে পেলেন তারা বনী আমের গোত্রের লোক তখন তিনি চুপ থাকলেন। তারা ঘুমিয়ে পড়লে আমর তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দুজনকেই হত্যা করেন। তিনি মনে করেছিলেন, বনী আমের রাসূল সা: এর সাহাবীদের সাথে যে আচরণ করেছে, এটা তার একটা বদলা হবে। আমর মদীনায় পৌঁছে রাসূল সা: এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলে তিনি বলেছিলেন: আমর, তুমি এমনটি দুটি হত্যাকান্ড ঘটিয়েছ যে, আমাকে অবশ্যই তাদের দিয়াত বা রক্তমূল্য আদায় করতে হবে। উল্লেখ্য যে, এ ঘটনার পূর্বেই বনী আমেরের সাথে রাসূল সা: এর চুক্তি হয়েছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/১৮৬) অত:পর রাসূল সা: তাদের দিয়াত আদায় করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৫৬৪)।
হিজরী ৬ষ্ঠ সনে হযরত রাসূলে কারীম সা: আমর ইবন উমাইয়্যাকে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্র সহকারে হাবশা যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই পত্রে রাসূল সা: নাজ্জাশীকে হাবশায় অবস্থিত মুহাজিরদের আতিথেয়তার সুপারিশ করেন্ এবং হযরত উম্মু হাবীবা বিনতু আবী সুফিয়ান, যিনি তখনও পর্যন্ত হাবশার মুহাজিরদের সাথে সেখানে অবস্থান করছিলেন- তার সাথে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠান। উল্লেখ্য যে, উম্মু হাবীবা ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবন জাহাশের স্ত্রী। প্রথম ভাগে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করে স্বামীর সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। সেখানে স্বামী উবাইদুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করলে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এই দাওয়াতপত্র পেয়ে নাজ্জাশী হযরত জাফর ইবন আবী তালিবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হযরত রাসূলুল্লাহর সা: পত্রের জবাবে একটি পত্র লিখেন। এই পত্রে তার ইসলাম গ্রহণ, রাসূল সা:এর প্রতি সালাম, মুহাজিরদের প্রতি আতিথেয়তা ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ ছিল। রাসূল সা: পত্র অনুসারে তার পক্ষ থেকে নাজ্জাশী নিজেই উম্মু হাবীবাকে বিয়ের পয়গাম দেন। তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহর উকিন হন এবং বিয়ের পর রাসূলুল্লাহর সা: পক্ষ থেকে চারশো দীনার মোহর আদায় করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/২২৪, ৩২৪)। (হায়াতুস সাহাবা-১/ ১৫৮, ৩/৫৯৬-৯৭)।
এই আমর ইবন উমাইয়া যখন রাসূল সা: এর দূত হিসেবে নাজ্জাশীর নিকট পৌঁছেন তখন সেখানে তৎকালীন ইসলামের চরম দুশমন আমর ইবনুল আস ও উপস্থিত ছিল। সে আমর ইবন উমাইয়াকে তার হাতে অর্পণের জন্য নাজ্জাশীর নিকট আবদার জানায় যাতে সে তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে পারে এবং কুরাইশদের নিকট নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/২৭৬-৭৭)।
হাবশায় যে সকল মুহাজির অবস্থান করছিলেন, দুটো জাহাজে করে আমর ইবন উমাইয়া তাদেরকে নিয়ে খাইবার যুদ্ধের সময় মদীনায় পৌঁছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৫৯)।
হাবশার এই দৌত্যগিরি শেষে মদীনায় ফেরার পর আবু সুফইয়ানের এক এক দুষ্কর্মের প্রতিশোধ নেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তার ওপর। ঘটনাটি এই : আবু সুফইয়ান রাসূল সা: কে হত্যার জন্য কিছু লোককে উতসাহিত করে। এক ব্যক্তি এই দায়িত্ব্ কাঁধে নেয় এবং আবু সুফইয়ান তাকে প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করে। সে মদীনায় আসে এবং সরাসরি মসজিদে রাসূল সা: এর নিকট পৌঁছে। রাসূল সা: তার উদ্দেশ্য জেনে ফেলেন। তিনি লোকটিকে দেখিয়েবলেন, সে কোন ধান্ধায় এসেছে। লোকটি রাসূল সা: এর ওপর প্রায় আক্রমণ করতে বসেছিল, ঠিক সে সময় হঠাত হযরত উসাইদ ইবন হুদাইর (রা) তাকে পাজা করে ধরে ফেলেন। লোকটির কাপড়ের নীচ থেকে একটি খঞ্জর বেরিয়ে পড়ে। অপরাধ প্রকাশ্য ছিল, কোন সাক্ষীর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু রাহমাতুল লিল আলামীন তাকে মাফ করে দেন। সে আবু সুফইয়ানের পুরো ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেয়।
যেহেতু এই ঘটনার মূল নায়ক আবু সুফইয়ান এবং তারই জন্য মক্কার কুরাইশ ও মদীনাবাসীদের মধ্যে সর্বক্ষণ যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান থাকে এ কারণে হযরত রাসূলে কারীম সা: আমর ইবন উমাইয়া ও সালামা ইবন আসলাম মতান্তরে জাব্বার ইবন সাখার আল আনসারীকে এক গোপন অভিযানে মক্কায় পাঠান। তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন, যদি সুযোগ হয় তাহলে এই অশান্তির মূলনায়ককে চির দিনের জন্য দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে।
আমর ও সালামা গোপনে মক্কায় পৌঁছলেন, কিন্তু মুআবিয়া কাবার তাওয়াফ করা অবস্থায় তাদেরকে দেখে ফেলেন। কুরাইশদের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল। তারা বলাবলি করলো, তাদের আগমন নি:সন্দেহে বিনা কারণে নয়। নিশ্চয় তারা কিছু একটা অঘটন ঘটাবে। এদিকে আমর ও সালামা যখন দেখলেন, তাদের আগমনের বিষয়টি কুরাইশদের মধ্য জানাজানি হয়ে গেছে, তখন তারা মক্কার বাইরে চলে যান। পথে উবাইদুল্লাহ ইবন মালিক এবং বনী হুজাইলের এক ব্যক্তির সাক্ষাত পান। আমর উবাইদুল্লাহকে এবং সালামা দ্বিতীয় লোকটিকে হত্যা করেন।
এদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে মক্কার চারদিকে গোয়েন্দা ছড়িয়ে দেয়। আমরও সালামা এমন দুই গোয়েন্দার দেখা পেলেন। তারা গোয়েন্দা দুজনের একজনকে হত্যা করেন এবং অন্যজনকে বন্দী করে মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা: নিকট নিয়ে আসেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/ ৬৩৩-৩৪)।
আহমাদ ও তাবারানীর এক বর্ণনায় জানা যায়, খুবাইব বিন আদী মক্কার কাফিরদের হাতে শহীদ হন এবং তার লাশ একটি কাঠের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা: খুবাইবের লাশ আনার জন্য গোপন মিশন মক্কায় পাঠান। তিনি গোপনে মক্কায় পৌঁছে কাঠ বেয়ে উঠে রশি কেটে দেন এবং খুবাইবের লাশ মাটিতে পড়ে যায়। এমন সময় কুরাইশরা টের পেয়ে তাকে ধাওয়া করে এবং তিনি লাশ ফেলে পালিয়ে যান। অবশ্য অন্য বর্ণনায় জানা যায়, মিকদাদ ইবন আসওয়াদ ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম এ দায়িত্বে নিয়োজিত হয়েছিলেন এবং তারাই এ অভিযান চালান। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৯৬,৯৭)।
হযরত রাসূলে কারীমের সা: ইনতিকালের পর হযরত আমর ইবন উমাইয়া দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে তার পরবর্তী জীবনের বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত আমীর মুআবিয়ার (রা) শাসনকালে হিজরী ৬০ সনের পূর্বে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। হাদীসের গ্রন্থ সমূহে আমর ইবন উমাইয়া থেকে বর্ণিত বিশটি হাদীস পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ, জাফর, ফাদল, যাবারকান,শাবী, আবু সালামা ইবন আবদির রহমান,আবু কিলাবা, জুরমী এবং আবুল মুহাজির তার উল্লেখযোগ্য ছাত্র।
তিনি ছিলেন ততকালীন আরবের অন্যতম বীর ও সাহসী ব্যক্তি। এ কারণে রাসূল সা: দু:সাহসিক অভিযানগুলির দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করতেন। মৃত্যুকালে জাফর, আবদুল্লাহ ও ফাদল নামে তিন ছেলে রেখে যান।
আবান ইবন সাঈদ ইবনুল আস (রা)

হযরত আবানের পিতার নাম আবু উহায়হা সাঈদ ইবনুল আস এবং মাতার নাম হিন্দা বিনতু মুগীরা। তার বংশের উপরের দিকের পঞ্চম পুরুষ আবদ মান্নাফে গিয়ে রাসূল সা: এর নসবের সাথে তার নসব মিলিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা-১/৩৫)
তার পিতা সাঈদ ছিল কুরাইশদের এক মর্যাদাবান ব্যক্তি। সে হিজরী ২য় অথবা ৩য় সনে কাফির অবস্থায় তায়িফে মারা যায় এবং তাকে সেখানেই দাফন করা হয়। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৪২.৩৬৮)।
তার কয়েকজন সুযোগ্য পুত্র ছিলেন। ইসলামের সূচনা পর্বেই তাদের মধ্যে খালিদ ও আমর ইসলাম গ্রহণ করে হাবশায় হিজরাত করেন। (আল ইসাবা-১/১৩)।
আবান তার অন্য দুই ভাই উবাইদা ও আল আসের সাথে পৌত্তলিক থেকে গেলেন। তার দুই ভাই খালিদ ও আমরের ইসলাম গ্রহণে দারুণ ব্যাথা পান। সে ব্যাথার প্রকাশ ঘটেছে তার রচিত একটি কাসীদায়। তার একটি শ্লোক নিম্নরূপ:
হায়! দ্বীনের ক্ষেত্রে আমর ও খালিদ যে মিথ্যারোপ করেছে, জারীবার মৃত লোকগুলি যদি তা দেখতো! (আল ইসাবা-১/১৩) (উসুদুল গাবা-১/৩৫)।
আবান তার অন্য দুই ভাইয়ের সাথে মিলে রাসূল সা: ও মুসলমানদের বিরোধিতা করতে থাকেন। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে লড়বার জন্য উবাইদা ও আল আসের সাথে মক্কা থেকে বের হলেন। উবাইদা ও আল আস মুসলমানদের হাতে শোচনীয় ভাবে নিহত হলো। আবান কোন রকমে প্রাণ নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন।
আবানের ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কিত একটি ঘটনার কথা ইবন হিশাম উল্লেখ করেছেন: ইসলাম পূর্ব যুগে রাসূল সা: তার কয়েকজন কন্যাকে মক্কার কুরাইশ যুবকদের সাথে বিয়ে দেন। কুরাইশদের সাথে রাসূল সা: সংঘাত শুরু হলে কুরাইশ নেতারা রাসূল সা: এর জামাতাদের নিকট তার কন্যাদের তালাক দেওয়ার আবেদন জানায়। রাসূল সা: এর কন্যা রুকাইয়া ছিলেন উতবা ইবন আবী লাহাবের স্ত্রী। কুরাইশরা উতবাকে বললো: তুমি মুহাম্মাদের কন্যাকে তালাক দাও। সে এই শর্তে রাজী হলো যে, যদি তারা আবান ইবন সাঈদের মেয়ে অথবা সাঈদ ইবন আসের মেয়ের সাথে তাকে বিয়ে দিতে পারে তাহলে সে রুকাইয়াকে তালাক দেবে। তারা উতবার দাবী মেনে নিয়ে সাঈদ ইবন আসের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে রুকাইয়াকে তার নিকট থেকে ছাড়িয়ে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-৬২৫)।
হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে হযরত রাসূলে কারীম সা: তার পয়গাম সহ হযরত উসমানকে (রা) মক্কার কুরাইশদের নিকট পাঠালেন। উসমান (রা) ‘বালদাহ’ উপত্যাকা দিয়ে মক্কার দিকে যাচ্ছেন। কুরাইশরা তাকে জিজ্ঞেস করলো: কোথায় যাও? উসমান তাদেরকে সেই কথাই বললেন যা তাকে রাসূল সা: বলে দিয়েছিলেন। এমন সময় আবান ইবন সাঈদ কুরাইশদের মধ্য থেকে এগিয়ে এসে উসমানকে স্বাগতম জানালেন। উসমানের সাথে তার আগে থেকেই ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। আবান নিজের ঘোড়াটিকে প্রস্তুত করে তার পিঠে উসমানকে উঠালেন এবং তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলেন। অত:পর আবান উসমানকে মক্কায় নিয়ে আসেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৫৬)।
উসমান আবানের বাড়ীতে আসার পর আবান তাকে বলেন: আপনার পোশাকের এ অবস্থা কেন? উসমানের জামা ছিল হাঁটু ও গোঁড়ালির মাঝামাঝি পর্যন্ত। আবান আরও বলেন: আপনার কাওমের লোকদের মত জামা লম্বা করেন না কেন? উসমান বললেন: আমাদের নবী এভাবে জামা পরেন। আবান বলেন: আপনি কাবা তাওয়াফ করুন। উসমান বললেন: আমাদের নবী কোন কাজ না করা পর্যন্ত আমরা তা করতে পারি না। আমরা শুধু তার পদাংক অনুসরণ করে থাকি। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩৫৮-৫৯) আল ইসতীয়াব-৩৫, সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩১৫)।
আবান যদিও দীর্ঘকাল যাবত ইসলাম ও ইসলামের নবীর প্রতি বিদ্বেষী ছিলেন, তবুও এ সময় সত্যের সন্ধান থেকে মোটেও বিরত থাকেননি। এ সময় তিনি বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিকট রাসূল সা: এর নবুওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তখনকার দিনে শাম বা সিরিয়া ছিল জ্ঞানী-গুণী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কেন্দ্র। ব্যবসার কাজে আবানের সেখানে যাতায়াত ছিল। একবার তিনি সেখানকার এক খৃস্টান ‘রাহিব’কে কথা প্রসঙ্গে বললেন, আমি হিজাযের কুরাইশ গোত্রের সন্তান। এই গোত্রের এক ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি বলে দাবী করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকেও ঈসা ও মূসার মত নবী করে পাঠিয়েছেন। রাহিব লোকটির নাম জিজ্ঞেস করলেন। আবান বললেন: লোকটির নাম মুহাম্মাদ। রাহিব আসমানী কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী একজন নবীর আত্মপ্রকাশের বয়স, বংশ ইত্যাদি ব্যাখ্যা করলেন। তার বক্তব্য শুনে আবান বললেন: এগুলির সবই তো সেই লোকটির মধ্যে বিদ্যমান। রাহিব তখন বললেন: আল্লাহর কসম, তাহলে সেই ব্যক্তি সমগ্র আরবের ওপর আধিপত্য বিস্তারের পর সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করবেন। তুমি যখন ফিরে যাবে, আল্লাহর এই নেক বান্দার নিকট আমার সালাম পৌঁছে দেবে। শামের এই রাহিব বা পাদ্রীর নাম ‘ইয়াক্কা’। এবার যখন আবান শাম থেকে ফিরলেন তখন তার পূর্বের রূপ আর নেই। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতার শক্তি তার শেষ হয়ে গেছে। (উসুদুল গাবা-১/৩৫, আল ইসাবা-১/১৩)।
পিতৃ পুরুষের ধর্মের কথা চিন্তা করে এবং সমবয়সীদের নিন্দা ও বিদ্রুপের কথা ভেবে আবান কিছুদিন সম্পূর্ণ চুপ থাকলেন। কিন্তু সত্যের প্রতি যে আবেগ তার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, তা তিনি দীর্ঘদিন দমন করে রাখতে সক্ষম হলেন না। এদিকে তার ভাই আমর ও খালিদ হাবশা থেকে ফিরে আবানের সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। অত:পর তিনি খাইবার যুদ্ধের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরাত করেন। তারা তিন ভাই একত্রে রাসূল সা: এর সাথে খাইবার অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-১/১৩)।
অন্য একটি বর্ণনা মতে আবান মদীনায় পৌঁছার পর হযরত রাসূলে কারীম সা: একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর আমীর বানিয়ে তাকে নাজদের দিকে পাঠিয়ে দেন। এ অভিযানে সফল হয়ে যখন তিনি মদীনায় ফিরে আসেন তখন খাইবার বিজয় শেয় হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময় হাবশার অন্যান্য মুহাজিরদের সংগে করে হযরত আবু হুরাইরা মদীনায় আসেন। তারা দুজন এক সাথে রাসূল সা: এর নিকট যান। রাসূল সা: খাইবারে গণীমতের মাল থেকে কিছু অংশ তাদেরকে দেন। নাজদ অভিযান ছাড়াও আরও কিছু ছোট ছোট অভিযানে ইমারাত বা নেতৃত্ব তিনি রাসূলুল্লাহর সা: নিকট থেকে লাভ করেন।
হযরত আবান হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে তায়িফ অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। হযরত আবু সিদ্দীক (রা) তায়িফে আবানের পিতার কবরটি দেখে বলে ওঠেন: এই কবরের অধিবাসীর প্রতি আল্লাহর লানাত বা অভিসম্পাত। সে ছিল আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারী। আবান ও তার ভাই আমর সাথে সাথে আবু বকরের কথার প্রতিবাদ করে তার পিতা আবু কুহাফার কিছু নিন্দা করেন। তখন রাসূল সা: বললেন: তোমরা মৃতদের গালি দিওনা। মৃতদের গালি দিলে জীবিতদের কষ্ট দেওয়া হয়। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৪২, ৩৬৮)
হযরত রাসূলে কারীম সা: আবানকে হযরত আলা ইবনুল হাদরামীর স্থলে বাহরাইনের শাসক নিয়োগ করেন। রাসূল সা: এর ইনতিকাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। রাসূল সা: এর ওফাতের খবর শুনে তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। (ইসতীয়াব-১/৩৫)।
হযরত আবান রাসূল সা: এর (সাকাতিব বা লেখকের দায়িত্বও পালন করেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৫৩২)।
রাসূল সা: ইনতিকালের পর হযরত আবু বকর (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন। তার হাতে গণ বাইয়াত শেষ হওয়ার পরও যে কজন কুরাইশ ব্যক্তি কিছুদিন যাবত বাইয়াত থেকে বিরত থাকেন, আবান তাদের একজন। বনী হাশেমের লোকেরা বাইয়াত গ্রহণ করলে তার আপত্তি দূর হয় এবং তিনি বাইয়াত করেন।
খলীফা হযরত আবু বকর (রা) রাসূল সা: এর নিয়োগকৃত কোন শাসক বা কর্মচারীকে অপসারণ করেননি। আবানও ছিলেন রাসূল সা: কর্তৃক নিযুক্ত একজন শাসক। আবানকে তার দায়িত্বে ফিরে যাওয়ার জন্য আবু বকর (রা) অনুরোধ করেন। কিন্তু আবান খলীফার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। কোন কোন বর্ণনায় জানা যায়, খলীফার বার বার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ইয়ামানের শাসনকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ইবন সাদ বর্ণনা করেন: আবান যখন খলীফার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন তখন হযরত উমার (রা) একদিন আবানকে বললেন: ইমাম বা নেতার অনুমতি ছাড়া এভাবে কর্মস্থল ত্যাগ করা তো তার উচিত হয়নি। এখন আবার তার নির্দেশে সেখানে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আবান বললেন: আল্লাহর কসম! রাসূল সা: এর পরে আমি আর কারও জন্য কাজ করবো না। যদি করতাম তাহলে আবু বকরের মর্যাদা, তার ইসলামে অগ্রগামিতা ইত্যাদি কারণে তার ‘আমেল’ বা কর্মচারী হতাম। অগত্যা আবু বকর (রা) বাহরাইনে আর কাকে পাঠানো যায় সে বিষয়ে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। উসমান সা: বসলেন: যেহেতু তার পূর্বে আলা ইবনুল হাদরামী সেখানে ছিলেন, তাই তাকেই সেখানো পাঠানো হোক। উমার বললেন: আবানকেই সেখানে আবার যেতে বাধ্য করা হোক। কিন্তু আবু বকর (রা) তা করতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন; যে ব্যক্তি বলে আমি রাসূলুল্লাহর সা: পরে আর কারও কাজ করবো না তাকে আমি বাধ্য করতে পারিনে। অত:পর আলা ইবনুল হাদরামীকে বাহরাইনের শাসক নিয়োগ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৫৯)।
হযরত আবানের মৃত্যুর সময়কাল সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানামত দেখা যায়। মূসা ইবন উকবা ও অধিকাংশ বংশবিদ্যা বিশারদদের মতে হযরত আবু বকরের খিলাফতকালের শেষ দিকে হিজরী ১৩ সনে আজনাদাইনের যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইবন ইসহাকের মতে তিনি ইয়ারমুক যুদ্ধে এবং অন্য কিছু লোকের মতে ‘মারজুস সাফারের দিন শাহাদাত লাভ করেন। আবার অন্য একটি বর্ণনায় জানা যায়, তিনি খলীফা উসমানের খিলাফতকালে হি: ২৭ সনে মারা যান এবং তারই তত্বাবধানে হযরত যায়িদ ইবন সাবিত মাসহাফে উসমানী সংকলন করেন। তবে প্রথমোক্ত মতটি সঠিক বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
মুআইকিব ইবন আবী ফাতিমা (রা)

মুআইকিব ছিলেন দাওস গোত্রের সন্তান। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তিনি দাসে পরিণত হয়ে মক্কার সাঈদ ইবনুল আসের নিকট উপনীত হন। (আনসাবুল আশরাফ-১/২০০)।
অন্য একটি বর্ণনামতে তিনি আযদ গোত্রের সন্তান এবং মক্কার বনী আবদি শামসের হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হাবশাগামী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। হাবশা থেকে খাইবার যুদ্ধের সময় মদীনায় আসেন। একটি বর্ননামতে তিনি আবু মূসা আশআরীর সাথে মক্কা থেকে মদীনায় আসেন এবং খাইবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আবার কোন কোন বর্ণনায় তার বদর যুদ্ধ ও বাইয়াতে রিদওয়ানে যোগদানের কথা পাওয়া যায় এই বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, তিনি খাইবার যুদ্ধের পূর্বে মদীনায় আসেন। তাদের মতে তিনি হাবশায় হিজরাত করেননি। তবে ওয়াকিদী বলেন: যারা বলে তিনি হাবশায় হিজরাত করেছিলেন, আমি তাদের কাছে শুনেছি, মুআইকীব হাবশা থেকে জাফর ইবন আবী তালিবের সাথে সরাসরি মদীনায় চলে যান। (আনসাবুল আশরাফ-১/ ২০০)।
তবে এ কথা সঠিক যে তিনি খাইবার যুদ্ধের পর মদীনায় আসেন। বদর ও খাইবারে তিনি অংশগ্রহণ করতে পারেননি। ইবন সাদও তাকে ঐ সকল সাহাবীর তালিকায় স্থান দিয়েছেন যারা সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করলেও বদরে যোগদানের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
হযরত রাসূলে কারীমের জীবদ্দশায় নবুওয়াতের ‘খাতাম’ বা মোহর তারই দায়িত্বে থাকতো। এ কারণে রাসূল সা: ওফাতের পর হযরত আবু বকর ও হযরত উমার (রা) তাকে বিশেষ সম্মান দেখাতেন। উপরোক্ত দুজনের খিলাফতকালে অর্থ বিষয়ক সকল কর্মকান্ড দেখাশুনা ও বাইতুল মালের রক্ষকের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন।
খলীফা হযরত উমার সা: তাকে খুব ভালোবাসতেন। শেষ বয়সে তিনি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন। খলীফা তার চিকিৎসার সব রকম চেষ্ঠা করেন। কোথাও কোন ভাল চিকিৎসকের সন্ধান পেলে তাদেরকে ডেকে তিনি তার চিকিৎসা করাতেন। কিন্তু কোন উপকার হয়নি। তবে ভবিষ্যতে আরও বেড়ে যাওয়ার আশংকা দূর হয়। মানুষ সাধারণত কুষ্ঠ রোগীদের সাথে ওঠা বসা ও পানাহার পরিহার করে চলে; কিন্তু হযরত উমার (রা) তাকে সংগে নিয়ে একই দস্তরখানে খেতে বসতেন। একবার খলীফা উমার (রা) ও তার সঙ্গীদের রাতের খাবার দেওয়া হলো। খলীফা ঘর থেকে বেরিয়ে মুআইকিব ইবন আবী ফাতিমাকে তাদের সাথে খাবারের জন্য ডাকলেন। উপস্থিত লোকেরা ভীত হয়ে পড়লো। উমার (রা) মুআইকিবকে বললেন: তুমি আমার কাছে বস। আল্লাহর কসম, তোমার ছাড়া এ রোগ অন্য কারও হলে আমি তার সাথে এক থালায় খেতাম না। তুমি তোমার দিক থেকে খুশীম খাও। মুআইকিব তাদের সাথে বসে এক থালায় আহার করেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪৫৮)। অন্য একটি বর্ণনামতে উমার বলেন: সে যদি রাসূলুল্লাহর সাহাবী না হতো আমি তার সাথে খেতাম না। (আনসাবুল আশরাফ-১/২০০)।
খলীফা হযরত উমারের (রা) পর খলীফা হযরত উসমান (রা) তার প্রতি একই রকম আচরণ করতে থাকেন। রাসূল সা: মোহর শেষ পর্যন্ত তারই জিম্মায় ছিল। এ মোহরটি তারই হাত থেকে ‘বীরে মাউনা’ বা মাউনা নামক কূপে পড়ে যায়। যে বছর মোহরটি পড়ে যায় সেই বছরের শেষ দিকে তিনি মৃত্যু বরণ করেন। বালাজুরী বলেন: খলীফা উসমানের যুগে যে বছর আফ্রিকা অভিযান চালানো হয় সেই বছর তিনি ইনতিকাল করেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/২০০)
ইতিহাসে মুহাম্মাদ ইবন মুয়াইকিব নামে তার এক পুত্রের সন্ধান পাওয়া যায়। তিনি তার পিতা মুআইকিব থেকে হাদীসও বর্ণনা করেছেন।
শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি এমন কোন বিশেষ ব্যক্তি ছিলেন না। তবে লেখাপড়ায় তার দক্ষতা ছিল। হযরত উমার (রা) যখন নিজের সম্পত্তি ওয়াক্বফ করেন তখন সেই ওয়াকফ নামাটি মুআইকিব রচনা করেন। রাসূলুল্লাহর সা: হাদীসেও তিনি ছিলেন পারদর্শী। হাদীস গ্রন্থসমূহে তার থেকে বর্ণিত বেশ কিছু হাদীস পাওয়া যায়। তার মধ্যে দুটি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাত বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন এবং একটি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
হিশাম ইবনুল আস (রা)

নাম হিশাম, কুনিয়াত বা ডাক নাম আবুল আস ও আবু মুতী। ইবন হিব্বান বলেন: জাহিলী যুগে হিশামের কুনিয়াত ছিল আবুল আস অর্থাত অবাধ্যের পিতা। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল সা: তা পরিবর্তন করে রাখেন আবু মুতী- অনুগতের পিতা। (আল ইসাবা-২/৬০৪) তার পিতা আল আস ইবন ওয়ায়িল। কুরাইশ গোত্রের বনী সাহম শাখার সন্তান। মিসর বিজয়ী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আমর ইবনুল আসের ছোট ভাই।
সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য বয়সের তারতম্যের ওপর নির্ভর করে না। হিশাম আমর অপেক্ষা ছোট হলেও বড় ভাইয়ের চেয়ে অধিকতর সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন। আমর যখন পৌত্তলিকতার অন্ধকারে হাবুডুব খাচ্ছেন, হিশামের ললাট তখন ইসলামের নূর ঝলক দিচেছ। মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই তিনি তা কবুল করেন এবং মক্কাবাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুহাজিরদের একটি কাফিলার সাথে হাবশায় চলে যান। কিছুদিন সেখানে অবস্থানের পর এই মিথ্যা গুজব শুনেন যে, মক্কাবাসীরা ইসলাম কবুল করেছে, তখন অনেকের সাথে তিনিও মক্কায় ফিরে আসেন। এখান থেকে আবার মদীনায় হিজরাতের পরিকল্পনা করেন; কিন্তু তার পিতা ও খান্দানের লোকদের হাতে বন্দী হন।
এ সম্পর্কে উমার ইবনুল খাত্তাবের বর্ণনা বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থে পাওয়া যায়। তিনি বলেন: ‘আমরা মদীনায় হিজরাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। আমি আইয়াশ ইবন রাবীয়া ও হিশাম ইবনুল আস- এ তিনজন মক্কা থেকে ছয় মাইল দূরে ‘তানদুব’ উপত্যকায় বনী গিফারের ‘উদাত’ নামক কূপের নিকট এই অঙ্গীকার করলাম আমাদের প্রত্যেকেই আগামীকাল সকালে এখানে উপস্থিত হবে। কেউ ব্যর্থ হলে অবশ্যই সে বন্দী হবে। আমি ও আইয়াশ সময়মত হাজির হলাম; কিন্তু হিশাম বন্দী হয়ে অত্যাচারিত হলো। আমরা মদীনায় পৌঁছে কুবার বনী আমর ইবন আওফের অতিথি হলাম। এদিকে আইয়াশকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আবু জাহল ইবন হিশাম ও হারিস ইবন হিশাম মদীনায় এলো। তারা দুজন ছিল আইয়াশের চাচাতো ভাই এবং সকলেই একই মায়ের সন্তান। রাসূল সা: তখন মক্কায়। তারা আইয়াশকে বললো, তোমার মা শপথ করেছে, তোমাকে না দেখে চুলে চিরুণী দেবে না, রোদ থেকে ছায়াতেও যাবে না। তুমি ফিরে চল। আইয়াশের অন্তর মায়ের জন্য নরম হয়ে গেল।
উমার বলেন: আমি তাকে বারবার অনুরোধ করলাম তাদের সাথে ফিরে না যাওয়ার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইয়াশ তাদের সাথে মক্কার দিকে যাত্রা করলো। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা আইয়াশকে বেধে ফেলে এবং অত্যাচার করতে করতে মক্কায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে বন্দী করে রাখা হয়।
উমার বলেন, আমরা তখন মদীনায় বলাবলি করতাম যারা এভাবে নিজেদেরকে বিপদের সম্মুখীন করেছে আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন না। অত:পর রাসূল সা: মদীনায় আসলেন এবং কুরআনের এ আয়াত নাযিল হলো:
বল হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়োনা। আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।
উমার বলে: আমি আয়াতটি লিখে গোপনে মক্কায় হিশামের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। হিশাম বলেন, আমি সে আয়াতটি মক্কার ‘যী-তুওয়া’ নামক স্থানে বসে পাঠ করতাম; কিন্তু কিছুই বুঝতাম না। অবশেষে তা বুঝার তাওফীক দানের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করলাম। তারপর আমি বুঝলাম এ আয়াত আমাদের শানে নাযিল হয়েছে। অত:পর আমি মদীনায় রাসূল সা: এর নিকট পৌঁছলাম। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৪৫-৪৬) সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৭৪-৪৭৬) আল ইসাবা-৩/৬০৪)।
ইবন হিশাম বলেন: আমার বিশ্বস্ত এক ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, মদীনায় একদিন রাসূল সা: বললেন: আইয়াশ ইবন রাবীয়া ও হিশাম ইবনুল আসের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে কে আমাকে সাহায্য করতে পারে? ওয়ালীদ ইবনুল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, তাদের ব্যাপারে আমি আপনাকে সাহায্য করবো। অত:পর তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। গোপনে মক্কায় প্রবেশ করে তিনি এক মহিলাকে দেখলেন, খাবার নিয়ে যাচ্ছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহর বান্দী, কোথায় যাচ্ছ? সে বললো: আমি যাচ্ছি এই দুই বন্দীর কাছে। অর্থাত আইয়াশ ও হিশামের কাছে। ওয়ালীদ মহিলাকে অনুসরণ করে বন্দীশালাটি চিনে নিলেন। তাদেরকে একটি ছাদবিহীন ঘরে বেধে রাখা হয়েছিল। তখন রাত হলো, ওয়ালীদ দেওয়াল টপকে তাদের কাছে পৌঁছে গেলেন এবং একটি পাথরের সাহায্যে তাদের বাধন কেটে দিলেন। তারপর তিন জন এক সাথে বেরিয়ে ওয়ালীদের উটে সওয়ার হয়ে মদীনায় পালিয়ে আসেন। তাদের একমাত্র বহান উটটি হোচট খেলে ওয়ালীদের একটি আংগুল আহত হয়ে রক্ত রঞ্জিত হয়। তিনি স্বীয় অঙ্গুলিকে উদ্দেশ্য করে এই শ্লোকটি আবৃত্তি করেন: ‘ হাল আনতি ইল্লা উসবুয়িন দামাইতি ওয়া ফী সাবীলিল্লাহি মা লাকীতি।
ওহে, তুমি একটি অঙ্গুলি ছাড়া আর তো কিছু নও, যা রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তোমার যা কিছু হয়েছে, তাতো আল্লাহর রাস্তায়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১ ৪৭৬)
বদর, উহুদ, খন্দকের যুদ্ধ মক্কায় হিশামের বন্দী দশায় শেষ হয়। খন্দক যুদ্ধের পর তিনি মদীনায় আসেন। খন্দকের পর কাফিরদের সাথে যতগুলি যুদ্ধ হয়েছে, সবগুলিতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ওয়াকিদী বলেন, মক্কা বিজয়ের পূর্বে রমযান মাসে রাসুলুল্লাহ সা: হিশামকে এক অভিযানে পাঠান। (আল ইসাবা-৩/৬০৪)
সেনা পরিচালনা, বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন এসব ছিল হিশামের খান্দানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ পরিবারের সন্তানেরা তরবারির ছায়াতলেই বেড়ে ওঠতো। রাসূল সা: এর ওফাতের পর হযরত আবুবকরের খিলাফতকালে তার এ বৈশিষ্টের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। কোন কোন বর্ণনায় জানা যায় প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রা) তাকে নুঈম ইবন আবদুল্লাহ ও অন্য কতিপয় ব্যক্তি সাথে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য তার দরবারে পাঠান। এ প্রসঙ্গে হিশাম বলেন: কয়েক ব্যক্তির সাথে আমাকে হিরাক্লিয়াসের নিকট পাঠানো হয়। আমরা ‘গুতা’ বা দিমাশকে পৌঁছে জাবালা ইবন আয়হাম আল গাসসানীর বাড়ীতে উপস্থিত হলাম। আমাদের সাথে কথা বলার জন্য তিনি একজন দূত পাঠালেন। আমরা বললাম: আমাদেরকে সম্রাটের কাছে পাঠানো হয়েছে, আমরা কোন দূতের সাথে কথা বলবো না। অনুমতি দিলে আমরা তারই সাথে কথা বলবো। অবশেষে জাবালা আমাদেরকে তার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।
জাবালা আমাদেরকে বললেন: আপনাদের বক্তব্য কী? হিশাম বলেন, আমি তার সামনে ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরি। তখন তার ও সভাষদবৃন্দের পরিধানে ছিল কালো পোশাক। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের পরিধানে এ পোশাক কেন? তিনি বললেন: আমরা এ পোশাক পরেছি এবং শপথ করেছি, শাম থেকে তোমাদের তাড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এগুলি খুলবো না। আমি বললাম: আল্লাহর কসম! আপনার এই সিংহাসন এবং আপনাদের সম্রাটের সাম্রাজ্য ইনশা আল্লাহ আমরা ছিনিয়ে নেব। আমাদের নবী মুহাম্মাদ সা: এমনই ভবিষ্যত বাণী করেছেন। জাবালা বললেন: আপনারা নন; বরং তারাই এর উপযুক্ত যারা দিনে সিয়াম সাধনা করে এবং রাতে ইবাদাতে দন্ডায়মান থাকে। আপনাদের সিয়াম কেমন? আমি আমাদের সিয়ামের পরিচিতি তুলে ধরলাম। তখন জাবালার চেহারা কালো হয়ে গেল। অত:পর তিনি একজন দূত সহ আমাদেরকে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট পাঠিয়ে দিলেন।
হিশাম বলেন: আমরা দূতের সাথে চলতে লাগলাম। যখন আমরা নগরের নিকটবর্তী হলাম, আমাদের সাথের দূতটি বললো: আপনাদের এই সওয়ারী পশু সম্রাটের নগরে প্রবেশ করতে পারবে না। আপনারা চাইলে আমি আপনাদের জন্য তুর্কী ঘোড়া ও খচ্চরের ব্যবস্থা করতে পারবো। আমরা বললাম: আমাদের এই পশুর ওপর সওয়ার হওয়া ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় আমরা শহরে প্রবেশ করবো না। আমাদের অনমনীয়তার কথা সম্রাটকে জানানো হলে তিনি আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমরা তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে সম্রাটের কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম।
এভাবে হিশাম ইবনুল আস ও তার সঙ্গীরা যখন রাজ দরবারের বাইরে নিজ নিজ পশুর পিঠ থেকে নামছিলেন তখন সম্রাট তাদেরকে তাকিয়ে দেখছিলেন। তারা যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করছিলেন, বাতাসে আন্দোলিত খেজুর গাছের পাতার মত তারা কাঁপছিল। সম্রাট লোক মারফত তাদের জানিয়ে দেন যে, এভাবে জোরে জোরে দ্বীন প্রচারের অধিকার তাদের নেই। তারা সম্রাটের কাছে গেলেন।
সম্রাট সিংহাসনে এবং রোমান সমরবিশারদরা নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট। সম্রাট হাসিমুখে তাদের বললেন: আপনারা নিজেদের মধ্যে যেভাবে সালাম ও সম্ভাষণ বিনিময় করেন, সেইভাবে আমাকে সম্ভাষণ জানালেন না কেন? সম্রাটের পাশেই বসা ছিল একজন প্রাঞ্জল আরবী ভাষী। তারা বললেন: আমাদের সম্ভাষণ আপনার জন্য বৈধ নয়; আর আপনাদের সম্ভাষণও আমাদের মুখে উচ্চারণ আমাদের জন্য উচিত নয়। সম্রাট প্রশ্ন করলেন: আপনারা নিজেদের মধ্যে এবং আপনাদের বাদশাহকে কিভাবে সম্ভাষণ জানান? তারা বললেন: আসসালামু আলাইকা। সম্রাট আবার প্রশ্ন করেন: আপনাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য কি? তারা বলেন: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুওয়া আল্লাহু আকবার- আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। অত:পর তারা সম্রাটের নিকট দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন বিষয় যথা-সালাত, সাওম, হজ্জ,যাকাত ইত্যাদির পরিচয় তুলে ধরেন। এই প্রতিনিধি দল সম্রাটের অতিথি হিসাবে তিন দিন তার নিকট অবস্থান করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থে এই দাওয়াতী মিশনের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। (আল ইসাবা-২/ ৪৭১)। হায়াতুস সাহাবা-১/২০৪, ৪০৫, ৩/৫৫৭-৫৬২) অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে, সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে তাবলীগী মিশন নিয়ে যিনি গিয়েছিলেন তিনি এ হিশাম নন, তিনি অন্য আর এক হিশাম।(আল ইসাবা-৩/৭০৪)।
খলীফা হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে দু একটি সংঘর্ষের পর রোমানরা আজনাদাইনে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। হিজরী ১৩ সনের জুমাদা আল উলা মাসে সংঘর্ষ শুরু হয়। ওয়াকিদী উম্মু বকর বিনতুল মিসওয়ারের সূত্রে উল্লেখ করেছেন: এ যুদ্ধে হিশাম যখন কিছু মুসলিম সৈনিকের মধ্যে পলায়নী মনোবৃত্তি লক্ষ্য করলেন, স্বীয় মুখাবরণ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শত্রু ব্যুহের মাঝ বরাবর এগিয়ে গেলেন এবং চিতকার করে বলতে থাকলেন: ওহে মুসলিম সৈনিকবৃন্দ, আমি হিশাম ইবনুল আস। তোমরা আমার সাথে এসো। তোমরা জান্নাত থেকে পালাচ্ছ?
এই খতনাবিহীন লোকেরা তোমাদের তরবারির সামনে টিকে থাকতে পারে না। হিশামের সাথে যোগ দিয়ে মুসলিম বাহিনী রোমান বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। রোমান বাহিনী একটি সংকীর্ণ পথের মুখে জমা হয়। পথের বিপরীত দিক থেকে হিশাম আক্রমণ চালান। রোমানরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে এবং তার লাশের ওপর দিয়ে পালিয়ে যায়। মুসলিম সৈন্যরা সেখানে পৌঁছে তার পেষা লাশটি পদদলিত হওয়ার ভয়ে শত্রু বাহিনীর পিছু ধাওয়া করতে ইতস্তত: করতে লাগলো। তখন তার বড় ভাই আমর (রা) এসে বললেন: ওহে লোক সকল, আল্লাহ তাকে শাহাদাত দান করেছেন, তার রুহটি উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তার দেহটি এখানে পড়ে আছে। অত:পর মুসলিম সৈন্যরা তার লাশের ওপর দিয়ে সংকীর্ণ পথটি অতিক্রম করে শত্রু বাহিনীর পিছু ধাওয়া করে। আমর ইবনুল আস (রা) সেই ছড়ানো ছিটানো লাশ একত্রিত করে দাফন করেন। (আল ইসাবা-৩/৬০৪)।
তবে ইবনুল মোবারকের মতে তিনি খলীফা উমারের যুগে ইয়ারমুক যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। (আল ইসতীয়াব, টীকা আল ইসাবা-৩/৫৯৩-৫৯৫)
হিশাম ইবনুল আস তার ভাই আমর ইবনুল আস অপেক্ষা বয়সে ছোট হলেও বড় ভাইয়ের চেয়ে বেশি নেককার ছিলেন। হিশামের শাহাদাতের পর একবার কতিপয় কুরাইশ ব্যক্তি খানায়ে কাবার পেছনে বসে তাদের দুই ভাইয়ের সম্পর্কে আলোচনা করছিল। এমন সময় তারা আমরকে তাওয়াফরত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে প্রশ্ন করলো: আপনাদের দুজনের মধ্যে কে উত্তম- আপনি না আপনার ভাই হিশাম? তিনি বললেন: আমার ও তার পক্ষ থেকে আমি বলছি। তার মা হাশেম ইবনুল মুগীরার মেয়ে, আর আমার মা একজন দাসী। আমাদের পিতা আমার চেয়ে তাকে বেশী ভালোবাসতেন। আর প্রত্যেক পিতার তার সন্তানের ব্যাপারে দুরদৃষ্টির কথা তো তোমাদের জানা আছে। আমরা দুজন ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করেছি, সব সময় সে আমাকে পরাজিত করেছে। আমি ও সে দুজনেই যুদ্ধে যোগদান করি এবং সারারাত দুজনই শাহাদাত লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করি। আল্লাহ তার দুআ কবুল করলেন এবং আমার দুআ ব্যর্থ হলো। (আল ইসাবা-১/৬০৪)
হযরত রাসূলে কারীম সা: তাদের দুই ভাইয়ের ঈমানী দৃঢ়তার সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন: আসের দুই পুত্র হিশাম ও আমর মুমিন।।
হিশামের শাহাদতের খবর শুনে হযরত উমার ফারুক (রা) মন্তব্য করেছিলেন: আল্লাহ তার ওপর রহমত নাযিল করুন। তিনি ইসলামের একজন উত্তম সেব ছিলেন।
যূ-শিমালাইন উমাইন ইবন আবদি আমর (রা)।
আসল নাম উমাইর, ডাক নাম আবু মুহাম্মাদ, লকব বা উপাধি যূ -শিমালাইন। পিতার নাম আবদু আমর। খুযায়া গোত্রের সন্তান। তিনি সকল কাজ দু হাত দিয়ে করতেন বলে যূ -শিমালাইন দুখানি দক্ষিণ হস্তের অধিকারী তার উপাধিতে পরিণত হন। তার পিতা আবদু আমর ইবন নাদলা মক্কায় এসে আবদ ইবন হারেস ইবন নাদলা ইবন যাহবার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যান। আবদ নিজ কন্যা নুম বিনতু আবদকে তার সাথে বিয়ে দেন। তারই গর্ভে পুত্র যূ-শিমালাইন ও কন্যা রায়তা জন্ম গ্রহণ করেন। (তাবাকাত ইবন সাদ-৩/১৬৭)।
উল্লেখ্য যে, সীরাত গ্রন্থ সমূহে যূ-শিমালাইন অর্থাত দুখানি ডান হাতের অধিকারী এবং যুল ইয়াদাইন বা দুখানি হাতের অধিকারী এ দুটি লকব বা উপাধি বিশিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদ্বয়ের কথা পাওয়া যায়। এ দুটি উপাধি কি একই ব্যক্তির না ভিন্ন দু ব্যক্তির এ সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতের অমিল দেখা যায়। অধিকাংশের মতে উপাধি দুটি একই ব্যক্তির যেমন: ইবন সা’দ তার তাবাকাতে শিরোনাম দিয়েছেন- যূল ইয়াদাইন ওয়া ইউকালু যূ আশ শিমালাইন অর্থাত যুল ইয়াদাইন এবং তাকেই যু আশ শিমালাইন বলা হয়। (তাবাকাত-৩/১৬৭)।
কিন্তু তাদের এ মত অনেকের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে মূলত: তারা ভিন্ন দু ব্যক্তি। হাদীদের দ্বারাও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যুল ইয়াদাইন নামক ব্যক্তির একটি ঘটনা বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একবার রাসুল সা: চার রাকয়াতের স্থলে দুই রাকয়াত নামায আদায় করে সালাম ফিরান। সাহাবীরা তো সবাই হতভম্ব। কিন্তু কেউ কোন প্রশ্ন করতে সাহস পেলেন না। যুল ইয়াদাইন ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! নামায কি কম করে দেওয়া হয়েছে না কি আপনি ভুল করেছেন? রাসুল সা: সাহাবীদের নিকট তার কথার সত্যতা যাচাই করলেন। সবাই যুল ইয়াদাইনকে সমর্থন করে বললেন: আপনি দুই রাকয়াতই আদায় করছেন। সত্যতা যাচাইর পর তিনি বাকী দু রাকায়াত আদায়ের শেষে সহু সিজদাহ করেন। (বুখারী: আযান অধ্যায়, অনুচ্ছেদ: ইমামের সন্দেহ হলে তিনি কি মুকতাদিদের কথা গ্রহণ করবেন?)
উপরোক্ত হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রা)। তিনি হিজরী সপ্তম সনে খাইবার যুদ্ধের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে যু শিমালাইন তারপ পাঁচ বছর পূর্বে বদর যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। সুতরাং যুল ইয়াদাইনও যু শিমালাইন একই ব্যক্তি হতে পারেন না। তাছাড়া দুজনের নামেও পার্থক্য আছে। একজনের নাম খিরবাক ও অন্যজনের নাম উমাইর। (সিয়ারুস সাহাব, মুহাজিরিন-২/৩২৭)। আবু উমার বলেন: বদরে যূ শিমালাইন শহীদ হন তিনি যুল ইয়াদাইন নন। (আল ইসাবা-৩/৩৩)।
হযরত যু-শিমালাইন কখন এবং কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ইসলাম গ্রহণের পর মদীনায় হিজরাত করে হযরত সাদ ইবন খাইসামার অতিথি হন। রাসূল সা: ইয়াযীদ ইবন হারেসের সাথে তার মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্টা করে দেন। ইসলাম গ্রহণের পর খুব বেশি দিন তিনি বাঁচেননি। মদীনায় আসার পর তিনি ও তার দ্বীনি ভাই ইয়াযীদ মহান বদর যুদ্ধে যোগদান করেন। এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম ও শেষ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তিনি কাফির আবু উসামা যুহাইর ইবন মুআবিয়া আল জুশামীর হাতে শহীদ হন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ত্রিশ বছর। তার দ্বীনী ভাই ইয়াযীদ ও এ যুদ্ধে শহীদ হন। (তাবাকাত: ৩/১৬৮, আনসাবুল আশরাফ-১/২৯৫)।
কুদামাহ ইবন মাজউন (রা)

নাম কুদামাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু উমার। পিতা মাজউন ইবন হাবীব এবং মা সুখাইলা বিনতুল আনবাস। (টীকা : সীরাতু ইবন হিশাম-১/২৫৩)।
কুরাইশ বংশের বনী জুমাহ শাখার সন্তান। হযরত উমারের বোন সাফিয়্যা বিনতুল খাত্তাব তার স্ত্রী।
হযরত কুদামাহ ইসলামের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা) আহবানে যে সকল ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন উসমান ইবন মাজউন ও তার অন্য দুই ভাই কুদামাহ ও আবদুল্লাহ অন্যতম। তিনি দুই হিজরাতের অধিকারী। ইসলাম গ্রহণের পর অন্য দুই ভায়ের সাথে প্রথমে তিনি হাবশায় হিজরাত করেন। অত:পর মক্কাবাসীরা সকলে ইসলামের দীক্ষা নিয়েছে এমন একটি মিথ্যা গুজব শুনে অনেকে হাবশা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই প্রত্যাবর্তনকারীদের মধ্যে কুদামাহও ছিলেন। সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৬৭)।
হযরত কুদামাহ হাবশা থেকে ফিরে মক্কায় বসবাস করতে থাকেন। বদর যুদ্ধের পূর্বে আবার মদীনায় হিজরাত করেন এবং বদরে যোগদান করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তারপর উহুদ,খন্দক সহ সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
খলীফা হযরত উমার (রা) কুদামাহকে বাহরাইনের শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। এই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাকালেই তিন মদ পানের অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং তার ওপর মদ পানের নির্ধারিত শাস্তি বা ‘হদ’ জারি করা হয়। তিনি হযরত উমারের সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন নি এবং বদরী সাহাবী হিসাবে তার আত্মপক্ষ সমর্থন বিশ্বাসযোগ্য হলেও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে হযরত উমারের নিকট তার অপরাধ প্রমাণ হয়ে যায়। এ জন্য খলীফা তার ওপর ‘হদ’ জারী করেন। ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, একবার বনু আবদি কায়সের সরদার ‘জারুদ’ খলীফা উমারের নিকট উপস্থিত হয়ে কুদামাহর বিরুদ্ধে মদ পানের অভিযোগ দায়ের করেন। খলীফা জারুদকে বললেন, তুমি ছাড়া এ ঘটনার আর কোন স্বাক্ষী আছে কি? জারুদ হযরত আবু হুরাইরাকে (রা) সাক্ষী মানলেন। উমার (রা) আবু হুরাইরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন। আবু হুরাইরা বললেন, তিনি কুদামাহকে কখনও মদ পান করতে দেখেননি, তবে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বমি করতে দেখেছেন। উমার (রা) বললেন, শুধু এ সাক্ষ্যে অপরাধ প্রমাণ হয় না। আরও অনুসন্ধানের জন্য তিনি কুদামাহকে বাহরাইন থেকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। কুদামাহ মদীনায় পৌঁছলেন। জারুদ আবারও খলীফার নিকট তার ওপর ‘হদ’ জারী করার দাবী জানালো। উমার (রা) তাকে বললেন তুমি সাক্ষী না বাদী? জারুদ বললো, সাক্ষী। খলীফা বললেন, তোমার দায়িত্ব তুমি পালন করেছো, এখন চুপ থাক। অত:পর জারুদ আবারও খলীফার নিকট ‘হদ’ জারির তাকিদ দিল। তার এই বাড়াবাড়ির কারণে হযরত উমারের মনে সন্দেহ দেখা দিল। তিনি জারুদকে বললেন: তোমার জিহবা সংযত রাখ, অন্যথায় তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি। প্রত্যুত্তরে জারুদ খলীফাকে বললো, উমার, আপনার চাচাতো ভাই মদ পান করেছে আর আপনি উল্টো আমাকে শাসাচ্ছেন- এ তো কোন ইনসাফের কথা নয়। এ পর্যায়ে হযরত আবু হুরাইরা (রা) খলীফাকে বললেন, ইয়া আমীরুল মুমিনীন, আমাদের সাক্ষ্যের ব্যাপারে আপনি সংশয় পোষণ করলে কুদামাহর স্ত্রী তথা ওয়ালীদের মেয়ে হিন্দাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। উমার (রা) তাকে ডেকে পাঠান। তিনিও স্বামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।
এবার উমারের (রা) আদল ও ইনসাফ বা সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতা উথলে উঠলো। তিনি কুদামাহকে বললেন, কুদামাহ, শাস্তি গ্রহণের জন্য তৈরী হয়ে যাও। জবাবে কুদামাহ বললেন, তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী যদি ধরেও নেওয়া যায় আমি মদ পান করেছি, তবুও আমার ওপর ‘হদ’ জারী করার কোন অধিকার আপনার নেই। উমার (রা) প্রশ্ন করলেন, কেন? কুদামাহ পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদাহর ১১ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করে শুনান। আল্লাহ বলছেন: যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ বা সতকাজ করেছে, তারা যা খেয়েছে তার জন্য তাদের কোন পাপ নেই। যখন তারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে। (সূরা মায়িদা-১১)।
উমার (রা) বললেন, কুদামাহ তুমি আয়াতটির অর্থ বিকৃত করছো। তুমি আল্লাহকে ভয় করলে অবশ্যই হারাম জিনিস থেকে বিরত থাকতে। হযরত কুদামাহ তখন অসুস্থ ছিলেন। এ কারণে খলীফা অন্যান্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে কিছুদিনের জন্য ‘হদ’ জারি বা শাস্তিদান মূলতবী রাখেন। কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর ‘হদ’ মূলতবী রাখা উমারের জন্য ছিল অসহনীয়। তিনি দ্বিতীয়বার সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। এবারও সকলে ‘হদ’ মূলতবী রাখার পক্ষে মত ব্যক্ত করলেন। কিন্তু খলীফা উমার বললেন: আমি আল্লাহর সাথে মিলিত হই, আর তার বোঝা আমার কাঁধে চাপুক, এ অবস্থার চেয়ে সে চাবুকের নিচে মৃত্যুবরণ করুক- এটাই আমার অধিক কাম্য। তিনি আর দেরী করলেন না। কুদামাহর অসুস্থতার মধ্যেই তার ওপর হদ জারি করেন এবং তার সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
এ ঘটনার কিছুদিন পর দুজন আবার এক সাথে হজ্জ আদায় করেন। মদীনায় ফেরার পথে উমার (রা) এক স্থানে ঘুমিয়ে পড়েন এবং স্বপ্নে কুদামাহর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নির্দেশ লাভ করেন। ঘুম থেকে জেগেই তিনি কুদামাহকে ডেকে পাঠান। কিন্তু কুদামাহ আসতে অস্বীকৃতি জানান। উমার (রা) দ্বিতীয়বার লোক পাঠিয়ে বলেন, স্বেচ্ছায় না এলে জোর করে ধরে আনা হবে। কুদামাহ আসলেন। খলীফাই প্রথম আলোচনার সূচনা করলেন। অত:পর দুজনের মধ্যে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলে কারীমের সা: ওফাতের পর একমাত্র কুদামাহ ছাড়া আর কোন বদরী সাহাবী মদ পানের অভিযোগে সাজা প্রাপ্ত হননি। (আল ইসাবা-৩/২২৯)।
হযরত কুদামাহর (রা) মৃত্যুসন সম্পর্কে মতপার্থক্য আছে। প্রসিদ্ধমতে তিনি হযরত আলীর (রা) খিলাফতকালে হিজরী ৩৬ সনে ৬৮ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। অন্য একটি মতে তার মৃত্যুসন ৫৬ হিজরী।
হাজ্জাজ ইবন ইলাত (রা)

নাম হাজ্জাজ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু কিলাব, মতান্তরে আবু মুহাম্মাদ ও আবু আবদুল্লাহ। পিতা ইলাত ইবন খালিদ। বনী সুলাইম গোত্রের সন্তান।
ইবন সাদ বলেন, রাসূল সা: যখন খাইবারে তখন তিনি তার খিদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মদীনায় বসতি স্থাপন করেন। ইবন শিহাব থেকে বর্ণিত। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহর সা: নবুওয়াত সত্য বলে স্বীকার করে তার কাছে লোক পাঠান। (আল ইসাবা-১/৩১৩)।
তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ কাহিনী ইতিহাসে দেখা যায়। ইবন আব আদ দুনিয়া ‘হাওয়াতিফুল জিন’ গ্রন্থে এবং ইবন আসাকির ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: হাজ্জাজের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি ছিল এমন। তিনি একটি কাফিলার সাথে মক্কায় যাচ্ছেন। একটি নির্জন ভীতিজনক উপত্যকায় রাত হলে তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। হাজ্জাজের সঙ্গী সাথীরা তাকে অনুরোধ করে বলে! আবু কিলাব, তুমিরাত জেগে বসে বসে তোমার নিজের ও সঙ্গীদের জন্য নিরাপত্তা কামনা করতে থাক। হাজ্জাজ পাহারাদারীর দায়িত্ব নিয়ে জেগে জেগে নিম্নোক্ত কথাগুলি জপতে থাকেন:
উয়িজু নাফসী ওয়া উয়িজু সাহবী,
মিন কুল্লি জিন্নিয়্যিন বিহাজান নাকবি,
হাত্তা আউবা সালেমান ওয়া রাকবী।
আমি আমার নিজের ও আমার সঙ্গীদের জন্য পানাহ চাই, এই গিরিপথের সকল জিন থেকে, যাতে আমি ও আমার কাফিলা নিরাপদে ফিরে যেতে পারি।
তিনি উপরোক্ত কথাগুলি জপছেন। এমন সময় অদৃশ্য থেকে কারও কন্ঠে কুরআনের নিম্নের আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনতে পান:
ওহে জিন ও মানবজাতি! আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর! কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ছাড়া।- সূরা আর রাহমান-৩৩।
তারা মক্কায় পৌঁছে কুরাইশদের মজলিসে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। কুরাইশরা বলে: আবু কিলাব, তুমিও তো দেখছি বে দ্বীন হয়ে গিয়েছ। এতো সেই বানী যা মুহাম্মাদের ধারণা মতে তার ওপর নাযিল হয়। জবাবে হাজ্জাজ বলেন: আল্লাহর কসম, আমি ও আমার সঙ্গীরা এই বাণীই শুনতে পেয়েছি। তাদের এ আলোচনার মাঝখানে আসী ইবন ওয়ালিল উপস্থিত হয়। লোকেরা তাকে বলে: আবু হিশাম, এই আবু কিলাব কি বলছে, শুনেছ? বিষয়টি সে জানতে চাইলে লোকেরা তাকে অবহিত করে। সবকিছু শুনে সে বলে : এতে অবাক হওয়ার কি আছে? তারা যার কাছ থেকে শুনেছে, সেই মুহাম্মাদের ওপর ভর করে তার মুখ দিয়ে বলে থাকে। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৭৬-৭৭)।
হাজ্জাজের সহধর্মিণী তখনও মক্কায় বসবাস করেন। তার সকল সম্পদও সেখানে। ইসলাম গ্রহণের পর এসব সহায় সম্পদ মদীনায় সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। অন্যথায় তার ইসলাম গ্রহণের কথা কুরাইশরা জানতে পেলে সব হাতিয়ে নেবে। তার সম্পর্কে মক্কাবাসী পৌত্তলিকরাও সন্দিহান ছিল। তার অর্থ সম্পদ সহজে মক্কা থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভবও ছিল না। এ কারণে হাজ্জাজ মক্কা গিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেন যে, খাইবারে মুহাম্মাদ সা: পরাজিত হয়েছে।
মুহুর্তের মধ্যে খবরটি সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কার মুশরিকদের এভাবে খুশী করে তিনি বললেন: মুহাম্মাদের সা: সকল আসবাবপত্র বিক্রি হচ্ছে। আমার বাসনা, অন্য ব্যবসায়ীদের পৌঁছার পূর্বেই আমি সেগুলি খরিদ করি। মক্কার বিভিন্ন লোকের নিকট আমার বহু অর্থ কড়ি পাওনা আছে। তোমরা একটু চেষ্টা করলে সহজে আদায় হতে পারে। মক্কাবাসীরা এই ভাল কাজটির জন্য কোমর বেধে লেগে গেল। তারা চেষ্টা তদবীর করে তার পাওনা অর্থ আদায় করে দিল। রাসূল সা: এর সম্মানিত চাচা হযরত আব্বাস (রা) তখন মক্কায়। তিনি নিজের বাড়ীতে বসে সব কিছু শুনছেন। তিনি এত ব্যাথা পেলেন যে, খবরের সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য ঘর থেকেও বের হলেন না। তিনি একটি ছেলের মাধ্যমে হাজ্জাজকে ডেকে পাঠালেন। হাজ্জাজ গেলে এবং আব্বাসকে (রা) আসল কথা খুলে বললেন। তিনি বললেন: আমার বকেয়া আদায়ের জন্য আমি এ কথা ছড়িয়েছি। আমি নিজেই ইসলাম গ্রহণ করেছি। মক্কাবাসীরা জানতে পেলে আমার প্রাপ্য এক কপর্দকও দেবে না। আল্লাহর ইচ্ছায় রাসুল সা: নিরাপদেই আছেন। খাইবারে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয়েছে এবং রাসূল সা: খাইবারের নেতা হুয়াই ইবন আখতারের কন্যাকে বিয়ে করে তার সাথে দাম্পত্য জীবন যাপন করছেন। আমি কুরাইশদের ক্ষমতার আওতা থেকে বের হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত এই গোপন তথ্য কারও নিকট প্রকাশ করবেন না।
অঙ্গীকার অনুযায়ী হযরত আব্বাস (রা) তিনদিন সম্পূর্ণ চুপ থাকলেন। চতুর্থ দিন যখন নিশ্চিত হলেন যে, হাজ্জাজ মক্কাবাসীদের নাগালের বাইরে চলে গেছে, তখন তিনি পোশাক পাল্টে হাজ্জাজের বাড়ী গেলেন এবং তার স্ত্রীর নিকট আসল ঘটনা প্রকাশ করলেন। তারপর তিনি কাবার চত্বরে আসলেন। সেখানে আগে থেকে এই বিষয়ে আলোচনা চলছিল। তিনি লোকদের বললেন: মুহাম্মাদ সা: খাইবার জয় করেছেন এবং হুয়াই ইবন আখতারের কন্যা এখন তার স্ত্রী। বনী আবী হাকীক তথা ইয়াসরিবের নেতৃবৃন্দের গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হাজ্জাজ তোমাদের ধোকা দিয়ে তার অর্থ সম্পদ নিয়ে চম্পট দিয়েছে। লোকেরা প্রশ্ন করলো, আপনি কার কাছে এসব কথা শুনলেন? বললো: হাজ্জাজের কাছে। লোকেরা হাজ্জাজের স্ত্রীর নিকট জিজ্ঞেস করলে তিনিও সমর্থন করলেন। পঞ্চম দিনে মদীনা থেকেও খবর এসে গেল। কিন্তু এখন তাদের করণীয় কিছুই নেই। শিকার তাদের নাগালের বাইরে। তারা চুপ হয়ে গেল। (ইবন সাদ-৪/২, পৃ. ১৪-১৫)
খাইবার যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পূর্বে হাজ্জাজ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ যুদ্ধেই তিনি সর্বপ্রথম মুসলিম বাহিনীর সাথে যোগ দেন। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি মদীনার বাইরে ছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাকে মদীনায় ডেকে পাঠান। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রা) এক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে বনী সুলাইমের পথে মক্কায় প্রবেশ করেন। এই বাহিনীতে আব্বাস ইবন মিরদাস, খুফাফ ইবন নুদবাহ ও হাজ্জাজ ইবন ইলাত- এ তিনজন তিনটি পতাকা বহন করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৬৭)।
হাজ্জাজ ছিলেন ধনী ব্যক্তি। তিনি মক্কা থেকে তার সকল সম্পদ সরিয়ে আনতেও সক্ষম হয়েছিলেন। মদীনায় তিনি নিজের জন্য একটি বাড়ী ও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। (আল ইসাবা-৩২৭)
তার মৃত্যুকাল সম্পর্কে দুটি বর্ণনা আছে। একটি মতে তিনি হযরত উমার ফারুকের (রা) খিলাফতকালের প্রথম দিকে মৃত্যুবরণ করেন। আর অন্য একটি মতে তিনি হযরত আলী (রা) ও আয়িশার মধ্যে সংঘটিত উটের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য। উটের যুদ্ধে হাজ্জাজ নন বরং তার ছেলে শহীদ হন।
উসমান ইবন তালহা (রা)

নাম উসমান, পিতার নাম তালহা ইবন আবী তালহা এবং মাতার নাম উম্মু সাঈদ সালামা। মক্কার কুরাইশ বংশের বনু আমর শাখার সন্তান। জাহিলী যুগে পবিত্র কাবার হাজেব বা তত্ত্বাবধায়ক ও চাবির রক্ষক ছিলেন। ইসলামী যুগেও এ দায়িত্ব পালন করেন। (উসুদুল গাবা-৩/৩৭২)।
উসমান ইবন তালহার পিতা তালহা,তিন ভাই মুসাফি, কিলাব ও হারেস এবং তার চাচা উসমান ইবন আবী তালহা উহুদ যুদ্ধে কাফির অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তার পিতা তালহা হযরত আলীর (রা) সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আলী (রা) তরবারির এক আঘাতে তাকে জাহান্নামে পৌঁছে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম ১ম খন্ড, টীকা নং-৩, পৃ. ৪৭০)।
উসমান ইবন তালহার ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়না। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মক্কায় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার উতপীড়নে শরীক হতেন কি না সে সম্পর্কেও ইতিহাসে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। একটি ঘটনা জানা যায়, হযরত মুসয়াব ইবন উমাইর (রা) মক্কায় দারুল আরকামে গোপনে ইসলাম গ্রহণের পর চুপে চুপে নামায আদায় করতেন। একদিন উসমান ইবনে তালহা তা দেখে ফেলেন এবং তার মা ও গোত্রের কানে পৌঁছে দেন। ফলে তারা মুসয়াবকে বন্দী করে তার ওপর নির্যাতন চালায়। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩০১)।
হযরত উম্মু সালামার (রা) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞরা উসমান ইবন তালহার নামটি বারবার উচ্চারণ করেছেন। ঘটনাটি সংক্ষেপে এই রকম: হযরত উম্মু সালামা সা: যখন মক্কার কুরাইশদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে স্বামী আবু সালামার (রা) সাথে মিলিত হওয়ার জন্য একাকী মদীনার পথে রওয়ানা হয়ে মক্কার অদূরে তানয়ীমে পৌঁছেন, তখন এই উসমান ইবন তালহা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেন: আবু উমাইয়্যার মেয়ে, কোন দিকে যাবে? তিনি বললেন: মদীনায় স্বামীর কাছে। উসমান বললেন: তোমার সাথে আর কেউ নেই? উম্মু সালামা বললেন: আমার এই ছোট্ট শিশু সালামা বললেন, আমার এই ছোট্ট শিশু সালামা ছাড়া আর কেউ নেই। অত:পর উসমান উম্মু সালামার উটের রশি ধরে টেনে চলতে লাগলেন এবং মদীনার উপকন্ঠে কুবার বনী আমর ইবন আউফের পল্লীতে পৌছে উম্মু সালামাকে বললেন: আল্লাহর নামে প্রবেশ কর, তোমার স্বামী এখানে আছে। এ কথা বলে উসমান আবার মক্কার পথ ধরেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৬৯-৭০)
হযরত উম্মু সালামা (রা) যখন মদীনায় হিজরত করেন, উসমান তখনও অমুসলিম।
উসমান ইবন তালহার ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পরিলক্ষিত হয়। কোন মতে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়, কোন মতে হিজরী ৮ম সনে আবার কোন মতে মক্কা বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বে হিজরী অষ্টম সনে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও হযরত আমর ইবনুল আসের সাথে মদীনায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম তখন মনে মনে বললাম: রাসূল সা: এর কাছে যাব কার সাথে? বিষয়টি নিয়ে সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার সাথে আলোচনা করলাম। সে আমার প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বললো, কেউ আমার সাথে না থাকলেও আমি কক্ষনও তার অনুসারী হবো না। এর আমি ইকরামা ইবন আবী জাহলের নিকট গিয়ে একই কথা বললাম। সেও সাফওয়ানের মত জবাব দিল। তারপর আমি উসমান ইবন তালহার সাথে দেখা করে বললাম: আমাদের অবস্থা তো এখন সেই খেকশিয়ালের মত যে একটি গর্তের মধ্যে আছে, আর সেই গর্তে পানি ঢালা হচ্ছে। এক সময় অবশ্যই তাকে বের হয়ে আসতে হবে। উসমান আমার কথা বুঝতে পেরে সায় দিল এবং আমার মত একই ইচ্ছা প্রকাশ করলো। আমি বললাম: আগামী কাল ভোরেই আমি মদীনার পথে রওয়ানা হচ্ছি। অত:পর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামীকাল ভোরে আমরা পৃথকভাবে মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে ইয়াজুজ নামক স্থানে পৌঁছবো এবং সেখান থেকে এক সাথে যাত্রা করবো। কেউ আগে পৌঁছলে অন্যের জন্য অপেক্ষা করবো। প্রভাত হওয়ার পূর্বেই আমরা ‘ইয়াজুজ’ পৌঁছে যাত্রা শুরু করলাম। ‘হাদ্দা’ নামক স্থানে পৌঁছে আমর ইবনুল আসের সাথে আমাদের দেখা হলো। আলাপ করে জানা গেল তিনিও একই উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। তারপর আমরা তিনজন এক সাথে মদীনায় পৌঁছে রাসূল সা: এর খিদমতে হাজির হই। প্রথমে আমি, তারপর উসমান ও আমর রাসূলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ করি। সে ছিল অষ্টম হিজরীর সফর মাস। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৬১-৬২, কবি আবদুল্লাহ ইবন যাবয়ারী তালহার ইসলাম গ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে সে সময় একটি কাসীদা রচনা করেছিলেন। তার কিছু অংশ হিবন হিশাম তার সীরাত গ্রন্থে সংকলন করেছেন (সীরাত-২/২৭৮)। অন্য একটি বর্ণনামতে, উসমান হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খালিদ ও আমরের সাথে মদীনায় যান। (আল ইসাবা-৩/৪৬০)। অপর দিকে মক্কা বিজয় সম্পর্কিত বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় মক্কা বিজয়ের দিন রাসূল সা: এর নিকট থেকে উসমান কাবার চাবি লাভ করার পর সেই দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। এতে বাহ্যত: প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, মক্কা বিজয়ের পর একজন অমুসলিমের হাতে রাসূল সা: কাবার চাবি তুলে দিতে পারেন কি? চাবি দেওয়ার ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও প্রশ্ন হচ্ছে, মক্কা বিজয়ের পূর্বেও কাবার চাবি ছিল উসমানের নিকট। মক্কা বিজয়ের পূর্বে একজন মুসলমানের হাতে কাবার চাবি থাকবে, আর কুরাইশরা তা মেনে নেবে, এ কি সম্ভব? এ সব প্রশ্নের সমাধান এ ভাবে হতে পারে, তিনি খালিদ ও আমরের সাথে পূর্বেই মদীনায় গিয়ে ইসলামের ঘোষণা দিয়ে মক্কায় চলে আসেন? কিন্তু মক্কার লোকেরা তা হয়তো জানতো না। (আসাহহুস সিয়ার-৩০৪-৩০৬)।
জাহিলী যুগ থেকে মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত কাবার তত্বাবধান ও চাবি রক্ষকের দায়িত্ব উসমানের ওপর ন্যাস্ত ছিলো। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত রাসূলে কারীম সা: কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য তার নিকট চাবি চাইলেন। তিনি বাড়ীতে গিয়ে তার মায়ের নিকট চাবি চাইলে তিনি দিতে অস্বীকার করেন। সম্ভবত: তখনও উসমানের মা ইসলাম গ্রহণ করেননি। উসমান কোষমুক্ত তরবারি উঁচু করে ধরে মাকে জবরদস্তি চাবি এনে নিয়ে হযরত রাসূলে কারীমের হাতে অর্পণ করেন। রাসূল সা: দরজা খুলে কাবার ভেতরে প্রবেশ করেন। উসমানও সংগে ছিলেন। দরযা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর কাবা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করার পর রাসূল সা: বের হয়ে আসেন। অত:পর রাসূল সা: মসজিদে বসলেন। আলী (রা) কাবার চাবিটি হাতে নিয়ে এসে দাড়িয়ে আরজ করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, চাবিটি আমাদের দায়িত্বে অর্পণ করুন। সিকায়াহ ও হিজাবাহ (হাজীদের পানি পান ও কাবার রক্ষণাবেক্ষণ) উভয় দায়িত্ব এখন থেকে বনু হাশিমের হাতে দান করুন।
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন, সে দিন আববাস ইবনুল আব্দুল মুত্তালিব কাবার চাবিটি হস্তগত করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন এবং তাকে সমর্থন করেছিল বনু হাশিমের আরও কিছু লোক। সিকায়াহ বা পানি পান করানোর দায়িত্ব পূর্ব থেকেই আব্বাসের ওপর ন্যস্ত ছিল।
বনু হাশিমের এ দাবীর মুখে হযরত রাসূলে কারীম সা: বললেন: উসমান ইবন তালহা কোথায়? উসমানকে ডাকা হলে রাসূল সা: তার হাতে মতান্তরে উসমান ও তার চাচাতো ভাই শাইবার হাতে চাবিটি দিয়ে বললেন: এই তোমার চাবি। এখন থেকে এই চাবি চিরদিনের জন্য তোমাদের হাতে থাকবে। কেউ তোমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে হবে অত্যাচারী। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪১১-১২)
ইবন সাদ লিখেছেন: কাবার চাবি পূর্ব থেকেই উসমান ইবন তালহার দায়িত্বে ছিল। তিনি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার কাবার দরজা খুলতেন। একবার রাসূল সা: তাকে ভিন্ন এক দিন দরযা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত শক্তভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। রাসূল সা: সেদিন বলেছিলেন, ওহে উসমান এমন একদিন আসবে যখন এ চাবি আমারই আয়ত্বে থাকবে এবং আমি যাকে ইচ্ছা তাকেই অর্পণ করবো। উসমান বলেছিলেন: সম্ভবত: সেদিন গোটা কুরাইশ বংশের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। রাসূল সা: তার কথা প্রত্যাখ্যান করে বলেন: না, বরং সেই দিনটি হবে কুরাইশদের প্রকৃত ইযযত ও সম্মানের দিন। তাই মক্কা বিজয়ের দিন উসমান যখন রাসূলুল্লাহর সা: হাত থেকে চাবিটি নিয়ে চলে যাচিছলেন তখন তিনি উসমানকে পুনরায় ডেকে অতীতের সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। উসমান তখন বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল।
আজও কাবার চাবি মক্কার শাইবী গোত্রের লোকের হাতে বিদ্যমান। এই শাইবী গোত্র হযরত উসমান ইবন তালহার (রা) চাচাতো ভাই শাইবা ইবন উসমান ইবন আবী তালহার বংশধর। এই শাইবা ইবন উসমান হুনাইন যুদ্ধের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। তার পিতা উসমান ইবন আবী তালহা উহুদ যুদ্ধে কাফির অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। আর তার মা উহুদ যুদেধ শাহাদত বরণকারী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত মুসআব ইবন উমাইরের বোন উম্মু জামীল হিন্দা বিনতু উমাইর। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর একটি বর্ণনা মতে হযরত রাসূলে কারীম সা: মক্কা বিজয়ের দিন কাবার চাবিটি শাইবা ও উসমান উভয়ের হাতে এক সাথে অর্পণ করেন। চাবিটি তখন উসমান ইবন তালহা ইবন আবী তালহার হাতে থাকে। তার মৃত্যুর পর উসমানের চাচাতো ভাই শাইবা ইবন উসমান ইবন আবী তালহা গ্রহণ করেন। তখন থেকে তার অধ:স্তন পুরুষদের হাতে কাবার চাবি বিদ্যমান। (আসাহুস সিয়ার, পৃ. ৩০৫)।
মক্কা বিজয়ের পর হযরত উসমান ইবন তালহা মদীনায় চলে যান এবং রাসূল সা: এর জীবদ্দশা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহর সা: ইনতিকালের পর কাবার চাবি রক্ষকের দায়িত্ব পালনের জন্য্ আবার মক্কায় ফিরে যান এবং এখানে হিজরী ৪২ সনে ইনতিকাল করেন। অবশ্য অন্য একটি বর্ণনামতে তিনি খলীফা হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালের প্রথম দিকে আজনাদাইনের যুদেধ শাহাদত বরণ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১, টীকা-৩, পৃ. ৪৭০)।
হযরত উসমান ইবন তালহার শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও উন্নত নৈতিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় হযরত উম্মু সালামার হিজরাতের ঘটনার মধ্যে। হযরত উম্মু সালামা তার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, তার চেয়ে অধিকতর কোন ভদ্র লোক আমি আরবে আর কখনও দেখিনি। যখন তিনি আমাকে সংগে নিয়ে কোন মানযিলে পৌঁছতেন, আমার নামার জন্য উট বসিয়ে দূরে সরে যেতেন। আমি উটের হাওদা থেকে নেমে একটু দুরে সরে গেলে তিনি আবার ফিরে এসে উটটি গাছের সাথে বাধতেন এবং আমার নিকট থেকে একটু দূরে কোন গাছের তলায় শুয়ে পড়তেন। আবার যাত্রার সময় হলে উট প্রস্তুত করে আমার কাছাকাছি নিয়ে এসে তিনি সরে যেতেন এবং বলতেন; উটে আরোহন কর। আমি উটের পিঠে ঠিকমত বসার পর তিনি ফিরে আসতেন এবং লাগামটি ধরে নিয়ে চলা শুরু করতেন। এভাবে তিনি আমাকে মদীনায় পৌঁছে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৬৯-৭০) (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৫৮-৩৫৯) এই ছিল হযরত উসমান ইবন তালহার (রা) ইসলাম পূর্ব জীবনে নৈতিকতার বাস্তব রূপ।
আমের ইবন রাবীয়া (রা)

নাম আমের, কুনিয়াত আবু আবদিল্লাহ এবং পিতা রাবীয়া। তার খান্দান হযরত উমারের (রা) পিতা খাত্তাব এর হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ ছিল। খাত্তাব তাকে এত ভালোবাসতেন যে, তাকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। এ কারণে প্রথম জীবনে আমের ইবনুল খাত্তাব (খাত্তাবের পুত্র আমের) নামে পরিচিত হন। কিন্তু কুরআন যখন প্রথা বাতিল করে প্রত্যেক মানুষকে তার জন্মদাতা পিতার নামে পরিচয় গ্রহণের নির্দেশ দেয়, তখন হযরত আমেরও খাত্তাবের পরিবর্তে নিজের জন্মদাতা পিতা রাবীয়ার নামে পরিচিত হন।
উল্লিখিত সম্পর্কের কারণে হযরত আমের ও হযরত উমারের মধ্যে শেষ জীবন পর্যন্ত অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। হযরত উমারের ‘বাইতুল মাকদাস’ সফরের সময় হযরত আমের তার সফরসঙ্গী ছিলেন। যে বছর হযরত উসমানকে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করে হযরত উমার হজ্জে যান, সঙ্গে আমেরও ছিলেন।
হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত আল আরকাম ইবন আবিল আরকামের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়ার পূর্বে ইসলামের সেই সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহর সা: আহবানে সাড়া দিয়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, হযরত আমের সেই সৌভাগ্যবানদেরই একজন। শিরক ও তাওহীদের সংঘাত সংঘর্ষ এবং কাফিরদের যুলুম নির্যাতনে তিনিও শান্তিতে মক্কায় বসবাস করতে পারেননি। তিনি স্ত্রী হযরত লায়লাকে সংগে করে শান্তিও নিরাপত্তার সন্ধানে দুইবার হাবশায় হিজরাত করেন। ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন: আমেরের স্ত্রী বলেন: আমরা হাবশায় হিজরাতের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমের কোন প্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে যান। এমন সময় উমার আমার সামনে এসে দাড়ায়। তখনও সে শিরকের ওপর। আমরা তার হাতে নিগৃহীত হতাম। উমার আমাকে বললো: আবদুল্লাহর মা, এ কি! তোমাদের চলে যাওয়ার প্রস্তুতি? বললাম: হাঁ, আমরা আল্লাহর এক যমীন হতে অন্য যমীনের দিকে যাব। তোমরা আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছ, আমাদের ওপর যুলুম করেছো। দেখা যাক, আল্লাহ কোন উপায় বের করে দেন কি না। উমার বললো: আল্লাহ তোমাদের দিনটি মঙ্গলময় করুন। আমেরের স্ত্রী বলেন: আমি সেদিন উমারকে এত নরম দেখলাম যা আর কখনও দেখিনি।উমার চলে গেল। আমাদের দেশত্যাগে সে অত্যন্ত কষ্ট পায়। আমের বাড়ী ফিরলে আমি তাকে বললাম: আবদুল্লাহর বাপ, এই মাত্র তুমি যদি উমারের বিষন্নতা ও আমাদের প্রতি তার দরদ দেখতে! আমের বললেন: তুমি তার ইসলাম গ্রহণের আশা করছো? বললাম: হাঁ। তিনি বললেন: খাত্তাবের গাধা ইসলাম গ্রহণ করতে পারে, তবে তুমি যাকে দেখেছো সে ইসলাম গ্রহণ করবে না। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৫৬)।
হযরত আমের (রা) হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে এসে সস্ত্রীক আবার মদীনায় হিজরাত করেন। ইবন ইসহাক বলেন: মুহাজিরদের মধ্যে সাবু সালামার পর সর্বপ্রথম মদীনায় আসেন আমের ইবন রাবীয়া ও আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৬৩)। অনেকের মতে এটা সঠিক নয়। তার পূর্বে আরও কতিপয় ব্যক্তি মদীনায় পৌঁছেন। তবে এ কথা সত্য যে, তার স্ত্রী হযরত লায়লা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতকারী প্রথম মহিলা।
বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসুল সা: সংগে ছিলেন। তাছাড়া ছোট ছোট অভিযানেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। জীবন বাজি রেখে আল্লাহর বাণী বা কালেমা প্রচারের দায়িত্ব সার্থকভাবে পালন করেন। স্বীয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবন আমেরের কাছে প্রায়ই নিজের গৌরবজনক কর্মকান্ডের কথা গর্বের সাথে বর্ণনা করতেন। একবার কথা প্রসঙ্গে বলেন: রাসুল সা: আমাদেরকে অভিযানে পাঠাতেন। দারিদ্রের কারণে পাথেয় হিসেবে সামান্য কিছু খেজুর দিতেন। প্রথম প্রথম আমরা এক এক মুট করে পেতাম, তারপর কমতে কমতে একটি মাত্র খেজুরে এসে ঠেকতো। হযরত আবদুল্লাহ বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করেন: একটা খেজুরে কিভাবে চলতো? জবাবে তিনি বললেন: প্রিয় বৎস! এমনটি বলো না। যখন খেজুর শেষ হয়ে যেত, তখন আমরা এই একটি খেজুরের জন্যও কাতর হয়ে পড়তাম।
হযরত উসমানের খিলাফতের শেষ দিকে যখন ফিতনা ও আত্মকলহ চরমরূপ ধারণ করে তখন হযরত আমের (রা) নির্জন বাস গ্রহণ করেন। রাত দিন সব সময় রোযা, নামায ও ইবাদাতে মাশগুল থাকতেন। একদা গভীর রাত পর্যন্ত ইবাদাতে মগ্ন ছিলেন, এ অবস্থায় একটু তন্দ্রাভাব আসে। তিনি স্বপ্নে দেখেন, কেউ যেন তাকে বলছেন, ‘উঠো, আল্লাহর কাছে দুআ কর, তিনি যেন তোমাকে এই ফিতনা থেকে বাঁচান- যিনি তার অন্য নেক বান্দাদের রক্ষা করেছেন।’ হযরত আমের সংগে সংগে উঠে বসেন। এই ঘটনার পর তার নির্জনতা অবলম্বন ও ইবাদাতের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এরপর থেকে কেউ আর তাকে ঘর থেকে বের হতে দেখেনি। এ অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হযরত উসমানের শাহাদাতের কয়েকদিন পর ইনতিকাল করেন। অতিরিক্ত নির্জনতা অবলম্বনের জন্য কেউ জানতে পারেনি তিনি কবে অসুস্থ হন এবং কবেই বা মৃত্যুবরণ করেন। হঠাত তার জানাযা দেখে লোকেরা অবাক হয়ে যায়।
মুসয়াব ইবন যুবাইর বলেন: আমের হিজরী ৩২ সনে মারা যান। আবু উবাইদার মতে তার মৃত্যুসন হিজরী ৩৭ হিজরী সন। ওয়াকিদী বলেন, হযরত উসমানের শাহাদাতের অল্প কিছুদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (আল ইসাবা-২/ ২৪৯)।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার, আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর, আবু উমামা ইবন সাহল প্রমূখের সূত্রে তিনি রাসূল সা: এর হাদীস বর্ণনা করেছেন যা বুখারী ও মুসলিম সহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।
আমের ইবন রাবীয়া থেকে বর্ণিত। আরবের এক ব্যক্তি তার নিকট আসে। আমের তার প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেন। লোকটি সে কথা রাসূল সা: এর কাছে বর্ণনা করে। সে আবার ফিরে এসে আমেরকে বলে, আমি রাসূল সা: এর কাছে এমন একটি উপত্যাকার মালিকানা চেয়েছি, যার থেকে উত্তম উপত্যকা আরবে দ্বিতীয়টি নেই। আমি ইচ্ছা করেছি তার কিছু অংশ আপনাকে দান করবো। যা আপনার ও আপনার পরবর্তী প্রজন্মের কাজে আসবে। আমের বললেন: তোমার ঐ জমির কোন প্রয়োজন আমার নেই। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে কুরআনের এ আয়াতটি নাযিল হয়: মানুষের হিসাব নিকাশ নিকটবর্তী হয়েছে অথচ এখনও তারা অমনোযোগী হয়ে প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। (সূরা আল আম্বিয়া-১) আমের বলেন, এ আয়াত আমাদেরকে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ করে তোলে। (আল ইসাবা-২/২৫১-৫২)।


















