Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ফাদল ইবন আব্বাস (রা)

    ফাদল ইবন আব্বাস (রা)

    নাম ফাদল, ডাক নাম আবু মুহাম্মাদ। পিতা প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা) এবং মাতা লুবাবা বিনতুল হারেস আল হিলালিয়্যাহ। রাসূল সা: এর চাচাতো ভাই। পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। এ কারণে পিতা আব্বাসকে ডাকা হতো আবুল ফাদলের পিতা বলে এবং ‍মাতা লুবাবাকে বলা হতো উম্মুল ফাদল বা ফাদলের মা।

    বদর যুদ্ধের পূর্বেই পরিবারের অন্যদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন ; কিন্তু মক্কার কাফিরদের ভয়ে প্রকাশ করেননি। মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে পিতা হযরত আব্বাস ও ছোট ভাই আবদুল্লাহর (রা) সাথে মদীনায় হিজরাত করেন। হিজরাতের সময় তার বয়স ছিল তের বছর এবং আবদুল্লাহর বয়স আট বছর। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭৩) তিনি মদীনায় হিজরাতের পর সর্ব প্রথম মক্কা অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। অত:পর হুনাইন অভিযানেও যোগদান করেন। আক্রমণের প্রথম পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে পালাতে শুরু করে তখনও তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে ময়দানে অটল থাকেন। বিদায় হজ্জে তিনি রাসূলুল্লাহর সা: সাথে একই বাহনে বসা ছিলেন। এ কারণে সেই দিন থেকে তিনি ‘রাদিফুর রাসূল’ উপাধিতে ভূষিত হন। এই সময় খাইসাম গোত্রের এক যুবক ও এক সুন্দরী যুবতী রাসূলুল্লাহর সা: নিকট হজ্জের বিভিন্ন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করতে আসে। হজ্জের সময় মহিলাদের মুখে নেকাব দেওয়া যেহেতু জায়েয নয়, এ কারণে মহিলাটির মুখ খোলা ছিল। ফাদল ছিলেন সুদর্শন নওজোয়ান। মহিলাটি তার দিকে আড় চোখে ‍তাকাতে থাকে এবং ফাদলও তাকে দেখতে থাকেন, হযরত রাসূলে কারীম সা: কয়েকবার ফাদলের মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে দেন। রাসূল সা: বললেন: আজ যে ব্যক্তি স্বীয় চোখ, কান ও জিহবা সংযত রাখতে পারবে তার সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (ইবন সা’দ-৪/৩৭, আল ইসাবা-৩/২০৮) এবং বুখারী শরীফে বাবু হজ্জিল মারয়াতে অধ্যায়ে বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।)

    মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় চাদর উঁচু করে ধরে তিনি রাসূল সা: কে ছায়াদান করেন। মদীনায় রাসূল সা: তাকে বিয়ে দেন এবং নিজেই তার দেন মোহর পরিশোধ করেন।

    হযরত ফাদল (রা) রাসূলুল্লাহর সা: পার্থিব জীবনের সর্বশেষ খিদমাতের সুযোগ লাভে ধন্য হন। অন্তিম রোগশয্যায় রাসূল সা: সর্বশেষ ভাষণ দান করেন। এ ভাষণ দেওয়ার জন্য যে দুজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সাহায্য নিয়ে তিনি ঘর থেকে বের হন তাদের একজন ফাদল। আর রাসূল সা: যে ভাষণ দেবেন এ কথাটিও ফাদল জনগণের মধ্যে ঘোষণা করেন। (আল ইসাবা-৩/২০৮) রাসূলুল্লাহর সা: ইনতিকালের পর যে কজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি পবিত্র দেহ গোসল দেওয়ার সুযোগ লাভ করেন ফাদল (রা) তাদের অন্যতম। হযরত আলী (রা) গোসল করান, ফাদল পানি ঢেলে দেন, রাসূল সা: কাপড় ধরে রাখেন এবং আউস ইবন খাওলী নামক এক আনসারী পানি এগিয়ে দেন। (আল ইসতীয়াব, হায়াতুস সাহাবা-২/৩৪১)। ওয়াকিদী বলেন: হযরত ফাদল হযরত উমারের খিলাফতকালে আমওয়াসের প্লেগের মহামারিতে মারা যান। আবার অনেকে বলেছেন, হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে আজনদাইন অথবা ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, হিজরী ১৫ সনে ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তার মৃত্যুসন সম্পর্কে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ইমাম বুখারী আজনাদাইনের মতটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন। (আল ইসাবা-৩/২০৯)।

    হযরত ফাদল (রা) হতে ২৪টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইবন আব্বাস ও আবু হুরাইরার মত বিশিষ্ট সাহাবীরাও তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। তাছাড়া কুরাইব, কুসাম ইবন আব্বাস, আব্বাস ইবন উবাইদিল্লাহ, রাবীয়া ইবন হারেস, উমাইর, আবু সাঈদ, সুলাইমান ইবন ইয়াসার, শাবী, আতা ইবন আবী রিবাহ প্রমূখ তাবেয়ী তার নিকট থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। (আল ইসাবা-৩/২০৯)।

  • আবু বারযাহ আল আসলামী (রা)

    আবু বারযাহ আল আসলামী (রা)

    আবু বারযাহর আসল নামের ব্যাপারে রিজাল শাস্ত্রবিদদের যথেষ্ট মতপার্থক্য আছে। সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মতানুসারে নাদলা ইবন উবাইদ তার নাম এবং আবু বারযাহ কুনিয়াত বা উপনাম। (আল ইসাবা-৪/১৯)

    মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমান হওয়ার পর কাফিরদের সাথে যত সংঘর্ষ হয়েছে তার সবগুলিতে তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলে কারীম সা: তার চরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দেন। তবে শত্রুতা ও বিদ্রোহের সীমা লংঘনকারী কতিপয় দুষ্কৃতিকারীকে সেদিন হত্যা করা হয়েছিল। আবদুর রহমান ইবন খাতাল ছিল এমনি একজন। এ ব্যক্তি প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তার এক মুসলমান দাসকে হত্যা করে ইসলামী দণ্ড ‘কিসাস’ থেকে বাঁচার জন্য ‘মুরতাদ’ (ইসলাম ত্যাগ) হয়ে মক্কায় পালিয়ে ‍যায়। তার ছিল দুটি দাসী। তারা মক্কার বাজারে মুহাম্মাদের সা: নিন্দাসূচক গীত গেয়ে বেড়াতো। মক্কা বিজয়ের দিন কোন উপায় না দেখে নরাধম ইবন খাতাল নিরাপত্তার আশায় কাবার গিলাফ আঁকড়ে ধরে পড়ে ‍থাকলো। সাহাবীরা রাসূল সা: কে বললেন: ইবন খাতাল কাবার গিলাফের আশ্রয়ে আছে। রাসূল সা: তাকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশ লাভের সাথে সাথে আবু বারযাহ ছুটে গিয়ে তাকে হত্যা করেন। (আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ; সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪১০)

    হযরত রাসূলে পাকের সা: জীবদ্দশা পর্যন্ত আবু বারযাহ মদীনায় বসবাসরত ছিলেন। হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি বসরার বাসিন্দা হন। সিফফীন যুদ্ধে হযরত আলীর (রা) পক্ষে এবং নাহরাওয়ানে খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ‍খুরাসান অভিযানে তিনি ছিলেন একজন মুজাহিদ।

    হযরত আবু বারযাহর (রা) মৃত্যুর সময়কাল সম্পর্কে মতপার্থক্য আছে। কারও মতে হিজরী ৬০, আবার কারও মতে হিজরী ৬৫ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। দ্বিতীয় মতটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, মারওয়ান ও আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) সংঘর্ষের সময় পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন এবং তিনি বলতেন, তারা সব দুনিয়ার ঝগড়া বিবাদ করছে। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪০৭)। তিনি মৃত্যুকালে একমাত্র ছেলে মুগীরাকে রেখে যান।

    হযরত আবু বারযাহ (রা) হযরত রাসূলে কারীম সা: এর দীর্ঘ সাহচর্যের সুযোগ পেয়েছিলেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সা: হাদীসের একটি নির্ভরযোগ্য সংখ্যা তিনি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৬৪। তার মধ্যে ২৭টি মুত্তাফাক আলাইহি। দুটি বুখারী ও চারটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

    হযরত আবু বারযাহর (রা) স্বভাবে যুহদের একটা ভাব বিদ্যমান ছিল। তিনি দামী কাপড় পরতেন না এবং ঘোড়ায়ও সওয়ার হতেন না। গেরুয়া রঙ্গের দু খানি কাপড় দিয়ে সতর ঢেকে চলতেন। তারই এক সমসাময়িক সাহাবী আয়িজ ইবন উমার। তিনি যেমন মূল্যবান কাপড় পরতেন তেমনি ঘোড়ায়ও সওয়ার হতেন। এক ব্যক্তি তাদের দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হযরত আয়িজের নিকট এসে বললো: আপনি আবু বারযাহকে দেখুন, তিনি পোশাক আশাকে আপনার বিরোধিতা করেন। আপনি দামী ‘খুয’ কাপড় পরেন, ঘোড়ায় চড়েন। আর তিনি এ দুটি জিনিসই পরিহার করেন। কিন্তু সাহাবীদের ভাতৃত্ব ছিল বাহ্যিক পোশাক আশাক ও চালচলন থেকেও অতি গভীর ও দৃঢ়। হযরত আয়িজ লোকটিকে জবাব দেন: আল্লাহ আবু বারযাহর ওপর রহম করুন। আজ আমাদের মধ্যে তার সমপর্যায়ের আর কে আছে? লোকটি হতাশ হয়ে সেখান থেকে আবু বারযাহর নিকট গেল এবং তাকে বললো: আপনি আয়িজকে একটু দেখুন। আপনার চালচলন তার পসন্দ নয়। তিনি ঘোড়ায় সোয়ার হয়ে ঘুরে বেড়ান, মূল্যবান ‘খুয’ কাপড় তার দেহে শোভা পায়। কিন্তু লোকটি এখানেও একই জবাব পেল। আবু বারযাহ লোকটিকে বললেন: আল্লাহ আয়িজের ওপর রহম করুন। আমাদের মধ্যে তার সমমর্যাদার আর কে আছে?

    একবার এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দীককে (রা) একটা শক্ত কথা বলে ফেলে। সংগে সংগে আবু বারযাহ বলে উঠলেন: আমি কি তার গর্দান উড়িয়ে দেব? আবু বকর (রা) তাকে ধমক দিয়ে বললেন: রাসূলুল্লাহর সা: পর আর কারও ক্ষেত্রে এতটুকু অপরাধের শাস্তি বৈধ নয়। (কানযুল উম্মাল-২/১৬১, হায়াতুস সাহাবা-২/৬৩৮)

    গরীব দু:খীর সেবা করা ছিল আবু বারযাহর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি ফকীর মিসকীনকে আহার করাতেন। ‍হাসান ইবন হাকীম তার মা নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।

    আবু বারযাহ বিধবা, ইয়াতিম ও মিসকীনদের সকালে এবং সন্ধ্যায় ‘সারীদ’ (আরবদের এক প্রকার প্রিয় খাদ্য) আহার করাতেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/১৯৪-৯৫)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: সম্পর্কে কোন প্রকার বিদ্রুপ বা হাসি কৌতুক তিনি বরদাশত করতে পারতেন না। উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের ‘হাউজে কাউসার’ সম্পর্কে কিছু জানার বাসনা হলো। তিনি লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন ‘হাউজে কাউসার’ সম্পর্কে কে বলতে পারবে? লোকেরা আবু বারযাহর (রা) কথা বললো। উবাইদুল্লাহ তাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি গেলেন। তাকে আসতে দেখে উবাইদুল্লাহ বিদ্রুপের সুরে বললো: এই সেই তোমাদের মুহাম্মাদী? অত্যন্ত ক্ষুব্ধভাবে আবু বারযাহ জবাব দিলেন, আল্লাহর শুকরিয়া! আমি এমন এক যুগে বেঁচে আছি যখন সাহাবিয়্যাতের (সাহচর্যের) মর্যাদাকে হেয় চোখে দেখা হয়। এ কথা বলতে বলতে অত্যন্ত রুষ্টভাবে তিনি আসন গ্রহণ করেন। উবাইদুল্লাহ প্রশ্নটি উত্থাপন করলেন, জবাবে আবু বারযাহ বললেন: যে ব্যক্তি হাউজে কাওসার অস্বীকার করবে সে তার ধারে কাছেও যেতে পারবে না এবং আল্লাহ তাকে তার থেকে পানও করাবেন না।’ এ কথা বলে তিনি উঠে চলে আসেন।

    হযরত আবু বারযাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এক যুদ্ধে (মতান্তরে খাইবার) আমরা মুশরিক বাহিনীকে হামলা করে তাদের রুটি তৈরীর সাজ সরঞ্জাম থেকে দূরে তাড়িয়ে দেই। তারপর আমরা সেগুলি দখল করে খেতে শুরু করি। জাহিলী যুগে আমরা শুনতাম, যারা সাদা রুটি খায় তারা মোটা হয়ে যায়। তাদের পরিত্যক্ত রুটি খাওয়ার পর আমাদের কেউ কেউ তার নিজের কাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে যে সে মোটা হয়েছে কি না। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩২৩) এ ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় সাহাবায়ে কিরাম সাদা মিহি আটা সাধারণত ব্যবহার করতেন না।

  • উকবা ইবন আমের আল জুহানী (রা)

    উকবা ইবন আমের আল জুহানী (রা)

    নাম উকবা, ডাক নাম আবু আমর, পিতা আমের। বনু জুহানা গোত্রের লোক। হযরত রাসূলে কারীম সা: যখন মদীনায় আসেন, উকবা তখন মদীনা থেকে বহু দূরে ছাগলের রাখালী করছিলেন। রাসূল সা: এর আগমন সংবাদ মদীনার অলি গলি ও তার আশ পাশের মরু ভূমি ও মরুদ্যানে ছড়িয়ে পড়ে। রাসূল সা: এর সাথে উকবার প্রথম সাক্ষাত কিভাবে ঘটে তা উকবার মুখেই শোনা যাক:

    ‘রাসূল সা: যখন মদীনায় এলেন আমি তখন মদীনার বাইরে আমার ছাগল চড়াচ্ছিলাম। খবরটি আমার কাছে পৌঁছার পর আমি সব কিছু ছেড়ে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য চলে আসি। রাসূল সা: এর খিদমতে হাজির হয়ে আমি আরজ করলাম: ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাকে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) করাবেন কি? তিনি আমার পরিচয় জানতে জিজ্ঞেস করেন: তুমি কে? বললাম: উকবা ইবন আমের আল জুহানী। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: মুরুবাসী বেদুঈনদের বাইয়াত অথবা হিজরাতের বাইয়াত এর কোনটি তোমার অধিক প্রিয়? আমি বললাম: হিজরাতের বাইয়াত। অত:পর তিনি আমাকে সেই বিষয়ের উপর বাইয়াত করালেন যার উপর মুহাজিরদের বাইয়াত করাতেন। রাসূলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াতের পর আমি এক রাত তার সাথে কাটিয়ে আবার মরূভূমিতে আমার ছাগলের কাছে ফিরে গেলাম।

    আমরা ছিলাম বারো জন মুসলমান। আমরা মদীনা থেকে দূরে ছাগল চড়াতাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বললো: একদিন পর পর আমরা যদি রাসূলুল্লাহর সা: কাছে হাজির ‍হয়ে দ্বীনের কথা না শিখি এবং তার উপর যা নাযিল হয় তা না জানি তাহলে আমাদেরে জীবনে কোন কল্যাণ নেই। প্রতিদিন আমাদের মধ্য থেকে একজন পালাক্রমে মদীনায়যাবে এবং তার ছাগল অন্যরা চড়াবে। আমি বললাম: তোমরা পালা করে একজন যাও এবং তার ছাগলগুলির জিম্মাদারি আমি নিলাম। কারও কাছে আমার ছাগলগুলি রেখে মদীনায় যেতে আমি ইচ্ছুক ছিলাম না।

    আমার সঙ্গীরা পালা করে মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা: দরবারে যেতে লাগলো, আর আমি তাদের ছাগলের পাল চড়াতে লাগলাম। তারা ফিরে এলে তারা যা কিছু শুনে বা শিখে আসতো আমি তাদের কাছে শুনে তা শিখে নিতাম। এভাবে কিছুদিন চললো। এর মধ্যে আমার মনে এ অনুভূতি জাগলো: তোমার সর্বনাশ হোক! ছাগলের জন্য তুমি রাসুলুল্লাহর সা: সুহবত বা সাহচর্য এবং সরাসরি তার মুখ নি:সৃত বাণী শোনার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছো! এই অনুভূতির পর আমি আমার ছাগল ফেলে রাসুলুল্লাহর সা: পাশে মসজিদে নববীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে মদীনার দিকে চললাম।

    আমি মদীনায় পৌঁছলাম। মসজিদে নববীতে ‍হাজির হয়ে সর্ব প্রথম শুনতে পেলাম এক ব্যক্তি বলছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি পূর্ণরূপে ওজু করবে সে তার সকল গুনাহ থেকে এমনভাবে পবিত্র হবে যেমনটি সে ছিল তার মা তাকে যেদিন জন্ম দিয়েছিল।’ কথাটি আমার খুবই ভালো লাগলো। উমার ইবনুল খাত্তাব তখন বললেন: তুমি যদি প্রথম কথাটি শুনতে আরও খুশি হতে। আমি তাকে কথাটি পুনরায় বলার জন্য অনুরোধ করলাম। তিনি বললেন; রাসূল ‍সা: বলেছেন: ‘আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরিক না করে কেউ যদি মারা যায় আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের সবগুলি দরযা খুলে দেন। জান্নাতের আটটি দরযা। সে এর যে কোনটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে।’ এমন সময় রাসূল সা: আমাদের মধ্যে উপস্থিত হলেন। আমি তার সামনাসামনি বসলাম। তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কয়েকবার এমনটি করলেন। চতুর্থবার আমি আরজ করলাম: হে আল্লাহর নবী, আমার মা বাবা আপনার প্রতি উতসর্গ হোক! আমার দিক থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কেন? এবার তিনি আমার প্রতি মনোযোগী বলে বললেন: একজন তোমার সর্বাধিক প্রিয় না বারোজন? (হায়াতুস সাহাবা-৩/২১৪-১৫,সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা-৪/১৪৪)।

    রাসূলুল্লাহর সাথে উকবা সর্ব প্রথম উহুদে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়েন। এরপর রাসূলুল্লাহর সা: জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি একজন মুজাহিদ হিসেবে সিরিয়া অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। দিমাশক জয়ের দিনে তিনি তীর নিক্ষেপে অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। দিমাশক বিজয়ের পর সেনাপতি আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা) তাকে মদীনায় পাঠান খলীফাকে এ সংবাদ দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তিনি মাত্র আট দিনে এক জুমআ থেকে অন্য জুমআর মধ্যে রাতদিন বিরামহীন চলার পর মদীনায় খলীফার কাছে সংবাদটি পৌঁছান। সিফফীন যুদ্ধে তিনি হযরত আমীর মুআবিয়া (রা) এর পক্ষে অংশ গ্রহণ করেন। মিসর জয়ের পর হযরত মুআবিয়া (রা) তাকে এক সময় তথাকার ওয়ালী বা শাসক নিয়োগ করেন। আবু আমর আল কিন্দী বলেন: মুআবিয়া তাকে মিসরের খারাজ (রাজস্ব) আদায় ও নামাযের ইমামতির দায়িত্ব অর্পণ করেন। পরে যখন তাকে অপসারণের ইচ্ছা করেন, তখন তিনি উকবাকে রোডস্ আক্রমণের নির্দেশ দেন। উকবা তখন রোডসের পথে অগ্রসর হচ্ছেন তখনই তিনি নিজের স্থলে মাসলামার নিযুক্তির কথা শুনতে পেলেন। তখন তিনি মন্তব্য করেন: দূরে পাঠিয়ে তারপর অপসারণ? এটা হিজরী ৪৭ সনের কথা। বরখাস্তের পর তিনি অভিযান থেকে ‍হাত গুটিয়ে নেন। হযরত উকবার মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। সঠিক বর্ণনামতে হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতকালে হিজরী ৫৮ সনে মিসরে ইনতিকাল করেন। তাকে বর্তমান কায়রোর দক্ষিণ দিকে ‘মুয়াত্তাম’ পাহাড়ের পাদদেশে দাফন করা হয়। (আল ইসাবা-৩/৪৮৯) তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৩)।

    জ্ঞান ও মর্যাদার দিক দিয়ে হযরত উকবা ছিলেন এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, ফারায়েজ ও কাব্য ছিল তার এক বিশেষ স্থান। আল্লামা জাহাবী বলেন, তিনি ছিলেন একাধারে ফকীহ, আল্লামাহ, আল্লাহর কিতাবের ক্বারী, ফারায়েজ শাস্ত্রের তত্বজ্ঞানী, প্রাঞ্জলভাষী ও উঁচু দরের এক কবি।’ (তাজকিরাতুল হুফফাজ ১/৪৩)।

    পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত শিক্ষার প্রতি ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। দারুণ আবেগ ও আগ্রহের সাথে তিনি কুরআন পাকের তিলাওয়াত শিক্ষা করতেন। কোন কোন সূরা তিনি খোদ রাসূলুল্লাহর সা: নিকটেই শিখেছেন। একবার তিনি রাসূল সা: এর পায়ের ওপর পড়ে নিবেদন করেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে সূরা হুদ ও সূরা ইউসুফ একটু শিখিয়ে দিন। এ প্রবল আগ্রহই তাকে একজন বিখ্যাত ক্বারী বানিয়ে দেয়।

    তিনি ছিলেন সুমধুর কন্ঠের অধিকারী। সুললিত কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। গভীর রাতে যখন নিরবতা নেমে আসতো, তিনি হৃদয়গ্রাহী কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করতেন। রাসূল সা: এর সাহাবীরা কান লাগিয়ে সে তিলাওয়াত শুনতেন। আল্লাহর ভয়ে তাদের হৃদয় বিগলিত হয়ে পড়তো এবং চোখ সজল হয়ে উঠতো। খলীফা হযরত উমার (রা) একবার তাকে বলেন: ‘উকবা, আমাদের কিছু কুরআন ‍শুনাও। উকবা তিলাওয়াত শুরু করলেন। সে তিলাওয়াত শুনে উমার (রা) কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন, চোখের পানিতে ‍তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। হযরত উকবা নিজ হাতে পবিত্র কুরআনের একটি সংকলন তৈরী করেন। হিজরী নবম শতক পর্যন্ত মিসরের ‘জামে উকবা ইবন আমের’ নামক মসজিদে এ কপিটি সংরক্ষিত ছিল। কপিটির শেষে লেখা ছিল ‘এটি উকবা ইবন আমের আল জুহানী লিখেছেন।’ এটা ছিল পৃথিবীতে প্রাপ্ত কুরআনের প্রাচীনতম কপি। কিন্তু হতভাগা মুসলিম জাতি আরও অনেক কিছুর মত এই মূল্যবান সম্পদটিও হারিয়েছে। (তাহজীবুত তাহজীব-৭/২৪৩, সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা-৪/১৪৮-৪৯, মুহাজিরিন-২/২৩৬)

    রাসূলুল্লাহ সা: এর হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি একেবারে পিছিয়ে নন। তার বর্ণিত হাদীসের সর্বমোট সংখ্যা পঞ্চান্ন। তার মধ্যে সাতটি মুত্তাফাক আলাইহি এবং একটি বুখারী ও সাতটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। বহু বড় বড় সাহাবী দীর্ঘপথ ভ্রমণ করে তার কাছে হাদীস শুনার জন্য আসতেন। হযরত আবু আইউব কেবল একটিমাত্র হাদীস শুনার জন্য মদীনা থেকে মিসরে যান এবং হাদীসটি শুনেই আবার মদীনার দিকে যাত্রা করেন। হিবরুল উম্মাহ হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসও (রা) তার নিকট থেকে ইলম হাসিল করেন। তাছাড়া বহু বিখ্যাত তাবেয়ী তার জ্ঞান ভান্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। ইবন আসাকির ইবরাহীম ইবন আবদির রহমান ইবন আউফ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন: আল্লাহর কসম, মৃত্যুর পূর্বে উমার ইবনুল খাত্তাব লোক পাঠিয়ে রাসুলুল্লাহর সা: সাহাবী- আবদুল্লাহ ইবন হুজাফা, আবুদ দারদা, আবু যার ও উকবা ইবন আমেরকে বিভিন্ন স্থান থেকে ডেকে এনে বলেন: তোমরা রাসূলুল্লাহ থেকে এত যে হাদীস বর্ণনা কর- এগুলি কী? তারা বললেন: আপনি কি আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেন? তিনি বললেন: না। তবে তোমরা আমার কাছে থাকবে। যতদিন আমি জীবিত আছি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। উমার যতদিন বেঁচে ছিলেন তাকে ছেড়ে তারা দূরে কোথাও যাননি। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২৪০-৪১)

    ফিকাহ শাস্ত্রেও হযরত উকবার ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। দ্বীনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত জ্ঞান তথা: খিতাবাহ (বক্তৃতা-ভাষণ), কবিতা ইত্যাদিতে তার ছিল বিরাট দখল। উকবা (রা) যদিও একজন উঁচু দরের সাহাবী ছিলেন, তথাপি দ্বীনী দায়িত্ব পালণে ভীষণ ভয় পেতেন। তিনি এক সময় মিসরে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন, তবে পরে ইমামতি এড়িয়ে চলতেন। আবু আলী হামাদানী বলেন: একবার এক সফরে লোকেরা তাকে বলে, যেহেতু আপনি রাসূলুল্লাহর সা: সাহাবী, আপনি নামায পড়াবেন। বললেন: না। আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি, যদি কোন ব্যক্তি ইমামতি করে এবং সঠিক সময়ে সঠিকভাবে নামায পড়ায়, ইমাম ও মুকতাদী উভয়ের জন্য সওয়াব আছে। আর যদি কোন ত্রুটি হয় তাহলে ইমামকে জবাবদিহি করতে হবে এবং মুকতাদির কোন দায়-দায়িত্ব নেই।

    হযরত রাসূলে কারীমের সা: সেবা করা ছিল তার একমাত্র হবি। সফরে, তিনি প্রায়ই রাসূলুল্লাহর সা: খচ্চর ‘আশ শুহবা’র লাগাম ধরে টেনে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। এই সেবা ও সাহচর্যকালে তিনি দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। তিনি বর্ণনা করেছেন: একবার আমি এক সফরে রাসূলুল্লাহর সা: সঙ্গী ছিলাম। আমি রাসূলুল্লাহর বাহন টেনে নিয়ে চলছি এমন সময় তিনি বললেন: উকবা, আমি কি তোমাকে পাঠযোগ্য দুটি উত্তম সূরার কথা বলবো? আমি আরজ করলাম: বলুন। তিনি বললেন: সূরা দুটি হলো: কুল আউযুবি রাব্বিল ফালাক ও কুল আউযুবি রাব্বিন নাস।

    তিনি রাসূলকে সা: এতই সম্মান করতেন যে, তার বাহনের ওপর বসাও বে আদবী বলে মনে করতেন। একবার তিনি সফরে নির্ধারিত খিদমতের দায়িত্ব পালন করছেন, এমন সময় রাসূল সা: সওয়ারী পশুটি থামিয়ে বসিয়ে দেন। সওয়ারীর পিঠ থেকে নেমে এসে তিনি বলেন: উকবা, তুমি বাহনের পিঠে সওয়ার হও। উকবা বললেন: সুবহানাল্লাহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনার বাহনে সওয়ার হব? রাসূল সা: আবারও নির্দেশ দিলেন। উকবা একই উত্তর দিলেন। অবশেষে বারবার পীড়াপীড়ির পর আদেশ পালনার্থে উকবা বাহনের পিঠে উঠে বসেন, আর রাসূল সা: পশুর লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চলতেন। এ কারণে তাকে রাদীফু রাসুলিল্লাহ-(রাসূলুল্লাহর বাহনের পিছনে আরোহণকারী বলে ডাকা হতো)। মানুষের দোষ গোপন করা ছিল উকবার বিশেষ গুণ। কারও কোন দোষ প্রচার করাকে তিনি খুবই নিন্দনীয় মনে করতেন। একবার তার সেক্রেটারী এসে বললো, আমাদের প্রতিবেশী লোকগুলি মদ পান করছে। তিনি বললেন: করতে দাও, কাউকে বলো না। সেক্রেটারী বললো: আমি পুলিশকে খবর দেই। তিনি বললেন: খুবই পরিতাপের বিষয়! এড়িয়ে যাও। আমি রাসূলুল্লাহকে সা: বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারও কোন দোষ গোপন করলো সে যেন একটি মৃতকে জীবিত করলো। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪২৩)।

    সামরিক বিদ্যা বিশেষত: তীরন্দাযীর প্রতি ছিল তার বিশেষ আকর্ষণ। এ বিদ্যা অর্জনের জন্য তিনি অন্যদেরকেও উতসাহিত করতেন। ‍একবার খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে ডেকে তিনি বলেন: ‘আমি রাসুলুল্লাহকে সা: বলতে শুনেছি, আল্লাহ একটি তীরের বিনিময়ে তিনজনকে জান্নাত দান করবেন-তীরটির প্রস্তুতকারী, আল্লাহর রাস্তায় তীরটি বহনকারী ও তীরটির নিক্ষেপকারী। তিনি এ কথাও বলেছেন: সকল প্রকার খেলা ধূলার মধ্যে মাত্র তিনটি খেলা জায়েয- তীরন্দাযী, অশ্বারোহন প্রশিক্ষণ এবং নিজ স্ত্রীর সাথে হাসি তামাশা। যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপ বিদ্যা অর্জন করে ভুলে গেছে সে মূলত: একটি বিরাট সম্পদ হারিয়েছে।’ (মুসনাদু ইমাম আহমাদ-৪/১৪৮) তিনি যুদ্ধের বহু অস্ত্র শস্ত্র জমা করেন। মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির খোঁজ নিয়ে দেখা গেল তার ঘরে সত্তরের চেয়ে কিছু বেশি ধনুক রয়েছে। আর সেই ধনুকগুলির সাথে বেশ কিছু তীর ও ফলা। সবগুলিই তিনি আল্লাহর রাস্তায় দান করে যান। (সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা-৪/১৫০-৫১)।

    হযরত উকবা (রা) ছিলেন সচ্ছল ব্যক্তি। তার চাকর বাকরও ছিল। তা সত্তেও নিজের সব কাজ নিজ হাতে করতেন।

    হযরত উকবা (রা) মিসরে অন্তিম রোগ শয্যায়। এ অবস্থায় সন্তানদের ডেকে এই উপদেশটি দান করেন: ‘আমার সন্তানেরা! আমি তোমাদের তিনটি কাজ থেকে নিষেধ করছি, ভালো করে স্মরণ রেখ। ১) নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও নিকট থেকে রাসূল সা: এর হাদীস গ্রহণ করো না। ২) আবা (সামনে খোলা ঢিলে ঢালা মোটা জুব্বা) পরলেও কখনও ঋণগ্রস্ত হয়ো না। ৩) তোমরা কবিতা লিখবে না। কারণ তাতে তোমাদের অন্তর কুরআন ছেড়ে সেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।’ (হায়াতুস সাহাবা-৩/২০১)।

    মোট কথা, ছাগলের রাখাল হযরত উকবার মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা ছিল রাসূল সা: এর স্বল্পকালীন সাহচর্যে তার সেই প্রতিভার চরম বিকাশ ঘটে। উত্তরকালে তিনি সাহাবাদের মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ আলেম, শ্রেষ্ঠ কারী, শ্রেষ্ঠ বিজয়ী সেনাপতি ও শ্রেষ্ঠ শাসকে পরিণত হন। যখন তিনি ছাগলের রাখালী ছেড়ে রাসূলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হন তখন তিনি ঘুনাক্ষরেও এ কথা জানতেন না যে, একদিন তিনি দিমাশক বিজয়ী বাহিনীর অগ্র সৈনিক হবেন এবং দিমাশকের ‘বাবে তুমায়’ তার একটি বাড়ী হবে। যে দিন তিনি মদীনায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন সেদিন তার মনে একবারও এ কথা উদয় হয়নি যে, একদিন তিনি মিসর বিজয়ের অন্যতম নেতা, তথাকার ওয়ালী হবেন এবং কায়রোর ‘মুকাত্তাম’ পাহাড়ে তার একটি বাড়ী হবে। ইসলাম তার সুপ্ত প্রতিভার এমন বিকাশ ঘটায় যে তিনি ছাগলের রাখালী থেকে এত কিছু হন।

  • বুরাইদাহ ইবনুল হুসাইব (রা)

    বুরাইদাহ ইবনুল হুসাইব (রা)

    নাম বুরাইদাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু আবদিল্লাহ। পিতার নাম হুসাইব ইবন আবদিল্লাহ। বনু আসলাম গোত্রের সরদার। রাসুল সা: হিজরাতের সময় বুরাইদাহ ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ‘গামীম’ নামক স্থানে পৌঁছলে বুরাইদাহ রাসূলুল্লাহর খিদমতে হাজির হন। রাসূল সা: তার সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং তিনি বিনা বাক্য ব্যয়ে তা কবুল করেন। উল্লেখ্য যে, এই ‘গামীম’ মক্কা থেকে দুই মনযিল দূরে অবস্থিত। এখানে তার সাথে বনু আসলামের আরও আশি ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূল সা: সেখানে ইশার নামায আদায় করেন এবং বুরাইদাহ ও তার সঙ্গীরা রাসূল সা: পেছনে ইকতিদা করে নামায আদায় করেন। (হায়াতুস ‍সাহাবা-১/৩) ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিজ গোত্রে অবস্থান করতে থাকেন এবং বদর ও উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায় আসেন। অবশ্য তার ইসলাম গ্রহণ ও মদীনায় আসার সময়কাল সম্পর্কে ইতিহাস ভিন্নমতও লক্ষ্য করা যায়।

    হিজরী ষষ্ঠ সনের পূর্বে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন এবং সর্বপ্রথম হুদাইবিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণ করে ‘বাইয়াতে রিদওয়ানের’ সৌভাগ্য অর্জন করেন। হিজরী ৭ম সনে খাইবার অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বর্ণনা করেন: আমরা খাইবার অবরোধ করলাম। প্রথম দিন ঝান্ডা নিলেন আবু বকর; কিন্তু জয় হলো না। দ্বিতীয় দিনও একই অবস্থা। লোকেরা হতাশ হয়ে পড়ছিল। রাসূল সা: তখন বললেন: আগামী দিন আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে ঝান্ডা তুলে দেব যে কি না আল্লাহ ও রাসূলের অতি প্রিয়। আগামী কালই বিষয়টি ফায়সালা হবে এ কথা চিন্তা করে লোকেরা খুব খুশী হলো। পরদিন প্রত্যুষে রাসূল সা: ফজরের নামায আদায়ের পর ঝান্ডা আনার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা ছিল কাতারবন্দী। তিনি আলীকে ডাকলেন এবং তার হাতে ঝান্ডাটি তুলে দিলেন। এই দিন আলীর হাতে খাইবার জয় হয়।

    হিজরী ৮ম সনে রাসূল সা: মক্কা অভিযানে বুরাইদাহ সংগী ছিলেন এবং একটি বাহিনীর পতাকা হাতে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। (হায়াতুস সাহাব-১/১৬৭)।

    এ প্রসঙ্গে তিনি বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন তিন এক ওজুতে কয়েক ওয়াক্তের নামায আদায় করেন।

    তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত রাসূলে কারীম সা: মক্কা সহ বিভিন্ন অঞ্চলের লোকদের যুদ্ধে যোগদানে উতসাহিত করার জন্য বিভিন্ন গোত্রের নিকট লোক পাঠান। এ সময় তিনি বুরাইদাকে আসলাম গোত্রের নিকট পাঠান এবং তাকে নির্দেশ দেন তিনি যেন মক্কা মদীনার মধ্যবর্তী স্থান ‘ফুরআ’ নামক স্থানে উপস্থিত হন। (তারীখে ইবন আসাকির-১/১১০)।

    মক্কা বিজয়ের পর হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী ইয়ামনে পাঠান। বুরাইদাহও এ বাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। পরে হযরত আলীর নেতৃত্বে অন্য একটি বাহিনী সেখানো পাঠানো হয় এবং গোটা বাহিনীর নেতৃত্ব আলী (রা) এর হাতে অর্পণ করা হয়। যুদ্ধ শেষে হযরত আলী (রা) গণীমতের মাল থেকে একটি দাসী নিজে গ্রহণ করেন। বুরাইদাহ এটা মেনে নিতে পারেননি। মদীনায় ফিরে বিষয়টি তিনি রাসূল সা: নিকট উত্থাপন করেন। সবকিছু শুনে রাসূল সা: বলেন: বুরাইদাহ, তোমার কি আলীর প্রতি কোন বিদ্বেষ আছে? বুরাইদাহ অস্বীকার করেন। তখন রাসূল করীম সা: বলেন: আলীর প্রতি মনে কোন রকম হিংসা রেখ না। গণীমতের এক পঞ্চমাংশ থেকে সে এরচেয়েও বেশি পায়। (সহীহুল বুখারী- বাবু বা’সু আলী ইলাল ইয়ামন)।

    অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, বুরাইদাহর বক্তব্য শুনে রাসুল সা: এর চেহারা মুবারকের রং পাল্টে যায়। তিনি বলেন: বুরাইদাহ, মুমিনদের ওপর তাদের নিজ সত্তা অপেক্ষাও কি কি আমার অধিকার বেশি নয়? বুরাইদাহ জবাব দিলেন: হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ! রাসূল সা: বললেন: আমি যার মাওলা (মনিব/ দাস) আলীও তার মাওলা। বুরাইদাহ বলেন: রাসূলুল্লাহর সা: পবিত্র যবান থেকে এ বাণী শোনারপর আলীর প্রতি আমার সকল অভিযোগ দূর হয়ে যায়। আর সেই দিন থেকে তার প্রতি আমার অন্তরে যে গভীর মুহাব্বাতের সৃষ্টি হয় তা আর কারও প্রতি কখনো হয়নি। (মুসনাদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: জীবনের শেষ অধ্যায়ে উসামাকে সিরিয়ায় একটি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। এ বাহিনীর পতাকাবাহী ছিলেন বুরাইদাহ। উসামা মদীনা থেকে বের হয়ে মদীনার উপকন্ঠে শিবির স্থাপন করে যাত্রার তোড়জোড় করছেন, এমন সময় রাসূলুল্লাহর সা: অন্তিম অবস্থার খবর পেলেন। তিনি যাত্রা স্থগিত করে ছুটে এলেন রাসূলুল্লাহর সা: শয্যা পাশে। অন্যদের সাথে বুরাইদাহও ঝান্ডা হাতে মদীনায় ফিরে এলেন এবং রাসূলুল্লাহর সা: ঘরের দরজার সামনে তা গেঁড়ে দিলেন। রাসূল সা: তিরোধানের পর হযরত আবু বকর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। বুরাইদাহ খলীফার নির্দেশে আবার ঝান্ডা তুলে নিয়ে সিরিয়া যান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে ঝান্ডা হাতে আবার মদীনায় ফিরে এলেন এবং উসামার বাড়ীর সামনে ঝান্ডাটি গেড়ে দিলেন। উসামার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঝান্ডাটি সেখানে ছিল। (হায়াতুস সাহাবা-১/৪২৫-২৬)

    হযরত বুরাইদাহ ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহর সা: জীবদ্দশায় যতগুলি যুদ্ধ হয়েছে সবগুলিতে অংশগ্রহণ করেন। সহীহাইনে তার থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহর সা: মোট ১৬ (ষোল)টি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-১১৪৬, তাবাকাতে ইবন সা’দ-মাগাযী অধ্যায়-১৩৬)।

    হযরত রাসূলে কারীমের জীবদ্দশায় বুরাইদাহ মদীনার বাসিন্দা ছিলেন। খলীফা উমারের (রা) খিলাফতকালে বসরা শহরের পত্তন হলে তিনি সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হন। হযরত বুরাইদাহর শিরা উপশিরায় জিহাদের খুন টগবগ করতো। লোকদের তিনি বলতেন: জীবনের মজা তো ঘোড়া দাবড়ানোর মধ্যেই। এই আবেগ ও উচ্ছাসের কারণে খলীফাদের যুগেও তিনি বিভিন্ন অভিযানে সৈনিক হিসাবে ঘর থেকে বের হয়ে পড়েন। হযরত উসমানের খিলাফতকালে খুরাসান অভিযানে অংশ নিয়ে ‍মারভে চলে যান এবং সেখানেই থেকে যান। হযরত বুরাইদাহ একজন বীর মুজাহিদ হওয়া সত্ত্বেও খলীফাদের যুগে মুসলমানদের পারষ্পরিক ঝগড়ায় তার তরবারি সব সময় কোষবদ্ধ থাকে। তার জীবদ্দশায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলীফার যুগে যত গৃহযুদ্ধ হয়েছে তার একটিতেও তিনি অংশগ্রহণ করেননি। এমনকি অত্যধিক সতর্কতার কারণে দুপক্ষের যারা সেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তাদের সম্পর্কেও কোন মতামত ব্যক্ত করতেন না। এ প্রসঙ্গে বনী বকর ইবন ওয়াযিলের এক ব্যক্তি বলেন: একবার আমি বুরাইদাহ আল আসলামীর সাথে সিজিস্তানে ছিলাম। একদিন আমি তার কাছে আলী, উসমান, ‍তালহা ও যুবাইর সম্পর্কে তার মতামত জানার জন্য তাদের প্রসঙ্গ উঠালাম। বুরাইদাহ সংগে সংগে কিবলার দিকে মুখ করে বসে দুহাত তুলে দুআ করতে শুরু করেন: হে আল্লাহ, তুমি উসমানকে ক্ষমা করে দাও। তুমি আলী, তালহা, যুবাইরওকে মাফ করে দাও। বর্ণনাকারী বলেন: অত:পর তিনি আমার দিকে ফিরে বলেন, তুমি কি আমার হত্যাকারী হতে চাও? আমি বললাম: আমি আপনার হত্যাকারী হতে যাব কেন? তবে আপনার কাছে এমনটি চেয়েছি। বুরাইদাহ বললেন: তারা ছিলেন এমন একদল লোক যাদের সম্পর্কে আল্লাহর ইচ্ছা পূর্বেই স্থির হয়ে আছে। তিনি চাইলে তাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন অথবা শাস্তি দিতে পারেন। তাদের হিসাব নিকাশের দায়িত্ব আল্লাহর। (ইবন সা’দ-৪/১৭৬, হায়াতুস সাহাবা-৩/৩৮৮)

    একবার তিনি হযরত আমীরে মুআবিয়ার (রা) কাছে যান। মুআবিয়া (রা) তখন একজন লোকের সাথে বসে কথা বলছিলেন। বুরাইদাহ বললেন: মুআবিয়া, আমাকেও একটু কথা বলার ‍সুযোগ দেবেন? মুআবিয়া বললেন: হাঁ, তিনি মনে করেছিলেন বুরাইদাহ হয়ত অন্যদের মতই কিছু বলবেন। কিন্তু বুরাইদাহ বললেন: আমি রাসুলুল্লাহকে সা: বলতে শুনেছি: ‘আমি আশা করি কিয়ামতের দিন জগতের সকল গাছ, পাথর ও বালুর সমপরিমাণ মানুষের জন্য সুপারিশ করবো। মুআবিয়া, আপনি এ সুপারিশের আশা করেন, আর আলী তার আশা করতে পারে না? (মুসনাদে ইমাম আহমাদ-৪/৩৪৭, হায়াতুস সাহাবা-৩/৪৯) সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি হযরত আলীর সমালোচনা করছিল এবং মুআবিয়া (রা) বুরাইদাহর মুখ থেকে তাই শোনার আশা করছিলেন। সত্য বলা ছিল তার বিশেষ গুণ। এ ব্যাপারে তিনি বিরাট ব্যক্তিত্বকেও ভয় করতেন না।

    সাহাবা সমাজের মধ্যে বুরাইদাহর ছিল বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। তিনি রাসূলুল্লাহর সা: বহু হাদীস স্মৃতিতে সংরক্ষণ করেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা প্রায় ১৬৪। তার মধ্যে মুত্তাফাক আলাইহি, দুটি বুখারী ও ১১টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণিত হাদীসগুলির সবই সরাসরি রাসূলুল্লাহর সা: যবানীতে। তার ছাত্রদের মধ্যে পুত্র আবদুল্লাহ ‍ও সুলাইমান, এবং অন্যদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন খাযায়ী, শা’বী ও মালীহ ইবন উসামা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: তার সাথে অত্যন্ত সহজ ও সাধারণ ভাবে মিশতেন। একবার বুরাইদাহ কোথাও যাচ্ছেন, পথে রাসূল সা: এর সাথে দেখা। রাসূল সা: বুরাইদাহর হাতে হাত রেখে হাঁটতে শুরু করেন।

    বুরাইদাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমরা রাসূল সা: এর নিকট বসা ছিলাম, এমন সময় ‍কুরাইশ বংশের এক ব্যক্তি আসলো। ‍রাসূল সা: তাকে ডেকে কাছে বসালেন। লোকটি যখন যাওয়ার জন্য উঠলো, রাসূল সা: আমাকে বললেন: বুরাইদাহ, তুমি কি এ লোকটিকে চেন? বললাম: হাঁ, বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে সে কুরাইশদের মধ্যে মধ্যম শ্রেণীর। তবে সে সর্বাধিক অর্থ সম্পদের অধিকারী। কথাটি আমি তিনবার বললাম। তারপর আমি বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ, তার সম্পর্কে আমার যা জানা আছে তাই আপনাকে জানালাম। তবে আপনি আমার চেয়ে বেশি জানেন। রাসূল সা: বললেন: কিয়ামতের দিন তার এই বৈশিষ্ট্য আল্লাহর কাছে কোন গুরুত্ববহ হবে না।

    রাসূল সা: মুখ থেকে তিনি একবার যা শুনতেন তা হুবহু পালন করার চেষ্ঠা করতেন। একবার তিনি রাসূল সা: কাছে বসে ছিলেন। রাসূল সা: বললেন: আমার উম্মাতকে ঢালের ন্যায় চওড়া ও ছোট ছোট চোখ বিশিষ্ট জাতির লোকেরা তিনবার তাড়াবে। এমনকি তাড়াতে তাড়াতে ‘জাযীরাতুল আরবের’ মধ্যে ঘিরে ফেলবে। তাদের প্রথম আক্রমণে যারা পালাবে তারা বেঁচে যাবে। দ্বিতীয় আক্রমণে কিছু বাঁচবে, কিছু মারা পড়বে! কিন্তু তৃতীয় আক্রমণে সবাই মারা পড়বে। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: ইয়া রাসূলুল্লাহ! তারা কারা? বললেন: তুর্কী। তিনি আরও বললেন: সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন! সেই লোকেরা তাদের ঘোড়া সমূহ মুসলমানদের মসজিদের খুঁটির সাথে বাঁধবে।

    এই ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণীর পর বুরাইদাহ সর্বদা দুই তিনটি উট, সফরের পাথেয় ও পানি পান করার একটি পাত্র প্রস্তুত রাখতেন। যাতে যখনই এ সময় আসুক, এ আযাব থেকে পালাতে পারেন। (মুসনাদে ইমাম আহমাদ-৫/৩৪৭)।

    হযরত বুরাইদাহ ছিলেন আসলাম গোত্রের সরদার। হযরত রাবীয়া আল আসলামী ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা: এক সহায় সম্বলহীন খাদেম। তিনি বিয়ে করলে, রাসূল সা: বুরাইদাহকে নির্দেশ দিলেন তার মোহর আদায়ের ব্যবস্থা করতে। বুরাইদাহ চাঁদা উঠিয়ে সে নির্দেশ পালন করেন।

    তিনি ইয়াযীদ ইবন মুআবিয়ার খিলাফতকালে হিজরী ৬৩ সনে পারস্যের মারভে ইনতিকাল করেন। তিনি আবদুল্লাহ ও সুলাইমান নামে দু ছেলে রেখে যান।

  • আবু সুফইয়ান ইবন হারেস (রা)

    আবু সুফইয়ান ইবন হারেস (রা)

    মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা: ও আবু সুফইয়ান ইবন হারেসের মধ্যে যতখানি গভীর ও শক্ত সম্পর্ক ছিল তা খুব কম লোকের সাথেই ছিল। তার দুজন একই পরিবারে একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তারা দুজন পরষ্পর চাচাতো ভাই। আবু সুফইয়ানের পিতা হারেস ইবন আবদুল মুত্তালিব ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা: বড় চাচা। তিনি ইসলাম পূর্ব যুগে মারা যান। (টীকা: সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬৩)।

    রাসূল সা: ও আবু সুফইয়ান পরষ্পর দুধ ভাই। হযরত হালীমা আস সাদিয়্যাহ তাদের দুজনকে দুধ পান করান। রাসুল সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত তাদের দুজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। দুজনের চেহারার মধ্যেও যথেষ্ট মিল ছিল। ইবনুল মোবারক ইবরাহীম ইবন মুনজির প্রমূখের মতে আবু সুফইয়ানের নাম মুগীরা এবং কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু সুফইয়ান। (আল ইসাবা-৪/৯০, সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৪৭)।

    নানাদিক দিয়ে দুজনের মধ্যে এত গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, রাসূলুল্লাহর সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির সূচনালগ্নেই আবু সুফইয়ান তার ওপর ঈমান আনবেন এবং তার দাওয়াতে সাড়া দেবেন। কিন্তু যা স্বাভাবিক ছিল তা না হয়ে ঘটলো তার বিপরীত। মক্কায় রাসুল সা: ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করতেই আবু সুফইয়ানের সব বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তা হিংসা বিদ্বেষ, শত্রুতা ও অবাধ্যতার রূপ নিল।

    রাসুল সা: যখন দাওয়াত দিতে শুরু করেন আবু সুফইয়ান তখন কুরাইশদের একজন নামযাদা অশ্বারোহী বীর এবং একজন শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি তার জিহবা ও তীর রাসুল সা: ও তার দাওয়াতের বিরোধিতায় নিয়োজিত করেন। ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতায় তিনি তার সকল শক্তি একীভূত করেন। রাসূল সা: বিরুদ্ধে কুরাইশরা যত যুদ্ধের পরিকল্পনা করে আবু সুফইয়ান তাতে ইন্ধন যোগায়। কুরাইশদের হাতে মুসলমানরা যত রকমের কষ্টভোগ করে তাতে তার বিরাট অবদান ছিল। তিনি তার কাব্য শক্তি রাসূল সা: হিজা বা নিন্দায় নিয়োজিত করেন। রাসূল সা: এর বিরুদ্ধে তিনি একটি অশালীন কবিতাও রচনা করেন। রাসূল সা: হাসসান ইবন সাবিত (রা) তার একটি বিখ্যাত কাসীদার একটি লাইনে বলেন: তুমি নিন্দা করেছ মুহাম্মাদের, আমি জবাব দিয়েছি, এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে। মূলত: এ লাইনটি আবু সুফইয়ানের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। (আল ইসাবা-৪/৯০)

    হযরত রাসূলে কারীমের সাথে আবু সুফইয়ানের এ শত্রুতা দীর্ঘ বিশ বছর চলে। এ দীর্ঘ সময়ে আল্লাহর রাসূল সা: মুসলমানদের বিরুদ্ধে যতরকম ষড়যন্ত্র করা যেতে পারে সবই তিনি করেন। বদর যুদ্ধের ব্যাপারে তার সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ বর্ণনা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। হযরত আবু রাফে বর্ণনা করেন: আমি বদর যুদ্ধের পর মক্কায় যমযম কূপের নিকট বসে তীর বানাচ্ছি, এমন সময় আবু লাহাব এসে আমার পাশে বসলো। সে কোন কারণবশত: বদরে অংশগ্রহণ না করে অন্য একজনকে নিজের পরিবর্তে পাঠিয়েছিল। তারপর আবু সুফইয়ান ইবন হারেস ইবন আবদুল মুত্তালিব এলো। আবু লাহাব তাকে কাছে বসিয়ে তার কাছে বদরের ঘটনা বিস্তারিত জানতে চায়। আবু সুফইয়ান বলে: আল্লাহর কসম, তারা ছিল এমন একটি দল যাদের কাছে আমরা আমাদের কাঁধ: সমর্পণ করেছিলাম। তারা তাদের ইচ্ছামত আমাদের পরিচালিত করে, ইচ্ছেমত আমাদের বন্দী করে। আল্লাহর কসম, এত কিছু সত্ত্বেও আমি আমাদের লোকদের তিরষ্কার করি না। কারণ, আমরা আসমান ও যমীনের মাঝে সাদা কালো উড়ন্ত অশ্বের ওপর কিছু সাদা ধবধবে আরোহী দেখতে পেয়েছি। আল্লাহর কসম, কোন কিছুই তাদের মুকাবিলা করতে সক্ষম হবে না। আবু রাফে সাথে সাথে বলে ওঠেন, আল্লাহর কসম,তারা ফিরিশতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। আবু লাহাব আবু রাফের গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৪৬-৪৭, হায়াতুস সাহাব-৩/৫৩০)

    অবশেষে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ইসলামের ‍সাথে আবু সুফইয়ানের শত্রুতার সমাপ্তি ঘটে। ইতিহাসে তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনীটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে: আবু সুফইয়ান বলেন, ইসলম যখন সবল হয়ে ওঠলো এবং এ খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, রাসূল সা: মক্কা জয়ের জন্য এগিয়ে আসছেন। তখন আমি চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। আমি আপন মনে বলতে লাগলাম, এখন কোথায় যাব, কার সাথে যাব এবং কোথায় কার সাথে থাকবো?

    এসব চিন্তা ভাবনার পর আমার স্ত্রী ও পুত্র কন্যাদের কাছে গিয়ে বললাম, মক্কা থেকে বের হওয়ার জন্য তৈরী হও। মুহাম্মাদের মক্কায় প্রবেশের সময় ঘনিয়ে এসেছে। মুসলমানরা আমাকে পেলেই হত্যা করবে।

    তারা আমাকে বললো, আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন আরব-অনারব সকলেই মুহাম্মাদের আনুগত্য স্বীকার করে তার দ্বীন কবুল করছে। আর আপনি এখনও তার শত্রুতার জেদ ধরে বসে আছেন? অথচ আপনারই সর্বপ্রথম তার সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত ছিল। এভাবে তারা আমাকে মুহাম্মাদের দ্বীনের প্রতি উতসাহী ও আকৃষ্ট করে তুলতে লাগলো। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন।

    আমি তক্ষুণি উঠে আমার দাস মাজকুরকে একটি উট ও একটি ঘোড়া প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিলাম। আমার পুত্র জাফরকেও আমি সংগে নিলাম। আমরা খুব দ্রুত মক্কা মদীনার মাঝখানে ‘আবওয়া’র দিকে চললাম। আমি আগেই জেনেছিলাম মুহাম্মাদ সেখানে পৌঁছেছেন। আমি ‘আবওয়ার’ কাছাকাছি পৌঁছে ছদ্মবেশ ধারণ করলাম, যাতে কেউ আমাকে চিনে ফেলে রাসূলুল্লাহর সা: সামনে হাজির পেয়ে ইসলামের ঘোষণা দেওয়ার পূর্বে মেরে না ফেলে। আমি প্রায় এক মাইল দূর থেকে পায়ে হেটে এগুতে লাগলাম। আর দেখতে লাগলাম মুসলমানদের অগ্রগামী দলগুলি একটির পর একটি মক্কার দিকে চলছে। কেউ আমাকে চিনতে পারে এই ভয় ও আশংকায় আমি তাদের পথ থেকে একটু দূর দিয়ে এগুতে লাগলাম। এই জনস্রোতের মধ্যে হঠাত রাসূলুল্লাহ সা: আমার নজরে পড়লেন। আমি খুব ত্বরিত গতিতে তার সামনে হাজির হয়ে আমার মুখাবরণ খুলে ফেললাম। তিনি আমাকে চিনতে পেরেই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি ঘুরে আবার তার সামনে গেলাম। তিনি আবারও মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। এভাবে কয়েকবার করলেন।

    আমার বিশ্বাস ছিল, আমার ইসলাম গ্রহণে রাসূল সা: অত্যন্ত খুশী হবেন। কিন্তু মুসলমানরা যখন দেখলো রাসূল সা: আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন তারাও মুখ কালো করে আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আবু বকর আমাকে দেখে অত্যন্ত কঠিনভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমি অত্যন্ত অসহায়ভাবে উমার ইবনুল খাত্তাবের দিকে তাকালাম। তিনিও তার সাথী অপেক্ষা অধিকর কঠোরতার সাথে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তিনি বরং একজন আনসারীকে আমার বিরুদেধ উসকে দিলেন। সেই আনসারী আমাকে লক্ষ্য করে বললো: ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই আল্লাহর রাসূল ও তার সাহাবীদের কষ্ট দিয়েছিস। উক্ত আনসারী উচ্চ কন্ঠে আমাকে ভর্তসনা ও গালি গালাজ করছে, আর মুসলমানরা আমার পাশে ভিড় করে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তা শুনে উপভোগ করছে।

    এমন সময় আমি আমার চাচা আব্বাসকে দেখলাম। আমি তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম, চাচা, আমার আশা ছিল রাসূলুল্লাহর সা: সাথে আমার আত্মীয়তা এবং আমার কাওমের মধ্যে আমার মর্যাদার কারণে তিনি আমার ইসলাম গ্রহণে খুশি হবেন। আপনি রাসূল সা: এর সাথে আমার ব্যাপারে কথা বলে তাকে একটু রাজী করান। তিনি বললেন, তোমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন এ দৃশ্য দেখার পর আমি রাসূলুল্লাহর সা: কাছে তোমার প্রসঙ্গে একটি কথাও বলতে পারবো না। তবে, যদি কখনও সুযোগ আসে বলবো। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহকে যেমন সম্মান করি তেমন ভয়ও করি।

    আমি বললাম, চাচা, আমাকে তাহলে কার দায়িত্বে ছেড়ে দিচ্ছেন?

    তিনি বললেন, এই মাত্র তুমি যা শুনলে তার অতিরিক্ত আমি কিছুই করতে পারবো না। দুশ্চিন্তা ও দূর্ভাবনায় আমার অন্তর ভরে গেল। হঠাত আমি আমার চাচাতো ভাই আলী ইবন আবু তালিবকে দেখলাম। বিষয়টি আমি তাকে বললাম। তিনিও চাচা আব্বাসের মত জবাব দিলেন, আমি আবার চাচা আব্বাসের কাছে গিয়ে বললাম, চাচা যদি আপনি আমার প্রতি রাসূলুল্লাহর অন্তর নরম করতে না পারেন, তাহলে এতটুকু অন্তত: লক্ষ্য করুন, যে লোকটি আমাকে নিন্দা করছে ও গালি দিচ্ছে এবং মানুষকে আমার প্রতি ক্ষেপিয়ে তুলছে, তাকে একটু ঠেকান। তিনি বললেন, লোকটি কেমন- একটু বর্ণনা দাওতো। আমি বর্ণনা দিলাম। তিনি বললেন, সে তো নুয়াইমান ইবনুল হারেস আন নাজ্জারী। তিনি নুয়াইমানের কাছে গিয়ে বললেন, শোন নুয়াইমান! আবু সুফইয়ান হচ্ছে রাসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই এবং আমার ভাতিজা। যদিও আজ রাসূলুল্লাহ তার প্রতি নারাজ, তবে একদিন তিনি রাজী হয়ে যাবেন। সুতরাং তাকে এভাবে লাঞ্ছিত করো না। এভাবে বার বার তাকে বুঝালেন। অবশেষে নুয়াইমান রাজী হয়ে গেলেন এবং বললেন, এই মুহুর্তের পর থেকে আমি আর তাকে কটু কথা বলবো না।

    রাসূলুল্লাহ সা: মক্কা মদীনার পথে ‘জাহফাহ’ নামক স্থানে অবতরণ করলেন। আমি রাসূল সা: এর তাঁবুর দরযায় গিয়ে বসলাম, আর আমার ছেলে জাফর আমার পাশে দাড়িয়ে থাকলো। রাসূল সা: বের হওয়ার সময় আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমি কিন্তু এতেও হতাশ হলাম না। এভাবে তিনি যখন যেখানে অবতরণ করতে লাগলেন আমি আমার ছেলেকে নিয়ে তার তাঁবুর দরযায় গিয়ে বসতে ‍লাগলাম। আর রাসূল সা: ও একই আচরণ করে যেতে লাগলেন। এভাবে কিছুকাল চললো। আমি খুব কষ্ট পেতে লাগলাম। দুনিয়াটা আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়লো।

    ইবন ইসহাক বলেন: আবু সুফইয়ান হারেস ও আবদুল্লাহ ইবন আবী উমাইয়্যা ‘নীকুল উকাব’ নামক স্থানে (মক্কা মদীনার পথে) আবার রাসুল সা: এর সাথে সাক্ষাতের আবেদন জানালেন। হযরত উম্মু সালামা তাদের সম্পর্কে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার চাচাতো ভাই ও ফুফাতো ভাই দুজন এসেছে সাক্ষাত করতে। রাসূল সা: বললেন: তাদের আর কোন প্রয়োজন আমার নেই। আমার চাচাতো ভাই আমার সম্মান নষ্ট করেছে, আর ফুফাতো ভাই- সে আমাকে মক্কায় যা বলার বলেছে। আবু সুফইয়ানের সাথে তার পুত্র জাফরও ছিল। যখন রাসূল সা: এর এ কথা তার কানে পৌঁছলো, আবু সুফইয়ান বললেন: আল্লাহর কসম, হয় তিনি আমাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেবেন নয়তো আমি আমার এ ছেলের হাত ধরে যমীনের যে দিকে ইচ্ছা চলে যাব এবং ক্ষুধা তৃষ্ণায় ‍মৃত্যুবরণ করবো। এ কথা যখন রাসূল সা: শুনলেন, তিনি একটু নরম হলেন এবং তাদেরকে সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। তারা দুজন রাসূল সা: এর নিকট পৌছে ইসলামের ঘোষণা দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪০০-৪০১)।

    আবু সুফইয়ান বলেন: রাসূল সা: মক্কায় প্রবেশ করেন এবং আমি ও তার কাফিলার সাথে মক্কায় প্রবেশ করলাম। তিনি মসজিদে যাওয়ার জন্য বের হলেন, আমি তার সাথে সাথে চললাম। মুহুর্তের জন্যও তার পিছু ছাড়লাম না।

    অত:পর হুনাইন অভিযানের সময় ঘনিয়ে এলো। সমগ্র আরববাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। এবার তারা ইসলাম ও মুসলমানদের একটা কিছু করেই ছাড়বে। রাসূল সা: তার বাহিনী নিয়ে তাদের মুকাবিলার জন্য বের হলেন। আমিও চললাম। আমি কাফিরদের বিশাল বাহিনী দেখে মনে মনে বললাম: আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহর প্রতি অতীতের সকল শত্রুতার প্রতিদান আজ আমি দেব: আজ আমি আমার কাজের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সা: কে খুশী করবো।

    দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। কাফিরদের তীব্র আক্রমণে মুসলমানরা ঠিকতে না পেরে ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করলো। আমি তখন দেখলাম রাসূল সা: ময়দানের মাঝখানে তার ‘শাহবা’ খচ্চরের উপর পাহাড়ের মত অটল আছেন। তিনি প্রচণ্ড বেগে তরবারি চালিয়ে নিজেকে ও আশেপাশের সংগীদের রক্ষা করছেন। তখন তাকে সিংহের মত সাহসী মনে হচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে আমি আমার ঘোড়ার উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে উন্মুক্ত তরবারি হাতে রাসূল সা: এর দিকে ছুটলাম। আল্লাহই জানেন, আমি তখন রাসূল সা: সামনে মৃত্যুর আশা করছিলাম। আমার চাচা আব্বাস রাসূলুল্লাহর সা: খচ্চরের লাগাম ধরে তার এক পাশে, আর আমি অন্য পাশে দাড়ালাম। আমি বাঁ হাতে রাসূল সা: বাহন এবং ডান হাতে তরবারি ধরে তীব্র আক্রমণ চালালাম। এ দৃশ্য দেখে রাসূল সা: চাচা আব্বাসকে জিজ্ঞেস করেন: এ কে? চাচা বললেন: আপনার ভাই, আপনার চাচার ছেলে- আবু সুফইয়ান ইবন হারেস। ইয়া রাসূল সা: আপনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। রাসূল সা: বললেন: আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমার প্রতি তার সকল শত্রুতা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।

    আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লাম এবং রাসূল সা: পায়ে চুমু খেলাম। তিনি আমার দিকে ফিলে বললেন: আমার ভাই, সামনে এগিয়ে যাও, আক্রমণ কর। রাসূল সা: এর এই কথায় আমার সাহস বেড়ে গেল। আমি তীব্র আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষ বাহিনীকে তাদের স্থান থেকে হটিয়ে দিলাম। আমার সাথে অন্য মুসলিমরাও আক্রমণ চালালো। আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে প্রায় এক ফারসাখ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম।”

    আবু সুফইয়ান ইবন হারেস এই ‍হুনাইনের ময়দান থেকে রাসূল সা: সন্তুষ্টি ও সাহচর্য লাভে ধন্য হন। তবে জীবনে আর কখনো রাসূলুল্লাহর সা: প্রতি চোখ উঁচু করে তাকিয়ে দেখেননি। অতীত আচরণের কথা মনে করে লজ্জা ও অনুশোচনায় রাসূল সা: চেহারা মুবারকের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে সাহস পাননি।

    ইসলাম গ্রহণের পর আবু সুফইয়ান তার অতীত জাহিলী জীবনের কাজ ও আচরণ এবং আল্লাহর কিতাব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা চিন্তা করে অনুশোচনায় জর্জরিত হয়েছেন। পরবর্তী জীবনে রাত দিন শুধু কুরআন তিলাওয়াত, কুরআনের বিধি বিধান ও উপদেশাবলী অনুধাবনে অতিবাহিত করতেন। তিনি দুনিয়ার সকল সুখ সম্পদ হতে দূরে থেকে নিজের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একীভূত করে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হয়ে পড়েন। একদিন তিনি মসজিদে ঢুকছেন। রাসূল সা: তাকে দেখে হযরত আয়িশাকে ডেকে বলেন: আয়িশা, এ লোকটিকে তুমি চেন? আয়িশা বললেন: না, ইয়া রাসূলুল্লাহ। রাসূল সা: বললেন: এ হচ্ছে আমার চাচাতো ভাই আবু সুফইয়ান ইবন হারেস। দেখ, সে সবার আগে মসজিদে ঢোকে, আর সবার পরে মসজিদ থেকে বের হয়। তার জুতোর ফিতে থেকে তার দৃষ্টি কখনও অন্যদিকে যায় না।

    হযরত রাসূলে কারীমের ইনতিকালের পর আবু সুফইয়ান সন্তান হারা মায়ের মত ভীষণ কান্নাকাটি করেন। একটি কাসীদায় তার সেই বিয়োগ ব্যথা অতি চমতকার রূপে ফুটিয়ে তোলেন। ইসলাম গ্রহণের পর আবু সুফইয়ান তখনকার স্বীয় অনুভূতি ব্যক্ত ও ক্ষমা প্রার্থনা করে একটি স্বরচিত কাসীদা রাসূল সা: কে পাঠ করে শোনান। কাসীদার একটি লাইনে তিনি যখন বলেন:‘তিনি আমাকে সত্যের পথ দেখিয়েছেন যাকে আমি বিতাড়িত করেছিলাম’ তখন রাসূল সা: তার বুকে থাপ্পড় মেরে বলে ওঠেন: তুমিই আমাকে বিতাড়িত করেছিলে।’ (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪০০-৪০১)

    হযরত উমারের খিলাফতকালে আবু সুফইয়ান অনুভব করেন, তাঁর জীবন-সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে। তিনি একদিন নিজ হাতে একটি কবর খোঁড়েন। এর তিনদিন পর তিনি এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। মৃত্যুর সাথে তার যেন একটি চুক্তি ছিল। মৃত্যুর পূর্বে স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের লোকদের বলেন: ‘তোমরা আমার জন্য কেদোঁনা। আল্লাহর কসম, ইসলাম গ্রহণের পর আমি কোন পাপ কাজ করিনি।’ এতটুকু বলার পর তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। খলীফা উমার তার জানাযার ‍নামায পড়ান। তার মৃত্যুসন হিজরী ১৫ মতান্তরে হিজরী ২০। হিশাম ইবন উরওয়াহ পিতা উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সা: বলেন: আবু সুফইয়ান জান্নাতের অধিবাসী যুবকদের নেতা। (আল ইসাবা-৪/৯০)।

  • উমাইর ইবন আবী ওয়াককাস (রা)

    উমাইর ইবন আবী ওয়াককাস (রা)

    নাম উমাইর, পিতা আবু ওয়াককাস, মাতা হামনা বিনতু সুফইয়ান। ইরান বিজয়ী হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াককাসের সহোদর।

    হযরত উমাইরের বড় ভাই সা’দ ইবন আবী ওয়াককাস ইসলামের সূচনা পর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন হযরত উমাইরের বয়স যদিও কম তথাপি তিনি বড় ভাই এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হিজরাত করে মদীনায় পৌঁছেন। রাসূল সা: মদীনার আবদুল আশহাল গোত্রের সরদার হযরত সা’দ ইবন মুয়াজের ছোট ভাই হযরত আমর ইবন মুয়াজের সাথে তার দ্বীনী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। তারা দুজনই প্রায় সমবয়সী ছিলেন।

    হিজরী ২য় সনে বদর যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। হযরত রাসূলে কারীম সা: সৈনিক নির্বাচন করছেন। হযরত উমাইরও সমাবেশে হাজির হয়েছেন। তার ভাই সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস দেখলেন, উমাইর তার দৃষ্টি এড়িয়ে অস্থির হয়ে এদিক ওদিক যাচ্ছে। তিনি যেকে জিজ্ঞেস করলেন: উমাইর, কি হয়েছে তোমার? তিনি জবাব দিলেন: ভাই, আমিও যুদ্ধে শরীক হতে চাই। হতে পারে, আল্লাহ আমাকে শাহাদাত দান করবেন। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, আমাকে ছোট মনে করে রাসূল সা: ফিরিয়ে না দেন।

    রাসূল সা: সামনে যখন সকলে একের পর এক হাজির হলেন তখন উমাইরের আশংকা সত্যে পরিণত হলো। তিনি উমাইরের বয়সের দিক লক্ষ্য করে বললেন: তুমি ফিরে যাও। এ কথা শুনে হযরত উমাইর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তার এ কান্না জিহাদের আগ্রহ ও শাহাদাতের তীব্র বাসনা দেখে রাসূলুল্লাহ সা: মুগ্ধ হন। উমাইর যুদ্ধে শরীক হওয়ার অনুমতি লাভ করেন। রাসূল সা: নিজে হাতে তার তরবারিটি ঝুলিয়ে দেন।

    হযরত উমাইর (রা) তখন ষোল বছরের এক কিশোর। ভালোমত অস্ত্রশস্ত্রও ধরতে জানেন না। তার বড় ভাই তরবারী ধরা শিখিয়ে দিলেন। শাহাদাতের প্রবল আবেগ উতসাহে তিনি কাফিরদের ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেলেন এবং দীর্ঘক্ষণ চরম বীরত্বের সাথে লড়লেন। এ অবস্থায় আমর ইবন আবদে উদ্দের অসির প্রচণ্ড আঘাত তার শাহাদাতের ‍বাসনা পূর্ণ করে দেয়। ইন্না লিল্লাহি….রাজিউন। মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯৯) খন্দকের যুদ্ধে হযরত আলী (রা) ঘাতক ‘আমর ইবন আবদে উদ্দকে হত্যা করেন। (আল ইসাবা-৩/৭০)।

  • শুকরান সালেহ (রা)

    শুকরান সালেহ (রা)

    নাম সালেহ, লকব বা উপাধি ‘শুকরান’। পিতার নাম আদী। হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফের (রা) হাবশী বংশজাত দাস। তবে এই দাসত্বের মধ্যেও নেতৃত্বদান তার ভাগ্যে ছিল। হযরত রাসূলে কারীম সা: নিজের কাজের জন্য তাকে নির্বাচন করেন। অর্থের বিনিময়ে তাকে আবদুর রহমানের নিকট থেকে খরীদ করেন। কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত আবদুর রহমান কোন রকম অর্থ বিনিময় ছাড়াই তাকে রাসূল সা: এর অনুকূলে হিবা করেন। তার জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তিনি কখন কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কেও তেমন কোন তথ্য সীরাতের গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না।

    অধিকাংশ যুদ্ধে হযরত শুকরান যুদ্ধলদ্ধ সম্পদ ও কয়েদীদের হিফাজতের দায়িত্বে নিয়োজিত হতেন। এ কারণে যুদ্ধে তিনি একদিকে গানীমাতের অংশ পেতেন, আবার অন্যদিকে যাদের কয়েদীদের দেখাশুনার দায়িত্ব পালন করতেন তাদের নিকট থেকে পারিশ্রমিক পেতেন। আবু মাশার বলেন, তিনি দাস হিসাবে বদর যুদেধ যোগদান করেন। এ কারণে গানীমাতের অংশ তাকে দেওয়া হয়নি। তবে বদরে বন্দীদের দেখাশুনার দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রত্যেকেই কিছু কিছু অর্থ তাকে দান করে। এতে যারা গানীমাতের অংশ পেয়েছিলেন তাদের থেকেও তিনি বেশি পেয়ে যান। বদর যুদ্ধে তার দায়িত্ব পালনে সতর্কতা ও দক্ষতা দেখে রাসূল সা: এতই মুগ্ধ হন যে, তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তিদান করেন।

    ‘মাররে ইয়াসী’ যুদ্ধে পরাজিত শত্রু বাহিনীর পরিত্যাক্ত অর্থ সম্পদ অস্ত্র-শস্ত্র, ছাগল-বকরী ও তাদের অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রী জমা করার দায়িত্বে তাঁকে নিয়োজিত করা হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার প্রতি এত প্রসন্ন ছিলেন যে, ইনতিকালের সময় তার প্রতি সদাচরণের জন্য অসীয়াত করে যান। হযরত শুকরান (রা) আহলে বাইত বা রাসূল সা: এর পরিবার পরিজনদের সাথে দাফন-কাফনে শরীক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ইবন ইসহাক আলী ইবনুল হুসাইনের সূত্রে বর্ণনা করেন, আলী ইবনু আবী তালিব, ফাদল ইবন আব্বাস, কুসাম ইবন আব্বাস, শুকরান মাওলা রাসুলিল্লাহ ও আউস ইবন খাওলা কবরে নেমে রাসূলুল্লাহকে কবরে শায়িত করেন। (আল ইসাবা-২/৬৬৪)।

    হযরত রাসুলুল্লাহর সা: ইনতিকালের পর হযরত শুকরান (রা) মদীনায় থাকেন না বসরায় বসতি স্থাপন করেন- এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। কারণ, বসরায় তার একটি বাড়ী ছিল। তার মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কেও সঠিকভাবে জানা যায় না। ইতিহাসে তিনি শুকরান মাওলা রাসুলিল্লাহ- রাসূলুল্লাহর আযাদকৃত দাস শুকরান নামে প্রসিদ্ধ।

  • মিহরায ইবন নাদলা (রা)

    মিহরায ইবন নাদলা (রা)

    নাম মিহরায, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু ফাদলাহ। তবে প্রধানত: আখরাম আল আসাদী উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন।

    তিনি কখন কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে তিনি প্রথম পর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন বলে সীরাত বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করার পর আবদুল আশহাল গোত্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন এবং হযরত আম্মার ইবন হাযামের (রা) সাথে তার মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

    মূসা ইবন উকবা, ইবন ইসহাক ও অন্যরা তাকে বদরী সাহাবীদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।

    ওয়াকিদী আয়্যূব ইবন নুমান থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: বদরে মুসয়াব ইবন উমাইরের ভাই আবু আযীয ইবন উমাইর বন্দী হয়। তাকে মিহরায ইবন নাদলার হিফাজতে দেওয়া হয়। মুসয়াব মুহরিযকে বলেন: ওর হাতটি একটু কষে বাঁধ। মক্কায় ওর একজন সম্পদশালী মা আছে। আবু আযীয বলে: ভাই, আমার প্রতি আপনার এমন নির্দেশ? মুসয়াব বললেন: তোমার স্থলে মুহরিয আমার ভাই। আবু আযীযের মুক্তির জন্য তার মা চার হাজার দিরহাম পাঠায়। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩১৫)।

    উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধেও তিনি জীবনবাজি রেখে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। তার জীবনের সর্বশেষ ও সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হলো ‘জী কারাদের’ যুদ্ধ। হিজরী ৬ষ্ঠ সনে বনু ফাযারাহ মদীনার উপকন্ঠে একটি চারণক্ষেত্রে হামলা চালায় এবং রাখালদের হত্যা করে রাসূল সা: উটগুলি লুট করে নিয়ে যায়। হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া ঘটনাস্থলের নিকটেই ছিলেন। তিনি রাসূল সা: এর দাস রাবাহকে মতান্তরে আবদুর রহমান ইবন আউফের একটি দাসকে মদীনায় পাঠান খবর দেওয়ার জন্য। আর এ দিকে তিনি নিজে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ‘ইয়া সাবাহাহ’ (বিপদের সতর্ক ধ্বনি) বলে এমন জোরে ধ্বনি দেন যে, মদীনার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দীর্ঘক্ষণ একাকী তীর ও পাথরের সাহায্যে এই ডাকাত দলের মুকাবিলা করতে থাকেন। এর মধ্যে গাছের ফাঁকে রাসুল সা: এর বাহিনী ছুটে আসতে দেখা গেল। সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন হযরত মুহরিয ইবন নাদলা। আর তাঁর পেছনে ছিলেন হযরত আবু কাতাদাহ আল আনসারী ও মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা)। হযরত সালামা ইবন আকওয়া হযরত আখরাম বা মিহরাযের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে বললেন: আখরাম, আগে অগ্রসর হবে না। আমার ভয় হচ্ছে, ডাকাতরা তোমাকে ঘিরে ফেলবে, রাসূল সা: ও তার সাহাবীদের সাথে তোমাকে মিলিত হতে দেবে না। তিনি জবাব দিলেন: সালামা, তুমি যদি আল্লাহ এবং কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক, আর তোমার যদি এ কথা জানা থাকে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, তাহলে আমার শাহাদাত লাভের পথে প্রতিবন্ধক হয়ো না। কথাটি তিনি এমন আবেগের সাথে উচ্চারণ করেন যে, হযরত সালামা (রা) তার ঘোড়ার লাগামটি ছেড়ে দেন। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে আবদুর রহমান ইবন ফারাযীর সামনে গিয়ে পথ রুখ করে দাড়ান। তিনি আবদুর রহমানের উপর তরবারির এমন শক্ত আঘাত হানেন যে, তার ঘোড়াটি কেটে দু টুকরো হয়ে যায়। এদিকে আব্দুর রহমানের নিক্ষিপ্ত বর্শাও লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। হযরত মিহরাযের শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আর আবদুর রহমান লাফিয়ে মিহরাযের ঘোড়ার উপর চেড়ে বসে। পেছনেই ছিলেন হযরত আবু কাতাদাহ। তিনি সাথে সাথে আব্দুর রহমানের উপর তীব্র আঘাত হানেন। এভাবে কাতাদাহ (রা) আ: রহমানকে জাহান্নামে পাঠিয়ে বন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেন। শাহাদাতের সময় হযরত মিহরাযের বয়স হয়েছিল ৩৭ অথবা ৩৮ বছর।

    উপরে উল্লেখিত ঘটনা তাঁর ঈমানী দৃঢ়তা ও শাহাদাতের তীব্র আকাংখার স্পষ্ট প্রমাণ। শাহাদাতের কয়েকদিন পূর্বে তিনি স্বপ্নে দেখেন, আকাশের দরযা সমূহ তার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি সর্বোচ্চ জগতে ভ্রমণ করতে করতে সিদরাতুল মুনতাহা পৌঁছে গেছেন। সেখানে তাকে বলা হয়, এটাই তোমার আবাসস্থল।

    হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ছিলেন স্বপ্নের তাবীর বা তাতপর্য ব্যাখ্যার সুবিজ্ঞ। হযরত মিহরায পরের দিন তার নিকট স্বপ্নটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আখরাম, তোমার শাহাদাতের সুসংবাদ। এ ঘটনার কিছুদিন পর ‘জী কারাদ’ অভিযানে তার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয় এবং তিনি তার স্থায়ী আবাসস্থল ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পৌঁছে যান।

  • শুজা ইবন ওয়াহাব (রা)

    শুজা ইবন ওয়াহাব (রা)

    নাম শুজা, কুনিয়াত আবু ওয়াহাব এবং পিতা ওয়াহাব। জাহিলী যুগে তার খান্দান বনী আবদে শাࢮস এর হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ ছিল। (উসুদুল গাবা-২/৩৮৬)।

    যারা ইসলামের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন, হযরত শুজা তাদেরই একজন। মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে হাবশা হিজরাতকারী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশা যান। (আল ইসাবা-৩/১৩৮)।

    তাদের হাবশা অবস্থানকালে যখন সেখানে এ গুজব রটে যে মক্কার সকল বাসিন্দা রাসুলুল্লাহর সা: আনুগত্য মেনে নিয়েছে, তখন স্বদেশের ভালোবাসা অনেকের মত তাকেও মক্কায় টেনে নিয়ে আসে। মক্কায় এসে দেখেন খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কিছুদিন মক্কায় অবস্থানের পর নিরাপদে মদীনায় হিজরাত করেন। এখানে হযরত আউসের সাথে তার দ্বীনী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

    বদর, উহুদ সহ সকল প্রসিদ্ধ যুদ্ধে তিনি অংশ গ্রহণ করেন। হিজরী ৮ম সনের রবীউল আউয়াল মাসে বনী হাওয়াযিনের একটি দলকে নির্মূলের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। এই বনী হাওয়াযিন মদীনা থেকে পাঁচ দিনের দুরত্বে ‘রসসী’ নামক স্থানে তাবু স্থাপন করেছিল। হযরত শুজা চব্বিশজন দু:সাহসী মুজাহিদকে সংগে করে দিনের বেলা লুকিয়ে লুকিয়ে এবং রাতের বেলা সদম্ভে ভ্রমণ করতে করতে একদিন হঠাত সেখানে উপস্থিত হলেন। শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের বিপুল সংখ্যক উট, ভেড়া, বকরী ছিনিয়ে মদীনায় নিয়ে আসেন। গানীমতের মালের পরিমাণ এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, প্রত্যেক মুজাহিদের ভাগে অন্যান্য জিনিসপত্র ছাড়াও পনেরটি উট পড়েছিল।

    হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল সা: ততকালীন বিশ্বের অধিকাংশ রাজা বাদশাদের নিকট পত্র সহ দূত পাঠান। রাসূল সা: শুজাকে একটি পত্র সহ হারেস ইবন আবী শিমর আল গাসসানী মতান্তরে মুনজির ইবন হারেস ইবন আবী শিমর আল গাসসানীর নিকট পাঠান। (হায়াতুস সাহাবা-১/১২৭)

    এই হারেস ছিল দিমাশকের নিকটবর্তী ‘গুতা’ স্থানের শাসক। রাসূল সা: তাকে যে পত্রটি লেখেন তার প্রথম কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হারেস ইবন আবী শিমরের প্রতি। যারা হিদায়াতের অনুসরণ করে, ঈমান আনে এবং সত্য বলে জানে তাদের উপর সালাম। আমি আপনাকে সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিচ্ছি যিনি এক, যার কোন শরীক নেই। এমতাবস্থায় আপনার রাজত্ব বহাল থাকবে।”

    হারেস এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। তবে তার উযীর ‘মুরাই’ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং গোপনে হযরত শুজার মাধ্যমে রাসুল সা: খিদমতে সালাম পেশ করেন।

    ইমাম যুহরী বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায়, শুজা ইবন ওয়াহাব ছিলেন পারস্যের কিসরার দরবারে প্রেরিত রাসূল সা: দূত। রাসূলুল্লাহর সা: চিঠিটি তিনিই কিসরার হাতে অপর্ণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৩৬)

    প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে ভন্ড নবী মুসাইলামা আল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে ইয়ামামার প্রান্তরে হযরত শুজা শাহাদত বরণ করেন। (আল ইসাবা-২/১৩৮)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল চল্লিশ বছরের কিছু বেশি।

  • শাম্মাস ইবন উসমান (রা)

    শাম্মাস ইবন উসমান (রা)

    নাম শাম্মাস, পিতার নাম উসমান এবং মাতার নাম সাফিয়্যাহ। কুরাইশ গোত্রের বনু মাখযুম শাখার সন্তান। হিশাম কালবী থেকে বর্ণিত হয়েছে, তার প্রকৃত নাম ছিল উসমান। শাম্মাস নামকরণের কারণ এই যে, একবার জাহিলী যুগে পরম সুন্দর এক খৃস্টান পুরুষ মক্কায় আসে। তার চেহারা থেকে যেন সূর্যের কিরণ চমকাচ্ছিল। তার এ অত্যাশ্চার্য সৌন্দর্য দেখে মানুষ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে।

    হযরত শাম্মাসের মামা উতবা ইবন রাবী’য়া এ সময় দাবী করলো যে, তার কাছে এর থেকেও বেশি সূর্য কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছে এমন মানুষ আছে। আর সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হযরত শাম্মাসকে উপস্থাপন করে। সেদিন থেকে উসমান শাম্মাসে পরিণত হন। শাম্মাস অর্থ অতিরিক্ত সূর্য কিরণ বিচ্ছুরণকারী। (উসুদুল গাবা-৩/৩৭৫)। যুবাইর ইবন বাক্কার বলেন: তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম সুদর্শন ব্যক্তি। (আল ইসাবা-১/১৫৫)।

    হযরত শাম্মাস ও তার মা হযরত সাফিয়্যা বিনতু রাবী’য়া প্রথম পর্বেই রাসুল সা: এর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।

    মুশরিকদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি হাবশায় হিজরত করেন। সংগে মা সাফিয়্যাকেও নিয়ে যান। সেখান থেকে মক্কায় ফিরে আবার মদীনায় হিজরাত করেন। মদীনায় হযরত মুবাশশির ইবন আল মুনজিরের অতিথি হন। হযরত হানজালা ইবন আবী আমের আল আনসারীর সাথে মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।

    বদর ও উহুদ যুদ্ধে হযরত শাম্মাস বীরত্বের সাথে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন। উহুদের যুদ্ধে হঠাত করে যখন মুসলমানদের বিজয় পরাজয়ে পরিণত হয় এবং মাত্র গুটি কয়েক জীবন জীবন উতসর্গকারী মুজাহিদ ছাড়া আর সকলে ময়দান ছেড়ে দেয়, সেই চরম মুহুর্তে যে কজন রাসুলুল্লাহর সা: পাশে থেকে কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করেন তাদের মধ্যে ‍শাম্মাস একজন। রাসুল সা: বলতেন: এক ঢাল ছাড়া আমি শাম্মাসের আর কোন উপমা পাই না। রাসূল সা: সেদিন ডানে বায়ে যেদিকে তাকান কেবল শাম্মাসই দৃষ্টিতে পড়েন। তিনি নিজেকে সেদিন রাসুলুল্লাহর ঢালে পরিণত করেন। তার সারাটি দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল প্রাণ স্পন্দন কোন রকম অবশিষ্ট আছে। এ অবস্থায় মদীনায় আনা হলো। হযরত উম্মু সালামাকে তার সেবার দায়িত্ব দেওয়া হল। কিন্তু তখন তার জীবনের শেষ পর্যায়। একদিন পর তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার রক্তমাখা জামাকাপড়েই জানাযার নামায ছাড়াই উহুদের শহীদদের কবরস্থানে দাফন করার নির্দেশ দেন। তাকে আবার উহুদে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়। তবে ঐতিহাসিক ওয়াকেদী বলেন: তাকে মদীনার বাকী গোরস্তানে দাফন করা হয়। তিনি ছাড়া উহুদে শাহাদাত প্রাপ্ত আর কেউ বাকী গোরস্তানে সমাহিত হননি। (আল ইসাবা-২/১৫৫)।

    হযরত হাসসান (রা) তার মৃত্যুতে শোক গাঁথা রচনা করেছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র চৌত্রিশ বছর।