Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • আবুল হায়সাম ইবন আত-তায়্যিহান (রা)

    আবুল হায়সাম ইবন আত-তায়্যিহান (রা)

    আবুল হায়সাম উপনামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম এবং কোন্ গোত্রের সন্তান সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। একটি মতে ‘আবদুল্লাহ’ তাঁর আসল নাম। তবে অন্য একটি মতে ‘মালিক’ তাঁর নাম। আর এ মতের ওপরই মুসা ইবন ’উকবা, ইবন সা’দ, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, আবূ মা’শার ও মুহাম্মাদ ইবন ’উমার ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তেমনিভাবে তাঁর গোত্র ও পিতার নামের ব্যাপারেও মতভেদ আছে। এক মতে পিতা বালী ইবন আমর ইবন আল-হাফ ইবন কুদা’য়া। এই হিসাবে তাঁকে আল-বালাবী বলা হয়। এটাই ইবন সা’দের মত। এ মতের বিরোধিতা করেছেন ইবন ইসহাক ও আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আম্মারা আল-আনসারী। ইবন ইসহাক বলেছেন, আবুল হায়সাম, যিনি বদরে অংশগ্রহণ করেছেন তাঁর নাম মালিক এবং তাঁর ভাইয়ের নাম আতীক। তাঁরা উভয়ে তায়্যিহানের ছেলে। আর আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আল-আনসারী বলেন, আবুল হায়সাম আউস গোত্রের সন্তান। তাঁর মা লায়লা বিনতু আতীক। এটাই অধিকাংশের মত। (তাবাকাত- ৩৪৪৭, আল-ইসাবা ৪/২১২, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) তাঁর জন্মের সঠিক সময় জানা যায় না। আবুল হায়সাম তাঁর বন্ধু আস’য়াদ ইবন যুরারার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। একটি বর্ণনা মতে আস’য়াদ ইবন যুরারা ও জাকওয়ান ইবন ’আবদি কায়েস মক্কায় ’উতবা ইবন রাবী’য়ার নিকট যান। সেখানে তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. দা’ওয়াতের কথা শুনতে পেয়ে গোপনে তাঁর সাথে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন। আস’য়াদ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে আবুল হায়সামের সাথে দেখা করেন এবং নিজে ইসলাম গ্রহণের কাহিনী, রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর দা’ওয়াতের কথা তাঁর নিকট বর্ণনা করেন। ইবন সা’দ বলেন, ইয়াসরিবে পূর্ব থেকে –সেই জাহিলী যুগে আস’য়াদ ও আবূল হায়সাম ছিলেন তাওহীদ বা একত্ববাদের প্রবক্তা। আবুল হায়সাম বন্ধু যুরারার মুখে রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর দা’ওয়াতের কথা শুনে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ না করে সাথে সাথে বলে ওঠেনঃ ‘আনু আশহাদু মা’য়াকা আন্নাহু রাসূলুল্লাহ- আমিও তোমার সাথে সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসূল।’ এভাবে তিনি তাঁর বন্ধু যুরারার হাতে মুসলমান হন। পরের হজ্জ মওসুমে যেবার আটজন মতান্তরে ছয়জন ইয়াসরিববাসী মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. সাথে গোপনে দেখা করে বাই’য়াত বা শপথ করেন তাঁদের মধ্যে আবুল হায়সামও ছিলেন। ইতিহাসে এ বাই’য়াতকে আকাবার প্রথম বাই’য়াতও বলা হয়। তবে একটি বর্ণনা মতে, উক্ত বাই’য়াত বা শপথে আবুল হায়সাম ছিলেন না। (তাবাকাত- ১/২১৮-২১৯) উক্ত মতে, আস’য়াদ প্রথম আকাবায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় ফিরে এসে আবুল হায়সামকে ইসলামের দাও’য়াত দেন। এ দাওয়াতেই আবুল হায়সাম ইসলাম গ্রহণ করেন। এর এক বছর পর বারো জনের সাথে এবং তারও পরের বছর তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জনের সাথে তিনি ’আকাবায় রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আবার মিলিত হন। এভাবে তিনি ’আকাবার সব ক’টি বাই’য়াতে শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। (তাবাকাত- ১/২২, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) একটি বর্ণনা মতে, শেষ ’আকাবায় আবুল হায়সাম রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াতের জন্য সর্ব প্রথম নিজের হাতটি বাড়িয়ে দেন। মুসা ইবন ’উকবা ইমাম যুহরী থেকে একথা বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে অবশ্য যথেষ্ট মতভেদ আছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪৭, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪) তৃতীয় আকাবার শপথের সময় মদীনাবাসীরা যখন রাসূলুল্লাহকে সা. মদীনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো তখন মক্কা ও মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে যে কয়েকজন লোক ভাষণ দেন, আবুল হায়সাম তাদের অন্যতম। তাবারানী ’উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। আবুল হায়সাম ইবন তায়্যিহান রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করার সময় বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সাথে অন্য লোকদের চুক্তি আছে। এমনও কি হতে পারে, আমরা সেই চুক্তি বাতিল করলাম, তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলাম, আর এ দিকে আপনি স্বগোত্রে ফিরে এলেন? তাঁর কথা শুনে রাসূল সা. একটু হাসি দিয়ে বললেনঃ তোমাদের রক্তের দাবীর অর্থ হবে আমারই রক্তের দাবী, তোমাদের রক্তপাত মানে আমারই রক্তপাত। অর্থাৎ আমার ও তোমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। রাসূলুল্লাহর সা. এ কথায় সন্তুষ্ট হয়ে আবুল হায়সাম সাথীদের লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘‘আমার স্বগোত্রীয় লোকেরা! এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় তিনি সত্যবাদী। আজ তিনি মক্কার হারামে আত্মীয়দের মধ্যে নিরাপদেই আছেন। জেনে রাখ, যদি তোমরা এখান থেকে বের করে তাঁকে তোমাদের কাছে নিয়ে যাও তাহলে সমগ্র আরববাসী একই ধনুক থেকে তোমাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করবে। অর্থাৎ সকালের সাধারণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। যদি তোমরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং জান-মাল ও সন্তান-সন্ততি বিলিয়ে দিতে রাজী থাক তাহলেই তাঁকে তোমাদের ভূমিতে আমন্ত্রণ জানাও। কারণ, তিনি সত্যি সত্যিই আল্লাহর রাসূল। তোমরা যদি পরে অনুশোচনার ভয় কর তাহলে ভেবে দেখ।’’ আবুল হায়সামের এ বক্তব্যের পর তাঁর সাথীরা বললোঃ ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু আমাদের দিয়েছেন, আমরা তা কবুল করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের নিকট যা কিছু দাবী করেছেন আমরা তা আপনাকে দান করলাম। আবুল হায়সাম, আপনি একটু সরে দাঁড়ান, আমরা রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করি।’ আবুল হায়সাম বললেনঃ আমিই প্রথম বাই’য়াত করি। তাঁর বাই’য়াতের পর অন্যরা একের পর এক বাই’য়াত করে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/২৪৭,২৪৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪২) এ বাই’য়াতের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. বারোজন নাকীব বা দায়িত্বশীলের নাম ঘোষণা করেন। আউস গোত্র থেকে আবুল হায়সাম, উসাইদ ইবন হুদাইর ও সা’দ ইবন খায়সামা- এই তিনজন নাকীব মনোনীত হন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫২) হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় হিজরাত করে প্রখ্যাত মুহাজির হযরত উসমান ইবন মাজ’উনের সাথে আবুল হায়সামের মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ-সম্পর্ক কায়েম করে দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৭১, আল-ইসাবা- ৪/২১২) বদর, উহুদ, খন্দকসহ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। উহুদে তাঁর ভাই আতীক ইবন তায়্যিহান ইকরিমা উবন আবূ জাহলের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। (আনসাব- ১/৩২৯) ইবন সা’দ বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা মূতায় শহীদ হওয়ার পর হযরত রাসূলে কারীম সা. আবুল হায়সামকে খেজুরের পরিমাপকারী হিসাবে খাইবারে পাঠান। রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর হযরত আবু বকরও তাঁকে এ পদে বহাল রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। (তাবাকাত- ৩/৪৪৮) খলীফা হযরত ’উমারের খিলাপতকালে হিজরী ২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। একটি বর্ণনা মতে হিজরী ৩৭ সনে সিফ্ফীন যুদ্ধের পূর্বে তাঁর মৃত্যুর কথা জানা যায়। ইমাম আসমা’ঈ একটি বর্ণনা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আবুল হায়সামের গোত্রের লোকদের নিকট তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তারা বলেছে, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেছেন। হিজরী ২১ সনেও তাঁর মৃত্যুর কথা যেমন অনেকে বলেছেন তেমনি কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, তিনি সিফ্ফীনে হযরত আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করেছেন। অনেকে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, তিনি সিফ্ফীনে ’আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেছেন। (আনসাব- ১/২৪০, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) ঐতিহাসিক ওয়াকিদী স্পষ্ট করে বলেছেন, সিফ্ফীনে তাঁর যোগদানের বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এর বিপরীতে হিজরী ২০ সনে তাঁর মৃত্যুর কথা ইমাম যুহরী, সালেহ ইবন কায়সান এবং হাকেমের মত উঁচু স্তরের মুহাদ্দিসীন থেকে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এর বিপরীতে একটি সন্দেহযুক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। (সীয়ারে আনসার- ২) হাদীসের গ্রন্থসমূহে আবুল হায়সাম থেকে বর্ণিত কিছু হাদীস দেখা যায় তবে সেগুলির বিশুদ্ধতা সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। ইবন হাজার ’আসকালানী বলেছেনঃ আবুল হায়সাম থেকে বর্ণিত যত হাদীস দেখা যায় তার সবই সন্দেহযুক্ত। এমন কোন একটি বর্ণনা শৃঙ্খল পাওয়া যায় না যার দ্বারা সেগুলির কোন একটি যথার্থতা প্রমাণিত হয়। এর কারণ হল, বহু আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। (আল-ইসাবা- ৪/২১৩) আল-হায়সাম ইবন নাসর আল-আসলামী রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর সা খিদমাত করেছি। আবুল হাযসাম ইবন তায়্যিহানের ‘জাসিম’ নামক একটি কূয়ো ছিল। এই কূয়োর পানি ছিল সুমিষ্ট। আমি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য এই কূয়ো থেকে পানি আনতাম। একবার গরমের দিনে হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু বকরকে রা. সংগে করে আবুল হাযসামের বাড়ীতে আসেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ ঠান্ডা পানি আছে কি? আবুল হায়সাম এক বালতি বরফের মত ঠান্ডা পানি নিয়ে আসেন। ছাগলের দুধের সাথে সেই ঠান্ডা পানি মিশিয়ে রাসূলুল্লাহকে সা. পান করান। তারপর আরজ করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের একটি ঠান্ডা ছাউনী (’আরীশ) আছে। এই দুপুরে আপনি সেখানে একটু বিশ্রাম নিন। আবুল হায়সাম ছাউনীর ওপর পানি ছিটিয়ে দেন। রাসূল সা. আবু বকরকে সংগে করে সেখানে প্রবেশ করেন। আবুল হায়সাম বিভিন্ন ধরণের খেজুর এবং ডিশ ভর্তি ‘সারীদ’ (এক প্রকার উপাদেয় পানীয়) তাঁদের সামনে হাজির করেন। বর্ণনাকারী হাযসাম ইবন নাসর বলেন, রাসূল সা. আবু বকর এবং আমরা সবাই তা আহার ও পান করলাম। তারপর নামাযের সময় হলে তিনি আবুল হায়সামের বাড়ীতে আমাদের নিয়ে জামা’য়াত নামায আদায় করেন। জামা’য়াতে আবুল হায়সামের স্ত্রী ছিলেন আমার পেছনে। নামায শেষে তিনি আবার ছাউনীতে ফিরে যান এবং সেখানে জুহরের ফরজের পরের দু’রাকা’য়াত নামায আদায় করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৩৫) একদিন হযরত রাসূলে কারীম সা. অভ্যাসের বিপরীত, যখন তিনি ঘর থেকে বের হন না এমন এক সময়ে বের হলেন। কিছুক্ষণ পর আবু বকরও আসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আবু বকর, এমন অসময়ে বের হলে যে? বললেন, আপনার সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। এর মধ্যে ’উমারও উপস্থিত হলেন। রাসূল সা. তাঁকেও ঠিক একই প্রশ্ন করলেন। ’উমার জবাব দিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ক্ষুধাই আমাকে এখানে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও ক্ষুধার্ত। তিনজন একসাথে আবুল হায়সামের বাড়ীতে গেলেন। তাঁর ছিল খেজুরের বাগান এবং বকরীর পাল। কিন্তু কোন চাকর-বাকর ছিল না। সব কাজ নিজে করতেন। আর তখন তিনি বাড়ীতেও ছিলেন না। আওয়ায দিলে তাঁর স্ত্রী বললেন, পানি আনতে গেছেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল তিনি মশক ভর্তি পানি নিয়ে ফিরছেন। রাসূলুল্লাহকে সা. দেখে মশক মাটিতে রেখে দেন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আবেগের সাথে বলতে থাকেন, আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক! তারপর সবাইকে বাগানে নিয়ে যান। সেখানে বসার জন্য কোন জিনিস বিছিয়ে দেন। সবাইকে বসিয়ে রেখে খেজুরের একটি কাঁধি কেটে নিয়ে আসেন। রাসূল সা. বললেনঃ যদি পাকা খেজুর নিয়ে আসতে। বললেনঃ এতে কাঁচা-পাকা সব রকমের আছে, আপনার খুশীমত গ্রহণ করুন। রাসূল সা. সেই খেজুর থেকে কিছু খেলেন। তারপর পানি পান করলেন। সেই পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ ও সুস্বাদু। রাসূল সা. পানাহারের পর বললেন, দেখ, আল্লাহর কত নি’য়ামত। ছায়া, উৎকৃষ্ট খেজুর, ঠান্ডা পানি- আল্লাহর কসম, কিয়ামতের দিন এর সবকিছু সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আবুল হায়সাম সম্মানিত মেহমানদের বাগানে বসিয়ে রেখে বাড়ীতে আসেন এবং খাবারের আয়োজন করেন। তিনি ছোট একটি ছাগল জবেহ করেন এবং তা ভূনা করে মেহমানদের সামনে পেশ করেন। আহার পর্ব শেষ করে রাসূল সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের কি কোন চাকর নেই। বললেনঃ না। রাসূল সা. বললেনঃ আমার হাতে কোন যুদ্ধবন্দী এলে তুমি আমার কাছে এস। সেই সময় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে দু’জন যুদ্ধবন্দী আসে। তিনি আবুল হায়সামকে তাদের যে কোন একজনকে গ্রহণ করতে বলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. ওপর নির্বাচনের ভার ছেড়ে দেন। রাসূল সা. তাঁদের একজনকে তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বলেনঃ এর সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তিনি দাসটিসহ বাড়ীতে এসে রাসূলুল্লাহর সা. উপদেশের কথা স্ত্রীর নিকট বলেন। স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। তিনি বললেন, যদি রাসূলুল্লাহর সা. আদেশ-পালন করতে চাও, তাহলে তাকে আযাদ করে দাও। তিনি স্ত্রীর পরামর্শ মত দাসটি আযাদ করে দেন। তাঁদের এ কাজের কথা রাসুল সা. জানতে পেরে খুব খুশী হলেন এবং তাদের দু’জনেরই প্রশংসা করেন। (তিরমিজী- ৩৯১) তাছাড়া কানসুল ’উম্মাল গ্রন্থেও ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম ও ইমাম মালিক ঘটনাটি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। হাফেজ আল-মুনজিরী বলেন, এই ঘটনাটি আবুল হায়সাম ও আবু আইউব আল-আনসারী উভয়ের সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩১০) আবুল হাযসামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনারা ’আকাবায় কিসের ওপর বাই’য়াত করেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, বনী ইসরাঈলরা মূসার আ. হাতে যে বিষয়ের বাই’য়াত করেছিল আমরাও রাসূলুল্লাহর সা. হাতে ঠিক সেই বাই’য়াত করেছিলাম। (আনসাবুল আশরাফ ১/২৪০)

  • আস’য়াদ ইবন যুরারা (রা)

    আস’য়াদ ইবন যুরারা (রা)

    আবূ উমামা আস’য়াদ, যিনি আস’য়াদ আল-খায়র নামেও পরিচিত, মদীনার খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। তাঁর পিতা যুরারা ইবন ’আদাস। (আল-ইসাবা-১/৩৪; উসুদুল গাবা-১/৭১) তাঁর জন্মের সন-তারিখ সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। হযরত রাসূলে কারীমের সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে সমগ্র আরব উপদ্বীপ কুফর ও গুমরাহীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। তবে এর মধ্যেও কিছু লোক বিশুদ্ধ স্বভাব বা ফিতরাতের দাবী অনুসারে তাওহীদ বা একত্ববাদের প্রবক্তা ছিলেন। আস’য়াদ ইবন ইবন যুরারা তাঁদেরই একজন। (তাবাকাত- ১/১৪৬) ইসলাম-পূর্ব যুগেও ইয়াসরিবের (মদীনা) লোকেরা নিজেদের ঝগড়া বিবাদে কুরাইশদের সমর্থন লাভ এবং তা ফায়সালার উদ্দেশ্যে মক্কায় যাতায়াত করতো। তাছাড়া হজ্জ ও ’উমরা আদায়ের জন্যও তারা সেখানে যেত। অতঃপর মক্কায় ইসলামের অভ্যূদয় ঘটলো। এরমধ্যে হযরত রাসূলে কারীম সা. নবুওয়াতী জীবনের বেশ ক’টি বছর অতিবাহিতও করেছেন। মক্কার লোকদের ইসলামের দাওয়াত দানের সাথে সাথে বিভিন্ন মেলা ও হাটে-বাজারে উপস্থিত হয়ে ব্যাপকভাবে তিনি মানুষকে সত্যের দা’ওয়াত দিচ্ছেন। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মক্কায় আগত বহিরাগত লোকদের নিকটও গোপনে কুরআনের বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করে চলেছেন। ইবনুল আসীর ওয়াকিদীর সূত্রে বলেনঃ এমনি এক সময়ে আস’য়াদ ইবন যুরারা ও জাকওয়ান ইবন ’আবদিল কায়স নিজেদের একটি ঝগড়া নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে মক্কার কুরাইশ নেতা ’উতবা ইবন রাবী’য়ার নিকট যান। এই ’উতবার নিকট তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দেখা করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের সামনে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করেন এবং পবিত্র কুরআন থেকে কিছু তিলা’ওয়াত করে শোনান। এই সাক্ষাতেই তাঁরা দু’জন ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে ’উতবার কাছে আর না গিয়ে সোজা মদীনায় ফিরে যান। এভাবে তাঁরা দু’জনই হলেন মদনিায় আগমণকারী প্রথম মুসলমান। এটা নবুওয়াতের দশম বছরে ’আকাবার প্রথম বাই’য়াতের পূর্বের ঘটনা। (উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা- ১/৩৪, হায়াতুস সাহাবা- ১/৮৬) অবশ্য ইবন ইসহাকের বরাতে ইবনুল আসীর বলেছেন, আস’য়াদ ইবন যুরারা সেই লোকগুলির একজন যাঁরা নবুওয়াতের দশম বছরে অনুষ্ঠিত ’আকাবার ১ম বাইয়াতে শরিক হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তিনি নবুওয়াতের একাদশ ও দ্বাদশ বছরে অনুষ্ঠিত ২য় ও ৩য় বাইয়াতেও উপস্থিত ছিলেন। তাই তিনি ছিলেন একজন পূর্ণ ’আকাবী ব্যক্তি। (উসুদুল গাবা- ১/৭১) প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, মদীনার প্রথম মুসলমান কে- এ বিষয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের বিস্তর মতবিরোধ আছে। ইবন হিশাম বলেছেন, সুওয়াইদ ইবন সামিত হজ্জ অথবা ’উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় যান এবং রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ইয়াসরিববাসীরা তাঁকে ‘কামিল’ উপাধি দান করে। বীরত্ব, সাহসিকতা, কাব্য প্রতিভা, বংশ মর্যাদা, সম্মান-প্রতিপত্তি, মোটকথা সর্বগুণে গুণান্বিত ব্যক্তিকে সে যুগের আরবরা ‘কামিল’ উপাধি দান করতো। মদীনাবাসীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর সা. দাও’য়াত লাভ ও কুরআন শোনার সৌভাগ্য সর্বপ্রথম তাঁরই হয়। ইবন হিশাম বলেন, এ দাওয়তের পর তিনি ইসলাম থেকে দূরে ছিলেন না। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪২৬-২৭) কিন্তু এর অব্যবহিত পরেই তিনি নিহত হন। যাই হোক সুওয়াইদ সর্ব প্রথম মুসলমান হলেও মদীনায় ফিরে ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করার সুযোগ পাননি। সম্ভবতঃ আস’য়াদ ও জাকওয়ানই প্রথম দুই ব্যক্তি যাঁরা সর্বপ্রথম মদীনায় ইসলামের তাবলীগের কাজ শুরু করেন। মদীনায় পৌঁছে সর্বপ্রথম তিনি আবুল হায়সামের সাথে দেখা করেন এবং তাঁর কাছে নিজের নতুন বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করেন। আবুল হায়সাম সাথে সাথে বলে ওঠেন, ‘‘তোমার সাথে আমিও তাঁর রিসালাতের প্রতি ঈমান আনলাম।’’ (তাবাকাত- ১/১৪৬) অনেকে এই আবুল হায়াসামকে মদীনার প্রথম মুসলমান বলে মনে করেছেন। নবুওয়াতের দশম বছরে প্রতিবছরের মত ইয়াসরিববাসীরা হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আসে। তাদের মধ্য থেকে ছয় ব্যক্তি হজ্জ শেষে গোপনে মিনার আকা’বা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। এ ছয়জনের মধ্যে আস’য়াদও ছিলেন। পরের বছর হজ্জের মওসুমে ইয়াসরিববাসীরা আবার মক্কায় আসে। তাদের মধ্য থেকে বারোজন লোক গোপনে, আকাবায়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মিলিত হয়ে বাই’য়াত করেন। এই বারো জনের মধ্যে আসয়াদও ছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪২৯, ৪৩১, ৪৩৩, ৪৩৫, ৪৩৬, ৪৩৭) এই ’আকাবার পর মদীনায় যখন ইসলামের তাবলীগ ও দাওয়াতের সম্ভাবনা অনেকটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তখন তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট একজন শিক্ষক দাবী করেন, যিনি তাদেরকে কুরআন ও দ্বীন শিক্ষা দেবেন। তাঁদের দাবী অনুসারে রাসূল সা. মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে রা. ইয়াসরিবে দা’য়ী বা আহবায়ক হিসাবে পাঠালেন। মুসয়াবের মদীনায় যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সেখানে আসয়াদ ইবন যুরারা নামাযের ইমাম ছিলেন। তারপর মুস’য়াব ইমাম হন। তবে অনেকের মতে সালেম মাওলা আবী হুজাইফার মদীনা পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আস’য়াদই সেখানে ইমামতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। মুস’য়াব শুধুমাত্র তাদের কুরআনের তা’লীম দিতেন। মদীনায় তাঁরা বাইতুল মাকদাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৩৯, ২৬৬) আস’য়াদ হযরত মুস’য়াবকে মদীনায় নিজ গৃহে অতিথির মর্যাদায় আশ্রয় দেন। (তাবাকাত- ৩/৪৮৩) হযরত মুস’য়াবের মদীনায় যাওয়ার পর আস’য়াদ ইবন যুরারা তাঁকে সংগে করে ব্যাপকভাবে দা’ওয়াতী তৎপরতা শুরু করেন। তাঁরা মদীনার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে মানুষকে ইসলামের দা’ওয়াত দিতেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ একদিন আস’য়াদ ইবন যুরারা মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে সাথে করে বনী ’আবদিল আশহাল ও বনী যাফারের দিকে বের হলেন। তাঁরা বনী যাফারের একটি বাগিচায় প্রবেশ করে ‘মা’রাক’ নামক একটি কূপের ধারে প্রাচীরের ওপর বসলেন। তাঁদের চারপাশে লোকজন জড় হল। সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর ছিলৈন বনী ’আবদিল আশহালের নেতা। তখনও তারা পৌত্তলিক ছিলেন। সা’দ ছিলেন আস’য়াদের খালাতো ভাই। আস’য়াদ ও মুস’য়াবের আগমণের কথা জানতে পেয়ে সা’দ ছিলেন আস’য়াদের খালাতো ভাই। আস’য়াদ ও মুস’য়াবের আগমণের কথা জানতে পেয়ে সা’দ উসাইদকে বললেনঃ ‘উসাইদ, তুমি এ দু’ব্যক্তির কাছে যাওতো। তারা আমাদের বাড়ীর উপর এসে আমাদের দুর্বল লোকগুলিকে বোকা বানিয়ে যাচ্ছে। তুমি তাদেরকে নিষেধ করে এস। যদি আমার খালাতো ভাই আস’য়াদ না থাকতো তাহলে তোমার প্রয়োজন হতো না। আমিই তাদের তাড়িয়ে দিতাম।’ উসাইদ বল্লম হাতে নিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে গেল। আস’য়াদ তাকে দেখে মুস’য়াবকে বললেন, ‘এ ব্যক্তি তার গোত্রের একজন নেতা, আপনার কাছে এসেছে।’ হযরত মুস’য়াব তার সাথে কথা বললেন। আল্লাহর ইচ্ছায় সেই বৈঠকেই উসাইদ মুসলমান হযে গেলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১৮৭/১৯০) আস’য়াদ ও মুস’য়াবের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মদীনায় ইসলামের এত ব্যাপক প্রসার হল যে , মাত্র এক বছর পর নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে হজ্জের মওসুমে তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জন নারী-পুরুষের একটি দল আবার মিনার ’আকাবায় গোপনে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মিলিত হয়। এই তৃতীয় তথা সর্বশেষ ’আকাবায় কে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর সা. হাতে হাত রেখে বাইয়াত বা শপথ করেন সে ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। একটি মতে সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিটি আস’য়াদ। (আল-ইসাবা- ১/৩৪, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪, উসুদুল গাবা- ১/৭১) আবদুল্লাহ ইবন আবী বকর থেকে বর্ণিত। বাই’য়াতের পর রাসূল সা. বললেন, ‘তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে বারোজন ‘নাকীব’ নির্বাচন কর, যাঁরা হবে ঈসার হাওয়ায়ীদের (সাথী) মত আপন আপন গোত্রের কাফীল বা দায়িত্বশীল।’ আস’য়াদ সায় দিয়ে বললেনঃ ‘হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল সা. বললেনঃ তুমি হবে তোমার গোত্রের ‘নাকীব’। তারপর তিনি অন্য ‘নাকীব’-দের নাম ঘোষণা করেন। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওযাল আ’লাম- ১/১৮২) এভাবে তিনি হলেন রাসূল সা. মনোনীত বনী নাজ্জারের ‘নাকীব’। তবে ইবন মুন্দাহ ও আবূ নু’ঈমের মতে তিনি ছিলেন বনী সায়িদার ‘নাকীব’। ইবনুল আসীর বলেন, এটা তাঁদের ধারণা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন নিজ গোত্র বনী নাজ্জারের ‘নাকীব’। তাই তিনি যখন মারা যান তখন বনী নাজ্জারের লোকেরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট আবেদন করে- ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আস’য়াদ মারা গেছেন, তিনি ছিলেন আমাদের নাকীব। এখন আপনি অন্য একজন নতুন ‘নাকীব’ নির্বাচন করে দিন। জবাবে রাসূল সা. বললেনঃ তোমরা আমার মাতুল গোত্র। আমিই তোমাদের ‘নাকীব’। এটা ছিল বনী নাজ্জারের জন্য বিরাট মর্যাদা। (উসুদুল গাবা- ১/৭১-৭২) রাসূল সা. তাঁকে শুধু নাকীবই মনোনীত করেননি, বরং ‘নাকীব আল-নুকাবা বা প্রধান দায়িত্বশীল বলেও ঘোষণা দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪) ইবনুল আসীর বলেন, একমাত্র জাবির ইবন আবদিল্লাহ ছাড়া আস’য়াদ ছিলেন এই আকাবীদের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠ। (উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা- ১/৩৪) আকাবার তৃতীয় বাই’য়াতের পর এক বিরাট দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি মদীনায় ফিরে যান। বয়স অল্প হলে কি হবে। তাঁর ঈমানী জযবা বা আবেগ ছিল অতি তীব্র। তিনি মদীনায় জামা’য়াতে নামায আদায়ের ব্যবস্থা করেন এবং চল্লিশজন মুসল্লী নিয়ে সর্বপ্রথম মদীনায় জুম’য়ার নামায আদায়ের ব্যবস্থা করেন এবং চল্লিশজন মুসল্লী নেয় সর্বপ্রথম মদীনায় জুম’আর নামাযের জন্য বের হলে যখনই আযান শুনতে পেতেন, তিনি আবু উমামা আস’য়াদ ইবন যুরারার জন্য ইসতিগফার ও দু’আ করতেন। একদিন আমি বললামঃ ‘আব্বা, আপনি আযান শুনলে এভাবে সব সময় তাঁর জন্য দু’আ করেন কেন?’ বললেনঃ ‘বেটা! রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আসার আগে তিনিই সর্বপ্রথম আমাদেরকে বনী বায়দা’র ‘হাযমুত নাবীত’ নামক পাহাড়ের কাছে ‘নাকী আল-খাদিমাত’ নামক স্থানে একত্র করে জুম’আর নামায আদায় করতেন। আমাদের সংখ্যা হত ৪০ জন।’ (উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা- ১/৩৪, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৫, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৩, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৮৭) মদীনায় সর্বপ্রথম কে জুম’আর নামায কায়েম করেন সে ব্যাপারে মতভেদ আছে। হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় পৌঁছার পর যদিও আবু আইউব আল-আনসারীর রা. বাড়ীতে ওঠেন, তবে তাঁর বাহন উটনীটি আস’য়াদের মেহমান হয়। (তাবাকাত- ১/১৬০) রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় পৌঁছার প্রথম ক্ষণটিতে উটনীটি সর্বপ্রথম বসে পড়ে এবং পরে যে স্থানটি রাসূলুল্লাহর সা. মসজিদ ও বাসস্থানের জন্য নির্বাচিত হয়, সেই ভূমির মালিক ছিল সাহল ও সুহাইল নামক দুই ইয়াতীম বালক। আর তাদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আস’য়াদ ইবন যুরারা। (বুখারী, হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৪৩) রাসূল সা. বালক দু’টির মুরব্বী আস’য়াদের নিকট ভূমির মূল্য জানতে চান। বালক দু’টি সাথে সাথে বলে ওঠে, ‘আমরা আল্লাহর কাছেই এর মূল্য চাই।’ যেহেতু বিনা মূল্যে রাসূল সা. ভূমি গ্রহণে রাজী হলেন না তাই হযরত আবু বকর রা. তার মূল্য পরিশোধ করেন। তবে কোন কোন বর্ণনায় জানা যায়, আস’য়াদ ইবন যুরারা তাঁর বনী বায়দায় অবস্থিত একটি বাগিচা মসজিদের এই ভূমির বিনিময়ে ইয়াতীমদ্বয়কে দান করেন। (যারকানী- ১/৪২২) বালাজুরী বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আগমণের পর আবু আইউবের বাড়ীতে অবস্থানকালে আস’য়াদ ইবন যুরারা এক রাত পর পর পালাক্রমে তাঁর জন্য খাবার পাঠাতেন। আস’য়াদের বাড়ী থেকে খাবার আসার পালার রাতে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ ‘আস’য়াদের পিয়ালাটি কি এসেছে?’ বলা হত, ‘হাঁ।’ তিনি বলতেনঃ ‘তা হলে সেইটি নিয়ে এস।’ বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, তাতে আমরা বুঝে নিতাম তাঁর খাবারটি রাসূলুল্লাহর সা. প্রিয়। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৬৭) ওয়াকিদী হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা. মদীনায় আবু আইউবের বাড়ীতে ওঠার পর একদিন জিজ্ঞেস কররেনঃ ‘আবু আইউব, তোমার কি কোন খাট (পালঙ্ক) আছে?’ উল্লেখ্য যে, মক্কায় কুরাইশরা খাটে ঘুমাতে অভ্যস্ত ছিল। আবু আইউব বললেনঃ ‘না।’ একথা আস’য়াদ ইবন যুরারার কানে গেল। তিনি একটি স্তম্ভ ও কারুকার্য করা পায়া বিশিষ্ট একটি খাট পাঠিয়ে দিলেন। রাসূল সা. তাঁর ওপর ঘুমাতেন। অতঃপর রাসূল সা. যখন আমার ঘরে চলে আসেন এবং আমার মা আমাকে যে খাটটি দেন তাতেই তিনি ঘুমাতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫২৫) হযরত তালহা ইবন ’উবায়দিল্লাহ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের পর আস’যাদের বাড়ীতে ওঠেন। হযরত হামযাও তাঁর বাড়ীতে ওঠেন বলে বর্ণিত আছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৭৭-৪৭৮) মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ তখন চলছে। এমন সময়ে প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে তাঁর পরকালের ডাক এসে যায়। তিনি ‘জাবহা’ নামক কণ্ঠনালীর এক প্রকার রোগে আক্রান্ত হন। হযরত রাসূলে কারীম সা. নিজ হাতে তাঁর আক্রান্ত স্থানে সেক দেন, তাঁর মাথায় হাত দেন; কিন্তু কোন উপকার দেখা গেল না। তিনি মারা যান। ওয়াকিদীর মতে হিজরতের পর ৯ম মাসে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ সা. ব্যথিত হন। তিনি বলেন, ‘‘এখন তো ইয়াহুদীরা বলে বেড়াবে ‘যদি তিনি নবী হতেন তাহলে তাঁর সাথী মরতো না, অথচ আমি কি মৃত্যুর চিকিৎসা করতে পারি?’’ হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং মদীনার বাকী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫০৭, উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা-১/৩৪, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৩) বলা হয়ে থাকে রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পর এটাই প্রথম মৃত্যু। আর এটাও ধারণা করা হয় যে, এবারই সর্বপ্রথম রাসূল সা. জানাযার নামায আদায় করেন। আনসারদের ধারণা মতে বাকী’তে দাফনকৃত প্রথম মুসলমান আস’য়াদ আর মুহাজিরদের মতে ’উসমান ইবন মাজ’উন। (আল-ইসাবা-১/৩৪) মৃত্যুকালে হযরত আস’যাদ দু’টি কন্যা সন্তান রাসূলুল্লাহর সা. জিম্মায় ছেড়ে যান। রাসূল সা. আজীবন তাদের দেখাশুনা করেন। মোতির দানা মিশ্রিত সোনার বালা তিনি তাদের হাতে পরান। এক মেয়েকে তিনি সাহল ইবন হুনাইফের সাথে বিয়ে দেন এবং সেখানে তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে আবু উমামা বিন সাহল। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৩, আল-ইসাবা- ১/৩৪)

  • আবদুল্লাহ ইবন মাখরামা (রা)

    আবদুল্লাহ ইবন মাখরামা (রা)

    পুরো নাম আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ, পিতা মাখরামা ইবন আবদিল উযযা এবং মাতা বাহসানা বিনতু সাফওয়ান। কুরাইশ বংশের আমেরী শাখার সন্তান। (আল ইসাবা-২/৩৬৫)।

    ইসলামী দাওয়াতের সূচনা লগ্নে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন। জাফর ইবন আবী তালিবের (রা) সাথে হাবশাগামী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। সেখান থেকে সরাসরি মদীনায় চলে যায় এবং হযরত কুলসুম ইবন হিদামের বাড়ীতে অতিথি হন। হরযত রাসূলে কারীম সা: ফারওয়া ইবন আমর আল বায়াদীর (রা) সাথে তার দ্বীনী ভাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। মদীনায় আসার পর সর্ব প্রথম বদর যুদ্ধে যোগদান করে বদরী সাহাবী হওয়ার মহা সম্মান অর্জন করেন। তখন তার বয়স ত্রিশ বছর। বদরের পর, উহুদ সহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূল সা: এর সাথে যোগ দেন।

    হযরত আবদুল্লাহর (রা) শাহাদাত লাভের এত তীব্র বাসনা ছিলো যে, দেহের প্রতিটি লোম রক্ত রঞ্জিত করার জন্য সর্বদা ব্যাকুল থাকতেন। তিনি দুআ করতেন: হে আল্লাহ, তুমি আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিওনা, যতক্ষণ না আমার দেহের প্রতিটি জোড়া আঘাতে আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। তার এ দুআ কবুল হয় এবং অনতিবিলম্বে সে সুযোগও এসে যায়।

    হযরত আবু বকর সিদ্দীকের সা: খিলাফতকালে রিদ্দা বা ধর্মত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে তিনি একজন মুজাহিদ হিসেবে যোগ দেন। মুরতাদদের বিরুদ্ধে তিনি এত নির্মম ভাবে যুদ্ধ করেন যে, তার সারা দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পবিত্র রমজান মাস। তিনি সাওম পালন করছিলেন। সূর্যাস্তের সময় যখন তারও জীবন সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাখরামা (রা) খোঁজ নিতে এসেছেন। আবদুল্লাহ ইবন মাখরামা (রা) তাকে জিজ্ঞেস করেন, আমার জন্যও একটু পানি আনুন না। পানি নিয়ে ফিরে এসে দেখেন তার প্রাণহীন দেহটি পড়ে আছে। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র একচল্লিশ বছর। (আল ইসাবা-২/৩৬৫)।

    ইলম, আমল, তাকওয়া ও পরহেযগারীর দিক দিয়ে তিনি ছিলেন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। উসুদুল গাবা গ্রন্থকার লিখেছেন, তিনি ছিলেন মাহাত্মের অধিকারী একজন আবেদ ব্যক্তি।

  • ওয়াকিদ ইবন আবদিল্লাহ (রা)

    ওয়াকিদ ইবন আবদিল্লাহ (রা)

    নাম ওয়াকিদ, পিতা আবদুল্লাহ। বনী তামিম গোত্রের হানজালী ইয়ারবূয়ী শাখার সন্তান। জাহিলী যুগে খাত্তাব ইবন নুফাইলের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। (তাবাকাত-৩/৩৯০, আল ইসাবা -৩/৬২৮)।

    মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনালগ্নে হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত আরকাম ইবন আবিল আরকামের বাড়ীতে প্রবেশের পূর্বেই ওয়াকিদ ইসলাম গ্রহণ করেন। হিজরাতের নির্দেশ আসার পর তিনি মদীনায় হিজরাত করেন এবং হযরত রিফায়া ইবন আবদিল মুনজিরের অতিথি হন। মদীনায় রাসূল সা: বিশর ইবন বারা ইবন মারুর এর সাথে তার মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক কায়েম করে দেন। (তাবাকাত-৩/৩৯০)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: মদীনায় হিজরাতের সতেরতম মাসটি ছিল রজব মাস। এ মাসে তিনি কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের নেতৃত্বে ১২ মতান্তরে ৯ সদস্যের একটি বাহিনীকে ‘নাখলায়’ পাঠান। এতে ওয়াকিদ ইবন আবদিল্লাহও ছিলেন। তারা নাখলায় পৌঁছে ওঁত পেতে আছেন। এমন সময় কুরাইশদের একটি ছোট্ট বাণিজ্য কাফিলা দৃষ্টিগোচর হয়। দিনটি ছিল রজবের একেবারে শেষ দিন। আর রজব মাসটি আরবে যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ চার মাসের একটি। সুতরাং এ সময় আক্রমণ করা যাবে কি না, এ বিষয়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা পরামর্শ করেন। অবশেষে আক্রমণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

    ওয়াকিদ ইবন আবদিল্লাহ (রা) তীর নিক্ষেপ করেন। সেই নিক্ষিপ্ত তীরে শত্রুপক্ষের আমর ইবনুল হাদরামী নিহত হয় এবং উসমান ও হাকাম নামে দুই ব্যক্তি বন্দী হয়।

    যেহেতু রক্তপাতের ঘটনাটি সংঘটিত হয় হারাম মাসে এ কারণে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সা: ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের প্রচারণা চালাতে থাকে। তারা বলে, মুহাম্মাদ সা: ও তার অনুসারীরা কি আবহমান কাল ধরে মেনে আসা হারাম মাসগুলির পবিত্রতা মানে না? এমনকি রাসূল সা: নিজেও ঘটনাটি মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি বাহিনীর লোকদের ডেকে বললেন, আমি তো তোমাদের যুদ্ধের অনুমতি দেইনি, তবে কেন তোমরা যুদ্ধ করলে? এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা আল বাকারার নীচের আয়াতটি নাযিল হয়:

    ‘হে মুহাম্মাদ, মুশরিকরা তোমার নিকট ‘হারাম’ মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তুমি তাদেরকে বলে দাও এ মাসে যুদ্ধ করা বড় পাপের কাজ। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, আল্লাহর কুফুরী করা, মানুষকে মসজিদে হারামে ইবাদাত করা থেকে বিরত রাখা এবং সেখান থেকে তার অধিবাসীদের বের করে দেওয়া আল্লাহর নিকট এ মাসে যুদ্ধ অপেক্ষা অধিকতর পাপ কাজ। আর অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর পাপ। (সূরা ‍বাকারা-২১৭)।’
    (আল ইসাবা-৩/৬২৮), আসাহুস সীয়ার-১২৮)।

    যাই হোক, আমর ইবনুল হাজরামী একজন মুসলমানের হাতে নিহত প্রথম কাফির, উসমান ও হাকাম ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দুই কয়েদি এবং কুরাইশ কাফিলার নিকট থেকে প্রাপ্ত জিনিস ইসলামের প্রথম গণীমত। (আসাহুস সীয়ার-১২৮)।

    এই ঘটনার পর বনী ইয়ারবু গর্ব করে বলে বেড়াতো আমাদেরই একজন ইসলামের ইতিহাসে সর্ব প্রথম একজন মুশরিককে হত্যা করেছে। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব কাব্য করে বলতেন: ‘নাখলায় আমরা আমাদের তীরগুলিকে ইবনুল হাদরামীর রক্ত পান করিয়েছি, যখন ওয়াকিদ যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। (আল ইসাবা-৩/৬২৮)

    নাখলার পর বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে তিনি অংশ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের খিলাফতকালের প্রথম দিকে তিনি ইনতিকাল করেন। তার কোন সন্তানাদি ছিল ‍না। হাদীসের গ্রন্থ সমূহে তার থেকে বর্ণিত দুই/একটি হাদীস দেখা যায়।

  • আমর ইবন সাঈদ ইবনুল আস (রা)

    আমর ইবন সাঈদ ইবনুল আস (রা)

    আমরের ডাক নাম আবু উকবা। পিতা সাঈদ ইবনুল আস। কুরাইশ বংশের উমাইয়া শাখার সন্তান। মা বনী মাখযুমের কন্যা। আমর হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের ফুফাতো ভাই। (উসুদুল গাবা-৪/১০৬)। (আল ইসাবা-২/৫৩৯)।

    সাঈদ ইবনুল আসের ৫ ছেলে- খালিদ, আবান, সাঈদ, আবদুল্লাহ, ও আমর। আগে পরে তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। যুবাইর ইবন বাককার বলেন: সাঈদ ইবনুল আসের ছেলে আবু উহায়হা সাঈদ ইবন সাঈদ তায়িফ অবরোধের সময় শাহাদাত বরণ করেন। আবদুল্লাহ ইবন সাঈদের পূর্ব নাম ছিল হাকাম। রাসূল সা: তা পরিবর্তন করে আবদুল্লাহ রাখেন। আমর ইবন ‍সাঈদ আজনাদাইনের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। খালিদ অত:পর আমর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবন ইসহাক বলেন, আমরের কোন সন্তানাদি ছিল না। সাঈদ ইবনুল আসের অন্য ছেলে আবান সব শেষে শেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। ভাইদের বিশেষত: খালিদ ও আমরের ইসলাম গ্রহণে আবান দারুন ক্ষুব্দ হন। খালিদ, আমর ও আবান তিনজনই কবি ছিলেন। আবার তার দুই ভাই খালিদ ও আমর ইসলাম গ্রহণ করার পর তিরষ্কার করে একটি কবিতা লিখেন। খালিদ ও আমর কবিতায় তার জবাবও দেন। আল ইসাবা, সীরাতু ইবন হিশাম, উসুদুল গাবা প্রভৃতি গ্রন্থে সেই কবিতার কিছু অংশ সংকলিত হয়েছে। আবান তার ভাইদের তিরষ্কার করে যে কবিতাটি রচনা করেন তার একটি পংক্তি এই রকম: ‘হায়! আমর ও খালিদ দ্বীনের (ধর্ম) ব্যাপারে যে কেমন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে তা যদি ‘জাবীরা’র মৃত ব্যক্তি দেখতো!

    তাদের পিতা সাঈদ ইবনুল আস ‘জাবীরা’ নামক স্থানে সমাহিত ছিল। এখানে সেই দিকেই ইংগিত করা হয়েছে। আমর কবিতায় জবাব দেন। তার একটি পংক্তি এমন: এখন ঐ মৃতদের কথা ছেড়ে দাও, যারা তাদের পথে চলে গেছেন। এখন সেই সত্যের দিকে এস যার সত্য হওয়াটা একেই সুস্পষ্ট।(আল ইসাবা-২/৫৩৯)। সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৬০)।

    খালিদ ইবন সাঈদের হাবশায় হিজরাতের দুই বছর পর হাবশাগামী দ্বিতীয় দলটির সাথে আমর ইবন সাঈদ স্ত্রী ফাতিমা বিনতু সাফওয়ান সহ হাবশায় হিজরাত করেন। ফাতিমা বিনতু সাফওয়ান হাবশায় ইনতিকাল করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/ ৩৬০)। আর আমর হাবশা থেকে মুসলিম কাফিলার সাথে জাহাজ যোগে খাইবার যুদ্ধের সময় মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় আসার পর মক্কা বিজয় সহ হুনাইন, তায়িফ, তাবুক, প্রভৃতি অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর সা: সাথে যোগ দেন।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: সাঈদের তিন ছেলে আবান, খালিদ ও আমরকে তিন অঞ্চলের শাসক নিয়োগ করেন। খালিদ ইয়ামন, আবান বাহরাইন এবং আমর মদীনার পশ্চিম অঞ্চল তথা তাবুক, খাইবার, ফিদাক ইত্যাদির শাসক ছিলেন। তারা সকলে রাসূলুল্লাহর সা: ইনতিকাল পর্যন্ত অতি দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: এর ওফাতের পর তারা মদীনায় চলে আসেন। হযরত আবু বকর (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর সকলকে তাদের পূর্ব পদে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন: শাসন কাজ পরিচালনার জন্য আপনাদের থেকে অধিকতর হকদার ব্যক্তি আমি আর কাউকে দেখি না। (আল ইসাবা-২/৫৩৯)।

    কিন্তু সাঈদ ইবনুল আসের ছেলেরা খলীফার এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে: আমরা রাসূল সা: এর পরে আর কারও আমিন বা শাসক হব না।

    হযরত আবু বকর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর সিরিয়ায় রোমানদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বিশিষ্ট সাহাবীদের একটি বৈঠকে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও মতামত গ্রহণ করা হয়। একে একে সবাই মত প্রকাশ করছেন, আবার অনেকে নীরব রয়েছেন। এক সময় হযরত উমার (রা) সকলকে উতসাহিত করার উদ্দেশ্যে বলেন: যদি আশু ফল লাভের সম্ভাবনা দেখা যেত অথবা সফর নিকটবর্তী হতো, শুধু তাহলেই কি আপনারা বেরুতেন? উমারের (রা) এ বক্তব্যে আমর ইবন সাঈদ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, আপনি মুনাফিকদের সম্পর্কে প্রয়োগকৃত দৃষ্টান্ত আমাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেন? আপনি নিজে চুপ করে বসে আছেন কেন? আপনিই প্রথম শুরু করুন না। এ পর্যায়ে উমারের সাথে তার বেশ কথা কাটাকাটি হয়। অত:পর খলীফা আবু বকর (রা) বলেন, আসলে উমারের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো আপনাদেরকে অনুপ্রাণিত ও উতসাহিত করা। সাথে সাথে আমরের ভাই খালিদ উঠে দাড়ান এবং খলীফার বক্তব্য সমর্থন করে এক ভাষণ দেন। এ ভাবে বিষয়টির মীমাংসা হয়। (হায়াতুস সাহাবা-১৪৪০)

    শাসনকর্তার পদ প্রত্যাখ্যান করে আমর একজন সাধারণ মুজাহিদ হিসাবে সিরিয়া অভিযানে যোগদেন। হিজরী ১৩ সনে আজনাদাইনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। মুসলিম বাহিনীর একটু দূর্বলতা দেখলেই তিনি চিতকার করে নানা ভাবে মনোবল দৃঢ় করার চেষ্ঠা করেন। একবার অত্যন্ত আবেগের সাথে বলেন, যুদ্ধের ময়দানে আমি আমার সাথীদের দূর্বলতা মোটেই দেখতে পারিনে। এখন আমি নিজেই ঢুকে পড়বো। এ কথা বলে তিনি শত্রু বাহিনীর মধ্যভাগের ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে চলে যান এবং অত্যন্ত দু:সাহসের সাথে লড়তে লড়তে শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধের শেষে তার লাশ কুড়িয়ে দেখা গেল অসংখ্য আঘাতে সারা দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। গুণে দেখা গেল মোট ত্রিশটি চিহ্ন। অবশ্য ইবন ইসহাক ও মূসা ইবন উকবার মতে আমর ‘মারজ আস সাফার’ যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। (আল ইসাবা-২/৫৩৯)।

  • আবু আহমাদ ইবন জাহাশ (রা)

    আবু আহমাদ ইবন জাহাশ (রা)

    আসল নাম আবদ মতান্তরে আবদুল্লাহ, ডাকনাম আবু আহমাদ। পিতা জাহশ ইবন রিয়াব এবং মাতা উমাইমা বিনতু আবদিল মুত্তালিব। একদিকে রাসূলুল্লাহ সা: এর ফুফাতো ভাই, অন্যদিকে রাসুল সা: এর স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশের আপন ভাই। (আনসাবুল আশরাফ-১/৮৮, আল ইসাবা-৪/৩)।

    মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা: ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বে আহমাদ তার অন্য দুই ভাই- আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় রাসূলুল্লাহ সা: হযরত আল আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে আশ্রয় নেওয়ার পূর্বেই তাদের ইসলাম গ্রহণের কাজটি সম্পন্ন হয়। বালাযুরী বলেছেন, তার অন্য দুই ভাই আবদুল্লাহ ও উবাদুল্লাহ হাবশায় হিজরাত করলেও তিনি হাবশায় হিজরাত করেননি। তিনি আরও বলেছেন, যে সব বর্ণনায় তার হাবশায় হিজরাতের কথা পাওয়া যায় তা সবই ভিত্তিহীন। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৯৯)।

    ইবন ইসহাক আবু আহমাদের পরিচয় ও মদীনায় হিজরাত সম্পর্কে বলেন: আবু সালামার পর সর্ব প্রথম যারা মদীনায় আসেন, আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি নিজ পরিবার এবং অন্য এক ভাই- আবু আহমাদকেও সংগে নিয়ে আসেন। এই আবু আহমাদ এক অন্ধ ব্যক্তি। তিনি মক্কার উঁচু নীচু ভূমিতে কারও সাহায্য ছাড়া ঘুরে বেড়াতেন। আবু সুফইয়ানের কন্যা ‘ফারয়া’ তার স্ত্রী। আর তার মা আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা উমাইমা।

    তারা ঘর বাড়ী ছেড়ে মদীনায় চলে এলে একদিন ‍উতবা ইবন রাবীয়া, আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিব ও আবু জাহল ইবন হিশাম তাদের পরিত্যক্ত বাড়ীর পাশ দিয়ে মক্কার উঁচু ভূমির দিকে যাচ্ছিল। উতবা খালি বাড়ীটির দিকে ইঙ্গিত করে কবি আবু দুওয়াদ আল ইয়াদীর একটি কবিতার শ্লোক আওড়িয়ে আফসুসের সুরে বলে: বনী জাহাশের বাড়িটি একেবারেই খালি হয়ে গেল। আবু জাহল তার জবাবে বললো: এতো আমাদের ভায়ের ছেলের কাজেরই পরিণাম। সে আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে, আমাদের সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে আমাদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।…। মদীনায় কুবার বনী আমর ইবন আওফের পল্লীতে আবু সালামা ইবন আবদিল আসাদ, আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ও আবু আহমাদ বসবাস করতেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৭০-৪৭২)।

     মদীনায় পৌঁছে প্রথমত: তিনি হযরত মুবাশশির ইবন আবদিল মুনজিরের অতিথি হন। মক্কায় একদল লোকের সার্বক্ষণিক কাজ ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানো এবং মুসলমানদের কষ্ট দেওয়া। এই দলটির প্রধান ছিল দুই ব্যক্তি: আবু সুফইয়ান ও আবু জাহল। আবু আহমাদ আগে ভাগে হিজরাত করে তাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় সরাসরি তাদের অত্যাচার থেকে বেঁচে যান। তবে আবু সুফইয়ান তাদের পরিত্যক্ত বাড়ীটি অন্যায়ভাবে আমর ইবন আলাকামার নিকট বিক্রি করে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৯৯)

    সম্ভবত আবু সুফইয়ানের মেয়ে ‘ফারয়া’ ছিল এই বাড়ীর পুত্রবধূ, সেই অধিকারে সে বাড়িটি বিক্রি করে। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৫০০)। হিজরী ৮ম সনে মক্কা বিজয়ের পর আবু আহমাদ তাদের বাড়ীর প্রসঙ্গটি রাসূল সা: এর নিকট উত্থাপন করেন। লোকেরা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে: আবু আহমাদ, আল্লাহর পথে যা তোমরা হারিয়েছ, এখন ‍তা আবার দাবী কর- রাসূল সা: পছন্দ করেননা। অন্য একটি বর্ণনা মতে আবু আহমাদের দাবীর পর হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত উসমানের (রা) মাধ্যমে তাকে কিছু বলে পাঠান। হযরত উসমান (রা) সে কথা তাকে কানে কানে বলেন। তারপর মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বাড়ী সম্পর্কে আর একটি কথাও তিনি উচ্চারণ করেননি। পরে তার সন্তানদের কাছে জানা গেছে হযরত রাসূলে কারীম সা: তাকে বাড়ীর দাবী ত্যাগ করতে বলেন এবং বিনিময়ে তাকে জান্নাতে একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দান করেন।

    তবে তিনি আবু সুফইয়ানের উদ্দেশ্যে একটি জ্বালাময়ী কবিতা রচনা করেন। তার কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপ: তোমরা আবু সুফইয়ানকে বলে দাও, সে যা করেছে তার পরিণাম লজ্জা ও অনুশোচনা। তুমি চাচতো ভাইদের বাড়ী বিক্রি করে নিজের ঋণ পরিশোধ করেছ।

    মানুষের রব আল্লাহর নামে আমি শক্ত কসম করেছি। যাও, নিয়ে যাও, যা, আমি সেই অর্থ তোমার গলায় কবুতরের গলার মালার মতো মালা বানিয়ে দিলাম, (যা আর কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না বা বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না)। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/ ৬৪৪)।

    রাসূল সা: আযাদকৃত দাস যায়িদ ইবন হারিসার সাথে হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশের বিবাহ বিচ্ছেদ হলে আবু আহমাদই তাকে রাসূল সা: এর সাথে বিয়ে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৬৪৪) হযরত আবু আহমাদ মদীনায় ইনতিকাল করেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/ ১৯৯)।

    তবে তার মৃত্যুর সময় সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ আছে। ইবনুল আসীর দৃঢ়ভাবে বলেছেন: তিনি বোন যয়নাব বিনতু জাহাশের পরে মারা গেছেন। অর্থাত হিজরী ২০ সনের পরে। কারণ হযরত যয়নাব মারা যান হি: ২০ সনে। ইবন ‍হাজার এ মত সমর্থন করেননি। তিনি বলেন, এমন বর্ণনাও তো আছে যে, আবু আহমাদের মৃত্যুর পর তার বোন যয়নাব কিছু খোশবু আনিয়ে তার গায়ে লাগিয়ে দেন। বুখারী ও মুসলিমে যয়নাব বিনতু উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন: আমি যয়নাব বিনতু জাহাশের এক ভায়ের মৃত্যুর সময় যয়নাবের ঘরে যাই। তিনি কিছু খোশবু আনিয়ে তার গায়ে লাগিয়ে দেন। ইবন হাজার বলেন, ‍এটা আবু আহমাদের মৃত্যুর সময়ের ঘটনা হবে। কারণ যয়নাবের অন্য দুই ভাই আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহর সা: জীবদ্দশায় উহুদে শহীদ হন এবং উবায়দুল্লাহ মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী অবস্থায় হাবশায় মৃত্যুবরণ করে। তার স্ত্রী উম্মু হাবীবাকে রাসূল সা: বিয়ে করেন। (আল ইসাবা-৪/৪)।

  • মারসাদ ইবন আবী মারসাদ আল গানাবী (রা)

    মারসাদ ইবন আবী মারসাদ আল গানাবী (রা)

    মারসাদের পিতার নাম আবু মারসাদ কান্নায ইবন হুসাইন। মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই পিতা পুত্র উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বদর যুদ্ধের পূর্বেই হিজরাত করে মদীনায় চলে যান। মারসাদ মক্কায় হামযা ইবন আবদিল মুত্তালিবের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন এবং মদীনায় হিজরাতের পর রাসূল সা: তাকে প্রখ্যাত আনসারী ‍সাহাবী উবাদা ইবন সামিতের ভাই আউস ইবন সামিতের সাথে মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। (তাবাকাত-৩/৪৮. আল ইসাবা-৩/৩৯৮)

    হযরত মারসাদ ও পিতা আবু মারসাদ কান্নায বদর যুদ্ধের বীরযোদ্ধা। এ যুদ্ধে মারসাদ ‘সাবাল’ নামক একটি ঘোড়ার পিঠে সাওয়ার হয়ে রাসূলুল্লাহর সা: পাশপাশি অত্যন্ত বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করেন। উহুদ যুদ্ধেও তিনি যোগদান করেন। (তাবাকাত-৩/৪৮, সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৬৬)।

    জাহিলী যুগে মক্কার ‘ইনাক’ নাম্নী এক পতিতার সাথে মারসাদের সম্পর্ক ছিল। ইসলামে ব্যভিচার নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি সেই পতিতার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী ও সাহসী, সে জন্য যে সকল মুসলমান মক্কায় কাফিরদের হাতে বন্দী অবস্থায় নির্যাতন ভোগ করতো রাসূল সা: তাদেরকে মক্কা থেকে গোপনে মদীনায় নিয়ে আসার দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করেন। এ উদ্দেশ্যে একবার তিনি মক্কায় যান। রাতটি ছিল চন্দ্রলোকিত। তিনি চুপিসারে মক্কার একটি গলি দিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় তার সেই পুরাতন প্রেয়সী ‘ইনাক’ তাকে দেখে ফেলে এবং ডাক দেয়। তিনি থেমে যান। সে অত্যন্ত মিষ্টি মধুর ভঙ্গিতে স্বাগতম জানায় এবং সেই রাতটি তার সাথে কাটাবার প্রলোভন দেয়। মারসাদ বলেন, ‘ইনাক, আল্লাহ এখন ব্যভিচার নিষিদ্ধ করেছেন। তার এমন নিরস উত্তরে ইনাক দারুণ চোট পায়। সে তখন প্রতিশোধ স্পৃহায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। মানুষকে মারসাদের আগমনের কথা জানিয়ে দেয়। আটজন লোক তাকে ধাওয়া করে। তিনি একটি নিরাপদ স্থানে লুকিয়ে পড়েন। শত্রুরা তাকে খুঁজে না পেয়ে ফিরে গেলে তিনি গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে সোজা মদীনার পথ ধরেন। মদীনায় পৌঁছে রাসুলুল্লাহর নিকট উপস্থিত হয়ে ‍আরজ করেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইনাকের সাথে আমার বিয়েটা দিয়ে দিন। রাসূল সা: কোন উত্তর না দিয়ে চুপ থাকলেন। এর পরই সূরা নূরের এ আয়াতটি নাযিল হয়:

    ‘ ব্যভিচারী পুরুষ কেবল ব্যাভচারী নারী অথবা মুশরিক নারীকে বিয়ে করবে এবং ব্যভিচারী পুরুষ অথবা মুশরিক পুরুষই বিয়ে করবে। বিশ্বাসীদের জন্য এগুলি হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। (সূরা নূর: ২)

    উদাল ও কা-রা গোত্রের কতিপয় লোক উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায় আসে। তারা রাসূলুল্লাহর সা: দরবারে হাজির হয়ে আরজ করে, আমাদের গোত্রের কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে, আপনি আমাদের সাথে এমন কিছু লোক পাঠান যারা তাদেরকে দ্বীন ও কুরআন শিক্ষা দিতে পারে। ইবন ইসহাকের বর্ণনা মতে, ‍নবী করীম সা: মারসাদ ইবন আবী মারসাদের (রা) নেতৃত্বে ছয় ব্যক্তিকে পাঠান। তবে বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে আসিম ইবন সাবিতের নেতৃত্বে রাসূল সা: দশ ব্যক্তিকে পাঠান। তাদের মধ্যে মারসাদও একজন। দলটি যখন বনু হুজাইলের জলাশয় ‘রাজী’ নামক স্থানে পৌঁছে তখন উদাল ও কা-রার লোকগুলি ষড়যন্ত্রমূলকভাবে চিতকার শুরু করে দেয়। বনু হুজাইলের লোকেরা কোষমুক্ত তরবারি হাতে ছুটে এসে দলটিকে ঘিরে ফেলে। সাহাবায়ে কিরাম ঘোড়ার ওপর ‍সাওয়ার ছিলেন। তারা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলেন। কিন্তু বনু হুজাইল বললো: আমরা তোমাদের হত্যা করতে চাইনে। তোমাদের বিনিময়ে মক্কাবাসীদের নিকট থেকে শুধু কিছু অর্থ আদায় করা আমাদের উদ্দেশ্যে। তোমরা নিজেরাই আমাদের কাছে চলে এস, আমরা অঙ্গিকার করছি।

    মারসাদ, খালিদ ও আসিম বললেন, আমরা মুশরিকদের অঙ্গিকারে বিশ্বাস করি না। এ কথা বলে তারা যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। অন্য দিকে তাদের অপর তিন সাথী খুবাইব, যায়িদ ও আবদুল্লাহ ইবন তারিক একটু বিনয়ী ভাব দেখিয়ে তাদের হাতে ধরা দেন। যখন শত্রু পক্ষ তাদের হাত পা বাঁধতে শুরু করে তখন আবদুল্লাহ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, এটা হলো তোমাদের প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। তারা আবদুল্লাহকে ‘জাহরান’ নাম স্থানে পাথর মেরে শহীদ করে। অত:পর তারা খুবাইব ও যায়িদকে নিয়ে মক্কায় উপস্থিত হয়। কুরাইশদের হাতে বনু হুজাইলের দুই ব্যক্তি বন্দী ছিল। তারা এদের দুজনের বিনিময়ে তাদের দুজনকে ছাড়িয়ে নেয়। উকবা ইবন হারিস ইবন আমির তার পিতা হারিসের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য খুবাইবকে গ্রহণ করে। হযরত খুবাইব (রা) বদর যুদ্ধে হারিসকে হত্যা করেন। অন্যদিকে সাফওয়ান ইবন উমাইয়া তার পিতা উমাইয়া ইবন খালাফের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে যায়িদকে হাতে নেয়। এ ভাবে কুরাইশদের প্রতিশোধ স্পৃহার শিকার হয়ে তারা দুজনই অত্যন্ত অসহায় ও নির্মম ভাবে মক্কায় শাহাদত বরণ করেন। ইতিহাসে এই ঘটনাকে ‘ওয়াকিতু ইউম আল রাজী’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইবন সাদ বলেন, ‘রাজী’ এর এই ঘটনাটি ঘটে রাসূল ‍সা: এর মদীনায় হিজরাতের ছত্রিশ মাসের মাথায় সফর মাসে। (তাবাকাত-৩/৪৮)।আসাহুস সীয়ার-১৬০), সীরাতু ইবন হিশাম-১৬৯-১৭৪)।

    হযরত মারসাদ (রা) এর যোগ্যতা ও মর্যাদার জন্য এই ঘটনাই যথেষ্ট যে, খোদ রাসূলে কারীম সা: তাকে দ্বীনের মুআল্লিম বা শিক্ষক হিসেবে নির্বাচন করেছেন। যেহেতু হযরত রাসূলে কারীমের সা: জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন সেহেতু তার ইলমী যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ হয়নি। তবুও হাদীসের গ্রন্থ সমূহ তার থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে একেবারে শূন্য নয়। আহমাদ ইবন সিনান আল কাত্তান তার মুসনাদে ইমাম বাগাবী ও হাকেম তাদের মুসতাদরিকে এবং তাবারানী তার ‘আওসাতে’ মারসাদ থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল ইসাবা-৩/৩৯৮)।

  • মিসতাহ ইবন উসাসা (রা)

    মিসতাহ ইবন উসাসা (রা)

    প্রকৃত নাম আউফ, ডাক নাম আবু আব্বাদ, এবং লকব বা উপাধি মিসতাহ। পিতা উসাসা ইবন আব্বাদ এবং মা হযরত আবু বকরের খালা মতান্তরে খালাত বোন। মাতা পিতা দুজনেই ইসলামের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-৩/৪০৮)

    মিসতাহ ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল সা: তার ও যায়েদ ইবন মুযায়্যিনের মধ্যে ভাতৃ সম্পর্ক স্থাপন করে দেন। তার হিজরাতের সময়কাল সম্পর্কে নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা যায় না। তবে তিনি বদর যুদ্ধের পূর্বেই হিজরাত করে মদীনায় চলে যান এবং বদর যুদ্ধে তার যোগদানের কথা ইতিহাস ও সীরাত গ্রন্থ সমূহে পাওয়া যায়। বনী মুসতালিক যুদ্ধে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। এ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে, ইফক, বা উম্মুল মুমিনীন আয়িশার (রা) প্রতি অপবাদের ঘটনাটি ঘটে। মুনাফিকরা যখন অপবাদটি ছড়িয়ে দেয় তখন তাতে কিছু নিষ্ঠাবান মুমিন সাহাবীও জড়িয়ে পড়েন। মিসতাহ এই দলেরই একজন।

    ‘ওয়াকিয়া ই ইফক’ নামে প্রসিদ্ধ ঘটনাটির প্রতি পবিত্র কুরআনের সূরা নূর এর ১১ নং আয়াত সহ কয়েকটি আয়াতে ইংগিত করা হয়েছে। সংক্ষেপে ঘটনাটি এই: উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) বনু মুসতালিকের যুদ্ধে (৬ হিজরী) রাসূলুল্লাহর সা: সংগে ছিলেন। মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পথে তারা এক স্থানে শিবির স্থাপন করেন। আয়িশা (রা) শিবির হতে কিছু দূরে বাহ্যক্রিয়া সম্পাদনের জন্য যান। তখন তার গলার হারটি সেখানে পড়ে গেলে তিনি তা খুঁজতে থাকেন। এদিকে তার হাওদা পর্দায় ঘেরা থাকায় তিনি ভেতরে আছেন মনে করে কাফিলা সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে যায়। পশ্চাতবর্তী রক্ষী সাফওয়ান (রা) তাকে দেখতে পেয়ে নিজের উটের পিঠে উঠিয়ে নেন এবং উটের রশি ধরে পায়ে হেটে কাফিলার সাথে মিলিত হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিক সরদার ‍আবদুল্লাহ ইবন উবাই নানা অপবাদ ছড়াতে থাকে। সূরা নূরের আয়াতগুলিতে আয়িশার (রা) পবিত্রতার ঘোষণা করা হয় এবং অপবাদ রটনাকারীদের কঠোর শাস্তির কথা ব্যক্ত করা হয়।

    যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে মিসতা ঘটনাটি তার মায়ের কাছে বর্ণনা করেন। মিসতাহর মা আবার একদিন রাতে কোন কাজে আয়িশার (রা) বাড়ীতে যান। আয়িশা তখন পিতৃগৃহে মায়ের কাছে। ততকালীন আবরে বাড়ীতে পেশাব পায়খানার স্থায়ী কোন জায়গা নির্দিষ্ট থাকতো না। মেয়েরা সাধারণত: রাতে বাড়ীর বাইরে মরু ভূমিতে গিয়ে বাহ্যক্রিয়া সম্পন্ন করতো। আয়িশা (রা) মিসতার মাকে সংগে করে বাড়ীর বাইরে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করতে যান। পথে মিসতাহর মা নিজের আঁচলে জড়িয়ে হোঁচট খান। হোচট খাওয়ার পর আরবের প্রথা অনুযায়ী তার মুখ থেকে বেরিয়ে যায় ‘মিসতাহর ধ্বংস হোক।’ এতে আয়িশা আপত্তি জানিয়ে বলেন, একজন মুহাজির মুসলমান, যিনি বদরে যুদ্ধ করেছেন তাকে এভাবে বদদুআ করছেন? মিসতাহর মা তখন বললেন: আবু বকরের মেয়ে, তুমি কি কিছু শোননি? তখন মিসতার মা তাকে পুরো ঘটনা বলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/২৯৯-৩০০) (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৮৭)।

    দরিদ্র মিসতাহ ছিলেন হযরত আবু বকরের (রা) খালাত ভাই। আবু বকর (রা) সব সময় তার সাথে ভালো ব্যবহার ও আর্থিক সাহায্য করতেন। যখন তিনি ‘ইফক’ এর ঘটনার সাথে মিসতাহর জড়িত থাকার কথা জানতে পারলেন এবং কুরআন তাদের প্রচারণাকে মিথ্যা অপবাদ হিসেবে ঘোষণা করলো তখন আবু বকর মিসতাহকে সাহায্য দান বন্ধ করে দিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, এখন থেকে আমি মিসতাহর জন্য এক কপর্দকও ব্যয় করবো না। তখন সূরা নূরের নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়: ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তারা আত্মীয় ও স্বজন অভাবগ্রস্থকে এবং আল্লাহর রাস্তায় যারা গৃহ ত্যাগ করেছে তাদেরকে কিছুই দেবে না। তারা যেন তাদেরকে ক্ষমা করে এবং তাদের দোষ ত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাওনা যে, আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সূরা নূর-২২)।

    আয়াত নাযিল হওয়ার পর হযরত আবু বকর (রা) আবার আগের মত সাহায্য দিতে শুরু করেন। বুখারী ও মুসলিমে আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়। (আল ইসাবা-৩/৪০৮)।

    তবে যেহেতু একজন সতী সাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপের ঘটনায় তিনি জড়িত হয়ে পড়েছিলেন এবং কুরআনও তাদের জন্য নিম্নোক্ত শাস্তির বিধান ঘোষণা করেছিল: যারা সতী সাধ্বী রমণীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি কশাঘাত করবে।’ (সূরা নূর-৪) এ কারণে অন্যদের সাথে তাকেও এ শাস্তি দান করা হয়। মিসতার সাথে আর যে কজন নিষ্ঠাবান বিখ্যাত ‍সাহাবী শাস্তি ভোগ করেন তারা হলেন- হযরত হাসসান বিন সাবিত ও উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশের বোন হামনা বিনতু জাহাশ (রা)। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩০২)। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯০)।

    আমাদের স্মরণ রাখতেহবে, হযরত মিসতাহর (রা) মত যে সকল নিষ্ঠাবান সাহাবী ‘ইফক’ এর ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, তারা নিতান্তই মুনাফিকদের প্রচারণার শিকার হয়েছিলেন। অন্যথায় হযরত মিসতাহর (রা) মত ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে এতে জড়িয়ে পড়তে পারেন না। তাছাড়া তারা তাওবাহ করেছেন এবং শাস্তিও মাথা পেতে নিয়েছেন। আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা), আবু বকর (রা), তথা গোটা মুসলিম উম্মাহ তাদের ক্ষমা করেছেন। সুতরাং এখন তাদের প্রতি কোন রকম বিদ্বেষ পোষণ করা ঈমানের পরিপন্থী কাজ হবে। হযরত মিসতাহর (রা) সবচেয়ে বড় পরিচয় হযরত আয়িশার (রা) মন্তব্যে ফুটে উঠেছে। তিনি প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী, গৃহত্যাগী মুহাজির এবং বদর যুদ্ধের একজন মুজাহিদ। আর এদের প্রশংসায় পবিত্র কুরআনের কত আয়াতই না নাযিল হয়েছে।

    হযরত মিসতাহ কখন ইনতিকাল করেন সে বিষয়ে মতভেদ আছে। একটি মতে হিজরী ৩৪ সনে হযরত উসমানের খিলাফতকালে তিনি ইনতিকাল করেন। অপর একটি মতে হিজরী ৩৭ সনে সিফফীনে হযরত আলী (রা) এর পক্ষে যুদ্ধ করার পর সেই বছর মারা যান। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। (উসুদুল গাবা-৪/ ৩৫৫, আল ইসাবা-৩/৪০৮, তাবাকাত-৩/৫২)।

  • আমর ইবন উমাইয়া (রা)

    আমর ইবন উমাইয়া (রা)

    নাম আমর কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু উমাইয়া। পিতার নাম উমাইয়া। বনী কিনানা গোত্রের সন্তান। ইবন হিশাম তাকে রাসূলুল্লাহর সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির কাছাকাছি সময়ের জাহিলী আরবের একজন শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান ব্যক্তিরূপে উল্লেখ করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনাও বর্ণনা করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/২০৪,২০৭)। তিনি বদর ও উহুদ যুদ্ধে মক্কার পৌত্তলিকদের পক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন। উহুদের পরই তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরাত করেন।

    ইসলাম গ্রহণের পর সর্ব প্রথম বীরে মাউনা এর ঘটনায় অংশ গ্রহণ করেন। ঘটনাটি ছিল এই রকম: উহুদ যুদ্ধের পর চতুর্থ মাসে নাজদের বনী কিলাব গোত্রের সরদার আবু বারা আমের ইবন মালেক ইবন জাফর মুলায়িবুল আসিন্নাহ মদীনায় হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমতে হাজির হয়। রাসূল সা: তার নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন। সে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্তি না করে বললো: আপনি যদি ‍নাজদবাসী কিলাব গোত্রের নিকট আপনার কিছু সংগী পাঠাতেন তাহলে তারা হয়তো ইসলাম গ্রহণ করতো। রাসূল সা: বললেন: নাজদীদের ব্যাপারে আমার শংকা হয়। কিন্তু আবু বারা প্রেরিত দলটির নিরাপত্তা পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করায় রাসূল সা: মুনজির ইবন্ আমেরের নেতৃত্বে চল্লিশ মতান্তরে সত্তর জনের একটি দল পাঠিয়ে দেন। তারা ‘বীরেমাউনা’ নামক স্থানে পৌঁছে তাবু ফেলে অবস্থান করতে থাকেন এবং ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত রাসূল সা: এর পত্রটি হারাম ইবন মালজানের মাধ্যমে আমের ইবন তুফাইলের নিকট পৌঁছে দেন।

    আমের ইবন তুফাইল দূত হারামকে হত্যা করে এবং আসিয়্যা, রা’ল, জাকওয়ান প্রভৃতি গোত্রে মুসলিম দলটির বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য দ্রুত বেরিয়ে পড়ার ঘোষণা দেয়। তারা সমবেত হয়। এদিকে ‍হারামের ফিরতে দেরী দেখে মুসলমানরা তার খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। কিছু দূর যেতেই তারা রা’ল,জাকওয়ান প্রভৃতি গোত্রের মুখোমুখি হয়। তারা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম দলটির ওপর আক্রমণ চালিয়ে সকলকে হত্যা করে। একমাত্র আমর ইবন উমাইয়া প্রাণে রক্ষা পান। তিনি শত্রু বাহিনীর হাতে বন্দী হন। তাকে আমের ইবন তুফাইলের সামনে আনা হলো। যখন সে জানতে পেল আমর ইবন উমাইয়া মুদার গোত্রের লোক তখন তাকে এই কথা বলে ছেড়ে দিল যে, আমার মার একটি দাস মুক্ত করার মান্নত ছিল। তবে অপমানের চিহ্ন সরূপ তার মাথার সামনের দিকের চুল কেটে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/১৮৪,১৮৫)।

    এই বীরে মাউনার ঘটনায় প্রখ্যাত সাহাবী আমের ইবন ফুহাইরাও শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আমর ইবন উমাইয়াকে বন্দী করে যখন আমের ইবন তুফাইলের সামনে আনা হলো তখন সে আমের ইবন ফুহাইরার লাশের দিকে ইঙ্গিত করে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল: এই লোকটি কে? আমর ইবন উমাইয়া বললেন: আমের ইবন ফুহাইরা। তখন আমের ইবন তুফাইল বলেছিল: আমি দেখলাম, সে নিহত হওয়ার পর তার লাশ শূন্যে আকাশের দিকে বহুদূর উঠে গেল, তারপর আবার তা নেমে এল। (হায়াতুসসাহাবা-৩/৫৯৫)

    আমর ইবন উমাইয়া বীরে মাউনার শত্রুদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে মদীনার দিকে চলার পথে যখন ‘কারকারা’ নামক স্থানে পৌঁছেন তখন বিপরীত দিক থেকে আগত দুজন লোকের সাথে তার দেখা হয়। তিনি যে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন লোক দুটিও সেখানে এসে বসলো। তাদের সাথে আলাপ পরিচয়ে আমর ইবন উমাইয়া যখন জানতে পেলেন তারা বনী আমের গোত্রের লোক তখন তিনি চুপ থাকলেন। তারা ঘুমিয়ে পড়লে আমর তাদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে দুজনকেই হত্যা করেন। তিনি মনে করেছিলেন, বনী আমের ‍রাসূল সা: এর সাহাবীদের সাথে যে আচরণ করেছে, এটা তার একটা বদলা হবে। আমর মদীনায় পৌঁছে রাসূল সা: এর নিকট ঘটনাটি বর্ণনা করলে তিনি বলেছিলেন: আমর, তুমি এমনটি দুটি হত্যাকান্ড ঘটিয়েছ যে, আমাকে অবশ্যই তাদের দিয়াত বা রক্তমূল্য আদায় করতে হবে। উল্লেখ্য যে, এ ঘটনার পূর্বেই বনী আমেরের সাথে রাসূল সা: এর চুক্তি হয়েছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/১৮৬) অত:পর রাসূল সা: তাদের দিয়াত আদায় করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৫৬৪)।

    হিজরী ৬ষ্ঠ সনে হযরত রাসূলে কারীম সা: আমর ইবন উমাইয়্যাকে ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত একটি পত্র সহকারে হাবশা যাওয়ার নির্দেশ দেন। এই পত্রে রাসূল সা: নাজ্জাশীকে হাবশায় অবস্থিত মুহাজিরদের আতিথেয়তার সুপারিশ করেন্ এবং হযরত উম্মু হাবীবা বিনতু আবী ‍সুফিয়ান, যিনি তখনও পর্যন্ত হাবশার মুহাজিরদের সাথে সেখানে অবস্থান করছিলেন- তার সাথে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠান। উল্লেখ্য যে, উম্মু ‍হাবীবা ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবন ‍জাহাশের স্ত্রী। প্রথম ভাগে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করে স্বামীর সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। সেখানে স্বামী উবাইদুল্লাহ ইসলাম ত্যাগ করে খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করলে তাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। এই দাওয়াতপত্র পেয়ে নাজ্জাশী হযরত জাফর ইবন আবী তালিবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং হযরত রাসূলুল্লাহর সা: পত্রের জবাবে একটি পত্র লিখেন। এই পত্রে তার ইসলাম গ্রহণ, রাসূল সা:এর প্রতি সালাম, মুহাজিরদের প্রতি আতিথেয়তা ইত্যাদি বিষয়ের উল্লেখ ছিল। রাসূল সা: পত্র অনুসারে তার পক্ষ থেকে নাজ্জাশী নিজেই উম্মু হাবীবাকে বিয়ের পয়গাম দেন। তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহর উকিন হন এবং বিয়ের পর রাসূলুল্লাহর সা: পক্ষ থেকে চারশো দীনার মোহর আদায় করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/২২৪, ৩২৪)। (হায়াতুস সাহাবা-১/ ১৫৮, ৩/৫৯৬-৯৭)।

    এই আমর ইবন উমাইয়া যখন রাসূল সা: এর দূত হিসেবে নাজ্জাশীর নিকট পৌঁছেন তখন সেখানে তৎকালীন ইসলামের চরম দুশমন আমর ইবনুল আস ও উপস্থিত ছিল। সে আমর ইবন উমাইয়াকে তার হাতে অর্পণের জন্য নাজ্জাশীর নিকট আবদার জানায় যাতে সে তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিতে পারে এবং কুরাইশদের নিকট নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারে। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/২৭৬-৭৭)।

    হাবশায় যে সকল মুহাজির অবস্থান করছিলেন, দুটো জাহাজে করে আমর ইবন উমাইয়া তাদেরকে নিয়ে খাইবার যুদ্ধের সময় মদীনায় পৌঁছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৫৯)।

    হাবশার এই দৌত্যগিরি শেষে মদীনায় ফেরার পর আবু সুফইয়ানের এক এক দুষ্কর্মের প্রতিশোধ নেওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করা হয় তার ওপর। ঘটনাটি এই : আবু সুফইয়ান রাসূল সা: কে হত্যার জন্য কিছু লোককে উতসাহিত করে। এক ব্যক্তি এই দায়িত্ব্ কাঁধে নেয় এবং আবু সুফইয়ান তাকে প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করে। সে মদীনায় আসে এবং সরাসরি মসজিদে রাসূল সা: এর নিকট পৌঁছে। রাসূল সা: তার উদ্দেশ্য জেনে ফেলেন। তিনি লোকটিকে দেখিয়েবলেন, সে কোন ধান্ধায় এসেছে। লোকটি রাসূল সা: এর ওপর প্রায় আক্রমণ করতে বসেছিল, ঠিক সে সময় হঠাত হযরত উসাইদ ইবন হুদাইর (রা) তাকে পাজা করে ধরে ফেলেন। লোকটির কাপড়ের নীচ থেকে একটি খঞ্জর বেরিয়ে পড়ে। অপরাধ প্রকাশ্য ছিল, কোন সাক্ষীর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু রাহমাতুল লিল আলামীন তাকে মাফ করে দেন। সে আবু সুফইয়ানের পুরো ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেয়।

    যেহেতু এই ঘটনার মূল নায়ক আবু সুফইয়ান এবং তারই জন্য মক্কার কুরাইশ ও মদীনাবাসীদের মধ্যে সর্বক্ষণ যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান থাকে এ কারণে হযরত রাসূলে কারীম সা: আমর ইবন উমাইয়া ও সালামা ইবন আসলাম মতান্তরে জাব্বার ইবন সাখার আল আনসারীকে এক গোপন অভিযানে মক্কায় পাঠান। তিনি তাদেরকে নির্দেশ দেন, যদি সুযোগ হয় তাহলে এই অশান্তির মূলনায়ককে চির দিনের জন্য দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে।

    আমর ও সালামা গোপনে মক্কায় পৌঁছলেন, কিন্তু মুআবিয়া কাবার তাওয়াফ করা অবস্থায় তাদেরকে দেখে ফেলেন। কুরাইশদের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল। তারা বলাবলি করলো, তাদের আগমন নি:সন্দেহে বিনা কারণে নয়। নিশ্চয় তারা কিছু একটা অঘটন ঘটাবে। এদিকে আমর ও সালামা যখন দেখলেন, তাদের আগমনের বিষয়টি কুরাইশদের মধ্য জানাজানি হয়ে গেছে, তখন তারা মক্কার বাইরে চলে যান। পথে উবাইদুল্লাহ ইবন মালিক এবং বনী হুজাইলের এক ব্যক্তির সাক্ষাত পান। আমর উবাইদুল্লাহকে এবং সালামা দ্বিতীয় লোকটিকে হত্যা করেন।

    এদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে মক্কার চারদিকে গোয়েন্দা ছড়িয়ে দেয়। আমরও সালামা এমন দুই গোয়েন্দার দেখা পেলেন। তারা গোয়েন্দা দুজনের একজনকে হত্যা করেন এবং অন্যজনকে বন্দী করে মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা: নিকট নিয়ে আসেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/ ৬৩৩-৩৪)।

    আহমাদ ও ‍তাবারানীর এক বর্ণনায় জানা যায়, খুবাইব বিন আদী মক্কার কাফিরদের হাতে শহীদ হন এবং তার লাশ একটি কাঠের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা: খুবাইবের লাশ আনার জন্য গোপন মিশন মক্কায় পাঠান। তিনি গোপনে মক্কায় পৌঁছে কাঠ বেয়ে উঠে রশি কেটে দেন এবং খুবাইবের লাশ মাটিতে পড়ে যায়। এমন সময় কুরাইশরা টের পেয়ে তাকে ধাওয়া করে এবং তিনি লাশ ফেলে পালিয়ে যান। অবশ্য অন্য বর্ণনায় জানা যায়, মিকদাদ ইবন আসওয়াদ ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম এ দায়িত্বে ‍নিয়োজিত হয়েছিলেন এবং তারাই এ অভিযান চালান। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৯৬,৯৭)।

    হযরত রাসূলে কারীমের সা: ইনতিকালের পর হযরত আমর ইবন উমাইয়া দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে তার পরবর্তী জীবনের বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত আমীর মুআবিয়ার (রা) শাসনকালে হিজরী ৬০ সনের পূর্বে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। হাদীসের গ্রন্থ সমূহে আমর ইবন উমাইয়া থেকে বর্ণিত বিশটি হাদীস পাওয়া যায়। আবদুল্লাহ, জাফর, ফাদল, যাবারকান,শাবী, আবু সালামা ইবন আবদির রহমান,আবু কিলাবা, জুরমী এবং আবুল মুহাজির তার উল্লেখযোগ্য ছাত্র।

    তিনি ছিলেন ততকালীন আরবের অন্যতম বীর ও সাহসী ব্যক্তি। এ কারণে রাসূল সা: দু:সাহসিক অভিযানগুলির দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করতেন। মৃত্যুকালে জাফর, আবদুল্লাহ ও ফাদল নামে তিন ছেলে রেখে যান।

  • আবান ইবন সাঈদ ইবনুল আস (রা)

    আবান ইবন সাঈদ ইবনুল আস (রা)

    হযরত আবানের পিতার নাম আবু উহায়হা সাঈদ ইবনুল আস এবং মাতার নাম হিন্দা বিনতু মুগীরা। তার বংশের উপরের দিকের পঞ্চম পুরুষ আবদ মান্নাফে গিয়ে রাসূল সা: এর নসবের সাথে তার নসব মিলিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা-১/৩৫)

    তার পিতা সাঈদ ছিল কুরাইশদের এক মর্যাদাবান ব্যক্তি। সে হিজরী ২য় অথবা ৩য় সনে কাফির অবস্থায় তায়িফে মারা যায় এবং তাকে সেখানেই দাফন করা হয়। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৪২.৩৬৮)।

    তার কয়েকজন সুযোগ্য পুত্র ছিলেন। ইসলামের সূচনা পর্বেই তাদের মধ্যে খালিদ ও আমর ইসলাম গ্রহণ করে হাবশায় হিজরাত করেন। (আল ইসাবা-১/১৩)।

    আবান তার অন্য দুই ভাই উবাইদা ও আল আসের সাথে পৌত্তলিক থেকে গেলেন। তার দুই ভাই খালিদ ও আমরের ইসলাম গ্রহণে দারুণ ব্যাথা পান। সে ব্যাথার প্রকাশ ঘটেছে তার রচিত একটি কাসীদায়। তার একটি শ্লোক নিম্নরূপ:

    হায়! দ্বীনের ক্ষেত্রে আমর ও খালিদ যে মিথ্যারোপ করেছে, জারীবার মৃত লোকগুলি যদি তা দেখতো! (আল ইসাবা-১/১৩) (উসুদুল গাবা-১/৩৫)।

    আবান তার অন্য দুই ভাইয়ের সাথে মিলে রাসূল সা: ও মুসলমানদের বিরোধিতা করতে থাকেন। বদর যুদ্ধে মুসলমানদের সাথে লড়বার জন্য উবাইদা ও আল আসের সাথে মক্কা থেকে বের হলেন। উবাইদা ও আল আস মুসলমানদের হাতে শোচনীয় ভাবে নিহত হলো। আবান কোন রকমে প্রাণ নিয়ে মক্কায় ফিরে গেলেন।

    আবানের ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কিত একটি ঘটনার কথা ইবন হিশাম উল্লেখ করেছেন: ইসলাম পূর্ব যুগে রাসূল সা: তার কয়েকজন কন্যাকে মক্কার কুরাইশ যুবকদের সাথে বিয়ে দেন। কুরাইশদের সাথে রাসূল সা: সংঘাত শুরু হলে কুরাইশ নেতারা রাসূল সা: এর জামাতাদের নিকট তার কন্যাদের তালাক দেওয়ার আবেদন জানায়। রাসূল সা: এর কন্যা রুকাইয়া ছিলেন উতবা ইবন আবী লাহাবের স্ত্রী। কুরাইশরা উতবাকে বললো: তুমি মুহাম্মাদের কন্যাকে তালাক দাও। সে এই শর্তে রাজী হলো যে, যদি তারা আবান ইবন সাঈদের মেয়ে অথবা সাঈদ ইবন আসের মেয়ের সাথে তাকে বিয়ে দিতে পারে তাহলে সে রুকাইয়াকে তালাক দেবে। তারা উতবার দাবী মেনে নিয়ে সাঈদ ইবন আসের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে রুকাইয়াকে তার নিকট থেকে ছাড়িয়ে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-৬২৫)।

    হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে হযরত রাসূলে কারীম সা: তার পয়গাম সহ হযরত উসমানকে (রা) মক্কার কুরাইশদের নিকট পাঠালেন। উসমান (রা) ‘বালদাহ’ উপত্যাকা দিয়ে মক্কার দিকে যাচ্ছেন। কুরাইশরা তাকে জিজ্ঞেস করলো: কোথায় যাও? উসমান তাদেরকে সেই কথাই বললেন যা তাকে রাসূল সা: বলে দিয়েছিলেন। এমন সময় আবান ইবন সাঈদ কুরাইশদের মধ্য থেকে এগিয়ে এসে উসমানকে স্বাগতম জানালেন। উসমানের সাথে তার আগে থেকেই ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। আবান নিজের ঘোড়াটিকে প্রস্তুত করে তার পিঠে উসমানকে উঠালেন এবং তার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিলেন। অত:পর আবান উসমানকে মক্কায় নিয়ে আসেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৫৬)।

    উসমান আবানের বাড়ীতে আসার পর আবান তাকে বলেন: আপনার পোশাকের এ অবস্থা কেন? উসমানের জামা ছিল হাঁটু ও গোঁড়ালির মাঝামাঝি পর্যন্ত। আবান আরও বলেন: আপনার কাওমের লোকদের মত জামা লম্বা করেন না কেন? উসমান বললেন: আমাদের নবী এভাবে জামা পরেন। আবান বলেন: আপনি কাবা ‍তাওয়াফ করুন। উসমান বললেন: আমাদের নবী কোন কাজ না করা পর্যন্ত আমরা তা করতে পারি না। আমরা শুধু তার পদাংক অনুসরণ করে থাকি। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩৫৮-৫৯) আল ইসতীয়াব-৩৫, সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩১৫)।

    আবান যদিও দীর্ঘকাল যাবত ইসলাম ও ইসলামের নবীর প্রতি বিদ্বেষী ছিলেন, তবুও এ সময় সত্যের সন্ধান থেকে মোটেও বিরত থাকেননি। এ সময় তিনি বিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিকট রাসূল সা: এর নবুওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তখনকার দিনে শাম বা সিরিয়া ছিল জ্ঞানী-গুণী ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কেন্দ্র। ব্যবসার কাজে আবানের সেখানে যাতায়াত ছিল। একবার তিনি সেখানকার এক খৃস্টান ‘রাহিব’কে কথা প্রসঙ্গে বললেন, আমি হিজাযের কুরাইশ গোত্রের সন্তান। এই গোত্রের এক ব্যক্তি নিজেকে আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তি বলে দাবী করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ আমাকেও ঈসা ও মূসার মত নবী করে পাঠিয়েছেন। রাহিব লোকটির নাম জিজ্ঞেস করলেন। আবান বললেন: লোকটির নাম মুহাম্মাদ। রাহিব আসমানী কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী একজন নবীর আত্মপ্রকাশের বয়স, বংশ ইত্যাদি ব্যাখ্যা করলেন। তার বক্তব্য শুনে আবান বললেন: এগুলির সবই তো সেই লোকটির মধ্যে বিদ্যমান। রাহিব তখন বললেন: আল্লাহর কসম, তাহলে সেই ব্যক্তি সমগ্র আরবের ওপর আধিপত্য বিস্তারের পর সারা বিশ্বে বিস্তার লাভ করবেন। তুমি যখন ফিরে যাবে, আল্লাহর এই নেক বান্দার নিকট আমার সালাম পৌঁছে দেবে। শামের এই রাহিব বা পাদ্রীর নাম ‘ইয়াক্কা’। এবার যখন আবান শাম থেকে ফিরলেন তখন তার পূর্বের রূপ আর নেই। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতার শক্তি তার শেষ হয়ে গেছে। (উসুদুল গাবা-১/৩৫, আল ইসাবা-১/১৩)।

    পিতৃ পুরুষের ধর্মের কথা চিন্তা করে এবং সমবয়সীদের নিন্দা ও বিদ্রুপের কথা ভেবে আবান কিছুদিন সম্পূর্ণ চুপ থাকলেন। কিন্তু সত্যের প্রতি যে আবেগ তার মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, তা তিনি দীর্ঘদিন দমন করে রাখতে সক্ষম হলেন না। এদিকে তার ভাই আমর ও খালিদ হাবশা থেকে ফিরে আবানের সাথে যোগাযোগ করতে থাকেন। অত:পর তিনি খাইবার যুদ্ধের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় হিজরাত করেন। তারা তিন ভাই একত্রে রাসূল সা: এর সাথে খাইবার অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-১/১৩)।

    অন্য একটি বর্ণনা মতে আবান মদীনায় পৌঁছার পর হযরত রাসূলে কারীম সা: একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর আমীর বানিয়ে তাকে নাজদের দিকে পাঠিয়ে দেন। এ অভিযানে সফল হয়ে যখন তিনি মদীনায় ফিরে আসেন তখন খাইবার বিজয় শেয় হয়ে গেছে। ঠিক সেই সময় হাবশার অন্যান্য মুহাজিরদের সংগে করে হযরত আবু হুরাইরা মদীনায় আসেন। তারা দুজন এক সাথে রাসূল সা: এর নিকট যান। রাসূল সা: খাইবারে গণীমতের মাল থেকে কিছু অংশ তাদেরকে দেন। নাজদ অভিযান ছাড়াও আরও কিছু ছোট ছোট অভিযানে ইমারাত বা নেতৃত্ব তিনি রাসূলুল্লাহর সা: নিকট থেকে লাভ করেন।

    হযরত আবান হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে তায়িফ অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। হযরত আবু সিদ্দীক (রা) তায়িফে আবানের পিতার কবরটি দেখে বলে ওঠেন: এই কবরের অধিবাসীর প্রতি আল্লাহর লানাত বা অভিসম্পাত। সে ছিল আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণকারী। আবান ও তার ভাই আমর সাথে সাথে আবু বকরের কথার প্রতিবাদ করে তার পিতা আবু কুহাফার কিছু নিন্দা করেন। তখন রাসূল সা: বললেন: তোমরা মৃতদের গালি দিওনা। মৃতদের গালি দিলে জীবিতদের কষ্ট দেওয়া হয়। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৪২, ৩৬৮)

    হযরত রাসূলে কারীম সা: আবানকে হযরত আলা ইবনুল হাদরামীর স্থলে বাহরাইনের শাসক নিয়োগ করেন। রাসূল সা: এর ইনতিকাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। রাসূল সা: এর ওফাতের খবর শুনে তিনি মদীনায় ফিরে আসেন। (ইসতীয়াব-১/৩৫)।

    হযরত আবান রাসূল সা: এর (সাকাতিব বা লেখকের দায়িত্বও পালন করেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৫৩২)।

    রাসূল সা: ইনতিকালের পর হযরত আবু বকর (রা) খলীফা নির্বাচিত হলেন। তার হাতে গণ বাইয়াত শেষ হওয়ার পরও যে কজন কুরাইশ ব্যক্তি কিছুদিন যাবত বাইয়াত থেকে বিরত থাকেন, আবান তাদের একজন। বনী হাশেমের লোকেরা বাইয়াত গ্রহণ করলে তার আপত্তি দূর হয় এবং তিনি বাইয়াত করেন।

    খলীফা হযরত আবু বকর (রা) রাসূল সা: এর নিয়োগকৃত কোন শাসক বা কর্মচারীকে অপসারণ করেননি। আবানও ছিলেন রাসূল সা: কর্তৃক নিযুক্ত একজন শাসক। আবানকে তার দায়িত্বে ফিরে যাওয়ার জন্য আবু বকর (রা) অনুরোধ করেন। কিন্তু আবান খলীফার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। কোন কোন বর্ণনায় জানা যায়, খলীফার বার বার অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ইয়ামানের শাসনকর্তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

    ইবন সাদ বর্ণনা করেন: আবান যখন খলীফার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন তখন হযরত উমার (রা) একদিন আবানকে বললেন: ইমাম বা নেতার অনুমতি ছাড়া এভাবে কর্মস্থল ত্যাগ করা তো তার উচিত হয়নি। এখন আবার তার নির্দেশে সেখানে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আবান বললেন: আল্লাহর কসম! রাসূল সা: এর পরে আমি আর কারও জন্য কাজ করবো না। যদি করতাম তাহলে আবু বকরের মর্যাদা, তার ইসলামে অগ্রগামিতা ইত্যাদি কারণে তার ‘আমেল’ বা কর্মচারী হতাম। অগত্যা আবু বকর (রা) বাহরাইনে আর কাকে পাঠানো যায় সে বিষয়ে সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। উসমান সা: বসলেন: যেহেতু তার পূর্বে আলা ইবনুল হাদরামী সেখানে ছিলেন, তাই তাকেই সেখানো পাঠানো হোক। উমার বললেন: আবানকেই সেখানে আবার যেতে বাধ্য করা হোক। কিন্তু আবু বকর (রা) তা করতে অস্বীকার করেন। তিনি বলেন; যে ব্যক্তি বলে আমি রাসূলুল্লাহর সা: পরে আর কারও কাজ করবো না তাকে আমি বাধ্য করতে পারিনে। অত:পর আলা ইবনুল হাদরামীকে বাহরাইনের শাসক নিয়োগ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৫৯)।

    হযরত আবানের মৃত্যুর সময়কাল সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানামত দেখা যায়। মূসা ইবন উকবা ও অধিকাংশ বংশবিদ্যা বিশারদদের মতে হযরত আবু বকরের খিলাফতকালের শেষ দিকে হিজরী ১৩ সনে আজনাদাইনের যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইবন ইসহাকের মতে তিনি ইয়ারমুক যুদ্ধে এবং অন্য কিছু লোকের মতে ‘মারজুস সাফারের দিন শাহাদাত লাভ করেন। আবার অন্য একটি বর্ণনায় জানা যায়, তিনি খলীফা উসমানের খিলাফতকালে হি: ২৭ সনে মারা যান এবং তারই তত্বাবধানে হযরত যায়িদ ইবন সাবিত মাসহাফে উসমানী সংকলন করেন। তবে প্রথমোক্ত মতটি সঠিক বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।