তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
আবু আইউব আল-আনসারী (রা)

নাম খালিদ, ডাক নাম আবু আইউব। পিতা যায়িদ ইবন কুলাইব আল-নাজ্জারী আল-খাযরাজী। কেউ কেউ মালিক ইবন নাজ্জারের সাথে সম্পর্কের কারণে ‘আল-মালিকী’ এবং আনসারদের ‘আযদী’ হওয়ার কারণে তাঁকে ‘আল-আযদী’ বলেও উল্লেখ করে থাকেন। (দারিয়া-ই মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা, উর্দু ১/৭৪২), মাতা হিন্দা বিনতু সা’দ। (উসুদুল গাবা- ২/৮০) তবে ইবন সা’দের মতে যাহরা বিনতু সা’দ। (তাবাকাত- ৩/৪৮৪) ‘যাহরা’ আবু আইউবের পিতার মামাতো বোন। আবু আইউব চল্লিশ ‘আমুল ফীল’ (হস্তী বৎসর) অর্থাৎ হিজরাতের একত্রিশ বছর পূর্বে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি ‘আবু আইউব’ ডাক নামে পরিচিত। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা, (উর্দু)- ১/৭৪২) নাজ্জার খান্দানটি ইয়াসরিবের অন্যতম অভিজাত খান্দান। আর সেই আভিজাত্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে রাসূলুল্লাহর সা. মাতুল গোত্র হওয়ার কারণে। আবু আইউব এই অভিজাত নাজ্জার গোত্রের রয়িস বা নেতা। রাসূলুল্লাহ সা. মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন। ইসলামী দাওয়াতের জন্য মক্কার প্রতিকূল অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইয়াসরিবেও ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়েছে। নবুওয়াতের দশম বছরে ছয় জন, একাদশ বছরে বারোজন এবং দ্বাদশ বছরে তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জন ইয়াসরিববাসী (মদীনা বাসী) হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একটি শপথ বাক্য উচ্চারণ করেন। ইতিহাসে যা ’আকাবার ১ম, ২য় ও ৩য় শপথ’ নামে পরিচিত। এই শেষ শপথে আবু আইউব উপস্থিত ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাইয়াত হতে ইয়াসরিবে ফিরে যান। (উসুদুল গাবা- ২/৮০, তাবাকাত ৩/৪৮৪) তিনি যে মহাসত্যের সন্ধান নিয়ে ফিরে এলেন তা অন্যদেরকে না জানানো পর্যন্ত স্থির হতে পারলেন না। নিকট আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের আপনজনদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। শিগগিরই স্ত্রীকে স্বধর্মে টেনে আনলেন। আকাবার শপথগুলিতে মদীনার বেশ কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করায় এবং মদীনায় প্রেরিত রাসূলুল্লাহর সা. প্রতিনিধি মুসয়াব ইবন ’উমাইরের রা. প্রচেষ্টায় সেখানে ইসলামী দাওয়াত খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো। এদিকে রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশে অনেক নির্যাতিত মুসলমান মক্কা থেকে চুপে চুপে হিজরাত করে মদীনায় চলে আসতে শুরু করলেন। কিন্তু হযরত রাসূলে কারীম সা. তখনও কুরাইশদের বৈরী পরিবেশের মধ্যে মক্কায় অবস্থান করতে লাগলেন। অবশেষে নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে আল্লাহর নির্দেশে তিনিও মদীনার দিকে বেরিয়ে পড়লেন। মদীনাবাসীরা অধীর আগ্রহে মহানবীর আগমন অপেক্ষায় ছিল। আনসারদের একটি দল- আবু আইউব তাদের একজন- নিয়মিত প্রতিদিন সকালে মদীনার ৪/৫ মাইল দূরে ‘হাররা’ নামক স্থানে চলে যেত এবং রাসূলুল্লাহর সা. সম্ভাব্য আগমন পথের দিকে তাকিয়ে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতো। তারপর এক সময় তারা ফিরে যেত। এমনিভাবে একদিন তাঁরা ফিরে যাচ্ছে, এমন সময় জনৈক ইয়াহুদী বহু দূর থেকে রাসূলুল্লাহকে সা. দেখতে পেয়ে তাদেরকে সুসংবাদ দেয়। আনসাররা অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে মহানবীকে স্বাগতম জানানোর জন্য দ্রুত ছুটে যায়। বনু নাজ্জার ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী। মদীনার উপকণ্ঠে ‘কুবা’ পল্লীতে হযরত রাসূলে কারীম সা. কয়েক দিন অবস্থান করলেন। অতঃপর তিনি মদীনার মূল শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কুবা থেকে মদীনার দিকে তাঁর যাত্রার সেই দিনটি ছিল মদীনার ইতিহাসের সর্বাধিক গৌরব ও কল্যাণময় দিন। বনী নাজ্জারসহ মদীনার সকল আনসার গোত্রের লোক মহানবীর চলার পথের দু’ধারে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে, আর গোত্র-পতিরা নিজ নিজ ঘরের দরযায় অপেক্ষমান। পর্দানশীল মেয়েরা ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে এবং হাবশী গোলামরা আনন্দ-ফুর্তিতে সামরিক কলা-কৌশল প্রদর্শনে মেতে উঠেছে। আর বনী নাজ্জারের ছোট ছেলে-মেয়েরা ‘তালায়াল বাদরু আলাইনা’- স্বাগতম সঙ্গীতটি সমবেত কণ্ঠে গেয়ে চলেছে। এমনি এক জাঁকালো ও পবিত্র অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে মহানবী মদীনায় প্রবেশ করলেন। মহানবীর আতিথেয়তার সৌভাগ্য কার হয় তা দেখার জন্য মদীনার প্রতিটি লোক অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল। তিনি পথ অতিক্রম করছেন, আর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা- আহলান, সাহলান ওয়া মারহাবান- স্বাগতম শুভাগমন ইত্যাদি বলে এগিয়ে এসে নিজ নিজ বাড়ীতে মেহমান হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে কিন্তু আল্লাহ পাক তো মহানবীর আতিথেয়তার জন্য আবু আইউবের বাড়ীটি নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর বাহন উটনীটির পথ রোধকারীদের বার বার বলছিলেনঃ ‘তোমরা তার পথটি ছেড়ে দাও, সে (আল্লাহর তরফ থেকে) নির্দেশ প্রাপ্ত।’ (উসুদুল গাবা- ২/৮০) ইমাম মালিক বলেন, সেই সময় রাসূলুল্লাহর সা. মধ্যে ওহীর অবস্থা বিরাজমান ছিল। তিনি অবতরণ স্থল নির্ণয়ের ব্যাপারে ওহীর প্রতীক্ষায় ছিলেন [সীয়ারে আনসার (উর্দু)- ১/১১০] উটনী চলতে চলতে এক সময় বনী মালিক ইবন নাজ্জারের মধ্যে এক স্থানে (পরবর্তীকালে মসজিদে নববীর দরযায়) বসে পড়ে। তারপর একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার উঠে পড়ে এবং একটু এদিক সেদিক ঘুরে আবার পূর্ব স্থানে ফিরে এসে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সা. নেমে পড়েন। নিকটেই ছিল আবূ আইউবের বাড়ী। (উসুদুল গাবা- ২/৮১) আবু আইউব এগিয়ে এসে আরজ করেন নিকটেই আমার বাড়ী, অনুমতি পেলে বাহনের পিঠ থেকে জিনিস পত্র নামাতে পারি। নিজের বাড়ীতে মেহমানদারি করার অভিলাষীদের ভিড় কিন্তু তখনও কমেনি। সবারই একান্ত ইচ্ছা রাসূলুল্লাহ সা. তারই মেহমান হউন। শেষমেষ লোকেরা নিজেদের মধ্যে কারয়া বা লটারী করে এবং তাতে আবূ আইউবের নামটি ওঠে। এভাবে আবূ আইউব মহানবীর মেহমানদারির মহাগৌরব অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। (সীয়ারে আনসার- ১/১১১) হযরত রাসূলে কারীম সা. মসজিদ ও মসজিদ সংলগ্ন তাঁর বাসস্থান তৈরী না হওয়া পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস আবূ আইউবের গৃহে অবস্থান করেন। অত্যন্ত প্রীতি ও বিনয়ের সাথে তিনি মেহমানদারির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ঘরটি ছিল দুইতলা। তবে ছাদটি ছিল সাদামাটা ধরণের। আবূ আইউব ওপরতলা রাসূলুল্লাহর সা. জন্য নির্ধারণ করেন। কিন্তু রাসূল সা. নিজের ও সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে নীচতলাই পছন্দ করেন। এভাবে দিন কেটে যেতে লাগলো। ঘটনাক্রমে একদিন ওপর তলায় পানির একটি কলস ভেঙ্গে পানি গড়িয়ে পলো। ছাদ ছিল অতি সাধারণ। পানি নীচে গড়িয়ে পড়বে এবং তাতে রাসূলুল্লাহর সা. কষ্ট হবে, এমন একটা ভীতি ও শঙ্কায় আবূ আইউব ও তাঁর স্ত্রী উম্মু আইউব অস্থির হয়ে পড়লেন। তাঁদের ছিল একটি মাত্র লেপ। পানি চুষে নেওয়ার জন্য তাঁরা সেটি পানির ওপর ফেলে দেন। সাথে সাথে তাঁরা নীচে নেমে এসে রাসূলুল্লাহকে সা. ওপরে যাওয়ার অনুরোধ করে নিজেরা নীচে নেমে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮১) এতটুকু কষ্ট অবশ্য তাঁদের জন্য তেমন কিছু ছিল না। তাঁরা অন্য একটি ভয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। ‘আমরা ওপরে আর ওহীর বাহক, আমাদের নীচে’ এমন একটা তীব্র অনুভূতি তাদেরকে অস্থির করে তুললো। একটি রাত তো তাঁরা ঘুমাতেই পারলেন না। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই ঘরের এক কোণে গুটি-শুটি মেরে কোন মতে জেগে কাটিয়ে দিলেন। সকালে আবূ আইউব রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে গতরাতের ঘটনা ও তাঁদের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাঁদের আবেদন মঞ্জুর করেন। তিনি ওপরে চলে যান। (সূরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/৩২৮-৩২৯) হযরত আবূ আইউবের মৃত্যুর পর এই বাড়ীটি তাঁর আযাদকৃত দাস আফলাহ-এর হাতে চলে যায়। ঘরটির দেওয়াল ধসে গিয়ে বিরান হওয়ার উপক্রম হলে তাঁর নিকট থেকে এক হাজার দিনারের বিনিময়ে মুগীরা ইবন ’আবদির রহমান ইবন হারিস ইবন হিশাম খরীদ করে সংস্কার করেন। আর আফলাহ সেই অর্থ মদনিার গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৮, টীকা নং- ৩) হযরত রাসূলে কারীম সা আবূ আইউবের গৃহে অবস্থানকালে সাধারণতঃ আনসারগণ পালাক্রমে অথবা আবূ আইউব নিজে তাঁর জন্য খাবার পাঠাতেন। খাওয়ার পর যা বেঁচে যেত তিনি আবূ আইউবের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। আবূ আইউব খাবারের থালায় রাসূলুল্লাহর সা. আাঙ্গুলের ছাপ দেখে দেখে যে দিক থেকে তিনি খেয়েছেন সেখান থেকেই খেতেন। ঘটনাক্রমে একদিন রাসূল সা. খাবার স্পর্শ না করে, সবই ফেরত পাঠান। দ্বিধা ও সংকোচের সাথে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে খাবার গ্রহণ না করার কারণ জানতে চান। তিনি বলেন, খাবারে রসুন ছিল। আমি রসুন পছন্দ করিনে। তবে তোমরা খাবে। আবূ আইউব বললেন, ‘আপনার যা পছন্দ নয়, আমিও তা পছন্দ করবো না।’ (মুসলিম- ২/১৯৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৯, উসুদুল গাবা- ২/৮১) হিজরাতের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. হযরত আনাসের বাড়ীতে আনসার ও মুহাজিরদের সমবেত করেন এবং রুচি, সামাজিক মর্যাদা, ঝোঁক প্রবণতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য অনুসারে একজন মুহাজির ও একজন আনসারের মধ্যে মওয়াখাত বা দ্বীনী ভ্রাতৃসম্পর্ক কায়েম করে দেন। ইয়াসরিবে ইসলামের প্রথম মুবাল্লিগ (প্রচারক) মুস’য়াব ইবন ’উমাইর আল-কুরাইশীর সাথে আবূ আইউবের ভ্রাতৃ-সম্পর্ক স্থাপিত হয়। (তাবাকাত- ৩/৪৮৪) মুস’য়াব প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা এক উৎসাহী সাহাবী। ইসলামী দা’ওয়াতের পথে তিনি বহু কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বে সর্বপ্রথম দায়ী (প্রচারক) হিসাবে তাঁকে মদনিায় পাঠান। তাঁর সাথে আবূ আইউবের ভ্রাতু-সম্পর্ক স্থাপনের তাৎপর্য হল, তাঁর মধ্যেও মুসয়াবের মত উৎসাহ উদ্দীপনা বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের ঘটনাবলী একথার সত্যতা প্রমাণ করেছে। বদর, উহুদ, খন্দক, বাইয়াতুর রিদওয়ান সহ সকল যুদ্ধ ও অভিযানে আবূ আইউব রাসূলুল্লাহর সা. সাথে অংশগ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮০, আল-ইসাবা- ১/৪০৫) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট তিনি সত্যিকারেই জীবন ও ধন-সম্পদ বিক্রী করে দিয়েছিলেন। রাসূলে পাকের সা. ওফাতের পর খলীফাদের যুগে যত যুদ্ধ হয়েছে, হাজারো দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও তিনি তাঁর একটি থেকেও পিছিয়ে থাকেননি। রাত-দিন, প্রকাশ্যে ও নিরিবিলিতে সর্বক্ষণ তাঁর শ্লোগান ছিল আল্লাহর এই বাণী- ‘ইনফিরূ খিফাফান ওয়াসিকালান’- তোমরা হালকা এবং ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বেরিয়ে পড়। (তাওবা- ৪১) অর্থাৎ একাকী ও দলবদ্ধভাবে, উদ্দমী ও হতোদ্দম অবস্থায়, যৌবনে ও বার্ধক্যে, প্রাচুর্য ও দারিদ্রের মধ্যে- মোটকথা সর্ব অবস্থায়। (ফাতহুল কাদীর- ২/২৬৩) তিনি বলতেনঃ আমি নিজেকে সব সময় ‘খাফীফ ও সাকীল’- ই পেয়েছি। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৫৭-৪৫৮, তাবাকাত- ৩/৪৮৫) রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর মাত্র একটি বার তিনি ঘর থেকে বের হননি। সেই যুদ্ধে খলীফা একজন কম বয়স্ক যুবককে সেনাপতি নিয়োগ করেন। যার নেতৃত্বের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে সেই সেনাপতি হলেন ইয়াযীদ ইবন মু’য়াবিয়া রা.। তবে বেশী দিন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আবর্তে দোল খেতে থাকেন, অনুশোচনায় দগ্ধিভূত হন। অল্প দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। আপন মনে বলে ওঠেনঃ কে আমার আমীর, তাতে আমার কী আসে যায়? এমন চিন্তার পর একটি মুহূর্তও নষ্ট না করে সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। ইসলামী সেনা দলের একজন সৈনিক হিসাবে বেঁচে থাকা, তার পতাকাতলে যুদ্ধ করে ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখা- তিনি জীবনের পরম প্রাপ্তি বলে মনে করেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৬, হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৫৮) তিনি জিহাদের উদ্দেশ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ তিনটি মহাদেশেই গমন করেন। (দারিয়া-ই মা’যারিফ-ই-ইসলামিয়্যা- ১/৭৪৩) হিজরী ৩৫ সনে হযরত ’উসমান রা. যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হন তখন আবূ আইউব মদীনা্য়। সেই দুর্যোগময় সময়ে মাঝে মাঝে তিনি মসজিদে নববীতে নামাযের ইমাম হতেন। আলী ও মু’য়াবিয়ার রা. মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকালীন সেই সংকটময় সময়ে তিনি বিনা দ্বিধায় আলীর রা. পক্ষ অবলম্বন করেন। কারণ, তাঁর মতে, তিনিই ইমাম, মুসলমানরা তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৭) ইবনুল আসীরের মতে আলীর রা. সাথে তিনি সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮১) মাস’উদী ‘মুরূপজ আজ-জাহব’ গ্রন্থে হিঃ ৩৬ সনে আলীর রা. সাথে উটের যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণের কথা বলেছেন। ইবন আবদিল বার ‘আল-ইসতী’য়াব’ গ্রন্থে মাস’উদীর কথা সমর্থন করেছেন। তবে হিঃ ৪র্থ শতকের ঐতিহাসেকি মাস’উদীর পূর্বের কোন ঐতিহাসিক আবূ আ্ইউবের উটের যুদ্ধে যোগদানের কথা বলেছেন বলে জানা যায় না। খারেজীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘নাহরাওয়ানের’ যুদ্ধে তিনি যোগদান করেন। যুদ্ধের পূর্বে যাঁরা খারেজীদের সাথে আপোষরফার চেষ্টা করেন তাঁদের মধ্যে আবূ আইউবও একজন। তিনি আলীর রা. সাথে ‘মাদায়িন’ গমন করেন। তাঁর প্রতি আলীর রা. ছিল গভীর বিশ্বাস ও আস্থা। মদীনা থেকে ‘দারুল খিলফা’ (রাজধানী) কূফায় স্থানান্তরিত হলে আলী রা. তাঁকে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান। আবূ আইউব সেই সময় মদীনায় আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। [সীয়ারে আনসার- ১/১১১, দারিয়া-ই মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা- (উর্দু) ১/৭৪৩] হযরত আলীর রা. শাহাদাতের সময় আবু আইউব মদীনায়। তারপর হযরত মুয়াবিয়া রা. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। আবূ আইউব চাওয়া-পাওয়ার লোক ছিলেন না। তাঁর একমাত্র বাসনা ছিল জিহাদের ময়দানে ও মুজাহিদদের সারিতে একটুখানি স্থান। হিজরী ৪২ সনে বাইজেন্টাইন রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের অভিযান বৃদ্ধি পায়। তিনি এ সময় খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পুত্র আবদুর রহমানের নেতৃত্বে জিহাদে শরিক হন। তখন তাঁর বয়স ৭৫ বছর। হিঃ ৪২ সনে সামুদ্রিক যুদ্ধে যোগদানের জন্য মিসর গমন করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. বাইজেন্টাইন রোমানদের ঘাঁটি কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে যান। কার হাতে এ বিজয়-কর্ম সমাধা হয় তা দেখার জন্য মুসলিম আমীরগণ সব সময় উৎসুক ছিলেন। হিঃ ৫২ মতান্তরে ৪৯ সনে হযরত মু’য়াবিয়া রা. রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। তিনি স্বীয় পুত্র ইয়াযীদকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধের নির্দেশ দেন। এই বাহিনীতে ইবন ’উমার, ইবন ’আব্বাস ও ইবন যুবাইরের মত মর্যাদাবান সাহাবীদের সাথে আবূ আইউবও একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে যোগ দেন। মিসর, সিরিয়াসহ মুসলিম খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভিন্ন ভিন্ন সেনা ইউনিট এ যুদ্ধে যোগ দেয়। মিসরীয় সেনা ইউনিটের কমাণ্ডার ছিলেন তথাকার গভর্ণর প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ’উকবা ইবন ’আমির আল-জুহানী। তাছাড়া ফুদালা ইবন ’উবাইদ ও আবদুর রহমান ইবন খালিদ ইবন ওয়ালীদের নেতৃত্বেও দু’টি সেনা ইউনিট যোগ দেয়। রোমানরা যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়বার জন্য এগিয়ে আসে। মুসলমানদের প্রস্তুতিও কম ছিল না। তাদের সংখ্যাও প্রায় শত্রুসংখ্যার সমান। মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে আবেগ উৎসাহ এত তীব্র ছিল যে, কোন কোন ক্ষেত্রে একজন মাত্র মুসলিম সৈনিক রোমানদের একটি পুরো সারির বিরুদ্ধে লড়তে থাকে। একজন মুসলিম সৈনিক একবার একাই রোমানদের ব্যুহ ভেদে করে তাদের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তার এই দুঃসাহস দেখে অন্যান্য মুসলমানদের মুখ থেকে সমস্বরে এ কুরআনের আয়াতটি ধ্বনিত হয়ে ওঠেঃ লা তুলকূআয়দীকুম ইলাত তাহলুকাহ’- তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করোনা। (আল-বাকারা- ১৯৫) তাদের একথা শুনে আবূ আইউব এগিয়ে গিয়ে বললেনঃ তোমরা আয়াতটির এই অর্থ বুঝলে? এ আয়াতটি তো নাযিল হয়েছিল ব্যবসায় ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে আনসারদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে। একবার আসাররা বলল, গত বছর জিহাদে যোগদানের জন্য ব্যবসায়ের যে ক্ষতি হয়েছে এ বছর তা পুষিয়ে নিতে হবে। সেই প্রেক্ষাপটে এ আয়াতের অবতরণ। আয়াতটির তাৎপর্য হল, ধ্বংস জিহাদে নয়, জিহাদ ত্যাগ করা ও অতিরিক্ত ধন-সম্পদ আহরণে ব্যস্ত থাকার মধ্যে ধ্বংস। (সীয়ারে আনসার- ১/১১২, হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭০-৪৭১, ৪৫৮-৪৫৯, তাবাকাত- ৩/৪৮৪-৪৮৫) এই কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানের সফরে এক মহামারি দেখা দেয়। বহু মুজাহিদ সেই মহামারিতে মারা যান। আবু আইউবও আক্রান্ত হলেন। তিনি অন্তিম রোগ শয্যায়। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়া শেষ বারের মত তাঁকে দেখতে এলেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘আবু আইউব, আপনার কিছু চাওয়ার আছে কি? আমি আপনার অন্তিম ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করবো।’ কিন্তু যে ব্যক্তি জান্নাতের বিনিময়ে নিজের সবকিছু বিক্রী করে দিয়েছেন, এ নশ্বর পৃথিবীতে তাঁর চাওয়ার কী থাকতে পারে? তিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ইয়াযীদের কাছে যা আশা করলেন তা কোন মানুষের কল্পনায়ও আসতে পারে না। তিনি ধীর স্থিরভাবে বললেন, আমি মারা গেলে তোমরা আমার মৃতদেহটি ঘোড়ার ওপর উঠিয়ে শত্রু-ভূমির অভ্যন্তরে যতদূর সম্ভব নিয়ে যাবে এবং শেষ প্রান্তে দাফন করবে। মুসলিম বাহিনীকে এই পথে দ্রুত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে যাতে তাদের অশ্বের পদাঘাত আমার কবরের ওপর পড়ে এবং আমি বুঝতে পারি, তারা যে সাহায্য ও কামিয়াবী চায় তা তারা লাভ করতে পেরেছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৭, আল ইসাবা- ১/৪০৫) আবূ আইউবের মৃত্যুর পর তাঁর অন্তিম ইচ্ছার বাস্তবায়ন করা হয়। একদিন রাতে মুসলিম বাহিনী অস্ত্র সজ্জিত হয়ে লাশটি উঠিয়ে নেয় এবং কনস্ট্যান্টিনোপলের (আধুনিক ইস্তাম্বুল) নগর প্রাচীরের গা ঘেঁষে তাঁকে দাফন করে। মুসলিশ বাহিনীর সকল সদস্য তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে। বিধর্মীরা তাঁর মাযারের অবমাননা করতে পারে, এই চিন্তায় ইয়াযীদ কবরটি মাটির সাথে সমান করে দেন। পরদিন সকালে রোমানরা মুসলিম মুজাহিদদের কাছে জানতে চাইলো, কাল রাতে আপনাদের একটু ব্যস্ত দেখা গেল, কী হয়েছিল? তাঁরা জবাব দিলেন, আমাদের নবীর একজন অতি সম্মানিত সংগীর মৃত্যু হয়েছে, তাঁরই দাফন কাজে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। যেখানে দাফন করা হয়েছে তোমরা তা জান। যদি তাঁর মাযারের অবমাননা করা হয় তাহলে জেনে রাখ, বিশাল ইসলামী খিলাফতের কোথাও তোমাদের ‘নাকুস’ আর বাজবে না। (সীয়াবে আনসার- ১/১১৩) ইস্তাম্বুলের সন্নিকটে হযরত আবু আইয়ূবের কবরটি আজও বর্ণ ও ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের এক তীর্থ-স্থান। রোমানরা তাদের দুর্ভিক্ষ ও খরার সময় তাঁর কবরে নিকট সমবেত হয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করতো এবং পানি চাইতো। (দারিয়া-ই মায়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা- ১/৭৪৫, উসুদুল গাবা- ২/৮২) হযরত আবু আইউবের মৃত্যুসন সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবনুল আসীর উসুদুল গাবা (২/৮১) গ্রন্থে তিনটি মতের উল্লেখ করেছেন। যথ হিজরী ৫০, ৫১ ও ৫২ সন। তবে হিজরী ৫২ সন অধিকাংশের মত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। ইবন আসাকির তাঁর একটি মতে হিজরী ৫৫ সন বলে উল্লেখ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় আশি বছর। হযরত আবু আইউবের ফজীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে বহু কথা হাদীস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। তাঁর জীবনের এমন অনেক ঘটনা জানা যায় যা খুবই শিক্ষণীয়। এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে সেসব বিস্তারিত বর্ণনা করা সম্ভব নয়। হযরত ইবন ’আব্বাস বলেন, ‘একথা প্রচন্ড গরমের দিনে ঠিক দুপুরের সময় আবু বকর ঘর থেকে বেরিয়ে মসজিদের দিকে আসলেন। ’উমার তাঁকে দেখে প্রশ্ন করলেন, – এমন অসময়ে বের হলেন যে? – কী করবো, দুঃসহ ক্ষুধা তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। – আল্লাহর কসম, আমারও একই দশা। তাঁদের দু’জনের কথা শেষ না হতেই হযরত রাসূলে কারীম সা. সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে দেখে বললেনঃ – কি ব্যাপার, এ অসময়ে তোমরা এখানে? – ক্ষুধার জ্বালায় আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি। রাসূল সা. বললেনঃ যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ, আমিও ক্ষুধার জ্বালায় ঘরে থাকতে পারিনি। এসো তোমরা আমার সাথে। তাঁরা তিন জন হাঁটতে হাঁটতে আবু আইউবের বাড়ীর দরজায় পৌঁছলেন। আবু আইউবের অভ্যাস ছিল, প্রতিদিন রাসূলে কারীমের সা. জন্য খাবার তৈরী রাখা। তিনি দেরি করলে বা না খেলে তাঁর পরিবারের লোকেরা তা ভাগ করে খেয়ে ফেলতো; তাঁদের তিনজনের সাড়া পেয়ে উম্মু আইউব (আবু আইউবের স্ত্রী) বেরিয়ে এসে বললেন, – আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়, আহলান ওয়া সাহলান। – আবু আইউব কোথায়? আবু আইউব নিকটেই তাঁর খেজুর বাগানে কাজ করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. গলার আওয়ায শুনে এই কথা বলতে বলতে ছুটে আসলেনঃ – ইয়া রাসূলুল্লাহ, এমন সময় তো আপনার শুভাগমন হয় না। – তোমার কথাই ঠিক। আবু আইউব দৌড়ে বাগানে গেলেন এবং এক কাঁধি শুকনো ও পাকা-কাঁচা খেজুর কেটে নিয়ে আসলেন। রাসূল সা. বললেনঃ তুমি এটা কেটে আন তা কিন্তু আমি চাইনি। – আপনি এর থেকে কিছু শুকনো, পাকা ও কাঁচা খেজুর খান- এটাই আমার একান্ত ইচ্ছা। আমি আপনাদের জন্য এক্ষুণি বকরী জবেহ করব। রাসূল সা. বললেনঃ জবেহ করলে দুধালো বকরী জবেহ করবে না। আবু আইউব দুধ দেয় না এমন একটি বকরী জবেহ করলেন। স্ত্রীকে বললেনঃ গোশত ভূনা কর এবং রুটি বানাও। তুমি তো রুটি বানাতে দক্ষ। আবু আইউব লেগে গেলেন বকরীর অর্ধেকটা রান্না করতে। রান্নার কাজ শেষ করে তা রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের সামনে হাজির করলেন। রাসুল সা. এক টুকরো গোশত উঠিয়ে একটি রুটির ওপর রেখে বললেনঃ – আবু আইউব, শিগগির তুমি এই টুকরোটি ফাতিমাকে দিয়ে এস। বহু দিন সে এমন খাবার দেখে না। তাঁরা সকলে পেট ভরে খেলেন। তারপর রাসূল সা. বললেন, ‘রুটি, গোশত, খুরমা, পাকা ও আধাপাকা খেজুর।’ চোখ দু’টি তাঁর পানিতে ভরে গেল। তারপর বললেনঃ ‘‘যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ! এই নি’য়ামত (দান, অনুগ্রহ) সম্পর্কে কিয়ামতের দিন তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা এই নিয়ামত লাভ করলে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তাতে হাত দেবে এবং পেট ভরে খাওয়ার পর বলবে ‘আলহামদুলিল্লাহ আল্লাজী আশবা’য়ানা ওযা আন’য়ামা আলাইনা ফা আফদালা।’’ রাসূলুল্লাহ সা. বিদায় নেওযার সময় আবু আইউবকে বললেনঃ – আগামী কাল আমার সাথে দেখা করবে। পরদিন আবু আইউব রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি ছোট একটি দাসীকে আবু আইউবের হাতে তুলে দিতে দিতে বললেনঃ আবু আইউব, তার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। আমার কাছে যতদিন ছিল, আমরা তাঁর মধ্যে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু দেখিনি। দাসীটি সংগে করে আবু আইউব বাড়ী ফিরলেন। স্ত্রী প্রশ্ন করলেনঃ আইউবের বাপ, এটা আবার কার? রাসূলুল্লাহ সা. আমাদেরকে দান করেছেন। ‘দাতা অতি মহান, দানটিও অতি সম্মানিত’- স্ত্রী মন্তব্য করলেন। – রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর প্রতি ভালো আচরণের উপদেশ দিয়েছেন। – উপদেশ কিভাবে বাস্তবায়ন করবে? – তাকে আযাদ করে দেওয়া ছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. উপদেশ বাস্তবায়নের আর কোন উত্তম পন্থা নেই। – তুমি সঠিক হিদায়াত পেয়েছ। তুমি আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি। অতঃপর তাঁরা দাসীটি আযাদ করে দিলেন। (সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ১/১২৪-১৩০; হায়াতুস সাহাবা- ১/৩০৮-৩১০) উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়া বিনতু হুয়াই-এর সাথে যে রাতে রাসূলুল্লাহর সা. প্রথম বাসর হয়, সে রাতে সকলের অজ্ঞাতসারে আবু আইউব রাসূলুল্লাহর সা. দরযায় কোষমুক্ত তরবারি হাতে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রত্যুষে রাসুল সা. বের হয়ে আবু আইউবকে দেখতে পান। আবু আইউব বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনি তাঁর বাপ, ভাই ও স্বামীকে হত্যা করেছেন- এজন্য আমি আপনাকে নিরাপদ মনে করিনি। তাঁর কথা শুনে রাসূল সা. হেসে দেন এবং তাঁর জন্য দু’আ করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৪৩, হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৬৩) সাহাবা সমাজের মধ্যে তাঁর মর্যাদা এত উঁচুতে ছিল যে, অন্যান্য সাহাবীরা তাঁর নিকট বিভিন্ন বিষয়ে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করতেন। ইবন ’আব্বাস, ইবন ’উমর, বারা’ ইবন আযিব, আনাস ইবন মালিক, আবু উমামা, যায়িদ ইবন খালিদ আল-জুহানী, মিকদাম ইবন মা’দিকারাব, জাবির ইবন সুমরা, আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আল-খাতামী প্রমুখের ন্যায় বিশিষ্ট সাহাবীরা তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেণ। আর সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, ’উরওয়া ইবন যুবাইর, সালিম ইবন ’আবদিল্লাহ, ’আতা ইবন ইয়াসার, ’আতা ইবন ইয়াযীদ, লায়সী, আবু সালামা, আবদুর রহমান ইবন আবী-লায়লার মত বিশিষ্ট তাবে’ঈগণও ছিলেন তাঁর শাগরিদ। তাঁরা সকলে তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮১; আল-ইসাবা- ১/৪০৫) আবু আইউব ছিলেন সাহাবাদের কেন্দ্রবিন্দু। কোন মাসযালায় সাহাবাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলে সবাই তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। একবার ইহরাম অবস্থায় জানাবাতের গোসলের সময় হাত দিয়ে মাথা ঘষা যায় কিনা- এ ব্যাপারে ইবন ’আব্বাস ও মিসওয়ার ইবন মাখরামার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। তাঁরা বিষয়টি জানার জন্য আবদুল্লাহ ইবন হুসাইনকে পাঠালেন আবু আইউবের নিকট। আবদুল্লাহ যখন পৌঁছলেন তখন ঘটনাক্রমে আবু আইউব গোসল করছিলেন। আবদুল্লাহর উদ্দেশ্য জানতে পেরে তিনি মাথাটি বাইরে বের করে দিয়ে তা ঘষতে ঘষতে বলেন, দেখ, এভাবে রাসূলুল্লাহ সা. গোসল করতেন। (বুখারী- ১/২৪৮) হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতকালে ’উকবা ইবন ’আমির আল-জুহানী যখন মিসরের গভর্ণর তখন আবু আইউব দুইবার মিসর ভ্রমণ করেন। প্রথম সফরটি হাদীসের অন্বেষণে। তিনি শুনেছিলেন, ’উকবা রাসূলুল্লাহর সা. একটি হাদীস বর্ণনা করেন। ’উকবার মুখ থেকে সেই একটিমাত্র হাদীস শোনার জন্য মদীনা থেকে মিসর পর্যন্ত এত দীর্ঘপথ পাড়ি দেন। মিসর পৌঁছে তিনি মাসলামা ইবন মাখলাদের বাড়ীতে যান। মাসলামা তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে বুকে বুক মিলান। আবু আইউব তাঁকে বলেন, ‘আমাকে একটু ’উকবার বাড়ীটি দেখিয়ে দাও।’ সেখানে পৌঁছে তিনি ’উকবাকে বলেন, ‘একটি কথা আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে যাঁরা সেই সময় উপস্থিত ছিলেন, আমি ও আপনি ছাড়া তাঁদের আর কেউ এখন বেঁচে নেই। আচ্ছা, ‘সতরুল মুসলিম’- মুসলমানের সতর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহকে সা. আপনি কী বলতে শুনেছেন?’ ’উকবা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ ‘দুনিয়াতে যে ব্যক্তি কোন মুমিনের কোন গোপন বিষয় গোপন রাখবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।’ এতটুকু শুনেই আবু আইউব মদীনার দিকে যাত্রা করেন। বাহনটিকে ছেড়ে দিয়ে একটু বিশ্রামও নিলেন না। অতঃপর হাদীসটি তিনি এভাবে বর্ণনা করতেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৮; মুসনাদে ইমাম আহমাদ- ৪/১৫৪) হযরত আবু আইউবের জ্ঞান আহরণ ও তার প্রচার প্রসারের প্রতি এত তীব্র আকর্ষণ ছিল যে, মৃত্যু শয্যায়ও তা থেকে বিরত থাকেননি। তাঁর মৃত্যুর পর সাধারণ ঘোষনার মাধ্যমে হাদীস দু’টি মানুষের মধ্যে প্রচার করা হয়। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১৪) হযরত আবু আইউব কুরআনের হাফেজ ছিলেন। ইবন সাদ বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. যুগে আনসারদের মধ্যে পাঁচ জন কুরআন সংগ্রহ করেন। মা’য়াজ ইবন জাবাল, ’উবাদাহ্ ইবন সামিত উবাই ইবন কা’ব, আবু আইউব ও আবু দারদা। দ্বিতীয় খলীফা ’উমারের খিলাফতকালে ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান রা. খলীফাকে লিখলেনঃ শামের অধিবাসীরা নানা পদ্ধতিতে কুরআন পাঠ করছে। তাদেরকে সঠিকভাবে কুরআন শিক্ষা দিতে পারে এমন কিছু বিজ্ঞ শিক্ষক সেখানে পাঠান। এই চিঠি পেয়ে ’উমার উপরোক্ত পাঁচ জনকে ডেকে পাঠান। তাঁরা উপস্থিত হলে বলেনঃ ‘তোমাদের শামবাসী ভাইয়েরা কুরআন শিক্ষার ব্যাপারে আমার সাহায্য চেয়েছে। তোমাদের মধ্য থেকে অন্ততঃ তিনজন এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য কর। আর ইচ্ছা করলে তোমরা সবাই অংশগ্রহণ করতে পার।’ তাঁরা খলীফার আবেদনে সাড়া দিলেন। তাঁরা বললেনঃ ‘আবু আইউব বয়সের ভারে দুর্বল, আর উবাই ইবন কা’ব রোগগ্রস্ত।’ অতঃপর বাকী তিনজন যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৫) হযরত আবু আইউব থেকে দেড়শো হাদীস বর্ণিত হয়েছে বলে সীরাত গ্রন্থসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ‘জালা’ আল-কুলুব’- এর গ্রন্থকার তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ২১০টি বলে উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে পাঁচটি হাদীস মুত্তাফাক আলাইহি। ইমাম আহমাদ তাঁর ‘মুসনাদ’- এর ৫ম খন্ডে ৪১২ থেকে ৪২৩ পৃষ্ঠায় ১১২টি এবং ১১৩-১১৪ পৃষ্ঠায় তাঁর বর্ণিত আরও কিছু হাদীস সংকলন করেছেন। [দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা (উর্দু)- ১/৭৪৫] হযরত আবু আইউবের চরিত্রে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে বিদ্যমান ছিল। ১. রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি গভীর ভালোবাসা, ২. ঈমানী তেজ ও উদ্দীপনা, ৩. সত্য ভাষণ। রাসূলুল্লাহকে সা. এত গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন যে, তাঁর ওফাতের পর রওজা পাকের কাছে গিয়ে পড়ে থাকতেন। তাঁর ঈমানী তেজ ও দৃঢ়তার প্রমাণ এই যে, রাসূলুল্লাহর সা. যুগে সংঘটিত কোন একটি যুদ্ধেও তিনি অনুপস্থিত থাকেননি। আর জীবনের শেষ প্রান্তে আশি বছর বয়সেও মিসরের পথে রোম সাগর পাড়ি দিয়ে ইস্তাম্বুলের নগর প্রাচীরের সন্নিকটে ইসলামী দা’ওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য গমন করেন। আর ব্যক্তি বা রাষ্ট্র- কারও ভয়েই তিনি সত্য কথা বলা থেকে কখনও বিরত থাকেননি। একবার মিসরের গভর্ণর ’উকবা ইবন ’আমির আল-জুহানী- যিনি একজন সাহাবী, কোন কারণবশতঃ মাগরিবের নামায পড়াতে একটু বিলম্ব করলেন। আবু আইউব উঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারলেন ‘মা হাজিহিস সালাতু ইয়া উকবা’- উকবা এটা কেমন নামায? উকবা বললেন, একটি কাজে আটকে গিয়ে দেরী হয়ে গেছে। আবু আইউব বললেনঃ ‘আপনি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী, আপনার এই কাজের দ্বারা মানুষের ধারণা হবে রাসূলুল্লাহ সা. এই সময় নামায আদায় করতেন। অথচ মাগরিবের নামায তাড়াতাড়ি আদায়ের জন্য তিনি কত তাকীদ দিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১৭) ইসলামী বিধি-বিধান তিনি নিজে যেমন পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করতেন তেমনি অন্যদের নিকট থেকেও অনুরূপ অনুসরণ আশা করতেন। কারও মধ্যে সামান্য বিচ্যুতি লক্ষ্য করলেও তা সংশোধন করে দিতেন। একবার হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের ছেলে আবদুর রহমান কোন এক যুদ্ধে চারজন বন্দীকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করেন। এ কথা আবু আইউব জানতে পেরে তাঁকে বলেন, ‘পশুর মত এভাবে হত্যা করা থেকে রাসূলুল্লাহ সা. নিষেধ করেছেন। আমি তো এভাবে একটি মুরগীও জবেহ করা পছন্দ করিনে।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪২২) রোমানদের সাথে যুদ্ধের সময় জাহাজে একজন অফিসারের তত্ত্বাবধানে বহু সংখ্যক যুদ্ধবন্দী ছিল। একদিন আবু আইউব দেখতে পেলো একজন মহিলা কয়েদী বড় ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। তিনি মহিলাটির এভাবে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল, ‘তার সন্তান থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।’ আবু আইউব ছেলেটির হাত ধরে মহিলার হাতে তুলে দেন। অফিসার আবু আইউবের বিরুদ্ধে কমান্ডারের নিকট অভিযোগ করেন। কমান্ডারের প্রশ্নের জবাবে আবু আইউব বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা. এ ধরণের কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১২) তিনি সিরিয়া ও মিসরে গেলেন। দেখলেন, সেখানকার পায়খানাসমূহ কিবলামুখী করে তৈরী করা। তিনি বার বার শুধু বলতে লাগলেন, ‘কী বলবো? এখানে পায়খানা কিবলামুখী করে তৈরী করা, অথচ রাসূল সা. এমনটি করতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১২) সালিম ইবন ’আবদিল্লাহ ইবন ’উমার বলেনঃ ‘আমার পিতার (আবদুল্লাহ ইবন ’উমার) জীবদ্দশায় একবার আমাদের বাড়ীতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান হল। আমার পিতা অন্যদের সাথে আবু আইউবকেও দাওয়াত দিলেন। সুন্দর সুন্দর সবুজ চাদর দিয়ে আমাদের বাড়ীর দেওয়াল ঢেকে দেওয়া হল। আবু আইউব এসেই মাথা উঁচু করে একবার তাকিয়ে দেখলেন। তারপর গম্ভীরভাবে বললেনঃ ‘আবদুল্লাহ, তোমরা দেওয়াল ঢেকে দিয়েছ?’ সালেম বলেনঃ আমার পিতা লজ্জিত হয়ে জবাব দিলেন, ‘আবু আইউব, মহিলারা আমাদেরকে কাবু করে ফেলেছে।’ আবু আইউব বললেনঃ ‘সবার ব্যাপারে এ আশংকা আমার আছে। তবে তোমার ব্যাপারে এমন আশংকা ছিলনা। আমি তোমার বাড়ীতে ঢুকবো না, আহারও করবো না।’ (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩০৫) হযরত আবু আইউব যে কত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইফ্ক-এর ঘটনায়। এই ইফ্ক বা হযরত ‘আয়িশার রা. প্রতি অপবাদ আরোপের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুষ্ঠু। একদিন তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেনঃ আবু আইউব, ’আয়িশার সম্পর্কে লোকেরা যা বলাবলি করছে, তা কি তুমি শুনেছ?’ বললেনঃ ‘হাঁ, শুনেছি। ডাহা মিথ্যে কথা। উম্মু আইউব, তুমি কি এমন কাজ করতে পার?’ বললেনঃ আল্লাহর কসম! এমন কাজ আমি কক্ষণও করতে পারিনে।’ আবু আইউব বললেনঃ ‘তাহলে ’আয়িশা- যিনি তোমার চেয়েও উত্তম, তিনি কিভাবে করতে পারেন?’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩০২) কনস্ট্যান্টিনোপল যুদ্ধের সময় একদিন একজন মুসলিম সৈনিক তাদের জাহাজে আবু আইউবকে খাবারের দা’ওয়াত দিল। তিনি হাজির হলেন এবং বললেন, ‘তোমরা আমাকে দাওয়াত দিয়েছে; অথছ আজ আমি রোযা রেখেছি। তোমাদের দাওয়াতে সাড়া দেওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। কারণ আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ একজন মুসলমানের ওপর তার অন্য এক মুসলিম ভাইয়ের ছয়টি অধিকার আছে। তার কোন একটি চেড়ে দিলে একটি অধিকার ছেড়ে দেওয়া হবে। ১. দেখা হলে তাকে সালাম দিতে হবে। ২. দাওযাত দিলে সাড়া দিতে হবে। ৩. হাঁচি দিয়ে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বললে তার জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলে জবাব দিতে হবে। ৪. অসুস্থ হলে দেখতে যেতে হবে। ৫. মারা গেলে তার জানাযায় শরিক হতে হবে। ৬. কোন ব্যাপারে উপদেশ চাইলে উপদেশ দিতে হবে।’ (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৫) হযরত আবু আইউব ছিলেন অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির। কুয়োর ধারে গোসলের সময়েও চারিদিকে কাপড় টানিয়ে ঘিরে নিতেন। (বুখারী- ১/২৪৮) কাফির মুনাফিকদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। এ কঠোরতা বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সে সময় মদীনার মুনাফিকরা (কপট) মসজিদে আসতো, মুসলমানদের নানা কথা কান পেতে শুনতো। বাইরে গিয়ে তারা মুসলমানদের দ্বীন নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতো। একদিন কতিপয় মুনাফিক মসজিদে নববীতে একত্রিত হল। তারা যখন পরস্পর গায়ে গা মিশিয়ে নিচুস্বরে নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করছে, ঠিক সেই সময় রাসূল সা. তাদেরকে দেখে ফেলেন। তিনি তাদেরকে মসজিদে থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সাথে সাথে আবু আইউব ছুটে গিয়ে ’আমর ইবন কায়েসের একটি ঠ্যাং ধরে টানতে টানতে মসজিদের বাইরে নিয়ে গেলেন। তিনি তার ঠ্যাং ধরে টানছেন আর সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছেঃ আবু আইউব, তুমি এভাবে আমাকে বনী-সা’লাবের মিরবাদ (খোঁয়াড়) থেকে বের করে দিচ্ছ? (মসজিদের স্থানে পূর্বে উট-বকরীর খোঁয়াড় ছিল) তারপর আবু আইউব রাফে ইবন ওয়াদীয়ার দিকে ধেয়ে যান এবং তার গলায় চাদর পেঁচিয়ে টানতে টানতে ও লাথি-চড় মারতে মারতে মসজিদ থেকে বের করে দেন। আবু আইউব টানছেন আর মুখে বলছেনঃ ‘পাপাত্মা মুনাফিক দূর হ। যে পথে এসেছিস সেই পথে চলে যা।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫২৮) হযরত আবু আইউব ও তাঁর স্ত্রী যেভাবে রাসূলুল্লাহকে সা. আশ্রয় দেন এবং প্রাণ দিয়ে তাঁর সেবা করেন তাতে নবী-খান্দানের লোকদের নিকট বিশেষভাবে, আর সাধারণভাবে সকল মুসলমানদের নিকট তাঁরা এক বিশেষ মর্যাদার আসন লাভ করেন, হযরত আলীর খিলাফতকালে হযরত ইবন ’আব্বাস রা. যখন বসরার গভর্ণর তখন একবার আবু আইউব গেলেন সেখানে। ইবন ’আব্বাস তাঁকে বললেন, ‘আমার ইচ্ছা, যেভাবে আপনি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য ঘর খালি করে দিয়েছিলেন, আজ আমিও তেমনিভাবে আপনার জন্য ঘর খালি করে দিই।’ একথা বলে তিনি পরিবারের সকল সদস্যকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে সকল সাজ সরঞ্জামসহ বাড়ীটি তাঁর থাকার জন্য ছেড়ে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০৫) রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর সাহাবা-ই-কিরামের পূর্ববর্তী সেবা ও আত্মত্যাগ অনুযায়ী প্রত্যেকের ভাতা নির্ধারিত হয়। আবু আইউবের ভাতা প্রথমে ৪০০০ (চার হাজার) দিরহাম নির্ধারিত হয়। হযরত আলী তা বাড়িয়ে বিশ হাজার করেন। তাঁর ভূমি চাষাবাদের জন্য প্রথমে ৮ (আট) টি দাস নিযুক্ত ছিল, হযরত আলী রা. তা চল্লিশ জনে উন্নীত করেন। হযরত আবু আইউবের ভাগ্যবতী স্ত্রীর নাম উম্মু হাসান বিনতু যায়িদ। অভিজাত আনসারী মহিলা। ইবন সা’দের বর্ণনা মতে, তাঁর গর্ভে একমাত্র ছেলে ’আবদুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। যদিও হযরত আবু আইউবের রা. জীবন যুদ্ধের ময়দানে কেটেছে এবং তরবারি কাঁধ থেকে নামিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাননি, তথাপি সে জীবন ছিল প্রভাতের মৃদুমন্দ শীতল বায়ুর ন্যায় প্রশান্ত। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছিলেনঃ ‘‘তুমি যখন নামায আদায় করবে, তা যে শেষবারের মত আদায় করছো, এমনভাবে করবে। এমন কথা কক্ষণও বলবে না যার জন্য পরে কৈফিয়াত দিতে হয়। মানুষের হাতে যা আছে তা পাওয়ার আশা কক্ষণও করবে না।’’ কোন ঝগড়া-বিবাদে কক্ষণও তাঁর জিহ্বা অসংযত হয়নি। কোন লালসা তাঁর অন্তরকে কক্ষণও কাবু করতে পারেনি। একজন ’আবেদের মত, দুনিয়া থেকে এই মুহূর্তে একজন বিদায় গ্রহণকারীর মত সারাটি জীবন তিনি অতিবাহিত করে গেছেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৮)
জাবির ইবন আবদিল্লাহ (রা)

নাম জাবির, কুনিয়াত বা ডাকনামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যথাঃ আবু ’আবিদিল্লাহ, আবু ’আবদির রহমান, ও আবু মুহাম্মাদ। ইবনুল আসীর প্রথমটি অধিকতর সঠিক বলে মনে করেছেন। (উসুদুল গাবা ১/২৫৭, আল-ইসাবা- ১/২১৩, তাহজীবুল আসমা ওয়া আল-লুগাত- ১/১৪৪) পিতা ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর এবং মাতা নাসীবা বিনতু উকবা। তাঁর বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ হারাম ইবন কা’ব- এর মাধ্যমে পিতা-মাতা উভয়ের বংশ একত্রে মিলিত হয়েছে। জাবিরের পিতৃবংশের উর্ধ্বতন পুরুষ সালামা-র বংশধরগণ মদীনার হাররা ও মসজিদে কিবলাতাইন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে তাঁর নিজ গোত্র বনু হারামের বসতি ছিল কবরস্থান ও ছোট্ট একটি মসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে। তাঁর পিতা ’আবদুল্লাহ ইবন আমর ছিলেন শেষ ’আকাবায় মনোনীত অন্যতম ‘নাকীব’। (তাবাকাত- ৩/৬২০, ৬৬১, উসুদুল গাবা- ১/২৫৬) জাবিরের দাদা ’আমর ছিলেন তাঁর খান্দানের রয়িস বা নেতা। ‘আয়নুল আরযাক’ নামক যে কুয়োটি মারওয়ান ইবন হাকাম হযরত মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতকালে সংস্কার করেন, সেটা ছিল তাঁরই মালিকানায়। বনু সালামার কয়েকটি দুর্গ ছাড়াও জাবির ইবন ’আতীকের নিকটবর্তী আরও কয়েকটি দুর্গ তারই অধীনে ছিল। ’আমরের মৃত্যুর পর এ সকল সম্পদের মালিক হন তাঁর পুত্র ’আবদুল্লাহ। এই ’আবদুল্লাহর পুত্র জাবির চৌত্রিশ (৩৪) ’আমুল ফীল (হাতীর বছর) মুতাবিক ৬১১ মতান্তরে ৬০৭ খৃস্টাব্দে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম- ২/৯২, সীয়ারে আনসার- ১/২৯৪) সর্বশেষ ’আকাবার বাই’য়াতে পিতা ’আবদুল্লাহর সাথে জাবিরও অংশগ্রহণ করেন। হতে পারে, তিনি এই বাই’য়াতের সময় অথবা এর পূর্বেই মদীনায় মুসয়াব ইবন ’উমাইরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বাই’য়াতের পর রাসূল সা. তাঁর পিতাকে বনু সালামা-র নাকীব বা দায়িত্বশীল মনোনীত করেন। জাবির বলেন, আমি ছিলাম এই ‘আকাবার কনিষ্ঠতম ব্যক্তি। ইবন সা’দের বর্ণনামতে এই সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ অথবা উনিশ বছর। ইবনুল আসীর বলেন, জাবির তখন একজন বালকমাত্র। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৮, ২৪৯, ২৫২, তাবাকাত- ৩/৫৬১, উসুদুল গাবা- ১/২৫৭, তাবাকাত আল-মাশাহীর ওয়া আল-আ’লাম- ১/১৮১) জাবির বদর ও উহুদ যুদ্ধ ছাড়া আর সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগদান করেন। বদর ও উহুদে তাঁর যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। ইবন ’আসাকির তাঁর তারীখে একটি বর্ণনা সংকলন করেছেন। জাবির বলতেন, আমি বদরের দিন আমার পিতার জন্য অঞ্চলি ভরে পানি নিয়েছিলাম। মুহাম্মাদ ইবন সা’দ বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন উমারকে এই বর্ণনাটি শুনালাম। তিনি বললেন, এটা ইরাকীদের একটি ভিত্তিহীন ধারণা মাত্র। তিনি বদরে জাবিরের অংশগ্রহণের কথা অস্বীকার করলেন। তাছাড়া জাবির নিজেই বলতেন, আমি বদর ও উহুদে অংশগ্রহণ করিনি। আমার পিতা আমাকে বিরত রেখেছেন। এই দুইটি ছাড়া আর কোন যুদ্ধ থেকে কক্ষনও আমি পেছনে থাকিনি। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৬, উসুদুল গাবা- ১/২৫৭, তাহজীবুল আসমা ওয়া আল-লুগাত- ১/১৪৩, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১৪৩) জাবির উহুদ যুদ্ধে যোগদান করেননি। তিনি কেন যোগদান করেননি তাঁর কারণ এই বর্ণনার মধ্যে পাওয়া যায়। ইবন হিশাম বললেনঃ ‘হামরা-উল-আসাদ’ মদীনা থেকে ৮/৯ মাইল দূরে অবস্থিত একটি স্থান। কুরাইশরা উহুদ থেকে সরে গিয়ে সেখানে সমবেত হয়। এটা ছিল হিজরী ৩ সালের আট অথবা নয় শাওয়ালের ঘটনা। রাসূল সা. এ খবর পেয়ে ঘোষণা দিলেনঃ উহুদে যারা অংশগ্রহণ করেছিলে তারা ছাড়া আর সবাই শত্রুদের খোঁজে বের হয়ে পড়। লোকেরা, এমনকি উহুদের আহতরাও বের হয়ে পড়লো। সংখ্যায় তারা অনেক হয়ে গেল। জাবির রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে ’আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! গতকাল আমি জিহাদে যোগদান থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমার পিতা আমাকে বিরত রেখেছিলেন। তিনি আমাকে আমার সাতটি বোনের তদারকিতে রেখে যান। তিনি আমাকে বললেনঃ ‘বেটা, কোন পুরুষ লোক তাদের কাছে থাকবে না, এমন অবস্থায় তাদের রেখে যাওয়া তোমার ও আমার উচিত হবে না। আর আমি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে জিহাদে যাওয়ার ব্যাপারে আমার নিজের ওপর তোমাকে অগ্রাধিকার দিতে পারিনে।’ জাবির বলেন, অতঃপর রাসূল সা. আমাকে যুদ্ধে বের হওয়ার অনুমতি দান করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৭) বদর ও উহুদ ছাড়া তিনি কতগুলি যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন সে ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে। কোন বর্ণনায় উনিশটি, কোন বর্ণনায় আঠারোটি, আবার কোন বর্ণনায় সতেরোটি যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন বলে জানা যায়। (আল-আ’লাম- ২/৯২, উসুদুল গাবা- ১/২৫৭, আল ইসাবা- ১/৩১৩, তাহজীবুল আসমা- ১/১৪৩) জাবিরের পিতা ’আবদুল্লাহ উহুদ যুদ্ধে যোগ দেন এবং শহীদ হন। জাবির বলেন, উহুদ যুদ্ধের আগের রাতে আমার পিতা আমাকে ডেকে বললেন, রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে যারা প্রথম দিকে শহীদ হবে, আমি নিজেকে তাঁদের কাতারেই দেখতে চাই। রাসূলুল্লাহর সা. পরে একমাত্র তুমি ছাড়া অধিকতর প্রিয় আর কাউকে আমি রেখে যাচ্ছিনে। আমার কিছু দেনা আছে, তুমি তা পরিশোধ করে দেবে। আর তোমার বোনদের সাথে ভালো আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। জাবির বলেন, সকাল হলো, আমার পিতা হলেন প্রথম শহীদ। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯৩) সুফইয়ান ইবন ’আবদি শাম্স আস-সুলামী নামক এক কাফির জাবিরের পিতা আবদুল্লাহকে হত্যা করে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৩) কাফিররা জাবিরের পিতা ’আবদুল্লাহকে হত্যা করে তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিকৃত করে ফেলে। এই কারণে দেহের বিচ্ছিন্ন অঙ্গ একটি কাপড়ে সংগ্রহ করা হয়। জাবির লাশ দেখতে চাইলে লোকেরা তাঁকে নিষেধ করে; কিন্তু রাসূল সা. অনুমতি দান করেন। তাঁর ফুফু পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভাইয়ের এ দৃশ্য দেখে তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠেন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করেন, কে? লোকেরা বললো, ’আবদুল্লাহর বোন। তিনি বললেনঃ তোমরা কাঁদ বা না কাঁদ, যতক্ষণ লাশ না উঠাবে ফিরিশতারা ডানা দিয়ে ছায়া দিতে থাকবে। (মুসলিম- ২/৩৪৬, বুখারী- ২/৫৮৪, তাবাকাত- ৩/৫৬১) জাবিরের বোনেরা তাদের পিতার লাশ উহুদ থেকে নেওয়ার জন্য একটি উট পাঠায়। তারা ইচ্ছা করছিল, বনু সালামার গোরস্তানে তাদের পিতাকে দাফন করবে। জাবির পিতার লাশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। -এ কথা রাসূল সা. জানতে পেয়ে বললেনঃ তাঁর অন্য সব শহীদ ভাইকে যেখানে দাফন করা হয়েছে তাকেও সেখানে দাফন করা হবে। এভাবে উহুদের অন্যান্য শহীদের সাথে তাঁকেও উহুদের প্রন্তরে দাফন করা হয়। (তাবাকাত- ৩/৫৬২) একটি বর্ণনায় এসেছে, জাবির বললেনঃ আমার পিতা উহুদে শহীদ হওয়ার কবর পেয়ে আমি আসলাম। লাশটি কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। আমি কাপড় সরিয়ে তাঁর মুখে চুমু দিতে লাগলাম। রাসূল সা. দেখেছিলেন কিন্তু নিষেধ করেননি। (তাবাকাত- ৩/৫৬১) তিনি আরও বলেনঃ আমি কাঁদছিলাম। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি কাঁদছো কেন? আয়িশা তোমার মা ও আমি বাবা হই, তাতে কি তুমি খুশী নও? এ কথা বলে তিনি আমার মাথায় হাত ঘষে দেন। আজ মাথার সব চুল সাদা হয়ে গেলেও যেখানে রাসূলে সা. হাতের স্পর্শ লেগেছিল সেখানে কালো আছে। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৬) জাবির তাঁর পিতার লাশ দাফনের ব্যাপারে বললেনঃ আমি অন্য একজন শহীদের সাথে এক কবরে তাঁকে দাফন করলাম। কিন্তু তাতে আমার মন তুষ্ট হলো ন। ছয় মাস পর কবর খুড়ে লাশটি বের করলাম। দেখা গেল একমাত্র কান ছাড়া মাটি লাশ মোটেই স্পর্শ করেনি। লাশটি এমন অবিকৃত অবস্থায় আছে যেন আজই দাফন করা হয়েছে। (তাবাকাত- ৩/৫৬২, তাহজীবুল আসমা- ১/১৪৩, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯২) জাবির বললেনঃ এর চল্লিশ বছর পর মু’য়াবিয়া যখন উহুদে কূপ খনন করায় তখন সেখানে সমাহিত কতিপয় শহীদের সাথে আমার পিতার লাশটিও উঠে আসে এবং তা সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় ছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯৩) একটি বর্ণনায় এসেছে, উহুদে জাবিরের পিতা শহীদ হলে আল্লাহ তাঁকে জীবিত করে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আবদুল্লাহ, তুমি কি চাও?’ তিনি বললেন, আমি দুনিয়ায় ফিরে যেতে চাই এবং আবার শহীদ হতে চাই। (তাহজীবুল আসমা- ১/১৪৩) জাবিরের পিতা ছিলেন একজন ঋণগ্রস্ত মানুষ। তাঁর মৃত্যুর পর জাবির এই সব ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়লেন। কিভাবে তা পরিশোধ করবেন, এই চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন। সম্পদের মধ্যে মাত্র দুইটি বাগিচা। তার সব ফলও ঋণ পরিশোদের জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ছুটে গেলেন এবং পাওনাদার ইহুদীদের ডেকে কিছু মওকুফ করিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। রাসূল সা. পাওনাদারদের ডেকে জাবিরের বক্তব্য পেশ করলেন। যেহেতু তারা ছিল ইহুদী, তাই তারা রাসূলুল্লাহর সা. আবেদনে সাড়া দিলনা। তিনি তাদেরকে অর্ধেক করে দুই বছরে দুইটি কিস্তিতে গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। তারা তাতেও রাজী হলো না। তখন তিনি জাবিরকে বললেন, আমি অমুক দিন তোমার বাড়ীতে যাব। তিনি নির্ধারিত দিনে উপস্থিত হলেন এবং অজু করে দুই রাকায়াত নামায আদায় করলে। তারপর তাবুতে এসে স্থির হয়ে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আবু বকর ও উমার উপস্থিত হলেন। রাসূল সা. খেজুর স্তূপ করে ভাগ করার নির্দেশ দিলেন এবং তিনি একটি স্তূপের ওপর উঠে বসলেন। জবির ভাগ শুরু করলেন, আর রাসূর সা. বসলেন দু’আ করতে। আল্লাহর ইচ্ছায় ঋণ পরিশোধের পরেও অনেক অবশিষ্ট থেকে গেল। জাবির খুব খুশী হয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বললেন, ঋণ পরিশোধ হয়েছে এবং এত পরিমাণ অবশিষ্ট আছে। রাসূল সা. আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করেন। আবু বকর ও উমার রা. দুইজনই খুব খুশী হলেন। (বুলুগুল আমানী মিন আসরারি ফাতহির রাব্বানী- ২২/২০৮, ২০৯, তাবাকাত- ৩/৫৬৪, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬৩১) হিজরী পঞ্চম সনে ‘জাতুর রুকা’ যুদ্ধে জাবির যোগ দেন। তিনি একটি উৎকৃষ্ট উটের ওপর সাওয়ার ছিলেন। চলতে চলতে উটটি হঠাৎ থেমে যায়। জাবির তাকে উঠিয়ে চালাবার চেষ্টা করছেন, এমন সময় পেছন থেকে রাসূলুল্লাহর সা. কণ্ঠস্বর ভেসে এলঃ জাবির কী হয়েছে? বললেন, উট চলছে না। রাসুল সা. নিকটে এসে উটের গায়ে চাবুকের একটি ঘা মারেন। সাথে উটটি দ্রুত চলতে থাকে এবং সবার আগে চলে যায়। জাবির রাসূলুল্লাহর সা. পাশ দিয়ে উটের খোঁজে যাচ্ছেন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? বললেন, উট হারিয়ে গেছে। রাসূল সা. বললেনঃ এই যে, এই দিকে তোমার উট, যাও নিয়ে এস। জাবির দৌড়ালেন সেই দিকে; কিন্তু বহু খোঁজাখুজির পরও না পেয়ে ফিরে এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ সা. পেলাম না। রাসূল সা. দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার একই কথা বললেন এবং জাবিরও প্রত্যেক বারই ফিরে আসলেন। অবশেষে রাসূল সা. জাবিরকে হাত ধরে উটের কাছে নিয়ে গেলেন এবং উটটি ধরে জাবিরকে বললেন, এই ধর তোমার উট। ইত্যবসরে কাফিলার লোকেরা অনেক দূর চলে গিয়েছিল। জাবির তাঁর উটের ওপর সাওয়ার হতেই উটটি এত দ্রুত গতিতে চললো যে, সবার আগেই পৌঁছে গেল। রাসূল সা. জাবিরের নিকট থেকে উটটি খরীদ করার প্রস্তাব করেন। জাবির মূল্য ছাড়াই বিক্রি করতে রাজী হন। রাসূল সা. বললেন, না তা হবে না, মূল্য তোমাকে নিতে হবে এবং মদীনা পর্যন্ত এর ওপর সাওয়ার হয়ে যাবে। এ ভাবে পথে উট কেনা বেচা হয়ে গেল। মদীনা পৌঁছে জাবির উট নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. দরযায় হাজির হলেন। রাসূল সা. উটটি ঘুরে ঘুরে দেখলেন আর বললেনঃ খুব সুন্দর। তারপর বিলালকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, এক উকিয়া সোনা ওজন করে দাও এবং একটু বেশী দাও। অতঃপর রাসূল সা. জাবিরকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি উটের দাম পেয়েছেন কিনা। জাবির বললেন, হাঁ, পেয়েছি। তখন রাসূল সা. জাবিরের হাতে উটটি তুলে দিয়ে বললেনঃ এই উট ও মূল্য দুইটিই নিয়ে যাও, সবই তোমার। জাবির খুব খুশী মনে উটসহ বাড়ী ফেরেন এবং ফুফুকে বলেন, দেখুন রাসূল সা. আমাকে এক উকিয়া সোনা এবং উটটিও দান করেছেন। (বুলুগুল আমানী মনি আসরারি ফাতহির রাব্বানী- ২২/২০৯, ২১০) উপরোক্ত উটের ঘটনাটি বিভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন রকম বর্ণিত হয়েছে। ইবন ’আসাকির তাঁর তারীখে উট কেনা বেচার ঘটনাটি জাবির থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূল সা. বললেন, জাবির এই উটটি আমার নিকট বিক্রি করবে? – হাঁ, করবো। – কত দামে? – এক দিরহামে। – এক দিরহামে একটি উট কেনা যায়? – তাহলে দুই দিরহামে। – না, আমি চল্লিশ দিরহামে তোমার উটটি কিনলাম এবং আল্লাহর রাস্তায় তোমাকে আমি ওর পিঠে চড়াবো। তারপর পূর্বে উল্লেখিতভাবে মদীনায় পৌঁছে উট কেনা-বেচার বাকী কাজ সম্পন্ন হয়। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৭)। মূল্যের অতিরিক্ত যে অর্থ জাবিরকে দেওয়া হয় তা ছিল রাসূলুল্লাহর সা. দান। এ কারণে জাবির সেই অর্থ ভিন্ন একটি থলিতে ভরে ঘরে হিফাজতে রেখে দেন। হাররা-র ঘটনার দিন শামবাসীরা তাঁর বাড়ীতে হামলা চালিয়ে অন্যান্য জিনিসের সাথে সেই থলিটিও লুট করে নিয়ে যায়। (মুসনাদ- ৩/৩০৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৬, ২০৭) উল্লেখ্য যে, ইয়াযীদ ইবন মু’য়াবিয়ার শাসন আমলে একবার মদীনায় ব্যাপক গণহত্যা ও লুটতরাজ হয়। এই চরম সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নায়ক ছিল মুসলিম ইবন ’উকবা আল-মুররী, মদীনাবাসীরা তাকে বলতো মুসরিফ ইবন ’উকবা। এর কারণ হলো, মদীনাবাসীরা ইয়াযীদ ইবন মু’যাবিয়াকে খলীফা বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাঁর নিয়োগকৃত গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হাকামকে মদীনা থেকে তাড়িয়ে দেয় এবং তাঁর স্থলে ’আবদুল্লাহ ইবন হানজালাকে নিজেদের আমীর মনোনীত করে। অবশ্য এ কাজের সাথে সে সময়ে জীবিত কোন বিশিষ্ট সাহাবী একমত ছিলেন না। হযরত জাবির তখন অন্ধ। তিনি মদীনার রাস্তাঘাটে বেড়াতেন, তাঁরই সামনে বাড়ী-ঘর লুট হতো ও সন্ত্রাসী কাজ চলতো। তিনি মৃতদেহের সাথে হোঁচট খেতেন, আর বলতেন যারা রাসূলুল্লাহকে সা. ভয় দেখাচ্ছে, তাদের জন্য ধ্বংস। মূলতঃ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. এই বাণীর প্রতি ইঙ্গিত করতেনঃ ‘যে মদীনাকে ভয় দেখাবে প্রকৃতপক্ষে সে আমার দুই পার্শ্বদেশের মধ্যে যা আছে তাকেই ভয় দেখাবে।’ সন্ত্রাসীরা তাঁকে হত্যার জন্য ধরে নিয়ে যায়। তবে মারওয়ান নিজে তাঁকে নিরাপত্তা দান করে নিজ বাড়ীতে আশ্রয় দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৭, টীকা নং ৫) জাবির বলেন, রাসূলুল্লাহর সা. দানকৃত উটটি আমার নিকট খলীফা ’উমারের খিলাফতকাল পর্যন্ত ছিল। তিনি সেটা আমার নিকট থেকে নিয়ে সাদাকার উটের সাথে দিয়ে তাকে ভালো খাবার ও সুস্বাদু পানি দেওয়ার নির্দেশ দান করেন। (তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৮৭) ‘জাতুর রুকা’ যুদ্ধের পর হিজরী পঞ্চম সনেই খন্দকের যুদ্ধ হয়। জাবির বলেন, আমরা খন্দক খনন করছিলাম। এক সময় একটা কঠিন পাথর আমাদের সামনে পড়লো যা কোন ভাবেই আমরা কাটতে পারছিলাম না। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সা. কে অবহিত করা হলো। তিনি বললেন, আমি নেমে দেখছি। রাসূল সা. একটি বড় কুড়াল নিয়ে আঘাত করলে পাথরটি চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩২০, ২/১৯১) রাসুল সা. কুড়াল নিয়ে পাথর সরানোর জন্য যখন আসেন, জাবির তখন দেখেন ক্ষুধার জ্বালায় তিনি পেটে পাথর বেঁধে রেখেছেন। (বুখারী- ২/৫৮৮, ৭৮৯) এ দৃশ্য দেখে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়ীতে যান এবং স্ত্রীকে বলেন, আজ আমি এমন এক দৃশ্য দেখেছি, যাতে ধৈর্য ধারণ করা যায় না। ঘরে কিছু থাকলে রান্না কর। তিনি ছাগলের একটি বাচ্চা জবেহ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বাড়ীতে একটু আসুন এবং যা কিছু আছে তাই একটু খেয়ে নিন। রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীতে তিনদিন যাবত কোন খাবার ছিল না। তিনি দাওয়াত কবুল করলেন। শুধু কবুল নয় তিনি খন্দকে কর্মরত সকলের মাঝে সাধারণ ঘোষণাও দিয়ে দিলেন যে, জাবির তোমাদের সকলকে খাবারের দাওয়াত দিয়েছে। জাবির তো শুধু রাসূল সা. ও সেই সাথে অতিরিক্ত দুই তিন জনের খাবার প্রস্তুত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহর সা. এই ঘোষণা শুনে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন; কিন্তু আদব ও ভদ্রতার খাতিরে চুপ থাকলেন। রাসূল সা. খন্দকবাসীদের সংগে করে জাবিরের বাড়ীতে পৌঁছালেন এবং সেই প্রস্তুত খাবার সকলে পেট ভরে খাবার পরেও কিছু বেঁচে গেল। (বুখারী- ২/৭৮৯) রাসূল সা. জাবিরের স্ত্রীকে বললেন, বেঁচে যাওয়া খাবার তোমরা খাও এবং অন্য লোকদের কাছেও কিছু পাঠিয়ে দাও। কারণ, তারা অভুক্ত আছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২১৮, ২১৯, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৯১, ১৯২, ১৯৩) হিজরী ষষ্ঠ সনে বনু মুসতালিকের যুদ্ধ হয়। রাসূল সা. যাত্রার উদ্দেশ্যে বের হয়ে নামায পড়তে লাগলেন। এর পূর্বেই তিনি জাবিরকে কোন কাজে কোথাও পাঠিয়েছিলেন। জাবির ফিরে এলে রাসুল সা. রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দান করেন। বনু মুসতালিকের পর আনমারের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধেও জাবির শরীক ছিলেন। (বুখারী, গুযওয়াতু আনমার) এই বছরই হযরত রাসূলে কারীম সা. ’উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় রওয়ানা হলেন। জাবির বলেন, এই সফরে আমরা মোট চৌদ্দশত লোক ছিলাম। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩০৯) বাই’য়াতুর রিদওয়ানের প্রসিদ্ধ ঘটনা এই সফরেই ঘটে। হযরত জাবিরও বাই’য়াতের (শপথ) সৌভাগ্য অর্জন করেন। বাই’য়াতের সময় ’উমার রাসূলুল্লাহর সা. হাত এবং জাবির ’উমারের হাত ধরে রেখেছিলেন। (মুসনাদ- ৩/৩৬৯) জাবির বলেন, একমাত্র আল-জাদ্দু ইবন কায়স ছাড়া আর সকলেই বাই’য়াত করেছিল। আল্লাহ রকসম, আমি যেন আজও দেখতে পাচ্ছি, সে তার উটের বগলের সাথে মিশে লুকিয়ে আছে, যাতে কেউ দেখতে না পায়। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩১৬) জাবির যখন রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করছিলেন তখন রাসূল সা. বলেছিলেনঃ তোমরা সারা দুনিয়ার মধ্যে উত্তম ব্যক্তি। (বুখারী, গুযওয়াতু হুদাইবিয়া) এই বাই’য়াত সম্পর্কে অন্যান্য সাহাবীরা পরবর্তীকালে বলতেন, আমরা মৃত্যুর ওপর বাই’য়াত করেছিলাম। কিন্তু জাবির বলতেন, আমরা মৃত্যুর ওপর বাই’য়াত করিনি। আমরা বাই’য়াত করেছি এই কথার ওপর যে, আমরা পালিয়ে যাব না। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩১৫) সাহাবিরা হুদাইবিয়া থেকে চলা শুরু করেন। পথে ‘সুকইয়া’ নামক স্থানে যাত্রা বিরতি হয়। সেখানে পানি ছিল না। হযরত মু’য়াজ ইবন জাবালের রা. মুখ দিয়ে ঘোষণা হলো- কেউ যদি পানি পান করাতো। ঘোষণা শুনে জাবির রা. কয়েকজন আনসারকে সংগে করে পানির সন্ধানে বের হলেন। তেইশ মাইল দূরে ‘কুরসায়া’ নামক স্থানে পানির সন্ধান পান। সেখানে থেকে মশকে ভরে পানি আনেন। ‘ঈশার নামাযের পর দেখেন, এক ব্যক্তি উটে সাওয়ার হয়ে হাউজের দিকে যাচ্ছে। তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে কারীম সা.। জাবির রা. রাসূলুল্লাহর সা. উটের লাগাম টেনে ধরে উট বসিয়ে দেন। রাসূল সা. নেমে নামায আদায় করেন। জাবির নিজেও রাসূলে সা. পাশে দাঁড়িয়ে নামাযে শরীক হন। (মুসনাদ- ৩/৩৮০) হিজরী অষ্টম সনে রাসূলুল্লাহ সা. উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে একটি বাহিনী পাঠান। এই বাহিনীর আমীর ছিলেন আবু ’উবাইদা। ইসলামের ইতিহাসে এই অভিযান ছিল একটি আশ্চর্যজনক পরীক্ষা। মুসলমানরা এ পরীক্ষায় পূর্ণরূপে কামিয়াব হয়। জাবিরও ছিলেন এই বাহিনীর একজন সদস্য। বাহিনীর লোকদের খাদ্য খাবার সব শেষ হয়ে গেল। তারা গাছের পাতা খাওয়া শুরু করলো। হঠাৎ একদিন তারা সাগর তীরে বিশাল এক মরা মাছ দেখতে পেল। লোকেরা আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ মনে করে মাছটি খাওয়া শুরু করলো। মাছটি এত বড় ছিল যে, বাহিনীর আমীর মাছটির পাঁজরের একটি কাটা সোজা করে ধরেন এবং তার নীচ দিয়ে সবচেয়ে উঁচু উটটি পার হয়ে গেল। জাবির পাঁচজন লোকের সাথে মাছটির একটি চোখের গর্তের মধ্যে বসে পড়েন; কিন্তু তাতে তাঁদের কোন কষ্ট হলো না। তিন শো লোক পনেরো দিন পর্যন্ত মাছটি খেয়েছিল। মাটির নাম ছিল ’আম্বর। (মুসনাদ আহমাদ- ৩/৩০৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/২০৮, ২০৯, ৩/৩৬৯, ৬৪০) সীরাত লেখকরা হুনাইনও তাবুক অভিযানে জাবিরের যোগদানের কথা উল্লেখ করেছেন। হিজরী দশম সনে বিদায় হজ্জেও তিনি শরীক ছিলেন। (মুসনাদ- ৩/৩৪৯, ২৯২) তবে তিনি খাইবার অভিযানে অনুপস্থিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও রাসূল সা. তাঁকে অংশগ্রহণকারী লোকদের সমান গনীমাতের অংশ দান করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৪৯) হিজরী ৩৭ সনে হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার রা. মধ্যে সংঘটিত সিফফীনের যুদ্ধে জাবির আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করেন। (উসুদুল গাবা- ১/২৫৭) হিজরী ৪০ সনে আমীর মু’য়াবিয়ার গভর্নর (আমিল) বুসর ইবন আরতাত হিজায ও ইয়ামনে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আসেন এবং মদীনায় এক ভাষণ দান করেন। ভাষণে তিনি বলেন, যতক্ষণ জাবির আমার সামনে হাজির না হবে ততক্ষণ বনু সালামাকে আমান বা নিরাপত্তা দেওয়া হবে না। জাবির জীবনের আশংকা করছিলেন। তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামার রা. নিকট গিয়ে পরামর্শ করেন। উম্মু সালামা তাঁকে বলেন, আমি আমার ছেলেদেরকেও বাই’য়াত (আনুগত্যের শপথ) করতে বলেছি, তুমিও বাই’য়াত করে নাও। জাবির বলেন, এটা তো হবে গোমরাহীর ওপর বাই’য়াত। উম্মু সালামা বলেন, না, এটা হবে মজবুরী বা বাধ্য অবস্থার বাই’য়াত। আমার মত এটাই। তাঁর পরামর্শ মত জাবির বুসরের সামনে হাজির হন এবং হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার খিলাফতের সপক্ষে বাই’য়াত করেন। হিজরী ৭৪ সনে হাজ্জাজ ছিলেন মদীনার গভর্নর। তাঁর যুলুম অত্যাচার থেকে সাহাবীরাও নিরাপদ ছিলেন না। তিনি কিছু সংখ্যক সাহাবীর ওপর এতটুকু করুণা করেন যে, তাঁদের ঘাড়ে, আর জাবিরের হাতে সীল মোহর মেরে দেন। (উসুদুল গাবা- ২/৩৬৬) শেষ জীবনে জাবির বলতেন, আমি আকাবায় উপস্থিত ছিলাম। হাজ্জাজ ও তার কর্মকাণ্ডও প্রত্যক্ষ করেছিল। আমার চোখের মত কান দু’টিও যদি নষ্ট হয়ে যেত, কতই না ভালো হতো। তাহলে অনেক কিছুই আমাকে শুনতে হতো না। হাজ্জাজ বলতেন, জাবিরের এই কথা যখন আমার কানে গেল তখন তাঁকে হত্যা না করার যে অনুশোচনা অনুরূপ অনুশোচনা অন্য কোন ব্যাপারে আমার হয়নি। এ কথা শুনে ‘আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. তাকে বলেন, তাহলে আল্লাহ তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৯) হযরত জাবির শেষ জীবনে অত্যন্ত দূর্বল হয়ে পড়েন। চোখেও দেখতেন না। তার ওপর সরকারের জুলুম অত্যাচার তাঁকে আরও কাহিল করে দেয়। তাঁর মৃত্যুসন ও মৃত্যুর সময় বয়স কত হয়েছিল সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। মৃত্যুসন হিজরী ৭৮, ৭৭, ৭৪ অথবা ৭৩ বলা হয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ৭৮ সনে ৯৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তিনি ছিলেন তৃতীয় আকাবায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশেষ দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী। (শাজারাতুজ জাহাব ফীমান জাহান- ১/৮৪, তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৮৬, আল ইসাবা- ১/২৪৮) ওয়াকিদী বলেন, জাবির ছিলেন মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি। কাতাদাহও এই মত সমর্থন করেছেন। ইমাম বাগাবী বলেন, এটা একটা ভিত্তিহীন ধারণামাত্র। প্রকৃপক্ষে সাহল ইবন সা’দই দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী মদীনার সর্বশেষ সাহাবী। তিনি হিজরী ৯১ সনে মারা যান। (আল ইসাবা- ১/২১৩, শাজারাতুজ জাহাব- ১/৪, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৮) তৃতীয় আকাবায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে এ সময় পর্যন্ত একমাত্র জাবিরই জীবিত ছিলেন। আর সাহাবীদের যুগও তখন শেষ হতে চলেছিল, অল্প সংখ্যক সাহাবী জীবিত ছিলেন। এই কারণে তাৎকালীন মুসলিম উম্মাহর জন্য তাঁর অস্তিত্ব ছিল রহমত ও বরকতস্বরূপ। হাজ্জাজের যুলুম অত্যাচার তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং নিজেও সহ্য করেছিলেন। তাই মৃত্যুর পূর্বে অসীয়ত করে যান যে, হাজ্জাজ যেন তাঁর জানাযার নামায না পড়ায়। এ কারণে হযরত ’উসমানের ছেলে আবার ইবন ’উসমান জানাযার নামায পড়ান। ইমাম বুখারী ও তাবারী তাদের তারীখে উল্লেখ করেছেন যে, হাজ্জাজ তাঁর জানাযার অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে তাহজীবুত তাহজীব গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, হাজ্জাজেই জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন। (আল ইসাবা- ১/২১৩, তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৯১) হযরত জাবির পিতার শাহাদাতের পর এক সতীচ্ছদা (সায়িবা) মহিলাকে বিয়ে করেন। এ সম্পর্কে মুসনাদে আহমাদ ও বুখারীতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একবার রাসূলুল্লাহর সা. সাথে জাবির এক সফর থেকে ফিরছিলেন। মদীনার কাছাকাছি পৌঁছলে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ’আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি নতুন বিয়ে করেছি। আপনি অনুমতি দিলে আমি একটু তাড়াতাড়ি পরিবারের সাথে মিলিত হতে পারি। রাসূল সা জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি বিয়ে করেছো? তিনি বললেনঃ হাঁ। আবার প্রশ্ন কররেনঃ কুমারী না (সাহিয়্যবা) সতীচ্ছদা মহিলা? বললেনঃ সতীচ্ছদা। রাসূল সা. তখন বললেনঃ তুমি একটি কুমারী মেয়ে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তোমরা পরস্পর খেল তামাশা করতে পারতে। জাবির বললেন, আমার পিতা উহুদে শহীদ হন এবং আমার ওপর কতকগুলি ছোট মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে যান। আমি তাদেরই মত কাউকে বিয়ে করতে চাইনি। আমার প্রয়োজন ছিল কোন বয়স্কা মহিলার যে তাদের চিরুনী করে দিতে পারে, বেনী বাঁধতে পারে এবং কাপড় সেলাই করে পরিয়ে দিতে পারে। তাঁর কথা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ তুমি ঠিক কাজটি করেছ। (বুলগুল আমানী মিন আসরারি ফাতহির রাব্বানী- ৬/১৪৬, ২২/২০৯, বুখারী- ২/৫৮০, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৭)। বনু সালামা গো্ত্রে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ইসলামে পাত্রী দেখে বিয়ের বিধান দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তিনি বিয়ের পয়গামের পর লুকিয়ে পাত্রী দেখে নেন। প্রথম স্ত্রীর নাম সুহাইলা বিনতু মাসউদ। তিনি বনু জুফার গোত্রের কন্যা ও সাহাবিয়্যা ছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম উম্মুল হারিস। তিনি আউস গোত্রের সম্মানিত সাহাবী মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার কন্যা। তাঁর সন্তানদের মধ্যে ’আবদুর রহমান, ’আকীল, মুহাম্মাদ, হামীদা, মায়মুনা ও উম্মু হাবীব এই কয়জনের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। হযরত জাবিরের জ্ঞান অর্জনের সূচনা হয় হযরত রাসূলে কারীমের সা. দারসগাহ বা শিক্ষা নিকেতনে। তাছাড়া মাদ্রাসা-ই-নববীর কৃতি ছাত্রদের হালকা-ই-দারস থেকেও ইলম হাসিল করেন। আবু বকর সিদ্দীক, ’উমার, আলী, আবু ’উবাইদা, তালহা, মু’য়াজ ইবন জাবাল, ’আম্মার ইবন ইয়াসির, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ, আবু বারদাহ ইবন নাযার, আবু কাতাদাহ, আবু হুরাইরা, আবু সা’ঈদ আল-খুদরী, আবু হুমাইদ সা’ঈদী, ’আবদুল্লাহ ইবন উনাইস উম্মু, শুরাইক, উম্মু মালিক, উম্মু মুবাশশির, উম্মু কুলসুম বিনতু আবী বকর রা.- এই মহান ব্যক্তিবর্গের সকলেই ছিলেন তাঁর সম্মানিত শিক্ষক। (তাহজীবু আসমা ওয়াল লুগাত- ১/১৪২) হাদীস শোনা ও সংগ্রহের প্রতি তাঁর আগ্রহ এত প্রবল ছিল যে, একটি মাত্র হাদীস শোনার জন্য মাসের পর মাস ভ্রমণ করতেন। জাবির বলেনঃ খোদ রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছিল এমন এক ব্যক্তির বর্ণিত একটি হাদীস আমি পেলাম। অতঃপর আমি একটি উট খরীদ করে প্রস্তুত করলাম এবং তার ওপর সাওয়ার হয়ে এক মাস পর শামে (সিরিয়া) পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি তিনি ’আবদুল্লাহ ইবন উনাইস। আমি তাঁর দারোয়ানকে বললামঃ বল, জাবির দরযায় দাঁড়িয়ে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ ’আবদুল্লাহর ছেলে জাবির? বললামঃ হাঁ। তিনি কাপড় টানতে টানতে ছুটে এসে আমার সাথে কোলাকুলি করলেন। বললামঃ কিসাস- এর ব্যাপারে আপনি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে একটি হাদীস শুনেছেন বলে আমি জেনেছি। হাদীসটি আপনার মুখ থেকে শোনার আগেই আমি অথবা আপনি মারা যান কিনা, এই ভয়ে ছুটে এসেছি। তারপর আবদুল্লাহ ইবন উনাইস তাঁর কাছে হাদীসটি বর্ণনা করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৬) এমনিভাবে একটি মাত্র হাদীস শোনার জন্য তিনি মিসর সফর করেন। মাসলামা ইবন মুখাল্লাদ রা. থেকে তাবারানী তাঁর ‘আল-আসওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে। তিনি বলেনঃ আমি যখন মিসরে তখন একদিন দারোয়ান এসে বললো, একজন বেদুঈন উটের পিঠে দরযায় অপেক্ষমান, আপনার সাথে দেখা করতে চায়। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ কে আপনি? বললেনঃ জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ আল-আনসারী। আমি বললামঃ আমি নিচে আসবো না আপনি উপরে উঠে আসবেন। বললেনঃ আপনার নেমে আসার দরকার নেই, আর আমিও উঠবো না। শুনেছি আপনি ‘সাতরুল মুমিন’ সম্পর্কিত একটি হাদীস রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করে থাকেন, আমি সেই হাদীসটি আপনার মুখ থেকে শোনার জন্যই এসেছি। আমি হাদীসটি বর্ণনা করলাম। হাদীসটি শুনেই তিনি উটকে চাবুক মেরে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৭, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৬, সীয়ারে আনসার- ১/৩০১) ইল্ম হাসিলের পর্ব শেষ করে তিনি তাদরীসের (শিক্ষাদান) আসনে বসেন। মসজিদে নববীতে তাঁর একটি হালকা-ই-দারস ছিল। (আল-আ’লাম- ২/৯২) মক্কা, মদীনা, ইয়ামন, কুফা, বসরা, মিসর প্রভৃতি স্থানের ছাত্ররা তাঁর দারসে শরীক হতো। হাদীসের প্রচার ও প্রসার ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি প্রচুর সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা- ১৫৪০ (এক হাজার পাঁচ শো চল্লিশ)। তার মধ্যে ৬০ টি (ষাট) মুত্তাফাক ’আলাইহি, ২৬ টি (ছাব্বিশ) বুখারী ও ১২৬ টি (একশো ছাব্বিশ) মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/১৪২, আল-আ’লাম- ২/৯২) তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যেমনঃ একটি হাদীস বর্ণনাকালে ‘সামি’তু’ (আমি শুনেছি) শব্দটি বলতে গিয়ে থেমে যান। পরে নিজের পক্ষ থেকে হাদীসটি ‘মাওকূফ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ, হাদীসটির সবগুলি শব্দ তিনি নিজ কানে রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শোনার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেননি। (মুসনাদ- ৩/৩৩৩) তাঁর ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাবে’ঈদের সব ক’টি স্তরের বিশিষ্ট মুহাদ্দিসীন তাঁর ছাত্র ছিলেন। বিশেষ খ্যাতিমান কয়েকজন তাবে’ঈর নামঃ সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, আবু সালামা, সা’ঈদ ইবন মীনা, সা’ঈদ ইবন আবী বিলালম, আসিম ইবন উমার ইবন কাতাদাহ, আবু আয-যুবাইর, মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির, আশ-শা’বী, আবু সুফইয়ান তালহা ইবন নাফি, আল-হাসান আল-বাসরী, মুহাম্মাদ আল-বাকি, ’আতা’, সালিম ইবন আবী জু’দ, ’আমর ইবন দীনার, মুজাহিদ, মুহাম্মাদ আল-বাকির, আল-হাসান ইবন মুহাম্মাদ আল-হানাফিয়্যা প্রমুখ। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪, তাহজীবুল আসমা’ ওয়ালগাত- ১/১৪৪) তবে’ঈরা ছাড়াও সাহাবীদের বিরাট একটি দল তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল-আ’লাম- ২/৯২) আল্লামা জাহ্বী তাঁর ‘তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ’ গ্রন্থে প্রথম তবকার (শ্রেণী) মুহাদ্দিসীনের মধ্যে জাবিরের নামটি উল্লেখ করেছেন। হাদীস ছাড়া তাফসীর ও ফিকাহ শাস্ত্রেও তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। তাফসীর শাস্ত্রে তাঁর বর্ণনা কম পাওয়া গেলেও যা আছে তা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। সব মানুষের জাহান্নামে অবতরণের ব্যাপারে লোকদের মতভেদ ছিল। কেউ কেউ মনে করতো, কোন মুসলমান জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। অনেকের ধারণা ছিল, সব মানুষই একবার জাহান্নামে যাবে, তবে মুসলমানরা মুক্তি পাবে। এ ব্যাপারে জাবিরকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, নেককার ও বদকার উভয়ই জাহান্নামে যাবে। তবে নেককারদের গায়ে আগুনের ছোঁয়া লাগবে না। তারপর মুত্তাকীরা (খোদাভীরু) মুক্তি পাবে এবং যালিমরা জাহান্নামেই থেকে যাবে। (মুসনাদ- ৩/৩২৯) তালাক ইবন হাবীব ‘শাফা’য়াত’ (সুপারিশ) অস্বীকার করতেন। এ ব্যাপারে তিনি ‘খুলুদ ফিন্নার’ (অনন্তকাল জাহান্নামে অবস্থান) সম্পর্কিত যাবতীয় আয়াত তিলাওয়াত করে জাবিরের সাথে মুনাজিরা ও তর্ক-বাহাছ করেন। হযরত জাবির তাঁর সব কথা শোনার পর বললেনঃ সম্ভবতঃ তুমি নিজেকে কুরআন-হাদীসের জ্ঞানে আমার চেয়ে বড় জ্ঞানী মনে করছো। তালাক ইবনহাবীব বললেনঃ আসতাগফিরুল্লাহ! এমনটি কল্পনাও করতে পারিরেন। তখন জাবির বলেন, শোন! এ সব আয়াতের উদ্দেশ্য মুশরিকগণ। যাদেরকে শাস্তি দেওয়ার পর জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে তাদের উল্লেখ এ সব আয়াতে নেই। তবে রাসূলুল্লাহ সা. হাদীসে তাদের কথা উল্লেখ করেছেন। (মুসনাদ- ৩/৩৩০, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৯) জাবির বললেনঃ সূরা আল মুয্যাম্মিলের প্রথম দুইটি আয়াত দ্বারা আমাদের ওপর ‘কিয়ামুল লাইল’ ফরয করা হয়। রাতে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমাদের পা ফুলে যেত। পরে আল্লাহ একই সূরার ২০ নং আয়াত নাযিল করে পূর্বোক্ত আদেশ রহিত করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৪১) জাবিরের মতে কুরআনের সর্বপ্রথম যে আয়াত নাযিল হয় তা সূরা আল মুদ্দাস্সিরের কয়েকটি আয়াক। (আনসাবুল আশরাফ- ১/১০৭) ফিকাহ শাস্ত্রেও তাঁর প্রভূত দখল ছিল। যে সব মাসয়ালা সমূহে বিভিন্ন সময়ে তিনি ফাতওয়া দিয়েছেন তা সংকলিত হলে ছোটখাট একটা গ্রন্থে পরিণত হবে। তিনি ছিলেন মদীনার অন্যতম মুফতী। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৫৫) ইসলামী আখলাক বা নৈতিকতার মূল ভিত্তি হচ্ছে ইকামাতে হুদুদিল্লাহ (আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন), ঈমানী আবেগ, সত্য প্রকাশের সৎ সাহস, আমর বিল মা’রূফ (সৎ কাজের আদেশ), রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি ভালোবাসা, ইত্তেবা-ই-সুন্নাত (সুন্নাতের অনুসরণ), অন্য মুসলমানের প্রতি দরদ ও সহানুভূতি ইত্যাদি। হযরত জাবিরের মধ্যে এই সব গুণের প্রত্যেকটির কিছু না কিছু বিকাশ ঘটেছিল। ইকামাতে হুদুদিল্লাহ প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয। এ ক্ষেত্রে জাবিরের নিকট আপন-পর কোন প্রভেদ ছিল না্ হযরত মা’য়িয আল-আসলামী রা. ছিলেন মদীনার বাসিন্দা ও রাসূলুল্লাহর সা. অন্যতম সাহাবী। তাঁকে ‘রজম’ (যিনার শাস্তি) করার সময় জাবির উপস্থিত থেকে নিজ হাতে তাঁদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করেন। (মুসনাদ- ৩/৩৮১) সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কারও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাঁকে কক্ষণও বিরত রাখতে অথবা বিপথগামী করতে সক্ষম হয়নি। হযরত সা’দ ইবন মু’য়াজ রা. ছিলেন আউস গোত্রের নেতা। তাছাড়া একজন উঁচু মর্যাদার সাহাবী। তিনি ইনতিকাল করলে হযরত রাসূলে কারীম সা. বললেনঃ আজ আরশ কেঁপে উঠেছে। এ হাদীসটি সাহাবী হযরত বারা’ ইবন ’আযিবের রা. জানা ছিল। কিন্তু তিনি ‘আরশ’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সারীর’ (খাটিয়া) শব্দ বলতেন। যার অর্থ শববাহী খাটিয়া দুলে ওঠা। বারা’ ইবন ’আযিবের রা. এমন কথা জাবিরকে বলা হলে তিনি বললেনঃ প্রকৃত হাদীস তো হচ্ছে তাই যা আমি বর্ণনা করেছি। আর বারা’- এর কথা হিংসা-বিদ্বেষ দ্বারা প্রভাবিত। কারণে, ইসলাম পূর্ব যুগে আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে ঝগড়া ও বিবাদ ছিল। উল্লেখ্য যে, হযরত জাবির রা. ছিলেন খাযরাজ গোত্রের লোক। তা সত্ত্বেও বারা ইবন ’আযিবকে সমর্থন না করে যা সত্য তাই প্রকাশ করে দেন। হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মদীনার গভর্নর হয়ে আসার পর নামাযের সময়ে কিছু আগে-পিছে করেন। লোকেরা জাবিরের কাছে ছুটে আসে। তিনি ঘোষণা করেন, রাসূল সা. জুহরের নামায দুপুরের পরে, ’আসর সূর্য স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল থাকা পর্যন্ত, সূর্যাস্তের সময় মাগরিব ও ফজরের নামায অন্ধকারে আদায় করতেন। আর ’ঈশার সময় লোকদের জন্য অপেক্ষা করতেন। তাড়াতাড়ি লোক সমাগম হলে তাড়াতাড়ি আদায় করতেন। অন্যথায় দেরী করতেন। (মুসনাদ- ৩/৩৬৯) একবার ’আবদুল্লাহ ইবন জাবির তাঁর বাগানের ফল তিন বছরের জন্য বিক্রি করেন। জাবির রা. এ কথা জানতে পেয়ে কিছু লোক সংগে করে মসজিদে আসেন এবং সকলের সামনে ঘোষনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. এমন ধরণের বেচা-কেনা নিষেধ করেছেন। ফল যতক্ষণ খাওয়ার উপযোগী না হয় ততক্ষণ তা বেচা-কেনা জায়েয নয়। (সুতরাং ফল হওয়ার পূর্বেই তা কিভাবে জায়েয হতে পারে?) (মুসনাদ- ৩/৩৯৫) রাসূলুল্লাহর সা. ইত্তেবা ’বা অনুসরণের আবেগ-উৎসাহ এত প্রবল ছিল যে, যে সকল বিষয়ে অনুসরণ আদৌ প্রয়োজনীয় নয় সে ক্ষেত্রেও অনুসরণ করতেন। একবার রাসূলুল্লাহকে সা. মাত্র একখানা কাপড়ে নামায আদায় করতে দেখেন। এ কারণে তিনিও সেই ভাবে নামায আদায় করলেন। লোকেরা যখন বললো আপনি এভাবে নামায আদায় করলেন, অথচ আপনার নিকট অতিরিক্ত কাপড় আছে। তিনি বললেন, এটা এই জন্য করলাম যে, তোমরা রাসূলুল্লাহর সা. এই অনুমতিকে দেখে বুঝতে পার। হযরত রাসূলে কারীম সা. মসজিদে ফাত্হ- এ তিন দিন দু’আ করেছিলেন। তৃতীয় দিন নামাযের মধ্যে দু’আ কবুল হলে চেহারা মুবারকে এক প্রকার নূরের চমক খেলে যায়। হযরত জাবির এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই যখনই তিনি কোন বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতেন, একটা নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে গিয়ে দু’আ করতেন। (মুসনাদ- ৩/৩৩২) রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা এবং তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রবল আগ্রহ। আর এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তৃতীয় ’আকাবার বাই’য়াতে। তাছাড়া আরও বহু ঘটনায় দেখা যায় রাসূলকে সা. খুশী করার কী প্রাণান্তকর চেষ্টাই না তিনি করছেন। একবার কিছু উৎকৃষ্টমানের খেজুর রাসূলের সা. খিদমতে পেশ করেন। তিনি দেখে বলেন, আমি মনে করেছিলাম গোশত। জাবির বাড়ি ফিরে গিয়ে স্ত্রীকে কথাটি বলেন। তারপর তক্ষুণি বকরী জবেহ করে গোশত রান্না করে দেন। একবার রাসূল সনা. জাবিরের বাড়ীতে আসলেন। জাবির একটি বকরী জবেহ করে দেন। জবেহের সময় বকরীটি কিছু ডাকাডাকি করছিল। তাই শুনে তিনি বললেন, বংশ ও দুধ শেষ করে দিচ্ছ কেন? জাবির বললেনঃ এটা এখনও বাচ্চা, খেজুর খেয়ে এমন মোটা হয়েছে। একবার তিনি ঢালে করে খেজুর নিয়ে যাচ্ছেন, এমন সময় রাসূলকে সা. সামনে দিয়ে যেতে দেখে খাওয়ার আহ্বান জানালেন। রাসূল সা. আহবানে সাড়া দিলেন। আর একবার জাবির রাসূলকে সা. বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে গোশ্ত, খুরমা ও পানি উপস্থাপন করেন। রাসূল সা. বলেন, তোমরা হয়তো জান আমি গোশ্ত খুব পসন্দ করি। বিদায় বেলা অন্দর মহল থেকে জাবিরের স্ত্রীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার ও আমার স্বামীর জন্য দু’আ করুন। তক্ষুণি তিনি বললেনঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলাইহিম- হে আল্লাহ, তাদের সকলের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। (মুসনাদ- ৩/২৯৭, ৩০৩, বুখারী- ২/৫৮০) একবার কোন এক বিশেষ ঘটনায় রাসূল সা. তাঁর জন্য পঁচিশবার মাগফিরাত কামনা করেন। একবার জাবিরের অসুখ হলো। রাসূল সা. দেখতে আসলেন। জাবির বেহুঁশ ছিলেন। রাসূল সা. অযু করে পানির ছিটা দিলে তাঁর হুঁশ হলো। তখন পর্যন্ত জাবিরের কোন সন্তানাদি ছিল না। পিতাও মারা গিয়েছিলেন। শরী’য়াতের পরিভাষায় এমন ব্যক্তিকে ‘কালালাহ’ বলে। যেহেতু জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, তাই রাসূলকে সা. জিজ্ঞেস করলেন, আমি মারা গেলে আমার মীরাস বা উত্তরাধিকার কিভাবে বণ্টিত হবে? আমি কি ২/৩ (দুই তৃতীয়াংশ) বোনদের দেব? বললেনঃ বেশ, দাও। আবার আরজ করলেনঃ ১/২ (অর্ধেক) দিই? বললেনঃ হাঁ, তাও দিতে পার। একথা বলে রাসূল সা. বাইরে বেরিয়ে আসেন। তারপর আবার ফিরে গিয়ে বললেনঃ জাবির, তুমি এ অসুখে মরবে না। তোমার সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়েছে। এই বলে তিনি সূরা নিসার ১৭৬ নং আয়াতুল কালালাহ পাঠ করেনঃ ‘হে নবী, লোকে তোমার নিকট ব্যবস্থা জানতে চায়। বল, পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্বন্ধে তোমাদেরকে ব্যবস্থা জানাচ্ছেন…..।’ (তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৯০, হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৯, মুসনাদ- ৩/২৯৮, ৩৭২) হযরত রাসূলে কারীম সা. কোথাও খাবারের দাও’য়াত পেলে জাবিরকে মাঝে মাঝে সংগে নিয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েও আহার করাতেন। একদিন জাবির তাঁর বাড়ীর পাশে বসে ছিলেন। মেন সময় সামনে দিয়ে রাসূলকে সা. যেতে দেখলেন। দৌড়ে কাছে গেলেন এবং আদব রক্ষার্থে পেছনে চলতে লাগলেন। রাসূল সা. বললেনঃ পাশে এস। তারপর জাবিরের হাত ধরে নিজ বাড়ীতে নিয়ে যান এবং পর্দা সরিয়ে ভেতরে বসতে দেন। ভেতর থেকে তিন টুকরো রুটি ও একটু সিরকা আসলো। রাসূল সা. রুটি তিনটি সমান দুই ভাগে ভাগ করলেন এবং বললেনঃ সিরকা খুব উপাদেয় তরকারি। জাবির বলেনঃ আমি সেই দিন থেকে সিরকা খুব ভালোবাসি। (মুসনাদ- ৩/৩৭৯, ৪০, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৩) একবার রাসুল সা. ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান। জাবির তাঁকে দেখতে যান (মুসনাদ- ৩/৩০০) রাসূলুল্লাহর সা. কখনও ঋণের প্রয়োজন হলে জাবিরের নিকট থেকে গ্রহণ করতেন। একবার ঋণ নিয়ে পরিশোদের সময় সন্তুষ্ট চিত্তে আসলের ওপর কিছু বেশী দান করেন। (মুসনাদ- ৩/৩০২) রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের শেষ পর্যায়ে একবার বাহরাইন থেকে মাল আসছিল। তিনি সেই মাল থেকে জাবিরকে কিছু দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। ইত্যবসরে রাসূল সা. ইনতিকাল করেন। হযরত আবু বকর রা. খলীফা হয়ে ঘোষণা দেন যে, রাসূল সা. যদি কাউকে কিছু দেওয়ার অঙ্গীকার করে থাকেন অথবা কারও নিকট ঋণী থাকেন, সে যেন আমার নিকট থেকে তা গ্রহণ করেন। হযরত জাবির রাসূলুল্লাহর সা. অঙ্গীকারের কথা বললে আবু বকর রা. তা পূরণ করেন। মুসলিম উম্মার প্রতি হযরত জাবিরের ছিল গভীর মমতা ও ভালোবাসা। তিনি ছিলেন ‘রুহামাউ বাইনাহুম’- (পরস্পর পরস্পরের প্রতি দয়ালু)- এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একবার তাঁর এক প্রতিবেশী কোথাও সফরে যায়। সফর থেকে ফিরে আসলে জাবির তার সাথে দেখা করতে যান। লোকটি মানুষের মধ্যে বিভেদ, দলাদলি, বিদ’য়াতের প্রচলন ইত্যাদি যা সে দেখেছিল, বর্ণনা করলো। যে সাহাবায়ে কিরাম রক্তের বিনিময়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁরা এমন কথা সহ্য করবেন কেমন করে। তাঁর চোখ দু’টি সজল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, রাসুল সা. সত্যই বলেছেন, মানুষ যেমন দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে, তেমনি বের হয়েও যাবে। (মুসনাদ- ৩/৩৪৩) তাঁর বাসস্থান ছিল মসজিদে নববী থেকে এক মাইল দূরে। এত দূর থেকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে মসজিদে নববীতে আসতেন। একবার মসজিদে নববীর পাশে কিছু বাড়ী-ঘর খালি হয়। জাবির ও বনু সালামার অন্য এক ব্যক্তি এই সব শূন্য বাড়ী-ঘরে চলে আসার ইচ্ছা করলেন। তাহলে নামায আদায় করা সহজ হবে। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বিষয়টি উত্থাপন করলে তিনি বললেনঃ তোমরা যে সেখান থেকে আস, তাতে তোমাদের প্রতি কদমে সাওয়াব লেখা হয়। চিন্তা করে দেখ তো কত সওয়াব হয়েছে? তাঁরা দু’জন মনে প্রাণে রাসূলুল্লাহর সা. কথা মেনে নেন। শেষ জীবনে বাড়ীর পাশে একটি মসজিদ তৈরী করেন। জাবির বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. আবু ’উবাইদার নেতৃত্বে আমাদেরকে একটি অভিযানে পাঠান। একটি থলিতে কিছু খেজুর ছাড়া আমাদের সাথে আর কিছুই ছিল না। আবু ’উবাইদা আমাদেরকে প্রতিদিন মাত্র একটি করে খেজুর দিতেন। আমরা সেটি বাচ্চাদের মত চুষতাম আর পানি পান করতাম। এভাবে একটি খেজুর দিয়ে রাত্রি পর্যন্ত চালাতাম। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩২১) ইবন হিব্বান তাঁর ‘সহীত’ গ্রন্থে আবুল মুসাববিহ আল-মুকরায়ী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মালিক ইবন ’আবদিল্লাহ আল-খাস’য়ামীর নেতৃত্বে আমরা একবার রোমের মাটিতে চলছিলাম। একদিন মালিক জাবিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, তিনি তাঁর বাহন খচ্চরটিকে লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চলছেন। মালিক বললেনঃ আবু আবদিল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে বাহন দিয়েছেন, তার পিঠে আরোহণ করুন। জাবির বললেনঃ আমি তাকে একটু বিশ্রাম দিচ্ছি, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি, আল্লাহর রাস্তায় যে দু’টি পা ধুলি-মলিন হয়েছে, তার জন্য আল্লাহ জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৬, ৪৭৭) হযরত জাবির হজ্জ আদায় করেছেন কয়েকবার। হাদীসে তাঁর দু’টি হজ্জের আলোচনা দেখা যায়। একটি বিদায় হজ্জ ও অন্য আর একটি। সরলতা মুসলমানদের উন্নতির মূল রহস্য। হযরত জাবির ছিলেন অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর। একবার সাহাবায়ে কিরামের একটি দল তাঁর বাড়িতে আসলেন। বাড়ীর ভেতর থেকে রুটি ও সিরকা পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনি বললেনঃ বিসমিল্লাহ বলে খেয়ে নিন। সিরকার খুব মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। মানুষের কাছে তার আত্মীয় বন্ধুদের কেউ আসলে উপস্থিত খাবার যা কিছু থাকে সামনে দিতে হবে, কোন রকম ইতস্তত করা উচিত নয়। তেমনি ভাবে উপস্থিত লোকদের সামনে যা কিছু খাবার হাজির করা হয় সন্তুষ্ট চিত্তে আহার করা উচিত। হেয় দৃষ্টিতে তা দেখা উচিত নয়। কারণ, ভনিতার মধ্যে উভয়ের ধ্বংসের উপকরণ বিদ্যমান। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮১, মুসনাদ- ৩/৩৭১) মানুষের সাথে মেলামেশায় তিনি ছিলেন আন্তরিক ও উদার। হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতিটি অভ্যাস ও আচরণ তাঁর মন-মগযে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছিল। হুদাইবিয়ায় ‘বাই’য়াতে রিদওয়ান’ একটি গাছের নীচে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। লোকেরা স্থানটিকে বরকত ও কল্যাণময় মনে করে সেখানে নামায আদায় করতে শুরু করে। এ অবস্থা দেখে হযরত উমার রা. গাছটি কেটে ফেলেন। মুসায়্যাব ইবন দুখন বলেন, পরের বছরই আমরা সেই গাছটি ও স্থানের কথা ভুলে যাই। (বুখারী- ২/৫৯৯) কিন্তু বহু বছর পর্যন্ত জাবিরের তা মনে ছিল। শেষ বয়সে তিনি অন্ধ হয়ে যান। হুদাইবিয়ার প্রসঙ্গ উঠলে একবার বললেনঃ আজ যদি চোখ থাকতো, সেই স্থানটি আমি দেখিয়ে দিতে পারতাম। (বুখারী- ২/৫৯৮) হযরত জাবির বলতেন, হুদাইবিয়ার সন্ধিই হচ্ছে কুরআনে উল্লেখিত প্রকৃত ফাত্হ বা বিজয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৮) জাবির আরও বলতেন, রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির খবর সর্বপ্রথম মদীনায় আসে এক জিনের মাধ্যমে। মদীনার এক মহিলার অনুগত একটি জিন ছিল। একদিন জিনটি একটি সাদা পাখীর রূপ ধরে মহিলার বাড়ীর দেওয়ালে এসে বসে। মহিলা তাকে বললোঃ নীচে নেমে এসো আমরা কথা বলি, খবর আদান-প্রদান করি। জিন বললোঃ মক্কায় এক নবীর আবির্ভাব হয়েছে। তিনি যিনা (ব্যভিচার) হারাম করেছেন এবং আমাদেরকে যমীনে থাকতে নিষেধ করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৭৩) জাবির রা. বলেনঃ আমি একবার এক দিরহামের গোশত কিনলাম। ’উমার একথা শুনে আমার কাছে এসে বললেনঃ জাবির, এটা কি? বললামঃ আমার পরিবারের লোকদের গোশ্ত খেতে খুব ইচ্ছা করেছে তাই এক দিরহামের গোশত কিনেছি। ’উমার কয়েকবার আমার কথাটি আওড়ালেন, ‘আমার পরিবারের লোকদের গোশ্ত খেতে খুব ইচ্ছা করেছে।’ তখন আমার ইচ্ছা হলো, যদি আমার দিরহামটি হারিয়ে যেত অথবা ’উমারের সাথে দেখা না হতো। অন্য একটি বর্ণনা মতে ’উমার বলেন, তোমাদের কোন ইচ্ছা হলেই এভাবে কিনে থাক? (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩০২, ৩০৩) এভাবে হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থ সমূহে হযরত জাবিরের রা. জীবনের বিভিন্ন দিকের অনেক টুকরো টুকরো কথা পাওয়া যায়, যার মধ্যে মুসলমানদের শিক্ষার অনেক কিছুই লুকিয়ে আছে।
’উবাদা ইবনুস সামিত (রা)

আবুল ওয়ালীদ ’উবাদা মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনী সালীম শাখার সন্তান। হিজরতের ৩৮ বছর পূর্বে ৫৮৬ খৃষ্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আ’লাম- ৪/৩০) পিতা সামিত ইবন কায়স এবং মাতা কুররাতুল আইন। মা ছিলেন ’উবাদা ইবন নাদলা ইবন মালিক ইবন আজলানের কন্যা। তিনি নিজের পিতার নামে ছেলের নাম রাখেন ’উবাদা’ (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) ‘উবাদার ভাই আউস ইবন সামিতের স্ত্রী খুওয়াইলা বিনতু সা’লাবা। তিনি সেই মহিলা যাঁর শানে সূ’রা মুজাদিলার জিহারের আয়াত নাযিল হয়। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫১)। মদীনার পশ্চিম দিকে কুবা সংলগ্ন প্রস্তরময় অঞ্চলে ছিল বনী সালীমের বসতি। ‘উতুম কাওয়াকিল’ নামে সেখানে তাদের কয়েকটি কিল্লা ছিল। এরই ভিত্তিতে বলা চলে ’উবাদার বাড়ীটি মদীনার কেন্দ্রস্থলের বাইরে ছিল। ’উবাদা সবে যৌবনে পা দিয়েছেন, এমন সময় মক্কায় ইসলামের অভ্যূদয় ঘটে। তিনি সেই মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের একজন যাঁরা ইসলামের প্রথম আহবান কানে আসতেই সাড়া দেন। ’আকাবার প্রথম শপথে যেবার ছয়জন মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহর সা. হাতে হাত রেখে বাই’য়াত করেন, তিনি তাঁদের একজন। অবশ্য ঐতিহাসিকদের অনেকে এই বাই’য়াতকে আকাবা নামে অভিহিত করেননি। তাঁদের মতে আকাবা মাত্র দু’টি। যাই হোক, দ্বিতীয় ও তৃতীয় আকাবায়ও শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। অনেকের মতে তিনি দ্বিতীয় আকাবায় বারোজনের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তৃতীয় তথা শেষ আকাবায় রাসূলুল্লাহ সা. মনোনীত বারো নাকীবের (দায়িত্বশীল) অন্যতম নাকীব। তিনি হন বনী কাওয়াকিল এর নাকীব। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬, বুলুগুল আমানী- শরহ মুসনাদে আহমাদ- ২২/২৭৫, ফাতহুল বারী- ৭/১৭২, তাবাকাত- ৩/৫৪৬) উল্লেখ্য যে, বনী ’আমর ইবন আওফ ইবন খাযরাজ সেই প্রাচীন কাল থেকে ‘কাওয়াকিল’ নামে পরিচিত। ‘কাওকালা’ শব্দটির অর্থ এক বিশেষ ধরণের চলন।’ এ নামে আখ্যায়িত হওয়ার কারণ হল, যখন কোন ব্যক্তি তাদের আশ্রয় গ্রহণ করতো তখন তারা লোকটির হাতে একটি তীর দিয়ে বলতো, যাও, এখন ইয়াসরিবের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াও। (ইবন হিশাম ১/৪৩১) ’উবাদার জীবনটি ছিল প্রাণরসে ভরপুর। ইসলাম গ্রহণ করে মক্কা থেকে ফিরে এসেই সর্বপ্রথম মা-কে ইসলামের দীক্ষিত করেন। মদীনায় কা’ব ইবন আজরা নামে তাঁর চিল এক অন্তরঙ্গ বন্ধু। তখনও সে অমুসলিম এবং তার বাড়ীতে ছিল বিরাট এক মূর্তি। ’উবাদার সব সময়ের চিন্তা হল কিভাবে এ বাড়ীটি শিরক থেকে মুক্ত করা যায়। একদিন সুযোগমত বাড়ীর মধ্যে ঢুকে মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলেন। অবশেষে আল্লাহর ইচ্ছায় কা’ব মুসলমান হয়ে যান। হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় পৌঁছে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। আবু মারসাদ আল গানাব হলেন তাঁর দ্বীনি ভাই। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬, আল ইসাবা- ২/২৬৮, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৭০) আবু মারসাদ ছিলেন ইসলামের সূচনা লগ্নের একজন মুসলমান এবং হযরত হামযার রা. হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ। বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে ‘উবাদা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) বদর যুদ্ধের পর গনীমতের মাল (যুদ্দলব্ধ সম্পদ) এর ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মুজাহিদদের মধ্যে কিঞ্চিৎ মত পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। তখন সূরা আনফালের প্রথম থেকে কতগুলি আয়াত নাযিল হয় এবং এ ঝগড়ার পরিসমাপ্তি ঘটে। ইবন হিশাম বলেন, সূরা আনফালের উল্লেখিত আয়াত সম্পর্কে ’উবাদাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দেন, আয়াতগুলি আমাদের বদরী যোদ্ধাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। বদরের দিন আমরা আনফাল এর ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি করি এবং তা নিয়ে যখন আমাদের আখলাকের অবনতি ঘটে তখন আল্লাহ আমাদের হাত থেকে তা ছিনিয়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তুলে দেন। তিনি আমাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬৬) এই বদর যুদ্ধের সময়ই মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের ইঙ্গিতে মদীনার ইয়াহুদী গোত্র বনু কায়নুকা রাসূলুল্লাহর সা. বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাদের সাথে উবাদার গোত্র বনী আউফের বহু আগে থেকেই মৈত্রী চুক্তি ছিল। তেমনিভাবে চুক্তি ছিল মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূলেরও। তাদের বিদ্রোহের কারণে হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন তখন উবাদা ছুটে গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এবং তাদের সাথে চুক্তি বাতিলের প্রকাশ্য ঘোষনা দিয়ে বললেনঃ আমি তাদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন ও দায়মুক্তির ঘোষণা করছি। আর আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও মুমিনদেরকে আমার বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করছি। অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল তার পূর্ব অবস্থায় অটল থাকে। বিদ্রোহ দমনের পর তাদেরকে মদীনা থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বহিষ্কারের এই কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব উবাদার ওপর অর্পণ করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সূরা মায়িদার ৫১ নং আয়াত থেকে ৫৮ নং পর্যন্ত আয়াতগুলি নাযিল হয়। আয়াতগুলিতে স্পষ্টতঃ উবাদার প্রশংসা ও মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের নিন্দা করা হয়েছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৯) ষষ্ঠ হিজরীর বাইয়াতুর রিদওয়ানে তিনি শরিক ছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৯) ষষ্ঠ হিজরীতে সংঘটিত বনী মুসতালিক বা মুরাইসী এর যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে তাঁরই দলের একটি লোক ভুলক্রমে শত্রু ভেবে অন্য একজন মুসলিম মুজাহিদকে হত্যা করে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৯০) হযরত আবু বকর সিদ্দীকের রা. খিলাফতকালে শামে যে সকল অভিযান পরিচালিত হয় তার বেশ ক’টিতে ’উবাদা অংশগ্রহণ করেন। হযরত ফারুকে আজমের খিলাফতকালে ’আমর ইবন ’আস মিসরে অভিযান পরিচালনা করেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি চূড়ান্ত বিজয় লাভে সক্ষম না হয়ে মদীনায় খলীফার নিকট অতিরিক্ত সাহায্য চেয়ে পাঠান। খলীফা উমার রা. চার হাজার মতান্তরে দশ হাজার সৈন্যের একটি অতিরিক্ত বাহিনী পাঠান। ’উবাদা ছিলেন সেই বাহিনীর এক চতুর্থাংশ সৈন্যের কমান্ডিং অফিসার। (আল-ইসাবা- ২/২৬৮) খলীফা ’আমর ইবনুল ’আসকে একটি চিঠিতে আরও লেখেন এই অফিসারদের প্রত্যেকেই একহাজার সৈন্যের সমান। এই অতিরিক্ত বাহিনী মিসর পৌঁছার পর ’আমর ইবনুল আস সকল সৈন্য একত্র করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দান করেন। ভাষণ শেষ করে তিনি উবাদাকে ডেকে বলেন, আপনার নিযাটি আমার হাতে দিন। তিনি নিযাটি নিয়ে নিজের মাথার পাগড়ীটি খুলে নিযার মাথায় বাঁধেন। তারপর সেটি উবাদার হাতে তুলে দিতে গিয়ে বলেন, এই হচ্ছে সেনাপতির আলাম বা পতাকা। আজ আপনিই সেনাপতি। আল্লাহর ইচ্ছায় প্রথম আক্রমণেই শহরের পতন ঘটে। হযরত ’উবাদা বিভিন্ন সময়ে ইসলামী খিলাফতের তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১. সাদাকা বিষয়ক অফিসার ২. ফিলিস্তিনের কাজী ৩. হিমসের আমীর। হযরত রাসূলে কারীম সা. জীবনের শেষ দিকে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘আমিলে সাদাকা’ বা যাকাত আদায়কারী নিয়োগ করেন। উবাদাকেও কোন একটি অঞ্চলে নিয়োগ দান করেন। যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে উপদেশ দেনঃ আল্লাহকে ভয় করবে। এমন যেন না হয়, কিয়ামতের দিন চতুষ্পদ জন্তুও তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে এক সময় তাঁকে ফিলিস্তীনের কাজী নিয়োগ করা হয়। সেই সময় উক্ত অঞ্চলটি ছিল হযরত মুয়াবিয়ার রা. ইমারাতের অধীনে। এক সময় কোন একটি বিষয়ে দু’জনের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে হযরত মু’য়াবিয়া রা. তাঁর প্রতি কিছু কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেন। তিনিও প্রত্যুত্তরে মুয়াবিয়াকে বলেন, আগামীতে আপনি যেখানে থাকবেন আমি সেখানে থাকবো না। তিনি মদীনায় চলে আসেন, খলীফা উমার রা. এভাবে তাঁর চলে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন। সবকিছু শোনার পর ’উমার রা. বললেনঃ আপনার স্থানে আবার আপনি ফিরে যান। এ যমীন আপনার মত লোকদের জন্য ঠিক আছে। আপনিও আপনার মত লোকেরা যেখানে নেই আল্লাহ সেই স্থানের মঙ্গল করুন। অতঃপর তিনি আমীর মু’য়াবিয়াকে রা. একটি চিঠি লিখে জানিয়ে দেনঃ আমি উবাদাকে তোমার কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন করে দিলাম। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) ফিলিস্তীনের বিচার বিভাগের এই পদটি সর্বপ্রথম ’উবাদার হাতে ন্যস্ত করা হয়। ইমাম আওযাঈ বলেনঃ উবাদা ফিলিস্তীনের প্রথম কাজী। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) হযরত আবু ’উবায়দাহ রা. যখন শামের আমীর তখন তিনি ’উবাদা ইবনুস সামিতকে হিমসে স্বীয় প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ করেন। এই হিমসে অবস্থানকালে তিনি লাজিকিয়্যা জয় করেন। এই অভিযানে তিনি এ নতুন সামরিক টেকনিক প্রয়োগ করেন। তিনি এমন সব বড় বড় গর্ত খনন করেন যে, তার মধ্যে একজন অশ্বারোহী তার অশ্বসহ অতি সহজে লুকিয়ে থাকতে পারতো। (ফুতুহুল বুলদান- ১৩৯) হযরত ’উবাদা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শামে (বৃহত্তর সিরিয়া) বসবাসরত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ৩৪/৬৫৪ সনে রামলা মতান্তরে বায়তুল মাকদাসে ৭২ (বাহাত্তর) বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ইবন ‘আসাকির ’উবাদার জীবনীতে মুয়াবিয়ার রা. সাথে তাঁর এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন যাতে ধারণা হয় তিনি হযরত মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতকালেও জীবিত ছিলেন। এ কারণে অনেকে মনে করেছেন তিনি হিজরী ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) সন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ইবনুল আসীর বলেন, পূর্বের মতটিই সঠিক। (তাবাকাত- ৩/৫৪৬, আল ইসাবা- ২/২৬৯, উসুদুল গাবা- ৩/১০৭, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫১) তিনি মৃত্যুর পূর্বে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে শেষ বারের মত একটু দেখার জন্য অনেকে আসা যাওয়া করছে। হযরত শাদ্দাদ ইবন আউসও এসেছেন কিছু লোক সংগে করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কেমন আছেন? জবাব দিলেনঃ আল্লাহর অনুগ্রহে ভালো আছি। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে ছেলে এসে কিছু অসীয়াত করার অনুরোধ করলো। বললেন, আমাকে একটু উঠিয়ে বসাও। তারপর বললেনঃ বেটা, তাকদীরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে, অন্যথায় ঈমানে কোন কল্যাণ নেই। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৭, বুলুগুল আমানীঃ শরহ মুসনাদে আহমাদ- ২২/২৭৬) এই সময়ে তাঁর ছাত্র ‘সানাবিহী’ আসলেন। প্রিয় শিক্ষকের এই অন্তিম অবস্থা দেখে কাঁদতে শুরু করলে। উবাদা তাকে কাঁদতে নিষেধ করে বললেনঃ সর্ব অবস্থায় আমি সন্তুষ্ট। তুমি কাঁদছো কেন? যদি সাক্ষ্য দিতে বল, দিব। যদি কারও জন্য সুপারিশ করি, তোমার জন্য করবো। তারপর বললেন, আমার কাছে রাসূলুল্লাহর সা. যত হাদীস সংরক্ষিত ছিল সবই তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তবে একটি হাদীস অবশিষ্ট ছিল তা এখন বর্ণনা করছি। হাদীসটি কারও কাছে এ পর্যন্ত বর্ণনা করিনি। আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি; যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিবে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন। (বুলুগুল আমানী- ২২/২৭৬) হাদীসটি বর্ণনার পর পরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখন হযরত উসমানের খিলাফতকাল চলছে। তাঁকে কোথায় দাফন করা হয় সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা’দ লিখেছেন, তাঁকে রামলায় দাপন করা হয়। অন্য একটি বর্ণনা মতে বায়তুল মাকদাসের পবিত্র মাটিই হচ্ছে তাঁর শেষ শয্যা এবং সেখানে তাঁর কবরটি এখনও প্রসিদ্ধ। ইমাম বুখারী তাঁর দাফন স্থল ফিলিস্তিন বলে উল্লেখ করেছেন। মূলতঃ সে সময় ফিলিস্তীন ছিল একটি প্রদেশ এবং উল্লেখিত স্থল দু’টি চিল তার ভিন্ন দু’টি জেলা। আল-আ’লাম’ গ্রন্থকার যিরিক্লী বলেন, তিনি শামের কিবরিসে মৃত্যুবরণ করেন। অদ্যাবধি সেখানে তাঁর কবর মানুষের যিয়ারতগাহ হিসাবে বিদ্যমান। খলীফা ’উমারের রা. পক্ষ থেকে তিনি সেখানকার ওয়ালী ছিলেন। (আ’লাম- ৪/৩০) হযরত ’উবাদার মরণ সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে আসে তিনি চাকর-বাকর, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সকলকে হাজির করার নির্দেশ দেন। সবাই উপস্থিত হলে বলেনঃ আজকের এ দিনটিই দুনিয়ায় আমার শেষ দিন, আর আগত রাতটি আমার আখিরাতের প্রথম রাত। আমার হাত বা জিহ্বা দিয়ে যদি তোমাদেরকে কোন রকম কষ্ট দিয়ে থাকি তোমরা এখনই তার ‘কিসাস’ বা প্রতিশোধ নিয়ে নাও। আমি নিজেকে তোমাদের সামনে পেশ করছি। তারা বললো, আপনি আমাদের পিতা, আমাদের শিক্ষক। বর্ণনাকারী বলেনঃ তিনি কখনও কোন খাদেমকে খারাপ কথা বলেননি। তারপর তিনি তাদের অসীয়াত করেনঃ আমি মারা গেলে কেউ কাঁদবে না। তোমরা ভালো করে অজু করে মসজিদে দিয়ে নামায পড়বে। নামায শেষে উবাদা ও তোমাদের নিজেদের জন্য দু’য়া করবে। কারণ, আল্লাহ বলেছেনঃ তোমরা ছবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা কর (সূরা বাকারাহ- ৪৫, ১৫৩)। আমাকে তোমরা খুব তাড়াতাড়ি কবর দেবে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৬) রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় যে পাঁচজন আনসারী ব্যক্তি সমগ্র কুরআন হিফ্জ (মুখস্থ) করেন ’উবাদা তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও সম্মানিত সাহাবীদের একজন, ইলমুল কিরয়াতে ছিল তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবদ্দশায় মদীনায় আসহাবে সুফ্ফার জন্য ইসলামের প্রথম যে মাদ্রাসাতুল কিরায়াহ প্রতিষ্ঠিত হয় তিনি ছিলেন তার দায়িত্বে। অতি সম্মানিত ও মর্যাদাবান আসহাবে সুফ্ফার সাহাবীরা তাঁর কাছে শিক্ষা লাভ করেন। এই মাদ্রাসায় কুরআনের তালীমের সাথে সাথে লেখাও শিখানো হত। বহু লোক এই মাদ্রাসা থেকে কিরায়াত ও লেখার তা’লীম নিয়ে বের হন। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬, মুসনাদে আহমাদ ৫/৩১৫) এই মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত কোন কোন ছাত্রের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করতেন। এক ব্যক্তি তাঁর বাড়ীতে থাকতেন এবং রাতের খাবার তাঁরই সাথে খেতেন। লোকটি ফিরে যাওয়ার সময় একটি উৎকৃষ্ট ধনুক তাঁকে দান করেন। তিনি একথা রাসূলুল্লাহকে সা. জানালেন। রাসূল সা. তাঁকে ধনুকটি নিতে নিষেধ করলেন। (মুসনাদে আহমাদ ৫/৩২৪, হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৩০) হযরত উমার তাঁকে এক সময় শামের মুসলমানদের বিশুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষাদানের জন্য পাঠান। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি কয়েকটি বিশেষ টেকনিক প্রচলন করেন। তাঁর সমসাময়িক যে সকল সাহাবী হাদীস বর্ণনা করতেন, তাঁরা বলতেনঃ আমি একথা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে শুনেছি। অনেকে কিছু অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার করতেন, যা পরবর্তীকালে হাদীস বর্ণনার একটি অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। উবাদাও এমন কিছু শব্দ প্রচলন করেন। যেমন তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ ‘রাসূলুল্লাহ সা. আমার সামনাসামনি বলেন। আমি একথা বলছিনে যে, অমুক অমুক আমার কাছে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।’ এমনিভাবে এক সমাবেশে তিনি একটি ভাষণ দিলেন। ভাষণে একটি হাদীস বর্ণনা করলে শ্রোতাদের মধ্য থেকে হযরত মুয়াবিয়া রা. হাদীসটির সত্যতা সম্পর্কে একটু সন্দেহ প্রকাশ করেন। উবাদা তখন বলেনঃ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে আমি একথা শুনেছি।’ তিনি সর্ব অবস্থায় সকল স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস বর্ণনা করতেন। ওয়াজ মাহফিল, জ্ঞান চর্চার বৈঠক, এমনকি কখনও গীর্জায় গেলে সেখানেও রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র বাণী ঈসায়ীদের কানে পৌঁছিয়ে দিতেন। হযরত ’উবাদা থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা প্রায় ১৮১ (একশো একাশি)। তাঁর মধ্যে ছয়টি মুত্তাফাক আলাইহি। (আল-আ’লাম ৪/৩০) অনেক বড় বড় সাহাবী এবং তাবে’ঈ তাঁর নিকট থেকে এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, জাবির ইবন আবদিল্লাহ, আবু উমামা, ছালামা ইবন মাহবাক, মাহমূদ ইবন রাবী, মিকদাম ইবন মা’দিকারব, রাফায়া ইবন রাফে, আউস ইবন আবদিল্লাহ আস-সাকাফী, শুরাহবীল ইবন হাসানা প্রমুখ এবং তাবে’ঈদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবন উসায়লা সানালজী, হিত্তান ইবন আবদিল্লাহ রাক্কাশী, আবুল আশ’য়াস সাগানী, জুবাইর ইবন নাদীর, জুনাদাহ্ ইবন আবী উমাইয়্যা, আসওয়াদ ইবন সা’লাবা, আতা ইবন আবী ইয়াসার, আবু মুসলিম খাওলানী, আবু ইদরীস খাওলানী বিশেষ উল্লেখযোগ্য। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) ফিকাহ শাস্ত্রেও তিনি ছিলেন সুপন্ডিত। সাহাবায়ে কিরাম তাঁর এ পান্ডিত্যের সম্মান করতেন। খালিদ ইবন মা’দান বলেনঃ শামে রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে উবাদা ও শাদ্দাদ ইবন আউস অপেক্ষা অধিকতর বড় কোন ফকীহ এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তি আর কেউ নেই। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬২) হযরত মুয়াবিয়া রা. একটি ভাষণে আমওয়াসের প্লেগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমার উবাদার সাথে আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি যা বলেছেন তাই সঠিক। তোমরা তাঁর থেকে ফায়দা হাসিল কর। কারণ, তিনি আমার চেয়েও বড় ফকীহ। জুনাদাহ যান উবাদার সাথে সাক্ষাৎ করতে, তারপর তিনি বর্ণনা করেন, উবাদা আল্লাহর দ্বীনের তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করেছেন। (আল ইসাবা- ২/২৬৮, সীয়ারে আনসার ২/৫৬) শাসকের মুখোমুখী হক কথা বলা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি অতি উৎসাহের সাথে এ দায়িত্ব পালন করতেন। শামে গিয়ে দেখেন, সেখানে ক্রয়-বিক্রয়ে শরীয়াতের বিধি-নিষেধ লঙ্ঘিত হচ্ছে। তিনি এমন এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন যে, গোটা সমাবেশে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সেই সমাবেশে হযরত মুয়াবিয়াও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠেন, হযরত রাসূলে কারীম সা. উবাদাকে একথা বলেননি। তখন ’উবাদার ঈমানী জোশ তীব্র আকার ধারণ করেন। তিনি বলেন, মুয়াবিয়ার সাথে থাকার কোন ইচ্ছা আমার নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, রাসূলুল্লাহ সা. একথা আমাকে বলেছিলেন। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৭, মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৯) উপরোক্ত ঘটনাটি ছিল হযরত উমারের রা. খিলাফত কালের। তবে খলীফা উসমানের রা. যুগে আমীর মুয়াবিয়া রা. খলীফার দরবারে লেখেনঃ উবাদা গোটা শামের অবস্থা বিপর্যস্ত করে তুলেছে। হয় আপনি তাঁকে মদীনায় ডেকে পাঠান, নয়তো আমিই শাম ছেড়ে চলে আসবো। জবাবে আমীরুল মু’মিনীন তাঁকে মদীনায় পাঠিয়ে দিতে বলেন। খলীফার নির্দেশের পর উবাদা শাম থেকে সোজা মদীনায় চলে যান। তিনি যখন খলীফার নিকট পৌঁছেন তখন তিনি একজন মুহাজির ব্যক্তির সাথে কথা বলছিলেন। খলীফার ঘরের বাইরে তখন বহু লোক সমবেত ছিল। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি এক কোণায় চুপ করে বসে পড়েন। খলীফা দৃষ্টি উঠাতেই তাঁকে দেখতে পান। তিনি প্রশ্ন করেন, কি ব্যাপার? সাথে সাথে তিনি দাঁড়িয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আমার পরে শাসকরা ভালোকে মন্দে এবং মন্দকে ভালোতে পরিণত করবে কিন্তু অন্যায় কাজে আনুগত্য সিদ্ধ নয়। তোমরা কখনও পাপ কাজে লিপ্ত হবে না। (মুসনাদে আহমা- ৫/৩১৯) তাঁর কথার মাঝাখানে হযরত আবু হুরাইরা রা. কিছু বলার চেষ্টা করেন। উবাদা গর্জে উঠে বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. হাতে আমরা যখন বাই’য়াত করি তোমরা তখন ছিলে না। (সুতরাং অযথা নাক গলাবে না) আমরা রাসূলুল্লাহর সা. হাতে এই শর্তাবলীর ওপর বাই’য়াত করি যে, সর্ব অবস্থায় আমরা তাঁর কথা মানবো, সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় আর্থিক সাহায্য দান করবো মানুষকে ভালো কাজের আদশে দেব এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবো। সত্যকথা বলতে কারও ভয় করবো না। রাসূলুল্লাহ সা. ইয়াসরিবে আসলে তাঁকে সাহায্য করবো। আমাদের জীবন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মত তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করবো। আর আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার কোন পরোয়া করবো না। আমাদেরকে জান্নাতের আকারে এ সকল কাজের প্রতিদান দেওয়া হবে। পরিপূর্ণ রূপে এ সব অঙ্গীকার পালন করা আমাদের কর্তব্য। আর কেউ পালন না করলে সেজন্য সেই জিম্মাদার। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৩, মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩২৫, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।) হযরত ’উবাদা আমর বিল মা’রূফের দায়িত্ব সর্বক্ষণ, এমনকি পথ চলতে চলতেও পালন করতেন। একবার কোথাও যাচ্ছেন। দেখলেন, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাদ যারকী পাখী শিকার করছেন। তাঁর হাত থেকে পাখী ছিনিয়ে নিয়ে শূন্যে উড়িয়ে দেন। তাঁকে বলেন এ স্থানটি হারামের অন্তর্ভুক্ত, এখানে শিকার নিষিদ্ধ। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৭) হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি উবাদার ছিল তীব্র ভালোবাসা। প্রথম দফা সাক্ষাতের পর আরও দু’বার মক্কায় গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বাইয়াত করে আসেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. মদীনায় আসার পর এমন কোন ঘটনা বা যুদ্ধ পাওয়া যায়না যাতে যোগদানের সৌভাগ্য থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। এ কারণে তিনিও রাসূলুল্লাহর সা. অতি প্রিয় পাত্র ছিলেন। একবার তিনি রোগাক্রান্ত হলে রাসূল সা. তাঁকে দেখতে আসেন। আনসারদের কিছু লোকও সংগে ছিল। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি জান শহীদ কে? সবাই চুপ করে রইল। উবাদা স্ত্রীকে বলেন, আমাকে একটু বালিশে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দাও। বসার পর তিনি রাসূলুল্লাহর সা. প্রশ্নের জবাব দিলেনঃ যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর হিজরাত করে, অতঃপর যুদ্ধে নিহত হওয়া, কলেরা বা পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এবং মেয়েদের সন্তান প্রসবকালীন মৃত্যুবরণ- এ সবই শাহাদাতের মধ্যে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৭) তিনি যতদিন অসুস্থ ছিলেন রাসূল সা. সকাল-সন্ধ্যায় তাঁকে দেখতে যেতেন। এ অবস্থায় তাঁকে একটি দু’আ শিখিয়ে দিয়ে বলেন, এটা জিবরাঈল আমাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩২৩) হযরত উবাদার স্ত্রী সম্পর্কে হায়াতুস সাহাবা গ্রন্থে একটি বর্ণনা দেখা যায়। একদিন রাসূলুল্লাহ সা. মিলহানের মেয়ের কাছে গিয়ে কিছুতে ঠেস দিয়ে বসলেন। তারপর হেসে উঠলেন। সে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমার উম্মাতের কিছু লোক আল্লাহর রাস্তায় সাগর পাড়ি দেবে। সে আরজ করলেো ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার জন্য দোয়া করুন আমিও যেন তাদেরকে একজন হতে পারি। রাসুল সা. দু’আ করলেন, হে আল্লাহ, তুমি তাকে তাদেরই একজন করে দাও। তারপর আবার তিনি হেসে উঠলেন। সে আবার জিজ্ঞেস করলে একই জবাব দিলেন। এবারও সে পূর্বের মত দু’আর আবেদন করলো। এবার তিনি বললেন, তুমি তাদের প্রথম দিকের লোক হবে, তবে শেষ দিকের নও। আনাস বলেন, এই মহিলাকে উবাদা বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে মুয়াবিয়া ইবন আবী সুফইয়ানের স্ত্রী কারাজার সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সমুদ্র পাড়ি দেন। তারপর বাহনের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৯২) উসমান ইবন সাওদা বলেন, আমি উবাদা ইবনুস সামিতকে দেখলাম, ওয়াদী জাহান্নামের মসজিদের দেওয়ালে বুক ঠেকিয়ে কাঁদছেন। আমি বললাম, আবুল ওয়ালীদ, আপনি এবাবে কাঁদছেন কেন? তিনি জবাব দিলেন, এটা সেই স্থান, যেখানে রাসূলুল্লাহ সা. জাহান্নাম দেখতে পেয়েছেন বলে আমাদেরকে বলেছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২৬) হযরত সুফইয়ান ইবন উয়াইনা অতি অল্প কথায় হযরত উবাদার রা. পরিচয় ও মর্যাদা তুলে ধরেছেন এভাবেঃ উবাদা আকাবী, উহুদী, বদরী, শাজারী, উপরন্তু তিনি নাকীব।’’ (বুলুগুল আমানীঃ শরহ মুসনাদে আহমাদ- ২২/২৭৫) হ্যাঁ, প্রকৃতই তিনি ছিলেন, বাইয়াতুল আকাবার একজন সদস্য, বদর-উহুদের যোদ্ধা। বাইয়াতুশ শাজারা তথা বাইয়াতুর রিদওয়ান-যা হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় অনুষ্ঠিত হয়- এরও অন্যতম সদস্য। উপরন্তু তিনি ছিলেন মদীনার দ্বাদশ নাকীবের একজন।
উসাইদ ইবন হুদাইর (রা)

প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী উসাইদ মদীনার ঐতিহ্যবাহী আউস গোত্রের বনী ’আবদুল আশহাল শাখার সন্তান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০) সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর একাধিক কুনিয়াত বা ডাকনাম দেখতে পাওয়া যায়। যেমনঃ পুত্র ইয়াহইয়ার নাম অনুসারে আবু ইয়াহইয়া, আবু ঈসা-এ নামে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে ডেকেছেন বলে বর্ণিত আছে। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) তাছাড়া আবু ’আতীক, আবু হুদাইর, আবু ’আমর ইত্যাদি নামের কথাও জানা যায়। (দ্রঃ সীয়ারে আনসার- ১/২২৮), উসুদুল গাবা- ১/৯২, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০, আল-আলাম- ১/৩৩০) তাঁর পিতার নাম হুদাইর ইবন সিমাক এবং মাতার নাম উম্মু উসাইদ বিনতু উসকুন। হুদাইর ছিলেন আউস গোত্রের একজন রয়িস বা নেতা। ইসলামপূর্ব যুগে মদীনার চির বৈরী আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যতগুলি যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলির নেতৃত্ব দেন হুদাইর। তিনি ছিলেন আউস গোত্রের প্রধান ঘোড় সাওয়ার। তাঁর নিজস্ব একটি মজবুত দুর্গও ছিল। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে সংঘটিত সর্বশেষ ও সর্ববৃহৎ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি ছিল ‘বু’য়াসের’ যুদ্ধ। এ যুদ্ধেরও সিপাহসালার ছিলেন হুদাইর, আর প্রতিপক্ষ খাযরাজ গোত্রের সেনাপতি ছিলেন ’আমর ইবন নু’মান রুজাইলা। উভয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সৈন্য পরিচালনা করেন। এক পর্যায়ে আউস গোত্র পরাজয়ের কাছাকাছি পৌছে যায়। এ অবস্থায় হুদাইর নিজেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। খাযরাজ সেনাপতি ’আমর নিহত হন এবং আউস গোত্র বিজয়ী হয়। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় হিজরাতের পাঁচ বছর পূর্বে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। (সীয়ারে আনসার- ১/২২৮) উপরোক্ত ‘বুয়াস’ যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছর পর মক্কায় ‘আকাবায় বাই’য়াত অনুষ্ঠিত হয় এবং মদীনাবাসী নওমুসলিমদের অনুরোধে হযরত রাসূলে কারীম সা. মুসয়াব েইবন ’উমাইরকে তাবলীগে ইসলামের উদ্দেশ্যে মদীনায় পাঠান। উসাইদ তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন মদীনায় হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইরের হাতে এবং হযরত মু’য়াজ ইবন জাবালের পূর্বে। কারো কারো মতে তিনি শেষ আকাবার পরে অর্থাৎ যে বার ৭৩/৭৫ জন মদীনাবাসী মক্কার আকাবা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাইয়াত করেন, তারও পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে একথা সঠিক নয়। কারণ, তিনি যে এই শেষ আকাবায় শরীক হন এবং রাসূলুল্লাহ সা. কর্তৃক বনী আবদুল আশহালের ‘নাকীব’ বা দায়িত্বশীল নিযুক্ত হন তা সীরাত গ্রন্থসমূহে বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা- ১/৯২, তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ’লাম- ১/১৮১, আল-আ’লাম- ১/৩১০, আল-ইসাবা- ১/৪৯) হযরত উসাইদের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে সীরাত গ্রন্থসমূহে চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইর মদীনায় হযরত আস’য়াদ ইবন যুরারা গৃহে অতিথি হন এবং বনী জাফার গোত্রে বসে মানুষকে কুরআনের তা’লীম দিতে থাকেন। বনী জাফারের বসতি ছিল ’আবদুল আশহাল গোত্রের কাছাকাছি। একদিন মুস’য়াব রা. একটি বাগানে বসে মুসলমানদের কুরআনের তা’লীম দিচ্ছেন, একথা সা’দ ইবন মু’য়াজ এবং উসাইদ ইবন হুদাইর জেনে ফেলেন। সা’দ উসাইদকে বললেন, তুমি সেখানে যাও এবং তাকে বল, সে যেন ভবিষ্যতে আর কখনও আমাদের এ মহল্লার চৌহদ্দিতে না আসে। যদিও আস’য়াদ ছিলেন সা’দের খালাতো বা মামাতো ভাই। সা’দের কথামত উসাইদ নিজ হাতে ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য বাগিচার দিকে চললেন। আস’য়াদ তাঁকে আসতে দেখে মুস’য়াবকে বললেন, ‘দেখুন একটি লোক আপনার কাছে আসছে। সে তার গোত্রের সরদার, আপনি তাঁকে মুসলমান বানিয়ে দিন।’ উসাইদ অত্যন্ত গরম মেজাজে বললেন, ‘এভাবে তোমরা আমাদের দুর্বল লোকগুলিকে বোকা বানিয়ে যাচ্ছ কেন? যদি ভালো চাও, এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও।’ রাসূলুল্লাহর সা. দরবারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দা’ঈ (আহবানকারী) মুস’য়াব হাসিমুখে অত্যন্ত ধীর স্থিরভাবে বললেন, ‘আপনি বসুন, আমার কথা একটু শুনুন। পছন্দ হলে কবুল করবেন, আর না হলে আমি বন্ধ করে চলে যাব।’ উসাইদ বললেন, এ তো বড় বুদ্ধিমত্তা ও ইনসাফের কথা।’ হযরত মুস’য়াবের এমন বিনীত আচরণে উসাইদের রাগ পড়ে গেল। তিনি বসে পড়লেন। মুস’য়াব তাঁর সামনে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। মুস’য়াব কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে যাচ্ছেন, আর এ দিকে উসাইদের চেহারা একটু একটু পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। অবলীলাক্রমে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘এই দ্বীনে দাখিল হওয়া যায় কিভাবে? মুস’য়াব বললেন, প্রথমে গোসল ও পাক-সাফ কাপড় পরে কালিমা উচ্চারণ করতে হবে। তারপর সালাত আদায় করতে হবে।’ মুস’য়াবের কথা শেষ না হতে উসাইদ স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। অল্পক্ষণ পর আবার যখন ফিরে আসলেন তখন তাঁর মাথার চুল ভিজা এবং পরনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড়। তারপর মুস’যাবের হাতে হাত রেখে উচ্চারণ করলেন, ‘আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু- আমি সাক্ষ দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তারপর তিনি মজলিস থেকে উঠে যেতে যেতে বললেন, ‘আমি যাচ্ছি এবং অন্য নেতাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি, তাদেরকেও মুসলমান বানিয়ে ছাড়বেন।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/১৮৮-১৮৯, সীয়ারে আনসার- ১/২২৯) উসাইদ উঠে সোজা সা’দ ইবন মুয়াজের দিকে চলে গেলেন। তাঁকে যেতে দেখে সা’দের কাছে বসা লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, সে আসছে, কিন্তু যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো তাতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যাওয়ার সময় ছিল দারুণ উত্তেজিত আর এখন দেখা যাচ্ছে শান্ত-শিষ্ট ও হাসিখুশি। এ ক্ষেত্রে উসাইদ তাঁর বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর একান্ত ইচ্ছা, মুস’য়াবের মুখ থেকে তিনি যা শুনেছেন, সা’দও তা শুনুক। কিন্তু তিনি যদি সরাসরি ঘোষণা দেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তুমিও আমার অনুসরণ কর, তাহলে সে হয়তো উসাইদের ওপর ঝাপিয়ে পড়তো। তিনি তা না করে সা’দকেও মুস’য়াবের সামনে হাজির করতে চাইলেন। মুস’য়াব ছিলেন আস’য়াদ ইবন যুরারা অতিথি। তাই সা’দকে ক্ষেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে উসাইদ বললেন, ‘আমি শুনেছি, বনী হারেসার লোকেরা আস’য়াদ ইবন যুরারাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। তারা তো একথা ভালো করেই জানে সে তোমার মামাতো ভাই।’ সা’দ রাগে ফুঁসে উঠলেন। সাথে সাথে তিনি তীর হাতে নিয়ে মুস’য়াব ও আস’য়াদের কাছে পৌঁছেলেন। সেখানে কোন শোরগোল বা ঝগড়া-বিবাদের চিহ্ন দেখতে পেলেন না; বরং তার বিপরীত এক শান্ত পরিবেশে মুস’য়াব মানুষকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাচ্ছেন আর লোকেরা মনোযোগ সহকারে তা শুনছে। সা’দ তার বন্ধু উসাইদের ধোঁকা বুঝতে পারলেন। তিনিও মুসয়াবের কথা মন দিয়ে শুনলেন এবং সেখানেই ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৬-৪৩৭, রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪৬০-৪৬১) হযরত উসাইদের ইসলাম গ্রহণের কিছু দিন পর হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় হিজরাত করেন। তিনি প্রখ্যাত মুহাজির সাহাবী হযরত যায়িদ ইবন হারিসার রা. সাতে উসাইদের ‘মুওয়াখাত’ বা দ্বীনি ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। (উসুদুল গাবা- ১/৯২, আল ইসাবা- ১/৪৯) উহুদ থেকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম-১/৩৩০) বদর যুদ্ধে তাঁর যোগদানের ব্যাপারে মতভেদ আছে। ওয়াকিদী, ইবন ইসহাক ও ইবনুল কালবীর মতে তিনি বদরে অংশগ্রহণ করেননি। তবে কোন কোন সীরাত বিশেষজ্ঞ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। (উসুদুল গাবা- ১/৯২, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০, তাবাকাত- ৩/৬০৫) ইবন সা’দ বলেন, উসাইদের মত আরও কয়েকজন নাকীব সাহাবীসহ কিছু বিশিষ্ট সাহাবী বদর যুদ্ধে যোগদান করেননি। বালাজুরী বলেন, হযরত রাসূলে কারীম সা. বদরের দিকে যাত্রা করলেন; কিন্তু তাঁর কিছু সাহাবী পিছনে থেকে গেলেন। তাঁরা ধারণা করতে পারেননি যে, কুরাইশদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হবে। এই পিছনে থেকে যাওয়া সাহাবীদের একজন হলেন উসাইদ। রাসূলুল্লাহ সা. বদর যুদ্ধ শেষ করে যখন মদীনায় ফিরলেন, উসাইদ দ্রুত রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ছুটে গেলেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহ বিজয় দান করায় তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। নিজে যোগদান করতে না পারার জন্য দুঃখ ও অনুশোচনা প্রকাশ করলেন। কৈফিয়াত হিসাবে বললেনঃ আমি ধারণা করেছিলাম, ওটা কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলা। তাঁদের সাথে আপনি যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না। আমি যদি বুঝতাম, তারা শত্রু এবং তাদের সাথে আপনার সংঘর্ষ হবে তাহলে কক্ষণো পিছনে পড়ে থাকতাম না। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁর কথা বিশ্বাস করেন। ইবন সা’দ ও একই কথা বর্ণনা করেছেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৮৮, তাবাকাত- ৩/৬০৫) তিনি উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধের প্রাক্কালে মদীনায় সা’দ ইবন মু’য়াজ’, উসাইদ ইবন হুদাইর ও সা’দ ইবন উবাদার নেতৃত্বে একদল লোক রাসূলুল্লাহর সা. পাহারায় নিয়োজিত থাকেন। তাঁরা সারারাত রাসূলুল্লাহর সা. দরজায় পাহারা দিতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৪)। যুদ্ধের চরম মুহূর্তে এক পর্যায়ে যখন প্রায় সকল সাহাবী বিক্ষিপ্তভাবে রাসূলুল্লাহ সা. থেকে দূরে ছিটকে পড়েন, তখনও তিনি মুষ্টিমেয় কিছু সাহাবীর সাথে অটল থাকেন। এই যুদ্ধে তাঁর দেহের সাতটি স্থান দারুণভাবে আহত হয়। (আল ইসাবা- ১/৪৯), আল-আ’লাম- ১/৩৩০) উহুদ যুদ্ধে শহীদদের জন্য তাঁদের আত্মীয়-পরিজন কান্নাকাটি করতে থাকে। তা দেখে হযরত রাসূলে কারীম সা. বলেন, আজ হামযার জন্য কাঁদার কেউ নেই। সা’দ ও উসাইদ একথা শুনে নিজ গোত্রে ফিরে এসে তাঁদের নারীদের হামযার স্মরণে বিলাপের নির্দেশ দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৯৯) উহুদের দিনে বনী আউসের পতাকা ছিল উসাইদের হাতে। প্রচন্ড যুদ্ধের সময় মুসলিম সৈনিকদের কউ কেউ ভুলবশতঃ নিজেগের সৈনিকদের কাফির সৈনিক মনে করে আঘাত করে বসে। উসাইদ ভুলক্রমে আবু বারদাহ ইবন নায়ারের হাতে আহত হন। তেমনিভাবে আবু যা’না না চিনতে পেরে আবু বারদাহকে তরবারির দুটি আঘাত করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের সম্পর্কে বলেন, সে তোমাদের কেউ এভাবে নিহত হলেও শহীদ হবে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৮, ৩২২) তিনি খন্দক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দশ দিন পর্যন্ত মুসলমানরা মদীনায় ঘেরা অবস্থায় ছিল। মক্কার পৌত্তলিক বাহিনী মুসলিম নেতৃবৃন্দের খোঁজে রাতে ঘুরা-ফিরা করতো। উসাইদ তখন দুই শো লোক নিয়ে খন্দক রক্ষা করেন। খন্দক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গাতফান গোত্রের লোকেরা খুব লুটতরাজ শুরু করে দিল। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের নেতা আমের ইবন তুফাইল ও যায়িদকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। তারা মদীনায় উপস্থিত হয়ে সম্মিলিতভাবে বলল, যদি মদীনায় উৎপাদিত ফলের একটি অংশ তাঁদের দেওয়া হয় তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উসাইদ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হাতের নিযা দিয়ে দুইজনের মাথায় টোকা দিয়ে বলে উঠলেনঃ খেঁকশিয়াল, দূর হ এখান থেকে। একথায় আমের দারুণ ক্ষুব্ধ হয়। সে জিজ্ঞেস করে- তুমি কে? – উসাইদ ইবন হুদাইর। – কাতাইবের পুত্র? (উল্লেখ্য যে, কাতাইব উসাইদের পিতা হুদাইরের উপাধি) – হ্যাঁ – তোমার পিতা তোমার চেয়ে ভালো। সংগে সংগে উসাইদ গর্জে উঠে বললেন, ‘কক্ষণও না। আমি তোমাদের সকলের চেয়ে এবং আমার পিতার চেয়ে ঢের ভালো। কারণ তিনি কাফির ছিলেন।’ (সীয়ারে আনসার- ১/২৩০) সম্ভবতঃ উপরোক্ত ঘটনাটিই ইবন আব্বাস থেকে তাবারানী বর্ণনা করেছেন। আমির ইবন তুফাইল ও আরবাদ ইবন কায়েস নামক দুই ব্যক্তি মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হলো। আমির রাসূলুল্লাহকে সা. সম্বোধন করে বলল, ‘মুহাম্মাদ, আমি ইসলাম গ্রহণ করলে আমাকে কী দেবেন?’ রাসূল সা. বললেনঃ সকল মুসলমানের জন্য যা হবে তোমার জন্য তাই হবে। তাদের মত তোমার ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাবে। আমি বলল, ‘আমি মুসলমান হলে আপনার পরে কি আমাকে শাসন কর্তৃত্ব দান করবেন? রাসূল সা. বললেন, ‘তুমি বা তোমার গোত্রের কেউ তা পাবে না। তবে তুমি অশ্বারোহী বাহিনীর একজন নেতা হতে পারবে।’ এভাবে তাদের সাথে আরও কিছু কথাবার্তা হওয়ার পর তারা উঠে গেলো। তারপর তারা রাসূলুল্লাহকে সা. হত্যার ষড়যন্ত্র আটলো। রাসূলুল্লাহর সা. নিকট তাদের সে পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেল। তারা পালিয়ে গেল। মু’য়াজ ও উসাইদ তাদের ধাওযা করেন। এক পর্যায়ে উসাইদ তাদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘ওরে আল্লাহর দুশমনরা তোদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ পথিম্যে দুইজনেরই অপঘাতে মৃত্যু হয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৮-৪৯) হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহকে সা. হত্যার উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তিকে মদীনায় পাঠায়। সে ছোট্ট একটি খঞ্জর কোমরে লুকিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. কথা জিজ্ঞেস করতে করতে বনী আবদিল আশহালের মসজিদে উপস্থিত হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা. তার চেহারা দেখেই বলে ওঠেন, ‘এ ব্যক্তি ধোঁকা দিতে এসেছে।’ সে হত্যার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহর সা. দিকে এগুতেই উসাইদ তার লুঙ্গি ধরে টান দেন। সাথে সাথে তার কোমর থেকে খঞ্জরটি ছিটকে পড়ে। সে বুঝতে পারে এখন আর রেহাই নেই। সে যাতে পালানোর চেষ্টা করতে না পারে, সেই জন্য উসাইদ তার গলার কাছে জামা খুব শক্ত করে ধরে রাখেন। (সীয়ারে আনসার- ১/২৩০) হিজরী ষষ্ঠ সনে বনী মুসতালিকের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ শেষে সেখানে একটি কূপে উট-ঘোড়ার পানি পান করানোর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন মুহাজির ও আনসারের মধ্যে সামান্য ঝগড়া হয়। এই সামান্য ঝগড়া মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই আরও উসকে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। সে আনসারদের লক্ষ্য করে বলে ফেলেঃ ‘তোমরা তাদেরকে নিজ দেশে থাকার অনুমতি দিয়েছ, তোমাদের ধন-সম্পদ তাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়েছ। আল্লাহর কসম, তোমরা যদি তা না করতে তাহলে তারা অন্য কোথাও চলে যেত। যদি মদীনায় ফিরতে পারি তাহলে আমরা অভিজাতরা (মদীনাবাসীরা) এই নীচদের তাড়িয়ে ছাড়বো।’ তার এসব কথা হযরত যায়িদ ইবন আরকাম শুনে ফেলেন এবং তিনি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করেন। হযরত রাসূলে কারীম খুবই মনঃক্ষুণ্ন হন। এই ঘটনার পর হযরত উসাইদ আসলেন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দেখা করতে। রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ – তোমাদের বন্ধু যা বলেছে, তা কি তুমি শুনেছ? – ইয়া রাসূলুল্লাহ, কোন্ বন্ধু? – আবদুল্লাহ ইবন উবাই। – কী বলে? – সে বলেছে, মদীনায় ফিরতে পারলে তারা অভিজাতরা নীচদেরকে বের করে দেবে। উসাইদ বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ সা., আল্লাহর কসম, ইনশাআল্লাহ আপনিই তাকে তাড়িয়ে দিবেন। আল্লাহর কসম সে-ই নীচ, আর আপনি অতি সম্মানিত ও বিজয়ী। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১২৯২) উসাইদ আরও বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহঃ আপনি তার প্রতি একটু সদয় হোন। আল্লাহ তা’য়ালা আপনার সাথে আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আর তার স্বগোত্রীয় লোকেরা তার জন্য মুকুট তৈরী করছিল, তাকে মদীনার বাদশাহ বানিয়ে তার মাথায় পরাবে বলে। সে স্বচক্ষে দেখতে পারবে তার সে সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪৬৩) একটি বর্ণনায় এসেছেঃ আবদুল্লাহ ইবন উবাইর উপরোক্ত মন্তব্যের কথা অবগত হয়ে উসাইদ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, যে লোকটি মানুষের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করছে, তাকে হত্যার অনুমতি আমাকে দিন। রাসূল সা. বললেন, আমি নির্দেশ দিলে তুমি তাকে হত্যা করবে? উসাইদ বললেনঃ হ্যাঁ, আপনার অনুমতি পেলে তরবারি দিয়ে তার গর্দানটি উড়িয়ে দেব। রাসূল সা. তাকে বসিয়ে শান্ত করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৪) এই বনী মুসতালিক যুদ্ধের সফরে হযরত ’আয়িশা রা. রাসূলুল্লাহর সা. সফর সঙ্গিনী ছিলেন। সফর থেকে মদীনায় ফেরার পথে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিকরা হযরত ’আয়িশার রা. চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক আরোপ করে। সীরাত গ্রন্থ সমূহে যা ‘ইফ্ক’ বা বানোয়াট কাহিনী বলে পরিচিত। কিছু সরলপ্রাণ মুসলমানও মুনাফিকদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। পরিশেষে আল্লাহ পাক কুরআনের আয়াত নাযিল করে আসল রহস্য ফাঁস করে দেন। বিষয়টি যখন তুঙ্গে তখন একদিন উসাইদ রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহঃ আউস গোত্রের লোকেরা আপনাকে কষ্ট দিলে আমরা তা বন্ধ করে দেব। আর আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের লোকেরা যদি কষ্ট দেয়, আমাদের নির্দেশ দিন। আল্লাহর কসম, তারা হত্যার উপযুক্ত।’ ‘খাযরাজ নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা সংগে সংগে প্রতিবাদ করে বলে ওঠেন, ‘খাযরাজ গোত্রের লোক বলে তুমি এমন কথা বলতে পারছো, তোমার নিজের গোত্রের লোক হলে এমন কথা বলতে পারতে না।’ ‘উসাইদও সংগে সংগে গর্জে উঠে বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তুমি মিথ্যা বলেছ।’ তুমি এক মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করছো।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৩০০) খাইবার যুদ্ধে সালামা ইবন আকও’য়ার চাচা ’আমির এক ইয়াহুদীর ওপর আক্রমণ চালাম; কিন্তু তাঁর তরবারীর আঘাত ফসকে গিয়ে নিজেই আহত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। হযরত উসাইদসহ অনেকে ধারণা করলেন, যেহেতু তিনি নিজের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছেন, যা এক ধরণের আত্মহত্যা- এ কারণে তাঁর সকল নেক ’আমল ব্যর্থ হয়ে গেছে। সালামা বিষয়টি রাসূলুল্লাহর সা. কানে দিলেন। রাসূল সা. বললেনঃ যারা এমন কথা বলেছে তাদের কথা ঠিক নয়। সে দ্বিগুণ সাওয়াবের অধিকারী হবে। (মুসলিম- ২/৯৬) মক্কা বিজয় অভিযানে হযরত রাসূলে কারীম সা. মুহাজির ও আনসারদের সাথে ছিলেন। তাঁর দলটি ছিল সকলের পিছনে। তিনি ছিলেন আবু বকর রা. ও উসাইদের মাঝখানে। হুনাইন ও তাবুক অভিযানের সময় আউস গোত্রের ঝান্ডাটি ছিল উসাইদের হাতে। সাকীফা-ই-বনী সা’য়িদার দিনটি- যেদিন হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের পর আনসারদের একটি দল, যার পুরোভাগে ছিলেন হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা- দাবী করলেন, খিলাফতের অগ্রাধিকার আনসারদের। একথা মদীনায় ছড়িয়ে পড়লো। তর্ক-বিতর্ক শুরু হল। উসাইদ ছিলেন আনসার গোত্র আউসের অন্যতম নেতা। সেই জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘তোমরা জান, রাসূলুল্লাহ সা. ছিলেন মুহাজিরদের একজন। তাঁর খলীফাও মুহাজিরদের মধ্য থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমরা ছিলাম রাসূলুল্লাহর সা. আনসার বা সাহায্যকারী।’’ সা’দ ইবন মু’য়াজকে লক্ষ্য করে তিনি বলেনঃ ‘‘আজও আমাদের উচিত রাসূলুল্লাহর সা. খলীফার আনসার হিসাবে থাকা।’’ (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪৬২)। এক পর্যায়ে তিনি নিজ গোত্র আউসের লোকদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘খাযরাজ গোত্র সা’দ ইবন ’উবাদাকে খলীফা বানিয়ে নেতৃত্ব কুক্ষিগত করতে চায়। আজ যদি তারা সফল হয় তাহলে চিরদিনের জন্য তারা তোমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ফেলবে এবং খিলাফতে তোমাদের কোন অংশ তারা আর কোন দিন দেবে না। আমার মতে আবু বকরের হাতে বাইয়াত করা উচিত।’ এরপর তিনি সকলকে আবু বকরের হাতে বাই’য়াত করার নির্দেশ দেন। এভাবে আউস গোত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে হযরত সা’দ ইবন উবাদার সমর্থকদের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। (সীয়ারে আনসার- ২৩১) হযরত আবু বকরের রা. মরণ সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে এল, তিনি খিলাফতের দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত করে যাবেন- এ বিষয়ে মুহাজির-আনসার নির্বিশেষে যে সকল বিশিষ্ট সাহাবীর মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে উসাইদও রা. ছিলেন। আবু বকর রা. যখন উমার রা. সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন, তিনি বললেনঃ ‘আপনার পরে খিলাফতের দায়িত্ব লাভের ব্যাপারে আমি তাঁকে ভালোই দেখতে পাই। ….তাঁর ভেতরটা বাইরের থেকে উত্তম। এই দায়িত্ব লাভের জন্য তাঁর চেয়ে অধিকতর সক্ষম ব্যক্তি আর কেউ নেই। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২৬) হিজরী ১৬ সনে তিনি খলীফা ’উমারের রা. সাথে মদীনা থেকে বায়তুল মাকদাসে যান। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) হিজরী ২০ সনের শা’বান মাসে, মতান্তরে হিজরী ২১ সনে তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। খলীফা হযরত উমার রা. কাঁধে করে তাঁর লাশ বহন করেন, জানাযার নামায পড়ান এবং বাকী গোরস্থানে দাফন করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০), তাবাকাত- ৩/৫০৬, শাজারাতুজ জাহাব ফী আখবারি মান জাহাব- ১/৩১) মৃত্যুর পূর্বে তিনি খলীফা ’উমারকে অসীয়াত করে যান, তিনি যেন তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিজ হাতে নিয়ে তাঁর সকল দায়-দেনা পরিশোধ করে দেন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত ’উমার রা. পাওনাদারদের ডেকে তাদেরকে এই শর্তে রাজী করান যে, তারা বছরে এক হাজার দিরহাম গ্রহণ করবেন। এভাবে চার বছরে বাগানের ফল বিক্রী করে সকল দেনা পরিশোধ করা হয়। এভাবে তাঁর সকল সম্পত্তি রক্ষা পায়। ’উমার রা. বলতেন, ‘আমার ভাইয়ের সন্তানদের আমি অভাবী দেখতে চাই না।’ (তাবাকাত- ৩/৬০৬, উসুদুল গাবা- ১/৯৩) হযরত উসাইদের স্ত্রী রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় ইন্তিকাল করেন। (সীয়ারে আনসার- ১/২৩১) হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘একবার আমরা হজ্জ অথবা ’উমরা থেকে মদীনায় ফিরলাম। আমাদেরকে জুল হুলায়ফায় অভ্যর্থনা জানানো হল। আনসারদের পরিবারবর্গের লোকেরা আপন আপন পরিবারের লোকদের সাথে মিলিত হল। এখানে উসাইদকে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর খবর দেওযা হল। তিনি মাথায় চাদর মুড়ি দিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। আমি বললাম, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী, প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী, আর আপনি কিনা একজন মহিলার জন্য এভাবে কাঁদছেন? আয়িশা রা. বলেন, একথা শুনে তিনি মাথা থেকে কাপড় ফেলে দিলেন। এবং বললেনঃ আপনি সত্যি কথাই বলেছেন। ‘সা’দ ইবন মু’য়াজের পর আর কারও জন্য আমাদের কাঁদা উচিত নয়।’ (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৯৫, মুসনাদে আহমদ- ২/৩৫২) সম্ভবতঃ ইয়াহইয়া নামে উসাইদের একটি মাত্র ছেলে ছিল। সহীহ বুখারীর ‘বাবু নুযুলিস সাকীনা ওয়াল মালায়িকা ইনদা কিরায়াতিল কুরআন’’ (কুরআন পাঠের সময় প্রশান্তি ও ফিরিশতার অবতরণ) অধ্যায়ে তাঁর আলোচনা এসেছে। কুরআন ও হাদীসের প্রচার-প্রসারে তাঁর বিরাট অবদান আছে। তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত ’আয়িশা, আবু সা’ঈদ আল খুদরী, আনাস বিন মালিক, আবু লাইল আনসারী, ও কা’ব ইবন মালিকের মত অতি সম্মানিত সাহাবায়ে কিরাম তাঁর নিকট থেকে শ্রুত হাদীস বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাঁর সর্বমোট ১৮ (আঠারো) টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (আল-আলাম- ১/৩৩০, আল-ইসাবা- ১/৪৯) হযরত উসাইদের পিতা ছিলেন তাঁর গোত্রের অতি সম্মানিত ব্যক্তি। ইবন সা’দ বলেনঃ ‘‘তাঁর পিতার পর ইসলাম ও জাহিলী উভয় যুগে তিনিও অত্যন্ত ভদ্র ও সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। গোত্রের বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরূপে গণ্য হন। এই গুণগুলির সমন্বয় ঘটেছিল উসাইদের মধ্যে।’’ তাছাড়া তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ ও দৌড়বিদ। আর সে যুগে আরবে এই তিনটি গুণে গুণান্বিত ব্যীক্তকে ‘কামিল’ উপাধিতে ভূষিত করা হত। (তাবাকাত- ৩/৬০৪, আল আলাম- ১/৩৩০, উসুদুল গাবা- ১/৯২) ইসলাম গ্রহণের পর তিনি আধ্যাত্ম সাধনায় এত উন্নতি সাধন করেন যে, তাঁর চোখের সকল পর্দা দূর হয়ে যায়। আর তিলাওয়াতও করতে পারতেন সুমধুর কণ্ঠে। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) একদিন রাতে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছেন। নিকটেই বাঁধা একটি ঘোড়া। ঘোড়াটি লাফাতে থাকে। তিলাওয়াত বন্ধ করলে ঘোড়াটিও থেমে যায়। আবার তিলাওয়াত শুরু করলে ঘোড়াটি লাফাতে শুরু করে। তাঁর ছেলে ইয়াহইয়া নিকটেই শুয়ে ছিল। তিনি ভীত হয়ে পড়রেন এই কথঅ চিন্তা করে যে, এমনটি চলতে থাকলে ছেলেটি ঘোড়ার পায়ে পিষে যাবে। তৃতীয়বারের মাথায় তিনি বাইরে এসে দেখেন, আকাশে একটি ছায়ার মত আচ্ছাদন এবং মধ্যে যেন বাতির আলো জ্বলছে। তিলাওয়াত শেষ হয়ে গিয়েছিল। এজন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতেই আলোটি অদৃশ্য হয়ে যায়। সকালে ঘটনাটি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেন, ফিরিশতারা কুরআন তিলাওয়াত শুনতে এসেছিল। তুমি যদি সকাল পর্যন্ত তিলাওয়াত করতে তাহলে লোকেরা তাদেরকে দিনের আলোতে দেখতে পেত। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৩, উসুদুল গাবা- ১/৯৩, বুখারী শরীফ- ২/৭৫০) তিনি দিব্য চোখে ‘সাকীনা’ বা প্রশান্তির বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি এমন এক ব্যক্তি যার চলার সময় আগে আগে একটি ‘নূর’ বা জ্যেতি চলতো। বুখারী বর্ণনা করেছেন, এক অন্ধকার রাতে আববাদ ইবন বিশর ও উসাইদ ইবন হুদাইর রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে বের হলেন। তাঁদের হাতে লাঠি থেকে জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে তাদের চলার পথ আলোকিত করে তুলেছিল। তাঁরা যখন দু’জন দুই দিকে চলে গেলেন, জ্যোতিও তাঁদের সাথে ভাগ হয়ে গেল। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৩১, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬১১) হযরত উসাইদ বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে একটি দুস্থ আনসার পরিবারের কথা তুলে ধরলাম। তারা অত্যন্ত অভাবী এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্য মহিলা। আমার কথা শুনে রাসূল সা. বললেন, ‘তুমি এমন এক সময় এসেছ যখন আমার হাতে যা কিছু ছিল সবই মানুষকে দেওয়া হয়ে গেছে। তুমি যখন শুনবে আমার হাতে আবার কিছু এসেছে এই পরিবারটির কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে।’ কিছুদিনের মধ্যে খাইবার থেকে কিছু জিনিস আসলো। তিনি আনসারদেরকে বেশী করে দিলেন। বিশেষ করে সেই পরিবারটিকে দিলেন প্রচুর পরিমাণে। আমি বললাম, ‘হে আল্লার নবী, আল্লাহ আপনাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন।’ রাসূল সা. বললেন, ওহে আনসারগণ, আল্লাহ তোমাদেরকে সর্বোত্তম বিনিময় দান করুন। তোমাদের সম্পর্কে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তোমরা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও ধৈর্যধারণকারী। আমার মৃত্যুর পর লোকেরা তোমাদের উপেক্ষা করে নিজেদেরকে অগ্রাধিকার দেবে। আমার সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত তোমরা ‘সবর’ (ধৈর্য) অবলম্বন করবে। আমাদের সেই মিলন স্থল হবে ‘হাউজ’।’ উসাইদ বলেন, ‘অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. ইন্তিকাল কররেন, আবু বকরের পর ’উমার রা. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। একবার তিনি মদীনাবাসীদের মধ্যে কিছু গনীমতের মাল বন্টন করলেন। আমার জন্য তিনি একটি জামা পাঠালেন। কিন্তু তা ছোট হয়ে গেল। আমি মসজিদে বসে আছি, এমন সময় এক কুরাইশ যুবককে দেখলাম ঠিক আমার জামার মত একটি লম্বা জামা সে পরে আছে। সেটা এত লম্বা যে, মাটি দিয়ে টেনে যাচ্ছে। তখন আমি আমার সংগের লোকটিকে রাসূলুল্লাহর সা. উপরোক্ত বাণী শুনিয়ে বললাম, রাসূলুল্লাহ সা. সত্যই বলেছেন। লোকটি দৌড়ে ’উমারের কাছে গেল এবং আমি যা বলেছি তাই তাঁকে গিয়ে বলল। ’উমার ছুটে আসলেন। আমি তখন নামাযে। ’উমার বললেন, উসাইদ নামায শেষ কর। নামায শেষ হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কী বলেছেন? আমি যা দেখেছি এবং যা বলেছি, তাঁকে বললাম। তিনি বললেন, আল্লাহ আপনাকে মাফ করুন। সেই জামাটি আমি অমুকের জন্য পাঠিয়েছিলাম। আর সে তো একজন আনসারী, আকাবায় শপথ গ্রহণকারী এবং বদর ও উহুদের মুজাহিদ। তাঁর কাছ থেকেই এই কুরাইশ যুবক জামাটি খরীদ করেছে। আপনি কি মনে করেন আনসারদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. সেই বাণী আমার যুগেই সত্যে পরিণত হবে? উসাইদ বললেন, আল্লাহর কসম, হে আমীরুল মুমিনীন, আমার বিশ্বাস আপনার যুগে তা হতে পারবে না।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০২-৪০৩, সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ৩/৩৬-৩৯) উম্মুল মুমিনীন হযরত ’আয়িশা রা. বলেন, উসাইদ একজন উত্তম মানুষ। তিনি বলতেন, যদি আমি এই তিনটি অবস্থার যে কোন একিট অবস্থায় সর্বদা থাকতে পারতাম তাহলে নিশ্চিত জান্নাতের অধিবাসী হতাম। এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ থাকতো না। সেই অবস্থা তিনটি হলঃ ১. আমি নিজে যখন কুরআন পাঠ করি অথবা অন্যকে পাঠ করতে শুনি। ২. যখন রাসূলুল্লাহর সা. ভাষণ শুনি ৩. যখন কোন জানাযায় অংশগ্রহণ করি। আমি যখন জানাযায় যোগদান করি, আমার নাফ্সকে প্রশ্ন করিঃ আমি তাকে দিয়ে কী করিয়েছি এবং তার শেষ পরিণতি কী হবে? (আল-ইসাবা- ১/৪৯, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪১-৪২) হাকেম আবু লায়লার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, উসাইদ ছিলেন একজন নেককার, হাসি-খুশী মেজাজের ও রসিক প্রকৃতির মানুষ। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহর সা. মজলিসে নানা রকম কথা বলে লোকদের হাসাচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ সা. একটু কৌতুক করে তাঁর কোমরে একটু আঘাত করেন। সাথে সাথে উসাইদ বলে উঠেনঃ আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। রাসূল সা. বললেনঃ ‘তুমি এর প্রতিশোধ নিয়ে নাও। উসাইদ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার গায়ে জামা ছিল না; কিন্তু আপনার গায়ে তো জামা। রাসূল সা. জামা খুলে ফেললেন, আর সাথে সাথে উসাইদ রাসূলুল্লাহকে সা. জড়িয়ে ধরে তাঁর পাজরে চুমুর পর চুমু দিতে লাগরেন। পরে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আমি এই ইচ্ছা.. করেছিলাম। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৩০-৩১) হযরত রাসূলে কারীম সা. বলেছেন, আবু ইবাইদাহ ইবনুল জাররাহ, মু’য়াজ ইবন জাবাল, উসাইদ ইবন হযদাইর ও মু’য়াজ ইবন ’আমর- এরা কতই না উত্তম মানুষ। (আল-ইসাবা- ১/৯২) অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। রাসূল সা. বলেছেন, নি’মার রাজুলু উসাইদ০উসাইদ কত ভালো মানুষ। (তাবাকাত- ৩/৬০৩) হযরত আয়িশা রা. বলেনঃ আনসারদের তিন ব্যক্তিকে কেউ মর্যাদার দিক দিয়ে নাগাল পায়নি। তাঁরা সবাই বনী আবদিল আশহালের লোক। তাঁরা হলেনঃ মু’য়াজ ইবন জাবাল, উসাইদ ইবন হুদাইর ও আব্বাদ ইবন বিশর। (আল-ইসাবা- ১/৪৯) এই সব কারণে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাতে তাঁকে খুবই সম্মান করতেন। তাঁর ওপর অন্য কাউকে তিনি প্রাধান্য দিতেন না। (উসুদুল গাবা- ১/৯২)
আবুল হায়সাম ইবন আত-তায়্যিহান (রা)

আবুল হায়সাম উপনামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম এবং কোন্ গোত্রের সন্তান সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। একটি মতে ‘আবদুল্লাহ’ তাঁর আসল নাম। তবে অন্য একটি মতে ‘মালিক’ তাঁর নাম। আর এ মতের ওপরই মুসা ইবন ’উকবা, ইবন সা’দ, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, আবূ মা’শার ও মুহাম্মাদ ইবন ’উমার ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তেমনিভাবে তাঁর গোত্র ও পিতার নামের ব্যাপারেও মতভেদ আছে। এক মতে পিতা বালী ইবন আমর ইবন আল-হাফ ইবন কুদা’য়া। এই হিসাবে তাঁকে আল-বালাবী বলা হয়। এটাই ইবন সা’দের মত। এ মতের বিরোধিতা করেছেন ইবন ইসহাক ও আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আম্মারা আল-আনসারী। ইবন ইসহাক বলেছেন, আবুল হায়সাম, যিনি বদরে অংশগ্রহণ করেছেন তাঁর নাম মালিক এবং তাঁর ভাইয়ের নাম আতীক। তাঁরা উভয়ে তায়্যিহানের ছেলে। আর আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আল-আনসারী বলেন, আবুল হায়সাম আউস গোত্রের সন্তান। তাঁর মা লায়লা বিনতু আতীক। এটাই অধিকাংশের মত। (তাবাকাত- ৩৪৪৭, আল-ইসাবা ৪/২১২, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) তাঁর জন্মের সঠিক সময় জানা যায় না। আবুল হায়সাম তাঁর বন্ধু আস’য়াদ ইবন যুরারার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। একটি বর্ণনা মতে আস’য়াদ ইবন যুরারা ও জাকওয়ান ইবন ’আবদি কায়েস মক্কায় ’উতবা ইবন রাবী’য়ার নিকট যান। সেখানে তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. দা’ওয়াতের কথা শুনতে পেয়ে গোপনে তাঁর সাথে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন। আস’য়াদ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে আবুল হায়সামের সাথে দেখা করেন এবং নিজে ইসলাম গ্রহণের কাহিনী, রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর দা’ওয়াতের কথা তাঁর নিকট বর্ণনা করেন। ইবন সা’দ বলেন, ইয়াসরিবে পূর্ব থেকে –সেই জাহিলী যুগে আস’য়াদ ও আবূল হায়সাম ছিলেন তাওহীদ বা একত্ববাদের প্রবক্তা। আবুল হায়সাম বন্ধু যুরারার মুখে রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর দা’ওয়াতের কথা শুনে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ না করে সাথে সাথে বলে ওঠেনঃ ‘আনু আশহাদু মা’য়াকা আন্নাহু রাসূলুল্লাহ- আমিও তোমার সাথে সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসূল।’ এভাবে তিনি তাঁর বন্ধু যুরারার হাতে মুসলমান হন। পরের হজ্জ মওসুমে যেবার আটজন মতান্তরে ছয়জন ইয়াসরিববাসী মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. সাথে গোপনে দেখা করে বাই’য়াত বা শপথ করেন তাঁদের মধ্যে আবুল হায়সামও ছিলেন। ইতিহাসে এ বাই’য়াতকে আকাবার প্রথম বাই’য়াতও বলা হয়। তবে একটি বর্ণনা মতে, উক্ত বাই’য়াত বা শপথে আবুল হায়সাম ছিলেন না। (তাবাকাত- ১/২১৮-২১৯) উক্ত মতে, আস’য়াদ প্রথম আকাবায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় ফিরে এসে আবুল হায়সামকে ইসলামের দাও’য়াত দেন। এ দাওয়াতেই আবুল হায়সাম ইসলাম গ্রহণ করেন। এর এক বছর পর বারো জনের সাথে এবং তারও পরের বছর তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জনের সাথে তিনি ’আকাবায় রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আবার মিলিত হন। এভাবে তিনি ’আকাবার সব ক’টি বাই’য়াতে শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। (তাবাকাত- ১/২২, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) একটি বর্ণনা মতে, শেষ ’আকাবায় আবুল হায়সাম রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াতের জন্য সর্ব প্রথম নিজের হাতটি বাড়িয়ে দেন। মুসা ইবন ’উকবা ইমাম যুহরী থেকে একথা বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে অবশ্য যথেষ্ট মতভেদ আছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪৭, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪) তৃতীয় আকাবার শপথের সময় মদীনাবাসীরা যখন রাসূলুল্লাহকে সা. মদীনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো তখন মক্কা ও মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে যে কয়েকজন লোক ভাষণ দেন, আবুল হায়সাম তাদের অন্যতম। তাবারানী ’উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। আবুল হায়সাম ইবন তায়্যিহান রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করার সময় বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সাথে অন্য লোকদের চুক্তি আছে। এমনও কি হতে পারে, আমরা সেই চুক্তি বাতিল করলাম, তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলাম, আর এ দিকে আপনি স্বগোত্রে ফিরে এলেন? তাঁর কথা শুনে রাসূল সা. একটু হাসি দিয়ে বললেনঃ তোমাদের রক্তের দাবীর অর্থ হবে আমারই রক্তের দাবী, তোমাদের রক্তপাত মানে আমারই রক্তপাত। অর্থাৎ আমার ও তোমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। রাসূলুল্লাহর সা. এ কথায় সন্তুষ্ট হয়ে আবুল হায়সাম সাথীদের লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘‘আমার স্বগোত্রীয় লোকেরা! এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় তিনি সত্যবাদী। আজ তিনি মক্কার হারামে আত্মীয়দের মধ্যে নিরাপদেই আছেন। জেনে রাখ, যদি তোমরা এখান থেকে বের করে তাঁকে তোমাদের কাছে নিয়ে যাও তাহলে সমগ্র আরববাসী একই ধনুক থেকে তোমাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করবে। অর্থাৎ সকালের সাধারণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। যদি তোমরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং জান-মাল ও সন্তান-সন্ততি বিলিয়ে দিতে রাজী থাক তাহলেই তাঁকে তোমাদের ভূমিতে আমন্ত্রণ জানাও। কারণ, তিনি সত্যি সত্যিই আল্লাহর রাসূল। তোমরা যদি পরে অনুশোচনার ভয় কর তাহলে ভেবে দেখ।’’ আবুল হায়সামের এ বক্তব্যের পর তাঁর সাথীরা বললোঃ ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু আমাদের দিয়েছেন, আমরা তা কবুল করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের নিকট যা কিছু দাবী করেছেন আমরা তা আপনাকে দান করলাম। আবুল হায়সাম, আপনি একটু সরে দাঁড়ান, আমরা রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করি।’ আবুল হায়সাম বললেনঃ আমিই প্রথম বাই’য়াত করি। তাঁর বাই’য়াতের পর অন্যরা একের পর এক বাই’য়াত করে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/২৪৭,২৪৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪২) এ বাই’য়াতের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. বারোজন নাকীব বা দায়িত্বশীলের নাম ঘোষণা করেন। আউস গোত্র থেকে আবুল হায়সাম, উসাইদ ইবন হুদাইর ও সা’দ ইবন খায়সামা- এই তিনজন নাকীব মনোনীত হন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫২) হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় হিজরাত করে প্রখ্যাত মুহাজির হযরত উসমান ইবন মাজ’উনের সাথে আবুল হায়সামের মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ-সম্পর্ক কায়েম করে দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৭১, আল-ইসাবা- ৪/২১২) বদর, উহুদ, খন্দকসহ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। উহুদে তাঁর ভাই আতীক ইবন তায়্যিহান ইকরিমা উবন আবূ জাহলের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। (আনসাব- ১/৩২৯) ইবন সা’দ বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা মূতায় শহীদ হওয়ার পর হযরত রাসূলে কারীম সা. আবুল হায়সামকে খেজুরের পরিমাপকারী হিসাবে খাইবারে পাঠান। রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর হযরত আবু বকরও তাঁকে এ পদে বহাল রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। (তাবাকাত- ৩/৪৪৮) খলীফা হযরত ’উমারের খিলাপতকালে হিজরী ২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। একটি বর্ণনা মতে হিজরী ৩৭ সনে সিফ্ফীন যুদ্ধের পূর্বে তাঁর মৃত্যুর কথা জানা যায়। ইমাম আসমা’ঈ একটি বর্ণনা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আবুল হায়সামের গোত্রের লোকদের নিকট তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তারা বলেছে, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেছেন। হিজরী ২১ সনেও তাঁর মৃত্যুর কথা যেমন অনেকে বলেছেন তেমনি কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, তিনি সিফ্ফীনে হযরত আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করেছেন। অনেকে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, তিনি সিফ্ফীনে ’আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেছেন। (আনসাব- ১/২৪০, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) ঐতিহাসিক ওয়াকিদী স্পষ্ট করে বলেছেন, সিফ্ফীনে তাঁর যোগদানের বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এর বিপরীতে হিজরী ২০ সনে তাঁর মৃত্যুর কথা ইমাম যুহরী, সালেহ ইবন কায়সান এবং হাকেমের মত উঁচু স্তরের মুহাদ্দিসীন থেকে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এর বিপরীতে একটি সন্দেহযুক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। (সীয়ারে আনসার- ২) হাদীসের গ্রন্থসমূহে আবুল হায়সাম থেকে বর্ণিত কিছু হাদীস দেখা যায় তবে সেগুলির বিশুদ্ধতা সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। ইবন হাজার ’আসকালানী বলেছেনঃ আবুল হায়সাম থেকে বর্ণিত যত হাদীস দেখা যায় তার সবই সন্দেহযুক্ত। এমন কোন একটি বর্ণনা শৃঙ্খল পাওয়া যায় না যার দ্বারা সেগুলির কোন একটি যথার্থতা প্রমাণিত হয়। এর কারণ হল, বহু আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। (আল-ইসাবা- ৪/২১৩) আল-হায়সাম ইবন নাসর আল-আসলামী রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর সা খিদমাত করেছি। আবুল হাযসাম ইবন তায়্যিহানের ‘জাসিম’ নামক একটি কূয়ো ছিল। এই কূয়োর পানি ছিল সুমিষ্ট। আমি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য এই কূয়ো থেকে পানি আনতাম। একবার গরমের দিনে হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু বকরকে রা. সংগে করে আবুল হাযসামের বাড়ীতে আসেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ ঠান্ডা পানি আছে কি? আবুল হায়সাম এক বালতি বরফের মত ঠান্ডা পানি নিয়ে আসেন। ছাগলের দুধের সাথে সেই ঠান্ডা পানি মিশিয়ে রাসূলুল্লাহকে সা. পান করান। তারপর আরজ করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের একটি ঠান্ডা ছাউনী (’আরীশ) আছে। এই দুপুরে আপনি সেখানে একটু বিশ্রাম নিন। আবুল হায়সাম ছাউনীর ওপর পানি ছিটিয়ে দেন। রাসূল সা. আবু বকরকে সংগে করে সেখানে প্রবেশ করেন। আবুল হায়সাম বিভিন্ন ধরণের খেজুর এবং ডিশ ভর্তি ‘সারীদ’ (এক প্রকার উপাদেয় পানীয়) তাঁদের সামনে হাজির করেন। বর্ণনাকারী হাযসাম ইবন নাসর বলেন, রাসূল সা. আবু বকর এবং আমরা সবাই তা আহার ও পান করলাম। তারপর নামাযের সময় হলে তিনি আবুল হায়সামের বাড়ীতে আমাদের নিয়ে জামা’য়াত নামায আদায় করেন। জামা’য়াতে আবুল হায়সামের স্ত্রী ছিলেন আমার পেছনে। নামায শেষে তিনি আবার ছাউনীতে ফিরে যান এবং সেখানে জুহরের ফরজের পরের দু’রাকা’য়াত নামায আদায় করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৩৫) একদিন হযরত রাসূলে কারীম সা. অভ্যাসের বিপরীত, যখন তিনি ঘর থেকে বের হন না এমন এক সময়ে বের হলেন। কিছুক্ষণ পর আবু বকরও আসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আবু বকর, এমন অসময়ে বের হলে যে? বললেন, আপনার সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। এর মধ্যে ’উমারও উপস্থিত হলেন। রাসূল সা. তাঁকেও ঠিক একই প্রশ্ন করলেন। ’উমার জবাব দিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ক্ষুধাই আমাকে এখানে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও ক্ষুধার্ত। তিনজন একসাথে আবুল হায়সামের বাড়ীতে গেলেন। তাঁর ছিল খেজুরের বাগান এবং বকরীর পাল। কিন্তু কোন চাকর-বাকর ছিল না। সব কাজ নিজে করতেন। আর তখন তিনি বাড়ীতেও ছিলেন না। আওয়ায দিলে তাঁর স্ত্রী বললেন, পানি আনতে গেছেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল তিনি মশক ভর্তি পানি নিয়ে ফিরছেন। রাসূলুল্লাহকে সা. দেখে মশক মাটিতে রেখে দেন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আবেগের সাথে বলতে থাকেন, আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক! তারপর সবাইকে বাগানে নিয়ে যান। সেখানে বসার জন্য কোন জিনিস বিছিয়ে দেন। সবাইকে বসিয়ে রেখে খেজুরের একটি কাঁধি কেটে নিয়ে আসেন। রাসূল সা. বললেনঃ যদি পাকা খেজুর নিয়ে আসতে। বললেনঃ এতে কাঁচা-পাকা সব রকমের আছে, আপনার খুশীমত গ্রহণ করুন। রাসূল সা. সেই খেজুর থেকে কিছু খেলেন। তারপর পানি পান করলেন। সেই পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ ও সুস্বাদু। রাসূল সা. পানাহারের পর বললেন, দেখ, আল্লাহর কত নি’য়ামত। ছায়া, উৎকৃষ্ট খেজুর, ঠান্ডা পানি- আল্লাহর কসম, কিয়ামতের দিন এর সবকিছু সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আবুল হায়সাম সম্মানিত মেহমানদের বাগানে বসিয়ে রেখে বাড়ীতে আসেন এবং খাবারের আয়োজন করেন। তিনি ছোট একটি ছাগল জবেহ করেন এবং তা ভূনা করে মেহমানদের সামনে পেশ করেন। আহার পর্ব শেষ করে রাসূল সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের কি কোন চাকর নেই। বললেনঃ না। রাসূল সা. বললেনঃ আমার হাতে কোন যুদ্ধবন্দী এলে তুমি আমার কাছে এস। সেই সময় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে দু’জন যুদ্ধবন্দী আসে। তিনি আবুল হায়সামকে তাদের যে কোন একজনকে গ্রহণ করতে বলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. ওপর নির্বাচনের ভার ছেড়ে দেন। রাসূল সা. তাঁদের একজনকে তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বলেনঃ এর সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তিনি দাসটিসহ বাড়ীতে এসে রাসূলুল্লাহর সা. উপদেশের কথা স্ত্রীর নিকট বলেন। স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। তিনি বললেন, যদি রাসূলুল্লাহর সা. আদেশ-পালন করতে চাও, তাহলে তাকে আযাদ করে দাও। তিনি স্ত্রীর পরামর্শ মত দাসটি আযাদ করে দেন। তাঁদের এ কাজের কথা রাসুল সা. জানতে পেরে খুব খুশী হলেন এবং তাদের দু’জনেরই প্রশংসা করেন। (তিরমিজী- ৩৯১) তাছাড়া কানসুল ’উম্মাল গ্রন্থেও ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম ও ইমাম মালিক ঘটনাটি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। হাফেজ আল-মুনজিরী বলেন, এই ঘটনাটি আবুল হায়সাম ও আবু আইউব আল-আনসারী উভয়ের সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩১০) আবুল হাযসামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনারা ’আকাবায় কিসের ওপর বাই’য়াত করেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, বনী ইসরাঈলরা মূসার আ. হাতে যে বিষয়ের বাই’য়াত করেছিল আমরাও রাসূলুল্লাহর সা. হাতে ঠিক সেই বাই’য়াত করেছিলাম। (আনসাবুল আশরাফ ১/২৪০)
আস’য়াদ ইবন যুরারা (রা)

আবূ উমামা আস’য়াদ, যিনি আস’য়াদ আল-খায়র নামেও পরিচিত, মদীনার খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। তাঁর পিতা যুরারা ইবন ’আদাস। (আল-ইসাবা-১/৩৪; উসুদুল গাবা-১/৭১) তাঁর জন্মের সন-তারিখ সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। হযরত রাসূলে কারীমের সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে সমগ্র আরব উপদ্বীপ কুফর ও গুমরাহীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। তবে এর মধ্যেও কিছু লোক বিশুদ্ধ স্বভাব বা ফিতরাতের দাবী অনুসারে তাওহীদ বা একত্ববাদের প্রবক্তা ছিলেন। আস’য়াদ ইবন ইবন যুরারা তাঁদেরই একজন। (তাবাকাত- ১/১৪৬) ইসলাম-পূর্ব যুগেও ইয়াসরিবের (মদীনা) লোকেরা নিজেদের ঝগড়া বিবাদে কুরাইশদের সমর্থন লাভ এবং তা ফায়সালার উদ্দেশ্যে মক্কায় যাতায়াত করতো। তাছাড়া হজ্জ ও ’উমরা আদায়ের জন্যও তারা সেখানে যেত। অতঃপর মক্কায় ইসলামের অভ্যূদয় ঘটলো। এরমধ্যে হযরত রাসূলে কারীম সা. নবুওয়াতী জীবনের বেশ ক’টি বছর অতিবাহিতও করেছেন। মক্কার লোকদের ইসলামের দাওয়াত দানের সাথে সাথে বিভিন্ন মেলা ও হাটে-বাজারে উপস্থিত হয়ে ব্যাপকভাবে তিনি মানুষকে সত্যের দা’ওয়াত দিচ্ছেন। বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মক্কায় আগত বহিরাগত লোকদের নিকটও গোপনে কুরআনের বাণী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও পালন করে চলেছেন। ইবনুল আসীর ওয়াকিদীর সূত্রে বলেনঃ এমনি এক সময়ে আস’য়াদ ইবন যুরারা ও জাকওয়ান ইবন ’আবদিল কায়স নিজেদের একটি ঝগড়া নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে মক্কার কুরাইশ নেতা ’উতবা ইবন রাবী’য়ার নিকট যান। এই ’উতবার নিকট তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দেখা করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের সামনে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করেন এবং পবিত্র কুরআন থেকে কিছু তিলা’ওয়াত করে শোনান। এই সাক্ষাতেই তাঁরা দু’জন ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে ’উতবার কাছে আর না গিয়ে সোজা মদীনায় ফিরে যান। এভাবে তাঁরা দু’জনই হলেন মদনিায় আগমণকারী প্রথম মুসলমান। এটা নবুওয়াতের দশম বছরে ’আকাবার প্রথম বাই’য়াতের পূর্বের ঘটনা। (উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা- ১/৩৪, হায়াতুস সাহাবা- ১/৮৬) অবশ্য ইবন ইসহাকের বরাতে ইবনুল আসীর বলেছেন, আস’য়াদ ইবন যুরারা সেই লোকগুলির একজন যাঁরা নবুওয়াতের দশম বছরে অনুষ্ঠিত ’আকাবার ১ম বাইয়াতে শরিক হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর তিনি নবুওয়াতের একাদশ ও দ্বাদশ বছরে অনুষ্ঠিত ২য় ও ৩য় বাইয়াতেও উপস্থিত ছিলেন। তাই তিনি ছিলেন একজন পূর্ণ ’আকাবী ব্যক্তি। (উসুদুল গাবা- ১/৭১) প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে, মদীনার প্রথম মুসলমান কে- এ বিষয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞদের বিস্তর মতবিরোধ আছে। ইবন হিশাম বলেছেন, সুওয়াইদ ইবন সামিত হজ্জ অথবা ’উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় যান এবং রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ইয়াসরিববাসীরা তাঁকে ‘কামিল’ উপাধি দান করে। বীরত্ব, সাহসিকতা, কাব্য প্রতিভা, বংশ মর্যাদা, সম্মান-প্রতিপত্তি, মোটকথা সর্বগুণে গুণান্বিত ব্যক্তিকে সে যুগের আরবরা ‘কামিল’ উপাধি দান করতো। মদীনাবাসীদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর সা. দাও’য়াত লাভ ও কুরআন শোনার সৌভাগ্য সর্বপ্রথম তাঁরই হয়। ইবন হিশাম বলেন, এ দাওয়তের পর তিনি ইসলাম থেকে দূরে ছিলেন না। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪২৬-২৭) কিন্তু এর অব্যবহিত পরেই তিনি নিহত হন। যাই হোক সুওয়াইদ সর্ব প্রথম মুসলমান হলেও মদীনায় ফিরে ইসলামী দাওয়াতের কাজ শুরু করার সুযোগ পাননি। সম্ভবতঃ আস’য়াদ ও জাকওয়ানই প্রথম দুই ব্যক্তি যাঁরা সর্বপ্রথম মদীনায় ইসলামের তাবলীগের কাজ শুরু করেন। মদীনায় পৌঁছে সর্বপ্রথম তিনি আবুল হায়সামের সাথে দেখা করেন এবং তাঁর কাছে নিজের নতুন বিশ্বাসের কথা ব্যক্ত করেন। আবুল হায়সাম সাথে সাথে বলে ওঠেন, ‘‘তোমার সাথে আমিও তাঁর রিসালাতের প্রতি ঈমান আনলাম।’’ (তাবাকাত- ১/১৪৬) অনেকে এই আবুল হায়াসামকে মদীনার প্রথম মুসলমান বলে মনে করেছেন। নবুওয়াতের দশম বছরে প্রতিবছরের মত ইয়াসরিববাসীরা হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় আসে। তাদের মধ্য থেকে ছয় ব্যক্তি হজ্জ শেষে গোপনে মিনার আকা’বা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। এ ছয়জনের মধ্যে আস’য়াদও ছিলেন। পরের বছর হজ্জের মওসুমে ইয়াসরিববাসীরা আবার মক্কায় আসে। তাদের মধ্য থেকে বারোজন লোক গোপনে, আকাবায়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মিলিত হয়ে বাই’য়াত করেন। এই বারো জনের মধ্যে আসয়াদও ছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪২৯, ৪৩১, ৪৩৩, ৪৩৫, ৪৩৬, ৪৩৭) এই ’আকাবার পর মদীনায় যখন ইসলামের তাবলীগ ও দাওয়াতের সম্ভাবনা অনেকটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তখন তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট একজন শিক্ষক দাবী করেন, যিনি তাদেরকে কুরআন ও দ্বীন শিক্ষা দেবেন। তাঁদের দাবী অনুসারে রাসূল সা. মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে রা. ইয়াসরিবে দা’য়ী বা আহবায়ক হিসাবে পাঠালেন। মুসয়াবের মদীনায় যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সেখানে আসয়াদ ইবন যুরারা নামাযের ইমাম ছিলেন। তারপর মুস’য়াব ইমাম হন। তবে অনেকের মতে সালেম মাওলা আবী হুজাইফার মদীনা পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত আস’য়াদই সেখানে ইমামতির দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। মুস’য়াব শুধুমাত্র তাদের কুরআনের তা’লীম দিতেন। মদীনায় তাঁরা বাইতুল মাকদাসের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৩৯, ২৬৬) আস’য়াদ হযরত মুস’য়াবকে মদীনায় নিজ গৃহে অতিথির মর্যাদায় আশ্রয় দেন। (তাবাকাত- ৩/৪৮৩) হযরত মুস’য়াবের মদীনায় যাওয়ার পর আস’য়াদ ইবন যুরারা তাঁকে সংগে করে ব্যাপকভাবে দা’ওয়াতী তৎপরতা শুরু করেন। তাঁরা মদীনার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগতভাবে মানুষকে ইসলামের দা’ওয়াত দিতেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ একদিন আস’য়াদ ইবন যুরারা মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে সাথে করে বনী ’আবদিল আশহাল ও বনী যাফারের দিকে বের হলেন। তাঁরা বনী যাফারের একটি বাগিচায় প্রবেশ করে ‘মা’রাক’ নামক একটি কূপের ধারে প্রাচীরের ওপর বসলেন। তাঁদের চারপাশে লোকজন জড় হল। সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর ছিলৈন বনী ’আবদিল আশহালের নেতা। তখনও তারা পৌত্তলিক ছিলেন। সা’দ ছিলেন আস’য়াদের খালাতো ভাই। আস’য়াদ ও মুস’য়াবের আগমণের কথা জানতে পেয়ে সা’দ ছিলেন আস’য়াদের খালাতো ভাই। আস’য়াদ ও মুস’য়াবের আগমণের কথা জানতে পেয়ে সা’দ উসাইদকে বললেনঃ ‘উসাইদ, তুমি এ দু’ব্যক্তির কাছে যাওতো। তারা আমাদের বাড়ীর উপর এসে আমাদের দুর্বল লোকগুলিকে বোকা বানিয়ে যাচ্ছে। তুমি তাদেরকে নিষেধ করে এস। যদি আমার খালাতো ভাই আস’য়াদ না থাকতো তাহলে তোমার প্রয়োজন হতো না। আমিই তাদের তাড়িয়ে দিতাম।’ উসাইদ বল্লম হাতে নিয়ে তাঁদের দিকে এগিয়ে গেল। আস’য়াদ তাকে দেখে মুস’য়াবকে বললেন, ‘এ ব্যক্তি তার গোত্রের একজন নেতা, আপনার কাছে এসেছে।’ হযরত মুস’য়াব তার সাথে কথা বললেন। আল্লাহর ইচ্ছায় সেই বৈঠকেই উসাইদ মুসলমান হযে গেলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১৮৭/১৯০) আস’য়াদ ও মুস’য়াবের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মদীনায় ইসলামের এত ব্যাপক প্রসার হল যে , মাত্র এক বছর পর নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে হজ্জের মওসুমে তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জন নারী-পুরুষের একটি দল আবার মিনার ’আকাবায় গোপনে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মিলিত হয়। এই তৃতীয় তথা সর্বশেষ ’আকাবায় কে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর সা. হাতে হাত রেখে বাইয়াত বা শপথ করেন সে ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। একটি মতে সেই ভাগ্যবান ব্যক্তিটি আস’য়াদ। (আল-ইসাবা- ১/৩৪, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪, উসুদুল গাবা- ১/৭১) আবদুল্লাহ ইবন আবী বকর থেকে বর্ণিত। বাই’য়াতের পর রাসূল সা. বললেন, ‘তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে বারোজন ‘নাকীব’ নির্বাচন কর, যাঁরা হবে ঈসার হাওয়ায়ীদের (সাথী) মত আপন আপন গোত্রের কাফীল বা দায়িত্বশীল।’ আস’য়াদ সায় দিয়ে বললেনঃ ‘হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল সা. বললেনঃ তুমি হবে তোমার গোত্রের ‘নাকীব’। তারপর তিনি অন্য ‘নাকীব’-দের নাম ঘোষণা করেন। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওযাল আ’লাম- ১/১৮২) এভাবে তিনি হলেন রাসূল সা. মনোনীত বনী নাজ্জারের ‘নাকীব’। তবে ইবন মুন্দাহ ও আবূ নু’ঈমের মতে তিনি ছিলেন বনী সায়িদার ‘নাকীব’। ইবনুল আসীর বলেন, এটা তাঁদের ধারণা মাত্র। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন নিজ গোত্র বনী নাজ্জারের ‘নাকীব’। তাই তিনি যখন মারা যান তখন বনী নাজ্জারের লোকেরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট আবেদন করে- ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আস’য়াদ মারা গেছেন, তিনি ছিলেন আমাদের নাকীব। এখন আপনি অন্য একজন নতুন ‘নাকীব’ নির্বাচন করে দিন। জবাবে রাসূল সা. বললেনঃ তোমরা আমার মাতুল গোত্র। আমিই তোমাদের ‘নাকীব’। এটা ছিল বনী নাজ্জারের জন্য বিরাট মর্যাদা। (উসুদুল গাবা- ১/৭১-৭২) রাসূল সা. তাঁকে শুধু নাকীবই মনোনীত করেননি, বরং ‘নাকীব আল-নুকাবা বা প্রধান দায়িত্বশীল বলেও ঘোষণা দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪) ইবনুল আসীর বলেন, একমাত্র জাবির ইবন আবদিল্লাহ ছাড়া আস’য়াদ ছিলেন এই আকাবীদের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠ। (উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা- ১/৩৪) আকাবার তৃতীয় বাই’য়াতের পর এক বিরাট দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে তিনি মদীনায় ফিরে যান। বয়স অল্প হলে কি হবে। তাঁর ঈমানী জযবা বা আবেগ ছিল অতি তীব্র। তিনি মদীনায় জামা’য়াতে নামায আদায়ের ব্যবস্থা করেন এবং চল্লিশজন মুসল্লী নিয়ে সর্বপ্রথম মদীনায় জুম’য়ার নামায আদায়ের ব্যবস্থা করেন এবং চল্লিশজন মুসল্লী নেয় সর্বপ্রথম মদীনায় জুম’আর নামাযের জন্য বের হলে যখনই আযান শুনতে পেতেন, তিনি আবু উমামা আস’য়াদ ইবন যুরারার জন্য ইসতিগফার ও দু’আ করতেন। একদিন আমি বললামঃ ‘আব্বা, আপনি আযান শুনলে এভাবে সব সময় তাঁর জন্য দু’আ করেন কেন?’ বললেনঃ ‘বেটা! রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আসার আগে তিনিই সর্বপ্রথম আমাদেরকে বনী বায়দা’র ‘হাযমুত নাবীত’ নামক পাহাড়ের কাছে ‘নাকী আল-খাদিমাত’ নামক স্থানে একত্র করে জুম’আর নামায আদায় করতেন। আমাদের সংখ্যা হত ৪০ জন।’ (উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা- ১/৩৪, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৫, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৩, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৮৭) মদীনায় সর্বপ্রথম কে জুম’আর নামায কায়েম করেন সে ব্যাপারে মতভেদ আছে। হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় পৌঁছার পর যদিও আবু আইউব আল-আনসারীর রা. বাড়ীতে ওঠেন, তবে তাঁর বাহন উটনীটি আস’য়াদের মেহমান হয়। (তাবাকাত- ১/১৬০) রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় পৌঁছার প্রথম ক্ষণটিতে উটনীটি সর্বপ্রথম বসে পড়ে এবং পরে যে স্থানটি রাসূলুল্লাহর সা. মসজিদ ও বাসস্থানের জন্য নির্বাচিত হয়, সেই ভূমির মালিক ছিল সাহল ও সুহাইল নামক দুই ইয়াতীম বালক। আর তাদের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন আস’য়াদ ইবন যুরারা। (বুখারী, হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৪৩) রাসূল সা. বালক দু’টির মুরব্বী আস’য়াদের নিকট ভূমির মূল্য জানতে চান। বালক দু’টি সাথে সাথে বলে ওঠে, ‘আমরা আল্লাহর কাছেই এর মূল্য চাই।’ যেহেতু বিনা মূল্যে রাসূল সা. ভূমি গ্রহণে রাজী হলেন না তাই হযরত আবু বকর রা. তার মূল্য পরিশোধ করেন। তবে কোন কোন বর্ণনায় জানা যায়, আস’য়াদ ইবন যুরারা তাঁর বনী বায়দায় অবস্থিত একটি বাগিচা মসজিদের এই ভূমির বিনিময়ে ইয়াতীমদ্বয়কে দান করেন। (যারকানী- ১/৪২২) বালাজুরী বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আগমণের পর আবু আইউবের বাড়ীতে অবস্থানকালে আস’য়াদ ইবন যুরারা এক রাত পর পর পালাক্রমে তাঁর জন্য খাবার পাঠাতেন। আস’য়াদের বাড়ী থেকে খাবার আসার পালার রাতে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ ‘আস’য়াদের পিয়ালাটি কি এসেছে?’ বলা হত, ‘হাঁ।’ তিনি বলতেনঃ ‘তা হলে সেইটি নিয়ে এস।’ বর্ণনাকারী সাহাবী বলেন, তাতে আমরা বুঝে নিতাম তাঁর খাবারটি রাসূলুল্লাহর সা. প্রিয়। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৬৭) ওয়াকিদী হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা. মদীনায় আবু আইউবের বাড়ীতে ওঠার পর একদিন জিজ্ঞেস কররেনঃ ‘আবু আইউব, তোমার কি কোন খাট (পালঙ্ক) আছে?’ উল্লেখ্য যে, মক্কায় কুরাইশরা খাটে ঘুমাতে অভ্যস্ত ছিল। আবু আইউব বললেনঃ ‘না।’ একথা আস’য়াদ ইবন যুরারার কানে গেল। তিনি একটি স্তম্ভ ও কারুকার্য করা পায়া বিশিষ্ট একটি খাট পাঠিয়ে দিলেন। রাসূল সা. তাঁর ওপর ঘুমাতেন। অতঃপর রাসূল সা. যখন আমার ঘরে চলে আসেন এবং আমার মা আমাকে যে খাটটি দেন তাতেই তিনি ঘুমাতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫২৫) হযরত তালহা ইবন ’উবায়দিল্লাহ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাতের পর আস’যাদের বাড়ীতে ওঠেন। হযরত হামযাও তাঁর বাড়ীতে ওঠেন বলে বর্ণিত আছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৭৭-৪৭৮) মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ তখন চলছে। এমন সময়ে প্রথম হিজরীর শাওয়াল মাসে তাঁর পরকালের ডাক এসে যায়। তিনি ‘জাবহা’ নামক কণ্ঠনালীর এক প্রকার রোগে আক্রান্ত হন। হযরত রাসূলে কারীম সা. নিজ হাতে তাঁর আক্রান্ত স্থানে সেক দেন, তাঁর মাথায় হাত দেন; কিন্তু কোন উপকার দেখা গেল না। তিনি মারা যান। ওয়াকিদীর মতে হিজরতের পর ৯ম মাসে তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ সা. ব্যথিত হন। তিনি বলেন, ‘‘এখন তো ইয়াহুদীরা বলে বেড়াবে ‘যদি তিনি নবী হতেন তাহলে তাঁর সাথী মরতো না, অথচ আমি কি মৃত্যুর চিকিৎসা করতে পারি?’’ হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং মদীনার বাকী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫০৭, উসুদুল গাবা- ১/৭১, আল-ইসাবা-১/৩৪, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৩) বলা হয়ে থাকে রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পর এটাই প্রথম মৃত্যু। আর এটাও ধারণা করা হয় যে, এবারই সর্বপ্রথম রাসূল সা. জানাযার নামায আদায় করেন। আনসারদের ধারণা মতে বাকী’তে দাফনকৃত প্রথম মুসলমান আস’য়াদ আর মুহাজিরদের মতে ’উসমান ইবন মাজ’উন। (আল-ইসাবা-১/৩৪) মৃত্যুকালে হযরত আস’যাদ দু’টি কন্যা সন্তান রাসূলুল্লাহর সা. জিম্মায় ছেড়ে যান। রাসূল সা. আজীবন তাদের দেখাশুনা করেন। মোতির দানা মিশ্রিত সোনার বালা তিনি তাদের হাতে পরান। এক মেয়েকে তিনি সাহল ইবন হুনাইফের সাথে বিয়ে দেন এবং সেখানে তাঁর গর্ভে জন্মগ্রহণ করে আবু উমামা বিন সাহল। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৩, আল-ইসাবা- ১/৩৪)
আবদুল্লাহ ইবন মাখরামা (রা)

পুরো নাম আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ, পিতা মাখরামা ইবন আবদিল উযযা এবং মাতা বাহসানা বিনতু সাফওয়ান। কুরাইশ বংশের আমেরী শাখার সন্তান। (আল ইসাবা-২/৩৬৫)।
ইসলামী দাওয়াতের সূচনা লগ্নে মক্কায় ইসলাম গ্রহণ করেন। জাফর ইবন আবী তালিবের (রা) সাথে হাবশাগামী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। সেখান থেকে সরাসরি মদীনায় চলে যায় এবং হযরত কুলসুম ইবন হিদামের বাড়ীতে অতিথি হন। হরযত রাসূলে কারীম সা: ফারওয়া ইবন আমর আল বায়াদীর (রা) সাথে তার দ্বীনী ভাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। মদীনায় আসার পর সর্ব প্রথম বদর যুদ্ধে যোগদান করে বদরী সাহাবী হওয়ার মহা সম্মান অর্জন করেন। তখন তার বয়স ত্রিশ বছর। বদরের পর, উহুদ সহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূল সা: এর সাথে যোগ দেন।
হযরত আবদুল্লাহর (রা) শাহাদাত লাভের এত তীব্র বাসনা ছিলো যে, দেহের প্রতিটি লোম রক্ত রঞ্জিত করার জন্য সর্বদা ব্যাকুল থাকতেন। তিনি দুআ করতেন: হে আল্লাহ, তুমি আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত দুনিয়া থেকে উঠিয়ে নিওনা, যতক্ষণ না আমার দেহের প্রতিটি জোড়া আঘাতে আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। তার এ দুআ কবুল হয় এবং অনতিবিলম্বে সে সুযোগও এসে যায়।
হযরত আবু বকর সিদ্দীকের সা: খিলাফতকালে রিদ্দা বা ধর্মত্যাগের হিড়িক পড়ে যায়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে তিনি একজন মুজাহিদ হিসেবে যোগ দেন। মুরতাদদের বিরুদ্ধে তিনি এত নির্মম ভাবে যুদ্ধ করেন যে, তার সারা দেহ ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পবিত্র রমজান মাস। তিনি সাওম পালন করছিলেন। সূর্যাস্তের সময় যখন তারও জীবন সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাখরামা (রা) খোঁজ নিতে এসেছেন। আবদুল্লাহ ইবন মাখরামা (রা) তাকে জিজ্ঞেস করেন, আমার জন্যও একটু পানি আনুন না। পানি নিয়ে ফিরে এসে দেখেন তার প্রাণহীন দেহটি পড়ে আছে। তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র একচল্লিশ বছর। (আল ইসাবা-২/৩৬৫)।
ইলম, আমল, তাকওয়া ও পরহেযগারীর দিক দিয়ে তিনি ছিলেন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। উসুদুল গাবা গ্রন্থকার লিখেছেন, তিনি ছিলেন মাহাত্মের অধিকারী একজন আবেদ ব্যক্তি।
ওয়াকিদ ইবন আবদিল্লাহ (রা)

নাম ওয়াকিদ, পিতা আবদুল্লাহ। বনী তামিম গোত্রের হানজালী ইয়ারবূয়ী শাখার সন্তান। জাহিলী যুগে খাত্তাব ইবন নুফাইলের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। (তাবাকাত-৩/৩৯০, আল ইসাবা -৩/৬২৮)।
মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনালগ্নে হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত আরকাম ইবন আবিল আরকামের বাড়ীতে প্রবেশের পূর্বেই ওয়াকিদ ইসলাম গ্রহণ করেন। হিজরাতের নির্দেশ আসার পর তিনি মদীনায় হিজরাত করেন এবং হযরত রিফায়া ইবন আবদিল মুনজিরের অতিথি হন। মদীনায় রাসূল সা: বিশর ইবন বারা ইবন মারুর এর সাথে তার মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক কায়েম করে দেন। (তাবাকাত-৩/৩৯০)।
হযরত রাসূলে কারীম সা: মদীনায় হিজরাতের সতেরতম মাসটি ছিল রজব মাস। এ মাসে তিনি কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের নেতৃত্বে ১২ মতান্তরে ৯ সদস্যের একটি বাহিনীকে ‘নাখলায়’ পাঠান। এতে ওয়াকিদ ইবন আবদিল্লাহও ছিলেন। তারা নাখলায় পৌঁছে ওঁত পেতে আছেন। এমন সময় কুরাইশদের একটি ছোট্ট বাণিজ্য কাফিলা দৃষ্টিগোচর হয়। দিনটি ছিল রজবের একেবারে শেষ দিন। আর রজব মাসটি আরবে যুদ্ধ বিগ্রহ নিষিদ্ধ চার মাসের একটি। সুতরাং এ সময় আক্রমণ করা যাবে কি না, এ বিষয়ে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা পরামর্শ করেন। অবশেষে আক্রমণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ওয়াকিদ ইবন আবদিল্লাহ (রা) তীর নিক্ষেপ করেন। সেই নিক্ষিপ্ত তীরে শত্রুপক্ষের আমর ইবনুল হাদরামী নিহত হয় এবং উসমান ও হাকাম নামে দুই ব্যক্তি বন্দী হয়।
যেহেতু রক্তপাতের ঘটনাটি সংঘটিত হয় হারাম মাসে এ কারণে কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সা: ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে নানা ধরণের প্রচারণা চালাতে থাকে। তারা বলে, মুহাম্মাদ সা: ও তার অনুসারীরা কি আবহমান কাল ধরে মেনে আসা হারাম মাসগুলির পবিত্রতা মানে না? এমনকি রাসূল সা: নিজেও ঘটনাটি মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি বাহিনীর লোকদের ডেকে বললেন, আমি তো তোমাদের যুদ্ধের অনুমতি দেইনি, তবে কেন তোমরা যুদ্ধ করলে? এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা আল বাকারার নীচের আয়াতটি নাযিল হয়:
‘হে মুহাম্মাদ, মুশরিকরা তোমার নিকট ‘হারাম’ মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তুমি তাদেরকে বলে দাও এ মাসে যুদ্ধ করা বড় পাপের কাজ। কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা, আল্লাহর কুফুরী করা, মানুষকে মসজিদে হারামে ইবাদাত করা থেকে বিরত রাখা এবং সেখান থেকে তার অধিবাসীদের বের করে দেওয়া আল্লাহর নিকট এ মাসে যুদ্ধ অপেক্ষা অধিকতর পাপ কাজ। আর অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষা গুরুতর পাপ। (সূরা বাকারা-২১৭)।’
(আল ইসাবা-৩/৬২৮), আসাহুস সীয়ার-১২৮)।যাই হোক, আমর ইবনুল হাজরামী একজন মুসলমানের হাতে নিহত প্রথম কাফির, উসমান ও হাকাম ইসলামের ইতিহাসের প্রথম দুই কয়েদি এবং কুরাইশ কাফিলার নিকট থেকে প্রাপ্ত জিনিস ইসলামের প্রথম গণীমত। (আসাহুস সীয়ার-১২৮)।
এই ঘটনার পর বনী ইয়ারবু গর্ব করে বলে বেড়াতো আমাদেরই একজন ইসলামের ইতিহাসে সর্ব প্রথম একজন মুশরিককে হত্যা করেছে। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব কাব্য করে বলতেন: ‘নাখলায় আমরা আমাদের তীরগুলিকে ইবনুল হাদরামীর রক্ত পান করিয়েছি, যখন ওয়াকিদ যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। (আল ইসাবা-৩/৬২৮)
নাখলার পর বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে তিনি অংশ গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের খিলাফতকালের প্রথম দিকে তিনি ইনতিকাল করেন। তার কোন সন্তানাদি ছিল না। হাদীসের গ্রন্থ সমূহে তার থেকে বর্ণিত দুই/একটি হাদীস দেখা যায়।
আমর ইবন সাঈদ ইবনুল আস (রা)

আমরের ডাক নাম আবু উকবা। পিতা সাঈদ ইবনুল আস। কুরাইশ বংশের উমাইয়া শাখার সন্তান। মা বনী মাখযুমের কন্যা। আমর হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের ফুফাতো ভাই। (উসুদুল গাবা-৪/১০৬)। (আল ইসাবা-২/৫৩৯)।
সাঈদ ইবনুল আসের ৫ ছেলে- খালিদ, আবান, সাঈদ, আবদুল্লাহ, ও আমর। আগে পরে তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। যুবাইর ইবন বাককার বলেন: সাঈদ ইবনুল আসের ছেলে আবু উহায়হা সাঈদ ইবন সাঈদ তায়িফ অবরোধের সময় শাহাদাত বরণ করেন। আবদুল্লাহ ইবন সাঈদের পূর্ব নাম ছিল হাকাম। রাসূল সা: তা পরিবর্তন করে আবদুল্লাহ রাখেন। আমর ইবন সাঈদ আজনাদাইনের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। খালিদ অত:পর আমর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইবন ইসহাক বলেন, আমরের কোন সন্তানাদি ছিল না। সাঈদ ইবনুল আসের অন্য ছেলে আবান সব শেষে শেষে ইসলাম গ্রহণ করেন। ভাইদের বিশেষত: খালিদ ও আমরের ইসলাম গ্রহণে আবান দারুন ক্ষুব্দ হন। খালিদ, আমর ও আবান তিনজনই কবি ছিলেন। আবার তার দুই ভাই খালিদ ও আমর ইসলাম গ্রহণ করার পর তিরষ্কার করে একটি কবিতা লিখেন। খালিদ ও আমর কবিতায় তার জবাবও দেন। আল ইসাবা, সীরাতু ইবন হিশাম, উসুদুল গাবা প্রভৃতি গ্রন্থে সেই কবিতার কিছু অংশ সংকলিত হয়েছে। আবান তার ভাইদের তিরষ্কার করে যে কবিতাটি রচনা করেন তার একটি পংক্তি এই রকম: ‘হায়! আমর ও খালিদ দ্বীনের (ধর্ম) ব্যাপারে যে কেমন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে তা যদি ‘জাবীরা’র মৃত ব্যক্তি দেখতো!
তাদের পিতা সাঈদ ইবনুল আস ‘জাবীরা’ নামক স্থানে সমাহিত ছিল। এখানে সেই দিকেই ইংগিত করা হয়েছে। আমর কবিতায় জবাব দেন। তার একটি পংক্তি এমন: এখন ঐ মৃতদের কথা ছেড়ে দাও, যারা তাদের পথে চলে গেছেন। এখন সেই সত্যের দিকে এস যার সত্য হওয়াটা একেই সুস্পষ্ট।(আল ইসাবা-২/৫৩৯)। সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৬০)।
খালিদ ইবন সাঈদের হাবশায় হিজরাতের দুই বছর পর হাবশাগামী দ্বিতীয় দলটির সাথে আমর ইবন সাঈদ স্ত্রী ফাতিমা বিনতু সাফওয়ান সহ হাবশায় হিজরাত করেন। ফাতিমা বিনতু সাফওয়ান হাবশায় ইনতিকাল করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/ ৩৬০)। আর আমর হাবশা থেকে মুসলিম কাফিলার সাথে জাহাজ যোগে খাইবার যুদ্ধের সময় মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় আসার পর মক্কা বিজয় সহ হুনাইন, তায়িফ, তাবুক, প্রভৃতি অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর সা: সাথে যোগ দেন।
হযরত রাসূলে কারীম সা: সাঈদের তিন ছেলে আবান, খালিদ ও আমরকে তিন অঞ্চলের শাসক নিয়োগ করেন। খালিদ ইয়ামন, আবান বাহরাইন এবং আমর মদীনার পশ্চিম অঞ্চল তথা তাবুক, খাইবার, ফিদাক ইত্যাদির শাসক ছিলেন। তারা সকলে রাসূলুল্লাহর সা: ইনতিকাল পর্যন্ত অতি দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: এর ওফাতের পর তারা মদীনায় চলে আসেন। হযরত আবু বকর (রা) খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর সকলকে তাদের পূর্ব পদে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন: শাসন কাজ পরিচালনার জন্য আপনাদের থেকে অধিকতর হকদার ব্যক্তি আমি আর কাউকে দেখি না। (আল ইসাবা-২/৫৩৯)।
কিন্তু সাঈদ ইবনুল আসের ছেলেরা খলীফার এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে: আমরা রাসূল সা: এর পরে আর কারও আমিন বা শাসক হব না।
হযরত আবু বকর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর সিরিয়ায় রোমানদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। বিশিষ্ট সাহাবীদের একটি বৈঠকে এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও মতামত গ্রহণ করা হয়। একে একে সবাই মত প্রকাশ করছেন, আবার অনেকে নীরব রয়েছেন। এক সময় হযরত উমার (রা) সকলকে উতসাহিত করার উদ্দেশ্যে বলেন: যদি আশু ফল লাভের সম্ভাবনা দেখা যেত অথবা সফর নিকটবর্তী হতো, শুধু তাহলেই কি আপনারা বেরুতেন? উমারের (রা) এ বক্তব্যে আমর ইবন সাঈদ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, আপনি মুনাফিকদের সম্পর্কে প্রয়োগকৃত দৃষ্টান্ত আমাদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করলেন? আপনি নিজে চুপ করে বসে আছেন কেন? আপনিই প্রথম শুরু করুন না। এ পর্যায়ে উমারের সাথে তার বেশ কথা কাটাকাটি হয়। অত:পর খলীফা আবু বকর (রা) বলেন, আসলে উমারের বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো আপনাদেরকে অনুপ্রাণিত ও উতসাহিত করা। সাথে সাথে আমরের ভাই খালিদ উঠে দাড়ান এবং খলীফার বক্তব্য সমর্থন করে এক ভাষণ দেন। এ ভাবে বিষয়টির মীমাংসা হয়। (হায়াতুস সাহাবা-১৪৪০)
শাসনকর্তার পদ প্রত্যাখ্যান করে আমর একজন সাধারণ মুজাহিদ হিসাবে সিরিয়া অভিযানে যোগদেন। হিজরী ১৩ সনে আজনাদাইনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। মুসলিম বাহিনীর একটু দূর্বলতা দেখলেই তিনি চিতকার করে নানা ভাবে মনোবল দৃঢ় করার চেষ্ঠা করেন। একবার অত্যন্ত আবেগের সাথে বলেন, যুদ্ধের ময়দানে আমি আমার সাথীদের দূর্বলতা মোটেই দেখতে পারিনে। এখন আমি নিজেই ঢুকে পড়বো। এ কথা বলে তিনি শত্রু বাহিনীর মধ্যভাগের ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে চলে যান এবং অত্যন্ত দু:সাহসের সাথে লড়তে লড়তে শাহাদাত বরণ করেন। যুদ্ধের শেষে তার লাশ কুড়িয়ে দেখা গেল অসংখ্য আঘাতে সারা দেহ ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। গুণে দেখা গেল মোট ত্রিশটি চিহ্ন। অবশ্য ইবন ইসহাক ও মূসা ইবন উকবার মতে আমর ‘মারজ আস সাফার’ যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। (আল ইসাবা-২/৫৩৯)।
আবু আহমাদ ইবন জাহাশ (রা)

আসল নাম আবদ মতান্তরে আবদুল্লাহ, ডাকনাম আবু আহমাদ। পিতা জাহশ ইবন রিয়াব এবং মাতা উমাইমা বিনতু আবদিল মুত্তালিব। একদিকে রাসূলুল্লাহ সা: এর ফুফাতো ভাই, অন্যদিকে রাসুল সা: এর স্ত্রী উম্মুল মুমিনীন হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশের আপন ভাই। (আনসাবুল আশরাফ-১/৮৮, আল ইসাবা-৪/৩)।
মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা: ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বে আহমাদ তার অন্য দুই ভাই- আবদুল্লাহ ও উবায়দুল্লাহর সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। মক্কায় রাসূলুল্লাহ সা: হযরত আল আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে আশ্রয় নেওয়ার পূর্বেই তাদের ইসলাম গ্রহণের কাজটি সম্পন্ন হয়। বালাযুরী বলেছেন, তার অন্য দুই ভাই আবদুল্লাহ ও উবাদুল্লাহ হাবশায় হিজরাত করলেও তিনি হাবশায় হিজরাত করেননি। তিনি আরও বলেছেন, যে সব বর্ণনায় তার হাবশায় হিজরাতের কথা পাওয়া যায় তা সবই ভিত্তিহীন। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৯৯)।
ইবন ইসহাক আবু আহমাদের পরিচয় ও মদীনায় হিজরাত সম্পর্কে বলেন: আবু সালামার পর সর্ব প্রথম যারা মদীনায় আসেন, আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি নিজ পরিবার এবং অন্য এক ভাই- আবু আহমাদকেও সংগে নিয়ে আসেন। এই আবু আহমাদ এক অন্ধ ব্যক্তি। তিনি মক্কার উঁচু নীচু ভূমিতে কারও সাহায্য ছাড়া ঘুরে বেড়াতেন। আবু সুফইয়ানের কন্যা ‘ফারয়া’ তার স্ত্রী। আর তার মা আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা উমাইমা।
তারা ঘর বাড়ী ছেড়ে মদীনায় চলে এলে একদিন উতবা ইবন রাবীয়া, আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিব ও আবু জাহল ইবন হিশাম তাদের পরিত্যক্ত বাড়ীর পাশ দিয়ে মক্কার উঁচু ভূমির দিকে যাচ্ছিল। উতবা খালি বাড়ীটির দিকে ইঙ্গিত করে কবি আবু দুওয়াদ আল ইয়াদীর একটি কবিতার শ্লোক আওড়িয়ে আফসুসের সুরে বলে: বনী জাহাশের বাড়িটি একেবারেই খালি হয়ে গেল। আবু জাহল তার জবাবে বললো: এতো আমাদের ভায়ের ছেলের কাজেরই পরিণাম। সে আমাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে, আমাদের সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে আমাদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে।…। মদীনায় কুবার বনী আমর ইবন আওফের পল্লীতে আবু সালামা ইবন আবদিল আসাদ, আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ও আবু আহমাদ বসবাস করতেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৭০-৪৭২)।
মদীনায় পৌঁছে প্রথমত: তিনি হযরত মুবাশশির ইবন আবদিল মুনজিরের অতিথি হন। মক্কায় একদল লোকের সার্বক্ষণিক কাজ ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকানো এবং মুসলমানদের কষ্ট দেওয়া। এই দলটির প্রধান ছিল দুই ব্যক্তি: আবু সুফইয়ান ও আবু জাহল। আবু আহমাদ আগে ভাগে হিজরাত করে তাদের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় সরাসরি তাদের অত্যাচার থেকে বেঁচে যান। তবে আবু সুফইয়ান তাদের পরিত্যক্ত বাড়ীটি অন্যায়ভাবে আমর ইবন আলাকামার নিকট বিক্রি করে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৯৯)
সম্ভবত আবু সুফইয়ানের মেয়ে ‘ফারয়া’ ছিল এই বাড়ীর পুত্রবধূ, সেই অধিকারে সে বাড়িটি বিক্রি করে। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৫০০)। হিজরী ৮ম সনে মক্কা বিজয়ের পর আবু আহমাদ তাদের বাড়ীর প্রসঙ্গটি রাসূল সা: এর নিকট উত্থাপন করেন। লোকেরা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে: আবু আহমাদ, আল্লাহর পথে যা তোমরা হারিয়েছ, এখন তা আবার দাবী কর- রাসূল সা: পছন্দ করেননা। অন্য একটি বর্ণনা মতে আবু আহমাদের দাবীর পর হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত উসমানের (রা) মাধ্যমে তাকে কিছু বলে পাঠান। হযরত উসমান (রা) সে কথা তাকে কানে কানে বলেন। তারপর মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বাড়ী সম্পর্কে আর একটি কথাও তিনি উচ্চারণ করেননি। পরে তার সন্তানদের কাছে জানা গেছে হযরত রাসূলে কারীম সা: তাকে বাড়ীর দাবী ত্যাগ করতে বলেন এবং বিনিময়ে তাকে জান্নাতে একটি প্রাসাদের সুসংবাদ দান করেন।
তবে তিনি আবু সুফইয়ানের উদ্দেশ্যে একটি জ্বালাময়ী কবিতা রচনা করেন। তার কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপ: তোমরা আবু সুফইয়ানকে বলে দাও, সে যা করেছে তার পরিণাম লজ্জা ও অনুশোচনা। তুমি চাচতো ভাইদের বাড়ী বিক্রি করে নিজের ঋণ পরিশোধ করেছ।
মানুষের রব আল্লাহর নামে আমি শক্ত কসম করেছি। যাও, নিয়ে যাও, যা, আমি সেই অর্থ তোমার গলায় কবুতরের গলার মালার মতো মালা বানিয়ে দিলাম, (যা আর কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না বা বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না)। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/ ৬৪৪)।
রাসূল সা: আযাদকৃত দাস যায়িদ ইবন হারিসার সাথে হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশের বিবাহ বিচ্ছেদ হলে আবু আহমাদই তাকে রাসূল সা: এর সাথে বিয়ে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৬৪৪) হযরত আবু আহমাদ মদীনায় ইনতিকাল করেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/ ১৯৯)।
তবে তার মৃত্যুর সময় সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ আছে। ইবনুল আসীর দৃঢ়ভাবে বলেছেন: তিনি বোন যয়নাব বিনতু জাহাশের পরে মারা গেছেন। অর্থাত হিজরী ২০ সনের পরে। কারণ হযরত যয়নাব মারা যান হি: ২০ সনে। ইবন হাজার এ মত সমর্থন করেননি। তিনি বলেন, এমন বর্ণনাও তো আছে যে, আবু আহমাদের মৃত্যুর পর তার বোন যয়নাব কিছু খোশবু আনিয়ে তার গায়ে লাগিয়ে দেন। বুখারী ও মুসলিমে যয়নাব বিনতু উম্মু সালামা থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন: আমি যয়নাব বিনতু জাহাশের এক ভায়ের মৃত্যুর সময় যয়নাবের ঘরে যাই। তিনি কিছু খোশবু আনিয়ে তার গায়ে লাগিয়ে দেন। ইবন হাজার বলেন, এটা আবু আহমাদের মৃত্যুর সময়ের ঘটনা হবে। কারণ যয়নাবের অন্য দুই ভাই আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহর সা: জীবদ্দশায় উহুদে শহীদ হন এবং উবায়দুল্লাহ মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী অবস্থায় হাবশায় মৃত্যুবরণ করে। তার স্ত্রী উম্মু হাবীবাকে রাসূল সা: বিয়ে করেন। (আল ইসাবা-৪/৪)।


















