তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
হানজালা ইবন আবী ’আমির (রা)

নাম হানজালা, লকব বা উপাধি ‘গাসীলুল মালায়িকা’ ও তাকী। মদীনার আউস গোত্রের ‘আমর ইবন’ আউফ শাখার সন্তান। পিতার নাম আবু ’আমির ’আমর, মতান্তরে ’আবদু ’আমর, মাতার নাম জানা যায় না। তবে এতটুকু জানা যায় যে, তিনি খাযরাজ নেতা মুনাফিক ’আবদুল্লাহ ইবন ’উবাইয়ের বোন ছিলেন। হানজালার জন্ম ও কৈশোর সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হানজালার পিতা আবূ ’আমির ছিলেন আউস গোত্রের একজন সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। সেই জাহিলী আরবে দ্বীনে হানীফের একজন বিশ্বাসী হিসেবে তিনি নবুওয়াত, রিসালা, কিয়ামাত ইত্যাদি বিশ্বাস করতেন। এই ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁকে ‘রুহবানিয়্যাত’ (বৈরাগ্য)- এর দিকে নিয়ে যায় এবং সব রকম পার্থিব নেতৃত্ব ছেড়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব অর্জন করেন। জীবনের এক পর্যায়ে গেরুয়া বসন পরিধান করে নির্জনবাস অবলম্বন করেন। একারণে তিনি ‘রাহিব’ (বৈরাগী) হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। (আল-ইসাবা- ১/৩৬১) এদিকে রাসূলে কারীম সা. নবুওয়াত লাভ করেন এবং মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করে ইসলামী খিলাফতের ভিত্তি স্থাপন করেন। এতে আবু ’আমির ও ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই উভয়ের নেতৃত্বে ভাটা পড়ে। ’আবদুল্লাহ ইবন ’উবাই মুনাফিকী (দ্বিমুখী) নীতি অবলম্বন করে মদীনাতেই বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু আবূ ’আমির ততখানি ধৈর্যধরণ করতে পারেননি। তিনি মদীনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি কুরাইশ বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে মদীনা আক্রমণে আসেন। একারণে হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে ‘ফাসিক’ নামে অভিহিত করেন। যুদ্ধ শেষে তিনি মক্কায় ফিরে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। হিজরী অষ্টম সনে মুসলমানদের দ্বারা মক্কা বিজিত হলে আল্লাহর যমীন তাঁর জন্য আবার সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তিনি মক্কা ছেড়ে রোমান সম্রাট হিরাকলের দরবারে পৌঁছেন এবং সেখানেই হিজরী দশ সনে মারা যান। এই তো ছিল আবূ ’আমিরের কুফরী বা অবিশ্বাসের চরম অবস্থা। অপর দিকে তাঁর ছেলে হযরত হানজালার ঈমানী মজবুতীর চরম অবস্থাও লক্ষ্যণীয়। তিনি ইসলাম কবুল করে আবেদন জানানঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি নির্দেশ দিলে আমি আমার পিতা আবূ ’আমিরকে হত্যা করতাম। কিন্তু রাসূল সা. তাঁর এ আবেদন মঞ্জুর করেননি। মুনাফিক সরদার ’আবদুল্লাহ ইবন ’উবাইর ছেলে হযরত ’আবদুল্লাহ রা. তাঁর পিতার ব্যাপারেও অনুরূপ আবেদন জানিয়েছিলেন এবং রাসূল সা. তাঁকেও একইভাবে নিবৃত্ত করেছিলেন। হযরত হানজালা বদর যুদ্ধে যোগ দেন নি। এর কারণ জানা যায় না। তবে উহুদ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। আর এটাই ছিল তাঁর ইসলামী জীবনের প্রথম ও শেষ যুদ্ধ। তিনি স্ত্রী উপগত হয়ে ঘরে শুয়ে আছেন। এমন সময় ঘোষকের কণ্ঠ কানে গেলঃ ‘এক্ষুনি জিহাদে বের হতে হবে।’ জিহাদের ডাক শুনে ‘তাহারাতের’ (পবিত্রতা) গোসলের কথা ভুলে গেলেন। সেই অশুচি অবস্থায় কোষমুক্ত তরবারি হাতে উহুদের প্রান্তরে উপস্থিত হলেন। যুদ্ধ শুরু হলো। তিনি কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান ইবন হারবের সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। তাকে কাবু করে তরবারির আঘাত করবেন, ঠিক সেই সময় নিকট থেকে শাদ্দাদ ইবন আসওয়াদ আল-লায়সী দেখে ফেলে এবং দ্রুত হানজালার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তরবারির এক আঘাতে তাঁর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। অনেকে বলেছেন, আবূ সুফইয়ান ও শাদ্দাদ দু’জনে একযোগে তাঁকে হত্যা করেন। তবে ‘রাওদুল আন্ফ’ গ্রন্থকার নাফে’ ইবন আবী নু’ঈম- মাওলা জা’উনা ইবন শা’উবকে হানজালার ঘাতক বলে উল্লেখ করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৭৫, ১২৩) বদর যুদ্ধে আবূ সুফইয়ানের পুত্র ‘হানজালা’ মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তাই উহুদে এই হানজালাকে হত্যার পর সে মন্তব্য করেঃ ‘হানজালার পরিবর্তে হানজালা।’ হযরত হানজালা রা. নামাক অবস্থায় শহীদ হন। শাহাদাতের পর ফিরিশতারা তাঁকে গোসল দেয়। তাই দেখে হযরত রাসূলে কারীম সা. সাহাবীদের বললেন, তোমরা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস কর তো ব্যাপার কি? হিশাম ইবন ’উরওয়া বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা. হানজালার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হানজালার ব্যাপারটি কি? স্ত্রী বললেনঃ হানজালা নাপাক ছিল। আমি তাঁর মাথার একাংশ মাত্র ধুইয়েছি, এমন সময় জিহাদের ডাক তাঁর কানে গেল। গোসল অসম্পূর্ণ রেখেই সেই অবস্থায় বেরিয়ে গেলেন এবং শাহাদাত বরণ করলেন। একথা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ এই জন্য আমিক ফিরিশতাদেরকে তাঁকে গোসল দিতে দেখেছি। (আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার টীকা- ১/২৮১; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৪) আর এখান থেকৈই ‘গাসীলুল মালায়িকা’ (ফিরিশতাকুল কর্তৃক গোসলকৃত) লকব বা উপাধিতে ভূষিত হন। হযরত হানজালা মৃত্যুর সময় ’আবদুল্লাহ নামে এক ছেলে রেখে যান। হযরত রাসুলে কারীমের সা. মদীনায় আগমনের পর এই ’আবদুল্লাহর জন্ম হয় এবং রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের সময় তাঁর বয়স হয় মাত্র সাত-আট বছর। পরিণত বয়সে তিনি পিতার সুযোগ্য উত্তরসুরী বলে নিজেকে প্রমাণ করেন। উমাইয়্যা শাসক ইয়াযিদ ইবন মু’য়াবিয়ার কলঙ্কজনক কর্মকান্ডের প্রতিবাদে তাঁর প্রতি কৃত ‘বাই’য়াত’ (আনুগত্যের অঙ্গীকার) প্রত্যাখ্যান তিনি হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের রা. প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ইয়াযীদের বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে। হযরত ’আবদুল্লাহ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে মদীনাবাসীদের সাথে নিয়ে নিজেই সেনাপতি হিসেবে আক্রমণকারীদের বাধা দেন। অসংখ্য মদীনাবাসী শাহাদাত বরণ করেন। একের পর এক হযরত ’আবদুল্লাহর আট পুত্র ইয়াযীদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হন। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য হযরত ’আবদুল্লাহ স্বচক্ষে অবলোকন করেন। অবশেষে তিনি নিজেই অগ্রসর হন। উহুদে শাহাদাতপ্রাপ্ত পিতার রক্তরঞ্জিত পোশাক পরে তিনি শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শাহাদাত বরণ করেন। এ ছিল হিজরী ৬৩ সনের জ্বিলহজ্জ মাসের ঘটনা। হযরত হানজালার পিতা ‘ফাসিক’ ছিলেন। আর এই ‘ফাসিক’ পিতার সন্তান হানজালা ‘তাকী’ (আল্লাহ ভীরু) উপাধি লাভ করেন। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে তিনি কত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ইবন ’আসাকির বর্ণনা করেছেন, খলীফা ’উমার যখন লোকদের ভাতার ব্যবস্থা করেন তখন হানজালার ছেলে ’আবদুল্লাহর জন্য দুই হাজার দিরহাম নির্ধারণ করেন। হযরত তালহা তাঁর ভাইয়ের ছেলের হাত ধরে খলীফার নিকট নিয়ে গেলেন। খলীফা তাঁর জন্য কিছু কম অংক নির্ধারণ করলেন। তালহা বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন। আপনি এই আনসারীকে আমার ভাতীজার চেয়ে বেশি দিলেন? খলীফা বললেনঃ হ্যাঁ। কারণ, তাঁর পিতা হানজালাকে আমি উহুদে অসির নীচে এমনভাবে হারিয়ে যেতে দেখেছি যেমন একটি উট হারিয়ে যায়। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২১৮) একবার আনসারদের দুই গোত্র- আউস ও খাযরাজ নিজেদের গৌরব ও সম্মানের কথা বর্ণনা করছিল। তারা নিজ নিজ গোত্রের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নাম উচ্চারণ করল। আউস গোত্র সর্বপ্রথম উচ্চারণ করল হানজালা ইবন আবী আমিরের পুণ্যময় নামটি। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। একবার আউস গোত্রের লোকেরা গর্ব করে বললঃ আমাদের আছে হানজালা- যাঁকে ফিরিশতারা গোসল দিয়েছেন; আসিম ইবন সাবিত- আল্লাহ যাঁর দেহ মৌমাছি ও ভীমরুলের দ্বারা মুশরিকদের হাত থেকে হিফাজত করেছিলেন; খুযায়মা ইবন সাবিত- যাঁর একার সাক্ষ্য দুইজনের সাক্ষ্যের সমান; আর আছে সা’দ ইবন ’উবাদা- যার মৃত্যুতে আল্লাহর ’আরশ কেঁপে উঠেছিল। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ১/৩৬১, আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবা টীকা- ১/২৮০-২৮২, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৭৫, ১২৩)
মু’য়াজ ইবন জাবাল (রা)

নাম মু’য়াজ, ডাকনাম আবু আবদির রহমান এবং লকব বা উপাধি ‘ইমামুল ফুকাহা, কানযুল ’উলামা ও রাব্বানিয়্যূল কুলূব।’ মদীনার খাযরাজ গোত্রের উদায় ইবন সা’দ শাখার সন্তান। অনেকে তাঁকে সালামা ইবন সা’দ শাখার সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেছেন, প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন বনু কুদা’য়া গোত্রের সন্তান, উদায় ইবন সা’দ গোত্রের নাম। এ গোত্রের লোকেরা তাঁকে নিজেদের গোত্রের লোক বলে দাবী করতো। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৭, আল-ইসাবা- ৪/৪২৭, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৬৪, উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৬) হিজরাতের ২০ বছর পূর্বে ৬০৩ খৃষ্টাব্দে ইয়াসরিবে (মদীনায়) জন্মগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬) তাঁর বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ সা’দ ইবন আলীর ছিল দুই ছেলে। তাদের নাম সালামা ও উদায়। সালামার বংশকে বলা হয় বনু সালামা। এই বংশে আবু কাতাদাহ, জাবির ইবন আবদিল্লাহ, কা’ব ইবন মালিক, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবন হারাম- এর মত বিখ্যাত সাহাবী জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখিত ব্যক্তিবৃন্দ ছাড়াও আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির এই বংশের সাথে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সালামার ভাই উদায়-এর বংশে রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের সময় শুধু এক মু’য়াজ-ই জীবিত ছিলেন এবং হিজরী ১৮ অথবা ১৯ সনে তাঁর মৃত্যুর সাথে এই বংশধারা চিরদিনের জন্য বিলীন হয়ে যায়। ইমাম সাম’য়ানী ‘কিতাবুল আনসাব’ গ্রন্থে হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ ইবন তাহিরকে এই উদায়-এর বংশের লোক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এ তথ্য সঠিক নয়। কারণ নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহ দ্বারা একথা প্রমাণিত যে, ইসলামের প্রাথমিক পর্বে এই খান্দানের দুই ব্যক্তি জীবিত ছিলেন। তাঁদের একজন মু’য়াজ ইবন জাবাল এবং দ্বিতীয় জন তাঁরই ছেলে ’আবদুর রহমান। আর তাঁরা উভয়ে শামের ‘আমওয়াসের মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৬) বনু উদায়- এর বাসস্থান তাদের চাচাতো গোষ্ঠী বনু সালঅমের পাশে মসজিদুল কিবলাতাইন- এর ধারে কাছেই ছিল। হযরত মু’য়াজের বাড়ীটিও ছিল এখানে। হযরত মু’য়াজের পিতা জাবাল ইবন আমর এবং মাতা হিন্দা বিনতু সাহল আল-জুহানিয়্যা। বদরী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল জাদ্দ (রা) তাঁর বৈপিত্রীয় ভাই। (তাবাকাত- ৩/৫৭১, ৫৮৩) মু’য়াজের ছেলের নাম ছিল আবদুর রহমান। এ জন্য তাঁকে আবু ’আবদির রহমান বলে ডাকা হতো। (তাবাকাত- ৩/৫৮৩) মক্কা থেকে মদীনায় প্রেরিত রাসূলুল্লাহর সা. দা’ঈ-ই-ইসলাম হযরত মুস’য়াব ইবন উমাইরের রা. হাতে নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে হযরত মু’য়াজ যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৬) তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর পরবর্তী হজ্জ মওসুমে মুস’য়াব ইবন ’উমাইর মক্কায় চললেন। মদীনাবাসী নবদীক্ষিত মুসলমান ও মুশরিকদের একটি দলও হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে তাঁর সংগী হলো। হযরত মুয়াজও ছিলেন এই কাফিলার একজন সদস্য। মক্কার আকাবায় তাঁরা গোপনে রাসূলুল্লাহর সা. দীদার লাভ করে তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। এটা ছিল আকাবার তৃতীয় বা শেষ বাইয়াত। এই দলটি মক্কা থেকে ফিরে আসার পর মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের দা’ওয়াত ছড়িয়ে পড়ে। অল্প বয়স্ক মু’য়াজ যখন মক্কা থেকে ফিরলেন, ঈমানী আবেগে তাঁর অন্তর তখন ভরপুর। এখন কারও বাড়ী মূর্তি থাকাটা তাঁর নিকট অসহনীয়। মদীনায় ফিরে তিনি এবং তাঁর মত আরও কিছু যুবক সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা প্রকাশ্যে বা গোপনে যেভাবেই হোক মদীনাকে প্রতীমামুক্ত করবেন। তাঁদের এই আন্দোলনের ফলে হযরত ’আমর ইবনুল জামূহ প্রতীমা পূজা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। ’আমর ইবনুল জামূহ ছিলেন মদীনার বনু সালামা গোত্রের অতি সম্মানিত সরদার। অন্য নেতাদের মত তাঁরও ছিল একটি অতি প্রিয় কাঠের প্রতীমা। প্রতীমাটির নাম ছিল মানাত। এই প্রতীমাটির প্রতি ছিল ’আমরের অত্যধিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা। তিনি অতি যত্নসহকারে সুগন্ধি মাখিয়ে রেশমী কাপড় দিয়ে সেটি সব সময় ঢেকে রাখতেন। মক্কা থেকে ফেরা এই তরুণরা রাতের অন্ধকারে একদিন চুপে চুপে মূর্তিটি তুলে নিয়ে বনু সালামা গোত্রের ময়লা-আবর্জনা ফেলার গর্তে ফেলে দেয়। ইবন ইসহাক এই উৎসাহী তরুণদের তিনজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেনঃ মু’য়াজ ইবন জাবাল, আবদুল্লাহ ইবন উনাইস ও সালামা ইবন গানামা। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬৯৯) সকালে ঘুম থেকে উঠে ’আমর ইবন জামূহ যথাস্থানে প্রতীমাটি না পেয়ে খোঁজা-খুঁজি শুরু করলেন। এক সময় ময়লা-আবর্জনার স্তূপে প্রতীমাটি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখে ব্যথিত কণ্ঠে বলেনঃ তোমাদের সর্বনাশ হোক! গত রাতে আমাদের ইলাহ’র সাথে কারা এমন আচরণ করলো? তিনি প্রতীমাটি সেখান থেকে তুলে ধুলে মুছে পরিষ্কার করে আতর-সুগন্ধি লাগিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। প্রতীমাকে সম্বোধন করে বললেনঃ ওহে মানাত, আমি যদি জানতাম, কারা তোমার সাথে এমন আচরণ করেছে! পরদিন রাতে আবার একই ঘটনা ঘটলো। সকালে ’আমর খুঁজতে খুঁজতে অন্য একটি গর্ত থেকে প্রতীমাটি উদ্ধার করে ধুয়ে মুছে আগের মত রেখে দেন। পরের রাতে একই ঘটনা ঘটলো। তিনিও আগের মত সেটি কুড়িয়ে এনে একই স্থানে রেখে দিলেন। তবে এ দিন তিনি প্রতীমাটির কাঁধে একটি তরবারি ঝুলিয়ে দিয়ে বলেনঃ ‘‘আল্লাহর কসম! তোমার সাথে কে বা কারা এমন আচরণ করছে, আমি জানিনে। তবে তুমি তাদের দেখেছো। হে মানাত, তোমার মধ্যে যদি কোন ক্ষমতা থাকে তুমি তাদের থেকে আত্মরক্ষা কর। এই থাকলো তোমার সাথে তরবারি।’’ রাত হলো। তরুণরা আজও এলো। তারা প্রতীমার কাঁধ থেকে তরবারি তুলে নিয়ে একটি মৃত কুকুরের সাথে সেটি বাঁধলো। তারপর প্রতীমাসহ কুকুরটি একটি নোংরা গর্তে ফেলে চলে গেল। ’আমর সকালে খুঁজতে বেরিয়ে মূর্তিটির এমন দশা দেখে তাকে লক্ষ্য করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। তার প্রথম লাইনটি এমনঃ ‘আল্লাহর কসম! তুমি যদি সত্যিই ইলাহ হতে তাহলে এমনভাবে কুকুর ও তুমি এক সাথে গর্তে পড়ে থাকতে না।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৩-৫৪) এভাবে ’আমর ইবন জামূহ মূর্তিপূজার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। (দ্রঃ সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ৭/১২২-১২৬, হায়াতুস সাহাবা- ১/২৩০, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫২, ৪৫৩, ৬৯৯) হযরত মু’য়াজের ইসলাম গ্রহণের অল্পকাল পরে হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় হিজরাত করেন। এরপর উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। (তাবাকাত- ৩/৫৮৪, আল-আলাম- ৮/১৬৬) হযরত মু’য়াজ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় কুরআন মজীদ হিফজ করেন। রাসূলে কারীমের সা. জীবনকালে যে ছয় ব্যক্তি কুরআন সংয়গ্রহ ও সংরক্ষণ করেন তিনি তাঁদের অন্যতম। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬) রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় বনু সালামার মহল্লায় একটি মসজিদ নির্মিত হলে হযরত মু’য়াজ এই মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। একদিন তিনি ’ঈশার নামাযে সূরা বাকারাহ পাঠ করেন। পিছনে মুকতাদীদের মধ্যে ছিলেন কর্মক্লান্ত এক ক্ষেত মজুর। হযরত মু’য়াজের নামায শেষ করার আগেই তিনি নামায ছেড়ে চলে যান। নামায শেষে মু’য়াজ বিষয়টি জানতে পেরে মন্তব্য করেনঃ সে একজন মুনাফিক (কপট মুসলমান)। লোকটি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট মু’য়াজের বিরুদ্ধে নালিশ জানালো। রাসূলুল্লাহ সা. মু’য়াজকে ডেকে বললেনঃ মুয়াজ! তুমি কি মানুষকে ফিতনায় ফেলতে চাও? তারপর তিনি বলেনঃ ছোট ছোট সূরা পাঠ করবে। কারণ, তোমার পিছনে বৃদ্ধ, দুর্বল ও ব্যস্ত লোকও থাকে। তাদের সবার কথা তোমার স্মরণে থাকা উচিত। (বুখারী- ১/৯৮) হিজরী নবম সনে হযরত রাসূলে কারীম সা. তাবুক অভিযান শেষ করে সবে মাত্র মদীনায় ফিরেছেন। এমন সময় রমজান মাসে ইয়ামনের হিময়ার গোত্রের শাসকের দূত মদীনায় খবর নিয়ে আসে যে, ইয়ামনবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ খবর পেয়ে রাসূল সা. সেখানকার আমীর হিসাবে মু’য়াজ ইবন জাবালকে মনোনীত করেন। আমীর মনোনীত হওয়ার পূর্বে হযরত মু’য়াজের সকল সহায় সম্পত্তি ঋণের দায়ে বিক্রী হয়ে গিয়েছিল। হযরত জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ বলেনঃ চেহারা-সুরৎ, স্বভাব-চরিত্র ও দানশীলতার দিক দিয়ে মু’য়াজ ছিলেন সর্বোত্তম লোকদের অন্যতম। দরায হস্তের কারণে তিনি প্রচুর ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পাওনাদাররা তাগাদা দিতে শুরু করলে কিছুদিন তিনি বাড়ীতে লুকিয়ে থাকেন। তারা তাদের পাওনা আদায় করে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহকে সা. অনুরোধ করলো। রাসূল সা. মু’য়াজকে ডাকলেন। পাওনাদার হাজির হলো। তাঁরা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, মু’য়াজের নিকট থেকে আমাদের পাওনা আদায় করে দিন। রাসূল সা. মু’য়াজের দুর্দশা দেখে পাওনাদারদের বললেনঃ যে তার পাওনা মাফ করে দেবে আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করবেন। রাসূলুল্লাহর সা. এ কথার পর কিছু পাওনাদার তাদের দাবী ছেড়ে দেয়। তবে অনেকে দাবী ছাড়তে নারাজি প্রকাশ করে। তখন রাসূল সা. বললেনঃ মু’য়াজ, তুমি ধৈর্য ধর। তারপর তিনি মু’য়াজের সকল সম্পদ পাওনাদারদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। তাতেও তার সব ঋণ পরিশোধ হলো না। তখন তিনি পাওনাদারদের বললেনঃ এর অতিরিক্ত তোমরা পাবেনা, এই গুলিই নিয়ে যাও। রাসূলুল্লাহর সা. দরবার থেকে হযরত মু’য়াজ রিক্ত হস্তে বনু সালামার দিকে ফিরে গেলেন। সেখানে এক ব্যক্তি বললোঃ আবু আবদির রহমান, তুমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট কিছু সাহায্য চাইলে না কেন? আজ তো তুমি একেবারে কপর্দকহীন হয়ে পড়েছ। মু’য়াজ বললেনঃ চাওয়া আমার স্বভাব নয়। মু’য়াজের কথা রাসূলুল্লাহর সা. স্মরণ ছিল। একদিন পর তিনি মু’য়াজকে ডাকলেন এবং তাঁকে ইয়ামনে আমীর হিসাবে নিযুক্তির কথা জানিয়ে বললেনঃ আশা করা যায় আল্লাহ তোমার ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২১, তাবাকাত- ৩/৫৮৪) যদিও হযরত মু’য়াজের আমীর হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর সা. পূর্ণ আস্থা ছিল, তবুও তাঁকে ইয়ামনে পাঠানোর পূর্বে একটি পরীক্ষা নেওয়া উচিত মনে করলেন। তিনি মু’য়াজকে ডেকে প্রশ্ন করলেনঃ – আচ্ছা, তুমি ফায়সালা করবে কিভাবে? – কুরআনের দ্বারা। – যদি এমন কোন বিষয় আসে যার সমাধান কুরআনে না পাও, তখন কি করবে? – আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতের দ্বারা ফায়সালা করবো। – যদি এমন কোন বিষয়ের সম্মুখীন হও যার সমাধান কুরআন অথবা সুন্নাতে পাচ্ছ না, তখন কি করবে? – আমি নিজেই ইজতিহাদ করে ফায়সালা করবো। হযরত মু’য়াজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। তাঁর জবাবে রাসূল সা. সন্তুষ্ট হয়ে বললেনঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর রাসূলের রাসূলকে (দূত) এমন জিনিসের তাওফীক বা ক্ষমতা দান করেছেন যা তাঁর রাসূলের পছন্দ। (আল-ইসতী’য়াব; আল-ইসাবার পার্শ্বটীকা- ৪/৪৫৮, তাবাকাত- ২/১৪৭-১৪৮) মু’য়াজের পরীক্ষা শেষ করে রাসূল সা. ইয়ামানবাসীদের উদ্দেশ্যে একটি পত্র লেখেন। তাতে হযরত মু’য়াজের স্থান ও মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬) তিনি লেখেনঃ ‘ইন্নি বা’য়াস্তু লাকুম খায়রা আহলী-’- আমি আমার সর্বোত্তম আহল বা পরিজনকে তোমাদের নিকট পাঠালাম। তিনি আরও লিখলেন, তোমরা মু’য়াজ ও অন্য লোকদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। সাদাকা ও জিযিয়ার অর্থ তার নিকট জমা করবে। আমি মু’য়াজ ইবন জাবালকে ইয়ামনে বসবাসরত সকলের ওপর আমীর নিয়োগ করছি। তাকে সন্তুষ্ট রাখবে এবং এমন যেন না হয় যে সে তোমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে। সফরের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে হযরত মু’য়াজ গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে। সেখানে আরও লোক ছিল। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে বিদায় নেন। মু’য়াজ উটের ওপর সাওয়ার ছিলেন, আর তাঁর পাশে রাসূল সা. পায়ে হেঁটে চলছিলেন। দুই জনের মধ্যে কিছু কথাবার্তাও হচ্ছিল। রাসূল সা. বললেনঃ মু’য়াজ তোমার দায়িত্ব অনেক। কেউ কিছু হাদিয়া দিলে তুমি তা গ্রহণ করবে। আমি তোমাকে তা গ্রহণের অনুমতি দিচ্ছি। বিদায়ের পূর্ব মুহূর্তে রাসূল সা. বললেনঃ ‘সম্ভবতঃ তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। এরপর তুমি মদীনায় ফিরে আমার স্থলে আমার কবর ও মসজিদ যিয়ারত করবে।’ সাথে সাথে মু’য়াজ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। রাসুল সা. বললেনঃ ‘কেঁদো না। কান্না শয়তানী কাজ। যাও আল্লাহ তোমাকে সব রকম বিপদ-আপদ থেকে হিফাজত করুন।’ একথা বলে রাসূল সা. মু’য়াজকে ছেড়ে দেন। মু’য়াজ অত্যন্ত ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মদীনার দিকে তাকিয়ে বলেনঃ মুত্তাকীরাই (খোদাভীরু) আমার নিকটতম মানুষ- তা তারা যে কেউ হোক না কেন এবং যেখানেই থাকুক না কেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৩৬) হযরত মু’য়াজ ইয়ামনে মাত্র দুই বছর ছিলেন। হিজরী নবম সনে ’আমীরের দায়িত্ব নিয়ে ইয়ামনে যান এবং হিজরী একাদশ সনে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে স্বেচ্ছায় মদীনায় ফিরে আসেন। হযরত মু’য়াজ ইয়ামন যাওয়ার কিছুদিন পর রাসূল সা. ইনতিকাল করেন এবং হযরত আবু বকর রা. খলীফা হন। তিনি আমীরে হজ্জের দায়িত্ব দিয়ে ’উমারকে মক্কায় পাঠালেন। এদিকে হযরত মু’য়াজও হজ্জের উদ্দেশ্যে ইয়ামন থেকে সরাসরি তাঁর লাটবহর সহ মক্কায় পৌঁছলেন। মিনায় দুইজনের সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় ও কোলাকুলি হলো। মু’য়াজের সাথে তাঁর অনেকগুলি দাস ও লাটবহর দেখে ’উমার জিজ্ঞেস করলেনঃ – আবু ’আবদির রহমান, এসব কি? – এগুলি আমার। আমি অর্জন করেছি। – কিভাবে অর্জন করলে? – লোকেরা আমাকে হাদিয়া দিয়েছে। – তুমি আবু বকরকে এসব কথা জানাবে এবং সবকিছুই তাঁর হাতে তুলে দেবে। যদি তিনি তোমাকে কিছু দান করেন, তুমি তা গ্রহণ করবে। – আমি তোমার কথা মানবো না। মানুষ আমাকে দান করেছে, আর আমি তা আবু বকরের হাতে তুলে দেব? হযরত ’উমার রা. মদীনায় ফিরে খলীফাকে পরামর্শ দিলেন, মু’য়াজের জীবন ধারণের মত কিছু অর্থ তাঁকে দিয়ে অবশিষ্ট সবকিছু বাইতুল মালে জমা করা হোক। আবু বকর জবাব দিলেনঃ তাঁকে ’আমীর নিয়োগ করেন খোদ রাসূলুল্লাহ সা.। সে যদি নিজেই জমা দিতে ইচ্ছা করে এবং আমার কাছে নিয়ে আসে, আমি গ্রহণ করবো। অন্যথায় এক কপর্দকও গ্রহণ করবো না। হযরত ’উমার খলীফার জবাব পেয়ে আবার মু’য়াজের কাছে যান এবং পুনরায় তাঁকে জমা দেওয়ার তাকিদ দেন। এবার মু’য়াজ বলেনঃ আমাকে রাসূল সা. ইয়ামনে শুধু এই জন্য পাঠান যে, আমি যেন সেখানে থেকে নিজের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারি। আমি কিছুই দেব না। হযরত ’উমার নীরবে উঠে চলে আসলেন। তবে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। হযরত মু’য়াজ তো ’উমারকে ফিরিয়ে দিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য সাহায্যে তিনি ’উমারের সাথে একমত পোষণ করেন। মু’য়াজ রাতে ঘুমিয়ে গেলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সোজা ’উমারের নিকট গিয়ে বললেনঃ আপনার কথা মানা ছাড়া আমার আর উপায় নেই। রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর আপনি আমাকে টেনে ধরে রেখেছেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে মু’য়াজ পানিতে ডুবে যাচ্ছেন এবং ’উমার তাঁকে উদ্ধার করছেন। তারপর মু’য়াজ সকল দাস-দাসী সংগে করে খলীফা আবু বকরের নিকট হাজির হন এবং পুরো ঘটনা বর্ণনার পর বলেন, আমার কাছে যা কিছু আছে সবই এনে হাজির করছি। আবু বকর রা. বললেনঃ আমি তোমার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করবো না, সবই তোমাকে হিবা বা দান করলাম। কারণ, আমি রাসূলকে সা. বলতে শুনেছিঃ ‘আশা করা যায় আল্লাহ তোমার ক্ষতি পুরণ করে দেবেন।’ অন্য একটি বর্ণনা মতে আবু বকর তাঁর নিকট থেকে কিছু সম্পদ গ্রহণ করে তাঁর অবশিষ্ট ঋণ পরিশোধ করেন এবং বাকী সম্পদ সবই তাঁকে দান করেন। হযরত ’উমার তখন মু’য়াজকে লক্ষ্য করে বলেনঃ এখন সবই তোমার কাছে রাখ। এখন তুমি অনুমতি প্রাপ্ত। হযরত মু’য়াজ দাসদের সংগে করে বাড়ী ফিরলেন। তাদের সাথে জামায়াতে নামায আদায় করলেন। সালাম ফিরিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কার জন্য নামায আদায় করলে? তারা বললোঃ আল্লাহর জন্য। মু’য়াজ বললেনঃ তাহলে তোমরা মুক্ত, তোমরা তাঁরই জন্য। (তাবাকাত- ৩/৫৮৬-৫৮৮, হায়াতুস সাহাবা- ১৫২-১৫৪) রাসূলুল্লাহ সা. মু’য়াজকে ইয়ামনে পাঠালেন। একদিকে তিনি ইয়ামনে গভর্ণর, অন্যদিকে সেখানকার তাবলীগ ও দ্বীনী তা’লীমের দায়িত্বশীলও। বিচারের দায়িত্ব ছাড়াও দ্বীনী দায়িত্বও পালন করতেন। তিনি লোকদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, ইসলামী বিধি-বিধানের প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি ইয়ামনে থাকাকালীন একবার হাওলান গোত্রের এক মহিলা তাঁর নিকট এলো। তার ছিল বারোটি ছেলে। তবে সবচেয়ে ছোট ছেলেটিও তখন শ্মশ্রু মন্ডিত। এর দ্বারাই অনুমান করা যায় মহিলার বয়স কত হতে পারে। স্বামীকে একা বাড়ীতে রেখে বারোটি ছেলের সকলকে সংগে করে সে এসেছে। দুই ছেলে তার দুইটি বাহু ধরে চলতে সাহায্য করেছে। মহিলা মু’য়াজকে প্রশ্ন করলোঃ – আপনাকে কে পাঠিয়েছে? – রাসূলুল্লাহ সা.। – আপনি তাহলে রাসূলুল্লাহর সা. নির্বাচিত প্রতিনিধি? আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চাই। – করুন। – স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক বা অধিকার কতটুকু? – যথাসম্ভব আল্লাহকে ভয় করে তার আনুগত্য করবে। – আল্লাহর কসম, আপনি একটু ঠিক ঠিক বলবেন। – আপনি এতটুকুতে সন্তুষ্ট নন? – ছেলেদের বাবা বৃদ্ধ হয়েছে, আমি তাঁর হক কিভাবে আদায় করবো? – আপনি তার দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন না। যদি কুষ্ঠ রোগে তার দেহ পঁচে ফেটে যায়, রক্ত ও পুঁজ ঝরতে থাকে, আর আপনি তাতে মুখ লাগিয়ে চুষে নেন, তবুও তার হক পুরোপুরি আদায় হবে না। (মুসনাদ- ৫/২৩৯, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৫৯০-৯০, সীয়ারে আনসার- ২/১৬৬) হযরত রাসূলে কারীম সা. গোটা ইয়ামনকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন; সান’য়া, কিন্দাহ, হাদরামাউত, জানাদ, খুবাইব। ইয়ামনের রাজধানী ছিল জানাদ, আর এখানেই থাকতেন হযরত মু’য়াজ। তিনিই জানাদের জামে’ মসজিদটির নির্মাতা। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৩০) অবশিষ্ট চারটি স্থানে নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ শাসক নিযুক্ত হনঃ সান’য়া- হযরত খালিদ ইবন সা’ঈদ, কিন্দাহ- হযরত মুহাজির ইবন আবী উমাইয়্যা, হাদরামাউত- হযরত যিয়াদ ইবন লাবীদ এবং খুবাইদ ও উপকূলীয় এলাকায়- হযরত আবু মূসা আল-আশয়ারী রা.। উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ এলাকায় সাদাকা, জিযিয়া ইত্যাদি আদায় করে হযরত মু’য়াজের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। রাজকোষের পূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন হযরত মু’য়াজ। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৩০) হযরত মু’য়াজ বিভিন্ন সময়ে তাঁর অধীনস্থ শাসকদের এলাকাসমূহ ঘুরে ঘুরে তাঁদের বিচার ও সিদ্ধান্তসমূহ দেখাশুনা করতেন। প্রয়োজনবোধে তিনি নিজেও মুকাদ্দামার শুনানী করতেন। একবার হযরত আবু মূসার অঞ্চলে গিয়ে এভাবে একটি মুকাদ্দামার ফায়সালা করেন। এসব সফরে তিনি তাঁবুতে অবস্থান করতেন। আবু মুসার এখানেও তাঁর জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করা হয়। তিনিও আবু মূসা দুইজনই পাশাপাশি তাঁবুতে অবস্থান করেন। (বুখারী- ২/৬৩৩) হযরত রাসূলে কালীম সা. যখন মু’য়াজকে ইয়ামনে পাঠান তখন তাঁকে একটি লিখিত নির্দেশনামা দান করেন। তাতে গনীমাত, খুমুস, সাদাকাত, জিযিয়াসহ বিভিন্ন বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। হযরত মু’য়াজ সব সময় তারই আলোকে কাজ করতেন। একবার এক ব্যক্তি একপাল গরু নিয়ে এলো। গরুগুলি সংখ্যায় ছিল তিরিশটি। রাসূল সা. তাঁকে তিরিশটি গরুতে একটি বাছুর নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ কারণে হযরত মু’য়াজ বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে না জেনে কিছুই গ্রহণ করবো না। কারণ এ ব্যাপারে রাসূল সা. আমাকে কিছুই বলেননি। এ দ্বারা বুঝা যায় রাসূলুল্লাহর সা. ওয়ালীগণ দুনিয়ার অন্যান্য শাসকদের মত অত্যাচারী ছিলেন না। রক্ষক ও রক্ষিতের মাঝে যে সম্পর্ক ইসলাম ঘোষণা করেছিল, তারা সব সময় তা স্মরণে রাখতেন। আর রক্ষকের ওপর শরীয়াত যেসব দায়িত্ব অর্পন করেছে তারা তা কঠোর ভাবে অনুসরণ করতেন। বিচার ও সিদ্ধান্তের সময়ও জনগণের অধিকার যাতে খর্ব না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তাদের আদালত সমূহে সর্বদা সত্য ও সততার বিজয় ছিল। এক ইয়াহুদী মারা গেল। একমাত্র ভাই রেখে গেল উত্তরাধিকারী। সেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বিষয়টি হযরত মু’য়অজের ’আদালতে উত্থাপিত হলো। তিনি ভাইকে উত্তরাধিকার দান করেন। (মুসনাদ- ৫/২৩০) হযরত মু’য়াজ ছিলেন জীবনের প্রথম থেকে অতি বুদ্ধিমান। রাসূল সা. মদীনায় আগমনের পর তিনি তাঁর সঙ্গ অবলম্বন করেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যে ফায়েজে নববীর বরকতে ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ মডেলের রূপ লাভ করেন এবং বিশিষ্ট সাহাবীদের মধ্যে পরিগণিত হন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে এত মুহাব্বত করতেন যে, অধিকাংশ সময় তাঁকে নিজেহর বাহনের পিছনে বসার সুযোগ দিয়ে নানা রকম ইলম ও মা’রেফাত শিক্ষা দিতেন। একবার তিনি রাসূলুল্লাহর সা. বাহনের পিছনে বসেছিলেন। রাসূল সা. ডাকলেঃ মু’য়াজ। তিনি জবাব দিলেনঃ লাব্বাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ ও সা’দাইকা- হাজির ইয়া রাসূলুল্লাহ! রাসূল সা. আবার ডাকলেনঃ মু’য়াজ। তনি অত্যন্ত আদব ও শ্রদ্ধার সাথে জবাব দিলেন। এভাবে রাসূল সা. তিনবার ডাকলেন, আর মু’য়াজও প্রতিবার সাড়া দিলেন। তারপর রাসূল সা. বললেনঃ ‘যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে কালিমা-ই-তাওহীদ পাঠ করে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেন।’ মু’য়াজ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি মানুষের কাছে এই সুসংবাদ কি পৌঁছে দেব? তিনি বললেনঃ না। কারণ, মানুষ আমল ছেড়ে দেবে। (বুখারী- ১/২৪) হযরত মু’য়াজের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. স্নেহের এত আধিক্য ছিল যে, তিনি নিজে কোন প্রশ্ন না করলে রাসুল সা. বলতেন, তুমি একাকী পেয়েও আমার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করছো না কেন? একবার মু’য়াজ রাসূলুল্লাহর সা. সাথে খচ্চরের ওপর সাওয়ার ছিলেন। রাসূল সা. চাবুক দিয়ে খচ্চরের পিঠে মৃদু আঘাত করে বলেনঃ ‘তুমি কি জান বান্দার ওপর আল্লাহর হক কি?’ মু’য়াজ বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সা. বললেনঃ ‘বান্দা তাঁর ইবাদাত করবে এবং শিরক থেকে বিরত থাকবে।’ কিছুদূর যাওয়ার পর আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ আচ্ছা বলতে পার, আল্লাহর নিকট বান্দা রহক বা অধিকার কি? মু’য়াজ বললেনঃ এ ব্যাপারে তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই বেশী জানেন। বললেনঃ ‘তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (মুসনাদ- ৫/২৩৮) এভাবে হযরত মু’য়াজ সর্বদা রাসূলুল্লাহর সা. স্নেহ ও আদর লাভে ধন্য হয়েছেন। উঠতে বসতে সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহর সা. নিকট শিক্ষার সুযোগ লাভ করেছেন। একবার তো দরযায় অপেক্ষমান দেখতে পেয়ে রাসুল সা. তাঁকে একটি জিনিস শিখিয়ে দিলেন। আর একবার বললেনঃ আমি কি তোমাকে জান্নাতের দরযার কথা বলে দেব? বললেনঃ হাঁ। ইরশাদ হলঃ ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পাঠ করবে। (মুসনাদ- ৫/২৩৮) একবার এক সফরে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গী ছিলেন। একদিন সকালে যখন সৈন্যরা লক্ষ্যস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন তিনি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে বসা। তিনি আবদার জানালেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন কোন আমল শিখিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যায় এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখে। রাসূল সা. বললেনঃ ‘তুমি একটা কঠিন বিষয় জানতে চেয়েছ। তবে আল্লাহ যাকে তাওফীক বা সামর্থ দান করেন তার জন্য সহজ। শিরক করবে না, ইবাদাত করবে, নামায আদায় করবে, যাকাত দান করবে, রমজান মাসে সিয়াম পালন করবে এবং হজ্জ আদায় করবে।’ তিনি আরও বলেনঃ ‘কল্যাণের কয়েকটি দ্বার আছে। আমি তোমাকে বলছি, শোনঃ সাওম- যা ঢালের কাজ করে, সাদাকা- যা পাপের আগুনকে পানির মতো নিভিয়ে দেয় এবং যে নামায রাতের বিভিন্ন অংশে আদায় করা হয়। এরপর তিনি নীচের আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ ‘তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায় এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ (সূরা সাজদা- ১৬) তিনি আরও বলেনঃ ‘ইসলামের মাথা, খুঁটি ও চূড়ার কথা বলছি। মাথা ও খুঁটি হচ্ছে নামায এবং চূড়া হচ্ছে জিহাদ।’ তারপর বললেনঃ ‘এইসব জিনিসের মূল হচ্ছে একটি মাত্র জিনিস। আর তা হলো ‘জিহবা’। তিনি নিজের ‘জিহবা’ বের করে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বলেন, একে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।’ মু’য়াজ প্রশ্ন করলেনঃ এই যে আমরা যা কিছু বলি, তার সব কিছুরই কি জবাবদিহি করতে হবে? বললেনঃ ‘মু’য়াজ! তোমার মার সর্বনাশ হোক। অনেকে শুধু এর জন্যই জাহান্নামে যাবে।’ (মুসনাদ- ৫/২৩১) একবার তো রাসূল সা. মু’য়াজকে দশটি বিষয়ের অসীয়াত করলেন। ১. শিরক করবে না। তার জন্য কেউ যদি তোমাকে হত্যা করে অথবা আগুনে পুড়িয়েও মারে, তবুও না। ২. মাতা-পিতাকে কষ্ট দেবে না। তারা যদি তোমাকে তোমার সন্তান-সন্ততি ও বিষয়-সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তবুও। ৩. ফরজ নামায ইচ্ছাকৃতভাবে কক্ষণও তরক করবে না। যে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তরক করে আল্লাহ তার জিম্মাদারী থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেন। ৪. মদ পান করবে না। কারণ, এ কাজটি সকল অশ্লীলতার মূল। ৫. পাপ কর্মে লিপ্ত হবে না। পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির ওপর আল্লাহর ক্রোধ বৈধ হয়ে যায়। ৬. জিহাদের ময়দান থেকে পালাবে না। যদি সকল সৈন্য রক্ত রঞ্জিত ও ধুলিমলিন হয়ে যায় এবং ব্যাপকভাবে মৃত্যুবরণ করে, তবুও না। ৭. মহামারি আকারে কোন রোগ-ব্যধি দেখা দিলে অটল থাকবে। ৮. নিজের সন্তানদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। ৯. তাদেরকে সর্বদা আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেবে। ১০. তাদেরকে খাওফে খোদা (আল্লাহর ভয়) শিক্ষা দেবে। হযরত রাসূলে কারীম সা. একবার মু’য়াজকে পাঁচটি জিনিসের তাকিদ দিয়ে বলেছিলেনঃ যে এই ’আমলগুলি করে আল্লাহ তার জামিন হয়ে যান। ১. অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, ২. জানাযার সাথে চলা, ৩. জিহাদে বের হওয়া, ৪. শাসককে ভীতি প্রদর্শন অথবা সম্মান দেখানোর জন্য যাওয়া, ৫. ঘরে চুপচাপ বসে থাকা- যে যেখানে সে নিরাপদ থাকে এবং মানুষও তার থেকে নিরাপদ হয়ে যায়। রাসুল সা. তাঁকে নৈতিক শিক্ষা দেন এভাবেঃ ‘মু’য়াজ! একটি মন্দ কাজ করার পর একটি নেক কাজ কর। নেক কাজ মন্দ কাজটি বিলীন করে দেয়। আর মানুষের সামনে সর্বোত্তম নৈতিকতার দৃষ্টিতে উপস্থাপন কর।’ (মুসনাদ- ৫/২৩৮) তিনি মু’য়াজকে এ কথাও শিক্ষা দেনঃ মাজলুম বা অত্যাচারিতের বদ দু’আ থেকে দূরে থাকবে। কারণ, সেই বদ দু’আ ও আল্লাহর মাঝে কোন প্রতিবন্ধক থাকে না। (বুখারী) রাসূল সা. যখন তাঁকে ইয়ামানের আমীর করে পাঠান তখন বলেছিলেনঃ ‘মু’য়াজ! ভোগ-বিলাসিতা থেকে দূরে থাকবে। কারণ, আল্লাহর বান্দা কক্ষণও আরামপ্রিয় ও বিলাসী হতে পারে না।’ (মুসনাদ-৫/২৪৩) রাসূল সা. তাঁকে সামাজিক জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন এভাবেঃ ‘মানুষের নেকড়ে হচ্ছে শয়তান। নেকড়ে যেমন দলছুট বকরীকে ধরে নিয়ে যায় তেমনি শয়তানও এমন মানুষের ওপর প্রভূত্ব লাভ করে যে জামা’য়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। সাবধান! সাবধান! কক্ষণও বিচ্ছিন্ন থাকবে না। সর্বদা জামা’য়াতের সাথে থাকবে। (মুসনাদ- ৫/২৪৩) ইসলামের তাবলীগ ও দা’ওয়াত সম্পর্কে রাসূল সা. তাকে বলেনঃ ‘মু’য়াজ! তুমি যদি কেবলমাত্র একজন মুশরিককেও মুসলমান বানাতে পার তাহলে সেটা হবে তোমার জন্য দুনিয়ার সবকিছু থেকে উত্তম কাজ।’ (মুসনাদ- ৫/২৩৮) এমন পবিত্র চিন্তা ও মহোত্তম শিক্ষা লাভ করেছিলেন হযরত মু’য়াজ। একারণে মহান সাহাবী হযরত ইবন মাসউদ তাঁকে শুধু একজন ব্যক্তি নয় বরং একটি উম্মাতই মনে করতেন। তিনি বলেনঃ ‘মু’য়াজ ছিলেন সরল-সোজা একটি আল্লাহ অনুগত উম্মাত। তিনি কখনও মুশরিকদের কেউ ছিলেন না।’ ফারওয়া আল-আশজা’ঈ তাঁকে বললেনঃ ‘এমন কথা তো আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম আ. সম্পর্কেই বলেছেন।’ ইবন মাস’উদ আবারও তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। ফারওয়া আল-আশজা’ঈ বলেনঃ ‘আমি ইবন মাস’উদকে তাঁর কথার ওপর অটল থাকতে দেখে চুপ থাকলাম। তারপর তিনিই আমাকে প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কি জান ‘উম্মাত’ মানে কি, বা ‘কানিত’ কাকে বলে? বললামঃ আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি বললেন, ‘উম্মাত’ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি মঙ্গলকে জানেন এবং যার ইকতিদা ও অনুসরণ করা যায়। আর ‘কানিত’ বলে আল্লাহর অনুগত ব্যক্তিকে। এই অর্থে মু’য়াজ ছিলো যথার্থই মঙ্গল বা কল্যাণের শিক্ষাদানকারী এবং আল্লাহ ও রাসূলের সা. অনুগত ব্যক্তি। (আল-ইসতী’য়াব; আল-ইসাবা- ৪/৩৬১, তাহজীবুল আসমা- ২/১০০) দ্বিতীয় খলীফা হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালেই মজলিসে শূরা প্রকৃতপক্ষে পূর্ণরূপ লাভ করে। তবে প্রথম খলীফার যুগেই তার একটি কাঠামো তৈরী হয়ে গিয়েছিল। ইবন সা’দের বর্ণনা মতে হযরত আবু বকর রা. খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যাঁদের সাথে পরামর্শ করতেন তাঁদের মধ্যে মু’য়াজও ছিলেন। হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে যখন মজলিসে শূরার নিয়মিত অধিবেশন বসতো তখনও মু’য়াজ সদস্য ছিলেন। (কানযুল ’উম্মাল- ১৩৪) হযরত ’উমারের খিলাফতকালে শামের ওয়ালী ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান খলীফাকে লিখলেন কিছু কুরআনের মু’য়াল্লিম পাঠানোর জন্য। রাসূলুল্লাহর সা. যুগে যাঁরা কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন এমন পাঁচ ব্যক্তিকে খলিফা ডাকলেন। তাঁরা হলেনঃ মু’য়াজ ইবন জাবাল, ’উবাদা ইবনুস সামিত, আবু আইউব আল-আনসারী, উবাই ইবন কা’ব ও আবু দারদা। খলীফা তাঁদেরকে বললেনঃ শামবাসী ভাইয়েরা এমন কিছু লোক পাঠানোর অনুরোধ করেছে যাঁরা তাদেরকে কুরআনের তা’লীম ও দ্বীনের তারবিয়াত দান করবেন। এ ব্যাপারে আপনাদের পাঁচ জনের যে কোন তিনজন আমাকে সাহায্য করুন। আপনারা ইচ্ছা করলে লটারীর মাধ্যমেও তিন জনের নাম নির্বাচন করতে পারেন। অন্যথায় আমিই তিন জনকে বেছে নিব। তাঁরা বললেনঃ লটারী কেন? আবু আইউব একজন বৃদ্ধ মানুষ, আর উবাইতো অসুস্থ। বাকী থাকলাম আমরা তিন জন। ’উমার রা. তাদেরকে হিমস, দিমাশ্ক ও ফিলিস্তিতে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। মু’য়াজ গেলেন ফিলিস্তিনে। (সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ৭/১৩২-১৩৪) বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা একথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, প্রথম খলীফা আবু বকরের রা. যুগেই হযরত মু’য়াজ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য শামে চলে যান। হযরত ’উমার রা. যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তিনি সিরিয়ার এক ফ্রন্টে যুদ্ধরত। সেখানে থেকে তিনি ও আবু ’উবাইদা সমতা ও ন্যায় বিচারের উপদেশ দান করে খলীফাকে একটি পত্র লেখেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১৩১) খলীফা ’উমারের খিলাফতকালে ইসলামী বিজয়ের প্রবল প্লাবন শামের ওপর দিয়েই বয়ে চলে। হযরত মু’য়াজও একজন সৈনিক হিসাবে রণক্ষেত্রে চরম বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রকাশ করেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ফলে হযরত মু’য়াজের মধ্যে বিচিত্রমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তাঁর মধ্যে দেখা দেয় বহুবিধা যোগ্যতা। তিনি হন একাধারে শরী’য়াতের মুফতী, মজলিসে শূরার সদস্য, কুরআন ও হাদীসের শিক্ষক, প্রদেশের ওয়ালী, দূত, সাহসী সেনাপতি, বিজয়ী যোদ্ধা ও যাকাত উসূলকারী ইত্যঅদি। দৌত্যগিরির দায়িত্ব যখন তাঁর ওপর অর্পিত হলো তিনি অতি দক্ষতার সাথে তা পালন করলেন। শামের ‘ফাহল’ নামক স্থানে যুদ্ধ প্রস্তুতি চলছিল, এমন সময় প্রতিপক্ষ রোমান বাহিনী সন্ধির প্রস্তাব দিল। সেনাপতি আবু ’উবাইদা আলোচনার জন্য মু’য়াজকে নির্বাচন করলেন। মু’য়াজ চললেন রোমান সেনা ছাউনীতে। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন, দরবার অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে। একটি তাঁবু খাটানো হয়েছে যার অভ্যন্তরে সোনালী কারুকাজ করা গালিচা বিছানো। হযরত মু’য়াজ ভিতরে না ঢুকে থমকে বাইরে দাঁড়িয়ে গেলেন। একজন খৃষ্টান সৈনিক এগিয়ে এসে বললোঃ আমি ঘোড়াটি ধরছি, আপনি ভিতরে যান। মু’য়াজ বললেনঃ আমি এমন শয্যায় বসিনা যা দরিদ্র লোকদের বঞ্চিত করে তৈরী হয়েছে। একথা বলে তিনি মাটির ওপর বসে পড়লেন। খৃষ্টানরা দুঃখ প্রকাশ করে বললোঃ আমরা আপনাকে সম্মান করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু আপনি তা অবহেলা করলেন। হযরত মু’য়াজ হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেনঃ আমার এমন সম্মানের প্রয়োজন নেই। যদি মাটিতে বসা দাসদের অভ্যাস হয় তা হলে আমার চেয়ে আল্লাহর বড় দাস আর কে আছে? রোমানরা হযরত মু’য়াজের এমন স্বাধীন ও বেপরোয়া আচরণে হতবাক হয়ে গেল। এমনকি তাদের একজন জিজ্ঞেস করেই বসলো, মুসলমানদের মধ্যে আপনার চেয়েও বড় কেউ কি আছে? তিনি জবাব দিলেনঃ ‘মায়াজ আল্লাহ! (আল্লাহর পানাহ্ চাই) আমি হচ্ছি তাদের এক নিকৃষ্টতম ব্যক্তি।’ লোকটি চুপ হয়ে গেল। হযরত মু’য়াজ কিছুক্ষণ পর দোভাষীকে বললেন; রোমানদের বল, তারা কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে আমরা বসবো, নইলে চলে যাব। আলোচনা শুরু হলো। রোমানরা বললঃ – আমাদের দেশ আক্রমণ করা হয়েছে কেন? অথচ হাবশা আরবের অতি নিকটে, পারস্যের সম্রাট মারা গেছেন এবং সাম্রাজ্যের কতৃত্ব এক মহিলার হাতে। আপনারা ঐ সকল দেশ ছেড়ে আমাদের দিকে ধাবিত হলেন কেন? অন্যদিকে আমাদের সম্রাট দুনিয়ার সকল সম্রাটদের সম্রাট এবং সংখ্যায় আমরা আসমানের তারকারাজি ও দুনিয়ার বালুকারাশির সমান। মুয়াজ বললেনঃ আমরা তোমাদেরকে যা বলতে চাই তার সরকথা হলো, তোমরা ইসলাম কবুল করে আমাদের কিবলার দিকে নামায আদায় কর, মদ পান ছেড়ে দাও, শুকরের মাংস পরিহার কর। তোমরা যদি এইসব কাজ কর তাহলে আমরা তোমাদের ভাই। আর যদি একান্তই ইসলাম গ্রহণ করতে না চাও তাহলে জিযিয়া দাও। তাও যদি না মান তাহলে যুদ্ধের ঘোষনা দিচ্ছি। যদি আসমানের তারকারাজি ও যমীনের বালুকারাশির পরিমাণ তোমাদের সংখ্যা হয় তাতেও আমাদের বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই। আর হ্যাঁ, তোমাদের এ জন্য গর্ব যে, তোমাদের শাহানশাহ্ তোমাদের জান-মালের মালিক মুখতার। কিন্তু আমরা যাঁকে বাদশাহ বানিয়েছি কোন ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দিতে পারেন না। তিনি ব্যভিচার করলে তাঁকে দুররা লাগানো হবে, চুরি করলে হাত কাটা হবে। তিনি গোপনে বসেন না, নিজেকে আমাদের চেয়ে বড় মনে করেন না। ধন-সম্পদেও আমাদের ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ রোমানরা মনোযোগ সহকারে তাঁর কথা শুনলো। তাঁর মুখে ইসলামী শিক্ষা ও সাম্যের কথা শুনে তারা হতবাক হয়ে গেল। তারা প্রস্তাব দিলঃ ‘আমরা আপনাদেরকে ‘বালকা’- এর সম্পূর্ণ এলাকা এবং ‘দূন’- এর যে অংশ আপনাদের অঞ্চলের সাথে মিশেছে, ছেড়ে দিচ্ছি। আপনারা আমাদের এই দেশ ছেড়ে পারস্যের দিকে চলে যান।’ এটা কোন কেনা-বেচার বিষয় ছিল না। তাই হযরত মু’য়াজ নেতিবাচক জবাব দিয়ে সেখান থেকে উঠে আসেন। (সীয়ারে আনসার- ২/১৬৯-১৭১) যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হলো। এ যুদ্ধে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। হযরত আবু ’উবাইদা তাঁকে ‘মায়মানা’ (দক্ষিণ ভাগ)- এর কমান্ডিং অফিসার নিয়োগ করেন। হিজরী ১৫ সনে ইয়ারমুকের যুদ্ধ হয়। খুবই ভয়াবহ যুদ্ধ। এ যুদ্ধেও তাঁকে ‘মায়মানা’-র দায়িত্ব দেওয়া হয়। শত্রুপক্ষের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে মুসলমানদের ‘মায়মানা’ মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় হযরত মু’য়াজ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও স্থির চিত্ততার পরিচয় দেন। তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে হুংকার দিয়ে বলেনঃ আমি পায়ে হেঁটে লড়বো। কোন সাহসী বীর যদি ঘোড়ার হক আদায় করতে পারে, সে এই ঘোড়া নিতে পারে। রণক্ষেত্রে তাঁর পুত্রও ছিলেন। তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, আমিই এ ঘোড়ার হক আদায় করবো। তারপর বাপ-বেটা দু’জন রোমান বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে ভিতরে ঢুকে যান এবং এমন সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন যে, বিক্ষিপ্ত মুসলিম বাহিনী আবার দৃঢ় অবস্থান ফিরে পায়। হযরত ফারুকে আ’জমের খিলাফতকালে সিরিয়ায় যুদ্ধরত গোটা মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন হযরত আবু ’উবাইদা। হিজরী ১৮ সনে সিরিয়ায় মহামারি আকারে প্লেগ বা ‘তা’উন’ দেখা দেয়। ইতিহাসে এই মহামারি ‘আমওয়াসের ‘তা’উন’ নামে প্রসিদ্ধ। ’আমওয়াস হচ্ছে রামলা ও বাইতুল মাকদাসের মধ্যবর্তী একটি গ্রামের নাম। সেনাপতি হযরত আবু ’উবাইদা সহ বহু মুসলিম সৈনিক এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হযরত আবু ’উবাইদা সহ বহু মুসলিম সৈনিক এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হযরত আবু ’উবাইদা মৃত্যুর পূর্বে হযরত মু’য়াজকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান। হযরত মু’য়াজ আবু ’উবাইদার জানাযার নামায পড়ান এবং অন্যদের সাথে কবরে নেমে তাঁকে কবরে শায়িত করেন। এ সময় তিনি সকলের উদ্দেশ্যে এক হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেন। আবু ’উবাইদার ইনতিকালের পর তিনি কিছু দিনের জন্য সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৮, আল-ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ৪/৩৫৭, ৩৫৯) মহামারি মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়লে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। হযরত ’আমর ইবনুল আস বললেনঃ আমাদের উচিত এ স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া। এ রোগ নয়, এ যেন আগুন। তাঁর এ কথায় হযরত মু’য়াজ দারুণ অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি সকলকে সম্বোধন করে একটি ভাষণ দেন। ভাষণের মধ্যে তিনি ’আমরের নিন্দাও করেন। তারপর বলেন, এই মহামারি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বালা-মুসীবত নয়; বরং তাঁর রহমত ও নবীর দু’আ। আমি রাসূলুল্লাহর সা. বলতে শুনেছিলাম, মুসলমানরা শামে হিজরাত করবে। শাম ইসলামী পতাকাতলে আসবে। সেখানে একটি রোগ দেখা দেবে যা ফোঁড়ার মত হয়ে শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করবে। কেউ তাতে মারা গেলে শহীদ হবে। তাঁর সকল ’আমল পাক হয়ে যাবে। হে আল্লাহ, যদি আমি একথা রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনে থাকি তাহলে এই রহমত আমার ঘরেও পাঠাও এবং আমাকেও তার যথেষ্ট অংশ দান কর।’ (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭, হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৮১, ৫৮২) ভাষণ শেষ করে তিনি পুত্র আবদুর রহমানের নিকট গেলেন। তখন তাঁর দু’আ কবুল হয়ে গেছে। দেখেন, পুত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। পুত্র পিতাকে দেখে কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ ‘আল-হাক্কু মির রাব্বিকা ফালা তাকূনান্না মিনাল মুমতারীন-’ এই মৃত্যু যা সত্য, আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। সুতরাং কক্ষণও আপনি সন্দেহ পোষণকারীদের মধ্যে হবেন না। যেমন পুত্র তেমনই পিতা। পিতা জবাব দিলেনঃ ‘সাতাজিদুনী ইনশাআল্লাহ মিনাস সাবিরীন’- ইনশাআল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যেই পাবে। হযরত আবদুর রহমান মারা গেলেন। পুত্রের মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর দুই স্ত্রীও একই রোগে মারা যান। এখন হযরত মু’য়াজ একাকী। নির্দিষ্ট সময়ে তিনিও আল্লাহর এই রহমাতের অংশীদার হন। তাঁর ডান হাতের শাহাদাত আংগুলে একটি ফোঁড়া বের হয়। তিনি অত্যন্ত খুশী ছিলেন। বলছিলেন, দুনিয়ার সকল সম্পদ এর তুলনায় মূল্যহীন। প্রচন্ড ব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। যখনেই চেতনা ফিরে পাচ্ছিলেন, বলছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার ব্যথায় ব্যথিত কর। আমি যে তোমাকে কত ভালোবাসি তা তুমি ভালোই জান।’ হযরত মু’য়াজ যে রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন খুব অস্থিরভাবে সেই রাতটি কাটান। বার বার শুধু জিজ্ঞেস করেনঃ দেখতো সকাল হলো কিনা? লোকরো জবাব দেনঃ এখনও হয়নি। যখন বলা হলো, হ্যাঁ, সকাল হয়েছে, তিনি বললেনঃ এমন রাত থেকে আল্লাহর পানাহ চাই যার প্রভাত জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। স্বাগতম মৃত্যু, স্বাগতম। তুমি সেই বন্ধুর কাছে এসেছ যে একেবারে রিক্ত ও নিঃস্ব। ইয়া ইলাহী, আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি তা তুমি জান। আজ তোমার কাছে আমার বড় আশা। আমি কখনও দুনিয়া এবং দীর্ঘ জীবন এই জন্য কামনা করিনি যে তা বৃক্ষ রোপণ ও নদী খননে ব্যয় করবো; বরং যদি কামনা করে থাকি তবে তা এ জন্য যাতে প্রচন্ড গরমে মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারি, উদারতা ও দানশীলতার প্রসার ঘটাতে এবং জিকিরের মজলিসসমূহে আলেমদের সাথে বসতে পারি। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৬২, তাহজীব আল আসমা- ১/৩০) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। লোকেরা সান্ত্বনা দিয়ে বলেঃ আপনি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী, উঁচু মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেনঃ আমার না আছে মরণ ভয়, আর না আছে দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার দুঃখ। তবে তার দুইটি মুষ্টি আছে আমার জানা নেই আমি তার কোন মুষ্টিতে থাকবো। এই ভয়েই আমি কাঁদছি। এই অবস্থায় তাঁর পবিত্র রূহ দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, সীয়ারে আনসার- ২/১৭৪, ১৭৫) হযরত মু’য়াজের মৃত্যুসন এবং মৃত্যুর সময় বয়স সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ আছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ১৮ অথবা ১৯ সনে ৩৮ বছর বয়সে বাইতুল মাকদাস ও দিমাশকের মধ্যবর্তী এবং জর্দান নদীর তীরবর্তী ‘বীনা’ নামক স্থানে মারা যান। এরই নিকটবর্তী একটি স্থান যেখান থেকে আল্লাহ তা’আলা হযরত ’ঈসাকে আ. আসমানে উঠিয়ে নেন, সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬, উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১) হযরত মু’য়াজের গায়ের রং ছিল সাদা, চেহারা উজ্জ্বল, দৈহিক কাঠামো দীর্ঘাকৃতির, চোখ কালো ও বড়, চুল খুব ঘন এবং সামনের দাঁত ধবধবে সাদা। কথা বলার সময় যেন মুক্তা ঝরতো। কণ্ঠস্বর ছিল খুবই মিষ্টি-মধুর। দৈহিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে ছিলেন সাহাবা সমাজের মধ্যমনি। জাবির ইবন আবদিল্লাহ রা. বলেনঃ মু’য়াজ ছিলেন সবার চেয়ে সুন্দর, সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি। আবু নু’ঈম বলেনঃ বিচক্ষণতা, লজ্জাশীলতা, ও বদান্যতার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন আনসারদের সর্বোত্তম যুবক। ওয়াকিদী বলেনঃ তিনি ছিলেন সুন্দরতম পুরুষ। (আল-ইসাবা- ৪/৪২৭, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯, উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭) হযরত মু’য়াজ ৩৮ বছর বয়সে মারা যান। আল-মাদায়িনী, ওয়াকিদী প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেছেন, তাঁর কোন সন্তানাদি হয়নি। তবে বিশ্বস্ত বর্ণনা সমূহে জানা যায় তাঁর এক পুত্র, মতান্তরে দুই পুত্র ছিল। তাদের একজনের নাম আবদুর রহমান এবং অন্যজনের নাম জানা যায় না। এই আবদুর রহমান ইয়ারমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং হিজরী ১৮ সনে ‘আমওয়াসের’ মহামারিতে পিতার আগে মারা যান। (আল-ইসতী’য়াব; আল-ইসাবা- ৪/৩৫৬) কুরআন, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হযরত মু’য়াজ ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবনুল ’আস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায়, সাহাবাদের মধ্যে যে চারজনের নিকট থেকে কুরআন গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ সা. নির্দেশ দিয়েছেন, মু’য়াজ তাঁদের অন্যতম। ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার থেকেও এ ধরণের একটি বর্ণনা আছে। এর কারণ হলো, রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় তিনি কুরআন হিফ্জ করেছিলেন। খাযরাজীরা বলতোঃ আমাদের চার ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর সা. যুগে কুরআন সংগ্রহ করেছে যা অন্যরা করেনি। তাঁদের একজন মু’য়াজ। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৬৪, হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৫) হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। তাছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. যুগ থেকে আমরণ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহ পালনের জন্য সব সময় মদীনা থেকে দূরে ছিলেন। এ কারণে তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাদীস বর্ণনার ধারাবাহিকতা তিনি চালু রাখেন। প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু শয্যায়ও এ মহান দায়িত্ব পালন করে গেছেন। (মুসনাদ- ৫/২৩৩) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ রা. ও আরও কিছু লোক তাঁর পাশে ছিলেন। অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে তিনি বললেন, আমি এমন একটি হাদীস বর্ণনা করবো যা আজ পর্যন্ত এই জন্য গোপন রেখেছিলাম যে তা শুনলে মানুষ হয়তো ’আমল ছেড়ে দিবে । তারপর তিনি হাদীসটি বর্ণনা করেন। (মুসনাদ- ৫/৩৩৬) হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের মধ্যে হযরত মু’য়াজের নামটি তৃতীয় তবকায় গণনা করা হয়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ১৫৭ টি। তার মধ্যে দুইটি মুত্তাফাক আলাইহি, তিনটি বুখারী ও একটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬), তাহজীবুল আসমা- ২/৯৮) হাদীস শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের সংখ্যা অনেক। উঁচু মর্যাদার সাহাবীদের বড় একটি দল তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেণ। যেমনঃ ’উমার, আবু কাতাদাহ আল-আনসারী, আবু মূসা আল-আশ’য়ারী, জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবন ’উমার, আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবনুল ’আস, আনাস ইবন মালিক, আবু উমামা আল-বাহিলী, আবু লায়লা আল-আনসারী, আবু তুফাইল ও আরও অনেকে। (আল-ইসাবা- ৪/৪২৭, তাহজীবুল আসমা- ২/৯৮) বিশিষ্ট তাবে’ঈ ছাত্রদের মধ্যে ইবন ’আদী, ইবন আবী-আউফা আল-আশয়ারী, আবদুর রহমান ইবন সুমরা লা’বাসী, জাবির ইবন আনাস, আবু সা’লাবা খুশানী, জাবির ইবন সুমরা, মালিক ইবন নীহামীর, আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু মুসলিম খাওলানী, আবদুল্লাহ ইবন সানাবিহী, আবু ওয়ায়িল মাসরূক, জুনাদাহ ইবন আবী উমাইয়্যা, আবু ইদরীস খাওলানী, আসলাম মাওলা ’উমার, আসওয়াদ ইবন হিলাল, আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ প্রমুখ সর্বাধিক খ্যাতি সম্পন্ন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯) রাসূলুল্লাহর সা. জীবন কালেই হযরত মু’য়াজ শ্রেষ্ঠ ফকীহদের মধ্যে পরিগণিত হন। খোদ রাসূলে কারীম সা. তাঁর ফকীহ হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন, এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে? তিনি বলেছেনঃ ‘আ’লামুহুম বিল হালালি ওয়াল হারামি মু’য়াজ ইবন জাবাল- তাদের মধ্যে মু’য়াজ ইবন জাবাল হালাল ও হারামের সবচেয়ে বড় ’আলিম।’ (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯) কা’ব ইবন মালিক বলেনঃ রাসূল সা. ও আবু বকরের রা. যুগে তিনি মদীনায় ফাতওয়া দিতেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৫২) ইবনুল আসীর বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় মুহাজিরদের মধ্যে ’উমার, ’উসমান, আলী এবং আনসারদের মধ্যে মু’য়াজ, ’উবাই ইবন কা’ব ও যায়িদ ইবন সাবিত ফাতওয়া দিতেন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭, তাবাকাত- ২/৩৫০) হযরত ’উমার রা. একবার মু’য়াজ সম্পর্কে বলেনঃ ‘লাওলা মু’য়াজ লাহালাকা ’উমার- মু’য়াজ না থাকলে ’উমার বিনাশ হতো।’ এই মন্তব্য দ্বারা তাঁর ইজতিহাদী যোগ্যতা ও গবেষণা শক্তি সম্পর্কে ধারণ লাভ করা যায়। এছাড়া বিভিন্ন সময় হযরত ’উমার তাঁর ফকীহ মুজতাহিদ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জাবিয়ায় প্রদত্ত খুতবায় বলেনঃ কেউ ফিকাহ শিখতে চাইলে সে যেন মু’য়াজের কাছে যায়। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২০) প্রশ্ন হতে পারে এই বিশাল জ্ঞান তিনি কিভাবে অর্জন করলেন? উত্তরে বলা যায় তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ও তীক্ষ্ণ মেধার বলে তিনি এ যোগ্যতা অর্জন করেন। তাছাড়া এমন প্রতিভাবান ছাত্রের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. বিশেষ যত্ন ও মনোযোগ দানও এর কারণ। হযরত মু’য়াজ অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর সা. আশেপাশে হাজির থাকতেন। তাছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. প্রত্যেকটি মজলিস ছিল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এক একটি বৈঠক। তিনি সব সময় এই মজলিসের সুযোগ গ্রহণ করতেন। হযরত মু’য়াজ সুযোগ পেলেই রাসূলুল্লাহর সা. সাথে একাকী থাকতেন। রাসূল সা. এই একাকীত্বের সুযোগে তাঁকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিতেন। কখনও কোন মাসয়ালা জানার প্রয়োজন হলে তখনই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হতেন। তখন রাসূলকে সা. না পেলে বহু দূর পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করতেন। একবার তিনি গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. গৃহে। যেয়ে শুনলেন তিনি কোথাও বেরিয়ে গেছেন। তিনি মানুষের কাছে রাসূলুল্লাহর সা. কথা জিজ্ঞেস করতে করতে এগুতে লাগলেন। এক সময় দেখলেন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। মু’য়াজও রাসূলুল্লাহর সা. পিছনে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সা. দীর্ঘ নামায আদায় করলেন। নামায শেষে মু’য়াজ বললেনঃ আপনি আজ দীর্ঘ নামায আদায় করেছেন। রাসূল সা. বললেনঃ এটা ছিল আশা ও ভীতির নামায। আমি আল্লাহর কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছিলাম। দুইটি দেওয়া হয়েছে এবং একটি দেওয়া হয়নি। তারপর তিনি সেই তিনটি প্রার্থনার কথা মু’য়াজকে বলেন। (মুসনাদ- ৫/২৪০) হযরত মু’য়াজ সব সময় সুযোগের সন্ধানে থাকতেন। সুযোগ পেলেই তিনি জানার জন্য রাসূলুল্লাহর সা. নিকট প্রশ্ন করতেন। তবে রাসূলুল্লাহর সা. মেজায ও মর্জির প্রতি সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তাবূক যুদ্ধের পূর্বে লোকেরা সূর্যোদয়ের সময় বাহনের পিঠে ঘুমাচ্ছিল এবং উটগুলি এদিক সেদিক চরছিল। হযরত মু’য়াজ এমন একটি সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গেলেন। তিনি তখন ঘুমিয়ে এবং উটটিও চরছে। মু’য়াজের উটটি হোঁচট খেলো এবং তিনি লাগাম ধরে টান দিলেন। উটটি আরও ক্ষেপে গিয়ে লাফালাফি করতে লাগলো। রাসূলুল্লাহর সা. ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি পিছনের দিকে তাকিয়ে মু’য়াজকে দেখে ডাক দিলেন! মু’য়াজ! মু’য়াজ সাড়া দিলেন। রাসূল সা. বললেনঃ কাছে এস। মু’য়াজ এত নিকটে গেলেন যে রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর উট একদম পাশাপাশি এসে গেল। তিনি বললেন, দেখ তো মানুষ কত দূরে? মু’য়াজ বললেনঃ সবাই ঘুমিয়ে আছে আর পশুগুলি চরছে। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও ঘুমাচ্ছিলাম। মু’য়াজ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! অনুমতি দিলে আমি আপনাকে এমন একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতাম যা আমাকে ভীষণ চিন্তিত ও পীড়িত করে তুলেছে। রাসূল সা. বললেন, তোমার যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার। হযরত মু’য়াজের স্বভাবেই ছিল জানার আগ্রহ। একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট একটি বিশেষ মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো। রাসূল সা. যে জবাব দিলেন তা একজন সাধারণ লোকের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু হযরত মু’য়াজ ততটুকু যথেষ্ট মনে করতে পারলেন না। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই হুকুম কি বিশেষ এই ব্যক্তির জন্য, না সাধারণভাবে সকল মুসলমানের জন্য? রাসূল সা. বললেন, না, এটা একটি সাধারণ হুকুম। (মুসনাদ- ৫/২৪৪) জ্ঞান ও বিভিন্ন বিষয়ে ইজতিহাদ ও গবেষণার যোগ্যতা অর্জন করে তিনি ফকীহ, মুজতাহিদ ও মু’য়াল্লিমের আসনে সমাসীন হন। রাসূলে কারীমের সা. জীবনেই তিনি শিক্ষকের পদে নিযুক্তি লাভ করেন। হিজরী অষ্টম সনে মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসীদের ফিকাহ ও সুন্নাতের তা’লীম দানের জন্য রাসূল সা. তাঁকে সেখানে রেখে আসেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৬৫, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৫০০, তাবাকাত- ১/৯৯) তাছাড়া- হিজরী নবম সনে রাসূল সা. তাঁকে ইয়ামনে পাঠান। ইয়ামনের অন্যান্য দায়িত্বের সাথে সেখানকার লোকদের শিক্ষার দায়িত্বও তাঁর ওপর অর্পণ করেন। মু’য়াজ যখন ফিলিস্তিনে তখন তাঁর শিক্ষাদানের গন্ডি ফিলিস্তিনের বাইরেও বিস্তৃত ছিল। দিমাশ্ক, হিমস প্রভৃতি স্থানেও তাঁর হালকা-ই-দারস ছিল। এ সকল স্থানে তিনি ঘুরে ঘুরে দারস দিতেন। তাঁর দারসের পদ্ধতি ছিল, একটি বৈঠকে কিছু সাহাবী কোন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন, আর হযরত মু’য়াজ চুপ করে বসে শুনতেন। আলোচকরা কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে তিনি সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করতেন। আবু ইদরীস আল-খাওলানী একবার জামে’ দিমাশ্ক- এ গিয়ে দেখলেন, এক সুদর্শন যুবককে ঘিরে লোকেরা গোল হয়ে বসে আছে। কোন বিষয়ে তাদের মতভেদ হলে সেই যুবকের দৃষ্টি আকর্ষন করা হচ্ছে আর তিনি সন্তোষজনক জবাব দিচ্ছেন। তিনি যখন জিজ্ঞেস করলেন, যুবকটি কে? বলা হলো- মু’য়াজ ইবন জাবাল। আবু মুসলিম আল-খাওলানী একবার জামে’ হিম্স- এ গিয়ে দেখলেন, বত্রিশ জন প্রবীণ সাহাবী গোল হয়ে বসে আছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন যুবকও আছেন। কোন মাসয়ালায় তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে এই যুবক মিমাংসা করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। পরে তিনি জানতে পারেন এই যুবক মু’য়াজ ইবন জাবাল। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২০, হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৩১, ৬৩৮) শহর ইবন হাওশাব থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীরা যখন কোন বিষয়ে আলোচনা করতেন, তাঁদের মধ্যে মু’য়াজ ইবন জাবাল উপস্থিত থাকলে সকলে তাঁর প্রতি সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকাতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ রা. বলতেন, দুনিয়ায় ’আলিম মাত্র তিনজন। তাঁদের একজন শামে বসবাসরত। একথা দ্বারা তিনি মু’য়াজের দিকেই ইঙ্গিত করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করতেন, তোমরা কি জান ’আলিম মতান্তরে ’আকিল কারা? লোকেরা অজ্ঞতা প্রকাশ করতে বলতেন, ’আলিম হলেন মু’য়াজ ইবন জাবাল ও আবুদ দারদা। (তাবাকাত- ২/৩৫০) একজন মুজতাহিদের সবচেয়ে বড় গুণ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। হযরত মু’য়াজ এমন সঠিক সিদ্ধান্তের অধিকারী ছিলেন যে খোদ রাসূলসা. কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধানেরত জন্য সন্তুষ্টি ব্যক্ত করেছেন। রাসূল সা. তাঁকে ইয়ামনে পাঠানোর পূর্বে যে পরীক্ষা গ্রহণ করেন সে সময় তিনি যে জবাব দেন তাতে রাসূল সা. দারুণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। মূলতঃ তাঁর এই জবাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ইসলামী শরী’য়াতের মৌলিক উৎস তিনটিঃ ১. কিতাবুল্লাহ, ২. সুন্নাহ ও ৩. কিয়াস। ইসলামের প্রথম যুগে যারা একটু দেরীতে নামাযের জামা’য়াতে হাজির হতো এবং দুই এক রাকা’য়াত ছুটে যেত। তারা নামাযে দাঁড়ানো লোকদের কাছে ইশারায় জিজ্ঞেস করে জেনে নিত কত রাকা’য়াত হয়েছে। নামাযীরাও ইশারায় তা জানিয়ে দিত। দেরীতে আসা লোকটি প্রথমে তার ছুটে যাওয়া নামায আদায় করে জামা’য়াতে শরীক হতো। এভাবে একদিন নামায হচ্ছে এবং প্রথম বৈঠক চলছে, এমন সময় মু’য়াজ আসলেন এবং প্রচলিত নিয়মের খিলাফ প্রথমে জামা’য়াতে শরীক হয়ে গেলেন। রাসূল সা. সালাম ফিরানোর পর মু’য়াজ উঠে ছুটে যাওয়া রাকা’য়াতগুলি আদায় করলেন। তাঁর এ কাজ দেখে রাসূল সা. বললেনঃ ‘কাদ সান্না লাকুম ফা হাকাজা ফাসনা’য়’- মু’য়াজ তোমাদের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি বের করেছে, তোমরাও এমনটি করবে। (মুসনাদ- ৫/২৩৩, ২৪৬) হযরত মু’য়াজের জন্য এটা অতি সম্মান ও গৌরবের বিষয় যে, তাঁরই একটা ’আমল গোটা মুসলিম জাতির জন্য ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা জারী থাকবে। একবার এক গর্ভবতী মহিলার স্বামী দুই বছর নিরুদ্দেশ থাকে। এর মধ্যে মহিলা গর্ভবর্তী হয়, মানুষের মনে সন্দেহ হলে তারা বিষয়টি খলীফা ’উমারের নিকট উত্থাপন করে। ’উমার রা. মহিলাকে রজম করার (যিনার শাস্তি) নির্দেশ দেন। মু’য়াজ বললেনঃ মহিলাকে রজম করার অধিকার আপনার আছে। কিন্তু পেটের সন্তানের রজম করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? ’উমার মহিলাকে তখনকার মত ছেড়ে দিয়ে সন্তান প্রসবের পর রজমের নির্দেশ দেন। মহিলা একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে। সন্তানটি ছিল অবিকল তাঁর পিতার ’আদলের। তখন পিতা সন্তান দেখে শপথ করে দাবী করে এ তো আমারই সন্তান। এ কথা শুনে ’উমার রা. মন্তব্য করেনঃ ‘মু’য়াজের মত সন্তান মহিলারা আর জন্ম দিতে পারবে না। মু’য়াজ না থাকলে ’উমার ধ্বংস হয়ে যেত।’ তিনি আরও বলতেনঃ ‘মু’য়াজের মত সন্তান জন্ম দিতে মহিলারা অক্ষম হয়ে গেছে।’ সাহাবী সমাজে রমধ্যে তাঁর বিশাল মর্যাদা সম্পর্কে এমনই একটা ধারণা বিদ্যমান ছিল। খলীফা ’উমারের অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে লোকেরা তাঁর নিকট পরবর্তী খলীফা মনোনয়নের জন্য ’আরজ করলো। তখন তিনি একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তার মধ্যে এ কথাটিও বলেন যে, ’আজ মু’য়াজ ইবন জাবাল বেঁচে থাকলে তাঁকেই খলীফা বানিয়ে যেতাম। আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আমি এমন এক ব্যক্তিকে খলীফা বানিয়ে এসেছি যার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ ‘কিয়ামতের দিন মু’য়াজ সব ’আলিমদের থেকে এক অথবা দুই তীর নিক্ষেপের দূরত্ব আগে থাকবে। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯) খলীফা হযরত আবু বকর রা. ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ানকে একবার অসীয়াত করেনঃ ‘মু’য়াজ ইবন জাবালের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আমি তাঁর সকল অভিযান প্রত্যক্ষ করেছিল। রাসূল সা. একদিন তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেনঃ কিয়ামতের দিন মু’য়াজ ’আলিমদের থেকে এক তীর নিক্ষেপের দূরত্ব আগে থাকবে। সে এবং আবু ’উবাইদার সাথে পরামর্শ ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। তাতে তোমার মঙ্গল হবে না। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১১৮) অপর একটি বর্ণনায় এসেছেঃ কিয়ামতের দিন সকল ’আলিম মু’য়াজের পতাকাতলে উঠবে। (শাজারাত- ১/৩০) একবার খলীফা হযরত ’উমার রা. মু’য়াজকে পাঠালেন বনু কিলাম গোত্রে যাকাত আদায় করে গরীবদের মধ্যে বন্টনের জন্য মু’য়াজ সেখানে গিয়ে দায়িত্ব পালন করে স্ত্রীর নিকট ফিরে আসলেন। যাওয়ার সময় হাতে করে যে জিনিসগুলি নিয়ে গিয়েছিলেন ফেরার সময় শুধু সেইগুলিই হাতে করে ফিরলেন। স্ত্রী কাছে এসে বললেনঃ অন্যান্য শাসকরা ঘরে ফেরার সময় তাঁদের পরিবারের লোকদের জন্য নানা রকম উপঢৌকন নিয়ে আসে, দেখি তুমি আমার জন্য কি নিয়ে এসেছ? মু’য়াজ বললেনঃ আমার সাথে সবসময় একজন পাহারাদার ছিল। সে সতর্কভাবে আমাকে পাহারা দিয়েছেন। স্ত্রী বললেনঃ তুমি ছিলে রাসূলুল্লাহর সা. ও আবু বকরের পরম বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। আর ’উমার কিনা তোমার পিছনে পাহারাদার নিয়োগ করেছে? স্বামী-স্ত্রীর এ আলোচনা ’উমারের রা. মেয়ে মহলের মাধ্যমে তাঁর কানে গেল। তিনি মু’য়াজকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আমি তোমার পিছনে পাহারাদার নিয়োগ করেছি? মু’য়াজ বললেনঃ না, আপনি তা করবেন কেন? তবে আমার স্ত্রীকে বুঝ দেওয়ার জন্য এমন কথা না বলে উপায় ছিলনা। ’উমার একটু হেসে দিলেন। তারপর মু’য়াজের হাতে কিছু অর্থ দিয়ে বলেন, যাও, এইগুলি দিয়ে তোমার স্ত্রীকে খুশী কর। (সুওয়ারুম মিন্ হায়াতিস সাহাবা- ৭/১৩১-১৩২) তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল একারণে তাঁর সকল বিষয়-সম্পত্তি একবার নিলামে উঠে বিক্রী হয়েছিল। তাঁর এই দানশীলতায় ইসলামের যথেষ্ট কল্যাণ সাধিত হয়েছে। খলীফা ’উমার রা. একদিন সংগীদের বললেনঃ আচ্ছা বলতো তোমরা কে কি নেক আশা কর। একজন বললো, আমার বাসনা হলো, আমি যদি এই ঘর ভর্তি দিরহাম পেতাম এবং সবই আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে পারতাম। আরেকজন বললোঃ আমি যদি এই ঘর ভর্তি সোনাদানা পেতাম এবং আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে পারতাম। এভাবে একেক জন একেক রকম সৎ বাসনা প্রকাশ করলো। সবশেষে ’উমার রা. বললেনঃ আমার বাসনা কি জান? আমি যদি এই ঘর ভর্তি পরিমাণ আবু ’উবাইদা ইবনুল জাররাহ, মু’য়াজ ইবন জাবাল ও হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামানের মত লোক পেতাম এবং তাদের সকলকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে পারতাম। তারপর তিনি বলেন, এখনই আমি পরীক্ষা করে প্রমাণ করে দিচ্ছি। তিনি চাকরকে ডেকে চারশত দীনার ভর্তি একটি থলি তার হাতে দিয়ে বলেন, এগুলি আবু ’উবাইদাকে দিয়ে তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতে বলে এস। আবু ’উবাইদা থলিটি হাতে নিয়ে খলীফার চাকর স্থান ত্যাগের পূর্বেই দীনারগুলি বিভিন্ন থলিতে ভরলেন এবং অভাবীদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। অনুরূপভাবে খলীফা আর একটি দীনার ভর্তি থলি পাঠালেন মু’য়াজ ইবন জাবালের কাছে। মু’য়াজও তক্ষুণি দাসীকে ডেকে দীনারগুলি বিভিন্ন লোকের মধ্যে বন্টন শুরু করলেন। থলিতে যখন মাত্র দুইটি দীনার বাকী তখন তাঁর স্ত্রী খবর পেলেন এবং দৌড়ে এসে বললেন, আমিও তো একজন মিসকীন, আমাকেও কিছু দাওনা। মু’য়াজ দীনার দুইটি সহ থলিটি স্ত্রীর দিকে ছুড়ে মেরে বলেনঃ এই নাও। খলীফা চাকরের মুখে আবু ’উবাইদা ও মু’য়াজের এই আচরণের কথা শুনে দারুণ পুলকিত হন এবং মন্তব্য করেনঃ তারা প্রত্যেকেই পরস্পরের ভাই। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২৩১-২৩৩) আল্লাহর প্রতি গভীর মুহাব্বত ও ভালোবাসা, তাঁর ইতা’য়াত ও আনুগত্য, ’ইবাদাত ও বন্দেগী এবং তাঁর ওপর তাওয়াককুল ও নির্ভরতা হচ্ছে একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট ও পরিচয়। হযরত মু’য়াজের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যপূর্ণরূপ লাভ করে। গভীর রাতে তিনি আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল হয়ে যেতেন। কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দু’আ করতেনঃ ‘হে আল্লাহ! এখন সকল চক্ষু নিদ্রিত। কিন্তু তুমি চিরজাগ্রত, চিরঞ্জীব। হে আল্লাহ। জান্নাতের দিকে আমার যাত্রা বড় মন্থর এবং জাহান্নাম থেকে পলায়ন বড় দুর্বল। তুমি আমার জন্য তোমার কাছে একটি হিদায়াত নির্দিষ্ট রাখ যা কিয়ামতের দিন আমি লাভ করতে পারি।’ (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭) তিনি যে কত বড় আল্লাহনির্ভর লোক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ’আমওয়াসের মহামারির সময়। হযরত ’আমর ইবনুল ’আস যখন সৈন্যদের স্থান ত্যাগের পরামর্শ দেন তখন তাঁর পরামর্শকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করে তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান। শেষ পর্যন্ত তাওয়াক্কুলের ওপর অটল থেকেই সেই মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেন। একদিন হযরত ’উমার রা. দেখলেন, মু’য়াজ কাঁদছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তুমি কাঁদছো কেন? মু’য়াজ বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ বিন্দুমাত্র ‘রিয়া’ ও এক ধরণের শিরক। আর আত্মগোপনকারী-মুত্তাকীরাই হচ্ছে আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বান্দা। তাঁরা অদৃশ্য হলে হারায় না এবং দৃশ্যমান হলে চেনা যায়না। তাঁরাই হলেন হিদায়াতের ইমাম ও ইলমের মশাল বা প্রদীপ। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২৪) তাউস থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একবার মু’য়াজ ইবন জাবাল আমাদের অঞ্চলে আসেন। আমাদের নেতারা বললোঃ আপনার অনুমতি পেলে আমরা পাথর ও ইট দিয়ে আপনার জন্য একটি মসজিদ বানিয়ে দিতাম। মু’য়াজ বললেনঃ কিয়ামতের দিন এই মজদি আমার পিঠে বহন করতে বলা হয় কিনা সে ব্যাপারে আমি শঙ্কিত। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২১) ইসলামী সাম্য ও ন্যায় বিচারে তিনি ছিলেন এক বাস্তব নমুনা। ছোট খাট ব্যাপারেও তিনি ইনসাফ থেকে বিচ্যুত হতেন না। ইয়াহইয়া ইবন সা’ঈদ থেকে বর্ণিত হয়েছে। মু’য়াজের দুই স্ত্রী ছিল। তিনি তাদের মধ্যে সমতা বিধানের প্রতি ছিলেন দারুণ সতর্ক। যেদিন তিনি এক স্ত্রীর ঘরে অবস্থান করতেন সেদিন অন্যের ঘরে অজু করা বা এক গ্লাস পানিও পান করতেন না। দুই স্ত্রীই ’আমওয়াসের মহামারিতে এক সাথে মারা যান। দুইজনকে একই কবরে দাফন করা হয়। কবর খোড়া হলে কাকে আগে কবরে রাখা হবে সে ব্যাপারেও লটারী করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬১২) রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি মু’য়াজের যে কত গভীর ভালোবাসা ছিল তার কিছু পরিচয় পূর্ববর্তী আলোচনায় পরিস্ফুট হয়েছে। কখনও তাঁকে না পেলে তিনি অস্থির হয়ে তাঁর খোঁজে বেরিয়ে পড়তেন। রাসূলুল্লাহর সা. নিয়ম ছিল সফরে রাত্রি যাপনের সময় মুহাজির সঙ্গীদের নিজের কাছেই রাখা। একবার তিনি কোন এক সফরে গেলেন। সাহাবীরাও সংগে ছিলেন। এক স্থানে রাত্রি যাপনের জন্য থামলেন। রাসূল সা. মু’য়াজহ সহ কতিপয় সাহাবীর একটি বৈঠক থেকে কিছু না বলে কোথাও চলে গেলেন। মু’য়াজ অস্থির হয়ে পড়লেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর আবু মূসাকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। পথে রাসূলুল্লাহর সা. কণ্ঠস্বর শুনে এগিয়ে গেলেন। রাসূল সা. তাঁদের দেখে প্রশ্ন করেনঃ তোমাদের কি অবস্থা? তাঁরা বললেনঃ আপনাকে না পেয়ে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। তাই খুঁজতে বেরিয়েছি। (মুসনাদ- ৫/২৩২) হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন ভক্তি ও শ্রদ্ধা। একবার তিনি সফর থেকে ফিরে এসে রাসূলকে সা. বললেনঃ আমরা ইয়ামানে একজন অন্যজনকে সিজদাহ করতে দেখেছি। আমরা কি আপনাকে সিজদাহ করতে পারিনে? রাসূল সা. বললেনঃ আমি যদি কোন মানুষের জন্য সিজদাহর বিধানই রাখতাম তাহলে মহিলাদেরকে বলতাম তাদের নিজ নিজ স্বামীদেরকে সিজদাহ করতে। (মুসনাদ- ৫/২২৭) একবার মুনাফিক কায়েস ইবন মুতাতিয়্যা একটি মজলিসে উপস্থিত হলো। সেই মজলিসে হযরত সালমান আল-ফারেসী, সুহাইব আর রূমী ও বিলাল আল-হাবশী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের প্রতি ইঙ্গিত করে কায়েস বললো, এই আউস ও খাযরাজ না হয় এই ব্যক্তিকে (রাসূলুল্লাহকে) সাহায্য করলো; কিন্তু এই সব লোক সাহায্য করছে কেন? একথা বলার সাথে সাথে মু’য়াজ ইবন জাবাল লাফ দিয়ে উঠে তার বুকের ও গলার কাপড় মুট করে ধরে টানতে টানতে সোজা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে গেলেন। এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি লোকদের মসজিদে সমবেত হওয়ার আহবান জানাতে বললেন। জনগণ মসজিদে সমবেত হলে তিনি ঐক্য ও সংহতির ওপর এক ভাষণ দান করেন। ভাষণ শেষ হলে মু’য়াজ বলেন, কিন্তু এই মুনাফিকের ব্যাপারে আপনি কি বলেন? রাসূল সা. জবাব দিলেনঃ তাঁকে জাহান্নামের জন্য ছেড়ে দাও। মু’য়াজ ছেড়ে দিলেন। পরবর্তীকালে এই কায়েস মুরতাদ হয়ে ইসলামী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয় এবং এ অবস্থায় মুসলিম মুজাহিদদের হাতে নিহত হয়। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৭৬, ৪৭৭) একবার হযরত মু’য়াজ রাসূলুল্লাহর সা. সংগে ছিলেন। রাসূল সা. তাঁর একখানি হাত ধরে বললেনঃ মু’য়াজ, তোমার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা। উত্তরে মু’য়াজ বললেনঃ আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আমিও অন্তর দিয়ে আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল সা. বললেনঃ আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিচ্ছি কক্ষণও তা অবহেলা করবে না। তারপর তাঁকে একটি দু’আ শিখিয়ে দিলেন। হযরত মু’য়াজ আমরণ সেই দু’আটি পাঠ করতেন। (মুসনাদ- ৫/২৪৫) হিজরী ১৬ সনে খলীফা হযরত ’উমার যখন বাইতুল মাকদাস সফর করেন তখন সেখানে হযরত বিলাল ও মু’যাজও ছিলেন। ’উমার আযান দেওয়ার জন্য বিলালকে অনুরোধ করলেন। বিলাল বললেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কারও অনুরোধে কক্ষণও আযান দেবনা। কিন্তু আজ আপনার অনুরোধ রক্ষা করবো। তিনি আযান দিতে শুরু করলেন। আযানের ধ্বনিতে সাহাবীদের মনে রাসূলে পাকের সা. জীবনকালের স্মৃতি ভেসে ওঠে। তাঁদের মধ্যে ভাবান্তর সৃষ্টি হয়। হযরত মু’য়াজ তো কাঁদতে কাঁদতে অস্থিত হয়ে পড়লেন। হযরত মু’য়াবিয়া রা. যখন শামের গভর্ণর তখন মু’য়াজ একবার সেখানে গিয়ে দেখলেন, লোকেরা ‘বিতর’ নামায আদায় করে না। তিনি মুয়াবিয়ার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বিষয়টি তাঁরও জানা ছিল না। তাই তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেনঃ বিতর কি ওয়াজিব? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। এভাবে আমর বিল মা’রূফের ব্যাপারে তিনি কারও পরোয়া করতেন না। (মুসনাদ- ৫/২৪২) তিনি ছিলেন সত্যবাদী। খোদ রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। একবার হযরত মু’য়াজ হযরত আনাসের নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। তারপর আনাস রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মু’য়াজকে একথা বলেছেন? জবাবে রাসূল সা. তিনবার বললেনঃ মু’য়াজ সত্য বলেছেন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭) তাঁর মরণ-সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে লোকেরা এই বলে বিলাপ শুরু করে দিল যে, ইল্ম উঠে যাচ্ছে। তারা মু’য়াজকে বললো, আপনি আমাদের বলে যান, আপনার মৃত্যুর পর আমরা কার নিকট যাব। তিনি বললেনঃ আমাকে একটু উঠিয়ে বসাও। বসানো হলে বললেনঃ শোন, ইলম ও ঈমান- এ দুইটি উঠার জিনিস নয়। যারা তালাশ করবে তারা লাভ করবে। কথাটি তিনবার বললেন। তারপর বললেনঃ তোমরা আবু দারদা, সালমান আল-ফারেসী, ইবন মাস’উদ ও আবদুল্লাহ ইবন সালাম- এই চার জনের নিকট থেকে ইলম হাসিল করবে। (মুসনাদ- ৫/২৪৩) সীরাত গ্রন্থসমূহে দেখা যায় পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াত নাযিলের ঘটনার সাথে হযরত মু’য়াজও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। একবার হযরত মু’য়াজ ইবন জাবালসহ আউস ও খাযরাজ গোত্রের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ইহুদীদের কয়েকজন আহবারের নিকট তাওরাতের কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য প্রশ্ন করেন। কিন্তু তারা সত্যকে গোপন করার উদ্দেশ্যে তা জানাতে অস্বীকার করে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক সূরা বাকারার ১৫৯ নং আয়াতটি নাযিল করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫৫১) হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনার ইহুদীদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করার পরিণতি সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। তা সত্ত্বেও তারা রাসূলুল্লাহর সা. কথা মানতে অস্বীকার করতে থাকে। তাদের এ অবস্থা দেখে হযরত মু’য়াজ সহ কতিপয় সাহাবী ইহুদীদেরকে বললেনঃ ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ কসম! তোমরা অবশ্যই জান যে তিনি আল্লাহর রাসূল। আর একথা তো তোমরা তাঁর নবুওয়াত লাভের পূর্বেই আমাদেরকে বলতে এবং তাঁর পরিচয়ও আমাদের কাছে তুলে ধরতে। একথার উত্তরে রাফে ইবন হুরায়মালা ও ওয়াহাব ইবন ইহাজা বললোঃ না, আমরা কক্ষণও তোমাদেরকে এমন কথা বলিনি। মূসার কিতাবের পর আর কোন কিতাব আল্লাহ নাযিল করেননি এবং আর কোন সুসংবাদ দানকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারীও আল্লাহ পাঠাননি। তখন আল্লাহ পাক সূরা আল-মায়িদার ১৯ নং আয়াতটি নাযিল করে ইহুদীদের কথার প্রতিবাদ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫৬৪) হাদীস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে হযরত মু’য়াজ ইবন জাবাল সম্পর্কে এ ধরণের বহু খন্ড খন্ড তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যা মুসলিম সমাজ চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
আবূ সা’ঈদ আল-খুদারী (রা)

নাম সা’দ, ডাক নাম আবূ সা’ইদ। খুদরাহ বংশের সন্তান হওয়ার কারণে খুদারী বা খুদরী বলা হয়। তাঁর পিতা মালিক ইবন সিনান উহুদের অন্যতম শহীদ। এ যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীম সা. আহত হলে তিনি রাসূলের সা. পবিত্র খুন চুষে গিলে ফেলেন। রাসূল সা. তখন মন্তব্য করেনঃ ‘আমার রক্ত যার রক্তে মিশেছে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৮০, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪) তাঁর মা উনায়সা বিনতু আবী হারিসা বনু ’আদী ইবন নাজ্জারের কন্যা। দাদা সিনান ছিলেন মহল্লার রয়িস। তিনি ছিলেন একটি কিল্লার অধিপতি ও ইসলাম পূর্ব যুগের একজন বিচারক। তাঁর মার প্রথম স্বামী ছিল আউস গোত্রের ’আম্মান নামক এক ব্যক্তি। সে মারা যায়। রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় আগমনের পূর্বে তিনি মালিক ইবন সিনানকে দ্বিতীয় স্বামী হিসাবে গ্রহণ করেন। তাঁদেরই সন্তান আবূ সা’ঈদ হিজরাতের দশ বছর পূর্বে ৬১৩ খ্রীস্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আল-ইসাবা- ৪/৮৮, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮) প্রখ্যাত বদরী সাহাবী কাতাদাহ ইবন নু’মান রা.- উহুদ যুদ্ধে যাঁর চোখ আহত হয় এবং রাসূলুল্লাহর সা. দু’আর বরকতে আবার ভালো হয়ে যায়- আবূ সা’ঈদের বৈপিত্রীয় ভাই। হিজরী ২৩ সনে এই কাতাদাহ মারা গেলে আবূ সা’ঈদ তাঁকে কবরে নামিয়ে দাপন করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪২, উসুদুল গাবা- ৫/২১১) বাই’য়াতে আকাবা থেকেই মোটামুটি মদীনায় ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু হয়। মদীনাবাসীদের অনেকেই তখন ইসলামী দা’ওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্ননিয়োগ করেন। এই সময় মালিক ইবন সিনান ইসলাম কবুল করেন। স্বামীর সাথে স্ত্রীও মুসলমান হন। সুতরাং আবূ সা’ঈদ মুসলিম মা-বাবার কোলেই বেড়ে উঠেন। হিজরাতের প্রথম বছরেই মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আবূ সা’ঈদ এই নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করেন। তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাথে মোট বারোটি যুদ্ধে যোগ দেন। (তাহজীবুল আসমা- ২/২৩৭, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮) অল্প বয়সের কারণে বদর যুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। উহুদ যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৩ বছর। যুদ্ধের পূর্বে পিতার সাথে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট যান। রাসূল সা. তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিরীক্ষণ করেন এবং এখনও যুদ্ধের বয়স হয়নি- এই বলে ফিরিয়ে দেন। পিতা মালিক তখন রাসূলুল্লাহর সা. হাত ধরে বলেন, ছেলের বয়স কম হলে কি হবে, তার হাত দু’টি পুরুষের মত সবল। তবুও রাসূল সা. তাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। (আল-ইসাবা- ২/৩৫; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩০) এই উহুদ যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীমের সা. পবিত্র মুখমন্ডল আহত হয়ে রক্ত রঞ্জিত হয়। মালিক ইবন সিনান সেই রক্ত পান করেন। রাসূল সা. মন্তব্য করেনঃ ‘যদি কারও এমন ব্যক্তিকে দেখার ইচ্ছা হয় যার রক্ত আমার রক্তের সাথে মিশেছে, সে যেন মালিক ইবন সিনানকে দেখে। এরপর বীরের মত যুদ্ধ করে মালিক শাহাদাত বরণ করেন। আবূ সা’ঈদের পিতা কোন সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন না। এ কারণে পিতার মৃত্যুতে তিনি পর্বত পরিমাণ বিপদের সম্মুখীন হলেন। দারিদ্র ও অনাহারে সময় সময় পেটে পাথর বেঁধে কাটাতেন। একদিন তিনি প্রচন্ড ক্ষুধায় পেটে পাথর বেঁধে আছেন। তখন তাঁর স্ত্রী (মতান্তরে মা অথবা দাসী) তাঁকে বললেনঃ নবীর সা. কাছে যাও, তাঁর কাছে কিছু চাও। অমুক এসে সাহায্য চেয়েছিল, তাকে তিনি দিয়েছেন। আবূ সা’ঈদ বলেনঃ আমি যখন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গেলাম তিনি তখন ভাষণ দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ ‘যে নিজেকে গনী বা ধনী মনে করে আল্লাহও তাকে ধনবান করে দেন। আর যে আমার কাছে কোন কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকে সে ঐ ব্যক্তির থেকেও আমার বেশী প্রিয় যে আমার কাছে চায়।’ একথা শুনে আমি আর কিছু চাইলাম না। আমি বাড়ী ফিরে এলাম। অতঃপর আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের রিযকে বরকত বা সমৃদ্ধি দান করতে লাগলো। অবশেষে, আনসারদের মধ্যে কোন বাড়ী আমাদের চেয়ে বেশী বিত্তশালী ছিল বলে আমি জানতাম না। (মুসনাদ- ৩/৪৪৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/২৫৭) খন্দক ও বনী মুসতালিকের যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। তবে ‘উসুদুল গাবা’ গ্রন্থের একটি বর্ণনায় এসেছেঃ ‘আবূ সা’ঈদ বলেনঃ খন্দকের দিন আমার পিতা আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহর সা. সামনে নিয়ে বলেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! এর হাড় খুব শক্ত।’ এরপরও তিনি আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে ফিরিয়ে দেন। তিনি আরও বলেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বনী মুসতালিক যুদ্ধে যোগ দিই।’ ওয়াকিদী বলেনঃ ‘তখন আবূ সা’ঈদের বয়স পনেরো বছর।’ (উসুদুল গাবা- ৫/২১১, আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৪) ইমাম আহমাদ আবূ সা’ঈদ খুদারী থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা খন্দকের দিন বললামঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের প্রাণ তো গলায় এসে ঠেকেছে। এমন কোন দু’আ কি আছে যা আমরা পাঠ করতে পারি? বললেনঃ হাঁ। বলঃ আল্লাহুম্মা উসতুর ’আওরাতিনা ওয়া আমিন রাও’য়াতিনা- হে আল্লাহ আমাদের গোপন বিষয় গোপন রাখ এবং আমাদের ভীতিকে নিরাপত্তা দান কর।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৮৮) তিনি ‘বাই’য়াতুশ শাজারা’ বা ‘বাই’য়াতুর রিদওয়ানে’ অংশগ্রহণ করেন। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৮১; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪) হিজরী ৮ম সনের সফর মাসে ’আবদুল্লাহ ইবন গালিব লায়সীর নেতৃত্বে একদল সৈন্য ফিদাক যায়। তিনিও এই বাহিনীতে ছিলেন। আবদুল্লাহ সৈন্যদের তাকীদ দেন, তারা যেন বিচ্ছিন্ন না হয়। এই উদ্দেশ্যে তিনি বাহিনীর সদস্যদের পরস্পরের সাথে মাওয়াখাত বা ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। তাঁকেও একজন বিশিষ্ট সাহাবীর সাথে ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে দেন। হিজরী ৯ম সনের বারী’উস সানী মাসে ’আরকামা ইবন মুখাররকে ছোট একটি বাহিনীসহ একটি অভিযানে পাঠানো হয়। আবূ সা’ঈদ ছিলেন এ বাহিনীর অন্যতম সদস্য। (মুসনাদ- ৩/২৭০; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৭) উপরোক্ত যুদ্ধগুলি ছাড়াও মক্কা বিজয়, হুনাইন, তাবুক, আওতাস প্রভৃতি অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণের কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহর সা. যুগে সংঘটিত মোট ১২ টি যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। তিনি তাবুক যুদ্ধে মুসলমানদের চরম অভাব ও দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। হুনাইন যুদ্ধে লব্ধ গনীমাতের বেশীর ভাগ যখন রাসূল সা. মক্কাবাসী নওমুসলিমদের খুশী (তালীফে কুলুম) করার জন্য দান করেন তখন মদীনার আনসারদের অনেকে একটু ক্ষুণ্ন হন। এ সম্পর্কিত ঘটনা আবূ সা’ঈদ বর্ণনা করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৭-৩৯৮; ৩/৬২৫) তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমরা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যুদ্ধে গিয়েছি রমজান মাসে। আমাদের কেউ সাওম পালন করতো, আবার কেউ করতো না। তবে একে অপরকে কোন রকম হিংসা করতো না। তারা প্রত্যেকেই জানতো যে, যে ব্যক্তি নিজেকে সক্ষম মনে করবে সে সাওম পালন করবে, আর এটাই তার জন্য উত্তম। আর যে নিজেকে দুর্বল ও অক্ষম মনে করবে সে সাওম পালন করবে না। আর এটাই তার জন্য উত্তম।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৯) একবার হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদেরকে একটি ছোটখাট অভিযানে পাঠালেন। বাহিনীর সর্বমোট সদস্য তিরিশজন এবং নেতা আবূ সা’ঈদ। যাত্রা পথে তাঁরা একটি স্থানে তাঁবু স্থাপন করে যাত্রা বিরতি করেন। নিকটেই ছিল একটি জনপদ। তাঁরা সেই জনপদের লোকদের বললেন, আমরা আপনাদের অতিথি। কিন্তু তারা অতিথিদের সেবা করতে পরিষ্কার অস্বীকার করলো। ঘটনাক্রমে সেইদিন উক্ত জনপদের প্রধানকে বিচ্ছুতে কামড়ায়। নানা জনে নানা রকম চিকিৎসা চালালো’ কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তাদেরকে কেউ পরামর্শ দিল, তোমরা এই অতিথিদের কাছে যাও, তাদের মধ্যে কারও হয়তো কোন চিকিৎসা জানা থাকতে পারে। পরামর্শমত তারা এসে বিষয়টি জানালো। আবূ সা’ঈদ বললেন, ‘আমি ঝাড়-ফুঁক জানি, তবে পারিশ্রমিক হিসেবে তিরিশটি ছাগল দিতে হবে। তারা রাজি হয়ে গেল। আবূ সা’ঈদ তাদের সাথে গেলেন এবং সূরা মুহাম্মাদ পাঠ করে দংশিত স্থানে একটু থু থু লাগিয়ে দিলেন। তাতেই লোকটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল। সাহাবায়ে কিরাম তিরিশটি ছাগল নিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করলেন। তাঁদের মনে দ্বিধা ও সংশয় ছিল, এভাবে ছাগলগুলি নেওয়া ঠিক কিনা। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, বিষয়টি রাসূলুল্লাহকে সা. জানানো হবে। মদীনায় পৌঁছেই তাঁরা রাসূলুল্লাহকে সা. ঘটনাটি খুলে বলেন। সবকিছু শুনে তিনি একটু মুচকি হাসি দেন। তারপর বলেন, তোমরা কিভাবে জানলে যে, এই সূরা ঝাড়-ফুঁকের কাজ দেয়? তোমরা ঠিকই করেছ। বকরীগুলি তোমরা ভাগ করে নেবে এবং আমাকেও একটি অংশ দিতে ভুল করবে না। (সহীহুল বুখারী- ১/২৫১) হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের পর তিনি মদীনাতেই অবস্থান করেন। খলীফা হযরত ’উমার ও হযরত ’উসমানের রা. যুগে ফাতওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। যিয়াদ ইবন মীনা’র সূত্রে ইবন সা’দ বর্ণনা করেছেনঃ ইবন ’আব্বাস, ইবন ’উমার, আবূ সা’ঈদ খুদারী, আবূ হুরাইরা, আবদুল্লাহ ’আমর ইবনুল ’আস, জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ প্রমুখ আসহাবে রাসূল ’উসমানের মৃত্যুর সময় থেকে তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত মদীনায় ফাতওয়া দিতেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস বর্ণনা করতেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৫৫) হযরত আলীর রা. যুগে খারেজীদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। তখন তিনি বলতেন, তুর্কীদের চেয়ে খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমি বেশী প্রয়োজন মনে করি। (মুসনাদ- ৩/৩৩, ৫৬) হযরত ইমাম হুসাইন যখন মদীনা ছেড়ে কুফায় যাওয়া স্থির করেন, তখন আরও অনেক সাহাবীর মত আবূ সা’ঈদও তাঁকে এই সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। (সুয়ূতীঃ তারীখুল খুলাফা) হিজরী ৫৯ সনে হযরত উম্মু সালামা রা. ইনতিকাল করলে আবূ সা’ঈদ তাঁর জানাযায় শরীক ছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৩২) হিজরী ৬১ সনে হিজাযবাসীরা ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে রাসূলুল্লাহর সা. ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের ইবনুল ’আওয়ামের রা. হাতে বাই’য়াত করে। এই বাই’য়াতকারীদের মধ্যে হযরত আবূ সা’ঈদও ছিলেন। হিজরী ৬৩ সনে দারুল হিজরাহ্ মদীনার অধিবাসীরা ইয়াযীদের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে গাসীলুল মালায়িকা হযরত হানজালার ছেলে হযরত ’আবদুল্লাহর হাতে বাই’য়াত করে তাঁকে নিজেদের আমীর বলে ঘোষণা দেয়। ইয়াযীদের বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে মদীনাবাসীদের পরাভূত করে। হযরত ’আবদুল্লাহ ইয়াযীদ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। বিজয়ী ইয়াযীদ বাহিনী সেই সময় মদীনায় হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও ধ্বংসের তান্ডবলীলা সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহর সা. হারাম বা সম্মানিত শহর মদীনার এমন অসম্মান ও অবমাননা সেই সময় জীবিত সাহাবীরা দেখে দারুন মর্মাহত হন। আবূ সা’ঈদও এমন দৃশ্য দেখে সহ্য করতে না পেরে পাহাড়ের এক গুহায় আত্মগোপন করেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর খোঁজে একজন পৌঁছে যায় এবং তাঁকে হত্যার জন্য তরবারি উঠায়। তিনি প্রথমতঃ তাকে ভয় দেখানোর জন্য তরবারি তুলে ধরেন। কিন্তু সৈন্যটি আরও এগিয়ে এলে তিনি তরবারি মাটিতে রেখে দিয়ে সূরা আল-মায়িদার ২৮ নং আয়াতটি পাঠ করেনঃ ‘যদি তুমি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তোমার হাত বাড়াও তবুও আমি তোমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আমার হাত বাড়াবো না। কারণ, আমি আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীনকে ভয় করি।’ সৈনিকটি থেমে যায়। সে প্রশ্ন করে, আল্লাহর ওয়াস্তে বলুন তো আপনি কে? বললেনঃ আমি আবূ সা’ঈদ আল খুদারী। আপনি কি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী? বললেন, হাঁ। সৈনিকটি গুহা ছেড়ে চলে গেল। (আল-ইসাবা- ৩/৫৫) আবূ সা’ঈদ গুহা থেকে বাড়ী আসলেন। নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ চললো এবং বন্দী করা হলো। অবশেষে প্রচন্ড চাপের মুখে ইয়াযীদের প্রতি বাই’য়াত করতে বাধ্য হলেন। একথা হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. অবগত হয়ে তাঁর কাছে যান এবং বলেনঃ শুনেছি আপনি নাকি দুই আমীরের বাই’য়াত বা আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছেন? বললেনঃ হাঁ। প্রথমে ’আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের এবং বন্দী হওযার পরে ইয়াযীদের প্রতি বাই’য়াত করেছি। ইবন ’উমার বললেনঃ আমি এমনই আশংকা করেছিলাম। আবূ সা’ঈদ বললেনঃ কিন্তু আমার করার কি ছিল? কারণ, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি, মানুষের প্রতিটি সকাল ও সন্ধ্যা কোন না কোন আমীরের অধীনে অতিবাহিত হওয়া উচিত। একথা শুনে ইবন ’উমার বললেন, যাই হোক না কেন, আমি দুই আমীরের প্রতি বাই’য়াত পছন্দ করিনে। (মুসনাদ- ৩/২৯, ৩০) বেশী সংখ্যক বর্ণনা মতে তিনি হিজরী ৭৪ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। তবে আল্লামা জাহাবী লিখেছেন, তিনি ৮৬ বছর বয়সে মারা যান এবং এটাই সঠিক। (দ্রঃ তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৩৭, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ২/২৩৭, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮, শাজারাতুজ জাহাব- ১/৮১, উসুদুল গাবা- ৫/২১১) হযরত আবূ সা’ঈদের ছিল দুই স্ত্রী। একজনের নাম যয়নাব বিনতু কা’ব ইবন আজযাহ্। কেউ কেউ বলেছেনম তিনি সাহাবিয়্যা ছিলেন। দ্বিতীয়জন উম্মু ’আবদিল্লাহ বিনতু ’আবদিল্লাহ নামে প্রসিদ্ধ। তাঁর সন্তানদের নামঃ আবদুর রহমান, হামযাহ্ ও সা’ঈদ। হযরত আবূ সা’ঈদ ছিলেন আহলুস্ সুফ্ফার অন্যতম সদস্য। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ ফকীহ। কোন ক্বারীর নিকট কুরআন তিলাওয়াত শিখেছিলেন। তাঁর শিক্ষা জীবনে আনসারদের কয়েকটি হালকায়ে দারস ছিল। সেখানে আনসারদের ’আলিম ব্যক্তিরা দারস দিতেন। আবূ সা’ঈদের ছাত্র জীবনের যুগটি ছিল ইসলামের প্রথম যুগ। সেই সময় মানুষ ঠিক মত শরীর ঢাকার মত কাপড়ও সংগ্রহ করতে পারতো না। হালকায়ে দারসে একজন আর একজনের আড়ালে আবডালে চুপে চুপে বসে যেত। একদিন এমন একটি হালকায়ে দারসে হযরত রাসূলে কারীম সা. উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে ক্বারীর কিরাত থেমে গেল। তিনি সবাইকে গোল হয়ে বসতে বলে নিজেও তাদের সাথে বসে গেলেন। সেই হালকায় সে দিন যারা উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে একমাত্র আবূ সা’ঈদকে রাসূল সা. চিনতেন। (মুসনাদ- ৩/৬৩, হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০৪) হাদীস ও ফিকাহর জ্ঞান তিনি সরাসরি রাসূল সা. ও অন্য সাহাবীদের নিকট থেকে অর্জন করেন। চার খলীফা ও যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট থেকে তিনি হাদীস শোনেন। অসংখ্য হাদীস তাঁর মুখস্থ ছিল। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ১১৭০ টি। যাঁরা বহু সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন তিনি এমন একজন হাফেজে হাদীস। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ৪৩ টি মতান্তরে ৪৬ টি মুত্তাফিক ’আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম সম্মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন।) এবং বুখারী ও মুসলিম প্রত্যেকেই এককভাবে যথাক্রমে ১৬ টি ও ৫২ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যে সকল বিখ্যাত সাহাবী ও তাবে’ঈ তাঁর নিকট থেকে হাদীস শোনেন ও বণৃনা করেন তাঁদের কয়েকজন নাম নিম্নে দেওয়া গেলঃ যায়িদ ইবন সাবিত, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস, আনাস ইবন মালিক, ইবন ’উমার, ইবন যুবাইর, জাবির, আবূ কাতাদাহ, ইবন ’আমর, মাহমূদ ইবন লাবীদ, আবুত তুফায়েল, আবূ উমামা ইবন সাহল, সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, তারিক ইবন শিহাব, ’আতা, মুজাহিদ, আবূ ’উসমান আন-নাহদী, ’উবায়দ ইবন ’উমায়র, ’আয়্যাদ ইবন আবী সারাহ, বুসর ইবন সা’ঈদ, আবূ নুদবাহ, ইবন সীরীন প্রমুখ। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ২/৩৫, তাজকিরাতুল হুফফাজ- ১/৪৪, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ২/২৩৭, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮) তাঁর হালকায়ে দারস সব সময় ছাত্রে পরিপূর্ণ থাকতো। কেউ কোন প্রশ্ন করতে চাইলে অনেক প্রতীক্ষার পর সুযোগ পেত। (মুসনাদ-৩/৩৫) দারসের সময় ছাড়াও যে কোন সময় লোকে তাঁর কাছে বিভিন্ন মাসয়ালা জানতে পারতো। প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিতেন। একবার ইবন ’আব্বাস ছেলে ’আলী ও দাস ’আকরামাকে বললেন, যাও তো আবূ সা’ঈদের নিকট থেকে হাদীস শুনে এস। তারা যখন পৌঁছলেন, আবূ সা’ঈদ তখন বাগিচায়, তিনি তাদের সাথে বসেন এবং হাদীস শোনান। (মুসনাদ- ৩/৯০, ৯১) হাদীস বর্ণনার সাথে সাথে কিভাবে তিনি সে হাদীস শুনেছিলেন সে অবস্থারও বর্ণনা দিতেন। হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. কোন এক ব্যক্তির নিকট থেকে একটি হাদীস শোনেন। এই লোকটি আবূ সা’ঈদের সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করে। ইবন ’উমার ঐ লোকটিকে সংগে করে আবূ সা’ঈদের নিকট যান এবং প্রশ্ন করেনঃ এই ব্যক্তি কি অমুক হাদীসটি আপনার নিকট থেকে শুনেছে? আর আপনি কি তা রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেনঃ আমার দু’চোখ দেখেছে এবং দু’কান শুনেছে। (মুসনাদ- ৩/৪) একবার কুয’য়া নামক একজন ছাত্রের নিকট একটি হাদীস খুব ভালো লাগে। তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন, হাদীসটি কি আপনি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছেন? এমন প্রশ্নে তিনি একটু ক্ষুব্ধ হলেন। বললেনঃ তাহলে কি না শুনেই আমি বর্ণনা করছি? হাঁ, আমি শুনেছি। (মুসনাদ- ৩/৯১) যে সকল হাদীস রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শোনা শব্দাবলীর ওপর আস্থা না হতো সেগুলি বর্ণনার ব্যাপারে দারুন সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যেমন একবার একটি হাদীস বর্ণনা করলেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহর সা. নামটি উচ্চারণ করলেন না। এক ব্যক্তি প্রশ্ন করে বসলো, এটা কি রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত? বললেনঃ আমিও জানি। আবূ সা’ঈদ হযরত রাসূলে কারীমের সা. উপদেশ মত তাঁর ছাত্রদের আন্তরিকভাবে স্বাগতম জানাতেন। ইমাম তিরমিযী আবূ হারুন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা আবূ সা’ঈদের কাছে গেলে বলতেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. অসীয়াতের (উপদেশ) প্রতি স্বাগতম। নবী সা. বলেছেনঃ মানুষ তোমাদের অনুসরণ করবে। কিছু লোক নানা স্থান থেকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে আসবে। তারা যখন তোমাদের কাছে আসবে তোমরা তাদের ভালো উপদেশ দেবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তাদেরকে শিক্ষা দেবে এবং বলবে মারহাবা, মারহাবা, নিকটে এস।’ (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০২, কানযুল ’উম্মাল- ৫/২৪৩) আবূ সা’ঈদ আরও বর্ণনা করেন। ‘রাসূল সা. আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন তাদের (ছাত্রদের) মজলিসে বসার স্থান করে দিই, তাদের হাদীস শিখাই।’ কারণ, তোমরাই তো আমাদের পরবর্তী প্রতিনিধি, আমাদের পরবর্তী মুহাদ্দিস। তিনি তাঁর ছাত্রদের আরও বলতেনঃ তুমি কোন বিষয় না বুঝলে তা বুঝার জন্য বার বার প্রশ্ন করবে। কারণ, তুমি বুঝে আমার মজলিস থেকে উঠে যাও- এটা তোমার না বুঝে উঠে যাওয়া থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০৩, কানযুল ’উম্মাল- ৫/২৪৩) তিনি ছাত্রদের হাদীস লিখে দিতেন না। তাবরানী আবূ নাদরাহ্ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমি আবূ সা’ঈদকে বললাম, আপনি আমাদেরকে হাদীস লিখে দিন। তিনি বললেনঃ আমরা কক্ষণও লিখে দেবনা এবং কক্ষণও হাদীসকে কুরআন বানাবো না। তোমরা বরং আমাদের নিকট থেকে এমনভাবে গ্রহণ কর যেমন আমরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে গ্রহণ করেছি। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২১৭) হানজালা ইবন আবী সুফইয়ান আল-জুমাহী তাঁর শায়খদের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন! আবূ সা’ঈদ আল-খুদারী অপেক্ষা রাসূলুল্লাহর সা. ঘটনাবলীর অধিকতর সমঝদার ব্যক্তি আর কেউ নেই। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ২/২৩৭) অত্যন্ত সত্যভাষী ছিলেন তিনি। বলতেনঃ আমি রাসূলকে সা. সত্য ভাষণের প্রতি জোর তাকীদ দিতে শুনেছি। হায়, যদি তা না শুনতাম! (মুসনাদ- ৩/৫) একবার সত্য ভাষণের হাদীসটির আলোচনা উঠলে তিনি কেঁদে ফেলেন। তারপর বলেনঃ হাদীসটি তো অবশ্যই শুনেছি; কিন্তু তার ওপর ’আমল মোটেও হচ্ছেনা। (মুসনাদ- ৩/৬১, ৭১) হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার রা. শাসনকালে অনেক বিদ’য়াতের প্রচলন হতে থাকে। তিনি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মু’য়াবিয়ার রা. কাছে যান এবং এক এক করে সকল বিদ’য়াতের কথা তাঁর কর্ণগোচর করেন। (মুসনাদ- ৩/৮৪) একবার আমীর মু’য়াবিয়ার সাথে তাঁর আনসারদের সম্পর্কে কথা হয়। তিনি বলেন, রাসূল সা. আমাদের কষ্টে ধৈর্য ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন আমীর মু’য়াবিয়া বললেনঃ তাহলে তোমরা ধৈর্য ধর। (মুসনাদ- ৩/৮৯) একবার উমাইয়্যা খলীফা মারওয়ানের দরবারে বসে সাহাবীদের ফজীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে তাঁকে রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস শোনালেন। মারওয়ান বিশ্বাস করতে চাইলেন না। উক্ত বৈঠকে হযরত যায়িদ ইবন সাবিত ও রাফে ’ইবন খাদীজও উপস্থিত ছিলেন। আবূ সা’ঈদ প্রথমে তাদের দুইজনকে স্বাক্ষী মানলেন। তারপর বললেনঃ তাঁরাই বা কেন বলবে? একজনের তো সাদাকার দায়িত্ব থেকে অপসারণের ভয় আছে, আর অন্যজনের আপনার একটু ইশারাতেই গোত্রের নেতৃত্ব চলে যাওয়ার ভয়। এমন স্পষ্ট কথা শুনে মারওয়ান তাঁকে কোড়া দিয়ে মারার জন্য উদ্যত হয়। তখন ঐ ব্যক্তিদ্বয় তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করেন। (মুসনাদ- ৩/২৩) এমনিভাবে এক ’ঈদের দিনে মারওয়ান মিম্বার বের করেন এবং নামাযের পূর্বে খুতবা দেন। এক ব্যক্তি উঠে প্রতিবাদ করে বলে, এ দু’টি কাজই সুন্নাতের পরিপন্থী বিদ’য়াত। মারওয়ান বললেনঃ পূর্বের পদ্ধতি পরিত্যক্ত হয়েছে। সেখানে আবূ সা’ঈদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, যা কিছুই হোক না কেন, লোকটি তার দায়িত্ব পালন করেছে। আমি হযরত রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ যদি কোন ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ করতে দেখে তাহলে তার উচিত শক্তি প্রয়োগে তা প্রতিরোধ করা। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে উচিত মুখে প্রতিবাদ করা, আর তাও সম্ভব না হলে কমপক্ষে অন্তরে তা ঘৃণা করা উচিত। (মুসনাদ- ৩/১০) আমর বিল মারূফের (সৎকাজের আদেশ) আবেগ এত তীব্র ছিল যে, একবার মারওয়ান হযরত আবূ হুরাইরার রা. সাথে বসে ছিলেন। এমন সময় তাঁদের সামনে দিয়ে একটি লাশ অতিক্রম করলো। এই লাশের সাথে আবূ সা’ঈদও ছিলেন। মারওয়ান লাশ দেখেও উঠলেন না। তখন আবূ সা’ঈদ তাঁকে বললেনঃ আমীর, জানাযার জন্যে ওঠো। কারণ, রাসূল সা. উঠতেন। একথা শুনে মারওয়ান দাঁড়িয়ে যান। (মুসনাদ- ৩/৪৭, ৯৭) ইবন সা’দের মতে এই জানাযাটি ছিল উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসার রা.। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪২৮) হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইর যখন মদীনার গভর্ণর তখন একবার ’ঈদুল ফিতরের দিন জিজ্ঞেস করলেন, নামায এবং খুতবার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর সা. কর্মপন্থা কি ছিল? আবূ সা’ঈদ বললেনঃ রাসূল সা. খুতবার আগে নামায পড়াতেন। মুস’য়াব তাঁর কথামত কাজ করেন। (মুসনাদ- ৩/৪) একবার শাহর ইবন হাওশাব ‘তূর’ পাহাড় ভ্রমণের ইচ্ছা করেন। তিনি আবূ সা’ঈদের সাথে দেখা করতে আসেন। আবূ সা’ঈদ তাঁকে বলেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন পবিত্র ভূমির প্রতি সফর নিষেধ করা হয়েছে। ইবন আবী সা’সার জঙ্গল খুব পছন্দ ছিল্ আবূ সা’ঈদ তাঁকে বললেনঃ তুমি সেখানে এমন জোরে আযান দেবে যেন গোটা জঙ্গলে তাকবীরের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। (মুসনাদ- ৩/৯৫, ৪/৯৩) তাঁর বোন কোন কিছু পানাহার ছাড়াই ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করতেন। রাসূলুল্লাহ সা. এ ধরণের সাওম পালনে নিষেধ করতেন। আবূ সা’ঈদও সব সময় তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন। তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে রাসূলুল্লাহর সা. সুন্নাতের অনুসারী। হযরত আবূ হুরাইরাহ এক মসজিদে নামায পড়াতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বা কোন কারণে আসতে পারলেন না। তাঁর পরিবর্তে আবূ সা’ঈদ নামায পড়ালেন। তাঁর নামাযের পদ্ধতির সাথে লোকেরা কিছুটা দ্বিমত পোষণ করলো। তিনি মিম্বারের কাছে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, আমি যেভাবে রাসূলুল্লাহকে সা. নামায আদায় করতে দেখেছি ঠিক সেইভাবে পড়িয়েছি। এখন তোমরা আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করলে তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল। একবার তাঁর পায়ে ব্যথা হলো। তিনি পায়ের ওপর পা রেখে শুয়ে ছিলেন। তাঁর ভাই এসে হঠাৎ সেই পায়ে হাত দিয়ে একটি থাবা মারেন। তাতে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। তিনি অত্যন্ত নরমভাবে বললেন, আমাকে ব্যথা দিলে? তুমি তো জানতে আমার পায়ে ব্যথা। ভাই বললেনঃ হাঁ, জানতাম। তবে এভাবে শুতে রাসূল সা. নিষেধ করেছেন। সরলতা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একবার একটি জানাযার নামাযের জন্য তাঁকে ডাকা হয়। সবার শেষে একটু দেরীতে তিনি পৌঁছলেন। লোকেরা তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিল। তাঁকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য স্থান খালি করে দেয়। তিনি বললেনঃ এ উচিত নয়। মানুষের উচিত ফাঁকা জায়গায় বসা। একথা বলে তিনি একটি ফাঁকা স্থানে বসে পড়েন। আবূ সালামা নামে তার এক ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন তাবে’ঈ। তাঁর সাথে ছিল চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একবার আবূ সালামা তাঁকে ডাক দিলেন। তিনি গায়ে চাদর জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। আবূ সালামা বললেন, একটু বাগিচা পর্যন্ত চলুন। আপনার সাথে কিছু কথা আছে। তিনি আবূ সালামার সাথে চললেন। তিনি ইয়াতীমদের প্রতিপালন করতেন। লায়স ও সুলায়মান ইবন ’আমর তাঁরই পালিত। তিনি হাতে একটি ছড়ি নিয়ে ঘুরতেন। হালকা-পাতলা ছড়ি তাঁর পছন্দ ছিল। খেজুরের ডাল সোজা করে তিনি ছড়ি বানাতেন। এক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. অনুসারী। (মুসনাদ- ৩/৬৫) আনাস বলেনঃ আনসারদের ২০ জন যুবক সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহর সা. সেবায় নিয়োজিত থাকতো। যে কোন প্রয়োজনে রাসূল সা. তাদের কাউকে পাঠাতেন। আবদুর রহমান ইবন ’আউফ বলেন, চার অথবা পাঁচজন সাহাবী তো কক্ষণও রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীর দরযা থেকে উঠতো না। আবূ সা’ঈদ বলেন, আমরা পালাক্রমে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে থাকতাম। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৮৭) একবার এক ওয়ালিমার অনুষ্ঠানে তাঁকে দা’ওয়াত করা হয়। তিনি উপস্থিত হয়ে দেখেন, নানা পদের খাবার প্রস্তুত। বাড়ীর লোকদের বললেন, তোমরা কি জাননা, রাসূল সা. যে দিন দুপুরে খেতেন সে দিন রাতে উপোস যেতেন এবং সকালে নাস্তা করলে দুপুরে খেতেন না? (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩০৮) সিফ্ফীন যুদ্ধে হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবনুল ’আস পিতা ’আমর ইবনুল ’আসের সাথে হযরত ’আলীর রা. বিরুদ্ধে রনাঙ্গনে যান। এ কারণে হযরত হাসান ইবন ’আলী বহুদিন যাবত তাঁর সাথে কথা বলা বন্ধ রাখেন। হযরত আবূ সা’ঈদ রা. এ কথা জানতে ’আবদুল্লাহকে সংগে নিয়ে হাসানের নিকট যান এবং তাঁদের দু’জনের মনোমালিন্য দূর করে সম্প্রীতি ও সৌহার্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৩৪)
আবু কাতাদাহ্ আল-আনসারী (রা)

হযরত আবু কাতাদাহ মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনী সুলামা শাখার সন্তান। তাঁর আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন ‘আল হারিস’; আবার কেউ বলেছেন ‘আমর’। আল-কালবী ও ইবন ইসহাকের মতে ‘আন-নু’মান’। তবে ‘আল-হারিস’ অধিকতর প্রসিদ্ধ। ইতিহাসে তিনি ‘আবু কাতাদাহ্’ এ ডাক নামেই খ্যাত। পিতা রাব’য়ী ইবন বালদামা এবং মাতা কাবশা বিনতু মুতাহ্হির। তিনিও খাযরাজ গোত্রের বনী সুলামার সাওয়াদ ইবন গানাম শাখার মেয়ে। রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের ১৮ বছর পূর্বে ৬০৪ খ্রীষ্টাব্দে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা- ৫/২৭৪, আল ইসাবা- ৪/১৫৮; আল-আ’লাম- ২/১৫৪) তাবুক যুদ্ধে যোগদান না করার কারণে যে কা’ব ইবন মালিক আল-আনসারীর শাস্তি হয় এবং পরে আল্লাহ পাক যাঁকে ক্ষমা করেন, তিনি আবু কাতাদাহ্র চাচাতো ভাই। সে সময় তিনিও অন্য সকলের মত কা’বকে বয়কট করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৬৭) শেষ ’আকাবার পরে কোন এক সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে তাঁর অংশ গ্রহণের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধ আছে। অনেকে তাঁকে বদরী সাহাবী বলেছেন। তবে মুসা ইবন ’উকবা বা ইবন ইসহাক, এঁদের কেউই বদরী সাহাবীদের তালিকার মধ্যে তাঁর নামটি উল্লেখ করেননি। উহুদসহ পরবর্তী সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। (আল-ইসাবা- ৪/১৫৮; উসুদুল গাবা- ৫/২৭৪) ৬ হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে জীকারাদ বা গাবা অভিযান পরিচালিত হয়। সেই অভিযানে তিনি দারুণ দুঃসাহসের পরিচয় দান করেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. উটগুলি জীকারাদ নামক একটি পল্লীতে চরতো। রাসূলুল্লাহর সা. দাস রাবাহ ছিলেন সেই উটগুলির দায়িত্বে। গাতফান গোত্রের কিছু লোক রাখালদের হত্যা করে উটগুলি লুট করে নিয়ে যায়। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালামা ইবন আকওয়া এ সংবাদ পেয়ে আরবের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মদীনার দিকে মুখ করে শত্রুর আক্রমণের সতর্ক ধ্বনি ‘ইয়া সাবাহাহ্!’ বলে তিনবার চিৎকার দেন। অন্যদিকে রাবাহকে দ্রুত রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠিয়ে দিয়ে নিজে গাতফানী লুটেরাদের পিছে ধাওয়া করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে সাহায্যের জন্য দ্রুত তিনজন অশ্বারোহীকে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁদের পিছনে তিনি নিজেও বেরিয়ে পড়েন। সালামা ইবন আকওয়া মদীনার সাহায্যের প্রতীক্ষায় ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি দেখতে পেলেন, আবু কাতাদাহ আল-আনসারী, আল-আখরাম আল-আসাদী এবং তাঁদের পিছনে মিকদাদ আল-কিন্দী বাতাসের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছেন। এই অশ্বারোহীদের দেখে গাতফানীর উট ফেলে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আল- আখরাম আল-আসাদীর মধ্যে তখন শাহাদাতের তীব্র বাসনা কাজ করছে। তিনি সালামার নিষেধ অমান্য করে গাতফানীদের পিছে ধাওয়া করেন। এক পর্যায়ে তাঁর ও ’আবদুর রহমান গাতফানীর মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হয় এবং আল-আখরাম শাহাদাত বরণ করেন। আবদুর রহমান আল-আখরামের ঘোড়াটি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এমন সময় আবু কাতাদাহ্ এসে উপস্থিত হন এবং তিনি বর্শার এক খোঁচায় আবদুর রহমানকে হত্যা করেন। (আল-কামিল ফী আত-তারীখ- ২/১৯৮-১৯১; আল-ইসাবা- ৪/১৫৮; হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৬১; সাহীহ মুসলিম- ২/১০১) অন্য একটি বর্ণনা মতে এই জীকারাদ যুদ্ধে আবু কাতাদাহ্ যাকে হত্যা করেন তার নাম হাবীব ইবন ’উয়াইনা ইবন হিস্ন। তিনি হাবীবকে হত্যা করে নিজের চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে শত্রুর পিছনে আরও এগিয়ে যান। পিছনের লোকেরা যখন দেখতে পেল, আবু কাতাদাহ্র চাদর দিয়ে একটি লাশ ঢাকা তখন তারা মনে করলো, নিশ্চয় এ আবু কাতাদাহ্র লাশ। সাথে সাথে তারা ‘ইন্নালিল্লাহ’ উচ্চারণ করলো। তারা নিজেরা বলাবলি করতে লাগলো’ আবু কাতাদাহ্ নিহত হয়েছে। একথা শুনে রাসূল সা. বললেন’ আবু কাতাদাহ্ নয়; বরং আবু কাতাদাহ্র হাতে নিহত ব্যক্তির লাশ। সে একে হত্যা করে নিজের চাদর দিয়ে ঢেকে রেখে গেছে, যাতে তোমরা বুঝতে পার, এ ঘাতক সেই। এ যুদ্ধে আবু কাতাদাহ্র ঘোড়াটির নাম ছিল ‘হাযওয়া’। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৮৪) আবু কাতাদাহ বলেন, জীকারাদের দিন অভিযান শেষে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আমার দেখা হলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে দু’আ করেনঃ হে আল্লাহ! তুমি তার কেশ ও ত্বকে বরকত দাও। তার চেহারাকে কামিয়াব কর। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ আপনার চেহারাও কামিয়াব করুন! (উসুদুল গাবা- ৫/২৭৫) এ দিন তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার বর্ণনা শুনে রাসূল সা. মন্তব্য করেনঃ ‘আবু কাতাদাহ্ আজ আমাদের সর্বোত্তম অশ্বারোহী।’ (আল-কামিল ফী আত-তারীখ- ২/১৯১; আল-ইসাবা- ৪/১৫৮) হুদাইবিয়া সন্ধির সফরে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আবু কাতাদাহ্ও ছিলেন। এ সফরে ফেরার পথে একদিন রাসূলসহ সা. তাঁর সফর সঙ্গীদের ফজরের নামায কাজা হয়ে যায়। সে কাজা নামায কখন কিভাবে রাসূল সা. আদায় করেছিলেন তার একটা বিবরণ আবু কাতাদাহ্ বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৯) হিজরী সপ্তম অথবা অষ্টম সনে রাসূল সা. আবু কাতাদাহ্র নেতৃত্বে একটি বাহিনী ‘ইদাম’-এর দিকে পাঠান। এই ‘ইদাম’ একটি স্থান বা একটি পাহাড়ের নাম এবং মদীনা থেকে শামের রাস্তায়। তাঁরা ‘ইদাম’ উপত্যকায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাশ দিয়ে ’আমের ইবন আল-আদবাত আল-আশজা’য়ী যাচ্ছিলেন। তিনি আবু কাতাদাহ্ ও তাঁর বাহিনীর সদস্যদের সালাম দিলেন। তা সত্ত্বেও পূর্ব শত্রুতার কারণে এ বাহিনীর সদস্য মুহাল্লিম ইবন জাসসামা ইবন কায়েস তাঁকে হত্যা করেন এবং তাঁর উট ও অন্যান্য জিনিস ছিনিয়ে নেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে যখন তাঁকে এ ঘটনা অবহিত করেন তখন সূরা আন নিসার ৯৪ নং আয়াতটি নাযিল হয়। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৮১; হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৮৯) ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করবে তখন পরীক্ষা করে নেবে কেউ তোমাদেরকে সালাম দিলে ইহ-জীবনের সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় তাকে বলো না, ‘তুমি মুমিন নও’। কারণ, আল্লাহর নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর আছে। তোমরা তো পূর্বে এরূপই ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং তোমরা পরীক্ষা করে নেবে। তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত।’ (সূরা আন নিসা- ৯৪) হিজরী ৮ম সনের শা’বান মাসে রাসূল সা. নাজ্দের ‘খাদরাহ্’ নামক স্থানের দিকে পনেরো সদস্যের একটি বাহিনী পাঠান। আবু কাতাদাহ্ ছিলেন এই বাহিনীর আমীর। সেখানে গাতফান গোত্রের বসতি ছিল। তারা ছিল মুসলমানদের চরম শত্রু এক লুটেরা গোত্র। তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল। একারণে সারা রাত চলতেন এবং দিনে কোথাও লুকিয়ে থাকতেন। এভাবে হঠাৎ তাঁরা গাতফান গোত্রে পৌঁছে যান। তারাও ছিল ভীষণ সাহসী। সাথে সাথে বহুলোক উপস্থিত হয়ে গেল এবং যুদ্ধ শুরু হলো। আবু কাতাদাহ্ সঙ্গীদের বললেন, যারা তোমাদের সাথে লড়বে শুধু তাদেরকেই হত্যা করবে। সবাইকে ধাওয়া করার কোন প্রয়োজন নেই। এমন নীতি গ্রহণের ফলে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। মাত্র ১৫ দিন পর প্রচুর গণীমতের মাল সঙ্গে নিয়ে মদীনায় ফিরে আসলেন। গণীমতের মালের মধ্যে ছিল দু’শো উট, দু’হাজার ছাগল এবং বহু বন্দী। এই মালের এক পঞ্চমাংশ পৃথক করে রেখে বাকী সবই তাঁদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়। এ ঘটনার কিছুদিন পর আল্লাহর রাসূল সা. রমজান মাসে ৮ জন লোকের একটি দল ‘বাতানে আখাম’- এর দিকে পাঠান। এঁদেরও নেতা ছিলেন আবু কাতাদাহ্। ‘বাতানে আখাম’- এর অবস্থান হচ্ছে জী-খাশাব ও জী-মারওয়ার মাঝামাঝি মদীনা থেকে মক্কার দিকে তিন মনযিল দূরে। রাসুল সা. মক্কায় সেনা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মানুষ যাতে একথা মোটেই বুঝতে না পারে এ জন্য এই দলটিকে পাঠান। মূলতঃ মানুষের চিন্তা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই একাজ করেন। জী-খাশাব পৌঁছার পর এ দলটি জানতে পেল যে, রাসূল সা. মক্কার দিকে বেরিয়ে পড়েছেন। সুতরাং তাঁরা ‘সুকাইয়্যা’ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. বাহিনীর সাথে মিলিত হন। (তাবাকাতঃ মাগাযী অধ্যায়- ৯১) মক্কা বিজয়ের পর হুনাইন অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে লড়াই এত তীব্র ছিল যে, মুসলমানদের অনেক বড় বড় বীরও পিছু হঠতে বাধ্য হন। আবু কাতাদাহ্ এ যুদ্ধে দারুন বীরত্ব প্রদর্শন করেন। এক স্থানে একজন মুসলমান ও একজন মুশরিক সৈনিকের মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হচ্ছে। দ্বিতীয় একজন পিছন দিক থেকে মুসলিম সৈনিককে আক্রমণের পায়তারা করছে। ব্যাপারটি আবু কাতাদাহর নজরে পড়লো। তিনি চুপিসারে এগিয়ে গিয়ে পিছন দিক থেকে লোকটির কাঁধে তরবারির ঘা বসিয়ে দিলেন। লোকটির একটি হাত কেটে পড়ে গেল; কিন্তু অতর্কিতে সে দ্বিতীয় হাতটি দিয়ে আবু কাতাদাহ্র গলা পেঁচিয়ে ধরলো। লোকটি ছিল অতি শক্তিশালী। সে এত জোরে আবু কাতাদাহ্কে চাপ দিল যে, তাঁর প্রাণ বেরিয়ে যাবার উপক্রম হলো। দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলছে, এর মধ্যে লোকটির দেহ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় সে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে আবু কাতাদাহ্ লোকটির দেহে আরেকটি ঘা বসিয়ে দেন। লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আবু কাতাদাহ্ যখন তার হত্যা কর্মে ব্যস্ত তখন মক্কার এক মৃসলিম সৈনিক সেই পথে যাচ্ছিল। সে নিহত ব্যক্তির সকল সাজ-সরঞ্জাম ও জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে গেল। এরপর মুসলিম বাহিনীর মধ্যে দারুন ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। তারা ময়দান থেকে যে যেদিকে পারে, পালিয়ে যাচ্ছিল। আবু কাতাদাহ্ও এক দিকে যাচ্ছেন। পথে এক স্থানে হযরত ’উমারের রা. সাথে দেখা। আবু কাতাদাহ্ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কী ব্যাপার? ’উমার রা. বললেনঃ আল্লাহর যা ইচ্ছা। এর মধ্যে মুসলমানরা দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং রণক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করে। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ যুদ্ধ থেমে গেল। আমরাও বিশ্রাম নিচ্ছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সা. ঘোষণা করলেনঃ কেউ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করলে হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত জিনিস লাভ করবে। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি একজন সাজ-সরঞ্জামবিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। আমি যখন তার হত্যা কর্মে ব্যস্ত তখন কে একজন তাঁর জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। আমি তাকে চিনিনে। তখন মক্কার সেই ব্যক্তি বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে সত্য বলেছে। নিহত ব্যক্তির জিনিস আমার কাছে আছে। সেগুলি আমাকে দেওয়ার জন্য তাঁকে একটু রাজী করিয়ে দিন। সাথে সাথে আবু বকর রা. বলে উঠলেনঃ আল্লাহর কসম! রাসূল সা. তাকে রাজী করাবেন না। একজন শেরে খোদা আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে, আর তুমি তার প্রাপ্য জিনিস হাতানোর মতলবে আছ? নিহত ব্যক্তির জিনিস তাকে দিয়ে দাও। তখন রাসূল সা. বললেনঃ আবু বকর সত্য বলেছে। তুমি তার লুণ্ঠিত দ্রব্য ফিরিয়ে দাও। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ আমি সেই জিনিসগুলি নিয়ে বিক্রী করি এবং সে অর্থ দিয়ে দশটির মত খেজুর গাছ ক্রয় করি। ইসলাম গ্রহণের পর এই ছিল আমার প্রথম কোন সম্পদ ক্রয়। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৪৮, ৪৪৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৯০, ৯১; মুসনাদ- ৫/৩০৬) রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর খলীফাদের সময়ে আবু কাতাদাহ্র কর্মকান্ডের বিস্তারিত তেম কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত ’উসমান রা. যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা মদীনায় নিজ গৃহে ঘেরাও অবস্থায়, তখন হজ্জ মওসুম। সে সময় একদিন আবু কাতাদাহ্ অন্য একজন লোককে সংগে করে খলীফা ’উসমানের রা. নিকট গিয়ে হজ্জে যাওয়ার অনুমতি চান। তিনি তাদেরকে অনুমতি দেন। তখন তারা খলীফার নিকট জানতে চানঃ যদি এই বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয় তাহলে তাঁরা কার সাথে থাকবেন? খলীফা বললেনঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ জামা’য়াতের সাথে। তাঁরা আবার প্রশ্ন করেনঃ যদি এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জামা’য়াতই আপনার ওপর বিজয়ী হয় তখন কার সাথে থাকবো? সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যারাই হোক না কেন তাদের সাথে থাকবে। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১২৬) হযরত আলী রা. তাঁকে একবার মক্কার আমীর নিয়োগ করেন। পরে তাঁর স্থলে কুছাম ইবন ’আব্বাসকে নিয়োগ করেন। হিজরী ৩৬ সনে উটের যুদ্ধ এবং এর পরের বছর সিফ্ফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. দু’টি যুদ্ধেই হযরত আলীর রা. পক্ষে যোগ দেন। (আল-আ’লাম- ২/১৫৪; আল-ইসাবা- ৪/১৫৮) হিজরী ৩৮ সনে খারেজীরা বিদ্রোহের পতাকা উড্ডীন করে। হযরত আলী রা. যে বাহিনী নিয়ে তাদের বিরেুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, আবু কাতাদাহ্ ছিলেন তার পদাতিক দলের অফিসার। হযরত আবু কাতাদাহ্র রা. মৃত্যু সন নিয়ে দারুন মতভেদ আছে। কুফাবাসীদের মতে হিজরী ৩৮ সনে তিনি কুফায় মারা যান এবং হযরত আলী রা. সাত তাকবীরের সাথে তাঁর জানাযার নামায পড়ান। ইমাম শা’বী বলেন, সাত নয়, বরং ছয় তাকবীরের সাথে। হাসান ইবন ’উসমান বলেন, তিনি হিজরী- ৪০ সনে মারা যান। ওয়াকিদী বলেন, হিজরী ৫৪ সনে ৭২ বছর বয়সে মদীনায় মারা যান। আবার কেউ বলেছেন, ৭২ নয়; বরং ৭০ বছর বয়সে। ইমাম বুখারী ‘আল-আওসাত’ গ্রন্থে যারা হিজরী ৫০ থেকে ৬০ সনের মধ্যে মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে আবু কাতাদাহ্র নামটি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, মারওয়ান যখন মু’য়াবিয়ার রা. পক্ষ থেকে মদীনার ওয়ালী তখন তিনি আবু কাতাদাহ্কে একবার দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান এবং তিনি মারওয়ানের সাথে দেখা করেন। এর সমর্থনে আর একটি বর্ণনা দেখা যায়। মু’য়াবিয়া রা. যখন মদীনায় আসেন তখন সবশ্রেণীর মানুষ তাঁর সাথে দেখা করে। তখন তিনি আবু কাতাদাহ্কে ডেকে বলেনঃ শুধু আপনারা-আনসাররা ছাড়া সব মানুষই আমার সাথে দেখা করেছে। এসব বর্ণনা দ্বারা নিশ্চিতভাবে বুঝা যায় তিনি হিজরী ৪০ সনের পরে মারা গেছেন। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ৪/১৫৯; আল-আ’লাম- ২/১৫৪; উসুদুল গাবা- ৫/২৭৫) হযরত আবু কাতাদাহ্র রা. দৈহিক আকার-আকৃতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে তিনি ঘাড় পর্যন্ত চুল রাখতেন যাকে ‘হামিয়্যা’ বলা হয়। চুলে মাঝে মাঝে চিরুনী করতেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. একবার তাঁর চুলের অযত্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থা দেখে বলেন, এগুলি একটু ঠিক কর। মানুষের উচিত চুল রাখলে তার যত্ন নেওয়া। অন্যথায় সে রাখার ফায়দা কি? তাঁর ছিল চার ছেলেঃ আবদুল্লাহ, মা’বাদ, আবদুর রহমান ও সাবিত। শেষের জন ছিলেন দাসীর গর্ভজাত। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল সালাফা বিনতু বারা’ ইবন মা’রূর ইবন সাখার। সুলামা খান্দানের এক অভিজাত ঘরের মেয়ে। তিনি নিজেও একজন ‘সাহাবিয়্যা’ (মহিলা সাহাবী) এবং তাঁর পিতা বারা’ ইবন মা’রূর ইবন সাখারও ছিলেন একজন খ্যাতিমান সাহাবী। হযরত আবু কাতাদাহ্ কুরআন-হাদীসের প্রচার প্রসারের দায়িত্ব সম্পর্কে মোটেই উদাসীন ছিলেন না। হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে ছিলেন দারুন সতর্ক। রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে ‘কিজব’ ’আলার রাসূলে’- বা রাসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপের হাদীস শোনার পর থেকে হাদীসের ব্যাপারে দারুন সতর্কতা অবলম্বন করেন। (মুসনাদ- ৫/২৯২) একদিন তাবঈদের একটি মজলিসে হাদীসের চর্চা হচ্ছিল। প্রত্যেকেই বলছিলেন, ‘রাসূল সা. এমন বলেছেন, রাসূল সা. এমন বলেছেন’। আবু কাতাদাহ্ তাঁদের এসব আলোচনা শুনে বললেন; হতভাগার দল, তোমাদের মুখ থেকে এসব কী বের হচ্ছে? রাসূল সা. মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীদের জাহান্নামের শাস্তির কথা বলেছেন। (মুসনাদ- ৫/৩১০) এত সতর্কতা সত্ত্বেও তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৭০ (একশত সত্তর)। তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে যেমন শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ আছেন, তেমনি আছেন শ্রেষ্ঠ তাবে’ঈগণও। যেমনঃ আনাস ইবন মালিক, জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ, আবু মুহাম্মাদ নাফে, (তাঁর আযাদকৃত দাস), সা’ঈদ ইবন কা’ব ইবন মালিক, কাবশা বিনতু কা’ব ইবন মালিক, ’আবদুল্লাহ ইবন রাবাহ, ’আতা ইবন ইয়াসার, আবু সালামা ইবন ’আবদির রহমান ইবন ’আউফ, ’উমার ইবন সুলাইম যারকী, ’আবদুল্লাহ ইবন মা’বাদ, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, সা’ঈদ ইবন মুসায়্যিব প্রমুখ। উল্লেখিত ব্যক্তিগণের সকলের হাদীস শাস্ত্রের এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। হযরত আবু কাতাদাহ্র মধ্যে ইসলামী উখুওয়াত বা ভ্রাতৃত্বের চরম বিকাশ ঘটেছিল। একবার রাসূলুল্লাহর সা. সামনে এক আনসারী ব্যক্তির মৃতদেহ আনা হলো জানাযার জন্য। রাসূল সা. প্রথমে জানতে চাইলেন, তার উপর কোন ঋণ আছে কিনা। লোকেরা বললো তার দু’দীনার ঋণ আছে। তিনি আবার জানতে চাইলেন, সে কোন সম্পদ রেখে গেছে কিনা। লোকেরা বললো, না, সে কিছুই রেখে যায়নি। তখন রাসূল সা. বললেনঃ তোমরা তার নামায পড়। হযরত আবু কাতাদাহ্ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ আমি যদি তার ঋণ পরিশোধ করে দেই, আপনি কি নামায পড়াবেন? বললেনঃ হ্যাঁ। আবু কাতাদাহ্ লোকটির ঋণ পরিশোধ করে রাসূলকে সা. খবর দিলেন। রাসূল সা. এসে জানাযার নামায পড়ান। (মুসনাদ- ৫/২৯, ২০৩) একজন মুসলমান তাঁর কাছে কিছু ঋণী ছিল। যখন তিনি তাগাদায় যেতেন তখন সে লুকিয়ে থাকতো। একদিন তিনি লোকটির বাড়ীতে গেলেন এবং তার ছেলের কাছে খবর পেলেন, সে খাবার খাচ্ছে। তিনি চেঁচিয়ে বললেনঃ তুমি বেরিয়ে এসো, আজ আমি জেনে ফেলেছি। আজ লুকিয়ে কাজ হবে না। সে বেরিয়ে এলে আবু কাতাদাহ্ তার এভাবে লুকানোর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বললোঃ আসল কথা হেলো, আমি খুবই গরীব। আমার কাছে কিছুই নেই। তার ওপর আছে পরিবার-পরিজনের বোঝা। আবু কাতাদাহ্ বললেনঃ সত্যিই কি তোমার এমন দুরবস্থা? সে বললোঃ হাঁ। আবু কাতাদাহ্র চোখ পানিতে ভরে গেল। তিনি তার ঋণ মাফ করে দিলেন। (মুসনাদ- ৫/৩০৮) হযরত আবু বকরের সা. খিলাফতকালে রিদ্দার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধেল এক পর্যায়ে খলীফা খালিদ ইবন ওয়ালীদকে পাঠালেন মালিক ইবন নুওয়াইরা ইয়ারবু’য়ীর বিরুদ্ধে। মালিক ইবন নুওয়াইরা ইসলাম কবুল করেন। তা সত্ত্বেও যে কোন কারণেই হোক খালিদ তাঁকে হত্যা করেন। খালিদের একাজে আবু কাতাদাহ্ এতই ক্ষুব্ধ হন যে, খলীফার নিকট আবেদন করেন; আমি খালিদের অধীনে থাকতে রাজী নই। সে একজন মুসলমানের রক্ত ঝরিয়ছে। অতি ক্ষুদ্র বিষয়েও তিনি মানুষকে সঠিক আকীদা বিশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। একবার তিনি ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন সময় একটা উল্কা আসতে থাকে। মানুষ সে দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য লক্ষ্য করে বললেনঃ এটা বেশী দেখা নিষেধ (মুসনাদ- ৫/২৯৯) হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. রাসূলুল্লাহর সা. সার্বক্ষণিক সাহচর্য ও খিদমতের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। একবার এক সফরে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গী ছিলেন। রাসূল সা. সাহাবীদের বললেন, পানি কোথায় আছে তা খুঁজে বের কর অন্যথায় সকালে ঘুম থেকে পিপাসিত অবস্থায় উঠতে হবে। লোকেরা পানির তালাশে বেরিয়ে গেল। কিন্তু হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. রাসূলুল্লাহর সা. সাথেই থেকে গেলেন। রাসুল সা. উটের ওপর সওয়ার ছিলেন। ঘুম কাতর অবস্থায় তিনি যখন এক দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন তখন আবু কাতাদাহ্ এগিয়ে গিয়ে নিজের হাত দিয়ে সে দিকে ঠেস দিচ্ছিলেন। একবার তো রাসূল সা. পড়ে যাবারই উপক্রম হলেন। আবু কাতাদাহ্ দ্রুত হাত দিয়ে ঠেকালেন। রাসূল সা. চোখ মেলে জিজ্ঞেস করলেনঃ কে? বললেনঃ আবু কাতাদাহ্। রাসূল সা. আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ কখন থেকে আমার সাথে আছ? বললেনঃ সন্ধ্যা থেকে। তখন রাসূল সা. তাঁর জন্য দু’আ করলেন এই বলেঃ হে আল্লাহ! আপনি আবু কাতাদাহ্কে হিফাজত করুন যেমন সে সারা রাত আমার হিফাজত করেছে। (মুসনাদ- ৫/২৯৮; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৪৭; আল-ইসাবা- ৪/১৫৯) একবার হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. রাসূলুল্লাহর সা. একটি মু’জিযা প্রত্যক্ষ করেন। আবু নু’য়ায়িম ‘আদ-দালায়িল’ গ্রন্থে (১৪৪) ইবন মাস’উদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহর সা. সংগে ছিলাম। এক সময় যাত্রা বিরতিকালে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের সাথে কি পানি আছে? বললামঃ হাঁ। আমার কাছে একটি পাত্রে কিছু পানি আছে। বললেনঃ নিয়ে এসো। আমি পানির পাত্রটি নিয়ে এলাম। তিনি বললেনঃ এর থেকে কিছু পানি নিয়ে তোমরা সবাই অজু কর। অজুর পর সেই পাত্রে এক ঢোক মত পানি থাকলো। রাসূল সা. বললেনঃ আবু কাতাদাহ্, তুমি এ পানিটুকু হিফাজতে রেখে দাও। খুব শিগগিরই এর একটি খবর হবে। আস্তে আস্তে দুপুরের প্রচন্ড গরম শুরু হলো। রাসূল সা. সঙ্গীদের সামনে উপস্থিত হলেন। তারা সবাই বললেনঃ না, তোমরা মরবে না। এই বলে তিনি আবু কাতাদাহ্কে ডেকে পানির পাত্রটি নিয়ে আসতে বললেন। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ আমি পাত্রটি নিয়ে এলাম। রাসূল সা. বললেনঃ আমার পিয়ালাটি নিয়ে এসো। পিয়ালা আনা হলো। তিনি পাত্র থেকে একটু করে পানি পিয়ালায় ঢেলে মানুষকে পান করাতে লাগলেন। পানি পানের জন্য রাসূলুল্লাহর সা. চারপাশে ভীড় জমে গেল। দারুন হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। রাসূল সা. বললেনঃ তোমরা ভদ্রভাবে শান্ত থাক, সবাই পান করতে পারবে। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ একমাত্র রাসূল সা. ও আমি ছাড়া সকলের পান শেষ হলে তিনি বললেনঃ আবু কাতাদাহ্, এবার তুমি পান কর। আমি বললাম! আপনি আগে পান করুন। তিনি বললেনঃ সম্প্রদায়ের যিনি সাকী বা পানি পান করান, তিনি সবার শেষে পান করেন। অতঃপর আমি পান করলাম এবং সবার শেষে রাসূল সা. পান করলেন। সবার পান করার পরেও পাত্রের ঠিক যতটুকু পানি ছিল তাই থেকে গেল। বর্ণনাকারী বলেনঃ সে দিন তিন শো লোক ছিল। অন্য একটি বর্ণনা মতে, লোক সংখ্যা ছিল সাতশো। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬২০, ৬২১) তিনি স্বভাবগতভাবেই ছিলেন কোমল। জীবের প্রতি ছিল তাঁর দারুন দয়। একবার ছেলের বাড়ী গেলেন। ছেলের বউ অজুর জন্য পানি রেখেছিল। একটি বিড়াল তাতে মুখ দিয়ে পান করতে শুরু করলো। হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. বিড়ালটি না তাড়িয়ে পাত্রটি তার দিকে আরো একটু কাত করে দিলেন, যাতে সে ভালো করে পান করতে পারে। পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের বউ এ দৃশ্য দেখছিল। তিনি ছেলে-বউকে বললেনঃ এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ বিড়ালের এঁটে না পাক নয়। কারণ, এরা ঘরের মধ্যে বিচরণকারী জীব। (মুসনাদ- ৫/৩০৩) শিকার করা ছিল তাঁর বিশেষ শখ। একবার হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাথে যাচ্ছিলেন। পথে যাত্রা বিরতিকালে কয়েকজন সংগী নিয়ে শিকারে বেরিয়ে পড়লেন। স্থানটি ছিল পাহাড়ী এলাকা। খুব দ্রুত পাহাড়ে উঠার অভ্যাস ছিল তাঁর। তিনি সংগীদের নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গেলেন। সেখানে একটি জন্তু দেখতে পেলেন। আবু কাতাদাহ্ একটু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখে সংগীদের জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা বলতো এটা কি জন্তু? তাঁরা বললেনঃ আমরা তো ঠিক বলতে পারছিনা। তিনি বললেনঃ এটা একটা বন্য গাধা। আবু কাতাদাহ্ পাহাড়ে উঠার সময় তাঁর চাবুকটি ভুলে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি সংগীদের চাবুকটি নিয়ে আসতে বললেন। তাঁরা ছিলেন ইহরাম অবস্থায়। একারণে তাঁরা শিকারে কোন রকম সহযোগিতা করলেন না। শেষে তিনি নিজেই বর্শা নিয়ে জন্তুটির পিছু ধাওয়া করে হত্যা করেন। তারপর সেটি ওঠানোর জন্য সংগীদের সাহায্য চান; কেউ তাঁকে সাহায্য করলেন না। অবশেষে তিনি একাই সেটা উঠিয়ে আনেন এবং গোশত তৈরী করে রান্না করেন। কিন্তু সংগীরা খেতে দ্বিধাবোধ করেন। কেউ কেউ সেই গোশ্ত খেলেন, আবার অনেকে খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। আবু কাতাদাহ্ বললেন, আচ্ছা আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট জিজ্ঞেস করে কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাদেরকে বলছি। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দেখা করে ঘটনাটি খুলে বললেন। রাসূল সা. শুনে বললেনঃ ওটা খেতে অসুবিধা কি? ওটা তো আল্লাহ তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমার জন্য কিছু নিয়ে এসো। গোশত সামনে আনা হলে রাসূল সা. সাহাবীদের বললেনঃ তোমরা খাও। (ফাতহুল বারী- ৯/৫২৮) তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির। একারণে তাঁর বন্ধুদের একটা দল ছিল। হুদাইবিয়ার সফরে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সংগী ছিলেন। তিনি ইয়ার-বন্ধুদের সাথে হাসি-তামাশা ও কৌতুক করতে করতে পথ চলছিলেন। আবু মুহাম্মাদও ছিলেন তাঁর বান্ধব মজলিসের একজন সদস্য। (মুসনাদ- ৫/২৯৫; ৩০১) হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. একবার একটি ‘আদনী’ (আদনে তৈরী) চাদর গায়ে জড়িয়ে হযরত মু’য়াবিয়ার রা. দরবারে যান। তখন সেখানে আবদুল্লাহ ইবন মাস’য়াদাহ্ বসা ছিলেন। ঘটনাক্রমে আবু কাতাদাহ্র গায়ের চাদরটি আবদুল্লাহর গায়ে খসে পড়ে। অত্যন্ত রাগের সাথে আবদুল্লাহ সেটি ছুঁড়ে ফেলে দেন। আবু কাতাদাহ্ প্রশ্ন বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তার পিতার বুক বর্শা দিয়ে প্রতিরোধ করেছি- সে দিন সে মদীনার উপকণ্ঠে আক্রমণ করেছিল। একথা শুনে ’আবদুল্লাহ চুপ থাকে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৪৯) উল্লেখ্য যে, আবু কাতাদাহ্ জীকারাদ অভিযানের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। সেই গাতফানী লুটেরাদের মধ্যে এই ’আবদুল্লাহর পিতাও ছিল।
আবু মাস’উদ আল-বদরী (রা)

আবু মাস’উদ ডাক নাম, আর এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম ’উকবা এবং পিতার নাম ’আমর ইবন সা’লাবা। সর্বশেষ বাই’য়াতে ’আকাবায় যোগ দিয়ে সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ওয়াকিদী বলেনঃ আবু মাস’উদ আকাবায় অংশগ্রহণ করেন, তবে বদরে অনুপস্থিত ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেনঃ আকাবায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৯; উসুদুল গাবা- ৫/২৯৬) এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। উহুদ এবং উহুদ পরবর্তী কাফিরদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। তবে তাঁর বদর যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের অনেক মতভেদ আছে। অধিকাংশের মতে, তিনি বদরে যোগ দেন এবং এ কারণেই তাঁকে বদরী বলা হয়। ইমাম বুখারী খুব দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, তিনি বদরে যোগ দিয়েছেন। আর এর স্বপক্ষে তিনি তাঁর সহীহ গ্রন্থে দলীল হিসেবে একাধিক হাদীস উপস্থাপন করেছেন। যেমন, বাশীর ইবন আবূ মাস’উদ বর্ণিত একটি হাদীস। তাতে এসেছেঃ মুগীরা আসরের নামায দেরী করে পড়লে আবু মাস’উদ ’উকবা ইবন ’আমর তার প্রতিবাদ করেন। এ আবু মাস’উদ হচ্ছে যায়িদ ইবন হাসানের নানা এবং তিনি বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবু ’উতবা ইবন সালাম এবং মুসলিম ‘আল-কনা’ গ্রন্থে তাঁর বদরে যোগদানের কথা বলেছেন। ইবনুল বারকী বলেনঃ ইবন ইসহাক তাঁকে বদরীদের মধ্যে উল্লেখ করেননি। তাবারানী বলেনঃ কুফাবাসীরা দাবী করেন, তিনি বদরে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু মদীনাবাসীরা তাঁকে বদরীদের মধ্যে উল্লেখ করেন না। ইবন সা’দ আল-ওয়াকিদী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আবু মাস’উদ যে বদরে যোগ দেননি, এ ব্যাপারে আমাদের সংগী-সাথীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। তিনি বদরে বসবাস করেছিলেন, এ কারণে তাঁকে বদরী বলা হয়। (আল-ইসাবা- ২/৪৯০, ৪৯১; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৯; উসুদুল গাবা- ৫/২৯৬) নবুওয়াতের যুদ ও প্রথম তিন খলীফার সময় পর্যন্ত আবু মাস’উদ মদীনায় ছিলেন। জীবনের কোন এক পর্যায়ে কিছু দিনের জন্য বদরের পানির ধারে বসবাস করেছিলেন। হযরত ’আলীর খিলাফতকালে মদীনা ছেড়ে কুফায় চলে যান এবং সেখানে বাড়ী তৈরী করে বসবাস করেন। (আল-ইসাবা- ৪/২৫২; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৫) হযরত ’আলী রা. ও হযরত মু’য়াবিয়ার রা. মধ্যে বিরোধের সময় আবু মাস’উদের ভূমিকার বিষয়ে পরস্পর বিরোধী বর্ণনা দেখা যায়। একটি বর্ণনা মতে, তিনি ছিলেন হযরত মু’য়াবিয়ার রা. ঘনিষ্ঠজনদের একজন। হযরত মু’য়াবিয়া রা. যখন সিফ্ফীন যুদ্ধে যান তখন তাঁকে কুফায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান। তাঁর না ফেরা পর্যন্ত আবু মাস’উদ কুফার আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। (আল-ইসাবা- ২/৪৯১) পক্ষান্তরে অন্য একটি বর্ণনা মতে, তিনি ছিলেন হযরত ’আলীর রা. সহচর। ’আলীর রা. সময়ে তিনি কুফায় যান এবং ’আলী রা. সিফ্ফীনে যাওয়ার সময় তাঁকে কুফার আমীরের দায়িত্ব দিয়ে যান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৫; আল-আ’লাম- ৪/২৪১) শেষের বর্ণনাটিই সঠিক। কারণ সিফ্ফীন যুদ্ধের সময় কুফা ছিল হযরত ’আলীর রা. অধীনে, মু’য়াবিয়ার রা. অধীনে নয়। হযরত আবু মাস’উদের মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেছেন, সিফ্ফীন যুদ্ধের পর তিনি কুফা থেকে জন্মভূমি মদীনায় ফিরে আসেন এবং সেখানে মারা যান। আবার অনেকে বলেছেন, তাঁর মৃত্যু হয় কুফায়। (আল-ইসাবা- ২/৪৯১; আল-আ’লাম- ৪/২৪১) তাঁর মৃত্যুর সন সম্পর্কেও মতভেদ আছে। হিজরী ৪১ ও ৪২ দু’টি তাঁর মৃত্যু সন বলে কথিত হয়েছে। আবার অনেকে বলেছেন, হযরত মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতের শেষ দিকে হিজরী ৬০ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। (উসুদুল গাবা- ৫/২৯৬) তবে এটা ঠিক যে হযরত মুগীরা ইবন শু’বার রা. কুফার শাসন কর্তৃত্বের সময় তিনি জীবিত ছিলেন। নিশ্চিতভাবে তা ছিল হিজরী ৪০ সনের পরে। (আল-ইসাবা- ২/৪৯১) হযরত আবু মাস’উদের এক পুত্র ও এক কন্যার পরিচয় জানা যায়। পুত্রের নাম বাশীর এবং কন্যা ছিলেন হযরত ইমাম হাসানের রা. সহধর্মিনী। তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হযরত যায়িদ ইবন হাসান। বাশীরের জন্ম হয় রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় বা তার কিছু পরে। হযরত আবু মাস’উদ রা. রাসূলুল্লাহর সা. হাদীসের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করেন। হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের তৃতীয় তবকা বা স্তরে তাঁকে গণ্য করা হয়। হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত ১০২ (একশো দুইটি) হাদীস পাওয়া যায়। (আল-’আলাম- ৪/২৪১) তাবে’ঈদের মধ্যে যাঁরা তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের খ্যাতিমান কয়েকজনের নামঃ বাশীর, আবদুল্লা ইবন ইয়াযীদ খুতামী, আবু ওয়ায়িল, ’আলকামা, কায়স ইবন আবী হাতেম, ’আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ নাখ’ঈ, ইয়াযীদ ইবন শুরাইক, মুহাম্মাদ ইবন ’আবদিল্লাহ ইবন যায়িদ ইবন ’আবদি রাব্বিহি- আনসারী প্রমুখ। রাসূলুল্লাহর সা. জীবনাচারের অনুসরণ এবং ’আমর বিল মা’রূফ ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাসূলুল্লাহর সা. আদেশ-নিষেধকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে পালন করতেন। একবার তিনি তাঁর এক দাসকে মারছেন। এমন সময় পিছন থেকে আওয়ায ভেসে এলোঃ ‘আবু মাস’উদ! একটু ভেবে দেখ। যে আল্লাহ তোমাকে তার ওপর ক্ষমতাবান করেছেন, তিনি তাকেও তোমার ওপর ক্ষমতাবান করতে পারতেন।’ আওয়াযটি ছিল রাসূলুল্লাহর সা.। আবু মাস’উদ ভীষণ প্রভাবিত হন। সেই মুহূর্তে তিনি শপথ করেন, আগামীতে কোন দিন আর কোন দাসের গায়ে হাত তুলবেন না। আর সেই দাসটিকে তিনি আযাদ (মুক্ত) করে দেন। (মুসনাদ- ৫/২৭৩, ২৭৪) আমর বিল মা’রূফের দায়িত্ব পালন থেকেও তিনি কক্ষণো উদাসীন ছিলেন না। আর এ ব্যাপারে ছোট-বড় কারো পরোয়া করতেন না। হযরত মুগীরা ইবন শু’বা রা. তখন কুফার আমীর। একদিন তিনি একটু দেরীতে আসরের নামায পড়ালেন। সাথে সাথে আবু মাস’উদ প্রতিবাদ করলেন। তিনি বললেনঃ আপনার জানা আছে, রাসূল সা. পাঁচ ওয়াক্ত নামায জিবরীলের বর্ণনা মত সময়ে আদায় করতেন, আর বলতেনঃ এভাবেই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (বুখারী- ২/৫৭১) তিনি নিজে রাসূলুল্লাহর সা. সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ করতেন। একদিন তিনি লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান রাসূলুল্লাহ সা. কিভাবে নামায আদায় করতেন? তারপর তিনি নামায আদায় করে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। (মুসনাদ- ৫/১২২) নামাযের জামা’য়াতে গায়ে গা মিশিয়ে দাঁড়ানো রাসূলের সা. সুন্নাত। তিনি যখন দেখলেন, লোকেরা তা পুরোপুরি পালন করছে না, তখন বলতেনঃ এমনভাবে দাঁড়ানোর ফায়দা এ ছিলো যে, তাঁরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন তোমরা দূরে দূরে দাঁড়াও, এ জন্যেই তো বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। হযরত আবু মাস’উদকে রা. মুফতী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয় না। তবে তিনি মাঝে মধ্যে ফাতওয়া দিতেন। ইবন ’আবদিল বার তাঁর ‘জামি’উল ’ইলম’ গ্রন্থে (২/১৬৬) ইবন সীরীন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ খলীফা ’উমার একবার আবু মাস’উদকে বলেনঃ আমাকে কি অবহিত করা হয়নি যে, তুমি ফাতওয়া দান করে থাক? ফাতওয়ার উষ্ণতা তার জন্য ছেড়ে দাও যে তার শৈত্যের স্পর্শ লাভ করেছেন। অর্থাৎ আমীরের জন্য। আর তুমি তো আমীর নও। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২৫৩)
আবু তালহা আল-আনসারী (রা)

নাম যায়িদ, ডাকনাম আবু তালহা। এ নামেই ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। হিজরাতের ৩৬ বছর পূর্বে ৫৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম- ৩/৯৮) পিতা সাহল ইবন আল-আসওয়াদ ইবন হারাম। বনু জাজীলার সন্তান। মাতা ’উবাদাহ্ বিনতু মালিক। প্রাচীন জাহিলী যুগে ইয়াসরিবে আবু তালহার খান্দান বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাঁর পিতৃ ও মাতৃ বংশের মধ্যেও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। বর্তমান মসজিদে নববী সংলগ্ন পশ্চিম দিকে তাঁর খান্দানের বসতি ছিল। তিনি তাঁর সময়ে খান্দানের রয়িস বা নেতা ছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪২, আল-ইসতীয়াব- ৪/১১৩, তাহজীবুল আসমা- ১/৪৪৫) ইসলাম-পূর্ব জীবনে সাধারণ আরববাসীর মত মূর্তি পূজারী ছিলেন। তাঁর মদ পানের আসরটিও ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। পানের আসরে নিয়মিত আড্ডা জমতো। সেই জাহিলী যুগে তিনি ইয়াসরিবের হাতেগোনা গুটি কয়েক সাহসী তীরন্দাযদের মধ্যে গণ্য হতেন। (বুখারী- ২/৬৬৪, আল-আ’লাম- ৩/৯৮) আবু তালহা যখন কুড়ি/বাইশ বছরের যুবক তখন মক্কায় হযরত রাসূলে কারীম সা. নবুওয়াত লাভ করেন। প্রথম কয়েক বছর ইয়াসরিবে এর কোন প্রভাব তেমন একটা না পড়লেও পরের বছরগুলিতে ধীরে ধীরে পড়তে থাকে। রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের কয়েক বছর পূর্বে মক্কা থেকে হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে সেখানে পাঠান ইসলাম প্রচারের জন্য। তাঁরই নিকট মদীনার এক মহিয়সী মহিলা উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করেন। এই মহিলার প্রচেষ্টায় পরবর্তীকালে আবু তালহা মূর্তি পূজা ত্যাগ করে মুসলিম হন এবং তাঁকে বিয়ে করেন। আবু তালহা কখন ইসলাম গ্রহণ করেন, বিভিন্ন বর্ণনা পর্যালোচনা করলে সে সম্পর্কে দুইটি ধারণা পাওয়া যায়। একটি এই যে, রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বে মুস’য়াব ইবন ’উমাইরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর সাথে হজ্জ উপলক্ষে মক্কার গিয়ে সর্বশেষ ’আকাবায় তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জনের সাথে রাসূলুল্লাহর হাতে বাই’য়াত (আনুগত্যের শপথ) করেন। এই বাই’য়াতে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে রাসূল সা. যে বারো জন নাকীব বা দায়িত্বশীল মনোনীত করেন তাঁদের একজন ছিলেন আবু তালহা। অন্যটি হলো, রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আসার পর আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে প্রথম ধারণাটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ একথাই বর্ণনা করেছেন। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ’লাম- ২/১১৯, শাজারাতুজ জাহাব- ১/৪০, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৪) আবু তালহার ইসলাম গ্রহণ এবং উম্মু সুলাইমের সাথে বিয়ের ঘটনার মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। হযরত রাসূলে কারীমের সা. খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের সম্মানিতা মা হলেন হযরত উম্মু সুলাইম। আনাসের পিতা মালিক ছিল তাঁর ইসলাম-পূর্ব জীবনের স্বামী। উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করলে দুঃখ ও ক্ষোভে মালিক স্ত্রী-পুত্র ফেলে শামে চলে যায় এবং সেখানে মারা যায়। তারপর আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এই বিয়ে সম্পর্কিত কয়েকটি বর্ণনা এখানে আমরা তুলে ধরছি। আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। উম্মু সুলাইম বললেনঃ ‘কোন মুশরিককে বিয়ে করা আমার উচিত হবে না। আচ্ছা আবু তালহা, তুমি কি দেখনা তোমাদের এইসব ইলাহ যার তোমরা ’ইবাদাত করে থাক, তা তো অমুকের ওখানে তৈরী। আগুন লাগালে তা জ্বলে যায়।’ কথাগুলি শুনে আবু তালহা উঠে চলে গেলেন। তবে অন্তরে একটা ভাবনা দেখা দিল। কিছুতেই ঘুম এলো না। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে। উম্মু সুলাইম বলেছিলেনঃ ‘তোমার এই প্রস্তাবে তো আমার কোন আপত্তি নেই। তবে সমস্যা হলো, তুমি যে একজন কাফির ব্যক্তি, আর আমি একজন মুসলিম নারী। তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তবে তো কোন সমস্যাই নেই। তখন তোমার ইসলামই হবে আমার মোহর। তাছাড়া অন্য কিছুই আমি চাইনা।’ আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উম্মু সুলাইমকে বিয়ে করেন। সাবিত বলতেনঃ উম্মু সুলাইমের মোহরের চেয়ে উত্তম মোহরের কথা আমরা আর শুনিনি। তাঁর সেই মোহর ছিল ইসলাম। ইবন ’আসাকির বলেন, তাবারানী, আবু নু’ঈম ও ইবন দুরাসতাওয়াইহ উপরোক্ত কথা বর্ণনা করেছেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৫) ’উরওয়া, মূসা ইবন ’উকবা, আল্লামা জাহবী, ইবনুল ’ইমাদ আল-হাম্বলী, ইবনুল আসীর প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেন, এটা রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বের ঘটনা। কারণ, আবু তালহা আকাবায় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন ও নাকীব মনোনীত হন। ইবন ’আসাকির বলেনঃ উম্মু সুলাইমের সাথে আবু তালহার বিয়ের যেসব বর্ণনা এসেছে তাতে ধারণা জন্মে যে, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি নাদর ইবন আনাস থেকে বর্ণিত হফেজ ও বায়হাকীর একটি বর্ণনা উদ্ধার করেছেন। নাদর বলেনঃ আনাসের পিতা মালিক একদিন তাঁর স্ত্রী উম্মু সুলাইমকে বললোঃ এ ব্যক্তি [রাসূল সা.] তো দেখছি মদ হারাম করেছেন। তারপর সে স্ত্রী ও সন্তান ফেলে শামে চলে যায় এবং সেখানে মারা যায়। অতঃপর আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন উম্মু সুলাইম বললেনঃ ‘শোন আবু তালহা, তোমার মত ব্যক্তিকে ফেরানো যায় না। তবে তুমি কাফির, আর আমি মুসলিম। সমস্যাটি এখানেই। এ বিয়ে হতে পারে না।’ আবু তালহা বললেনঃ ‘তুমি সোনা-রূপো চাও?’ উম্মু সুলাইম বললেনঃ ‘না, আমি তা চাইনা। আমি শুধু তোমার ইসলাম চাই।’ আবু তালহা বললেনঃ ‘এ ব্যাপারে আমাকে কে সাহায্য করবে?’ বললেনঃ ‘রাসূলুল্লাহ সা.।’ আবু তালহা চললেন রাসূলুল্লাহর সা. কাছে। তিনি তখন সাহাবীদের নিয়ে বসে ছিলেন। আবু তালহাকে আসতে দেখে বললেনঃ আবু তালহা আসছে। ইসলামের দীপ্তি তার কপালে দেখা যাচ্ছে। আবু তালহা এসে উম্মু সুলাইম যা বলেছিলেন সেই কথাগুলি রাসূলুল্লাহকে সা. বললেন। এভাবে আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উম্মু সুলাইমকে বিয়ে করেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৫, হায়াতুস সাহাবা- ১/১৯৬) রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় এসে মক্কার মুহাজির ও মদীনার আনসারদের মধ্যে দ্বীনী ভ্রাতৃ সম্পর্কের প্রচলন করেন। আবু তালহার দ্বীনী ভাই কে হয়েছিলেন, সে সম্পর্কেও নানা জনের নানা কথা আছে। প্রখ্যাত কুরাইশ মুহাজির আবু ’উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহর রা. সাথে তাঁর ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- এটা সংখ্যাগরিষ্ঠ সীরাত লেখকের মত। রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে এই আবু ’উবায়দাহ্ ‘আমীনুল উম্মাহ’ খিতাবসহ জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। ইবন ’আসাকির বলেনঃ হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু তালহা ও বিলালের হাত ধরে তাঁদের ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৯) ইবন সা’দ এ সম্পর্কে ’আসিম ইবন ’উমারের একটি বর্ণনা পেশ করেছেন। রাসূল সা. আবু তালহা ও আরকাম ইবন আল-আরকাম আল-মাখযূমীর মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক কায়েম করেন। (তাবাকাত- ৩/৫০৫) বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধ ও অভিযানে আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি প্রায়ই এই চরণটি আওড়াতেনঃ ‘আমি আবু তালহা, আমার নাম যায়িদ। প্রতিদিন আমার অস্ত্রে থাকে একটি শিকার।’ (তাহজীবুল আসমা- ১/৪৪৫, তারীখে ইবন আসাকির- ৫/৪) ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ বদর। আবু তালহা অতি উৎসাহের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাতে বদরী সাহাবীদের নামের তালিকায় তাঁর নামটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ বদরে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আমার হাত থেকে তরবারি পড়ে গিয়েছিল। একবার নয়, তিনবার। আর এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ ‘স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ হতে স্বস্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন।’ (সূরা আল-আনফাল- ১১) (তারীখে ইবন আসাকির- ৬/৬) উল্লেখ্য যে, বদর যুদ্ধের ময়দানে এক সময় ক্ষণিকের জন্য মুসলিম বাহিনী তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়। এতে তাঁদের ক্লান্তি ও ভয়ভীতি দূর হয়ে যায়। উহুদ যুদ্ধে তিনি আল্লাহর নবীর জন্য আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন তীরন্দায বাহিনীর সদস্য। (আনসাবুল আশরাফ- ১/১২৫) প্রচন্ড যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। তখন আবু তালহাসহ মুষ্টিমেয় কিছু সৈনিক নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহকে সা. ঘিরে শত্রু বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেন। এদিন তিনি রাসূলুল্লাহকে সা. নিজের পেছনে আড়াল করে রেখে শত্রুদের দিকে তীর ছুড়ছিলেন। একটি তীর ছুড়লে রাসুল সা. একটু মাথা উঁচু করে দেখছিলেন, তা কোথায় গিয়ে পড়ছে। আবু তালহা রাসূলুল্লাহরর সা. বুকে হাত দিয়ে বসিয়ে দিয়ে বলছিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! বসুন! এভাবে থাকুন। তাহলে আপনার গায়ে কোন তীর লাগবে না। তিনি একটু মাথা উঁচু করলেই আবু তালহা খুব দ্রুত তাঁকে আড়াল করে দাঁড়াচ্ছিলেন। সেদিন তিনি রাসূলকে সা. আরও বলেছিলেন, আমার এ বুক আপনার বুকের সামনেই থাকবে। এক পর্যায়ে তিনি রাসূলকে সা. বলেনঃ আমি শক্তিশালী সাহসী মানুষ। আপনার যা প্রয়োজন আমাকেই বলুন। তিনি শত্রুদের বুক লক্ষ্য করে তীর ছুড়ছিলেন আর গুন গুন করে কবিতার একটি পংক্তি আওড়াচ্ছিলেনঃ ‘আমার জীবন হোক আপনার জীবনের প্রতি উৎসর্গ, আমার মুখমন্ডল হোক আপনার মুখমন্ডলের ঢাল।’ আবু তালহা ছিলেন বলবান বীর পুরুষ। এই উহুদ যুদ্ধে তিনি দুই অথবা তিনখানি ধনুক ভেঙ্গেছিলেন। আক্রমণের প্রচন্ডতায় তাঁর হাত দুইখানি অবশ হয়ে পড়ছিল। তবুও তিনি একবারও একটু উহ্ শব্দ উচ্চারণ করেননি। কারণ, তখন তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল রাসূলুল্লাহর সা. হিফাজত ও নিরাপত্তা। (উসুদুল গাবা- ৫/২৩৪, তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৭, তাবাকাত- ৩/৫০৭, বুখারী-কিতাবুল মাগাযী) হযরত আবু তালহা খাইবার যুদ্ধে যোগদান করেন। এই যুদ্ধের সময় তাঁর ও রাসূলুল্লাহ সা. উভয়ের উট খুবই নিকটে পাশাপাশি ছিল এবং রাসূল সা. গাধার গোশত হারাম ঘোষণা করার জন্য ঘোষক হিসেবে তাঁকেই মনোনীত করেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/১২১) এই অভিযান থেকে ফেরার সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. ও হযরত সাফিয়্যা ছিলেন এক উটের ওপর। মদীনার কাছাকাছি এসে উটটি হোঁচট খায় এবং আরোহীদ্বয় ছিটকে মাটিতে পড়ে যান। আবু তালহা দ্রুত নিজের উট থেকে লাফিয়ে পড়ে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে পৌঁছে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে আল্লাহ আপনার প্রতি উৎসর্গ করুন! আপনি কি কষ্ট পেয়েছেন? বললেনঃ না। তবে মহিলার খবর লও। আবু তালহা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে হযরত সাফিয়্যার নিকটে যান এবং উটের হাওদা ঠিক করে আবার তাঁকে বসিয়ে দেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/১৮০) হুনাইন যুদ্ধেও তিনি দারুণ বাহাদুরী দেখান। এ যুদ্ধে তিনি একাই বিশ মতান্তরে একুশজন কাফিরকে হত্যা করেন। রাসূল সা. ঘোষণা করেছিলেন কেউ কোন কাফিরকে হত্যা করলে সে হবে নিহত ব্যক্তির সকল জিনিসের মালিক। এ দিন আবু তালহা একুশ ব্যক্তির সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী হন। হিজরী অষ্টম সনে সংঘটিত এই যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর- ২/১১৯, তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৭, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫) এই যুদ্ধের সময় তিনি হাসতে হাসতে রাসূলুল্লাহর সা.কাছে এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! উম্মু সুলাইমের হাতে একটি খঞ্জর, আপনি কি তা দেখেছেন? রাসূল সা. বললেন, উম্মু সুলাইম, এই খঞ্জর দিয়ে কি করবে? বললেনঃ মুশরিকরা কেউ আমার নিকটে এলে এটা দিয়ে তাঁর পেট ফেঁড়ে ফেলবো। একথা শুনে রাসুল সা. হাসতে লাগলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৪৬, ৪৪৭, হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৯৭) বিদায় হজ্জে আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ছিলেন। মিনায় রাসূল সা. মাথা ‘হলক’ (চুল ছেঁচে ফেলা) করছিলেন। তিনি মাথার ডান দিকের কর্তিত চুল একটি/দুইটি করে পাশে বসা সাহাবীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। কিন্তু মাথার বাম পাশের চুলগুলির সবই আবু তালহাকে দান করেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৭) ইমাম মুসলিমও একথা বর্ণনা করেছেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের কাছাকাছি সময় মদীনায় সাধারণতঃ দুই ব্যক্তি কবর খুঁড়তেন। মুহাজিরদের মধ্যে আবু ’উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ। তিনি খুঁড়তেন মককাবাসীদের মত। আর আনসারদের মধ্যে আবু তালহা। তিনি খুঁড়তেন মদীনাবাসীদের মত। হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরাম মসজিদে নববীতে বসে দাফন-কাফনের বিষয় পরামর্শ শুরু করলেন। প্রশ্ন দেখা দিল, কে এবং কোন পদ্ধতিতে কবর তৈরী করবে? উপরোক্ত দুই ব্যক্তি তখন এই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন না। হযরত ’আব্বাস রা. একই সময়ে দুইজনের নিকট লোক পাঠালেন, তাঁদেরকে ডেকে আনার জন্য। সিদ্ধান্ত হলো, এই দুইজনের মধ্যে যিনি আগে পৌঁছবেন তিনিই এই সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। তাঁদের ডাকার জন্য লোক পাঠিয়ে দিয়ে হযরত ’আব্বাস রা. সহ উপস্থিত সাহাবীরা দু’আ করতে লাগলেনঃ হে আল্লাহ, আপনার নবীর জন্য এই দুই জনের একজনকে নির্বাচন করুন। কিছুক্ষণের মধ্যে যে ব্যক্তি আবু তালহার খোঁজে গিয়েছিল, তাঁকে সংগে করে ফিরে আসে। অতঃপর আবু তালহা মদীনাবাসীদের নিয়ম অনুযায়ী রাসূলুল্লাহর সা. কবর তৈরী করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৭৩, আসাহ আস-সীয়ার- ৫৮৭) হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের পর বহু সাহাবী মদীনা ছেড়ে শামে আবাসন গড়ে তোলেন। আবু তালহাও তথাকার অধিবাসীদের একজন। তবে যখনই কোন দুঃখ ও দুশ্চিন্তায় পিষ্ট হতেন, তখনই এই মাসাধিক কালের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র মাযারে হাজির হতেন এবং মানসিক প্রশান্তি লাভ করতেন। (তারীখে ইবন আসাকির- ৬/৪) হযরত আবু বকরের রা. খিলাফত কাল আবু তালহা মোটামুটি শামে (সিরিয়া) কাটান। হযরত ফারুকে ’আজমের খিলাফত কালের বেশীর ভাগ সময় সেখানেই ছিলেন। হযরত উমারের রা. বাইতুল মাকদাস সফরের সময় তিনি শামে ছিলেন। আনাস থেকে বর্ণিত। ’উমার ইবনুল খাত্তাব শাম সফরে গেছেন। আবু তালহা ও আবু ’উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে বললেনঃ আপনার সাথে রাসূলুল্লাহর সা. বাছা বাছা সাহাবীরা আছেন। অথচ আমরা পিছনে রেখে এসেছি এক প্রজ্জ্বলিত আগুন। (তাঁরা মহামারি আকারে প্লেগের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।) আপনি এ যাত্রা শামে প্রবেশ না করে মদীনায় ফিরে যান। ’উমার ফিরে গেলেন। পরের বছর তিনি এই স্থগিত সফর শেষ করেন।’ (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৪) হযরত ’উমারের রা. অন্তিম সময়ে আবু তালহা মদীনায় ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার প্রতি খলীফা ’উমারের রা. প্রবল আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। তিনি যখন জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে পড়লেন, তখন পরবর্তী খলীফা পদের জন্য ছয়জন সর্বজনমান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মনোনয়ন দান করলেন। তারপর আবু তালহাকে ডেকে বললেনঃ আপনাদের দ্বারাই আল্লাহ তা’য়ালা ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমার মৃত্যুর পর আপনি ৫০ জন আনসারকে সংগে নিয়ে এই ছয় ব্যক্তির কার্যকলাপের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। যদি তাঁদের চারজন এক দিকে যায় আর দুই জন বিরোধিতা করে তাহলে ঐ দুইজনের গর্দান উড়িয়ে দিবেন। আর তাঁরা সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে যে দলে ’আবদুল রহমান ইবন ’আউফ থাকবে না সে দলকে হত্যা করবেন। তিন দিনের মধ্যে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে তাদের সকলের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেন। আমার মৃত্যুর পর পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত আপনিই হবে অন্তরবর্তীকালীন খরীফা। (কানযুল ’উম্মাল- ৩/১৫৬, ১৫৭, হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৪) হযরত মিসওয়ার ইবন মাখরামার গৃহে ঐ ছয় ব্যক্তির বৈঠক বসলো। আবু তালহা সঙ্গীদের নিয়ে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে বাড়ীর দরযায় দাঁড়িয়ে গেলেন। বনু ’হাশিম প্রথম থেকেই এই পরামর্শের বিরোধী ছিল। কারণ, তার ছিল ’আলীকে রা. খলীফা বানানোর অভিলাষী। হযরত ’আব্বাস রা. সেই সময় চুপে চুপে ’আলীকে রা. বলেছিলেন, আপনি নিজের বিষয়ট ঐ লোকদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। আপনি নিজেই ফায়সালা করুন। ’আলী রা. কিছু একটা জবাব দিয়েছিলেন। আবু তালহা পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের এ সংলাপ শুনেছিলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ’আলীর দৃষ্টি পড়তেই তিনি কিছু একটা যেন চিন্তা করলেন। আবু তালহা তা বুঝতে পেরে বলেছিলেনঃ আবুল হাসান, ভয়ের কিছু নেই। একদিন এই ছয় ব্যক্তির গোপন বৈঠক চলছে। আবু তালহাও তাঁর বাহিনী নিয়ে দরযায় দাঁড়িয়ে। এমন সময় ’আমর ইবনুল ’আস ও মুগীরা ইবন শু’বা এসে দরযায় বসে পড়েন। আবু তালহা তাঁদেররকে তেমন কিছু বললেন না; তবে সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস ছিলেন অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির মানুষ। তিনি ওঁদের দুইজনের ভাব-ভঙ্গিমায় স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি কঙ্কর উঠিয়ে তাঁদের প্রতি নিক্ষেপ করে বললেনঃ এরা এসেছে মদীনায় একথা প্রচার করতে যে, আমরাও শূরার সদস্য ছিলাম। কঙ্কর নিক্ষেপ করায় ’আমর ও মুগীরা ক্ষুব্ধ হন এবং ঝগড়া শুরু করেন। আবু তালহা বিরক্ত হয়ে বললেনঃ আমার আশংকা হচ্ছে, আপনারা এমন অহেতুক ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে আসল বিষয়টি ছেড়ে না দেন। সেই সত্তার নামে শপথ, যিনি ’উমারকে মৃত্যু দান করেছেন, আমি তিনদিনের বেশী একটুও সময় দেব না। খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারটি শেষ হওয়ার পর আবু তালহা মন্তব্য করেনঃ খিলাফতের দায়িত্ব লাভের জন্য এই ছয় ব্যক্তি প্রতিযোগিতা করবে, এমন আশংকার চেয়ে আমার বেশী ভয় ছিল তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে দূরে সরে থাকে কিনা। কারণ, ’উমারের মৃত্যুর পর প্রতিটি গৃহে দ্বীন ও দুনিয়ার ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৭৩) খলিফা নির্বাচনের পর আবু তালহা সম্পূর্ণ নির্জনে চলে যান এবং বাকী জীবন একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদাতে কাটিয়ে দেন। হযরত উম্মু সুলাইমের রা. গর্ভে আবু তালহার একাধিক সন্তান হয়; কিন্তু তাদের কেউই বেশী দিন বাঁচেনি। তাঁর এক ছেলের নাম ছিল আবু ’উমাইর। ছোট বেলায় তার ছিল একটি ছোট পাখী। পাখীটি মারা গেল। একদিন রাসূল সা. তাদের বাড়ীতে গিয়ে তাকে খুবই বিমর্ষ দেখতে পেলেন। তার এমন অবস্থার কারণ জানতে চাইলে লোকেরা রাসূলকে সা. প্রকৃত ঘটনা খুলে বললে রাসূল সা. তাকে হাসানের জন্য একটু কাব্য করে বললেনঃ ‘ইয়া আবা ’উমাইর, মা ফা’য়ালান নুগাইর’- ওহে আবু উমাইর তোমার ছোট পাখীটি কী করলো? (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৭০, আল-ইসতী’য়াব) আবু তালহার অন্য একটি ছেলে কিছু দিন রোগ ভোগের পর মারা যায়। ছেলেটির অসুস্থতার মধ্যে আবু তালহা একদিন মসজিদে নববীতে যান এবং তখন সে মারা যায়। উম্মু সুলাইম ছেলের বাবার জন্য অপেক্ষা না করে তাকে দাফন করে দেন এবং বাড়ীতে লোকদের বলেন, তারা যেন ছেলের দাফন-কাফনের কথা আবু তালহাকে না বলে। এদিকে আবু তালহা মসজিদ থেকে আরও কয়েকজন মেহমানসহ বাড়ী ফিরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ছেলে কেমন আছে? ছেলের মা বললেনঃ আগের চেয়ে ভালো। আবু তালহা মেহমানদের সাথে কথা বলতে লাগলেন। খাবার এলো এবং সবাই এক সাথে বসে খেয়ে নিলেন। মেহমান বিদায় নিলে আবু তালহা ভিতর বাড়ীতে আসলেন। রাতে স্বামী-স্ত্রী এক বিছানায় কাটালেন এবং মিলিত হলেন। শেষ রাতে উম্মু সুলাইম ছেলের মৃত্যুর খবর সহ কাফন-দাফনের কথা প্রকাশ করে বললেনঃ সে ছিল আমাদের কাছে আল্লাহর এক আমানত। তিনি সেই আমানত ফিরিয়ে নিয়েছেন। এতে কার কি আপত্তি থাকতে পারে? আবু তালহা ’ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজউন’ উচ্চারণ করলেন তবে এভাবে খবরটি গোপন করাতে তিনি একটু ক্ষুব্ধ হলেন। পরদিন সকালে আবু তালহা বিষয়টি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করলে তিনি বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের গত রাতের বরকত দান করুন। সেই রাতেই উম্মু সুলাইম গর্ভবতী হন। গর্ভের এই সন্তান প্রসব করার পর উম্মু সুলাইম তাকে আনাসের হাতে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠান। রাসূল সা. একটু খেজুর চিবিয়ে শিশুর গালে দেন এবং সে মুখ নেড়ে একটু চুষতে থাকে। তাই দেখে তিনি বললেনঃ দেখ, আনসারদের খেজুরের প্রতি স্বভাবগত টান রয়েছে। তিনি এই শিশুর নাম রাখে ’আবদুল্লাহ। রাসূলুল্লাহর সা. এই পবিত্র লালার বদৌলতে উত্তরকালে এই ছেলে অন্যান্য আনসার নওজোয়ানদের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। এই ’আবদুল্লাহর মাধ্যমে আবু তালহার বংশধারা চলেছে। ইসহাক ও ’উবাইদুল্লাহ নামে তাঁর ছিল দুই ছেলে, আর ইয়াহইয়া নামে ইসহাকের এক ছেলে। এঁরা সবাই ছিলেন তাঁদের যুগের অন্যতম হাদীস বিশারদ। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/২৫৭, তারীখ ইবন ’আসাকির- ৬/৬, বুখারী ও মুসলিমেও বিভিন্নভাবে উপরোক্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।) হযরত আবু তালহার মৃত্যুসন সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইমাম নাওয়াবী বলেনঃ ‘তিনি হিজরী ৩২ অথবা ৩৪ সনে ৭০ বছর বয়সে মদীনায় মারা যান। তাঁর মদীনায় মৃত্যুর কথা অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ বলেছেন। তবে আবু যুর’য়া আদ-দিমাশ্কী বলেছেন, তিনি শামে মারা গেছেন। আবার কেউ বলেছেন, তিনি সমুদ্র পথে অভিযানে বেরিয়ে মারা যান। আবু যুর’য়া আদ-দিমাশকী থেকে বর্ণিত হয়েছে, আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর চল্লিশ বছর একাধারে রোযা রেখে জীবন কাটান। এই বর্ণনা উপরে উল্লেখিত মৃত্যুসনের পরিপন্থী। কারণ, তিনি যদি হিজরী ৩২ অথবা ৩৪ সনে মারা যান তাহলে রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর ৪০ বছর রোযা রেখে বাঁচার প্রশ্নই ওঠে না। যাঁরা বলেছেন তিনি মদীনায় মারা গেছেন, তাঁরা একথাও বলেছেন যে, খলীফা হযরত ’উসমান রা. তাঁর জানাযার নামায পড়ান। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/৪৪৫, ৪৪৬) বসরাবাসীরা বলেন, তিনি শেষ জীবনে সমুদ্র পথে অভিযানে বেরিয়ে পথিমধ্যে মারা যান। এই মতে তাঁর মৃত্যুসন হিজরী ৫১। বিভিন্ন গ্রন্থে আবু তালহার এই জিহাদে যাওয়ার চমকপ্রদ ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। একদিন সূরা ‘তাওবাহ’ তিলাওয়াত করছেন। যখন ‘ইনফিরূ খিফাফান ওয়া সিকালান’- অভিযানে বের হয়ে পড়, ভারি অবস্থায় হোক অথবা হালকা অবস্থায় (আয়াত ৪১)- এ পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তাঁর মধ্যে জিহাদের প্রবল উদ্দীপনা সৃষ্টি হয। তিনি পরিবারের লোকদের বললেনঃ আল্লাহ যুবক-বৃদ্ধ সকলের ওপর জিহাদ ফরয করেছেন। আমি জিহাদে যেতে চাই, তোমরা আমার সফরের ব্যবস্থা কর। একথা দুইবার উচ্চারণ করেন। একেতো বার্ধক্য, তাছাড়া ক্রমাগত সিয়াম পালন করতে করতে তিনি শীর্ণকায় ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। পরিবারের লোকেরা বললোঃ আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। আপনি রাসূলুল্লাহর সা. যুগের সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, আবু বকর ও ’উমারের যুগেও ধারাবাহিকভাবে জিহাদে লিপ্ত থেকেছেন। এখনও আপনার জিহাদের লোভ আছে? আপনি বাড়ীতে থাকুন, আমরা আপনার পক্ষ থেকে জিহাদে বেরিয়ে পড়ছি। শাহাদাতের অদম্য আবেগ যাঁকে ধাক্কাচ্ছে তাঁকে ঠেকাচ্ছে কে? বললেনঃ আমি যা বলছি তাই কর। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর সফরের ব্যবস্থা করা হয়। সত্তুর বছরের এই বৃদ্ধ আল্লাহর নাম নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। মুসলিম বাহিনী প্রস্তুত ছিল। অভিযানটি ছিল সাগর পথে। আবু তালহাজাহাজে চড়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তীব্র প্রতীক্ষা, কখন শত্রুসেনার মুখোমুখি হবেন। এমন সময় তাঁর ডাক এসে যায়। তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সাগর পথে কোথাও একটু ভূমির চিহ্ন দেখা গেল না। প্রবল বায়ু ও বিক্ষুব্ধ সাগর জাহাজটি অজানা লক্ষ্যের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল। এই মুমিন মুজাহিদের লাশ সাত দিন জাহাজের ডেকে পড়ে রইল। অবশেষে একটি অজানা দ্বীপ পাওয়া গেল এবং সেখানেই দাফন করা হলো এত দিনেও লাশে পচন ধরেনি বা সামান্য বিকৃতি ঘটেনি। (তাবাকাত- ৩/৫০৭, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৭, তারীখুর ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর- ২/১২০, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪২) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আবু তালহা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাঁর বর্ণিত হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আবু তালহা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাঁর বর্ণিত হাদীস সমূহে বিভিন্ন মাসয়ালা অথবা যুদ্ধ-বিগ্রহের আলোচনা থাকতো। দীর্ঘ দিন তিনি রাসূলুল্লাহ সা. সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছেন, অথবা ’আমলের ফজীলাত বিষয়ক কোন বর্ণনা তাঁর থেকে পাওয়া যায় না। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ৯২ টি (বিরানব্বই)। তার মধ্যে বুখারী ও মুসলিম প্রত্যেকে একটি করে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস ও আনাস ইবন মালিকসহ সাহাবীদের একটি দল এবং বিশিষ্ট তাবে’ঈদের একটি দলও তাঁর নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন ও বর্ণনাও করেছেন। (তাহজীবুল আসমা- ১/৪৪৫, তারিখে ইবন ’আসাকির- ৬/৪) হযরত আবু তালহার এক দল ছাত্র ও ভক্ত একবার তাঁর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে আসলো। তারা দেখলো, দরযায় একটি ছবিযুক্ত পর্দা টাঙ্গানো। তারা পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগলো। একটু সাহস করে যায়িদ ইবন খালিদ বলেই ফেললেনঃ গতকাল তো আপনি ছবি নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কি হাদীস বর্ণনা করলেন। তিনি ’উবাইদুল্লাহ খাওলানীকে বললেনঃ হাঁ, তা করেছিলাম। তবে এ কথাও তো বলেছিলাম, কাপড়ে যে ছবি থাকে তা এর আওতায় পড়বে না। (মুসনাদ- ৪/২৮) একদিন আবু তালহা আহার করছেন। সাথে উবাই ইবন কা’ব এবং আনাস ইবন মালিকও আছেন। আহার শেষে আনাস অজুর জন্য পানি চাইলেন। আবু তালহা ও ’উবাই দুই জনই বললেনঃ গোশত খাওয়ার কারণে হয়তো অজুর কথা মনে হয়েছে? আনাস বললেনঃ জী হাঁ! আবু তালহা বললেনঃ তোমরা ‘তায়্যিবাত’- পবিত্র বস্তুসমূহ খেয়ে অজু করছো অথচ রাসূল সা. এমনটি করতেন না। (মুসনাদ- ৪/৩) আবু তালহা একদিন নফল রোযা রেখেছিলেন। ঘটনাক্রমে সেই দিনই বরফ পড়েছিল। তিনি কয়েকটি তুষার খন্ড হাতে নিয়ে খেয়ে ফেলেন। ‘আপনি তো রোযার মধ্যে খাচ্ছেন’- লোকেরা এ কথা বললে তিনি মন্তব্য করেনঃ এ একটা রবকত, এ কিছু অর্জন করা উচিত। এ কোন খাদ্যও নয়, পানীয়ও নয়।’ (মুসনাদ- ৩/২৭৯, তারিখু ইবন ’আসাকির- ৬/১০) হযরত আবু তালহার মধ্যে কাব্য-প্রীতি ও প্রতিভা ছিল। তিনি কবিতা রচনা করতেন, আবৃত্তিও করতেন। প্রচন্ড যুদ্ধের সময় তিনি গুন গুন করে কবিতার পংক্তি আওড়াতেন। সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর কিছু পংক্তি সংকলিত হয়েছে। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ৪/১১৩, তারিখু ইবন ’আসাকির- ৬/৭, আল-ইসতীয়াব) হযরত আবু তালহার চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হুব্বে রাসূল- বা রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা। যুদ্ধের ময়দানে শত্রু পক্ষের প্রচন্ড আক্রমণে যখন সাথীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে তখনও তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য নিচের জীবনকে বাজি রেখে রুখে দাঁড়িয়েছেন। নিজের গোটাদেহ আঁড় করে দিয়ে তাঁকে হিফাজত করেছেন। প্রিয় নবীর গায়ে যেন আঁচড় লাগতে না পারে- এই আশায় তীর-বর্শার আঘাত নিজের বুকে ধারণ করেছেন। তাঁর প্রেমের গভীরতা এর দ্বারাই কিছুটা মাপা যায়। তিনি সাধারণতঃ সকল অভিযানে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে থাকতেন এবং দুই জনের উটও প্রায় পাশাপাশি চলতো। একবার মদীনায় শত্রুর আক্রমণের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু তালহার ‘মানদূর’ নামক ঘোড়াটি চেয়ে নিলেন এবং যে দিক থেকে শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা ছিল সেই দিকেই যাত্রা করলেন। আবু তালহাও রাসূলুল্লাহর সা. নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পিছনে পিছনে চললেন। কিন্তু তাঁর পৌঁছতে না পৌঁছতেই রাসূল সা. আবার ফিরে আসলেন এবং পথে আবু তালহার সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি আবু তালহাকে বললেনঃ সেখানে কিছু না। তোমার ঘোড়াটি খুব দ্রুতগতি সম্পন্ন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি যে তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল, খুব ছোট ছোট ব্যাপারেও তা প্রকাশ পেত। তাঁর বাড়ীতে কোন জিনিস এলে তার কিছু রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীতেও পাঠিয়ে দিতেন। একবার হযরত আনাস একটি খরগোশ ধরে আনলেন। আবু তালহা খরগোশটি জবেহ করে তার একটি রান নবীগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। একবার আবু তালহার স্ত্রী উম্মু সুলাইম এক থালা খেজুর পাঠালেন। রাসূল সা. খেজুরগুলি আযওয়াজে মুতাহ্হারাত ও অন্যান্য সাহাবীদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। (মুসনাদ- ৩/১২৫, ১৭১) হযরত রাসূলে কারীমের সা. শেষ রোগ যন্ত্রণায়- যাতে তিনি ইন্তিকাল করেন, একদিন আবু তালহা গেলেন তাঁকে দেখতে। রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ তোমার কাওমকে (আনসার) আমার সালাম বলবে। কারণ, তারা যা বৈধ ও উচিত নয় তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে এবং ধৈর্য ধারণ করে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০১) আবু তালহা বরেনঃ আমি একদিন রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গেলাম। তখন তাঁর চামড়া ও চেহারায় এমন এক অবস্থা দেখলাম যা এর পূর্বে আর কখনও দেখিনি। ইয়া রাসূলুল্লাহ! এমন অবস্থায় আমি আপনাকে আর কক্ষণও দেখিনি। বললেনঃ আবু তালহাঃ এমন অবস্থা হবে না কেন। এইমাত্র জিবরীল বেরিয়ে গেলেন। তিনি আমার রবের পক্ষ থেকে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলে গেলেনঃ আল্লাহ আমাকে আপনার কাছে এই সুসংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, আপনার উম্মাতের কেউ আপনার ওপর একবার দরুদ ও সালাম পেশ করলে আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ তার ওপর দশবার দরূদ ও সালাম পাঠ করবেন। (উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫) আহমাদ ও নাসাঈ অন্যভাবে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে, জিবরীল বললেন, আপনার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি আপনার ওপর দরূদ ও সালাম পাঠ করবে আল্লাহ তার জন্য ১০ টি নেকী লিখবেন, তার ১০ টি গুনাহ মাফ করবেন এবং তার ১০ টি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩১৩) মদ হারাম হওয়ার পূর্বে একদিন তিনি খেজুর থেকে তৈরী ‘ফাদীখ’ নামক এক প্রকার মদ পান করেছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে খবর দিল, মদ হারাম ঘোষিত হয়েছে। সাথে সাথে তিনি আনাসকে বললেনঃ মদের এই কলসটি ভেঙ্গে ফেল। আনাস নির্দেশ পালন করলেন। (বুখারী- ২/১০৭) যখন সূরা আলে ইমরানের এই আয়াত- ‘তোমরা কোন কল্যাণই লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা এমন সব জিনিস (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ কর যা তোমাদের নিকট সর্বাধিক প্রিয়’- নাযিল হলো তখন আনসারদের যার কাছে যে সব মূল্যবান জিনিস ছিল সবই রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে গেল এবং আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিল। আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর ‘বীরাহ’ নামক বিশাল ভূ-সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় ওয়াক্ফ করে দিলেন। এখানে তাঁর একটি কুয়ো ছিল। কুয়োটির পানি ছিল সুস্বাদু এবং রাসূল সা. এর পানি খুব পছন্দ করতেন। আবু তালহার এই দানে রাসূল সা. খুব খুশী হয়েছিলেন। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৪০, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৫৭) আবদুল্লাহ ইবন আবী বকর থেকে বর্ণিত। একদিন আবু তালহা তাঁর একটি বাগিচার দেয়ালের পাশে নামাযে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় একটি ছোট্ট পাখি- এদিক ওদিক উড়ে বেরোনোর পথ খুঁজতে থাকে; কিন্তু ঘন খেজুর গাছের জন্য বেরোনোর পথ পেল না। আবু তালহা নামাযে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ এই তামাশা দেখলেন। এদিকে নামায কত রাকায়াত পড়েছেন তা আর স্মরণ করতে পারলেন না। ভাবলেন, এই সম্পদই আমাকে ফিতনায় (বিপর্যয়ে) ফেলেছে। নামায শেষ করে তিনি ছুটে গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. কাছে। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ সবই আমি সাদাকা (দান) করে দিলাম। এই সম্পদ আপনি আল্লাহর পথে কাজে লাগান। রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ এই সম্পদ তোমার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বন্টন করে দাও। নির্দেশমত তিনি যাঁদের মধ্যে বন্টন করে দেন তাঁদের মধ্যে হাসসান ইবন সাবিত ও উবাই ইবন কা’বও ছিলেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৯৭, মুসনাদে আহমাদ- ৩/১৪১) একবার এক ব্যক্তি মদীনায় এলো, সেখানে থাকা-খাওয়ার কোন সংস্থান তার ছিল না। রাসূল সা. ঘোষণা করলেন, যে এই লোকটিকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করবে আল্লাহ তার ওপর সদয় হবেন। আবু তালহা সাথে সাথে বললেনঃ আমিই নিয়ে যাচ্ছি। বাড়ীতে ছোট ছেলে-মেয়েদের খাবার ছাড়া অতিরিক্ত কোন খাবার ছিল না। আবু তালহা স্ত্রীকে বললেনঃ এক কাজ কর, তুমি ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়াও। তারপর মেহমানের সামনে খাবার হাজির করে কোন এক ছুতোয় আলো নিভিয়ে দাও। অন্ধকারে আমরা খাওয়ার ভান করে শুধু মুখ নাড়াচাড়া করবো, আর মেহমান একাই পেট ভরে খেয়ে নেবে। যেই কথা সেই কাজ। স্বামী-স্ত্রী মেহমানকে পরিতৃপ্তি সহকারে আহার করালেন; কিন্তু ছেলে-মেয়ে সহ নিজেরা উপোস থাকলেন। সকালে আবু তালহা আসলেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট। তিনি ‘তাদের তীব্র প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দান করে’ (সূরা হাশর- ৯) – এই আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শোনান। তারপর আবু তালহাকে বলেন, অতিথির সাথে তোমাদের রাতের আচরণ আল্লাহর খুব পছন্দ হয়েছে। (মুসলিম- ২/১৯৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৬০, ১৬১) নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল আবু তালহার বিশেষ গুণ। খ্যাতি ও প্রদর্শনী থেকে তিনি সব সময় দূরে থাকতেন। ‘বীরাহা’ সম্পত্তি দান করার সময় তিনি কসম খেয়ে রাসূলুল্লাহকে সা. বললেন, একথা যদি গোপন রাখতে সক্ষম হতাম তাহলে কক্ষণও প্রকাশ করতাম না। (মুসনাদ- ৩/১১৫) আবু তালহা ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের অধিকারী। আনাস রা. বলেনঃ রাসূল সা. বলতেন, সৈন্যদের মধ্যে আবু তালহার একটি জোর আওয়ায একদল সৈনিক থেকেও উত্তম। অন্য বর্ণনা মতে ‘এক হাজার মানুষের চেয়েও উত্তম।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছেঃ ‘মুশরিকদের জন্য আবু তালহার একটি হুংকার একদল সৈন্যের চেয়েও ভয়ংকর।’ (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর- ২/১১৯, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৭, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫) হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু তালহার পরিবারের জন্য দু’আ করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৯) হযরত আনাস রা. বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর সারা বছরই আবু তালহা রোযা পালন করতেন। শুধু দুই ’ঈদ ছাড়া কখনও রোযা ত্যাগ করতেন না। কারণ রাসূলের সা. জীবদ্দশায় সব সময় জিহাদে ব্যস্ত থাকায় তখন রোযা রাখতে পারতেন না। (তাহজীবুল আসমা- ১/২৪৬) ইবন হাজার ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে আবু তালহার সম্মান ও মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এই বলে, তিনি ছিলেন উঁচু স্তরের মর্যাদাবান সাহাবীদের অন্যতম।
’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)

’আবদুল্লাহ নাম। কুনিয়াত বা উপনামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যথাঃ আবু মুহাম্মদ, আবু রাওয়াহা অথবা আবু ’আমর। ‘শায়িরু রাসূলিল্লাহ’- ‘রাসূলুল্লাহর সা. কবি’ তাঁর উপাধি। মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনী আল-হারিস শাখার সন্তান। পিতা রাওয়াহা ইবন সা’লাবা এবং মাতা কাবশা বিনতু ওয়াকিদ। সাহাবিয়্যা ’আমরাহ বিনতু রাওয়াহা তাঁর বোন এবং কবি সাহাবী নু’মান ইবন বাশীর তাঁর ভাগ্নে। ইতিহাসে তাঁর জন্মের সময়কাল সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি জাহিলী ও ইসলামী উভয় জীবনে অতি মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। (তাবাকাত- ৩/৫২৫, আল-আ’লাম- ৪/২১৭, তাহজীবুল আসমা ওয়াললুগাত- ১/২৬৫) তিনি তৃতীয় আকাবায় সত্তর জন (৭০) মদীনাবাসীর সাথে অংশগ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন এবং সা’দ ইবনুর রাবূর’র সাথে তিনিও বনু আল-হারিসার ‘নাকীব’ (দায়িত্বশীল) মনোনীত হন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪৩, ৪৫৮, তাবাকাত- ৩/৫২৬, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫২, তারীখুল ইসলাম ও তাবাকাতুল মাশাহীর- ১/১৮১) তবে সম্ভবতঃ তিনি এই তৃতীয় ’আকাবার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় তিনি প্রথম আকাবায় ছয়জনের সাথে ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১০৫) ইসলাম গ্রহণের পর মদীনায় ইসলামের তাবলীগ ও দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে হিজরাত করে কুবায় উপস্থিত হলেন। তিনি যে দিন কুবা থেকে সর্বপ্রথম মদীনায় পদার্পণ করেন, সেদিন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা, সা’দ ইবনুর রাবী ও খারিজা ইবন যায়িদ তাদের গোত্র বনু আল-হারিসার লোকদের সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. উটনীর পথরোধ করে দৌঁড়ান এবং তাঁকে তাদের গোত্রে অবতরণের বিনীত আবেদন জানান। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের বলেন, উটনীর পথ ছেড়ে দাও। সে আল্লাহর নির্দেশমত চলছে, আল্লাহর যেখানে ইচ্ছা সেখানেই থামবে। তাঁরা পথ ছেড়ে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৫) হযরত রাসূলে কারীম সা. মিকদাদ ইবন আসওয়াদ আল-কিন্দীর সাথে তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। বদর, উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া, খাইবার, ’উমরাতুল কাদা- প্রত্যেকটি অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কেবল হিজরী চতুর্থ সনে সংঘটিত ‘বদর আস-সুগরা’ অভিযানে যোগদান করতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে মদীনায় স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করে যান। (তাবাকাত- ৩/৫২৬, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৮) উল্লেখ্য যে, উহুদ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান ইবন হারব ঘোষণা দেয় যে, এখন থেকে ঠিক এক বছরের মাথায় ‘বদর আস-সুগরা’ তে আবার তোমাদের মুখোমুখি হব। রাসূলুল্লাহ সা. ও মুসলমানরা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে যথাসময়ে সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু কুরাইশরা অঙ্গীকার পালনের ব্যর্থ হয়। এই বদর আস-সুগরা- তে রাসূল সা. বাহিনীসহ আট দিন অপেক্ষা করেন। এটা হিজরী চতুর্থ সনের জ্বিলকা’দ মাসের ঘটনা। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৯-৩৪০) বদর যুদ্ধের সূচনা পর্বে কুরাইশ পক্ষের বাহাদুর ’উতবা ইবন রাবীয়া’ তার ভাই শাইবা ইবন রাবীয়া ও ছেলে আল-ওয়ালীদ ইবন উতবাকে সংগে করে প্রতিপক্ষ মুসলিম বাহিনীকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানায়। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে ’আউফ, মুয়াওয়াজ ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সর্বপ্রথম এগিয়ে যান। ’উতবা তাঁদের জিজ্ঞেস করেঃ তোমরা কারা? তাঁরা জবাব দেনঃ আনসারদের একটি দল। ’উতবা বলল, তোমাদের সাথে আমরা লড়তে চাইনা। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬২৫) বদরের বিজয় বার্তা দিয়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনার চতুর্দিকে লোক পাঠান। তিনি ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে পাঠান মদীনার উঁচু অঞ্চলের দিকে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬৪২) রাসূলুল্লাহ সা. বদর যুদ্ধেল পর মুসলমানদের হাতে বন্দী কুরাইশদের সম্পর্কে সাহাবীদের মতামত জানতে চান। তাঁদের সম্পর্কে নানাজন নানা মত প্রকাশ করেন। ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ প্রচুর জ্বালানী কাঠে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকায় তাদেরকে জড় করে তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হোক। তারপর আমিই সেই কাঠে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলবো। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪২) খন্দক যুদ্ধের সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার রচিত কবিতা বার বার আবৃত্তি করেছিলেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপঃ ‘‘হে আল্লাহ, তোমার সাহায্য না হলে আমরা হিদায়াত পেতাম না, আমরা যাকাত দিতাম না, সালাত আদায় করতাম না তুমি আমাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল কর, যুদ্ধে আমাদেরকে অটল রাখ। যারা আমাদের ওপর জুলুম করেছে, তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করলে, আমরা অস্বীকার করবো।’’ (সীয়ারে আনসার- ২/৫৯) এই খন্দক যুদ্ধের সময় মদীনার ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজার নেতা কাব ইবন আসাদ রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সম্পাদিত তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। খবরটি রাসূলুল্লাহর সা. কানে পৌঁছে। তিনি খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কয়েকজন লোককে কা’বের নিকট পাঠান। তাদের মধ্যে ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাও ছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২১, আসাহ আস-সীয়ার- ১৯০) খন্দক যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহর সা. একটি মু’জিযা বা অলৌকিক কর্মকান্ডের কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর তার সাথে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার নামটি উচ্চারিত হয়েছে। ঘটনাটি সংক্ষেপে এইরূপঃ ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার ভাগ্নী তথা নু’মান ইবন বাশীরের বোন বলেনঃ একদিন আমার মা ’উমরাহ বিনতু রাওয়াহা আমাকে ডেকে আমার কাপড়ে কিছু খেজুর বেঁধে দিয়ে বললেনঃ এগুলি তোমার বাবা বাশীর ও মামা ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে দিয়ে এস, তাঁরা দুপুরে খাবেন। আমি সেগুলি নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. পাশ দিয়ে যাচ্ছি, আর আমার বাবা ও মামাকে খোঁজ করছি। রাসূল সা. আমাকে দেখে ডাক দিলেনঃ এই মেয়ে, এদিকে এস। তোমার কাছে কি? বললামঃ খেজুর। আমার মা আমার বাবা বাশীর ইবন সা’দ ও মামা ’আবদুল্লাহর দুপুরের খাবারের জন্য পাঠিয়েছেন। বললেনঃ আমার কাছে দাও। আমি খেজুরগুলি রাসূলুল্লাহর সা. দুই হাতে ঢেলে দিলাম, কিন্তু হাত ভরলো না। তিনি কাপড় বিছাতে বললেন এবং খেজুরগুলি কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে দিলেন; তারপর পাশের লেকটিকে বললেনঃ যাও, খন্দকবাসীদের দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে বল। ঘোষণার পর, সবাই চেল এল এবং খাবার খেতে শুরু কর। তাঁরা খাচ্ছে, আর খেজুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকলো। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/১১৮, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬৩১) ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি ও বাই’য়াতে রিদওয়ানেও ’আবদুল্লাহ যোগদান করেন। আবু রাফে’র পরে উসাইর ইবন রাযিম ইহুদীকে খাইবারের শাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল উপযুক্ত উত্তরাধিকারী। সে গাতফান গোত্রে ঘুরাঘুরি করে তাদেরকে বিদ্রাহী করে তোলে। হযরত রাসূলে কারীম সা. খবর পেয়ে ষষ্ঠ হিজরীর রমাদান মাসে তিরিশ সদস্যের একটি দলের সাথে ’আবদুল্লাহকে খাইবারে পাঠান। তিনি গোপনে উসাইর ইবন রাযিমের সকল তথ্য সংগ্রহ করে রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করেন। রাসূল সা. তিরিশ সদস্যের একটি বাহিনী ’আবদুল্লাহর অধীনে ন্যস্ত করে উসাইরকে হত্যার নির্দেশ দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৭৮) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা উসাইরের সাথে দেখা করে বলেন, যদি আপনি নিরাপত্তার আশ্বাস দেন তাহলে একটি কথা বলি। সে আশ্বাস দিল। ’আবদুল্লাহ বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। আপনাকে খাইবারের নেতা বানানো তাঁর ইচ্ছা। তবে আপনাকে একবার মদীনায় যেতে হবে। সে প্রলোভনে পড়ে এবং তিরিশজন ইহুদীকে সংগে করে ’আবদুল্লাহর বাহিনীর সাথে চলতে শুরু করলো। পথে ’আবদুল্লাহ প্রত্যেক ইহুদীর প্রতি নজর রাখার জন্য একজন করে মুসলমান নির্দিষ্ট করে দিলেন। এতে উসাইরের মনে সন্দেহের উদ্রেক হল এবং ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। ধোঁকা ও প্রতারণার অপরাধে মুসলিম মুজাহিদরা খুব দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে তাদের সকলকে হত্যা করেন। এই ঘটনার পর খাইবারের মাথাচাড়া দেওয়া বিদ্রোহ দমিত হয়। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৬১৮, সীয়ারে আনসার- ২/৬০) পরে হযরত রাসূলুল্লাহ সা. ’আবদুল্লাহকে খাইবারে উৎপাদিত খেজুর পরিমাপকারী হিসাবে আবারও সেখানে পাঠান। কিছু লোক রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ’আবদুল্লাহর কঠোরতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলো। এক পর্যায়ে তারা ঘুষও দিতে চাইল। ইবন রাওয়াহা তাদেরকে বললেনঃ ওহে আল্লাহর দুশমনরা। তোমরা আমাকে হারাম খাওয়াতে চাও? আমার প্রিয় ব্যক্তির পক্ষ থেকে আমি এসেছি। আমার নিকট তোমরা বানর ও শুকর থেকেও ঘৃণিত। তোমাদের প্রতি ঘৃণা এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা তোমাদের ওপর কোন রকম জুলুমের দিকে নিয়ে যাবে না। একথা শুনে তারা বললঃ এমন ন্যায়পরায়ণতার ওপরই আসমান ও যমীন প্রতিষ্ঠিত। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১০৮, আল বিদায়া- ৪/১৯৯) হুদাইবিয়ার সন্ধি অনুযায়ী সে বছরের মূলতবী ’উমরাহ রাসূল সা. পরের বছর হিজরী সপ্তম সনে আদায় করেন। একে ‘উমরাতুল কাদা’ বা কাজা ’উমরা বলে। এই সফরে রাসূলে কারীম সা. যখন মক্কায় প্রবেশ করেন এবং উটের পিঠে বসে ‘হাজরে আসওয়াদ’ চুম্বন করেন তখন মক্কায় প্রবেশ করেন এবং উটের পিঠে বসে ‘হাজলে আসওয়াদ’ চুম্বন করেন তখন আবদুল্লাহ তার বাহনের লাগাম ধরে একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। কবিতাটির কিছু অংশের মর্ম নিম্নরূপঃ ওরে কাফিরের সন্তানরা! তোরা তাঁর পথ থেকে সরে যা, তোরা পথ ছেড়ে দে। কারণ, সকল সৎকাজ তো তাঁরই সাথে। আমরা তোদের মেরেছি কুরআনের ব্যাখ্যার ওপর, যেমন মেরেছি তাঁর নাযিলের ওপর। এমন মার দিয়েছি যে, তোদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বন্ধু ভুলে ফেলে গেছে তাঁর বন্ধুকে। প্রভু আমি তাঁর কথার ওপর ঈমান এনেছি। (তাবাকাত- ৩/৫২৬, আল ইসাবা- ২/৩০৭) এক সময় হযরত উমার রা. ধমক দিয়ে বলেনঃ আল্লাহর হারামে ও রাসূলুল্লাহর সা. সামনে এভাবে কবিতা পাঠ? রাসূল সা. তাঁকে শান্ত করে বলেনঃ ’উমার! আমি তার কথা শুনছি। আল্লাহর কসম! কাফিরদের ওপর তার কথা তীর বর্শর চেয়েও বেশী ক্রিয়াশীল। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭) তিনি আবদুল্লাহকে বলেনঃ তুমি এভাবে বলঃ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু, নাসারা ’আবদাহ ওয়া আ’য়ায্যা জুনদাহ, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ’- এক আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছেন এবং একাই প্রতিপক্ষের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা উপরোক্ত বাক্যগুলি আবৃত্তি করছিলেন, আর তার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে উচ্চারণ করছিলেন সমবেত মুসলিম জনমন্ডলী। তখন মক্কার উপত্যকা সমূহে সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছিল। (সীয়ারে আনসার- ২/৬১) হিজরী অষ্টম সনের জামাদি-ইল-আওয়াল মাসে মূতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বসরার শাসকের নিকট দূত মারফত একটি চিঠি পাঠান। পথে মূতা নামক স্থানে এক গাসসানী ব্যক্তির হাতে দূত নিহত হয়। দূতের হত্যা মূলতঃ যুদ্ধ ঘোষণার ইঙ্গিত। রাসূল সা. খবর পেয়ে যায়িদ ইবন হারিসার নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী মূতায় পাঠান। যাত্রার প্রাক্কালে হযরত রাসূলে কারীম সা. বলেনঃ যায়িদ হবে এ বাহিনীর প্রধান। সে নিহত হলে জা’ফর ইবন আবী তালিব তার স্থলাভিষিক্ত হবে। জা’ফরের পর হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। আর সেও যদি নিহত হয় তাহলে মুসলমানরা আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের আমীর বানিয়ে নেবে। বাহিনী মদীনা থেকে যাত্রার সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. ‘সানিয়্যাতুল বিদা’ পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে তাদের বিদায় জানান। বিদায় বেলা মদীনাবাসীরা তাদেরকে বললঃ তোমরা নিরাপদে থাক এবং কামিয়াব হয়ে ফিরে এসো। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা কাঁদতে লাগলেন। লোকেরা বললঃ কাঁদার কী আছে? তিনি বললেন, দুনিয়ার মুহাব্বতে আমি কাঁদছিনা। তিনি সূরা মারিইয়াম এর ৭১ নং আয়াত- ‘তোমাদের প্রত্যেককেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করতে হবে। এটা তোমার রব-এ অনিবার্য সিদ্ধান্ত’- পাঠ করেন। তারপর তিনি বলেন, আমি কি সেই পুলসিরাত পার হতে পারবো? লোকরা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললঃ আল্লাহ তোমাকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আবার মিলিত করবেন। তখন তিনি স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। কবিতাটির অর্থ নিম্নরূপ। ‘তবে আমি রহমানের কাছে মাগফিরাত কামনা করি, আর কামনা করি অসির অন্তরভেদী একটি আঘাত, অথবা কলিজা ও নাড়িতে পৌঁছে যায় নিযার এমন একটি খোঁচা, আমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী যেন বলে- হায় আল্লাহ, সে কত ভালো যোদ্ধা ও গাজী ছিল।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৭৪, ৩৭৭ হায়াতুস সাহাবা- ১/৫২৯, ৫৩০) কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, যায়িদ ও জা’ফর বাহিনীসহ সকালে মদীনা ত্যাগ করলেন। ঘটনাক্রমে সেটা ছিল জুময়ার দিন। ’আবদুল্লাহ বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে জুময়ার নামায আদায় করে রওয়াহা হব। তিনি নামায আদায় করলে। রাসূল সা. নামায শেষে তাঁকে দেখে বললেনঃ সকালে তোমার সংগীদের সাথে যাওনি কেন? ’আবদুল্লাহ বললেন, আমি ইচ্ছা করেছি, আপনার সাথে জুম’য়া আদায় করে তাদের সাথে মিলিত হব। রাসূল সা. বললেন, তুমি যদি দুনিয়ার সবকিছু খরচ কর তবুও তাদের সকালে যাত্রার সাওয়াবের সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবে না। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৬৩) মদীনা থেকে শামের ‘মা’য়ান’ নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা জানতে পারেন যে, রোমান সম্রাট হিরাকল এক লাখ রোমান সৈন্যসহ ‘বালকা’-র ‘মাব’ নামক স্থানে অবস্থান নিয়েছে। আর তাদের সাথে যোগ দিয়েছে লাখম, জুজাম, কায়ন, বাহরা, বালী-সহ বিভিন্ন গোত্রের আরও এক লাখ লোক। এ খবর পেয়ে তাঁরা মায়ানে দুই দিন ধরে চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শ করেন। মুসলিম সৈনিকদের কেউ কেউ মত প্রকাশ করে যে, আমরা শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা ও প্রস্তুতির সব খবর রাসূলকে সা. অবহিত করি। তারপর তিনি আমাদেরকে অতিরিক্ত সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবেন অথবা অন্য কোন নির্দেশ দেবেন এবং আমরা সেই মোতাবিক কাজ করব। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তখন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ওহে জনমন্ডলী, এখন তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হতে পসন্দ করছো না; অথচ তোমার সবাই শাহাদাত লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়েছো। আমরা তো শত্রুর সাথে সংখ্যা, শক্তি ও আধিক্যের দ্বারা লড়বো না। আমরা লড়বো দ্বীনের বলে বলীয়ান হয়ে- যে দ্বীনের দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তোমরা সামনে ঝাঁপিয়ে পড়। তোমাদের সামনে আছে দুইটি কল্যানের যে কোন একটি হয় বিজয়ী হবে নতুবা শাহাদাত লাভ করবে। সৈনিকরা তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললঃ আল্লাহর কসম! ইবন রাওয়াহা ঠিক কথাই বলেছেন। তারা তাদের সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হন। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাও একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তাদের সাথে চলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৭৫, আসাহ আস-সীয়ার- ২৮০) তাঁরা ‘মা’য়ান’ ত্যাগ করে মূতায় পৌঁছে শিবির স্থাপন করেন। এখানে অমুসলিমদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী অসম যুদ্ধ হয়। ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘মূতার যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা মাত্র তিনহাজার আর শত্রুবাহিনীর সংখ্যা অগণিত। (সীয়ারে আনসার- ২/৬২) প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হল। সেনাপতি যায়িদ ইবন হারিসা যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হলেন। জা’ফর তাঁর পতাকাটি তুলে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনিও শাহাদাত বরণ করলেন। এবার আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ঝান্ডা হাতে তুলে নিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। তিনি ছিলেন ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার মুহূর্তে তাঁর মনে একটু দ্বিধার ভাব দেখা দিল। তিনি সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আপন মনে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপঃ ‘হে আমার প্রাণ! আমি কসম করেছি, তুমি অবশ্যই নামবে, তুমি স্বেচ্ছায় নামবে অথবা নামতে বাধ্য করা হবে। মানুষের চিৎকার ও ক্রন্দন ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে, তোমার কী হয়েছে যে, এখনও জান্নাতকে অবজ্ঞা করছো? সেই কত দিন থেকে না এই জান্নাতের প্রত্যাশা করে আসছো, পুরানো ফুটো মশকের এক বিন্দু পানি ছাড়া তো তুমি আর কিছু নও। হে আমার প্রাণ, আজ তুমি নহত না হলেও একদিন তুমি মরবে, এই মৃত্যুর হাম্মাম এখানে উত্তপ্ত করা হচ্ছে। তুমি যা কামনা করতে এখন তোমাকে তাই দেওয়া হয়েছে, তুমি তোমার সঙ্গীদ্বয়ের কর্মপন্থা অনুসরণ করলে হিদায়াত পাবে।’ উপরোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন। তখন তাঁর এক চাচাতো ভাই গোশতসহ একটুকরো হাড় নিয়ে এসে তার হাতে দেন। তিনি সেটা হাতে নিয়ে যেই না একটু চাটা দিয়েছেন, ঠিক তখনই প্রচণ্ড যুদ্ধের শোরগোল ভেসে এলো। ‘তুমি এখনও বেঁচে আছ’- এ কথা বলে হাতের হাড়টি ছুড়ে ফেলে দিয়ে তরবারি হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শত্রুপক্ষের এক সৈনিক এমন জোরে তীর নিক্ষেপ করে যে, মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি হয়। একটি তীর তাঁর দেহে বিদ্ধ হয়। তিনি রক্তরঞ্জিত অবস্থায় সাথীদের আহবন জানান। সাথীরা ছুটে এসে তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। (তাবাকাত- ৩/৫২৯, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৭৯, হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৩৩, সীয়ারে আনসার- ২/৬৩, আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৮০, ২৪৪) মূতায় অবস্থানকালে শাহাদাতের পূর্বে একদিন রাতে তিনি একটি মর্মস্পর্শী কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। আবৃত্তি শুনে যায়িদ ইবন আরকাম কাঁদতে শুরু করেন। তিনি যায়িদের মাথার ওপর দুররা উঁচু করে ধরে বলেনঃ তোমার কী হয়েছে? আল্লাহ আমাকে শাহাদাত দান করলে তোমরা নিশ্চিন্তে ধরে ফিরে যাবে। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭) হযরত রাসূলে কালীম সা. ওহীর মাধ্যমে মূতার প্রতি মুহূর্তের খবর লাভ করে মদীনায় উপস্থিত লোকদের সামনে বর্ণনা করছিলেন। সহীহ বুখারীতে আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, মূতার খবর আসার পূর্বেই রাসূল সা. মদীনায় যায়িদ, জা’ফর ও আব্দুল্লাহর শাহাদাতের খবর দান করেন। তিনি বলেনঃ যায়িদ ঝান্ডা হাতে নেয় এবং শহীদ হয়। তারপর জা’ফর তুলে নেয়, সেও শহীদ হয়। অতঃপর আবদুল্লাহ তুলে নেয় এবং সেও শহীদ হয়। তিনি একথা বলছিলেন আর তাঁর দুই চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। (আসাহ আস-সীয়ার- ২৮১) কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, যায়িদ ও জা’ফরের শাহাদাতের খবর দেওয়ার পর রাসূল সা. একটু চুপ থাকেন। এতে আনসারদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। তারা ধারণা করে যে, ’আবদুল্লাহর এমন কিছু ঘটেছে যা তাদের মনঃপূত নয়। তারপর রাসূল সা. বলেনঃ অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা উঠিয়ে নেয় এবং যুদ্ধ করে শহীদ হয়। তিনি আরও বলেন, তাদের সকলকে জান্নাতে আমার কাছে আনা হয়েছে। আমি দেখলাম, তারা সোনার পালঙ্কে শুয়ে আছে। তবে ’আবদুল্লাহর পালঙ্কটি তার অন্য দুই সঙ্গীর থেকে একটু বাঁকা। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা এমন কেন? বলা হলঃ তারা দুইজন দ্বিধাহীন চিত্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু আবদুল্লাহর চিত্ত দ্বিধা-সংকোচ একটি দোল খায়। তারপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৮০) মূতার তিন সেনাপতির মৃত্যুর খবর রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পৌঁছলে তিনি উঠে দাঁড়ান এবং তাঁদের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করে এই বলে দুআ করেনঃ আল্লাহ তুমি যায়িদকে ক্ষমা করে দাও। একথা তিনবার বলেন, তারপর বলেনঃ আল্লাহ তুমি জাফর ও আবদুল্লাহ ইবন রাওযাহাকে ক্ষমা করে দাও। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৪৪) মূতায় যাওয়ার পূর্বে একবার মদীনায় অসুস্থ অবস্থায় অচেতন হয়ে পড়েন। তখন তাঁর বোন ’উমরাহ নানাভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে আরবদের প্রথা অনুযায়ী বিলাপ শুরু করেন। চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি বোনকে বলেন, তুমি আমার সম্পর্কে অতিরঞ্জন করে যা কিছু বলছিলে, তার সবই আমার কাছ থেকে সত্যায়িত করা হচ্ছিল। এই কারণে তাঁর মৃত্যুর সময় তারই উপদেশ মত সকলে ‘সবা’ (ধৈর্য্য) অবলম্বন করে। সহীহ বুখারীতে এসেছে- তিনি যখন মারা যান তাঁর জন্য কান্নাকাটি বা বিলাপ করা হয়নি। (উসুদুল গাবা- ৩/১৪৭-১৫৯, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৮০) মূতা রওয়ানা হওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী ও সন্তান ছিল। কিন্তু উসুদুল গাবা গ্রন্থকার বলেছেন, তিনি নিহত হন এবং কোন সন্তান রেখে যাননি। (উসুদুল গাবা- ৩/১৫৯, সীয়ারে আনসার- ২/২৬৫) ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার স্ত্রী সম্পর্কে আল-ইসতীয়াব গ্রন্থে একটি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর স্ত্রী তাঁকে বলেন, তুমি যদি পাক অবস্থায় থাক তাহলে একটু কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাও। তখন ’আবদুল্লাহ চালাকির আশ্রয় গ্রহণ করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। যার কিছু নিম্নরূপঃ ‘‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কাফিরদের ঠিকানা দোযখ, ’আরশ ছিল পানির ওপর, ’আরশের ওপর ছিলেন বিশ্বের প্রতিপালক, আর সেই আরশ বহন করে তাঁরই শক্তিশালী ফিরিশতারা।’’ তাঁর স্ত্রী কুরআনের পারদর্শী ছিলেন না। এই কারণে তিনি বিশ্বাস করেন যে, আবদুল্লাহ কুরআন থেকেই তিলাওয়াত করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ সত্যবাদী, আমার চোখ দেখতে ভুল করেছে। আমি অহেতুক তোমাকে দোষারোপ করছি। দাসীর সাথে উপগত হওয়ার পর স্ত্রীর ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য হযরত আবদুল্লাহ এমন বাহানার আশ্রয় নেন। তিনি পরদিন সকালে এ ঘটনা রাসূলুল্লাহকে সা. জানালে তিনি হেসে দেন। (আল-ইসতীয়াব- ১/৩৬২, হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৫) সামরিক দক্ষতা ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার আরও অনেক যোগ্যতা ছিল। একারণে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে সমাদর করতেন। সেই জাহিলী আরবে যে মুষ্টিমেয় কিছু লোক আরবীতে লেখা জানতো, ’আবদুল্লাহ তাদের অন্যতম। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল সা. তাঁকে স্বীয় ‘কাতিব’ (লেখক) হিসাবে নিয়োগ করেন। তবে কখন কিভাবে তিনি লেখা শিখেছিলেন, সে সম্পর্কে ইতিহাস কিছু বলে না। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন বিখ্যাত করি। ডক্টর ’উমার ফাররুখ বলেন, ’মদীনায় ইসলাম রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করলে আরবের মুশরিকগণ আরও শংকিত হয়ে পড়ে। মক্কার পৌত্তলিক কবিগণ বিশেষতঃ ’আবদুল্লাহ ইবন আয-যিবা’রী, কা’ব ইবন যুহাইর ও আবু সুফইয়ান ইবন আল-হারিস রাসূলুল্লাহ সা. ও ইসলামের নিন্দা ও কুৎসা রটনা করে কবিতা লিখতো। তখন মদীনায় হাসসান ইবন সাবিত, ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও কা’ব ইবন মালিক তাদের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়িয়ে সমুচিত জবাব দেন এবং ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন। মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত দু’পক্ষের এ কবিতায় যুদ্ধ চলতে থাকে। ’আবদুল্লাহ ছিলেন তাঁর যুগের ভালো কবিদের একজন। তিনি হাস্সান ও কা’বের সমপর্যায়ের কবি। জাহিলী যুগে তিনি কবি কায়েস ইবনুল খুতাইম- এর সাথে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মূলক কবিতা লিখে প্রতিযোগিতা করতেন। আর ইসলামী যুগে রাসূলের সা. প্রশংসা এবং মুশরিক কবিদের প্রতিবাদ ও নিন্দায় কবিতা রচনা করতেন। (তারীখুল আদাব আল-আরাবী- ১/২৫৮, ২৬১, ২৬২) জুরযী যায়দান বলেনঃ ‘মক্কার পৌত্তলিক কবিদের মধ্যে যারা মুসলমানদের নিন্দা করে কবিতা বলতো তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন আয-যিবারী, আবু সুফইয়ান ইবন আল-হারিস ও ’আমর ইবন আল- ’আস ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। একদিন নবী সা. বললেনঃ যারা তাদের অস্ত্রের দ্বারা আল্লাহর রাসূলকে সাহায্য করেছে, জিহ্বা দিয়ে তাঁকে সাহায্য করতে তাদেরকে কিসে বিরত রেখেছে? এই কথার পর যে তিন কবি উপরোক্ত কবিদের প্রতিরোধে দাঁড়িয়ে যান তাঁরা হলেন, হাস্সান, ক’ব ও আবদুল্লাহ। রাসুল সা. মনে করতেন, এই তিন কবির কবিতা শত্রুদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তিনি বলেছেনঃ এই তিন কবি কুরাইশদের কাছে তীরের ফলার চেয়েও বেশী শক্তিশালী। (তারীখু আদাব আল-লুগাহ আল-’আরাবিয়্যাহ- ১/১৯১) কবি হাস্সান কুরাইশদের বংশ ও রক্তের ওপর আঘাত হানতেন, কবি কা’ব কুরাইশদের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অতীত ইতিহাস বর্ণনা করে তাদের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরতেন। পক্ষান্তরে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাদের কুফরীর জন্য নিন্দা ও ধিক্কার দিতেন। (উসুদুল গাবা- ৪/২৪৮) আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানী বলেনঃ হাস্সান ও কা’ব প্রতিপক্ষ কুরাইশ কবিদের মত যুদ্ধ বিগ্রহ ও গৌরবমূলক কাজ-কর্ম নিয়ে কবিতা রচনা করতেন এবং তার মধ্যে কুরাইশদের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি তুলে ধরতেন। আর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহ তাদের কুফরীর জন্য ধিক্কার ও নিন্দা জানাতেন। কুরাইশদের ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত পূর্বোক্ত দু’জনের কবিতা ছিল তাদের নিকট ’আবদুল্লাহর কবিতা অপেক্ষা অধিকতর পীড়াদায়ক। কিন্তু যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করে তার মর্মবাণী উপলব্ধি করলো তখন ’আবদুল্লাহর কবিতা সর্বাধিক প্রভাবশালী ও পীড়াদায়ক বলে তাদের নিকট প্রতিভাত হলো। (কিতাবুল আগানী- ৪/১৩৬) আবদুল্লাহ ছিলেন স্বভাব কবি। উপস্থিত কবিতা রচনায় দক্ষ ছিলেন। হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াব রা. বলেনঃ তাৎক্ষণিক কবিতা বলার ক্ষেত্রে আমি ’আবদুল্লাহ অপেক্ষা অধিকতর সক্ষম আর কাউকে দেখিনি। (তাহীবুল আসমা ওয়াল লূগাত- ১/২৬৫) একদিন তিনি মসজিদে নববীতে। পূর্বেই সেখানে হযরত রাসূলে কারীম সা. একদল সাহাবীর সাথে বসে ছিলেন। তিনি ’আবদুল্লাহকে কাছে ডেকে বলেন, তুমি এখন মুশরিকদের সম্পর্কে কিছু কবিতা শোনাও।’ আবদুল্লাহ কিছু কবিতা শোনালেন। কবিতা শুনে রাসূল সা. একটু হাসি দিয়ে বলেন, আল্লাহ তোমাকে অটল রাখুন। (আল-ইসতীয়াব- ১/৩৬২, তাবাকাত- ৩/৫২৮, আল-ইসাবা- ২/৩০৭) হযরত আবু হুরাইরা রা. ওয়াজ নসীহাতের সময় বলতেন, তোমাদের এক ভাই আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা অশ্লীল কথা বলতেন। তারপর তিনি ’আবদুল্লাহর একটি কবিতা আবৃত্তি করতেন। ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে কবিতাটি সংকলটন করেছেন। (আল-ফাতহুর রাব্বানী, শরহু মুসনাদ আহমাদ- ২২/২৮৭) ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার সব কবিতা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তবে এখনও পঞ্চাশটি শ্লোক (verse) সীরাত ও ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে সংরক্ষিত আছে। সীরাতু ইবন হিশামে তার অধিকাংশ পাওয়া যায়। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা (উর্দু)- ১২/৭৮০) যখন সূরা শু’য়ারা- এর ২২৪-২২৬ নং আয়াতগুলি- ‘কবিদেরকে তারাই অনুসরণ করে যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখনা তারা উদভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তাই বলে বেড়ায়’- নাযিল হয় তখন হাস্সান, আবদুল্লাহ ও কাব এত ভীত হয়ে পড়েন যে, তাঁরা কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ছুটে যান। তাঁরা বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই আয়াত নাযিলের সময় আল্লাহ তো জানতেন আমরা কবি। তখন রাসূল সা. আয়াতের পরবর্তী অংশ- ‘কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহকে বার বার স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে’- পাঠ করেন এবং বলেন এই হচ্ছো তোমরা। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭, তাবাকাত- ৩/৫২৮, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৭৭, ১৭২) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা থেকে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি হাদীসগুলি খোদ রাসূল সা. ও বিলাল থেকে বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন ইবন ’আব্বাস, উসামা ইবন যায়িদ, আনাস ইবন মালিক, নু’মান ইবন বাশীর ও আবু হুরাইরা। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ছিলেন একজন দুনিয়া বিরাগী ’আবিদ ও সব সময় আল্লাহকে স্মরণকারী (জাকির) ব্যক্তি। আবুদ দারদা বলেনঃ এমন কোন দিন যায়না যেদিন আমি তাঁকে স্মরণ করিনা। আমার সঙ্গে একত্র হলেই তিনি বলতেনম, এস, কিছুক্ষণের জন্য আমরা মুসলমান হয়ে যাই। তারপর বসে ‘জিকর’ শুরু করতেন। ‘জিকর’ শেষ হলে বলতেন, এটা ছিল ঈমানের মজলিস। (উসুদুল গাবা- ৩/১৫৭) আনাস ইবন মালিক বলেন। ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার সাথে রাসূলুল্লাহর সা. কোন সাহাবীর দেখা হলে বলতেন, এস, আমরা কিছু সময়ের জন্য ঈমান আনি। একদিন এক ব্যক্তি তাঁর এমন কথায় খুব রেগে গেল। সে সোজা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট অভিযোগ করে বললঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি কি দেখেন না, ইবন রাওয়াহা আপনার ঈমান ত্যাগ করে কিছুক্ষণের ঈমানকে পসন্দ করছে? তিনি বললেন, আল্লাহ ইবন রাওয়াহার ওপর রহম করুন। সে এমন সব মজলিস পসন্দ করে যার জন্য ফিরিশতারাও ফখর করে থাকে। একবার তো তাঁর এমনি ধরণের আহ্বানে এক ব্যক্তি প্রতিবাদ করে বলে বসলো, কেন আমরা কি মুমিন নই? তিনি বললেনঃ হাঁ, আমরা মুমিন। তবে আমরা জিকর করবো, তাতে আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পাবে। (আল-ফাতহুল রাব্বানী- ২২/২৮৬, হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৫) তাঁর স্ত্রী বর্ণনা করেন, যখন তিনি ঘর থেকে বের হতেন, দুই রাকায়াত নামায আদায় করতেন। আবার ঘরে ফিরে এসে ঠিক একই রকম করতেন। এ ব্যাপারে কক্ষণও অলসতা করতেন না। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭, হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৪৮) একবার এক সফরে এত প্রচণ্ড গরম ছিল যে, মানুষ সূর্যের তেজ থেকে বাঁচার জন্য নিজ নিজ মাথার ওপর হাত দিয়ে রেখেছিল। এমন গরমে কে রোযা রাখে? কিন্তু তার মধ্যেও কেবল হযরত রাসূলে কারীম সা. ও ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ‘সাওম’ পালন করেন। (সহীহ বুখারী- ১/২৬১, মুসলিম- ১/৩৫৭, হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৯, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/২৬৫) জিহাদের প্রতি ছিল তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ। বদর থেকে নিয়ে মূতা পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে তার একটিতেও তিনি অনুপস্থিত থাকেননি। রিজাল শাস্ত্রবিদরা (চরিত অভিধান) বলেছেনঃ আবদুল্লাহ সবার আগে যুদ্ধে বের হতেন এবং সবার শেষে ঘরে ফিরতেন। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭) হযরত রাসূলে কারীমের সা. আদেশ-নিষেধ তিনি অক্ষরে পালন করতেন। একটি ঘটনায় এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার হযরত রাসূলে কারীম সা. মসজিদে খুতবা (ভাষণ) দিচ্ছেন। আর ইবন রাওয়াহা যাচ্ছেন মসজিদের দিকে। তিনি যখন মসজিদের বাইরের রাস্তায় এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন রাসূল সা. বলছেন, তোমরা নিজ নিজ স্থানে বসে পড়। এই নির্দেশ ইবন রাওয়াহার কানে যেতেই সেখানে বসে পগেন। রাসূল সা. খুতবা শেষ করার পর কোন এক ব্যক্তি ইবন রাওয়াহার ব্যাপারটি তাঁকে শোনান। শুনে তিনি মন্তব্য করেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের লালসা আল্লাহ তার মধ্যে আরও বৃদ্ধি করে দিন। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬, হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৫৬) হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা যেমন রাসূলকে সা. গভীরভাবে ভালোবাসতেন তেমনি রাসূল সা.-ও তাঁকে ভালোবাসতেন। একবার আবদুল্লাহ অসুখে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। রাসূল সা. দেখতে গেলেন। তিনি দু’আ করলেঃ হে আল্লাহ, যদি তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসে থাকে তাহলে সহজে তার মরণ দাও অন্যথায় তাকে ভালো করে দাও। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬) উসামা ইবন যায়িদ বলেনঃ সা’দ ইবন ’উবাদা অসুস্থ হলে রাসূল সা. তাঁকে দেখার জন্য বের হলেন। আমাকেও বাহনের পিছনে বসিয়ে নিলেন। ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই তার মুযাহিম দুর্গের ছায়ায় নিজ গোত্রের আরও কিছু লোকের সাথে বসে ছিল। রাসূল সা. মনে করলেন, কোন কথা না বলে তাদের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তাই তিনি বাহনের পিছ থেকে নামলেন এবং সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ বসলেন। তারপর কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে তাদের সকলকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। এতক্ষণ ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই চুপ করে ছিল। রাসূলুল্লাহর সা. কথা শেষ হলে সে বললঃ দেখুন, আপনার কথা সত্য হলে বাড়ীতে গিয়ে বসে থাকুন। কেউ আপনার কাছে গেলে তাকে যত পারেন শুনাবেন। এমন অবাঞ্ছিতভাবে কোন মজলিসে উপস্থিত হয়ে কাউকে বিরক্ত করবেন না। সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের মধ্যে ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাও ছিলেন। তিনি গর্জে উঠলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, তার কথা কক্ষণও মানবেন না। আপনি আসবেন! আপনি আমাদের মজলিসে, ঘরে ঘরে এবং বাড়ীতে বাড়ীতে আসবেন। আমরা সেটাই পসন্দ করি। আপনার আগমণের দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন, আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫৮৭, হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৯) একদিন আবদুল্লাহ তাঁর স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কাঁদা শুরু করলেন। তাই দেখে স্ত্রীও কাঁদতে লাগলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কাঁদছো কেন? স্ত্রী বললেনঃ তোমাকে কাঁদতে দেখে আমি কাঁদছি। তখন তিনি সূরা মরিয়াম- এর ৭১ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেন, আমি এই আয়াতটি স্মরণ করে কাঁদছি। জানিনে আমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাব কিনা। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৫) বিখ্যাত আনসারী সাহাবী আবু দারদা-র ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আবদুল্লাহর ভূমিকাটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। জাহিলী যুগে উভয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। ’আব্দুল্লাহর ইসলাম গ্রহণের পরও আবু দারদা মূর্তি উপাসক থেকে যান। তাঁর বাড়ীতে ছিল বিরাট এক মূর্তি। একদিন আবু দারদা বাড়ী থেকে বের হলেন, আর ঠিক সেই সময় ভিন্ন পথ দিয়ে আবদুল্লাহ বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করলেন। তিনি আবু দারদা-র স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আবু দারদা কোথায়? স্ত্রী জবাব দিলেনঃ এই মাত্র বেরিয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ মূর্তির ঘরে প্রবেশ করে সেখানে রক্ষিত একটি হাতুড়ী দিয়ে মূর্তিটি ভেঙ্গে চুরমার করে ফেললেন। শব্দ শুনে আবু দারদা-র স্ত্রী ছুটে গেলেন। আবদুল্লাহ কাজ শেষ করে চলে গেলেন। এ দিকে আবু দারদা-র স্ত্রী ভয়ে মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। আবু দারদা ঘরে ফিরে স্ত্রীর নিকট সব কথা শুনে প্রথমে খুব রেগে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন, যদি মূর্তির কোন ক্ষমতা থাকতো তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হতো। এই উপলব্ধির পর তিনি আবদুল্লাহকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট যান এবং ইসলামের ঘোষণা দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৩২, ৩৩৩) একবার কবি হাস্সান ইবন সাবিত, একটি কবিতায় সাফওয়ান ইবন আল-মুয়াত্তাল ও তাঁর গোত্রের নিন্দা করেন। সাফওয়ান ক্ষেপে গিয়ে কবিকে মারপিট করে এবং তাঁকে দু’হাত গলার সাথে বেঁধে বনু আল-হারিসের পল্লীতে নিয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাকে ছাড়িয়ে দেন এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করেন। তাদের দু’জনকেও রাসূলুল্লাহর সা. দরবারে নিয়ে আসেন। তিনি তাদের ঝগড়া মিটমাট করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩০৫) উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহের কারণে রাসূল সা. তাঁর প্রশংসায় বলেছেনঃ ‘নি’মার রাজুলু আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা’- আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা কতই না ভালো মানুষ। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬)
সা’দ ইবনুর রাবী’ (রা)

সা’দ ইবনুর রাবী আল-আনসারী মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনু আল-হারিস শাখার সন্তান। হায়সাম উল্লেখ করেছেন, ‘আবু রাবী’ তাঁর কুনিয়াত বা ডাকনাম। পিতা আর-রাবী ও মাতা হুযাইলা বিন্তু ইন্বা। সীরাত বিশেষজ্ঞরা তাঁর জন্মসন সম্পর্কে নীরব। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৪, তাবাকাত- ৩/৫২২, উসুদুল গাবা- ২/২৭৭) সা’দ ইবনুর রাবী’র ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে মতভেদ দেখা যায়। আবু নু’য়াইম তাঁর ‘দালায়িল’ গ্রন্থে ’আকীল ইবন আবী তালিব ও যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন, প্রথম ’আকাবায়, যে বার ছয়জন ইয়াসরিববাসী মক্কায় রাসূলুল্লাহর হাতে সা. ইসলাম গ্রহণ করে বায়’য়াত করেন তাঁদের একজন ছিলেন সা’দ। সেই ছয় ব্যক্তি হলেনঃ ১. আস’য়াদ ইবন যুরারা ২. আবুল হায়সাম ইবন আত-তায়্যিহান ৩. আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ৪. সা’দ ইবনুর রাবী’ ৫. আন-নু’মান ইবন হারিসা ও ৬. ’উবাদা ইবনুস সামিত। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১০৫) পক্ষান্তরে কোন কোন বর্ণনায় বুঝা যায়, তিনি দ্বিতীয় আকাবার বারো সদস্যের অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি এই দ্বিতীয় ’আকাবায় ইসলাম গ্রহণে করেন। তৃতীয় আকাবায় তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জন লোকের সংগে তিনি যোগ দেন। হযরত রাসুলে কারীম সা. তাঁকে ও ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে তাঁদের গোত্র বনু আল-হারিস ইবনুল খাযরাজের যুগ্ম ‘নাকীব’ বা দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ’লাম- ১/১৮১, তাবাকাত- ২/৫২২, উসুদুল গাবা- ২/২২৭) ইবন হিশাম বর্ণনা করেনঃ হযরত রাসূলে কারীম সা. কুবা থেকে যে দিন মদীনায় উপস্থিত হন, মদীনার সকল শ্রেণীর মানুষ তাঁকে স্বাগতঃ জানায়। তিনি বিভিন্ন গোত্রের ভিতর দিয়ে চলছিলেন, আর সেই গোত্রের লোকেরা তাঁর বাহনের পথ রোধ করে তাদের ওখানে অবতরণের আবেদন জানাচ্ছিল। যখন তিনি বনু আল-হারিস ইবনুল খাযরাজের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সা’দ ইবনুর রাবী খারিজা ইবন যায়িদ ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বনী হারিসার আরও কিছু লোক সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাওয়ারীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে ’আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাদের সংখ্যা, সাজ-সর্যঞ্জাম ও প্রতিরক্ষার দিকে আসুন। (অর্থাৎ আপনাকে সম্মানের সাথে আশ্রয় দানের মত ক্ষমতা আমাদের আছে) রাসুল সা বললেনঃ তোমরা আমার বাহনের পথ ছেড়ে দাও। সে আল্লাহর নির্দেশ প্রাপ্ত। তাঁরা সবাই পথ থেকে সরে দাঁড়ালেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৫) যুহরী ও মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. সাদ ইবনুর রাবী ও আবদুর রহামান ইবন ’আউফের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। হযরত সা’দ তাঁর এই মুহাজির ভাইয়ের প্রতি যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দেখান দুনিয়ার ইতিহাসে তার কোন তুলনা পাওয়া যাবে না। অন্যান্য আনসারগণ নিজনিজ অর্থ-সম্পদ, জায়গা-জমি সবই অর্ধেক তাঁর দ্বীনী মুহাজির ভাইকে ভাগ করে দেন; কিন্তু হযরত সা’দ অর্থ-সম্পদ ছাড়াও একজন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার দ্বীনী ভাইকে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। আর আব্দুর রহমান যদিও সে সময় রিক্ত ও নিঃস্ব, তবে তাঁর অন্তরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত। তিনি সা’দের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এ সম্পর্কে আনাস ইবন ’আউফ থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ সা’দ তাঁর দ্বীনি ভাইকে সংগে করে নিজ গৃহে নিয়ে যান এবং এক সাথে আহার করেন। তারপর বলেনঃ আল্লাহর নামে আপনি আমার ভাই। আপনার স্ত্রী নেই; কিন্তু আমার দুই স্ত্রী। একজনকে আমি তালাক দেব, আপনি তাঁকে বিয়ে করবেন। আব্দুর রহমান বলেনঃ আল্লাহর কসম! কক্ষনো না। সা’দ বললেনঃ আমার বাগানে চলুন, আধা-আধি ভাগ করে নিই। আব্দুর রহমান বললেনঃ না। আল্লাহ আপনার ছেলে-মেয়ে ও মাল-দৌলতে বরকত ও সমৃদ্ধি দান করুন। এসবের কোন কিছুই প্রয়োজন আমার নেই। আমাকে শুধু বাজারের পথটি একটু দেখিয়ে দিন। (আল-ইসাবা- ৩/২৬, উসুদুল গাবা- ২/২৭৮, তাবাকাত- ৩/৫২৩) হযরত সা’দ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি বনী মাখযুমের রিফা’য়া ইবন রিফা’য়াকে হত্যা করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৭১১, তাবাকাত- ৩/৫২৩) উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে মক্কার কুরাইশরা ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করলো। তাদের সেই সমর প্রস্তুতির খবর দিয়ে একটি চিঠি মক্কা থেকে রাসূলুল্লাহর সা. চাচা আব্বাস ইবন ‘আবদিল মুত্তালিব গোপনে মদিনায় রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠালেন। চিঠিতে তিনি তাদের প্রস্তুতির বিবরণ দিয়ে এ কথাও লিখেন যে, ‘তারা তোমাদের ওপর আপতিত হলে, তোমরা যা ভালো মনে কর তাই করবে এবং সেই জন্য প্রস্তুতি নাও।’ বনী গিফারের একটি লোক অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে কুবায় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে চিঠিটি পৌঁছে দেয়। রাসূল সা. সর্বপ্রথম তা উবাই ইবন কা’বকে পড়তে দেন এবং গোপন রাখতে বলেন। তারপর সা’দ ইবনুর রাবী’র নিকট আসেন এবং তাঁকেও বিষয়টি অবহিত করেন। তাঁকেও কথাটি কারও নিকট ফাঁস না করার নির্দেশ দেন। রাসূল সা. চলে যাওয়ার পর সা’দের স্ত্রী সা’দকে জিজ্ঞেস করলোঃ রাসূল সা. তোমাকে কি বললেন? সা’দঃ তোমরা মা নিপাত যাক। তোমার তা শোনার কি প্রয়োজন? স্ত্রীঃ আমি তোমাদের সব কথা শুনেছি। এই বলে তিনি সব কথা সা’দকে শোনান। সা’দ ইন্নালিল্লাহ পাঠ করে বললেনঃ দেখছি, তুমি আমাদের কথা আঁড়ি পেতে শুনে থাক। সা’দ তাঁর স্ত্রীকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট হাজির হলেন এবং সব ঘটনা খুলে বলার পর আরজ করেন ইয়া রাসূলুল্লাহরঃ আমার ভয় হচ্ছে, খবরটি হয়ত ছড়িয়ে পড়বে, আর আপনি ধারণা করবেন আমিই তা ছড়িয়েছি। রাসূল সা. বললেনঃ বিষয়টি ছেড়ে দাও। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩১৩-৩১৪) হিজরী তৃতীয় সনে সংঘটিত উহুদ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁকে একদল প্রতিপক্ষ যোদ্ধা পরাস্ত করে হত্যা করে। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৪, উসুদুল গাবা- ২/২৭৭, আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩০) তাঁর দেহে তীর-বর্ষার মোট বারোটি আঘাত লাগে। তিনি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় যুদ্ধের ময়দানে পড়ে আছেন তখন মালিক ইবন দুখশান তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞেস করেনঃ মুহাম্মাদ সা. নাকি নিহত হয়েছেন, তুমি জান? সা’দ জবাব দেন, তিনি নিহত হলেও আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। তুমি তোমার দ্বীনের পক্ষে জিহাদ কর। মুহাম্মাদ সা. তো তাঁর রবের বাণী ও দ্বীনের বিধি-বিধান পৌঁছানের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করে গেছেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩২৭, তাবাকাত- ৩/৫২৩) উহুদের যুদ্ধ মেষে হযরত রাসূলে কারীম সা. বললেনঃ কেউ সা’দ ইবনুর রাবীর খোঁজ নিয়ে আসতো। এক ব্যক্তি বললেনঃ আমি যাচ্ছি। যারকানী বলেন, লোকটি পড়ে থাকা লাশগুলির চারপাশে চক্কর দিয়ে সা’দের নাম ধরে জোরে ডাক দিলেন। কোন সাড়া পাওয়া গেলোনা। কিন্তু যখন তিনি এই কথা বলে চিৎকার করলেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. তোমার খোঁজে আমাকে পাঠিয়েছেন। তখন ক্ষীণকণ্ঠের একটা আওয়াজ ভেসে এল; আমি মৃতদের মধ্যে। তখন তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত। শ্বাস-প্র্শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, জিহ্বাও আয়ত্তে নেই। অন্য একটি বর্ণনা মতে, লোকটি যখন তাঁর খোঁজে ঘুরাঘুরি করছে, তখন সা’দই তাঁকে ডাক দেন। যাই হোক, সেই অবস্থায় সা’দ তাঁকে বললেন, রাসূলুল্লাহকে সা. আমার সালাম পৌঁছিয়ে বলবেন, আমাকে বারোটি আঘাত করা হয়েছে। আমিও আমার হত্যাকারীকে হত্যা করেছি। আর আনসারদের বলবেন, যদি দুর্ভাগ্যবশতঃ রাসূল সা. নিহত হন, আর তোমাদের একজনও জীবিত ফিরে যাও, আল্লাহকে মুখ দেখানোর যেগ্য তোমরা থাকবে না। কারণ, ‘লাইলাতুল আকাবায়’ (আকাবার রাত্রি) তোমরা রাসূলুল্লাহর সা. জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়েছিলে। কোন কোন বর্ণনায় এই ব্যক্তির নাম উবাই ইবন কা’ব বলা হয়েছে। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সা’দের পবিত্র রূহ তাঁর নশ্বর দেহ তেকে বেরিয়ে যায়। (তাবাকাত- ৩/৫২৩-২৪, আল-ইসতীয়াব- ২/৩৪, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/২১০, আল-ইসাবা- ২/২৭) হযরত উবাই ইবন কা’ব ফিরে এসে রাসূলুল্লাহকে সা. সা’দের অন্তিম কথাগুলো পৌঁছালে তিনি বলেন, আল্লাহ তার ওপর করুণা বর্ষণ করুন। জীবন-মরণ উভয় অবস্থায় সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে উপদেশ দিয়েছেন। (উসুদুল গাবা- ২৭৭) উহুদের অন্য এক শহীদ ইবন যায়িদ ও সা’দকে উহুদের প্রান্তরে একই কবরে দাফন করা হয়। খারিজা ছিলেন সম্পর্কে সা’দের চাচা। সা’দের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জাহিলী প্রথা অনুসারে তাঁর সকল সম্পত্তি দখল করে নেয়। সা’দ গর্ভবতী স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তান রেখে যান। তখনও মীরাসের (উত্তরাধিকার) আয়াত নাযিল হয়নি। জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করেন। সা;দের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী একদিন তাঁর দুই কন্যাকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এরা সা’দের কন্যা। ওদের পিতা উহুদে শাহাদাত বরণ করেছে। আর ওদের চাচা সকল সহায় সম্পত্তি আত্মসাৎ করে বসেছে, ওদেরকে কিছুই দেয়নি। অর্থ-সম্পদ ছাড়া ওদের বিয়ে শাদী হবে কেমন করে? রাসূল সা বললেনঃ আল্লাহ তা’য়ালা ওদের ব্যাপারে ফায়সালা দেবেন। এর পরই সূরা নিসার ১১ নং আয়াতের এই অংশটুকু নাযিল হয়ঃ ‘যদি কন্যা কেবল দুই-এর অধিক হয় তাহলে তাদের জন্য পরিত্যাক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ।’ উপরোক্ত আয়াত নাযিলৈর পর হযরত রাসুলে কারীম সা. মেয়ে দু’টির চাচাকে ডেকে নির্দেশ দেনঃ সা’দের পরিত্যাক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ তার দুই মেয়েকে, এক-অষ্টমাংশ তাদের মাকে দেওয়ার পর বাকীটা তুমি গ্রহণ কর। (আল-ইসাবা- ২/২৭, তাবাকাত- ৩/৫২৪, উসুদুল গাবা- ২/২৭৮, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/২১০, তাছাড়া ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিজি ও ইবন মাজা এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন সা’দের কন্যা ও স্ত্রীদের জন্য এই ফায়সালা দান করেন তখনও মাতৃগর্ভের সন্তানের কোন মীরাস বা উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়নি। এই ঘটনার অনেক পরে গর্ভের সন্তানের মীরাস্ দেওয়ার বিধান হয়। সা’দের স্ত্রীগর্ভের সেই সন্তানটি ভূমিষ্ট হয়। তাঁর নাম রাখা হয় উম্মু সা’দ বিনতু সা’দ এবং পরবর্তীকালে তিনি যায়িদ ইবন সাবিতের স্ত্রী হন। খলীফা হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে যায়িদ তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে তোমার পিতার মীরাসের ব্যাপারে আমীরুল মুমিনীনের সাথে কথা বলতে পার। বর্তমানে তনি গর্ভের সন্তানদের মীরাসের অংশ দান করছেন। উম্মু সা’দ বললেনঃ আমি আমার বোনদের কাছে কিছুই দাবী করবো না। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৮) সেই জাহিলী আরবে যখন লেখার খুব কম প্রচলন ছিল, হযরত সা’দ লেখা জানতেন। (তাবাকাত- ৩/৫২২, তাহজীবুল আসবা- ১/২১০) যেহেতু তিনি গোত্রীয় নেতার সন্তান ছিলেন, তাই শিক্ষার বিশেষ সুযোগ লাভ করেছিলেন এবং লেখাও শিখেছিলেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. মুখ থেকে শোনা কিছু হাদীসও মুখস্থ করেছিলেন। (উসুদুল গাবা- ২/২৭৮) তাঁর ’ঈমানী জোশ ও রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি প্রবল ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছিল আকাবার বাই’য়াত, উহুদের যুদ্ধ এবং মৃত্যুর পূর্বে করে যাওয়া অসীয়াতের মধ্যে। এই সব কারণে সাহাবায়ে কিরামের নিকট হযরত সা’দের একটা বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান ছিল। তাঁর এক কন্যা একবার হযরত আবু বকরের রা. নিকট আসলে তিনি তাঁর বসার জন্য নিজের কাপড় বিছিয়ে দেন। তা দেখে হযরত উমার রা. জিজ্ঞেস করেনঃ মেয়েটি কার? খলীফা বললেনঃ এ সেই ব্যক্তির মেয়ে- যিনি তোমার ও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। আবার প্রশ্ন করলেনঃ এমন মর্যাদা কি জন্য? বললেনঃ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় জান্নাতে পৌঁছে গেছেন আর তুমি-আমি এখনও এখানে পড়ে আছি। (আল-ইসাবা- ২/২৭) আবু বকর আয-যুবায়রী বর্ণনা করেনঃ এক ব্যক্তি খলীফা আবু বকরের কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি সা’দ ইবনুর রাবীর ছোট্ট একটি মেয়েকে বুকের মধ্যে নিয়ে তার লালা মুছে দিচ্ছেন ও চুমু খাচ্ছেন। লোকটি জিজ্ঞেস করল, মেয়েটি কে? তিনি জবাব দিলেন, এ এমন এক ব্যক্তির মেয়ে যিনি তোমার ও আমার চেয়ে উত্তম। এ সা’দ ইবনুর রাবীর মেয়ে। তিনি ছিলেন ’আকাবার নাকীব, বদরের যোদ্ধা ও উহুদের শহীদ। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৯৫)
সা’দ ইবন ’উবাদা (রা)

আসল নাম সা’দ, ডাকনাম আবু কায়স ও আবু সাবিত। প্রথমটি অধিকতর প্রসিদ্ধ। (উসুদুল গাবা- ২/২৮৩) লকব বা উপাধি সায়্যিদুল খাযরাজ। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের ‘সায়িদাহ’ শাখার সন্তান। পিতার নাম ’উবাদা ইবন দুলাইম এবং মাতার নাম ’উমরা বিন্তু মাস’উদ। ’উমরা সাহাবিয়্যা (মহিলা সাহাবী) ছিলেন এবং হিজরী ৫ম সনে ইন্তিকাল করেন। সা’দ তখন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ‘দুমাতুল জান্দাল’ যুদ্ধে যোগদানের জন্য মদীনার বাইরে। মদীনায় ফিরে রাসূল সা. তাঁর মার কবরে যান এবং তাঁর জন্য দু’আ করেন। (তাবাকাত- ৩/৬১৪; আল-ইসাবা- ২/৩০) হযরত সা’দের সম্মানিত দাদা ‘দুলাইম’ ছিলেন খাযরাজ গোত্রের সবচেয়ে বড় নেতা। তাছাড়া মদীনার জনকল্যাণমূলক কাজেও তাঁর খ্যাতি ছিল। সায়িদাহ খান্দানের সম্মান ও গৌরব মূলতঃ তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন পৌত্তলিক। দেবী ‘মানাত’- এর পূজা করতেন। এ দেবীর মূর্তি ছিল মক্কার নিকটে ‘মুসালাল্’ নামক স্থানে। তিনি প্রতি বছর সেখানে দশটি উট বলি দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ’উবাদা, তারপর সা’দ ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এ কাজ অব্যাহত রাখেন। ইসলামী যুগে সা’দের ছেলে কায়স পূর্ব পুরুষের ধারা বজায় রেখে উটগুলি কা’বার চত্বরে কুরবানী করতেন। একবার হযরত আবু ’উবাইদা ও হযরত ’উমার রা. কায়সকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করে; কিন্তু কায়স তাঁদের কথার প্রতি মোটেও কর্ণপাত করেননি। তাঁরা কায়সের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট অভিযোগ করেন। তখন রাসূল সা. বলেনঃ কায়স তো দানশীল পরিবারের সন্তান। (আল-ইসতীয়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৭) সা’দের পিতা ’উবাদা ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তরসূরী। পিতার মত একইভাবে জীবন কাটিয়ে ছেলে সা’দের জন্য ক্ষমতা ও নেতৃত্বের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে যান। ছেলেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলেন। ‘সা’দ’ সেই জাহিলী আরবেই ‘কামিল’ উপাধি লাভ করেন। কারণ, তৎকালীন আরবে হাতে গোনা যে ক’জন লোক আরবী লিখতে জানতো, তিনি ছিলেন তাদের একজন। তাঁর আরবী লেখা ছিল চমৎকার। তাছাড়া তিনি ছিলেন সে সময়ের আরবের একজন শ্রেষ্ঠ সাঁতারু ও দক্ষ তীরন্দাজ। আর এ বিদ্যাগুলি যারা বিশেষভাবে রফ্ত করতো আরববাসী শুধু তাদেরকেই ‘কামিল’ উপাধি দিত। (দ্রঃ তাহজীব আত-তাহজীব- ৩/৪৭৫; আল ইসাবা- ২/৩০; তাবাকাত- ৩/৬১৩) শেষ ’আকাবার বাই’য়াতের সময় সা’দ ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে বনী সায়িদার ‘নাকীব’ (দায়িত্বশীল) নিয়োগ করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫০; উসুদুল গাবা- ২/২৮৩) তাঁকে উঁচু স্তরের সাহাবী গণ্য করা হতো। বুখারী শরীফে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘ওয়া কানা জা কিদামিন ফিল ইসলাম’- ইসলামে তিনি ছিলেন প্রথম স্তরের মানুষ। ’আকাবার শেষ বাই’য়াত যেভাবে সম্পন্ন হয়, আনসারদের যে সংখ্যক মানুষ তাতে অংশগ্রহণ করেন এবং যে সকল গুরুত্বপূর্ণ শর্তের ওপর তা অনুষ্ঠিত হয় তাতে তা গোপন থাকা সম্ভব ছিল না। যদিও তা রাতের অন্ধকারে গোপনে হয়েছিল। কারণ, রাসূলকে সা. নিয়ে কুরাইশদের চিন্তার অন্ত ছিল না। তারা সর্বক্ষণ তাঁর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতো। সুতরাং রাতের যে লগ্নে রাসূল সা. ’আকাবার মদীনা থেকে আগত লোকদের নিকট থেকে বাই’য়াত গ্রহণ করেন, ঠিক সেই সময়ে; কেউ একজন মক্কার ‘জাবালে আবু কুরাইসের ওপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল; ‘দেখ সা’দ যদি মুসলমান হয়ে যায় তাহলে মুহাম্মাদ একেবারেই নির্ভীক হয়ে যাবে।’ (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৭) এ আওয়ায কুরাইশদের কানে পৌঁছালেও প্রথমে তারা বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। তারা সা’দ বলতে ‘কাদায়া’ ও তামীম গোত্রের সা’দ নামের লোকগুলিকে বুঝেছিল। পরের রাতে ঐ পাহাড় থেকে আবার একটি কবিতার কিছু চরণ আবৃত্তি করতে শোনা গেল। তাতে পরিষ্কার ভাবে সা’দের নাম ও পরিচয় ছিল। কুরাইশরা দারুণ বিস্ময়ের মধ্যে পড়ে গেল। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তারা ‘দারুন নাদওয়া’ বা পরামর্শ গৃহে সমবেত হলো। তারা মদীনার আউস গোত্রের সর্দার আবদুল্লাহ ইবন ’উবাই ইবন সুলুলের সাথে কথা বললো, কিন্তু সে বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করলো। কুরাইশরা চারিদিকে গোয়েন্দা নিয়োগ করে যার যার মত বাড়ীতে ফিরে গেল। আর মদীনাবাসী মুসলমানরা ‘ইয়াজজ’- এর পথে স্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করলো। ইবন ইসহাক ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ‘নাকীবগণ ’আকাবার রাতে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত শেষ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কেউ কেউ মক্কা ছেড়ে স্বদেশের পথ ধরলো। এদিকে বাই’য়াতের কথা লোকমুখে প্রচার হয়ে গেল। খোঁজ-খবর নিয়ে কুরাইশরা বুঝতে পারলো, ব্যাপারটি সত্য। তারা বাই’য়াতকারীদের ধরার জন্য বেরিয়ে পড়লো এবং সু’দ ইবন ’উবাদা ও আল মুনজির ইবন ’উমারকে পেয়ে গেল। তবে সা’দকে ধরতে পারলেও আল মুনজির ইবন ’উমার পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। সা’দের মাথার চুল ছিল লম্বা। তারা সেই চুল ধরে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে চললো। সা’দ বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তাদের হাতে বন্দী। কুরাইশদের কয়েকজন লোক আমার কাছে আসলো। তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল সুদর্শন যুবককে দেখে আমি ভাবলাম, যদি এ সম্প্রদায়ের কারও মধ্যে ভালো কিছু থাকে তাহলে হয়তো এর মধ্যেই আছে। সে ছিল সুহাইল ইবন ’আমর। কিন্তু সে আমার আশার মুখে ছাই দিয়ে কাছে এগিয়ে এসে আমার গায়ে জোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল। আমি তখন মনে মনে বললাম; আল্লাহর কসম! এরপর এ সম্প্রদায়ের অন্য কারও কাছে ভালো কিছু আশা করা বৃথা। একজন প্রশ্ন করলো; তুমি কি মুহাম্মাদের দীন কবুল করেছ? আমি বললাম; হাঁ, কবুল করেছি। তখন তাঁরা আমাকে দড়ি দিয়ে কষে বাঁধলো। এসময় একজন আমার উরুতে টোকা মেরে বললোঃ কুরাইশদের কারও সাথে তোমার কি কোন চুক্তি আছে? বললামঃ হাঁ আছে। মুতয়িম ইবন ’আদী ও আল-হারিস ইবন উমায়্যা যখন আমাদের আবাসভূমিতে যায়, আমি তাদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। সে বললোঃ তোমার বাপ নিপাত যাক। শিগগিরই তাদের নাম ধরে জোরে জোরে সাহায্য চাও। আমি তাই করলাম। লোকটি ছুটে তাদের দু’জনের কাছে গিয়ে বললোঃ কুরাইশদের কয়েক ব্যক্তি যে লোকটিকে বন্দী করে মারধোর ও অপমান করছে সে তোমাদের দু’জনের নাম ধরে ডাকছে। সে বলছে, তোমাদের সাথে নাকি তার মৈত্রী চুক্তি আছে। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ লোকটি কে? সে বললোঃ সা’দ ইবন ’উবাদা। তারা বললোঃ সে সত্য বলেছে। তারপর মুতয়িম ইবন ’আদী ও আল হারিস ইবন উমায়্যা ছুটে এসে তাদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে মদীনার পথ ধরিয়ে দেয়।’ এই মুতয়িম ইবন আদী ছিলেন মক্কার এক অতি ভদ্র ও সম্মানিত ব্যক্তি। ইসলামের সূচনা পর্বে মক্কায় তিনি রাসূলকে সা. নানাভাবে সাহায্য করেছেন। আর যে ব্যক্তি তাকে খবর দিয়েছিল, সে ছিল আবুল বাখতারী ইবন হিশাম। যাইহোক, সা’দ এভাবে বন্দী হওয়ায় মদীনা অভিমুখী আনসারদের কাফেলায় দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তারা পরামর্শ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়, জীবনের ঝুঁকি থাকলেও মক্কায় ফিরে সা’দের সন্ধান নিতে হবে। এর মধ্যে সা’দকে ফিরে আসতে দেখা গেল। তারা তাঁকে সংগে করে সোজা মদীনার পথ ধরলো। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৫, ৮৬; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪, ২৫৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১৫০, ১৫১; তাবাকাত- ১/১৫০) সা’দের বন্দীর বিষয়টি নিয়ে কুরাইশ পক্ষের কবি দারবার ইবনুল খাত্তাব ইবন মিরদাস একটি কবিতা রচনা করে। কবি হাস্সান ইবন সাবিত তার জবাবে বড় একটি কবিতা লেখেন। তাতে সা’দের প্রশংসা ও কুরাইশদের নিন্দা করা হয়েছে। আনসাবুল আশরাফ ও সীরাতু ইবন হিশামসহ বিভিন্ন গ্রন্থে তার কিছু অংশ সংকলিত হয়েছে। (দ্রঃ আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১৫০, ১৫১) উপরোক্ত ঘটনার কয়েক মাস পর রাসূল সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। এ উপলক্ষে মদীনার প্রতিটি অলি-গলিতে আনন্দ উৎসবের বন্যা বয়ে যায়। তিনি আবু আইউবের বাড়ীতে পৌঁছতেই সেখানে হাদিয়া তোহফা আসা শুরু হয়ে যায়। হযরত সা’দ তাঁর বাড়ী থেকে বড় এক পাত্র সারীদ ও ’উরাক পাঠিয়ে দেন। (তাবাকাত- ১/১৬১) হিজরাতের কয়েক মাস পর থেকে ইসলামী আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করতে থাকে। হিজরাতের দ্বাদশ মাস সফরে হযরত রাসূলে কারীম সা. কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য ছোট্ট একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে যান। এটাকে ‘ওয়াদ্দান’ অভিযানও বলা হয়। এ বাহিনীতে কোন আনসার মুজাহিদ ছিল না। এ সময় পনেরোটি রাত রাসূল সা. মদীনার বাইরে ছিলেন। তিনি সা’দ ইবন ’উবাদাকে স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মদীনায় রেখে যান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৮৭; তাবাকাত- ১/৩) হিজরী দ্বিতীয় সনে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে হযরত সা’দের অংশ গ্রহণের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের দারুণ মতভেদ আছে। ইয়াকুব ইবন সুফইয়ান, মূসা ইবন ’উকবা, খলীফা ইবন খায়্যাত, আল ওয়াকিদী, আল মাদায়িনী, ইবনুল কালবী প্রমুখ সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁকে বদরী যোদ্ধা বলে উল্লেখ করেছেন। আবু আহমাদ তাঁর ‘আল কুনা’ গ্রন্থে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বদরে অংশগ্রহণ করে। (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৩; আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৬; তারীখ ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪, ৮৫) পক্ষান্তরে ইবন ইসহাক তাঁকে বদরী যোদ্ধাদের মধ্যে উল্লেখ করেননি। ইবন সা’দ ও বালাজুরী বলেনঃ সা’দ বদরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু যাত্রার প্রাক্কালে তাঁকে কুকুরে কামড়ায়। এ কারণে তিনি যেতে পারেননি। রাসূল সা. তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ যদিও সা’দ বদরে হাজির হয়নি, তবে সে যাওয়ার জন্য আগ্রহী ছিল। কোন কোন বর্ণনা মতে রাসূল সা. তাঁকে বদরের গনীমতের অংশ দিয়েছিলেন। ইবন আসাকির বলেন, এটা সর্বসম্মত ও প্রমাণিত নয়। (দ্রঃ তাকরীবুত তাহজীব- ১/২৮৮; উসুদুল গাবা- ২/২৮৩, আল ইসাবা- ২/৩০; তারীখ ইবন ’আসাকির ৬৮৪, ৮৫) ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম সা’দের বদরে অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। তবে এটাই সঠিক যে, তিনি বদরে শরীক হননি। আল্লামা ইবন হাজার ’আসকিলানীর মতও এটাই। তিনি ইমাম মুসলিমের ভাষা দ্বারা নিজ মতের স্বপক্ষে খুব সূক্ষ্ণভাবে প্রমাণ গ্রহণ করেছেন। (দ্রঃ ফাতহুল বারী- ৫/২২৪) বদর যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের যুদ্ধগুলির মধ্যে প্রথম এবং সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। এর পূর্বে যদিও চারটি গাযওয়া ও চারটি সারিয়্যা সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোন আনসারী সৈনিক অংশগ্রহণ করেনি। এর নানা কারণ থাকতে পারে। একটি এই হতে পারে যে, ’আকাবার বাই’য়াতের সময় আনসারদের পক্ষ থেকে শুধু এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, যারা মদীনা আক্রমণ করবে শুধু তাদেরকেই তারা প্রতিরোধ করবে। মদীনার বাইরে কোন সংঘাত হলে সে বিষয়ে তাদের ভূমিকা কী হবে তার কোন উল্লেখ তাতে ছিল না। আরেকটি কারণ এই হতে পারে যে, রাসূল সা. প্রথমত মদীনার মূল বাসিন্দাদেরকে কুরাইশদের শত্রু হিসেবে দাঁড় করাতে চাননি। অতএব রাসূল সা. যখন বদরে যাত্রার মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন তখন আনসারদের সথে পরামর্শ করা ও তাদের মতামত গ্রহণ প্রয়োজন মনে করেন। মদীনার সকল গোত্রের লোকদের একটি বৈঠকে ডাকা হলো। সেখানে যুদ্ধের বিষয়টি উঠলো। হযরত আবু বকর রা. উঠে তাঁর মতামত পেশ করলেন। হযরত ’উমার রা. কিছু বলার জন্য উঠলেন, কিন্তু রাসূল সা. তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন না। সেই বৈঠকে হযরত সা’দ ইবন ’উবাদাও ছিলেন। তিনি বুঝলেন, রাসূল সা. তাঁদের মতামত চাচ্ছেন। তিনি বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল। যার হাতে আমার জীবন, তাঁর জাতের কসম, আপনি যদি আমাদেরকে সমুদ্র অভিযানের নির্দেশ দেন, আমরা তা দলিত মথিত করে ছাড়বো। আর যদি শুকনো মাটিতে অভিযানের আদেশ দেন তাহলে ইয়ামনের ‘বারকে গিমাদ’ পর্যন্ত উট ছুটিয়ে নিয়ে যাব। (সহীহ মুসলিম- ২/৮৪; আল-বিদায়া- ৩/২৬৩; কানযুল ’উম্মাল- ৫/২৭৩; হায়াতুস সাহাবা- ১/৪২৪) উল্লেখিত বর্ণনার ভিত্তিতে সীরাত লেখকদের অনেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তিনি বদরে যোগদান করেছিলেন। অথচ সহীহ মুসলিমের এ বর্ণনাতেই উল্লেখ আছে সিরিয়া থেকে আবু সুফইয়ানের বণিজ্য কাফিলা আসার খবর যখন রাসূলুল্লাহ সা. পেলেন তখন তিনি পরামর্শ করেন। মূলতঃ এ বাণিজ্য কাফেলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে রাসূল সা. মদীনা থেকে বের হন; যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নয়। (মুসলিম- ২/৮৪) কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, মক্কা থেকে কুরাইশ বাহিনী বদরের দিকে এগিয়ে আসছে। আর তখনই রাসূল সা. যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ কারণে মদীনাবাসীদের অনেকেই বুঝতে পারেননি যে, রাসূল সা. বদরে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন। তাই তাদের অনেকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মদীনা থেকে বের হননি। আর তাদেরই একজন সা’দ ইবন ’উবাদা। (আনসাবূল আশরাফ- ১/২৮৮) বদরের পর উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মক্কার পৌত্তলিক শক্তি এমন তোড়জোড় সহকারে ধেয়ে আসে যে মদীনায় একটি ভীতির সঞ্জার হয়। গোটা মদীনায় সারা রাত পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। মদীনার কয়েকজন শ্রেষ্ঠ সন্তান যথা সা’দ ইবন মু’য়াজ, ’উসাইদ ইবন হুদাইর প্রমুখের সাথে তিনিও অস্ত্র হাতে রাসূলুল্লাহর সা. গৃহের হিফাজত দাঁড়িয়ে যান। তাঁরা সারা রাত মদীনা পাহারা দেন। শাওয়ালের ৬ তারিখ জুম’আর দিন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা. আনসার গোত্র খাযরাজের পতাকাটি সা’দ ইবন ’উবাদার হাতে তুলে দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৪, ৩১৭) প্রস্তুতি শেষ হলে রাসূল সা. ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে বের হন। আউস ও খাযরাজ গোত্রের দুই নেতা সা’দ ইবন মুদয়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদা নিজ নিজ গোত্রের ঝান্ডা হাতে নিয়ে আগে আগে চললেন। মধ্যে রাসূল সা. এবং ডানে বাঁয়ে অন্যান্য আনসার-মুহাজির মুজাহিদগণ। এমন শান শওকাতে হযরত রাসূলে কারীমকে সা. বের হতে দেখে কাফির ও মুনাফিকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। শনিবার উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে যুদ্ধ শুরু হলো। সংঘর্ষ এমন তীব্র ছিল যে, এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো। তবে রাসুল সা. ময়দানে অটল থাকলেন। এ সময় মাত্র ১৪ ব্যক্তি নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. সামনে থেকে কাফিরদের হটিয়ে দেন। অনেকের মতে ঐ ১৪ জনের একজন সা’দ ইবন ’উবাদা। (যারকানী- ২/৪০) হিজরী ৫ম সনে সংঘটিত হয় বনী মুসতালিক বা মুরাইসী’র যুদ্ধ। এতে আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রের ঝান্ডা তাঁরই হাতে অর্পণ করা হয়। (তাবাকাত, মাগাযী অধ্যায়- ৪৫) এ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে উম্মুল মুমিনীন হযরত ’আয়িশাকে রা. কেন্দ্র করে একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে। মুনাফিকরা সুযোগ পেয়ে যায়। তারা হযরত ’আয়িশার রা. চরিত্র সম্পর্কে কিছু অশোভন উক্তি করে এবং তাতে কিছু সরল মুসলমানও জড়িয়ে পড়ে। এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় রাসূল সা. ভীষণ কষ্ট পান এবং একটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। ইসলামের ইতিহাসে ঘটনাটি ‘ইফ্ক’ বা বানোয়াট কাহিনী নামে পরিচিত হয়েছে। এই ‘ইফ্ক’- এর ঘটনার এক পর্যায়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল আমার পরিবারের প্রতি মিথ্যা কলঙ্ক আরোপ করেছে। এতে আমি দারুণ কষ্ট পেয়েছি। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে এর প্রতিবিধান করতে পারে? সাথে সাথে আউস গোত্রের নেতা সা’দ ইবন মু’য়াজ বলে ওঠেন; আমি প্রস্তুত। আপনি যে হুকুম দেবেন তা পালন করবো। সে যদি আউস গোত্রের লোক হয় এখনই তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে। আর খাযরাজ গোত্রের হলে আপনার নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত আছি। উল্লেখ্য যে প্রাচীন কাল থেকে আউস ও খাযরাজ এই দুই গোত্রের মধ্যে শত্রুতা ও রেষারেষি চলে আসছিল। প্রাক-ইসলামী যুগে তাদের মধ্যে বড় ধরনের অনেক যুদ্ধও হয়েছিল। ইসলাম তাদের সেই বৈরিতা দূর করে দেয়। তা সত্ত্বেও তাদের অন্তরে পূর্ব শত্রুতার কিছুটা রেশ বিদ্যমান ছিল। এ কারণে সা’দ ইবন মু’য়াজের কথায় খাযরাজ গোত্রের নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা অপমান বোধ করেন। কথাটি তিনি সহজভাবে নিতে পারলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওহে সা’দ ইবন মু’য়াজ! তুমি ঠিক বলোনি। তোমরা কক্ষনো খাযরাজকে হত্যা করতে পারবে না, তাদেরকে পরাভূত করতেও সক্ষম হবে না। যদি তোমার নিজ গোত্র আবদুল আশহালের ব্যাপারে হতো তাহলে তোমার মুখ থেকে এমন কথা বের হতো না। উসাউদ ইবন হুদাইর ছিলেন সা’দ ইবন মু’য়াজের খালাতো বা মামাতো ভাই। তিনি সা’দ ইবন ’উবাদাকে লক্ষ্য করে বললেন; আপনি এসব কী বলছেন। রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশ পেলে আমরা অবশ্যই তা পালন করবো। তারপর দুই গোত্র উত্তেজিতভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। রাসূল সা. মিম্বরে ছিলেন। তিনি উত্তেজনা দূর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। (ফাতহুল বারী- ৮/৩২; সহীহুল বুখারী- ৭/৩৩৫; সীয়ারে আনসার- ২/৩৩) হিজরী ৫ম সনে খন্দক যুদ্ধের সময় মদীনার মুসলমানদের অবস্থা যখন অতি সঙ্কটজনক তখন হযরত রাসূলে কারীম সা. গাত্ফান গোত্রের দুই নেতা ’উয়াইনা ইবন হিস্ন ও আল হারিস ইবন ’আউফের সাথে একটি চুক্তি করার ইচ্ছা করলেন। তিনি তাদের সাথে এই শর্তে চুক্তি করতে চাইলেন যে, মদীনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশের বিনিময়ে তারা কুরাইশদের সাথে যোগ দিয়ে মদীনা আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে। রাসুল সা. পরামর্শের জন্য সা’দ ইবন মু’য়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদাকে ডাকলেন। তাঁরা উপস্থিত হলে রাসূল সা. বললেন; আমি ’উয়াইনা ও আল হারিসকে মদীনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ এই শর্তে দিতে চাই যে, তারা কুরাইশদের পক্ষ ত্যাগ করে ফিরে যাবে; কিন্তু তারা অর্ধেক দাবী করছে। এ ব্যাপারে তোমাদের মত কী? সা’দ ইবন ’উবাদা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ যদি ওহীর নির্দেশ হয় তাহলে তো দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। আর তা যদি না হয় তাহলে তাদের দাবীর জবাব তো শুধু তরবারি। আল্লাহর কসম! আমরা তাদেরকে ফলের পরিবর্তে তরবারির ধার উপহার দেব। রাসূল সা. বললেনঃ ‘ওহী নয়। ওহী হলে তো তোমাদের সাথে পরামর্শের কোন প্রশ্নই উঠতো না। সা’দ বললেনঃ ‘তাহলে তরবারির মাধ্যমে তাদেরকে জবাব দিতে হবে। জাহিলী যুগেও এমন অপমান আমরা চিন্তা করিনি। আর এখন তো আল্লাহ তা’য়ালা আপনার মাধ্যমে হিদায়াত দান করে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। এখন দেব আমরা আমাদের ফসলের একাংশ তাদেরকে?’ রাসূল সা. তাঁদের দুই জনের সাথে আলোচনা করে খুব খুশী হলেন এবং তাঁদের জন্য দু’আ করলেন। তারপর সা’দ ইবন উবাদা খসড়া চুক্তি পত্রটি হাতে নিয়ে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। (দ্র্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২১-২২৩; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৪৬, ৩৪৭; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৪, ৪৫) এই খন্দক যুদ্ধেও আনসারদের ঝান্ডা সা’দ ’উবাদার হাতে ছিল। মদীনার ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের অবরোধের সময় সা’দ ইবন উবাদা নিজ খরচে মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে খেজুর বন্টন করেন। তেমনিভাবে বনু কুরাইজার অবরোধের সময় তিনি মুসলিম সৈনিকদের রসদপত্র সরবরাহ করেন। (দারিয়া-ই-মা’খারিফ ইসলামিয়্যা- ১১/৩২) হিজরী ৬ষ্ঠ সনে রাসূল সা. ‘গাবা’ অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি সা’দকে ৩০০ সদস্যের একটি বাহিনীর অফিসার বানিয়ে মদীনার নিরাপত্তহার দায়িত্বে রেখে যান। ওয়াকিদী বর্ণনা করেনঃ গাবা অভিযানের সময় সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর গোত্রের তিন শো লোক নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. না ফেরা পর্যন্ত পাঁচ রাত্রি মদীনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাছাড়া রাসূল সা. যখন ‘জ্বিকারাদ’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন তখন সাহায্যের জন্য মদীনায় খবর পাঠান। হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা দশটি উট বোঝাই করে খেজুর পাঠান। রাসূলুল্লাহর সা. এই বাহিনীতে সা’দের ছেলে কায়সও ছিলেন একজন অশ্বারোহী সৈনিক। তিনি পিতা প্রেরিত উট ও খেজুর যখন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পেশ করলেন তখন তিনি বললেনঃ হে কায়স! তোমার পিতা তোমাকে ঘোড় সওয়ার করে পাঠিয়েছেন, মুজাহিদদের শক্তিশালী করেছেন এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মদীনা পাহারা দিয়েছেন। তারপর তিনি দু’আ করেনঃ হে আল্লাহ! সা’দ ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহম করুন! সা’দ ইবন ’উবাদা কতই না ভালো মানুষ। তখন খাযরাজ গোত্রের লোকেরা বলে ওঠেঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি আমাদের খান্দানের লোক, আমাদের নেতা এবং নেতার ছেলে। (তারীখে ইবন আসাকির- ৬/৮৮; তাবাকাতঃ মাগাযী- ৫৮) হিজরী ৭ম সনে খাইবার যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীতে তিনটি ঝান্ডা ছিল। তার একটি ছিল সা’দ ইবন ’উবাদার হাতে। (তাবাকাতঃ মাগাযী- ৭৭) তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূল সা. সাহাবায়ে কিরামের নিকট বস্তুগত সাহায্যের আবেদন জানালে অন্যদের মত সা’দ ইবন ’উবাদাও তাঁর হাতে বিপুল অর্থ তুলে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪২১; দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ১১/৩২) মক্কা বিজয়ের দিন খোদ রাসূলুল্লাহর সা. ঝান্ডাটি হযরত সা’দের হাতে ছিল। মুসলিম সৈনিকদের একটি দল ‘কাদায়া’র দিক দিয়ে শহরে প্রবেশ করছিল। আবু সুফইয়ান হযরত ’আব্বাসের সাথে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি এর আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আনসারদের একটি দলের পুরোভাগে ছিলেন সা’দ ইবন ’উবাদা। তাদের দৃপ্ত ভঙ্গিতে চলা দেখে আবু সুফইয়ানের দু’ চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তিনি ’আব্বাসকে জিজ্ঞেস করেনঃ এ কারা? আব্বাস জবাব দিলেনঃ আনসার। এদের কমান্ডার সা’দ ইবন ’উবাদা। ঝান্ডা তাঁরই হাতে। সা’দ আবু সুফইয়ানের কাছাকাছি এসে তাঁকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে বলে ওঠেন, ‘দেখবে আজ কেমন তুমুল যুদ্ধ হয়। আজ কা’বা হালাল (রক্তপাত বৈধ) হয়ে যাবে।’ একথা শুনে আবু সুফইয়ানের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়। তিনি ’আব্বাসকে বলেন, ‘আজ তো তুমুল লড়াই হবে।’ সা’দের বাহিনী অতিক্রমের পরই রাসূলুল্লাহর সা. দলটি উপস্থিত হয়। তাঁকে দেখে আবু সুফইয়ান চেঁচিয়ে বলে উঠেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার সম্প্রদায়ের প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ আপনাকে দয়ালু ও সৎকর্মশীল করে সৃষ্টি করেছেন। সা’দ আমাকে ভয় দেখিয়ে গেছে। আজ নাকি ঘোরতর যুদ্ধ হবে, কুরাইশদের বিনাশ ঘটবে। আবু সুফইয়ানের কথা সমর্থন করে আরও কয়েকজন একই কথা বললেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে হযরত ’উমার সা’দের কথা শুনে তা রাসূলকে সা. অবহিত করেন। হযরত ’উসমান ও হযরত ’আবদুর রহমান ইবন ’আউফ বললেনঃ ‘আমাদের ভয় হচ্ছে, সা’দের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে না ওঠে।’ দার্রার ইবন খাত্তাব আল-ফিহ্রী একটি কবিতা আবৃত্তিও করলেন। এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন, রাসূলুল্লাহর সা. সামনে গিয়ে কবিতার মাধ্যমে ফরিয়াদ কর। দার্রারের সেই সব কবিতার অংশবিশেষ ‘আল-ইসতী’য়াব’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তাঁর একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট কুরাইশরা এমন সময় আশ্রয় নিয়েছে যখন তাদের আর কোন আশ্রয় স্থল নেই, আর দুনিয়া প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও যখন তাদের জন্য শংকীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং আসমানের আল্লাহ তাদের শত্রু হয়ে গেছে। সা’দ মক্কাবাসীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছে।’ কবিতা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ ‘সা’দ ঠিক বলেনি। আজ কা’বার সম্মান আরও বৃদ্ধি পাবে। তার গায়ে গিলাফ চড়ানো হবে।’ তিনি আলীকে রা. বললেন, ‘তুমি ছুটে যাও। সা’দের হাত থেকে ঝান্ডাটি নিয়ে তার ছেলে কায়সের হাতে দাও। আলী ছুটে গিয়ে ঝান্ডাটি চাইলেন। সা’দ তা দিতে অস্বীকার করে বললেন, সত্যিই যে রাসূল সা. তোমাকে পাঠিয়েছেন তার প্রমাণ কি? রাসূল সা. তাঁর পাগড়ীটি পাঠালেন। তখন সা’দ ঝান্ডাটি নিজের ছেলের হাতে তুলে দিলেন। কিন্তু যে আশঙ্কা সা’দকে নিয়ে ছিল, একই আশঙ্কা তাঁর ছেলেকে নিয়েও দেখা দিল। আবেদন জানানো হলোঃ সা’দের ছেলে কায়সের হাত থেকে ঝান্ডাটি অন্য কারও হাতে দেওয়া হোক। তখন রাসূল সা. ঝান্ডাটি নিয়ে যুবাইর ইবনুল ’আওয়ামের হাতে তুলে দেন। সহীহ বুখারীতে যে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহর সা. ঝান্ডা হযরত যুবাইর ইবনুল ’আওয়ামের হাতে ছিল, তার তাৎপর্য এটাই। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪০৬, ৪০৭; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; হায়াতুস সাহাবা- ১/১৬৯; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৩৯; বুখারী- ২/৬১৩; ফাতহুল বারী- ৮/৭) মক্কা বিজয়ের পর হুনাইন অভিযান পরিচালিত হয়। এতে খাযরাজ গোত্রের ঝান্ডা সা’দের হাতে ছিল। (তাবাকাতঃ মাগাযী- ১০৮) উল্লেখিত যুদ্ধগুলি ছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় উপস্থিতির পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ছোট-বড় যত যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলিতে সা’দ অংশ গ্রহণ করেছিলেন, প্রতিটি অভিযানেই তিনি ছিলেন আনসারদের পতাকাবাহী। হিজরী ১১ সনে হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাত হয়। প্রাচীন কাল থেকে মদীনার মালিকানা ছিল আনসারদের। ইসলামের সূচনা পর্ব থেকেই তারা রাসূলকে সা. সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছিল। যে সময় ইসলামের কোন আবাসভূমি ছিল না, রাসূল সা. ব্যাকুল হয়ে একটি আশ্রয় খুঁজছিলেন, কুরাইশদের ভয়ে যখন আরবের কোন একটি গোত্র তাঁকে আশ্রয় দিতে দুঃসাহস করেনি তখন আনসারদের ৭২/৭৫ জনের একটি দল মক্কায় এসে আরব-আজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শর্তে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’যাত (শপথ) করেন এবং সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে রাসূলকে সা. মদীনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবনকালে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তাতে জীবন ও সম্পদ কুরবানীর দিক দিয়ে আনসাররা ছিল সকলের অগ্রগামী। হযরত কাতাদা বলতেন, আরব গোত্রসমূহের মধ্যে কোন একটি গোত্র আনসারদের সমসংখ্যক শহীদ উপস্থাপন করতে পারবে না। আমি আনাসের নিকট শুনেছি, উহুদে সত্তর জন, বীরে মা’উনায় সত্তর জন এবং ইয়ামামায় সত্তর জন আনসার শাহাদাত বরণ করেন। (বুখারী- ২/৫৮৪; সীয়ারে আনসার- ২/২৭) তাছাড়া কুরআনের বহু আয়াত এবং রাসূলুল্লাহর সা. বহু হাদীসে আনসারদের অনেক ফজীলাত ও মর্যাদা ঘোষিত হয়েছে। এসব কারণে তাদের অন্তরে খিলাফতের নেতৃত্বলাভ করার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হওয়া ছিল অতি স্বাভাবিক। মদীনার আনসারগণ সেই প্রাচীনকাল থেকে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্র দু’টি আউস ও খাযরাজ। লোকসংখ্যা ও নেতৃত্বের দিক দিয়ে খাযরাজ গোত্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে একটু বেশী বরেণ্য। এর নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা. মনোনীত দ্বাদশ নাকীবের অন্যতম। অপর দিকে সা’দ ইবন মু’য়াজ ছিলেন আউস গোত্রের নেতা। তবে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবনকালে উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায় ইনতিকাল করেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের সময় সা’দ ইবন ’উবাদা মদীনার আনসার সম্প্রদায়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। সা’দ ইবন ’উবাদার বাড়ীটি ছিল মদীনার বাজার সংলগ্ন। তাঁর ঘরের সাথেই ছিল একটি ছাউনী। এর মালিকানা ছিল খাযরাজ গোত্রের বনী সায়িদা শাখার লোকদের। এ জন্য তা ‘সাকীফা বনী সায়িদা’ নামে প্রসিদ্ধ। এটাকে আনসাররা মক্কার ‘দারুন নাদওয়ার’ মত পরামর্শ গৃহ হিসাবে ব্যবহার করতো। হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে আউস ও খাযরাজ গোত্রের বিশিষ্ট আনসারগণ উক্ত সাকীফায় সমবেত হলেন। সা’দ উবন ’উবাদা তখন ভীষণ অসুস্থ। রোকেরা তাঁকেও ধরাধরি করে মঞ্চে এনে বসিয়ে দিল। তিনি বালিশে হেলান ও কাপড় মুড়ি দিয়ে বসলেন। তাদের এই সমাবেশের উদ্দেশ্য, আনসারদের মধ্য থেকেই রাসূলুল্লাহর সা. একজন খলীফা নির্বাচন। সা’দ ইবন ’উবাদা সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দিতে চাইলেন। তিনি নিকটতম লোকদের বললেন, আমার আওয়াজ হয়তো সবার কানে পৌঁছবে না। আমি যা বলবো তোমরা তা জোর গলায় সবার কানে পৌঁছে দেবে। তারপর তিনি আনসারদের মর্যাদা, কার্যাবলী, রাসূলুল্লাহর সা. সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদি দিক তুলে ধরে একটি ভাষণ দান করেন। ভাষণটির সারকথা ছিল এরূপঃ ‘আনসারদের যে সম্মান এবং দীনের ক্ষেত্রে যে অগ্রগামিতা তা আরবের আর কোন গোত্রের নেই। রাসূল সা. দশ বছরের বেশী সময় ধরে নিজ গোত্রে ছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনেনি। যাঁরা শুনেছিলেন তাঁদের সংখ্যাও অতি নগণ্য। তাঁদের না ছিল রাসূলকে সা. নিরাপত্তা দানের শক্তি, আর না ছিল তাঁদের দীনের আওয়াজ বুলন্দ করার ক্ষমতা। তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা বিধানেই ছিল অক্ষম। আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের সম্মানিত করতে চাইলেন। তাই তিনি তোমাদেরকে এক সাথে দু’টি উপাদান সরবরাহ করলেন। তোমরা ঈমান আনলে, রাসূল সা. ও তাঁর সাহাবাদের আশ্রয় দিলে এবং নিজেদের থেকেও আল্লাহর রাসূলকে সা. প্রিয় মনে করলেও তাঁর বিরুদ্ধেবাদীদের সাথে জিহাদ করলে। শেষ পর্যন্ত গোটা আরব ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নেয় এবং নিকট ও দূরের সকলেই মস্তক অবনত করে দেয়। সুতরাং এই বিজিত অঞ্চলের সবটুকু তোমাদের তলোয়ারের নিকট দায়বদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সা. আজীবন তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন এবং ওফাতের সময় সন্তুষ্ট চিত্তে বিদায় নিয়েছেন। এ সকল কারণে এ খিলাফতের একমাত্র হকদার তোমরা এবং এ ব্যাপারে আর কেউ তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেনা।’ তাঁর ভাষণ শেষ হলে উপস্থিত আনসারমন্ডলী সমবেত কণ্ঠে বলে উঠলো, আপনার কথা খুবই যুক্তিসম্মত। আমাদের মতে এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অধিকতর যোগ্য আর কেউ নেই। আমরা আপনাকেই খলীফা বানাতে চাই। তারপর নিজেদের মধ্যে আলোচনা চললো। একজন বললো, যদি মুহাজিররা মানতে অস্বীকার করে তাহলে তাদের কি জবাব দেওয়া যাবে? অন্য একজন তাকে বললো, আমরা তখন তাদেরকে বলবো, তাহলে আমীর দু’জন হবে- একজন আমাদের আর একজন তোমাদের। এছাড়া আর কিছুতেই আমরা রাজী হবো না। তার একথা শুনে সা’দ মন্তব্য করেনঃ এ হলো প্রথম দুর্বলতা। এদিকে আনসারদের এ সমাবেশের কথা হযরত ’উমারের রা. কানে পৌঁছে গেল। তিনি হযরত আবু বকরকে রা. সংগে নিয়ে সাকীফা বনী সায়িদার সমাবেশে উপস্থিত হলেন। হযরত ’উমারের রা. কঠোর প্রকৃতি আনসারদের উত্তেজিত করে তুললো। আনসারী বক্তারাও বারবাপর উত্তেজনামূলক বক্তৃতা করছিল। হযরত ’উমার রা. এবং তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি, এমন কি তরবারির ভয়-ভীতি দেখানো পর্যন্ত পৌঁছে। অবস্থা বেগতিক দেখে ধীর স্থির প্রকৃতির মানুষ হযরত আবু বকর রা. ’উমারকে রা. নিবৃত করেন এবং নিজেই এক আবেগময় ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সেই বিখ্যাত বাণী- ‘আল আয়িমম্মাতু মিন কুরাইশ’- ইমাম হবে কুরাইশদের ভিতর থেকে- উল্লেখ করেন। ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সমাবেশের রূপ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তারপর হযরত ’উমার রা. দাঁড়িয়ে আবু বকরের রা. ফজীলাত ও মর্যাদা বর্ণনা করেন। সেই বর্ণনা শুনে আনসাররা চেঁচেয়ে বলতে থাকে- ‘না’উযুবিল্লাহ আন নাতাকাদ্দামা আবা বকর’- আবু বকরের আগে যাওয়ার ব্যাপারে আমরা আল্লাহর পানাহ চাই। ’উমারের ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে মুহাজিরদের মধ্য থেকে যথাক্রমে ’উমার, আবু ’উবাইদা এবং আনসারদের মধ্য থেকে খাযরাজ গোত্রের বাশীর ইবন সা’দ সর্বপ্রথম প্রথম আবু বকরের হাত স্পর্শ করে বা’ইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন। তারপর সমবেত জনতা বা’ইয়াতের উদ্দেশ্যে একযোগে দাঁড়িয়ে গেলে লোকেরা এই বলে চেঁচাতে শুরু করে যে, সাবধান! সা’দ যেন পায়ে পিষে না যায়। একথা শুনে ’উমার রা. বললেনঃ আল্লাহ তাকে পিষে ফেলুক। এমনিতেই সা’দ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় জর্জরিত হচ্ছিলেন। ’উমারের একথায় তিনি দারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে লোকদের বললেনঃ তোমরা আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। (দ্রঃ মুসনাদ- ১/২১; তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যা- ১/১৬৮, ১৬৯; তাবারীঃ হিজরী ১১ সনের ঘটনাবলী- ১৮৪৩; বুখারী- ২/১০১০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১২-১৮) আল্লামা যিরিক্লী ‘ফিল বুদয়ি ওয়াত তারীখ’ (৫/১৩২) গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানরা যখন আবু বকর রা. উদ্ধৃত হাদীস ‘আল-আয়িম্মাতু মিন কুরাইশ’ মেনে নিয়ে তাঁকেই খলীফা নির্বাচন করে তখন সা’দ বলেনঃ ‘লা ওয়াল্লাহ্! লা উবায়ি’উ কুরাশিয়্যাম আবাদা’- আল্লাহর কসম, না। আমি কক্ষণো কোন কুরাইশীর হাতে বা’ইয়াত করবো না। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৫) বেশ কিছু দিন খলীফা হযরত আবু বকর রা. তাঁকে কোন রকম ঘাঁটাঘাঁটি করলেন না। শেষে একদিন এক ব্যক্তিকে বলে পাঠালেন যে, সা’দ যেন এসে বাই’য়াত করে যান। সা’দ বাই’য়াত করতে সরাসরি অস্বীকার করলেন। হযরত ’উমার রা. খলীফাকে বললেন, তাঁর থেকে আপনি অবশ্যই বাই’য়াত নিন। সেখানে হযরত বাশীর ইবন সা’দ আল-আনসারীও ছিলেন। তিনি বললেন, একবার যখন তিনি বাই’য়াত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তখন আর কোন ভাবেই তাঁর থেকে বাই’য়াত নেওয়া যাবেনা। চাপাচাপি করলে রক্তারক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। তিনি রুখে দাঁড়ালে তাঁর পরিবার ও বংশের লোকেরাও তাঁর পাশে এসে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত গোটা খাযরাজ গোত্রই তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে যাবে। এভাবে একটি ঘুমন্ত ফিত্না জাগিয়ে তোলা উচিত হবে না। আমার মতে তাঁকে থাকতে দিন, একটি লোক কী আর করবে? বাশীরের এ মত সবাই পছন্দ করলেন। হযরত সা’দ রা. খলীফা হযরত আবু বকরের রা. খিলাফতের শেষ পর্যন্ত মদীনায় ছিলেন। অবশেষে মদীনা ছেড়ে শামে চলে যান এবং দিমাশ্কের নিকটবর্তী- ‘হাওরান’ নামক একটি উর্বর ও সবুজ স্থান বসবাসের জন্য নির্বাচন করেন। আমরণ সেখানেই বসবাস করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৮৯; তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৯০) হযরত সা’দের মদীনা ত্যাগের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, হযরত ’উমার রা. খলীফা হওয়ার পর বাই’য়াত থেকে দূরে থাকার জন্য একবার তাঁকে তিরস্কার করেন। জবাবে সা’দ বলেনঃ আপনার বন্ধু আবু বকর আমার কাছে আপনার চেয়ে বেশী পছন্দনীয় ছিলেন। আল্লাহর কসম! আপনার প্রতিবেশীত্ব আমাকে অতিষ্ট করে তুলেছে। ’উমার বলেনঃ কেউ তার প্রতিবেশীকে পছন্দ না করলে দূরে সরে যেতে পারে। এরপর সা’দ কালবিলম্ব না করে শামে চলে যান। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৫; তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪) হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। বিভিন্ন গ্রন্থে হিজরী ১১, ১৪ ও ১৫ সনের কথা উল্লেখ আছে। ইবন আসাকির হিজরী ১৪ সনটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন। (তারীখ- ৬/৯১) আবু ’উবাইদ কাসেম ইবন সাল্লামের মথে তিনি ‘হাওরানে’ মারা যান। এবং সেখানেই দাফন করা হয়। আর দিমাশ্কের ‘আল-মুনীহা’ নামক স্থানে তাঁর যে কবরের কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে ইবন আসাকির তা সঠিক বলে মনে করেননি। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৯১; আল-ইসতী’য়াব; টীকা আল-ইসাবা- ২/৪০; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪) হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। এ হত্যা সম্পর্কে নানা রকম বর্ণনা ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। বালাজুরী বলেনঃ সা’দ ইবন ’উবাদা শামে হিজরাত করেন এবং সেখানে নিহত হন। তিনি আবু বকরের হাতে বাই’য়াত করেননি। ’উমার রা. তাঁর কাছে একজন লোক পাঠান। তাঁকে বলে দেন তাঁকে বাই’য়াত করতে বলবে। যদি অস্বীকার করে তাহলে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। লোকটি শামে গেল এবং সা’দকে ‘হাওরানের’ একটি প্রাচীর বেষ্টিত উদ্যানে পেল। সে তাঁকে বাই’য়াত করতে বললো। তিনি বললেনঃ আমি কোন কুরাইশর হাতে বাই’য়াত করবো না। লোকটি বললোঃ তাহলে আমি আপনাকে হত্যা করবো। তিনি বললেনঃ আমাকে হত্যা করলেও আমি বাই’য়াত করবো না। লোকটি তখন বললোঃ তাহলে গোটা উম্মাত যাতে ঢুকেছে আপনি কি তার বাইরে? বললেন’ বাই’য়াতের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি তাদের বাইরে। লোকটি তখন তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে হত্যা করে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৮৯) ডঃ হামীদুল্লাহ বলেন, এটা চরমপন্থী শিয়াদের একটি মনগড়া কথা। (আনসাবুল আশরাফঃ টীকা- ১/২৫০) অন্য একটি বর্ণনা মতে, কেউ তাঁকে হত্যা করে গোসল খানায় ফেলে রাখে। বাড়ীর লোকেরা যখন দেখতে পায় তখন তাঁর প্রাণ স্পন্দন থেমে গেছে। তাঁর সারা দেহ নীল হয়ে যায়। ঘাতকের সন্ধান করেও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। শুধু দূর থেকে ভেসে আসা কবিতার একটি চরণ আবৃত্তির শব্দ শোনা যায়, যার অর্থ এরূপঃ ‘আমরা খাযরাজ নেতা সা’দ ইবন ’উবাদাকে হত্যা করেছি। আমরা দুইটি তীর নিক্ষেপ করেছি এবং তাঁর কলিজা ভেদ করতে ভুল করিনি।’ যেহেতু ঘাতকের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং শব্দ শোনা গেছে, এজন্য অনেকের ধারণা হয়েছিল যে, তাঁকে জ্বীনে হত্যা করেছে। (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৫; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৪০; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫০) হযরত সা’দের দুই স্ত্রী ছিল- গাযিয়্যা বিনতু সা’দ ইবন খলীফা ও ফুকাইহা বিনতু ’উবায়েদ ইবন দুলাইম। ফুকাইহা ছিলেন সা’দের চাচাতো বোন। তিনি সাহাবিয়্যাও ছিলেন। গাযিয়্যার গর্ভে সা’দের তিন ছেলে সা’ঈদ, মুহাম্মাদ ও আবদুর রহমান এবং ফুকাইহার গর্ভে দুই ছেলে কায়স, সাদুস ও এক মেয়ে উমামা জন্মগ্রহণ করেন। (তাবাকাত- ৩/৬১৩; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৫৩৮) হযরত সা’দের প্রচুর বিষয় সম্পত্তি ছিল, মদীনা ত্যাগের পর সবই ছেলে মেয়েদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেন। এক ছেলে তখন পেটে। তিনি তার অংশ দিয়ে যাননি। সে ভূমিষ্ট হওয়ার পর ’উমার রা. কায়সকে ডেকে বলেন, তুমি তোমার পিতার ভাগ বাতিল করে দাও। কারণ, মৃত্যুর পর তাঁর একটি ছেলে হয়েছে। কায়েস বললেন, আমার পিতার ভাগ ঠিক থাকবে। তবে ইচ্ছা করলে সে আমার অংশটি নিতে পারে। (আল-ইসতীয়াব- ২/৫৩৯) হযরত সা’দের বাড়ীটি ছিল মদীনার বাজারের শেষ প্রান্তে। সেখানে একটি মসজিদ ও কয়েকটি দুর্গও ছিল। বনু হারিস পল্লীতে তাঁর আর একটি বাড়ী ছিল। (খুলাসাতুল ওফা’- ৮৮) হযরত রাসূলে কারীমের রা. হাদীসের প্রতি সা’দ অসাধারণ গুরুত্ব দিতেন। সাহাবীদের যুগে ব্যাপকভাবে লেখালেখি শুরু হয়ে যায়। কুরআন ও লেখা হয়েছিল। তাসত্ত্বেও হাদীস লেখার ব্যাপক প্রচলন তখন হয়নি। তবে সা’দ হাদীস লিখেছিলেন। মুসনাদে ইমাম আহমাদে এ রকম একটি বর্ণনা এসেছেঃ ‘কায়স ইবন সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর পিতা সা’দ থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা এ হাদীসটি সা’দ ইবন ’উবাদার পুস্তক বা পুস্তকসমূহে পেয়েছেন।’ (মুসনাদ- ৫/২৮৫) হযরত সা’দ হাদীস লেখার সাথে সাথে তা শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রচারও করেন। একারণে তাঁর ছেলে কায়স ও সাঈদ, পৌত্র শুরাহবীল, প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস আবু ’উমামা ইবন সাহ্ল, তাবে’ঈ ইবন মুসায়্যিব প্রমুখ ব্যক্তিগণ তাঁর থেকে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪) হযরত সা’দের চরিত্রে দানশীলতার গুণটির চরম বিকাশ ঘটেছিল। ‘আসমাউর রিজাল’ শাস্ত্রকারদের প্রায় প্রত্যেকে তাঁর চরিত্র রূপায়ণ করতে গিয়ে বলেছেনঃ ‘তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল’। শুধু তিনি নন, পুরুষানুক্রমে তাঁরা ছিলেন আরবের বিখ্যাত দানশীল। তাঁর চার পুরুষ বদান্যতার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিল। এমন গৌরব সে যুগে খুব কম লোকেরই ছিল। তার দাদা দুলাইম, পিতা ’উবাদা, পুত্র কায়স এবং তিনি নিজে- প্রত্যেকেই ছিলেন আপন আপন সময়ের বিখ্যাত জনহিতৈষী ও অতিথি সেবক। (আল-ইসতীয়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৬) তাঁর দাদার সময় আতিথেয়তা এত ব্যাপক ছিল যে, একজন ঘোষক দূর্গের চূড়ায় উঠে চিৎকার করে আহ্বান জানাতো, যারা গোশ্ত, চর্বি ও উপাদেয় খাবার খেতে চায় তারা যেন আমাদের অতিথি হয়। হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. একবার সা’দের দুর্গের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নাফে’কে ডেকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলেন, এ হচ্ছে সা’দের দাদার দুর্গ। একজন ঘোষক এ দূর্গের চূড়ায় উঠে ঘোষণা করতোঃ কেউ চর্বি-গোশ্ত খেতে চাইলে দুলাইমের বাড়ীতে এসো। দুলাইম মারা গেলে তাঁর ছেলে ’উবাদার সময়েও একই রকম ঘোষনা দেওয়া হতো। সা’দের সময়ও এ ধারা অব্যাহত থাকে। আমি সা’দের ছেলে কায়সকেও একই রকম করতে দেখেছি। কায়স ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। (আল-ইসতী’য়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৬-৩৭) প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত ’উরওয়া ইবন যুবাইর বলেনঃ আমি সা’দ ইবন ’উবাদাকে তাঁর দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিতে দেখেছিঃ কেউ চর্বি ও গোশ্ত পছন্দ করলে সা’দ ইবন ’উবাদার বাড়ীতে এসো। তারপর তাঁর ছেলেকেও আমি একই রকম করতে দেখেছি। যৌবনে একদিন আমি মদীনার রাস্তায় হাঁটছি। এমন সময় ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার আমার পাশ দিয়ে ’আওয়ালীতে তাঁর ক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছিলেন। আমাকে বললেনঃ বালক, দেখতো সা’দ ইবন ’উবাদার দুর্গের ওপর থেকে কেউ আহ্বান জানাচ্ছে কিনা। আমি তাকিয়ে দেখে বললামঃ না। তিনি বললেনঃ তুমি ঠিকই বলেছ। (তাবাকাত- ৩/৬১৩; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯) এমন ব্যাপক আতিথেয়তা ও দানশীলতা বনী সা’য়িদাকে মদীনার ‘হাতেম’ বানিয়ে দিয়েছিল। ইসলাম ও হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি সা’দের বদান্যতার অনেক মুখরোচক কাহিনী বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে দু’একটি সত্য কাহিনী সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন হিজরাত করে মদীনায় আসলেন তখন সা’দের বাড়ী থেকে রাসূল সা. ও তাঁর পরিবারের জন্য প্রতিদিন নিয়মিত খাবার আসতো। প্রতিদিন বড় এক গামলা গোশ্ত অথবা দুধের সারীদ অথবা সিরকা ও তেল বা ঘিয়ের সালীদ আসতো, এই পাত্রটি রাসূল সা. ও তাঁর সহধর্মিনীদের গৃহে চক্কর দিত। (আল-ইসাবা- ২/৩০; তাবাকাত- ৩/৬১৪; হায়াতুস সাহাবা- ২/৭০০) একবার সা’দ ইবন ’উবাদা হযরত রাসূলে কারীমের সা. জন্য বরতন ভর্তি রান্না করা মগজ নিয়ে আসলেন। রাসূল সা. বললেনঃ এটা কি? সা’দ বললেনঃ যিনি সত্য সহকারে আপনাকে পাঠিয়েছেন সে সত্তার নামে শপথ, আমি আজ ৪০টি তাজা-মোটা উট নহর (জবেহ) করেছি। আমার ইচ্ছা হলো আপনাকে একটু পেট ভরে মগজ খাওয়াই। রাসূল সা. খেলেন এবং তাঁর কল্যাণ কামনা করে দু’আ করলেন। (কানযুল ’উম্মাহ- ৭/৪০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯) সাহাবীদের ‘আসহাবে সুফ্ফা’ নামে একটি দল ছিল। যাঁরা বহু দূর-দূরান্ত থেকে ঘর-বাড়ী ছেড়ে মদীনায় এসেছিলেন। তাদের এখান আসা ও অবস্থানের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ’উলম হাসিল এবং দীনের প্রশিক্ষণ লাভ করা। রাসূল সা. তাদেরকে সচ্ছল সাহাবীদের সাথে সম্পৃক্ত করে দিতেন। অন্যরা যেখানে দুই একজন করে সাথে নিয়ে যেতেন, সেখানে হযরত সা’দ প্রতিদিন সন্ধ্যায় ৮০ জনকে আহার করানো জন্য নিয়ে যেতেন। (আল-ইসাবা- ২/৩০; কানযুল ’উম্মাল- ৫/১৯০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৯৬) ইয়াহইয়া ইবন ’আবদুল ’আযীয থেকে বর্ণিত আছে। সা’দ ইবন ’উবাদা ও তাঁর ছেলে কায়স ইবন সা’দ পালাক্রমে জিহাদে যেতেন। একবার সা’দ লোকদের সাথে জিহাদে গেলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বাইরের অনেক অতিথি এলো। সেনা শিবিরে বসে সা’দ একথা জানতে পেয়ে বললেনঃ কায়স যদি আমার ছেলে হয় তাহলে আমার দাস নিস্তাসকে ডেকে বলবে, চাবি দাও, আমি রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজন মেটানোর জন্য খাবার বের করে নিই। তখন হযতো নিস্তাস বলবেঃ তোমার আব্বা চিঠি নিয়ে এসো। এতে কায়স হয়তো ক্ষেপে গিয়ে তার নামে ঘুষি মেরে চাবিটি ছিনিয়ে নেবে এবং রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজন মত খাদ্য বের করে নেবে। আসলে ব্যাপারটিও তাই হয়েছে। সেবার কায়স রাসূলুল্লাহর সা. জন্য এক শো ওয়াসক খাদ্য নিয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২০০) ওয়াকিদী বলেনঃ বিদায় হজ্জের সময় একদিন হযরত রাসূলে কারীমের সা. ভারবাহী পশুটি হারিয়ে গেল। সা’দ ও কায়স সাথে সাথে একটি পশু নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে। আল্লাহ তাঁর পশুটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সা’দ আরজ করলেন। ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা জেনেছি, আপনার পশুটি হারিয়ে গেছে। তাই এ পশুটি নিয়ে এসেছি। রাসুল সা. বললেনঃ আল্লাহ আমার বাহনটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তোমরা এটি নিয়ে যাও। আল্লাহ তোমাদের বরকত দিন। ওহে আবু সাবিত! আমি মদীনায় আসার পর থেকে তোমরা যে সমাদর করেছ তাকি যথেষ্ট নয়? সা’দ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সম্পদ থেকে যা আপনি গ্রহণ করেন না তার চেয়ে যা কিছু আপনি গ্রহণ করেন তাই আমাদের নিকট অধিকতর প্রিয়। রাসুল সা. তাঁর কথা সমর্থন করে বলেনঃ আবু সাবিত! সত্য বলেছ। সুসংবাদ লও। তুমি সফলকাম হয়েছ। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৮৮) হযরত ইবন ’আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। সা’দ ইবন ’উবাদা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট জানতে চান যে, তাঁর মা একটি মান্নত মেনেছিলেন; কিন্তু তা পূরণ না করেই মারা গেছেন। এখন তিনি কি তা পূরণ করে দেবেন? রাসূল সা. তাঁকে পুরণ করে দিতে বলেন। এমনিভাবে তাঁর মা’র পক্ষ থেকে সাদাকা করার কথা জিজ্ঞেস করলে রাসূল সা. তাঁকে বলেনঃ হাঁ তুমি তা করতে পার। তখন সা’দ রাসূলকে সা. সাক্ষী রেখে তাঁর ‘আল-মিখরাফ’ বাগিচাটি দান করার কথা ঘোষণা করেন। সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণিত হয়েছে। সা’দ তাঁর মা’র মৃত্যুর পর একবার রাসূলকে সা. জিজ্ঞেস করেনঃ কোন সাদাকা সবচেয়ে ভালো? তিনি বলেনঃ তুমি মানুষকে পানি পান করাও। সা’দ মদীনার মসজিদে তাঁর মায়ের নামে পানি পানের ব্যবস্থা করেন। যা বহু দিন যাবত ‘সিকায়া আলে সা’দ’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। একবার এক ব্যক্তি হযরত হাসানের রা. নিকট জানতে চায় যে, সা’দের মায়ের নামে যে পানির ব্যবস্থা তাতো সাদাকা। সে পানি কি আমি পান করতে পারি? হাসান রা. জবাব দিলেনঃ আবু বকর ও ’উমার যখন পান করেছেন তখন তোমার আপত্তি কিসে? (তাবাকাত- ৩/৬১৪, ৬১৫; মুসনাদে ইমাম আহমাদ- ৫/২৮৫) ‘জাতুল ফুদুল’ নামে সা’দ ইবন ’উবাদার একটি বর্ম ছিল। রাসূল সা. যে দিন বদরের উদ্দেশ্যে বের হন, সা’দ বর্মটি তাঁকে দান করেন। সেই সাথে ‘আল-আদব’ নামে একখানি তরবারিও দান করেন। এ দু’টি যুদ্ধাস্ত্র রাসূল সা. বদরে ব্যবহার করেন। এই বদরে রাসূল সা. ‘জুল-ফিকার’ তরবারিটি গনীমাত হিসাবে লাভ করেন। ওয়াকিদীর মতে ঐ তরবারিটি ছিল কাফির সৈনিক মুনাব্বিহ অথবা নাবীহ্ ইবন হাজ্জাজের। কালবীর মতে আল-আ’স ইবন মুনাব্বিহ্ ইবন হাজ্জাজের। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫২১) ইবন ’আসাকির হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার সা’দ ইবন ’উবাদা নবী কারীমকে সা. আহারের দা’ওয়াত দিলেন। তিনি উপস্থিত হলে সা’দ খেজুর ও হাড়সহ গোশ্ত হাজির করলেন। রাসুল সা. তা খেলেন এবং এক পেয়ালা দুধও পান করলেন। শেষে বললেনঃ নেক্কার লোকেরা তোমার খাবার খেয়েছে, রোযাদাররা ইফ্তার করেছেন এবং ফিরিশ্তারা তোমাদের জন্য দু’আ করেছেন। হে আল্লাহ! সা’দ ইবন ’উবাদার পরিবার-পরিচনের ওপর রহমত বর্ষন করুন। (কানযুল ’উম্মাহ- ৫/৬৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯, ৩৬৪) এভাবে হযরত সা’দের আতিথেয়তা, দানশীলতা, উদারতা ও বদান্যতার বহু কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি হযরত সা’দের ভালোবাসার রূপ এমন ছিল যে, রাসুল সা. সম্পর্কে তাঁর গোত্রের অতি গোপন কথাটিও তিনি তাঁর নিকট পৌঁছে দিতেন। হাওয়াযিন যুদ্ধের সময় রাসুল সা. ‘তালীফে কুলুবের’ জন্য কুরাইশ বংশের নও মুসলিমদেরকে গনীমতের বড় বড় অংশ দিলেন এবং আনসারদেরকে কিছুই দিলেন না। এতে অনেক আনসার যুবক ক্ষুব্ধ হয়ে বললোঃ রাসূল সা. স্বগোত্রীয় লোকদের দিলেন এবং আমাদেরকে মাহরূম করলেন। অথচঃ আমাদের তরবারি হতে এখনো কুরাইশদের রক্ত ঝরছে। সা’দ ইবন ’উবাদা সাথে সাথে বিষয়টি জানিয়ে দিলেন। তিনি সা’দকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার মত কি? বললেনঃ আমিও আমার সম্প্রদায়ের একজন। তবে এমন কথা বলিনা। রাসুল সা. তাঁকে বললেনঃ যাও, লোকদের অমুক তাঁবুতে সমবেত কর। ঘোষণা শুনে মুহাজির ও আনসার উভয় সম্প্রদায়ের লোক উপস্থিত হলো। সা’দ শুধু আনসারদের থাকতে বলে মুহাজিরদের চলে যেতে বললেন। তারপর রাসুল সা. এসে এক আবেগময় ভাষণ দান করলেন। সে ভাষয়ের কিছু অংশ ছিল এরূপঃ তোমরা কি এতে খুশী নও যে, অন্যরা ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাক, আর তোমরা আমাকে নিয়ে ফিরবে? রাসূলুল্লাহর সা. এমন প্রশ্নে সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সমস্বরে তারা জবাব দেয়, আপনার পরিবর্তে গোটা দুনিয়া কিছুই না। (বুখারী- ২/৬২০; মুসনাদ- ৩/৭২০; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৯৮, ৪৯৯; হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৮) উহুদ যুদ্ধের সময় গোটা মদীনা একটা মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে। এ সময় সা’দ ইবন ’উবাদা নিজের বাড়ী ছেড়ে রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ী পাহারা দিয়েছিলেন। হযরত রাসুলে কারীমও তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। প্রায়ই তাঁর বাড়ীতে যেতেন। সা’দের ছেলে কায়স বলেনঃ একবার রাসূল সা. আমাদের বাড়ীতে আসলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি সালাম দিলেন। সা’দ সালাম শুনে খুব নিচু স্বরে জবাব দিলেন। কায়স বললেনঃ আপনি কি রাসুলকে সা. ভিতরে আসার অনুমতি দেবেন না? সা’দ বললেনঃ দেরী কর। তাঁকে আমাদের ওপর একটু বেশী করে সালাম দেওয়ার সুযোগ দাও। রাসুল সা. তিনবার সালাম দিয়ে কোন জবাব না পেয়ে ফিরে চললেন। সা’দ তখন দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে ডাক দিয়ে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার সালাম শুনেছি। জবাবও দিয়েছি একটু আস্তে আস্তে। আমি চেয়েছি, আপনি আমাদের ওপর একটু বেশী সালাম দিন। রাসূল সা. সা’দের সাথে আবার ফিরে আসলেন। সেদিন তিনি সা’দের বাড়ীতে আহার করে তাঁর পরিবারের সকলের জন্য দু’আ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/২৮৩; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৯১, ৫১৫; ৩/৩১৪) একবার রাসুল সা. এক দু’আয় বলেনঃ হে আল্লাহ! আনসারদের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন। বিশেষ করে ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবন হারাম ও সা’দ ইবন ’উবাদাকে। একবার হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ী গেলেন। তিনি সোজা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইছেন। রাসুল সা. তাঁকে ইশারায় দূরে সরে যেতে বললেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার দরজার সামনে গিয়ে অনুমতি চাইলেন। তখন রাসূল সা. বললেনঃ যখন দরজার সামনেই থাকবে, অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫১৬) একবার রাসূলুল্লাহ সা. যাকাত আদায়কারী হিসাবে সা’দকে নিয়োগ করলেন। একদিন রাসুল সা. তাঁর কাছে গিয়ে বললেনঃ কিয়ামতের দিন যাতে তোমাকে উট কাঁধে করে উঠতে না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। সা’দ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি তেমন কিছু করি তাহলে সত্যি এমন হবে? তিনি বললেনঃ হাঁ। সা’দ আরজ করলেনঃ আমাকে অব্যাহতি দিন। রাসূল সা. তাঁর আবদেন মঞ্জুর করে অব্যাহতি দান করেন। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৮৯; মুসনাদ- ৫/২৮৫) একবার হযরত সা’দ অসুস্থ হলে রাসূল সা. সাহাবীদের সংগে করে তাঁকে দেখতে যান। সা’দ অচেতন ছিলেন। সাহাবীদের মধ্য থেকে নানাজনে নানারকম মন্তব্য করলেন। কেউ বললেন, শেষ হয়ে গেছে! কেউ বললেন, না এখনো দম আছে। একথা শুনে রাসুল সা. কেঁদে ফেলেন। সাথে সাথে গোটা মজলিসে কান্না শুরু হয়ে যায। (বুখারী- ২/১৭৪) আর একবার রাসূল সা. যায়িদ ইবন সাবিতকে বাহনের পিছনে বসিয়ে অসুস্থ সা’দকে দেখতে তাঁর বাড়ী গিয়েছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৯) একবার রাসুল সা. সা’দকে দেখতে যাচ্ছেন। পথে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল বসে ছিল। সে রাসূলকে সা. কিছু কটু কথা বললো। উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয় হয় অবস্থা। রাসূল সা. সকলকে নিবৃত্ত করলেন এবং সা’দের বাড়ী উপস্থিত হলেন। তিনি বললেনঃ সা’দ! আজ আমাকে আবু হুবাব (ইবন উবাই) যে সব কথা বলেছে তাকি শুনেছ? সা’দ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তার অপরাধ ক্ষমা করে দিন। আসল কথা হলো, ইসলাম আসার পূর্বে মানুষ ধারণা করেছিল সে মদীনার বাদশাহ হবে। কিন্তু যখন আল্লাহ আপনাকে সত্য সহকারে পাঠালেন তখন তাদের সে ধারণা চুরমার হয়ে গেল। এটা হলো সেই বেদনার বহিঃপ্রকাশ। এবার রাসুল সা. তাঁর অনুরোধে ইবন উবাইকে ক্ষমা করে দেন। (বুখারী- ২/৬৫৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৯) হযরত সা’দ যে নরম প্রকৃতির ও শান্তিপ্রিয় স্বভাবের ছিলেন উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা তা বুঝা যায়। ইবন ’আসাকির হযরত যায়িদ ইবন সাবিত থেকে বর্ণনা করেছেন। একদিন সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর ছেলেকে সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট আসলেন। সালাম বিনিময়ের পর রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ এখানে, এখানে। এই বলে তাঁকে ডান পাশে বসালেন। তারপর বললেনঃ মারহাবান বিল আনসার, মারহাবান বিল আনসার- আনসারদের প্রতি স্বাগতম, আনসারদের প্রতি স্বাগতম। ছেলেটি রাসূলুল্লাহর সা. সামনে দাঁড়িয়েছিল। রাসুল সা. বসতে বললেন। সে বসে পড়লো। একটু পরে তিনি তাকে কাছে আসতে বললেন। সে এগিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে ও পায়ে চুমু দিল। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও আনসারদের একজন। সা’দ তখন বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন যেমন আপনি আমাদের সম্মান দেখিয়েছেন। রাসূল সা. বললেন, আমার সম্মান দেখানো আগেই আল্লাহ তোমাদের সম্মানিত করেছেন। আমার পরে তোমরা অনেক কষ্ট ভোগ করবে। তখন সবর করবে। অবশেষে হাউজে কাওসারের নিকট আমার সাথে তোমাদের আবার সাক্ষাত হবে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০৪) হযরত সা’দের একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা মজলিস ছিল। একদিন রাসুল সা. সেখানে গিয়ে কিভাবে রাসূলের সা. ওপর দরূদ ও সালাম পেশ করতে হয় তা শিখিয়েছিলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩১৪) হযরত সালমান আল-ফারেসী রা. ইসলাম গ্রহণের পর মনিবের হাত থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে তার সাথে একটি চুক্তি করেন। তার একটি শর্ত ছিল, তিনি মনিবকে ৩০০ (তিন শো) খেজুরের চারা লাগিয়ে দেবেন। হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁকে ষাটটি (৬০) চারা দিয়ে সাহায্য করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৮৭) এক সময় হযরত রাসূলে কারীমের সা. দশটি গর্ভবতী উট ছিল। তার তিনটিই সা’দ তাঁকে দান করেন। তার একটির নাম ছিল ‘মুহরাহ্’। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫১২) সাফওয়ান ইবন মু’য়াত্তাল বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সা’দ ইবন ’উবাদা পরার জন্য তাঁকে কাপড় দান করেন। সেই কাপড় পরে রাসূলুল্লাহর সা. সামনে গেলে তিনি বলেনঃ যে তাকে কাপড় পরিয়েছে আল্লাহ তাকে জান্নাতের কাপড় পরাবেন। সাফওয়ান তখন বলেনঃ আমাকে সা’দ ইবন ’উবাদা কাপড় দান করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬-৮৯) হযরত ইবন ’আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। যখন সূরা আন-নূরের ৪ নং আয়াত- ‘যারা সাধ্বী রমনীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি দুর্রা লাগাবে এবং কখনো তাদের সাক্ষী গ্রহণ করবে না। তারাই ফাসিক’- নাযিল হয় তখন সা’দ ইবন ’উবাদা বলে ওঠেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা এভাবে নাযিল হয়েছেন? তাঁর মধ্যে বিস্ময়ের ভাব দেখে রাসূল সা. বলেনঃ ওহে আনসারগণ! শোন, তোমাদের নেতার কথা শোন। তারা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা এভাবে নাযিল হয়েছে? তাঁর মধ্যে বিস্ময়ের ভাব দেখে রাসুল সা. বলেনঃ ওহে আনসারগণ! শোন, তোমাদের নেতার কথা শোন। তারা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ তিনি একজন প্রখর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি। আল্লাহর কসম। তিনি কুমারী ছাড়া কোন মেয়ে বিয়ে করেননি। তেমনিভাবে তাঁর তালাক দেওয়া কোন মহিলাকেও কেউ কখনো বিয়ে করত সাহস করেনি। এর একমাত্র কারণ, তাঁর তীক্ষ্ণ আত্মমর্যাদাবোধ। সা’দ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি জানি এটি সত্য এবং আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে, একজন দুরাচারীকে আমার স্ত্রীর সাথে কুকর্ম করতে দেখেও তাকে কিছুই না বলে চারজন সাক্ষীর তালাশে বেরিয়ে যাব এবং তাকে নির্বিঘ্নে তার কুকর্ম শেষ করার সুযোগ করে দেব। আল্লাহর কসম! আমি যখন সাক্ষী নিয়ে ফিরে আসবো তখন তো তার কাজ শেষ হয়ে যাবে।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, সা’দ বলেনঃ কক্ষণো না। সেই সত্তার নামে শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্যই তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করবো। তখন রাসূল সা. আনসারদের ডেকে বলেন, শোন তোমাদের নেতার কথা শোন। সে অবশ্যই আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন লোক। তবে তার থেকেও আমি এবং আমার থেকেও আল্লাহ বেশী মর্যাদাবোধের অধিকারী। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৩৮, ৬৩৯) মালিক থেকে বর্ণিত হয়েছে। যখন আবু ’উবাইদাহ, মু’য়াজ, বিলাল ও সা’দ ইবন ’উবাদার মত প্রথম শ্রেণীর সাহাবীরা শামে গেলেন তখন সেখানে একজন খৃস্টান রাহিব (সাধক) তাদেরকে দেখে মন্তব্য করেনঃ হযরত ’ঈসার যে সকল হাওয়ারীকে (সাথী) শূলীতে চড়ানো হয়েছিল এবং করাত দিয়ে দু’ফালি করে ফেলা হয়েছিল তারাও সংগ্রামে মুহাম্মাদের সা. এ সকল সাহাবীদের সমকক্ষ ছিলেন না। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৯১)
সা’দ ইবন মু’য়াজ (রা)

আসল নাম সা’দ, ডাকনাম আবু ’আমর, লকব বা উপাধি সায়্যিদুল আউস। মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের আবদুল আশহাল শাখার সন্তান। পিতার নাম মু’য়াজ ইবন নু’মান, মাতা কাবশা মতান্তরে কুবাইশা ‘বিনতু রাফি’। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ সা’ঈদ আল খুদরীর চাচাতো বোন। জাহিলী যুগেই পিতা মু’য়াজ্জের মৃত্যু হয়। তবে মাতা কাবশা হিজরাতের পরে ঈমান আনেন এবং সা’দের ইনতিকালের পরেও বহু দিন জীবিত ছিলেন। গোটা আউস গোত্রের মধ্যে আবদুল আশহাল শাখাটি ছিল সর্বাধিক অভিজাত এবং বংশানুক্রমে নেতৃত্ব ছিল তাদেরই হাতে। সা’দ ছিলেন তাঁর সময়ে একজন বড় মাপের নেতা। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২, উসুদুল গাবা- ২/২৯৬, তাবাকাত- ৩/৪২০, তাহজীবুত তাহজীর- ৩/৪৮১) তাঁর জন্ম সন সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। আকাবার প্রথম বাইয়াতের পর থেকে যদিও মদীনায় ইসলামের প্রভাব পড়তে থাকে তবে তা প্রকৃতপক্ষে হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইরের ব্যক্তিত্বের সাথে জড়িত ছিল। আকাবার শপথের পর মদীনাবাসীদের অনুরোধে হযরত রাসূলে কারীম সা. মুস’য়াবকে দা’ঈ-ই-ইসলামের (আহবানকারী) দায়িত্ব দিয়ে মদীনায় পাঠান। ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন সফল দা’ঈ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তিনি নিরলস চেষ্টার মা্ধ্যমে মদীনার প্রতিটি লোকের কানে ইসলামের দা’ওয়াত পৌঁছে দেন। হযরত মুস’য়াব মদীনায় এসে যখন ইসলামের দা’ওয়াত দিতে শুরু করলেন তখন সা’দ ইবন মু’য়াজ একজন চরম অস্বীকারকারী। তাঁর এ অবস্থা বেশী দিন থাকেনি। অনতিবিলম্বে তিনিও মুস’য়াবের দা’ওয়াতে সাড়া দেন। ইবন ইসহাক তাঁর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ একদিন আস’য়াদ ইবন যুরারা রাসূলুল্লাহর সা. প্রেরিত দা’ঈ (আহবানকারী) মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে সংগে করে দা’ওয়াতী কাজে বনী আবদুল আশহাল ও বনী জাফার গোত্রে গেলেন। তাঁরা ‘মারাক’ নামক একটি কুয়োর ধারে দেওয়ালের ওপর বসলেন। আর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এমন কিছু লোক তাঁদের পাশে জড় হলেন। সা’দ ইবন মুয়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর উভয়ই তখন বনী আবদুল আশহাল গোত্রের নেতা। তখনও তাঁরা মুশ্রিক বা পৌত্তলিক। উল্লেখ্য যে, সা’দ ছিলেন আস’য়াদ ইবন যুরারার খালাতো ভাই। যাই হোক, খবরটি সা’দ ও উসাইদের কানে গেল। সাথে সাথে সা’দ উসাইদকে বললেনঃ ‘তোমার বাপের সর্বনাশ হোক। তুমি এখনই এ দু’জন লোকের কাছে যাও। তারা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে আমাদের বাড়ীর ওপর চড়াও হয়েছে। তাদের তাড়িয়ে দাও, এ পথ মাড়াতে নিষেধ কর। যদি ঐ দ্বিতীয় লোকটির সাথে আমার খালাতো ভাই আস’য়াদ ইবন যুরারা না থাকতো তাহলে তোমাকে পাঠাতাম না, আমি নিজেই যেতাম। তার সামনে আমার যাওয়া শোভন হবে না। ’উসাইদ অস্ত্র সজ্জিত হয়ে তাঁদের নিকট গেলেন। উল্টো ফল ফললো। তাড়াতে গিয়ে নিজেই তাঁদের কথায় প্রভাবিত হলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। তিনি মুস’য়াব ও আস’য়াদকে বললেনঃ ‘আমি পিছনে এমন এক ব্যক্তিকে রেখে এসেছি, যদি তিনি তোমাদের কথা শোনেন তাহলে গোত্রের একটি লোকও তোমাদের থেকে দূরে থাকবে না। আমি এখনই সা’দ ইবন মু’য়াজকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই বলে তিনি নিজ গোত্রের দিকে ফিরে চললেন। সা’দ তখন গোত্রীয় এক আড্ডায় বসা। উসাইদকে ফিরে আসতে দেখে তিনি মন্তব্য করলেনঃ ‘আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, উসাইদ যে চেহারায় গিয়েছিল তার থেকে ভিন্ন এক চেহারা নিয়ে তোমাদের কাছে ফিরছে।’ উসাইদ কাছাকাছি এসে পৌঁছালে সা’দ জিজ্ঞেস করলেনঃ কী করেছ? উসাইদ জবাব দিলেনঃ আমি তাদের দু’জনের সাথে কথা বলেছি, তাদের মধ্যে তেমন খারাপ কিছু দেখিনি। তবুও তাদেরকে এখানে আসতে নিষেধ করে দিয়েছি। তারাও বলেছে, তোমরা যা ভালো মনে কর, তাই হবে। তবে আমি শুনেছি, বনী হারিছার লোকেরা আস’য়াদ ইবন যুরারাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। তারা তো একথা জানে, আস’য়াদ তোমার খালাতো ভাই।’ সা’দ সাথে সাথে উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়ালেন এবং বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে তাঁদের দুজনের দিকে ছুটলেন। নিকটে পৌঁছে যখন তিনি দেখলেন, তাঁরা অত্যন্ত শান্ত ও স্থিরভাবে বসে আছেন তখন তিনি বুঝলেন, উসাইদ তাঁকে ঘোকা দিয়ে তাঁদের কথা শুনাতে চেয়েছে। তিনি তাঁদের দু’জনকে গালাগালি করতে করতে আস’য়াদকে বললেনঃ ‘শোন আবু উসামা! তোমার ও আমার মধ্যে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো তাহলে আমি এত কথা বলতাম না। আমরা যা পছন্দ করিনে তাই তুমি আমাদের বাড়ীর ওপর এসে করে যাচ্ছ।’ এ দিকে সা’দকে আসতে দেখে আস’য়াদ, মুসয়াবকে বলেছিলেনঃ ‘মুস’য়াব! আপনার নিকট একজন গোত্র নেতা আসছেন। এ ব্যক্তি যদি আপনার কথা মেনে নেন তাহলে গোত্রের দু’ব্যক্তিও আপনার থেকে দূরে থাকতে পারবে না।’ মুস’য়াব অত্যন্ত নরম মিযাজে সা’দকে বললেনঃ ‘আপনি কি একটু বসে আমার কথা শুনবেন? আমার কথা পসন্দ হলে, ভালো লাগলে, মানবে। আর পসন্দ না হলে, খারাপ লাগলে আমরা চলে যাব।’ সা’দ বললেনঃ ‘এ তো খুব ইনসাফের কথা।’ তিনি মাটিতে বর্শাটি গেঁড়ে বসে পড়লেন। মুস’য়াব অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে তাঁর সামনে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করলেন, তাঁকে কুরআন পাঠ করে শোনালেন। মুস’য়াব ও আস’য়াদ দু’জনেই বর্ণনা করেছেনঃ ইসলামের দাওয়াত পেশ করার পর সা’দ কোন কথা বলার পূর্বেই আমরা তাঁর চেহারায় ইসলামের দীপ্তি লক্ষ্য করেছিলাম। ইসলামের দা’ওয়াত শোনার পর সা’দ তাঁদের কাছে জানতে চান? ‘তোমাদের এই ইসলাম, এই দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে কি কি কাজ করতে হয়?’ তাঁরা বললেন, ‘গোসল করে পবিত্র হতে হয়, পোশাক পরিচ্ছদ করতে হয়, তারপর কালিমা শাহাদাত উচ্চারণ করে দু’রাকা’য়াত সালাত আদায় করতে হয়।’ সা’দ তাই করলেন। তারপর বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে উসাইদের সাথে গোত্রীয় আড্ডার দিকে রওয়ানা দিলেন। তাঁদেরকে ফিরতে দেখে গোত্রীয় লোকেরা বলাবলি করতে লাগলোঃ ‘সা’দ যে চেহারা নিয়ে গিয়েীছলেন এখন তাঁর সেই চেহারা নেই। তাঁকে ভিন্ন এক চেহারায় দেখা যাচ্ছে।’ সা’দ নিকটে এসে গোত্রীয় লোকদের বললেনঃ ‘ওহে আবদুল আশহাল গোত্রের লোকেরা! বিভিন্ন ব্যাপারে তোমরা আমার কাজ-কর্ম কেমন দেখে থাক?’ তাঁরা সমস্বরে জবাব দিলঃ ‘আপনি আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মতামতের অধিকারী ব্যক্তি এবং আমারে বিশ্বস্ত নাকীব বা দায়িত্বশীল।’ সা’দ বললেনঃ তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সা. প্রতি ঈমান আনবে তোমাদের কোন নারী-পুরুষের সাথে কথা বলা আমার জন্য হারাম।’ আস’য়াদ ও মুস’য়াব বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম! সা’দের এই ঘোষনার পর সন্ধ্যা হতে না হতে বনী আবদুল আশহালের সকল নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করে। সা’দের ইসলাম গ্রহণের পর আস’য়াদ ও মুস’য়াব তাঁর বাড়ীতে অবস্থান করে ইসলামের দা’ওয়াত দিতে থাকেন। ফলে রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বে সেখানে এমন কোন বাড়ী বা গোত্র ছিল না যেখানে দুই-একজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেনি। এরপর সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর দুইজন মিলে বনী আবদুল আশহালের মূর্তিগুলি ভাংতে শুরু করেন। (দ্রঃ তাবাকাত- ৩/৪২০, ৪২১; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৫, ৪৩৭, ৪৭৯; আল-বিদায়া- ৩/১৫২; উসুদুল গাবা- ৩/২৯৬; হায়াতুস সাহাবা- ১/১৮৭-১৯০) মদীনায় ইসলামের দা’ওযাত ও তাবলীগের ক্ষেত্রে হযরত সা’দের অবদান ছিল অনন্য। এই গৌরবে অন্য কোন সাহাবী তাঁর জুড়ি নেই। কারণ, একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের প্রভাবে গোটা গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা শুধু তাঁর ক্ষেত্রে ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। এই কারণে রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘আনসারদের সর্বোত্তম গৃহ বনু নাজ্জার। তারপর আবদুল আশহালের স্থান।’ হযরত সা’দ ও তাঁর গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় আকাবার মধ্যবর্তী সময়ে। ইবন ’আসাকির বুখারী ও কালবী থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা. মক্কা থেকে হিজরাত করার পর কুরাইশরা তাঁর কোন খোঁজ-খবর পাচ্ছে না। তাঁরা কা’বার পাশে তাদের পরামর্শ গৃহে বসে আছে। এমন সময় তারা জাবালে আবূ কুবায়সের দিক থেকে একটি কবিতা আবৃত্তির কণ্ঠ শুনতে পেল। তার কিয়দাংশ নিম্নরূপঃ ‘দুই সা’দ যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে বিরুদ্ধবাদীদের ভয় থেকে মুহাম্মাদ নিরাপদ হয়ে যাবে। ওহে আউসের সা’দ, ওহে খাযরাজের সা’দ! তোমরা মুহাম্মাদের রক্ষক হয়ে যাও।’- এরূপ আরো কয়েকটি পংক্তি। এই কবিতা শুনে কুরাইশরা বুঝতে পারে, আউস ও খাযরাজ গোত্রে রাসূলুল্লাহর সা. সাহায্যকারী দু’সা’দ হলেন- সা’দ ইবন মু’য়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদা। (তাহজীবে ইবন ’আসাকির- ৬/৮৯) ইসলাম গ্রহণের কিছু দিন পর সা’দ ’উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। মক্কার বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা উমায়্যা ইবন ইবন খালাফ ছিল তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। সা’দ তার বাড়ীতে উঠলেন। উমাইয়্যা মদীনায় এলে সা’দের বাড়ীতে উঠতো। তিনি উমায়্যাকে বললেন, হারাম শরীফ (কা’বার আশপাশ) যখন জনশূণ্য হয় তখন আমাকে বলবে। দুপুর বেলা উমায়্যা তাঁকে সংগে করে হারামের উদ্দেশ্যে বের হলো। পথে আবূ জাহলের সাথে দেখা। সে উমায়্যাকে জিজ্ঞেস করলোঃ এ ব্যক্তি কে? উমায়্যাঃ সা’দ ইবন মু’য়াজ। আবূ জাহলঃ এ তো খুবই আশ্চর্য্যের বিষয় যে, তুমি একজন ধর্মত্যাগীকে আশ্রয় দিয়েছ এবং তার সাহায্যকারী হিসেবে মক্কায় দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছ। তুমি তাঁর সাথে না থাকলে তাঁর বাড়ী ফেরা কঠিন হতো। উল্লেখ্য যে, যারা ইসলাম গ্রহণ করতো কাফিররা ধর্মত্যাগী বলতো। হযরত সা’দ সাথে সাথে আবু জাহলের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। বললেনঃ তুমি আমাকে বাধা দিয়েই দেখনা কেমন হয়। আমি তোমার মদীনার রাস্তা বন্ধ করে দেব। উমায়্যা বললেনঃ সা’দ। আবুল হাকাম (আবূ জাহল) মক্কার একজন বিশিষ্ট নেতা। তার সামনে নিচু স্বরে কথা বল। সা’দ বললেনঃ চলো যাই। আমি রাসূলের সা. নিকট শুনেছি, মুসলমানরা তোমাদেরকে হত্যা করবে। আবূ জাহল প্রশ্ন করলোঃ তারা কি মক্কায় এসে হত্যা করবে? সা’দ বললেনঃ তা আমার জানা নেই। হিজরী ২য় সনের রাবীউল আওয়াল মাসে রাসূল সা. কুরাইশ নেতা উমায়্যা ইবন খালাফের নেতৃত্বাধীন এক’শ লোকের একটি কাফিলার সন্ধানে বের হন। ইতিহাসে এটা ‘বাওয়াত’ অভিযান নামে খ্যাত। একটি বর্ণনা মতে রাসূল সা. স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে সা’দ ইবন মু’য়াজকে মদীনায় রেখে যান। (আনসাবূল আশরাফ- ১/২৮৭) হযরত রাসূলে কারীম সা., আবূ ’উবাইদা ইবনুল জাররাহ মতান্তরে সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসের সাথে তাঁর মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। (তাবাকাত- ৩/৪২১; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫০৫) হিজরী ২য় সনে ‘বাওয়াত’ অভিযানের পর ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ আসন্ন। হযরত সা’দের ভবিষ্যদ্বানী সত্যে পরিণত হওয়ার সময় সমাগত। মক্কার কুরাইশরা মদীনা আক্রমণের জন্য তোড়জোড় শুরু করলো। খবর পেয়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. বদরের দিকে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে কুরাইশ বাহিনীর সর্বশেষ গতিবিধি অবগত হয়ে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মুহাজির ও আনসারদের সাথে পরামর্শে বসেন। মুহাজিরদের মধ্য থেকে আবু বকর, ’উমার, মিকদাদ রা. প্রমুখ সাহাবী নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করেন। অতঃপর রাসূল সা. আনসারদের লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘ওহে লোকেরা, আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।’ সাথে সাথে সা’দ ইবন মু’য়াজ উঠে দাঁড়িয়ে বলেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! সম্ভবতঃ আপনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করেছেন?’ রাসূল সা. বললেনঃ ‘হা। সা’দ বললেনঃ ‘আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যবাদী বলে জেনেছি, আর আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, যা কিছু আপনি নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য। আপনার কথা শোনার ও আপনার আনুগত্য করার আমরা অঙ্গীকার করেছি। ইয়া রাসূলুল্লাহ। আপনার যা ইচ্ছা করুন, আমরা আপনার সাথে আছি। সেই সত্তার নামে শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। যদি আপনি আমাদেরকে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন, আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পিছনে থাকবে না। আগামী কালই আপনি আমাদেরকে নিয়ে শত্রুর সম্মুখীন হোন, আমরা তাতে ক্ষুণ্ন হবো না। যুদ্ধে আমরা দুরুন ধৈর্যশীল, শত্রুর মুকাবিলায় পরম সত্যনিষ্ঠ। আল্লাহ আমাদের থেকে আপনাকে এমন আচরণ প্রত্যক্ষ করাবেন যাতে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমাদের সাথে নিয়ে আপনি অগ্রসর হোন।’ তিনি আরও বলেনঃ ‘আমরা তাদের মত হবো না যারা মূসাকে আ. বলেছিল, আপনিও আপনার রব যান এবং শত্রুর সাথে যুদ্ধ করুন। আর আমরা এখানে বসে থাকি। বরং আমরা বলি, আপনি ও আপনার রব যান, আমরা আপনাদের অনুসরণ করবো। হতে পারে এক উদ্দেশ্যে আপনি বেরিয়েছেন; কিন্তু আল্লাহ আর একটি করলেন। দেখুন, আল্লাহ আপনার দ্বারা কি করান।’ ঐতিহাসিকরা বলেছেন, আল্লাহ সা’দের এই কথার সমর্থনে সূরা আনফালের ৫ নং আয়াতটি নাযিল করেন। সা’দের উপরোক্ত ভাষণে রাসূল সা. ভীষণ খুশী হন। সৈন্য মোতায়েনের সময় তিনি আউস গোত্রের ঝান্ডাটি সা’দের হাতে তুলে দেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে এ যুদ্ধে গোটা আনসার সম্প্রদায়ের পতাকা ছিল সা’দের হাতে। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬১৩, ৬১৫; উসুদুল গাবা- ২/২৯৯; তাবাকাত- ৩/৪২১; আল-বিদায়া- ৩/২৬২; হায়াতুস সাহাবা- ১/৪১৫) ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে সা’দ ইবন মু’য়াজ বললেনঃ ‘ইয়া নাবীয়াল্লাহ! আমরা আপনার জন্য একটি ‘আরীশ’ বা তাঁবু স্থাপন করে একটি বাহিনী মোতায়েন রাখিনা কেন? আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাব। তাতে যদি আল্লাহ আমাদের সম্মান দান করেন, আমরা বিজয়ী হই, তাহলে তো আমাদের আশা পূর্ণ হলো। আর যদি এর বিপরীত কিছু ঘটে তাহলে আপনি এই বাহিনী সহ আমাদের পিছনে ছেড়ে আসা লোকদের সাথে গিয়ে মিলিত হবেন। হে আল্লাহর নবী! আমাদের যে সব লোক মদীনায় পিছনে রয়ে গেছে, আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা তাদের থেকে একটুও বেশী নয়। যদি তারা বুঝতে পারতো আপনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন, তবে তারা এভাবে পিছনে পড়ে থাকতো না। আল্লাহ তাদের দ্বারা আপনার হিফাজত করবেন। তারা আপনাকে সৎ উপদেশ দান করবে এবং আপনার সাথে শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করবে।’ এই বক্তব্যের জন্য রাসূল সা. সা’দের প্রশংসা করে তাঁর জন্য দু’আ করলেন। এভাবে রাসূলুল্লাহর সা. জন্য রণক্ষেত্রের অদূরে একটি ‘আরীশ’ নির্মিত হয় এবং তিনি সেখান থেকে বদর যুদ্ধ পরিচালনা করেন। (আল-বিদায়া- ৩/২৬৮; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬২০) এই বদর যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী যখন পরাজিত হয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে তখন মুসলিম মুজাহিদরা তাদের ধাওয়া করে ধরে ধরে বন্দী করতে শুরু করে। হযরত রাসূলে কারীম সা. তখন ‘আরীশে’ অবস্থান করছেন। তাঁর ওপর অকস্মাৎ পাল্টা আক্রমণ হতে পারে, এমন এক আশঙ্কায় সা’দ ইবন মু’য়াজ আরো কিছু আনসারী মুজাহিদকে সংগে নিয়ে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ‘আরীশের’ দরযায় পাহারায় নিয়োজিত হন। রাসূল সা. সা’দের চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ লক্ষ্য করে বলেনঃ সা’দ! মনে হচ্ছে লোকদের কাজ তোমার পছন্দ হচ্ছে না। সা’দ বললেনঃ হাঁ। পৌত্তলিকদের সাথে এটা আমাদের প্রথম সংঘাত। তাদের পুরুষদের জীবিত রাখার চেয়ে হত্যা করাই আমার পছন্দ। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬২৮) একটি বর্ণনা মতে, এ যুদ্ধে তিনি ’আমর ইবন ’উবাইদুল্লাহকে হত্যা করেন। এতে তাঁর একটি দাসও যোগদান করে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৯৭, ৪৭৯) উহুদ যুদ্ধেও তিনি যোগদান করেন। এ যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. অবস্থান স্থলের পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। সূচনাতেই রাসূলুল্লাহর সা. ইচ্ছা ছিল মদীনার ভেতর থেকেই কাফিরদের প্রতিরোধ করার। মুনাফিক ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূলেরও ছিল একই ইচ্ছা। কিন্তু কিছু নওজোয়ান মুজাহিদ যাঁরা ছিলেন শাহাদাত লাভের চরম অভিলাষী, তাঁরা মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার জন্য জিদ ধরে বসেন। যেহেতু তাঁরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই রাসূল সা. তাঁদের মতামত মেনে নেন এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হওয়ার জন্য অন্দর মহলে প্রবেশ করেন। সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর তখন বললেনঃ তোমরা রাসূলকে সা. মদীনার বাইরে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছ; অথচ তাঁর ওপর আসমান থেকে ওহী নাযিল হয়। তোমাদের উচিত, তোমাদের মতামত প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে রাসূলুল্লাহর সা. ওপর ছেড়ে দেওয়া। এদিকে রাসূল সা. যখন তরবারি, ঢাল, বর্ম ইত্যাদি যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তখন সবাই অনুতপ্ত হলেন। একযোগে তাঁরা বললেন, আপনার বিরুদ্ধাচারণ আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আপনার নির্দেশ আমাদের শিরোধার্য। রাসূল সা. বললেনঃ এখন আমার করার কিছুই নেই। কারণ একজন নবী অস্ত্র সজ্জিত হলে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসার কোন অবকাশ থাকে না। (তাবাকাত- ২/২৬) উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর বিজয় হলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের প্রবল আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটে গেল। দারুন একটা বিপর্যয় ঘটে গেল। এ সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. অটল ও দৃঢ় থাকেন। অন্য যে পনেরো ব্যক্তি রাসূলে সা. পাশে অটল থাকেন তাঁদের একজন সা’দ ইবন মু’য়াজ। এই উহুদে তাঁর ভাই ’আমর ইবন মু’য়াজ শাহাদাত বরণ করেন। (তাবাকাত- ২/৩০; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৮, ৩২৯)। উহুদ যুদ্ধের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. একদিন আনসারদের বনী আবদুল আশহাল ও জুফার গোত্রের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন, ঐ গোত্রদ্বয়ের মেয়েরা উহুদে শাহাদাত প্রাপ্ত তাদের লোকদের জন্য কান্নাকাটি ও মাতম করছে। দয়ার নবীর দু’টি চোখ পানিতে ভরে গেল। তিনিও কাঁদলেন। তারপর বললেনঃ ‘কিন্তু ‘হামযার’ জন্য কাঁদার তো কেউ নেই।’ সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর নিজ গোত্র বনী আবদুল আশহালে ফিরে যখন একথা শুনলেন তখন তাঁরা তাঁদের গোত্রের মহিলাদের নির্দেশ দিলেনঃ ‘তোমরা রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীতে যাও এবং তাঁর চাচা হামযার জন্য শোক ও মাতম কর।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৯৯) মদীনার ইহুদী গোত্র বনী কুরায়জার নেতা কা’ব ইবন আসাদ তার গোত্রের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে একটি মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেছিল। খন্দক যুদ্ধের সময় সে বনী নাদার গোত্রের নেতা হুয়ায় ইবন আখতাবের কুপরামর্শ ও উস্কানিতে সেই চুক্তি ভেঙ্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। একথা রাসূলুল্লাহ সা. সহ মুসলমানদের কানে গেল। রাসূল সা. ঘটনার যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য আউস গোত্রের পক্ষ থেকে সা’দ ইবন মু’য়াজ ও খাযরাজ গোত্রের পক্ষ থেকে সা’দ ইবন ’উবাদাকে পাঠান। তাদের সাথে আরও যান আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও খাওয়াত ইবন জুবায়র। তাঁরা বনী কুরায়জায় যান এবং তাদের সাথে আলোচনা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, বিষয়টি সত্য। তাঁরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট তাঁদের তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ বিপোর্ট পেশ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২১) হযরত সা’দের দৃঢ়তার বহু কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এমন একটি ঘটনা বালাজুরী ও ইবনুল আসীর বর্ণনা করেছেন। গাতফান গোত্রের নেতা আল-হারেস ইবন আউফ ও ’উয়ায়না ইবন হিসনের সাথে রাসূল সা. এ শর্তে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা করলেন যে, তাদের পক্ষ থেকে মদীনার প্রতি কোন প্রকার হুমকী থাকবে না এবং বিনিময়ে তারা মদীনায় উৎপন্ন শস্যের এক তৃতীয়াংশ লাভ করবে। এর মধ্যে হিঃ ৫ম সনে খন্দক যুদ্ধের ডামাডোলে মদীনায় দারুণ অভাব দেখা দিল। রাসূলে কারীম সা. এ সন্ধির ব্যাপারে সা’দ ইবন মু’য়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদার সাথে পরামর্শ করলেন। তাঁরা দু’জন বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল। এ যদি আপনার পসন্দ হয়, আমরা তা পালন করবো। যদি আল্লাহর নির্দেশ হয় তা হলে তো অবশ্যই পালনীয়। তবে কি এটা আমাদের কথা চিন্তা করে করছেন?’ তিনি বললেনঃ ‘হ্যা, তোমাদের কথা চিন্তা করেই করছি। আমি দেখেছি, গোটা আরব এখন তোমাদের বিরুদ্ধে। আমি চেয়েছি, অন্ততঃ এর বিনিময়ে তাদের শত্রুতা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকুক।’ একথা শুনে সা’দ ইবন মু’য়াজ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! তারা ও আমরা ছিলাম এক সাথে পৌত্তলিক। আমরা কেউ আল্লাহর ইবাদাত করতাম না, তাঁকে জানতামও না। তখনও তারা ব্যবসা উপলক্ষে এবং অতিথি হিসেবে ছাড়া আমাদের একটি খেজুরও খাওয়ার আশা করেনি। আজ আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, আল্লাহ ইসলাম ও আপনার দ্বারা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আর এখন কিনা আমাদের সম্পদের একটি অংশ তাদেরকে দিতে হবে? এমন সন্ধির প্রয়োজন আমাদের নেই। আল্লাহ আমাদের ও তাদের মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত শুধু তরবারি ছাড়া আর কিছুই আমরা তাদেরকে দিব না।’ রাসূল সা. তাঁর কথা মেনে নিলেন। (আল-বিদায়া- ৪/১০৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৪৬, ৩৪৭) যুদ্ধ শুরুর সময় প্রায় কাছাকাছি। সা’দ বর্ম পরে হাতে বর্শা নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছেন। পথে বনী হারেছার দূর্গে তাঁর মা উম্মুল মুমিনীন হযরত ’আয়িশার রা. পাশে বসে ছিলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর ছেলে একটি কবিতার চরণ আবৃত্তি করতে করতে চলেছে। তার একটি পংক্তি এমনঃ ‘যখন আজল এসে যায় তখন আর মৃত্যুর জন্য আপত্তি কিসের।’ মা চেঁচিয়ে বললেনঃ ‘ছেলে! তুমি তো পিছনে পড়ে গেছ, তাড়াতাড়ি যাও।’ সা’দের যে হাতে বর্শা ছিল সেই হাতটি বর্মের বাইরে বেরিয়ে ছিল। সে দিকে ইঙ্গিত করে হযরত আয়িশা বললেনঃ ‘সা’দের মা! দেখ, তার বর্মটি কত ছোট।’ যুদ্ধ ক্ষেত্রে পৌঁছার সাথে সাথে তাঁকে লক্ষ্য করে হিববান ইবন ’আবদি মান্নাফ একটি তীর ছোঁড়ে। কোন কোন বর্ণনায় হিববানের পরিবর্তে আবু উসামা অথবা খাফাজা ইবন ’আসিমের নাম এসেছে। তীরটি তাঁর হাতে লেগে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করে। খুশীর চোটে হিব্বান বলে ওঠে ‘আমি ’আরিকার পুত্র।’ একথা শুনে রাসূল সা., মতান্তরে সা’দ বলে ওঠেনঃ ‘দোযখের মধ্যে আল্লাহ তোমার মুখমণ্ডল ঘামে নিমজ্জিত করুন।’ উল্লেখ্য যে, ’আরাকার অর্থ ঘাম। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশামঃ ২/২২৬-২২৮; উসুদুল গাবা- ২/২৯৬) সেকালে মসজিদে নববীতে যুদ্ধে আহতদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য একটি শিবির স্থাপন করা হয়েছিল। সম্ভবতঃ এই শিবিরের প্রতিষ্ঠা হয় উহুদ যুদ্ধের পর এবং তা ছিল রাসূলুল্লাহর সা. হুজরার নিকটে। আসলাম গোত্রের ’উফাইদা’ নাম্নী এক সেবা পরায়না সৎকর্মশীলা মহিলা ছিলেন এই শিবিরের একজন সেবিকা। তিনি আহতদের সেবা ও চিকিৎসা করতেন। রোগীর সেবা ও ক্ষত চিকিৎসায় তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ। খন্দক যুদ্ধে সা’দ ইবন মু’য়াজ আহত হলে রাসূল সা. নির্দেশ দেনঃ ‘তোমরা সা’দকে রুফাইদার তাঁবুতে রাখ। তাহলে আমি নিকট থেকেই তার দেখাশুনা করতে পারবো।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৩৯; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭; দায়িরা-ই-মা’রিফ-ইসলামিয়্যা, উর্দু- ১১/৩৩) হযরত রাসূলে কারীম সা. প্রতিদিন এই শিবিরে এসে অসুস্থ সা’দের দেখাশুনা করতেন। তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন, তাই আল্লাহর দরবারে দু’আ করেনঃ ‘হে আল্লাহ! কুরাইশদের সাথে এ সংঘাত যদি এখনও অবশিষ্ট থাকে তবে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন। তাদের সাথে লড়াই করার আমার খুব সাধ। কারণ, আপনার রাসূলকে তারা কষ্ট দিয়েছে, তাঁকে অস্বীকার করেছে এবং মাতৃভূমি মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আর যদি সংঘাত শেষ হওয়ার সময় হয়ে থাকে তাহলে এই ক্ষতের দ্বারাই আমাকে শাহাদাত দান করুন। আর বনী কুরায়জার ব্যাপারে আমার চোখে প্রশান্তি না আসা পর্যন্ত আমার মরণ দিও না।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২৭; উসুদুল গাবা- ২/২৯৬; বুখারী- ২/৫৯১) আল্লাহ পাক তাঁর দু’আর শেষ কথাটি কবুল করেন। খন্দক যুদ্ধে কুরাইশ ও তাদের মিত্র বাহিনীর পশ্চাদপসরণের পর রাসূল সা. মদীনার যাবতীয় ফাসাদের উৎস ইহুদী গোত্র বনু কুরায়জাকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তারা চুক্তি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই বনী কুরায়জার সাথে প্রাচীনকাল থেকে মদীনার আউস গোত্রের মৈত্রী চুক্তি ছিল। রাসূল সা. যখন তাদেরকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন আউস গোত্রের লোকেরা বললোঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের প্রতিপক্ষ খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে তারা ছিল আমাদের মিত্র। এর আগে আপনি আমাদের ভাই খাযরাজীদের মিত্র গোত্র বনী কায়নুকা’র বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তা তো আপনার জানা আছে।’ মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুলও একই রকম কথা বললো। আসলে তারা রাসূলুল্লাহর সা. পক্ষ থেকে বনী কুরায়জার ব্যাপারে কোন কঠিন দন্ডের আশংকা করছিল। রাসূল সা. বললেনঃ ‘ওহে আউস গোত্রের লোকেরা! তোমাদের গোত্রের কেউ একজন তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিলে তোমরা কি তাতে খুশী হবে?’ তারা বললোঃ হ্যাঁ, খুশী হবো।’ রাসূল সা. বললেনঃ ‘তাদের ব্যাপারে সা’দ ইবন মু’য়াজ রায় দেবে।’ বনী কুরায়জার ভাগ্য নির্ধারণের জন্য রাসূল সা. এভাবে সা’দ ইবন মু’য়াজকে বিচারক নিয়োগ করলেন। সা’দ তো তখন আহত অবস্থায় দারুণ অসুস্থ। আউস গোত্রের লোকেরা উটের পিঠে গদি বসিয়ে তার ওপর সা’দকে উঠিয়ে রাসূলের সা. নিকট নিয়ে গেল। তারা সা’দকে বললোঃ ‘আবু ’আমর! আপনার মিত্রদের সাথে একটু ভালো আচরণ করবেন। সম্ভবতঃ এ জন্যই রাসূল সা. আপনাকে বিচারক মনোনীত করেছেন।’ তারা বেশী বাড়াবাড়ি শুরু করলে সা’দ বললেনঃ ‘আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন নিন্দুকের নিন্দার বিন্দুমাত্র পরোয়া সা’দের নেই।’ সা’দ যখন রাসূলের সা. নিকট পৌঁছুলেন তখন রাসূল সা. আশেপাশে বসা আনসার ও মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘কু মু ইলা সায়্যিদিকুম- তোমাদের নেতার সম্মানার্থে তোমরা উঠে দাঁড়াও।’ সা’দের গোত্রের লোকেরা বিচারের ক্ষেত্রে একটু নমনীয় হওয়ার জন্য যখন আবারও পীড়াপীড়ি শুরু করলো তখন তিনি বললেনঃ ‘এ ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার ও চুক্তি অনুসরণ করা উচিত।’ তারপর রাসূল সা. সা’দকে লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘এই লোকেরা তোমার রায়ের অপেক্ষায় আছে।’ সা’দ বললেন, ‘আমি আমার রায় ঘোষণা করছিঃ তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধ করার উপযুক্ত তাদেরকে হত্যা করা, তাদের নারী ও শিশুদেরকে দাস-দাসীকে পরিণত করা এবং তাদের ধন-সম্পদ বন্টন করে দেওয়া হোক।’ তাঁর এই রায় শুনে রাসূল সা. বলেনঃ ‘সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহ যে ফায়সালা দিয়েছেন তুমিও ঠিক একই ফায়সালা দিয়েছ।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৩৯, ২৪০; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭; আল-ইসাবা- ২/৩৮) বনী কুরায়জার ব্যাপারে সা’দের রায় বাস্তবায়িত হওয়ার পর অল্প কিছু দিন তিনি জীবিত ছিলেন। একদিন রাসূল সা. নিজ হাতে তাঁর ক্ষতে সেঁক দেন। তাতে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে ফুলে যায়। হঠাৎ একদিন ক্ষতটি ফেটে তীব্র বেগে রক্ত ঝরতে থাকে। ইবন ‘আব্বাস বলেনঃ যখন সা’দের ক্ষত থেকে রক্ত প্রবাহ শুরু হয় তখন রাসূল সা. দৌড়ে এসে তাঁর মাথাটি কোলের ওপর উঠিয়ে নেন। সা’দের রক্তে রাসূলের সা. চেহারা ও দাড়ি ভিজে যায়। রাসূল সা. একটি সাদা চাদর দিয়ে তাঁর দেহটি ঢেকে দেন। চাদরটি এত ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল। সা’দ ছিলেন ফর্সা মোটা মানুষ। রাসূল সা. তখন সা’দের জন্য দু’আ করেন এই বলেনঃ ‘হে আল্লাহ! সা’দ তোমার রাস্তায় জিহাদ করেছেন, তোমার নবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে এবং তাঁর পথে চলেছে। তুমি তাঁর রূহকে সর্বোত্তমভাবে কবুল কর।’ রাসূলের সা. এই দু’আ শুনে সা’দ চোখ খোলেন এবং বলেনঃ ‘আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। (তাবাকাত- ৩/৪২৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৫৭) হযরত সা’দ ইনতিকাল করলেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ ‘সা’দ ইবন মু’য়াজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর রাতের বেলা একটি রেশমী পাগড়ী মাথায় বেঁধে জিবরীল আ. রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বলেনঃ ‘ইয়া মুহাম্মদ! এ মৃত ব্যক্তিটি কে, যার জন্য আসমানের সবগুলি দরযা খুলে গেছে এবং ’আরশ কেঁপে উঠেছে?’ রাসূল সা. কাপড় টানতে টানতে খুব দ্রুত সা’দের নিকট গিয়ে দেখলেন, তিনি ইনতিকাল করেছেন। (তাবাকাত- ৩/৪৩২; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫০, ২৫১) রাসূল সা. সা’দের মাথাটি কোলের মধ্যে নিয়ে বসে থাকলেন। তখনও তাঁর হাত থেকে রক্ত ঝরছিল। চতুর্দিক থেকে মানুষ ছুটে আসতে লাগলো। আবু বকর রা. দৌড়ে এসে লাশ দেখে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। রাসূল সা. তাঁকে এমনটি করতে নিষেধ করলেন। ’উমার রা. কাঁদতে কাঁদতে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করলেন। গোটা তাঁবুতে একটি কান্নার রোল পড়ে গেল। সা’দের দুখিনী মা কাঁদতে কাঁদতে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। ’উমার রা. তাঁকে কবিতা পড়তে নিষেধ করলেন; কিন্তু রাসূল সা. বললেনঃ থাক, তাকে পড়তে দাও। অন্য বিলাপ কারিনীরা মিথ্যা বলে থাকে; কিন্তু সা’দের মা সত্য বলছে।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২; তাবাকাত- ৩/২২৮, ২২৯) হযরত রাসূলে কারীম সা. সা’দের মৃত্যুর পর তাঁর বাড়ীতে যাচ্ছিলেন। সাহাবীরাও সংগে ছিলেন। তিনি এত দ্রুত চলছিলেন যে, সাহাবীরা তাঁর অনুসরণ করতে গিয়ে অক্ষম হয়ে পড়ছিলেন। একজন তো বলেই বসলেন; ‘আপনি এত দ্রুত চলছেন কেন? আমরা তো রীতিমত ক্লান্ত হয়ে পড়ছি।’ রাসূল সা. বললেনঃ ‘আমার ভয় হচ্ছে, আমাদের আগেই ফিরিশ্তারা তাকে গোসল না দিয়ে ফেলে, যেমন দিয়েছিল হানজালাকে।’ (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৫) রাসূল সা. সা’দের জানাযার সাথে গোরস্তানে গিয়েছিলেন। মুনাফিকরাও গিয়েছিল। তাঁর লাশ হালকা বোধ হচ্ছিলো। এজন্য মুনাফিকরা বলাবলি করছিল, এমন হালকা লাশ তো আমরা আর কখনও দেখিনি। সম্ভবতঃ বনী কুরায়জার ব্যাপারে সে যে রায় দিয়েছিল, এটা তারই কুফল। কথাটি রাসূলুল্লাহর সা. কানে গেলে তিনি বললেন, ‘যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর নামে শপথ! ফিরিশতাকুল তাঁর খাটিয়া বহন কেরছে।’ ইবন ’উমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. আরও বললেনঃ ‘নিশ্চয় এই সা’দ অতি নেক্কার বান্দা। তার জন্য আল্লাহর ’আরশ দুলে উঠেছে, আসমানের দরযাসমূহ খুলে গেছে এবং তাঁর জানাযায় এমন ৭০ হাজার ফিরিশতা যোগদান করেছে যারা এর আগে আর কখনও পৃথিবীতে আসেনি।’ (তাবাকাত- ৩/৪৩০; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫১) ইবন ইসহাক জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ ‘সা’দকে দাফনের সময় আমরা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ছিলাম। তিনি প্রথমে, একবার জোরে ‘সুবহানাল্লাহ’ উচ্চারণ করলেন। লোকেরাও তাঁর সাথে ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়লেন। তারপর তিনি ‘তাকবীর’ ধ্বনি দিলেন, লোকেরাও ‘তাকবীর’ দিল। লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এভাবে ‘তাসবীহ’ পড়লেন কেন? বললেনঃ এ নেক্কার লোকটির কবর বড় সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ পাক প্রশস্ত করে দিয়েছেন।’ (তাবাকাত- ৩/৪৩২; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫১, ২৫২) হযরত সা’দকে দাফনের পর রাসূলে কারীমকে সা. দারুণ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। চোখ দিয়ে ক্রমাগতভাবে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আল-ইস্তীয়াব গ্রন্থকার বলেছেনঃ ‘খন্দক যুদ্ধের একমাস এবং বনী কুরায়জার ঘটনার কয়েক রাত্রি পর হিজরী পঞ্চম সনে সা’দের ওফাত হয়।’ (টীকাঃ আল-ইসাবা- ২/২৮) মদীনার বাকী গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৯) ইবন ইসহাক তাঁকে খন্দক যুদ্ধে বনী ’আবদিল আশহালের শাহাদাত প্রাপ্তদের মধ্যে গণ্য করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২) হযরত সা’দের ওফাতের ঘটনাটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক অসাধারণ ঘটনা। তিনি ইসলামের খিদমতে যে অবদান রাখেন এবং তাঁর মধ্যে যে ঈমানী চেতনা বিদ্যমান ছিল, তার জন্য তাঁকে আনসারদের ‘আবু বকর’ বলে গণ্য করা হতো। ‘ইফক’ বা হযরত আয়িশার প্রতি মিথ্যা অপবাদের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একদিন রাসূল সা. ক্ষোভের সাথে বললেনঃ ‘এ আল্লাহর দুশমন (আবদুল্লাহ ইবন উবাই, মুনাফিক সর্দার) আমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে এর প্রতিবিধান করতে পারে? ’সাথে সাথে সা’দ উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেনঃ ’আউস গোত্রের কেউ থাকলে আমাকে বলুন, আমরা তার গর্দান উড়িয়ে দিচ্ছি। আর যদি আমাদের ভাই খাযরাজীদের কেউ হয়, আমাদেরকে নির্দেশ দিন, আমরা আপনার নির্দেশ বাস্তবায়ন করবো।’ (শাহীরাতুন নিসা ফিল ’আলম আল-ইসলামী- ৫৯) তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বুঝা যায় তাঁর জানাযায় ফিরিশতাদের অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর ’আরশ কেঁপে উঠার মাধ্যমে। তাই একজন আনসারী কবি গর্ব করে বলেছিলেনঃ ‘একমাত্র সা’দ আবু ’আমরের মৃত্যু ছাড়া আর কোন মরণশীলের মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছে, এমন কথা আমরা কখনও শুনিনি।’ এমনিভাবে রাসূলুল্লাহর সা. দরবারী কবি হাস্সান ইবন সাবিতও তাঁর অনেক কবিতায় সা’দের প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক জ্ঞাপন করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২, ২৬৯, ২৭০, ২৭২) হযরত সা’দ ছিলেন ফর্সা, দীর্ঘদেহী, সুদর্শন পুরুষ। মৃত্যুকালে ’আমর ও আবদুল্লাহ নামে দুই ছেলে রেখে যান। তাঁরা দু’জনই বাই’য়াতে রিদওয়ানে শরীক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁদের মা হিন্দা বিনতু সাম্মাকও ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. সম্মানিত সাহাবিয়্যা। (তাবাকাত- ৪২০, ৪৩৩) মদীনায় ইসলামের প্রথম ভাগেই হযরত সা’দের ওফাত হয়। জীবনের মাত্র পাঁচটি বছর রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। এ অল্প সময়ে তিনি হয়তো বহু হাদীস শুনে থাকবেন; কিন্তু হাদীস বর্ণনার সিলসিলা যেহেতু রাসূলুল্লাহর সা. দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর শুরু হয়, এ কারণে তাঁর বর্ণনা প্রচারিত হয়নি। তবে সহীহ বুখারীতে ’আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদের একটি বর্ণনা এসেছে যাতে সা’দের ’উমরার কথা আছে এবং উহুদে সা’দ ইবন রাবী’র শাহাদাতের ঘটনা প্রসঙ্গে আনাস রা. তাঁর থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এটাও বুখারীতে এসেছে। (তাহজীব আত-তাহজীব- ৩/৪৮২) নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে হযরত সা’দ ইবন মু’য়াজ ছিলেন অতি উঁচুমানের লোক। ’আয়িশা রা. বলেনঃ ‘রাসূলুল্লাহর সা. পরে বনী ’আবদুল আশহালে তিন ব্যক্তি থেকে উত্তম আর কেউ নেই। তাঁরা হলেনঃ সা’দ ইবন মু’য়াজ, উসাইদ ইবন হুদাইর ও ’আব্বাদ ইবন বিশর।’ (আল-ইসাবা- ২/৯৭) সা’দ নিজেই বলতেনঃ আমি একজন সাধারণ মানুষ, তবে তিনটি বিষয়ে যে পর্যন্ত পৌঁছানো উচিত, আমি সেখানে পৌঁছেছি। ১. রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে যে বাণী আমি শুনি তা সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে বিশ্বাস করি। ২. নামাযের মধ্যে অন্য কোন চিন্তা আমার মনে জাগে না। ৩. মৃত ব্যক্তির জানাযার কাছে থাকলে মুনকির- নাকীরের প্রশ্নের চিন্তা ছাড়া আমার মধ্যে আর কিছু থাকে না। (টীকাঃ আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৩; তাহজীব আত তাহজীব- ৩/৪৮২) হযরত সা’দের ’আমলের ওপর হযরত রাসূলে কারীমের সা. যে দারুণ আস্থা ছিল সে কথা একটি হাদীসে জানা যায়। হযরত ’আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘কবরের একটি চাপ অবশ্যই আছে। যদি কেউ এই চাপ থেকে রেহাই পেয়ে থাকে, তাহলে সে সা’দ ইবন মু’য়াজ।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২; তাবাকাত- ৩/২৫২; তাবাকাত- ৩/৪৩২। তাছাড়া ইমাম আহমাদ ও বায়হাকীও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) কিন্দার রাজা উকাযদারকে খালিদ ইবন ওয়ালীদ বন্দী করে মদীনায় নিয়ে এলেন। তার মূল্যবান পোশক দেখে, মতান্তরে রাসূলকে সা. উপহার দেওয়া একখানা কাপড় দেখে সাহাবীরা অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁদের এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. বললেনঃ ‘তোমরা এই দেখে অবাক হচ্ছো? জান্নাতে সা’দ ইবন মু’য়াজের রুমালগুলিও এর থেকে সুন্দর হবে।’ (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৮৩; তাবাকাত- ৩/৪৩৬; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭; উবন হিশাম- ২/৫২৬; সহীহ বুখারী- ১/৫৩৬) আবু সা’ঈদ আল-খুদরী রা. বলেনঃ ‘যাঁরা বাকী গোরস্তানে সা’দের কবর খুঁড়েছিল আমি তাঁদের একজন। আমরা কবরের মাটি খোঁড়ার সময় মিশকের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। শুরাহবীল ইবন হাসানা বলেনঃ এক ব্যক্তি সা’দের কবরের মাটি থেকে এক মুঠ মাটি নিয়ে ঘরে রেখে দেয়। কিছুদিন পরে সে দেখে, তা মাটি নয়; বরং মিশ্ক। (তাবাকাত- ৩/৪৩১; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯৫)


















