তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

আমরা যদি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখি, তাহলে দেখতে পাব যে এর দৃষ্টিভঙ্গি হল এটি মানুষের প্রয়োজন (needs) এবং এসব প্রয়োজন পূরণের উপকরণ নিয়ে কাজ করে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের কেবলমাত্র বস্তুগত দিকটি নিয়েই আলোচনা করে এবং এটি তিনটি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত:
১. প্রয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক অভাব (relative scarcity) রয়েছে। এর অর্থ হল মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ও সেবার অপর্যাপ্ততা। তাদের দৃষ্টিতে এটাই হল সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা।
২. অধিকাংশ অর্থনৈতিক গবেষণা ও অধ্যয়নের ভিত্তি হল উৎপাদিত পণ্যের মূল্য (value)।
৩. উৎপাদন, ভোগ ও বন্টনে দামের (price) ভূমিকা। দাম হল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক বিষয়।পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক অভাবের ক্ষেত্রে বলা যায়, পণ্য ও সেবা মানুষের অভাব পূরণের উপকরণ হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তারা বলে মানুষের প্রয়োজন রয়েছে যা পূরণ করতে হয় এবং এ প্রয়োজন পূরণের উপকরণ থাকতেই হবে। এ প্রয়োজনসমূহ পুরোপুরিই বস্তুগত (materialistic)। এগুলো হয় দৃশ্যমান (tangible), যেমন: খাদ্য ও বস্ত্রের প্রয়োজন, অথবা এমন সব প্রয়োজন যা মানুষ অনুভব করে এবং এগুলো অদৃশ্যমান (intangible) অর্থাৎ সেবার প্রয়োজন, যেমন: ডাক্তার বা শিক্ষকের সেবা। নৈতিক প্রয়োজন, যেমন: গৌরব ও সম্মান অথবা আধ্যাত্মিক প্রয়োজন, যেমন: স্রষ্টার উপাসনা করা, এগুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃত নয়। একারণে এগুলো পরিত্যাগ করা হয়, ফলে অর্থনৈতিক আলোচনায় এগুলোর কোন স্থান নেই।
প্রয়োজন পূরণের উপকরণসমূহকে পণ্য ও সেবা বলা হয়। পণ্য হল দৃশ্যমান প্রয়োজন পূরণের উপকরণ এবং সেবা হল অদৃশ্যমান প্রয়োজন পূরণের উপকরণ। তাদের দৃষ্টিতে যা পণ্য ও সেবাকে প্রয়োজন পূরণ করতে দেয়, তা হল পণ্য ও সেবার মধ্যে থাকা সুযোগ-সুবিধা বা উপযোগ। এই উপযোগ এমন একটি বৈশিষ্ট্য যা প্রয়োজন পূরণের জন্য আকাঙ্খিত বস্তু থেকে পাওয়া যায়। যেহেতু প্রয়োজন হল অর্থনৈতিক আকাঙ্খা, সেহেতু আকাঙ্খিত প্রতিটি বস্তুই অর্থনৈতিকভাবে উপকারী – হোক তা অপরিহার্য বা তা নয়, কিংবা কিছু সংখ্যক লোক এটিকে উপকারী মনে করুক এবং অন্য কিছু সংখ্যক এটিকে ক্ষতিকর মনে করুক। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে উপকারী যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ একে আকাঙ্খিত মনে করে। যেকোন বস্তুকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কিনা শুধুমাত্র সে দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়, যদিও বা জনমত এটিকে অলাভজনক বা ক্ষতিকারক মনে করে। সেকারণে মদ ও হাসিস অর্থনীতিবিদদের কাছে লাভজনক, কেননা কিছু লোক এগুলো চায়।
অন্য কোন বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে কেবলমাত্র প্রয়োজন পূরণ করে- এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অর্থনীতিবিদ প্রয়োজন পূরণের উপকরণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অর্থাৎ পণ্য ও সেবার দিকে লক্ষ্য করে। সুতরাং সে প্রয়োজন ও উপযোগ এ দু’টি যেরূপ বিদ্যমান ঠিক সেভাবেই দেখে, কিন্তু এগুলো কিরকম হওয়া উচিত সেদিকে দৃষ্টিপাত করেনা অর্থাৎ সে অন্য কোন কিছুকে বিবেচনায় না এনে উপযোগকে প্রয়োজন পূরণের নিয়ামক হিসেবে দেখে। সুতরাং কিছু লোকের চাহিদা মেটানোর কারণে সে মদকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করে এবং অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনা করে মদ প্রস্তুতকারীকে একজন সেবাপ্রদানকারী হিসেবে মনে করে। কারণ এটি কিছু ব্যক্তির অভাব পূরণ করে।
এটিই হল পুঁজিবাদে প্রয়োজন ও তা পূরণের উপকরণের প্রকৃতি। সেকারণে অর্থনীতিবিদ সমাজের প্রকৃতির তোয়াক্কা করে না, কিন্তু তারা অর্থনৈতিক বস্তুগত সম্পদ বা অর্থনৈতিক পণ্যের ব্যাপারে যত্মশীল কারণ এগুলো প্রয়োজন পূরণ করে। সুতরাং তাদের মতানুসারে অন্য কোন কিছু বিবেচনায় না এনে মানুষের প্রয়োজন পূরণের উপকরণ যোগানের জন্য পণ্য ও সেবা সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। অর্থাৎ, প্রয়োজন পূরণের উপকরণ সরবরাহ করা দরকার। প্রয়োজন পূরণের উপকরণ হিসেবে পণ্য ও সেবা যেহেতু সীমিত সেহেতু এগুলো মানুষের সব প্রয়োজন পূরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কারণ তাদের দৃষ্টিতে এই প্রয়োজনসমূহ অসীম এবং ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি একারণে যে, মানুষের রয়েছে এমন কিছু মৌলিক প্রয়োজন যা তাকে পূরণ করতেই হয় এবং এমন কিছু প্রয়োজন রয়েছে যা নগরায়নের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়। এ চাহিদাসমূহ গুনিতক হারে বাড়তেই থাকে এবং এগুলো পুরোপুরি পূরণ করা দরকার। যদিও পণ্য ও সেবা যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, এগুলো কখনই পূরণ হবার নয়। এ ভিত্তি থেকে অর্থনৈতিক সমস্যার সূত্রপাত হয়, যা হল প্রয়োজনের অতিরিক্ত বোঝা এবং এগুলো পূরণের জন্য উপকরণের অপ্রতুলতা অর্থাৎ মানুষের সব অভাব পূরণের জন্য পণ্য ও সেবার অপ্রতুলতা।
এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজ একটি অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং তা হল পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা। এ দুষ্প্রাপ্যতার অপরিহার্য ফল হল কিছু প্রয়োজন আংশিকভাবে পূরণ হয় এবং কিছু কখনই পূরণ হয় না। যেহেতু এটাই হল অবস্থা সেহেতু এটি অপরিহার্য যে সমাজের সদস্যগণ এমন আইনের ব্যাপারে একমত হবেন- যা নির্ধারণ করবে কোন প্রয়োজনগুলো পূরণ হওয়া উচিত এবং কোনগুলো নয়। অন্যকথায় এমন আইন প্রণয়ন করা জরুরী যা অসীম অভাব পূরণ করার জন্য সীমিত সম্পদ বন্টনের ব্যবস্থা করবে। সুতরাং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের চেয়ে প্রয়োজন ও সম্পদকে বেশী গুরুত্ব প্রদান করেছে। অর্থাৎ সমস্যা হল প্রয়োজন পূরণের জন্য সম্পদকে সুলভ করতে হবে, কিন্তু সেটা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নয়। সুতরাং এটি অপরিহার্য যে যেসব আইন প্রণয়ন করা হবে সেগুলোকে অবশ্যই সর্বোচ্চ পরিমাণ উৎপাদনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে যাতে করে সম্পদের সর্বোচ্চ সরবরাহ অর্জন করা সম্ভবপর হয়। অর্থাৎ সামগ্রিতকভাবে জাতির কাছে পণ্য ও সেবা সরবরাহ করা যায়, অবশ্যই প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে নয়। সুতরাং পণ্য ও সেবার বন্টন উৎপাদনের সমস্যার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং অর্থনীতি অধ্যয়ন ও গবেষণার উদ্দেশ্য হল সমাজের ভোগের জন্য পণ্য ও সেবা বৃদ্ধি করা। সুতরাং এটি অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে যেসব নিয়ামক জাতীয় আয়ের (GDP and GNP) আকারকে প্রভাবিত করে সেগুলোর অধ্যয়ন বাদ বাকী সব কিছুর উপর প্রাধান্য লাভ করে। কারণ জাতীয় আয় বৃদ্ধির অধ্যয়ন অর্থনৈতিক সমস্যা অর্থাৎ প্রয়োজনের বিপরীতে পণ্য ও সেবার দুষ্প্রাপ্যতার সমস্যার সমাধান করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তারা মনে করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা ছাড়া দরিদ্রতা ও বঞ্চনা নিরসন করা সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজ যেসব অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলোর সমাধান কেবলমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমেই করা সম্ভব।
উৎপাদিত পণ্যের মূল্য (value) বলতে এর গুরুত্বের মাত্রাকে বুঝায়; যেখানে কোন এক বিশেষ ব্যক্তির বা কোন এক বিশেষ বস্তুর সাপেক্ষে সে মাত্রা নির্ধারিত হয়। প্রম ক্ষেত্রে এটাকে ‘উপযোগের মূল্য’ (The Value of The Benefit) বলা হয় এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এটিকে ‘বিনিময়ের মূল্য’ (value of exchange) বলা হয়। একটি বস্তু থেকে প্রাপ্ত উপযোগকে যেভাবে বর্ণনা করা যায় তার চুম্বকাংশ হল: একটি বস্তুর যে কোন এককের উপযোগের মূল্য এর প্রান্তিক উপযোগ দ্বারা পরিমাপ করা হয় অর্থাৎ সর্বনিম্ন প্রয়োজন যে পরিমাণ বস্তু দ্বারা পূরণ করা যায় সে পরিমাণ বস্তুর উপযোগ। তারা এটিকে ‘প্রান্তিক উপযোগ তত্ত্ব’ বা ‘The Theory Of Marginal Utility’ বলে। এর অর্থ হল উপযোগ কেবলমাত্র এর উৎপাদকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিমাপ করা হয় না অর্থাৎ উৎপাদন খরচ দ্বারা মূল্যায়িত হয় না, তাহলে সেক্ষেত্রে চাহিদা বিবেচনা না করে কেবল যোগানই বিবেচনা করা হত। আবার এটিকে কেবলমাত্র ভোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না অর্থাৎ এর উপযোগ এবং চাহিদা বিবেচনা করার সাথে সাথে এর আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা বিবেচনা করতে হবে। কেননা এতে করে যোগানের বিষয়টি হিসেবে না এনে চাহিদা বিবেচনা করা হবে। বাস্তবিকভাবে তারা বলে যে, যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে একত্রে উপযোগকে দেখা উচিত। সুতরাং সর্বনিম্ন যে উপযোগ প্রয়োজন পূরণ করে তার ভিত্তিতে একটি বস্তুর উপযোগ পরিমাপ করা হয় অর্থাৎ সন্তুষ্টির সর্বনিম্ন বিন্দু থেকে। সুতরাং এক টুকরো রুটির মূল্য সবচেয়ে কম ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় পরিমাপ করা হবে, সর্বাধিক ক্ষুধার্ত অবস্থায় নয় এবং সেসময় বাজারে রুটি সুলভ থাকতে হবে এবং যখন সুলভ নয় এমন অবস্থায় পরিমাপ করা যাবে না।
বিনিময়ের মূল্যের ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি হল একটি বস্তুর এমন বৈশিষ্ট্য যা থাকার কারণে সেটি বিনিময়ের উপযোগী হয়। একটি বস্তুর বিনিময়ের শক্তিমত্তা আপেক্ষিকভাবে অন্য একটি বস্তুর সাথে তুলনা করে নিরূপণ করা হয়; যেমন: ভূট্টার সাথে গমের বিনিময় মূল্য হিসেব করতে হলে দেখতে হবে এক একক গম পাবার জন্য কত একক ভূট্টা বিনিময় করতে হয়। তারা কেবলমাত্র ‘উপযোগ’ শব্দ দ্বারা উপযোগের মূল্য এবং কেবলমাত্র ‘মূল্য’ শব্দ দ্বারা বিনিময়ের মূল্য বুঝিয়ে থাকে।
মূল্যের দিক থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ দু’টি পণ্য ও সেবার মধ্যে বিনিময় সংঘটিত হয়। সেকারণে অর্থনীতিবিদদের জন্য মূল্য অধ্যয়ন করা অপরিহার্য। কেননা এটি হল বিনিময়ের ভিত্তি এবং এমন একটি উপযোগ যা পরিমাপ করা যায়। এটি এমন একটি মানদন্ড যার মাধ্যমে পণ্য ও সেবা পরিমাপ করা হয় এবং এর মাধ্যমে কোন কাজ উৎপাদনমুখী কিনা তা পরিমাপ করা হয়।
তাদের দৃষ্টিতে উৎপাদন হল কাজের মাধ্যমে উপযোগ সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করা। সুতরাং কোন কাজটি উৎপাদনশীল এবং কোনটির অনেক বেশী উৎপাদনশীলতা রয়েছে তা চিহ্নিত করার জন্য বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্য ও সেবার জন্য একটি সূক্ষ্ম মানদন্ড থাকা উচিত। এ মানদন্ড হল বিবিধ পণ্য ও সেবার বিষয়ে সামাজিক মূল্য। অন্য কথায় এটি হল ব্যয়কৃত শ্রম ও প্রদত্ত সেবার যৌথ মূল্যায়ন। আধুনিক সময়ে ‘ভোগ করার জন্য উৎপাদন’ দ্বারা ‘বিনিময়ের জন্য উৎপাদন’ প্রতিস্থাপিত হওয়ায় এ মূল্যায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অবস্থা এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কার্যত প্রত্যেক ব্যক্তি তার উৎপাদনকে অন্য আরেকজনের উৎপাদিত পণ্যের সাথে বিনিময় করে থাকে। পণ্য ও সেবার ক্ষতিপূরণের (compensation) মাধ্যমে বিনিময় সম্পাদিত হয়। সেকারণে পণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে একটি মানদন্ড থাকা উচিত যাতে করে বিনিময় করা যায়। সুতরাং উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রে ‘মূল্য কী’ – সে ব্যাপারে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে অর্থাৎ উপকরণসমূহ ব্যবহার করে মানুষের অভাব পূরণ করার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।
আধুনিক ইতিহাসে, এ বিনিময়ের মূল্যকে এর একটি মূল্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয় এবং এ ধরনের মূল্য প্রণিধানযোগ্য হয়ে পড়েছে। উনড়বত সম্প্রদায়ে পণ্যসমূহের মূল্য একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়, বরং একটি বিশেষ পণ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত – যাকে অর্থ (money) বলা হয়। অর্থের সাথে কোন পণ্য বা সেবার বিনিময়ের অনুপাতকে তাদের দাম (price) বলা হয়। সুতরাং দাম হল অর্থের তুলনায় একটি পণ্য বা সেবার বিনিময়ের পরিমাণ। অতএব বিনিময়ের মূল্য (value of exchange) ও দামের (price) মধ্যে পার্থক্য হল বিনিময়ের মূল্য হল একটি বস্তুর সাথে অপর কিছুর বিনিময়ের হার – হতে পারে সেটি অর্থ, পণ্য বা সেবা। অন্যদিকে দাম হল অর্থের সাথে বিনিময় মূল্য। এর অর্থ হল সব পণ্যের দাম একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে বাড়তে পারে এবং অপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে হ্রাস পেতে পারে। অন্যদিকে একে অপরের তুলনায় আপেক্ষিকভাবে সব পণ্যের বিনিময় মূল্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে বাড়া বা কমা সম্ভব নয়। আবার বিনিময় মূল্যে কোনরূপ পরিবর্তন না এনে পণ্যের দামে পরিবর্তন আসা সম্ভব। সুতরাং পণ্যের দাম হল এর মূল্যসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি। অন্য কথায় এটি অর্থের তুলনায় পরিমাপ করা একটি মূল্যমাত্র। যেহেতু দাম হল অন্যতম একটি মূল্য সেহেতু একটি বস্তু উপকারী কিনা বা উপযোগের মাত্রা কতটুকু সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য দামকে ব্যবহার করা স্বাভাবিক। সুতরাং একটি পণ্যকে ফলদায়ক ও উপকারী তখনই বিবেচনা করা হবে যখন সমাজ এ বিশেষ পণ্য ও সেবাকে একটি দাম দ্বারা মূল্যায়ন করে। পণ্য বা সেবার উপযোগের মাত্রা এমন একটি দাম দ্বারা পরিমাপ করা হয় যা অধিকাংশ ভোক্তা মালিকানায় নেয়া বা সদ্ব্যবহার করবার জন্য দিতে সম্মত থাকে – হোক সে পণ্য কৃষিজাত বা শিল্পজাত এবং সে সেবা একজন ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ডাক্তার বা প্রকৌশলীর।
উৎপাদন, ভোগ, বন্টনের ক্ষেত্রে দাম যে ভূমিকা রাখে তা হল, দামের ব্যবস্থাপনা (price mechanism) নির্ধারণ করে কোন উৎপাদক পণ্য উৎপাদন করবে এবং কোন উৎপাদক পণ্য উৎপাদন করবে না। একইভাবে দামই নির্ধারণ করে কোন ভোক্তা পণ্য দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাবে এবং কোন ভোক্তা পণ্য ভোগ করতে সমর্থ হবে না। একটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাজারে এর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক ও পণ্যের উপযোগ বাজারে এর চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে এবং উভয়ক্ষেত্রে দাম দ্বারা এসব পরিমাপ করা হয়। সুতরাং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগান (demand and supply) অধ্যয়ন করা মৌলিক ইস্যু। যোগান বলতে বাজারে সরবরাহ করা বুঝায় এবং একইভাবে চাহিদা বলতে বাজারের চাহিদা বুঝায়। চাহিদা দাম উল্লেখ ব্যতিরেকে যেমনি বলা যায় না, তেমনি সরবরাহও দাম ব্যতিরেকে bমূল্যায়ন করা যায় না। তবে চাহিদা দামের ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়, অর্থাৎ যদি দাম বাড়ে তাহলে চাহিদা কমে এবং দাম কমলে চাহিদা বাড়ে। সরবরাহের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটি ঠিক উল্টো, অর্থাৎ দামের অনুপাতে যোগান পরিবর্তিত হয়। সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যদি দাম বাড়ে এবং সরবরাহ হ্রাস পায় যদি দাম কমে যায়। যোগান ও চাহিদা এ উভয়ক্ষেত্রে দামের সবচেয়ে বড় প্রভাব রয়েছে; ফলে উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে এর বড় প্রভাব।
পুঁজিবাদীদের মতে দামের ব্যবস্থাপনা হল সমাজে ব্যক্তির মধ্যে পণ্য ও সেবা বন্টনের আদর্শ পদ্ধতি। কেননা মানুষ যে শ্রম ব্যয় করে তার ফলই হল উপযোগ। সুতরাং ক্ষতিপূরণ (compensation) যদি শ্রমের সমান না হয় তাহলে সন্দেহাতীতভাবে উৎপাদন কমে যাবে। সুতরাং সমাজে পণ্য ও সেবা বন্টনের আদর্শ পদ্ধতি হল এমন একটি ব্যবস্থা যা সর্বোচ্চ উৎপাদনকে সুনিশ্চিত করে। এ পদ্ধতি হল দামের পদ্ধতি – যাকে দামের ব্যবস্থা বা দামের ব্যবস্থাপনা বলা হয়। তারা মনে করে দামের ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সাম্যাবস্থার (economic equilibrium) সৃষ্টি করে। যেহেতু এটি ভোক্তাকে কিছু পণ্যের ব্যাপারে তার চাহিদা এবং অন্যকিছুর ব্যাপারে চাহিদা না থাকার ভিত্তিতে বিভিনড়ব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অর্জিত সমাজের মালিকানাধীন সম্পদের বন্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করার সুযোগ দেয়। সুতরাং যা প্রয়োজন ও পছন্দনীয় তা μয় করার জন্য তাদের আয়কে ব্যয় করে। সুতরাং যে ভোক্তা মদ পছন্দ না করে সে সেটি ক্রয় না করে অন্য কিছুর পেছনে তার আয় ব্যয় করবে। মদ অপছন্দ করে এমন ক্রেতার সংখ্যা যদি বৃদ্ধি পায়, অথবা সবাই মদকে অপছন্দ করা শুরু করে, তাহলে ক্রমহ্রাসমান চাহিদার কারণে মদ উৎপাদন করা অলাভজনক হয়ে যাবে। এভাবে মদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে এবং একই নিয়ম অন্য পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভোক্তাগণ কী ক্রয় করবে এবং কী ক্রয় করবে না এ ব্যাপারে তারা স্বাধীন বিধায় উৎপাদনের পরিমাণ ও প্রকরণকে তারাই নির্ধারণ করে। তারা তা করে দামের মাধ্যমে এবং পণ্য ও সেবার বন্টনও ঘটে, যদিও ভোক্তা কর্তৃক প্রদেয় দাম সরাসরি উৎপাদক পায় না এবং ভোক্তা উৎপাদককে দেয়ও না।
দামের ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের উদ্দীপক। এটি বন্টনের নিয়ন্ত্রক এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী, অর্থাৎ এটি এমন একটি উপায় যার মাধ্যমে উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা অর্জন হয়।
দামের ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের উদ্দীপক, কেননা যে কোন মানুষের কোন ফলদায়ক প্রচেষ্টা ও ত্যাগের কারণ হল বস্তুগত লাভ। পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা এ সম্ভাবনা বাদ দিয়েছে যে কোন মানুষ আধ্যাত্মিক বা নৈতিক কারণে প্রচেষ্টা চালাতে পারে। যখন তারা নৈতিক উদ্দেশ্যকে সনাক্ত করে তখন সেটিকে বস্তুগত লাভের জন্য করা হয় বলে ধরে নেয়। তারা বিবেচনা করে যে, মানুষ কেবলমাত্র তার বস্তুগত অভাব ও ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করে। এ প্রয়োজন পূরণ হতে পারে ব্যক্তি সরাসরি যা উৎপাদন করে সেগুলোর ভোগ থেকে অথবা এমন কোন আর্থিক পুরস্কার থেকে যার মাধ্যমে সে অন্যদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে সক্ষম হয়। যেহেতু মানুষ অন্যের সাথে প্রচেষ্টা বিনিময় করার মাধ্যমে তার অধিকাংশ বা সব প্রয়োজন পূরণের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু প্রয়োজন পূরণ করার প্রচেষ্টা আর্থিক পুরস্কারের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। এই আর্থিক পুরস্কার তাকে পণ্য ও সেবা প্রাপ্তিতে সহায়তা করে এবং একইভাবে সে যেসব পণ্য উৎপাদন করে তা পাওয়া তার লক্ষ্য থাকে না। সুতরাং আর্থিক পুরস্কার বা দাম পণ্য উৎপাদনের জন্য মূল লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ দাম হল এমন একটি উপায় যা উৎপাদককে তার প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং দাম উৎপাদনের উদ্দীপক।
দাম হল এমন একটি উপায় যা বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ মানুষ তার সব প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করতে চায় এবং প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ও সেবা অর্জনে সে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়। যদি প্রত্যেক মানুষকে তার প্রয়োজন পূরণের জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হত তাহলে সে তার পছন্দমত যে কোন পণ্য লাভ করতে ও ভোগ করতে ক্ষান্ত হত না। যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তি একই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রচেষ্টা চালায়, সেহেতু একজন মানুষকে তার প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে সে সীমায় থেমে যেতে হয় যেখানে সে নিজের প্রচেষ্টা অন্যের প্রচেষ্টার সাথে বিনিময় করতে সমর্থ হয়, অর্থাৎ তার প্রচেষ্টার কারণে সে যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ লাভ করে সে সীমা পর্যন্ত অর্থাৎ দামের সীমা পর্যন্ত। সুতরাং দাম স্বাভাবিকভাবে মানুষকে কোন কিছু লাভ ও ব্যয় করার ক্ষেত্রে একটি সীমার মধ্যে বেধে রাখার জন্য বাধ্য করে এবং এই সীমাটি হল তার আয়ের সীমা। সুতরাং দাম মানুষকে চিন্তা, মূল্যায়ন, তার পূরণ করতে হবে এমন তুলনামূলক প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য করতে দেয়, অর্থাৎ যা তার জন্য অপরিহার্য সেটি সে গ্রহণ করে এবং যা কম গুরুত্বপূর্ণ তা ছেড়ে দেয়। সুতরাং দাম কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাকে আংশিক চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য করে – যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ অন্য প্রয়োজনগুলো সে পূরণ করতে পারে।
সুতরাং দাম হল এমন একটি উপায় যা ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উপযোগসমূহের বন্টন নিয়ন্ত্রণ করে। উপযোগ প্রাপ্তির আকাঙ্খা করে এমন ভোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ উপযোগের বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে দাম। ভোক্তাদের আয়ের বৈষম্যের কারণে তাদের আয় তাদের ব্যয়কে একটি সীমার মধ্যে বেধে রাখে। এর কারণে কিছু পণ্য কেবল সামর্থবান লোকেরাই ভোগ করতে পারে এবং বাকী কিছু পণ্য কম দামের হওয়ায় সবাই ভোগ করতে পারে। সুতরাং কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে দাম বেশী ও অন্য কিছুর জন্য দাম কম এবং কিছু ভোক্তার চেয়ে অন্য কিছু ভোক্তার কাছে দামের তুলনামূলক যথার্থতা ঠিক করে দেয়ার মাধ্যমে দাম ভোক্তাদের মধ্যে উপযোগ বন্টনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের কাজ করে।
দাম উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা আনয়ন করে এবং এটি উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। কেননা ভোক্তার আকাঙ্খা পূরণকারী উৎপাদক লাভের মাধ্যমে পুরস্কৃত হন। অন্যদিকে যেসব উৎপাদকের পণ্য ভোক্তাদের দ্বারা গৃহীত হবে না, সে লোকসানের মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে। যে পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদক ভোক্তার আকাঙ্খা চিহ্নিত করে, তা হল দাম। যদি ভোক্তার কাছে কোন পণ্যের চাহিদা থাকে তাহলে এর দাম বেড়ে যাবে, ফলে ভোক্তার আকাঙ্খা পূরণ করতে গিয়ে এর উৎপাদনও বেড়ে যাবে। যদি ভোক্তাগণ একটি বিশেষ পণ্য ক্রয় করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বাজারে এর দাম কমে যাবে ও সে পণ্যের উৎপাদন হ্রাস পাবে। সুতরাং পণ্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকৃত সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং দাম কমার সাথে সাথে হ্রাস পায়। এভাবে উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা অর্জনে দাম সহায়তা করে এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে এবং এই প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদিত হয়। সুতরাং পুঁজিবাদীদের মতে, দাম হল অর্থনীতির ভিত্তি যার উপর এটি দাঁড়িয়ে থাকে এবং তাদের মতে এটি অর্থনীতির স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।
এই হল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সারমর্ম – যাকে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলা হয়। গভীর অধ্যয়নের পর পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিম্নলিখিত ত্রুটিসমূহ পরিষ্কার হয়ে উঠে।
অধ্যায় ১: অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিচিতি

সদ্যজাত যে কোন জাতি প্রাণ লাভ করার পর তার জীবদ্দশায় প্রাপ্ত সর্বোত্তম ঐশ্বর্য্য হচ্ছে চিন্তা; এবং এগুলো কোন প্রজন্মের জন্য তার পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে লাভ করা সর্বোত্তম উপহার। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হল জাতির মধ্যে আলোকিত চিন্তা গভীরভাবে প্রোথিত থাকতে হবে। বস্তুগত সম্পদ, শিল্প ও বৈজ্ঞানিক আবিস্কার এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় চিন্তার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হচ্ছে, এসব বস্তুগত বিষয়াদি অর্জন এবং এগুলোর সংরক্ষণ নির্ভর করে চিন্তার উপর।
বস্তুগত সম্পদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব যদি জাতি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংরক্ষণ করে। তবে যদি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং জাতি শুধুমাত্র বস্তুগত সম্পদ দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, তবে তা খুব দ্রুত সংকুচিত হয়ে সে জাতিকে দারিদ্রতায় নিপতিত করে। একটি জাতি তার অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক অর্জন পুনরুদ্ধার করতে পারে যদি জাতিটি তার চিন্তার প্রক্রিয়া না হারায়। আর যদি সে ফলপ্রসূ চিন্তার পথ হারিয়ে ফেলে, তবে সে খুব দ্রুত পশ্চাৎমুখী হয়ে যাবে এবং তার সব আবিষ্কার ও উদ্ভাবন হারিয়ে ফেলবে। তাই প্রথমেই চিন্তার যত্ন নেওয়া অত্যাবশ্যক। এই চিন্তার উপর ভিত্তি করে ফলপ্রসূ চিন্তার পদ্ধতি দ্বারা বস্তুগত সম্পদ অর্জন করা যায় এবং সেই সাথে অর্জন করা যায় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, শিল্পের জন্য উদ্ভাবন এবং আরও অনেক কিছু।
এই চিন্তা বলতে বুঝায় জাতির মধ্যে বিদ্যমান জীবন সম্পর্কিত বিষয়ে চিন্তার একটি প্রক্রিয়া। জাতি যখন কোন ঘটনার মুখোমুখি হয় তখন বেশীরভাগ জনগোষ্ঠী সে ঘটনাকে বিচার করতে তাদের কাছে বিদ্যমান তথ্যগুলো ব্যবহার করবে এই চিন্তার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এর অর্থ এই যে, তাদের কাছে চিন্তা আছে যা তারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করে এবং বারবার এই চিন্তা সফলভাবে ব্যবহার করার ফলে একটি ফলপ্রসূ চিন্তার প্রক্রিয়া তৈরী হয়।
আজ মুসলিম উম্মাহ্ এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন অতীতের ফলপ্রসূ চিন্তার পদ্ধতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, এমনকি তা হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র, খিলা-ফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবনধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাওয়াহ্’র প্রসারতার ফলে বিগত বছরগুলোতে এই বাস্তবতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এটা আজ সুস্পষ্ট যে মুসলিমরা ইসলামের দিকে মুখ ফিরিয়েছে, এবং ইসলামের ধারনা, সমাধান ও হুকুমের উপর আস্থা স্থাপন করেছে। যদিও এটা পরিষ্কার যে মুসলিম ভূখন্ডে প্রচারিত সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ধারনাসমূহের অসারতা ও এর ভ্রান্তিসমূহ জনগণের কাছে উম্মোচিত হয়ে গেছে, মুসলিম জাতি এখনও কুফর রাষ্ট্র ও তাদের দালালদের আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই কুফর রাষ্ট্র ও তাদের দালালরা মুসলিম ভূখন্ডে জঘন্য মিথ্যা ও প্রতারণামূলক প্রচারণার পদ্ধতি ও ধরন ব্যবহার করে তাদের বস্তাপঁচা ধারনা সুন্দরভাবে সাজিয়ে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে, বিশেষ করে সেসব ধারনা যা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের সাথে সম্পর্কিত।
ফলে ইসলামি দাওয়াহ্ বহনকারীদের প্রমে অবশ্যই যে ভিত্তির উপর পুঁজিবাদী সমাধানগুলো প্রতিষ্ঠিত তা প্রকাশ করে দিতে হবে, এগুলোর অসারতা তুলে ধরে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমাধানগুলোর বিনাশ সাধন করতে হবে। দাওয়াহ্ বহনকারীদের জীবনের নতুন ইস্যুসমূহ আলোচনা করতে হবে এবং এগুলোর সমাধান তুলে ধরে দেখাতে হবে যে ঐশী হুকুম বিধায় তা মানতে হবে। কারণ এ হুকুমসমূহ কুর’আন ও সুন্নাহ্ বা এ দু’টি উৎস যে দিকনির্দেশনা দেয়, তা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা – কখনই এ দৃষ্টিভঙ্গী বিবেচ্য নয়। তার মানে ইসলামী সমাধানকে আক্বীদার ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে এবং কখনই তা থেকে প্রাপ্ত লাভের উপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা যাবে না। সুতরাং প্রত্যেকটি হুকুমের সাথে যেসব ঐশী দলিল থেকে সেগুলোকে আহরণ করা হয়েছে অথবা ঐশী হুকুম বা বাণী যে ঐশী কারণ বা ইলাহ্ নিয়ে এসেছে তা উপস্থাপন করতে হবে।
শাসন ব্যবস্থা ও অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত চিন্তাসমূহ মুসলিমদেরকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করে এবং এগুলোর জন্য তাদেরকে জীবনে সবচেয়ে বেশী যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। মুসলিমরা সাধারণত এ চিন্তাগুলোকে প্রশংসা করে। অন্যদিকে পশ্চিমারা বাস্তবে এই চিন্তাগুলো প্রয়োগ করার চেষ্টা করে, এমনকি তারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অধ্যবসায়ী। যদিও উম্মাহ্ উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাফের উপনিবেশবাদীদের দ্বারা তাত্ত্বিকভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত, পশ্চিমা ব্যবস্থা ও উপনিবেশবাদ বজায়রাখার জন্য উম্মাহ্ বাস্তবে অর্থনৈতিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত। সুতরাং ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী বিশ্বের মুসলিমদের অর্থনৈতিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে। এই প্রভাব এতটাই বেশী হবে যে উম্মাহ্ চলমান ব্যবস্থা উল্টে দিতে উদ্বুদ্ধ হবে। আর কাফের উপনিবেশবাদী, পশ্চিমাদের গুণমুগ্ধ লোকজন – বিশেষ করে যারা অন্ধকারে থাকতে পছন্দ করে, যারা পরাজিত মানসিকতা সম্পন্ন ও শাসকগোষ্ঠী – এই ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার তীব্র বিরোধীতা করবে।
সুতরাং, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি সঠিক চিত্র তুলে ধরা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যে চিত্র সুবিন্যস্ত আকারে পশ্চিমা রাজনৈতিক অর্থনীতি যে মৌলিক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত তা প্রকাশ করবে। এটা এজন্য প্রয়োজন যাতে করে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা মুগ্ধ লোকেরা এ ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ ও ইসলামের সাথে এর সাংঘর্ষিক দিকসমূহ উপলদ্ধি করতে পারে। অতঃপর তারা অর্থনৈতিক জীবনের সমস্যা সঠিকভাবে সমাধানকারী ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চিন্তাসমূহ পরীক্ষা করে দেখতে পারবে এবং তাদের কাছে এটি সাধারণ মূলনীতি ও বিস্তারিত – উভয় আঙ্গিকে পুঁজিবাদী জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেবে উপস্থাপিত হবে।
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

নিম্নোক্ত বইটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিজামুল ইকতিসাদি ফিল ইসলাম’ (ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা) হতে নেয়া হয়েছে।
ভূমিকা
এটাই প্রথম বই যেখানে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে সমকালীন ইসলামিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতাকে পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে অর্থনীতি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর উদ্দেশ্য, কিভাবে সম্পদের মালিকানা অর্জন ও তা বৃদ্ধি করা যায়, কিভাবে তা ব্যয় ও হস্তান্তর করা যায়, কিভাবে নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ বন্টন এবং সমাজে সম্পদের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।
বাইতুল মালের প্রাপ্য সম্পত্তি এবং যে খাতে তা ব্যয় করা হবে সেগুলোসহ সম্পদের প্রকারভেদ (ব্যক্তিগত, গণমালিকানাধীন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি) বইটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বইটি ভূমি সম্পর্কিত নিয়মনীতি ব্যাখ্যা করেছে – হোক তা উশরী বা খারাযী। জমির উপর উশর (এক দশমাংশ হারে কর) নাকি ভূমি খাজনা (খারায) প্রযোজ্য এবং কিভাবে জমি চাষাবাদ, ব্যবহার ও বন্টন হবে ও কী প্রক্রিয়ায় একজন থেকে আরেকজনের কাছে হস্তান্তরিত হবে তাও এটি ব্যাখ্যা করেছে।
বইটিতে আরো আলোচনা করা হয়েছে বিভিন্ন প্রকার মুদ্রা (নুকুদ) সম্পর্কে; রিবা (সুদ) ও বিনিময়ের সময় মুদ্রার ক্ষেত্রে কি ঘটে এবং মুদ্রার উপর যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে কি বাধ্যবাধকতা তাও আলোচনা করা হয়েছে।
পরিশেষে বইটিতে বৈদেশিক বাণিজ্য ও এর নিয়মনীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ বইয়ে গৃহিত সব হুকুমের একমাত্র উৎস হচ্ছে মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কিতাব এবং তাঁর রাসূল (স:) এর সুন্নাহ্ এবং এগুলো থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনা, যেমন কিয়াস এবং ইজমা-আসসাহাবা। অন্য কোন উৎস থেকে এ হুকুমসমূহ গ্রহণ করা হয়নি।
এ বইটি সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এছাড়া বইটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভুলসমূহের যুক্তিখন্ডনসহ তাদের ত্রুটিসমূহ এবং ইসলামিক অর্থনীতির সাথে এগুলোর সাংঘর্ষিক দিকগুলো ব্যাখ্যা করেছে।
এ বইটির নতুন সংস্করণ ছাপানোর পূর্বে সামান্য সংশোধনীসহ পুন:নিরীক্ষণ করা হয়েছিল। হাদীস উল্লেখ করবার পূর্বেসেগুলো হাদীস গ্রন্থসমূহের বর্ণনাকারী দ্বারা প্রমাণিত কিনা তা পুন:নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক দৃষ্টি দেয়া হয়েছিল।
ইসলামিক অর্থনীতি বিষয়ে মুসলিমদের মধ্যে সচেতনতা তৈরী করতে এই বইটি বিশাল ভূমিকা রেখেছে। আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন তাঁর রহমত নাজিল করেন এবং মুসলিমদেরকে এসব হুকুম আহকাম আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার সামর্থ্য প্রদান করেন।
১৪ রবিউস সানি ১৪২৫ হিজরী
২/৬/২০০৪মুহাম্মাদ বিন কাসিম এর ভারত বিজয়
১ম অংশ
২য় অংশ
সত্য বলা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না

আবু আদ-দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
«العلماء ورثة الأنبياء»
“আলেমগণ নবীগণের উত্তরসূরী।” [আবু দাউদ, তিরমিযি]আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে আপনাদের উপর অর্পিত উচ্চ মর্যাদা ও দায়িত্বের কারণে আমরা আপনাদের প্রতি নিম্নোক্ত আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই প্রত্যাশায় যেন আমরা সকলেই তাদের কাতারে শামিল হতে পারি যারা সত্যের পক্ষে অবস্থানকারী এবং আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেনা।
প্রিয় ভাইয়েরা ও কর্তব্যপরায়ণ আলেমগণ :
আলেমগণ তাদের ঈমান, জ্ঞান, কর্ম এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়ার সাহসিকতার কারণে নবীগণের উত্তরসূরী হিসেবে পরিগণিত। কিন্তু আজকের সেই আলেমগণ কোথায়? নবীগণের এই যুগের উত্তরসূরীরা কোথায়? যেখানে আমাদের পূর্বের বড় বড় আলেমগণ তাদের অপরিসীম জ্ঞান ও দ্বীনকে সঠিকভাবে বোঝার সক্ষমতার কারণে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। যা তাদেরকে সত্যের পক্ষে সাহসী অবস্থানকারী ও তৎকালীন সমাজে বিদ্যমান ভুলগুলিকে দৃঢ়ভাবে চ্যালেঞ্জকারী মহৎ ও সুপরিচিত আলেম হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। যার কিছু উদাহরণ হলো:
– আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা), যিনি খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।
– সাইদ বিন জুবায়ের (রা), যিনি আল হাজ্জাজ বিন ইউসুফ-এর যুলুমের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সহিত অবস্থান নিয়েছিলেন।
– সুফিয়ান আল-ছাওরি (রহ), যিনি হারুন আল-রশিদ-এর পাঠানো চিঠিকে স্পর্শও করেননি, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এটা একজন যালিম শাসকের নিকট থেকে এসেছে। তিনি তার এক অনুসারীকে এই চিঠিকে উল্টিয়ে তার পিছনের দিকে লিখতে আদেশ করলেন: “হারুনের প্রতি” এবং “আমির-উল-মু’মিনি’ন” সম্মোধন করে নয়, এবং বললেন (যার সার সংক্ষেপ): “মুসলিমদের সম্পদকে যথেচ্ছা ব্যবহার করতে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়েছো, তাই তুমি একজন যালিম, এবং আমি তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবো।”
– আবু হানিফা (রহ.), যিনি আল-মনসুর-এর নেতৃত্বে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি যখন কারাগারে, তখন তার মা তাকে একদিন বললেন: “হে নু’মান, এই জ্ঞান তোমার জন্য শারীরিক শাস্তি আর কারাবাস ছাড়া আর কোন কল্যাণ বয়ে আনেনি, এবং এই জ্ঞানকে পরিত্যাগ করার জন্য এটাই যথেষ্ট।” উত্তরে তিনি বললেন: “হে আম্মা, যদি আমি দুনিয়া আকাঙ্খা করতাম তবে তা পেতাম, কিন্তু আমি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে চেয়েছি যাতে আমি নিশ্চিত হতে পারি যে, আমাকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছে আমি তা সুরক্ষা করতে পেরেছি এবং এর দ্বারা নিজেকে অন্ধকারে ঠেলে দেইনি।”
– আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) কারাগারে থাকা অবস্থায় তার চাচার সাথে তার এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক হয় যাতে তিনি জনসম্মুখে আল-মুতাসিম কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বিরোধিতা থেকে বিরত থাকেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন: “যদি আলেমগণ হক্ কথা না বলেন, এবং ফলশ্রুতিতে জনগণের নিকট তা উপেক্ষিত হয়, তবে কিভাবে তখন সত্য সবার নিকট প্রকাশিত হবে?”
এগুলো ছিল পূর্ববর্তী মুসলিম আলেমদের কর্তৃক হকের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের সামান্য কিছু নমূনা, সুতরাং আজকের সেই মুসলিম আলেমগণ কোথায়? উম্মাহ্’র বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে আপনাদের অবস্থান কী? ইমাম আল-গাজ্জালি (রহ.) কর্তৃক প্রদত্ত এই উক্তির ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কোথায় যেখানে তিনি বলেছেন: “শাসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়”, “এবং আলেমগণ দুর্নীতিগ্রস্ত হলে শাসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়”? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত নির্দেশের ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কোথায় :
﴿وَإِذ أَخَذَ اللَّهُ ميثاقَ الَّذينَ أوتُوا الكِتابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنّاسِ وَلا تَكتُمونَهُ﴾
“…(সত্য ও মহান বাণী) মানুষের নিকট বর্ণনা (ব্যক্ত ও সুস্পষ্ট) কর, এবং তা গোপন করো না।” [সূরা আলি ইমরান : ১৮৭]আলেমগণ ছাড়া জনগণ অন্ধকারে দিকভ্রান্ত এবং শয়তানের সহজ শিকার। তাই আলেমগণ হলেন এই জমীনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত বিশেষ রহমতস্বরূপ, এবং অন্ধকারে আলোকবর্তিকা, সঠিক পথে পরিচালনার নেতৃত্ব, এবং এই জমীনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিদর্শন; যাদের মাধ্যমে ভ্রান্ত চিন্তাসমূহকে প্রতিহত করা হয় এবং মানুষের হৃদয় ও মনে বিদ্যমান সন্দেহসমূহ দূর করা হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে তারকারাজির সাথে তুলনা করে বলেছেন :
«إِنَّ مَثَلَ الْعُلَمَاءِ فِي الأَرْضِ كَمَثَلِ نُجُومِ السَّمَاءِ ، يُهْتَدَى بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْر، فَإِذَا انْطَمَسَتِ النُّجُومُ يُوشِكُ أَنْ تَضِلَّ الْهُدَاةُ»
“নিশ্চয়ই, আলেমগণ হচ্ছেন আকাশের নক্ষত্রের মত; যাদের মাধ্যমে জনগণ ভূ-পৃষ্ঠে ও মহাসমুদ্রে অন্ধকারে আলোর পথ দেখতে পায়, এবং যদি তারা দৃশ্যমান না থাকে, তবে জনগণ পথ হারাবে যেভাবে পথিক অন্ধকারে পথ হারায়।” [আহমাদ]
আমরা আপনাদের ভাই হিসেবে আপনাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক প্রদত্ত এই দায়িত্বের কথা স্মরণ করাতে চাই যেন আপনারা সেইসব সম্মানিত আলেমদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন :
– মুসলিম বিশ্বের শাসকদের জবাবদিহি করুন: উম্মাহ্’র বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত আল-আসাদ কিংবা আল-সিসি থেকে শুরু করে ইয়েমেনে আমাদের মুসলিম ভাইবোনদের উপর সৌদী সরকারের নৃশংস বোমাবর্ষণ – আলেমগণকে সকল বিশ্বাসঘাতক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে।
– উম্মাহ্ ও মানবতার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করুন: প্রাক্তন রিয়ালিটি শো’ তারকা ডোনাল্ট ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ায়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইচ্ছায় উদার ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ও তাদের নীতিসমূহের ভ্রান্তির মুখোশ উন্মোচনের কাজ সহজ করে দিয়েছে। আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ – আমেরিকা, বৃটেন ও রাশিয়া – মানবতার বিরুদ্ধে বিশেষ করে উম্মাহ্’র বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ও গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত; হোক সেটা দক্ষিণ ডাকোটার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, অথবা সিরিয়া ও ইরাকে অব্যাহত আক্রমণ। তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিসমূহ শুধু মানবজাতির জন্যই ক্ষতি বয়ে আনেনি, বরং পশুকুল ও পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি আলেমগণ এ সকল নীতিসমূহের বিরুদ্ধে কথা না বলেন তাহলে কে আছে যারা উম্মাহ্ ও মানবজাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিবেন?
আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একটি হাদীস দিয়ে এই আহ্বান শেষ করতে চাই
«أَلاَ لاَ يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ هَيْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ، فَإِنَّهُ لاَ يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ وَلاَ يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ»
“মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে হক্ কথা বলা হতে বিরত না রাখে যখন তা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়; সত্য বলা এবং সৎকর্ম করা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না।” [আহমদ, ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ্]
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে দৃঢ়পদ করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে ভাই-ভাই হিসাবে পুনরুত্থিত করুন। আমিন!
হাসিনার ভারত সফর, বাংলাদেশের ভারত দাসত্বের সেকাল-একাল

কয়েকদফা স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে এপ্রিলে ভারত সফর করতে সম্মত হয়েছেন। এ সফরটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা জল্পনা কল্পনা ভাসছে। তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি,গংগা ব্যারেজ এগুলোই খুব বেশি আলোচনায় এসেছে কিন্তু এখন বুঝা যাচ্ছে এগুলো স্রেফ হিমবাহের শৃঙ্গ।
পানির নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আড়ালেই থেকে গিয়েছিল, আর সেটি হল বাংলাদেশকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে চাইছে ভারত যার মেয়াদ হবে ২৫ বছর।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘২৫ বছরের চুক্তি’ টার্মটি নতুন কিছু নয়, বরং ১৯৭৪ সালের ‘ইন্দিরা-মুজীব’র চুক্তির সাথেও বাংলাদেশের জনগণ পরিচিত। ২৫ বছরের দাসত্বের চুক্তি হলেও আজ অবধি বাংলাদেশ ভারতের দাসত্বের ঘানি টেনে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত মরণবাধ ফারাক্কা বাংলাদেশের একাংশ মরুভূমি করে রেখেছে। স্থল সীমান্ত চুক্তিতে ভারতই বাংলাদেশ থেকে বেশি সুবিধা ভোগ করেছে। সীমান্তে হত্যাকান্ড চলছে নির্বিচারে। মাদকদ্রব্য চোরাচালান, পতিতাবৃত্তি মানবপাচার ইত্যাদিতে ভারতের নিকট বাংলাদেশ যেন দাসত্বমনা ধারণ করছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক গোষ্ঠী ভারতের নিকট সমর্পন করেছে। পিলখানা হত্যাকান্ডে ভারত আমেরিকার সরাসরি সংযুক্ত চক্রান্ত বাস্তবায়নে এদেশের আওয়ামী বি.এন.পি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ভূমিকা অপরিসীম। নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় যেমন, বিদ্যুৎ, সার, ভোগ্যপণ্য দ্রব্য ইত্যাদিতে ভারতের উপরই বাংলাদেশকে নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে।
বাংলাদেশে আজকে ভারতেরই সংস্কৃতি পালিত হয়। তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার আড়ালে মূলত মুশরিকদের নস্ট সংস্কৃতি বাংলাদেশের মুসলিম তরুন সমাজের মাঝে অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে আমাদের তরুনেরা নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে অবিশ্বাসী কাফের সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে অনুসরণ করছে। ভারতের অনুকরণে হোলী খেলার নামে আজ বাংলাদেশের তরুনীরাও নির্যাতিত হয়।
বাংলাদেশের জনগন ইসলামী আকীদায় বিশ্বাসী। এই আকীদার ইতিহাস কখনো মুশরকদের নিকট সমর্পনের সাক্ষ্য দেয় না। ১৪০০শ বছরের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা খিলাফতের শাসনে আমরা কোন মুশরিক রাষ্ট্র কর্তৃক উপরে বর্ণিত জুলুমের ছিটেফোঁটাও দেখি না। এটা এই কারণেই যে, খিলাফত পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মত নয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দূর্নীতি গ্রস্থ শাসক গোষ্ঠী একে অপরকে ভারত-আমেরিকার দালাল বলে আক্ষায়িত করে, অথচ মানবরচিত শাসনব্যবস্থার বাস্তবায়ন ঘটিয়ে উভয়ে (আওয়ামী, বি.এন.পি) ভারত আমেরিকার দালালী করে চলেছে।
ইসলামী রাষ্ট্র খিলাফত আল্লাহ মনোনীত জীবনব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়। রাসূল (স) যখন মদীনায় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন তখন থেকে খিলাফত ধ্বংসের আগ অবধি মুসলিমরা পৃথিবীর বুকে শুধুমাত্র আল্লাহ’র ই দাসত্ব করেছে, কিন্তু যখন খিলাফত ধ্বংস হল মুসলিমরা ইসলাম ছেড়ে কুফর চিন্তাকে আকড়ে ধরল তখন থেকেই মুসলিমদের অধঃপতন শুরু হল। তখন থেকেই মুসলিম উম্মাহ’র উপর কুফর শক্তি প্রভাব নিতে শুরু করে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
“যে আমার স্বরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব”
ভারত আমেরিকার প্রভাব দূরিকরণে বাংলাদেশের মুসলিম উম্মাহ’র নিকট একমাত্র সমাধান খিলাফত শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। যা বাংলাদেশকে ভারত আমেরিকার দাসত্ব থেকে মুক্ত করবে এবং মুসলিমদের হারিয়ে যাওয়া সোনালী ইতিহাস ফিরিয়ে দিবে, এটাই রাসূলের(সা) ভবিষ্যৎবাণী
“এরপর আবার আসবে নবুয়তের আদলে খিলাফত” (মুসনাদে আহমদ)
প্রশ্ন-উত্তর: “আমরা কি ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসূল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই”?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুৃম… আমাদের শাইখ… যে বলে যে, “আমরা ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই” তার জন্য আমাকে কি যথার্থ উত্তর দিতে পারেন?
উত্তর: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, সংক্ষেপে যথার্থ উত্তর হলো: যিনি বলেন, “আমরা ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই” উনাকে জিজ্ঞেস করেন: উনি ওযু করার জন্য কোন ধরণের দলীল-প্রমাণের সাহায্য নিবেন? ওযু সংক্রান্ত প্রমাণাদিই নিবেন না? নাকি হজ্জ্বের মাসলা মাসায়েল খু্ঁজবেন? তিনি উত্তর দিবেন যে, তিনি ওযুর দলীল-প্রমান চাইবেন।
তারপর জিজ্ঞেস করুন যে তিনি কি সিয়ামের নিয়ম জানতে সিয়াম সংক্রান্ত দলীল নিবেন? নাকি কি করে রোযা রাখতে হয় তা জানতে জিহাদের মাসআলা খুঁজবেন? তিনি উত্তর দিবেন যে তিনি সিয়ামের জন্য সিয়ামের দলীলই চাইবেন।
এরপর উনাকে জিজ্ঞেস করেন যে, এটা কি সঠিক নয় যে তিনি সালাতের ব্যাপারে জানতে সালাতের মাসআলাই তালাশ করবেন? নাকি যাকাতের দলীলপ্রমাণ খুঁজবেন? তিনি জবাব দিবেন যে, তিনি সালাতের দলীল-প্রমাণই চাইবেন। মোটকথা, এটাই পরিষ্কার যে তিনি যে কোন ইস্যুতে ঠিক ঐ বিষয়েরই শরয়ী দলীল-প্রমাণ চাইবেন।
এবার, তাকে বলুন যে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কি তিনি রাসূল (সা) কিভাবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন এ বিষয়ে শরয়ী দলীল চাইবেন না? উদাহরণস্বরূপ, তিনি তো এ বিষয়ে জিহাদ, সালাত বা সিয়ামের দলীল খুঁজবেন না, বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীল খুঁজবেন এবং আল্লাহর রাসূল (সা) একবারই রাজনৈতিক সংগ্রামের ধাপে এসে নুসরাহ অন্বেষণের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতদর্থে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হলো নুসরাহ তালাশ।
এখন প্রশ্ন হলো, নুসরাহ তালাশ কি ফরজ (অবশ্য পালনীয়), মানদুব (যেসব কাজে উৎসাহিত করা হয়েছে), কিংবা মুবাহ (যা অনুমতি প্রদানকৃত)? যদি নুসরাহ তালাশ ফরজ হয় তবে আমরা এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করতে বাধ্য, এ বিষয়ে অধ্যয়ন করে আমরা পাই: নুসরাহ তালাশ ফরজ, এটার প্রমাণ হলো আল্লাহর রাসুল (সা) উনার পদ্ধতি পরিবর্তন করেননি এমনকি চরম নির্যাতনের সময়েও। তিনি এটা তালাশ করেছেন বনু সাকিফের কাছে এবং তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর জবাব দিয়েছে উনার পা রক্তাক্ত করার মাধ্যমে… তবুও আল্লাহর রাসুল (সা) অন্য কোন পদ্ধতি গ্রহণ করেন নাই, বরং তিনি বিরামহীন নুসরাহ তালাশ করতে থাকেন গোত্রসমূহের কাছে। আশানুরূপ সাড়া না পেয়েও উনি বনু শায়বান, বনু আমেরসহ অন্যান্য গোত্রের নিকট নুসরাহ চেয়েছেন এবং বারবার চেয়েছেন। এত কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি পদ্ধতি পরিবর্তন করেন নাই।
উসুল আল ফিকহর প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, কোন কাজ করতে গিয়ে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও বারবার তা করা ঐ কাজের ফরজ হওয়া নির্দেশ করে। অতএব, নুসরাহ তালাশ ফরজ এবং এটা আল্লাহর রাসূল (সা) অনুসৃত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি এবং তিনি এটা জারি রাখেন ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা দ্বিতীয় আকাবার বায়’আতে আনসারদের বায়’আত (পূর্ণ আনুগত্য বা আনুগত্যের শপথ) প্রদানের মাধ্যমে উনাকে সম্মানিত করেন, তারপরই উনি (সা) মদীনায় হিজরতপূর্বক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই হৃদয়বান, শ্রোতা ও সাক্ষ্যদাতাদের জন্য সংক্ষিপ্ত উত্তর এবং এটাই গোঁড়া ও একগুঁয়েদের তর্কের উপযুক্ত জবাব। কারণ সে তো ওযু, সালাত আর সিয়ামের মাস’আলা নিয়েই সন্তুষ্ট যাতে সে কেবল এগুলোই করতে পারে এবং সে এমন কোন কাজের দলীল চায় না যা সে করতে রাজি নয় যদি তা তার জন্য ফরজ। যদি সে সূস্থ মস্তিষ্কের হয় তবে সে অবশ্যই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীল প্রমাণ ব্যতিত সন্তুষ্ট হবে না, যদি সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করতে চায়। এই একটি দলীল প্রমাণই আছে যা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের দেখিয়েছেন উনার বানী ও কর্মের মাধ্যমে তা হলো নুসরাহ তালাশ। যা তিনি দাওয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম পর্যায়ের শেষের দিকে করেছিলেন। এটাই সংক্ষিপ্ত, যথার্থ ও পর্যাপ্ত উত্তর যে পদ্ধতি আমরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করি। পরিশেষে, আপনাকে সালাম এবং আল্লাহ যেন আপনার জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন।
মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর
উৎস: ইংরেজি আরবীপ্রশ্ন-উত্তর: সিনেমায় যাওয়া ও অশ্লীল ছবি দেখা কি বৈধ?
সিনেমায় যাওয়া কিংবা সাধারণ সিনেমা দেখা কি বৈধ? যৌন-উত্তেজক অশ্লীল সিনেমা দেখা, এটি জেনে যে এগুলো ছবি মাত্র, সরাসরি শরীর নয়? যেসব মুসলিম এ ধরনের ছবি দেখে তাদের ব্যাপারে আমাদের দায়িত্ব কী: আমরা কি তাদের বারণ করবো নাকি যা খুশি করার ব্যাপারে তাকে ছেড়ে দেব?
উত্তর: সিনেমায় যেয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি দেখা বৈধ, এ শর্তে যে হলে নারীদের সারি পুরুষদের সারি হতে পৃথক রয়েছে। এটি কোনো লেকচার বা সেমিনারে অংশ নেয়ার মতো, এটি করা বৈধ, এ শর্তে যে নারী ও পুরুষের সারি একে অপর হতে পৃথক রয়েছে।
তবে – যেটি বৈধ – উল্লিখিত শর্তানুসারে, ছেড়ে দেওয়াই উত্তম, যাতে হলে উপস্থিত নারীদের কারো কারো লজ্জাস্থানের উপর চক্ষু না পড়ে, যাতে কর্ণ হলের শ্রোতাদের অসংগতিপূর্ণ কণ্ঠ না শুনতে পায়। যৌন উত্তেজক অশ্লীল ছবি দেখা বৈধ নয়, যদিও বা তা কেবল ছবিই হয় এবং বাস্তব শরীর না হয়। কারণ এ বিষয়ের ক্ষেত্রে শরীআহ মুলনীতি অনুযায়ী – (الوسيلة إلى الحرام حرام) ‘হারামের দিকে যা-ই ধাবিত করে তা-ই হারাম’, এ শর্ত নিশ্চিতভাবে ধাবিত না করলেও প্রযোজ্য, সম্ভাবনা থাকলেই যথেষ্ঠ।
সাধারনত এ ধরনের ছবি, যারা এগুলো দেখে তাদের হারামে ধাবিত করে, সুতরাং এ মুলনীতি এসব ছবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তাই এগুলো দেখা কিংবা ক্রয় করা বৈধ নয়।
আর (ইসলামের দায়ী) শাবাবগণ কিরূপ আচরণ করবে তাদের প্রতি যারা এসব দেখে; অধিকাংশ মানুষ যারা এগুলো দেখে তারা নিচু প্রকৃতির মানুষ যারা কথা বা দাবি মানতে চায় না, কেবলমাত্র তারা ছাড়া যারা আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত। তবুও যদি শাবাবগণ কেনো শক্তিশালী বাধাদানকারী ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায় খুঁজে পায়, তবে তারা তা ব্যবহার করতে পারে। হতে পারে যে ব্যক্তি প্রশ্ন করেছেন তিনি তার কোনো আত্মীয়ের ব্যাপার বুঝিয়েছেন, যিনি তার এ অসুস্থ আচরনে বিষন্ন, সেক্ষেত্রে তার উচিত তাদের এসব আচরণ হতে তাড়িয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া, এ আশা রেখে যে আল্লাহ তাদের সঠিক পথ দেখাবেন, এবং সে এতে পুরস্কৃত হবে, আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী।
বর্তমানে, খিলাফতের অনুপস্থিতিতে মুসলিমগণ সকল দিকে হতে দুর্যোগে পরিবেষ্টিত, (এ বাস্তবতায়) একজন মুসলিমের কেনো সময়ই থাকা উচিত না হালাল আমোদ-প্রমোদের, সুতরাং কিভাবে হতে পারে যে হারামে সময় কাটাচ্ছে (আল্লাহ রক্ষা করুন)? হে ভাইয়েরা, মুসলিমদের শক্তিশালী ও প্রজ্ঞার সাথে দিক-নির্দেশনা দেয়া আপনাদের কর্তব্য, যাতে তাদের সময় কেবল ভালো কাজ করায় পরিপূর্ণ থাকে, খিলাফতে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ ও অধ্যবসায় করা, যাতে উম্মতকে এসব দুর্যোগ হতে উদ্ধার করা যায়।
মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর
উৎস: ইংরেজি
আরো পড়ুন: হারামের উপায়ও হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবেসার্চ কমিটি গঠন ও নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগ

সামগ্রিকভাবে পুরো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করুন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠা করুন
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের সমগ্র রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন – রাজনৈতিক দলসমূহ, গণমাধ্যম ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবীগণ – সকলেই নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনায় লিপ্ত থাকতে দেখেছি। তারা রাজনৈতিক বক্তব্য/কর্মসূচী, বিবৃতি, পত্রিকার কলাম ও টক-শো’র মাধ্যমে সাধারণ জনগণের উপরে তাদের উদ্বেগ ও নিজস্ব মতামতসমূহ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এখন যখন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে তখন তার নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে আবারও বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
কিন্তু আসল বিষয় হচ্ছে, এই সার্চ কমিটি এবং একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের ধারনা কেবলমাত্র একটি প্রতারণা ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়।
গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী এক ব্যর্থ ব্যবস্থা
বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্র ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আর যখন এটা প্রমান হয়ে গেছে যে, বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কার্যকারিতা হারাচ্ছে তখন এইসব বিশ্বাসঘাতক শাসক, রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা সম্প্রদায় নতুন সার্চ কমিটি ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন জাতির জন্য আদৌ কোন কল্যান বয়ে আনবে কি না সে বিষয়ে কোন আলোচনা করছে না, কিংবা এ সংক্রান্ত কোন আলোচনার সুযোগ দিচ্ছে না। বিগত ২৬ বছর ধরেই অমরা এ ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতারণার শিকার হচ্ছি, যদিওবা আমরা জানি যে রাসূল (সা) বলেছেন:
لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ
“মু’মিন একই গর্তে দুই বার দংশিত হয় না” (বুখারি)।
আমরা কি ইউরোপীয় দেশগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যক্ষ করি না? ইউরোপের শতকরা ৩০ ভাগেরও কম সংখ্যক লোক তাদের নিজেদের জাতীয় সংসদের উপর আস্থা রাখে (ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যুরোর অফিসিয়াল জরিপ ২০১৬ অনুসারে)। এমনকি ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পরে আমেরিকার বেশিরভাগ নাগরিক বলতে শুরু করেছে যে তারা গণতন্ত্রের উপর বিশ্বাস হারিয়েছে।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি সম্পর্কিত আলোচনা দূরে রেখে শাখা-প্রশাখার আলোচনা তথা সুষ্ঠু নির্বাচনের বিতর্ক কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন একটি দেশের রাজনীতি দুর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর গড়ে ওঠে, তখন সার্চ কমিটি ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে কেবলমাত্র তিক্ত ফলই পাওয়া যাবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ، وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَبِيثَةٍ اجْتُثَّتْ مِنْ فَوْقِ الْأَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَارٍ
“তুমি কি লক্ষ্য করনি আল্লাহ্ কিভাবে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন একটি পবিত্র বাণীর (কালেমায়ে তাইয়্যেবার) যে, তা একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় যার শিকড় (জমিনে) সুদৃঢ় এবং যার শাখা-প্রশাখা উর্ধ্বে উত্থিত, সে বৃক্ষ স্বীয় রবের আদেশে প্রত্যেক মওসুমে তার ফলদান করে….আর অপবিত্র কথার (কালেমা খাবিছার) তুলনা হচ্ছে একটি নিকৃষ্ট বৃক্ষ, যার মূল জমিন থেকে বিচ্ছিন্ন, যার কোনো স্থায়িত্ব নাই” (সুরা-ইব্রাহিম: ২৪-২৬)।
গণতন্ত্র কোন প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনবে না
প্রথমত, গণতান্ত্রিক শাসকেরা কুফর ব্যবস্থা দিয়ে জনগণকে শাসন করা অব্যাহত রাখবে, দেশের মুসলিমদেরকে অত্যাচার ও নিপীড়ণ করতে থাকবে এবং জনগণের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি অগ্রাহ্য করে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে আরও অসহায় অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।
পশ্চিমাশক্তি সমর্থিত বাংলাদেশী গণতন্ত্রের অধীনে কেবলমাত্র অত্যাচারীর চেহারা পরিবর্তন ব্যতিরেকে আর কিছুই অর্জিত হবে না। এখন এদেশের জনগণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে আওয়ামী লীগ (হাসিনা) কর্তৃক অত্যাচারিত হচ্ছে; আর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বড় জোর এই ক্ষমতাসীন আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ বিএনপি’র (খালেদা-তারেক) হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে, যারা একইভাবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে জনগণকে শোষণ করতে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ পশ্চিমা শক্তিসমূহের অনুগত একটি রাষ্ট্র এবং যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং দেশের জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তির বিনিময়ে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে সচেষ্ট থাকবে…
সাম্রাজ্যবাদীদের (আমেরিকা-বৃটেন-ভারতের) জন্য সবচেয়ে অনুগত দালাল শাসক খুঁজে বের করাই হচ্ছে এই সার্চ কমিটি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের একমাত্র উদ্দেশ্য, যারা কার্যকরভাবে জনগণকে বশে রাখবে, ইসলামের উত্থানকে দমন করবে এবং সুচারুভাবে পশ্চিমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। মুসলিম বিশ্বের নির্বাচনসমূহ নিরপেক্ষ কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট যাই হোক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচিত শাসকেরা তাদের প্রভুদের হীন স্বার্থ সংরক্ষন করবে ততক্ষন পর্যন্ত পশ্চিমা শক্তিসমূহ এসব দালালদেরকে সমর্থন দিয়ে যাবে। আমরা সকলেই প্রত্যক্ষ করেছি যে, ২০১৪ সালে হাসিনা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন নির্বাচনে নজিরবিহীন জালিয়াতির পরেও কিভাবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো তার সরকারকে বৈধতা দিয়েছে!!
প্রকৃত সমাধান
পশ্চিমা উপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের দালালদের মাধ্যমে ১৯২৪ সালে খিলাফতকে ধ্বংস করে দেয় এবং মুসলিম ভূ-খন্ডসমূহে জোরপূর্বক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়, যা মুসলিমদের বর্তমান সমস্যা ও সঙ্কটের মূল কারণ।
গণতন্ত্র হচ্ছে একটি কুফর শাসনব্যবস্থা; শাসকগোষ্ঠী ও তাদের প্রভুদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এ মানব রচিত ব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিসমূহ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন ব্যতিরেকে আমাদের সমস্যা সমাধান এবং একটি ন্যায়পরায়ণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়।
মুসলিমদের জন্য ইসলাম খিলাফত ব্যবস্থা প্রদান করেছে এবং প্রকৃত পরিবর্তন আনয়নের এটিই একমাত্র পথ।
প্রথমত, এটি উম্মাহ্’র উপর একটি ফরয দায়িত্ব; কারণ রাসূল (সা) বলেছেন:
وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِى عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً
“যারা খলিফার বাই’য়াত ছাড়া মৃত্যুবরণ করবে তাদের মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)।
অর্থাৎ, খলীফাবিহীন সময়ে মৃত্যুবরণ করা ইসলামপূর্ব আইয়ামে জাহিলিয়্যাতের মতোই ভয়ংকর ও পংকিলতাপূর্ণ। কেবলমাত্র খিলাফত ফিরিয়ে আনার কাজে রত থাকলেই কিয়ামত দিবসে এই অপরাধ হতে আমরা নিজেদের মুক্ত করতে পারবো।
দ্বিতীয়ত, উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের এটিই একমাত্র পথ; ক্ষুদা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়ার এটিই একমাত্র পন্থা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
“আর যদি সেই জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই উম্মুক্ত করে দিতাম তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমুহ” (সূরা আল-আরাফ: ৯৬)।
খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই হচ্ছে সে ব্যবস্থা যা ঈমান ও তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে সমাজ পরিচালনা করে যা আল্লাহর রাসূলের সীরাত ও খুলাফায়ে রাশিদীনদের জীবনী হতে দেখতে পাই।
তৃতীয়ত, এটিই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যা ইসলাম ও মুসলিমদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসী ও তাদের দালাল কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো তবে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন। (সূরা মুহাম্মদ: ৭)
রাসূল (সা) বলেন,
إِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ
“নিশ্চয়ই খলীফা (ইমাম) হচ্ছে ঢালস্বরূপ, যার পেছনে দাঁড়িয়ে (শত্রুদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ করা হয় ও নিজেদেরকে সুরক্ষা করা হয়” (তিরমিযি)।
সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচীর দিক-নির্দেশনা
যখনই সুযোগ পাওয়া যায় আমাদের তখনই মুসলিমদের শাসনব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রের বৈধতা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা উচিত; এটা হতে পারে জনসমাগমস্থলে, কিংবা বাসে, বা পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ‘টক-শো’গুলোতে, কিংবা যেখানেই আমরা এসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের দেখা পাবো সেখানেই তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, এবং তাদেরকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে হবে যে কেন তারা গণতন্ত্রের মিথ্যা মোহকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
এবং একইসাথে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, যা আমাদের সকলের জন্য ফরয; এবং, প্রতিশ্রুত দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন, যার মাধ্যমে আমরা একটি সমৃদ্ধ জীবন শুরু করতে পারবো এবং আমাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনে পৃথিবীতে নিজেদেরকে একটি নেতৃত্বস্থানীয় ও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হবো…এবং আখিরাতেও সফলতা অর্জন করবো ও নিজেদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ থেকে রক্ষা করতে পারবো, ইনশা’আল্লাহ্।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ তাদের প্রতিষ্ঠিত করেন শাশ্বত বাণীর দ্বারা এই দুনিয়ার জীবনে ও পরকালে, আর আল্লাহ্ পথহারা করেন অন্যায়কারীদের, আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছে করেন তাই করেন। (সূরা ইবরাহীম: ২৭)
আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দাফনে বিলম্ব ও খলীফা নিয়োগের বাধ্যবাধকতার ইজমা

দাফন বিলম্বের ব্যাপারে আলোচনার পূর্বে আমাদের শরীআহ হুকুমের ক্ষেত্রে কিছু উসূলী ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন।
মৌলিকভাবে প্রত্যেক শরীআহ বিষয় তা কোনো কাজ হোক কিংবা কথা, তা কোনো নির্দেশ হিসেবে গণ্য হতে হলে তার জন্য একটি কারীনা (আইনী সূচক) দরকার হয় যা হুকুমটির প্রকৃতি নির্দেশ করে।
কারীনা চুড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করলে হুকুমটি ফরজ হিসেবে গণ্য হয়। আর কারীনা চুড়ান্ত নির্দেশ প্রদান না করলে তা মানদুব (উৎসাহিত) হিসেবে গণ্য হয়। আর কারীনা বাছাই (করা বা না করা)-এর নির্দেশনা দিলে তা মুবাহ হিসেবে গণ্য হয়।
এবং এ বিষয়টি শরীআহর সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা আল্লাহর কিতাবের কোনো কথা হোক কিংবা রাসূল (সা) এর কোনো সুন্নাহ হোক কিংবা নবী (সা) এর কোনো কাজ হোক কিংবা সাহাবা (রা)-দের কোনো ইজমা হোক কিংবা হোক তা নবী (সা)-এর কোনো অনুমতি প্রদান।
১. উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বক্তব্য:
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহ’র অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পারো” । [সূরা জুমুআ: ১০]
এখানে (فَانْتَشِرُوا) দ্বারা জুমার পর মসজিদ থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ প্রদান করে। এখন, এ হুকুমটির কারীনার মাধ্যমে বুঝতে হবে এটি কি ফরজ, মানদুব নাকি মুবাহ। উল্লেখ্য, এ আয়াতে (فَانْتَشِرُوا) মুবাহ অর্থে এসেছে।
২. জানাযা যাওয়ার সময় উঠে দাঁড়ানোর উদাহরণ:
আবদুল্লাহ বিন আবী আস-সাফার হতে শু’বা বর্ণনা করেন: আমি শুনেছি আশ-শা’বী আবী সাঈদ বর্ণনা করেন: (إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّتْ بِهِ جَنَازَةٌ فَقَامَ) একটি জানাযা অতিক্রম হচ্ছিল এবং (তা দেখে) রাসূল (সা) উঠে দাড়িয়েছিলেন। [সুনান আন-নাসাঈ]
নবী (সা) জানাযা যাওয়ার সময় উঠে দাড়িয়েছিলেন, এ কাজটি একটি আদেশের হুকুম প্রদান করে।আমরা যখন হুকুমটির প্রকৃতি বোঝার জন্য এর কারীনার জন্য সীরাহ অধ্যয়ন করবো অর্থাৎ এটি বোঝার জন্য যে এ আদেশটি চুড়ান্ত (ফরজ), উৎসাহিত (মানদুব) না বৈধ (মুবাহ) হুকুম প্রদান করে, তখন দেখবো একটি জানাজা অতিক্রান্ত হওয়ার সময় আল-হাসান বিন আলী (রা) উঠে দাঁড়িয়েছিলেন কিন্তু ইবন আব্বাস উঠে দাড়াননি, (তখন) আল-হাসান (রা) বলেন, (أَلَيْسَ قَدْ قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِجَنَازَةِ يَهُودِيٍّ؟) “আল্লাহর রাসূল কি উঠে দাড়াননি যখন একজন ইহুদীর জানাযা অতিক্রান্ত হচ্ছিল? ইবন আব্বাস (রা) বলেন, হ্যাঁ, এর তিনি (সা) বসে পড়েন।” এ ঘটনা নির্দেশনা দেয় যে এখানে (দাড়ানো বা বসা) বাছাই করার সুযোগ রয়েছে অর্থাৎ এটি বৈধ (মুবাহ)।
সাকীফাহ-তে বাইয়াতের ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, এ ব্যাপারে সাহাবা (রা) গণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। এ ঘটনা নির্দেশনা প্রদান করে যে একজন খলীফাকে বাইয়াত প্রদান করতে হবে। এখন এ আদেশটির প্রকৃতি বুঝতে হলে এর কারীনা খুঁজে দেখতে হবে, এবং এর কারীনা নির্দেশনা দেয় যে এটি একটি ফরজ দায়িত্ব যেহেতু সাহাবা (রা) গণ বিষয়টিকে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দাফন তথা একটি ফরজ দায়িত্বের উপরে প্রাধান্য দান করেছেন। অর্থাৎ, একটি ফরজের উপর কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়াটি ওই বিষয়টিকেও ফরজিয়্যাত প্রদান করে। এবং এও প্রমাণ হয় যে এটি শুধুমাত্র একটি ফরজ না বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ।
ফিকহী দৃষ্টিকোন থেকে:এটি বলা যে দাফনের সাথে বাইয়াতের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং মুসলিমদের জানাযার জন্য একত্রিত হবার জন্য সময় দেয়া হচ্ছিল, এটি যা ঘটেছিল তা থেকে অনেক দুরে।
আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মৃত্যু একটি বড় ঘটনা ছিল। এবং মদীনা ও তার আশেপাশের সকল মুসলিম খবরটি শুনতে পায় এবং মদীনা ও মসজিদের দিকে মুসলিমদের ঢল নামে। কিন্তু তারা আবু বকরের বাইয়াত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সীরাহ গ্রন্থগুলোতে ঘটনার প্রবাহটি এরকম:
আল্লাহর রাসূল (সা) সোমবার দোহার ওয়াক্তে মৃত্যুবরণ করেন; মঙ্গলবার রাত্রি পর্যন্ত তার দাফন সম্পন্ন হয়নি। মঙ্গলবার সকালে আবু বকরকে বাইয়াত প্রদান করা হয় এবং বুধবার মধ্যরাতে রাসূল (সা)-এর দাফন সম্পন্ন হয়।
আবু বকরকে রাসূল (সা) এর দাফনের পূর্বেই বাইয়াত প্রদান করা হয়। এটি সাহাবা (রা) গণের ইজমা ছিল; অর্থাৎ মৃতের দাফনের উপর খলীফা নিয়োগ দেওয়ার কাজে রত থাকাকে প্রাধান্য প্রদান।
দাফনের বিলম্ব এজন্য হয় নি যাতে মুসলিমগণ জানাযা দেখতে আসার জন্য সময় পায় কারণ তারা সকলে তখন সেখানেই ছিল বিশেষ করে সাহাবা (রা) গণ, কিন্তু তারা বাইয়াত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
চুক্তির ও আনুগত্যের বাইয়াত শেষ হবার সাথে সাথে তারা রাসূল (সা)-এর দাফনের কাজ সম্পন্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন, এবং এটি কখন? এটি বাইয়াত শেষ হবার পর মধ্যরাতে।
যদি বিলম্ব এ কারণে হয়ে থাকতো যাতে মানুষ জানাযার জন্য একত্রিত হতে পারে, তাহলে সোমবার, মঙ্গলবার রাত্রি কিংবা মঙ্গলবার সকালেও তা হতে পারতো…কিন্তু তারা আবু বকরের জন্য চুক্তি ও আনুগত্যের বাইয়াত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। যখনি তা শেষ হয় তারা অনতিবিলম্বে দাফন কাজ সম্পাদনে রত হয়ে পড়েন, বুধবার মধ্যরাতে।
দাফনে বিলম্বের বিষয়ে চিন্তা করলে যা পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয় তা হলো এ বিলম্ব কেবলমাত্র আবু বকরের চুক্তি ও আনুগত্যের বাইয়াত সম্পন্ন শেষ হওয়ার জন্যই হয়েছে। সুতরাং এটি বাইয়াতের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
শাইখ আতা বিন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর অবলম্বনে লিখিত
মূল প্রশ্নোত্তরটির লিংক: ইংরেজি আরবী
















