তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২আবু তালহা আল-আনসারী (রা)

নাম যায়িদ, ডাকনাম আবু তালহা। এ নামেই ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। হিজরাতের ৩৬ বছর পূর্বে ৫৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম- ৩/৯৮) পিতা সাহল ইবন আল-আসওয়াদ ইবন হারাম। বনু জাজীলার সন্তান। মাতা ’উবাদাহ্ বিনতু মালিক। প্রাচীন জাহিলী যুগে ইয়াসরিবে আবু তালহার খান্দান বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিল। তাঁর পিতৃ ও মাতৃ বংশের মধ্যেও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিল। বর্তমান মসজিদে নববী সংলগ্ন পশ্চিম দিকে তাঁর খান্দানের বসতি ছিল। তিনি তাঁর সময়ে খান্দানের রয়িস বা নেতা ছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪২, আল-ইসতীয়াব- ৪/১১৩, তাহজীবুল আসমা- ১/৪৪৫) ইসলাম-পূর্ব জীবনে সাধারণ আরববাসীর মত মূর্তি পূজারী ছিলেন। তাঁর মদ পানের আসরটিও ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ। পানের আসরে নিয়মিত আড্ডা জমতো। সেই জাহিলী যুগে তিনি ইয়াসরিবের হাতেগোনা গুটি কয়েক সাহসী তীরন্দাযদের মধ্যে গণ্য হতেন। (বুখারী- ২/৬৬৪, আল-আ’লাম- ৩/৯৮) আবু তালহা যখন কুড়ি/বাইশ বছরের যুবক তখন মক্কায় হযরত রাসূলে কারীম সা. নবুওয়াত লাভ করেন। প্রথম কয়েক বছর ইয়াসরিবে এর কোন প্রভাব তেমন একটা না পড়লেও পরের বছরগুলিতে ধীরে ধীরে পড়তে থাকে। রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের কয়েক বছর পূর্বে মক্কা থেকে হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে সেখানে পাঠান ইসলাম প্রচারের জন্য। তাঁরই নিকট মদীনার এক মহিয়সী মহিলা উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করেন। এই মহিলার প্রচেষ্টায় পরবর্তীকালে আবু তালহা মূর্তি পূজা ত্যাগ করে মুসলিম হন এবং তাঁকে বিয়ে করেন। আবু তালহা কখন ইসলাম গ্রহণ করেন, বিভিন্ন বর্ণনা পর্যালোচনা করলে সে সম্পর্কে দুইটি ধারণা পাওয়া যায়। একটি এই যে, রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বে মুস’য়াব ইবন ’উমাইরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁর সাথে হজ্জ উপলক্ষে মক্কার গিয়ে সর্বশেষ ’আকাবায় তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জনের সাথে রাসূলুল্লাহর হাতে বাই’য়াত (আনুগত্যের শপথ) করেন। এই বাই’য়াতে উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে রাসূল সা. যে বারো জন নাকীব বা দায়িত্বশীল মনোনীত করেন তাঁদের একজন ছিলেন আবু তালহা। অন্যটি হলো, রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় আসার পর আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে প্রথম ধারণাটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ এবং অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ একথাই বর্ণনা করেছেন। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ’লাম- ২/১১৯, শাজারাতুজ জাহাব- ১/৪০, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৪) আবু তালহার ইসলাম গ্রহণ এবং উম্মু সুলাইমের সাথে বিয়ের ঘটনার মধ্যে একটি যোগসূত্র আছে। হযরত রাসূলে কারীমের সা. খাদিম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের সম্মানিতা মা হলেন হযরত উম্মু সুলাইম। আনাসের পিতা মালিক ছিল তাঁর ইসলাম-পূর্ব জীবনের স্বামী। উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করলে দুঃখ ও ক্ষোভে মালিক স্ত্রী-পুত্র ফেলে শামে চলে যায় এবং সেখানে মারা যায়। তারপর আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। এই বিয়ে সম্পর্কিত কয়েকটি বর্ণনা এখানে আমরা তুলে ধরছি। আনাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন। উম্মু সুলাইম বললেনঃ ‘কোন মুশরিককে বিয়ে করা আমার উচিত হবে না। আচ্ছা আবু তালহা, তুমি কি দেখনা তোমাদের এইসব ইলাহ যার তোমরা ’ইবাদাত করে থাক, তা তো অমুকের ওখানে তৈরী। আগুন লাগালে তা জ্বলে যায়।’ কথাগুলি শুনে আবু তালহা উঠে চলে গেলেন। তবে অন্তরে একটা ভাবনা দেখা দিল। কিছুতেই ঘুম এলো না। অন্য এক বর্ণনায় এসেছে। উম্মু সুলাইম বলেছিলেনঃ ‘তোমার এই প্রস্তাবে তো আমার কোন আপত্তি নেই। তবে সমস্যা হলো, তুমি যে একজন কাফির ব্যক্তি, আর আমি একজন মুসলিম নারী। তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তবে তো কোন সমস্যাই নেই। তখন তোমার ইসলামই হবে আমার মোহর। তাছাড়া অন্য কিছুই আমি চাইনা।’ আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উম্মু সুলাইমকে বিয়ে করেন। সাবিত বলতেনঃ উম্মু সুলাইমের মোহরের চেয়ে উত্তম মোহরের কথা আমরা আর শুনিনি। তাঁর সেই মোহর ছিল ইসলাম। ইবন ’আসাকির বলেন, তাবারানী, আবু নু’ঈম ও ইবন দুরাসতাওয়াইহ উপরোক্ত কথা বর্ণনা করেছেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৫) ’উরওয়া, মূসা ইবন ’উকবা, আল্লামা জাহবী, ইবনুল ’ইমাদ আল-হাম্বলী, ইবনুল আসীর প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেন, এটা রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বের ঘটনা। কারণ, আবু তালহা আকাবায় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন ও নাকীব মনোনীত হন। ইবন ’আসাকির বলেনঃ উম্মু সুলাইমের সাথে আবু তালহার বিয়ের যেসব বর্ণনা এসেছে তাতে ধারণা জন্মে যে, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি নাদর ইবন আনাস থেকে বর্ণিত হফেজ ও বায়হাকীর একটি বর্ণনা উদ্ধার করেছেন। নাদর বলেনঃ আনাসের পিতা মালিক একদিন তাঁর স্ত্রী উম্মু সুলাইমকে বললোঃ এ ব্যক্তি [রাসূল সা.] তো দেখছি মদ হারাম করেছেন। তারপর সে স্ত্রী ও সন্তান ফেলে শামে চলে যায় এবং সেখানে মারা যায়। অতঃপর আবু তালহা উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন উম্মু সুলাইম বললেনঃ ‘শোন আবু তালহা, তোমার মত ব্যক্তিকে ফেরানো যায় না। তবে তুমি কাফির, আর আমি মুসলিম। সমস্যাটি এখানেই। এ বিয়ে হতে পারে না।’ আবু তালহা বললেনঃ ‘তুমি সোনা-রূপো চাও?’ উম্মু সুলাইম বললেনঃ ‘না, আমি তা চাইনা। আমি শুধু তোমার ইসলাম চাই।’ আবু তালহা বললেনঃ ‘এ ব্যাপারে আমাকে কে সাহায্য করবে?’ বললেনঃ ‘রাসূলুল্লাহ সা.।’ আবু তালহা চললেন রাসূলুল্লাহর সা. কাছে। তিনি তখন সাহাবীদের নিয়ে বসে ছিলেন। আবু তালহাকে আসতে দেখে বললেনঃ আবু তালহা আসছে। ইসলামের দীপ্তি তার কপালে দেখা যাচ্ছে। আবু তালহা এসে উম্মু সুলাইম যা বলেছিলেন সেই কথাগুলি রাসূলুল্লাহকে সা. বললেন। এভাবে আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উম্মু সুলাইমকে বিয়ে করেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৫, হায়াতুস সাহাবা- ১/১৯৬) রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় এসে মক্কার মুহাজির ও মদীনার আনসারদের মধ্যে দ্বীনী ভ্রাতৃ সম্পর্কের প্রচলন করেন। আবু তালহার দ্বীনী ভাই কে হয়েছিলেন, সে সম্পর্কেও নানা জনের নানা কথা আছে। প্রখ্যাত কুরাইশ মুহাজির আবু ’উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহর রা. সাথে তাঁর ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- এটা সংখ্যাগরিষ্ঠ সীরাত লেখকের মত। রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে এই আবু ’উবায়দাহ্ ‘আমীনুল উম্মাহ’ খিতাবসহ জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেছিলেন। ইবন ’আসাকির বলেনঃ হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু তালহা ও বিলালের হাত ধরে তাঁদের ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৯) ইবন সা’দ এ সম্পর্কে ’আসিম ইবন ’উমারের একটি বর্ণনা পেশ করেছেন। রাসূল সা. আবু তালহা ও আরকাম ইবন আল-আরকাম আল-মাখযূমীর মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক কায়েম করেন। (তাবাকাত- ৩/৫০৫) বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধ ও অভিযানে আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। যুদ্ধের ময়দানে তিনি প্রায়ই এই চরণটি আওড়াতেনঃ ‘আমি আবু তালহা, আমার নাম যায়িদ। প্রতিদিন আমার অস্ত্রে থাকে একটি শিকার।’ (তাহজীবুল আসমা- ১/৪৪৫, তারীখে ইবন আসাকির- ৫/৪) ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ বদর। আবু তালহা অতি উৎসাহের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাতে বদরী সাহাবীদের নামের তালিকায় তাঁর নামটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেনঃ বদরে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় আমার হাত থেকে তরবারি পড়ে গিয়েছিল। একবার নয়, তিনবার। আর এই সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ ‘স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ হতে স্বস্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন।’ (সূরা আল-আনফাল- ১১) (তারীখে ইবন আসাকির- ৬/৬) উল্লেখ্য যে, বদর যুদ্ধের ময়দানে এক সময় ক্ষণিকের জন্য মুসলিম বাহিনী তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়। এতে তাঁদের ক্লান্তি ও ভয়ভীতি দূর হয়ে যায়। উহুদ যুদ্ধে তিনি আল্লাহর নবীর জন্য আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন তীরন্দায বাহিনীর সদস্য। (আনসাবুল আশরাফ- ১/১২৫) প্রচন্ড যুদ্ধের এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত ও বিপর্যস্ত হয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। তখন আবু তালহাসহ মুষ্টিমেয় কিছু সৈনিক নিজেদের জীবন বাজি রেখে রাসূলুল্লাহকে সা. ঘিরে শত্রু বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করেন। এদিন তিনি রাসূলুল্লাহকে সা. নিজের পেছনে আড়াল করে রেখে শত্রুদের দিকে তীর ছুড়ছিলেন। একটি তীর ছুড়লে রাসুল সা. একটু মাথা উঁচু করে দেখছিলেন, তা কোথায় গিয়ে পড়ছে। আবু তালহা রাসূলুল্লাহরর সা. বুকে হাত দিয়ে বসিয়ে দিয়ে বলছিলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! বসুন! এভাবে থাকুন। তাহলে আপনার গায়ে কোন তীর লাগবে না। তিনি একটু মাথা উঁচু করলেই আবু তালহা খুব দ্রুত তাঁকে আড়াল করে দাঁড়াচ্ছিলেন। সেদিন তিনি রাসূলকে সা. আরও বলেছিলেন, আমার এ বুক আপনার বুকের সামনেই থাকবে। এক পর্যায়ে তিনি রাসূলকে সা. বলেনঃ আমি শক্তিশালী সাহসী মানুষ। আপনার যা প্রয়োজন আমাকেই বলুন। তিনি শত্রুদের বুক লক্ষ্য করে তীর ছুড়ছিলেন আর গুন গুন করে কবিতার একটি পংক্তি আওড়াচ্ছিলেনঃ ‘আমার জীবন হোক আপনার জীবনের প্রতি উৎসর্গ, আমার মুখমন্ডল হোক আপনার মুখমন্ডলের ঢাল।’ আবু তালহা ছিলেন বলবান বীর পুরুষ। এই উহুদ যুদ্ধে তিনি দুই অথবা তিনখানি ধনুক ভেঙ্গেছিলেন। আক্রমণের প্রচন্ডতায় তাঁর হাত দুইখানি অবশ হয়ে পড়ছিল। তবুও তিনি একবারও একটু উহ্ শব্দ উচ্চারণ করেননি। কারণ, তখন তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল রাসূলুল্লাহর সা. হিফাজত ও নিরাপত্তা। (উসুদুল গাবা- ৫/২৩৪, তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৭, তাবাকাত- ৩/৫০৭, বুখারী-কিতাবুল মাগাযী) হযরত আবু তালহা খাইবার যুদ্ধে যোগদান করেন। এই যুদ্ধের সময় তাঁর ও রাসূলুল্লাহ সা. উভয়ের উট খুবই নিকটে পাশাপাশি ছিল এবং রাসূল সা. গাধার গোশত হারাম ঘোষণা করার জন্য ঘোষক হিসেবে তাঁকেই মনোনীত করেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/১২১) এই অভিযান থেকে ফেরার সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. ও হযরত সাফিয়্যা ছিলেন এক উটের ওপর। মদীনার কাছাকাছি এসে উটটি হোঁচট খায় এবং আরোহীদ্বয় ছিটকে মাটিতে পড়ে যান। আবু তালহা দ্রুত নিজের উট থেকে লাফিয়ে পড়ে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে পৌঁছে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে আল্লাহ আপনার প্রতি উৎসর্গ করুন! আপনি কি কষ্ট পেয়েছেন? বললেনঃ না। তবে মহিলার খবর লও। আবু তালহা রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে হযরত সাফিয়্যার নিকটে যান এবং উটের হাওদা ঠিক করে আবার তাঁকে বসিয়ে দেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/১৮০) হুনাইন যুদ্ধেও তিনি দারুণ বাহাদুরী দেখান। এ যুদ্ধে তিনি একাই বিশ মতান্তরে একুশজন কাফিরকে হত্যা করেন। রাসূল সা. ঘোষণা করেছিলেন কেউ কোন কাফিরকে হত্যা করলে সে হবে নিহত ব্যক্তির সকল জিনিসের মালিক। এ দিন আবু তালহা একুশ ব্যক্তির সাজ-সরঞ্জামের অধিকারী হন। হিজরী অষ্টম সনে সংঘটিত এই যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর- ২/১১৯, তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৭, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫) এই যুদ্ধের সময় তিনি হাসতে হাসতে রাসূলুল্লাহর সা.কাছে এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! উম্মু সুলাইমের হাতে একটি খঞ্জর, আপনি কি তা দেখেছেন? রাসূল সা. বললেন, উম্মু সুলাইম, এই খঞ্জর দিয়ে কি করবে? বললেনঃ মুশরিকরা কেউ আমার নিকটে এলে এটা দিয়ে তাঁর পেট ফেঁড়ে ফেলবো। একথা শুনে রাসুল সা. হাসতে লাগলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৪৬, ৪৪৭, হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৯৭) বিদায় হজ্জে আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ছিলেন। মিনায় রাসূল সা. মাথা ‘হলক’ (চুল ছেঁচে ফেলা) করছিলেন। তিনি মাথার ডান দিকের কর্তিত চুল একটি/দুইটি করে পাশে বসা সাহাবীদের মধ্যে বন্টন করে দেন। কিন্তু মাথার বাম পাশের চুলগুলির সবই আবু তালহাকে দান করেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৭) ইমাম মুসলিমও একথা বর্ণনা করেছেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের কাছাকাছি সময় মদীনায় সাধারণতঃ দুই ব্যক্তি কবর খুঁড়তেন। মুহাজিরদের মধ্যে আবু ’উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ। তিনি খুঁড়তেন মককাবাসীদের মত। আর আনসারদের মধ্যে আবু তালহা। তিনি খুঁড়তেন মদীনাবাসীদের মত। হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের পর সাহাবায়ে কিরাম মসজিদে নববীতে বসে দাফন-কাফনের বিষয় পরামর্শ শুরু করলেন। প্রশ্ন দেখা দিল, কে এবং কোন পদ্ধতিতে কবর তৈরী করবে? উপরোক্ত দুই ব্যক্তি তখন এই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন না। হযরত ’আব্বাস রা. একই সময়ে দুইজনের নিকট লোক পাঠালেন, তাঁদেরকে ডেকে আনার জন্য। সিদ্ধান্ত হলো, এই দুইজনের মধ্যে যিনি আগে পৌঁছবেন তিনিই এই সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। তাঁদের ডাকার জন্য লোক পাঠিয়ে দিয়ে হযরত ’আব্বাস রা. সহ উপস্থিত সাহাবীরা দু’আ করতে লাগলেনঃ হে আল্লাহ, আপনার নবীর জন্য এই দুই জনের একজনকে নির্বাচন করুন। কিছুক্ষণের মধ্যে যে ব্যক্তি আবু তালহার খোঁজে গিয়েছিল, তাঁকে সংগে করে ফিরে আসে। অতঃপর আবু তালহা মদীনাবাসীদের নিয়ম অনুযায়ী রাসূলুল্লাহর সা. কবর তৈরী করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৭৩, আসাহ আস-সীয়ার- ৫৮৭) হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের পর বহু সাহাবী মদীনা ছেড়ে শামে আবাসন গড়ে তোলেন। আবু তালহাও তথাকার অধিবাসীদের একজন। তবে যখনই কোন দুঃখ ও দুশ্চিন্তায় পিষ্ট হতেন, তখনই এই মাসাধিক কালের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র মাযারে হাজির হতেন এবং মানসিক প্রশান্তি লাভ করতেন। (তারীখে ইবন আসাকির- ৬/৪) হযরত আবু বকরের রা. খিলাফত কাল আবু তালহা মোটামুটি শামে (সিরিয়া) কাটান। হযরত ফারুকে ’আজমের খিলাফত কালের বেশীর ভাগ সময় সেখানেই ছিলেন। হযরত উমারের রা. বাইতুল মাকদাস সফরের সময় তিনি শামে ছিলেন। আনাস থেকে বর্ণিত। ’উমার ইবনুল খাত্তাব শাম সফরে গেছেন। আবু তালহা ও আবু ’উবায়দাহ্ ইবনুল জাররাহ তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে এসে বললেনঃ আপনার সাথে রাসূলুল্লাহর সা. বাছা বাছা সাহাবীরা আছেন। অথচ আমরা পিছনে রেখে এসেছি এক প্রজ্জ্বলিত আগুন। (তাঁরা মহামারি আকারে প্লেগের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।) আপনি এ যাত্রা শামে প্রবেশ না করে মদীনায় ফিরে যান। ’উমার ফিরে গেলেন। পরের বছর তিনি এই স্থগিত সফর শেষ করেন।’ (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৬/৪) হযরত ’উমারের রা. অন্তিম সময়ে আবু তালহা মদীনায় ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার প্রতি খলীফা ’উমারের রা. প্রবল আস্থা ও বিশ্বাস ছিল। তিনি যখন জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে পড়লেন, তখন পরবর্তী খলীফা পদের জন্য ছয়জন সর্বজনমান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিকে মনোনয়ন দান করলেন। তারপর আবু তালহাকে ডেকে বললেনঃ আপনাদের দ্বারাই আল্লাহ তা’য়ালা ইসলামের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন। আমার মৃত্যুর পর আপনি ৫০ জন আনসারকে সংগে নিয়ে এই ছয় ব্যক্তির কার্যকলাপের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন। যদি তাঁদের চারজন এক দিকে যায় আর দুই জন বিরোধিতা করে তাহলে ঐ দুইজনের গর্দান উড়িয়ে দিবেন। আর তাঁরা সমান দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলে যে দলে ’আবদুল রহমান ইবন ’আউফ থাকবে না সে দলকে হত্যা করবেন। তিন দিনের মধ্যে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে তাদের সকলের দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলবেন। আমার মৃত্যুর পর পরবর্তী খলীফা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত আপনিই হবে অন্তরবর্তীকালীন খরীফা। (কানযুল ’উম্মাল- ৩/১৫৬, ১৫৭, হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৪) হযরত মিসওয়ার ইবন মাখরামার গৃহে ঐ ছয় ব্যক্তির বৈঠক বসলো। আবু তালহা সঙ্গীদের নিয়ে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে বাড়ীর দরযায় দাঁড়িয়ে গেলেন। বনু ’হাশিম প্রথম থেকেই এই পরামর্শের বিরোধী ছিল। কারণ, তার ছিল ’আলীকে রা. খলীফা বানানোর অভিলাষী। হযরত ’আব্বাস রা. সেই সময় চুপে চুপে ’আলীকে রা. বলেছিলেন, আপনি নিজের বিষয়ট ঐ লোকদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। আপনি নিজেই ফায়সালা করুন। ’আলী রা. কিছু একটা জবাব দিয়েছিলেন। আবু তালহা পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের এ সংলাপ শুনেছিলেন। হঠাৎ তাঁর প্রতি ’আলীর দৃষ্টি পড়তেই তিনি কিছু একটা যেন চিন্তা করলেন। আবু তালহা তা বুঝতে পেরে বলেছিলেনঃ আবুল হাসান, ভয়ের কিছু নেই। একদিন এই ছয় ব্যক্তির গোপন বৈঠক চলছে। আবু তালহাও তাঁর বাহিনী নিয়ে দরযায় দাঁড়িয়ে। এমন সময় ’আমর ইবনুল ’আস ও মুগীরা ইবন শু’বা এসে দরযায় বসে পড়েন। আবু তালহা তাঁদেররকে তেমন কিছু বললেন না; তবে সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস ছিলেন অত্যন্ত কঠোর প্রকৃতির মানুষ। তিনি ওঁদের দুইজনের ভাব-ভঙ্গিমায় স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি কঙ্কর উঠিয়ে তাঁদের প্রতি নিক্ষেপ করে বললেনঃ এরা এসেছে মদীনায় একথা প্রচার করতে যে, আমরাও শূরার সদস্য ছিলাম। কঙ্কর নিক্ষেপ করায় ’আমর ও মুগীরা ক্ষুব্ধ হন এবং ঝগড়া শুরু করেন। আবু তালহা বিরক্ত হয়ে বললেনঃ আমার আশংকা হচ্ছে, আপনারা এমন অহেতুক ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে আসল বিষয়টি ছেড়ে না দেন। সেই সত্তার নামে শপথ, যিনি ’উমারকে মৃত্যু দান করেছেন, আমি তিনদিনের বেশী একটুও সময় দেব না। খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারটি শেষ হওয়ার পর আবু তালহা মন্তব্য করেনঃ খিলাফতের দায়িত্ব লাভের জন্য এই ছয় ব্যক্তি প্রতিযোগিতা করবে, এমন আশংকার চেয়ে আমার বেশী ভয় ছিল তাঁরা এই দায়িত্ব থেকে দূরে সরে থাকে কিনা। কারণ, ’উমারের মৃত্যুর পর প্রতিটি গৃহে দ্বীন ও দুনিয়ার ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৭৩) খলিফা নির্বাচনের পর আবু তালহা সম্পূর্ণ নির্জনে চলে যান এবং বাকী জীবন একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদাতে কাটিয়ে দেন। হযরত উম্মু সুলাইমের রা. গর্ভে আবু তালহার একাধিক সন্তান হয়; কিন্তু তাদের কেউই বেশী দিন বাঁচেনি। তাঁর এক ছেলের নাম ছিল আবু ’উমাইর। ছোট বেলায় তার ছিল একটি ছোট পাখী। পাখীটি মারা গেল। একদিন রাসূল সা. তাদের বাড়ীতে গিয়ে তাকে খুবই বিমর্ষ দেখতে পেলেন। তার এমন অবস্থার কারণ জানতে চাইলে লোকেরা রাসূলকে সা. প্রকৃত ঘটনা খুলে বললে রাসূল সা. তাকে হাসানের জন্য একটু কাব্য করে বললেনঃ ‘ইয়া আবা ’উমাইর, মা ফা’য়ালান নুগাইর’- ওহে আবু উমাইর তোমার ছোট পাখীটি কী করলো? (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৭০, আল-ইসতী’য়াব) আবু তালহার অন্য একটি ছেলে কিছু দিন রোগ ভোগের পর মারা যায়। ছেলেটির অসুস্থতার মধ্যে আবু তালহা একদিন মসজিদে নববীতে যান এবং তখন সে মারা যায়। উম্মু সুলাইম ছেলের বাবার জন্য অপেক্ষা না করে তাকে দাফন করে দেন এবং বাড়ীতে লোকদের বলেন, তারা যেন ছেলের দাফন-কাফনের কথা আবু তালহাকে না বলে। এদিকে আবু তালহা মসজিদ থেকে আরও কয়েকজন মেহমানসহ বাড়ী ফিরলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ছেলে কেমন আছে? ছেলের মা বললেনঃ আগের চেয়ে ভালো। আবু তালহা মেহমানদের সাথে কথা বলতে লাগলেন। খাবার এলো এবং সবাই এক সাথে বসে খেয়ে নিলেন। মেহমান বিদায় নিলে আবু তালহা ভিতর বাড়ীতে আসলেন। রাতে স্বামী-স্ত্রী এক বিছানায় কাটালেন এবং মিলিত হলেন। শেষ রাতে উম্মু সুলাইম ছেলের মৃত্যুর খবর সহ কাফন-দাফনের কথা প্রকাশ করে বললেনঃ সে ছিল আমাদের কাছে আল্লাহর এক আমানত। তিনি সেই আমানত ফিরিয়ে নিয়েছেন। এতে কার কি আপত্তি থাকতে পারে? আবু তালহা ’ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজউন’ উচ্চারণ করলেন তবে এভাবে খবরটি গোপন করাতে তিনি একটু ক্ষুব্ধ হলেন। পরদিন সকালে আবু তালহা বিষয়টি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করলে তিনি বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের গত রাতের বরকত দান করুন। সেই রাতেই উম্মু সুলাইম গর্ভবতী হন। গর্ভের এই সন্তান প্রসব করার পর উম্মু সুলাইম তাকে আনাসের হাতে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠান। রাসূল সা. একটু খেজুর চিবিয়ে শিশুর গালে দেন এবং সে মুখ নেড়ে একটু চুষতে থাকে। তাই দেখে তিনি বললেনঃ দেখ, আনসারদের খেজুরের প্রতি স্বভাবগত টান রয়েছে। তিনি এই শিশুর নাম রাখে ’আবদুল্লাহ। রাসূলুল্লাহর সা. এই পবিত্র লালার বদৌলতে উত্তরকালে এই ছেলে অন্যান্য আনসার নওজোয়ানদের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেন। এই ’আবদুল্লাহর মাধ্যমে আবু তালহার বংশধারা চলেছে। ইসহাক ও ’উবাইদুল্লাহ নামে তাঁর ছিল দুই ছেলে, আর ইয়াহইয়া নামে ইসহাকের এক ছেলে। এঁরা সবাই ছিলেন তাঁদের যুগের অন্যতম হাদীস বিশারদ। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/২৫৭, তারীখ ইবন ’আসাকির- ৬/৬, বুখারী ও মুসলিমেও বিভিন্নভাবে উপরোক্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।) হযরত আবু তালহার মৃত্যুসন সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইমাম নাওয়াবী বলেনঃ ‘তিনি হিজরী ৩২ অথবা ৩৪ সনে ৭০ বছর বয়সে মদীনায় মারা যান। তাঁর মদীনায় মৃত্যুর কথা অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ বলেছেন। তবে আবু যুর’য়া আদ-দিমাশ্কী বলেছেন, তিনি শামে মারা গেছেন। আবার কেউ বলেছেন, তিনি সমুদ্র পথে অভিযানে বেরিয়ে মারা যান। আবু যুর’য়া আদ-দিমাশকী থেকে বর্ণিত হয়েছে, আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর চল্লিশ বছর একাধারে রোযা রেখে জীবন কাটান। এই বর্ণনা উপরে উল্লেখিত মৃত্যুসনের পরিপন্থী। কারণ, তিনি যদি হিজরী ৩২ অথবা ৩৪ সনে মারা যান তাহলে রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর ৪০ বছর রোযা রেখে বাঁচার প্রশ্নই ওঠে না। যাঁরা বলেছেন তিনি মদীনায় মারা গেছেন, তাঁরা একথাও বলেছেন যে, খলীফা হযরত ’উসমান রা. তাঁর জানাযার নামায পড়ান। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/৪৪৫, ৪৪৬) বসরাবাসীরা বলেন, তিনি শেষ জীবনে সমুদ্র পথে অভিযানে বেরিয়ে পথিমধ্যে মারা যান। এই মতে তাঁর মৃত্যুসন হিজরী ৫১। বিভিন্ন গ্রন্থে আবু তালহার এই জিহাদে যাওয়ার চমকপ্রদ ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। একদিন সূরা ‘তাওবাহ’ তিলাওয়াত করছেন। যখন ‘ইনফিরূ খিফাফান ওয়া সিকালান’- অভিযানে বের হয়ে পড়, ভারি অবস্থায় হোক অথবা হালকা অবস্থায় (আয়াত ৪১)- এ পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তাঁর মধ্যে জিহাদের প্রবল উদ্দীপনা সৃষ্টি হয। তিনি পরিবারের লোকদের বললেনঃ আল্লাহ যুবক-বৃদ্ধ সকলের ওপর জিহাদ ফরয করেছেন। আমি জিহাদে যেতে চাই, তোমরা আমার সফরের ব্যবস্থা কর। একথা দুইবার উচ্চারণ করেন। একেতো বার্ধক্য, তাছাড়া ক্রমাগত সিয়াম পালন করতে করতে তিনি শীর্ণকায় ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। পরিবারের লোকেরা বললোঃ আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন। আপনি রাসূলুল্লাহর সা. যুগের সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, আবু বকর ও ’উমারের যুগেও ধারাবাহিকভাবে জিহাদে লিপ্ত থেকেছেন। এখনও আপনার জিহাদের লোভ আছে? আপনি বাড়ীতে থাকুন, আমরা আপনার পক্ষ থেকে জিহাদে বেরিয়ে পড়ছি। শাহাদাতের অদম্য আবেগ যাঁকে ধাক্কাচ্ছে তাঁকে ঠেকাচ্ছে কে? বললেনঃ আমি যা বলছি তাই কর। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর সফরের ব্যবস্থা করা হয়। সত্তুর বছরের এই বৃদ্ধ আল্লাহর নাম নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। মুসলিম বাহিনী প্রস্তুত ছিল। অভিযানটি ছিল সাগর পথে। আবু তালহাজাহাজে চড়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তীব্র প্রতীক্ষা, কখন শত্রুসেনার মুখোমুখি হবেন। এমন সময় তাঁর ডাক এসে যায়। তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সাগর পথে কোথাও একটু ভূমির চিহ্ন দেখা গেল না। প্রবল বায়ু ও বিক্ষুব্ধ সাগর জাহাজটি অজানা লক্ষ্যের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল। এই মুমিন মুজাহিদের লাশ সাত দিন জাহাজের ডেকে পড়ে রইল। অবশেষে একটি অজানা দ্বীপ পাওয়া গেল এবং সেখানেই দাফন করা হলো এত দিনেও লাশে পচন ধরেনি বা সামান্য বিকৃতি ঘটেনি। (তাবাকাত- ৩/৫০৭, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৭, তারীখুর ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর- ২/১২০, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪২) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আবু তালহা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাঁর বর্ণিত হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আবু তালহা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাঁর বর্ণিত হাদীস সমূহে বিভিন্ন মাসয়ালা অথবা যুদ্ধ-বিগ্রহের আলোচনা থাকতো। দীর্ঘ দিন তিনি রাসূলুল্লাহ সা. সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছেন, অথবা ’আমলের ফজীলাত বিষয়ক কোন বর্ণনা তাঁর থেকে পাওয়া যায় না। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ৯২ টি (বিরানব্বই)। তার মধ্যে বুখারী ও মুসলিম প্রত্যেকে একটি করে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস ও আনাস ইবন মালিকসহ সাহাবীদের একটি দল এবং বিশিষ্ট তাবে’ঈদের একটি দলও তাঁর নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন ও বর্ণনাও করেছেন। (তাহজীবুল আসমা- ১/৪৪৫, তারিখে ইবন ’আসাকির- ৬/৪) হযরত আবু তালহার এক দল ছাত্র ও ভক্ত একবার তাঁর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে আসলো। তারা দেখলো, দরযায় একটি ছবিযুক্ত পর্দা টাঙ্গানো। তারা পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগলো। একটু সাহস করে যায়িদ ইবন খালিদ বলেই ফেললেনঃ গতকাল তো আপনি ছবি নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কি হাদীস বর্ণনা করলেন। তিনি ’উবাইদুল্লাহ খাওলানীকে বললেনঃ হাঁ, তা করেছিলাম। তবে এ কথাও তো বলেছিলাম, কাপড়ে যে ছবি থাকে তা এর আওতায় পড়বে না। (মুসনাদ- ৪/২৮) একদিন আবু তালহা আহার করছেন। সাথে উবাই ইবন কা’ব এবং আনাস ইবন মালিকও আছেন। আহার শেষে আনাস অজুর জন্য পানি চাইলেন। আবু তালহা ও ’উবাই দুই জনই বললেনঃ গোশত খাওয়ার কারণে হয়তো অজুর কথা মনে হয়েছে? আনাস বললেনঃ জী হাঁ! আবু তালহা বললেনঃ তোমরা ‘তায়্যিবাত’- পবিত্র বস্তুসমূহ খেয়ে অজু করছো অথচ রাসূল সা. এমনটি করতেন না। (মুসনাদ- ৪/৩) আবু তালহা একদিন নফল রোযা রেখেছিলেন। ঘটনাক্রমে সেই দিনই বরফ পড়েছিল। তিনি কয়েকটি তুষার খন্ড হাতে নিয়ে খেয়ে ফেলেন। ‘আপনি তো রোযার মধ্যে খাচ্ছেন’- লোকেরা এ কথা বললে তিনি মন্তব্য করেনঃ এ একটা রবকত, এ কিছু অর্জন করা উচিত। এ কোন খাদ্যও নয়, পানীয়ও নয়।’ (মুসনাদ- ৩/২৭৯, তারিখু ইবন ’আসাকির- ৬/১০) হযরত আবু তালহার মধ্যে কাব্য-প্রীতি ও প্রতিভা ছিল। তিনি কবিতা রচনা করতেন, আবৃত্তিও করতেন। প্রচন্ড যুদ্ধের সময় তিনি গুন গুন করে কবিতার পংক্তি আওড়াতেন। সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর কিছু পংক্তি সংকলিত হয়েছে। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ৪/১১৩, তারিখু ইবন ’আসাকির- ৬/৭, আল-ইসতীয়াব) হযরত আবু তালহার চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হুব্বে রাসূল- বা রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা। যুদ্ধের ময়দানে শত্রু পক্ষের প্রচন্ড আক্রমণে যখন সাথীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে তখনও তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য নিচের জীবনকে বাজি রেখে রুখে দাঁড়িয়েছেন। নিজের গোটাদেহ আঁড় করে দিয়ে তাঁকে হিফাজত করেছেন। প্রিয় নবীর গায়ে যেন আঁচড় লাগতে না পারে- এই আশায় তীর-বর্শার আঘাত নিজের বুকে ধারণ করেছেন। তাঁর প্রেমের গভীরতা এর দ্বারাই কিছুটা মাপা যায়। তিনি সাধারণতঃ সকল অভিযানে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে থাকতেন এবং দুই জনের উটও প্রায় পাশাপাশি চলতো। একবার মদীনায় শত্রুর আক্রমণের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু তালহার ‘মানদূর’ নামক ঘোড়াটি চেয়ে নিলেন এবং যে দিক থেকে শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা ছিল সেই দিকেই যাত্রা করলেন। আবু তালহাও রাসূলুল্লাহর সা. নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পিছনে পিছনে চললেন। কিন্তু তাঁর পৌঁছতে না পৌঁছতেই রাসূল সা. আবার ফিরে আসলেন এবং পথে আবু তালহার সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি আবু তালহাকে বললেনঃ সেখানে কিছু না। তোমার ঘোড়াটি খুব দ্রুতগতি সম্পন্ন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি যে তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল, খুব ছোট ছোট ব্যাপারেও তা প্রকাশ পেত। তাঁর বাড়ীতে কোন জিনিস এলে তার কিছু রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীতেও পাঠিয়ে দিতেন। একবার হযরত আনাস একটি খরগোশ ধরে আনলেন। আবু তালহা খরগোশটি জবেহ করে তার একটি রান নবীগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। একবার আবু তালহার স্ত্রী উম্মু সুলাইম এক থালা খেজুর পাঠালেন। রাসূল সা. খেজুরগুলি আযওয়াজে মুতাহ্হারাত ও অন্যান্য সাহাবীদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। (মুসনাদ- ৩/১২৫, ১৭১) হযরত রাসূলে কারীমের সা. শেষ রোগ যন্ত্রণায়- যাতে তিনি ইন্তিকাল করেন, একদিন আবু তালহা গেলেন তাঁকে দেখতে। রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ তোমার কাওমকে (আনসার) আমার সালাম বলবে। কারণ, তারা যা বৈধ ও উচিত নয় তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে এবং ধৈর্য ধারণ করে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০১) আবু তালহা বরেনঃ আমি একদিন রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গেলাম। তখন তাঁর চামড়া ও চেহারায় এমন এক অবস্থা দেখলাম যা এর পূর্বে আর কখনও দেখিনি। ইয়া রাসূলুল্লাহ! এমন অবস্থায় আমি আপনাকে আর কক্ষণও দেখিনি। বললেনঃ আবু তালহাঃ এমন অবস্থা হবে না কেন। এইমাত্র জিবরীল বেরিয়ে গেলেন। তিনি আমার রবের পক্ষ থেকে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলে গেলেনঃ আল্লাহ আমাকে আপনার কাছে এই সুসংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, আপনার উম্মাতের কেউ আপনার ওপর একবার দরুদ ও সালাম পেশ করলে আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ তার ওপর দশবার দরূদ ও সালাম পাঠ করবেন। (উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫) আহমাদ ও নাসাঈ অন্যভাবে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। তাতে আছে, জিবরীল বললেন, আপনার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি আপনার ওপর দরূদ ও সালাম পাঠ করবে আল্লাহ তার জন্য ১০ টি নেকী লিখবেন, তার ১০ টি গুনাহ মাফ করবেন এবং তার ১০ টি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩১৩) মদ হারাম হওয়ার পূর্বে একদিন তিনি খেজুর থেকে তৈরী ‘ফাদীখ’ নামক এক প্রকার মদ পান করেছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে খবর দিল, মদ হারাম ঘোষিত হয়েছে। সাথে সাথে তিনি আনাসকে বললেনঃ মদের এই কলসটি ভেঙ্গে ফেল। আনাস নির্দেশ পালন করলেন। (বুখারী- ২/১০৭) যখন সূরা আলে ইমরানের এই আয়াত- ‘তোমরা কোন কল্যাণই লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা এমন সব জিনিস (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ কর যা তোমাদের নিকট সর্বাধিক প্রিয়’- নাযিল হলো তখন আনসারদের যার কাছে যে সব মূল্যবান জিনিস ছিল সবই রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে গেল এবং আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিল। আবু তালহা রাসূলুল্লাহর সা নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর ‘বীরাহ’ নামক বিশাল ভূ-সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় ওয়াক্ফ করে দিলেন। এখানে তাঁর একটি কুয়ো ছিল। কুয়োটির পানি ছিল সুস্বাদু এবং রাসূল সা. এর পানি খুব পছন্দ করতেন। আবু তালহার এই দানে রাসূল সা. খুব খুশী হয়েছিলেন। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৪০, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৫৭) আবদুল্লাহ ইবন আবী বকর থেকে বর্ণিত। একদিন আবু তালহা তাঁর একটি বাগিচার দেয়ালের পাশে নামাযে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় একটি ছোট্ট পাখি- এদিক ওদিক উড়ে বেরোনোর পথ খুঁজতে থাকে; কিন্তু ঘন খেজুর গাছের জন্য বেরোনোর পথ পেল না। আবু তালহা নামাযে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ এই তামাশা দেখলেন। এদিকে নামায কত রাকায়াত পড়েছেন তা আর স্মরণ করতে পারলেন না। ভাবলেন, এই সম্পদই আমাকে ফিতনায় (বিপর্যয়ে) ফেলেছে। নামায শেষ করে তিনি ছুটে গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. কাছে। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ সবই আমি সাদাকা (দান) করে দিলাম। এই সম্পদ আপনি আল্লাহর পথে কাজে লাগান। রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ এই সম্পদ তোমার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বন্টন করে দাও। নির্দেশমত তিনি যাঁদের মধ্যে বন্টন করে দেন তাঁদের মধ্যে হাসসান ইবন সাবিত ও উবাই ইবন কা’বও ছিলেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৯৭, মুসনাদে আহমাদ- ৩/১৪১) একবার এক ব্যক্তি মদীনায় এলো, সেখানে থাকা-খাওয়ার কোন সংস্থান তার ছিল না। রাসূল সা. ঘোষণা করলেন, যে এই লোকটিকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করবে আল্লাহ তার ওপর সদয় হবেন। আবু তালহা সাথে সাথে বললেনঃ আমিই নিয়ে যাচ্ছি। বাড়ীতে ছোট ছেলে-মেয়েদের খাবার ছাড়া অতিরিক্ত কোন খাবার ছিল না। আবু তালহা স্ত্রীকে বললেনঃ এক কাজ কর, তুমি ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়াও। তারপর মেহমানের সামনে খাবার হাজির করে কোন এক ছুতোয় আলো নিভিয়ে দাও। অন্ধকারে আমরা খাওয়ার ভান করে শুধু মুখ নাড়াচাড়া করবো, আর মেহমান একাই পেট ভরে খেয়ে নেবে। যেই কথা সেই কাজ। স্বামী-স্ত্রী মেহমানকে পরিতৃপ্তি সহকারে আহার করালেন; কিন্তু ছেলে-মেয়ে সহ নিজেরা উপোস থাকলেন। সকালে আবু তালহা আসলেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট। তিনি ‘তাদের তীব্র প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দান করে’ (সূরা হাশর- ৯) – এই আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শোনান। তারপর আবু তালহাকে বলেন, অতিথির সাথে তোমাদের রাতের আচরণ আল্লাহর খুব পছন্দ হয়েছে। (মুসলিম- ২/১৯৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৬০, ১৬১) নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা ছিল আবু তালহার বিশেষ গুণ। খ্যাতি ও প্রদর্শনী থেকে তিনি সব সময় দূরে থাকতেন। ‘বীরাহা’ সম্পত্তি দান করার সময় তিনি কসম খেয়ে রাসূলুল্লাহকে সা. বললেন, একথা যদি গোপন রাখতে সক্ষম হতাম তাহলে কক্ষণও প্রকাশ করতাম না। (মুসনাদ- ৩/১১৫) আবু তালহা ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরের অধিকারী। আনাস রা. বলেনঃ রাসূল সা. বলতেন, সৈন্যদের মধ্যে আবু তালহার একটি জোর আওয়ায একদল সৈনিক থেকেও উত্তম। অন্য বর্ণনা মতে ‘এক হাজার মানুষের চেয়েও উত্তম।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছেঃ ‘মুশরিকদের জন্য আবু তালহার একটি হুংকার একদল সৈন্যের চেয়েও ভয়ংকর।’ (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর- ২/১১৯, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৭, উসুদুল গাবা- ৫/২৩৫) হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু তালহার পরিবারের জন্য দু’আ করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৯) হযরত আনাস রা. বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর সারা বছরই আবু তালহা রোযা পালন করতেন। শুধু দুই ’ঈদ ছাড়া কখনও রোযা ত্যাগ করতেন না। কারণ রাসূলের সা. জীবদ্দশায় সব সময় জিহাদে ব্যস্ত থাকায় তখন রোযা রাখতে পারতেন না। (তাহজীবুল আসমা- ১/২৪৬) ইবন হাজার ‘আল-ইসাবা’ গ্রন্থে আবু তালহার সম্মান ও মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এই বলে, তিনি ছিলেন উঁচু স্তরের মর্যাদাবান সাহাবীদের অন্যতম।
’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা)

’আবদুল্লাহ নাম। কুনিয়াত বা উপনামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যথাঃ আবু মুহাম্মদ, আবু রাওয়াহা অথবা আবু ’আমর। ‘শায়িরু রাসূলিল্লাহ’- ‘রাসূলুল্লাহর সা. কবি’ তাঁর উপাধি। মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনী আল-হারিস শাখার সন্তান। পিতা রাওয়াহা ইবন সা’লাবা এবং মাতা কাবশা বিনতু ওয়াকিদ। সাহাবিয়্যা ’আমরাহ বিনতু রাওয়াহা তাঁর বোন এবং কবি সাহাবী নু’মান ইবন বাশীর তাঁর ভাগ্নে। ইতিহাসে তাঁর জন্মের সময়কাল সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি জাহিলী ও ইসলামী উভয় জীবনে অতি মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। (তাবাকাত- ৩/৫২৫, আল-আ’লাম- ৪/২১৭, তাহজীবুল আসমা ওয়াললুগাত- ১/২৬৫) তিনি তৃতীয় আকাবায় সত্তর জন (৭০) মদীনাবাসীর সাথে অংশগ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন এবং সা’দ ইবনুর রাবূর’র সাথে তিনিও বনু আল-হারিসার ‘নাকীব’ (দায়িত্বশীল) মনোনীত হন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪৩, ৪৫৮, তাবাকাত- ৩/৫২৬, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫২, তারীখুল ইসলাম ও তাবাকাতুল মাশাহীর- ১/১৮১) তবে সম্ভবতঃ তিনি এই তৃতীয় ’আকাবার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় তিনি প্রথম আকাবায় ছয়জনের সাথে ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১০৫) ইসলাম গ্রহণের পর মদীনায় ইসলামের তাবলীগ ও দাওয়াতের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। রাসূলুল্লাহ সা. মক্কা থেকে হিজরাত করে কুবায় উপস্থিত হলেন। তিনি যে দিন কুবা থেকে সর্বপ্রথম মদীনায় পদার্পণ করেন, সেদিন আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা, সা’দ ইবনুর রাবী ও খারিজা ইবন যায়িদ তাদের গোত্র বনু আল-হারিসার লোকদের সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. উটনীর পথরোধ করে দৌঁড়ান এবং তাঁকে তাদের গোত্রে অবতরণের বিনীত আবেদন জানান। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের বলেন, উটনীর পথ ছেড়ে দাও। সে আল্লাহর নির্দেশমত চলছে, আল্লাহর যেখানে ইচ্ছা সেখানেই থামবে। তাঁরা পথ ছেড়ে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৫) হযরত রাসূলে কারীম সা. মিকদাদ ইবন আসওয়াদ আল-কিন্দীর সাথে তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। বদর, উহুদ, খন্দক, হুদাইবিয়া, খাইবার, ’উমরাতুল কাদা- প্রত্যেকটি অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কেবল হিজরী চতুর্থ সনে সংঘটিত ‘বদর আস-সুগরা’ অভিযানে যোগদান করতে পারেননি। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে মদীনায় স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করে যান। (তাবাকাত- ৩/৫২৬, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৮) উল্লেখ্য যে, উহুদ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান ইবন হারব ঘোষণা দেয় যে, এখন থেকে ঠিক এক বছরের মাথায় ‘বদর আস-সুগরা’ তে আবার তোমাদের মুখোমুখি হব। রাসূলুল্লাহ সা. ও মুসলমানরা এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে যথাসময়ে সেখানে উপস্থিত হন। কিন্তু কুরাইশরা অঙ্গীকার পালনের ব্যর্থ হয়। এই বদর আস-সুগরা- তে রাসূল সা. বাহিনীসহ আট দিন অপেক্ষা করেন। এটা হিজরী চতুর্থ সনের জ্বিলকা’দ মাসের ঘটনা। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৯-৩৪০) বদর যুদ্ধের সূচনা পর্বে কুরাইশ পক্ষের বাহাদুর ’উতবা ইবন রাবীয়া’ তার ভাই শাইবা ইবন রাবীয়া ও ছেলে আল-ওয়ালীদ ইবন উতবাকে সংগে করে প্রতিপক্ষ মুসলিম বাহিনীকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহ্বান জানায়। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুসলিম বাহিনীর মধ্য থেকে ’আউফ, মুয়াওয়াজ ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সর্বপ্রথম এগিয়ে যান। ’উতবা তাঁদের জিজ্ঞেস করেঃ তোমরা কারা? তাঁরা জবাব দেনঃ আনসারদের একটি দল। ’উতবা বলল, তোমাদের সাথে আমরা লড়তে চাইনা। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬২৫) বদরের বিজয় বার্তা দিয়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনার চতুর্দিকে লোক পাঠান। তিনি ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে পাঠান মদীনার উঁচু অঞ্চলের দিকে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬৪২) রাসূলুল্লাহ সা. বদর যুদ্ধেল পর মুসলমানদের হাতে বন্দী কুরাইশদের সম্পর্কে সাহাবীদের মতামত জানতে চান। তাঁদের সম্পর্কে নানাজন নানা মত প্রকাশ করেন। ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ প্রচুর জ্বালানী কাঠে পরিপূর্ণ একটি উপত্যকায় তাদেরকে জড় করে তার মধ্যে ফেলে দেওয়া হোক। তারপর আমিই সেই কাঠে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে মেরে ফেলবো। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪২) খন্দক যুদ্ধের সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার রচিত কবিতা বার বার আবৃত্তি করেছিলেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপঃ ‘‘হে আল্লাহ, তোমার সাহায্য না হলে আমরা হিদায়াত পেতাম না, আমরা যাকাত দিতাম না, সালাত আদায় করতাম না তুমি আমাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল কর, যুদ্ধে আমাদেরকে অটল রাখ। যারা আমাদের ওপর জুলুম করেছে, তারা বিপর্যয় সৃষ্টি করলে, আমরা অস্বীকার করবো।’’ (সীয়ারে আনসার- ২/৫৯) এই খন্দক যুদ্ধের সময় মদীনার ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজার নেতা কাব ইবন আসাদ রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সম্পাদিত তাদের চুক্তি ভঙ্গ করে গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। খবরটি রাসূলুল্লাহর সা. কানে পৌঁছে। তিনি খবরের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কয়েকজন লোককে কা’বের নিকট পাঠান। তাদের মধ্যে ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাও ছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২১, আসাহ আস-সীয়ার- ১৯০) খন্দক যুদ্ধের সময় রাসূলুল্লাহর সা. একটি মু’জিযা বা অলৌকিক কর্মকান্ডের কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে। আর তার সাথে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার নামটি উচ্চারিত হয়েছে। ঘটনাটি সংক্ষেপে এইরূপঃ ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার ভাগ্নী তথা নু’মান ইবন বাশীরের বোন বলেনঃ একদিন আমার মা ’উমরাহ বিনতু রাওয়াহা আমাকে ডেকে আমার কাপড়ে কিছু খেজুর বেঁধে দিয়ে বললেনঃ এগুলি তোমার বাবা বাশীর ও মামা ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে দিয়ে এস, তাঁরা দুপুরে খাবেন। আমি সেগুলি নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. পাশ দিয়ে যাচ্ছি, আর আমার বাবা ও মামাকে খোঁজ করছি। রাসূল সা. আমাকে দেখে ডাক দিলেনঃ এই মেয়ে, এদিকে এস। তোমার কাছে কি? বললামঃ খেজুর। আমার মা আমার বাবা বাশীর ইবন সা’দ ও মামা ’আবদুল্লাহর দুপুরের খাবারের জন্য পাঠিয়েছেন। বললেনঃ আমার কাছে দাও। আমি খেজুরগুলি রাসূলুল্লাহর সা. দুই হাতে ঢেলে দিলাম, কিন্তু হাত ভরলো না। তিনি কাপড় বিছাতে বললেন এবং খেজুরগুলি কাপড়ের ওপর ছড়িয়ে দিলেন; তারপর পাশের লেকটিকে বললেনঃ যাও, খন্দকবাসীদের দুপুরের খাবার খেয়ে যেতে বল। ঘোষণার পর, সবাই চেল এল এবং খাবার খেতে শুরু কর। তাঁরা খাচ্ছে, আর খেজুর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকলো। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/১১৮, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬৩১) ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধি ও বাই’য়াতে রিদওয়ানেও ’আবদুল্লাহ যোগদান করেন। আবু রাফে’র পরে উসাইর ইবন রাযিম ইহুদীকে খাইবারের শাসক নিয়োগ করা হয়েছিল। ইসলামের শত্রুতায় সে ছিল উপযুক্ত উত্তরাধিকারী। সে গাতফান গোত্রে ঘুরাঘুরি করে তাদেরকে বিদ্রাহী করে তোলে। হযরত রাসূলে কারীম সা. খবর পেয়ে ষষ্ঠ হিজরীর রমাদান মাসে তিরিশ সদস্যের একটি দলের সাথে ’আবদুল্লাহকে খাইবারে পাঠান। তিনি গোপনে উসাইর ইবন রাযিমের সকল তথ্য সংগ্রহ করে রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করেন। রাসূল সা. তিরিশ সদস্যের একটি বাহিনী ’আবদুল্লাহর অধীনে ন্যস্ত করে উসাইরকে হত্যার নির্দেশ দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৭৮) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা উসাইরের সাথে দেখা করে বলেন, যদি আপনি নিরাপত্তার আশ্বাস দেন তাহলে একটি কথা বলি। সে আশ্বাস দিল। ’আবদুল্লাহ বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। আপনাকে খাইবারের নেতা বানানো তাঁর ইচ্ছা। তবে আপনাকে একবার মদীনায় যেতে হবে। সে প্রলোভনে পড়ে এবং তিরিশজন ইহুদীকে সংগে করে ’আবদুল্লাহর বাহিনীর সাথে চলতে শুরু করলো। পথে ’আবদুল্লাহ প্রত্যেক ইহুদীর প্রতি নজর রাখার জন্য একজন করে মুসলমান নির্দিষ্ট করে দিলেন। এতে উসাইরের মনে সন্দেহের উদ্রেক হল এবং ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলো। ধোঁকা ও প্রতারণার অপরাধে মুসলিম মুজাহিদরা খুব দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে তাদের সকলকে হত্যা করেন। এই ঘটনার পর খাইবারের মাথাচাড়া দেওয়া বিদ্রোহ দমিত হয়। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৬১৮, সীয়ারে আনসার- ২/৬০) পরে হযরত রাসূলুল্লাহ সা. ’আবদুল্লাহকে খাইবারে উৎপাদিত খেজুর পরিমাপকারী হিসাবে আবারও সেখানে পাঠান। কিছু লোক রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ’আবদুল্লাহর কঠোরতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলো। এক পর্যায়ে তারা ঘুষও দিতে চাইল। ইবন রাওয়াহা তাদেরকে বললেনঃ ওহে আল্লাহর দুশমনরা। তোমরা আমাকে হারাম খাওয়াতে চাও? আমার প্রিয় ব্যক্তির পক্ষ থেকে আমি এসেছি। আমার নিকট তোমরা বানর ও শুকর থেকেও ঘৃণিত। তোমাদের প্রতি ঘৃণা এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা তোমাদের ওপর কোন রকম জুলুমের দিকে নিয়ে যাবে না। একথা শুনে তারা বললঃ এমন ন্যায়পরায়ণতার ওপরই আসমান ও যমীন প্রতিষ্ঠিত। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১০৮, আল বিদায়া- ৪/১৯৯) হুদাইবিয়ার সন্ধি অনুযায়ী সে বছরের মূলতবী ’উমরাহ রাসূল সা. পরের বছর হিজরী সপ্তম সনে আদায় করেন। একে ‘উমরাতুল কাদা’ বা কাজা ’উমরা বলে। এই সফরে রাসূলে কারীম সা. যখন মক্কায় প্রবেশ করেন এবং উটের পিঠে বসে ‘হাজরে আসওয়াদ’ চুম্বন করেন তখন মক্কায় প্রবেশ করেন এবং উটের পিঠে বসে ‘হাজলে আসওয়াদ’ চুম্বন করেন তখন আবদুল্লাহ তার বাহনের লাগাম ধরে একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। কবিতাটির কিছু অংশের মর্ম নিম্নরূপঃ ওরে কাফিরের সন্তানরা! তোরা তাঁর পথ থেকে সরে যা, তোরা পথ ছেড়ে দে। কারণ, সকল সৎকাজ তো তাঁরই সাথে। আমরা তোদের মেরেছি কুরআনের ব্যাখ্যার ওপর, যেমন মেরেছি তাঁর নাযিলের ওপর। এমন মার দিয়েছি যে, তোদের মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বন্ধু ভুলে ফেলে গেছে তাঁর বন্ধুকে। প্রভু আমি তাঁর কথার ওপর ঈমান এনেছি। (তাবাকাত- ৩/৫২৬, আল ইসাবা- ২/৩০৭) এক সময় হযরত উমার রা. ধমক দিয়ে বলেনঃ আল্লাহর হারামে ও রাসূলুল্লাহর সা. সামনে এভাবে কবিতা পাঠ? রাসূল সা. তাঁকে শান্ত করে বলেনঃ ’উমার! আমি তার কথা শুনছি। আল্লাহর কসম! কাফিরদের ওপর তার কথা তীর বর্শর চেয়েও বেশী ক্রিয়াশীল। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭) তিনি আবদুল্লাহকে বলেনঃ তুমি এভাবে বলঃ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু, নাসারা ’আবদাহ ওয়া আ’য়ায্যা জুনদাহ, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহ’- এক আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করেছেন এবং একাই প্রতিপক্ষের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করেছেন। ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা উপরোক্ত বাক্যগুলি আবৃত্তি করছিলেন, আর তার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে উচ্চারণ করছিলেন সমবেত মুসলিম জনমন্ডলী। তখন মক্কার উপত্যকা সমূহে সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছিল। (সীয়ারে আনসার- ২/৬১) হিজরী অষ্টম সনের জামাদি-ইল-আওয়াল মাসে মূতার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বসরার শাসকের নিকট দূত মারফত একটি চিঠি পাঠান। পথে মূতা নামক স্থানে এক গাসসানী ব্যক্তির হাতে দূত নিহত হয়। দূতের হত্যা মূলতঃ যুদ্ধ ঘোষণার ইঙ্গিত। রাসূল সা. খবর পেয়ে যায়িদ ইবন হারিসার নেতৃত্বে তিন হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী মূতায় পাঠান। যাত্রার প্রাক্কালে হযরত রাসূলে কারীম সা. বলেনঃ যায়িদ হবে এ বাহিনীর প্রধান। সে নিহত হলে জা’ফর ইবন আবী তালিব তার স্থলাভিষিক্ত হবে। জা’ফরের পর হবে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। আর সেও যদি নিহত হয় তাহলে মুসলমানরা আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের আমীর বানিয়ে নেবে। বাহিনী মদীনা থেকে যাত্রার সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. ‘সানিয়্যাতুল বিদা’ পর্যন্ত অগ্রসর হয়ে তাদের বিদায় জানান। বিদায় বেলা মদীনাবাসীরা তাদেরকে বললঃ তোমরা নিরাপদে থাক এবং কামিয়াব হয়ে ফিরে এসো। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা কাঁদতে লাগলেন। লোকেরা বললঃ কাঁদার কী আছে? তিনি বললেন, দুনিয়ার মুহাব্বতে আমি কাঁদছিনা। তিনি সূরা মারিইয়াম এর ৭১ নং আয়াত- ‘তোমাদের প্রত্যেককেই তা (পুলসিরাত) অতিক্রম করতে হবে। এটা তোমার রব-এ অনিবার্য সিদ্ধান্ত’- পাঠ করেন। তারপর তিনি বলেন, আমি কি সেই পুলসিরাত পার হতে পারবো? লোকরা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললঃ আল্লাহ তোমাকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আবার মিলিত করবেন। তখন তিনি স্বরচিত একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। কবিতাটির অর্থ নিম্নরূপ। ‘তবে আমি রহমানের কাছে মাগফিরাত কামনা করি, আর কামনা করি অসির অন্তরভেদী একটি আঘাত, অথবা কলিজা ও নাড়িতে পৌঁছে যায় নিযার এমন একটি খোঁচা, আমার কবরের পাশ দিয়ে অতিক্রমকারী যেন বলে- হায় আল্লাহ, সে কত ভালো যোদ্ধা ও গাজী ছিল।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৭৪, ৩৭৭ হায়াতুস সাহাবা- ১/৫২৯, ৫৩০) কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, যায়িদ ও জা’ফর বাহিনীসহ সকালে মদীনা ত্যাগ করলেন। ঘটনাক্রমে সেটা ছিল জুময়ার দিন। ’আবদুল্লাহ বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে জুময়ার নামায আদায় করে রওয়াহা হব। তিনি নামায আদায় করলে। রাসূল সা. নামায শেষে তাঁকে দেখে বললেনঃ সকালে তোমার সংগীদের সাথে যাওনি কেন? ’আবদুল্লাহ বললেন, আমি ইচ্ছা করেছি, আপনার সাথে জুম’য়া আদায় করে তাদের সাথে মিলিত হব। রাসূল সা. বললেন, তুমি যদি দুনিয়ার সবকিছু খরচ কর তবুও তাদের সকালে যাত্রার সাওয়াবের সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবে না। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৬৩) মদীনা থেকে শামের ‘মা’য়ান’ নামক স্থানে পৌঁছে তাঁরা জানতে পারেন যে, রোমান সম্রাট হিরাকল এক লাখ রোমান সৈন্যসহ ‘বালকা’-র ‘মাব’ নামক স্থানে অবস্থান নিয়েছে। আর তাদের সাথে যোগ দিয়েছে লাখম, জুজাম, কায়ন, বাহরা, বালী-সহ বিভিন্ন গোত্রের আরও এক লাখ লোক। এ খবর পেয়ে তাঁরা মায়ানে দুই দিন ধরে চিন্তা-ভাবনা ও পরামর্শ করেন। মুসলিম সৈনিকদের কেউ কেউ মত প্রকাশ করে যে, আমরা শত্রুপক্ষের সৈন্যসংখ্যা ও প্রস্তুতির সব খবর রাসূলকে সা. অবহিত করি। তারপর তিনি আমাদেরকে অতিরিক্ত সৈন্য দিয়ে সাহায্য করবেন অথবা অন্য কোন নির্দেশ দেবেন এবং আমরা সেই মোতাবিক কাজ করব। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তখন সৈনিকদের উদ্দেশ্যে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। তিনি বলেন, ওহে জনমন্ডলী, এখন তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হতে পসন্দ করছো না; অথচ তোমার সবাই শাহাদাত লাভের উদ্দেশ্যে বের হয়েছো। আমরা তো শত্রুর সাথে সংখ্যা, শক্তি ও আধিক্যের দ্বারা লড়বো না। আমরা লড়বো দ্বীনের বলে বলীয়ান হয়ে- যে দ্বীনের দ্বারা আল্লাহ তা’য়ালা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। তোমরা সামনে ঝাঁপিয়ে পড়। তোমাদের সামনে আছে দুইটি কল্যানের যে কোন একটি হয় বিজয়ী হবে নতুবা শাহাদাত লাভ করবে। সৈনিকরা তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললঃ আল্লাহর কসম! ইবন রাওয়াহা ঠিক কথাই বলেছেন। তারা তাদের সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হন। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাও একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তাদের সাথে চলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৭৫, আসাহ আস-সীয়ার- ২৮০) তাঁরা ‘মা’য়ান’ ত্যাগ করে মূতায় পৌঁছে শিবির স্থাপন করেন। এখানে অমুসলিমদের সাথে এক রক্তক্ষয়ী অসম যুদ্ধ হয়। ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘মূতার যুদ্ধ’ নামে খ্যাত। মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা মাত্র তিনহাজার আর শত্রুবাহিনীর সংখ্যা অগণিত। (সীয়ারে আনসার- ২/৬২) প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হল। সেনাপতি যায়িদ ইবন হারিসা যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হলেন। জা’ফর তাঁর পতাকাটি তুলে নিলেন। কিছুক্ষণ পর তিনিও শাহাদাত বরণ করলেন। এবার আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ঝান্ডা হাতে তুলে নিয়ে সামনে অগ্রসর হলেন। তিনি ছিলেন ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়ার পিঠ থেকে নামার মুহূর্তে তাঁর মনে একটু দ্বিধার ভাব দেখা দিল। তিনি সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আপন মনে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। তার কিছু অংশ নিম্নরূপঃ ‘হে আমার প্রাণ! আমি কসম করেছি, তুমি অবশ্যই নামবে, তুমি স্বেচ্ছায় নামবে অথবা নামতে বাধ্য করা হবে। মানুষের চিৎকার ও ক্রন্দন ধ্বনি উত্থিত হচ্ছে, তোমার কী হয়েছে যে, এখনও জান্নাতকে অবজ্ঞা করছো? সেই কত দিন থেকে না এই জান্নাতের প্রত্যাশা করে আসছো, পুরানো ফুটো মশকের এক বিন্দু পানি ছাড়া তো তুমি আর কিছু নও। হে আমার প্রাণ, আজ তুমি নহত না হলেও একদিন তুমি মরবে, এই মৃত্যুর হাম্মাম এখানে উত্তপ্ত করা হচ্ছে। তুমি যা কামনা করতে এখন তোমাকে তাই দেওয়া হয়েছে, তুমি তোমার সঙ্গীদ্বয়ের কর্মপন্থা অনুসরণ করলে হিদায়াত পাবে।’ উপরোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে তিনি ঘোড়া থেকে নেমে পড়েন। তখন তাঁর এক চাচাতো ভাই গোশতসহ একটুকরো হাড় নিয়ে এসে তার হাতে দেন। তিনি সেটা হাতে নিয়ে যেই না একটু চাটা দিয়েছেন, ঠিক তখনই প্রচণ্ড যুদ্ধের শোরগোল ভেসে এলো। ‘তুমি এখনও বেঁচে আছ’- এ কথা বলে হাতের হাড়টি ছুড়ে ফেলে দিয়ে তরবারি হাতে তুলে নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শত্রুপক্ষের এক সৈনিক এমন জোরে তীর নিক্ষেপ করে যে, মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ত্রাসের সৃষ্টি হয়। একটি তীর তাঁর দেহে বিদ্ধ হয়। তিনি রক্তরঞ্জিত অবস্থায় সাথীদের আহবন জানান। সাথীরা ছুটে এসে তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইতিমধ্যে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। (তাবাকাত- ৩/৫২৯, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৭৯, হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৩৩, সীয়ারে আনসার- ২/৬৩, আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৮০, ২৪৪) মূতায় অবস্থানকালে শাহাদাতের পূর্বে একদিন রাতে তিনি একটি মর্মস্পর্শী কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। আবৃত্তি শুনে যায়িদ ইবন আরকাম কাঁদতে শুরু করেন। তিনি যায়িদের মাথার ওপর দুররা উঁচু করে ধরে বলেনঃ তোমার কী হয়েছে? আল্লাহ আমাকে শাহাদাত দান করলে তোমরা নিশ্চিন্তে ধরে ফিরে যাবে। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭) হযরত রাসূলে কালীম সা. ওহীর মাধ্যমে মূতার প্রতি মুহূর্তের খবর লাভ করে মদীনায় উপস্থিত লোকদের সামনে বর্ণনা করছিলেন। সহীহ বুখারীতে আনাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, মূতার খবর আসার পূর্বেই রাসূল সা. মদীনায় যায়িদ, জা’ফর ও আব্দুল্লাহর শাহাদাতের খবর দান করেন। তিনি বলেনঃ যায়িদ ঝান্ডা হাতে নেয় এবং শহীদ হয়। তারপর জা’ফর তুলে নেয়, সেও শহীদ হয়। অতঃপর আবদুল্লাহ তুলে নেয় এবং সেও শহীদ হয়। তিনি একথা বলছিলেন আর তাঁর দুই চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। (আসাহ আস-সীয়ার- ২৮১) কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, যায়িদ ও জা’ফরের শাহাদাতের খবর দেওয়ার পর রাসূল সা. একটু চুপ থাকেন। এতে আনসারদের চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। তারা ধারণা করে যে, ’আবদুল্লাহর এমন কিছু ঘটেছে যা তাদের মনঃপূত নয়। তারপর রাসূল সা. বলেনঃ অতঃপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা উঠিয়ে নেয় এবং যুদ্ধ করে শহীদ হয়। তিনি আরও বলেন, তাদের সকলকে জান্নাতে আমার কাছে আনা হয়েছে। আমি দেখলাম, তারা সোনার পালঙ্কে শুয়ে আছে। তবে ’আবদুল্লাহর পালঙ্কটি তার অন্য দুই সঙ্গীর থেকে একটু বাঁকা। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ এটা এমন কেন? বলা হলঃ তারা দুইজন দ্বিধাহীন চিত্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু আবদুল্লাহর চিত্ত দ্বিধা-সংকোচ একটি দোল খায়। তারপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৮০) মূতার তিন সেনাপতির মৃত্যুর খবর রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পৌঁছলে তিনি উঠে দাঁড়ান এবং তাঁদের কর্মকাণ্ড বর্ণনা করে এই বলে দুআ করেনঃ আল্লাহ তুমি যায়িদকে ক্ষমা করে দাও। একথা তিনবার বলেন, তারপর বলেনঃ আল্লাহ তুমি জাফর ও আবদুল্লাহ ইবন রাওযাহাকে ক্ষমা করে দাও। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৪৪) মূতায় যাওয়ার পূর্বে একবার মদীনায় অসুস্থ অবস্থায় অচেতন হয়ে পড়েন। তখন তাঁর বোন ’উমরাহ নানাভাবে ইনিয়ে বিনিয়ে আরবদের প্রথা অনুযায়ী বিলাপ শুরু করেন। চেতনা ফিরে পেয়ে তিনি বোনকে বলেন, তুমি আমার সম্পর্কে অতিরঞ্জন করে যা কিছু বলছিলে, তার সবই আমার কাছ থেকে সত্যায়িত করা হচ্ছিল। এই কারণে তাঁর মৃত্যুর সময় তারই উপদেশ মত সকলে ‘সবা’ (ধৈর্য্য) অবলম্বন করে। সহীহ বুখারীতে এসেছে- তিনি যখন মারা যান তাঁর জন্য কান্নাকাটি বা বিলাপ করা হয়নি। (উসুদুল গাবা- ৩/১৪৭-১৫৯, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৮০) মূতা রওয়ানা হওয়ার সময় তাঁর স্ত্রী ও সন্তান ছিল। কিন্তু উসুদুল গাবা গ্রন্থকার বলেছেন, তিনি নিহত হন এবং কোন সন্তান রেখে যাননি। (উসুদুল গাবা- ৩/১৫৯, সীয়ারে আনসার- ২/২৬৫) ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার স্ত্রী সম্পর্কে আল-ইসতীয়াব গ্রন্থে একটি কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বিশেষ এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর স্ত্রী তাঁকে বলেন, তুমি যদি পাক অবস্থায় থাক তাহলে একটু কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাও। তখন ’আবদুল্লাহ চালাকির আশ্রয় গ্রহণ করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। যার কিছু নিম্নরূপঃ ‘‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহর ওয়াদা সত্য, কাফিরদের ঠিকানা দোযখ, ’আরশ ছিল পানির ওপর, ’আরশের ওপর ছিলেন বিশ্বের প্রতিপালক, আর সেই আরশ বহন করে তাঁরই শক্তিশালী ফিরিশতারা।’’ তাঁর স্ত্রী কুরআনের পারদর্শী ছিলেন না। এই কারণে তিনি বিশ্বাস করেন যে, আবদুল্লাহ কুরআন থেকেই তিলাওয়াত করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ সত্যবাদী, আমার চোখ দেখতে ভুল করেছে। আমি অহেতুক তোমাকে দোষারোপ করছি। দাসীর সাথে উপগত হওয়ার পর স্ত্রীর ক্রোধ থেকে বাঁচার জন্য হযরত আবদুল্লাহ এমন বাহানার আশ্রয় নেন। তিনি পরদিন সকালে এ ঘটনা রাসূলুল্লাহকে সা. জানালে তিনি হেসে দেন। (আল-ইসতীয়াব- ১/৩৬২, হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৫) সামরিক দক্ষতা ছাড়াও হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার আরও অনেক যোগ্যতা ছিল। একারণে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে সমাদর করতেন। সেই জাহিলী আরবে যে মুষ্টিমেয় কিছু লোক আরবীতে লেখা জানতো, ’আবদুল্লাহ তাদের অন্যতম। ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল সা. তাঁকে স্বীয় ‘কাতিব’ (লেখক) হিসাবে নিয়োগ করেন। তবে কখন কিভাবে তিনি লেখা শিখেছিলেন, সে সম্পর্কে ইতিহাস কিছু বলে না। তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের একজন বিখ্যাত করি। ডক্টর ’উমার ফাররুখ বলেন, ’মদীনায় ইসলাম রাষ্ট্রশক্তি অর্জন করলে আরবের মুশরিকগণ আরও শংকিত হয়ে পড়ে। মক্কার পৌত্তলিক কবিগণ বিশেষতঃ ’আবদুল্লাহ ইবন আয-যিবা’রী, কা’ব ইবন যুহাইর ও আবু সুফইয়ান ইবন আল-হারিস রাসূলুল্লাহ সা. ও ইসলামের নিন্দা ও কুৎসা রটনা করে কবিতা লিখতো। তখন মদীনায় হাসসান ইবন সাবিত, ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও কা’ব ইবন মালিক তাদের প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড়িয়ে সমুচিত জবাব দেন এবং ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরেন। মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত দু’পক্ষের এ কবিতায় যুদ্ধ চলতে থাকে। ’আবদুল্লাহ ছিলেন তাঁর যুগের ভালো কবিদের একজন। তিনি হাস্সান ও কা’বের সমপর্যায়ের কবি। জাহিলী যুগে তিনি কবি কায়েস ইবনুল খুতাইম- এর সাথে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মূলক কবিতা লিখে প্রতিযোগিতা করতেন। আর ইসলামী যুগে রাসূলের সা. প্রশংসা এবং মুশরিক কবিদের প্রতিবাদ ও নিন্দায় কবিতা রচনা করতেন। (তারীখুল আদাব আল-আরাবী- ১/২৫৮, ২৬১, ২৬২) জুরযী যায়দান বলেনঃ ‘মক্কার পৌত্তলিক কবিদের মধ্যে যারা মুসলমানদের নিন্দা করে কবিতা বলতো তাদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন আয-যিবারী, আবু সুফইয়ান ইবন আল-হারিস ও ’আমর ইবন আল- ’আস ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। একদিন নবী সা. বললেনঃ যারা তাদের অস্ত্রের দ্বারা আল্লাহর রাসূলকে সাহায্য করেছে, জিহ্বা দিয়ে তাঁকে সাহায্য করতে তাদেরকে কিসে বিরত রেখেছে? এই কথার পর যে তিন কবি উপরোক্ত কবিদের প্রতিরোধে দাঁড়িয়ে যান তাঁরা হলেন, হাস্সান, ক’ব ও আবদুল্লাহ। রাসুল সা. মনে করতেন, এই তিন কবির কবিতা শত্রুদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তিনি বলেছেনঃ এই তিন কবি কুরাইশদের কাছে তীরের ফলার চেয়েও বেশী শক্তিশালী। (তারীখু আদাব আল-লুগাহ আল-’আরাবিয়্যাহ- ১/১৯১) কবি হাস্সান কুরাইশদের বংশ ও রক্তের ওপর আঘাত হানতেন, কবি কা’ব কুরাইশদের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও অতীত ইতিহাস বর্ণনা করে তাদের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরতেন। পক্ষান্তরে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাদের কুফরীর জন্য নিন্দা ও ধিক্কার দিতেন। (উসুদুল গাবা- ৪/২৪৮) আবুল ফারাজ আল-ইস্পাহানী বলেনঃ হাস্সান ও কা’ব প্রতিপক্ষ কুরাইশ কবিদের মত যুদ্ধ বিগ্রহ ও গৌরবমূলক কাজ-কর্ম নিয়ে কবিতা রচনা করতেন এবং তার মধ্যে কুরাইশদের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি তুলে ধরতেন। আর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহ তাদের কুফরীর জন্য ধিক্কার ও নিন্দা জানাতেন। কুরাইশদের ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত পূর্বোক্ত দু’জনের কবিতা ছিল তাদের নিকট ’আবদুল্লাহর কবিতা অপেক্ষা অধিকতর পীড়াদায়ক। কিন্তু যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করে তার মর্মবাণী উপলব্ধি করলো তখন ’আবদুল্লাহর কবিতা সর্বাধিক প্রভাবশালী ও পীড়াদায়ক বলে তাদের নিকট প্রতিভাত হলো। (কিতাবুল আগানী- ৪/১৩৬) আবদুল্লাহ ছিলেন স্বভাব কবি। উপস্থিত কবিতা রচনায় দক্ষ ছিলেন। হযরত যুবাইর ইবনুল আওয়াব রা. বলেনঃ তাৎক্ষণিক কবিতা বলার ক্ষেত্রে আমি ’আবদুল্লাহ অপেক্ষা অধিকতর সক্ষম আর কাউকে দেখিনি। (তাহীবুল আসমা ওয়াল লূগাত- ১/২৬৫) একদিন তিনি মসজিদে নববীতে। পূর্বেই সেখানে হযরত রাসূলে কারীম সা. একদল সাহাবীর সাথে বসে ছিলেন। তিনি ’আবদুল্লাহকে কাছে ডেকে বলেন, তুমি এখন মুশরিকদের সম্পর্কে কিছু কবিতা শোনাও।’ আবদুল্লাহ কিছু কবিতা শোনালেন। কবিতা শুনে রাসূল সা. একটু হাসি দিয়ে বলেন, আল্লাহ তোমাকে অটল রাখুন। (আল-ইসতীয়াব- ১/৩৬২, তাবাকাত- ৩/৫২৮, আল-ইসাবা- ২/৩০৭) হযরত আবু হুরাইরা রা. ওয়াজ নসীহাতের সময় বলতেন, তোমাদের এক ভাই আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা অশ্লীল কথা বলতেন। তারপর তিনি ’আবদুল্লাহর একটি কবিতা আবৃত্তি করতেন। ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে কবিতাটি সংকলটন করেছেন। (আল-ফাতহুর রাব্বানী, শরহু মুসনাদ আহমাদ- ২২/২৮৭) ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার সব কবিতা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। তবে এখনও পঞ্চাশটি শ্লোক (verse) সীরাত ও ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে সংরক্ষিত আছে। সীরাতু ইবন হিশামে তার অধিকাংশ পাওয়া যায়। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা (উর্দু)- ১২/৭৮০) যখন সূরা শু’য়ারা- এর ২২৪-২২৬ নং আয়াতগুলি- ‘কবিদেরকে তারাই অনুসরণ করে যারা বিভ্রান্ত। তুমি কি দেখনা তারা উদভ্রান্ত হয়ে প্রত্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়? এবং যা করে না তাই বলে বেড়ায়’- নাযিল হয় তখন হাস্সান, আবদুল্লাহ ও কাব এত ভীত হয়ে পড়েন যে, তাঁরা কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ছুটে যান। তাঁরা বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, এই আয়াত নাযিলের সময় আল্লাহ তো জানতেন আমরা কবি। তখন রাসূল সা. আয়াতের পরবর্তী অংশ- ‘কিন্তু তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, আল্লাহকে বার বার স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে’- পাঠ করেন এবং বলেন এই হচ্ছো তোমরা। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭, তাবাকাত- ৩/৫২৮, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৭৭, ১৭২) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা থেকে কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি হাদীসগুলি খোদ রাসূল সা. ও বিলাল থেকে বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে বর্ণনা করেছেন ইবন ’আব্বাস, উসামা ইবন যায়িদ, আনাস ইবন মালিক, নু’মান ইবন বাশীর ও আবু হুরাইরা। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬) আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ছিলেন একজন দুনিয়া বিরাগী ’আবিদ ও সব সময় আল্লাহকে স্মরণকারী (জাকির) ব্যক্তি। আবুদ দারদা বলেনঃ এমন কোন দিন যায়না যেদিন আমি তাঁকে স্মরণ করিনা। আমার সঙ্গে একত্র হলেই তিনি বলতেনম, এস, কিছুক্ষণের জন্য আমরা মুসলমান হয়ে যাই। তারপর বসে ‘জিকর’ শুরু করতেন। ‘জিকর’ শেষ হলে বলতেন, এটা ছিল ঈমানের মজলিস। (উসুদুল গাবা- ৩/১৫৭) আনাস ইবন মালিক বলেন। ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার সাথে রাসূলুল্লাহর সা. কোন সাহাবীর দেখা হলে বলতেন, এস, আমরা কিছু সময়ের জন্য ঈমান আনি। একদিন এক ব্যক্তি তাঁর এমন কথায় খুব রেগে গেল। সে সোজা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট অভিযোগ করে বললঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি কি দেখেন না, ইবন রাওয়াহা আপনার ঈমান ত্যাগ করে কিছুক্ষণের ঈমানকে পসন্দ করছে? তিনি বললেন, আল্লাহ ইবন রাওয়াহার ওপর রহম করুন। সে এমন সব মজলিস পসন্দ করে যার জন্য ফিরিশতারাও ফখর করে থাকে। একবার তো তাঁর এমনি ধরণের আহ্বানে এক ব্যক্তি প্রতিবাদ করে বলে বসলো, কেন আমরা কি মুমিন নই? তিনি বললেনঃ হাঁ, আমরা মুমিন। তবে আমরা জিকর করবো, তাতে আমাদের ঈমান বৃদ্ধি পাবে। (আল-ফাতহুল রাব্বানী- ২২/২৮৬, হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৫) তাঁর স্ত্রী বর্ণনা করেন, যখন তিনি ঘর থেকে বের হতেন, দুই রাকায়াত নামায আদায় করতেন। আবার ঘরে ফিরে এসে ঠিক একই রকম করতেন। এ ব্যাপারে কক্ষণও অলসতা করতেন না। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭, হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৪৮) একবার এক সফরে এত প্রচণ্ড গরম ছিল যে, মানুষ সূর্যের তেজ থেকে বাঁচার জন্য নিজ নিজ মাথার ওপর হাত দিয়ে রেখেছিল। এমন গরমে কে রোযা রাখে? কিন্তু তার মধ্যেও কেবল হযরত রাসূলে কারীম সা. ও ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ‘সাওম’ পালন করেন। (সহীহ বুখারী- ১/২৬১, মুসলিম- ১/৩৫৭, হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৯, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/২৬৫) জিহাদের প্রতি ছিল তাঁর দুর্নিবার আকর্ষণ। বদর থেকে নিয়ে মূতা পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়েছে তার একটিতেও তিনি অনুপস্থিত থাকেননি। রিজাল শাস্ত্রবিদরা (চরিত অভিধান) বলেছেনঃ আবদুল্লাহ সবার আগে যুদ্ধে বের হতেন এবং সবার শেষে ঘরে ফিরতেন। (আল-ইসাবা- ২/৩০৭) হযরত রাসূলে কারীমের সা. আদেশ-নিষেধ তিনি অক্ষরে পালন করতেন। একটি ঘটনায় এর সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার হযরত রাসূলে কারীম সা. মসজিদে খুতবা (ভাষণ) দিচ্ছেন। আর ইবন রাওয়াহা যাচ্ছেন মসজিদের দিকে। তিনি যখন মসজিদের বাইরের রাস্তায় এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন রাসূল সা. বলছেন, তোমরা নিজ নিজ স্থানে বসে পড়। এই নির্দেশ ইবন রাওয়াহার কানে যেতেই সেখানে বসে পগেন। রাসূল সা. খুতবা শেষ করার পর কোন এক ব্যক্তি ইবন রাওয়াহার ব্যাপারটি তাঁকে শোনান। শুনে তিনি মন্তব্য করেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের লালসা আল্লাহ তার মধ্যে আরও বৃদ্ধি করে দিন। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬, হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৫৬) হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা যেমন রাসূলকে সা. গভীরভাবে ভালোবাসতেন তেমনি রাসূল সা.-ও তাঁকে ভালোবাসতেন। একবার আবদুল্লাহ অসুখে পড়ে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। রাসূল সা. দেখতে গেলেন। তিনি দু’আ করলেঃ হে আল্লাহ, যদি তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এসে থাকে তাহলে সহজে তার মরণ দাও অন্যথায় তাকে ভালো করে দাও। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬) উসামা ইবন যায়িদ বলেনঃ সা’দ ইবন ’উবাদা অসুস্থ হলে রাসূল সা. তাঁকে দেখার জন্য বের হলেন। আমাকেও বাহনের পিছনে বসিয়ে নিলেন। ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই তার মুযাহিম দুর্গের ছায়ায় নিজ গোত্রের আরও কিছু লোকের সাথে বসে ছিল। রাসূল সা. মনে করলেন, কোন কথা না বলে তাদের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তাই তিনি বাহনের পিছ থেকে নামলেন এবং সালাম দিয়ে কিছুক্ষণ বসলেন। তারপর কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে তাদের সকলকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। এতক্ষণ ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই চুপ করে ছিল। রাসূলুল্লাহর সা. কথা শেষ হলে সে বললঃ দেখুন, আপনার কথা সত্য হলে বাড়ীতে গিয়ে বসে থাকুন। কেউ আপনার কাছে গেলে তাকে যত পারেন শুনাবেন। এমন অবাঞ্ছিতভাবে কোন মজলিসে উপস্থিত হয়ে কাউকে বিরক্ত করবেন না। সেখানে উপস্থিত মুসলমানদের মধ্যে ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাও ছিলেন। তিনি গর্জে উঠলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, তার কথা কক্ষণও মানবেন না। আপনি আসবেন! আপনি আমাদের মজলিসে, ঘরে ঘরে এবং বাড়ীতে বাড়ীতে আসবেন। আমরা সেটাই পসন্দ করি। আপনার আগমণের দ্বারা আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন, আমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫৮৭, হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৯) একদিন আবদুল্লাহ তাঁর স্ত্রীর কোলে মাথা রেখে কাঁদা শুরু করলেন। তাই দেখে স্ত্রীও কাঁদতে লাগলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কাঁদছো কেন? স্ত্রী বললেনঃ তোমাকে কাঁদতে দেখে আমি কাঁদছি। তখন তিনি সূরা মরিয়াম- এর ৭১ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেন, আমি এই আয়াতটি স্মরণ করে কাঁদছি। জানিনে আমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাব কিনা। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৫) বিখ্যাত আনসারী সাহাবী আবু দারদা-র ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আবদুল্লাহর ভূমিকাটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য। জাহিলী যুগে উভয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। ’আব্দুল্লাহর ইসলাম গ্রহণের পরও আবু দারদা মূর্তি উপাসক থেকে যান। তাঁর বাড়ীতে ছিল বিরাট এক মূর্তি। একদিন আবু দারদা বাড়ী থেকে বের হলেন, আর ঠিক সেই সময় ভিন্ন পথ দিয়ে আবদুল্লাহ বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করলেন। তিনি আবু দারদা-র স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আবু দারদা কোথায়? স্ত্রী জবাব দিলেনঃ এই মাত্র বেরিয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ মূর্তির ঘরে প্রবেশ করে সেখানে রক্ষিত একটি হাতুড়ী দিয়ে মূর্তিটি ভেঙ্গে চুরমার করে ফেললেন। শব্দ শুনে আবু দারদা-র স্ত্রী ছুটে গেলেন। আবদুল্লাহ কাজ শেষ করে চলে গেলেন। এ দিকে আবু দারদা-র স্ত্রী ভয়ে মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। আবু দারদা ঘরে ফিরে স্ত্রীর নিকট সব কথা শুনে প্রথমে খুব রেগে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তা করলেন, যদি মূর্তির কোন ক্ষমতা থাকতো তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হতো। এই উপলব্ধির পর তিনি আবদুল্লাহকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট যান এবং ইসলামের ঘোষণা দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৩২, ৩৩৩) একবার কবি হাস্সান ইবন সাবিত, একটি কবিতায় সাফওয়ান ইবন আল-মুয়াত্তাল ও তাঁর গোত্রের নিন্দা করেন। সাফওয়ান ক্ষেপে গিয়ে কবিকে মারপিট করে এবং তাঁকে দু’হাত গলার সাথে বেঁধে বনু আল-হারিসের পল্লীতে নিয়ে যায়। আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা তাকে ছাড়িয়ে দেন এবং বিষয়টি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করেন। তাদের দু’জনকেও রাসূলুল্লাহর সা. দরবারে নিয়ে আসেন। তিনি তাদের ঝগড়া মিটমাট করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩০৫) উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহের কারণে রাসূল সা. তাঁর প্রশংসায় বলেছেনঃ ‘নি’মার রাজুলু আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা’- আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা কতই না ভালো মানুষ। (আল-ইসাবা- ২/৩০৬)
সা’দ ইবনুর রাবী’ (রা)

সা’দ ইবনুর রাবী আল-আনসারী মদীনার খাযরাজ গোত্রের বনু আল-হারিস শাখার সন্তান। হায়সাম উল্লেখ করেছেন, ‘আবু রাবী’ তাঁর কুনিয়াত বা ডাকনাম। পিতা আর-রাবী ও মাতা হুযাইলা বিন্তু ইন্বা। সীরাত বিশেষজ্ঞরা তাঁর জন্মসন সম্পর্কে নীরব। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৪, তাবাকাত- ৩/৫২২, উসুদুল গাবা- ২/২৭৭) সা’দ ইবনুর রাবী’র ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে মতভেদ দেখা যায়। আবু নু’য়াইম তাঁর ‘দালায়িল’ গ্রন্থে ’আকীল ইবন আবী তালিব ও যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন, প্রথম ’আকাবায়, যে বার ছয়জন ইয়াসরিববাসী মক্কায় রাসূলুল্লাহর হাতে সা. ইসলাম গ্রহণ করে বায়’য়াত করেন তাঁদের একজন ছিলেন সা’দ। সেই ছয় ব্যক্তি হলেনঃ ১. আস’য়াদ ইবন যুরারা ২. আবুল হায়সাম ইবন আত-তায়্যিহান ৩. আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ৪. সা’দ ইবনুর রাবী’ ৫. আন-নু’মান ইবন হারিসা ও ৬. ’উবাদা ইবনুস সামিত। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১০৫) পক্ষান্তরে কোন কোন বর্ণনায় বুঝা যায়, তিনি দ্বিতীয় আকাবার বারো সদস্যের অন্যতম সদস্য ছিলেন। তিনি এই দ্বিতীয় ’আকাবায় ইসলাম গ্রহণে করেন। তৃতীয় আকাবায় তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জন লোকের সংগে তিনি যোগ দেন। হযরত রাসুলে কারীম সা. তাঁকে ও ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে তাঁদের গোত্র বনু আল-হারিস ইবনুল খাযরাজের যুগ্ম ‘নাকীব’ বা দায়িত্বশীল নিয়োগ করেন। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ’লাম- ১/১৮১, তাবাকাত- ২/৫২২, উসুদুল গাবা- ২/২২৭) ইবন হিশাম বর্ণনা করেনঃ হযরত রাসূলে কারীম সা. কুবা থেকে যে দিন মদীনায় উপস্থিত হন, মদীনার সকল শ্রেণীর মানুষ তাঁকে স্বাগতঃ জানায়। তিনি বিভিন্ন গোত্রের ভিতর দিয়ে চলছিলেন, আর সেই গোত্রের লোকেরা তাঁর বাহনের পথ রোধ করে তাদের ওখানে অবতরণের আবেদন জানাচ্ছিল। যখন তিনি বনু আল-হারিস ইবনুল খাযরাজের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন সা’দ ইবনুর রাবী খারিজা ইবন যায়িদ ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বনী হারিসার আরও কিছু লোক সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাওয়ারীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে ’আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমাদের সংখ্যা, সাজ-সর্যঞ্জাম ও প্রতিরক্ষার দিকে আসুন। (অর্থাৎ আপনাকে সম্মানের সাথে আশ্রয় দানের মত ক্ষমতা আমাদের আছে) রাসুল সা বললেনঃ তোমরা আমার বাহনের পথ ছেড়ে দাও। সে আল্লাহর নির্দেশ প্রাপ্ত। তাঁরা সবাই পথ থেকে সরে দাঁড়ালেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৫) যুহরী ও মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. সাদ ইবনুর রাবী ও আবদুর রহামান ইবন ’আউফের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। হযরত সা’দ তাঁর এই মুহাজির ভাইয়ের প্রতি যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা দেখান দুনিয়ার ইতিহাসে তার কোন তুলনা পাওয়া যাবে না। অন্যান্য আনসারগণ নিজনিজ অর্থ-সম্পদ, জায়গা-জমি সবই অর্ধেক তাঁর দ্বীনী মুহাজির ভাইকে ভাগ করে দেন; কিন্তু হযরত সা’দ অর্থ-সম্পদ ছাড়াও একজন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে তার দ্বীনী ভাইকে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। আর আব্দুর রহমান যদিও সে সময় রিক্ত ও নিঃস্ব, তবে তাঁর অন্তরটি ছিল অত্যন্ত প্রশস্ত। তিনি সা’দের সব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এ সম্পর্কে আনাস ইবন ’আউফ থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ সা’দ তাঁর দ্বীনি ভাইকে সংগে করে নিজ গৃহে নিয়ে যান এবং এক সাথে আহার করেন। তারপর বলেনঃ আল্লাহর নামে আপনি আমার ভাই। আপনার স্ত্রী নেই; কিন্তু আমার দুই স্ত্রী। একজনকে আমি তালাক দেব, আপনি তাঁকে বিয়ে করবেন। আব্দুর রহমান বলেনঃ আল্লাহর কসম! কক্ষনো না। সা’দ বললেনঃ আমার বাগানে চলুন, আধা-আধি ভাগ করে নিই। আব্দুর রহমান বললেনঃ না। আল্লাহ আপনার ছেলে-মেয়ে ও মাল-দৌলতে বরকত ও সমৃদ্ধি দান করুন। এসবের কোন কিছুই প্রয়োজন আমার নেই। আমাকে শুধু বাজারের পথটি একটু দেখিয়ে দিন। (আল-ইসাবা- ৩/২৬, উসুদুল গাবা- ২/২৭৮, তাবাকাত- ৩/৫২৩) হযরত সা’দ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি বনী মাখযুমের রিফা’য়া ইবন রিফা’য়াকে হত্যা করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৭১১, তাবাকাত- ৩/৫২৩) উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে মক্কার কুরাইশরা ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করলো। তাদের সেই সমর প্রস্তুতির খবর দিয়ে একটি চিঠি মক্কা থেকে রাসূলুল্লাহর সা. চাচা আব্বাস ইবন ‘আবদিল মুত্তালিব গোপনে মদিনায় রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠালেন। চিঠিতে তিনি তাদের প্রস্তুতির বিবরণ দিয়ে এ কথাও লিখেন যে, ‘তারা তোমাদের ওপর আপতিত হলে, তোমরা যা ভালো মনে কর তাই করবে এবং সেই জন্য প্রস্তুতি নাও।’ বনী গিফারের একটি লোক অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে কুবায় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে চিঠিটি পৌঁছে দেয়। রাসূল সা. সর্বপ্রথম তা উবাই ইবন কা’বকে পড়তে দেন এবং গোপন রাখতে বলেন। তারপর সা’দ ইবনুর রাবী’র নিকট আসেন এবং তাঁকেও বিষয়টি অবহিত করেন। তাঁকেও কথাটি কারও নিকট ফাঁস না করার নির্দেশ দেন। রাসূল সা. চলে যাওয়ার পর সা’দের স্ত্রী সা’দকে জিজ্ঞেস করলোঃ রাসূল সা. তোমাকে কি বললেন? সা’দঃ তোমরা মা নিপাত যাক। তোমার তা শোনার কি প্রয়োজন? স্ত্রীঃ আমি তোমাদের সব কথা শুনেছি। এই বলে তিনি সব কথা সা’দকে শোনান। সা’দ ইন্নালিল্লাহ পাঠ করে বললেনঃ দেখছি, তুমি আমাদের কথা আঁড়ি পেতে শুনে থাক। সা’দ তাঁর স্ত্রীকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট হাজির হলেন এবং সব ঘটনা খুলে বলার পর আরজ করেন ইয়া রাসূলুল্লাহরঃ আমার ভয় হচ্ছে, খবরটি হয়ত ছড়িয়ে পড়বে, আর আপনি ধারণা করবেন আমিই তা ছড়িয়েছি। রাসূল সা. বললেনঃ বিষয়টি ছেড়ে দাও। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩১৩-৩১৪) হিজরী তৃতীয় সনে সংঘটিত উহুদ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। তাঁকে একদল প্রতিপক্ষ যোদ্ধা পরাস্ত করে হত্যা করে। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৪, উসুদুল গাবা- ২/২৭৭, আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩০) তাঁর দেহে তীর-বর্ষার মোট বারোটি আঘাত লাগে। তিনি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় যুদ্ধের ময়দানে পড়ে আছেন তখন মালিক ইবন দুখশান তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞেস করেনঃ মুহাম্মাদ সা. নাকি নিহত হয়েছেন, তুমি জান? সা’দ জবাব দেন, তিনি নিহত হলেও আল্লাহ চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। তুমি তোমার দ্বীনের পক্ষে জিহাদ কর। মুহাম্মাদ সা. তো তাঁর রবের বাণী ও দ্বীনের বিধি-বিধান পৌঁছানের দায়িত্ব পূর্ণরূপে পালন করে গেছেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩২৭, তাবাকাত- ৩/৫২৩) উহুদের যুদ্ধ মেষে হযরত রাসূলে কারীম সা. বললেনঃ কেউ সা’দ ইবনুর রাবীর খোঁজ নিয়ে আসতো। এক ব্যক্তি বললেনঃ আমি যাচ্ছি। যারকানী বলেন, লোকটি পড়ে থাকা লাশগুলির চারপাশে চক্কর দিয়ে সা’দের নাম ধরে জোরে ডাক দিলেন। কোন সাড়া পাওয়া গেলোনা। কিন্তু যখন তিনি এই কথা বলে চিৎকার করলেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. তোমার খোঁজে আমাকে পাঠিয়েছেন। তখন ক্ষীণকণ্ঠের একটা আওয়াজ ভেসে এল; আমি মৃতদের মধ্যে। তখন তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত। শ্বাস-প্র্শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, জিহ্বাও আয়ত্তে নেই। অন্য একটি বর্ণনা মতে, লোকটি যখন তাঁর খোঁজে ঘুরাঘুরি করছে, তখন সা’দই তাঁকে ডাক দেন। যাই হোক, সেই অবস্থায় সা’দ তাঁকে বললেন, রাসূলুল্লাহকে সা. আমার সালাম পৌঁছিয়ে বলবেন, আমাকে বারোটি আঘাত করা হয়েছে। আমিও আমার হত্যাকারীকে হত্যা করেছি। আর আনসারদের বলবেন, যদি দুর্ভাগ্যবশতঃ রাসূল সা. নিহত হন, আর তোমাদের একজনও জীবিত ফিরে যাও, আল্লাহকে মুখ দেখানোর যেগ্য তোমরা থাকবে না। কারণ, ‘লাইলাতুল আকাবায়’ (আকাবার রাত্রি) তোমরা রাসূলুল্লাহর সা. জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নিয়েছিলে। কোন কোন বর্ণনায় এই ব্যক্তির নাম উবাই ইবন কা’ব বলা হয়েছে। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় সা’দের পবিত্র রূহ তাঁর নশ্বর দেহ তেকে বেরিয়ে যায়। (তাবাকাত- ৩/৫২৩-২৪, আল-ইসতীয়াব- ২/৩৪, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/২১০, আল-ইসাবা- ২/২৭) হযরত উবাই ইবন কা’ব ফিরে এসে রাসূলুল্লাহকে সা. সা’দের অন্তিম কথাগুলো পৌঁছালে তিনি বলেন, আল্লাহ তার ওপর করুণা বর্ষণ করুন। জীবন-মরণ উভয় অবস্থায় সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে উপদেশ দিয়েছেন। (উসুদুল গাবা- ২৭৭) উহুদের অন্য এক শহীদ ইবন যায়িদ ও সা’দকে উহুদের প্রান্তরে একই কবরে দাফন করা হয়। খারিজা ছিলেন সম্পর্কে সা’দের চাচা। সা’দের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই জাহিলী প্রথা অনুসারে তাঁর সকল সম্পত্তি দখল করে নেয়। সা’দ গর্ভবতী স্ত্রী ও দুই কন্যা সন্তান রেখে যান। তখনও মীরাসের (উত্তরাধিকার) আয়াত নাযিল হয়নি। জাবির ইবন আবদিল্লাহ বর্ণনা করেন। সা;দের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী একদিন তাঁর দুই কন্যাকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এরা সা’দের কন্যা। ওদের পিতা উহুদে শাহাদাত বরণ করেছে। আর ওদের চাচা সকল সহায় সম্পত্তি আত্মসাৎ করে বসেছে, ওদেরকে কিছুই দেয়নি। অর্থ-সম্পদ ছাড়া ওদের বিয়ে শাদী হবে কেমন করে? রাসূল সা বললেনঃ আল্লাহ তা’য়ালা ওদের ব্যাপারে ফায়সালা দেবেন। এর পরই সূরা নিসার ১১ নং আয়াতের এই অংশটুকু নাযিল হয়ঃ ‘যদি কন্যা কেবল দুই-এর অধিক হয় তাহলে তাদের জন্য পরিত্যাক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ।’ উপরোক্ত আয়াত নাযিলৈর পর হযরত রাসুলে কারীম সা. মেয়ে দু’টির চাচাকে ডেকে নির্দেশ দেনঃ সা’দের পরিত্যাক্ত সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ তার দুই মেয়েকে, এক-অষ্টমাংশ তাদের মাকে দেওয়ার পর বাকীটা তুমি গ্রহণ কর। (আল-ইসাবা- ২/২৭, তাবাকাত- ৩/৫২৪, উসুদুল গাবা- ২/২৭৮, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/২১০, তাছাড়া ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিজি ও ইবন মাজা এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন সা’দের কন্যা ও স্ত্রীদের জন্য এই ফায়সালা দান করেন তখনও মাতৃগর্ভের সন্তানের কোন মীরাস বা উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়নি। এই ঘটনার অনেক পরে গর্ভের সন্তানের মীরাস্ দেওয়ার বিধান হয়। সা’দের স্ত্রীগর্ভের সেই সন্তানটি ভূমিষ্ট হয়। তাঁর নাম রাখা হয় উম্মু সা’দ বিনতু সা’দ এবং পরবর্তীকালে তিনি যায়িদ ইবন সাবিতের স্ত্রী হন। খলীফা হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে যায়িদ তাঁর স্ত্রীকে বললেন, তুমি ইচ্ছা করলে তোমার পিতার মীরাসের ব্যাপারে আমীরুল মুমিনীনের সাথে কথা বলতে পার। বর্তমানে তনি গর্ভের সন্তানদের মীরাসের অংশ দান করছেন। উম্মু সা’দ বললেনঃ আমি আমার বোনদের কাছে কিছুই দাবী করবো না। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৮) সেই জাহিলী আরবে যখন লেখার খুব কম প্রচলন ছিল, হযরত সা’দ লেখা জানতেন। (তাবাকাত- ৩/৫২২, তাহজীবুল আসবা- ১/২১০) যেহেতু তিনি গোত্রীয় নেতার সন্তান ছিলেন, তাই শিক্ষার বিশেষ সুযোগ লাভ করেছিলেন এবং লেখাও শিখেছিলেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. মুখ থেকে শোনা কিছু হাদীসও মুখস্থ করেছিলেন। (উসুদুল গাবা- ২/২৭৮) তাঁর ’ঈমানী জোশ ও রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি প্রবল ভালোবাসার প্রকাশ ঘটেছিল আকাবার বাই’য়াত, উহুদের যুদ্ধ এবং মৃত্যুর পূর্বে করে যাওয়া অসীয়াতের মধ্যে। এই সব কারণে সাহাবায়ে কিরামের নিকট হযরত সা’দের একটা বিশেষ মর্যাদা ও সম্মান ছিল। তাঁর এক কন্যা একবার হযরত আবু বকরের রা. নিকট আসলে তিনি তাঁর বসার জন্য নিজের কাপড় বিছিয়ে দেন। তা দেখে হযরত উমার রা. জিজ্ঞেস করেনঃ মেয়েটি কার? খলীফা বললেনঃ এ সেই ব্যক্তির মেয়ে- যিনি তোমার ও আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। আবার প্রশ্ন করলেনঃ এমন মর্যাদা কি জন্য? বললেনঃ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় জান্নাতে পৌঁছে গেছেন আর তুমি-আমি এখনও এখানে পড়ে আছি। (আল-ইসাবা- ২/২৭) আবু বকর আয-যুবায়রী বর্ণনা করেনঃ এক ব্যক্তি খলীফা আবু বকরের কাছে গিয়ে দেখলেন, তিনি সা’দ ইবনুর রাবীর ছোট্ট একটি মেয়েকে বুকের মধ্যে নিয়ে তার লালা মুছে দিচ্ছেন ও চুমু খাচ্ছেন। লোকটি জিজ্ঞেস করল, মেয়েটি কে? তিনি জবাব দিলেন, এ এমন এক ব্যক্তির মেয়ে যিনি তোমার ও আমার চেয়ে উত্তম। এ সা’দ ইবনুর রাবীর মেয়ে। তিনি ছিলেন ’আকাবার নাকীব, বদরের যোদ্ধা ও উহুদের শহীদ। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৯৫)
সা’দ ইবন ’উবাদা (রা)

আসল নাম সা’দ, ডাকনাম আবু কায়স ও আবু সাবিত। প্রথমটি অধিকতর প্রসিদ্ধ। (উসুদুল গাবা- ২/২৮৩) লকব বা উপাধি সায়্যিদুল খাযরাজ। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের ‘সায়িদাহ’ শাখার সন্তান। পিতার নাম ’উবাদা ইবন দুলাইম এবং মাতার নাম ’উমরা বিন্তু মাস’উদ। ’উমরা সাহাবিয়্যা (মহিলা সাহাবী) ছিলেন এবং হিজরী ৫ম সনে ইন্তিকাল করেন। সা’দ তখন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ‘দুমাতুল জান্দাল’ যুদ্ধে যোগদানের জন্য মদীনার বাইরে। মদীনায় ফিরে রাসূল সা. তাঁর মার কবরে যান এবং তাঁর জন্য দু’আ করেন। (তাবাকাত- ৩/৬১৪; আল-ইসাবা- ২/৩০) হযরত সা’দের সম্মানিত দাদা ‘দুলাইম’ ছিলেন খাযরাজ গোত্রের সবচেয়ে বড় নেতা। তাছাড়া মদীনার জনকল্যাণমূলক কাজেও তাঁর খ্যাতি ছিল। সায়িদাহ খান্দানের সম্মান ও গৌরব মূলতঃ তিনিই প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন পৌত্তলিক। দেবী ‘মানাত’- এর পূজা করতেন। এ দেবীর মূর্তি ছিল মক্কার নিকটে ‘মুসালাল্’ নামক স্থানে। তিনি প্রতি বছর সেখানে দশটি উট বলি দিতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ’উবাদা, তারপর সা’দ ইসলাম গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এ কাজ অব্যাহত রাখেন। ইসলামী যুগে সা’দের ছেলে কায়স পূর্ব পুরুষের ধারা বজায় রেখে উটগুলি কা’বার চত্বরে কুরবানী করতেন। একবার হযরত আবু ’উবাইদা ও হযরত ’উমার রা. কায়সকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করে; কিন্তু কায়স তাঁদের কথার প্রতি মোটেও কর্ণপাত করেননি। তাঁরা কায়সের বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট অভিযোগ করেন। তখন রাসূল সা. বলেনঃ কায়স তো দানশীল পরিবারের সন্তান। (আল-ইসতীয়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৭) সা’দের পিতা ’উবাদা ছিলেন পিতার যোগ্য উত্তরসূরী। পিতার মত একইভাবে জীবন কাটিয়ে ছেলে সা’দের জন্য ক্ষমতা ও নেতৃত্বের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে যান। ছেলেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলেন। ‘সা’দ’ সেই জাহিলী আরবেই ‘কামিল’ উপাধি লাভ করেন। কারণ, তৎকালীন আরবে হাতে গোনা যে ক’জন লোক আরবী লিখতে জানতো, তিনি ছিলেন তাদের একজন। তাঁর আরবী লেখা ছিল চমৎকার। তাছাড়া তিনি ছিলেন সে সময়ের আরবের একজন শ্রেষ্ঠ সাঁতারু ও দক্ষ তীরন্দাজ। আর এ বিদ্যাগুলি যারা বিশেষভাবে রফ্ত করতো আরববাসী শুধু তাদেরকেই ‘কামিল’ উপাধি দিত। (দ্রঃ তাহজীব আত-তাহজীব- ৩/৪৭৫; আল ইসাবা- ২/৩০; তাবাকাত- ৩/৬১৩) শেষ ’আকাবার বাই’য়াতের সময় সা’দ ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে বনী সায়িদার ‘নাকীব’ (দায়িত্বশীল) নিয়োগ করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫০; উসুদুল গাবা- ২/২৮৩) তাঁকে উঁচু স্তরের সাহাবী গণ্য করা হতো। বুখারী শরীফে তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘ওয়া কানা জা কিদামিন ফিল ইসলাম’- ইসলামে তিনি ছিলেন প্রথম স্তরের মানুষ। ’আকাবার শেষ বাই’য়াত যেভাবে সম্পন্ন হয়, আনসারদের যে সংখ্যক মানুষ তাতে অংশগ্রহণ করেন এবং যে সকল গুরুত্বপূর্ণ শর্তের ওপর তা অনুষ্ঠিত হয় তাতে তা গোপন থাকা সম্ভব ছিল না। যদিও তা রাতের অন্ধকারে গোপনে হয়েছিল। কারণ, রাসূলকে সা. নিয়ে কুরাইশদের চিন্তার অন্ত ছিল না। তারা সর্বক্ষণ তাঁর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতো। সুতরাং রাতের যে লগ্নে রাসূল সা. ’আকাবার মদীনা থেকে আগত লোকদের নিকট থেকে বাই’য়াত গ্রহণ করেন, ঠিক সেই সময়ে; কেউ একজন মক্কার ‘জাবালে আবু কুরাইসের ওপর দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলেছিল; ‘দেখ সা’দ যদি মুসলমান হয়ে যায় তাহলে মুহাম্মাদ একেবারেই নির্ভীক হয়ে যাবে।’ (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৭) এ আওয়ায কুরাইশদের কানে পৌঁছালেও প্রথমে তারা বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। তারা সা’দ বলতে ‘কাদায়া’ ও তামীম গোত্রের সা’দ নামের লোকগুলিকে বুঝেছিল। পরের রাতে ঐ পাহাড় থেকে আবার একটি কবিতার কিছু চরণ আবৃত্তি করতে শোনা গেল। তাতে পরিষ্কার ভাবে সা’দের নাম ও পরিচয় ছিল। কুরাইশরা দারুণ বিস্ময়ের মধ্যে পড়ে গেল। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তারা ‘দারুন নাদওয়া’ বা পরামর্শ গৃহে সমবেত হলো। তারা মদীনার আউস গোত্রের সর্দার আবদুল্লাহ ইবন ’উবাই ইবন সুলুলের সাথে কথা বললো, কিন্তু সে বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করলো। কুরাইশরা চারিদিকে গোয়েন্দা নিয়োগ করে যার যার মত বাড়ীতে ফিরে গেল। আর মদীনাবাসী মুসলমানরা ‘ইয়াজজ’- এর পথে স্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করলো। ইবন ইসহাক ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ ‘নাকীবগণ ’আকাবার রাতে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত শেষ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। কেউ কেউ মক্কা ছেড়ে স্বদেশের পথ ধরলো। এদিকে বাই’য়াতের কথা লোকমুখে প্রচার হয়ে গেল। খোঁজ-খবর নিয়ে কুরাইশরা বুঝতে পারলো, ব্যাপারটি সত্য। তারা বাই’য়াতকারীদের ধরার জন্য বেরিয়ে পড়লো এবং সু’দ ইবন ’উবাদা ও আল মুনজির ইবন ’উমারকে পেয়ে গেল। তবে সা’দকে ধরতে পারলেও আল মুনজির ইবন ’উমার পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। সা’দের মাথার চুল ছিল লম্বা। তারা সেই চুল ধরে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে চললো। সা’দ বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তাদের হাতে বন্দী। কুরাইশদের কয়েকজন লোক আমার কাছে আসলো। তাদের মধ্যে একজন উজ্জ্বল সুদর্শন যুবককে দেখে আমি ভাবলাম, যদি এ সম্প্রদায়ের কারও মধ্যে ভালো কিছু থাকে তাহলে হয়তো এর মধ্যেই আছে। সে ছিল সুহাইল ইবন ’আমর। কিন্তু সে আমার আশার মুখে ছাই দিয়ে কাছে এগিয়ে এসে আমার গায়ে জোরে এক ঘুষি বসিয়ে দিল। আমি তখন মনে মনে বললাম; আল্লাহর কসম! এরপর এ সম্প্রদায়ের অন্য কারও কাছে ভালো কিছু আশা করা বৃথা। একজন প্রশ্ন করলো; তুমি কি মুহাম্মাদের দীন কবুল করেছ? আমি বললাম; হাঁ, কবুল করেছি। তখন তাঁরা আমাকে দড়ি দিয়ে কষে বাঁধলো। এসময় একজন আমার উরুতে টোকা মেরে বললোঃ কুরাইশদের কারও সাথে তোমার কি কোন চুক্তি আছে? বললামঃ হাঁ আছে। মুতয়িম ইবন ’আদী ও আল-হারিস ইবন উমায়্যা যখন আমাদের আবাসভূমিতে যায়, আমি তাদের নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। সে বললোঃ তোমার বাপ নিপাত যাক। শিগগিরই তাদের নাম ধরে জোরে জোরে সাহায্য চাও। আমি তাই করলাম। লোকটি ছুটে তাদের দু’জনের কাছে গিয়ে বললোঃ কুরাইশদের কয়েক ব্যক্তি যে লোকটিকে বন্দী করে মারধোর ও অপমান করছে সে তোমাদের দু’জনের নাম ধরে ডাকছে। সে বলছে, তোমাদের সাথে নাকি তার মৈত্রী চুক্তি আছে। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ লোকটি কে? সে বললোঃ সা’দ ইবন ’উবাদা। তারা বললোঃ সে সত্য বলেছে। তারপর মুতয়িম ইবন ’আদী ও আল হারিস ইবন উমায়্যা ছুটে এসে তাদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করে মদীনার পথ ধরিয়ে দেয়।’ এই মুতয়িম ইবন আদী ছিলেন মক্কার এক অতি ভদ্র ও সম্মানিত ব্যক্তি। ইসলামের সূচনা পর্বে মক্কায় তিনি রাসূলকে সা. নানাভাবে সাহায্য করেছেন। আর যে ব্যক্তি তাকে খবর দিয়েছিল, সে ছিল আবুল বাখতারী ইবন হিশাম। যাইহোক, সা’দ এভাবে বন্দী হওয়ায় মদীনা অভিমুখী আনসারদের কাফেলায় দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তারা পরামর্শ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়, জীবনের ঝুঁকি থাকলেও মক্কায় ফিরে সা’দের সন্ধান নিতে হবে। এর মধ্যে সা’দকে ফিরে আসতে দেখা গেল। তারা তাঁকে সংগে করে সোজা মদীনার পথ ধরলো। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৫, ৮৬; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪, ২৫৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১৫০, ১৫১; তাবাকাত- ১/১৫০) সা’দের বন্দীর বিষয়টি নিয়ে কুরাইশ পক্ষের কবি দারবার ইবনুল খাত্তাব ইবন মিরদাস একটি কবিতা রচনা করে। কবি হাস্সান ইবন সাবিত তার জবাবে বড় একটি কবিতা লেখেন। তাতে সা’দের প্রশংসা ও কুরাইশদের নিন্দা করা হয়েছে। আনসাবুল আশরাফ ও সীরাতু ইবন হিশামসহ বিভিন্ন গ্রন্থে তার কিছু অংশ সংকলিত হয়েছে। (দ্রঃ আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১৫০, ১৫১) উপরোক্ত ঘটনার কয়েক মাস পর রাসূল সা. মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। এ উপলক্ষে মদীনার প্রতিটি অলি-গলিতে আনন্দ উৎসবের বন্যা বয়ে যায়। তিনি আবু আইউবের বাড়ীতে পৌঁছতেই সেখানে হাদিয়া তোহফা আসা শুরু হয়ে যায়। হযরত সা’দ তাঁর বাড়ী থেকে বড় এক পাত্র সারীদ ও ’উরাক পাঠিয়ে দেন। (তাবাকাত- ১/১৬১) হিজরাতের কয়েক মাস পর থেকে ইসলামী আন্দোলন তীব্র রূপ ধারণ করতে থাকে। হিজরাতের দ্বাদশ মাস সফরে হযরত রাসূলে কারীম সা. কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য ছোট্ট একটি বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে ‘আবওয়া’ নামক স্থানে যান। এটাকে ‘ওয়াদ্দান’ অভিযানও বলা হয়। এ বাহিনীতে কোন আনসার মুজাহিদ ছিল না। এ সময় পনেরোটি রাত রাসূল সা. মদীনার বাইরে ছিলেন। তিনি সা’দ ইবন ’উবাদাকে স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে মদীনায় রেখে যান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৮৭; তাবাকাত- ১/৩) হিজরী দ্বিতীয় সনে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে হযরত সা’দের অংশ গ্রহণের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের দারুণ মতভেদ আছে। ইয়াকুব ইবন সুফইয়ান, মূসা ইবন ’উকবা, খলীফা ইবন খায়্যাত, আল ওয়াকিদী, আল মাদায়িনী, ইবনুল কালবী প্রমুখ সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁকে বদরী যোদ্ধা বলে উল্লেখ করেছেন। আবু আহমাদ তাঁর ‘আল কুনা’ গ্রন্থে বলেছেন, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বদরে অংশগ্রহণ করে। (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৩; আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৬; তারীখ ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪, ৮৫) পক্ষান্তরে ইবন ইসহাক তাঁকে বদরী যোদ্ধাদের মধ্যে উল্লেখ করেননি। ইবন সা’দ ও বালাজুরী বলেনঃ সা’দ বদরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু যাত্রার প্রাক্কালে তাঁকে কুকুরে কামড়ায়। এ কারণে তিনি যেতে পারেননি। রাসূল সা. তাঁর সম্পর্কে বলেনঃ যদিও সা’দ বদরে হাজির হয়নি, তবে সে যাওয়ার জন্য আগ্রহী ছিল। কোন কোন বর্ণনা মতে রাসূল সা. তাঁকে বদরের গনীমতের অংশ দিয়েছিলেন। ইবন আসাকির বলেন, এটা সর্বসম্মত ও প্রমাণিত নয়। (দ্রঃ তাকরীবুত তাহজীব- ১/২৮৮; উসুদুল গাবা- ২/২৮৩, আল ইসাবা- ২/৩০; তারীখ ইবন ’আসাকির ৬৮৪, ৮৫) ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম সা’দের বদরে অংশগ্রহণের বিষয়টি প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। তবে এটাই সঠিক যে, তিনি বদরে শরীক হননি। আল্লামা ইবন হাজার ’আসকিলানীর মতও এটাই। তিনি ইমাম মুসলিমের ভাষা দ্বারা নিজ মতের স্বপক্ষে খুব সূক্ষ্ণভাবে প্রমাণ গ্রহণ করেছেন। (দ্রঃ ফাতহুল বারী- ৫/২২৪) বদর যুদ্ধ ছিল রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের যুদ্ধগুলির মধ্যে প্রথম এবং সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। এর পূর্বে যদিও চারটি গাযওয়া ও চারটি সারিয়্যা সংঘটিত হয়েছিল, কিন্তু তাতে কোন আনসারী সৈনিক অংশগ্রহণ করেনি। এর নানা কারণ থাকতে পারে। একটি এই হতে পারে যে, ’আকাবার বাই’য়াতের সময় আনসারদের পক্ষ থেকে শুধু এ প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে, যারা মদীনা আক্রমণ করবে শুধু তাদেরকেই তারা প্রতিরোধ করবে। মদীনার বাইরে কোন সংঘাত হলে সে বিষয়ে তাদের ভূমিকা কী হবে তার কোন উল্লেখ তাতে ছিল না। আরেকটি কারণ এই হতে পারে যে, রাসূল সা. প্রথমত মদীনার মূল বাসিন্দাদেরকে কুরাইশদের শত্রু হিসেবে দাঁড় করাতে চাননি। অতএব রাসূল সা. যখন বদরে যাত্রার মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন তখন আনসারদের সথে পরামর্শ করা ও তাদের মতামত গ্রহণ প্রয়োজন মনে করেন। মদীনার সকল গোত্রের লোকদের একটি বৈঠকে ডাকা হলো। সেখানে যুদ্ধের বিষয়টি উঠলো। হযরত আবু বকর রা. উঠে তাঁর মতামত পেশ করলেন। হযরত ’উমার রা. কিছু বলার জন্য উঠলেন, কিন্তু রাসূল সা. তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন না। সেই বৈঠকে হযরত সা’দ ইবন ’উবাদাও ছিলেন। তিনি বুঝলেন, রাসূল সা. তাঁদের মতামত চাচ্ছেন। তিনি বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল। যার হাতে আমার জীবন, তাঁর জাতের কসম, আপনি যদি আমাদেরকে সমুদ্র অভিযানের নির্দেশ দেন, আমরা তা দলিত মথিত করে ছাড়বো। আর যদি শুকনো মাটিতে অভিযানের আদেশ দেন তাহলে ইয়ামনের ‘বারকে গিমাদ’ পর্যন্ত উট ছুটিয়ে নিয়ে যাব। (সহীহ মুসলিম- ২/৮৪; আল-বিদায়া- ৩/২৬৩; কানযুল ’উম্মাল- ৫/২৭৩; হায়াতুস সাহাবা- ১/৪২৪) উল্লেখিত বর্ণনার ভিত্তিতে সীরাত লেখকদের অনেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তিনি বদরে যোগদান করেছিলেন। অথচ সহীহ মুসলিমের এ বর্ণনাতেই উল্লেখ আছে সিরিয়া থেকে আবু সুফইয়ানের বণিজ্য কাফিলা আসার খবর যখন রাসূলুল্লাহ সা. পেলেন তখন তিনি পরামর্শ করেন। মূলতঃ এ বাণিজ্য কাফেলা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে রাসূল সা. মদীনা থেকে বের হন; যুদ্ধের উদ্দেশ্যে নয়। (মুসলিম- ২/৮৪) কিন্তু পরে তিনি জানতে পারেন, মক্কা থেকে কুরাইশ বাহিনী বদরের দিকে এগিয়ে আসছে। আর তখনই রাসূল সা. যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ কারণে মদীনাবাসীদের অনেকেই বুঝতে পারেননি যে, রাসূল সা. বদরে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন। তাই তাদের অনেকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে মদীনা থেকে বের হননি। আর তাদেরই একজন সা’দ ইবন ’উবাদা। (আনসাবূল আশরাফ- ১/২৮৮) বদরের পর উহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মক্কার পৌত্তলিক শক্তি এমন তোড়জোড় সহকারে ধেয়ে আসে যে মদীনায় একটি ভীতির সঞ্জার হয়। গোটা মদীনায় সারা রাত পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। মদীনার কয়েকজন শ্রেষ্ঠ সন্তান যথা সা’দ ইবন মু’য়াজ, ’উসাইদ ইবন হুদাইর প্রমুখের সাথে তিনিও অস্ত্র হাতে রাসূলুল্লাহর সা. গৃহের হিফাজত দাঁড়িয়ে যান। তাঁরা সারা রাত মদীনা পাহারা দেন। শাওয়ালের ৬ তারিখ জুম’আর দিন যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা. আনসার গোত্র খাযরাজের পতাকাটি সা’দ ইবন ’উবাদার হাতে তুলে দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৪, ৩১৭) প্রস্তুতি শেষ হলে রাসূল সা. ঘোড়ায় সাওয়ার হয়ে বের হন। আউস ও খাযরাজ গোত্রের দুই নেতা সা’দ ইবন মুদয়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদা নিজ নিজ গোত্রের ঝান্ডা হাতে নিয়ে আগে আগে চললেন। মধ্যে রাসূল সা. এবং ডানে বাঁয়ে অন্যান্য আনসার-মুহাজির মুজাহিদগণ। এমন শান শওকাতে হযরত রাসূলে কারীমকে সা. বের হতে দেখে কাফির ও মুনাফিকরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। শনিবার উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে যুদ্ধ শুরু হলো। সংঘর্ষ এমন তীব্র ছিল যে, এক পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লো। তবে রাসুল সা. ময়দানে অটল থাকলেন। এ সময় মাত্র ১৪ ব্যক্তি নিজেদের জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. সামনে থেকে কাফিরদের হটিয়ে দেন। অনেকের মতে ঐ ১৪ জনের একজন সা’দ ইবন ’উবাদা। (যারকানী- ২/৪০) হিজরী ৫ম সনে সংঘটিত হয় বনী মুসতালিক বা মুরাইসী’র যুদ্ধ। এতে আউস ও খাযরাজ উভয় গোত্রের ঝান্ডা তাঁরই হাতে অর্পণ করা হয়। (তাবাকাত, মাগাযী অধ্যায়- ৪৫) এ যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে উম্মুল মুমিনীন হযরত ’আয়িশাকে রা. কেন্দ্র করে একটি অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটে। মুনাফিকরা সুযোগ পেয়ে যায়। তারা হযরত ’আয়িশার রা. চরিত্র সম্পর্কে কিছু অশোভন উক্তি করে এবং তাতে কিছু সরল মুসলমানও জড়িয়ে পড়ে। এ অপ্রত্যাশিত ঘটনায় রাসূল সা. ভীষণ কষ্ট পান এবং একটা বিব্রতকর অবস্থায় পড়েন। ইসলামের ইতিহাসে ঘটনাটি ‘ইফ্ক’ বা বানোয়াট কাহিনী নামে পরিচিত হয়েছে। এই ‘ইফ্ক’- এর ঘটনার এক পর্যায়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেন, আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুল আমার পরিবারের প্রতি মিথ্যা কলঙ্ক আরোপ করেছে। এতে আমি দারুণ কষ্ট পেয়েছি। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে এর প্রতিবিধান করতে পারে? সাথে সাথে আউস গোত্রের নেতা সা’দ ইবন মু’য়াজ বলে ওঠেন; আমি প্রস্তুত। আপনি যে হুকুম দেবেন তা পালন করবো। সে যদি আউস গোত্রের লোক হয় এখনই তার গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হবে। আর খাযরাজ গোত্রের হলে আপনার নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত আছি। উল্লেখ্য যে প্রাচীন কাল থেকে আউস ও খাযরাজ এই দুই গোত্রের মধ্যে শত্রুতা ও রেষারেষি চলে আসছিল। প্রাক-ইসলামী যুগে তাদের মধ্যে বড় ধরনের অনেক যুদ্ধও হয়েছিল। ইসলাম তাদের সেই বৈরিতা দূর করে দেয়। তা সত্ত্বেও তাদের অন্তরে পূর্ব শত্রুতার কিছুটা রেশ বিদ্যমান ছিল। এ কারণে সা’দ ইবন মু’য়াজের কথায় খাযরাজ গোত্রের নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা অপমান বোধ করেন। কথাটি তিনি সহজভাবে নিতে পারলেন না। উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওহে সা’দ ইবন মু’য়াজ! তুমি ঠিক বলোনি। তোমরা কক্ষনো খাযরাজকে হত্যা করতে পারবে না, তাদেরকে পরাভূত করতেও সক্ষম হবে না। যদি তোমার নিজ গোত্র আবদুল আশহালের ব্যাপারে হতো তাহলে তোমার মুখ থেকে এমন কথা বের হতো না। উসাউদ ইবন হুদাইর ছিলেন সা’দ ইবন মু’য়াজের খালাতো বা মামাতো ভাই। তিনি সা’দ ইবন ’উবাদাকে লক্ষ্য করে বললেন; আপনি এসব কী বলছেন। রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশ পেলে আমরা অবশ্যই তা পালন করবো। তারপর দুই গোত্র উত্তেজিতভাবে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল। রাসূল সা. মিম্বরে ছিলেন। তিনি উত্তেজনা দূর করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। (ফাতহুল বারী- ৮/৩২; সহীহুল বুখারী- ৭/৩৩৫; সীয়ারে আনসার- ২/৩৩) হিজরী ৫ম সনে খন্দক যুদ্ধের সময় মদীনার মুসলমানদের অবস্থা যখন অতি সঙ্কটজনক তখন হযরত রাসূলে কারীম সা. গাত্ফান গোত্রের দুই নেতা ’উয়াইনা ইবন হিস্ন ও আল হারিস ইবন ’আউফের সাথে একটি চুক্তি করার ইচ্ছা করলেন। তিনি তাদের সাথে এই শর্তে চুক্তি করতে চাইলেন যে, মদীনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশের বিনিময়ে তারা কুরাইশদের সাথে যোগ দিয়ে মদীনা আক্রমণ থেকে বিরত থাকবে। রাসুল সা. পরামর্শের জন্য সা’দ ইবন মু’য়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদাকে ডাকলেন। তাঁরা উপস্থিত হলে রাসূল সা. বললেন; আমি ’উয়াইনা ও আল হারিসকে মদীনায় উৎপাদিত ফলের এক তৃতীয়াংশ এই শর্তে দিতে চাই যে, তারা কুরাইশদের পক্ষ ত্যাগ করে ফিরে যাবে; কিন্তু তারা অর্ধেক দাবী করছে। এ ব্যাপারে তোমাদের মত কী? সা’দ ইবন ’উবাদা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ যদি ওহীর নির্দেশ হয় তাহলে তো দ্বিমত পোষণের অবকাশ নেই। আর তা যদি না হয় তাহলে তাদের দাবীর জবাব তো শুধু তরবারি। আল্লাহর কসম! আমরা তাদেরকে ফলের পরিবর্তে তরবারির ধার উপহার দেব। রাসূল সা. বললেনঃ ‘ওহী নয়। ওহী হলে তো তোমাদের সাথে পরামর্শের কোন প্রশ্নই উঠতো না। সা’দ বললেনঃ ‘তাহলে তরবারির মাধ্যমে তাদেরকে জবাব দিতে হবে। জাহিলী যুগেও এমন অপমান আমরা চিন্তা করিনি। আর এখন তো আল্লাহ তা’য়ালা আপনার মাধ্যমে হিদায়াত দান করে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। এখন দেব আমরা আমাদের ফসলের একাংশ তাদেরকে?’ রাসূল সা. তাঁদের দুই জনের সাথে আলোচনা করে খুব খুশী হলেন এবং তাঁদের জন্য দু’আ করলেন। তারপর সা’দ ইবন উবাদা খসড়া চুক্তি পত্রটি হাতে নিয়ে ছিড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। (দ্র্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২১-২২৩; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৪৬, ৩৪৭; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৪, ৪৫) এই খন্দক যুদ্ধেও আনসারদের ঝান্ডা সা’দ ’উবাদার হাতে ছিল। মদীনার ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের অবরোধের সময় সা’দ ইবন উবাদা নিজ খরচে মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে খেজুর বন্টন করেন। তেমনিভাবে বনু কুরাইজার অবরোধের সময় তিনি মুসলিম সৈনিকদের রসদপত্র সরবরাহ করেন। (দারিয়া-ই-মা’খারিফ ইসলামিয়্যা- ১১/৩২) হিজরী ৬ষ্ঠ সনে রাসূল সা. ‘গাবা’ অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি সা’দকে ৩০০ সদস্যের একটি বাহিনীর অফিসার বানিয়ে মদীনার নিরাপত্তহার দায়িত্বে রেখে যান। ওয়াকিদী বর্ণনা করেনঃ গাবা অভিযানের সময় সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর গোত্রের তিন শো লোক নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. না ফেরা পর্যন্ত পাঁচ রাত্রি মদীনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তাছাড়া রাসূল সা. যখন ‘জ্বিকারাদ’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন তখন সাহায্যের জন্য মদীনায় খবর পাঠান। হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা দশটি উট বোঝাই করে খেজুর পাঠান। রাসূলুল্লাহর সা. এই বাহিনীতে সা’দের ছেলে কায়সও ছিলেন একজন অশ্বারোহী সৈনিক। তিনি পিতা প্রেরিত উট ও খেজুর যখন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পেশ করলেন তখন তিনি বললেনঃ হে কায়স! তোমার পিতা তোমাকে ঘোড় সওয়ার করে পাঠিয়েছেন, মুজাহিদদের শক্তিশালী করেছেন এবং শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য মদীনা পাহারা দিয়েছেন। তারপর তিনি দু’আ করেনঃ হে আল্লাহ! সা’দ ও তার পরিবার-পরিজনের ওপর রহম করুন! সা’দ ইবন ’উবাদা কতই না ভালো মানুষ। তখন খাযরাজ গোত্রের লোকেরা বলে ওঠেঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি আমাদের খান্দানের লোক, আমাদের নেতা এবং নেতার ছেলে। (তারীখে ইবন আসাকির- ৬/৮৮; তাবাকাতঃ মাগাযী- ৫৮) হিজরী ৭ম সনে খাইবার যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনীতে তিনটি ঝান্ডা ছিল। তার একটি ছিল সা’দ ইবন ’উবাদার হাতে। (তাবাকাতঃ মাগাযী- ৭৭) তাবুক যুদ্ধের সময় রাসূল সা. সাহাবায়ে কিরামের নিকট বস্তুগত সাহায্যের আবেদন জানালে অন্যদের মত সা’দ ইবন ’উবাদাও তাঁর হাতে বিপুল অর্থ তুলে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪২১; দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ১১/৩২) মক্কা বিজয়ের দিন খোদ রাসূলুল্লাহর সা. ঝান্ডাটি হযরত সা’দের হাতে ছিল। মুসলিম সৈনিকদের একটি দল ‘কাদায়া’র দিক দিয়ে শহরে প্রবেশ করছিল। আবু সুফইয়ান হযরত ’আব্বাসের সাথে দাঁড়িয়ে এ দৃশ্য দেখছিলেন। তিনি এর আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আনসারদের একটি দলের পুরোভাগে ছিলেন সা’দ ইবন ’উবাদা। তাদের দৃপ্ত ভঙ্গিতে চলা দেখে আবু সুফইয়ানের দু’ চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। তিনি ’আব্বাসকে জিজ্ঞেস করেনঃ এ কারা? আব্বাস জবাব দিলেনঃ আনসার। এদের কমান্ডার সা’দ ইবন ’উবাদা। ঝান্ডা তাঁরই হাতে। সা’দ আবু সুফইয়ানের কাছাকাছি এসে তাঁকে লক্ষ্য করে চেঁচিয়ে বলে ওঠেন, ‘দেখবে আজ কেমন তুমুল যুদ্ধ হয়। আজ কা’বা হালাল (রক্তপাত বৈধ) হয়ে যাবে।’ একথা শুনে আবু সুফইয়ানের অন্তরে ভীতির সঞ্চার হয়। তিনি ’আব্বাসকে বলেন, ‘আজ তো তুমুল লড়াই হবে।’ সা’দের বাহিনী অতিক্রমের পরই রাসূলুল্লাহর সা. দলটি উপস্থিত হয়। তাঁকে দেখে আবু সুফইয়ান চেঁচিয়ে বলে উঠেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহর ওয়াস্তে আপনার সম্প্রদায়ের প্রতি সদয় হোন। আল্লাহ আপনাকে দয়ালু ও সৎকর্মশীল করে সৃষ্টি করেছেন। সা’দ আমাকে ভয় দেখিয়ে গেছে। আজ নাকি ঘোরতর যুদ্ধ হবে, কুরাইশদের বিনাশ ঘটবে। আবু সুফইয়ানের কথা সমর্থন করে আরও কয়েকজন একই কথা বললেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে হযরত ’উমার সা’দের কথা শুনে তা রাসূলকে সা. অবহিত করেন। হযরত ’উসমান ও হযরত ’আবদুর রহমান ইবন ’আউফ বললেনঃ ‘আমাদের ভয় হচ্ছে, সা’দের মধ্যে প্রতিশোধ স্পৃহা জেগে না ওঠে।’ দার্রার ইবন খাত্তাব আল-ফিহ্রী একটি কবিতা আবৃত্তিও করলেন। এক ব্যক্তি তাঁকে বললেন, রাসূলুল্লাহর সা. সামনে গিয়ে কবিতার মাধ্যমে ফরিয়াদ কর। দার্রারের সেই সব কবিতার অংশবিশেষ ‘আল-ইসতী’য়াব’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। তাঁর একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট কুরাইশরা এমন সময় আশ্রয় নিয়েছে যখন তাদের আর কোন আশ্রয় স্থল নেই, আর দুনিয়া প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও যখন তাদের জন্য শংকীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং আসমানের আল্লাহ তাদের শত্রু হয়ে গেছে। সা’দ মক্কাবাসীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছে।’ কবিতা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ ‘সা’দ ঠিক বলেনি। আজ কা’বার সম্মান আরও বৃদ্ধি পাবে। তার গায়ে গিলাফ চড়ানো হবে।’ তিনি আলীকে রা. বললেন, ‘তুমি ছুটে যাও। সা’দের হাত থেকে ঝান্ডাটি নিয়ে তার ছেলে কায়সের হাতে দাও। আলী ছুটে গিয়ে ঝান্ডাটি চাইলেন। সা’দ তা দিতে অস্বীকার করে বললেন, সত্যিই যে রাসূল সা. তোমাকে পাঠিয়েছেন তার প্রমাণ কি? রাসূল সা. তাঁর পাগড়ীটি পাঠালেন। তখন সা’দ ঝান্ডাটি নিজের ছেলের হাতে তুলে দিলেন। কিন্তু যে আশঙ্কা সা’দকে নিয়ে ছিল, একই আশঙ্কা তাঁর ছেলেকে নিয়েও দেখা দিল। আবেদন জানানো হলোঃ সা’দের ছেলে কায়সের হাত থেকে ঝান্ডাটি অন্য কারও হাতে দেওয়া হোক। তখন রাসূল সা. ঝান্ডাটি নিয়ে যুবাইর ইবনুল ’আওয়ামের হাতে তুলে দেন। সহীহ বুখারীতে যে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহর সা. ঝান্ডা হযরত যুবাইর ইবনুল ’আওয়ামের হাতে ছিল, তার তাৎপর্য এটাই। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪০৬, ৪০৭; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪; হায়াতুস সাহাবা- ১/১৬৯; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৩৯; বুখারী- ২/৬১৩; ফাতহুল বারী- ৮/৭) মক্কা বিজয়ের পর হুনাইন অভিযান পরিচালিত হয়। এতে খাযরাজ গোত্রের ঝান্ডা সা’দের হাতে ছিল। (তাবাকাতঃ মাগাযী- ১০৮) উল্লেখিত যুদ্ধগুলি ছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় উপস্থিতির পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত ছোট-বড় যত যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলিতে সা’দ অংশ গ্রহণ করেছিলেন, প্রতিটি অভিযানেই তিনি ছিলেন আনসারদের পতাকাবাহী। হিজরী ১১ সনে হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাত হয়। প্রাচীন কাল থেকে মদীনার মালিকানা ছিল আনসারদের। ইসলামের সূচনা পর্ব থেকেই তারা রাসূলকে সা. সবচেয়ে বেশী সাহায্য করেছিল। যে সময় ইসলামের কোন আবাসভূমি ছিল না, রাসূল সা. ব্যাকুল হয়ে একটি আশ্রয় খুঁজছিলেন, কুরাইশদের ভয়ে যখন আরবের কোন একটি গোত্র তাঁকে আশ্রয় দিতে দুঃসাহস করেনি তখন আনসারদের ৭২/৭৫ জনের একটি দল মক্কায় এসে আরব-আজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শর্তে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’যাত (শপথ) করেন এবং সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে রাসূলকে সা. মদীনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবনকালে যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, তাতে জীবন ও সম্পদ কুরবানীর দিক দিয়ে আনসাররা ছিল সকলের অগ্রগামী। হযরত কাতাদা বলতেন, আরব গোত্রসমূহের মধ্যে কোন একটি গোত্র আনসারদের সমসংখ্যক শহীদ উপস্থাপন করতে পারবে না। আমি আনাসের নিকট শুনেছি, উহুদে সত্তর জন, বীরে মা’উনায় সত্তর জন এবং ইয়ামামায় সত্তর জন আনসার শাহাদাত বরণ করেন। (বুখারী- ২/৫৮৪; সীয়ারে আনসার- ২/২৭) তাছাড়া কুরআনের বহু আয়াত এবং রাসূলুল্লাহর সা. বহু হাদীসে আনসারদের অনেক ফজীলাত ও মর্যাদা ঘোষিত হয়েছে। এসব কারণে তাদের অন্তরে খিলাফতের নেতৃত্বলাভ করার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হওয়া ছিল অতি স্বাভাবিক। মদীনার আনসারগণ সেই প্রাচীনকাল থেকে পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি গোত্রে বিভক্ত ছিল। গোত্র দু’টি আউস ও খাযরাজ। লোকসংখ্যা ও নেতৃত্বের দিক দিয়ে খাযরাজ গোত্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে একটু বেশী বরেণ্য। এর নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সা. মনোনীত দ্বাদশ নাকীবের অন্যতম। অপর দিকে সা’দ ইবন মু’য়াজ ছিলেন আউস গোত্রের নেতা। তবে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবনকালে উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায় ইনতিকাল করেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের সময় সা’দ ইবন ’উবাদা মদীনার আনসার সম্প্রদায়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। সা’দ ইবন ’উবাদার বাড়ীটি ছিল মদীনার বাজার সংলগ্ন। তাঁর ঘরের সাথেই ছিল একটি ছাউনী। এর মালিকানা ছিল খাযরাজ গোত্রের বনী সায়িদা শাখার লোকদের। এ জন্য তা ‘সাকীফা বনী সায়িদা’ নামে প্রসিদ্ধ। এটাকে আনসাররা মক্কার ‘দারুন নাদওয়ার’ মত পরামর্শ গৃহ হিসাবে ব্যবহার করতো। হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের খবর ছড়িয়ে পড়লে আউস ও খাযরাজ গোত্রের বিশিষ্ট আনসারগণ উক্ত সাকীফায় সমবেত হলেন। সা’দ উবন ’উবাদা তখন ভীষণ অসুস্থ। রোকেরা তাঁকেও ধরাধরি করে মঞ্চে এনে বসিয়ে দিল। তিনি বালিশে হেলান ও কাপড় মুড়ি দিয়ে বসলেন। তাদের এই সমাবেশের উদ্দেশ্য, আনসারদের মধ্য থেকেই রাসূলুল্লাহর সা. একজন খলীফা নির্বাচন। সা’দ ইবন ’উবাদা সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দিতে চাইলেন। তিনি নিকটতম লোকদের বললেন, আমার আওয়াজ হয়তো সবার কানে পৌঁছবে না। আমি যা বলবো তোমরা তা জোর গলায় সবার কানে পৌঁছে দেবে। তারপর তিনি আনসারদের মর্যাদা, কার্যাবলী, রাসূলুল্লাহর সা. সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদি দিক তুলে ধরে একটি ভাষণ দান করেন। ভাষণটির সারকথা ছিল এরূপঃ ‘আনসারদের যে সম্মান এবং দীনের ক্ষেত্রে যে অগ্রগামিতা তা আরবের আর কোন গোত্রের নেই। রাসূল সা. দশ বছরের বেশী সময় ধরে নিজ গোত্রে ছিলেন, কিন্তু কেউ তাঁর কথা শোনেনি। যাঁরা শুনেছিলেন তাঁদের সংখ্যাও অতি নগণ্য। তাঁদের না ছিল রাসূলকে সা. নিরাপত্তা দানের শক্তি, আর না ছিল তাঁদের দীনের আওয়াজ বুলন্দ করার ক্ষমতা। তাঁরা নিজেদের নিরাপত্তা বিধানেই ছিল অক্ষম। আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের সম্মানিত করতে চাইলেন। তাই তিনি তোমাদেরকে এক সাথে দু’টি উপাদান সরবরাহ করলেন। তোমরা ঈমান আনলে, রাসূল সা. ও তাঁর সাহাবাদের আশ্রয় দিলে এবং নিজেদের থেকেও আল্লাহর রাসূলকে সা. প্রিয় মনে করলেও তাঁর বিরুদ্ধেবাদীদের সাথে জিহাদ করলে। শেষ পর্যন্ত গোটা আরব ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নেয় এবং নিকট ও দূরের সকলেই মস্তক অবনত করে দেয়। সুতরাং এই বিজিত অঞ্চলের সবটুকু তোমাদের তলোয়ারের নিকট দায়বদ্ধ। রাসূলুল্লাহ সা. আজীবন তোমাদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন এবং ওফাতের সময় সন্তুষ্ট চিত্তে বিদায় নিয়েছেন। এ সকল কারণে এ খিলাফতের একমাত্র হকদার তোমরা এবং এ ব্যাপারে আর কেউ তোমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেনা।’ তাঁর ভাষণ শেষ হলে উপস্থিত আনসারমন্ডলী সমবেত কণ্ঠে বলে উঠলো, আপনার কথা খুবই যুক্তিসম্মত। আমাদের মতে এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অধিকতর যোগ্য আর কেউ নেই। আমরা আপনাকেই খলীফা বানাতে চাই। তারপর নিজেদের মধ্যে আলোচনা চললো। একজন বললো, যদি মুহাজিররা মানতে অস্বীকার করে তাহলে তাদের কি জবাব দেওয়া যাবে? অন্য একজন তাকে বললো, আমরা তখন তাদেরকে বলবো, তাহলে আমীর দু’জন হবে- একজন আমাদের আর একজন তোমাদের। এছাড়া আর কিছুতেই আমরা রাজী হবো না। তার একথা শুনে সা’দ মন্তব্য করেনঃ এ হলো প্রথম দুর্বলতা। এদিকে আনসারদের এ সমাবেশের কথা হযরত ’উমারের রা. কানে পৌঁছে গেল। তিনি হযরত আবু বকরকে রা. সংগে নিয়ে সাকীফা বনী সায়িদার সমাবেশে উপস্থিত হলেন। হযরত ’উমারের রা. কঠোর প্রকৃতি আনসারদের উত্তেজিত করে তুললো। আনসারী বক্তারাও বারবাপর উত্তেজনামূলক বক্তৃতা করছিল। হযরত ’উমার রা. এবং তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি, এমন কি তরবারির ভয়-ভীতি দেখানো পর্যন্ত পৌঁছে। অবস্থা বেগতিক দেখে ধীর স্থির প্রকৃতির মানুষ হযরত আবু বকর রা. ’উমারকে রা. নিবৃত করেন এবং নিজেই এক আবেগময় ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সেই বিখ্যাত বাণী- ‘আল আয়িমম্মাতু মিন কুরাইশ’- ইমাম হবে কুরাইশদের ভিতর থেকে- উল্লেখ করেন। ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে সমাবেশের রূপ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তারপর হযরত ’উমার রা. দাঁড়িয়ে আবু বকরের রা. ফজীলাত ও মর্যাদা বর্ণনা করেন। সেই বর্ণনা শুনে আনসাররা চেঁচেয়ে বলতে থাকে- ‘না’উযুবিল্লাহ আন নাতাকাদ্দামা আবা বকর’- আবু বকরের আগে যাওয়ার ব্যাপারে আমরা আল্লাহর পানাহ চাই। ’উমারের ভাষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে মুহাজিরদের মধ্য থেকে যথাক্রমে ’উমার, আবু ’উবাইদা এবং আনসারদের মধ্য থেকে খাযরাজ গোত্রের বাশীর ইবন সা’দ সর্বপ্রথম প্রথম আবু বকরের হাত স্পর্শ করে বা’ইয়াত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করেন। তারপর সমবেত জনতা বা’ইয়াতের উদ্দেশ্যে একযোগে দাঁড়িয়ে গেলে লোকেরা এই বলে চেঁচাতে শুরু করে যে, সাবধান! সা’দ যেন পায়ে পিষে না যায়। একথা শুনে ’উমার রা. বললেনঃ আল্লাহ তাকে পিষে ফেলুক। এমনিতেই সা’দ নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় জর্জরিত হচ্ছিলেন। ’উমারের একথায় তিনি দারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে লোকদের বললেনঃ তোমরা আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলো। (দ্রঃ মুসনাদ- ১/২১; তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যা- ১/১৬৮, ১৬৯; তাবারীঃ হিজরী ১১ সনের ঘটনাবলী- ১৮৪৩; বুখারী- ২/১০১০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১২-১৮) আল্লামা যিরিক্লী ‘ফিল বুদয়ি ওয়াত তারীখ’ (৫/১৩২) গ্রন্থের বরাতে উল্লেখ করেছেন যে, মুসলমানরা যখন আবু বকর রা. উদ্ধৃত হাদীস ‘আল-আয়িম্মাতু মিন কুরাইশ’ মেনে নিয়ে তাঁকেই খলীফা নির্বাচন করে তখন সা’দ বলেনঃ ‘লা ওয়াল্লাহ্! লা উবায়ি’উ কুরাশিয়্যাম আবাদা’- আল্লাহর কসম, না। আমি কক্ষণো কোন কুরাইশীর হাতে বা’ইয়াত করবো না। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৫) বেশ কিছু দিন খলীফা হযরত আবু বকর রা. তাঁকে কোন রকম ঘাঁটাঘাঁটি করলেন না। শেষে একদিন এক ব্যক্তিকে বলে পাঠালেন যে, সা’দ যেন এসে বাই’য়াত করে যান। সা’দ বাই’য়াত করতে সরাসরি অস্বীকার করলেন। হযরত ’উমার রা. খলীফাকে বললেন, তাঁর থেকে আপনি অবশ্যই বাই’য়াত নিন। সেখানে হযরত বাশীর ইবন সা’দ আল-আনসারীও ছিলেন। তিনি বললেন, একবার যখন তিনি বাই’য়াত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন তখন আর কোন ভাবেই তাঁর থেকে বাই’য়াত নেওয়া যাবেনা। চাপাচাপি করলে রক্তারক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে। তিনি রুখে দাঁড়ালে তাঁর পরিবার ও বংশের লোকেরাও তাঁর পাশে এসে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত গোটা খাযরাজ গোত্রই তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে যাবে। এভাবে একটি ঘুমন্ত ফিত্না জাগিয়ে তোলা উচিত হবে না। আমার মতে তাঁকে থাকতে দিন, একটি লোক কী আর করবে? বাশীরের এ মত সবাই পছন্দ করলেন। হযরত সা’দ রা. খলীফা হযরত আবু বকরের রা. খিলাফতের শেষ পর্যন্ত মদীনায় ছিলেন। অবশেষে মদীনা ছেড়ে শামে চলে যান এবং দিমাশ্কের নিকটবর্তী- ‘হাওরান’ নামক একটি উর্বর ও সবুজ স্থান বসবাসের জন্য নির্বাচন করেন। আমরণ সেখানেই বসবাস করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৮৯; তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৯০) হযরত সা’দের মদীনা ত্যাগের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, হযরত ’উমার রা. খলীফা হওয়ার পর বাই’য়াত থেকে দূরে থাকার জন্য একবার তাঁকে তিরস্কার করেন। জবাবে সা’দ বলেনঃ আপনার বন্ধু আবু বকর আমার কাছে আপনার চেয়ে বেশী পছন্দনীয় ছিলেন। আল্লাহর কসম! আপনার প্রতিবেশীত্ব আমাকে অতিষ্ট করে তুলেছে। ’উমার বলেনঃ কেউ তার প্রতিবেশীকে পছন্দ না করলে দূরে সরে যেতে পারে। এরপর সা’দ কালবিলম্ব না করে শামে চলে যান। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৫; তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪) হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। বিভিন্ন গ্রন্থে হিজরী ১১, ১৪ ও ১৫ সনের কথা উল্লেখ আছে। ইবন আসাকির হিজরী ১৪ সনটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য মনে করেছেন। (তারীখ- ৬/৯১) আবু ’উবাইদ কাসেম ইবন সাল্লামের মথে তিনি ‘হাওরানে’ মারা যান। এবং সেখানেই দাফন করা হয়। আর দিমাশ্কের ‘আল-মুনীহা’ নামক স্থানে তাঁর যে কবরের কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে ইবন আসাকির তা সঠিক বলে মনে করেননি। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৯১; আল-ইসতী’য়াব; টীকা আল-ইসাবা- ২/৪০; উসুদুল গাবা- ২/২৮৪) হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়নি। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। এ হত্যা সম্পর্কে নানা রকম বর্ণনা ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। বালাজুরী বলেনঃ সা’দ ইবন ’উবাদা শামে হিজরাত করেন এবং সেখানে নিহত হন। তিনি আবু বকরের হাতে বাই’য়াত করেননি। ’উমার রা. তাঁর কাছে একজন লোক পাঠান। তাঁকে বলে দেন তাঁকে বাই’য়াত করতে বলবে। যদি অস্বীকার করে তাহলে আল্লাহর সাহায্য কামনা করবে। লোকটি শামে গেল এবং সা’দকে ‘হাওরানের’ একটি প্রাচীর বেষ্টিত উদ্যানে পেল। সে তাঁকে বাই’য়াত করতে বললো। তিনি বললেনঃ আমি কোন কুরাইশর হাতে বাই’য়াত করবো না। লোকটি বললোঃ তাহলে আমি আপনাকে হত্যা করবো। তিনি বললেনঃ আমাকে হত্যা করলেও আমি বাই’য়াত করবো না। লোকটি তখন বললোঃ তাহলে গোটা উম্মাত যাতে ঢুকেছে আপনি কি তার বাইরে? বললেন’ বাই’য়াতের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই। আমি তাদের বাইরে। লোকটি তখন তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে হত্যা করে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৮৯) ডঃ হামীদুল্লাহ বলেন, এটা চরমপন্থী শিয়াদের একটি মনগড়া কথা। (আনসাবুল আশরাফঃ টীকা- ১/২৫০) অন্য একটি বর্ণনা মতে, কেউ তাঁকে হত্যা করে গোসল খানায় ফেলে রাখে। বাড়ীর লোকেরা যখন দেখতে পায় তখন তাঁর প্রাণ স্পন্দন থেমে গেছে। তাঁর সারা দেহ নীল হয়ে যায়। ঘাতকের সন্ধান করেও কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। শুধু দূর থেকে ভেসে আসা কবিতার একটি চরণ আবৃত্তির শব্দ শোনা যায়, যার অর্থ এরূপঃ ‘আমরা খাযরাজ নেতা সা’দ ইবন ’উবাদাকে হত্যা করেছি। আমরা দুইটি তীর নিক্ষেপ করেছি এবং তাঁর কলিজা ভেদ করতে ভুল করিনি।’ যেহেতু ঘাতকের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি এবং শব্দ শোনা গেছে, এজন্য অনেকের ধারণা হয়েছিল যে, তাঁকে জ্বীনে হত্যা করেছে। (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ২/২৮৫; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৪০; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫০) হযরত সা’দের দুই স্ত্রী ছিল- গাযিয়্যা বিনতু সা’দ ইবন খলীফা ও ফুকাইহা বিনতু ’উবায়েদ ইবন দুলাইম। ফুকাইহা ছিলেন সা’দের চাচাতো বোন। তিনি সাহাবিয়্যাও ছিলেন। গাযিয়্যার গর্ভে সা’দের তিন ছেলে সা’ঈদ, মুহাম্মাদ ও আবদুর রহমান এবং ফুকাইহার গর্ভে দুই ছেলে কায়স, সাদুস ও এক মেয়ে উমামা জন্মগ্রহণ করেন। (তাবাকাত- ৩/৬১৩; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/৫৩৮) হযরত সা’দের প্রচুর বিষয় সম্পত্তি ছিল, মদীনা ত্যাগের পর সবই ছেলে মেয়েদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দেন। এক ছেলে তখন পেটে। তিনি তার অংশ দিয়ে যাননি। সে ভূমিষ্ট হওয়ার পর ’উমার রা. কায়সকে ডেকে বলেন, তুমি তোমার পিতার ভাগ বাতিল করে দাও। কারণ, মৃত্যুর পর তাঁর একটি ছেলে হয়েছে। কায়েস বললেন, আমার পিতার ভাগ ঠিক থাকবে। তবে ইচ্ছা করলে সে আমার অংশটি নিতে পারে। (আল-ইসতীয়াব- ২/৫৩৯) হযরত সা’দের বাড়ীটি ছিল মদীনার বাজারের শেষ প্রান্তে। সেখানে একটি মসজিদ ও কয়েকটি দুর্গও ছিল। বনু হারিস পল্লীতে তাঁর আর একটি বাড়ী ছিল। (খুলাসাতুল ওফা’- ৮৮) হযরত রাসূলে কারীমের রা. হাদীসের প্রতি সা’দ অসাধারণ গুরুত্ব দিতেন। সাহাবীদের যুগে ব্যাপকভাবে লেখালেখি শুরু হয়ে যায়। কুরআন ও লেখা হয়েছিল। তাসত্ত্বেও হাদীস লেখার ব্যাপক প্রচলন তখন হয়নি। তবে সা’দ হাদীস লিখেছিলেন। মুসনাদে ইমাম আহমাদে এ রকম একটি বর্ণনা এসেছেঃ ‘কায়স ইবন সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর পিতা সা’দ থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা এ হাদীসটি সা’দ ইবন ’উবাদার পুস্তক বা পুস্তকসমূহে পেয়েছেন।’ (মুসনাদ- ৫/২৮৫) হযরত সা’দ হাদীস লেখার সাথে সাথে তা শিক্ষাদানের মাধ্যমে প্রচারও করেন। একারণে তাঁর ছেলে কায়স ও সাঈদ, পৌত্র শুরাহবীল, প্রখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস আবু ’উমামা ইবন সাহ্ল, তাবে’ঈ ইবন মুসায়্যিব প্রমুখ ব্যক্তিগণ তাঁর থেকে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৪) হযরত সা’দের চরিত্রে দানশীলতার গুণটির চরম বিকাশ ঘটেছিল। ‘আসমাউর রিজাল’ শাস্ত্রকারদের প্রায় প্রত্যেকে তাঁর চরিত্র রূপায়ণ করতে গিয়ে বলেছেনঃ ‘তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল’। শুধু তিনি নন, পুরুষানুক্রমে তাঁরা ছিলেন আরবের বিখ্যাত দানশীল। তাঁর চার পুরুষ বদান্যতার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিল। এমন গৌরব সে যুগে খুব কম লোকেরই ছিল। তার দাদা দুলাইম, পিতা ’উবাদা, পুত্র কায়স এবং তিনি নিজে- প্রত্যেকেই ছিলেন আপন আপন সময়ের বিখ্যাত জনহিতৈষী ও অতিথি সেবক। (আল-ইসতীয়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৬) তাঁর দাদার সময় আতিথেয়তা এত ব্যাপক ছিল যে, একজন ঘোষক দূর্গের চূড়ায় উঠে চিৎকার করে আহ্বান জানাতো, যারা গোশ্ত, চর্বি ও উপাদেয় খাবার খেতে চায় তারা যেন আমাদের অতিথি হয়। হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. একবার সা’দের দুর্গের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি নাফে’কে ডেকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলেন, এ হচ্ছে সা’দের দাদার দুর্গ। একজন ঘোষক এ দূর্গের চূড়ায় উঠে ঘোষণা করতোঃ কেউ চর্বি-গোশ্ত খেতে চাইলে দুলাইমের বাড়ীতে এসো। দুলাইম মারা গেলে তাঁর ছেলে ’উবাদার সময়েও একই রকম ঘোষনা দেওয়া হতো। সা’দের সময়ও এ ধারা অব্যাহত থাকে। আমি সা’দের ছেলে কায়সকেও একই রকম করতে দেখেছি। কায়স ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক দানশীল। (আল-ইসতী’য়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৩৬-৩৭) প্রখ্যাত তাবে’ঈ হযরত ’উরওয়া ইবন যুবাইর বলেনঃ আমি সা’দ ইবন ’উবাদাকে তাঁর দুর্গের ওপর দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিতে দেখেছিঃ কেউ চর্বি ও গোশ্ত পছন্দ করলে সা’দ ইবন ’উবাদার বাড়ীতে এসো। তারপর তাঁর ছেলেকেও আমি একই রকম করতে দেখেছি। যৌবনে একদিন আমি মদীনার রাস্তায় হাঁটছি। এমন সময় ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার আমার পাশ দিয়ে ’আওয়ালীতে তাঁর ক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছিলেন। আমাকে বললেনঃ বালক, দেখতো সা’দ ইবন ’উবাদার দুর্গের ওপর থেকে কেউ আহ্বান জানাচ্ছে কিনা। আমি তাকিয়ে দেখে বললামঃ না। তিনি বললেনঃ তুমি ঠিকই বলেছ। (তাবাকাত- ৩/৬১৩; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯) এমন ব্যাপক আতিথেয়তা ও দানশীলতা বনী সা’য়িদাকে মদীনার ‘হাতেম’ বানিয়ে দিয়েছিল। ইসলাম ও হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি সা’দের বদান্যতার অনেক মুখরোচক কাহিনী বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এখানে দু’একটি সত্য কাহিনী সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো। হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন হিজরাত করে মদীনায় আসলেন তখন সা’দের বাড়ী থেকে রাসূল সা. ও তাঁর পরিবারের জন্য প্রতিদিন নিয়মিত খাবার আসতো। প্রতিদিন বড় এক গামলা গোশ্ত অথবা দুধের সারীদ অথবা সিরকা ও তেল বা ঘিয়ের সালীদ আসতো, এই পাত্রটি রাসূল সা. ও তাঁর সহধর্মিনীদের গৃহে চক্কর দিত। (আল-ইসাবা- ২/৩০; তাবাকাত- ৩/৬১৪; হায়াতুস সাহাবা- ২/৭০০) একবার সা’দ ইবন ’উবাদা হযরত রাসূলে কারীমের সা. জন্য বরতন ভর্তি রান্না করা মগজ নিয়ে আসলেন। রাসূল সা. বললেনঃ এটা কি? সা’দ বললেনঃ যিনি সত্য সহকারে আপনাকে পাঠিয়েছেন সে সত্তার নামে শপথ, আমি আজ ৪০টি তাজা-মোটা উট নহর (জবেহ) করেছি। আমার ইচ্ছা হলো আপনাকে একটু পেট ভরে মগজ খাওয়াই। রাসূল সা. খেলেন এবং তাঁর কল্যাণ কামনা করে দু’আ করলেন। (কানযুল ’উম্মাহ- ৭/৪০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯) সাহাবীদের ‘আসহাবে সুফ্ফা’ নামে একটি দল ছিল। যাঁরা বহু দূর-দূরান্ত থেকে ঘর-বাড়ী ছেড়ে মদীনায় এসেছিলেন। তাদের এখান আসা ও অবস্থানের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল ’উলম হাসিল এবং দীনের প্রশিক্ষণ লাভ করা। রাসূল সা. তাদেরকে সচ্ছল সাহাবীদের সাথে সম্পৃক্ত করে দিতেন। অন্যরা যেখানে দুই একজন করে সাথে নিয়ে যেতেন, সেখানে হযরত সা’দ প্রতিদিন সন্ধ্যায় ৮০ জনকে আহার করানো জন্য নিয়ে যেতেন। (আল-ইসাবা- ২/৩০; কানযুল ’উম্মাল- ৫/১৯০; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৯৬) ইয়াহইয়া ইবন ’আবদুল ’আযীয থেকে বর্ণিত আছে। সা’দ ইবন ’উবাদা ও তাঁর ছেলে কায়স ইবন সা’দ পালাক্রমে জিহাদে যেতেন। একবার সা’দ লোকদের সাথে জিহাদে গেলেন। এদিকে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বাইরের অনেক অতিথি এলো। সেনা শিবিরে বসে সা’দ একথা জানতে পেয়ে বললেনঃ কায়স যদি আমার ছেলে হয় তাহলে আমার দাস নিস্তাসকে ডেকে বলবে, চাবি দাও, আমি রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজন মেটানোর জন্য খাবার বের করে নিই। তখন হযতো নিস্তাস বলবেঃ তোমার আব্বা চিঠি নিয়ে এসো। এতে কায়স হয়তো ক্ষেপে গিয়ে তার নামে ঘুষি মেরে চাবিটি ছিনিয়ে নেবে এবং রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজন মত খাদ্য বের করে নেবে। আসলে ব্যাপারটিও তাই হয়েছে। সেবার কায়স রাসূলুল্লাহর সা. জন্য এক শো ওয়াসক খাদ্য নিয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২০০) ওয়াকিদী বলেনঃ বিদায় হজ্জের সময় একদিন হযরত রাসূলে কারীমের সা. ভারবাহী পশুটি হারিয়ে গেল। সা’দ ও কায়স সাথে সাথে একটি পশু নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি দরজায় দাঁড়িয়ে। আল্লাহ তাঁর পশুটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। সা’দ আরজ করলেন। ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা জেনেছি, আপনার পশুটি হারিয়ে গেছে। তাই এ পশুটি নিয়ে এসেছি। রাসুল সা. বললেনঃ আল্লাহ আমার বাহনটি ফিরিয়ে দিয়েছেন। তোমরা এটি নিয়ে যাও। আল্লাহ তোমাদের বরকত দিন। ওহে আবু সাবিত! আমি মদীনায় আসার পর থেকে তোমরা যে সমাদর করেছ তাকি যথেষ্ট নয়? সা’দ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সম্পদ থেকে যা আপনি গ্রহণ করেন না তার চেয়ে যা কিছু আপনি গ্রহণ করেন তাই আমাদের নিকট অধিকতর প্রিয়। রাসুল সা. তাঁর কথা সমর্থন করে বলেনঃ আবু সাবিত! সত্য বলেছ। সুসংবাদ লও। তুমি সফলকাম হয়েছ। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৮৮) হযরত ইবন ’আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। সা’দ ইবন ’উবাদা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট জানতে চান যে, তাঁর মা একটি মান্নত মেনেছিলেন; কিন্তু তা পূরণ না করেই মারা গেছেন। এখন তিনি কি তা পূরণ করে দেবেন? রাসূল সা. তাঁকে পুরণ করে দিতে বলেন। এমনিভাবে তাঁর মা’র পক্ষ থেকে সাদাকা করার কথা জিজ্ঞেস করলে রাসূল সা. তাঁকে বলেনঃ হাঁ তুমি তা করতে পার। তখন সা’দ রাসূলকে সা. সাক্ষী রেখে তাঁর ‘আল-মিখরাফ’ বাগিচাটি দান করার কথা ঘোষণা করেন। সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব থেকে বর্ণিত হয়েছে। সা’দ তাঁর মা’র মৃত্যুর পর একবার রাসূলকে সা. জিজ্ঞেস করেনঃ কোন সাদাকা সবচেয়ে ভালো? তিনি বলেনঃ তুমি মানুষকে পানি পান করাও। সা’দ মদীনার মসজিদে তাঁর মায়ের নামে পানি পানের ব্যবস্থা করেন। যা বহু দিন যাবত ‘সিকায়া আলে সা’দ’ নামে প্রসিদ্ধ ছিল। একবার এক ব্যক্তি হযরত হাসানের রা. নিকট জানতে চায় যে, সা’দের মায়ের নামে যে পানির ব্যবস্থা তাতো সাদাকা। সে পানি কি আমি পান করতে পারি? হাসান রা. জবাব দিলেনঃ আবু বকর ও ’উমার যখন পান করেছেন তখন তোমার আপত্তি কিসে? (তাবাকাত- ৩/৬১৪, ৬১৫; মুসনাদে ইমাম আহমাদ- ৫/২৮৫) ‘জাতুল ফুদুল’ নামে সা’দ ইবন ’উবাদার একটি বর্ম ছিল। রাসূল সা. যে দিন বদরের উদ্দেশ্যে বের হন, সা’দ বর্মটি তাঁকে দান করেন। সেই সাথে ‘আল-আদব’ নামে একখানি তরবারিও দান করেন। এ দু’টি যুদ্ধাস্ত্র রাসূল সা. বদরে ব্যবহার করেন। এই বদরে রাসূল সা. ‘জুল-ফিকার’ তরবারিটি গনীমাত হিসাবে লাভ করেন। ওয়াকিদীর মতে ঐ তরবারিটি ছিল কাফির সৈনিক মুনাব্বিহ অথবা নাবীহ্ ইবন হাজ্জাজের। কালবীর মতে আল-আ’স ইবন মুনাব্বিহ্ ইবন হাজ্জাজের। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫২১) ইবন ’আসাকির হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন, একবার সা’দ ইবন ’উবাদা নবী কারীমকে সা. আহারের দা’ওয়াত দিলেন। তিনি উপস্থিত হলে সা’দ খেজুর ও হাড়সহ গোশ্ত হাজির করলেন। রাসুল সা. তা খেলেন এবং এক পেয়ালা দুধও পান করলেন। শেষে বললেনঃ নেক্কার লোকেরা তোমার খাবার খেয়েছে, রোযাদাররা ইফ্তার করেছেন এবং ফিরিশ্তারা তোমাদের জন্য দু’আ করেছেন। হে আল্লাহ! সা’দ ইবন ’উবাদার পরিবার-পরিচনের ওপর রহমত বর্ষন করুন। (কানযুল ’উম্মাহ- ৫/৬৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৯, ৩৬৪) এভাবে হযরত সা’দের আতিথেয়তা, দানশীলতা, উদারতা ও বদান্যতার বহু কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি হযরত সা’দের ভালোবাসার রূপ এমন ছিল যে, রাসুল সা. সম্পর্কে তাঁর গোত্রের অতি গোপন কথাটিও তিনি তাঁর নিকট পৌঁছে দিতেন। হাওয়াযিন যুদ্ধের সময় রাসুল সা. ‘তালীফে কুলুবের’ জন্য কুরাইশ বংশের নও মুসলিমদেরকে গনীমতের বড় বড় অংশ দিলেন এবং আনসারদেরকে কিছুই দিলেন না। এতে অনেক আনসার যুবক ক্ষুব্ধ হয়ে বললোঃ রাসূল সা. স্বগোত্রীয় লোকদের দিলেন এবং আমাদেরকে মাহরূম করলেন। অথচঃ আমাদের তরবারি হতে এখনো কুরাইশদের রক্ত ঝরছে। সা’দ ইবন ’উবাদা সাথে সাথে বিষয়টি জানিয়ে দিলেন। তিনি সা’দকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমার মত কি? বললেনঃ আমিও আমার সম্প্রদায়ের একজন। তবে এমন কথা বলিনা। রাসুল সা. তাঁকে বললেনঃ যাও, লোকদের অমুক তাঁবুতে সমবেত কর। ঘোষণা শুনে মুহাজির ও আনসার উভয় সম্প্রদায়ের লোক উপস্থিত হলো। সা’দ শুধু আনসারদের থাকতে বলে মুহাজিরদের চলে যেতে বললেন। তারপর রাসুল সা. এসে এক আবেগময় ভাষণ দান করলেন। সে ভাষয়ের কিছু অংশ ছিল এরূপঃ তোমরা কি এতে খুশী নও যে, অন্যরা ধন-সম্পদ নিয়ে ফিরে যাক, আর তোমরা আমাকে নিয়ে ফিরবে? রাসূলুল্লাহর সা. এমন প্রশ্নে সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। সমস্বরে তারা জবাব দেয়, আপনার পরিবর্তে গোটা দুনিয়া কিছুই না। (বুখারী- ২/৬২০; মুসনাদ- ৩/৭২০; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৯৮, ৪৯৯; হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৮) উহুদ যুদ্ধের সময় গোটা মদীনা একটা মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়ে। এ সময় সা’দ ইবন ’উবাদা নিজের বাড়ী ছেড়ে রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ী পাহারা দিয়েছিলেন। হযরত রাসুলে কারীমও তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। প্রায়ই তাঁর বাড়ীতে যেতেন। সা’দের ছেলে কায়স বলেনঃ একবার রাসূল সা. আমাদের বাড়ীতে আসলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি সালাম দিলেন। সা’দ সালাম শুনে খুব নিচু স্বরে জবাব দিলেন। কায়স বললেনঃ আপনি কি রাসুলকে সা. ভিতরে আসার অনুমতি দেবেন না? সা’দ বললেনঃ দেরী কর। তাঁকে আমাদের ওপর একটু বেশী করে সালাম দেওয়ার সুযোগ দাও। রাসুল সা. তিনবার সালাম দিয়ে কোন জবাব না পেয়ে ফিরে চললেন। সা’দ তখন দৌড়ে গিয়ে পিছন থেকে ডাক দিয়ে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার সালাম শুনেছি। জবাবও দিয়েছি একটু আস্তে আস্তে। আমি চেয়েছি, আপনি আমাদের ওপর একটু বেশী সালাম দিন। রাসূল সা. সা’দের সাথে আবার ফিরে আসলেন। সেদিন তিনি সা’দের বাড়ীতে আহার করে তাঁর পরিবারের সকলের জন্য দু’আ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/২৮৩; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৯১, ৫১৫; ৩/৩১৪) একবার রাসুল সা. এক দু’আয় বলেনঃ হে আল্লাহ! আনসারদের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন। বিশেষ করে ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবন হারাম ও সা’দ ইবন ’উবাদাকে। একবার হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ী গেলেন। তিনি সোজা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইছেন। রাসুল সা. তাঁকে ইশারায় দূরে সরে যেতে বললেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার দরজার সামনে গিয়ে অনুমতি চাইলেন। তখন রাসূল সা. বললেনঃ যখন দরজার সামনেই থাকবে, অনুমতির প্রয়োজন পড়ে না। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫১৬) একবার রাসূলুল্লাহ সা. যাকাত আদায়কারী হিসাবে সা’দকে নিয়োগ করলেন। একদিন রাসুল সা. তাঁর কাছে গিয়ে বললেনঃ কিয়ামতের দিন যাতে তোমাকে উট কাঁধে করে উঠতে না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। সা’দ বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি তেমন কিছু করি তাহলে সত্যি এমন হবে? তিনি বললেনঃ হাঁ। সা’দ আরজ করলেনঃ আমাকে অব্যাহতি দিন। রাসূল সা. তাঁর আবদেন মঞ্জুর করে অব্যাহতি দান করেন। (তারীখু ইবন আসাকির- ৬/৮৯; মুসনাদ- ৫/২৮৫) একবার হযরত সা’দ অসুস্থ হলে রাসূল সা. সাহাবীদের সংগে করে তাঁকে দেখতে যান। সা’দ অচেতন ছিলেন। সাহাবীদের মধ্য থেকে নানাজনে নানারকম মন্তব্য করলেন। কেউ বললেন, শেষ হয়ে গেছে! কেউ বললেন, না এখনো দম আছে। একথা শুনে রাসুল সা. কেঁদে ফেলেন। সাথে সাথে গোটা মজলিসে কান্না শুরু হয়ে যায। (বুখারী- ২/১৭৪) আর একবার রাসূল সা. যায়িদ ইবন সাবিতকে বাহনের পিছনে বসিয়ে অসুস্থ সা’দকে দেখতে তাঁর বাড়ী গিয়েছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৯) একবার রাসুল সা. সা’দকে দেখতে যাচ্ছেন। পথে মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল বসে ছিল। সে রাসূলকে সা. কিছু কটু কথা বললো। উপস্থিত সাহাবায়ে কিরাম উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। উভয় পক্ষের মধ্যে লড়াই শুরু হয় হয় অবস্থা। রাসূল সা. সকলকে নিবৃত্ত করলেন এবং সা’দের বাড়ী উপস্থিত হলেন। তিনি বললেনঃ সা’দ! আজ আমাকে আবু হুবাব (ইবন উবাই) যে সব কথা বলেছে তাকি শুনেছ? সা’দ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! তার অপরাধ ক্ষমা করে দিন। আসল কথা হলো, ইসলাম আসার পূর্বে মানুষ ধারণা করেছিল সে মদীনার বাদশাহ হবে। কিন্তু যখন আল্লাহ আপনাকে সত্য সহকারে পাঠালেন তখন তাদের সে ধারণা চুরমার হয়ে গেল। এটা হলো সেই বেদনার বহিঃপ্রকাশ। এবার রাসুল সা. তাঁর অনুরোধে ইবন উবাইকে ক্ষমা করে দেন। (বুখারী- ২/৬৫৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৯) হযরত সা’দ যে নরম প্রকৃতির ও শান্তিপ্রিয় স্বভাবের ছিলেন উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা তা বুঝা যায়। ইবন ’আসাকির হযরত যায়িদ ইবন সাবিত থেকে বর্ণনা করেছেন। একদিন সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁর ছেলেকে সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট আসলেন। সালাম বিনিময়ের পর রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ এখানে, এখানে। এই বলে তাঁকে ডান পাশে বসালেন। তারপর বললেনঃ মারহাবান বিল আনসার, মারহাবান বিল আনসার- আনসারদের প্রতি স্বাগতম, আনসারদের প্রতি স্বাগতম। ছেলেটি রাসূলুল্লাহর সা. সামনে দাঁড়িয়েছিল। রাসুল সা. বসতে বললেন। সে বসে পড়লো। একটু পরে তিনি তাকে কাছে আসতে বললেন। সে এগিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে ও পায়ে চুমু দিল। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও আনসারদের একজন। সা’দ তখন বললেনঃ আল্লাহ আপনাকে সম্মানিত করুন যেমন আপনি আমাদের সম্মান দেখিয়েছেন। রাসূল সা. বললেন, আমার সম্মান দেখানো আগেই আল্লাহ তোমাদের সম্মানিত করেছেন। আমার পরে তোমরা অনেক কষ্ট ভোগ করবে। তখন সবর করবে। অবশেষে হাউজে কাওসারের নিকট আমার সাথে তোমাদের আবার সাক্ষাত হবে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০৪) হযরত সা’দের একটি স্বতন্ত্র শিক্ষা মজলিস ছিল। একদিন রাসুল সা. সেখানে গিয়ে কিভাবে রাসূলের সা. ওপর দরূদ ও সালাম পেশ করতে হয় তা শিখিয়েছিলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩১৪) হযরত সালমান আল-ফারেসী রা. ইসলাম গ্রহণের পর মনিবের হাত থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে তার সাথে একটি চুক্তি করেন। তার একটি শর্ত ছিল, তিনি মনিবকে ৩০০ (তিন শো) খেজুরের চারা লাগিয়ে দেবেন। হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা তাঁকে ষাটটি (৬০) চারা দিয়ে সাহায্য করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৮৭) এক সময় হযরত রাসূলে কারীমের সা. দশটি গর্ভবতী উট ছিল। তার তিনটিই সা’দ তাঁকে দান করেন। তার একটির নাম ছিল ‘মুহরাহ্’। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫১২) সাফওয়ান ইবন মু’য়াত্তাল বন্দীদশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সা’দ ইবন ’উবাদা পরার জন্য তাঁকে কাপড় দান করেন। সেই কাপড় পরে রাসূলুল্লাহর সা. সামনে গেলে তিনি বলেনঃ যে তাকে কাপড় পরিয়েছে আল্লাহ তাকে জান্নাতের কাপড় পরাবেন। সাফওয়ান তখন বলেনঃ আমাকে সা’দ ইবন ’উবাদা কাপড় দান করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬-৮৯) হযরত ইবন ’আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে। যখন সূরা আন-নূরের ৪ নং আয়াত- ‘যারা সাধ্বী রমনীর প্রতি অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদেরকে আশিটি দুর্রা লাগাবে এবং কখনো তাদের সাক্ষী গ্রহণ করবে না। তারাই ফাসিক’- নাযিল হয় তখন সা’দ ইবন ’উবাদা বলে ওঠেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা এভাবে নাযিল হয়েছেন? তাঁর মধ্যে বিস্ময়ের ভাব দেখে রাসূল সা. বলেনঃ ওহে আনসারগণ! শোন, তোমাদের নেতার কথা শোন। তারা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটা এভাবে নাযিল হয়েছে? তাঁর মধ্যে বিস্ময়ের ভাব দেখে রাসুল সা. বলেনঃ ওহে আনসারগণ! শোন, তোমাদের নেতার কথা শোন। তারা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ তিনি একজন প্রখর আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ব্যক্তি। আল্লাহর কসম। তিনি কুমারী ছাড়া কোন মেয়ে বিয়ে করেননি। তেমনিভাবে তাঁর তালাক দেওয়া কোন মহিলাকেও কেউ কখনো বিয়ে করত সাহস করেনি। এর একমাত্র কারণ, তাঁর তীক্ষ্ণ আত্মমর্যাদাবোধ। সা’দ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি জানি এটি সত্য এবং আল্লাহর নিকট থেকে এসেছে। কিন্তু আমি আশ্চর্য হচ্ছি যে, একজন দুরাচারীকে আমার স্ত্রীর সাথে কুকর্ম করতে দেখেও তাকে কিছুই না বলে চারজন সাক্ষীর তালাশে বেরিয়ে যাব এবং তাকে নির্বিঘ্নে তার কুকর্ম শেষ করার সুযোগ করে দেব। আল্লাহর কসম! আমি যখন সাক্ষী নিয়ে ফিরে আসবো তখন তো তার কাজ শেষ হয়ে যাবে।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, সা’দ বলেনঃ কক্ষণো না। সেই সত্তার নামে শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। আমি অবশ্যই তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করবো। তখন রাসূল সা. আনসারদের ডেকে বলেন, শোন তোমাদের নেতার কথা শোন। সে অবশ্যই আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন লোক। তবে তার থেকেও আমি এবং আমার থেকেও আল্লাহ বেশী মর্যাদাবোধের অধিকারী। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৮৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৩৮, ৬৩৯) মালিক থেকে বর্ণিত হয়েছে। যখন আবু ’উবাইদাহ, মু’য়াজ, বিলাল ও সা’দ ইবন ’উবাদার মত প্রথম শ্রেণীর সাহাবীরা শামে গেলেন তখন সেখানে একজন খৃস্টান রাহিব (সাধক) তাদেরকে দেখে মন্তব্য করেনঃ হযরত ’ঈসার যে সকল হাওয়ারীকে (সাথী) শূলীতে চড়ানো হয়েছিল এবং করাত দিয়ে দু’ফালি করে ফেলা হয়েছিল তারাও সংগ্রামে মুহাম্মাদের সা. এ সকল সাহাবীদের সমকক্ষ ছিলেন না। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৬/৯১)
সা’দ ইবন মু’য়াজ (রা)

আসল নাম সা’দ, ডাকনাম আবু ’আমর, লকব বা উপাধি সায়্যিদুল আউস। মদীনার বিখ্যাত আউস গোত্রের আবদুল আশহাল শাখার সন্তান। পিতার নাম মু’য়াজ ইবন নু’মান, মাতা কাবশা মতান্তরে কুবাইশা ‘বিনতু রাফি’। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ সা’ঈদ আল খুদরীর চাচাতো বোন। জাহিলী যুগেই পিতা মু’য়াজ্জের মৃত্যু হয়। তবে মাতা কাবশা হিজরাতের পরে ঈমান আনেন এবং সা’দের ইনতিকালের পরেও বহু দিন জীবিত ছিলেন। গোটা আউস গোত্রের মধ্যে আবদুল আশহাল শাখাটি ছিল সর্বাধিক অভিজাত এবং বংশানুক্রমে নেতৃত্ব ছিল তাদেরই হাতে। সা’দ ছিলেন তাঁর সময়ে একজন বড় মাপের নেতা। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২, উসুদুল গাবা- ২/২৯৬, তাবাকাত- ৩/৪২০, তাহজীবুত তাহজীর- ৩/৪৮১) তাঁর জন্ম সন সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। আকাবার প্রথম বাইয়াতের পর থেকে যদিও মদীনায় ইসলামের প্রভাব পড়তে থাকে তবে তা প্রকৃতপক্ষে হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইরের ব্যক্তিত্বের সাথে জড়িত ছিল। আকাবার শপথের পর মদীনাবাসীদের অনুরোধে হযরত রাসূলে কারীম সা. মুস’য়াবকে দা’ঈ-ই-ইসলামের (আহবানকারী) দায়িত্ব দিয়ে মদীনায় পাঠান। ইসলামের ইতিহাসে তিনি একজন সফল দা’ঈ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। তিনি নিরলস চেষ্টার মা্ধ্যমে মদীনার প্রতিটি লোকের কানে ইসলামের দা’ওয়াত পৌঁছে দেন। হযরত মুস’য়াব মদীনায় এসে যখন ইসলামের দা’ওয়াত দিতে শুরু করলেন তখন সা’দ ইবন মু’য়াজ একজন চরম অস্বীকারকারী। তাঁর এ অবস্থা বেশী দিন থাকেনি। অনতিবিলম্বে তিনিও মুস’য়াবের দা’ওয়াতে সাড়া দেন। ইবন ইসহাক তাঁর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ একদিন আস’য়াদ ইবন যুরারা রাসূলুল্লাহর সা. প্রেরিত দা’ঈ (আহবানকারী) মুস’য়াব ইবন ’উমাইরকে সংগে করে দা’ওয়াতী কাজে বনী আবদুল আশহাল ও বনী জাফার গোত্রে গেলেন। তাঁরা ‘মারাক’ নামক একটি কুয়োর ধারে দেওয়ালের ওপর বসলেন। আর ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এমন কিছু লোক তাঁদের পাশে জড় হলেন। সা’দ ইবন মুয়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর উভয়ই তখন বনী আবদুল আশহাল গোত্রের নেতা। তখনও তাঁরা মুশ্রিক বা পৌত্তলিক। উল্লেখ্য যে, সা’দ ছিলেন আস’য়াদ ইবন যুরারার খালাতো ভাই। যাই হোক, খবরটি সা’দ ও উসাইদের কানে গেল। সাথে সাথে সা’দ উসাইদকে বললেনঃ ‘তোমার বাপের সর্বনাশ হোক। তুমি এখনই এ দু’জন লোকের কাছে যাও। তারা আমাদের দুর্বল লোকদের বোকা বানাতে আমাদের বাড়ীর ওপর চড়াও হয়েছে। তাদের তাড়িয়ে দাও, এ পথ মাড়াতে নিষেধ কর। যদি ঐ দ্বিতীয় লোকটির সাথে আমার খালাতো ভাই আস’য়াদ ইবন যুরারা না থাকতো তাহলে তোমাকে পাঠাতাম না, আমি নিজেই যেতাম। তার সামনে আমার যাওয়া শোভন হবে না। ’উসাইদ অস্ত্র সজ্জিত হয়ে তাঁদের নিকট গেলেন। উল্টো ফল ফললো। তাড়াতে গিয়ে নিজেই তাঁদের কথায় প্রভাবিত হলেন এবং ইসলাম কবুল করলেন। তিনি মুস’য়াব ও আস’য়াদকে বললেনঃ ‘আমি পিছনে এমন এক ব্যক্তিকে রেখে এসেছি, যদি তিনি তোমাদের কথা শোনেন তাহলে গোত্রের একটি লোকও তোমাদের থেকে দূরে থাকবে না। আমি এখনই সা’দ ইবন মু’য়াজকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। এই বলে তিনি নিজ গোত্রের দিকে ফিরে চললেন। সা’দ তখন গোত্রীয় এক আড্ডায় বসা। উসাইদকে ফিরে আসতে দেখে তিনি মন্তব্য করলেনঃ ‘আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, উসাইদ যে চেহারায় গিয়েছিল তার থেকে ভিন্ন এক চেহারা নিয়ে তোমাদের কাছে ফিরছে।’ উসাইদ কাছাকাছি এসে পৌঁছালে সা’দ জিজ্ঞেস করলেনঃ কী করেছ? উসাইদ জবাব দিলেনঃ আমি তাদের দু’জনের সাথে কথা বলেছি, তাদের মধ্যে তেমন খারাপ কিছু দেখিনি। তবুও তাদেরকে এখানে আসতে নিষেধ করে দিয়েছি। তারাও বলেছে, তোমরা যা ভালো মনে কর, তাই হবে। তবে আমি শুনেছি, বনী হারিছার লোকেরা আস’য়াদ ইবন যুরারাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। তারা তো একথা জানে, আস’য়াদ তোমার খালাতো ভাই।’ সা’দ সাথে সাথে উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়ালেন এবং বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে তাঁদের দুজনের দিকে ছুটলেন। নিকটে পৌঁছে যখন তিনি দেখলেন, তাঁরা অত্যন্ত শান্ত ও স্থিরভাবে বসে আছেন তখন তিনি বুঝলেন, উসাইদ তাঁকে ঘোকা দিয়ে তাঁদের কথা শুনাতে চেয়েছে। তিনি তাঁদের দু’জনকে গালাগালি করতে করতে আস’য়াদকে বললেনঃ ‘শোন আবু উসামা! তোমার ও আমার মধ্যে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক না থাকতো তাহলে আমি এত কথা বলতাম না। আমরা যা পছন্দ করিনে তাই তুমি আমাদের বাড়ীর ওপর এসে করে যাচ্ছ।’ এ দিকে সা’দকে আসতে দেখে আস’য়াদ, মুসয়াবকে বলেছিলেনঃ ‘মুস’য়াব! আপনার নিকট একজন গোত্র নেতা আসছেন। এ ব্যক্তি যদি আপনার কথা মেনে নেন তাহলে গোত্রের দু’ব্যক্তিও আপনার থেকে দূরে থাকতে পারবে না।’ মুস’য়াব অত্যন্ত নরম মিযাজে সা’দকে বললেনঃ ‘আপনি কি একটু বসে আমার কথা শুনবেন? আমার কথা পসন্দ হলে, ভালো লাগলে, মানবে। আর পসন্দ না হলে, খারাপ লাগলে আমরা চলে যাব।’ সা’দ বললেনঃ ‘এ তো খুব ইনসাফের কথা।’ তিনি মাটিতে বর্শাটি গেঁড়ে বসে পড়লেন। মুস’য়াব অত্যন্ত ধীর-স্থিরভাবে তাঁর সামনে ইসলামের দা’ওয়াত পেশ করলেন, তাঁকে কুরআন পাঠ করে শোনালেন। মুস’য়াব ও আস’য়াদ দু’জনেই বর্ণনা করেছেনঃ ইসলামের দাওয়াত পেশ করার পর সা’দ কোন কথা বলার পূর্বেই আমরা তাঁর চেহারায় ইসলামের দীপ্তি লক্ষ্য করেছিলাম। ইসলামের দা’ওয়াত শোনার পর সা’দ তাঁদের কাছে জানতে চান? ‘তোমাদের এই ইসলাম, এই দ্বীনে প্রবেশ করতে হলে কি কি কাজ করতে হয়?’ তাঁরা বললেন, ‘গোসল করে পবিত্র হতে হয়, পোশাক পরিচ্ছদ করতে হয়, তারপর কালিমা শাহাদাত উচ্চারণ করে দু’রাকা’য়াত সালাত আদায় করতে হয়।’ সা’দ তাই করলেন। তারপর বর্শাটি হাতে তুলে নিয়ে উসাইদের সাথে গোত্রীয় আড্ডার দিকে রওয়ানা দিলেন। তাঁদেরকে ফিরতে দেখে গোত্রীয় লোকেরা বলাবলি করতে লাগলোঃ ‘সা’দ যে চেহারা নিয়ে গিয়েীছলেন এখন তাঁর সেই চেহারা নেই। তাঁকে ভিন্ন এক চেহারায় দেখা যাচ্ছে।’ সা’দ নিকটে এসে গোত্রীয় লোকদের বললেনঃ ‘ওহে আবদুল আশহাল গোত্রের লোকেরা! বিভিন্ন ব্যাপারে তোমরা আমার কাজ-কর্ম কেমন দেখে থাক?’ তাঁরা সমস্বরে জবাব দিলঃ ‘আপনি আমাদের নেতা, আমাদের মধ্যে সর্বোত্তম মতামতের অধিকারী ব্যক্তি এবং আমারে বিশ্বস্ত নাকীব বা দায়িত্বশীল।’ সা’দ বললেনঃ তাহলে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সা. প্রতি ঈমান আনবে তোমাদের কোন নারী-পুরুষের সাথে কথা বলা আমার জন্য হারাম।’ আস’য়াদ ও মুস’য়াব বলেনঃ ‘আল্লাহর কসম! সা’দের এই ঘোষনার পর সন্ধ্যা হতে না হতে বনী আবদুল আশহালের সকল নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করে। সা’দের ইসলাম গ্রহণের পর আস’য়াদ ও মুস’য়াব তাঁর বাড়ীতে অবস্থান করে ইসলামের দা’ওয়াত দিতে থাকেন। ফলে রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বে সেখানে এমন কোন বাড়ী বা গোত্র ছিল না যেখানে দুই-একজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেনি। এরপর সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর দুইজন মিলে বনী আবদুল আশহালের মূর্তিগুলি ভাংতে শুরু করেন। (দ্রঃ তাবাকাত- ৩/৪২০, ৪২১; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৫, ৪৩৭, ৪৭৯; আল-বিদায়া- ৩/১৫২; উসুদুল গাবা- ৩/২৯৬; হায়াতুস সাহাবা- ১/১৮৭-১৯০) মদীনায় ইসলামের দা’ওযাত ও তাবলীগের ক্ষেত্রে হযরত সা’দের অবদান ছিল অনন্য। এই গৌরবে অন্য কোন সাহাবী তাঁর জুড়ি নেই। কারণ, একজন মানুষের ইসলাম গ্রহণের প্রভাবে গোটা গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা শুধু তাঁর ক্ষেত্রে ছাড়া আর কোথাও দেখা যায় না। এই কারণে রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘আনসারদের সর্বোত্তম গৃহ বনু নাজ্জার। তারপর আবদুল আশহালের স্থান।’ হযরত সা’দ ও তাঁর গোত্রের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় আকাবার মধ্যবর্তী সময়ে। ইবন ’আসাকির বুখারী ও কালবী থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা. মক্কা থেকে হিজরাত করার পর কুরাইশরা তাঁর কোন খোঁজ-খবর পাচ্ছে না। তাঁরা কা’বার পাশে তাদের পরামর্শ গৃহে বসে আছে। এমন সময় তারা জাবালে আবূ কুবায়সের দিক থেকে একটি কবিতা আবৃত্তির কণ্ঠ শুনতে পেল। তার কিয়দাংশ নিম্নরূপঃ ‘দুই সা’দ যদি ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে বিরুদ্ধবাদীদের ভয় থেকে মুহাম্মাদ নিরাপদ হয়ে যাবে। ওহে আউসের সা’দ, ওহে খাযরাজের সা’দ! তোমরা মুহাম্মাদের রক্ষক হয়ে যাও।’- এরূপ আরো কয়েকটি পংক্তি। এই কবিতা শুনে কুরাইশরা বুঝতে পারে, আউস ও খাযরাজ গোত্রে রাসূলুল্লাহর সা. সাহায্যকারী দু’সা’দ হলেন- সা’দ ইবন মু’য়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদা। (তাহজীবে ইবন ’আসাকির- ৬/৮৯) ইসলাম গ্রহণের কিছু দিন পর সা’দ ’উমরার উদ্দেশ্যে মক্কায় গেলেন। মক্কার বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা উমায়্যা ইবন ইবন খালাফ ছিল তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। সা’দ তার বাড়ীতে উঠলেন। উমাইয়্যা মদীনায় এলে সা’দের বাড়ীতে উঠতো। তিনি উমায়্যাকে বললেন, হারাম শরীফ (কা’বার আশপাশ) যখন জনশূণ্য হয় তখন আমাকে বলবে। দুপুর বেলা উমায়্যা তাঁকে সংগে করে হারামের উদ্দেশ্যে বের হলো। পথে আবূ জাহলের সাথে দেখা। সে উমায়্যাকে জিজ্ঞেস করলোঃ এ ব্যক্তি কে? উমায়্যাঃ সা’দ ইবন মু’য়াজ। আবূ জাহলঃ এ তো খুবই আশ্চর্য্যের বিষয় যে, তুমি একজন ধর্মত্যাগীকে আশ্রয় দিয়েছ এবং তার সাহায্যকারী হিসেবে মক্কায় দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছ। তুমি তাঁর সাথে না থাকলে তাঁর বাড়ী ফেরা কঠিন হতো। উল্লেখ্য যে, যারা ইসলাম গ্রহণ করতো কাফিররা ধর্মত্যাগী বলতো। হযরত সা’দ সাথে সাথে আবু জাহলের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন। বললেনঃ তুমি আমাকে বাধা দিয়েই দেখনা কেমন হয়। আমি তোমার মদীনার রাস্তা বন্ধ করে দেব। উমায়্যা বললেনঃ সা’দ। আবুল হাকাম (আবূ জাহল) মক্কার একজন বিশিষ্ট নেতা। তার সামনে নিচু স্বরে কথা বল। সা’দ বললেনঃ চলো যাই। আমি রাসূলের সা. নিকট শুনেছি, মুসলমানরা তোমাদেরকে হত্যা করবে। আবূ জাহল প্রশ্ন করলোঃ তারা কি মক্কায় এসে হত্যা করবে? সা’দ বললেনঃ তা আমার জানা নেই। হিজরী ২য় সনের রাবীউল আওয়াল মাসে রাসূল সা. কুরাইশ নেতা উমায়্যা ইবন খালাফের নেতৃত্বাধীন এক’শ লোকের একটি কাফিলার সন্ধানে বের হন। ইতিহাসে এটা ‘বাওয়াত’ অভিযান নামে খ্যাত। একটি বর্ণনা মতে রাসূল সা. স্বীয় প্রতিনিধি হিসেবে সা’দ ইবন মু’য়াজকে মদীনায় রেখে যান। (আনসাবূল আশরাফ- ১/২৮৭) হযরত রাসূলে কারীম সা., আবূ ’উবাইদা ইবনুল জাররাহ মতান্তরে সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসের সাথে তাঁর মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। (তাবাকাত- ৩/৪২১; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫০৫) হিজরী ২য় সনে ‘বাওয়াত’ অভিযানের পর ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ আসন্ন। হযরত সা’দের ভবিষ্যদ্বানী সত্যে পরিণত হওয়ার সময় সমাগত। মক্কার কুরাইশরা মদীনা আক্রমণের জন্য তোড়জোড় শুরু করলো। খবর পেয়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. বদরের দিকে যাত্রা করলেন। পথিমধ্যে কুরাইশ বাহিনীর সর্বশেষ গতিবিধি অবগত হয়ে তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মুহাজির ও আনসারদের সাথে পরামর্শে বসেন। মুহাজিরদের মধ্য থেকে আবু বকর, ’উমার, মিকদাদ রা. প্রমুখ সাহাবী নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করেন। অতঃপর রাসূল সা. আনসারদের লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘ওহে লোকেরা, আপনারা আমাকে পরামর্শ দিন।’ সাথে সাথে সা’দ ইবন মু’য়াজ উঠে দাঁড়িয়ে বলেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! সম্ভবতঃ আপনি আমাদেরকে উদ্দেশ্য করেছেন?’ রাসূল সা. বললেনঃ ‘হা। সা’দ বললেনঃ ‘আমরা আপনার প্রতি ঈমান এনেছি, আপনাকে সত্যবাদী বলে জেনেছি, আর আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, যা কিছু আপনি নিয়ে এসেছেন তা সবই সত্য। আপনার কথা শোনার ও আপনার আনুগত্য করার আমরা অঙ্গীকার করেছি। ইয়া রাসূলুল্লাহ। আপনার যা ইচ্ছা করুন, আমরা আপনার সাথে আছি। সেই সত্তার নামে শপথ যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন। যদি আপনি আমাদেরকে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন, আমরা ঝাঁপিয়ে পড়বো। আমাদের একজনও পিছনে থাকবে না। আগামী কালই আপনি আমাদেরকে নিয়ে শত্রুর সম্মুখীন হোন, আমরা তাতে ক্ষুণ্ন হবো না। যুদ্ধে আমরা দুরুন ধৈর্যশীল, শত্রুর মুকাবিলায় পরম সত্যনিষ্ঠ। আল্লাহ আমাদের থেকে আপনাকে এমন আচরণ প্রত্যক্ষ করাবেন যাতে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আল্লাহর ওপর ভরসা করে আমাদের সাথে নিয়ে আপনি অগ্রসর হোন।’ তিনি আরও বলেনঃ ‘আমরা তাদের মত হবো না যারা মূসাকে আ. বলেছিল, আপনিও আপনার রব যান এবং শত্রুর সাথে যুদ্ধ করুন। আর আমরা এখানে বসে থাকি। বরং আমরা বলি, আপনি ও আপনার রব যান, আমরা আপনাদের অনুসরণ করবো। হতে পারে এক উদ্দেশ্যে আপনি বেরিয়েছেন; কিন্তু আল্লাহ আর একটি করলেন। দেখুন, আল্লাহ আপনার দ্বারা কি করান।’ ঐতিহাসিকরা বলেছেন, আল্লাহ সা’দের এই কথার সমর্থনে সূরা আনফালের ৫ নং আয়াতটি নাযিল করেন। সা’দের উপরোক্ত ভাষণে রাসূল সা. ভীষণ খুশী হন। সৈন্য মোতায়েনের সময় তিনি আউস গোত্রের ঝান্ডাটি সা’দের হাতে তুলে দেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে এ যুদ্ধে গোটা আনসার সম্প্রদায়ের পতাকা ছিল সা’দের হাতে। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬১৩, ৬১৫; উসুদুল গাবা- ২/২৯৯; তাবাকাত- ৩/৪২১; আল-বিদায়া- ৩/২৬২; হায়াতুস সাহাবা- ১/৪১৫) ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, বদর যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে সা’দ ইবন মু’য়াজ বললেনঃ ‘ইয়া নাবীয়াল্লাহ! আমরা আপনার জন্য একটি ‘আরীশ’ বা তাঁবু স্থাপন করে একটি বাহিনী মোতায়েন রাখিনা কেন? আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাব। তাতে যদি আল্লাহ আমাদের সম্মান দান করেন, আমরা বিজয়ী হই, তাহলে তো আমাদের আশা পূর্ণ হলো। আর যদি এর বিপরীত কিছু ঘটে তাহলে আপনি এই বাহিনী সহ আমাদের পিছনে ছেড়ে আসা লোকদের সাথে গিয়ে মিলিত হবেন। হে আল্লাহর নবী! আমাদের যে সব লোক মদীনায় পিছনে রয়ে গেছে, আপনার প্রতি আমাদের ভালোবাসা তাদের থেকে একটুও বেশী নয়। যদি তারা বুঝতে পারতো আপনি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বেন, তবে তারা এভাবে পিছনে পড়ে থাকতো না। আল্লাহ তাদের দ্বারা আপনার হিফাজত করবেন। তারা আপনাকে সৎ উপদেশ দান করবে এবং আপনার সাথে শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করবে।’ এই বক্তব্যের জন্য রাসূল সা. সা’দের প্রশংসা করে তাঁর জন্য দু’আ করলেন। এভাবে রাসূলুল্লাহর সা. জন্য রণক্ষেত্রের অদূরে একটি ‘আরীশ’ নির্মিত হয় এবং তিনি সেখান থেকে বদর যুদ্ধ পরিচালনা করেন। (আল-বিদায়া- ৩/২৬৮; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬২০) এই বদর যুদ্ধে কুরাইশ বাহিনী যখন পরাজিত হয়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়ে যেতে থাকে তখন মুসলিম মুজাহিদরা তাদের ধাওয়া করে ধরে ধরে বন্দী করতে শুরু করে। হযরত রাসূলে কারীম সা. তখন ‘আরীশে’ অবস্থান করছেন। তাঁর ওপর অকস্মাৎ পাল্টা আক্রমণ হতে পারে, এমন এক আশঙ্কায় সা’দ ইবন মু’য়াজ আরো কিছু আনসারী মুজাহিদকে সংগে নিয়ে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে ‘আরীশের’ দরযায় পাহারায় নিয়োজিত হন। রাসূল সা. সা’দের চেহারায় অসন্তুষ্টির ছাপ লক্ষ্য করে বলেনঃ সা’দ! মনে হচ্ছে লোকদের কাজ তোমার পছন্দ হচ্ছে না। সা’দ বললেনঃ হাঁ। পৌত্তলিকদের সাথে এটা আমাদের প্রথম সংঘাত। তাদের পুরুষদের জীবিত রাখার চেয়ে হত্যা করাই আমার পছন্দ। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬২৮) একটি বর্ণনা মতে, এ যুদ্ধে তিনি ’আমর ইবন ’উবাইদুল্লাহকে হত্যা করেন। এতে তাঁর একটি দাসও যোগদান করে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৯৭, ৪৭৯) উহুদ যুদ্ধেও তিনি যোগদান করেন। এ যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. অবস্থান স্থলের পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন। সূচনাতেই রাসূলুল্লাহর সা. ইচ্ছা ছিল মদীনার ভেতর থেকেই কাফিরদের প্রতিরোধ করার। মুনাফিক ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূলেরও ছিল একই ইচ্ছা। কিন্তু কিছু নওজোয়ান মুজাহিদ যাঁরা ছিলেন শাহাদাত লাভের চরম অভিলাষী, তাঁরা মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার জন্য জিদ ধরে বসেন। যেহেতু তাঁরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই রাসূল সা. তাঁদের মতামত মেনে নেন এবং যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হওয়ার জন্য অন্দর মহলে প্রবেশ করেন। সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর তখন বললেনঃ তোমরা রাসূলকে সা. মদীনার বাইরে যাওয়ার জন্য বাধ্য করেছ; অথচ তাঁর ওপর আসমান থেকে ওহী নাযিল হয়। তোমাদের উচিত, তোমাদের মতামত প্রত্যাহার করে নেওয়া এবং বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে রাসূলুল্লাহর সা. ওপর ছেড়ে দেওয়া। এদিকে রাসূল সা. যখন তরবারি, ঢাল, বর্ম ইত্যাদি যুদ্ধ সাজে সজ্জিত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন তখন সবাই অনুতপ্ত হলেন। একযোগে তাঁরা বললেন, আপনার বিরুদ্ধাচারণ আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আপনার নির্দেশ আমাদের শিরোধার্য। রাসূল সা. বললেনঃ এখন আমার করার কিছুই নেই। কারণ একজন নবী অস্ত্র সজ্জিত হলে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। এই সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসার কোন অবকাশ থাকে না। (তাবাকাত- ২/২৬) উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে যুদ্ধ শুরু হলো। প্রথম দিকে মুসলিম বাহিনীর বিজয় হলেও শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের প্রবল আক্রমণের মুখে তারা পিছু হটে গেল। দারুন একটা বিপর্যয় ঘটে গেল। এ সময় হযরত রাসূলে কারীম সা. অটল ও দৃঢ় থাকেন। অন্য যে পনেরো ব্যক্তি রাসূলে সা. পাশে অটল থাকেন তাঁদের একজন সা’দ ইবন মু’য়াজ। এই উহুদে তাঁর ভাই ’আমর ইবন মু’য়াজ শাহাদাত বরণ করেন। (তাবাকাত- ২/৩০; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৮, ৩২৯)। উহুদ যুদ্ধের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. একদিন আনসারদের বনী আবদুল আশহাল ও জুফার গোত্রের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন, ঐ গোত্রদ্বয়ের মেয়েরা উহুদে শাহাদাত প্রাপ্ত তাদের লোকদের জন্য কান্নাকাটি ও মাতম করছে। দয়ার নবীর দু’টি চোখ পানিতে ভরে গেল। তিনিও কাঁদলেন। তারপর বললেনঃ ‘কিন্তু ‘হামযার’ জন্য কাঁদার তো কেউ নেই।’ সা’দ ইবন মু’য়াজ ও উসাইদ ইবন হুদাইর নিজ গোত্র বনী আবদুল আশহালে ফিরে যখন একথা শুনলেন তখন তাঁরা তাঁদের গোত্রের মহিলাদের নির্দেশ দিলেনঃ ‘তোমরা রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীতে যাও এবং তাঁর চাচা হামযার জন্য শোক ও মাতম কর।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৯৯) মদীনার ইহুদী গোত্র বনী কুরায়জার নেতা কা’ব ইবন আসাদ তার গোত্রের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে একটি মৈত্রী চুক্তি সম্পাদন করেছিল। খন্দক যুদ্ধের সময় সে বনী নাদার গোত্রের নেতা হুয়ায় ইবন আখতাবের কুপরামর্শ ও উস্কানিতে সেই চুক্তি ভেঙ্গে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। একথা রাসূলুল্লাহ সা. সহ মুসলমানদের কানে গেল। রাসূল সা. ঘটনার যথার্থতা যাচাইয়ের জন্য আউস গোত্রের পক্ষ থেকে সা’দ ইবন মু’য়াজ ও খাযরাজ গোত্রের পক্ষ থেকে সা’দ ইবন ’উবাদাকে পাঠান। তাদের সাথে আরও যান আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও খাওয়াত ইবন জুবায়র। তাঁরা বনী কুরায়জায় যান এবং তাদের সাথে আলোচনা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে, বিষয়টি সত্য। তাঁরা ফিরে এসে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট তাঁদের তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ বিপোর্ট পেশ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২১) হযরত সা’দের দৃঢ়তার বহু কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এমন একটি ঘটনা বালাজুরী ও ইবনুল আসীর বর্ণনা করেছেন। গাতফান গোত্রের নেতা আল-হারেস ইবন আউফ ও ’উয়ায়না ইবন হিসনের সাথে রাসূল সা. এ শর্তে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা করলেন যে, তাদের পক্ষ থেকে মদীনার প্রতি কোন প্রকার হুমকী থাকবে না এবং বিনিময়ে তারা মদীনায় উৎপন্ন শস্যের এক তৃতীয়াংশ লাভ করবে। এর মধ্যে হিঃ ৫ম সনে খন্দক যুদ্ধের ডামাডোলে মদীনায় দারুণ অভাব দেখা দিল। রাসূলে কারীম সা. এ সন্ধির ব্যাপারে সা’দ ইবন মু’য়াজ ও সা’দ ইবন ’উবাদার সাথে পরামর্শ করলেন। তাঁরা দু’জন বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল। এ যদি আপনার পসন্দ হয়, আমরা তা পালন করবো। যদি আল্লাহর নির্দেশ হয় তা হলে তো অবশ্যই পালনীয়। তবে কি এটা আমাদের কথা চিন্তা করে করছেন?’ তিনি বললেনঃ ‘হ্যা, তোমাদের কথা চিন্তা করেই করছি। আমি দেখেছি, গোটা আরব এখন তোমাদের বিরুদ্ধে। আমি চেয়েছি, অন্ততঃ এর বিনিময়ে তাদের শত্রুতা কিছুদিনের জন্য বন্ধ থাকুক।’ একথা শুনে সা’দ ইবন মু’য়াজ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! তারা ও আমরা ছিলাম এক সাথে পৌত্তলিক। আমরা কেউ আল্লাহর ইবাদাত করতাম না, তাঁকে জানতামও না। তখনও তারা ব্যবসা উপলক্ষে এবং অতিথি হিসেবে ছাড়া আমাদের একটি খেজুরও খাওয়ার আশা করেনি। আজ আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, আল্লাহ ইসলাম ও আপনার দ্বারা আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আর এখন কিনা আমাদের সম্পদের একটি অংশ তাদেরকে দিতে হবে? এমন সন্ধির প্রয়োজন আমাদের নেই। আল্লাহ আমাদের ও তাদের মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালা না করা পর্যন্ত শুধু তরবারি ছাড়া আর কিছুই আমরা তাদেরকে দিব না।’ রাসূল সা. তাঁর কথা মেনে নিলেন। (আল-বিদায়া- ৪/১০৪; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৪৬, ৩৪৭) যুদ্ধ শুরুর সময় প্রায় কাছাকাছি। সা’দ বর্ম পরে হাতে বর্শা নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছেন। পথে বনী হারেছার দূর্গে তাঁর মা উম্মুল মুমিনীন হযরত ’আয়িশার রা. পাশে বসে ছিলেন। তিনি দেখলেন, তাঁর ছেলে একটি কবিতার চরণ আবৃত্তি করতে করতে চলেছে। তার একটি পংক্তি এমনঃ ‘যখন আজল এসে যায় তখন আর মৃত্যুর জন্য আপত্তি কিসের।’ মা চেঁচিয়ে বললেনঃ ‘ছেলে! তুমি তো পিছনে পড়ে গেছ, তাড়াতাড়ি যাও।’ সা’দের যে হাতে বর্শা ছিল সেই হাতটি বর্মের বাইরে বেরিয়ে ছিল। সে দিকে ইঙ্গিত করে হযরত আয়িশা বললেনঃ ‘সা’দের মা! দেখ, তার বর্মটি কত ছোট।’ যুদ্ধ ক্ষেত্রে পৌঁছার সাথে সাথে তাঁকে লক্ষ্য করে হিববান ইবন ’আবদি মান্নাফ একটি তীর ছোঁড়ে। কোন কোন বর্ণনায় হিববানের পরিবর্তে আবু উসামা অথবা খাফাজা ইবন ’আসিমের নাম এসেছে। তীরটি তাঁর হাতে লেগে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করে। খুশীর চোটে হিব্বান বলে ওঠে ‘আমি ’আরিকার পুত্র।’ একথা শুনে রাসূল সা., মতান্তরে সা’দ বলে ওঠেনঃ ‘দোযখের মধ্যে আল্লাহ তোমার মুখমণ্ডল ঘামে নিমজ্জিত করুন।’ উল্লেখ্য যে, ’আরাকার অর্থ ঘাম। (দ্রঃ সীরাতু ইবন হিশামঃ ২/২২৬-২২৮; উসুদুল গাবা- ২/২৯৬) সেকালে মসজিদে নববীতে যুদ্ধে আহতদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য একটি শিবির স্থাপন করা হয়েছিল। সম্ভবতঃ এই শিবিরের প্রতিষ্ঠা হয় উহুদ যুদ্ধের পর এবং তা ছিল রাসূলুল্লাহর সা. হুজরার নিকটে। আসলাম গোত্রের ’উফাইদা’ নাম্নী এক সেবা পরায়না সৎকর্মশীলা মহিলা ছিলেন এই শিবিরের একজন সেবিকা। তিনি আহতদের সেবা ও চিকিৎসা করতেন। রোগীর সেবা ও ক্ষত চিকিৎসায় তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ। খন্দক যুদ্ধে সা’দ ইবন মু’য়াজ আহত হলে রাসূল সা. নির্দেশ দেনঃ ‘তোমরা সা’দকে রুফাইদার তাঁবুতে রাখ। তাহলে আমি নিকট থেকেই তার দেখাশুনা করতে পারবো।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৩৯; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭; দায়িরা-ই-মা’রিফ-ইসলামিয়্যা, উর্দু- ১১/৩৩) হযরত রাসূলে কারীম সা. প্রতিদিন এই শিবিরে এসে অসুস্থ সা’দের দেখাশুনা করতেন। তিনি নিজের জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েন, তাই আল্লাহর দরবারে দু’আ করেনঃ ‘হে আল্লাহ! কুরাইশদের সাথে এ সংঘাত যদি এখনও অবশিষ্ট থাকে তবে আমাকে বাঁচিয়ে রাখুন। তাদের সাথে লড়াই করার আমার খুব সাধ। কারণ, আপনার রাসূলকে তারা কষ্ট দিয়েছে, তাঁকে অস্বীকার করেছে এবং মাতৃভূমি মক্কা থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আর যদি সংঘাত শেষ হওয়ার সময় হয়ে থাকে তাহলে এই ক্ষতের দ্বারাই আমাকে শাহাদাত দান করুন। আর বনী কুরায়জার ব্যাপারে আমার চোখে প্রশান্তি না আসা পর্যন্ত আমার মরণ দিও না।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২২৭; উসুদুল গাবা- ২/২৯৬; বুখারী- ২/৫৯১) আল্লাহ পাক তাঁর দু’আর শেষ কথাটি কবুল করেন। খন্দক যুদ্ধে কুরাইশ ও তাদের মিত্র বাহিনীর পশ্চাদপসরণের পর রাসূল সা. মদীনার যাবতীয় ফাসাদের উৎস ইহুদী গোত্র বনু কুরায়জাকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ তারা চুক্তি ভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। এই বনী কুরায়জার সাথে প্রাচীনকাল থেকে মদীনার আউস গোত্রের মৈত্রী চুক্তি ছিল। রাসূল সা. যখন তাদেরকে শাস্তি দানের সিদ্ধান্ত নিলেন তখন আউস গোত্রের লোকেরা বললোঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের প্রতিপক্ষ খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে তারা ছিল আমাদের মিত্র। এর আগে আপনি আমাদের ভাই খাযরাজীদের মিত্র গোত্র বনী কায়নুকা’র বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তা তো আপনার জানা আছে।’ মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলুলও একই রকম কথা বললো। আসলে তারা রাসূলুল্লাহর সা. পক্ষ থেকে বনী কুরায়জার ব্যাপারে কোন কঠিন দন্ডের আশংকা করছিল। রাসূল সা. বললেনঃ ‘ওহে আউস গোত্রের লোকেরা! তোমাদের গোত্রের কেউ একজন তাদের ব্যাপারে ফায়সালা দিলে তোমরা কি তাতে খুশী হবে?’ তারা বললোঃ হ্যাঁ, খুশী হবো।’ রাসূল সা. বললেনঃ ‘তাদের ব্যাপারে সা’দ ইবন মু’য়াজ রায় দেবে।’ বনী কুরায়জার ভাগ্য নির্ধারণের জন্য রাসূল সা. এভাবে সা’দ ইবন মু’য়াজকে বিচারক নিয়োগ করলেন। সা’দ তো তখন আহত অবস্থায় দারুণ অসুস্থ। আউস গোত্রের লোকেরা উটের পিঠে গদি বসিয়ে তার ওপর সা’দকে উঠিয়ে রাসূলের সা. নিকট নিয়ে গেল। তারা সা’দকে বললোঃ ‘আবু ’আমর! আপনার মিত্রদের সাথে একটু ভালো আচরণ করবেন। সম্ভবতঃ এ জন্যই রাসূল সা. আপনাকে বিচারক মনোনীত করেছেন।’ তারা বেশী বাড়াবাড়ি শুরু করলে সা’দ বললেনঃ ‘আল্লাহর হুকুম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন নিন্দুকের নিন্দার বিন্দুমাত্র পরোয়া সা’দের নেই।’ সা’দ যখন রাসূলের সা. নিকট পৌঁছুলেন তখন রাসূল সা. আশেপাশে বসা আনসার ও মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘কু মু ইলা সায়্যিদিকুম- তোমাদের নেতার সম্মানার্থে তোমরা উঠে দাঁড়াও।’ সা’দের গোত্রের লোকেরা বিচারের ক্ষেত্রে একটু নমনীয় হওয়ার জন্য যখন আবারও পীড়াপীড়ি শুরু করলো তখন তিনি বললেনঃ ‘এ ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার ও চুক্তি অনুসরণ করা উচিত।’ তারপর রাসূল সা. সা’দকে লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘এই লোকেরা তোমার রায়ের অপেক্ষায় আছে।’ সা’দ বললেন, ‘আমি আমার রায় ঘোষণা করছিঃ তাদের মধ্যে যারা যুদ্ধ করার উপযুক্ত তাদেরকে হত্যা করা, তাদের নারী ও শিশুদেরকে দাস-দাসীকে পরিণত করা এবং তাদের ধন-সম্পদ বন্টন করে দেওয়া হোক।’ তাঁর এই রায় শুনে রাসূল সা. বলেনঃ ‘সাত আসমানের ওপর থেকে আল্লাহ যে ফায়সালা দিয়েছেন তুমিও ঠিক একই ফায়সালা দিয়েছ।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৩৯, ২৪০; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭; আল-ইসাবা- ২/৩৮) বনী কুরায়জার ব্যাপারে সা’দের রায় বাস্তবায়িত হওয়ার পর অল্প কিছু দিন তিনি জীবিত ছিলেন। একদিন রাসূল সা. নিজ হাতে তাঁর ক্ষতে সেঁক দেন। তাতে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়ে ফুলে যায়। হঠাৎ একদিন ক্ষতটি ফেটে তীব্র বেগে রক্ত ঝরতে থাকে। ইবন ‘আব্বাস বলেনঃ যখন সা’দের ক্ষত থেকে রক্ত প্রবাহ শুরু হয় তখন রাসূল সা. দৌড়ে এসে তাঁর মাথাটি কোলের ওপর উঠিয়ে নেন। সা’দের রক্তে রাসূলের সা. চেহারা ও দাড়ি ভিজে যায়। রাসূল সা. একটি সাদা চাদর দিয়ে তাঁর দেহটি ঢেকে দেন। চাদরটি এত ছোট ছিল যে, মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে যাচ্ছিল। সা’দ ছিলেন ফর্সা মোটা মানুষ। রাসূল সা. তখন সা’দের জন্য দু’আ করেন এই বলেনঃ ‘হে আল্লাহ! সা’দ তোমার রাস্তায় জিহাদ করেছেন, তোমার নবীকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছে এবং তাঁর পথে চলেছে। তুমি তাঁর রূহকে সর্বোত্তমভাবে কবুল কর।’ রাসূলের সা. এই দু’আ শুনে সা’দ চোখ খোলেন এবং বলেনঃ ‘আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। (তাবাকাত- ৩/৪২৬; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৫৭) হযরত সা’দ ইনতিকাল করলেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ ‘সা’দ ইবন মু’য়াজ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর রাতের বেলা একটি রেশমী পাগড়ী মাথায় বেঁধে জিবরীল আ. রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বলেনঃ ‘ইয়া মুহাম্মদ! এ মৃত ব্যক্তিটি কে, যার জন্য আসমানের সবগুলি দরযা খুলে গেছে এবং ’আরশ কেঁপে উঠেছে?’ রাসূল সা. কাপড় টানতে টানতে খুব দ্রুত সা’দের নিকট গিয়ে দেখলেন, তিনি ইনতিকাল করেছেন। (তাবাকাত- ৩/৪৩২; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫০, ২৫১) রাসূল সা. সা’দের মাথাটি কোলের মধ্যে নিয়ে বসে থাকলেন। তখনও তাঁর হাত থেকে রক্ত ঝরছিল। চতুর্দিক থেকে মানুষ ছুটে আসতে লাগলো। আবু বকর রা. দৌড়ে এসে লাশ দেখে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। রাসূল সা. তাঁকে এমনটি করতে নিষেধ করলেন। ’উমার রা. কাঁদতে কাঁদতে ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ পাঠ করলেন। গোটা তাঁবুতে একটি কান্নার রোল পড়ে গেল। সা’দের দুখিনী মা কাঁদতে কাঁদতে একটি কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলেন। ’উমার রা. তাঁকে কবিতা পড়তে নিষেধ করলেন; কিন্তু রাসূল সা. বললেনঃ থাক, তাকে পড়তে দাও। অন্য বিলাপ কারিনীরা মিথ্যা বলে থাকে; কিন্তু সা’দের মা সত্য বলছে।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২; তাবাকাত- ৩/২২৮, ২২৯) হযরত রাসূলে কারীম সা. সা’দের মৃত্যুর পর তাঁর বাড়ীতে যাচ্ছিলেন। সাহাবীরাও সংগে ছিলেন। তিনি এত দ্রুত চলছিলেন যে, সাহাবীরা তাঁর অনুসরণ করতে গিয়ে অক্ষম হয়ে পড়ছিলেন। একজন তো বলেই বসলেন; ‘আপনি এত দ্রুত চলছেন কেন? আমরা তো রীতিমত ক্লান্ত হয়ে পড়ছি।’ রাসূল সা. বললেনঃ ‘আমার ভয় হচ্ছে, আমাদের আগেই ফিরিশ্তারা তাকে গোসল না দিয়ে ফেলে, যেমন দিয়েছিল হানজালাকে।’ (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৫) রাসূল সা. সা’দের জানাযার সাথে গোরস্তানে গিয়েছিলেন। মুনাফিকরাও গিয়েছিল। তাঁর লাশ হালকা বোধ হচ্ছিলো। এজন্য মুনাফিকরা বলাবলি করছিল, এমন হালকা লাশ তো আমরা আর কখনও দেখিনি। সম্ভবতঃ বনী কুরায়জার ব্যাপারে সে যে রায় দিয়েছিল, এটা তারই কুফল। কথাটি রাসূলুল্লাহর সা. কানে গেলে তিনি বললেন, ‘যাঁর হাতে আমার জীবন তাঁর নামে শপথ! ফিরিশতাকুল তাঁর খাটিয়া বহন কেরছে।’ ইবন ’উমার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. আরও বললেনঃ ‘নিশ্চয় এই সা’দ অতি নেক্কার বান্দা। তার জন্য আল্লাহর ’আরশ দুলে উঠেছে, আসমানের দরযাসমূহ খুলে গেছে এবং তাঁর জানাযায় এমন ৭০ হাজার ফিরিশতা যোগদান করেছে যারা এর আগে আর কখনও পৃথিবীতে আসেনি।’ (তাবাকাত- ৩/৪৩০; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫১) ইবন ইসহাক জাবির থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ ‘সা’দকে দাফনের সময় আমরা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ছিলাম। তিনি প্রথমে, একবার জোরে ‘সুবহানাল্লাহ’ উচ্চারণ করলেন। লোকেরাও তাঁর সাথে ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়লেন। তারপর তিনি ‘তাকবীর’ ধ্বনি দিলেন, লোকেরাও ‘তাকবীর’ দিল। লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এভাবে ‘তাসবীহ’ পড়লেন কেন? বললেনঃ এ নেক্কার লোকটির কবর বড় সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর আল্লাহ পাক প্রশস্ত করে দিয়েছেন।’ (তাবাকাত- ৩/৪৩২; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫১, ২৫২) হযরত সা’দকে দাফনের পর রাসূলে কারীমকে সা. দারুণ বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। চোখ দিয়ে ক্রমাগতভাবে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। আল-ইস্তীয়াব গ্রন্থকার বলেছেনঃ ‘খন্দক যুদ্ধের একমাস এবং বনী কুরায়জার ঘটনার কয়েক রাত্রি পর হিজরী পঞ্চম সনে সা’দের ওফাত হয়।’ (টীকাঃ আল-ইসাবা- ২/২৮) মদীনার বাকী গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। (আল-আ’লাম- ৩/১৩৯) ইবন ইসহাক তাঁকে খন্দক যুদ্ধে বনী ’আবদিল আশহালের শাহাদাত প্রাপ্তদের মধ্যে গণ্য করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২) হযরত সা’দের ওফাতের ঘটনাটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক অসাধারণ ঘটনা। তিনি ইসলামের খিদমতে যে অবদান রাখেন এবং তাঁর মধ্যে যে ঈমানী চেতনা বিদ্যমান ছিল, তার জন্য তাঁকে আনসারদের ‘আবু বকর’ বলে গণ্য করা হতো। ‘ইফক’ বা হযরত আয়িশার প্রতি মিথ্যা অপবাদের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে একদিন রাসূল সা. ক্ষোভের সাথে বললেনঃ ‘এ আল্লাহর দুশমন (আবদুল্লাহ ইবন উবাই, মুনাফিক সর্দার) আমাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছে। তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে এর প্রতিবিধান করতে পারে? ’সাথে সাথে সা’দ উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলেনঃ ’আউস গোত্রের কেউ থাকলে আমাকে বলুন, আমরা তার গর্দান উড়িয়ে দিচ্ছি। আর যদি আমাদের ভাই খাযরাজীদের কেউ হয়, আমাদেরকে নির্দেশ দিন, আমরা আপনার নির্দেশ বাস্তবায়ন করবো।’ (শাহীরাতুন নিসা ফিল ’আলম আল-ইসলামী- ৫৯) তাঁর মৃত্যুর ঘটনাটি যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বুঝা যায় তাঁর জানাযায় ফিরিশতাদের অংশগ্রহণ এবং আল্লাহর ’আরশ কেঁপে উঠার মাধ্যমে। তাই একজন আনসারী কবি গর্ব করে বলেছিলেনঃ ‘একমাত্র সা’দ আবু ’আমরের মৃত্যু ছাড়া আর কোন মরণশীলের মৃত্যুতে আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠেছে, এমন কথা আমরা কখনও শুনিনি।’ এমনিভাবে রাসূলুল্লাহর সা. দরবারী কবি হাস্সান ইবন সাবিতও তাঁর অনেক কবিতায় সা’দের প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক জ্ঞাপন করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২, ২৬৯, ২৭০, ২৭২) হযরত সা’দ ছিলেন ফর্সা, দীর্ঘদেহী, সুদর্শন পুরুষ। মৃত্যুকালে ’আমর ও আবদুল্লাহ নামে দুই ছেলে রেখে যান। তাঁরা দু’জনই বাই’য়াতে রিদওয়ানে শরীক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁদের মা হিন্দা বিনতু সাম্মাকও ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. সম্মানিত সাহাবিয়্যা। (তাবাকাত- ৪২০, ৪৩৩) মদীনায় ইসলামের প্রথম ভাগেই হযরত সা’দের ওফাত হয়। জীবনের মাত্র পাঁচটি বছর রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্য লাভের সৌভাগ্য অর্জন করেন। এ অল্প সময়ে তিনি হয়তো বহু হাদীস শুনে থাকবেন; কিন্তু হাদীস বর্ণনার সিলসিলা যেহেতু রাসূলুল্লাহর সা. দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার পর শুরু হয়, এ কারণে তাঁর বর্ণনা প্রচারিত হয়নি। তবে সহীহ বুখারীতে ’আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদের একটি বর্ণনা এসেছে যাতে সা’দের ’উমরার কথা আছে এবং উহুদে সা’দ ইবন রাবী’র শাহাদাতের ঘটনা প্রসঙ্গে আনাস রা. তাঁর থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। এটাও বুখারীতে এসেছে। (তাহজীব আত-তাহজীব- ৩/৪৮২) নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে হযরত সা’দ ইবন মু’য়াজ ছিলেন অতি উঁচুমানের লোক। ’আয়িশা রা. বলেনঃ ‘রাসূলুল্লাহর সা. পরে বনী ’আবদুল আশহালে তিন ব্যক্তি থেকে উত্তম আর কেউ নেই। তাঁরা হলেনঃ সা’দ ইবন মু’য়াজ, উসাইদ ইবন হুদাইর ও ’আব্বাদ ইবন বিশর।’ (আল-ইসাবা- ২/৯৭) সা’দ নিজেই বলতেনঃ আমি একজন সাধারণ মানুষ, তবে তিনটি বিষয়ে যে পর্যন্ত পৌঁছানো উচিত, আমি সেখানে পৌঁছেছি। ১. রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে যে বাণী আমি শুনি তা সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে বিশ্বাস করি। ২. নামাযের মধ্যে অন্য কোন চিন্তা আমার মনে জাগে না। ৩. মৃত ব্যক্তির জানাযার কাছে থাকলে মুনকির- নাকীরের প্রশ্নের চিন্তা ছাড়া আমার মধ্যে আর কিছু থাকে না। (টীকাঃ আল ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ২/৩৩; তাহজীব আত তাহজীব- ৩/৪৮২) হযরত সা’দের ’আমলের ওপর হযরত রাসূলে কারীমের সা. যে দারুণ আস্থা ছিল সে কথা একটি হাদীসে জানা যায়। হযরত ’আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘কবরের একটি চাপ অবশ্যই আছে। যদি কেউ এই চাপ থেকে রেহাই পেয়ে থাকে, তাহলে সে সা’দ ইবন মু’য়াজ।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৫২; তাবাকাত- ৩/২৫২; তাবাকাত- ৩/৪৩২। তাছাড়া ইমাম আহমাদ ও বায়হাকীও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন) কিন্দার রাজা উকাযদারকে খালিদ ইবন ওয়ালীদ বন্দী করে মদীনায় নিয়ে এলেন। তার মূল্যবান পোশক দেখে, মতান্তরে রাসূলকে সা. উপহার দেওয়া একখানা কাপড় দেখে সাহাবীরা অভিভূত হয়ে গেলেন। তাঁদের এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. বললেনঃ ‘তোমরা এই দেখে অবাক হচ্ছো? জান্নাতে সা’দ ইবন মু’য়াজের রুমালগুলিও এর থেকে সুন্দর হবে।’ (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৮৩; তাবাকাত- ৩/৪৩৬; উসুদুল গাবা- ২/২৯৭; উবন হিশাম- ২/৫২৬; সহীহ বুখারী- ১/৫৩৬) আবু সা’ঈদ আল-খুদরী রা. বলেনঃ ‘যাঁরা বাকী গোরস্তানে সা’দের কবর খুঁড়েছিল আমি তাঁদের একজন। আমরা কবরের মাটি খোঁড়ার সময় মিশকের ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম। শুরাহবীল ইবন হাসানা বলেনঃ এক ব্যক্তি সা’দের কবরের মাটি থেকে এক মুঠ মাটি নিয়ে ঘরে রেখে দেয়। কিছুদিন পরে সে দেখে, তা মাটি নয়; বরং মিশ্ক। (তাবাকাত- ৩/৪৩১; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯৫)
আবু আইউব আল-আনসারী (রা)

নাম খালিদ, ডাক নাম আবু আইউব। পিতা যায়িদ ইবন কুলাইব আল-নাজ্জারী আল-খাযরাজী। কেউ কেউ মালিক ইবন নাজ্জারের সাথে সম্পর্কের কারণে ‘আল-মালিকী’ এবং আনসারদের ‘আযদী’ হওয়ার কারণে তাঁকে ‘আল-আযদী’ বলেও উল্লেখ করে থাকেন। (দারিয়া-ই মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা, উর্দু ১/৭৪২), মাতা হিন্দা বিনতু সা’দ। (উসুদুল গাবা- ২/৮০) তবে ইবন সা’দের মতে যাহরা বিনতু সা’দ। (তাবাকাত- ৩/৪৮৪) ‘যাহরা’ আবু আইউবের পিতার মামাতো বোন। আবু আইউব চল্লিশ ‘আমুল ফীল’ (হস্তী বৎসর) অর্থাৎ হিজরাতের একত্রিশ বছর পূর্বে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি ‘আবু আইউব’ ডাক নামে পরিচিত। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা, (উর্দু)- ১/৭৪২) নাজ্জার খান্দানটি ইয়াসরিবের অন্যতম অভিজাত খান্দান। আর সেই আভিজাত্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে রাসূলুল্লাহর সা. মাতুল গোত্র হওয়ার কারণে। আবু আইউব এই অভিজাত নাজ্জার গোত্রের রয়িস বা নেতা। রাসূলুল্লাহ সা. মক্কায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন। ইসলামী দাওয়াতের জন্য মক্কার প্রতিকূল অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকেই ধাবিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইয়াসরিবেও ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়েছে। নবুওয়াতের দশম বছরে ছয় জন, একাদশ বছরে বারোজন এবং দ্বাদশ বছরে তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জন ইয়াসরিববাসী (মদীনা বাসী) হজ্জ উপলক্ষে মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একটি শপথ বাক্য উচ্চারণ করেন। ইতিহাসে যা ’আকাবার ১ম, ২য় ও ৩য় শপথ’ নামে পরিচিত। এই শেষ শপথে আবু আইউব উপস্থিত ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাইয়াত হতে ইয়াসরিবে ফিরে যান। (উসুদুল গাবা- ২/৮০, তাবাকাত ৩/৪৮৪) তিনি যে মহাসত্যের সন্ধান নিয়ে ফিরে এলেন তা অন্যদেরকে না জানানো পর্যন্ত স্থির হতে পারলেন না। নিকট আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের আপনজনদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করলেন। শিগগিরই স্ত্রীকে স্বধর্মে টেনে আনলেন। আকাবার শপথগুলিতে মদীনার বেশ কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করায় এবং মদীনায় প্রেরিত রাসূলুল্লাহর সা. প্রতিনিধি মুসয়াব ইবন ’উমাইরের রা. প্রচেষ্টায় সেখানে ইসলামী দাওয়াত খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো। এদিকে রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশে অনেক নির্যাতিত মুসলমান মক্কা থেকে চুপে চুপে হিজরাত করে মদীনায় চলে আসতে শুরু করলেন। কিন্তু হযরত রাসূলে কারীম সা. তখনও কুরাইশদের বৈরী পরিবেশের মধ্যে মক্কায় অবস্থান করতে লাগলেন। অবশেষে নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছরে আল্লাহর নির্দেশে তিনিও মদীনার দিকে বেরিয়ে পড়লেন। মদীনাবাসীরা অধীর আগ্রহে মহানবীর আগমন অপেক্ষায় ছিল। আনসারদের একটি দল- আবু আইউব তাদের একজন- নিয়মিত প্রতিদিন সকালে মদীনার ৪/৫ মাইল দূরে ‘হাররা’ নামক স্থানে চলে যেত এবং রাসূলুল্লাহর সা. সম্ভাব্য আগমন পথের দিকে তাকিয়ে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতো। তারপর এক সময় তারা ফিরে যেত। এমনিভাবে একদিন তাঁরা ফিরে যাচ্ছে, এমন সময় জনৈক ইয়াহুদী বহু দূর থেকে রাসূলুল্লাহকে সা. দেখতে পেয়ে তাদেরকে সুসংবাদ দেয়। আনসাররা অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে মহানবীকে স্বাগতম জানানোর জন্য দ্রুত ছুটে যায়। বনু নাজ্জার ছিল তাদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী। মদীনার উপকণ্ঠে ‘কুবা’ পল্লীতে হযরত রাসূলে কারীম সা. কয়েক দিন অবস্থান করলেন। অতঃপর তিনি মদীনার মূল শহরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কুবা থেকে মদীনার দিকে তাঁর যাত্রার সেই দিনটি ছিল মদীনার ইতিহাসের সর্বাধিক গৌরব ও কল্যাণময় দিন। বনী নাজ্জারসহ মদীনার সকল আনসার গোত্রের লোক মহানবীর চলার পথের দু’ধারে কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে, আর গোত্র-পতিরা নিজ নিজ ঘরের দরযায় অপেক্ষমান। পর্দানশীল মেয়েরা ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে এবং হাবশী গোলামরা আনন্দ-ফুর্তিতে সামরিক কলা-কৌশল প্রদর্শনে মেতে উঠেছে। আর বনী নাজ্জারের ছোট ছেলে-মেয়েরা ‘তালায়াল বাদরু আলাইনা’- স্বাগতম সঙ্গীতটি সমবেত কণ্ঠে গেয়ে চলেছে। এমনি এক জাঁকালো ও পবিত্র অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে মহানবী মদীনায় প্রবেশ করলেন। মহানবীর আতিথেয়তার সৌভাগ্য কার হয় তা দেখার জন্য মদীনার প্রতিটি লোক অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল। তিনি পথ অতিক্রম করছেন, আর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা- আহলান, সাহলান ওয়া মারহাবান- স্বাগতম শুভাগমন ইত্যাদি বলে এগিয়ে এসে নিজ নিজ বাড়ীতে মেহমান হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে কিন্তু আল্লাহ পাক তো মহানবীর আতিথেয়তার জন্য আবু আইউবের বাড়ীটি নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর বাহন উটনীটির পথ রোধকারীদের বার বার বলছিলেনঃ ‘তোমরা তার পথটি ছেড়ে দাও, সে (আল্লাহর তরফ থেকে) নির্দেশ প্রাপ্ত।’ (উসুদুল গাবা- ২/৮০) ইমাম মালিক বলেন, সেই সময় রাসূলুল্লাহর সা. মধ্যে ওহীর অবস্থা বিরাজমান ছিল। তিনি অবতরণ স্থল নির্ণয়ের ব্যাপারে ওহীর প্রতীক্ষায় ছিলেন [সীয়ারে আনসার (উর্দু)- ১/১১০] উটনী চলতে চলতে এক সময় বনী মালিক ইবন নাজ্জারের মধ্যে এক স্থানে (পরবর্তীকালে মসজিদে নববীর দরযায়) বসে পড়ে। তারপর একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার উঠে পড়ে এবং একটু এদিক সেদিক ঘুরে আবার পূর্ব স্থানে ফিরে এসে বসে পড়ে। রাসূলুল্লাহ সা. নেমে পড়েন। নিকটেই ছিল আবূ আইউবের বাড়ী। (উসুদুল গাবা- ২/৮১) আবু আইউব এগিয়ে এসে আরজ করেন নিকটেই আমার বাড়ী, অনুমতি পেলে বাহনের পিঠ থেকে জিনিস পত্র নামাতে পারি। নিজের বাড়ীতে মেহমানদারি করার অভিলাষীদের ভিড় কিন্তু তখনও কমেনি। সবারই একান্ত ইচ্ছা রাসূলুল্লাহ সা. তারই মেহমান হউন। শেষমেষ লোকেরা নিজেদের মধ্যে কারয়া বা লটারী করে এবং তাতে আবূ আইউবের নামটি ওঠে। এভাবে আবূ আইউব মহানবীর মেহমানদারির মহাগৌরব অর্জনের সুযোগ লাভ করেন। (সীয়ারে আনসার- ১/১১১) হযরত রাসূলে কারীম সা. মসজিদ ও মসজিদ সংলগ্ন তাঁর বাসস্থান তৈরী না হওয়া পর্যন্ত প্রায় ছয় মাস আবূ আইউবের গৃহে অবস্থান করেন। অত্যন্ত প্রীতি ও বিনয়ের সাথে তিনি মেহমানদারির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ঘরটি ছিল দুইতলা। তবে ছাদটি ছিল সাদামাটা ধরণের। আবূ আইউব ওপরতলা রাসূলুল্লাহর সা. জন্য নির্ধারণ করেন। কিন্তু রাসূল সা. নিজের ও সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে নীচতলাই পছন্দ করেন। এভাবে দিন কেটে যেতে লাগলো। ঘটনাক্রমে একদিন ওপর তলায় পানির একটি কলস ভেঙ্গে পানি গড়িয়ে পলো। ছাদ ছিল অতি সাধারণ। পানি নীচে গড়িয়ে পড়বে এবং তাতে রাসূলুল্লাহর সা. কষ্ট হবে, এমন একটা ভীতি ও শঙ্কায় আবূ আইউব ও তাঁর স্ত্রী উম্মু আইউব অস্থির হয়ে পড়লেন। তাঁদের ছিল একটি মাত্র লেপ। পানি চুষে নেওয়ার জন্য তাঁরা সেটি পানির ওপর ফেলে দেন। সাথে সাথে তাঁরা নীচে নেমে এসে রাসূলুল্লাহকে সা. ওপরে যাওয়ার অনুরোধ করে নিজেরা নীচে নেমে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮১) এতটুকু কষ্ট অবশ্য তাঁদের জন্য তেমন কিছু ছিল না। তাঁরা অন্য একটি ভয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। ‘আমরা ওপরে আর ওহীর বাহক, আমাদের নীচে’ এমন একটা তীব্র অনুভূতি তাদেরকে অস্থির করে তুললো। একটি রাত তো তাঁরা ঘুমাতেই পারলেন না। স্বামী-স্ত্রী দু’জনই ঘরের এক কোণে গুটি-শুটি মেরে কোন মতে জেগে কাটিয়ে দিলেন। সকালে আবূ আইউব রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে গতরাতের ঘটনা ও তাঁদের অনুভূতির কথা ব্যক্ত করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাঁদের আবেদন মঞ্জুর করেন। তিনি ওপরে চলে যান। (সূরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/৩২৮-৩২৯) হযরত আবূ আইউবের মৃত্যুর পর এই বাড়ীটি তাঁর আযাদকৃত দাস আফলাহ-এর হাতে চলে যায়। ঘরটির দেওয়াল ধসে গিয়ে বিরান হওয়ার উপক্রম হলে তাঁর নিকট থেকে এক হাজার দিনারের বিনিময়ে মুগীরা ইবন ’আবদির রহমান ইবন হারিস ইবন হিশাম খরীদ করে সংস্কার করেন। আর আফলাহ সেই অর্থ মদনিার গরীব-মিসকীনদের মধ্যে বন্টন করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৮, টীকা নং- ৩) হযরত রাসূলে কারীম সা আবূ আইউবের গৃহে অবস্থানকালে সাধারণতঃ আনসারগণ পালাক্রমে অথবা আবূ আইউব নিজে তাঁর জন্য খাবার পাঠাতেন। খাওয়ার পর যা বেঁচে যেত তিনি আবূ আইউবের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। আবূ আইউব খাবারের থালায় রাসূলুল্লাহর সা. আাঙ্গুলের ছাপ দেখে দেখে যে দিক থেকে তিনি খেয়েছেন সেখান থেকেই খেতেন। ঘটনাক্রমে একদিন রাসূল সা. খাবার স্পর্শ না করে, সবই ফেরত পাঠান। দ্বিধা ও সংকোচের সাথে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে খাবার গ্রহণ না করার কারণ জানতে চান। তিনি বলেন, খাবারে রসুন ছিল। আমি রসুন পছন্দ করিনে। তবে তোমরা খাবে। আবূ আইউব বললেন, ‘আপনার যা পছন্দ নয়, আমিও তা পছন্দ করবো না।’ (মুসলিম- ২/১৯৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৯৯, উসুদুল গাবা- ২/৮১) হিজরাতের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. হযরত আনাসের বাড়ীতে আনসার ও মুহাজিরদের সমবেত করেন এবং রুচি, সামাজিক মর্যাদা, ঝোঁক প্রবণতা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য অনুসারে একজন মুহাজির ও একজন আনসারের মধ্যে মওয়াখাত বা দ্বীনী ভ্রাতৃসম্পর্ক কায়েম করে দেন। ইয়াসরিবে ইসলামের প্রথম মুবাল্লিগ (প্রচারক) মুস’য়াব ইবন ’উমাইর আল-কুরাইশীর সাথে আবূ আইউবের ভ্রাতৃ-সম্পর্ক স্থাপিত হয়। (তাবাকাত- ৩/৪৮৪) মুস’য়াব প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা এক উৎসাহী সাহাবী। ইসলামী দা’ওয়াতের পথে তিনি বহু কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় হিজরাতের পূর্বে সর্বপ্রথম দায়ী (প্রচারক) হিসাবে তাঁকে মদনিায় পাঠান। তাঁর সাথে আবূ আইউবের ভ্রাতু-সম্পর্ক স্থাপনের তাৎপর্য হল, তাঁর মধ্যেও মুসয়াবের মত উৎসাহ উদ্দীপনা বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীকালে তাঁর জীবনের ঘটনাবলী একথার সত্যতা প্রমাণ করেছে। বদর, উহুদ, খন্দক, বাইয়াতুর রিদওয়ান সহ সকল যুদ্ধ ও অভিযানে আবূ আইউব রাসূলুল্লাহর সা. সাথে অংশগ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮০, আল-ইসাবা- ১/৪০৫) আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট তিনি সত্যিকারেই জীবন ও ধন-সম্পদ বিক্রী করে দিয়েছিলেন। রাসূলে পাকের সা. ওফাতের পর খলীফাদের যুগে যত যুদ্ধ হয়েছে, হাজারো দুঃখ-কষ্ট সত্ত্বেও তিনি তাঁর একটি থেকেও পিছিয়ে থাকেননি। রাত-দিন, প্রকাশ্যে ও নিরিবিলিতে সর্বক্ষণ তাঁর শ্লোগান ছিল আল্লাহর এই বাণী- ‘ইনফিরূ খিফাফান ওয়াসিকালান’- তোমরা হালকা এবং ভারী উভয় অবস্থায় যুদ্ধে বেরিয়ে পড়। (তাওবা- ৪১) অর্থাৎ একাকী ও দলবদ্ধভাবে, উদ্দমী ও হতোদ্দম অবস্থায়, যৌবনে ও বার্ধক্যে, প্রাচুর্য ও দারিদ্রের মধ্যে- মোটকথা সর্ব অবস্থায়। (ফাতহুল কাদীর- ২/২৬৩) তিনি বলতেনঃ আমি নিজেকে সব সময় ‘খাফীফ ও সাকীল’- ই পেয়েছি। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৫৭-৪৫৮, তাবাকাত- ৩/৪৮৫) রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর মাত্র একটি বার তিনি ঘর থেকে বের হননি। সেই যুদ্ধে খলীফা একজন কম বয়স্ক যুবককে সেনাপতি নিয়োগ করেন। যার নেতৃত্বের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট হতে পারেননি। সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে সেই সেনাপতি হলেন ইয়াযীদ ইবন মু’য়াবিয়া রা.। তবে বেশী দিন ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আবর্তে দোল খেতে থাকেন, অনুশোচনায় দগ্ধিভূত হন। অল্প দিনের মধ্যেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। আপন মনে বলে ওঠেনঃ কে আমার আমীর, তাতে আমার কী আসে যায়? এমন চিন্তার পর একটি মুহূর্তও নষ্ট না করে সাথে সাথে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। ইসলামী সেনা দলের একজন সৈনিক হিসাবে বেঁচে থাকা, তার পতাকাতলে যুদ্ধ করে ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখা- তিনি জীবনের পরম প্রাপ্তি বলে মনে করেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৬, হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৫৮) তিনি জিহাদের উদ্দেশ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ তিনটি মহাদেশেই গমন করেন। (দারিয়া-ই মা’যারিফ-ই-ইসলামিয়্যা- ১/৭৪৩) হিজরী ৩৫ সনে হযরত ’উসমান রা. যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা অবরুদ্ধ হন তখন আবূ আইউব মদীনা্য়। সেই দুর্যোগময় সময়ে মাঝে মাঝে তিনি মসজিদে নববীতে নামাযের ইমাম হতেন। আলী ও মু’য়াবিয়ার রা. মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকালীন সেই সংকটময় সময়ে তিনি বিনা দ্বিধায় আলীর রা. পক্ষ অবলম্বন করেন। কারণ, তাঁর মতে, তিনিই ইমাম, মুসলমানরা তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৭) ইবনুল আসীরের মতে আলীর রা. সাথে তিনি সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮১) মাস’উদী ‘মুরূপজ আজ-জাহব’ গ্রন্থে হিঃ ৩৬ সনে আলীর রা. সাথে উটের যুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণের কথা বলেছেন। ইবন আবদিল বার ‘আল-ইসতী’য়াব’ গ্রন্থে মাস’উদীর কথা সমর্থন করেছেন। তবে হিঃ ৪র্থ শতকের ঐতিহাসেকি মাস’উদীর পূর্বের কোন ঐতিহাসিক আবূ আ্ইউবের উটের যুদ্ধে যোগদানের কথা বলেছেন বলে জানা যায় না। খারেজীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘নাহরাওয়ানের’ যুদ্ধে তিনি যোগদান করেন। যুদ্ধের পূর্বে যাঁরা খারেজীদের সাথে আপোষরফার চেষ্টা করেন তাঁদের মধ্যে আবূ আইউবও একজন। তিনি আলীর রা. সাথে ‘মাদায়িন’ গমন করেন। তাঁর প্রতি আলীর রা. ছিল গভীর বিশ্বাস ও আস্থা। মদীনা থেকে ‘দারুল খিলফা’ (রাজধানী) কূফায় স্থানান্তরিত হলে আলী রা. তাঁকে মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান। আবূ আইউব সেই সময় মদীনায় আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। [সীয়ারে আনসার- ১/১১১, দারিয়া-ই মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা- (উর্দু) ১/৭৪৩] হযরত আলীর রা. শাহাদাতের সময় আবু আইউব মদীনায়। তারপর হযরত মুয়াবিয়া রা. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। আবূ আইউব চাওয়া-পাওয়ার লোক ছিলেন না। তাঁর একমাত্র বাসনা ছিল জিহাদের ময়দানে ও মুজাহিদদের সারিতে একটুখানি স্থান। হিজরী ৪২ সনে বাইজেন্টাইন রোমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের অভিযান বৃদ্ধি পায়। তিনি এ সময় খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের পুত্র আবদুর রহমানের নেতৃত্বে জিহাদে শরিক হন। তখন তাঁর বয়স ৭৫ বছর। হিঃ ৪২ সনে সামুদ্রিক যুদ্ধে যোগদানের জন্য মিসর গমন করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. বাইজেন্টাইন রোমানদের ঘাঁটি কনস্ট্যান্টিনোপল বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করে যান। কার হাতে এ বিজয়-কর্ম সমাধা হয় তা দেখার জন্য মুসলিম আমীরগণ সব সময় উৎসুক ছিলেন। হিঃ ৫২ মতান্তরে ৪৯ সনে হযরত মু’য়াবিয়া রা. রোমানদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। তিনি স্বীয় পুত্র ইয়াযীদকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে কনস্ট্যান্টিনোপল অবরোধের নির্দেশ দেন। এই বাহিনীতে ইবন ’উমার, ইবন ’আব্বাস ও ইবন যুবাইরের মত মর্যাদাবান সাহাবীদের সাথে আবূ আইউবও একজন সাধারণ সৈনিক হিসাবে যোগ দেন। মিসর, সিরিয়াসহ মুসলিম খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভিন্ন ভিন্ন সেনা ইউনিট এ যুদ্ধে যোগ দেয়। মিসরীয় সেনা ইউনিটের কমাণ্ডার ছিলেন তথাকার গভর্ণর প্রখ্যাত সাহাবী হযরত ’উকবা ইবন ’আমির আল-জুহানী। তাছাড়া ফুদালা ইবন ’উবাইদ ও আবদুর রহমান ইবন খালিদ ইবন ওয়ালীদের নেতৃত্বেও দু’টি সেনা ইউনিট যোগ দেয়। রোমানরা যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়বার জন্য এগিয়ে আসে। মুসলমানদের প্রস্তুতিও কম ছিল না। তাদের সংখ্যাও প্রায় শত্রুসংখ্যার সমান। মুসলিম সৈনিকদের মধ্যে আবেগ উৎসাহ এত তীব্র ছিল যে, কোন কোন ক্ষেত্রে একজন মাত্র মুসলিম সৈনিক রোমানদের একটি পুরো সারির বিরুদ্ধে লড়তে থাকে। একজন মুসলিম সৈনিক একবার একাই রোমানদের ব্যুহ ভেদে করে তাদের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তার এই দুঃসাহস দেখে অন্যান্য মুসলমানদের মুখ থেকে সমস্বরে এ কুরআনের আয়াতটি ধ্বনিত হয়ে ওঠেঃ লা তুলকূআয়দীকুম ইলাত তাহলুকাহ’- তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করোনা। (আল-বাকারা- ১৯৫) তাদের একথা শুনে আবূ আইউব এগিয়ে গিয়ে বললেনঃ তোমরা আয়াতটির এই অর্থ বুঝলে? এ আয়াতটি তো নাযিল হয়েছিল ব্যবসায় ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে আনসারদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে। একবার আসাররা বলল, গত বছর জিহাদে যোগদানের জন্য ব্যবসায়ের যে ক্ষতি হয়েছে এ বছর তা পুষিয়ে নিতে হবে। সেই প্রেক্ষাপটে এ আয়াতের অবতরণ। আয়াতটির তাৎপর্য হল, ধ্বংস জিহাদে নয়, জিহাদ ত্যাগ করা ও অতিরিক্ত ধন-সম্পদ আহরণে ব্যস্ত থাকার মধ্যে ধ্বংস। (সীয়ারে আনসার- ১/১১২, হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭০-৪৭১, ৪৫৮-৪৫৯, তাবাকাত- ৩/৪৮৪-৪৮৫) এই কনস্ট্যান্টিনোপল অভিযানের সফরে এক মহামারি দেখা দেয়। বহু মুজাহিদ সেই মহামারিতে মারা যান। আবু আইউবও আক্রান্ত হলেন। তিনি অন্তিম রোগ শয্যায়। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ইয়াযীদ ইবন মুয়াবিয়া শেষ বারের মত তাঁকে দেখতে এলেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘আবু আইউব, আপনার কিছু চাওয়ার আছে কি? আমি আপনার অন্তিম ইচ্ছা পূরণের চেষ্টা করবো।’ কিন্তু যে ব্যক্তি জান্নাতের বিনিময়ে নিজের সবকিছু বিক্রী করে দিয়েছেন, এ নশ্বর পৃথিবীতে তাঁর চাওয়ার কী থাকতে পারে? তিনি জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ইয়াযীদের কাছে যা আশা করলেন তা কোন মানুষের কল্পনায়ও আসতে পারে না। তিনি ধীর স্থিরভাবে বললেন, আমি মারা গেলে তোমরা আমার মৃতদেহটি ঘোড়ার ওপর উঠিয়ে শত্রু-ভূমির অভ্যন্তরে যতদূর সম্ভব নিয়ে যাবে এবং শেষ প্রান্তে দাফন করবে। মুসলিম বাহিনীকে এই পথে দ্রুত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে যাতে তাদের অশ্বের পদাঘাত আমার কবরের ওপর পড়ে এবং আমি বুঝতে পারি, তারা যে সাহায্য ও কামিয়াবী চায় তা তারা লাভ করতে পেরেছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৭, আল ইসাবা- ১/৪০৫) আবূ আইউবের মৃত্যুর পর তাঁর অন্তিম ইচ্ছার বাস্তবায়ন করা হয়। একদিন রাতে মুসলিম বাহিনী অস্ত্র সজ্জিত হয়ে লাশটি উঠিয়ে নেয় এবং কনস্ট্যান্টিনোপলের (আধুনিক ইস্তাম্বুল) নগর প্রাচীরের গা ঘেঁষে তাঁকে দাফন করে। মুসলিশ বাহিনীর সকল সদস্য তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করে। বিধর্মীরা তাঁর মাযারের অবমাননা করতে পারে, এই চিন্তায় ইয়াযীদ কবরটি মাটির সাথে সমান করে দেন। পরদিন সকালে রোমানরা মুসলিম মুজাহিদদের কাছে জানতে চাইলো, কাল রাতে আপনাদের একটু ব্যস্ত দেখা গেল, কী হয়েছিল? তাঁরা জবাব দিলেন, আমাদের নবীর একজন অতি সম্মানিত সংগীর মৃত্যু হয়েছে, তাঁরই দাফন কাজে আমরা ব্যস্ত ছিলাম। যেখানে দাফন করা হয়েছে তোমরা তা জান। যদি তাঁর মাযারের অবমাননা করা হয় তাহলে জেনে রাখ, বিশাল ইসলামী খিলাফতের কোথাও তোমাদের ‘নাকুস’ আর বাজবে না। (সীয়াবে আনসার- ১/১১৩) ইস্তাম্বুলের সন্নিকটে হযরত আবু আইয়ূবের কবরটি আজও বর্ণ ও ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের এক তীর্থ-স্থান। রোমানরা তাদের দুর্ভিক্ষ ও খরার সময় তাঁর কবরে নিকট সমবেত হয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করতো এবং পানি চাইতো। (দারিয়া-ই মায়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা- ১/৭৪৫, উসুদুল গাবা- ২/৮২) হযরত আবু আইউবের মৃত্যুসন সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবনুল আসীর উসুদুল গাবা (২/৮১) গ্রন্থে তিনটি মতের উল্লেখ করেছেন। যথ হিজরী ৫০, ৫১ ও ৫২ সন। তবে হিজরী ৫২ সন অধিকাংশের মত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। ইবন আসাকির তাঁর একটি মতে হিজরী ৫৫ সন বলে উল্লেখ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় আশি বছর। হযরত আবু আইউবের ফজীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে বহু কথা হাদীস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। তাঁর জীবনের এমন অনেক ঘটনা জানা যায় যা খুবই শিক্ষণীয়। এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে সেসব বিস্তারিত বর্ণনা করা সম্ভব নয়। হযরত ইবন ’আব্বাস বলেন, ‘একথা প্রচন্ড গরমের দিনে ঠিক দুপুরের সময় আবু বকর ঘর থেকে বেরিয়ে মসজিদের দিকে আসলেন। ’উমার তাঁকে দেখে প্রশ্ন করলেন, – এমন অসময়ে বের হলেন যে? – কী করবো, দুঃসহ ক্ষুধা তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। – আল্লাহর কসম, আমারও একই দশা। তাঁদের দু’জনের কথা শেষ না হতেই হযরত রাসূলে কারীম সা. সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে দেখে বললেনঃ – কি ব্যাপার, এ অসময়ে তোমরা এখানে? – ক্ষুধার জ্বালায় আমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি। রাসূল সা. বললেনঃ যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ, আমিও ক্ষুধার জ্বালায় ঘরে থাকতে পারিনি। এসো তোমরা আমার সাথে। তাঁরা তিন জন হাঁটতে হাঁটতে আবু আইউবের বাড়ীর দরজায় পৌঁছলেন। আবু আইউবের অভ্যাস ছিল, প্রতিদিন রাসূলে কারীমের সা. জন্য খাবার তৈরী রাখা। তিনি দেরি করলে বা না খেলে তাঁর পরিবারের লোকেরা তা ভাগ করে খেয়ে ফেলতো; তাঁদের তিনজনের সাড়া পেয়ে উম্মু আইউব (আবু আইউবের স্ত্রী) বেরিয়ে এসে বললেন, – আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়, আহলান ওয়া সাহলান। – আবু আইউব কোথায়? আবু আইউব নিকটেই তাঁর খেজুর বাগানে কাজ করছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. গলার আওয়ায শুনে এই কথা বলতে বলতে ছুটে আসলেনঃ – ইয়া রাসূলুল্লাহ, এমন সময় তো আপনার শুভাগমন হয় না। – তোমার কথাই ঠিক। আবু আইউব দৌড়ে বাগানে গেলেন এবং এক কাঁধি শুকনো ও পাকা-কাঁচা খেজুর কেটে নিয়ে আসলেন। রাসূল সা. বললেনঃ তুমি এটা কেটে আন তা কিন্তু আমি চাইনি। – আপনি এর থেকে কিছু শুকনো, পাকা ও কাঁচা খেজুর খান- এটাই আমার একান্ত ইচ্ছা। আমি আপনাদের জন্য এক্ষুণি বকরী জবেহ করব। রাসূল সা. বললেনঃ জবেহ করলে দুধালো বকরী জবেহ করবে না। আবু আইউব দুধ দেয় না এমন একটি বকরী জবেহ করলেন। স্ত্রীকে বললেনঃ গোশত ভূনা কর এবং রুটি বানাও। তুমি তো রুটি বানাতে দক্ষ। আবু আইউব লেগে গেলেন বকরীর অর্ধেকটা রান্না করতে। রান্নার কাজ শেষ করে তা রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের সামনে হাজির করলেন। রাসুল সা. এক টুকরো গোশত উঠিয়ে একটি রুটির ওপর রেখে বললেনঃ – আবু আইউব, শিগগির তুমি এই টুকরোটি ফাতিমাকে দিয়ে এস। বহু দিন সে এমন খাবার দেখে না। তাঁরা সকলে পেট ভরে খেলেন। তারপর রাসূল সা. বললেন, ‘রুটি, গোশত, খুরমা, পাকা ও আধাপাকা খেজুর।’ চোখ দু’টি তাঁর পানিতে ভরে গেল। তারপর বললেনঃ ‘‘যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ! এই নি’য়ামত (দান, অনুগ্রহ) সম্পর্কে কিয়ামতের দিন তোমাদের জিজ্ঞাসা করা হবে। তোমরা এই নিয়ামত লাভ করলে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে তাতে হাত দেবে এবং পেট ভরে খাওয়ার পর বলবে ‘আলহামদুলিল্লাহ আল্লাজী আশবা’য়ানা ওযা আন’য়ামা আলাইনা ফা আফদালা।’’ রাসূলুল্লাহ সা. বিদায় নেওযার সময় আবু আইউবকে বললেনঃ – আগামী কাল আমার সাথে দেখা করবে। পরদিন আবু আইউব রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হলেন। তিনি ছোট একটি দাসীকে আবু আইউবের হাতে তুলে দিতে দিতে বললেনঃ আবু আইউব, তার সাথে ভালো ব্যবহার করবে। আমার কাছে যতদিন ছিল, আমরা তাঁর মধ্যে ভালো ছাড়া মন্দ কিছু দেখিনি। দাসীটি সংগে করে আবু আইউব বাড়ী ফিরলেন। স্ত্রী প্রশ্ন করলেনঃ আইউবের বাপ, এটা আবার কার? রাসূলুল্লাহ সা. আমাদেরকে দান করেছেন। ‘দাতা অতি মহান, দানটিও অতি সম্মানিত’- স্ত্রী মন্তব্য করলেন। – রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর প্রতি ভালো আচরণের উপদেশ দিয়েছেন। – উপদেশ কিভাবে বাস্তবায়ন করবে? – তাকে আযাদ করে দেওয়া ছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. উপদেশ বাস্তবায়নের আর কোন উত্তম পন্থা নেই। – তুমি সঠিক হিদায়াত পেয়েছ। তুমি আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত ব্যক্তি। অতঃপর তাঁরা দাসীটি আযাদ করে দিলেন। (সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ১/১২৪-১৩০; হায়াতুস সাহাবা- ১/৩০৮-৩১০) উম্মুল মুমিনীন হযরত সাফিয়া বিনতু হুয়াই-এর সাথে যে রাতে রাসূলুল্লাহর সা. প্রথম বাসর হয়, সে রাতে সকলের অজ্ঞাতসারে আবু আইউব রাসূলুল্লাহর সা. দরযায় কোষমুক্ত তরবারি হাতে সারারাত দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রত্যুষে রাসুল সা. বের হয়ে আবু আইউবকে দেখতে পান। আবু আইউব বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ আপনি তাঁর বাপ, ভাই ও স্বামীকে হত্যা করেছেন- এজন্য আমি আপনাকে নিরাপদ মনে করিনি। তাঁর কথা শুনে রাসূল সা. হেসে দেন এবং তাঁর জন্য দু’আ করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৪৩, হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৬৩) সাহাবা সমাজের মধ্যে তাঁর মর্যাদা এত উঁচুতে ছিল যে, অন্যান্য সাহাবীরা তাঁর নিকট বিভিন্ন বিষয়ে মাসয়ালা জিজ্ঞেস করতেন। ইবন ’আব্বাস, ইবন ’উমর, বারা’ ইবন আযিব, আনাস ইবন মালিক, আবু উমামা, যায়িদ ইবন খালিদ আল-জুহানী, মিকদাম ইবন মা’দিকারাব, জাবির ইবন সুমরা, আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আল-খাতামী প্রমুখের ন্যায় বিশিষ্ট সাহাবীরা তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেণ। আর সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, ’উরওয়া ইবন যুবাইর, সালিম ইবন ’আবদিল্লাহ, ’আতা ইবন ইয়াসার, ’আতা ইবন ইয়াযীদ, লায়সী, আবু সালামা, আবদুর রহমান ইবন আবী-লায়লার মত বিশিষ্ট তাবে’ঈগণও ছিলেন তাঁর শাগরিদ। তাঁরা সকলে তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (উসুদুল গাবা- ২/৮১; আল-ইসাবা- ১/৪০৫) আবু আইউব ছিলেন সাহাবাদের কেন্দ্রবিন্দু। কোন মাসযালায় সাহাবাদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিলে সবাই তাঁর কাছে ছুটে যেতেন। একবার ইহরাম অবস্থায় জানাবাতের গোসলের সময় হাত দিয়ে মাথা ঘষা যায় কিনা- এ ব্যাপারে ইবন ’আব্বাস ও মিসওয়ার ইবন মাখরামার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিল। তাঁরা বিষয়টি জানার জন্য আবদুল্লাহ ইবন হুসাইনকে পাঠালেন আবু আইউবের নিকট। আবদুল্লাহ যখন পৌঁছলেন তখন ঘটনাক্রমে আবু আইউব গোসল করছিলেন। আবদুল্লাহর উদ্দেশ্য জানতে পেরে তিনি মাথাটি বাইরে বের করে দিয়ে তা ঘষতে ঘষতে বলেন, দেখ, এভাবে রাসূলুল্লাহ সা. গোসল করতেন। (বুখারী- ১/২৪৮) হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতকালে ’উকবা ইবন ’আমির আল-জুহানী যখন মিসরের গভর্ণর তখন আবু আইউব দুইবার মিসর ভ্রমণ করেন। প্রথম সফরটি হাদীসের অন্বেষণে। তিনি শুনেছিলেন, ’উকবা রাসূলুল্লাহর সা. একটি হাদীস বর্ণনা করেন। ’উকবার মুখ থেকে সেই একটিমাত্র হাদীস শোনার জন্য মদীনা থেকে মিসর পর্যন্ত এত দীর্ঘপথ পাড়ি দেন। মিসর পৌঁছে তিনি মাসলামা ইবন মাখলাদের বাড়ীতে যান। মাসলামা তাঁকে স্বাগতম জানিয়ে বুকে বুক মিলান। আবু আইউব তাঁকে বলেন, ‘আমাকে একটু ’উকবার বাড়ীটি দেখিয়ে দাও।’ সেখানে পৌঁছে তিনি ’উকবাকে বলেন, ‘একটি কথা আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই। রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে যাঁরা সেই সময় উপস্থিত ছিলেন, আমি ও আপনি ছাড়া তাঁদের আর কেউ এখন বেঁচে নেই। আচ্ছা, ‘সতরুল মুসলিম’- মুসলমানের সতর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহকে সা. আপনি কী বলতে শুনেছেন?’ ’উকবা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ ‘দুনিয়াতে যে ব্যক্তি কোন মুমিনের কোন গোপন বিষয় গোপন রাখবে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখবেন।’ এতটুকু শুনেই আবু আইউব মদীনার দিকে যাত্রা করেন। বাহনটিকে ছেড়ে দিয়ে একটু বিশ্রামও নিলেন না। অতঃপর হাদীসটি তিনি এভাবে বর্ণনা করতেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৮; মুসনাদে ইমাম আহমাদ- ৪/১৫৪) হযরত আবু আইউবের জ্ঞান আহরণ ও তার প্রচার প্রসারের প্রতি এত তীব্র আকর্ষণ ছিল যে, মৃত্যু শয্যায়ও তা থেকে বিরত থাকেননি। তাঁর মৃত্যুর পর সাধারণ ঘোষনার মাধ্যমে হাদীস দু’টি মানুষের মধ্যে প্রচার করা হয়। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১৪) হযরত আবু আইউব কুরআনের হাফেজ ছিলেন। ইবন সাদ বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. যুগে আনসারদের মধ্যে পাঁচ জন কুরআন সংগ্রহ করেন। মা’য়াজ ইবন জাবাল, ’উবাদাহ্ ইবন সামিত উবাই ইবন কা’ব, আবু আইউব ও আবু দারদা। দ্বিতীয় খলীফা ’উমারের খিলাফতকালে ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান রা. খলীফাকে লিখলেনঃ শামের অধিবাসীরা নানা পদ্ধতিতে কুরআন পাঠ করছে। তাদেরকে সঠিকভাবে কুরআন শিক্ষা দিতে পারে এমন কিছু বিজ্ঞ শিক্ষক সেখানে পাঠান। এই চিঠি পেয়ে ’উমার উপরোক্ত পাঁচ জনকে ডেকে পাঠান। তাঁরা উপস্থিত হলে বলেনঃ ‘তোমাদের শামবাসী ভাইয়েরা কুরআন শিক্ষার ব্যাপারে আমার সাহায্য চেয়েছে। তোমাদের মধ্য থেকে অন্ততঃ তিনজন এ ব্যাপারে আমাদের সাহায্য কর। আর ইচ্ছা করলে তোমরা সবাই অংশগ্রহণ করতে পার।’ তাঁরা খলীফার আবেদনে সাড়া দিলেন। তাঁরা বললেনঃ ‘আবু আইউব বয়সের ভারে দুর্বল, আর উবাই ইবন কা’ব রোগগ্রস্ত।’ অতঃপর বাকী তিনজন যাবার জন্য প্রস্তুত হলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৫) হযরত আবু আইউব থেকে দেড়শো হাদীস বর্ণিত হয়েছে বলে সীরাত গ্রন্থসমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ‘জালা’ আল-কুলুব’- এর গ্রন্থকার তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ২১০টি বলে উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে পাঁচটি হাদীস মুত্তাফাক আলাইহি। ইমাম আহমাদ তাঁর ‘মুসনাদ’- এর ৫ম খন্ডে ৪১২ থেকে ৪২৩ পৃষ্ঠায় ১১২টি এবং ১১৩-১১৪ পৃষ্ঠায় তাঁর বর্ণিত আরও কিছু হাদীস সংকলন করেছেন। [দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ-ই-ইসলামিয়্যা (উর্দু)- ১/৭৪৫] হযরত আবু আইউবের চরিত্রে তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে বিদ্যমান ছিল। ১. রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি গভীর ভালোবাসা, ২. ঈমানী তেজ ও উদ্দীপনা, ৩. সত্য ভাষণ। রাসূলুল্লাহকে সা. এত গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন যে, তাঁর ওফাতের পর রওজা পাকের কাছে গিয়ে পড়ে থাকতেন। তাঁর ঈমানী তেজ ও দৃঢ়তার প্রমাণ এই যে, রাসূলুল্লাহর সা. যুগে সংঘটিত কোন একটি যুদ্ধেও তিনি অনুপস্থিত থাকেননি। আর জীবনের শেষ প্রান্তে আশি বছর বয়সেও মিসরের পথে রোম সাগর পাড়ি দিয়ে ইস্তাম্বুলের নগর প্রাচীরের সন্নিকটে ইসলামী দা’ওয়াতের দায়িত্ব পালনের জন্য গমন করেন। আর ব্যক্তি বা রাষ্ট্র- কারও ভয়েই তিনি সত্য কথা বলা থেকে কখনও বিরত থাকেননি। একবার মিসরের গভর্ণর ’উকবা ইবন ’আমির আল-জুহানী- যিনি একজন সাহাবী, কোন কারণবশতঃ মাগরিবের নামায পড়াতে একটু বিলম্ব করলেন। আবু আইউব উঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে মারলেন ‘মা হাজিহিস সালাতু ইয়া উকবা’- উকবা এটা কেমন নামায? উকবা বললেন, একটি কাজে আটকে গিয়ে দেরী হয়ে গেছে। আবু আইউব বললেনঃ ‘আপনি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী, আপনার এই কাজের দ্বারা মানুষের ধারণা হবে রাসূলুল্লাহ সা. এই সময় নামায আদায় করতেন। অথচ মাগরিবের নামায তাড়াতাড়ি আদায়ের জন্য তিনি কত তাকীদ দিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১৭) ইসলামী বিধি-বিধান তিনি নিজে যেমন পরিপূর্ণরূপে অনুসরণ করতেন তেমনি অন্যদের নিকট থেকেও অনুরূপ অনুসরণ আশা করতেন। কারও মধ্যে সামান্য বিচ্যুতি লক্ষ্য করলেও তা সংশোধন করে দিতেন। একবার হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের ছেলে আবদুর রহমান কোন এক যুদ্ধে চারজন বন্দীকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করেন। এ কথা আবু আইউব জানতে পেরে তাঁকে বলেন, ‘পশুর মত এভাবে হত্যা করা থেকে রাসূলুল্লাহ সা. নিষেধ করেছেন। আমি তো এভাবে একটি মুরগীও জবেহ করা পছন্দ করিনে।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪২২) রোমানদের সাথে যুদ্ধের সময় জাহাজে একজন অফিসারের তত্ত্বাবধানে বহু সংখ্যক যুদ্ধবন্দী ছিল। একদিন আবু আইউব দেখতে পেলো একজন মহিলা কয়েদী বড় ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। তিনি মহিলাটির এভাবে কাঁদার কারণ জিজ্ঞেস করলেন। লোকেরা বলল, ‘তার সন্তান থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।’ আবু আইউব ছেলেটির হাত ধরে মহিলার হাতে তুলে দেন। অফিসার আবু আইউবের বিরুদ্ধে কমান্ডারের নিকট অভিযোগ করেন। কমান্ডারের প্রশ্নের জবাবে আবু আইউব বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সা. এ ধরণের কষ্ট দিতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১২) তিনি সিরিয়া ও মিসরে গেলেন। দেখলেন, সেখানকার পায়খানাসমূহ কিবলামুখী করে তৈরী করা। তিনি বার বার শুধু বলতে লাগলেন, ‘কী বলবো? এখানে পায়খানা কিবলামুখী করে তৈরী করা, অথচ রাসূল সা. এমনটি করতে নিষেধ করেছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৪১২) সালিম ইবন ’আবদিল্লাহ ইবন ’উমার বলেনঃ ‘আমার পিতার (আবদুল্লাহ ইবন ’উমার) জীবদ্দশায় একবার আমাদের বাড়ীতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান হল। আমার পিতা অন্যদের সাথে আবু আইউবকেও দাওয়াত দিলেন। সুন্দর সুন্দর সবুজ চাদর দিয়ে আমাদের বাড়ীর দেওয়াল ঢেকে দেওয়া হল। আবু আইউব এসেই মাথা উঁচু করে একবার তাকিয়ে দেখলেন। তারপর গম্ভীরভাবে বললেনঃ ‘আবদুল্লাহ, তোমরা দেওয়াল ঢেকে দিয়েছ?’ সালেম বলেনঃ আমার পিতা লজ্জিত হয়ে জবাব দিলেন, ‘আবু আইউব, মহিলারা আমাদেরকে কাবু করে ফেলেছে।’ আবু আইউব বললেনঃ ‘সবার ব্যাপারে এ আশংকা আমার আছে। তবে তোমার ব্যাপারে এমন আশংকা ছিলনা। আমি তোমার বাড়ীতে ঢুকবো না, আহারও করবো না।’ (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩০৫) হযরত আবু আইউব যে কত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইফ্ক-এর ঘটনায়। এই ইফ্ক বা হযরত ‘আয়িশার রা. প্রতি অপবাদ আরোপের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুষ্ঠু। একদিন তাঁর স্ত্রী তাঁকে বললেনঃ আবু আইউব, ’আয়িশার সম্পর্কে লোকেরা যা বলাবলি করছে, তা কি তুমি শুনেছ?’ বললেনঃ ‘হাঁ, শুনেছি। ডাহা মিথ্যে কথা। উম্মু আইউব, তুমি কি এমন কাজ করতে পার?’ বললেনঃ আল্লাহর কসম! এমন কাজ আমি কক্ষণও করতে পারিনে।’ আবু আইউব বললেনঃ ‘তাহলে ’আয়িশা- যিনি তোমার চেয়েও উত্তম, তিনি কিভাবে করতে পারেন?’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩০২) কনস্ট্যান্টিনোপল যুদ্ধের সময় একদিন একজন মুসলিম সৈনিক তাদের জাহাজে আবু আইউবকে খাবারের দা’ওয়াত দিল। তিনি হাজির হলেন এবং বললেন, ‘তোমরা আমাকে দাওয়াত দিয়েছে; অথছ আজ আমি রোযা রেখেছি। তোমাদের দাওয়াতে সাড়া দেওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। কারণ আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ একজন মুসলমানের ওপর তার অন্য এক মুসলিম ভাইয়ের ছয়টি অধিকার আছে। তার কোন একটি চেড়ে দিলে একটি অধিকার ছেড়ে দেওয়া হবে। ১. দেখা হলে তাকে সালাম দিতে হবে। ২. দাওযাত দিলে সাড়া দিতে হবে। ৩. হাঁচি দিয়ে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ বললে তার জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলে জবাব দিতে হবে। ৪. অসুস্থ হলে দেখতে যেতে হবে। ৫. মারা গেলে তার জানাযায় শরিক হতে হবে। ৬. কোন ব্যাপারে উপদেশ চাইলে উপদেশ দিতে হবে।’ (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৫) হযরত আবু আইউব ছিলেন অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির। কুয়োর ধারে গোসলের সময়েও চারিদিকে কাপড় টানিয়ে ঘিরে নিতেন। (বুখারী- ১/২৪৮) কাফির মুনাফিকদের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। এ কঠোরতা বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে প্রকাশ পেয়েছে। সে সময় মদীনার মুনাফিকরা (কপট) মসজিদে আসতো, মুসলমানদের নানা কথা কান পেতে শুনতো। বাইরে গিয়ে তারা মুসলমানদের দ্বীন নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতো। একদিন কতিপয় মুনাফিক মসজিদে নববীতে একত্রিত হল। তারা যখন পরস্পর গায়ে গা মিশিয়ে নিচুস্বরে নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করছে, ঠিক সেই সময় রাসূল সা. তাদেরকে দেখে ফেলেন। তিনি তাদেরকে মসজিদে থেকে বের করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সাথে সাথে আবু আইউব ছুটে গিয়ে ’আমর ইবন কায়েসের একটি ঠ্যাং ধরে টানতে টানতে মসজিদের বাইরে নিয়ে গেলেন। তিনি তার ঠ্যাং ধরে টানছেন আর সে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলছেঃ আবু আইউব, তুমি এভাবে আমাকে বনী-সা’লাবের মিরবাদ (খোঁয়াড়) থেকে বের করে দিচ্ছ? (মসজিদের স্থানে পূর্বে উট-বকরীর খোঁয়াড় ছিল) তারপর আবু আইউব রাফে ইবন ওয়াদীয়ার দিকে ধেয়ে যান এবং তার গলায় চাদর পেঁচিয়ে টানতে টানতে ও লাথি-চড় মারতে মারতে মসজিদ থেকে বের করে দেন। আবু আইউব টানছেন আর মুখে বলছেনঃ ‘পাপাত্মা মুনাফিক দূর হ। যে পথে এসেছিস সেই পথে চলে যা।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫২৮) হযরত আবু আইউব ও তাঁর স্ত্রী যেভাবে রাসূলুল্লাহকে সা. আশ্রয় দেন এবং প্রাণ দিয়ে তাঁর সেবা করেন তাতে নবী-খান্দানের লোকদের নিকট বিশেষভাবে, আর সাধারণভাবে সকল মুসলমানদের নিকট তাঁরা এক বিশেষ মর্যাদার আসন লাভ করেন, হযরত আলীর খিলাফতকালে হযরত ইবন ’আব্বাস রা. যখন বসরার গভর্ণর তখন একবার আবু আইউব গেলেন সেখানে। ইবন ’আব্বাস তাঁকে বললেন, ‘আমার ইচ্ছা, যেভাবে আপনি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য ঘর খালি করে দিয়েছিলেন, আজ আমিও তেমনিভাবে আপনার জন্য ঘর খালি করে দিই।’ একথা বলে তিনি পরিবারের সকল সদস্যকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে সকল সাজ সরঞ্জামসহ বাড়ীটি তাঁর থাকার জন্য ছেড়ে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০৫) রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর সাহাবা-ই-কিরামের পূর্ববর্তী সেবা ও আত্মত্যাগ অনুযায়ী প্রত্যেকের ভাতা নির্ধারিত হয়। আবু আইউবের ভাতা প্রথমে ৪০০০ (চার হাজার) দিরহাম নির্ধারিত হয়। হযরত আলী তা বাড়িয়ে বিশ হাজার করেন। তাঁর ভূমি চাষাবাদের জন্য প্রথমে ৮ (আট) টি দাস নিযুক্ত ছিল, হযরত আলী রা. তা চল্লিশ জনে উন্নীত করেন। হযরত আবু আইউবের ভাগ্যবতী স্ত্রীর নাম উম্মু হাসান বিনতু যায়িদ। অভিজাত আনসারী মহিলা। ইবন সা’দের বর্ণনা মতে, তাঁর গর্ভে একমাত্র ছেলে ’আবদুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। যদিও হযরত আবু আইউবের রা. জীবন যুদ্ধের ময়দানে কেটেছে এবং তরবারি কাঁধ থেকে নামিয়ে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সময় পাননি, তথাপি সে জীবন ছিল প্রভাতের মৃদুমন্দ শীতল বায়ুর ন্যায় প্রশান্ত। কারণ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছিলেনঃ ‘‘তুমি যখন নামায আদায় করবে, তা যে শেষবারের মত আদায় করছো, এমনভাবে করবে। এমন কথা কক্ষণও বলবে না যার জন্য পরে কৈফিয়াত দিতে হয়। মানুষের হাতে যা আছে তা পাওয়ার আশা কক্ষণও করবে না।’’ কোন ঝগড়া-বিবাদে কক্ষণও তাঁর জিহ্বা অসংযত হয়নি। কোন লালসা তাঁর অন্তরকে কক্ষণও কাবু করতে পারেনি। একজন ’আবেদের মত, দুনিয়া থেকে এই মুহূর্তে একজন বিদায় গ্রহণকারীর মত সারাটি জীবন তিনি অতিবাহিত করে গেছেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪০৮)
জাবির ইবন আবদিল্লাহ (রা)

নাম জাবির, কুনিয়াত বা ডাকনামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যথাঃ আবু ’আবিদিল্লাহ, আবু ’আবদির রহমান, ও আবু মুহাম্মাদ। ইবনুল আসীর প্রথমটি অধিকতর সঠিক বলে মনে করেছেন। (উসুদুল গাবা ১/২৫৭, আল-ইসাবা- ১/২১৩, তাহজীবুল আসমা ওয়া আল-লুগাত- ১/১৪৪) পিতা ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর এবং মাতা নাসীবা বিনতু উকবা। তাঁর বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ হারাম ইবন কা’ব- এর মাধ্যমে পিতা-মাতা উভয়ের বংশ একত্রে মিলিত হয়েছে। জাবিরের পিতৃবংশের উর্ধ্বতন পুরুষ সালামা-র বংশধরগণ মদীনার হাররা ও মসজিদে কিবলাতাইন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তবে তাঁর নিজ গোত্র বনু হারামের বসতি ছিল কবরস্থান ও ছোট্ট একটি মসজিদের মধ্যবর্তী স্থানে। তাঁর পিতা ’আবদুল্লাহ ইবন আমর ছিলেন শেষ ’আকাবায় মনোনীত অন্যতম ‘নাকীব’। (তাবাকাত- ৩/৬২০, ৬৬১, উসুদুল গাবা- ১/২৫৬) জাবিরের দাদা ’আমর ছিলেন তাঁর খান্দানের রয়িস বা নেতা। ‘আয়নুল আরযাক’ নামক যে কুয়োটি মারওয়ান ইবন হাকাম হযরত মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতকালে সংস্কার করেন, সেটা ছিল তাঁরই মালিকানায়। বনু সালামার কয়েকটি দুর্গ ছাড়াও জাবির ইবন ’আতীকের নিকটবর্তী আরও কয়েকটি দুর্গ তারই অধীনে ছিল। ’আমরের মৃত্যুর পর এ সকল সম্পদের মালিক হন তাঁর পুত্র ’আবদুল্লাহ। এই ’আবদুল্লাহর পুত্র জাবির চৌত্রিশ (৩৪) ’আমুল ফীল (হাতীর বছর) মুতাবিক ৬১১ মতান্তরে ৬০৭ খৃস্টাব্দে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম- ২/৯২, সীয়ারে আনসার- ১/২৯৪) সর্বশেষ ’আকাবার বাই’য়াতে পিতা ’আবদুল্লাহর সাথে জাবিরও অংশগ্রহণ করেন। হতে পারে, তিনি এই বাই’য়াতের সময় অথবা এর পূর্বেই মদীনায় মুসয়াব ইবন ’উমাইরের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। বাই’য়াতের পর রাসূল সা. তাঁর পিতাকে বনু সালামা-র নাকীব বা দায়িত্বশীল মনোনীত করেন। জাবির বলেন, আমি ছিলাম এই ‘আকাবার কনিষ্ঠতম ব্যক্তি। ইবন সা’দের বর্ণনামতে এই সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ অথবা উনিশ বছর। ইবনুল আসীর বলেন, জাবির তখন একজন বালকমাত্র। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৮, ২৪৯, ২৫২, তাবাকাত- ৩/৫৬১, উসুদুল গাবা- ১/২৫৭, তাবাকাত আল-মাশাহীর ওয়া আল-আ’লাম- ১/১৮১) জাবির বদর ও উহুদ যুদ্ধ ছাড়া আর সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগদান করেন। বদর ও উহুদে তাঁর যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ আছে। ইবন ’আসাকির তাঁর তারীখে একটি বর্ণনা সংকলন করেছেন। জাবির বলতেন, আমি বদরের দিন আমার পিতার জন্য অঞ্চলি ভরে পানি নিয়েছিলাম। মুহাম্মাদ ইবন সা’দ বলেন, আমি মুহাম্মাদ ইবন উমারকে এই বর্ণনাটি শুনালাম। তিনি বললেন, এটা ইরাকীদের একটি ভিত্তিহীন ধারণা মাত্র। তিনি বদরে জাবিরের অংশগ্রহণের কথা অস্বীকার করলেন। তাছাড়া জাবির নিজেই বলতেন, আমি বদর ও উহুদে অংশগ্রহণ করিনি। আমার পিতা আমাকে বিরত রেখেছেন। এই দুইটি ছাড়া আর কোন যুদ্ধ থেকে কক্ষনও আমি পেছনে থাকিনি। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৬, উসুদুল গাবা- ১/২৫৭, তাহজীবুল আসমা ওয়া আল-লুগাত- ১/১৪৩, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১৪৩) জাবির উহুদ যুদ্ধে যোগদান করেননি। তিনি কেন যোগদান করেননি তাঁর কারণ এই বর্ণনার মধ্যে পাওয়া যায়। ইবন হিশাম বললেনঃ ‘হামরা-উল-আসাদ’ মদীনা থেকে ৮/৯ মাইল দূরে অবস্থিত একটি স্থান। কুরাইশরা উহুদ থেকে সরে গিয়ে সেখানে সমবেত হয়। এটা ছিল হিজরী ৩ সালের আট অথবা নয় শাওয়ালের ঘটনা। রাসূল সা. এ খবর পেয়ে ঘোষণা দিলেনঃ উহুদে যারা অংশগ্রহণ করেছিলে তারা ছাড়া আর সবাই শত্রুদের খোঁজে বের হয়ে পড়। লোকেরা, এমনকি উহুদের আহতরাও বের হয়ে পড়লো। সংখ্যায় তারা অনেক হয়ে গেল। জাবির রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে ’আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! গতকাল আমি জিহাদে যোগদান থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমার পিতা আমাকে বিরত রেখেছিলেন। তিনি আমাকে আমার সাতটি বোনের তদারকিতে রেখে যান। তিনি আমাকে বললেনঃ ‘বেটা, কোন পুরুষ লোক তাদের কাছে থাকবে না, এমন অবস্থায় তাদের রেখে যাওয়া তোমার ও আমার উচিত হবে না। আর আমি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে জিহাদে যাওয়ার ব্যাপারে আমার নিজের ওপর তোমাকে অগ্রাধিকার দিতে পারিনে।’ জাবির বলেন, অতঃপর রাসূল সা. আমাকে যুদ্ধে বের হওয়ার অনুমতি দান করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৭) বদর ও উহুদ ছাড়া তিনি কতগুলি যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন সে ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মতভেদ আছে। কোন বর্ণনায় উনিশটি, কোন বর্ণনায় আঠারোটি, আবার কোন বর্ণনায় সতেরোটি যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন বলে জানা যায়। (আল-আ’লাম- ২/৯২, উসুদুল গাবা- ১/২৫৭, আল ইসাবা- ১/৩১৩, তাহজীবুল আসমা- ১/১৪৩) জাবিরের পিতা ’আবদুল্লাহ উহুদ যুদ্ধে যোগ দেন এবং শহীদ হন। জাবির বলেন, উহুদ যুদ্ধের আগের রাতে আমার পিতা আমাকে ডেকে বললেন, রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে যারা প্রথম দিকে শহীদ হবে, আমি নিজেকে তাঁদের কাতারেই দেখতে চাই। রাসূলুল্লাহর সা. পরে একমাত্র তুমি ছাড়া অধিকতর প্রিয় আর কাউকে আমি রেখে যাচ্ছিনে। আমার কিছু দেনা আছে, তুমি তা পরিশোধ করে দেবে। আর তোমার বোনদের সাথে ভালো আচরণের উপদেশ দিচ্ছি। জাবির বলেন, সকাল হলো, আমার পিতা হলেন প্রথম শহীদ। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯৩) সুফইয়ান ইবন ’আবদি শাম্স আস-সুলামী নামক এক কাফির জাবিরের পিতা আবদুল্লাহকে হত্যা করে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৩) কাফিররা জাবিরের পিতা ’আবদুল্লাহকে হত্যা করে তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে বিকৃত করে ফেলে। এই কারণে দেহের বিচ্ছিন্ন অঙ্গ একটি কাপড়ে সংগ্রহ করা হয়। জাবির লাশ দেখতে চাইলে লোকেরা তাঁকে নিষেধ করে; কিন্তু রাসূল সা. অনুমতি দান করেন। তাঁর ফুফু পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভাইয়ের এ দৃশ্য দেখে তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠেন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করেন, কে? লোকেরা বললো, ’আবদুল্লাহর বোন। তিনি বললেনঃ তোমরা কাঁদ বা না কাঁদ, যতক্ষণ লাশ না উঠাবে ফিরিশতারা ডানা দিয়ে ছায়া দিতে থাকবে। (মুসলিম- ২/৩৪৬, বুখারী- ২/৫৮৪, তাবাকাত- ৩/৫৬১) জাবিরের বোনেরা তাদের পিতার লাশ উহুদ থেকে নেওয়ার জন্য একটি উট পাঠায়। তারা ইচ্ছা করছিল, বনু সালামার গোরস্তানে তাদের পিতাকে দাফন করবে। জাবির পিতার লাশ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। -এ কথা রাসূল সা. জানতে পেয়ে বললেনঃ তাঁর অন্য সব শহীদ ভাইকে যেখানে দাফন করা হয়েছে তাকেও সেখানে দাফন করা হবে। এভাবে উহুদের অন্যান্য শহীদের সাথে তাঁকেও উহুদের প্রন্তরে দাফন করা হয়। (তাবাকাত- ৩/৫৬২) একটি বর্ণনায় এসেছে, জাবির বললেনঃ আমার পিতা উহুদে শহীদ হওয়ার কবর পেয়ে আমি আসলাম। লাশটি কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। আমি কাপড় সরিয়ে তাঁর মুখে চুমু দিতে লাগলাম। রাসূল সা. দেখেছিলেন কিন্তু নিষেধ করেননি। (তাবাকাত- ৩/৫৬১) তিনি আরও বলেনঃ আমি কাঁদছিলাম। রাসূল সা. আমাকে বললেন, তুমি কাঁদছো কেন? আয়িশা তোমার মা ও আমি বাবা হই, তাতে কি তুমি খুশী নও? এ কথা বলে তিনি আমার মাথায় হাত ঘষে দেন। আজ মাথার সব চুল সাদা হয়ে গেলেও যেখানে রাসূলে সা. হাতের স্পর্শ লেগেছিল সেখানে কালো আছে। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৬) জাবির তাঁর পিতার লাশ দাফনের ব্যাপারে বললেনঃ আমি অন্য একজন শহীদের সাথে এক কবরে তাঁকে দাফন করলাম। কিন্তু তাতে আমার মন তুষ্ট হলো ন। ছয় মাস পর কবর খুড়ে লাশটি বের করলাম। দেখা গেল একমাত্র কান ছাড়া মাটি লাশ মোটেই স্পর্শ করেনি। লাশটি এমন অবিকৃত অবস্থায় আছে যেন আজই দাফন করা হয়েছে। (তাবাকাত- ৩/৫৬২, তাহজীবুল আসমা- ১/১৪৩, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯২) জাবির বললেনঃ এর চল্লিশ বছর পর মু’য়াবিয়া যখন উহুদে কূপ খনন করায় তখন সেখানে সমাহিত কতিপয় শহীদের সাথে আমার পিতার লাশটিও উঠে আসে এবং তা সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় ছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৯৩) একটি বর্ণনায় এসেছে, উহুদে জাবিরের পিতা শহীদ হলে আল্লাহ তাঁকে জীবিত করে জিজ্ঞেস করেনঃ ‘আবদুল্লাহ, তুমি কি চাও?’ তিনি বললেন, আমি দুনিয়ায় ফিরে যেতে চাই এবং আবার শহীদ হতে চাই। (তাহজীবুল আসমা- ১/১৪৩) জাবিরের পিতা ছিলেন একজন ঋণগ্রস্ত মানুষ। তাঁর মৃত্যুর পর জাবির এই সব ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়লেন। কিভাবে তা পরিশোধ করবেন, এই চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠলেন। সম্পদের মধ্যে মাত্র দুইটি বাগিচা। তার সব ফলও ঋণ পরিশোদের জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ছুটে গেলেন এবং পাওনাদার ইহুদীদের ডেকে কিছু মওকুফ করিয়ে দেওয়ার আবেদন করেন। রাসূল সা. পাওনাদারদের ডেকে জাবিরের বক্তব্য পেশ করলেন। যেহেতু তারা ছিল ইহুদী, তাই তারা রাসূলুল্লাহর সা. আবেদনে সাড়া দিলনা। তিনি তাদেরকে অর্ধেক করে দুই বছরে দুইটি কিস্তিতে গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। তারা তাতেও রাজী হলো না। তখন তিনি জাবিরকে বললেন, আমি অমুক দিন তোমার বাড়ীতে যাব। তিনি নির্ধারিত দিনে উপস্থিত হলেন এবং অজু করে দুই রাকায়াত নামায আদায় করলে। তারপর তাবুতে এসে স্থির হয়ে বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আবু বকর ও উমার উপস্থিত হলেন। রাসূল সা. খেজুর স্তূপ করে ভাগ করার নির্দেশ দিলেন এবং তিনি একটি স্তূপের ওপর উঠে বসলেন। জবির ভাগ শুরু করলেন, আর রাসূর সা. বসলেন দু’আ করতে। আল্লাহর ইচ্ছায় ঋণ পরিশোধের পরেও অনেক অবশিষ্ট থেকে গেল। জাবির খুব খুশী হয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বললেন, ঋণ পরিশোধ হয়েছে এবং এত পরিমাণ অবশিষ্ট আছে। রাসূল সা. আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করেন। আবু বকর ও উমার রা. দুইজনই খুব খুশী হলেন। (বুলুগুল আমানী মিন আসরারি ফাতহির রাব্বানী- ২২/২০৮, ২০৯, তাবাকাত- ৩/৫৬৪, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬৩১) হিজরী পঞ্চম সনে ‘জাতুর রুকা’ যুদ্ধে জাবির যোগ দেন। তিনি একটি উৎকৃষ্ট উটের ওপর সাওয়ার ছিলেন। চলতে চলতে উটটি হঠাৎ থেমে যায়। জাবির তাকে উঠিয়ে চালাবার চেষ্টা করছেন, এমন সময় পেছন থেকে রাসূলুল্লাহর সা. কণ্ঠস্বর ভেসে এলঃ জাবির কী হয়েছে? বললেন, উট চলছে না। রাসুল সা. নিকটে এসে উটের গায়ে চাবুকের একটি ঘা মারেন। সাথে উটটি দ্রুত চলতে থাকে এবং সবার আগে চলে যায়। জাবির রাসূলুল্লাহর সা. পাশ দিয়ে উটের খোঁজে যাচ্ছেন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? বললেন, উট হারিয়ে গেছে। রাসূল সা. বললেনঃ এই যে, এই দিকে তোমার উট, যাও নিয়ে এস। জাবির দৌড়ালেন সেই দিকে; কিন্তু বহু খোঁজাখুজির পরও না পেয়ে ফিরে এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ সা. পেলাম না। রাসূল সা. দ্বিতীয় ও তৃতীয় বার একই কথা বললেন এবং জাবিরও প্রত্যেক বারই ফিরে আসলেন। অবশেষে রাসূল সা. জাবিরকে হাত ধরে উটের কাছে নিয়ে গেলেন এবং উটটি ধরে জাবিরকে বললেন, এই ধর তোমার উট। ইত্যবসরে কাফিলার লোকেরা অনেক দূর চলে গিয়েছিল। জাবির তাঁর উটের ওপর সাওয়ার হতেই উটটি এত দ্রুত গতিতে চললো যে, সবার আগেই পৌঁছে গেল। রাসূল সা. জাবিরের নিকট থেকে উটটি খরীদ করার প্রস্তাব করেন। জাবির মূল্য ছাড়াই বিক্রি করতে রাজী হন। রাসূল সা. বললেন, না তা হবে না, মূল্য তোমাকে নিতে হবে এবং মদীনা পর্যন্ত এর ওপর সাওয়ার হয়ে যাবে। এ ভাবে পথে উট কেনা বেচা হয়ে গেল। মদীনা পৌঁছে জাবির উট নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. দরযায় হাজির হলেন। রাসূল সা. উটটি ঘুরে ঘুরে দেখলেন আর বললেনঃ খুব সুন্দর। তারপর বিলালকে ডেকে নির্দেশ দিলেন, এক উকিয়া সোনা ওজন করে দাও এবং একটু বেশী দাও। অতঃপর রাসূল সা. জাবিরকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি উটের দাম পেয়েছেন কিনা। জাবির বললেন, হাঁ, পেয়েছি। তখন রাসূল সা. জাবিরের হাতে উটটি তুলে দিয়ে বললেনঃ এই উট ও মূল্য দুইটিই নিয়ে যাও, সবই তোমার। জাবির খুব খুশী মনে উটসহ বাড়ী ফেরেন এবং ফুফুকে বলেন, দেখুন রাসূল সা. আমাকে এক উকিয়া সোনা এবং উটটিও দান করেছেন। (বুলুগুল আমানী মনি আসরারি ফাতহির রাব্বানী- ২২/২০৯, ২১০) উপরোক্ত উটের ঘটনাটি বিভিন্ন বর্ণনায় ভিন্ন রকম বর্ণিত হয়েছে। ইবন ’আসাকির তাঁর তারীখে উট কেনা বেচার ঘটনাটি জাবির থেকে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূল সা. বললেন, জাবির এই উটটি আমার নিকট বিক্রি করবে? – হাঁ, করবো। – কত দামে? – এক দিরহামে। – এক দিরহামে একটি উট কেনা যায়? – তাহলে দুই দিরহামে। – না, আমি চল্লিশ দিরহামে তোমার উটটি কিনলাম এবং আল্লাহর রাস্তায় তোমাকে আমি ওর পিঠে চড়াবো। তারপর পূর্বে উল্লেখিতভাবে মদীনায় পৌঁছে উট কেনা-বেচার বাকী কাজ সম্পন্ন হয়। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৭)। মূল্যের অতিরিক্ত যে অর্থ জাবিরকে দেওয়া হয় তা ছিল রাসূলুল্লাহর সা. দান। এ কারণে জাবির সেই অর্থ ভিন্ন একটি থলিতে ভরে ঘরে হিফাজতে রেখে দেন। হাররা-র ঘটনার দিন শামবাসীরা তাঁর বাড়ীতে হামলা চালিয়ে অন্যান্য জিনিসের সাথে সেই থলিটিও লুট করে নিয়ে যায়। (মুসনাদ- ৩/৩০৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৬, ২০৭) উল্লেখ্য যে, ইয়াযীদ ইবন মু’য়াবিয়ার শাসন আমলে একবার মদীনায় ব্যাপক গণহত্যা ও লুটতরাজ হয়। এই চরম সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের নায়ক ছিল মুসলিম ইবন ’উকবা আল-মুররী, মদীনাবাসীরা তাকে বলতো মুসরিফ ইবন ’উকবা। এর কারণ হলো, মদীনাবাসীরা ইয়াযীদ ইবন মু’যাবিয়াকে খলীফা বলে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাঁর নিয়োগকৃত গভর্নর মারওয়ান ইবনুল হাকামকে মদীনা থেকে তাড়িয়ে দেয় এবং তাঁর স্থলে ’আবদুল্লাহ ইবন হানজালাকে নিজেদের আমীর মনোনীত করে। অবশ্য এ কাজের সাথে সে সময়ে জীবিত কোন বিশিষ্ট সাহাবী একমত ছিলেন না। হযরত জাবির তখন অন্ধ। তিনি মদীনার রাস্তাঘাটে বেড়াতেন, তাঁরই সামনে বাড়ী-ঘর লুট হতো ও সন্ত্রাসী কাজ চলতো। তিনি মৃতদেহের সাথে হোঁচট খেতেন, আর বলতেন যারা রাসূলুল্লাহকে সা. ভয় দেখাচ্ছে, তাদের জন্য ধ্বংস। মূলতঃ তিনি রাসূলুল্লাহর সা. এই বাণীর প্রতি ইঙ্গিত করতেনঃ ‘যে মদীনাকে ভয় দেখাবে প্রকৃতপক্ষে সে আমার দুই পার্শ্বদেশের মধ্যে যা আছে তাকেই ভয় দেখাবে।’ সন্ত্রাসীরা তাঁকে হত্যার জন্য ধরে নিয়ে যায়। তবে মারওয়ান নিজে তাঁকে নিরাপত্তা দান করে নিজ বাড়ীতে আশ্রয় দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৭, টীকা নং ৫) জাবির বলেন, রাসূলুল্লাহর সা. দানকৃত উটটি আমার নিকট খলীফা ’উমারের খিলাফতকাল পর্যন্ত ছিল। তিনি সেটা আমার নিকট থেকে নিয়ে সাদাকার উটের সাথে দিয়ে তাকে ভালো খাবার ও সুস্বাদু পানি দেওয়ার নির্দেশ দান করেন। (তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৮৭) ‘জাতুর রুকা’ যুদ্ধের পর হিজরী পঞ্চম সনেই খন্দকের যুদ্ধ হয়। জাবির বলেন, আমরা খন্দক খনন করছিলাম। এক সময় একটা কঠিন পাথর আমাদের সামনে পড়লো যা কোন ভাবেই আমরা কাটতে পারছিলাম না। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সা. কে অবহিত করা হলো। তিনি বললেন, আমি নেমে দেখছি। রাসূল সা. একটি বড় কুড়াল নিয়ে আঘাত করলে পাথরটি চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেল। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩২০, ২/১৯১) রাসুল সা. কুড়াল নিয়ে পাথর সরানোর জন্য যখন আসেন, জাবির তখন দেখেন ক্ষুধার জ্বালায় তিনি পেটে পাথর বেঁধে রেখেছেন। (বুখারী- ২/৫৮৮, ৭৮৯) এ দৃশ্য দেখে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে বাড়ীতে যান এবং স্ত্রীকে বলেন, আজ আমি এমন এক দৃশ্য দেখেছি, যাতে ধৈর্য ধারণ করা যায় না। ঘরে কিছু থাকলে রান্না কর। তিনি ছাগলের একটি বাচ্চা জবেহ করে দিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার বাড়ীতে একটু আসুন এবং যা কিছু আছে তাই একটু খেয়ে নিন। রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীতে তিনদিন যাবত কোন খাবার ছিল না। তিনি দাওয়াত কবুল করলেন। শুধু কবুল নয় তিনি খন্দকে কর্মরত সকলের মাঝে সাধারণ ঘোষণাও দিয়ে দিলেন যে, জাবির তোমাদের সকলকে খাবারের দাওয়াত দিয়েছে। জাবির তো শুধু রাসূল সা. ও সেই সাথে অতিরিক্ত দুই তিন জনের খাবার প্রস্তুত করেছিলেন। রাসূলুল্লাহর সা. এই ঘোষণা শুনে তিনি অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন; কিন্তু আদব ও ভদ্রতার খাতিরে চুপ থাকলেন। রাসূল সা. খন্দকবাসীদের সংগে করে জাবিরের বাড়ীতে পৌঁছালেন এবং সেই প্রস্তুত খাবার সকলে পেট ভরে খাবার পরেও কিছু বেঁচে গেল। (বুখারী- ২/৭৮৯) রাসূল সা. জাবিরের স্ত্রীকে বললেন, বেঁচে যাওয়া খাবার তোমরা খাও এবং অন্য লোকদের কাছেও কিছু পাঠিয়ে দাও। কারণ, তারা অভুক্ত আছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২১৮, ২১৯, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৯১, ১৯২, ১৯৩) হিজরী ষষ্ঠ সনে বনু মুসতালিকের যুদ্ধ হয়। রাসূল সা. যাত্রার উদ্দেশ্যে বের হয়ে নামায পড়তে লাগলেন। এর পূর্বেই তিনি জাবিরকে কোন কাজে কোথাও পাঠিয়েছিলেন। জাবির ফিরে এলে রাসুল সা. রওয়ানা হওয়ার নির্দেশ দান করেন। বনু মুসতালিকের পর আনমারের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধেও জাবির শরীক ছিলেন। (বুখারী, গুযওয়াতু আনমার) এই বছরই হযরত রাসূলে কারীম সা. ’উমরাহ আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় রওয়ানা হলেন। জাবির বলেন, এই সফরে আমরা মোট চৌদ্দশত লোক ছিলাম। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩০৯) বাই’য়াতুর রিদওয়ানের প্রসিদ্ধ ঘটনা এই সফরেই ঘটে। হযরত জাবিরও বাই’য়াতের (শপথ) সৌভাগ্য অর্জন করেন। বাই’য়াতের সময় ’উমার রাসূলুল্লাহর সা. হাত এবং জাবির ’উমারের হাত ধরে রেখেছিলেন। (মুসনাদ- ৩/৩৬৯) জাবির বলেন, একমাত্র আল-জাদ্দু ইবন কায়স ছাড়া আর সকলেই বাই’য়াত করেছিল। আল্লাহ রকসম, আমি যেন আজও দেখতে পাচ্ছি, সে তার উটের বগলের সাথে মিশে লুকিয়ে আছে, যাতে কেউ দেখতে না পায়। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩১৬) জাবির যখন রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করছিলেন তখন রাসূল সা. বলেছিলেনঃ তোমরা সারা দুনিয়ার মধ্যে উত্তম ব্যক্তি। (বুখারী, গুযওয়াতু হুদাইবিয়া) এই বাই’য়াত সম্পর্কে অন্যান্য সাহাবীরা পরবর্তীকালে বলতেন, আমরা মৃত্যুর ওপর বাই’য়াত করেছিলাম। কিন্তু জাবির বলতেন, আমরা মৃত্যুর ওপর বাই’য়াত করিনি। আমরা বাই’য়াত করেছি এই কথার ওপর যে, আমরা পালিয়ে যাব না। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩১৫) সাহাবিরা হুদাইবিয়া থেকে চলা শুরু করেন। পথে ‘সুকইয়া’ নামক স্থানে যাত্রা বিরতি হয়। সেখানে পানি ছিল না। হযরত মু’য়াজ ইবন জাবালের রা. মুখ দিয়ে ঘোষণা হলো- কেউ যদি পানি পান করাতো। ঘোষণা শুনে জাবির রা. কয়েকজন আনসারকে সংগে করে পানির সন্ধানে বের হলেন। তেইশ মাইল দূরে ‘কুরসায়া’ নামক স্থানে পানির সন্ধান পান। সেখানে থেকে মশকে ভরে পানি আনেন। ‘ঈশার নামাযের পর দেখেন, এক ব্যক্তি উটে সাওয়ার হয়ে হাউজের দিকে যাচ্ছে। তিনি ছিলেন হযরত রাসূলে কারীম সা.। জাবির রা. রাসূলুল্লাহর সা. উটের লাগাম টেনে ধরে উট বসিয়ে দেন। রাসূল সা. নেমে নামায আদায় করেন। জাবির নিজেও রাসূলে সা. পাশে দাঁড়িয়ে নামাযে শরীক হন। (মুসনাদ- ৩/৩৮০) হিজরী অষ্টম সনে রাসূলুল্লাহ সা. উপকূলীয় অঞ্চলের দিকে একটি বাহিনী পাঠান। এই বাহিনীর আমীর ছিলেন আবু ’উবাইদা। ইসলামের ইতিহাসে এই অভিযান ছিল একটি আশ্চর্যজনক পরীক্ষা। মুসলমানরা এ পরীক্ষায় পূর্ণরূপে কামিয়াব হয়। জাবিরও ছিলেন এই বাহিনীর একজন সদস্য। বাহিনীর লোকদের খাদ্য খাবার সব শেষ হয়ে গেল। তারা গাছের পাতা খাওয়া শুরু করলো। হঠাৎ একদিন তারা সাগর তীরে বিশাল এক মরা মাছ দেখতে পেল। লোকেরা আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ মনে করে মাছটি খাওয়া শুরু করলো। মাছটি এত বড় ছিল যে, বাহিনীর আমীর মাছটির পাঁজরের একটি কাটা সোজা করে ধরেন এবং তার নীচ দিয়ে সবচেয়ে উঁচু উটটি পার হয়ে গেল। জাবির পাঁচজন লোকের সাথে মাছটির একটি চোখের গর্তের মধ্যে বসে পড়েন; কিন্তু তাতে তাঁদের কোন কষ্ট হলো না। তিন শো লোক পনেরো দিন পর্যন্ত মাছটি খেয়েছিল। মাটির নাম ছিল ’আম্বর। (মুসনাদ আহমাদ- ৩/৩০৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/২০৮, ২০৯, ৩/৩৬৯, ৬৪০) সীরাত লেখকরা হুনাইনও তাবুক অভিযানে জাবিরের যোগদানের কথা উল্লেখ করেছেন। হিজরী দশম সনে বিদায় হজ্জেও তিনি শরীক ছিলেন। (মুসনাদ- ৩/৩৪৯, ২৯২) তবে তিনি খাইবার অভিযানে অনুপস্থিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও রাসূল সা. তাঁকে অংশগ্রহণকারী লোকদের সমান গনীমাতের অংশ দান করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৪৯) হিজরী ৩৭ সনে হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার রা. মধ্যে সংঘটিত সিফফীনের যুদ্ধে জাবির আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করেন। (উসুদুল গাবা- ১/২৫৭) হিজরী ৪০ সনে আমীর মু’য়াবিয়ার গভর্নর (আমিল) বুসর ইবন আরতাত হিজায ও ইয়ামনে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আসেন এবং মদীনায় এক ভাষণ দান করেন। ভাষণে তিনি বলেন, যতক্ষণ জাবির আমার সামনে হাজির না হবে ততক্ষণ বনু সালামাকে আমান বা নিরাপত্তা দেওয়া হবে না। জাবির জীবনের আশংকা করছিলেন। তিনি উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামার রা. নিকট গিয়ে পরামর্শ করেন। উম্মু সালামা তাঁকে বলেন, আমি আমার ছেলেদেরকেও বাই’য়াত (আনুগত্যের শপথ) করতে বলেছি, তুমিও বাই’য়াত করে নাও। জাবির বলেন, এটা তো হবে গোমরাহীর ওপর বাই’য়াত। উম্মু সালামা বলেন, না, এটা হবে মজবুরী বা বাধ্য অবস্থার বাই’য়াত। আমার মত এটাই। তাঁর পরামর্শ মত জাবির বুসরের সামনে হাজির হন এবং হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার খিলাফতের সপক্ষে বাই’য়াত করেন। হিজরী ৭৪ সনে হাজ্জাজ ছিলেন মদীনার গভর্নর। তাঁর যুলুম অত্যাচার থেকে সাহাবীরাও নিরাপদ ছিলেন না। তিনি কিছু সংখ্যক সাহাবীর ওপর এতটুকু করুণা করেন যে, তাঁদের ঘাড়ে, আর জাবিরের হাতে সীল মোহর মেরে দেন। (উসুদুল গাবা- ২/৩৬৬) শেষ জীবনে জাবির বলতেন, আমি আকাবায় উপস্থিত ছিলাম। হাজ্জাজ ও তার কর্মকাণ্ডও প্রত্যক্ষ করেছিল। আমার চোখের মত কান দু’টিও যদি নষ্ট হয়ে যেত, কতই না ভালো হতো। তাহলে অনেক কিছুই আমাকে শুনতে হতো না। হাজ্জাজ বলতেন, জাবিরের এই কথা যখন আমার কানে গেল তখন তাঁকে হত্যা না করার যে অনুশোচনা অনুরূপ অনুশোচনা অন্য কোন ব্যাপারে আমার হয়নি। এ কথা শুনে ‘আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. তাকে বলেন, তাহলে আল্লাহ তোমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৯) হযরত জাবির শেষ জীবনে অত্যন্ত দূর্বল হয়ে পড়েন। চোখেও দেখতেন না। তার ওপর সরকারের জুলুম অত্যাচার তাঁকে আরও কাহিল করে দেয়। তাঁর মৃত্যুসন ও মৃত্যুর সময় বয়স কত হয়েছিল সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। মৃত্যুসন হিজরী ৭৮, ৭৭, ৭৪ অথবা ৭৩ বলা হয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ৭৮ সনে ৯৪ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তিনি ছিলেন তৃতীয় আকাবায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশেষ দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী। (শাজারাতুজ জাহাব ফীমান জাহান- ১/৮৪, তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৮৬, আল ইসাবা- ১/২৪৮) ওয়াকিদী বলেন, জাবির ছিলেন মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি। কাতাদাহও এই মত সমর্থন করেছেন। ইমাম বাগাবী বলেন, এটা একটা ভিত্তিহীন ধারণামাত্র। প্রকৃপক্ষে সাহল ইবন সা’দই দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী মদীনার সর্বশেষ সাহাবী। তিনি হিজরী ৯১ সনে মারা যান। (আল ইসাবা- ১/২১৩, শাজারাতুজ জাহাব- ১/৪, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৮) তৃতীয় আকাবায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে এ সময় পর্যন্ত একমাত্র জাবিরই জীবিত ছিলেন। আর সাহাবীদের যুগও তখন শেষ হতে চলেছিল, অল্প সংখ্যক সাহাবী জীবিত ছিলেন। এই কারণে তাৎকালীন মুসলিম উম্মাহর জন্য তাঁর অস্তিত্ব ছিল রহমত ও বরকতস্বরূপ। হাজ্জাজের যুলুম অত্যাচার তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং নিজেও সহ্য করেছিলেন। তাই মৃত্যুর পূর্বে অসীয়ত করে যান যে, হাজ্জাজ যেন তাঁর জানাযার নামায না পড়ায়। এ কারণে হযরত ’উসমানের ছেলে আবার ইবন ’উসমান জানাযার নামায পড়ান। ইমাম বুখারী ও তাবারী তাদের তারীখে উল্লেখ করেছেন যে, হাজ্জাজ তাঁর জানাযার অংশগ্রহণ করেছিলেন। তবে তাহজীবুত তাহজীব গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, হাজ্জাজেই জানাযার নামায পড়িয়েছিলেন। (আল ইসাবা- ১/২১৩, তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৯১) হযরত জাবির পিতার শাহাদাতের পর এক সতীচ্ছদা (সায়িবা) মহিলাকে বিয়ে করেন। এ সম্পর্কে মুসনাদে আহমাদ ও বুখারীতে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। একবার রাসূলুল্লাহর সা. সাথে জাবির এক সফর থেকে ফিরছিলেন। মদীনার কাছাকাছি পৌঁছলে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ’আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি নতুন বিয়ে করেছি। আপনি অনুমতি দিলে আমি একটু তাড়াতাড়ি পরিবারের সাথে মিলিত হতে পারি। রাসূল সা জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি বিয়ে করেছো? তিনি বললেনঃ হাঁ। আবার প্রশ্ন কররেনঃ কুমারী না (সাহিয়্যবা) সতীচ্ছদা মহিলা? বললেনঃ সতীচ্ছদা। রাসূল সা. তখন বললেনঃ তুমি একটি কুমারী মেয়ে বিয়ে করলে না কেন? তাহলে তোমরা পরস্পর খেল তামাশা করতে পারতে। জাবির বললেন, আমার পিতা উহুদে শহীদ হন এবং আমার ওপর কতকগুলি ছোট মেয়ের দায়িত্ব দিয়ে যান। আমি তাদেরই মত কাউকে বিয়ে করতে চাইনি। আমার প্রয়োজন ছিল কোন বয়স্কা মহিলার যে তাদের চিরুনী করে দিতে পারে, বেনী বাঁধতে পারে এবং কাপড় সেলাই করে পরিয়ে দিতে পারে। তাঁর কথা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ তুমি ঠিক কাজটি করেছ। (বুলগুল আমানী মিন আসরারি ফাতহির রাব্বানী- ৬/১৪৬, ২২/২০৯, বুখারী- ২/৫৮০, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২০৭)। বনু সালামা গো্ত্রে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ইসলামে পাত্রী দেখে বিয়ের বিধান দেওয়া হয়েছে। এ কারণে তিনি বিয়ের পয়গামের পর লুকিয়ে পাত্রী দেখে নেন। প্রথম স্ত্রীর নাম সুহাইলা বিনতু মাসউদ। তিনি বনু জুফার গোত্রের কন্যা ও সাহাবিয়্যা ছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম উম্মুল হারিস। তিনি আউস গোত্রের সম্মানিত সাহাবী মুহাম্মাদ ইবন মাসলামার কন্যা। তাঁর সন্তানদের মধ্যে ’আবদুর রহমান, ’আকীল, মুহাম্মাদ, হামীদা, মায়মুনা ও উম্মু হাবীব এই কয়জনের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। হযরত জাবিরের জ্ঞান অর্জনের সূচনা হয় হযরত রাসূলে কারীমের সা. দারসগাহ বা শিক্ষা নিকেতনে। তাছাড়া মাদ্রাসা-ই-নববীর কৃতি ছাত্রদের হালকা-ই-দারস থেকেও ইলম হাসিল করেন। আবু বকর সিদ্দীক, ’উমার, আলী, আবু ’উবাইদা, তালহা, মু’য়াজ ইবন জাবাল, ’আম্মার ইবন ইয়াসির, খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ, আবু বারদাহ ইবন নাযার, আবু কাতাদাহ, আবু হুরাইরা, আবু সা’ঈদ আল-খুদরী, আবু হুমাইদ সা’ঈদী, ’আবদুল্লাহ ইবন উনাইস উম্মু, শুরাইক, উম্মু মালিক, উম্মু মুবাশশির, উম্মু কুলসুম বিনতু আবী বকর রা.- এই মহান ব্যক্তিবর্গের সকলেই ছিলেন তাঁর সম্মানিত শিক্ষক। (তাহজীবু আসমা ওয়াল লুগাত- ১/১৪২) হাদীস শোনা ও সংগ্রহের প্রতি তাঁর আগ্রহ এত প্রবল ছিল যে, একটি মাত্র হাদীস শোনার জন্য মাসের পর মাস ভ্রমণ করতেন। জাবির বলেনঃ খোদ রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছিল এমন এক ব্যক্তির বর্ণিত একটি হাদীস আমি পেলাম। অতঃপর আমি একটি উট খরীদ করে প্রস্তুত করলাম এবং তার ওপর সাওয়ার হয়ে এক মাস পর শামে (সিরিয়া) পৌঁছলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি তিনি ’আবদুল্লাহ ইবন উনাইস। আমি তাঁর দারোয়ানকে বললামঃ বল, জাবির দরযায় দাঁড়িয়ে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ ’আবদুল্লাহর ছেলে জাবির? বললামঃ হাঁ। তিনি কাপড় টানতে টানতে ছুটে এসে আমার সাথে কোলাকুলি করলেন। বললামঃ কিসাস- এর ব্যাপারে আপনি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে একটি হাদীস শুনেছেন বলে আমি জেনেছি। হাদীসটি আপনার মুখ থেকে শোনার আগেই আমি অথবা আপনি মারা যান কিনা, এই ভয়ে ছুটে এসেছি। তারপর আবদুল্লাহ ইবন উনাইস তাঁর কাছে হাদীসটি বর্ণনা করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৬) এমনিভাবে একটি মাত্র হাদীস শোনার জন্য তিনি মিসর সফর করেন। মাসলামা ইবন মুখাল্লাদ রা. থেকে তাবারানী তাঁর ‘আল-আসওয়াত’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছে। তিনি বলেনঃ আমি যখন মিসরে তখন একদিন দারোয়ান এসে বললো, একজন বেদুঈন উটের পিঠে দরযায় অপেক্ষমান, আপনার সাথে দেখা করতে চায়। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ কে আপনি? বললেনঃ জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ আল-আনসারী। আমি বললামঃ আমি নিচে আসবো না আপনি উপরে উঠে আসবেন। বললেনঃ আপনার নেমে আসার দরকার নেই, আর আমিও উঠবো না। শুনেছি আপনি ‘সাতরুল মুমিন’ সম্পর্কিত একটি হাদীস রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণনা করে থাকেন, আমি সেই হাদীসটি আপনার মুখ থেকে শোনার জন্যই এসেছি। আমি হাদীসটি বর্ণনা করলাম। হাদীসটি শুনেই তিনি উটকে চাবুক মেরে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৭, তারীখু ইবন ’আসাকির- ৩/৩৮৬, সীয়ারে আনসার- ১/৩০১) ইল্ম হাসিলের পর্ব শেষ করে তিনি তাদরীসের (শিক্ষাদান) আসনে বসেন। মসজিদে নববীতে তাঁর একটি হালকা-ই-দারস ছিল। (আল-আ’লাম- ২/৯২) মক্কা, মদীনা, ইয়ামন, কুফা, বসরা, মিসর প্রভৃতি স্থানের ছাত্ররা তাঁর দারসে শরীক হতো। হাদীসের প্রচার ও প্রসার ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি প্রচুর সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা- ১৫৪০ (এক হাজার পাঁচ শো চল্লিশ)। তার মধ্যে ৬০ টি (ষাট) মুত্তাফাক ’আলাইহি, ২৬ টি (ছাব্বিশ) বুখারী ও ১২৬ টি (একশো ছাব্বিশ) মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/১৪২, আল-আ’লাম- ২/৯২) তিনি হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যেমনঃ একটি হাদীস বর্ণনাকালে ‘সামি’তু’ (আমি শুনেছি) শব্দটি বলতে গিয়ে থেমে যান। পরে নিজের পক্ষ থেকে হাদীসটি ‘মাওকূফ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ, হাদীসটির সবগুলি শব্দ তিনি নিজ কানে রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শোনার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারেননি। (মুসনাদ- ৩/৩৩৩) তাঁর ছাত্রদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাবে’ঈদের সব ক’টি স্তরের বিশিষ্ট মুহাদ্দিসীন তাঁর ছাত্র ছিলেন। বিশেষ খ্যাতিমান কয়েকজন তাবে’ঈর নামঃ সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, আবু সালামা, সা’ঈদ ইবন মীনা, সা’ঈদ ইবন আবী বিলালম, আসিম ইবন উমার ইবন কাতাদাহ, আবু আয-যুবাইর, মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির, আশ-শা’বী, আবু সুফইয়ান তালহা ইবন নাফি, আল-হাসান আল-বাসরী, মুহাম্মাদ আল-বাকি, ’আতা’, সালিম ইবন আবী জু’দ, ’আমর ইবন দীনার, মুজাহিদ, মুহাম্মাদ আল-বাকির, আল-হাসান ইবন মুহাম্মাদ আল-হানাফিয়্যা প্রমুখ। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪, তাহজীবুল আসমা’ ওয়ালগাত- ১/১৪৪) তবে’ঈরা ছাড়াও সাহাবীদের বিরাট একটি দল তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল-আ’লাম- ২/৯২) আল্লামা জাহ্বী তাঁর ‘তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ’ গ্রন্থে প্রথম তবকার (শ্রেণী) মুহাদ্দিসীনের মধ্যে জাবিরের নামটি উল্লেখ করেছেন। হাদীস ছাড়া তাফসীর ও ফিকাহ শাস্ত্রেও তাঁর অগাধ পান্ডিত্য ছিল। তাফসীর শাস্ত্রে তাঁর বর্ণনা কম পাওয়া গেলেও যা আছে তা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য। সব মানুষের জাহান্নামে অবতরণের ব্যাপারে লোকদের মতভেদ ছিল। কেউ কেউ মনে করতো, কোন মুসলমান জাহান্নামে প্রবেশ করবে না। অনেকের ধারণা ছিল, সব মানুষই একবার জাহান্নামে যাবে, তবে মুসলমানরা মুক্তি পাবে। এ ব্যাপারে জাবিরকে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, নেককার ও বদকার উভয়ই জাহান্নামে যাবে। তবে নেককারদের গায়ে আগুনের ছোঁয়া লাগবে না। তারপর মুত্তাকীরা (খোদাভীরু) মুক্তি পাবে এবং যালিমরা জাহান্নামেই থেকে যাবে। (মুসনাদ- ৩/৩২৯) তালাক ইবন হাবীব ‘শাফা’য়াত’ (সুপারিশ) অস্বীকার করতেন। এ ব্যাপারে তিনি ‘খুলুদ ফিন্নার’ (অনন্তকাল জাহান্নামে অবস্থান) সম্পর্কিত যাবতীয় আয়াত তিলাওয়াত করে জাবিরের সাথে মুনাজিরা ও তর্ক-বাহাছ করেন। হযরত জাবির তাঁর সব কথা শোনার পর বললেনঃ সম্ভবতঃ তুমি নিজেকে কুরআন-হাদীসের জ্ঞানে আমার চেয়ে বড় জ্ঞানী মনে করছো। তালাক ইবনহাবীব বললেনঃ আসতাগফিরুল্লাহ! এমনটি কল্পনাও করতে পারিরেন। তখন জাবির বলেন, শোন! এ সব আয়াতের উদ্দেশ্য মুশরিকগণ। যাদেরকে শাস্তি দেওয়ার পর জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে তাদের উল্লেখ এ সব আয়াতে নেই। তবে রাসূলুল্লাহ সা. হাদীসে তাদের কথা উল্লেখ করেছেন। (মুসনাদ- ৩/৩৩০, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৯) জাবির বললেনঃ সূরা আল মুয্যাম্মিলের প্রথম দুইটি আয়াত দ্বারা আমাদের ওপর ‘কিয়ামুল লাইল’ ফরয করা হয়। রাতে নামাযে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমাদের পা ফুলে যেত। পরে আল্লাহ একই সূরার ২০ নং আয়াত নাযিল করে পূর্বোক্ত আদেশ রহিত করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৪১) জাবিরের মতে কুরআনের সর্বপ্রথম যে আয়াত নাযিল হয় তা সূরা আল মুদ্দাস্সিরের কয়েকটি আয়াক। (আনসাবুল আশরাফ- ১/১০৭) ফিকাহ শাস্ত্রেও তাঁর প্রভূত দখল ছিল। যে সব মাসয়ালা সমূহে বিভিন্ন সময়ে তিনি ফাতওয়া দিয়েছেন তা সংকলিত হলে ছোটখাট একটা গ্রন্থে পরিণত হবে। তিনি ছিলেন মদীনার অন্যতম মুফতী। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৫৫) ইসলামী আখলাক বা নৈতিকতার মূল ভিত্তি হচ্ছে ইকামাতে হুদুদিল্লাহ (আল্লাহর নির্ধারিত শাস্তি বাস্তবায়ন), ঈমানী আবেগ, সত্য প্রকাশের সৎ সাহস, আমর বিল মা’রূফ (সৎ কাজের আদেশ), রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি ভালোবাসা, ইত্তেবা-ই-সুন্নাত (সুন্নাতের অনুসরণ), অন্য মুসলমানের প্রতি দরদ ও সহানুভূতি ইত্যাদি। হযরত জাবিরের মধ্যে এই সব গুণের প্রত্যেকটির কিছু না কিছু বিকাশ ঘটেছিল। ইকামাতে হুদুদিল্লাহ প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরয। এ ক্ষেত্রে জাবিরের নিকট আপন-পর কোন প্রভেদ ছিল না্ হযরত মা’য়িয আল-আসলামী রা. ছিলেন মদীনার বাসিন্দা ও রাসূলুল্লাহর সা. অন্যতম সাহাবী। তাঁকে ‘রজম’ (যিনার শাস্তি) করার সময় জাবির উপস্থিত থেকে নিজ হাতে তাঁদের ওপর পাথর নিক্ষেপ করেন। (মুসনাদ- ৩/৩৮১) সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কারও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাঁকে কক্ষণও বিরত রাখতে অথবা বিপথগামী করতে সক্ষম হয়নি। হযরত সা’দ ইবন মু’য়াজ রা. ছিলেন আউস গোত্রের নেতা। তাছাড়া একজন উঁচু মর্যাদার সাহাবী। তিনি ইনতিকাল করলে হযরত রাসূলে কারীম সা. বললেনঃ আজ আরশ কেঁপে উঠেছে। এ হাদীসটি সাহাবী হযরত বারা’ ইবন ’আযিবের রা. জানা ছিল। কিন্তু তিনি ‘আরশ’ শব্দটির পরিবর্তে ‘সারীর’ (খাটিয়া) শব্দ বলতেন। যার অর্থ শববাহী খাটিয়া দুলে ওঠা। বারা’ ইবন ’আযিবের রা. এমন কথা জাবিরকে বলা হলে তিনি বললেনঃ প্রকৃত হাদীস তো হচ্ছে তাই যা আমি বর্ণনা করেছি। আর বারা’- এর কথা হিংসা-বিদ্বেষ দ্বারা প্রভাবিত। কারণে, ইসলাম পূর্ব যুগে আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে ঝগড়া ও বিবাদ ছিল। উল্লেখ্য যে, হযরত জাবির রা. ছিলেন খাযরাজ গোত্রের লোক। তা সত্ত্বেও বারা ইবন ’আযিবকে সমর্থন না করে যা সত্য তাই প্রকাশ করে দেন। হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ মদীনার গভর্নর হয়ে আসার পর নামাযের সময়ে কিছু আগে-পিছে করেন। লোকেরা জাবিরের কাছে ছুটে আসে। তিনি ঘোষণা করেন, রাসূল সা. জুহরের নামায দুপুরের পরে, ’আসর সূর্য স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল থাকা পর্যন্ত, সূর্যাস্তের সময় মাগরিব ও ফজরের নামায অন্ধকারে আদায় করতেন। আর ’ঈশার সময় লোকদের জন্য অপেক্ষা করতেন। তাড়াতাড়ি লোক সমাগম হলে তাড়াতাড়ি আদায় করতেন। অন্যথায় দেরী করতেন। (মুসনাদ- ৩/৩৬৯) একবার ’আবদুল্লাহ ইবন জাবির তাঁর বাগানের ফল তিন বছরের জন্য বিক্রি করেন। জাবির রা. এ কথা জানতে পেয়ে কিছু লোক সংগে করে মসজিদে আসেন এবং সকলের সামনে ঘোষনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সা. এমন ধরণের বেচা-কেনা নিষেধ করেছেন। ফল যতক্ষণ খাওয়ার উপযোগী না হয় ততক্ষণ তা বেচা-কেনা জায়েয নয়। (সুতরাং ফল হওয়ার পূর্বেই তা কিভাবে জায়েয হতে পারে?) (মুসনাদ- ৩/৩৯৫) রাসূলুল্লাহর সা. ইত্তেবা ’বা অনুসরণের আবেগ-উৎসাহ এত প্রবল ছিল যে, যে সকল বিষয়ে অনুসরণ আদৌ প্রয়োজনীয় নয় সে ক্ষেত্রেও অনুসরণ করতেন। একবার রাসূলুল্লাহকে সা. মাত্র একখানা কাপড়ে নামায আদায় করতে দেখেন। এ কারণে তিনিও সেই ভাবে নামায আদায় করলেন। লোকেরা যখন বললো আপনি এভাবে নামায আদায় করলেন, অথচ আপনার নিকট অতিরিক্ত কাপড় আছে। তিনি বললেন, এটা এই জন্য করলাম যে, তোমরা রাসূলুল্লাহর সা. এই অনুমতিকে দেখে বুঝতে পার। হযরত রাসূলে কারীম সা. মসজিদে ফাত্হ- এ তিন দিন দু’আ করেছিলেন। তৃতীয় দিন নামাযের মধ্যে দু’আ কবুল হলে চেহারা মুবারকে এক প্রকার নূরের চমক খেলে যায়। হযরত জাবির এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই যখনই তিনি কোন বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হতেন, একটা নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে গিয়ে দু’আ করতেন। (মুসনাদ- ৩/৩৩২) রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা এবং তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রবল আগ্রহ। আর এর বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল তৃতীয় ’আকাবার বাই’য়াতে। তাছাড়া আরও বহু ঘটনায় দেখা যায় রাসূলকে সা. খুশী করার কী প্রাণান্তকর চেষ্টাই না তিনি করছেন। একবার কিছু উৎকৃষ্টমানের খেজুর রাসূলের সা. খিদমতে পেশ করেন। তিনি দেখে বলেন, আমি মনে করেছিলাম গোশত। জাবির বাড়ি ফিরে গিয়ে স্ত্রীকে কথাটি বলেন। তারপর তক্ষুণি বকরী জবেহ করে গোশত রান্না করে দেন। একবার রাসূল সনা. জাবিরের বাড়ীতে আসলেন। জাবির একটি বকরী জবেহ করে দেন। জবেহের সময় বকরীটি কিছু ডাকাডাকি করছিল। তাই শুনে তিনি বললেন, বংশ ও দুধ শেষ করে দিচ্ছ কেন? জাবির বললেনঃ এটা এখনও বাচ্চা, খেজুর খেয়ে এমন মোটা হয়েছে। একবার তিনি ঢালে করে খেজুর নিয়ে যাচ্ছেন, এমন সময় রাসূলকে সা. সামনে দিয়ে যেতে দেখে খাওয়ার আহ্বান জানালেন। রাসূল সা. আহবানে সাড়া দিলেন। আর একবার জাবির রাসূলকে সা. বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে গোশ্ত, খুরমা ও পানি উপস্থাপন করেন। রাসূল সা. বলেন, তোমরা হয়তো জান আমি গোশ্ত খুব পসন্দ করি। বিদায় বেলা অন্দর মহল থেকে জাবিরের স্ত্রীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার ও আমার স্বামীর জন্য দু’আ করুন। তক্ষুণি তিনি বললেনঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলাইহিম- হে আল্লাহ, তাদের সকলের ওপর রহমত বর্ষণ করুন। (মুসনাদ- ৩/২৯৭, ৩০৩, বুখারী- ২/৫৮০) একবার কোন এক বিশেষ ঘটনায় রাসূল সা. তাঁর জন্য পঁচিশবার মাগফিরাত কামনা করেন। একবার জাবিরের অসুখ হলো। রাসূল সা. দেখতে আসলেন। জাবির বেহুঁশ ছিলেন। রাসূল সা. অযু করে পানির ছিটা দিলে তাঁর হুঁশ হলো। তখন পর্যন্ত জাবিরের কোন সন্তানাদি ছিল না। পিতাও মারা গিয়েছিলেন। শরী’য়াতের পরিভাষায় এমন ব্যক্তিকে ‘কালালাহ’ বলে। যেহেতু জীবন সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, তাই রাসূলকে সা. জিজ্ঞেস করলেন, আমি মারা গেলে আমার মীরাস বা উত্তরাধিকার কিভাবে বণ্টিত হবে? আমি কি ২/৩ (দুই তৃতীয়াংশ) বোনদের দেব? বললেনঃ বেশ, দাও। আবার আরজ করলেনঃ ১/২ (অর্ধেক) দিই? বললেনঃ হাঁ, তাও দিতে পার। একথা বলে রাসূল সা. বাইরে বেরিয়ে আসেন। তারপর আবার ফিরে গিয়ে বললেনঃ জাবির, তুমি এ অসুখে মরবে না। তোমার সম্পর্কে আয়াত নাযিল হয়েছে। এই বলে তিনি সূরা নিসার ১৭৬ নং আয়াতুল কালালাহ পাঠ করেনঃ ‘হে নবী, লোকে তোমার নিকট ব্যবস্থা জানতে চায়। বল, পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্বন্ধে তোমাদেরকে ব্যবস্থা জানাচ্ছেন…..।’ (তারীখু ইবন আসাকির- ৩/৩৯০, হায়াতুস সাহাবা- ২/৫০৯, মুসনাদ- ৩/২৯৮, ৩৭২) হযরত রাসূলে কারীম সা. কোথাও খাবারের দাও’য়াত পেলে জাবিরকে মাঝে মাঝে সংগে নিয়ে যেতেন। মাঝে মাঝে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়েও আহার করাতেন। একদিন জাবির তাঁর বাড়ীর পাশে বসে ছিলেন। মেন সময় সামনে দিয়ে রাসূলকে সা. যেতে দেখলেন। দৌড়ে কাছে গেলেন এবং আদব রক্ষার্থে পেছনে চলতে লাগলেন। রাসূল সা. বললেনঃ পাশে এস। তারপর জাবিরের হাত ধরে নিজ বাড়ীতে নিয়ে যান এবং পর্দা সরিয়ে ভেতরে বসতে দেন। ভেতর থেকে তিন টুকরো রুটি ও একটু সিরকা আসলো। রাসূল সা. রুটি তিনটি সমান দুই ভাগে ভাগ করলেন এবং বললেনঃ সিরকা খুব উপাদেয় তরকারি। জাবির বলেনঃ আমি সেই দিন থেকে সিরকা খুব ভালোবাসি। (মুসনাদ- ৩/৩৭৯, ৪০, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮৩) একবার রাসুল সা. ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যান। জাবির তাঁকে দেখতে যান (মুসনাদ- ৩/৩০০) রাসূলুল্লাহর সা. কখনও ঋণের প্রয়োজন হলে জাবিরের নিকট থেকে গ্রহণ করতেন। একবার ঋণ নিয়ে পরিশোদের সময় সন্তুষ্ট চিত্তে আসলের ওপর কিছু বেশী দান করেন। (মুসনাদ- ৩/৩০২) রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের শেষ পর্যায়ে একবার বাহরাইন থেকে মাল আসছিল। তিনি সেই মাল থেকে জাবিরকে কিছু দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। ইত্যবসরে রাসূল সা. ইনতিকাল করেন। হযরত আবু বকর রা. খলীফা হয়ে ঘোষণা দেন যে, রাসূল সা. যদি কাউকে কিছু দেওয়ার অঙ্গীকার করে থাকেন অথবা কারও নিকট ঋণী থাকেন, সে যেন আমার নিকট থেকে তা গ্রহণ করেন। হযরত জাবির রাসূলুল্লাহর সা. অঙ্গীকারের কথা বললে আবু বকর রা. তা পূরণ করেন। মুসলিম উম্মার প্রতি হযরত জাবিরের ছিল গভীর মমতা ও ভালোবাসা। তিনি ছিলেন ‘রুহামাউ বাইনাহুম’- (পরস্পর পরস্পরের প্রতি দয়ালু)- এর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। একবার তাঁর এক প্রতিবেশী কোথাও সফরে যায়। সফর থেকে ফিরে আসলে জাবির তার সাথে দেখা করতে যান। লোকটি মানুষের মধ্যে বিভেদ, দলাদলি, বিদ’য়াতের প্রচলন ইত্যাদি যা সে দেখেছিল, বর্ণনা করলো। যে সাহাবায়ে কিরাম রক্তের বিনিময়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁরা এমন কথা সহ্য করবেন কেমন করে। তাঁর চোখ দু’টি সজল হয়ে উঠলো। তিনি বললেন, রাসুল সা. সত্যই বলেছেন, মানুষ যেমন দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে, তেমনি বের হয়েও যাবে। (মুসনাদ- ৩/৩৪৩) তাঁর বাসস্থান ছিল মসজিদে নববী থেকে এক মাইল দূরে। এত দূর থেকে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করতে মসজিদে নববীতে আসতেন। একবার মসজিদে নববীর পাশে কিছু বাড়ী-ঘর খালি হয়। জাবির ও বনু সালামার অন্য এক ব্যক্তি এই সব শূন্য বাড়ী-ঘরে চলে আসার ইচ্ছা করলেন। তাহলে নামায আদায় করা সহজ হবে। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বিষয়টি উত্থাপন করলে তিনি বললেনঃ তোমরা যে সেখান থেকে আস, তাতে তোমাদের প্রতি কদমে সাওয়াব লেখা হয়। চিন্তা করে দেখ তো কত সওয়াব হয়েছে? তাঁরা দু’জন মনে প্রাণে রাসূলুল্লাহর সা. কথা মেনে নেন। শেষ জীবনে বাড়ীর পাশে একটি মসজিদ তৈরী করেন। জাবির বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. আবু ’উবাইদার নেতৃত্বে আমাদেরকে একটি অভিযানে পাঠান। একটি থলিতে কিছু খেজুর ছাড়া আমাদের সাথে আর কিছুই ছিল না। আবু ’উবাইদা আমাদেরকে প্রতিদিন মাত্র একটি করে খেজুর দিতেন। আমরা সেটি বাচ্চাদের মত চুষতাম আর পানি পান করতাম। এভাবে একটি খেজুর দিয়ে রাত্রি পর্যন্ত চালাতাম। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩২১) ইবন হিব্বান তাঁর ‘সহীত’ গ্রন্থে আবুল মুসাববিহ আল-মুকরায়ী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, মালিক ইবন ’আবদিল্লাহ আল-খাস’য়ামীর নেতৃত্বে আমরা একবার রোমের মাটিতে চলছিলাম। একদিন মালিক জাবিরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলেন, তিনি তাঁর বাহন খচ্চরটিকে লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চলছেন। মালিক বললেনঃ আবু আবদিল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে বাহন দিয়েছেন, তার পিঠে আরোহণ করুন। জাবির বললেনঃ আমি তাকে একটু বিশ্রাম দিচ্ছি, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি, আল্লাহর রাস্তায় যে দু’টি পা ধুলি-মলিন হয়েছে, তার জন্য আল্লাহ জাহান্নামের আগুন হারাম করে দিয়েছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৬, ৪৭৭) হযরত জাবির হজ্জ আদায় করেছেন কয়েকবার। হাদীসে তাঁর দু’টি হজ্জের আলোচনা দেখা যায়। একটি বিদায় হজ্জ ও অন্য আর একটি। সরলতা মুসলমানদের উন্নতির মূল রহস্য। হযরত জাবির ছিলেন অত্যন্ত সরল ও অনাড়ম্বর। একবার সাহাবায়ে কিরামের একটি দল তাঁর বাড়িতে আসলেন। বাড়ীর ভেতর থেকে রুটি ও সিরকা পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনি বললেনঃ বিসমিল্লাহ বলে খেয়ে নিন। সিরকার খুব মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। মানুষের কাছে তার আত্মীয় বন্ধুদের কেউ আসলে উপস্থিত খাবার যা কিছু থাকে সামনে দিতে হবে, কোন রকম ইতস্তত করা উচিত নয়। তেমনি ভাবে উপস্থিত লোকদের সামনে যা কিছু খাবার হাজির করা হয় সন্তুষ্ট চিত্তে আহার করা উচিত। হেয় দৃষ্টিতে তা দেখা উচিত নয়। কারণ, ভনিতার মধ্যে উভয়ের ধ্বংসের উপকরণ বিদ্যমান। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮১, মুসনাদ- ৩/৩৭১) মানুষের সাথে মেলামেশায় তিনি ছিলেন আন্তরিক ও উদার। হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতিটি অভ্যাস ও আচরণ তাঁর মন-মগযে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছিল। হুদাইবিয়ায় ‘বাই’য়াতে রিদওয়ান’ একটি গাছের নীচে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। লোকেরা স্থানটিকে বরকত ও কল্যাণময় মনে করে সেখানে নামায আদায় করতে শুরু করে। এ অবস্থা দেখে হযরত উমার রা. গাছটি কেটে ফেলেন। মুসায়্যাব ইবন দুখন বলেন, পরের বছরই আমরা সেই গাছটি ও স্থানের কথা ভুলে যাই। (বুখারী- ২/৫৯৯) কিন্তু বহু বছর পর্যন্ত জাবিরের তা মনে ছিল। শেষ বয়সে তিনি অন্ধ হয়ে যান। হুদাইবিয়ার প্রসঙ্গ উঠলে একবার বললেনঃ আজ যদি চোখ থাকতো, সেই স্থানটি আমি দেখিয়ে দিতে পারতাম। (বুখারী- ২/৫৯৮) হযরত জাবির বলতেন, হুদাইবিয়ার সন্ধিই হচ্ছে কুরআনে উল্লেখিত প্রকৃত ফাত্হ বা বিজয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৮) জাবির আরও বলতেন, রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির খবর সর্বপ্রথম মদীনায় আসে এক জিনের মাধ্যমে। মদীনার এক মহিলার অনুগত একটি জিন ছিল। একদিন জিনটি একটি সাদা পাখীর রূপ ধরে মহিলার বাড়ীর দেওয়ালে এসে বসে। মহিলা তাকে বললোঃ নীচে নেমে এসো আমরা কথা বলি, খবর আদান-প্রদান করি। জিন বললোঃ মক্কায় এক নবীর আবির্ভাব হয়েছে। তিনি যিনা (ব্যভিচার) হারাম করেছেন এবং আমাদেরকে যমীনে থাকতে নিষেধ করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৭৩) জাবির রা. বলেনঃ আমি একবার এক দিরহামের গোশত কিনলাম। ’উমার একথা শুনে আমার কাছে এসে বললেনঃ জাবির, এটা কি? বললামঃ আমার পরিবারের লোকদের গোশ্ত খেতে খুব ইচ্ছা করেছে তাই এক দিরহামের গোশত কিনেছি। ’উমার কয়েকবার আমার কথাটি আওড়ালেন, ‘আমার পরিবারের লোকদের গোশ্ত খেতে খুব ইচ্ছা করেছে।’ তখন আমার ইচ্ছা হলো, যদি আমার দিরহামটি হারিয়ে যেত অথবা ’উমারের সাথে দেখা না হতো। অন্য একটি বর্ণনা মতে ’উমার বলেন, তোমাদের কোন ইচ্ছা হলেই এভাবে কিনে থাক? (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩০২, ৩০৩) এভাবে হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থ সমূহে হযরত জাবিরের রা. জীবনের বিভিন্ন দিকের অনেক টুকরো টুকরো কথা পাওয়া যায়, যার মধ্যে মুসলমানদের শিক্ষার অনেক কিছুই লুকিয়ে আছে।
’উবাদা ইবনুস সামিত (রা)

আবুল ওয়ালীদ ’উবাদা মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনী সালীম শাখার সন্তান। হিজরতের ৩৮ বছর পূর্বে ৫৮৬ খৃষ্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আ’লাম- ৪/৩০) পিতা সামিত ইবন কায়স এবং মাতা কুররাতুল আইন। মা ছিলেন ’উবাদা ইবন নাদলা ইবন মালিক ইবন আজলানের কন্যা। তিনি নিজের পিতার নামে ছেলের নাম রাখেন ’উবাদা’ (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) ‘উবাদার ভাই আউস ইবন সামিতের স্ত্রী খুওয়াইলা বিনতু সা’লাবা। তিনি সেই মহিলা যাঁর শানে সূ’রা মুজাদিলার জিহারের আয়াত নাযিল হয়। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫১)। মদীনার পশ্চিম দিকে কুবা সংলগ্ন প্রস্তরময় অঞ্চলে ছিল বনী সালীমের বসতি। ‘উতুম কাওয়াকিল’ নামে সেখানে তাদের কয়েকটি কিল্লা ছিল। এরই ভিত্তিতে বলা চলে ’উবাদার বাড়ীটি মদীনার কেন্দ্রস্থলের বাইরে ছিল। ’উবাদা সবে যৌবনে পা দিয়েছেন, এমন সময় মক্কায় ইসলামের অভ্যূদয় ঘটে। তিনি সেই মুষ্টিমেয় ভাগ্যবানদের একজন যাঁরা ইসলামের প্রথম আহবান কানে আসতেই সাড়া দেন। ’আকাবার প্রথম শপথে যেবার ছয়জন মদীনাবাসী রাসূলুল্লাহর সা. হাতে হাত রেখে বাই’য়াত করেন, তিনি তাঁদের একজন। অবশ্য ঐতিহাসিকদের অনেকে এই বাই’য়াতকে আকাবা নামে অভিহিত করেননি। তাঁদের মতে আকাবা মাত্র দু’টি। যাই হোক, দ্বিতীয় ও তৃতীয় আকাবায়ও শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। অনেকের মতে তিনি দ্বিতীয় আকাবায় বারোজনের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। তৃতীয় তথা শেষ আকাবায় রাসূলুল্লাহ সা. মনোনীত বারো নাকীবের (দায়িত্বশীল) অন্যতম নাকীব। তিনি হন বনী কাওয়াকিল এর নাকীব। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬, বুলুগুল আমানী- শরহ মুসনাদে আহমাদ- ২২/২৭৫, ফাতহুল বারী- ৭/১৭২, তাবাকাত- ৩/৫৪৬) উল্লেখ্য যে, বনী ’আমর ইবন আওফ ইবন খাযরাজ সেই প্রাচীন কাল থেকে ‘কাওয়াকিল’ নামে পরিচিত। ‘কাওকালা’ শব্দটির অর্থ এক বিশেষ ধরণের চলন।’ এ নামে আখ্যায়িত হওয়ার কারণ হল, যখন কোন ব্যক্তি তাদের আশ্রয় গ্রহণ করতো তখন তারা লোকটির হাতে একটি তীর দিয়ে বলতো, যাও, এখন ইয়াসরিবের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াও। (ইবন হিশাম ১/৪৩১) ’উবাদার জীবনটি ছিল প্রাণরসে ভরপুর। ইসলাম গ্রহণ করে মক্কা থেকে ফিরে এসেই সর্বপ্রথম মা-কে ইসলামের দীক্ষিত করেন। মদীনায় কা’ব ইবন আজরা নামে তাঁর চিল এক অন্তরঙ্গ বন্ধু। তখনও সে অমুসলিম এবং তার বাড়ীতে ছিল বিরাট এক মূর্তি। ’উবাদার সব সময়ের চিন্তা হল কিভাবে এ বাড়ীটি শিরক থেকে মুক্ত করা যায়। একদিন সুযোগমত বাড়ীর মধ্যে ঢুকে মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলেন। অবশেষে আল্লাহর ইচ্ছায় কা’ব মুসলমান হয়ে যান। হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় পৌঁছে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। আবু মারসাদ আল গানাব হলেন তাঁর দ্বীনি ভাই। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬, আল ইসাবা- ২/২৬৮, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৭০) আবু মারসাদ ছিলেন ইসলামের সূচনা লগ্নের একজন মুসলমান এবং হযরত হামযার রা. হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ। বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে ‘উবাদা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) বদর যুদ্ধের পর গনীমতের মাল (যুদ্দলব্ধ সম্পদ) এর ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে মুজাহিদদের মধ্যে কিঞ্চিৎ মত পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। তখন সূরা আনফালের প্রথম থেকে কতগুলি আয়াত নাযিল হয় এবং এ ঝগড়ার পরিসমাপ্তি ঘটে। ইবন হিশাম বলেন, সূরা আনফালের উল্লেখিত আয়াত সম্পর্কে ’উবাদাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি জবাব দেন, আয়াতগুলি আমাদের বদরী যোদ্ধাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। বদরের দিন আমরা আনফাল এর ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি করি এবং তা নিয়ে যখন আমাদের আখলাকের অবনতি ঘটে তখন আল্লাহ আমাদের হাত থেকে তা ছিনিয়ে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তুলে দেন। তিনি আমাদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬৬) এই বদর যুদ্ধের সময়ই মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের ইঙ্গিতে মদীনার ইয়াহুদী গোত্র বনু কায়নুকা রাসূলুল্লাহর সা. বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তাদের সাথে উবাদার গোত্র বনী আউফের বহু আগে থেকেই মৈত্রী চুক্তি ছিল। তেমনিভাবে চুক্তি ছিল মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূলেরও। তাদের বিদ্রোহের কারণে হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন তখন উবাদা ছুটে গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এবং তাদের সাথে চুক্তি বাতিলের প্রকাশ্য ঘোষনা দিয়ে বললেনঃ আমি তাদের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন ও দায়মুক্তির ঘোষণা করছি। আর আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল ও মুমিনদেরকে আমার বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করছি। অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবন উবাই ইবন সুলূল তার পূর্ব অবস্থায় অটল থাকে। বিদ্রোহ দমনের পর তাদেরকে মদীনা থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। রাসূলুল্লাহ সা. বহিষ্কারের এই কাজটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব উবাদার ওপর অর্পণ করেন। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে সূরা মায়িদার ৫১ নং আয়াত থেকে ৫৮ নং পর্যন্ত আয়াতগুলি নাযিল হয়। আয়াতগুলিতে স্পষ্টতঃ উবাদার প্রশংসা ও মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাইয়ের নিন্দা করা হয়েছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৯) ষষ্ঠ হিজরীর বাইয়াতুর রিদওয়ানে তিনি শরিক ছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৯) ষষ্ঠ হিজরীতে সংঘটিত বনী মুসতালিক বা মুরাইসী এর যুদ্ধেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে তাঁরই দলের একটি লোক ভুলক্রমে শত্রু ভেবে অন্য একজন মুসলিম মুজাহিদকে হত্যা করে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৯০) হযরত আবু বকর সিদ্দীকের রা. খিলাফতকালে শামে যে সকল অভিযান পরিচালিত হয় তার বেশ ক’টিতে ’উবাদা অংশগ্রহণ করেন। হযরত ফারুকে আজমের খিলাফতকালে ’আমর ইবন ’আস মিসরে অভিযান পরিচালনা করেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তিনি চূড়ান্ত বিজয় লাভে সক্ষম না হয়ে মদীনায় খলীফার নিকট অতিরিক্ত সাহায্য চেয়ে পাঠান। খলীফা উমার রা. চার হাজার মতান্তরে দশ হাজার সৈন্যের একটি অতিরিক্ত বাহিনী পাঠান। ’উবাদা ছিলেন সেই বাহিনীর এক চতুর্থাংশ সৈন্যের কমান্ডিং অফিসার। (আল-ইসাবা- ২/২৬৮) খলীফা ’আমর ইবনুল ’আসকে একটি চিঠিতে আরও লেখেন এই অফিসারদের প্রত্যেকেই একহাজার সৈন্যের সমান। এই অতিরিক্ত বাহিনী মিসর পৌঁছার পর ’আমর ইবনুল আস সকল সৈন্য একত্র করে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দান করেন। ভাষণ শেষ করে তিনি উবাদাকে ডেকে বলেন, আপনার নিযাটি আমার হাতে দিন। তিনি নিযাটি নিয়ে নিজের মাথার পাগড়ীটি খুলে নিযার মাথায় বাঁধেন। তারপর সেটি উবাদার হাতে তুলে দিতে গিয়ে বলেন, এই হচ্ছে সেনাপতির আলাম বা পতাকা। আজ আপনিই সেনাপতি। আল্লাহর ইচ্ছায় প্রথম আক্রমণেই শহরের পতন ঘটে। হযরত ’উবাদা বিভিন্ন সময়ে ইসলামী খিলাফতের তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১. সাদাকা বিষয়ক অফিসার ২. ফিলিস্তিনের কাজী ৩. হিমসের আমীর। হযরত রাসূলে কারীম সা. জীবনের শেষ দিকে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘আমিলে সাদাকা’ বা যাকাত আদায়কারী নিয়োগ করেন। উবাদাকেও কোন একটি অঞ্চলে নিয়োগ দান করেন। যাত্রাকালে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে উপদেশ দেনঃ আল্লাহকে ভয় করবে। এমন যেন না হয়, কিয়ামতের দিন চতুষ্পদ জন্তুও তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে এক সময় তাঁকে ফিলিস্তীনের কাজী নিয়োগ করা হয়। সেই সময় উক্ত অঞ্চলটি ছিল হযরত মুয়াবিয়ার রা. ইমারাতের অধীনে। এক সময় কোন একটি বিষয়ে দু’জনের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে হযরত মু’য়াবিয়া রা. তাঁর প্রতি কিছু কঠোর ভাষা প্রয়োগ করেন। তিনিও প্রত্যুত্তরে মুয়াবিয়াকে বলেন, আগামীতে আপনি যেখানে থাকবেন আমি সেখানে থাকবো না। তিনি মদীনায় চলে আসেন, খলীফা উমার রা. এভাবে তাঁর চলে আসার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি পুরো ঘটনা খুলে বলেন। সবকিছু শোনার পর ’উমার রা. বললেনঃ আপনার স্থানে আবার আপনি ফিরে যান। এ যমীন আপনার মত লোকদের জন্য ঠিক আছে। আপনিও আপনার মত লোকেরা যেখানে নেই আল্লাহ সেই স্থানের মঙ্গল করুন। অতঃপর তিনি আমীর মু’য়াবিয়াকে রা. একটি চিঠি লিখে জানিয়ে দেনঃ আমি উবাদাকে তোমার কর্তৃত্ব থেকে স্বাধীন করে দিলাম। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) ফিলিস্তীনের বিচার বিভাগের এই পদটি সর্বপ্রথম ’উবাদার হাতে ন্যস্ত করা হয়। ইমাম আওযাঈ বলেনঃ উবাদা ফিলিস্তীনের প্রথম কাজী। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) হযরত আবু ’উবায়দাহ রা. যখন শামের আমীর তখন তিনি ’উবাদা ইবনুস সামিতকে হিমসে স্বীয় প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ করেন। এই হিমসে অবস্থানকালে তিনি লাজিকিয়্যা জয় করেন। এই অভিযানে তিনি এ নতুন সামরিক টেকনিক প্রয়োগ করেন। তিনি এমন সব বড় বড় গর্ত খনন করেন যে, তার মধ্যে একজন অশ্বারোহী তার অশ্বসহ অতি সহজে লুকিয়ে থাকতে পারতো। (ফুতুহুল বুলদান- ১৩৯) হযরত ’উবাদা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শামে (বৃহত্তর সিরিয়া) বসবাসরত ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কে মতভেদ আছে। হিজরী ৩৪/৬৫৪ সনে রামলা মতান্তরে বায়তুল মাকদাসে ৭২ (বাহাত্তর) বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ইবন ‘আসাকির ’উবাদার জীবনীতে মুয়াবিয়ার রা. সাথে তাঁর এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ করেছেন যাতে ধারণা হয় তিনি হযরত মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতকালেও জীবিত ছিলেন। এ কারণে অনেকে মনে করেছেন তিনি হিজরী ৪৫ (পঁয়তাল্লিশ) সন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ইবনুল আসীর বলেন, পূর্বের মতটিই সঠিক। (তাবাকাত- ৩/৫৪৬, আল ইসাবা- ২/২৬৯, উসুদুল গাবা- ৩/১০৭, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫১) তিনি মৃত্যুর পূর্বে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাঁকে শেষ বারের মত একটু দেখার জন্য অনেকে আসা যাওয়া করছে। হযরত শাদ্দাদ ইবন আউসও এসেছেন কিছু লোক সংগে করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কেমন আছেন? জবাব দিলেনঃ আল্লাহর অনুগ্রহে ভালো আছি। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে ছেলে এসে কিছু অসীয়াত করার অনুরোধ করলো। বললেন, আমাকে একটু উঠিয়ে বসাও। তারপর বললেনঃ বেটা, তাকদীরের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে, অন্যথায় ঈমানে কোন কল্যাণ নেই। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৭, বুলুগুল আমানীঃ শরহ মুসনাদে আহমাদ- ২২/২৭৬) এই সময়ে তাঁর ছাত্র ‘সানাবিহী’ আসলেন। প্রিয় শিক্ষকের এই অন্তিম অবস্থা দেখে কাঁদতে শুরু করলে। উবাদা তাকে কাঁদতে নিষেধ করে বললেনঃ সর্ব অবস্থায় আমি সন্তুষ্ট। তুমি কাঁদছো কেন? যদি সাক্ষ্য দিতে বল, দিব। যদি কারও জন্য সুপারিশ করি, তোমার জন্য করবো। তারপর বললেন, আমার কাছে রাসূলুল্লাহর সা. যত হাদীস সংরক্ষিত ছিল সবই তোমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। তবে একটি হাদীস অবশিষ্ট ছিল তা এখন বর্ণনা করছি। হাদীসটি কারও কাছে এ পর্যন্ত বর্ণনা করিনি। আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি; যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিবে আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেবেন। (বুলুগুল আমানী- ২২/২৭৬) হাদীসটি বর্ণনার পর পরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তখন হযরত উসমানের খিলাফতকাল চলছে। তাঁকে কোথায় দাফন করা হয় সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন সা’দ লিখেছেন, তাঁকে রামলায় দাপন করা হয়। অন্য একটি বর্ণনা মতে বায়তুল মাকদাসের পবিত্র মাটিই হচ্ছে তাঁর শেষ শয্যা এবং সেখানে তাঁর কবরটি এখনও প্রসিদ্ধ। ইমাম বুখারী তাঁর দাফন স্থল ফিলিস্তিন বলে উল্লেখ করেছেন। মূলতঃ সে সময় ফিলিস্তীন ছিল একটি প্রদেশ এবং উল্লেখিত স্থল দু’টি চিল তার ভিন্ন দু’টি জেলা। আল-আ’লাম’ গ্রন্থকার যিরিক্লী বলেন, তিনি শামের কিবরিসে মৃত্যুবরণ করেন। অদ্যাবধি সেখানে তাঁর কবর মানুষের যিয়ারতগাহ হিসাবে বিদ্যমান। খলীফা ’উমারের রা. পক্ষ থেকে তিনি সেখানকার ওয়ালী ছিলেন। (আ’লাম- ৪/৩০) হযরত ’উবাদার মরণ সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে আসে তিনি চাকর-বাকর, পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন সকলকে হাজির করার নির্দেশ দেন। সবাই উপস্থিত হলে বলেনঃ আজকের এ দিনটিই দুনিয়ায় আমার শেষ দিন, আর আগত রাতটি আমার আখিরাতের প্রথম রাত। আমার হাত বা জিহ্বা দিয়ে যদি তোমাদেরকে কোন রকম কষ্ট দিয়ে থাকি তোমরা এখনই তার ‘কিসাস’ বা প্রতিশোধ নিয়ে নাও। আমি নিজেকে তোমাদের সামনে পেশ করছি। তারা বললো, আপনি আমাদের পিতা, আমাদের শিক্ষক। বর্ণনাকারী বলেনঃ তিনি কখনও কোন খাদেমকে খারাপ কথা বলেননি। তারপর তিনি তাদের অসীয়াত করেনঃ আমি মারা গেলে কেউ কাঁদবে না। তোমরা ভালো করে অজু করে মসজিদে দিয়ে নামায পড়বে। নামায শেষে উবাদা ও তোমাদের নিজেদের জন্য দু’য়া করবে। কারণ, আল্লাহ বলেছেনঃ তোমরা ছবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা কর (সূরা বাকারাহ- ৪৫, ১৫৩)। আমাকে তোমরা খুব তাড়াতাড়ি কবর দেবে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৬) রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় যে পাঁচজন আনসারী ব্যক্তি সমগ্র কুরআন হিফ্জ (মুখস্থ) করেন ’উবাদা তাঁদের অন্যতম। তিনি ছিলেন শিক্ষিত ও সম্মানিত সাহাবীদের একজন, ইলমুল কিরয়াতে ছিল তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবদ্দশায় মদীনায় আসহাবে সুফ্ফার জন্য ইসলামের প্রথম যে মাদ্রাসাতুল কিরায়াহ প্রতিষ্ঠিত হয় তিনি ছিলেন তার দায়িত্বে। অতি সম্মানিত ও মর্যাদাবান আসহাবে সুফ্ফার সাহাবীরা তাঁর কাছে শিক্ষা লাভ করেন। এই মাদ্রাসায় কুরআনের তালীমের সাথে সাথে লেখাও শিখানো হত। বহু লোক এই মাদ্রাসা থেকে কিরায়াত ও লেখার তা’লীম নিয়ে বের হন। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬, মুসনাদে আহমাদ ৫/৩১৫) এই মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত কোন কোন ছাত্রের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও তিনি করতেন। এক ব্যক্তি তাঁর বাড়ীতে থাকতেন এবং রাতের খাবার তাঁরই সাথে খেতেন। লোকটি ফিরে যাওয়ার সময় একটি উৎকৃষ্ট ধনুক তাঁকে দান করেন। তিনি একথা রাসূলুল্লাহকে সা. জানালেন। রাসূল সা. তাঁকে ধনুকটি নিতে নিষেধ করলেন। (মুসনাদে আহমাদ ৫/৩২৪, হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৩০) হযরত উমার তাঁকে এক সময় শামের মুসলমানদের বিশুদ্ধভাবে কুরআন শিক্ষাদানের জন্য পাঠান। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি কয়েকটি বিশেষ টেকনিক প্রচলন করেন। তাঁর সমসাময়িক যে সকল সাহাবী হাদীস বর্ণনা করতেন, তাঁরা বলতেনঃ আমি একথা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে শুনেছি। অনেকে কিছু অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার করতেন, যা পরবর্তীকালে হাদীস বর্ণনার একটি অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। উবাদাও এমন কিছু শব্দ প্রচলন করেন। যেমন তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেনঃ ‘রাসূলুল্লাহ সা. আমার সামনাসামনি বলেন। আমি একথা বলছিনে যে, অমুক অমুক আমার কাছে এ হাদীস বর্ণনা করেছেন।’ এমনিভাবে এক সমাবেশে তিনি একটি ভাষণ দিলেন। ভাষণে একটি হাদীস বর্ণনা করলে শ্রোতাদের মধ্য থেকে হযরত মুয়াবিয়া রা. হাদীসটির সত্যতা সম্পর্কে একটু সন্দেহ প্রকাশ করেন। উবাদা তখন বলেনঃ ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে আমি একথা শুনেছি।’ তিনি সর্ব অবস্থায় সকল স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস বর্ণনা করতেন। ওয়াজ মাহফিল, জ্ঞান চর্চার বৈঠক, এমনকি কখনও গীর্জায় গেলে সেখানেও রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র বাণী ঈসায়ীদের কানে পৌঁছিয়ে দিতেন। হযরত ’উবাদা থেকে বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা প্রায় ১৮১ (একশো একাশি)। তাঁর মধ্যে ছয়টি মুত্তাফাক আলাইহি। (আল-আ’লাম ৪/৩০) অনেক বড় বড় সাহাবী এবং তাবে’ঈ তাঁর নিকট থেকে এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে আনাস ইবন মালিক, জাবির ইবন আবদিল্লাহ, আবু উমামা, ছালামা ইবন মাহবাক, মাহমূদ ইবন রাবী, মিকদাম ইবন মা’দিকারব, রাফায়া ইবন রাফে, আউস ইবন আবদিল্লাহ আস-সাকাফী, শুরাহবীল ইবন হাসানা প্রমুখ এবং তাবে’ঈদের মধ্যে আবদুর রহমান ইবন উসায়লা সানালজী, হিত্তান ইবন আবদিল্লাহ রাক্কাশী, আবুল আশ’য়াস সাগানী, জুবাইর ইবন নাদীর, জুনাদাহ্ ইবন আবী উমাইয়্যা, আসওয়াদ ইবন সা’লাবা, আতা ইবন আবী ইয়াসার, আবু মুসলিম খাওলানী, আবু ইদরীস খাওলানী বিশেষ উল্লেখযোগ্য। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৬) ফিকাহ শাস্ত্রেও তিনি ছিলেন সুপন্ডিত। সাহাবায়ে কিরাম তাঁর এ পান্ডিত্যের সম্মান করতেন। খালিদ ইবন মা’দান বলেনঃ শামে রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীদের মধ্যে উবাদা ও শাদ্দাদ ইবন আউস অপেক্ষা অধিকতর বড় কোন ফকীহ এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তি আর কেউ নেই। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬২) হযরত মুয়াবিয়া রা. একটি ভাষণে আমওয়াসের প্লেগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আমার উবাদার সাথে আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি যা বলেছেন তাই সঠিক। তোমরা তাঁর থেকে ফায়দা হাসিল কর। কারণ, তিনি আমার চেয়েও বড় ফকীহ। জুনাদাহ যান উবাদার সাথে সাক্ষাৎ করতে, তারপর তিনি বর্ণনা করেন, উবাদা আল্লাহর দ্বীনের তত্ত্বজ্ঞান হাসিল করেছেন। (আল ইসাবা- ২/২৬৮, সীয়ারে আনসার ২/৫৬) শাসকের মুখোমুখী হক কথা বলা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি অতি উৎসাহের সাথে এ দায়িত্ব পালন করতেন। শামে গিয়ে দেখেন, সেখানে ক্রয়-বিক্রয়ে শরীয়াতের বিধি-নিষেধ লঙ্ঘিত হচ্ছে। তিনি এমন এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন যে, গোটা সমাবেশে দারুণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। সেই সমাবেশে হযরত মুয়াবিয়াও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠেন, হযরত রাসূলে কারীম সা. উবাদাকে একথা বলেননি। তখন ’উবাদার ঈমানী জোশ তীব্র আকার ধারণ করেন। তিনি বলেন, মুয়াবিয়ার সাথে থাকার কোন ইচ্ছা আমার নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, রাসূলুল্লাহ সা. একথা আমাকে বলেছিলেন। (উসুদুল গাবা- ৩/১০৭, মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৯) উপরোক্ত ঘটনাটি ছিল হযরত উমারের রা. খিলাফত কালের। তবে খলীফা উসমানের রা. যুগে আমীর মুয়াবিয়া রা. খলীফার দরবারে লেখেনঃ উবাদা গোটা শামের অবস্থা বিপর্যস্ত করে তুলেছে। হয় আপনি তাঁকে মদীনায় ডেকে পাঠান, নয়তো আমিই শাম ছেড়ে চলে আসবো। জবাবে আমীরুল মু’মিনীন তাঁকে মদীনায় পাঠিয়ে দিতে বলেন। খলীফার নির্দেশের পর উবাদা শাম থেকে সোজা মদীনায় চলে যান। তিনি যখন খলীফার নিকট পৌঁছেন তখন তিনি একজন মুহাজির ব্যক্তির সাথে কথা বলছিলেন। খলীফার ঘরের বাইরে তখন বহু লোক সমবেত ছিল। ভেতরে প্রবেশ করে তিনি এক কোণায় চুপ করে বসে পড়েন। খলীফা দৃষ্টি উঠাতেই তাঁকে দেখতে পান। তিনি প্রশ্ন করেন, কি ব্যাপার? সাথে সাথে তিনি দাঁড়িয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আমার পরে শাসকরা ভালোকে মন্দে এবং মন্দকে ভালোতে পরিণত করবে কিন্তু অন্যায় কাজে আনুগত্য সিদ্ধ নয়। তোমরা কখনও পাপ কাজে লিপ্ত হবে না। (মুসনাদে আহমা- ৫/৩১৯) তাঁর কথার মাঝাখানে হযরত আবু হুরাইরা রা. কিছু বলার চেষ্টা করেন। উবাদা গর্জে উঠে বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. হাতে আমরা যখন বাই’য়াত করি তোমরা তখন ছিলে না। (সুতরাং অযথা নাক গলাবে না) আমরা রাসূলুল্লাহর সা. হাতে এই শর্তাবলীর ওপর বাই’য়াত করি যে, সর্ব অবস্থায় আমরা তাঁর কথা মানবো, সচ্ছলতা ও অসচ্ছলতা উভয় অবস্থায় আর্থিক সাহায্য দান করবো মানুষকে ভালো কাজের আদশে দেব এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখবো। সত্যকথা বলতে কারও ভয় করবো না। রাসূলুল্লাহ সা. ইয়াসরিবে আসলে তাঁকে সাহায্য করবো। আমাদের জীবন, ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততির মত তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ করবো। আর আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার কোন পরোয়া করবো না। আমাদেরকে জান্নাতের আকারে এ সকল কাজের প্রতিদান দেওয়া হবে। পরিপূর্ণ রূপে এ সব অঙ্গীকার পালন করা আমাদের কর্তব্য। আর কেউ পালন না করলে সেজন্য সেই জিম্মাদার। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৩, মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩২৫, ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমও হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।) হযরত ’উবাদা আমর বিল মা’রূফের দায়িত্ব সর্বক্ষণ, এমনকি পথ চলতে চলতেও পালন করতেন। একবার কোথাও যাচ্ছেন। দেখলেন, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাদ যারকী পাখী শিকার করছেন। তাঁর হাত থেকে পাখী ছিনিয়ে নিয়ে শূন্যে উড়িয়ে দেন। তাঁকে বলেন এ স্থানটি হারামের অন্তর্ভুক্ত, এখানে শিকার নিষিদ্ধ। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৭) হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি উবাদার ছিল তীব্র ভালোবাসা। প্রথম দফা সাক্ষাতের পর আরও দু’বার মক্কায় গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে বাইয়াত করে আসেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. মদীনায় আসার পর এমন কোন ঘটনা বা যুদ্ধ পাওয়া যায়না যাতে যোগদানের সৌভাগ্য থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। এ কারণে তিনিও রাসূলুল্লাহর সা. অতি প্রিয় পাত্র ছিলেন। একবার তিনি রোগাক্রান্ত হলে রাসূল সা. তাঁকে দেখতে আসেন। আনসারদের কিছু লোকও সংগে ছিল। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি জান শহীদ কে? সবাই চুপ করে রইল। উবাদা স্ত্রীকে বলেন, আমাকে একটু বালিশে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দাও। বসার পর তিনি রাসূলুল্লাহর সা. প্রশ্নের জবাব দিলেনঃ যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করার পর হিজরাত করে, অতঃপর যুদ্ধে নিহত হওয়া, কলেরা বা পানিতে ডুবে মারা যাওয়া এবং মেয়েদের সন্তান প্রসবকালীন মৃত্যুবরণ- এ সবই শাহাদাতের মধ্যে গণ্য হবে। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩১৭) তিনি যতদিন অসুস্থ ছিলেন রাসূল সা. সকাল-সন্ধ্যায় তাঁকে দেখতে যেতেন। এ অবস্থায় তাঁকে একটি দু’আ শিখিয়ে দিয়ে বলেন, এটা জিবরাঈল আমাকে শিখিয়ে দিয়েছেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৫/৩২৩) হযরত উবাদার স্ত্রী সম্পর্কে হায়াতুস সাহাবা গ্রন্থে একটি বর্ণনা দেখা যায়। একদিন রাসূলুল্লাহ সা. মিলহানের মেয়ের কাছে গিয়ে কিছুতে ঠেস দিয়ে বসলেন। তারপর হেসে উঠলেন। সে হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমার উম্মাতের কিছু লোক আল্লাহর রাস্তায় সাগর পাড়ি দেবে। সে আরজ করলেো ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার জন্য দোয়া করুন আমিও যেন তাদেরকে একজন হতে পারি। রাসুল সা. দু’আ করলেন, হে আল্লাহ, তুমি তাকে তাদেরই একজন করে দাও। তারপর আবার তিনি হেসে উঠলেন। সে আবার জিজ্ঞেস করলে একই জবাব দিলেন। এবারও সে পূর্বের মত দু’আর আবেদন করলো। এবার তিনি বললেন, তুমি তাদের প্রথম দিকের লোক হবে, তবে শেষ দিকের নও। আনাস বলেন, এই মহিলাকে উবাদা বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে মুয়াবিয়া ইবন আবী সুফইয়ানের স্ত্রী কারাজার সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সমুদ্র পাড়ি দেন। তারপর বাহনের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৯২) উসমান ইবন সাওদা বলেন, আমি উবাদা ইবনুস সামিতকে দেখলাম, ওয়াদী জাহান্নামের মসজিদের দেওয়ালে বুক ঠেকিয়ে কাঁদছেন। আমি বললাম, আবুল ওয়ালীদ, আপনি এবাবে কাঁদছেন কেন? তিনি জবাব দিলেন, এটা সেই স্থান, যেখানে রাসূলুল্লাহ সা. জাহান্নাম দেখতে পেয়েছেন বলে আমাদেরকে বলেছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২৬) হযরত সুফইয়ান ইবন উয়াইনা অতি অল্প কথায় হযরত উবাদার রা. পরিচয় ও মর্যাদা তুলে ধরেছেন এভাবেঃ উবাদা আকাবী, উহুদী, বদরী, শাজারী, উপরন্তু তিনি নাকীব।’’ (বুলুগুল আমানীঃ শরহ মুসনাদে আহমাদ- ২২/২৭৫) হ্যাঁ, প্রকৃতই তিনি ছিলেন, বাইয়াতুল আকাবার একজন সদস্য, বদর-উহুদের যোদ্ধা। বাইয়াতুশ শাজারা তথা বাইয়াতুর রিদওয়ান-যা হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় অনুষ্ঠিত হয়- এরও অন্যতম সদস্য। উপরন্তু তিনি ছিলেন মদীনার দ্বাদশ নাকীবের একজন।
উসাইদ ইবন হুদাইর (রা)

প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী উসাইদ মদীনার ঐতিহ্যবাহী আউস গোত্রের বনী ’আবদুল আশহাল শাখার সন্তান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০) সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর একাধিক কুনিয়াত বা ডাকনাম দেখতে পাওয়া যায়। যেমনঃ পুত্র ইয়াহইয়ার নাম অনুসারে আবু ইয়াহইয়া, আবু ঈসা-এ নামে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে ডেকেছেন বলে বর্ণিত আছে। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) তাছাড়া আবু ’আতীক, আবু হুদাইর, আবু ’আমর ইত্যাদি নামের কথাও জানা যায়। (দ্রঃ সীয়ারে আনসার- ১/২২৮), উসুদুল গাবা- ১/৯২, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০, আল-আলাম- ১/৩৩০) তাঁর পিতার নাম হুদাইর ইবন সিমাক এবং মাতার নাম উম্মু উসাইদ বিনতু উসকুন। হুদাইর ছিলেন আউস গোত্রের একজন রয়িস বা নেতা। ইসলামপূর্ব যুগে মদীনার চির বৈরী আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে যতগুলি যুদ্ধ হয়েছে তার সবগুলির নেতৃত্ব দেন হুদাইর। তিনি ছিলেন আউস গোত্রের প্রধান ঘোড় সাওয়ার। তাঁর নিজস্ব একটি মজবুত দুর্গও ছিল। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের মধ্যে সংঘটিত সর্বশেষ ও সর্ববৃহৎ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধটি ছিল ‘বু’য়াসের’ যুদ্ধ। এ যুদ্ধেরও সিপাহসালার ছিলেন হুদাইর, আর প্রতিপক্ষ খাযরাজ গোত্রের সেনাপতি ছিলেন ’আমর ইবন নু’মান রুজাইলা। উভয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সৈন্য পরিচালনা করেন। এক পর্যায়ে আউস গোত্র পরাজয়ের কাছাকাছি পৌছে যায়। এ অবস্থায় হুদাইর নিজেই যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। খাযরাজ সেনাপতি ’আমর নিহত হন এবং আউস গোত্র বিজয়ী হয়। রাসূলুল্লাহ সা. মদীনায় হিজরাতের পাঁচ বছর পূর্বে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। (সীয়ারে আনসার- ১/২২৮) উপরোক্ত ‘বুয়াস’ যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন বছর পর মক্কায় ‘আকাবায় বাই’য়াত অনুষ্ঠিত হয় এবং মদীনাবাসী নওমুসলিমদের অনুরোধে হযরত রাসূলে কারীম সা. মুসয়াব েইবন ’উমাইরকে তাবলীগে ইসলামের উদ্দেশ্যে মদীনায় পাঠান। উসাইদ তখনও ইসলাম গ্রহণ করেননি। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন মদীনায় হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইরের হাতে এবং হযরত মু’য়াজ ইবন জাবালের পূর্বে। কারো কারো মতে তিনি শেষ আকাবার পরে অর্থাৎ যে বার ৭৩/৭৫ জন মদীনাবাসী মক্কার আকাবা নামক স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাইয়াত করেন, তারও পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। তবে একথা সঠিক নয়। কারণ, তিনি যে এই শেষ আকাবায় শরীক হন এবং রাসূলুল্লাহ সা. কর্তৃক বনী আবদুল আশহালের ‘নাকীব’ বা দায়িত্বশীল নিযুক্ত হন তা সীরাত গ্রন্থসমূহে বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা- ১/৯২, তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর ওয়াল আ’লাম- ১/১৮১, আল-আ’লাম- ১/৩১০, আল-ইসাবা- ১/৪৯) হযরত উসাইদের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে সীরাত গ্রন্থসমূহে চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইর মদীনায় হযরত আস’য়াদ ইবন যুরারা গৃহে অতিথি হন এবং বনী জাফার গোত্রে বসে মানুষকে কুরআনের তা’লীম দিতে থাকেন। বনী জাফারের বসতি ছিল ’আবদুল আশহাল গোত্রের কাছাকাছি। একদিন মুস’য়াব রা. একটি বাগানে বসে মুসলমানদের কুরআনের তা’লীম দিচ্ছেন, একথা সা’দ ইবন মু’য়াজ এবং উসাইদ ইবন হুদাইর জেনে ফেলেন। সা’দ উসাইদকে বললেন, তুমি সেখানে যাও এবং তাকে বল, সে যেন ভবিষ্যতে আর কখনও আমাদের এ মহল্লার চৌহদ্দিতে না আসে। যদিও আস’য়াদ ছিলেন সা’দের খালাতো বা মামাতো ভাই। সা’দের কথামত উসাইদ নিজ হাতে ইসলামের মূলোৎপাটনের জন্য বাগিচার দিকে চললেন। আস’য়াদ তাঁকে আসতে দেখে মুস’য়াবকে বললেন, ‘দেখুন একটি লোক আপনার কাছে আসছে। সে তার গোত্রের সরদার, আপনি তাঁকে মুসলমান বানিয়ে দিন।’ উসাইদ অত্যন্ত গরম মেজাজে বললেন, ‘এভাবে তোমরা আমাদের দুর্বল লোকগুলিকে বোকা বানিয়ে যাচ্ছ কেন? যদি ভালো চাও, এই মুহূর্তে এখান থেকে চলে যাও।’ রাসূলুল্লাহর সা. দরবারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দা’ঈ (আহবানকারী) মুস’য়াব হাসিমুখে অত্যন্ত ধীর স্থিরভাবে বললেন, ‘আপনি বসুন, আমার কথা একটু শুনুন। পছন্দ হলে কবুল করবেন, আর না হলে আমি বন্ধ করে চলে যাব।’ উসাইদ বললেন, এ তো বড় বুদ্ধিমত্তা ও ইনসাফের কথা।’ হযরত মুস’য়াবের এমন বিনীত আচরণে উসাইদের রাগ পড়ে গেল। তিনি বসে পড়লেন। মুস’য়াব তাঁর সামনে ইসলামের মর্মকথা তুলে ধরে কুরআনের কিছু আয়াত তিলাওয়াত করে শোনান। মুস’য়াব কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করে যাচ্ছেন, আর এ দিকে উসাইদের চেহারা একটু একটু পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে তিনি দারুণভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন। অবলীলাক্রমে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, ‘এই দ্বীনে দাখিল হওয়া যায় কিভাবে? মুস’য়াব বললেন, প্রথমে গোসল ও পাক-সাফ কাপড় পরে কালিমা উচ্চারণ করতে হবে। তারপর সালাত আদায় করতে হবে।’ মুস’য়াবের কথা শেষ না হতে উসাইদ স্থান ত্যাগ করে চলে গেলেন। অল্পক্ষণ পর আবার যখন ফিরে আসলেন তখন তাঁর মাথার চুল ভিজা এবং পরনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড়। তারপর মুস’যাবের হাতে হাত রেখে উচ্চারণ করলেন, ‘আশহাদু আন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াআশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু- আমি সাক্ষ দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তারপর তিনি মজলিস থেকে উঠে যেতে যেতে বললেন, ‘আমি যাচ্ছি এবং অন্য নেতাদের পাঠিয়ে দিচ্ছি, তাদেরকেও মুসলমান বানিয়ে ছাড়বেন।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/১৮৮-১৮৯, সীয়ারে আনসার- ১/২২৯) উসাইদ উঠে সোজা সা’দ ইবন মুয়াজের দিকে চলে গেলেন। তাঁকে যেতে দেখে সা’দের কাছে বসা লোকেরা বলাবলি করতে লাগলো, সে আসছে, কিন্তু যে চেহারা নিয়ে গিয়েছিলো তাতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যাওয়ার সময় ছিল দারুণ উত্তেজিত আর এখন দেখা যাচ্ছে শান্ত-শিষ্ট ও হাসিখুশি। এ ক্ষেত্রে উসাইদ তাঁর বুদ্ধিমত্তা কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর একান্ত ইচ্ছা, মুস’য়াবের মুখ থেকে তিনি যা শুনেছেন, সা’দও তা শুনুক। কিন্তু তিনি যদি সরাসরি ঘোষণা দেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তুমিও আমার অনুসরণ কর, তাহলে সে হয়তো উসাইদের ওপর ঝাপিয়ে পড়তো। তিনি তা না করে সা’দকেও মুস’য়াবের সামনে হাজির করতে চাইলেন। মুস’য়াব ছিলেন আস’য়াদ ইবন যুরারা অতিথি। তাই সা’দকে ক্ষেপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে উসাইদ বললেন, ‘আমি শুনেছি, বনী হারেসার লোকেরা আস’য়াদ ইবন যুরারাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে। তারা তো একথা ভালো করেই জানে সে তোমার মামাতো ভাই।’ সা’দ রাগে ফুঁসে উঠলেন। সাথে সাথে তিনি তীর হাতে নিয়ে মুস’য়াব ও আস’য়াদের কাছে পৌঁছেলেন। সেখানে কোন শোরগোল বা ঝগড়া-বিবাদের চিহ্ন দেখতে পেলেন না; বরং তার বিপরীত এক শান্ত পরিবেশে মুস’য়াব মানুষকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাচ্ছেন আর লোকেরা মনোযোগ সহকারে তা শুনছে। সা’দ তার বন্ধু উসাইদের ধোঁকা বুঝতে পারলেন। তিনিও মুসয়াবের কথা মন দিয়ে শুনলেন এবং সেখানেই ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৬-৪৩৭, রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪৬০-৪৬১) হযরত উসাইদের ইসলাম গ্রহণের কিছু দিন পর হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় হিজরাত করেন। তিনি প্রখ্যাত মুহাজির সাহাবী হযরত যায়িদ ইবন হারিসার রা. সাতে উসাইদের ‘মুওয়াখাত’ বা দ্বীনি ভ্রাতৃ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। (উসুদুল গাবা- ১/৯২, আল ইসাবা- ১/৪৯) উহুদ থেকে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম-১/৩৩০) বদর যুদ্ধে তাঁর যোগদানের ব্যাপারে মতভেদ আছে। ওয়াকিদী, ইবন ইসহাক ও ইবনুল কালবীর মতে তিনি বদরে অংশগ্রহণ করেননি। তবে কোন কোন সীরাত বিশেষজ্ঞ ভিন্নমত পোষণ করেছেন। (উসুদুল গাবা- ১/৯২, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০, তাবাকাত- ৩/৬০৫) ইবন সা’দ বলেন, উসাইদের মত আরও কয়েকজন নাকীব সাহাবীসহ কিছু বিশিষ্ট সাহাবী বদর যুদ্ধে যোগদান করেননি। বালাজুরী বলেন, হযরত রাসূলে কারীম সা. বদরের দিকে যাত্রা করলেন; কিন্তু তাঁর কিছু সাহাবী পিছনে থেকে গেলেন। তাঁরা ধারণা করতে পারেননি যে, কুরাইশদের সাথে মুসলমানদের যুদ্ধ হবে। এই পিছনে থেকে যাওয়া সাহাবীদের একজন হলেন উসাইদ। রাসূলুল্লাহ সা. বদর যুদ্ধ শেষ করে যখন মদীনায় ফিরলেন, উসাইদ দ্রুত রাসূলুল্লাহর সা. নিকট ছুটে গেলেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে আল্লাহ বিজয় দান করায় তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। নিজে যোগদান করতে না পারার জন্য দুঃখ ও অনুশোচনা প্রকাশ করলেন। কৈফিয়াত হিসাবে বললেনঃ আমি ধারণা করেছিলাম, ওটা কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলা। তাঁদের সাথে আপনি যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না। আমি যদি বুঝতাম, তারা শত্রু এবং তাদের সাথে আপনার সংঘর্ষ হবে তাহলে কক্ষণো পিছনে পড়ে থাকতাম না। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁর কথা বিশ্বাস করেন। ইবন সা’দ ও একই কথা বর্ণনা করেছেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৮৮, তাবাকাত- ৩/৬০৫) তিনি উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধের প্রাক্কালে মদীনায় সা’দ ইবন মু’য়াজ’, উসাইদ ইবন হুদাইর ও সা’দ ইবন উবাদার নেতৃত্বে একদল লোক রাসূলুল্লাহর সা. পাহারায় নিয়োজিত থাকেন। তাঁরা সারারাত রাসূলুল্লাহর সা. দরজায় পাহারা দিতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৪)। যুদ্ধের চরম মুহূর্তে এক পর্যায়ে যখন প্রায় সকল সাহাবী বিক্ষিপ্তভাবে রাসূলুল্লাহ সা. থেকে দূরে ছিটকে পড়েন, তখনও তিনি মুষ্টিমেয় কিছু সাহাবীর সাথে অটল থাকেন। এই যুদ্ধে তাঁর দেহের সাতটি স্থান দারুণভাবে আহত হয়। (আল ইসাবা- ১/৪৯), আল-আ’লাম- ১/৩৩০) উহুদ যুদ্ধে শহীদদের জন্য তাঁদের আত্মীয়-পরিজন কান্নাকাটি করতে থাকে। তা দেখে হযরত রাসূলে কারীম সা. বলেন, আজ হামযার জন্য কাঁদার কেউ নেই। সা’দ ও উসাইদ একথা শুনে নিজ গোত্রে ফিরে এসে তাঁদের নারীদের হামযার স্মরণে বিলাপের নির্দেশ দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৯৯) উহুদের দিনে বনী আউসের পতাকা ছিল উসাইদের হাতে। প্রচন্ড যুদ্ধের সময় মুসলিম সৈনিকদের কউ কেউ ভুলবশতঃ নিজেগের সৈনিকদের কাফির সৈনিক মনে করে আঘাত করে বসে। উসাইদ ভুলক্রমে আবু বারদাহ ইবন নায়ারের হাতে আহত হন। তেমনিভাবে আবু যা’না না চিনতে পেরে আবু বারদাহকে তরবারির দুটি আঘাত করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের সম্পর্কে বলেন, সে তোমাদের কেউ এভাবে নিহত হলেও শহীদ হবে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৮, ৩২২) তিনি খন্দক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দশ দিন পর্যন্ত মুসলমানরা মদীনায় ঘেরা অবস্থায় ছিল। মক্কার পৌত্তলিক বাহিনী মুসলিম নেতৃবৃন্দের খোঁজে রাতে ঘুরা-ফিরা করতো। উসাইদ তখন দুই শো লোক নিয়ে খন্দক রক্ষা করেন। খন্দক যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গাতফান গোত্রের লোকেরা খুব লুটতরাজ শুরু করে দিল। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদের নেতা আমের ইবন তুফাইল ও যায়িদকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। তারা মদীনায় উপস্থিত হয়ে সম্মিলিতভাবে বলল, যদি মদীনায় উৎপাদিত ফলের একটি অংশ তাঁদের দেওয়া হয় তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উসাইদ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হাতের নিযা দিয়ে দুইজনের মাথায় টোকা দিয়ে বলে উঠলেনঃ খেঁকশিয়াল, দূর হ এখান থেকে। একথায় আমের দারুণ ক্ষুব্ধ হয়। সে জিজ্ঞেস করে- তুমি কে? – উসাইদ ইবন হুদাইর। – কাতাইবের পুত্র? (উল্লেখ্য যে, কাতাইব উসাইদের পিতা হুদাইরের উপাধি) – হ্যাঁ – তোমার পিতা তোমার চেয়ে ভালো। সংগে সংগে উসাইদ গর্জে উঠে বললেন, ‘কক্ষণও না। আমি তোমাদের সকলের চেয়ে এবং আমার পিতার চেয়ে ঢের ভালো। কারণ তিনি কাফির ছিলেন।’ (সীয়ারে আনসার- ১/২৩০) সম্ভবতঃ উপরোক্ত ঘটনাটিই ইবন আব্বাস থেকে তাবারানী বর্ণনা করেছেন। আমির ইবন তুফাইল ও আরবাদ ইবন কায়েস নামক দুই ব্যক্তি মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হলো। আমির রাসূলুল্লাহকে সা. সম্বোধন করে বলল, ‘মুহাম্মাদ, আমি ইসলাম গ্রহণ করলে আমাকে কী দেবেন?’ রাসূল সা. বললেনঃ সকল মুসলমানের জন্য যা হবে তোমার জন্য তাই হবে। তাদের মত তোমার ওপরও একই দায়িত্ব বর্তাবে। আমি বলল, ‘আমি মুসলমান হলে আপনার পরে কি আমাকে শাসন কর্তৃত্ব দান করবেন? রাসূল সা. বললেন, ‘তুমি বা তোমার গোত্রের কেউ তা পাবে না। তবে তুমি অশ্বারোহী বাহিনীর একজন নেতা হতে পারবে।’ এভাবে তাদের সাথে আরও কিছু কথাবার্তা হওয়ার পর তারা উঠে গেলো। তারপর তারা রাসূলুল্লাহকে সা. হত্যার ষড়যন্ত্র আটলো। রাসূলুল্লাহর সা. নিকট তাদের সে পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে গেল। তারা পালিয়ে গেল। মু’য়াজ ও উসাইদ তাদের ধাওযা করেন। এক পর্যায়ে উসাইদ তাদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘ওরে আল্লাহর দুশমনরা তোদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।’ পথিম্যে দুইজনেরই অপঘাতে মৃত্যু হয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৮-৪৯) হুদাইবিয়ার সন্ধির পূর্বে মক্কার কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান রাসূলুল্লাহকে সা. হত্যার উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তিকে মদীনায় পাঠায়। সে ছোট্ট একটি খঞ্জর কোমরে লুকিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. কথা জিজ্ঞেস করতে করতে বনী আবদিল আশহালের মসজিদে উপস্থিত হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা. তার চেহারা দেখেই বলে ওঠেন, ‘এ ব্যক্তি ধোঁকা দিতে এসেছে।’ সে হত্যার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহর সা. দিকে এগুতেই উসাইদ তার লুঙ্গি ধরে টান দেন। সাথে সাথে তার কোমর থেকে খঞ্জরটি ছিটকে পড়ে। সে বুঝতে পারে এখন আর রেহাই নেই। সে যাতে পালানোর চেষ্টা করতে না পারে, সেই জন্য উসাইদ তার গলার কাছে জামা খুব শক্ত করে ধরে রাখেন। (সীয়ারে আনসার- ১/২৩০) হিজরী ষষ্ঠ সনে বনী মুসতালিকের যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ শেষে সেখানে একটি কূপে উট-ঘোড়ার পানি পান করানোর তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন মুহাজির ও আনসারের মধ্যে সামান্য ঝগড়া হয়। এই সামান্য ঝগড়া মুনাফিক আবদুল্লাহ ইবন উবাই আরও উসকে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে। সে আনসারদের লক্ষ্য করে বলে ফেলেঃ ‘তোমরা তাদেরকে নিজ দেশে থাকার অনুমতি দিয়েছ, তোমাদের ধন-সম্পদ তাদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিয়েছ। আল্লাহর কসম, তোমরা যদি তা না করতে তাহলে তারা অন্য কোথাও চলে যেত। যদি মদীনায় ফিরতে পারি তাহলে আমরা অভিজাতরা (মদীনাবাসীরা) এই নীচদের তাড়িয়ে ছাড়বো।’ তার এসব কথা হযরত যায়িদ ইবন আরকাম শুনে ফেলেন এবং তিনি রাসূলুল্লাহকে সা. অবহিত করেন। হযরত রাসূলে কারীম খুবই মনঃক্ষুণ্ন হন। এই ঘটনার পর হযরত উসাইদ আসলেন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দেখা করতে। রাসূল সা. তাঁকে বললেনঃ – তোমাদের বন্ধু যা বলেছে, তা কি তুমি শুনেছ? – ইয়া রাসূলুল্লাহ, কোন্ বন্ধু? – আবদুল্লাহ ইবন উবাই। – কী বলে? – সে বলেছে, মদীনায় ফিরতে পারলে তারা অভিজাতরা নীচদেরকে বের করে দেবে। উসাইদ বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ সা., আল্লাহর কসম, ইনশাআল্লাহ আপনিই তাকে তাড়িয়ে দিবেন। আল্লাহর কসম সে-ই নীচ, আর আপনি অতি সম্মানিত ও বিজয়ী। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/১২৯২) উসাইদ আরও বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহঃ আপনি তার প্রতি একটু সদয় হোন। আল্লাহ তা’য়ালা আপনার সাথে আমাদেরকে এখানে নিয়ে এসেছেন। আর তার স্বগোত্রীয় লোকেরা তার জন্য মুকুট তৈরী করছিল, তাকে মদীনার বাদশাহ বানিয়ে তার মাথায় পরাবে বলে। সে স্বচক্ষে দেখতে পারবে তার সে সাম্রাজ্য ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪৬৩) একটি বর্ণনায় এসেছেঃ আবদুল্লাহ ইবন উবাইর উপরোক্ত মন্তব্যের কথা অবগত হয়ে উসাইদ বললেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, যে লোকটি মানুষের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করছে, তাকে হত্যার অনুমতি আমাকে দিন। রাসূল সা. বললেন, আমি নির্দেশ দিলে তুমি তাকে হত্যা করবে? উসাইদ বললেনঃ হ্যাঁ, আপনার অনুমতি পেলে তরবারি দিয়ে তার গর্দানটি উড়িয়ে দেব। রাসূল সা. তাকে বসিয়ে শান্ত করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৪) এই বনী মুসতালিক যুদ্ধের সফরে হযরত ’আয়িশা রা. রাসূলুল্লাহর সা. সফর সঙ্গিনী ছিলেন। সফর থেকে মদীনায় ফেরার পথে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুনাফিকরা হযরত ’আয়িশার রা. চরিত্রে মিথ্যা কলঙ্ক আরোপ করে। সীরাত গ্রন্থ সমূহে যা ‘ইফ্ক’ বা বানোয়াট কাহিনী বলে পরিচিত। কিছু সরলপ্রাণ মুসলমানও মুনাফিকদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। পরিশেষে আল্লাহ পাক কুরআনের আয়াত নাযিল করে আসল রহস্য ফাঁস করে দেন। বিষয়টি যখন তুঙ্গে তখন একদিন উসাইদ রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহঃ আউস গোত্রের লোকেরা আপনাকে কষ্ট দিলে আমরা তা বন্ধ করে দেব। আর আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের লোকেরা যদি কষ্ট দেয়, আমাদের নির্দেশ দিন। আল্লাহর কসম, তারা হত্যার উপযুক্ত।’ ‘খাযরাজ নেতা সা’দ ইবন ’উবাদা সংগে সংগে প্রতিবাদ করে বলে ওঠেন, ‘খাযরাজ গোত্রের লোক বলে তুমি এমন কথা বলতে পারছো, তোমার নিজের গোত্রের লোক হলে এমন কথা বলতে পারতে না।’ ‘উসাইদও সংগে সংগে গর্জে উঠে বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তুমি মিথ্যা বলেছ।’ তুমি এক মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করছো।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৩০০) খাইবার যুদ্ধে সালামা ইবন আকও’য়ার চাচা ’আমির এক ইয়াহুদীর ওপর আক্রমণ চালাম; কিন্তু তাঁর তরবারীর আঘাত ফসকে গিয়ে নিজেই আহত হন এবং মৃত্যুবরণ করেন। হযরত উসাইদসহ অনেকে ধারণা করলেন, যেহেতু তিনি নিজের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছেন, যা এক ধরণের আত্মহত্যা- এ কারণে তাঁর সকল নেক ’আমল ব্যর্থ হয়ে গেছে। সালামা বিষয়টি রাসূলুল্লাহর সা. কানে দিলেন। রাসূল সা. বললেনঃ যারা এমন কথা বলেছে তাদের কথা ঠিক নয়। সে দ্বিগুণ সাওয়াবের অধিকারী হবে। (মুসলিম- ২/৯৬) মক্কা বিজয় অভিযানে হযরত রাসূলে কারীম সা. মুহাজির ও আনসারদের সাথে ছিলেন। তাঁর দলটি ছিল সকলের পিছনে। তিনি ছিলেন আবু বকর রা. ও উসাইদের মাঝখানে। হুনাইন ও তাবুক অভিযানের সময় আউস গোত্রের ঝান্ডাটি ছিল উসাইদের হাতে। সাকীফা-ই-বনী সা’য়িদার দিনটি- যেদিন হযরত রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের পর আনসারদের একটি দল, যার পুরোভাগে ছিলেন হযরত সা’দ ইবন ’উবাদা- দাবী করলেন, খিলাফতের অগ্রাধিকার আনসারদের। একথা মদীনায় ছড়িয়ে পড়লো। তর্ক-বিতর্ক শুরু হল। উসাইদ ছিলেন আনসার গোত্র আউসের অন্যতম নেতা। সেই জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আনসারদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘‘তোমরা জান, রাসূলুল্লাহ সা. ছিলেন মুহাজিরদের একজন। তাঁর খলীফাও মুহাজিরদের মধ্য থেকেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমরা ছিলাম রাসূলুল্লাহর সা. আনসার বা সাহায্যকারী।’’ সা’দ ইবন মু’য়াজকে লক্ষ্য করে তিনি বলেনঃ ‘‘আজও আমাদের উচিত রাসূলুল্লাহর সা. খলীফার আনসার হিসাবে থাকা।’’ (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪৬২)। এক পর্যায়ে তিনি নিজ গোত্র আউসের লোকদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘খাযরাজ গোত্র সা’দ ইবন ’উবাদাকে খলীফা বানিয়ে নেতৃত্ব কুক্ষিগত করতে চায়। আজ যদি তারা সফল হয় তাহলে চিরদিনের জন্য তারা তোমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ফেলবে এবং খিলাফতে তোমাদের কোন অংশ তারা আর কোন দিন দেবে না। আমার মতে আবু বকরের হাতে বাইয়াত করা উচিত।’ এরপর তিনি সকলকে আবু বকরের হাতে বাই’য়াত করার নির্দেশ দেন। এভাবে আউস গোত্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে হযরত সা’দ ইবন উবাদার সমর্থকদের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। (সীয়ারে আনসার- ২৩১) হযরত আবু বকরের রা. মরণ সন্ধ্যা যখন ঘনিয়ে এল, তিনি খিলাফতের দায়িত্ব কার ওপর ন্যস্ত করে যাবেন- এ বিষয়ে মুহাজির-আনসার নির্বিশেষে যে সকল বিশিষ্ট সাহাবীর মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করেন তাঁদের মধ্যে উসাইদও রা. ছিলেন। আবু বকর রা. যখন উমার রা. সম্পর্কে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন, তিনি বললেনঃ ‘আপনার পরে খিলাফতের দায়িত্ব লাভের ব্যাপারে আমি তাঁকে ভালোই দেখতে পাই। ….তাঁর ভেতরটা বাইরের থেকে উত্তম। এই দায়িত্ব লাভের জন্য তাঁর চেয়ে অধিকতর সক্ষম ব্যক্তি আর কেউ নেই। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২৬) হিজরী ১৬ সনে তিনি খলীফা ’উমারের রা. সাথে মদীনা থেকে বায়তুল মাকদাসে যান। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) হিজরী ২০ সনের শা’বান মাসে, মতান্তরে হিজরী ২১ সনে তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। খলীফা হযরত উমার রা. কাঁধে করে তাঁর লাশ বহন করেন, জানাযার নামায পড়ান এবং বাকী গোরস্থানে দাফন করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪০), তাবাকাত- ৩/৫০৬, শাজারাতুজ জাহাব ফী আখবারি মান জাহাব- ১/৩১) মৃত্যুর পূর্বে তিনি খলীফা ’উমারকে অসীয়াত করে যান, তিনি যেন তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি নিজ হাতে নিয়ে তাঁর সকল দায়-দেনা পরিশোধ করে দেন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত ’উমার রা. পাওনাদারদের ডেকে তাদেরকে এই শর্তে রাজী করান যে, তারা বছরে এক হাজার দিরহাম গ্রহণ করবেন। এভাবে চার বছরে বাগানের ফল বিক্রী করে সকল দেনা পরিশোধ করা হয়। এভাবে তাঁর সকল সম্পত্তি রক্ষা পায়। ’উমার রা. বলতেন, ‘আমার ভাইয়ের সন্তানদের আমি অভাবী দেখতে চাই না।’ (তাবাকাত- ৩/৬০৬, উসুদুল গাবা- ১/৯৩) হযরত উসাইদের স্ত্রী রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় ইন্তিকাল করেন। (সীয়ারে আনসার- ১/২৩১) হযরত আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘একবার আমরা হজ্জ অথবা ’উমরা থেকে মদীনায় ফিরলাম। আমাদেরকে জুল হুলায়ফায় অভ্যর্থনা জানানো হল। আনসারদের পরিবারবর্গের লোকেরা আপন আপন পরিবারের লোকদের সাথে মিলিত হল। এখানে উসাইদকে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর খবর দেওযা হল। তিনি মাথায় চাদর মুড়ি দিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। আমি বললাম, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী, প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী, আর আপনি কিনা একজন মহিলার জন্য এভাবে কাঁদছেন? আয়িশা রা. বলেন, একথা শুনে তিনি মাথা থেকে কাপড় ফেলে দিলেন। এবং বললেনঃ আপনি সত্যি কথাই বলেছেন। ‘সা’দ ইবন মু’য়াজের পর আর কারও জন্য আমাদের কাঁদা উচিত নয়।’ (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৯৫, মুসনাদে আহমদ- ২/৩৫২) সম্ভবতঃ ইয়াহইয়া নামে উসাইদের একটি মাত্র ছেলে ছিল। সহীহ বুখারীর ‘বাবু নুযুলিস সাকীনা ওয়াল মালায়িকা ইনদা কিরায়াতিল কুরআন’’ (কুরআন পাঠের সময় প্রশান্তি ও ফিরিশতার অবতরণ) অধ্যায়ে তাঁর আলোচনা এসেছে। কুরআন ও হাদীসের প্রচার-প্রসারে তাঁর বিরাট অবদান আছে। তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বহু হাদীস বর্ণনা করেছেন। হযরত ’আয়িশা, আবু সা’ঈদ আল খুদরী, আনাস বিন মালিক, আবু লাইল আনসারী, ও কা’ব ইবন মালিকের মত অতি সম্মানিত সাহাবায়ে কিরাম তাঁর নিকট থেকে শ্রুত হাদীস বর্ণনা করেছেন। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে তাঁর সর্বমোট ১৮ (আঠারো) টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (আল-আলাম- ১/৩৩০, আল-ইসাবা- ১/৪৯) হযরত উসাইদের পিতা ছিলেন তাঁর গোত্রের অতি সম্মানিত ব্যক্তি। ইবন সা’দ বলেনঃ ‘‘তাঁর পিতার পর ইসলাম ও জাহিলী উভয় যুগে তিনিও অত্যন্ত ভদ্র ও সম্মানিত ব্যক্তিতে পরিণত হন। গোত্রের বুদ্ধিমান ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরূপে গণ্য হন। এই গুণগুলির সমন্বয় ঘটেছিল উসাইদের মধ্যে।’’ তাছাড়া তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দাজ ও দৌড়বিদ। আর সে যুগে আরবে এই তিনটি গুণে গুণান্বিত ব্যীক্তকে ‘কামিল’ উপাধিতে ভূষিত করা হত। (তাবাকাত- ৩/৬০৪, আল আলাম- ১/৩৩০, উসুদুল গাবা- ১/৯২) ইসলাম গ্রহণের পর তিনি আধ্যাত্ম সাধনায় এত উন্নতি সাধন করেন যে, তাঁর চোখের সকল পর্দা দূর হয়ে যায়। আর তিলাওয়াতও করতে পারতেন সুমধুর কণ্ঠে। (উসুদুল গাবা- ১/৯২) একদিন রাতে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করছেন। নিকটেই বাঁধা একটি ঘোড়া। ঘোড়াটি লাফাতে থাকে। তিলাওয়াত বন্ধ করলে ঘোড়াটিও থেমে যায়। আবার তিলাওয়াত শুরু করলে ঘোড়াটি লাফাতে শুরু করে। তাঁর ছেলে ইয়াহইয়া নিকটেই শুয়ে ছিল। তিনি ভীত হয়ে পড়রেন এই কথঅ চিন্তা করে যে, এমনটি চলতে থাকলে ছেলেটি ঘোড়ার পায়ে পিষে যাবে। তৃতীয়বারের মাথায় তিনি বাইরে এসে দেখেন, আকাশে একটি ছায়ার মত আচ্ছাদন এবং মধ্যে যেন বাতির আলো জ্বলছে। তিলাওয়াত শেষ হয়ে গিয়েছিল। এজন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতেই আলোটি অদৃশ্য হয়ে যায়। সকালে ঘটনাটি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বর্ণনা করলে তিনি বলেন, ফিরিশতারা কুরআন তিলাওয়াত শুনতে এসেছিল। তুমি যদি সকাল পর্যন্ত তিলাওয়াত করতে তাহলে লোকেরা তাদেরকে দিনের আলোতে দেখতে পেত। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৩, উসুদুল গাবা- ১/৯৩, বুখারী শরীফ- ২/৭৫০) তিনি দিব্য চোখে ‘সাকীনা’ বা প্রশান্তির বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করেন। তিনি এমন এক ব্যক্তি যার চলার সময় আগে আগে একটি ‘নূর’ বা জ্যেতি চলতো। বুখারী বর্ণনা করেছেন, এক অন্ধকার রাতে আববাদ ইবন বিশর ও উসাইদ ইবন হুদাইর রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে বের হলেন। তাঁদের হাতে লাঠি থেকে জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয়ে তাদের চলার পথ আলোকিত করে তুলেছিল। তাঁরা যখন দু’জন দুই দিকে চলে গেলেন, জ্যোতিও তাঁদের সাথে ভাগ হয়ে গেল। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৩১, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬১১) হযরত উসাইদ বলেন, একদিন আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে একটি দুস্থ আনসার পরিবারের কথা তুলে ধরলাম। তারা অত্যন্ত অভাবী এবং পরিবারের অধিকাংশ সদস্য মহিলা। আমার কথা শুনে রাসূল সা. বললেন, ‘তুমি এমন এক সময় এসেছ যখন আমার হাতে যা কিছু ছিল সবই মানুষকে দেওয়া হয়ে গেছে। তুমি যখন শুনবে আমার হাতে আবার কিছু এসেছে এই পরিবারটির কথা আমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে।’ কিছুদিনের মধ্যে খাইবার থেকে কিছু জিনিস আসলো। তিনি আনসারদেরকে বেশী করে দিলেন। বিশেষ করে সেই পরিবারটিকে দিলেন প্রচুর পরিমাণে। আমি বললাম, ‘হে আল্লার নবী, আল্লাহ আপনাকে সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন।’ রাসূল সা. বললেন, ওহে আনসারগণ, আল্লাহ তোমাদেরকে সর্বোত্তম বিনিময় দান করুন। তোমাদের সম্পর্কে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তোমরা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও ধৈর্যধারণকারী। আমার মৃত্যুর পর লোকেরা তোমাদের উপেক্ষা করে নিজেদেরকে অগ্রাধিকার দেবে। আমার সাথে মিলিত হওয়া পর্যন্ত তোমরা ‘সবর’ (ধৈর্য) অবলম্বন করবে। আমাদের সেই মিলন স্থল হবে ‘হাউজ’।’ উসাইদ বলেন, ‘অতঃপর রাসূলুল্লাহ সা. ইন্তিকাল কররেন, আবু বকরের পর ’উমার রা. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। একবার তিনি মদীনাবাসীদের মধ্যে কিছু গনীমতের মাল বন্টন করলেন। আমার জন্য তিনি একটি জামা পাঠালেন। কিন্তু তা ছোট হয়ে গেল। আমি মসজিদে বসে আছি, এমন সময় এক কুরাইশ যুবককে দেখলাম ঠিক আমার জামার মত একটি লম্বা জামা সে পরে আছে। সেটা এত লম্বা যে, মাটি দিয়ে টেনে যাচ্ছে। তখন আমি আমার সংগের লোকটিকে রাসূলুল্লাহর সা. উপরোক্ত বাণী শুনিয়ে বললাম, রাসূলুল্লাহ সা. সত্যই বলেছেন। লোকটি দৌড়ে ’উমারের কাছে গেল এবং আমি যা বলেছি তাই তাঁকে গিয়ে বলল। ’উমার ছুটে আসলেন। আমি তখন নামাযে। ’উমার বললেন, উসাইদ নামায শেষ কর। নামায শেষ হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কী বলেছেন? আমি যা দেখেছি এবং যা বলেছি, তাঁকে বললাম। তিনি বললেন, আল্লাহ আপনাকে মাফ করুন। সেই জামাটি আমি অমুকের জন্য পাঠিয়েছিলাম। আর সে তো একজন আনসারী, আকাবায় শপথ গ্রহণকারী এবং বদর ও উহুদের মুজাহিদ। তাঁর কাছ থেকেই এই কুরাইশ যুবক জামাটি খরীদ করেছে। আপনি কি মনে করেন আনসারদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. সেই বাণী আমার যুগেই সত্যে পরিণত হবে? উসাইদ বললেন, আল্লাহর কসম, হে আমীরুল মুমিনীন, আমার বিশ্বাস আপনার যুগে তা হতে পারবে না।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪০২-৪০৩, সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ৩/৩৬-৩৯) উম্মুল মুমিনীন হযরত ’আয়িশা রা. বলেন, উসাইদ একজন উত্তম মানুষ। তিনি বলতেন, যদি আমি এই তিনটি অবস্থার যে কোন একিট অবস্থায় সর্বদা থাকতে পারতাম তাহলে নিশ্চিত জান্নাতের অধিবাসী হতাম। এ ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ থাকতো না। সেই অবস্থা তিনটি হলঃ ১. আমি নিজে যখন কুরআন পাঠ করি অথবা অন্যকে পাঠ করতে শুনি। ২. যখন রাসূলুল্লাহর সা. ভাষণ শুনি ৩. যখন কোন জানাযায় অংশগ্রহণ করি। আমি যখন জানাযায় যোগদান করি, আমার নাফ্সকে প্রশ্ন করিঃ আমি তাকে দিয়ে কী করিয়েছি এবং তার শেষ পরিণতি কী হবে? (আল-ইসাবা- ১/৪৯, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪১-৪২) হাকেম আবু লায়লার সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, উসাইদ ছিলেন একজন নেককার, হাসি-খুশী মেজাজের ও রসিক প্রকৃতির মানুষ। একদিন তিনি রাসূলুল্লাহর সা. মজলিসে নানা রকম কথা বলে লোকদের হাসাচ্ছেন। রাসূলুল্লাহ সা. একটু কৌতুক করে তাঁর কোমরে একটু আঘাত করেন। সাথে সাথে উসাইদ বলে উঠেনঃ আপনি আমাকে ব্যথা দিয়েছেন। রাসূল সা. বললেনঃ ‘তুমি এর প্রতিশোধ নিয়ে নাও। উসাইদ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার গায়ে জামা ছিল না; কিন্তু আপনার গায়ে তো জামা। রাসূল সা. জামা খুলে ফেললেন, আর সাথে সাথে উসাইদ রাসূলুল্লাহকে সা. জড়িয়ে ধরে তাঁর পাজরে চুমুর পর চুমু দিতে লাগরেন। পরে বললেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আমি এই ইচ্ছা.. করেছিলাম। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৩০-৩১) হযরত রাসূলে কারীম সা. বলেছেন, আবু ইবাইদাহ ইবনুল জাররাহ, মু’য়াজ ইবন জাবাল, উসাইদ ইবন হযদাইর ও মু’য়াজ ইবন ’আমর- এরা কতই না উত্তম মানুষ। (আল-ইসাবা- ১/৯২) অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। রাসূল সা. বলেছেন, নি’মার রাজুলু উসাইদ০উসাইদ কত ভালো মানুষ। (তাবাকাত- ৩/৬০৩) হযরত আয়িশা রা. বলেনঃ আনসারদের তিন ব্যক্তিকে কেউ মর্যাদার দিক দিয়ে নাগাল পায়নি। তাঁরা সবাই বনী আবদিল আশহালের লোক। তাঁরা হলেনঃ মু’য়াজ ইবন জাবাল, উসাইদ ইবন হুদাইর ও আব্বাদ ইবন বিশর। (আল-ইসাবা- ১/৪৯) এই সব কারণে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাতে তাঁকে খুবই সম্মান করতেন। তাঁর ওপর অন্য কাউকে তিনি প্রাধান্য দিতেন না। (উসুদুল গাবা- ১/৯২)
আবুল হায়সাম ইবন আত-তায়্যিহান (রা)

আবুল হায়সাম উপনামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম এবং কোন্ গোত্রের সন্তান সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। একটি মতে ‘আবদুল্লাহ’ তাঁর আসল নাম। তবে অন্য একটি মতে ‘মালিক’ তাঁর নাম। আর এ মতের ওপরই মুসা ইবন ’উকবা, ইবন সা’দ, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক, আবূ মা’শার ও মুহাম্মাদ ইবন ’উমার ঐক্যমত পোষণ করেছেন। তেমনিভাবে তাঁর গোত্র ও পিতার নামের ব্যাপারেও মতভেদ আছে। এক মতে পিতা বালী ইবন আমর ইবন আল-হাফ ইবন কুদা’য়া। এই হিসাবে তাঁকে আল-বালাবী বলা হয়। এটাই ইবন সা’দের মত। এ মতের বিরোধিতা করেছেন ইবন ইসহাক ও আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মাদ ইবন আম্মারা আল-আনসারী। ইবন ইসহাক বলেছেন, আবুল হায়সাম, যিনি বদরে অংশগ্রহণ করেছেন তাঁর নাম মালিক এবং তাঁর ভাইয়ের নাম আতীক। তাঁরা উভয়ে তায়্যিহানের ছেলে। আর আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আল-আনসারী বলেন, আবুল হায়সাম আউস গোত্রের সন্তান। তাঁর মা লায়লা বিনতু আতীক। এটাই অধিকাংশের মত। (তাবাকাত- ৩৪৪৭, আল-ইসাবা ৪/২১২, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) তাঁর জন্মের সঠিক সময় জানা যায় না। আবুল হায়সাম তাঁর বন্ধু আস’য়াদ ইবন যুরারার হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। একটি বর্ণনা মতে আস’য়াদ ইবন যুরারা ও জাকওয়ান ইবন ’আবদি কায়েস মক্কায় ’উতবা ইবন রাবী’য়ার নিকট যান। সেখানে তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. দা’ওয়াতের কথা শুনতে পেয়ে গোপনে তাঁর সাথে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করেন। আস’য়াদ মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে আবুল হায়সামের সাথে দেখা করেন এবং নিজে ইসলাম গ্রহণের কাহিনী, রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর দা’ওয়াতের কথা তাঁর নিকট বর্ণনা করেন। ইবন সা’দ বলেন, ইয়াসরিবে পূর্ব থেকে –সেই জাহিলী যুগে আস’য়াদ ও আবূল হায়সাম ছিলেন তাওহীদ বা একত্ববাদের প্রবক্তা। আবুল হায়সাম বন্ধু যুরারার মুখে রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর দা’ওয়াতের কথা শুনে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ না করে সাথে সাথে বলে ওঠেনঃ ‘আনু আশহাদু মা’য়াকা আন্নাহু রাসূলুল্লাহ- আমিও তোমার সাথে সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয় তিনি আল্লাহর রাসূল।’ এভাবে তিনি তাঁর বন্ধু যুরারার হাতে মুসলমান হন। পরের হজ্জ মওসুমে যেবার আটজন মতান্তরে ছয়জন ইয়াসরিববাসী মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. সাথে গোপনে দেখা করে বাই’য়াত বা শপথ করেন তাঁদের মধ্যে আবুল হায়সামও ছিলেন। ইতিহাসে এ বাই’য়াতকে আকাবার প্রথম বাই’য়াতও বলা হয়। তবে একটি বর্ণনা মতে, উক্ত বাই’য়াত বা শপথে আবুল হায়সাম ছিলেন না। (তাবাকাত- ১/২১৮-২১৯) উক্ত মতে, আস’য়াদ প্রথম আকাবায় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় ফিরে এসে আবুল হায়সামকে ইসলামের দাও’য়াত দেন। এ দাওয়াতেই আবুল হায়সাম ইসলাম গ্রহণ করেন। এর এক বছর পর বারো জনের সাথে এবং তারও পরের বছর তিহাত্তর মতান্তরে পঁচাত্তর জনের সাথে তিনি ’আকাবায় রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আবার মিলিত হন। এভাবে তিনি ’আকাবার সব ক’টি বাই’য়াতে শরিক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। (তাবাকাত- ১/২২, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) একটি বর্ণনা মতে, শেষ ’আকাবায় আবুল হায়সাম রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াতের জন্য সর্ব প্রথম নিজের হাতটি বাড়িয়ে দেন। মুসা ইবন ’উকবা ইমাম যুহরী থেকে একথা বর্ণনা করেছেন। এ ব্যাপারে অবশ্য যথেষ্ট মতভেদ আছে। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪৭, আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫৪) তৃতীয় আকাবার শপথের সময় মদীনাবাসীরা যখন রাসূলুল্লাহকে সা. মদীনায় যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালো তখন মক্কা ও মদীনাবাসীদের পক্ষ থেকে যে কয়েকজন লোক ভাষণ দেন, আবুল হায়সাম তাদের অন্যতম। তাবারানী ’উরওয়া থেকে বর্ণনা করেছেন। আবুল হায়সাম ইবন তায়্যিহান রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করার সময় বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের সাথে অন্য লোকদের চুক্তি আছে। এমনও কি হতে পারে, আমরা সেই চুক্তি বাতিল করলাম, তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলাম, আর এ দিকে আপনি স্বগোত্রে ফিরে এলেন? তাঁর কথা শুনে রাসূল সা. একটু হাসি দিয়ে বললেনঃ তোমাদের রক্তের দাবীর অর্থ হবে আমারই রক্তের দাবী, তোমাদের রক্তপাত মানে আমারই রক্তপাত। অর্থাৎ আমার ও তোমাদের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না। রাসূলুল্লাহর সা. এ কথায় সন্তুষ্ট হয়ে আবুল হায়সাম সাথীদের লক্ষ্য করে বলেনঃ ‘‘আমার স্বগোত্রীয় লোকেরা! এ ব্যক্তি আল্লাহর রাসূল। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, নিশ্চয় তিনি সত্যবাদী। আজ তিনি মক্কার হারামে আত্মীয়দের মধ্যে নিরাপদেই আছেন। জেনে রাখ, যদি তোমরা এখান থেকে বের করে তাঁকে তোমাদের কাছে নিয়ে যাও তাহলে সমগ্র আরববাসী একই ধনুক থেকে তোমাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করবে। অর্থাৎ সকালের সাধারণ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। যদি তোমরা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে এবং জান-মাল ও সন্তান-সন্ততি বিলিয়ে দিতে রাজী থাক তাহলেই তাঁকে তোমাদের ভূমিতে আমন্ত্রণ জানাও। কারণ, তিনি সত্যি সত্যিই আল্লাহর রাসূল। তোমরা যদি পরে অনুশোচনার ভয় কর তাহলে ভেবে দেখ।’’ আবুল হায়সামের এ বক্তব্যের পর তাঁর সাথীরা বললোঃ ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা কিছু আমাদের দিয়েছেন, আমরা তা কবুল করেছি। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদের নিকট যা কিছু দাবী করেছেন আমরা তা আপনাকে দান করলাম। আবুল হায়সাম, আপনি একটু সরে দাঁড়ান, আমরা রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করি।’ আবুল হায়সাম বললেনঃ আমিই প্রথম বাই’য়াত করি। তাঁর বাই’য়াতের পর অন্যরা একের পর এক বাই’য়াত করে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/২৪৭,২৪৮, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৪২) এ বাই’য়াতের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. বারোজন নাকীব বা দায়িত্বশীলের নাম ঘোষণা করেন। আউস গোত্র থেকে আবুল হায়সাম, উসাইদ ইবন হুদাইর ও সা’দ ইবন খায়সামা- এই তিনজন নাকীব মনোনীত হন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৫২) হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় হিজরাত করে প্রখ্যাত মুহাজির হযরত উসমান ইবন মাজ’উনের সাথে আবুল হায়সামের মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ-সম্পর্ক কায়েম করে দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৭১, আল-ইসাবা- ৪/২১২) বদর, উহুদ, খন্দকসহ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। উহুদে তাঁর ভাই আতীক ইবন তায়্যিহান ইকরিমা উবন আবূ জাহলের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। (আনসাব- ১/৩২৯) ইবন সা’দ বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা মূতায় শহীদ হওয়ার পর হযরত রাসূলে কারীম সা. আবুল হায়সামকে খেজুরের পরিমাপকারী হিসাবে খাইবারে পাঠান। রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর হযরত আবু বকরও তাঁকে এ পদে বহাল রাখার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। (তাবাকাত- ৩/৪৪৮) খলীফা হযরত ’উমারের খিলাপতকালে হিজরী ২০ সনে তিনি ইনতিকাল করেন। একটি বর্ণনা মতে হিজরী ৩৭ সনে সিফ্ফীন যুদ্ধের পূর্বে তাঁর মৃত্যুর কথা জানা যায়। ইমাম আসমা’ঈ একটি বর্ণনা নকল করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আবুল হায়সামের গোত্রের লোকদের নিকট তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তারা বলেছে, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেছেন। হিজরী ২১ সনেও তাঁর মৃত্যুর কথা যেমন অনেকে বলেছেন তেমনি কেউ কেউ একথাও বলেছেন যে, তিনি সিফ্ফীনে হযরত আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করেছেন। অনেকে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, তিনি সিফ্ফীনে ’আলীর রা. পক্ষে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেছেন। (আনসাব- ১/২৪০, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৩৩) ঐতিহাসিক ওয়াকিদী স্পষ্ট করে বলেছেন, সিফ্ফীনে তাঁর যোগদানের বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এর বিপরীতে হিজরী ২০ সনে তাঁর মৃত্যুর কথা ইমাম যুহরী, সালেহ ইবন কায়সান এবং হাকেমের মত উঁচু স্তরের মুহাদ্দিসীন থেকে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এর বিপরীতে একটি সন্দেহযুক্ত বর্ণনা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। (সীয়ারে আনসার- ২) হাদীসের গ্রন্থসমূহে আবুল হায়সাম থেকে বর্ণিত কিছু হাদীস দেখা যায় তবে সেগুলির বিশুদ্ধতা সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। ইবন হাজার ’আসকালানী বলেছেনঃ আবুল হায়সাম থেকে বর্ণিত যত হাদীস দেখা যায় তার সবই সন্দেহযুক্ত। এমন কোন একটি বর্ণনা শৃঙ্খল পাওয়া যায় না যার দ্বারা সেগুলির কোন একটি যথার্থতা প্রমাণিত হয়। এর কারণ হল, বহু আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। (আল-ইসাবা- ৪/২১৩) আল-হায়সাম ইবন নাসর আল-আসলামী রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর সা খিদমাত করেছি। আবুল হাযসাম ইবন তায়্যিহানের ‘জাসিম’ নামক একটি কূয়ো ছিল। এই কূয়োর পানি ছিল সুমিষ্ট। আমি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য এই কূয়ো থেকে পানি আনতাম। একবার গরমের দিনে হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু বকরকে রা. সংগে করে আবুল হাযসামের বাড়ীতে আসেন এবং জিজ্ঞেস করেনঃ ঠান্ডা পানি আছে কি? আবুল হায়সাম এক বালতি বরফের মত ঠান্ডা পানি নিয়ে আসেন। ছাগলের দুধের সাথে সেই ঠান্ডা পানি মিশিয়ে রাসূলুল্লাহকে সা. পান করান। তারপর আরজ করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের একটি ঠান্ডা ছাউনী (’আরীশ) আছে। এই দুপুরে আপনি সেখানে একটু বিশ্রাম নিন। আবুল হায়সাম ছাউনীর ওপর পানি ছিটিয়ে দেন। রাসূল সা. আবু বকরকে সংগে করে সেখানে প্রবেশ করেন। আবুল হায়সাম বিভিন্ন ধরণের খেজুর এবং ডিশ ভর্তি ‘সারীদ’ (এক প্রকার উপাদেয় পানীয়) তাঁদের সামনে হাজির করেন। বর্ণনাকারী হাযসাম ইবন নাসর বলেন, রাসূল সা. আবু বকর এবং আমরা সবাই তা আহার ও পান করলাম। তারপর নামাযের সময় হলে তিনি আবুল হায়সামের বাড়ীতে আমাদের নিয়ে জামা’য়াত নামায আদায় করেন। জামা’য়াতে আবুল হায়সামের স্ত্রী ছিলেন আমার পেছনে। নামায শেষে তিনি আবার ছাউনীতে ফিরে যান এবং সেখানে জুহরের ফরজের পরের দু’রাকা’য়াত নামায আদায় করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৩৫) একদিন হযরত রাসূলে কারীম সা. অভ্যাসের বিপরীত, যখন তিনি ঘর থেকে বের হন না এমন এক সময়ে বের হলেন। কিছুক্ষণ পর আবু বকরও আসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, আবু বকর, এমন অসময়ে বের হলে যে? বললেন, আপনার সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে। এর মধ্যে ’উমারও উপস্থিত হলেন। রাসূল সা. তাঁকেও ঠিক একই প্রশ্ন করলেন। ’উমার জবাব দিলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, ক্ষুধাই আমাকে এখানে তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও ক্ষুধার্ত। তিনজন একসাথে আবুল হায়সামের বাড়ীতে গেলেন। তাঁর ছিল খেজুরের বাগান এবং বকরীর পাল। কিন্তু কোন চাকর-বাকর ছিল না। সব কাজ নিজে করতেন। আর তখন তিনি বাড়ীতেও ছিলেন না। আওয়ায দিলে তাঁর স্ত্রী বললেন, পানি আনতে গেছেন। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল তিনি মশক ভর্তি পানি নিয়ে ফিরছেন। রাসূলুল্লাহকে সা. দেখে মশক মাটিতে রেখে দেন এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আবেগের সাথে বলতে থাকেন, আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক! তারপর সবাইকে বাগানে নিয়ে যান। সেখানে বসার জন্য কোন জিনিস বিছিয়ে দেন। সবাইকে বসিয়ে রেখে খেজুরের একটি কাঁধি কেটে নিয়ে আসেন। রাসূল সা. বললেনঃ যদি পাকা খেজুর নিয়ে আসতে। বললেনঃ এতে কাঁচা-পাকা সব রকমের আছে, আপনার খুশীমত গ্রহণ করুন। রাসূল সা. সেই খেজুর থেকে কিছু খেলেন। তারপর পানি পান করলেন। সেই পানি ছিল খুবই স্বচ্ছ ও সুস্বাদু। রাসূল সা. পানাহারের পর বললেন, দেখ, আল্লাহর কত নি’য়ামত। ছায়া, উৎকৃষ্ট খেজুর, ঠান্ডা পানি- আল্লাহর কসম, কিয়ামতের দিন এর সবকিছু সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে। আবুল হায়সাম সম্মানিত মেহমানদের বাগানে বসিয়ে রেখে বাড়ীতে আসেন এবং খাবারের আয়োজন করেন। তিনি ছোট একটি ছাগল জবেহ করেন এবং তা ভূনা করে মেহমানদের সামনে পেশ করেন। আহার পর্ব শেষ করে রাসূল সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের কি কোন চাকর নেই। বললেনঃ না। রাসূল সা. বললেনঃ আমার হাতে কোন যুদ্ধবন্দী এলে তুমি আমার কাছে এস। সেই সময় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে দু’জন যুদ্ধবন্দী আসে। তিনি আবুল হায়সামকে তাদের যে কোন একজনকে গ্রহণ করতে বলেন। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. ওপর নির্বাচনের ভার ছেড়ে দেন। রাসূল সা. তাঁদের একজনকে তাঁর হাতে তুলে দিয়ে বলেনঃ এর সাথে ভালো ব্যবহার করবে। তিনি দাসটিসহ বাড়ীতে এসে রাসূলুল্লাহর সা. উপদেশের কথা স্ত্রীর নিকট বলেন। স্ত্রী ছিলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। তিনি বললেন, যদি রাসূলুল্লাহর সা. আদেশ-পালন করতে চাও, তাহলে তাকে আযাদ করে দাও। তিনি স্ত্রীর পরামর্শ মত দাসটি আযাদ করে দেন। তাঁদের এ কাজের কথা রাসুল সা. জানতে পেরে খুব খুশী হলেন এবং তাদের দু’জনেরই প্রশংসা করেন। (তিরমিজী- ৩৯১) তাছাড়া কানসুল ’উম্মাল গ্রন্থেও ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম মুসলিম ও ইমাম মালিক ঘটনাটি সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। হাফেজ আল-মুনজিরী বলেন, এই ঘটনাটি আবুল হায়সাম ও আবু আইউব আল-আনসারী উভয়ের সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩১০) আবুল হাযসামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনারা ’আকাবায় কিসের ওপর বাই’য়াত করেছিলেন? তিনি বলেছিলেন, বনী ইসরাঈলরা মূসার আ. হাতে যে বিষয়ের বাই’য়াত করেছিল আমরাও রাসূলুল্লাহর সা. হাতে ঠিক সেই বাই’য়াত করেছিলাম। (আনসাবুল আশরাফ ১/২৪০)
























