তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
আত্মপরিচয়, যা থেকে আসে আত্মসম্মান!

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের পড়ালেখার Subject choice করা থেকে শুরু করে, বন্ধুত্ব নির্বাচন, লেনদেন, বিয়ে শাদী নানা রকম কর্মকান্ডে Standard maintain করার চেষ্টা করেন। সব জায়গায়, সব কিছু আসলে তার সাথে Chill করে না। ‘আমি করব তার সাথে বন্ধুত্ব!’ ‘আমি ওখানে যাব!’ ‘আমি এটা কিভাবে করব!’ এই টাইপ কথা বলে থাকেন। কারণ, এসব করতে তার আসলে আত্মসম্মানে নাড়া দেয়। আর যে কাজ করতে তার আত্মসম্মানে নাড়া দেয় সেই কাজ যত কঠিন হোক না কেন তা সে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
একটু ভিন্ন ভাবে বিষয়টা আলোচনা করা যাক। আল্লাহ তায়ালা সুরা ইউসুফের ২৩ নম্বর আয়াতে আমাদের জানাচ্ছেন, “আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল আর বলল, ‘এসো (তাড়াতাড়ি করো)’। সে বলল, আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয় তিনি আমার মনিব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমগণ সফল হয় না।”
উপরোক্ত ঘটনাটি হযরত ইউসুফ (আ) এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা সমুহের একটি। যখন তার মুনিব, মিশরের আজিজ(শাসক) এর স্ত্রী তাকে দীর্ঘদিন অন্যায় কাজের (ব্যভিচারের) প্ররোচনা দেওয়ার পর সর্বশেষ ও চুড়ান্ত যে আহবান দেন “এসো” তখন ইউসুফ (আ) আল্লাহপাকের নিকট আশ্রয় চেয়েছেন।
আয়াতটি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, মুনিবের এই আহবানে ইউসুফ (আ) মাঝে যে বিষয় গুলো ফুটে উঠে তা হচ্ছে,
· তাক্বওয়া
· প্রবল কৃতজ্ঞতা বোধ
ঘটনাটি আরো একটু বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, ইউসুফ (আ) ছিলেন তখন একজন দাস। মুনিবের হুকুম বিনা বাক্যে পালন করাই ছিল তার মূল কাজ। কিন্তু সাইয়িদেনা ইউসুফ (আ) যদিও শারীরিক ভাবে মুনিবের দাস ছিলেন, মানসিক ভাবে তিনি ততটাই স্বাধীন ও মুক্ত ছিলেন। মুনিবের কাছ থেকে এই নোংরা আহবান পাওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যে তাক্বওয়া ও কৃতজ্ঞতা বোধের পাশাপাশি প্রবল আত্মসম্মান জেগে উঠে, ‘কিভাবে তিনি এই কাজ করবেন!’
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে একজন দাসের এমন আত্মসম্মান কিভাবে জেগে উঠলো! তার উত্তর হচ্ছে, এই প্রবল আত্মসম্মান এসেছে নবী ইউসুফ (আ) তার নিজের আত্মপরিচয় থেকে। কিভাবে???
একটি মানুষের জন্য তার নিজের আত্মপরিচয় জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মপরিচয়ই তাকে তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে মৌলিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনের প্রতিটি কর্মকান্ড, সিন্ধান্ত এই আত্মপরিচয়ের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষের জীবন সম্পর্কে তার যে মৌলিক ধারনা (Concept) যেমন,
· সে কে?
· সে কোথা থেকে এসেছে?
· এই দুনিয়াতে তার আসা/পাঠানো পিছনের objective টা কি?
· এই দুনিয়ার পর সে কোথায় যাবে?
যখন একজন মানুষ তার জীবন সম্পর্কে এই মৌলিক প্রশ্নের Convincing উত্তর পায় তখন তার জীবন সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারনা (Concept) তৈরি হয়। এবং সেখান থেকেই তার সঠিক আত্মপরিচয় গঠিত হয়।
যেমন, আজকাল boyfriend-girlfriend culture. যারা এই culture ধারণ করে তার পিছনে তার আত্মপরিচয় কিভাবে গঠিত হল?
প্রথমত, তারা তাদের জীবনের সকল functions থেকে দ্বীনকে পৃথক করে ফেলে বা সেকুলারিজম কে তার চিন্তার মৌলিক উৎস বানিয়ে ফেলে। কারণ, তাকে বুঝানো হয় ‘দুনিয়াতে এসেছো একবারই, আর আসা হবে না। So, have fun! Enjoy yourself! Weekend এ গিয়ে জুমা পড়বা বা শেষ জীবনে একবার হজ্ব করে নিবা। সাত খুন মাফ।’ এবং এটাই হয়ে থাকে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। আমরা নিজেদের মেধা খাটিয়ে একবারও চিন্তা করতে পারি না যে, আমরা যা চিন্তা করছি বা যেভাবে চিন্তা করছি সেটা সঠিক কিনা। আমাদের ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, আমরা কে? কারণ, আমরা যদি একবারও বুঝতে পারি ‘আমরা আল্লাহ পাকের কাছ থেকে এসেছি সুনির্দিষ্ট objective পূরণের জন্য, তার ইবাদাত করার জন্য, আমরা আবার তারই কাছে ফিরে যাব’ তাহলে আমরা আমাদের আসল আত্মপরিচয় পাব। আর এই সঠিক আত্মপরিচয় জানার পর নষ্ট সেকুলার চিন্তাকে গ্রহন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে আমাদের আত্মসম্মানে নাড়া দিবে।
তাছাড়া, সম্মানিত ইউসুফ (আ) তার জীবন সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারনার পাশাপাশি তিনি জানতেন এই নোংরা কাজ তার দ্বারা শোভা পায় না। তিনি খুব ভাল করেই জানতেন তিনি কে? ইউসুফ (আ) এর বাবা ছিলেন একজন সম্মানিত নবী ইয়াক্বুব (আ), তার দাদা ছিলেন সম্মানিত নবী ইসহাক্ব (আ), তার পর দাদাও ছিলেন সম্মানিত নবী ইব্রাহিম (আ)। যিনি নবী পরিবারের একজন সদস্য তিনি এরকম কাজ কিভাবে করতে পারেন। একজন দাস হয়েও তার কি পরিমান আত্মসম্মান, একবার চিন্তা করুন।
কিন্তু আমরা! আমরা তো শারীরিক ভাবে দাস নই। বরং আমাদের গোটা জাতি এক চরম মানসিক দাসত্বে বন্দী। কারণ, আমরা আমাদের আত্মপরিচয় ভুলে পশ্চিমাদের দেখানো কুফরি আদর্শ, সেকুলারিজমকে গ্রহন করেছি, যা আমাদের জীবনের সকল কর্মকান্ড ও সিন্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা বুঝে বা না বুঝে এর অন্ধ অনুসরণ করছি। আমাদের বিন্দু মাত্র আত্মসম্মানে লাগছে না যে ইসলামকে বাদ দিয়ে আমরা নষ্ট আদর্শ গ্রহন করছি। আমাদের একটুও আত্মসম্মানে লাগছে না যেখানে আমাদের নবী মোহাম্মদ (সা) রেখে যাওয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা খিলাফাত পুনঃ প্রতিষ্ঠা না করে আমাদের মতো একজন মানুষের তৈরি করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করছি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত তথা খিলাফত বিদ্যমান নেই, তবুও আমরা নিষ্ক্রিয়।
এটাই মূলত বর্তমান তরুন ও যুবসমাজের অবক্ষয়ের মৌলিক কারণ। কিন্তু একসময় মুসলিমরা পুরো বিশ্বের কাছে Idol ছিল। কারণ, তারা তাদের জীবনকে আক্বীদার ভিত্তিতে গঠিত করেছিলেন। দুনিয়াতে আসা বা পাঠানোর যে objective ছিল আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত ও সম্মুন্নত রাখা, সেই কাজটিই তারা করে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তারা সফলকাম হয়েছেন। কারণ আল্লাহ পাক বলেন,
“তোমরাই দুনিয়া সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, মানব জাতিকে কল্যাণের দিকে নেওয়ার জন্য তোমাদের বাছাই করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে, আর আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।” (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।
আমরা যদি আবার দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হতে চাই যারা পুরো মানব জাতিকে Guide করবে, তাহলে সঠিক আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে হবে। উম্মাহর হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কতৃক একমাত্র বৈধ শাসন ব্যবস্থা খিলাফত পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব ও সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুক।
পৌরুষদীপ্ত পুরুষ

সাহসিকতা একজন মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। যারা সাহসিকতার সাথে কোনো কাজ সম্পন্ন করেন তারা সমাজে সমাদৃত হন। বিশেষ করে, পুরুষরা নিজেকে পৌরুষদীপ্ত পুরুষ প্রমাণে অনেক ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেন কিংবা নিজের ইম্প্রেশন তৈরিতে কার রেসিং বা বাইক রেসিং করে থাকে। এতে সে তার সাহসিকতার প্রমাণের চেষ্টা করে। কিছু বালক কিংবা তরুণ এলাকায় মাস্তানি-সন্ত্রাস করে, হাতে অস্ত্র নাড়াচাড়া করে সাহস প্রমাণ করতে চায়, অসৎ রাজনৈতিক নেতার কাছে তার আনুগত্য প্রমাণ করতে চায়। কখনো বিভিন্ন নোংরামি কাজের বেলায় তারা নিজের সাহসিকতা দেখায়। আবার কিছু তরুণ ছেলে মাদক পাচারের জন্য যে সাহসিকতা দেখায় তা দেখে আমরা বিস্মিত হই।
এখন আমরা একটু ভিন্ন প্রেক্ষিতে সাহসিকতা বা পৌরুষদীপ্ত পুরুষের কিছু নমুনা দেখব। সূরা মুমিন/গাফিরের ২৮ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এমন এক মুমিন বান্দার কথা আলোচনা করেছেন যিনি নিজে ফিরাউনের পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং ফিরাউনের সভাসদের একজন সদস্য ছিলেন। ফিরাউনের সাথে সেই মুমিন ব্যক্তির দীর্ঘ কথোপকথন হয় যেটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো কথোপকথন কুরআনের মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন যা ১০ আয়াতের চেয়েও দীর্ঘ। মুমিন ব্যক্তির এই কথোপকথনের মতো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আর কোনো ব্যক্তির এমনকি নবী-রাসূলের কথাও এতো হুবহু কুরআনে আলোচনা করেন নি। মুমিন ব্যক্তির সাথে ফিরাউনের এমন কি আলোচনা হলো যে যেটা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো আলোচনা আমাদের জন্য কুরআনে লিপিবদ্ধ করেছেন। মুমিন ব্যক্তির আলোচনা শুরুই হয়েছে,“— তোমরা কি একজনকে এজন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, ‘আমার রব আল্লাহ!’ একবার চিন্তা করুন, দুনিয়ার তাবৎ জালিমদের সর্দার মিশরের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ফিরাউনের সামনে তার মুখের উপর বলছে, শুধু আল্লাহকে রব বলার কারণেই কি তারা মুসা(আ.) – কে হত্যা করতে চাচ্ছে? এই মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্বোধন করেছেন ‘রাজুলুন’ বলে যার শাব্দিক অর্থ পুরুষ। কিন্তু ‘রাজুলুন’ শব্দ দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেই মুমিন ব্যক্তিকে “ পৌরুষদীপ্ত পুরুষ বা সাহসী পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সত্যিকার সাহসী পুরুষ এরাই যারা জালিমের মুখের উপরে তাকে জালিম বলে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে একমাত্র রব বা হুকুমদাতা বলে। যে বলে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জমিনে আল্লাহর আইন দ্বারা অন্য কারো আইন/ব্যবস্থা চলবে না। এই সব সাহসীদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “শহীদদের সর্দার হামজা (রা) এবং ঐ ব্যক্তি যে জালিম শাসককে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজের নিষেধ করে। আর এই কারণে সেই জালিম শাসক তাকে হত্যা করে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সব সাহসীদের বলেছেন, “সাইয়্যেদুন শুহাদান”। রাসুলুল্লাহ (সা) অন্য একটি হাদিসে বলেন, “জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।” এই সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ এবং জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মূল অংশ। যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামে লিপ্ত, জালিমের সামনে তাকে হক্ব নসিহা করে তারা হচ্ছে এ যুগের পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। কারণ তারা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকেই তাদের রব হিসেবে ঘোষণা করেছে, অন্য কাউকে পরোয়া করার সুযোগ আর নেই।
একবার হযরত আলী (রা.) তার খুতবায় মুসল্লিদের জিজ্ঞাসা করেন, “উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী কে?” সবাই উত্তর দিল, “আপনি”। কারণ আপনি সব যুদ্ধে সবার আগে থেকেছেন, অনেক দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আপনি জয়ী হয়েছেন। আপনার চেয়ে সাহসী আমরা আর কাউকে দেখি না।” এ জবাব শুনে আলী (রা) বললেন, “এটা ঠিক আমি কখনো দ্বন্দ্ব যুদ্ধে হারিনি। অবশ্যই এটা মোকাবিলা করা সাহসিকতার কাজ। কিন্তু উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ছিলেন আবু বকর (রা)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা) যখন কাবার নামাজ আদায় করছিলেন তখন উকবা বিন মুতাইম তার চাদর দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা) -কে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা পেচিয়ে ধরেন। তখন আবু বকর (রা.) তাদেরকে চিৎকার করে বলেন, “তোমরা কি এজন্যে একে হত্যা করতে চাও যে বলে “ আমার রব একমাত্র আল্লাহ।” সুবহানাল্লাহ! সঠিক সময় সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তির সামনে হক্ব কথা বলার মর্যাদা কত বেশি। তারাই তো সাহসী তথা পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতা নষ্ট সেকুলারিজম ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছে। জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকের চিন্তা যুব সমাজ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের সাহসিকতা প্রয়োগও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাই আসল সাহসী বা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত উপাধী পৌরুষদীপ্ত পুরুষ হতে চাইলে আামাদেরও সাহসিকতাকে দ্বীন ইসলাম তথা খিলাফাহ্ প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগাতে হবে। সাহসিকতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে একটি আমানত। এই সাহসিকতা যদি খিলাফাহ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োগ না করি তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে এর জবাবদিহি করতে হবে। তাই আল্লাহকে ভয় করুন, নিজের কোমরে সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ্ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করুন।
গুম: ম্যাকেয়াভেলিয়ান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জুলুমের হাতিয়ার

বাস্তবতা:
ঢাকা ট্রিবিউন এ প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৪ মাসে ঢাকা থেকে মোট ১৪ জন নাগরিক গুমের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে মোট ৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে নিখোজের পর জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। সরকার এবং পুলিশ এগুলোকে মুক্তিপণ আদায়ের কৌশল বললেও তথাকথিত মানবাধিকার কর্মী মনে করেন, চলমান নিখোজ প্রক্রিয়া অর্থের দ্বারা প্রভাবিত নয়; বরং এগুলো হচ্ছে সরকারের জন্য সম্ভাব্য হুমকি এবং ভীতি সঞ্চার করার উপায়। এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ফেইসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট শেয়ার করা সাবেক রাষ্ট্রদূতও রয়েছে। যারা ফিরে আসছেন তারা অজানা ভয়ে কেউই মুখ খুলছেন না।
কারণ:
১. পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের কারণে দারিদ্রতা, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ভিন্ন মত দমন ইত্যাদি ইস্যুতে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ম্যাকায়াভেলিয়ান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জালিম শাসক জনগনের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছে।
২. খিলাফত রাষ্ট্রের মত বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করে শাসন করে না। সেকারণে গুম এধরনের সরকারের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
৩. যেসব গুম ও অপহরণের পেছনে সরকার জড়িত নয়, সেসবের ব্যাপারে শাসক জনগনকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তারা মোটেও আন্তরিক নয়।
সমাধান:
১. খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খলিফা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার-অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সুনিশ্চিত এবং উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা দিতে শরী’আহগতভাবে বাধ্য। মৌলিক অধিকার পূরণ থাকায় ও মানুষের ফিতরাতের সাথে যায় এরকম জীবনাদর্শ -ইসলাম দ্বারা শাসন করায় শাসক সহজেই জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করতে পারে। একারণে খিলাফত ব্যবস্থায় জনগন ও শাসক পরস্পরের শত্রু নয়, বরং পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই খিলাফত ব্যবস্থায় শাসক কতৃক গুম সম্ভব নয়।
২. ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ আল্লাহ’র ভয়ে ইবাদত মনে করে জনগনকে শাসন করে না। বরং তারা ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থে শাসনক্ষমতায় আসীন হয়। সেকারণে এসব শাসক নিজের বাসভূমি ও চলাচলের রাস্তার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও জনগনের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা উদাসীন এবং এ ব্যাপারে কারও কাছে জবাবদিহী করতে বাধ্য নয়। রাসূল (সা) বলেন, ‘...এমন একটি সময় আসবে যখন সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত গভীর রাতে যুবতী নারী হেটে চলে যাবে কিন্তু তার মনে দু’টি ভয় (আল্লাহ এবং চতুষ্পদ হিংস্র জন্তু) ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ ইতিহাস সাক্ষী এ হাদীসের বাস্তবায়ন ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুনিশ্চিত হয়েছিল-যা পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় কল্পনাতীত।
৩. খিলাফত ব্যবস্থায় শাসককে জবাবদিহী করাকে কেবল উৎসাহিত করা হয় না, বরং এটি জনগনের জন্য একটি ফরয কাজ। খিলাফত ব্যবস্থায় সাধারণ জনগন, রাজনৈতিক দলসমূহ খলিফা বা শাসকের পদে আসীন যে কাউকে জবাবদিহী করতে পারবে এবং যে কোন নাগরিক তাদের বিরুদ্ধে মাহকামাতুল মাজালিম এর আদালতে মামলা করতে পারবেন। অথচ মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের তথাকথিত পুঁজিবাদী সংবিধান স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সরকার সমালোচনা ও ভিন্নমতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসহিষ্ণু ও প্রতিক্রিয়াশীল। এমনকি এই তথাকথিত পবিত্র সংবিধান অনুসারে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রধামন্ত্রীর কোন অন্যায় কাজের ব্যাপারে আদালতে মামলা করা যায় না।
বিশ্ব ধাবিত হচ্ছে এক সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে

কোন কিছু থেমে নেই। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে। সূর্য থেমে নেই। মিল্কিওয়ে নামক গ্যালাক্সীতে সূর্য চলমান। গ্যালাক্সীগুলো একে অপরের থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞান এসব কথা বলে। সময়ও থেমে নেই। কথায় বলে, সময় ও নদীর ঢেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সময় নদীর ঢেউয়ের মত বহমান।
সময় পরিক্রমায় বিগত একশ বছর…
১৯২৪ সালে ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিমদের অভিভাবক রাষ্ট্র উসমানীয় খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পর প্রায় এক শতাব্দী পার হতে চলেছে। গত একশবছরে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে অনেক কিছু, বিশেষত: মুসলিম বিশ্ব। এই একশ বছর ছিল বেশ ঘটনাবহুল। উপনিবেশবাদীরা ইসলামিক ভূমিসমূহে নব্য উপনিবেশবাদ বা Neo-colonialism এর আওতায় বিশ্বাসঘাতক তাবেদার শাসকদের বসিয়েছে। কুফর শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ ও নিপীড়নমূলক বৃটিশ বিচার ব্যবস্থা মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের বিতাড়িত করে বেলফার চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ডের ভেতরে ইসরাইল নামক ইহুদীদের অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুসলিম দেশসমূহে পরিকল্পিতাবে বিভাজন ও নৈরাজ্য উসকে দিয়ে তাদের সম্পদসমূহ লুট করা হয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে মুসলিমদের চিন্তা প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছে এবং সামাজিক জীবনে পশ্চিমীকরণ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু বিগত খৃষ্টীয় শতকের শেষের দিকে পুঁজিবাদ মুসলিম বিশ্বসহ পুরো পৃথিবীতে তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হারাতে শুরু করে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন নামক পুঁজিবাদের অন্তসারশূন্য ফাঁকা বুলি মুসলিমদের আর টানতে পারছিল না। মুসলিম বিশ্ব উপনিবেশবাদী পাশ্চাত্য, প্রতারণাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ও তাদের তাবেদার দালাল শাসকদের ব্যাপারে ফুসে উঠল এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থার দাবি ক্রমাগত উচুঁ হতে থাকল। পশ্চিমারা তখন নতুন ফন্দি আটল। নব্য উপনিবেশবাদ থেকে বের হয়ে পুরনো সরাসরি উপনিবেশবাদের দিকে ফিরে আসল। ওয়ার অন টেররের (War on terror) নামে Crusade শুরু হল এবং যার ফলশ্রুতিতে মার্কিনীদের নেতৃত্বে কাফেরচক্র ইরাক, আফগানিস্তান সামরিকভাবে দখল করে নিল। কিন্তু খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই শরীআহগত দায়িত্বের কারণে মুসলিমদের মধ্যে পূর্নজাগরণের রাজনৈতিক আকাঙ্খা দানা বেধেছিল। যা কালক্রমে বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক দলের কাজের কারণে আরও জনপ্রিয় ও বেগবান হয়েছে। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ, তাদের প্রতারণাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, অন্তসারশূন্য মূল্যবোধ ও তাদের নিযুক্ত স্বৈরশাসকদের জুলুমের বিপরীতে ইসলামের দাবিতে মুসলিম বিশ্ব জেগে উঠে। এরই চূড়ান্ত বহিপ্রকাশ হল চলমান দশকের শুরুর দিকে তিউনিসিয়া, মিশর, ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়াসহ আরববিশ্বে সংঘটিত আরব বসন্ত। কিন্তু ধূর্ত উপনিবেশবাদীরা জনগনের এ জাগরণকে ছিনতাই করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সিরিয়ার মুসলিমদের জাগরণ ছিল ব্যতিক্রম। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের রক্তচক্ষু, হাজার হাজার মুসলিম শিশুর লাশ, বিষাক্ত গ্যাস, তেজষ্ক্রিয় রাসায়নিক বোমা, জঙ্গি বিমানের সদর্প পদচারণা কোনকিছুই এখনও এ দূর্দমনীয় জাগরণকে থামাতে পারেনি। যেন একটি সুনিশ্চিত গন্তব্যের জন্যই এ জাগরণ।
সুনিশ্চিত গন্তব্যের ব্যাপারে উম্মাহ’র ভিন্ন অবস্থান…
এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের সব আলেম ও সাধারণ জনগণ কি ওয়াকিবহাল? আলেম ও সাধারণ জনগণ কি একটি সুনিশ্চিত গন্তব্যের ব্যাপারে একমত নাকি এ ব্যাপারে রয়েছে একাধিক মতামত? মুসলিমদের অভিভাবক রাষ্ট্র খিলাফতের অনুপস্থিতি, বুদ্ধিবৃত্তিক অবনমন ও সঠিক ইসলামি চিন্তাপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় মুসলিম বিশ্বের আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত নন। যেমন: অনেক আলেম মনে করেন বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা অবধারিতভাবে দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদার প্রত্যাবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে একটি ভবিষ্যতবাণীমূলক সহিহ হাদীস খুব উল্লেখযোগ্য:
নূ’মান বিন বশীর (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন: ‘তোমাদের মধ্যে নবুয়্যত ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি তার অবসান ঘটাবেন। তারপর নবুয়্যতের আদলের খেলাফত আসবে। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে আঁকড়ে ধরা (বংশের) শাসন। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। অতপর আসবে জুলুমের শাসন আর তা ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন আল্লাহ চান। আল্লাহ্’র ইচ্ছায় একদিন এরও অবসান হবে। তারপর আবার আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত। অতপর তিনি (সা) চুপ থাকলেন।’ (মুসনাদে ইমাম আহমদ)
যদিও এ মতের পক্ষালম্বনকারী আলেম ও তাদের প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহ এ হাদীসের ভিত্তিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য পুরো পৃথিবীব্যাপী কাজ করছে না। বরং তাদের ফিকহভিত্তিক দাবি, ভবিষ্যত বাণীমূলক আহাদ হাদীস থেকে হুকুম শরী’আহ আসে না। ইজতিহাদি প্রক্রিয়ায় তাহকীকুল মানাত (বাস্তবতা পর্যালোচনা) ও তাখরীজুল মানাত (বাস্তবতা আহরণ) ও তানকীহুল মানাত (বাস্তবতার জন্য নির্দিষ্ট হুকম সম্পর্কিত করা)-এর মাধ্যমে উম্মাহ’র বর্তমান সময়ের কর্মপদ্ধতি বা হুকম শরী’আহ নির্ধারিত হবে।
তবে মুসলিমদের মধ্যে যেসব আলেম ও দল রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে কাজ করেন তারা সবাই যে এ গন্তব্য সর্ম্পকে সুনিশ্চিত এমনটা নয়। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতাও সমান নয়।
মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যে অপর একটি অংশের আলেমগন সচেতনভাবে অথবা কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বলছেন, মুসলিমদের এখন খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা জরুরী নয়। আমরা ক্বিয়ামতের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। ক্বিয়ামতের ছোট নির্দশনসমূহ সুস্পষ্ট। বড় নিদর্শনসমূহ আসন্ন। অনেক আলেম ইমাম মাহদীর জন্ম হয়ে গেছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চটকদার কথা বলে ঝড় তুলছেন। উম্মাহ’র অবনমন যেহেতু তলানীতে এসে পৌছেছে সেহেতু গোটা উম্মাহকে পূর্ণজাগরিত করার চিন্তা কল্পনাবিলাস মাত্র। জালিম শাসককে জবাবদিহী করা নয়, বরং ব্যক্তিগত আমলের মাধ্যমে ফিতনার এ সময়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই শরী’আহগত প্রাধান্য। ইমাম মাহদী অথবা ঈসা ইবনে মারিয়াম এসে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করে এর ফিতনা থেকে মুসলিমদের সুরক্ষা দিবেন। কিয়ামতের ছোট ও বড় নিদর্শন, ইমাম মাহদী ও ঈসা (আ)-এর আগমন সর্ম্পকিত রাসূল (সা) এর ভবিষ্যতবাণীমূলক আহাদ হাদীসসমূহকে তারা দলিল হিসেবে দেখিয়ে থাকে। অনেক মুসলিম এসব আলেমদের বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে ফেলেছে এবং অন্য সব ধর্মের মত ইসলামকেও তাদের জন্য আচরণ সর্বস্ব ধর্মে পরিণত করেছে। মুসলিমদের জন্য ইসলামকে জীবনাদর্শ থেকে ধর্মে রূপান্তরিত করে দেয়া কাফেরদের সুগভীর ষড়যন্ত্রের সফলতার ঈঙ্গিত বহন করে। আর ফিকহের দৃষ্টিতে ভবিষ্যত বাণীমূলক আহাদ হাদীস থেকে মুসলিমদের হুকুম শরী’আহ আসে না, বরং অণুপ্রেরণা আসতে পারে। এটি ফিকহের বাস্তবতা উপলদ্ধি করার ক্ষেত্রে অপরিপক্কতা অথবা সচেতন অবহেলা।
ইতিহাস স্বাক্ষী উম্মাহ’র এই ভিন্ন অবস্থান ও কর্মপদ্ধতি সুনিশ্চিত গন্তব্য অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা নয়। এর জন্য ইসলাম ও এর ইতিহাসকে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। যেমন: নুহ (আ) যখন তার কওমের লোকদের বললেন, অতি দ্রুত একটি বড় প্লাবন হবে এবং আমি একটি বিশাল আকারের কিস্তি (নৌকা) তৈরি করছি এবং লোকদের নির্দিষ্ট দিনে সেই কিস্তিতে উঠে পড়া উচিত। একথা শুনে তার কওমের সব লোকেরা কি বিশ্বাস করেছিল? অবশ্যই না। এমনকি তার পরিবারের লোকেরাই এটি নিয়ে বিদ্রুপ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল নুহ (আ) এর কথা অনুযায়ী সুনিশ্চিতভাবে মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়েছিল এবং অধিকাংশ লোক নবী নুহ (আ) এর স্রষ্টা প্রদত্ত ভবিষ্যতদ্বাণী উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই কথা মহাবীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবী (রহ) এর জেরুজালেম পূনরুদ্ধার অভিযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেসময় উম্মাহ’র অবনমন এমন এক পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, সাধারণ মুসলিম তো বটেই, আলেমগন পর্যন্ত জেরুজালেম অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করত। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা’র ইচ্ছায় মহাবীর সালাহউদ্দিন আইয়ূবী একটি অসম যুদ্ধে Crusade -দের পরাজিত করে জেরুজালেম পূণরুদ্ধার করেছিলেন এবং ইতিহাস এগিয়ে গিয়েছিল এক সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। এভাবে ইসলামের ইতিহাস বার বার Human Perception কে ভুল প্রমাণ করে সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। ইতিহাস সেদিকে ধাবিত হবে যেদিকের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা একে পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছেন। Pragmatic Human Perception ইতিহাসের টেকসই ভীত রচনা করে না, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা এর গন্তব্য ঠিক করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘ইসলাম অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল এবং অচিরেই তা আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে, সুতরাং অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।’ তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কারা এই অপরিচিত ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)?’ তিনি (সা) বললেন, ‘ওরা তারা যারা মানুষ আমার সুন্নাহকে নষ্ট করে দিলে সেটাকে বিশুদ্ধ করবে।’ অন্য এক বর্ণণায় আছে, ‘তারা হচ্ছে ওরা যারা মানুষ খারাপ হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে ঠিক করবে।’ (তাবারানী)
অন্য এক হাদীসে রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,
“শেষ বিচারের দিন এমন কিছু লোককে উপস্থিত করা হবে যাদের নূর হবে সূর্যের মতো।” আবু বকর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা কি আমরা, ইয়া রাসূলুলাহ (সা)?’ তিনি বললেন, “না তোমাদের জন্য বিশাল পুরষ্কার রয়েছে আর তারা হচ্ছে কিছু সংখ্যক দরিদ্র দেশত্যাগী যারা উত্থিত হবে পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকে।” তারপর তিনি (সা) বললেন, “কল্যান হোক অপরিচিতদের (তিনবার)।” জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কারা সেই অপরিচিতরা?’ তিনি (সা) বললেন, “তারা হবে অনেক খারাপ লোকের মাঝে অল্পসংখ্যক সৎ লোক। তাদের মান্যকারীর চেয়ে তাদের অমান্যকারীদের সংখ্যা বেশী হবে।” (তাবারানী)
রাসূলুলাহ্ (সা) বলেন,
“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা আলাহ্’র হুকুমের উপর অটল থাকবে। যারা তাদের সাহায্য করা পরিত্যাগ করবে অথবা তাদের বিরোধীতা করবে তারা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবেনা। এ অবস্থায় আলাহ্’র নির্দেশ এসে যাবে এবং তারা মানুষের (বিরোধীদের) উপর বিজয়ী হবে।” (মুসলিম)
Clash of Civilization এবং সুনিশ্চিত গন্তব্য…
বিশ্ব এবং মুসলিম উম্মাহ আজকে Clash of Civilization এর যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিপত্তিশালী এবং বৈশ্বিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদ এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রবিহীন ইসলামিক জীবনাদর্শ। তাছাড়া তাদের রয়েছে বিশ্বব্যাপী জালের মত ছড়িয়ে থাকা শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম- যা মানুষের বেডরুম পর্যন্ত পৌছে গেছে। এসব প্রচারমাধ্যম হল মগজধোলাই ও জনমত গঠনের প্রকৃষ্ট হাতিয়ার। এটি হল দুই সভ্যতার অসম দ্বন্দ। এই অসম দ্বন্দ উম্মাহ’র একাংশের মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু উম্মাহ’র ধারণা (Perception) যাই হোক অথবা অধ্যাপক হান্টিংটন যাই বলুন না কেন এই দ্বন্দের অবসান হবে একটি সভ্যতার সুনিশ্চিত বিজয় ও অপর সভ্যতার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। এ যেন কলোসিয়ামে গ্লাডিয়েটরদের নিষ্ঠূর খেলার মত। এখানে বাস্তবতার প্রকৃত উপলদ্ধি ও আলোকিত চিন্তা হল, অসম দ্বন্দে ইসলাম ক্রমশই শক্তিশালী হচ্ছে এবং পুঁজিবাদ তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হারিয়ে উন্মাদের মত শক্তি প্রয়োগ করে টিকে থাকতে চাইছে। ইসলামী জীবনাদর্শের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ব্যাপারে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনের মাধ্যমে বারবার এই আভাস দিচ্ছে। তাদের শাসকদের কথা থেকেও এ বিষয়টি সুস্পষ্ট। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাবলু বুশ জুনিয়র ২০০১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এক ভাষণে বলে,
“The militants believe that controlling one country will rally the Muslim masses, enabling them to overthrow all moderate governments in the region and establish a radical Islamic empire that spans from Spain to Indonesia.”
কাফেরদের নেতা যাই বলুক না কেন- সহিহ মুসলিম, আবু দাউদ, আত তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুবাহানাহু তা’আলা আমাকে পুরো পৃথিবী এক করে দেখালেন, সুতরাং আমি এর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত দেখতে পেলাম। অবশ্যই আমার উম্মতের কতৃত্ব সেসব জায়গায় পৌছে যাবে যেসব জায়গা আমাকে দেখানো হয়েছে।’
নব্য উপনিবেশবাদ, সাইক পিকো চুক্তি, বেলফার চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ব্যাপক প্রভাবশালী পশ্চিমা মিডিয়ার মগজ ধোলাই, শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষকীকরণ, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের War on terror নামক Crusade, মুসলিম ভূমিসমূহ জবরদখল করা, তাদের সম্পদ লুট করা, মুসলিমদের উপর ইতিহাসের ভয়াবহতম নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো, আইসিস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খিলাফতের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, নিষ্ঠাবান ইসলামিক দলসমূহকে নিষিদ্ধ করা, ইসলামের দাওয়াত বহনকারীদের উপর বর্বর নির্যাতন পরিচালনা ও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের হত্যা করা, পর্ণোগ্রাফি, মাদ্রকদ্রব্য প্রভৃতি ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়ে মুসলিম উম্মাহ এগিয়ে চলেছে এক সুনিশ্চিত গন্তব্য- দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদাহ প্রতিষ্ঠার দিকে। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
‘নিশ্চয়ই যারা কাফের তারা মানুষকে আল্লাহ’র পথ থেকে ফিরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ধনসম্পদ ব্যয় করে, তারা তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে, অতপর ওটাই শেষ পর্যন্ত তাদের দুঃখ ও আফসোসের কারণ হবে এবং তারা পরাভূতও হবে। আর যারা কুফরী করে তাদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে।’ (সূরা আনফাল:৩৫)
লেখক: রাফীম আহমেদ
বি পি এল কি কেবলই ক্রিকেট খেলা?

বাস্তবতা:
বিগত কয়েক বছরের মত এ বছরও আই পি এল কে অনুসরণ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড টি টোয়েন্টি ক্রিকেট লীগ বি পি এল আয়োজন করেছে। মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণার কারণে বি পি এল নিয়ে সর্বসাধারণ বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। মিডিয়া মারফত আরও জানা যাচ্ছে বি পি এল কে ঘিরে জনাধিক্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে জুয়া ব্যাপকতা লাভ করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বি পি এল কি কেবলই ক্রিকেট খেলা, নাকি এর পেছনে রয়েছে মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে দূর্বৃত্তায়িত পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণীর গভীর ষড়যন্ত্র।
মূল আলোচনা:
ষোড়শ শতাব্দীর ইটালিয়ান কূটনীতিবিদ ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক/বিশ্লেষক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির মতে, ‘একজন ধূর্ত শাসকের পক্ষে জনগণকে দয়া ও ভালবাসা নয়, বরং ভয়/আতঙ্ক ও প্রতারণা দিয়ে শাসন করা উত্তম।’ বর্তমান বিশ্বের সব রাষ্ট্রই ম্যাকয়েভেলির রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ করে। পুঁজিবাদ মানেই হল কিছু সংখ্যক পুঁজিপতির একচ্ছত্র অর্থ, ক্ষমতা ও শোষণ। বাদবাকী আপামর জনগণ দারিদ্রতা, অপুষ্টি, বঞ্চণা নিয়ে কোনরকমে বেঁচে থাকে। দারিদ্রতা ও বঞ্চণা থেকে সাধারণ জনগন যাতে সংগঠিত ও ফুঁসে উঠতে না পারে সে জন্য অজনপ্রিয় জালিম শাসক প্রতারণা ও ভয় সৃষ্টি করে এবং এভাবে শাসনকার্য পরিচালনা অব্যাহত রাখে। প্রাচীণ গ্রীসে অজনপ্রিয় শাসকগণ দারিদ্রপীড়িত ও বঞ্চিত জনগণকে গ্লাডিয়েটরদের খেলা দেখিয়ে ব্যস্ত রাখতে কোলোসিয়াম বানিয়েছিল। এখান থেকে ম্যাকয়েভেলির মত ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রচিন্তকেরা শাসকের কর্মপদ্ধতি বাতলে নিয়েছেন। আর এ কর্মপদ্ধতি বাংলাদেশসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শাসকেরা অনুসরণ করে থাকে।
ধর্মনিরপেক্ষ আকীদা থেকে উৎসারিত গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র পৃথিবীতে মানুষের দারিদ্রতা, শোষণ ও বঞ্চনার মূল কারণ। দরিদ্র, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষের যন্ত্রনাকে ক্ষণিকের জন্য ভুলিয়ে দিতে পেইন কিলারের মত কাজ করে বিভিন্ন জাকজমকপূর্ণ খেলাধুলার বর্ণাঢ্য আয়োজন, চলচ্চিত্রসহ বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি, মাদকদ্রব্য, জুয়া প্রভৃতি।
বাংলাদেশ হল তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ। এখানে শাসকশ্রেণী অধিকাংশ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। শাসকশ্রেণী সাধারণ জনগনের কষ্টার্জিত উপার্জন মুসক, আয়কর ইত্যাদির নামে লুটে পুটে নিয়ে বিদেশে টাকার পাহাড় গড়ছে। ব্যাংকে রাখা সাধারণ জনগণের যতসামান্য সঞ্চয় পুঁজিপতি ঋণখেলাপীরা লুট করছে। দেশে প্রায় সাড়ে চারকোটি লোক বেকার। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। নাগরিক সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে থেকেও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল নগরী ঢাকা। বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ এর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতাকে হরণ করে দারিদ্রতাকে জিইয়ে রাখা হচেছ। জনগণের জান ও মালের নিরাপত্তা দিতে শাসক সম্পূর্নরূপে ব্যর্থ। এতসব প্রকটতর সমস্যা থাকা সত্ত্বেও মিডিয়ার কল্যাণে শাসকশ্রেণী সাধারণ জনগণকে বি পি এল দিয়ে ব্যস্ত রাখতে সমর্থ হচেছ। সাধারণ জনগণ বিশেষ করে তরুণ সমাজ শাকশ্রেণীর এ ধরণের প্রতারণার প্রধান শিকার। কেননা যুগে যুগে তরুণরাই পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উপনিবেশিকদের বসানো মুসলিম বিশ্বের পুতুল শাসকেরা জুলুমের বিরুদ্ধে মুসলিম তরুণদের ইসলামের ভিত্তিতে জাগরণকে চরমভাবে ভয় পায়। বিধায় মুসলিম তরুণদের বি পি এল দিয়ে সত্যিকারের ইস্যু থেকে বিমুখ রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে জুয়া ও বেহায়াপনার ব্যাপক প্রসারের দ্বারা তাদের চরিত্র ও নৈতিকতা ধ্বংস করে দেয়ার সুগভীর ষড়যন্ত্র চলছে।
বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের তরুণদের এ ভয়াবহ ষড়যন্ত্র উপলদ্ধি করতে হবে এবং উপনিবেশবাদীদের ক্রীড়ানক জালিম শাসকদের এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শক্তিশালী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হবে। মক্কাতে যখন বৃদ্ধরা আল্লাহর রাসূলকে পরিত্যাগ করেছিল তখন তরুণরাই তাকে সাদরে বরণ করেছিল। মুসলিম তরুণেরাই সর্বশেষ আরব বসন্তের সময় মরক্কো, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে পশ্চিমাদের বসানো পুতুল স্বৈরশাসকদের ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছিল- তরুণদের একথা ভুলে গেলে চলবে না । তাদের আরও ভুলে গেলে চলবে না কী উদ্দেশ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদেরকে এ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। রাসূল (সা) বলেন, ‘হাশরের ময়দানে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কেউ এক পাও এগুতে পারবে না…(এদের মধ্যে একটি প্রশ্ন হল)…তুমি তোমার যৌবনকে কোন কাজে ব্যয় করেছ?’
লেখক: রাফীম আহমেদ
সুন্দরী প্রতিযোগিতা, পুুঁজিবাদ ও আমাদের মুসলিম পরিচয়

অতি সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মিস ইউনিভার্স বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা। যেখানে মিস ইউনিভার্সের মুকুট পড়েছে দেড়শ কোটি মানুষের দেশ ভারতের হরিয়ানার মেয়ে মানসী চিল্লার। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে জেসিয়া ইসলাম এতে অংশগ্রহণ করে। এর কিছু দিন আগে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারী মিস বাংলাদেশ খুজে বের করতে স্থানীয়ভাবে সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দুই সময়েই বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া সুন্দরীদের নিয়ে বিভিন্ন ইতিবাচক খবর পরিবেশনে ছিল নজিরবিহীন।
মিডিয়া যে ভুল চিন্তাসমূহ দেয়ার চেষ্টা করে:
১. সুন্দরী প্রতিযোগিতা নারী স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের পরিচায়ক।
২. সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নারীরা সাহসী ও অনুকরণীয়।
৩. মিস বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।
সঠিক চিন্তা:
১. নারী স্বাধীনতা বা নারীর ক্ষমতায়নের নামে সুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনের পেছনে রয়েছে ঘৃণ্য পুঁজিবাদী স্বার্থ। বহুজাতিক বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের পণ্যের বিপণন বৃদ্ধির করার লক্ষ্যে এ ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। ভারত বা চীনের মত জনবহুল দেশকে কখনও বা আয়োজক, আবার কখনও বা সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে সেসব দেশের নারীদের মধ্যে বিউটি পণ্য ক্রয়ের মাদকতা তৈরি করা হয়। এটিই হল গ্লোবালাইজশনের ঘৃণ্যতম রূপ।
২. পুঁজিবাদে সবকিছুই বাণিজ্যিক পণ্য, এমনকি নারীর শরীরও। নারী স্বাধীনতা অথবা ক্ষমতায়নের শ্লোগান বাইরের খোলস মাত্র। তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ নারীর সর্বশেষ গন্তব্য হল পতিতালয় বা পর্ণ ইন্ডাস্ট্রী। পতিতালয় বা পর্ণ ইন্ডাস্ট্রীতে কাজ করা যদি নারীর ক্ষমতায়ন হয়, তাহলে তা মানসিক বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩. শরীআহ কতৃক সংজ্ঞায়িত মুসলিম নারীদের আওরা বা সতরের সংরক্ষণ করা ফরয বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে মুসলিম বোন ও কন্যাদের শরীরের প্রদর্শনী জঘন্যতম হারাম কাজ। এটি ইসলামি আক্বীদা, শরী’আহ ও মুসলিম পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক।
৪. নারীকে দেখার ক্ষেত্রে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পশ্চিমাদের কাছে নারী শরীরের প্রদর্শন শিল্প হলেও ইসলামে এটি হারাম। পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার অগভীর চিন্তার অধিকারী অধপতিত মুসলিম উম্মাহ আজকে এ সত্য উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা অন্ধভাবে পশ্চিমা কাফেরদের অনুকরণ করছে। যে সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
‘এমন একটা সময় আসবে যখন আমার উম্মত অন্ধভাবে কাফেরদের অনুসরণ করবে এবং তারা (কাফেররা) টিকটিকির গর্তে প্রবেশ করাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলে, উম্মতও তাই করবে...।’
৫. নারীর শরীরের উন্মুক্ত প্রদর্শণীতে অংশগ্রহণ সাহসী ও সম্মানজনক কাজ হলে জঙ্গলের সব চতুষ্পদ জন্তুও সাহসী ও সম্মানিত, কেননা তাদেরকে কোন পোশাকই পরতে হয় না। শরীর নিয়ে হীন পুঁজিবাদী ব্যবসার উপকরণ হওয়ার মধ্যে নারীর মুক্তি নিহিত নেই, বরং ইসলামি শরী’আহ’র যথাযথ অনুসরণের মধ্যেই নারীর দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি নিহিত রয়েছে। একারণে পুরো পৃথিবীব্যাপী প্রচুর অমুসলিম নারী ইসলামের সুশীতল ছায়ায় অনুপ্রবেশ করছে।
৬. মিস ইউনিভার্স নামক হারাম ও নারী অবমাননাকারী আয়োজনে বাংলাদেশ বা কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে কোন মুসলিম নারী সেসব দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। বরং বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসের মত এটিও মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্য ও সংহতি বিনষ্টকারী কুফরী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে শক্তিশালী করেছে।
রাফীম আহমেদ
খিলাফত ব্যবস্থার খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা – ধারা ২

ধারা ২
দার আল-ইসলাম (ইসলামের আবাসস্থল বা ইসলামী রাষ্ট্র) হচ্ছে সেই অঞ্চল যেখানে ইসলামের আইনসমূহ বাস্তবায়ন করা হয় এবং যার নিরাপত্তা ইসলাম কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়। দার আল-কুফর (কুফরের আবাসস্থল বা কুফর রাষ্ট্র) হচ্ছে সেই অঞ্চল যেখানে কুফর আইনসমূহ বাস্তবায়িত হয় কিংবা এর নিরাপত্তা ইসলাম ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা নিশ্চিত করা হয়।
দার শব্দটির অনেকগুলো অর্থ রয়েছে, তার মধ্যে:
ভাষাগতভাবে: এর অর্থ হচ্ছে “আবাসস্থল”, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে শব্দটি এভাবে এসেছে: “অতঃপর আমি তাকে ও তার বসবাসের স্থানকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম” (সূরা আল-কাসাস : ৮১), এছাড়াও “যাত্রা-বিরতির স্থান” এবং জনগণের বসবাসের জায়গা হিসেবেও এসেছে, যাতে বলা হয়েছে যে মানুষ যে স্থানে বসবাস করে তার প্রতিটিই তাদের দার। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণী অনুসারে: “অনন্তর ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করলো এবং তারা সকাল বেলায় গৃহের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।” (সূরা আল-আরাফ : ৯১), এখানে এর অর্থ হচ্ছে, ‘শহর’। সিবাওয়েহ্ বলেছেন: “এই দার হচ্ছে একটি মনোরম শহর এবং “আবাসস্থল ও স্থান”, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দে: “এবং মুত্তাকীদের আবাসস্থল (জান্নাত) কতই না চমৎকার হবে” (সূরা আন-নাহল : ৩০)। একইভাবে রূপকঅর্থে এর মানে হচ্ছে “গোত্র”, বুখারীতে আবু হামিদ আল-সা’দি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, “সত্যই, বনু নাজ্জার হচ্ছে আনসারদের মধ্য হতে সর্বোত্তম গোত্র (দার)…”
এবং দার শব্দটি কোন কিছুর নামের সাথেও যুক্ত হতে পারে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দে: “আমি তোমাদেরকে ফাসেকদের আবাসস্থল দেখাবো” (সূরা আল-আরাফ : ১৪৫), “এবং মুত্তাকীদের আবাসস্থল কতই না চমৎকার হবে” (সূরা আন-নাহল : ৩০), “কিন্তু তারা তাকে হত্যা করল। সুতরাং সালেহ্ বললেন, তোমরা নিজেদের গৃহে তিনটি দিন উপভোগ করে নাও। ইহা এমন ওয়াদা যা মিথ্যা হবে না” (সূরা হুদ : ৬৫), এবং “এবং তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খণ্ডের মালিক করে দিয়েছেন যেখানে তোমরা অভিযান করোনি” (সূরা আল-আহযাব : ২৭)। এবং একইভাবে মুসলিমে বুরাইদাহ্ কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “…অতঃপর তাদেরকে তাদের পরিবার-পরিজন ছেড়ে মুহাজিরদের আবাসস্থলে গমনের আহ্বান জানাও” এবং আহমদে সালিমা বিন নওফেল কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “বিশ্ববাসীদের আবাসস্থলের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আস-শাম।”
এবং এটা শব্দার্থের সাথেও যুক্ত হতে পারে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দ অনুসারে “এবং স্বজাতিকে ধ্বংসের গৃহে বসবাসের সম্মুখীন করেছে” (সূরা ইবরাহিম : ২৮) এবং “যিনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাদেরকে বসবাসের গৃহে স্থান দিয়েছেন যা চিরকাল থাকবে” (সূরা ফাতির : ৩৫)। এবং আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস, হাসান সহীহ্ সনদ সহকারে ইবনে আসাকির হতে এবং তিরমিযী শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বলেছেন: “আল্লাহ্ আবু বকরকে রহমত করুন, সে আমার সাথে তার কন্যার বিবাহ দিয়েছে এবং আমাকে হিজরতের স্থানে (দার আল-হিজরাহ্) সাথে করে নিয়ে গেছে।” দারাকুতনি’তে ইবন আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “যদি একজন দাস তার মনিবের পুর্বে শিরকের আবাসস্থল ত্যাগ করে তবে সে মুক্ত এবং যদি সে তার পরে ত্যাগ করে তাহলে সে তার মনিবের কাছে ফেরত যাবে, এবং যদি একজন নারী তার স্বামীর পুর্বে শিরকের আবাসস্থল ত্যাগ করে তবে সে যাকে ইচ্ছা তাকে বিয়ে করতে পারবে এবং যদি সে তার স্বামীর পরে ত্যাগ করে তবে সে তার স্বামীর কাছে ফেরত যাবে।”
এবং, শারী’আহ্ অর্থের দিক দিয়ে দু’টি শব্দের সাথে দার শব্দটিকে যুক্ত করেছে – ইসলাম এবং শিরক। পূর্বে উল্লেখিত সালিমা বিন নওফিল কর্তৃক বর্ণিত মুসনাদ আল-সামিয়্যিনের হাদিসটির আরেকটি বর্ণনা তাবারানির কাছে রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে: “আস-শাম হচ্ছে ইসলামের আবাসস্থলের কেন্দ্রবিন্দু।” সুতরাং এখানে দার শব্দটি ইসলামের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং একইভাবে আল-আহকাম আল-সুলতানিয়াহতে ও আল-হাওই আল-কবির-এ আল-মাওয়ার্দি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “ইসলামের আবাসস্থলে এর সবকিছুই নিষিদ্ধ এবং শিরকের আবাসস্থলে এর সবকিছুই অনুমোদিত” – সবকিছু বলতে এখানে শারী’আহ্ লঙ্ঘনে প্রাপ্য শাস্তি ব্যতিত ইসলামের আবাসস্থলে রক্ত এবং সম্পদের পবিত্রতাকে নির্দেশ করা হয়েছে এবং শারী’আহ্’র সুনির্দিষ্ট আইন মোতাবেক যুদ্ধ ও যুদ্ধলব্ধ মালামালের বিধান অনুসারে, যুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতিতে শিরকের আবাসস্থলে (“দার আল-হারব্” – যে দেশের সাথে যুদ্ধ চলমান রয়েছে) রক্ত এবং সম্পদের পবিত্রতার অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করা হয়েছে। এই বিভক্তিটি সমগ্র দুনিয়াব্যাপী পরিব্যাপ্ত, সুতরাং দুনিয়াতে এমন কোন স্থান নেই যেটা ইসলামের আবাসস্থল (দার আল-ইসলাম) কিংবা শিরকের আবাসস্থল বা ভিন্নার্থে কুফরের আবাসস্থল বা যুদ্ধের আবাসস্থলের (দার আল-কুফর, দার আল-হারব্) বাহিরে থাকতে পারে।
দুটি শর্ত পূরণ করলে কোন স্থানকে দার আল-ইসলাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে:
প্রথমত: উক্ত স্থানের নিরাপত্তা মুসলিমগণ নিশ্চিত করবে, এর প্রমাণ আমরা রাসূলুল্লাহ্’র (সা) হাদিস থেকে পেয়ে থাকি; এতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কাতে তাঁর সাহাবাদেরকে (রা:) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য ভাই এবং আবাসস্থলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যাতে তোমরা এর মধ্যে নিরাপদে থাকতে পার।” এই স্থানটি দার আল-হিজরাহ্, যা ইবনে আসাকিরে আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে ইতোমধ্যেই উল্লেখিত এবং বুখারীতে আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থানকে দেখানো হয়েছে।” এবং এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ (রা.) ততক্ষণ পর্যন্ত মদীনাতে হিজরত করেননি যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি (সা) সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন; আল-হাফিজ আল-ফাতহ্-এ বলেছেন, আল-শাবি হতে শক্তিশালী সনদের মাধ্যমে বাইহাকি বর্ণনা করেছেন এবং আল-তাবারানি এটাকে সংযুক্ত করেছেন আবু মুসা আনসারির বর্ণনার সাথে, যিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল-আকাবাতে আনসারদের মধ্য হতে ৭০ জনের সাথে কথা বলার জন্য তাঁর (সা) চাচা আব্বাসকে সাথে নিয়ে রওয়ানা হন এবং আবু উমামা (আসাদ বিন যুরারা) তাঁকে বলেছিলেন: হে মুহাম্মদ, আপনার প্রভুর জন্য ও নিজের জন্য যা খুশি চান, অতঃপর তিনি (সা) আমাদেরকে আমাদের পুরষ্কার সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি (সা) বলেছিলেন: আমি আমার রবের জন্য এটা চাচ্ছি যে, তোমরা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, এবং আমি নিজের জন্য ও আমার সাথীদের জন্য এটা চাচ্ছি যে, তোমরা আমাদেরকে তোমাদের অন্তর্ভূক্ত করে নেবে, আমাদেরকে সহায়তা করবে এবং আমাদেরকে নিরাপত্তা দেবে, যেরকমভাবে তোমরা নিজেদেরকে রক্ষা করে থাক। এর উত্তরে তারা বলেছিল: এর বিনিময়ে আমরা কি পাবো? তিনি (সা) বলেছিলেন: জান্নাত। তারা বলেছিল: আপনি যা চেয়েছেন আমরা তা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।”
এবং সহীহ্ সনদের মাধ্যমে ক্বাব বিন মালিক হতে আহ্মদ কর্তৃক বর্ণিত হাদিসটিও এর প্রমাণ, হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “তোমরা প্রতিশ্রুতি দাও যে, তোমরা যেভাবে তোমাদের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দাও সেভাবে আমাকে নিরাপত্তা দেবে, অতঃপর আল-বারা বিন মারুর তাঁর (সা) হাত ধরলেন এবং বললেন: আপনাকে যিনি সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তাঁর নামে শপথ করে বলছি, যেভাবে আমরা আমাদের লোকদের নিরাপত্তা দেই সেভাবে আপনাকে নিরাপত্তা দেবো এবং হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), আমরা যোদ্ধা জাতি এবং সাহসী চরিত্রের অধিকারী যা আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের নিকট হতে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।” এবং যাবের হতে আহমদ কর্তৃক একটি সহীহ্ বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আকাবার বাই’আতে বলেছেন: “...যখন আমি তোমাদের কাছে আসব তখন তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে, তোমাদের স্ত্রীদেরকে ও তোমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা দাও সেভাবে আমাকে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রদান করবে।
এবং শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সনদসহ আল-বাইহাকি কর্তৃক সংকলিত দালাইল আল-নাবুওয়াতে উল্লেখ আছে যে, উবাদাহ্ বিন সামিত বলেছেন: “আমরা আমাদের নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে ও সন্তানদেরকে যেসব থেকে নিরাপত্তা দেই, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কেও সেসব থেকে নিরাপত্তা দেবো এবং এর বিনিময়ে আমরা জান্নাত লাভ করবো।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমন কোন স্থানে হিজরত করতে রাজি হননি যেটার নিরাপত্তা, ক্ষমতা এবং সুরক্ষার সক্ষমতা ছিল না। আলী (রা.) হতে হাসান সনদ সহকারে আল-বাইহাকি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু শায়বান বিন থালাবাহ্ গোত্রকে বলেছিলেন: “তোমরা মন্দভাবে জবাব দাওনি কারণ তোমরা সত্য কথা বলেছ, কিন্তু আল্লাহ্’র দ্বীনকে যারা সকল দিক দিয়ে সুরক্ষা দিতে পারে তারা ব্যতিত অন্য কেউ একে নুসরাহ্ দিতে পারে না।” যখন তারা পারস্য ব্যতিত সমস্ত আরবদের থেকে নুসরাহ্ (নিরাপত্তা, সুরক্ষা) দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) একথা বলেছিলেন। দ্বিতীয়ত: যেখানে ইসলামের আইন-কানুন বাস্তবায়ন করা হয়। বুখারীতে উবাদাহ্ বিন সামিতের বর্ণনা হতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, এতে তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে ডেকেছিলেন এবং আমরা তাঁকে (সাঃ) আনুগত্যের শপথ প্রদান করেছিলাম। যেসব বিধি-বিধান তিনি আমাদের জন্য আবশ্যক করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: আমাদের আনন্দে ও বেদনায়, কষ্টে ও সমৃদ্ধিতে শোনা ও মান্য করা (আমিরের নির্দেশ), এমনকি কাউকে যদি আমাদের চেয়ে পছন্দে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং আইনসঙ্গতভাবে কোন ব্যক্তিকে ক্ষমতা প্রদান করা হয় তবে কোনরূপ বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না, এর ব্যত্যয় হতে পারে শুধুমাত্র যদি তোমরা পরিষ্কার কুফর দেখতে পাও, যা আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে আগত বিধান দ্বারা প্রমাণিত।” এবং আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে শোনা ও মান্য করার বিষয়টি তাঁর (সা) আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে আইনকানুনসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। আহ্মদ-এর বর্ণনা এর আরেকটি প্রমাণ, ইবনে হিব্বান তার সহীহ্ সংগ্রহে ও আবু উবায়েদ আল-আমওয়ালে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমরু কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “হিজরত দুই ধরনের – কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাসকারীর হিজরত ও যাযাবরের হিজরত, যাযাবরের ক্ষেত্রে তাকে আদেশ দেয়া হলে মান্য করে এবং ডাকে সাড়া দেয়, কিন্তু কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাকে অধিকতর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং পুরষ্কারের পরিমাণও অধিক হয়ে থাকে।” রাসূল (সা)-এর বক্তব্য থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গী পরিষ্কার: “আদেশ করা হলে সে মান্য করে এবং ডাকলে সাড়া দেয়”; যেহেতু মরুভুমি ইসলামের আবাসস্থলের (দার আল-ইসলাম) অন্তর্ভূক্ত ছিল, যদিওবা এটা হিজরতের (দার আল-হিজরাহ্) স্থান ছিল না। এবং একইভাবে আল-তাবারানিতে ওয়াছিলাহ্ বিন আল-আসকার বর্ণনা থেকেও এর স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশ্বস্ত মানুষদের একটি সনদ থেকে আল-হাইথামি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বলেছেন: “এবং যাযাবরের হিজরত হচ্ছে যাযাবর জীবনেই প্রত্যাবর্তন এবং তোমার আনন্দে ও বেদনাতে এবং তোমার কষ্টে ও সমৃদ্ধিতে শোনা ও মান্য করা, এমনকি তোমার উপরে অন্য কাউকে যদি অধিক পছন্দনীয় করা হয়...” এবং আনাস থেকে সহীহ্ সনদ সহকারে আহ্মদের বর্ণনা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়: আমি কিছু তরুণকে অনুসরণ করেছিলাম যারা বলছিল যে মুহাম্মাদ (সা) এসেছেন, সুতরাং আমি তাদেরকে অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু কিছুই দেখতে পাইনি। তখন তারা আবার বলেছিল যে, মুহাম্মদ (সা) এসেছেন, সুতরাং আমি আবার তাদেরকে অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু কিছুই দেখতে পাইনি। তিনি বলেছিলেন: যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর সাথী আবু বকর এসেছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মদীনাবাসীর ব্যাকুলতা ও উত্তেজনার অংশ ছিলাম। তখন তাঁরা মদীনাবাসীর পক্ষ থেকে একজনকে পাঠিয়েছিল যাতে করে আনসারদের কাছে তাঁদের আগমনের খবর পৌঁছাতে পারে এবং যখন তাঁরা পৌঁছেছিলেন তখন প্রায় ৫০০ আনসারের একটি দল তাঁদেরকে স্বাগত জানিয়েছিল। আনসাররা বলেছিল: নিরাপত্তার মধ্যে ক্ষমতা সহকারে অগ্রসর হোন। এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাথী তাদের মধ্য হতে বেরিয়ে আসলেন। এবং মদীনাবাসীরাও বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, এমনকি মহিলারাও তাদের বাড়িঘর থেকে বলছিল যে, তাঁদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোন ব্যক্তি, তাঁদের মধ্যে তিনি (সা) কোন ব্যক্তি?” এই বর্ণনার মধ্যে নিরাপত্তা ও আইনের বাস্তবায়ন – উভয়টির জন্যই প্রমাণ রয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ৫০০ আনসারের উপস্থিতি থেকে ও তাদের ‘নিরাপত্তায় প্রবেশ করুন’ – আহ্বানটি থেকে এ বিষয়টি প্রমাণিত এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের বক্তব্যকে সুনিশ্চিত করেছেন। একইভাবে তাদের দুজনকে যে আনুগত্য করা হবে সেই বক্তব্যও তিনি (সা) নিশ্চিত করেছেন। ফলশ্রুতিতে নিরাপত্তা এবং আনুগত্য হিজরতের স্থানে (দার আল-হিজরাহ্) নিশ্চিতভাবে পূর্ণ করা হয়েছিল এবং যদি এগুলো পূরণ করা না হতো তবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হিজরত করতেন না।
আকাবার শপথে আনসাররা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আনুগত্য প্রদান – এই শর্ত দু’টি পূরণের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। আল বাইহাকি উবাদাহ্ বিন সামিত হতে শক্তিশালী সনদ সহকারে বর্ণনা করেন যে, “…আমরা যেসব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্কে (সা) আনুগত্যের শপথ প্রদান করেছিলাম সেগুলো হচ্ছে: আমাদের ব্যস্ততায় ও আলস্যে, কষ্টকর সময়ে ও আরামদায়ক অবস্থায় শোনা ও মান্য করা, সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধে, নিন্দুকদের নিন্দায় ভীত না হয়ে আল্লাহ্’র ক্ষেত্রে সত্যকথন এবং যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াসরিবে আসবেন তখন আমরা নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে এবং আমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা দিয়ে থাকি সেভাবে তাঁকে (সা) নিরাপত্তা দেবো এবং এসব কিছুর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করব। এই আনুগত্যের শপথই আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দিয়েছিলাম”। এবং নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল মুসলিমদের জন্য, যা তার কথা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়: “যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াসরিবে আসবেন তখনই আমরা যেভাবে নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে ও আমাদের সন্তানদেরকে রক্ষা করি সেভাবে তাঁকে রক্ষা করব ও বিনিময়ে জান্নাত পাবো।”
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কর্তৃক লিপিবদ্ধ চুক্তিপত্র থেকেও এর অর্থ পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা যায়, যাতে তিনি (সাঃ) ইহুদীদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সকলের মধ্যে শান্তি স্থাপন করেন। এটা হিজরতের প্রথম বর্ষে ঘটেছিল, ইবনে ইস্হাকের বর্ণনা থেকে এটা পাওয়া যায় এবং এটাকে ‘সাহিফা’ নামে ডাকা হয়। চুক্তিপত্রটি ছিল নিম্নরূপ: “পরম করুনাময় ও দয়ালু আল্লাহ্’র নামে। এটা হচ্ছে নবী মুহাম্মাদ (সা)-এর পক্ষ থেকে লিপিবদ্ধ দলিল। কুরাইশ ও ইয়াসরিবের মু’মিন ও মুসলিম এবং যারা তাদের অধীনে তাদের সাথে শামিল হবে বা তাদের সাথে মিলেমিশে কাজ করবে তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত এবং অন্যদের মোকাবিলায় তারা এক উম্মত হিসেবে গণ্য হবে…। বহিরাগত ব্যতিত সকল বিশ্ববাসীরা একে অপরকে রক্ষা করবে… ইহুদীদের উপর তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বর্তাবে এবং মুসলিমদের উপর তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বর্তাবে। যে কেউ এই চুক্তিনামা গ্রহণকারী কোন পক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে তার বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য করবে… এই চুক্তিনামা গ্রহণকারী পক্ষসমূহের মধ্যে যদি এমন কোন নতুন সমস্যা বা বিরোধের উদ্ভব হয় যা থেকে দাঙ্গা বেধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে তা আল্লাহ্ তা’আলা এবং আল্লাহ্’র রাসূল মুহাম্মাদ (সা)-এর নিকট মীমাংসার্থে উত্থাপিত করতে হবে।”
এর ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, কোন স্থান দার আল-ইসলাম হিসেবে গণ্য হবেনা, যদি না নিরাপত্তার দায়িত্ব মুসলিমদের অধীনে থাকে এবং ইসলামের আইনকানুন বাস্তবায়িত হয় – এই শর্তদুটি পূরণ করা যায়। এবং যদি এ দুটি শর্তের মধ্যে কোন একটি অকার্যকর হয়ে যায়, অথবা পূরণ করা না হয়, যেমন: অবিশ্বাসীদের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় বা আল-তাগুতের আইন জনগণের উপর বাস্তবায়িত হয় তবে সেই স্থানটি বহুদেববাদ (দার আল-শিরক) বা অবিশ্বাসের আবাসস্থল (দার আল-কুফর) হিসেবে পরিগণিত হবে। ইসলামের আবাসস্থল শিরকের বা কুফরের আবাসস্থলে রূপান্তর হওয়ার জন্য দু’টি শর্তের অনুপস্থিতি জরুরী নয় বরং যে কোন একটি শর্তের অনুপস্থিতিই এই রূপান্তরের জন্য যথেষ্ঠ। কোন স্থান অবিশ্বাসের আবাসস্থল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানকার সকল অধিবাসীরা অবিশ্বাসী এবং যেকোন স্থান ইসলামের আবাসস্থল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানকার সকল অধিবাসী মুসলিম হবে। বরং আবাসস্থল (দার) শব্দটির অর্থ শারী’আহ্’র পরিভাষাকে (প্রকৃত শর’ঈ অর্থ) নির্দেশ করে, ভিন্ন অর্থে: শর’ঈ বাস্তবতা থেকে যেভাবে প্রার্থনা ও উপবাসকে শারী’আহ্’র পরিভাষায় সালাত ও সাওম নামে অভিহিত করা হয় সেভাবে এই শব্দটির অর্থও শারী’আহ্ প্রদান করে থাকে।
এর ভিত্তিতে উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, এই শব্দটি সে স্থানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে যেখানকার বেশিরভাগ অধিবাসী খৃষ্টান, কিন্তু যদি স্থানটি ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হয় তাহলে সেটা ইসলামের আবাসস্থল (দার আল-ইসলাম) হিসেবে গণ্য হবে। কারণ সেখানে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেটি ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সেটার নিরাপত্তার দায়িত্বও ইসলামের অধীনে নিশ্চিত করা হয়।
এবং একইভাবে, যদি কোন একটি অঞ্চলের বেশিরভাগ অধিবাসী মুসলিম হয়, কিন্তু সেটা এমন কোন রাষ্ট্রের অধীনে থাকে যেটা ইসলাম দ্বারা শাসন করে না, কিংবা মুসলিম সামরিক বাহিনী সেটার সুরক্ষা প্রদান করে না, বরং অবিশ্বাসীরা সেই অঞ্চলের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে তবে অবিশ্বাসের আবাসস্থল (দার আল-কুফর) শব্দটি এ অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যদিওবা এর অধিকাংশ অধিবাসী মুসলিম হয়ে থাকে।
সুতরাং এখানে আবাসস্থল (দার) শব্দটি শর’ঈ বাস্তবতাকে (আইনগত অর্থ) নির্দেশ করে এবং এক্ষেত্রে কোথায় মুসলিমের সংখ্যা বেশি বা কোথায় কম সেটা বিচার্য বিষয় নয়, বরং সেখানকার অধিবাসীদের উপর বাস্তবায়িত আইন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বই মুখ্য বিষয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে আবাসস্থল শব্দটির অর্থ আইনগত (শর’ঈ) উৎস হতে নেয়া হয়েছে যা এর অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করে। যেরকমভাবে সালাহ্ শব্দটির অর্থ আইনগত উৎস হতে নেয়া হয়েছে যা এর অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করে এবং একইভাবে এসকল শব্দের শর’ঈগত প্রকৃত অর্থও শর’ঈ উৎস হতে গ্রহণ করা হয় না।
ইসলামি জ্ঞান ও চিন্তার প্রক্রিয়া

কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিছক ইসলামি জ্ঞান নাকি সঠিক চিন্তার প্রক্রিয়া? নাকি এ দু’টো পরিপূরক? জ্ঞান মানে হল প্রয়োজনের নিরীখে যা জানি না তা জানা এবং যা চিনি না তা চেনা। জ্ঞান অর্জন করলে মানুষ অজ্ঞানতা বা মূর্খতা থেকে বের হয়ে আসে। ইসলামে জ্ঞান অর্জন করার বিষয়টিকে ফরজ করা হয়েছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘পড়, তোমার প্রভূর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন……তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না….।’
(সূরা আলাক)রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।’
তবে চিন্তার সঠিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে কেবলমাত্র নিছক জ্ঞান ব্যক্তি বা জাতির পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করতে পারে না। যদি ইসলামের ভিত্তিতে মুসলিম জাতির পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করতে হয় তাহলে এর সন্তানদেরকে সঠিক চিন্তার প্রক্রিয়াও শিক্ষা দিতে হবে। যদিও এই চিন্তার প্রক্রিয়া এক ধরনের বিশেষ জ্ঞান।
ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীনদের পর আসে উমাইয়াদের শাসন এবং তারপর আসে আব্বাসিয় শাসন। আব্বাসিয় শাসনামলে গ্রীক চিন্তা প্রক্রিয়া (logical way of thinking) দ্বারা মুসলিম আলেমগন প্রভাবিত হন এবং ক্বাদা এর মত আক্বীদার বিষয় থেকে শুরু করে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়সমূহ যুক্তি দ্বারা ব্যখ্যা করার চেষ্টা করেন। আলেমগণ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যান। মুতাজিলা, জাবারিয়্যাহ এবং আহলুস সুন্নাহদের উদ্ভব হয়। অথচ ক্বাদা এর মত গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদার বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপলদ্ধি করা উচিত ছিল। তদ্রুপ আক্বীদার অন্যান্য মৌলিক বিষয় যেমন: আল্লাহ’র অস্তিত্বে বিশ্বাস, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র নবী এবং কুরআন আল্লাহ’র পক্ষ থেকে এসেছে-এগুলো বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই (rational way of thinking) বুঝতে হবে। তবেই সঠিকভাবে আক্বীদা উপলদ্ধি করা যাবে। কিন্তু এখানে অন্য কোন চিন্তা প্রক্রিয়া, যেমন যৌক্তিক (logical way of thinking) বা বৈজ্ঞানিক (scientific way of thinking) প্রক্রিয়া কাজ করবে না। যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়ার স্ব-স্ব ক্ষেত্র রয়েছে। সেগুলোকে সেখানেই ব্যবহার করতে হবে। অন্যত্র ব্যবহার করলে একজন মুসলিম ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে। যদিও এখনও অনেক আলেম এবং ইসলামি দলসমূহ যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত এবং ইসলামকে সেভাবে ব্যাখ্যা করা বা উপলদ্ধি করার চেষ্টা করেন। জীবনে প্রয়োগের জন্য ইসলামের হুকুমসমূহ বুঝা বা বের করে নিয়ে আসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনী প্রক্রিয়া (legislative process) রয়েছে। যেখানে যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়ার কোন স্থান নেই। হয়ত আলোচিত বিষয়ের মানাত বা বাস্তবতা বুঝতে গিয়ে বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। আবার এটাও বুঝতে হবে আইন বা হুকুম জানার বা প্রণয়ন করার জন্য তিনটি ব্যবস্থাতে (পুজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং ইসলাম) তিনটি ভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। পুঁজিবাদে আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল বাস্তবতা। কিন্তু ইসলামে কখনওই বাস্তবতা থেকে হুকুম আসে না। কিন্তু পশ্চিমা ধ্যান ধারণার অনুপ্রবেশ ও অজ্ঞানতার দরুণ কোন কোন মুসলিম আলেম বাস্তবতাকে ইসলামি হুকুমের উৎস হিসেবে এখন গ্রহণ করছেন। ইজতিহাদি প্রক্রিয়া শতকের পর শতক বন্ধ থাকার কারণে আলেমগণের জন্য মানবজীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলাম প্রয়োগ করার কথা চিন্তা করা দূরুহ হয়ে পড়ছে যদিও ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে এসেছে এবং এটি কিয়ামতের আগ পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বর্তমানে ইসলামি বিদ্যাপীঠসমূহ থেকে সাধারণভাবে জ্ঞান আহরণ করা হয় নেহায়েত আলেম বা ফকীহ হওয়ার জন্য। অর্থাৎ এখানে Academic Approach দেখা যায়। জ্ঞান অর্জন করে আলেম বা ফকীহ হওয়া দোষণীয় নয় যদি না তা হয়ে থাকে জীবনে প্রয়োগের জন্য। জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে গ্রীক ও ইসলামি চিন্তা প্রক্রিয়ায় পার্থক্য রয়েছে। ইসলামি জ্ঞান আহরণের লক্ষ্যই হল জীবনে প্রয়োগ করা। এটি কোন প্রয়োগশূন্য পুথিগত বিদ্যা নয়। আজকের পৃথিবীতে রয়েছে শত শত ইসলামি বিদ্যাপীঠ। যেগুলো থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত স্নাতক বের হচ্ছে। কিন্তু এই শত শত বিদ্যাপীঠ এবং লক্ষ লক্ষ স্নাতক সমাজ এবং রাষ্ট্রে যে ধরনের ইসলামি প্রভাব তৈরি করার কথা ছিল তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর একটাই কারণ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে Academic Approach এর উপস্থিতি। প্রতি বছর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্ধ, আরবের মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় মাপের পুথিগত ইসলামি পন্ডিত বা আলেম বের হয়ে আসছেন। কিন্ত সঠিক চিন্তার পদ্ধতি তাদের মধ্যে না থাকার কারণে সালফে সালেহীন বা পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের মত মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রে এসব আলেম নবীগনের উত্তরসূরীর (ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া) হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। বরং কেউ কেউ ইসলাম ও মুসলিমদের দুশমন কুফরদের কাজকে সচেতনভাবে অথবা অবচেতনভাবে সমর্থন করছেন। তাদের কেউ কেউ মুসলিম বিশ্বের জালিম ও উপনিবেশবাদীদের তাবেদার শাসকদের গর্হিত কাজগুলোকে ইসলাম দ্বারা জায়েয করে ফতওয়া দিচ্ছেন। যেমন: মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য বিন বাজ (প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি) সৌদি আরবের পবিত্র ভূমিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি এবং মুসলিম উম্মাহ’র হৃদয়ের মধ্যে বিষফোড়ার মত বসে থাকা ইসরাইলের প্রতি সৌদি শাসকদের নগ্ন সমর্থনকে বৈধতা দিয়েছে। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী মিশরের এক সময়ের গ্রান্ড মুফতি তানতাওয়ির মৃত্যুতে তার প্রশংসা করে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান দুশমন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট শোক বার্তা পাঠিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ আবার নিজেদের সালাফি (পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনুসারী) বলে পরিচয় দেন। অথচ পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনেকে (ইমাম আবু হানিফা রহ:, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ:, ইমাম তাইমিয়্যাহ রহ:) কোন একটি ইস্যুতে হক্বের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে তৎকালীণ শাসকদের দ্বারা কারাবরণ করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শাসকদের অন্যায় আনুকূল্য নিতে চাননি। তবে আশার কথা হচ্ছে সব আলেম নিজেদের ভুল চিন্তা পদ্ধতির কাছে বিকিয়ে দেননি। কেউ কেউ নিকট অতীতে সত্যিকার অর্থেই পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনুসরণ করে ওয়ারাসাতুল আম্বিয়ার মত জুলুম ও জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা বা ইস্তিকামাত দেখিয়েছেন, তাদের জ্ঞানকে যথাযথভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগ করেছেন। যেমন: ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও তুরষ্কের খিলাফতের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় শায়খুল ইসলাম মাওলানা মাহমুদুল হাসান কারাবরণ করেছিলেন, মিশরে সাইয়্যেদ কুতুব রহ: ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জালিম শাসক কতৃক শাহাদাত বরণ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শায়খ তাকিউদ্দীন আন নাবাহানি রহ: খিলাফতের পক্ষে এবং উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার কারণে তাবেদার মুসলিম শাসকদের দ্বারা চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিরোধিতাকারী মক্কার কাফের শাসকশ্রেণী জানত যে, তিনি (সা) একজন সত্য নবী। কিন্তু ভুল চিন্তার পদ্ধতি (pragmatism or superiority complex) বা দৃষ্টিভঙ্গি (Mindset) তাদের হিদায়াতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মদীনার ইহুদী আলেমদের কাছে পূর্ববর্তী নবীদের উপর নাযিলকৃত কিতাবের জ্ঞান ছিল- যেগুলো মুহাম্মদ (সা) এর নবুয়্যতকে সত্যায়িত করে। কিন্তু ভুল চিন্তা পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি (Mindset) এর কারণে এই জ্ঞান তাদের কোন কাজে আসেনি। অপরদিকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতির কারণে আবু বকর (রা) মেরাজের ঘটনা শোনামাত্র এতে বিশ্বাস স্থাপন করে সিদ্দিক উপাধি লাভ করেন।
সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম উম্মাহকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতিসহ ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তবেই এটি ফলদায়ক হবে। তবেই জ্ঞান অর্জন মুসলিম উম্মাহ’র জন্য দুনিয়া এবং আখেরাতে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“হাশরের ময়দানে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কেউ এক পা ও এগোতে পারবে না…….যা জেনেছ সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ? (৫টির মধ্যে একটি প্রশ্ন)…….’’ ।
অন্যথায় এ জ্ঞান দুনিয়া এবং আখেরাতে মুসলিমদের জন্য দায় হিসেবে দেখা দিবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতিসহ ইসলামি জ্ঞান অর্জন করার তৌফিক দান করুক। আমীন।
রাফীম আহমেদ
চিন্তা ও জাতিসমূহের অগ্রাধিকার

আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিন্ত বাস্তবে আমরা এরূপ বলতে শুনি না। বরং একটি জাতির প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, তার দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ইত্যদিকে উন্নয়নের নিয়ামক মনে করা হয়। আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া একটি জাতিকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন করে, সঠিক পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করে এবং সঠিক ও টেকসই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি জাতির আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল। আবার আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া না থাকলে প্রচুর প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদ থাকলেও সে জাতি পৃথিবীর সর্বাধিক অধপতিত অবস্থায় উপনীত হতে পারে।
উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া বা আদর্শিক আদর্শিক চিন্তা সব জাতির মধ্যে না থাকলেও মূলত: চিন্তাই একজন ব্যক্তির মত জাতিরও কর্মকান্ডের পরিচায়ক অথবা জাতির কর্মকান্ডে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। বিভিন্ন জাতিসমূহের দিকে অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখলে আমরা এ বিষয়টি খুব সহজে বুঝতে পারব। যেমন: চীনাদের আত্মরক্ষামূলক মানসিকতাই তাদের চারপাশে মহাপ্রাচীর তৈরি করতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল। যদিও এরকম বলা হয়ে থাকে, যে খরচ, আয়োজন ও সময় নিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে তার চেয়ে কম প্রচেষ্টায় তারা শত্রুকে পরাজিত এবং চীনের আশেপাশের দেশসমূহ দখল করে রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা সুসংহত করতে পারত। অপরদিকে এই চিন্তার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার কোটি কোটি মানুষকে অভূক্ত রেখে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার ও মহাকাশ গবেষণায় বিলিয়ন বিলিয়ন রুবল খরচ করেছে। পাকভারত উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল যখন একে একে বৃটিশদের উপনিবেশে পরিণত হচ্ছে তখন মোঘল সম্রাট শাহজাহান তখন তাজমহল ণির্মানে ব্যস্ত। একধরনের অনাদর্শিক অবনতিশীল চিন্তার কারণে বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের শাসকগণ কোটি কোটি মুসলিম আবাল বৃদ্ধ বণিতাকে অভূক্ত রেখে কেউ বা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সুইস ব্যাংকে পাচার করছে, আবার কেউ সুরম্য অট্টালিকা, শপিং মল, নাইটক্লাব, ক্যাসিনো, ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার হোটেল নির্মাণ করে সেবা খাতের বিকাশ ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের মত একটি দেশে এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিং মল কিংবা ক্রিকেট খেলার পেছনে শত শত কোটি টাকা অথবা ঢাকার রাস্তার সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে যখন এদেশের অধিকাংশ মানুষ দু’বেলা পেট পুড়ে খেতে পায় না, যখন শতকরা ৪৭ ভাগ শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে টারজান বা কলম্বাস ভিসায় সোনার বাংলা ছেড়ে অবৈধভাবে পাড়ি জমাতে গিয়ে মরুভূমি বা সমুদ্রে ভাসমান দিনের পর দিন, যখন ইউরোপমুখী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশীরা সর্বাধিক।
খোলাফায়ে রাশেদীনদের মধ্যে আমরা আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া লক্ষ্য করি এবং সে কারণে তারা দ্বিধাহীনভাবে আদর্শিক অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন। যখন উমর (রা) কে বলা হল, কাবা শরীফের গিলাফগুলোকে নবায়ন করতে হবে; তখন তিনি বললেন, এর চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম শিশুদের উদরসমূহ পূর্ণ করা। যখন উম্মাহ’র শাসক, আলেমগণ ও জনগন আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হল তখন এর পতন ত্বরান্বিত হল। আরবী ভাষা নয় নিজ নিজ মাতৃভাষায় ইসলাম বুঝতে যাওয়া, ইজতিহাদ বন্ধ করা, জিহাদ বন্ধ করা ইত্যাদি কর্মকান্ডই আদর্শিক চিন্তা থেকে বিচ্যুতির পরিচায়ক। সেকারণে উম্মাহ’র সন্তানদের আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়ায় সমৃদ্ধ হতে হবে।
রাফীম আহমেদ
মুসলিম উম্মাহ’র উপর পশ্চিমা উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরূপ প্রভাব

কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়া কী?
কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়া বুঝতে হলে আমাদেরকে চিন্তা কাকে বলে তা আগে বুঝতে হবে। মস্তিষ্কে সংরক্ষিত পূর্ব ধারণার ভিত্তিতে মানুষের ইন্দ্রিয়ের (নাক, কান,ত্বক, জিহ্বা, চোখ) মাধ্যমে কোন বাস্তবতা সর্ম্পকে গৃহীত তথ্যাদি যাচাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াই হল চিন্তা। অর্থাৎ চিন্তার জন্য চারটি অপরিহার্য উপাদান আবশ্যক: বাস্তবতা, পঞ্চইন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক ও পূর্বধারণা (Previous Information)। কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়ায় আমরা যা শিখি তা মূলত পূর্বধারণা (Previous Information) হিসেবে মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকে এবং তা পরবর্তীতে নতুন কোন বাস্তবতা সর্ম্পকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগে। ইসলামে তাফসীর, হাদীসশাস্ত্র, ফিকহ ইত্যাদি এর কালচার। এছাড়া পুনর্জাগরণের জন্য নির্দিষ্ট কালচার তথা হালাকাহ, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব প্রভৃতি এর অপরিহার্য অংশ। গান, নাচ, নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য ইত্যাদি পুজিবাদী কালচারের উপকরণ।
১. পশ্চিমা উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ারসমূহ:
১.১. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ: পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ সবই এর আক্বীদা ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে উঠা মানুষের সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ বহিপ্রকাশ। সেকারণে এ বিভাগসমূহের অধীন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের প্রকাশ ঘটায় ও প্রচার করে।
১.২. শিক্ষাব্যবস্থা: পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়ার পর এর স্থায়ীত্ব সুনিশ্চিত ও ইসলামের পূণরুত্থানের পথকে রুদ্ধ করতে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে উম্মাহকে কালচার করার জন্য ইসলামবিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করে। শায়খ তাকিউদ্দিন আন নাবাহানি (র) তাকাত্তুল আল হিযবী বইয়ে উল্লেখ করেন যে,(উপনিবেশবাদীরা বস্তু থেকে স্পিরিটকে পৃথক করা বা রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার জীবন সর্ম্পকিত দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর দৃঢ় দর্শনের উপর ভিত্তি করে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করে। উপনিবেশবাদীরা তাদের ব্যক্তিত্বগুলোকে আমাদের কালচারিং একমাত্র ভিত্তি করে। তারা তাদের হাদারাহ, ধারণা, ব্যক্তি, ইতিহাস ও লাইফস্টাইলকে চিন্তার প্রাথমিক উৎসে পরিণত করে। এটা যেন যথেষ্ট ছিল না, উপনিবেশবাদীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের ব্যক্তিত্বসমূহকে পরিবর্তিত করে আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা সচেতনভাবে উপনিবেশবাদের প্রকৃত চেহারা গোপন করে কিছু দিক ও ধারণা পছন্দ করে ও গুরুত্বারোপ করে। তারা পাঠ্যক্রমের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করে যাতে করে এগুলো সাধারণ লক্ষ্য থেকে সামান্যতম বিচ্যুত না হয়। একারণে মুসলিমগণ ভুল চিন্তুা দ্বারা বিকশিত হচ্ছে যেখানে আমাদেরকে চিন্তার প্রক্রিয়া শেখানো হয় না, বরং শেখানো হয় কীভাবে অন্যরা চিন্তা করে। এর কারণ হল আমাদের পরিবেশ, ব্যক্তিত্ব, ইতিহাস থেকে চিন্তাকে আলাদা করা হয়েছে এবং এগুলো আমাদের আদর্শ থেকে উৎসারিত নয়। সেকারণে আমরা এমন ব্যক্তিতে পরিণত হলাম যারা জনবিচ্ছিন্ন এবং পরিস্থিতি সর্ম্পকে অসচেতন।) এর প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায় উপমহাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত ম্যাকলে কমিশন রিপোর্টের শেষের দিকে এই ইংরেজ শিক্ষাবিদ উল্লেখ করে যে, ‘এ কমিশন বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের লোকেরা গায়ের রঙের দিক থেকে হবে ভারতীয় কিন্তু চিন্তাচেতনায় হবে বৃটিশ।’
১.৩. রাজনৈতিক দলসমূহ: উপনিবেশবাদীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মুসলিম ভূমিসমূহতে পশ্চিমা চিন্তাধারার ধারক ও বাহক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর নেতৃবৃন্দ দোসর (এজেন্ট) হিসেবে তাদের স্বার্থের অনুকূলে এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এসব দলগুলো জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র প্রভৃতি চিন্তার দিকে উম্মাহকে ক্রমাগত আহ্বান করছে। দৃষ্টান্ত হিসেব বলা যায় ১৮৮৫ সালে বৃটিশ শিক্ষাবিদ অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ কংগ্রেস পার্টি প্রতিষ্ঠা করে। ওসমানীয় খিলাফতকে ধ্বংস করার জন্য আরব ও তুর্কীদের জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে উপনিবেশবাদীরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুবসংঘ, পাঠাগার, বিজ্ঞান ক্লাব প্রভৃতির মাধ্যমে উম্মাহকে কালচার করেছে। দূর্ভাগ্যবশত এসব ভুল চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলসমূহ এখনও সব মুসলিম ভূমিতে উপনিবেশবাদীদের মদদে কাজ করে চলেছে।
১.৪. বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ: পুঁজিবাদে রাজনীতি অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেকারণে কাঁচামাল সংগ্রহ, জ্বালানীর অবিরত সরবরাহ, সস্তা শ্রম ও বাজারের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপনিবেশ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একারণে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিজ্ঞাপন, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপোনসিবিলিটি (CSR) ইত্যাদির নামে উম্মাহ’র বিশেষত যুবসমাজের ইসলামি চেতনাকে ধ্বংস করে পশ্চিমা চিন্তা (যেমন: জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, ভোগ) ও লাইফস্টাইলকে (যেমন: ফ্রি মিক্সিং) বিস্তৃত করছে।
১.৫. মিডিয়া: প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ও প্রভাব তৈরি করার সক্ষমতার কারণে আমাদের জীবনে ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অনস্বীকার্য। এসব মিডিয়া ব্যবহার করে উপনিবেশবাদী, দালাল শাসক, উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মীরা সেক্স ও ভায়োলেন্সনির্ভর চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপন, টক শো, শিক্ষা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে উম্মাহর মধ্যে পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তা ও জীবনাচরণের বিস্তার করে চলেছে। অগভীর চিন্তার অধিকারী হওয়ায় অনুুকরণপ্রিয় উম্মাহ এসব দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
২. পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কুপ্রভাব:
একটি আদর্শিক জাতি সাধারণত অন্য কোন জাতির উপর শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের পর কালচারিং এর মাধ্যমে সে আদর্শের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব জনগনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। আর তা না করলে শাসনব্যবস্থা অপসারিত হওয়ার পর সে জাতি পূর্বাবস্থায় ফেরত যায়। এমনটি ঘটেছিল আন্দালুসিয়া ও বলকান অঞ্চলে ইসলামি শাসনব্যবস্থা অবসানের পর। পুঁজিবাদী পশ্চিমারা মুসলিম ভূমিসমূহ দখলের পর তাদের ঘৃণ্য শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের পর এর স্থায়ীত্ব সুনিশ্চিত করতে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে কালচারিং করে আসছে ও পুঁজিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে জনগনের চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্বধারণা করার অপচেষ্টা এখন অবধি অব্যাহত রেখেছে।
২.১. ইসলামি আক্বীদার বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা:
আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, কিয়ামত দিবস, ভাগ্যের ভাল মন্দ, আখিরাত এই সাতটি মৌলিক বিষয়ের উপর বিশ্বাসকে আক্বীদা বলা হয়। পশ্চিমারা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে বিশেষ করে পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে এসব মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। ডারউইনিজম বা বিবর্তনবাদের মাধ্যমে স্রষ্টার ধারণা সর্ম্পকে অবিশ্বাস বা সন্দেহ সৃষ্টি করা, রিয্ক বা আজলের সাথে মানুষের কাজকে সর্ম্পকিত করে এর সঠিক ধারণা থেকে উম্মাহকে সরিয়ে নিয়ে আসার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। স্রষ্টার ধারণার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস বা সন্দেহ সৃষ্টিতে খুব বেশী সফল না হলেও ক্বাদার ভাল মন্দের বিষয়ে উম্মাহ আজ দারুণভাবে বিভ্রান্ত।
২.২ জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব:
‘আমি জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্য’। (আল কোরআন)
এ আয়াতের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানুষকে প্রেরণের উদ্দেশ্য সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যায়। সেকারণে মানুষের জীবনের সব কাজ এ উদ্দেশ্যকে ঘিরেই আবর্তিত হওয়া উচিত। কিন্তু পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে পৃথিবীতে প্রেরণের উদ্দেশ্য মুসলিম উম্মাহকে আজ সার্বক্ষণিকভাবে তাড়িত করে না। চিরস্থায়ী আখেরাতের সাফল্য নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাফল্যই আজ তার কাছে মুখ্য।
২.৩. চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি গ্রহণ করা:
চিন্তার তিনটি পদ্ধতি রয়েছে: বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational), যৌক্তিক (Logical), বৈজ্ঞানিক (Scientific)। আব্বাসীয় খিলাফতের সময়ে আলেমগণের ইসলামি চিন্তার প্রক্রিয়ায় গ্রীকদের যৌক্তিক চিন্তাপদ্ধতির অনুপ্রবেশ ঘটে-যা এখন অবধি বলবৎ রয়েছে। আর ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে প্রথমে মিশনারীদের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে মুসলিম ভূমিসমূহ দখল উত্তর শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপকরণের মাধ্যমে পশ্চিমারা মুসলিমদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তার পদ্ধতিকে বিকশিত করেছে। আমাদের জীবনে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তার জন্য স্ব স্ব ক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও ইসলামিক আক্বীদা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational) চিন্তা পদ্ধতিকে মুসলিমদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। ইসলামিক আক্বীদা ও শরী’আহ অনুধাবনে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তা পদ্ধতি অকার্যকর এবং অপ্রয়োজনীয়ও বটে। কিন্তু সাধারণ মুসলিম থেকে শুরু করে অনেক আলেমগণ ইসলামকে বুঝার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তা পদ্ধতি গ্রহণ করছে। বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করার মাধ্যমে পশ্চিমারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বই জাহির করতে চায়। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে মুসলিম উম্মাহ আজকে এ সত্যটুকু বুঝতে অক্ষম হচ্ছে।
২.৪. চিন্তার গুনগত মানের অবনমন:
গুনগত মানের বিচারে চিন্তা তিনধরনের: অগভীর (Shallow), গভীর (Deep), আলোকিত (Enlightened)। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে মুসলিম উম্মাহ ইসলামসহ জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে গভীর (Deep) ও আলোকিত (Enlightened) চিন্তা প্রয়োগ করছে না, বরং অগভীর (Shallow) চিন্তা উম্মাহ থেকে শুরু করে আলেমগণের মধ্যে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। চিন্তা ও কর্মে কাফেরদের অন্ধ অনুকরণই এর নগ্ন বহিপ্রকাশ।
২.৫. প্রাথমিক মূল্যবোধ পরিবর্তন:
মানুষ যে কোন কাজের পেছনে চার ধরনের মূল্যবোধ অন্বেষণ করে। এ মূল্যবোধ হল যে কোন কাজের পেছনে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। এগুলো হল: বস্তুগত, মানবিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক মূল্যবোধ। ইসলামে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ প্রাথমিক এবং অন্যান্যগুলোর তুলনায় প্রণিধানযোগ্য। অপরদিকে পুজিবাদে অন্যান্য তিনটির তুলনায় বস্তুগত মূল্যবোধ প্রাথমিক বা অগ্রগণ্য। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে আধ্যাত্মিক নয়, বরং বস্তুগত মূল্যবোধ মুসলিম উম্মাহ’র কাছে আজ প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠেছে।
২.৬. সুখ (Happiness) সর্ম্পকিত ধারণার পরিবর্তন:
পুজিবাদী ব্যবস্থায় ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তিকেই (Pleasure) সুখ (Happiness) মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামে ‘সুখ’ (Happiness) একটি ধারণা বা concept এবং তা হল আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা’র সন্তুষ্টি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তুমি উপরের (বৈষয়িকভাবে ভাল অবস্থান) দিকে তাকিও না, বরং নীচের (বৈষয়িকভাবে অপেক্ষাকৃত মন্দ অবস্থানে) দিকে তাকাও, তবেই আল্লাহ’র নেয়ামত সর্ম্পকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারবে।’ মূলত: এ চিন্তাই মানুষকে সুখের সত্যিকারের অনুভূতি দিতে পারে। পশ্চিমা পুঁজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে উম্মাহ কাফেরদের মত ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তি (Pleasure) বা ভোগকে সুখ (Happiness) ভাবছে; খেলাধুলা, সেক্স ও ভায়োলেন্সনির্ভর চলচ্চিত্র, গান, নাটক, সাহিত্য ইত্যাদির মাধ্যমে বিনোদিত হওয়াকে নিজের অধিকার মনে করছে।
২.৭. ইসলামি জীবনাদর্শ সর্ম্পকে আত্মবিশ্বাসহীনতা:
ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক হুকুমসমূহ (পর্দা, জিহাদ, বহুবিবাহ, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা) সর্ম্পকে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচারণায় প্রভাবিত, সাংস্কৃতিক দখলদারিত্বের শিকার, ফিকরাহ ত্বরীকার ব্যাপারে যথাযথ জ্ঞানহীন উম্মাহ’র আলেম ও সাধারণ মুসলিমগণ ইসলামী জীবনাদর্শের বিষয়ে হীনমন্যতায় ভুগছেন। পরাজিত মানসিকতা থেকেই তারা তাদাররুজ (gradualism), ব্যাংকিং ও বীমা ব্যবস্থার ইসলামীকীকরণ, পরস্পর বিপরীতধর্মী ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে মধুচন্দ্রিমাময় সর্ম্পক আবিষ্কার করছে।
২.৮. পূর্ণজাগরণের সঠিক পথ অনুধাবন করতে না পারা:
এটি সবাই বুঝতে পারছে যে, উম্মাহ’র অবনমন ঘটেছে। কিন্তু পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কুপ্রভাবের দরুণ এ অবনমনের প্রকৃতি ও তা থেকে উত্তরণের উপায় বাতলানো সম্ভবপর হচ্ছে না। উম্মাহ’র অবনমনের সত্যিকারের কারণ তার বুদ্ধিবৃত্তিক অধপতন এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান খিলাফতের অনুপস্থিতি এবং এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এমন একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল যা বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হওয়া উম্মাহ’র অভিভাবকতুল্য অধিকাংশ আলেমগণ ব্যক্তি মুসলিমের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পদস্খলনকেই অবনমনের কারণ ভাবছেন এবং নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি বা ইসলাহকে এর সমাধান মনে করছেন। অধিকাংশ আলেমগণ ইসলামকে ফিকরাহ ও ত্বরীকার সমষ্টি হিসেবে দেখেন না। বিধায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি যে ইসলামের মধ্যেই রয়েছে এ ব্যাপারে তারা ওয়াকিবহাল নন।
২.৯. কাজের ভিত্তি পরিবর্তন:
একজন প্রকৃত মুসলিমের কাজের ভিত্তি হল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া ত’আলা’র সন্তুষ্টি অর্জন। শরী’আহ সংজ্ঞায়িত খায়ের (কল্যাণকর) শার্ (অকল্যাণকর) বা হালাল হারাম- ই তার জন্য হুসন (নৈতিক) কুব্হ (অনৈতিক) হওয়া উচিত। এখানে বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া বা মানব মস্তিষ্ক ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। পুজিবাদে কাজের ভিত্তি হল লাভ বা Benefit । কিন্তু পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও অন্যান্য উপকরন ব্যবহার করে কালচারিং করার কারণে উম্মাহ’র কাজের ভিত্তি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। উম্মাহ হুসন কুব্হ নির্ধারণ এর ক্ষেত্রে পুজিবাদে কাজের ভিত্তি-লাভ বা Benefit কে গ্রহণ করছে।
উপসংহার:
পশ্চিমারা মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়ার পর তাদের ব্যবস্থাসমূহ বাস্তবায়ন করে বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে উম্মাহকে সাফল্যজনকভাবে কালচার করতে সমর্থ হয়েছে। কালচারিং এর মাধ্যমে ভূমির উপনিবেশবাদ থেকে মস্তিষ্কের উপনিবেশবাদে সফল হওয়ায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সময়ে তারা প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ থেকে সফলভাবে Neocolonialism বা নব্য উপনিবেশবাদে রূপান্তরিত হতে পেরেছে। কালচারিং এর কারণেই বৃটেন এখনও পৃথিবীর অনেক জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারছে; যদিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তেরশ বছরের ইতিহাসে ইসলামী ভূমির যেসব অংশে খিলাফত রাষ্ট্র সফলভাবে উম্মাহকে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের মাধ্যমে কালচারিং করতে সমর্থ হয়েছিল সেসব অংশের মুসলিমগণ ইসলামকে ধারণ করার ক্ষেত্রে এখনও অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থানে আছে। তবে আশার কথা এই যে, কুফর দিয়ে কালচার করার ঘৃণ্য পশ্চিমা উপনিবেশবাদী অপচেষ্টা সত্ত্বেও উম্মাহ তার অর্ন্তনিহিত খায়ের, শক্তিশালী আক্বীদা ও আদর্শিক ইসলামি রাজনীতির কারণে আবার ইসলামের দিকে ব্যাপকভাবে ফিরে আসতে শুরু করেছে। উম্মাহ’র এই উত্তম প্রবণতাই অনতিদূর ভবিষ্যতে দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদার ভীত রচনা করবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“তারা (কাফের) চায় মুখের ফুৎকারে আল্লাহ’র নূরকে নিভিয়ে দিতে, কিন্তু তিনি তাঁর নূরকে প্রজ্জলিত রাখবেনই; যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।’’ (সূরা আস-সফ: ৮)


















