Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক

    ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক

    ভূমিকা

    ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একথা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আম্বিয়ায়ে কিরাম সর্বদাই মানব সমাজের পুনর্বিন্যাস করেছেন। তাঁরা মানব জাতিকে এক বুনিয়াদী আদর্শের দিকে আহবান জানিয়েছেন। এবং সে আহবানে যারা সাড়া দিয়েছে, তাদেরকে এক নতুন ঐক্যসূত্রে গেঁথে দিয়েছেন। যে মানব গোষ্ঠী বিভিন্ন দল-গোত্র-খান্দানে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছিলো, ছিলো পরস্পরের রক্ত পিপাসু ও ইজ্জতের দুশমন-এ আহবানর ফলে তারা পরস্পর পরস্পরের ভাই এবং একে অপরের ইজ্জতের সংরক্ষক বনে গেল। এই ঐক্যের ফলে এক নতুন শক্তির উদ্বোধন হলো এবং এই আহবান দুনিয়ার সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস সৃষ্টি করলো ও শ্রেষ্ঠতম সংস্কৃতি রূপায়ণের নিয়ামকে পরিণত হলো। এই গূঢ় সত্যের দিকেই আল কুরআন ইংগিত করেছে তার নিজস্ব অনুপম ভঙ্গিতে:

    واذكروا نعمة الله عليكم اذ كنتم اعداء فالَّف بيت قلوبكم فاصبحتم بنعمته اخوانا وَّ كنتم على شفاء حفرة من النار فانقذكم منها –

    “আল্লাহর সেই নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা ছিলে পরস্পরের ঘোরতর দুশমন, তখন তিনিই তোমাদের হৃদয়কে জুড়ে দিলেন এবং তোমরা তাঁর অনুগ্রহ ও মেহরবানীর ফলে ভাই-ভাই হয়ে গেলে। (নিঃসন্দেহে) তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের তীরে দাঁড়িয়ে। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে সেখান থেকে নাজাত দিলেন (এবং ধ্বংসের হাত থেকে রা করলেন।)” আলে ইমরান: ১০৩

    আম্বিয়ায়ে কিরাম মানব জাতিকে আহবান জানিয়েছেন এই বলে:

    واعتصموا بحبل الله جميعا ولا تفرقوا –

    “আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো (ঐকবদ্ধ হও) এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”

    এক: পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তি: তার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

    ১. সম্পর্কের ভিত্তি ও মর্যাদা

    ইসলামী আন্দোলন এক সামগ্রিক ও সর্বাত্মক বিপ্লবের আহবান। এ জন্যই এ বিপ্লবী আন্দোলনের কর্মীদের সাধারণভাবে সমস্ত মানুষের সঙ্গে এবং বিশেষভাবে পরস্পরের সাথে এর সঠিক ভিত্তির ওপর সম্পৃক্ত করে দেয়া এর প্রধানতম বুনিয়াদী কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। এ কর্তব্য সম্পাদনের জন্যে ইসলাম এই সম্পর্কের প্রতিটি দিকের ওপরই আলোকপাত করেছে এবং ভিত্তি থেকে খুঁটিনাটি বিষয় পর্যন্ত প্রতিটি জিনিসকেই নির্ধারিত করে দিয়েছে।

    পারস্পারিক সম্পর্ককে বিবৃত করার জন্যে আল-কুরআনে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ মনোজ্ঞ বর্ণনাভংগী ব্যবহার করা হয়েছে, বলা হয়েছে:

    انما المؤمنون اخواة –

    “মু’মিনেরাতো পরস্পরের ভাই”—হুজরাত: ১০

    দৃশ্যতঃ এটি তিনটি শব্দ বিশিষ্ট একটি ছোট্ট বাক্যাংশ মাত্র। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পারস্পারিক সম্পর্কের ভিত্তি, তার আদর্শিক মর্যাদা এবং ইসলামী আন্দোলনের জন্যে তার গুরুত্ব ও গভীরতা প্রকাশ করার নিমিত্তে এ বাক্যাংশটুকু যথেষ্ট। এ ব্যাপারে একে ইসলামী আন্দোলনের সনদের (ঈযধৎঃবৎ) মর্যাদা দেয়া যেত পারে।

    এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী আন্দোলনে লোকদের সম্পর্ক হচ্ছে একটি আদর্শিক সম্পর্ক। লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের একত্ব এর গোড়া পত্তন করে এবং একই আদর্শের প্রতি ঈমানের ঐক্য এতে রঙ বিন্যাস করে। দ্বিতীয়তঃ আদর্শিক সম্পর্ক হবার কারণে এটা নিছক কোন নিরস বা ঠুনকো সম্পর্ক নয়। বরং এতে যে স্থিতি, গভীরতা ও প্রগাঢ় ভালোবাসার সমন্বয় ঘটে, তাকে শুধু দুই ভাইয়ের পারস্পারিক সম্পর্কের দৃষ্টান্ত দ্বারাই প্রকাশ করা চলে। এমনি সম্পর্ককেই বলা হয় উখুয়্যাত বা ভ্রাতৃত্ব। বস্তুতঃ একটি আদর্শিক সম্পর্কের ভেতর ইসলাম যে স্থিতিশীলতা, প্রশস্ততা ও আবেগের সঞ্চার করে,তার প্রতিধ্বনি করার জন্যে ভ্রাতৃত্বের (উখুয়্যাত) চেয়ে উত্তম শব্দ আর কি হতে পারে?

    ২. ভ্রাতৃত্ব ঈমানের অনিবার্য দাবী

    ইসলামী সভ্যতায় ঈমানের ধারণা শুধু এটুকু নয় যে, কতিপয় অতি প্রাকৃতিক সত্যকে স্বীকার করে নিলেই ব্যস হয়ে গেল। বরং এ একটি ব্যপকতর ধারণা বিশিষ্ট প্রত্যয়-যা মানুষের হৃদয়-মনকে আচ্ছন্ন করে, যা তার শিরা-উপশিরায় রক্তের ন্যায় সঞ্চালিত হয়। এ এমন একটি অনুভূতি, যা তার বক্ষশেকে উদ্বেলিত করে ও আলোড়িত করে রাখে। এ হচ্ছে তার মন-মগজ ও দিল-দিমাগের কাঠামো পরিবর্তনকারী এক চিন্তাশক্তি। সর্বোপরি, এ হচ্ছে এক বাস্তবানুগ ব্যবস্থাপনার কার্যনির্বাহী শক্তি, যা তার সমস্ত অংগ-প্রত্যংগকে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীনে নিয়ে গোটা ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনেই বিপ্লবের সূচনা করে। যে ঈমান এতোটা ব্যাপক প্রভাবশালী, তার অক্টোপাস থেকে মানুষের পারস্পারিক সম্পর্ক কিভাবে মুক্ত থাকতে পারে! বিশেষতঃ এটা যখন এক অনস্বীকার্য সত্য যে, মানুষের পারস্পারিক সম্পর্কের সাথে তার গোটা জীবন–একটি নগণ্য অংশ ছাড়া- ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। বস্তুতঃ এ কারণেই ঈমান তার অনুসারীদেরকে সমস্ত মানুষের সাথে সাধারণভাবে এবং পরস্পরের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্ক স্থাপন করার নির্দেশ দেয়। উপরন্তু ঐ সম্পর্ককে সুবিচার (আদ্ল) ও সদাচরণের (ইহ্সান) ওপর প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সে একটি সামগ্রিক জীবনপদ্ধতি এবং সভ্যতারও রূপদান করে। অন্যদিকে অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিকে সে একটি পূর্ণাঙ্গ বিধি-ব্যবস্থায় পরিণত করে দেয়, যাতে করে নিজ নিজ স্থান থেকে প্রত্যেকেই তাকে মেনে চলতে পারে। এভাবে এক হাতের আঙ্গুলের ভেতর অন্য হাতের আঙ্গুল কিংবা এক ভাইয়ের সঙ্গে অন্য ভাই যেমন যুক্ত ও মিলিত হয়, ঈমানের সম্পর্কে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও যেনো পরস্পরে তেমনি যুক্ত হতে পারে। আর এ হচ্ছে ঈমানের আদর্শিক মর্যাদার অনিবার্য দাবী। এমন ঈমানই মানব প্রকৃতি দাবী করে এবং এ সম্পর্কেই তার বিবেক সাক্ষ্যদান করে। যারা সব রঙ বর্জন করে শুধু আল্লাহর রঙে রঞ্জিত হয়, তামাম আনুগত্য পরিহার করে কেবল আল্লাহর আনুগত্য কবুল করে, সমস্ত বাতিল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু সত্যের সাথে যুক্ত হয় এবং আল্লাহরই জন্যে একনিষ্ঠ ও একমুখী হয়, তারাও যদি পরস্পরে সম্পৃক্ত ও সংশ্লিষ্ট না হয় এবং প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন না করে, তবে আর কে করবে? উদ্দেশ্যের একমুখিনতার চাইতে আর কি বড় শক্তি রয়েছে, যা মানুষকে মানুষের সাথে যুক্ত করতে পারে! এ একমুখিনতার এবং সত্য পথের প্রতিটি মঞ্জিলই এ সম্পর্ককে এক জীবন্ত সত্যে পরিবর্তিত করতে থাকে। যে ব্যক্তি সত্যের খাতিরে নিজেকে উৎসর্গ করে দেয়, সে স্বভাবতই এ পথের প্রতিটি পথিকের ভালোবাসা, সহানুভূতি, সান্তনা ও পোষকতার মুখাপেক্ষী এবং প্রয়োজনশীল হয়ে থাকে। সুতরাং এ পথে এসে এ নিয়ামতটুকুও যদি সে লাভ না করে তো বড় অভাবকে আর কিছুতেই পূর্ণ করা সম্ভব নয়।

    ৩. বিশ্বব্যাপী ইসলামী বিপ্লবের জন্যে ভ্রাতৃত্ব অপরিহার্য

    এ দুনিয়ায় ঈমানের মূল লক্ষ্যে (অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী ইসলামী বিপ্লব সৃষ্টি এবং ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা) স্বতঃই এক সূদৃঢ়, স্থিতিশীল ও ভ্রাতৃত্বসুলভ সম্পর্কের দাবী করে। এ লক্ষ্য অর্জনটা কোন সহজ কাজ নয়। এ হচ্ছে ‘প্রেমের সমীপে পদার্পণ করার সমতুল্য’। এখানে প্রতি পদক্ষেপে বিপদের ঝড়-ঝান্ডা ওঠে,পরীক্ষার সয়লাব আসে। স্পষ্টত এমনি গুরুদায়িত্ব পালন করার জন্যে প্রতিটি ব্যক্তির বন্ধুত্ব অতীব মূল্যবান। এর অভাব অন্য কোন উপায়েই পূর্ণ করা চলে না। বিশেষত এ পথে সমর্থক-সহায়কের অভাব এক স্বাভাবিক সত্য বিধায় এমনি ধরণের শূণ্যতাকে এক মুহূর্তের জন্যেও বরদাশত করা যায় না।

    উপরন্তু একটি সংঘবদ্ধ ও শক্শিালী জামায়াত ছাড়া কোন সামগ্রিক বিপ্লবই সংঘটিত হতে পারে না। আর সংহত ও শক্তিশালী জামায়াত ঠিক তখনই জন্ম লাভ করে, যখন তার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিগণ পরস্পরে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। এই উদ্দেশ্যে এমনি সংঘবদ্ধভাবে কাজ করা উচিত, যাতে স্বভাবতই এক ‘সীসার প্রাচীরে\’ পরিণত হবে (بنيان مرصوص); তার ভেতরে কোন বিভেদ বা অনৈক পথ খুঁজে পাবে না। বস্তুত এমনি সুসংহত প্রচেষ্টাই সাফল্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে।

    আল্লাহ তায়ালা সূরায়ে আলে ইমরানে একটি নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচালকদের এমন সম্পর্ক গড়ে তোলবারই নির্দেশ দিয়েছেন:

    يايها الذين امنوا اصبروا وصابروا ورابطوا واتقوا الله لعلكم تفلحون –

    “হে ঈমানদারগণ! ধৈর্যধারণ কর এবং মুকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আল্লাহকে ভয় করতে থাক, যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পারো।” (আলে ইমরান: ২০০)

    সূরায়ে আনফালের শেষ দিকে ইসলামী বিপ্লবের পূর্ণতার জন্যে মুসলমানদের পারস্পারিক সম্পর্ককে একটি আবশ্যিক শর্ত হিসাবে সামনে রাখা হয়েছে। এবং বলা হয়েছেঃ যারা এই দ্বীনের প্রতি ঈমান আনবে, এর জন্যে সবকিছু ত্যাগ করবে এবং এই আন্দোলনে নিজের ধন-প্রাণ উৎসর্গ করবে, তাদের পারস্পারিক সম্পর্ক হবে নিশ্চিতরূপে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার সম্পর্ক। এ সম্পর্কের জন্যে এখানে ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

    ان الذين امنوا وهاجروا وجاهدوا باموالهم وانفسهم فى سبيل الله والذين اواو ونصروا اولـــئك بعضهم اولــياء بعضٍ –

    “যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, স্বীয় জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেছে এবং যারা তাদেরকে আশ্রয় ও সাহায্য-সহযোগিতা দিয়েছে, তারা একে অপরের বন্ধু।” (আনফাল: ৭২)

    এখান থেকে আরো কিছুটা সামনে এগিয়ে কাফেরদের সাংগঠনিক ঐক্য এবং তাদের দলীয় শক্তির প্রতি ইশারা দিয়ে বলা হয়েছে যে, মুসলমানরা যদি এমনি বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে না তোলে তবে আদল, ইহসান ও খোদাপরস্তির ভিত্তিতে একটি বিশ্বব্যাপী ইসলামী বিপ্লবের আকাঙ্খা কখনো বাস্তব দুনিয়ায় দৃঢ় মূল হতে পারবে না। ফলে আল্লাহর এই দুনিয়া ফেতনা-ফাসাদে পূর্ণ হয়ে যাবে। কেননা এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছাড়া বিপ্লবের বিরুদ্ধ শক্তিগুলোর মুকাবেলা করা মুসলমানদের পে সম্ভবপর নয়।

    والذين كفروا بعضهم اولـــياء بعضٍ – الا تفعلوه تكن فتنة فى الارض وفساد كبير –

    “আর যারা কাফের তারা পরস্পরের বন্ধু, সহযোগী। তোমরা (ঈমানদার লোকেরা) যদি পরস্পরের সাহায্যে এগিয়ে না আস তাহলে জমীনে বড়ই ফেতনা ও কঠিন বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।” (আনফাল: ৭৩)

    আর এ কথা সুস্পষ্ট যে, ইসলামী সভ্যতার প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী বিপ্লব সৃষ্টির জন্যে এমন প্রয়াস-প্রচেষ্টাই হচ্ছে ঈমানের সত্যাসত্য নির্ণয়ের প্রকৃত মানদন্ড।

    والذين امنوا وهاجروا وجاهدوا فى سبيل الله والذين اَوَاوْ ونصروا اولـــئك هم المؤمنون حقاً –

    “যারা ঈমান এনেছে নিজেদের ঘর-বাড়ী ছেড়েছে এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে এবং যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছে, সাহায্য-সহায়তা করেছে, তারাই প্রকৃত মু’মিন। (আনফাল: ৭৪)

    এরই কিছুটা আগে আল্লাহ তায়ালা বিরুদ্ধবাদীদের মুকাবেলায় আপন সাহায্যের প্রতিশ্র“তির সাথে মু’মিনদের জামায়াত সম্পর্কে নবী করিম (সা)কে এই বলে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, তাদের দিলকে তিনি নিবিড়ভাবে জুড়ে দিয়েছেন এবং তারাই হচ্ছে ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের চাবিকাঠি।

    هو الذى ايدك بنصره وبالمؤمنين – والّف بين قلوبهم-

    “তিনিই তো নিজের সাহায্য দ্বারা ও মু’মিনদের দ্বারা তোমার সহায়তা করেছেন এবং মু’মিনদের দিলকে পরস্পরের সাথে জুড়ে দিয়েছেন।” (আনফাল: ৬২-৬৩)

    ৪. ভ্রাতৃত্বের দাবী: তার গুরুত্ব ও ফলাফল

    বস্তুত ইসলামী বিপ্লবের আহবায়কদের এ পারস্পারিক সম্পর্ক হচ্ছে ভ্রাতৃত্ব (উখুয়্যাত), বন্ধুত্ব, রহমত ও ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু এর ভেতর ‘ভ্রাতৃত্ব’’ শব্দটি এতো ব্যাপক অর্থবহ যে, অন্যান্য গুণরাজিকে সে নিজের ভেতরেই আত্নস্থ করে নেয়। অর্থাৎ দুই সহোদর ভাই যেমন একত্রিত হয় এবং তাদের মধ্যকার কোন মতপার্থক্য, ঝসড়া-ফাসাদ বা বিভেদ-বিসম্বাদকে প্রশ্রয় দেয়া হয় না, ইসলামী আন্দোলনের কর্র্মীদের পরস্পরকে ঠিক তেমনিভাবে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত। দুই ভাই যেমন পরস্পরের জন্যে নিজেদের সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত হয়, পরস্পর পরস্পরের শুভাকাক্সী হয়, সাহায্য ও সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকে এবং একে অপরের সহায়ক ও পৃষ্টপোষকে পরিণত হয়; যেভাবে এক তীব্র প্রেমের আবেগ ও প্রাণ-চেতনার সঞ্চার করে, সত্য পথের পথিকদের (যারা দ্বীন ইসলামের খাতিরে নিজেদের গোটা জীবনকে নিয়োজিত করে দেয়) মধ্যে ঠিক তেমনি সম্পর্কই গড়ে ওঠে। মোটকথা ইসলামী বিপ্লবের প্রতি যে যতোটা গভীরভাবে অনুরক্ত হবে, আপন সাথী ভাইয়ের সংগে ততোটা গভীর সম্পর্কই সে গড়ে তুলবে। তেমনি এ উদ্দেশ্যটা যার কাছে যতোটা প্রিয় হবে, তার কাছে এ সম্পর্কও ততোটা প্রিয় হবে। কারণ এ সম্পর্ক হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর জন্যে এবং আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীদের। কাজেই যে ব্যক্তি ইসলামী বিপ্লবের কর্মী ও আহবায়ক হবে, আপন সাথী ভাইয়ের সাথে তার সম্পর্ক যদি পথ চলাকালীন অপরিচিত লোকের মত হয় তবে তার নিজের সম্পর্কে চিন্তা করে দেখা উচিত যে, সে কোন্ পথে এগিয়ে চলেছে। অথবা আপন সংগী-সহকর্মীদের সাথে তার সম্পর্ক যদি গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দেয়া ধুলোর মত ণস্থায়ী হয়, তবে, তার চিন্তা করে দেখতে হবে যে, যে উদ্দেশ্যের প্রতি মে ভালোবাসার দাবী করে, তার দিলে তার কতোটা মূল্য রয়েছে।

    ভ্রাতৃত্বের এ সম্পর্কের জন্যেই নবী করিম (সা) حب الله (আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা)-এর মত পবিত্র, ব্যাপক ও মনোরম পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। ‘ভালোবাসা’ নিজেই এক বিরাট চিত্তাকর্ষক ও শ্র“তিমধুর পরিভাষা। এর সাথে ‘আল্লাহর পথে’ এবং ‘আল্লাহর জন্যে’ বিশ্লেষণদ্বয় একে তামাম স্থুলতা ও অপবিত্রতা থেকে মহত্ত্বের উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছিয়ে দিয়েছে। এমনিভাবে এ পরিভাষাটি দিল ও আকলকে যুগপৎ এমন এক নির্ভুল মানদন্ড দান করে, যা দিয়ে প্রত্যেক মু’মিন তার সম্পর্ককে যাচাই করে দেখতে পারে।

    আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং তার পথে ভালোবাসা এ দু’টো জিনিসের মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। যেখানে এর একটি থাকবে, সেখানে অপরটিও দেখা যাবে। একটি যদি না থাকে তবে অপরটি সন্দেহজনক হয়ে দাঁড়াবে। তাই নবী করিম (সা) বলেছেন: لا تؤمنوا حتى تحابوا

    “তোমরা ততক্ষন পর্যন্ত মু’মিন হবে না, যতোণ না পরস্পরকে ভালোবাসবে।” (মুসলিম: আবু হুরায়রা)

    অতঃপর গোটা সম্পর্ককে এই ভিত্তির ওপর স্থাপন করা এবং ভালোবাসা ও শত্রুতাকে শুধু আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়াকে ঈমানের পূর্ণতার জন্যে অপরিহার্য শর্ত বলে অভিহিত করা হয়েছে:

    من احب لله وابغض لله واعطى لله ومنع لله فقد استكمل الايمان –

    “যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর জন্যে ভালোবাসলো, আল্লাহর জন্যে শত্রুতা করলো, আল্লাহর জন্যে কাউকে কিছু দান করলো এবং আল্লাহর জন্যই কাউকে বিরত রাখলো, সে তার ঈমানকেই পূর্ণ করে নিলো।”

    মানুষের জীবনে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা বাস্তবিকই অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে থাকে। তাই ঈমানের পূর্ণতার জন্যে এ দু\’টো জিনিসকেই আল্লাহর জন্যে নির্দিষ্ট করে দেয়ার অপরিহার্য শর্ত নিতান্ত স্বাভাবিক ও যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। ঈমানের বহুতর শাখা-প্রশাখা রয়েছে। এর প্রতিটি শাখাই নিজ নিজ জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ। একটি সুসংহত শক্তিকে ক্ষমতাশীন করার জন্যে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা যেরূপ জরুরী তার  পরিপ্রেক্ষিতে নবী করিম (সঃ) তাকে সমস্ত কাজের চাইতে শ্রেষ্ঠ কাজ বলে অভিহিত করেছেন। হযরত আবু জার (রাঃ) বর্ণনা করেন:

    خرج علينا رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال أتد رون اىُّ الاعمال احب الى الله تعالى قال قائـــل الصلوة والزكوة وقال قائـــل الجهاد قال النبى صلى الله عليه وسلم ان احب الاعمال الى الله تعالى الحب لله والبغض لله –

    “একদা রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের কাছে আগমন করলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কি জান, আল্লাহ তায়ালার কাছে কোন কাজটি বেশী প্রিয়? কেউ বললো নামাজ ও যাকাত। কেউ বললো জিহাদ। মহানবী (সা) বললেনঃ কেবল আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্যেই শত্রুতাই হচ্ছে সমস্ত কাজের মধ্যে আল্লাহর কাছে বেশী প্রিয়।” (আহমদ, আবু দাউদ, আবু যাররা)

    আর একবার হযরত আবুজার (রা)কে উদ্দেশ্য করে মুহাম্মাদ (সঃ) প্রশ্ন করেন:

    يا ابا ذرٍّ اىُّ عرى الايمان اوثق قال الله ورسوله اعلم قال الموالاة فى الله والحب لله وابغض لله

    ‘হে আবুজার! ঈমানের কোন্ কাজটি অধিকতর মজবুত? জবাব দিলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। মহানবী (সা) বললেন: তা হচ্ছে আল্লাহর পথে বন্ধুত্ব এবং তাঁর জন্যে ভালোবাসা ও শত্রুতা।’ (বায়হাকী-ইবনে আব্বাস)

    হাদীসে উল্লেখিত عرى বলতে রজ্জু এবং থালা-বাসনের আংটা বা হাতলকেও বুঝায়। তাছাড়া যে গাছের পাতা শীতকালেও ঝরে না, তাকেও عرى বলা হয়। অর্থাৎ আল্লাহর পথে ভালোবাসা হচ্ছে এমন মজবুত ভিত্তি, যার ওপর নির্ভর করে মানুষ নিশ্চিন্তে ঈমানের চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে।এমন ভিত্তিতে না কখনো ফাঁটল ধরে, আর না তা ধসে পড়ে।

    মোটকথা, ঈমান মানুষের গোটা জীবনকেই দাবী করে। অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি মুহুর্তই- যতক্ষন দেহে শ্বাস-প্রশ্বাসের আসা যাওয়া অব্যহত থাকবে-ঈমানের চাহিদা অনুযায়ী অতিবাহিত করা উচিত। কিন্তু যতোণ পর্যন্ত মু’মিনের গোটা সম্পর্ক-সম্বন্ধ আল্লাহর জন্যে ভালোবাসার সম্পর্কে পরিণত না হবে ততোক্ষণ জীবনে এতো ব্যাপকভাবে নেক কাজের সূচনা হতে পারে না। এ জন্যে যে, সম্পর্ক-সম্বন্ধ হচ্ছে মানব জীবনের এক বিরাট অংশ। এ জিনিসটি অনিবার্যভাবে তার জীবনকে প্রভাবান্বিত করে এবং এক প্রকারে তার বন্ধুত্ব ও দীনের মানদন্ড হয়ে দাঁড়ায়। তাই যাদের জীবনে খোদার স্মরণ দৃঢ় মূল হয়েছে, তাদের সাথে আপন সত্তাকে যুক্ত করার জন্যে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। এবং তারা যাতে সত্য পথে চালিত হয় এবং দুনিয়ার শান-শওকত ও সাজসজ্জার গোলক-ধাঁধায় পড়ে নিজেদের চুকে বিভ্রান্ত না করে,তার জন্যে ‘সবর’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন:

    واصبر نفسك مع الذين يدعون ربهم بالغدوت والعشى يريدون وجهه ولا تعد عيناك عنهم تريد زينة الحيوة الدنيا –

    ‘তুমি স্বীয় সত্তাকে তাদের সঙ্গে সংযত রাখো, যারা সকাল ও সন্ধ্যায় আপন প্রভূকে ডাকে এবং তার সন্তুষ্টি তালাশ করে, আর দুনিয়াবী জীবনের চাক্চিক্য কামনায় তোমাদের দৃষ্টি যেন তাদের দিক থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্যদিকে ছুটে না যায়।’ –(সূরা ক্বাহাফ)

    অন্যদিকে মানুষকে তার বন্ধুত্ব স্থাপন খুব ভেবে চিন্তে করার জন্যে নবী করিম (সঃ) সাবধান করে দিয়েছেন। কেননা:

    المرء على دين خليله فلينظر احدكم من يخالل – (احمد- ترمذى – ابو داود –بيهقى- ابو هريرة)

    ‘মানুষ তার বন্ধুর (খলীল) দ্বীনের ওপরই কায়েম থাকে। কাজেই তোমরা কাকে বন্ধু বানাও তা প্রত্যেকেই ভেবে চিন্তে নাও।’ (আবু হুরায়রা রাঃ থেকে)

    হাদীসে উল্লেখিত خليل শব্দটি থেকে خلت নিষ্পন্ন হয়েছে। এর মানে হচ্ছে এমন ভালোবাসা ও আন্তরিকতা, যা দিলের ভেতর বদ্ধমূল হয়ে যায়। হাদীসে ভালো ও মন্দ লোকের ভালোবাসা ও সহচর্যের একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত বর্ণিত হয়েছে। বলা হয়েছে: ভালো লোকের সহচর্য হচ্ছে কোন আতর বিক্রেতার কাছে বসার মতো, যদি আতর না পাওয়া যায়, তবু তার খুশবুতে দিল-দিমাগ সতেজ হয়ে উঠবে। মতো, যদি আতর না পাওয়া যায়, তবু তার খুশ্বুতে দিল-দিমাগ সতেজ হয়ে উঠবে। আর মন্দ লোকের সংস্পর্শ হচ্ছে লোহার দোকানের তুল্য; তাতে কাপড় না পুড়লেও তার কালি এবং ধোঁয়া মন-মেজাজ খারাপ করে দিবেই।

    ঈমানের একটি স্তরে এসে মানুষ নিজেই ঈমান এবং তার বাস্তব দাবী পূরণে এক বিশেষ ধরণের আনন্দ ও মাধুর্য অনুভব করে। এ আনন্দানুভূতির কারণেই মানুষের ভেতর নেক কাজের প্রেরণা জাগে। রাসূলে কারীম (সঃ) এই জিনিসটাকেই حلاوت الايمان বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি এর তিনটি শর্ত উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একটা জিনিস হচ্ছে এই:

    ان يحب المرء لا يحبه الا لله –

    ‘সে অন্য লোককে ভালোবাসবে এবং তার এ ভালোবাসা আল্লাহ ছাড়া আর কারো জন্যে হবে না।’ (বুখারী, মুসলিম)

    গোলাম ও বান্দাহ্ যদি তার মালিক ও মনিবের ভালোবাসা অর্জন করতে পারে তো এ বিরাট সম্পদের বিনিময়ে সে আর কি জিনিস পেতে পারে! বস্তুত এ ভালোবাসাই হচ্ছে মু’মিনের পক্ষে মি’রাজ স্বরূপ। নবী করিম (সঃ) বলেছেন- ‘যারা আল্লাহর জন্যে পরস্পরের বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে, তারাই এ বিরাট নিয়ামতের উপযুক্ত।’ তাই হযরত মু’য়াজ বিন জাবাল (রা.) বলেন:

    سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول قال الله تعالى وجبت محبتى للمتحابين فى المسجالسين فى المتزاورين فى والمتباذلين فى-

    ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি যে, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: ‘যারা আমার জন্যে পরস্পরকে ভালোবাসে, আমার জন্যে একত্রে উপবেশন করে, আমার জন্যে পরস্পরে সাাত করতে যায় এবং আমার জন্যে পরস্পরে অর্থ ব্যয় করে, তাদের প্রতি আমার ভালোবাসা অনিবার্য।’ – (মালেক)

    ৫. আখিরাতে ভ্রাতৃত্বের সুফল

    দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর জন্যে ভালোবাসার এ ফলাফল তো আছেই; কিন্তু আখিরাতে যখন মানুষের প্রতিটি নেক কাজই মূল্যবান বিবেচিত হবে এবং একটি মাত্র খেজুরের সাদকা ও একটি ভালো কথাও তার জন্যে গণীমত বলে সাব্যস্ত হবে, তখন এ সম্পর্ক একজন মু’মিনকে অত্যন্ত উচু মর্যাদায় অভিষিক্ত করবে। বস্তুত ইসলামী বিপ্লবের ব্যাপারে এ সম্পর্কের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা যা কিছু জানি, তার পরিপ্রেক্ষিতে এটা খুবই স্বাভাবিক ও স্বতঃসিদ্ধ ব্যাপার।

    সেদিন অন্যের সম্পর্কে কারো কোন হুশ থাকবে না। মানুষ তার মা-বাপ, ভাই-বোন, স্ত্রী, পুত্র-কন্যা সবকিছু ছেড়ে দূরে পালিয়ে যাবে। জাহান্নাম থেকে বাঁচবার জন্যে তাদের সাবাইকে বিনিময় দিতেও সে তৈরী হবে। সেদিন বন্ধুত্বের তামাম রহস্য উদ্ঘাটিত হয়ে যাবে এবং দুনিয়ার জীবনে যাদের ভালোবাসা দিল ও দিমাগে বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিলো, সে বন্ধুই সেখানে শত্রুতে পরিণত হবে। কিন্তু প্রকৃত খোদাভীরু লোকদের বন্ধুত্ব সেখানে বজায় থাকবে। এজন্যে যে, সেদিন কাজে লাগবার মতো কি জিনিস সে বন্ধুরা দুনিয়ার জীবনে পরস্পরকে দান করেছে, সেই সংকট মুহুর্তে তা নির্ভুলভাবে জানা যাবে এবং তার গুরুত্ব সঠিকভাবে অনুভূত হবে:

    الا خلاء يومئذ بعضهم لبعض عدو الا المتقين ياعباد لا خوف عليكم اليوم ولا انتم تحزنون –

    ‘যারা পরস্পরের বন্ধু ছিল, সেদিন পরস্পরের শত্রু হয়ে যাবে, কেবল মুত্তাকি লোক ছাড়া। হে আমার বান্দাহ্গণ! আজকে তোমাদের কোন ভয় নেই, তোমরা ভীত সন্ত্রস্তও হবে না।’ -(সূরা যুখরুফ)

    এভাবে যাদের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপিত হবে, তাদের সাথেই তার পরিণাম যুক্ত হবে। এমনকি আল্লাহর জন্যে ভালোবাসা পোষণকারীগণ যদি একজন থাকে প্রাচ্যে এবং অপর জন পাশ্চাত্যে তবুও মহান রব্বুল আলামীন আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে কিয়ামতের দিন একত্রিত করে বলবেন, যার প্রতি তুমি আমার জন্যে ভালোবাসা পোষণ করতে সে লোকটিই হচ্ছে এই। হাদীসের বর্ণনা এমন:

    ১) المرء مع من احبَّ

    ২) لو ان عبد ين تحابَّا فى الله عزَّ وجلَّ واحد فى المشرق واخر ى المغرب لجمع الله بينهما يوم القيامة يقول هذا الذى كنت تحبه فىَّ

    ১। “মানুষ যে যাকে ভালোবাসে তার সাথেই তার পরিণাম সংযুক্ত।” (বুখারী, মুসলিম; ইবনে মাসউদ রা.)

    ২। “আল্লাহর উদ্দেশ্যে ভালোবাসা পোষণকারী দু’ব্যক্তির একজন যদি থাকে প্রাচ্যে এবং অপর জন যদি থাকে পাশ্চাত্যে তবুও আল্লাহ রব্বুল আ’লামীন তাদের উভয়কে কিয়ামতের দিন একত্রিত করে বলবেন, যার প্রতি তুমি আমার জন্যে ভালোবাসা করতে সে ব্যক্তিটি হচ্ছে এই – (বায়হাকী; আবু হুরায়রা রা.)

    সেদিন মানুষের পায়ের নীচে আগুন উৎক্ষিপ্ত হতে থাকবে, মাথার ওপরে থাকবে আগুনের মেঘ এবং তা থেকে বর্ষিত হতে থাকবে আগুনের ফুলকি। ডানে, বামে, সামনে, পেছনে শুধু আগুনই তাকে পরিবেষ্টিত করে রাখবে আর তার আশ্রয় লাভের মতো একটি মাত্র ছায়াই থাকবে। আর তা হচ্ছে আরশে ইলাহীর ছায়া। সেদিন এ ছায়াতে সাত শ্রেণীর লোক স্থান পাবে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন:

    رجلان تحابَّا فى الله اجتمعا عليه وتفرق عليه –

    ‘তাদের ভেতর এমন দু’জন লোক থাকবে, যারা আল্লাহর জন্যে পরস্পরকে ভালোবেসেছে, তাঁরই জন্যে একত্রিত হয়েছে এবং তাঁরই খাতিরে বিচ্ছিন্ন হয়েছে।’

    তাঁর প্রতি আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক যে, তিনি আমাদের কাছে তাঁর এ ফরমান পৌঁছে দিয়েছেন:

    ان الله تعالى يقول يوم القيامة اين المتحابون فىَّ بجلا لى اليوم اظلهم فى ظلى يوم لا ظلَّ الا ظلِّى –

    ‘আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন বলবেন, যারা আমার শ্রেষ্ঠত্বের জন্যে পরস্পরকে ভালোবাসতো, তারা আজ কোথায়! আজকে আমি নিজের ছায়াতলে আশ্রয় দান করবো। আজকে আমার ছায়া ছাড়া আর কারো ছায়া নেই। -(মুসলিম-আবু হুরায়রা রা.)

    আর যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা নিম্নরুপ সংবাদ দিয়েছেন তাদের জন্যে তো কতোই মর্যাদার ব্যাপার হবে:

    المتحابون بجلالى لهم منابر من نور يغيطهم النبيون والشهداء –

    ‘যারা আমার শ্রেষ্ঠত্বের খাতিরে পরস্পরকে ভালোবাসে তাদের জন্যে আখিরাতে নূরের মিম্বর তৈরী হবে এবং নবী ও শহীদগণ তাদের প্রতি ঈর্ষা করবেন।’ – (তিরমিযি-মু’য়াজ বিন জাবাল)

    ৬. পারস্পারিক সম্পর্কের গুরুত্ব

    আল্লাহর জন্যে এক ঈমানের ভিত্তিতে পরস্পরের এ গভীর স্থিতিশীল ও প্রেমের আবেগময় সম্পর্ক ইসলামী আন্দোলনের জন্যে এতোখানি গুরুত্বপূর্ণ যে, এর বিকৃতিকে অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে দেখা হয়েছে। পারস্পারিক সম্পর্কচ্ছেদ সম্পর্কে যে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে, পরস্পরে আপোষ-মীমাংসা করা ও করানোর ব্যাপারে যে প্রতিশ্র“তি দেয়া হয়েছে এবং সম্পর্ক বিকৃতকারীদের সম্বন্ধে যা কিছু বলা হয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা পরে আসবে কিন্তু এখানে একথা মনে রাখা দরকার যে, সম্পর্কের বিকৃতি ও বিদ্বেষ পোষণকে নবী করীম (সঃ) এমন এক অস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন যা গোটা দ্বীনকেই একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়:

    هى الحالقة لا اقول تحلق الشعر ولكن تحلق الدين – (احمد وترمذى- زبير)

    এ সম্পর্কের প্রভাব কতো ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী হয়ে থাকে, তা এ থেকে বোঝা যায়। যারা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে এ দ্বীনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে, আপন সঙ্গী-সাথীদের জন্যে তাদের অন্তঃকরণ থেকে ক্রমাগত প্রেমের ঝর্ণাধারা উৎসারিত হবে। তাদের কাছে এ সম্পর্ক এতোটা প্রিয় হবে এবং তাদের এ হৃদয়ে এর জন্যে এতোখানি মূল্যবোধের সৃষ্টি হবে যে অন্য যে কোন তি স্বীকারে তারা প্রস্তুত হবে; কিন্তু এর কোন অনিষ্ট তারা বরদাশ্ত করবে না।

    ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এই পারস্পারিক প্রেম-ভালোবাসা তথা প্রীতির সম্পর্ককেই আল্লাহ তায়ালা তাঁর শ্রেষ্ঠতম নিয়ামতের মধ্যে গণ্য করেছেন। আর যে ইসলামী জামায়াত এই অমূল্য সম্পদ লাভ করবে, তার প্রতি বর্ষিত হবে তার বিশেষ করুণা-আশির্বাদ। কেননা এ সম্পর্কই হচ্ছে ইসলামী জামায়াতের প্রাণবন্তু এবং তার সজীবতার লক্ষণ। এ সম্পর্ক তার লোকদের জন্যে এমন এক পরিবেশ রচনা করে, যাতে তারা একে অপরের পৃষ্ঠপোষক হয়ে সত্য পথের মঞ্জিল নির্ধারণ করতে থাকে; পরস্পর পরস্পরকে পূণ্যের পথে চালিত করার জন্যে হামেশা সচেষ্ট থাকে। প্রথম যুগের ইসলামী জামায়াতকে আল্লাহ তায়ালা পারস্পারিক ঐক্য, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বেও যে বিরাট সম্পদ দান করেছিলেন, সূরা আলে ইমরানে তার উল্লেখ করে তাকে তাঁর বিশেষ নিয়ামত বলে অভিহিত করা হয়েছে:

    واذكروا نعمة الله عليكم اذ كنتم اعداء فالف بين قلوبكم فاصبحتم بنعمته اخوانًا –

    “আর আল্লাহর সে নিয়ামতকে স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পরে দুশমন ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়কে জুড়ে দিলেন আর তোমরা তাঁর মেহেরবানীর ফলে ভাই ভাই হয়ে গেলে।” – (আল ইমরানঃ১০৩)

    অতঃপর সূরায়ে আনফালে নবী কারীম (সঃ)কে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে যে, দুনিয়ার সমস্ত সম্পদ ব্যয় করলেও মুসলমানদের দিলকে এমন প্রেম, ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কে জুড়ে দেয়া আপনার পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না। এটা কেবল আল্লাহ তায়ালার কুদরতেই সম্ভবপর হয়েছে-একমাত্র তাঁর পক্ষেই এটা সম্ভবপর ছিলো। তিনি মানুষকে একটি দ্বীন দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান ও ভালোবাসা পোষণের তাওফিক দিয়েছেন। তারই অনিবার্য ফল হচ্ছে এই প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসা।

    দুই: চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা ও তার মৌলিক বৈশিষ্ট্য

    ইসলাম পারস্পারিক সম্পর্কেও যে মান নির্ধারণ করেছে তাকে কায়েম ও বজায় রাখার জন্যে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) পারস্পারিক অধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে একটি বিধ-বিধানও তৈরী করে দিয়েছেন। সেই বিধি-বিধানকে অনুসরণ করে এ সম্পর্ককে অনায়াসে দ্বীন-ইসলামের অভীষ্ট মানে উন্নীত করা যেতে পারে। এ বিধি-বিধানের ভিত্তি কতিপয় মৌলিক বিষয়ের ওপর স্থাপিত। এগুলো যদি মানুষ তার নৈতিক জীবনে গ্রহণ করে ও অনুসরণ করে তাহলে ঐ অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কিত প্রতিটি জিনিসই এই মৌলিক গুণরাজির স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে প্রকাশ পেতে থাকবে। অন্য কথায় বলা যায়, এই গুণরাজি এক একটি কর্তব্য পালন এবং এক একটি মর্যাদা লাভের জন্যে মানুষের ভেতর থেকে ক্রমাগত তকিদ ও দাবী জানাতে থাকবে। এর ফলে প্রতি পদক্ষেপই সদুপদেশ বা সতর্কবাণীর প্রয়োজন হবে না। এই গুণরাজির মধ্যে সবচেয়ে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে কল্যাণ কামনা।

    ১. কল্যাণ কামনা

    হাদীস শরীফে কল্যাণ কামনার জন্যে ‘নছিহত’ (نصخت) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থপূর্ণ। এ কারণে নবী করীম (সঃ) এ পর্যন্ত বলেছেন الدين النصيحة (ثلاثا) ‘দ্বীন হচ্ছে নিছক কল্যাণ কামনা’। (এ বাক্যটি তিনি এক সঙ্গে তিনবার উচ্চারন করেছেন)-মুসলিম।

    এরপর অধিকতর ব্যাখ্যা হিসেবে যাদের প্রতি কল্যাণ কামনা করা উচিত, তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে সাধারণ মুসলমানদের কথাও উল্লেখ রয়েছে। এভাবে একবার মহানবী (সা) তাঁর কতিপয় সাহাবীদের কাছ থেকে সাধারণ মুসলমানদের জন্যে কল্যাণ কামনার (নছিহত) বাইয়াত গ্রহণ করেন। আভিধানিক অর্থের আলোকে এ শব্দটির তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, সম্পর্কের ভেতর কোন ভেজাল বা ত্র“টি না থেকে যায়। অন্যকথায় এ গুণটি আমরা এভাবে নির্ধারণ করতে পারি যে মানুষ তার ভাইয়ের কল্যাণ ও মঙ্গল চিন্তায় সর্বদা প্রভাবান্বিত থাকবে; তারই মঙ্গল সাধনের জন্যে প্রতিটি মুহূর্ত উদ্গ্রীব থাকবে, তারই উপকার করার জন্যে সর্বতোভাবে চেষ্টা করবে, তার কোন ক্ষতি বা কষ্ট স্বীকার করবে না। বরং দ্বীন ও দুনিয়াবী যে কোন দিক দিয়ে সম্ভব তার সাহায্য করার প্রয়াস পাবে। এ কল্যাণ কামনার প্রকৃত মন্দণ্ড হচ্ছে যে মানুষ তাঁর নিজের জন্যে যা পছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্যেও ঠিক তা পছন্দ করবে। কারণ মানুষ কখনো আপন অকল্যাণ কামনা করতে পারে না। বরং নিজের জন্যে সে যতটুকু সম্ভব ফায়দা, কল্যাণ ও মঙ্গল বিধানেই সচেষ্ট থাকে। নিজের অধিকারের বেলায় সে এতোটুকু ক্ষতি স্বীকার করতে পারে না, নিজের ফায়দার জন্যে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করে না, নিজের অনিষ্টের কথা সে শুনতে পারে না, নিজের বে-ইজ্জতি কখনো বরদাশ্ত করতে পারে না বরং নিজের জন্যে সে সর্বাধিক পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা পেতে আগ্রহী। অতঃএব কল্যাণ কামনার মানে হচ্ছে এই যে, মানব চরিত্রে উল্লেখিত গুণসমূহ পয়দা হতে হবে এবং সে নিজের জন্যে যা পছন্দ করবে, তার ভাইয়ের জন্যেও ঠিক তাই পছন্দ করবে। এমনি ধারায় তার আচার-আচরণ বিকাশ লাভ করতে থাকবে।

    মু\’মিনের এ চারিত্রিক বৈশিষ্টকেই রাসূলে কারীম (সা) ঈমানের এক আবশ্যিক শর্ত বলে উল্লেখ করেছেন:

    والذى نفسى بيده لا يؤمن عبد حتى يحب لاخيه ما يحب لنفسه –

    ‘যে মহান সত্তার হাতে আমার জান নিবদ্ধ তার কসম! কোন বান্দাহ্ ততোক্ষণ পর্যন্ত মু’মিন হতে পারে না, যতোক্ষণ না সে নিজের জন্যে যা পছন্দ করবে তার ভাইয়ের জন্যেও তাই পছন্দ করবে।’ (বুখারী ও মুসলিম-আনাস)

    এভাবে এক মুসলমানের প্রতি অপর মুসলমানের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ অধিকারের কথা বলা হয়েছে; তার মধ্যে এ কল্যাণ কামনাকে একটি হাদীসে নিম্নোক্তরূপে বিবৃত করা হয়েছে:

    وينصح له اذا غاب او شهد –

    অর্থাৎ ‘সে আপন ভাইয়ের কল্যাণ কামনা করে, সে উপস্থিত থাকুক আর অনুপস্থিত।’ (বুখারী-আবু হুরায়রা রা.)

    অন্য এক হাদীসে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, মুসলমানের প্রতি মুসলমানের ছয়টি অধিকার রয়েছে, তার একটি হচ্ছে:

    ويحب له ما يخب لنفسه –

    ‘সে নিজের জন্যে যা পছন্দ করে, তার জন্যেও তা-ই পছন্দ করে।’ (তিরমিযি, ফাবিসী-আলী রা.)

    আরো সামনে এগিয়ে আমরা দেখতে পাবো, কল্যাণ কমনার এ গুণটির ভেতর কতো অধিকার ও মর্যাদা নিহিত রয়েছে, যা সরাসরি এর অনিবার্য দাবী হিসেবে এসে পড়ে।

    ২. আত্মত্যাগ (ايثار)

    একজন মুসলমান যখন তার ভাইয়ের জন্যে শুধু নিজের মতোই পছন্দ করে না বরং তাকে নিজের ওপর অগ্রাধিকার দেয়, তখন তার এ গুণটিকেই বলা হয় ايثر বা আত্মত্যাগ। এটি হচ্ছে দ্বিতীয় মৌলিক গুণ। ايثار শব্দটি اثر থেকে নির্গত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে পা ফেলা বা অগ্রাধিকার দেয়া। অর্থাৎ মুসলমান তার ভাইয়ের কল্যাণ ও মঙ্গল চিন্তাকে নিজের কল্যাণ ও মঙ্গলের উপর অগ্রাধিকার দেবে। নিজের প্রয়োজনকে মূলতবী রেখে অন্যের প্রয়োজন মেটাবে।নিজে কষ্ট স্বীকার করে অন্যকে আরাম দেবে। নিজে ক্ষুধার্ত থেকে অন্যের ক্ষুন্নিবৃত্তি করবে। নিজের জন্যে দরকার হলে স্বভাব-প্রকৃতির প্রতিকূল জিনিস মেনে নেবে, কিন্ত স্বীয় ভাইয়ের দিলকে যথাসম্ভব অপ্রীতিকর অবস্থা থেকে রক্ষা করবে।

    বস্তুত এ হচ্ছে উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, এটা সবার কাছ থেকে আশা করা যায় না। কারণ এর ভিত্তিমূলে কোন অধিকার বা কর্তব্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়নি। অবশ্য এর ভিত্তিতে অপরিসীম চারিত্রিক মহত্ত্বের কথা বিবৃত হয়েছে।

    এ আত্মত্যাগ সর্বপ্রথম প্রয়োজন-সীমার মধ্যে হওয়া উচিত। তারপর আরাম আয়েশের ক্ষেত্রে এবং সর্বশেষ স্বভাব-প্রকৃতির ক্ষেত্রে। এ সর্বশেষ জিনিসটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ স্বভাবতই বিভিন্ন প্রকৃতির, সেহেতু তাদের আকাঙ্খা ও চাহিদাও বিভিন্ন রূপ। এমতাবস্থায় প্রতিটি মানুষ যদি তার প্রকৃতির চাহিদার ওপর অনড় হয়ে থাকে তাহলে মানব সমাজ ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে বাধ্য। পক্ষান্তরে সে যদি অন্যের রুচি, পছন্দ, ঝোঁক-প্রবণতাকে অগ্রাধিকার দিতে শিখে তাহলে অত্যন্ত চমৎকার ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।

    এ আত্মত্যাগেরই উচ্চতর পর্যায় হচ্ছে, নিজে অভাব-অনটন ও দূরাবস্থার মধ্যে থেকে আপন ভাইয়ের প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের চাইতে অগ্রাধিকার দেয়া। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সঙ্গী-সাথীদের জীবন এ ধরণেরই ঘটনাবলীতে পরিপূর্ণ। আল কুরআনেও তাদের এ গুণটির প্রশংসা করা হয়েছে:

    ويوثرون على انفسهم ولو كان بهم خصاصة –

    ‘এবং তারা নিজের উপর অন্যদের (প্রয়োজনকে) অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা রয়েছে অনটনের মধ্যে।’ – (সূরা হাশর-৯)

    বস্তুত নিজেদের অভাব-অনটন সত্ত্বেও আনসারগণ যেভাবে মুহাজির ভাইদের অভ্যর্থনা করেছে এবং নিজেদের মধ্যে তাদেরকে স্থান দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আত্মত্যাগের আদর্শ দৃষ্টান্ত। উপরোক্ত আয়াতের শানে নূযুল হিসেবে, হযরত আবু বকর তালহা আনসারীর একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি থেকে এর একটি চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায়:

    “একদিন রাসূলে কারীম (সা)-এর কাছে একজন ক্ষুধার্ত লোক এলো। তখন তাঁর গৃহে কোন খাবার ছিলো না। তিনি বললেন: যে ব্যক্তি আজ রাতে এ লোকটিকে মেহমান হিসেবে রাখবে, আল্লাহ তার প্রতি করুণা বর্ষণ করবেন। হযরত আবু তালহা লোকটিকে নিজের ঘরে নিয়ে গেলেন। কিন্তু ঘরে গিয়ে স্ত্রীর কাছ থেকে জানতে পারলেন যে, ঘরে শুধু মেহমানের পেট ভরার মতো খাবারই আছে। তিনি বললেন: ছেলে-মেয়েদের খাইয়ে বাতি নিভিয়ে দাও। আমরা উভয়ে সারা রাত অভূক্ত থাকবো। অবশ্য মেহমান বুঝতে পারবে যে, আমরাও খাচ্ছি। অবশেষে তারা তা-ই করলেন। সকালে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে হাজির হলে তিনি বললেন: আল্লাহ তায়ালা তোমার এ সদাচরণে অত্যন্ত খুশী হয়েছেন এবং সেই সঙ্গে এই আয়াতটি পড়ে শুনালেন।” (বুখারী ও মুসলিম)

    এ তো হচ্ছে আর্থিক অনটনের মধ্যে আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত। কিন্তু এর চাইতেও চমৎকার ঘটনা হচ্ছে এক জিহাদের, যাকে আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা বলা যায়। ঘটনাটি হচ্ছে:

    “যুদ্ধের ময়দানে একজন আহত লোকের কাছে পানি নিয়ে যাওয়া হলো। ঠিক সে মুহূর্তে নিকট থেকে অপর একজন লোকের আর্তনাদ শোনা গেল। প্রথম লোকটি বললো: ঐ লোকটির কাছে আগে নিয়ে যাও। দ্বিতীয় লোকটির কাছে গিয়ে পৌঁছলে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো এবং সে মুমূর্ষাবস্থায়ও লোকটি নিজের সঙ্গীর প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিলো। এভাবে ষষ্ট ব্যক্তি পর্যন্ত একই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটলো এবং প্রত্যেকেই নিজের ওপর অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে লাগলো। কিন্তু ষষ্ট ব্যক্তির কাছে গিয়ে দেখা গেল, তার জীবন প্রদীপ ইতিমধ্যে নিভে গেছে। এভাবে প্রথম লোকটির কাছে ফিরে আসতে আসতে একে একে সবারই জীবনাবসান হলো।”

    আত্মত্যাগের অন্য একটি অর্থ হচ্ছে, নিজে অপোকৃত নিম্নমানের জিনিসে তুষ্ট থাকা এবং নিজের সাথীকে উৎকৃষ্ট জিনিস দান করা। একবার রাসূলুল্লাহ (সা) একটি জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি দু’টি মেসওয়াক কাটলেন, তার একটি ছিলো সোজা এবং অপরটি বাঁকা। তাঁর সঙ্গে একজন সাহাবী ছিলো। তিনি সোজা মেসওয়াকটি তাঁকে দিলেন এবং বাঁকাটি রাখলেন নিজে। সাহাবী বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ, ‘এটি ভালো এবং আপনার জন্যে উত্তম’। তিনি বললেন: কেউ যদি কোন ব্যক্তির সঙ্গে একঘন্টা পরিমাণও সংশ্রব রাখে, তবে কিয়ামতের দিন তাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, এ লোকটি কি সংশ্রবকালীন হক আদায়ের প্রতি লক্ষ্য রেখেছে কিংবা তাকে নষ্ট করেছে? (কিমিয়ায়ে সায়াদাত) বস্তুত আত্মত্যাগ যে সংশ্রবেরও একটি হক এদ্বারা তার প্রতিই ইশারা করা হয়েছে।

    ৩. আদল (সুবিচার)

    চরিত্রের দু’টো গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গুণ হচ্ছে আদল ও ইহসান। মু’মিন যদি এ গুণ দুটো অনুসরণ করে, তাহলে শুধু সম্পর্কচ্ছেদেও কোন কারণই মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না তাই নয়, বরং সম্পর্ক অত্যন্ত মধুর হয়েও উঠবে। তাই এগুণ দুটো সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা আদেশসূচক ভঙ্গিতে ইরশাদ করেছেন:

    ان الله يأمر بالعدل والاحسان –

    ‘আল্লাহ তায়ালা আদল ও ইহসানের উপর অবিচল থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন।’ -(সূরা নাহল-৯)

    এখানে ‘আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন’ -এ বাচন-ভঙ্গিটি বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। আদল সম্পর্কিত ধারণার মধ্যে দু’টো মৌলিক সত্য নিহিত রয়েছে। প্রথমতঃ লোকদের অধিকারের বেলায় সমতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। দ্বিতীয়তঃ প্রত্যেকের দাবী এই যে, প্রতিটি লোকের নৈতিক, সামাজিক, তামাদ্দুনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আউনগত প্রাপ্য অধিকারকে পূর্ণ ঈমানদারীর সাথে আদায় করতে হবে। অর্থাৎ একজন মুসলমান তার ভাইয়ের সকল শরীয়ত সম্মত প্রাপ্যধিকার আদায় করবে, শরীয়াতের ইচ্ছানুযায়ী আচরণ করবে, শরীয়াতের নির্দেশ অনুসারে ব্যবহার করবে। কেননা, শরীয়াতের মধ্যেই আদলের সমস্ত বিধি-বিধান পরিপূর্ণ এবং সুন্দরভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে:

    وانزلنا معهم الكتاب والميزان ليقوم الناس بالقسط –

    “এবং আমি তাদের (রাসূলদের) সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মানদণ্ড, ন্যায়নীতি-যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।” – (হাদীদ-২৫)

    অনুরূপভাবে শরীয়াত এটাও দাবী করে যে, কারো কাছ থেকে অনিষ্টকারিতার বদলা নিতে হলে যতোটুকু অনিষ্ট করা হয়েছে ততোটুকুই নেবে। যে ব্যক্তি এর চাইতে সামনে অগ্রসর হলো সে আদলেরই বিরুদ্ধচারণ করলো। আদলের বিস্তৃত ব্যাখ্যা ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা নবী কারীম (সা)-এর একটি হাদীসে বিবৃত হয়েছে। উক্ত হাদীসে আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশিত নয়টি বিষয়ের উল্লেখ করা হয়েছে। তার একটি হচ্ছে এই:

    كلمة العدل فى الغضب والرضاء –

    ‘গজবের অবস্থা হোক আর সন্তুষ্টির, যে কোন অবস্থায় আদলের বাণীর ওপর কায়েম থাকো।’

    প্রকৃতপক্ষে পূর্ণাঙ্গ চরিত্রের বুনিয়াদী লক্ষন এই যে, মানুষের অন্তঃকরণের অবস্থা যাই হোক সে আদলের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। তার ভেতর এতোটা চরিত্রবল থাকতে হবে যে, তার ভাইয়ের সাথে তার যতোই মনোমালিন্য বা মন কষাকষি থাকুক না কেন, নিজের কায়-কারবার ও আচার-ব্যবহারকে সে শরীয়াতের মানদন্ড থেকে বিচ্যুত হতে দেবে না। এ আদলেরই পরবর্তী জিনিস হচ্ছে ইহ্সান। এটি আদলের চাইতে বাড়তি একটা জিনিস।

    ৪. ইহ্সান (সদাচরণ)

    পারস্পারিক সম্পর্কেও ক্ষেত্রে ইহ্সানের গুরুত্ব আদলের চাইতেও বেশী। আদলকে যদি সম্পর্কের ভিত্তি বলা যায় তবে ইহ্সান হচ্ছে তার সৌন্দর্য ও পূর্ণতা। আদল যদি সম্পর্ককে অপ্রীতি ও তিক্ততা থেকে রক্ষা করে তবে ইহ্সান তাতে মাধুর্য ও সম্প্রীতির সৃষ্টি করে। বস্তুত প্রত্যেক পক্ষই কেবল সম্পর্কের নুন্যতম মানটুকু পরিমাপ করে দেখতে থাকবে আর প্রাপ্যধিকারে এতোটুকু কম ও অন্যের দেয়া অধিকারে এতোটুকু বেশীদিন টিকে থাকতে পারে না। এমন সাদাসিদা সম্পর্কের ফলে সংঘর্ষ হয়তো বাঁধবে না; কিন্তু ভালোবাসা, আত্মত্যাগ, নৈতিকতা ও শুভকাঙ্খার যে, নিয়ামতগুলো জীবনে আনন্দ ও মাধুর্যের সৃষ্টি করে, তা থেকে সে বঞ্চিত হবে। কারণ এ নিয়ামতগুলো অর্জিত হয় ইহ্সান তথা সদাচরণ, অকৃপণ ব্যবহার, সহানুভূতিশীলতা, শুভাকাঙ্খা, খোশমেজাজ, মাশীলতা, পারস্পারিক শিষ্টাচার, সৌজন্যবোধ, অন্যকে অধিকারের চাইতে বেশী দেয়া এবং নিজে অধিকারের চাইতে কম নিয়ে তুষ্ট থাকা ইত্যাকার গুণরাজি থেকে।

    এই ইহ্সানের ধারণাও নয়টি বিষয় সমন্বিত হাদীসে তিনটি বিষয়কে পূর্ণাঙ্গ ও সুস্পষ্ট করে তোলে:

    ان اصل من قطعنى واعطى من حرمنى واعفو عمَّن ظلمنى –

    ‘যে ব্যক্তি আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, আমি তার সঙ্গে যুক্ত হবো; যে আমাকে (অধিকার থেকে) বঞ্চিত করবে, আমি তাকে (তার অধিকার) বুঝিয়ে দেবো এবং যে আমার ওপর জুলুম করবে আমি তাকে মার্জনা করে দেবো।’ (সূরা-রা’দ-২২)

    অর্থাৎ চরিত্রের এ গুণটি দাবী করে যে, মানুষ শুধু তার ভাইয়ের ন্যায় ও পূণ্যের বদলা অধিকতর ন্যায় ও পূণ্যের দ্বারাই দেবে তাই নয়, বরং সে অন্যায় করলেও তার জবাব ন্যায়ের দ্বারাই দিবে।

    ويدرون بالحسنة السيّئة –

    ‘তারা অন্যায় ও পাপকে ন্যায় ও পূণ্যের দ্বারা নিরসন করে থাকে।’ (সূরা কাসাস-৫৪)

    ৫. রহমত

    এ চারটি গুণের পর পঞ্চম জিনিসটির জন্যে আমি ‘রহমত’ শব্দটি ব্যবহার করবো। অবশ্য এর জন্যে আরো বহু পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে।

    আমি রহমত শব্দটি এ জন্যে ব্যবহার করছি যে, খোদ আল্লাহ তায়ালাই মুসলমানদের পারস্পারিক সম্পর্কের চিত্র আঁকবার জন্যে এ শব্দটি বেছে নিয়েছেন। এটা তার অর্থের ব্যাপকতার দিকেই অংগুলি নির্দেশ করে:

    محمد الرسول الله والذين معه أشداء على الكفار رحماء بينهم –

    “আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং তাদের মধ্যে পরস্পরে রহমশীল।” (সূরা ফাতহ-২৯)

    এ গুণটিকে সহজভাবে বুঝবার জন্যে আমরা একে হৃদয়ের নম্রতা ও কোমলতা বলে উল্লেখ করতে পারি। এর ফলে ব্যক্তির আচরণে তার ভাইয়ের জন্যে গভীর ভালোবাসা, স্নেহ-প্রীতি, দয়া-দরদ ও ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। তার দ্বারা তার ভাইয়ের মনে অনু পরিমাণ কষ্ট বা আঘাত লাগবার কল্পনাও তার পক্ষে বেদনাদায়ক ব্যাপার। এ রহমতের গুণ ব্যক্তিকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং সাধারণ লোকদেরকে তার প্রতি আকৃষ্ট করে। রাসূলের (সঃ) প্রধান গুণরাজির মধ্যে এটিকে কুরআন একটি অন্যতম গুণ বলে উল্লেখ করেছে এবং দাওয়াত ও সংগঠনের ব্যাপার এর কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হয়েছে।

    لقد جاءكم رسول من انفسكم عزيز عليكم ما عنتُّم حريص عليكم بالمؤمنين رؤف رَّحيم –

    “নিঃসন্দেহে তোমাদের ভেতর থেকেই নবী এসেছেন। তোমরা কোন কষ্ট পেলে ভরাক্রান্ত হয়ে পড়েন। তোমাদের কল্যাণের জন্যে তিনি সর্বদা উদগ্রীব এবং মু’মিনের প্রতি অতীব দয়াশীল ও মেহেরবান।” (সূরা তাওবা-১২৮)

    সূরা আলে ইমরানে বলা হয়েছে যে, আপনার হৃদয় যদি কোমল না হতো তাহলে লোকেরা কখনো আপনার কাছে ঘেঁষতো না। আর দিলের এ কোমলতা আল্লাহ তায়ালারই রহমত।

    فبما رحمة من الله لنت لهم ولو كنت فظا غليظ القلب لا نفضُّيوا حولك –

    “আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্যে নরম দিল ও সহৃদয়বান হয়েছেন। যদি বদমেজাজী ও কঠিন হৃদয়ের হতেন তাহলে লোকেরা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেতো।” (আলে ইমরান-১৫৯)

    ঈমানের স্বতঃস্ফূর্ত পরিণতিই প্রেম-প্রীতি। আর প্রেম-প্রীতি ও কঠিন হৃদয় কখনো একত্রিত হতে পারে না। তাই একজন মু’মিন যথন প্রেমিক হয়, তখন স্বভাবতই সে নম্র স্বভাবের হয়। নতুবা তার ঈমানে কোন কল্যাণ নেই। এ সত্যের প্রতিই রাসূলে কারীম (স) নিম্নরূপ আলোকপাত করেছেন:

    المؤمن مالف ولا خير فيمن لا يألف ولا يولف – (احمد وبيهقى – ابو هريرة)

    “মু’মিন হচ্ছে প্রেম ভালোবাসার উজ্জল প্রতীক। যে ব্যক্তি না কাউকে ভালোবাসে আর না কেউ তাকে ভালোবাসে, তার ভেতর কোন কল্যাণ নেই।” (আহমাদ, বায়হাকী-আবু হুরায়রা রা.)

    আর এ জন্যেই বলা হয়েছে:

    من يحرم الرفق يحرم الخير –

    “যে ব্যক্তি কোমল স্বভাব থেকে বঞ্চিত, সে কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত।” (মুসলিম)

    এ কথারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা হচ্ছে এই:

    من اعطى حظه من الرفق اعطى حظه من خير الدنيا والاخرة –

    “যে ব্যক্তি নম্র স্বভাব থেকে তার অংশ দেয়া হয়েছে তাকে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ থেকেও তার অংশ দেয়া হয়েছে।” (শরহে সুন্নাহ-আয়েশা রা.)

    একবার মহানবী (সা) তিনজন জান্নাতী লোকের ভিতর থেকে একজনের কথা উল্লেখ করেন। লোকটি তার আত্মীয়-স্বজন এবং সাধারণ মুসলমানদের প্রতি অতীব দায়ার্দ্র ও সহানুভূতিশীল ছিলো।

    رحيم رفيق القلب لكل ذى قرب وَّ مسلم – (مسلم )

    বস্তুত যে ব্যক্তি দুনিয়ার মানুষের প্রতি রহম করে না, তার চেয়ে হতভাগ্য আর কেউ নয়। কারণ, আখিরাতে সে খোদার রহমত থেকে বঞ্চিত হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর বান্দাহদের প্রতি রহম করে, তার জন্যে আল্লাহর রহমত ও অনিবার্য হয়ে যায়। মুহাম্মাদ (সা) তাই বলেছেন:

    لا تنزع الرحمة الا من شقىٍّ –

    “রহমত কারো থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় না, কেবল হতভাগ্য ছাড়া।”

    আরো বলেছেন:

    الرحيمون يرحمهم الرحمن – ارحم من فى الارض يرحمكم من فى السماء –

    “যারা রহম করে, রহমান তাদের প্রতি রহম করেন। তোমরা দুনিয়াবাসীর প্রতি রহম করো, যেন আসমানবাসী তোমাদের প্রতি রহম করেন।” – (আবু দাউদ, তিরমিযি-ইবনে ওমর রা.)

    এ রহমত ও নম্রতারই দুটো ভিন্ন দিকের প্রকাশ ঘটে ছোটদের প্রতি স্নেহ ও বড়দের প্রতি সন্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে। এ দুটো জিনিস উল্লেখ করা হয়েছে। নিন্মোক্ত ভাষায়:

    ليس منا من لم يرحم صغيرنا ولم يوقر كبيرنا –

    “যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদের প্রতি রহম (স্নেহ) এবং বড়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে না সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়।” (তিরমিযি-ইবনে আব্বাস রা.)

    একজন মুসলমান তার ভাইয়ের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নম্রপ্রকৃতির হয়ে থাকে এবং সম্ভাব্য সকল উপায়ে তার দিলকে খুশি রাখা, তাকে কষ্ট পেতে না দেয়া এবং তার প্রতিটি ন্যায় সঙ্গত দাবী পূরণ করার জন্যে সে আপ্রাণ চেষ্টা করে থাকে। এ বিষয়টিকে রাসূলে কারীম (সঃ) নিম্নোক্ত দৃষ্টান্ত দ্বারা বৃঝিয়েছেন:

    المؤمنون هينون لينون كلجمل ان قيد انقاد وان أنيخ على صخرة استنا خ –

    “মু’মিন ব্যক্তি সেই উটের ন্যায় সহিষ্ণু ও সহৃদয় হয়ে থাকে, যার নাকে পতর পরিহিত, তাকে আকর্ষণ করলে আকৃষ্ট হয় আর পাথরের ওপর বসানো হলে বসে পড়ে।” – (তিরমিযি)

    কুরআন মজীদ অত্যন্ত সংক্ষেপে এ সমগ্র বিষয়টি বর্ণনা করেছে:

    اذلة على المؤمنين –

    “তারা মু’মিনদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে।” – (সূরা মায়েদা-৫৪)

    প্রকৃতপক্ষে এ রহমতের গুণটিই মানবিক সম্পর্কের ভেতর নতুন প্রাণ-চেতনার সঞ্চার করে, তার সৌন্দর্য ও সৌকর্যকে পূর্ণত্ব দান করে। এক ব্যক্তি যদি একবার এ রহমতের মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারে, তবে তার দিলকে ঐ সম্পর্ক যার মাধ্যমে সে এ নিয়ামত লাভ করেছে ছিন্ন করার জন্যে সম্মত করানো খুবই কঠিন ব্যাপার হয়ে পড়ে।

    ৬. মার্জনা (عفوٌّ)

    মার্জনা অর্থ মাফ করে দেয়া। অবশ্য এ অর্থের ভেতর থেকে পৃথক পৃথকভাবে অনেক বিষয় শামিল হয়ে থাকে। যেমন-ক্রোধ-দমন, ধৈর্য-স্থৈর্য, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি। কিন্তু এ গুণটির সাথে ওগুলোর যেহেতু ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, তাই ওগুলোকেও আমরা এরই অন্তর্ভূক্ত করে নিচ্ছি। যখন দু’জন লোকের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তখন প্রত্যেকের দ্বারা স্বভাবতঃই এমন কিছু না কিছু ব্যাপার ঘটে যা অন্যের পক্ষে অপ্রীতিকর, তিক্ত, কষ্টদায়ক ও দুঃখজনক। এর কোনোটা তার মনে ক্রোধের সঞ্চার করে, আবার কোনোটা তাকে আইনসঙ্গত প্রতিশোধেরও অধিকার দেয়। কিন্তু এমনি ধরণের পরিস্থিতিতে, ভালোবাসাই বিজয়ী হোক, প্রতিশোধ গ্রহণের মতা থাকা সত্ত্বেও তা থেকে তারা বিরত থাকুক এবং তারা মার্জনা ও ক্ষমাশীলতার নীতি অনুসরণ করুক-একটি প্রেম ভালোবাসার সম্পর্ক তার স্থিতিশীলতার জন্যে এটাই দাবী করে। এটা ছিলো রাসূলে কারীম (সঃ)-এর বিশেষ চরিত্রগুণ। এ জন্যে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বহু জায়গায় নছিহত করেছেন: خذ العفو –

    “নম্রতা ও মাশীলতার নীতি অবলম্বন করো।” – (সূরা আ’রাফ-১৯৯)

    فاعف عنهم واستغفرلهم –

    “তুমি তাদের মাফ করে দাও, তাদের জন্যে মাগফেরাত কামনা করো।” – (আলে ইমরান-১৫৯)

    মুসলমানদের তাকওয়ার গুণাবলী শিখাতে গিয়ে এও বলা হয়েছে:

    والكاظمين الغيظ والعافين عن الناس –

    “যারা নিজেদের রাগকে সংবরন করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে।” – (আলে ইমরান-১৩৪)

    কোন মানুষ যখন কষ্ট পায় অথবা তার কোন ক্ষতি সাধন হয়, তখন সর্বপ্রথম ক্রোধই তার মন-মগজকে আচ্ছন্ন করার প্রয়াস পায়। আর ক্রোধ যদি তার দিল-দিমাগকে অধিকার করতে পারে, তাহলে মার্জনা তো দূরের কথা, সে এমন সব অস্বভাবিক কাণ্ড করে বসে যে, ভবিষ্যতে সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্কের আশাই তিরোহিত হয়ে যায়। এ কারণেই সর্বপ্রথম নিজের ক্রোধকে হজম করার বিষয়েই প্রত্যেকের চিন্তা করা উচিত। মানুষ যতি এ সম্পর্ককে শান্ত মস্তিষ্কে চিন্তা করার অবকাশ পায় আর তারপর মার্জনা করার নীতি অনুসরণ নাও করে তবু অন্তত সে আদলের সীমা লংঘন করবে না। রাসূলে কারীম (সঃ) ক্রোধের অনিষ্টকারিতা সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে সতর্কবাণী উচ্চারণ করে একে দমন করবার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

    ان الغضب ليقسد الايمان كما يفسد الصبر العسل –

    “নিশ্চয় ক্রোধ ঈমানকে এমনিভাবে নষ্ট করে দেয়, যেমন বিষাক্ত ওষুধ মধুকে নষ্ট করে।” – (বায়হাকী-ইবনে ওমর রা.)

    ما تجرع عبد افضل عند الله عز وجل من جرعة غيظ يكظمها ابتغاء وجه الله تعالى –

    “আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে যে ক্রোধের ঢোক গলাধঃকরণ করা হয়, আল্লাহর দৃষ্টিতে তার চাইতে কোন শ্রেষ্ঠ ঢোক বান্দাহ গলাধঃকরণ করে না।” (আহমত-ইবনে ওমর রা.)

    অনুরূপভাবে রাসূলে কারীম (সা) সবরের (ধৈর্য) শিক্ষা দিয়েছেন এবং বলেছেন যে, সম্পর্কচ্ছেদ করার চাইতে দুঃখ কষ্টে সবর অবলম্বন করা ও মিলে মিশে থাকাই হচ্ছে মানুষের শ্রেষ্ঠ আচরণ। তিনি বলেছেন:

    المسلم خالط الناس ويصبر على اذاهم افضل من الذى لا يخالطهم ولا يصبر على اذاهم –

    “যে মুসলমান লোকদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকে এবং তাদের দেয়া দুঃখ-কষ্টে সবর অবলম্বন করে, সে তার চাইতে শেষ্ঠ, যে ব্যক্তির মেলামেশা ছেড়ে দেয় এবং দুঃখ-কষ্টে সবর করে না।” (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ-ইবনে ওমর রা.)

    একবার হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে নছিহত করতে গিয়ে অন্যান্য কথার সঙ্গে তিনি বলেন:

    عبدا ظلم بظلمة فيغضى عنها لله عز وجل الا امر الله بنصره –

    “কোন বান্দাহর ওপর জুলুম করা হলে সে যদি শুধুই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই নীরব থাকে তবে আল্লাহ্ তার বিরাট সাহায্য করেন।” (বায়হাকী- আবু হুরায়রা রা.)

    সবরের পরবর্তী জিনিস হচ্ছে-বদলা ও প্রতিশোধ নেবার মতা থাকা সত্ত্বেও আপন ভাইকে হৃষ্টচিত্তে ক্ষমা করে দেয়া। নবী (সা) বলেছেন: হযরত মূসা (আ.) আল্লাহর কাছে জিজ্ঞেস করেন, বান্দাহ্র ভেতর কে তোমার কাছে প্রিয়। এর জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন:

    من اذا قدر عذر –

    “যে ব্যক্তি প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মাফ করে দেয়া।” (বায়হাকী- আবু হুরায়রা রা.)

    অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ক্ষমা কবুল না করবে, তাকে নবী কারীম (সা)-এ দুঃসংবাদ দিয়েছেন:

    من اعتذر الى اخيه فلم يعتذره او لم يقبل عذره كان عليه مثل خطيئة صاحب مكسٍ –

    “যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের কাছে নিজ অন্যায়ের জন্য ক্ষমা চাইলো এবং সে তাকে ক্ষমা মনে করলো না অথবা তার ক্ষমা কবুল করলো না, তার এতোখানি গোনাহ্ হলো যতোটা (একজন অবৈধ) শুল্ক আদায়কারীর হয়ে থাকে।” (তিরমিযি-সাহল বিন মায়াজ)

    আর যে ব্যক্তি ক্রুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তার ভাইকে ক্ষমা করে দিলো তার জন্যে আখিরাতেও রয়েছে শ্রেষ্ঠতম প্রতিফল। তাই নবী কারীম (সা) বলেছেন:

    من كظم غليظا وهو يقدر على ان ينقذه دعاه الله على رئوس الخلائق يوم القيامة حتى يخيره فى اى الحور شاء –

    “যে ব্যক্তি ক্রোধ চরিতার্থ করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাকে হজম করে ফেললো, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সমস্ত সৃষ্টির সামনে ডাকবেন এবং যে হুরকে ইচ্ছা তাকে মনোনীত করার ইখতেয়ার দিবেন।” (তিরমিযি-সাহল বিন মায়াজ)

    যারা দুনিয়ার জীবনে ক্ষমা করে দেবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের দোষ-ত্র“টি ক্ষমা করে দিবেন।

    وليعفوا وليصفحوا الا تحبون ان يغفرالله لكم والله غفور رَّحيم –

    “তাদের ক্ষমা ও মার্জনার নীতি গ্রহণ করা উচিত। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন? বস্তুত আল্লাহ মার্জনাকারী ও দয়া প্রদর্শনকারী।” (সূরা আন্ নূর-২২)

    অবশ্য অন্যায়ের সমান অন্যায় দ্বারা প্রতিশোধ গ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দেয়, তার প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর হাতে নিবদ্ধ।

    <> وجزاؤ اسيّئة سيّئة مّثلها – فمن عفا واصلح فاجره على الله انه لا يحب الظالمين –

    “অন্যায়ের বদলা সমান পরিমাণের অন্যায়। কিন্তু যে ব্যক্তি ক্ষমা করে দিলো এবং আপোষ-রফা করলো, তার প্রতিফল রয়েছে আল্লাহর কাছে; তিনি জালিমদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আশ্ শুরা-৪০)

    মার্জনার এ গুণটি অর্জন করা কোন সহজ কাজ নয়। এ বড় সাহসের কাজ।

    ولمن صبر وغفر ان ذالك من عزم الامور-

    “যে ব্যক্তি সবর করলো এবং ক্ষমা করে দিলো তো এক বিরাট সাহসের কাজ (করলো)।” (সূরা আশ্ শুরা-৪৩)

    কিন্তু এ জিনিসটাই সম্পর্কের ভেতর অত্যন্ত মহত্ব ও পবিত্রতার সৃষ্টি করে। এ জন্যে এটা নিত্যান্তই একটি গুরুত্বপূর্ণ গুণ।

    এ প্রসঙ্গে আরো দুটো গুণের উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি। একটি হচ্ছে পারস্পারিক আস্থা বা নির্ভরতা, আর দ্বিতীয়টি মূল্যোপলব্ধি।

    ৭. নির্ভরতা

    নির্ভরতা পূর্ণাঙ্গ ধারণার মধ্যে বন্ধুত্ব শব্দটিও। কুরআন যাকে মুসলমানদের পারস্পারিক রূপ নির্ণয়ের জন্যে ব্যবহার করেছে, নিহিত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য, যার কাছে মানুষ তার সমস্ত গোপন বিষয়াদি পূর্ণ নিশ্চিন্ততার সাথে প্রকাশ করতে পারে, তাকেই বলা হয় বন্ধু। আর মানুষ তার সঙ্গীর ওপর নির্ভর করবে এবং জীবনের তাবৎ বিষয়ে তাকে বরাবর শরীক করবে, ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক এটাই তো দাবী করে।

    ৮. মূল্যোপলব্ধি

    এ সর্বশেষ জিনিসটির লক্ষ্য হচ্ছে এই যে, মানুষ তার এ সম্পর্কের গুরুত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে এতোটুকু অবহিত হবে, যাতে করে এর সঠিক মূল্যটা সে উপলব্ধি করতে পারে। আর এটা তখনই সম্ভব হবে, যখন মানুষ কোনক্রমেই তার এ সম্পর্ক ছিন্ন করতে সম্মত হবে না।

    তিন: সম্পর্ককে বিকৃতি থেকে রক্ষা করার উপায়

    এ বুনিয়াদী নীতি ও গুণরাজির আলোকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা) আমাদেরকে বিস্তৃত হেদায়াত প্রদান করেছেন, যাতে করে সম্পর্ককে অভীষ্ট মানে উন্নীত করা যায়। এর ভেতরে কতিপয় জিনিস হচ্ছে নেতিবাচক, এগুলো সম্পর্ককে অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে। আর কতিপয় বিষয় ইতিবাচক, এগুলো তাকে অধিকতর স্থিতি ও প্রীতির সঞ্চার করে।

    সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান নিষিদ্ধ জিনিসটি হচ্ছে অধিকারে হস্তক্ষেপ।

    ১. অধিকারে হস্তক্ষেপ

    এ বিশ্ব জাহানে প্রত্যেক মানুষেরই কিছুনা কিছু অধিকার রয়েছে। এ অধিকার যেমন মানুষের ব্যবহৃত জিনিসপত্রে রয়েছে, তেমনি রয়েছে তার সাথে সম্পর্কযুক্ত মানুষের প্রতি। একজন মুসলমানের কর্তব্য হচ্ছে, তার ভাইয়ের এ উভয়বিধ অধিকারের মধ্যে কোন একটি অধিকারও হরণ করার অপরাধে যাতে সে অপরাধী না হয়, তার প্রতি কঠোর দৃষ্টি রাখা। অর্থ-সম্পদ বা বস্তুগত স্বার্থের ভেতর তার ভাইয়ের যে অধিকার রয়েছে, তা যেমন সে হরণ করবে না, তেমনি তার জান-মাল, ইজ্জত-আব্র“ ও দ্বীনের দিক থেকে তার প্রতি যে কর্তব্য ন্যস্ত হয়েছে, তা পালন করতেও সে বিরত থাকবে না। এ সমস্ত অধিকার সম্পর্কেই কুরআন সবিস্তারে আলোচনা করেছে। মীরাস, বিবাহ, তালাক এবং অন্যান্য প্রতিটি বিষয়েই আল্লাহ্ তাঁর সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে সেগুলোতে হস্তক্ষেপ করার পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কিত খুঁটিনাটি বিবরণ হাদীসে খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। উপরন্তু যে সকল জায়গায় এ সম্পর্কিত বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে সেখানে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অধিকার ও খোদাভীতি সম্পর্কে নছিহত এবং নির্ধারিত সীমা লঙঘনের মন্দ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।

    تلك حدود الله فلا تعتدوها ومن يعتدَّ حدود الله فاولـــئك هم الظالمون –

    “এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা, অতঃএব একে লংঘন করো না। যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমা লংঘন করে, সে-ই জালিম।” (সূরা বাকারা-২২৯)

    تلك حدود الله ومن يطع الله ورسوله يدخله جنات تجرى من تحتها الانهار خالدين فيها وذالك الفوز العظيم- ومن يعص الله ورسوله ويعتدَّ حدوده يدخله نارا خالدا فيها وله عذاب مُّهين –

    “এ হচ্ছে আল্লাহর নির্ধারিত সীমা, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহ্ তাকে এমন বাগিচায় প্রবেশ করাবেন যার নিম্নদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত এবং সেখানে সে চিরকাল থাকবে। এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সাফল্য। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের (সা) নাফরমানী করে এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমা লংঘন করে, আল্লাহ তাকে দোযকের আগুনে নিক্ষেপ করবেন, সেখানে সে চিরদিন অবস্থান করবে এবং তার জন্যে রয়েছে অবমাননাকর শাস্তি।” (সূরা নিসা-১৩-১৪)

    মহানবী (সঃ) এ কথাটি মুসলমানদের সামনে এভাবে বর্ণনা করেছেন:

    من اقتع حق امرء مسلم بيمينه فقد اوجب الله له النار وحرَّم عليه الجنة –

    “যে ব্যক্তি কসম খেয়ে কোন মুসলমানের হক নষ্ট করেছে, আল্লাহ নিঃসন্দেহে তার প্রতি জাহান্নামকে অনিবার্য এবং জান্নতকে হারাম করে দিয়েছেন।

    সাহাবীদের ভেতর থেকে কেউ জিজ্ঞেস করলেন:

    وان كان شيئا يسيرا يا رسول الله ! فقال ان كان قضيبا من اراك –

    “তা যদি কোন মামুলি জিনিস হয়? মহানবী (সা) বললেন: হ্যাঁ, তা যদি পীলো গাছের একটি অকেজো এবং মামুলি ডালও হয়, তবুও।”

    একবার রাসূল (সা) অত্যন্ত মনোরম ভঙ্গিতে একথাটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেন:

    أتدرون المفلس؟ قالوا المفلس فينا من لا درهم له ولا متاع فقال ان المفلس فى امتى من يأتى يوم القيامة بصلوة وصيام وزكوة وياتى قد شتم هذا وقذف هذا واكل مال هذا وسفك دم هذا وضرب هذا فيعطى هذا من حسناته وهذا من حسناته فان فنيت حسناته قبل ان يقضى ما عليه اخذ من خطاياهم فطرحت عليه ثم طرح فى النار –

    “দরিদ্র কে, জানো? সাহাবীগণ (সাধারণ অর্থের দৃষ্টিতে) বললেন: যে ব্যক্তির মাল-মাত্তা নেই, সেই দরিদ্র। রাসূল (সা) বললেন: আমার উম্মতের মধ্যে আসল দরিদ্র হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও যাকাতের ন্যায় আমল নিয়ে আসবে এবং সে সঙ্গে গালি দেয়া, কারুর ওপর অপবাদ দেয়া, কারুর মাল খাওয়া, কারুর রক্তপাত করা এবং কাউকে মারধর করার আমলও নিয়ে আসবে। অতঃপর একজন মজলুমকে তার নেকী দিয়ে দেয়া হবে। তারপর দেয়া হবে দ্বিতীয় মজলুমকে তার নেকী। এভাবে চুড়ান্ত ফায়সালার আগে তার নেকী যদি খতম হয়ে যায়, তাহলে হকদারের পাপ এনে তার ওপর চাপিয়ে দেয়া হবে এবং তারপর তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে।” (মুসলিম- আবু হুরায়রা রা.)

    দুনিয়ার জীবনে সম্পর্ক-সম্বন্ধকে বিকৃতি থেকে রা করা এবং আখিরাতের শাস্তি থেকে বাঁচবার জন্যে অধিকারের পূর্ণ নিরাপত্তা প্রয়োজন। এজন্যেই রাসূলে কারীম (সা) মৃত্যুর আগে মুসলমান ভাইদের কাছ থেকে নিজের দোষত্র“টি মাফ চেয়ে নেবার জন্যে বিশেষভাবে নছিহত করেছেন।

    অধিকারের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রধান বুনিয়াদী জিনিস হচ্ছে এই যে, মুসলমানদের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্র“ তার ভাইয়ের হাত ও মুখ থেকে নিরাপদ থাকবে। এমন কি এ জিনিসটিকে রাসূলে কারীম (সঃ) একজন আবশ্যকীয় গুণাবলীর মধ্যে শামিল করেছেন। তিনি বলেছেন:

    المسلم من سلم المسلمون من لسانه ويده –

    “মুসলমান হচ্ছে সে ব্যক্তি, যার মুখ ও হাত থেকে সমস্ত মুসলমান নিরাপদ।” (বুখারী ও মুসলিম- আব্দুল্লাহ বিন ওমর রা.)

    ২. দেহ ও প্রাণের নিরাপত্তা

    প্রত্যেক মুসলমানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ও মূল্যবান হচ্ছে তার দেহ ও প্রাণ। এ ব্যাপারে যে ব্যক্তি অন্যায়াচরণ করবে, তাকে সে কখনো নিজের ভাই বলে মনে করতে পারে না। তাই নাহক রক্তপাত থেকে মুসলমানদেরকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে:

    ومن يقتل مؤمنا متعمدا فجزائه جهنم خالدا فيها وغضب الله عليه ولعنه واعدله عذابا عظيما –

    “যে ব্যক্তি কোন মু’মিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার পুরস্কার হচ্ছে জাহান্নাম। সেখানে সে চিরদিন থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি গজব ও লা’নত বর্ষণ করেছেন এবং তার জন্যে নির্দিষ্ট করে রেখেছেন কঠোরতম শাস্তি।” (সূরা নিসা-৯৩)

    বিদায় হজ্জের কালে রাসূল (সা) অত্যন্ত মনোজ্ঞ ভাষায় মুসলমানদের প্রতি পরস্পরের জান-মাল ও ইজ্জত-আব্র“কে সম্মনার্হ বলে ঘোষণা করেন এবং তারপর বলেন: ‘দেখো, আমার পরে তোমরা কাফের হয়ে যেয়োনা এবং পরস্পরের গলা কাটতে শুরু করো না।’

    এভাবে একবার তিনি বলেন:

    سباب المسلم فسوق وقتاله كفرً-

    ‘মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী আর তার সঙ্গে লড়াই করা হচ্ছে কুফুরী।’ (বুখারী ও মুসলিম)

    হাতের চাইতে মুখের অপব্যবহার পারস্পারিক সম্পর্ককে অত্যন্ত নাজুক করে তোলে। এ জিনিসটি অসংখ্য দিক দিয়ে ফেতনার সৃষ্টি করতে থাকে। আর প্রত্যেকটি ফেতনাই এতো জটিল যে, তার নিরসন করা অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার। এজন্যেই এ শ্রেণীর ফেতনার সামনে অন্তরায় সৃষ্টি করাই সবচাইতে বেশী প্রয়োজন। তাই আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল (সা) মুখের ব্যবহার সম্পর্ক যেমন অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, তেমনি সম্পর্কের চৌহদ্দীর মধ্যে বিকৃতি ও বিপর্যয়ের প্রত্যেকটি কারণকে চিহ্নিত করে সেগুলোকে প্রতিরোধ করার পন্থা বাতলে দিয়েছেন।

    আল কুরআন মুসলমানদের বলছে:

    ما يلفظ من قول الا لديه رقيب عتيد –

    “তার মুখ দিয়ে কোন কথা বেরোয় না, কিন্তু তার কাছে হাজির রয়েছেন একজন নিয়ামক।” (সূরা ক্বফ-১৮)

    একদা রাসূলে কারীম (সা) হযরত মা’য়াজকে (রা.) বিভিন্ন নছিহত করার পর নিজের জিহ্বা আঁকড়ে ধরে বলেন: كف عليك هذا তোমার কর্তব্য হচ্ছে একে বিরত রাখা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল (সা)! আমরা যা কিছু বলা-বলি করি, সে সম্পর্কেও কি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে? তিনি বললেন:

    هل يكبَّ الناس على وجوههم الا حصائد ألسنتهم –

    “জবানের কামাই (অর্থাৎ ভাষা) ছাড়া আর কোন্ জিনিস মানুষকে দোযখের আগুনে নিক্ষেপ করবে?” (তিরমিযি-মু’য়াজ ইবনে জাবাল)

    সুফিয়ান বিন আব্দুল্লাহ্ জিজ্ঞেস করলেন: ‘নিজের ব্যাপারে কোন জিনিসটাকে সবচাইতে বেশী ভয় করবো?’ রাসূল (সা) নিজের জিহ্বা ধরে বললেন: ‘একে’।

    ৩. কটু ভাষণ ও গালাগাল

    কোন ভাইকে সাক্ষাতে গালাগাল করা, তার সঙ্গে কটু ভাষায় কথা বলা এবং তাকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ। অনুরূপভাবে বিকৃত নামে ডাকাও এর আওতায় এসে যায়। এ সম্পর্কে আল কুরআনে বলা হয়েছে:

    ولا تنابزوا بالالقاب بئس الاسم الفسوق بعد الايمان –

    “আর বদনাম করোনা বিকৃতির উপাধির সঙ্গে, ঈমানের পর বিকৃত নামকরণ হচ্ছে বদকারী।” (সূরা হুজরাত-১১)

    অনুরূপভাবে রাসূল (সা) বলেছেন:

    لا يدخل الجنة الجواط الجعظرى –

    “কোন কটুভাষী ও বদ-স্বভাব বিশিষ্ট ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (আবু দাউদ, বায়হাকী-হারিস বিন ওয়াহাব)

    ان ابغضكم الى وابغضكم منى عبسا يوم القيامة الثارثرون المتشدقون المتفيهقون –

    “কিয়ামতের দিন আমার দৃষ্টিতে সবচাইতে অভিশপ্ত এবং আমার থেকে সবচাইতে দূরে থাকবে বাচাল, অশ্লীলভাষী, ইলমের মিথ্যা দাবীদার ও অহংকারী ব্যক্তিগণ।” (তিরমিযি-জাবির রা.)

    ليس المؤمن بالطّعّان ولا بالَّعان ولا الفاحش ولا البذى –

    “মু’মিন না বিদ্রুপকারী হয়, না লা’নত দানকারী, না অশ্লীলভাষী আর না বাচাল হয়।” (তিরমিযি-ইবনে মাসউদ রাঃ)

    মোটকথা, মু’মিন তার ভাইয়ের সামনে তার মান-ইজ্জতের ওপর কোনরূপ হামলা করবে না।

    ৪. গীবত

    অপর একটি ফেতনা হচ্ছে গীবত। এটা আগেরটির চেয়েও বেশী গুরুতর। কারণ এতে মানুষ তার ভাইয়ের সামনে নয় বরং তার পেছনে বসে নিন্দাবাদ করে। তাই কুরআন গীবতকে আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাবার সঙ্গে তুলনা করেছে:

    لا يغتب بعضكم بعضا – أيحب أحدكم أن يأكل لحم اخيه ميتا فكرهتموه –

    “কেউ কারো গীবত করো না। তোমরা কি কেউ আপন মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে? একে তো তোমরা অবশ্যই ঘৃণা করবে।” (সূরা হুজরাত-১২)

    রাসূলে কারীম (সা) গীবতের সংজ্ঞা দান প্রসঙ্গে একবার সাহাবীদের কাছে জিজ্ঞাসা করেন: ‘গীবত কি তা তোমরা জানো?’

    সাহাবীগণ বলেন: ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন।’ তিনি বললেন:

    ذكرك اخاك بما يكره فقيل ارايت ان كان فى اخى ما اقول قال ان كان فيه ما تقول فقد اغتبته وان لم يكن فيه ما تقول فقد بهته –

    “গীবত হচ্ছে এই যে, তোমার ভইয়ের পছন্দনীয় নয়, এমনভাবে তার চর্চা করা। বলা হলো, আমার ভাইয়ের মধ্যে যদি উল্লেখিত খারাবী বর্তমান থাকে? রাসূল (সা) বললেন: তোমরা যদি এমন খারাবীর কথা উল্লেখ করো, যা তার মধ্যে বর্তমান রয়েছে, তবে তো গীবত করলে। আর তার মধ্যে যদি তা বর্তমান না থাকে তো তার ওপর অপবাদ চাপিয়ে দিলে।” (মুসলিম-আবু হুরায়রা রা.)

    বস্তুত একজন মুসলিম ভাইয়ের মান-ইজ্জত দাবী করে যে, তার ভাই যেনো পেছনে বসে নিন্দাবাদ না করে।

    ৫. চোগলখুরী

    গীবতের একটি রূপ হচ্ছে চোগলখুরী। আল কুরআন এর নিন্দা করতে গিয়ে বলেছে:

    همَّازٍ مَّشّاء بنميم –

    ‘যারা লোকদের প্রতি বিদ্রুপ প্রদর্শন করে এবং চোগলখুরী করে বেড়ায়।’ (সূরা কালাম-১১)

    হযরত হোজায়ফা (রা.) বলেন:

    ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছি চোগলখোর জান্নাতে যাবে না।’

    রাসূলে কারীম (সা) সঙ্গীদেরকে বিশেষভাবে নছিহত করে বলেন:

    لا يبلغنى احد من اصابى شيئا فانى احبَّ ان اخرج اليكم وانا سليم الصدر –

    “কোন ব্যক্তি কারো সম্পর্কে কোন খারাপ কথা আমার কাছে পৌঁছাবে না, কারণ আমি যখন তোমাদের কাছে আসি, তখন সবার প্রতিই আমার মন পরিস্কার থাকুকু-এটাই আমি পছন্দ করি।” (আবু দাউদ-ইবনে মাসউদ রা.)

    গীবত ও চোগলখুরীর মধ্যে জবান ছাড়াও হাত, পা ও চোখের সাহায্যে দুস্কৃতি করাও অন্তর্ভুক্ত।

    ৬. শরমিন্দা করা

    দুস্কৃতিরই একটি গুরুতর সৃষ্টিকারী এবং মানব মনে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী রূপ হচ্ছে- আপন ভাইকে তার সাক্ষাতে বা অন্য লোকের সামনে তার দোষ-ত্র“টির জন্যে লজ্জা দেয়া এবং এভাবে অবমাননা করা। এমন আচরণের ফলে তার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে যায়। কারণ এমনি অবমাননা কোন মানুষই সহ্য করতে পারে না।

    আল কুরআনে বলা হয়েছে:

    ولا تلمزوا انفسكم –

    ‘আপন ভাইয়ের প্রতি দোষারোপ করো না।’ (সূরা হুজরাত-১১)

    একটি হাদীসে রাসূলে কারীম (সা) বলেছেন: যে ব্যক্তি তার ভাইকে কোন গুনাহ্র জন্যে লজ্জা দিলো তার দ্বারা সেই গুনাহর কাজ না হওয়া পর্যন্ত সে মৃত্যুবরণ করবে না।

    من غيَّر اخاه بذنب لم يمت حتى يعمله –

    হযরত ইবনে ওমর (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে হযরত (সঃ) মুসলমানদের কতিপয় কর্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তাতে তিনি বলেছেন: ‘তাদেরকে কোন দোষ বা গোনাহর লক্ষ্য বানিয়ে শরমিন্দা ও অপমানিত করো না। (তিরমিযি)

    ৭. ছিদ্রান্বেষণ

    দোষারোপ করে শরমিন্দা করার আগে আর একটি খারাপ কাজ রয়েছে। তা হচ্ছে, আপন ভাইয়ের দোষ খুঁজে বোড়ানো, তার ছিদ্রান্বেষণ করা। কারণ, যার ছিদ্রান্বেণ করা হয় সে যেন অপ্রতিভূত হয়, তার দোষত্রুটি যার গোচুরীভুত হয়, তার মনেও বিরূপ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়। যেহেতু ছিদ্রান্বেষণ কোন নির্ভরযোগ্য অন্বেষণ উপায়ের ধার ধারে না এজন্যই সাধারনত বাজে অন্বেষণ উপায়ের উপর নির্ভর করে আপন ভাই সম্পর্কে বিরূপ ধারণা তথা সন্দেহ পোষনের মতো গুরুতর অপরাধে লিপ্ত হবার সম্ভাবনাই থাকে বেশী। এ জন্যে আল কুরআন বিরূপ ধারণার সঙ্গে সঙ্গেই মুসলমানদের বলেছে:

    ولا تجسَّسوا

    ‘আর দোষ খূঁজে বেড়িয়ো না।’ (সূরা হুজরাত-১২)

    নবী কারীম (সা)ও এ সম্পর্কে বলেছেন:

    ولا تتَّبعوا عوراتهم فانه من يتَّبع عورة اخيه المسلم يتَّبع الله عورته ومن يتَّبع الله عورته يفضحه ولو فى جوف رحله –

    ‘মুসলমানদের দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না। কারণ, যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ ও গুনাহ্ খুঁজতে থাকে, আল্লাহ্ তার গোপন দোষ ফাঁস করতে লেগে যান। আর আল্লাহ যার দোষ প্রকাশ করতে লেগে যান, তাকে তিনি অপমান করেই ছাড়েন-সে তার ঘরের মধ্যেই লুকিয়ে থাকুক না কেন।’ (তিরমিযি- আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা.)

    ৮. উপহাস করা

    জবানের দুস্কৃতির মধ্যে আর একটি মারাত্মক দুস্কৃতি-যা এক ভাই থেকে অন্য ভাইকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়-তা হচ্ছে ঠাট্টা বা উপহাস করা। অর্থাৎ আপন ভাইকে এমনিভাবে ঠাট্টা বিদ্রুপ করা, যার মধ্যে হেয় প্রতিপন্নের সূর মিশ্রিত রয়েছে, বরং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করা এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠতর মনে করারই ফল হচ্ছে উপহাস। তাই আল কুরআন এ সম্পর্কে নিম্নোক্ত ভাষায় সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেঃ

    يايُّها الذين امنوا لا يسخر قوم من قوم عسى ان يَّكونوا خيرًا منهم ولا نساء من نساءٍ عسى ان يّكنًّ خيرًا منهنَّ-

    ‘হে ঈমানদারগণ! কোন সম্প্রদায় অপর কোন সম্প্রদায়কে ঠাট্টা করোনা, সম্ভবতঃ সে তার চাইতে শ্রেষ্ঠ হবে। আর কোন নারী অপর কোন নারীকে ঠাট্টা করো না, সম্ভবতঃ সে শ্রেষ্ঠ হবে তার চাইতে।’ (সূরা হুজরাত-১১)

    যে ব্যক্তি তার কোন মুসলমান ভাইকে উপহাস করে, আখিরাতে তার ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সা) নিম্নরূপ বর্ণনা দিয়েছেনঃ

    انَّ المستهزئين بالناس يفتح لاحدهم فى الاخرة باب من الجنة فيقال له هلمَّ فيجئُّ بكربه وغمِّه فاذا جاءه اغلق دونه ثم يفتح له باب اخر فيقال له هلمَّ فيجئُّ بكربه وغمِّه فاذا جاءه اغلق دونه فما يزال كذالك حتى انَّ احدهم ليفتح له الباب من ابواب الجنة فيقال له هلمَّ فما يأتيه من الياس-

    ‘লোকদের প্রতি বিদ্রুপ প্রদর্শনকারী ব্যক্তির জন্যে কিয়ামতের দিন জান্নাতের একটি দরজা খোলা হবে। এবং তাকে বলা হবে, ‘ভেতরে আসুন’। সে কষ্ট করে সেদিকে আসবে এবং দরজা পর্যন্ত পৌঁছতেই তার সামনে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। অতঃপর দ্বিতীয় দরজা খুলে বলা হবে, ‘আসুন\’ ‘বসুন’। সে আবার কষ্ট করে আসবে, যেইমাত্র সে কাছাকাছি পৌঁছবে অমনি দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। এ ঘটনা পরস্পরা এমনিভাবেই অব্যহত থাকবে। এমনকি এক সময়ে তার জন্যে জান্নাতের দরজা খুলে বলা হবে, ‘আসুন’। তখন সে নৈরাশ্যের কারণে সেদিকে যেতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে সাহসই পাবে না।’ (বায়হাকী)

    উপহাসের একপি রূপ হচ্ছে, অন্য লোকের দোষত্রুটি নিয়ে ব্যঙ্গ করা। একবার হযরত আয়েশা (রাঃ) কারো ব্যঙ্গ করলে রাসূল (সা) অত্যন্ত অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন:

    ما احب انى حكيت احدا وانَّ لى كذا وكذا –

    ‘আমি কারুর ব্যঙ্গ করাকে পছন্দ করি না- তার বিনিময়ে আমাকে অমুক অমুক জিনিস দেয়া হোক না কেন (অর্থাৎ যে কোন দুনিয়াবী নিয়ামত)। (তিরমিযি-আয়েশা রা.)

    ৯. তুচ্ছ জ্ঞান করা

    যে বস্তুটি মনের ভেতর চাপা থাকে এবং বাহ্যত তা গালি দেয়া, লজ্জা দেয়া, গীবত করা, চোগলখুরী করা ও উপহাস করার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তা হচ্ছে আপন ভাইকে নিজের চাইতে তুচ্ছ জ্ঞান করা। বস্তুত এমনি উচ্চমন্যোতাবোধ সৃষ্টির পরই মানুষ তার ভাই সম্পর্কে এ শ্রেণীর আচরণ করার সাহস পায়। নচেৎ আপন ভাইকে যে ব্যক্তি নিজের চাইতে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করবে, সে কখনো এ ধরণের কাজ করতে পারে না। এজন্যই আল কুরআন উপহাস থেকে বিরত রাখার সময় এ ইংগিত প্রদান করেছে যে, মানুষ যদি চিন্তা করে দেখে যে, তার ভাই তার চাইতে শ্রেষ্ঠ হতে পারে, তবে সে কখনো তাকে বিদ্রুপ করবে না।

    عسى ان يَّكونوا خيرًا مِّنهم –

    ‘হতে পারে সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম।’ (সূরা হুজরাত-১১)

    সাহাবীদের ভেতর থেকে কেউ জিজ্ঞেস করলেন – ঈমান ও তাকওয়ার সাথে একজন মু’মিন ও মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান অথবা তার সম্পর্কে নীচ ও নিকৃষ্ট ধারণায় কখনো একত্রিত হতে পারে না। কারণ, প্রত্যেক ব্যক্তির মান-সম্ভ্রমের মানদণ্ড হচ্ছে তাকওয়া এবং এর প্রকৃত মীমাংসা হবে আখিরাতে আল্লাহ্র দরাবারে। সুতরাং দুনিয়ায় আপন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করার মানেই হচ্ছে সে ব্যক্তি ঈমানের প্রকৃত মূল্যমানকে এখনো বুঝতে পারেনি। একবার রাসূলে কারীম (সাঃ) এক বিরাট তাৎপর্যপূর্ণ হাদীসে তাকওয়াকে অন্তরের জিনিস আখ্যা দিয়ে বলেন:

    يحسب امرء مِّن الَِّشرِّ ان يُّحقر اخاه المسلم –

    ‘এক ব্যক্তির গুণাহ্গার হবার জন্যে এতোটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে নীচ জ্ঞান করে।’ (মুসলিম-আবু হুরায়রা রা.)

    অপর একটি বর্ণনায় রাসূল (সা) এমনিভাবে বলেন:

    ولا يخذ له ولا يحقره –

    ‘কোন মুসলমান অপর মুসলমানকে না অপমান করবে আর না তুচ্ছ জ্ঞান করবে।’

    একদা রাসূল (সা) বলেন যে, যার দিলে অনুপরিমাণও অহংকার تعد থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। অতঃপর এক ব্যক্তির প্রশ্নের জাবাবে তিনি অহংকারের ব্যাখ্যা দান করে বলেন:

    يطر الحقِّ وغمط النَّاس –

    ‘অহংকার বলতে বুঝায় সত্যকে অস্বীকার এবং লোকদের নীচ জ্ঞান করা।’ (মুসলিম-ইবনে মাসউদ রা.)

    একটি হাদীসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) তিনটি নাজাতদানকারী এবং তিনটি ধ্বংসকারী বিষয় উল্লেখ করে বলেন:

    اعجاب المرء بنفسه وهى اشدُّ هُنَّ –

    ‘একটি ধ্বংসকারী জিনিস হচ্ছে নিজেকে নিজে বুজুর্গ ও শ্রেষ্ঠতম মনে করা আর এটা হচ্ছে নিকৃষ্টতম অভ্যাস।’ (বায়হাকী- আবু হুরায়রা রা.)

    আজকের সমাজ-পরিবেশ শুধু নিজেদের বন্ধু-সহকর্মীদের সঙ্গেই নয়, বরং সাধারণ মুসলমানদের সাথে আচরণের বেলায়ও ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের এদিক দিয়ে আত্মানুশীলন করা উচিত।

    ১০. নিকৃষ্ট অনুমান

    অনুমানের ব্যাধি এক গুরুতর ব্যাধি। এ ব্যাধি পারস্পরিক সম্পর্কে ঘুণ ধরিয়ে দেয় এবং তাকে অন্তঃসারশূণ্য করে ফেলে। প্রচলিত অর্থে অনুমান বলতে বুঝায় এমনি ধারণাকে, যার পেছনে কোন স্পষ্ট সাক্ষ্য প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। আর এমনি ধারণা যখন নিকৃষ্ট হয়, তখন তাকেই বলা হয় সন্দেহ। কোন মুসলমান যদি তার ভাই সম্পর্কে কোন প্রত্যক্ষ জ্ঞান ছাড়াই সন্দেহ করতে শুরু করে, তবে সেখান থেকে প্রেম-ভালোবাসা বিদায় গ্রহণ করতে বাধ্য। তাই আল কুরআন এ সম্পর্কে বলেছে:

    يايها الذين امنوا اجتـنبوا كثيرًا من الظَّنِّ انَّ بعض الظَّنِّ اثم –

    ‘হে ঈমানদারগণ! বহু অনুমান থেকে তোমরা বেঁচে থাকো, নিঃসন্দেহে কোন কোন অনুমান হচ্ছে গুনাহ্।’ (সূরা হুজরাত-১২)

    রাসূল (সা) তাঁর সঙ্গীদেরকে নিম্নোক্ত ভাষায় বলেছেন:

    ايّاكم والظّنِّ فانَّ الظَّنَّ اكذب الحديث –

    ‘তোমরা অনুমান পরিহার করো, কেননা অনুমান হচ্ছে নিকৃষ্টতম মিথ্যা কথা।’ (বুখারী ও মুসলিম-আবু হুরায়রা রা.)

    অনুমান সন্দেহ থেকে বাঁচার সবচাইতে বড় উপায় হলো এই যে, মানুষ তার ভাইয়ের নিয়্যাত সম্পর্কে কোন কারাপ ধারণা পোষণ করবে না, কোন খারাপ মন্তব্যও করবে না। কারণ, নিয়্যাত এমনি জিনিস যে, সে সম্পর্কে কোন স্পষ্ট বা প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে সর্বদাই অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আরো কয়েকটি কথা সামনে রাখলে সহজেই এ ব্যাধিটির প্রতিকার সম্ভব হবে।

    প্রথম কথা এই যে, আপন ভাই সম্পর্কে অনুমান বা সন্দেহ পোষন না করা যেমন প্রত্যেক মুসলমানের অব্যশ্য কর্তব্য, তেমনি নিজের সম্পর্কে অপরকে সন্দেহ পোষণের সুযোগ না দেয়াও তার কর্তব্য। তাই সন্দেহের সুযোগ দানকারী বিষয়কে যতদূর সম্ভব পরিহার করতে হবে। অপরকে কোন অবস্থায়ই ফেতনায় ফেলা উচিত নয়, এ সম্পর্কে স্বয়ং নবী কারীম (সা) দৃষ্টান্ত পেশ করেছেন। একবার তিনি ই’তেকাফে বসেছিলেন। রাতে তাঁর জনৈকা স্ত্রী তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে এলেন। ফিরতি পথে তিনি তাঁকে এগিয়ে দিতে চললেন। ঘটনাক্রমে দু’জন আনসারের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। তারা তাঁকে স্ত্রীলোকের সঙ্গে দেখে নিজেদের আগমনকে ‘অসময়’ মনে করে ফিরে চললেন। অমনি তিনি তাদেরকে ডেকে বললেন: ‘শোনো, এ হচ্ছে আমার অমুক স্ত্রী’। আনসারদ্বয় বললেন: ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্! কারো প্রতি যদি আমাদের সন্দেহ পোষণ করতেই হতো তবে কি আপনার প্রতি করতাম?’ তিনি বললেন: ‘শয়তান মানুষের ভেতর রক্তের ন্যায় ছুটে থাকে।’

    দ্বিতীয়তঃ যদি এড়াবার চেষ্টা সত্ত্বেও সন্দেহের সৃষ্টি হয়ই, তবে তাকে মনের মধ্যে চেপে রাখবে না। কারণ মনের মধ্যে সন্দেহ চেপে রাখা খিয়ানতের শামিল। বরং অবিলম্বে গিয়ে নিজের ভাইয়ের কাছে তা প্রকাশ করবে, যাতে করে সে তার নিরসন করতে পারে। অপরদিকে যার প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করা হবে, সে চুপচাপ বসে না থেকে সঙ্গে সঙ্গেই তার অপনোদন করবে। নচেৎ এ গুনাহর অনেকখানি তার নিজের ঘাড়েও চাপতে পারে।

    ১১. অপবাদ

    জেনে-শুনে নিজের ভাইকে অপরাধী ভাবা অথবা তার প্রতি কোন অকৃত গুনাহ্, আরোপ করাকে বলা হয় অপবাদ। এটা স্পষ্টত এক ধরণের মিথ্যা ও খিয়ানত। এ অপবাদেরই আর একটি নিকৃষ্টতর রূপ হচ্ছে নিজের গুনাহকে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া। এ সম্পর্কে আল কুরআন বলেছে:

    ومن يكسب خطيئة او اثما ثمَّ يرم به بريئًا فقد احتمل بهتانا وَّاثمًا مُّبينا –

    ‘যে ব্যক্তি কোন গুনাহ্ বা নাফরমানী করলো এবং তারপর এক নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর তার অপবাদ আরোপ করলো, সে এক মহাক্ষতি এবং স্পষ্ট গুনাহ্কেই নিজের মাথায় চাপিয়ে নিলো।’ (সূরা নিরা-১১২)

    এভাবে মুসলমানদের মিথ্যা অপবাদ দেয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে:

    والذين يؤذون المؤمنين والمؤمنات بغير ما اكتسبوا فقد احتملوا بهتانا وَّاثما مُّبينا –

    ‘যারা মুসলমান পুরুষ ও মুসলমান নারীর প্রতি মিথ্যা আপবাদ চাপিয়ে কষ্ট দেয়, তারা আপন মাথায় ‘বুহতান’ ও স্পষ্ট গুনাহ্ চাপিয়ে নিলো।’ (সূরা আহযাব-৫৮)

    বস্তুত একটি ভালোবাসার সম্পর্কে এমন আচরণের কতোখানি অবকাশ থাকতে পারে?

    ১২. ক্ষতি সাধন

    তি শব্দটিও অত্যন্ত ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এখানে এর অর্থ হচ্ছে এই যে, কোন মুসলমানের দ্বারা তার ভাইয়ের যাতে কোন ক্ষতি সাধন না হয়, এর প্রতি সে লক্ষ্য রাখবে। এ ক্ষতি দৈহিকও হতে পারে, মানসিকও হতে পারে। এ সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সঃ) অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছেন:

    ملعون من ضارُّمؤمنا او مكربه-

    ‘যে ব্যক্তি কোন মু’মিনের ক্ষতি সাধন করে অথবা কারো সঙ্গে ধোকাবাজী করে, সে হচ্ছে অভিশপ্ত।’ (তিরমিযি, আবু বকর সিদ্দিক রা.)

    “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের ক্ষতিসাধন করলো, আল্লাহ তার ক্ষতিসাধন করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের কষ্ট দিলো আল্লাহ তাকে কষ্ট দিবেন। (ইবনে মাযাহ, তিরমিযি)

    ১৩. মনোকষ্ট

    কোন মুসলমানের পে তার ভাইয়ের মনে কষ্ট দেয়া নিশ্চিতরূপে এক অবাঞ্চিত কাজ। এমন কাজকে আদৌ প্রশ্রয় দেয়া উচিত নয়। এক ভাইয়ের মন অন্য ভাইয়ের দ্বারা কয়েকটি কারণে কষ্ট পেতে পারে। এ সম্পর্কিত বড় বড় কারণগুলো ছাড়াও জীবনের খুঁটিনাটি ব্যাপারে মানুষের মেজাজ ও প্রকাশভংগীও মনোকষ্টের একটা কারণ হতে পারে। এ ব্যাপারে নীতিগত কথা এই যে, কোন মুসলমানের দ্বারা তার ভাইয়ের মন যাতে কষ্ট না পায় অথবা তার অনুভূতিতে আঘাত না লাগে, তার জন্যে তার চেষ্টা করা উচিত।

    গীবতের মতো গুরুতর অপরাধেরও ভিত্তি হচ্ছে এটি। তাই গীবতের সংজ্ঞা হচ্ছে এই যে, কারো সম্পর্কে এমনি আলোচনা করা, যা তার কাছে পছন্দনীয় নয় অথবা তার মনোকষ্টের কারণ হতে পারে।

    রাসূলে কারীম (সা) বলেছেন: ‘যখন তিন ব্যক্তি একত্রিত হবে, তখন দু’জনে কোন কানালাপ করবে না। অবশ্য অনেক লোক যদি জমায়েত হয়, তবে এমন করা যেতে পারে।’ এই হুকুমের যে কারণ বর্ণিত হয়েছে, তা হচ্ছে এই:

    من اجل ان يَّحزنه –

    ‘এই ভয়ে যে, সে দুশ্চিন্তায় পড়ে।’ (মুসলিম-আবু আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ)

    ইমলামের দেয়া এ নিয়ম-কানূনগুলোর প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে জানা যাবে যে, কোন মুসলমান ভাইয়ের মনে কষ্ট না দেয়া এর পেছনে একটি বুনিয়াদী নীতি হিসেবে ক্রিয়াশীল রয়েছে। মুসলমানকে কষ্ট দেয়া দ্বীনি দৃষ্টিকোন থেকেও অত্যন্ত অন্যায়। তাই এ সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সা) বলেছেন:

    من اذى مسلما فقد اذى الله –

    ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলমানকে কষ্ট দিলো, সে আল্লাহকেই কষ্ট দিলো।’ (তিরমিযি- আনাস রা.)

    পান্তরে কারো মনকে খুশী করার উদ্দেশ্যে কোন কাজ করা হলে সে সম্পর্কে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে:

    من قضى لاحد من امَّتى حاجَّة يُّريد ان يُّسرَّه بها فقد سرَّنى ومن سرَّنى فقد سرَّالله ومن سرّالله ادخله الله الجنة –

    ‘যে ব্যক্তি আমার কোন উম্মতকে খুশী করার উদ্দেশ্যে তার প্রয়োজন পূর্ণ করলো, সে আমাকে খুশী করলো। যে আমাকে খুশী করলো, সে আল্লাহকেই খুশী করলো। আর যে আল্লাহকে খুশী করলো, আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করে দেবেন।’ (বায়হাকী- আনাস রা.)

    এখানে রাসূলে কারীম (সা) এর এ কথাটিও স্মর্তব্য: ‘মুমিন হচ্ছে প্রেম-ভালোবাসার উজ্জল প্রতীক। যে ব্যক্তি কারো প্রতি ভালোবাসা পোষণ করে না এবং তার প্রতিও কেউ ভালোবাসা রাখে না, তার ভেতর কল্যাণ নেই।’

    মনোকষ্ট সাধারণতঃ হাসি-তামাসার মাধ্যমে উত্যক্ত করার ফলেই হয়ে থাকে। অর্থাৎ এমনভাবে হাসি তামাসা করা, যাতে অপর ব্যক্তি বিব্রত হয় এবং তার মনে কষ্ট লাগে।

    একবার সাহাবীগণ রাসূল (সঃ) এর সঙ্গে সফর করছিলেন। পথে এক জায়গায় কাফেলার রাত্রিযাপনকালে এক ব্যক্তি তার অপর এক ঘুমন্ত সঙ্গীর রশি তুলে নিলো এবং এভাবে তাকে বিব্রত করলো। এ কথা জানতে পেরে রাসূলে কারীম (সা) বললেন:

    لا يحلُّ للمسلم ان يَّروع مسلماً –

    ‘কোন মুসলমানকে হাসি-তামাসার মাধ্যমে উত্যক্ত করা মুসলমানের পক্ষে হালাল নয়।’ (আহমদ, আবু দাউদ, তিরমিযি-আব্দুর রহমান রা.)

    অনুরূপভাবে একবার অস্ত্র গোপন করার এক ঘটনা ঘটলে রাসূল (সা) এই বলে নিষেধ করলেন:

    ان يَّروع المؤمن او ان يُّؤخذ متاعه لا لعبا وَّلا جدَّا –

    ‘কোন মু’মিনকে ভয় দেখানো এবং হাসি-তামাসা করে অথবা বাস্তবিক পক্ষে কারো কোন জিনিস নিয়ে যাওয়া জায়েজ নয়।’

    ১৪. ধোঁকা দেয়া

    কথাবার্তা বা লেনদেনে আপন ভাইকে ধোঁকা দেয়া বা মিথ্যা কথা বলা সম্পর্কে মুসলমানদেরকে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। কারণ যেখানে এক পক্ষে অন্য পক্ষের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে, সেখানে একজন অপরজনের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আর যেখানে এক ব্যক্তির কথা অন্য ব্যক্তির পক্ষে নির্ভরযোগ্য করতে নয় সেখানে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও পারস্পারিক আস্থা কিছুতেই বর্তমান থাকতে পারে না। হাদীস শরীফে এ জিনিসটাকেই ‘নিকৃষ্টতম খিয়ানত’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন:

    قال كبرت خيانة ان تحدث اخاك حديثا هولك مصدق وانت به كاذبٌ –

    ‘সব চাইতে বড় খিয়ানত হচ্ছে এই যে, তুমি তোমার ভাইকে কোন কথা বললে সে তোমাকে সত্যবাদী মনে করলো; অথচ তুমি তাকে মিথ্যা কথা বললে।’ (তিরমিযি-সুফিয়ান বিন আসাদ)

    ১৫. হিংসা

    হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা এক ঘৃণ্য ব্যাধি। এ ব্যাধিটা যদি মানুষের মনে একবার ঠাঁই পায় তাহলে আন্তরিক সম্পর্কই শুধু ছিন্ন হয় না, লোকদের ঈমানও বিপন্ন হয়ে পড়ে। হিংসার সংজ্ঞা এই যে, কোন মানুষের প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার দেয়া কোন নিয়ামত, যেমন ধন-দৌলত, জ্ঞান-বুদ্ধি বা সৌন্দর্য সুষমাকে পছন্দ না করা এবং তার থেকে এ নিয়ামতগুলো ছিনিয়ে নেয়া হউক, মনে প্রাণে এটা কামনা করা। হিংসার ভেতর নিজের জন্যে নিয়ামতের আকাঙ্খার চাইতে অন্যের থেকে ছিনিয়ে নেয়ার আকাঙ্খাটাই প্রবল থাকে।

    হিংসার মূলে থাকে কখনো বিদ্বেষ ও শত্রুতা, কখনো ব্যক্তিগত অহমিকা ও অপরের সম্পর্কে হীনমন্যতাবোধ, কখনো অন্যকে অনুগত বানানোর প্রেরণা, কখনো কোন সম্মিলিত কাজে নিজের ব্যর্থতা ও অপরের সাফল্য লাভ, আবার কখনো শুধু মান-ইজ্জত লাভের আকাঙ্খাই এর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হিংসা সম্পর্কে নবী কারীম (সা) এ মর্মে সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন:

    ايَّاكم والحسد فانَّ الحسد يأكل الحسنات كما تأكل النّار الحطب –

    “তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাক। কারণ, আগুন যেমন লাকড়িকে (কাঠ) খেয়ে ফেলে, হিংসা তেমনি নেকী ও পুণ্যকে খেয়ে ফেলে।” (আবু দাউদ-আবু হুরায়রা রা.)

    আর এ জিনিসটি থেকেই আল কুরআন প্রত্যেক মুসলমানকে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছে:

    من شرِّ حاسدٍ اذا حسد –

    “এবং (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে।” (সূরা ফালাক-৫)

    একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীসে নবী কারীম (সঃ) ভ্রাতৃত্ব সম্পর্কের জন্যে অপরিহার্য কতকগুলো বিষয়ের প্রতি অংগুলি নির্দেশ করেছেন। উক্ত হাদীসের এক অংশে নিকৃষ্ট অনুমান প্রসঙ্গে উল্লেখিত হয়েছে। বাকী অংশে রাসূল (সা) বলেন:

    ولا تجسَّسوا ولا تناجشوا ولا تحاسدوا ولا تباغضوا ولا تدابروا ولا تنافسوا وكونوا عباد الله اخوانا –

    “কারো দোষ খুঁজে বেড়িয়ো না, কারো ব্যবসায়-বাণিজ্যের ক্ষতি করো না, পরস্পরে হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পরে শত্রুতা রেখোনা, পরস্পর সম্পর্কহীন থেকো না, পরস্পরে লোভ-লালসা করো না বরং আল্লাহর বান্দাহ্ ও ভাই ভাই হয়ে থাকো।” (বুখারী ও মুসলিম-আবু হুরায়রা রা.)

    হাদীসের প্রখ্যাত ভাষ্যকার হাফিজ ইবনে হাজ্বার আসকালানী এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন: ‘এর তাৎপর্য হচ্ছে এই যে, তোমরা যখন এ নিষিদ্ধ কাজগুলো বর্জন করবে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই ভাই ভাই হয়ে যাবে।’ উপরন্তু এ হিংসা ও শত্রুতা সম্পর্কে রাসূল (সা) এও বলেছেন:

    دبَّ اليكم داء الامم قيلكم الحسد والبغضاء هى الحالقة لا اقول تحلق الشَّعر ولكن تحلق الدين-

    “পূর্বেকার উম্মতদের ব্যাধি তোমাদের মধ্যে প্রবেশ করেছে। আর এ ব্যাধি হচ্ছে হিংসা ও শত্রুতা-যা মুণ্ডন করে দেয়। অবশ্য চুল মুণ্ডন করে দেয়া একথা আমি বলছি না, বরং দ্বীনকে মুণ্ডন করে দেয়।” (আহমদ, তিরমিযি)

  • হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা)

    হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা)

    আসল নাম হুজাইফা, ডাকনাম আবু ’আবদিল্লাহ, এবং লকব বা উপাধি ‘সাহিবুস সির’। গাতফান গোত্রের ’আবস শাখার সন্তান। এজন্য তাঁকে আল- ’আবসীও বলা হয়। পিতার নাম হুসাইল মতান্তরে হাসাল ইবন জাবির এবং মাতার নাম রাবাহ বিনতু কা’ব ইবন ’আদী ইবন ’আবদিল আশহাল, মদীনার আনসার গোত্র আউসের আবদুল আশহাল শাখার কন্যা। ইবন হাজার রহ. বলেনঃ এ হুজাইফা একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহাবী। (আল-ইসাবা- ১/৩১৭; আল-ইসতী’য়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্বটীকা- ১/২৭৭) হুজাইফার পিতা হুসাইল ছিলেন মূলতঃ মক্কার বনী ’আবস গোত্রের লোক। ইসলামপূর্ব যুগে তিনি নিজ গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে মক্কা থেকে পালিয়ে ইয়াসরিবে আশ্রয় নেন। সেখানে বনী ’আবদুল আশহাল গোত্রের সাথে প্রথমে মৈত্রীচুক্তি, পরে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে বসবাস করতে থাকেন। মদীনার আনসার গোত্রসমূহের আদি সম্পর্ক মূলতঃ ইয়ামানের সাথে। হুসাইল তাদের মেয়ে বিয়ে করায় তাঁর গোত্রের লোকেরা তাঁর পরিচয় দিত ‘আল-ইয়ামান’ বলে। এজন্য হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান বলা হয়। (দ্রঃ শাজারাতুয্ যাহাব- ১/৪৪; আল-ইসাবা- ১/৩১৭; তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩) এ ইয়ামান আবদুল আশহাল গোত্রে যে বিয়ে করেন সেখানে তাঁর নিম্নোল্লেখিত সন্তানগণ জন্মগ্রহণ করেনঃ ১. হুজাইফা, ২. সা’দ, ৩. সাফওয়ান, ৪. মুদলিজ, ৫. লাইলা। এঁরা ইতিহাসে ইয়ামানে বংশধর নামে খ্যাত। আল-ইয়ামানের মক্কায় প্রবেশে যে বাধা ও ভয় ছিল ধীরে ধীরে তা দূর হয়ে যায়। তিনি মাঝে মধ্যে মক্কা-ইয়াসরিবের মধ্যে যাতায়াত করতেন। তবে বেশী থাকতেন ইয়াসরিবে। এদিকে হযরত রাসূলে কারীম সা. মক্কায় ইসলামের দা’ওয়াত দিতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে হুজাইফার পিতা আল-ইয়ামান বনী ’আবসের এগারো ব্যক্তিকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তখনও মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেননি। সুতরাং হুজাইফা মূলে দিক থেকে মক্কার তবে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বড় হন। (সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা- ৪/১২২) হযরত হুজাইফার পিতা আল-ইয়ামান মুসলমান হন মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্বে। পিতার সাথে মা-ও ইসলাম গ্রহণ করেন। এভাবে হুজাইফা মুসলিম পিতা-মাতার কোলে বেড়ে ওঠেন। এবং হযরত রাসূলে কারীমকে সা. দেখার সৌভাগ্য অর্জনের আগেই মুসলিম হন। ভাই-বোনের মধ্যে শুধু তিনি ও সাফওয়ান এ গৌরবের অধিকারী হন। মুসলিম হওয়ার পর রাসূলকে সা. একটু দেখার আগ্রহ জন্মে। দিন দিন এ আগ্রহ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। তিনি সব সময় যাঁরা রাসূলকে সা. দেখেছেন, তাঁদের কাছে রাসূলে সা. চেহারা- সুরত ও গুণ-বৈশিষ্ট্য কেমন তা জানার জন্য প্রশ্ন করতেন। শেষে একদিন সত্যি সত্যি মক্কায় রাসূলুল্লাহর সা. দরবারে হাজির হন এবং হিজরাত ও নুসরাতের ব্যাপারে তাঁর মতামত জানতে চান। রাসূল সা. তাঁকে দু’টোর যে কোন একটি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দান করেন। হুজাইফা বলেনঃ রাসূল সা. হিজরাত ও নুসরাত (মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে অবস্থান)- এর যে কোন একটি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দান করেন। আমি নুসরাতকে বেছে নিলাম। (উসুদুল গাবা- ১/৩৯৪; তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩; আল-ইসাবা- ১/৩১৮) অন্য একটি বর্ণনায় এসেছেঃ মক্কার প্রথম সাক্ষাতে তিনি প্রশ্ন করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি কি মুহাজির না আনসার? রাসূল সা. জবাব দিলেনঃ তুমি মুহাজির বা আনসার যে কোন একটি বেছে নিতে পার। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আনসারই হবো। (সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা- ৪/১২৩-১২৪) হযরত রাসূলে কারীম সা. মক্কা থেকে মদীনায় আসার পর মুওয়াখাত বা দ্বীনী ভ্রাতু-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিধান চালু করেন। তিনি হুজাইফা ও ’আম্মার ইবন ইয়াসিরকে পরস্পরের দ্বীনী ভাই বলে ঘোষণা করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫০৬) হযরত হুজাইফা বদর যুদ্ধে যোগদান করেননি। ইবন সা’দ তাঁকে যে সকল সাহাবী বদরে যোগদান করেননি তাঁদের মধ্যে উল্লেখ করেছেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/৯৪) এ যুদ্ধে হুজাইফা ও তাঁর পিতার যোগদান না করার কারণ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেনঃ আমার বদরে যোগদানে কোন বাধা ছিল না। তবে আমার আব্বার সাথে আমি তখন মদীনার বাইরে আমাদের দীনায় ফেরার পথে কুরাইশ কাফিররা পথরোধ করে জিজ্ঞেস করেঃ তোমরা কোথায় যাচ্ছ? বললামঃ মদীনায়। তারা বললোঃ তাহলে নিশ্চয় তোমরা মুহাম্মাদের কাছেই যাচ্ছে? আমরা বললামঃ আমরা শুধু মদীনায় যাচ্ছি। তা ছাড়া আমাদের আর কোন উদ্দেশ্য নেই। অবশেষে তারা আমাদের পথ ছেড়ে দিল। তবে এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে যে, আমরা মদীনায় গিয়ে কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুহাম্মাদকে সা. কোনভাবে সাহায্য করবো না। তাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা মদীনায় পৌঁছলাম এবং রাসূলুল্লাহকে সা. কুরাইশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুহাম্মাদকে সা. কোনভাবে সাহায্য করবো না। তাদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আমরা মদীনায় পৌঁছলাম এবং রাসূলুল্লাহকে সা. কুরাইশদের নিকট কৃত অঙ্গীকারের কথা বলে জিজ্ঞেস করলামঃ এখন আমরা কী করবো? বললেনঃ তোমরা তোমাদের অঙ্গীকার পূরণ কর। আর আমরা তাদের বিরুদ্ধে বিজয়ের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইবো। (তারীখুল ইসলামঃ যাহাবী- ২/১৫৩; সহীহ মুসলিম- ২/৮৯; তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩; আল-ইসাবা- ১/৩১৭) হযরত হুজাইফা উহুদ যুদ্ধে তাঁর পিতার সাথে যোগদান করেন। তিনি দারুণ সাহসের সাথে যুদ্ধ করেন এবং নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন। তবে তাঁর বৃদ্ধ পিতা শাহাদাত বরণ করেন। আর সে শাহাদত ছিল স্বপক্ষীয় মুসলিম সৈনিকদের হাতে ঘটনাটি এ রকমঃ উহুদ যুদ্ধের সময় তাঁর পিতা আল-ইয়ামান ও সাবিত ইবন ওয়াক্শ বার্ধক্যে উপনীত হয়েছেন। যুদ্ধের আগে নারী ও শিশুদের একটি নিরাপদ দুর্গে রাখা হয়। আর এই দুই বৃদ্ধকে রাখ হয় ঐ দুর্গের তত্তাবধানে। যুদ্ধ যখন তীব্র আকার ধারণ করে তখন আল-ইয়ামান সঙ্গী সাবিতকে বললেনঃ তোমার বাপ নিপাত যাক! আমরা কিসের অপেক্ষায় বসে আছি? পিপাসিত গাধার স্বল্পায়ুর মত আমাদের সবার আয়ুও শেষ হয়ে এসেছে। আমরা খুব বেশী হলে আজ অথবা কাল পর্যন্ত বেঁচে আছি। আমাদের কি উচিত নয়, তরবারি হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট চলে যাওয়া? হতে পারে, আল্লাহ তাঁর নবীর সা. সাথে আমাদের শাহাদাত দান করবেন। তাঁরা দু’জন তরবারি হাতে নিয়ে দুর্গ ছেড়ে বেয়ে পড়লেন। এদিকে যুদ্ধের এক পর্যায়ে পৌত্তলিক বাহিনী পরাজয় বরণ করে প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছিল। তখন এক দুরাচারী শয়তান চেচিয়ে বলে ওঠে, দেখ, মুসলমানরা এসে পেড়েছে। একথা শুনে পৌত্তলিক বাহিনীর একটি দল ফিরে দাঁড়ায় এবং মুসলমানদের একটি দলের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আল-ইয়ামান ও সাবিত দু’দলের তুমুল সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে যান। পৌত্তলিক বাহিনীর হাতে সাবিত শাহাদাত বরণ করেন। কিন্তু হুজাইফার পিতা আল-ইয়ামান শহীদ হন মুসলমানদের হাতে। না চেনার কারণে এবং যুদ্ধের ঘোরে এমনটি ঘটে যায়। হুজাইফা কিছু দূর থেকে পিতার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখে চিৎকার দিয়ে ওঠেনঃ ‘আমার আব্বা, আমার আব্বা’ বলে। কিন্ত সে চিৎকার কারো কানে পৌঁছেনি। যুদ্ধের শোরগোলে তা অদৃশ্যে মিলিয়ে যায়। ইতিমধ্যে বৃদ্ধ নিজ সঙ্গীদের তরবারির আঘাতে ঢলে পড়ে গেছেন। হুজাইফা পিতার মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে শুধু একটি কথা উচ্চারণ করেঃ ‘আল্লাহ আমাদের সকলকে ক্ষমা করুন। তিনিই সর্বাধিক দয়ালু।’ হযরত রাসূলে কারীম সা. হুজাইফাকে তাঁর পিতার ‘দিয়াত’ বা রক্তমূল্য দিতে চাইলে তিনি বললেনঃ আমার আব্বা তো শাহাদাতেরই প্রত্যাশী ছিলেন, আর তিনি তা লাভ করেছেন। হে আল্লাহ, তুমি সাক্ষী থাক, আমি তাঁর দিয়াত বা রক্তমূল্য মুসলমানদের জন্য দান করে দিলাম। রাসূল সা. দারুণ খুশী হলেন। (দ্রঃ সহীহ বুখারী- ২/৫৮১; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৮৭; হায়াতুস সাহাবা- ১/৫১৯; সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা- ৪/১২৫-১২৭) হযরত হুজাইফা খন্দক যুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কুরাইশরা এমন তোড়জোড় করে ধেয়ে আসে যে, মদীনায় ভীতি ও ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। মদীনার চতুর্দিকে বহুদূর পর্যন্ত কুরাইশ বাহিনীর লোকেরা ছড়িয়ে পড়ে। রাসুল সা. আল্লাহর কাছে দু’আ করেন, আর সেইসাথে মদীনার প্রতিরক্ষার জন্য খন্দক খনন করেন। একদিন রাতে এক অভিনব ঘটনা ঘটে গেল। আর তা মুসলমানদের জন্য এক অদৃশ্য সাহায্য ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কুরাইশ মদীনার আশে-পাশের বাগানগুলিতে শিবির সংস্থাপন করে আছে। হঠাৎ এমন প্রচন্ড বাতাস বইতে শুরু করলো যে, রশি ছিড়ে তাঁবু ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, হাঁড়ি-পাতিল উল্টে-পাল্টে গেল এবং হাড় কাঁপানো শীত আরম্ভ হলো। আবু সুফইয়ান বললো, আর উপায় নেই, এখনই স্থান ত্যাগ করতে হবে। (তাবাকাত- ২/৫০) হযরত রাসূলে কারীম সা. কুরাইশ বাহিনী নিয়ে দারুণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি সেই ভয়াল দুর্যোদময় রাতে হুজাইফার শক্তি ও অভিজ্ঞতার সাহায্য গ্রহণ করতে চাইলেন। তিনি কোন রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে রাতের অন্ধকারে কাউকে কুরাইশ বাহিনীর অভ্যন্তরে পাঠিয়ে তাদের খবর সংগ্রহের ইচ্ছা করলেন। আর এ দুঃসাহসী অভিযানের জন্য তিনি শেষ পর্যন্ত হাজাইফাকে নির্বাচন করেন। এ অভিযান সম্পর্কে সীরাতের গ্রন্থসমূহে নানা রকম বর্ণনা দেখা যায়। একটি বর্ণনা মতে রাসূল সা. সঙ্গীদের বললেনঃ ‘যদি কেউ মুশরিকদের খবর নিয়ে আসতে পারে, তাকে আমি কিয়ামতের দিন আমার সাহচর্যের খোশখবর দিচ্ছি।’ একে তো দারুণ শীত, তার উপর প্রবল বাতাস। কেউ সাহস পেল না। রাসুল সা. তিনবার কথাটি উচ্চারণ করলেন; কিন্তু কোন দিক থেকে কোন রকম সাড়া লেন না। চতুর্থবার তিনি হুজাইফার নাম ধরে ডেকে বললেনঃ ‘তুমি যাও, খবর নিয়ে এসো।’ যেহেতু নাম ধরে ডেকেছেন, সুতরাং আদেশ পালন ছাড়া উপায় ছিল না। অন্য একটি বর্ণনা মতে হুজাইফা নিজেই বলেনঃ ‘আমরা সে রাতে কাতারবন্দী হয়ে বসেছিলাম। আবু সুফইয়ান ও মক্কার মুশরিক বাহিনী ছিল আমাদের উপরের দিকে, আর নীচে ছিল বনী কুরাইজার ইহুদী গোত্র। আমাদের নারী ও শিশুদের নিয়ে আমরা ছিলাম শঙ্কিত। আর সেইসাথে ছিল প্রবল ঝড়-ঝঞ্ঝা ও ঘোর অন্ধকার। এমন দুযোর্গপূর্ণ রাত আমাদের জীবনে আর কখনো আসেনি। বাতাসের শব্দ ছিল বাজ পড়ার শব্দের মত। আর এমন ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার ছিল যে, আমরা আমাদের নিজের আঙ্গুল পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম না। এদিকে মুনাফিক শ্রেণীর লোকেরা একজন একজন করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বলতে লাগলোঃ আমাদের ঘর-দোর শত্রুর সামনে একেবারেই খোলা। তাই একটু ঘরে ফেরার অনুমতি চাই। মূলতঃ অবস্থা সে রকম ছিল না। কেউ যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেই তিনি অনুমতি দিচ্ছিলেন। এভাবে যেতে যেতে শেষ পর্যন্ত আমরা তিন শো বা তার কাছাকাছি সংখ্যক লোক থাকলাম। এমন সময় রাসুল সা. উঠে এক এক করে আমাদের সবার কাছে আসতে লাগলেন। এক সময় আমার কাছেও আসলেন। শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমার গায়ে একটি চাদর ছাড়া আর কিছু ছিল না। চাদরটি ছিল আমার স্ত্রীর, আর তা খুব টেনেটুটে হাঁটু পর্যন্ত পড়ছিল। তিনি আমার একেবারে কাছে আসলেন। আমি মাটিতে বসে ছিলাম। জিজ্ঞেস করলেনঃ এই তুমি কে? বললামঃ হুজাইফা। হুজাইফা? এই বলে মাটির দিকে একটু ঝুঁকলেন, যাতে আমি তীব্র ক্ষুধা ও শীতের মধ্যে উঠে না দাঁড়াই। আমি বললামঃ হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি বললেনঃ কুরাইশদের মধ্যে একটি খবর হচ্ছে। তুমি তাদের শিবিরে যেয়ে আমাকে তাদের খবর এনে দেবে। আমি বের হলাম। অথচ আমি ছিলাম সবার চেয়ে ভীতু ও শীতকাতর। রাসূল সা. দু’আ করলেনঃ ‘হে আল্লাহ! সামনে-পিছনে, ডানে-বামে, উপর-নীচে, সব দিক থেকে তুমি তাকে হিফাজত কর।’ রাসূলুল্লাহর সা. এ দু’আ শেষ হতে না হতে আমার সব ভীতি দূর হলো এবং শীতের জড়তাও কেটে গেল। আমি যখন পিছন ফিরে চলতে শুরু করেছি তখন তিনি আমাকে আবার ডেকে বললেনঃ হুজাইফা! আমার কাছে ফিরে না এসে আক্রমণ করবে না। বললামঃ ঠিক আছে। আমি রাতের ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকারে চলতে লাগলাম। এক সময় চুপিসারে কুরাইশদের শিবিরে প্রবেশ করে তাদের সাথে এমনভাবে মিশে গেলাম যেন আমি তাদেরই একজন। আমার পৌঁছার কিছুক্ষণ পর আবু সুফইয়ান কুরাইশ বাহিনীর সামনে ভাষণ দিতে দাঁড়ালেন। বললেনঃ ওহে কুরাইশ সম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকে একটি কথা বলতে চাই। তবে আমার আশঙ্কা হচ্ছে তা মুহাম্মাদের কাছে পৌঁছে যায় কিনা। তোমরা প্রত্যেকেই নিজের পাশের লোকটির প্রতি লক্ষ্য রাখ। একথা শোনার সাথে সাথে আমার পাশের লোকটির হাত মুট করে ধরে জিজ্ঞেস করলামঃ কে তুমি? সে জবাব দিল অমুকের ছেলে অমুক। আবু সুফইয়ান বললেনঃ ‘ওহে কুরাইশ সম্প্রদায়! আল্লাহর কসম! তোমরা কোন নিরাপদ গৃহে নও। আমাদের ঘোড়াগুলি মরে গেছে, উটগুলি কমে গেছে এবং মদীনার ইহুদী গোত্র বনু কুরাইজাও আমাদের ছেড়ে গেছে। তাদের যে খবর আমাদের কাছে এসেছে তা সুখকর নয়। আর কেমন প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যে পড়েছি, তাও তোমরা দেখছো। আমাদের হাঁড়িও আর নিরাপদ নয়। আগুনও জ্বলছেনা। সুতরাং ফিরে চলো। আমি চলছি।’ একথা বলে তিনি উটের রশি খুললেন এবং পিঠে চড়ে বসে তার গায়ে আঘাত করলেন। উট চলতে শুরু করলো। কোন কিছু ঘটাতে রাসুল সা. যদি নিষেধ না করতেন তাহলে একটি মাত্র তীর মেরে তাকে হত্যা করতে পারতাম। আমি ফিরে এলাম। এসে দেখলাম রাসূল সা. তাঁর এক স্ত্রীর চাদর গায়ে জড়িয়ে নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। নামায শেষ করে তিনি আমাকে তাঁর দু’পায়ের কাছে টেনে নিয়ে চাদরের এক কোনা আমার গায়ে জড়িয়ে দিলেন। আমি সব খবর তাঁকে জানালাম। তিনি দারুণ খুশী হলেন এবং আল্লাহ হামদ ও ছানা পেশ করলেন। হযরত হুজাইফা সে দিন বাকী রাতটুকু রাসূলুল্লাহর সা. সেই চাদর গায়ে জড়িয়ে সেখানেই কাটিয়ে দেন। প্রত্যুষে রাসূল সা. তাঁকে ডাকেনঃ ইয়া নাওমান- ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তি।’ (দ্রঃ সহীহ মুসলিম- ২/৮৯; তারীখু ইবন আসাকির- ১/৯৮; সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৩১; হায়াতুস সাহাবা- ১/৩২৮-৩৩০; সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা- ৪/১২৯-১৩৬) একবার কূফার এক লোক হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামনকে বললোঃ আবু ’আবদিল্লাহ! আপনি কি রাসূলুল্লাহকে সা. দেখেছেন? তাঁর সুহবত সাহচর্য পেয়েছেন? বললেনঃ হাঁ, ভাতিজা। লোকটি আবার প্রশ্ন করলোঃ আপনারা কেমন আচরণ করতেন? বললেনঃ তাঁর আদেশ পালনের চেষ্টা করতাম। লোকটি বললোঃ আমরা রাসুলকে সা. পেলে মাটিতে হেঁটে চলতে দিতাম না, কাঁধে করে নিয়ে বেড়াতাম। তিনি বললেনঃ আমি খন্দকের দিন রাসূলুল্লাহর সা. সাথে নিজেকে দেখেছি। এই বলে তিনি খন্দকের সেই রাতের ভয়-ভীতি, ঝড় শৈত্য ইত্যাদির এক চিত্র তুলে ধরলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/২৬৪) খন্দক পরবর্তী রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় বা তাঁর পরের সকল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। হযরত রাসুলে কারীমের সা. ওফাতের পর তিনি ইরাকে বসতি স্থাপন করেন। তারপর বিভিন্ন সময় কূফা, নিস্সীবীন ও মাদায়েনে বসবাস করেন। নিস্সীবীনের ‘আল-জাযীরা’ শহরে একটি বিয়েও করেন। (উসুদুল গাবা- ১/৩৯৪) হযরত হুজাইফা যে পারস্যের নিহাওয়ান্দ, দাইনাওয়ার, হামজান, মাহ্ রায় প্রভৃতি অঞ্চল জয় করেন এবং গোটা ইরাক ও পারস্যবাসীকে কুরআনের এক পাঠের ওপর সমবেত করেন, একথা খুব কম লোকেই জানে। (আল-ইসতী’য়াব; আল-ইসাবার টীকা- ১/২৭৮; তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩) ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চল বিজিত হওয়ার পর হযরত ’উমার রা. সেখানকার ভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ কাজের জন্য তিনি দু’জন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করেন। ফুরাত নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে হযরত ’উসমান ইবন হুনাইফ এবং দিজলা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে হযরত হুজাইফাকে নিয়োগ করেন। দিজলা তীরবর্তী অঞ্চলের অধিবাসীরা ছিল ভীষণ দুষ্ট প্রকৃতির। তারা হযরত হুজাইফাকে তার কাজে কোন রকম সাহায্য তো দূরের কথা বরং নানা রকম বাধার সৃষ্টি করলো। তা সত্ত্বেও তিনি বন্দোবস্ত দিলেন। এর ফলে সরকারী আয় অনেকটা বেড়ে গেল। এরপর তিনি মদীনায় এসে খলীফা ’উমারের রা সাথে সাক্ষাৎ করলেন। খলীফা তাঁকে বললেনঃ ‘সম্ভবতঃ যমীনের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপানো হয়েছে।’ হুজাইফা বললেনঃ আমি অনেক বেশী ছেড়ে দিয়েছি। (কিতাবুজ খিরাজ- ২১) হযরত হুজাইফা ইয়ারমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইয়ারমুক যুদ্ধের বিজয়ের খবর সর্বপ্রথম তিনিই মদীনায় খলীফা ’উমারের নিকট নিয়ে আসেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৪/৯৩,৯৪) হিজরী ১৮ সনে নিহাওয়ান্দের ওপর সেনা অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। অবশ্য আবু ’উবাইদাহ বলেন, হিজরী ২২ সনে হুজাইফা নিহাওয়ান্দে যান। (তারীখু ইবন আসাকির- ১/১০০) এই নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে পারসিক সৈন্যসংখ্যা ছিল দেড় লাখ। খলীফা হযরত ’উমার রা. মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক নিয়োগ করেন হযরত নু’মান ইবন মুকাররিনকে। তারপর তিনি কূফায় অবস্থানরত হযরত হুজাইফাকে একটি চিঠিতে সেখান থেকে একটি বাহিনী নিয়ে নিহাওয়ান্দের দিকে যাত্রা করার জন্য নির্দেশ দেন। এদিকে খলীফা মুসলিম মুজাহিদদের প্রতি জারি করা এক ফরমানে বললেন, চারিদিক থেকে মুসলিম সৈন্যরা যখন এক স্থানে সমবেত হবে তখন প্রত্যেক স্থান থেকে আগত বাহিনীর একজন করে আমীর থাকবে। আর গোটা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবেন, নু’মান ইবন মুকাররিন। নু’মান যদি শাহাদাত বরণ করেন, হুজাইফা হবেন পরবর্তী আমীর। আর তিনি শহীদ হলে আমীর হবেন জারীর ইবন ’আবদিল্লাহ আল-বাজালী। এভাবে খলীফা সে ফরমানে একের পর এক সাতজন সেনাপতির নাম ঘোষণা করেন। হযরত নু’মান নিহাওয়ান্দের অদূরে শিবির স্থাপন করে বাহিনীর দায়িত্ব বন্টন করেন। সেখানে হযরত হুজাইফাকে দক্ষিণ ভাগের অফিসার নিয়োগ করা হয। দু’বাহিনী মুখোমুখি হলো। শত্রুসৈন্য দেড় লাখ, আর মুসলমান সৈন্য মাত্র তিরিশ হাজার। প্রচন্ড যুদ্ধ হলো। ইতিহাসে এমন যুদ্ধের নজীর খুব কমই আছে। মুসলিম বাহিনীর এক নম্বর অধিনায়ক নু’মান শাহাদাত বরণ করলেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনিও হুজাইফাকে আমীর নিয়োগের অসীয়াত করে যান। তাঁর শাহাদাতের পর আশে পাশের সৈনিকরা যখন নতুন আমীরের সন্ধান করছে তখন হযরত মা’কাল হুজাইফার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ইনিই তোমাদের পরবর্তী আমীর। আশা করা যায়, আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে তোমাদের বিজয় দান করবেন। হযরত হুজাইফা সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। যুদ্ধ তখন ঘোরতর রূপ ধারণ করেছে। তিনি পার্শ্ববর্তী লোকদেরকে নু’মানের শাহাদাতের খবর প্রচার করতে নিষেধ করে দিলেন। আর সাথে সাথে নু’মানের স্থলে ভাই নু’য়াঈমকে দাঁড় করিয়ে দিলেন। যাতে নু’মানের শাহাদাতে যুদ্ধের ওপর কোন রকম প্রভাব না পড়ে। এ কাজগুলি তিনি করলেন মুহূর্তের মধ্যে। তারপর তিনি ঝড়ের গতিতে চিরে-ফেঁড়ে পারসিক বাহিনীর সামনে পৌঁছে চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলেনঃ ‘আল্লাহু আকবারঃ সাদাকা ও’য়াদাহ্ আল্লাহ আকবারঃ নাসারা জুনদাহ্’ আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ- তিনি তাঁর অঙ্গীকার পূরণ করেছেন। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ- তিনি তাঁর সিপাহীদের সাহায্য করেছেন। তারপর তনি নিজের ঘোড়ার লাগাম ধরে টান মেরে শত্রু বাহিনীর দিকে ফিরিয়ে জোরে চেঁচিয়ে বলতে লাগলেনঃ ‘ওহে মুহাম্মাদের সা. অনুসারীরা! এখানে, এদিকে জান্নাত তোমাদের স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। তোমরা আর দেরী করোনা। ওহে বদরের যোদ্ধারা! ছুটে এসো। ওহে খন্দক, উহুদ ও তাবুকের বীরেরা! সামনে এগিয়ে চলো।’ এভাবে তিনি সেদিন নজীরবিহীন সাহস ও বিজ্ঞতার পরিচয দান করেন। (দ্রঃ তাবারী- ৫/২৬০১, ২৬০৫, ২৬৩২; যাহাবীঃ তারীখ- ২/৩৯-৪১; রিজালুন হাওলার রাসূল- ১৯৯) নিহাওয়ান্দে ছিল একটি অগ্নি উপাসনা কেন্দ্র। তার প্রধান ধর্মগুরু একদিন হুজাইফার নিকট এসে বললেন, যদি আমার নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয় তাহলে আমি একটি মহামূল্যবান গুপ্ত সম্পদের সন্ধান দিতে পারি। হযরত হুজাইফা রা. তাঁকে আশ্বাস দিলেন। লোকটি পারস্য সম্রাটের অতিমূল্যবান মনি-মুক্তা এনে হাজির করলেন। হযরত হুজাইফা রা. গনীমতের সম্পদের এক পঞ্চমাংশসহ সেই মহামূল্যবান মনি-মুক্তা মদীনায় খলীফা ’উমারের নিকট পাঠিয়ে দিলেন। হযরত ’উমার রা. মনি-মুক্তা দেখে রাগে ফেটে পড়লেন। ইবন মুলাইকাকে ডেকে বললেন, এক্ষুণি এগুলি নিয়ে যাও। আর হুজাইফাকে বল, এগুলি বিক্রী করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ সৈন্যদের মধ্যে যেন বন্টন করে দেয়। হযরত হুজাইফা তখন নিহাওয়ান্দের ‘মাহ’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন। সেখানে তিনি সেই ধনরত্ন চার কোটি দিরহামে বিক্রী করেন। (তাবারী- ৫/২৬২৭, ২৬৩০) ইবন আসাকির বলেন, নিহাওয়ান্দের শাসক বাৎসরিক আট লাখ দিরহাম জিযিয়া দানের অঙ্গীকার করে হযরত হুজাইফার সাথে সন্ধি করেন। নিহাওয়ান্দের পর তিনি বিনা বাধায় ‘দায়নাওয়ার’ জয় করেন। হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস পূর্বেই এ দায়নাওয়ার জয় করেছিলেন; কিন্ত অধিবাসীরা বিদ্রোহ করে। তারপর হযরত হুজাইফা বিনা যুদ্ধে একে একে মাহ্, হামাজান, ও রায় জয় করেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/১০০) মাহ্- এর অধিবাসীদের সাথে হযরত হুজাইফা রা. যে চুক্তি স্বাক্ষর করেন। তা নিম্নরূপঃ ‘‘হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান মাহবাসীদের জান, মাল ও বিষয়- সম্পত্তির এ নিরাপত্তা দান করছেন যে, তাদের ধর্মের ব্যাপারে কোন রকম হস্তক্ষেপ করা হবেনা। এবং ধর্ম ত্যাগের জন্য কোনরূপ জোর-জবরদস্তি করা হবে না। তাদের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যতদিন বাৎসরিক জিযিয়া আদায় করবে, পথিকদের পথের সন্ধান দেবে, পথ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, এখানে অবস্থানরত মুসলিম সৈনিকদের একদিন এক রাত আহার করাবে এবং মুসলমানদের শুভাকাংখী থাকবে, ততদিন তাদের এ নিরাপত্তা বলবৎ থাকবে। আর যদি তারা এ অঙ্গীকার ভঙ্গ করে বা তাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে তাদের কোন দায়-দায়িত্ব মুসলমানদের ওপর থাকবে না।’’ হিজরী ১৯ সনের মুহাররাম মাসে এ চুক্তিপত্রটি লেখা হয় এবং তাতে কা’কা’, নু’য়াইম ইবন মুকাররিন ও মুয়ায়িদ ইবন মুকাররিন সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর দান করেন। (তাবারী- ৫/২৬৩৩) উল্লেখিত অভিযানসমূহ শেষ করে হযরত হুজাইফা তাঁর পূর্বের ভূমি বন্দোবস্তদানকারী অফিসার পদে ফিরে যান। (তাবারী- ৫/২৬৩৮) বালাজুরীর বর্ণনা মতে হিজরী ২২ সনে আজারবাইজান অভিযানে হযরত হুজাইফা গোটা বাহিনীর পতাকাবাহী ছিলেন। তিনি নিহাওয়ান্দ থেকে আজারবাইজানের রাজধানী আরদাবীলে পৌঁছেন। এখানকার শাসক মাজেরওয়ান, মায়মন্দ, সুরাত, সাব্জ, মিয়াঞ্চ প্রভৃতি স্থান থেকে একটি বাহিনী সংগ্রহ করে প্রতিরোধের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অতঃপর বাৎসরিক আট লাখ দিরহাম জিযিয়া দানের শর্তে সন্ধি করে। হযরত হুজাইফা সেখান থেকে মুকাম ও রুজাইলার দিকে অগ্রসর হন এবং বিজয় লাভ করেন। ইত্যবসরে মদীনার খলীফার দরবার থেকে তাঁর বরখাস্তের নির্দেশ হাতে পৌঁছে। তাঁর স্থলে ’উতবা ইবন ফারকাদকে নিয়োগ করা হয। (তাবারী- ৫/২৮০৬; বিস্তারিত বর্ণনা তারীখে বালাজুরীতে এসেছে।) হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে মাদায়েন বিজিত হওয়ার পর মুসলিম বাহিনী সেখানে অবস্থান করতে থাকে। কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া আরব মুসলমানদের স্বাস্থ্যসম্মত না হওয়ায় খলীফা ’উমার রা. সা’দকে তাঁর বাহিনী নিয়ে কূফায় চলে যেতে বলেন এবং সেখানে একটি স্বাস্থ্য উপযোগী স্থান নির্বাচন করে স্থায়ী সেনা ছাওনী তখা শহর পত্তনের নির্দেশ দেন। হযরত সা’দ রা. শহর পত্তনের জন্য হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান ও সালমান ইবন যিয়াদের ওপর স্থান নির্বাচনের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তাঁরা দু’জন গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একটি স্বাস্থ্যকর স্থান নির্বাচন করেন। আজকের কূফা শহরটি এ দু’ব্যক্তিরই নির্বাচিত স্থানে অবস্থিত। (রিজালুন হাওলার রাসুল- ২০০) উল্লেখিত অভিযান সমূহের পর খলীফা হযরত ’উমার রা. তাকে মাদায়েনের ওয়ালী নিয়োগ করেন। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/৯৪) একজন নতুন ওয়ালী আসছেন- এ খবর মাদায়েনবাসীদের কাছে পৌঁছে গেল। নতুন আমীরকে স্বাগত জানানোর জন্য তারা দলে দলে শহরের বাইরে সমবেত হলো। তারা এ মহান সাহাবীর তাকওয়া, খোদাভীতি, সরলতা ও ইরাক বিজয়ের অনেক কথা শুনেছিল। তারা তাঁর একটি জাঁকজমকপূর্ণ কাফিলার সাথে আগমণের প্রতীক্ষায় ছিল। না, কোন কাফিলার সাথে নয়। তারা দেখতে পেল কিছু দূরে গাধার ওপর সাওয়ার হয়ে দীপ্ত চেহারার এক ব্যক্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। গাধার পিঠে অতি পুরনো একটি জিন। তার ওপর বসে বাহনের পিঠের দু’পাশের পা ছেড়ে দিয়ে এক হাতে রুটি ও অন্য হাতে লবণ ধরে মুখে ঢুকিয়ে চিবোচ্ছেন। আরোহী ধীরে ধীরে জনতার মাঝখানে এসে পড়লেন। তারা ভালো করে তাকিয়ে দেখে বুঝলো, ইনিই সেই ওয়ালী যার প্রতীক্ষায় তারা দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রথমবারের মত তাদের কল্পনা হোঁচট খেল। পারস্যের কিসরা বা তাঁর পূর্ব থেকে তাদের দেশে এমন ওয়ালীর আগমণ আর কক্ষণো ঘটেনি। তিনি চললেন এবং লোকেরাও তাঁকে ঘিরে পাশাপাশি চললো। তিনি আবাস স্থলে পৌঁছে উপস্থিত জনতাকে তাদের প্রতি লেখা খলীফার ফরমান পাঠ করে শোনালেন। খলীফা হযরত ’উমারের রা. নিয়ম ছিল, নতুন ওয়ালী বা শাসক নিয়োগের সময় সেই এলাকার অধিবাসীদের প্রতি বিভিন্ন নির্দেশ ও ওয়ালীর দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া। কিন্তু হযরত হুজাইফার রা. নিয়োগ পত্রে মাদায়েনবাসীর প্রতি শুধু একটি নির্দেশ ছিলঃ ‘তোমরা তাঁর কথা শুনবে ও আনুগত্য করবে।’ তিনি যখন তাদের সামনে খলীফার এ ফরমান পাঠ করে শোনালেন, তখন চারদিক থেকে আওয়ায উঠলো, বলুন, আপনার কী প্রয়োজন। আমরা সবই দিতে প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী ও খুলাফায়ে রাশেদার পদাঙ্ক অনুসরণকারী হযরত হজাইফা বললেনঃ ‘আমার নিজের পেটের জন্য শুধু কিছু খাবার, আর আমার গাধাটির জন্য কিছু ঘাস-খড় প্রয়োজন। যতদিন এখানে থাকবো, আপনাদের কাছে শুধু এতটুকুই চাইবো।’ তিনি সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে আরো বললেনঃ ‘তোমরা ফিতনার স্থানগুলি থেকে দূরে থাকবে। লোকেরা জানতে চাইলো, ফিতনার স্থানগুলি কি? বললেনঃ আমীর বা শাসকদের বাড়ীর দরযাসমূহ। তোমাদের কেউ আমীর বা শাসকের কাছে এসে মিথ্যা দ্বারা তার সত্যায়িত করবে এবং তার মধ্যে যা নেই তাই বলে তার প্রশংসা করবে- এটাই মূলতঃ ফিত্না।’ এ পদে কিছু দিন থাকার পর কোন এক কারণে খলীফা হযরত ’উমার রা. তাঁকে রাজধানী মদীনায় তলব করেন। খলীফার ডাকে সাড়া দিয়ে হযরত হুজাইফা রা. যে অবস্থায় একদিন মাদায়েন গিয়েছিলেন ঠিক একই অবস্থায় মদীনার দিকে যাত্রা করেন। হুজাইফা আসছেন, এ খবর পেয়ে খলীফা মদীনার কাছাকাছি পথের পাশে এক স্থানে লুকিয়ে থাকেন। নিকটে আসকেই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ান এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেনঃ ‘হুজাইফা, তুমি আমার ভাই, আর আমিও তোমার ভাই।’ তারপর সেই পদেই তাঁকে বহাল রাখেন। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/১০০; আল-আ’লাম- ২/১৭১; তাহজীবুত তাহজীব-২/১৯৩; উসুদুল গাবা- ১/৩৯২; হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৬৬, ২/৭৩) হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দিহ্লবী রহ. হযরত ইমাম আবু হানীফার রহ. একটি বর্ণনা নকল করেছেন। হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামন রা. মাদায়েন থাকাকালে এক ইহুদী নারীকে বিয়ে করেন। খবর পেয়ে আমীরুল মুমিনীন ’উমার রা. তাঁকে উক্ত মহিলা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নির্দেশ দেন। হুজাইফা রা. খলীফাকে প্রশ্ন করেনঃ কিতাবী নারী বিয়ে করা কি হারাম? জবাবে ’উমার রা. বলেনঃ হুজাইফা! আমি তোমাকে তাকীদ দিচ্ছি, আমার এ নির্দেশ হাত থেকে রাখার পূর্বেই যেন মহিলাকে বিদায় করে দেয়া হয়। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তোমার দেখাদেখি অন্য মুসলমানরাও জিম্মী নারীর রূপ ও গুণের কারণে মুসিলম মহিলাদের ওপর তাদেরকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে না দেয়। আর এমন হলে তা মুসলিম মেয়েদের জন্য একটি মারাত্মক ফিত্না বলে প্রমাণিত হবে। (ফিক্হে ’উমারঃ শাহ ওয়ালী উল্লাহ দিহলবী, উর্দু অনুবাদ) মাদায়েনে ওয়ালী থাকাকালে একবার জনতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষয়ে তিনি বলেনঃ ‘হে জনমন্ডলী! তোমরা তোমাদের দাসদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখ। দেখ, তারা কোথা থেকে কিভাবে উপার্জন করে তোমাদের নির্ধারিত মজুরী পরিশোধ করছে। কারণ, হারাম উপার্জন খেয়ে দেহে যে গোশ্ত তৈরী হয় তা কক্ষণো জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর এটাও জেনে রাখ, মদ বিক্রেতা, ক্রেতা ও তাঁর প্রস্তুতকারক, সকলেই তা পানকারীর সমান।’ (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৮২) হযরত ’উসমানের রা. খিলাফতকালের পুরো সময়টা এবং হযরত আলীর রা. খিলাফতের কিছু দিন, একটানা এ দীর্ঘ সময় তিনি মাদায়েনের ওয়ালী পদে আসীন ছিলেন। (আল-ইসাবা- ১/৩১৭) হযরত ’উসমানের খিলাফতকালে হিজরী তিরিশ সনে হযরত সা’ঈদ ইবন ’আসের সাথে কূফা থেকে খুরাসানের উদ্দেশ্যে বের হন। ‘তুমাইস নামক বন্দরে শত্রু বাহিনীর সাথে প্রচন্ড সংঘর্ষ হয়। এখানে সা’ঈদ ইবন ’আস সালাতুল খাওফ (ভীতিকালীন নামায) আদায় করেন। তিনি নামায পড়ানোর পূর্বে হযরত হুজাইফার নিকট থেকে তার পদ্ধতি জেনে নেন। (মুসনাদ-৫/৩৮৫; রাবীয়া- ৫/৩৮৩৬-৩৭) এরপর তিনি ‘রায়’- এ যান এবং সেখান থেকে সালমান ইবন রাবীয়া ও হাবীব ইবন মাসলামার সাথে আরমেনিয়ার দিকে অগ্রসর হন। এ অভিযানে তিনি কুফী বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন। (তাবারী- ৫/২৮৯৩) হিজরী ৩১ সনে ‘খাকানে খাযার’- এর বাহিনীর সাথে বড় ধরণের একটি সংঘর্ষ হয়। এতে সালমানসহ প্রায় চার হাজার মুসলিম শহীদ হন। সালমানের শাহাদাতের পর হযরত হুজাইফা গোটা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন। কিন্তু অল্প কিছুদিন পর তাঁকে অন্যত্র বদলী করা হয় এবং তাঁর স্তলে হযরত মুগীরা ইবন শু’বাকে নিয়োগ করা হয। হযরত হুজাইফা রা. ‘বাব’- এর ওপর তিনবার অভিযান চালান। (তাবারী- ৫/২৮৯৪) তৃতীয় হামলাটি ছিল হিজরী ৩৪ সনে। (তাবারী- ৫/২৯৩৬) এ অভিযান ছিল হযরত ’উসমানের রা. খিলাফতের শেষ দিকে। এ সকল অভিযান শেষ করে তিনি মাদায়েনে নিজ পদে ফিরে আসেন। মাদায়েনে পৌঁছার পর তিনি হযরত ’উসমানের রা. শাহাদাতের ঘটনা অবগত হন। খলীফা ’উসমানের রা. শাহাদাতের মাত্র চল্লিশ দিন পর তিনিও ইনতিকাল করেন। এটা হিজরী ৩৬ সন মুতাবিক ৬৫৮ খ্রীস্টাব্দের ঘটনা। ওয়াকিদী ও আল-হায়সাম ইবন ’আদী এ ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ১/৩১৮; শাজারাতুয্ যাহাব- ১/৪৪; আল-আ’রাম- ২/১৭১; তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/৯৪) মৃত্যুর পূর্বে তাঁর মধ্যে এক আশ্চর্য অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাঁর সাদাসিধে ভাব আরো বেড়ে যায় এবং দারুণ ভীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সব সময় কান্নাকাটি করতেন। লোকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার দুঃখে এ কান্না নয়। কারণ, মৃত্যু আমার অতি প্রিয়। তবে এ জন্য কাঁদছি যে, মৃত্যুর পর আমার যে কী অবস্থা হবে এবং আমার পরিণতিই বা কী হবে, তা তো আমার জানা নেই। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি বলেনঃ ‘হে আল্লাহ! তোমার সাক্ষাত আমার জন্য কল্যাণময় কর। তুমি তো জান আমি তোমায় কত ভালোবাসি।’ (উসুদুল গাবা- ১/৩৯২) তাঁর অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে রাতের বেলা কয়েকজন সাহাবী তাঁকে দেখতে গেলেন। হুজাইফা তাঁদেরকে প্রশ্ন করলেনঃ এটা কোন্ সময়? তাঁরা বললেনঃ প্রভাতের কাছাকাছি সময়। তিনি বললেনঃ আমি সেই সকালের ব্যাপারে আল্লাহর পানাহ্ চাই যা আমাদের জাহান্নামে নিয়ে যাবে। এ কথাটি তিনি কয়েকবার উচ্চারণ করলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনারা কি কাফন এনেছেন? তাঁরা বললেনঃ হাঁ, এনেছি। বললেনঃ কাফনের ব্যাপারে বেশী বাড়াবাড়ি করবেন না। কারণ, আল্লাহর কাছে যদি আমার কিছু ভালো থেকে থাকে তাহলে এ কাফন পরিবর্তন করে দেওয়া হবে, আর যদি খারাপ থাকে এ ভালো কাফন ছিনিয়ে নেওয়া হবে। তিনি কাফন দেখতে চাইলে তা দেখানো হলো। যখন দেখলেন, তা নতুন ও দামী তখন ঠোঁটে একটু বিদ্রুপের হাসি ফুটিয়ে বললেনঃ এ আমার কাফন নয়। কামিস ছাড়াই দু’প্রস্থ সাদা কাপড়ই আমার জন্য যথেষ্ট। কারণ কবরে আমাকে বেশী সময় বিরতি দেওয়া হবে না। খুব তাড়াতাড়ি আমাকে তার চেয়ে ভালো অথবা মন্দ স্থানে স্থানান্তর করা হবে। তারপর দু’আ করলেনঃ ‘হে আল্লাহ! তুমি জান আমি ধনের পরিবর্তে দারিদ্রকে, ইয্যতের পরিবর্তে জিল্লতীকে এবং জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুকে ভালোবাসতাম।’ তার শেষ কথাটি ছিলঃ ‘অতি আবেগের সাথে বন্ধু এসেছে, যে অনুশোচনা করবে তার সফলতা নেই।’ (দ্রঃ উসুদুল গাবা- ১/৩৯৩; তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/১০৩; রিজালুন হাওলার রাসূল- ২০১; সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা- ৪/১৩৮) তাঁর জানাযায় বহু লোক উপস্থিত ছিল। এক ব্যক্তি তাঁর প্রতি ইঙ্গিত করে বললো, আমি এই খাটিয়ার ওপর শায়িত ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি, রাসূলসা. যা কিছু বলেছেন তা বর্ণনা করতে কোন দোষ নেই। আর তোমরা যদি পরস্পর যুদ্ধের দিকে ধাবিত হও তাহলে আমি ঘরে বসে থাকবো। তারপরেও যদি কেউ সেখানে উপস্থিত হয় তাহলে তাকে বলবো, এগিয়ে এসো, আমার ও তোমার পাপের বোঝা কাঁধে তুলে নাও। (মুসনাদ- ৫/৩৮৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪০৪, ৪০৫) মৃত্যুর পূর্বে তিনি ’আলীর রা. নিকট বাই’য়াত করার জন্য দুই ছেলেকে অসীয়াত করে যান। তাঁরা দু’জনই ’আলীর রা. বাই’য়াত করেন এবং সিফ্ফীন যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। (আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার টীকা- ১/২৭৮) হযরত হুজাইফা রা. নিজেও ’আলীর নিকট বাই’য়াত করেছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে। আবু ’উবাইদাহ, বিলাল, সাফওয়ান ও সা’ঈদ নামে তাঁর চার ছেলে ছিল। ‘তাবাকাত’ গ্রন্থকার ইবন সা’দের সময় মাদায়েনে তাঁর বংশধরগণ জীবিত ছিলেন। (তাবাকাত- ৬/৮) হযরত হুজাইফার দুই স্ত্রী ছিল বলে প্রসিদ্ধি আছে। দৈহিক আকৃতিক দিক দিয়ে হযরত হুজাইফাকে রা. হিজাযী বলে চেনা যেত। মধ্যমাকৃতির একহারা গড়ন এবং সামনের দাঁতগুলি ছিল অতি সুন্দর। দৃষ্টিশক্তি এতই প্রখর ছিল যে, ভোরের আবছা অন্ধকারেও তীরের নিশানা (লক্ষ্যস্থল) নির্ভুলভাবে দেখতে পেতেন। হযরত হুজাইফা রা. ছিলেন শ্রেষ্ঠ ’আলিম সাহাবীদের একজন। ফিকাহ ও হাদীস ছাড়াও কিয়ামত পর্যন্ত ইসলামে যে সকল আবর্তন-বিবর্তন হবে সে সম্পর্কেও একজন শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। মুনাফিকদের সম্পর্কে তাঁর জানা ছিল অনেকে। এ কারণে তাঁকে রাসূলুল্লাহর সা. গোপন জ্ঞানের অধিকারী বা ‘সাহিবুস সির’ বলা হতো। হুজাইফা বলেনঃ অতীতে পৃথিবীতে যা ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে কিয়ামত পর্যন্ত যা ঘটবে তা সবই রাসূল সা. আমাকে বলেছেন। (তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩) একবার তিনি প্রখ্যাত ’আলিম সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদের নিকট বসে ছিলেন। আরো অনেকে সেখানে ছিলেন। আলোচনার এক পর্যায়ে দাজ্জালের কথা উঠলে তিনি বললেন, আমি এ বিষয়ে তোমাদের থেকে অনেক বেশী জানি। (সহীহ মুসলিম- ২/৫১৪) একদিন হযরত রাসূলে কারীম সা. এক ভাষণে সাহাবীদের সামনে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর যাবতীয় ঘটনার বর্ণনা দান করেন। হযরত হুজাইফার সেই ভাষণটি স্মরণ ছিল। তবে কিছু কথা ভুলে যান। যখনই কোন ঘটনা ঘটতো তখন সে কথা মনে পড়তো। (সহীহ মুসলিম- ৫/৪৯) তিনি নিজেই বলেছেন, রাসূল সা. তাঁকে সব ঘটনা অবহিত করেন। শুধু একটি কথা বলা বাকী চিল। তা হলো, মদীনাবাসীদের মদীনা থেকে বের হওয়ার কারণ কী হবে? (সহীহ মুসলিম- ৫/৪৯) ’আলকামা বলেনঃ একবার আমি শামে গেলাম। সেখানে আমি এই বলে দু’আ করলামঃ হে আল্লাহ! আমাকে একজন নেক্কার সঙ্গী দাও। এরপর আমি একজন লোকের পাশে বসলাম। ঘটনাক্রমে তিনি ছিলেন আবু দারদা রা.। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কোথাকার লোক? বললামঃ কুফার। তিনি বললেনঃ তোমাদের ওখানে ‘সাহিবুস সির’ বা গোপন রহস্যের অধিকারী ব্যক্তি, যিনি ছাড়া অন্য কেউ সে রহস্য জানোনা- সেই হুজাইফা কি নেই? (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৪/৯৬) হযরত হুজাইফা রা. সম্পর্কে একবার হযরত ’আলীকে রা. জিজ্ঞেস করা হলে বললেন, তিনি তো মুনাফিকদের সম্পর্কে সর্বাধিক জ্ঞানী। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে- তিনি তো মুনাফিকদের সম্পর্কে মুহাম্মাদের সা. সাহাবীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী জ্ঞানী। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৪/৯৭; হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৫৭) আর একবার হুজাইফা সম্পর্কে হযরত আবু যারকে রা. জিজ্ঞেস করা হলে বললেনঃ তিনি যেমন যাবতীয় জটিল ও বিস্তারিত বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, তেমনিভাবে মুনাফিকদের নামও জানেন। মুনাফিকদের সম্পর্কে যদি তুমি জানতে চাও তাহলে এ বিষয়ে তাঁকে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তিই পাবে। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৪/৯৭) সাহাবায়ে কিরাম সাধারণতঃ রাসূলুল্লাহর সা. নিকট বিভিন্ন ’আমলের ফজীলাত, নামায, রোযা বা এ জাতীয় বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। কিন্তু হুজাইফা রা. তা করতেন না। তিনি বলেনঃ মুহাম্মাদের সা. সাহাবীরা সব সময় ভালো কি, তাই জিজ্ঞেস করতেন। আর আমি জিজ্ঞেস করতাম, খারাপ কি, তা জানার জন্য। প্রশ্ন করা হলো, কেন এমন করতেন? বললেনঃ যে খারাপকে জানে সে ভালোর মধ্যে থাকে। অন্য একটি বর্ণনা মতে, তিনি বলেন, ‘যাতে আমি খারাপের মধ্যে না পড়ি সেই ভয়ে।’ (বুখারী- ২/১০৪৯; তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/১০১; তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩) একবার হযরত ’উমারের রা. নিকট বহু সাহাবী বসে ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ ফিত্না সম্পর্কে কারো কি কিছু জানা আছে? হুজাইফা বললেনঃ ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজন ও প্রতিবেশীর ব্যাপারে মানুষের যা কিছু ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়, নামায, সাদাকা, আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকার দ্বারা তার কাফ্ফারা হয়ে যায়। ’উমার বললেনঃ আমার প্রশ্ন করার উদ্দেশ্য এ নয়। আমাকে সে ফিত্নার কথা বল যা সাগরের মত বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে।’ হুজাইফা বললেনঃ আপনার ও সেই ফিত্নার মধ্যে একটি দরযার বাধা আছে। এ জন্য আপনার দ্বিধান্বিত হওয়ার কারণ নেই। ’উমার রা. জানতে চাইলেনঃ দরযা খোলা হবে না ভেঙ্গে ফেলা হবে? বললেনঃ ভেঙ্গে ফেলা হবে। ’উমার রা. বললেনঃ তাহলে তো আর কক্ষণো থামবে না। হুজাইফা বললেনঃ হাঁ, তাই। হযরত হুজাইফা রা. উল্লেখিত ঘটনাটি পরবর্তীকালে অন্য একটি মজলিসে বর্ণনা করলেন। তখন সেখানে প্রখ্যাত তাবে’ঈ ‘শাকীক’ উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ ’উমার কি দরযা সম্পর্কে জানতেন? বললেনঃ তোমরা যেমন জান দিনের পর রাত হয়, ঠিক তেমনি তিনিও দরযা সম্পর্কে জানতেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলোঃ দরযার অর্থ কি? বললেনঃ ’উমার নিজেই। (বুখারী) হযরত হুজাইফা রা. থেকে এ ধরণের বর্ণনা পাওয়া যায়। নবুওয়াতের যেসব গোপন কথা তাঁর জানা ছিল তার বেশীল ভাগ ইসলামী রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত। সাহাবীদের মধ্যে তিনি ছাড়া আরো অনেকে এসব গোপন কথা জানতেন। হুজাইফার রা. বর্ণনা থেকে সে কথা জানা যায়। সহীহ মুসলিমে তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘আমি বর্তমান সময় হতে কিয়ামত পর্যন্ত সময়ের সকল ফিত্না সম্পর্কে জানি। তবে একথা দ্বারা কেউ যেন না বোঝে যে, আমি ছাড়া আর কেউ বিষয়টি জানতো না। রাসূল সা. এক মজলিসে কথাগুলি বলেছিলেন। ছোট-বড় সকল ঘটনার সংবাদ দিয়েছিলেন। তবে সেই মজলিসে উপস্থিত লোকদের মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া আজ আর কেউ বেঁচে নেই।’ (মুসলিম- ২/৩৯৭) হযরত হুজাইফা রা. মাঝে মাঝে নিজের এ জ্ঞান কাজে লাগাতেন এবং মুসলিম উম্মাহ্কে তাদের ভবিষ্যত সম্পর্কে সতর্ক করে দিতেন। একবার ’আমের ইবন হানজালার গৃহে প্রদত্ত এক খুতবায় তিনি বলেনঃ ‘একটি সময়ে কুরাইশরা দুনিয়ার কোন নেক্কার বান্দাহ্কে ছেড়ে দেবে না। তারা সকলকে ফিত্নায় জড়িয়ে ধ্বংস করে ফেলবে। অতঃপর আল্লাহ তাঁর বান্দাহদের একটি বাহিনী দিয়ে তাদেরকে একেবারেই নির্মূল করে ফেলবেন।’ লোকেরা বললোঃ আপনি নিজেও তো একজন কুরাইশী। বললেনঃ আমার করার কী আছে? আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে এমনই শুনেছি। (মুসনাদ- ৫/৩৯০, ৩৯৫, ৪০৪) একবার হযরত হুজাইফা বললেনঃ রাসূল সা. আমাদেরকে দু’টি কথা বলেছিলেন। যার একটি আমি দেখেছি, আর অন্যটির প্রতীক্ষায় আছি। এমন এক সময় ছিল যখন আমি যে আমীরের হাতেই বাই’য়াত করতাম, তার ব্যাপারে আমার মধ্যে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ দেখা দিতনা। আমি বিশ্বাস করতাম, তার ব্যাপারে আমার মধ্যে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ দেখা দিতনা। আমি বিশ্বাস করতাম, সে মুসলিম হলে ইসলামের দ্বারা, আর খ্রীস্টান হলে মুসলিম কর্মচারী দ্বারা আমাদেরকে শাসন করবে। কিন্তু এখন আমি বাই’য়াতের ব্যাপারে দ্বিধাবোধ করি। আমার দৃষ্টিতে বাই’য়াতের জন্য যোগ্য ব্যক্তি মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন আছে। আমি কেবল তাদের হাতে বাই’য়াত করতে পারি। (বুখারী) কিয়ামত সম্পর্কে তিনি একটি আগাম কথা বলে গেছে। তিনি বলেছেনঃ ‘যতদিন প্রতিটি গোত্রের মুনাফিকরা তার নেতা না হবে ততদিন কিয়ামত হবে না।’ (আল-ইসতী’য়াব, আল-ইসাবা- ১/২৭৮) আর একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, কোন্ ফিত্না সবচেয়ে বড়? বললেনঃ যদি তোমার সামনে ভালো ও মন্দ দু’টোই পেশ করা হয় আর তুমি কোন্টি গ্রহণ করবে তা ঠিক করতে না পার, তাহলে সেটাই বড় ফিত্না। (আল-ইসতীয়’য়াবঃ আল-ইসাবা- ১/২৭৮) আর একবার বললেনঃ মানবজাতির জন্য এমন একটা সময় বা কাল আসবে যখন কেউ ফিত্না থেকে মুক্তি পাবে না। শুধু তারাই মুক্তি পাবে যারা পানিতে নিমজ্জমান ব্যক্তির ডাকার মত আল্লাহকে ডাকবে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫১৭) তিনি সরাসরি রাসূল সা. ও ’উমার রা. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩) ‘খুলাসা’ গ্রন্থের লেখক তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা এক শো’র (১০০) বেশী বলে উল্লেখ করেছেন। যে সকল সাহাবী তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে খ্যাতিমান কয়েকজনের নামঃ জাবির ইবন আবদিল্লাহ, জুনদুব ইবন ’আবদিল্লাহ আল-বাজালী, ’আবদুল্লাহ ইবন ইয়াযীদ আল-খুতামী, আবুত তুফাইল, ’আলী ইবন আবী তালিব, ’উমার ইবন খাত্তাব প্রমুখ সাহাবী। (উসুদুল গাবা- ১/৩৯০; তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩) তাবে’ঈদের একটি বিরাট দল তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁদের কয়েকজনের নাম এখানে উল্লেখ করা হলোঃ কায়স ইবন আবী-হাযেম, আবু ওয়ায়িল, যায়িদ ইবন ওয়াহাব, রিব’ঈ ইবন খিরাশ, যার ইবন হুবাইশ, আবু জাবইয়ান, হুসাইন ইবন জুনদুব, সিলা ইবন যুফার, আবু ইদরীস আল-খাওলানী, ’আবদুল্লাহ ইবন ’উকাইম, সুওয়াইদ ইবন ইয়াযীদ নাখ’ঈ, ’আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ, আবদুর রহমান ইবন আবী লাইলা, হাম্মাম ইবন আল-হারেস, ইয়াযীদ ইবন শুরাইত আত-তাঈমী, বিলাল ইবন হুজাইফা প্রমুখ। (আল-ইসাবা- ১/৩১৮; আয্-যাহাবী, তারীখ- ২/১৫২; তাহজীবুত তাহজীব- ২/১৯৩) রাষ্ট্রীয় গুরুত্বদায়িত্ব পালনের পর তিনি সময় খুব কম পেতেন। তা সত্ত্বেও যখনই সুযোগ হতো হাদীসের দারস দিতে বসে যেতেন। কূফার মসজিদে দারসের হালকা বসতো এবং তিনি সেখানে হাদীস বর্ণনা করতেন। (মুসনাদ- ৫/৪০৩) জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ বলেনঃ হুজাইফা রা. আমাদের বলতেন, আমাদের ওপর এই ইলমের দায়িত্ব চাপানো হয়েছে। আমরা তোমাদের কাছে তো পৌঁছাবো- যদিও তার ওপর আমরা ’আমল না করি। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৬৮; কানযুল ’উম্মাল- ৭/২৪) ছাত্ররা তাঁকে যেমন অতিরিক্ত ভক্তি ও সম্মান দেখাতো তেমনি ভয়ও পেত। ‘বাশকারী’ একবার মসজিদে এসে দেখেন, গোটা মজলিস সম্পূর্ণ নীরব এবং একই ব্যক্তির দিকে একাগ্রচিত্তে চেয়ে আছে। যেন সকলের মাথা কেটে ফেলা হয়েছে। (মুসনাদ- ৫/৩৮৬) ছাত্ররা যে তাঁকে কী পরিমাণ ভয় ও সম্মানের চোখে দেখতো তা একটি ঘটনা দ্বারা বুঝা যায়। একবার তিনি হযরত ’উমার রা. সম্পর্কিত ফিত্নার হাদীসটি বর্ণনা করলেন। হাদীসটি ছিল গোপন রহস্য বিষয়ক ও ইশারা-ইঙ্গিতে পরিপূর্ণ। কিন্তু তার অর্থ জিজ্ঞেস করার হিম্মত কোন ছাত্রের হলো না। অবশেষে তাঁরা হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদের যোগ্য ছাত্র ‘মাসরূক’ কে হাদীসটির অর্থ জিজ্ঞেস করার জন্য রাজী করান। তিনি তা জিজ্ঞেস করেন। একবার হযরত হুজাইফা রা. মি’রাজের হাদীস বর্ণনা করেছেন। এমন সময় যার বিন হুবাইশ আসলেন। হুজাইফা বললেনঃ হযরত রাসূলে কারীম সা. বাইতুল মাকদাসের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেননি। যার বললেনঃ রাসূল সা. ভিতরে ঢুকেছিলেন এবং নামাযও আদায় করেছিলেন। হুজাইফা বললেনঃ তোমার নাম কি? আমি তোমাকে চিনি তবে নামটি জানিনে। তিনি নাম বললেনঃ হুজাইফা বললেনঃ রাসুল সা. যে নামায আদায় করেছিলেন, সেকথা তুমি কিভাবে জানলে? যার বললেনঃ কুরআন থেকে। হুজাইফা বললেনঃ আয়াতটি পাঠ কর তো। যার সূরা আল-ইসরার সেই আয়াতটি পাঠ করলেন যাতে মি’রাজের বর্ণনা এসেছে। হুজাইফা বললেনঃ এর মধ্যে নামাযের কথা কোথায় আছে? যার কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে নিজের ভুল স্বীকার করেন। (মুসনাদ- ৫/৩৮৭) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি দারুণ সতর্ক ও সংরক্ষণবাদী ছিলেন। আবদুর রহমান ইবন আবী লাইলা বলেনঃ আমরা তাঁর কাছে হাদীস শুনতে চাইলে তিনি বর্ণনা করতেন না। (মুসনাদ- ৫/৩৯৭) এ কারণে মানুষও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতো। যখন কোন ঘটনা ঘটতো, আর তিনি হাদীস বর্ণনা করতেন তখন গোটা সমাবেশকে অতি গুরুত্বের সাথে চুপ করানো হতো। (মুসনাদ- ৫/৩৯৭) একবার তিনি ও আবু মাস’উদ একসাথে ছিলেন। একজন অন্যজনের কাছে হাদীস শুনতে চাইলেন। কিন্তু প্রত্যেকেই বলছিলেন, না, আপনি বলুন। (মুসনাদ- ৫/৪০৭) তিনি পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি ছিলেন দারুণ উদাসীন। এ ব্যাপারে তাঁর অবস্থা এমন ছিল যে, মাদায়েনের ওয়ালী থাকাকালেও তাঁর জীবন যাপনে কোনরূপ পরিবর্তন হয়নি। অনারব পরিবেশ এবং সেইসাথে ইমারাতের পদে অধিষ্ঠিত থাকা- এত কিছু সত্ত্বেও তাঁর কোন সাজ-সরঞ্জাম ছিল না। বাহনের জন্য সব সময় একটি গাধা ব্যবহার করতেন। এমন কি জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম খাবার ছাড়া কাছে আর কিছুই রাখতেন না। একবার খলীফা হযরত ’উমার রা. তাঁর কাছে কিছু অর্থ পাঠালেন। সাথে সাথে তিনি সবই মানুষের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। (উসুদুল গাবা- ১/৩৯২) তবে তিনি দুনিয়া ও আখিরাত সমানভাবে গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি বলতেনঃ তোমাদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম নয় যারা আখিরাতের জন্য দুনিয়া ত্যাগ করেছে, আবার তারাও নয় যারা দুনিয়ার জন্য আখিরাত ছেড়ে দিয়েছে। বরং যারা এখান থেকে কিছু এবং ওখান থেকে কিছু গ্রহণ করে তারাই মূলতঃ সবচেয়ে ভালো। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ২০০; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫১৭) দুনিয়ার প্রতি উদাসীনতার সাথে সাথে ইবাদাত-বন্দেগীতে গভীরভাবে মশগুল থাকতেন। একবার তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে সারা রাত নামায আদায় করেন। এর মধ্যে একবারও ‘উহু’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। (মুসনাদ- ৫/৪০০) হুজাইফা রা. বলেনঃ আমি একদিন রাতে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে নামায পড়েছি। তিনি সূরা বাকারাহ দিয়ে শুরু করলেন। ভাবলাম, এক শো আয়াতের মাথায় হয়তো রুকু’ করবে; কিন্তু তার পরেও পড়ে যেতে লাগলেন। মনে করলাম, সূরা বাকারাহ্ এক রাকা’য়াতে শেষ করবেন। কিন্তু না, সূরা নিসা শুরু করলেন। নিসার পর আলে ’ইমরানও শেষ করলেন। তারপরও রুকু’র কোন লক্ষণ দেখা গেল না। বিভিন্ন সূরা পড়তে লাগলেন। কোন তাসবীহর আয়াত তিলাওয়াত করছেন, সাথে সাথে সুবহানাল্লাহ পড়ছেন। দু’আর আয়াত এলে দু’আ করছেন, আবার তা’য়াউজের আয়াত এলে আ’উজুবিল্লাহ পড়ছেন। এক সময় রুকু’তে গেলেন এবং সুবহানা রাব্বীয়াল ’আজীম পড়তে লাগলেন। সে রুকু’র যেন শেষ নেই। তা ছিল কিয়ামের মতই দীর্ঘ। এক সময় ‘সামি’য়া আল্লাহু লিমান হামিদা’ বলে উঠে দাড়ালেন এবং রুকু’র মতই দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর সিজদায় গেলেন এবং তাও ছিল কিয়ামের মত দীর্ঘ। এভাবে নামায শেষ হলে বিষয়টির প্রতি আমি রাসূলুল্লাহর সা. দৃষ্টি আকর্ষন করলাম। তিনি বললেনঃ তুমি যে আমার পিছনে আছ একথা জানতে পেলে আমি নামায সংক্ষেপ করতাম। (মুসনাদ-৫/৩৮২, ৩৮৪; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৯১) সর্ব অবস্থায় সকলকে তিনি আমর বিল মা’রূফ বা ভালো কাজের আদেশ দিতেন। হযরত আবু মূসা আল-আশ’য়ারী রা. ছিলেন একজন উঁচু স্তরের সম্মানিত সাহাবী। তিনি কাপড়ে প্রস্রাবের ছিটা লাগার ভয়ে সতর্কতা স্বরূপ বোতলে প্রস্রাব করা শুরু করেন। হযরত হুজাইফা এ কথা জানতে পেরে তাঁকে বললেনঃ এমন কঠোরতা ঠিক নয়। রাসুল সা. একবার একটি ঘোড়ার ওপর দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করেন। আমিও তখন তাঁর সাথে। আমি একটু দূরে সরে যেতে চাইলে বললেন, কাছেই থাক। আমি তাঁর পিঠের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকলাম। (মুসনাদ- ৫/৩৮২) একবার কিছু লোক এক স্থানে জটলা করে বসে কথা বলছিল। হুজাইফা তাদের কাছে এসে বললেন, রাসূলের সো. সময়ে এমন জটলা করে কথা বলা ‘নিফাকের’ (কপটতা) মধ্যে গণ্য করা হতো। (মুসনাদ- ৫/৩৮৪) একদিন এক ব্যক্তি মসজিদে এসে খুব তাড়াতাড়ি নামায আদায় করছিল। হযরত হুজাইফা রা. কাছে এসে বললেন, তুমি কতকাল এভাবে নামায আদায় করছো? লোকটি বললোঃ চল্লিশ বছর। হুজাইফা বললেন, তোমার এ চবল্লিশ বছরের নামায একেবারে মিছেমিছি হয়ে গেছে। যদি এভাব নামায আদায় করতে করতে মারা যাও তাহলে সে মরণ দ্বীনে মুহাম্মদীর ওপর হবে না। তারপর তাকে নামাযের নিয়ম-কানুন শিখিয়ে দিলে বলে, ছোট ছোট সূরাহ পড়, তবে রুকু’-সিজদা ঠিকমত কর। (মুসনাদ- ৫/৩৮৪; কানযুল ’উম্মাল- ৪/২৩০; হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৮০) একবার এক ব্যক্তিকে মজলিসের মাঝখানে এসে বসতে দেখে তিনি বললেন, রাসূল সা. এমন ব্যক্তির ওপর লা’নত (অভিশাপ) করেছেন। (মুসনাদ- ৫/৩৯৮) হযরত ’উসমান রা. যখন মদীনায় বিদ্রোহীদের দ্বারা ঘেরাও অবস্থায় আছেন তখন একবার রিব’ঈ হযরত হুজাইফার রা. সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মাদায়েন আসলেন। হুজাইফা তাঁর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ’উসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে কারা? রিব’ই কতিপয় লোকের নাম বললেন। তখন তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে শুনেছি, যে ব্যক্তি জামা’য়াত (দল) ছেড়ে দিয়েছে এবং ইমারাত বা নেতৃত্বকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে, আল্লাহর নিকট সে একেবারেই গুরুত্বহীন। (মুসনাদ- ৫/৩৮৭) সত্যবাদিতা ছিল তাঁর চরিত্রের বিশেষ গুণ। তাঁর ছাত্র হযরত রিব’ঈ যখন হযরত হুজাইফার রা. সূ্ত্রে হাদীস বর্ণনা করতেন তখন বলতেনঃ ‘হাদ্দাসানী মান লাম ইউকাজ্জিব্নী- আমাকে এমন ব্যক্তি এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, যিনি আমাকে মিথ্যা বলেননি।’ তাঁর এ কথা দ্বারা লোকেরা বুঝে যেত যে তিনি হুজাইফা ছাড়া আর কেউ নন। (মুসনাদ- ৫/৩৮৫, ৪০১) হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাথে তাঁর গভীর নৈকট্য ও অন্তরঙ্গতা ছিল। বহু ঘটনায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়। একবার রাসূল সা. তাঁর বুকে ঠেস দিয়ে বসেছিলেন। (মুসনাদ- ৫/৩৮৩) আর একবার ইযারের (পাজামা) সীমা বলতে গিয়ে তাঁর পবিত্র হাত হুজাইফার রা. পায়েল নালা স্পর্শ করেছিল। (মুসনাদ-৫/৩৮২) খন্দকের সেই দুর্যোগপূর্ণ রাতে মুশরিকদের খবর নিয়ে এলে রাসুল সা. নিজের কম্বলের একাংশ তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেন, টেনে নিজের কাছে বসান। একরাত নিজের হুজরায় থাকার ব্যবস্থা করেন। (মুসনাদ-৫/৩৯৩) তিনি বিশিষ্ট সাহাবীদের সাথে বসে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে নানা বিষয়ে ইলম বা জ্ঞান অর্জন করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন ’উমারের রা. একটি বর্ণনা থেকে একথা জানা যায়। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৬৩১) হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাথে তাঁর কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল তা আরেকটি ঘটনা দ্বারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একবার রমজান মাসে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে নামায আদায় করেন। রাতে রাসূল সা. গোসল করেন। তখন হুজাইফা রা. পর্দা করে দাঁড়ান। কিন্তু পানি বেঁচে গেল এবং তা দিয়ে হুজাইফা গোসল করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাসূল সা. অনুমতি দিলেন। তিনি গোসল শুরু করলে রাসূল সা. পর্দা করে দাঁড়ালেন। এতে তিনি আপত্তি জানালে রাসুল সা. বললেনঃ তুমি যেমন আমার পর্দা করেছ, আমিও তেমন তোমার পর্দা করবো (তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/৯৮; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৮৮) হযরত হুজাইফা ছিলেন ক্ষমা ও সহনশীলতার মূর্ত প্রতীক। তার পিতাকে যাঁরা ভুলক্রমে হত্যা করেছিল তিনি তাদের প্রতি উত্তেজিত বা তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেননি; বরং আল্লাহ তা’য়ালার দরবারে তাদের এ ভুলের মাগফিরাত কামনা করেছেন। হযরত ’উরওয়া ইবন যুবাইর রহ. বলেনঃ ক্ষমা ও সহনশীলতার গুণটি হযরত হুজাইফার রা. মধ্যে আমরণ বিদ্যমান ছিল। (বুখারী- ২/৫৮১) রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি তাঁর আনুগত্যের অবস্থা যে কেমন ছিল তা বুঝা যায় খন্দক যুদ্ধের ঘটনাটি দ্বারা। সে সময় একজ সাহাবীও শত্রু শিবিরে যেতে সাহস করেনি। কিন্তু তিনি রাসূলের সা. আদেশ পালনের জন্য জীবন বাজি রেখে সেখানে যান এবং জান্নাতের সুসংবাদ লাভ করেন। একবার পথে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে তাঁর দেখা হলো। রাসুল সা. হাত মিলানোর জন্য তাঁর দিকে এগিয়ে গেলে তিনি বললেন, আমি অপবিত্র। রাসুল সা. বললেনঃ মুমিন ব্যক্তি কখনো নাজাস বা অপবিত্র হয়না। (মুসনাদ- ৫/৩৮৪) অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা. বলেনঃ একজন মুসলিম যখন তার ভাইয়ের সাথে হাত মেলায় তখন তাদের দু’জনের গুনাহ গাছের শুকনো পাতার মত ঝরে পড়ে। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৯৫) হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাথে যখন তাঁর আহার করার সৌভাগ্য হতো, তিনি কখনো আগে শুরু করতেন না। রাসুল সা. আগে শুরু করতেন। (মুসনাদ- ৫/৩৮৩) হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাহচর্যে যে দিন আসতেন সেদিন যুহর, ’আসর, মাগরিব ও ’ইশার নামায তার সাথে আদায় করতেন। মাঝের এ সময়টুকু সুহবতের সৌভাগ্য অর্জন করতেন। (মুসনাদ- ৫/৩৯২) যখনই সময় ও সুযোগ পেতের রাসূলুল্লাহর সা. খিদমাত করতেন এবং ওযু-গোসলের পানি এগিয়ে দিতেন। তিনি বর্ণনা করেছেনঃ একদিন রাসুল সা. ময়লা-আবর্জনা ফেলার স্থলে দাঁড়িয়ে পেশাব করলেন। তারপর আমার কাছে পানি চাইলেন। আমি পানি এগিয়ে দিলে তিনি ওযু করে মোযার ওপর মাসেই করলেন। (মুসনাদ- ৫/৩৮২) তিনি এ খবরও দিয়েছেন যে, রাসূল সা. রাতে যখন নামাযের জন্য উঠতেন তখন মিসওয়াক করতেন। (মুসনাদ- ৫/৩৮২) এ সকল বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি সময় ও সুযোগ পেলে সব সময় রাসূলুল্লাহর সা. আশে-পাশে থাকতেন। একদিন হুজাইফার রা. সম্মানিত মা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন তুমি রাসূলুল্লাহর সা. দরবারে যাওনি? ছেলে সময়-সীমা বলার পর তিনি ক্ষেপে গিয়ে তাকে বকাঝকা করেন। তখন হুজাইফা মাকে বলেন, মা, আপনি থামুন। আমি আজই মাগরিবের নামায রাসূলুল্লাহর সা. আদায় করছি এবং তাঁর দ্বারা আমার ও আপনার মাগফিরাত কামনা করে দু’আ করাচ্ছি। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. দরবারে গেরেন এবং নামায আদায় করলেন। নামায শেষ করে রাসূল সা. বের হলেন। হুজাইফাও পিছনে পিছনে চলতে লাগলেন। এক সময় রাসুল সা. ঘাড় ফিরিয়ে তাঁকে দেখে বলে উঠলেনঃ কে, হুজাইফা? আল্লাহ তোমাকে ও তোমাকে মাকে ক্ষমা করুন। (মুসনাদ- ৫/৩৯১; তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/৯৫) হযরত হুজাইফা খুব কমই উত্তেজিত হতেন। তবে শরী’য়াতের হুকুম যথাযথভাবে পালিত হতে না দেখলে তাঁর রোগের কোন সীমা থাকতো না। শরী’য়াতের বিন্দুমাত্র এদিক ওদিক হওয়া সহ্য করতেন না। মাদায়েনে থাকাকালে একবার এক রয়িসের (সর্দার) গৃহে পানি চাইলেন। রয়িস রূপোর পাত্রে পানি দিলে তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান। পাত্রটি রয়িসের হাত থেকে নিয়ে তার গায়ে ছুড়ে মারেন। তারপর বলেন, আমি কি তোমাকে সতর্ক করে দিইনি যে, রাসুল সা. সোনা-রূপোর পাত্রের ব্যবহার নিষেধ করেছেন? এমনিভাবে তিনি সুন্নাতের হেরফের হওয়া বিন্দুমাত্র পসন্দ করতেন না। একবার বনী উসাইদের আযাদকৃত দাস আবু সা’ঈদ কিছু খাবার তৈরী করে আবু যার, হুজাইফা ও ইবন মাস’উদকে দা’ওয়াত দিলেন। তিনজন যখন তাঁর বাড়ী পৌঁছলেন তখন নামাযের সময় হয়েছে। আবু যার ইমামতির জন্য এগিয়ে গেলে হুজাইফা বলে উঠলেনঃ আবু যার পিছনে সরে এসো। ইমামতির অগ্রাধিকার গৃহকর্তার। আবু যার বললেনঃ ইবনে মাস’উদ, কথাটি কি সত্যি? ইবন মাস’উদ বললেনঃ হাঁ। আবু যার পেছনে সরে এলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৩১) জাহিলী আরবে কারো মৃত্যু হলে তা খুব ঘটা করে প্রচার করা হতো। রাসুল সা. এমনটি করতে নিষেধ করেন। হযরত হুজাইফা এত কঠোরভাবে তা পালন করতেন যে, কেউ মারা গেলে কাউকে সে খবরটি পর্যন্ত দিতে চাইতেন না। তিনি ভয় করতেন, সেই আগের অবস্থায় আবার ফিরে না আসে। (মুসনাদ- ৫/৪০৬) তিনি নির্জনতা পসন্দ করতেন, কিন্তু সেভাবে থাকতে পারতেন না। তিনি বলতেনঃ আমার ইচ্ছা হয়, বিষয়-সম্পদ দেখা-শুনার মত কেউ থাকলে আমি ঘরের দরযা বন্ধ করে দিতাম। তাহলে কেউ আমার কাছে ঘেঁষতে পারতো না এবং আমিও মানুষের কাছে যেতাম না। আর এভাবে আমি আল্লাহর সাথে মিলিত হতাম। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৪৯) তিনি ঝগড়া-বিবাদ, পরনিন্দা, দোষ অন্বেষণ, রক্তপাত ইত্যাদি ধরণের খারাপ কাজ খুবই ঘৃণা করতেন। একবার তিনি এক ব্যক্তিকে বললেনঃ তুমি কি একজন মস্তবড় পাপীকে হত্যা করতে পারলে খুশী হবে? সে বললোঃ হাঁ। তিনি বললেনঃ তাহলে তুমি হবে তখন তার চেয়েও বড় পাপাচারী। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪০৮) এক ব্যক্তি খলীফা হযরত ’উসমানের রা. কাছে মানুষের নানা কথা পৌঁছে দিত। লোকটি একদিন যখন হুজাইফার রা. সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন লোকেরা বললেঃ এ ব্যক্তি আমীরের নিকট সকল সংবাদ পৌঁছে দেয়। তিনি বললেনঃ এমন লোক জান্নাতে যেতে পারে না। (মুসনাদ- ৫/৩৮৯) যায়িদ ইবন ওয়াহাব বলেনঃ একবার একটি ব্যাপারে কোন এক আমীরের প্রতি মানুষ ক্ষেপে গেল। হযরত হুজাইফা মসজিদে দারস দিচ্ছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি মানুষের ভীড় ঠেলে হুজাইফার রা. মাথার কাছে এসে দাড়িয়ে বললোঃ ‘হে রাসূলুল্লাহর সাহাবী! আপনি কি মানুষকে ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবেন না? হুজাইফা রা. লোকটির উদ্দেশ্য বুঝতে পারলেন। তিনি মাথা সোজা করে তাকে বললেনঃ ’আমর বিল মা’রূফ ও নাহি ’আনিল মুনকার অতি ভালো কাজ- এতে সন্দেহ নেই। তবে এ জন্য আমীরের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ সুন্নাত সম্মত নয়। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৬) তিনি সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে মিষ্টি-মধুর আলাপ করতেন। কিন্তু বাড়ীতে স্ত্রীর সাথে কথাবার্তায় ছিলেন একটু কর্কশ। বিষয়টি তিনি নিজেই উপলব্ধি করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, ‘আমি নবীর সা. কাছে এসে বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার একটি জিহবা আছে, আমার স্ত্রীর প্রতি তা বড় কঠোর। ভয় হচ্ছে, তা আমাকে জাহান্নামে নিয়ে না যায়। রাসূল সা. বললেনঃ তুমি আল্লাহর কাছে ইসতিগ্ফার (ক্ষমা চাওয়া) করনা কেন? এই যে আমি, প্রতিদিন শতবার আল্লাহর কাছে ইসতিগফার করি। (রিজালুন হাওলার রাসুল- ১৯৬; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩১৬) একবার লোকেরা বললো, আপনি রাসূলুল্লাহর সা. এমন একজন সাহাবীর নাম বলুন যিনি চলন-বলন, আকীদা-বিশ্বাস, তথা প্রতিটি বিষয়ে আপনার মত। বললেনঃ এমন ব্যক্তি শুধূ ইবন মাস’উদ। তবে যতক্ষণ তিনি ঘরের বাইরে থাকেন। ঘরের ভিতরের অবস্থা আমার জানা নেই। (মুসনাদ- ৫/২৮৯, ৩৯৪) হযরত ’আলী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে। রাসুল সা. বলেছেনঃ ‘আমার পূর্বের নবীদেরকে সাতজন উযীর ও বন্ধু দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাকে দেওয়া হয়েছে চৌদ্দজন।’ এই বলে তিনি চৌদ্দ জনের নাম উচ্চারণ করেন। তাদের মধ্যে হুজাইফার নামটিও ছিল। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৪/৯৬) তিনি সব সময় হিংসা-বিদ্বেষের উর্ধে থাকার চেষ্টা করতেন। কারো সাথে কোন রকম তিক্ততার সৃষ্টি হলে তাড়াতাড়ি মিটমাট করে নিতেন। ’আকাবায় অংশগ্রহণকারী কোন এক সাহাবীর সাথে একটি ব্যাপারে তাঁর তিক্ততার সৃষ্টি হয়। তাদের কথা বলাবলি বন্ধ হয়ে যায়। হযরত হুজাইফা রা. সবকিছু ভুলে প্রথমে তাঁর সাথে কথা বলেন। তারপর সে সাহাবীও নিজের আচরণে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হন। (মুসনাদ- ৫/৩৯০) তিনি ছিলেন খুবই সামাজিক ও উদার। খাওয়ার সময় কেউ উপস্থিত হলে তাকেও ডেকে সংগে বসাতেন। (মুসনাদ- ৫/৩৯২) হযরত রাসূলে কারীম সা. অন্তিম রোগ শয্যায় শায়িত। সাহাবীরা তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী একজন খলীফা নিয়োগ করে যাওয়ার আবেদন জানান। তিনি তাদের সে আবেদন প্রত্যাখ্যাত করে যে সব উপদেশ দান করেন তার মধ্যে এ কথাটিও ছিলঃ ‘হুজাইফা তোমাদেরকে যা বলবে তা মেনে নিবে।’ (তারীখু ইবন ’আসাকির- ৪/৯৬) খলীফা হযরত ’উসমান রা. পবিত্র কুরআনের যে স্ট্যান্ডার্ড কপি তৈরী করেন এবং খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান, তার নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করেন মূলত” হযরত হুজাইফা রা.। ইমাম বুখারী হযরত আনাসের রা. একটি বর্ণনা নকল করেছেন। আনাস বলেন, ‘হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান সিরিয়াবাসীদের সাথে ইরাক, আরমেনিয়া ও আজারবাইজান অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তিনি এ সকল এলাকার নবদীক্ষিত অনারব মুসলিমদের কুরআন পাঠে তারতম্য লক্ষ্য করে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। সেখান থেকে মদীনায় ফিরে খলীফাকে বললেন, ‘আমি আরমেনিয়া ও আজারবাইজানের লোকদের দেখেছি, তারা সঠিকভাবে কুরআন পড়তে জানেনা। তাদের কাছে কুরআনের স্ট্যান্ডার্ড কপি পৌঁছাতে না পারলে ইয়াহুদ ও নাসারার হাতে তাওরাত ও ইনজীলের যে দশা হয়েছে, এ উম্মতের হাতে কুরআনের দশাও অনুরূপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ খলীফা বিশিষ্ট সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রা. কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ‘মাসহাফ’ এনে তার হুবহু নকল করে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার করেন। এভাবে পবিত্র কুরআনের হিফাজতের ব্যাপারে হযরত হুজাইফা রা. পরোক্ষভাবে বিরাট অবদান রাখেন। (দ্রঃ সহীহ বুখারীঃ জাম’উল কুরআন অধ্যায়; আত-তিব ইয়ান ফী উলুমিল কুরআন- ৫৭) উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ ও গুণাবলীর কারণে হযরত ’উমার রা. তাঁকে খুব সম্মান করতেন। যেহেতু হুজাইফা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে মুনাফিকদের নাম জেনেছিলেন, তাই সকলে এ ব্যাপারে তাঁরই শরণাপন্ন হতেন। খলীফা ’উমারের রা. তো অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল কোন মুসলমান মারা গেলে এ কথা জিজ্ঞেস করা যে, হুজাইফা কি এর জানাযায় শরীক হয়েছে? যদি বলা হতো ‘হ্যাঁ’ তাহলে তিনিও পড়তেন। আর যদি বলা হতো ‘না’ তাহলে তাঁর সন্দেহ হতো এবং তিনি তার জানাযা পড়তেন না। (উসুদুল গাবা- ১/৩৯১; শাজারাতুজ জাহাব- ১/৪৪) একবার খলীফা ’উমার রা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আচ্ছা আমার কর্মকর্তাদের মধ্যে কি কোন মুনাফিক আছে? হুজাইফা বললেনঃ একজন আছে। খলীফা বললেনঃ আমাকে তার একটু পরিচয় দাও না। বললেনঃ আমি তা দেব না। হুজাইফা বলেনঃ তবে অল্প কিছু দিনের মধ্যে ’উমার তাকে বরখাস্ত করেন। সম্ভবতঃ তিনি সঠিক হিদায়াত পেয়েছিলেন। (সুওয়ারুন মিন হায়াতিস সাহাবা- ৪/১৩৬-১৩৭) হুজাইফা রা. বলেনঃ আমি একদিন মসজিদে বসে আছি। ’উমার রা. আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে বললেনঃ হুজাইফা, অমুক মারা গেছে, তার জানাযায় চলো। একথা বলে তিনি চলে গেলেন। মসজিদ থেকে বের হতে যাবেন, এমন সময় পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন, আমি নিজ স্থানে বসে আছি। তিনি বুঝতে পেরে আমার কাছে ফিরে এসে বললেনঃ হুজাইফা, আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, সত্যি করে বল তো আমিও কি তাদের (মুনাফিকদের) একজন? আমি বললামঃ নিশ্চয়ই না। আপনার পরে আর কাউকে কক্ষণো আমি এমন সনদ দেব না। (তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/৯৭; যাহাবীঃ তারীখ- ২/১৫৩) একবার খলীফা হযরত ’উমার রা. তাঁর পাশে বসা সাহাবীদের বললেন, আচ্ছা আপনারা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষার কথা একটু বলুন তো! প্রায় সকলেই বললেন, আমাদের একান্ত ইচ্ছা এই যে, আমরা যদি ধন-রত্নে ভরা একটি ঘর পেতাম, আর তার সবই আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে পারতাম। সবার শেষে ’উমার রা. বললেন, আমার বাসনা এই যে, আমি যদি আবু ’উবাইদাহ, মুয়াজ ও হুজাইফার রা. মত মানুষ বেশী বেশী পেতাম, আর তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পণ করতে পারতাম। একথা বলে তিনি দীনার ভর্তি একটি থলে একজন লোকের হাতে দিয়ে বলেন, এগুলি হুজাইফার নিকট নিয়ে যাও, আর তাকে বল, খলীফা এগুলি আপনার প্রয়োজনে খরচের জন্য পাঠিয়েছেন। তাকে আরো বলে দেন, তুমি একটু অপেক্ষা করে দেখে আসবে, সে দীনারগুলি কি করে। লোকটি থলেটি নিয়ে হুজাইফার নিকট গেল। আর হুজাইফা সাথে সাথে তা গরীব-মিসকীনের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। (দ্রঃ তারীখু ইবন ’আসাকির- ১/৯৯, ১০০; উসুদুল গাবা- ১/৩৯২; হায়াতুস সাহাবা- ২/২৩৩) হযরত হুজাইফার রা. এমনি ধরণের অনেক ফজীলাত ও মহত্বের কথা বিভিন্ন গ্রন্থে ছড়িয়ে আছে যা ছোট কোন প্রবন্ধে প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না।

  • আবু দারদা (রা)

    আবু দারদা (রা)

    ডাক নাম আবু দারদা। কন্যা দারদার নাম অনুসারে এ নাম এবং ইতিহাসে এ নামেই খ্যাত। আসল নামের ব্যাপারে মত পার্তক্য আছে। যথাঃ ’আমির ও ’উয়াইমির। আল-আসমা’ঈর মতে, ’আমির, তবে লোকে ’উয়াইমির বলতো। আর এটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। কেউ বলেছেন, ’উয়াইমির তাঁর লকব বা উপাধি। পিতার নামের ব্যাপারেও বিস্তর মত পার্থক্য আছে। যথাঃ মালিক, ’আমির, সা’লাবা, আবদুল্লাহ, যায়িদ ইত্যাদি। মায়েল নাম মুহাব্বাত বা ওয়াকিদাহ্। (তাহজীব আত-তাহজীব- ৮/১৫৬; আল-ইসাবা- ২/৪৫; উসুদুল গাবা- ৫/১৮৫; আল-ইসতী’য়াবঃ পার্শ্ব টীকাঃ আল-ইসাবা- ৪/৫৯) মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের ‘বালহারিস’ শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর সা. সমবয়সী বা কিছুদিনের ছোট। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ ইলামিয়্যা (উর্দ্দু)- ১/৮০০) তিনি ছিলেন আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, অশ্বারোহী ও বিচারক। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ছিলেন মদীনার একজন সফল ব্যবসায়ী। তারপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে একান্তভাবে আল্লাহর ইবাদাতে আত্মনিয়োগ করেন। এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলতেনঃ ‘রাসূলুল্লাহর সা. নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে আমি ছিলাম ব্যবসায়ী। তারপর যখন ইসলাম এলো, আমি আমার ব্যবসা ও ইবাদাতের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করলাম। কিন্তু তা সমন্বিত হলোনা। সুতরাং আমি ব্যবসা ছেড়ে ইবাদাতে আত্মেনিয়োগ করলাম।’ (আজ-জাহাবীঃ তারীখুল ইসলাম- ২/১০৭; আল-আ’লাম- ৫/২৮১; হায়াতুস সাহাবা- ২/২৯৬) শেষে ব্যবসার প্রতি দারুণ বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠেন। অনেক সময় বলতেন, এখন যদি আমার মসজিদে নববীর সামনে একটি দোকান থাকে, প্রতিদিন তাতে ৪০ দীনার করে লাভ হয় এবং তা সাদাকা করে দিই, আর এ জন্য নামাযের জামা’য়াতও ফাওত না হয়- তবুও এমন ব্যবসা এখন আমার পসন্দ নয়। লোকেরা এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেনঃ শেষ বিচার দিনের কঠিন হিসাবের ভয়। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২৫; হায়াতুস সাহাবা- ২/২৯৬; আল-হুলায়্যা- ১/২০৯) ইসলাম গ্রহণের পর বীরত্ব, খোদাভীরুতা ও পার্থিব ভোগ-বিলাসিতার প্রতি উদাসীনতার জন্য সাহাবাকুলের মধ্যে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেন। (আল-আ’লাম- ৫/২৮১; আল-ইসাবা- ২/৪৫) আবু দারদার বীরত্ব, অশ্বারোহণ ও বিজ্ঞতার স্বীকৃতি হযরত রাসূলে কারীমের সা. বাণীতে পাওয়া যায়। বিজ্ঞতা সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছেনঃ ’উয়াইমির হাকীমু উম্মাতি- ’উয়াইমির- আমার উম্মাতের একজন মহাজ্ঞানী হাকীম। তাঁর অশ্বারোহণ সম্পর্কে বলেছেনঃ নি’মাল ফারিসু ’উয়াইমির- ’উয়াইমির একজন চমৎকার অশ্বারোহী। (তারীখুল ইসলাম- ২/১০৮; আল-ইসাবা- ২/৪৪; আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার টীকা- ৪/৬০) তাঁর বিজ্ঞতাসূচক অনেক বাণী বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। তার কিছু অংশ ‘আল-ইসতীয়াব’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। (টীকা আল-ইসাবা- ২/১৭) এ কারণে ইমাম ইবনুল জাযারী তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেনঃ ‘কানা মিনাল ’উলামা আল-হুকামা’- তিনি ছিলেন বিজ্ঞ জ্ঞানীদের একজন। (আল-আ’লাম- ৫/২৮১) সা’ঈদ ইবন ’আবদুল আযীয বলেনঃ আবু দারদা বদর যুদ্ধের দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। (তারীখুল ইসলাম- ২/১০৯) আবার অনেকে বলেছেন বদর যুদ্ধের পর। (শাজারাতুজ জাহাব- ৫/৩৯) আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থকার বলেনঃ তিনি তাঁর পরিবারের সকলের শেষে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং উত্তরকালে একজন ভালো মুসলিমে পরিণত হন। (টীকা- আল-ইসাবা- ৪/৫৯) জুবাইর ইবন নুফাইর বলেন, রাসূল সা. বলেছেনঃ আল্লাহ আমাকে আবু দারদার ইসলামের অঙ্গীকার করেছেন। জুবাইর বলেনঃ অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। (তারীখুল ইসলাম- ২/১০৯) এ খুব বিস্ময়ের ব্যাপার যে, এত বড় বুদ্ধিমান হওয়া সত্ত্বেও তিনি অন্য শ্রেষ্ঠ আনসারদের সাথে ইসলাম গ্রহণ না করে হিজরী দ্বিতীয় সন পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। এর একমাত্র কারণ, তার ইসলাম গ্রহণ অন্যের দেখাদেখি নয়; বরং ভেবে-চিন্তে ও জেনেশুনে ছিল। সম্ভবতঃ রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় আগমনের পর এক বছর পর্যন্ত তিনি বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেন এবং ভালোমত খোঁজখবর নেন। তবে এই একটি বছর পেছনে পড়ার কারণে সারা জীবন অনুশোচনা করেছেন। পরবর্তীকালে প্রায়ই বলতেনঃ এক মুহূর্তের প্রবৃত্তির দাসত্ব দীর্ঘকালের অনুশোচনার জন্ম দেয়। জাহিলী যুগে প্রখ্যাত শহীদ সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার রা. সাতে আবু দারদার গভীর বন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃ সম্পর্ক ছিল। আবদুল্লাহ আগে ভাগেই ইসলাম গ্রহণ করেন; কিন্তু আবু দারদা পৌত্তলিকতার ওপর অটল থঅকেন। তবে আবদুল্লাহর সাথে সম্পক পূর্বের মতই বজায় রাখেন। আবদুল্লাহও বন্ধুকে ইসলামের মধ্যে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকেন। তিনি আবু দারদাকে বারবার ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। অবশেষে তাঁরই চেষ্টায় আবু দারদাকে বারবার ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। অবশেষে তাঁরই চেষ্টায় আবু দারদা মুসলমান হন। বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর ইসলাম গ্রহণের কাহিনীটি এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘সেদিন আবু দারদা ’উয়াইমির প্রত্যুষে ঘুম থেকে জেগে তাঁর প্রতীমাটির কাছে গেলেন। সেটি থাকতো বাড়ীর সবচেয়ে ভালো ঘরটিতে। প্রথমে তার প্রতি আদাব ও সম্মান প্রদর্শন। সেটি থাকতো বাড়ীর সবচেয়ে ভালো ঘরটিতে। প্রথমে তার প্রতি আদাব ও সম্মান প্রদর্শন করলেন। নিজের বিশাল দোকানের সর্বোত্তম সুগন্ধ তেল তার গায়ে ভালো করে মালিশ করলেন। তারপর গতকালই ইয়ামন থেকে আগত একজন ব্যবসায়ী তাঁকে যে একখানি উৎকৃষ্ঠ রেশমী কাপড় উপহার দিয়েছেন তাই দিয়ে খুব সুন্দরভাবে প্রতীমাটি ঢেকে রাখলেন। অতঃপর একটু বেলা হলে তিনি দোকানের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার পথে তিনি দেখলেন, মদীনার রাস্তা-ঘাট, অলি-গলি সর্বত্রই মুহাম্মাদের সা. সংগী-সাথী গিজ গিজ করছে। তারা দলে দলে বদর যুদ্ধ থেকে ফিরছেন। আর তাঁদের আগে আগে চলছে কুরাইশ বন্দীরা। তিনি তাঁদের এড়িয়ে চলতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ খাযরাজ গোত্রের এক যুবক তাঁর সামনে এসে পড়লো। তিনি যুবকের কাছে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার কুশল জিজ্ঞেস করলেন। যুবক বললেন, বদরে তিনি দারুণ যুদ্ধ করেছেন এবং গণীমতের মাল নিয়ে নিরাপদে মদীনায় ফিরেছেন। আবু দারদার দোকানে গিয়ে বরলেন। এদিকে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বদর থেকে ফিরে তাঁর ভাই আবু দারদার বাড়ীতে গেছেন তার সাথে দেখা করতে। বাড়ীর ভিতরে ঢুকে দেখলেন, আবু দারদার স্ত্রী বসে বসে চুলে চিরুনী করছেন। সালাম ও কুশল বিনিময়েল পর আবদুল্লাহ জিজ্ঞেস করলেনঃ আবু দারদা কোথায়? স্ত্রী বললেনঃ আপনার ভাই তো এই মাত্র বেরিয়ে গেলেন। এ কথা বলে আবদুল্লাহকে ঘরে বসতে দিয়ে তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। এদিকে আবদুল্লাহ একটি হাতুড়ি হাতে তুলে নিয়ে যে ঘরে প্রতীমাটি চিল সেখানে ঢুকে গেলেন এবং বিভিন্ন শয়তানের নামের একটি কাসীদা আবৃত্তি করতে করতে হাতুড়ির আঘাতে মূর্তিটি চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলেন। কাসীদাটির শেষাংশ ছিল নিম্নরূপঃ ‘ওহে সাবধান! আল্লাহ ছাড়া আর যত কিছুই ডাকা হোক না কেন সবই বাতিল ও অসার।’ আবু দারদার স্ত্রী হাতুড়ির আঘাতের শব্দ শুনে ছুটে এসে ঘটনাটি দেখে চেঁচিয়ে বলে ওঠেনঃ ‘ওহে ইবন রাওয়াহা। আপনি আমার সর্বনাশ করেছেন।’ আবদুল্লাহ কোন জবাব না দিয়ে এমনভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন যেন কিছুই ঘটেনি। আবু দারদা বাড়ী ফিরে দেখলেন, স্ত্রী বসে বসে কাঁদছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কি হয়েছে? বললেনঃ আপনার ভাই আবদুল্লাহ এসে ঐ দেখুন কি কান্ডই না ঘটিয়ে গেছেন। আবু দারদা প্রথমতঃ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তারপর গভীরভাবে চিন্তা করার পর আপন মনে বলে ওঠেনঃ যদি এ প্রতীমার মধ্যে সত্যি সত্যিই কোন কল্যাণ থাকতো তাহলে সে নিজেকে রক্ষা করতো। এমন চিন্তার পর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট যান এবং ইসলাম কবুল করেন।’ (সুওয়ারুন মিন হায়াতুস সাহাবা- ৩/৯৫-১০০; হায়াতুস সাহাবা- ১/২৩২-২৩৩; ৩/৩৮৪; আল-মুসতাদরিক- ৩/৩৩৬) রাসূল সা. সালমান আল-ফারেসীর সাথে তাঁর দ্বীনি-ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৭১; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২৫; উসুদুল গাবা- ৫/১৮৫) বদর যুদ্ধের সময় আবু দারদা অমুসলিম ছিলেন। এ কারণে সে যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেননি। তবে খলীফা হযরত ’উমার রা. তাঁর খিলাফতকালে সাহাবাদের যে ভাতার ব্যবস্থা করেন তাতে আবু দারদার ভাতা বদরী সাহাবীদের সমান নির্ধারণ করেন বলে বর্ণিত হয়েছে। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ১/৮০০) উহুদ যুদ্ধের সময় তিনি মুসলমান। এ যুদ্ধে তিনি যোগদান করেন এবং একজন অশ্বারোহী সৈনিক হিসাবেই এতে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে প্রতিপক্ষের একটি অশ্বারোহী বাহিনীকে তাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি একাই তাদের তাড়িয়ে দেন। রাসূল সা. সে দিন তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতা দেখে দারুণ পুলকিত হন এবং মন্তব্য করেনঃ ‘নি’মাল ফারিসু ’উয়াইমির’- ’উয়াইমির এক চমৎকার ঘোড় সওয়ার। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২৪; তারীখুল ইসলাম- ২/১০৭) উহুদ ছাড়াও অন্যান্য সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে অংশগ্রহণ করেন। তবে সে সব ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের পর হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে আবু দারদা মদীনায় ছিলেন। তাঁর এ সময়ের কর্মকান্ড সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে মদীনা ছেড়ে শামে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। সীরাত বিশেষজ্ঞরা তাঁর মদীনা ত্যাগের কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। ১. মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা. স্মৃতি তাঁকে সব সময় কষ্ট দিত। ২. তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসার নবীর ওয়ারিসদের ওপর ফরজ। এই বোধ তাঁকে মদীনা ত্যাগে উদ্বুদ্ধ করে। ৩. তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট একথা শুনেছিলেন যে, ফিত্নার অন্ধকারে ঈমানের প্রদীপ শামে নিরাপদ থাকবে। মূলতঃ এসকল কারণে শামের রাজধানী দিমাশকে তিনি বসতি স্থাপন করেন। (সীয়ারে আনসার- ২/১৯০) হযরত আবু দারদার মদীনা ত্যাগের ব্যাপারে একটি কাহিনী প্রসিদ্ধ আছে। তিনি সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে খলীফা হযরত ’উমারের নিকট গেলেন অনুমতি চাইতে। খলীফা অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানালেন। তবে একটি শর্তে অনুমতি দিতে পারেন বলে জানালেন। শর্তটি হলো তাঁকে কোন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নিয়ে যেতে হবে। আবু দারদা জানালেন, শাসক হওয়া তাঁর পছন্দ নয়। খলীফা বললেন, তাহলে অনুমতির আশা করবে না। আবু দারদা অবস্থা বেগতিক দেখে বললেন, আমি কোন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করবো না ঠিক, তবে মানুষকে কুরআন-হাদীস শিখাবো এবং নামায পড়াবো। তাঁর প্রস্তাবে খলীফা রাজী হলেন এবং তাঁকে মদীনা ত্যাগের অনুমতি দিলেন। মূলতঃ এ দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যেই তিনি শামের প্রবাস জীবন গ্রহণ করেন। আবু দরদার শামে গমন সম্পর্কে ইবন সা’দ ও হাকেম, মুহাম্মাদ ইবন কা’ব আল-কুরাজী থেকে একটি বর্ণনা নকল করেছেন। তিনি বলেন, হযরত নবী কারীমের সা. জীবনকালে পাঁচজন আনসার সমগ্র কুরআন সংগ্রহ করেন। তাঁরা হলেনঃ মু’য়াজ ইবন জাবাল, ’উবাদা ইবনুস সামিত, উবাই ইবন কা’ব, আবু আইউব ও আবু দারদা রা.। খলীফা ’উমারের খিলাফতকালে হযরত ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান শাম থেকে খলীফাকে লিখলেনঃ শামের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিটি শহর-বন্দর লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়েছে। এ সকল লোককে কুরআন শিখাতে পারে এমন কিছু ব্যক্তির প্রয়োজন। চিঠি পেয়ে খলীফা ’উমার রা. উপরোক্ত পাঁচ ব্যক্তিকে ডেকে চিঠির বক্তব্য তাঁদেরকে জানালেন এবং আবেদন রাখলেন আপনাদের মধ্য থেকে অন্ততঃ তিনজন এ ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করুন। আর ইচ্ছা করলে সবাই করতে পারেন। ইচ্ছা করলে আপনাদের মধ্য থেকে নিজেরা তিনজনকে নির্বাচন করতে পারেন, অন্যথায় আমিই তিনজনকে বেছে নেব। তাঁরা বললেনঃ ঠিক আছে, আমরা যাব। আবু আইউব ছিলেন বয়োবৃদ্ধ, আবু উবাই পীড়িত, এ জন্য এ দু’জনকে তাঁরা বাদ দিলেন। বাকী তিন জনকে খলীফা বিভিন্ন স্থানে পাঠালেন। আবু দারদাকে পাঠালেন দিমাশ্কে এবং তিনি আমরণ সেখানে অবস্থান করেন। (তাবাকাত- ৪/১৭২; হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৫-১৯৬) দিমাশ্কে তাঁর অধিকাংশ সময় ছাত্রদের কুরআন হাদীসে তা’লীম, শরীয়াতের আহকামের তারবিয়্যাত (প্রশিক্ষণ দান) এবং ইবাদতের মধ্যে অতিবাহিত হতো। যখন শামে অবস্থানরত সংখ্যাগরিষ্ঠ সাহাবায়ে কিরামের সরল ও অনাড়ম্বর জীবনের ওপর সেখানকার ঠাঁট ও জৌলুসের কিছু না কিছু ছাপ পড়েছিল তখন আবু দারদা এর থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এক অকৃত্রিম জীবনধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। খলীফা হযরত ’উমার রা. তাঁর ঐতিহাসিক শাম সফরের সময় সেখানে অবস্থানরত প্রখ্যাত সাহাবা ইয়াযীদ ইবন আবূ সুফইয়ান, ’আমর ইবনুল ’আস ও আবু মুসা আল-’আশ’য়ারী রা. প্রত্যেকের গৃহে অতর্কিতে উপস্থিত হন এবং তাঁদের জীবন যাপনে জৌলুসের ছাপ দেখতে পান। তিনি আবু দারদার আবাসস্থলেও যান; কিন্তু সেখানে ভোগ-বিলাসের চিহ্ন তো দূরের কথা রাতের অন্ধকারে একটি বাতিও দেখতে পেলেন না। একটি অন্ধকার ঘরে কম্বল মুড়ি দিয়ে তিনি শুয়ে আছেন। তাঁর এ চরম দীন-হীন অবস্থা দেখে খলীফার চোখ পানিতে ভরে গেল। তিনি জানতে চাইলেন, জীবনের প্রতি এমন নির্মমতার কারণ কি? আবু দারদা বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, এ পৃথিবীতে আমাদের এতটুকু জীবন উপকরণ থাকা উচিত যতটুকু একজন মুসাফিরের প্রয়োজন হয়। হায়! অবস্থান সা. পরে আমরা কিসের থেকে কি হয়ে গেলাম। তারপর উভয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাত কাটিয়ে দিলেন। (কানযুল ’উম্মাল- ৭/৭৭; হায়াতুস সাহাবা- ২/৮২-৮৪) খলীফা হযরত ’উসমানের খিলাফতকালে শামের গভর্ণর হযরত মু’য়াবিয়া রা. খলীফার নির্দেশে আবু দারদাকে দিমাশ্কের কাজী নিয়োগ করেন। হযরত আমীর মু’য়াবিয়া রা. কখনও সফরে গেলে তাঁকেই স্থলাভিষিক্ত করে যেতন। এটি ছিল দিমাশ্কের প্রথম কাজীর পদ। (শাজারাতুজ জাহাব- ৫/৩৯; আল-আ’লাম- ৫/২৮১) ইবন হিব্বানের মতে, খলীফা ’উমারে নির্দেশে হযরত মু’য়াবিয়া রা. তাঁকে কাজীর পদে নিয়োগ করেন। (লিসানুল মীযান- ৭/৪৪) ’আল-ইসতী’য়াব’ গ্রন্থকার প্রথম মতটি সঠিক বলে উল্লেখ করেছেন। (আল-ইসাবার পার্শ্ব টীকা- ২/১৭; ৪/৬০) হযরত আবু দারদার দুই স্ত্রী ছিল। দু’জনই ছিলেন সম্মান ও মর্যাদা উঁচু আসনের অধিকারিনী। প্রথম জনের নাম উম্মু দারদা কুবরা খাযরা বিন্তু আবী হাদরাদ আল-আসলামী এবং দ্বিতীয়জনের নাম উম্মু দারদা সুগরা হাজীমা হায়ওয়াস্ সাবিয়্যা। উম্মু দারদা কুবরা ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাহাবিয়্যা, প্রখর বুদ্ধিমতী, উঁচু স্তরের ফকীহা ও শ্রেষ্ঠ ’আবিদাহ্। হাদীসের গ্রন্থসমূহে তাঁর সূত্রে বর্ণিত বহু হাদীস পাওয়া যায়। তবে উম্মু দারদা সুগরা সাহাবিয়্যা ছিলেন না। স্বামীর মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। হযরত মু’য়াবিয়া রা. তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেন; কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত আবু দারদার বিয়ে সম্পর্কিত এক বর্ণনা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। সাবিত আল-বুনানী থেকে বর্ণিত হয়েছে। আবু দারদা তাঁর দ্বীনী ভাই সালমান আল-ফারেসীকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁকে সংগে করে একটি কনের পিতার গৃহে গেলেন। তিনি সালমানকে বাইরে বসিয়ে রেখে ভিতর বাড়ী ঢুকলেন। কনের অভিভাবকদের নিকট সালমানের দ্বীনদারী ও দ্বীনের জন্য তাঁকে সংগে করে একটি কনের পিতার গৃহে গেলেন। তিনি সালমানকে বাইরে বসিয়ে রেখে ভিতর বাড়ী ঢুকলেন। কনের অভিভাবকদের নিকট সালমানের দ্বীনদারী ও দ্বীনের জন্য তাঁর ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তাঁর পরিচয় তুলে ধরেন এবং তাদের মেয়ের সাথে তাঁর বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন। পাত্রীপক্ষ বলেনঃ আমরা সারমানকে মেয়ে দেব না, তবে তোমাকে দেব। এই বলে তাঁরা আবু দারদার সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ের কাজ শেষ হলে আবু দারদা বাড়ীর ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে অত্যন্ত লজ্জার সাথে সালমানকে খবরটি দেন। তবে এটা আবু দারদার কোন বিয়ে সে সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৭৪) হযরত আবু দারদা ছিলেন একজন সুপুরুষ। বার্ধক্যে দাড়িতে খিজাব লাগাতেন। সব সময় আরবী পোশাক পরতেন। মাথায় ‘কালানসুয়া’ নামক এক প্রকার উঁচু টুপি ও পাগড়ী পরতেন। আবু দারদার সন্তানদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা যায়। তাঁরা হলেনঃ বিলাল, ইয়াযীদ, দারদা ও নুসাইবা। প্রথমজন বিলাল। তিনি ইতিহাসে বিলাল আবু মুহাম্মাদ দিমাশকী নামে খ্যাত। তিনি ইয়াযীদ ও পরবর্তী খলীফাদের সময়ে দিমাশ্কের কাজী ছিলেন। খলীফা ’আবদুল মালিক তাঁকে বরখাস্ত করেন। হিজরী ৯২ সনে তাঁর ওফাত হয়। কন্যা দারদা ছিলেন মক্কার এক সম্ভ্রান্ত সংশীয় ও প্রখ্যাত তাবে’ঈ সাফওয়ান ইবন ’আবদিল্লাহ আল কুরাইশীর সহধর্মিনী। এই দারদার বিয়ে সম্পর্কে একটি ঘটনা বিভিন্ন গ্রন্থে দেখা যায়। ইয়াযীদ ইবন মু’য়াবিয়া দারদাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব পাঠান। আবু দারদা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরে এক অতি সাধারণ দীনদার মুসলমানের সাতে তাঁকে বিয়ে দেন। তখন লোকে বলাবলি করতে লাগলো, আবু দারদা, ইয়াযীদের সাথে মেয়ের বিয়ে দিলেন না; অথচ তাঁর চেয়ে নিচু স্তরের একজন সাধারণ মুসলমানের সাথে মেয়ের বিয়ে দিলেন। একথা আবু দারদার কানে গেলে তিনি বললেনঃ আমি দারদার প্রতি লক্ষ্য করেছি। যখন দারদার মাথার ওপর চাকর-বাকর দাঁড়িয়ে থাকবে এবং ঘরের বিপুল দ্রব্যের প্রতি নজর পড়বে তখন তাঁর দ্বীনের কি অবস্থা হবে? (সিফাতুস সাফওয়াহ্- ১/২৬০; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৭৪) হযরত আবু দারদার মৃত্যুসন সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের বিস্তর মতভেদ আছে। বিভিন্নজন বিভিন্ন গ্রন্থে হিজরী ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ সনগুলি উল্লেখ করেছেন। আবার কারো কারো মতে তিনি হযরত আলী ও হযরত মু’য়াবিয়ার রা. মধ্যে সংঘটিত সিফ্ফীন যুদ্ধের পর ইনতিকাল করেন। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে তিনি হিজরী ৩২ সন মুতাবিক ৬৫২ খ্রীস্টাব্দে দিমাশ্কে ইনতিকাল করেন। ওয়াকিদী, আবু মাসহার সহ প্রমুখ ইতিহাসবিদ এমত পোষণ করেছেন। দিমাশ্কের ‘বাবুস সাগীর’-এর নিকট তাঁকে দাফন করা হয় এবং তাঁরই পাশে তাঁর সহধর্মীনী উম্মু দারদাকেও সমাহিত করা হয় বলে প্রসিদ্ধি আছে। (দ্রঃ আল-ইসতী’য়াবঃ টীকা আল-ইসাবা- ২/৪৬; ৪/৬০; উসুদুল গাবা- ৫/১৮৬; ’আল-আ’লাম- ৫/২৮১; তারীখুল ইসলাম- ২/১১১; দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ১/৮০১; তাহজীবুত তাহজীব- ৮/১৫৬; শাজারাতুজ জাহাব- ৫/৩৯) হযরত আবু দারদার রা. মৃত্যুর ঘটনাটি ছিল একটু ব্যতিক্রম ধরণের জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনি ব্যাকুলভাবে কাঁদছেন। স্ত্রী উম্মু দারদা বললেন, আপনি রাসূলুল্লাহর সা. একজন সাহাবী হয়ে এত কাঁদছেন? বললেনঃ কেন কাঁদবো না? কিভাবে মুক্তি পাব আল্লাহই ভালো জানেন। এ অবস্থায় ছেলে বিলালকে ডেকে বললেন, দেখ, একদিন তোমাকেও এমন অবস্থার সম্মুখীন হতে হবে। সে দিনের জন্য কিছু করে রাখ। মৃত্যুর সময় যতই ঘনিয়ে আসতে লাগলো তাঁর হাহুতাশ ও অস্থিরতা তথই বৃদ্ধি পেয়ে চললো। ঈমান সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ঈমান হচ্ছে ভীতি আশার মাঝখানে। আবু দারদার ওপর খোদাভীতির প্রাবল্য ছিল। স্ত্রী পাশে বসে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। তিনি এক সময় বললেন, আপনি তো মৃত্যুকে খুবই ভালোবাসতেন। এখন এত অস্থির কেন? বললেনঃ তোমার কথা সত্য। কিন্তু যখন মৃত্যু অবধারিত বুঝেছি তখনই এ অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এতটুকু বলে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তারপর বললেন, এখন আমার শেষ সময়। আমাকে কালিমার তালকীন দাও। লোকেরা কালিমার তালকীন দিল। তিনি তা উচ্চারণ করতে করতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। হযরত আবু দারদা যখন অন্তিম রোগ শয্যায় তখন একদিন ইউসফ ইবন ’আবদিল্লাহ ইবন সালাম আসলেন তাঁর নিকট ইল্ম হাসিলের জন্য। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি উদ্দেশ্যে আসা হয়েছে? তাঁর সেই মুমূর্ষু অবস্থা দেখে ইউসুফ জবাব দিলেন আপনার সাথে আমার আব্বার যে গভীর সম্পর্ক ছিল সেই সূত্রে আমি আপনার সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে এসেছি। তিনি বললেন, মিথ্যা অতি নিকৃষ্ট জিনিস। কিন্তু কেউ মিথ্যা বলে ইসতিগফার করলে তা মাফ হতে পারে। (মুসনাদ- ৬/৪৫০) হযরত আবু দারদার ওফাত পর্যন্ত ইউসুফ অবস্থান করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁকে ডেকে বললেন, আমার মৃত্যু আসন্ন, একথা মানুষকে জানিয়ে দাও। তিনি খবর ছড়িয়ে দিতেই বন্যার স্রোতের মত মানুষ আসতে শুরু করলো। ঘরে বাইরে শুধু মানুষ আর মানুষ। তাঁকে প্রচুর লোক সমাগমের কথা জানানো হলে তিনি বললেন, আমাকে বাইরে নিয়ে চলো। ধরে বাইরে আনা হলে তিনি উঠে বসলেন এবং জনগণের উদ্দেশ্যে একটি হাদীস বর্ণনা করলে। (মুসনাদ- ৬/৪৪৩) এভাবে রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস প্রচারের আবেগ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান ছিল। হযরত আবু দারদাকে আলিম সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয়। সাহাবায়ে কিরাম তাঁকে অতি সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. বলতেনঃ তোমরা দু’জন বা- ’আমল আলি- মু’য়াজ ও আবু দারদার কিছু আলোচনা কর। ইয়াযীদ ইবন মু’য়াবিয়া বলতেনঃ আবু দারদা এমন আলিম ও ফকীহদের অন্তর্ভুক্ত যাঁরা রোগের নিরাময় দান করে থাকেন। (আল-ইসতী’য়াবঃ আল-ইসাবা- ৪/৫০) মৃত্যুর পূর্বে হযরত মু’য়াজ ইবন জাবালও আবু দারদার গভীর জ্ঞানের সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। তাঁর অন্তিম সময় ঘনিয়ে এসেছে। এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর শিয়রে দাঁড়িয়ে কান্না জুড়ে দিল। তিনি প্রশ্ন করলেনঃ এত কান্না কেন? লোকটি বললোঃ আমি আপনার নিকট থেকে ইলম হাসিল করতাম; কিন্তু এখন আপনি চলে যাচ্ছেন। তাই আমার কান্না পাচ্ছে। তিনি বললেনঃ কেঁদো না। আমার মৃত্যুর পর তোমরা ইলম হাসিলের জন্য আবু দারদা, সালমান, ইবন মাস’উদ ও আবদুল্লাহ ইবন সালাম- এ চার ব্যক্তির কাছে যাবে। (কানযুল ’উম্মাল- ২/৩২৫; হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৮১, ৫৮২; তারীখুল ইসলাম- ২/১০৯) একবার হযরত আবুজার আল-গিফারী রা. আবু দারদাকে লক্ষ্য করে বলেনঃ ওহে আবু দারদাঃ যমীনের ওপর এবং আসমানের নীচে আপনার চেয়ে বড় কোন ’আলিম নেই। (তারীখুল ইসলাম- ২/১০৯); হযরত মাসরূক, যিনি একজন উঁচু মর্যাদার তাবে’ঈ এবং তাঁর যুগের একজন বিশিষ্ট ইমাম-বলেনঃ আমি সকল সাহাবীর জ্ঞানরাশি মাত্র ছ’ব্যক্তির মধ্যে একত্রে দেখতে পেয়েছি। তাঁদের একজন আবু দারদা। মিসয়ার থেকে বর্ণিত। কাসেম ইবন ’আবদির রহমান বলেনঃ যাঁদেরকে ইলম দান করা হয়েছে, আবু দারদা তাঁদের একজন। (আল-ইসতয়’য়াবঃ আল-ইসাবা- ৪/৫০) তাঁর এ বিশাল জ্ঞানের কারণে তাঁর সময়ে মক্কা-মদীনা তথা গোটা হিজাযে বহু বড় বড় সাহাবী ফাতওয়া ও ইমামতের পদে অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থান থেকে জ্ঞানপিপাসু ছাত্ররা দলে দলে আবু দারদার দারসগাহে ভিড় জমাতেন। হযরত আবু দারদার দারসগাহে সব সময় ছাত্রদের ভিড় জমে থাকতো। ঘর থেকে বের হলেই দেখতে পেতেন পথের দু’ধারে ছাত্ররা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। একদিন মসজিদের যাচ্ছেন। পিছনে এত ভিড় জমে গেল যে, মানুষ মনে করলো হয়তো এটা কোন শাহী মিছিল হবে। তাদের প্রত্যেকেই কিছুনা কিছু জিজ্ঞেস করছিল। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১২৫) হযরত আবু দারদা সব সময় মানুষকে ইলম হাসিলের প্রতি উৎসাহ দান করতেন। হযরত হাসান বলেছেন, আবু দারদা বলতেনঃ তোমরা ’আলিম, ইলবে ইলম, তাঁদের প্রতি ভালোবাসা পোষণকারী অথবা তাঁদের অনুসারী- এ চারটির যে কোন একটি হও। এর বাইরে পঞ্চম কিছু হয়ো না। তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে। হাসানকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল পঞ্চমটি কি? বললেনঃ বিদ’য়াতী। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১৬০) তিনি আরও বলতেন, জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে প্রবেশ করা ও বের হওয়া একজন মানুষের বিজ্ঞতার পরিচায়ক। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৯) দাহ্হাক থেকে বর্ণিত হয়েছে আবু দারদা শামবাসীদের বলতেনঃ ওহে দিমাশ্কের অধিবাসীরা! তোমরা আমার দ্বীনী ভাই, বাড়ীর পাশের প্রতিবেশী এবং শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্যকারী। আমার সাথে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করতে তোমাদের বাঁধা কিসের? তোমাদের কি হয়েছে যে, তোমাদের ’আলিমরা চলে যাচ্ছেন অথচ তোমাদের জাহিলরা শিখছেনা? তোমরা শুধু জীবিকার ধান্দায় ঘুরছো অথচ তোমাদেরকে যা কিছুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা ছেড়ে দিচ্ছ? শুনে রাখ, একটি জাতি বড় বড় অট্টালিকা তৈরী করেছিল, বিশাল সম্পদ পুঞ্জিভূত করেছিল। এভাবে তারা বড় উচ্চাভিলাষী হয়ে পড়েছিল। অবশেষে তাদের সেই সুউচ্চ অট্টালিকা তাদের কবরে পরিণত হয়, তাদের উচ্চাভিলাষ তাদেরকে প্রতারিত করে এবং তাদের পুঞ্জিভূত সম্পদ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। ওহে, তোমরা শেখ এবং অন্যকে শিখাও। কারণ, শিক্ষাদানকারী ও গ্রহণকারীর প্রতিদান সমান সমান। এ দু’শ্রেণীর মানুষ ছাড়া আর কারও মধ্যে অধিকতর কল্যাণ নেই। হযরত হাসান থেকে বর্ণিত হয়েছে। একবার তিনি দিমাশ্কবাসীদের উদ্দেশ্যে বলেনঃ ওহে, তোমরা বছরের পর বছর পেট ভরে শুধু গমের রুটি খাবে- এতেই খুশী থাকবে? তোমাদের মজলিশ ও সভা-সমিতিতে কি তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করবে না? তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমাদের ’আলীমগণ চলে যাচ্ছেন আর তোমাদের জাহিলগণ তাঁদের নিকট থেকে কিছুই শিখছে না? (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৬০, ১৬১) হযরত আবু দারদা ছিলেন একজন বা-’আমল আলিম। যা শিখেছিলেন তা যথাযথভাবে পালন করতেন। ইবন ইসহাক বর্ণনা করে, সাহাবায়ে কিরাম বলতেনঃ আমাদের মধ্যে আবু দারদা ইলম অনুযায়ী সর্বাধিক আমলকারী। আবু দারদা বলতেনঃ যে জানে তার ধ্বংস একবার, আর যে জেনে ’আমল করেনা তার ধ্বংস সাতবার। সালেম ইবন আবিল জা’দ থেকে বর্ণিত। আবু দারদা বলতেনঃ তোমরা আমার কাছে প্রশ্ন কর। আল্লাহর কসম! আমাকে হারালে তোমরা একজন মহান ব্যক্তিকে হারাবে। (তারীখুল ইসলাম- ২/১০৯, ২১১) হযরত আবু দারদার শিক্ষাদানের নিয়ম ছিল ফজরের নামাযের পর জামে’ মসজিদে দারসের জন্য বসে যেতেন। ছাত্ররা তাঁকে ঘিরে বসে প্রশ্ন করতো, আর তিনি জবাব দিতেন। যদিও তিনি হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তবে তাঁর মূল বিষয় ছিল কুরআন মজীদের দারস ও তা’লীম। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবদ্দশায় যাঁরা সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ ও সংগ্রহ করেছিলেন, তিনি তাদের একজন। ইমাম বুখারী হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আবু দারদা, মু’য়াজ, যায়িদ ইবন সাবিত ও আবু যায়িদ আল-আনসারী- এ চারজন ছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. মৃত্যু পর্যন্ত আর কেউ সম্পূর্ণ কুরআন সংগ্রহ করেননি। ইমাম শা’বী অবশ্য উবাই ইবন কা’ব ও সা’ঈদ ইবন ’উবায়েদ- এ দু’জনের নাম সংযোগ করে মোট ছয়জনের কথা বলেছেন। ইবন হাজার ফাতহুল বারী (৯/৪৩) গ্রন্থে এমন ২৯ জন হাফেজে কুরআনের নাম উল্লেখ করেছেন। (তারীখুল ইসলাম- ২/১০৮; আল-আ’লাম- ৫/২৮১; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২৫) যাইহোক, রাসূলুল্লাহর সা. জীবনকালের হুফ্ফাজে কুরআনদের অন্যতম সদস্য ছিলেন আবু দারদা। এ কারণে খলীফা হযরত ’উমার রা. শামে কুরআনের তা’লীম ও তাবলীগের জন্য তাঁকে নির্বাচন করেন। দিমাশ্কের জামে’ ’উমারী’তে তিনি কুরআনের দারস দিতেন। অবশেষে এটা একটি শ্রেষ্ঠ কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়। তাঁর অধিীনে আরো অনেক শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রসংখ্যাও ছিল কয়েক হাজার। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এসে তাঁর দারসে শরীক হতো। ফজর নামাযের পর তিনি দশজন করে একটি গ্রুপ করে দিতেন। প্রত্যেক গ্রুপের জন্য একজন করে ক্বারী থাকতেন। ক্বারী কুরআন পড়াতেন। তিনি টহল দিতেন এবং ছাত্রদের পাঠ কান লাগিয়ে শুনতেন। এভাবে কোন ছাত্রের সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ হয়ে গেলে তাঁকে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দানের জন্য নিজের তত্ত্বাবধানে নিয়ে নিতেন। গ্রুপ শিক্ষক ছাত্রদের কোন প্রশ্নের জবাব দিতে অক্ষম হলে তাঁর নিকট থেকেই জেনে নিতেন। দারসে প্রচুর ছাত্র সমাগম হতো। একদিন গুণে দেখা গেল কেন্দ্র থেকে ১৬০০ ছাত্র বের হচ্ছে। ইবন ’আমির ইয়াহসাবী, উম্মু দারদা সুগরা, খলীফা ইবন সা’দ, রাশেদ ইবন সা’দ, খালিদ ইবন সা’দ প্রমুখ এই কুরআন শিক্ষা কেন্দ্রের খ্যাতিমান ছাত্র-ছাত্রী। ইবন ’আমির ইয়াহসাবী ছিলেন খলীফা ওয়ালীদ ইবন আবদুল মালিকের সময়ে মসজিদ বিষয়ক দফতরের রয়িস বা নেতা। আবু দারদার স্ত্রী উম্মু দারদা সুগরা ছিলেন কিরাত শাস্ত্রের একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিশেষজ্ঞ। মূলতঃ স্বামী নিকট থেকেই তিনি এ জ্ঞান অর্জন করেন। আতীয়্যা ইবন কায়েস কিলাবীকে তিনিই কিরাত শেখান। খলীফা ইবন সা’দের এমন বৈশিষ্ট্য ছিল যে, লোকে তাঁকে আবু দারদার সার্থক উত্তরাধিকারী বলতো। শামের বিখ্যাত ক্বারীদের মধ্যে তাঁকে গণ্য করা হতো। তাফসীর শাস্ত্রে যে সকল সাহাবী প্রসিদ্ধ তাঁদের মধ্যে যদিও আবু দারদার নামটি পাওয়া যায় না, তবুও বেশ কিছু আয়াতের তাফসীর তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলতেন, মানুষ যতক্ষণ না কুরআনের নানা দিক বিবেচনায় আনবে ততক্ষণ ফকীহ হতে পারবে না। জটিল আয়াতসমূহের ভাব তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট জিজ্ঞেস করে জেনে নিতেন। হযরত আবু দারদার নিকট কোন আয়াতের তাফসীর জিজ্ঞেস করলে তিনি সন্তোষজনক জবাব দিতেন। একবার এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলোঃ وَلِمَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ جَنَّتَانِ এর মধ্যে কি ব্যভিচারী ও চোর শামিল হবে? তিনি জবাব দিলেন, তার রব বা প্রভুর ভয় থাকলে সে কিভাবে ব্যভিচার ও চুরি করতে পারে? সূরা الْقَلَمِ- এ এক কাফির সম্পর্কে এসেছে عُتُلٍّ بَعْدَ ذَٰلِكَ زَنِيمٍ এখানে ‘উ’তুল’ শব্দটির অর্থের ব্যাপারে ‘মুফাসসিরগণ নানা কথা বলেছেন। আবু দারদা তার ব্যাপক অর্থ বলেছেন। তিনি বলেছেনঃ বড় পেট ও শক্ত হলক বিশিষ্ট অতিরিক্ত পানাহারকারী, সম্পদ পুঞ্জিভূতকারী ও অতি কৃপণ ব্যক্তিকে ‘উতুল’ বলে। এমনিভাবে সূরা তারিক-এ السَّرَائِرُ শব্দটি এসেছে। হযরত আবু দারদা এ শব্দটিরও একটি বিশেষ অর্থ বর্ণনা করেছেন। আল্লাহর কালাম কুরআন মজীদের তা’লীম ও খিদমতে পরে সাহাবায়ে কিরাম সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন রাসূলুল্লাহর সা. হাদীসের প্রচার ও প্রসারের ব্যাপারে। হযরত আবু দারদা অতি সার্থকভাবে এ দায়িত্ব পালন করেন। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আবু দারদার এক বিশেষ স্টাইল ছিল। তাবারানী ইদরীস আল-খাওলানী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, আমি আবু দারদাকে দেখেছি, রাসূলের সা. কোন হাদীস বর্ণনা শেষ করে তিনি বলতেনঃ এই অথবা এই রকম অথবা এ ধরণের। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৩৯) ইবন ’আসাকির ইবরাহীম ইবরাহীম ইবন আবদুর রহমান ইবন আ’উফ থেকে বর্ণনা করেছেন। খলীফা ’উমার রা. বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত বিশিষ্ট সাহাবা- আবদুল্লাহ ইবন হুজাইফা, আবু দারদা, আবু জার ও ’উকবা ইবন ’আমিরকে ডেকে পাঠান। তাঁরা হাজির হলে বলেনঃ এই যে আপনারা রাসূলের সা. হাদীসের নামে যা কিছু প্রচার করছেন, এসব কী? তাঁরা বললেনঃ আপনি প্রচার করতে নিষেধ করেন? ’উমার বললেনঃ না। তবে আপনারা আমার পাশে থাকবেন। আমি আপনাদের থেকে গ্রহণ অথবা বর্জন করবো। এ ব্যাপারে আমরা বেশী জানি। (হায়াতুস সাহাব- ৩/৪৪০, ৪৪১) একবার তিনি হযরত সা’দান ইবন তালহার নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। দিমাশ্কের মসজিদে তখন হযরত রাসূলে কারীমের সা. আযাদকৃত দাস হযরত সাওবান উপস্থিত ছিলেন। হযরত সা’দান একটু বেশী আশ্বস্ত হওয়ার জনর্য হাদীসটি সম্পর্কে তাঁর নিকট জিজ্ঞেস করলেন। সাওবান বললেন, আবু দারদা সত্য বলেছেন। আমিও সে সময় রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত ছিলাম। (মুসনাদ- ৬/৪৪২) হযরত মু’য়াজ রা. মৃত্যুর পূর্বক্ষণে একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেছিলেন, এর জন্য সাক্ষী চাইলে ’উয়াইমির (আবু দারদা) আছেন, তাঁর কাছে তোমরা জিজ্ঞেস করতে পার। লোকেরা তাঁর নিকট গেল। তিনি হাদীসটি শুনে বললেনঃ আমার ভাই (মু’য়াজ) সত্য বলেছেন। (মুসনাদ- ৬/৪৫০) সম্মানিত সাহাবায়ে কিরামের অভ্যাস ছিল, একে অপরের সাথে মিলিত হলে তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস সম্পর্কে আলোচনা করতেন। একবার একটি সমাবেশে ’উবাদা ইবনুস সামিত, হারিস আল-কিন্দী ও মিকদাদ ইবন মা’দিকারিবের সাথে আবু দারদাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি ’উবাদাকে প্রশ্ন করলেন, অমুক যুদ্ধের সময় রাসূল সা. কি খুমুস সম্পর্কে কিছু বলেছিলেন? ’উবাদার স্মরণ হলো। তিনি পুরো ঘটনা বর্ণনা করলেন। হযরত আবু দারদার গোটা জীবন কেটেছে আল্লাহর কালাম ও হাদীসে নববীর শিক্ষাদান ও প্রচারে। তাঁর মৃত্যুর পূর্বক্ষণে শহরের নানা শ্রেণীর অধিবাসীদের সমবেত করে তাদেরকে ঠিকমত নামায আদায়ের শেষ অসীয়াত করে যান। তাঁর নিকট হাদীসের যে ভান্ডার ছিল তা তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে সংগ্রহ করেন। রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর কিছু হাদীস তিনি যায়িদ ইবন সাবিত ও ’আয়িশা রা. থেকেও বর্ণনা করেন। হাদীস শাস্ত্রে তাঁর ছাত্র এবং তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের গন্ডি ছিল সীমিত। আনাস ইবন মালিক, ফুদালা ইবন ’উবাইদ, আবু উমামা, ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস, উম্মু দারদা প্রমুখের ন্যায় বিশিষ্ট সাহাবীরা তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। অধিকাংশ খ্যাতিমান ’আলিম তাবে’ঈ তাঁর নিকট ইলমে হাদীস হাসিল করেছেন এবং তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনাও করেছেন। এখানে সর্বাধিক খ্যাতিমান কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলোঃ সা’ঈদ ইবন মুসায়্যিব, বিলাল ইবন আবু দারদা, ’আলকামা ইবন কায়স, আবু মুররা মাওলা উম্মে হানী, আবু ইদরীস খাওলী, জুবাইর ইবন নাদীর, সুওয়ায়িদ ইবন গাফলা, যায়িদ ইবন ওয়াহাব, মা’দান ইবন আবী তালহা, আবু হাবীবা তাঈ, আবুস সাফার হামাদানী, আবু সালামা ইবন ’আবদির রহমান, সাফওয়ান ইবন ’আবদিল্লাহ, কুসায়্যিব ইবন কায়স, আবু বাহরিয়্যা ’আবদুল্লাহ ইবন কায়স, কুসায়্যিব ইবন মুররা, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, মুহাম্মাদ ইবন সুওয়াইদ আবী ওয়াক্কাস, মুহাম্মাদ ইবন কা’ব আল-কুরাজী, হিলাল ইবন ইয়াসাফ প্রমুখ। (তাহজীবুত তাহজীব- ৮/১৫৬; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২৪; তারীখুল ইসলাম- ২/১০৭) হযরত আবু দারদার সূত্রে বর্ণিত হাদীস, যা হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায় তার মোট সংখ্যা- ১৭৯ (এক শো উনাশি)। এর মধ্যে বুখারী শরীফে ১৩টি ও মুসলিম শরীফে ৮টি সংকলিত হয়েছে। (আল-আ’লাম- ৫/২৮১; তারীখুল ইসলাম- ২/১০৭) ফিকাহ শাস্ত্রেও তিনি এক বিশেষ স্থানের অধিকারী ছিলেন। মানুষ বহু দূর-দূরান্ত থেকে মাসয়ালা জানার জন্য তাঁর কাছে আসতো। এক ব্যক্তি তো শুধু একটি মাসয়ালা জানার জন্য সুদূর কুফা থেকে দিমাশ্কে তাঁর নিকট আসেন। সেই বিশেষ মাসয়ালাটি ছিল এ রকমঃ উক্ত ব্যক্তি প্রথমে বিয়ে করতে রাজী ছিলনা। কিন্তু পরে মায়ের চাপাচাপিতে বিয়ে করে। বিয়ের পর যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে গভীর ভালোবাসা গড়ে ওঠে তখন মা আবার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার জন্য চাপাচাপি শুরু করে দেন। এখন সে তালাক দিতে চায়না। সবকিছু শুনে আবু দারদা বলরেন, আমি সুনির্দিষ্টভাবে কারো সাথে- না মায়ের সাথে, না স্ত্রীর সাথে, সম্পর্ক ছেদ করার কথা বলবো না। আমি তোমার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কথাও বলবো না, আবার মায়ের নাফরমানীও জায়েয মনে করবো না। তোমার ইচ্ছা হলে তালাকও দিতে পার, আবার এখন যেমন আছ তেমন থাকতেও পার। তবে একথা যেন স্মরণ থাকে যে, রাসূলুল্লাহ সা. মাকে জান্নাতের দরজা বলে অভিহিত করেছেন। (মুসনাদ- ৫/৯৮; সীয়ারে আনসার- ২/২০০) আবু হাবীব তাঈ একবার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার ভাই কিছু দীনার ‘ফী সাবীলিল্লাহ’ (আল্লাহর রাহে) দান করেন এবং মরণকালে অসীয়াত করে যান, দীনারগুলি যেন দানের খাতসমূহের কোন একটিতে দিয়ে দিই। এখন আপনি বলুন, সবচেয়ে উত্তম খাত কোনটি? তিনি জবাব দিলেন, আমার নিকট উত্তম খাত ‘জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে জিহাদ)। হযরত আবু দারদা ছিলেন স্বভাবগতভাবেই সৎ ও সত্যনিষ্ঠ প্রকৃতির। ইসলামী শিক্ষা তাঁর এ প্রকৃতিকে আরো দীপ্ত ও স্বচ্ছ করে তোলে। গোটা সাহাবাকুলের মধ্যে হযরত আবু জার আল গিফারী ছিলেন সবচেয়ে বড় স্পষ্টভাষী ও স্বাধীনচেতা। প্রথম পর্যায়ে তিনিও শামে থাকতেন। সেখানে খুব কম লোকই তাঁর কঠোরতার হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন। হযরত আমীর মা’য়াবিয়াকে রা. তিনি তাঁর দরবারে কঠোর সমালোচনা করেছেন। ইসলামী বিধি-নিষেধের ব্যাপারে এহেন কঠোর ব্যক্তি একদিন আবু দারদাকে বললেনঃ আপনি যদি রাসূলুল্লাহর সা. সাক্ষাৎ নাও পেতেন অথবা রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর ইসলাম গ্রহণ করতেন তাহলেও নেককার মুসলমানদের মধ্যে গণ্য হতেন। হযরত আবু দারদার রা. আখলাকের পবিত্রতার জন্য এর চেয়ে বড় সনদ আর কী হতে পারে? তিনি ছিলেন নবীর সা. সহচর। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা’য়ালার ভয়ে তাঁর দেহে কম্পন সৃষ্টি হতো। একবার তো মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে খুতবার মধ্যে বলতে লাগলেন, আমি সেই দিনের ব্যাপারে খুবই ভীত যেদিন আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কি তোমার ইল্ম অনুযায়ী ’আমল করেছো? যে দিন কুরআনের প্রতিটি আয়াত জীবন্তরূপে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে এবং আমার কাছে জিজ্ঞেস করবে তুমি কুরআনের নির্দেশের কতটুকু অনুসরণ করেছো? নির্দেশসূচক আয়াত তখন আমার বিরুদ্ধে স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে এবং বলবে, কোন কিছুই করেনি। তারপর প্রশ্ন করা হবে নিষেধ থেকে কতটুকু দূরে থেকেছো? নিষেধসূচক আয়াত তখন বলে উঠবে, কিছুই করেনি। ওহে জনমন্ডলী! আমি কি সেদিন মুক্তি পাব? (কানযুল ’উম্মাল- ৭/৮৪; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৪৮৮,৪৮৯) পরকালের ভয়ে সব সময় তিনি ভীত থাকতেন। হিযাম ইবন হাকীম বলেন, আবু দারদা বলতেনঃ মরণের পর যে কী হবে তা যদি তোমরা উপলব্ধি করতে তাহলে তৃপ্তির সাথে পানাহার করতে পারতে না এবং রোদ থেকে বাঁচার জন্য ছাদওয়ালা ঘরেও প্রবেশ করতে না। বরং রাস্তায় বেরিয়ে বুক চাপড়াতে আর কাঁদতে। তিনি আরো বলতেনঃ হায়! আমি যদি গাছ হতাম, আর গরু-ছাগলে খেয়ে ফেলতো। আমি যদি আমার পরিবারের ছাগল হতাম, আর তারা আমাকে জবেহ করে টুকরো টুকরো করে অতিথি-মেহমানদের নিয়ে খেয়ে ফেলতো। অথবা আমি যদি এই খুঁটি হয়ে জন্মাতাম। তাহলে হিসাব নিকাশের কোন ভয় থাকতো না। (কানযুল ’উম্মাল- ২/১৪৫; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২০,৬২১) ইবাদাতের ক্ষেত্রে পাঞ্জেগানা ও কিয়ামুল লাইল ছাড়াও তিনটি জিনিস অত্যন্ত কঠোরভাবে পালন করতেন। ১. প্রত্যেক মাসে তিন দিন সাওম পালন করতেন। ২. বিতর নামায আদায় করতেন। ৩. আবাসে-প্রবাসে সকল অবস্থায় চাশ্তের নামায আদায় করতেন। এগুলি সম্পর্কে রাসূল সা. তাঁকে অসীয়াত করেছিলেন। তিনি প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর তাসবীহ পাঠ করতেন। তাসবীহ ৩৩ বার, তাহমীদ ৩৩ বার এবং তাকবীর ৩৪ বার। (মুসনাদ- ৫/১৯৬) উম্মু দারদা থেকে বর্ণিত। একবার আবু দারদার নিকট একটি লোক এলো। আবু দারদা তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন আপনি থাকবেন না চলে যাবেন? থাকলে বাতি জ্বালাই, নইলে আপনার বাহনের খাদ্য দিই। লোকটি চললোঃ চলে যাব। আবু দারদা বললেনঃ আমি আপনাকে পাথেয় দান করবো। যদি এর চেয়ে উত্তম কোন পাথেয় পেতাম তাহলে তাই আপনাকে দিতাম। একবার আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গিয়ে বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! ধনীরা দুনিয়া ও আখিরাত দুটোই লুটে নিল। আমরাও নামায পড়ি, তারা পড়ে, আমরাও রোযা রাখি, তারাও রাখে। কিন্তু তারা সাদাকা করে, আমরা তা করতে পারিনা। রাসূল সা. বললেনঃ আমি কি তোমাকে একটি জিনিস বলে দেব না, যদি তুমি তা কর তাহলে তোমার পূর্বের ও পরের কেউ তোমাকে অতিক্রম করতে পারবেনা? তবে যে তোমার মত করবে, কেবল সেই তোমার সমান হবে। সে জিনিসটি হলোঃ প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩ বার তাসবীহ, ৩৩ বার আল-হামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩০৫) আর একবার আবু দারদা বলেনঃ এক শো দীনার সাদাকা করার চেয়ে এক শো বার তাকবীর পাঠ করা আমার নিকট অধিকতর প্রিয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৭৯) তিনি প্রতি মুহূর্ত তাসবীহ পাঠে নিরত থাকতেন। একবার তাঁকে প্রশ্ন করা হলো, আপনি প্রতিদিন কতবার তাসবীহ পাঠ করেন? বললেনঃ এক রাখ বার। তবে আমার আংগুল যদি ভুল করে তবে তা ভিন্ন কথা। (তারীখুল ইসলাম- ২/১১০) একবার আবু দারদাকে বলা হলোঃ আবু সা’দ ইবন মুনাব্বিহ্ এক শো দাস মুক্ত করেছে। তিনি বললেনঃ একজন লোকের সম্পদের জন্য এক শো দাস অনেক। তুমি শুনতে চাইলে এর চেয়ে উত্তম জিনিসের কথা আমি তোমাকে শোনাতে পারি। আর তা হলোঃ দিবা-রাত্রির অবিচ্ছিন্ন ঈমান, আর সেই সাথে আল্লাহর জিক্র (স্মরণ) থেকে তোমার জিহ্বা বিরত না থাকা। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১২) একবার এক ব্যক্তি আবু দারদার নিকট এসে বললো, আমাকে কিছু অসীয়াত করুন। বললেনঃ সুখের সময় আল্লাহকে স্মরণ কর, তিনি তোমার দুঃখের সময় স্মরণ করবেন। দুনিয়ার কোন জিনিসের প্রতি যখন তাকাবে তখন তার পরিণতির প্রতি একটু দৃষ্টি দেবে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৭৬) হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে জিকর শিক্ষা দিয়েছেন। একদিন রাসূল সা. বললেনঃ আবু দারদা, তুমি কী পাঠ কর? বললেনঃ আল্লাহর জিক্র করি। রাসূল সা. বললেনঃ আমি কি রাত-দিনে আল্লাহর যে জিক্র করা হয় তার থেকে কিছু শিখিয়ে দেব না? আবু দারদা বললেন হাঁ, শিখিয়ে দিন। তখন রাসূল সা. তাঁকে একটি জিক্র শিখিয়ে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩০২) রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে শ্রুত বাণীর প্রতি তাঁর পূর্ণ বিশ্বাস ও ইয়াকীন ছিল। একবার এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বললোঃ আবু দারদা। আপনার বাড়ীটি আগুনে পুড়ে গেছে। তিনি বললেনঃ না পুড়েনি। এরপ দু’ব্যক্তি একের পর এক একই খবর নিয়ে এলো। তিনিও একই জবাব দিলেন। চতুর্থ এক ব্যক্তি এসে বললো, আগুন লেগে ছিল; কিন্তু আপনার ঘর পর্যন্ত এসে তা নিভে যায়। একথা শুনে তিনি বলেন, আমি জেনেছি, আল্লাহ অবশ্যই তা করেন না। তখন লোকটি বললোঃ ওহে আবু দারদা! আপনি যে বললেন, ‘আমার ঘর পুড়েনি’ এবং ‘আমি জেনেছি, আল্লাহ অবশ্যই তা করেন না’- এ দু’টি কথার মধ্যে কোনটি সর্বাধিক বিস্ময়কর? তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে কিছু বাক্য শিখেছি, কেউ সেগুলি সকালে পাঠ করলে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোন বিপদে পড়েনা। তারপর তিনি সেই বাক্যগুলি উচ্চারণ করেন। (বায়হাকীঃ আসমা ও সিফাত অধ্যায়- ১২৫; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৭০) হযরত আবু দারদার জীবন ছিল অতি সরল ও অনাড়ম্বর। দুনিয়ার কোন চাকচিক্য, জৌলুষ, ভোগ-বিলাস তাঁর গায়ে কক্ষণো দাগ কাটতে পারেনি। তিনি বলতেন, দুনিয়ায় মানুষের একজন মুসাফিরের মত থাকা উচিত। সূফীরা তাঁকে ‘আসহাবে সুফ্ফা’র সদস্যদের মধ্যে গণ্য করে থাকেন এবং ‘যুহুদ ও তাকওয়া’র বিষয়েল ওপর তাঁর বহু মূল্যবান বাণী- তারা বর্ণনা করেছেন। (দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ১/৮০০) একবার হযরত সালমান আল-ফারেসী রা. সাক্ষাতের জন্য তাঁর গৃহে আসলেন। তাঁরা ছিলেন পরস্পর দ্বীনি ভাই। তিনি আবু দারদার স্ত্রীকে অতি সাধঅরণ বেশভূষায় দেখতে পেয়ে তাঁর এমন দীন-হীন অবস্থার কারণ জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, আপনার ভাই আবু দারদা দুনিয়ার প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে গেছেন। এখন আর তাঁর কোন কিছুর প্রতি কোন রকম আগ্রহ নেই। আবু দারদা ঘরে ফিরলেন। সালাম বিনিময়ের পালা শেষ হলে খাবার এলো। সালমান আবু দারদাকে খাবারের জন্য ডাকলেন। আবু দারদা বললেন, আমি সাওম পালন করছি। সালমান কসম খেয়ে বললেন, আপনাকে অবশ্যই আমার সাথে খেতে হবে, অন্যথায় আমিও খাব না। সালমান আবু দারদার বাড়ীতে রাত্রি যাপন করলেন। রাতে আবু দারদা নামায পড়ার জন্য উঠলেন। সালমান তাঁকে বাধা দিয়ে বললেনঃ ভাই আপনার ওপর আল্লাহর যেমন হক আছে, তেমনি স্ত্রীরও আছে। আপনার দেহেরও আছে। সুতরাং আপনি ইফতার করবেন, নামায পড়বেন, স্ত্রীর কাছে যাবেন এবং সকলের হক আদায় করবেন। শেষ রাতে সালমান তাঁকে ঘুম থেকে জাগালেন, দুইজন এক সাথে নামায পড়লেন এবং এক সাথে মসজিদে নববীতে চলে গেলেন। সকালে আবু দারদা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট সালমানের ঘটনা বর্ণনা করলেন। রাসূল সা. বললেন, সালমান ঠিক বলেছে। সে তোমার চেয়ে বেশী বুদ্ধিমান। (তারীখুল ইসলাম- ২/১০৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৯২,৬৯৩) বিলাল ইবন সা’দ বলেন। আবু দারদা প্রায়ই দু’আ করতেনঃ হে আল্লাহ! আমার অন্তরের বিক্ষিপ্ততা থেকে আমি আপনার পানাহ চাই। প্রশ্ন করা হলোঃ অন্তরের বিক্ষিপ্ততা আবার কী? বললেনঃ প্রতিটি উপত্যকায় আমার সম্পদ ছড়িয়ে থাকাই হচ্ছে অন্তরের বিক্ষিপ্ততা। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৮৩) আবু নু’য়াইম ‘আল হুলইয়্যা’ গ্রন্থে (১/২২২) খালিদ ইবন হুদাইর আল-আসলামী থেকে বর্ণনা করেছেন। একবার তিনি আবু দারদার ঘরে গিয়ে দেখলেন, তিনি চামড়া অথবা পশমের বিছানার ওপর বসে আছেন। তাঁর গায়ে মোটা পশমের কাপড় এবং পায়েও পশমের জুতো। আর তিনি তখন অসুস্থ। এ অবস্থায় তিনি শুধু ঘামছেন। খালিদ বললেনঃ আপনি অনুমতি দিলে আমীরুল মুমিনীদের নিকট থেকে প্রেরিত উত্তম বিছানা ও পোশাক আপনার জন্য আনতে পারি। জবাবে তিনি বললেনঃ আমার তো অন্য একটি বাড়ী আছে। আমি সেখানেই চলে যাব এবং সেখানে যাওয়ার জন্যই কাজ করছি। সুতরাং এতকিছুর প্রয়েঅজন কি? (হায়াতুস সাহাবা- ২/২৯৬) একবার আবু দারদার গৃহে কয়েকজন মেহমান এলো। সময়টি ছিল শীতকাল। তিনি গরম খাবার তো দিলেন; কিন্তু গরম বিছানা দিলেন না। মেহমানদের একজন তার সঙ্গীদের বললেনঃ আমাদের গরম খাবার তো দিলেন, কিন্তু শীত নিবারণের জন্য কোন কিছু তো দিলেন না। এভাবে থাকা যাবে না। তাঁর কাছে চাইতে হবে। অন্য একজন বললোঃ বাদ দাও। কিন্তু এক ব্যক্তি কারো কথা না শুনে সোজা বাড়ীর ভিতরে ঢুকে গেল। সে দেখলো, আবু দারদার পাশেই তাঁর স্ত্রী বসে আছেন; কিন্তু তাদের গায়েও তেমন কোন শীতের কাপড় নেই। লেকাটি ফিরে গেল। পরে সে আবু দারদাকে জিজ্ঞেস করলোঃ আপনি আমাদের মতই শীত বস্ত্র ছাড়াই রাত কাটালেন কেন? জবাব দিলেন, আমাদের অন্য একটি বাড়ী আছে। আর সেখানেই আমরা চলে যাব। আমাদের বিছানাপত্র ও লেপ-তোষক সবই সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছি। তার কিছু আমাদের কাছে থাকলে অবশ্য তোমাদের কক্ষে পাঠিয়ে দিতাম। (সিফাতুস সাফওয়া- ১/২৬৩; হায়াতুস সাহাবা- ২/২৯৭) মু’য়াবিয়া ইবন কুররা বরেন, আবু দারদা বলতেনঃ আমি তিনটি জিনিস পসন্দ করি, অথচ মানুষ সেগুলি অপসন্দ করে। দারিদ্র, রোগ ও মৃত্যু। মৃত্যুকে আমি পসন্দ করি আমার রব বা প্রভুর সাথে মিলিত হওয়ার জন্য, দারিদ্রকে পসন্দ করি প্রভুর সামনে বিনীতভাবে প্রকাশের জন্য, আর রোগ পসন্দ করি আমার পাপের কাফ্ফারার জন্য। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২৫; তারীখুল ইসলাম- ২/১১০) রাসূলুল্লাহর সা. দারসগাহে যাঁরা শিক্ষা পেয়েছিলেন, তাঁরা সবাই বুঝেছিলেনঃ ’আমর বিল মা’রূফ বা সৎ কাজের আদেশ তাঁদের ওপর ফরজ। হযরত আবু দারদা এ ফরজের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন না। একবার হযরত মু’য়াবিয়া একটি রূপোর পাত্র খরীদ করলেন। বিনিময়ে তিনি কিছু কম-বেশী রূপোর মুদ্রা বিক্রেতাকে দিলেন। শরীয়াতের দৃষ্টিতে এটা ছিল অবৈধ। বিষয়টি আবু দারদা অবগত হওয়ার সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলেন, ওহে মু’য়াবিয়া! এমন কেনা-বেচা জায়েজ নয়। রাসূল সা. সোনারূপোর বিনিময়ে সমতার নির্দেশ দিয়েছেন। ইউসুফ ইবন আবদিল্লাহর ঘটনাটি পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আবু দারদার কাছে এসেছিলেন এক উদ্দেশ্যে, আর বলেছিলেন ভিন্ন কথা। এ কারণে আবু দারদা সংগে সংগে তাঁকে শুধরে দিয়ে বলেছিলেনঃ মিথ্যা বলা খুবই খারাপ কাজ। (মুসনাদ- ৬/৪৫০) আমীর মু’য়াবিয়া রা. হযরত আবু জারকে রা. শাম থেকে বের করে দিলেন। পথ চলা কালে আবু দারদার কানে খবরটি পৌঁছালে অবলীলাক্রমে তাঁর মুখ দিয়ে ‘ইন্নালিল্লাহ’ উচ্চারিত হলো। তারপর তিনি বললেনঃ উটের সাথীদের সম্পর্কে যেমন বলা হয়েছে, তেমনি তাদের ব্যাপারে অপেক্ষা কর। (উটের সাথী দ্বারা হযরত সালেহর আ. সংগী সাথী বুঝিয়েছে।) তারপর অত্যন্ত আবেগের সাথে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহ! তারা আবু জারকে মিথ্যাবাদী বলেছেন, কিন্তু আমি তা বলি না। লোকে তাঁর ওপর মিথ্যা দোষারোপ করেছে, কিন্তু আমি তা করিনা। তারা তাঁকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে, কিন্তু আমি এ ব্যাপারে তাদের সাথে নই। কারণ আমি জানি, রাসূল সা. ধরাপৃষ্ঠে তাঁর মত আর কাউকে সত্যবাদী মনে করতেন না এবং তাঁর মত আর কারো নিকট গোপন কথা বলতেন না। যার হাতে আমার জীবন সেই সত্তার শপথ, যদি আবু জার আমার হাতও কেটে দেন তবুও আমি তাঁর প্রতি কোন কেম বিদ্বেষ পোষণ করবো না। কারণ, রাসুল সা. বলেছেনঃ আসমানের নীচে ও যমীনের ওপরে আবু জার অপেক্ষা অধিকতর সত্যবাদী আর কেউ নেই। ইবন ’আসাকির বর্ণনা করেছেন। আবু দারদা একবার মাসলামা ইবন মুখাল্লাদকে লিখলেনঃ বান্দা যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে তখন আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আর আল্লাহ যখন তাঁকে ভালোবাসেন তখন তার সকল বান্দার প্রিয়পাত্র করে দেন। অপর দিকে বান্দা যখন আল্লাহর নাফরমানির কাজ করে তখন তার ওপর আল্লাহর ক্রোধ পতিত হয়। যখন সে আল্লাহর ক্রোধে পতিত হয় তখন সে তার সৃষ্টিরও ক্রোধের পাত্রে পরিণত হয়। (কানযুল ’উম্মাল- ৮/২২৭, হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫১৪) হযরত রাসূলে কারীম সা. একদিন বললেন, যে ব্যক্তি তাওহীদের কালেমা উচ্চারণ করবে সে জান্নাতে যাবে। আবু দারদা প্রশ্ন কররেন- সে যদি যিনা বা চুরি করে, তবুও? রাসূল সা. বললেনঃ হাঁ, তবুও। এমন একটা খোশখবর মানুষের কাছে পৌঁছানো উচিত। আবু দারদা তিনবার জিজ্ঞেস করে মানুষের নিকট এ খবর পৌঁছানোর জন্য বেরিয়ে পড়লেন। পথে ’উমারের সাথে সাক্ষাত। তিনি বললেনঃ এমন কাজ করো না। এতে মানুষ ’আমল ছেড়ে দেবে। আবু দারদা ফিরে বিষয়টি রাসুলকে সা. জানালেন। তিনি বললেন, ’উমার ঠিক বলেছে। (মুসনাদ- ৫/৪১) একদিন তিনি বাহির থেকে ঘরে ফিরলেন। চোখে-মুখে উত্তেজনার ছাপ। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেনঃ কী হয়েছে? বললেনঃ আল্লাহর কসম! শুধুমাত্র জামায়াতে নামায আদায় ছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. একটি কাজও আর পালিত হচ্ছে না। মানুষ সব ছেড়ে দিয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১২৩) একবার সা’দান ইবন আবী তালহার সাথে তাঁর দেখা হলে জিজ্ঞেস করেনঃ আপনার বাড়ী কোথায়? সা’দান বললেনঃ গ্রামে। তবে শহরের কাছাকাছি। তখন তিনি বললেনঃ তাহলে আপনি শহরে নামায পড়বেন। যেখানে আযান এবং নামায হয়না সেখানে শয়তানের আধিপত্য বিস্তার লাভ করে। দেখ, নেকড়ে সেই মেষকে ধরে যে দলছুট হয়ে যায়। (মুসনাদ- ৬/৪৫৯) গোটা মুসলিম সমাজ তাঁকে অত্যন্ত সমীহ ও সম্মান করতো। উত্তেজিত অবস্থায়ও তিনি যা কিছু বলতেন, মানুষ অন্তর দিয়ে তা শুনতো। একবার এক কুরাইশী এক আনসারীর দাঁত ভেঙ্গে দেয়। হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার রা. দরবারে বিচার গেল। তিনি কুরাইশীকে অপরাধী ঘোষনা করলেন। তখন সে বললো, আনসারী লোকটি প্রথমে আমার দাঁতে ব্যথা দেয়। একথা শুনে আমীর মু’য়াবিয়া বললেনঃ একটু থাম, আমি আনসারীকে রাজী করাচ্ছি। কিন্তু আনসারী-কিসাসের দাবীতে অটল রইল। সে রাজী হলো না। আমীর মু’য়াবিয়া বললেন, এই যে আবু দারদা আসছেন, তিনি যে ফায়সালা করেন তাই মেনে নাও। আবু দারদা ঘটনাটি শুনে এই হাদীসটি বর্ণনা করেনঃ কোন ব্যক্তি কাউকে দৈহিক কষ্ট দিলে কষ্টপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি তাকে ক্ষমা করে দেয় তাহলে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন এবং তার গুনাহ মাফ হয়ে যায়। আবু দারদার মুখ থেকে এ হাদীসটি শোনার সাথে সাথে আনসারী লোকটি- যে তখন দারুণ উত্তেজিত ছিল, রাজী হয়ে গেলে। সে আবু দারদাকে জিজ্ঞেস করলো, হাদীসটি কি আপনি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেন- হাঁ! আনসারী বললেন, তাহলে আমি তাঁকে মাফ করে দিলাম। (মুসনাদ- ৬/৪৪৮) তিনি সব সময় সব রকম ফিত্না ও অশান্তি থেকে দূরে থাকতেন। হিজায অপেক্ষা শাম কোন দিক দিয়েই ভালো ছিল না। তবে ফিত্না ও অশান্তি থেকে দূরে থাকার জন্যই শামে বসবাস করতেন। তিনি বলতেন, যেখানে দু’জন লোকও একহাত পরিমাণ ভূমির জন্য বিবাদ করে সে স্থানও ত্যাগ করা আমি পসন্দ করি। তিনি আরো বলতেন তোমরা বাজারের মজলিস থেকে দূরে থাক। কারণ, এসব মজলিস তোমাদেরকে খেলা ও হাসি-তামাশার দিকে নিয়ে যায়। (কানযুল ’উম্মাল- ২/১৫৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৫০) তিনি সব সময় চুপচাপ থাকতে এবং চিন্তা-অনুধ্যানে সময় কাটাতে পসন্দ করতেন। ’আউন ইবন ’আবদিল্লাহ একবার উম্মু দারদাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আবু দারদার সর্বোত্তম আমল ছিল কোনটি? বললেনঃ গভীর চিন্তা ও অনুধ্যান। আবু দারদা আরও বলতেনঃ এক ঘন্টা চিন্তা করা সারারাত ইবাদাত অপেক্ষা উত্তম। (সিফাতুস সাফওয়অ- ১/২৫৮; কানযুল ’উম্মাল- ২/১৪২; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২৭) তিনি আরও বলতেনঃ তোমরা যেমন কথা বলা শেখ, তেমনি চুপ থাকাও শেখ। কারণ, চুপ থাকা বিরাট সহনশীলতা। বলার চেয়ে শোনার প্রতি আগ্রহী হও। অহেতুক কোন কথা বলো না। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৩২) তিনি সব সময় হাসি মুখে থাকতেন এবং মানুষের সাথে খোশ-মেযাজে মিশতেন। কথা বলার সময় ঠোঁটে হাসি ঝরতো। আর এ হাসিকে স্ত্রী উম্মু দারদা মর্যাদার পরিপন্থী মনে করতেন। একদিন তো বলেই বসলেন, এই যে আপনি প্রতি কথায় মুচকি হাসি দেন এতে লোকে আপনাকে নির্বোধ মনে না করে। আবু দারদা বললেনঃ রাসূল সা. তো কথা বলার সময় মৃদু হাসতেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২০৩) তাঁর স্বভাব ছিল সরল ও অনাড়ম্বর। দিমাশ্কের মসজিদ চত্বরে নিজ হাতে গাছ লাগাতেন। রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী ও মসজিদের হালকায়ে দারসের ইমাম হয়ে এত ছোট ছোট কাজ নিজ হাতে করাতে লোকে অবাক হয়ে যেত। এক ব্যক্তি তো একবার তাঁকে বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করে বসে, আপনি নিজেই এমন কাজ করেন? আবু দারদা তাঁর বিস্ময়ের জবাবে বলেন, এতে খুব সওয়াব। তিনি অত্যন্ত দানশীল ও অতিথিপরায়ণ ছিলেন। অভাব-অনটন সত্ত্বেও মেহমানের খিদমতের কোন প্রকার ত্রুটি কক্ষণো করতেন না। অধিকাংশ সময় তাঁর বাড়ীতে লোক থাকতেন। কোন মেহমান এলে তিনি জিজ্ঞেস করতেনঃ থাকবেন না চলে যাবেন? যদি যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করতো, তাহলে তিনি তার পাথেয় দিয়ে দিতেন। কোন কোন লোক কয়েক সপ্তাহ অবস্থান করতো। হযরত সালমান আল-ফারেসী-দিমাশ্কে গেলে তাঁরই বাড়ীতে অবস্থান করতেন। তাঁর অন্তরটি ছিল বড় কোমল ও উদার। কাউকে ঘৃণা করা বা গালি দেওয়া পসন্দ করতেন না। একদিন কোথায় যেন যাচ্ছিলেন। দেখলেন, বেশ কিছু লোক এক ব্যক্তিকে গালি দিচ্ছে। জিজ্ঞেস করে জানলেন যে, সে কোন পাপ কাজ করেনে। হযরত আবু দারদা লোকদের বললেন, কেউ কুয়ায় পড়ে গেলে তাকে টেনে তোলা উচিত। গালি দেওয়াতে কোন কল্যাণ নেই। তোমরা যে এ পাপ থেকে বেঁচে থাকতে পেরেছ, সেটাই সৌভাগ্য মনে কর। লোকেরা তখন প্রশ্ন করলেো আপনি কি এ ব্যক্তিকে খারাপ মনে করেন না? বললেনঃ স্বভাবগতভাবে লোকটির মধ্যে কোনরকম খারাবি নেই’ তবে তার এ কাজটি খারাপ। যখন সে এ কাজ ছেড়ে দেবে তখন সে আবার আমার ভাই। (উসুদুল গাবা- ৪/১৫০; কানযুল ’উম্মাল- ২/১৭৪; হায়াতুস সাহাবা- ২/৪২৮) তাঁর স্বভাবটি ছিল বড় ঐশ্বর্যমন্ডিত। কারো নিকট থেকে কোন কিছু গ্রহণ করা ছিল তাঁর প্রকৃতি বিরোধী। একবার ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমির আসলেন শামে। বহু সাহাবী তাঁর কাছে গিয়ে নিজ নিজ ভাতা গ্রহণ করলেন। কিন্তু আবু দারদা গেলেন না। বাধ্য হয়ে ’আবদুল্লাহ নিজেই ভাতা নিয়ে তাঁর গৃহে হাজির হলেন এবং বললেনঃ আপনি যাননি তাই আমি নিজেই ভাতা নিয়ে হাজির হয়েচি। তিনি বললেনঃ রাসুল সা. আমাকে বলেছেন, যখন আমীরগণ নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে নেয় তখন তোমরাও নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নেবে। (কানযুল ’উম্মাল- ২/১৭১) তাঁর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা সম্পর্কে অনেক কথা বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। আবুল বাখতারী থেকে বর্ণিত। একবার আবু দারদা একটি হাঁড়িতে কিছু জ্বাল দিচ্ছিলেন। পাশেই হযরত সালমান আল-ফারেসী বসেছিলেন। এমন সময় আবু দারদা ছোট বাচ্চাদের আওয়াযের মত হাঁড়ির মধ্যে তাসবীহ পাঠের আওয়ায শুনতে পেলেন। তিনি চিৎকার করে সালমানকে ডেকে বললেনঃ সালমান! দেখ, দারুণ বিস্ময়ের ব্যঅপার। তুমি বা তোমার বাপ-দাদা কেউ কক্ষণো এমন ঘটনা দেখনি। সালমান বললেনঃ তুমি যদি চুপ থাকতে তাহলে আল্লাহর এর থেকে বড় নিদর্শন দেখতে পেতে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৮৬) আবু নু’য়াইম ‘আল-হুলইয়্যা’ গ্রন্থে (১/২১০) ’আউফ ইবন মালিক থেকে বর্ণনা করেছেন। আউফ স্বপ্নে একটি চামড়ার নির্মিত গম্বুজ ও একটি চারণক্ষেত্র দেখলেন। গম্বুজের পাশে একপাল ছাগল শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এগুলি কার? বলা হলো, আবদুর রহমান ইবন আউফের। কিছুক্ষণ পর আবদুর রহমান ইবন আউফ বের হয়ে আসলেন। বললেনঃ হে আউফ, কুরআনের বিনিময়ে আল্লাহ আমাকে এ সবকিছু দান করেছেন। যদি তুমি এ রাস্তার দিকে একটু তাকাও তাহলে এমন সব জিনিস দেখতে পাবে যা তোমার চোখ কখনো দেখেনি, তোমার কান কখনো সে সম্পর্কে কিছু শোনেনি এবং তোমার অন্তরে তার কল্পনাও কখনো উদয় হয়নি। আল্লাহ তা’য়ালা তা আবু দারদার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন। কারণ, তিনি দু’হাত ও বুক দিয়ে দুনিয়অকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। (উসুদুল গাবা- ৫/১৮৫; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬৭২) তিনি বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। তাঁর দ্বীনী-ভাই হযরত সালমান আল-ফারেসীর সাথে আজীবন গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তাবারানী বর্ণনা করেছেন। আশ’য়াস ইবন কায়স ও জারীর ইবন আবদুল্লাহ আল-বাজালী একবার সালমান আল-ফারেসীর নিকট আসলেন। তিনি তখন মাদায়েনের একটি দূর্গে অবস্থান করছিলেন। তাঁরা সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি কি সালমান আল-ফারেসী? বললেনঃ হা। আপনি কি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী? বললেনঃ জানিনে। তখন তাঁর সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেল। তাঁরা মনে করলেন, আমরা যাঁকে খুঁজছি, এ তিনি নন। তাঁদের এ ইতস্ততঃ ভাব দেখে সালমান বললেনঃ তোমরা যাঁকে খুজছো আমি সেই ব্যক্তি। আমি রাসূলুল্লাহকে সা. দেখেছি, তাঁর সাথে উঠা-বসা করেছি। আর সাহাবী তো সেই যে রাসূলের সা. সাথে জান্নাতে যাবে। যাই হোক, তোমাদের কী প্রয়োজন? তাঁরা বললেনঃ শামে অবস্থানরত আপনার এক ভাইয়ের নিকট থেকে আমরা এসেছি। তিনি জানতে চাইলেনঃ কে সে? তারা বললেনঃ আবু দারদা। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তাহলে তোমাদের সাথে পাঠানো তাঁর উপহার সামগ্রী কোথায়? তাঁর বললেনঃ আমাদের সাথে তো কোন উপহার পাঠাননি। আবু দারদা বললেনঃ আল্লাহকে ভয় কর এবং যথাযথভাবে আমানত আদায় কর। তাঁর নিকট থেকে যেই এসেছে, তার সাথে কিছু না কিছু হাদিয়া তিনি আমার জন্য পাঠিয়েছেন। তাঁরা বললেনঃ এভাবে আমাদেরকে দোষারোপ করবেন না। এই আমাদের অর্থকড়ি থেকে যা খুশী আপনি গ্রহণ করুন। তিনি বললেনঃ আমি তোমাদের অর্থকড়ি চাইনা। যে হাদিয়া পাঠিয়েছেন শুধু তাই চাই। তখন তাঁরা শপথ করে বললেন, কোন হাদিয়া তিনি পাঠাননি। তবে তিনি আমাদেরকে একথা বলেছেন যে, তোমাদের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি আছেন, রাসূল সা. যখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে যেতেন তখন তাঁকে ছাড়া আর কাউকে ডাকতেন না। তোমরা যখন তাঁর কাছে যাবে, তাঁকে আমার সালাম পৌঁছে দেবে। আবু দারদা বললেনঃ এছাড়া আর কি হাদিয়া আমি তোমাদের কাছে চাচ্ছি? সালামের চেয়ে উত্তম হাদিয়া আর কী হতে পারে? (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৯২-৪৯৫) হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা রা. ছিলেন তাঁর জাহিলী যুগের অন্তরঙ্গ বন্ধু বা ভাই। তাঁরই দাওয়াত ও চেষ্টায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। আজীবন তিনি সে সম্পর্ক অটুট রেখেছিলেন। তিনি প্রায়ই দু’আ করতেনঃ হে আল্লাহ! আমার ভাই ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা লজ্জা পায় আমার এমন কোন ’আমল তাঁর কাছে উপস্থাপনের ব্যাপারে আ আপনার পানাহ্ চাই। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৮৪) এছাড়া হযরত আবু দারদার বহু দ্বীনী ইয়ার-বন্ধু ছিলেন। তিনি নামাযের পর তাঁদের সকলের মঙ্গল কামনা করে আল্লাহর কাছে দু’আ করতেন। তাঁর স্ত্রী হযরত উম্মুল দারদা রা. বলেনঃ আবু দারদার ৩৬০ জন আল্লাহর পথের বন্ধু ছিলেন। নামাযে তাঁদের প্রত্যেকের জন্য দু’আ করতেন। আমি তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তনি বললেনঃ কোন মানুষ দূর থেকে যখন তার কোন ভাইয়ের জন্য দু’আ করে তখন আল্লাহ তার জন্য দু’জন ফিরিশতা নিয়োগ করেন। তারা বলতে থাকেঃ তোমার ভাইয়েল জন্য তুমি যা কামনা করছো, আল্লাহ তোমাকেও তা দান করুন। ফিরিশতারা আমার জন্য দু’আ করুক, তাকি আমি চাইবো না? (তারীখুল ইসলাম- ২/১১১) তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ও ’আশেক। রাসূলের সা. জীবদ্দশায় তাঁকে এত বেশী ভালোবাসতেন যে, রাতে তাঁর ঘরের সামনে শুয়ে থাকতেন, যাতে তিনি প্রয়োজন হলে তাঁকে জাগিয়ে তুলে তাঁকে কাজে লাগাতে পারেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৮৮) পরোক্ষভাবে কুরআনের একটি আয়াতও তাঁর শানে নাযিল হয়েছে। শুরাইহ ইবন ’উবাইয়দ থেকে বর্ণিত হয়েছে। এক ব্যক্তি একদিন আবু দারদাকে বিদ্রুপ করে বললোঃ ওহে ক্বারীদের দল! তোমাদের হয়েছে কি যে, তোমরা আমাদের চেয়ে বেশী ভীরু ও বেশী কৃপণ? কিন্তু খাওয়ার সময় তোমাদের গ্রাসটি তো হয় সবচেয়ে বড়। আবু দারদা তার কথার কোন উত্তর দিলেন না। বিষয়টি ’উমারের কানে গেল। তিনি আবু দারদাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃ আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিন। তাদের সব কথাই কি আমরা ধরবো? তখন ’উমার সেই লোকটির নিকট গিয়ে তার গলায় কাপড় পেঁচিয়ে টানতে টানতে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে যান। লোকটি বললোঃ আমরা একটু হাসি-মাশ্কারা করছিলাম। তখন সূরা তাওবার ৬৫ নং আয়াতটি নাযিল হয়। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৬৩) মু’য়াবিয়া ইবন কুররা বলেনঃ একবার আবু দারদা অসুস্থ হলেন। বন্ধুরা দেখতে গেলেন। তাঁরা বললেনঃ আপনার অভিযোগ কিসের বিরুদ্ধে? বললেনঃ আমার গুনাহ্র বিরুদ্ধে। আপনার সর্বশেষ কামনা কী? বললেনঃ জান্নাত। তাঁরা বললেনঃ আমরা কি একজন ডাক্তার ডাকবো? বললেনঃ প্রয়োজন নেই। শ্রেষ্ঠতম ডাক্তারই তো আমাকে এ কষ্ট দিয়েছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৮১) আবু নু’য়াইম ‘আল-হুলাইয়্যা’ গ্রন্থে (১/২১২) জুবাইর ইবন নুফাইর রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। ভূমধ্য সাগরীয় দ্বীপ ‘কিবরিস’ বিজয়ের দিন অনেক মুজাহিদ কেঁদে ফেলেন। আমি দেখলাম, আবু দারদা একাকী বসে বসে কাঁদছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, যে দিন আল্লাহ ইসলাম ও মুসলমানদের সম্মানিত করলেন, সে দিন এভাবে কাঁদার কারণ কি? বললেনঃ জুবাইর, তোমার ধ্বংস হোক। যে মানুষ আল্লাহর হুকুম ছেড়ে দেয় সে কতই না নিকৃষ্ট জীব। এই জাতি ছিল শক্তিশালী ও বিজয়ী। তাদের ছিল একটি রাষ্ট্র। তারা আল্লাহর আদেশ ছেড়ে দেয়। তাই তাদের এ পরিণতি। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬৮১) একবার হযরত মুয়াবিয়া আবু দারদাকে লিখলেনঃ আপনি আমাকে দিমাশ্কের ফাসিকদের একটা তালিকা দিন। জবাবে তিনি বললেনঃ তাদের সাথে আমার সম্পর্ক কি? আমি কিভাবে তাদের চিনবো? কিন্তু তাঁর ছেলে বিলাল বললেনঃ আমিই তাদের তালিকা পাঠাবো। সত্যিই তিনি তালিকা তৈরী করলেন। তখন আবু দারদা বললেনঃ কিভাবে তুমি তাদেরকে চিনলে? তুমি তাদের দলের একজন না হলে তাদেরকে চিনতে পার না। তোমার নামটি দিয়েই তালিকা শুরু কর। একথার পর বিলাল আর তালিকা পাঠাননি। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪২৪) হযরত আবু দারদা মানুষকে বলতেনঃ তোমরা দুনিয়া থেকে দূরে থাক। কারণ, এ দুনিয়া হারূত ও মারূত অপেক্ষা বড় জাদুকর। (লিসানুল- মীযান- ৭/৪৪) তিনি প্রায়ই দু’আ করতেনঃ হে আল্লাহ! আমাকে পূর্ণবানদের সাথে মরণ দিন এবং পাপাচারীদের সাথে বাঁচিয়ে রাখবেন না। তিনি আরো দু’আ করতেনঃ হে আল্লাহ! আমি আলিমদের অভিশাপ থেকে আপনার পানাহ চাই। যখন জানতে চাওয়অ হলো, তারা কিভাবে আপনাকে অভিশাপ দেবে? বললেনঃ আমাকে ঘৃণা করবে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৮৪) হযরত আবু দারদা রা. সম্পর্কে অনেক টুকরো টুকরো কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা খুবই চমকপ্রদ ও শিক্ষণীয়। ইবন হাজারের রহ. মত আমরাও বলি, তাঁর মাহাত্ম্য ও গুণাবলী অনেক যা ছোটখাট কোন প্রবন্ধে প্রকাশ করা যাবে না। (তাহজীবুত তাহজীব- ৮/১৫৬)

  • আনাস ইবন মালিক (রা)

    আনাস ইবন মালিক (রা)

    আনাস ইবন মালিক ছিলেন বিখ্যাত সাহাবী, খাদিমে রাসূল, ইমাম, মুফতী, মু’য়াল্লিমে কুরআন, মুহাদ্দিস, খ্যাতিমান রাবী, আনসারী, খাযরাজী ও মাদানী। কুনিয়াত আবু সুমামা ও আবু হামযা। খাদিমু রাসূলিল্লাহ লকব বা উপাধি। (দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়া- ৩/৪০২, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪) আনাস বলতেনঃ আমি ‘হামযা’ নামক এক প্রকার সব্জী খুটতাম, তাই দেখে রাসুল সা. আদর করে আমাকে ডাকেন: ‘ইয়া আবা হামযা’। সে দিন থেকে এটাই আমার কুনিয়াত বা ডাকনাম হয়ে যায়। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪১) ইয়াসরিবের (আল-ইসাবা- ১/৭১) বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখায় হিজরাতের দশ বছর পূর্বে ৬১২ খ্রীস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করে। (আল-আ’লাম- ১/৩৬৫, আল-ইসাবা- ১/৭১) এই গোত্রটি ছিল আনসারদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত। আনাসের পিতা মালিক ইবন নাদর এবং মাতা উম্মু সুলাইম সাহলা বিনতু মিলহান আল-আনসারিয়্যা। উম্মু সুলাইম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. খালা হতেন। রাসূলুল্লাহর সা. দাদা আবদুল মুত্তালিবের মা সালমা বিনতু ’আমর-এর নসব ’আমির ইবন গানাম- এ গিয়ে আনাসের মার বংশের সাথে মিলিত হয়েছে। (উসুদুল গাবা- ১/১২৭, আসাহহুস সীয়াব- ৬০৬)

    উম্মু সুলাইমের আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যেমনঃ সাহলা, রুমাইলা, রুমাইসা, সুলাইকা, আল-ফায়সা ইত্যাদি। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৪০)

    আনাসের চাচা আনাস ইবন নাদর উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন। কাফিররা কেটে কুটে তাঁর দেহ বিকৃত করে ফেলেছিল। তাঁর দেহে মোট আশিটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। তাঁর এক বোন ছাড়া আর কেউ সে লাশ সনাক্ত করতে পারেনি। আনাস বলতেন, আমার এই চাচা আনাসের নামেই আমার নাম রাখা হয়েছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৮৩, হায়াতুস সাহাবা- ১/৫০৪, ৫০৫) আনাসের মামা হারাম ইবন মিলহান বি’রে মা’উনার দুঃখজনক ঘটনায় শাহাদাত বরণ করেন। (দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ৩/৪০২)

    আনাসের বয়স যখন আট/নয় বছর তখন তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করে। এ কারণে তাঁর পিতা ক্ষোভ ও ঘৃণায় শামে চলে যায় এবং সেখানে কুফরী অবস্থায় মারা যায়। মা আবু তালহাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। আবু তালহা ছিলেন খাযরাজ গোত্রের একজন বিত্তশালী ব্যক্তি। মা বালক আনাসকেও সাথে করে আবু তালহার বাড়ীতে নিয়ে যান। আনাস এখানেই প্রতিপালিত হন।

    আবু তালহার সাথে তাঁর মার বিয়ে সম্পর্কে আনাস বর্ণনা করেছেনঃ আবু তালহা যখন উম্মু সুলাইমকে বিয়ের প্রস্তাব দেন তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। উম্মু সুলাইম বললেনঃ আবু তালহা, তুমি কি জাননা, যে ইলাহ-র ইবাদাত তুমি কর তা মাটি দিয়ে তৈরী? বললেনঃ হাঁ, তা জানি। উম্মু সুলাইম আরও বললেন: একটি গাছের ইবাদাত করতে তোমার লজ্জা হয় না? তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তোমাকে বিয়ে করতে আমার আপত্তি নেই এবং তোমার কাছে কোনমোহরের দাবীও আমার থাকবে না। ‘আমি ভেবে দেখবো’- এ কথা বলে আবু তালহা উঠে গেলেন। পরে ফিরে এসে তিনি উচ্চারণ করলেনঃ ‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তখন উম্মু সুলাইম ছেলে আনাসকে ডেকে বললেনঃ আনাস, তুমি আবু তালহার বিয়ের কাজটি সমাধা কর। আনাস তাঁর মাকে আবু তালহার সাথে বিয়ে দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/১৯৫, ১৯৬)

    মদ হারাম হওয়ার পূর্বে আবু তালহার বাড়ীতে মদ পানের আসর বসতো। বালক আনাস সেই আসরে সাকীর দায়িত্ব পালন করতেন এবং নিজেও মদের অভ্যাস করতেন। এই বালককে মদ পান থেকে বিরত রাখার কেউ ছিল না। (মুসনাদ- ৩/১৮১)

    আনাসের বয়স যখন আট/নয় বছর তখন মদীনায় ইসলামের প্রচার শুরু হয়ে যায়। ইসলাম কবুলের ব্যাপারে বনু নাজ্জার গোত্র সবার আগে ভাগেই ছিল। এই খান্দানের বেশীর ভাগ সদস্য রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় আসার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। আনাসের মা উম্মু সুলাইম ও তৃতীয় আকাবার পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। পূর্বেই বলা হয়েছে উম্মু সুলাইম ইসলাম গ্রহণ করায় তাঁর স্বামী অর্থাৎ আনাসের পিতা স্ত্রী ও সন্তান ত্যাগ করে শামে চলে যায়। স্বামী পরিত্যক্তা উম্মু সুলাইম আবু তালহাকে বিয়ে করতে রাজী হন এই শর্তে যে, তিনিও ইসলাম গ্রহণ করবেন। এভাবে উম্মে সুলাইমের চেষ্টায় আবু তালহা ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় যান এবং তৃতীয় ’আকাবায় শরীক হয়ে রাসূলুল্লাহর হাতে সা. বাইয়াতের গৌরব অর্জন করেন। এভাবে আনাসের বাড়ী ঈমানের আলোয় আলোকিত হয়ে যায়। তাঁর জান্নাতী মা উম্মু সুলাইম ইসলামের এক আলোক বর্তিকা, আর তাঁর স্বামী দ্বীনের এক নিবেদিত প্রাণ কর্মী। এমনই এক আশ্রয়ে আনাস বেড়ে ওঠেন।

    আনাস যখন দশ বছরের বালক তখন হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় আসেন। আনাসের বয়স অল্প হলেও তিনি খুবই উৎসাহী ছিলেন। রাসুল সা. যখন কুবা থেকে মদীনার দিকে আসছিলেন, সমবয়সী ছোট ছেলে-মেয়েদের সাথে পথের পাশে দাঁড়িয়ে আনাসও স্বাগত সংগীত গেয়েছিলেন, তাঁরা ছুটে ছুটে ‘রাসূলুল্লাহ এসেছেন, মুহাম্মাদ এসেছেন’- বলে মদীনাবাসীদের ঘরে ঘরে রাসূলুল্লাহর সা. আগমন বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। এক সময় রাসূলুল্লাহর সা. পাশ থেকে ভীড় একটু কম হলে আনাস তাঁর চেহারা মুবারকে প্রতি দৃষ্টিপাত করেন এবং সাহাবিয়্যাতের মর্যাদা লাভে ধন্য হন।

    হযরত রাসূলে কারীম সা. যখন মদীনায় আসেন প্রসিদ্ধ মতে আনাসের বয়স তখন দশ বছর। রাসুল সা. একটু স্থির হওয়ার পর আনাসের মা একদিন তাঁর হাত ধরে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে নিয়ে যান। এ সম্পর্কে আনাস বলেনঃ আমার মা আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে নিয়ে গিয়ে বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আনসারদের প্রত্যেক নারী-পুরুষ আপনাকে কিছু না কিছু হাদিয়া দিয়েছে। আমি তো তেমন কিছু দিতে পারছিনে। আমার এই ছেলেটি আছে, সে লিখতে জানে। এখনও সে বালেগ হয়নি। আপনি একেই গ্রহণ করুন। সে আপনার খিদমাত করবে। সেই দিন থেকে আমি একাধারে দশ বছর যাবত রাসূলুল্লাহর সা. খিদমাত করেছিল। এর মধ্যে কখনও তিনি আমাকে মারেননি, গালি দেননি, বকাঝকা করেননি এবং মুখও কালো করেননি। তিনি সর্বপ্রথম আমাকে এই অসীয়াতটি করেনঃ ছেলে, তুমি আমার গোপন কথা গোপন রাখবে। তা হলেই তুমি ঈমানদার হবে। আমার মা এবং রাসূলুল্লাহর সা. সহধর্মিনীগণ কখনও আমার কাছে রাসূলে সা. গোপন কথা জিজ্ঞেস করলে, বলিনি। আমি তাঁর কোন গোপন কথা কারও কাছে প্রকাশ করিনি। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবু তালহা তাঁকে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে যান। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪১, আনসাবুল আশরাফ- ১/৫০৬, আল-ইসাবা- ১/৭১)

    হযরত আনাস রাসূলুল্লাহর সা. জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় দশ বছর অত্যন্ত যোগ্যতার সাথে তাঁর খিদমাতের দায়িত্ব পালন করেন। এ জন্য তাঁর গর্বের শেষ ছিল না। ফজর নামাযের পূর্বেই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. খিদমাতে হাজির হয়ে দুপুরে বাড়ী ফিরতেন। কিছুক্ষণ পর আবার আসতেন এবং আসরের নামায আদায় করে বাড়ী ফিরতেন। আনাসের মহল্লায় একটি মসজিদ ছিল, সেখানে মুসল্লীরা তাঁর অপেক্ষায় থাকতো। তাঁকে দেখে তারা আসরের নামাযে দাঁড়াতো। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/২২২)

    উপরোক্ত সময় ছাড়াও তিনি সব সময় রাসূলুল্লাহর সা. যে কোন নির্দেশ পালনের জন্য প্রস্তুত থাকতেন। যখনই প্রয়োজন পড়তো রাসূলুল্লাহর সা. ডাকে সাড়া দিতেন। এক দিনের ঘটনা, তিনি রাসূলুল্লাহর সা. প্রয়োজনীয় কাজ সেরে দুপুরে বাড়ীর দিকে চলেছেন। পথে দেখলেন, তাঁরই সমবয়সী ছেলেরা খেলছে। তাঁর কাছে খেলাটি ভালো লাগলো। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন তাদের খেলা দেখতে। কিছুক্ষণ পর দেখলেন, রাসূল সা. তাদের দিকে আসছেন। তিনি এসে প্রথমে ছেলেদের সালাম দিলেন, তারপর আনাসের হাতটি ধরে তাঁকে কোন কাজে পাঠালেন। আর রাসূল সা. তাঁর অপেক্ষায় একটি দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। আনাস কাজ সেরে ফিরে এলে রাসুল সা. বাড়ীর দিকে ফিরলেন, আর তিনি চললেন বাড়ীর দিকে। ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় তাঁর মা জিজ্ঞেস করলেন, এত দেরী হলো কেন? তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. একটি গোপন কাজে গিয়েছিলাম। এই জন্য ফিরতে দেরী হয়েছে। মা মনে করলেন, ছেলে হয়তো সত্য গোপন করছে, এই জন্য জানতে চাইলেনঃ কী কাজ? আনাস জবাব দিলেন একটি গোপন কথা, কাউকে বলা যাবেনা। মা বললেনঃ তাহলে গোপনই রাখ কারও কাছে প্রকাশ করোনা। আনাস আজীবন এ সত্য গোপন রেখেছেন। একবার তাঁর বিশিস্ট ছাত্র সাবিত যখন সেই কথাটি জানতে চাইলেন তখন তিনি বললেন, কথাটি কাউকে জানালে তোমাকেই জানাতাম। কিন্তু আমি তা কাউকে বলবো না। (আল-ফাতহুর রাব্বাবী মা’য়া বুলুগুল আমানী- ২২/২০৪, হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৪৩, ২/৫০৩)

    হযরত আনাস সব সময় রাসূলুল্লাহর সা. সংগে থাকতেন। আবাসে-প্রবাসে, ভিতরে-বাহিরে কোন বিশেষ স্থান বা সময় তাঁর জন্য নির্ধারিত ছিলনা। হিজাবের আয়াত নাযিল হওয়ার পূর্বে তিনি স্বাধীনভাবে রাসূলুল্লাহর সা. গৃহে যাতায়াত করতেন। আনাস বলেন: আমি রাসূলুল্লাহর সা. গৃহে আসতাম এবং অন্দর মহলে আযওয়াজে মুতাহ্হারাতদের কাছেও যেতাম। একদিন আমি অন্দরে প্রবেশ করতে যাব, এমন সময় রাসূল সা. ডাকলেনঃ আনাস, পিছিয়ে এস। হিজাবের আয়াত নাযিল হয়ে গেছে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৪) আনাস আরও বলেনঃ আমি যে দিন বালেগ হলাম, রাসূলকে সা. সে কথা জানালাম। তিনি বললেনঃ এখন থেকে অনুমতি ছাড়া মেয়েদের কাছে যাবেনা। আনাস বলেনঃ সেই দিনটির মত কঠিন দিন আমার জীবনে আর আসেনি। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪৪)

    একদিন ফজরের নামাযের পূর্বে রাসূল সা. বললেন, আজ রোযা রাখার ইচ্ছা করেছি, আমাকে কিছু খাবার দাও। আনাস খুব তাড়াতাড়ি কিছু খুরমা ও পানি হাজির করেন। রাসুল সা. তাই দিয়ে সেহরী সেরে ফজরের নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। (মুসনাদ- ৩/১৯৭) ওয়াকিদী বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. খাদিমদের মধ্যে যাঁরা তাঁর দরজা থেকে দূরে যেত না তাঁদের মধ্যে আনাস একজন। আবু হুরাইরা রা. বলতেনঃ আমি তো মনে করতাম আনাস রাসূলুল্লাহর সা. দাস। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৮৫)

    হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় এসে আবু আইউব আল আনসারীর রা. অতিথি হন। সেই সময় তিনি আনাসের পিতা মালিক ইবন নাদরের কুয়োর পানি সবচেয়ে বেশী তৃপ্তি সহকারে পান করতেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. আবু আইউবের বাড়ী থেকে নিজের বাড়ীতে চলে গেলে আনাস সেই কুয়োর পানি রাসূলুল্লাহর সা. জন্য বয়ে নিয়ে আসতেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৩৫)
    হযরত আনাস অত্যন্ত নিপুণতার সাথে রাসূলুল্লাহর সা. সকল কাজ সম্পাদন করতেন। আনুগত্যের মাধ্যমে সর্বক্ষণ তাঁকে খুশী রাখতেন। তিনি নিজেই বলেনঃ আমি দশ বছর যাবত রাসূলুল্লাহর সা. খিদমাত করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কক্ষণও আমার ওপর নারাজ হননি। আমার কোন কাজের জন্য কক্ষণও বলেননিঃ এ কাজটি তুমি কেন করলে? আর আমি কোন কাজ করিনি সে জন্যও তিনি প্রশ্ন করেননিঃ কাজটি তুমি কেন করনি? অথবা তুমি ভুল করেছ বা যা করেছ, খুবই খারাপ করেছ- এমন কথাও আমার কোন ভুলের জন্য তিনি বলেননি। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৪, ৫০৬) এভাবে আনাস রাসূলুল্লাহর সা. অন্তরে এক বিশেষ স্থান দখল করেন। রাসুল সা. স্নেহভরে কখনও ‘ছেলে’ আবার কখনও ‘উনাইস’ বলে ডাকতেন। তিনি মাঝে মধ্যে আনাসদের বাড়ীতে যেতেন, আহার করতেন, দুপুরের সময় হলে বিশ্রাম নিতেন, নামায আদায় করতেন এবং আনাসের জন্য দু’আও করতেন। এ সম্পর্কিত কয়েকটি হাদীস মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। (আল-ফাতহুর রাব্বানী-২২/২০৩)

    আনাস বলেনঃ একদিন আবু তালহা আমার মা উম্মু সুলাইমকে বললেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহর সা. কণ্ঠস্বর একটু দুর্বল শুনতে পেলাম। মনে হলো তিনি ক্ষুধার্ত। তোমার কাছে কোন খাবার আছে কি? মা বললেনঃ আছে। তিনি কয়েক টুকরো রুটি আমার কাপড়ে জড়িয়ে দিয়ে আমাকে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠালেন। আমাকে দেখেই রাসূল সা. জিজ্ঞেস করলেনঃ আবু তালহা পাঠিয়েছে? বললামঃ হাঁ। বললেনঃ খাবার? বললামঃ হাঁ। রাসূলসা. সাথের লোকদের বললেনঃ তোমরা ওঠো। তাঁরা চললেন, আমিও তাদের আগে আগে চললাম। আবু তালহা সকলকে দেখে স্ত্রীকে ডেকে বললেন: উম্মু সুলাইম, দেখ, রাসূল সা. লোকজন সংগে করে চলে এসেছেন। সবাইকে খেতে দেওয়ার মত খাবার তো নেই। উম্মু সুলাইম বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসুল সা. সে কথা ভালোই জানেন। আবু তালহা অতিথিদের নিয়ে বসালেন। রাসূল সা. ঘরে ঢুকে বললেনঃ যা আছে নিয়ে এসো। সামান্য খাবার ছিল, তাই হাজির করা হলো। তিনি বললেনঃ প্রথম দশজনকে আসতে বল। দশ জন ঢুকে পেট ভরে খেয়ে বের হয়ে গেল। তারপর আর দশ জন। এ ভাবে মোট সত্তু জন লোক পেট ভরে সেই খাবার খেয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১৯৪)

    আনাস আরও বলেন, আমার মা উম্মু সুলাইমের আবু তালহার পক্ষের আবু ’উমাইর নামে একটি ছোট ছেলে ছিল। রাসুল সা. আমাদের বাড়ীতে এলে তার সাথে একটু রসিকতা করতেন। একদিন দেখলেন আবু ’উমাইর মুখ ভার করে বসে আছে। রাসুল সা. বললেনঃ আবু ’উমাইর এমন মুখ গোমড়া করে বসে আছ কেন? মা বললেনঃ তার খেলার সাথ ‘নুগাইর’ টি মারা গেছে। তখন থেকে রাসুল সা. তাঁকে দেখলে কাব্যি করে বলতেনঃ ‘ইয়া আবা ’উমাইর- মা ফা’য়ালান নুগাইর’- ওহে আবু ’উমাইর, তোমার নুগাইরটি কি করলো? উল্লেখ্য যে, ‘নুগাইর’ লাল ঠোঁট বিশিষ্ট চড়ুই- এর মত এক প্রকার ছোট্ট পাখী। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৩৯, হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৭০, ৫৭১)

    আনাসদের বাড়ীতে রাসূলুল্লাহর সা. ওপর কুরআনের বহু আয়াত নাযিল হয়েছে। রাসুল সা. ওহী নাযিলের সময় ঘেমে যেতেন আর তাঁরা সেই ঘাম সংরক্ষণ করতেন। আনাস বলেনঃ একদিন দুপুরে রাসুল সা. আমাদের বাড়ীতে এসে বিশ্রাম নিলেন এবং ঘেমে গেলেন। আমার মা একটি বোতল এনে সেই ঘাম ভরতে লাগলেন। রাসুল সা. জেগে উঠে বললেনঃ ’উম্মু সুলাইম, একি করছো? মা বললেনঃ আপনার এই ঘাম আমাদের জন্য সুগন্ধি। আনাস বলতেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. সুগন্ধি থেকে অধিকতর সুগন্ধিযুক্ত মিশ্ক অথবা আম্বর আমার জীবনে আর শুকিনি। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪৪, ১৪৫)

    আমরা আগেই বলেছি, আনাসের কল্যাণময়ী মা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. খালা। তিনি অন্তর দিয়ে তাঁকে ভালোবাসতেন, ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। আর রাসূলও সা. তাঁর কথা কখনও বিস্মৃত হননি। এই সম্মানিত মহিলাকে রাসূল সা. জান্নাতের সুসংবাদ দান করেছেন। (দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা (উর্দু)- ৩/৪০২) খাইবার যুদ্ধে হযরত সাফিয়্যা রা. বন্দী হলেন এবং রাসুল সা. তাঁকে শাদী করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। সাফিয়্যাকে উম্মু সুলাইমের নিকট পাঠিয়ে দেওয়া হলো। তিনিই বিয়ের সকল ব্যবস্থা সম্পদেন করলেন। এ সম্পর্কে ইবন ইসহাক বলেনঃ খাইবারে অথবা খাইবার থেকে ফেরার পথে হযরত সাফিয়্যার সাথে রাসূলুল্লাহর সা. শাদী মুবারাক অনুষ্ঠিত হয়। আনাসের মা উম্মু সুলাইম তাঁর সাজানো, চুল বাঁধা ইত্যাদি যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৩৩৯, ৩৪০, আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৪৩)

    এমনিভাবে হযরত যয়নাবের সাথে যখন রাসূলুল্লাহর সা. বিয়ে হয় তখনও উম্মু সুলাইম কিছু খাবার তৈরী করে পাঠান। রাসুল সা. সাহাবীদের দা’ওয়াত দিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান করে সেই খাবার পরিবেশন করেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/১৬৩)

    এই সব বৈশিষ্ট্যই আনাসকে নবী খান্দানের একজন সদস্যে পরিণত করে। রাসুল সা. মাঝে মধ্যে তাঁর সাথে হালকা মিযাজ হয়ে যেতেন। এই যেমন তাঁকে ডাকলেন ‘আবু হামযা’ বলে। একবার তো ডাকলেন ‘ইয়া জাল উজনাইন’- ওহে দুই কান ওয়ালা বলে। (উসুদুল গাবা- ১/১২৭)

    আমরা পূর্বেই দেখেছি, রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আনাসের কত গভীর সম্পর্ক ছিল। এই সম্পর্কে কারণেই ঘরে-বাইরে, আবাসে-প্রবাসে সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহর সা. সংগে থাকতেন। যুদ্ধের ময়দানেও সেই সংগ ত্যাগ করেননি। বদর যুদ্ধের সময় আনাসের বয়স এমন কিছু হয়নি। মাত্র বারো বছর। তাসত্ত্বেও মুসলিম মুজাহিদদের পাশাপাশি যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সেবা ও সৈনিকদের সাজ-সরঞ্জাম ও মাল-সামান দেখার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বয়স অতি অল্প থাকার কারণে তাঁর এ যুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে পরবর্তীকালে অনেকের মনে সংশয় দেখা দিয়েছে। একবার তো সংশয়ের সুরে এক ব্যক্তি তাঁকে প্রশ্ন করেই বসেঃ আপনি কি বদরে হাজির ছিলেন? জবাব দিলেনঃ আমি কিভাবে গায়ের হাজির থাকতে পারি? (আল-ইসাবা- ১/৭১, দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ৩/৪০২)

    বদরের এক বছর পর উহুদ যুদ্ধ হয়। তখনও আনাস অল্প বয়স্ক। হিজরী ষষ্ঠ সনে হুদাইবিয়ায় বাইয়াতে শাজারার গৌরব অর্জন করেন। তখন তাঁর বয়স ষোল বছর। যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার যোগ্য হয়ে উঠেছেন। হিজরী সপ্তম সনে রাসূল সা. ’উমরাতুল কাদা (কাজা ’উমরাহ) আদায় করেন। আনাস সংগে ছিলেন। এ বছরই খাইবার বিজিত হয়। এই অভিযানে আনাস আবু তালহার সাথে উটের পিঠে সাওয়ার ছিলেন। এক পর্যায়ে বিজয়ীর বেশে হযরত রাসূলে কারীম সা. খাইবারে প্রবেশ করছিলেন তখন আনাস তাঁর এত নিকটে ছিলেন যে তাঁর পা রাসূলে সা. পবিত্র পা স্পর্শ করে। এর ফলে রাসূলুল্লাহর সা. ইযার হাঁটুর ওপরে উঠে যায় এবং তা মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়। (মুসনাদ- ৩/১০২) এরপর মক্কা বিজয়, তায়িফ ও হুনাইন অভিযানে যোগ দেন। সর্বশেষ হিজরী দশ সনে বিদায় হজ্জে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে ছিলেন।

    আনাস বলেনঃ হুনাইন যুদ্ধের দিন আবু তালহা হাসতে হাসতে রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গিয়ে বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কি দেখেছেন, উম্মু সুলাইমের হাতে খঞ্জর? রাসুল সা. বললেনঃ উম্মু সুলাইম খঞ্জর দিয়ে কি করবে? জবাব দিলেন: কেউ আমার দিকে এগিয়ে এলে এটা দিয়ে আমি আঘাত করবো। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৯৭)

    হযরত রাসূলে কারীমের সা. অভিযানের সংখ্যা ছিল ২৬ অথবা ২৭ টি। তবে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এমন অভিযানের সংখ্যা মাত্র ৯টি। যেমনঃ বদর, উহুদ, খন্দক, কুরায়জা, মুসতালিক, খাইবার, হুনাইন ও তায়িফ। আনাস এর সব ক’টিতে উপস্থিত ছিলেন। এক ব্যক্তি আনাসের ছেলে মূসাকে জিজ্ঞেস করেছিল, আপনার সম্মানিত পিতা কতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন? তিনি জবাব দিয়েছিলেনঃ আটটি যুদ্ধে। সম্ভবতঃ বদর যুদ্ধটি বাদ দিয়েছিলেন। তার কারণ এই হতে পারে যে, সে সময় জিহাদে যাওয়ার যে বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল, আনাস তার চেয়ে ছোট ছিলেন।

    হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের পর হযরত আবু বকর রা. খলীফা হলেন। এ সময় ভন্ড নবীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ইয়ামামার যুদ্ধে আনাসের অংশগ্রহণের কথা জানা যায়। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৩৭) খলীফা আনাসকে বাহরাইনে ‘আমিলে সাদাকা’র পদে নিয়োগ দান করতে চান। এ ব্যাপারে ’উমারের পরামর্শ চাইলে তিনি বলেনঃ আনাস বুদ্ধিমান ও লেখাপড়া জানা মানুষ। তার জন্য যে খিদমতের প্রস্তাব আপনি করেছেন আমি তা সমর্থন করি। খলীফা আনাসকে ডেকে পাঠান এবং আমিলে সাদাকার দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে বাহরাইনে পাঠিয়ে দেন। (বুখারী, কিতাবুয যাকাত, আল-ইসাবা- ১/৭২) তিনি যখন বাহরাইন থেকে ফিরে আসেন তখন আবু বকর রা. আর নেই। তাঁর স্থলে ’উমার রা. খলীফা। তিনি বাহরাইন থেকে আনীত অর্থ থেকে চার হাজার দিরহাম আনাসকে দান করেন। আনাস বলেনঃ আমি সেই অর্থ পেয়ে মদীনাবাসীদের মধ্যে একজন অধিক অর্থশালী ব্যক্তি হয়ে যাই। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২২)

    আনাস আরও বলেনঃ আবু বকরের রা. মৃত্যুর পর ’উমার খিলাফতের দায়িত্বভার হাতে নিলে আমি মদীনায় এসে তাঁকে বললাম: দেখি, আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে দিন। যে কথার ওপর আপনার পূর্ববর্তী বন্ধুর হাতে আপনি বাই’য়াত করেছিলেন সেই কথার ওপর আমি আপনার হাতে বাই’য়াত করবো। এভাবে তিনি ’উমারের রা. হাতে বাই’য়াত করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/২৫৮)

    খলীফা হযরত আবু বকর রা. ইয়ামনবাসীদের উদ্দেশ্যে লেখা একটি পত্রসহ আনাসকে ইয়ামনেও পাঠান। সেই পত্রে তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বেরিয়ে পড়ার জন্য তাদের প্রতি আহ্বান জানান। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৪১, ৪৪২)

    হযরত মুগীরা ইবন শু’বা রা. বসরার গভর্ণর ছিলেন। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে হযরত আবু বাকরার রা. নেতৃত্বে এক মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপিত হয়। (দ্রঃ আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৯০-৪৯২) খলীফা হযরত ’উমার রা. তাঁকে বরখাস্ত করে আবু মূসা আল-আশ’য়ারীকে তাঁর স্থলে নিয়োগ করেন। ঘটনার তদন্তের জন্য তাঁর সহকারী হিসাবে আরও চার ব্যক্তিকে বসরায় পাঠান। তারা হলেন, ১. আনাস ইবন মালিক, ২. আনাসের ভাই আল-বারা’ ইবন মালিক, ৩. ইমরান ইবনুল হুসাইন, ৪. আবু নাজীদ আল-খুযা’ঈ। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৯১)

    এই বসরা শহরে হযরত আনাস স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। খলীফা ’উমার রা. যাঁদের ওপর এখানকার ফিকাহ ও ফাতওয়ার দায়িত্ব অর্পণ করেন তাঁদের মধ্যে আনাস একজন। জীবনের বাকী অংশ তিনি এই বসরা শহরেই কাটিয়ে দেন। এখানে ফিকাহ ও ফাতওয়ার দায়িত্ব পালন ছাড়াও যখন যে দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে তিনি দক্ষতার সাথে তা পালন করেন। এই সময় পরিচালিত সকল অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ‘তুসতার’ অভিযানে পদাতিক বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন। তুসতার বিজিত হয় এবং পারস্য সেনাপতি হুমুযানকে সপরিবারে বন্দী করে মুসলিম সেনাপতি আবু মূসা আল-আশয়ারীর রা. সামনে হাজির করা হয়। হযরত আবু মূসা রা. তিনশো সদস্যের একটি বাহিনীর হিফাজতে হুরমুযানকে মদীনায় খলীফার দরবারে পাঠিয়ে দেন। আনাস রা. ছিলেন এ বাহিনীর আমীর এবং তিনি তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন। এভাবে দীর্ঘদিন পর প্রিয় জন্মভূমির যিয়ারত লাভের সুযোগ পান। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৬৬, দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ৩/৪০২)

    কিছুদিন মদীনায় অবস্থান করার পর আনাস আবার বসরায় ফিরে গেলেন। হিজরী ২৩ সনের জ্বিলহজ্জ মাসে হযরত ’উমার রা. শাহাদাত বরণ করলে হযরত ’উসমান রা. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হলেন। তাঁর খিলাফতের প্রথম কয়টি বছর খুবই শান্ত ছিল। তবে কিছুকাল পরে নানারকম ফিত্না ও অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। চতুর্দিকে স্বার্থন্বেষী, হাঙ্গামাবাজ লোকেরা বিদ্রোহের পতাকা উড়িয়ে দেয় এবং তারা মদীনা অভিমুখে যাত্রা করে।

    তখনও কিন্তু ইসলামী খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে এমন বহু ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা কোন রকম বিদ্রোহ ও হুমকির পরোয়া করতেন না। সুতরাং মাজলুম খলীফার আর্ত চিৎকার সর্বপ্রথম এই সত্যের সৈনিকদের কাছে পৌঁছে। তাঁরা তাঁর সাহায্যের জন্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ান।

    ইরাকের রাজধানী বসরাতেও এমন লোকের অভাব ছিলনা। এমন ভয়াবহ অবস্থার খবর যখন সেখানে পৌঁছলো তখন আনাস ইবন মালিক, ’ইমরান ইবন হুসাইনসহ বহু বিশিস্ট ব্যক্তি দ্বীনের সাহায্যের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তাঁরা বক্তৃতা-ভাষণের দ্বারা গোটা বসরাকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তোলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ তাঁদের সাহায্য মদীনায় পৌঁছার পূর্বেই বিদ্রোহীদের হাতে খলীফা ’উসমান রা. শাহাদাত বরণ করেন।

    হযরত ’উসমানের রা. পর হযরত আলী রা. খিলাফতের দায়িত্ব ভার গ্রহণ করলেন। ছয় মাস যেতে না যেতেই তাঁর বিরুদ্ধে এক মস্ত বড় ফিত্না এই বসরাতেই মাথা তুলে দাঁড়ায়। আর তাতে বিশিস্ট সাহাবা-ই-কিরামও জড়িয়ে পড়েন। বসরা ছিল আনাসের আবাস স্থল। সেখানে তার বিশেষ প্রভাবও চিল। কিন্তু তিনি সকল আন্দোলন থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। যতদিন পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত না হয়, তিনি আরও বহু বিশিষ্ট সাহাবীর মত নির্জনতা অবলম্বন করেন। এ কারণে, হযরত আলী ও হযরত ’আয়িশার রা. উটের য্রুদ্ধ, যা এই বসরার অনতি দুরে সংঘটিত হয়- তাতে কোন পক্ষে আনাসের রা. কোন ভূমিকা দেখা যায় না। এসব ঘটনায় তিনি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকেন।

    হযরত ’আলীর রা. খিলাফতের পরেও হযরত আনাস বহুদিন জীবিত ছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে নানা রকম দৃশ্য ও অবস্থা অবলোকন করেন; কিন্তু সব সময় নির্জনতাকে প্রাধান্য দান করেন। কোন অবস্থাতেই নিজেকে জাহির করা তিনি মোটেই পছন্দ করেননি। তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে স্বৈরাচারী উমাইয়্যা শাসকদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে পারেননি। খলীফা আবদুল মালিকের সময় উমাইয়্যা সাম্রাজ্যের পূর্ব অঞ্চলের গভর্ণর ছিলেন হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ। অত্যাচারী ও নিপীড়ক হিসেবে ইতিহাসে তিনি খ্যাতিমান। একবার তিনি বসরায় এসে আনাসকে ডেকে শাসান এবং জনগণের মাঝে হেয় করার জন্য তাঁর ঘাড়ে ছাপ মেরে দেন। ওয়াকিদী ইসহাক ইবন ইয়াযীদ থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেনঃ আমি এই ছাপ মারা অবস্থায় আনাসকে দেখেছি। (আল-ইসতী’য়াবঃ আল-ইসাবার পার্শ্বটীকা- ১/৭২)

    হাজ্জাজ ধারণা করেছিলেন, আনাস রাজনৈতিক বাতাস বুঝে কাজ করেন। তাই আনাসকে দেখেই তিনি বলে ওঠেন: ওহে খবীস! এটা একটা চালবাজি। আপনি মুখতার আস-সাকাফীর সাথেও থাকেন, আবার কখনও থাকেন ইবনুল আশয়াসের সাথে। আমি আপনাদের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি। এমন কঠিন মুহূর্তেও আনাস নিজেকে আয়ত্বে রাখেন। শান্তভাবে তিনি বলেনঃ আল্লাহ আমীরকে সাহায্য করুন। আপনার শাস্তি কার জন্য? বললেনঃ আপনার জন্য। হযরত আনাস চুপচাপ বাড়ী ফিরে এলেন এবং খলীফা ’আবদুল মালিকের নিকট হাজ্জাজের আচরণের বিবরণ দিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়ে দিলেন। চিঠি পড়ে ’আবদুল মালিক রাগে ফেটে পলেন। সাথে সাথে তিনি হাজ্জাজকে লিখলেন, তুমি খুব তাড়াতাড়ি আনাসের বাড়ীতে গিয়ে ক্ষমা চাও, নইলে তোমার সাথে খুব খারাপ আচরণ করা হবে। খলীফার চিঠি পেয়ে হাজ্জাজ তাঁর পরিষদবর্গসহ আনাসের খিদমতে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি আনাসের নিকট আরও আবেদন জানান, তিনি যে হাজ্জাজকে ক্ষমা করেছেন, সেই কথা যেন খলীফাকে একটু জানিয়ে দেন। আনাস তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং সেই মর্মে একটি চিঠি দিমাশ্কে পাঠিয়ে দেন। মূলতঃ ফিত্না ও বিশৃঙ্খলার ভয়ে আনাস এমন কঠিন ধৈর্য অবলম্বন করেন। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪৮, আল-ফাতহুর রাব্বানী মা’য়া বুলুগিল আমানী- ২২/২০৫, হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৪৭, ৬৪৮)

    হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের রা. কর্তৃত্বের সময় হযরত আনাস কিছুদিনের জন্য বসরার ইমাম ছিলেন। খলীফা ওয়ালিদ ইবন ’আবদিল মালিকের সময় তিনি একবার দিমাশকে যান। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৩৯) তবে অন্য একটি বর্ণনা মতে তিনি প্রথমে দিমাশকে যান এবং সেখান থেকে বসরায় পৌঁছেন। (আল-আ’লাম- ১/৩৬৫)

    হযরত আনাসের মৃত্যু সন ও মৃত্যুর সময় বয়স সম্পর্কে প্রচুর মতভেদ আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ৯৩ সনে মৃত্যুবরণ করেন এবং তখন তাঁর বয়স হয়েছিল এক শো বছরের উর্দ্ধে। কারণ, হিজরাতের পূর্বে তাঁর বয়স ছিল দশ বছর। (তাহজীবুল আসমা- ১/১২৮, আল-আ’লাম- ১/৩৬৫, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৫, উসুদুল গাবা- ১/১২৮) মৃত্যুর পূর্বে তিনি কয়েক মাস অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। দেখার জন্য ভক্ত-অনুরক্তদের ভীড় লেগেই থাকতো। দূর থেকে দলে দলে মানুষ তাঁকে এক নজর দেখার জন্য আসতো। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাঁর একান্ত শাগরিদ সাবিত নাবানীকে বলেন, আমার জিহবার নীচে রাসূলুল্লাহর সা. একটি পবিত্র চুল রেখে দাও। পবিত্র চুল রাখা হলো। এ অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেই অবস্থায় দাফন করা হয়। রাসূলুল্লাহর সা. একটি লাঠি ছিল তাঁর কাছে। মৃত্যুর পূর্বে লাঠিটি কবরে তাঁর সাথে দাফনের নির্দেশ দিয়ে যান। সে নির্দেশ পালন করা হয়। (উসুদুল গাবা- ১/১২৮, আল-ইসাবা- ১/৭১, আল-ইসতীয়াব- ১/৭৩) ইবন কুতায়বা ‘আল-মা’য়ারিফ’ গ্রন্থে বলেন, বসরার তিন ব্যক্তির প্রত্যেকেই এক শোন বছর জীবন পেয়েছিলেন। তাঁরা হলেনঃ আনাস ইবন মালিক, আবু বাকরাহ্ ও খীলফা ইবন বদর রা.। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/১২৮)

    হযরত আনাস ছিলেন দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী বসরার শেষ সাহাবী। সম্ভবতঃ একমাত্র আবুত তুফাইল রা. ছাড়া তখন পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন সাহাবী জীবিত ছিলেন না। (আল-ইসাবা- ১/৭১, আল-আ’লাম- ১/৩৬৫, আল-ইসতী’য়াবঃ আল-ইসাবা- ১/৭৩) অবশ্য আল্লামা জাহাবী ‘তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ’ গ্রন্থে বলেনঃ ‘কানা (আনাস) আখিরাস সাহাবাতি মাওতান’- আনাস মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী।’ সাহাবীদের মধ্যে দুনিয়া থেকে তিনিই সর্বশেষ বিদায় নেন। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪) হযরত আনাস নিজেও শেষ জীবনে বলতেনঃ কিলাতাইন বা দুই কিবলার দিকে মুখ করে নামায আদায় করেছেন, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া এখন আর কেউ বেঁচে নেই। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪৫)

    পরিবারের সদস্য, ছাত্র ও ভক্তবৃন্দ ছাড়াও আশ-পাশের লোকেরা তাঁর জানাযায় শরীক হন। কুতন ইবন মুদরিক আল-কিলাবী জানাযার নামায পড়ান। বসরার উপকণ্ঠে ‘তিফ্’ নামক স্থানে তাঁর বাসস্থানেরে পাশেই কবর দেওয়া হয়। (উসুদুল গাবা- ১/১২৯)

    হযরত আনাসের মৃত্যুতে গোটা মুসলিম উম্মাহ দারুণ শোকাকিভূত হয়ে পড়েছিল। বাস্তবেও তেমন হওয়ার কথা। কারণ, রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীরা এক এক করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। মাত্র দুই ব্যক্তি যাঁদেরকে দেখে মানুষ প্রশান্তি লাভ করতো, তাঁদের একজন চলে গেলেন।

    হযরত আনাসের ইনতিকালের পর ‘মাওরিক’ নামক এক তাবঈ ব্যক্তি আফসোস করে বলেন: ‘আল-ইউয়াম জাহাবা নিসফুল ’ইলম- আজ অর্ধেক ’ইলম (জ্ঞান) চলে গেল।’ লোকেরা প্রশ্ন করলোঃ তা কেমন করে? বললেন: আমার কাছে একজন প্রবৃত্তির অনুসারী লোক আসতো। সে যখন হাদীসের বিরোধীতা করতো, আমি তাঁকে আনাসের নিকট নিয়ে যেতাম। আনাস তাঁকে হাদীস শুনিয়ে নিশ্চিন্ত করতেন। এখন কার কাছে যাব? (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ১/১২৮, তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪১)

    আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে হযরত আনাসের সন্তান সন্ততির সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশী। আর এটা হয়েছিল হযরত রাসূলে কারীমের সা. দু’আর বরকতে। এ সম্পর্কে আনাস বলেনঃ একদিন রাসুলসা. উম্মু সুলাইমের (আনাসের মা) বাড়ীতে এলেন। উম্মু সুলাইম খুরমা ও ঘি খেতে দিলেন। কিন্তু রাসুল সা. সে দিন সাওম পালন করছিলেন। তিনি বললেনঃ এগুলি নিয়ে যাও এবং খুরমার পাত্রে খুরমা ও ঘিয়ের পাত্রে ঘি রেখে দাও। তারপর তিনি উঠে ঘরের এক কোণে গিয়ে দুই রাকা’য়াত নামায আদায় করেন। আমরাও তাঁর সাথে নামায আদায় করলাম। তারপর তিনি উম্মু সুলাইম ও তাঁর পরিবারের কল্যাণ কামনা করে দু’আ করলেন। উম্মু সুলাইম ’আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার কিছু নিশেষ নিবেদন আছে। তিনি জানতে চাইলেনঃ কী? বললেনঃ এই আপনার খাদিম আনাস। আনাস বলেনঃ তারপর রাসূল সা. আমার জন্য এমন দু’আ করলেন যে, দুনিয়া ও আখিরাতের কোন কল্যাণই বাদ দিলেন না। শেষের দিকে তিনি বলেনঃ ‘হে আল্লাহ আনাসের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধি দান কর এবং তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাও।’ আনাস বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. যে তিনটি জিনিসের জন্য দু’আ করেছিলেন, তার দুইটি আমি পেয়ে গেছি এবং বাকী একটি (জান্নাত) অপেক্ষায় আছি। আনাস আরও বলতেনঃ ‘আজ আনসারদের মধ্যে আমার চেয়ে বেশী সম্পদশালী ব্যক্তি আর কেউ নেই।’ ঐতিহাসিকরা বলছেন, রাসূলুল্লাহর সা. এই দু’আর পূর্বে একটি মাত্র আংটি ছাড়া তিনি কোন সোনা বা রূপোর মালিক ছিলেন না। এভাবে রাসুল সা. আনাস ও তাঁর পরিবারের কল্যাণ চেয়ে বহুবার দু’আ করেছেন। (আল-ফাতহুর রাব্বানী- মা’য়া বুলুগিল আমানী- ২২/২০৩, আল-ইসাবা- ১/৭২, তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪২, ১৪৩)

    মৃত্যুকালে হযরত আনাস মোট ৮২ (বিরাশি) জন ছেলে মেয়ে-রেখে যান। তাদের মধ্যে ৮০ (আশি) জন ছেলে এবং হাফসা ও উম্মু ’আমর নামে দুই মেয়ে। তাছাড়া নাতি-নাতনীর সংখ্যা ছিল আরও অনেকে। (উসুদুল গাবা- ১/১২৮) খলীফা ইবন খাইয়্যাত বলেনঃ আনাস যখন মারা যান তখন তাঁর চারটি বাড়ী। একটি বসরার জামে মসজিদের সামনে, একটি ইসতাফনুস গলিতে এবং একটি বসরা থেকে দুই ফারসাখ দূরে। তাছাড়া আরও একটি বাড়ী ছিল। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪১)

    সন্তানদের প্রতি ছিল হযরত আনাসের দারুণ স্নেহ-মমতা। সব সময় যে তিনি বাড়ীতে থাকতেন- এই স্নেহ-মমতার প্রাবাল্যও তার একটি কারণ। ছেলে-মেয়েদের নিজেই শিক্ষা দিতেন। মেয়েদেরও হালকায়ে দারসে বসার অনুমতি ছিল। তাঁর কয়েকটি ছেলে হাদীস শাস্ত্রের শায়খ ও ইমাম রূপে স্বীকৃত হন। তাবঈদের তাবকায় (শ্রণী) তাদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। হযরত আনাসই তাদেরকে গড়ে তোলেন।

    হযরত আনাস ছিলেন একজন দক্ষ তীরন্দাজ। সন্তানদেরও এর অনুশীলন করাতেন। ছেলেরা প্রথমে নিশানা ঠিক করে তীর ছুড়তো। তারা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে তিনি ছুড়তেন এবং সঠিকভাবে তা লক্ষ্যভেদ করতো। তীর ছোড়ার অনুশীলনী সেই প্রাচীন জাহিলিয়্যাতের সময় থেকেই আনসারদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। একথা তাবারী উল্লেখ করেছেন। (উসুদুল গাবা- ১/১২৮)

    হযরত আনাসের পরিপূর্ণ হুলিয়া বা অবয়ব জানা যায় না। এতটুকু জানা যায় যে, তিনি মধ্যম আকৃতির সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন। চুল-দাড়িতে মেহেন্দীর খিযাব লাগাতেন। হাতে সব সময় হলুদ বর্ণের ‘খালুক’ নামক এক রকম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। ‘উসুদুল গাবা’ গ্রন্থকার বলেনঃ সিংহের ছবি অঙ্কিত একটি আংটি হাতে পরতেন। ছোট বেলায় মাথায় একটা জটা ছিল। রাসুল সা. যখন মাথায় হাত দিতেন, সেই জটা স্পর্শ করতেন। পরে সেটি কেটে ফেলার ইচ্ছা করলে মা বললেনঃ রাসূল সা. এটি স্পর্শ করেছেন, সুতরাং কেটো না। (উসুদুল গাবা- ১/১২৭, ১২৮) মাথায় পাগড়ী বাঁধতেন।

    তিনি ছিলেন দারুণ সৌখিন ও পরিচ্ছন্ন প্রকৃতির একজন মার্জিত রুচির মানুষ। দুনিয়ার বিত্ত-বৈভবও তাঁর অনুকূলে সাড়া দেয়। এ কারণে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। অতি যত্নে একটি উদ্যান তৈরী করেছিলেন, তাতে বছরে দুইবার ফল আসতো। সেখানে একটি ফুল ছিল যা মিশকের মত সুগন্ধি ছড়াতো। (আল-ইসাবা- ১/৭১)

    তিনি বসরার দুই ফারসাখ (মাইল) দূরে ‘তিফ’ নামক স্থানে একটি বাড়ী বানিয়ে বসবাস করতেন। এতে বুঝা যায়, নগর জীবনের চেয়ে পল্লীতে বাস করা বেশী পসন্দ করতেন। ভালো খাবার খেতেন। খাবার তালিকায় সব সময় রুটি ও শুরবা থাকতো। তিনি উদার প্রকৃতির ছিলেন। আহারের সময় ছাত্র বা অন্য কেউ কাছে থাকলে, আহারে শরীক করাতেন। সকালে নাশতা করতেন এবং তিন অথবা পাঁচটি খেজুর খেতেন। কথা খুব কম বলতেন। প্রয়োজন হলে কথা তিনবার করে বলতেন। কারও বাড়ীতে ঢুকবার আগে তিনবার অনুমতি চাইতেন। (মুসনাদ- ৩/১২৮, ১৮০, ২২১, ২৩২) আত্মীয়-বন্ধুদের কেউ সাক্ষাৎ করতে এলে কিছু না কিছু খাবার তাদের সামনে উপস্থিত করতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে কিছু লোক তাঁকে দেখতে আসে। তিনি দাসীকে ডেকে বললেনঃ রুটির সামান্য একটি টুকরো হলেও আমার বন্ধুদের জন্য নিয়ে এসো। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি: উত্তম নৈতিকতা জান্নাতের কাজ। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১৮২)

    তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র প্রকৃতির ছিলেন। মানুষের সাথে উদারভাবে মিশতেন। ছাত্রদের সাথেও ছিলেন ভীষণ আন্তরিক। প্রায়ই বলতেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. সময় আমরা বসা থাকতাম, তিনি আসতেন; কিন্তু তাঁর সম্মানে আমরা কেউই উঠে দাঁড়াতাম না। অথচ রাসূলুল্লাহর সা. চেয়ে অধিকতর প্রিয় আমাদের আর কে হতে পারে? এর কারণ, রাসূল সা. এ সব কৃত্রিমতা একটু পসন্দ করতেন না।

    সবরের গুণটি তাঁর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়েছিল। তিনি যে পর্যায়ের লোক ছিলেন, মুসলমানদের অন্তরে তার প্রতি যে ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল, হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁর যে মর্যাদার কথা বলেছেন এবং খোদ রাসূলুল্লাহর সা. যে নৈকট্য তিনি লাভ করেছিলেন তাতে প্রতিটি মানুষ তাঁকে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতো। তাঁর ছাত্র প্রখ্যাত তাবঈ সাবিত নাবানী ভক্তি ও শ্রদ্ধার আতিশয্যে হযরত আনাসের দুই চোখের মাঝখানে চুমু দিতেন। একবার আনাস আবুল ’আলিয়্যাকে একটি সেব দিলেন। সেবটি হাতে নিয়ে তিনি শুকতে, চুমু খেতে ও মুখে ঘষতে লাগলেন। তারপর বললেনঃ এই সেবে এমন হাতের স্পর্শ লেগেছে যে হাত রাসূলের সা. পবিত্র হাত স্পর্শ করেছে। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪৪) কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও উমাইয়্যা শাসকদের অনেকের কাছে এর কোন গুরুত্বই ছিল না। এসব স্বেচ্ছাচারী দুষ্টমতিদের নেতা ছিলেন হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ। তাঁর উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। হযরত আনাস তখন চরম ধৈর্য অবলম্বন করেন। তিনি ছাড়া অন্য কারও সাথে এমন আচরণ করা হলে বসরায় আগুন জ্বলে যেত। তিনি কোন্ নীতি অবলম্বন করে এত ধৈর্য ধারণ করতেন? এর একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাঁর নিজের কথার মধ্যে। তিনি বলতেনঃ মুহাম্মাদের সা, বিশিষ্ট সাহাবীরা আমাদেরকে বলেছেনঃ তোমরা তোমাদের আমীরদেরকে গালাগালি করবেনা, তাঁদেরকে ধোকা দেবে না এবং তাঁদের অবাধ্য হবে না। আল্লাহকে ভয় করবে ও ধৈর্য ধারণ করবে। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৭২)

    ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ভয়-ডর শূণ্য দুঃসাহসী। খুব দৌড়াতে পারতেন। একবার ‘মাররুজ জাহরান’ নামক স্থানে একটি খরগোশ তাড়া করে ধরে ফেলেন। অথচ তাঁর সমবয়সী ছেলেরা খরগোশটির পিছনে ধাওয়া করে ফিরে আসে। বড় হয়ে নিপুণ অশ্বারোহী ও দক্ষ তীরন্দাজ হন।

    হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের সংখ্যা বিপুল। তাঁদের মধ্যে আবার এমন একদল আছেন যাঁরা বর্ণনার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি বলে বিবেচিত। আনাস ছিলেন এই দলেরই একজন। তাঁর বর্ণনা সমূহ বিশ্লেষণ করলে নীচের মূলনীতিগুলি পাওয়া যায়:

    ১. হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে এসেছে: ‘আনাস ইবন মালিক হাদীস বর্ণনার সময় ভীত হয়ে পড়তেন। বর্ণনার শেষে বলতেনঃ এই রকম অথবা এই যেমনটি রাসূল সা. বলেছেন’ মুহাদ্দিসগণ হাদীস বর্ণনার শেষে যে বলে থাকেন- ‘আও কামা কালা-অথবা যেমন তিনি বলেছেন’- এবং আজকের যুগ পর্যন্ত যে ধারাটি অব্যাহত রয়েছেন, তার প্রচলন হযরত আনাস থেকে। (তারীখে ইবন ’আসাকির- ৩/১৪৮)

    ২. যে হাদীস বুঝতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো, তিনি তা বর্ণনা করেননি।

    ৩. যে সকল হাদীস তিনি সাহাবীদের নিকট থেকে এবং যেগুলি খোদ রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছিলেন এই দুই প্রকারের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন।

    প্রকৃতপক্ষে কোন জ্ঞানের সেবা বা খিদমাত হলো সেই জ্ঞানের প্রচার ও প্রসার ঘটানো, হযরত আনাস এ ক্ষেত্রে কোন সাহাবী থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। সারাটি জীবন তিনি অভিনিবেশ সহকারে ইলমে হাদীসের প্রচার-প্রসারে অতিবাহিত করেন। তিনি হাদীস শিক্ষা দানের আওতা থেকে কক্ষণও বাইরে যাননি। যে যুগে তাঁর সমসাময়িক সাহাবা যুদ্ধ-বিদ্রহে ব্যস্ত ছিলেন তখনও রাসূলুল্লাহর সা. এই খাদিম দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে বসরার জামে মসজিদে বসে মানুষকে হাদীস শোনাতেন।

    তাঁর জ্ঞানের প্রসারতা তাঁর শাগরিদদের সংখ্যা দ্বারাই অনুমান করা যায়। তাঁর হালকায়ে দারসে মক্কা, মদীনা, কূফা, বসরা, সিরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্রের সমাবেশ ঘটতো তাঁর সন্তান সংখ্যার মত ছাত্র সংখ্যাও অগণিত। হযরত আনাস হযরত রাসূলে কারীম সা. থেকে এবং বিশিস্ট সাহাবীদের নিকট থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন। প্রায় এক শো রাবী তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ২২৮৬ (দুই হাজার দুই শো ছিয়াশি)। মুত্তাফাক আলাইহি- ১৮০, বুখারী এককভাবে ৮০ এবং মুসলিম এককভাবে ৭০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর ছেলে এবং নাতীদের থেকেও বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বসরার বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবু ’উমাইর ’আবদুল কাবীল ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন হাফ্স ইবন হিশাম (২৯১ হিঃ) তাঁরই বংশধর। (দারিয়া-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়্যা- ৩/৪০১) অবশ্য তাঁর বর্ণিত মুত্তাফাক আলাইহি হাদীসের ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন- ১৬৮, আবার কেউ বলেছেন- ১২৮। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৫, তাহজীবুল আসমা- ১/১২৭)

    হযরত আনাস প্রথমতঃ রাসূলে পাকের সা. সাহচার্যে থেকে ইল্ম হাসিল করেন। রাসূলে সা. ওফাতের পর যে সকল সাহাবীর নিকট থেকে হাদীস শোনেন তারা হলেনঃ উবাই ইবন কা’ব, ’আবদুর রহমান ইবন ’আউফ, ’আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ, আবু জার, আবু তালহা, মু’য়াজ ইবন জাবাল, ’উবাদাহ্ ইবনুস সামিত, ’আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা, সাবিত ইবন কায়েস, মালিক ইবন সা’সা’, উম্মু সুলাইম (তাঁর মা), উম্মু হারাম (তাঁর খালা), উম্মুল ফাদল (হযরত ’আব্বাসের স্ত্রী), আবু বকর, ’উমার, ’উসমান রা. প্রমুখ। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪)

    হযরত আনাসের ছাত্র ও শাগরিদদের নামে তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাঁর মধ্যে হাদীস শাস্ত্রে যাঁরা বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন এখানে তাঁদের কয়েকজন জনের নাম উল্লেখ করা গেলঃ হাসান বসরী, ইবন শিহাব যুহরী, সুলাইমান তায়মী, আবু কিলাবা, ইসহাক ইবন আবী তালহা, আবু বকর ইবন ’আবদিল্লাহ মুযানী, কাতাদাহ, সাবিত নাবানী, হুমাইদ আতত্বাবীল, সুমামাহ্ ইবন ’আবদিল্লাহ, (আনাসের পৌত্র) জা’দ, আবু ’উসমান, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন আনসারী, আনাস ইবন সীরীন আযহারী, ইয়াহইয়া ইবন সা’ঈদ আনসারী, রাবী’য়াতুর রায়, সা’ঈদ ইবন জুবাইর এবং সুলাইমান ওয়ারদান রাহিমাহুমুল্লাহ। (তাজহকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৫)

    ইলমে হাদীসের মত ফিকাহ শাস্ত্রেও হযরত আনাসের পান্ডিত্য ছিল। ফকীহ সাহাবীদেরকে তিনটি তাবকা বা স্তরে ভাগ করা হয়। আনাসের স্থান দ্বিতীয় স্তরে। তাঁর ইজতিহাদ ও ফাতওয়াসমূহ সংকলিত হলে একটি স্বতন্ত্র পুস্তকের রূপ লাভ করতে পারে। হযরত ’উমার রা. ফকীহ সাহাবীদের একটি দলের সাথে তাঁকে বসরায় পাঠান। ফিকাহ শাস্ত্রে তাঁর বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে?

    সাহাবীদের যুগে শিক্ষাদান সাধারণতঃ হালকা-ই-দারসের মধ্যেই সীমিত ছিল। হযরত আনাসও এই হালকার পদ্ধতিতেই দারস দিতেন। কোন ছাত্র প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিতেন। তাঁর দারসের এ ধরণের সাওয়াল-জাওয়াবের একটি সংকলন আছে। এখানে কয়েকটি মাসয়ালা উদ্ধৃত হলো যার মাধ্যমে তাঁর ইজতিহাদ পদ্ধতি, সূক্ষ্ণদৃষ্টি, স্বচ্ছ বোধশক্তি, সঠিক সিদ্ধান্ত ইত্যাদির একটা ধরণা লাভ করা যেতে পারে।

    বিশেষ কয়েকটি বরতনে নাবীজ (আংগুর বা খেজুরের রস) পান করা মাকরূহ। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কিরাম একমত। হযরত আনাস স্পষ্ট করে তার কারণগুলির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

    একবার কাতাদাহ জিজ্ঞেস করলেন, ঘড়া বা কলসে কি নাবীজ বানানো যায়? আনাস বললেনঃ যদিও রাসূলে কারীম সা. এ সম্পর্কে কোন মত প্রকাশ করে যাননি, তবুও আমি মাকরুহ মনে করি। কারণ, যে জিনিসের হারাম বা হালাল হওয়া সম্পর্কে সন্দেহ আছে, তাতে হারাম হওয়ার দিকটিই প্রাধান্য পাবে।

    একবার মুখতার ইবন ফিলফিল জানতে চাইলেন, কোন্ কোন্ পাত্রে নাবীজ পান করা উচিত নয়? বললেন, যাতে নেশা হয় তা সবই হারাম। মুখতার বললেন, কাঁচ অথবা আলকাতরার পাত্রে কি পান করা যায়? বললেনঃ হাঁ। আবার প্রশ্ন করা হলোঃ মানুষ যে মাকরূহ মনে করে? বললেনঃ যাতে সন্দেহ হয় তা পরিহার কর। তারপর একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা হলো: নেশা হয় এমন জিনিস তো হারাম; কিন্তু এক দুই ঢোক পানে আপত্তি কি? আনাস বললেনঃ যে জিনিসের বেশী পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে তার অল্প পরিমাণও হারাম। দেখ-আংগুর, খুরমা, গম, যব ইত্যাদি থেকে মদ তৈরী হয়। তার মধ্যে যে জিনিসে নেশা সৃষ্টি হয় তা মদ হয়ে যায়।

    হযরত আনাস যদিও সুন্দরভাবে এই মাসয়ালাটি বর্ণনা করেছেন; তবুও এর আরও একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন। হযরত রাসূলে কারীম সা. পান ও পানীয় সম্পর্কে যে বিধি-বিধান দান করেছেন সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ:

    ১. প্রত্যেক শরাব বা পানীয় যা নেশা সৃষ্টি করে তা হারাম। সাহীহাইনে হযরত ’আয়িশা রা. থেকে এ হাদীস বর্নিত হয়েছে।
    ২. প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই খমর এবং প্রত্যেক খমর (মদ) হারাম। ইবন ’উমার রা. থেকে সাহীহ মুসলিমে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।
    ৩. ‘যে সব জিনিসের বেশী পান করলে নেশা হয় তার অল্প একটুও হারাম।’ (সুনানু ইবন ’উমার)। এর মধ্যে প্রথম হাদীসটির মর্ম হলো, যে সকল পানীয়ের মধ্যে নেশা বা মাদকতা এসে যায় তা হারাম। দ্বিতীয়টির অর্থ হলো, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই খমর, আর প্রত্যেক খমরই হারাম। সুতরাং সিদ্ধান্ত এই দাঁড়ায়; প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই হারাম। তৃতীয়টির অর্থ হলোঃ যে সব জিনিসের বেশী পান করলে নেশা হয় তার অর্প একটুও হারাম। হযরত আনাস রা. তাঁর উপরোক্ত জবাবে এই কথাটিই বলেছেন।

    এখন প্রশ্ন হলো বিশেষ কয়েকটি পাত্রে নাবীজ পান করতে নিষেধ করা হয়েছে কেন? এর প্রকৃত রহস্য এই যে, আধুনিক বিশ্ব মদ তৈরী ও সংরক্ষণের জন্য সুন্দর কাঁচের যে সব পাত্র আবিষ্কার করেছে, তৎকালীন আরবে তা ছিলনা। সেখানে সাধারণভাবে লাউ-এর খোল ও সুরাহী বোতলের কাজ দিত। অথবা এ জাতীয় আরও কয়েকটি পাত্র ছিল যা প্রাকৃতিক ফল শুকিয়ে ও সাফ করে মদের কাজে ব্যবহার করা হতো। ঐ সব পাত্রে মদ রাখলে স্বাভাবিকভাবেই তাতে মদের ক্রিয়া পড়তো, আর তা ধোয়ার পরেও দূর হতো না। ইসলামের প্রথম যুগে যখন মদ হারাম হয় তখন এইসব পাত্রের ব্যবহার হারাম হওয়ার প্রকৃত রহস্য এটাই। অবশ্য পরবর্তীকালে এ জাতীয় পাত্র যাতে মদ রাখা হয়নি, তার ব্যবহার জায়েয হতে পারে। কিন্তু হিজরী প্রথম শতকের ঈমানী চেতায় উজ্জীবিত মুসলমানরা ধারণা করে যে, ঐ সব পাত্র ব্যবহার করলে শরাব পানের কথা নতুন করে মানুষের স্মরণ হতে পারে।

    একবার এক ব্যক্তি হযরত আনাসকে প্রশ্ন করলোঃ রাসূল সা. কি জুতো পরে নামায আদায় করতেন? বললেনঃ হাঁ। জুতো পরে নামায আদায় করা যায়। তবে শর্ত হলেো পাক হতে হবে, নাজাসাত থেকে পরিষ্কার হতে হবে। কেউ নতুন জুতো পরে নামায পড়লে ক্ষতি নেই।

    একবার ইয়াহইয়া ইবন ইয়াযীদ হান্নায়ী প্রশ্ন করলেনঃ নামাযে কখন কসর করা উচিত? বললেনঃ আমি যখন কুফা যেতাম, তখন কসর করতাম। আর রাসূল সা. তিন মাইল বা তিন ফারসাখ পথ চলার পর কসর করেছিলেন। হযরত আনাসের কথার অর্থ এই নয় যে, তিন মাইল সফর করলেই কসর করতে হবে। বরং প্রকৃত ঘটনা হলো, রাসূল সা. মক্কার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পথে সর্বপ্রথম জুলহুলায়ফা নামক স্থানে যাত্রা বিরতি করেন। সাহীহ বর্ণনা মতে, তা মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। আর এ জন্যই তিনি সেখানে কসর আদায় করেন।

    মুখতার ইবন ফিলফিল একবার প্রশ্ন করলেনঃ অসুস্থ ব্যক্তি কিভাবে নামায আদায় করবে? আনাস বললেন: বসে বসে।

    ’আবদুর রহমান ইবন দারদান এবং তাঁর সাথে আরও কিছু লোক মদীনায় আনাসের কাছে আসলেন। আনাস জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কি ’আসরের নামায আদায় করেছ? তাঁরা বললেনঃ হাঁ। তাঁরা পাল্টা প্রশ্ন করলোঃ রাসূল সা. ’আসরের নামায পড়তেন কোন সময়? বললেনঃ সূর্য তখনও উজ্জ্বল ও উপরে থাকতো।

    একবার তিনি একটি জানাযার নামায পড়ালেন। জানাযাটি ছিল পুরুষের। এজন্য মাইয়্যেতের মাথা বরাবর দাঁড়ালেন। একবার এক মহিলার জানাযা আনা হলো। এবার তিনি কোমর সোজা দাঁড়ালেন। ’আল ইবন যিয়াদ ’আদাদীও সেই নামাযে উপস্থিত ছিলেন। তিনি দুইটি জানাযায় দুই রকম দাড়ানোর কারণ জানতে চাইলেন। আনাস বললেনঃ রাসূল সা. এমনটিই করতেন। ‘আলা’ সমবেত লোকদের বললেনঃ ওহে, তোমরা কথাটি মনে রেখ।

    একবার এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলোঃ হযরত ’উমার রা. রুকু’র পরে কুনুত পড়েছিলেন? বললেনঃ হাঁ। রাসূল সা. ও পড়েছিলেন। তবে এটা হযরত আনাসের নিজস্ব মতামত। কারণ, সাহীহ হাদীস দ্বারা একথা প্রমাণিত যে, রাসূল সা. এবং সাধারণভাবে প্রায় সকল সাহাবা ‘বিতর’ নামাযে রুকু’র পূর্বে কুনুত পড়তেন। এই মাসয়ালায় ইমাম শাফে’ঈ হযরত আনাসের অনুসারী। তিনি নিজের মতের স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে একটি হাদীস গ্রহণ করেছেন। হাদীসটি হলো, হযরত ’আলীও রুকু’র পরে কুনুত পড়তেন। কিন্তু হাদীসটি মুনকাতা’ ও দুর্বল সনদ বিশিষ্ট।

    তাছাড়া ইবন মুনজির ‘আল-আশরাফ’ গ্রন্থে লিখেছেন, আনাস এবং অমুক অমুক সাহাবী থেকে বর্ণিত যে সকল হাদীস আমার কাছে পৌঁছেছে, তার প্রত্যেকটিতে রুকু’র পূর্বে কুনুত পড়ার কথা এসেছে। আর এটাই সঠিক। কারণ, সাহীহ মুসলিম গ্রন্থে আনাস থেকে যে সকল রিওয়ায়াত এসেছে তাতে এ্ মিাসয়ালার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ’আসিম হযরত আনাসকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কুনুত রুকু’র পূর্বে না পরে পড়া উচিত? বললেনঃ রুকু’র পূর্বে। ’আসিম বললেনঃ মানুষের তো ধারণা রাসূল সা. রুকু’র পরে পড়তেন। আনাস বললেনঃ সে একটা সাময়িক ঘটনা। কয়েকটি গোত্র মুরতাদ হয়ে যায় এবং বেশ কিছু সাহাবাকে হত্যা করে। এজন্য হযরত রাসূলে কারীম সা. একমাস রুকু’র পরে কুনুত পড়ে তাদের ওপর বদ দু’আ করেছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/১০০, ১১২, ১১৮, ১২৬, ১২৯, ২০৪, ২০৯)

    উল্লেখিত আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পেলাম হযরত আনাস কেমন সঠিক সিদ্ধান্তের অধিকারী ছিলেন। তাঁর ইজতিহাদী মাসয়ালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, তা অন্যান্য সাহাবার ইজতিহাদের সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এজন্য তা সঠিক। (দ্রঃ সীয়ারে আনসার- ১/১৩৭-১৪২)

    হযরত আনাসের চারটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তাঁর চারিত্রিক সৌন্দর্যকে আরও শোভা দান করেছিল, হুব্বে রাসূল, ইত্তেবা-ই-সুন্নাত, আমর বিল মা’রূফ ও হক কথা বলা- এগুলিই হলো সেই বৈশিষ্ঠ্য। হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি তাঁর ভালোবাসার চিত্র তো আমরা তুলে ধরেছি। তিনি যখন মাত্র দশ বছরের এক অবুঝ বালক তখনই রাসূলে সা. প্রতি এত গভীর মুহাব্বত যে, প্রতিদিন প্রত্যুষে রাসূলের সা. দীদার লাভে তাঁর চোখ দুটি ধন্য হতো। সেই সুবহে সাদিকের পূর্বে রাতের অন্ধকারে উম্মু সুলাইমের এই ছেলে শয্যা ত্যাগ করে তাঁর হাবীবের অজুর পানির বন্দোবস্ত করার জন্য মসজিদে নববীর পথ ধরতেন। যৌবনে তাঁর এই ভালোবাসার কোন সীমা ছিল না। রাসূলুল্লাহর সা. একটিমাত্র দৃষ্টি আনাসের জন্য চরম আনন্দ ও প্রশান্তি বয়ে নিয়ে আসতো। রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর যদিও তিনি বাহ্যতঃ তাঁর দীদার থেকে বঞ্চিত হন, তবুও প্রায়ই স্বপ্নে তাঁর দীদার লাভে ধন্য হতেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁদতে কাঁদতে মানুষের কাছে সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতেন। রাসূলুল্লাহর সা. কথা যখন তিনি স্মরণ করতেন তখন বড় অস্থির ও কাতর হয়ে পড়তেন। একদিন রাসূলুল্লাহর সা. চেহারা মুবারক ও দৈহিক গঠনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। তখন শুধু উদাস চাহনিতে রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশার সেই সৌভাগ্যে ভরা দিনগুলির কথা স্মরণ করতে লাগলেন। তিনি যখন রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতের কথা বলতেন, তখন দেখা যেত অকস্মাৎ তাঁর মধ্যে ভাবান্তর ঘটে গেছে। অবলীলাক্রমে মুখ থেকে বেরিয়ে পড়েছেঃ কিয়ামতের দিন আমি যখন রাসূলুল্লাহর সা. সামনে উপস্থিত হবো তখন বলবো, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার সেই নিকৃষ্ট খাদিম আনাস উপস্থিত।

    হযরত আনাসের প্রতিটি মজলিস হযরত রাসূলে কারীমের সা. ঘটনাবলী স্মরণে ভরপুর থাকতো। নবুওয়াতের সময়কালের ঘটনাবলী ছাত্র ও ভক্তদের কাছে বর্ণনা করতেন। এই বর্ণনার মধ্যেই অন্তরে এটা প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করতেন এবং তাতে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। তিনি বাড়ী ফিরে যেতেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. যে সকল জিনিস তাঁর কাছে ছিল তা বের করে বার বার দেখতেন এবং মনকে সান্ত্বনা দিতেন। তাঁর ছাত্রদের সকলের মধ্যে এই রাসূল-প্রেমের প্রভাব পড়েছিল। সাবিত ছিলেন হযরত আনাসের অন্যতম ছাত্র। তিনি একেবারেই উস্তাদের রংগে রংগিত ছিলেন। তিনি উস্তাদের নিকট সব সময় নবুওয়াতী যুগ সম্পর্কে প্রশ্ন করতেন। একদিন প্রশ্ন করলেন, আপনি কি হযরতের পবিত্র হাত স্পর্শ করেছেন? আনাস বললেনঃ হাঁ। অথবা তিনি বললেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. হাত অপেক্ষা অধিকতর কোমল হাত আর কক্ষণও স্পর্শ করিনি। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৪) একথা শুনে সাবিতের অন্তরে প্রেমের আগুন জ্বলে উঠলো। তিনি উস্তাদকে বললেনঃ আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে দিন, একটু চুমু দিই।

    প্রকৃত ভালোবাসার দাবী হলো প্রিয়জনের প্রতিটি জিনিস ও আচরণই পছন্দ করা। হযরত আনাস তা করতেন। তাঁর জীবনের অসংখ্য ঘটনাও একথা প্রমাণ করে। আনাস বলেনঃ একবার এক দর্জি রাসূলকে সা. আহারের দা’ওয়াত দিল। আমিও সাথে গেলাম। যবের রুটি এবং শুকনো গোশত ও লাউ-এর তরকারি উপস্থিত করা হলো। আমি দেখলাম, রাসূল সা. বেছে বেছে লাউ খাচ্ছেন। সেইদিন থেকে আমি লাউ খেতে ভালোবাসি। (হায়াতুস-সাহাবা- ২/১৯০)

    আনাস বলেন, একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহকে সা. জিজ্ঞেস করলোঃ কিয়ামত কখন হবে? তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেনঃ তুমি তার জন্য কি প্রস্তুতি নিয়েছ? লোকটি বললোঃ কিছুই না। তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মুহাব্বত করি। রাসুল সা. বললেনঃ তুমি যাদের ভালোবাস তাদের সাথেই থাকবে। আনাস বলেনঃ সেদিন রাসূলুল্লাহর সা. এ কথায় আমরা দারুণ খুশী হয়েছিলাম। আমি- নবী সা., আবু বকর ও উমারকে ভালোবাসি এবং আশা করি ভালোবাসার বিনিময়ে আমি তাঁদের সাথেই থাকবো। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩১৮)

    কালিমা তাওহীদের পর ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন নামায। হযরত রাসূলে কারীম সা. যে খুশু’- খুদু’ (ভয় ও বিনয়) ও আদবের সাথে নামায আদায় করতেন সাহাবীরাও সেই পদ্ধতি অনুসরণের চেষ্টা করতেন। বহু সাহাবীর নামায তো ছিল প্রায় রাসূলে পাকের সা. নামাযের কাছাকাছি। তবে রাসূলুল্লাহর সা. নামাযের সাথে আনাসের নামাযের সাদৃশ্য ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্য মন্ডিত। একবার তো হযরত আবু হুরাইরা রা. আনাসকে রা. নামায পড়তে দেখে বলেছিলেন, আমি ইবন উম্মে সুলাইমের (আনাস) নামায অপেক্ষা রাসূলুল্লাহর সা. নামাযের সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ আর কারও নামায দেখিনি।

    নামায ছাড়াও রাসূলুল্লাহর সা. প্রতিটি কথা ও কাজ সাহাবায়ে কিরামের সামনে ছিল। হযরত আনাস দশ বছর যাবত রাসূলুল্লাহর সা. সার্বক্ষণিক খাদেম ছিলেন। এই সময় কালে রাসূলুল্লাহর সা. কোন কাজ আনাসের নিকট গোপন থাকতে পারে না। রাসূল সা. যা কিছু বলতেন অথবা ’আমলের মাধ্যমে যা প্রতিষ্ঠিত করতেন তার সবই আনাস স্মৃতিতে ধরে রাখতেন এবং সেই অনুযায়ী ’আমল করতেন। একবার খলিফার আমন্ত্রণে তিনি দিমাশকে গেলেন। ফেরার পথে ‘আইনুত তামার’ নামক স্থানে যাত্রা বিরতির ইচ্ছা করলেন। ছাত্র ও ভক্তদের কাছে সে খবর পৌঁছে গেল। তারা নির্ধারিত দিনে উক্ত স্থানে সমবেত হলো, লোকালয়ের বাইরে একটি বিস্তীর্ণ ময়দানের মধ্য দিয়ে তাঁর উট এগিয়ে আসছিল। তখন ছিল নামাযের সময়। লোকেরা দেখলো, তিনি উটের পিঠে নামাযরত; কিন্তু উটটি কিবলামুখী নয়। ছাত্ররা বিস্ময়ের সুরে প্রশ্ন করলেনঃ আপনি এ কেমনভাবে নামায আদায় করছিলেন? হযরত আনাস বললেনঃ আমি যদি রাসূলুল্লাহকে সা. এভাবে নামায আদায় করতে না দেখতাম, কক্ষণও আদায় করতাম না।

    একবার ইবরাহীম ইবন রাবীয়া’ হযরত আনাসের নিকট আসলেন। হযরত আনাস একখানা কাপড়ের একপাশ পরে অন্য পাশ গায়ে জড়িয়ে নামাযে মশগুল ছিলেন। নামায শেষ হলে ইবরাহীম জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি এভাবে এক কাপড়ে নামায পড়েন? আনাস বললেনঃ হাঁ, আমি এভাবে রাসুলকে সা. নামায পড়তে দেখেছিলাম। উল্লেখ্য যে, হযরত রাসূলে কারীম সা. জীবেনের সর্বশেষ নামায- যে নামায হযরত আবু বকরের রা. পিছনে পড়েছিলেন, তা এক কাপড়েই ছিল। (মুসনাদ- ৩/১৫৯)

    হযরত রাসূলে কারীমের সা. পবিত্র জীবনের প্রতিটি আচরণ ও পদক্ষেপ ছিল হযরত আনাসের জীবন পথের দিশারী। ফরজ ছাড়াও ওয়াজিব ও সুন্নাত সমূহেও রাসূলুল্লাহ সা. ছিলেন তাঁর আদর্শ। তিনি ছোট-বড় সকলকে সালাম করতেন। সব সময় অজু অবস্থায় থাকতেন। তিনি বলতেন, আমাকে রাসুল সা. বলেছেনঃ আনাস, তুমি যখন ঘর থেকে বের হবে, তারপর যার সাথে দেখা হবে, সকলকে সালাম করবে। এতে তোমার নেকী বা মুহাব্বত বৃদ্ধি পাবে। আর সম্ভব হলে সব সময় অজু অবস্থায় থাকবে। কারণ, তুমি জান না তোমার মৃত্যু কখন আসবে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৬৪)

    প্রত্যেক সচ্ছল ব্যক্তির জন্য কুরবানী প্রয়োজন। হযরত আনাস ছিলেন একজন বিত্তশালী রয়িস বা নেতা। যতগুলি জানোয়ার ইচ্ছা, কুরবানী করতে পারতেন। কিন্তু ‘খায়রুল কুরূন’- সর্বোত্তম যুগের লোকদের নিকট নাম-কামের চেয়ে রাসূলের সা. পায়রুবী ও অনুসরণ ছিল সব কিছুর উর্দ্ধে। সে যুগের লোকেরা খ্যাতির জন্য; বরং সাওয়াবের জন্যই কুরবানী করতেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. দুইটি পশু কুরবানী করতেন, এই জন্য হযরত আনাসও দুইটিই করতেন।

    উমাইয়্যা শাসন আমলে হযরত ’উমার ইবন ’আবদিল ’আযীয র. যুবরাজ থাকাকালে একবার মদীনার গভর্ণর ছিলেন। যেহেতু শাহী খান্দানের সদস্য ছিলেন, এ কারণে জাতীয় জীবনের অনেক কিছুই তাঁর জানা ছিল না। সে যুগের প্রচলন অনুযায়ী নিজেই নামাযের ইমামতি করতেন এবং মাঝে মধ্যে কিছু ভুল-ত্রুটিও হয়ে যেত। হযরত আনাস প্রায়ই তাঁর ভুল ধরিয়ে দিতেন। তিনি একবার হযরত আনাসকে বললেন, আপনি এভাবে আমার বিরোধীতা করেন কেন? হযরত আনাস বললেন: আমি যেভাবে রাসূলুল্লাহকে সা. নামায পড়তে দেখেছি আপনি যদি সেইভাবে নামায পড়ান তাহলে আমি সন্তুষ্ট হবো। অন্যথায় আপনার পিছনে নামায আদায় করবো না। হযরত ’উমার ইবন ’আবদিল ’আযীয ছিলেন বুদ্ধিমান ও সৎ স্বভাব- বিশিষ্ট ব্যক্তি। হযরত আনাসের কথায় তিনি প্রভাবিত হলেন। তিনি আনাসকে উস্তাদ হিসেবে গ্রহণ করলেন। কিছুদিন তাঁর সাহচর্য ও শিক্ষার প্রভাবে তিনি এমন সুন্দর নামায পড়াতে লাগলেন যে, খোদ আনাসই বলতে লাগলেন, এই ছেলের নামাযের চেয়ে আর কারও নামায রাসূলুল্লাহর সা. নামাযের সাথে অধিকতর সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৩৩, ১৩৪)

    একবার খলীফা ’আবদুল মালিক হযরত আনাসসহ আরও চল্লিশজন আনসারী ব্যক্তিকে দিমাশ্কে ডেকে পাঠান। সেখান থেকে ফেরার পথে ‘ফাজ্জুন নাকাহ’ নামক স্থানে পৌঁছলে আসর নামাযের সময় হয়ে যায়। যেহেতু সফর তখনও শেষ হয়নি, এই কারণে হযরত আনাস দুই রাকা’য়াত নামায পড়ান (কসর করেন)। তবে কিছু লোক আরও দুই রাকা’য়াত পড়ে চার রাকা’য়াত পুরো করেন। একথা হযরত আনাস জানতে পেরে দারুণ ক্ষুব্ধ হন এবং বলেন, আল্লাহ যখন কসরের অনুমতি দিয়েছেন তখন এ সুবিধা গ্রহণ করবে না কেন? আমি রাসূলকে সা. বলতে শুনেছি, এমন একটি সময় আসবে যখন মানুষ দ্বীনের ব্যাপারে অহেতুক বাড়াবাড়ি করবে। আসলে তারা দ্বীনের প্রকৃত রহস্য সম্পর্কে থাকবে গাফিল।

    সত্যকথা বলা এবং সত্যকে পছন্দ করা ছিল হযরত আনাসের চরিত্রের এক উজ্জ্বল বৈশিষ্ট্য। খিলাফতে রাশেদার প্রথম দুই খলীফার পর এমন অনেক যুবক সরকারের উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয় যারা ইসলামী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল। এজন্য তাদের অনেক কাজই কুরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী হতো। যে সাহাবায়ে কিরাম জীবনের বিনিময়ে ইসলাম খরীদ করেছিলেন তাঁরা এটা সহ্য করতে পারতেন না। তাঁরা ভয়-ভীতির উর্ধ্বে উঠে সব সময় সত্য কথাটি স্পষ্টভাবে বলে দিতেন। হযরত আনাস রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর দীর্ঘ দিন জীবিত ছিলেন। তাঁর দীর্ঘ জীবনে বহু স্বৈরাচারী শাসকের সাক্ষাৎ লাভ করেছেন যারা প্রকাশ্যে শরীয়াতের প্রতি অবহেলা করতো। হযরত আনাস এ অবস্থায় চুপ থাকেননি। তিনি প্রকাশ্যে জনসমাবেশে তাদের সতর্ক করে দিতেন।

    ইয়াযীদের সময়ে আবদুল্লাহ ইবন যিয়াদ ছিলেন ইরাকের গভর্ণর। তাঁর নির্দেশে হযরত ইমাম হুসাইনের পবিত্র মাথা সামনে আনা হলে তিনি হাতের ছড়িটি দিয়ে হযরত হুসাইনের চোখে টোকা দিয়ে তাঁর সৌন্দর্য সম্পর্কে কিছু অশালীন কটাক্ষ করেন। হযরত আনাস নিজেকে আর সম্বরণ করতে পারলেন না। ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে বললেন: এই চেহারা রাসূলুল্লাহর সা. চেহারার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

    উমাইয়্যা রাজবংশের বিখ্যাত স্বৈরাচারী গভর্ণর হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ আস-সাকাফী নিজের ছেলেকে বসরার কাজী নিয়োগ করতে চায়। হাদীস শরীফে বিচারক অথবা আমীরের পদের আকাঙক্ষা হবার নিষেধাজ্ঞা এসেছে। তাই হযরত আনাস হাজ্জাজের এই ইচ্ছার কথা জানতে পেরে বলেনঃ এমনটি করতে রাসূল সা. নিষেধ করেছেন।

    উমাইয়্যা শাসকদের আর এক আমীর হাকাম ইবন আইউব। তাঁর নৃশংসতা মানুষের সীমা অতিক্রম করে জীব-জন্তু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। একবার হযরত আনাস তাঁর বাড়ীতে গিয়ে দেখেন, মুরগীর পায়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে তীরের নিশানা বানানো হচ্ছে। তীর লাগলে মুরগীটি ছটফট করছে। হযরত আনাস এ দৃশ্য দেখে খুবই মর্মাহত হলেন এবং মানুষকে তাদের এ কাজের জন্য ধিক্কার দিলেন। (সাহীহ মুসলিম- ২/১৫৮)

    একবার কিছু লোক জুহরের নামায আদায় করে হযরত আনাসের সাক্ষাতের জন্য আসে। তিনি তখন চাকরের নিকট অজুর পানি চাইলেন। লোকেরা জানতে চাইলো, এ কোন নামাযের প্রস্তুতি? বললেনঃ ’আসর নামাযের। এক ব্যক্তি বললোঃ আমরা তো এখনই ‘জুহর’ পড়ে এলাম। হযরত আনাস আমীর উমরাহের দ্বীনের প্রতি উদাসীনতা এবং জনগণের দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা দেখে দারুণ ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি বললেনঃ এ তো হবে মুনাফিকদের নামায। মানুষ বেকার বসে থাকবে, তবুও নামাযের জন্য উঠবে না। যখন সূর্য অস্ত যেতে থাকবে তখন খুব তাড়াতাড়ি মোরগের মত চারটি ঠোকর মেরে দেবে। সেই ঠোকরে আল্লাহর স্মরণ থাকবে অতি অল্পই।

    প্রকৃত দ্বীনদারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘আমর বিল মা’রূফ’- সৎ কাজের আদেশ দান করা। আর এজন্যই কুরআন মজীদে উম্মাতে মুসলিমাকে সর্বোত্তম উম্মাত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। হযরত আনাসের মধ্যে এই গুণটির বিশেষ বিকাশ ঘটেছিল। একবার ’উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের একটি মজলিসে হাউজে কাওসার প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। উবাইদুল্লাহ এর বাস্তবতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেন। একথা হযরত আনাসের কানে গেল। তিনি সরাসরি উবাইদুল্লাহর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেনঃ তোমার এখানে কি ‘হাউজে কাওসার’ প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা হয়েছিল? বললেনঃ হাঁ। কেন, রাসূল সা. কি এ সম্পর্কে কিছু বলেছেন? হযরত আনাস রা. হাউজে কাওসার সম্পর্কে রাসূলের সা. হাদীস তাঁকে শুনিয়ে ফিরে আসেন।

    হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইর রা. একজন আনসারী ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের রিপোর্ট পেলেন। এই অপরাধের জন্য তিনি লোকটিকে পাকড়াও করার চিন্তা করলেন। লোকেরা হযরত আনাসকে কথাটি জানালেন। তিনি সোজা মুস’য়াবের কাছে গিয়ে বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সা. আনসারদের প্রতি ভালো ব্যবহার করার জন্য আমীরদের অসীয়াত করেছেন। তাদের ভালো লোকদের সাথে উত্তম আচরণ এবং খারাপ লোকদের ক্ষমা করতে বলেছেন। এই হাদীস শুনা মাত্র মুস’য়াব ইবন ’উমাইর রা. খাট থেকে নীচে নেমে এসে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. আদেশের স্থান আমার চোখের ওপর। আমি লোকটিকে ছেড়ে দিচ্ছি।
    সাবিত আন-নাবানী বলেনঃ একদিন আমি বসরার ‘যাবিয়া’ নামক স্থানে আনাসের সঙ্গে চলছিলাম। এমন সময় আজান শোনা গেল। সাথে সাথে আনাস মন্থর গতিতে চলতে শুরু করলেন এবং এভাবে আমরা মসজিদে প্রবেশ করলাম। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ

    তুমি কি বলতে পার কেন আমি এভাবে হেঁটে মসজিদে এলাম? তারপর নিজেই বললেনঃ নামাযের জন্য আমার পদক্ষেপ যাতে বেশী হয়, সেই জন্য। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১০৪)

    হযরত আনাস ’ইলম হাসিলের চেয়ে অর্জিত ’ইলম অনুযায়ী ’আমলের ওপর বেশী জোর দিতেন। তিনি বলতেনঃ যত ইচ্ছা ’ইলম বা জ্ঞান হাসিল কর। তবে আল্লাহর কসম, ’আমল না করলে সে সব ’ইলমের প্রতিদান দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলতেনঃ প্রকৃত ’আলেমের কাজ বুঝাও সেই অনুযায়ী কাজ করা। আর মূর্খদের কাজ শুধু বর্ণনা করা। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৪১, ২৪৪)

    তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সুন্নাতের প্রতি অপরিসীম গুরুত্ব দিতেন। এ সম্পর্কে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা. বলেছেনঃ যে আমার সুন্নাত ছেড়ে দেবে সে আমার উম্মাতের কেউ নয়। তিনি আরও বলেছেনঃ যে আমার সুন্নাত অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৫)

    হযরত আনাস রা. রাসূলুল্লাহর সা. ব্যবহৃত বেশ কিছু জিনিস স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করেছিলেন, যেমনঃ জুতো, একটি চাদর, একটি পিয়ালা, তাঁবুর কয়েকটি খুঁটি ইত্যাদি। আনাস বলতেনঃ আমার মা উম্মু সুলাইম মৃত্যুকালে আমার জন্য রেখে যান রাসূলুল্লাহর সা. একটি চাদর, একটি পিয়ালা যাতে তিনি পানি পান করতেন, তাঁবুর কয়েকটি খুঁটি এবং একটি শীলা যা ওপর আমার মা রাসূলুল্লাহর সা. ঘাম মিশিয়ে সুগন্ধি পিষতেন। (তারিখে ইবন আসাকির- ৩/১৪৪, ১৪৫)

    এভাবে হযরত আনাস ইবন মালিক রা. সম্পর্কে টুকরো টুকরো তথ্য হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থ সমূহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে যা খুবই চমকপ্রদ এবং মুসলিম সমাজের জন্য কল্যাণকরও বটে।

  • উবাই ইবন কা’ব আল-আনসারী (রা)

    উবাই ইবন কা’ব আল-আনসারী (রা)

    নাম উবাই, ডাকনাম আবূল মুনজির ও আবুত তুফাইল। (আল-আ’লাম- ১/৭৮; আল-ইসাবা- ১/১৯) সায়্যিদুল কুররা, সায়্যিদুল আনসার প্রভৃতি তাঁর লকব বা উপাধি। মদীনার খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। পিতার নাম কা’ব ইবন কাইস, মাতার নাম সুহাইলা। তিনি বনী ’আদী ইবন নাজ্জারের কন্যা এবং প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবূ তালহা আল-আনসারীর ফুফু। সুতরাং উবাই, আবূ তালহার ফুফাতো ভাই। উবাইর আবুল মুনজির কুনিয়াতটি খোদ রাসূল সা. দান করেন এবং দ্বিতীয় কুনিয়াতটি হযরত ’উমার রা. তাঁর ছেলে তুফাইলের নাম অনুসারে আবুত তুফাইল রাখেন। তাঁর জন্মের সঠিক সন-তারিখ জানা যায় না। হযরত উবাইয়ের প্রথম জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে হযরত আনাস ইবন মালিকের বর্ণনায় এতটুকু জানা যায় যে, ইসলাম-পূর্ব জীবনে তিনি মদ পানে আসক্ত ছিলেন। হযরত আবু তালহার মদ পানের আড্ডার তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাঁকে মদীনার অন্যতম ইয়াহুদী ধর্মগুরু বলে গণ্য করা হতো। প্রাচীন আসমানী কিতাব সমূহেও তাঁর জ্ঞান ছিল সে যুগে লেখা-পড়ার তেমন প্রচলন ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি লিখতে পড়তে জানতেন। এ কারণে ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহর সা. সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন এবং কুরআনের অন্যতম লেখকে পরিণত হন। (আল-আ’লাম- ১/৭৮) মদীনায় ইয়াহুদীদের যথেষ্ট ধর্মীয় প্রভাব ছিল। ইসলাম-পূর্ব জীবনে তিনি তাওরাতসহ অন্যান্য যে সকল ধর্মীয় গ্রন্থ পড়েছিলেন, মূলতঃ সেই জ্ঞানই তাঁকে ইসলামের দিকে টেনে আনে। যে সকল মদীনাবাসী মক্কায় গিয়ে সর্বশেষ আকাবায় রাসূলুল্লাহর সা. হাতে বাই’য়াত করেন তিনিও তাঁদের একজন। আর এখান থেকেই তাঁর ইসলামী জীবনের সূচনা। (আল-ইসাবা- ১/১৯) হিজরাতের পর হযরত রাসূলে কারীম সা. ’আশারা মুবাশ্শারার অন্যতম সদস্য হযরত সা’ঈদ ইবন যায়িদের সাথে উবাইয়ের মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৫০৫) বালাজুরীর মতে, তালহা ইবন ’উবাইদুল্লাহর সাথে তাঁর ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৭১) রাসূল সা. মদীনায় আগমনের পর হযরত আবু আইউব আল-আনসারীর বাড়ীতে অতিথি হন। তবে একটি বর্ণনা মতে, তাঁর বাহন উটনীটি উবাই ইবন কা’বের বাড়ীতে থঅকে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৬৭) হযরত উবাই বদর থেকে নিয়ে তায়িফ অভিযান পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে যোগদান করেন। (আল-ইসাবা- ১/১৯, আল-আ’লাম- ১/৭৮) কুরাইশরা বদরে পরাজিত হয়ে মক্কায় ফিরে প্রতিশোধ নেওয়ার তোড়জোড় শুরু করে দেয়। উহুদ যুদ্ধের প্রাক্কালে মক্কায় অবস্থানকারী রাসূলুল্লাহর সা. চাচা হযরত ’আব্বাস ইবন ’আবদুল মুত্তালিব গোপনে বনী গিফার গোত্রের এক লোকের মাধ্যমে একটি পত্র রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠান। সেই পত্রে তিনি কুরাইশদের সকল গতিবিধি রাসূলকে সা. অবহিত করেন। লোকটি মদীনার উপকণ্ঠে কুবায় পত্রখানি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট হস্তান্তর করেন। রাসূলসা. পত্রখানা সেখানে উবাই ইবন কা’বের দ্বারা পাঠ করিয়ে শোনেন এবং পত্রের বিষয় গোপন রাখার নির্দেশ দেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩১৪) এই উহুদ যুদ্ধে শত্রু পক্ষের নিক্ষিপ্ত তীরের আঘাতে তিনি আহত হন। হযরত রাসূল সা. তাঁর চিকিৎসার জন্য একজন চিকিৎসক পাঠান। চিকিৎসক তাঁর রগ কেটে সেই স্থানে সেঁক দেয়। উহুদ যুদ্ধের শেষে হযরত রাসূলে কারীম সা. আহত-নিহতদের খোঁজ-খবর নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেনঃ তোমাদের কেউ একজন সা’দ ইবন রাবী’র খোঁজ নাও তো। একজন আনসারী সাহাবী তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় শহীদদের লাশের স্তূপ থেকে খুঁজে বের করেন। কোন কোন বর্ণনা মতে এই আনসারী সাহাবী হলেন উবাই ইবন কা’ব। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৯৫) খন্দক যুদ্ধের প্রক্কালে মক্কার কুরাইশ নেতা আবূ সুফইয়ান, আবূ উসামা আল-জাশামীর মারফত একটি চিঠি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠান। সেই চিঠিও রাসূল সা. উবাইয়ের দ্বারা পাঠ করান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৭০) তেমনিভাবে হিজরী ২য় সনের রজব মাসে রাসূল সা. ’আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ আল-আসাদীর নেতৃত্বে একটি বাহিনী নাখলা অভিমুখে পাঠান। যাত্রাকালে তিনি ’আবদুল্লাহর হাতে একটি সীলকৃত চিঠি দিয়ে বলেনঃ ‘দুই রাত একাধারে চলার পর চিঠিটি খুলে পাঠ করবে এবং এর নির্দেশ মত কাজ করবে।’ রাসূল সা. এই চিঠিটি উবাইয়ের দ্বারা লেখান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৭১) হিজরী ৯ম সনে যাকাত ফরজ হলে রাসূল সা. আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে যাকাত আদায়কারী নিয়োগ করেন। তিনি উবাইকে বালী, ’আজরা এব্ং বনী সা’দ গোত্রে যাকাত আদায়কারী হিসেবে পাঠান। তিনি অত্যন্ত দ্বীনদারী ও সততার সাথে এই দায়িত্ব পালন করেন। একবার এক জনবসতিতে গেলেন যাকাত আদায় করতে। নিয়ম অনুযায়ী এক ব্যক্তি তার সকল গবাদিপশু উবাইয়ের সামনে হাজির করে যাতে তিনি যেটা ইচ্ছা গ্রহণ করতে পারেন। উবাই উটের পাল থেকে দুই বছরের একটি বাচ্চা গ্রহণ করেন। যাকাত দানকারী বললেনঃ এতটুকু বাচ্চা নিয়ে কি হবে? এতো দুধও দেয় না, আরোহণেরও উপযোগী নয়। আপনি যদি নিতে চান এই মোটা তাজা উটনীটি নিন। উবাই বললেনঃ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। রাসূলুল্লাহর সা. নির্দেশের বিপরীত আমি কিছুই করতে পারি না। মদীনা তো এখান থেকে খুব বেশি দূর না, তুমি আমার সাথে চলো, বিষয়টি আমরা রাসূলকে সা. জানাই। তিনি যা বলবেন, আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করবো। লোকটি রাজী হলো। সে তার উটনী নিয়ে উবাইয়ের সাথে মদীনায় উপস্থিত হলো। তাদের কথা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ এই যদি তোমার ইচ্ছা হয় তাহলে উটনী দাও, গ্রহণ করা হবে। আল্লাহ তোমাকে এই প্রতিদান দিবেন। লোকটি সন্তুষ্টচিত্তে উটনীটি দান করে বাড়ী ফিরে গেল। (মুসনাদ- ৫/১৪২, কানযুল ’উম্মাল- ৩/৩০৯, হায়াতুস সাহাবা- ১/১৫১) হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের পর হযরত আবু বকর রা. খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় পবিত্র কুরআনের সংগ্রহ ও সংকলনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু হয়। সাহাবা-ই-কিরামের যে দলটির ওপর এই দায়িত্ব অর্পিত হয়, উবাই ছিলেন তাঁদের নেতা। তিনি কুরআনের শব্দাবলী উচ্চারণ করতে, আর অন্যরা লিখতেন। এই দলীটর সকলেই ছিলেন উঁচু স্তরের ’আলিম। এই কারণে মাঝে মধ্যে কোন কোন আয়াত সম্পর্কে তাঁদের মধ্যে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হতো। যখন সূরা আত-তাওবার ১২৭ নং আয়াতটি লেখা হয় তখন দলের অন্য সদস্যরা বললেন, এই আয়াতটি সর্বশেষ নাযিল হয়েছে। হযরত উবাই বললেনঃ না। রাসূল সা. এর পরে আরও দু’টি আয়াত আমাকে শিখিয়েছিলেন। সূরা আল-তাওবার ১২৮ নং আয়াতটি সর্বশেষ নাযিল হয়েছে। (মুসনাদ- ৫/১৩৪) হযরত আবু বকরের রা. ইনতিকালের পর হযরত ’উমার রা. তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি তাঁর খিলাফতকালে অসংখ্য জনকল্যাণ ও সংস্কারমূলক কাজের প্রবর্তন করেন। মজলিসে শূরা তার মধ্যে একটি। বিশিষ্ট মুহাজির ও আনসার ব্যক্তিবৃন্দের সমন্বয়ে এাই মজলিস গঠিত হয়। খাযরাজ গোত্রের প্রতিনিধি হিসেবে উবাই এই মজলিসের সদস্য ছিলেন। (কানযুল উম্মাল- ৩/১৩) হযরত ’উমারের খিলাফতকালের গোটা সময়টা তিনি মদীনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করে কাটান। বেশীর ভাগ সময় অধ্যয়ন ও শিক্ষাদানে ব্যয় করেন। যখন মজলিসে শূরার অধিবেশন বসতো বা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থিত হতো খলীফা ’উমার রা. তাঁর যুক্তি ও পরামর্শ গ্রহণ করতেন। হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালের পুরো সময়টা তিনি ‘ইফতার’ পদে আসীন ছিলেন। এছাড়া অন্য কোন পদ তিনি লাভ করেননি। একবার ’উমারকে রা. জিজ্ঞেস করলেন, আপনি আমাকে কোন এক স্থানের ওয়ালী (শাসক) নিযুক্ত করেন না কেন? ’উমার রা. বললেনঃ আমি আপনার দ্বীনকে দুনিয়ার দ্বারা কলুষিত হতে দেখতে চাই না। (কানযুল ’উম্মাল- ৩/১২৩) হযরত ’উমার রা. যখন তারাবীহর নামায জামা’য়াতের সাথে আদায়ের প্রচলন করেন তখন উবাইকে ইমাম মনোনীত করেন। (বুখারীঃ কিতাবু সালাতিত তারাবীহ) ’উমার যেমন তাঁকে সম্মান করতেন তেমনি ভয়ও করতেন। তাঁর কাছে ফাতওয়া চাইতেন। খলীফা ’উমারের রা. বাইতুল মাকদাস সফরে উবাই তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। খলীফার ঐতিহাসিক জাবিয়া ভাষণের সময় উপস্থিত ছিলেন। বাইতুল মাকদাসের অধিবাসীদের সাথে হযরত ’উমার রা. যে সন্ধি চুক্তি সম্পাদন করেন তার লেখন ছিলেন হযরত উবাই। (আল-আ’লাম- ১/৭৮; সিফাতুল সাফওয়া- ১/১৮৮) ’উমারের পর হযরত ’উসমানের রা. সময় খিলাফতের বিভিন্ন অঞ্চলে কুরআন মজীদের তিলাওয়াত ও উচ্চারণে বিভিন্নতা ছড়িয়ে পড়ে। খলীফা ’উসমান রা. শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তিনি এই বিভিন্নতা দূর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তিনি শ্রেষ্ঠ ক্বারীদের ডেকে পৃথকভাবে তাঁদের তিলাওয়াত শুনলেন। ’উবাই ইবন কা’ব, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস এবং মু’য়াজ ইবন জাবাল- প্রত্যেকেরই উচ্চারণে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, সকল মুসলমানকে একই উচ্চারণের কুরআনের ওপর ঐক্যবদ্ধ করতে চাই। সেই সময় কুরাইশ ও আনসারদের মধ্যে ১২ ব্যক্তি সম্পূর্ণ কুরআনে দক্ষ ছিলেন। খলীফা ’উসমান এই ১২ জনের ওপর এই গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেন। আর এই পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব দান করেন উবাই উবন কা’বকে। তিনি শব্দাবলী উচ্চারণ করতেন, যায়িদ ইবন সাবিত লিখতেন। আজ পৃথিবীতে যে কুরআন বিদ্যমান তা মূলতঃ হযরত উবাইয়ের পাঠের অনুলিপি। (কানযুল উম্মাল- ১/২৮২, ২৮৩) হযরত উবাইয়ের মৃত্যু সন নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হযরত ’উসমানের রা. খিলাফতকালে হিজরী ৩৯ সনের এক জুম’আর দিনে তিনি ইনতিকাল করেন। হযরত ’উসমান তাঁর জানাযার নামায পড়ান এবং মদীনায় দাফন করা হয়। হাইসাম ইবন ’আদী ও অন্যদের মতে তিনি হিজরী ১৯ সনে মদীনায় মারা যান। আর ওয়াকিদী, মুহাম্মদ ইবন ’আবদুল্লাহ প্রমুখের মতে তাঁর মৃত্যু হয় হিজরী ২২ সনে। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৭; শাজারাতুজ জাহাব- ১/৩১) তবে বিভিন্ন বর্ণনা মাধ্যমে খলীফা ’উসমানের খিলফতকালে বিভিন্ন কর্মকান্ডে তাঁর শরীক হওয়ার কথা জানা যায়। অতএব হিজরী ৩৯ সনে তাঁর মৃত্যুর মতটি সঠিক বলে মনে হয়। হযরত সন্তানদের সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। তবে যে সকল সন্তানদের নাম জানা যায় তারা হলেনঃ ১. তুফাইল, ২. মুহাম্মাদ, ৩. রাবী’, ৪. উম্মু ’উমার। প্রথমোক্ত দুইজন হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবদ্দশায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্ত্রীর ডাকনাম উম্মু তুফাইল। তিনি সাহাবিয়্যা ছিলেন। হাদীস বর্ণনা কারী মহিলা সাহাবীদের নামের তালিকায় তাঁর নামটিও দেখা যায়। হযরত উবাইয়ের দৈহিক গঠন ছিল মধ্যম আকৃতির হালকা পাতলা ধরণের। গায়ের রং ছিল উজ্জ্বল গৌর বর্ণের বার্ধ্বক্যে মাথার চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু খিযাব লাগাতেন না। (আল-ইসাবা- ১/১৯; আল-আ’লাম- ১/৭৮; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৭) স্বভাব ছিল একটু সৌখিন প্রকৃতির। বাড়ীতে গদীর ওপর বসতেন। ঘরের দেওয়ালে আয়না লাগিয়েছিলেন এবং সেইদিকে মুখ করে নিয়মিত চিরুনী করতেন। একটু রুক্ষ প্রকৃতির ছিলেন। সাধারণঃ স্বভাববিরোধী কোন কথা শুনলেই রেগে যেতেন। হযরত ’উমারের স্বভাবও ছিল একই রকম। এই কারণে মাঝে মাঝে তাদের দুইজনের মধ্যে ঝগড়াহয়ে যেত। বিভিন্ন বর্ণনায় এমন বহু ঝগড়ার কথা জানা যায়। একবার হযরত উবাই একব্যক্তিকে একটি আয়াত শেখালেন। হযরত ’উমার রা. লেকটির মুখে আয়াতটির পাঠ শুনে জিজ্ঞেস করেন, তুমি এ পাঠ কার কাছে শিখেছ? লোকটি উবাইয়ের নাম বললো। হযরত ’উমার লোকটিকে সংগে করে উবাইয়ের বাড়ীতে উপস্থিত হন এবং আয়াতটি সম্পর্কে জানতে চান। ’উবাই বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে এভাবেই শিখেছি। হযরত ’উমার আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শিখেছেন? উবাই বললেনঃ হাঁ। হযরত ’উমার রা. প্রশ্নটির পুনরাবৃত্তির করেন। এবার উবাই ক্ষেপে যান। তিনি বলেনঃ আল্লাহর কসম! আল্লাহ তা’য়ালা এই আয়াতটি জিবরীলের আ. মাধ্যমে মুহাম্মাদের সা. অন্তকরণে নাযিল করেন। এই ব্যাপারে খাত্তাব ও তাঁর ছেলের সাথে পরামর্শ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। এ কথা শুনে হযরত ’উমার রা. কানে হাত দিয়ে তাকবীর পড়তে পড়তে তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে যান। (কানযুল ’উম্মাল- ১/২৮৭) হযরত হাসান থেকে বর্ণিত! উবাই ইবন কা’বের একটি আয়াতের তিলাওয়াতের সাথে ’উমার ইবন খাত্তাব দ্বিমত পোষণ করলেন। উবাই তাঁকে বললেনঃ আপনি যখন বাকী’র বাজারে কেনা-বেচা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন আমি তখন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে আয়াতটি শুনেছি। ’উমার বললেনঃ সত্যি কথা বলেছেন। কে সত্য বলে আমি শুধু তাই পরীক্ষা করতে চেয়েছি। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছেঃ উবাই সূরা আল-মায়িদার ১০৭ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করলে ’উমার বললেনঃ মিথ্যা বলছেন। উবাই বললেনঃ আপনি অধিকতর মিথ্যাবাদী। এক ব্যক্তি বললোঃ আপনি আমীরুল মুমিনীনকে মিথ্যাবাদী বললেন? উবাই বললেনঃ আমি আমীরুল মুমিনীনকে তোমার থেকে বেশী সম্মান করি; কিন্তু তাঁকে আমি কিতাবুল্লাহর তাসদীক বা প্রত্যায়নের ব্যাপারে মিথ্যাবাদী বলেছি। অর্থাৎ কিতাবুল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস প্রকাশের ব্যাপারে আমি তাঁকে সত্যবাদী বলে স্বীকার করিনি। (কানযুল ’উম্মাল ১/২৮৫; হায়াতুস সাহাবা- ১/৭৪) হযরত আবূ দারদা রা. একবার শামের অধিবাসীদের বিরাট একটি দলকে কুরআন শিখানোর জন্য মদীনায় নিয়ে আসেন। তারা হযরত উবাইয়ের নিকট কুরআন শিখেন। একদিন তাদেরই একজন হযরত ’উমারের সামনে কুরআন পাঠ করেন। ’উমার তার ভুল ধরেন। লোকটি বলে, আমাকে তো উবাই এভাবে শিখিয়েছেন। ’উমার তার সংগে একজন লোক দিয়ে বলেনঃ যাও, উবাইকে ডেকে নিয়ে এসো। তারা উবাইয়ের বাড়ীতে গিয়ে দেখেন তিনি উটকে খাবার দিচ্ছেন। তারা বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন আপনাকে ডেকেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কী কাজে? তারা ঘটনাটি খুলে বললো। তিনি তাদের ওপর ভীষণ ক্ষেপে গিয়ে বললেনঃ তোমরা কি ক্ষ্যান্ত দিবে না? রাগের চোটে সেই উটের খাবার হাতে নিয়েই ’উমারের কাছে ছুটে যান। উমার তাঁর ও যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট থেকে আয়াতটি শোনেন। দুইজনের পাঠে কিছু তারতম্য ছিল। হযরত ’উমার যায়িদের পাঠ সমর্থন করেন। এতে উবাই ক্ষেপে গিয়ে বলেনঃ আল্লাহর কসম! ’উমার! আপনার ভালো জানা আছে, আমি যখন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট অন্দরে থাকতাম আর আপনার তখন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আজ আমার সাথে এমন আচরণ করছেন। আল্লাহর কসম! আপনি যদি বলেন, আমি ঘরেই বসে থাকবো। আমরণ কারও সাথে কথা বলবো না, কাউকে কুরআনও শিখাবো না। ’উমার বললেনঃ না, এমন করবেন না। আল্লাহ আপনাকে যে ইলম দান করেছেন, আপনি অতি আগ্রহের সাথে তা শিখাতে থাকুন। (কানযুল ’উম্মাল- ১/২৮৫) স্বভাবগতভাবেই হযরত উবাই ছিলেন একটু স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন। একবার হযরত ইবন আব্বাস রা. মদীনার একটি গলি দিয়ে কুরআনের একটি তিলাওয়াত করতে করতে যাচ্ছেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, পিছন থেকে কেউ যেন তাঁকে ডাকছে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখেন, ’উমার। কাছে এসে ইবন ’আব্বাসকে বললেনঃ তুমি আমার দাসকে সংগে নিয়ে উবাই ইবন কা’বের নিকট যাবে এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করবে যে, তিনি কি অমুক আয়াতটি এভাবে পড়েছেন? ইবন আব্বাস উবাইয়ের গৃহে পৌঁছলেন এবং পরপরই ’উমারও সেখানে হাজির হলেন। অনুমতি নিয়ে তাঁরা ভিতরে প্রবেশ করলেন। উবাই তখন দেওয়ালের দিকে মুখ করে মাথার চুল ঠিক করছিলেন। ’উমারকে গদীর ওপর বসানো হলো। উবাইয়ের পিছ ছিল ’উমারের দিকে এবং সেই অবস্থায়ই বসে থাকলেন, পিছনে তাকালেন না। কিছুক্ষণ পর বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন, স্বাগত! আমার সংগে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে না অন্য কোন প্রয়োজন এসেছেন? ’উমার বললেনঃ একটি কাজে এসেছি। অতঃপর একটি আয়াত তিলাওয়াত করে বলেন- এর উচ্চারণ তো খুব কঠিন। উবাই বললেনঃ আমি কুরআন তাঁর নিকট থেকেই শিখেছি, যিনি জিবরীলের নিকট থেকে শিখেছিলেন। এ তো খুব সহজ ও কোমল। ’উমার বললেনঃ আমি সন্তুষ্ট হতে পারলাম না। হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে একবার একটি বাগিচা নিয়ে খলীফা ও উবাইয়ের মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি হলো। উবাই কাঁদতে কাঁদতে অভিযোগ করলেন, আপনার খিলাফতকালে এমন কর্ম? ’উমার বললেনঃ আমি তো এমনটি চাইনি। মুসলমানদের মধ্যে যার কাছে ইচ্ছা, আপনি বিচার চাইতে পারেন। তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। উবাই বিচারক মানলেন যায়িদ ইবন সাবিতকে রা.। ’উমার রাজী হলেন। হযরত যায়িদের এজলাসে মুকাদ্দামার শুনানীর দিন ধার্য হলো। নির্ধারিত দিনে খলীফাতুল মুসলিমীন এজলাসে হাজির হলেন। তিনি উবাইয়ের দাবী অস্বীকার করলেন এবং উবাইকে লক্ষ্য করে বললেনঃ আপনি ভুলে গেছেন, একটু চিন্তা করে মনে করার চেষ্টা করুন। উবাই বললেনঃ এখন আমার কিছুই স্মরণের আসছেন। তখন হযরত ’উমার ঘটনাটির পূর্ণ চিত্র উবাইয়ের সামনে তুলে ধরেন। বিচারক যায়িদ উবাইকে বললেন, আপনার কোন প্রমাণ আছে কি? তিনি বললেন, না। যায়িদ বললেনঃ তাহলে আপনি আমীরুল মুমিনীনকে কসম দিতে আমার কোন আপত্তি নেই। (কানযুল ’উম্মাল- ৩/১৮১-১৮৪; হায়াতুস সাহাবা- ১/৯৪) একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট এসে বললো, অমুক তার পিতার স্ত্রীর (সৎমা) সাথে সহবাস করে। উবাই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলে উঠলেনঃ আমি এমন ব্যক্তির গর্দান উড়িয়ে দিতাম। একথা শুনে রাসূল সা. একটু মৃদু হেসে বললেনঃ উবাই কতই না আত্মমর্যাদাসম্পন্ন। তবে আমি তাঁর চেয়েও বেশী আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। আর আল্লাহ আমার চেয়েও বেশী আত্মমর্যাদাবোধের অধিকারী। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৬৩৮) হযরত উবাই ইবন কা’বের পবিত্র জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত জ্ঞান চর্চার জন্য নিবেদিত ছিল। মদীনার আনসার-মুহাজিরগণ যখন ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ নিয়ে দারুণ ব্যস্ত থাকতো, হযরত উবাই তখন মসজিদে নববীতে কুরআন-হাদীসের জ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পঠন-পাঠনে সময় অতিবাহিত করতেন। আনসারদের মধ্যে তাঁর চেয়ে বড় কোন ‘আলিম’ কেউ ছিলেন না। আর কুরআন বুঝার দক্ষতা এবং হিফ্জ ও কিরআতে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ছিল সর্বজন স্বীকৃত। খোদ রাসূলে কারীম সা. মাঝে মাঝে তাঁর নিকট থেকে কুরআন তিলাওয়াত শুনতেন। ইসলামী জ্ঞান ছাড়া প্রাচীন আসমানী কিতাবের জ্ঞানেও ছিল তাঁর সমান দক্ষতা। তাওরাত ও ইন্জীলের আলিম ছিলেন। অতীতের আসমানী গ্রন্থসমূহে রাসূল সা. সম্পর্কে যে সকল ভবিষ্যদ্বাণী ও সুসংবাদ ছিল সে বিষয়ে তিনি ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। তাঁর এই পান্ডিত্যের কারণে হযরত ফারুকে আজম তাঁকে খুবই সমীহ ও সম্মান করতেন। এমন কি তিনি নিজেই বিভিন্ন মাসয়ালার সমাধান জানার জন্য সময়-অসময়ে তাঁর গৃহে যেতেন। ইসলামের ইতিহাসে গভীর জ্ঞান ও অসাধারণ মনীষার জন্য হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস রা. ‘হিবরুল উম্মাত’ নামে খ্যাত। তিনিও হযরত উবাইয়ের হালকা-ই-দারসে উপস্থিত হওয়াকে গৌরবজনক বলে মনে করতেন। তাঁর এই ফজীলাত ও মর্যাদা ছিল নবীর সা. নিকট থেকে অর্জিত জ্ঞানের কারণেই। তিনি নবীর সা. নিকট থেকে এত বেশী পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন যে, অন্য কারও নিকট জ্ঞানের জন্য যাওয়ার প্রয়োজন তাঁর ছিল না। সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে একমাত্র আবুবকর রা. ছাড়া তাঁর সমকক্ষ আর কেউ ছিলেন না। হযরত উবাই রা. বিভিন্ন শাস্ত্রে পারদর্শী ছিলেন। তবে বিশেষভাবে কুরআন, তাফসীর, শানে নুযুল, নাসিখ-মানসুখ, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে ছিলেন ইমাম ও মুজতাহিদ। একজন মুজতাহিদ বা গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করতেন। একদিন রাসূল সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলতো কুরআনের শ্রেষ্ঠতম আয়াত কোনটি? বললেনঃ আয়াতুল কুরসী। রাসূল সা. দারুণ খুশী হলেন এবং বললেনঃ উবাই, এই ইলম্ তোমাকে খুশী করুক। উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি কুরআনের আয়াত নিয়ে কতখানি চিন্তা-ভাবনা করতেন। একবার এক ব্যক্তি উবাইকে বললো, আমাকে কিছু নসীহত বা উপদেশ দান করুন। তিনি বললেনঃ কুরআনকে পথের দিশারী মানবে, তার বিধি-নিষেধ ও সিদ্ধান্ত সমূহের ওপর রাজী থাকবে। হযরত রাসূলে কারীম সা. তোমাদের জন্য এই জিনিসটিই রেখে গেছেন। তাতে আছে তোমাদের ও তোমার পূর্ববর্তীদের কথা এবং যা কিছু তোমার পরে হবে, সব কিছুই। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৭; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫১৮) উল্লেখিত মতামত দ্বারা উবাই মূলতঃ এই কথাগুলিই প্রকাশ করেছেনঃ ১. কুরআন ইসলামের পূর্ণ জীবন বিধান। ২. কুরআন মুসলমানদের সর্বোত্তম জীবন বিধান। ৩. কুরআনের সকল কাহিনী ও বর্ণনা শিক্ষা ও উপদেশমূলক। ৪. এতে সকল জাতি-গোষ্ঠীর মোটামুটি আলোচনা এসেছে। কোন ব্যক্তি যদি এইভাবে কুরআনকে দেখে তাহলে তাঁর জ্ঞানের পরিধি যে কত বিস্তৃত, গভীর ও সূক্ষ্ণ হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়। ইসলাম গ্রহণের পর থেকেই হযরত উবাই কুরআনের সাথে অস্বাভাবিক প্রীতির সম্পর্ক গড়ে তোলেন। রাসূল সা. মদীনায় আগমনের পর অহী লেখার সর্বপ্রথম গৌরব তিনিই অর্জন করে। (আল-ইসাবা- ১/১৭) তখন থেকেই তাঁর মধ্যে কুরআন হিফ্জ করার প্রবণতা দেখা দেয়। যতটুকু কুরআন অবতর্ণি হতো তিনি হিফ্জ করে ফেলতেন। এভাবে রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সমগ্র কুরআন হিফ্জ শেষ করেন। আনসারদের যে পাঁচ ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ কুরআন হিফ্জ করেন তাদের মধ্যে উবাইয়ের স্থঅন ছিল সর্বোচ্চে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৯৫) মদীনার খাযরাজ গোত্রের লোকেরা গর্ব করে বলতোঃ আমাদের গোত্রের চার ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় সমগ্র কুরআন সংগ্রহ করেনি। তাদের অন্যতম হলেন উবাই ইবন কা’ব। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৫) হযরত উবাই পবিত্র কুরআনের প্রতিটি হরফ রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র মুখ থেকে শুনে হিফ্জ করেন। রাসূলও সা. অত্যাধিক আগ্রহ দেখে তাঁর শিক্ষার প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দেন। রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা ও ভীতির কারণে অনেক বিশিষ্ট সাহাবী অনেক সময় তাঁর কাছে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকতেন; কিন্তু উবাই নিঃসংকোচে যা ইচ্ছা তাই প্রশ্ন করতেন। তাঁর এই আগ্রহের কারণ রাসূলও সা. মাঝে মাঝে প্রশ্ন করার আগেই তাঁকে অনেক কথা বলে দিতেন। একবার তাঁকে বললেনঃ আমি তোমাকে এমন একটি সূরার কথা বলছি, তাওরাত ও ইনজীলে যার সমকক্ষ কোন কিছু নেই। এমন কি কুরআনেও এর মত দ্বিতীয়টি নেই। এতটুকু বলে তিনি অন্য কথায় চলে গেলেন। উবাই বলেন, আমার ধারণা ছিল তিনি বলে দিবেন; কিন্তু তা না বলে বাড়ী যাওয়ার জন্য উঠে পড়লেন। আমি পিছনে পিছনে চললাম। এক সময় তিনি আমার হাত মুট করে ধরে কথা বলতে আরম্ভ করলেন এবং বাড়ীর দরজা পর্যন্ত পৌঁছলেন। তখন আমি সেই সূরাটির নাম বলার জন্য ’আরজ করলাম। তিনি সূরাটির নাম আমাকে বলে দিলেন। (মুসনাদ- ৫/১১৪) একবার হযরত রাসূলে কারীম সা. ফজরের নামায পড়ালেন এবং একটি আয়াত ভুলে বাদ পড়ে গেল। হযরত উবাই মাঝখানে নামাযে শরীক হন। নামায শেষে রাসূল সা. প্রশ্ন করলেন, তোমাদের কেউ কি আমার কিরআতের প্রতি মনোযোগী ছিলে? লোকেরা কেউ কোন জবাব দিল না। তিনি আবার জানতে চাইলেন, উবাই ইবন কা’ব আছ কি? হযরত উবাই ততোক্ষণে বাকী নামায শেষ করেছেন। তিনি বলে উঠলেন, আপনি অমুক আয়াতটি পাঠ করেননি। আয়াতটি কি ‘মানসুখ’ (রহিত) হয়েছে নাকি আপনি পড়তে ভুলে গেছেন? রাসূল সা. বললেনঃ মানসুখ হয়নি, আমি পড়তে ভুলে গেছি। আমি জানতাম তুমি ছাড়া আর কেউ হয়তো এইদিকে মনোযোগী হবে না। (মুসনাদ- ৫/১২৩, ১৪৪) উপরোক্ত ঘটনা দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, কোন বিষয় হযরত উবাইয়ের বোধগম্য না হলে অন্য সাহাবীদের মত চুপ থাকতেন না; বরং বিষয়টি নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আলোচনা করতেন এবং বুঝে আসার পরই উঠতেন। একবার মসজিদে ববীতে হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ রা. একটি আয়াত পাঠ করলেন। যেহেতু তিনি ছিলেন হুজায়ল গোত্রের লোক, এ কারণে তাঁর উচ্চারণে একটু ভিন্নতা ছিল। হযরত উবাই তাঁর পাঠ শুনে প্রশ্ন করেনঃ আপনি এই আয়াত কার কাছে শিখেছেন? আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট আয়াতটির পাঠ এভাবে শিখেছি। ’আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বললেনঃ আমাকেও তো রাসূল সা. শিখিয়েছেন। উবাই বলেন, সেই সময় আমার অন্তরে ভ্রান্ত ধারণার প্রবাহ বয়ে যেতে লাগলো। আমি ইবন মাস’উদকে সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হয়ে ’আরজ করলামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার ও তাঁর কুরআন পাঠে তারতম্য দেখা দিয়েছে। রাসূল সা. আমার পাঠ শুনলেন এবং বললেনঃ তুমি ঠিক পড়েছ। তারপর ইবন মাস’উদের পাঠ শুনে বললেনঃ তুমিও ফিক পড়েছ। আমি হাত দিয়ে ইশারা করে বললামঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! দুইজনের পাঠই সঠিক হয় কি করে?’ এতক্ষণে হযরত উবাই ঘেমে একাকার হয়ে গেছেন। রাসূলসা. এ অবস্থা দেখে তাঁর বুকের ওপর হাত রেখে বললেনঃ ‘হে আল্লাহ! উবায়ের সংশয় দূর করে দাও।’ পবিত্র হাতের স্পর্শে তাঁর হৃদয়ে পূর্ণ প্রত্যয় নেমে আসে। কিরায়াত শাস্ত্রে হযরত উবাই ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। এই বিষয়ে তিনি এত পারদর্শী ছিলেন যে, স্বয়ং রাসূল সা. তাঁর প্রশংসা করেছেন। সাহাবা-ই-কিরামের মধ্যে কতিপয় ব্যক্তির বিশেষত্ব রাসূল সা. নিজে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সেইসব মহান ব্যক্তির একজন হযরত উবাই। তাঁর সম্পর্কে রাসূল সা. বলেছেনঃ ‘আকরাহুম উবাই’- তাদের মধ্যে সবচেয়ে ক্বারী উবাই। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৬) মাসরূক থেকে বর্ণিত, রাসূল সা বলেছেনঃ তোমরা ইবন মাস’উদ, উবাই ইবন কা’ব, মু’য়াজ ইবন জাবাল ও সালিম মাওলা আবী হুজায়ফা- এই চারজনের নিকট থেকে কুরআনের জ্ঞান অর্জন করবে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৬৪) হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের পর হযরত ’উমার রা. উবাই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর সা. এসব বাণী অনেকবার মানুষকে নতুন করে স্মরণ করিয়ে দেন। একবার মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলেনঃ উবাই সবচেয়ে বড় ক্বারী। সিরিয়া সফরের সময় ‘জাবিয়া’ নামক স্থানের ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি আর একবার বলেনঃ তোমাদের কেউ কুরআন শিখতে চাইলে সে যেন উবাইয়ের কাছে আসে। (মুসনাদ- ৫/১২৩; হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০১) হযরত ’উমার তাঁকে সায়্যিদুল মুসলিমীন নামে আখ্যায়িত করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫১৯; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৭; আল-ইসাবা- ১/১৯) হযরত রাসূলে কারীম সা. নিজে উবাইকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনাতেন। যে বছর তিনি ইনতিকাল করেন সে বছরও উবাইকে কুরআন শোনান। আর একথাও বলেন যে, জিবরীল আমাকে বলেছেন, আমি যেন উবাইকে কুরআন শুনাই। যখনই কুরআনের যে আয়াতটি বা সূরাটি নাযিল হতো রাসূল সা. উবাইকে পাঠ করে শোনাতেন। শুধু তাই নয়, মুখস্ত করিয়ে দিতেন। যখন সূরা ‘আল-বায়্যিনাহ’ নাযিল হয় তখন তিনি উবাইকে ডেকে বলেন, আল্লাহ তোমাকে কুরআন শিখানোর জন্য আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। উবাই তখন খুশীর আতিশয্যে কেঁদে ফেলেন। (আল-ইসাবা- ১/১৯) আবদুর রহমান ইবন আবী আবযা নামক উবাইয়ের এক ছাত্র উস্তাদের এই ঘটনা অবগত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আবুল মুনজির! সম্ভবতঃ সেই সময় আপনি বিশেষ পুলক ও আনন্দ অনুভব করেছিলেন? উবাই বললেনঃ কেন করবো না? একথা বলে তিনি সূরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াতটি পাঠ করেন। (মুসনাদ- ৪/১১৩) কিরায়াত শাস্ত্রে তাঁর পারদর্শিতার কারণে বিশেষ এক ধরণের কিরায়াত সেখানে তাঁর নাম চালু হয় এবং ‘কিরায়াতে উবাই’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বিশেষতঃ দিমাশ্কবাসীদের মধ্যে তা বেশী প্রচলিত ছিল। হযরত উবাইয়ের জীবদ্দশায় তাঁর কিরায়াত সারা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে গৃহীত হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। কারণ অনেক মানসূখ (রহিত) আয়াত তাঁর পাঠে বিদ্যমান ছিল। আর এ জন্য হযরত ’উমার রা. তাঁর মর্যাদা উচ্চ কণ্ঠে স্বীকার করা সত্ত্বেও বহুবার বহু ক্ষেত্রে উবাইয়ের সাথে কুরআন পাঠের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বার বার বলেছেন, উবাই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী কুরআন জানেন। তা সত্ত্বেও কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদেরকে তাঁর সাথে দ্বিমত পোষণ করতে হয়েছে। তিনি দাবী করে থাকেন, সবকিছুই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে শিখেছেন। তাঁর দাবী অবশ্যই সত্য। কিন্তু যখন দেখা যায় বহু আয়াত মানসূখ (রহিত) হয়েছে অথচ তিনি তা জানেন না, তখন তাঁর কিরায়াতের ওপর আমরা কেমন করে অটল থাকতে পারি? (মুসনাদ- ৫/১১৩) তবে পরবর্তীকালে তিনি সংশোধন হয়ে যান। হযরত ’উসমানের খিলাফতকালে যখন কুরআন সংকলন করা হয় তখন মানসূখ আয়াতের প্রতি সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। তখন উবাইয়ের কিরায়াত সর্বজন স্বীকৃতি লাভ করে এবং সমগ্র মুসলিম খিলাফতে চালু হয়। (দ্রঃ সীয়ারে আনসার- ১/১৬২-৬৩) হযরত উবাই রা. মৃত্যুর সময় তাঁর কিরায়াত শাস্ত্রে দুইজন যোগ্য উত্তরসূরী রেখে যান যাঁরা বিশ্ব মুসলিমের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তাঁরা হলেনঃ হযরত আবূ হুরাইরা ও হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস রা.। পরবর্তীকালে বিখ্যাত সাত ক্বারীর মধ্যে নাফে ’ইবন কাসীর মাক্কীর সনদ আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাসের মাধ্যমে হযরত উবাই ইবন কা’বে গিয়ে মিলিত হয়েছে। সেকালে হযরত উবাইয়েল ‘মাদরাসাতুল কিরায়াহ’ (কিরায়াত শাস্ত্রের শিক্ষালয়) একটি কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। আরব, রোম, শাম এবং ইসলামী খিলাফতের নানা অঞ্চলের ছাত্ররা মদীনায় এসে তাঁর শিক্ষালয়ে কিরায়াত শিখতো। বহু বড় বড় সাহাবী দূর-দূরান্ত থেকে উৎসাহী লোকদের সাথে করে মদীনায় নিয়ে আসতেন এবং উবাইয়ের মাদরাসায় ভর্তি করে দিতেন। হযরত ’উমার তাঁর খিলাফতকালে হযরত আবূ দারদা আল-আনসারীকে রা. লোকদের কুরআন শিক্ষাদানের জন্য শামে পাঠান। তিনি ছিলেন সেই পাঁচ রত্নের অন্যতম যাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় গোটা কুরআন হিফ্জ করেন। তা সত্ত্বেও তিনি উবাইয়ের কিরায়াতের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। একবার হযরত ’উমারের খিলাফতকালে শামবাসীদের একটি দল সংগে নিয়ে তিনি মদীনায় উবাইয়ের নিকট আসেন। তাঁর নিকট তাঁদের সাথে তিনি নিজেও কুরআন পড়েন। ছাত্রদের শিক্ষাদানের ব্যাপারে হযরত উবাইয়ের যদিও বিশেষ আগ্রহ ছিল, তবে মেজায ছিল এক্টু উগ্র। এই কারণে তাঁর ধৈর্য খুব শিগগিরই ক্রোধে পরিণত হন। তিনি ক্ষেপে যান এই ভয়ে ছাত্ররা প্রশ্ন করতে ভয় পেত। হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদের ছাত্র যার ইবন জা’য়শ, যিনি হযরত উবাইয়ের ছাত্র হওয়ার গৌরবও অর্জন করেন- একদিন তাঁকে একটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করেন, কিন্তু সাহস পাননি। একদিন এভাবে ভূমিকা দিয়ে একটি প্রশ্ন করেনঃ ‘আমার প্রতি একটু অনুগ্রহের দৃষ্টি দিন। আমি আপনার নিকট থেকে ইলম হাসিল করতে চাই।’ উবাই বললেনঃ হুঁ, সম্ভবতঃ তোমার ইচ্ছা, কুরআনের কোন আয়াত যেন জিজ্ঞাসা থেকে বাকী না থাকে। এই কারণে তাঁর মজলিস অর্থহীন প্রশ্ন থেকে মুক্ত থাকতো। তিনি সম্ভাব্য কোন সমস্যার উত্তর দিতেন না; বরং অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতেন। একদিন তাঁর ছাত্র পখ্যাত তাবে’ঈ মাসরূক এমন একটি পশ্ন করলে বললেনঃ এমনও কি আছে? মাসরূক বললেনঃ না। তিনি বললেনঃ তাহলে অপেক্ষা কর। যখন তেমন অবস্থা হয় তখন তোমার জন্য ইজতিহাদের কষ্ট স্বীকার করা যাবে। তবে যুক্তি সঙ্গত প্রশ্ন করা হলে তিনি খুশী হতেন। জুনদুব ইবন ’আবদুল্লাহ আল-বাজালী বলেনঃ আমি ইলম হাসিলের উদ্দেশ্যে মদীনায় গেলাম, রাসূলুল্লাহর সা. মসজিদে উপস্থিত হয়ে দেখলাম লোকেরা বিভিন্ন স্থানে হালকা করে বসে আলোচনা করছে। আমি একটি হালকার কাছে গিয়ে লক্ষ্য করলাম তার মধ্যস্থলে একজন বিমর্ষ লোক, পরনে তার দুই প্রস্থ কাপড়। তিনি যেন এই মাত্র সফর থেকে এসেছেন। আমি তাঁকে বলতে শুনলামঃ ‘ক্ষমতাসীন শাসকরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তাদের প্রতি আমার কোন সমবেদনা নেই।’ আমি বসলাম। তিনি কিছু কথা বলার পর চলে গেলেন। আমি মানুষের নিকট জিজ্ঞেস করলামঃ ইনি কে? তারা বললোঃ ইনি সায়্যিদুল মুসলিমীন উবাই ইবন কা’ব। আমি পিছনে পিছনে তাঁর বাড়ীতে গেলাম। বাড়ীটি অতি সাধারণ ভাঙ্গাচোরা। তিনি যেন দুনিয়ার ভোগ-বিলাসিতার প্রতি উদাসীন এক সাধক। আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনি সালামের জবাব দিয়ে প্রশ্ন করলেনঃ কোথা থেকে আসা হয়েছে? বললামঃ ইরাক থেকে তিনি বললেনঃ লোকেরা আমাকে খুব বেশী প্রশ্ন করে। একথা শুনে আমি একটু ক্ষুণ্ন হলাম। আর কথা না বাড়িয়ে সোজা আমার বাহনের দিকে যেতে যেতে হাত উঁচিয়ে বলতে লাগলামঃ হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে অভিযোগ পেশ করছি। আমরা অর্থ-কড়ি খরচ করে, দৈহিক ক্লেশ-ভোগ করে, বাহন ছুটিয়ে ইলম হাসিলের উদ্দেশ্যে আলিমদের নিকট যাই, আর তাঁর কিনা আমাদের সাথে রূঢ় ব্যবহার করেন। আমার একথা শুনে উবাই কেঁদে ফেলেন এবং আমাকে খুশী করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেনঃ ‘যদি তুমি আমাকে জুম’আর দিন পর্যন্ত সময় দাও তাহলে রাসূলুল্লাহ সা. থেকে আমি যা শুনেছি তার কিছু তোমাদের শোনাবো। এ ব্যাপারে কারো কোন সমালোচনার পরোয়া করবো না।’ আমি ফিরে এসে জুম’আ বারের অপেক্ষা করতে লাগলাম। বৃহস্পতিবার কোন প্রয়োজনে আমি বের হয়ে দেখি মদীনার সব অলি-গলি লোকে লোকারণ্য। আমি মানুষকে জিজ্ঞেস করলামঃ কী ব্যাপার? লোকেরা অবাক হয়ে বললোঃ মনে হচ্ছে আপনি বিদেশী। বললামঃ হাঁ। তখন তারা বললো। সায়্যিদুল মুসলিমীন উবাই ইবন কা’বের ইনতিকাল হয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০৬) হযরত উবাইয়ের জীবনধারা ছিল অতি সাধারণ, তবে গাম্ভীর্যপূর্ণ। বাড়ীর ভিতরে এবং বাইরে উভয় স্থানে গদীর ওপর বসতেন, আর ছাত্ররা বসতেন সাধারণ সারিতে। মজলিসে আসা এবং মজলিস থেকে যাওয়ার সময় তাঁর সম্মানে ছাত্ররা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যেত। সে যুগে এই নিয়ম ছিল সম্পূর্ণ নতুন। একবার সুলায়ম ইবন হানজালা কোন একটি মাসয়ালা জানার জন্য উবাইয়ের নিকট আসলেন। যখন উবাই উঠলেন তখন ছাত্ররা তাঁর পিছনে চলতে শুরু করলো। হযরত ’উমার এ অবস্থা দেখে খুব অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেনঃ এটা আপনার জন্য ফিত্না এবং তাদের জন্য অপমান। (কানযুল ’উম্মাল- ৮/৬১; হায়াতুস সাহাবা- ১/৬৯৮) প্রথম জীবনে তিনি ছাত্রদের নিকট থেকে হাদীয়া তোহফা গ্রহণ করতেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবনকালে একবার তুফাইল ইবন ’আমর আদ-দাওসীকে কুরআন শিখিয়েছিলেন। তিনি একটি ধনুক হাদীয়া দেন। উবাই ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে রাসূলুল্লাহর সা খিদমতে হাজির হন। রাসূল সা. জিজ্ঞেস করেনঃ এটা কোথায় পেয়েছ? বললেনঃ একজন ছাত্রের হাদীয়া। রাসূল সা. বললেনঃ তাকে ফিরিয়ে দাও। ভবিষ্যতে এমন হাদীয়া থেকে দূরে থাকবে। আর একবার একজন ছাত্র কাপড় হাদীয়া দেয়। সেবারও একই অবস্থা দেখা দেয়। এই কারণে পরবর্তীকালে কোন রকম হাদীয়া তোহফা গ্রহণ করতেন না। শামের লোকেরা যখন তাঁর নিকট কুরআন শিখতে আসে, তখন তারা মদীনার কাতিবদের (লেখক) দ্বারা কুরআন লিখিয়েও নিত। বিনিময়ে তারা লেখকদের আহার করিয়ে পরিতুষ্ট করতো। কিন্তু হযরত উবাই কোন দিন তাদের কোন খাবারে হাত দেননি। হযরত ’উমার রা. একদিন তাঁকে প্রশ্ন করেন, শামীদের খাবার কেমন? তিনি বলেনঃ আমি তাদের খাবার খাইনা। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৪১) কিরায়াত শিক্ষাদানের সময় হরফের যথাযথ উচ্চারণের প্রতি জোর দিতেন। এতে মদীনা ও তার আশে-পাশের লোকদের তেমন অসুবিধা হতো না। তবে মরু-বেদুঈন ও অন্য দেশের অধিবাসী, যারা আরবী বর্ণ-ধ্বনির বিশুদ্ধ উচ্চারণ জানতো না তাদের নিয়ে কঠিন সমস্যায় পড়তেন। অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই সমস্যার সমাধান করতেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবদ্দশায় এক ইরানীকে তিনি কুরআন শিখাতেন। যখন আদ-দুখানের ৪৩ নং আয়াত ‘ইন্না শাজারাতুজ যাকুম, তা’য়ামুল আছীম’ পর্যন্ত পৌঁছেন তখন লোকটির ‘আছীম’ শব্দের উচ্চারণে বিভ্রাট দেখা দেয়। হযরত উবাই উচ্চারণ করে ‘আছীম’ আর লোকটি উচ্চারণ করে ‘ইয়াতীম’। একদিন উবাই তাকে শব্দটির উচ্চারণ মশ্ক করাচ্ছেন, এমন সময় রাসূল সা. সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি উবাইয়ের অস্থিরতা ও দুঃশ্চিন্তা দেখে তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এলেন। তিনি ইরানী লোকটিকে প্রথমে বলেনঃ বল, ‘তা’য়ামুজ জালিম’। লোকটি পরিষ্কারভাবে তা উচ্চারণ করলো। তখন তিনি উবাইকে বললেনঃ প্রথমে তার জিহ্বা ঠিক কর এবং তাকে বর্ণ-ধ্বনির উচ্চারণ শিখাও। আল্লাহ তোমাকে প্রতিদান দিবেন। হযরত উবাই রা. রাসূলুল্লাহর সা. নিকট যতটুকু কুরআন পড়তেন, ঘরে ফিরে তা লিখে রাখতেন। কিরায়াত শাস্ত্রের ইতিহাসে এই কুরআনই ‘মাসহাফে উবাই’ নামে প্রসিদ্ধ। এই মাসহাফ হযরত ’উসমানের রা. খিলাফতকাল পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। এই মাসহাফের খ্যাতি ছিল বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। হযরত উবাইয়ের ইনতিকালের পর তাঁর পুত্র মুহাম্মাদ মদীনায় বসবাস করতেন। একবার ইরাক থেকে কিছু লোক তাঁর নিকট এসে বললো, আমরা আপনার পিতার মাসহাফ শরীফ দেখার জন্য এসেছি। তিনি বললেনঃ তা তো আমাদের নিকট নেই, খলীফা উসমান তা নিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত উবাই ছিলেন কুরআনের মুফাস্সির (ভাষ্যকার) সাহাবীদের অন্যতম। এই শাস্ত্রের বড় একটি অংশ তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আবূ জা’ফর আর রামী তার বর্ণনাকারী। মাত্র তিনটি মাধ্যমে এই সনদ হযরত উবাই পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই শাস্ত্রে হযরত উবাইয়ের বহু ছাত্র ছিল। তাফসীরের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁদের বর্ণনা ছড়িয়ে রয়েছে। তবে তার সিংহভাগ আবুল আলীয়্যার মাধ্যমে আমাদের নিকট পৌঁছেছে। এই আবুল আলীয়্যার ছাত্র রাবী ইবন আনাস। ইমাম তিরমিযীর সনদের ধারাবাহিকতা এই রাবী পর্যন্ত পৌঁছেছে। উবাইয়ের তাফসীরের বর্ণনাসমূহ ইবন জারীর ও ইবন আবী হাতেম প্রচুর পরিমাণে নকল করেছেন। হাকেম তাঁর মুসতাদরাকে এবং ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদে কিছু বর্ণনা সংকলন করেছেন। তাফসীর শাস্ত্রে হযরত উবাই থেকে দুই রকম রিওয়ায়াত (বর্ণনা) আছে। ১. তিনি রাসূলুল্লাহকে সা. যে সকল প্রশ্ন করেন এবং রাসূল সা. তার যে সকল জবাব দেন, তাই। ২. এমন সব তাফসীর যা খোদ উবাইয়ের প্রতি আরোপ করা হয়েছে। প্রথম প্রকারের তাফসীর, যেহেতু তা রাসূল সা. থেকে বর্ণিত হয়েছে এ কারণে তা ঈমান ও ইয়াকীনের স্তরে উন্নীত হয়েছে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকারের তাফসীর হচ্ছে হযরত উবাইয়ের মতামত ও সিদ্ধান্তের সমষ্টি। তার কোনটিকে তাফসীরুল কুরআন বিল কুরআন (কুরআনের দ্বারা কুরআনের তাফসীর)- এর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে, কোনটিকে সমকালীন চিন্তা-বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটেছে, আবার কোনটিতে ইহুদী বর্ণনার প্রভাব পড়েছ্ আবার কোন কোন ক্ষেত্রে এ সবের উর্ধে উঠে একজন মুজতাহিদের মত নিজস্ব মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। মূলতঃ এটাই তাঁর তাফসীর শাস্ত্রের শ্রেষ্ঠ অবদান। শানে নুযূল বিষয়ে তাঁর থেকে অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। তাফসীরের বিভিন্ন গ্রন্থে তা ছড়িয়ে রয়েছে। সাহাবা-ই-কিরামের মধ্যে যাঁদেরকে হাদীসের বিশেষজ্ঞ বলা হয় উবাই ইবন কা’ব তাঁদের অন্যতম। আল্লামা জাহাবী বলেছেনঃ উবাই ছিলেন সেই সকল ব্যক্তির একজন যাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে হাদীসের বিরাট এক অংশ শুনেছিলেন। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৬) এই কারণে আলিম সাহাবীদের মধ্যে যাঁদের নিজস্ব হালকা-ইদারস ছিল তাঁরাও উবাইয়ের হালকা-ই-দারসে শরীক হওয়াকে গৌরবের বিষয় বলে মনে করতেন। আর এই কারণে তাঁর হালকা-ই-দারসে তাবে’ঈদের চেয়ে সাহাবীদের সমাবেশ ঘটতো বেশী। হযরত ’উমার ইবনুল খাত্তাব, আবূ আইউব আল-আনসারী, উবাদাহ ইবন সামিত, আবূ হুরাইরা, আবূ মূসা আল-আশ’য়ারী, আনাস ইবন মালিক, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস, সাহল ইবন সা’দ, সুলায়মান ইবন সুরাদ রা. প্রমুখের মত উঁচু স্তরের সাহাবীরা উবাইয়ের দারসে বসাকে গৌরবের বিষয় মনে করতেন। (তাজকিরাতুল হুফফাজ- ১/১৭) তাঁর দারসের নির্দিষ্ট সময় ছিল। তবে তাঁর জ্ঞান ভান্ডার সবার জন্য সর্বক্ষণ উন্মুক্ত ছিল। যখন তিনি নামাযের জন্য মসজিদে নববীতে আসতেন তখন কেউ কিছু জানতে চাইলে মাহরূম করতেন না। কায়স ইবন ’আববাদ সাহাবীদের দীদার লাভে ধন্য হওয়ার জন্য একবার মদীনায় আসেন। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন এভাবেঃ ‘আমি মদীনায় উবাই ইবন কা’ব অপেক্ষা অধিকতর বড় কোন ’আলিম পাইনি। নামাযের সময় হলে মানুষ সমবেত হলো। জনগণের মধ্যে হযরত ’উমারও ছিলেন। হযরত উবাই কোন একটি বিষয়ে মানুষকে শিক্ষাদানের প্রয়োজন অনুভব করলেন। নামায শেষে তিনি দাঁড়ালেন এবং সমবেত জনমন্ডলীর নিকট রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস পৌঁছলেন। জনতা অত্যন্ত আগ্রহ ও আবেগের সাথে নীরবে তাঁর কথা শুনছিল।’ হযরত উবাইয়ের এমন সম্মান ও মর্যাদা দেখে কায়স আজীবন মুগ্ধ ছিলেন। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে হযরত উবাই ছিলেন খুবই বিচক্ষণ ও সতর্ক। এ কারণে জীবনে বিরাট এক অংশ রাসূলুল্লাহর সা. সাহচর্যে কাটালেও খুব বেশী হাদীস তিনি বর্ণনা করেননি। ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাঁর বর্ণিত ১৬৪ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল-আ’লাম- ১/৭৮) সাহাবা-ই-কিরামের মধ্যে যাঁদের ইজতিহাদ ও ইসতিম্বাতের যোগ্যতা ছিল, উবাই তাঁদের অন্যতম। হযরত রাসূলে কারীমের সা. জীবনকালেই তিনি ফাতওয়ার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। হযরত আবূ বকরের রা. খিলাফত কালেও সিদ্ধান্তদানকারী ফকীহদের মধ্যে গণ্য ছিলেন। বিন সা’দ বর্ণনা করেনঃ আবূ বকর রা. কোন কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলে মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যাঁরা চিন্তাশীল ও সিদ্ধান্তদানকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাঁদের সাথে পরামর্শ করতেন। এই সকল ব্যক্তির একজন ছিলেন উবাই ইবন কা’ব। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৫) হযরত ’উমার ও হযরত ’উসমানের খিলাফতকালেও তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ইবন সা’দ, সাহল ইবন আবী খায়সামা থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহর সা. যুগে তিনজন মুহাজির ও তিনজন আনসার ফাতওয়া দিতেন। তাঁরা হলেনঃ ’উমার, ’উসমান, আলী, উবাই, মু’য়াজ ও যায়িদ ইবন সাবিত। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৫৪) মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা বিষয়ে তাঁর নিকট ফাতওয়া চাওয়া হতো। এই ফাতওয়া তলবকারীদের মধ্যে সম্মানিত সাহাবা-ই-কিরামও থাকতেন। সুমরাহ্ ইব জুনদুব ছিলেন একজন উঁচু স্তরের সাহাবী। তিনি নামাযে তাকবীর ও সূরা পাঠের পর একটু দেরী করতেন। লোকেরা আপত্তি জানালো। তিনি হযরত উবাইকে লিখলেন, এ ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য আমাকে অবহিত করুন, আমি ভুলে গেছি। হযরত উবাই সংক্ষিপ্ত জবাব লিখে পাঠান। তাতে তিনি বলেনঃ আপনার পদ্ধতি শরীয়াত অনুসারী। আপত্তি উত্থাপনকারীরা ভুল করছে। (কানযুল ’উম্মাল- ৪/২৫১) তাঁর ইজতিহাদের পদ্ধতি ছিল, প্রথমে কুরআনের আয়াত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করা, তারপর সেই বিষয়ে হাদীসের সন্ধান করা। আর যখন কোন বিষয়ে কুরআন হাদীস সম্পটর্কে কিছু না পেতেন তখন কিয়াস বা অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। হযরত ’উমারের নিকট এক মহিলা এসে দাবী করলো যে, সে যখন গর্ভবতী তখন তার স্বামী মারা গেছে। এখন সে সন্তান প্রসব করেছে; কিন্তু ‘ইদ্দতের সময় সীমা পূর্ণ হয়নি, এ বিষয়ে সে খলীফার মতামত চাইলো। খলীফা ’উমার বললেনঃ ’ইদ্দতের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। মহিলা উঠে উবাই ইবন কা’বের নিকট গেল এবং ’উমারের নিকট তার যাওয়া, ফাতওয়া জিজ্ঞেস করা ইত্যাদি তাঁকে অবহিত করলো। উবাই বললেনঃ তুমি ’উমারের কাছে আবার যাও এবং তাঁকে বল, উবাই বলেছেনঃ মহিলার ’ইদ্দত পূর্ণ হয়ে হালাল হয়ে গেছে। যদি তিনি আমার কথা জিজ্ঞেস করেন তাহলে বলবে, আমি এখানে বসে আছি, তুমি এসে আমাকে নিয়ে যাবে। মহিলা ’উমারের নিকট ফিরে গেল। ’উমার রা. উবাইকে ডেকে পাঠালেন। তিনি হাজির হলে ’উমার জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনি একথা কিভাবে বললেন এবং কোথায় পেলেন? তিনিবললেনঃ কুরআনে পেয়েছি। এই বলে তিনি সূরা আত-তালাকের ৪ নং আয়াত- ‘ওয়া উলাতিল আহমালি আজালুহুন্না আন ইয়াদা’না হামলাহুন্না-’ পাঠ করেন। তারপর বলেন, যে গর্ভবতী মহিলা বিধবা হবে সেও এই বিধানের অন্তর্গত। তাছাড়া রাসূল সা. থেকে এ সম্পর্কে একটি হাদীসও শুনেছি। হযরত ’উমার মহিলাকে বললেনঃ উবাইয়ের কথা শোন। (কানযুল ’উম্মাল- ৫/১৬৬) রাসূলুল্লাহর সা. চাচা হযরত ’আব্বাসের রা. বাড়ীটি ছিল মসজিদে নববীর সংলগ্ন। হযরত ’উমার রা. যখন মসজিদ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন তিনি ’আব্বাসকে রা. বলেন, মসজিদ বানাতে হবে, বাড়ীটি বিক্রী করে দিন। ’আব্বাস বললেন, না, আমি বিক্রী করবো না। ’উমার বললেন, তাহলে বাড়ীটি মসজিদের অনুকূলে হিবা (দান) করে দিন। এ প্রস্তাবেও তিনি রাজী হলেন না। ’উমার তখনবরলেনঃ তাহলে আপনি নিজে মসজিদটি সম্প্রসারণ করে দিন এবং আপনার বাড়ীটিও তার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন। ’আব্বাস রাজী হলেন না। ’উমার রা. বললেনঃ এই তিনটি প্রস্তাবের যে কোন একটি আপনাকে মানতে হবে। অবশেষে দু’জনই উবাই ইবন কা’বকে শালিস মানলেন। তিনি ’উমারকে রা. প্রশ্ন করলেনঃ ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারও জিনিস কেড়ে নেওয়ার অধিকার আপনি কোথায় পেলেন? ’উমার জানতে চাইলেন, এ বিধান কুরআন না হাদীসে পেয়েছেন? বললেনঃ হাদীসে। তারপর বলেনঃ হযতে সুলাইমান বাইতুল মাকদাসের প্রাচীর নির্মাণ করেন। প্রাচীরের একাংশ অন্যের জমিতে নির্মিত হয় এবং তা ধ্বসে পড়ে। অতঃপর হযরত সুলাইমানের নিকট ওহী আসে যে, জমির মালিকের অনুমতি নিয়ে তা পুনঃনির্মাণ করবে। একথা শুনে হযরত ’উমার চুপ হয়ে যান। এই ঘটনার পর হযরত ’আব্বাস স্বেচ্ছঅয় মসজিদের জন্য বাড়ীটি দান করেন। (হায়াতুস সাহাব- ১/৯৪, ৯৫) সুওয়ায়দ ইবন গাফলা, যায়িদ ইবন সুজান ও সুলাইমান ইবন রাবী’য়ার সাথে কোন এক অভিযানে যান। পথে ‘উজায়ব’ নামক স্থানে একটি চাবুক পড়ে থাকতে দেখে উঠিয়ে নেন। তাঁর অপর সঙ্গীদ্বয় বললেন, আপনি ওটা ফেলে দিন। তিনি ফেললেন না। এই ঘটনার কিছু দিন পর সুওয়ায়দ হজ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে মদীনায় যাত্রা বিরতি করে হযরত উবাইয়ের নিকট যান এবং চাবুকের ঘটনা বর্ণনা করেন। উবাই বললেন; আমার জীবনে একবার এমন ঘটনা ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় একবার আমি একশো দীনার পথে পাই। তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন, এক বছর পর্যন্ত মানুষকে জানাতে থাকবে। একবছর পূর্ণ হলে বললেন, দীনারের পরিমাণ, থলির অবস্থা সব ভালোভাবে মনে রেখে আরও এক বছর অপেক্ষা করবে। এর মধ্যে প্রমাণসহ কেউ উপস্থিত হলে তাকে দেবে। অন্যথায় তুমি মালিক হবে। হযরত ’উমার রা. একবার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন যে, তিনি মানুষকে ‘তামাত্তু’ হজ্জ আদায় করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করবেন। উবাই তাঁকে বললেন, এমন নিষেধাজ্ঞা জারির কোন ইখতিয়ার আপনার নেই। হযরত উবাই ‘কিরায়াত খালফাল ইমাম’ (ইমামের পিছনে কিরায়াত পাঠ)- এর প্রবক্তা ছিলেন। তবে তার রূপ ছিল এমনঃ যুহর ও ’আসরের ফরয নামাযে ইমামের পিছনে কিরায়াত পাঠ করতেন। একবার ’আবদুল্লাহ ইবন হুজায়ল তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি ইমামের পিছনে কিয়ারাত পড়েন? বললেনঃ হাঁ। (কানযুল ’উম্মাল- ৪/২৫৪) তিনি সূরা আল-আ’রাফের ২০৪ নং আয়াত ‘ওয়া ইজা কুরিয়াল কুরআন ফাসতামি’উ লাহু ওয়া আনসিতু-’ যখন কুরআন পাঠ করা হয় তখন তোমরা মনোযোগ সহকারে শোন এবং চুপ থাক- এর বাহ্যিক অর্থের ওপর ’আমল করতেন। যুহর ও আসরে ইমাম যখন চুপে চুপে কিরায়াত পড়েন তখন তো শোনার প্রশ্ন আসেনা। সুতরাং তাঁ রমতে যে নামাযে ইমাম জোরে কিরায়াত পাঠ করবেন সেখানে মুক্তাদী চুপ করে শুনবেন। আর যেখানে ইমাম চুপে চুপে পাঠ করবেন সেখানে মুক্তাদীও কিরায়াত পাঠ করবেন। একবার এক ব্যক্তি মসজিদে একটি হারানো জিনিসের ব্যাপারে হৈ চৈ করছিল। হযরত উবাই রেগে গেলেন। লোকটি বললো, আমি তো অশ্লীল কিছু বলছিনে। উবাই বললেন, অশ্লীল না হলেও এটা মসজিদের আদবের খেলাফ। (কানযুল ’উম্মাল- ৪/২৫০) আর একবার রাসূল সা. জুম’আর খুতবা দিলেন এবং সূরা বারায়াত থেকে পাঠ করলেন। এই সূরাটি হযরত আবূ দারদা ও আবূ জারের রা. জানা ছিল না। তাঁরা খুতবার মধ্যেই ইশারায় উবাইকে জিজ্ঞেস করলেন, এই সূরাটি কবে নাযিল হয়েছে, আমাদের তো জানা নেই? উবাইও ইশারায় তাদেরকে চুপ থাকতে বললেন। নামায শেষে তিনজনই নিজ নিজ বাড়ীতে ফেরার জন্য রওয়ানা হচ্ছেন, তখন অন্য দু’জন উবাইকে বললেন, আপনি আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিলেন না কেন? উবাই বললেনঃ আজ আপনাদের নামায নষ্ট হয়ে গেছে, আর তাও একটি অহেতুক কারণে। এমন কথা শুনে তাঁরা হযরত রাসূল কারীমের সা. নিকট হাজির হলেন এবং বললেনঃ উবাই আমাদেরকে এমন কথা বলেছেন। তিনি বললেনঃ সে ঠিক কথাই বলেছে। (কানযুল ’উম্মাল- ৪/২৫৫) ব্যভিচারের শাস্তি সম্পর্কে হযরত উবাই বলতেন, তিন রকম লোকের জন্য তিন রকম হুকুম আছে। কিছু লোক দুররা ও রজম উভয় প্রকার শাস্তির যোগ্য। কিছু লোক শুধু রজম এবং কিছু শুধু দুররার শাস্তি লাভের উপযুক্ত। যে বৃদ্ধ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ব্যভিচার করে তাকে উভয় শাস্তি দিতে হবে। আর যে যুবক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও ব্যভিচার করে তাকে শুধু রজম করতে হবে। যে যুবকের স্ত্রী নেই সে ব্যভিচার করলে তাকে শুধু দুররা লাগাতে হবে। নাবীজ (খেজুরের শরবত) হালাল হওয়া সম্পর্কে সকল ’আলিম প্রায় একমত। তবে উবাই থেকে এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, নাবীজের মধ্যে এমন কী দেখেছ? পানি, ছাতুর শরবত, দুধ ইত্যাদি পান কর। প্রশ্নকারী বললো, মনে হচ্ছে আপনি নাবীজ পানের সমর্থক নন। তিনি বললেন, মদ পান আমি কিভাবে সমর্থন করতে পারি? এভাবে বিভিন্ন মাসয়ালা সম্পর্কে হযরত উবাইয়ের মতামত গভীরভাবে অধ্যয়ন করলে ফকীহ সাহাবীদের মধ্যে তাঁর যে উঁচু মর্যাদ ছিল সে সম্পর্কে স্পষ্টধারণা লাভ করা যায়। হযরত উবাই লিখতে-পড়তে জানতেন। এ করণে ওহীর বেশীর ভাগ আয়াত তিনিই লিখতেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. মদীনা আগমণের পর ওহী লেখার প্রথম গৌরব তিনিই লাভ করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৫৩১) সে যুগে কোন লেখা বা কুরআনের শেষে লেখকের নাম লেখার রেওয়াজ ছিল না। হযরত উবাই সর্বপ্রথম নাম লেখার প্রচলন করেন। পরে অন্যরা তাঁর অনুসরণ করে। সকল প্রকার বিদ’য়াত থেকে দূরে থাকা, সত্য প্রকাশের সৎ সাহস- এ জাতীয় গুণাবলী হযরত উবাইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে বিদ্যমান ছিল। আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি প্রবল উৎসাহ- আবেগ তাঁর মধ্যে রূহানিয়্যাতের চরম বিকাশ সাধন করেছিল। গভীর রাতে মানুষ যখন আরাম-আয়েশে বিছানায় গা এলিয়ে দিত, তিনি তখন ঘরের এক কোণে বিনীতভাবে আল্লাহর ইবাদাতে মাশগুল থাকতেন, মুখে আল্লাহর কালাম জারী থাকতো এবং চোখ থেকে অশ্রুর ধারা প্রবাহিত হতো। তিন রাতে কুরআন খতম করতেন। রাতের এক অংশ দরূদ ও সালাম পেশের মাধ্যমে অতিবাহিত হতো। হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি তাঁর ভালোবাসা এত প্রবল ছিল যে ’উস্তুনে হান্নানা’র একাংশ তাবারুক হিসেবে বাড়ীতে রেখে দেন এবং উইপোকায় খেয়ে শেষ না করা পর্যন্ত তাঁর বাড়ীতেই ছিল। সব ধরণের বিদ’য়াত থেকে এত দূরে থাকতেন যে, রাসূলুল্লাহর সা. পবিত্র সময়ে যে কথা বা কাজ হয়নি তা বলা বা করাকে তিনি খুব খারাপ মনে করতেন। হযরত ’উমার রা তাঁর খিলাফতকালে একদিন মসজিদে নববীতে এসে দেখলেন লোকেরা পৃথকভাবে যার যার মত তারাবীহর নামায পড়ছে। ’উমার জামায়াতবদ্ধ করতে চাইলেন। তিনি উবাইকে বললেনঃ আমি আপনাকে ইমাম নিযুক্ত করতে চাই, আপনি তারাবীহ্র নামায পড়াবেন। উবাই বললেনঃ যে কাজ আগে করিনি এখন তা কিভাবে করি? ’উমার রা. বললেন, আমি তা জানি। তবে এ কোন খারাপ কাজ নয়। (কানযুল ’উম্মাল- ৪/২৪৮; হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৪৯) একবার এক ব্যক্তি হযরত রাসূলে কারীমকে সা. প্রশ্ন করলোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই আমরা মাঝে মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়ি বা নানাবিধ কষ্ট ভোগ করি, কি কোন সাওয়াব আছে? রাসূল সা. বললেনঃ এতে গুণাহ্র কাফ্ফারা হয়ে যায়। সেখানে হযরত উবাই উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানতে চাইলেন, ছোট ছোট বিপদ-মুসীবতও কি গুণাহ্র কাফ্ফারা হয়? বললেনঃ একটি কাঁটা ফুটলেও তা কাফ্ফারা হয়। তখন ঈমানী আবেগে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে যায়; হায়! সব সময় যদি আমার দেহে জ্বর লেগে থাকতো, আর তা সত্ত্বেও আমি হজ্জ ’উমরা আদায়ে সক্ষম হতাম এবং জিহাদে গমন ও জামায়অতে নামায আদায়ের যোগ্য থাকতাম। আল্লাহ পাক তাঁর এই দু’আ কবুল করেন। তারপর থেকে যত দিন জীবিত ছিলেন, শরীরে সব সময় জ্বর থাকতো। (কানযুল ’উম্মাল- ২/১৫৩; আল-ইসাবা- ১/২০; হায়াতুস সাহাবা- ১/৫০২-৩) আল্লাহর ভয়ে, শেষ বিচার দিনের ভয়ে, সব সময় তিনি কাঁদতেন। কুরআন পাঠের সময় ভীষণ ভীত হয়ে পড়তেন। বিশেষতঃ সূরা আল-আনয়ামের ৬৫ নং আয়াত ও পরবর্তী আযাবের আয়াতগুলি যখন পাঠ করতেন তখন তাঁর শঙ্কা ও ভয়ের সীমা থাকতো না। (রিজালুন হাওলার রাসূল- ৪৯৮) ইসলামী খিলাফতের সীমা যখন বিস্তার লাভ করে এবং সাধারণ মুসলমানরা বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ালী বা শাসকদের অহেতুক তোয়াজ খাতির করে চলতে থাক তখন তিনি বলতেনঃ কা’বার প্রভুর নামে শপথ। তারা ধ্বংস হয়েছে। তারা ধ্বংস হয়েছে। অন্যদেরকে তারা ধ্বংস করেছে। তাদের জন্য আমার কোন দুঃখ নেই। আমার দুঃখ তাদের জন্য, যাদের তারা সর্বনাশ করেছে। (রিজালুন হাওলার রাসুল- ৪৯৮) হযরত উবাই বলতেনঃ মুমিনের চারটি বৈশিষ্ঠ্যঃ ১. বিপদে ধৈর্যধারণ করে, ২. কোন কিছু পেলে আল্লাহর শোক করে, ৩. যখন কথা বলে, সত্য বলে, ৪. যখন বিচার করে, ন্যায়-নীতির সাথে বিচার করে। তিনি আরও বলতেন, মুমিনের জীবন পাঁচটি নূর বা জ্যোতির মধ্যে বিবর্তিত হয়। ১. তার কথা নূর, ২. তার ইলম বা জ্ঞান নূর, ৩. কবরে সে নূরের মধ্যে অবস্থান করবে, ৪. কবর থেকে সে নূরের মধ্যে উঠবে এবং ৫. কিয়ামতের দিন নূরের দিকেই তার শেষ যাত্রা হবে। অপর দিকে একজন কাফিরের জীবন পাঁচটি অন্ধকারের মধ্যে বিবর্তিত হয়। ১. তার কথা অন্ধকার, ২. তার আমল অন্ধকার, ৩. তার কবর অন্ধকার, ৪. কবর থেকে উঠবে অন্ধকারে এবং ৫. কিয়ামতের দিন তার শেষ যাত্রা হবে অন্ধকারের দিকে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫১৮) জীনের সাথে হযরত উবাইয়ের একটি ঘটনার কথা বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। খেজুর শুকানোর জন্য হযরত উবাইয়ের একটি উঠোন ছিল। সেখানে খেজুর নেড়ে দেওয়া ছিল। তিনি মাঝে মাঝে সেখানে আসতেন। একদিন খেজুরে ঘাটতি লক্ষ্য করে রাতে পাহারা দিলেন। হঠাৎ অন্ধকারে একজন যুবকের মত একটি প্রাণী দেখতে পেলেন। তিনি তাকে সালাম দিলেন। সে সালামের জবাব দিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে তুমি? সে বললোঃ জীন। তিনি বললেনঃ তোমার একটি হাত দাও তো। সে হাত বাড়িয়ে দিল। তিনি হাত ধরলেন এবং তাঁর মনে হলো, সেটা যেন কুকুরের হাত এবং তার লোম কুকুরের লোমের মত। তিনি বললেনঃ জীবনের সৃষ্টি কি এমনই? আমার তো ধারণা ছিল তারা আরও শক্তিশালী। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি যা করেছ, তার কারণ কি? সে জবাব দিলঃ আমরা জেনেছি, আপনি সাদাকা (দান) করতে ভালোবাসেন। তাই আমরা এই খেজুর থেকে কিছু গ্রহণ করতে চেয়েছি। তিনি জীনকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের হাত থেকে আমাদের নিরাপত্তা কিসে? সে বললোঃ সূরা বাকারার আয়াতুল কুরসীতে। কেউ সন্ধ্যায় পড়ে ঘুমালে সকাল পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে; আর কেউ সকালে পড়লে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিরাপদ থাকবে। পরদিন সকালে হযরত উবাই রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গিয়ে রাতের ঘটনা খুলে বললেন। রাসূল সা. সবকিছু শুনে বললেন” এই খবীসটি (পাপাত্মাটি) সত্যি কথা বলেছে। নাসাঈ, হাকেম, তাবারানী প্রভৃতি গ্রন্থে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৯০) হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। একদিন উবাই ইবন কা’ব প্রতিজ্ঞা করলেনঃ আজ আমি মসজিদের এমন নামায আদায় করবো এবং আল্লাহর এমন প্রশংসা করবো যা আর কেউ কোন দিন করেনি। তিনি মসজিদে গিয়ে নামায আদায় করে যেই না আল্লাহর প্রশংসার জন্য বসেছেন অমনি পিছন দিকে জোরে জোরে কাউকে হামদ পাঠ করতে শুনতে পেলেন। তিনি ঘটনাটি রাসুলকে সা. জানালেন। রাসুল সা. বললেন, এই হামদের পাঠন ছিলেন জিবরীল আ.। (দ্রঃ হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪১) ইবন ’আব্বাসের বর্ণনা করেন। একবার ’উমার ইবন আল-খাত্তাব আমাদেরকে কোথাও বের হতে বললেন। আমরা পথ চলছি। আমি ও উবাই এক সময় কাফিলার একটু পিছনে পড়ে গেলাম। এমন সময় আকাশে একটু মেঘ দেখা গেল। উবাই দু’আ করলেনঃ হে আল্লাহ! এই মেঘের কষ্ট আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিন। আমরা মেঘের কষ্ট থেকে বেঁচে গেলাম। আমরা কাফিলার সাথে মিলিত হলে ’উমার জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরাও কি আমাদের মত কষ্ট পেয়েছ? আমি বললামঃ আবুল মুনজির (উবাই) মেঘের কষ্ট থেকে আমাদেরকে রেহাই দেওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করেছিল। ’উমার বললেনঃ আমাদের জন্যও একটু দু’আ করলে না কেন? (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬৫৮)

  • হানজালা ইবন আবী ’আমির (রা)

    হানজালা ইবন আবী ’আমির (রা)

    নাম হানজালা, লকব বা উপাধি ‘গাসীলুল মালায়িকা’ ও তাকী। মদীনার আউস গোত্রের ‘আমর ইবন’ আউফ শাখার সন্তান। পিতার নাম আবু ’আমির ’আমর, মতান্তরে ’আবদু ’আমর, মাতার নাম জানা যায় না। তবে এতটুকু জানা যায় যে, তিনি খাযরাজ নেতা মুনাফিক ’আবদুল্লাহ ইবন ’উবাইয়ের বোন ছিলেন। হানজালার জন্ম ও কৈশোর সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হানজালার পিতা আবূ ’আমির ছিলেন আউস গোত্রের একজন সম্মানিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। সেই জাহিলী আরবে দ্বীনে হানীফের একজন বিশ্বাসী হিসেবে তিনি নবুওয়াত, রিসালা, কিয়ামাত ইত্যাদি বিশ্বাস করতেন। এই ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁকে ‘রুহবানিয়্যাত’ (বৈরাগ্য)- এর দিকে নিয়ে যায় এবং সব রকম পার্থিব নেতৃত্ব ছেড়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব অর্জন করেন। জীবনের এক পর্যায়ে গেরুয়া বসন পরিধান করে নির্জনবাস অবলম্বন করেন। একারণে তিনি ‘রাহিব’ (বৈরাগী) হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। (আল-ইসাবা- ১/৩৬১) এদিকে রাসূলে কারীম সা. নবুওয়াত লাভ করেন এবং মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করে ইসলামী খিলাফতের ভিত্তি স্থাপন করেন। এতে আবু ’আমির ও ’আবদুল্লাহ ইবন উবাই উভয়ের নেতৃত্বে ভাটা পড়ে। ’আবদুল্লাহ ইবন ’উবাই মুনাফিকী (দ্বিমুখী) নীতি অবলম্বন করে মদীনাতেই বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু আবূ ’আমির ততখানি ধৈর্যধরণ করতে পারেননি। তিনি মদীনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। উহুদ যুদ্ধে তিনি কুরাইশ বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে মদীনা আক্রমণে আসেন। একারণে হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে ‘ফাসিক’ নামে অভিহিত করেন। যুদ্ধ শেষে তিনি মক্কায় ফিরে যান এবং সেখানেই বসবাস করতে থাকেন। হিজরী অষ্টম সনে মুসলমানদের দ্বারা মক্কা বিজিত হলে আল্লাহর যমীন তাঁর জন্য আবার সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। তিনি মক্কা ছেড়ে রোমান সম্রাট হিরাকলের দরবারে পৌঁছেন এবং সেখানেই হিজরী দশ সনে মারা যান। এই তো ছিল আবূ ’আমিরের কুফরী বা অবিশ্বাসের চরম অবস্থা। অপর দিকে তাঁর ছেলে হযরত হানজালার ঈমানী মজবুতীর চরম অবস্থাও লক্ষ্যণীয়। তিনি ইসলাম কবুল করে আবেদন জানানঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি নির্দেশ দিলে আমি আমার পিতা আবূ ’আমিরকে হত্যা করতাম। কিন্তু রাসূল সা. তাঁর এ আবেদন মঞ্জুর করেননি। মুনাফিক সরদার ’আবদুল্লাহ ইবন ’উবাইর ছেলে হযরত ’আবদুল্লাহ রা. তাঁর পিতার ব্যাপারেও অনুরূপ আবেদন জানিয়েছিলেন এবং রাসূল সা. তাঁকেও একইভাবে নিবৃত্ত করেছিলেন। হযরত হানজালা বদর যুদ্ধে যোগ দেন নি। এর কারণ জানা যায় না। তবে উহুদ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। আর এটাই ছিল তাঁর ইসলামী জীবনের প্রথম ও শেষ যুদ্ধ। তিনি স্ত্রী উপগত হয়ে ঘরে শুয়ে আছেন। এমন সময় ঘোষকের কণ্ঠ কানে গেলঃ ‘এক্ষুনি জিহাদে বের হতে হবে।’ জিহাদের ডাক শুনে ‘তাহারাতের’ (পবিত্রতা) গোসলের কথা ভুলে গেলেন। সেই অশুচি অবস্থায় কোষমুক্ত তরবারি হাতে উহুদের প্রান্তরে উপস্থিত হলেন। যুদ্ধ শুরু হলো। তিনি কুরাইশ নেতা আবু সুফইয়ান ইবন হারবের সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে লিপ্ত হলেন। তাকে কাবু করে তরবারির আঘাত করবেন, ঠিক সেই সময় নিকট থেকে শাদ্দাদ ইবন আসওয়াদ আল-লায়সী দেখে ফেলে এবং দ্রুত হানজালার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তরবারির এক আঘাতে তাঁর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। অনেকে বলেছেন, আবূ সুফইয়ান ও শাদ্দাদ দু’জনে একযোগে তাঁকে হত্যা করেন। তবে ‘রাওদুল আন্ফ’ গ্রন্থকার নাফে’ ইবন আবী নু’ঈম- মাওলা জা’উনা ইবন শা’উবকে হানজালার ঘাতক বলে উল্লেখ করেছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৭৫, ১২৩) বদর যুদ্ধে আবূ সুফইয়ানের পুত্র ‘হানজালা’ মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তাই উহুদে এই হানজালাকে হত্যার পর সে মন্তব্য করেঃ ‘হানজালার পরিবর্তে হানজালা।’ হযরত হানজালা রা. নামাক অবস্থায় শহীদ হন। শাহাদাতের পর ফিরিশতারা তাঁকে গোসল দেয়। তাই দেখে হযরত রাসূলে কারীম সা. সাহাবীদের বললেন, তোমরা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস কর তো ব্যাপার কি? হিশাম ইবন ’উরওয়া বর্ণনা করেছেন। রাসূল সা. হানজালার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হানজালার ব্যাপারটি কি? স্ত্রী বললেনঃ হানজালা নাপাক ছিল। আমি তাঁর মাথার একাংশ মাত্র ধুইয়েছি, এমন সময় জিহাদের ডাক তাঁর কানে গেল। গোসল অসম্পূর্ণ রেখেই সেই অবস্থায় বেরিয়ে গেলেন এবং শাহাদাত বরণ করলেন। একথা শুনে রাসূল সা. বললেনঃ এই জন্য আমিক ফিরিশতাদেরকে তাঁকে গোসল দিতে দেখেছি। (আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবার টীকা- ১/২৮১; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৫৪৪) আর এখান থেকৈই ‘গাসীলুল মালায়িকা’ (ফিরিশতাকুল কর্তৃক গোসলকৃত) লকব বা উপাধিতে ভূষিত হন। হযরত হানজালা মৃত্যুর সময় ’আবদুল্লাহ নামে এক ছেলে রেখে যান। হযরত রাসুলে কারীমের সা. মদীনায় আগমনের পর এই ’আবদুল্লাহর জন্ম হয় এবং রাসূলে কারীমের সা. ওফাতের সময় তাঁর বয়স হয় মাত্র সাত-আট বছর। পরিণত বয়সে তিনি পিতার সুযোগ্য উত্তরসুরী বলে নিজেকে প্রমাণ করেন। উমাইয়্যা শাসক ইয়াযিদ ইবন মু’য়াবিয়ার কলঙ্কজনক কর্মকান্ডের প্রতিবাদে তাঁর প্রতি কৃত ‘বাই’য়াত’ (আনুগত্যের অঙ্গীকার) প্রত্যাখ্যান তিনি হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন যুবায়রের রা. প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। ইয়াযীদের বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে। হযরত ’আবদুল্লাহ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে মদীনাবাসীদের সাথে নিয়ে নিজেই সেনাপতি হিসেবে আক্রমণকারীদের বাধা দেন। অসংখ্য মদীনাবাসী শাহাদাত বরণ করেন। একের পর এক হযরত ’আবদুল্লাহর আট পুত্র ইয়াযীদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হন। এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য হযরত ’আবদুল্লাহ স্বচক্ষে অবলোকন করেন। অবশেষে তিনি নিজেই অগ্রসর হন। উহুদে শাহাদাতপ্রাপ্ত পিতার রক্তরঞ্জিত পোশাক পরে তিনি শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং শাহাদাত বরণ করেন। এ ছিল হিজরী ৬৩ সনের জ্বিলহজ্জ মাসের ঘটনা। হযরত হানজালার পিতা ‘ফাসিক’ ছিলেন। আর এই ‘ফাসিক’ পিতার সন্তান হানজালা ‘তাকী’ (আল্লাহ ভীরু) উপাধি লাভ করেন। এর দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে তিনি কত উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। ইবন ’আসাকির বর্ণনা করেছেন, খলীফা ’উমার যখন লোকদের ভাতার ব্যবস্থা করেন তখন হানজালার ছেলে ’আবদুল্লাহর জন্য দুই হাজার দিরহাম নির্ধারণ করেন। হযরত তালহা তাঁর ভাইয়ের ছেলের হাত ধরে খলীফার নিকট নিয়ে গেলেন। খলীফা তাঁর জন্য কিছু কম অংক নির্ধারণ করলেন। তালহা বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন। আপনি এই আনসারীকে আমার ভাতীজার চেয়ে বেশি দিলেন? খলীফা বললেনঃ হ্যাঁ। কারণ, তাঁর পিতা হানজালাকে আমি উহুদে অসির নীচে এমনভাবে হারিয়ে যেতে দেখেছি যেমন একটি উট হারিয়ে যায়। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২১৮) একবার আনসারদের দুই গোত্র- আউস ও খাযরাজ নিজেদের গৌরব ও সম্মানের কথা বর্ণনা করছিল। তারা নিজ নিজ গোত্রের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নাম উচ্চারণ করল। আউস গোত্র সর্বপ্রথম উচ্চারণ করল হানজালা ইবন আবী আমিরের পুণ্যময় নামটি। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত। একবার আউস গোত্রের লোকেরা গর্ব করে বললঃ আমাদের আছে হানজালা- যাঁকে ফিরিশতারা গোসল দিয়েছেন; আসিম ইবন সাবিত- আল্লাহ যাঁর দেহ মৌমাছি ও ভীমরুলের দ্বারা মুশরিকদের হাত থেকে হিফাজত করেছিলেন; খুযায়মা ইবন সাবিত- যাঁর একার সাক্ষ্য দুইজনের সাক্ষ্যের সমান; আর আছে সা’দ ইবন ’উবাদা- যার মৃত্যুতে আল্লাহর ’আরশ কেঁপে উঠেছিল। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ১/৩৬১, আল-ইসতীয়াবঃ আল-ইসাবা টীকা- ১/২৮০-২৮২, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৭৫, ১২৩)

  • মু’য়াজ ইবন জাবাল (রা)

    মু’য়াজ ইবন জাবাল (রা)

    নাম মু’য়াজ, ডাকনাম আবু আবদির রহমান এবং লকব বা উপাধি ‘ইমামুল ফুকাহা, কানযুল ’উলামা ও রাব্বানিয়্যূল কুলূব।’ মদীনার খাযরাজ গোত্রের উদায় ইবন সা’দ শাখার সন্তান। অনেকে তাঁকে সালামা ইবন সা’দ শাখার সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন। মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেছেন, প্রকৃত পক্ষে তিনি ছিলেন বনু কুদা’য়া গোত্রের সন্তান, উদায় ইবন সা’দ গোত্রের নাম। এ গোত্রের লোকেরা তাঁকে নিজেদের গোত্রের লোক বলে দাবী করতো। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৭, আল-ইসাবা- ৪/৪২৭, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৬৪, উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৬) হিজরাতের ২০ বছর পূর্বে ৬০৩ খৃষ্টাব্দে ইয়াসরিবে (মদীনায়) জন্মগ্রহণ করেন। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬) তাঁর বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ সা’দ ইবন আলীর ছিল দুই ছেলে। তাদের নাম সালামা ও উদায়। সালামার বংশকে বলা হয় বনু সালামা। এই বংশে আবু কাতাদাহ, জাবির ইবন আবদিল্লাহ, কা’ব ইবন মালিক, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবন হারাম- এর মত বিখ্যাত সাহাবী জন্মগ্রহণ করেন। উল্লেখিত ব্যক্তিবৃন্দ ছাড়াও আরও বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির এই বংশের সাথে সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সালামার ভাই উদায়-এর বংশে রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের সময় শুধু এক মু’য়াজ-ই জীবিত ছিলেন এবং হিজরী ১৮ অথবা ১৯ সনে তাঁর মৃত্যুর সাথে এই বংশধারা চিরদিনের জন্য বিলীন হয়ে যায়। ইমাম সাম’য়ানী ‘কিতাবুল আনসাব’ গ্রন্থে হুসাইন ইবন মুহাম্মাদ ইবন তাহিরকে এই উদায়-এর বংশের লোক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এ তথ্য সঠিক নয়। কারণ নির্ভরযোগ্য বর্ণনাসমূহ দ্বারা একথা প্রমাণিত যে, ইসলামের প্রাথমিক পর্বে এই খান্দানের দুই ব্যক্তি জীবিত ছিলেন। তাঁদের একজন মু’য়াজ ইবন জাবাল এবং দ্বিতীয় জন তাঁরই ছেলে ’আবদুর রহমান। আর তাঁরা উভয়ে শামের ‘আমওয়াসের মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৬) বনু উদায়- এর বাসস্থান তাদের চাচাতো গোষ্ঠী বনু সালঅমের পাশে মসজিদুল কিবলাতাইন- এর ধারে কাছেই ছিল। হযরত মু’য়াজের বাড়ীটিও ছিল এখানে। হযরত মু’য়াজের পিতা জাবাল ইবন আমর এবং মাতা হিন্দা বিনতু সাহল আল-জুহানিয়্যা। বদরী সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনুল জাদ্দ (রা) তাঁর বৈপিত্রীয় ভাই। (তাবাকাত- ৩/৫৭১, ৫৮৩) মু’য়াজের ছেলের নাম ছিল আবদুর রহমান। এ জন্য তাঁকে আবু ’আবদির রহমান বলে ডাকা হতো। (তাবাকাত- ৩/৫৮৩) মক্কা থেকে মদীনায় প্রেরিত রাসূলুল্লাহর সা. দা’ঈ-ই-ইসলাম হযরত মুস’য়াব ইবন উমাইরের রা. হাতে নবুওয়াতের দ্বাদশ বছরে হযরত মু’য়াজ যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর বয়স ১৮ বছর। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৬) তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর পরবর্তী হজ্জ মওসুমে মুস’য়াব ইবন ’উমাইর মক্কায় চললেন। মদীনাবাসী নবদীক্ষিত মুসলমান ও মুশরিকদের একটি দলও হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে তাঁর সংগী হলো। হযরত মুয়াজও ছিলেন এই কাফিলার একজন সদস্য। মক্কার আকাবায় তাঁরা গোপনে রাসূলুল্লাহর সা. দীদার লাভ করে তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। এটা ছিল আকাবার তৃতীয় বা শেষ বাইয়াত। এই দলটি মক্কা থেকে ফিরে আসার পর মদীনার ঘরে ঘরে ইসলামের দা’ওয়াত ছড়িয়ে পড়ে। অল্প বয়স্ক মু’য়াজ যখন মক্কা থেকে ফিরলেন, ঈমানী আবেগে তাঁর অন্তর তখন ভরপুর। এখন কারও বাড়ী মূর্তি থাকাটা তাঁর নিকট অসহনীয়। মদীনায় ফিরে তিনি এবং তাঁর মত আরও কিছু যুবক সিদ্ধান্ত নিলেন তাঁরা প্রকাশ্যে বা গোপনে যেভাবেই হোক মদীনাকে প্রতীমামুক্ত করবেন। তাঁদের এই আন্দোলনের ফলে হযরত ’আমর ইবনুল জামূহ প্রতীমা পূজা ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। ’আমর ইবনুল জামূহ ছিলেন মদীনার বনু সালামা গোত্রের অতি সম্মানিত সরদার। অন্য নেতাদের মত তাঁরও ছিল একটি অতি প্রিয় কাঠের প্রতীমা। প্রতীমাটির নাম ছিল মানাত। এই প্রতীমাটির প্রতি ছিল ’আমরের অত্যধিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা। তিনি অতি যত্নসহকারে সুগন্ধি মাখিয়ে রেশমী কাপড় দিয়ে সেটি সব সময় ঢেকে রাখতেন। মক্কা থেকে ফেরা এই তরুণরা রাতের অন্ধকারে একদিন চুপে চুপে মূর্তিটি তুলে নিয়ে বনু সালামা গোত্রের ময়লা-আবর্জনা ফেলার গর্তে ফেলে দেয়। ইবন ইসহাক এই উৎসাহী তরুণদের তিনজনের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁরা হলেনঃ মু’য়াজ ইবন জাবাল, আবদুল্লাহ ইবন উনাইস ও সালামা ইবন গানামা। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৬৯৯) সকালে ঘুম থেকে উঠে ’আমর ইবন জামূহ যথাস্থানে প্রতীমাটি না পেয়ে খোঁজা-খুঁজি শুরু করলেন। এক সময় ময়লা-আবর্জনার স্তূপে প্রতীমাটি মুখ থুবড়ে পড়ে থাকতে দেখে ব্যথিত কণ্ঠে বলেনঃ তোমাদের সর্বনাশ হোক! গত রাতে আমাদের ইলাহ’র সাথে কারা এমন আচরণ করলো? তিনি প্রতীমাটি সেখান থেকে তুলে ধুলে মুছে পরিষ্কার করে আতর-সুগন্ধি লাগিয়ে আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। প্রতীমাকে সম্বোধন করে বললেনঃ ওহে মানাত, আমি যদি জানতাম, কারা তোমার সাথে এমন আচরণ করেছে! পরদিন রাতে আবার একই ঘটনা ঘটলো। সকালে ’আমর খুঁজতে খুঁজতে অন্য একটি গর্ত থেকে প্রতীমাটি উদ্ধার করে ধুয়ে মুছে আগের মত রেখে দেন। পরের রাতে একই ঘটনা ঘটলো। তিনিও আগের মত সেটি কুড়িয়ে এনে একই স্থানে রেখে দিলেন। তবে এ দিন তিনি প্রতীমাটির কাঁধে একটি তরবারি ঝুলিয়ে দিয়ে বলেনঃ ‘‘আল্লাহর কসম! তোমার সাথে কে বা কারা এমন আচরণ করছে, আমি জানিনে। তবে তুমি তাদের দেখেছো। হে মানাত, তোমার মধ্যে যদি কোন ক্ষমতা থাকে তুমি তাদের থেকে আত্মরক্ষা কর। এই থাকলো তোমার সাথে তরবারি।’’ রাত হলো। তরুণরা আজও এলো। তারা প্রতীমার কাঁধ থেকে তরবারি তুলে নিয়ে একটি মৃত কুকুরের সাথে সেটি বাঁধলো। তারপর প্রতীমাসহ কুকুরটি একটি নোংরা গর্তে ফেলে চলে গেল। ’আমর সকালে খুঁজতে বেরিয়ে মূর্তিটির এমন দশা দেখে তাকে লক্ষ্য করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। তার প্রথম লাইনটি এমনঃ ‘আল্লাহর কসম! তুমি যদি সত্যিই ইলাহ হতে তাহলে এমনভাবে কুকুর ও তুমি এক সাথে গর্তে পড়ে থাকতে না।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৩-৫৪) এভাবে ’আমর ইবন জামূহ মূর্তিপূজার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। (দ্রঃ সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ৭/১২২-১২৬, হায়াতুস সাহাবা- ১/২৩০, সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫২, ৪৫৩, ৬৯৯) হযরত মু’য়াজের ইসলাম গ্রহণের অল্পকাল পরে হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনায় হিজরাত করেন। এরপর উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। (তাবাকাত- ৩/৫৮৪, আল-আলাম- ৮/১৬৬) হযরত মু’য়াজ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় কুরআন মজীদ হিফজ করেন। রাসূলে কারীমের সা. জীবনকালে যে ছয় ব্যক্তি কুরআন সংয়গ্রহ ও সংরক্ষণ করেন তিনি তাঁদের অন্যতম। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬) রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় বনু সালামার মহল্লায় একটি মসজিদ নির্মিত হলে হযরত মু’য়াজ এই মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। একদিন তিনি ’ঈশার নামাযে সূরা বাকারাহ পাঠ করেন। পিছনে মুকতাদীদের মধ্যে ছিলেন কর্মক্লান্ত এক ক্ষেত মজুর। হযরত মু’য়াজের নামায শেষ করার আগেই তিনি নামায ছেড়ে চলে যান। নামায শেষে মু’য়াজ বিষয়টি জানতে পেরে মন্তব্য করেনঃ সে একজন মুনাফিক (কপট মুসলমান)। লোকটি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট মু’য়াজের বিরুদ্ধে নালিশ জানালো। রাসূলুল্লাহ সা. মু’য়াজকে ডেকে বললেনঃ মুয়াজ! তুমি কি মানুষকে ফিতনায় ফেলতে চাও? তারপর তিনি বলেনঃ ছোট ছোট সূরা পাঠ করবে। কারণ, তোমার পিছনে বৃদ্ধ, দুর্বল ও ব্যস্ত লোকও থাকে। তাদের সবার কথা তোমার স্মরণে থাকা উচিত। (বুখারী- ১/৯৮) হিজরী নবম সনে হযরত রাসূলে কারীম সা. তাবুক অভিযান শেষ করে সবে মাত্র মদীনায় ফিরেছেন। এমন সময় রমজান মাসে ইয়ামনের হিময়ার গোত্রের শাসকের দূত মদীনায় খবর নিয়ে আসে যে, ইয়ামনবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ খবর পেয়ে রাসূল সা. সেখানকার আমীর হিসাবে মু’য়াজ ইবন জাবালকে মনোনীত করেন। আমীর মনোনীত হওয়ার পূর্বে হযরত মু’য়াজের সকল সহায় সম্পত্তি ঋণের দায়ে বিক্রী হয়ে গিয়েছিল। হযরত জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ বলেনঃ চেহারা-সুরৎ, স্বভাব-চরিত্র ও দানশীলতার দিক দিয়ে মু’য়াজ ছিলেন সর্বোত্তম লোকদের অন্যতম। দরায হস্তের কারণে তিনি প্রচুর ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পাওনাদাররা তাগাদা দিতে শুরু করলে কিছুদিন তিনি বাড়ীতে লুকিয়ে থাকেন। তারা তাদের পাওনা আদায় করে দেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহকে সা. অনুরোধ করলো। রাসূল সা. মু’য়াজকে ডাকলেন। পাওনাদার হাজির হলো। তাঁরা বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, মু’য়াজের নিকট থেকে আমাদের পাওনা আদায় করে দিন। রাসূল সা. মু’য়াজের দুর্দশা দেখে পাওনাদারদের বললেনঃ যে তার পাওনা মাফ করে দেবে আল্লাহ তার ওপর রহমত বর্ষণ করবেন। রাসূলুল্লাহর সা. এ কথার পর কিছু পাওনাদার তাদের দাবী ছেড়ে দেয়। তবে অনেকে দাবী ছাড়তে নারাজি প্রকাশ করে। তখন রাসূল সা. বললেনঃ মু’য়াজ, তুমি ধৈর্য ধর। তারপর তিনি মু’য়াজের সকল সম্পদ পাওনাদারদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। তাতেও তার সব ঋণ পরিশোধ হলো না। তখন তিনি পাওনাদারদের বললেনঃ এর অতিরিক্ত তোমরা পাবেনা, এই গুলিই নিয়ে যাও। রাসূলুল্লাহর সা. দরবার থেকে হযরত মু’য়াজ রিক্ত হস্তে বনু সালামার দিকে ফিরে গেলেন। সেখানে এক ব্যক্তি বললোঃ আবু আবদির রহমান, তুমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট কিছু সাহায্য চাইলে না কেন? আজ তো তুমি একেবারে কপর্দকহীন হয়ে পড়েছ। মু’য়াজ বললেনঃ চাওয়া আমার স্বভাব নয়। মু’য়াজের কথা রাসূলুল্লাহর সা. স্মরণ ছিল। একদিন পর তিনি মু’য়াজকে ডাকলেন এবং তাঁকে ইয়ামনে আমীর হিসাবে নিযুক্তির কথা জানিয়ে বললেনঃ আশা করা যায় আল্লাহ তোমার ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন এবং তোমার ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করবেন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২১, তাবাকাত- ৩/৫৮৪) যদিও হযরত মু’য়াজের আমীর হওয়ার যোগ্যতার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর সা. পূর্ণ আস্থা ছিল, তবুও তাঁকে ইয়ামনে পাঠানোর পূর্বে একটি পরীক্ষা নেওয়া উচিত মনে করলেন। তিনি মু’য়াজকে ডেকে প্রশ্ন করলেনঃ – আচ্ছা, তুমি ফায়সালা করবে কিভাবে? – কুরআনের দ্বারা। – যদি এমন কোন বিষয় আসে যার সমাধান কুরআনে না পাও, তখন কি করবে? – আল্লাহর রাসূলের সুন্নাতের দ্বারা ফায়সালা করবো। – যদি এমন কোন বিষয়ের সম্মুখীন হও যার সমাধান কুরআন অথবা সুন্নাতে পাচ্ছ না, তখন কি করবে? – আমি নিজেই ইজতিহাদ করে ফায়সালা করবো। হযরত মু’য়াজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। তাঁর জবাবে রাসূল সা. সন্তুষ্ট হয়ে বললেনঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর রাসূলের রাসূলকে (দূত) এমন জিনিসের তাওফীক বা ক্ষমতা দান করেছেন যা তাঁর রাসূলের পছন্দ। (আল-ইসতী’য়াব; আল-ইসাবার পার্শ্বটীকা- ৪/৪৫৮, তাবাকাত- ২/১৪৭-১৪৮) মু’য়াজের পরীক্ষা শেষ করে রাসূল সা. ইয়ামানবাসীদের উদ্দেশ্যে একটি পত্র লেখেন। তাতে হযরত মু’য়াজের স্থান ও মর্যাদা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬) তিনি লেখেনঃ ‘ইন্নি বা’য়াস্তু লাকুম খায়রা আহলী-’- আমি আমার সর্বোত্তম আহল বা পরিজনকে তোমাদের নিকট পাঠালাম। তিনি আরও লিখলেন, তোমরা মু’য়াজ ও অন্য লোকদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে। সাদাকা ও জিযিয়ার অর্থ তার নিকট জমা করবে। আমি মু’য়াজ ইবন জাবালকে ইয়ামনে বসবাসরত সকলের ওপর আমীর নিয়োগ করছি। তাকে সন্তুষ্ট রাখবে এবং এমন যেন না হয় যে সে তোমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে। সফরের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে হযরত মু’য়াজ গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে। সেখানে আরও লোক ছিল। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে বিদায় নেন। মু’য়াজ উটের ওপর সাওয়ার ছিলেন, আর তাঁর পাশে রাসূল সা. পায়ে হেঁটে চলছিলেন। দুই জনের মধ্যে কিছু কথাবার্তাও হচ্ছিল। রাসূল সা. বললেনঃ মু’য়াজ তোমার দায়িত্ব অনেক। কেউ কিছু হাদিয়া দিলে তুমি তা গ্রহণ করবে। আমি তোমাকে তা গ্রহণের অনুমতি দিচ্ছি। বিদায়ের পূর্ব মুহূর্তে রাসূল সা. বললেনঃ ‘সম্ভবতঃ তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না। এরপর তুমি মদীনায় ফিরে আমার স্থলে আমার কবর ও মসজিদ যিয়ারত করবে।’ সাথে সাথে মু’য়াজ কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। রাসুল সা. বললেনঃ ‘কেঁদো না। কান্না শয়তানী কাজ। যাও আল্লাহ তোমাকে সব রকম বিপদ-আপদ থেকে হিফাজত করুন।’ একথা বলে রাসূল সা. মু’য়াজকে ছেড়ে দেন। মু’য়াজ অত্যন্ত ব্যথা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে মদীনার দিকে তাকিয়ে বলেনঃ মুত্তাকীরাই (খোদাভীরু) আমার নিকটতম মানুষ- তা তারা যে কেউ হোক না কেন এবং যেখানেই থাকুক না কেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৩৬) হযরত মু’য়াজ ইয়ামনে মাত্র দুই বছর ছিলেন। হিজরী নবম সনে ’আমীরের দায়িত্ব নিয়ে ইয়ামনে যান এবং হিজরী একাদশ সনে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে স্বেচ্ছায় মদীনায় ফিরে আসেন। হযরত মু’য়াজ ইয়ামন যাওয়ার কিছুদিন পর রাসূল সা. ইনতিকাল করেন এবং হযরত আবু বকর রা. খলীফা হন। তিনি আমীরে হজ্জের দায়িত্ব দিয়ে ’উমারকে মক্কায় পাঠালেন। এদিকে হযরত মু’য়াজও হজ্জের উদ্দেশ্যে ইয়ামন থেকে সরাসরি তাঁর লাটবহর সহ মক্কায় পৌঁছলেন। মিনায় দুইজনের সাক্ষাৎ, কুশল বিনিময় ও কোলাকুলি হলো। মু’য়াজের সাথে তাঁর অনেকগুলি দাস ও লাটবহর দেখে ’উমার জিজ্ঞেস করলেনঃ – আবু ’আবদির রহমান, এসব কি? – এগুলি আমার। আমি অর্জন করেছি। – কিভাবে অর্জন করলে? – লোকেরা আমাকে হাদিয়া দিয়েছে। – তুমি আবু বকরকে এসব কথা জানাবে এবং সবকিছুই তাঁর হাতে তুলে দেবে। যদি তিনি তোমাকে কিছু দান করেন, তুমি তা গ্রহণ করবে। – আমি তোমার কথা মানবো না। মানুষ আমাকে দান করেছে, আর আমি তা আবু বকরের হাতে তুলে দেব? হযরত ’উমার রা. মদীনায় ফিরে খলীফাকে পরামর্শ দিলেন, মু’য়াজের জীবন ধারণের মত কিছু অর্থ তাঁকে দিয়ে অবশিষ্ট সবকিছু বাইতুল মালে জমা করা হোক। আবু বকর জবাব দিলেনঃ তাঁকে ’আমীর নিয়োগ করেন খোদ রাসূলুল্লাহ সা.। সে যদি নিজেই জমা দিতে ইচ্ছা করে এবং আমার কাছে নিয়ে আসে, আমি গ্রহণ করবো। অন্যথায় এক কপর্দকও গ্রহণ করবো না। হযরত ’উমার খলীফার জবাব পেয়ে আবার মু’য়াজের কাছে যান এবং পুনরায় তাঁকে জমা দেওয়ার তাকিদ দেন। এবার মু’য়াজ বলেনঃ আমাকে রাসূল সা. ইয়ামনে শুধু এই জন্য পাঠান যে, আমি যেন সেখানে থেকে নিজের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারি। আমি কিছুই দেব না। হযরত ’উমার নীরবে উঠে চলে আসলেন। তবে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। হযরত মু’য়াজ তো ’উমারকে ফিরিয়ে দিলেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য সাহায্যে তিনি ’উমারের সাথে একমত পোষণ করেন। মু’য়াজ রাতে ঘুমিয়ে গেলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সোজা ’উমারের নিকট গিয়ে বললেনঃ আপনার কথা মানা ছাড়া আমার আর উপায় নেই। রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমাকে জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর আপনি আমাকে টেনে ধরে রেখেছেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে মু’য়াজ পানিতে ডুবে যাচ্ছেন এবং ’উমার তাঁকে উদ্ধার করছেন। তারপর মু’য়াজ সকল দাস-দাসী সংগে করে খলীফা আবু বকরের নিকট হাজির হন এবং পুরো ঘটনা বর্ণনার পর বলেন, আমার কাছে যা কিছু আছে সবই এনে হাজির করছি। আবু বকর রা. বললেনঃ আমি তোমার নিকট থেকে কিছুই গ্রহণ করবো না, সবই তোমাকে হিবা বা দান করলাম। কারণ, আমি রাসূলকে সা. বলতে শুনেছিঃ ‘আশা করা যায় আল্লাহ তোমার ক্ষতি পুরণ করে দেবেন।’ অন্য একটি বর্ণনা মতে আবু বকর তাঁর নিকট থেকে কিছু সম্পদ গ্রহণ করে তাঁর অবশিষ্ট ঋণ পরিশোধ করেন এবং বাকী সম্পদ সবই তাঁকে দান করেন। হযরত ’উমার তখন মু’য়াজকে লক্ষ্য করে বলেনঃ এখন সবই তোমার কাছে রাখ। এখন তুমি অনুমতি প্রাপ্ত। হযরত মু’য়াজ দাসদের সংগে করে বাড়ী ফিরলেন। তাদের সাথে জামায়াতে নামায আদায় করলেন। সালাম ফিরিয়ে তাদের জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা কার জন্য নামায আদায় করলে? তারা বললোঃ আল্লাহর জন্য। মু’য়াজ বললেনঃ তাহলে তোমরা মুক্ত, তোমরা তাঁরই জন্য। (তাবাকাত- ৩/৫৮৬-৫৮৮, হায়াতুস সাহাবা- ১৫২-১৫৪) রাসূলুল্লাহ সা. মু’য়াজকে ইয়ামনে পাঠালেন। একদিকে তিনি ইয়ামনে গভর্ণর, অন্যদিকে সেখানকার তাবলীগ ও দ্বীনী তা’লীমের দায়িত্বশীলও। বিচারের দায়িত্ব ছাড়াও দ্বীনী দায়িত্বও পালন করতেন। তিনি লোকদের কুরআন শিক্ষা দিতেন, ইসলামী বিধি-বিধানের প্রশিক্ষণ দিতেন। তিনি ইয়ামনে থাকাকালীন একবার হাওলান গোত্রের এক মহিলা তাঁর নিকট এলো। তার ছিল বারোটি ছেলে। তবে সবচেয়ে ছোট ছেলেটিও তখন শ্মশ্রু মন্ডিত। এর দ্বারাই অনুমান করা যায় মহিলার বয়স কত হতে পারে। স্বামীকে একা বাড়ীতে রেখে বারোটি ছেলের সকলকে সংগে করে সে এসেছে। দুই ছেলে তার দুইটি বাহু ধরে চলতে সাহায্য করেছে। মহিলা মু’য়াজকে প্রশ্ন করলোঃ – আপনাকে কে পাঠিয়েছে? – রাসূলুল্লাহ সা.। – আপনি তাহলে রাসূলুল্লাহর সা. নির্বাচিত প্রতিনিধি? আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে চাই। – করুন। – স্ত্রীর ওপর স্বামীর হক বা অধিকার কতটুকু? – যথাসম্ভব আল্লাহকে ভয় করে তার আনুগত্য করবে। – আল্লাহর কসম, আপনি একটু ঠিক ঠিক বলবেন। – আপনি এতটুকুতে সন্তুষ্ট নন? – ছেলেদের বাবা বৃদ্ধ হয়েছে, আমি তাঁর হক কিভাবে আদায় করবো? – আপনি তার দায়িত্ব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারেন না। যদি কুষ্ঠ রোগে তার দেহ পঁচে ফেটে যায়, রক্ত ও পুঁজ ঝরতে থাকে, আর আপনি তাতে মুখ লাগিয়ে চুষে নেন, তবুও তার হক পুরোপুরি আদায় হবে না। (মুসনাদ- ৫/২৩৯, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৫৯০-৯০, সীয়ারে আনসার- ২/১৬৬) হযরত রাসূলে কারীম সা. গোটা ইয়ামনকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করেন; সান’য়া, কিন্দাহ, হাদরামাউত, জানাদ, খুবাইব। ইয়ামনের রাজধানী ছিল জানাদ, আর এখানেই থাকতেন হযরত মু’য়াজ। তিনিই জানাদের জামে’ মসজিদটির নির্মাতা। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৩০) অবশিষ্ট চারটি স্থানে নিম্নলিখিত ব্যক্তিবর্গ শাসক নিযুক্ত হনঃ সান’য়া- হযরত খালিদ ইবন সা’ঈদ, কিন্দাহ- হযরত মুহাজির ইবন আবী উমাইয়্যা, হাদরামাউত- হযরত যিয়াদ ইবন লাবীদ এবং খুবাইদ ও উপকূলীয় এলাকায়- হযরত আবু মূসা আল-আশয়ারী রা.। উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ নিজ নিজ এলাকায় সাদাকা, জিযিয়া ইত্যাদি আদায় করে হযরত মু’য়াজের নিকট পাঠিয়ে দিতেন। রাজকোষের পূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন হযরত মু’য়াজ। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৩০) হযরত মু’য়াজ বিভিন্ন সময়ে তাঁর অধীনস্থ শাসকদের এলাকাসমূহ ঘুরে ঘুরে তাঁদের বিচার ও সিদ্ধান্তসমূহ দেখাশুনা করতেন। প্রয়োজনবোধে তিনি নিজেও মুকাদ্দামার শুনানী করতেন। একবার হযরত আবু মূসার অঞ্চলে গিয়ে এভাবে একটি মুকাদ্দামার ফায়সালা করেন। এসব সফরে তিনি তাঁবুতে অবস্থান করতেন। আবু মুসার এখানেও তাঁর জন্য একটি তাঁবু নির্মাণ করা হয়। তিনিও আবু মূসা দুইজনই পাশাপাশি তাঁবুতে অবস্থান করেন। (বুখারী- ২/৬৩৩) হযরত রাসূলে কালীম সা. যখন মু’য়াজকে ইয়ামনে পাঠান তখন তাঁকে একটি লিখিত নির্দেশনামা দান করেন। তাতে গনীমাত, খুমুস, সাদাকাত, জিযিয়াসহ বিভিন্ন বিধানের বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। হযরত মু’য়াজ সব সময় তারই আলোকে কাজ করতেন। একবার এক ব্যক্তি একপাল গরু নিয়ে এলো। গরুগুলি সংখ্যায় ছিল তিরিশটি। রাসূল সা. তাঁকে তিরিশটি গরুতে একটি বাছুর নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ কারণে হযরত মু’য়াজ বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে না জেনে কিছুই গ্রহণ করবো না। কারণ এ ব্যাপারে রাসূল সা. আমাকে কিছুই বলেননি। এ দ্বারা বুঝা যায় রাসূলুল্লাহর সা. ওয়ালীগণ দুনিয়ার অন্যান্য শাসকদের মত অত্যাচারী ছিলেন না। রক্ষক ও রক্ষিতের মাঝে যে সম্পর্ক ইসলাম ঘোষণা করেছিল, তারা সব সময় তা স্মরণে রাখতেন। আর রক্ষকের ওপর শরীয়াত যেসব দায়িত্ব অর্পন করেছে তারা তা কঠোর ভাবে অনুসরণ করতেন। বিচার ও সিদ্ধান্তের সময়ও জনগণের অধিকার যাতে খর্ব না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। তাদের আদালত সমূহে সর্বদা সত্য ও সততার বিজয় ছিল। এক ইয়াহুদী মারা গেল। একমাত্র ভাই রেখে গেল উত্তরাধিকারী। সেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বিষয়টি হযরত মু’য়অজের ’আদালতে উত্থাপিত হলো। তিনি ভাইকে উত্তরাধিকার দান করেন। (মুসনাদ- ৫/২৩০) হযরত মু’য়াজ ছিলেন জীবনের প্রথম থেকে অতি বুদ্ধিমান। রাসূল সা. মদীনায় আগমনের পর তিনি তাঁর সঙ্গ অবলম্বন করেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যে ফায়েজে নববীর বরকতে ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ মডেলের রূপ লাভ করেন এবং বিশিষ্ট সাহাবীদের মধ্যে পরিগণিত হন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে এত মুহাব্বত করতেন যে, অধিকাংশ সময় তাঁকে নিজেহর বাহনের পিছনে বসার সুযোগ দিয়ে নানা রকম ইলম ও মা’রেফাত শিক্ষা দিতেন। একবার তিনি রাসূলুল্লাহর সা. বাহনের পিছনে বসেছিলেন। রাসূল সা. ডাকলেঃ মু’য়াজ। তিনি জবাব দিলেনঃ লাব্বাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ ও সা’দাইকা- হাজির ইয়া রাসূলুল্লাহ! রাসূল সা. আবার ডাকলেনঃ মু’য়াজ। তনি অত্যন্ত আদব ও শ্রদ্ধার সাথে জবাব দিলেন। এভাবে রাসূল সা. তিনবার ডাকলেন, আর মু’য়াজও প্রতিবার সাড়া দিলেন। তারপর রাসূল সা. বললেনঃ ‘যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে কালিমা-ই-তাওহীদ পাঠ করে আল্লাহ তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম করে দেন।’ মু’য়াজ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি মানুষের কাছে এই সুসংবাদ কি পৌঁছে দেব? তিনি বললেনঃ না। কারণ, মানুষ আমল ছেড়ে দেবে। (বুখারী- ১/২৪) হযরত মু’য়াজের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. স্নেহের এত আধিক্য ছিল যে, তিনি নিজে কোন প্রশ্ন না করলে রাসুল সা. বলতেন, তুমি একাকী পেয়েও আমার কাছে কিছু জিজ্ঞেস করছো না কেন? একবার মু’য়াজ রাসূলুল্লাহর সা. সাথে খচ্চরের ওপর সাওয়ার ছিলেন। রাসূল সা. চাবুক দিয়ে খচ্চরের পিঠে মৃদু আঘাত করে বলেনঃ ‘তুমি কি জান বান্দার ওপর আল্লাহর হক কি?’ মু’য়াজ বললেনঃ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। রাসূল সা. বললেনঃ ‘বান্দা তাঁর ইবাদাত করবে এবং শিরক থেকে বিরত থাকবে।’ কিছুদূর যাওয়ার পর আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ আচ্ছা বলতে পার, আল্লাহর নিকট বান্দা রহক বা অধিকার কি? মু’য়াজ বললেনঃ এ ব্যাপারে তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই বেশী জানেন। বললেনঃ ‘তিনি তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।’ (মুসনাদ- ৫/২৩৮) এভাবে হযরত মু’য়াজ সর্বদা রাসূলুল্লাহর সা. স্নেহ ও আদর লাভে ধন্য হয়েছেন। উঠতে বসতে সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহর সা. নিকট শিক্ষার সুযোগ লাভ করেছেন। একবার তো দরযায় অপেক্ষমান দেখতে পেয়ে রাসুল সা. তাঁকে একটি জিনিস শিখিয়ে দিলেন। আর একবার বললেনঃ আমি কি তোমাকে জান্নাতের দরযার কথা বলে দেব? বললেনঃ হাঁ। ইরশাদ হলঃ ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পাঠ করবে। (মুসনাদ- ৫/২৩৮) একবার এক সফরে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গী ছিলেন। একদিন সকালে যখন সৈন্যরা লক্ষ্যস্থলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তখন তিনি রাসূলুল্লাহর সা. কাছে বসা। তিনি আবদার জানালেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে এমন কোন আমল শিখিয়ে দিন যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যায় এবং জাহান্নাম থেকে দূরে রাখে। রাসূল সা. বললেনঃ ‘তুমি একটা কঠিন বিষয় জানতে চেয়েছ। তবে আল্লাহ যাকে তাওফীক বা সামর্থ দান করেন তার জন্য সহজ। শিরক করবে না, ইবাদাত করবে, নামায আদায় করবে, যাকাত দান করবে, রমজান মাসে সিয়াম পালন করবে এবং হজ্জ আদায় করবে।’ তিনি আরও বলেনঃ ‘কল্যাণের কয়েকটি দ্বার আছে। আমি তোমাকে বলছি, শোনঃ সাওম- যা ঢালের কাজ করে, সাদাকা- যা পাপের আগুনকে পানির মতো নিভিয়ে দেয় এবং যে নামায রাতের বিভিন্ন অংশে আদায় করা হয়। এরপর তিনি নীচের আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ ‘তারা শয্যা ত্যাগ করে তাদের প্রতিপালককে ডাকে আশায় ও আশংকায় এবং আমি তাদেরকে যে রিয্ক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।’ (সূরা সাজদা- ১৬) তিনি আরও বলেনঃ ‘ইসলামের মাথা, খুঁটি ও চূড়ার কথা বলছি। মাথা ও খুঁটি হচ্ছে নামায এবং চূড়া হচ্ছে জিহাদ।’ তারপর বললেনঃ ‘এইসব জিনিসের মূল হচ্ছে একটি মাত্র জিনিস। আর তা হলো ‘জিহবা’। তিনি নিজের ‘জিহবা’ বের করে হাত দিয়ে স্পর্শ করে বলেন, একে নিয়ন্ত্রণে রাখবে।’ মু’য়াজ প্রশ্ন করলেনঃ এই যে আমরা যা কিছু বলি, তার সব কিছুরই কি জবাবদিহি করতে হবে? বললেনঃ ‘মু’য়াজ! তোমার মার সর্বনাশ হোক। অনেকে শুধু এর জন্যই জাহান্নামে যাবে।’ (মুসনাদ- ৫/২৩১) একবার তো রাসূল সা. মু’য়াজকে দশটি বিষয়ের অসীয়াত করলেন। ১. শিরক করবে না। তার জন্য কেউ যদি তোমাকে হত্যা করে অথবা আগুনে পুড়িয়েও মারে, তবুও না। ২. মাতা-পিতাকে কষ্ট দেবে না। তারা যদি তোমাকে তোমার সন্তান-সন্ততি ও বিষয়-সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, তবুও। ৩. ফরজ নামায ইচ্ছাকৃতভাবে কক্ষণও তরক করবে না। যে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তরক করে আল্লাহ তার জিম্মাদারী থেকে অব্যাহতি নিয়ে নেন। ৪. মদ পান করবে না। কারণ, এ কাজটি সকল অশ্লীলতার মূল। ৫. পাপ কর্মে লিপ্ত হবে না। পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তির ওপর আল্লাহর ক্রোধ বৈধ হয়ে যায়। ৬. জিহাদের ময়দান থেকে পালাবে না। যদি সকল সৈন্য রক্ত রঞ্জিত ও ধুলিমলিন হয়ে যায় এবং ব্যাপকভাবে মৃত্যুবরণ করে, তবুও না। ৭. মহামারি আকারে কোন রোগ-ব্যধি দেখা দিলে অটল থাকবে। ৮. নিজের সন্তানদের সাথে সদ্ব্যবহার করবে। ৯. তাদেরকে সর্বদা আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেবে। ১০. তাদেরকে খাওফে খোদা (আল্লাহর ভয়) শিক্ষা দেবে। হযরত রাসূলে কারীম সা. একবার মু’য়াজকে পাঁচটি জিনিসের তাকিদ দিয়ে বলেছিলেনঃ যে এই ’আমলগুলি করে আল্লাহ তার জামিন হয়ে যান। ১. অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া, ২. জানাযার সাথে চলা, ৩. জিহাদে বের হওয়া, ৪. শাসককে ভীতি প্রদর্শন অথবা সম্মান দেখানোর জন্য যাওয়া, ৫. ঘরে চুপচাপ বসে থাকা- যে যেখানে সে নিরাপদ থাকে এবং মানুষও তার থেকে নিরাপদ হয়ে যায়। রাসুল সা. তাঁকে নৈতিক শিক্ষা দেন এভাবেঃ ‘মু’য়াজ! একটি মন্দ কাজ করার পর একটি নেক কাজ কর। নেক কাজ মন্দ কাজটি বিলীন করে দেয়। আর মানুষের সামনে সর্বোত্তম নৈতিকতার দৃষ্টিতে উপস্থাপন কর।’ (মুসনাদ- ৫/২৩৮) তিনি মু’য়াজকে এ কথাও শিক্ষা দেনঃ মাজলুম বা অত্যাচারিতের বদ দু’আ থেকে দূরে থাকবে। কারণ, সেই বদ দু’আ ও আল্লাহর মাঝে কোন প্রতিবন্ধক থাকে না। (বুখারী) রাসূল সা. যখন তাঁকে ইয়ামানের আমীর করে পাঠান তখন বলেছিলেনঃ ‘মু’য়াজ! ভোগ-বিলাসিতা থেকে দূরে থাকবে। কারণ, আল্লাহর বান্দা কক্ষণও আরামপ্রিয় ও বিলাসী হতে পারে না।’ (মুসনাদ-৫/২৪৩) রাসূল সা. তাঁকে সামাজিক জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন এভাবেঃ ‘মানুষের নেকড়ে হচ্ছে শয়তান। নেকড়ে যেমন দলছুট বকরীকে ধরে নিয়ে যায় তেমনি শয়তানও এমন মানুষের ওপর প্রভূত্ব লাভ করে যে জামা’য়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। সাবধান! সাবধান! কক্ষণও বিচ্ছিন্ন থাকবে না। সর্বদা জামা’য়াতের সাথে থাকবে। (মুসনাদ- ৫/২৪৩) ইসলামের তাবলীগ ও দা’ওয়াত সম্পর্কে রাসূল সা. তাকে বলেনঃ ‘মু’য়াজ! তুমি যদি কেবলমাত্র একজন মুশরিককেও মুসলমান বানাতে পার তাহলে সেটা হবে তোমার জন্য দুনিয়ার সবকিছু থেকে উত্তম কাজ।’ (মুসনাদ- ৫/২৩৮) এমন পবিত্র চিন্তা ও মহোত্তম শিক্ষা লাভ করেছিলেন হযরত মু’য়াজ। একারণে মহান সাহাবী হযরত ইবন মাসউদ তাঁকে শুধু একজন ব্যক্তি নয় বরং একটি উম্মাতই মনে করতেন। তিনি বলেনঃ ‘মু’য়াজ ছিলেন সরল-সোজা একটি আল্লাহ অনুগত উম্মাত। তিনি কখনও মুশরিকদের কেউ ছিলেন না।’ ফারওয়া আল-আশজা’ঈ তাঁকে বললেনঃ ‘এমন কথা তো আল্লাহ তা’আলা ইবরাহীম আ. সম্পর্কেই বলেছেন।’ ইবন মাস’উদ আবারও তাঁর কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। ফারওয়া আল-আশজা’ঈ বলেনঃ ‘আমি ইবন মাস’উদকে তাঁর কথার ওপর অটল থাকতে দেখে চুপ থাকলাম। তারপর তিনিই আমাকে প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কি জান ‘উম্মাত’ মানে কি, বা ‘কানিত’ কাকে বলে? বললামঃ আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি বললেন, ‘উম্মাত’ হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি মঙ্গলকে জানেন এবং যার ইকতিদা ও অনুসরণ করা যায়। আর ‘কানিত’ বলে আল্লাহর অনুগত ব্যক্তিকে। এই অর্থে মু’য়াজ ছিলো যথার্থই মঙ্গল বা কল্যাণের শিক্ষাদানকারী এবং আল্লাহ ও রাসূলের সা. অনুগত ব্যক্তি। (আল-ইসতী’য়াব; আল-ইসাবা- ৪/৩৬১, তাহজীবুল আসমা- ২/১০০) দ্বিতীয় খলীফা হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালেই মজলিসে শূরা প্রকৃতপক্ষে পূর্ণরূপ লাভ করে। তবে প্রথম খলীফার যুগেই তার একটি কাঠামো তৈরী হয়ে গিয়েছিল। ইবন সা’দের বর্ণনা মতে হযরত আবু বকর রা. খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যাঁদের সাথে পরামর্শ করতেন তাঁদের মধ্যে মু’য়াজও ছিলেন। হযরত ’উমারের রা. খিলাফতকালে যখন মজলিসে শূরার নিয়মিত অধিবেশন বসতো তখনও মু’য়াজ সদস্য ছিলেন। (কানযুল ’উম্মাল- ১৩৪) হযরত ’উমারের খিলাফতকালে শামের ওয়ালী ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান খলীফাকে লিখলেন কিছু কুরআনের মু’য়াল্লিম পাঠানোর জন্য। রাসূলুল্লাহর সা. যুগে যাঁরা কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন এমন পাঁচ ব্যক্তিকে খলিফা ডাকলেন। তাঁরা হলেনঃ মু’য়াজ ইবন জাবাল, ’উবাদা ইবনুস সামিত, আবু আইউব আল-আনসারী, উবাই ইবন কা’ব ও আবু দারদা। খলীফা তাঁদেরকে বললেনঃ শামবাসী ভাইয়েরা এমন কিছু লোক পাঠানোর অনুরোধ করেছে যাঁরা তাদেরকে কুরআনের তা’লীম ও দ্বীনের তারবিয়াত দান করবেন। এ ব্যাপারে আপনাদের পাঁচ জনের যে কোন তিনজন আমাকে সাহায্য করুন। আপনারা ইচ্ছা করলে লটারীর মাধ্যমেও তিন জনের নাম নির্বাচন করতে পারেন। অন্যথায় আমিই তিন জনকে বেছে নিব। তাঁরা বললেনঃ লটারী কেন? আবু আইউব একজন বৃদ্ধ মানুষ, আর উবাইতো অসুস্থ। বাকী থাকলাম আমরা তিন জন। ’উমার রা. তাদেরকে হিমস, দিমাশ্ক ও ফিলিস্তিতে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। মু’য়াজ গেলেন ফিলিস্তিনে। (সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা- ৭/১৩২-১৩৪) বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা একথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, প্রথম খলীফা আবু বকরের রা. যুগেই হযরত মু’য়াজ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য শামে চলে যান। হযরত ’উমার রা. যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তিনি সিরিয়ার এক ফ্রন্টে যুদ্ধরত। সেখানে থেকে তিনি ও আবু ’উবাইদা সমতা ও ন্যায় বিচারের উপদেশ দান করে খলীফাকে একটি পত্র লেখেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১৩১) খলীফা ’উমারের খিলাফতকালে ইসলামী বিজয়ের প্রবল প্লাবন শামের ওপর দিয়েই বয়ে চলে। হযরত মু’য়াজও একজন সৈনিক হিসাবে রণক্ষেত্রে চরম বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রকাশ করেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ফলে হযরত মু’য়াজের মধ্যে বিচিত্রমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তাঁর মধ্যে দেখা দেয় বহুবিধা যোগ্যতা। তিনি হন একাধারে শরী’য়াতের মুফতী, মজলিসে শূরার সদস্য, কুরআন ও হাদীসের শিক্ষক, প্রদেশের ওয়ালী, দূত, সাহসী সেনাপতি, বিজয়ী যোদ্ধা ও যাকাত উসূলকারী ইত্যঅদি। দৌত্যগিরির দায়িত্ব যখন তাঁর ওপর অর্পিত হলো তিনি অতি দক্ষতার সাথে তা পালন করলেন। শামের ‘ফাহল’ নামক স্থানে যুদ্ধ প্রস্তুতি চলছিল, এমন সময় প্রতিপক্ষ রোমান বাহিনী সন্ধির প্রস্তাব দিল। সেনাপতি আবু ’উবাইদা আলোচনার জন্য মু’য়াজকে নির্বাচন করলেন। মু’য়াজ চললেন রোমান সেনা ছাউনীতে। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন, দরবার অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে। একটি তাঁবু খাটানো হয়েছে যার অভ্যন্তরে সোনালী কারুকাজ করা গালিচা বিছানো। হযরত মু’য়াজ ভিতরে না ঢুকে থমকে বাইরে দাঁড়িয়ে গেলেন। একজন খৃষ্টান সৈনিক এগিয়ে এসে বললোঃ আমি ঘোড়াটি ধরছি, আপনি ভিতরে যান। মু’য়াজ বললেনঃ আমি এমন শয্যায় বসিনা যা দরিদ্র লোকদের বঞ্চিত করে তৈরী হয়েছে। একথা বলে তিনি মাটির ওপর বসে পড়লেন। খৃষ্টানরা দুঃখ প্রকাশ করে বললোঃ আমরা আপনাকে সম্মান করতে চেয়েছিলাম; কিন্তু আপনি তা অবহেলা করলেন। হযরত মু’য়াজ হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেনঃ আমার এমন সম্মানের প্রয়োজন নেই। যদি মাটিতে বসা দাসদের অভ্যাস হয় তা হলে আমার চেয়ে আল্লাহর বড় দাস আর কে আছে? রোমানরা হযরত মু’য়াজের এমন স্বাধীন ও বেপরোয়া আচরণে হতবাক হয়ে গেল। এমনকি তাদের একজন জিজ্ঞেস করেই বসলো, মুসলমানদের মধ্যে আপনার চেয়েও বড় কেউ কি আছে? তিনি জবাব দিলেনঃ ‘মায়াজ আল্লাহ! (আল্লাহর পানাহ্ চাই) আমি হচ্ছি তাদের এক নিকৃষ্টতম ব্যক্তি।’ লোকটি চুপ হয়ে গেল। হযরত মু’য়াজ কিছুক্ষণ পর দোভাষীকে বললেন; রোমানদের বল, তারা কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে আমরা বসবো, নইলে চলে যাব। আলোচনা শুরু হলো। রোমানরা বললঃ – আমাদের দেশ আক্রমণ করা হয়েছে কেন? অথচ হাবশা আরবের অতি নিকটে, পারস্যের সম্রাট মারা গেছেন এবং সাম্রাজ্যের কতৃত্ব এক মহিলার হাতে। আপনারা ঐ সকল দেশ ছেড়ে আমাদের দিকে ধাবিত হলেন কেন? অন্যদিকে আমাদের সম্রাট দুনিয়ার সকল সম্রাটদের সম্রাট এবং সংখ্যায় আমরা আসমানের তারকারাজি ও দুনিয়ার বালুকারাশির সমান। মুয়াজ বললেনঃ আমরা তোমাদেরকে যা বলতে চাই তার সরকথা হলো, তোমরা ইসলাম কবুল করে আমাদের কিবলার দিকে নামায আদায় কর, মদ পান ছেড়ে দাও, শুকরের মাংস পরিহার কর। তোমরা যদি এইসব কাজ কর তাহলে আমরা তোমাদের ভাই। আর যদি একান্তই ইসলাম গ্রহণ করতে না চাও তাহলে জিযিয়া দাও। তাও যদি না মান তাহলে যুদ্ধের ঘোষনা দিচ্ছি। যদি আসমানের তারকারাজি ও যমীনের বালুকারাশির পরিমাণ তোমাদের সংখ্যা হয় তাতেও আমাদের বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই। আর হ্যাঁ, তোমাদের এ জন্য গর্ব যে, তোমাদের শাহানশাহ্ তোমাদের জান-মালের মালিক মুখতার। কিন্তু আমরা যাঁকে বাদশাহ বানিয়েছি কোন ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দিতে পারেন না। তিনি ব্যভিচার করলে তাঁকে দুররা লাগানো হবে, চুরি করলে হাত কাটা হবে। তিনি গোপনে বসেন না, নিজেকে আমাদের চেয়ে বড় মনে করেন না। ধন-সম্পদেও আমাদের ওপর তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ রোমানরা মনোযোগ সহকারে তাঁর কথা শুনলো। তাঁর মুখে ইসলামী শিক্ষা ও সাম্যের কথা শুনে তারা হতবাক হয়ে গেল। তারা প্রস্তাব দিলঃ ‘আমরা আপনাদেরকে ‘বালকা’- এর সম্পূর্ণ এলাকা এবং ‘দূন’- এর যে অংশ আপনাদের অঞ্চলের সাথে মিশেছে, ছেড়ে দিচ্ছি। আপনারা আমাদের এই দেশ ছেড়ে পারস্যের দিকে চলে যান।’ এটা কোন কেনা-বেচার বিষয় ছিল না। তাই হযরত মু’য়াজ নেতিবাচক জবাব দিয়ে সেখান থেকে উঠে আসেন। (সীয়ারে আনসার- ২/১৬৯-১৭১) যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হলো। এ যুদ্ধে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। হযরত আবু ’উবাইদা তাঁকে ‘মায়মানা’ (দক্ষিণ ভাগ)- এর কমান্ডিং অফিসার নিয়োগ করেন। হিজরী ১৫ সনে ইয়ারমুকের যুদ্ধ হয়। খুবই ভয়াবহ যুদ্ধ। এ যুদ্ধেও তাঁকে ‘মায়মানা’-র দায়িত্ব দেওয়া হয়। শত্রুপক্ষের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে মুসলমানদের ‘মায়মানা’ মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় হযরত মু’য়াজ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও স্থির চিত্ততার পরিচয় দেন। তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে হুংকার দিয়ে বলেনঃ আমি পায়ে হেঁটে লড়বো। কোন সাহসী বীর যদি ঘোড়ার হক আদায় করতে পারে, সে এই ঘোড়া নিতে পারে। রণক্ষেত্রে তাঁর পুত্রও ছিলেন। তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, আমিই এ ঘোড়ার হক আদায় করবো। তারপর বাপ-বেটা দু’জন রোমান বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে ভিতরে ঢুকে যান এবং এমন সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন যে, বিক্ষিপ্ত মুসলিম বাহিনী আবার দৃঢ় অবস্থান ফিরে পায়। হযরত ফারুকে আ’জমের খিলাফতকালে সিরিয়ায় যুদ্ধরত গোটা মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন হযরত আবু ’উবাইদা। হিজরী ১৮ সনে সিরিয়ায় মহামারি আকারে প্লেগ বা ‘তা’উন’ দেখা দেয়। ইতিহাসে এই মহামারি ‘আমওয়াসের ‘তা’উন’ নামে প্রসিদ্ধ। ’আমওয়াস হচ্ছে রামলা ও বাইতুল মাকদাসের মধ্যবর্তী একটি গ্রামের নাম। সেনাপতি হযরত আবু ’উবাইদা সহ বহু মুসলিম সৈনিক এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হযরত আবু ’উবাইদা সহ বহু মুসলিম সৈনিক এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হযরত আবু ’উবাইদা মৃত্যুর পূর্বে হযরত মু’য়াজকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান। হযরত মু’য়াজ আবু ’উবাইদার জানাযার নামায পড়ান এবং অন্যদের সাথে কবরে নেমে তাঁকে কবরে শায়িত করেন। এ সময় তিনি সকলের উদ্দেশ্যে এক হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেন। আবু ’উবাইদার ইনতিকালের পর তিনি কিছু দিনের জন্য সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৮, আল-ইসতীয়াব; আল ইসাবা- ৪/৩৫৭, ৩৫৯) মহামারি মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়লে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। হযরত ’আমর ইবনুল আস বললেনঃ আমাদের উচিত এ স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া। এ রোগ নয়, এ যেন আগুন। তাঁর এ কথায় হযরত মু’য়াজ দারুণ অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি সকলকে সম্বোধন করে একটি ভাষণ দেন। ভাষণের মধ্যে তিনি ’আমরের নিন্দাও করেন। তারপর বলেন, এই মহামারি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বালা-মুসীবত নয়; বরং তাঁর রহমত ও নবীর দু’আ। আমি রাসূলুল্লাহর সা. বলতে শুনেছিলাম, মুসলমানরা শামে হিজরাত করবে। শাম ইসলামী পতাকাতলে আসবে। সেখানে একটি রোগ দেখা দেবে যা ফোঁড়ার মত হয়ে শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করবে। কেউ তাতে মারা গেলে শহীদ হবে। তাঁর সকল ’আমল পাক হয়ে যাবে। হে আল্লাহ, যদি আমি একথা রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনে থাকি তাহলে এই রহমত আমার ঘরেও পাঠাও এবং আমাকেও তার যথেষ্ট অংশ দান কর।’ (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭, হায়াতুস সাহাবা- ২/৫৮১, ৫৮২) ভাষণ শেষ করে তিনি পুত্র আবদুর রহমানের নিকট গেলেন। তখন তাঁর দু’আ কবুল হয়ে গেছে। দেখেন, পুত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। পুত্র পিতাকে দেখে কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ ‘আল-হাক্কু মির রাব্বিকা ফালা তাকূনান্না মিনাল মুমতারীন-’ এই মৃত্যু যা সত্য, আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। সুতরাং কক্ষণও আপনি সন্দেহ পোষণকারীদের মধ্যে হবেন না। যেমন পুত্র তেমনই পিতা। পিতা জবাব দিলেনঃ ‘সাতাজিদুনী ইনশাআল্লাহ মিনাস সাবিরীন’- ইনশাআল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যেই পাবে। হযরত আবদুর রহমান মারা গেলেন। পুত্রের মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর দুই স্ত্রীও একই রোগে মারা যান। এখন হযরত মু’য়াজ একাকী। নির্দিষ্ট সময়ে তিনিও আল্লাহর এই রহমাতের অংশীদার হন। তাঁর ডান হাতের শাহাদাত আংগুলে একটি ফোঁড়া বের হয়। তিনি অত্যন্ত খুশী ছিলেন। বলছিলেন, দুনিয়ার সকল সম্পদ এর তুলনায় মূল্যহীন। প্রচন্ড ব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। যখনেই চেতনা ফিরে পাচ্ছিলেন, বলছিলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার ব্যথায় ব্যথিত কর। আমি যে তোমাকে কত ভালোবাসি তা তুমি ভালোই জান।’ হযরত মু’য়াজ যে রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন খুব অস্থিরভাবে সেই রাতটি কাটান। বার বার শুধু জিজ্ঞেস করেনঃ দেখতো সকাল হলো কিনা? লোকরো জবাব দেনঃ এখনও হয়নি। যখন বলা হলো, হ্যাঁ, সকাল হয়েছে, তিনি বললেনঃ এমন রাত থেকে আল্লাহর পানাহ চাই যার প্রভাত জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। স্বাগতম মৃত্যু, স্বাগতম। তুমি সেই বন্ধুর কাছে এসেছ যে একেবারে রিক্ত ও নিঃস্ব। ইয়া ইলাহী, আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি তা তুমি জান। আজ তোমার কাছে আমার বড় আশা। আমি কখনও দুনিয়া এবং দীর্ঘ জীবন এই জন্য কামনা করিনি যে তা বৃক্ষ রোপণ ও নদী খননে ব্যয় করবো; বরং যদি কামনা করে থাকি তবে তা এ জন্য যাতে প্রচন্ড গরমে মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারি, উদারতা ও দানশীলতার প্রসার ঘটাতে এবং জিকিরের মজলিসসমূহে আলেমদের সাথে বসতে পারি। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/১৬২, তাহজীব আল আসমা- ১/৩০) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। লোকেরা সান্ত্বনা দিয়ে বলেঃ আপনি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী, উঁচু মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেনঃ আমার না আছে মরণ ভয়, আর না আছে দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার দুঃখ। তবে তার দুইটি মুষ্টি আছে আমার জানা নেই আমি তার কোন মুষ্টিতে থাকবো। এই ভয়েই আমি কাঁদছি। এই অবস্থায় তাঁর পবিত্র রূহ দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, সীয়ারে আনসার- ২/১৭৪, ১৭৫) হযরত মু’য়াজের মৃত্যুসন এবং মৃত্যুর সময় বয়স সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ আছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ১৮ অথবা ১৯ সনে ৩৮ বছর বয়সে বাইতুল মাকদাস ও দিমাশকের মধ্যবর্তী এবং জর্দান নদীর তীরবর্তী ‘বীনা’ নামক স্থানে মারা যান। এরই নিকটবর্তী একটি স্থান যেখান থেকে আল্লাহ তা’আলা হযরত ’ঈসাকে আ. আসমানে উঠিয়ে নেন, সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬, উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১) হযরত মু’য়াজের গায়ের রং ছিল সাদা, চেহারা উজ্জ্বল, দৈহিক কাঠামো দীর্ঘাকৃতির, চোখ কালো ও বড়, চুল খুব ঘন এবং সামনের দাঁত ধবধবে সাদা। কথা বলার সময় যেন মুক্তা ঝরতো। কণ্ঠস্বর ছিল খুবই মিষ্টি-মধুর। দৈহিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে ছিলেন সাহাবা সমাজের মধ্যমনি। জাবির ইবন আবদিল্লাহ রা. বলেনঃ মু’য়াজ ছিলেন সবার চেয়ে সুন্দর, সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি। আবু নু’ঈম বলেনঃ বিচক্ষণতা, লজ্জাশীলতা, ও বদান্যতার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন আনসারদের সর্বোত্তম যুবক। ওয়াকিদী বলেনঃ তিনি ছিলেন সুন্দরতম পুরুষ। (আল-ইসাবা- ৪/৪২৭, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯, উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭) হযরত মু’য়াজ ৩৮ বছর বয়সে মারা যান। আল-মাদায়িনী, ওয়াকিদী প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেছেন, তাঁর কোন সন্তানাদি হয়নি। তবে বিশ্বস্ত বর্ণনা সমূহে জানা যায় তাঁর এক পুত্র, মতান্তরে দুই পুত্র ছিল। তাদের একজনের নাম আবদুর রহমান এবং অন্যজনের নাম জানা যায় না। এই আবদুর রহমান ইয়ারমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং হিজরী ১৮ সনে ‘আমওয়াসের’ মহামারিতে পিতার আগে মারা যান। (আল-ইসতী’য়াব; আল-ইসাবা- ৪/৩৫৬) কুরআন, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হযরত মু’য়াজ ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবনুল ’আস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায়, সাহাবাদের মধ্যে যে চারজনের নিকট থেকে কুরআন গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ সা. নির্দেশ দিয়েছেন, মু’য়াজ তাঁদের অন্যতম। ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার থেকেও এ ধরণের একটি বর্ণনা আছে। এর কারণ হলো, রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় তিনি কুরআন হিফ্জ করেছিলেন। খাযরাজীরা বলতোঃ আমাদের চার ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর সা. যুগে কুরআন সংগ্রহ করেছে যা অন্যরা করেনি। তাঁদের একজন মু’য়াজ। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৬৪, হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৫) হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। তাছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. যুগ থেকে আমরণ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহ পালনের জন্য সব সময় মদীনা থেকে দূরে ছিলেন। এ কারণে তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাদীস বর্ণনার ধারাবাহিকতা তিনি চালু রাখেন। প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু শয্যায়ও এ মহান দায়িত্ব পালন করে গেছেন। (মুসনাদ- ৫/২৩৩) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ রা. ও আরও কিছু লোক তাঁর পাশে ছিলেন। অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে তিনি বললেন, আমি এমন একটি হাদীস বর্ণনা করবো যা আজ পর্যন্ত এই জন্য গোপন রেখেছিলাম যে তা শুনলে মানুষ হয়তো ’আমল ছেড়ে দিবে । তারপর তিনি হাদীসটি বর্ণনা করেন। (মুসনাদ- ৫/৩৩৬) হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের মধ্যে হযরত মু’য়াজের নামটি তৃতীয় তবকায় গণনা করা হয়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ১৫৭ টি। তার মধ্যে দুইটি মুত্তাফাক আলাইহি, তিনটি বুখারী ও একটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (আল-আ’লাম- ৮/১৬৬), তাহজীবুল আসমা- ২/৯৮) হাদীস শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রদের সংখ্যা অনেক। উঁচু মর্যাদার সাহাবীদের বড় একটি দল তাঁর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেণ। যেমনঃ ’উমার, আবু কাতাদাহ আল-আনসারী, আবু মূসা আল-আশ’য়ারী, জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবন ’উমার, আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবনুল ’আস, আনাস ইবন মালিক, আবু উমামা আল-বাহিলী, আবু লায়লা আল-আনসারী, আবু তুফাইল ও আরও অনেকে। (আল-ইসাবা- ৪/৪২৭, তাহজীবুল আসমা- ২/৯৮) বিশিষ্ট তাবে’ঈ ছাত্রদের মধ্যে ইবন ’আদী, ইবন আবী-আউফা আল-আশয়ারী, আবদুর রহমান ইবন সুমরা লা’বাসী, জাবির ইবন আনাস, আবু সা’লাবা খুশানী, জাবির ইবন সুমরা, মালিক ইবন নীহামীর, আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু মুসলিম খাওলানী, আবদুল্লাহ ইবন সানাবিহী, আবু ওয়ায়িল মাসরূক, জুনাদাহ ইবন আবী উমাইয়্যা, আবু ইদরীস খাওলানী, আসলাম মাওলা ’উমার, আসওয়াদ ইবন হিলাল, আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ প্রমুখ সর্বাধিক খ্যাতি সম্পন্ন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯) রাসূলুল্লাহর সা. জীবন কালেই হযরত মু’য়াজ শ্রেষ্ঠ ফকীহদের মধ্যে পরিগণিত হন। খোদ রাসূলে কারীম সা. তাঁর ফকীহ হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন, এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে? তিনি বলেছেনঃ ‘আ’লামুহুম বিল হালালি ওয়াল হারামি মু’য়াজ ইবন জাবাল- তাদের মধ্যে মু’য়াজ ইবন জাবাল হালাল ও হারামের সবচেয়ে বড় ’আলিম।’ (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯) কা’ব ইবন মালিক বলেনঃ রাসূল সা. ও আবু বকরের রা. যুগে তিনি মদীনায় ফাতওয়া দিতেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৫২) ইবনুল আসীর বলেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় মুহাজিরদের মধ্যে ’উমার, ’উসমান, আলী এবং আনসারদের মধ্যে মু’য়াজ, ’উবাই ইবন কা’ব ও যায়িদ ইবন সাবিত ফাতওয়া দিতেন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭, তাবাকাত- ২/৩৫০) হযরত ’উমার রা. একবার মু’য়াজ সম্পর্কে বলেনঃ ‘লাওলা মু’য়াজ লাহালাকা ’উমার- মু’য়াজ না থাকলে ’উমার বিনাশ হতো।’ এই মন্তব্য দ্বারা তাঁর ইজতিহাদী যোগ্যতা ও গবেষণা শক্তি সম্পর্কে ধারণ লাভ করা যায়। এছাড়া বিভিন্ন সময় হযরত ’উমার তাঁর ফকীহ মুজতাহিদ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জাবিয়ায় প্রদত্ত খুতবায় বলেনঃ কেউ ফিকাহ শিখতে চাইলে সে যেন মু’য়াজের কাছে যায়। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২০) প্রশ্ন হতে পারে এই বিশাল জ্ঞান তিনি কিভাবে অর্জন করলেন? উত্তরে বলা যায় তাঁর স্বভাবগত আগ্রহ ও তীক্ষ্ণ মেধার বলে তিনি এ যোগ্যতা অর্জন করেন। তাছাড়া এমন প্রতিভাবান ছাত্রের প্রতি রাসূলুল্লাহর সা. বিশেষ যত্ন ও মনোযোগ দানও এর কারণ। হযরত মু’য়াজ অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর সা. আশেপাশে হাজির থাকতেন। তাছাড়া রাসূলুল্লাহর সা. প্রত্যেকটি মজলিস ছিল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এক একটি বৈঠক। তিনি সব সময় এই মজলিসের সুযোগ গ্রহণ করতেন। হযরত মু’য়াজ সুযোগ পেলেই রাসূলুল্লাহর সা. সাথে একাকী থাকতেন। রাসূল সা. এই একাকীত্বের সুযোগে তাঁকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিতেন। কখনও কোন মাসয়ালা জানার প্রয়োজন হলে তখনই তিনি রাসূলুল্লাহর সা. খিদমতে হাজির হতেন। তখন রাসূলকে সা. না পেলে বহু দূর পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করতেন। একবার তিনি গেলেন রাসূলুল্লাহর সা. গৃহে। যেয়ে শুনলেন তিনি কোথাও বেরিয়ে গেছেন। তিনি মানুষের কাছে রাসূলুল্লাহর সা. কথা জিজ্ঞেস করতে করতে এগুতে লাগলেন। এক সময় দেখলেন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। মু’য়াজও রাসূলুল্লাহর সা. পিছনে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ সা. দীর্ঘ নামায আদায় করলেন। নামায শেষে মু’য়াজ বললেনঃ আপনি আজ দীর্ঘ নামায আদায় করেছেন। রাসূল সা. বললেনঃ এটা ছিল আশা ও ভীতির নামায। আমি আল্লাহর কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছিলাম। দুইটি দেওয়া হয়েছে এবং একটি দেওয়া হয়নি। তারপর তিনি সেই তিনটি প্রার্থনার কথা মু’য়াজকে বলেন। (মুসনাদ- ৫/২৪০) হযরত মু’য়াজ সব সময় সুযোগের সন্ধানে থাকতেন। সুযোগ পেলেই তিনি জানার জন্য রাসূলুল্লাহর সা. নিকট প্রশ্ন করতেন। তবে রাসূলুল্লাহর সা. মেজায ও মর্জির প্রতি সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তাবূক যুদ্ধের পূর্বে লোকেরা সূর্যোদয়ের সময় বাহনের পিঠে ঘুমাচ্ছিল এবং উটগুলি এদিক সেদিক চরছিল। হযরত মু’য়াজ এমন একটি সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গেলেন। তিনি তখন ঘুমিয়ে এবং উটটিও চরছে। মু’য়াজের উটটি হোঁচট খেলো এবং তিনি লাগাম ধরে টান দিলেন। উটটি আরও ক্ষেপে গিয়ে লাফালাফি করতে লাগলো। রাসূলুল্লাহর সা. ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি পিছনের দিকে তাকিয়ে মু’য়াজকে দেখে ডাক দিলেন! মু’য়াজ! মু’য়াজ সাড়া দিলেন। রাসূল সা. বললেনঃ কাছে এস। মু’য়াজ এত নিকটে গেলেন যে রাসূলুল্লাহ সা. ও তাঁর উট একদম পাশাপাশি এসে গেল। তিনি বললেন, দেখ তো মানুষ কত দূরে? মু’য়াজ বললেনঃ সবাই ঘুমিয়ে আছে আর পশুগুলি চরছে। রাসূল সা. বললেনঃ আমিও ঘুমাচ্ছিলাম। মু’য়াজ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! অনুমতি দিলে আমি আপনাকে এমন একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতাম যা আমাকে ভীষণ চিন্তিত ও পীড়িত করে তুলেছে। রাসূল সা. বললেন, তোমার যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার। হযরত মু’য়াজের স্বভাবেই ছিল জানার আগ্রহ। একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট একটি বিশেষ মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো। রাসূল সা. যে জবাব দিলেন তা একজন সাধারণ লোকের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু হযরত মু’য়াজ ততটুকু যথেষ্ট মনে করতে পারলেন না। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই হুকুম কি বিশেষ এই ব্যক্তির জন্য, না সাধারণভাবে সকল মুসলমানের জন্য? রাসূল সা. বললেন, না, এটা একটি সাধারণ হুকুম। (মুসনাদ- ৫/২৪৪) জ্ঞান ও বিভিন্ন বিষয়ে ইজতিহাদ ও গবেষণার যোগ্যতা অর্জন করে তিনি ফকীহ, মুজতাহিদ ও মু’য়াল্লিমের আসনে সমাসীন হন। রাসূলে কারীমের সা. জীবনেই তিনি শিক্ষকের পদে নিযুক্তি লাভ করেন। হিজরী অষ্টম সনে মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসীদের ফিকাহ ও সুন্নাতের তা’লীম দানের জন্য রাসূল সা. তাঁকে সেখানে রেখে আসেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৬৫, সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৫০০, তাবাকাত- ১/৯৯) তাছাড়া- হিজরী নবম সনে রাসূল সা. তাঁকে ইয়ামনে পাঠান। ইয়ামনের অন্যান্য দায়িত্বের সাথে সেখানকার লোকদের শিক্ষার দায়িত্বও তাঁর ওপর অর্পণ করেন। মু’য়াজ যখন ফিলিস্তিনে তখন তাঁর শিক্ষাদানের গন্ডি ফিলিস্তিনের বাইরেও বিস্তৃত ছিল। দিমাশ্ক, হিমস প্রভৃতি স্থানেও তাঁর হালকা-ই-দারস ছিল। এ সকল স্থানে তিনি ঘুরে ঘুরে দারস দিতেন। তাঁর দারসের পদ্ধতি ছিল, একটি বৈঠকে কিছু সাহাবী কোন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন, আর হযরত মু’য়াজ চুপ করে বসে শুনতেন। আলোচকরা কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে তিনি সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করতেন। আবু ইদরীস আল-খাওলানী একবার জামে’ দিমাশ্ক- এ গিয়ে দেখলেন, এক সুদর্শন যুবককে ঘিরে লোকেরা গোল হয়ে বসে আছে। কোন বিষয়ে তাদের মতভেদ হলে সেই যুবকের দৃষ্টি আকর্ষন করা হচ্ছে আর তিনি সন্তোষজনক জবাব দিচ্ছেন। তিনি যখন জিজ্ঞেস করলেন, যুবকটি কে? বলা হলো- মু’য়াজ ইবন জাবাল। আবু মুসলিম আল-খাওলানী একবার জামে’ হিম্স- এ গিয়ে দেখলেন, বত্রিশ জন প্রবীণ সাহাবী গোল হয়ে বসে আছেন। তাঁদের প্রত্যেকেই বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন যুবকও আছেন। কোন মাসয়ালায় তাঁদের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে এই যুবক মিমাংসা করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। পরে তিনি জানতে পারেন এই যুবক মু’য়াজ ইবন জাবাল। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/২০, হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৩১, ৬৩৮) শহর ইবন হাওশাব থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবীরা যখন কোন বিষয়ে আলোচনা করতেন, তাঁদের মধ্যে মু’য়াজ ইবন জাবাল উপস্থিত থাকলে সকলে তাঁর প্রতি সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকাতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ রা. বলতেন, দুনিয়ায় ’আলিম মাত্র তিনজন। তাঁদের একজন শামে বসবাসরত। একথা দ্বারা তিনি মু’য়াজের দিকেই ইঙ্গিত করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করতেন, তোমরা কি জান ’আলিম মতান্তরে ’আকিল কারা? লোকেরা অজ্ঞতা প্রকাশ করতে বলতেন, ’আলিম হলেন মু’য়াজ ইবন জাবাল ও আবুদ দারদা। (তাবাকাত- ২/৩৫০) একজন মুজতাহিদের সবচেয়ে বড় গুণ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। হযরত মু’য়াজ এমন সঠিক সিদ্ধান্তের অধিকারী ছিলেন যে খোদ রাসূলসা. কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধানেরত জন্য সন্তুষ্টি ব্যক্ত করেছেন। রাসূল সা. তাঁকে ইয়ামনে পাঠানোর পূর্বে যে পরীক্ষা গ্রহণ করেন সে সময় তিনি যে জবাব দেন তাতে রাসূল সা. দারুণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। মূলতঃ তাঁর এই জবাবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ইসলামী শরী’য়াতের মৌলিক উৎস তিনটিঃ ১. কিতাবুল্লাহ, ২. সুন্নাহ ও ৩. কিয়াস। ইসলামের প্রথম যুগে যারা একটু দেরীতে নামাযের জামা’য়াতে হাজির হতো এবং দুই এক রাকা’য়াত ছুটে যেত। তারা নামাযে দাঁড়ানো লোকদের কাছে ইশারায় জিজ্ঞেস করে জেনে নিত কত রাকা’য়াত হয়েছে। নামাযীরাও ইশারায় তা জানিয়ে দিত। দেরীতে আসা লোকটি প্রথমে তার ছুটে যাওয়া নামায আদায় করে জামা’য়াতে শরীক হতো। এভাবে একদিন নামায হচ্ছে এবং প্রথম বৈঠক চলছে, এমন সময় মু’য়াজ আসলেন এবং প্রচলিত নিয়মের খিলাফ প্রথমে জামা’য়াতে শরীক হয়ে গেলেন। রাসূল সা. সালাম ফিরানোর পর মু’য়াজ উঠে ছুটে যাওয়া রাকা’য়াতগুলি আদায় করলেন। তাঁর এ কাজ দেখে রাসূল সা. বললেনঃ ‘কাদ সান্না লাকুম ফা হাকাজা ফাসনা’য়’- মু’য়াজ তোমাদের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি বের করেছে, তোমরাও এমনটি করবে। (মুসনাদ- ৫/২৩৩, ২৪৬) হযরত মু’য়াজের জন্য এটা অতি সম্মান ও গৌরবের বিষয় যে, তাঁরই একটা ’আমল গোটা মুসলিম জাতির জন্য ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা জারী থাকবে। একবার এক গর্ভবতী মহিলার স্বামী দুই বছর নিরুদ্দেশ থাকে। এর মধ্যে মহিলা গর্ভবর্তী হয়, মানুষের মনে সন্দেহ হলে তারা বিষয়টি খলীফা ’উমারের নিকট উত্থাপন করে। ’উমার রা. মহিলাকে রজম করার (যিনার শাস্তি) নির্দেশ দেন। মু’য়াজ বললেনঃ মহিলাকে রজম করার অধিকার আপনার আছে। কিন্তু পেটের সন্তানের রজম করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? ’উমার মহিলাকে তখনকার মত ছেড়ে দিয়ে সন্তান প্রসবের পর রজমের নির্দেশ দেন। মহিলা একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে। সন্তানটি ছিল অবিকল তাঁর পিতার ’আদলের। তখন পিতা সন্তান দেখে শপথ করে দাবী করে এ তো আমারই সন্তান। এ কথা শুনে ’উমার রা. মন্তব্য করেনঃ ‘মু’য়াজের মত সন্তান মহিলারা আর জন্ম দিতে পারবে না। মু’য়াজ না থাকলে ’উমার ধ্বংস হয়ে যেত।’ তিনি আরও বলতেনঃ ‘মু’য়াজের মত সন্তান জন্ম দিতে মহিলারা অক্ষম হয়ে গেছে।’ সাহাবী সমাজে রমধ্যে তাঁর বিশাল মর্যাদা সম্পর্কে এমনই একটা ধারণা বিদ্যমান ছিল। খলীফা ’উমারের অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে লোকেরা তাঁর নিকট পরবর্তী খলীফা মনোনয়নের জন্য ’আরজ করলো। তখন তিনি একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তার মধ্যে এ কথাটিও বলেন যে, ’আজ মু’য়াজ ইবন জাবাল বেঁচে থাকলে তাঁকেই খলীফা বানিয়ে যেতাম। আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আমি এমন এক ব্যক্তিকে খলীফা বানিয়ে এসেছি যার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ ‘কিয়ামতের দিন মু’য়াজ সব ’আলিমদের থেকে এক অথবা দুই তীর নিক্ষেপের দূরত্ব আগে থাকবে। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/১৯) খলীফা হযরত আবু বকর রা. ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ানকে একবার অসীয়াত করেনঃ ‘মু’য়াজ ইবন জাবালের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আমি তাঁর সকল অভিযান প্রত্যক্ষ করেছিল। রাসূল সা. একদিন তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেনঃ কিয়ামতের দিন মু’য়াজ ’আলিমদের থেকে এক তীর নিক্ষেপের দূরত্ব আগে থাকবে। সে এবং আবু ’উবাইদার সাথে পরামর্শ ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। তাতে তোমার মঙ্গল হবে না। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১১৮) অপর একটি বর্ণনায় এসেছেঃ কিয়ামতের দিন সকল ’আলিম মু’য়াজের পতাকাতলে উঠবে। (শাজারাত- ১/৩০) একবার খলীফা হযরত ’উমার রা. মু’য়াজকে পাঠালেন বনু কিলাম গোত্রে যাকাত আদায় করে গরীবদের মধ্যে বন্টনের জন্য মু’য়াজ সেখানে গিয়ে দায়িত্ব পালন করে স্ত্রীর নিকট ফিরে আসলেন। যাওয়ার সময় হাতে করে যে জিনিসগুলি নিয়ে গিয়েছিলেন ফেরার সময় শুধু সেইগুলিই হাতে করে ফিরলেন। স্ত্রী কাছে এসে বললেনঃ অন্যান্য শাসকরা ঘরে ফেরার সময় তাঁদের পরিবারের লোকদের জন্য নানা রকম উপঢৌকন নিয়ে আসে, দেখি তুমি আমার জন্য কি নিয়ে এসেছ? মু’য়াজ বললেনঃ আমার সাথে সবসময় একজন পাহারাদার ছিল। সে সতর্কভাবে আমাকে পাহারা দিয়েছেন। স্ত্রী বললেনঃ তুমি ছিলে রাসূলুল্লাহর সা. ও আবু বকরের পরম বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। আর ’উমার কিনা তোমার পিছনে পাহারাদার নিয়োগ করেছে? স্বামী-স্ত্রীর এ আলোচনা ’উমারের রা. মেয়ে মহলের মাধ্যমে তাঁর কানে গেল। তিনি মু’য়াজকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আমি তোমার পিছনে পাহারাদার নিয়োগ করেছি? মু’য়াজ বললেনঃ না, আপনি তা করবেন কেন? তবে আমার স্ত্রীকে বুঝ দেওয়ার জন্য এমন কথা না বলে উপায় ছিলনা। ’উমার একটু হেসে দিলেন। তারপর মু’য়াজের হাতে কিছু অর্থ দিয়ে বলেন, যাও, এইগুলি দিয়ে তোমার স্ত্রীকে খুশী কর। (সুওয়ারুম মিন্ হায়াতিস সাহাবা- ৭/১৩১-১৩২) তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল একারণে তাঁর সকল বিষয়-সম্পত্তি একবার নিলামে উঠে বিক্রী হয়েছিল। তাঁর এই দানশীলতায় ইসলামের যথেষ্ট কল্যাণ সাধিত হয়েছে। খলীফা ’উমার রা. একদিন সংগীদের বললেনঃ আচ্ছা বলতো তোমরা কে কি নেক আশা কর। একজন বললো, আমার বাসনা হলো, আমি যদি এই ঘর ভর্তি দিরহাম পেতাম এবং সবই আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে পারতাম। আরেকজন বললোঃ আমি যদি এই ঘর ভর্তি সোনাদানা পেতাম এবং আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে পারতাম। এভাবে একেক জন একেক রকম সৎ বাসনা প্রকাশ করলো। সবশেষে ’উমার রা. বললেনঃ আমার বাসনা কি জান? আমি যদি এই ঘর ভর্তি পরিমাণ আবু ’উবাইদা ইবনুল জাররাহ, মু’য়াজ ইবন জাবাল ও হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামানের মত লোক পেতাম এবং তাদের সকলকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে পারতাম। তারপর তিনি বলেন, এখনই আমি পরীক্ষা করে প্রমাণ করে দিচ্ছি। তিনি চাকরকে ডেকে চারশত দীনার ভর্তি একটি থলি তার হাতে দিয়ে বলেন, এগুলি আবু ’উবাইদাকে দিয়ে তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতে বলে এস। আবু ’উবাইদা থলিটি হাতে নিয়ে খলীফার চাকর স্থান ত্যাগের পূর্বেই দীনারগুলি বিভিন্ন থলিতে ভরলেন এবং অভাবীদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। অনুরূপভাবে খলীফা আর একটি দীনার ভর্তি থলি পাঠালেন মু’য়াজ ইবন জাবালের কাছে। মু’য়াজও তক্ষুণি দাসীকে ডেকে দীনারগুলি বিভিন্ন লোকের মধ্যে বন্টন শুরু করলেন। থলিতে যখন মাত্র দুইটি দীনার বাকী তখন তাঁর স্ত্রী খবর পেলেন এবং দৌড়ে এসে বললেন, আমিও তো একজন মিসকীন, আমাকেও কিছু দাওনা। মু’য়াজ দীনার দুইটি সহ থলিটি স্ত্রীর দিকে ছুড়ে মেরে বলেনঃ এই নাও। খলীফা চাকরের মুখে আবু ’উবাইদা ও মু’য়াজের এই আচরণের কথা শুনে দারুণ পুলকিত হন এবং মন্তব্য করেনঃ তারা প্রত্যেকেই পরস্পরের ভাই। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২৩১-২৩৩) আল্লাহর প্রতি গভীর মুহাব্বত ও ভালোবাসা, তাঁর ইতা’য়াত ও আনুগত্য, ’ইবাদাত ও বন্দেগী এবং তাঁর ওপর তাওয়াককুল ও নির্ভরতা হচ্ছে একজন মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট ও পরিচয়। হযরত মু’য়াজের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্যপূর্ণরূপ লাভ করে। গভীর রাতে তিনি আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল হয়ে যেতেন। কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দু’আ করতেনঃ ‘হে আল্লাহ! এখন সকল চক্ষু নিদ্রিত। কিন্তু তুমি চিরজাগ্রত, চিরঞ্জীব। হে আল্লাহ। জান্নাতের দিকে আমার যাত্রা বড় মন্থর এবং জাহান্নাম থেকে পলায়ন বড় দুর্বল। তুমি আমার জন্য তোমার কাছে একটি হিদায়াত নির্দিষ্ট রাখ যা কিয়ামতের দিন আমি লাভ করতে পারি।’ (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭) তিনি যে কত বড় আল্লাহনির্ভর লোক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় ’আমওয়াসের মহামারির সময়। হযরত ’আমর ইবনুল ’আস যখন সৈন্যদের স্থান ত্যাগের পরামর্শ দেন তখন তাঁর পরামর্শকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করে তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান। শেষ পর্যন্ত তাওয়াক্কুলের ওপর অটল থেকেই সেই মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেন। একদিন হযরত ’উমার রা. দেখলেন, মু’য়াজ কাঁদছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন। তুমি কাঁদছো কেন? মু’য়াজ বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ বিন্দুমাত্র ‘রিয়া’ ও এক ধরণের শিরক। আর আত্মগোপনকারী-মুত্তাকীরাই হচ্ছে আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বান্দা। তাঁরা অদৃশ্য হলে হারায় না এবং দৃশ্যমান হলে চেনা যায়না। তাঁরাই হলেন হিদায়াতের ইমাম ও ইলমের মশাল বা প্রদীপ। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২৪) তাউস থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একবার মু’য়াজ ইবন জাবাল আমাদের অঞ্চলে আসেন। আমাদের নেতারা বললোঃ আপনার অনুমতি পেলে আমরা পাথর ও ইট দিয়ে আপনার জন্য একটি মসজিদ বানিয়ে দিতাম। মু’য়াজ বললেনঃ কিয়ামতের দিন এই মজদি আমার পিঠে বহন করতে বলা হয় কিনা সে ব্যাপারে আমি শঙ্কিত। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬২১) ইসলামী সাম্য ও ন্যায় বিচারে তিনি ছিলেন এক বাস্তব নমুনা। ছোট খাট ব্যাপারেও তিনি ইনসাফ থেকে বিচ্যুত হতেন না। ইয়াহইয়া ইবন সা’ঈদ থেকে বর্ণিত হয়েছে। মু’য়াজের দুই স্ত্রী ছিল। তিনি তাদের মধ্যে সমতা বিধানের প্রতি ছিলেন দারুণ সতর্ক। যেদিন তিনি এক স্ত্রীর ঘরে অবস্থান করতেন সেদিন অন্যের ঘরে অজু করা বা এক গ্লাস পানিও পান করতেন না। দুই স্ত্রীই ’আমওয়াসের মহামারিতে এক সাথে মারা যান। দুইজনকে একই কবরে দাফন করা হয়। কবর খোড়া হলে কাকে আগে কবরে রাখা হবে সে ব্যাপারেও লটারী করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬১২) রাসূলুল্লাহর সা. প্রতি মু’য়াজের যে কত গভীর ভালোবাসা ছিল তার কিছু পরিচয় পূর্ববর্তী আলোচনায় পরিস্ফুট হয়েছে। কখনও তাঁকে না পেলে তিনি অস্থির হয়ে তাঁর খোঁজে বেরিয়ে পড়তেন। রাসূলুল্লাহর সা. নিয়ম ছিল সফরে রাত্রি যাপনের সময় মুহাজির সঙ্গীদের নিজের কাছেই রাখা। একবার তিনি কোন এক সফরে গেলেন। সাহাবীরাও সংগে ছিলেন। এক স্থানে রাত্রি যাপনের জন্য থামলেন। রাসূল সা. মু’য়াজহ সহ কতিপয় সাহাবীর একটি বৈঠক থেকে কিছু না বলে কোথাও চলে গেলেন। মু’য়াজ অস্থির হয়ে পড়লেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর আবু মূসাকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর সা. খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। পথে রাসূলুল্লাহর সা. কণ্ঠস্বর শুনে এগিয়ে গেলেন। রাসূল সা. তাঁদের দেখে প্রশ্ন করেনঃ তোমাদের কি অবস্থা? তাঁরা বললেনঃ আপনাকে না পেয়ে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। তাই খুঁজতে বেরিয়েছি। (মুসনাদ- ৫/২৩২) হযরত রাসূলে কারীমের সা. প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন ভক্তি ও শ্রদ্ধা। একবার তিনি সফর থেকে ফিরে এসে রাসূলকে সা. বললেনঃ আমরা ইয়ামানে একজন অন্যজনকে সিজদাহ করতে দেখেছি। আমরা কি আপনাকে সিজদাহ করতে পারিনে? রাসূল সা. বললেনঃ আমি যদি কোন মানুষের জন্য সিজদাহর বিধানই রাখতাম তাহলে মহিলাদেরকে বলতাম তাদের নিজ নিজ স্বামীদেরকে সিজদাহ করতে। (মুসনাদ- ৫/২২৭) একবার মুনাফিক কায়েস ইবন মুতাতিয়্যা একটি মজলিসে উপস্থিত হলো। সেই মজলিসে হযরত সালমান আল-ফারেসী, সুহাইব আর রূমী ও বিলাল আল-হাবশী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের প্রতি ইঙ্গিত করে কায়েস বললো, এই আউস ও খাযরাজ না হয় এই ব্যক্তিকে (রাসূলুল্লাহকে) সাহায্য করলো; কিন্তু এই সব লোক সাহায্য করছে কেন? একথা বলার সাথে সাথে মু’য়াজ ইবন জাবাল লাফ দিয়ে উঠে তার বুকের ও গলার কাপড় মুট করে ধরে টানতে টানতে সোজা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট নিয়ে গেলেন। এ অবস্থা দেখে রাসূল সা. রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি লোকদের মসজিদে সমবেত হওয়ার আহবান জানাতে বললেন। জনগণ মসজিদে সমবেত হলে তিনি ঐক্য ও সংহতির ওপর এক ভাষণ দান করেন। ভাষণ শেষ হলে মু’য়াজ বলেন, কিন্তু এই মুনাফিকের ব্যাপারে আপনি কি বলেন? রাসূল সা. জবাব দিলেনঃ তাঁকে জাহান্নামের জন্য ছেড়ে দাও। মু’য়াজ ছেড়ে দিলেন। পরবর্তীকালে এই কায়েস মুরতাদ হয়ে ইসলামী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয় এবং এ অবস্থায় মুসলিম মুজাহিদদের হাতে নিহত হয়। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৭৬, ৪৭৭) একবার হযরত মু’য়াজ রাসূলুল্লাহর সা. সংগে ছিলেন। রাসূল সা. তাঁর একখানি হাত ধরে বললেনঃ মু’য়াজ, তোমার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা। উত্তরে মু’য়াজ বললেনঃ আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আমিও অন্তর দিয়ে আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল সা. বললেনঃ আমি তোমাকে একটি উপদেশ দিচ্ছি কক্ষণও তা অবহেলা করবে না। তারপর তাঁকে একটি দু’আ শিখিয়ে দিলেন। হযরত মু’য়াজ আমরণ সেই দু’আটি পাঠ করতেন। (মুসনাদ- ৫/২৪৫) হিজরী ১৬ সনে খলীফা হযরত ’উমার যখন বাইতুল মাকদাস সফর করেন তখন সেখানে হযরত বিলাল ও মু’যাজও ছিলেন। ’উমার আযান দেওয়ার জন্য বিলালকে অনুরোধ করলেন। বিলাল বললেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কারও অনুরোধে কক্ষণও আযান দেবনা। কিন্তু আজ আপনার অনুরোধ রক্ষা করবো। তিনি আযান দিতে শুরু করলেন। আযানের ধ্বনিতে সাহাবীদের মনে রাসূলে পাকের সা. জীবনকালের স্মৃতি ভেসে ওঠে। তাঁদের মধ্যে ভাবান্তর সৃষ্টি হয়। হযরত মু’য়াজ তো কাঁদতে কাঁদতে অস্থিত হয়ে পড়লেন। হযরত মু’য়াবিয়া রা. যখন শামের গভর্ণর তখন মু’য়াজ একবার সেখানে গিয়ে দেখলেন, লোকেরা ‘বিতর’ নামায আদায় করে না। তিনি মুয়াবিয়ার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বিষয়টি তাঁরও জানা ছিল না। তাই তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেনঃ বিতর কি ওয়াজিব? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। এভাবে আমর বিল মা’রূফের ব্যাপারে তিনি কারও পরোয়া করতেন না। (মুসনাদ- ৫/২৪২) তিনি ছিলেন সত্যবাদী। খোদ রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। একবার হযরত মু’য়াজ হযরত আনাসের নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। তারপর আনাস রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মু’য়াজকে একথা বলেছেন? জবাবে রাসূল সা. তিনবার বললেনঃ মু’য়াজ সত্য বলেছেন। (উসুদুল গাবা- ৪/৩৭৭) তাঁর মরণ-সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে লোকেরা এই বলে বিলাপ শুরু করে দিল যে, ইল্ম উঠে যাচ্ছে। তারা মু’য়াজকে বললো, আপনি আমাদের বলে যান, আপনার মৃত্যুর পর আমরা কার নিকট যাব। তিনি বললেনঃ আমাকে একটু উঠিয়ে বসাও। বসানো হলে বললেনঃ শোন, ইলম ও ঈমান- এ দুইটি উঠার জিনিস নয়। যারা তালাশ করবে তারা লাভ করবে। কথাটি তিনবার বললেন। তারপর বললেনঃ তোমরা আবু দারদা, সালমান আল-ফারেসী, ইবন মাস’উদ ও আবদুল্লাহ ইবন সালাম- এই চার জনের নিকট থেকে ইলম হাসিল করবে। (মুসনাদ- ৫/২৪৩) সীরাত গ্রন্থসমূহে দেখা যায় পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াত নাযিলের ঘটনার সাথে হযরত মু’য়াজও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। একবার হযরত মু’য়াজ ইবন জাবালসহ আউস ও খাযরাজ গোত্রের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ইহুদীদের কয়েকজন আহবারের নিকট তাওরাতের কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য প্রশ্ন করেন। কিন্তু তারা সত্যকে গোপন করার উদ্দেশ্যে তা জানাতে অস্বীকার করে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক সূরা বাকারার ১৫৯ নং আয়াতটি নাযিল করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫৫১) হযরত রাসূলে কারীম সা. মদীনার ইহুদীদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করার পরিণতি সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। তা সত্ত্বেও তারা রাসূলুল্লাহর সা. কথা মানতে অস্বীকার করতে থাকে। তাদের এ অবস্থা দেখে হযরত মু’য়াজ সহ কতিপয় সাহাবী ইহুদীদেরকে বললেনঃ ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহ কসম! তোমরা অবশ্যই জান যে তিনি আল্লাহর রাসূল। আর একথা তো তোমরা তাঁর নবুওয়াত লাভের পূর্বেই আমাদেরকে বলতে এবং তাঁর পরিচয়ও আমাদের কাছে তুলে ধরতে। একথার উত্তরে রাফে ইবন হুরায়মালা ও ওয়াহাব ইবন ইহাজা বললোঃ না, আমরা কক্ষণও তোমাদেরকে এমন কথা বলিনি। মূসার কিতাবের পর আর কোন কিতাব আল্লাহ নাযিল করেননি এবং আর কোন সুসংবাদ দানকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারীও আল্লাহ পাঠাননি। তখন আল্লাহ পাক সূরা আল-মায়িদার ১৯ নং আয়াতটি নাযিল করে ইহুদীদের কথার প্রতিবাদ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৫৬৪) হাদীস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে হযরত মু’য়াজ ইবন জাবাল সম্পর্কে এ ধরণের বহু খন্ড খন্ড তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যা মুসলিম সমাজ চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

  • আবূ সা’ঈদ আল-খুদারী (রা)

    আবূ সা’ঈদ আল-খুদারী (রা)

    নাম সা’দ, ডাক নাম আবূ সা’ইদ। খুদরাহ বংশের সন্তান হওয়ার কারণে খুদারী বা খুদরী বলা হয়। তাঁর পিতা মালিক ইবন সিনান উহুদের অন্যতম শহীদ। এ যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীম সা. আহত হলে তিনি রাসূলের সা. পবিত্র খুন চুষে গিলে ফেলেন। রাসূল সা. তখন মন্তব্য করেনঃ ‘আমার রক্ত যার রক্তে মিশেছে তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।’ (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৮০, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪) তাঁর মা উনায়সা বিনতু আবী হারিসা বনু ’আদী ইবন নাজ্জারের কন্যা। দাদা সিনান ছিলেন মহল্লার রয়িস। তিনি ছিলেন একটি কিল্লার অধিপতি ও ইসলাম পূর্ব যুগের একজন বিচারক। তাঁর মার প্রথম স্বামী ছিল আউস গোত্রের ’আম্মান নামক এক ব্যক্তি। সে মারা যায়। রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় আগমনের পূর্বে তিনি মালিক ইবন সিনানকে দ্বিতীয় স্বামী হিসাবে গ্রহণ করেন। তাঁদেরই সন্তান আবূ সা’ঈদ হিজরাতের দশ বছর পূর্বে ৬১৩ খ্রীস্টাব্দে ইয়াসরিবে জন্মগ্রহণ করেন। (আল-ইসাবা- ৪/৮৮, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮) প্রখ্যাত বদরী সাহাবী কাতাদাহ ইবন নু’মান রা.- উহুদ যুদ্ধে যাঁর চোখ আহত হয় এবং রাসূলুল্লাহর সা. দু’আর বরকতে আবার ভালো হয়ে যায়- আবূ সা’ঈদের বৈপিত্রীয় ভাই। হিজরী ২৩ সনে এই কাতাদাহ মারা গেলে আবূ সা’ঈদ তাঁকে কবরে নামিয়ে দাপন করেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪২, উসুদুল গাবা- ৫/২১১) বাই’য়াতে আকাবা থেকেই মোটামুটি মদীনায় ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু হয়। মদীনাবাসীদের অনেকেই তখন ইসলামী দা’ওয়াত ও তাবলীগের কাজে আত্ননিয়োগ করেন। এই সময় মালিক ইবন সিনান ইসলাম কবুল করেন। স্বামীর সাথে স্ত্রীও মুসলমান হন। সুতরাং আবূ সা’ঈদ মুসলিম মা-বাবার কোলেই বেড়ে উঠেন। হিজরাতের প্রথম বছরেই মসজিদে নববীর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আবূ সা’ঈদ এই নির্মাণ কাজে অংশগ্রহণ করেন। তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাথে মোট বারোটি যুদ্ধে যোগ দেন। (তাহজীবুল আসমা- ২/২৩৭, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮) অল্প বয়সের কারণে বদর যুদ্ধে যোগ দিতে পারেননি। উহুদ যুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৩ বছর। যুদ্ধের পূর্বে পিতার সাথে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট যান। রাসূল সা. তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিরীক্ষণ করেন এবং এখনও যুদ্ধের বয়স হয়নি- এই বলে ফিরিয়ে দেন। পিতা মালিক তখন রাসূলুল্লাহর সা. হাত ধরে বলেন, ছেলের বয়স কম হলে কি হবে, তার হাত দু’টি পুরুষের মত সবল। তবুও রাসূল সা. তাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। (আল-ইসাবা- ২/৩৫; আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩০) এই উহুদ যুদ্ধে হযরত রাসূলে কারীমের সা. পবিত্র মুখমন্ডল আহত হয়ে রক্ত রঞ্জিত হয়। মালিক ইবন সিনান সেই রক্ত পান করেন। রাসূল সা. মন্তব্য করেনঃ ‘যদি কারও এমন ব্যক্তিকে দেখার ইচ্ছা হয় যার রক্ত আমার রক্তের সাথে মিশেছে, সে যেন মালিক ইবন সিনানকে দেখে। এরপর বীরের মত যুদ্ধ করে মালিক শাহাদাত বরণ করেন। আবূ সা’ঈদের পিতা কোন সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন না। এ কারণে পিতার মৃত্যুতে তিনি পর্বত পরিমাণ বিপদের সম্মুখীন হলেন। দারিদ্র ও অনাহারে সময় সময় পেটে পাথর বেঁধে কাটাতেন। একদিন তিনি প্রচন্ড ক্ষুধায় পেটে পাথর বেঁধে আছেন। তখন তাঁর স্ত্রী (মতান্তরে মা অথবা দাসী) তাঁকে বললেনঃ নবীর সা. কাছে যাও, তাঁর কাছে কিছু চাও। অমুক এসে সাহায্য চেয়েছিল, তাকে তিনি দিয়েছেন। আবূ সা’ঈদ বলেনঃ আমি যখন রাসূলুল্লাহর সা. নিকট গেলাম তিনি তখন ভাষণ দিচ্ছেন এবং বলছেনঃ ‘যে নিজেকে গনী বা ধনী মনে করে আল্লাহও তাকে ধনবান করে দেন। আর যে আমার কাছে কোন কিছু চাওয়া থেকে বিরত থাকে সে ঐ ব্যক্তির থেকেও আমার বেশী প্রিয় যে আমার কাছে চায়।’ একথা শুনে আমি আর কিছু চাইলাম না। আমি বাড়ী ফিরে এলাম। অতঃপর আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের রিযকে বরকত বা সমৃদ্ধি দান করতে লাগলো। অবশেষে, আনসারদের মধ্যে কোন বাড়ী আমাদের চেয়ে বেশী বিত্তশালী ছিল বলে আমি জানতাম না। (মুসনাদ- ৩/৪৪৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/২৫৭) খন্দক ও বনী মুসতালিকের যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। তবে ‘উসুদুল গাবা’ গ্রন্থের একটি বর্ণনায় এসেছেঃ ‘আবূ সা’ঈদ বলেনঃ খন্দকের দিন আমার পিতা আমার হাত ধরে রাসূলুল্লাহর সা. সামনে নিয়ে বলেনঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! এর হাড় খুব শক্ত।’ এরপরও তিনি আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি না দিয়ে ফিরিয়ে দেন। তিনি আরও বলেনঃ ‘আমি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে বনী মুসতালিক যুদ্ধে যোগ দিই।’ ওয়াকিদী বলেনঃ ‘তখন আবূ সা’ঈদের বয়স পনেরো বছর।’ (উসুদুল গাবা- ৫/২১১, আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৩৪) ইমাম আহমাদ আবূ সা’ঈদ খুদারী থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমরা খন্দকের দিন বললামঃ ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের প্রাণ তো গলায় এসে ঠেকেছে। এমন কোন দু’আ কি আছে যা আমরা পাঠ করতে পারি? বললেনঃ হাঁ। বলঃ আল্লাহুম্মা উসতুর ’আওরাতিনা ওয়া আমিন রাও’য়াতিনা- হে আল্লাহ আমাদের গোপন বিষয় গোপন রাখ এবং আমাদের ভীতিকে নিরাপত্তা দান কর।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৮৮) তিনি ‘বাই’য়াতুশ শাজারা’ বা ‘বাই’য়াতুর রিদওয়ানে’ অংশগ্রহণ করেন। (শাজারাতুজ জাহাব- ১/৮১; তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৪৪) হিজরী ৮ম সনের সফর মাসে ’আবদুল্লাহ ইবন গালিব লায়সীর নেতৃত্বে একদল সৈন্য ফিদাক যায়। তিনিও এই বাহিনীতে ছিলেন। আবদুল্লাহ সৈন্যদের তাকীদ দেন, তারা যেন বিচ্ছিন্ন না হয়। এই উদ্দেশ্যে তিনি বাহিনীর সদস্যদের পরস্পরের সাথে মাওয়াখাত বা ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। তাঁকেও একজন বিশিষ্ট সাহাবীর সাথে ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে দেন। হিজরী ৯ম সনের বারী’উস সানী মাসে ’আরকামা ইবন মুখাররকে ছোট একটি বাহিনীসহ একটি অভিযানে পাঠানো হয়। আবূ সা’ঈদ ছিলেন এ বাহিনীর অন্যতম সদস্য। (মুসনাদ- ৩/২৭০; হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৭) উপরোক্ত যুদ্ধগুলি ছাড়াও মক্কা বিজয়, হুনাইন, তাবুক, আওতাস প্রভৃতি অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণের কথা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। সহীহ বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহর সা. যুগে সংঘটিত মোট ১২ টি যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। তিনি তাবুক যুদ্ধে মুসলমানদের চরম অভাব ও দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। হুনাইন যুদ্ধে লব্ধ গনীমাতের বেশীর ভাগ যখন রাসূল সা. মক্কাবাসী নওমুসলিমদের খুশী (তালীফে কুলুম) করার জন্য দান করেন তখন মদীনার আনসারদের অনেকে একটু ক্ষুণ্ন হন। এ সম্পর্কিত ঘটনা আবূ সা’ঈদ বর্ণনা করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৩৯৭-৩৯৮; ৩/৬২৫) তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘আমরা রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যুদ্ধে গিয়েছি রমজান মাসে। আমাদের কেউ সাওম পালন করতো, আবার কেউ করতো না। তবে একে অপরকে কোন রকম হিংসা করতো না। তারা প্রত্যেকেই জানতো যে, যে ব্যক্তি নিজেকে সক্ষম মনে করবে সে সাওম পালন করবে, আর এটাই তার জন্য উত্তম। আর যে নিজেকে দুর্বল ও অক্ষম মনে করবে সে সাওম পালন করবে না। আর এটাই তার জন্য উত্তম।’ (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৭৯) একবার হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁদেরকে একটি ছোটখাট অভিযানে পাঠালেন। বাহিনীর সর্বমোট সদস্য তিরিশজন এবং নেতা আবূ সা’ঈদ। যাত্রা পথে তাঁরা একটি স্থানে তাঁবু স্থাপন করে যাত্রা বিরতি করেন। নিকটেই ছিল একটি জনপদ। তাঁরা সেই জনপদের লোকদের বললেন, আমরা আপনাদের অতিথি। কিন্তু তারা অতিথিদের সেবা করতে পরিষ্কার অস্বীকার করলো। ঘটনাক্রমে সেইদিন উক্ত জনপদের প্রধানকে বিচ্ছুতে কামড়ায়। নানা জনে নানা রকম চিকিৎসা চালালো’ কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। তাদেরকে কেউ পরামর্শ দিল, তোমরা এই অতিথিদের কাছে যাও, তাদের মধ্যে কারও হয়তো কোন চিকিৎসা জানা থাকতে পারে। পরামর্শমত তারা এসে বিষয়টি জানালো। আবূ সা’ঈদ বললেন, ‘আমি ঝাড়-ফুঁক জানি, তবে পারিশ্রমিক হিসেবে তিরিশটি ছাগল দিতে হবে। তারা রাজি হয়ে গেল। আবূ সা’ঈদ তাদের সাথে গেলেন এবং সূরা মুহাম্মাদ পাঠ করে দংশিত স্থানে একটু থু থু লাগিয়ে দিলেন। তাতেই লোকটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল। সাহাবায়ে কিরাম তিরিশটি ছাগল নিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করলেন। তাঁদের মনে দ্বিধা ও সংশয় ছিল, এভাবে ছাগলগুলি নেওয়া ঠিক কিনা। অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো যে, বিষয়টি রাসূলুল্লাহকে সা. জানানো হবে। মদীনায় পৌঁছেই তাঁরা রাসূলুল্লাহকে সা. ঘটনাটি খুলে বলেন। সবকিছু শুনে তিনি একটু মুচকি হাসি দেন। তারপর বলেন, তোমরা কিভাবে জানলে যে, এই সূরা ঝাড়-ফুঁকের কাজ দেয়? তোমরা ঠিকই করেছ। বকরীগুলি তোমরা ভাগ করে নেবে এবং আমাকেও একটি অংশ দিতে ভুল করবে না। (সহীহুল বুখারী- ১/২৫১) হযরত রাসূলে কারীমের সা. ইনতিকালের পর তিনি মদীনাতেই অবস্থান করেন। খলীফা হযরত ’উমার ও হযরত ’উসমানের রা. যুগে ফাতওয়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। যিয়াদ ইবন মীনা’র সূত্রে ইবন সা’দ বর্ণনা করেছেনঃ ইবন ’আব্বাস, ইবন ’উমার, আবূ সা’ঈদ খুদারী, আবূ হুরাইরা, আবদুল্লাহ ’আমর ইবনুল ’আস, জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ প্রমুখ আসহাবে রাসূল ’উসমানের মৃত্যুর সময় থেকে তাঁদের মৃত্যু পর্যন্ত মদীনায় ফাতওয়া দিতেন এবং রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস বর্ণনা করতেন। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৫৫) হযরত আলীর রা. যুগে খারেজীদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে তিনি যোগ দেন। তখন তিনি বলতেন, তুর্কীদের চেয়ে খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমি বেশী প্রয়োজন মনে করি। (মুসনাদ- ৩/৩৩, ৫৬) হযরত ইমাম হুসাইন যখন মদীনা ছেড়ে কুফায় যাওয়া স্থির করেন, তখন আরও অনেক সাহাবীর মত আবূ সা’ঈদও তাঁকে এই সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। (সুয়ূতীঃ তারীখুল খুলাফা) হিজরী ৫৯ সনে হযরত উম্মু সালামা রা. ইনতিকাল করলে আবূ সা’ঈদ তাঁর জানাযায় শরীক ছিলেন। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪৩২) হিজরী ৬১ সনে হিজাযবাসীরা ইয়াযীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে রাসূলুল্লাহর সা. ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের ইবনুল ’আওয়ামের রা. হাতে বাই’য়াত করে। এই বাই’য়াতকারীদের মধ্যে হযরত আবূ সা’ঈদও ছিলেন। হিজরী ৬৩ সনে দারুল হিজরাহ্ মদীনার অধিবাসীরা ইয়াযীদের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে গাসীলুল মালায়িকা হযরত হানজালার ছেলে হযরত ’আবদুল্লাহর হাতে বাই’য়াত করে তাঁকে নিজেদের আমীর বলে ঘোষণা দেয়। ইয়াযীদের বাহিনী মদীনা আক্রমণ করে মদীনাবাসীদের পরাভূত করে। হযরত ’আবদুল্লাহ ইয়াযীদ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করেন। বিজয়ী ইয়াযীদ বাহিনী সেই সময় মদীনায় হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ ও ধ্বংসের তান্ডবলীলা সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহর সা. হারাম বা সম্মানিত শহর মদীনার এমন অসম্মান ও অবমাননা সেই সময় জীবিত সাহাবীরা দেখে দারুন মর্মাহত হন। আবূ সা’ঈদও এমন দৃশ্য দেখে সহ্য করতে না পেরে পাহাড়ের এক গুহায় আত্মগোপন করেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর খোঁজে একজন পৌঁছে যায় এবং তাঁকে হত্যার জন্য তরবারি উঠায়। তিনি প্রথমতঃ তাকে ভয় দেখানোর জন্য তরবারি তুলে ধরেন। কিন্তু সৈন্যটি আরও এগিয়ে এলে তিনি তরবারি মাটিতে রেখে দিয়ে সূরা আল-মায়িদার ২৮ নং আয়াতটি পাঠ করেনঃ ‘যদি তুমি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তোমার হাত বাড়াও তবুও আমি তোমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আমার হাত বাড়াবো না। কারণ, আমি আল্লাহ রাব্বুল ’আলামীনকে ভয় করি।’ সৈনিকটি থেমে যায়। সে প্রশ্ন করে, আল্লাহর ওয়াস্তে বলুন তো আপনি কে? বললেনঃ আমি আবূ সা’ঈদ আল খুদারী। আপনি কি রাসূলুল্লাহর সা. সাহাবী? বললেন, হাঁ। সৈনিকটি গুহা ছেড়ে চলে গেল। (আল-ইসাবা- ৩/৫৫) আবূ সা’ঈদ গুহা থেকে বাড়ী আসলেন। নানা রকম জিজ্ঞাসাবাদ চললো এবং বন্দী করা হলো। অবশেষে প্রচন্ড চাপের মুখে ইয়াযীদের প্রতি বাই’য়াত করতে বাধ্য হলেন। একথা হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. অবগত হয়ে তাঁর কাছে যান এবং বলেনঃ শুনেছি আপনি নাকি দুই আমীরের বাই’য়াত বা আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছেন? বললেনঃ হাঁ। প্রথমে ’আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের এবং বন্দী হওযার পরে ইয়াযীদের প্রতি বাই’য়াত করেছি। ইবন ’উমার বললেনঃ আমি এমনই আশংকা করেছিলাম। আবূ সা’ঈদ বললেনঃ কিন্তু আমার করার কি ছিল? কারণ, আমি রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছি, মানুষের প্রতিটি সকাল ও সন্ধ্যা কোন না কোন আমীরের অধীনে অতিবাহিত হওয়া উচিত। একথা শুনে ইবন ’উমার বললেন, যাই হোক না কেন, আমি দুই আমীরের প্রতি বাই’য়াত পছন্দ করিনে। (মুসনাদ- ৩/২৯, ৩০) বেশী সংখ্যক বর্ণনা মতে তিনি হিজরী ৭৪ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। তবে আল্লামা জাহাবী লিখেছেন, তিনি ৮৬ বছর বয়সে মারা যান এবং এটাই সঠিক। (দ্রঃ তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ- ১/৩৭, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ২/২৩৭, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮, শাজারাতুজ জাহাব- ১/৮১, উসুদুল গাবা- ৫/২১১) হযরত আবূ সা’ঈদের ছিল দুই স্ত্রী। একজনের নাম যয়নাব বিনতু কা’ব ইবন আজযাহ্। কেউ কেউ বলেছেনম তিনি সাহাবিয়্যা ছিলেন। দ্বিতীয়জন উম্মু ’আবদিল্লাহ বিনতু ’আবদিল্লাহ নামে প্রসিদ্ধ। তাঁর সন্তানদের নামঃ আবদুর রহমান, হামযাহ্ ও সা’ঈদ। হযরত আবূ সা’ঈদ ছিলেন আহলুস্ সুফ্ফার অন্যতম সদস্য। তিনি ছিলেন তাঁর সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ ফকীহ। কোন ক্বারীর নিকট কুরআন তিলাওয়াত শিখেছিলেন। তাঁর শিক্ষা জীবনে আনসারদের কয়েকটি হালকায়ে দারস ছিল। সেখানে আনসারদের ’আলিম ব্যক্তিরা দারস দিতেন। আবূ সা’ঈদের ছাত্র জীবনের যুগটি ছিল ইসলামের প্রথম যুগ। সেই সময় মানুষ ঠিক মত শরীর ঢাকার মত কাপড়ও সংগ্রহ করতে পারতো না। হালকায়ে দারসে একজন আর একজনের আড়ালে আবডালে চুপে চুপে বসে যেত। একদিন এমন একটি হালকায়ে দারসে হযরত রাসূলে কারীম সা. উপস্থিত হলেন। তাঁকে দেখে ক্বারীর কিরাত থেমে গেল। তিনি সবাইকে গোল হয়ে বসতে বলে নিজেও তাদের সাথে বসে গেলেন। সেই হালকায় সে দিন যারা উপস্থিত ছিল তাদের মধ্যে একমাত্র আবূ সা’ঈদকে রাসূল সা. চিনতেন। (মুসনাদ- ৩/৬৩, হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০৪) হাদীস ও ফিকাহর জ্ঞান তিনি সরাসরি রাসূল সা. ও অন্য সাহাবীদের নিকট থেকে অর্জন করেন। চার খলীফা ও যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট থেকে তিনি হাদীস শোনেন। অসংখ্য হাদীস তাঁর মুখস্থ ছিল। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ১১৭০ টি। যাঁরা বহু সংখ্যক হাদীস বর্ণনা করেছেন তিনি এমন একজন হাফেজে হাদীস। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মধ্যে ৪৩ টি মতান্তরে ৪৬ টি মুত্তাফিক ’আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম সম্মিলিতভাবে বর্ণনা করেছেন।) এবং বুখারী ও মুসলিম প্রত্যেকেই এককভাবে যথাক্রমে ১৬ টি ও ৫২ টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। যে সকল বিখ্যাত সাহাবী ও তাবে’ঈ তাঁর নিকট থেকে হাদীস শোনেন ও বণৃনা করেন তাঁদের কয়েকজন নাম নিম্নে দেওয়া গেলঃ যায়িদ ইবন সাবিত, ’আবদুল্লাহ ইবন ’আব্বাস, আনাস ইবন মালিক, ইবন ’উমার, ইবন যুবাইর, জাবির, আবূ কাতাদাহ, ইবন ’আমর, মাহমূদ ইবন লাবীদ, আবুত তুফায়েল, আবূ উমামা ইবন সাহল, সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিব, তারিক ইবন শিহাব, ’আতা, মুজাহিদ, আবূ ’উসমান আন-নাহদী, ’উবায়দ ইবন ’উমায়র, ’আয়্যাদ ইবন আবী সারাহ, বুসর ইবন সা’ঈদ, আবূ নুদবাহ, ইবন সীরীন প্রমুখ। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ২/৩৫, তাজকিরাতুল হুফফাজ- ১/৪৪, তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ২/২৩৭, আল-আ’লাম- ৩/১৩৮) তাঁর হালকায়ে দারস সব সময় ছাত্রে পরিপূর্ণ থাকতো। কেউ কোন প্রশ্ন করতে চাইলে অনেক প্রতীক্ষার পর সুযোগ পেত। (মুসনাদ-৩/৩৫) দারসের সময় ছাড়াও যে কোন সময় লোকে তাঁর কাছে বিভিন্ন মাসয়ালা জানতে পারতো। প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিতেন। একবার ইবন ’আব্বাস ছেলে ’আলী ও দাস ’আকরামাকে বললেন, যাও তো আবূ সা’ঈদের নিকট থেকে হাদীস শুনে এস। তারা যখন পৌঁছলেন, আবূ সা’ঈদ তখন বাগিচায়, তিনি তাদের সাথে বসেন এবং হাদীস শোনান। (মুসনাদ- ৩/৯০, ৯১) হাদীস বর্ণনার সাথে সাথে কিভাবে তিনি সে হাদীস শুনেছিলেন সে অবস্থারও বর্ণনা দিতেন। হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’উমার রা. কোন এক ব্যক্তির নিকট থেকে একটি হাদীস শোনেন। এই লোকটি আবূ সা’ঈদের সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করে। ইবন ’উমার ঐ লোকটিকে সংগে করে আবূ সা’ঈদের নিকট যান এবং প্রশ্ন করেনঃ এই ব্যক্তি কি অমুক হাদীসটি আপনার নিকট থেকে শুনেছে? আর আপনি কি তা রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছেন? তিনি বললেনঃ আমার দু’চোখ দেখেছে এবং দু’কান শুনেছে। (মুসনাদ- ৩/৪) একবার কুয’য়া নামক একজন ছাত্রের নিকট একটি হাদীস খুব ভালো লাগে। তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেন, হাদীসটি কি আপনি রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শুনেছেন? এমন প্রশ্নে তিনি একটু ক্ষুব্ধ হলেন। বললেনঃ তাহলে কি না শুনেই আমি বর্ণনা করছি? হাঁ, আমি শুনেছি। (মুসনাদ- ৩/৯১) যে সকল হাদীস রাসূলুল্লাহর সা. মুখ থেকে শোনা শব্দাবলীর ওপর আস্থা না হতো সেগুলি বর্ণনার ব্যাপারে দারুন সতর্কতা অবলম্বন করতেন। যেমন একবার একটি হাদীস বর্ণনা করলেন; কিন্তু রাসূলুল্লাহর সা. নামটি উচ্চারণ করলেন না। এক ব্যক্তি প্রশ্ন করে বসলো, এটা কি রাসূলুল্লাহ সা. থেকে বর্ণিত? বললেনঃ আমিও জানি। আবূ সা’ঈদ হযরত রাসূলে কারীমের সা. উপদেশ মত তাঁর ছাত্রদের আন্তরিকভাবে স্বাগতম জানাতেন। ইমাম তিরমিযী আবূ হারুন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা আবূ সা’ঈদের কাছে গেলে বলতেনঃ রাসূলুল্লাহর সা. অসীয়াতের (উপদেশ) প্রতি স্বাগতম। নবী সা. বলেছেনঃ মানুষ তোমাদের অনুসরণ করবে। কিছু লোক নানা স্থান থেকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তোমাদের কাছে আসবে। তারা যখন তোমাদের কাছে আসবে তোমরা তাদের ভালো উপদেশ দেবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘তাদেরকে শিক্ষা দেবে এবং বলবে মারহাবা, মারহাবা, নিকটে এস।’ (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০২, কানযুল ’উম্মাল- ৫/২৪৩) আবূ সা’ঈদ আরও বর্ণনা করেন। ‘রাসূল সা. আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন তাদের (ছাত্রদের) মজলিসে বসার স্থান করে দিই, তাদের হাদীস শিখাই।’ কারণ, তোমরাই তো আমাদের পরবর্তী প্রতিনিধি, আমাদের পরবর্তী মুহাদ্দিস। তিনি তাঁর ছাত্রদের আরও বলতেনঃ তুমি কোন বিষয় না বুঝলে তা বুঝার জন্য বার বার প্রশ্ন করবে। কারণ, তুমি বুঝে আমার মজলিস থেকে উঠে যাও- এটা তোমার না বুঝে উঠে যাওয়া থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২০৩, কানযুল ’উম্মাল- ৫/২৪৩) তিনি ছাত্রদের হাদীস লিখে দিতেন না। তাবরানী আবূ নাদরাহ্ থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমি আবূ সা’ঈদকে বললাম, আপনি আমাদেরকে হাদীস লিখে দিন। তিনি বললেনঃ আমরা কক্ষণও লিখে দেবনা এবং কক্ষণও হাদীসকে কুরআন বানাবো না। তোমরা বরং আমাদের নিকট থেকে এমনভাবে গ্রহণ কর যেমন আমরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে গ্রহণ করেছি। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২১৭) হানজালা ইবন আবী সুফইয়ান আল-জুমাহী তাঁর শায়খদের নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা বলেছেন! আবূ সা’ঈদ আল-খুদারী অপেক্ষা রাসূলুল্লাহর সা. ঘটনাবলীর অধিকতর সমঝদার ব্যক্তি আর কেউ নেই। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত- ২/২৩৭) অত্যন্ত সত্যভাষী ছিলেন তিনি। বলতেনঃ আমি রাসূলকে সা. সত্য ভাষণের প্রতি জোর তাকীদ দিতে শুনেছি। হায়, যদি তা না শুনতাম! (মুসনাদ- ৩/৫) একবার সত্য ভাষণের হাদীসটির আলোচনা উঠলে তিনি কেঁদে ফেলেন। তারপর বলেনঃ হাদীসটি তো অবশ্যই শুনেছি; কিন্তু তার ওপর ’আমল মোটেও হচ্ছেনা। (মুসনাদ- ৩/৬১, ৭১) হযরত আমীর মু’য়াবিয়ার রা. শাসনকালে অনেক বিদ’য়াতের প্রচলন হতে থাকে। তিনি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মু’য়াবিয়ার রা. কাছে যান এবং এক এক করে সকল বিদ’য়াতের কথা তাঁর কর্ণগোচর করেন। (মুসনাদ- ৩/৮৪) একবার আমীর মু’য়াবিয়ার সাথে তাঁর আনসারদের সম্পর্কে কথা হয়। তিনি বলেন, রাসূল সা. আমাদের কষ্টে ধৈর্য ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। তখন আমীর মু’য়াবিয়া বললেনঃ তাহলে তোমরা ধৈর্য ধর। (মুসনাদ- ৩/৮৯) একবার উমাইয়্যা খলীফা মারওয়ানের দরবারে বসে সাহাবীদের ফজীলাত ও মর্যাদা সম্পর্কে তাঁকে রাসূলুল্লাহর সা. হাদীস শোনালেন। মারওয়ান বিশ্বাস করতে চাইলেন না। উক্ত বৈঠকে হযরত যায়িদ ইবন সাবিত ও রাফে ’ইবন খাদীজও উপস্থিত ছিলেন। আবূ সা’ঈদ প্রথমে তাদের দুইজনকে স্বাক্ষী মানলেন। তারপর বললেনঃ তাঁরাই বা কেন বলবে? একজনের তো সাদাকার দায়িত্ব থেকে অপসারণের ভয় আছে, আর অন্যজনের আপনার একটু ইশারাতেই গোত্রের নেতৃত্ব চলে যাওয়ার ভয়। এমন স্পষ্ট কথা শুনে মারওয়ান তাঁকে কোড়া দিয়ে মারার জন্য উদ্যত হয়। তখন ঐ ব্যক্তিদ্বয় তাঁর কথার সত্যতা স্বীকার করেন। (মুসনাদ- ৩/২৩) এমনিভাবে এক ’ঈদের দিনে মারওয়ান মিম্বার বের করেন এবং নামাযের পূর্বে খুতবা দেন। এক ব্যক্তি উঠে প্রতিবাদ করে বলে, এ দু’টি কাজই সুন্নাতের পরিপন্থী বিদ’য়াত। মারওয়ান বললেনঃ পূর্বের পদ্ধতি পরিত্যক্ত হয়েছে। সেখানে আবূ সা’ঈদ উপস্থিত ছিলেন। তিনি বললেন, যা কিছুই হোক না কেন, লোকটি তার দায়িত্ব পালন করেছে। আমি হযরত রাসূলুল্লাহকে সা. বলতে শুনেছিঃ যদি কোন ব্যক্তি কোন খারাপ কাজ করতে দেখে তাহলে তার উচিত শক্তি প্রয়োগে তা প্রতিরোধ করা। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে উচিত মুখে প্রতিবাদ করা, আর তাও সম্ভব না হলে কমপক্ষে অন্তরে তা ঘৃণা করা উচিত। (মুসনাদ- ৩/১০) আমর বিল মারূফের (সৎকাজের আদেশ) আবেগ এত তীব্র ছিল যে, একবার মারওয়ান হযরত আবূ হুরাইরার রা. সাথে বসে ছিলেন। এমন সময় তাঁদের সামনে দিয়ে একটি লাশ অতিক্রম করলো। এই লাশের সাথে আবূ সা’ঈদও ছিলেন। মারওয়ান লাশ দেখেও উঠলেন না। তখন আবূ সা’ঈদ তাঁকে বললেনঃ আমীর, জানাযার জন্যে ওঠো। কারণ, রাসূল সা. উঠতেন। একথা শুনে মারওয়ান দাঁড়িয়ে যান। (মুসনাদ- ৩/৪৭, ৯৭) ইবন সা’দের মতে এই জানাযাটি ছিল উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসার রা.। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৪২৮) হযরত মুস’য়াব ইবন ’উমাইর যখন মদীনার গভর্ণর তখন একবার ’ঈদুল ফিতরের দিন জিজ্ঞেস করলেন, নামায এবং খুতবার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহর সা. কর্মপন্থা কি ছিল? আবূ সা’ঈদ বললেনঃ রাসূল সা. খুতবার আগে নামায পড়াতেন। মুস’য়াব তাঁর কথামত কাজ করেন। (মুসনাদ- ৩/৪) একবার শাহর ইবন হাওশাব ‘তূর’ পাহাড় ভ্রমণের ইচ্ছা করেন। তিনি আবূ সা’ঈদের সাথে দেখা করতে আসেন। আবূ সা’ঈদ তাঁকে বলেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন পবিত্র ভূমির প্রতি সফর নিষেধ করা হয়েছে। ইবন আবী সা’সার জঙ্গল খুব পছন্দ ছিল্ আবূ সা’ঈদ তাঁকে বললেনঃ তুমি সেখানে এমন জোরে আযান দেবে যেন গোটা জঙ্গলে তাকবীরের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে। (মুসনাদ- ৩/৯৫, ৪/৯৩) তাঁর বোন কোন কিছু পানাহার ছাড়াই ধারাবাহিকভাবে সাওম পালন করতেন। রাসূলুল্লাহ সা. এ ধরণের সাওম পালনে নিষেধ করতেন। আবূ সা’ঈদও সব সময় তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করতেন। তিনি ছিলেন পরিপূর্ণভাবে রাসূলুল্লাহর সা. সুন্নাতের অনুসারী। হযরত আবূ হুরাইরাহ এক মসজিদে নামায পড়াতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বা কোন কারণে আসতে পারলেন না। তাঁর পরিবর্তে আবূ সা’ঈদ নামায পড়ালেন। তাঁর নামাযের পদ্ধতির সাথে লোকেরা কিছুটা দ্বিমত পোষণ করলো। তিনি মিম্বারের কাছে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, আমি যেভাবে রাসূলুল্লাহকে সা. নামায আদায় করতে দেখেছি ঠিক সেইভাবে পড়িয়েছি। এখন তোমরা আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করলে তাতে আমার কিছু যায় আসেনা। তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল। একবার তাঁর পায়ে ব্যথা হলো। তিনি পায়ের ওপর পা রেখে শুয়ে ছিলেন। তাঁর ভাই এসে হঠাৎ সেই পায়ে হাত দিয়ে একটি থাবা মারেন। তাতে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। তিনি অত্যন্ত নরমভাবে বললেন, আমাকে ব্যথা দিলে? তুমি তো জানতে আমার পায়ে ব্যথা। ভাই বললেনঃ হাঁ, জানতাম। তবে এভাবে শুতে রাসূল সা. নিষেধ করেছেন। সরলতা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। একবার একটি জানাযার নামাযের জন্য তাঁকে ডাকা হয়। সবার শেষে একটু দেরীতে তিনি পৌঁছলেন। লোকেরা তাঁর অপেক্ষায় বসে ছিল। তাঁকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য স্থান খালি করে দেয়। তিনি বললেনঃ এ উচিত নয়। মানুষের উচিত ফাঁকা জায়গায় বসা। একথা বলে তিনি একটি ফাঁকা স্থানে বসে পড়েন। আবূ সালামা নামে তার এক ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন তাবে’ঈ। তাঁর সাথে ছিল চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। একবার আবূ সালামা তাঁকে ডাক দিলেন। তিনি গায়ে চাদর জড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। আবূ সালামা বললেন, একটু বাগিচা পর্যন্ত চলুন। আপনার সাথে কিছু কথা আছে। তিনি আবূ সালামার সাথে চললেন। তিনি ইয়াতীমদের প্রতিপালন করতেন। লায়স ও সুলায়মান ইবন ’আমর তাঁরই পালিত। তিনি হাতে একটি ছড়ি নিয়ে ঘুরতেন। হালকা-পাতলা ছড়ি তাঁর পছন্দ ছিল। খেজুরের ডাল সোজা করে তিনি ছড়ি বানাতেন। এক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. অনুসারী। (মুসনাদ- ৩/৬৫) আনাস বলেনঃ আনসারদের ২০ জন যুবক সর্বক্ষণ রাসূলুল্লাহর সা. সেবায় নিয়োজিত থাকতো। যে কোন প্রয়োজনে রাসূল সা. তাদের কাউকে পাঠাতেন। আবদুর রহমান ইবন ’আউফ বলেন, চার অথবা পাঁচজন সাহাবী তো কক্ষণও রাসূলুল্লাহর সা. বাড়ীর দরযা থেকে উঠতো না। আবূ সা’ঈদ বলেন, আমরা পালাক্রমে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে থাকতাম। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৬৮৭) একবার এক ওয়ালিমার অনুষ্ঠানে তাঁকে দা’ওয়াত করা হয়। তিনি উপস্থিত হয়ে দেখেন, নানা পদের খাবার প্রস্তুত। বাড়ীর লোকদের বললেন, তোমরা কি জাননা, রাসূল সা. যে দিন দুপুরে খেতেন সে দিন রাতে উপোস যেতেন এবং সকালে নাস্তা করলে দুপুরে খেতেন না? (হায়াতুস সাহাবা- ২/৩০৮) সিফ্ফীন যুদ্ধে হযরত ’আবদুল্লাহ ইবন ’আমর ইবনুল ’আস পিতা ’আমর ইবনুল ’আসের সাথে হযরত ’আলীর রা. বিরুদ্ধে রনাঙ্গনে যান। এ কারণে হযরত হাসান ইবন ’আলী বহুদিন যাবত তাঁর সাথে কথা বলা বন্ধ রাখেন। হযরত আবূ সা’ঈদ রা. এ কথা জানতে ’আবদুল্লাহকে সংগে নিয়ে হাসানের নিকট যান এবং তাঁদের দু’জনের মনোমালিন্য দূর করে সম্প্রীতি ও সৌহার্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে দেন। (হায়াতুস সাহাবা- ২/৪৩৪)

  • আবু কাতাদাহ্ আল-আনসারী (রা)

    আবু কাতাদাহ্ আল-আনসারী (রা)

    হযরত আবু কাতাদাহ মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনী সুলামা শাখার সন্তান। তাঁর আসল নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন ‘আল হারিস’; আবার কেউ বলেছেন ‘আমর’। আল-কালবী ও ইবন ইসহাকের মতে ‘আন-নু’মান’। তবে ‘আল-হারিস’ অধিকতর প্রসিদ্ধ। ইতিহাসে তিনি ‘আবু কাতাদাহ্’ এ ডাক নামেই খ্যাত। পিতা রাব’য়ী ইবন বালদামা এবং মাতা কাবশা বিনতু মুতাহ্হির। তিনিও খাযরাজ গোত্রের বনী সুলামার সাওয়াদ ইবন গানাম শাখার মেয়ে। রাসূলুল্লাহর সা. মদীনায় হিজরাতের ১৮ বছর পূর্বে ৬০৪ খ্রীষ্টাব্দে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা- ৫/২৭৪, আল ইসাবা- ৪/১৫৮; আল-আ’লাম- ২/১৫৪) তাবুক যুদ্ধে যোগদান না করার কারণে যে কা’ব ইবন মালিক আল-আনসারীর শাস্তি হয় এবং পরে আল্লাহ পাক যাঁকে ক্ষমা করেন, তিনি আবু কাতাদাহ্র চাচাতো ভাই। সে সময় তিনিও অন্য সকলের মত কা’বকে বয়কট করেন। (হায়াতুস সাহাবা- ১/৪৬৭) শেষ ’আকাবার পরে কোন এক সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বদর যুদ্ধে তাঁর অংশ গ্রহণের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধ আছে। অনেকে তাঁকে বদরী সাহাবী বলেছেন। তবে মুসা ইবন ’উকবা বা ইবন ইসহাক, এঁদের কেউই বদরী সাহাবীদের তালিকার মধ্যে তাঁর নামটি উল্লেখ করেননি। উহুদসহ পরবর্তী সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। (আল-ইসাবা- ৪/১৫৮; উসুদুল গাবা- ৫/২৭৪) ৬ হিজরীর রবীউল আউয়াল মাসে জীকারাদ বা গাবা অভিযান পরিচালিত হয়। সেই অভিযানে তিনি দারুণ দুঃসাহসের পরিচয় দান করেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা. উটগুলি জীকারাদ নামক একটি পল্লীতে চরতো। রাসূলুল্লাহর সা. দাস রাবাহ ছিলেন সেই উটগুলির দায়িত্বে। গাতফান গোত্রের কিছু লোক রাখালদের হত্যা করে উটগুলি লুট করে নিয়ে যায়। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত সালামা ইবন আকওয়া এ সংবাদ পেয়ে আরবের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মদীনার দিকে মুখ করে শত্রুর আক্রমণের সতর্ক ধ্বনি ‘ইয়া সাবাহাহ্!’ বলে তিনবার চিৎকার দেন। অন্যদিকে রাবাহকে দ্রুত রাসূলুল্লাহর সা. নিকট পাঠিয়ে দিয়ে নিজে গাতফানী লুটেরাদের পিছে ধাওয়া করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. তাঁকে সাহায্যের জন্য দ্রুত তিনজন অশ্বারোহীকে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁদের পিছনে তিনি নিজেও বেরিয়ে পড়েন। সালামা ইবন আকওয়া মদীনার সাহায্যের প্রতীক্ষায় ছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি দেখতে পেলেন, আবু কাতাদাহ আল-আনসারী, আল-আখরাম আল-আসাদী এবং তাঁদের পিছনে মিকদাদ আল-কিন্দী বাতাসের বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছেন। এই অশ্বারোহীদের দেখে গাতফানীর উট ফেলে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু আল- আখরাম আল-আসাদীর মধ্যে তখন শাহাদাতের তীব্র বাসনা কাজ করছে। তিনি সালামার নিষেধ অমান্য করে গাতফানীদের পিছে ধাওয়া করেন। এক পর্যায়ে তাঁর ও ’আবদুর রহমান গাতফানীর মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হয় এবং আল-আখরাম শাহাদাত বরণ করেন। আবদুর রহমান আল-আখরামের ঘোড়াটি নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। এমন সময় আবু কাতাদাহ্ এসে উপস্থিত হন এবং তিনি বর্শার এক খোঁচায় আবদুর রহমানকে হত্যা করেন। (আল-কামিল ফী আত-তারীখ- ২/১৯৮-১৯১; আল-ইসাবা- ৪/১৫৮; হায়াতুস সাহাবা- ১/৫৬১; সাহীহ মুসলিম- ২/১০১) অন্য একটি বর্ণনা মতে এই জীকারাদ যুদ্ধে আবু কাতাদাহ্ যাকে হত্যা করেন তার নাম হাবীব ইবন ’উয়াইনা ইবন হিস্ন। তিনি হাবীবকে হত্যা করে নিজের চাদর দিয়ে লাশটি ঢেকে শত্রুর পিছনে আরও এগিয়ে যান। পিছনের লোকেরা যখন দেখতে পেল, আবু কাতাদাহ্র চাদর দিয়ে একটি লাশ ঢাকা তখন তারা মনে করলো, নিশ্চয় এ আবু কাতাদাহ্র লাশ। সাথে সাথে তারা ‘ইন্নালিল্লাহ’ উচ্চারণ করলো। তারা নিজেরা বলাবলি করতে লাগলো’ আবু কাতাদাহ্ নিহত হয়েছে। একথা শুনে রাসূল সা. বললেন’ আবু কাতাদাহ্ নয়; বরং আবু কাতাদাহ্র হাতে নিহত ব্যক্তির লাশ। সে একে হত্যা করে নিজের চাদর দিয়ে ঢেকে রেখে গেছে, যাতে তোমরা বুঝতে পার, এ ঘাতক সেই। এ যুদ্ধে আবু কাতাদাহ্র ঘোড়াটির নাম ছিল ‘হাযওয়া’। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/২৮৪) আবু কাতাদাহ বলেন, জীকারাদের দিন অভিযান শেষে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আমার দেখা হলে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে দু’আ করেনঃ হে আল্লাহ! তুমি তার কেশ ও ত্বকে বরকত দাও। তার চেহারাকে কামিয়াব কর। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আল্লাহ আপনার চেহারাও কামিয়াব করুন! (উসুদুল গাবা- ৫/২৭৫) এ দিন তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার বর্ণনা শুনে রাসূল সা. মন্তব্য করেনঃ ‘আবু কাতাদাহ্ আজ আমাদের সর্বোত্তম অশ্বারোহী।’ (আল-কামিল ফী আত-তারীখ- ২/১৯১; আল-ইসাবা- ৪/১৫৮) হুদাইবিয়া সন্ধির সফরে রাসূলুল্লাহর সা. সাথে আবু কাতাদাহ্ও ছিলেন। এ সফরে ফেরার পথে একদিন রাসূলসহ সা. তাঁর সফর সঙ্গীদের ফজরের নামায কাজা হয়ে যায়। সে কাজা নামায কখন কিভাবে রাসূল সা. আদায় করেছিলেন তার একটা বিবরণ আবু কাতাদাহ্ বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/২৯) হিজরী সপ্তম অথবা অষ্টম সনে রাসূল সা. আবু কাতাদাহ্র নেতৃত্বে একটি বাহিনী ‘ইদাম’-এর দিকে পাঠান। এই ‘ইদাম’ একটি স্থান বা একটি পাহাড়ের নাম এবং মদীনা থেকে শামের রাস্তায়। তাঁরা ‘ইদাম’ উপত্যকায় পৌঁছানোর পর তাঁদের পাশ দিয়ে ’আমের ইবন আল-আদবাত আল-আশজা’য়ী যাচ্ছিলেন। তিনি আবু কাতাদাহ্ ও তাঁর বাহিনীর সদস্যদের সালাম দিলেন। তা সত্ত্বেও পূর্ব শত্রুতার কারণে এ বাহিনীর সদস্য মুহাল্লিম ইবন জাসসামা ইবন কায়েস তাঁকে হত্যা করেন এবং তাঁর উট ও অন্যান্য জিনিস ছিনিয়ে নেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহর সা. নিকট উপস্থিত হয়ে যখন তাঁকে এ ঘটনা অবহিত করেন তখন সূরা আন নিসার ৯৪ নং আয়াতটি নাযিল হয়। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৮১; হায়াতুস সাহাবা- ২/৩৮৯) ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যখন আল্লাহর পথে যাত্রা করবে তখন পরীক্ষা করে নেবে কেউ তোমাদেরকে সালাম দিলে ইহ-জীবনের সম্পদের আকাঙ্ক্ষায় তাকে বলো না, ‘তুমি মুমিন নও’। কারণ, আল্লাহর নিকট অনায়াসলভ্য সম্পদ প্রচুর আছে। তোমরা তো পূর্বে এরূপই ছিলে, অতঃপর আল্লাহ তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। সুতরাং তোমরা পরীক্ষা করে নেবে। তোমরা যা কর আল্লাহ সে বিষয়ে বিশেষভাবে অবহিত।’ (সূরা আন নিসা- ৯৪) হিজরী ৮ম সনের শা’বান মাসে রাসূল সা. নাজ্দের ‘খাদরাহ্’ নামক স্থানের দিকে পনেরো সদস্যের একটি বাহিনী পাঠান। আবু কাতাদাহ্ ছিলেন এই বাহিনীর আমীর। সেখানে গাতফান গোত্রের বসতি ছিল। তারা ছিল মুসলমানদের চরম শত্রু এক লুটেরা গোত্র। তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল। একারণে সারা রাত চলতেন এবং দিনে কোথাও লুকিয়ে থাকতেন। এভাবে হঠাৎ তাঁরা গাতফান গোত্রে পৌঁছে যান। তারাও ছিল ভীষণ সাহসী। সাথে সাথে বহুলোক উপস্থিত হয়ে গেল এবং যুদ্ধ শুরু হলো। আবু কাতাদাহ্ সঙ্গীদের বললেন, যারা তোমাদের সাথে লড়বে শুধু তাদেরকেই হত্যা করবে। সবাইকে ধাওয়া করার কোন প্রয়োজন নেই। এমন নীতি গ্রহণের ফলে দ্রুত যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। মাত্র ১৫ দিন পর প্রচুর গণীমতের মাল সঙ্গে নিয়ে মদীনায় ফিরে আসলেন। গণীমতের মালের মধ্যে ছিল দু’শো উট, দু’হাজার ছাগল এবং বহু বন্দী। এই মালের এক পঞ্চমাংশ পৃথক করে রেখে বাকী সবই তাঁদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয়। এ ঘটনার কিছুদিন পর আল্লাহর রাসূল সা. রমজান মাসে ৮ জন লোকের একটি দল ‘বাতানে আখাম’- এর দিকে পাঠান। এঁদেরও নেতা ছিলেন আবু কাতাদাহ্। ‘বাতানে আখাম’- এর অবস্থান হচ্ছে জী-খাশাব ও জী-মারওয়ার মাঝামাঝি মদীনা থেকে মক্কার দিকে তিন মনযিল দূরে। রাসুল সা. মক্কায় সেনা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মানুষ যাতে একথা মোটেই বুঝতে না পারে এ জন্য এই দলটিকে পাঠান। মূলতঃ মানুষের চিন্তা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই একাজ করেন। জী-খাশাব পৌঁছার পর এ দলটি জানতে পেল যে, রাসূল সা. মক্কার দিকে বেরিয়ে পড়েছেন। সুতরাং তাঁরা ‘সুকাইয়্যা’ নামক স্থানে রাসূলুল্লাহর সা. বাহিনীর সাথে মিলিত হন। (তাবাকাতঃ মাগাযী অধ্যায়- ৯১) মক্কা বিজয়ের পর হুনাইন অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানে লড়াই এত তীব্র ছিল যে, মুসলমানদের অনেক বড় বড় বীরও পিছু হঠতে বাধ্য হন। আবু কাতাদাহ্ এ যুদ্ধে দারুন বীরত্ব প্রদর্শন করেন। এক স্থানে একজন মুসলমান ও একজন মুশরিক সৈনিকের মধ্যে হাতাহাতি লড়াই হচ্ছে। দ্বিতীয় একজন পিছন দিক থেকে মুসলিম সৈনিককে আক্রমণের পায়তারা করছে। ব্যাপারটি আবু কাতাদাহর নজরে পড়লো। তিনি চুপিসারে এগিয়ে গিয়ে পিছন দিক থেকে লোকটির কাঁধে তরবারির ঘা বসিয়ে দিলেন। লোকটির একটি হাত কেটে পড়ে গেল; কিন্তু অতর্কিতে সে দ্বিতীয় হাতটি দিয়ে আবু কাতাদাহ্র গলা পেঁচিয়ে ধরলো। লোকটি ছিল অতি শক্তিশালী। সে এত জোরে আবু কাতাদাহ্কে চাপ দিল যে, তাঁর প্রাণ বেরিয়ে যাবার উপক্রম হলো। দু’জনের মধ্যে ধস্তাধস্তি চলছে, এর মধ্যে লোকটির দেহ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়ায় সে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে আবু কাতাদাহ্ লোকটির দেহে আরেকটি ঘা বসিয়ে দেন। লোকটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আবু কাতাদাহ্ যখন তার হত্যা কর্মে ব্যস্ত তখন মক্কার এক মৃসলিম সৈনিক সেই পথে যাচ্ছিল। সে নিহত ব্যক্তির সকল সাজ-সরঞ্জাম ও জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে গেল। এরপর মুসলিম বাহিনীর মধ্যে দারুন ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। তারা ময়দান থেকে যে যেদিকে পারে, পালিয়ে যাচ্ছিল। আবু কাতাদাহ্ও এক দিকে যাচ্ছেন। পথে এক স্থানে হযরত ’উমারের রা. সাথে দেখা। আবু কাতাদাহ্ তাঁকে জিজ্ঞেস করলেনঃ কী ব্যাপার? ’উমার রা. বললেনঃ আল্লাহর যা ইচ্ছা। এর মধ্যে মুসলমানরা দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে এবং রণক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করে। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ যুদ্ধ থেমে গেল। আমরাও বিশ্রাম নিচ্ছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ সা. ঘোষণা করলেনঃ কেউ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করলে হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির পরিত্যক্ত জিনিস লাভ করবে। আমি বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি একজন সাজ-সরঞ্জামবিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। আমি যখন তার হত্যা কর্মে ব্যস্ত তখন কে একজন তাঁর জিনিস ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। আমি তাকে চিনিনে। তখন মক্কার সেই ব্যক্তি বললোঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে সত্য বলেছে। নিহত ব্যক্তির জিনিস আমার কাছে আছে। সেগুলি আমাকে দেওয়ার জন্য তাঁকে একটু রাজী করিয়ে দিন। সাথে সাথে আবু বকর রা. বলে উঠলেনঃ আল্লাহর কসম! রাসূল সা. তাকে রাজী করাবেন না। একজন শেরে খোদা আল্লাহর রাহে জিহাদ করেছে, আর তুমি তার প্রাপ্য জিনিস হাতানোর মতলবে আছ? নিহত ব্যক্তির জিনিস তাকে দিয়ে দাও। তখন রাসূল সা. বললেনঃ আবু বকর সত্য বলেছে। তুমি তার লুণ্ঠিত দ্রব্য ফিরিয়ে দাও। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ আমি সেই জিনিসগুলি নিয়ে বিক্রী করি এবং সে অর্থ দিয়ে দশটির মত খেজুর গাছ ক্রয় করি। ইসলাম গ্রহণের পর এই ছিল আমার প্রথম কোন সম্পদ ক্রয়। (সীরাতু ইবন হিশাম- ২/৪৪৮, ৪৪৯; হায়াতুস সাহাবা- ২/৯০, ৯১; মুসনাদ- ৫/৩০৬) রাসূলুল্লাহর সা. ইনতিকালের পর খলীফাদের সময়ে আবু কাতাদাহ্র কর্মকান্ডের বিস্তারিত তেম কোন তথ্য পাওয়া যায় না। হযরত ’উসমান রা. যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা মদীনায় নিজ গৃহে ঘেরাও অবস্থায়, তখন হজ্জ মওসুম। সে সময় একদিন আবু কাতাদাহ্ অন্য একজন লোককে সংগে করে খলীফা ’উসমানের রা. নিকট গিয়ে হজ্জে যাওয়ার অনুমতি চান। তিনি তাদেরকে অনুমতি দেন। তখন তারা খলীফার নিকট জানতে চানঃ যদি এই বিদ্রোহীরা বিজয়ী হয় তাহলে তাঁরা কার সাথে থাকবেন? খলীফা বললেনঃ সংখ্যাগরিষ্ঠ জামা’য়াতের সাথে। তাঁরা আবার প্রশ্ন করেনঃ যদি এই সংখ্যাগরিষ্ঠ জামা’য়াতই আপনার ওপর বিজয়ী হয় তখন কার সাথে থাকবো? সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যারাই হোক না কেন তাদের সাথে থাকবে। (হায়াতুস সাহাবা- ২/১২৬) হযরত আলী রা. তাঁকে একবার মক্কার আমীর নিয়োগ করেন। পরে তাঁর স্থলে কুছাম ইবন ’আব্বাসকে নিয়োগ করেন। হিজরী ৩৬ সনে উটের যুদ্ধ এবং এর পরের বছর সিফ্ফীনের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. দু’টি যুদ্ধেই হযরত আলীর রা. পক্ষে যোগ দেন। (আল-আ’লাম- ২/১৫৪; আল-ইসাবা- ৪/১৫৮) হিজরী ৩৮ সনে খারেজীরা বিদ্রোহের পতাকা উড্ডীন করে। হযরত আলী রা. যে বাহিনী নিয়ে তাদের বিরেুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, আবু কাতাদাহ্ ছিলেন তার পদাতিক দলের অফিসার। হযরত আবু কাতাদাহ্র রা. মৃত্যু সন নিয়ে দারুন মতভেদ আছে। কুফাবাসীদের মতে হিজরী ৩৮ সনে তিনি কুফায় মারা যান এবং হযরত আলী রা. সাত তাকবীরের সাথে তাঁর জানাযার নামায পড়ান। ইমাম শা’বী বলেন, সাত নয়, বরং ছয় তাকবীরের সাথে। হাসান ইবন ’উসমান বলেন, তিনি হিজরী- ৪০ সনে মারা যান। ওয়াকিদী বলেন, হিজরী ৫৪ সনে ৭২ বছর বয়সে মদীনায় মারা যান। আবার কেউ বলেছেন, ৭২ নয়; বরং ৭০ বছর বয়সে। ইমাম বুখারী ‘আল-আওসাত’ গ্রন্থে যারা হিজরী ৫০ থেকে ৬০ সনের মধ্যে মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে আবু কাতাদাহ্র নামটি উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, মারওয়ান যখন মু’য়াবিয়ার রা. পক্ষ থেকে মদীনার ওয়ালী তখন তিনি আবু কাতাদাহ্কে একবার দেখা করার জন্য ডেকে পাঠান এবং তিনি মারওয়ানের সাথে দেখা করেন। এর সমর্থনে আর একটি বর্ণনা দেখা যায়। মু’য়াবিয়া রা. যখন মদীনায় আসেন তখন সবশ্রেণীর মানুষ তাঁর সাথে দেখা করে। তখন তিনি আবু কাতাদাহ্কে ডেকে বলেনঃ শুধু আপনারা-আনসাররা ছাড়া সব মানুষই আমার সাথে দেখা করেছে। এসব বর্ণনা দ্বারা নিশ্চিতভাবে বুঝা যায় তিনি হিজরী ৪০ সনের পরে মারা গেছেন। (দ্রঃ আল-ইসাবা- ৪/১৫৯; আল-আ’লাম- ২/১৫৪; উসুদুল গাবা- ৫/২৭৫) হযরত আবু কাতাদাহ্র রা. দৈহিক আকার-আকৃতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে তিনি ঘাড় পর্যন্ত চুল রাখতেন যাকে ‘হামিয়্যা’ বলা হয়। চুলে মাঝে মাঝে চিরুনী করতেন। হযরত রাসূলে কারীম সা. একবার তাঁর চুলের অযত্ন ও বিক্ষিপ্ত অবস্থা দেখে বলেন, এগুলি একটু ঠিক কর। মানুষের উচিত চুল রাখলে তার যত্ন নেওয়া। অন্যথায় সে রাখার ফায়দা কি? তাঁর ছিল চার ছেলেঃ আবদুল্লাহ, মা’বাদ, আবদুর রহমান ও সাবিত। শেষের জন ছিলেন দাসীর গর্ভজাত। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল সালাফা বিনতু বারা’ ইবন মা’রূর ইবন সাখার। সুলামা খান্দানের এক অভিজাত ঘরের মেয়ে। তিনি নিজেও একজন ‘সাহাবিয়্যা’ (মহিলা সাহাবী) এবং তাঁর পিতা বারা’ ইবন মা’রূর ইবন সাখারও ছিলেন একজন খ্যাতিমান সাহাবী। হযরত আবু কাতাদাহ্ কুরআন-হাদীসের প্রচার প্রসারের দায়িত্ব সম্পর্কে মোটেই উদাসীন ছিলেন না। হাদীস বর্ণনার ব্যাপারে ছিলেন দারুন সতর্ক। রাসূলুল্লাহর সা. নিকট থেকে ‘কিজব’ ’আলার রাসূলে’- বা রাসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপের হাদীস শোনার পর থেকে হাদীসের ব্যাপারে দারুন সতর্কতা অবলম্বন করেন। (মুসনাদ- ৫/২৯২) একদিন তাবঈদের একটি মজলিসে হাদীসের চর্চা হচ্ছিল। প্রত্যেকেই বলছিলেন, ‘রাসূল সা. এমন বলেছেন, রাসূল সা. এমন বলেছেন’। আবু কাতাদাহ্ তাঁদের এসব আলোচনা শুনে বললেন; হতভাগার দল, তোমাদের মুখ থেকে এসব কী বের হচ্ছে? রাসূল সা. মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীদের জাহান্নামের শাস্তির কথা বলেছেন। (মুসনাদ- ৫/৩১০) এত সতর্কতা সত্ত্বেও তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৭০ (একশত সত্তর)। তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে যেমন শ্রেষ্ঠ সাহাবাগণ আছেন, তেমনি আছেন শ্রেষ্ঠ তাবে’ঈগণও। যেমনঃ আনাস ইবন মালিক, জাবির ইবন ’আবদিল্লাহ, আবু মুহাম্মাদ নাফে, (তাঁর আযাদকৃত দাস), সা’ঈদ ইবন কা’ব ইবন মালিক, কাবশা বিনতু কা’ব ইবন মালিক, ’আবদুল্লাহ ইবন রাবাহ, ’আতা ইবন ইয়াসার, আবু সালামা ইবন ’আবদির রহমান ইবন ’আউফ, ’উমার ইবন সুলাইম যারকী, ’আবদুল্লাহ ইবন মা’বাদ, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন, সা’ঈদ ইবন মুসায়্যিব প্রমুখ। উল্লেখিত ব্যক্তিগণের সকলের হাদীস শাস্ত্রের এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। হযরত আবু কাতাদাহ্র মধ্যে ইসলামী উখুওয়াত বা ভ্রাতৃত্বের চরম বিকাশ ঘটেছিল। একবার রাসূলুল্লাহর সা. সামনে এক আনসারী ব্যক্তির মৃতদেহ আনা হলো জানাযার জন্য। রাসূল সা. প্রথমে জানতে চাইলেন, তার উপর কোন ঋণ আছে কিনা। লোকেরা বললো তার দু’দীনার ঋণ আছে। তিনি আবার জানতে চাইলেন, সে কোন সম্পদ রেখে গেছে কিনা। লোকেরা বললো, না, সে কিছুই রেখে যায়নি। তখন রাসূল সা. বললেনঃ তোমরা তার নামায পড়। হযরত আবু কাতাদাহ্ আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ আমি যদি তার ঋণ পরিশোধ করে দেই, আপনি কি নামায পড়াবেন? বললেনঃ হ্যাঁ। আবু কাতাদাহ্ লোকটির ঋণ পরিশোধ করে রাসূলকে সা. খবর দিলেন। রাসূল সা. এসে জানাযার নামায পড়ান। (মুসনাদ- ৫/২৯, ২০৩) একজন মুসলমান তাঁর কাছে কিছু ঋণী ছিল। যখন তিনি তাগাদায় যেতেন তখন সে লুকিয়ে থাকতো। একদিন তিনি লোকটির বাড়ীতে গেলেন এবং তার ছেলের কাছে খবর পেলেন, সে খাবার খাচ্ছে। তিনি চেঁচিয়ে বললেনঃ তুমি বেরিয়ে এসো, আজ আমি জেনে ফেলেছি। আজ লুকিয়ে কাজ হবে না। সে বেরিয়ে এলে আবু কাতাদাহ্ তার এভাবে লুকানোর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। লোকটি বললোঃ আসল কথা হেলো, আমি খুবই গরীব। আমার কাছে কিছুই নেই। তার ওপর আছে পরিবার-পরিজনের বোঝা। আবু কাতাদাহ্ বললেনঃ সত্যিই কি তোমার এমন দুরবস্থা? সে বললোঃ হাঁ। আবু কাতাদাহ্র চোখ পানিতে ভরে গেল। তিনি তার ঋণ মাফ করে দিলেন। (মুসনাদ- ৫/৩০৮) হযরত আবু বকরের সা. খিলাফতকালে রিদ্দার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধেল এক পর্যায়ে খলীফা খালিদ ইবন ওয়ালীদকে পাঠালেন মালিক ইবন নুওয়াইরা ইয়ারবু’য়ীর বিরুদ্ধে। মালিক ইবন নুওয়াইরা ইসলাম কবুল করেন। তা সত্ত্বেও যে কোন কারণেই হোক খালিদ তাঁকে হত্যা করেন। খালিদের একাজে আবু কাতাদাহ্ এতই ক্ষুব্ধ হন যে, খলীফার নিকট আবেদন করেন; আমি খালিদের অধীনে থাকতে রাজী নই। সে একজন মুসলমানের রক্ত ঝরিয়ছে। অতি ক্ষুদ্র বিষয়েও তিনি মানুষকে সঠিক আকীদা বিশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। একবার তিনি ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন সময় একটা উল্কা আসতে থাকে। মানুষ সে দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে। তিনি তাদেরকে লক্ষ্য লক্ষ্য করে বললেনঃ এটা বেশী দেখা নিষেধ (মুসনাদ- ৫/২৯৯) হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. রাসূলুল্লাহর সা. সার্বক্ষণিক সাহচর্য ও খিদমতের সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। একবার এক সফরে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সঙ্গী ছিলেন। রাসূল সা. সাহাবীদের বললেন, পানি কোথায় আছে তা খুঁজে বের কর অন্যথায় সকালে ঘুম থেকে পিপাসিত অবস্থায় উঠতে হবে। লোকেরা পানির তালাশে বেরিয়ে গেল। কিন্তু হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. রাসূলুল্লাহর সা. সাথেই থেকে গেলেন। রাসুল সা. উটের ওপর সওয়ার ছিলেন। ঘুম কাতর অবস্থায় তিনি যখন এক দিকে ঝুঁকে পড়ছিলেন তখন আবু কাতাদাহ্ এগিয়ে গিয়ে নিজের হাত দিয়ে সে দিকে ঠেস দিচ্ছিলেন। একবার তো রাসূল সা. পড়ে যাবারই উপক্রম হলেন। আবু কাতাদাহ্ দ্রুত হাত দিয়ে ঠেকালেন। রাসূল সা. চোখ মেলে জিজ্ঞেস করলেনঃ কে? বললেনঃ আবু কাতাদাহ্। রাসূল সা. আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ কখন থেকে আমার সাথে আছ? বললেনঃ সন্ধ্যা থেকে। তখন রাসূল সা. তাঁর জন্য দু’আ করলেন এই বলেঃ হে আল্লাহ! আপনি আবু কাতাদাহ্কে হিফাজত করুন যেমন সে সারা রাত আমার হিফাজত করেছে। (মুসনাদ- ৫/২৯৮; হায়াতুস সাহাবা- ৩/৩৪৭; আল-ইসাবা- ৪/১৫৯) একবার হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. রাসূলুল্লাহর সা. একটি মু’জিযা প্রত্যক্ষ করেন। আবু নু’য়ায়িম ‘আদ-দালায়িল’ গ্রন্থে (১৪৪) ইবন মাস’উদ রা. থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহর সা. সংগে ছিলাম। এক সময় যাত্রা বিরতিকালে তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের সাথে কি পানি আছে? বললামঃ হাঁ। আমার কাছে একটি পাত্রে কিছু পানি আছে। বললেনঃ নিয়ে এসো। আমি পানির পাত্রটি নিয়ে এলাম। তিনি বললেনঃ এর থেকে কিছু পানি নিয়ে তোমরা সবাই অজু কর। অজুর পর সেই পাত্রে এক ঢোক মত পানি থাকলো। রাসূল সা. বললেনঃ আবু কাতাদাহ্, তুমি এ পানিটুকু হিফাজতে রেখে দাও। খুব শিগগিরই এর একটি খবর হবে। আস্তে আস্তে দুপুরের প্রচন্ড গরম শুরু হলো। রাসূল সা. সঙ্গীদের সামনে উপস্থিত হলেন। তারা সবাই বললেনঃ না, তোমরা মরবে না। এই বলে তিনি আবু কাতাদাহ্কে ডেকে পানির পাত্রটি নিয়ে আসতে বললেন। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ আমি পাত্রটি নিয়ে এলাম। রাসূল সা. বললেনঃ আমার পিয়ালাটি নিয়ে এসো। পিয়ালা আনা হলো। তিনি পাত্র থেকে একটু করে পানি পিয়ালায় ঢেলে মানুষকে পান করাতে লাগলেন। পানি পানের জন্য রাসূলুল্লাহর সা. চারপাশে ভীড় জমে গেল। দারুন হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। রাসূল সা. বললেনঃ তোমরা ভদ্রভাবে শান্ত থাক, সবাই পান করতে পারবে। আবু কাতাদাহ্ বলেনঃ একমাত্র রাসূল সা. ও আমি ছাড়া সকলের পান শেষ হলে তিনি বললেনঃ আবু কাতাদাহ্, এবার তুমি পান কর। আমি বললাম! আপনি আগে পান করুন। তিনি বললেনঃ সম্প্রদায়ের যিনি সাকী বা পানি পান করান, তিনি সবার শেষে পান করেন। অতঃপর আমি পান করলাম এবং সবার শেষে রাসূল সা. পান করলেন। সবার পান করার পরেও পাত্রের ঠিক যতটুকু পানি ছিল তাই থেকে গেল। বর্ণনাকারী বলেনঃ সে দিন তিন শো লোক ছিল। অন্য একটি বর্ণনা মতে, লোক সংখ্যা ছিল সাতশো। (হায়াতুস সাহাবা- ৩/৬২০, ৬২১) তিনি স্বভাবগতভাবেই ছিলেন কোমল। জীবের প্রতি ছিল তাঁর দারুন দয়। একবার ছেলের বাড়ী গেলেন। ছেলের বউ অজুর জন্য পানি রেখেছিল। একটি বিড়াল তাতে মুখ দিয়ে পান করতে শুরু করলো। হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. বিড়ালটি না তাড়িয়ে পাত্রটি তার দিকে আরো একটু কাত করে দিলেন, যাতে সে ভালো করে পান করতে পারে। পাশে দাঁড়িয়ে ছেলের বউ এ দৃশ্য দেখছিল। তিনি ছেলে-বউকে বললেনঃ এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেনঃ বিড়ালের এঁটে না পাক নয়। কারণ, এরা ঘরের মধ্যে বিচরণকারী জীব। (মুসনাদ- ৫/৩০৩) শিকার করা ছিল তাঁর বিশেষ শখ। একবার হযরত রাসূলে কারীমের সা. সাথে যাচ্ছিলেন। পথে যাত্রা বিরতিকালে কয়েকজন সংগী নিয়ে শিকারে বেরিয়ে পড়লেন। স্থানটি ছিল পাহাড়ী এলাকা। খুব দ্রুত পাহাড়ে উঠার অভ্যাস ছিল তাঁর। তিনি সংগীদের নিয়ে পাহাড়ের উপর উঠে গেলেন। সেখানে একটি জন্তু দেখতে পেলেন। আবু কাতাদাহ্ একটু এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখে সংগীদের জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা বলতো এটা কি জন্তু? তাঁরা বললেনঃ আমরা তো ঠিক বলতে পারছিনা। তিনি বললেনঃ এটা একটা বন্য গাধা। আবু কাতাদাহ্ পাহাড়ে উঠার সময় তাঁর চাবুকটি ভুলে রেখে গিয়েছিলেন। তিনি সংগীদের চাবুকটি নিয়ে আসতে বললেন। তাঁরা ছিলেন ইহরাম অবস্থায়। একারণে তাঁরা শিকারে কোন রকম সহযোগিতা করলেন না। শেষে তিনি নিজেই বর্শা নিয়ে জন্তুটির পিছু ধাওয়া করে হত্যা করেন। তারপর সেটি ওঠানোর জন্য সংগীদের সাহায্য চান; কেউ তাঁকে সাহায্য করলেন না। অবশেষে তিনি একাই সেটা উঠিয়ে আনেন এবং গোশত তৈরী করে রান্না করেন। কিন্তু সংগীরা খেতে দ্বিধাবোধ করেন। কেউ কেউ সেই গোশ্ত খেলেন, আবার অনেকে খেতে অস্বীকৃতি জানালেন। আবু কাতাদাহ্ বললেন, আচ্ছা আমি রাসূলুল্লাহর সা. নিকট জিজ্ঞেস করে কিছুক্ষণের মধ্যেই তোমাদেরকে বলছি। তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে দেখা করে ঘটনাটি খুলে বললেন। রাসূল সা. শুনে বললেনঃ ওটা খেতে অসুবিধা কি? ওটা তো আল্লাহ তোমাদের জন্য পাঠিয়েছেন। যদি কিছু অবশিষ্ট থাকে তাহলে আমার জন্য কিছু নিয়ে এসো। গোশত সামনে আনা হলে রাসূল সা. সাহাবীদের বললেনঃ তোমরা খাও। (ফাতহুল বারী- ৯/৫২৮) তিনি ছিলেন অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির। একারণে তাঁর বন্ধুদের একটা দল ছিল। হুদাইবিয়ার সফরে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সংগী ছিলেন। তিনি ইয়ার-বন্ধুদের সাথে হাসি-তামাশা ও কৌতুক করতে করতে পথ চলছিলেন। আবু মুহাম্মাদও ছিলেন তাঁর বান্ধব মজলিসের একজন সদস্য। (মুসনাদ- ৫/২৯৫; ৩০১) হযরত আবু কাতাদাহ্ রা. একবার একটি ‘আদনী’ (আদনে তৈরী) চাদর গায়ে জড়িয়ে হযরত মু’য়াবিয়ার রা. দরবারে যান। তখন সেখানে আবদুল্লাহ ইবন মাস’য়াদাহ্ বসা ছিলেন। ঘটনাক্রমে আবু কাতাদাহ্র গায়ের চাদরটি আবদুল্লাহর গায়ে খসে পড়ে। অত্যন্ত রাগের সাথে আবদুল্লাহ সেটি ছুঁড়ে ফেলে দেন। আবু কাতাদাহ্ প্রশ্ন বললেনঃ আল্লাহর কসম! আমি তার পিতার বুক বর্শা দিয়ে প্রতিরোধ করেছি- সে দিন সে মদীনার উপকণ্ঠে আক্রমণ করেছিল। একথা শুনে ’আবদুল্লাহ চুপ থাকে। (আনসাবুল আশরাফ- ১/৩৪৯) উল্লেখ্য যে, আবু কাতাদাহ্ জীকারাদ অভিযানের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। সেই গাতফানী লুটেরাদের মধ্যে এই ’আবদুল্লাহর পিতাও ছিল।

  • আবু মাস’উদ আল-বদরী (রা)

    আবু মাস’উদ আল-বদরী (রা)

    আবু মাস’উদ ডাক নাম, আর এ নামেই তিনি ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। আসল নাম ’উকবা এবং পিতার নাম ’আমর ইবন সা’লাবা। সর্বশেষ বাই’য়াতে ’আকাবায় যোগ দিয়ে সেখানেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ওয়াকিদী বলেনঃ আবু মাস’উদ আকাবায় অংশগ্রহণ করেন, তবে বদরে অনুপস্থিত ছিলেন। মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক বলেনঃ আকাবায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৫; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৯; উসুদুল গাবা- ৫/২৯৬) এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। উহুদ এবং উহুদ পরবর্তী কাফিরদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যোগ দেন। তবে তাঁর বদর যুদ্ধে যোগদানের ব্যাপারে সীরাত বিশেষজ্ঞদের অনেক মতভেদ আছে। অধিকাংশের মতে, তিনি বদরে যোগ দেন এবং এ কারণেই তাঁকে বদরী বলা হয়। ইমাম বুখারী খুব দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, তিনি বদরে যোগ দিয়েছেন। আর এর স্বপক্ষে তিনি তাঁর সহীহ গ্রন্থে দলীল হিসেবে একাধিক হাদীস উপস্থাপন করেছেন। যেমন, বাশীর ইবন আবূ মাস’উদ বর্ণিত একটি হাদীস। তাতে এসেছেঃ মুগীরা আসরের নামায দেরী করে পড়লে আবু মাস’উদ ’উকবা ইবন ’আমর তার প্রতিবাদ করেন। এ আবু মাস’উদ হচ্ছে যায়িদ ইবন হাসানের নানা এবং তিনি বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন। আবু ’উতবা ইবন সালাম এবং মুসলিম ‘আল-কনা’ গ্রন্থে তাঁর বদরে যোগদানের কথা বলেছেন। ইবনুল বারকী বলেনঃ ইবন ইসহাক তাঁকে বদরীদের মধ্যে উল্লেখ করেননি। তাবারানী বলেনঃ কুফাবাসীরা দাবী করেন, তিনি বদরে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু মদীনাবাসীরা তাঁকে বদরীদের মধ্যে উল্লেখ করেন না। ইবন সা’দ আল-ওয়াকিদী থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ আবু মাস’উদ যে বদরে যোগ দেননি, এ ব্যাপারে আমাদের সংগী-সাথীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই। তিনি বদরে বসবাস করেছিলেন, এ কারণে তাঁকে বদরী বলা হয়। (আল-ইসাবা- ২/৪৯০, ৪৯১; সীরাতু ইবন হিশাম- ১/৪৫৯; উসুদুল গাবা- ৫/২৯৬) নবুওয়াতের যুদ ও প্রথম তিন খলীফার সময় পর্যন্ত আবু মাস’উদ মদীনায় ছিলেন। জীবনের কোন এক পর্যায়ে কিছু দিনের জন্য বদরের পানির ধারে বসবাস করেছিলেন। হযরত ’আলীর খিলাফতকালে মদীনা ছেড়ে কুফায় চলে যান এবং সেখানে বাড়ী তৈরী করে বসবাস করেন। (আল-ইসাবা- ৪/২৫২; আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৫) হযরত ’আলী রা. ও হযরত মু’য়াবিয়ার রা. মধ্যে বিরোধের সময় আবু মাস’উদের ভূমিকার বিষয়ে পরস্পর বিরোধী বর্ণনা দেখা যায়। একটি বর্ণনা মতে, তিনি ছিলেন হযরত মু’য়াবিয়ার রা. ঘনিষ্ঠজনদের একজন। হযরত মু’য়াবিয়া রা. যখন সিফ্ফীন যুদ্ধে যান তখন তাঁকে কুফায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান। তাঁর না ফেরা পর্যন্ত আবু মাস’উদ কুফার আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। (আল-ইসাবা- ২/৪৯১) পক্ষান্তরে অন্য একটি বর্ণনা মতে, তিনি ছিলেন হযরত ’আলীর রা. সহচর। ’আলীর রা. সময়ে তিনি কুফায় যান এবং ’আলী রা. সিফ্ফীনে যাওয়ার সময় তাঁকে কুফার আমীরের দায়িত্ব দিয়ে যান। (আনসাবুল আশরাফ- ১/২৪৫; আল-আ’লাম- ৪/২৪১) শেষের বর্ণনাটিই সঠিক। কারণ সিফ্ফীন যুদ্ধের সময় কুফা ছিল হযরত ’আলীর রা. অধীনে, মু’য়াবিয়ার রা. অধীনে নয়। হযরত আবু মাস’উদের মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ কেউ বলেছেন, সিফ্ফীন যুদ্ধের পর তিনি কুফা থেকে জন্মভূমি মদীনায় ফিরে আসেন এবং সেখানে মারা যান। আবার অনেকে বলেছেন, তাঁর মৃত্যু হয় কুফায়। (আল-ইসাবা- ২/৪৯১; আল-আ’লাম- ৪/২৪১) তাঁর মৃত্যুর সন সম্পর্কেও মতভেদ আছে। হিজরী ৪১ ও ৪২ দু’টি তাঁর মৃত্যু সন বলে কথিত হয়েছে। আবার অনেকে বলেছেন, হযরত মু’য়াবিয়ার রা. খিলাফতের শেষ দিকে হিজরী ৬০ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। (উসুদুল গাবা- ৫/২৯৬) তবে এটা ঠিক যে হযরত মুগীরা ইবন শু’বার রা. কুফার শাসন কর্তৃত্বের সময় তিনি জীবিত ছিলেন। নিশ্চিতভাবে তা ছিল হিজরী ৪০ সনের পরে। (আল-ইসাবা- ২/৪৯১) হযরত আবু মাস’উদের এক পুত্র ও এক কন্যার পরিচয় জানা যায়। পুত্রের নাম বাশীর এবং কন্যা ছিলেন হযরত ইমাম হাসানের রা. সহধর্মিনী। তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হযরত যায়িদ ইবন হাসান। বাশীরের জন্ম হয় রাসূলুল্লাহর সা. জীবদ্দশায় বা তার কিছু পরে। হযরত আবু মাস’উদ রা. রাসূলুল্লাহর সা. হাদীসের প্রচার-প্রসারের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করেন। হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের তৃতীয় তবকা বা স্তরে তাঁকে গণ্য করা হয়। হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত ১০২ (একশো দুইটি) হাদীস পাওয়া যায়। (আল-’আলাম- ৪/২৪১) তাবে’ঈদের মধ্যে যাঁরা তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের খ্যাতিমান কয়েকজনের নামঃ বাশীর, আবদুল্লা ইবন ইয়াযীদ খুতামী, আবু ওয়ায়িল, ’আলকামা, কায়স ইবন আবী হাতেম, ’আবদুর রহমান ইবন ইয়াযীদ নাখ’ঈ, ইয়াযীদ ইবন শুরাইক, মুহাম্মাদ ইবন ’আবদিল্লাহ ইবন যায়িদ ইবন ’আবদি রাব্বিহি- আনসারী প্রমুখ। রাসূলুল্লাহর সা. জীবনাচারের অনুসরণ এবং ’আমর বিল মা’রূফ ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাসূলুল্লাহর সা. আদেশ-নিষেধকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে পালন করতেন। একবার তিনি তাঁর এক দাসকে মারছেন। এমন সময় পিছন থেকে আওয়ায ভেসে এলোঃ ‘আবু মাস’উদ! একটু ভেবে দেখ। যে আল্লাহ তোমাকে তার ওপর ক্ষমতাবান করেছেন, তিনি তাকেও তোমার ওপর ক্ষমতাবান করতে পারতেন।’ আওয়াযটি ছিল রাসূলুল্লাহর সা.। আবু মাস’উদ ভীষণ প্রভাবিত হন। সেই মুহূর্তে তিনি শপথ করেন, আগামীতে কোন দিন আর কোন দাসের গায়ে হাত তুলবেন না। আর সেই দাসটিকে তিনি আযাদ (মুক্ত) করে দেন। (মুসনাদ- ৫/২৭৩, ২৭৪) আমর বিল মা’রূফের দায়িত্ব পালন থেকেও তিনি কক্ষণো উদাসীন ছিলেন না। আর এ ব্যাপারে ছোট-বড় কারো পরোয়া করতেন না। হযরত মুগীরা ইবন শু’বা রা. তখন কুফার আমীর। একদিন তিনি একটু দেরীতে আসরের নামায পড়ালেন। সাথে সাথে আবু মাস’উদ প্রতিবাদ করলেন। তিনি বললেনঃ আপনার জানা আছে, রাসূল সা. পাঁচ ওয়াক্ত নামায জিবরীলের বর্ণনা মত সময়ে আদায় করতেন, আর বলতেনঃ এভাবেই আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। (বুখারী- ২/৫৭১) তিনি নিজে রাসূলুল্লাহর সা. সুন্নাতের হুবহু অনুসরণ করতেন। একদিন তিনি লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জান রাসূলুল্লাহ সা. কিভাবে নামায আদায় করতেন? তারপর তিনি নামায আদায় করে তাদেরকে দেখিয়ে দেন। (মুসনাদ- ৫/১২২) নামাযের জামা’য়াতে গায়ে গা মিশিয়ে দাঁড়ানো রাসূলের সা. সুন্নাত। তিনি যখন দেখলেন, লোকেরা তা পুরোপুরি পালন করছে না, তখন বলতেনঃ এমনভাবে দাঁড়ানোর ফায়দা এ ছিলো যে, তাঁরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন তোমরা দূরে দূরে দাঁড়াও, এ জন্যেই তো বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। হযরত আবু মাস’উদকে রা. মুফতী সাহাবীদের মধ্যে গণ্য করা হয় না। তবে তিনি মাঝে মধ্যে ফাতওয়া দিতেন। ইবন ’আবদিল বার তাঁর ‘জামি’উল ’ইলম’ গ্রন্থে (২/১৬৬) ইবন সীরীন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ খলীফা ’উমার একবার আবু মাস’উদকে বলেনঃ আমাকে কি অবহিত করা হয়নি যে, তুমি ফাতওয়া দান করে থাক? ফাতওয়ার উষ্ণতা তার জন্য ছেড়ে দাও যে তার শৈত্যের স্পর্শ লাভ করেছেন। অর্থাৎ আমীরের জন্য। আর তুমি তো আমীর নও। (হায়াতুস সাহাবা- ২/২৫৩)