তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
বি পি এল কি কেবলই ক্রিকেট খেলা?

বাস্তবতা:
বিগত কয়েক বছরের মত এ বছরও আই পি এল কে অনুসরণ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড টি টোয়েন্টি ক্রিকেট লীগ বি পি এল আয়োজন করেছে। মিডিয়ার ব্যাপক প্রচারণার কারণে বি পি এল নিয়ে সর্বসাধারণ বিশেষত তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। মিডিয়া মারফত আরও জানা যাচ্ছে বি পি এল কে ঘিরে জনাধিক্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে জুয়া ব্যাপকতা লাভ করেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বি পি এল কি কেবলই ক্রিকেট খেলা, নাকি এর পেছনে রয়েছে মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে দূর্বৃত্তায়িত পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণীর গভীর ষড়যন্ত্র।
মূল আলোচনা:
ষোড়শ শতাব্দীর ইটালিয়ান কূটনীতিবিদ ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক/বিশ্লেষক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির মতে, ‘একজন ধূর্ত শাসকের পক্ষে জনগণকে দয়া ও ভালবাসা নয়, বরং ভয়/আতঙ্ক ও প্রতারণা দিয়ে শাসন করা উত্তম।’ বর্তমান বিশ্বের সব রাষ্ট্রই ম্যাকয়েভেলির রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ করে। পুঁজিবাদ মানেই হল কিছু সংখ্যক পুঁজিপতির একচ্ছত্র অর্থ, ক্ষমতা ও শোষণ। বাদবাকী আপামর জনগণ দারিদ্রতা, অপুষ্টি, বঞ্চণা নিয়ে কোনরকমে বেঁচে থাকে। দারিদ্রতা ও বঞ্চণা থেকে সাধারণ জনগন যাতে সংগঠিত ও ফুঁসে উঠতে না পারে সে জন্য অজনপ্রিয় জালিম শাসক প্রতারণা ও ভয় সৃষ্টি করে এবং এভাবে শাসনকার্য পরিচালনা অব্যাহত রাখে। প্রাচীণ গ্রীসে অজনপ্রিয় শাসকগণ দারিদ্রপীড়িত ও বঞ্চিত জনগণকে গ্লাডিয়েটরদের খেলা দেখিয়ে ব্যস্ত রাখতে কোলোসিয়াম বানিয়েছিল। এখান থেকে ম্যাকয়েভেলির মত ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রচিন্তকেরা শাসকের কর্মপদ্ধতি বাতলে নিয়েছেন। আর এ কর্মপদ্ধতি বাংলাদেশসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শাসকেরা অনুসরণ করে থাকে।
ধর্মনিরপেক্ষ আকীদা থেকে উৎসারিত গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র পৃথিবীতে মানুষের দারিদ্রতা, শোষণ ও বঞ্চনার মূল কারণ। দরিদ্র, বঞ্চিত ও শোষিত মানুষের যন্ত্রনাকে ক্ষণিকের জন্য ভুলিয়ে দিতে পেইন কিলারের মত কাজ করে বিভিন্ন জাকজমকপূর্ণ খেলাধুলার বর্ণাঢ্য আয়োজন, চলচ্চিত্রসহ বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি, মাদকদ্রব্য, জুয়া প্রভৃতি।
বাংলাদেশ হল তৃতীয় বিশ্বের একটি দরিদ্র দেশ। এখানে শাসকশ্রেণী অধিকাংশ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। শাসকশ্রেণী সাধারণ জনগনের কষ্টার্জিত উপার্জন মুসক, আয়কর ইত্যাদির নামে লুটে পুটে নিয়ে বিদেশে টাকার পাহাড় গড়ছে। ব্যাংকে রাখা সাধারণ জনগণের যতসামান্য সঞ্চয় পুঁজিপতি ঋণখেলাপীরা লুট করছে। দেশে প্রায় সাড়ে চারকোটি লোক বেকার। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী। নাগরিক সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে থেকেও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল নগরী ঢাকা। বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ এর প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতাকে হরণ করে দারিদ্রতাকে জিইয়ে রাখা হচেছ। জনগণের জান ও মালের নিরাপত্তা দিতে শাসক সম্পূর্নরূপে ব্যর্থ। এতসব প্রকটতর সমস্যা থাকা সত্ত্বেও মিডিয়ার কল্যাণে শাসকশ্রেণী সাধারণ জনগণকে বি পি এল দিয়ে ব্যস্ত রাখতে সমর্থ হচেছ। সাধারণ জনগণ বিশেষ করে তরুণ সমাজ শাকশ্রেণীর এ ধরণের প্রতারণার প্রধান শিকার। কেননা যুগে যুগে তরুণরাই পরিবর্তনের অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। উপনিবেশিকদের বসানো মুসলিম বিশ্বের পুতুল শাসকেরা জুলুমের বিরুদ্ধে মুসলিম তরুণদের ইসলামের ভিত্তিতে জাগরণকে চরমভাবে ভয় পায়। বিধায় মুসলিম তরুণদের বি পি এল দিয়ে সত্যিকারের ইস্যু থেকে বিমুখ রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে জুয়া ও বেহায়াপনার ব্যাপক প্রসারের দ্বারা তাদের চরিত্র ও নৈতিকতা ধ্বংস করে দেয়ার সুগভীর ষড়যন্ত্র চলছে।
বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের তরুণদের এ ভয়াবহ ষড়যন্ত্র উপলদ্ধি করতে হবে এবং উপনিবেশবাদীদের ক্রীড়ানক জালিম শাসকদের এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য শক্তিশালী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে হবে। মক্কাতে যখন বৃদ্ধরা আল্লাহর রাসূলকে পরিত্যাগ করেছিল তখন তরুণরাই তাকে সাদরে বরণ করেছিল। মুসলিম তরুণেরাই সর্বশেষ আরব বসন্তের সময় মরক্কো, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন প্রভৃতি দেশে পশ্চিমাদের বসানো পুতুল স্বৈরশাসকদের ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করেছিল- তরুণদের একথা ভুলে গেলে চলবে না । তাদের আরও ভুলে গেলে চলবে না কী উদ্দেশ্যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাদেরকে এ দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। রাসূল (সা) বলেন, ‘হাশরের ময়দানে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কেউ এক পাও এগুতে পারবে না…(এদের মধ্যে একটি প্রশ্ন হল)…তুমি তোমার যৌবনকে কোন কাজে ব্যয় করেছ?’
লেখক: রাফীম আহমেদ
সুন্দরী প্রতিযোগিতা, পুুঁজিবাদ ও আমাদের মুসলিম পরিচয়

অতি সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল মিস ইউনিভার্স বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতা। যেখানে মিস ইউনিভার্সের মুকুট পড়েছে দেড়শ কোটি মানুষের দেশ ভারতের হরিয়ানার মেয়ে মানসী চিল্লার। জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে জেসিয়া ইসলাম এতে অংশগ্রহণ করে। এর কিছু দিন আগে বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণকারী মিস বাংলাদেশ খুজে বের করতে স্থানীয়ভাবে সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দুই সময়েই বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়া সুন্দরীদের নিয়ে বিভিন্ন ইতিবাচক খবর পরিবেশনে ছিল নজিরবিহীন।
মিডিয়া যে ভুল চিন্তাসমূহ দেয়ার চেষ্টা করে:
১. সুন্দরী প্রতিযোগিতা নারী স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়নের পরিচায়ক।
২. সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নারীরা সাহসী ও অনুকরণীয়।
৩. মিস বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে।
সঠিক চিন্তা:
১. নারী স্বাধীনতা বা নারীর ক্ষমতায়নের নামে সুন্দরী প্রতিযোগিতা আয়োজনের পেছনে রয়েছে ঘৃণ্য পুঁজিবাদী স্বার্থ। বহুজাতিক বিউটি ইন্ডাস্ট্রিগুলো তাদের পণ্যের বিপণন বৃদ্ধির করার লক্ষ্যে এ ধরনের সুন্দরী প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। ভারত বা চীনের মত জনবহুল দেশকে কখনও বা আয়োজক, আবার কখনও বা সুন্দরী প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করে সেসব দেশের নারীদের মধ্যে বিউটি পণ্য ক্রয়ের মাদকতা তৈরি করা হয়। এটিই হল গ্লোবালাইজশনের ঘৃণ্যতম রূপ।
২. পুঁজিবাদে সবকিছুই বাণিজ্যিক পণ্য, এমনকি নারীর শরীরও। নারী স্বাধীনতা অথবা ক্ষমতায়নের শ্লোগান বাইরের খোলস মাত্র। তথ্য উপাত্ত থেকে দেখা যায়, সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ নারীর সর্বশেষ গন্তব্য হল পতিতালয় বা পর্ণ ইন্ডাস্ট্রী। পতিতালয় বা পর্ণ ইন্ডাস্ট্রীতে কাজ করা যদি নারীর ক্ষমতায়ন হয়, তাহলে তা মানসিক বিকৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
৩. শরীআহ কতৃক সংজ্ঞায়িত মুসলিম নারীদের আওরা বা সতরের সংরক্ষণ করা ফরয বা অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সুন্দরী প্রতিযোগিতার নামে মুসলিম বোন ও কন্যাদের শরীরের প্রদর্শনী জঘন্যতম হারাম কাজ। এটি ইসলামি আক্বীদা, শরী’আহ ও মুসলিম পরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক।
৪. নারীকে দেখার ক্ষেত্রে পশ্চিমা পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পশ্চিমাদের কাছে নারী শরীরের প্রদর্শন শিল্প হলেও ইসলামে এটি হারাম। পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার অগভীর চিন্তার অধিকারী অধপতিত মুসলিম উম্মাহ আজকে এ সত্য উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। তারা অন্ধভাবে পশ্চিমা কাফেরদের অনুকরণ করছে। যে সর্ম্পকে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
‘এমন একটা সময় আসবে যখন আমার উম্মত অন্ধভাবে কাফেরদের অনুসরণ করবে এবং তারা (কাফেররা) টিকটিকির গর্তে প্রবেশ করাকে বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলে, উম্মতও তাই করবে...।’
৫. নারীর শরীরের উন্মুক্ত প্রদর্শণীতে অংশগ্রহণ সাহসী ও সম্মানজনক কাজ হলে জঙ্গলের সব চতুষ্পদ জন্তুও সাহসী ও সম্মানিত, কেননা তাদেরকে কোন পোশাকই পরতে হয় না। শরীর নিয়ে হীন পুঁজিবাদী ব্যবসার উপকরণ হওয়ার মধ্যে নারীর মুক্তি নিহিত নেই, বরং ইসলামি শরী’আহ’র যথাযথ অনুসরণের মধ্যেই নারীর দুনিয়া ও আখিরাতের মুক্তি নিহিত রয়েছে। একারণে পুরো পৃথিবীব্যাপী প্রচুর অমুসলিম নারী ইসলামের সুশীতল ছায়ায় অনুপ্রবেশ করছে।
৬. মিস ইউনিভার্স নামক হারাম ও নারী অবমাননাকারী আয়োজনে বাংলাদেশ বা কোন মুসলিম রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে কোন মুসলিম নারী সেসব দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেনি। বরং বিশ্বকাপ ফুটবল, ক্রিকেট, অলিম্পিক ও কমনওয়েলথ গেমসের মত এটিও মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্য ও সংহতি বিনষ্টকারী কুফরী জাতীয়তাবাদী চিন্তাকে শক্তিশালী করেছে।
রাফীম আহমেদ
খিলাফত ব্যবস্থার খসড়া সংবিধানের ব্যাখ্যা – ধারা ২

ধারা ২
দার আল-ইসলাম (ইসলামের আবাসস্থল বা ইসলামী রাষ্ট্র) হচ্ছে সেই অঞ্চল যেখানে ইসলামের আইনসমূহ বাস্তবায়ন করা হয় এবং যার নিরাপত্তা ইসলাম কর্তৃক নিশ্চিত করা হয়। দার আল-কুফর (কুফরের আবাসস্থল বা কুফর রাষ্ট্র) হচ্ছে সেই অঞ্চল যেখানে কুফর আইনসমূহ বাস্তবায়িত হয় কিংবা এর নিরাপত্তা ইসলাম ব্যতিত অন্য কিছু দ্বারা নিশ্চিত করা হয়।
দার শব্দটির অনেকগুলো অর্থ রয়েছে, তার মধ্যে:
ভাষাগতভাবে: এর অর্থ হচ্ছে “আবাসস্থল”, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে শব্দটি এভাবে এসেছে: “অতঃপর আমি তাকে ও তার বসবাসের স্থানকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম” (সূরা আল-কাসাস : ৮১), এছাড়াও “যাত্রা-বিরতির স্থান” এবং জনগণের বসবাসের জায়গা হিসেবেও এসেছে, যাতে বলা হয়েছে যে মানুষ যে স্থানে বসবাস করে তার প্রতিটিই তাদের দার। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণী অনুসারে: “অনন্তর ভূমিকম্প তাদেরকে পাকড়াও করলো এবং তারা সকাল বেলায় গৃহের মধ্যে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।” (সূরা আল-আরাফ : ৯১), এখানে এর অর্থ হচ্ছে, ‘শহর’। সিবাওয়েহ্ বলেছেন: “এই দার হচ্ছে একটি মনোরম শহর এবং “আবাসস্থল ও স্থান”, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দে: “এবং মুত্তাকীদের আবাসস্থল (জান্নাত) কতই না চমৎকার হবে” (সূরা আন-নাহল : ৩০)। একইভাবে রূপকঅর্থে এর মানে হচ্ছে “গোত্র”, বুখারীতে আবু হামিদ আল-সা’দি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, “সত্যই, বনু নাজ্জার হচ্ছে আনসারদের মধ্য হতে সর্বোত্তম গোত্র (দার)…”
এবং দার শব্দটি কোন কিছুর নামের সাথেও যুক্ত হতে পারে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দে: “আমি তোমাদেরকে ফাসেকদের আবাসস্থল দেখাবো” (সূরা আল-আরাফ : ১৪৫), “এবং মুত্তাকীদের আবাসস্থল কতই না চমৎকার হবে” (সূরা আন-নাহল : ৩০), “কিন্তু তারা তাকে হত্যা করল। সুতরাং সালেহ্ বললেন, তোমরা নিজেদের গৃহে তিনটি দিন উপভোগ করে নাও। ইহা এমন ওয়াদা যা মিথ্যা হবে না” (সূরা হুদ : ৬৫), এবং “এবং তিনি তোমাদেরকে তাদের ভূমির, ধন-সম্পদের এবং এমন এক ভূ-খণ্ডের মালিক করে দিয়েছেন যেখানে তোমরা অভিযান করোনি” (সূরা আল-আহযাব : ২৭)। এবং একইভাবে মুসলিমে বুরাইদাহ্ কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “…অতঃপর তাদেরকে তাদের পরিবার-পরিজন ছেড়ে মুহাজিরদের আবাসস্থলে গমনের আহ্বান জানাও” এবং আহমদে সালিমা বিন নওফেল কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “বিশ্ববাসীদের আবাসস্থলের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আস-শাম।”
এবং এটা শব্দার্থের সাথেও যুক্ত হতে পারে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র বাণীতে আসা শব্দ অনুসারে “এবং স্বজাতিকে ধ্বংসের গৃহে বসবাসের সম্মুখীন করেছে” (সূরা ইবরাহিম : ২৮) এবং “যিনি স্বীয় অনুগ্রহে আমাদেরকে বসবাসের গৃহে স্থান দিয়েছেন যা চিরকাল থাকবে” (সূরা ফাতির : ৩৫)। এবং আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিস, হাসান সহীহ্ সনদ সহকারে ইবনে আসাকির হতে এবং তিরমিযী শরীফে আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বলেছেন: “আল্লাহ্ আবু বকরকে রহমত করুন, সে আমার সাথে তার কন্যার বিবাহ দিয়েছে এবং আমাকে হিজরতের স্থানে (দার আল-হিজরাহ্) সাথে করে নিয়ে গেছে।” দারাকুতনি’তে ইবন আব্বাস কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “যদি একজন দাস তার মনিবের পুর্বে শিরকের আবাসস্থল ত্যাগ করে তবে সে মুক্ত এবং যদি সে তার পরে ত্যাগ করে তাহলে সে তার মনিবের কাছে ফেরত যাবে, এবং যদি একজন নারী তার স্বামীর পুর্বে শিরকের আবাসস্থল ত্যাগ করে তবে সে যাকে ইচ্ছা তাকে বিয়ে করতে পারবে এবং যদি সে তার স্বামীর পরে ত্যাগ করে তবে সে তার স্বামীর কাছে ফেরত যাবে।”
এবং, শারী’আহ্ অর্থের দিক দিয়ে দু’টি শব্দের সাথে দার শব্দটিকে যুক্ত করেছে – ইসলাম এবং শিরক। পূর্বে উল্লেখিত সালিমা বিন নওফিল কর্তৃক বর্ণিত মুসনাদ আল-সামিয়্যিনের হাদিসটির আরেকটি বর্ণনা তাবারানির কাছে রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে: “আস-শাম হচ্ছে ইসলামের আবাসস্থলের কেন্দ্রবিন্দু।” সুতরাং এখানে দার শব্দটি ইসলামের সাথে সম্পর্কযুক্ত এবং একইভাবে আল-আহকাম আল-সুলতানিয়াহতে ও আল-হাওই আল-কবির-এ আল-মাওয়ার্দি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “ইসলামের আবাসস্থলে এর সবকিছুই নিষিদ্ধ এবং শিরকের আবাসস্থলে এর সবকিছুই অনুমোদিত” – সবকিছু বলতে এখানে শারী’আহ্ লঙ্ঘনে প্রাপ্য শাস্তি ব্যতিত ইসলামের আবাসস্থলে রক্ত এবং সম্পদের পবিত্রতাকে নির্দেশ করা হয়েছে এবং শারী’আহ্’র সুনির্দিষ্ট আইন মোতাবেক যুদ্ধ ও যুদ্ধলব্ধ মালামালের বিধান অনুসারে, যুদ্ধ চলাকালীন পরিস্থিতিতে শিরকের আবাসস্থলে (“দার আল-হারব্” – যে দেশের সাথে যুদ্ধ চলমান রয়েছে) রক্ত এবং সম্পদের পবিত্রতার অনুপস্থিতিকে নির্দেশ করা হয়েছে। এই বিভক্তিটি সমগ্র দুনিয়াব্যাপী পরিব্যাপ্ত, সুতরাং দুনিয়াতে এমন কোন স্থান নেই যেটা ইসলামের আবাসস্থল (দার আল-ইসলাম) কিংবা শিরকের আবাসস্থল বা ভিন্নার্থে কুফরের আবাসস্থল বা যুদ্ধের আবাসস্থলের (দার আল-কুফর, দার আল-হারব্) বাহিরে থাকতে পারে।
দুটি শর্ত পূরণ করলে কোন স্থানকে দার আল-ইসলাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে:
প্রথমত: উক্ত স্থানের নিরাপত্তা মুসলিমগণ নিশ্চিত করবে, এর প্রমাণ আমরা রাসূলুল্লাহ্’র (সা) হাদিস থেকে পেয়ে থাকি; এতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কাতে তাঁর সাহাবাদেরকে (রা:) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য ভাই এবং আবাসস্থলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যাতে তোমরা এর মধ্যে নিরাপদে থাকতে পার।” এই স্থানটি দার আল-হিজরাহ্, যা ইবনে আসাকিরে আলী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে ইতোমধ্যেই উল্লেখিত এবং বুখারীতে আয়েশা (রা) হতে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থানকে দেখানো হয়েছে।” এবং এটা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ (রা.) ততক্ষণ পর্যন্ত মদীনাতে হিজরত করেননি যতক্ষণ পর্যন্ত না তিনি (সা) সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন; আল-হাফিজ আল-ফাতহ্-এ বলেছেন, আল-শাবি হতে শক্তিশালী সনদের মাধ্যমে বাইহাকি বর্ণনা করেছেন এবং আল-তাবারানি এটাকে সংযুক্ত করেছেন আবু মুসা আনসারির বর্ণনার সাথে, যিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল-আকাবাতে আনসারদের মধ্য হতে ৭০ জনের সাথে কথা বলার জন্য তাঁর (সা) চাচা আব্বাসকে সাথে নিয়ে রওয়ানা হন এবং আবু উমামা (আসাদ বিন যুরারা) তাঁকে বলেছিলেন: হে মুহাম্মদ, আপনার প্রভুর জন্য ও নিজের জন্য যা খুশি চান, অতঃপর তিনি (সা) আমাদেরকে আমাদের পুরষ্কার সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি (সা) বলেছিলেন: আমি আমার রবের জন্য এটা চাচ্ছি যে, তোমরা তাঁর ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না, এবং আমি নিজের জন্য ও আমার সাথীদের জন্য এটা চাচ্ছি যে, তোমরা আমাদেরকে তোমাদের অন্তর্ভূক্ত করে নেবে, আমাদেরকে সহায়তা করবে এবং আমাদেরকে নিরাপত্তা দেবে, যেরকমভাবে তোমরা নিজেদেরকে রক্ষা করে থাক। এর উত্তরে তারা বলেছিল: এর বিনিময়ে আমরা কি পাবো? তিনি (সা) বলেছিলেন: জান্নাত। তারা বলেছিল: আপনি যা চেয়েছেন আমরা তা দিতে প্রস্তুত রয়েছি।”
এবং সহীহ্ সনদের মাধ্যমে ক্বাব বিন মালিক হতে আহ্মদ কর্তৃক বর্ণিত হাদিসটিও এর প্রমাণ, হাদিসটিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “তোমরা প্রতিশ্রুতি দাও যে, তোমরা যেভাবে তোমাদের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা দাও সেভাবে আমাকে নিরাপত্তা দেবে, অতঃপর আল-বারা বিন মারুর তাঁর (সা) হাত ধরলেন এবং বললেন: আপনাকে যিনি সত্য সহকারে প্রেরণ করেছেন তাঁর নামে শপথ করে বলছি, যেভাবে আমরা আমাদের লোকদের নিরাপত্তা দেই সেভাবে আপনাকে নিরাপত্তা দেবো এবং হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), আমরা যোদ্ধা জাতি এবং সাহসী চরিত্রের অধিকারী যা আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের নিকট হতে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি।” এবং যাবের হতে আহমদ কর্তৃক একটি সহীহ্ বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আকাবার বাই’আতে বলেছেন: “...যখন আমি তোমাদের কাছে আসব তখন তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে, তোমাদের স্ত্রীদেরকে ও তোমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা দাও সেভাবে আমাকে সহযোগিতা ও নিরাপত্তা প্রদান করবে।
এবং শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সনদসহ আল-বাইহাকি কর্তৃক সংকলিত দালাইল আল-নাবুওয়াতে উল্লেখ আছে যে, উবাদাহ্ বিন সামিত বলেছেন: “আমরা আমাদের নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে ও সন্তানদেরকে যেসব থেকে নিরাপত্তা দেই, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কেও সেসব থেকে নিরাপত্তা দেবো এবং এর বিনিময়ে আমরা জান্নাত লাভ করবো।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমন কোন স্থানে হিজরত করতে রাজি হননি যেটার নিরাপত্তা, ক্ষমতা এবং সুরক্ষার সক্ষমতা ছিল না। আলী (রা.) হতে হাসান সনদ সহকারে আল-বাইহাকি কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু শায়বান বিন থালাবাহ্ গোত্রকে বলেছিলেন: “তোমরা মন্দভাবে জবাব দাওনি কারণ তোমরা সত্য কথা বলেছ, কিন্তু আল্লাহ্’র দ্বীনকে যারা সকল দিক দিয়ে সুরক্ষা দিতে পারে তারা ব্যতিত অন্য কেউ একে নুসরাহ্ দিতে পারে না।” যখন তারা পারস্য ব্যতিত সমস্ত আরবদের থেকে নুসরাহ্ (নিরাপত্তা, সুরক্ষা) দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) একথা বলেছিলেন। দ্বিতীয়ত: যেখানে ইসলামের আইন-কানুন বাস্তবায়ন করা হয়। বুখারীতে উবাদাহ্ বিন সামিতের বর্ণনা হতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়, এতে তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে ডেকেছিলেন এবং আমরা তাঁকে (সাঃ) আনুগত্যের শপথ প্রদান করেছিলাম। যেসব বিধি-বিধান তিনি আমাদের জন্য আবশ্যক করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: আমাদের আনন্দে ও বেদনায়, কষ্টে ও সমৃদ্ধিতে শোনা ও মান্য করা (আমিরের নির্দেশ), এমনকি কাউকে যদি আমাদের চেয়ে পছন্দে অগ্রাধিকার দেয়া হয় এবং আইনসঙ্গতভাবে কোন ব্যক্তিকে ক্ষমতা প্রদান করা হয় তবে কোনরূপ বিবাদে লিপ্ত হওয়া যাবে না, এর ব্যত্যয় হতে পারে শুধুমাত্র যদি তোমরা পরিষ্কার কুফর দেখতে পাও, যা আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে আগত বিধান দ্বারা প্রমাণিত।” এবং আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে শোনা ও মান্য করার বিষয়টি তাঁর (সা) আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে আইনকানুনসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। আহ্মদ-এর বর্ণনা এর আরেকটি প্রমাণ, ইবনে হিব্বান তার সহীহ্ সংগ্রহে ও আবু উবায়েদ আল-আমওয়ালে আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমরু কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “হিজরত দুই ধরনের – কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাসকারীর হিজরত ও যাযাবরের হিজরত, যাযাবরের ক্ষেত্রে তাকে আদেশ দেয়া হলে মান্য করে এবং ডাকে সাড়া দেয়, কিন্তু কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাকে অধিকতর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং পুরষ্কারের পরিমাণও অধিক হয়ে থাকে।” রাসূল (সা)-এর বক্তব্য থেকে এই দৃষ্টিভঙ্গী পরিষ্কার: “আদেশ করা হলে সে মান্য করে এবং ডাকলে সাড়া দেয়”; যেহেতু মরুভুমি ইসলামের আবাসস্থলের (দার আল-ইসলাম) অন্তর্ভূক্ত ছিল, যদিওবা এটা হিজরতের (দার আল-হিজরাহ্) স্থান ছিল না। এবং একইভাবে আল-তাবারানিতে ওয়াছিলাহ্ বিন আল-আসকার বর্ণনা থেকেও এর স্বপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়, বিশ্বস্ত মানুষদের একটি সনদ থেকে আল-হাইথামি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বলেছেন: “এবং যাযাবরের হিজরত হচ্ছে যাযাবর জীবনেই প্রত্যাবর্তন এবং তোমার আনন্দে ও বেদনাতে এবং তোমার কষ্টে ও সমৃদ্ধিতে শোনা ও মান্য করা, এমনকি তোমার উপরে অন্য কাউকে যদি অধিক পছন্দনীয় করা হয়...” এবং আনাস থেকে সহীহ্ সনদ সহকারে আহ্মদের বর্ণনা থেকেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়: আমি কিছু তরুণকে অনুসরণ করেছিলাম যারা বলছিল যে মুহাম্মাদ (সা) এসেছেন, সুতরাং আমি তাদেরকে অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু কিছুই দেখতে পাইনি। তখন তারা আবার বলেছিল যে, মুহাম্মদ (সা) এসেছেন, সুতরাং আমি আবার তাদেরকে অনুসরণ করেছিলাম কিন্তু কিছুই দেখতে পাইনি। তিনি বলেছিলেন: যতক্ষণ পর্যন্ত না মুহাম্মাদ (সা) ও তাঁর সাথী আবু বকর এসেছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মদীনাবাসীর ব্যাকুলতা ও উত্তেজনার অংশ ছিলাম। তখন তাঁরা মদীনাবাসীর পক্ষ থেকে একজনকে পাঠিয়েছিল যাতে করে আনসারদের কাছে তাঁদের আগমনের খবর পৌঁছাতে পারে এবং যখন তাঁরা পৌঁছেছিলেন তখন প্রায় ৫০০ আনসারের একটি দল তাঁদেরকে স্বাগত জানিয়েছিল। আনসাররা বলেছিল: নিরাপত্তার মধ্যে ক্ষমতা সহকারে অগ্রসর হোন। এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাথী তাদের মধ্য হতে বেরিয়ে আসলেন। এবং মদীনাবাসীরাও বাইরে বেরিয়ে এসেছিল, এমনকি মহিলারাও তাদের বাড়িঘর থেকে বলছিল যে, তাঁদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোন ব্যক্তি, তাঁদের মধ্যে তিনি (সা) কোন ব্যক্তি?” এই বর্ণনার মধ্যে নিরাপত্তা ও আইনের বাস্তবায়ন – উভয়টির জন্যই প্রমাণ রয়েছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ৫০০ আনসারের উপস্থিতি থেকে ও তাদের ‘নিরাপত্তায় প্রবেশ করুন’ – আহ্বানটি থেকে এ বিষয়টি প্রমাণিত এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের বক্তব্যকে সুনিশ্চিত করেছেন। একইভাবে তাদের দুজনকে যে আনুগত্য করা হবে সেই বক্তব্যও তিনি (সা) নিশ্চিত করেছেন। ফলশ্রুতিতে নিরাপত্তা এবং আনুগত্য হিজরতের স্থানে (দার আল-হিজরাহ্) নিশ্চিতভাবে পূর্ণ করা হয়েছিল এবং যদি এগুলো পূরণ করা না হতো তবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হিজরত করতেন না।
আকাবার শপথে আনসাররা নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আনুগত্য প্রদান – এই শর্ত দু’টি পূরণের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। আল বাইহাকি উবাদাহ্ বিন সামিত হতে শক্তিশালী সনদ সহকারে বর্ণনা করেন যে, “…আমরা যেসব বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্কে (সা) আনুগত্যের শপথ প্রদান করেছিলাম সেগুলো হচ্ছে: আমাদের ব্যস্ততায় ও আলস্যে, কষ্টকর সময়ে ও আরামদায়ক অবস্থায় শোনা ও মান্য করা, সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধে, নিন্দুকদের নিন্দায় ভীত না হয়ে আল্লাহ্’র ক্ষেত্রে সত্যকথন এবং যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াসরিবে আসবেন তখন আমরা নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে এবং আমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে নিরাপত্তা দিয়ে থাকি সেভাবে তাঁকে (সা) নিরাপত্তা দেবো এবং এসব কিছুর বিনিময়ে জান্নাত লাভ করব। এই আনুগত্যের শপথই আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দিয়েছিলাম”। এবং নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল মুসলিমদের জন্য, যা তার কথা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়: “যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াসরিবে আসবেন তখনই আমরা যেভাবে নিজেদেরকে, আমাদের স্ত্রীদেরকে ও আমাদের সন্তানদেরকে রক্ষা করি সেভাবে তাঁকে রক্ষা করব ও বিনিময়ে জান্নাত পাবো।”
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কর্তৃক লিপিবদ্ধ চুক্তিপত্র থেকেও এর অর্থ পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা যায়, যাতে তিনি (সাঃ) ইহুদীদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে সকলের মধ্যে শান্তি স্থাপন করেন। এটা হিজরতের প্রথম বর্ষে ঘটেছিল, ইবনে ইস্হাকের বর্ণনা থেকে এটা পাওয়া যায় এবং এটাকে ‘সাহিফা’ নামে ডাকা হয়। চুক্তিপত্রটি ছিল নিম্নরূপ: “পরম করুনাময় ও দয়ালু আল্লাহ্’র নামে। এটা হচ্ছে নবী মুহাম্মাদ (সা)-এর পক্ষ থেকে লিপিবদ্ধ দলিল। কুরাইশ ও ইয়াসরিবের মু’মিন ও মুসলিম এবং যারা তাদের অধীনে তাদের সাথে শামিল হবে বা তাদের সাথে মিলেমিশে কাজ করবে তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত এবং অন্যদের মোকাবিলায় তারা এক উম্মত হিসেবে গণ্য হবে…। বহিরাগত ব্যতিত সকল বিশ্ববাসীরা একে অপরকে রক্ষা করবে… ইহুদীদের উপর তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বর্তাবে এবং মুসলিমদের উপর তাদের নিজেদের ব্যয়ভার বর্তাবে। যে কেউ এই চুক্তিনামা গ্রহণকারী কোন পক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করবে তার বিরুদ্ধে একে অপরকে সাহায্য করবে… এই চুক্তিনামা গ্রহণকারী পক্ষসমূহের মধ্যে যদি এমন কোন নতুন সমস্যা বা বিরোধের উদ্ভব হয় যা থেকে দাঙ্গা বেধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে তা আল্লাহ্ তা’আলা এবং আল্লাহ্’র রাসূল মুহাম্মাদ (সা)-এর নিকট মীমাংসার্থে উত্থাপিত করতে হবে।”
এর ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, কোন স্থান দার আল-ইসলাম হিসেবে গণ্য হবেনা, যদি না নিরাপত্তার দায়িত্ব মুসলিমদের অধীনে থাকে এবং ইসলামের আইনকানুন বাস্তবায়িত হয় – এই শর্তদুটি পূরণ করা যায়। এবং যদি এ দুটি শর্তের মধ্যে কোন একটি অকার্যকর হয়ে যায়, অথবা পূরণ করা না হয়, যেমন: অবিশ্বাসীদের হাতে নিরাপত্তার দায়িত্ব ন্যস্ত হয় বা আল-তাগুতের আইন জনগণের উপর বাস্তবায়িত হয় তবে সেই স্থানটি বহুদেববাদ (দার আল-শিরক) বা অবিশ্বাসের আবাসস্থল (দার আল-কুফর) হিসেবে পরিগণিত হবে। ইসলামের আবাসস্থল শিরকের বা কুফরের আবাসস্থলে রূপান্তর হওয়ার জন্য দু’টি শর্তের অনুপস্থিতি জরুরী নয় বরং যে কোন একটি শর্তের অনুপস্থিতিই এই রূপান্তরের জন্য যথেষ্ঠ। কোন স্থান অবিশ্বাসের আবাসস্থল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানকার সকল অধিবাসীরা অবিশ্বাসী এবং যেকোন স্থান ইসলামের আবাসস্থল হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেখানকার সকল অধিবাসী মুসলিম হবে। বরং আবাসস্থল (দার) শব্দটির অর্থ শারী’আহ্’র পরিভাষাকে (প্রকৃত শর’ঈ অর্থ) নির্দেশ করে, ভিন্ন অর্থে: শর’ঈ বাস্তবতা থেকে যেভাবে প্রার্থনা ও উপবাসকে শারী’আহ্’র পরিভাষায় সালাত ও সাওম নামে অভিহিত করা হয় সেভাবে এই শব্দটির অর্থও শারী’আহ্ প্রদান করে থাকে।
এর ভিত্তিতে উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে, এই শব্দটি সে স্থানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে যেখানকার বেশিরভাগ অধিবাসী খৃষ্টান, কিন্তু যদি স্থানটি ইসলামী রাষ্ট্রের অংশ হয় তাহলে সেটা ইসলামের আবাসস্থল (দার আল-ইসলাম) হিসেবে গণ্য হবে। কারণ সেখানে ইসলামী আইন বাস্তবায়ন করা হয় এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সেটি ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সেটার নিরাপত্তার দায়িত্বও ইসলামের অধীনে নিশ্চিত করা হয়।
এবং একইভাবে, যদি কোন একটি অঞ্চলের বেশিরভাগ অধিবাসী মুসলিম হয়, কিন্তু সেটা এমন কোন রাষ্ট্রের অধীনে থাকে যেটা ইসলাম দ্বারা শাসন করে না, কিংবা মুসলিম সামরিক বাহিনী সেটার সুরক্ষা প্রদান করে না, বরং অবিশ্বাসীরা সেই অঞ্চলের নিরাপত্তা দিয়ে থাকে তবে অবিশ্বাসের আবাসস্থল (দার আল-কুফর) শব্দটি এ অঞ্চলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে, যদিওবা এর অধিকাংশ অধিবাসী মুসলিম হয়ে থাকে।
সুতরাং এখানে আবাসস্থল (দার) শব্দটি শর’ঈ বাস্তবতাকে (আইনগত অর্থ) নির্দেশ করে এবং এক্ষেত্রে কোথায় মুসলিমের সংখ্যা বেশি বা কোথায় কম সেটা বিচার্য বিষয় নয়, বরং সেখানকার অধিবাসীদের উপর বাস্তবায়িত আইন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্বই মুখ্য বিষয়। অন্যভাবে বলা যেতে পারে যে আবাসস্থল শব্দটির অর্থ আইনগত (শর’ঈ) উৎস হতে নেয়া হয়েছে যা এর অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করে। যেরকমভাবে সালাহ্ শব্দটির অর্থ আইনগত উৎস হতে নেয়া হয়েছে যা এর অর্থের ব্যাখ্যা প্রদান করে এবং একইভাবে এসকল শব্দের শর’ঈগত প্রকৃত অর্থও শর’ঈ উৎস হতে গ্রহণ করা হয় না।
ইসলামি জ্ঞান ও চিন্তার প্রক্রিয়া

কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিছক ইসলামি জ্ঞান নাকি সঠিক চিন্তার প্রক্রিয়া? নাকি এ দু’টো পরিপূরক? জ্ঞান মানে হল প্রয়োজনের নিরীখে যা জানি না তা জানা এবং যা চিনি না তা চেনা। জ্ঞান অর্জন করলে মানুষ অজ্ঞানতা বা মূর্খতা থেকে বের হয়ে আসে। ইসলামে জ্ঞান অর্জন করার বিষয়টিকে ফরজ করা হয়েছে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘পড়, তোমার প্রভূর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন……তিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না….।’
(সূরা আলাক)রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান অর্জন করা ফরয।’
তবে চিন্তার সঠিক প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে কেবলমাত্র নিছক জ্ঞান ব্যক্তি বা জাতির পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করতে পারে না। যদি ইসলামের ভিত্তিতে মুসলিম জাতির পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করতে হয় তাহলে এর সন্তানদেরকে সঠিক চিন্তার প্রক্রিয়াও শিক্ষা দিতে হবে। যদিও এই চিন্তার প্রক্রিয়া এক ধরনের বিশেষ জ্ঞান।
ইসলামের ইতিহাসে খোলাফায়ে রাশেদীনদের পর আসে উমাইয়াদের শাসন এবং তারপর আসে আব্বাসিয় শাসন। আব্বাসিয় শাসনামলে গ্রীক চিন্তা প্রক্রিয়া (logical way of thinking) দ্বারা মুসলিম আলেমগন প্রভাবিত হন এবং ক্বাদা এর মত আক্বীদার বিষয় থেকে শুরু করে ইসলামের বিভিন্ন বিষয়সমূহ যুক্তি দ্বারা ব্যখ্যা করার চেষ্টা করেন। আলেমগণ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যান। মুতাজিলা, জাবারিয়্যাহ এবং আহলুস সুন্নাহদের উদ্ভব হয়। অথচ ক্বাদা এর মত গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদার বিষয়টি বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উপলদ্ধি করা উচিত ছিল। তদ্রুপ আক্বীদার অন্যান্য মৌলিক বিষয় যেমন: আল্লাহ’র অস্তিত্বে বিশ্বাস, মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ’র নবী এবং কুরআন আল্লাহ’র পক্ষ থেকে এসেছে-এগুলো বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেই (rational way of thinking) বুঝতে হবে। তবেই সঠিকভাবে আক্বীদা উপলদ্ধি করা যাবে। কিন্তু এখানে অন্য কোন চিন্তা প্রক্রিয়া, যেমন যৌক্তিক (logical way of thinking) বা বৈজ্ঞানিক (scientific way of thinking) প্রক্রিয়া কাজ করবে না। যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়ার স্ব-স্ব ক্ষেত্র রয়েছে। সেগুলোকে সেখানেই ব্যবহার করতে হবে। অন্যত্র ব্যবহার করলে একজন মুসলিম ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে। যদিও এখনও অনেক আলেম এবং ইসলামি দলসমূহ যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়া দ্বারা প্রভাবিত এবং ইসলামকে সেভাবে ব্যাখ্যা করা বা উপলদ্ধি করার চেষ্টা করেন। জীবনে প্রয়োগের জন্য ইসলামের হুকুমসমূহ বুঝা বা বের করে নিয়ে আসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আইনী প্রক্রিয়া (legislative process) রয়েছে। যেখানে যৌক্তিক বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়ার কোন স্থান নেই। হয়ত আলোচিত বিষয়ের মানাত বা বাস্তবতা বুঝতে গিয়ে বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হওয়া যেতে পারে। আবার এটাও বুঝতে হবে আইন বা হুকুম জানার বা প্রণয়ন করার জন্য তিনটি ব্যবস্থাতে (পুজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং ইসলাম) তিনটি ভিন্ন প্রক্রিয়া রয়েছে। পুঁজিবাদে আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হল বাস্তবতা। কিন্তু ইসলামে কখনওই বাস্তবতা থেকে হুকুম আসে না। কিন্তু পশ্চিমা ধ্যান ধারণার অনুপ্রবেশ ও অজ্ঞানতার দরুণ কোন কোন মুসলিম আলেম বাস্তবতাকে ইসলামি হুকুমের উৎস হিসেবে এখন গ্রহণ করছেন। ইজতিহাদি প্রক্রিয়া শতকের পর শতক বন্ধ থাকার কারণে আলেমগণের জন্য মানবজীবনের সব ক্ষেত্রে ইসলাম প্রয়োগ করার কথা চিন্তা করা দূরুহ হয়ে পড়ছে যদিও ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে আল্লাহ’র পক্ষ থেকে এসেছে এবং এটি কিয়ামতের আগ পর্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বর্তমানে ইসলামি বিদ্যাপীঠসমূহ থেকে সাধারণভাবে জ্ঞান আহরণ করা হয় নেহায়েত আলেম বা ফকীহ হওয়ার জন্য। অর্থাৎ এখানে Academic Approach দেখা যায়। জ্ঞান অর্জন করে আলেম বা ফকীহ হওয়া দোষণীয় নয় যদি না তা হয়ে থাকে জীবনে প্রয়োগের জন্য। জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে গ্রীক ও ইসলামি চিন্তা প্রক্রিয়ায় পার্থক্য রয়েছে। ইসলামি জ্ঞান আহরণের লক্ষ্যই হল জীবনে প্রয়োগ করা। এটি কোন প্রয়োগশূন্য পুথিগত বিদ্যা নয়। আজকের পৃথিবীতে রয়েছে শত শত ইসলামি বিদ্যাপীঠ। যেগুলো থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত স্নাতক বের হচ্ছে। কিন্তু এই শত শত বিদ্যাপীঠ এবং লক্ষ লক্ষ স্নাতক সমাজ এবং রাষ্ট্রে যে ধরনের ইসলামি প্রভাব তৈরি করার কথা ছিল তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এর একটাই কারণ জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে Academic Approach এর উপস্থিতি। প্রতি বছর ভারতের দারুল উলুম দেওবন্ধ, আরবের মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়, মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বড় মাপের পুথিগত ইসলামি পন্ডিত বা আলেম বের হয়ে আসছেন। কিন্ত সঠিক চিন্তার পদ্ধতি তাদের মধ্যে না থাকার কারণে সালফে সালেহীন বা পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের মত মুসলিম সমাজ বা রাষ্ট্রে এসব আলেম নবীগনের উত্তরসূরীর (ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া) হিসেবে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। বরং কেউ কেউ ইসলাম ও মুসলিমদের দুশমন কুফরদের কাজকে সচেতনভাবে অথবা অবচেতনভাবে সমর্থন করছেন। তাদের কেউ কেউ মুসলিম বিশ্বের জালিম ও উপনিবেশবাদীদের তাবেদার শাসকদের গর্হিত কাজগুলোকে ইসলাম দ্বারা জায়েয করে ফতওয়া দিচ্ছেন। যেমন: মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য বিন বাজ (প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি) সৌদি আরবের পবিত্র ভূমিতে মার্কিন সেনা উপস্থিতি এবং মুসলিম উম্মাহ’র হৃদয়ের মধ্যে বিষফোড়ার মত বসে থাকা ইসরাইলের প্রতি সৌদি শাসকদের নগ্ন সমর্থনকে বৈধতা দিয়েছে। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীধারী মিশরের এক সময়ের গ্রান্ড মুফতি তানতাওয়ির মৃত্যুতে তার প্রশংসা করে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রধান দুশমন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট শোক বার্তা পাঠিয়েছিল। তাদের কেউ কেউ আবার নিজেদের সালাফি (পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনুসারী) বলে পরিচয় দেন। অথচ পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনেকে (ইমাম আবু হানিফা রহ:, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ:, ইমাম তাইমিয়্যাহ রহ:) কোন একটি ইস্যুতে হক্বের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে তৎকালীণ শাসকদের দ্বারা কারাবরণ করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শাসকদের অন্যায় আনুকূল্য নিতে চাননি। তবে আশার কথা হচ্ছে সব আলেম নিজেদের ভুল চিন্তা পদ্ধতির কাছে বিকিয়ে দেননি। কেউ কেউ নিকট অতীতে সত্যিকার অর্থেই পূর্ববর্তী হক্বপন্থী আলেমদের অনুসরণ করে ওয়ারাসাতুল আম্বিয়ার মত জুলুম ও জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা বা ইস্তিকামাত দেখিয়েছেন, তাদের জ্ঞানকে যথাযথভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রয়োগ করেছেন। যেমন: ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশবিরোধী আন্দোলন ও তুরষ্কের খিলাফতের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় শায়খুল ইসলাম মাওলানা মাহমুদুল হাসান কারাবরণ করেছিলেন, মিশরে সাইয়্যেদ কুতুব রহ: ইসলামের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জালিম শাসক কতৃক শাহাদাত বরণ করেন, মধ্যপ্রাচ্যে শায়খ তাকিউদ্দীন আন নাবাহানি রহ: খিলাফতের পক্ষে এবং উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেয়ার কারণে তাবেদার মুসলিম শাসকদের দ্বারা চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) এর বিরোধিতাকারী মক্কার কাফের শাসকশ্রেণী জানত যে, তিনি (সা) একজন সত্য নবী। কিন্তু ভুল চিন্তার পদ্ধতি (pragmatism or superiority complex) বা দৃষ্টিভঙ্গি (Mindset) তাদের হিদায়াতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মদীনার ইহুদী আলেমদের কাছে পূর্ববর্তী নবীদের উপর নাযিলকৃত কিতাবের জ্ঞান ছিল- যেগুলো মুহাম্মদ (সা) এর নবুয়্যতকে সত্যায়িত করে। কিন্তু ভুল চিন্তা পদ্ধতি বা দৃষ্টিভঙ্গি (Mindset) এর কারণে এই জ্ঞান তাদের কোন কাজে আসেনি। অপরদিকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতির কারণে আবু বকর (রা) মেরাজের ঘটনা শোনামাত্র এতে বিশ্বাস স্থাপন করে সিদ্দিক উপাধি লাভ করেন।
সুতরাং উপরের আলোচনা থেকে এটিই প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম উম্মাহকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতিসহ ইসলামি জ্ঞান অর্জন করতে হবে। তবেই এটি ফলদায়ক হবে। তবেই জ্ঞান অর্জন মুসলিম উম্মাহ’র জন্য দুনিয়া এবং আখেরাতে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“হাশরের ময়দানে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কেউ এক পা ও এগোতে পারবে না…….যা জেনেছ সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ? (৫টির মধ্যে একটি প্রশ্ন)…….’’ ।
অন্যথায় এ জ্ঞান দুনিয়া এবং আখেরাতে মুসলিমদের জন্য দায় হিসেবে দেখা দিবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে সঠিক চিন্তা পদ্ধতিসহ ইসলামি জ্ঞান অর্জন করার তৌফিক দান করুক। আমীন।
রাফীম আহমেদ
চিন্তা ও জাতিসমূহের অগ্রাধিকার

আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া একটি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিন্ত বাস্তবে আমরা এরূপ বলতে শুনি না। বরং একটি জাতির প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ, তার দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি ইত্যদিকে উন্নয়নের নিয়ামক মনে করা হয়। আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া একটি জাতিকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন করে, সঠিক পূর্ণজাগরণ সুনিশ্চিত করে এবং সঠিক ও টেকসই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, দক্ষ মানবসম্পদ, শিল্প, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রগতি জাতির আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ফল। আবার আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া না থাকলে প্রচুর প্রাকৃতিক এবং খনিজ সম্পদ থাকলেও সে জাতি পৃথিবীর সর্বাধিক অধপতিত অবস্থায় উপনীত হতে পারে।
উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া বা আদর্শিক আদর্শিক চিন্তা সব জাতির মধ্যে না থাকলেও মূলত: চিন্তাই একজন ব্যক্তির মত জাতিরও কর্মকান্ডের পরিচায়ক অথবা জাতির কর্মকান্ডে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। বিভিন্ন জাতিসমূহের দিকে অর্ন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখলে আমরা এ বিষয়টি খুব সহজে বুঝতে পারব। যেমন: চীনাদের আত্মরক্ষামূলক মানসিকতাই তাদের চারপাশে মহাপ্রাচীর তৈরি করতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল। যদিও এরকম বলা হয়ে থাকে, যে খরচ, আয়োজন ও সময় নিয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছে তার চেয়ে কম প্রচেষ্টায় তারা শত্রুকে পরাজিত এবং চীনের আশেপাশের দেশসমূহ দখল করে রাষ্ট্রের আয়তন বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা সুসংহত করতে পারত। অপরদিকে এই চিন্তার কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন তার কোটি কোটি মানুষকে অভূক্ত রেখে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার ও মহাকাশ গবেষণায় বিলিয়ন বিলিয়ন রুবল খরচ করেছে। পাকভারত উপমহাদেশের অধিকাংশ অঞ্চল যখন একে একে বৃটিশদের উপনিবেশে পরিণত হচ্ছে তখন মোঘল সম্রাট শাহজাহান তখন তাজমহল ণির্মানে ব্যস্ত। একধরনের অনাদর্শিক অবনতিশীল চিন্তার কারণে বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের শাসকগণ কোটি কোটি মুসলিম আবাল বৃদ্ধ বণিতাকে অভূক্ত রেখে কেউ বা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার সুইস ব্যাংকে পাচার করছে, আবার কেউ সুরম্য অট্টালিকা, শপিং মল, নাইটক্লাব, ক্যাসিনো, ফাইভ স্টার, সেভেন স্টার হোটেল নির্মাণ করে সেবা খাতের বিকাশ ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের মত একটি দেশে এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিং মল কিংবা ক্রিকেট খেলার পেছনে শত শত কোটি টাকা অথবা ঢাকার রাস্তার সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে যখন এদেশের অধিকাংশ মানুষ দু’বেলা পেট পুড়ে খেতে পায় না, যখন শতকরা ৪৭ ভাগ শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে টারজান বা কলম্বাস ভিসায় সোনার বাংলা ছেড়ে অবৈধভাবে পাড়ি জমাতে গিয়ে মরুভূমি বা সমুদ্রে ভাসমান দিনের পর দিন, যখন ইউরোপমুখী অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশীরা সর্বাধিক।
খোলাফায়ে রাশেদীনদের মধ্যে আমরা আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া লক্ষ্য করি এবং সে কারণে তারা দ্বিধাহীনভাবে আদর্শিক অগ্রাধিকারও নির্ধারণ করতে পেরেছিলেন। যখন উমর (রা) কে বলা হল, কাবা শরীফের গিলাফগুলোকে নবায়ন করতে হবে; তখন তিনি বললেন, এর চেয়ে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম শিশুদের উদরসমূহ পূর্ণ করা। যখন উম্মাহ’র শাসক, আলেমগণ ও জনগন আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়া থেকে বিচ্যুত হল তখন এর পতন ত্বরান্বিত হল। আরবী ভাষা নয় নিজ নিজ মাতৃভাষায় ইসলাম বুঝতে যাওয়া, ইজতিহাদ বন্ধ করা, জিহাদ বন্ধ করা ইত্যাদি কর্মকান্ডই আদর্শিক চিন্তা থেকে বিচ্যুতির পরিচায়ক। সেকারণে উম্মাহ’র সন্তানদের আদর্শিক চিন্তা ও উৎপাদনমুখী চিন্তা প্রক্রিয়ায় সমৃদ্ধ হতে হবে।
রাফীম আহমেদ
মুসলিম উম্মাহ’র উপর পশ্চিমা উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরূপ প্রভাব

কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়া কী?
কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়া বুঝতে হলে আমাদেরকে চিন্তা কাকে বলে তা আগে বুঝতে হবে। মস্তিষ্কে সংরক্ষিত পূর্ব ধারণার ভিত্তিতে মানুষের ইন্দ্রিয়ের (নাক, কান,ত্বক, জিহ্বা, চোখ) মাধ্যমে কোন বাস্তবতা সর্ম্পকে গৃহীত তথ্যাদি যাচাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াই হল চিন্তা। অর্থাৎ চিন্তার জন্য চারটি অপরিহার্য উপাদান আবশ্যক: বাস্তবতা, পঞ্চইন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক ও পূর্বধারণা (Previous Information)। কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়ায় আমরা যা শিখি তা মূলত পূর্বধারণা (Previous Information) হিসেবে মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকে এবং তা পরবর্তীতে নতুন কোন বাস্তবতা সর্ম্পকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগে। ইসলামে তাফসীর, হাদীসশাস্ত্র, ফিকহ ইত্যাদি এর কালচার। এছাড়া পুনর্জাগরণের জন্য নির্দিষ্ট কালচার তথা হালাকাহ, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব প্রভৃতি এর অপরিহার্য অংশ। গান, নাচ, নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য ইত্যাদি পুজিবাদী কালচারের উপকরণ।
১. পশ্চিমা উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ারসমূহ:
১.১. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ: পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ সবই এর আক্বীদা ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে উঠা মানুষের সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ বহিপ্রকাশ। সেকারণে এ বিভাগসমূহের অধীন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের প্রকাশ ঘটায় ও প্রচার করে।
১.২. শিক্ষাব্যবস্থা: পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়ার পর এর স্থায়ীত্ব সুনিশ্চিত ও ইসলামের পূণরুত্থানের পথকে রুদ্ধ করতে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে উম্মাহকে কালচার করার জন্য ইসলামবিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করে। শায়খ তাকিউদ্দিন আন নাবাহানি (র) তাকাত্তুল আল হিযবী বইয়ে উল্লেখ করেন যে,(উপনিবেশবাদীরা বস্তু থেকে স্পিরিটকে পৃথক করা বা রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার জীবন সর্ম্পকিত দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর দৃঢ় দর্শনের উপর ভিত্তি করে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করে। উপনিবেশবাদীরা তাদের ব্যক্তিত্বগুলোকে আমাদের কালচারিং একমাত্র ভিত্তি করে। তারা তাদের হাদারাহ, ধারণা, ব্যক্তি, ইতিহাস ও লাইফস্টাইলকে চিন্তার প্রাথমিক উৎসে পরিণত করে। এটা যেন যথেষ্ট ছিল না, উপনিবেশবাদীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের ব্যক্তিত্বসমূহকে পরিবর্তিত করে আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা সচেতনভাবে উপনিবেশবাদের প্রকৃত চেহারা গোপন করে কিছু দিক ও ধারণা পছন্দ করে ও গুরুত্বারোপ করে। তারা পাঠ্যক্রমের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করে যাতে করে এগুলো সাধারণ লক্ষ্য থেকে সামান্যতম বিচ্যুত না হয়। একারণে মুসলিমগণ ভুল চিন্তুা দ্বারা বিকশিত হচ্ছে যেখানে আমাদেরকে চিন্তার প্রক্রিয়া শেখানো হয় না, বরং শেখানো হয় কীভাবে অন্যরা চিন্তা করে। এর কারণ হল আমাদের পরিবেশ, ব্যক্তিত্ব, ইতিহাস থেকে চিন্তাকে আলাদা করা হয়েছে এবং এগুলো আমাদের আদর্শ থেকে উৎসারিত নয়। সেকারণে আমরা এমন ব্যক্তিতে পরিণত হলাম যারা জনবিচ্ছিন্ন এবং পরিস্থিতি সর্ম্পকে অসচেতন।) এর প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায় উপমহাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত ম্যাকলে কমিশন রিপোর্টের শেষের দিকে এই ইংরেজ শিক্ষাবিদ উল্লেখ করে যে, ‘এ কমিশন বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের লোকেরা গায়ের রঙের দিক থেকে হবে ভারতীয় কিন্তু চিন্তাচেতনায় হবে বৃটিশ।’
১.৩. রাজনৈতিক দলসমূহ: উপনিবেশবাদীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মুসলিম ভূমিসমূহতে পশ্চিমা চিন্তাধারার ধারক ও বাহক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর নেতৃবৃন্দ দোসর (এজেন্ট) হিসেবে তাদের স্বার্থের অনুকূলে এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এসব দলগুলো জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র প্রভৃতি চিন্তার দিকে উম্মাহকে ক্রমাগত আহ্বান করছে। দৃষ্টান্ত হিসেব বলা যায় ১৮৮৫ সালে বৃটিশ শিক্ষাবিদ অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ কংগ্রেস পার্টি প্রতিষ্ঠা করে। ওসমানীয় খিলাফতকে ধ্বংস করার জন্য আরব ও তুর্কীদের জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে উপনিবেশবাদীরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুবসংঘ, পাঠাগার, বিজ্ঞান ক্লাব প্রভৃতির মাধ্যমে উম্মাহকে কালচার করেছে। দূর্ভাগ্যবশত এসব ভুল চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলসমূহ এখনও সব মুসলিম ভূমিতে উপনিবেশবাদীদের মদদে কাজ করে চলেছে।
১.৪. বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ: পুঁজিবাদে রাজনীতি অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেকারণে কাঁচামাল সংগ্রহ, জ্বালানীর অবিরত সরবরাহ, সস্তা শ্রম ও বাজারের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপনিবেশ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একারণে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিজ্ঞাপন, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপোনসিবিলিটি (CSR) ইত্যাদির নামে উম্মাহ’র বিশেষত যুবসমাজের ইসলামি চেতনাকে ধ্বংস করে পশ্চিমা চিন্তা (যেমন: জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, ভোগ) ও লাইফস্টাইলকে (যেমন: ফ্রি মিক্সিং) বিস্তৃত করছে।
১.৫. মিডিয়া: প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ও প্রভাব তৈরি করার সক্ষমতার কারণে আমাদের জীবনে ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অনস্বীকার্য। এসব মিডিয়া ব্যবহার করে উপনিবেশবাদী, দালাল শাসক, উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মীরা সেক্স ও ভায়োলেন্সনির্ভর চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপন, টক শো, শিক্ষা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে উম্মাহর মধ্যে পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তা ও জীবনাচরণের বিস্তার করে চলেছে। অগভীর চিন্তার অধিকারী হওয়ায় অনুুকরণপ্রিয় উম্মাহ এসব দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
২. পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কুপ্রভাব:
একটি আদর্শিক জাতি সাধারণত অন্য কোন জাতির উপর শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের পর কালচারিং এর মাধ্যমে সে আদর্শের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব জনগনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। আর তা না করলে শাসনব্যবস্থা অপসারিত হওয়ার পর সে জাতি পূর্বাবস্থায় ফেরত যায়। এমনটি ঘটেছিল আন্দালুসিয়া ও বলকান অঞ্চলে ইসলামি শাসনব্যবস্থা অবসানের পর। পুঁজিবাদী পশ্চিমারা মুসলিম ভূমিসমূহ দখলের পর তাদের ঘৃণ্য শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের পর এর স্থায়ীত্ব সুনিশ্চিত করতে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে কালচারিং করে আসছে ও পুঁজিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে জনগনের চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্বধারণা করার অপচেষ্টা এখন অবধি অব্যাহত রেখেছে।
২.১. ইসলামি আক্বীদার বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা:
আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, কিয়ামত দিবস, ভাগ্যের ভাল মন্দ, আখিরাত এই সাতটি মৌলিক বিষয়ের উপর বিশ্বাসকে আক্বীদা বলা হয়। পশ্চিমারা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে বিশেষ করে পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে এসব মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। ডারউইনিজম বা বিবর্তনবাদের মাধ্যমে স্রষ্টার ধারণা সর্ম্পকে অবিশ্বাস বা সন্দেহ সৃষ্টি করা, রিয্ক বা আজলের সাথে মানুষের কাজকে সর্ম্পকিত করে এর সঠিক ধারণা থেকে উম্মাহকে সরিয়ে নিয়ে আসার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। স্রষ্টার ধারণার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস বা সন্দেহ সৃষ্টিতে খুব বেশী সফল না হলেও ক্বাদার ভাল মন্দের বিষয়ে উম্মাহ আজ দারুণভাবে বিভ্রান্ত।
২.২ জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব:
‘আমি জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্য’। (আল কোরআন)
এ আয়াতের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানুষকে প্রেরণের উদ্দেশ্য সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যায়। সেকারণে মানুষের জীবনের সব কাজ এ উদ্দেশ্যকে ঘিরেই আবর্তিত হওয়া উচিত। কিন্তু পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে পৃথিবীতে প্রেরণের উদ্দেশ্য মুসলিম উম্মাহকে আজ সার্বক্ষণিকভাবে তাড়িত করে না। চিরস্থায়ী আখেরাতের সাফল্য নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাফল্যই আজ তার কাছে মুখ্য।
২.৩. চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি গ্রহণ করা:
চিন্তার তিনটি পদ্ধতি রয়েছে: বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational), যৌক্তিক (Logical), বৈজ্ঞানিক (Scientific)। আব্বাসীয় খিলাফতের সময়ে আলেমগণের ইসলামি চিন্তার প্রক্রিয়ায় গ্রীকদের যৌক্তিক চিন্তাপদ্ধতির অনুপ্রবেশ ঘটে-যা এখন অবধি বলবৎ রয়েছে। আর ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে প্রথমে মিশনারীদের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে মুসলিম ভূমিসমূহ দখল উত্তর শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপকরণের মাধ্যমে পশ্চিমারা মুসলিমদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তার পদ্ধতিকে বিকশিত করেছে। আমাদের জীবনে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তার জন্য স্ব স্ব ক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও ইসলামিক আক্বীদা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational) চিন্তা পদ্ধতিকে মুসলিমদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। ইসলামিক আক্বীদা ও শরী’আহ অনুধাবনে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তা পদ্ধতি অকার্যকর এবং অপ্রয়োজনীয়ও বটে। কিন্তু সাধারণ মুসলিম থেকে শুরু করে অনেক আলেমগণ ইসলামকে বুঝার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তা পদ্ধতি গ্রহণ করছে। বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করার মাধ্যমে পশ্চিমারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বই জাহির করতে চায়। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে মুসলিম উম্মাহ আজকে এ সত্যটুকু বুঝতে অক্ষম হচ্ছে।
২.৪. চিন্তার গুনগত মানের অবনমন:
গুনগত মানের বিচারে চিন্তা তিনধরনের: অগভীর (Shallow), গভীর (Deep), আলোকিত (Enlightened)। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে মুসলিম উম্মাহ ইসলামসহ জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে গভীর (Deep) ও আলোকিত (Enlightened) চিন্তা প্রয়োগ করছে না, বরং অগভীর (Shallow) চিন্তা উম্মাহ থেকে শুরু করে আলেমগণের মধ্যে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। চিন্তা ও কর্মে কাফেরদের অন্ধ অনুকরণই এর নগ্ন বহিপ্রকাশ।
২.৫. প্রাথমিক মূল্যবোধ পরিবর্তন:
মানুষ যে কোন কাজের পেছনে চার ধরনের মূল্যবোধ অন্বেষণ করে। এ মূল্যবোধ হল যে কোন কাজের পেছনে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। এগুলো হল: বস্তুগত, মানবিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক মূল্যবোধ। ইসলামে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ প্রাথমিক এবং অন্যান্যগুলোর তুলনায় প্রণিধানযোগ্য। অপরদিকে পুজিবাদে অন্যান্য তিনটির তুলনায় বস্তুগত মূল্যবোধ প্রাথমিক বা অগ্রগণ্য। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে আধ্যাত্মিক নয়, বরং বস্তুগত মূল্যবোধ মুসলিম উম্মাহ’র কাছে আজ প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠেছে।
২.৬. সুখ (Happiness) সর্ম্পকিত ধারণার পরিবর্তন:
পুজিবাদী ব্যবস্থায় ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তিকেই (Pleasure) সুখ (Happiness) মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামে ‘সুখ’ (Happiness) একটি ধারণা বা concept এবং তা হল আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা’র সন্তুষ্টি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তুমি উপরের (বৈষয়িকভাবে ভাল অবস্থান) দিকে তাকিও না, বরং নীচের (বৈষয়িকভাবে অপেক্ষাকৃত মন্দ অবস্থানে) দিকে তাকাও, তবেই আল্লাহ’র নেয়ামত সর্ম্পকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারবে।’ মূলত: এ চিন্তাই মানুষকে সুখের সত্যিকারের অনুভূতি দিতে পারে। পশ্চিমা পুঁজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে উম্মাহ কাফেরদের মত ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তি (Pleasure) বা ভোগকে সুখ (Happiness) ভাবছে; খেলাধুলা, সেক্স ও ভায়োলেন্সনির্ভর চলচ্চিত্র, গান, নাটক, সাহিত্য ইত্যাদির মাধ্যমে বিনোদিত হওয়াকে নিজের অধিকার মনে করছে।
২.৭. ইসলামি জীবনাদর্শ সর্ম্পকে আত্মবিশ্বাসহীনতা:
ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক হুকুমসমূহ (পর্দা, জিহাদ, বহুবিবাহ, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা) সর্ম্পকে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচারণায় প্রভাবিত, সাংস্কৃতিক দখলদারিত্বের শিকার, ফিকরাহ ত্বরীকার ব্যাপারে যথাযথ জ্ঞানহীন উম্মাহ’র আলেম ও সাধারণ মুসলিমগণ ইসলামী জীবনাদর্শের বিষয়ে হীনমন্যতায় ভুগছেন। পরাজিত মানসিকতা থেকেই তারা তাদাররুজ (gradualism), ব্যাংকিং ও বীমা ব্যবস্থার ইসলামীকীকরণ, পরস্পর বিপরীতধর্মী ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে মধুচন্দ্রিমাময় সর্ম্পক আবিষ্কার করছে।
২.৮. পূর্ণজাগরণের সঠিক পথ অনুধাবন করতে না পারা:
এটি সবাই বুঝতে পারছে যে, উম্মাহ’র অবনমন ঘটেছে। কিন্তু পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কুপ্রভাবের দরুণ এ অবনমনের প্রকৃতি ও তা থেকে উত্তরণের উপায় বাতলানো সম্ভবপর হচ্ছে না। উম্মাহ’র অবনমনের সত্যিকারের কারণ তার বুদ্ধিবৃত্তিক অধপতন এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান খিলাফতের অনুপস্থিতি এবং এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এমন একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল যা বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হওয়া উম্মাহ’র অভিভাবকতুল্য অধিকাংশ আলেমগণ ব্যক্তি মুসলিমের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পদস্খলনকেই অবনমনের কারণ ভাবছেন এবং নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি বা ইসলাহকে এর সমাধান মনে করছেন। অধিকাংশ আলেমগণ ইসলামকে ফিকরাহ ও ত্বরীকার সমষ্টি হিসেবে দেখেন না। বিধায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি যে ইসলামের মধ্যেই রয়েছে এ ব্যাপারে তারা ওয়াকিবহাল নন।
২.৯. কাজের ভিত্তি পরিবর্তন:
একজন প্রকৃত মুসলিমের কাজের ভিত্তি হল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া ত’আলা’র সন্তুষ্টি অর্জন। শরী’আহ সংজ্ঞায়িত খায়ের (কল্যাণকর) শার্ (অকল্যাণকর) বা হালাল হারাম- ই তার জন্য হুসন (নৈতিক) কুব্হ (অনৈতিক) হওয়া উচিত। এখানে বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া বা মানব মস্তিষ্ক ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। পুজিবাদে কাজের ভিত্তি হল লাভ বা Benefit । কিন্তু পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও অন্যান্য উপকরন ব্যবহার করে কালচারিং করার কারণে উম্মাহ’র কাজের ভিত্তি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। উম্মাহ হুসন কুব্হ নির্ধারণ এর ক্ষেত্রে পুজিবাদে কাজের ভিত্তি-লাভ বা Benefit কে গ্রহণ করছে।
উপসংহার:
পশ্চিমারা মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়ার পর তাদের ব্যবস্থাসমূহ বাস্তবায়ন করে বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে উম্মাহকে সাফল্যজনকভাবে কালচার করতে সমর্থ হয়েছে। কালচারিং এর মাধ্যমে ভূমির উপনিবেশবাদ থেকে মস্তিষ্কের উপনিবেশবাদে সফল হওয়ায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সময়ে তারা প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ থেকে সফলভাবে Neocolonialism বা নব্য উপনিবেশবাদে রূপান্তরিত হতে পেরেছে। কালচারিং এর কারণেই বৃটেন এখনও পৃথিবীর অনেক জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারছে; যদিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তেরশ বছরের ইতিহাসে ইসলামী ভূমির যেসব অংশে খিলাফত রাষ্ট্র সফলভাবে উম্মাহকে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের মাধ্যমে কালচারিং করতে সমর্থ হয়েছিল সেসব অংশের মুসলিমগণ ইসলামকে ধারণ করার ক্ষেত্রে এখনও অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থানে আছে। তবে আশার কথা এই যে, কুফর দিয়ে কালচার করার ঘৃণ্য পশ্চিমা উপনিবেশবাদী অপচেষ্টা সত্ত্বেও উম্মাহ তার অর্ন্তনিহিত খায়ের, শক্তিশালী আক্বীদা ও আদর্শিক ইসলামি রাজনীতির কারণে আবার ইসলামের দিকে ব্যাপকভাবে ফিরে আসতে শুরু করেছে। উম্মাহ’র এই উত্তম প্রবণতাই অনতিদূর ভবিষ্যতে দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদার ভীত রচনা করবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“তারা (কাফের) চায় মুখের ফুৎকারে আল্লাহ’র নূরকে নিভিয়ে দিতে, কিন্তু তিনি তাঁর নূরকে প্রজ্জলিত রাখবেনই; যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।’’ (সূরা আস-সফ: ৮)
বন্যা ও জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও খিলাফত রাষ্ট্রের আকাংখিত পরিবর্তন

দুর্যোগ-পীড়িত অসহায় মানুষের দুর্দশা সরকার কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সপ্তাহাধিককাল ধরে প্রায় সাত লক্ষ মানুষ নতুন করে বন্যা কবলিত হচ্ছে এবং কোন ধরনের সরকারি সাহায্য না পৌঁছার কারণে তারা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। খাদ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকটের পাশাপাশি বন্যা কবলিত মানুষেরা ইতিমধ্যেই পানিবাহিত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে।
এসব দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও আক্ষেপের সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের কাজে সরকারের ব্যর্থতা সম্পর্কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কান্ডজ্ঞানহীন মন্তব্য করে যাচ্ছে। রাজধানীতে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে মায়া বলেছে যে: “ত্রাণ-সামগ্রীর কোন স্বল্পতা নেই”। যখন এসব দুর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদগণ আমাদের জীবনের প্রতিদিনকার সংগ্রাম ও ভোগান্তিকে প্রতিনিয়তই উপহাস করে, তখন বিপদকালে তাদের কাছ থেকে আমরা এর চেয়েও খারাপ কিছুর আশংকা করতে পারি।
সত্যই, ত্রাণ-সামগ্রীর কোন অপ্রতুলতা ছিল না, কিন্তু তা বন্যা কবলিত মানুষের জন্য নয় বরং কেবলমাত্র তাদের দলীয় কর্মীদের লুন্ঠনের জন্য! এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কেবলমাত্র শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুগামী লোকদেরই সযত্নে লালন করে। এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, যখন ভারত প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে তার ব্যারেজগুলো খুলে দেয় যার দরুণ বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি হয়, তখন আমাদের দেশের “মেরুদন্ডহীন রাজনীতিবিদগণ” ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। বরং এসব ভীরু ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদগণ ক্ষমতায় থাকার জন্য এই শত্রুরাষ্ট্রের প্রতি আজ্ঞাবহ থাকাকেই অধিকতর পছন্দনীয় মনে করে।
বন্যার পাশাপাশি ঢাকা ও বিশেষ করে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে। মেয়র নির্বাচনের পূর্বের অনেক রঙিন প্রতিশ্রুতি এখন শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ের পানির নিচে ডুবন্ত অবস্থায়। উন্নয়নের জোয়ারে নৌকা চড়ে জনগণ আজ অফিস করতে যায়! শহরের নালা-গুলো আবর্জনায় অবরুদ্ধ। বৃষ্টির পানি মিশে সেসব ময়লা-আবর্জনা সড়কে ও অলি-গলিতে ছড়িয়ে পড়ছে, জন্ম দিচ্ছে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধি।
আমরা কখনই এই সীমাহীন লোভ ও দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবস্থা হতে নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ জন্ম হওয়ার আশা করতে পারি না। এসব রাজনীতিবিদদের না আছে বন্যা সংক্রান্ত সমস্যা উৎস থেকে প্রতিরোধ করার মতো সাহস, অর্থাৎ চিরতরে ভারতের ধৃষ্টতার অবসান ঘটানো; কিংবা না আছে দুর্যোগ, জলাবদ্ধতার মোকাবেলা করার মতো সক্ষমতা।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি যথাযথ বন্যা ও জলাবদ্ধতা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়িত করতেও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যদিওবা আমাদের দক্ষ পরিকল্পনাকারী, প্রকৌশলী ও লোকবলের কখনই অভাব ছিল না, তথাপি একটি নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের অভাবে তাদেরকে কাজে লাগানো যায়নি। ব্যর্থ গণতন্ত্রের দুর্নীতি এত বছরেও বাংলাদেশে একটি কার্যকর বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি, না পেরেছে শহর হতে জলাবদ্ধতার নিরসন। তাই এখন যা প্রয়োজন তা হচ্ছে এই ব্যর্থ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূলোৎপাটন, যেটা কেবলমাত্র জনগণের কষ্টের প্রতি উদাসীন অযোগ্য ও অসৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্ম দেয়। এ মুহূর্তে জনগণের একমাত্র আশা এবং অবলম্বন হচ্ছে খিলাফত। নবুয়্যতের আদলের খিলাফতের নিষ্ঠাবান ও সাহসী নেতৃত্বের অধীনে শক্তিশালী ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছাই’ এদেশের জনগণের বহুল আকাঙ্খিত পরিবর্তন আনয়ন করতে সক্ষম হবে। আসন্ন দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্’ই পুনরায় এমন ধরনের নেতৃত্বের জন্ম দেবে যারা পূর্ববর্তী খলীফাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, যেসব খলীফারা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে এবং তাদের জনগণের জবাবদিহিতাকে ভয় করতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“ইমাম (খলীফা) জনগণের উপর দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারি)
কোথায় সেই শাসক যে বলবে, ‘যদি কর্ণফুলির তীরে একটি বকরী পিছলে পড়ে তবে আমি জিজ্ঞাসিত হবো’!

গত কয়েকদিন পূর্বে আমরা দেখেছি চলমান বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। এছাড়াও পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রাম শহর ও এর পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকাতে বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সহ প্রায় শতাধিক লোক নিহত হয়েছে। এ দুর্যোগে নিহত সেনা কর্মকর্তাসহ সকলের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহি রাজিউন।
হে মুসলিমগণ! আপনারা জানেন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় লক্ষাধিক জনগণ রয়েছে যারা বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতাপ্রবণ ও পাহাড়সংলগ্ন বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ এলাকাসমূহতে বসবাস করছেন। একটু লক্ষ্য করলে দেখব, জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট জটিলতা ও পাহাড়ধ্বসে মৃত্যুর ঘটনা নতুন কোন বিষয় নয়। প্রতি বছর পাহাড় ধ্বস ও অতি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার ফলে মৃত্যু হয় আর এবারও সেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হল শতাধিক প্রাণ। এ ব্যাপারে সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে এ ধরণের মৃত্যুকে নেহাতই মৃত্যু বলা যাবে না বরং এটি হত্যাকাণ্ড/খুন। রাষ্ট্রের উদাসীনতা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সদিচ্ছার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তা এর প্রমাণ বহন করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলছেন- “আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি, সচেতনতামূলক মাইকিং করেছি, এটা তো রিমোট কন্ট্রোল না যে যখন তখন পরিবর্তন করা যাবে”। ঠিক একই ভাবে কিছুদিন আগে যালিম হাসিনা ‘ঘুর্ণিঝড় মোরা’ পরবর্তী সময়ে বলেছিল-“ বিএনপি আমলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়েছিল বেশি, আমাদের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ফলে ক্ষতি হয়নি”। দুর্যোগ নিয়ে এদেশের শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অধনস্তদের নানামুখী বিভ্রান্তিমূলক কথা বার্তা এটা প্রমাণ করে এরা জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন এবং কেবলমাত্র রাজনৈতিক বড়াই করার জন্য সময়ে সময়ে তা ইস্যু হয়। এসব যালিম শাসকগোষ্ঠী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে ও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বলতে শুধুমাত্র আশ্রয় কেন্দ্রে প্রেরণ ও শুকনো খাবার প্রদান কে মনে করে। ফলস্বরূপ জনগণ এদের কথায় বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতেও অনীহা প্রকাশ করে। জনগনের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে এসব গণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী ও ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।
আল্লাহ্ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-
“মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ্ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।” [সূরা আর রুম- ৪১]
হে সম্মানিত মুসলিম উম্মাহ! এসব শাসকগোষ্ঠী বছরের পর বছরের ধরে জনগণের সাথে পরিষ্কার প্রতারণা করে চলেছে। জনগণের উন্নয়নের বিভিন্ন রঙিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা ক্ষমতায় আসে, কিন্ত ক্ষমতায় আরোহণের পর এরা কেবল এদের সম্পদের আখের গুছাতেই ব্যস্ত থাকে। একটু চিন্তা করে দেখুন, পাহাড় ধ্বসপ্রবণ ঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জনগণকে নিরাপত্তা প্রদাণ করার জন্য কি বছরের পর বছর সময় লাগে? আরো চিন্তা করে দেখুন, নদী দিয়ে ঘেরা চট্টগ্রামের মতো একটি শহরের জলাবদ্ধতা দুর করা কি খুব কষ্টকর কোনো কাজ? যেখানে কোটি টাকার ফ্লাইওভার প্রজেক্ট খুব সহজেই নির্মান হয়ে সেখানে জলাবদ্ধতা দূর করতে কিসের প্রতিবন্ধকতা! মূলত যেসব প্রজেক্টে এসব শাসকগোষ্ঠী ও এদের সাঙ্গপাঙ্গরা প্রচুর লাভবান হয় এবং জনগণকে বাহ্যিক উন্নয়ন দেখিয়ে আই-ওয়াশ করা যায় সেসব প্রজেক্টই খুব দ্রুত পালে হাওয়া পায়। আর জনগণের মূল সমস্যা আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো শহরের মাঝখান দিয়ে পশ্চিম হতে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত কালভার্ট ও মোটরচালিত পাইপ দিয়ে সহজেই জলাবদ্ধতা দুর করা যায়। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট খাল পুনরুদ্ধারেরও বড় কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মানসিক সক্ষমতা যা এসব শাসকগোষ্ঠীর নেই।
এ সক্ষমতা রয়েছে ইসলামি শাসনব্যবস্থার। আমরা দেখেছি মদীনায় ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবার পর মদীনার শাসক হিসেবে সর্বপ্রথম যে কাজগুলো রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন তা ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন। এছাড়াও আমরা দেখেছি উমর (রা)-এর মতো শাসক যিনি (আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের মতো) তৎকালীন সময়ের খিলাফত রাষ্ট্রের সীমানা অঞ্চল তথা ইরাকের ব্যাপারে বলেছিলেন, “যদি ফোরাত নদীর তীরে একটি বকরীও পা পিছলে পড়ে তবে আমি উমর এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবো।” কোথায় সেই শাসক যে বলবে, ‘যদি কর্ণফুলির তীরে একটি বকরী পিছলে পড়ে তবে আমি জিজ্ঞাসিত হবো’! একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই এধরনের শাসনব্যবস্থা ও শাসক উপহার দিতে পারে।
হে উম্মতের সম্মানিত সেনাসদস্যবৃন্দ! জনগণের এ বিপদে নিজেদের জীবন বাজি রেখে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে আপনাদের জীবন দিয়েছেন। জনগণকে পাহাড় ধ্বস থেকে রক্ষা করতে যেভাবে জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন ঠিক একইভাবে জনগণের উপর চেপে বসা গণতান্ত্রিক যুলুমের শাসন ও হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে ইসলামের ছায়াতলে এ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আপনাদের আর কত সময় লাগবে!
হে সেনা অফিসারগণ, আমরা আপনাদের উদাত্ত আহ্বান জানাই, আপনারা সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নুসরাহ প্রদান করুন। ফিরিয়ে আনুন সেই আকাঙ্ক্ষিত শাসনব্যবস্থা যা আপনাদের শক্তিশালী করবে এবং যাকে আপনারা শক্তিশালী করবেন। ফিরিয়ে আনুন ইসলামের ইতিহাসের সেইসব শক্তিশালী শাসকদের যাদের স্যালুট দিতে আপনাদের বুক গর্বে ভরে উঠবে। আল্লাহ আমাদের শীঘ্রই সেই সময় দেখার তৌফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)
অধ্যায় ৫: নিয়োগকৃত ব্যক্তি বা শ্রমিকের কাজ

কাজের সংজ্ঞা
ভাড়া করার সাথে ভাড়াকৃত বস্তুর উপযোগ ব্যবহারের বিষয়টি সম্পর্কিত। একজন শ্রমিককে ভাড়া করার/নিয়োগ দেয়ার অর্থ হলো তার সামর্থ্যকে কাজে লাগানো। একজন শ্রমিককে নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে কাজটির প্রকৃতি, কাজের সময়কাল, পারিশ্রমিক ও শ্রমের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কাজটি অজ্ঞাত যাতে না হয় সেজন্য কাজের প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিতে হবে, কেননা কাজ সম্পর্কে অজ্ঞ রেখে কোন ব্যক্তিকে নিয়োগ/ভাড়া করা অবৈধ (ফাসিদ)। কার্যকাল নির্ধারণ করাটাও জরুরি, অর্থাৎ সেটি কি দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক নাকি বাৎসরিক হবে। একইভাবে শ্রমিকের কাজের পারিশ্রমিকও সুনির্ধারিত হতে হবে। ইবনে মাসউদ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোন শ্রমিককে নিয়োগ দেয় তবে তাকে অবশ্যই তার পারিশ্রমিক জানাতে হবে” [আল-দারাকুন্তি কর্তৃক কান্জ আল-উম্মাল-তে বর্ণিত]। হয়েছে শ্রমিককে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হবে তা নির্ধারণ করে দেয়াও জরুরী। তদনুসারে, শ্রমিকের কাছ থেকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ দাবী করা অনুমোদিত নয়। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আল্লাহ্ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতীত বোঝা চাপান না।”
[সূরা বাক্বারাহ্: ২৮৬]আবু হুরাইরাহ্ থেকে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) এ ব্যাপারে বলেন:
“আমি যদি তোমাকে কোন কিছুর আদেশ দেই, তবে তোমার পক্ষে যতদূর সম্ভব কর।”
শ্রমিককে কখনই তার স্বাভাবিক সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কোন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বলা উচিত নয়। যেহেতু বাস্তবে সামর্থ্য পরিমাপ করা কঠিন, সেহেতু প্রতিদিনকার কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করে দেয়া সম্ভাব্য সবচেয়ে ভাল উপায়। এর পাশাপাশি কাজের প্রকৃতিও সঠিকভাবে বর্ণনা করতে হবে, যেমন: নরম বা শক্ত মাটি কাটা, ধাতব দ্রব্যাদি প্রস্তুতকরণ, বা পাথর কাটা। যে পরিমাণ শ্রম বিনিয়োগ করতে হবে সে সম্পর্কে একটি ধারনা প্রদান করতে হবে। সুতরাং কোন কাজকে এর ধরন, কার্যকাল, পারিশ্রমিক এবং ব্যয়কৃত শ্রমের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। যখন শারী’আহ্ একজন শ্রমিককে কোন কাজে নিয়োগের অনুমোদন দেয় তখন কাজটিকে ধরন, কার্যকাল, পারিশ্রমিক এবং ব্যয়কৃত শ্রমের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার শর্ত জুড়ে দিয়েছে। কার্য সম্পাদনের জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে শ্রমিক যা পায় তা হল তার ব্যয়কৃত শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সম্পত্তি।
কাজের ধরন
প্রত্যেক হালাল বা আইনগতভাবে বৈধ কাজের জন্য চুক্তি করা অনুমোদিত। যেমন: ব্যবসা, চাষাবাদ, কলকারখানার কাজ, সেবা বা প্রতিনিধিত্বের কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা। বিচারিক কাজে বাদী বা বিবাদীর বক্তব্য/প্রতিক্রিয়া প্রকাশ/জ্ঞাত করার জন্য, প্রমাণাদি সংগ্রহ করে বিচারককে প্রদান করার জন্য, অধিকার দাবী ও লোকদের মধ্যকার বিবাদ নিরসনের জন্য একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এছাড়াও কূপ খনন, নির্মাণকাজ, গাড়ী বা উড়োজাহাজ চালানো, বই ছাপানো, মুসাফ নকল করা, যাত্রী বহন করা ইত্যাদি বৈধ কাজের জন্য যে কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা যেতে পারে।
একটি সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য, কিংবা বিশেষ ধরনের কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করা যায়। একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য কোন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে যদি ভাড়ার চুক্তি করা হয়, যেমন: যদি নির্দিষ্ট একটি কাপড় সেলাই করার জন্য, অথবা বিশেষ একটি গাড়ী চালানোর জন্য খালিদ মুহাম্মদকে ভাড়া করে, তবে মুহাম্মদেরই কাজটি করা উচিত এবং সেটি করে দেয়ার জন্য তার জায়গায় অন্য কাউকে নিয়োগ দিতে পারবে না। যদি মুহাম্মদ অসুস্থ হয় বা কাজটি করতে অসমর্থ হয় তাহলে তার পরিবর্তে অন্য কেউ কাজটি করতে পারবে না, কারণ এক্ষেত্রে কাজটি সম্পাদন করার জন্য শ্রমিক সুনির্দিষ্ট। যদি ঐ নির্দিষ্ট পোষাকটি নষ্ট হয়ে যায় বা বিশেষ গাড়িটি ভেঙ্গে যায়, তাহলে মুহাম্মদ ঐ দু’টি ব্যতিত অন্য কোন কাজ করতে বাধ্য নয়, কারণ চুক্তিতে কাজের ধরন সুনির্ধারিত করে দেয়া হয়েছিল।
যাহোক, যদি কোন একজনের দায়িত্বে, কিংবা বিশেষ ধরনের শ্রমিক বা বিশেষ কাজের উপর ভিত্তি করে ভাড়ার চুক্তিটি করা হয় তবে হুকুম ভিন্ন হবে। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগকৃত ব্যক্তি নিজেই কাজটি করতে পারে এবং তার পক্ষ হয়ে কাজ করার জন্য অন্য একজনকে নিয়োগও দিতে পারে। যদি সে অসুস্থ হয়, অথবা কাজটি করতে অসমর্থ হয় তবে কাজটি করে দেয়ার জন্য তার বদলে অন্য আরেকজনকে পাঠাতে বাধ্য থাকবে। নিয়োগ প্রদানকারী ব্যক্তির নির্দেশক্রমে চুক্তি অনুসারে সে তখন যেকোন গাড়ি চালনা, অথবা যেকোন পোশাক সেলাই করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল হবে। কারণ, কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কোন একটি কাজ সম্পাদনের জন্য চুক্তি হয়নি, বরং নির্দিষ্ট ধরনের কাজ করার জন্য চুক্তি হয়েছে; সুতরাং চুক্তিতে উল্লেখিত ধরনের অন্তভর্‚ক্ত যে কোন কাজ করার ব্যাপারে নিয়োগকৃত ব্যক্তি বাধ্য থাকবে। এক্ষেত্রে এটির নির্দিষ্টতা চুক্তিতে উল্লেখিত কাজের ধরনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং কাজটির নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না, যা নিয়োগকৃত ব্যক্তিকে চুক্তিতে বর্ণিত কাজের ধরনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোন কাজ করার স্বাধীনতা প্রদান করে।
কাজের ধরন সঠিকভাবে বর্ণনা করার মধ্যে কাজটি সম্পর্কে শ্রমিকের কাছে বর্ণনা প্রদান করাও অন্তভর্‚ক্ত, যাতে শ্রমিক তার শ্রমের ধরন সম্পর্কে ধারনা লাভ করতে পারে, যেমন: একজন প্রকৌশলীর কাজ। যে কাজটি সম্পাদন করতে হবে সেটার বিষয়ে এই বর্ণনায় উল্লেখ থাকতে হবে। যে প্রকৃতির শ্রম দিতে হবে সে ব্যাপারে এটি ধারনা দেয়, যেমন: একটি কূপ খনন করা। এরূপ বর্ণনার মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা এবং নামকরণের মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা একই অর্থ বহন করে। একারণে, কাজের বর্ণনা প্রদান করে, অথবা বিশেষভাবে নামকরণের মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা গ্রহণযোগ্য। অদৃশ্য হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান ও বাস্তবের মতোই কোন একজনের দায়িত্বের আওতাভূক্ত হওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট। সুতরাং, বিশেষভাবে সুনির্দিষ্ট নামের একজন প্রকৌশলীকে ভাড়া করা যেমন অনুমোদিত, তেমনি কাজের বর্ণনার মাধ্যমেও একজন প্রকৌশলীকে ভাড়া করা অনুমোদিত। একইভাবে কোন একটি নির্দিষ্ট জামা সেলাই করার জন্য একজন দর্জিকে ভাড়া করা যেমন অনুমোদিত, তেমনি নির্দিষ্ট বর্ণনার জামা সেলাই করার জন্য একজনকে ভাড়া করাও অনুমোদিত।
যদি কোন ব্যক্তি একটি কাজ করতে রাজী হয়, তবে সে অন্য আরেকজনকে তার চেয়ে কম পারিশ্রমিকে কাজটি সম্পাদন করতে দিতে পারে এবং এভাবে মুনাফা করতে পারে। এর কারণ হল, যে কোন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্য আরেকজনকে ভাড়া করা তার জন্য অনুমোদিত। দর্জি বা ছুতারের মতো ব্যবসায়ী যেমনিভাবে তার কাজ করে দেয়ার জন্য শ্রমিক ভাড়া করতে পারে, এবং তেমনিভাবে ঠিকাদাররা কোন কাজ করে দেয়ার ব্যাপারে নিজেদের চুক্তিবদ্ধ করার পরে সে কাজ সম্পাদনের জন্য অন্য শ্রমিকদেরকে ভাড়া করতে পারে যা তাদের জন্য অনুমোদিত, এক্ষেত্রে তারা তাদের কর্মচারীদেরকে কত টাকা পারিশ্রমিক দেয় তা বিবেচ্য বিষয় নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট কাজ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাউকে ভাড়া করা হিসেবেই বিবেচিত হবে। এধরনের সব শ্রমিক ব্যক্তি পর্যায়ের শ্রমিকের ধরনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত, যা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত।
নিয়োগকৃত শ্রমিকদের পারিশ্রমিক থেকে কোন অংশ গ্রহণ করার শর্তে, অথবা তাদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিজেকে নিয়োগ করে তাদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ গ্রহণ করা কোন ব্যক্তির জন্য অনুমোদিত নয়। কারণ এতে করে সে শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ অন্যায়ভাবে দখল করে। আবু সাঈদ আল-খুদরী হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “বন্টনের ক্ষেত্রে সাবধান হও”, “আমরা বলেছিলাম: “হে রাসূলুল্লাহ্ (সা), বন্টন কী?” তিনি (সা) বলেন: “লোকেরা কোন কিছুতে একমত হয়, কিন্তু সেটি হতে একটি অংশ কমিয়ে দেয়।” আতা হতে আরেকটি বর্ণনা এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “একদল লোকের উপর কারও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং এজন্য সে তাদের প্রাপ্য হতে নিয়ে নেয়।” সুতরাং, যদি একজন ঠিকাদার প্রতিদিন এক দিনার পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এক ব্যক্তিকে একশজন শ্রমিক এনে দিতে বলে এবং কাজ শেষে প্রত্যেককে এক দিনারের চেয়ে কম করে প্রদান করে, তবে তা অনুমোদিত নয়। যে পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়ার ব্যাপারে সে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, সেটার সমপরিমাণই প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি নির্দিষ্ট এই পরিমাণ থেকে কোন কিছু নেয়া হয় তবে শ্রমিকদের অধিকার হতে সে কোন কিছু নিল। যদি সে পারিশ্রমিক উল্লেখ না করে একশ শ্রমিক এনে দেয়ার চুক্তি করে থাকে তবে শ্রমিকদেরকে চুক্তিকৃত পরিমাণের চেয়ে কম দিতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে সে ওয়াদাকৃত পরিমাণ থেকে হরাস করে না।
কাজের ধরনকে সংজ্ঞায়িত করার এটাও একটি শর্ত যে, এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে কাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা জন্মায় এবং নিয়োগের বিষয়টি একটি জ্ঞাত পরিমন্ডলে সমাপ্ত হয়। এর কারণ হল, অজ্ঞাত কাজের জন্য ভাড়া করা অবৈধ। সুতরাং যদি কেউ একজন শ্রমিককে এই বলে ভাড়া করে যে, দশ দিরহামের বিনিময়ে কিছু পণ্যের বাক্সকে মিশওে পৌঁছে দেবে, তবে তা অবৈধ হবে। এটিও বৈধ হবে যদি সে বলে যে, প্রতি টন বহনের জন্য এক দিনার করে দেয়ার শর্তে তাকে ভাড়া করা হয়েছে, কিংবা এক টন বহনের জন্য এক দিনার করে দেয়ার শর্তে তাকে ভাড়া করা হয়েছে এবং এর চেয়ে বেশি হলে তা হিসাব করা হবে। এটা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে এমন শব্দসমূহ ব্যবহার করে যা নির্দেশ করে যে তাকে সবগুলো বাক্স বহন করতে হবে। কিন্তু যদি সে সেগুলোকে এই শর্তে বহন করতে বলে যে, এক টনের জন্য এক দিনার দেয়া হবে এবং যা অতিরিক্ত হবে তা তদনুসারে হিসাব করা হবে, অর্থাৎ অবশিষ্টটির যতটুকু বহন করা হবে তা হিসাব করা হবে, তাহলে তা বৈধ হবে না, কারণ এক্ষেত্রে চুক্তির কিছু বিষয় অনির্ধারিত। তবে যদি সে তাকে প্রত্যেক টন এক দিনারের বিনিময়ে বহনের জন্য বলে থাকে তবে তা বৈধ হবে, এটা অনেকটা এরকম যে তার জন্য প্রতি ঘনমিটার পানি উত্তোলনের বিনিময়ে এক পয়সা করে দেয়ার শর্তে সে তাকে ভাড়া করেছে, যা অনুমেদিত। সুতরাং, এটি শর্ত যে নিয়োগ/ভাড়া করার বিষয়টি অবশ্যই একটি জ্ঞাত বিষয়ের উপর হতে হবে। এতে যদি অজ্ঞাত কিছু থেকে থাকে তবে নিয়োগটি অবৈধ হয়ে যাবে।
কাজের ব্যাপ্তিকাল
কিছু নিয়োগ/ভাড়ার ক্ষেত্রে, যে কাজের জন্য নিয়োগ/ভাড়া করা হচ্ছে তার ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ না করে ধরন উল্লেখ করা জরুরী, যেমন: সেলাই করা, নির্দিষ্ট গন্তব্যে গাড়ী চালনা করা। কিছু নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ উল্লেখ না করে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করা জরুরী। এর একটি উদাহরণ হল: একটি গর্ত বা খাল খনন করার জন্য কাউকে এক মাসের জন্য ভাড়া করা, এক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ উল্লেখ করা জরুরী নয়, শুধু উল্লেখ করতে হবে যে খনন কাজটি একমাসব্যপী চলবে, হোক সেটা কম বা বেশী। এবং কিছু নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের ধরন ও ব্যাপ্তিকাল উভয়ই উল্লেখ করতে হবে, যেমন: একটি বাড়ি নির্মাণ করা, একটি তেল পরিশোধনাগার তৈরি করা এবং এধরনের অন্যান্য কাজ। সুতরাং যে ধরনের নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করা প্রয়োজন সেগুলোর প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করতে হবে, কারণনিয়োগের/ভাড়ার প্রকৃতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কিছু কিছু কাজের ক্ষেত্রে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ না করলে কাজটি অজ্ঞাত থেকে যায় এবং সেক্ষেত্রে নিয়োগ/ভাড়া করা অবৈধ হয়ে যায়। যদি নিয়োগের/ভাড়ার চুক্তিটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্পাদিত হয়, যেমন: একমাস বা একবছরের জন্য, তাহলে এ সময়কাল অতিবাহিত হওয়ার আগে কোন পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করতে পারবে না। যদি কোন শ্রমিককে পুনরায় ভাড়া করা হয়, যেমন: মাসিক বিশ দিরহামের বিনিময়ে, তবে তাকে প্রতিমাসে চুক্তিকৃত কাজে যোগদান করতে হবে এবং ভাড়ার চুক্তিতে কার্যকাল উল্লেখ করতে হবে। এটা জরুরী নয় যে, চুক্তির পরপরই ভাড়ার কার্যকাল (যেমন: একমাস) অবিলম্বে শুরু করতে হবে। সুতরাং, রজব মাসে কাজ করার জন্য
একজন শ্রমিককে মহররম মাসে ভাড়া করা যাবে। যদি চুক্তিপত্রে কার্যকাল উল্লেখ করা হয়, কিংবা অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য কার্যকাল উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়, তাহলে কার্যকালকে সময়ের এককে, অর্থাৎ মিনিট, ঘন্টা, সপ্তাহ বা মাসে উল্লেখ করতে হবে।
কাজের পারিশ্রমিক
চুক্তির শর্ত হিসেবে এই বিষয়ের উপর জোর দিতে হবে যে, পারিশ্রমিক হিসেবে প্রদেয় সম্পত্তির যথোপযুক্ত সাক্ষী বা বর্ণনা এমনভাবে উপস্থাপিত হতে হবে যাতে এ বিষয়ক যেকোন অনিশ্চয়তা দূরীভূত হয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ বিষয়ে বলেছেন: “যে কেউ কোন ব্যক্তিকে ভাড়া করলে সে যাতে ঐ ব্যক্তিকে তার পারিশ্রমিকের ব্যাপারে অবহিত করে।” নিয়োগের/ভাড়ার প্রতিদান হতে পারে আর্থিক, অনার্থিক, সম্পত্তি, কিংবা কোন উপযোগ। পণ্য অথবা উপযোগ যেটাই হোক, মূল্য আছে এরকম যে কোন কিছুই মজুরি হিসেবে দেয়া যাবে, তবে শর্ত হচ্ছে যে তা জানা থাকতে হবে; কিন্তু অজ্ঞাত হলে সেটি অবৈধ। যদি কোন ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক হিসেবে কর্তনকৃত ফসলের একটি অংশের বিনিময়ে ফসল কাটার জন্য ভাড়া করা হয় তবে তা অবৈধ, কেননা এক্ষেত্রে পারিশ্রমিক অজ্ঞাত। কিন্তু যদি তাকে এক বা দুই সা’র (A Cubic Mesure) বিনিময়ে ভাড়া করা হয় তবে তা বৈধ। শ্রমিককে খাবার বা বস্ত্র প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া অনুমেদিত কিংবা তার খাবার ও বস্ত্রের সাথে সাথে মজুরিও দেয়া যাবে, কারণ এটি দুগ্ধদানকারী মহিলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আর সন্তানের অধিকারী, অর্থাৎ পিতার উপর হলো সে সমস্ত নারীর খোর-পোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।”
[সূরা বাকারাহ্ : ২৩৩]সুতরাং, দুগ্ধ প্রদানের পারিশ্রমিক হিসেবে তারা খোর-পোষ এবং পোষাকের অধিকারী হয়েছিল। যদি সেবাদানকারী মায়ের ক্ষেত্রে এটা অনুমোদিত হয় তবে এটি অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কেননা এধরনের বর্ণনাসমূহ ভাড়া করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সংক্ষেপে, এমনভাবে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে যাতে করে এ সম্পর্কিত যে কোন ধরনের অজ্ঞতা দূরীভূত হয় এবং কোন ধরনের বিরোধ ব্যতিরেকে তা যথাযথভাবে মিটিয়ে দেয়া যায়, কারণ লোকদের মধ্যকার বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মূলতঃ সকল ধরনের চুক্তি করা হয়। কাজ শুরুর আগেই পারিশ্রমিকের বিষয়ে একমত হতে হবে এবং এটি মাকরুহ্ বা অপছন্দনীয় যে, কাজ শুরু করার পর একজন শ্রমিকের মজুরী নির্ধারণ করা হয়। যদি কোন কাজের বিষয়ে নিয়োগের/ভাড়ার চুক্তি হয় তাহলে শ্রমিক চুক্তির জোরেই পারিশ্রমিক পাওয়ার যোগ্য হয়ে যায়, তবে কাজ শেষ করার পূর্বেই তার কাছে এটি হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কাজ শেষ হওয়া মাত্রই পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে, কেননা এ সম্পর্কে আবু হুরাইরাহ্ হতে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি হাদীসে কুদসীতে বলেন: “বিচার দিবসে আমি তিন ধরনের ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব: একজন হল সেই ব্যক্তি যে আমার নামে কাউকে কোন কথা দিল এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করল, যে ব্যক্তি একজন মুক্ত মানুষকে বিয়ে করল এবং এর মূল্য আত্মসাৎ করল, এবং সেই ব্যক্তি যে কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করল এবং পুরো শ্রম আদায় করার পরও তাকে তার পারিশ্রমিক দিল না।” তবে যদি পারিশ্রমিক বিলম্বিত করার কোন শর্ত চুক্তিতে উল্লেখ থাকে তাহলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা উচিত। যদি এরূপ কোন শর্ত থাকে যে পারিশ্রমিক দৈনিক, মাসিক বা তারচেয়ে কম বা বেশি কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে, তাহলে নির্ধারিত সময় সেটাই যেটা দু’পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত হবে। এটা জরুরী নয় যে নিয়োগকারী ব্যক্তি সম্পূর্ণ উপযোগ আগে গ্রহণ করবে, বরং এটা যথেষ্ট যে শ্রমিক শ্রম প্রদানের জন্য নিজেকে তৈরী রাখে, যার মাধ্যমে নিয়োগকারীর কাছ থেকে পারিশ্রমিক প্রাপ্য হয়ে যায়। সুতরাং, যদি একজন ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তিকে তার বাড়ীতে কাজ
করার জন্য ভাড়া করে থাকে, এবং এরপর শ্রমিক কাজ করার জন্য তার বাড়ীতে উপস্থিত হয় তাহলে যে সময়ের জন্য তাকে ভাড়া করা হয়েছিল সে সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেই শ্রমিক তার পারিশ্রমিকের দাবীদার হয়ে যাবে। যদিও পুরো চুক্তিটি হয়েছিল কোন একটি সেবা প্রদানের জন্য যা হয়ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগকারী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি, তদুপরি শ্রমিক তার পারিশ্রমিক পাওয়ার যোগ্য হয়ে যাবে। কারণ অক্ষমতাটি ছিল নিয়োগকারী ব্যক্তির, শ্রমিকের নয়। তবে সাধারণ কর্মচারীর ক্ষেত্রে, যদি তাকে সুনির্দিষ্ট কোন কাজ করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়, তবে তার দায়িত্বের মধ্যে থাকলে সে তা করতে পারবে, যেমন: একজন চিত্রকর, যে তার দোকানে নিজেই কাজ করে এবং একজন পোষাক প্রস্তুতকারী, যে তার নিজের দোকানে কাজ করে। সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সেটা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার দায়িত্ব শেষ হবে না, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে কাজটি পুরোপুরি শেষ করে গ্রাহককে তা হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পারিশ্রমিক পাবার যোগ্য হবে না। এর কারণ হল, চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত জিনিসটি তার জিম্মায় রয়েছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে গ্রাহকের কাছে তা হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে না। একইভাবে, চুক্তি এরূপ হতে পারে যে নিয়োগকারীর কর্তৃত্বাধীন স্থানে চুক্তিকৃত কাজটি করতে হবে, যেমন: যদি নিয়োগকারীপোষাক প্রস্তুতকারী বা চিত্রকরকে যথাক্রমে সেলাই করা বা রং করার জন্য তার বাড়ীতে নিয়ে আসে তবে এক্ষেত্রে নিয়োগকৃত ব্যক্তি যখন কাজটি শেষ করবে তখন সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে এবং পারিশ্রমিক পাবার যোগ্য হবে, কারণ সে নিয়োগকারী ব্যক্তির কর্তৃত্বাধীন রয়েছে এবং একারণে কাজটি অবিলম্বে শেষ করতে হয়।
কাজের পেছনে ব্যয়কৃত শ্রম
একজন শ্রমিককে ভাড়া করার জন্য যে চুক্তি করা হয় তা শ্রমিকের ব্যয়কৃত শ্রম থেকে প্রাপ্ত উপযোগের উপর প্রয়োগ হয়; এবং প্রাপ্ত উপযোগ অনুসারে পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়। প্রদত্ত শ্রম মজুরি বা উপযোগের মানদন্ড হতে পারে না, অন্যথায় একজন পাথরশ্রমিকের পারিশ্রমিক একজন প্রকৌশলীর চেয়ে অনেক বেশী হতে পারে, কেননা একজন পাথরশ্রমিক কর্তৃক প্রদত্ত শ্রমের পরিমাণ অনেক বেশি এবং এটি বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং, পারিশ্রমিক হল প্রাপ্ত উপযোগের তুল্যবিনিময়, প্রদত্ত শ্রমের নয়। এর পাশাপাশি, কর্মচারীদের দক্ষতা অনুসারে পারিশ্রমিক ভিন্ন ও পরিবর্তিত হয় এবং এটি একই কর্মচারীর জন্য প্রাপ্ত উপযোগের মানের পার্থক্যের ভিত্তিতে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কখনওই প্রদত্ত শ্রমের মাত্রার ভিন্নতার দরুন নয়। উভয়ক্ষেত্রেই চুক্তি করা হয়েছিল নিয়োগকারী ব্যক্তির প্রাপ্ত উপযোগের ভিত্তিতে, নিয়োগকৃত ব্যক্তির প্রদত্ত শ্রমের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং যেটা বিবেচিত হয় সেটা হচ্ছে শ্রমের ফলাফল বা প্রদত্ত শ্রম হতে প্রাপ্ত উপযোগ, এটা হতে পারে ভিন্ন কর্মচারীর মাধ্যমে সম্পাদিত ভিন্ন কাজ, অথবা ভিন্ন কর্মচারীর মাধ্যমে একই ধরনের কাজ, এবং প্রদত্ত শ্রমের প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়া হয় না। এটা সত্য যে, কাজের ফলাফল হচ্ছে শ্রমের ফসল, হোক তা ভিন্ন ভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন লোক কর্তৃক একই কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে; কিন্তু কাজটির উদ্দেশ্য হচ্ছে ফলাফল, কেবলমাত্র শ্রম নয়, যদিওবা পারিশ্রমিক নিরূপনের ক্ষেত্রে এটার দিকে নজর দেয়া হয়। সুতরাং একজন লোককে যদি নির্মাণ কাজের জন্য ভাড়া করা হয় তাহলে তার পারিশ্রমিক নির্ধারিত হওয়া উচিত সময় বা কাজের ভিত্তিতে। যদি এটি কাজ দ্বারা নিরূপিত হয় তবে অবশ্যই দালানটির অবস্থানে সেটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ঘনত্ব ও দালান তৈরির সামগ্রী, ইত্যাদির মধ্যে তার শ্রমের ফলাফল পরিলক্ষিত হবে। যদি কাজটি সময় দ্বারা মূল্যায়িত হয় তবে অধিক পরিমাণ সময় অতিক্রান্ত হলে কাজের উপযোগও অধিক হবে এবং কম পরিমাণ সময় অতিবাহিত হলে কাজের উপযোগও কম হবে। অতএব, সময় উল্লেখ সহকারে কাজের বর্ণনাই হচ্ছে প্রাপ্ত উপযোগের মানদন্ড। যদি কাজটি সময় দ্বারা নিরূপিত হয় তবে নিয়োগকৃত ব্যক্তির স্বাভাবিক সামর্থ্যরে বাইরে অতিরিক্ত কাজ করা উচিত নয়, এবং তাকে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করা উচিত নয়।
নিষিদ্ধ উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করার ক্ষেত্রে হুকুম
ভাড়ার বিষয়টি আইনত বৈধ হতে হলে তা থেকে প্রাপ্ত উপযোগের প্রকৃতিকে হালাল বা বৈধ হতে হবে। সুতরাং নিষিদ্ধ কোন কিছু করার জন্য কাউকে ভাড়া করা উচিত নয়। তদনুসারে, ক্রেতার কাছে মদ বহনের জন্য বা মদ প্রস্তুত করার জন্য একজন শ্রমিককে ভাড়া করা উচিত নয়। একইভাবে শূকরের মাংস বা পঁচা মাংস বহনের জন্য কাউকে ভাড়া করা উচিত নয়।
আনাস বিন মালিক হতে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
“মদের ব্যাপারে দশ ব্যক্তির উপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) অভিশম্পাত করেছেন: এর প্রস্তুতকারী, এটি প্রেরণ করার জন্য আহ্বানকারী, এর পানকারী, এর বহনকারী, এটি প্রস্তুতের আদেশকারী, এর পরিবেশনকারী, এর বিক্রেতা যার জন্য এটি বিয়ে করা হয়, এর ক্রেতা এবং যার জন্য এটি ক্রয় করা হয়।”
সুদের সাথে সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য ভাড়া করা অনুমোদিত নয়, কারণ এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করা হয়, এবং যেহেতু ইবনে মাসুদ থেকে ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) সুদখোর, সুদের দালাল, সুদের দুই সাক্ষী ও সুদের হিসাবরক্ষাকারী কেরাণীকে অভিশম্পাত করেছেন।
ব্যাংক, টাকশাল বিভাগ ও সুদকে নিয়ে কাজ করে এমন সব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের কাজকে নিরীক্ষা করতে হবে। যে কাজের জন্য তাদেরকে ভাড়া করা হচ্ছে তা যদি সুদ সম্পর্কিত কাজের কোন অংশ হয়, এক্ষেত্রে সুদ হতে পারে ব্যক্তির কাজের সরাসরি ফলাফল, কিংবা হতে পারে তার কাজটির সাথে সাথে অন্যদের কাজের সমন্বিত ফলাফল, তবে এধরনের কাজ করা মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক, হিসাব নিরীক্ষক এবং প্রত্যেকটি কাজ যা সুদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোন উপযোগ প্রদান করে। কিন্তু যেসব কাজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদের সাথে সম্পৃক্ত নয় সেগুলো অনুমোদিত, যেমন: কুলি, পাহারাদার, পরিষ্কারক বা এধরনের কাজ, কেননা এধরনের কাজে নিয়োগ দেয়া হয় অনুমোদিত উপযোগের উপর ভিত্তি করে, এবং যেহেতেু সুদের হিসাবরক্ষক ও সুদের সাক্ষীর জন্য যা প্রযোজ্য তা তাদের উপরে প্রযোজ্য নয়। সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে সুদের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য, এদের মধ্যে সেসব কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত যারা কৃষকদের জন্য সুদভিত্তিক ঋণ নিয়ে কাজ করে এবং সেসব রাজস্ব কর্মকর্তা যারা সুদ নিয়ে কাজ করে এবং এতিম শিশুদের বিভাগে চাকুরীরত কর্মকর্তাগণ যারা সুদের বিনিময়ে সম্পত্তি ধার দিয়ে থাকে। এসবই নিষিদ্ধ কাজ; এ কাজের সাথে জড়িত যে কেউই ভয়ঙ্কর গোনাহর সাথে সম্পৃক্ত, কারণ যেহেতু সে সুদের হিসাবরক্ষণকারী অথবা এ বিষয়ক কাজের সাক্ষী, সেহেতু এটা তার উপর প্রযোজ্য। একইভাবে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নিষিদ্ধকৃত যে কোন কাজে সম্পৃক্ত হওয়া মুসলিমের জন্য অবৈধ।
যেসব কাজ থেকে মুনাফা অর্জন বা তাতে শরীক হওয়া নিষিদ্ধ কারণ তা আইনত অবৈধ যেমন বীমা কোম্পানী, শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানী, সমবায় সমিতি কিংবা এধরনের যেকোন প্রতিষ্ঠান, সেসব কাজের ক্ষেত্রে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে। যদি নিয়োগকৃত ব্যক্তির কাজ অবৈধ হয়, অথবা এটি একটি অবৈধ (বাতিল) কিংবা ত্রুটিযুক্ত (ফাসিদ) চুক্তি হয়, বা সেগুলো থেকে উদ্ভুত হয়, তবে একজন মুসলিমের জন্য এসব দায়িত্ব পালন করা অনুমোদিত নয়, কারণ একজন মুসলিমের জন্য অবৈধ বা ত্রুটিযুক্ত বা এগুলো থেকে উদ্ভূত কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া অনুমোদিত নয়। হুকুম শারী’য়াহ্’র সাথে সাংঘর্ষিক কোন চুক্তি বা কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া একজন মুসলিমের জন্য অনুমোদিত নয়, সুতরাং ভাড়ার বিনিময়ে একটি নিষিদ্ধ কাজে সম্পৃক্ত হওয়া তার জন্য অনুমোদিত নয়। এটা অনেকটা সেই বীমা কর্মকর্তার মত যে অপছন্দ করার পরেও এর নথিপত্র সংরক্ষণ করে, যে ব্যক্তি বীমা চুক্তির ব্যাপারে দর কষাকষি/মধ্যস্থতা করে, অথবা যে ব্যক্তি বীমা গ্রহণ করে। একইভাবে, যে কর্মচারী হোল্ডিং সদস্যপদ অনুসারে সমবায় সমিতির লভ্যাংশ বন্টন করে, যে কর্মকর্তা কোম্পানীর শেয়ার বিক্রি করে, অথবা যে শেয়ার স্টকের হিসবাবরক্ষণ নিয়ে কাজ করে এবং যে সমবায় সমিতির জন্য প্রচারণা চালায় এবং এধরনের কাজসমূহ সম্পাদন করে।
যেসব কোম্পানী বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত, সেসব কোম্পানীর সকল বৈধ কাজসমূহ এবং বিভিন্ন পদে যোগদান করাও বৈধ। যদি একজন ব্যক্তির জন্য কোন কাজ করার বৈধতা না থাকে তবে কাজটি করার জন্য সে কর্মচারী হিসেবে যোগদান করতে পারে না এবং সেটা করার জন্য সে নিয়োগের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারে না। সুতরাং যেসব কাজ করা নিষিদ্ধ, সেসব কাজ করার জন্য মুসলিমগণ অন্য কাউকে ভাড়াও করতে পারবে না বা নিজে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেই কাজে নিয়োজিতও হতে পারবে না।
নিয়োগকারী ও কর্মচারী কারও জন্যই মুসলিম হওয়া শর্ত নয়। সুতরাং, একজন মুসলিম কোন অমুসলিমকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাজ ও সাহাবীদের (রা) ঐকমত্য থেকে এটি জানা যায় যে, রাষ্ট্রীয় কাজসহ যেকোন মুবাহ্ বা অনুমোদিত কাজে একজন মুসলিম একজন অমুসলিমকে ভাড়া করতে পারে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) একজন ইহুদীকে কেরানি, আরেকজন ইহুদীকে অনুবাদক এবং একজন মুশরিককে পথ প্রদর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আবু বকর (রা) ও ওমর (রা) তহবিলের হিসাবরক্ষক হিসেবে খ্রীস্টান ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। যেরকম মুসলিমদের জন্য অমুসলিমদের ভাড়া করা বৈধ সেরকম একজন অমুসলিমও বৈধ কাজের জন্য মুসলিমদেরকে ভাড়া করতে পারে। নিয়োগদানকারী ব্যক্তি মুসলিম বা অমুসলিম যাই হোক না কেন, তার জন্য নিষিদ্ধ কাজ করা বৈধ নয়। সুতরাং, একজন মুসলিমকে একজন খ্রীস্টান তার হয়ে কাজ করার জন্য ভাড়া করতে পারে। তবে এর মধ্যে ঐ ধরনের কাজ অন্তর্ভুক্ত নয় যেখানে একজন মুসলিমকে কাফেরের কাছে অপমানিত হতে হয়। বরং, এটি হল বৈধ কোন কাজ করার জন্য নিজেকে অন্যের কাজে নিয়োজিত করা, এবং এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা বা কর্মচারী কারও জন্য ইসলামে বিশ্বাস করা শর্ত নয়। আলী (রা.) একজন ইহুদীর জন্য প্রতি বালতি পানি এক খেজুরের বিনিময়ে তুলে দেয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এবং এ বিষয়টি তিনি রাসূলুল্লাহ্কে (সা) অবহিত করেছিলেন এবং তিনি (সা) এটা নিষেধ করেননি। এছাড়াও, ভাড়া হল বিনিময়ের একটি চুক্তি যাতে মুসলিমদের জন্য অমর্যাদাকর কোন কিছু থাকতে পারবে না। তবে সে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন, তাহলে নিয়োগকৃত ব্যক্তিটি মুসলিম হওয়া বাঞ্চণীয়। উদাহরণস্বরূপ: নামাজে ইমামতি করা, আজান দেয়া, হজ্জ্ব করা, যাকাত বন্টন করা এবং কুর’আন ও হাদীস শিক্ষা দেয়া। কারণ, এগুলো মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য আইনত বৈধ নয়, সুতরাং এসব কাজ করানোর জন্য মুসলিম ব্যতিত অন্য কাউকে নিয়োগ করা হয় না। এ ধরনের কাজের ইল্লাহ্ বা শারী’আহ্গত কারণ হল, একজন মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য এগুলো বৈধ নয়। তবে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন এবং কাজটিতে যদি অমুসলিমের অংশগ্রহণে শারী’আহ্গত কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে তবে তাকে ভাড়া করা বৈধ। সংক্ষেপে বলা যায় যে, একজন নিয়োগদানকারী ব্যক্তি যদি কাজটিকে আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু নিয়োগকৃত ব্যক্তি সেরকম মনে না করে তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি সেগুলো মুসলিম ব্যতিত অন্য কারও জন্য বৈধ না হয়, যেমন: বিচারিক কাজ (কাদা’আ), তাহলে একজন অমুসলিমকে কাজটি করার জন্য নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে যদি একজন অমুসলিমের জন্য কাজটি করা বৈধ হয়, যেমন: জিহাদ করা, তাহলে তাকে একাজের জন্য ভাড়া করা যাবে। সুতরাং, একজন জিম্মি বা অমুসলিমকে জিহাদের জন্য ভাড়া করা যাবে এবং বায়তুল মাল থেকে তার পারিশ্রমিক দেয়া হবে।
প্রার্থনা বা জনসেবামূলক কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা
চুক্তি হিসেবে ভাড়ার সংজ্ঞায় শর্ত রয়েছে যে, শ্রম হতে প্রাপ্ত উপযোগের বিনিময়ে পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে এবং এটাও রয়েছে যে উপযোগ হল এমন একটি বিষয় যা নিয়োগকারী ব্যক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে, এ থেকে বোঝা যায় যে সকল ধরনের উপযোগ লাভের জন্য নিয়োগ দেয়া অনুমোদিত, যা নিয়োগকৃত ব্যক্তি হতে নিয়োগকারী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে। এটি হতে পারে চাকরের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, কিংবা একজন কারিগরের কাজ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, যদিনা শরীয় নির্দেশনা পাওয়া যায় যে এধরনের উপযোগ নিষিদ্ধ। এর কারণ হল, জিনিসসমূহ আদতে বৈধ এবং এদের মধ্যে উপযোগ একটি। এটা বলা অসত্য হবে যে, এটি এমন একটি চুক্তি বা লেনদেন যা আদতে বৈধ হওয়ার চেয়ে বরং প্রকৃতপক্ষে শারী’আহ্ দ্বারা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। এটা অসত্য কারণ, চুক্তি হচ্ছে নিয়োগটি নিজেই, উপযোগ নয়। উপযোগ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যার উপর লেনদেন সম্ভব হয় ও চুক্তি সাধিত হয়, এবং এজন্যই উপযোগ কোন লেনদেন বা চুক্তি নয়। সুতরাং, নিষিদ্ধ নয় এমন সব ধরনের উপযোগের জন্য ভাড়া করা বৈধ, এক্ষেত্রে অনুমতির ব্যাপারে শারী’আহ্ উৎসে কোন নির্দেশনা থাকুক বা না থাকুক। সুতরাং, একজন ব্যক্তি একটি টাইপরাইটারে তার জন্য টাইপ করার কাজে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পুরুষ বা নারীকে ভাড়া করতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে এমন একটি উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করা হচ্ছে যার বিষয়ে কোন নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং, এ ব্যাপারে অনুমোদনের বিষয়ে শারী’আহ্ উৎসে কোন সুনির্দিষ্ট দলিল না থাকা সত্ত্বেও কাউকে ভাড়া করা বৈধ। এমন একজন ব্যক্তিকেও নিয়োগ দেয়া বৈধ যে সুনির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য পরিমাপ ও ওজন করবে। সুয়াইদ ইবনে কায়েসের হাদীসের মাধ্যমে ইবনে দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাজারে আমাদের কাছে আসলেন এবং তিনি (সা) আমাদের সাথে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করলেন এবং আমরা তাঁর (সা) কাছে বিক্রয় করলাম। সেখানে একজন ব্যক্তি ছিল যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওজন করছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ‘পরিমাপ কর এবং পাল্লার ওজনে অধিক কর।’ সুতরাং, এ ধরনের ভাড়া করা বৈধ এবং এ ব্যাপারে দলিল রয়েছে। কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে, হোক সেটি ফরয বা নফল, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি এ কাজের উপযোগ আদায়কারী ব্যক্তি ব্যতিরেকে অন্য কারও মধ্যে সঞ্চারিত না হয়, যেমন: নিজের জন্য হজ্জ্ব করা, নিজের যাকাত প্রদান করা, তবে সে এর জন্য কোন পারিশ্রমিক পাবে না, কারণ পারিশ্রমিক হল একটি উপযোগের প্রতিফলস্বরূপ এবং এসব ক্ষেত্রে আর কারও জন্য নয় বরং আদায়কারী ব্যক্তির নিজের জন্যই তা নির্দিষ্ট থাকে। তদানুসারে এসব কাজে তাকে ভাড়া করা অনুমোদিত নয়, কারণ এগুলো তার উপর ফরয। কিন্তু যদি ইবাদতের উপযোগ এমন হয় যে তা সম্পাদনকারীকে ছাড়িয়ে যায় তাবে এজন্য কাউকে ভাড়া করা অনুমোদিত। উদাহরণস্বরূপ: অন্যদের জন্য আজান দেয়া, নামাজে ইমামতি করা, একজন মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ্জ্ব করার জন্য কাউকে ভাড়া করা, অথবা একজন ব্যক্তির পক্ষে যাকাত প্রদান করার জন্য কাউকে ভাড়া করা। এগুলো সবই বৈধ, কারণ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন একটি উপযোগ লাভের জন্য এধরনের চুক্তি করা হয়। এখানে পারিশ্রমিক হল উপযোগের প্রতিফল, যা অন্য একজন ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছে বিধায় এধরনের নিয়োগ বৈধ। এ প্রসঙ্গে উসমান ইবনে আবি আল আ’স থেকে আত তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “সর্বশেষ যে কাজটি করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হচ্ছে এমন একজন মুয়াজ্জিন নিয়োগ করা যিনি আজানের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না।” এ হাদীসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমন একজন মুয়াজ্জিনকে কাজে লাগাতে বলেছেন যিনি তার কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না, কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি মুয়াজ্জিনের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে নিষিদ্ধ করেননি। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, এমন কিছু মুয়াজ্জিন আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন এবং কিছু আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। সুতরাং, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে পারিশ্রমিক গ্রহণকারী মুয়াজ্জিনদের মধ্য হতে কাউকে নিয়োগ দিতে নিষেধ করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে পারিশ্রমিক গ্রহণ না করা হতে বিচ্ছিন্ন করার দিকে নির্দেশ করে। যা দ্বারা বোঝা যায় যে আজান দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়। তবে এর দ্বারা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার নিষেধাজ্ঞার প্রতি নির্দেশ করা হয়নি। বরং এটা নির্দেশ করে যে, এটি বৈধ।
শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তি তার সন্তানদেরকে অথবা নিজেকে বা পছন্দনীয় কাউকে শিক্ষাদানের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে। কারণ, শিক্ষা হল একটি বৈধ (মুবাহ্) উপযোগ, যার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা যায়। সুতরাং, একাজের জন্য নিয়োগ/ভাড়া করা বৈধ। এবং শারী’আহ্ কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অনুমোদন দিয়েছে। সুতরাং, বৃহত্তর যুক্তিবিচারে কুর’আন ছাড়া অন্য কিছু শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাও বৈধ।
ইবনে আব্বাস থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন যে:
“সর্বোত্তম বিষয় হচ্ছে আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা।”
এছাড়াও, সাহল ইবনে সা’দ আস সা’য়িদী থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) একজন মহিলাকে একজন পুরুষের সাথে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তার বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছেন, অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তা শিক্ষা দিবে। এ ব্যাপারে সাহাবাদের (রা.) ঐকমত্য ছিল যে, শিক্ষার জন্য বায়তুল মাল থেকে বরাদ্দ নেয়া বৈধ, সুতরাং এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ।
আল-ওয়াদিয়া ইবনে আতা’আ হতে সাদাকা আল-দিমাশকি এবং সাদাকা আল-দিমাশকি হতে আবি শিবা কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “তিনজন ব্যক্তি ছিলেন যারা মদীনার বালকদের শিক্ষা দিতেন এবং ওমর আল-খাত্তাব (রা) তাদের প্রত্যেককে প্রতিমাসে পনের দিনার করে পারিশ্রমিক প্রদান করতেন।” এসব কিছুই নির্দেশ করে যে, শিক্ষাদানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ। পারিশ্রমিক নেয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করে যে হাদীসসমূহ এসেছে সেগুলোতে কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য লোকদের ভাড়া করার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান নয়, বরং সেসব হাদীসের মূল লক্ষ্য ছিল কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা। এগুলো সবই কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অপছন্দনীয় বলে নির্দেশ করে, কিন্তু এর জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করাকে নিষিদ্ধ করেনি। পারিশ্রমিক গ্রহণের অপছন্দনীয়তা এর বৈধতা অস্বীকার করে না, সুতরাং কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়, তথাপিও এ কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা যাবে।
একজন ডাক্তার নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে এটা বৈধ, কেননা এতে এমন একটি উপযোগ রয়েছে যা নিয়োগকারী গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু আরোগ্যকরণের জন্য তাকে ভাড়া করা যাবে না, কারণ এটা তখন অজ্ঞাত বিষয়ের উপর ভাড়া করা হবে। তবে একজন রোগীকে পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এটা জ্ঞাত উপযোগের উপর করা হবে এবং একজন রোগীর সেবার উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এক্ষেত্রে নির্ধারিত কাজের জন্য একজনকে ভাড়া করা হচ্ছে। রোগীর চিকিৎসার জন্য ডাক্তারকে ভাড়া করা বৈধ, কারণ তার চিকিৎসা এমনভাবে জ্ঞাত যা অজ্ঞানতাকে দূরীভূত করে, যদিওবা রোগের ধরন পরিচিত নাও হতে পারে, তথাপি এক্ষেত্রে এটুকু জানাই যথেষ্ট যে, রোগী অসুস্থ।
একজন ডাক্তারকে ভাড়া করার বৈধতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত, কারণ ঔষধ এমন একটি উপযোগ যা নিয়োগকারী ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারে, সুতরাং, এটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া বৈধ। এছাড়াও এটা উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঔষধের জন্য ভাড়া করার বৈধতার প্রতি নির্দেশ করেছেন। আনাস (রা) থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু তাইয়্যিবাকে রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের জন্য ডেকেছিলেন এবং এরপর তাকে দুই সা’আ (A Cubic Mesure) খাদ্য দিয়েছিলেন এবং তার উপর ন্যস্তকৃত কাজের ভার কমিয়ে দেয়ার জন্য তার মনিবের কাছে সুপারিশ করেছিলেন।” সে সময় উত্তপ্ত কাঁচের পেয়ালা ব্যবহার করে চামড়ার উপরে আংশিক শূন্যস্থান তৈরী করে রক্তমোক্ষণ করার এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে লোকদের চিকিৎসা করা হত। সুতরাং, এটা করার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার অর্থ হল এ ব্যাপারে ডাক্তার ভাড়া করা বৈধ। রাফি’আ ইবনে খাদিজ থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে বলেছেন: “রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীর উপার্জন কুৎসিত (কাবিহ্)”, যা একজন রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীকে ভাড়া না করার ব্যাপারে কোন নির্দেশনা প্রদান করে না। বরং, রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের মাধ্যমে উপার্জন করাকে অপছন্দনীয় হিসেবে নির্দেশ করে, যদিওবা মা’দান ইবনে আবি তালহা থেকে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে এটিকে মুবাহ্ বলা হয়েছে, যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা) রসুন ও পেঁয়াজ খাওয়াকে নিন্দনীয় বলেছেন, যদিও এগুলো বৈধ। এসবই ব্যক্তি পর্যায়ের শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কিন্তু যে শ্রমিকের উপযোগ সার্বজনীন তার ক্ষেত্রে তার প্রদত্ত সেবাকে এমনভাবে বিবেচনা করা হয় যে রাষ্ট্রকে তা জনগণের জন্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এর কারণ হল, যদি কোন কাজের উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে কোন সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে যায় এবং সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় হয় তবে তা জনস্বার্থ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বায়তুল মালকে সকল মানুষের জন্য তা সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এর একটি উদাহরণ হল, যখন শাসক জনগণের বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য মাসিক বেতনের ভিত্তিতে একজন বিচারককে নিয়োগ/ভাড়া করে, কিংবা বিভিন্ন বিভাগে ও সেবার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে এবং মুয়াজ্জিন ও ইমামকে নিয়োগ/ভাড়া করে। এছাড়াও, জনগণের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে কর্মচারী নিয়োগ/ভাড়া করতে হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে ভাতা প্রদানের বিষয়ে সাহাবীদের (রা) ঐকমত্য বা ইজমা অনুসারে তাদেরকে বায়তুল মাল থেকে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া হত। এটা একারণেও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) দশজন নিরক্ষর মুসলিমকে অক্ষরজ্ঞান প্রদান করাকে মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে ধার্য করে দিয়েছিলেন, আর এই মুক্তিপণ হল গণীমতের মালের অন্তর্ভূক্ত, যার মালিক হলেন সকল মুসলিম। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে এর কারণ হল, একজন চিকিৎসককে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য উপহার হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তিনি তাকে মুসলিমদের কল্যাণে নিয়োজিত করেন। এখানে বাস্তবতা হল, রাসূলুল্লাহ্ (সা) উপহার গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার উপযোগ নিঃশেষ করে ফেলেননি বা ব্যবহার করেননি, বরং তাকে মুসলিমদের সেবায় নিযুক্ত করেন। এ থেকে দলিল পাওয়া যায় যে, এ ধরনের উপহার মুসলিম জনসাধারণের, ব্যক্তিগতভাবে কেবল তাঁর (সা) নয়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি উপহার পাবার পর সেটাকে সব মুসলিমের জন্য বরাদ্দ করেন, সেহেতু এ থেকে এই নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, এটি সাধারণ মুসলিম জনগণের অধিকারভূক্ত জিনিসসমূহের একটি। সুতরাং, বায়তুল মাল থেকে শিক্ষক ও ডাক্তারদেরকে ভাতা প্রদান করা যাবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ ডাক্তার ও শিক্ষক ভাড়া করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বাধ্য, এক্ষেত্রে জিম্মী বা মুসলিম এবং ধনী বা দরিদ্রের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এর কারণ হল, এটি আজান ও বিচারব্যবস্থার মতই, যার উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায় এবং এগুলো জনগণের জন্য প্রয়োজনীয়; সুতরাং, এগুলো জনসেবার মধ্যে অন্তভর্‚ক্ত এবং রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের জন্য এসব সেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বায়তুল মালকে এগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
অধ্যায় ৪: মালিকানা লাভের প্রথম উপায়: কাজ (’আমাল)

যেকোন ধরনের সম্পত্তি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সেগুলো অর্জনের জন্য কাজ করা প্রয়োজন, এক্ষেত্রে সম্পত্তিসমূহ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যেতে পারে, যেমন: মাশরুম, কিংবা সেগুলো মানুষের শ্রম দ্বারা তৈরী হতে পারে, যেমন: এক টুকরো রুটি বা একটি গাড়ি।
’আমাল (কাজ) শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অনেকগুলো ধরন ও রূপ এবং ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল বিদ্যমান। সেজন্য শারী’আহ্ ’আমাল বা কাজ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করা ব্যতিরেকে এটির প্রচলিত ধ্রুপদী অর্থের উপর ছেড়ে দেয়নি। এছাড়াও, শারী’আহ্ ’আমাল শব্দটিকে সাধারণভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি, বরং বিশেষ কিছু কাজ হিসেবে এটিকে উপস্থাপিত করেছে। এটি কাজের প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোচনা করেছে এবং সেগুলোই মালিকানা অর্জনের উপায় হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। কাজ সম্পর্কিত ঐশী হুকুমসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সম্পত্তি অর্জনের উপায় হিসেবে আইনগতভাবে বৈধ কাজসমূহ নিম্নরূপ:
১. অব্যবহৃত (নিষ্ফলা) ভূমির চাষাবাদ
২. ভূ-গর্ভে বা বাতাসের মধ্যে যা পাওয়া যায় তা আহরণ করা
৩. শিকার
৪. দালালি (সামসারা) এবং কমিশন এজেন্ট (দালালা)
৫. শ্রম ও মূলধনের ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব (মুদারাবা)
৬. বর্গাচাষ (মুসাকাত)
৭. পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্যের জন্য কাজ করানিষ্ফলা জমিতে চাষাবাদ (ইহ্ইয়া উল-মাওয়াত)
নিষ্ফলা জমি (মাওয়াত) হলো এমন এক ধরনের ভূমি যার কোন মালিক নেই এবং যা থেকে কেউ উপযোগ লাভ করছে না। এতে চাষাবাদের অর্থ হলো বৃক্ষরোপন করা, বনায়ন করা বা এর উপর ইমারত নির্মাণ করা। ভিন্নভাবে বলা যায় যে, জমিটির যে কোন প্রকারের ব্যবহারের অর্থই হলো সেটিকে আবাদ করা (ইহ্ইয়া)। কেউ এ ধরনের ভূমি আবাদ করলে সে এর মালিক হিসেবে পরিগণিত হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোনো নিষ্ফলা জমিতে আবাদ করবে সেটি তার হয়ে যাবে।”
তিনি (সা) আরও বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোন একটি ভূমিকে বেড়া দ্বারা ঘেরাও করে ফেলে সেটি তার।”
এবং, তিনি (সা) বলেছেন:
“অন্য কোন মুসলিমের পূর্বে যে কেউ কোন কিছুর উপর হাত রাখলে সেটা তার হয়ে যাবে।” এক্ষেত্রে একজন মুসলিম ও জিম্মীর (ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিক) মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, কেননা এ হাদিসটি কোন ধরনের সীমাবদ্ধতা ছাড়া অর্থগত দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ; এবং যেহেতু একজন জিম্মী উপত্যকা, বন এবং পাহাড়ের উপর থেকে যাই গ্রহণ করুক না কেন সেটি তারই, সেহেতু সেগুলো তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া অনুমোদিত নয়। নিষ্ফলা জমি তার সম্পত্তি হওয়ার ক্ষেত্রেও হাদিসটি প্রযোজ্য। সব ভূমির ক্ষেত্রেই এই নিয়ম সাধারণভাবে প্রযোজ্য – হোক সেটা দারুল ইসলাম বা দারুল হারব্, কিংবা উশরী বা খারাজী ভূমি। তবে মালিকানা লাভের শর্ত হলো যে, জমিটি অধীনে আসার পর তিনবছরের মধ্যে সেটিতে কাজ করতে হবে এবং ব্যবহারের মাধ্যমে জমিটির আবাদ অব্যাহত রাখতে হবে। যদি কেউ জমি অধিকারে আসার প্রম তিন বছরের মধ্যে আবাদ না করে, বা পরবর্তীতে টানা তিন বছর ব্যবহার না করে তবে সে সেটির মালিকানার অধিকার হারাবে। উমর বিন আল-খাত্তাব (রা.) বলেছেন: “কোন ব্যক্তি জমিতে বেড়া দিয়ে মালিকানা অর্জন করতে পারে, তিন বছর পর্যন্ত অনাবাদী রাখলে সে জমিটির মালিকানা হারাবে।” অন্যান্য সাহাবাদের (রা.) উপস্থিতিতে উমর (রা.) এই উক্তি করেছিলেন এবং এই আইন প্রয়োগ করেছিলেন, সাহাবীরা (রা.) এ ব্যাপারে কোন আপত্তি করেননি – যা তাদের ইজমাকে সুনিশ্চিত করে।
ভূগর্ভে যা আছে আহরণ
আরেক প্রকারের কাজ হচ্ছে ভূ-গর্ভ হতে এমন ধরনের সম্পদ আহরণ করা যা কোন সম্প্রদায়ের টিকে থাকার নিয়ামক নয়, এগুলো লুক্কায়িত বা গুপ্তধন হিসেবে পরিচিত (রিকায্)। ফিকহ্-এর ব্যবহৃত পরিভাষা অনুসারে এ ধরনের সম্পদে মুসলিমদের সামষ্টিক কোনো অধিকার থাকে না। বরং, যদি কেউ কোন গুপ্তধন খুঁজে পায় তবে সেটার চার-পঞ্চমাংশ ঐ ব্যক্তির এবং অবশিষ্ট এক-পঞ্চমাংশ যাকাত হিসেবে গণ্য হবে।
তবে এটি যদি কোনো সম্প্রদায়ের সকল মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় হয় এবং সামষ্টিকভাবে মুসলিমদের অধিকার হয় তাহলে এটি গণমালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। যা এই বিষয়টিকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে তা হলো, যদি কোনো সম্পদ মানুষ যমিনে লুকিয়ে রাখে, কিংবা এর পরিমাণ এতো সামান্য যে তা সম্প্রদায়ের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নয়, তবেই এটি গুপ্তধন হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে যা আদতে ভূ-গর্ভস্থ ছিল এবং সম্প্রদায়ের সকলের প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, তা রিকায্ নয় বরং গণমালিকানাধীন সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে, যা সত্যিকারভাবে মাটিতে পাওয়া যায় এবং সকলের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, যেমন: পাথরের খনি, যা থেকে দালান নির্মানের পাথর এবং এজাতীয় কোন কিছু তৈরী হয়, তা রিকায্ বা গণমালিকানাধীন সম্পত্তি কোনটি হিসেবেই বিবেচিত হবে না, বরং তা ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। রিকায্-এর মালিকানা লাভ এবং এর এক-পঞ্চমাংশ যাকাত হিসেবে প্রদানের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আমর ইবনে শু’য়াইব তার পিতার কাছ থেকে ও তার পিতা তার দাদার কাছ থেকে আল-নিসাইতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্’কে (সাঃ) লুকাতাহ্ (যা মাটি থেকে সংগৃহীত হয়) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি (সাঃ) বলেন:
“যদি এটা কোনো ব্যবহৃত রাস্তা বা মানববসতিপূর্ণ গ্রাম থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে তাহলে তোমাকে এ ব্যাপারে বর্ণনা দিতে হবে এবং ঘোষণা দিয়ে একবছর কাল অপেক্ষা করতে হবে। যদি এর মালিক একে শনাক্ত করতে পারে তাহলে এটি তার জিম্মায় চলে যাবে, অন্যথায় এটি তোমার। আর যদি এটি কোন ব্যবহৃত রাস্তা বা মানববসতিপূর্ণ গ্রাম থেকে সংগৃহীত না হয় তাহলে এটির এক-পঞ্চমাংশ যাকাত হিসেবে দিতে হবে এবং গুপ্তধনের (রিকায্) ক্ষেত্রেও একই বিষয়।”
অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেনের মতো বাতাসে মিশে থাকা কোন কিছু সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে, সেগুলোকে ভূ-গর্ভস্থ হতে উৎপাদিত বস্তুসমূহের মতো একইভাবে বিবেচনা করা হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক সৃষ্ট যে জিনিসকে শারী’আহ্ মুবাহ্ ঘোষণা করেছে এবং যেটির ব্যবহার সীমাবদ্ধ করে দেয়নি সেটির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
শিকার
শিকার করা হচ্ছে আরেক ধরনের কাজ। মাছ, মুক্তা, প্রবাল, স্পঞ্জ (এক প্রকার সামুদ্রিক প্রাণী) এবং অন্যান্য শিকার হওয়া প্রাণীর মালিকানা লাভ করবে শিকারী; পাখি বা পশু, কিংবা যমিন হতে শিকার করা কোন কিছুর মালিকও হবে শিকারকারী ব্যক্তি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও সমুদ্রের খাদ্য হালাল করা হয়েছে তোমাদের উপকারার্থে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এহরামরত অবস্থায় থাকততক্ষণ পর্যন্ত হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার।”
[সূরা মায়িদাহ্: ৯৬]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যখন তোমরা এহরাম ভেঙ্গে ফেল, তখন তোমাদের জন্য শিকার করা অনুমোদিত।”
[সূরা মায়িদাহ্: ২]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:
“তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, কি বস্তু তাদের জন্য হালাল? বলে দিন: তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে। যেসব শিকারী জন্তুকে তোমরা প্রশিক্ষণ দান করো শিকারের প্রতি প্রেরণের জন্যে এবং ওদেরকে ঐ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দাও, যা আল্লাহ্ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। এমন শিকারী জন্তু যে শিকারকে তোমাদের জন্যে ধরে রাখে, তা খাও এবং তার উপর আল্লাহ্’র নাম উচ্চারণ করো…”
[সূরা মায়িদাহ্: ৪] ।এবং আবু সা’লাবা আল-খাসনী বর্ণনা করেছেন যে,
“আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে গেলাম এবং বললাম: ‘হে আল্লাহ্’র নবী! আমরা শিকারের জন্য উপযোগী ভূমিতে বসবাস করি, আমি তীর এবং প্রশিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত কুকুরের মাধ্যমে শিকার করি, সুতরাং আপনি আমাকে বলে দিন যে, এদের কোনটি আমার জন্য অনুমোদিত?” তিনি (সা) বলেন: “তোমার দেয়া বর্ণনা অনুসারে, তুমি একটি শিকার উপযোগী ভূমিতে বসবাস করো; সুতরাং তুমি আল্লাহ্’র নামে তোমার তীর দিয়ে যা শিকার করো তা থেকে ভক্ষণ করো, এবং তুমি যদি আল্লাহ্’র নামে তোমার প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে শিকার করো, তাহলে শিকারের সময় ও সেটি খাবারের সময় আল্লাহ্’র নাম উচ্চারণ করো, এবং তুমি যদি তোমার অপ্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে যদি শিকার করো এবং মৃত্যুর পূর্বে শিকারটিকে সংগ্রহ ও জবাই করতে পারো তবে তা থেকে ভক্ষণ করো।” (আন-নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ্ কর্তৃক বর্ণিত)
দালালি এবং কমিশন এজেন্সী (সামসারা এবং দালালা)
দালাল হচ্ছে এমন একজন ব্যক্তি যাকে অন্যান্য ব্যক্তি তাদের পক্ষ হয়ে কোন কিছু ক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য নিয়োগ করে থাকে। একজন কমিশন এজেন্টকেও এভাবেই নিয়োগ দেয়া হয়। সামসারা (দালালি) হল এমন এক ধরনের কাজ যার মাধ্যমে কোন সম্পত্তি বৈধভাবে অধিকৃত হয়। আবু দাউদ তার সুনানে উল্লেখ করেছেন যে, কায়েস ইবনে আবু ঘুরজা আল-কাননী বলেছেন:
আমরা মদীনাতে আউসাক (বোঝাই করা মালামাল) ক্রয় করতাম এবং নিজেদেরকে দালাল বলে অভিহিত করতাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের কাছে আসলেন এবং আমাদেরকে আগের চেয়ে উত্তম একটি নামে ডাকলেন। তিনি (সা) বলেন: “হে বণিকগণ, সাধারণত ব্যবসা হচ্ছে মূর্খ কথাবার্তা ও শপথের কালিমাযুক্ত, সুতরাং একে সাদাকার সাথে মিশ্রিত করো।” এর অর্থ হলো, ব্যবসায়ীরা তার পণ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে এমনভাবে সীমালঙ্ঘন করে যে, তা মূর্খতার পর্যায়ে পড়ে যায় এবং পণ্যকে বিক্রয় করার জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দিয়ে ফেলে। তাই তার কাজের প্রতিফল থেকে মুক্তি লাভের জন্য সাদাকা দেয়া অধিকতর পছন্দনীয়। ক্রয়-বিক্রয়ের যে কাজের জন্য লোকটি চুক্তিবদ্ধ হয়েছে সেটি সুনির্দিষ্ট হতে হবে, এটি হতে পারে পণ্যের ভিত্তিতে কিংবা সময়ের ভিত্তিতে। সুতরাং, কেউ যদি একটি বাড়ী বা কোন সম্পত্তি বিক্রয় বা ক্রয় করার জন্য কাউকে একদিনের জন্যও নিয়োগ দেয় তবে সেটি বৈধ হবে। কিন্তু সে যদি অনির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ দেয় তবে তা অবৈধ হবে।
নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির কিছু কাজের ক্ষেত্রে দালালি প্রযোজ্য নয়। যেমন: এক ব্যবসায়ী অন্য আরেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করার জন্য একজন এজেন্ট নিয়োগ দিলো, এবং বিক্রেতা তার কাছ থেকে ক্রয় করার প্রতিদানে এজেন্টকে কিছু অর্থ প্রদান করলো। যদি এজেন্ট এই অর্থ পণ্যের মূল্য থেকে বাদ না দিয়ে নিজের জন্য কমিশন হিসেবে রেখে দেয় তবে শারী’আহ্ এটিকে দালালি হিসেবে অনুমোদন দেয় না, কারণ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি ব্যবসায়ীর জন্য একজন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে, তাই পণ্যের মূল্য যতটুকু কমানো হয় তা নিয়োগকারী ব্যবসায়ীর জন্য, এজেন্টের জন্য নয়। অতএব, এজেন্টের জন্য এই অর্থ গ্রহণ করা নিষিদ্ধ, কারণ তা ক্রেতার অধিকারভুক্ত, যদি ক্রেতা তা গ্রহণের অনুমতি প্রদান করে তবেই তা গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ হবে।
একইভাবে, যদি কোনো ব্যক্তি একটি পণ্য ক্রয় করার জন্য তার বন্ধু বা ভৃত্যকে প্রেরণ করে এবং বিক্রেতা তার কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করার জন্য বন্ধু বা ভৃত্যকে কোনো সম্পত্তি প্রদান করে, অর্থাৎ কমিশন প্রদান কওে তবে সে বন্ধু বা ভৃত্যের জন্য তা গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়, কারণ সেটা দালালি নয়, বরং সেটা প্রেরণকারী ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে চুরি হিসেবে বিবেচিত হবে। এর কারণ হলো, এ সম্পত্তি তারই যে তাকে ক্রয় করতে পাঠিয়েছে এবং কখনই যাকে পাঠানো হয়েছে তার জন্য নয়।
মুদারাবা
মুদারাবা হলো দুই বা ততোধিক ব্যক্তির ব্যবসায় অংশগ্রহণ, যাতে একজন মূলধন এবং অন্যজন শ্রম বিনিয়োগ করে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির শ্রমের সাথে আরেকজন ব্যক্তির সম্পত্তি অংশীদারিত্বে উপনীত হয়। এর অর্থ হচ্ছে যে, একজন কাজ করবে এবং অন্যজন সম্পত্তি বিনিয়োগ করবে। সুনির্দিষ্ট পরিমাণে লাভ ভাগাভাগি করে নেয়ার ব্যাপারে দু’জন অংশীদার একমত হয়। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে, যখন একজন ব্যক্তি এক হাজার পাউন্ড বিনিয়োগ করে ও অন্যজন সেটা দিয়ে কাজ করে এবং প্রাপ্ত লাভ তাদের দু’জনের মধ্যে বন্টিত হয়। শ্রম বিনিয়োগকারী অংশীদারকে অর্থ হস্তান্তর করতে হবে এবং অর্থের উপর তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে, কারণ মুদারাবাতে শ্রম বিনিয়োগকারী ব্যক্তিকে সম্পত্তি হস্তান্তর করে দিতে হয়। শ্রম বিনিয়োগকারী অংশীদার সম্পদ বিনিয়োগকারী অংশীদারের উপর এমন শর্তারোপ করতে পারে যে, লভ্যাংশের এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক তাকে দিতে হবে, কিংবা লভ্যাংশের সুনির্দিষ্ট অংশ ভাগ করে নেয়ার ব্যাপারে তারা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে। এটি একারণে যে, মুদারিব বা শ্রম বিনিয়োগকারী অংশীদার তার কাজের জন্য লভ্যাংশে অধিকার দাবী করতে পারে। অতএব, অংশীদারদের জন্য এটা অনুমোদিত যে তারা মুদারিবের অল্প অথবা অধিক পরিমাণ লভ্যাংশ প্রাপ্তির বিষয়ে একমত হতে পারে। সুতরাং, মুদারাবা এমন এক ধরনের কারবার যা মালিকানা অর্জনের বৈধ পন্থা। এর ফলে মুদারিব সম্পত্তির মালিকানা লাভ করতে পারে, যা সে পারষ্পরিক ঐক্যমত্য অনুযায়ী কাজ করে মুদারাবার মাধ্যমে লভ্যাংশ হিসেবে অর্জন করে থাকে।
মুদারাবা হচ্ছে একধরনের কোম্পানী, কারণ এটা হচ্ছে শ্রম ও সম্পদেও অংশীদারিত্ব। শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত লেনদেনসমূহের একটি হচ্ছেএধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। আবু হুরায়রাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“আল্লাহ্ বলেন: ‘দুইজন অংশীদারের মধ্যে আমি তৃতীয়জন, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন আরেকজনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। যদি তাদের একজন আরেকজনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে আমি নিজেকে সেখান থেকে অপসারণ করে নেই।”
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“আল্লাহ্’র হাত ততক্ষণ পর্যন্ত দুইজন অংশীদারের উপর থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পরস্পরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করে।”
আল-আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব বর্ণনা করেছেন যে, যখন তিনি কোনো সম্পত্তি মুদারাবা হিসেবে হস্তান্তর করেন তখন তিনি মুদারিবের উপর শর্তারোপ করতেন যে, এটি নিয়ে সে সমুদ্রে ভ্রমণ করতে পারবে না, কোনো উপত্যকায় অবরোহণ করতে পারবে না, কিংবা জীবন্ত কোনো কিছু নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না, অন্যথায় সে নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে জানতেন এবং তিনি (সা) এটিকে অনুমোদন দিয়েছেন। সাহাবীগণ (রা.) নিরঙ্কুশভাবে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, মুদারাবা অনুমোদিত। সাধারণত উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রা.) এতিমদের সম্পত্তি মুদারাবা হিসেবে হস্তান্তর করতেন। উসমান ইবনে আফফান (রা.) কিছু সম্পত্তি মুদারাবা হিসেবে এক ব্যক্তিকে হস্তান্তর করেন। সুতরাং, মুদারিব অন্য একজনের সম্পত্তিকে ব্যবহার করে সম্পত্তি অর্জন করে থাকে। অতএব, মুদারিব কর্তৃক সম্পাদিত মুদারাবা হচ্ছে একধরনের কাজ এবং মালিকানা অর্জনের একটি বৈধ পন্থা। সম্পদের মালিকের জন্য এটি মালিকানা অর্জনের পন্থা নয়, বরং এটি মালিকানা বিনিয়োগের একটি মাধ্যম।
বর্গাচাষ (মুসাকাত)
কাজের আরেকটি ধরন হচ্ছে মুসাকাত, যাতে একজন ব্যক্তি তার গাছসমূহকে সেচ প্রদান ও তত্ত্বাবধান করার জন্য কারো কাছে সেগুলো হস্তান্তর করে এবং এর বিনিময়ে তাকে গাছগুলো থেকে প্রাপ্ত ফলের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ প্রদান করে। এটাকে বলা হত মুসাকাত (পারিভাষিক অর্থ সেচকার্য), কেননা এটি সেচকার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট; হিজাজের লোকদেও গাছে প্রচুর পরিমাণে সেচ প্রয়োজন হতো, আর তারা তা কূপ থেকে সংগ্রহ করতো। মুসাকাত এমন এক ধরনের কাজ যা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত।
মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা.) বলেছেন:
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের লোকদের সাথে অর্ধেক ফল ও বৃক্ষের ভিত্তিতে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন।”
মুসাকাত সাধারণত তাল গাছ ও লতাজাতীয় গাছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য – যার ফসলের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ শ্রমিকদেরকে দেয়া হয়। এটা শুধুমাত্র ফলবান গাছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেসব গাছে ফল উৎপন্ন হয় না, যেমন: উইলো, কিংবা ফল হলেও তা সংগ্রহ করা হয় না, যেমন: পাইন ও সিডার, সেগুলোর ক্ষেত্রে মুসাকাত প্রযোজ্য নয়, কারণ মুসাকাত ফলের একটি অংশের জন্য প্রযোজ্য এবং এ ধরনের গাছ হতে কোনরূপ ফল অন্বেষন করা হয় না। কিন্তু যেসব গাছ হতে পাতা অন্বেষণ করা হয়, যেমন: তুঁত ও গোলাপ গাছ, সেগুলোর ক্ষেত্রে মুসাকাত প্রযোজ্য, কারণ এগুলোর পাতা ফলের সমপর্যায়ের। এগুলো থেকে বছরান্তে ফসল পাওয়া যায় এবং এগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব, এবং এগুলোর একটি অংশের বিনিময়ে মুসাকাতে প্রবেশ করা যায়, আর একারণে ফলের মতই এক্ষেত্রে একই হুকুম প্রযোজ্য।
একজন কর্মচারী বা শ্রমিককে নিয়োগ প্রদান
ইসলাম একজন ব্যক্তিকে তার হয়ে কাজ করার জন্য কর্মচারী ও শ্রমিক, অর্থাৎ কর্মী নিয়োগ করার অনুমতি প্রদান করেছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“এই পৃথিবীতে আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বন্টন করেছি এবং একের পদমর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে কিছু ব্যক্তি অপরকে তাদের কাজে নিয়োগ দিতে পারে…”
[সূরা যুখরুফ: ৩২]ইবনে শিহাব বর্ণনা করেছেন যে, উরওয়াহ্ ইবনে আজ-জুবায়ের বলেছেন যে, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন:
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবুবকর (রা.) বনু আদ-দীল থেকে অভিজ্ঞ পথ নির্দেশক হিসেবে এক ব্যক্তিকে ভাড়া করেছিলেন, যে তখনও কুরাইশদের কুফফার দ্বীনের মধ্যে ছিল। তারা তার কাছে তাদের দু’টি ভারবাহী মাদী উট হস্তান্তর করলেন এবং তিনরাত পর সকালবেলা দু’টি উটসহ সাওর-এর গুহায় তাদের সাথে সাক্ষাতের সময় ধার্য করলেন।”
এছাড়াও, আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে, তবে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেবে।”
[সূরা ত্বালাক: ৬]আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“আল্লাহ্ আজ ওয়া যাল্লা বলেন: বিচার দিবসে আমি তিন ধরনের ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হবো: একজন হলো সে ব্যক্তি যে আমার নামে কাউকে কোনো কথা দিলো এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করলো, যে একজন আজাদ ব্যক্তিকে বিয়ে করলো এবং এর মূল্য গ্রাস করল এবং যে ব্যক্তি কোনো কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করলো এবং পুরো শ্রম দেয়ার পরও তাকে তার পারিশ্রমিক দিলো না।”
নিয়োগ প্রদানের অর্থ হচ্ছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিয়োগকারীকে কোন সুবিধা প্রদান করে এবং এর বিনিময়ে নিয়োগকারী হতে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি সম্পদ লাভ করে। সুতরাং এটিকে এমন একটি চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা যায় যেখানে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিনিময়ে উপযোগ (কাজ হতে প্রাপ্ত সুবিধা) পাওয়া যায়। শ্রমিকের কাজের উপযোগের উপর ভিত্তি করে অথবা শ্রমিকের উপকারিতার কথা বিবেচনা করে একজন শ্রমিককে ভাড়া করার চুক্তি করা হয়। যদি চুক্তিটি কাজের উপযোগের উপর নির্ভর করে সম্পাদন করা হয় তবে চুক্তিকৃত বিয়য়টি হলো কাজ দ্বারা সৃষ্ট উপযোগ, যেমন: কোন বিশেষ কাজের জন্য কারিগর ভাড়া করা, পরিচ্ছনতা কর্মী ভাড়া করা, কামার বা ছুতার ভাড়া করা। তবে চুক্তিটি যদি ব্যক্তির নিজস্ব মানবীয় উপযোগিতার কথা বিবেচনা করে করা হয় তাহলে চুক্তির বিষয়বস্তু হলো ব্যক্তির উপযোগিতা, যেমন: একজন ভৃত্যকে ভাড়া করা এবং এধরনের সকল শ্রমিক। এ ধরনের চুক্তিতে শ্রমিক নিয়োগকারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করে, যেমন: যে ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একটি কারখানা বা বাগানে কাজ করে, কিংবা একজন কৃষক। সরকারী কর্মচারীরা এর আওতায় পড়ে। বিকল্পভাবে, একটি সুনির্দিষ্ট কাজের বিষয়ে তার দক্ষতা থাকতে পারে, মজুরির বিনিময়ে যেকোন ব্যক্তির জন্য কাজটি সে করে দিতে পারে। এ ধরনের কাজের উদাহরণ হলো ছুতার, দর্জি ও মুচীর কাজ। প্রম ধরনের কাজ হলো ব্যক্তি পর্যায়ের কাজ এবং দ্বিতীয় ধরনের কাজ হল সাধারণ শ্রম।


















