তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২অধ্যায় ১: অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিচিতি

সদ্যজাত যে কোন জাতি প্রাণ লাভ করার পর তার জীবদ্দশায় প্রাপ্ত সর্বোত্তম ঐশ্বর্য্য হচ্ছে চিন্তা; এবং এগুলো কোন প্রজন্মের জন্য তার পূর্ববর্তী প্রজন্ম থেকে লাভ করা সর্বোত্তম উপহার। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হল জাতির মধ্যে আলোকিত চিন্তা গভীরভাবে প্রোথিত থাকতে হবে। বস্তুগত সম্পদ, শিল্প ও বৈজ্ঞানিক আবিস্কার এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় চিন্তার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবতা হচ্ছে, এসব বস্তুগত বিষয়াদি অর্জন এবং এগুলোর সংরক্ষণ নির্ভর করে চিন্তার উপর।
বস্তুগত সম্পদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব যদি জাতি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সংরক্ষণ করে। তবে যদি বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং জাতি শুধুমাত্র বস্তুগত সম্পদ দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, তবে তা খুব দ্রুত সংকুচিত হয়ে সে জাতিকে দারিদ্রতায় নিপতিত করে। একটি জাতি তার অধিকাংশ বৈজ্ঞানিক অর্জন পুনরুদ্ধার করতে পারে যদি জাতিটি তার চিন্তার প্রক্রিয়া না হারায়। আর যদি সে ফলপ্রসূ চিন্তার পথ হারিয়ে ফেলে, তবে সে খুব দ্রুত পশ্চাৎমুখী হয়ে যাবে এবং তার সব আবিষ্কার ও উদ্ভাবন হারিয়ে ফেলবে। তাই প্রথমেই চিন্তার যত্ন নেওয়া অত্যাবশ্যক। এই চিন্তার উপর ভিত্তি করে ফলপ্রসূ চিন্তার পদ্ধতি দ্বারা বস্তুগত সম্পদ অর্জন করা যায় এবং সেই সাথে অর্জন করা যায় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, শিল্পের জন্য উদ্ভাবন এবং আরও অনেক কিছু।
এই চিন্তা বলতে বুঝায় জাতির মধ্যে বিদ্যমান জীবন সম্পর্কিত বিষয়ে চিন্তার একটি প্রক্রিয়া। জাতি যখন কোন ঘটনার মুখোমুখি হয় তখন বেশীরভাগ জনগোষ্ঠী সে ঘটনাকে বিচার করতে তাদের কাছে বিদ্যমান তথ্যগুলো ব্যবহার করবে এই চিন্তার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এর অর্থ এই যে, তাদের কাছে চিন্তা আছে যা তারা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার করে এবং বারবার এই চিন্তা সফলভাবে ব্যবহার করার ফলে একটি ফলপ্রসূ চিন্তার প্রক্রিয়া তৈরী হয়।
আজ মুসলিম উম্মাহ্ এমন এক সময় অতিক্রম করছে যখন অতীতের ফলপ্রসূ চিন্তার পদ্ধতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, এমনকি তা হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র, খিলা-ফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামী জীবনধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাওয়াহ্’র প্রসারতার ফলে বিগত বছরগুলোতে এই বাস্তবতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এটা আজ সুস্পষ্ট যে মুসলিমরা ইসলামের দিকে মুখ ফিরিয়েছে, এবং ইসলামের ধারনা, সমাধান ও হুকুমের উপর আস্থা স্থাপন করেছে। যদিও এটা পরিষ্কার যে মুসলিম ভূখন্ডে প্রচারিত সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ধারনাসমূহের অসারতা ও এর ভ্রান্তিসমূহ জনগণের কাছে উম্মোচিত হয়ে গেছে, মুসলিম জাতি এখনও কুফর রাষ্ট্র ও তাদের দালালদের আধিপত্য মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। এই কুফর রাষ্ট্র ও তাদের দালালরা মুসলিম ভূখন্ডে জঘন্য মিথ্যা ও প্রতারণামূলক প্রচারণার পদ্ধতি ও ধরন ব্যবহার করে তাদের বস্তাপঁচা ধারনা সুন্দরভাবে সাজিয়ে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে, বিশেষ করে সেসব ধারনা যা অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের সাথে সম্পর্কিত।
ফলে ইসলামি দাওয়াহ্ বহনকারীদের প্রমে অবশ্যই যে ভিত্তির উপর পুঁজিবাদী সমাধানগুলো প্রতিষ্ঠিত তা প্রকাশ করে দিতে হবে, এগুলোর অসারতা তুলে ধরে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সমাধানগুলোর বিনাশ সাধন করতে হবে। দাওয়াহ্ বহনকারীদের জীবনের নতুন ইস্যুসমূহ আলোচনা করতে হবে এবং এগুলোর সমাধান তুলে ধরে দেখাতে হবে যে ঐশী হুকুম বিধায় তা মানতে হবে। কারণ এ হুকুমসমূহ কুর’আন ও সুন্নাহ্ বা এ দু’টি উৎস যে দিকনির্দেশনা দেয়, তা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কিনা – কখনই এ দৃষ্টিভঙ্গী বিবেচ্য নয়। তার মানে ইসলামী সমাধানকে আক্বীদার ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে এবং কখনই তা থেকে প্রাপ্ত লাভের উপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা যাবে না। সুতরাং প্রত্যেকটি হুকুমের সাথে যেসব ঐশী দলিল থেকে সেগুলোকে আহরণ করা হয়েছে অথবা ঐশী হুকুম বা বাণী যে ঐশী কারণ বা ইলাহ্ নিয়ে এসেছে তা উপস্থাপন করতে হবে।
শাসন ব্যবস্থা ও অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত চিন্তাসমূহ মুসলিমদেরকে সবচেয়ে বেশী মুগ্ধ করে এবং এগুলোর জন্য তাদেরকে জীবনে সবচেয়ে বেশী যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। মুসলিমরা সাধারণত এ চিন্তাগুলোকে প্রশংসা করে। অন্যদিকে পশ্চিমারা বাস্তবে এই চিন্তাগুলো প্রয়োগ করার চেষ্টা করে, এমনকি তারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অধ্যবসায়ী। যদিও উম্মাহ্ উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাফের উপনিবেশবাদীদের দ্বারা তাত্ত্বিকভাবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত, পশ্চিমা ব্যবস্থা ও উপনিবেশবাদ বজায়রাখার জন্য উম্মাহ্ বাস্তবে অর্থনৈতিক জীবনের সর্বক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত। সুতরাং ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তা স্বাভাবিকভাবেই ইসলামী বিশ্বের মুসলিমদের অর্থনৈতিক জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে। এই প্রভাব এতটাই বেশী হবে যে উম্মাহ্ চলমান ব্যবস্থা উল্টে দিতে উদ্বুদ্ধ হবে। আর কাফের উপনিবেশবাদী, পশ্চিমাদের গুণমুগ্ধ লোকজন – বিশেষ করে যারা অন্ধকারে থাকতে পছন্দ করে, যারা পরাজিত মানসিকতা সম্পন্ন ও শাসকগোষ্ঠী – এই ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তার তীব্র বিরোধীতা করবে।
সুতরাং, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি সঠিক চিত্র তুলে ধরা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে, যে চিত্র সুবিন্যস্ত আকারে পশ্চিমা রাজনৈতিক অর্থনীতি যে মৌলিক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত তা প্রকাশ করবে। এটা এজন্য প্রয়োজন যাতে করে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা মুগ্ধ লোকেরা এ ব্যবস্থার ত্রুটিসমূহ ও ইসলামের সাথে এর সাংঘর্ষিক দিকসমূহ উপলদ্ধি করতে পারে। অতঃপর তারা অর্থনৈতিক জীবনের সমস্যা সঠিকভাবে সমাধানকারী ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চিন্তাসমূহ পরীক্ষা করে দেখতে পারবে এবং তাদের কাছে এটি সাধারণ মূলনীতি ও বিস্তারিত – উভয় আঙ্গিকে পুঁজিবাদী জীবন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হিসেবে উপস্থাপিত হবে।
ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

নিম্নোক্ত বইটি প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক শাইখ তাকী উদ্দীন আন-নাবহানি (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক লিখিত ‘নিজামুল ইকতিসাদি ফিল ইসলাম’ (ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা) হতে নেয়া হয়েছে।
ভূমিকা
এটাই প্রথম বই যেখানে সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে সমকালীন ইসলামিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতাকে পরিপূর্ণরূপে তুলে ধরা হয়েছে।
বইটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে অর্থনীতি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি এবং এর উদ্দেশ্য, কিভাবে সম্পদের মালিকানা অর্জন ও তা বৃদ্ধি করা যায়, কিভাবে তা ব্যয় ও হস্তান্তর করা যায়, কিভাবে নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ বন্টন এবং সমাজে সম্পদের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়।
বাইতুল মালের প্রাপ্য সম্পত্তি এবং যে খাতে তা ব্যয় করা হবে সেগুলোসহ সম্পদের প্রকারভেদ (ব্যক্তিগত, গণমালিকানাধীন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি) বইটিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বইটি ভূমি সম্পর্কিত নিয়মনীতি ব্যাখ্যা করেছে – হোক তা উশরী বা খারাযী। জমির উপর উশর (এক দশমাংশ হারে কর) নাকি ভূমি খাজনা (খারায) প্রযোজ্য এবং কিভাবে জমি চাষাবাদ, ব্যবহার ও বন্টন হবে ও কী প্রক্রিয়ায় একজন থেকে আরেকজনের কাছে হস্তান্তরিত হবে তাও এটি ব্যাখ্যা করেছে।
বইটিতে আরো আলোচনা করা হয়েছে বিভিন্ন প্রকার মুদ্রা (নুকুদ) সম্পর্কে; রিবা (সুদ) ও বিনিময়ের সময় মুদ্রার ক্ষেত্রে কি ঘটে এবং মুদ্রার উপর যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে কি বাধ্যবাধকতা তাও আলোচনা করা হয়েছে।
পরিশেষে বইটিতে বৈদেশিক বাণিজ্য ও এর নিয়মনীতি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ বইয়ে গৃহিত সব হুকুমের একমাত্র উৎস হচ্ছে মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কিতাব এবং তাঁর রাসূল (স:) এর সুন্নাহ্ এবং এগুলো থেকে প্রাপ্ত নির্দেশনা, যেমন কিয়াস এবং ইজমা-আসসাহাবা। অন্য কোন উৎস থেকে এ হুকুমসমূহ গ্রহণ করা হয়নি।
এ বইটি সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাস্তবতার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এছাড়া বইটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভুলসমূহের যুক্তিখন্ডনসহ তাদের ত্রুটিসমূহ এবং ইসলামিক অর্থনীতির সাথে এগুলোর সাংঘর্ষিক দিকগুলো ব্যাখ্যা করেছে।
এ বইটির নতুন সংস্করণ ছাপানোর পূর্বে সামান্য সংশোধনীসহ পুন:নিরীক্ষণ করা হয়েছিল। হাদীস উল্লেখ করবার পূর্বেসেগুলো হাদীস গ্রন্থসমূহের বর্ণনাকারী দ্বারা প্রমাণিত কিনা তা পুন:নিরীক্ষণের ক্ষেত্রে খুবই সতর্ক দৃষ্টি দেয়া হয়েছিল।
ইসলামিক অর্থনীতি বিষয়ে মুসলিমদের মধ্যে সচেতনতা তৈরী করতে এই বইটি বিশাল ভূমিকা রেখেছে। আমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন তাঁর রহমত নাজিল করেন এবং মুসলিমদেরকে এসব হুকুম আহকাম আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার সামর্থ্য প্রদান করেন।
১৪ রবিউস সানি ১৪২৫ হিজরী
২/৬/২০০৪মুহাম্মাদ বিন কাসিম এর ভারত বিজয়
১ম অংশ
২য় অংশ
সত্য বলা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না

আবু আদ-দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
«العلماء ورثة الأنبياء»
“আলেমগণ নবীগণের উত্তরসূরী।” [আবু দাউদ, তিরমিযি]আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র পক্ষ থেকে আপনাদের উপর অর্পিত উচ্চ মর্যাদা ও দায়িত্বের কারণে আমরা আপনাদের প্রতি নিম্নোক্ত আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই প্রত্যাশায় যেন আমরা সকলেই তাদের কাতারে শামিল হতে পারি যারা সত্যের পক্ষে অবস্থানকারী এবং আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেনা।
প্রিয় ভাইয়েরা ও কর্তব্যপরায়ণ আলেমগণ :
আলেমগণ তাদের ঈমান, জ্ঞান, কর্ম এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেয়ার সাহসিকতার কারণে নবীগণের উত্তরসূরী হিসেবে পরিগণিত। কিন্তু আজকের সেই আলেমগণ কোথায়? নবীগণের এই যুগের উত্তরসূরীরা কোথায়? যেখানে আমাদের পূর্বের বড় বড় আলেমগণ তাদের অপরিসীম জ্ঞান ও দ্বীনকে সঠিকভাবে বোঝার সক্ষমতার কারণে সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। যা তাদেরকে সত্যের পক্ষে সাহসী অবস্থানকারী ও তৎকালীন সমাজে বিদ্যমান ভুলগুলিকে দৃঢ়ভাবে চ্যালেঞ্জকারী মহৎ ও সুপরিচিত আলেম হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। যার কিছু উদাহরণ হলো:
– আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা), যিনি খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন।
– সাইদ বিন জুবায়ের (রা), যিনি আল হাজ্জাজ বিন ইউসুফ-এর যুলুমের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সহিত অবস্থান নিয়েছিলেন।
– সুফিয়ান আল-ছাওরি (রহ), যিনি হারুন আল-রশিদ-এর পাঠানো চিঠিকে স্পর্শও করেননি, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এটা একজন যালিম শাসকের নিকট থেকে এসেছে। তিনি তার এক অনুসারীকে এই চিঠিকে উল্টিয়ে তার পিছনের দিকে লিখতে আদেশ করলেন: “হারুনের প্রতি” এবং “আমির-উল-মু’মিনি’ন” সম্মোধন করে নয়, এবং বললেন (যার সার সংক্ষেপ): “মুসলিমদের সম্পদকে যথেচ্ছা ব্যবহার করতে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়েছো, তাই তুমি একজন যালিম, এবং আমি তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবো।”
– আবু হানিফা (রহ.), যিনি আল-মনসুর-এর নেতৃত্বে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সন্তুষ্ট ছিলেন না। তিনি যখন কারাগারে, তখন তার মা তাকে একদিন বললেন: “হে নু’মান, এই জ্ঞান তোমার জন্য শারীরিক শাস্তি আর কারাবাস ছাড়া আর কোন কল্যাণ বয়ে আনেনি, এবং এই জ্ঞানকে পরিত্যাগ করার জন্য এটাই যথেষ্ট।” উত্তরে তিনি বললেন: “হে আম্মা, যদি আমি দুনিয়া আকাঙ্খা করতাম তবে তা পেতাম, কিন্তু আমি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে চেয়েছি যাতে আমি নিশ্চিত হতে পারি যে, আমাকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছে আমি তা সুরক্ষা করতে পেরেছি এবং এর দ্বারা নিজেকে অন্ধকারে ঠেলে দেইনি।”
– আহমদ বিন হাম্বল (রহ.) কারাগারে থাকা অবস্থায় তার চাচার সাথে তার এই বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক হয় যাতে তিনি জনসম্মুখে আল-মুতাসিম কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর বিরোধিতা থেকে বিরত থাকেন। জবাবে তিনি বলেছিলেন: “যদি আলেমগণ হক্ কথা না বলেন, এবং ফলশ্রুতিতে জনগণের নিকট তা উপেক্ষিত হয়, তবে কিভাবে তখন সত্য সবার নিকট প্রকাশিত হবে?”
এগুলো ছিল পূর্ববর্তী মুসলিম আলেমদের কর্তৃক হকের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানের সামান্য কিছু নমূনা, সুতরাং আজকের সেই মুসলিম আলেমগণ কোথায়? উম্মাহ্’র বর্তমান সংকটাপন্ন অবস্থার প্রেক্ষাপটে আপনাদের অবস্থান কী? ইমাম আল-গাজ্জালি (রহ.) কর্তৃক প্রদত্ত এই উক্তির ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কোথায় যেখানে তিনি বলেছেন: “শাসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়”, “এবং আলেমগণ দুর্নীতিগ্রস্ত হলে শাসকরা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়”? আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত নির্দেশের ক্ষেত্রে আপনাদের অবস্থান কোথায় :
﴿وَإِذ أَخَذَ اللَّهُ ميثاقَ الَّذينَ أوتُوا الكِتابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنّاسِ وَلا تَكتُمونَهُ﴾
“…(সত্য ও মহান বাণী) মানুষের নিকট বর্ণনা (ব্যক্ত ও সুস্পষ্ট) কর, এবং তা গোপন করো না।” [সূরা আলি ইমরান : ১৮৭]আলেমগণ ছাড়া জনগণ অন্ধকারে দিকভ্রান্ত এবং শয়তানের সহজ শিকার। তাই আলেমগণ হলেন এই জমীনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত বিশেষ রহমতস্বরূপ, এবং অন্ধকারে আলোকবর্তিকা, সঠিক পথে পরিচালনার নেতৃত্ব, এবং এই জমীনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নিদর্শন; যাদের মাধ্যমে ভ্রান্ত চিন্তাসমূহকে প্রতিহত করা হয় এবং মানুষের হৃদয় ও মনে বিদ্যমান সন্দেহসমূহ দূর করা হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে তারকারাজির সাথে তুলনা করে বলেছেন :
«إِنَّ مَثَلَ الْعُلَمَاءِ فِي الأَرْضِ كَمَثَلِ نُجُومِ السَّمَاءِ ، يُهْتَدَى بِهَا فِي ظُلُمَاتِ الْبَرِّ وَالْبَحْر، فَإِذَا انْطَمَسَتِ النُّجُومُ يُوشِكُ أَنْ تَضِلَّ الْهُدَاةُ»
“নিশ্চয়ই, আলেমগণ হচ্ছেন আকাশের নক্ষত্রের মত; যাদের মাধ্যমে জনগণ ভূ-পৃষ্ঠে ও মহাসমুদ্রে অন্ধকারে আলোর পথ দেখতে পায়, এবং যদি তারা দৃশ্যমান না থাকে, তবে জনগণ পথ হারাবে যেভাবে পথিক অন্ধকারে পথ হারায়।” [আহমাদ]
আমরা আপনাদের ভাই হিসেবে আপনাদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক প্রদত্ত এই দায়িত্বের কথা স্মরণ করাতে চাই যেন আপনারা সেইসব সম্মানিত আলেমদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারেন :
– মুসলিম বিশ্বের শাসকদের জবাবদিহি করুন: উম্মাহ্’র বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত আল-আসাদ কিংবা আল-সিসি থেকে শুরু করে ইয়েমেনে আমাদের মুসলিম ভাইবোনদের উপর সৌদী সরকারের নৃশংস বোমাবর্ষণ – আলেমগণকে সকল বিশ্বাসঘাতক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিবাদ করতে হবে।
– উম্মাহ্ ও মানবতার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের চক্রান্তের মুখোশ উন্মোচন করুন: প্রাক্তন রিয়ালিটি শো’ তারকা ডোনাল্ট ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ায়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র ইচ্ছায় উদার ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠী ও তাদের নীতিসমূহের ভ্রান্তির মুখোশ উন্মোচনের কাজ সহজ করে দিয়েছে। আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ – আমেরিকা, বৃটেন ও রাশিয়া – মানবতার বিরুদ্ধে বিশেষ করে উম্মাহ্’র বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ও গোপনে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত; হোক সেটা দক্ষিণ ডাকোটার অধিবাসীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন, অথবা সিরিয়া ও ইরাকে অব্যাহত আক্রমণ। তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিসমূহ শুধু মানবজাতির জন্যই ক্ষতি বয়ে আনেনি, বরং পশুকুল ও পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি আলেমগণ এ সকল নীতিসমূহের বিরুদ্ধে কথা না বলেন তাহলে কে আছে যারা উম্মাহ্ ও মানবজাতিকে সঠিক দিক নির্দেশনা দিবেন?
আমাদের প্রাণ প্রিয় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একটি হাদীস দিয়ে এই আহ্বান শেষ করতে চাই
«أَلاَ لاَ يَمْنَعَنَّ أَحَدَكُمْ هَيْبَةُ النَّاسِ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍ إِذَا رَآهُ أَوْ شَهِدَهُ، فَإِنَّهُ لاَ يُقَرِّبُ مِنْ أَجَلٍ وَلاَ يُبَاعِدُ مِنْ رِزْقٍ أَنْ يَقُولَ بِحَقٍّ أَوْ يُذَكِّرَ بِعَظِيمٍ»
“মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে হক্ কথা বলা হতে বিরত না রাখে যখন তা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়; সত্য বলা এবং সৎকর্ম করা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না।” [আহমদ, ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ্]
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে দৃঢ়পদ করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে ভাই-ভাই হিসাবে পুনরুত্থিত করুন। আমিন!
হাসিনার ভারত সফর, বাংলাদেশের ভারত দাসত্বের সেকাল-একাল

কয়েকদফা স্থগিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশেষে এপ্রিলে ভারত সফর করতে সম্মত হয়েছেন। এ সফরটি নিয়ে অনেক দিন ধরেই নানা জল্পনা কল্পনা ভাসছে। তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি,গংগা ব্যারেজ এগুলোই খুব বেশি আলোচনায় এসেছে কিন্তু এখন বুঝা যাচ্ছে এগুলো স্রেফ হিমবাহের শৃঙ্গ।
পানির নিচে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অংশটি আড়ালেই থেকে গিয়েছিল, আর সেটি হল বাংলাদেশকে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির দিকে নিয়ে যেতে চাইছে ভারত যার মেয়াদ হবে ২৫ বছর।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘২৫ বছরের চুক্তি’ টার্মটি নতুন কিছু নয়, বরং ১৯৭৪ সালের ‘ইন্দিরা-মুজীব’র চুক্তির সাথেও বাংলাদেশের জনগণ পরিচিত। ২৫ বছরের দাসত্বের চুক্তি হলেও আজ অবধি বাংলাদেশ ভারতের দাসত্বের ঘানি টেনে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত মরণবাধ ফারাক্কা বাংলাদেশের একাংশ মরুভূমি করে রেখেছে। স্থল সীমান্ত চুক্তিতে ভারতই বাংলাদেশ থেকে বেশি সুবিধা ভোগ করেছে। সীমান্তে হত্যাকান্ড চলছে নির্বিচারে। মাদকদ্রব্য চোরাচালান, পতিতাবৃত্তি মানবপাচার ইত্যাদিতে ভারতের নিকট বাংলাদেশ যেন দাসত্বমনা ধারণ করছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক গোষ্ঠী ভারতের নিকট সমর্পন করেছে। পিলখানা হত্যাকান্ডে ভারত আমেরিকার সরাসরি সংযুক্ত চক্রান্ত বাস্তবায়নে এদেশের আওয়ামী বি.এন.পি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ভূমিকা অপরিসীম। নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন বিষয় যেমন, বিদ্যুৎ, সার, ভোগ্যপণ্য দ্রব্য ইত্যাদিতে ভারতের উপরই বাংলাদেশকে নির্ভরশীল করে তোলা হচ্ছে।
বাংলাদেশে আজকে ভারতেরই সংস্কৃতি পালিত হয়। তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক চেতনার আড়ালে মূলত মুশরিকদের নস্ট সংস্কৃতি বাংলাদেশের মুসলিম তরুন সমাজের মাঝে অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে আমাদের তরুনেরা নিজস্ব পরিচয় হারিয়ে অবিশ্বাসী কাফের সম্প্রদায়ের সংস্কৃতিকে অনুসরণ করছে। ভারতের অনুকরণে হোলী খেলার নামে আজ বাংলাদেশের তরুনীরাও নির্যাতিত হয়।
বাংলাদেশের জনগন ইসলামী আকীদায় বিশ্বাসী। এই আকীদার ইতিহাস কখনো মুশরকদের নিকট সমর্পনের সাক্ষ্য দেয় না। ১৪০০শ বছরের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা খিলাফতের শাসনে আমরা কোন মুশরিক রাষ্ট্র কর্তৃক উপরে বর্ণিত জুলুমের ছিটেফোঁটাও দেখি না। এটা এই কারণেই যে, খিলাফত পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মত নয়। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় দূর্নীতি গ্রস্থ শাসক গোষ্ঠী একে অপরকে ভারত-আমেরিকার দালাল বলে আক্ষায়িত করে, অথচ মানবরচিত শাসনব্যবস্থার বাস্তবায়ন ঘটিয়ে উভয়ে (আওয়ামী, বি.এন.পি) ভারত আমেরিকার দালালী করে চলেছে।
ইসলামী রাষ্ট্র খিলাফত আল্লাহ মনোনীত জীবনব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়। রাসূল (স) যখন মদীনায় প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র খিলাফত প্রতিষ্ঠা করেন তখন থেকে খিলাফত ধ্বংসের আগ অবধি মুসলিমরা পৃথিবীর বুকে শুধুমাত্র আল্লাহ’র ই দাসত্ব করেছে, কিন্তু যখন খিলাফত ধ্বংস হল মুসলিমরা ইসলাম ছেড়ে কুফর চিন্তাকে আকড়ে ধরল তখন থেকেই মুসলিমদের অধঃপতন শুরু হল। তখন থেকেই মুসলিম উম্মাহ’র উপর কুফর শক্তি প্রভাব নিতে শুরু করে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
وَمَنْ أَعْرَضَ عَن ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَىٰ
“যে আমার স্বরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব”
ভারত আমেরিকার প্রভাব দূরিকরণে বাংলাদেশের মুসলিম উম্মাহ’র নিকট একমাত্র সমাধান খিলাফত শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। যা বাংলাদেশকে ভারত আমেরিকার দাসত্ব থেকে মুক্ত করবে এবং মুসলিমদের হারিয়ে যাওয়া সোনালী ইতিহাস ফিরিয়ে দিবে, এটাই রাসূলের(সা) ভবিষ্যৎবাণী
“এরপর আবার আসবে নবুয়তের আদলে খিলাফত” (মুসনাদে আহমদ)
প্রশ্ন-উত্তর: “আমরা কি ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসূল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই”?

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুৃম… আমাদের শাইখ… যে বলে যে, “আমরা ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই” তার জন্য আমাকে কি যথার্থ উত্তর দিতে পারেন?
উত্তর: ওয়ালাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু, সংক্ষেপে যথার্থ উত্তর হলো: যিনি বলেন, “আমরা ক্ষমতা অর্জন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহর রাসুল (সা) এর পদ্ধতি অনুসরণে বাধ্য নই” উনাকে জিজ্ঞেস করেন: উনি ওযু করার জন্য কোন ধরণের দলীল-প্রমাণের সাহায্য নিবেন? ওযু সংক্রান্ত প্রমাণাদিই নিবেন না? নাকি হজ্জ্বের মাসলা মাসায়েল খু্ঁজবেন? তিনি উত্তর দিবেন যে, তিনি ওযুর দলীল-প্রমান চাইবেন।
তারপর জিজ্ঞেস করুন যে তিনি কি সিয়ামের নিয়ম জানতে সিয়াম সংক্রান্ত দলীল নিবেন? নাকি কি করে রোযা রাখতে হয় তা জানতে জিহাদের মাসআলা খুঁজবেন? তিনি উত্তর দিবেন যে তিনি সিয়ামের জন্য সিয়ামের দলীলই চাইবেন।
এরপর উনাকে জিজ্ঞেস করেন যে, এটা কি সঠিক নয় যে তিনি সালাতের ব্যাপারে জানতে সালাতের মাসআলাই তালাশ করবেন? নাকি যাকাতের দলীলপ্রমাণ খুঁজবেন? তিনি জবাব দিবেন যে, তিনি সালাতের দলীল-প্রমাণই চাইবেন। মোটকথা, এটাই পরিষ্কার যে তিনি যে কোন ইস্যুতে ঠিক ঐ বিষয়েরই শরয়ী দলীল-প্রমাণ চাইবেন।
এবার, তাকে বলুন যে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে কি তিনি রাসূল (সা) কিভাবে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন এ বিষয়ে শরয়ী দলীল চাইবেন না? উদাহরণস্বরূপ, তিনি তো এ বিষয়ে জিহাদ, সালাত বা সিয়ামের দলীল খুঁজবেন না, বরং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীল খুঁজবেন এবং আল্লাহর রাসূল (সা) একবারই রাজনৈতিক সংগ্রামের ধাপে এসে নুসরাহ অন্বেষণের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এতদর্থে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি হলো নুসরাহ তালাশ।
এখন প্রশ্ন হলো, নুসরাহ তালাশ কি ফরজ (অবশ্য পালনীয়), মানদুব (যেসব কাজে উৎসাহিত করা হয়েছে), কিংবা মুবাহ (যা অনুমতি প্রদানকৃত)? যদি নুসরাহ তালাশ ফরজ হয় তবে আমরা এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করতে বাধ্য, এ বিষয়ে অধ্যয়ন করে আমরা পাই: নুসরাহ তালাশ ফরজ, এটার প্রমাণ হলো আল্লাহর রাসুল (সা) উনার পদ্ধতি পরিবর্তন করেননি এমনকি চরম নির্যাতনের সময়েও। তিনি এটা তালাশ করেছেন বনু সাকিফের কাছে এবং তারা অত্যন্ত নিষ্ঠুর জবাব দিয়েছে উনার পা রক্তাক্ত করার মাধ্যমে… তবুও আল্লাহর রাসুল (সা) অন্য কোন পদ্ধতি গ্রহণ করেন নাই, বরং তিনি বিরামহীন নুসরাহ তালাশ করতে থাকেন গোত্রসমূহের কাছে। আশানুরূপ সাড়া না পেয়েও উনি বনু শায়বান, বনু আমেরসহ অন্যান্য গোত্রের নিকট নুসরাহ চেয়েছেন এবং বারবার চেয়েছেন। এত কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি পদ্ধতি পরিবর্তন করেন নাই।
উসুল আল ফিকহর প্রতিষ্ঠিত নীতি অনুযায়ী, কোন কাজ করতে গিয়ে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েও বারবার তা করা ঐ কাজের ফরজ হওয়া নির্দেশ করে। অতএব, নুসরাহ তালাশ ফরজ এবং এটা আল্লাহর রাসূল (সা) অনুসৃত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র পদ্ধতি এবং তিনি এটা জারি রাখেন ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা দ্বিতীয় আকাবার বায়’আতে আনসারদের বায়’আত (পূর্ণ আনুগত্য বা আনুগত্যের শপথ) প্রদানের মাধ্যমে উনাকে সম্মানিত করেন, তারপরই উনি (সা) মদীনায় হিজরতপূর্বক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই হৃদয়বান, শ্রোতা ও সাক্ষ্যদাতাদের জন্য সংক্ষিপ্ত উত্তর এবং এটাই গোঁড়া ও একগুঁয়েদের তর্কের উপযুক্ত জবাব। কারণ সে তো ওযু, সালাত আর সিয়ামের মাস’আলা নিয়েই সন্তুষ্ট যাতে সে কেবল এগুলোই করতে পারে এবং সে এমন কোন কাজের দলীল চায় না যা সে করতে রাজি নয় যদি তা তার জন্য ফরজ। যদি সে সূস্থ মস্তিষ্কের হয় তবে সে অবশ্যই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত দলীল প্রমাণ ব্যতিত সন্তুষ্ট হবে না, যদি সে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজ করতে চায়। এই একটি দলীল প্রমাণই আছে যা আল্লাহর রাসূল (সা) আমাদের দেখিয়েছেন উনার বানী ও কর্মের মাধ্যমে তা হলো নুসরাহ তালাশ। যা তিনি দাওয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম পর্যায়ের শেষের দিকে করেছিলেন। এটাই সংক্ষিপ্ত, যথার্থ ও পর্যাপ্ত উত্তর যে পদ্ধতি আমরা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যবহার করি। পরিশেষে, আপনাকে সালাম এবং আল্লাহ যেন আপনার জন্য রহমতের দরজা খুলে দেন।
মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর
উৎস: ইংরেজি আরবীপ্রশ্ন-উত্তর: সিনেমায় যাওয়া ও অশ্লীল ছবি দেখা কি বৈধ?
সিনেমায় যাওয়া কিংবা সাধারণ সিনেমা দেখা কি বৈধ? যৌন-উত্তেজক অশ্লীল সিনেমা দেখা, এটি জেনে যে এগুলো ছবি মাত্র, সরাসরি শরীর নয়? যেসব মুসলিম এ ধরনের ছবি দেখে তাদের ব্যাপারে আমাদের দায়িত্ব কী: আমরা কি তাদের বারণ করবো নাকি যা খুশি করার ব্যাপারে তাকে ছেড়ে দেব?
উত্তর: সিনেমায় যেয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি দেখা বৈধ, এ শর্তে যে হলে নারীদের সারি পুরুষদের সারি হতে পৃথক রয়েছে। এটি কোনো লেকচার বা সেমিনারে অংশ নেয়ার মতো, এটি করা বৈধ, এ শর্তে যে নারী ও পুরুষের সারি একে অপর হতে পৃথক রয়েছে।
তবে – যেটি বৈধ – উল্লিখিত শর্তানুসারে, ছেড়ে দেওয়াই উত্তম, যাতে হলে উপস্থিত নারীদের কারো কারো লজ্জাস্থানের উপর চক্ষু না পড়ে, যাতে কর্ণ হলের শ্রোতাদের অসংগতিপূর্ণ কণ্ঠ না শুনতে পায়। যৌন উত্তেজক অশ্লীল ছবি দেখা বৈধ নয়, যদিও বা তা কেবল ছবিই হয় এবং বাস্তব শরীর না হয়। কারণ এ বিষয়ের ক্ষেত্রে শরীআহ মুলনীতি অনুযায়ী – (الوسيلة إلى الحرام حرام) ‘হারামের দিকে যা-ই ধাবিত করে তা-ই হারাম’, এ শর্ত নিশ্চিতভাবে ধাবিত না করলেও প্রযোজ্য, সম্ভাবনা থাকলেই যথেষ্ঠ।
সাধারনত এ ধরনের ছবি, যারা এগুলো দেখে তাদের হারামে ধাবিত করে, সুতরাং এ মুলনীতি এসব ছবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তাই এগুলো দেখা কিংবা ক্রয় করা বৈধ নয়।
আর (ইসলামের দায়ী) শাবাবগণ কিরূপ আচরণ করবে তাদের প্রতি যারা এসব দেখে; অধিকাংশ মানুষ যারা এগুলো দেখে তারা নিচু প্রকৃতির মানুষ যারা কথা বা দাবি মানতে চায় না, কেবলমাত্র তারা ছাড়া যারা আল্লাহর রহমতপ্রাপ্ত। তবুও যদি শাবাবগণ কেনো শক্তিশালী বাধাদানকারী ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপায় খুঁজে পায়, তবে তারা তা ব্যবহার করতে পারে। হতে পারে যে ব্যক্তি প্রশ্ন করেছেন তিনি তার কোনো আত্মীয়ের ব্যাপার বুঝিয়েছেন, যিনি তার এ অসুস্থ আচরনে বিষন্ন, সেক্ষেত্রে তার উচিত তাদের এসব আচরণ হতে তাড়িয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া, এ আশা রেখে যে আল্লাহ তাদের সঠিক পথ দেখাবেন, এবং সে এতে পুরস্কৃত হবে, আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী।
বর্তমানে, খিলাফতের অনুপস্থিতিতে মুসলিমগণ সকল দিকে হতে দুর্যোগে পরিবেষ্টিত, (এ বাস্তবতায়) একজন মুসলিমের কেনো সময়ই থাকা উচিত না হালাল আমোদ-প্রমোদের, সুতরাং কিভাবে হতে পারে যে হারামে সময় কাটাচ্ছে (আল্লাহ রক্ষা করুন)? হে ভাইয়েরা, মুসলিমদের শক্তিশালী ও প্রজ্ঞার সাথে দিক-নির্দেশনা দেয়া আপনাদের কর্তব্য, যাতে তাদের সময় কেবল ভালো কাজ করায় পরিপূর্ণ থাকে, খিলাফতে প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ ও অধ্যবসায় করা, যাতে উম্মতকে এসব দুর্যোগ হতে উদ্ধার করা যায়।
মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর
উৎস: ইংরেজি
আরো পড়ুন: হারামের উপায়ও হারাম হিসেবে সাব্যস্ত হবেসার্চ কমিটি গঠন ও নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগ

সামগ্রিকভাবে পুরো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করুন এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠা করুন
গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশের সমগ্র রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন – রাজনৈতিক দলসমূহ, গণমাধ্যম ও তথাকথিত বুদ্ধিজীবীগণ – সকলেই নতুন নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনায় লিপ্ত থাকতে দেখেছি। তারা রাজনৈতিক বক্তব্য/কর্মসূচী, বিবৃতি, পত্রিকার কলাম ও টক-শো’র মাধ্যমে সাধারণ জনগণের উপরে তাদের উদ্বেগ ও নিজস্ব মতামতসমূহ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। এখন যখন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছে তখন তার নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতা ইত্যাদি নিয়ে আবারও বিতর্ক ও আলোচনা শুরু হয়েছে এবং তা অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
কিন্তু আসল বিষয় হচ্ছে, এই সার্চ কমিটি এবং একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের ধারনা কেবলমাত্র একটি প্রতারণা ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়।
গণতন্ত্র বিশ্বব্যাপী এক ব্যর্থ ব্যবস্থা
বিশ্বজুড়েই গণতন্ত্র ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আর যখন এটা প্রমান হয়ে গেছে যে, বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কার্যকারিতা হারাচ্ছে তখন এইসব বিশ্বাসঘাতক শাসক, রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনা সম্প্রদায় নতুন সার্চ কমিটি ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন জাতির জন্য আদৌ কোন কল্যান বয়ে আনবে কি না সে বিষয়ে কোন আলোচনা করছে না, কিংবা এ সংক্রান্ত কোন আলোচনার সুযোগ দিচ্ছে না। বিগত ২৬ বছর ধরেই অমরা এ ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতারণার শিকার হচ্ছি, যদিওবা আমরা জানি যে রাসূল (সা) বলেছেন:
لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ
“মু’মিন একই গর্তে দুই বার দংশিত হয় না” (বুখারি)।
আমরা কি ইউরোপীয় দেশগুলোর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যক্ষ করি না? ইউরোপের শতকরা ৩০ ভাগেরও কম সংখ্যক লোক তাদের নিজেদের জাতীয় সংসদের উপর আস্থা রাখে (ইউরোপীয় ইউনিয়ন ব্যুরোর অফিসিয়াল জরিপ ২০১৬ অনুসারে)। এমনকি ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের পরে আমেরিকার বেশিরভাগ নাগরিক বলতে শুরু করেছে যে তারা গণতন্ত্রের উপর বিশ্বাস হারিয়েছে।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি সম্পর্কিত আলোচনা দূরে রেখে শাখা-প্রশাখার আলোচনা তথা সুষ্ঠু নির্বাচনের বিতর্ক কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন একটি দেশের রাজনীতি দুর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের উপর গড়ে ওঠে, তখন সার্চ কমিটি ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে কেবলমাত্র তিক্ত ফলই পাওয়া যাবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ كَيْفَ ضَرَبَ اللَّهُ مَثَلًا كَلِمَةً طَيِّبَةً كَشَجَرَةٍ طَيِّبَةٍ أَصْلُهَا ثَابِتٌ وَفَرْعُهَا فِي السَّمَاءِ، تُؤْتِي أُكُلَهَا كُلَّ حِينٍ بِإِذْنِ رَبِّهَا وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ، وَمَثَلُ كَلِمَةٍ خَبِيثَةٍ كَشَجَرَةٍ خَبِيثَةٍ اجْتُثَّتْ مِنْ فَوْقِ الْأَرْضِ مَا لَهَا مِنْ قَرَارٍ
“তুমি কি লক্ষ্য করনি আল্লাহ্ কিভাবে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন একটি পবিত্র বাণীর (কালেমায়ে তাইয়্যেবার) যে, তা একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায় যার শিকড় (জমিনে) সুদৃঢ় এবং যার শাখা-প্রশাখা উর্ধ্বে উত্থিত, সে বৃক্ষ স্বীয় রবের আদেশে প্রত্যেক মওসুমে তার ফলদান করে….আর অপবিত্র কথার (কালেমা খাবিছার) তুলনা হচ্ছে একটি নিকৃষ্ট বৃক্ষ, যার মূল জমিন থেকে বিচ্ছিন্ন, যার কোনো স্থায়িত্ব নাই” (সুরা-ইব্রাহিম: ২৪-২৬)।
গণতন্ত্র কোন প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনবে না
প্রথমত, গণতান্ত্রিক শাসকেরা কুফর ব্যবস্থা দিয়ে জনগণকে শাসন করা অব্যাহত রাখবে, দেশের মুসলিমদেরকে অত্যাচার ও নিপীড়ণ করতে থাকবে এবং জনগণের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি অগ্রাহ্য করে তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে আরও অসহায় অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে।
পশ্চিমাশক্তি সমর্থিত বাংলাদেশী গণতন্ত্রের অধীনে কেবলমাত্র অত্যাচারীর চেহারা পরিবর্তন ব্যতিরেকে আর কিছুই অর্জিত হবে না। এখন এদেশের জনগণ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে আওয়ামী লীগ (হাসিনা) কর্তৃক অত্যাচারিত হচ্ছে; আর একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বড় জোর এই ক্ষমতাসীন আওয়ামী শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তে ধর্মনিরপেক্ষ বিএনপি’র (খালেদা-তারেক) হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে, যারা একইভাবে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের নামে জনগণকে শোষণ করতে থাকবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ পশ্চিমা শক্তিসমূহের অনুগত একটি রাষ্ট্র এবং যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং দেশের জনগণের কষ্ট ও ভোগান্তির বিনিময়ে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে সচেষ্ট থাকবে…
সাম্রাজ্যবাদীদের (আমেরিকা-বৃটেন-ভারতের) জন্য সবচেয়ে অনুগত দালাল শাসক খুঁজে বের করাই হচ্ছে এই সার্চ কমিটি এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের একমাত্র উদ্দেশ্য, যারা কার্যকরভাবে জনগণকে বশে রাখবে, ইসলামের উত্থানকে দমন করবে এবং সুচারুভাবে পশ্চিমাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। মুসলিম বিশ্বের নির্বাচনসমূহ নিরপেক্ষ কিংবা পক্ষপাতদুষ্ট যাই হোক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নির্বাচিত শাসকেরা তাদের প্রভুদের হীন স্বার্থ সংরক্ষন করবে ততক্ষন পর্যন্ত পশ্চিমা শক্তিসমূহ এসব দালালদেরকে সমর্থন দিয়ে যাবে। আমরা সকলেই প্রত্যক্ষ করেছি যে, ২০১৪ সালে হাসিনা সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ভোটারবিহীন নির্বাচনে নজিরবিহীন জালিয়াতির পরেও কিভাবে আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলো তার সরকারকে বৈধতা দিয়েছে!!
প্রকৃত সমাধান
পশ্চিমা উপনিবেশিক শক্তিসমূহ তাদের দালালদের মাধ্যমে ১৯২৪ সালে খিলাফতকে ধ্বংস করে দেয় এবং মুসলিম ভূ-খন্ডসমূহে জোরপূর্বক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়, যা মুসলিমদের বর্তমান সমস্যা ও সঙ্কটের মূল কারণ।
গণতন্ত্র হচ্ছে একটি কুফর শাসনব্যবস্থা; শাসকগোষ্ঠী ও তাদের প্রভুদের স্বার্থ রক্ষার জন্যই এ মানব রচিত ব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। পশ্চিমা শক্তিসমূহ কর্তৃক চাপিয়ে দেয়া এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূলোৎপাটন ব্যতিরেকে আমাদের সমস্যা সমাধান এবং একটি ন্যায়পরায়ণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব নয়।
মুসলিমদের জন্য ইসলাম খিলাফত ব্যবস্থা প্রদান করেছে এবং প্রকৃত পরিবর্তন আনয়নের এটিই একমাত্র পথ।
প্রথমত, এটি উম্মাহ্’র উপর একটি ফরয দায়িত্ব; কারণ রাসূল (সা) বলেছেন:
وَمَنْ مَاتَ وَلَيْسَ فِى عُنُقِهِ بَيْعَةٌ مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً
“যারা খলিফার বাই’য়াত ছাড়া মৃত্যুবরণ করবে তাদের মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু” (মুসলিম)।
অর্থাৎ, খলীফাবিহীন সময়ে মৃত্যুবরণ করা ইসলামপূর্ব আইয়ামে জাহিলিয়্যাতের মতোই ভয়ংকর ও পংকিলতাপূর্ণ। কেবলমাত্র খিলাফত ফিরিয়ে আনার কাজে রত থাকলেই কিয়ামত দিবসে এই অপরাধ হতে আমরা নিজেদের মুক্ত করতে পারবো।
দ্বিতীয়ত, উন্নতি ও সমৃদ্ধি অর্জনের এটিই একমাত্র পথ; ক্ষুদা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়ার এটিই একমাত্র পন্থা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ
“আর যদি সেই জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই উম্মুক্ত করে দিতাম তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমুহ” (সূরা আল-আরাফ: ৯৬)।
খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই হচ্ছে সে ব্যবস্থা যা ঈমান ও তাকওয়ার উপর ভিত্তি করে সমাজ পরিচালনা করে যা আল্লাহর রাসূলের সীরাত ও খুলাফায়ে রাশিদীনদের জীবনী হতে দেখতে পাই।
তৃতীয়ত, এটিই হচ্ছে একমাত্র ব্যবস্থা যা ইসলাম ও মুসলিমদেরকে ইসলামের বিরুদ্ধে অবিশ্বাসী ও তাদের দালাল কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধ থেকে সুরক্ষা দিতে পারে।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন,
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য করো তবে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পা দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করবেন। (সূরা মুহাম্মদ: ৭)
রাসূল (সা) বলেন,
إِنَّمَا الإِمَامُ جُنَّةٌ يُقَاتَلُ مِنْ وَرَائِهِ وَيُتَّقَى بِهِ
“নিশ্চয়ই খলীফা (ইমাম) হচ্ছে ঢালস্বরূপ, যার পেছনে দাঁড়িয়ে (শত্রুদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ করা হয় ও নিজেদেরকে সুরক্ষা করা হয়” (তিরমিযি)।
সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচীর দিক-নির্দেশনা
যখনই সুযোগ পাওয়া যায় আমাদের তখনই মুসলিমদের শাসনব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রের বৈধতা ও জবাবদিহিতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা উচিত; এটা হতে পারে জনসমাগমস্থলে, কিংবা বাসে, বা পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ‘টক-শো’গুলোতে, কিংবা যেখানেই আমরা এসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের দেখা পাবো সেখানেই তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে, এবং তাদেরকে প্রশ্নের সম্মুখীন করতে হবে যে কেন তারা গণতন্ত্রের মিথ্যা মোহকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
এবং একইসাথে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, যা আমাদের সকলের জন্য ফরয; এবং, প্রতিশ্রুত দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করুন, যার মাধ্যমে আমরা একটি সমৃদ্ধ জীবন শুরু করতে পারবো এবং আমাদের হারানো গৌরব ফিরিয়ে এনে পৃথিবীতে নিজেদেরকে একটি নেতৃত্বস্থানীয় ও শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করতে সক্ষম হবো…এবং আখিরাতেও সফলতা অর্জন করবো ও নিজেদেরকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ থেকে রক্ষা করতে পারবো, ইনশা’আল্লাহ্।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
يُثَبِّتُ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ وَيُضِلُّ اللَّهُ الظَّالِمِينَ وَيَفْعَلُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ
যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ তাদের প্রতিষ্ঠিত করেন শাশ্বত বাণীর দ্বারা এই দুনিয়ার জীবনে ও পরকালে, আর আল্লাহ্ পথহারা করেন অন্যায়কারীদের, আর আল্লাহ্ যা ইচ্ছে করেন তাই করেন। (সূরা ইবরাহীম: ২৭)
আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দাফনে বিলম্ব ও খলীফা নিয়োগের বাধ্যবাধকতার ইজমা

দাফন বিলম্বের ব্যাপারে আলোচনার পূর্বে আমাদের শরীআহ হুকুমের ক্ষেত্রে কিছু উসূলী ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন।
মৌলিকভাবে প্রত্যেক শরীআহ বিষয় তা কোনো কাজ হোক কিংবা কথা, তা কোনো নির্দেশ হিসেবে গণ্য হতে হলে তার জন্য একটি কারীনা (আইনী সূচক) দরকার হয় যা হুকুমটির প্রকৃতি নির্দেশ করে।
কারীনা চুড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করলে হুকুমটি ফরজ হিসেবে গণ্য হয়। আর কারীনা চুড়ান্ত নির্দেশ প্রদান না করলে তা মানদুব (উৎসাহিত) হিসেবে গণ্য হয়। আর কারীনা বাছাই (করা বা না করা)-এর নির্দেশনা দিলে তা মুবাহ হিসেবে গণ্য হয়।
এবং এ বিষয়টি শরীআহর সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা আল্লাহর কিতাবের কোনো কথা হোক কিংবা রাসূল (সা) এর কোনো সুন্নাহ হোক কিংবা নবী (সা) এর কোনো কাজ হোক কিংবা সাহাবা (রা)-দের কোনো ইজমা হোক কিংবা হোক তা নবী (সা)-এর কোনো অনুমতি প্রদান।
১. উদাহরণস্বরূপ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বক্তব্য:
فَإِذَا قُضِيَتِ الصَّلَاةُ فَانْتَشِرُوا فِي الْأَرْضِ وَابْتَغُوا مِنْ فَضْلِ اللَّهِ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“অতঃপর যখন সালাত সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো আর আল্লাহ’র অনুগ্রহ অনুসন্ধান কর এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফল হতে পারো” । [সূরা জুমুআ: ১০]
এখানে (فَانْتَشِرُوا) দ্বারা জুমার পর মসজিদ থেকে বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ প্রদান করে। এখন, এ হুকুমটির কারীনার মাধ্যমে বুঝতে হবে এটি কি ফরজ, মানদুব নাকি মুবাহ। উল্লেখ্য, এ আয়াতে (فَانْتَشِرُوا) মুবাহ অর্থে এসেছে।
২. জানাযা যাওয়ার সময় উঠে দাঁড়ানোর উদাহরণ:
আবদুল্লাহ বিন আবী আস-সাফার হতে শু’বা বর্ণনা করেন: আমি শুনেছি আশ-শা’বী আবী সাঈদ বর্ণনা করেন: (إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّتْ بِهِ جَنَازَةٌ فَقَامَ) একটি জানাযা অতিক্রম হচ্ছিল এবং (তা দেখে) রাসূল (সা) উঠে দাড়িয়েছিলেন। [সুনান আন-নাসাঈ]
নবী (সা) জানাযা যাওয়ার সময় উঠে দাড়িয়েছিলেন, এ কাজটি একটি আদেশের হুকুম প্রদান করে।আমরা যখন হুকুমটির প্রকৃতি বোঝার জন্য এর কারীনার জন্য সীরাহ অধ্যয়ন করবো অর্থাৎ এটি বোঝার জন্য যে এ আদেশটি চুড়ান্ত (ফরজ), উৎসাহিত (মানদুব) না বৈধ (মুবাহ) হুকুম প্রদান করে, তখন দেখবো একটি জানাজা অতিক্রান্ত হওয়ার সময় আল-হাসান বিন আলী (রা) উঠে দাঁড়িয়েছিলেন কিন্তু ইবন আব্বাস উঠে দাড়াননি, (তখন) আল-হাসান (রা) বলেন, (أَلَيْسَ قَدْ قَامَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِجَنَازَةِ يَهُودِيٍّ؟) “আল্লাহর রাসূল কি উঠে দাড়াননি যখন একজন ইহুদীর জানাযা অতিক্রান্ত হচ্ছিল? ইবন আব্বাস (রা) বলেন, হ্যাঁ, এর তিনি (সা) বসে পড়েন।” এ ঘটনা নির্দেশনা দেয় যে এখানে (দাড়ানো বা বসা) বাছাই করার সুযোগ রয়েছে অর্থাৎ এটি বৈধ (মুবাহ)।
সাকীফাহ-তে বাইয়াতের ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই, এ ব্যাপারে সাহাবা (রা) গণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। এ ঘটনা নির্দেশনা প্রদান করে যে একজন খলীফাকে বাইয়াত প্রদান করতে হবে। এখন এ আদেশটির প্রকৃতি বুঝতে হলে এর কারীনা খুঁজে দেখতে হবে, এবং এর কারীনা নির্দেশনা দেয় যে এটি একটি ফরজ দায়িত্ব যেহেতু সাহাবা (রা) গণ বিষয়টিকে আল্লাহর রাসূল (সা)-এর দাফন তথা একটি ফরজ দায়িত্বের উপরে প্রাধান্য দান করেছেন। অর্থাৎ, একটি ফরজের উপর কোনো বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়াটি ওই বিষয়টিকেও ফরজিয়্যাত প্রদান করে। এবং এও প্রমাণ হয় যে এটি শুধুমাত্র একটি ফরজ না বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ।
ফিকহী দৃষ্টিকোন থেকে:এটি বলা যে দাফনের সাথে বাইয়াতের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং মুসলিমদের জানাযার জন্য একত্রিত হবার জন্য সময় দেয়া হচ্ছিল, এটি যা ঘটেছিল তা থেকে অনেক দুরে।
আল্লাহর রাসূল (সা)-এর মৃত্যু একটি বড় ঘটনা ছিল। এবং মদীনা ও তার আশেপাশের সকল মুসলিম খবরটি শুনতে পায় এবং মদীনা ও মসজিদের দিকে মুসলিমদের ঢল নামে। কিন্তু তারা আবু বকরের বাইয়াত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সীরাহ গ্রন্থগুলোতে ঘটনার প্রবাহটি এরকম:
আল্লাহর রাসূল (সা) সোমবার দোহার ওয়াক্তে মৃত্যুবরণ করেন; মঙ্গলবার রাত্রি পর্যন্ত তার দাফন সম্পন্ন হয়নি। মঙ্গলবার সকালে আবু বকরকে বাইয়াত প্রদান করা হয় এবং বুধবার মধ্যরাতে রাসূল (সা)-এর দাফন সম্পন্ন হয়।
আবু বকরকে রাসূল (সা) এর দাফনের পূর্বেই বাইয়াত প্রদান করা হয়। এটি সাহাবা (রা) গণের ইজমা ছিল; অর্থাৎ মৃতের দাফনের উপর খলীফা নিয়োগ দেওয়ার কাজে রত থাকাকে প্রাধান্য প্রদান।
দাফনের বিলম্ব এজন্য হয় নি যাতে মুসলিমগণ জানাযা দেখতে আসার জন্য সময় পায় কারণ তারা সকলে তখন সেখানেই ছিল বিশেষ করে সাহাবা (রা) গণ, কিন্তু তারা বাইয়াত নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
চুক্তির ও আনুগত্যের বাইয়াত শেষ হবার সাথে সাথে তারা রাসূল (সা)-এর দাফনের কাজ সম্পন্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন, এবং এটি কখন? এটি বাইয়াত শেষ হবার পর মধ্যরাতে।
যদি বিলম্ব এ কারণে হয়ে থাকতো যাতে মানুষ জানাযার জন্য একত্রিত হতে পারে, তাহলে সোমবার, মঙ্গলবার রাত্রি কিংবা মঙ্গলবার সকালেও তা হতে পারতো…কিন্তু তারা আবু বকরের জন্য চুক্তি ও আনুগত্যের বাইয়াত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। যখনি তা শেষ হয় তারা অনতিবিলম্বে দাফন কাজ সম্পাদনে রত হয়ে পড়েন, বুধবার মধ্যরাতে।
দাফনে বিলম্বের বিষয়ে চিন্তা করলে যা পরিষ্কারভাবে প্রতিফলিত হয় তা হলো এ বিলম্ব কেবলমাত্র আবু বকরের চুক্তি ও আনুগত্যের বাইয়াত সম্পন্ন শেষ হওয়ার জন্যই হয়েছে। সুতরাং এটি বাইয়াতের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
শাইখ আতা বিন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর অবলম্বনে লিখিত
মূল প্রশ্নোত্তরটির লিংক: ইংরেজি আরবীখিলাফত সম্পর্কে হানাফী আলেমগণের মতামত

অন্যান্য মাযহাবের আলেমগণের মত হানাফী আলেমগণও খিলাফতের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন ক্রমাগতভাবে সকল যুগেই। বস্তুতঃ অন্যান্য আলেমগণের চেয়ে হানাফী আলেমগণকে শাসন ও সরকার পরিচালনার মত বিষয়গুলোতে বেশি বক্তব্য দিতে হয়েছে; কারণ অনেক খলিফারাই (মূলতঃ আব্বাসীয় ও উসমানীয় খলিফারা) হানাফী মাযহাবকে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গ্রহণ করেছিলেন এবং তৎকালীন সময়ের হানাফী আলেমগণের নিকট পরামর্শ ও আইনের বিষয়ে জানতে চাইতেন। যেমন, আব্বাসীয় খলিফা হারুন আর রশিদ, আবু হানিফা (রহ.)-এর ছাত্র ও সহচর আবু ইউসুফ (রহ.)-এর নিকট প্রশ্ন লিখে রাষ্ট্রের অর্থায়নের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন। উত্তরে আবু ইউসুফ লিখে পাঠিয়েছিলেন তার বিখ্যাত ও চমৎকার রচনা “আল-খারাজ” যাতে রাষ্ট্রীয় অর্থায়নের নানাবিধ শারী’আহ্ নিয়মের বিশদ ব্যাখ্যা ছিল।
এই নিবন্ধে আমরা খিলাফত সম্পর্কে হানাফী আলেমগণের বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরবো যাতে উপমহাদেশের উলামা, শারী’আহ্ জ্ঞানের ছাত্রবৃন্দ ও খিলাফতের রাজনৈতিক কর্মীদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়, যাদের অধিকাংশই হানাফী মাযহাবের অনুসারী।
ইমাম আন-নাসাফি (মৃ. ৫৩৭ হিজরী) খিলাফতের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করেন তার আক্বীদাহ্ বিষয়ক বিখ্যাত “আক্বাঈদ আল-নাসাফিয়া” রচনার ৩৫৪ নং পৃষ্ঠায়:والمسلمون لا بد لهم من إمام يقوم بتنفيذ أحكامهم وإقامة حدودهم وسد ثغورهم وتجهيز جيوشهم وأخذ صدقاتهم وقهر المتغلبة والمتلصصة وقطاع الطريق وإقامة الجمع والأعياد وقطع المنازعات الواقعة بين العباد وقبول الشهادات القائمة على الحقوق وتزويج الصغار والصغائر الذين لا أولياء لهم وقسمة الغنائم.”
“মুসলিমদের অবশ্যই একজন ইমাম থাকতে হবে, যার দায়িত্ব হলো আহ্কাম বাস্তবায়ন, হুদুদ রক্ষণাবেক্ষণ, সীমান্তগুলো পাহারা, সেনাবাহিনীকে অস্ত্রসস্ত্রে সুসজ্জিত, যাকাত গ্রহণ, বিদ্রোহী, চোর ও মহাসড়কের ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ, জুমু’আ ও দুইটি ঈদ প্রতিষ্ঠিত, জনগণের মধ্যকার বিভেদের মীমাংসা, আইনী অধিকারের ভিত্তিতে স্বাক্ষ্য প্রমাণ গ্রহণ; অভিভাবকহীন যুবক-যুবতীদের বিয়ের ব্যবস্থা এবং গণীমতের মাল বিতরণ করা।”
তিনি এখানে তুলে ধরেছেন ইসলামে খিলাফত রাষ্ট্র কতখানি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এবং দেখিয়েছেন যে, ইসলামের অসংখ্য মৌলিক দায়িত্বগুলো (ফরয) কিভাবে এর উপর নির্ভরশীল এবং সঠিকভাবে পালন করা অসম্ভব।
নাসাফি (রহ.)-এর এই বক্তব্যের বিষয়ে মন্ত্মব্য করতে গিয়ে ইমাম সাদ আল-দীন আল-তাফতাযানি (রহ.) যিনি একজন শাফী মাযহাবের আলেম কিন্তু ‘আক্বাঈদ আল-নাসাফি’-এর সবচেয়ে সুপরিচিত ব্যাখ্যাটি লিখেন এবং অসংখ্য চমৎকার গ্রন্থের রচয়িতা যেগুলো ব্যাপক হারে পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোতে পঠিত হয় যেমন: বালাগার ক্ষেত্রে তাঁর ‘মুখতাছার আল মা’নী’-তে বলেন,
“ثم الإجماع على أن نصب الإمام واجب وإنما الخلاف في أنه هل يجب على الله تعالى أو على الخلق بدليل سمعي أو عقلي. والمذهب أنه يجب على الخلق سمعاً، لقوله عليه السلام: ((من مات ولم يعرف إمام زمانه مات ميتة جاهلية)) ولأن الأمة قد جعلوا أهم المهمات بعد وفاة النبي عليه السلام نصب الإمام حتى قدموه على الدفن، وكذا بعد موت كل إمام، ولأن كثيراً من الواجبات الشرعية يتوقف عليه.”
“আলেমগণের মধ্যে ঐক্যমত রয়েছে যে একজন খলিফা নিয়োগ করা আবশ্যিক (ফরয)। শুধুমাত্র এই বিষয়ে মতভেদ রয়েছে যে এই দায়িত্ব কি আল্লাহ্’র না মানুষের এবং এটার দলিল কি লিখিত (নাকলী) না যৌক্তিক (আকলী)। সঠিক মতামত হচ্ছে এই দায়িত্ব মানুষের যা লিখিত দলিল দ্বারা প্রমাণিত, কারণ রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন, “যে তার সময়কার ইমামকে না জেনে মৃত্যুবরণ করলো তার মৃত্যু জাহেলী যুগের মৃত্যু” এবং এই কারণেও যে, উম্মাহ্ (সাহাবাগণ) রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর মৃত্যুর পর একজন ইমাম নিয়োগ করাকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে গ্রহণ করেন, এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর দাফন-এর চাইতেও এই কাজকে অধিক গুরুত্ব দেন; একইভাবে সকল ইমাম এর মৃত্যুর পরও এমনই করা হয়েছে। এবং এছাড়া আরেকটি কারণ হচ্ছে অন্যান্য শারী’আহ্ দায়িত্বগুলো এর উপরই নির্ভরশীল।” (শরহু আল-আক্বাঈদ আল-নাসাফিয়া, পৃষ্ঠা নং ৩৫৩-৩৫৪)
ইমাম আল-তাফতাযানি (রহ.) এখানে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উল্লেখ করেন। প্রথমত, খিলাফত রাষ্ট্র ফরয হওয়ার বিষয়ে আলেমগণের ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে বলে তিনি উলেস্নখ করেন। মতপার্থক্যের বিষয়ে তিনি যা উল্লেখ করেন তা হচ্ছে মূলতঃ শিয়াদের ব্যাপারে যারা মনে করতো এটা ফরয কিন্তু আল্লাহ্’র উপর (এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে ইমামগণ আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনিত) এবং মু’তাযিলাদের ব্যাপারে যারা মনে করতো এটা একটি ফরয বিষয় যা মনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত (মনের ভিত্তিতে কিছু ফরয দায়িত্ব আসতে পারে – যা তাদের উসুলের ভিত্তি)। যদিও তিনি উল্লেখ করেন যে চার মাযহাবের সকল আলেমগণের মতে সঠিক মতামত হচ্ছে লিখিত দলিল (কুর’আন ও হাদীস)-এর আলোকে খিলাফত রাষ্ট্র মানুষের উপর একটি ফরয দায়িত্ব।
দ্বিতীয়ত, সহীহ্ মুসলিম-এর ইমামত (সরকার পরিচালনা) অধ্যায়ের একটি হাদিস তিনি উলেস্নখ করেন যেখানে মহানবী (সা:) বলেন, “যে ব্যক্তি আনুগত্যের শপথ (একজন খলিফার নিকট বাই’আত) ব্যতীত মৃত্যুবরণ করে তার মৃত্যু জাহেলী যুগের মৃত্যু।” এখানে জাহেলী যুগের মৃত্যু বলতে হারাম বুঝাচ্ছে; ইবনে হাযর তার ফাতহ্-আল-বারী’তে এমনই ব্যাখ্যা করেন।
তৃতীয়ত, তিনি একটি সুবিদিত সত্য ঘটনার উলেস্নখ করেন, মহান সাহাবাগণ (রা.) খিলাফতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর দাফন বিলম্বে করেন, খিলাফতকে অগ্রাধিকার দেন। চর্তুত, অন্যান্য সকল দায়িত্বের চেয়ে খিলাফতের দায়িত্ব যে অধিকতর গুরুত্ববহ তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: এটি শুধুমাত্র একটি ফরয দায়িত্ব নয় বরং এমন একটি ফরয দায়িত্ব যার উপর অন্যান্য ফরয দায়িত্বসমূহ নির্ভর করে (যেমন নাসাফি (রহ.) যে দায়িত্বগুলো উল্লেখ করেছেন), সুতরাং সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার মূলক।এখানে আরো একটি লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, খিলাফত সম্পর্কিত আলোচনাগুলো আক্বীদাহ্ বিষয়ক বইগুলোতে আলোচিত হয়েছে যদিও খিলাফত কোন আক্বীদাহ্’গত বিষয় নয় বরং ফিকহ্ সম্পর্কিত বিষয়। এর কারণ হচ্ছে খিলাফতের ব্যাপারে কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের মাযহাবের ভুল অবস্থান ছিল। সুতরাং এই বিষয়ক বির্তকের মূলে বিশ্বাসগত (আক্বীদাহ্’গত) কারণ ছিল এবং যেহেতু ইসলামে এটি খুবই গুরুত্ববহ ব্যাপার সেহেতু আলেমগণ আক্বীদাহ্’র বইতে খিলাফতের আলোচনা করেন।
এজন্যই অনেক আলেম খিলাফতকে ইমামত হিসেবে বর্ণনা করেন। কারণ শিয়াদের মত কিছু মাযহাবের লোকজনের সাথে বিতর্কে ‘ইমামত’ শব্দটি জনপ্রিয় ছিল। উলেস্নখ্য যে, ইমামত ও খিলাফত উভয় শব্দ সমার্থক এবং এর দ্বারা মুসলিমদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝায়, যিনি ইসলাম বাস্তবায়নের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। ইমাম ও খলিফা শব্দ দুটোও সমার্থক এবং এমন একজন ব্যক্তিকে বুঝায় যার মাধ্যমে এই নেতৃত্ব বাস্তবরূপ লাভ করে অথবা আধুনিক পরিভাষায় খিলাফত রাষ্ট্রের প্রধানকে বুঝায়। মহানবীও (সা:) এই বিষয়ে উভয় শব্দই ব্যবহার করেছেন। যেমন, খিলাফতের ঐক্যের গুরুত্ব সংক্রান্ত মুসলিম শরীফের হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন, “যদি দুইজন খলিফাকে আনুগত্যের বাই’আত দেয়া হয় তবে দ্বিতীয়জনকে হত্যা কর।” খিলাফতকে ঢাল হিসেবে বর্ণনা করে মুসলিম শরীফের হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন, “প্রকৃত পক্ষে, ইমাম হচ্ছে ঢাল…”উপমহাদেশের সুপরিচিত আলেম শাহ্ ওয়ালীউল্লাহ্ দেহলভীও (মৃ. ১১৫২ হিজরী) খিলাফতের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে গুরুত্বরোপ করেন:
“اعلم أنه يجب أن يكون في جماعة المسلمين خليفة لمصالح لا تتم إلا بوجوده…”
“জেনে রাখ মুসলিম জামায়াতের জন্য একজন খলিফার উপস্থিতি অপরিহার্য কারণ তার উপস্থিতি ব্যতীত উম্মাহ্’র অনেক স্বার্থই সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে না।” (হুজ্জাত আল্লাহি আল-বালিগা, ২:২২৯)
অবশ্যই হানাফি ফিকহ্-এর অনেক বইতেও খিলাফতের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ১২শ হিজরী শতকের দামাস্কাস-এর প্রখ্যাত শা’ম’ই আলেম মুহাম্মদ আমিন ইবনে আবিদিন (মৃ. ১২৫২ হিজরী) এর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। যিনি সম্ভবত পরবর্তী যুগের হানাফী আলেমগণের মধ্যে সবচেয়ে সুপরিচিত, বিশেষতঃ এই উপমহাদেশে। তিনি হানাফী মাযহাবের চূড়ান্ত নিরীক্ষাকারী (খাতিমাত আল-মুহাক্কিকিন) হিসেবে পরিচিত। তার ‘রাদ আল-মুহতার’ (সংশয়ের জবাব) গ্রন্থ, যেটির অন্য নাম হাসিয়াত ইবন তাবিদিন; এটাকে হানাফী মাযহাবের অধিকাংশ বিষয়ে চূড়ান্ত বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এটি একটি বিশদ ব্যাখ্যামূলক রচনা ১১ হিজরী শতকের বিজ্ঞ হানাফী ফকিহ্ আলাদীন আল-হাসকাফি (১০৮৮ হিজরী) এর চমৎকার রচনা ‘দুর আল-মুখতার’ (মুক্তো বাছাই) গ্রন্থের, যেটি আবার গাজার আল-তুরতুমাশি (১০০৪ হিজরী) রচিত ‘তানউইর আল-আবাসা’ গ্রন্থের ব্যাখ্যা।
ইমাম আল-হাসকাফি তার ‘দুর আল-মুখতার’ গ্রন্থে লিখেন (ব্র্যাকেটে ইবনে আবিদিন এর ব্যাখ্যা),
“فالكبرى استحقاق تصرف عام على الأنام، وتحقيقه في علم الكلام، ونصبه أهم الواجبات (أي من أهمها لتوقف كثير من الواجبات الشرعية عليه)، فلذا قدموه على دفن صاحب المعجزات (فإنه – صلى الله عليه وسلم – توفي يوم الاثنين ودفن يوم الثلاثاء أو ليلة الأربعاء أو يوم الأربعاء ح عن المواهب، وهذه السنة باقية إلى الآن لم يدفن خليفة حتى يولى غيره).”
“মূল ইমামত (খিলাফত) হচ্ছে জনগণের উপর সাধারণ কর্তৃত্বের অধিকার। এর আলোচনা ইলম আল-কালামের অংশ এবং এটা প্রতিষ্ঠা করা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব (শারী’আহ্’র অসংখ্য দায়িত্ব পালন এর উপর নির্ভর করায় এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব)। আর একারণেই সাহাবাগণ (রা.) রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর দাফন এর চাইতে এটাকে অগ্রাধিকার দেন [তিনি (সা:) সোমবার মৃত্যুবরণ করেন এবং তাকে দাফন করা হয় মঙ্গলবার দিনে বা বুধবার দিনে বা রাতে (বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী), এবং এই সুন্নাহ্ এখনো চালু রয়েছে যে নতুন খলিফা নিয়োগের পূর্বে বিগত খলিফাকে দাফন করা হয় না] (রাদ আল-মুহতার আলা আল-দুর আল-মুখতার, ১:৫৪৮)
অতএব, ইমাম হাসকাফি খিলাফতকে সংজ্ঞায়িত করেন জনগণের উপর সাধারণ কর্তৃত্ব হিসেবে। এর মাধ্যমে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন জনগণের কর্মকান্ড ব্যবস্থাপনা করা একটি অধিকার এবং একটি চূড়ান্ত অধিকার যার অর্থ সামগ্রিকভাবে খিলাফত রাষ্ট্রে অবস্থানরত সকল জনগণ ও তাদের কর্মকান্ড এর আওতাভুক্ত। এই অধিকার গভর্ণর ও বিচারকদের সীমিত অধিকারের বিপরীত, যাদের অধিকার শুধুমাত্র কোন নির্দিষ্ট এলাকার কিছু সংখ্যক মানুষের উপর বর্তায়।
এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ইবন আবিদিন (রহ.) উদ্ধৃত করেন ‘শরহু আল-মাকাসিদ’ গ্রন্থে তাফতাযানির সংজ্ঞাকে, যিনি খিলাফতকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে, “দ্বীন ও দুনিয়ার কর্মকান্ডের উপর সাধারণ নেতৃত্ব যা রাসূলুল্লাহ্ (সা:)-এর উত্তরসূরী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।”
সংজ্ঞার শেষাংশ নির্দেশ করে যে খিলাফত হচ্ছে মহানবী (সা:)-এর উত্তরসূরীর পদ। এর অর্থ হচ্ছে মহানবী (সা) উত্তরসূরী হিসেবে শারী’আহ্ বাস্তবায়নই খিলাফতের কাজ। এ কারণেই তাকে বলা হয় খলিফা যার শাব্দিক অর্থ উত্তরসূরী।
তারপর আল-হাসকাফি খলিফা হওয়ার জন্য শর্তসমূহ আলোচনা করেন। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত কিছু শর্ত যেমন: মুসলিম, মুক্ত, পুরুষ, সুস্থ মস্তিস্ক, প্রাপ্ত বয়স্ক ও সক্ষম হওয়া এবং কিছু শর্ত যেগুলোর বিষয়ে মতভেদ রয়েছে যেমন: কুরাইশ, মুজতাহিদ ও সাহসী হওয়া ইত্যাদি শর্তসমূহ উল্লেখ করেন। কিছু দলের দাবী অনুযায়ী হাশেমী, আলাওয়ী বা ত্রুটিমুক্ত হওয়ার শর্তসমূহ তিনি খন্ডন করেন।শাসন ও সরকার পরিচালনার ফিকহ্ এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আরও বলা যায়, এই বিষয়ে অনেক হানাফীদের কাজ রয়েছে যারা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেছেন; আবু ইউসুফ (১৬২ হিজরী)-এর কিতাব আল-খারাজ থেকে শুরু করে ইমাম মুহাম্মদ ইবন আল-হাসান আল শায়বানি (১৮৯ হিজরী)-এর আল-সিয়ার আল-সাগীর ও আল-সিয়ার আল-কাবীর; দুইজনই আবু হানিফার ছাত্র। পরবর্তী যুগের অনেকেও এই বিষয়ে লিখেছেন।
উপরোক্ত বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে, হানাফী মাযহাবের আলেমগণ খিলাফতকে চূড়ান্তভাবে গুরুত্ব দিতেন। ফলে বর্তমানের আলেম ও শারী’আহ্ জ্ঞানের ছাত্রদের এই বিষয়ে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেয়া এবং নবুয়্যতের আদলে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে অগ্রবর্তী হওয়ার জন্য এগুলো উৎসাহ হিসেবে কাজ করবে।
মূল: উসমান বদর কর্তৃক লিখিত নিবন্ধ (কিছুটা পরিমার্জিত)






















