তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ

প্রশ্ন:
বিগত ২৪/৫/২০১৮ তারিখে বিশ্বব্যাপী তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭৯ মার্কিন ডলার এবং টেক্সাস ক্রুড ব্যারেল প্রতি ৭১ মার্কিন ডলার মূল্যে বিক্রয় হচ্ছে। ২০১৪ সালের ক্রমাগত দরপতনের পর এই মূল্য বৃদ্ধি কী আবারও তেলের উচ্চ মূল্যের যুগের সূচনার লক্ষণ? আমরা কি অতীতের মত আবারও ব্যারেল প্রতি ১৫০ মার্কিন ডলার মূল্যের দিকে যাচ্ছি? এই উচ্চমূল্য বৃদ্ধির কারণ কী?
উত্তর:
অন্য যে কোন পণ্যের মত তেলের মূল্য চাহিদা এবং যোগানের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু অন্য সকল পণ্য থেকে তেলের মূল্য অতি মাত্রায় অস্থিতিশীল। আন্যভাবে বলা যায় চাহিদা বা যোগানের যে কোন উপাদানের সমান্যতম পরিবর্তন তেলের মূল্যকে প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করে। জ্বালানী তেলের বাজারের প্রকৃতির কারণেই তেলের মূল্যের এই উঠানামা। এছাড়াও রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব বিশেষ করে রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন বা এর সম্ভবনা তেলের বাজারকে করে আরও অস্থিতিশীল। বিষয়টি বিশদভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য নিচের আলোচনাটি উপস্থাপন করা হল:
১. বিশ্ব বাজারে তেলের যোগান
ক. পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশসমূহের সংগঠন ওপেক এবং নন-ওপেকভুক্ত দেশ সমূহ বিশ্ববাজারে তেলের যোগনকে সীমিত করার বিষয়ে ঐক্যমত পোষণ করেছে। ২০১৬ সালের শেষের দিকে রাশিয়া এবং ওপেকভুক্ত দেশসমূহ তেলের অতিরিক্ত যোগনকে সীমিত করা এবং মূল্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিদিনে তেলের উৎপাদনকে ১.৮ মিলিয়ন ব্যারেলে সীমিত রাখার জন্য চুক্তি সম্পাদন করেছিল। গবেষণায় উঠে এসেছে যে গত এপ্রিল মাসে টানা তৃতীয়বারের মত তেলের উৎপাদন ছিল সর্বনিম্ন প্রতিদিন মাত্র ৩২ মিলিয়ন ব্যারেল যা গত মার্চ মাসের প্রতিদিনের উৎপাদন থেকে ১৪০,০০০ ব্যারেল কম। আজকে তেলের উৎপাদন প্রতিদিন মাত্র ৩২.৭৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ওপেকের প্রতিদিনের জন্য নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭৩০,০০০ ব্যারেল কম। ওপেকের চুক্তিটি আগামী এক বছর কার্যকর থাকবে। যদি বর্তমান অবস্থা আব্যাহত থাকে তবে তেলের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এনার্জি আসপেক্টসের দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা দলের প্রধান পরামর্শক ম্যাথি ব্যারি বলেন, “বর্তমানে যোগান স্বল্পতার কারণে যে মূল্য বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা যাচ্ছে ” (marketwatch.com)
খ. ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেশটির তেলের উৎপাদনের লক্ষ্যকে পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দেশটি প্রতি দিন মাত্র ১.৪১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করে যা ছিল ২০১৮ সালের মার্চ মাস থেকে ৮০,০০০ ব্যারেল কম, এবং ২০১৭ সালের প্রতি দিনের গড় উৎপাদন থেকে ৫,৪০,০০০ ব্যারেল কম। ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন কমার জন্য মূলত দায়ী দেশটির সরকারের নীতি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল এবং গ্যাস কোম্পানী পিডিভিএসএর অদক্ষতা। এছাড়াও সাম্প্রতি ২ টি তেল ক্ষেত্র নিয়ে বিরোধের বিচারাধীন মামলায় আদালত পিডিভিএসএকে কনকো-ফিলিপসকে ২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ প্রদানের রায় প্রদান করে। এখন পর্যন্ত পডিভিএসএ ক্ষতিপূরণের ২.৫ বিলিয়ন ডলার পরিশোধে ব্যার্থ হয়েছে। এই সকল ঘটনাগুলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে হ্রাস করে যার ফলে বিশ্ববাজারে দেশটির তেলের যোগান যথেষ্ট পরিমাণে হ্রাস পায়।
গ. প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণায় ইরনের তেল শিল্পের উপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১২ সালে ওবামা ইরানের উপর এই ধরনের একটি নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। উক্ত নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা ২০% বা দিনে ৫০০,০০০ থেকে ৪০০,০০০ ব্যারেলে হ্রাস পেতে পারে যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (foreignpolicy.com). যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও ইরানের উপর কোন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে নাই, ইরানের তেল শিল্পকে টার্গেট করে ব্যবস্থা নেয়ার আশংকা করা হচ্ছে।
উপরোক্ত তিনটি ঘটনার প্রভাবে বিশ্বব্যাপী তেলের যোগান সীমিত হচ্ছে এবং এর প্রভাবে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
২. চাহিদা
ক. আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থার মতে বিশ্বব্যাপী প্রতি দিনের তেলের চাহিদা ৯৯.৩ মিলিয়ন ব্যারেল যা ২০১৭ সালে ছিল ৯৭.৮ মিলিয়ন ব্যারেল। সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী তেলের প্রতিদিনের চাহিদার প্রবৃদ্ধি ১.৩ থেকে ১.৪ মিলিয়ন হবে বলে প্রাক্কলন করে। আর্ন্তজাতিক শক্তি সংস্থা তাদের মাসিক মার্কেট রিপোর্টে ২০১৭ সালে প্রতি দিন তেলের ব্যাবহার ১.৬ মিলিয়ন ব্যারেল করে বৃদ্ধি পায় বলে প্রকাশ করে (reuters.com)।
খ. চাহিদা বৃদ্ধির আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে চীনের তেলের চাহিদার উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি। চীন ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে দিনে ৯ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করেছিল যা ছিল সমগ্র বিশ্বের তেলের ব্যাবহারের ১০% এবং এশিয়ার মোট চাহিদার ১/৩ এরও বেশী। যদি তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ৭৫ ডলার হয়, তবে চীনের এক মাসের তেল আমদানীর খরচ হবে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেও বেশী। ধারণা করা হয় চীনের প্রকৃত চাহিদা আরও অনেক বেশী। গোল্ডম্যান সাসেস ব্যাংক তাদের একজন গ্রাহককে এক নোটে বলেন, “চীনের চাহিদা দেশটির উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির বহিঃপ্রকাশ, প্রকৃত চাহিদা বর্তমান প্রাক্কলন থেকে আনেক বেশী বলে ধারনা করা হয়” (reuters.com)
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায়, তেলের ব্যাবহারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে যার ফলে তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৩. ফটকা কারবার
জ্বালানী তেলের চাহিদা এবং যোগানের নাটকীয় পরিবর্তন ফটকা কারবারীদের তেলের বাজারে আকৃষ্টি করে। বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও যোগানের কারণেই যে তেলের মূল্যের ব্যাপক উত্থান-পতনর কারণ বলে প্রতিয়মান হচ্ছে না। ইহা থেকে সহজে অনুমেয় যে তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির পিছনে রয়েছে ফটকা কারবারের প্রভাব। বড় হেজ ফান্ডগুলো ক্রয় এবং বিপুল পরিমাণ চুক্তি উপস্থাপনের মাধ্যমে তেলের বাজারকে প্রভাবিত করে। সুতরাং, বলা যায় ফটকা কারবারের তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও হ্রাসের দ্বৈত ভূমিকা রাখে। এই কারবারিরা কখনও চাহিদা বৃদ্ধি করে তেলের মূল্য বাড়ায় আবার কখনও চাহিদা হ্রাস করে তেলের মূল্য কমায়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ফটকা বাজারের প্রভাব খুব বেশি নয় বরং চাহিদা যোগানই তেলের মূল্য বৃদ্ধির মূল কারণ বলে প্রতীয়মান হয়।
বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তেলের মূল্য ব্যারেল ১৫০ মার্কিন ডলার বা তার বেশি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছেনা। ধারনা কার যাচ্ছে তেলের মূল্য ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেল প্রতি প্রায় ১০০ মার্কিন ডলারে পর্যন্ত হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের আসন্ন বাণিজ্যযুদ্ধ তেলের চাহিদাকে হ্রাস করতে পারে যার ফলে তেলের মূল্য হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা যায়। এছাড়াও, তেলের মূল্য যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছার বাহিরে বৃদ্ধি পায় তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাউদি আরবকে দিয়ে ওপেকভুক্ত দেশগুলোকে চাপ দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করবে যা তেলের মূল্যকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসবে।
বিটকয়েন বা ক্রিপ্টোকারেন্সি কি ইসলামে বৈধ?

নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব হতে সংগৃহীত
১) বিটকয়েন কোনো কারেন্সি তথা মুদ্রা নয়। এটি মুদ্রার শর্ত পূরণ করে না। কারণ নবী (সা) কর্তৃক গৃহীত ও বাস্তবায়িত মুদ্রা ছিল স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা অর্থাৎ, দিরহাম ও দিনার। এই ইসলামী মুদ্রা তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করে:
– এটি পন্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি হতে হবে অর্থাৎ, এটি দাম ও মজুরীর নিরুপনকারী হতে হবে।
– এটি একটি কেন্দ্রী কর্তৃপক্ষ প্রচলন করবে। যা দিনার ও দিরহাম প্রচলনের দায়ভার বহন করবে এবং এটি কোনো অজানা পক্ষ হতে পারবে না।
– এটি মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য হতে হবে, শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হলে চলবে না।
উপরিউক্ত শর্তাদি বিটকয়েন এর উপর আরোপিত করলে এটি পরিষ্কার হয় যে তা এই তিন শর্ত পূরণ করে না:
এটি পন্য ও সেবা পরিমাপের ভিত্তি নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবা বিনিময়ের মাধ্যম।
কোনো জ্ঞাত পক্ষ কর্তৃক এর প্রচলন হয়নি, বরং তা অজ্ঞাত।
এটি মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ও সহজলভ্য নয়। এবং এটি তাদের মাঝেই সীমাবদ্ধ যারা এটি বিনিময় করে ও এর মূল্য স্বীকার করে অর্থাৎ, এটি সমাজের সকলের জন্য নয়।
সুতরাং, বিটকয়েন মুদ্রা ইসলামী শরীআহতে কোনো মুদ্রা হিসেবে সিদ্ধ নয়।
২) সুতরাং, বিটকয়েন একটি পন্য ব্যতিত আর কিছুই নয়। তথাপি, এই পন্য একটি অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া হয়, এর কোনো ব্যাকিং ছাড়াই। উপরন্ত, এটি জোচ্চুরি, প্রতারণা, ফটকাবাজি ও ধোঁকাবাজির বিশাল ক্ষেত্র। তাই এতে ব্যবসা করা বৈধ নয় অর্থাৎ, এটি কেনা ও বেচা বৈধ নয়। বিশেষত এটি যেহেতু অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া হয়, তাই এটি সন্দেহ তৈরি করে হয়তো এর সাথে বড় পুঁজিবাদী দেশসমূহ সংশ্লিষ্ট রয়েছে, বিশেষ করে আমেরিকা। অথবা অসৎ উদ্দেশ্যে বড় কোনো দেশের গ্যাং কিংবা আন্তর্জাতিক বড় কোনো জুয়া কোম্পানি, মাদক চোরাচালান, অর্থ পাচার কিংবা সংঘটিত অপরাধচক্র জড়িত। নয়তো এর উৎস গোপন কেন?
সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হচ্ছে বিটকয়েন অজ্ঞাত (مجهول) উৎস হতে ছাড়া কেবল একটি পণ্য যার কোনো প্রকৃত মূল্য নেই এবং তাই এটি ফটকাবাজি ও জোচ্চুরির জন্য উন্মুক্ত, এবং এটি উপনিবেশিক পুঁজিবাদী দেশ, বিশেষত আমেরিকার জন্য এটি মানুষের সম্পদ কাজে লাগানোর ও লুঠ করার সুযোগ।
এ কারণেই এটি ক্রয় করা বৈধ নয় যেহেতু শরীআহর দলীল অজ্ঞাত পণ্য বিক্রয় ও ক্রয় হতে নিষেধ করেছে। এবং এর জন্য দলীল হচ্ছে:
«نَهَى رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ بَيْعِ الْحَصَاةِ، وَعَنْ بَيْعِ الْغَرَرِ»
আবু হুরায়রা হতে বর্ণিত মুসলিম তার সহীহতে বর্ণনা করেছেন:
আল্লাহর রাসূল (সা) ‘হাসাহ’ ও ‘গারার’ ব্যবসা হতে নিষেধ করেছেন।
আবু হুরায়রা হতে তিরমিযি অনুরূপ বর্ণনা করেছেন…
এবং ‘হাসাহ ব্যবসা’ বলতে বোঝানো হয়েছে যখন বিক্রেতা ক্রেতার কাছে কাপড় বিক্রির সময় বলে, ‘আমি আপনার কাছে তা-ই বিক্রি করবো যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।’ অথবা ‘আমি আপনাকে সেই জমিই বিক্রি করবো যার উপর আমার ছোড়া পাথরটি পড়বে।’ সুতরাং, যা বিক্রি হচ্ছে তা জ্ঞাত নয়, এবং এটি নিষিদ্ধ।
গারার ব্যবসা বলতে যা অনিশ্চিত; অর্থাৎ, হতেও পারে, নাও হতে পারে, যেমন পানির মাছ বিক্রি করা, গরুর বাঁটের দুধ বিক্রি করা কিংবা গর্ভবতী পশুর গর্ভে যা আছে তা বিক্রি করা ইত্যাদি। এটি নিষিদ্ধ কারণ এটি গারার।
সুতরাং, এটি পরিষ্কার যে গারার ব্যবসা বা যা অনিশ্চিত, যা বিটকয়েন এর বাস্তবতা, যা একটি অজ্ঞাত উৎস হতে ছাড়া একটি পণ্য এবং অকর্তৃত্বশালী পক্ষ হতে প্রচলন করা হয় যা এটির গ্যারান্টি দিতে পারে। এটি ক্রয় বা বিক্রয় বৈধ নয়।
আতা বিন খলীল আবু আল-রাশতা
৩০ রবিউল আউয়্যাল, ১৪৩৯ হিজরী
১৮/১২/২০১৭ ইং
অনুবাদকৃত, মূল উৎসের জন্য: এখানে ক্লিক করুনইলেকট্রনিক পেমেন্ট ওয়ালেট এ ক্যাশব্যাকের শর’ঈ বিধান

নিচের প্রশ্নোত্তরটি অনুদিত। মূল ফতওয়ার জন্য অরিজিনাল ভার্শনটি পড়ুন।
প্রশ্ন: ইলেকট্রনিক ওয়ালেট অথবা পেমেন্ট ওয়ালেট এ ক্যাশব্যাক পাওয়ার ব্যাপারে হুকুম কী? অনেক ইলেকট্রনিক ওয়ালেট ৫% ক্যাশব্যাক দিচ্ছে এবং বেশি ব্যবহার তথা ইলেকট্রিসিটি বিল ইত্যাদি দেয়ার উপর ভিত্তি করে আরো বেশি দিচ্ছে, এই ক্যাশব্যাক কি সুদ বলে বিবেচিত হবে? উপরন্তু, কখনো কখনো এসব ওয়ালেট রিচার্জ করার পর যে এমাউন্ট পাই তা মুল এমাউন্ট হতে অতিরিক্ত হয়। উদাহরণসরূপ, যদি ১০০ রিয়াল রিচার্জ করি তাহলে আমরা ১১০ রিয়াল পাই ইলেকট্রনিক ওয়ালেটে। এই অতিরিক্ত পরিমান কি সুদ? এক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে যে এসব ওয়ালেট ব্যাংক নয়।
উত্তর: ইলেকট্রনিক ওয়ালেট হচ্ছে ডিজিটাল এপ্লিকেশন যাতে পেমেন্ট এর ব্যাবস্থাপনা ডিজিটালি করা হয়, এ প্রক্রিয়ায় একটি ওয়ালেট থাকে যাতে বা যার সার্ভারে গ্রাহকের তথ্যাদি এনক্রিপটেড অবস্থায় থাকে। এসব ওয়ালেটের ব্যবহারকারীগণ এসব ওয়ালেট হতে অর্থ প্রদান ও গ্রহণ করতে পারেন এবং কিছু কিনতে বা বিল প্রদান করতে পারেন তা থেকে।
এসব পেমেন্ট ওয়ালেট রিচার্জ ও এর দ্বারা পেমেন্ট এর ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট রয়েছে।
প্রথমত, এসব ওয়ালেট দিয়ে বিল প্রদানের সময়, গ্রাহক ইনভয়েজ এর মূল্যের উপর ৫% থেকে ১০% ডিসকাউন্ট পাচ্ছে এবং এই ডিসকাউন্টকে বলা হয় ক্যাশব্যাক। এবং এই ডিসকাউন্ট কখনো ওয়ালেট কম্পানি কর্তৃক হয় আবার কখনো বিক্রেতা হতে হয়।
দ্বিতীয়ত, যখন কেউ পেমেন্ট ওয়ালেট রিচার্জ করে, সে মাঝে মাঝে অতিরিক্ত পরিমান পায় তার ওয়ালেটে। উদাহরণস্বরূপ, সে ১০০ রিয়াল রিচার্জ করলে ১১০ রিয়াল পাচ্ছে।
ওয়ালেট হতে পেমেন্ট করার পর অর্থের অংকটি সেন্ডার এর একাউন্ট হতে রিসিভারের একাউন্টে চলে যায় এবং সে চাইলে তা নগদে রূপান্তর করে নিতে পারে কিংবা ওয়ালেট দিয়ে তা তার ব্যাংক একাউন্টে পাঠিয়ে দিতে পারে।
এটি হচ্ছে পেমেন্ট ওয়ালেট সমূহের বাস্তবতা এবং এসব পেমেন্ট ওয়ালেট এর শরঈ বিধান নিম্নরূপ:
১. এসব পেমেন্ট ওয়ালেট এর বাস্তবতা হচ্ছে চেক বা শুকুক এর বাস্তবতার মতো, এবং যে অর্থ পেমেন্ট ওয়ালেট এ জমা আছে তা ব্যাংক একাউন্ট এ অর্থ জমা রাখার মতো।
২. পেমেন্ট করার সময় যদি প্রদানকারী বিক্রেতার কাছ হতে মূল্যহ্রাস (ক্যাশব্যাক) পায় তবে তা বৈধ।
এটি এ কারণে যে, পণ্য ও সেবার দাম নির্ধারিত হয় যারা কেনা বেচা করছে তাদের দ্বারা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
إلا أن تكون تجارة عن تراض منكم
কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। [নিসা: ২৯]
সুতরাং, যদি বিক্রেতা তার পন্য বা সেবা কম দামে বিক্রি করতে চায়, তবে তা বৈধ। ব্যবসার ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো তা হালাল।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
وأحل الله البيع
আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। [বাকারাহ: ২৭৫]
৩. পেমেন্ট ওয়ালেট ব্যবহার করে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে, যদি ডিসকাউন্ট (ক্যাশব্যাক) পেমেন্ট ওয়ালেট থেকেই আসে, তাহলে তা বৈধ নয় কারণ এই ডিসকাউন্ট বা ক্যাশব্যাক হচ্ছে সুদ। এ বাস্তবতা ব্যাংকে অর্থ রাখার ক্ষেত্রে আমানতকারী যে ইন্টারেস্ট পায় তার মতোই, যা অর্থের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ এবং তা সুদ।
৪. আর একাউন্ট রিচার্জ করার সময় ১০০ রিয়ালে ১১০ রিয়াল পাওয়া যায়, এই অতিরিক্ত প্রাপ্ত ১০ রিয়াল হচ্ছে সুদ।
কারণ ওয়ালেটে প্রদত্ত ১০০ রিয়াল হচ্ছে গচ্ছিত রাখার উদ্দেশ্যে যা ব্যবহারকারী তার চাহিদা অনুযায়ী ব্যবহার করবেন। এবং কোনো গচ্ছিত অর্থের উপর অতিরিক্ত অর্থ প্রদান নিষিদ্ধ এবং তা সুদ বলে বিবেচিত হবে।
এবং আল্লাহই ভালো জানেন
আবু খালেদ আল হিজাজী
মূল ভার্শনজাতি-রাষ্ট্র বনাম খিলাফত রাষ্ট্র

জাতি-রাষ্ট্র: কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও উম্মাহকে বিভক্তি করার ফসল
খিলাফাহ রাষ্ট্র : নবী-রাসূলদের দেখানো পথ যা উম্মাহকে একত্রিত করে
গত ৪৭ বছর ধরে, আমরা প্রতিবছর তথাকথিত স্বাধীনতা দিবস পালন করে আসছি যা আমাদের জন্য আনন্দের (!) উৎসব হিসাবে পরিগনিত হচ্ছে। এ দিবস পালনের সময় আমদের প্রশ্ন করা উচিত এ রাষ্ট্রের বাস্তবতা কী, কে এটা তৈরি করেছে, কেন এবং কিইবা পেলাম?
রাসূল (সা) মক্কা থেকে মদীনায় হিযরত করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছায় ইসলামী জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন যার মাধ্যমে ইসলাম বাস্তবায়িত ছিলো ও সমগ্র পৃথিবীতে দাওয়ার কার্য সম্পাদিত হয়েছিল। তথন থেকেই কুফর ও হক্ব এর দ্বন্দ শুরু হয় যার ফলশ্রুতিকে ১৩০০ বছর পর পশ্চিমা কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি খিলাফত ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছিল যা মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ রাখতো। তার পরিবর্তে ৯ই মে সাইকস-পিকো (ব্রিটেন ও ফ্রান্স এর দুই পররাষ্ট্র মন্ত্রী) চুক্তির মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতি রাষ্ট্র তৈরি করলো যার ফলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলি তাদের করায়ত হলো ও তাদের তাবেদার শাসক তৈরির ভুমি হিসাবে ব্যবহৃত হতে থাকলো। অন্যদিকে রেডক্লিফ লাইন এর মাধ্যমে ভারত-পাকিস্তান নামের দুই দেশ তৈরি পরবর্তীতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নামের দুটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা একই ধারাবাহিকতার ফসল।
তাই আমাদের সত্যটা উপলব্দি করতে হবে আর তা হলো খিলাফত রাষ্ট্র মুসলমানদের ঐক্যবব্ধ করে আর জাতি রাষ্ট্র মুসলমানদেরকে বিভক্ত করে যা মুসলমানদের শত্রু কাফির সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কার্যফল। জাতি রাষ্ট্রের বর্তমান বাস্তবতা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।
১. জাতি রাষ্ট্র তৈরির মাধ্যমে কুফর শক্তি মানবখচিত রাষ্ট্রীয় সীমানা তৈরি করেছে যা সমুন্নত রাখতে আমারা একে অপরের সাথে যুদ্ধ করতেও পিছপা হই না হোক সে আমার মুসলিম ভাই যে সীমানার অপর প্রান্তে থাকে। তাছাড়া অন্য প্রান্তে কুফরের বোমার আঘাতে প্রতিনিয়ত মুসলমান মা বোন, শিশু, বৃদ্ধ মারা যাচ্ছে যা আমরা দেখেও না দেখার ভান করছি কারন তারা আমাদের জাতি রাষ্ট্রের নাগরিক নয়। যার বাস্তবতা আমরা দেখছি সিরিয়াতে নারী শিশু হত্যা, আরাকানের মুসলিমদের উপর অত্যাচার, কাশ্মির সমস্যা ইত্যাদি। সর্বোপরি আমরা সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্ট জাতি রাষ্ট্রের সীমাকে রক্ষা করে মুসলিমদেরকে একত্রিত হতে বাধা দিচ্ছি। এবং এই বিভক্তিকে ধরে রাখার জন্য প্রত্যেক জাতি রাষ্ট্রের নিজস্ব জাতীয় দিবস, পতাকা আছে যা মিথ্যা বাস্তাবতাকে (!!) প্রকাশ করে।
রাসূল (সা) বলেছেন, “সে আমাদের অন্তর্ভূক্ত নয়, যে জাতীয়তাবাদের দিকে আহ্বান করে, এর জন্য লড়াই করে এবং এর জন্য মারা যায়”
২. জাতি রাষ্ট্রগুলো তাদের জনগনের জন্য কুফর আইন বাস্তবায়ন করে তারা শরীয়াহ আইনের কোন প্রয়োগ করে না যা ইসলামি জীবন ব্যবস্থা থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে নেয়। আর এই তাগুত বাস্তবায়নের পদ্ধতি হলো বেশিরভাগ লোকের সম্মতি (যদিও বা তা ইসলামী নিয়ম নীতির বিরুদ্ধে হয়) নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে তা বাস্তবায়ন। যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ও তাঁর ঐশী বানীর কোন মূল্য নেই (নাউযুবিল্লাহ)। যা আমাদেরকে দেশে দেশে খুবই মানবেতর জীবন যাপনের জন্য ঠেলে দিচ্ছে।
“যে আমার স্মরণে বিমুখ তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতে দিন উত্থিত করবো অন্ধ অবস্থায়। ” (ত্ব-হা-১২৪)
৩. জাতি রাষ্ট্রগুলো “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর ব্যানারে ইসলামের উত্থানকে ঠেকাতে কাজ করে যা বাস্তবিকভাবে ইসলামকে জীবন ব্যবস্থা হিসাবে বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। দেশে দেশে আজ সাম্রাজ্যবাদীদের যে চাপানো যুদ্ধ চলছে তা তারা সিদ্ধ করতে চায় “সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” এর শ্লোগান তুলে বাস্তবিক ভাবে তারা সবাই মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে যার বলি হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সাধারন মানুষ।
“বস্তুত: তাদের মুখ থেকে শত্রুতা প্রকাশিত হয় এবং তাদের অন্তর যা গোপন করে তা গুরুতর…” [আলে ইমরান: ১১৮]
সন্ত্রাসী কর্মকান্ড সম্পর্কে পশ্চিমাদের (র্যান্ড কর্পোরেশান) ব্যাখ্যা হলো, “সন্ত্রাসী তারা যারা শরীয়াহ আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে”, কারণ তারা মনে করে মুসলিম মাত্রই সন্ত্রাসী যারা ইসলামি আইন বাস্তবায়নের দাবী তোলে।”
৪. মুসলিম অধ্যুষিত জাতি রাষ্ট্রগুলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃত কারন রাষ্ট্র হিসাবে যে সকল গুনাবলী থাকা দরকার তাদের তা নেই যার কারণে সকল ক্ষেত্রে তারা কুফর সাম্রাজ্যবাদীদের নিয়ন্ত্রেনে থাকে। যখনই কোন সমস্যা হয় এই জাতি রাষ্ট্রগুলো কাফিরদের স্মরনাপন্ন হয় এবং কাফিররা সময় সময় তাদের সাক্ষাত অব্যাহত রাখে। আরাকানে মুসলমানদের সমস্যার জন্য বিভিন্ন কুফর ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে আসে যাদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, মানবাধিকার কর্মী, ধর্মীয় নেতা অন্যতম। অ্যডভেন্টিস্ট ডেভেলপমেন্ট এন্ড রিলিফ অ্যজেন্সির সভাপতি জনাথন ডাফি, প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বারাক ওবামা অন্যতম, অথবা পোপ ফ্রান্সিস এর আগমন। তাছাড়া জাতি রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রপ্রধানরা সব সময় মুখিয়ে থাকে বিদেশী শক্তির সাথে দেখা করার জন্য যার উদাহরন হলো মুসলিম বিশ্বের শাসকদের কুফর রাষ্ট্রগুলোতো কিছুদিন পরপর সফর। তাছাড়া আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও ঐ জাতিরাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রনের জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যাবস্থাপত্র দিয়ে থাকে যা জাতি রাষ্ট্র হিসাবে সবাই নতচিত্তে মেনে নেয়। তাছাড়া গত ১৬, ১১, ২০১৭ তারিখে ইউ এস ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট এর খার্তুম সফর ও তার ১৭.১২.১৭ তারিখের বক্তব্য এবং ২০.১২.২০১৭ তারিখে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট প্রতিনিধির দেশ ত্যাগ যা কাফিরদের জাতিরাষ্ট্রগুলোর নিয়ন্ত্রনের একটি চিত্র মাত্র। IMF, WB, ADB’র ব্যবস্থাপত্র মুসলিম বিশ্বের জাতিরাষ্ট্রে অবস্থানরত মুসলিমদের জীবন মানকে মারাত্মক ভাবে প্রভাবিত করছে।
৫. জাতি রাষ্ট্রগুলো মুসলিম দেশগুলোর ক্ষুদ্র একক যারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারে না । কুফর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিও আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো ক্রমাগত তাদেরকে শোষন করে যাচ্ছে। উদাহরনস্বরুপ, ভারত কর্তৃক ফারাক্কা বাধঁ, টিপাইমুখ বাঁধ, পদ্মার পানি প্রত্যাহার, সীমান্তে পাখির মতো গুলি করে মানুষ হত্যা তারপর কাটাতারে ঝুলিয়ে রাখা অথবা আন-নাহদা বাঁধকে আত্মসমর্পন করা যার মাধ্যমে সুদান ও মিশরের মুসলমানদের স্বার্থ বহুগুনে ক্ষুন্ন হচ্ছে।
রাসূল (সা) বলেছেন, “মুসলমানরা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে এক অনন্য উম্মাহ” অর্থাৎ, তাদের এক দেশ, এক যুদ্ধ, শান্তি ও সম্মান এক, বিশ্বাসও এক“।
হে মুসলিমগন, এই হলো জাতি রাষ্ট্রের স্বরূপ ও ফলাফল যা কেবল আমাদেরকে জাতি হিসাবে করেছে দুর্বল, পর্যুদস্ত, ব্যর্থ এবং আমাদের পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী হিসাবে স্বীকৃতি দান করেছে। এ থেকে বের হওয়ার একটাই সমাধান, তা হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে নবুওয়াতের আদলের খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। যা রাসূল (সা) এর ব্যানার আল-উক্কাব সুউচ্চে তুলে ধরবে, মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করবে, ইসলামি শরীয়াহ বাস্তবায়ন করবে, কাফেরদের পরাজিত করবে এবং সমগ্র মানবজাতির কাছে আল্লাহর হেদায়েত সম্বলিত বানী পৌছে দিবে ইন শা আল্লাহ।
“এতে রয়েছে বানী সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা ইবাদত করে।” [সূরা আম্বিয়া-১০৬]
এই উন্নয়ন, উন্নয়ন না, আরও উন্নয়ন আছে…!

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার নিজেকে উন্নয়নে রোল মডেল হিসেবে দাবি করছে। ফলাও করে প্রচার করছে গত ৯ বছরে তাদের তথাকথিত অর্জনসমূহ। যার মধ্যে রয়েছে গুটি কয়েক ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, বাংলাদেশকে স্বল্প উন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, ছয় বা তার উপরে জিডিপি ধরে রাখা, ডলারের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়া ইত্যাদি।
এ ধরনের প্রচারণার পেছনে কারণ কী?
এ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে সরকার জনগনের দৃষ্টি মূল ইস্যু থেকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখতে চায়। প্রশ্ন হচ্ছে কী সেসব মূল ইস্যু? এসব প্রচারণার মাধ্যমে সরকার আড়াল করতে চায় নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূলবৃদ্ধি, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বাধিক বেকারত্বের হার, ঢাকার উচ্চ জীবনযাত্রা ব্যয়, দেশের খনিজ সম্পদ উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে তুলে দেয়া, প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়া, গরীব ধনীর মধ্যকার ব্যাপক বৈষম্য, ব্যাংকসমূহ লুটপাটের মাধ্যমে সাধারণ জনগনের গচ্ছিত সঞ্চয় নিঃশেষ করে দেয়া, হাজার হাজার কোটি টাকা দেশ থেকে পাচার করা, আইন শৃৃংখলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, জঙ্গীবাদ দমনের নামে নিষ্ঠাবান মুসলিম ও ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহকে দমন করার উপনিবেশবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়ন ইত্যাদি।
অবকাঠামো উন্নয়ন কি উন্নয়ন নয়?
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে অবশ্যই অবকাঠামো উন্নয়নের সর্ম্পক রয়েছে। তবে কেবলমাত্র অবকাঠামো উন্নত করলেই দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির উন্নয়ন হয় না। এখন পর্যন্ত ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যানজট সমস্যা নিরসন কল্পে যতগুলো ফ্লাইওভার ণির্মাণ করা হয়েছে তার কোনটিই বাস্তবতার নিরীখে সফল হয়নি। ঢাকার উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ প্রান্তে যেতে আগে যত সময় লাগত এখন একই বা তার চেয়ে বেশী সময় লাগে। মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, পদ্মা সেতু ও রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্পের মত মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশ ও জনগনের উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছাও প্রশ্নবিদ্ধ। কেননা এসব প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ করার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আর প্রজেক্ট নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে এর ব্যয় বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। আর ব্যয় বৃদ্ধি পেলে এর থেকে সরকারের মন্ত্রী ও সচিব থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের বখরার টাকাটাও বেড়ে যায়। আর এসব প্রজেক্টসমূহ সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আওতায় করা হয়নি। অনেক সময় এসব অবকাঠামো ণির্মাণের পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কারণ। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তা ও সেতু ণির্মাণের পেছনে রয়েছে আধিপত্যবাদী শত্রু রাষ্ট্র ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া। রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প ণির্মাণের সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে সরকার গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি রাশিয়াকে অনুকূলে রাখতে চায়। তাছাড়া বিশ^ব্যাংক, আই এম এফ, জাইকা, এডিবির ঋণ সহায়তা কৃষি বা শিল্প ণির্মাণে খরচ না করে অবকাঠামো খাতে খরচ করতে হবে বলে শর্ত দেয়া হয়। এরূপ শর্তের কারণ হল অবকাঠামো উন্নয়ন হলে বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের পণ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌছানো সহজতর হয়। সুতরাং উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, সাম্প্রতিক অবকাঠামো উন্নয়ন নিছক দেশ ও জনগনের উন্নয়নের জন্য হচ্ছে না।
সরকার প্রচারিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) কীভাবে দেখা উচিত?
বাংলাদেশ পুজিবাদী অর্থনেতিক ব্যবস্থা অনুযায়ী চলে। পুজিবাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকসমূহকে (Macro Economic Index) বুঝতে হলে এ অর্থনীতি কতৃক নির্ধারিত মানুষের মৌলিক অর্থনৈতিক সমস্যাকে বুঝতে হবে। পুজিবাদের মতে, মানুষের প্রধান অর্থনৈতিক সমস্যা হল, সম্পদ সীমিত কিন্তু চাহিদা অসীম। সম্পদের অপ্রতুলতাই যেহেতু সমস্যা, সেহেতু সম্পদের উৎপাদন বৃদ্ধিই এর যুতসই সমাদান। আবার চাহিদা অসীম এবং সম্পদ সীমিত হওয়ায় সব মানুষের চাহিদা পূরণ কখনওই সম্ভব নয়। পুজিবাদী অর্থনীতিতে বন্টন নিয়ে আলোচনা থাকলে বন্টন এর প্রধান লক্ষ্য নয়, বরং উৎপাদনই মূল লক্ষ্য। সেকারণে সামষ্টিক উৎপাদনই উন্নয়নের সূচক হিসেবে কাজ করে, যেমন: জিডিপি(Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production), মাথাপিছু আয় (Per capita Income)। জিডিপি (Gross Domestic Production), জি এন পি (Gross National Production) তে বিশাল পুজির মালিক কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের উৎপাদনই হিসেবে আসে। এতে অধিকাংশ সাধারণ মানুষের উৎপাদনের কোন প্রতিফলন নেই। আর মাথাপিছু আয় (Per capita Income) এ প্রধানত বিশাল পুজির মালিক দেশের কর্পোরেট কোম্পানীসমূহের মোট রাজস্বকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ দেয়া হয়। এটি একটি ধোকাবাজি ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা এখানে একজন হাজার কোটি টাকার মালিক ধনী ব্যক্তির রাজস্বের সাথে কয়েকশ টাকা আয়ের দিনমজুর বা রিকশাচালকের বাৎসরিক আয়কে গড় করা হয় যদিও তাদের দু’জনের মধ্যে আয়ের ব্যবধান আকাশ পাতাল। এসব সূচকের মাধ্যমে দেশে প্রতিটি ব্যক্তির সত্যিকারের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা, গরীব ও ধনীর মধ্যকার ব্যাপক অর্থনৈতিক বৈষম্যকে সূচারুরূপে আড়াল করা হয়। এসব সূচক থেকে বুঝা যায় না দেশের সব জনগনের নূন্যতম মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হয়েছে কিনা। তাই এসব প্রতারণামূলক সূচক তথা পুজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করা উচিত।
বাংলাদেশের অতি ধীর প্রক্রিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নকে কিভাবে দেখা উচিত?
বাংলাদেশের তথাকথিত স্বাধীনতার পর চল্লিশের বেশী বছর পার হয়ে গেলেও রাষ্ট্রের যে সামগ্রিক উন্নয়ন হয়েছে তা সত্যিই নগন্য। অনেক আদর্শিক ও অনাদর্শিক রাষ্ট্র এর চেয়েও কম সময়ে উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেছে। ইতিহাস স্বাক্ষী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আদর্শিক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভারী শিল্প নির্ভর উন্নয়ন, হিটলারের অধীনে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র জার্মানীর ভারী শিল্প নির্ভর অর্থননীতির বিকাশ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিপর্যস্ত জাপানের প্রযুক্তিগত বিকাশ, সমরশিল্পনির্ভর আদর্শিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির বিকাশ প্রভৃতি প্রমাণ করে একটি রূপকল্পের ভিত্তিতে কীভাবে সম্ভব স্বল্পতম সময়ে একটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়ন করতে পারে। এক্ষেত্রে ভিশন ২০৪১ এর মত ফাঁকা বুলি সর্বস্ব প্রতারণামূলক শ্লোগান কতটুকু যুক্তিযুক্ত।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতি নব্য উপনিবেশবাদী বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান বিশ্বব্যাংক, আই এম এফ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এডিবির প্রত্যক্ষ প্রেসক্রিপশন ও খবরদারিতে পরিচালিত হচ্ছে। এসব উপনিবেশবাদী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে Structural Adjustment Program, Millennium Development Goal ইত্যাদির নামে দারিদ্রতাকে টেকসই রূপ দিয়েছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের নামে বাংলাদেশের বাজারকে সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানীসমূহের বাজারে পরিণত করা হয়েছে। দেশের সস্তা শ্রম, কর রেয়াত সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাবিহীন স্বল্প উৎপাদন খরচ সুবিধাপ্রাপ্ত বিদেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়েছে। FDI বা Foreign Direct Investment কতটুকু আসল সেটাকে উন্নয়নের সূচক বানানো হয়েছে! কৃষি ও চামাড়াশিল্পসহ দেশীয় অন্যান্য শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে ঝুকিপূর্ণ ও রপ্তানী নির্ভর গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে অর্থনৈতিক দাসত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়েছে। ভারী শিল্প নয়, বরং ঝুকিপূর্ণ ও পরনির্ভরশীল সেবাখাতের বিকাশকে সরকারিভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
এতদসত্ত্বেও যে যৎসামান্য বস্তুগত উন্নয়ন আমরা দেখতে পাই তা হল গনমানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিজাত প্রচেষ্টার ফল। এতে সরকারের ভূমিকা নগন্য। বরং অনেকক্ষেত্রেই সরকারের নীতিসমূহ সাধারণ জনগনকে উদ্যোক্তা হতে অনুৎসাহিত করে। এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ হল দেশের ব্যাংকসমূহে রেকর্ড পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা অবিনিয়োগকৃত অলস অর্থ পড়ে আছে। আমাদের দেশের পরিশ্রমী কৃষক, নিপীড়িত লক্ষ লক্ষ নারী পোশাক শ্রমিক, প্রবাসী শ্রমিক ও দূর্দমনীয় সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টাই যৎসামান্য উন্নয়নের মূল নিয়ামক শক্তি।
প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন
পুঁজিবাদের মাধ্যমে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এর মাধ্যমে দারিদ্রতা বিমোচন, বেকারত্বের বিলোপ সাধন, সম্পদের সুষম বন্টন, ধনী দরিদ্রের আকাশসম বৈষম্য নিরসন সম্ভব নয়। একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে এগুলো অর্জন করা সম্ভব। কেননা ইসলামিক অর্থনীতিতে মূল অর্থনৈতিক সমস্যা হল সম্পদের বন্টন এবং এ ব্যবস্থা মনে করে সব মানুষের মৌলিক অধিকার পরিপূর্ণভাবে পূরণের জন্য পৃথিবীতে যথেষ্ট সম্পদ রয়েছে। ইসলামি ব্যবস্থায় খলিফা প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক চাহিদা হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করতে বাধ্য। এছাড়াও উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে খলিফা জনগনের শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরীআহগতভাবে বাধ্য। ‘…আর সম্পদ যাতে কেবল বিত্তশালীদের মধ্যে আবর্তিত না হয়।’ (সূরা হাশর:৭) – পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটিই ইসলামি অর্থনীতি সর্ম্পকে সম্যক ধারণা দেয়। সেকারণে এ ব্যবস্থায় মাত্র ২০ ভাগ লোক শতকরা ৮০ ভাগ সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব নয়। পরাশক্তিমূলক ভিশনারী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, উপনিবেশবাদীদের নিয়ন্ত্রনমুক্ত, সুদের জুলুমবিহীন বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ থাকায় খিলাফত রাষ্ট্রে সমরশিল্পভিত্তিক ভারীশিল্পের বিকাশ ঘটবে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইসলামি ব্যবস্থায় জনগনের আয়ের উপর নয় বরং সম্পদের উপর কর ধার্য করা হয়। সেকারণে পুজিবাদী ব্যবস্থার আয়কর ও ভ্যাটের জুলুম থেকে জনগন মুক্তি পাবে।
উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণাটি কেমন?
একটি জাতির পূর্ণজাগরণের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নই যথেষ্ট নয়, যদিও স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই অর্থনৈতিক উন্নয়নই করতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং এক্ষেত্রে তাদের সামান্যতম রাজনৈতিক সদিচ্ছাও ছিল না।
উন্নয়নের সামগ্রিক ধারণার মধ্যে একটি জাতির অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন অর্ন্তভূক্ত রয়েছে। আদর্শিক পুঁজিবাদের বাস্তবায়ন হলে অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) হলেও আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) উন্নয়ন সম্ভব হয় না। পশ্চিমা বিশ্বই এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। পশ্চিমা সভ্যতা আধ্যাত্মিকতাশূন্য, নৈতিকতা ও মানবিকতা বিবর্জিত। সেকারণে তাদের অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material) উন্নয়ন স্বভাবতই একটি আংশিক উন্নয়ন যা মানুষকে প্রশান্তি দিতে দারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ব্যাপক অস্থিরতা সেখানকার সাধারণ ঘটনা। অপরাধ ও মানসিক বৈকল্য সীমাহীন। পশ্চিমা বিশ্বের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো স্লিপিং পিল ও অ্যান্টিডিপ্রেশনের ওষুধের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সবচেয়ে বেশী আয় হয় পর্ণ ইন্ডাস্ট্রি থেকে। এসবই প্রমাণ করে তাদের আংশিক উন্নয়ন মানবতার মুক্তি দিতে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের তাবেদার শাসকগোষ্ঠী তাদের পশ্চিমা প্রভূদের মত জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন সাধনের চেষ্টা করে না এবং এ নিয়ে চিন্তিতও নয়। ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার জন্য ফ্লাইওভার, ণির্মানাধীন মেট্রোরেল প্রকল্প, এলিভেটেড এক্সপ্রেস হাইওয়ে, রূপপূর পারমাণবিক প্রকল্প, পদ্মা সেতু নির্মাণকে উল্লেখ করলেও সামাজিক নিরাপত্তা (Social Security), শিক্ষা, চিকিৎসা, আইনের শাসন, সম্পদের সুষম বন্টন, বেকারত্ব, উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ, খনিজ সম্পদের উপর জনগনের মালিকানা ও অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের সাফল্য একেবারেই শূন্যের কোটায়। বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ড, গুম, অপহরণ, খুন, শিশু ধর্ষণ, ডাকাতি, ছিনতাই, দূর্নীতি, প্রশ্নপত্র ফাসের মহোৎসব, বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা, ভিন্নমত দমন, শিক্ষা ও চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে, তখন তথাকথিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাফল্যের দাবি অযৌক্তিক, হাস্যকর এবং জনগনের সাথে কঠিন তামাসা ছাড়া আর কিছুই নয়।
একমাত্র ইসলামের মাধ্যমে একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন (অর্থনৈতিক বা বস্তুগত (Material), আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) সম্ভব। কেননা ইসলাম মানুষের বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি তার আধ্যাত্মিক (Spiritual), নৈতিক (Moral) ও মানবিক (Humanitarian) চাহিদাকে অনুমোদন দেয় ও এগুলোর উন্নয়নের পথ বাতলে দেয়। জীবনে সামগ্রিকভাবে ইসলামী আদর্শের বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সামগ্রিক উন্নয়ন সুনিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের মত দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রে পশ্চিমা কাফেরদের পুজিবাদী জীবনব্যবস্থা অন্ধ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগনের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে না, বরং আক্বীদা সমেত ইসলামী জীবনাদর্শ পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়নই সমাধান। এ লক্ষ্যে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামরত আদর্শিক ইসলামি রাজনৈতিক দলের সাথে মুসলিমদের সম্পৃক্ত হওয়া বাঞ্চণীয়।
সম্পদের স্বল্পতা বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ নয়

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের আরেকটি বিশেষায়িত সংস্থা আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (আইএফএডি) খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি শীর্ষক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই তথ্য ২০১৪-১৬ সালের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রণীত ওই প্রতিবেদনে বলা হয় গত বছরে (২০১৭) বিশ্বের ১১ শতাংশ মানুষের ক্ষুধা বেড়েছে। ওই রিপোর্ট প্রকাশের পর সংস্থাটির প্রধান গিলবার্ট হুংবো বলেছিলেন, ‘সম্পদের স্বল্পতা নয়, খাদ্যের অপচয়ই বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ।’
তবে তারা যে বিষয়টি উল্লেখ করেনি তা হল, পশ্চিমাদের নীতির কারণেই তৃতীয় বিশ্ব দরিদ্র এবং উন্নত বিশ্বে অপব্যয়ের কারণেই সৃষ্ট খাদ্যসংকটের ফলে তারা দরিদ্রই থাকবে। পশ্চিমাদের দ্বারা নিয়ত্রিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক এবং এদের কাঠামোগত পরিবর্তন নীতি (Structural Adjustment Policy) মিশর, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া এবং বাংলাদেশের বিবিধ অর্থনৈতিক সংকট তৈরির পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখছে। দরিদ্রতা মুক্তির উপর তাদের নিজস্ব প্রেসক্রিপশন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কাছে বিক্রয় করে থাকে। এসব সংস্থা প্রদত্ত নীতিসমূহের মধ্যে রয়েছে শস্যের মজুদ না রাখা বা কমিয়ে আনা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে আমদানিকৃত খাবারের উপর কর হ্রাস, সারসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের উপর থেকে ভর্তুকি উঠিয়ে নেয়া প্রভৃতি। অন্যান্য দরিদ্র দেশসমূহ থেকে আমদানির বদলে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে ক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি করে তারা। বাজার অর্থনীতি ও ব্যক্তিখাতের বিকাশের মাধ্যমে অর্থনীতিকে উদ্দীপিত করা ও একে দারিদ্রতা বিমোচনের পথ হিসেবে দেখানো হয়।
দারিদ্র্যের অপর কারণগুলোর মধ্যে একটি হল ঋণ। আফ্রিকাকে ঔপনিবেশিক সময়ের ঋণ পরিশোধ করবার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। এ ধরণের দেনার কারণ হচ্ছে অসদুপায়ে উচ্চ সুদে ঔপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহের ঋণ গ্রহণ। আবার অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত স্বৈরশাসকদের বিলাসিতায় অপচয়ের জন্য ধনী দেশসমূহ ঋণ দিয়েছে যা ‘ঘৃন্য ঋন’ হিসাবে পরিচিত। উদাহরণ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ২৮ বিলিয়ন ডলারের (যা বর্তমানে ৪৬ বিলিয়ন) “বর্ণবাদজনিত ঋন” এ জর্জরিত। বর্ণবাদ পরবর্তি আফ্রিকার উপর বর্ণবাদ শাসনামলের ঋন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। ১৯৯৮ সালে এ.সি.টি.এস.এ (এ.সি.টি.এস.এ: অ্যাকশন ফর সাউদার্ন আফ্রিকা) হিসেব করে দেখেছে যে, বর্ণবাদ বজায় রাখবার জন্য ১১ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ১৮ বিলিয়ন ডলার) ধার করেছে। আর প্রতিবেশী দেশসমুহও এ জন্য ১৭ বিলিয়ন ডলার (যা বর্তমানে ২৮ বিলিয়ন) ঋণ গ্রহণ করেছে। শতকরা ৭৪ ভাগের উপরে আফ্রিকান ঋণে জর্জরিত থাকায় পুরো মহাদেশ জুড়ে অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বজায় আছে।
বর্তমান বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থাপনা প্রাথমিক সময়ের মত কেবলমাত্র কৃষকের নিজস্ব প্রয়োজন মেটানোর জন্য পরিচালিত হয় না। ১৯৬০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাসমূহ এ ধরণের ব্যবস্থা এবং সরকারকে খাদ্য সরবরাহের উপর হস্তক্ষেপের সুযোগ থেকে বের হয়ে আসবার জন্য কৌশল প্রণয়ন করেছে। লাভের অঙ্কটাকে বাড়িয়ে নেবার জন্য দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলো এ সুযোগে এগিয়ে এসেছে। পণ্যদ্রব্যের মূল্যের ব্যাপক হ্রাসবৃদ্ধিতে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগ এখন আর নেই। সেকারণে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশের জনগণ কে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কর্তৃক বেধে দেয়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে হয়। বিশ্ব মন্দা চলাকালীন সময়ে কিংবা তার আগে অনুমাননির্ভর আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে। শুরু থেকেই বিলাসজাত পণ্যদ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি ছিল বৈশ্বিক ব্যবসা। কিন্তু ১৯৬০ সাল থেকে খাদ্য দ্রব্য উৎপাদন আঞ্চলিক পরিমন্ডল থেকে বৈশ্বিক পরিমন্ডলে রূপান্তরিত হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরিদ্র দেশসমূহে ধনী দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর অশুভ পদচারণার মাধ্যমে উপার্জনের ক্ষেত্রস্থল বানানোয় সেসব দেশের কৃষির উপর কুপ্রভাব পড়েছে। অসম বানিজ্য চুক্তি; প্রধান ফসলসমূহের উৎপাদনের উপর অতি খবরদারি; বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা প্রভৃতি সংস্থার নিয়ন্ত্রন ও আধিপত্য দরিদ্র দেশসমূহের কৃষির মেরুদন্ড ভেঙে দিয়েছে।
ক্রমবর্ধমান দরিদ্রতা ও অসমতা দরিদ্র দেশসমূহে দুর্নীতিকে বাড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও প্রতিকূল করছে। দরিদ্র দেশকে ধনী দেশের খাদ্য সহায়তা প্রদানের নামে অতিরিক্ত খাদ্য বিক্রি করা; উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপের কৃষিতে ব্যাপক ভর্তুকি প্রদান, প্রভৃতি তৃতীয় বিশ্বের খাদ্য সংকট ও দরিদ্রতাকে ঘনীভূত করছে।
আইএফডি পৃথিবীতে খাদ্য সংকটের একটি কারণ চিহ্নিত করতে পারলেও এর সমাধানের ব্যপারে তেমন কিছুই বলেনি। এক্ষেত্রে ইসলাম একটি সুন্দর সমাধান দিয়েছে।
ইসলাম মানুষের চাহিদাগুলোকে সামষ্টিকাভাবে না দেখে প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদাগুলোকে আলাদাভাবে দেখে। স্বতন্ত্রভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মোলিক চাহিদাকে পূরন না করে সামগ্রিকভাবে পুরো সমাজের জীবনাযাত্রার মান বৃদ্ধি করা তথা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইসলামি রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামি রাষ্ট্রের উপর ধর্ম, জাতি, বর্ণ নির্বিশেষে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিকা চাহিদা পূরণ করাকে বাধ্যতামূলক বা ফরয করে দিয়েছে। রাসূল (স) বলেছেন, “বাস করার জন্য একটি গৃহ, আব্রু রক্ষা করার জন্য এক টুকরো কাপড় আর খাওয়ার জন্য একটা রুটি ও একটু পানি এসবের চেয়ে অধিকতর জরুরী কোন অধিকার আদম সন্তানের থাকতে পারে না।” (তিরমিযি)
রাষ্ট্রের নাগরিদের এসকল চাহিদা পূরণে ইসলামি খিলাফত বাধ্য। অন্যথায় তাদের বিরুদ্ধে রাসূল (স) বলেন, “একজন আমীর, যার উপর মুসলিমদের শাসনভার অর্পিত হয় অথচ সে তাদের কল্যাণ সাধনে চেষ্টা না করে বা তাদের মঙ্গল কামনা না করে; আল্লাহ তাকে তাদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।” (মুসলিম)
সুতরাং ইসলামি খিলাফত সরকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের চাহিদা পূরণের জন্য তার অর্থনীতিকে ইসলামি শরিয়ার হুকুম মত সাজাবে। বর্তমান মুদ্রা ব্যবস্থা বাদ দিয়ে সে স্থলে ইসলামি মুদ্রাব্যবস্থা তথা স্বর্ণ ও রৌপ্য ভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থা চালু করবে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রনে থাকবে। খাদ্যের চাহিদা ও যোগান নিশ্চিত করতে খিলাফত সরকার পতিত খাস জমিসমূহ ভুমিহীন দরিদ্র কৃষক, নদী ভাঙনে ভূমিহারা জনগোষ্ঠী ও বেকারদের মাঝে বণ্টন করবে। ব্যক্তি মালিকানাধীন চাষযোগ্য অব্যবহারিত জমিকে চাষের আওতায় আনা হবে। কৃষির উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য উন্নতমানের পানি সেচের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় সার, ডিজেল ইত্যাদি যোগান দেওয়াও ইসলামি খিলাফত সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এছাড়াও খিলাফত সরকার দরিদ্র কৃষকদের অনুদান ও সুদমুক্ত ঋণ প্রদান করবে,যাতে তারা জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে।
বাজারে পণ্যের যোগান নিশ্চিত করা এবং সিন্ডিকেট, অবৈধ মজুদদারি নিয়ন্ত্রনের জন্য ইসলাম কঠোরতা আরোপ করে।
রাসূল (সা) বলেন,“যে মজুতদারি করেছে, সে অন্যায় করেছে।” (মুসলিম)
“যে প্রতারণা করে, সে আমাদের কেউ না।” (ইবনে মাজা ও আবু দাউদ)
সিন্ডিকেট, অসৎ ব্যবসা, ভেজাল ইত্যাদি কঠোর হস্তে দমন করার জন্য ইসলামি খিলাফত রাষ্ট্রের বিচারক কাজি উল মুহতাসিব সব সময় বাজার পরিদর্শন করবেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিবেন।
মূলত ইসলামি খিলাফত সরকার সামগ্রিকভাবে একটি আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তুলবে এবং সমগ্র বিশ্বের বঞিত মানুষের চাহিদা পূরণের লক্ষে কাজ করবে। অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী একটি সরকারই পারে গণমানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করতে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বানী বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে। মহান আল্লাহ বলেন,
“তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যানের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে”।(আলে ইমরান ১১০)
মুহাম্মদ আজিম
আত্মপরিচয়, যা থেকে আসে আত্মসম্মান!

আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছেন যারা তাদের পড়ালেখার Subject choice করা থেকে শুরু করে, বন্ধুত্ব নির্বাচন, লেনদেন, বিয়ে শাদী নানা রকম কর্মকান্ডে Standard maintain করার চেষ্টা করেন। সব জায়গায়, সব কিছু আসলে তার সাথে Chill করে না। ‘আমি করব তার সাথে বন্ধুত্ব!’ ‘আমি ওখানে যাব!’ ‘আমি এটা কিভাবে করব!’ এই টাইপ কথা বলে থাকেন। কারণ, এসব করতে তার আসলে আত্মসম্মানে নাড়া দেয়। আর যে কাজ করতে তার আত্মসম্মানে নাড়া দেয় সেই কাজ যত কঠিন হোক না কেন তা সে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
একটু ভিন্ন ভাবে বিষয়টা আলোচনা করা যাক। আল্লাহ তায়ালা সুরা ইউসুফের ২৩ নম্বর আয়াতে আমাদের জানাচ্ছেন, “আর যে মহিলার ঘরে সে ছিল, সে তাকে কুপ্ররোচনা দিল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল আর বলল, ‘এসো (তাড়াতাড়ি করো)’। সে বলল, আল্লাহর আশ্রয় (চাই)। নিশ্চয় তিনি আমার মনিব, তিনি আমার থাকার সুন্দর ব্যবস্থা করেছেন। নিশ্চয় যালিমগণ সফল হয় না।”
উপরোক্ত ঘটনাটি হযরত ইউসুফ (আ) এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা সমুহের একটি। যখন তার মুনিব, মিশরের আজিজ(শাসক) এর স্ত্রী তাকে দীর্ঘদিন অন্যায় কাজের (ব্যভিচারের) প্ররোচনা দেওয়ার পর সর্বশেষ ও চুড়ান্ত যে আহবান দেন “এসো” তখন ইউসুফ (আ) আল্লাহপাকের নিকট আশ্রয় চেয়েছেন।
আয়াতটি লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, মুনিবের এই আহবানে ইউসুফ (আ) মাঝে যে বিষয় গুলো ফুটে উঠে তা হচ্ছে,
· তাক্বওয়া
· প্রবল কৃতজ্ঞতা বোধ
ঘটনাটি আরো একটু বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখি, ইউসুফ (আ) ছিলেন তখন একজন দাস। মুনিবের হুকুম বিনা বাক্যে পালন করাই ছিল তার মূল কাজ। কিন্তু সাইয়িদেনা ইউসুফ (আ) যদিও শারীরিক ভাবে মুনিবের দাস ছিলেন, মানসিক ভাবে তিনি ততটাই স্বাধীন ও মুক্ত ছিলেন। মুনিবের কাছ থেকে এই নোংরা আহবান পাওয়ার সাথে সাথে তার মধ্যে তাক্বওয়া ও কৃতজ্ঞতা বোধের পাশাপাশি প্রবল আত্মসম্মান জেগে উঠে, ‘কিভাবে তিনি এই কাজ করবেন!’
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে একজন দাসের এমন আত্মসম্মান কিভাবে জেগে উঠলো! তার উত্তর হচ্ছে, এই প্রবল আত্মসম্মান এসেছে নবী ইউসুফ (আ) তার নিজের আত্মপরিচয় থেকে। কিভাবে???
একটি মানুষের জন্য তার নিজের আত্মপরিচয় জানাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই আত্মপরিচয়ই তাকে তার জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে মৌলিক প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জীবনের প্রতিটি কর্মকান্ড, সিন্ধান্ত এই আত্মপরিচয়ের মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রিত হয়। মানুষের জীবন সম্পর্কে তার যে মৌলিক ধারনা (Concept) যেমন,
· সে কে?
· সে কোথা থেকে এসেছে?
· এই দুনিয়াতে তার আসা/পাঠানো পিছনের objective টা কি?
· এই দুনিয়ার পর সে কোথায় যাবে?
যখন একজন মানুষ তার জীবন সম্পর্কে এই মৌলিক প্রশ্নের Convincing উত্তর পায় তখন তার জীবন সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারনা (Concept) তৈরি হয়। এবং সেখান থেকেই তার সঠিক আত্মপরিচয় গঠিত হয়।
যেমন, আজকাল boyfriend-girlfriend culture. যারা এই culture ধারণ করে তার পিছনে তার আত্মপরিচয় কিভাবে গঠিত হল?
প্রথমত, তারা তাদের জীবনের সকল functions থেকে দ্বীনকে পৃথক করে ফেলে বা সেকুলারিজম কে তার চিন্তার মৌলিক উৎস বানিয়ে ফেলে। কারণ, তাকে বুঝানো হয় ‘দুনিয়াতে এসেছো একবারই, আর আসা হবে না। So, have fun! Enjoy yourself! Weekend এ গিয়ে জুমা পড়বা বা শেষ জীবনে একবার হজ্ব করে নিবা। সাত খুন মাফ।’ এবং এটাই হয়ে থাকে আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। আমরা নিজেদের মেধা খাটিয়ে একবারও চিন্তা করতে পারি না যে, আমরা যা চিন্তা করছি বা যেভাবে চিন্তা করছি সেটা সঠিক কিনা। আমাদের ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, আমরা কে? কারণ, আমরা যদি একবারও বুঝতে পারি ‘আমরা আল্লাহ পাকের কাছ থেকে এসেছি সুনির্দিষ্ট objective পূরণের জন্য, তার ইবাদাত করার জন্য, আমরা আবার তারই কাছে ফিরে যাব’ তাহলে আমরা আমাদের আসল আত্মপরিচয় পাব। আর এই সঠিক আত্মপরিচয় জানার পর নষ্ট সেকুলার চিন্তাকে গ্রহন এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে আমাদের আত্মসম্মানে নাড়া দিবে।
তাছাড়া, সম্মানিত ইউসুফ (আ) তার জীবন সম্পর্কে সঠিক ও স্বচ্ছ ধারনার পাশাপাশি তিনি জানতেন এই নোংরা কাজ তার দ্বারা শোভা পায় না। তিনি খুব ভাল করেই জানতেন তিনি কে? ইউসুফ (আ) এর বাবা ছিলেন একজন সম্মানিত নবী ইয়াক্বুব (আ), তার দাদা ছিলেন সম্মানিত নবী ইসহাক্ব (আ), তার পর দাদাও ছিলেন সম্মানিত নবী ইব্রাহিম (আ)। যিনি নবী পরিবারের একজন সদস্য তিনি এরকম কাজ কিভাবে করতে পারেন। একজন দাস হয়েও তার কি পরিমান আত্মসম্মান, একবার চিন্তা করুন।
কিন্তু আমরা! আমরা তো শারীরিক ভাবে দাস নই। বরং আমাদের গোটা জাতি এক চরম মানসিক দাসত্বে বন্দী। কারণ, আমরা আমাদের আত্মপরিচয় ভুলে পশ্চিমাদের দেখানো কুফরি আদর্শ, সেকুলারিজমকে গ্রহন করেছি, যা আমাদের জীবনের সকল কর্মকান্ড ও সিন্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আমরা বুঝে বা না বুঝে এর অন্ধ অনুসরণ করছি। আমাদের বিন্দু মাত্র আত্মসম্মানে লাগছে না যে ইসলামকে বাদ দিয়ে আমরা নষ্ট আদর্শ গ্রহন করছি। আমাদের একটুও আত্মসম্মানে লাগছে না যেখানে আমাদের নবী মোহাম্মদ (সা) রেখে যাওয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থা তথা খিলাফাত পুনঃ প্রতিষ্ঠা না করে আমাদের মতো একজন মানুষের তৈরি করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা গ্রহণ করছি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত তথা খিলাফত বিদ্যমান নেই, তবুও আমরা নিষ্ক্রিয়।
এটাই মূলত বর্তমান তরুন ও যুবসমাজের অবক্ষয়ের মৌলিক কারণ। কিন্তু একসময় মুসলিমরা পুরো বিশ্বের কাছে Idol ছিল। কারণ, তারা তাদের জীবনকে আক্বীদার ভিত্তিতে গঠিত করেছিলেন। দুনিয়াতে আসা বা পাঠানোর যে objective ছিল আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত ও সম্মুন্নত রাখা, সেই কাজটিই তারা করে গিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তারা সফলকাম হয়েছেন। কারণ আল্লাহ পাক বলেন,
“তোমরাই দুনিয়া সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি, মানব জাতিকে কল্যাণের দিকে নেওয়ার জন্য তোমাদের বাছাই করা হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দিবে আর অসৎ কাজের নিষেধ করবে, আর আল্লাহর উপর ঈমান আনবে।” (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।
আমরা যদি আবার দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হতে চাই যারা পুরো মানব জাতিকে Guide করবে, তাহলে সঠিক আত্মপরিচয়ে পরিচিত হতে হবে। উম্মাহর হারিয়ে যাওয়া আত্মসম্মান ফিরিয়ে আনতে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা কতৃক একমাত্র বৈধ শাসন ব্যবস্থা খিলাফত পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর হারানো গৌরব ও সম্মান ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করতে হবে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুক।
পৌরুষদীপ্ত পুরুষ

সাহসিকতা একজন মানুষের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি গুণ। যারা সাহসিকতার সাথে কোনো কাজ সম্পন্ন করেন তারা সমাজে সমাদৃত হন। বিশেষ করে, পুরুষরা নিজেকে পৌরুষদীপ্ত পুরুষ প্রমাণে অনেক ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেন কিংবা নিজের ইম্প্রেশন তৈরিতে কার রেসিং বা বাইক রেসিং করে থাকে। এতে সে তার সাহসিকতার প্রমাণের চেষ্টা করে। কিছু বালক কিংবা তরুণ এলাকায় মাস্তানি-সন্ত্রাস করে, হাতে অস্ত্র নাড়াচাড়া করে সাহস প্রমাণ করতে চায়, অসৎ রাজনৈতিক নেতার কাছে তার আনুগত্য প্রমাণ করতে চায়। কখনো বিভিন্ন নোংরামি কাজের বেলায় তারা নিজের সাহসিকতা দেখায়। আবার কিছু তরুণ ছেলে মাদক পাচারের জন্য যে সাহসিকতা দেখায় তা দেখে আমরা বিস্মিত হই।
এখন আমরা একটু ভিন্ন প্রেক্ষিতে সাহসিকতা বা পৌরুষদীপ্ত পুরুষের কিছু নমুনা দেখব। সূরা মুমিন/গাফিরের ২৮ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এমন এক মুমিন বান্দার কথা আলোচনা করেছেন যিনি নিজে ফিরাউনের পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং ফিরাউনের সভাসদের একজন সদস্য ছিলেন। ফিরাউনের সাথে সেই মুমিন ব্যক্তির দীর্ঘ কথোপকথন হয় যেটা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো কথোপকথন কুরআনের মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন যা ১০ আয়াতের চেয়েও দীর্ঘ। মুমিন ব্যক্তির এই কথোপকথনের মতো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আর কোনো ব্যক্তির এমনকি নবী-রাসূলের কথাও এতো হুবহু কুরআনে আলোচনা করেন নি। মুমিন ব্যক্তির সাথে ফিরাউনের এমন কি আলোচনা হলো যে যেটা স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা পুরো আলোচনা আমাদের জন্য কুরআনে লিপিবদ্ধ করেছেন। মুমিন ব্যক্তির আলোচনা শুরুই হয়েছে,“— তোমরা কি একজনকে এজন্য হত্যা করবে যে, সে বলে, ‘আমার রব আল্লাহ!’ একবার চিন্তা করুন, দুনিয়ার তাবৎ জালিমদের সর্দার মিশরের সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক ফিরাউনের সামনে তার মুখের উপর বলছে, শুধু আল্লাহকে রব বলার কারণেই কি তারা মুসা(আ.) – কে হত্যা করতে চাচ্ছে? এই মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্বোধন করেছেন ‘রাজুলুন’ বলে যার শাব্দিক অর্থ পুরুষ। কিন্তু ‘রাজুলুন’ শব্দ দ্বারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সেই মুমিন ব্যক্তিকে “ পৌরুষদীপ্ত পুরুষ বা সাহসী পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সত্যিকার সাহসী পুরুষ এরাই যারা জালিমের মুখের উপরে তাকে জালিম বলে এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে একমাত্র রব বা হুকুমদাতা বলে। যে বলে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জমিনে আল্লাহর আইন দ্বারা অন্য কারো আইন/ব্যবস্থা চলবে না। এই সব সাহসীদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “শহীদদের সর্দার হামজা (রা) এবং ঐ ব্যক্তি যে জালিম শাসককে সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজের নিষেধ করে। আর এই কারণে সেই জালিম শাসক তাকে হত্যা করে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) এই সব সাহসীদের বলেছেন, “সাইয়্যেদুন শুহাদান”। রাসুলুল্লাহ (সা) অন্য একটি হাদিসে বলেন, “জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।” এই সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ এবং জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলা রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মূল অংশ। যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দ্বীন প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামে লিপ্ত, জালিমের সামনে তাকে হক্ব নসিহা করে তারা হচ্ছে এ যুগের পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। কারণ তারা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকেই তাদের রব হিসেবে ঘোষণা করেছে, অন্য কাউকে পরোয়া করার সুযোগ আর নেই।
একবার হযরত আলী (রা.) তার খুতবায় মুসল্লিদের জিজ্ঞাসা করেন, “উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী কে?” সবাই উত্তর দিল, “আপনি”। কারণ আপনি সব যুদ্ধে সবার আগে থেকেছেন, অনেক দ্বন্দ্ব যুদ্ধে আপনি জয়ী হয়েছেন। আপনার চেয়ে সাহসী আমরা আর কাউকে দেখি না।” এ জবাব শুনে আলী (রা) বললেন, “এটা ঠিক আমি কখনো দ্বন্দ্ব যুদ্ধে হারিনি। অবশ্যই এটা মোকাবিলা করা সাহসিকতার কাজ। কিন্তু উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সাহসী ছিলেন আবু বকর (রা)। ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কায় রাসুলুল্লাহ (সা) যখন কাবার নামাজ আদায় করছিলেন তখন উকবা বিন মুতাইম তার চাদর দিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা) -কে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা পেচিয়ে ধরেন। তখন আবু বকর (রা.) তাদেরকে চিৎকার করে বলেন, “তোমরা কি এজন্যে একে হত্যা করতে চাও যে বলে “ আমার রব একমাত্র আল্লাহ।” সুবহানাল্লাহ! সঠিক সময় সঠিক জায়গায় সঠিক ব্যক্তির সামনে হক্ব কথা বলার মর্যাদা কত বেশি। তারাই তো সাহসী তথা পৌরুষদীপ্ত পুরুষ। আজ আমাদের তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতা নষ্ট সেকুলারিজম ছিনতাই করে নিয়ে গিয়েছে। জীবন থেকে দ্বীনকে পৃথকের চিন্তা যুব সমাজ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের সাহসিকতা প্রয়োগও দ্বীন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। তাই আসল সাহসী বা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রদত্ত উপাধী পৌরুষদীপ্ত পুরুষ হতে চাইলে আামাদেরও সাহসিকতাকে দ্বীন ইসলাম তথা খিলাফাহ্ প্রতিষ্ঠায় কাজে লাগাতে হবে। সাহসিকতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে একটি আমানত। এই সাহসিকতা যদি খিলাফাহ প্রতিষ্ঠায় প্রয়োগ না করি তাহলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে এর জবাবদিহি করতে হবে। তাই আল্লাহকে ভয় করুন, নিজের কোমরে সোজা হয়ে দাঁড়ান এবং দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফাহ্ পুনঃপ্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক প্রচেষ্টায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করুন।
গুম: ম্যাকেয়াভেলিয়ান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জুলুমের হাতিয়ার

বাস্তবতা:
ঢাকা ট্রিবিউন এ প্রকাশিত এক রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৪ মাসে ঢাকা থেকে মোট ১৪ জন নাগরিক গুমের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে মোট ৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে নিখোজের পর জীবিত অবস্থায় ফিরে এসেছেন। সরকার এবং পুলিশ এগুলোকে মুক্তিপণ আদায়ের কৌশল বললেও তথাকথিত মানবাধিকার কর্মী মনে করেন, চলমান নিখোজ প্রক্রিয়া অর্থের দ্বারা প্রভাবিত নয়; বরং এগুলো হচ্ছে সরকারের জন্য সম্ভাব্য হুমকি এবং ভীতি সঞ্চার করার উপায়। এই তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ফেইসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট শেয়ার করা সাবেক রাষ্ট্রদূতও রয়েছে। যারা ফিরে আসছেন তারা অজানা ভয়ে কেউই মুখ খুলছেন না।
কারণ:
১. পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের কারণে দারিদ্রতা, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, ভিন্ন মত দমন ইত্যাদি ইস্যুতে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ম্যাকায়াভেলিয়ান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জালিম শাসক জনগনের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাচ্ছে।
২. খিলাফত রাষ্ট্রের মত বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করে শাসন করে না। সেকারণে গুম এধরনের সরকারের জন্য একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
৩. যেসব গুম ও অপহরণের পেছনে সরকার জড়িত নয়, সেসবের ব্যাপারে শাসক জনগনকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং এ ব্যাপারে তারা মোটেও আন্তরিক নয়।
সমাধান:
১. খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থায় খলিফা জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার-অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান সুনিশ্চিত এবং উম্মাহ’র অধিকার হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা দিতে শরী’আহগতভাবে বাধ্য। মৌলিক অধিকার পূরণ থাকায় ও মানুষের ফিতরাতের সাথে যায় এরকম জীবনাদর্শ -ইসলাম দ্বারা শাসন করায় শাসক সহজেই জনগনের হৃদয় মন (Heart & Mind) জয় করতে পারে। একারণে খিলাফত ব্যবস্থায় জনগন ও শাসক পরস্পরের শত্রু নয়, বরং পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তাই খিলাফত ব্যবস্থায় শাসক কতৃক গুম সম্ভব নয়।
২. ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থায় শাসকগণ আল্লাহ’র ভয়ে ইবাদত মনে করে জনগনকে শাসন করে না। বরং তারা ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থে শাসনক্ষমতায় আসীন হয়। সেকারণে এসব শাসক নিজের বাসভূমি ও চলাচলের রাস্তার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করলেও জনগনের নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা উদাসীন এবং এ ব্যাপারে কারও কাছে জবাবদিহী করতে বাধ্য নয়। রাসূল (সা) বলেন, ‘...এমন একটি সময় আসবে যখন সানা থেকে হাজরামাউত পর্যন্ত গভীর রাতে যুবতী নারী হেটে চলে যাবে কিন্তু তার মনে দু’টি ভয় (আল্লাহ এবং চতুষ্পদ হিংস্র জন্তু) ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ ইতিহাস সাক্ষী এ হাদীসের বাস্তবায়ন ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুনিশ্চিত হয়েছিল-যা পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থায় কল্পনাতীত।
৩. খিলাফত ব্যবস্থায় শাসককে জবাবদিহী করাকে কেবল উৎসাহিত করা হয় না, বরং এটি জনগনের জন্য একটি ফরয কাজ। খিলাফত ব্যবস্থায় সাধারণ জনগন, রাজনৈতিক দলসমূহ খলিফা বা শাসকের পদে আসীন যে কাউকে জবাবদিহী করতে পারবে এবং যে কোন নাগরিক তাদের বিরুদ্ধে মাহকামাতুল মাজালিম এর আদালতে মামলা করতে পারবেন। অথচ মত প্রকাশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের তথাকথিত পুঁজিবাদী সংবিধান স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সরকার সমালোচনা ও ভিন্নমতের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অসহিষ্ণু ও প্রতিক্রিয়াশীল। এমনকি এই তথাকথিত পবিত্র সংবিধান অনুসারে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় প্রধামন্ত্রীর কোন অন্যায় কাজের ব্যাপারে আদালতে মামলা করা যায় না।
বিশ্ব ধাবিত হচ্ছে এক সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে

কোন কিছু থেমে নেই। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘুরে। সূর্য থেমে নেই। মিল্কিওয়ে নামক গ্যালাক্সীতে সূর্য চলমান। গ্যালাক্সীগুলো একে অপরের থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞান এসব কথা বলে। সময়ও থেমে নেই। কথায় বলে, সময় ও নদীর ঢেউ কারও জন্য অপেক্ষা করে না। সময় নদীর ঢেউয়ের মত বহমান।
সময় পরিক্রমায় বিগত একশ বছর…
১৯২৪ সালে ৩ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে মুসলিমদের অভিভাবক রাষ্ট্র উসমানীয় খিলাফত ধ্বংস হওয়ার পর প্রায় এক শতাব্দী পার হতে চলেছে। গত একশবছরে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে অনেক কিছু, বিশেষত: মুসলিম বিশ্ব। এই একশ বছর ছিল বেশ ঘটনাবহুল। উপনিবেশবাদীরা ইসলামিক ভূমিসমূহে নব্য উপনিবেশবাদ বা Neo-colonialism এর আওতায় বিশ্বাসঘাতক তাবেদার শাসকদের বসিয়েছে। কুফর শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পুঁজিবাদ ও নিপীড়নমূলক বৃটিশ বিচার ব্যবস্থা মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের বিতাড়িত করে বেলফার চুক্তির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের হৃদপিন্ডের ভেতরে ইসরাইল নামক ইহুদীদের অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। মুসলিম দেশসমূহে পরিকল্পিতাবে বিভাজন ও নৈরাজ্য উসকে দিয়ে তাদের সম্পদসমূহ লুট করা হয়েছে এবং তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থা ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে মুসলিমদের চিন্তা প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছে এবং সামাজিক জীবনে পশ্চিমীকরণ অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু বিগত খৃষ্টীয় শতকের শেষের দিকে পুঁজিবাদ মুসলিম বিশ্বসহ পুরো পৃথিবীতে তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হারাতে শুরু করে। স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন নামক পুঁজিবাদের অন্তসারশূন্য ফাঁকা বুলি মুসলিমদের আর টানতে পারছিল না। মুসলিম বিশ্ব উপনিবেশবাদী পাশ্চাত্য, প্রতারণাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা ও তাদের তাবেদার দালাল শাসকদের ব্যাপারে ফুসে উঠল এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থার দাবি ক্রমাগত উচুঁ হতে থাকল। পশ্চিমারা তখন নতুন ফন্দি আটল। নব্য উপনিবেশবাদ থেকে বের হয়ে পুরনো সরাসরি উপনিবেশবাদের দিকে ফিরে আসল। ওয়ার অন টেররের (War on terror) নামে Crusade শুরু হল এবং যার ফলশ্রুতিতে মার্কিনীদের নেতৃত্বে কাফেরচক্র ইরাক, আফগানিস্তান সামরিকভাবে দখল করে নিল। কিন্তু খিলাফত ধ্বংসের সময় থেকেই শরীআহগত দায়িত্বের কারণে মুসলিমদের মধ্যে পূর্নজাগরণের রাজনৈতিক আকাঙ্খা দানা বেধেছিল। যা কালক্রমে বিভিন্ন ইসলামিক রাজনৈতিক দলের কাজের কারণে আরও জনপ্রিয় ও বেগবান হয়েছে। পশ্চিমা উপনিবেশবাদ, তাদের প্রতারণাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, অন্তসারশূন্য মূল্যবোধ ও তাদের নিযুক্ত স্বৈরশাসকদের জুলুমের বিপরীতে ইসলামের দাবিতে মুসলিম বিশ্ব জেগে উঠে। এরই চূড়ান্ত বহিপ্রকাশ হল চলমান দশকের শুরুর দিকে তিউনিসিয়া, মিশর, ইয়েমেন, সিরিয়া, লিবিয়াসহ আরববিশ্বে সংঘটিত আরব বসন্ত। কিন্তু ধূর্ত উপনিবেশবাদীরা জনগনের এ জাগরণকে ছিনতাই করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সিরিয়ার মুসলিমদের জাগরণ ছিল ব্যতিক্রম। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের রক্তচক্ষু, হাজার হাজার মুসলিম শিশুর লাশ, বিষাক্ত গ্যাস, তেজষ্ক্রিয় রাসায়নিক বোমা, জঙ্গি বিমানের সদর্প পদচারণা কোনকিছুই এখনও এ দূর্দমনীয় জাগরণকে থামাতে পারেনি। যেন একটি সুনিশ্চিত গন্তব্যের জন্যই এ জাগরণ।
সুনিশ্চিত গন্তব্যের ব্যাপারে উম্মাহ’র ভিন্ন অবস্থান…
এ ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের সব আলেম ও সাধারণ জনগণ কি ওয়াকিবহাল? আলেম ও সাধারণ জনগণ কি একটি সুনিশ্চিত গন্তব্যের ব্যাপারে একমত নাকি এ ব্যাপারে রয়েছে একাধিক মতামত? মুসলিমদের অভিভাবক রাষ্ট্র খিলাফতের অনুপস্থিতি, বুদ্ধিবৃত্তিক অবনমন ও সঠিক ইসলামি চিন্তাপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় মুসলিম বিশ্বের আলেমগণ এ ব্যাপারে একমত নন। যেমন: অনেক আলেম মনে করেন বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতা অবধারিতভাবে দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদার প্রত্যাবর্তনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে একটি ভবিষ্যতবাণীমূলক সহিহ হাদীস খুব উল্লেখযোগ্য:
নূ’মান বিন বশীর (রা) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন: ‘তোমাদের মধ্যে নবুয়্যত ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি তার অবসান ঘটাবেন। তারপর নবুয়্যতের আদলের খেলাফত আসবে। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে আঁকড়ে ধরা (বংশের) শাসন। এটাও ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ চান, তারপর তিনি এরও অবসান ঘটাবেন। অতপর আসবে জুলুমের শাসন আর তা ততদিন বলবৎ থাকবে যতদিন আল্লাহ চান। আল্লাহ্’র ইচ্ছায় একদিন এরও অবসান হবে। তারপর আবার আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত। অতপর তিনি (সা) চুপ থাকলেন।’ (মুসনাদে ইমাম আহমদ)
যদিও এ মতের পক্ষালম্বনকারী আলেম ও তাদের প্রতিষ্ঠিত ইসলামি রাজনৈতিক দলসমূহ এ হাদীসের ভিত্তিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য পুরো পৃথিবীব্যাপী কাজ করছে না। বরং তাদের ফিকহভিত্তিক দাবি, ভবিষ্যত বাণীমূলক আহাদ হাদীস থেকে হুকুম শরী’আহ আসে না। ইজতিহাদি প্রক্রিয়ায় তাহকীকুল মানাত (বাস্তবতা পর্যালোচনা) ও তাখরীজুল মানাত (বাস্তবতা আহরণ) ও তানকীহুল মানাত (বাস্তবতার জন্য নির্দিষ্ট হুকম সম্পর্কিত করা)-এর মাধ্যমে উম্মাহ’র বর্তমান সময়ের কর্মপদ্ধতি বা হুকম শরী’আহ নির্ধারিত হবে।
তবে মুসলিমদের মধ্যে যেসব আলেম ও দল রাজনৈতিক ইসলাম নিয়ে কাজ করেন তারা সবাই যে এ গন্তব্য সর্ম্পকে সুনিশ্চিত এমনটা নয়। এ ব্যাপারে সবার সচেতনতাও সমান নয়।
মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যে অপর একটি অংশের আলেমগন সচেতনভাবে অথবা কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বলছেন, মুসলিমদের এখন খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা জরুরী নয়। আমরা ক্বিয়ামতের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি। ক্বিয়ামতের ছোট নির্দশনসমূহ সুস্পষ্ট। বড় নিদর্শনসমূহ আসন্ন। অনেক আলেম ইমাম মাহদীর জন্ম হয়ে গেছে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চটকদার কথা বলে ঝড় তুলছেন। উম্মাহ’র অবনমন যেহেতু তলানীতে এসে পৌছেছে সেহেতু গোটা উম্মাহকে পূর্ণজাগরিত করার চিন্তা কল্পনাবিলাস মাত্র। জালিম শাসককে জবাবদিহী করা নয়, বরং ব্যক্তিগত আমলের মাধ্যমে ফিতনার এ সময়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন করাই শরী’আহগত প্রাধান্য। ইমাম মাহদী অথবা ঈসা ইবনে মারিয়াম এসে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করবেন এবং দাজ্জালকে হত্যা করে এর ফিতনা থেকে মুসলিমদের সুরক্ষা দিবেন। কিয়ামতের ছোট ও বড় নিদর্শন, ইমাম মাহদী ও ঈসা (আ)-এর আগমন সর্ম্পকিত রাসূল (সা) এর ভবিষ্যতবাণীমূলক আহাদ হাদীসসমূহকে তারা দলিল হিসেবে দেখিয়ে থাকে। অনেক মুসলিম এসব আলেমদের বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ হিসেবে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে ফেলেছে এবং অন্য সব ধর্মের মত ইসলামকেও তাদের জন্য আচরণ সর্বস্ব ধর্মে পরিণত করেছে। মুসলিমদের জন্য ইসলামকে জীবনাদর্শ থেকে ধর্মে রূপান্তরিত করে দেয়া কাফেরদের সুগভীর ষড়যন্ত্রের সফলতার ঈঙ্গিত বহন করে। আর ফিকহের দৃষ্টিতে ভবিষ্যত বাণীমূলক আহাদ হাদীস থেকে মুসলিমদের হুকুম শরী’আহ আসে না, বরং অণুপ্রেরণা আসতে পারে। এটি ফিকহের বাস্তবতা উপলদ্ধি করার ক্ষেত্রে অপরিপক্কতা অথবা সচেতন অবহেলা।
ইতিহাস স্বাক্ষী উম্মাহ’র এই ভিন্ন অবস্থান ও কর্মপদ্ধতি সুনিশ্চিত গন্তব্য অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা নয়। এর জন্য ইসলাম ও এর ইতিহাসকে একটি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে। যেমন: নুহ (আ) যখন তার কওমের লোকদের বললেন, অতি দ্রুত একটি বড় প্লাবন হবে এবং আমি একটি বিশাল আকারের কিস্তি (নৌকা) তৈরি করছি এবং লোকদের নির্দিষ্ট দিনে সেই কিস্তিতে উঠে পড়া উচিত। একথা শুনে তার কওমের সব লোকেরা কি বিশ্বাস করেছিল? অবশ্যই না। এমনকি তার পরিবারের লোকেরাই এটি নিয়ে বিদ্রুপ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল নুহ (আ) এর কথা অনুযায়ী সুনিশ্চিতভাবে মহাপ্লাবন সংঘটিত হয়েছিল এবং অধিকাংশ লোক নবী নুহ (আ) এর স্রষ্টা প্রদত্ত ভবিষ্যতদ্বাণী উপলদ্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একই কথা মহাবীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবী (রহ) এর জেরুজালেম পূনরুদ্ধার অভিযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সেসময় উম্মাহ’র অবনমন এমন এক পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল যে, সাধারণ মুসলিম তো বটেই, আলেমগন পর্যন্ত জেরুজালেম অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রুপ করত। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা’র ইচ্ছায় মহাবীর সালাহউদ্দিন আইয়ূবী একটি অসম যুদ্ধে Crusade -দের পরাজিত করে জেরুজালেম পূণরুদ্ধার করেছিলেন এবং ইতিহাস এগিয়ে গিয়েছিল এক সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে। এভাবে ইসলামের ইতিহাস বার বার Human Perception কে ভুল প্রমাণ করে সুনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। ইতিহাস সেদিকে ধাবিত হবে যেদিকের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা একে পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছেন। Pragmatic Human Perception ইতিহাসের টেকসই ভীত রচনা করে না, বরং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ইচ্ছা ও পরিকল্পনা এর গন্তব্য ঠিক করে দেয়।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘ইসলাম অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল এবং অচিরেই তা আবার অপরিচিত অবস্থায় ফিরে আসবে, সুতরাং অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।’ তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কারা এই অপরিচিত ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা)?’ তিনি (সা) বললেন, ‘ওরা তারা যারা মানুষ আমার সুন্নাহকে নষ্ট করে দিলে সেটাকে বিশুদ্ধ করবে।’ অন্য এক বর্ণণায় আছে, ‘তারা হচ্ছে ওরা যারা মানুষ খারাপ হয়ে যাওয়ার পর তাদেরকে ঠিক করবে।’ (তাবারানী)
অন্য এক হাদীসে রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,
“শেষ বিচারের দিন এমন কিছু লোককে উপস্থিত করা হবে যাদের নূর হবে সূর্যের মতো।” আবু বকর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তারা কি আমরা, ইয়া রাসূলুলাহ (সা)?’ তিনি বললেন, “না তোমাদের জন্য বিশাল পুরষ্কার রয়েছে আর তারা হচ্ছে কিছু সংখ্যক দরিদ্র দেশত্যাগী যারা উত্থিত হবে পৃথিবীর সব অঞ্চল থেকে।” তারপর তিনি (সা) বললেন, “কল্যান হোক অপরিচিতদের (তিনবার)।” জিজ্ঞেস করা হলো, ‘কারা সেই অপরিচিতরা?’ তিনি (সা) বললেন, “তারা হবে অনেক খারাপ লোকের মাঝে অল্পসংখ্যক সৎ লোক। তাদের মান্যকারীর চেয়ে তাদের অমান্যকারীদের সংখ্যা বেশী হবে।” (তাবারানী)
রাসূলুলাহ্ (সা) বলেন,
“আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা আলাহ্’র হুকুমের উপর অটল থাকবে। যারা তাদের সাহায্য করা পরিত্যাগ করবে অথবা তাদের বিরোধীতা করবে তারা তাদের কোনই ক্ষতি করতে পারবেনা। এ অবস্থায় আলাহ্’র নির্দেশ এসে যাবে এবং তারা মানুষের (বিরোধীদের) উপর বিজয়ী হবে।” (মুসলিম)
Clash of Civilization এবং সুনিশ্চিত গন্তব্য…
বিশ্ব এবং মুসলিম উম্মাহ আজকে Clash of Civilization এর যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিপত্তিশালী এবং বৈশ্বিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদ এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রবিহীন ইসলামিক জীবনাদর্শ। তাছাড়া তাদের রয়েছে বিশ্বব্যাপী জালের মত ছড়িয়ে থাকা শক্তিশালী প্রচারমাধ্যম- যা মানুষের বেডরুম পর্যন্ত পৌছে গেছে। এসব প্রচারমাধ্যম হল মগজধোলাই ও জনমত গঠনের প্রকৃষ্ট হাতিয়ার। এটি হল দুই সভ্যতার অসম দ্বন্দ। এই অসম দ্বন্দ উম্মাহ’র একাংশের মধ্যে হীনমন্যতার জন্ম দিয়েছে। কিন্তু উম্মাহ’র ধারণা (Perception) যাই হোক অথবা অধ্যাপক হান্টিংটন যাই বলুন না কেন এই দ্বন্দের অবসান হবে একটি সভ্যতার সুনিশ্চিত বিজয় ও অপর সভ্যতার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। এ যেন কলোসিয়ামে গ্লাডিয়েটরদের নিষ্ঠূর খেলার মত। এখানে বাস্তবতার প্রকৃত উপলদ্ধি ও আলোকিত চিন্তা হল, অসম দ্বন্দে ইসলাম ক্রমশই শক্তিশালী হচ্ছে এবং পুঁজিবাদ তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব হারিয়ে উন্মাদের মত শক্তি প্রয়োগ করে টিকে থাকতে চাইছে। ইসলামী জীবনাদর্শের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ব্যাপারে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদনের মাধ্যমে বারবার এই আভাস দিচ্ছে। তাদের শাসকদের কথা থেকেও এ বিষয়টি সুস্পষ্ট। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাবলু বুশ জুনিয়র ২০০১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এক ভাষণে বলে,
“The militants believe that controlling one country will rally the Muslim masses, enabling them to overthrow all moderate governments in the region and establish a radical Islamic empire that spans from Spain to Indonesia.”
কাফেরদের নেতা যাই বলুক না কেন- সহিহ মুসলিম, আবু দাউদ, আত তিরমিযী, ইবনে মাজাহ এবং মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সুবাহানাহু তা’আলা আমাকে পুরো পৃথিবী এক করে দেখালেন, সুতরাং আমি এর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত দেখতে পেলাম। অবশ্যই আমার উম্মতের কতৃত্ব সেসব জায়গায় পৌছে যাবে যেসব জায়গা আমাকে দেখানো হয়েছে।’
নব্য উপনিবেশবাদ, সাইক পিকো চুক্তি, বেলফার চুক্তির মাধ্যমে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, ব্যাপক প্রভাবশালী পশ্চিমা মিডিয়ার মগজ ধোলাই, শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষকীকরণ, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের War on terror নামক Crusade, মুসলিম ভূমিসমূহ জবরদখল করা, তাদের সম্পদ লুট করা, মুসলিমদের উপর ইতিহাসের ভয়াবহতম নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো, আইসিস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খিলাফতের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা, নিষ্ঠাবান ইসলামিক দলসমূহকে নিষিদ্ধ করা, ইসলামের দাওয়াত বহনকারীদের উপর বর্বর নির্যাতন পরিচালনা ও ক্ষেত্রবিশেষে তাদের হত্যা করা, পর্ণোগ্রাফি, মাদ্রকদ্রব্য প্রভৃতি ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দিয়ে মুসলিম উম্মাহ এগিয়ে চলেছে এক সুনিশ্চিত গন্তব্য- দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদাহ প্রতিষ্ঠার দিকে। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
‘নিশ্চয়ই যারা কাফের তারা মানুষকে আল্লাহ’র পথ থেকে ফিরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে ধনসম্পদ ব্যয় করে, তারা তাদের ধনসম্পদ ব্যয় করতেই থাকবে, অতপর ওটাই শেষ পর্যন্ত তাদের দুঃখ ও আফসোসের কারণ হবে এবং তারা পরাভূতও হবে। আর যারা কুফরী করে তাদেরকে জাহান্নামে একত্রিত করা হবে।’ (সূরা আনফাল:৩৫)
লেখক: রাফীম আহমেদ


















