তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২মুসলিম উম্মাহ’র উপর পশ্চিমা উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরূপ প্রভাব

কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়া কী?
কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়া বুঝতে হলে আমাদেরকে চিন্তা কাকে বলে তা আগে বুঝতে হবে। মস্তিষ্কে সংরক্ষিত পূর্ব ধারণার ভিত্তিতে মানুষের ইন্দ্রিয়ের (নাক, কান,ত্বক, জিহ্বা, চোখ) মাধ্যমে কোন বাস্তবতা সর্ম্পকে গৃহীত তথ্যাদি যাচাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াই হল চিন্তা। অর্থাৎ চিন্তার জন্য চারটি অপরিহার্য উপাদান আবশ্যক: বাস্তবতা, পঞ্চইন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক ও পূর্বধারণা (Previous Information)। কালচারিং বা চিন্তা বিকাশ প্রক্রিয়ায় আমরা যা শিখি তা মূলত পূর্বধারণা (Previous Information) হিসেবে মস্তিষ্কে সংরক্ষিত থাকে এবং তা পরবর্তীতে নতুন কোন বাস্তবতা সর্ম্পকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাজে লাগে। ইসলামে তাফসীর, হাদীসশাস্ত্র, ফিকহ ইত্যাদি এর কালচার। এছাড়া পুনর্জাগরণের জন্য নির্দিষ্ট কালচার তথা হালাকাহ, প্রশ্ন-উত্তর পর্ব প্রভৃতি এর অপরিহার্য অংশ। গান, নাচ, নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য ইত্যাদি পুজিবাদী কালচারের উপকরণ।
১. পশ্চিমা উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ারসমূহ:
১.১. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ: পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ সবই এর আক্বীদা ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে উঠা মানুষের সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ বহিপ্রকাশ। সেকারণে এ বিভাগসমূহের অধীন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের প্রকাশ ঘটায় ও প্রচার করে।
১.২. শিক্ষাব্যবস্থা: পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়ার পর এর স্থায়ীত্ব সুনিশ্চিত ও ইসলামের পূণরুত্থানের পথকে রুদ্ধ করতে শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে উম্মাহকে কালচার করার জন্য ইসলামবিদ্বেষী ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করে। শায়খ তাকিউদ্দিন আন নাবাহানি (র) তাকাত্তুল আল হিযবী বইয়ে উল্লেখ করেন যে,(উপনিবেশবাদীরা বস্তু থেকে স্পিরিটকে পৃথক করা বা রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করার জীবন সর্ম্পকিত দৃষ্টিভঙ্গি নির্ভর দৃঢ় দর্শনের উপর ভিত্তি করে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করে। উপনিবেশবাদীরা তাদের ব্যক্তিত্বগুলোকে আমাদের কালচারিং একমাত্র ভিত্তি করে। তারা তাদের হাদারাহ, ধারণা, ব্যক্তি, ইতিহাস ও লাইফস্টাইলকে চিন্তার প্রাথমিক উৎসে পরিণত করে। এটা যেন যথেষ্ট ছিল না, উপনিবেশবাদীরা উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাদের ব্যক্তিত্বসমূহকে পরিবর্তিত করে আমাদের জন্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করে। তারা সচেতনভাবে উপনিবেশবাদের প্রকৃত চেহারা গোপন করে কিছু দিক ও ধারণা পছন্দ করে ও গুরুত্বারোপ করে। তারা পাঠ্যক্রমের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করে যাতে করে এগুলো সাধারণ লক্ষ্য থেকে সামান্যতম বিচ্যুত না হয়। একারণে মুসলিমগণ ভুল চিন্তুা দ্বারা বিকশিত হচ্ছে যেখানে আমাদেরকে চিন্তার প্রক্রিয়া শেখানো হয় না, বরং শেখানো হয় কীভাবে অন্যরা চিন্তা করে। এর কারণ হল আমাদের পরিবেশ, ব্যক্তিত্ব, ইতিহাস থেকে চিন্তাকে আলাদা করা হয়েছে এবং এগুলো আমাদের আদর্শ থেকে উৎসারিত নয়। সেকারণে আমরা এমন ব্যক্তিতে পরিণত হলাম যারা জনবিচ্ছিন্ন এবং পরিস্থিতি সর্ম্পকে অসচেতন।) এর প্রকৃষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায় উপমহাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত ম্যাকলে কমিশন রিপোর্টের শেষের দিকে এই ইংরেজ শিক্ষাবিদ উল্লেখ করে যে, ‘এ কমিশন বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের লোকেরা গায়ের রঙের দিক থেকে হবে ভারতীয় কিন্তু চিন্তাচেতনায় হবে বৃটিশ।’
১.৩. রাজনৈতিক দলসমূহ: উপনিবেশবাদীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মুসলিম ভূমিসমূহতে পশ্চিমা চিন্তাধারার ধারক ও বাহক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এর নেতৃবৃন্দ দোসর (এজেন্ট) হিসেবে তাদের স্বার্থের অনুকূলে এবং ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। এসব দলগুলো জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র প্রভৃতি চিন্তার দিকে উম্মাহকে ক্রমাগত আহ্বান করছে। দৃষ্টান্ত হিসেব বলা যায় ১৮৮৫ সালে বৃটিশ শিক্ষাবিদ অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউম ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে কথা বলার জন্য দেশপ্রেমে উদ্ধুদ্ধ কংগ্রেস পার্টি প্রতিষ্ঠা করে। ওসমানীয় খিলাফতকে ধ্বংস করার জন্য আরব ও তুর্কীদের জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে উপনিবেশবাদীরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যুবসংঘ, পাঠাগার, বিজ্ঞান ক্লাব প্রভৃতির মাধ্যমে উম্মাহকে কালচার করেছে। দূর্ভাগ্যবশত এসব ভুল চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দলসমূহ এখনও সব মুসলিম ভূমিতে উপনিবেশবাদীদের মদদে কাজ করে চলেছে।
১.৪. বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ: পুঁজিবাদে রাজনীতি অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সেকারণে কাঁচামাল সংগ্রহ, জ্বালানীর অবিরত সরবরাহ, সস্তা শ্রম ও বাজারের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উপনিবেশ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একারণে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিজ্ঞাপন, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপোনসিবিলিটি (CSR) ইত্যাদির নামে উম্মাহ’র বিশেষত যুবসমাজের ইসলামি চেতনাকে ধ্বংস করে পশ্চিমা চিন্তা (যেমন: জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেম, ভোগ) ও লাইফস্টাইলকে (যেমন: ফ্রি মিক্সিং) বিস্তৃত করছে।
১.৫. মিডিয়া: প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা ও প্রভাব তৈরি করার সক্ষমতার কারণে আমাদের জীবনে ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব অনস্বীকার্য। এসব মিডিয়া ব্যবহার করে উপনিবেশবাদী, দালাল শাসক, উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবি, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মীরা সেক্স ও ভায়োলেন্সনির্ভর চলচ্চিত্র, নাটক, বিজ্ঞাপন, টক শো, শিক্ষা ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, প্রামাণ্যচিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে উম্মাহর মধ্যে পশ্চিমা আদর্শিক চিন্তা ও জীবনাচরণের বিস্তার করে চলেছে। অগভীর চিন্তার অধিকারী হওয়ায় অনুুকরণপ্রিয় উম্মাহ এসব দ্বারা দারুণভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
২. পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কুপ্রভাব:
একটি আদর্শিক জাতি সাধারণত অন্য কোন জাতির উপর শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের পর কালচারিং এর মাধ্যমে সে আদর্শের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব জনগনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করে। আর তা না করলে শাসনব্যবস্থা অপসারিত হওয়ার পর সে জাতি পূর্বাবস্থায় ফেরত যায়। এমনটি ঘটেছিল আন্দালুসিয়া ও বলকান অঞ্চলে ইসলামি শাসনব্যবস্থা অবসানের পর। পুঁজিবাদী পশ্চিমারা মুসলিম ভূমিসমূহ দখলের পর তাদের ঘৃণ্য শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়নের পর এর স্থায়ীত্ব সুনিশ্চিত করতে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে কালচারিং করে আসছে ও পুঁজিবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে জনগনের চিন্তার ক্ষেত্রে পূর্বধারণা করার অপচেষ্টা এখন অবধি অব্যাহত রেখেছে।
২.১. ইসলামি আক্বীদার বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা:
আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, কিয়ামত দিবস, ভাগ্যের ভাল মন্দ, আখিরাত এই সাতটি মৌলিক বিষয়ের উপর বিশ্বাসকে আক্বীদা বলা হয়। পশ্চিমারা বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে বিশেষ করে পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে এসব মৌলিক বিশ্বাসের বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছে। ডারউইনিজম বা বিবর্তনবাদের মাধ্যমে স্রষ্টার ধারণা সর্ম্পকে অবিশ্বাস বা সন্দেহ সৃষ্টি করা, রিয্ক বা আজলের সাথে মানুষের কাজকে সর্ম্পকিত করে এর সঠিক ধারণা থেকে উম্মাহকে সরিয়ে নিয়ে আসার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। স্রষ্টার ধারণার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস বা সন্দেহ সৃষ্টিতে খুব বেশী সফল না হলেও ক্বাদার ভাল মন্দের বিষয়ে উম্মাহ আজ দারুণভাবে বিভ্রান্ত।
২.২ জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির উপর প্রভাব:
‘আমি জ্বীন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি কেবলমাত্র আমার ইবাদতের জন্য’। (আল কোরআন)
এ আয়াতের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানুষকে প্রেরণের উদ্দেশ্য সর্ম্পকে ধারণা পাওয়া যায়। সেকারণে মানুষের জীবনের সব কাজ এ উদ্দেশ্যকে ঘিরেই আবর্তিত হওয়া উচিত। কিন্তু পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে পৃথিবীতে প্রেরণের উদ্দেশ্য মুসলিম উম্মাহকে আজ সার্বক্ষণিকভাবে তাড়িত করে না। চিরস্থায়ী আখেরাতের সাফল্য নয়, বরং ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সাফল্যই আজ তার কাছে মুখ্য।
২.৩. চিন্তার পদ্ধতি হিসেবে বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি গ্রহণ করা:
চিন্তার তিনটি পদ্ধতি রয়েছে: বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational), যৌক্তিক (Logical), বৈজ্ঞানিক (Scientific)। আব্বাসীয় খিলাফতের সময়ে আলেমগণের ইসলামি চিন্তার প্রক্রিয়ায় গ্রীকদের যৌক্তিক চিন্তাপদ্ধতির অনুপ্রবেশ ঘটে-যা এখন অবধি বলবৎ রয়েছে। আর ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর থেকে প্রথমে মিশনারীদের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে মুসলিম ভূমিসমূহ দখল উত্তর শাসনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপকরণের মাধ্যমে পশ্চিমারা মুসলিমদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তার পদ্ধতিকে বিকশিত করেছে। আমাদের জীবনে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তার জন্য স্ব স্ব ক্ষেত্র থাকা সত্ত্বেও ইসলামিক আক্বীদা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক (Rational) চিন্তা পদ্ধতিকে মুসলিমদের গুরুত্ব দেয়া উচিত। ইসলামিক আক্বীদা ও শরী’আহ অনুধাবনে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তা পদ্ধতি অকার্যকর এবং অপ্রয়োজনীয়ও বটে। কিন্তু সাধারণ মুসলিম থেকে শুরু করে অনেক আলেমগণ ইসলামকে বুঝার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক চিন্তা পদ্ধতি গ্রহণ করছে। বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতিকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করার মাধ্যমে পশ্চিমারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বই জাহির করতে চায়। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে মুসলিম উম্মাহ আজকে এ সত্যটুকু বুঝতে অক্ষম হচ্ছে।
২.৪. চিন্তার গুনগত মানের অবনমন:
গুনগত মানের বিচারে চিন্তা তিনধরনের: অগভীর (Shallow), গভীর (Deep), আলোকিত (Enlightened)। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে মুসলিম উম্মাহ ইসলামসহ জীবনের বিভিন্নক্ষেত্রে গভীর (Deep) ও আলোকিত (Enlightened) চিন্তা প্রয়োগ করছে না, বরং অগভীর (Shallow) চিন্তা উম্মাহ থেকে শুরু করে আলেমগণের মধ্যে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। চিন্তা ও কর্মে কাফেরদের অন্ধ অনুকরণই এর নগ্ন বহিপ্রকাশ।
২.৫. প্রাথমিক মূল্যবোধ পরিবর্তন:
মানুষ যে কোন কাজের পেছনে চার ধরনের মূল্যবোধ অন্বেষণ করে। এ মূল্যবোধ হল যে কোন কাজের পেছনে তাৎক্ষণিক লক্ষ্য। এগুলো হল: বস্তুগত, মানবিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক মূল্যবোধ। ইসলামে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ প্রাথমিক এবং অন্যান্যগুলোর তুলনায় প্রণিধানযোগ্য। অপরদিকে পুজিবাদে অন্যান্য তিনটির তুলনায় বস্তুগত মূল্যবোধ প্রাথমিক বা অগ্রগণ্য। পশ্চিমা পুজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে আধ্যাত্মিক নয়, বরং বস্তুগত মূল্যবোধ মুসলিম উম্মাহ’র কাছে আজ প্রণিধানযোগ্য হয়ে উঠেছে।
২.৬. সুখ (Happiness) সর্ম্পকিত ধারণার পরিবর্তন:
পুজিবাদী ব্যবস্থায় ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তিকেই (Pleasure) সুখ (Happiness) মনে করা হয়। কিন্তু ইসলামে ‘সুখ’ (Happiness) একটি ধারণা বা concept এবং তা হল আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা’র সন্তুষ্টি। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘তুমি উপরের (বৈষয়িকভাবে ভাল অবস্থান) দিকে তাকিও না, বরং নীচের (বৈষয়িকভাবে অপেক্ষাকৃত মন্দ অবস্থানে) দিকে তাকাও, তবেই আল্লাহ’র নেয়ামত সর্ম্পকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারবে।’ মূলত: এ চিন্তাই মানুষকে সুখের সত্যিকারের অনুভূতি দিতে পারে। পশ্চিমা পুঁজিবাদী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কারণে উম্মাহ কাফেরদের মত ইন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তি (Pleasure) বা ভোগকে সুখ (Happiness) ভাবছে; খেলাধুলা, সেক্স ও ভায়োলেন্সনির্ভর চলচ্চিত্র, গান, নাটক, সাহিত্য ইত্যাদির মাধ্যমে বিনোদিত হওয়াকে নিজের অধিকার মনে করছে।
২.৭. ইসলামি জীবনাদর্শ সর্ম্পকে আত্মবিশ্বাসহীনতা:
ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক হুকুমসমূহ (পর্দা, জিহাদ, বহুবিবাহ, ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা) সর্ম্পকে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচারণায় প্রভাবিত, সাংস্কৃতিক দখলদারিত্বের শিকার, ফিকরাহ ত্বরীকার ব্যাপারে যথাযথ জ্ঞানহীন উম্মাহ’র আলেম ও সাধারণ মুসলিমগণ ইসলামী জীবনাদর্শের বিষয়ে হীনমন্যতায় ভুগছেন। পরাজিত মানসিকতা থেকেই তারা তাদাররুজ (gradualism), ব্যাংকিং ও বীমা ব্যবস্থার ইসলামীকীকরণ, পরস্পর বিপরীতধর্মী ইসলাম ও গণতন্ত্রের মধ্যে মধুচন্দ্রিমাময় সর্ম্পক আবিষ্কার করছে।
২.৮. পূর্ণজাগরণের সঠিক পথ অনুধাবন করতে না পারা:
এটি সবাই বুঝতে পারছে যে, উম্মাহ’র অবনমন ঘটেছে। কিন্তু পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কুপ্রভাবের দরুণ এ অবনমনের প্রকৃতি ও তা থেকে উত্তরণের উপায় বাতলানো সম্ভবপর হচ্ছে না। উম্মাহ’র অবনমনের সত্যিকারের কারণ তার বুদ্ধিবৃত্তিক অধপতন এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান খিলাফতের অনুপস্থিতি এবং এর থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন এমন একটি আদর্শিক রাজনৈতিক দল যা বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হওয়া উম্মাহ’র অভিভাবকতুল্য অধিকাংশ আলেমগণ ব্যক্তি মুসলিমের নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পদস্খলনকেই অবনমনের কারণ ভাবছেন এবং নৈতিক বা আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি বা ইসলাহকে এর সমাধান মনে করছেন। অধিকাংশ আলেমগণ ইসলামকে ফিকরাহ ও ত্বরীকার সমষ্টি হিসেবে দেখেন না। বিধায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি যে ইসলামের মধ্যেই রয়েছে এ ব্যাপারে তারা ওয়াকিবহাল নন।
২.৯. কাজের ভিত্তি পরিবর্তন:
একজন প্রকৃত মুসলিমের কাজের ভিত্তি হল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া ত’আলা’র সন্তুষ্টি অর্জন। শরী’আহ সংজ্ঞায়িত খায়ের (কল্যাণকর) শার্ (অকল্যাণকর) বা হালাল হারাম- ই তার জন্য হুসন (নৈতিক) কুব্হ (অনৈতিক) হওয়া উচিত। এখানে বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া বা মানব মস্তিষ্ক ব্যবহারের কোন সুযোগ নেই। পুজিবাদে কাজের ভিত্তি হল লাভ বা Benefit । কিন্তু পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা ও অন্যান্য উপকরন ব্যবহার করে কালচারিং করার কারণে উম্মাহ’র কাজের ভিত্তি পরিবর্তিত হয়ে গেছে। উম্মাহ হুসন কুব্হ নির্ধারণ এর ক্ষেত্রে পুজিবাদে কাজের ভিত্তি-লাভ বা Benefit কে গ্রহণ করছে।
উপসংহার:
পশ্চিমারা মুসলিম ভূমিসমূহ দখল করে নেয়ার পর তাদের ব্যবস্থাসমূহ বাস্তবায়ন করে বিভিন্ন উপকরণের মাধ্যমে উম্মাহকে সাফল্যজনকভাবে কালচার করতে সমর্থ হয়েছে। কালচারিং এর মাধ্যমে ভূমির উপনিবেশবাদ থেকে মস্তিষ্কের উপনিবেশবাদে সফল হওয়ায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সময়ে তারা প্রত্যক্ষ উপনিবেশবাদ থেকে সফলভাবে Neocolonialism বা নব্য উপনিবেশবাদে রূপান্তরিত হতে পেরেছে। কালচারিং এর কারণেই বৃটেন এখনও পৃথিবীর অনেক জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারছে; যদিও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এর অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তেরশ বছরের ইতিহাসে ইসলামী ভূমির যেসব অংশে খিলাফত রাষ্ট্র সফলভাবে উম্মাহকে ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বের মাধ্যমে কালচারিং করতে সমর্থ হয়েছিল সেসব অংশের মুসলিমগণ ইসলামকে ধারণ করার ক্ষেত্রে এখনও অপেক্ষাকৃত ভাল অবস্থানে আছে। তবে আশার কথা এই যে, কুফর দিয়ে কালচার করার ঘৃণ্য পশ্চিমা উপনিবেশবাদী অপচেষ্টা সত্ত্বেও উম্মাহ তার অর্ন্তনিহিত খায়ের, শক্তিশালী আক্বীদা ও আদর্শিক ইসলামি রাজনীতির কারণে আবার ইসলামের দিকে ব্যাপকভাবে ফিরে আসতে শুরু করেছে। উম্মাহ’র এই উত্তম প্রবণতাই অনতিদূর ভবিষ্যতে দ্বিতীয় খোলাফায়ে রাশেদার ভীত রচনা করবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন,
“তারা (কাফের) চায় মুখের ফুৎকারে আল্লাহ’র নূরকে নিভিয়ে দিতে, কিন্তু তিনি তাঁর নূরকে প্রজ্জলিত রাখবেনই; যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।’’ (সূরা আস-সফ: ৮)
বন্যা ও জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও খিলাফত রাষ্ট্রের আকাংখিত পরিবর্তন

দুর্যোগ-পীড়িত অসহায় মানুষের দুর্দশা সরকার কর্তৃক সম্পূর্ণরূপে অবহেলিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সপ্তাহাধিককাল ধরে প্রায় সাত লক্ষ মানুষ নতুন করে বন্যা কবলিত হচ্ছে এবং কোন ধরনের সরকারি সাহায্য না পৌঁছার কারণে তারা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছে। খাদ্য, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকটের পাশাপাশি বন্যা কবলিত মানুষেরা ইতিমধ্যেই পানিবাহিত মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে।
এসব দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ও আক্ষেপের সময়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের কাজে সরকারের ব্যর্থতা সম্পর্কে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া কান্ডজ্ঞানহীন মন্তব্য করে যাচ্ছে। রাজধানীতে আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে মায়া বলেছে যে: “ত্রাণ-সামগ্রীর কোন স্বল্পতা নেই”। যখন এসব দুর্নীতিগ্রস্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদগণ আমাদের জীবনের প্রতিদিনকার সংগ্রাম ও ভোগান্তিকে প্রতিনিয়তই উপহাস করে, তখন বিপদকালে তাদের কাছ থেকে আমরা এর চেয়েও খারাপ কিছুর আশংকা করতে পারি।
সত্যই, ত্রাণ-সামগ্রীর কোন অপ্রতুলতা ছিল না, কিন্তু তা বন্যা কবলিত মানুষের জন্য নয় বরং কেবলমাত্র তাদের দলীয় কর্মীদের লুন্ঠনের জন্য! এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কেবলমাত্র শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুগামী লোকদেরই সযত্নে লালন করে। এটা আশ্চর্যজনক নয় যে, যখন ভারত প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে তার ব্যারেজগুলো খুলে দেয় যার দরুণ বাংলাদেশে বন্যার সৃষ্টি হয়, তখন আমাদের দেশের “মেরুদন্ডহীন রাজনীতিবিদগণ” ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। বরং এসব ভীরু ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদগণ ক্ষমতায় থাকার জন্য এই শত্রুরাষ্ট্রের প্রতি আজ্ঞাবহ থাকাকেই অধিকতর পছন্দনীয় মনে করে।
বন্যার পাশাপাশি ঢাকা ও বিশেষ করে চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারণে দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে। মেয়র নির্বাচনের পূর্বের অনেক রঙিন প্রতিশ্রুতি এখন শহরের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ের পানির নিচে ডুবন্ত অবস্থায়। উন্নয়নের জোয়ারে নৌকা চড়ে জনগণ আজ অফিস করতে যায়! শহরের নালা-গুলো আবর্জনায় অবরুদ্ধ। বৃষ্টির পানি মিশে সেসব ময়লা-আবর্জনা সড়কে ও অলি-গলিতে ছড়িয়ে পড়ছে, জন্ম দিচ্ছে বিভিন্ন প্রকার রোগ-ব্যাধি।
আমরা কখনই এই সীমাহীন লোভ ও দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবস্থা হতে নিষ্ঠাবান রাজনীতিবিদ জন্ম হওয়ার আশা করতে পারি না। এসব রাজনীতিবিদদের না আছে বন্যা সংক্রান্ত সমস্যা উৎস থেকে প্রতিরোধ করার মতো সাহস, অর্থাৎ চিরতরে ভারতের ধৃষ্টতার অবসান ঘটানো; কিংবা না আছে দুর্যোগ, জলাবদ্ধতার মোকাবেলা করার মতো সক্ষমতা।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র একটি যথাযথ বন্যা ও জলাবদ্ধতা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাস্তবায়িত করতেও শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যদিওবা আমাদের দক্ষ পরিকল্পনাকারী, প্রকৌশলী ও লোকবলের কখনই অভাব ছিল না, তথাপি একটি নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের অভাবে তাদেরকে কাজে লাগানো যায়নি। ব্যর্থ গণতন্ত্রের দুর্নীতি এত বছরেও বাংলাদেশে একটি কার্যকর বন্যা প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি, না পেরেছে শহর হতে জলাবদ্ধতার নিরসন। তাই এখন যা প্রয়োজন তা হচ্ছে এই ব্যর্থ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মূলোৎপাটন, যেটা কেবলমাত্র জনগণের কষ্টের প্রতি উদাসীন অযোগ্য ও অসৎ রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্ম দেয়। এ মুহূর্তে জনগণের একমাত্র আশা এবং অবলম্বন হচ্ছে খিলাফত। নবুয়্যতের আদলের খিলাফতের নিষ্ঠাবান ও সাহসী নেতৃত্বের অধীনে শক্তিশালী ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছাই’ এদেশের জনগণের বহুল আকাঙ্খিত পরিবর্তন আনয়ন করতে সক্ষম হবে। আসন্ন দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্’ই পুনরায় এমন ধরনের নেতৃত্বের জন্ম দেবে যারা পূর্ববর্তী খলীফাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, যেসব খলীফারা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’কে এবং তাদের জনগণের জবাবদিহিতাকে ভয় করতেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“ইমাম (খলীফা) জনগণের উপর দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারি)
কোথায় সেই শাসক যে বলবে, ‘যদি কর্ণফুলির তীরে একটি বকরী পিছলে পড়ে তবে আমি জিজ্ঞাসিত হবো’!

গত কয়েকদিন পূর্বে আমরা দেখেছি চলমান বৃষ্টির ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। এছাড়াও পাহাড় ধ্বসে চট্টগ্রাম শহর ও এর পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি এলাকাতে বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সহ প্রায় শতাধিক লোক নিহত হয়েছে। এ দুর্যোগে নিহত সেনা কর্মকর্তাসহ সকলের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নালিল্লাহি রাজিউন।
হে মুসলিমগণ! আপনারা জানেন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় লক্ষাধিক জনগণ রয়েছে যারা বছরের পর বছর ধরে জলাবদ্ধতাপ্রবণ ও পাহাড়সংলগ্ন বিভিন্ন ঝুকিপূর্ণ এলাকাসমূহতে বসবাস করছেন। একটু লক্ষ্য করলে দেখব, জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট জটিলতা ও পাহাড়ধ্বসে মৃত্যুর ঘটনা নতুন কোন বিষয় নয়। প্রতি বছর পাহাড় ধ্বস ও অতি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার ফলে মৃত্যু হয় আর এবারও সেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হল শতাধিক প্রাণ। এ ব্যাপারে সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলে এ ধরণের মৃত্যুকে নেহাতই মৃত্যু বলা যাবে না বরং এটি হত্যাকাণ্ড/খুন। রাষ্ট্রের উদাসীনতা, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সদিচ্ছার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের কথাবার্তা এর প্রমাণ বহন করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বলছেন- “আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি, সচেতনতামূলক মাইকিং করেছি, এটা তো রিমোট কন্ট্রোল না যে যখন তখন পরিবর্তন করা যাবে”। ঠিক একই ভাবে কিছুদিন আগে যালিম হাসিনা ‘ঘুর্ণিঝড় মোরা’ পরবর্তী সময়ে বলেছিল-“ বিএনপি আমলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয়েছিল বেশি, আমাদের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ফলে ক্ষতি হয়নি”। দুর্যোগ নিয়ে এদেশের শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অধনস্তদের নানামুখী বিভ্রান্তিমূলক কথা বার্তা এটা প্রমাণ করে এরা জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীন এবং কেবলমাত্র রাজনৈতিক বড়াই করার জন্য সময়ে সময়ে তা ইস্যু হয়। এসব যালিম শাসকগোষ্ঠী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে ও জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা বলতে শুধুমাত্র আশ্রয় কেন্দ্রে প্রেরণ ও শুকনো খাবার প্রদান কে মনে করে। ফলস্বরূপ জনগণ এদের কথায় বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতেও অনীহা প্রকাশ করে। জনগনের সার্বিক নিরাপত্তা দিতে এসব গণতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠী ও ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ।
আল্লাহ্ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-
“মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ্ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।” [সূরা আর রুম- ৪১]
হে সম্মানিত মুসলিম উম্মাহ! এসব শাসকগোষ্ঠী বছরের পর বছরের ধরে জনগণের সাথে পরিষ্কার প্রতারণা করে চলেছে। জনগণের উন্নয়নের বিভিন্ন রঙিন প্রতিশ্রুতি নিয়ে তারা ক্ষমতায় আসে, কিন্ত ক্ষমতায় আরোহণের পর এরা কেবল এদের সম্পদের আখের গুছাতেই ব্যস্ত থাকে। একটু চিন্তা করে দেখুন, পাহাড় ধ্বসপ্রবণ ঝুকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে জনগণকে নিরাপত্তা প্রদাণ করার জন্য কি বছরের পর বছর সময় লাগে? আরো চিন্তা করে দেখুন, নদী দিয়ে ঘেরা চট্টগ্রামের মতো একটি শহরের জলাবদ্ধতা দুর করা কি খুব কষ্টকর কোনো কাজ? যেখানে কোটি টাকার ফ্লাইওভার প্রজেক্ট খুব সহজেই নির্মান হয়ে সেখানে জলাবদ্ধতা দূর করতে কিসের প্রতিবন্ধকতা! মূলত যেসব প্রজেক্টে এসব শাসকগোষ্ঠী ও এদের সাঙ্গপাঙ্গরা প্রচুর লাভবান হয় এবং জনগণকে বাহ্যিক উন্নয়ন দেখিয়ে আই-ওয়াশ করা যায় সেসব প্রজেক্টই খুব দ্রুত পালে হাওয়া পায়। আর জনগণের মূল সমস্যা আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে। অথচ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুরো শহরের মাঝখান দিয়ে পশ্চিম হতে পূর্ব প্রান্ত পর্যন্ত কালভার্ট ও মোটরচালিত পাইপ দিয়ে সহজেই জলাবদ্ধতা দুর করা যায়। এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট খাল পুনরুদ্ধারেরও বড় কোনো প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও মানসিক সক্ষমতা যা এসব শাসকগোষ্ঠীর নেই।
এ সক্ষমতা রয়েছে ইসলামি শাসনব্যবস্থার। আমরা দেখেছি মদীনায় ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবার পর মদীনার শাসক হিসেবে সর্বপ্রথম যে কাজগুলো রাসূলুল্লাহ (সা) করেছিলেন তা ছিল জলাবদ্ধতা নিরসন। এছাড়াও আমরা দেখেছি উমর (রা)-এর মতো শাসক যিনি (আমাদের পার্বত্য অঞ্চলের মতো) তৎকালীন সময়ের খিলাফত রাষ্ট্রের সীমানা অঞ্চল তথা ইরাকের ব্যাপারে বলেছিলেন, “যদি ফোরাত নদীর তীরে একটি বকরীও পা পিছলে পড়ে তবে আমি উমর এ ব্যাপারে আল্লাহর কাছে জিজ্ঞাসিত হবো।” কোথায় সেই শাসক যে বলবে, ‘যদি কর্ণফুলির তীরে একটি বকরী পিছলে পড়ে তবে আমি জিজ্ঞাসিত হবো’! একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই এধরনের শাসনব্যবস্থা ও শাসক উপহার দিতে পারে।
হে উম্মতের সম্মানিত সেনাসদস্যবৃন্দ! জনগণের এ বিপদে নিজেদের জীবন বাজি রেখে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে আপনাদের জীবন দিয়েছেন। জনগণকে পাহাড় ধ্বস থেকে রক্ষা করতে যেভাবে জীবন বাজি রেখে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন ঠিক একইভাবে জনগণের উপর চেপে বসা গণতান্ত্রিক যুলুমের শাসন ও হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে ইসলামের ছায়াতলে এ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আপনাদের আর কত সময় লাগবে!
হে সেনা অফিসারগণ, আমরা আপনাদের উদাত্ত আহ্বান জানাই, আপনারা সে আহ্বানে সাড়া দিয়ে খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নুসরাহ প্রদান করুন। ফিরিয়ে আনুন সেই আকাঙ্ক্ষিত শাসনব্যবস্থা যা আপনাদের শক্তিশালী করবে এবং যাকে আপনারা শক্তিশালী করবেন। ফিরিয়ে আনুন ইসলামের ইতিহাসের সেইসব শক্তিশালী শাসকদের যাদের স্যালুট দিতে আপনাদের বুক গর্বে ভরে উঠবে। আল্লাহ আমাদের শীঘ্রই সেই সময় দেখার তৌফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“যারা আমার পথে সাধনায় আত্মনিয়োগ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার পথে পরিচালিত করব। নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের সাথে আছেন।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)
অধ্যায় ৫: নিয়োগকৃত ব্যক্তি বা শ্রমিকের কাজ

কাজের সংজ্ঞা
ভাড়া করার সাথে ভাড়াকৃত বস্তুর উপযোগ ব্যবহারের বিষয়টি সম্পর্কিত। একজন শ্রমিককে ভাড়া করার/নিয়োগ দেয়ার অর্থ হলো তার সামর্থ্যকে কাজে লাগানো। একজন শ্রমিককে নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে কাজটির প্রকৃতি, কাজের সময়কাল, পারিশ্রমিক ও শ্রমের পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কাজটি অজ্ঞাত যাতে না হয় সেজন্য কাজের প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিতে হবে, কেননা কাজ সম্পর্কে অজ্ঞ রেখে কোন ব্যক্তিকে নিয়োগ/ভাড়া করা অবৈধ (ফাসিদ)। কার্যকাল নির্ধারণ করাটাও জরুরি, অর্থাৎ সেটি কি দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক নাকি বাৎসরিক হবে। একইভাবে শ্রমিকের কাজের পারিশ্রমিকও সুনির্ধারিত হতে হবে। ইবনে মাসউদ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোন শ্রমিককে নিয়োগ দেয় তবে তাকে অবশ্যই তার পারিশ্রমিক জানাতে হবে” [আল-দারাকুন্তি কর্তৃক কান্জ আল-উম্মাল-তে বর্ণিত]। হয়েছে শ্রমিককে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হবে তা নির্ধারণ করে দেয়াও জরুরী। তদনুসারে, শ্রমিকের কাছ থেকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত কাজ দাবী করা অনুমোদিত নয়। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আল্লাহ্ কোন ব্যক্তির উপর তার সাধ্যের অতীত বোঝা চাপান না।”
[সূরা বাক্বারাহ্: ২৮৬]আবু হুরাইরাহ্ থেকে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) এ ব্যাপারে বলেন:
“আমি যদি তোমাকে কোন কিছুর আদেশ দেই, তবে তোমার পক্ষে যতদূর সম্ভব কর।”
শ্রমিককে কখনই তার স্বাভাবিক সামর্থ্যরে অতিরিক্ত কোন দায়িত্ব গ্রহণের জন্য বলা উচিত নয়। যেহেতু বাস্তবে সামর্থ্য পরিমাপ করা কঠিন, সেহেতু প্রতিদিনকার কর্মঘন্টা নির্দিষ্ট করে দেয়া সম্ভাব্য সবচেয়ে ভাল উপায়। এর পাশাপাশি কাজের প্রকৃতিও সঠিকভাবে বর্ণনা করতে হবে, যেমন: নরম বা শক্ত মাটি কাটা, ধাতব দ্রব্যাদি প্রস্তুতকরণ, বা পাথর কাটা। যে পরিমাণ শ্রম বিনিয়োগ করতে হবে সে সম্পর্কে একটি ধারনা প্রদান করতে হবে। সুতরাং কোন কাজকে এর ধরন, কার্যকাল, পারিশ্রমিক এবং ব্যয়কৃত শ্রমের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। যখন শারী’আহ্ একজন শ্রমিককে কোন কাজে নিয়োগের অনুমোদন দেয় তখন কাজটিকে ধরন, কার্যকাল, পারিশ্রমিক এবং ব্যয়কৃত শ্রমের ভিত্তিতে সংজ্ঞায়িত করার শর্ত জুড়ে দিয়েছে। কার্য সম্পাদনের জন্য পারিশ্রমিক হিসেবে শ্রমিক যা পায় তা হল তার ব্যয়কৃত শ্রমের বিনিময়ে অর্জিত সম্পত্তি।
কাজের ধরন
প্রত্যেক হালাল বা আইনগতভাবে বৈধ কাজের জন্য চুক্তি করা অনুমোদিত। যেমন: ব্যবসা, চাষাবাদ, কলকারখানার কাজ, সেবা বা প্রতিনিধিত্বের কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা। বিচারিক কাজে বাদী বা বিবাদীর বক্তব্য/প্রতিক্রিয়া প্রকাশ/জ্ঞাত করার জন্য, প্রমাণাদি সংগ্রহ করে বিচারককে প্রদান করার জন্য, অধিকার দাবী ও লোকদের মধ্যকার বিবাদ নিরসনের জন্য একজন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। এছাড়াও কূপ খনন, নির্মাণকাজ, গাড়ী বা উড়োজাহাজ চালানো, বই ছাপানো, মুসাফ নকল করা, যাত্রী বহন করা ইত্যাদি বৈধ কাজের জন্য যে কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা যেতে পারে।
একটি সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য, কিংবা বিশেষ ধরনের কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করা যায়। একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য কোন একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির সাথে যদি ভাড়ার চুক্তি করা হয়, যেমন: যদি নির্দিষ্ট একটি কাপড় সেলাই করার জন্য, অথবা বিশেষ একটি গাড়ী চালানোর জন্য খালিদ মুহাম্মদকে ভাড়া করে, তবে মুহাম্মদেরই কাজটি করা উচিত এবং সেটি করে দেয়ার জন্য তার জায়গায় অন্য কাউকে নিয়োগ দিতে পারবে না। যদি মুহাম্মদ অসুস্থ হয় বা কাজটি করতে অসমর্থ হয় তাহলে তার পরিবর্তে অন্য কেউ কাজটি করতে পারবে না, কারণ এক্ষেত্রে কাজটি সম্পাদন করার জন্য শ্রমিক সুনির্দিষ্ট। যদি ঐ নির্দিষ্ট পোষাকটি নষ্ট হয়ে যায় বা বিশেষ গাড়িটি ভেঙ্গে যায়, তাহলে মুহাম্মদ ঐ দু’টি ব্যতিত অন্য কোন কাজ করতে বাধ্য নয়, কারণ চুক্তিতে কাজের ধরন সুনির্ধারিত করে দেয়া হয়েছিল।
যাহোক, যদি কোন একজনের দায়িত্বে, কিংবা বিশেষ ধরনের শ্রমিক বা বিশেষ কাজের উপর ভিত্তি করে ভাড়ার চুক্তিটি করা হয় তবে হুকুম ভিন্ন হবে। এসব ক্ষেত্রে নিয়োগকৃত ব্যক্তি নিজেই কাজটি করতে পারে এবং তার পক্ষ হয়ে কাজ করার জন্য অন্য একজনকে নিয়োগও দিতে পারে। যদি সে অসুস্থ হয়, অথবা কাজটি করতে অসমর্থ হয় তবে কাজটি করে দেয়ার জন্য তার বদলে অন্য আরেকজনকে পাঠাতে বাধ্য থাকবে। নিয়োগ প্রদানকারী ব্যক্তির নির্দেশক্রমে চুক্তি অনুসারে সে তখন যেকোন গাড়ি চালনা, অথবা যেকোন পোশাক সেলাই করার ব্যাপারে দায়িত্বশীল হবে। কারণ, কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কোন একটি কাজ সম্পাদনের জন্য চুক্তি হয়নি, বরং নির্দিষ্ট ধরনের কাজ করার জন্য চুক্তি হয়েছে; সুতরাং চুক্তিতে উল্লেখিত ধরনের অন্তভর্‚ক্ত যে কোন কাজ করার ব্যাপারে নিয়োগকৃত ব্যক্তি বাধ্য থাকবে। এক্ষেত্রে এটির নির্দিষ্টতা চুক্তিতে উল্লেখিত কাজের ধরনের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং কাজটির নাম উল্লেখ করার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না, যা নিয়োগকৃত ব্যক্তিকে চুক্তিতে বর্ণিত কাজের ধরনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যেকোন কাজ করার স্বাধীনতা প্রদান করে।
কাজের ধরন সঠিকভাবে বর্ণনা করার মধ্যে কাজটি সম্পর্কে শ্রমিকের কাছে বর্ণনা প্রদান করাও অন্তভর্‚ক্ত, যাতে শ্রমিক তার শ্রমের ধরন সম্পর্কে ধারনা লাভ করতে পারে, যেমন: একজন প্রকৌশলীর কাজ। যে কাজটি সম্পাদন করতে হবে সেটার বিষয়ে এই বর্ণনায় উল্লেখ থাকতে হবে। যে প্রকৃতির শ্রম দিতে হবে সে ব্যাপারে এটি ধারনা দেয়, যেমন: একটি কূপ খনন করা। এরূপ বর্ণনার মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা এবং নামকরণের মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা একই অর্থ বহন করে। একারণে, কাজের বর্ণনা প্রদান করে, অথবা বিশেষভাবে নামকরণের মাধ্যমে কাজকে সংজ্ঞায়িত করা গ্রহণযোগ্য। অদৃশ্য হওয়া সত্ত্বেও বর্তমান ও বাস্তবের মতোই কোন একজনের দায়িত্বের আওতাভূক্ত হওয়ার জন্য এটি যথেষ্ট। সুতরাং, বিশেষভাবে সুনির্দিষ্ট নামের একজন প্রকৌশলীকে ভাড়া করা যেমন অনুমোদিত, তেমনি কাজের বর্ণনার মাধ্যমেও একজন প্রকৌশলীকে ভাড়া করা অনুমোদিত। একইভাবে কোন একটি নির্দিষ্ট জামা সেলাই করার জন্য একজন দর্জিকে ভাড়া করা যেমন অনুমোদিত, তেমনি নির্দিষ্ট বর্ণনার জামা সেলাই করার জন্য একজনকে ভাড়া করাও অনুমোদিত।
যদি কোন ব্যক্তি একটি কাজ করতে রাজী হয়, তবে সে অন্য আরেকজনকে তার চেয়ে কম পারিশ্রমিকে কাজটি সম্পাদন করতে দিতে পারে এবং এভাবে মুনাফা করতে পারে। এর কারণ হল, যে কোন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্য আরেকজনকে ভাড়া করা তার জন্য অনুমোদিত। দর্জি বা ছুতারের মতো ব্যবসায়ী যেমনিভাবে তার কাজ করে দেয়ার জন্য শ্রমিক ভাড়া করতে পারে, এবং তেমনিভাবে ঠিকাদাররা কোন কাজ করে দেয়ার ব্যাপারে নিজেদের চুক্তিবদ্ধ করার পরে সে কাজ সম্পাদনের জন্য অন্য শ্রমিকদেরকে ভাড়া করতে পারে যা তাদের জন্য অনুমোদিত, এক্ষেত্রে তারা তাদের কর্মচারীদেরকে কত টাকা পারিশ্রমিক দেয় তা বিবেচ্য বিষয় নয়; এটি একটি নির্দিষ্ট কাজ বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাউকে ভাড়া করা হিসেবেই বিবেচিত হবে। এধরনের সব শ্রমিক ব্যক্তি পর্যায়ের শ্রমিকের ধরনের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত, যা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত।
নিয়োগকৃত শ্রমিকদের পারিশ্রমিক থেকে কোন অংশ গ্রহণ করার শর্তে, অথবা তাদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিজেকে নিয়োগ করে তাদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ গ্রহণ করা কোন ব্যক্তির জন্য অনুমোদিত নয়। কারণ এতে করে সে শ্রমিকদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ অন্যায়ভাবে দখল করে। আবু সাঈদ আল-খুদরী হতে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “বন্টনের ক্ষেত্রে সাবধান হও”, “আমরা বলেছিলাম: “হে রাসূলুল্লাহ্ (সা), বন্টন কী?” তিনি (সা) বলেন: “লোকেরা কোন কিছুতে একমত হয়, কিন্তু সেটি হতে একটি অংশ কমিয়ে দেয়।” আতা হতে আরেকটি বর্ণনা এসেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “একদল লোকের উপর কারও নিয়ন্ত্রণ রয়েছে এবং এজন্য সে তাদের প্রাপ্য হতে নিয়ে নেয়।” সুতরাং, যদি একজন ঠিকাদার প্রতিদিন এক দিনার পারিশ্রমিকের বিনিময়ে এক ব্যক্তিকে একশজন শ্রমিক এনে দিতে বলে এবং কাজ শেষে প্রত্যেককে এক দিনারের চেয়ে কম করে প্রদান করে, তবে তা অনুমোদিত নয়। যে পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়ার ব্যাপারে সে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, সেটার সমপরিমাণই প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক হিসেবে বিবেচিত হবে। যদি নির্দিষ্ট এই পরিমাণ থেকে কোন কিছু নেয়া হয় তবে শ্রমিকদের অধিকার হতে সে কোন কিছু নিল। যদি সে পারিশ্রমিক উল্লেখ না করে একশ শ্রমিক এনে দেয়ার চুক্তি করে থাকে তবে শ্রমিকদেরকে চুক্তিকৃত পরিমাণের চেয়ে কম দিতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে সে ওয়াদাকৃত পরিমাণ থেকে হরাস করে না।
কাজের ধরনকে সংজ্ঞায়িত করার এটাও একটি শর্ত যে, এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে কাজ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা জন্মায় এবং নিয়োগের বিষয়টি একটি জ্ঞাত পরিমন্ডলে সমাপ্ত হয়। এর কারণ হল, অজ্ঞাত কাজের জন্য ভাড়া করা অবৈধ। সুতরাং যদি কেউ একজন শ্রমিককে এই বলে ভাড়া করে যে, দশ দিরহামের বিনিময়ে কিছু পণ্যের বাক্সকে মিশওে পৌঁছে দেবে, তবে তা অবৈধ হবে। এটিও বৈধ হবে যদি সে বলে যে, প্রতি টন বহনের জন্য এক দিনার করে দেয়ার শর্তে তাকে ভাড়া করা হয়েছে, কিংবা এক টন বহনের জন্য এক দিনার করে দেয়ার শর্তে তাকে ভাড়া করা হয়েছে এবং এর চেয়ে বেশি হলে তা হিসাব করা হবে। এটা ততক্ষণ পর্যন্ত বৈধ হবে যতক্ষণ পর্যন্ত সে এমন শব্দসমূহ ব্যবহার করে যা নির্দেশ করে যে তাকে সবগুলো বাক্স বহন করতে হবে। কিন্তু যদি সে সেগুলোকে এই শর্তে বহন করতে বলে যে, এক টনের জন্য এক দিনার দেয়া হবে এবং যা অতিরিক্ত হবে তা তদনুসারে হিসাব করা হবে, অর্থাৎ অবশিষ্টটির যতটুকু বহন করা হবে তা হিসাব করা হবে, তাহলে তা বৈধ হবে না, কারণ এক্ষেত্রে চুক্তির কিছু বিষয় অনির্ধারিত। তবে যদি সে তাকে প্রত্যেক টন এক দিনারের বিনিময়ে বহনের জন্য বলে থাকে তবে তা বৈধ হবে, এটা অনেকটা এরকম যে তার জন্য প্রতি ঘনমিটার পানি উত্তোলনের বিনিময়ে এক পয়সা করে দেয়ার শর্তে সে তাকে ভাড়া করেছে, যা অনুমেদিত। সুতরাং, এটি শর্ত যে নিয়োগ/ভাড়া করার বিষয়টি অবশ্যই একটি জ্ঞাত বিষয়ের উপর হতে হবে। এতে যদি অজ্ঞাত কিছু থেকে থাকে তবে নিয়োগটি অবৈধ হয়ে যাবে।
কাজের ব্যাপ্তিকাল
কিছু নিয়োগ/ভাড়ার ক্ষেত্রে, যে কাজের জন্য নিয়োগ/ভাড়া করা হচ্ছে তার ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ না করে ধরন উল্লেখ করা জরুরী, যেমন: সেলাই করা, নির্দিষ্ট গন্তব্যে গাড়ী চালনা করা। কিছু নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ উল্লেখ না করে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করা জরুরী। এর একটি উদাহরণ হল: একটি গর্ত বা খাল খনন করার জন্য কাউকে এক মাসের জন্য ভাড়া করা, এক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ উল্লেখ করা জরুরী নয়, শুধু উল্লেখ করতে হবে যে খনন কাজটি একমাসব্যপী চলবে, হোক সেটা কম বা বেশী। এবং কিছু নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের ধরন ও ব্যাপ্তিকাল উভয়ই উল্লেখ করতে হবে, যেমন: একটি বাড়ি নির্মাণ করা, একটি তেল পরিশোধনাগার তৈরি করা এবং এধরনের অন্যান্য কাজ। সুতরাং যে ধরনের নিয়োগের/ভাড়ার ক্ষেত্রে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করা প্রয়োজন সেগুলোর প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ করতে হবে, কারণনিয়োগের/ভাড়ার প্রকৃতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কিছু কিছু কাজের ক্ষেত্রে কাজের ব্যাপ্তিকাল উল্লেখ না করলে কাজটি অজ্ঞাত থেকে যায় এবং সেক্ষেত্রে নিয়োগ/ভাড়া করা অবৈধ হয়ে যায়। যদি নিয়োগের/ভাড়ার চুক্তিটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সম্পাদিত হয়, যেমন: একমাস বা একবছরের জন্য, তাহলে এ সময়কাল অতিবাহিত হওয়ার আগে কোন পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করতে পারবে না। যদি কোন শ্রমিককে পুনরায় ভাড়া করা হয়, যেমন: মাসিক বিশ দিরহামের বিনিময়ে, তবে তাকে প্রতিমাসে চুক্তিকৃত কাজে যোগদান করতে হবে এবং ভাড়ার চুক্তিতে কার্যকাল উল্লেখ করতে হবে। এটা জরুরী নয় যে, চুক্তির পরপরই ভাড়ার কার্যকাল (যেমন: একমাস) অবিলম্বে শুরু করতে হবে। সুতরাং, রজব মাসে কাজ করার জন্য
একজন শ্রমিককে মহররম মাসে ভাড়া করা যাবে। যদি চুক্তিপত্রে কার্যকাল উল্লেখ করা হয়, কিংবা অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য কার্যকাল উল্লেখ করার প্রয়োজন হয়, তাহলে কার্যকালকে সময়ের এককে, অর্থাৎ মিনিট, ঘন্টা, সপ্তাহ বা মাসে উল্লেখ করতে হবে।
কাজের পারিশ্রমিক
চুক্তির শর্ত হিসেবে এই বিষয়ের উপর জোর দিতে হবে যে, পারিশ্রমিক হিসেবে প্রদেয় সম্পত্তির যথোপযুক্ত সাক্ষী বা বর্ণনা এমনভাবে উপস্থাপিত হতে হবে যাতে এ বিষয়ক যেকোন অনিশ্চয়তা দূরীভূত হয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ বিষয়ে বলেছেন: “যে কেউ কোন ব্যক্তিকে ভাড়া করলে সে যাতে ঐ ব্যক্তিকে তার পারিশ্রমিকের ব্যাপারে অবহিত করে।” নিয়োগের/ভাড়ার প্রতিদান হতে পারে আর্থিক, অনার্থিক, সম্পত্তি, কিংবা কোন উপযোগ। পণ্য অথবা উপযোগ যেটাই হোক, মূল্য আছে এরকম যে কোন কিছুই মজুরি হিসেবে দেয়া যাবে, তবে শর্ত হচ্ছে যে তা জানা থাকতে হবে; কিন্তু অজ্ঞাত হলে সেটি অবৈধ। যদি কোন ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক হিসেবে কর্তনকৃত ফসলের একটি অংশের বিনিময়ে ফসল কাটার জন্য ভাড়া করা হয় তবে তা অবৈধ, কেননা এক্ষেত্রে পারিশ্রমিক অজ্ঞাত। কিন্তু যদি তাকে এক বা দুই সা’র (A Cubic Mesure) বিনিময়ে ভাড়া করা হয় তবে তা বৈধ। শ্রমিককে খাবার বা বস্ত্র প্রদানের মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া অনুমেদিত কিংবা তার খাবার ও বস্ত্রের সাথে সাথে মজুরিও দেয়া যাবে, কারণ এটি দুগ্ধদানকারী মহিলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আর সন্তানের অধিকারী, অর্থাৎ পিতার উপর হলো সে সমস্ত নারীর খোর-পোষের দায়িত্ব প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী।”
[সূরা বাকারাহ্ : ২৩৩]সুতরাং, দুগ্ধ প্রদানের পারিশ্রমিক হিসেবে তারা খোর-পোষ এবং পোষাকের অধিকারী হয়েছিল। যদি সেবাদানকারী মায়ের ক্ষেত্রে এটা অনুমোদিত হয় তবে এটি অন্যান্য ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, কেননা এধরনের বর্ণনাসমূহ ভাড়া করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
সংক্ষেপে, এমনভাবে পারিশ্রমিক নির্ধারণ করতে হবে যাতে করে এ সম্পর্কিত যে কোন ধরনের অজ্ঞতা দূরীভূত হয় এবং কোন ধরনের বিরোধ ব্যতিরেকে তা যথাযথভাবে মিটিয়ে দেয়া যায়, কারণ লোকদের মধ্যকার বিরোধ নিরসনের লক্ষ্যকে সামনে রেখেই মূলতঃ সকল ধরনের চুক্তি করা হয়। কাজ শুরুর আগেই পারিশ্রমিকের বিষয়ে একমত হতে হবে এবং এটি মাকরুহ্ বা অপছন্দনীয় যে, কাজ শুরু করার পর একজন শ্রমিকের মজুরী নির্ধারণ করা হয়। যদি কোন কাজের বিষয়ে নিয়োগের/ভাড়ার চুক্তি হয় তাহলে শ্রমিক চুক্তির জোরেই পারিশ্রমিক পাওয়ার যোগ্য হয়ে যায়, তবে কাজ শেষ করার পূর্বেই তার কাছে এটি হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে কাজ শেষ হওয়া মাত্রই পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে, কেননা এ সম্পর্কে আবু হুরাইরাহ্ হতে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি হাদীসে কুদসীতে বলেন: “বিচার দিবসে আমি তিন ধরনের ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হব: একজন হল সেই ব্যক্তি যে আমার নামে কাউকে কোন কথা দিল এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করল, যে ব্যক্তি একজন মুক্ত মানুষকে বিয়ে করল এবং এর মূল্য আত্মসাৎ করল, এবং সেই ব্যক্তি যে কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করল এবং পুরো শ্রম আদায় করার পরও তাকে তার পারিশ্রমিক দিল না।” তবে যদি পারিশ্রমিক বিলম্বিত করার কোন শর্ত চুক্তিতে উল্লেখ থাকে তাহলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিলম্ব করা উচিত। যদি এরূপ কোন শর্ত থাকে যে পারিশ্রমিক দৈনিক, মাসিক বা তারচেয়ে কম বা বেশি কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে, তাহলে নির্ধারিত সময় সেটাই যেটা দু’পক্ষের সম্মতিতে নির্ধারিত হবে। এটা জরুরী নয় যে নিয়োগকারী ব্যক্তি সম্পূর্ণ উপযোগ আগে গ্রহণ করবে, বরং এটা যথেষ্ট যে শ্রমিক শ্রম প্রদানের জন্য নিজেকে তৈরী রাখে, যার মাধ্যমে নিয়োগকারীর কাছ থেকে পারিশ্রমিক প্রাপ্য হয়ে যায়। সুতরাং, যদি একজন ব্যক্তি আরেকজন ব্যক্তিকে তার বাড়ীতে কাজ
করার জন্য ভাড়া করে থাকে, এবং এরপর শ্রমিক কাজ করার জন্য তার বাড়ীতে উপস্থিত হয় তাহলে যে সময়ের জন্য তাকে ভাড়া করা হয়েছিল সে সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেই শ্রমিক তার পারিশ্রমিকের দাবীদার হয়ে যাবে। যদিও পুরো চুক্তিটি হয়েছিল কোন একটি সেবা প্রদানের জন্য যা হয়ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিয়োগকারী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেনি, তদুপরি শ্রমিক তার পারিশ্রমিক পাওয়ার যোগ্য হয়ে যাবে। কারণ অক্ষমতাটি ছিল নিয়োগকারী ব্যক্তির, শ্রমিকের নয়। তবে সাধারণ কর্মচারীর ক্ষেত্রে, যদি তাকে সুনির্দিষ্ট কোন কাজ করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়, তবে তার দায়িত্বের মধ্যে থাকলে সে তা করতে পারবে, যেমন: একজন চিত্রকর, যে তার দোকানে নিজেই কাজ করে এবং একজন পোষাক প্রস্তুতকারী, যে তার নিজের দোকানে কাজ করে। সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সেটা গ্রাহকের কাছে হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার দায়িত্ব শেষ হবে না, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে কাজটি পুরোপুরি শেষ করে গ্রাহককে তা হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে পারিশ্রমিক পাবার যোগ্য হবে না। এর কারণ হল, চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত জিনিসটি তার জিম্মায় রয়েছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না সে গ্রাহকের কাছে তা হস্তান্তর করবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে না। একইভাবে, চুক্তি এরূপ হতে পারে যে নিয়োগকারীর কর্তৃত্বাধীন স্থানে চুক্তিকৃত কাজটি করতে হবে, যেমন: যদি নিয়োগকারীপোষাক প্রস্তুতকারী বা চিত্রকরকে যথাক্রমে সেলাই করা বা রং করার জন্য তার বাড়ীতে নিয়ে আসে তবে এক্ষেত্রে নিয়োগকৃত ব্যক্তি যখন কাজটি শেষ করবে তখন সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হবে এবং পারিশ্রমিক পাবার যোগ্য হবে, কারণ সে নিয়োগকারী ব্যক্তির কর্তৃত্বাধীন রয়েছে এবং একারণে কাজটি অবিলম্বে শেষ করতে হয়।
কাজের পেছনে ব্যয়কৃত শ্রম
একজন শ্রমিককে ভাড়া করার জন্য যে চুক্তি করা হয় তা শ্রমিকের ব্যয়কৃত শ্রম থেকে প্রাপ্ত উপযোগের উপর প্রয়োগ হয়; এবং প্রাপ্ত উপযোগ অনুসারে পারিশ্রমিক নির্ধারিত হয়। প্রদত্ত শ্রম মজুরি বা উপযোগের মানদন্ড হতে পারে না, অন্যথায় একজন পাথরশ্রমিকের পারিশ্রমিক একজন প্রকৌশলীর চেয়ে অনেক বেশী হতে পারে, কেননা একজন পাথরশ্রমিক কর্তৃক প্রদত্ত শ্রমের পরিমাণ অনেক বেশি এবং এটি বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। সুতরাং, পারিশ্রমিক হল প্রাপ্ত উপযোগের তুল্যবিনিময়, প্রদত্ত শ্রমের নয়। এর পাশাপাশি, কর্মচারীদের দক্ষতা অনুসারে পারিশ্রমিক ভিন্ন ও পরিবর্তিত হয় এবং এটি একই কর্মচারীর জন্য প্রাপ্ত উপযোগের মানের পার্থক্যের ভিত্তিতে ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু কখনওই প্রদত্ত শ্রমের মাত্রার ভিন্নতার দরুন নয়। উভয়ক্ষেত্রেই চুক্তি করা হয়েছিল নিয়োগকারী ব্যক্তির প্রাপ্ত উপযোগের ভিত্তিতে, নিয়োগকৃত ব্যক্তির প্রদত্ত শ্রমের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়। সুতরাং যেটা বিবেচিত হয় সেটা হচ্ছে শ্রমের ফলাফল বা প্রদত্ত শ্রম হতে প্রাপ্ত উপযোগ, এটা হতে পারে ভিন্ন কর্মচারীর মাধ্যমে সম্পাদিত ভিন্ন কাজ, অথবা ভিন্ন কর্মচারীর মাধ্যমে একই ধরনের কাজ, এবং প্রদত্ত শ্রমের প্রতি কোন গুরুত্ব দেয়া হয় না। এটা সত্য যে, কাজের ফলাফল হচ্ছে শ্রমের ফসল, হোক তা ভিন্ন ভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে কিংবা ভিন্ন ভিন্ন লোক কর্তৃক একই কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে; কিন্তু কাজটির উদ্দেশ্য হচ্ছে ফলাফল, কেবলমাত্র শ্রম নয়, যদিওবা পারিশ্রমিক নিরূপনের ক্ষেত্রে এটার দিকে নজর দেয়া হয়। সুতরাং একজন লোককে যদি নির্মাণ কাজের জন্য ভাড়া করা হয় তাহলে তার পারিশ্রমিক নির্ধারিত হওয়া উচিত সময় বা কাজের ভিত্তিতে। যদি এটি কাজ দ্বারা নিরূপিত হয় তবে অবশ্যই দালানটির অবস্থানে সেটার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, ঘনত্ব ও দালান তৈরির সামগ্রী, ইত্যাদির মধ্যে তার শ্রমের ফলাফল পরিলক্ষিত হবে। যদি কাজটি সময় দ্বারা মূল্যায়িত হয় তবে অধিক পরিমাণ সময় অতিক্রান্ত হলে কাজের উপযোগও অধিক হবে এবং কম পরিমাণ সময় অতিবাহিত হলে কাজের উপযোগও কম হবে। অতএব, সময় উল্লেখ সহকারে কাজের বর্ণনাই হচ্ছে প্রাপ্ত উপযোগের মানদন্ড। যদি কাজটি সময় দ্বারা নিরূপিত হয় তবে নিয়োগকৃত ব্যক্তির স্বাভাবিক সামর্থ্যরে বাইরে অতিরিক্ত কাজ করা উচিত নয়, এবং তাকে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করা উচিত নয়।
নিষিদ্ধ উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করার ক্ষেত্রে হুকুম
ভাড়ার বিষয়টি আইনত বৈধ হতে হলে তা থেকে প্রাপ্ত উপযোগের প্রকৃতিকে হালাল বা বৈধ হতে হবে। সুতরাং নিষিদ্ধ কোন কিছু করার জন্য কাউকে ভাড়া করা উচিত নয়। তদনুসারে, ক্রেতার কাছে মদ বহনের জন্য বা মদ প্রস্তুত করার জন্য একজন শ্রমিককে ভাড়া করা উচিত নয়। একইভাবে শূকরের মাংস বা পঁচা মাংস বহনের জন্য কাউকে ভাড়া করা উচিত নয়।
আনাস বিন মালিক হতে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
“মদের ব্যাপারে দশ ব্যক্তির উপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) অভিশম্পাত করেছেন: এর প্রস্তুতকারী, এটি প্রেরণ করার জন্য আহ্বানকারী, এর পানকারী, এর বহনকারী, এটি প্রস্তুতের আদেশকারী, এর পরিবেশনকারী, এর বিক্রেতা যার জন্য এটি বিয়ে করা হয়, এর ক্রেতা এবং যার জন্য এটি ক্রয় করা হয়।”
সুদের সাথে সম্পর্কিত কোন কাজের জন্য ভাড়া করা অনুমোদিত নয়, কারণ এক্ষেত্রে নিষিদ্ধ উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করা হয়, এবং যেহেতু ইবনে মাসুদ থেকে ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) সুদখোর, সুদের দালাল, সুদের দুই সাক্ষী ও সুদের হিসাবরক্ষাকারী কেরাণীকে অভিশম্পাত করেছেন।
ব্যাংক, টাকশাল বিভাগ ও সুদকে নিয়ে কাজ করে এমন সব প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের কাজকে নিরীক্ষা করতে হবে। যে কাজের জন্য তাদেরকে ভাড়া করা হচ্ছে তা যদি সুদ সম্পর্কিত কাজের কোন অংশ হয়, এক্ষেত্রে সুদ হতে পারে ব্যক্তির কাজের সরাসরি ফলাফল, কিংবা হতে পারে তার কাজটির সাথে সাথে অন্যদের কাজের সমন্বিত ফলাফল, তবে এধরনের কাজ করা মুসলিমদের জন্য নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক, হিসাব নিরীক্ষক এবং প্রত্যেকটি কাজ যা সুদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত কোন উপযোগ প্রদান করে। কিন্তু যেসব কাজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুদের সাথে সম্পৃক্ত নয় সেগুলো অনুমোদিত, যেমন: কুলি, পাহারাদার, পরিষ্কারক বা এধরনের কাজ, কেননা এধরনের কাজে নিয়োগ দেয়া হয় অনুমোদিত উপযোগের উপর ভিত্তি করে, এবং যেহেতেু সুদের হিসাবরক্ষক ও সুদের সাক্ষীর জন্য যা প্রযোজ্য তা তাদের উপরে প্রযোজ্য নয়। সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে সুদের বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য, এদের মধ্যে সেসব কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত যারা কৃষকদের জন্য সুদভিত্তিক ঋণ নিয়ে কাজ করে এবং সেসব রাজস্ব কর্মকর্তা যারা সুদ নিয়ে কাজ করে এবং এতিম শিশুদের বিভাগে চাকুরীরত কর্মকর্তাগণ যারা সুদের বিনিময়ে সম্পত্তি ধার দিয়ে থাকে। এসবই নিষিদ্ধ কাজ; এ কাজের সাথে জড়িত যে কেউই ভয়ঙ্কর গোনাহর সাথে সম্পৃক্ত, কারণ যেহেতু সে সুদের হিসাবরক্ষণকারী অথবা এ বিষয়ক কাজের সাক্ষী, সেহেতু এটা তার উপর প্রযোজ্য। একইভাবে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক নিষিদ্ধকৃত যে কোন কাজে সম্পৃক্ত হওয়া মুসলিমের জন্য অবৈধ।
যেসব কাজ থেকে মুনাফা অর্জন বা তাতে শরীক হওয়া নিষিদ্ধ কারণ তা আইনত অবৈধ যেমন বীমা কোম্পানী, শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানী, সমবায় সমিতি কিংবা এধরনের যেকোন প্রতিষ্ঠান, সেসব কাজের ক্ষেত্রে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে হবে। যদি নিয়োগকৃত ব্যক্তির কাজ অবৈধ হয়, অথবা এটি একটি অবৈধ (বাতিল) কিংবা ত্রুটিযুক্ত (ফাসিদ) চুক্তি হয়, বা সেগুলো থেকে উদ্ভুত হয়, তবে একজন মুসলিমের জন্য এসব দায়িত্ব পালন করা অনুমোদিত নয়, কারণ একজন মুসলিমের জন্য অবৈধ বা ত্রুটিযুক্ত বা এগুলো থেকে উদ্ভূত কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া অনুমোদিত নয়। হুকুম শারী’য়াহ্’র সাথে সাংঘর্ষিক কোন চুক্তি বা কাজের সাথে সম্পৃক্ত হওয়া একজন মুসলিমের জন্য অনুমোদিত নয়, সুতরাং ভাড়ার বিনিময়ে একটি নিষিদ্ধ কাজে সম্পৃক্ত হওয়া তার জন্য অনুমোদিত নয়। এটা অনেকটা সেই বীমা কর্মকর্তার মত যে অপছন্দ করার পরেও এর নথিপত্র সংরক্ষণ করে, যে ব্যক্তি বীমা চুক্তির ব্যাপারে দর কষাকষি/মধ্যস্থতা করে, অথবা যে ব্যক্তি বীমা গ্রহণ করে। একইভাবে, যে কর্মচারী হোল্ডিং সদস্যপদ অনুসারে সমবায় সমিতির লভ্যাংশ বন্টন করে, যে কর্মকর্তা কোম্পানীর শেয়ার বিক্রি করে, অথবা যে শেয়ার স্টকের হিসবাবরক্ষণ নিয়ে কাজ করে এবং যে সমবায় সমিতির জন্য প্রচারণা চালায় এবং এধরনের কাজসমূহ সম্পাদন করে।
যেসব কোম্পানী বৈধভাবে প্রতিষ্ঠিত, সেসব কোম্পানীর সকল বৈধ কাজসমূহ এবং বিভিন্ন পদে যোগদান করাও বৈধ। যদি একজন ব্যক্তির জন্য কোন কাজ করার বৈধতা না থাকে তবে কাজটি করার জন্য সে কর্মচারী হিসেবে যোগদান করতে পারে না এবং সেটা করার জন্য সে নিয়োগের আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারে না। সুতরাং যেসব কাজ করা নিষিদ্ধ, সেসব কাজ করার জন্য মুসলিমগণ অন্য কাউকে ভাড়াও করতে পারবে না বা নিজে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেই কাজে নিয়োজিতও হতে পারবে না।
নিয়োগকারী ও কর্মচারী কারও জন্যই মুসলিম হওয়া শর্ত নয়। সুতরাং, একজন মুসলিম কোন অমুসলিমকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাজ ও সাহাবীদের (রা) ঐকমত্য থেকে এটি জানা যায় যে, রাষ্ট্রীয় কাজসহ যেকোন মুবাহ্ বা অনুমোদিত কাজে একজন মুসলিম একজন অমুসলিমকে ভাড়া করতে পারে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) একজন ইহুদীকে কেরানি, আরেকজন ইহুদীকে অনুবাদক এবং একজন মুশরিককে পথ প্রদর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। আবু বকর (রা) ও ওমর (রা) তহবিলের হিসাবরক্ষক হিসেবে খ্রীস্টান ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। যেরকম মুসলিমদের জন্য অমুসলিমদের ভাড়া করা বৈধ সেরকম একজন অমুসলিমও বৈধ কাজের জন্য মুসলিমদেরকে ভাড়া করতে পারে। নিয়োগদানকারী ব্যক্তি মুসলিম বা অমুসলিম যাই হোক না কেন, তার জন্য নিষিদ্ধ কাজ করা বৈধ নয়। সুতরাং, একজন মুসলিমকে একজন খ্রীস্টান তার হয়ে কাজ করার জন্য ভাড়া করতে পারে। তবে এর মধ্যে ঐ ধরনের কাজ অন্তর্ভুক্ত নয় যেখানে একজন মুসলিমকে কাফেরের কাছে অপমানিত হতে হয়। বরং, এটি হল বৈধ কোন কাজ করার জন্য নিজেকে অন্যের কাজে নিয়োজিত করা, এবং এক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা বা কর্মচারী কারও জন্য ইসলামে বিশ্বাস করা শর্ত নয়। আলী (রা.) একজন ইহুদীর জন্য প্রতি বালতি পানি এক খেজুরের বিনিময়ে তুলে দেয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন এবং এ বিষয়টি তিনি রাসূলুল্লাহ্কে (সা) অবহিত করেছিলেন এবং তিনি (সা) এটা নিষেধ করেননি। এছাড়াও, ভাড়া হল বিনিময়ের একটি চুক্তি যাতে মুসলিমদের জন্য অমর্যাদাকর কোন কিছু থাকতে পারবে না। তবে সে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন, তাহলে নিয়োগকৃত ব্যক্তিটি মুসলিম হওয়া বাঞ্চণীয়। উদাহরণস্বরূপ: নামাজে ইমামতি করা, আজান দেয়া, হজ্জ্ব করা, যাকাত বন্টন করা এবং কুর’আন ও হাদীস শিক্ষা দেয়া। কারণ, এগুলো মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য আইনত বৈধ নয়, সুতরাং এসব কাজ করানোর জন্য মুসলিম ব্যতিত অন্য কাউকে নিয়োগ করা হয় না। এ ধরনের কাজের ইল্লাহ্ বা শারী’আহ্গত কারণ হল, একজন মুসলিম ব্যতিরেকে অন্য কারও জন্য এগুলো বৈধ নয়। তবে কাজের উদ্দেশ্য যদি হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন এবং কাজটিতে যদি অমুসলিমের অংশগ্রহণে শারী’আহ্গত কোন প্রতিবন্ধকতা না থাকে তবে তাকে ভাড়া করা বৈধ। সংক্ষেপে বলা যায় যে, একজন নিয়োগদানকারী ব্যক্তি যদি কাজটিকে আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করে, কিন্তু নিয়োগকৃত ব্যক্তি সেরকম মনে না করে তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি সেগুলো মুসলিম ব্যতিত অন্য কারও জন্য বৈধ না হয়, যেমন: বিচারিক কাজ (কাদা’আ), তাহলে একজন অমুসলিমকে কাজটি করার জন্য নিয়োগ দেয়া যাবে না। তবে যদি একজন অমুসলিমের জন্য কাজটি করা বৈধ হয়, যেমন: জিহাদ করা, তাহলে তাকে একাজের জন্য ভাড়া করা যাবে। সুতরাং, একজন জিম্মি বা অমুসলিমকে জিহাদের জন্য ভাড়া করা যাবে এবং বায়তুল মাল থেকে তার পারিশ্রমিক দেয়া হবে।
প্রার্থনা বা জনসেবামূলক কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা
চুক্তি হিসেবে ভাড়ার সংজ্ঞায় শর্ত রয়েছে যে, শ্রম হতে প্রাপ্ত উপযোগের বিনিময়ে পারিশ্রমিক প্রদান করতে হবে এবং এটাও রয়েছে যে উপযোগ হল এমন একটি বিষয় যা নিয়োগকারী ব্যক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে, এ থেকে বোঝা যায় যে সকল ধরনের উপযোগ লাভের জন্য নিয়োগ দেয়া অনুমোদিত, যা নিয়োগকৃত ব্যক্তি হতে নিয়োগকারী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারে। এটি হতে পারে চাকরের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, কিংবা একজন কারিগরের কাজ থেকে প্রাপ্ত উপযোগ, যদিনা শরীয় নির্দেশনা পাওয়া যায় যে এধরনের উপযোগ নিষিদ্ধ। এর কারণ হল, জিনিসসমূহ আদতে বৈধ এবং এদের মধ্যে উপযোগ একটি। এটা বলা অসত্য হবে যে, এটি এমন একটি চুক্তি বা লেনদেন যা আদতে বৈধ হওয়ার চেয়ে বরং প্রকৃতপক্ষে শারী’আহ্ দ্বারা সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। এটা অসত্য কারণ, চুক্তি হচ্ছে নিয়োগটি নিজেই, উপযোগ নয়। উপযোগ হচ্ছে এমন একটি বিষয় যার উপর লেনদেন সম্ভব হয় ও চুক্তি সাধিত হয়, এবং এজন্যই উপযোগ কোন লেনদেন বা চুক্তি নয়। সুতরাং, নিষিদ্ধ নয় এমন সব ধরনের উপযোগের জন্য ভাড়া করা বৈধ, এক্ষেত্রে অনুমতির ব্যাপারে শারী’আহ্ উৎসে কোন নির্দেশনা থাকুক বা না থাকুক। সুতরাং, একজন ব্যক্তি একটি টাইপরাইটারে তার জন্য টাইপ করার কাজে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠার জন্য নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে পুরুষ বা নারীকে ভাড়া করতে পারে, কারণ এক্ষেত্রে এমন একটি উপযোগ লাভের জন্য ভাড়া করা হচ্ছে যার বিষয়ে কোন নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করা হয়নি। সুতরাং, এ ব্যাপারে অনুমোদনের বিষয়ে শারী’আহ্ উৎসে কোন সুনির্দিষ্ট দলিল না থাকা সত্ত্বেও কাউকে ভাড়া করা বৈধ। এমন একজন ব্যক্তিকেও নিয়োগ দেয়া বৈধ যে সুনির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য পরিমাপ ও ওজন করবে। সুয়াইদ ইবনে কায়েসের হাদীসের মাধ্যমে ইবনে দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাজারে আমাদের কাছে আসলেন এবং তিনি (সা) আমাদের সাথে পণ্যদ্রব্য বিনিময় করলেন এবং আমরা তাঁর (সা) কাছে বিক্রয় করলাম। সেখানে একজন ব্যক্তি ছিল যে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওজন করছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ‘পরিমাপ কর এবং পাল্লার ওজনে অধিক কর।’ সুতরাং, এ ধরনের ভাড়া করা বৈধ এবং এ ব্যাপারে দলিল রয়েছে। কিন্তু ইবাদতের ক্ষেত্রে, হোক সেটি ফরয বা নফল, তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে। যদি এ কাজের উপযোগ আদায়কারী ব্যক্তি ব্যতিরেকে অন্য কারও মধ্যে সঞ্চারিত না হয়, যেমন: নিজের জন্য হজ্জ্ব করা, নিজের যাকাত প্রদান করা, তবে সে এর জন্য কোন পারিশ্রমিক পাবে না, কারণ পারিশ্রমিক হল একটি উপযোগের প্রতিফলস্বরূপ এবং এসব ক্ষেত্রে আর কারও জন্য নয় বরং আদায়কারী ব্যক্তির নিজের জন্যই তা নির্দিষ্ট থাকে। তদানুসারে এসব কাজে তাকে ভাড়া করা অনুমোদিত নয়, কারণ এগুলো তার উপর ফরয। কিন্তু যদি ইবাদতের উপযোগ এমন হয় যে তা সম্পাদনকারীকে ছাড়িয়ে যায় তাবে এজন্য কাউকে ভাড়া করা অনুমোদিত। উদাহরণস্বরূপ: অন্যদের জন্য আজান দেয়া, নামাজে ইমামতি করা, একজন মৃত ব্যক্তির পক্ষে হজ্জ্ব করার জন্য কাউকে ভাড়া করা, অথবা একজন ব্যক্তির পক্ষে যাকাত প্রদান করার জন্য কাউকে ভাড়া করা। এগুলো সবই বৈধ, কারণ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কোন একটি উপযোগ লাভের জন্য এধরনের চুক্তি করা হয়। এখানে পারিশ্রমিক হল উপযোগের প্রতিফল, যা অন্য একজন ব্যক্তি কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছে বিধায় এধরনের নিয়োগ বৈধ। এ প্রসঙ্গে উসমান ইবনে আবি আল আ’স থেকে আত তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “সর্বশেষ যে কাজটি করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা হচ্ছে এমন একজন মুয়াজ্জিন নিয়োগ করা যিনি আজানের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না।” এ হাদীসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমন একজন মুয়াজ্জিনকে কাজে লাগাতে বলেছেন যিনি তার কাজের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না, কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি মুয়াজ্জিনের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে নিষিদ্ধ করেননি। এর দ্বারা বোঝা যায় যে, এমন কিছু মুয়াজ্জিন আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন এবং কিছু আছেন যারা পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। সুতরাং, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে পারিশ্রমিক গ্রহণকারী মুয়াজ্জিনদের মধ্য হতে কাউকে নিয়োগ দিতে নিষেধ করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে পারিশ্রমিক গ্রহণ না করা হতে বিচ্ছিন্ন করার দিকে নির্দেশ করে। যা দ্বারা বোঝা যায় যে আজান দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়। তবে এর দ্বারা আজান দেয়ার বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার নিষেধাজ্ঞার প্রতি নির্দেশ করা হয়নি। বরং এটা নির্দেশ করে যে, এটি বৈধ।
শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তি তার সন্তানদেরকে অথবা নিজেকে বা পছন্দনীয় কাউকে শিক্ষাদানের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করতে পারে। কারণ, শিক্ষা হল একটি বৈধ (মুবাহ্) উপযোগ, যার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা যায়। সুতরাং, একাজের জন্য নিয়োগ/ভাড়া করা বৈধ। এবং শারী’আহ্ কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অনুমোদন দিয়েছে। সুতরাং, বৃহত্তর যুক্তিবিচারে কুর’আন ছাড়া অন্য কিছু শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাও বৈধ।
ইবনে আব্বাস থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন যে:
“সর্বোত্তম বিষয় হচ্ছে আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা।”
এছাড়াও, সাহল ইবনে সা’দ আস সা’য়িদী থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) একজন মহিলাকে একজন পুরুষের সাথে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তার বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছেন, অর্থাৎ ঐ ব্যক্তি তার স্ত্রীকে কুর’আনের যতটুকু সে জানে তা শিক্ষা দিবে। এ ব্যাপারে সাহাবাদের (রা.) ঐকমত্য ছিল যে, শিক্ষার জন্য বায়তুল মাল থেকে বরাদ্দ নেয়া বৈধ, সুতরাং এর জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ।
আল-ওয়াদিয়া ইবনে আতা’আ হতে সাদাকা আল-দিমাশকি এবং সাদাকা আল-দিমাশকি হতে আবি শিবা কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “তিনজন ব্যক্তি ছিলেন যারা মদীনার বালকদের শিক্ষা দিতেন এবং ওমর আল-খাত্তাব (রা) তাদের প্রত্যেককে প্রতিমাসে পনের দিনার করে পারিশ্রমিক প্রদান করতেন।” এসব কিছুই নির্দেশ করে যে, শিক্ষাদানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ। পারিশ্রমিক নেয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করে যে হাদীসসমূহ এসেছে সেগুলোতে কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য লোকদের ভাড়া করার উপর নিষেধাজ্ঞা প্রদান নয়, বরং সেসব হাদীসের মূল লক্ষ্য ছিল কুর’আন শিক্ষা দেয়ার জন্য পারিশ্রমিক নেয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা। এগুলো সবই কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করাকে অপছন্দনীয় বলে নির্দেশ করে, কিন্তু এর জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করাকে নিষিদ্ধ করেনি। পারিশ্রমিক গ্রহণের অপছন্দনীয়তা এর বৈধতা অস্বীকার করে না, সুতরাং কুর’আন শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা অপছন্দনীয়, তথাপিও এ কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ/ভাড়া করা যাবে।
একজন ডাক্তার নিয়োগ/ভাড়া করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে এটা বৈধ, কেননা এতে এমন একটি উপযোগ রয়েছে যা নিয়োগকারী গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু আরোগ্যকরণের জন্য তাকে ভাড়া করা যাবে না, কারণ এটা তখন অজ্ঞাত বিষয়ের উপর ভাড়া করা হবে। তবে একজন রোগীকে পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এটা জ্ঞাত উপযোগের উপর করা হবে এবং একজন রোগীর সেবার উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ডাক্তার ভাড়া করা যাবে, কারণ এক্ষেত্রে নির্ধারিত কাজের জন্য একজনকে ভাড়া করা হচ্ছে। রোগীর চিকিৎসার জন্য ডাক্তারকে ভাড়া করা বৈধ, কারণ তার চিকিৎসা এমনভাবে জ্ঞাত যা অজ্ঞানতাকে দূরীভূত করে, যদিওবা রোগের ধরন পরিচিত নাও হতে পারে, তথাপি এক্ষেত্রে এটুকু জানাই যথেষ্ট যে, রোগী অসুস্থ।
একজন ডাক্তারকে ভাড়া করার বৈধতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত, কারণ ঔষধ এমন একটি উপযোগ যা নিয়োগকারী ব্যক্তি গ্রহণ করতে পারে, সুতরাং, এটার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া বৈধ। এছাড়াও এটা উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঔষধের জন্য ভাড়া করার বৈধতার প্রতি নির্দেশ করেছেন। আনাস (রা) থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু তাইয়্যিবাকে রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের জন্য ডেকেছিলেন এবং এরপর তাকে দুই সা’আ (A Cubic Mesure) খাদ্য দিয়েছিলেন এবং তার উপর ন্যস্তকৃত কাজের ভার কমিয়ে দেয়ার জন্য তার মনিবের কাছে সুপারিশ করেছিলেন।” সে সময় উত্তপ্ত কাঁচের পেয়ালা ব্যবহার করে চামড়ার উপরে আংশিক শূন্যস্থান তৈরী করে রক্তমোক্ষণ করার এক ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতিতে লোকদের চিকিৎসা করা হত। সুতরাং, এটা করার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করার অর্থ হল এ ব্যাপারে ডাক্তার ভাড়া করা বৈধ। রাফি’আ ইবনে খাদিজ থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে বলেছেন: “রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীর উপার্জন কুৎসিত (কাবিহ্)”, যা একজন রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগকারীকে ভাড়া না করার ব্যাপারে কোন নির্দেশনা প্রদান করে না। বরং, রক্তমোক্ষক কাঁচ প্রয়োগের মাধ্যমে উপার্জন করাকে অপছন্দনীয় হিসেবে নির্দেশ করে, যদিওবা মা’দান ইবনে আবি তালহা থেকে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের ভিত্তিতে এটিকে মুবাহ্ বলা হয়েছে, যেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা) রসুন ও পেঁয়াজ খাওয়াকে নিন্দনীয় বলেছেন, যদিও এগুলো বৈধ। এসবই ব্যক্তি পর্যায়ের শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
কিন্তু যে শ্রমিকের উপযোগ সার্বজনীন তার ক্ষেত্রে তার প্রদত্ত সেবাকে এমনভাবে বিবেচনা করা হয় যে রাষ্ট্রকে তা জনগণের জন্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। এর কারণ হল, যদি কোন কাজের উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে কোন সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে যায় এবং সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় হয় তবে তা জনস্বার্থ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বায়তুল মালকে সকল মানুষের জন্য তা সরবরাহ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এর একটি উদাহরণ হল, যখন শাসক জনগণের বিচারকার্য সম্পাদনের জন্য মাসিক বেতনের ভিত্তিতে একজন বিচারককে নিয়োগ/ভাড়া করে, কিংবা বিভিন্ন বিভাগে ও সেবার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে এবং মুয়াজ্জিন ও ইমামকে নিয়োগ/ভাড়া করে। এছাড়াও, জনগণের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রকে কর্মচারী নিয়োগ/ভাড়া করতে হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরকে ভাতা প্রদানের বিষয়ে সাহাবীদের (রা) ঐকমত্য বা ইজমা অনুসারে তাদেরকে বায়তুল মাল থেকে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া হত। এটা একারণেও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) দশজন নিরক্ষর মুসলিমকে অক্ষরজ্ঞান প্রদান করাকে মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে ধার্য করে দিয়েছিলেন, আর এই মুক্তিপণ হল গণীমতের মালের অন্তর্ভূক্ত, যার মালিক হলেন সকল মুসলিম। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে এর কারণ হল, একজন চিকিৎসককে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য উপহার হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল এবং তিনি তাকে মুসলিমদের কল্যাণে নিয়োজিত করেন। এখানে বাস্তবতা হল, রাসূলুল্লাহ্ (সা) উপহার গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তার উপযোগ নিঃশেষ করে ফেলেননি বা ব্যবহার করেননি, বরং তাকে মুসলিমদের সেবায় নিযুক্ত করেন। এ থেকে দলিল পাওয়া যায় যে, এ ধরনের উপহার মুসলিম জনসাধারণের, ব্যক্তিগতভাবে কেবল তাঁর (সা) নয়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি উপহার পাবার পর সেটাকে সব মুসলিমের জন্য বরাদ্দ করেন, সেহেতু এ থেকে এই নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, এটি সাধারণ মুসলিম জনগণের অধিকারভূক্ত জিনিসসমূহের একটি। সুতরাং, বায়তুল মাল থেকে শিক্ষক ও ডাক্তারদেরকে ভাতা প্রদান করা যাবে। তবে ব্যক্তিগতভাবে যে কেউ ডাক্তার ও শিক্ষক ভাড়া করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে বাধ্য, এক্ষেত্রে জিম্মী বা মুসলিম এবং ধনী বা দরিদ্রের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এর কারণ হল, এটি আজান ও বিচারব্যবস্থার মতই, যার উপযোগ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায় এবং এগুলো জনগণের জন্য প্রয়োজনীয়; সুতরাং, এগুলো জনসেবার মধ্যে অন্তভর্‚ক্ত এবং রাষ্ট্রকে সকল নাগরিকের জন্য এসব সেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং বায়তুল মালকে এগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।
অধ্যায় ৪: মালিকানা লাভের প্রথম উপায়: কাজ (’আমাল)

যেকোন ধরনের সম্পত্তি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে সেগুলো অর্জনের জন্য কাজ করা প্রয়োজন, এক্ষেত্রে সম্পত্তিসমূহ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যেতে পারে, যেমন: মাশরুম, কিংবা সেগুলো মানুষের শ্রম দ্বারা তৈরী হতে পারে, যেমন: এক টুকরো রুটি বা একটি গাড়ি।
’আমাল (কাজ) শব্দটি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অনেকগুলো ধরন ও রূপ এবং ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল বিদ্যমান। সেজন্য শারী’আহ্ ’আমাল বা কাজ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করা ব্যতিরেকে এটির প্রচলিত ধ্রুপদী অর্থের উপর ছেড়ে দেয়নি। এছাড়াও, শারী’আহ্ ’আমাল শব্দটিকে সাধারণভাবে সংজ্ঞায়িত করেনি, বরং বিশেষ কিছু কাজ হিসেবে এটিকে উপস্থাপিত করেছে। এটি কাজের প্রকারভেদ সম্পর্কে আলোচনা করেছে এবং সেগুলোই মালিকানা অর্জনের উপায় হিসেবে অনুমোদিত হয়েছে। কাজ সম্পর্কিত ঐশী হুকুমসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সম্পত্তি অর্জনের উপায় হিসেবে আইনগতভাবে বৈধ কাজসমূহ নিম্নরূপ:
১. অব্যবহৃত (নিষ্ফলা) ভূমির চাষাবাদ
২. ভূ-গর্ভে বা বাতাসের মধ্যে যা পাওয়া যায় তা আহরণ করা
৩. শিকার
৪. দালালি (সামসারা) এবং কমিশন এজেন্ট (দালালা)
৫. শ্রম ও মূলধনের ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব (মুদারাবা)
৬. বর্গাচাষ (মুসাকাত)
৭. পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অন্যের জন্য কাজ করানিষ্ফলা জমিতে চাষাবাদ (ইহ্ইয়া উল-মাওয়াত)
নিষ্ফলা জমি (মাওয়াত) হলো এমন এক ধরনের ভূমি যার কোন মালিক নেই এবং যা থেকে কেউ উপযোগ লাভ করছে না। এতে চাষাবাদের অর্থ হলো বৃক্ষরোপন করা, বনায়ন করা বা এর উপর ইমারত নির্মাণ করা। ভিন্নভাবে বলা যায় যে, জমিটির যে কোন প্রকারের ব্যবহারের অর্থই হলো সেটিকে আবাদ করা (ইহ্ইয়া)। কেউ এ ধরনের ভূমি আবাদ করলে সে এর মালিক হিসেবে পরিগণিত হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোনো নিষ্ফলা জমিতে আবাদ করবে সেটি তার হয়ে যাবে।”
তিনি (সা) আরও বলেছেন:
“যে ব্যক্তি কোন একটি ভূমিকে বেড়া দ্বারা ঘেরাও করে ফেলে সেটি তার।”
এবং, তিনি (সা) বলেছেন:
“অন্য কোন মুসলিমের পূর্বে যে কেউ কোন কিছুর উপর হাত রাখলে সেটা তার হয়ে যাবে।” এক্ষেত্রে একজন মুসলিম ও জিম্মীর (ইসলামী রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিক) মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, কেননা এ হাদিসটি কোন ধরনের সীমাবদ্ধতা ছাড়া অর্থগত দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ; এবং যেহেতু একজন জিম্মী উপত্যকা, বন এবং পাহাড়ের উপর থেকে যাই গ্রহণ করুক না কেন সেটি তারই, সেহেতু সেগুলো তার কাছ থেকে কেড়ে নেয়া অনুমোদিত নয়। নিষ্ফলা জমি তার সম্পত্তি হওয়ার ক্ষেত্রেও হাদিসটি প্রযোজ্য। সব ভূমির ক্ষেত্রেই এই নিয়ম সাধারণভাবে প্রযোজ্য – হোক সেটা দারুল ইসলাম বা দারুল হারব্, কিংবা উশরী বা খারাজী ভূমি। তবে মালিকানা লাভের শর্ত হলো যে, জমিটি অধীনে আসার পর তিনবছরের মধ্যে সেটিতে কাজ করতে হবে এবং ব্যবহারের মাধ্যমে জমিটির আবাদ অব্যাহত রাখতে হবে। যদি কেউ জমি অধিকারে আসার প্রম তিন বছরের মধ্যে আবাদ না করে, বা পরবর্তীতে টানা তিন বছর ব্যবহার না করে তবে সে সেটির মালিকানার অধিকার হারাবে। উমর বিন আল-খাত্তাব (রা.) বলেছেন: “কোন ব্যক্তি জমিতে বেড়া দিয়ে মালিকানা অর্জন করতে পারে, তিন বছর পর্যন্ত অনাবাদী রাখলে সে জমিটির মালিকানা হারাবে।” অন্যান্য সাহাবাদের (রা.) উপস্থিতিতে উমর (রা.) এই উক্তি করেছিলেন এবং এই আইন প্রয়োগ করেছিলেন, সাহাবীরা (রা.) এ ব্যাপারে কোন আপত্তি করেননি – যা তাদের ইজমাকে সুনিশ্চিত করে।
ভূগর্ভে যা আছে আহরণ
আরেক প্রকারের কাজ হচ্ছে ভূ-গর্ভ হতে এমন ধরনের সম্পদ আহরণ করা যা কোন সম্প্রদায়ের টিকে থাকার নিয়ামক নয়, এগুলো লুক্কায়িত বা গুপ্তধন হিসেবে পরিচিত (রিকায্)। ফিকহ্-এর ব্যবহৃত পরিভাষা অনুসারে এ ধরনের সম্পদে মুসলিমদের সামষ্টিক কোনো অধিকার থাকে না। বরং, যদি কেউ কোন গুপ্তধন খুঁজে পায় তবে সেটার চার-পঞ্চমাংশ ঐ ব্যক্তির এবং অবশিষ্ট এক-পঞ্চমাংশ যাকাত হিসেবে গণ্য হবে।
তবে এটি যদি কোনো সম্প্রদায়ের সকল মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় হয় এবং সামষ্টিকভাবে মুসলিমদের অধিকার হয় তাহলে এটি গণমালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। যা এই বিষয়টিকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করে তা হলো, যদি কোনো সম্পদ মানুষ যমিনে লুকিয়ে রাখে, কিংবা এর পরিমাণ এতো সামান্য যে তা সম্প্রদায়ের প্রয়োজন পূরণে যথেষ্ট নয়, তবেই এটি গুপ্তধন হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে যা আদতে ভূ-গর্ভস্থ ছিল এবং সম্প্রদায়ের সকলের প্রয়োজনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, তা রিকায্ নয় বরং গণমালিকানাধীন সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে, যা সত্যিকারভাবে মাটিতে পাওয়া যায় এবং সকলের জন্য প্রয়োজনীয় নয়, যেমন: পাথরের খনি, যা থেকে দালান নির্মানের পাথর এবং এজাতীয় কোন কিছু তৈরী হয়, তা রিকায্ বা গণমালিকানাধীন সম্পত্তি কোনটি হিসেবেই বিবেচিত হবে না, বরং তা ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। রিকায্-এর মালিকানা লাভ এবং এর এক-পঞ্চমাংশ যাকাত হিসেবে প্রদানের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, আমর ইবনে শু’য়াইব তার পিতার কাছ থেকে ও তার পিতা তার দাদার কাছ থেকে আল-নিসাইতে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্’কে (সাঃ) লুকাতাহ্ (যা মাটি থেকে সংগৃহীত হয়) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি (সাঃ) বলেন:
“যদি এটা কোনো ব্যবহৃত রাস্তা বা মানববসতিপূর্ণ গ্রাম থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে তাহলে তোমাকে এ ব্যাপারে বর্ণনা দিতে হবে এবং ঘোষণা দিয়ে একবছর কাল অপেক্ষা করতে হবে। যদি এর মালিক একে শনাক্ত করতে পারে তাহলে এটি তার জিম্মায় চলে যাবে, অন্যথায় এটি তোমার। আর যদি এটি কোন ব্যবহৃত রাস্তা বা মানববসতিপূর্ণ গ্রাম থেকে সংগৃহীত না হয় তাহলে এটির এক-পঞ্চমাংশ যাকাত হিসেবে দিতে হবে এবং গুপ্তধনের (রিকায্) ক্ষেত্রেও একই বিষয়।”
অক্সিজেন এবং নাইট্রোজেনের মতো বাতাসে মিশে থাকা কোন কিছু সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে, সেগুলোকে ভূ-গর্ভস্থ হতে উৎপাদিত বস্তুসমূহের মতো একইভাবে বিবেচনা করা হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কর্তৃক সৃষ্ট যে জিনিসকে শারী’আহ্ মুবাহ্ ঘোষণা করেছে এবং যেটির ব্যবহার সীমাবদ্ধ করে দেয়নি সেটির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।
শিকার
শিকার করা হচ্ছে আরেক ধরনের কাজ। মাছ, মুক্তা, প্রবাল, স্পঞ্জ (এক প্রকার সামুদ্রিক প্রাণী) এবং অন্যান্য শিকার হওয়া প্রাণীর মালিকানা লাভ করবে শিকারী; পাখি বা পশু, কিংবা যমিন হতে শিকার করা কোন কিছুর মালিকও হবে শিকারকারী ব্যক্তি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“তোমাদের জন্য সমুদ্রের শিকার ও সমুদ্রের খাদ্য হালাল করা হয়েছে তোমাদের উপকারার্থে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা এহরামরত অবস্থায় থাকততক্ষণ পর্যন্ত হারাম করা হয়েছে স্থল শিকার।”
[সূরা মায়িদাহ্: ৯৬]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যখন তোমরা এহরাম ভেঙ্গে ফেল, তখন তোমাদের জন্য শিকার করা অনুমোদিত।”
[সূরা মায়িদাহ্: ২]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন:
“তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, কি বস্তু তাদের জন্য হালাল? বলে দিন: তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে। যেসব শিকারী জন্তুকে তোমরা প্রশিক্ষণ দান করো শিকারের প্রতি প্রেরণের জন্যে এবং ওদেরকে ঐ পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দাও, যা আল্লাহ্ তোমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন। এমন শিকারী জন্তু যে শিকারকে তোমাদের জন্যে ধরে রাখে, তা খাও এবং তার উপর আল্লাহ্’র নাম উচ্চারণ করো…”
[সূরা মায়িদাহ্: ৪] ।এবং আবু সা’লাবা আল-খাসনী বর্ণনা করেছেন যে,
“আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে গেলাম এবং বললাম: ‘হে আল্লাহ্’র নবী! আমরা শিকারের জন্য উপযোগী ভূমিতে বসবাস করি, আমি তীর এবং প্রশিক্ষিত ও অপ্রশিক্ষিত কুকুরের মাধ্যমে শিকার করি, সুতরাং আপনি আমাকে বলে দিন যে, এদের কোনটি আমার জন্য অনুমোদিত?” তিনি (সা) বলেন: “তোমার দেয়া বর্ণনা অনুসারে, তুমি একটি শিকার উপযোগী ভূমিতে বসবাস করো; সুতরাং তুমি আল্লাহ্’র নামে তোমার তীর দিয়ে যা শিকার করো তা থেকে ভক্ষণ করো, এবং তুমি যদি আল্লাহ্’র নামে তোমার প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে শিকার করো, তাহলে শিকারের সময় ও সেটি খাবারের সময় আল্লাহ্’র নাম উচ্চারণ করো, এবং তুমি যদি তোমার অপ্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে যদি শিকার করো এবং মৃত্যুর পূর্বে শিকারটিকে সংগ্রহ ও জবাই করতে পারো তবে তা থেকে ভক্ষণ করো।” (আন-নাসাঈ ও ইবনে মাজাহ্ কর্তৃক বর্ণিত)
দালালি এবং কমিশন এজেন্সী (সামসারা এবং দালালা)
দালাল হচ্ছে এমন একজন ব্যক্তি যাকে অন্যান্য ব্যক্তি তাদের পক্ষ হয়ে কোন কিছু ক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য নিয়োগ করে থাকে। একজন কমিশন এজেন্টকেও এভাবেই নিয়োগ দেয়া হয়। সামসারা (দালালি) হল এমন এক ধরনের কাজ যার মাধ্যমে কোন সম্পত্তি বৈধভাবে অধিকৃত হয়। আবু দাউদ তার সুনানে উল্লেখ করেছেন যে, কায়েস ইবনে আবু ঘুরজা আল-কাননী বলেছেন:
আমরা মদীনাতে আউসাক (বোঝাই করা মালামাল) ক্রয় করতাম এবং নিজেদেরকে দালাল বলে অভিহিত করতাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের কাছে আসলেন এবং আমাদেরকে আগের চেয়ে উত্তম একটি নামে ডাকলেন। তিনি (সা) বলেন: “হে বণিকগণ, সাধারণত ব্যবসা হচ্ছে মূর্খ কথাবার্তা ও শপথের কালিমাযুক্ত, সুতরাং একে সাদাকার সাথে মিশ্রিত করো।” এর অর্থ হলো, ব্যবসায়ীরা তার পণ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে এমনভাবে সীমালঙ্ঘন করে যে, তা মূর্খতার পর্যায়ে পড়ে যায় এবং পণ্যকে বিক্রয় করার জন্য মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দিয়ে ফেলে। তাই তার কাজের প্রতিফল থেকে মুক্তি লাভের জন্য সাদাকা দেয়া অধিকতর পছন্দনীয়। ক্রয়-বিক্রয়ের যে কাজের জন্য লোকটি চুক্তিবদ্ধ হয়েছে সেটি সুনির্দিষ্ট হতে হবে, এটি হতে পারে পণ্যের ভিত্তিতে কিংবা সময়ের ভিত্তিতে। সুতরাং, কেউ যদি একটি বাড়ী বা কোন সম্পত্তি বিক্রয় বা ক্রয় করার জন্য কাউকে একদিনের জন্যও নিয়োগ দেয় তবে সেটি বৈধ হবে। কিন্তু সে যদি অনির্দিষ্ট কোনো কাজের জন্য কাউকে নিয়োগ দেয় তবে তা অবৈধ হবে।
নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির কিছু কাজের ক্ষেত্রে দালালি প্রযোজ্য নয়। যেমন: এক ব্যবসায়ী অন্য আরেক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করার জন্য একজন এজেন্ট নিয়োগ দিলো, এবং বিক্রেতা তার কাছ থেকে ক্রয় করার প্রতিদানে এজেন্টকে কিছু অর্থ প্রদান করলো। যদি এজেন্ট এই অর্থ পণ্যের মূল্য থেকে বাদ না দিয়ে নিজের জন্য কমিশন হিসেবে রেখে দেয় তবে শারী’আহ্ এটিকে দালালি হিসেবে অনুমোদন দেয় না, কারণ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি ব্যবসায়ীর জন্য একজন এজেন্ট হিসেবে কাজ করে, তাই পণ্যের মূল্য যতটুকু কমানো হয় তা নিয়োগকারী ব্যবসায়ীর জন্য, এজেন্টের জন্য নয়। অতএব, এজেন্টের জন্য এই অর্থ গ্রহণ করা নিষিদ্ধ, কারণ তা ক্রেতার অধিকারভুক্ত, যদি ক্রেতা তা গ্রহণের অনুমতি প্রদান করে তবেই তা গ্রহণ করা তার জন্য বৈধ হবে।
একইভাবে, যদি কোনো ব্যক্তি একটি পণ্য ক্রয় করার জন্য তার বন্ধু বা ভৃত্যকে প্রেরণ করে এবং বিক্রেতা তার কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করার জন্য বন্ধু বা ভৃত্যকে কোনো সম্পত্তি প্রদান করে, অর্থাৎ কমিশন প্রদান কওে তবে সে বন্ধু বা ভৃত্যের জন্য তা গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়, কারণ সেটা দালালি নয়, বরং সেটা প্রেরণকারী ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে চুরি হিসেবে বিবেচিত হবে। এর কারণ হলো, এ সম্পত্তি তারই যে তাকে ক্রয় করতে পাঠিয়েছে এবং কখনই যাকে পাঠানো হয়েছে তার জন্য নয়।
মুদারাবা
মুদারাবা হলো দুই বা ততোধিক ব্যক্তির ব্যবসায় অংশগ্রহণ, যাতে একজন মূলধন এবং অন্যজন শ্রম বিনিয়োগ করে। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির শ্রমের সাথে আরেকজন ব্যক্তির সম্পত্তি অংশীদারিত্বে উপনীত হয়। এর অর্থ হচ্ছে যে, একজন কাজ করবে এবং অন্যজন সম্পত্তি বিনিয়োগ করবে। সুনির্দিষ্ট পরিমাণে লাভ ভাগাভাগি করে নেয়ার ব্যাপারে দু’জন অংশীদার একমত হয়। এর একটি উদাহরণ হচ্ছে, যখন একজন ব্যক্তি এক হাজার পাউন্ড বিনিয়োগ করে ও অন্যজন সেটা দিয়ে কাজ করে এবং প্রাপ্ত লাভ তাদের দু’জনের মধ্যে বন্টিত হয়। শ্রম বিনিয়োগকারী অংশীদারকে অর্থ হস্তান্তর করতে হবে এবং অর্থের উপর তাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে, কারণ মুদারাবাতে শ্রম বিনিয়োগকারী ব্যক্তিকে সম্পত্তি হস্তান্তর করে দিতে হয়। শ্রম বিনিয়োগকারী অংশীদার সম্পদ বিনিয়োগকারী অংশীদারের উপর এমন শর্তারোপ করতে পারে যে, লভ্যাংশের এক-তৃতীয়াংশ বা অর্ধেক তাকে দিতে হবে, কিংবা লভ্যাংশের সুনির্দিষ্ট অংশ ভাগ করে নেয়ার ব্যাপারে তারা ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে। এটি একারণে যে, মুদারিব বা শ্রম বিনিয়োগকারী অংশীদার তার কাজের জন্য লভ্যাংশে অধিকার দাবী করতে পারে। অতএব, অংশীদারদের জন্য এটা অনুমোদিত যে তারা মুদারিবের অল্প অথবা অধিক পরিমাণ লভ্যাংশ প্রাপ্তির বিষয়ে একমত হতে পারে। সুতরাং, মুদারাবা এমন এক ধরনের কারবার যা মালিকানা অর্জনের বৈধ পন্থা। এর ফলে মুদারিব সম্পত্তির মালিকানা লাভ করতে পারে, যা সে পারষ্পরিক ঐক্যমত্য অনুযায়ী কাজ করে মুদারাবার মাধ্যমে লভ্যাংশ হিসেবে অর্জন করে থাকে।
মুদারাবা হচ্ছে একধরনের কোম্পানী, কারণ এটা হচ্ছে শ্রম ও সম্পদেও অংশীদারিত্ব। শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত লেনদেনসমূহের একটি হচ্ছেএধরনের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। আবু হুরায়রাহ্ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“আল্লাহ্ বলেন: ‘দুইজন অংশীদারের মধ্যে আমি তৃতীয়জন, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন আরেকজনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করে। যদি তাদের একজন আরেকজনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তবে আমি নিজেকে সেখান থেকে অপসারণ করে নেই।”
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“আল্লাহ্’র হাত ততক্ষণ পর্যন্ত দুইজন অংশীদারের উপর থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা পরস্পরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করে।”
আল-আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব বর্ণনা করেছেন যে, যখন তিনি কোনো সম্পত্তি মুদারাবা হিসেবে হস্তান্তর করেন তখন তিনি মুদারিবের উপর শর্তারোপ করতেন যে, এটি নিয়ে সে সমুদ্রে ভ্রমণ করতে পারবে না, কোনো উপত্যকায় অবরোহণ করতে পারবে না, কিংবা জীবন্ত কোনো কিছু নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না, অন্যথায় সে নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ব্যাপারে জানতেন এবং তিনি (সা) এটিকে অনুমোদন দিয়েছেন। সাহাবীগণ (রা.) নিরঙ্কুশভাবে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, মুদারাবা অনুমোদিত। সাধারণত উমর ইবনে আল-খাত্তাব (রা.) এতিমদের সম্পত্তি মুদারাবা হিসেবে হস্তান্তর করতেন। উসমান ইবনে আফফান (রা.) কিছু সম্পত্তি মুদারাবা হিসেবে এক ব্যক্তিকে হস্তান্তর করেন। সুতরাং, মুদারিব অন্য একজনের সম্পত্তিকে ব্যবহার করে সম্পত্তি অর্জন করে থাকে। অতএব, মুদারিব কর্তৃক সম্পাদিত মুদারাবা হচ্ছে একধরনের কাজ এবং মালিকানা অর্জনের একটি বৈধ পন্থা। সম্পদের মালিকের জন্য এটি মালিকানা অর্জনের পন্থা নয়, বরং এটি মালিকানা বিনিয়োগের একটি মাধ্যম।
বর্গাচাষ (মুসাকাত)
কাজের আরেকটি ধরন হচ্ছে মুসাকাত, যাতে একজন ব্যক্তি তার গাছসমূহকে সেচ প্রদান ও তত্ত্বাবধান করার জন্য কারো কাছে সেগুলো হস্তান্তর করে এবং এর বিনিময়ে তাকে গাছগুলো থেকে প্রাপ্ত ফলের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ প্রদান করে। এটাকে বলা হত মুসাকাত (পারিভাষিক অর্থ সেচকার্য), কেননা এটি সেচকার্যের সাথে সংশ্লিষ্ট; হিজাজের লোকদেও গাছে প্রচুর পরিমাণে সেচ প্রয়োজন হতো, আর তারা তা কূপ থেকে সংগ্রহ করতো। মুসাকাত এমন এক ধরনের কাজ যা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত।
মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা.) বলেছেন:
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারের লোকদের সাথে অর্ধেক ফল ও বৃক্ষের ভিত্তিতে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন।”
মুসাকাত সাধারণত তাল গাছ ও লতাজাতীয় গাছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য – যার ফসলের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ শ্রমিকদেরকে দেয়া হয়। এটা শুধুমাত্র ফলবান গাছের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেসব গাছে ফল উৎপন্ন হয় না, যেমন: উইলো, কিংবা ফল হলেও তা সংগ্রহ করা হয় না, যেমন: পাইন ও সিডার, সেগুলোর ক্ষেত্রে মুসাকাত প্রযোজ্য নয়, কারণ মুসাকাত ফলের একটি অংশের জন্য প্রযোজ্য এবং এ ধরনের গাছ হতে কোনরূপ ফল অন্বেষন করা হয় না। কিন্তু যেসব গাছ হতে পাতা অন্বেষণ করা হয়, যেমন: তুঁত ও গোলাপ গাছ, সেগুলোর ক্ষেত্রে মুসাকাত প্রযোজ্য, কারণ এগুলোর পাতা ফলের সমপর্যায়ের। এগুলো থেকে বছরান্তে ফসল পাওয়া যায় এবং এগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব, এবং এগুলোর একটি অংশের বিনিময়ে মুসাকাতে প্রবেশ করা যায়, আর একারণে ফলের মতই এক্ষেত্রে একই হুকুম প্রযোজ্য।
একজন কর্মচারী বা শ্রমিককে নিয়োগ প্রদান
ইসলাম একজন ব্যক্তিকে তার হয়ে কাজ করার জন্য কর্মচারী ও শ্রমিক, অর্থাৎ কর্মী নিয়োগ করার অনুমতি প্রদান করেছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“এই পৃথিবীতে আমি তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বন্টন করেছি এবং একের পদমর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে কিছু ব্যক্তি অপরকে তাদের কাজে নিয়োগ দিতে পারে…”
[সূরা যুখরুফ: ৩২]ইবনে শিহাব বর্ণনা করেছেন যে, উরওয়াহ্ ইবনে আজ-জুবায়ের বলেছেন যে, উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন:
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবুবকর (রা.) বনু আদ-দীল থেকে অভিজ্ঞ পথ নির্দেশক হিসেবে এক ব্যক্তিকে ভাড়া করেছিলেন, যে তখনও কুরাইশদের কুফফার দ্বীনের মধ্যে ছিল। তারা তার কাছে তাদের দু’টি ভারবাহী মাদী উট হস্তান্তর করলেন এবং তিনরাত পর সকালবেলা দু’টি উটসহ সাওর-এর গুহায় তাদের সাথে সাক্ষাতের সময় ধার্য করলেন।”
এছাড়াও, আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে, তবে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেবে।”
[সূরা ত্বালাক: ৬]আবু হুরাইরাহ্ (রা.) থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“আল্লাহ্ আজ ওয়া যাল্লা বলেন: বিচার দিবসে আমি তিন ধরনের ব্যক্তির প্রতিপক্ষ হবো: একজন হলো সে ব্যক্তি যে আমার নামে কাউকে কোনো কথা দিলো এবং পরবর্তীতে তা ভঙ্গ করলো, যে একজন আজাদ ব্যক্তিকে বিয়ে করলো এবং এর মূল্য গ্রাস করল এবং যে ব্যক্তি কোনো কাজের জন্য কাউকে ভাড়া করলো এবং পুরো শ্রম দেয়ার পরও তাকে তার পারিশ্রমিক দিলো না।”
নিয়োগ প্রদানের অর্থ হচ্ছে, নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিয়োগকারীকে কোন সুবিধা প্রদান করে এবং এর বিনিময়ে নিয়োগকারী হতে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি সম্পদ লাভ করে। সুতরাং এটিকে এমন একটি চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা যায় যেখানে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিনিময়ে উপযোগ (কাজ হতে প্রাপ্ত সুবিধা) পাওয়া যায়। শ্রমিকের কাজের উপযোগের উপর ভিত্তি করে অথবা শ্রমিকের উপকারিতার কথা বিবেচনা করে একজন শ্রমিককে ভাড়া করার চুক্তি করা হয়। যদি চুক্তিটি কাজের উপযোগের উপর নির্ভর করে সম্পাদন করা হয় তবে চুক্তিকৃত বিয়য়টি হলো কাজ দ্বারা সৃষ্ট উপযোগ, যেমন: কোন বিশেষ কাজের জন্য কারিগর ভাড়া করা, পরিচ্ছনতা কর্মী ভাড়া করা, কামার বা ছুতার ভাড়া করা। তবে চুক্তিটি যদি ব্যক্তির নিজস্ব মানবীয় উপযোগিতার কথা বিবেচনা করে করা হয় তাহলে চুক্তির বিষয়বস্তু হলো ব্যক্তির উপযোগিতা, যেমন: একজন ভৃত্যকে ভাড়া করা এবং এধরনের সকল শ্রমিক। এ ধরনের চুক্তিতে শ্রমিক নিয়োগকারীর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে কাজ করে, যেমন: যে ব্যক্তি সুনির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একটি কারখানা বা বাগানে কাজ করে, কিংবা একজন কৃষক। সরকারী কর্মচারীরা এর আওতায় পড়ে। বিকল্পভাবে, একটি সুনির্দিষ্ট কাজের বিষয়ে তার দক্ষতা থাকতে পারে, মজুরির বিনিময়ে যেকোন ব্যক্তির জন্য কাজটি সে করে দিতে পারে। এ ধরনের কাজের উদাহরণ হলো ছুতার, দর্জি ও মুচীর কাজ। প্রম ধরনের কাজ হলো ব্যক্তি পর্যায়ের কাজ এবং দ্বিতীয় ধরনের কাজ হল সাধারণ শ্রম।
অধ্যায় ৩: মালিকানার প্রকারভেদ (ব্যক্তি মালিকানা)

মানষের স্বাাভাবিক প্রবনতা হচ্ছে, সে তার অভাব পরণের জন্য কাজ করতে চায় ও সম্পদের অধিকারী হতে চায় এবং এই সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে সে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। মানুষের অভাব পূরণ একটি অপরিহার্য বিষয়, যা থেকে নিজেকে সে নিবৃত্ত রাখতে পারে না। এছাড়াও, মানুষের প্রকৃতির অংশ হিসেবে সম্পদ অর্জনের বিষয়টিও অনিবার্য হয়ে পড়ে। সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা ও এর পরিমাণকে সীমাবদ্ধ করে দেয়ার যে কোন প্রচেষ্টা মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক হবে। অতএব, মানুষ ও তার সম্পদ অর্জনের স্পৃহায় বাধা সৃষ্টি করা কিংবা ব্যক্তি ও তার সম্পদ সংগ্রহের প্রচেষ্টার মাঝে অবস্থান নেয়া প্রকৃতি বিরুদ্ধ হবে।
যাই হোক, সম্পদ অর্জন, এই উদ্দেশ্যে কঠোরভাবে প্রচেষ্টা করা কিংবা এর বিলিব্যবস্থার বিষয়টি মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দেয়া উচিত নয়, কেননা এটি অনিষ্ট ও দুর্নীতির কারণ হতে পারে যা নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দিতে পারে। সক্ষমতা এবং প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ থাকার দরুন এই বিষয়টি অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। যদি এ বিষয়টি তাদের নিজেদের উপর ছেড়ে দেয়া হয় তবে শুধুমাত্র ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা সম্পদ অর্জন করতে পারবে এবং দুর্বল ব্যক্তিরা বঞ্চিত হবে, অসুস্থ ও অসমর্থ্য ব্যক্তিরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং লোভীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যাবে। অতএব, সম্পদ অর্জন এবং এই উদ্দেশ্যে সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি এমন প্রক্রিয়ায় হতে হবে যাতে করে তা সকল মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে। এই প্রক্রিয়াটির এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে, মানুষের মধ্যে বিলাস-দ্রব্যাদি অর্জনের যে আকাঙ্খা রয়েছে তাও পূরণ করা সম্ভবপর হয়। একারণে এই সম্পদ অর্জনের বিষয়টিকে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়া উচিত যার মাধ্যমে সক্ষমতা ও প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকা সত্ত্বেও সকলে সহজে সম্পদ অর্জন করতে পারে। এই পদ্ধতিটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে যাতে করে মানুষ তার মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করতে পারে এবং মানুষকে তার বিলাস সামগ্রী অর্জনের আকাঙ্খা পূরণেও সক্ষম করে তোলে। সুতরাং, সম্পদের প্রকৃতি অনুসারে মালিকানা নির্ধারণ করা জরুরী এবং মালিকানা রহিতকরণের বিষয়টি প্রতিহত করা অপরিহার্য, কারণ এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিকানাই কেবল অর্জন করা যাবে – এ বিষয়টিও রোধ করা জরুরী, কেননা এটা মানুষকে সম্পদ অর্জনের প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখে যা মানব প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। মালিকানার স্বাধীনতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কেননা এর মাধ্যমে পাপ ও দূর্নীতির জন্ম হয় যা মানুষের মধ্যে বিস্তার লাভ করে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্পর্কেরসূত্রপাত করে। ইসলাম ব্যক্তি পর্যায়ের মালিকানাকে অনুমোদন দেয় এবং এর পরিমাণ নির্ধারণ না করে মানুষের প্রকৃতি অনুসারে এটি অর্জনের প্রক্রিয়াকে সুনির্দিষ্ট করে দেয়। এটা মানুষের মধ্যকার সম্পর্কগুলোকে সুসংগঠিত করে যাতে করে মানুষ তার অভাবসমূহ পূরণ করতে পারে।
ব্যক্তি মালিকানার সংজ্ঞা
ব্যক্তি মালিকানার বিধান হচ্ছে একটি ঐশী হুকুম যা সম্পদ কিংবা প্রাপ্ত উপযোগের ভিত্তিতে বিবেচিত হয়, সম্পদের মালিককে সম্পদ সদ্ব্যবহারের এবং এর ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকার প্রদান করে। উদাহরণস্বরুপ: এটা হতে পারে এক টুকরো রুটি ও একটি বাড়ীর উপর কোন ব্যক্তির মালিকানা। রুটির টুকরোর মালিকানার মাধ্যমে সে এটি খেতে পারে বা বিক্রয় করতে পারে। একইভাবে বাড়ীর মালিকানার মাধ্যমে সে তাতে বসবাস করতে পারে বা বিক্রয় করে দিতে পারে। দু’টি উদাহরণের ক্ষেত্রেই এক টুকরো রুটি ও বাড়ী সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এগুলোর ব্যাপারে ঐশী হুকুম হচ্ছে যে, আইনপ্রণেতা এগুলো ভোগ করার মাধ্যমে প্রাপ্ত উপযোগ বা বিনিময়ের মাধ্যমে কাজে লাগানোর অনুমোদন
দিয়েছেন। সদ্ব্যবহারের অনুমোদনের অর্থ হল মালিক রুটির টুকরোটি ভক্ষণ করতে পারে ও বাড়ীতে বসবাস করতে পারে এবং চাইলে বিক্রিও করে দিতে পারে। সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত রুটির টুকরোর ক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুম হচ্ছে যে এটিকে ভোগ করার অনুমোদন রয়েছে। বাড়ীর ক্ষেত্রে শারী’আহ্ হুকুমটি বিবেচিত হয় বাড়ী হতে প্রাপ্ত উপযোগ দ্বারা, আর তা হচ্ছে এতে বসবাসের অনুমোদন। সুতরাং মালিকানা বলতে বুঝায় সম্পত্তির সদ্ব্যবহার করার জন্য আইনপ্রণেতার অনুমোদন। এই দৃষ্টিকোন অনুযায়ী, যদি আইনপ্রণেতা এটিকে এবং এর উপকরণকে অনুমোদন না দেয় তবে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে না। সম্পত্তির মালিকানা লাভের অধিকার সম্পত্তি হতে কিংবা এর উপকারী বা ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য হতে উদ্ভুত হয় না। বরং এটি আইনপ্রণেতার অনুমোদন হতে এবং কোন একটি সম্পদ আইনসঙ্গতভাবে অর্জনের পন্থাগুলোর ক্ষেত্রে তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) প্রদত্ত বৈধতা হতে উদ্ভুত হয়। এর মাধ্যমে আইনপ্রণেতা কিছু জিনিসের মালিকানার অধিকার প্রদান করেছেন এবং অন্যান্য জিনিসের মালিকানা অর্জনকে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) কিছু চুক্তিকে বৈধতা দিয়েছেন এবং অন্যগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন। একারণে আইনপ্রণেতা মুসলিমদের জন্য মদ ও শূকরের মালিকানা নিষিদ্ধ করেছেন এবং সুদ ও জুয়ার মাধ্যমে সম্পদ অর্জনকে ইসলামী রাষ্ট্রের যেকোন নাগরিকের জন্য অবৈধ ঘোষণা করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বেচাকেনাকে অনুমোদনের মাধ্যমে একে হালাল করেছেন এবং সুদকে নিষিদ্ধ, অর্থাৎ হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি ’আনান (ব্যক্তি ও আর্থিক অংশীদারীত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কারবার)-এর অনুমোদন দিয়েছেন এবং সমবায়, যৌথমূলধনী কারবার ও বীমাকে নিষিদ্ধ করেছেন।
বৈধ মালিকানা শর্তসাপেক্ষ এবং এটি হস্তান্তরে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। মালিকানা কোন সম্প্রদায়ের স্বার্থ কিংবা সম্প্রদায়ের অংশ ও সমাজে বসবাসরত কোন ব্যক্তির স্বার্থে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। মালিকানাপ্রাপ্ত কোন সম্পত্তি সদ্ব্যবহারের বিষয়টি কেবলমাত্র আইনপ্রণেতার অনুমোদনের মাধ্যমেই আসতে পারে যা তিনি ওহীর মাধ্যমে মানুষকে দান করেছেন। কোন একটি বস্তুর মালিকানা হল সমাজের কোন ব্যক্তির জন্য আইনপ্রণেতা কর্তৃক প্রদত্ত বরাদ্দ, এবং অনুমোদিত পন্থাগুলো ছাড়া অন্য কোনভাবে তার জন্য এর মালিকানা অর্জন বৈধ নয়।
কোন সম্পদের মালিকানার অর্থ হল সম্পত্তির এবং সেটা থেকে প্রাপ্ত উপযোগের মালিকানা লাভ করা। মালিকানার প্রকৃত উদ্দেশ্য হল শারী’আহ্ নিধারিত পথে সম্পত্তির সদ্বব্যবহার নিশ্চিত করা।
ব্যক্তি মালিকানার সংজ্ঞার আলোকে এটা বুঝা যায় যে, মালিকানা অর্জনের আইনগত পন্থা রয়েছে। এটাও বুঝা যায় যে, এই মালিকানা হস্তান্তরের জন্য এবং স্বত্বাধিকারে থাকা বস্তুসমূহ সদ্ব্যবহারের জন্যও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে।
অতএব, উপরোক্ত আলোচনা হতে যেসব বিষয় ব্যক্তি মালিকানার অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক হিসেবে বিবেচিত হয় সেগুলো বোঝা যেতে পারে। সুতরাং, আইনপ্রণেতা কর্তৃক প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে মালিকানা অর্জিত হওয়ার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে- অধিকার লাভ করার জন্য এবং সেই সাথে এর
সদ্ব্যবহারের জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালানো, আর এটিকেই মালিকানার প্রকৃত সংজ্ঞা হিসেবে গণ্য করা হয়। ভিন্ন শব্দে বলা যায় যে, মালিকানার প্রকৃত সংজ্ঞাই মালিকানার প্রকৃত অর্থ নির্দেশ করে।
মালিকানার অর্থ
ব্যক্তি মালিকানার অধিকার হচ্ছে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানার অধিকারী ব্যক্তির আইনগত অধিকার। আইন প্রয়োগ ও সমাজকে ইসলামী চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে তোলার মাধ্যমে এই অধিকার সংরক্ষিত ও নির্ধারিত হয়। শারী’আহ্ কর্তৃক নির্ধারিত আর্থিক মূল্য বহনের পাশাপাশি মালিকানারঅধিকার এটাও নির্দেশ করে যে, দখলে থাকা অর্জিত সম্পত্তির উপরে ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যেভাবে নিজের ঐচ্ছিক কর্মকান্ডের উপর ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, ঠিক একইভাবে সে চাইলে তার নিজের অধিকারে থাকা সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারে। অতএব, মালিকানার অধিকার আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তাআ’লা) প্রদত্ত হুকুম ও নিষেধাজ্ঞার সীমার মধ্যেই নির্ধারিত হয়।
মালিকানার অধিকার নির্ধারনকারী আইনী প্রক্রিয়ায় মালিকানা নির্ধারণের বিষয়টি সুস্পষ্ট এবং এর দ্বারা শাস্তির প্রয়োগ হবে কি হবে না সেই সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। এর উদাহরণ হল চৌর্যবৃত্তি, ডাকাতি ও অবৈধভাবে সম্পত্তি হরণের সংজ্ঞা। এই মালিকানা নির্ধারণের বিষয়টি মালিকানা হস্তান্তরের অধিকারের মধ্যেও সুস্পষ্ট, এতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে হস্তান্তর অনুমোদিত ও অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ এবং এসব ঘটনার সংজ্ঞায় ও ক্ষেত্রসমূহের প্রকারভেদ ও বহিঃপ্রকাশের মধ্যেও এটি সুস্পষ্ট। যখন ইসলাম মালিকানা নির্ধারণ করে, তখন তা পরিমাণের ভিত্তিতে করা হয় না বরং এর ধরনের বা প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে করা হয়। নিম্নলিখিত বিষয়গুলোতে এটা পরিষ্কার হয়েছে:
১. কী পরিমাণ সম্পদ অর্জিত হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে নয় বরং ইসলামে মালিকানা নির্ধারিত হয় সম্পদ অর্জন ও বিনিয়োগের পন্থার ভিত্তিতে।
২. এটি সম্পদ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে দিয়েছে।
৩. খারাজী ভূমি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, ব্যক্তি মালিকানাধীন নয়।
৪. কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তি গণমালিকানাধীন সম্পত্তিতে রূপান্তর হয়ে যেতে পারে।
৫. অভাব পূরণের জন্য যেসব মানুষের যথেষ্ট সম্পদ নেই সেসব মানুষদেরকে রাষ্ট্র প্রয়োজনের নিরিখে অনুদান প্রদান করতে পারে।এটা অপরিহার্য যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার আইনগত অধিকারসমূহ নিশ্চিত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ থাকা প্রয়োজন। আইন ব্যক্তিপর্যায়ের মালিকানার অধিকারকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের উপর অর্পণ করেছে। এটি মালিকানার মর্যাদা, সুরক্ষা ও এর প্রতি আগ্রাসনকে প্রতিহত করার বিষয়গুলোকে সুনিশ্চিত করেছে। আইনের মধ্যে শাস্তির বিধান রেখে অপরাধকে নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেছে, এবং যারা চুরি, ডাকাতি অথবা অন্য কোনভাবে এই অধিকার লঙ্ঘন করে তাদের উপর এটি পয়োগ করা হয়। সমাজকে ইসলামী চিন্তার ভিত্তিতে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ে এই বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় যাতে মানুষ তার অধিকার বহির্ভূত উপায়ে কোন কিছু অর্জনের বাসনা পোষণ না করে, অর্থাৎ যা অন্যের অধিকারে আছে তার দিকে লালসার দৃষ্টি প্রসারিত না করে। সুতরাং, হালাল বা বৈধ সম্পত্তি হিসেবে সেটাই বিবেচিত হবে যা মালিকানার সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে এবং কোন অবৈধ (হারাম) সম্পত্তি মালিকানার অধীনে আসবে না ও এটি মালিকানার সংজ্ঞার মধ্যেও পড়ে না।
সম্পত্তির মালিকানা লাভের পন্থা
যা অধিকারে নেয়া যায় তাই সম্পদ, এক্ষেত্রে এর প্রকৃতি কোন বিবেচ্য বিষয় নয়। সম্পদ অর্জনের পন্থাগুলোই হচ্ছে সেই কারণ যা প্রারম্ভিক পর্যায়ে ব্যক্তিকে সম্পত্তির মালিকানা প্রদান করে। কোন প্রকারের বিনিময়কে সম্পদের মালিকানা লাভের পন্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। এটি শুধুমাত্র সম্পত্তির অংশবিশেষ হিসেবে কোন পণ্য প্রদানের মাধ্যমে আরেকটি পণ্যের মালিকানা অর্জনের উপায়, আর এক্ষেত্রে সম্পত্তি মূলতঃ অর্জিতই থাকে এবং এর কিছু অংশবিশেষের বিনিময় হয়। সম্পদ বিনিয়োগ, যেমন: ব্যবসার লভ্যাংশ, বাড়ীর ভাড়া, কিংবা ফসল – এগুলোও একইভাবে সম্পদ অর্জনের পন্থা হিসেবে বিবেচিত হয় না। যদিওবা এই বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কিছু সম্পদের সৃষ্টি হচ্ছে তথাপি এই সম্পদ অন্য একটি সম্পত্তি থেকে উৎপন্ন হয়েছে, সুতরাং বিনিয়োগ হচ্ছে সম্পদ বৃদ্ধির একটি পন্থা, সম্পদ অর্জনের পন্থা নয়। আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সম্পদের প্রারম্ভিক মালিকানা অর্জন, ভিন্ন শব্দে: প্রকৃত সম্পদ অর্জন।
মালিকানা অর্জনের উপায় এবং ইতিমধ্যেই মালিকানাধীন সম্পত্তি বিনিয়োগের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে: প্রকৃত সম্পত্তি আহরণের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে সম্পদ অর্জন বা অধিকার করাই হল মালিকানা অর্জন। অন্যদিকে, মালিকানাধীন সম্পত্তি বিনিয়োগের অর্থ হল অধিকারে বা দখলে থাকা সম্পত্তি বৃদ্ধি পাওয়া। এক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই সম্পত্তি অধিকারে বা দখলে রয়েছে, তবে তা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং বৃদ্ধি পেয়েছে। সম্পদ অর্জন এবং মালিকানাধীন সম্পত্তির বিনিয়োগ – উভয়ের ব্যাপারে শারী’আহ্ হুকুম বিদ্যমান। বিক্রয় ও ইজারা চুক্তির সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমসমূহ বিনিয়োগের সাথে সম্পর্কিত এবং শিকার ও নীরব অংশীদারিত্বের মত কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমসমূহ সম্পত্তির মালিকানা অর্জনের সাথে সম্পর্কিত। একইভাবে, মালিকানা অর্জনের পন্থাগুলোই প্রকৃত সম্পদ অর্জনের মাধ্যম। আর মালিকানায় থাকা সম্পত্তি বিনিয়োগের পন্থাগুলোই সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম, যা ইতিমধ্যেই মালিকানা লাভের কোন একটি পন্থার মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে।
সম্পদের মালিকানার জন্য ঐশী কারণ বিদ্যমান, যা আইনপ্রণেতা সুনির্দিষ্ট কিছু উপায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন। এই কারণসমূহের ক্ষেত্রে সীমালংঘন করা যাবে না। অতএব, সম্পদের মালিকানা অর্জনের পন্থাগুলো শারী’আহ্ প্রদত্ত হুকুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সম্পদ অথবা প্রাপ্ত উপযোগের ভিত্তিতে বিবেচিত সুনির্ধারিত হুকুম বা হুকুম শারী’আহ্ হিসেবে পূর্বে উল্লেখিত সম্পত্তির সংজ্ঞানুসারে সম্পদের মালিকানা লাভের জন্য আইনপ্রণেতার অনুমোদন প্রয়োজন। অন্য কথায়, মালিকানা অর্জনের জন্য অনুমোদিত পন্থাটি শারী’আহ্র মধ্যে উল্লেখ থাকতে হবে। যদি মালিকানা লাভের বৈধ পন্থা অনুসৃত হয়ে থাকে তবে সম্পত্তির মালিকানা বিদ্যমান থাকবে এবং যদি মালিকানা অর্জনের বৈধ পন্থা না থাকে তবে সম্পত্তির মালিকানার অস্তিত্বও থাকবে না, যদিওবা একজন ব্যক্তি সেই সম্পদের মালিক হয়ে থাকে। অতএব, মালিকানা হল আইনপ্রণেতা কর্তৃক অনুমোদিত ঐশী পন্থার মাধ্যমে কোন সম্পত্তি অধীনে থাকা। শারী’আহ্ মালিকানা লাভের উপায়কে অনিয়ন্ত্রিত নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে পরিষ্কার কিছু পন্থার দ্বারা নিধারিত করে দিয়েছে। শারী’আহ সুস্পষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে এই পন্থাগুলো তুলে ধরেছে। অনেকগুলো অধ্যায়ের সমন্বয়ে এগুলো গঠিত হয়েছে, আর এ অধ্যায়গুলো হচ্ছে এই পন্থাগুলোর শাখা-প্রশাখা ও হুকুমসমূহ সুস্পষ্টকরণের জন্য প্রদত্ত ব্যাখ্যা। শারী’আহ্ এই পন্থাগুলোকে কিছু সাধারণ মানদন্ড দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেনি, সুতরাং অন্য কোন সাধারণ পন্থাকে সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এটা একারণে যে, নতুন চাহিদা শুধুমাত্র উৎপাদিত সম্পদের উপর, লেনদেনের উপর নয়; অর্থাৎ সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থার মধ্যে এটি অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং এটা সম্পর্কের উপজীব্য বিষয়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। অতএব, লেনদেনকে সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা জরুরী যা নতুন ও বিভিন্ন ধরনের চাহিদার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, এছাড়াও এটিকে সম্পত্তির ক্ষেত্রে সম্পদ হিসেবে ও কাজের ক্ষেত্রে কাজ হিসেবে প্রয়োগ করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গী ব্যক্তি মালিকানাকে এমনভাবে নিরূপণ করে যা মানুষের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি এমনভাবে মালিকানাকে সুসংগঠিত করে যাতে মালিকানা অর্জনের পন্থা অনিয়ন্ত্রিত রাখার ফলে উদ্ভুত বিপদ হতে সমাজকে সুরক্ষিত রাখা যায়। বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির একটি দিক হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জনের আকাঙ্খা, যেমনিভাবে যৌন প্রবৃত্তির একটি দিক হলো বিয়ে এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পনের প্রবৃত্তির একটি দিক হলো উপাসনার আচার-আনুষ্ঠানাদি। যদি প্রবৃত্তির এসব দিকগুলোকে যথেচ্ছভাবে পূরণ করতে দেয়া হয় তবে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হবে এবং মানুষ সেগুলোকে অস্বাভাবিক ও ভুলপথে পূরণ করার দিকে ধাবিত করবে। অতএব, যে পন্থায় মানুষ সম্পদ অর্জন করবে সেটি নির্ধারণ করে দেয়া জরুরী, যাতে করে উম্মাহ্’র ছোট একটি অংশ সম্পত্তির উপকরণ ব্যবহার করে উম্মাহ্’কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে এবং অধিকাংশ জনগণ যেন তাদের চাহিদা পূরণে বঞ্চিত না হয়; এবং সম্পদ যাতে কেবলমাত্র সম্পদ আহরণের নিমিত্তেই উপার্জিত না হয়, অন্যথায় মানুষ সুখকর জীবন হারিয়ে ফেলবে; আর একারণে কেবলমাত্র সঞ্চয় করার জন্য মানুষ সম্পদ অর্জন করলে তা প্রতিহত করা হবে। একইভাবে, সম্পদের মালিকানা লাভের পন্থাগুলোও নির্ধারিত করে দেয়া প্রয়োজন। সম্পদের মালিকানা সংক্রান্ত আহকামে শারী’আহ্ বা ঐশী বাণী পর্যবেক্ষণ করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, মালিকানা অর্জনের পন্থাগুলোকে ৫টি বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেয়া হয়েছে:
১. কাজ।
২. উত্তরাধিকার।
৩. জীবন ধারণের জন্য সংগৃহীত সম্পদ।
৪. নাগরিকদের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক মঞ্জরিকৃত সম্পদ।
৫. সম্পত্তি বিনিময় বা কাজ ব্যতিরেকে ব্যক্তি কর্তৃক গৃহীত সম্পদ।অধ্যায় ২: অর্থনীতি

অর্থনীতি (Economy) শব্দটি একটি পুরনো গ্রীক শব্দ হতে উৎপত্তি হয়েছে, যার অর্থ হলো গৃহস্থালীর কাজের জন্য পরিকল্পনা করা যাতে এর কর্মক্ষম সদস্যগণ পণ্য উৎপাদন ও দায়িত্ব পালন করে, এবং এর সব সদস্যগণ তাদের অধীনে থাকা সবকিছু ভোগ করে। সময়ের আবর্তে লোকেরা গৃহের সংজ্ঞাকে রাষ্ট্র দ্বারা পরিচালিত একটি সম্প্রদায় পর্যন্ত পরিব্যপ্ত করেছেন।
অর্থনীতি শব্দটি সঞ্চয় কিংবা সম্পদ বোঝানোর মতো ভাষাগত অর্থে প্রয়োগের অভিপ্রায়ে ব্যবহার করা হয়নি। বরং এখানে একে প্রায়োগিক অর্থে অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা একে নিশ্চিত করার মতো সম্পদের ব্যবস্থাপনার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যা অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়; অথবা সম্পদের বন্টন ব্যবস্থার অর্থে যা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আলোচ্য বিষয়।
যদিও অর্থনৈতিক বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা উভয়ই অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করে, তদুপরি এদের স্বকীয় অর্থ রয়েছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পদের পরিমাণের উঠানামা দ্বারা প্রভাবিত হয় না। সম্পদের পরিমাণের উঠানামা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধরণের উপরও কোন প্রভাব ফেলে না। সুতরাং অর্থনীতিকে একটি মাত্র বিষয় হিসেবে দেখা, এবং একে একটি প্রসঙ্গ হিসেবে আলোচনা করা একটি মারাত্বক ভুল। কেননা তা সমাধানের প্রয়োজন অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে ক্রটিপূর্ণ উপলদ্ধির দিকে ধাবিত করে কিংবা যে নিয়ামকসমূহ দেশের সম্পদ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে সেগুলোকে উপলদ্ধি করার ক্ষেত্রে ত্রুটি দেখা দিতে পারে। কারণ, সম্পদ বৃদ্ধির দৃষ্টিকোন থেকে জনগণের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা হলো এক ইস্যু, এবং সম্পদ বন্টনের দৃষ্টিকোন থেকে জনগণের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ইস্যু। সুতরাং অর্থনৈতিক বস্তুর ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে এর বন্টন ব্যবস্থাপনার বিষয় থেকে আলাদা করে দেখতে হবে। প্রথমটি উপকরণের সাথে জড়িত এবং পরেরটি চিন্তার সাথে সম্পর্কিত। জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী (একটি আদর্শের বিশ্বাস) উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা চিন্তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আলোচিত হতে হবে এবং অর্থনৈতিক বিজ্ঞানকে অবশ্যই বিজ্ঞান হিসেবে আলোচনা করতে হবে যার সাথে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গীর কোন সম্পর্ক নেই। তাই এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কেননা অর্থনৈতিক সমস্যা মানবজাতির চাহিদা, এগুলো পূরণের উপকরণ এবং এই উপকরণসমূহের সদ্ব্যবহারকে ঘিরে আবর্তিত হয়। যেহেতু উপকরণসমূহ এ মহাবিশ্বে অস্তিত্বশীল, সেহেতু এদের উৎপাদন চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অপরিহার্য কোন সমস্যা সৃষ্টি করে না, বরং মানুষের প্রয়োজনই তাকে এই উপকরণসমূহকে উৎপাদনের দিকে তাড়িত করে। তবে প্রকৃত সমস্যা বিদ্যমান মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের মাঝে, অর্থাৎ সমাজে, যা এসব উপকরণকে সদ্বব্যবহার করার ব্যাপারে জনগণকে সুযোগ দেয়া কিংবা নিয়ন্ত্রন আরোপ করার কারণে সৃষ্ট হয়। এসব উপকরণের উপর মানুষের মালিকানা সম্পর্কিত বিষয় হতে সৃষ্ট। এটাই হলো অর্থনৈতিক সমস্যার ভিত্তি যার অবশ্যই সমাধান প্রয়োজন। সুতরাং উপযোগের মালিকানা থেকে অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হয়, উপযোগ প্রদানকারী উপকরণের উৎপাদন থেকে নয়।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি
একটি বস্তু থেকে প্রাপ্ত উপযোগই মানুষের প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে সে বস্তুর উপযোগিতাকে উপস্থাপন করে। উপযোগ দু’টি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। একটি হলো ঐ বিশেষ বস্তুর জন্য মানুষ কতটুকু তাগিদ অনুভব করে এবং দ্বিতীয়টি হলো বস্তুর মধ্যে বিদ্যমান যোগ্যতা ও মানুষের চাহিদা পূরণের সক্ষমতা যা বিশেষ কোন ব্যক্তির চাহিদার বিপরীত। এ উপযোগ আসতে পারে মানুষের প্রচেষ্টার মাধ্যমে, পণ্যের মাধ্যমে অথবা উভয়ের মাধ্যমে। মানবীয় প্রচেষ্টার মধ্যে রয়েছে কায়িক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রম যা সে সম্পদ সৃষ্টি অথবা সম্পত্তি থেকে উপযোগ লাভের জন্য বিনিয়োগ করে।
পণ্য শব্দটি দ্বারা সদ্বব্যবহারের জন্য ক্রয়, ইজারা বা ধার করার মাধ্যমে অধিকারে থাকা যে কোন বস্তুকে বুঝায়, হোক সেটা ভোগের মাধ্যমে, যেমন: কোন আপেল বা ব্যবহারের মাধ্যমে, যেমন: গাড়ি, অথবা ধার করা একটি মেশিনকে সদ্ব্যবহার করা বা একটি বাড়ীকে ইজারা নেয়া। সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে অর্থ, যেমন: সোনা বা রূপা, পণ্য যেমন: পোষাক পরিচ্ছদ ও খাদ্যদ্রব্য এবং স্থাবর সম্পত্তি, যেমন: বাড়ী বা কলকারখানা এবং মানুষের অধিকারে থাকা এরকম অনেক কিছু। যেহেতু সম্পত্তি নিজে থেকেই মানুষের প্রয়োজন মেটায় এবং মানুষের প্রচেষ্টা হলো সম্পত্তি অর্জন বা এর থেকে উপযোগ পাওয়ার মাধ্যম, সেহেতু সম্পদ হলো উপযোগ প্রাপ্তির ভিত্তি ও মানুষের শ্রম হলো সম্পত্তি অর্জনে সমর্থবান করে তুলার একটি উপায় মাত্র। সুতরাং প্রকৃতিগতভাবে মানুষ অধিকার করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি লাভের জন্য প্রচেষ্টা চালায়। সুতরাং মানুষের প্রচেষ্টা এবং সম্পত্তি হলো প্রয়োজন মেটাবার উপকরণ। এগুলো হলো সম্পত্তি যা অর্জন করার জন্য মানুষ প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়। সুতরাং সম্পদ বলতে সম্পত্তি এবং মানুষের প্রচেষ্টাকে একত্রে বুঝায়।
ব্যক্তির সম্পত্তি লাভ ঘটতে পারে অন্যের মাধ্যমে, যেমন: উপহার হিসেবে সম্পত্তি লাভ করা, অথবা প্রত্যক্ষভাবে, যেমন: কাঁচামালের মালিক হওয়া। পণ্য অর্জনের অপরিহার্যতা হতে পারে:
১. ভোগের জন্য, যেমন: একটি আপেল অধিকারে থাকা
২. সদ্বব্যবহার করা, যেমন: একটি বাড়ীর মালিক হওয়া
৩. সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত উপযোগের অধিকারী হওয়া, যেমন: একটি বাড়ী ইজারা করা
৪. অথবা মানুষের শ্রমলদ্ধ উপযোগের অধিকারী হওয়া, যেমন: একজন স্থপতির নকশাসম্পদের মালিক হওয়ার ধরণ হলো- ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে, যেমন: সম্পত্তি ইজারা বা বিক্রয় করা এবং কর্মচারীদের বেতন, অথবা এটা ক্ষতিপূরণ নয়, হতে পারে সাহায্য, মঞ্জুরী, উপহার, উত্তরাধিকার অথবা ঋণ। তবে অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হয় সম্পদের মালিকানা লাভের ক্ষেত্রে, কিন্তু সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে নয়। অর্থনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি হয় মালিকানার দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, মালিকানার মন্দ বিন্যাস থেকে এবং লোকদের মাঝে সম্পদের অসম বন্টন থেকে। সমস্যা অন্য কোন বিষয় থেকে উদ্ভুত হয় না এবং এ বিষয়টির দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করাই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত তা তিনটি মূলনীতির সমন্বয়ে গঠিত:
১. মালিকানা
২. মালিকানার হস্তান্তর (Disposal) এবং
৩. লোকদের মাঝে সম্পদের বন্টনঅর্থনীতির প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী
সম্পদের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী এর সদ্ব্যবহারের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর চেয়ে ভিন্নতর। যে উপকরণ উপযোগ (Benefit) উৎপাদন করে তার চেয়ে উপযোগের সত্ত্বাধিকারী হওয়ার বিষয়টিকে ভিন্নতর বিষয় হিসেবে ইসলাম বিবেচনা করে। সুতরাং সম্পত্তি এবং মানুষের শ্রম হলো সম্পদের উপাদান বা উপকরণ, এবং এই উপকরণসমূহ উপযোগ তৈরি করে। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনে এদের অস্তিত্ব ও উৎপাদন এদের ব্যবহার ও উপযোগের মালিকানা লাভ করার প্রশ্ন থেকে ভিন্নতর। সুতরাং কিছু সম্পদের সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলাম সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে, উদাহরণস্বরূপ এটি কিছু পণ্য যথা: মদ এবং মৃত খাদ্যদ্রব্যকে নিষিদ্ধ করেছে। একইভাবে এটা মানুষের কিছু কাজ থেকে উপযোগ পাওয়াকে নিষিদ্ধ করেছে, যেমন: নাচ এবং বেশ্যাবৃত্তি। তাছাড়া ইসলাম হারাম খাদ্যদ্রব্যের ব্যবসা এবং হারাম কর্মকান্ড সম্পাদনের জন্য কাউকে নিয়োগ প্রদানকে নিষিদ্ধ করেছে। এটি হল সম্পত্তির সদ্ব্যবহার ও মানুষের শ্রমের ক্ষেত্রে। তবে সম্পত্তি ও মানুষের শ্রমের মালিক হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলাম একে নিয়ন্ত্রন করার জন্য অসংখ্য হুকুম দিয়েছে, যেমন: শিকারের হুকুম, ভূমি পুণরুদ্ধার, ইজারা, উৎপাদন, উত্তরাধিকার, দান এবং অসিয়ত সম্পর্কিত হুকুমসমূহ।
এগুলো হলো সম্পদের সদ্ব্যবহার এবং এর প্রাথমিক মালিকানার বিষয়াদি। সম্পদ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষকে সাধারণভাবে উপার্জনের জন্য প্রণোদিত করার মাধ্যমে উৎসাহ দিয়েছে। উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কারিগরি পদ্ধতির আলোচনা বা উৎপাদনের পরিমাণের ক্ষেত্রে ইসলাম হস্তক্ষেপ করেনি, বরং এটাকে লোকদের ইচ্ছার উপর ন্যস্ত করেছে।
সম্পত্তির অস্তিত্বের ক্ষেত্রে বলা যায়, এটা এ পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবেই রয়েছে। মানুষের প্রয়োজনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য যা কিছু জমিনে রয়েছে সে সমস্ত।”
[সূরা বাক্বারা: ২৯]“তিনি আল্লাহ্ যিনি সমুদ্রকে তোমাদের উপকারার্থে আয়ত্বাধীন করে দিয়েছেন, যাতে তাঁর আদেশক্রমে তাতে জাহাজ চলাচল করে এবং যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ তালাশ করো ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হও।”
[সূরা আল-জাসিয়া: ১২]তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
“এবং আয়াত্বাধীন করে দিয়েছেন তোমাদের, যা আছে নভোমন্ডলে ও যা আছে ভূমন্ডলে; তাঁর পক্ষ থেকে। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।”
[সূরা আল-জাসিয়া: ১৩]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
“মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক, আমি আশ্চর্য উপায়ে পানি বর্ষণ করেছি, এরপর আমি ভূমিকে বিদীর্ণ করেছি। অতঃপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙুর ও শাক-সবজি, যয়তুন, খেজুর, ঘন উদ্যান, ফল এবং ঘাস, তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের উপকারার্থে।”
[সূরা আবাসা: ২৪-৩২]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
“আমি তাঁকে তোমাদের জন্যে বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে। অতএব তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে?”
[সূরা আম্বিয়া: ৮০]“আর আমি নাযিল করেছি লৌহ, যাতে আছে প্রচন্ড রণশক্তি এবং মানুষের বহুবিধ উপকার।”
[সূরা হাদীদ: ২৫]আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এইসব এবং অন্যান্য আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে, তিনিই সম্পত্তি এবং মানুষের শ্রমকে সৃষ্টি করেছেন, এবং এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত থাকতে পারে এমন কিছু নিয়ে তিনি আলোচনা করেননি; যা থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সম্পত্তি ও মানুষের পরিশ্রমের সদ্ব্যবহার দেখানো ছাড়া এগুলোর ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেননি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সম্পদ সৃষ্টিতেও হস্তক্ষেপ করেননি; এমন কোন শারী’আহ্ দলিল দেখানো সম্ভবপর নয় যেখানে সম্পদ সৃষ্টির ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। উল্টো আমরা দেখতে পাই শারী’আহ্ সম্পদ আহরণ ও মানুষের প্রচেষ্টাকে উন্নততর করার বিষয়টি মানুষের উপর ছেড়ে দিয়েছে। হাতের মাধ্যমে খেজুর গাছের পরাগায়নের ব্যাপারে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
“তোমরা তোমাদের দৈনন্দিন কাজের ব্যাপারে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল আছো।”
এটাও বর্ণিত আছে যে মুহাম্মদ (সা) অস্ত্র উৎপাদনের কৌশল শেখার জন্য দু’জন মুসলিমকে ইয়ামেনের জুরাসে প্রেরণ করেছিলেন। এই উদাহরণসমূহ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শারী’আহ সম্পদ সৃষ্টির বিষয়টি মানুষের উপর অর্পণ করেছে যা তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে উৎপাদিত হবে।
এসব থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠে যে, ইসলাম অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে, অর্থনৈতিক বিজ্ঞানের প্রতি নয়। এটা সম্পদের ব্যবহার, এবং তা হতে উপযোগ প্রাপ্তির পদ্ধতিকে এর আলোচ্য বিষয়বস্তু হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এটা সম্পদ উৎপাদন কিংবা উপযোগ লাভের বিভিন্ন উপায়ের উপর মোটেও আলোকপাত করেনি।
ইসলামে অর্থনৈতিক নীতি
অর্থনৈতিক নীতি হলো আইনের লক্ষ্য যা মানুষের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করে। ইসলামে অর্থনৈতিক নীতি হলো প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সব মৌলিক চাহিদাকে পূর্ণাঙ্গরূপে পূরণ করা, এবং একটি আদর্শিক সমাজে বসবাসরত একজন ব্যক্তির জন্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিলাসদ্রব্য অর্জনের সুযোগ করে দেয়া। অর্থাৎ ইসলাম একটি দেশে বসবাসরত মোট জনগোষ্ঠীকে ব্যক্তিসমষ্টি হিসেবে চিন্তা না করে প্রত্যেক ব্যক্তিকে এককভাবে বিবেচনা করে। তাকে প্রথমত একজন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে যার সকল মৌলিক চাহিদা সম্পূর্ণ পূরণ করতে হবে এবং অত:পর বিবেচনা করে ব্যক্তি বিশেষ হিসেবে যাতে সে তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিলাসদ্রব্য অর্জনের সুযোগ করে দিতে হবে। একইসময় ইসলাম তাকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখে যে অন্যদের সাথে একটি নির্দিষ্ট রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন সম্পর্কের মাধ্যমে পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ অধিকারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে শুধু দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা ইসলামী অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্য নয়। শুধুমাত্র সমাজে চাহিদাসমূহ পূরণের জন্য বিভিন্ন উপকরণের যোগান দেয়াও নয়, বরং এসব উপকরণ হতে সামর্থ্য অনুযায়ী সুবিধা নেয়ার জন্য মানুষকে তার স্বাধীন ইচ্ছার উপর ছেড়ে না দিয়ে প্রত্যেকের জীবনধারণের অধিকারকে নিরাপত্তা প্রদান করে। এটি প্রত্যেক ব্যক্তির সমস্যাকে মানবীয় সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে যারা একটি সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ থেকে বসবাস করে। অত:পর একটি নির্দিষ্ট জীবনরীতি অনুসারে তার জীবনমান উন্নত করে এবং স্বাচ্ছন্দ্য অর্জনের জন্য নিজেকে সামর্থ্যবান করে তোলে। এভাবে এটি অন্যান্য অর্থনৈতিক নীতির চেয়ে আলাদা।
মানুষের জন্য অর্থনৈতিক হুকুমসমূহ প্রণয়নের সময়, ইসলাম হুকুমগুলোকে ব্যক্তির জীবনধারণের অধিকার এবং বিলাসসামগ্রী অর্জনের নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছে, এবং একই সময়ে এটা নিশ্চিত করেছে যে, সমাজে একটি বিশেষ জীবনব্যবস্থা বিদ্যমান। সুতরাং, ইসলাম একটি সমাজ কেমন হবে সেটা বিবেচনায় আনে, এবং পাশাপাশি একই সময়ে নিরাপদ জীবিকা এবং বিলাসসামগ্রী প্রাপ্তির সুযোগ নিশ্চিত করে। একটি সমাজ কেমন হবে এ ব্যাপারে গৃহিত দৃষ্টিভঙ্গীকেই সে জীবিকা ও সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গীর ভিত্তি করেছে। সুতরাং, যেকেউ আহকামে শারী’আহ্-তে দৃষ্টিপাত করলে দেখতে পাবে যে তা পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য মৌলিক অধিকারসমূহকে (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) নিশ্চিত করেছে। এটা অর্জিত হয় প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তিকে কাজ করতে বাধ্য করার মাধ্যমে, যাতে সে নিজের এবং তার উপর নির্ভরশীলদের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করতে পারে। ইসলাম কাজ করতে অক্ষম পিতামাতার দায়িত্ব তাদের সন্তান বা উত্তরাধিকারীদের হাতে অর্পণ করেছে, এবং দায়িত্ব নেয়ার মতো কেউ না থাকলে বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপর এ দায়িত্ব অর্পণ করেছে। ইসলাম এমনভাবে তা করেছে যাতে প্রত্যেক ব্যক্তি তার নিজের এবং তার উপর নির্ভরশীলদের মৌলিক চাহিদাসমূহ তথা পর্যাপ্ত খাবার, বস্ত্র এবং বাসস্থান নিশ্চিত করাকে তার ইসলামী দায়িত্ব মনে করে। এবং অতঃপর সামর্থ্য অনুযায়ী বিলাসদ্রব্য অর্জনের প্রতি উৎসাহিত হয়।
কিছু বিশেষ ক্ষেত্র বাদে জনগণের কাছ থেকে করারোপ করে সম্পদ হরণ করাকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে, যেমন: জিহাদ বা দূর্ভিক্ষের সময় সব মুসলিমের উপর কর দেয়া বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। আর এ করারোপ করা হবে সে সম্পত্তির উপর যা সাধারণত একজন ব্যক্তি তার মৌলিক অধিকার ও বিলাসসামগ্রী পূরণের পর উদ্বৃত্ত থাকে। এভাবে এটা প্রত্যেকের জীবিকা অর্জনের অধিকার পূরণ করে এবং বিলাসসামগ্রী অর্জনের পথকে সুগম করে। এছাড়া ইসলাম তার মৌলিক অধিকার ও বিলাসসামগ্রী উপার্জনের ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং একটি নির্দিষ্ট রীতির মাধ্যমে তার সাথে অন্যদের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সেকারণে ইসলাম মুসলিমদের জন্য মদ উৎপাদনকে নিষিদ্ধ করেছে এবং এটিকে অর্থকারী পণ্য হিসেবে গণ্য করে না। ইসলাম রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য সুদকে এবং লেনদেনের সময় এর ব্যবহারকে নিষিদ্ধ করেছে। ইসলাম মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে কারো জন্যই সুদকে অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে গণ্য করে না। সুতরাং অর্থনৈতিক পণ্যের সদ্ব্যবহারের জন্য ইসলাম কোন সম্পত্তি সদ্ব্যবহারের সময় একটি সমাজ কেমন হবে তাকে মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
ইসলাম একজনের ব্যক্তি সত্ত্বাকে তার মানবীয় সত্ত্বা কিংবা তার মানবীয় সত্ত্বাকে তার ব্যক্তি সত্ত্বা হতে আলাদা করে না। তাছাড়া প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পূরণের নিরাপত্তা এবং বিলাসামগ্রী অর্জনের সুযোগ প্রদানকে, একটি সমাজ কেমন হবে তা হতে আলাদা করেনা। বরং, ইসলাম চাহিদা পূরণ এবং সমাজ কেমন হবে, এই দুটি বিষয়কে পরস্পর অবিচ্ছেদ্য বিষয় মনে করে কিন্তু এক্ষেত্রে সমাজব্যবস্থার ধরণকে মৌলিক চাহিদা পূরণের ভিত্তি বানিয়েছে। সকল মৌলিক চাহিদাগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ এবং বিলাসদ্রব্য অর্জনে সক্ষম করার স্বার্থে, অর্থনৈতিক পণ্য সহজলভ্য করতে হবে, এবং ততক্ষণ পর্যন্ত এগুলোকে সহজলভ্য করা যাবে না যতক্ষন পর্যন্ত না তারা এগুলো অর্জনে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালায়। সুতরাং, ইসলাম জনগণকে উপার্জন, রিযিক অন্বেষণ এবং প্রতিযোগীতার আহ্বান জানায়। এবং ইসলাম ব্যক্তির নিজের জন্য এবং তার উপর নির্ভরশীল বাকি সদস্যদের ভরণপোষণের জন্য প্রত্যেক কর্মক্ষম ব্যক্তির জন্য রিযিক অন্বেষণকে ফরয করেছে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“অতএব, তোমরা তাতে বিচরণ করো এবং তাঁর দেয়া রিযিক আহার করো।”
[সূরা মূলক: ১৫]তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইসলাম সম্পদের উৎপাদন কিংবা সম্পদের উৎপাদন ও পরিমাণ বৃদ্ধির কারিগরী কৌশলের দিকে হস্তক্ষেপ করেছে। বরং এটি সম্পত্তি অর্জনের উদ্দেশ্যে উপার্জনের জন্য উৎসাহিত করেছে। সম্পত্তি অর্জনের ব্যাপারে উৎসাহিত করে অনেক হাদীস এসেছে।
একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাদ ইবনে মু’আজ (রা.)-এর সাথে হাত মেলালেন এবং তার হাত রুক্ষ পেলেন। যখন রাসূল (সা) এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলেন, তখন তিনি (রা.) বললেন: “আমি পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বেলচা দিয়ে খনন করেছি।” রাসূল (সা) তার হাতে চুমু খেলেন এবং বললেন: “এই হাতদ্বয়কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পছন্দ করেন” । যা আল-শারখাশি তার আল-মাবসুত-এ বর্ণনা করেছেন। এবং আল-বুখারী আল-মিকদাম হতে বর্ণনা করেছেন যে রাসূল (সা) বলেছেন: “স্বীয় হাতে উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে ভাল খাবার আর কেউ কখনও খায়নি।”
বর্ণিত আছে যে, উমর বিন আল খাত্তাব (রা.) কিছু লোককে অতিক্রম করছিলেন, যারা কুর’আন পাঠকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তাদের বসে থাকতে এবং মাথা নোওয়াতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন: “তারা কে?” তাকে বলা হলো: “এরা হচ্ছে সে সমস্ত লোক যারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র উপর ভরসা করে।” প্রত্যুত্তরে উমর (রা.) বললেন: “না, তারা হলো সে সমস্ত লোক যারা লোকেদের সম্পত্তি ভক্ষণ করে। তোমরা কি চাও আমি তাদের কথা বলি যারা সত্যিকারভাবেই আল্লাহ্’র উপর নির্ভর করে?’ তিনি বললেন: “এরা হচ্ছে সে সমস্ত লোক যারা বীজকে ভূমিতে বপন করে এবং সর্বশক্তিমান ও পরাক্রমশালী আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার উপর ভরসা করে।”
সুতরাং এসব আয়াত এবং হাদীসসমূহ রিযিক অন্বেষণ, সম্পত্তি অর্জনের জন্য কাজ করার ব্যাপারে উৎসাহী করে যেমনভাবে এগুলো সম্পত্তির ভোগ এবং ভালো খাদ্যগ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহিত করে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আপনি বলুন: আল্লাহ্’র সাজ-সজ্জাকে যা তিনি বান্দাদের জন্যে সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র খাদ্রবস্তুসমূহকে কে হারাম করেছে?”
[আল-আরা’ফ: ৩২]এবং
“আল্লাহ্ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে, এই কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পণ্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ী বানিয়ে পরানো হবে। আর আল্লাহ্ হচেছন আসমান ও যমীনের পরম সত্ত্বাধিকারী। আর যা কিছু তোমরা কর; আল্লাহ্ সে সম্পর্কে জানেন।”
[সূরা আলি-ইমরান: ১৮০]এবং
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্যে ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর এবং তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না।”
[সুরা আল বাক্বারা: ২৬৭]এবং
“হে মুমিনগণ, তোমরা ঐসব সুস্বাদু বস্তু হারাম করো না, যেগুলো আল্লাহ্ তোমাদের জন্য হালাল করেছেন” ।
[সূরা মায়ি’দাহ্: ৮৭]এবং
“আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা যেসব বস্তু তোমাদেরকে দিয়েছেন, তন্মধ্য থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু খাও এবং আল্লাহ্-কে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী।”
[সূরা আল-মায়ি’দাহ্: ৮৮]এ আয়াত ও এজাতীয় অন্যান্য আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, অর্থনৈতিক নীতির সাথে সম্পর্কিত ঐশী বাণী বা আহকামে শারী’আহ্’র লক্ষ্য হল সম্পত্তি অর্জন করা এবং উত্তম বস্তু ভোগ করা। সুতরাং ইসলাম ব্যক্তির উপর উপার্জনকে বাধ্যতামূলক করেছে এবং উপার্জিত সম্পদ থেকে ভোগ করার নির্দেশ দিয়েছে যাতে করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়, প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যায় এবং তার বিলাসদ্রব্যের চাহিদা পূরণ করা যায়।
সম্পদ অর্জনকে সহজতর করার জন্য, আমরা দেখতে পাই যে, ইসলাম কোন জটিলতা ব্যতিরেকে সম্পদের মালিকানা অর্জনের জন্য পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। সেটা সম্পদ অর্জনের পথকে সহজতর করেছে। ইসলাম মালিকানা লাভের বৈধ পথ ও মালিকানা হস্তান্তরের চুক্তিসমূহ সুসংজ্ঞায়িত করেছে এবং মানুষ যেসব রীতি ও উপকরণ প্রয়োগ করে উপার্জন করতে চায় সে ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছে এবং সম্পদ উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনরূপ হস্তক্ষেপ করেনি।
বৈধ উপায়ে মালিকানা ও চুক্তি সম্পাদনের জন্য ইসলাম বিবিধ নীতিমালা এবং আইন সম্বলিত সাধারণ নির্দেশনা উপস্থাপন করেছে, যা বহু বিষয়ে প্রয়োগ করা যায় এবং যা থেকে কিয়াসের মাধ্যমে বহু হুকুম উৎসারিত করা যায়।
সুতরাং ইসলাম কাজকে বাধ্যতামূলক করেছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত আইন প্রণয়ন করেছে, এবং মানুষকে বিভিন্ন পেশা- কাঠমিস্ত্রী, উৎপাদনকারী, কারিগর, ব্যবসায়ী প্রভৃতি হবার সুযোগ দিয়েছে। উপহারকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যার সাথে কিয়াসের মাধ্যমে দান বা আর্থিক সাহায্যকে মালিকানা প্রাপ্তির উপায় বলা যায়। কর্মসংস্থানকে এমনভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যার সাথে কিয়াসের মাধ্যমে উকালতিকে তুলনা করা যায় ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির সাথে। সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, মালিকানা লাভের উপায় এবং চুক্তিসমূহ সাধারণভাবে শারী’আহ্ বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করেছে এবং এমনভাবে স্থাপন করেছে যাতে করে অনেক সমসাময়িক বিষয়সমূহের সমাধানও এখান থেকে পাওয়া যায়, যদিও এগুলো নতুন কোন ধরনের লেনদেনকে অনুমোদন দেয় না। শারী’আহ্ সংজ্ঞায়িত পদ্ধতিতেই লোকদের লেনদেন করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে যা নতুন অনেক ঘটনার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যায়।
সুতরাং মুসলিমগণ সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন কোন বাঁধা ছাড়াই দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হবে। এভাবে সব ব্যক্তির জন্য মৌলিক অধিকার পূরণ করা সম্ভব। ইসলাম কেবলমাত্র ব্যক্তিকে উপার্জন করতে বলে না, বরং রাষ্ট্রের সব নাগরিকদের প্রয়োজনে বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে দায়িত্বশীল হতে বলে। সেকারণে এটা শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তির দায়িত্ব নেয়াকে রাষ্ট্রের কর্তব্য মনে করে। উম্মাহ্’র জন্য মৌলিক অধিকারের সংস্থান করা এর অন্যতম একটি দায়িত্ব মনে করে, কেননা রাষ্ট্র উম্মাহ্’র তত্ত্বাবধান করতে বাধ্য।
ইবনে উমর হতে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“ইমাম হলেন দায়িত্বশীল (রা’ঈ) এবং তিনি সব নাগরিকের জন্য দায়িত্বশীল।”
রাষ্ট্রের উপর শারী’আহ্ প্রদত্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শারী’আহ্ রাষ্ট্রকে বিশেষ কিছু রাজস্ব আদায় করার দায়িত্ব অর্পণ করেছে, যেমন: জিযিয়া এবং খারাজ (ভূমিকর); যাকাতও রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মাল সংগ্রহ করে থাকে। উম্মাহ্’র উপর ন্যস্ত দায়িত্বের জন্য রাষ্ট্রের অর্থ সংগ্রহের অধিকার রয়েছে, যেমন: রাস্তা সংস্কার, হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা, দরিদ্র লোককে খাদ্য দেয়া এবং এ জাতীয় সবকিছু।
শারী’আহ্ গণমালিকানাধীন সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রকে অর্পণ করেছে। শারী’আহ্ ব্যক্তিকে গণমালিকানাধীন সম্পত্তি পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। কারণ সামগ্রিক দায়দায়িত্ব ইমামের এবং এ দায়দায়িত্ব ইমাম ছাড়া আর কোন সাধারণ নাগরিকের উপর বর্তায় না যদি না তিনি ইমাম কর্তৃক নিযুক্ত হন। পানি, তেল, লোহা, তামা, এবং এ জাতীয় গণমালিকানাধীন সম্পত্তি উম্মাহ্’র বা জাতির সমৃদ্ধির জন্য সদ্ব্যবহার করতে হবে। কারণ এ সম্পত্তির মালিক হল উম্মাহ্। রাষ্ট্র বরং এগুলোর প্রশাসনিক ও উন্নয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। যখন রাষ্ট্র তহবিল সরবরাহ করে এবং লোকদের বিষয়াদি তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব গ্রহণ করে, এবং যখন প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি সম্পদ উপার্জন করে তখন ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও বিলাসসামগ্রীর চাহিদা পূরণের জন্য ব্যাপক সম্পদ সুলভ হয়ে যায়।
তাছাড়া, কাজের জন্য প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করা, রাষ্ট্রীয় মালিকানা নির্ধারণ এবং গণমালিকানাধীন সম্পত্তি বিনিয়োগ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হয়, এবং এসবই হচ্ছে চাহিদা পূরণের উপায়, সম্পত্তি পাওয়ার জন্য পাওয়া কিংবা দাম্ভিকতা কিংবা গুনাহ্’র কাজে ব্যয়ের জন্য কিংবা অহংকার এবং নির্যাতনের জন্য নয়। এজন্যই রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি হালালভাবে এবং যথাযথ উপায়ে রিযিক অন্বেষণ করে, পরিবারের প্রতি উদার, প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল, সে পূর্ণ চাঁদের ন্যায় চেহারা নিয়ে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাথে দেখা করবে; এবং যে ব্যক্তি উদ্ধত্য ও বাহুল্যতার সাথে তা অন্বেষণ করবে সে আল্লাহ্’র সাথে যখন দেখা করবে তখন তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) তার প্রতি রাগান্বিত থাকবেন।” আবু হুরায়রা (রা.) হতে ইবনে আবু শায়বা তার মুসান্নাফ-এ বর্ণিত করেছেন।
মুসলিম মুতাররিফ-এর বরাত দিয়ে এবং মুতাররিফ তার পিতার বরাত দিয়ে বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“হে আদম সস্তান, তুমি যা খাও এবং ব্যয় করো, যা পরিধান করো এবং ফেলে দাও, এবং যা দান করো এবং নিজের জন্য রেখে দাও, তাছাড়া আর কি সম্পদ তোমার থাকতে পারে?”
সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“অপব্যয় করো না। তিনি অপব্যয়ীদেরকে পছন্দ করেন না।” [সূরা আল-আ’রাফ: ৩১]
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোই সম্পত্তি অর্জনের উদ্দেশ্য, অহংকার প্রদর্শনের জন্য নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র হুকুম অনুসারে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা করা বাধ্যতামূলক। এটা মানুষকে সে যা আয় করে সেগুলোর মাধ্যমে আখিরাতকে অন্বেষণ করার নির্দেশ দিয়েছে এবং বৈষয়িক বিষয়ে তার হিস্যার কথা ভুলে না যেতে বলেছে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আল্লাহ্ তোমাকে যা দান করেছেন, তা দ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান করো, এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি অনুগ্রহ করো, যেমন আল্লাহ্ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না।”
[সূরা কাসাস: ৭৭]ইসলামী অর্থনীতির দর্শন অনুসারে, সব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাথে সম্পর্কের ভিত্তিতে, তাঁর প্রদত্ত নির্দেশ অনুয়ায়ী পরিচালিত হতে হবে। যে ধারণার উপর সমাজে মুসলিমদের বিষয়াদির ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠিত, তা হলো- একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন বা ব্যবস্থা হিসেবে আহকামে শারী’আহ্ বা ঐশী হুকুম অনুসারে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে পরিচালনা করা। রাষ্ট্রের অন্য নাগরিকদের (অমুসলিম) অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ব্যবস্থাপনাও ঐশী হুকুমের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এটা তাদেরকে এমন কিছুর অনুমোদন দেয় যা ইসলামে অনুমোদিত এবং সেটাকে নিষিদ্ধ করে যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ্ বলেন:
“রাসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ করো এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকো।”
[সূরা হাশর: ৭]এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশ বাণী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়।”
[সূরা ইউনুস: ৫৭]এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“যারা তাঁর (রাসূল (সা) এর) আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা এ বিষয়ে সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় তাদেরকে ¯পর্শ করবে অথবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে।”
[সূরা নূর: ৬৩]এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“আপনি তাদের পার¯পরিক ব্যাপারাদিতে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করুন”
[সূরা মায়ি’দাহ্: ৪৯]তাক্বওয়ার ভিত্তিতে মুসলিমদের এই অর্থনৈতিক নীতির প্রতি আনুগত্যশীল থাকতে উদ্বুদ্ধ করে, এবং জনগণকে রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে ইসলাম শারী’আহ্ প্রণীত এসব হুকুমসমূহের বাস্তবায়নকে নিরাপদ করে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ্কে ভয় করো এবং সুদের যে সমস্ত বকেয়া আছে, তা পরিত্যাগ করো, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো।”
[সূরা আল-বাক্বারা: ২৭৮]এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋণের আদান-প্রদান করো, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও।”
[সূরা বাক্বারা: ২৮২যতক্ষণ না তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“… কিন্তু যদি কারবার নগদ হয়, পর¯পর হাতে হাতে আদান-প্রদান করো, তবে তা না লিখলে তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই।”
[সূরা বাক্বারা: ২৮২]ইসলাম কীভাবে এ হুকুমসমূহ বাস্তবায়ন হবে সে পদ্ধতি বর্ণনা করেছে এবং কীভাবে লোকেরা এ হুকুমসমূহ নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করবে তাও বিধৃত করেছে।
এটা প্রমাণ করে যে, ইসলামী অর্থনৈতিক নীতি একটি নির্দিষ্ট সমাজে বসবাসরত মানুষ হিসেবে প্রতিটি ব্যক্তির চাহিদা পূরণ ও সে চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদ উপার্জনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে। ইসলামী অর্থনৈতিক নীতিও একটি চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তা হলো সব কাজ ঐশী হুকুম অনুসারে বাস্তবায়ন করা। প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহ্’র ভয় দ্বারা উদ্ধুদ্ধ করে এবং রাষ্ট্র কর্তৃক জনগণের বিকাশ প্রক্রিয়া ও আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়িত হয়।
সাধারণ অর্থনৈতিক মূলনীতি
অর্থনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট ঐশী হুকুমসমূহ বিশ্লেষণ করলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম লোকদের সম্পদের সদ্ব্যবহার করার লক্ষ্যে সমর্থ করে তোলার বিষয়টিকে নির্দেশ করেছে। সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এটাই হলো ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী। যখন অর্থনীতির কথা আসে তখন প্রাথমিকভাবে তা সম্পদ অর্জন, এর হস্তান্তর ও জনগণের মধ্যে তা বন্টনের কথা বলে।
অর্থনীতির সাথে বিজড়িত হুকুমসমূহ তিনটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত:
১. প্রাথমিক মালিকানা
২. মালিকানার হস্তান্তর (Disposal)
৩. এবং জনগণের মধ্যে সম্পদের বন্টনমালিকানার ক্ষেত্রে সত্ত্বাধিকারী হলেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। কেননা তিনি হলেন সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি (মালিক আল মুলক) । বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে, সম্পত্তির মালিক হলেন তিনি।
তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:
“আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে, অর্থ-কড়ি দিয়েছেন, তা থেকে তাদেরকে দান করো।”
[সূরা নূর: ৩৩]সুতরাং সম্পত্তির একক মালিক হলেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। তবে তিনি মানুষকে এগুলোর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন, তাকে এটি দান করেছেন এবং মানুষকে এগুলোর মালিকানা লাভের অধিকার প্রদান করেছেন।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“তিনি তোমাদেরকে যার উত্তরাধিকারী করেছেন, তা থেকে ব্যয় করো।”
[সূরা হাদীদ: ৭]এবং তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন” ।
[সূরা নূহ: ১২]স্পষ্টতই যখন তিনি সম্পদের উৎস সম্পর্কে বলেন তখন এর মালিকানা নিজের উপরই অর্পণ করেন এবং তিনি বলেন:
“…আল্লাহ্ তোমাদেরকে যে অর্থ-কড়ি দিয়েছেন…”
[সূরা নূর: ৩৩]অতঃপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মানুষের কাছে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন; তিনি তাদেরকে সম্পত্তি প্রদান করেছেন এবং বলেন:
“তাদের হাতে তাদের সম্পদ প্রত্যার্পণ করো।”
[সূরা নিসা: ৬]এবং
“তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ করো।”
[সূরা তাওবা: ১০৩]এবং
“তবে তোমরা নিজের মূলধন পেয়ে যাবে।”
[সূরা বাক্বারা: ২৭৯]এবং
“তোমাদের অর্জিত ধন-সম্পদ”
[সূরা তাওবা: ২৪]এবং
“তখন তার সম্পদ তার কোনই কাজে আসবে না।”
[সূরা আল-লাইল: ১১]আল্লাহ্’র প্রতিনিধিত্বের দৃষ্টিকোন থেকে সম্পদের প্রতি সকল মানুষের মালিকানার অধিকার রয়েছে। তবে এটা সত্যিকারের মালিকানা নয়, বরং শুধুমাত্র মালিকানার অধিকার। একজন ব্যক্তির সত্যিকারের মালিকানা তখনই নিশ্চিত হয় যখন মালিকানার ইসলামী শর্তাবলী পূরণ হয়, অর্থাৎ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুমোদন। সুতরাং সম্পত্তির সত্যিকারের মালিকানা তখনই সম্ভবপর হয়, যখন একজন ব্যক্তি কোন সম্পত্তি অর্জনের জন্য তার প্রভূর অনুমোদন পায়। এই অনুমোদন হলো একজন ব্যক্তি সম্পত্তির মালিক হতে পারে এ ব্যাপারে একটি সুনির্দিষ্ট দলিল। সমস্ত মানবজাতিকে মালিকানার স্বত্ব প্রদান করা আ’ম বা সাধারণ দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং এটা মালিকানার অধিকারকে প্রমাণ করে। একজন ব্যক্তিকে কোন সম্পত্তির সত্যিকারের মালিকানা প্রদান করার জন্য সুনির্দিষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন যা ব্যক্তিকে আইনপ্রণেতা অর্থাৎ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, প্রদান করেছেন।
আইনপ্রণেতা উল্লেখ করেছেন যে, ব্যক্তিগত মালিকানা সেখানেই কার্যকর যেখানে একজন ব্যক্তি আইনদাতা কর্তৃক অনুমোদিত মালিকানা লাভের পন্থার কোন একটির মাধ্যমে তা অধিকার করে থাকে। আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:
“যে ব্যক্তি একটি দেয়ালের মাধ্যমে একখন্ড জমিকে ঘিরে ফেলে, এটি তার হয়ে যায়।”
এছাড়া পুরো উম্মাহ্’র মালিকানায় রয়েছে গণমালিকানাধীন সম্পত্তি। আহ্মাদ মুহাজীরদের এক ব্যক্তির কাছ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
“জনগণ তিনটি বিষয়ে অংশীদার: পানি, চারণভূমি ও আগুন।”
তাছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাও রয়েছে। যখন কোন ওয়ারিশ ছাড়া একজন মুসলিম মারা যান তখন তার সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বায়তুল মালে চলে যায়। খারাজ ও জিযিয়া থেকে যাই সংগৃহীত হবে, তাই কোষাগারের অংশ। রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ব্যবহার রাষ্ট্রের এখতিয়ারভুক্ত।
ব্যক্তিগত, গণমালিকানাধীন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির মালিকানা লাভের প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট ইসলাম শারী’আহ্ হুকুমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করেছে। এর বাইরে যে কোন প্রক্রিয়া নিষিদ্ধ।
সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে জনগণের পক্ষ থেকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্র গণমালিকানাধীন সম্পত্তির দায়িত্বভার গ্রহণ করে। তবে রাষ্ট্র কর্তৃক গণমালিকানাধীন সম্পত্তির দলিল কিংবা স্বত্বকে বিনিময় (Exchange) অথবা মঞ্জুর (Grant) ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে। এ দু’টি বাদে অন্য যেকোন উপায়ে গণমালিকানাধীন সম্পত্তির হস্তান্তর অনুমোদিত এবং তা শারী’আহ্ হুকুমের ভিত্তিতে হতে হবে।
ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির হস্তান্তর বায়তুল মাল ও লেনদেনের সাথে সংশ্লিষ্ট হুকুমের মাধ্যমে করা হয়, যেমন: বিক্রয় করা বা বন্ধক রাখা। ইসলাম ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিকে শারী’আহ্ হুকুমের ভিত্তিতে বিনিময় (Exchange) অথবা মঞ্জুরের (Grant) মাধ্যমে হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে।
মালিকানা এবং চুক্তির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে সম্পত্তির বন্টন করা হয়। মানুষের সামর্থ্য এবং তাদের প্রয়োজন মেটানোর প্রবণতার মধ্যে স্বাভাবিক পার্থক্যের দরুণ তাদের মাঝে সম্পত্তির বন্টনের ক্ষেত্রে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এর ফলে বৈষম্যপূর্ণ বন্টন হতে পারে এবং সম্পদ
সামান্য কিছু লোকের কাছে কুক্ষিগত হয়ে অন্যরা বঞ্চিত হতে পারে। স্বর্ণ ও রৌপ্য মজুতের ঘটনাও ঘটতে পারে, যা মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যম। সেকারণে ইসলাম কেবলমাত্র ধনীদের মাঝে সম্পদ আবর্তিত হওয়াকে নিষিদ্ধ করেছে। বরং ইসলাম বাস্তবিকভাবে সম্পদ সবার মধ্যে আবর্তিত হওয়াকে বাধ্যতামূলক করেছে। ইসলাম স্বর্ণ ও রৌপ্য মজুত করাকে নিষিদ্ধ করেছে, এমনকি এর উপর যাকাত প্রদান করা হলেও।
সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যেখানে কমিউনিজম এর একটি অংশ, এটি পুজিবাদের সাথে সাংঘর্ষিক। এর বৈশ্বিক ও আভ্যন্তরীণ প্রয়োগকারী সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে এর প্রভাব বিদায় হলেও ইসলামের দাওয়াহ প্রচারকারীগণের জন্য এই চিন্তাকে খন্ডন এবং এর ত্রুটিগুলোকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য এই বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রাখা অত্যাবশ্যক। কারণ সামগ্রিক কিংবা আংশিকভাবে হোক, গুটিকয়েক গোষ্ঠীর মধ্যে এই চিন্তাগুলো এখনও আলোচিত হয়।
ঊনিশ শতকের দিকে অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক চিন্তার জন্ম হয়। উদারপন্থী মতবাদ অর্থ্যাৎ পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিকদের কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। পুজিবাদের অধীনে সমাজে যে অসমতা বিরাজ করছিল এবং পাশাপাশি এর ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজতন্ত্রের শক্তিশালী উত্থান ঘটেছিল। সমাজতান্ত্রিক মতবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, তারা তিনটি বিষয়ে একমত পোষণ করে যা তাদেরকে অন্য অর্থনৈতিক মতবাদ থেকে আলাদা করেছে:
১. একধরণের প্রকৃত সমতা অর্জন করা।
২. পুরোপুরি কিংবা আংশিকভাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি বিলুপ্ত করা।
৩. সব লোকের মাধ্যমে পণ্য ও সেবার উৎপাদন ও বন্টন সম্পন্ন করা।এ তিনটি বিষয়ে তাদের ঐক্যমত থাকলেও বহু বিষয়ে তাদের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য বিদ্যমান, যাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষায় গুরুত্বপূর্ণগুলো হলো:
প্রথমত: সমাজতান্ত্রিক মতবাদীরা চূরান্ত সমতা অর্জনের রূপরেখার ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে। এক দল পাটিগাণিতিক সমতার পক্ষে কথা বলে অর্থ্যাৎ সবাই সবক্ষেত্রে সমান সুবিধা পাবে; সুতরাং প্রতিটি ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ দেওয়া হবে। অন্য দল সাধারণ সমতার কথা বলে অর্থাৎ কাজের বন্টনের ক্ষেত্রে সক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং উৎপাদিত পণ্য বন্টনের সময় প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদার দিকে নজর দিতে হবে। তাদের মতে নিম্নোক্ত মূলনীতিটি প্রয়োগ হলেই কেবল সমতা বাস্তবায়িত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হবেঃ “সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেকের কাছ থেকে অর্থ্যাৎ তার সক্ষমতা অনুযায়ী(এর অর্থ হচ্ছে সে যতটুকু কাজ সম্পাদন করে),এবং চাহিদানুযায়ী প্রত্যেককে (উৎপাদিত পণ্যের বন্টনকে বুঝায়)।” তৃতীয় দল সবার চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদ পর্যাপ্ত না হওয়ায় উৎপাদনের ভিত্তিতে সমতাকে গ্রহণ করছে না। ফলে তাদের মতে বন্টনের ভিত্তি হচ্ছেঃ “সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ্যাৎ সক্ষমতা অনুযায়ী প্রত্যেকের কাছ থেকে এবং কাজ অনুযায়ী প্রত্যেককে।” সুতরাং তাদের মতে সক্ষমতা তখনই অর্জন হবে যখন প্রত্যেক ব্যক্তিই অন্য সক্ষম ব্যক্তির মতো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
দ্বিতীয়ত: সমাজতান্ত্রিক মতবাদের প্রবক্তাগণ ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিলুপ্তির রূপরেখা নিয়ে মতভেদ পোষণ করে। একগোষ্ঠী ব্যক্তিগত সম্পত্তি পুরোপুরি বিলুপ্তির পক্ষের মতকে গ্রহণ করেছে, যা মূলতঃ কমিউনিজম। অন্যরা যেসব ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি উৎপাদনের হাতিয়ার অর্থ্যাৎ মূলধন জাতীয়, যেমন – কলকারখানা, রেল, খনি এবং এ জাতীয় সম্পত্তির সাথে সম্পর্কিত, তা বিলুপ্তির পক্ষে মত দিয়েছে। সুতরাং তারা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এমন পণ্যের মালিকানা নিষিদ্ধ করেছে। তাই কেউ ভাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে একটি বাড়ি, কারখানা কিংবা এক খন্ড জমির মালিক হতে পারবে না কিন্তু ভোগের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ধরণের সম্পত্তিকে তার মালিকানাধীন রাখতে পারবে। সুতরাং তাদের মতে ভোগের নিমিত্তে যেকোন ধরণের পণ্যের অর্জনই বৈধ, যেমন:বসবাসের জন্য বাড়ী,কিন্তু ভূমি ও কারখানা নয়, বরং এগুলো যা উৎপাদন করে সেগুলোর মালিক হতে পারবে। এটিকে বলা হয় মূলধনের সমাজতন্ত্রায়ন। অন্য একটি দল কৃষি জমির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কিছু বাদের অন্য কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধন না করার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করে এবং এদেরকে কৃষিভিত্তিক সমাজতান্ত্রিক (কৃষিভিত্তিক সংস্কারক) বলা হয়। তারপরও আরেক গোষ্ঠীর মতে, জনস্বার্থ যেসব ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে গণমালিকানাধীন সম্পত্তিতে রূপান্তর করতে চায় এমন একটি বিষয়বস্তুকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। তাই তারা সুদ ও ভাড়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা এবং পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন সীমা সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে বহু জায়গায় নিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিমালকানার কথা বলে এবং শ্রমিককে মূলধনের একজন অংশীদার বানানোর প্রতি জোর দেয়। এটাকেই রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র বলা হয়।
তৃতীয়ত: সমাজতান্ত্রিক মতবাদ তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপকরণের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করে। সেকারণে বিপ্লবী সমাজতন্ত্র (Revolutionary Syndicalism) শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ আন্দোলন, যেমন:অসহযোগ ধর্মঘট, যন্ত্রপাতি নষ্টের নাশকতামূলক কর্মকান্ড, শ্রমিকদেরকে সাধারণ ধর্মঘটে উদ্বুদ্ধ করা, অর্থ্যাৎ শ্রমিকের নিজস্ব শক্তিবলে অর্জিত শ্রমিক মুলতি তত্ত্বের উপর নির্ভরশীল। তাই তারা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডকে পঙ্গু করার মাধ্যমে বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে সাধারণ ধর্মঘট ডাক দেয়ার সুযোগ আসা পর্যন্ত এই চিন্তার ভিত্তিতে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তাদের কর্মসূচীগুলো পরিচালনা করে।
মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিকেরা সমাজ বিবর্তনের প্রাকৃতিক নিয়মে বিশ্বাসী এবং তারা মনে করে বর্তমান ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য এটাই যথেষ্ট, এবং যা সমাজতন্ত্রের তত্ত্বানুযায়ী অন্য একটি ব্যবস্থা দ্বারা এমনিতেই প্রতিস্থাপিত হবে।
রাষ্ট্রীয় (সরকার) সমাজতন্ত্রের প্রবক্তাগণ মনে করে তাদের চিন্তা বাস্তবায়নের উপায় হল আইন প্রণয়ন। আইন প্রণয়নের মাধ্যমে তারা জনস্বার্থ সংরক্ষণ এবং শ্রমিক শক্তির অবস্থা উন্নয়নের জন্য কাজ করে। পাশাপাশি কর আরোপ, বিশেষ করে মূলধন ও উত্তরাধিকারের সম্পত্তির উপর কর আরোপ করে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মধ্যে বৈষম্য দূর করতে কাজ করে।
চতুর্থত: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রজেক্ট পরিচালনায় প্রশাসনিক কর্মকান্ডের কাঠামোর ব্যাপারেও সমাজতান্ত্রিকেরা দ্বিধাবিভক্ত। যেমন, মূলধনী সমাজতান্ত্রিকেরা উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকেরা এই ব্যবস্থাপনাকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে (Guild Socialism) গঠিত পরিচালনা পর্ষদের কাছে রাখতে চায়।
সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বসমূহের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও বিখ্যাত হল জার্মানীর কার্ল মার্কসের তত্ত্ব। তার তত্ত্ব সমাজতান্ত্রিক দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং এর উপর ভিত্তি করে রাশিয়াতে কমিউনিস্ট পার্টি এবং ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক (USSR)প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যা দুই দশক আগে তা ধ্বংসের আগ পর্যন্ত ৭০ বৎসর টিকেছিল।
কার্ল মার্কসের অন্যতম সুপরিচিত তত্ত্বসমূহের মধ্যে একটি হল মূল্য তত্ত্ব, যা সে পুঁজিবাদী চিন্তাবিদদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিল এবং এর ভিত্তিতেই সে পুঁজিবাদকে আক্রমণ করছিল। অ্যাডাম স্মিথকে ইংল্যান্ডের উদার মতবাদের গুরু হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং মনে করা হয় সে রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থ্যাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তির রচয়িতা; মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করে সে বলেছে, ‘একটি পণ্যের মূল্য তা উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম পরিমাণের উপর নির্ভরশীল।’ সুতরাং যে পণ্যটি উৎপাদনে দুই ঘন্টা সময় লাগে তার মূল্য যে পণ্যের উৎপাদনে এক ঘন্টা লাগে তার মূল্যের চেয়ে দ্বিগুন। কাজের তত্ত্বের ব্যাখ্যায় মূল্যকে সংজ্ঞায়িত করে অ্যাডাম স্মিথের পরবর্তী প্রবক্তা রিকার্ডোর মতে, ‘শুধু পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত শ্রম পরিমাণই পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেনা বরং উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও উপকরণ তৈরিতে যে পরিমাণ শ্রম ব্যয় হয়েছে তাই বিবেচনায় রাখতে হবে।’ অর্থ্যাৎ, রিকার্ডো পণ্যের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত সকল শ্রমের ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণে বিশ্বাসী। সে এই সমস্ত ব্যয়কে একটি বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত করেছে, আর তা হলো কাজ।
অতঃপর কার্ল মার্কস রিকার্ডোর পুঁজিবাদে ব্যবহৃত মূল্যের তত্ত্বকে ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি ও সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী চিন্তাকে আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তার মতে, পণ্য উৎপাদনে ব্যয়িত সকল শ্রমশক্তি হচ্ছে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের একয়ামত্র উৎস, এবং পুঁজিপতি অর্থলগ্নিকারীরা শ্রমিকের শ্রমশক্তিকে এমন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কিনে নেয় যা কোনরকমে শ্রমিককে বাঁচিয়ে রাখা এবং কাজ অব্যাহত রাখার পরিমাণের ভেয়ে বেশী নয়। অতঃপর পুজিপতিরা পণ্য উৎপাদনের শ্রমিকের শ্রম শুষে নেয়, যার মূল্য তাকে দেয়া পারিশ্রমিকের চেয়ে অনেক বেশী। কার্ল মার্কস এই পার্থক্যকে অর্থ্যাৎ শ্রমিক যে শ্রমমূল্য দেয় এবং বিনিময়ে তাকে যে পারশ্রমিক দেয়া হয়, তার পার্থক্যকে ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ (surplus value) হিসেবে অভিহিত করেছে। রাজস্ব, লাভ বা মূলধন অনুপাতে ফেরতপ্রাপ্ত অর্থ ইত্যাদির নামে জমিদার এবং ব্যবসায়ীরা যে পরিমাণ অধিকার হরণ করে, তাকে সে এই উদ্বৃত্ত মূল্য হিসেবে অ্যাখ্যা দিয়েছে এবং অবৈধ বলেছে।
কার্ল মার্কসের মতে পূর্বের সমাজতান্ত্রিকরা মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি ভালোবাসা এবং নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ানোর স্বভাবজাত প্রকৃতি বিদ্যমান থাকার কারণে তাদের তত্ত্বগুলোর সফলতার ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। এই মতবাদের প্রবক্তারা সমাজের উপর প্রয়োগ করার জন্য এমন কিছু নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করত যেগুলোতে তারা বিশ্বাস স্থাপন করত এবং তারা এগুলোকে গভর্ণর, ব্যবসায়ী, চিন্তাশীল মানুষদের নিকট উপস্থাপন করত এবং তাদেরকে এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানাত। কাররল মার্কস এই চিন্তার ভিত্তিতে তার মতবাদকে তৈরি করেনি অথবা এই প্রক্রিয়াকেও অনুসরণ করেনি। সে তার মতবাদকে যে দার্শনিক তত্ত্বের উপর গড়ে তুলেছিল তা ঐতিহাসিক বিবর্তনবাদ নামে পরিচিত, যাকে দ্বান্দিক তত্ত্বও বলা হয়। তার মতে কোন ব্যবস্থাপক, আইনপ্রণেতা কিংবা সংস্কারকের হস্তক্ষেপ ছাড়াই অর্থনৈতিক নিয়মের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমাজে বিবর্তনের নিয়মের ফলস্বরূপ সমাজে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। কার্ল মার্কস এ ধরণের সমাজতন্ত্রকে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ হিসেবে অভিহিত করে যাতে তার আগে যেসব সমাজতান্ত্রিক মতবাদ এসেছে সেগুলো থেকে এটিকে আলাদা করা যায়। তার আগে আসা সমাজতান্ত্রিক মতবাদসমূহকে ‘ইউটোপিয়ান সমাজতন্ত্র’ বলা হত। কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বের চুম্বক অংশ নিম্নরূপ:
যে কোন যুগের সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনুযায়ী গঠিত হয়। সমাজব্যবস্থা বিবর্তনের উপর ভূমিকা রাখে বস্তুগত অবস্থার উন্নতির জন্য চলমান শ্রেণী সংগ্রাম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সংখ্যালঘিষ্ট ধনবান শ্রেণীর উপর সর্বাধিক খারাপ অবস্থায় থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে এ সংগ্রামের সমাপ্তি হয়েছে। সে এটিকে সামাজিক বিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেছে। তার মতে অতীতের মত এ তত্ত্ব ভবিষ্যতেও প্রয়োগযোগ্য। পূর্বে এ সংগ্রাম ছিল মুক্ত মানুষ ও দাসদের মধ্যে, অতঃপর অভিজাত শ্রেণী ও প্রজাদের মধ্যে, এরও পরে অভিজাত শ্রেণী ও কৃষকের মধ্যে এবং নেতা ও দলের প্রধানদের মধ্যে। এ সংগ্রাম সর্বদা স্বল্পসংখ্যক নির্যাতঙ্কারী শ্রেণীর উপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নির্যাতিত শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়েছে। কিন্তু বিজয়ের পর নির্যাতিত শ্রেণী রক্ষণশীল নির্যাতনকারীতে পরিণত হয়। ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে এ সংগ্রাম ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণী (Bourgeoisie) ও শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে। প্রথম শ্রেণী বিভিন্ন প্রকল্লপের প্রভুতে, মূলধনের মালিকে পরিণত হল এবং রক্ষনশীল হয়ে উঠল। ফলতঃ এ অবস্থা দুটি শ্রেণীর মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্বে পরিণত হল যার উৎস হল অর্থনৈতিক কারণ।
আজকের দিনের উৎপাদনের রীতি মালিকানার ব্যবস্থানুযায়ী আবর্তিত হয় না। উৎপাদন আজকাল আর ব্যক্তিতান্ত্রিক নয়; অর্থ্যাৎ আগের মত কেবল ব্যক্তির দ্বারা সম্পাদিত হয় না, বরং সামষ্টিক হয়েছে অর্থ্যাৎ কিছু সংখ্যক ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হয়। যাই হোক, একই সময়ে মালিকানার ব্যবস্থা পরিবর্তিত হয়নি। সুতরাং ব্যক্তিগত মালিকানা অব্যাহত আছে এবং বর্তমান সমাজের ভিত্তি। একারণে উৎপাদনে অংশগ্রহণকারী শ্রমিক শ্রেণীর মূলধনে কোন অংশ থাকেনা। বিধায় তারা প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে না এমন পুঁজিপতিদের করুণার উপর নির্ভর করে। পুঁজিপতিরা শ্রমিকশক্তিকে যৎসামান্য পারিশ্রমিক দিয়ে তাদের শোষণ করে এবং শ্রমিকেরাও এটি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, কেননা তাদেরকে এ পরিশ্রমের বিনিময়ে অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়। উৎপাদিত পণ্যের মূল্য ও শ্রমিকের পারিশ্রমিকের মধ্যকার পার্থক্য যাকে যাকে কার্ল মার্কস ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ বা ‘surplus value’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এটি পুঁজিপতি একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের কাছে লাভ এবং ন্যায় বিচার হলে তা শ্রমিকদের অংশ হওয়া উচিৎ ছিল।
সুতরাং এ দু’টি শ্রেণীর মধ্যে দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে যতক্ষণ না মালিকানার ব্যবস্থা উৎপাদনের ব্যবস্থার সাথে একইরকম না হয় অর্থ্যাৎ যতক্ষন না মালিকানা সমাজতান্ত্রিক বা সামষ্টিক না হয়। সমাজের বিবর্তনের সূত্র অনুসারে এ সংগ্রাম শ্রমিক শ্রেণীর বিজয়ের মাধ্যমে শেষ হবে। কেননা তারা হল নিপীড়িত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণী।
শ্রমিক শ্রেণী যে প্রক্রিয়ায় সাফল্য লাভ করবে এবং যে বিষয়টি এই সাফল্যে লাভের কারণ তা হল সমাজের বিবর্তন তত্ত্ব। অর্থনৈতিক জীবনের বর্তমান ব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ সম্প্রদায়ের বীজ নিজের মধ্যে বহন করে এবং বর্তমান ব্যবস্থা যে তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত সে কারণেই তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এমন একটি সময় ছিল যখন মধ্যবিত্তরা অভিজাতদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জয়ী হয়েছিল এবং অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছিল, কেননা তারা মূলধনের মালিক ছিল। তবে এর ভূমিকা শেষ হয়েছে এবং সময় এসেছে এর অবস্থান পরিত্যাগ করে তা শ্রমিক শ্রেণীর কাছে অর্পন করার। কেন্দ্রীভূত করার তত্ত্ব ও মুক্ত প্রতিযোগিতার পদ্ধতি তাকে তা করতে বাধ্য করে। কেন্দ্রীভূতকরণের তত্ত্বের প্রভাবে পুঁজিপতিরা সংখ্যায় বিলীন হতে থাকে এবং শ্রমিক শ্রেণী সংখ্যায় বৃদ্ধি পেতে থাকে। মুক্ত প্রতিযোগিতার প্রভাবে উৎপাদন সব সীমাবদ্ধতাকে দূর অতিক্রম করে এবং এর পরিমাণ এমন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যে, শ্রমিক শ্রেণির ভোক্তারা তাদের নিম্ন মাত্রার পারিশ্রমিক দ্বারা তা ক্রয় করতে অক্ষম। এটি এমন একটি সংকট সৃষ্টি করে যে, কিছু মালিক পুঁজি হারিয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। এ ব্যবস্থা যখন চলতে থাকে তখন সংকট আরও ঘনীভূত হয় এবং এ ধরণের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় এবং পুঁজিপতিদের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। আর তখনই স্বল্প সময়ের মধ্যে পূর্ববর্তী সব সংকটকে অতিক্রম করে যায় এমন সঙ্কট সৃষ্টি হয় এবং এটি এত বড় আকারে হয় যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিত্তি সমূহকে ধসিয়ে দেয়। পুজিবাদের ধ্বংসস্তূপের উপর অতঃপর প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজতন্ত্র। মার্কসের মতে ঐতিহাসিক বিবর্তনের সর্বশেষ পর্যায় হল সমাজতন্ত্র। কারণ এটি ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে শেষ করে দেয় বিধায় সমাজে আর বৈষম্য সৃষ্টিকারী সংঘাত থাকে না।
কার্ল মার্কসের বর্ণনায়, কেন্দ্রীভূত করা পুঁজিবাদী অর্থনীতির অংশ। মোদ্দা কথা, একটি প্রকল্প থেকে শ্রম ও মূলধন অন্যটিতে চলে যায় যাতে একজনের বাড়তে থাকলে অপরজনের হ্রাস পেতে থাকে। এসবকিছুই উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণকে নির্দেশ করে। যদি কেউ শিল্পের উৎপাদনের কোন একটি শাখাকে পর্যবেক্ষণ করে, যেমন:চকোলেটের কারখানা; যে কেউ দেখতে পাবে যে, ধীরে ধীরে অনেক প্রকল্প হারিয়ে যাচ্ছে। এবং অন্যদিকে সময়ের সাথে সাথে , প্রত্যেক প্রকল্পে শ্রমশক্তি বৃদ্ধি পায়। উৎপাদনের যে কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটেছে এটি হল তার প্রমাণ। কেননা বড় উৎপাদন ছোট আকারের উৎপাদনকে প্রতিস্থাপন করে। সুতরাং উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যদি কারখানার সংখ্যা দশ থাকে, তবে সময়ের সাথে সাথে সেগুলো চার বা পাঁচটি বড় কারখানায় পরিণত হয় এবং বাকিগুলো হারিয়ে যাবে।
মার্কসের নির্ধারিত মুক্ত প্রতিযোগিতা বলতে কাজ করার স্বাধীনতার মূলনীতিকে বুঝানো হয়েছে অর্থ্যাৎ এর অর্থ হল যে কোন ব্যক্তির যে কোন কিছু যে কোন পদ্ধতিতে উৎপাদনের অধিকার রয়েছে।
মার্কসের মতে অর্থনৈতিক ভারসাম্যতার ক্ষতি করে এমন হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া যেকোন সমস্যার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সঙ্কট বিষয়টি প্রয়োগ হবে। বিশেষ সমস্যার মধ্যে রয়েছে উৎপাদন ও বন্টনের ভারসাম্যহীনতা থেকে উদ্ভূত উৎপাদনের একটি শাখার আওতাধীন সব সমস্যা। এ ধরণের ঘটনা ঘটতে পারে অতিরিক্ত উৎপাদন ও বন্টন অথবা কম উৎপাদন ও বন্টনের ক্ষেত্রে।
বারবার পুনরাবৃত্তি হয় এমন সংকটের ক্ষেত্রে এমন প্রচন্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে তা পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে কম্পন সৃষ্টি করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মন্দার মধ্যে পার্থক্য সূচনাকারী বিন্দু হিসেবে কাজ করে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়কাল তিন থেকে পাঁচ বছর হয় এবং মন্দার ক্ষেত্রেও একই রকম হয়। এসব পর্যায়ক্রমিক বড় সংকটের বিশেষ বৈশিষ্ট্যই এদেরকে আলাদা করে। এ বৈশিষ্ট্যগুলো তিনটি প্রধান গুনের মধ্যে পড়ে – প্রথমত, সাধারণীকরণের গুণ। এর অর্থ হল একটি দেশে সঙ্কট অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সবগুলো দিকের উপর অথবা কমপক্ষে এর অধিকাংশের উপর আঘাত হানে। এই সাধারণ সংকটটি প্রথমে যে দেশে সমস্যা ঘনীভূত হয় সে দেশে সর্বপ্রথম দেখা দেয় এবং পরবর্তীতে অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশে ছড়িয়ে পড়ে যাদের সাথে প্রথমে সমস্যায় পড়া রাস্ট্রের কিছু স্থায়ী সম্পর্ক বজায় ছিল। দ্বিতীয় গুণটি হল এটি পর্যায়ক্রমিক। এর অর্থ হল সঙ্কট হয় সৃষ্টি হয় পুনঃপুনিকভাবে ও চক্রাকারে সময়ের পালাক্রমে। একটি সংকট ও অপরটির মধ্যে সময়কাল সাত থেকে এগারো বছরের মধ্যে উঠানামা করে। পর্যায়ক্রমিক হওয়া সত্ত্বেও একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ ঘটনা ঘটে না। তৃতীয় গুণটি হল অতিরিক্ত উৎপাদন যাতে করে বড় বড় প্রকল্পের মালিকেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নষ্ট করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে যায়। সুতরাং অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহ উৎপাদনকে ছাড়ীয়ে যায় এবং সঙ্কট সৃষ্টি করে।
কার্ল মার্কসের বিবেচনায়, এ বড় সঙ্কট কিছু লোককে মূলধন হারাতে বাধ্য করে। সুতরাং মালিকের সংখ্যা কমতে থাকে এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ ঘটনাগুলো সর্বশেষ বড় সংকটের দিকে ধাবিত করবে এবং পুরনো ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে ফেলে দিবে।
এই হচ্ছে সমাজতন্ত্রের সারসংক্ষেপ, যার মধ্যে কমিউনিজমও (সাম্যবাদ) অন্তর্ভূক্ত। উপরের সারাংশ থেকে ফুটে উঠেছে যে, সাম্যবাদীসহ সমাজতান্ত্রিক মতবাদীরা ব্যক্তিদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে সমতা বিধানের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়, হোক তা লাভের ক্ষেত্রে অথবা উৎপাদনের উপকরণের ক্ষেত্রে অথবা প্রকৃত সমতার ক্ষেত্রে। এধরণের যেকোন সমতা অর্জন করা দুঃসাধ্য এবং এটি তাত্ত্বিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি অবয়াস্তব বিধায় অসম্ভব। কারণ এরূপ সমতা অবাস্তব ও বাস্তবতা বিবর্জিত। সৃষ্টিগত কারণেই স্বভাবগতভাবে মানুষ শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার দিক থেকে ভিন্নতর এবং চাহিদা পূরণের দিক থেকেও তারা পরস্পর আলাদা। সুতরাং তাদের মধ্যে সমতা অর্জন করা সম্ভব নয়। যদি একজন বলপূর্বক সমপরিমাণ পণ্য ও সেবা বন্টন করেও থাকে তবে তাদের পক্ষে এ সম্পদের দ্বারা উৎপাদন ও সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে সমতা অর্জন করা অসম্ভব। তাদের নিজ নিজ চাহিদা পূরণ করার জন্য যে পরিমাণ প্রয়োজন সেক্ষেত্রেও সমান হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং তাদের মতে সমতা প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টি একটি কল্পনাপ্রবণ ও তাত্ত্বিক বিষয়।
তাছাড়া শক্তি/সামর্থ্যের পার্থক্যের কারণে মানুষের মধ্যে সমতা অর্জনের ধারণা ন্যায়বিচার হতে অনেক দূরে অবস্থিত, যা সমাজতান্ত্রিকেরা অর্জনে প্রচেষ্টারত বলে দাবি করে। মালিকানা এবং উৎপাদনের হাতিয়ারের ক্ষেত্রে লোকদের মধ্যে বৈষম্য অবশ্যম্ভাবী এবং খুবই স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে থাকা বিদ্যমান স্বাভাবিক বৈপরীত্যের সাথে সমতা অর্জনের যেকোন প্রচেষ্টা সাংঘর্ষিক হওয়ায় তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
ব্যক্তিগত সম্পত্তির পুরোপুরি বিলোপ সাধনের ক্ষেত্রে বলা যায় এটি মানুষের প্রকৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। কেননা মালিকানা হলো বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ এবং এটি মানুষের মধ্যে অস্তিত্বশীল। তার মধ্যে এটি স্বভাব্জাত হওয়ায় এটি তারই একটি অংশ এবং প্রবৃত্তিগত হওয়ায় এর নির্মূল সম্ভব নয়। একটি মানুষ যতক্ষন বেঁচে থাকে ততক্ষণ প্রবৃত্তিগত কোন কিছুই তার থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ সাধন মানুষের স্বভাব্জাত প্রবৃত্তির উপর এক নিপীড়ন ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটি অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই বয়ে আনেনা। সুতরাং এটিকে বিলুপ্তি না করে বরং এই প্রবৃত্তিকে সংগঠিত করা উচিৎ।
মালিকানার আংশিক বিলুপ্তির বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। যদি এর দ্বারা পণ্যের যে মানুষ অর্জন করতে চায়, তার বিস্তার লাভের আগাম টানাকে বুঝায় ( পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করা), তবে তা উৎপাদনের পরিমাণকে সীমিত করে দিবে, যা আবার সঠিক হবে না, কারণ তা মানুষের কার্যক্রমকে সীমাবধ্ব করে ফেলে, তার প্রচেষ্টায় বাঁধা দিলে, তারা কার্যত এই জনসাধারণ ঐসব ব্যক্তির উৎপাদনমূখীতার ফল ভোগ করা থেকে বঞ্চিত হয়।
তবে পণ্য ও সেবার মালিকানা যদি প্রাপ্ত পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি নির্দিষ্ট রীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য। কারণ এটি মানুষের কাজকে ক্ষতিগ্রস্থ করে না । এ প্রক্রিয়া ব্যক্তির মধ্যে সম্পত্তির মালিকানাকে সংগঠিত করে এবং তাদেরকে আরও বেশ শ্রম ন্য্য করতে ও কাজ বাড়াতে উৎসাহিত করে ।
যদি মালিকানার আংশিক বিলুপ্তি বলতে ব্যক্তিকে বিশেষ কিছু সম্পত্তির মালিকানা অর্জনকে রোধ করা এবং অন্যান্য কিছু সম্পত্তি অসীমভাবে অর্জন করা বুঝায়, তাহলে এ বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে হবে । যদি এসব সম্পত্তির উপযোগের প্রতৃতি কারণে জনগণকে বঞ্চিত করা ছাড়া কেবলমাত্র ব্যক্তি একা ভোগ না করতে পারে তাহলে সে ব্যক্তিকে সে সম্পত্তির মালিকানা অর্জনে বাঁধা দেওয়া খুব স্বাভাবিক হবে, যেমনঃ জনগণের রাস্তা, টাউন স্কয়ার,নদী, সাগর এবং ওজাতীয় অনেক কিছু । সম্পত্তির প্রকৃতির কারণে এসব সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করা দোষণীয় নয়। কেননা এ ধরনের মালিকানা সম্পত্তির প্রকৃতির উপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়।
যদি সম্পত্তির কারণে ব্যক্তিগত মালিকানা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন না পড়ে তাহলে বিষয়টি আরও বিশ্লেষণ করে দেখার অবকাশ রয়েছে । যদি সম্পত্তিটি প্রথম প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে অর্থাৎ সম্পত্তির ব্যক্তিমালিকানা যদি সম্প্রদায়কে বঞ্চিত করে, যেমনঃ জলাশয় ও খনিজ দ্রব্য, তাহলে এগুলোর ব্যক্তিমালিকানার বিলোপ সাধন করা কখনওই দোষণীয় নয়। যে ইস্যুটি এ ধরনের সম্পত্তিতে প্রথম আকারে অন্তর্ভুক্ত করে তা হল সম্পত্তির প্রকৃতি। যদি এর মালিকানা ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা হয়, তাহলে জনগণকে বঞ্চিত করবে। তবে যদি এর মালিকানা অর্জনের ক্ষেত্রে কোনরূপ প্রতিবন্ধকতা থাকা উচিত হবে না । আর যদি তা করা, তবে তা কোন কারণ ব্যতিরেকে অন্যায়ভাবে মালিকানাকে সীমাবদ্ধ করা হবে । এটি হবে পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করার মতই এবং একারণে মানুষের কাজকে সীমিত করে ফেলবে, তার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে, উৎপাদনকে হ্রাস করবে ও কাজ করার স্পৃহাকে স্থবির করে দেবে।
সমাজতন্ত্রে মালিকানার আংশিক বিলোপসাধনের কারণে পরিমাণগতভাবে মালিকানা সীমিত করা হয়, কিন্তু মালিকানা লাভের পথ ও উপায়ের মাধ্যমে তা সীমিত করা হয় না । এটি কিছু সম্পত্তির মালিকানা অর্জনকে প্রতিহত করে যা তাদের প্রকৃতি ও তাদের উৎপত্তির প্রকৃতির কারণে ব্যক্তিগতভাবে মালিকানায় নেয়া উচিত। সমাজতন্ত্র মালিকানাকে পরিমাণগতভাবে সীমিত করে, যেমনঃ একটি নির্দিষ্ট এলাকা পর্যন্ত ভূমির মালিকানাকে সীমিত করা, অথবা এটি কোন বিশেষ সম্পত্তির মালিকানাকে সীমিত করে, যেমনঃ উৎপাদনের উপায়। এসব সম্পত্তির অনেকগুলোর প্রকৃতির কারণে সেগুলোকে ব্যক্তিগত মালিকানায় নেয়া যায়। এ ধরনের সম্পত্তির মালিকানাকে সীমিত করার মাধ্যমে কাজকে সীমিত করা হয়, হোক সে সীমিতকরণ আইন দ্বরা পূর্বনির্ধারিত, যেমনঃ উত্তরাধিকার প্রতিরোধ, খনিজের মালিকানা, রেল অথবা কলকারখানা; অথবা জনস্বার্থ বিবেচনায় এগুলোর অধিকরণ রোধে অবস্থানুপাতে যদি একে রাষ্ট্রের হাতে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। সুতরাং এসবগুলোই ব্যক্তির কাজকে সীমিত করার প্রয়াস কারণ প্রকৃতিগত কারণে এই সম্পত্তিগুলো ব্যক্তিমালিকানায় চলে যেতে পারে ।
জনগণের মধ্যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি করে এবং তাদের মধ্যে ঘৃণা সৃষ্টি করে লোকদের মাধ্যমে উৎপাদন ও বন্টন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এটি বরং ব্যবস্থাপনা নয়, বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। তাছাড়া সমাজ বিবর্তনের সবাভাবিক তত্ত্ব অনুসরণে শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যে ‘ব্যবসায়ীরা নির্যাতনকারী’, এ বোধ তৈরি করে লোকদের মাধ্যমে উৎপাদন সংগঠিত করা সম্ভব নয়। কেননা ব্যবসায়ীরা শ্রমিক শ্রেনীর চাহিদা পূরণ করার ক্ষেত্রে চতুর ও দক্ষ হতে পারে, যেমনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারখানা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে ঘটে। সুতরাং শ্রমিক শ্রেনী তাদের পরিশ্রমের ফল দ্বারা শোষিত হওয়া সত্ত্বেও নির্যাতিত অনুভব করে না । এভাবে তথাকথিত বিবর্তন কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন ও বন্টনকে নিশ্চিত করতে পারে না । প্রকৃতপক্ষে, এ বিষয়গুলোকে সমস্যার সঠিক প্রকৃতিকে নিয়ে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সঠিক প্রকৃতিকে নিয়ে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত সঠিক আইন ও সমাধান দ্বারা সংগঠিত করতে হবে । সমাজতন্ত্রে উৎপাদন ও বন্টন সুনিশ্চিত করার জন্য হয় শ্রমিকশ্রেনীর মধ্যে উদ্বেগ ও অসন্তোষকে উসকে দেয় অথবা সমাজ বিবর্তনের স্বাভাবিক তত্ত্ব অনুসরণ অথবা সুনিদির্ষ্ট কোন ভিত্তি বা বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত নয় এমন মানব সৃষ্টি আইন ও কানুনের উপর নির্ভর করে । সেকারণে এ ধরনের সমাধান ভিত্তি থেকেই ভুল।
এই ছিল সমাজতন্ত্রের ভ্রান্তিগুলো নিয়ে আলোচনা । সুনির্দিষ্টভাবে কার্লমার্কসের সমজতান্ত্রিক তত্ত্বের ভুলগুলো নিম্নের তিনটি ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়:
প্রথমত: মূল্য তত্ত্বের উপর তার মত ভুল এবং এবং বাস্তবতা বিবর্জিত। একটি পণ্যের মূল্যের একমাত্র উৎস হল এর উৎপাদনের জন্য ব্যয়কৃত শ্রম-এ মতামটি বাস্তবতার সাথে অমিল। কেননা ব্যয়কৃত শ্রম একটি উৎস কিন্তু একমাত্র উৎস নয়। এখানে শ্রম ছাড়াও আরও অনেক উপাদান রয়েছে যা পণ্যে মূল্য নির্ধারণের যুক্ত হয় । পণ্যেড় উপযোগীতার কারণে এর চাহিদার বিষয়টিও এখানে অন্তর্ভূক্ত। কাঁচামালের ভেতর এমন উপযোগিতা থাকতে পারে যা কৃতি কাজের মূল্যকেও অতিক্রম করতে পারে, যেমনঃ শিকার। বাজারে পণ্য থেকে প্রাপ্ত উপযোগিতার কোন চাহদা নাও থাকতে পারে কিংবা এর রপ্তানি নিষিদ্ধ হতে পারে যেমনঃ মুসলিমদের ক্ষেত্রে মদ । সুতরাং বিনিয়োগকৃত শ্রমই মূল্যের একমাত্র উৎস কথাটি সঠিক নয় এবং এটা পণ্যের বাস্তবতার সাথে অমিল।
দ্বিতীয়ত: তার মতবাদ অনুযায়ী যে কোন একটি সমাজের ব্যবস্থা সে সময়ের অর্থনৈতিক অবস্থার ফলাফল, এবং একটি কারণে এ ব্যবস্থার মধ্যে সবধরনের রুপান্তর সংঘটিত হয়, আর তা হচ্ছে বস্তুগত অবস্থার উন্নতির অন্য শ্রেণী সংগ্রাম, এটিও ভুল ও ভিত্তিহীন এবং ত্রুটিযুক্ত কল্পানাপ্রসূত চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। ঐতিহাসিক ঘটনা ও বর্তমান অবস্থা থেকে এর ভ্রান্ত ও বাস্তবতার সাথে অবস্থান সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যায়। আমরা দেখি যে, রাশিয়ার সমাজতন্ত্রের দিকে যে রুপান্তর তা বস্তুগত বিবর্তনের কারণে সংঘটিত হয়নি কিংবা শ্রেণী সংগ্রামের কারণে ব্যবস্থার পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়নি। বরং একটি দল রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং লোকদের উপর তাদের চিন্তা প্রয়োগ করে এবং ব্যবস্থার পরিবর্তন করে। একই ঘটনা সমাজতান্ত্রিক চীনেও সংঘটিত হয়েছে। পশ্চিম জার্মানী নয় বরং পূর্ব জার্মানীতে, পশ্চিম ইউরপ নয় বরং পূর্ব ইউরোপ সমাজতন্ত্রের প্রয়োগ কখনওই শ্রেণী সংগ্রামের কারণে সংঘটিত হয়নি। বরং সেসব দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিল অপর একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র দ্বারা দখল করে নেয়ার মাধ্যমে, যেখানে বিজয়ী দেশ বিজিত দেশ তার ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়েছিল। একই বিষয় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, ইসলামী রাষ্ট্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও হয়েছিল । তাছাড়া ও তত্ত্বের মাধ্যমে যেসব দেশের ব্যবস্থা শ্রেণী সংগ্রামের মাধ্যমে পরিবর্তিত হবে বলে ধরে নেয়া হয়েছিল, যেমনঃ জার্মানী,ইংল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সেসব দেশগুলো সব পুঁজিবাদী রাষ্ট্র, যেখানে পুঁজির মালিক ও শ্রমিক শ্রেণী অনেক। জার শাসিত রাশিয়া বা চীন শিল্পোন্নত ছিল না, বরং ক্ররষিভিত্তিক ছিল এবং সেখানে পুঁজির মালিকের সংখ্যা পশ্চিমের তুলনায় অনেক কম ছিল। পশ্চিম ইউরোপ ও আমেরিকায় এ দুটি শ্রেণীর ব্যাপক উপস্থিতি সত্ত্বেও সেগুলো সমাজতানন্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি এবং এখন পর্যন্ত এসব দেশে পুঁজিবাদই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এ দুটি শ্রেণির উপস্থিতি তাদের ব্যবস্থার উপর কোন প্রভাব সৃষ্টি করেনি। এ আলোচনাই ভিত্তি থেকে এ তত্ত্বের যুক্তি খন্ডনের জন্য যথেষ্ট।
তৃতীয় ত্রুটি যা কার্ল মার্কস থেকে উদ্ভুত হয়েছিল তা হল সামাজিক বিবর্তন তত্ত্ব- যেখানে সে বলেছে যে, নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক তত্ত্বের কারণে অর্থনৈতিক জীবনের ব্যবস্থা বিলোপ হতে বাধ্য অর্থ্যাৎ বর্তমান অবস্থা যে অর্থনৈতিক তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত সে কারণেই তা নিশ্চিত হয়ে যাবে। এবং একারণেই অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংগ্রামে মধ্যবিত্ত শ্রেণী জয়লাভ করেছে অর্থ্যাৎ কেন্দ্রীভূত তত্ত্বের কারণে পুঁজিপতি শ্রেণী শ্রমিক শ্রেণীর জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে। কার্ল মার্কসের উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ তত্ত্বের ভিত্তিতে শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাবে এবং পুঁজির মালিকেরা হ্রাস পাবে, এটাও ভুল। কেননা উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণের একটি সীমা রয়েছে যা এটি অতিক্রম করতে পারে না। সুতরাং একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছানোর পর সেখানেই থেমে যায়, বিধায় কার্ল মার্কস বর্ণিত বিবর্তনের জন্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে না। তাছাড়া উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ বিষয়টি উৎপাদনের একটি শাখায় মোটেই অস্তিত্বশীল নয়, যেমন: কৃষি। তাহলে কীভাবে সমাজ বিবর্তনের তত্ত্ব সেখানে কাজ করে? পাশাপাশি কার্ল মার্কসের মতে, উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণের পর সমাজের কেন্দ্রীভূতকরণ ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা কমতে থাকে এবং শ্রমিকের সংখ্যা বাড়তে থাকে, যাদের কোন কিছুই নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভুল। কেননা উৎপাদনের কেন্দ্রীভূতকরণ পুঁজির মালিকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে এবং শ্রমিক শ্রেণীকে পুঁজির মালিক বানিয়ে দিতে পারে। বড় বড় কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত বড় বড় প্রজেক্টসমূহে শ্রমিক শ্রেণী থেকে সাধারণত শেয়ারধারী থাকে – যা উপরোক্ত তত্ত্বকে খন্ডনকারী উদাহরণ। তাছাড়া কারখানার অনেক শ্রমিকের রয়েছে উচ্চ বেতন, যেমন: প্রকৌশলী, রসায়নবিদ এবং ব্যবস্থাপক – যারা তাদের বেতনের একটি বড় অংশ সঞ্চয় করতে পারে এবং নিজেরা স্বাধীনভাবে কোন প্রজেক্ট করা ছাড়া বিনিয়োগকারী হতে পারে। সুতরাং কার্ল মার্কস শ্রমিক শ্রেণী ও বিবর্তন নিয়ে যা বলেছে তা এদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয় না।
পুঁজিবাদ ও সামজতন্ত্র (যা থেকে কমিউনিজম বা সাম্যবাদ উৎসরিত) যেসব নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত সে বিষয়ে এটিই হল সংক্ষিপ্ত আলোচনা। এ নিরীক্ষাধর্মী আলোচনা থেকে এসব মূলনীতির মধ্যে যেসব ভ্রান্তিসমূহ বিদ্যমান রয়েছে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি হল একদিকে এবং অন্যদিকে উভয় ব্যবস্থা ইসলাম যেভাবে একটি সমস্যাকে সমাধান করে তার সাথে এবং ইসলাম নিজের সাথে সাংঘর্ষিক।
সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে ইসলামী পদ্ধতির সাথে অন্যগুলোর সাংঘর্ষিক হওয়ার ক্ষেত্রে বলা যায়, ইসলাম অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছে তা অন্যান্য মানবিক সমস্যাসমূহ সমাধান করার ক্ষেত্রে গৃহীত পদ্ধতির অনুরূপ। ইসলামের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি হল অর্থনৈতিক সমস্যার বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করা, এটিকে অনুধাবন করা এবং অতঃপর শারী’আহ দলিল অধ্যয়ন করে সেসব দলিল থেকে সমাধান বের করে নিয়ে আসা এবং নিশ্চিত করা যে এ সমাধান সে বিশেষ সমস্যার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হচ্ছে। এটি পুঁজিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতি থেকে আলাদা। পুঁজিবাদে যে বাস্তবতা থেকে সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে সেখানেই সমাধান খোঁজা হয় (pragmatism)। আর সমাজতন্ত্রে সমাধান নেয়া হয় কাল্পনিক ধারণা থেকে এবং সমস্যার মধ্যে তা অস্তিত্বশীল ধরে নেয়া হয় এবং সেসব ধারণা অনুসারে সমাধান করা হয়। এ দু’টি পদ্ধতির প্রত্যেকটি ইসলাম থেকে আলাদা। সুতরাং মুসলিমদের এটি গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়।
ইসলামের সাথে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক (সাম্যবাদসহ) অর্থনীতির মূল সাংঘর্ষিক দিক হচ্ছে ইসলাম অর্থনৈতিক সমাধান সমূহকে ঐশী হুকুম (আহকাম শারী’আহ) হিসেবে গ্রহণ করেছে যা হুকুম শারী’আহ’র উৎস হতে উৎসরিত এবং অন্যদিকে পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সমাধান ঐশী হুকুম নয়, বরং তা কুফর ব্যবস্থা থেকে উৎসারিত। তাদের মত করে কোন কিছু যাচাই করা হলে তা হবে আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা ব্যতিরেকে অন্য কিছুকে মেনে নেয়ার মত, যা কখনওই কোন মুসলিমের জন্য গ্রহণ করা অনুমোদিত নয়। এই সমাধানে বিশ্বাস না করেও একে গ্রহণ করা হবে প্রকাশ্যে গুনাহের কাজ। আর যদি কেউ বিশ্বাস করে যে, এগুলোই হল উপযুক্ত আইন এবং ইসলামী হুকুমসমূহ আধুনিক যুগে প্রযোজ্য নয় এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান দিতে পারে না, তাহলে সেটি কুফর। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদেরকে এই পাপ থেকে রক্ষা করুন।
প্রয়োজন ও তা পূরণের উপায়সমূহ মিশ্রিতকরণ

পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থনীতি মূলতঃ মানুষের প্রয়োজন ও তা পূরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করে। সেকারণে প্রয়োজন পূরণের উপায় হিসেবে পণ্য ও সেবার উৎপাদন এবং পণ্য ও সেবার বন্টন তাদের দৃষ্টিতে একই বিষয়। প্রয়োজন ও তা পূরণের উপায় পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত ও এমনভাবে অবিচ্ছেদ্য যে একটি আরেকটি মধ্যে অন্তর্নিহিত রয়েছে বিধায় এগুলো একই বিষয়। ফলে পণ্য ও সেবার উৎপাদনের মধ্যে পণ্য ও সেবার বন্টন বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। এর উপর ভিত্তি করে তারা অর্থনীতিকে একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে যেখানে অর্থনৈতিক পণ্য ও পণ্যের মালিকানা লাভ করার পদ্ধতিকে কোনরূপ পার্থক্য করা ছাড়া এক করে দেখা হয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক বিজ্ঞান ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য করা ছাড়া তারা এক করে দেখে। তবে অর্থনৈতিক বিজ্ঞান ও ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বনাম অর্থনৈতিক বিজ্ঞান
অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হল তাই যা কীভাবে সম্পদের বন্টন হবে, কীভাবে এর মালিকানা লাভ করা যাবে, কীভাবে ব্যয় ও হস্তান্তর করা হবে তা নির্ধারণ করে। এসব বিষয় নির্ধারণ করা হয় জীবন সম্পর্কে একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি বা আদর্শ অনুসরণ করে। সুতরাং ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সমাজতন্ত্র/কম্যুনিজম এবং পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণআলাদা। কারণ এ ব্যবস্থাগুলোর প্রত্যেকটি জীবন সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে।
অর্থনৈতিক বিজ্ঞান উৎপাদন, এর উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও এর উপকরণের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করে। অন্যান্য বিজ্ঞানের মত অর্থনৈতিক বিজ্ঞান সব জাতির জন্য সার্বজনীন এবং কোন আদর্শের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পুঁজিবাদে মালিকানার দৃষ্টিভঙ্গি সমাজতন্ত্র/কম্যুনিজম ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলাদা। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি করার আলোচনা একটি পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক ইস্যু এবং জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সর্ম্পকহীন ও সব লোকের জন্য সমান। মানুষের প্রয়োজন এবং তা পূরণ করার বিষয় অধ্যয়ন – একটি বিষয় হিসেবে অর্ন্তভুক্তি অর্থাৎ অর্থনৈতিক পণ্য উৎপাদন করা ও তা বন্টনের ধরণকে এক বিষয় ও ইস্যু হিসেবে দেখা ভুল। যার ফলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির অধ্যয়নে মিশ্রণ ও বিঘড়ব সৃষ্টি হয়েছে। সে কারণে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ভিত্তিই ভুল।
মানুষের প্রয়োজন কেবলই বস্তুগত
যেসব প্রয়োজন পূরণ করতে হয় সেগুলো সব কেবলই বস্তুগত – এটি ঠিক নয় এবং প্রয়োজনের বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। বস্তুগত প্রয়োজন ছাড়াও মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদা রয়েছে এবং এগুলো পূরণ হওয়া দরকার এবং এগুলোর প্রত্যেকটির পূরণের জন্য পণ্য ও সেবা প্রয়োজন।
পণ্য ও সেবাসমূহ সমাজের কাঠামোর সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়
পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদেরা সমাজ কিরকম হওয়া উচিত সে দিকে দৃষ্টি না দিয়ে প্রয়োজন ও উপযোগ যেমন সেগুলোকে তেমনভাবেই দেখেছে, অর্থাৎ তারা মানুষকে আধ্যাত্মিক চাহিদা, নীতি চিন্তা বিবর্জিত ও নৈতিক উদ্দেশ্য শূন্য একটি বস্তুগত প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করেছে। একইভাবে নৈতিকতার উৎকর্ষতার ভিত্তিতে সমাজ কীভাবে গঠিত হয়, ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে সামাজিক সম্পর্কগুলো কীভাবে নিরূপিত হয় অথবা সমাজে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা অর্থাৎ আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সব সম্পর্কের পেছনে মানুষের সাথে আল্লাহ্’র সম্পর্ক উপলব্ধিকে চালিকা শক্তি হিসেবে কীভাবে থাকা উচিত সে ব্যাপারে তারা পরোয়া করে না। বস্তুগত চাহিদা পূরণ করার জন্য তার লক্ষ্যও পুরোপুরি বস্তুগত হওয়ায় পুঁজিবাদীরা এসবকে পরোয়া করে না। তার ব্যবসায় যদি লাভ হয় তাহলে সে প্রতারণা করে না, আর প্রতারণা করে যদি লাভ করা যায় তাহলে তার জন্য সেটি বৈধ। স্রষ্টার নির্দেশ মোতাবেক দান করার জন্য সে দরিদ্র মানুষকে খাওয়ায় না, বরং দরিদ্র লোক যাতে তার কাছ থেকে চুরি না করে সে জন্য তাদের খাওয়ায়। যদি দরিদ্র মানুষকে না খাওয়ালে তার সম্পদ বৃদ্ধি পায় তবে সে তাই করবে। সুতরাং পুঁজিবাদীদের প্রধান উদ্বেগ হল কেবলমাত্র বস্তুগত প্রয়োজন পূরণ করে যে লাভ – সেদিকে লক্ষ্য রাখা। ব্যক্তি তার নিজের লাভের ভিত্তিতে অন্যের দিকে তাকায় এবং এর ভিত্তিতে অর্থনৈতিক জীবন প্রতিষ্ঠা করে এবং এরূপ লোক সমাজ ও জনগণের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি।
এটি হল প্রয়োজন ও উপযোগের আলোকে আলোচনা। সম্পদ ও শ্রমের নিরীখে অর্থাৎ যেগুলোকে পণ্য ও সেবা বলা হয় সেগুলোকে পাওয়ার জন্য ব্যক্তি প্রচেষ্টা চালায় যাতে করে উপযোগ পাওয়া যায়। সম্পদ ও শ্রমের বিনিময়ের কারণে লোকদের মধ্যে সম্পর্কের সৃষ্টি হয় এবং এর উপর ভিত্তি করে গঠিত হয় সামাজ কাঠামো। সুতরাং সম্পদ ও শ্রমকে মূল্যায়ন করার সময় সমাজের কাঠামো কীরকম হওয়া উচিত তা সাধারণ ও বিস্তারিত উভয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা অপরিহার্য।
সমাজ কীরকম হওয়া উচিত সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে প্রয়োজন পূরণ করার জন্য অর্থনৈতিক পণ্যের দিকে কেবল দৃষ্টি নিবদ্ধ করা অর্থনৈতিক পণ্যকে সমাজ বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন করার নামান্তর – যা অস্বাভাবিক। এই অর্থনৈতিক পণ্য লোকদের মধ্যে বিনিময় হয়, ফলে তাদের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি হয় এবং সমাজ থেকেও সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সুতরাং অর্থনৈতিক পণ্যকে বিবেচনা করার সময় সমাজের উপর এর প্রভাব উপলব্ধি করা উচিত। কেউ পছন্দ করে বলে একটি পণ্যকে সমাজের উপযোগী বলে বিবেচনা করা ঠিক নয় – হতে পারে এটি নিজেই ক্ষতিকারক অথবা ক্ষতিকারক নয়, এটি মানুষের মধ্যকার সম্পর্ককে প্রভাবিত করে অথবা করে না, সমাজের লোকদের বিশ্বাসের ভিত্তিতে এটি অনুমোদিত অথবা নিষিদ্ধ। বরং একটি পণ্যকে তখনই উপযোগী বলা উচিত যখন এর থেকে সমাজ যে রকম হওয়া উচিত তার ভিত্তিতে সত্যিকার অর্থে সমাজ উপকৃত হয়। সুতরাং ক্যানাবিস, আফিম ও এজাতীয় তথাকথিত পণ্যকে উপযোগী বিবেচনা করা ও কেউ এগুলো চায় বলে সেগুলোকে অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক হবে না। তার বদলে যখন কোন অর্থনৈতিক পণ্যকে উপযোগী বিবেচনা করা হবে তখন সমাজের লোকদের সম্পর্কের উপর এর প্রভাব বিবেচনা করতে হবে, অর্থাৎ এর ভিত্তিতে পণ্যটিকে আমরা অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করব অথবা করব না। সমাজ যে রকম হওয়া উচিত এর ভিত্তিতে জিনিসসমূহকে দেখা উচিত। সমাজ কীরকম হওয়া উচিত তা বিবেচনায় না এনে পণ্যটিকে খোলা চোখে যেরকম মনে হয়, সেরকম মনে করা ভুল।
প্রয়োজন পূরণ করার বিষয়টি প্রয়োজন পূরণের উপকরণের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্য কিছু বিবেচনায় না এনে প্রয়োজন পূরণের উপকরণকে প্রয়োজন পূরণের একমাত্র অবলম্বন মনে করে অর্থনীতিবিদেরা সম্পদের বন্টনের চেয়ে সম্পদ সৃষ্টি করার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। প্রয়োজন পূরণের জন্য সম্পদ বন্টন করার গুরুত্ব এখানে গৌণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটিই লক্ষ্য এবং সেটি হল সামগ্রিকভাবে দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করা এবং এটি সর্বোচ্চ পরিমাণের উৎপাদন অর্জন করার জন্য কাজ করে। এটি বিবেচনা করে যে দেশে উৎপাদন বৃদ্ধি করে জাতীয় আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে এবং উৎপাদন ও মালিকানা লাভ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন হওয়ায় প্রত্যেক ব্যক্তিকে সম্পদ অর্জন করার জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দিয়ে সমাজের সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ পরিমাণে সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব। সুতরাং ব্যক্তির চাহিদা পূরণ করা বা একটি সম্প্রদায়ের প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন মেটানো সহজতর করার জন্য অর্থনীতি নয়, বরং যা ব্যক্তির প্রয়োজন মেটায় তা বৃদ্ধির দিকে এটি অর্থাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্প্রদায়ের প্রয়োজন পূরণ করাই এর লক্ষ্য। মালিকানা লাভ করা ও কাজ স্বাধীনতার দ্বারা জাতীয় আয়ের সুপ্রাপ্যতার মাধ্যমে সমাজের সদস্যদের মধ্যে আয়ের বন্টন নিশ্চিত হয়। সম্পদ অর্জন করার ক্ষেত্রে ব্যক্তির উৎপাদনের সামর্থ অনুসারে এটি তার উপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে – হোক এর মাধ্যমে সব ব্যক্তি কিংবা কেবল কিছু ব্যক্তি সন্তুষ্ট থাকে।
এটি হল রাজনৈতিক অর্থনীতি অর্থাৎ পুঁজিবাদী অর্থনীতি। এটি একটি প্রকাশ্য ভ্রান্তি এবং বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। এটি সব ব্যক্তির জীবনমান উন্নত করার জন্য কাজ করে না এবং প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক কল্যাণ নিশ্চিত করে না। এ দৃষ্টিভঙ্গির ভুল দিকটি হল যে, যেসব প্রয়োজন মেটানোর কথা বলা হয় সেগুলো হল ব্যক্তির প্রয়োজন। এগুলো হল মানুষের প্রয়োজন। সুতরাং এগুলো হল মুহাম্মদ, সালিহ ও হাসানের প্রয়োজন, এ প্রয়োজন কোন ব্যক্তি সমষ্টি, কিছু জাতির বা একটি জনসমষ্টির নয়। সুতরাং ব্যক্তি নিজেই তার প্রয়োজন পূরণের জন্য কাজ করবে – হোক সে এটি সরাসরি পূরণ করে, যেমন: খাওয়া দাওয়া অথবা সে পুরো জনসমষ্টির চাহিদা পূরণ করার মাধ্যমে এটি করে থাকে, যেমন: একটি জাতির প্রতিরক্ষা । সুতরাং ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণের উপকরণ বন্টনের মধ্যে অর্থনৈতিক সমস্যা নিহিত রয়েছে অর্থাৎ জাতির মধ্যে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির কথা বিবেচনা না করে জাতি বা লোকদের যা প্রয়োজন তা পূরণ করার মধ্যে নয়, বরং জাতির সদস্য ও লোকদের কাছে তহবিল ও উপযোগ বন্টন করার মধ্যে। অন্য কথায় সমস্যা হল ব্যক্তির দরিদ্রতা কিন্তু জাতির নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল বিষয় হতে হবে, কখনই অর্থনৈতিক পণ্য উৎপাদনের আলোচনা করা নয়।
ফলে জাতীয় উৎপাদনের আকারকে প্রভাবিত করে এমন নিয়ামকসমূহের অধ্যয়ন অবশ্যই প্রত্যেক ব্যক্তির আলাদা আলাদাভাবে ও সম্পূর্ণরূপে সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণের অধ্যয়ন থেকে আলাদা। একজন ব্যক্তির সব মৌলিক মানবিক প্রয়োজন পূরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সমাজের সদস্যদের মধ্যে সম্পদের বন্টনের আলোচনা অধ্যয়নের বিষয় হতে হবে। এটিই গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত এবং প্রম থেকেই এটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাছাড়া একটি দেশের দরিদ্রতা বিমোচনের প্রচেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে একজন ব্যক্তির দরিদ্রতা নিরসন করে না। বরং ব্যক্তির দরিদ্রতা নিরসনের জন্য গৃহীত পদক্ষেপসমূহ এবং পদক্ষেপগুলোর মধ্যে দেশের সম্পদ বন্টনের কর্মসূচী দেশের লোকদের জাতীয় আয় বৃদ্ধি করার জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। উৎপাদনের পরিমাণ ও জাতীয় আয় বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে এমন নিয়ামকসমূহের গবেষণা অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে আলোচনা করা উচিত অর্থাৎ প্রয়োজন পূরণের আলোচনায় নয় বরং অর্থনেতিক পণ্য এবং এর বৃদ্ধির আলোচনায় এটি স্থান পাবে। কেননা প্রয়োজন পূরণের বিষয়টি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আলোচিত হবে।
পুঁজিবাদীরা দাবি করে যে কোন একটি সমাজ অর্থনৈতিকভাবে যে সমস্যার সম্মুখীন হয় তা হল পণ্য ও সেবার অভাব। তারা আরও দাবি করে যে, চাহিদা অবিরতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং এগুলোকে পূরণ করার অক্ষমতা অর্থাৎ মানুষের সব প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করার জন্য পণ্য ও সেবার অপর্যাপ্ততাই হল অর্থনৈতিক সমস্যার ভিত্তি। এ দৃষ্টিভঙ্গি ত্রুটিপূর্ণ ও বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। এর কারণ হল একজন মানুষের ব্যক্তি হিসেবে তার মৌলিক প্রয়োজন (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) পূরণ হতে হবে, কিন্তু বিলাস সামগ্রী নয় – যদিও এগুলোও মানুষ চায়। মানুষের মৌলিক প্রয়োজন সীমিত এবং পৃথিবীতে বর্তমান যেসব সম্পদ ও প্রচেষ্টাকে তারা পণ্য ও সেবা হিসেবে অভিহিত করে থাকে সেসব অবশ্যই সব মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করার জন্য পর্যাপ্ত, মানবজাতির সব মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব। মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা নিয়ে কোন সমস্যা নেই যদি না সেটিকে সমাজের জন্য অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাস্তবে অর্থনৈতিক সমস্যা হল ব্যক্তির সব মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য এইসব সম্পদ ও প্রচেষ্টাসমূহের বন্টন এবং এরপর তাদেরকে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালাতে সাহায্য করা।
অবিরতভাবে প্রয়োজন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলা যায় এটি মৌলিক প্রয়োজন বৃদ্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় নয়। কারণ মানুষ হিসেবে কোন ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন বাড়ে না। অন্যদিকে বিলাস সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে ও পরিবর্তিত হয়। শহুরে জীবনে উন্নতির সাথে চাহিদার বৃদ্ধি মৌলিক প্রয়োজনের সাথে বিজড়িত নয় বরং বিলাস সামগ্রীর সাথে জড়িত। মানুষ বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য কাজ করে, কিন্তু এগুলো পূরণ না হলে সমস্যার সৃষ্টি হয় না। যা সমস্যার সৃষ্টি করে তা হল মৌলিক অধিকার পূরণ না হওয়া। এসব কিছুর পাশাপাশি বিলাস সামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধির প্রশ্নটি কেবলমাত্র কিছু লোকের সাথে জড়িত যারা একটি নির্দিষ্ট দেশে বাস
করে এবং এ প্রশ্নটি দেশের সব ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত নয়। মানুষের মধ্যে প্রয়োজন পূরণের স্বাভাবিক প্রবণতার মাধ্যমে এ প্রশ্নটির সমাধান হয়। বিলাস সামগ্রী অর্জনের প্রবল আকাঙ্খার ফলে মানুষ তার দেশের সম্পদ বৃদ্ধি করে, অন্য দেশে কাজ করে অথবা অন্য দেশের সাথে একীভূতকরণ বা প্রসারণের মাধ্যমে এগুলো পূরণের জন্য ধাবিত হয়। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণের ইস্যুটির চেয়ে এটি আলাদা। এর কারণ হল প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা ও বিলাস সামগ্রীর চাহিদা পূরণ করার জন্য সম্পদ বন্টন করার সমস্যাটি জীবনের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সম্পর্কযুক্ত যা বিশেষ আদর্শ বহনকারী কোন বিশেষ জাতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় আয় বৃদ্ধির সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্রের সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, বিদেশ গমন, রাষ্ট্রের সীমানা বর্ধন অথবা অন্য দেশের সাথে একীভূত হওয়া ইত্যাদি জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি করে। দেশের সম্পদ বৃদ্ধি কোন বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ বা জাতির সম্পর্কিত নয়, বরং তা বাস্তবভিত্তিক সমাধানের উপর নির্ভরশীল।
সুতরাং এমন অর্থনৈতিক মূলনীতি প্রণয়ন করতে হবে যেগুলো জাতির প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সম্পদের বন্টন নিশ্চিত করবে – যাতে করে প্রত্যেকের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় এবং অতঃপর প্রত্যেককে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য সামর্থ্যবান করে তোলা যায়। তবে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এর আলোচনা অর্থনৈতিক সমস্যাটির সমাধান করে না – যা হল প্রত্যেক ব্যক্তির চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা। উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি দেশের সম্পদ বৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায় কিন্তু কার্যকরভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করে না। দেশটি প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারে, যেমন: ইরাক ও সৌদি আরব, কিন্ত তাদের দেশের অধিকাংশ নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয়নি। সুতরাং জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি প্রত্যেক ব্যক্তির সবার আগে ও সর্বপ্রম বিবেচনা করতে হয় এমন মৌলিক সমস্যার সমাধান করে না অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করা ও অতঃপর তাদেরকে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য সামর্থ্যবান করে তোলার সাথে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধির সম্পর্ক নেই। সুতরাং দরিদ্রতা ও বঞ্চনা মানুষ হিসেবে মৌলিক অধিকার পূরণ না হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে হবে, কিন্তু কখনই নগরায়নের কারণে ক্রমবর্ধমান বিলাস সামগ্রীর চাহিদার কারণে নয়। সুতরাং সমাজের প্রত্যেকের দরিদ্রতা ও বঞ্চনাকেই বঞ্চনা সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে হিসেব করা দেশের দরিদ্রতা বঞ্চনা সমস্যা নয়। প্রত্যেক ব্যক্তির দরিদ্রতা ও বঞ্চনা বিবেচনা করার দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমবর্ধমান জাতীয় আয় বৃদ্ধি দ্বারা নিরূপিত হয় না, বরং এটিকে এমনভাবে বিবেচনা করা হয় যাতে মৌলিক অধিকার পুরোপুরি পূরণ করার জন্য সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সম্পদ বন্টিত হয় এবং তারপর প্রত্যেককে বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য সামর্থ্যবান করে তোলা যায়।
পুঁজিবাদ মূল্যকে প্রকৃত নয়, বরং আপেক্ষিক হিসেবে বিবেচনা করে, এবং এটি একটি অনুমান ভিত্তিক পরিমাপ হিসেবে পরিগণিত হয়। বাজারে সুপ্রাপ্যতার ভিত্তিতে এক হাত কাপড়ের মূল্য হল তা থেকে প্রাপ্ত প্রান্তিক উপযোগিতা। এর মূল্য বলতে যে পরিমাণ পণ্য ও সেবা এর জন্য বিনিম করা যাবে তাও বুঝায়। এক হাত কাপড়ের বিনিময় হিসেবে যদি অর্থ পাওয়া যায় তাহলে তা ‘দাম’ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাদের দৃষ্টিতে এ দু’টি মূল্য স্বতন্ত্র, এবং এগুলোর আলাদা নাম রয়েছে: উপযোগিতা এবং বিনিময়ের মূল্য। এ সংজ্ঞা অনুসারে মূল্যের এই অর্থ ভুল। কারণ কোন পণ্যের মূল্য হল পণ্যটির দুষ্প্রাপ্যতা সাপেক্ষে ঐ পণ্যের মধ্যে থাকা উপযোগিতার পরিমাণ। সুতরাং একটি পণ্যের জন্য সত্যিকারের দৃষ্টিভঙ্গী হল এর দুষ্প্রাপ্যতাকে বিবেচনা করে এর মধ্যে থাকা উপযোগিতা পর্যবেক্ষণ করা, তা এই পণ্যটি শুরু থেকেই কোন ব্যক্তির মালিকানায় শিকারের মাধ্যমেই আসুক অথবা বেচাকেনার মাধ্যমেই আসুক অথবা এটি ব্যক্তি সম্পর্কিত হোক অথবা কোন জিনিষ সম্পর্কিত হোক। সুতরাং মূল্য এমন একটি সুনির্ধারিত বিষয়ের নাম যার সুনির্দিষ্ট বাস্তবতা রয়েছে এবং এটি কোন আপেক্ষিক বিষয় নয় যা কোন ক্ষেত্রে প্রয়োগ হয়, অন্যক্ষেত্রে নয়। সুতরাং মূল্য একটি বাস্তব পরিমাপ, আপেক্ষিক নয় সুতরাং অর্থনীতিবিদদের মূল্য সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গী তা এর ভিত্তি থেকেই ভুল।
প্রান্তিক উপযোগিতা বা মূল্য বলতে মূল্যর এমন একটি হিসাব বা অনুমানকে বুঝায় যা পণ্য বন্টনের নিকৃষ্টতম পরিস্থিতিতে উৎপাদন পরিচালনার অভিপ্রায়ে প্রাক্কলিত। ফলতঃ একটি পণ্যের মূল্য হিসাব করা হয় সর্বনিম্ন সীমার উপর ভিত্তি করে যাতে উৎপাদন সুনিশ্চিতভাবে চলতে থাকে। প্রান্তিক উপযোগিতা একটি পণ্যের প্রকৃত মূল্য নয় অথবা এমনকি পণ্যের দামও নয়। কেননা পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতাকে বিবেচনায় এনে হিসাব করার সময় এর মধ্যে থাকা উপযোগিতাই হল এর মূল্য। এর মূল্য কমবে না যখন পরবর্তীতে এর দাম পড়ে যায় এবং বৃদ্ধি পাবে না যদি এর দাম বেড়ে যায়। কারণ মূল্যায়ন করার সময় এর মূল্য বিবেচনা করা হয়েছে। সুতরাং প্রান্তিক উপযোগিতা তত্ত্ব মূল্য সম্পর্কিত কিছু নয়, ববং এটি দামের সাথে সংশ্লিষ্ট। এমনকি পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতেও দাম ও মূল্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দামের হিসাবকে যা পরিচালনা করে তা হল চাহিদার প্রাচূর্যতার সাথে সরবরাহের ঘাটতি অথবা সরবরাহের প্রাচূর্যতার সাথে চাহিদার ঘাটতি। এগুলো একটি পণ্যের উৎপাদনের পরিমাণের সাথে সম্পর্কযুক্ত, বন্টনের সাথে নয়। বরং মূল্য, মূল্যায়নের সময় পণ্যের মধ্যে থাকা মোট উপযোগিতার পরিমাণ যা পণ্যের দুষ্প্রাপ্যতাকে মাথায় রেখে পরিমাপ করা হয় যদিও তা পণ্যের মূল্য নির্ধারণের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। সুতরাং সরবরাহ ও চাহিদা মূল্যকে প্রভাবিত করে না।
সুতরাং, মূল্যের বিষয়টি এর গোড়া থেকেই ভুল। সে কারণে ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা যে কোন কিছু ভুল হতে বাধ্য। যদি শ্রম কিংবা অন্য কোন পণ্য হতে প্রাপ্ত সুবিধা মাপকাঠি হিসেবে ধরে নিয়ে পণ্যের মধ্যে উপস্থিত সুবিধাকে পরিমাপ করা হয় তবে সে মূল্যায়নটি সঠিক হবে এবং স্বল্পমেয়াদে অনেক বেশী স্থিতিশীলতা প্রদান করবে। যদি মূল্য দামের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয় তাহলে মূল্যায়ন প্রকৃত হবে না, আপেক্ষিক হবে। এবং বাজার অনুসারে এটি সর্বদা পরিবর্তিত হতে থাকবে। এক্ষেত্রে এটিকে মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা সঠিক হবে না বিধায় মূল্য শব্দটি এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা সমীচীন নয়। কারণ সেক্ষেত্রে এটি পণ্যের গুণাগুণ অনুযায়ী নয় বরং বাজার অনুযায়ী টাকা কামানোর মাধ্যমে পরিণত হবে।
পুঁজিবাদীরা বলে মানুষ যে শ্রম ব্যয় করে তার ফলাফল হিসেবে উপযোগ পাওয়া যায়। সুতরাং পুরষ্কার যদি কাজের অনুরূপ না হয় তাহলে নিঃসন্দেহে উৎপাদন নিম্নমুখী হবে এবং তারা এটি থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সমাজের সদস্যদের মধ্যে সম্পদ বন্টনের আদর্শিক পদ্ধতি হল তাই যা সর্বোচ্চ পরিমাণের উৎপাদনকে সুনিশ্চিত করে। এ পদ্ধতি পুরোপুরি ভুল। কেননা বাস্তবে যেসব সম্পদ স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন সেগুলোই পণ্যের মধ্যে থাকা উপযোগের ভিত্তি। এবং এসব সম্পদের উপযোগিতা বৃদ্ধির জন্য ব্যয়কৃত খরচ অথবা নতুন একটি উপযোগের সুত্রপাত করতে এর সাথে যোগকৃত শ্রম একটি বিশেষ উপযোগের যোগান দেয়। সুতরাং উপযোগকে কেবলমাত্র শ্রমের ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা পুরোপুরি ভুল। কেননা এটি কাঁচামাল ও অন্যান্য ব্যয়কে উপেক্ষা করে। কিছুক্ষেত্রে এ খরচ কাঁচামালের জন্য ক্ষতিপূরণস্বরূপ, কোনভাবেই শ্রমের জন্য নয়। সুতরাং উপযোগ মানুষের শ্রমের ফলাফল হিসেবে আসতে পারে অথবা কাঁচামালের জন্যও আসতে পারে অথবা উভয়ের ফলাফল হিসেবে আসতে পারে, কিন্তু কেবলমাত্র মানুষের শ্রমের ফলাফল হিসেবে নয়।
কেবলমাত্র কাজের পুরষ্কার হ্রাস পেলেই উৎপাদনের পরিমাণ হ্রাস পায় না, বরং দেশ থেকে সম্পদ ক্রমাগত উজাড় হতে থাকলে, যুদ্ধ বা অন্য কোন কারণে উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বৃটেন ও ফ্রান্সের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণ কাজের পুরষ্কার কমে যাওয়ায় নয়, বরং ঐশ্বর্যপূর্ণ উপনিবেশগুলোর উপর তাদের প্রভাব সংকুচিত হওয়ায় এবং যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের কারণে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণ কাজের পুরষ্কার কমে যাওয়ায় নয়, বরং জার্মানীর সাথে তাদের যুদ্ধের কারণে। ইসলামী বিশ্বে আজকে উৎপাদনের যে হ্রাস ঘটেছে সেটিও কাজের পুরষ্কার কমে যাওয়ায় নয় বরং বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে যাতে গোটা উম্মাহ্ নিপতিত। সুতরাং কাজের পুরষ্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ততাই উৎপাদন হ্রাসের একমাত্র কারণ নয় এবং এই ভিত্তিতে চিন্তা করাও ভুল যে, বন্টনের আদর্শিক পদ্ধতি হল উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা। উৎপাদনের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্জনের সাথে প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সম্পদ বন্টনের কোন সম্পর্ক নেই।
পুঁজিবাদীরা বলে দাম উৎপাদনের প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে এবং একজন ব্যক্তির শ্রম ব্যয় করার লক্ষ্যই হল বস্তুগতভাবে পুরষ্কৃত হওয়া। এ দৃষ্টিভঙ্গী ভুল এবং বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। মানুষ অনেক সময় নৈতিক পুরষ্কার পাওয়ার জন্য শ্রম ব্যয় করে, যেমন স্রষ্টার কাছ থেকে পুরষ্কার পাওয়ার জন্য অথবা কোন নৈতিক যোগ্যতা অর্জনের জন্য, যেমন: কারও অনুগ্রহ ফিরিয়ে দেয়া। মানুষের চাহিদা বস্তুগত হতে পারে, যেমন: বস্তুগত লাভ; এটি আধ্যাত্মিকও হতে পারে, যেমন: মুক্তি লাভ করা; অথবা নৈতিক, যেমন: প্রশংসা করা। সুতরাং কেবলমাত্র বস্তুগত চাহিদাকে বিবেচনা করা ভুল। বাস্তবে একজন ব্যক্তি তার বস্তুগত চাহিদা পূরণের চেয়ে আধ্যাত্মিক বা নৈতিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অনেক উদারভাবে ব্যয় করতে পারে। সুতরাং দামই উৎপাদনের একমাত্র প্রণোদনা নয়। একজন রাজমিস্ত্রী মাসের পর মাস পাথর কেটে মসজিদ বানানোর জন্য আত্মনিয়োগ করতে পারে, একটি কারখানা কিছুদিনের উৎপাদন দরিদ্রদের মধ্যে বন্টনের জন্য বরাদ্দ করতে পারে এবং একটি জাতি কিছু অথবা সব প্রচেষ্টা তার ভূমিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য ব্যয় করতে পারে। এ ধরনের উৎপাদন দাম দ্বারা প্রণোদিত নয়। তাছাড়া বস্তুগত পুরষ্কার কেবলমাত্র দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি অন্য পণ্য ও সেবার মাধ্যমেও আসতে পারে। সুতরাং দামকে উৎপাদনের একমাত্র প্রণোদনা বিবেচনা করা ভুল।
পুঁজিবাদের একটি বড় অনিয়ম হল দামকে সমাজের লোকদের মধ্যে সম্পদ বন্টনের জন্য একমাত্র নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিবেচনা করা। তারা বলে দাম হল একমাত্র প্রতিবন্ধকতা যা ভোক্তাকে তার আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ কোন কিছুর মালিকানা লাভ ও সে অনুসারে ব্যয় করতে বাধ্য করে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার আয় যতটুকু অনুমোদন করে ঠিক ততটুকুর মধ্যে ব্যয়কে সীমিত রাখে। একইভাবে কিছু পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও অন্য কিছুর দাম হ্রাসের মাধ্যমে এবং কিছু লোকের হাতে অর্থের সুলভতা ও অন্য কিছু লোকের হাতে এর দুষ্প্রাপ্যতার কারণে দাম ভোক্তাদের মধ্যে সম্পদের বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে। সুতরাং দেশের প্রত্যেক ব্যক্তি যে পরিমাণ সম্পদের অংশীদার হয় তা তার মৌলিক চাহিদার সমপরিমাণ নয়, বরং পণ্য বা সেবা উৎপাদনের ক্ষেত্রে তার যতটুকু অবদান রয়েছে অর্থাৎ ভূমি বা মূলধনের ক্ষেত্রে সে যতটুকুর মালিক সে পরিমাণ অথবা সে কাজের বা প্রজেক্টের যতটুকু করেছে সে পরিমাণ।
এ মূলনীতি থেকে অর্থাৎ দাম বন্টনের নিয়ন্ত্রক থেকে বলা যায় যে, পুঁজিবাদ কার্যকরভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, মানুষ একটি সুন্দর জীবন পাবে না যদি সে পণ্য ও সেবা উৎপাদনে অবদান রাখতে সামর্থবান না হতে পারে। যে ব্যক্তি অবদান রাখতে অক্ষম অর্থাৎ সে যদি জন্মসূত্রে শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম থাকে তাহলে সে জীবন পাওয়ার যোগ্যতা রাখে না এবং তার চাহিদা পূরণের জন্য সম্পদ নেয়ার ক্ষেত্রেও তার যোগ্যতা নেই। তাছাড়া যে শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী হয়ে জন্ম লাভ করেছে এবং সে তার ইচ্ছেমত সম্পদ সৃষ্টি ও মালিকানা লাভ করতে সমর্থ্য। এ ধরনের লোক বিলাসী জীবনযাপনের মাধ্যমে খরচ করার যোগ্য এবং তার সম্পদ দ্বারা অন্যদের উপর নিয়ন্ত্রণ ও প্রভূত্ব করার যোগ্যতা রাখে। তাছাড়া বস্তুগত লাভ খোঁজার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তির প্রণোদনা বেশী সে ব্যক্তি সম্পদের মালিকানা অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যদের ছাড়িয়ে যাবে, আর অন্যদিকে যার মধ্যে আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতি (উপার্জনের সময় যেগুলো তাকে নিয়ন্ত্রণ করে) ঝোঁক বেশী শক্তিশালী তার মালিকানা অর্জন বা সম্পদ অর্জন অন্যদের তুলনায় কম হবে। এ প্রক্রিয়া জীবন থেকে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক নিয়ামক সমূহকে বাদ দিয়েছে এবং বস্তুগত চাহিদা পূরণের বিভিন্ন উপায় অনুসন্ধানে লালায়িত বস্তুগত সংগ্রামের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এক জীবন তৈরি করেছে। পুঁজিবাদ প্রয়োগকারী প্রতিটি দেশে ক্রমাগত এটাই ঘটেছে। যেসব দেশ পুঁজিবাদকে গ্রহণ করেছে সেসব দেশে ভোক্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন উৎপাদক পুঁজিপতিদের একচেটিয়া আধিপত্য গড়ে উঠেছে। জনগণের ছোট্ট একটি অংশ, বড় তেল কোম্পানী, স্বয়ক্রিয় যান, ভারী শিল্প করপোরেশনের মালিক হওয়ায় তারা যা উৎপাদন করে সেসবের উপর যথেচ্ছভাবে একটি দাম বসিয়ে তারা ভোক্তাদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। যা একটি জোড়াতালি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করে। জাতীয় অর্থনীতিকে রক্ষা, ভোক্তাদের রক্ষা এবং কিছু পণ্যের ব্যবহারকে হ্রাস করা এবং একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের কর্তৃত্ব সীমিত করার জন্য রাষ্ট্রকে বিশেষ ক্ষেত্রে দাম নির্ধারণ করে দেয়ার ক্ষমতা দিয়ে তারা এটি করে থাকে। সরকার পরিচালিত কিছু গণ প্রকল্পকেও তারা এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করে থাকে। এসব হস্তক্ষেপ তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার (অর্থনৈতিক স্বাধীনতা) সাথে সাংঘর্ষিক এবং এগুলো কেবলমাত্র বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। অনেক (রক্ষণশীল) পুঁজিবাদী এ হস্তক্ষেপ নীতি গ্রহণ করে না এবং তারা একে প্রশ্নবিদ্ধ করে ও প্রচার করে যে, সরকারি কোন হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে দামের কলাকৌশলই কেবল উৎপাদক ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে যথেষ্ট। হস্তক্ষেপের সমর্থকরা (উদারপন্থীরা) ধরনের জোড়াতালি দেয়া সমাধানের ব্যাপারে সুপারিশ করেছে যা বিশেষ পরিস্থিতিতে ও অবস্থাতে প্রয়োগ করা হয়। এমনকি এসব পরিস্থিতিতেও প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সম্পদের বন্টন প্রত্যেকের সব মৌলিক চাহিদাকে পরিপূর্ণভাবে পূরণ করতে পারে না।
মালিকানার স্বাধীনতার ধারণা এবং দামকে সম্পদ বন্টনের একমাত্র কলাকৌশল হিসেবে বিবেচনা করার ধারণার কারণে পণ্য ও সেবার খারাপ বন্টন হয় এবং এ চিত্র পুঁজিবাদ প্রয়োগ হয় এমন সব সমাজে আধিপত্য বিস্তার করে। আমেরিকান সমাজের ক্ষেত্রে অনেক আমেরিকানদের তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ ও এমনকি বিলাস সামগ্রী অর্জনের জন্য দেশের সম্পদে যথেষ্ট শেয়ার রয়েছে। এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সে দেশের ব্যাপক সম্পদের কারণে, যা সে দেশের প্রত্যেক ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও বিলাসী সামগ্রী অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। তবে এটি একজন ব্যক্তি উৎপাদনে যতটুকু শ্রম দিতে পারছে তার মূল্যের সমপরিমাণ শেয়ারের কারণে হচ্ছে এরূপ বলা যাবে না। তাছাড়া দামের কৌশলকে বন্টনের নিয়ন্ত্রক হিসেবে নির্ধারণের কারণে পশ্চিমা পুঁজিপতি একচেটিয়া ব্যবসায়ীরা অন্য দেশের নতুন বাজার খুঁজতে প্রণোদিত হয়, যেখান থেকে তারা কাঁচামাল সংগ্রহ করে ও উৎপাদিত পণ্য বিμয় করে। উপনিবেশবাদ, আঞ্চলিক কর্তৃত্ব, অর্থনৈতিক দখলদারিত্ব থেকে উদ্ভুত সমস্যাগুলো একচেটিয়া ব্যবসা ও সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে দামকে উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এ ভিত্তিতেই পৃথিবীর সম্পদ পুঁজিপতি একচেটিয়া ব্যবসায়ীদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়েছে। পুঁজিবাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এসব ভুল নিয়ম-নীতির কারণে তা সম্ভব হয়েছে।
পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

আমরা যদি পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখি, তাহলে দেখতে পাব যে এর দৃষ্টিভঙ্গি হল এটি মানুষের প্রয়োজন (needs) এবং এসব প্রয়োজন পূরণের উপকরণ নিয়ে কাজ করে। পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষের কেবলমাত্র বস্তুগত দিকটি নিয়েই আলোচনা করে এবং এটি তিনটি মূল নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত:
১. প্রয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক অভাব (relative scarcity) রয়েছে। এর অর্থ হল মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ও সেবার অপর্যাপ্ততা। তাদের দৃষ্টিতে এটাই হল সমাজের অর্থনৈতিক সমস্যা।
২. অধিকাংশ অর্থনৈতিক গবেষণা ও অধ্যয়নের ভিত্তি হল উৎপাদিত পণ্যের মূল্য (value)।
৩. উৎপাদন, ভোগ ও বন্টনে দামের (price) ভূমিকা। দাম হল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক বিষয়।পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক অভাবের ক্ষেত্রে বলা যায়, পণ্য ও সেবা মানুষের অভাব পূরণের উপকরণ হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। তারা বলে মানুষের প্রয়োজন রয়েছে যা পূরণ করতে হয় এবং এ প্রয়োজন পূরণের উপকরণ থাকতেই হবে। এ প্রয়োজনসমূহ পুরোপুরিই বস্তুগত (materialistic)। এগুলো হয় দৃশ্যমান (tangible), যেমন: খাদ্য ও বস্ত্রের প্রয়োজন, অথবা এমন সব প্রয়োজন যা মানুষ অনুভব করে এবং এগুলো অদৃশ্যমান (intangible) অর্থাৎ সেবার প্রয়োজন, যেমন: ডাক্তার বা শিক্ষকের সেবা। নৈতিক প্রয়োজন, যেমন: গৌরব ও সম্মান অথবা আধ্যাত্মিক প্রয়োজন, যেমন: স্রষ্টার উপাসনা করা, এগুলো অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃত নয়। একারণে এগুলো পরিত্যাগ করা হয়, ফলে অর্থনৈতিক আলোচনায় এগুলোর কোন স্থান নেই।
প্রয়োজন পূরণের উপকরণসমূহকে পণ্য ও সেবা বলা হয়। পণ্য হল দৃশ্যমান প্রয়োজন পূরণের উপকরণ এবং সেবা হল অদৃশ্যমান প্রয়োজন পূরণের উপকরণ। তাদের দৃষ্টিতে যা পণ্য ও সেবাকে প্রয়োজন পূরণ করতে দেয়, তা হল পণ্য ও সেবার মধ্যে থাকা সুযোগ-সুবিধা বা উপযোগ। এই উপযোগ এমন একটি বৈশিষ্ট্য যা প্রয়োজন পূরণের জন্য আকাঙ্খিত বস্তু থেকে পাওয়া যায়। যেহেতু প্রয়োজন হল অর্থনৈতিক আকাঙ্খা, সেহেতু আকাঙ্খিত প্রতিটি বস্তুই অর্থনৈতিকভাবে উপকারী – হোক তা অপরিহার্য বা তা নয়, কিংবা কিছু সংখ্যক লোক এটিকে উপকারী মনে করুক এবং অন্য কিছু সংখ্যক এটিকে ক্ষতিকর মনে করুক। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থনৈতিকভাবে উপকারী যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ একে আকাঙ্খিত মনে করে। যেকোন বস্তুকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কিনা শুধুমাত্র সে দৃষ্টিতে বিবেচনা করা হয়, যদিও বা জনমত এটিকে অলাভজনক বা ক্ষতিকারক মনে করে। সেকারণে মদ ও হাসিস অর্থনীতিবিদদের কাছে লাভজনক, কেননা কিছু লোক এগুলো চায়।
অন্য কোন বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে কেবলমাত্র প্রয়োজন পূরণ করে- এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অর্থনীতিবিদ প্রয়োজন পূরণের উপকরণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অর্থাৎ পণ্য ও সেবার দিকে লক্ষ্য করে। সুতরাং সে প্রয়োজন ও উপযোগ এ দু’টি যেরূপ বিদ্যমান ঠিক সেভাবেই দেখে, কিন্তু এগুলো কিরকম হওয়া উচিত সেদিকে দৃষ্টিপাত করেনা অর্থাৎ সে অন্য কোন কিছুকে বিবেচনায় না এনে উপযোগকে প্রয়োজন পূরণের নিয়ামক হিসেবে দেখে। সুতরাং কিছু লোকের চাহিদা মেটানোর কারণে সে মদকে অর্থনৈতিকভাবে মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করে এবং অর্থনৈতিক মূল্য বিবেচনা করে মদ প্রস্তুতকারীকে একজন সেবাপ্রদানকারী হিসেবে মনে করে। কারণ এটি কিছু ব্যক্তির অভাব পূরণ করে।
এটিই হল পুঁজিবাদে প্রয়োজন ও তা পূরণের উপকরণের প্রকৃতি। সেকারণে অর্থনীতিবিদ সমাজের প্রকৃতির তোয়াক্কা করে না, কিন্তু তারা অর্থনৈতিক বস্তুগত সম্পদ বা অর্থনৈতিক পণ্যের ব্যাপারে যত্মশীল কারণ এগুলো প্রয়োজন পূরণ করে। সুতরাং তাদের মতানুসারে অন্য কোন কিছু বিবেচনায় না এনে মানুষের প্রয়োজন পূরণের উপকরণ যোগানের জন্য পণ্য ও সেবা সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। অর্থাৎ, প্রয়োজন পূরণের উপকরণ সরবরাহ করা দরকার। প্রয়োজন পূরণের উপকরণ হিসেবে পণ্য ও সেবা যেহেতু সীমিত সেহেতু এগুলো মানুষের সব প্রয়োজন পূরণের জন্য পর্যাপ্ত নয়। কারণ তাদের দৃষ্টিতে এই প্রয়োজনসমূহ অসীম এবং ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি একারণে যে, মানুষের রয়েছে এমন কিছু মৌলিক প্রয়োজন যা তাকে পূরণ করতেই হয় এবং এমন কিছু প্রয়োজন রয়েছে যা নগরায়নের সাথে সাথে বৃদ্ধি পায়। এ চাহিদাসমূহ গুনিতক হারে বাড়তেই থাকে এবং এগুলো পুরোপুরি পূরণ করা দরকার। যদিও পণ্য ও সেবা যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, এগুলো কখনই পূরণ হবার নয়। এ ভিত্তি থেকে অর্থনৈতিক সমস্যার সূত্রপাত হয়, যা হল প্রয়োজনের অতিরিক্ত বোঝা এবং এগুলো পূরণের জন্য উপকরণের অপ্রতুলতা অর্থাৎ মানুষের সব অভাব পূরণের জন্য পণ্য ও সেবার অপ্রতুলতা।
এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমাজ একটি অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং তা হল পণ্য ও সেবার আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা। এ দুষ্প্রাপ্যতার অপরিহার্য ফল হল কিছু প্রয়োজন আংশিকভাবে পূরণ হয় এবং কিছু কখনই পূরণ হয় না। যেহেতু এটাই হল অবস্থা সেহেতু এটি অপরিহার্য যে সমাজের সদস্যগণ এমন আইনের ব্যাপারে একমত হবেন- যা নির্ধারণ করবে কোন প্রয়োজনগুলো পূরণ হওয়া উচিত এবং কোনগুলো নয়। অন্যকথায় এমন আইন প্রণয়ন করা জরুরী যা অসীম অভাব পূরণ করার জন্য সীমিত সম্পদ বন্টনের ব্যবস্থা করবে। সুতরাং তাদের দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের চেয়ে প্রয়োজন ও সম্পদকে বেশী গুরুত্ব প্রদান করেছে। অর্থাৎ সমস্যা হল প্রয়োজন পূরণের জন্য সম্পদকে সুলভ করতে হবে, কিন্তু সেটা প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য নয়। সুতরাং এটি অপরিহার্য যে যেসব আইন প্রণয়ন করা হবে সেগুলোকে অবশ্যই সর্বোচ্চ পরিমাণ উৎপাদনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে যাতে করে সম্পদের সর্বোচ্চ সরবরাহ অর্জন করা সম্ভবপর হয়। অর্থাৎ সামগ্রিতকভাবে জাতির কাছে পণ্য ও সেবা সরবরাহ করা যায়, অবশ্যই প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে নয়। সুতরাং পণ্য ও সেবার বন্টন উৎপাদনের সমস্যার সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত এবং অর্থনীতি অধ্যয়ন ও গবেষণার উদ্দেশ্য হল সমাজের ভোগের জন্য পণ্য ও সেবা বৃদ্ধি করা। সুতরাং এটি অবাক হওয়ার বিষয় নয় যে যেসব নিয়ামক জাতীয় আয়ের (GDP and GNP) আকারকে প্রভাবিত করে সেগুলোর অধ্যয়ন বাদ বাকী সব কিছুর উপর প্রাধান্য লাভ করে। কারণ জাতীয় আয় বৃদ্ধির অধ্যয়ন অর্থনৈতিক সমস্যা অর্থাৎ প্রয়োজনের বিপরীতে পণ্য ও সেবার দুষ্প্রাপ্যতার সমস্যার সমাধান করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ তারা মনে করে উৎপাদন বৃদ্ধি করা ছাড়া দরিদ্রতা ও বঞ্চনা নিরসন করা সম্ভব নয়। সুতরাং সমাজ যেসব অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলোর সমাধান কেবলমাত্র উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমেই করা সম্ভব।
উৎপাদিত পণ্যের মূল্য (value) বলতে এর গুরুত্বের মাত্রাকে বুঝায়; যেখানে কোন এক বিশেষ ব্যক্তির বা কোন এক বিশেষ বস্তুর সাপেক্ষে সে মাত্রা নির্ধারিত হয়। প্রম ক্ষেত্রে এটাকে ‘উপযোগের মূল্য’ (The Value of The Benefit) বলা হয় এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে এটিকে ‘বিনিময়ের মূল্য’ (value of exchange) বলা হয়। একটি বস্তু থেকে প্রাপ্ত উপযোগকে যেভাবে বর্ণনা করা যায় তার চুম্বকাংশ হল: একটি বস্তুর যে কোন এককের উপযোগের মূল্য এর প্রান্তিক উপযোগ দ্বারা পরিমাপ করা হয় অর্থাৎ সর্বনিম্ন প্রয়োজন যে পরিমাণ বস্তু দ্বারা পূরণ করা যায় সে পরিমাণ বস্তুর উপযোগ। তারা এটিকে ‘প্রান্তিক উপযোগ তত্ত্ব’ বা ‘The Theory Of Marginal Utility’ বলে। এর অর্থ হল উপযোগ কেবলমাত্র এর উৎপাদকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিমাপ করা হয় না অর্থাৎ উৎপাদন খরচ দ্বারা মূল্যায়িত হয় না, তাহলে সেক্ষেত্রে চাহিদা বিবেচনা না করে কেবল যোগানই বিবেচনা করা হত। আবার এটিকে কেবলমাত্র ভোক্তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিবেচনা করা ঠিক হবে না অর্থাৎ এর উপযোগ এবং চাহিদা বিবেচনা করার সাথে সাথে এর আপেক্ষিক দুষ্প্রাপ্যতা বিবেচনা করতে হবে। কেননা এতে করে যোগানের বিষয়টি হিসেবে না এনে চাহিদা বিবেচনা করা হবে। বাস্তবিকভাবে তারা বলে যে, যোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে একত্রে উপযোগকে দেখা উচিত। সুতরাং সর্বনিম্ন যে উপযোগ প্রয়োজন পূরণ করে তার ভিত্তিতে একটি বস্তুর উপযোগ পরিমাপ করা হয় অর্থাৎ সন্তুষ্টির সর্বনিম্ন বিন্দু থেকে। সুতরাং এক টুকরো রুটির মূল্য সবচেয়ে কম ক্ষুধার্ত থাকা অবস্থায় পরিমাপ করা হবে, সর্বাধিক ক্ষুধার্ত অবস্থায় নয় এবং সেসময় বাজারে রুটি সুলভ থাকতে হবে এবং যখন সুলভ নয় এমন অবস্থায় পরিমাপ করা যাবে না।
বিনিময়ের মূল্যের ক্ষেত্রে বলা যায়, এটি হল একটি বস্তুর এমন বৈশিষ্ট্য যা থাকার কারণে সেটি বিনিময়ের উপযোগী হয়। একটি বস্তুর বিনিময়ের শক্তিমত্তা আপেক্ষিকভাবে অন্য একটি বস্তুর সাথে তুলনা করে নিরূপণ করা হয়; যেমন: ভূট্টার সাথে গমের বিনিময় মূল্য হিসেব করতে হলে দেখতে হবে এক একক গম পাবার জন্য কত একক ভূট্টা বিনিময় করতে হয়। তারা কেবলমাত্র ‘উপযোগ’ শব্দ দ্বারা উপযোগের মূল্য এবং কেবলমাত্র ‘মূল্য’ শব্দ দ্বারা বিনিময়ের মূল্য বুঝিয়ে থাকে।
মূল্যের দিক থেকে সামঞ্জস্যপূর্ণ দু’টি পণ্য ও সেবার মধ্যে বিনিময় সংঘটিত হয়। সেকারণে অর্থনীতিবিদদের জন্য মূল্য অধ্যয়ন করা অপরিহার্য। কেননা এটি হল বিনিময়ের ভিত্তি এবং এমন একটি উপযোগ যা পরিমাপ করা যায়। এটি এমন একটি মানদন্ড যার মাধ্যমে পণ্য ও সেবা পরিমাপ করা হয় এবং এর মাধ্যমে কোন কাজ উৎপাদনমুখী কিনা তা পরিমাপ করা হয়।
তাদের দৃষ্টিতে উৎপাদন হল কাজের মাধ্যমে উপযোগ সৃষ্টি বা বৃদ্ধি করা। সুতরাং কোন কাজটি উৎপাদনশীল এবং কোনটির অনেক বেশী উৎপাদনশীলতা রয়েছে তা চিহ্নিত করার জন্য বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্য ও সেবার জন্য একটি সূক্ষ্ম মানদন্ড থাকা উচিত। এ মানদন্ড হল বিবিধ পণ্য ও সেবার বিষয়ে সামাজিক মূল্য। অন্য কথায় এটি হল ব্যয়কৃত শ্রম ও প্রদত্ত সেবার যৌথ মূল্যায়ন। আধুনিক সময়ে ‘ভোগ করার জন্য উৎপাদন’ দ্বারা ‘বিনিময়ের জন্য উৎপাদন’ প্রতিস্থাপিত হওয়ায় এ মূল্যায়ন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। অবস্থা এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, কার্যত প্রত্যেক ব্যক্তি তার উৎপাদনকে অন্য আরেকজনের উৎপাদিত পণ্যের সাথে বিনিময় করে থাকে। পণ্য ও সেবার ক্ষতিপূরণের (compensation) মাধ্যমে বিনিময় সম্পাদিত হয়। সেকারণে পণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে একটি মানদন্ড থাকা উচিত যাতে করে বিনিময় করা যায়। সুতরাং উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রে ‘মূল্য কী’ – সে ব্যাপারে জ্ঞান থাকা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে অর্থাৎ উপকরণসমূহ ব্যবহার করে মানুষের অভাব পূরণ করার ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান।
আধুনিক ইতিহাসে, এ বিনিময়ের মূল্যকে এর একটি মূল্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয় এবং এ ধরনের মূল্য প্রণিধানযোগ্য হয়ে পড়েছে। উনড়বত সম্প্রদায়ে পণ্যসমূহের মূল্য একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়, বরং একটি বিশেষ পণ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত – যাকে অর্থ (money) বলা হয়। অর্থের সাথে কোন পণ্য বা সেবার বিনিময়ের অনুপাতকে তাদের দাম (price) বলা হয়। সুতরাং দাম হল অর্থের তুলনায় একটি পণ্য বা সেবার বিনিময়ের পরিমাণ। অতএব বিনিময়ের মূল্য (value of exchange) ও দামের (price) মধ্যে পার্থক্য হল বিনিময়ের মূল্য হল একটি বস্তুর সাথে অপর কিছুর বিনিময়ের হার – হতে পারে সেটি অর্থ, পণ্য বা সেবা। অন্যদিকে দাম হল অর্থের সাথে বিনিময় মূল্য। এর অর্থ হল সব পণ্যের দাম একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে বাড়তে পারে এবং অপর একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে হ্রাস পেতে পারে। অন্যদিকে একে অপরের তুলনায় আপেক্ষিকভাবে সব পণ্যের বিনিময় মূল্য একটি নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে বাড়া বা কমা সম্ভব নয়। আবার বিনিময় মূল্যে কোনরূপ পরিবর্তন না এনে পণ্যের দামে পরিবর্তন আসা সম্ভব। সুতরাং পণ্যের দাম হল এর মূল্যসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি। অন্য কথায় এটি অর্থের তুলনায় পরিমাপ করা একটি মূল্যমাত্র। যেহেতু দাম হল অন্যতম একটি মূল্য সেহেতু একটি বস্তু উপকারী কিনা বা উপযোগের মাত্রা কতটুকু সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য দামকে ব্যবহার করা স্বাভাবিক। সুতরাং একটি পণ্যকে ফলদায়ক ও উপকারী তখনই বিবেচনা করা হবে যখন সমাজ এ বিশেষ পণ্য ও সেবাকে একটি দাম দ্বারা মূল্যায়ন করে। পণ্য বা সেবার উপযোগের মাত্রা এমন একটি দাম দ্বারা পরিমাপ করা হয় যা অধিকাংশ ভোক্তা মালিকানায় নেয়া বা সদ্ব্যবহার করবার জন্য দিতে সম্মত থাকে – হোক সে পণ্য কৃষিজাত বা শিল্পজাত এবং সে সেবা একজন ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, ডাক্তার বা প্রকৌশলীর।
উৎপাদন, ভোগ, বন্টনের ক্ষেত্রে দাম যে ভূমিকা রাখে তা হল, দামের ব্যবস্থাপনা (price mechanism) নির্ধারণ করে কোন উৎপাদক পণ্য উৎপাদন করবে এবং কোন উৎপাদক পণ্য উৎপাদন করবে না। একইভাবে দামই নির্ধারণ করে কোন ভোক্তা পণ্য দিয়ে তার প্রয়োজন মেটাবে এবং কোন ভোক্তা পণ্য ভোগ করতে সমর্থ হবে না। একটি পণ্যের উৎপাদন খরচ বাজারে এর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক ও পণ্যের উপযোগ বাজারে এর চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রাখে এবং উভয়ক্ষেত্রে দাম দ্বারা এসব পরিমাপ করা হয়। সুতরাং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে চাহিদা ও যোগান (demand and supply) অধ্যয়ন করা মৌলিক ইস্যু। যোগান বলতে বাজারে সরবরাহ করা বুঝায় এবং একইভাবে চাহিদা বলতে বাজারের চাহিদা বুঝায়। চাহিদা দাম উল্লেখ ব্যতিরেকে যেমনি বলা যায় না, তেমনি সরবরাহও দাম ব্যতিরেকে bমূল্যায়ন করা যায় না। তবে চাহিদা দামের ব্যস্তানুপাতে পরিবর্তিত হয়, অর্থাৎ যদি দাম বাড়ে তাহলে চাহিদা কমে এবং দাম কমলে চাহিদা বাড়ে। সরবরাহের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটি ঠিক উল্টো, অর্থাৎ দামের অনুপাতে যোগান পরিবর্তিত হয়। সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় যদি দাম বাড়ে এবং সরবরাহ হ্রাস পায় যদি দাম কমে যায়। যোগান ও চাহিদা এ উভয়ক্ষেত্রে দামের সবচেয়ে বড় প্রভাব রয়েছে; ফলে উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রেও রয়েছে এর বড় প্রভাব।
পুঁজিবাদীদের মতে দামের ব্যবস্থাপনা হল সমাজে ব্যক্তির মধ্যে পণ্য ও সেবা বন্টনের আদর্শ পদ্ধতি। কেননা মানুষ যে শ্রম ব্যয় করে তার ফলই হল উপযোগ। সুতরাং ক্ষতিপূরণ (compensation) যদি শ্রমের সমান না হয় তাহলে সন্দেহাতীতভাবে উৎপাদন কমে যাবে। সুতরাং সমাজে পণ্য ও সেবা বন্টনের আদর্শ পদ্ধতি হল এমন একটি ব্যবস্থা যা সর্বোচ্চ উৎপাদনকে সুনিশ্চিত করে। এ পদ্ধতি হল দামের পদ্ধতি – যাকে দামের ব্যবস্থা বা দামের ব্যবস্থাপনা বলা হয়। তারা মনে করে দামের ব্যবস্থাপনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থনৈতিক সাম্যাবস্থার (economic equilibrium) সৃষ্টি করে। যেহেতু এটি ভোক্তাকে কিছু পণ্যের ব্যাপারে তার চাহিদা এবং অন্যকিছুর ব্যাপারে চাহিদা না থাকার ভিত্তিতে বিভিনড়ব অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে অর্জিত সমাজের মালিকানাধীন সম্পদের বন্টনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পছন্দ করার সুযোগ দেয়। সুতরাং যা প্রয়োজন ও পছন্দনীয় তা μয় করার জন্য তাদের আয়কে ব্যয় করে। সুতরাং যে ভোক্তা মদ পছন্দ না করে সে সেটি ক্রয় না করে অন্য কিছুর পেছনে তার আয় ব্যয় করবে। মদ অপছন্দ করে এমন ক্রেতার সংখ্যা যদি বৃদ্ধি পায়, অথবা সবাই মদকে অপছন্দ করা শুরু করে, তাহলে ক্রমহ্রাসমান চাহিদার কারণে মদ উৎপাদন করা অলাভজনক হয়ে যাবে। এভাবে মদের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে এবং একই নিয়ম অন্য পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভোক্তাগণ কী ক্রয় করবে এবং কী ক্রয় করবে না এ ব্যাপারে তারা স্বাধীন বিধায় উৎপাদনের পরিমাণ ও প্রকরণকে তারাই নির্ধারণ করে। তারা তা করে দামের মাধ্যমে এবং পণ্য ও সেবার বন্টনও ঘটে, যদিও ভোক্তা কর্তৃক প্রদেয় দাম সরাসরি উৎপাদক পায় না এবং ভোক্তা উৎপাদককে দেয়ও না।
দামের ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের উদ্দীপক। এটি বন্টনের নিয়ন্ত্রক এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী, অর্থাৎ এটি এমন একটি উপায় যার মাধ্যমে উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা অর্জন হয়।
দামের ব্যবস্থাপনা উৎপাদনের উদ্দীপক, কেননা যে কোন মানুষের কোন ফলদায়ক প্রচেষ্টা ও ত্যাগের কারণ হল বস্তুগত লাভ। পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদরা এ সম্ভাবনা বাদ দিয়েছে যে কোন মানুষ আধ্যাত্মিক বা নৈতিক কারণে প্রচেষ্টা চালাতে পারে। যখন তারা নৈতিক উদ্দেশ্যকে সনাক্ত করে তখন সেটিকে বস্তুগত লাভের জন্য করা হয় বলে ধরে নেয়। তারা বিবেচনা করে যে, মানুষ কেবলমাত্র তার বস্তুগত অভাব ও ইচ্ছা পূরণের জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করে। এ প্রয়োজন পূরণ হতে পারে ব্যক্তি সরাসরি যা উৎপাদন করে সেগুলোর ভোগ থেকে অথবা এমন কোন আর্থিক পুরস্কার থেকে যার মাধ্যমে সে অন্যদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে সক্ষম হয়। যেহেতু মানুষ অন্যের সাথে প্রচেষ্টা বিনিময় করার মাধ্যমে তার অধিকাংশ বা সব প্রয়োজন পূরণের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু প্রয়োজন পূরণ করার প্রচেষ্টা আর্থিক পুরস্কারের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। এই আর্থিক পুরস্কার তাকে পণ্য ও সেবা প্রাপ্তিতে সহায়তা করে এবং একইভাবে সে যেসব পণ্য উৎপাদন করে তা পাওয়া তার লক্ষ্য থাকে না। সুতরাং আর্থিক পুরস্কার বা দাম পণ্য উৎপাদনের জন্য মূল লক্ষ্য হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ দাম হল এমন একটি উপায় যা উৎপাদককে তার প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সুতরাং দাম উৎপাদনের উদ্দীপক।
দাম হল এমন একটি উপায় যা বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ মানুষ তার সব প্রয়োজন পুরোপুরি পূরণ করতে চায় এবং প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ও সেবা অর্জনে সে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায়। যদি প্রত্যেক মানুষকে তার প্রয়োজন পূরণের জন্য স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়া হত তাহলে সে তার পছন্দমত যে কোন পণ্য লাভ করতে ও ভোগ করতে ক্ষান্ত হত না। যেহেতু প্রত্যেক ব্যক্তি একই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রচেষ্টা চালায়, সেহেতু একজন মানুষকে তার প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে সে সীমায় থেমে যেতে হয় যেখানে সে নিজের প্রচেষ্টা অন্যের প্রচেষ্টার সাথে বিনিময় করতে সমর্থ হয়, অর্থাৎ তার প্রচেষ্টার কারণে সে যে আর্থিক ক্ষতিপূরণ লাভ করে সে সীমা পর্যন্ত অর্থাৎ দামের সীমা পর্যন্ত। সুতরাং দাম স্বাভাবিকভাবে মানুষকে কোন কিছু লাভ ও ব্যয় করার ক্ষেত্রে একটি সীমার মধ্যে বেধে রাখার জন্য বাধ্য করে এবং এই সীমাটি হল তার আয়ের সীমা। সুতরাং দাম মানুষকে চিন্তা, মূল্যায়ন, তার পূরণ করতে হবে এমন তুলনামূলক প্রয়োজনের মধ্যে পার্থক্য করতে দেয়, অর্থাৎ যা তার জন্য অপরিহার্য সেটি সে গ্রহণ করে এবং যা কম গুরুত্বপূর্ণ তা ছেড়ে দেয়। সুতরাং দাম কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তাকে আংশিক চাহিদা পূরণ করতে বাধ্য করে – যাতে করে গুরুত্বপূর্ণ অন্য প্রয়োজনগুলো সে পূরণ করতে পারে।
সুতরাং দাম হল এমন একটি উপায় যা ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উপযোগসমূহের বন্টন নিয়ন্ত্রণ করে। উপযোগ প্রাপ্তির আকাঙ্খা করে এমন ভোক্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ উপযোগের বন্টনকে নিয়ন্ত্রণ করে দাম। ভোক্তাদের আয়ের বৈষম্যের কারণে তাদের আয় তাদের ব্যয়কে একটি সীমার মধ্যে বেধে রাখে। এর কারণে কিছু পণ্য কেবল সামর্থবান লোকেরাই ভোগ করতে পারে এবং বাকী কিছু পণ্য কম দামের হওয়ায় সবাই ভোগ করতে পারে। সুতরাং কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে দাম বেশী ও অন্য কিছুর জন্য দাম কম এবং কিছু ভোক্তার চেয়ে অন্য কিছু ভোক্তার কাছে দামের তুলনামূলক যথার্থতা ঠিক করে দেয়ার মাধ্যমে দাম ভোক্তাদের মধ্যে উপযোগ বন্টনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের কাজ করে।
দাম উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা আনয়ন করে এবং এটি উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যকার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। কেননা ভোক্তার আকাঙ্খা পূরণকারী উৎপাদক লাভের মাধ্যমে পুরস্কৃত হন। অন্যদিকে যেসব উৎপাদকের পণ্য ভোক্তাদের দ্বারা গৃহীত হবে না, সে লোকসানের মাধ্যমে শেষ হয়ে যাবে। যে পদ্ধতির মাধ্যমে উৎপাদক ভোক্তার আকাঙ্খা চিহ্নিত করে, তা হল দাম। যদি ভোক্তার কাছে কোন পণ্যের চাহিদা থাকে তাহলে এর দাম বেড়ে যাবে, ফলে ভোক্তার আকাঙ্খা পূরণ করতে গিয়ে এর উৎপাদনও বেড়ে যাবে। যদি ভোক্তাগণ একটি বিশেষ পণ্য ক্রয় করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে বাজারে এর দাম কমে যাবে ও সে পণ্যের উৎপাদন হ্রাস পাবে। সুতরাং পণ্যের দাম বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকৃত সম্পদ বৃদ্ধি পায় এবং দাম কমার সাথে সাথে হ্রাস পায়। এভাবে উৎপাদন ও ভোগের মধ্যে সাম্যাবস্থা অর্জনে দাম সহায়তা করে এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে এবং এই প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পাদিত হয়। সুতরাং পুঁজিবাদীদের মতে, দাম হল অর্থনীতির ভিত্তি যার উপর এটি দাঁড়িয়ে থাকে এবং তাদের মতে এটি অর্থনীতির স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে।
এই হল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সারমর্ম – যাকে রাজনৈতিক অর্থনীতি বলা হয়। গভীর অধ্যয়নের পর পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নিম্নলিখিত ত্রুটিসমূহ পরিষ্কার হয়ে উঠে।
























