Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • সালামা ইবন হিশাম (রা)

    সালামা ইবন হিশাম (রা)

    নাম সালামা, ডাক নাম আবু হাশেম। পিতা হিশাম ইবন মুগীরা এবং মাতা দাবায়া বিনতু আমের। ইসলামের ঘোরতর শত্রু আবু জাহলের ভাই।

    ড: মুহাম্মাদ হামীদুল্লাহ সালামার মা দাবায়া বিনতু আমেরের জাহিলী জীবনের এক চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণনা করেছেন। হাইসাম ও ইবনুল কালবী বর্ণনা করেছেন: মুত্তালিব ইবন আবী ওয়াদায়া ইবন আব্বাসকে বলেছেন: দাবায়া বিনতু আমের ছিলেন হাওজা ইবন আলীর স্ত্রী। হাওজা মারা গেলে দাবায়া উত্তরাধিকারী হিসাবে প্রচুর সম্পত্তি লাভ করেন। অত:পর তিনি পিতৃ গোত্রে ফিরে আসেন। সেখানে আবদুল্লাহ ইবন জুদয়ান আত তাইমী দাবায়ার পিতার নিকট তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তার পিতা রাজী হন এবং আবদুল্লাহর সাথে তাকে বিয়ে দেন।

    এদিকে দাবায়ার পিতা বলেন,আমি তো তাকে ইবন জুদয়ানের সাথে বিয়ে দিয়েছি। হুযন তখন শপথ করে বলে, দাবায়া যদি ইবন জুদয়ানের কাছে যায় তাহলে আমি তার স্বামীর সামনেই তাকে হত্যা করবো।

    দাবায়ার পিতা ঘটনাটি ইবন জুদয়ানকে জানালেন। ইবন জুদয়ানও পাল্টা জানিয়ে দিলেন, যদি তিনি দাবায়ার চাচাতো ভাইয়ের দাবী অনুযায়ী কাজ করেন তাহলে উকাজ মেলায় তার বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগের ঝান্ডা উত্তোলন করা হবে। দাবায়ার পিতা তার চাচাতো ভাইয়ের নিকট বিষয়টি বর্ণনা করলে সে নমনীয় হয়ে যায় এবং তার দাবী প্রত্যাহার করে নেয়। দাবায়াকে ইবন জুদয়ানের নিকট পাঠানো হলো। আল্লাহর মর্জি যতদিন ছিল, তিনি সেখানে থাকলেন। দাবায়া ছিলেন অতি সুন্দরী যুবতী। ইবন জুদয়ানের সাথে দাম্পত্য জীবন চলাকালে একদিন মক্কায় কাবার তাওয়াফ করছিলেন, এ সময় হিশাম ইবন মুগীরার নজরে পড়লেন। দাবায়ার রূপে হিশাম মুগ্ধ হলেন। কাবার চত্বরে তারা কিছুক্ষণ কথা বললেন, এক পর্যায়ে হিশাম বললেন: দাবায়া! এই রূপ ও যৌবন নিয়ে তুমি একজন বৃদ্ধের ঘর করছো? তার নিকট থেকে তালাক নিতে পারলে আমি তোমাকে বিয়ে করবো।

    ঘরে ফিরে দাবায়া স্বামী ইবন জুদয়ানকে বললেন: আমি একজন যুবতী নারী, আর তুমি এক বৃদ্ধ। ইবন জুদয়ান বললেন: এ কথা কেন? আমি জানতে পেরেছি, তাওয়াফের সময় হিশাম তোমার সাথে কথা বলেছে। তুমি হিশামকে বিয়ে করবে না- যতক্ষণ তুমি আমার কাছে এ অঙ্গীকার না করছো, আমি তোমাকে তালাক দিচ্ছি না। তোমাকে আরও অঙ্গীকার করতে হবে, যদি তাকে বিয়ে কর তাহলে তুমি আমার এই শর্তগুলি পূরণ করবে: ১. উলঙ্গ হয়ে কাবা তাওয়াফ করবে, ২. এতগুলি উট কুরবানী করবে, ৩. এত পরিমাণ পশমের সূতা কাটবে।

    দাবায়া এই শর্তের কথা হিশামকে ‍জানালেন। হিশাম বললেন: প্রথম শর্তটির ব্যাপারে আমি কুরাইশদের সাথে আলোচনা করে কাবার চত্বর সম্পূর্ণ ফাকা করে দেব। তুমি শেষ রাতে অন্ধকারে একাকী উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ সেরে নেবে। কেউ দেখার সুযোগ পাবে না। আর তোমার পক্ষ থেকে উট আমি কুরবানী করে দেব। আর সূতা কাটার ব্যাপারটি, তা এটা কোন ধর্ম নয়। কুরাইশরা এটা তৈরী করেছে। আমার প্রতিবেশী মহিলারা তোমার পক্ষ থেকে এ কাজটি করে দেবে। হিশামের প্রতিশ্রুতি পেয়ে দাবায়া স্বামী ইবন জুদয়ানকে বলেন, আমি তোমার শর্তে রাজী। হিশামকে বিয়ে করলে তোমার এ শর্ত সমূহ পূরণ করবো। এভাবে ইবন জুদয়ানের নিকট থেকে তালাক নিয়ে দাবায়া হিশামকে বিয়ে করেন। হিশাম কুরাইশদের সাথে কথা বলে কাবার চত্তর খালি করে দিলে দাবায়া উলঙ্গ হয়ে কাবা তাওয়াফ করেন। কালবী বলেন: মুত্তালিব ইবন আবী ওয়াদায়া বলেছেন: আমি তখন এক বালক। মসজিদের একটি দরযা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছিলাম। দেখলাম, দাবায়া কাপড় খুলে ফেললো। এভাবে এক সপ্তাহ ধরে সে একটি শ্লোক আবৃত্তি করতে করতে ‍তাওয়াফ করলো। অন্য শর্ত দুটিও হিশাম পূরণ করেন। এই হিশামের ঔরষে দাবায়ার গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন সালামা ইবন হিশাম। উত্তরকালে এই সালামা হলেন পরীক্ষিত উত্তম মুসলমান। হিশামের সাথে দাম্পত্য জীবন চলাকালে দাবায়ার পূর্ব স্বামী আবদুল্লাহ ইবন জুদয়ান মারা যান। তার ‍মৃত্যুর খবর শুনে দাবায়া মন্তব্য করেন: তিনি ছিলেন একজন আরব রমণীর এক চমতকার স্বামী। এর কিছুদিন পর হিশাম মারা গেলে দাবায়া বিধবা হন।

    পরবর্তীকালে দাবায়া ইসলাম গ্রহণ করেন। এদিকে পুত্র সালামাও বড় হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: সালামার নিকট তার মাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সালামা তার মায়ের সাথে পরামর্শ করে তার মধ্যে অনীহার ভাব লক্ষ্য করে রাসূল সা: কে জানান। রাসূল সা: ও প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন। (ড. হামীদুল্লাহ সম্পাদিত আনসাবুল আশরাফ-১, টীকা নং-৩, পৃ. ৪৬০-৪৬১)।

    মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই সালামা ইসলাম গ্রহণ করেন। হাবশায় হিজরাত করেন। কিছুদিন সেখানে থাকার পর আরও অনেক মুহাজিরদের সাথে তিনিও মক্কায় ফিরে আসেন। অনেকেই আবার হাবশায় ফিরে যান। সালামাও যেতে চান, কিন্তু আবু জাহল তাকে বাধা দেয়। তার উপর অত্যাচার শুরু হয়। তাকে অনাহারে রাখা হয় এবং মারপিটও চলতে থাকে। তবে তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। তখন পর্যন্ত ইসলাম তেমন শক্তি অর্জন করতে পারেনি। রাসূল সা: ও কোন রকম সাহায্য করতে সক্ষম ছিলেন না। তবে নামাযের পর সালামা ও তার মত নির্যাতিতদের জন্য এই বলে দুআ করতেন: হে আল্লাহ, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ, সালামা ইবন হিশাম ও আয়্যাশ ইবন রাবীয়াকে মক্কার মুশরিকদের কঠোরতা থেকে মুক্তি দাও। ওয়ালীদের জীবনীতে সালামার মুক্তি ও মদীনা হিজরাতের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

    তিনি মক্কায় কাফিরদের হাতে বন্দী থাকা অবস্থায় বদর যুদ্ধ শেষ হয়। বদর যুদ্ধের পর, মতান্তরে খন্দক যুদ্ধের পর তিনি মদীনায় আসেন। মদীনায় আসার পর সংঘটিত সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুতার যুদ্ধে শত্রু বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে যারা ময়দান থেকে পালিয়েছিলেন তাদের মধ্যে তিনিও একজন। এই লজ্জা ও অনুশোচনায় পরবর্তী জীবনে তিনি ঘর থেকে বের হওয়া প্রায় ছেড়ে দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামা থেকে ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন। তিনি সালামা ইবন হিশামের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, সালামার হয়েছে কি, আমি তাকে রাসূলুল্লাহ সা: ও মুসলমানদের সাথে নামাযের জামায়াতে শামিল হতে দেখিনে কেন? সালামার স্ত্রী বললেন: আল্লাহর কসম, তিনি বের হতেই পারেন না। বের হলেই মানুষ তাকে দেখে চেঁচিয়ে বলতে থাকে-ইয়া ফুররার, ফারারতুম ফী সাবীলিল্লাহ, ওহে পলাতক, আল্লাহর রাস্তা থেকে তোমরা পালিয়েছো। এ কারণে তিনি বাড়ীতেই থাকেন, বাইরে কোথাও যান না। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৮২-৮৩)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: তাকে ‘কাররার’ বা প্রচণ্ড আক্রমণকারী বলে সম্বোধন করতেন। (আল ইসাবা-২/৬৯)।

    হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালে তিনি শাম বা সিরিয়া অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানের এক পর্যায়ে হযরত উমারের খিলাফতকালে হিজরী ১৪ সনের মুহাররম মাসে সংঘটিত ‘মারজে সফর’ বা ‘মারজে রোম’ নামক যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। তবে উরওয়া মূসা ইবন উকবা, আবু যারয়া আদ দিমাশকীর মতে তিনি আজনাদাইন যুদ্ধে শহীদ হন। (আল ইসাবা-২৬৯)।

    সালামার মা দাবায়া একটি কবিতায় বলেছেন: হে সম্মানিত কাবার প্রভূ: কোন দুশ্চিন্তা নেই। সালামাকে প্রতিটি শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী কর। অনিশ্চিত কর্মকান্ডে তার দুটি হাত, যার একটি প্রকাশ পায় এবং অন্যটি দানশীল। (আনসাবুল আশরাফ-১/২০৮)।

  • ওয়ালীদ ইবনুল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা (রা)

    ওয়ালীদ ইবনুল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা (রা)

    নাম ওয়ালীদ, পিতা ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা। কুরাইশ গোত্রের বনী মাখযুম শাখার সন্তান। প্রখ্যাত সাহাবী ও সেনানায়ক হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও হিশাম ইবনুল ওয়ালীদের ভাই। একটি বর্ণনায় জানা যায়, তিনি হিশামের সহোদর ও খালিদের বৈমাত্রীয় ভাই। হযরত রাসূলে কারীমের সা: মক্কী জীবনে ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করেননি। এ সময় মুসলমানদের সাথে তার আচরণ কেমন ছিল, সীরাত গ্রন্থাবলীতে সে সম্পর্কে তেমন কিছু উল্লেখ নেই। তবে দেখা যায়, মক্কার কুরাইশ বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং পরাজিত হয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ মতান্তরে সুলাইত ইবন কায়েসের সা: হাতে বন্দী হন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩০২)।

    ওয়ালীদের অন্য দুই ভাই খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও হিশাম ইবনুল ওয়ালীদ তাকে ছাড়িয়ে নিতে আসেন। আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ দাবী করেন। এতে মোটা অংকের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে খালিদ দ্বিধার ভাব প্রকাশ করেন। এতে হিশাম খুব রেগে গিয়ে খালিদকে বলেন: তোমার কি, তুমি তো আর তার ভাই নও? আবদুল্লাহ যদি এর চেয়েও বেশি দাবী করে তবুও তাকে মুক্ত করতে হবে। ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বলেন: ওয়ালীদ ‍তার কাওমের ধর্মের ওপর থাকা অবস্থায় বন্দী হন এবং চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্তিলাভ করেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে, হযরত রাসূলে কারীম সা: ওয়ালীদের মুক্তির বিনিময়ে তার পিতার ঢাল, বর্ম ও তরবারী দাবী করেন। তার ভাইয়েরা সেই দাবী পূরণ করে তাকে মুক্ত করেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/২১০)

    ওয়ালীদ মুক্তি পেয়ে ভাইদের সাথে মক্কার পথে যাত্রা করলেন। যুল হুলাইফা নামক স্থানে পৌঁছার পর ভাইদের নিকট থেকে পালিয়ে আবার মদীনায় রাসূল সা: এর নিকট ফিরে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ভাইয়েরা ফিরে এসে আবার তার সাথে দেখা করে বলেন, যদি তোমার মুসলমান হওয়ার ইচ্ছা ছিল, তাহলে মুক্তিপণ দেওয়ার পূর্বে হলে না কেন? শুধু শুধু পিতার স্মৃতিচিহ্নগুলি নষ্ট করলে। ওয়ালীদ তাদেরকে বলেন, অন্য কুরাইশদের মত আমিও মুক্তিপণ প্রদান করে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। মুক্তির পূর্বে আমি ইসলামের ঘোষণা এ জন্য দেইনি যে, যাতে কুরাইশরা এমন কথা বলতে না পারে, আমি ফিদিয়া বা মুক্তিপণ দেওয়ার ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছি।

    ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ভাইদের সাথে আবার মক্কার পথে যাত্রা করেন। পথে তার ভাইয়েরা তো তেমন কিছু বললো না। কিন্তু মক্কায় পৌঁছে অন্যান্য অত্যাচারিত মুসলমানদের মত ‍তাকেও বন্দী করলো এবং তার মত অন্য বন্দী-আইয়াশ ইবন রাবীয়া, হিশাম ইবনুল আস, সালামা ইবন হিশাম প্রমূখের সাথে এক ঘরে আটক করলো।

    ঐতিহাসিকরা বলেছেন, এসব বন্দীদের ওপর কুরাইশরা অমানুষিক নির্যাতন চালাতো। তাদের হত্যারও হুমকি দেয়া হতো।

    কালবী বলেন: যাদের কোন গোত্রীয় শক্তি বা জনবল ছিল না এমন একটি দূর্বল সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহণের কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তাদের অনেকে দ্বীন ত্যাগ করেছে, অভিজাত ঘরের অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে পরীক্ষায় সম্মুখীন হয়েছে। যেমন: সালামা ইবন হিশাম ইবনুল মুগীরা, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা, আইয়াশ ইবন রাবীয়া প্রমূখ। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৯)।

    ইবন ইসহাক বলেন, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, বনু মাখযুমের একদল লোক তার ভাই হিশাম ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, বনু মাখযুমের একদল লোক তার ভাই হিশাম ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরার নিকট যায় এবং ওয়ালীদকে হত্যার জন্য তাদের হাতে তুলে দেওয়ার আবদার জানায়। তাদের যুক্তি ছিল, তাকে হত্যা করলে অন্যদের ব্যাপারে তারা নিরাপদ হতে পারবে। হিশাম তাদের সেই আবদার অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। তিনি আরও হুমকি দেন, কেউ তার ভাই ওয়ালীদকে হত্যা করলে তিনি তাদের সর্বাধিক মর্যাদাবান এক ব্যক্তিকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেবেন। এই চরম হুমকির মুখে তারা ওয়ালীদকে হত্যার আশা ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩২১)।

    বদর যুদ্ধের পূর্বে হযরত রাসূলে কারীম সা: আইয়াশ ইবন রাবীয়া, সালামা ইবন হিশাম, হিশাম ইবন আস প্রমূখের মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করতেন। বদর যুদ্ধের পর ওয়ালীদ বন্দী হয়ে তাদের সাথে যুক্ত হলে রাসুল সা: তার নাম ধরেও দুআ করতে লাগলেন। বাযযার আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সা: নামাযে সালাম ফিরানোর পর মাথা উঁচু করলেন এবং কিবলামূখী অবস্থায় বললেন: হে আল্লাহ, তুমি সালামা ইবন হিশাম, আইয়াশ ইবন রাবীয়া, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ এবং ঐ সকল দূর্বল মুসলমানকে মুক্তি দাও যারা কোন কৌশল অবলম্বনে অক্ষম এবং যাদের কোন পন্থা জানা নেই। অন্য একটি বর্ণনা মতে রাসুল সা: সালাতুল ফজরে এই দুআ করতেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৩৪৮)।

    বেশ কিছুদিন তার বন্দী দশায় কাটে। একদিন সুযোগ বুঝে তিনি মদীনায় পালিয়ে আসেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার কাছে আইয়াশ ও ‍সালামার অবস্থা জিজ্ঞেস করেন। ওয়ালীদ বলেন, তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। একটি বেড়ী দুজনের পায়ে লাগানো হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীম সা: তাকে বললেন: তুমি আবার মক্কায় যাও। সেখানকার এক কর্মকার ইসলাম গ্রহণ করেছে। প্রথমে তার ওখানে গিয়ে ওঠো। তারপর গোপনে আইয়াশ ও সালামার সাথে দেখা করে বল, তুমি আমার প্রতিনিধি, আমার সাথে চলো।

    রাসূল সা: এর নির্দেশ মত ওয়ালীদ মক্কায় পৌঁছলেন এবং আইয়াশ ও সালামার সাথে দেখা করে রাসূল সা: এর বাণী তাদের কাছে পৌঁছে দিলেন। পরিকল্পনা মত তারা মক্কা থেকে পালিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করলেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ তাদের পিছু ধাওয়া করেন; কিন্তু ধরতে ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফিরে যান।

    এদিকে ওয়ালীদ তার সঙ্গীদ্বয় সহ একটানা ভ্রমণ ও অজানা শংকায় ক্লান্তিতে অসাড় হয়ে পড়ছিলেন। এই সময় কবিতার একটি শ্লোক বারবার তার মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল: ‘ওহে আমার চরণ যুগল! আমাকে আমার কাওমের নিকট পৌঁছে দাও। আজকের এ দিনটির পর আর কখনও তুমি অলস দেখতে পাবে না।’

    আজবাস নামক স্থানে তিনি পড়ে গেলে একটি অঙ্গুলি মারাত্মকভাবে আহত হয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। তিনি আহত অঙ্গুলিটিকে উদ্দেশ্য করে একটি শ্লোক আওড়াতে থাকেন: ‘ওহে, তুমি একটি অঙ্গুলি ছাড়া আর কিছু নও, যা থেকে রক্ত ঝরেছে।

    যা কিছু তুমি লাভ করেছ, তা সবই আল্লাহর রাস্তায়। (আনসাবুল আশরাফ-১/২০৯-১০)

    হুদাইবিয়ার ‍চুক্তি অনুযায়ী হযরত রাসূলে কারীম সা: হিজরী সপ্তম সনে বিগত বছরের কাজা উমরা আদায় করতে মক্কায় যান। ওয়ালীদ এ সময় রাসূল সা: এর সফরসঙ্গী ছিলেন। তখনও তার ভাই খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করেননি। এ সম্পর্কে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ বলেন: হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আমি যখন দারুণ অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছি, তখন হিজরী ৭ম সনে যুল কাদাহ মাসে হযরত রাসূলে কারীম সা: ‘উমরাতুল কাযা’ আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তাদের কারও সামনে পড়তে হয় এই আশংকায় আমি আত্মগোপন করে থাকলাম। তাদের কারও সাথে আমার দেখা হলো না। আমার ভাই ওয়ালীদ ইবনুল ওয়ালীদ এই সফরে রাসূল সা: এর সঙ্গী ছিলেন। তিনি আমাকে খুঁজে না পেয়ে আমাকে একটি চিঠি লিখেন। চিঠির বিষয়বস্তু নিম্নরূপ: ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। অত:পর ইসলামের ব্যাপারে আপনার এমন বিরূপ মনোভাব পোষণের কারণে আপনাকে আমার খুব আশ্চর্য মানুষ বলে মনে হয়েছে। অথচ আপনি একজন বড় বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার অধিকারী ব্যক্তি। আপনার মত কোন ব্যক্তি কি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে? রাসূল সা: আপনার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন: খালিদ কোথায়? আমি বলেছি: শিগগিরই আল্লাহ তাকে নিয়ে আসবেন। তিনি তখন বললেন: তার মত ব্যক্তি কি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে? তার বুদ্ধি ও চেষ্টা যদি মুসলমানদের পক্ষে হতো, তাহলে তা তার কল্যাণ বয়ে আনতো এবং আমি তাকে অন্যদের চেয়ে বেশী মর্যাদা দিতাম। ভাই, যে ভালো কাজ আপনার হাতছাড়া হয়ে গেছে, এখনই আপনি এসে তাতে শরিক হউন।” মূলত: এই চিঠি পেয়ে হযরত খালিদ ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন এবং অল্পদিনের মধ্যে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৬০), উসুদুল গাবা-৫/৯৩)।

    হযরত ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদের মৃত্যুর সময়কাল সম্পর্কে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে তিনি আইয়াশ ও সালামাকে মুক্ত করে মদীনায় ফিরে অল্প কিছুদিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। এই বর্ণনা মতে, মদীনায় পৌঁছে তিনি সরাসরি রাসূল সা: এর নিকট হাজির হয়ে বলেন: ইয়া রাসূল সা: আমি মৃত, আপনার পরিত্যক্ত একটু কাপড় দিয়ে আমাকে কাফন দিন। অত:পর তিনি মারা যান এবং রাসূল সা: স্বীয় কাপড় দিয়ে তাকে কাফন দেন। (আল ইসাবা-৩/৬৪০, আনসাবুল আশরাফ-১/২১০-২১১)।

    কিন্তু উপরোক্ত বর্ণনা সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ, একাধিক বর্ণনায় জানা যায়, তিনি হিজরী ৭ম সনে রাসূল সা: এর সাথে ‘উমরাতুল কাযা’ আদায়ে শরিক ছিলেন। আল্লামা ইবন আবদিলবার লিখেছেন: আর এ কথা সঠিক যে, তিনি ‘উমরাতুল কাযায়’ রাসূল সা: এর সাথে অংশ গ্রহণ করেন। আর উমরাতুল কাযা হিজরী ৭ম সনের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে প্রথম বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় ‘উমরাতুল কাযা’র দুই বছর পূর্বে হিজরী ৫ম সনে তার ওফাত হয়।

    তাছাড়া ওয়াকিদী বলেছেন: কেউ কেউ মনে করেন, ওয়ালীদ মক্কা থেকে পালিয়ে আবু বাসীরের দলের সাথে যোগ দেন। উল্লেখ্য যে, এই আবু বাসীর হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মদীনায় আসেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: সন্ধির শর্ত অনুযায়ী ‍তাকে মক্কায় ফেরত পাঠান। কিন্তু পথিমধ্যে তার এক সঙ্গীকে হত্যা করে আবার মদীনায় রাসূল সা: এর নিকট ফিরে আসেন। তিনি আবু বাসীরকে মদীনা ত্যাগের নির্দেশ দেন। আবু বাসীর মদীনা ত্যাগ করে লোহিত সাগরের উপকূল এলাকায় চলে যান। এরপর মক্কার আরও কিছু নও মুসলিম যুবক তার সাথে যোগ দেন। তারা কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলা আক্রমণ করে লুটপাট করতেন। ফলে কুরাইশদের ব্যবসা বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অত:পর কুরাইশরা অনন্যোপায় হয়ে এই দলটিকে মদীনায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রাসূল ‍সা:কে অনুরোধ জানায়। রাসূল সা: তাদেরকে মদীনায় ডেকে পাঠান। (আনসাবুল আশরাফ-১/২১০-২১১)।

    তবে বালাযুরী এই বর্ণনাকে সঠিক বলে মনে করেননি। যাই হউক হিজরী অষ্টম সনের পরে যে তিনি জীবিত ছিলেন এমন কোন প্রমাণ সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না।

    উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামা ছিলেন ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদের চাচাতো বোন। ওয়ালীদের মৃত্যুর পর তিনি রাসূল সা:কে বললেন: ইয়া রাসূল সা:। সে বিদেশ বিভূয়ে মারা গেছে। তার জন্য শোক প্রকাশের কেউ এখানে নেই। রাসূল সা: তাকে শোক প্রকাশের অনুমতি দান করেন। উম্মু সালামা রাসূল সা: এর অনুমতি পেয়ে খাবার তৈরী করেন এবং পাড়ার অন্য মহিলাদের ডেকে ‍আনেন। হযরত উম্মু সালামা (রা) একটি মরসিয়া বা শোকগাথা আবৃত্তি করতে শুরু করেন। তার দুটি শ্লোক নিম্নরূপ:

    ‘ওহে চোখ, তুমি ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরার জন্য কাঁদ। আমাদের মধ্যে সে ছিল খরার সময় বৃষ্টি ও রহমত স্বরূপ। নামকাম ও গৌরবে সে ছিল তার পিতার মত। সে তার গোত্রের জন্য একাই যথেষ্ট।’

    হযরত রাসূলে কারীম সা: মরসিয়াটি শোনার সাথে সাথে বলে উঠলেন: উম্মু সালামা, এ কথা না বলে বরং বল: মৃত্যু যন্ত্রনা সত্যই আসবে। আর এ থেকেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে এসেছো। (সূরা কাফ-১৯)। (আনসাবুল আশরাফ-১/২১০-২১১) (আল ইসাবা-৩/৬৪০)।

    ইবন হিশাম বলেন: মুজাহিদের সূত্রে আমার নিকট পৌঁছেছে। তিনি বলেছেন সূরা ফাতহ এর নিম্নের আয়াতটি ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ, সালামা ইবন হিশাম, আইয়াশ ইবন রাবীয়া, আবু জান্দাল ইবন সুহাইল ও তাদের মত আর যারা ছিলেন তাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে: ‘তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেওয়া হতো, যদি ‍না এমন কিছু মুমিন নর ও নারী থাকতো, যাদেরকে তোমরা জাননা। তোমরা অজ্ঞাতসারে তাদেরকে পদদলিত করতে। ফলে, তাদের কারণে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।’ (সূরা আল ফাতহ-২৫) (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩২১)।

  • আমর ইবন আবাসা (রা)

    আমর ইবন আবাসা (রা)

    তার নাম আমর, আবু নাজীহ কুনিয়াত বা ডাকনাম। পিতা ‍আবাসা ইবন আমের এবং মাতা রামলা বিনতুল ওয়াকীয়া। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবুযার আল গিফারীর (রা) বৈপিত্রীয় ভাই। (আল ইসাবা-৩/৫)।

    জীবনের প্রথম থেকেই আমর ছিলেন সত প্রকৃতির লোক। জাহিলী যুগে যখন গোটা আরব মূর্তি পূজায় লিপ্ত তখনও তিনি এ কাজকে ঘৃণা এবং মূর্তি পূজারীদের পথভ্রষ্ট বলে মনে করতেন। তিনি নিজেকে ইসলামের চতুর্থ ব্যক্তি অথবা ইসলামের এক চতুর্থাংশ বলে দাবী করতেন। তার কাছে যখন জানতে চাওয়া হলো, আপনি কিসের ভিত্তিতে এ দাবী করেন? তিনি বললেন: জাহিলী যুগে আমি মানুষকে পথভ্রষ্ট বলে বিশ্বাস করতাম। মূর্তির কোন গুরুত্ব আমার কাছে ছিল না। আমি জানতাম, এগুলি যেমন কোন ক্ষতি করতে পারে না, তেমনি কোন উপকারও করতে পারে না। কারণ, তারা পাথরের মূর্তির পূজা করতো। এ সময় আমি একজন আহলি কিতাব বা ঐশী ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তির নিকট সর্বোত্তম দ্বীন সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন: মক্কায় এক ব্যক্তির আবির্ভাব হবে। তিনি নিজ কাওমের ইলাহ বা উপাস্য পরিত্যাগ করে অন্য ইলাহর দিকে মানুষকে আহবান জানাবেন। তিনিই সর্বোত্তম দ্বীন নিয়ে আসবেন। তুমি তার আবির্ভাবের কথা শুনতে পেলে তাকে অনুসরণ করবে।

    আমর বলেন, এমন সময় আমি মক্কা থেকে একটি সংবাদ পেলাম। মক্কায় নতুন কোন ঘটনা ঘটেছে কি না-এ কথা আমি কারও কাছে জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলাম না। অবশেষে পশুর পিঠে সওয়ার হয়ে আমি মক্কায় পৌঁছলাম। সেখানে এক আরোহীকে প্রশ্ন করলে সে বললো: এখানে এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে যে তার কাওম বা স্বজাতীয় ইলাহকে ঘৃণা করে। আমি গোপনে রাসূল সা: সাথে সাক্ষাত করলাম। কারণ, তখন তার স্বজাতীয় লোকেরা চরমভাবে তার বিরোধিতা করছে। অন্য একটি বর্ণনা মতে রাসূল সা: সাথে আমরের এ সাক্ষাত হয় উকাজ মেলায়। প্রথম সাক্ষাতে তাদের কথোপকথন ছিল নিম্নরূপ: আমর প্রশ্ন করেন: আপনি কে?

    -আমি আল্লাহর নবী।

    -আল্লাহ কি আপনাকে পাঠিয়েছেন?

    -হাঁ।

    -কি কি জিনিস সহকারে পাঠিয়েছেন?

    -আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করবে, তার সাথে কোন কিছু শরিক করবে না, মূর্তি ভেঙ্গে ফেলবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবে।

    – কেউ কি এ দাওয়াত কবুল করেছে?

    -হাঁ, একজন আযাদ, একজন দাস।

    আমর বলেন, সে দুজন হলেন আবু বকর ও বিলাল। অত:পর আমার আরজ করেন, আমাকেও আল্লাহর উপাসকদের মধ্যে শরীক করে নিন। আমি আপনারই সাথে থাকবো। রাসূল সা: বললেন, যখন চারদিক থেকে আমার বিরোধিতা চলছে তখন কিভাবে তুমি আমার সাথে থাকবে? এখন তোমার স্বদেশ ভূমিতে ফিরে যাও। যখন আমি প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে শুরু করি তখন আমার নিকট চলে এসো। আমর বলেন এভাবে আমি ইসলাম গ্রহণ করি এবং নিজেকে ইসলামের এক চতুর্থ হিসেবে দেখতে পাই। (আল ইসাবা-৩/৬, হায়াতুস সাহাবা-১/৭১-৭২)।

    রাসুল সা: এর নির্দেশমত আমর ইসলাম গ্রহণ করে স্বগোত্রে ফিরে যান। তবে মক্কায় যাতায়াতকারীদের মাধ্যমে সব সময় রাসুলুল্লাহর সা: খোঁজ খবর রাখতেন। রাসূল সা: মদীনায় হিজরাতের পর ইয়াসরিব বা মদীনার কিছু লোক আমরের গোত্রে আসে। তিনি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, মক্কা থেকে যে লোকটি মদীনায় এসেছেন, তার অবস্থা কি? তারা বললো, দলে দলে লোক তার দিকে ছুটে আসছে। তার স্বজাতি তো তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল; কিন্তু পারেনি। এখন তিনি মদীনায়।

    তাদের কাছে এই খবর পেয়ে আমর মদীনায় রওয়ানা হয়ে গেলেন। মদীনায় রাসুল সা: এর নিকট উপস্থিত হয়ে নিজের পরিচয় দিলে তিনি বললেন: হাঁ, তোমাকে আমি চিনেছি, মক্কায় তুমি আমার সাথে দেখা করেছিলে। তখন থেকে আমর মদীনায় স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান।

    হযরত আমরের মদীনায় আগমনের সময় সম্পর্কে মতভেদ আছে। একটি মতে তিনি বদর যুদ্ধের পূর্বে মদীনায় আসেন এবং বদরে অংশগ্রহণ করেন। তবে প্রসিদ্ধ মতে তিনি খাইবার যুদ্ধের পরে এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে মদীনায় আসেন। (আল ইসাবা-৩/৫)।

    বদর, উহুদ, হুদাইবিয়া, খাইবার সহ বিভিন্ন যুদ্ধ তার স্বদেশ থাকাকালেই শেষ হয়ে যায়। মক্কা বিজয় অভিযানে তিনি সর্বপ্রথম অংশগ্রহণ করেন। তায়িফ অভিযানেও যে তিনি শরিক ছিলেন, এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। তায়িফ অবরোধকালে হযরত রাসূলে কারীম সা: বললেন: যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একটি তীর নিক্ষেপ করবে, তার জন্য জান্নাতের একটি দরযা খুলে যাবে। এই সুসংবাদ শুনে আমি ১৬টি তীর নিক্ষেপ করি। তায়িফ অভিযানের পর আর কোন যুদ্ধে তার তার যোগদানের কথা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে এতটুকু জানা যায় যে, তিনি আরও কিছু যুদ্ধে যোগদান করেন। হযরত আমর ইবন আবাসার (রা) মৃত্যুর সময়কাল সঠিকভাবে জানা যায় না। সীরাত বিশেষজ্ঞরা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলেছেন, তিনি খলীফা হযরত উসমানের (রা) খিলাফতের শেষ দিকে মৃত্যু বরণ করেছেন। সুতরাং ‘আল ইসাবা ফী তাময়ী যিস সাহাবা’ গ্রন্থকার আল্লামা ইবন হাজার আল ‘আসকালানী’ শুধু এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে-যেহেতু আলী-মুআবিয়ার (রা) দ্বন্দ্ব এবং আমীর মুআবিয়ার খিলাফতকালে কোথাও তাকে দেখা যায় না- উসমানী খিলাফতের শেষদিকে তার মৃত্যুকাল উল্লেখ করেছেন। (আল ইসাবা-৩/৬) কিন্তু মুসনাদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের এক বর্ণনায় জানা যায়, আমীর মুআবিয়া (রা) ও রোমানদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এই চুক্তির কারণে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমীর মুআবিয়া (রা) রোমানদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারতেন না। কিন্তু হযরত মুআবিয়া (রা) পরিকল্পনা করেন, তার বাহিনী রোমানদের সীমান্তে পৌঁছে যাবে, আর এদিকে চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। অত:পর তার বাহিনী সাথে সাথে হামলা চালিয়ে দেবে। এ সময় আমর ইবন আবাসা চিতকার করে বলে বেড়াতেন, অঙ্গীকার পূর্ণ কর, ধোকা দিওনা। উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি আমীর মুআবিয়ার খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। কিন্তু যদি ‘আল ইসাবা’ গ্রন্থকারের মতটি সত্য ধরা হয়, তাহলে এই ঘটনাটি ছিল উসমানী খিলাফতকালের, যখন হযরত মুআবিয়া (রা) শামের গভর্ণর ছিলেন। তখনও রোমানদের সাথে তার সংঘর্ষ হয়েছিল।

    হযরত আমর ইবন আবাসা (রা) রাসূলুল্লাহর সা: মুহাব্বত বা সাহচর্যের খুব বেশি সুযোগ পাননি। তবে যতটুকু পেয়েছেন তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছেন। আমরা তার প্রমাণ পাই মদীনায় রাসুল সা: এর সাথে প্রথম সাক্ষাতে। তিনি আরজ করেন- আল্লিমনী মা আল্লামাকাল্লাহু- আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন তার কিছু আমাকেও শিখিয়ে দিন। এ কারণে এত কম সময়ের সাহচর্য সত্ত্বেও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে তার বর্ণিত মোট ৪৮টি হাদীস দেখা যায়।

    সাহাবীদের মধ্যে ইবন মাসউদ, আবু উমামা আল বাহিলী,সাহল ইবন সাদ, এবং তাবেঈদের মধ্যে শুরাহবীল ইবন সামাত, সাদান ইবন আবী তালহা, সুলাইম ইবন আমের, আবদুর রহমান ইবন আমের, জুবাইর ইবন নাফীর, আবু সালাম ও অন্যরা তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল ইসাবা-৩/৫)।

    আবু নুঈম কাবের মাওলা বা আযাদকৃত দাস থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: একদিন আমর ইবন আবাসা পশু চড়াতে গেলেন। আমি তার খোঁজে দুপুরে বের হলাম। আমি দেখতে পেলাম, আমর একস্থানে ঘুমিয়ে আছেন এবং একখানি মেঘ তার ওপর ছায়া দিচ্ছে। আমি তাকে জাগালাম। তিনি জেগে আমাকে বললেন, এই ব্যাপারটি আমার ও তোমার মধ্যে গোপন থাকুক। অন্য কারও নিকট প্রকাশ করলে তোমার ভালো হবে না। আমি তার জীবদ্দশায় এ কথা কারও নিকট বলিনি। (আল ইসাবা-৩/৬)

  • সাওবান ইবন নাজদাহ (রা)

    সাওবান ইবন নাজদাহ (রা)

    নাম সাওবান, পিতার নাম নাজদাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু আবদিল্রাহ। ইয়ামানের প্রসিদ্ধ হিময়ার গোত্রের সন্তান। (আসাহ হুস সিয়ার-৫৯৯) কোন কারণে তিনি দাসে পরিণত হন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তাকে খরীদ করেন এবং পরে আযাদ করে দেন। আযাদ করার সময় তিনি সাওবানকে বলেন, ইচ্ছা করলে তুমি স্বগোত্রীয় লোকদের কাছে চলে যেতে পার অথবা আমার সাথে থাকতে পার। আমার সাথে থাকলে আমার পরিবারের সদস্য বলে গণ্য হবে। সাওবান নিজ গোত্রে ফিরে যাওয়ার চেয়ে রাসূলুল্লাহর সা: সাহচর্যে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন।

    হযরত রাসূলে কারীমের ওফাতের পর অল্প কিছুদিন তিনি মদীনায় ছিলেন। রাসূল সা: ছাড়া মদীনা তার কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি মদীনা ছেড়ে শামের ‘রামলা’ নামক স্থানে বসবাস শুরু করেন। মিসর অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং ‘রামলা’ ছেড়ে ‘হিমসে’ বসতি স্থাপন করেন। এই হিমসে হিজরী ৫৪ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।

    হযরত সাওবান ছিলেন রাসুল সা: এর বিশেষ খাদেম। ভেতর বাহির সর্ব অবস্থায় তিনি রাসূল সা: সঙ্গ লাভের সুযোগ পান। এ কারণে স্বাভাবিকভাবে ‘উলুমে নববী’ বা নবীর জ্ঞান সমূহে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার থেকে রাসুল সা: এর ১২৭টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি হাদীস হিফজ বা মুখস্থ করার সাথে সাথে প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বও পালন করতেন। আল্লামাহ ইবন আবদিল ‍বার বলেছেন, সাওবান সেই সব লোকদের একজন যারা হাদীস মুখস্থ করণের সাথে সাথে তার প্রচারের কাজও করেছেন।

    হযরত সাওবানের প্রচুর হাদীস মুখস্থ থাকায় অসংখ্য লোক তা শোনার জন্য তার নিকট আসতো। একবার লোকেরা তার নিকট হাদীস শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি বলেন: কোন মুসলমান আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি সিজদাহ করলে আল্লাহ তার একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন এবং তার গোনাহ সমূহও মাফ করে দেন। (মুসনাদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল-৫/২৭৬)।

    হযরত সাওবানের যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ অন্যদের নিকট থেকে শ্রুত তাদের হাদীস সমূহের সত্যাসত্য তার নিকট থেকে যাচাই করতেন। সা’দান ইবন তালহার মত উচু স্তরের একজন হাদীস বিশারদ হযরত আবুদ দারদার (রা) নিকট থেকে একটি হাদীস শোনেন এবং তার সত্যাসত্য যাচাই করেন হযরত সাওবানের নিকট থেকে। হযরত রাসূলে কারীমের সা: ওফাতের পর তিনি মদীনার অন্যতম মুজতাহিদ সাহাবী হিসাবে পরিগণিত হন। (আলামুল মুওয়াক্কিরীন -১/১৫)।

    হযরত সাওবানের ছাত্রদের গন্ডিও ‍সুপ্রশস্ত। সা’দান ইবন তালহা, রাশেদ ইবন সাদ, জুবাইর ইবন নুদাইর, আব্দুর রহমান ইবন গানাম, আবু ইদরীস প্রমূখ ছিলেন তার উল্লেখযোগ্য ছাত্র।

    হযরত রাসূলে কারীমের সা: প্রতি তার এত বেশি ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল যে, রাসুলুল্লাহর সা: প্রতি বিন্দুমাত্র অশ্রদ্ধার ভাব প্রকাশ পায় এমন কোন একটি শব্দও তিনি অমুসলিমের মুখ থেকে শুনে সহ্য করতে পারতেন না। একবার এক ইয়াহুদী রাসুল সা: এর নিকট এসে বললো: আসসালামু আলাইকা ইয়া মুহাম্মাদ। সাথে সাথে সাওবান ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি সেই ইয়াহুদীকে এমন জোরে এক ধাক্কা দিলেন যে বেচারা পড়তে পড়তে কোন রকম টাল সামলাল। লোকটি একটু স্থির হয়ে তার এত রাগের কারণ কি তা জানতে চাইলো। সাওবান বললেন: তুমি কেন ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ’ না বলে ‘ইয়া মুহাম্মাদ’ বললে? লোকটি বললো, এতে এমন কি অপরাধ হয়েছে? আমি তার খান্দানী নামই উচ্চারণ করেছি। রাসুল সা: তার কথায় সায় দিয়ে বললেন, হা, আমার খান্দানী নাম মুহাম্মাদ।

    নবুওয়াতের সম্মান তো বিরাট ব্যাপার। রাসুল সা: এর সাথে তার যে গোলামী বা দাসত্বের সম্পর্ক ছিল তাও যদি কেউ উপেক্ষা বা অবহেলার দৃষ্টিতে দেখতো, তিনি তাকে সতর্ক করে দিতেন। হিমসে অবস্থান কালে একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হিমসের ততকালীন ওয়ালী আবদুল্লাহ ইবন কারাত ইযদী যখন তাকে দেখতে এলেন না, তখন তিনি একটি চিঠিতে লিখলেন: যদি মূসা ও ঈসার দাস তোমার এখানে থাকতো, তুমি তার অসুস্থতা সম্পর্কে খোঁজ নিতে বা দেখতে যেতে। এই চিঠি পেয়ে ওয়ালী এমন ব্যস্ততার সাথে বাড়ী থেকে বের হন যে, লোকেরা মনে করে নিশ্চয় বিরাট কোন কিছু ঘটেছে। এ অবস্থায় তিনি হযরত সাওবানের বাড়ী পৌঁছেন এবং দীর্ঘক্ষণ তার পাশে বসে থাকেন।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: এর নির্দেশ পালনের ব্যাপারে তিনি এত বেশি সচেতন ছিলেন যে, একবার যে নির্দেশ তিনি রাসুল সা: থেকে লাভ করেছেন আজীবন তা পালন করেছেন এবং কোন নির্দেশ অমান্য করার বিন্দুমাত্র আশংকা থাকে এমন কাজ তিনি কখনও করেননি। তাবারানী আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: রাসুল সা: বললেন: কে বাইয়াত করবে? সাওবান বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমরা তো বাইয়াত করেছি। রাসূল সা: বললেন: কারও কাছে কোন কিছু চাইবে না- এ কথার উপর বাইয়াত। সাওবান বললেন: কিসের জন্য ইয়া রাসুলুল্লাহ! বললেন: জান্নাতের জন্য। সাওবান্ এ কথার উপর বাইয়াত করলেন। আবু উমামা বলেন: আমি তাকে মক্কায় মানুষের ভিড়ের মধ্যে সওয়ারী অবস্থায় দেখেছি। এ অবস্থায় তার হাত থেকে চাবুকটি পড়ে যায়। সম্ভবত: তা এক ব্যক্তির ঘাড়ের উপর পড়ে এবং সে চাবুকটি ধরে ফেলে। অত:পর সে তা সাওবানের হাতে তুলে দিতে চায়; কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে বাহন থেকে নেমে এসে নিজ হাতে তুলে নেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/২৪২)।

    অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সা: বললেন: মানুষের কাছে সাওয়াল করবে না, এ নিশ্চয়তা যে আমাকে দেবে আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এ কথা শুনে সাওবান বলে উঠলেন: আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এরপর তিনি কারও কাছে কিছু চাইতেন না। (আল ইসাবা-১/২০৪)।

    ইউসুফ ইবন আবদিল হামীদ বর্ণনা করেছেন। সাওবান আমাকে বলেছেন, একবার রাসূল সা: তার আহল বা পরিবারবর্গের জন্য দুআ করলেন। আমি বললাম, আমিও তো আহলি বাইতের (আপনার পরিবারবর্গের) অন্তর্গত। তৃতীয়বার তিনি বললেন: হা, তুমি আমার পরিবারের অন্তর্গত। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি কোন বন্ধ দরযায় না দাড়াবে অথবা কোন আমীরের কাছে কিছু চাইতে না যাবে। (আল ইসাবা-১/২০৪)।

    এই সব নির্দেশের পর তিনি জীবনে আর কখনও কারও নিকট কোন কিছু চাননি বলে ইতিহাসে জানা যায়।

  • তুলাইব ইবন উমাইর (রা)

    তুলাইব ইবন উমাইর (রা)

    নাম তুলাইব, ডাকনাম আবু আদী। পিতা উমাইর ইবন ওয়াহাব, মাতা রাসুলুল্লাহর (মা) ফুফু আরওয়া বিনতু আবদুল মুত্তালিব। কুরাইশ বংশের বনী আবদী শাখার সন্তান। (আনসাবুল আশরাফ-১/৮৮)।

    হযরত তুলাইবের জন্ম ও ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। ইসলামের সূচনা পর্বেই যে তিনি এক কাফিলায় শরিক হন সে কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। ইতিহাসে বর্ণিত কিছু কিছু ঘটনা দ্বারা বুঝা যায়, তার মামাতো ভাই মুহাম্মাদ ও তার দ্বীনের প্রতি ছিল তার সীমাহীন ভক্তি ও ভালোবাসা। রাসূল সা: প্রতি কুরাইশদের বৈরী আচরণে তুলাইব ছিলেন সব সময় ক্রুব্ধ। রাসূল সা: এর প্রতি কুরাইশদের রূঢ় আচরণের কঠিন জবাবও তিনি মাঝে মাঝে দিতেন। আর এসব কাজে তার নেককার মা তাকে সব সময় সমর্থন জানাতেন।

    আল হারেস আত তাঈমী বলেন, রাসূল সা: মক্কার দারুল আরকাম বা আরকামের গৃহে অবস্থানকালে ‘তুলাইব’ ইবন উমাইর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সেখান থেকে বের হয়ে সোজা মা আরওয়া বিনতু আবদুল মুত্তালিবের নিকট উপস্থিত হন। মাকে বলেন: মা, আমি মুহাম্মাদের অনুসরণ করেছি, আল্লাহর নিকট নিজেকে সমপর্ণ করেছি। মা বললেন: তোমার সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত ব্যক্তি হচ্ছেন তোমার মামার ছেলে। পুরুষদের যে শক্তি ও ক্ষমতা আছে আমার তা থাকলে আমি অবশ্যই মানুষের হাত থেকে তাকে বাঁচাতাম। তুলাইব বললেন: মা, ইসলাম গ্রহণ করে তার অনুসারী হতে আপনার সামনে কিসের বাধা? আপনার ভাই হামযা, তিনি তো ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মা বললেন: আমার অন্য বোনেরা কি করে, আমি সেই প্রতীক্ষায় আছি। আমি তাদের সাথে সাথেই থাকবো।

    তুলাইব বললেন: যতক্ষণ আপনি তার নিকট গিয়ে তাকে সালাম করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর সাক্ষ্য না দেবেন, আমি ততক্ষণ আল্লাহর কাছে আপনার জন্য দুআ করতে থাকবো। সন্তানের এই অনুরোধ ভাগ্যবতী মা প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তিনি ঘোষণা করলেন: আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বা প্রেরিত বান্দা। এই দিন থেকে তিনি তার যবান দ্বারা রাসূলুলুল্লাহকে সা: সব রকম সহায়তা করতে শুরু করেন এবং পুত্র তুলাইবকে সর্ব অবস্থায় রাসূলুল্লাহর সা: পাশে দাড়ানোর নির্দেশ দেন। (তাবাকাত-৩/১২৩, আল ইসাবা-২ ২৩৩-২৩৪)।

    মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্বে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা নানাভাবে কুরাইশদের হাতে নির্যাতিত হন। একদিন তুলাইব ও হাতেব ইবন আমর মক্কার ‘আজ ইয়াদে আসগার’ এলাকায় নামায আদায় করছেন। মক্কার ততকালীন চরম দুই সন্ত্রাসী ইবনুল আসদা ও ইবনুল গায়তালা তা দেখে ফেলে। তারা তুলাইব ও হাতেবের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে আক্রমণ চালায়। হাতেব ও তুলাইব প্রায় এক ঘন্টা যাবত সে আক্রমণ প্রতিহত করেন এবং প্রাণ বাঁচিয়ে কোন রকমে পালিয়ে যান। (আনসাবুল আশরাফ-১/১১৭)।

    মক্কার উকবা ইবন আবী মুয়াইত ছিল রাসুলুল্লাহর সা: চরম দুশমন। তাছাড়া সে ছিল অত্যন্ত নীচ প্রকৃতির। নানাভাবে সে রাসুলুল্লাহকে সা: কষ্ট দিত। একদিন সে এক ঝুড়ি ময়লা নিয়ে এসে রাসুলুল্লাহর সা: বাড়ীর দরযায় ফেলতে শুরু করে। ব্যাপারটি তুলাইবের নজরে পড়ে। তিনি ছুটে গিয়ে উকবার হাত থেকে ঝুড়িটি ছিনিয়ে নিয়ে তার দুটি কান মলে দেন। উকবা খুব ক্ষেপে গিয়ে তুলাইবের পিছু পিছু তার মায়ের কাছে গিয়ে নালিশ জানায় এই বলে: তুমি কি দেখনা, তোমার ছেলে মুহাম্মাদের পক্ষ নিয়েছে?আব্দুল মুত্তালিবের ভাগ্যবতী মেয়ে জবাব দিলেন: আচ্ছা তুমিই বল, তার পক্ষ নেওয়ার জন্য তুলাইবের চেয়ে অধিকতর উপযুক্ত ব্যক্তি আর কে আছে? মুহাম্মাদ তো তার মামাত ভাই। আমাদের অর্থ কড়ি, জীবন সবই তো মুহাম্মাদের জন্য নিবেদিত। তারপর তিনি একটি শ্লোক আবৃত্তি করেন। যার অর্থ: তুলাইব ‍তার মামাতো ভাইকে সাহায্য করেছে, সে তার রক্ত ও অর্থের ব্যাপারে সমবেদনা জানিয়েছে।

    উল্লেখ্য যে, এই উকবা বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয় এবং রাসূল সা: বিশেষ নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়। (আনসাবুল আশরাফ-১/১৪৭)।

    হযরত তুলাইব (রা) ইসলাম গ্রহণের পর বেশ কিছুদিন কুরাইশদের সকল অত্যাচার নিপীড়ন প্রতিরোধ করে মক্কায় অবস্থান করেন। কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা চরম রূপ ধারণ করে এবং মক্কায় টিকে থাকা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন হাবশাগামী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। সেখানে কিছুকাল অবস্থানের পর মক্কাবাসীদের সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে, এমন একটি গুজব শুনে যারা হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে আসেন তাদের মধ্যে তুলাইবও ছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩২৪, ৩৬৬)।

    হাবশা থেকে ফিরে কিছুকাল মক্কায় অবস্থান করেন। তারপর আবার মদীনায় হিজরাত করেন। মদীনায় তিনি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন সালামা আল আজলানীর অতিথি হন। রাসুল সা: মুনজির ইবন আমর আস সায়েদীর সাথে তার মুওয়াখাত বা ইসলামী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।

    মুহাম্মাদ ইবন উমারের বর্ণনা মতে হযরত তুলাইব বদর যুদ্ধে যোগদান করেন। তাবারী বলেন: বদর যুদ্ধে তার যোগদানের ব্যাপারটি প্রমাণিত সত্য। অবশ্য মূসা ইবন উকবা, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ও আবূ মাশার বদর যুদ্ধে যারা যোগদান করেন তাদের নামের তালিকায় তুলাইবের নামটি উল্লেখ করেননি। (তাবাকাত-৩/১২৩)

    বদর যুদ্ধের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার কর্মকান্ডের আর কোন তথ্য সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা যায়, তার মত এমন তেজোদীপ্ত পুরুষ কখনও চুপ করে বসে ‍থাকতে পারেন না। আমরণ সকল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

    হিজরী ১৩ সনে জামাদিউল উলা মাসে আজনাদাইন যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তবে মুসয়াব ইবন আবদিল্লাহ বলেন: তিনি ইয়ারমুক যুদ্ধে শহীদ হন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। তিনি কোন সন্তানাদি রেখে যাননি। (তাবাকাত-৩/১২৪, আল ইসতীয়াব)।

  • ফাদল ইবন আব্বাস (রা)

    ফাদল ইবন আব্বাস (রা)

    নাম ফাদল, ডাক নাম আবু মুহাম্মাদ। পিতা প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা) এবং মাতা লুবাবা বিনতুল হারেস আল হিলালিয়্যাহ। রাসূল সা: এর চাচাতো ভাই। পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। এ কারণে পিতা আব্বাসকে ডাকা হতো আবুল ফাদলের পিতা বলে এবং ‍মাতা লুবাবাকে বলা হতো উম্মুল ফাদল বা ফাদলের মা।

    বদর যুদ্ধের পূর্বেই পরিবারের অন্যদের সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন ; কিন্তু মক্কার কাফিরদের ভয়ে প্রকাশ করেননি। মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে পিতা হযরত আব্বাস ও ছোট ভাই আবদুল্লাহর (রা) সাথে মদীনায় হিজরাত করেন। হিজরাতের সময় তার বয়স ছিল তের বছর এবং আবদুল্লাহর বয়স আট বছর। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭৩) তিনি মদীনায় হিজরাতের পর সর্ব প্রথম মক্কা অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। অত:পর হুনাইন অভিযানেও যোগদান করেন। আক্রমণের প্রথম পর্যায়ে মুসলিম বাহিনী যখন পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়ে পালাতে শুরু করে তখনও তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে ময়দানে অটল থাকেন। বিদায় হজ্জে তিনি রাসূলুল্লাহর সা: সাথে একই বাহনে বসা ছিলেন। এ কারণে সেই দিন থেকে তিনি ‘রাদিফুর রাসূল’ উপাধিতে ভূষিত হন। এই সময় খাইসাম গোত্রের এক যুবক ও এক সুন্দরী যুবতী রাসূলুল্লাহর সা: নিকট হজ্জের বিভিন্ন মাসয়ালা জিজ্ঞেস করতে আসে। হজ্জের সময় মহিলাদের মুখে নেকাব দেওয়া যেহেতু জায়েয নয়, এ কারণে মহিলাটির মুখ খোলা ছিল। ফাদল ছিলেন সুদর্শন নওজোয়ান। মহিলাটি তার দিকে আড় চোখে ‍তাকাতে থাকে এবং ফাদলও তাকে দেখতে থাকেন, হযরত রাসূলে কারীম সা: কয়েকবার ফাদলের মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে দেন। রাসূল সা: বললেন: আজ যে ব্যক্তি স্বীয় চোখ, কান ও জিহবা সংযত রাখতে পারবে তার সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (ইবন সা’দ-৪/৩৭, আল ইসাবা-৩/২০৮) এবং বুখারী শরীফে বাবু হজ্জিল মারয়াতে অধ্যায়ে বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে।)

    মিনায় পাথর নিক্ষেপের সময় চাদর উঁচু করে ধরে তিনি রাসূল সা: কে ছায়াদান করেন। মদীনায় রাসূল সা: তাকে বিয়ে দেন এবং নিজেই তার দেন মোহর পরিশোধ করেন।

    হযরত ফাদল (রা) রাসূলুল্লাহর সা: পার্থিব জীবনের সর্বশেষ খিদমাতের সুযোগ লাভে ধন্য হন। অন্তিম রোগশয্যায় রাসূল সা: সর্বশেষ ভাষণ দান করেন। এ ভাষণ দেওয়ার জন্য যে দুজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সাহায্য নিয়ে তিনি ঘর থেকে বের হন তাদের একজন ফাদল। আর রাসূল সা: যে ভাষণ দেবেন এ কথাটিও ফাদল জনগণের মধ্যে ঘোষণা করেন। (আল ইসাবা-৩/২০৮) রাসূলুল্লাহর সা: ইনতিকালের পর যে কজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি পবিত্র দেহ গোসল দেওয়ার সুযোগ লাভ করেন ফাদল (রা) তাদের অন্যতম। হযরত আলী (রা) গোসল করান, ফাদল পানি ঢেলে দেন, রাসূল সা: কাপড় ধরে রাখেন এবং আউস ইবন খাওলী নামক এক আনসারী পানি এগিয়ে দেন। (আল ইসতীয়াব, হায়াতুস সাহাবা-২/৩৪১)। ওয়াকিদী বলেন: হযরত ফাদল হযরত উমারের খিলাফতকালে আমওয়াসের প্লেগের মহামারিতে মারা যান। আবার অনেকে বলেছেন, হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে আজনদাইন অথবা ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, হিজরী ১৫ সনে ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন। তার মৃত্যুসন সম্পর্কে বিস্তর মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ইমাম বুখারী আজনাদাইনের মতটি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন। (আল ইসাবা-৩/২০৯)।

    হযরত ফাদল (রা) হতে ২৪টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। ইবন আব্বাস ও আবু হুরাইরার মত বিশিষ্ট সাহাবীরাও তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। তাছাড়া কুরাইব, কুসাম ইবন আব্বাস, আব্বাস ইবন উবাইদিল্লাহ, রাবীয়া ইবন হারেস, উমাইর, আবু সাঈদ, সুলাইমান ইবন ইয়াসার, শাবী, আতা ইবন আবী রিবাহ প্রমূখ তাবেয়ী তার নিকট থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। (আল ইসাবা-৩/২০৯)।

  • আবু বারযাহ আল আসলামী (রা)

    আবু বারযাহ আল আসলামী (রা)

    আবু বারযাহর আসল নামের ব্যাপারে রিজাল শাস্ত্রবিদদের যথেষ্ট মতপার্থক্য আছে। সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মতানুসারে নাদলা ইবন উবাইদ তার নাম এবং আবু বারযাহ কুনিয়াত বা উপনাম। (আল ইসাবা-৪/১৯)

    মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। মুসলমান হওয়ার পর কাফিরদের সাথে যত সংঘর্ষ হয়েছে তার সবগুলিতে তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে ছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলে কারীম সা: তার চরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দেন। তবে শত্রুতা ও বিদ্রোহের সীমা লংঘনকারী কতিপয় দুষ্কৃতিকারীকে সেদিন হত্যা করা হয়েছিল। আবদুর রহমান ইবন খাতাল ছিল এমনি একজন। এ ব্যক্তি প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তার এক মুসলমান দাসকে হত্যা করে ইসলামী দণ্ড ‘কিসাস’ থেকে বাঁচার জন্য ‘মুরতাদ’ (ইসলাম ত্যাগ) হয়ে মক্কায় পালিয়ে ‍যায়। তার ছিল দুটি দাসী। তারা মক্কার বাজারে মুহাম্মাদের সা: নিন্দাসূচক গীত গেয়ে বেড়াতো। মক্কা বিজয়ের দিন কোন উপায় না দেখে নরাধম ইবন খাতাল নিরাপত্তার আশায় কাবার গিলাফ আঁকড়ে ধরে পড়ে ‍থাকলো। সাহাবীরা রাসূল সা: কে বললেন: ইবন খাতাল কাবার গিলাফের আশ্রয়ে আছে। রাসূল সা: তাকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। এ নির্দেশ লাভের সাথে সাথে আবু বারযাহ ছুটে গিয়ে তাকে হত্যা করেন। (আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ; সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪১০)

    হযরত রাসূলে পাকের সা: জীবদ্দশা পর্যন্ত আবু বারযাহ মদীনায় বসবাসরত ছিলেন। হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি বসরার বাসিন্দা হন। সিফফীন যুদ্ধে হযরত আলীর (রা) পক্ষে এবং নাহরাওয়ানে খারেজীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ‍খুরাসান অভিযানে তিনি ছিলেন একজন মুজাহিদ।

    হযরত আবু বারযাহর (রা) মৃত্যুর সময়কাল সম্পর্কে মতপার্থক্য আছে। কারও মতে হিজরী ৬০, আবার কারও মতে হিজরী ৬৫ সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। দ্বিতীয় মতটি অধিকতর সঠিক বলে মনে হয়। কারণ, মারওয়ান ও আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের (রা) সংঘর্ষের সময় পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন এবং তিনি বলতেন, তারা সব দুনিয়ার ঝগড়া বিবাদ করছে। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪০৭)। তিনি মৃত্যুকালে একমাত্র ছেলে মুগীরাকে রেখে যান।

    হযরত আবু বারযাহ (রা) হযরত রাসূলে কারীম সা: এর দীর্ঘ সাহচর্যের সুযোগ পেয়েছিলেন। এ কারণে রাসূলুল্লাহ সা: হাদীসের একটি নির্ভরযোগ্য সংখ্যা তিনি স্মৃতিতে সংরক্ষণ করেছিলেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৬৪। তার মধ্যে ২৭টি মুত্তাফাক আলাইহি। দুটি বুখারী ও চারটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

    হযরত আবু বারযাহর (রা) স্বভাবে যুহদের একটা ভাব বিদ্যমান ছিল। তিনি দামী কাপড় পরতেন না এবং ঘোড়ায়ও সওয়ার হতেন না। গেরুয়া রঙ্গের দু খানি কাপড় দিয়ে সতর ঢেকে চলতেন। তারই এক সমসাময়িক সাহাবী আয়িজ ইবন উমার। তিনি যেমন মূল্যবান কাপড় পরতেন তেমনি ঘোড়ায়ও সওয়ার হতেন। এক ব্যক্তি তাদের দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে হযরত আয়িজের নিকট এসে বললো: আপনি আবু বারযাহকে দেখুন, তিনি পোশাক আশাকে আপনার বিরোধিতা করেন। আপনি দামী ‘খুয’ কাপড় পরেন, ঘোড়ায় চড়েন। আর তিনি এ দুটি জিনিসই পরিহার করেন। কিন্তু সাহাবীদের ভাতৃত্ব ছিল বাহ্যিক পোশাক আশাক ও চালচলন থেকেও অতি গভীর ও দৃঢ়। হযরত আয়িজ লোকটিকে জবাব দেন: আল্লাহ আবু বারযাহর ওপর রহম করুন। আজ আমাদের মধ্যে তার সমপর্যায়ের আর কে আছে? লোকটি হতাশ হয়ে সেখান থেকে আবু বারযাহর নিকট গেল এবং তাকে বললো: আপনি আয়িজকে একটু দেখুন। আপনার চালচলন তার পসন্দ নয়। তিনি ঘোড়ায় সোয়ার হয়ে ঘুরে বেড়ান, মূল্যবান ‘খুয’ কাপড় তার দেহে শোভা পায়। কিন্তু লোকটি এখানেও একই জবাব পেল। আবু বারযাহ লোকটিকে বললেন: আল্লাহ আয়িজের ওপর রহম করুন। আমাদের মধ্যে তার সমমর্যাদার আর কে আছে?

    একবার এক ব্যক্তি হযরত আবু বকর সিদ্দীককে (রা) একটা শক্ত কথা বলে ফেলে। সংগে সংগে আবু বারযাহ বলে উঠলেন: আমি কি তার গর্দান উড়িয়ে দেব? আবু বকর (রা) তাকে ধমক দিয়ে বললেন: রাসূলুল্লাহর সা: পর আর কারও ক্ষেত্রে এতটুকু অপরাধের শাস্তি বৈধ নয়। (কানযুল উম্মাল-২/১৬১, হায়াতুস সাহাবা-২/৬৩৮)

    গরীব দু:খীর সেবা করা ছিল আবু বারযাহর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি ফকীর মিসকীনকে আহার করাতেন। ‍হাসান ইবন হাকীম তার মা নিকট থেকে বর্ণনা করেছেন।

    আবু বারযাহ বিধবা, ইয়াতিম ও মিসকীনদের সকালে এবং সন্ধ্যায় ‘সারীদ’ (আরবদের এক প্রকার প্রিয় খাদ্য) আহার করাতেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/১৯৪-৯৫)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: সম্পর্কে কোন প্রকার বিদ্রুপ বা হাসি কৌতুক তিনি বরদাশত করতে পারতেন না। উবাইদুল্লাহ ইবন যিয়াদের ‘হাউজে কাউসার’ সম্পর্কে কিছু জানার বাসনা হলো। তিনি লোকদের কাছে জিজ্ঞেস করলেন ‘হাউজে কাউসার’ সম্পর্কে কে বলতে পারবে? লোকেরা আবু বারযাহর (রা) কথা বললো। উবাইদুল্লাহ তাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি গেলেন। তাকে আসতে দেখে উবাইদুল্লাহ বিদ্রুপের সুরে বললো: এই সেই তোমাদের মুহাম্মাদী? অত্যন্ত ক্ষুব্ধভাবে আবু বারযাহ জবাব দিলেন, আল্লাহর শুকরিয়া! আমি এমন এক যুগে বেঁচে আছি যখন সাহাবিয়্যাতের (সাহচর্যের) মর্যাদাকে হেয় চোখে দেখা হয়। এ কথা বলতে বলতে অত্যন্ত রুষ্টভাবে তিনি আসন গ্রহণ করেন। উবাইদুল্লাহ প্রশ্নটি উত্থাপন করলেন, জবাবে আবু বারযাহ বললেন: যে ব্যক্তি হাউজে কাওসার অস্বীকার করবে সে তার ধারে কাছেও যেতে পারবে না এবং আল্লাহ তাকে তার থেকে পানও করাবেন না।’ এ কথা বলে তিনি উঠে চলে আসেন।

    হযরত আবু বারযাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: এক যুদ্ধে (মতান্তরে খাইবার) আমরা মুশরিক বাহিনীকে হামলা করে তাদের রুটি তৈরীর সাজ সরঞ্জাম থেকে দূরে তাড়িয়ে দেই। তারপর আমরা সেগুলি দখল করে খেতে শুরু করি। জাহিলী যুগে আমরা শুনতাম, যারা সাদা রুটি খায় তারা মোটা হয়ে যায়। তাদের পরিত্যক্ত রুটি খাওয়ার পর আমাদের কেউ কেউ তার নিজের কাঁধের দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকে যে সে মোটা হয়েছে কি না। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩২৩) এ ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় সাহাবায়ে কিরাম সাদা মিহি আটা সাধারণত ব্যবহার করতেন না।

  • উকবা ইবন আমের আল জুহানী (রা)

    উকবা ইবন আমের আল জুহানী (রা)

    নাম উকবা, ডাক নাম আবু আমর, পিতা আমের। বনু জুহানা গোত্রের লোক। হযরত রাসূলে কারীম সা: যখন মদীনায় আসেন, উকবা তখন মদীনা থেকে বহু দূরে ছাগলের রাখালী করছিলেন। রাসূল সা: এর আগমন সংবাদ মদীনার অলি গলি ও তার আশ পাশের মরু ভূমি ও মরুদ্যানে ছড়িয়ে পড়ে। রাসূল সা: এর সাথে উকবার প্রথম সাক্ষাত কিভাবে ঘটে তা উকবার মুখেই শোনা যাক:

    ‘রাসূল সা: যখন মদীনায় এলেন আমি তখন মদীনার বাইরে আমার ছাগল চড়াচ্ছিলাম। খবরটি আমার কাছে পৌঁছার পর আমি সব কিছু ছেড়ে তার সাথে সাক্ষাতের জন্য চলে আসি। রাসূল সা: এর খিদমতে হাজির হয়ে আমি আরজ করলাম: ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাকে বাইয়াত (আনুগত্যের শপথ) করাবেন কি? তিনি আমার পরিচয় জানতে জিজ্ঞেস করেন: তুমি কে? বললাম: উকবা ইবন আমের আল জুহানী। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: মুরুবাসী বেদুঈনদের বাইয়াত অথবা হিজরাতের বাইয়াত এর কোনটি তোমার অধিক প্রিয়? আমি বললাম: হিজরাতের বাইয়াত। অত:পর তিনি আমাকে সেই বিষয়ের উপর বাইয়াত করালেন যার উপর মুহাজিরদের বাইয়াত করাতেন। রাসূলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াতের পর আমি এক রাত তার সাথে কাটিয়ে আবার মরূভূমিতে আমার ছাগলের কাছে ফিরে গেলাম।

    আমরা ছিলাম বারো জন মুসলমান। আমরা মদীনা থেকে দূরে ছাগল চড়াতাম। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ বললো: একদিন পর পর আমরা যদি রাসূলুল্লাহর সা: কাছে হাজির ‍হয়ে দ্বীনের কথা না শিখি এবং তার উপর যা নাযিল হয় তা না জানি তাহলে আমাদেরে জীবনে কোন কল্যাণ নেই। প্রতিদিন আমাদের মধ্য থেকে একজন পালাক্রমে মদীনায়যাবে এবং তার ছাগল অন্যরা চড়াবে। আমি বললাম: তোমরা পালা করে একজন যাও এবং তার ছাগলগুলির জিম্মাদারি আমি নিলাম। কারও কাছে আমার ছাগলগুলি রেখে মদীনায় যেতে আমি ইচ্ছুক ছিলাম না।

    আমার সঙ্গীরা পালা করে মদীনায় রাসূলুল্লাহর সা: দরবারে যেতে লাগলো, আর আমি তাদের ছাগলের পাল চড়াতে লাগলাম। তারা ফিরে এলে তারা যা কিছু শুনে বা শিখে আসতো আমি তাদের কাছে শুনে তা শিখে নিতাম। এভাবে কিছুদিন চললো। এর মধ্যে আমার মনে এ অনুভূতি জাগলো: তোমার সর্বনাশ হোক! ছাগলের জন্য তুমি রাসুলুল্লাহর সা: সুহবত বা সাহচর্য এবং সরাসরি তার মুখ নি:সৃত বাণী শোনার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছো! এই অনুভূতির পর আমি আমার ছাগল ফেলে রাসুলুল্লাহর সা: পাশে মসজিদে নববীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশ্যে মদীনার দিকে চললাম।

    আমি মদীনায় পৌঁছলাম। মসজিদে নববীতে ‍হাজির হয়ে সর্ব প্রথম শুনতে পেলাম এক ব্যক্তি বলছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন: ‘যে ব্যক্তি পূর্ণরূপে ওজু করবে সে তার সকল গুনাহ থেকে এমনভাবে পবিত্র হবে যেমনটি সে ছিল তার মা তাকে যেদিন জন্ম দিয়েছিল।’ কথাটি আমার খুবই ভালো লাগলো। উমার ইবনুল খাত্তাব তখন বললেন: তুমি যদি প্রথম কথাটি শুনতে আরও খুশি হতে। আমি তাকে কথাটি পুনরায় বলার জন্য অনুরোধ করলাম। তিনি বললেন; রাসূল ‍সা: বলেছেন: ‘আল্লাহর সাথে কোন কিছু শরিক না করে কেউ যদি মারা যায় আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের সবগুলি দরযা খুলে দেন। জান্নাতের আটটি দরযা। সে এর যে কোনটি দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করবে।’ এমন সময় রাসূল সা: আমাদের মধ্যে উপস্থিত হলেন। আমি তার সামনাসামনি বসলাম। তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। কয়েকবার এমনটি করলেন। চতুর্থবার আমি আরজ করলাম: হে আল্লাহর নবী, আমার মা বাবা আপনার প্রতি উতসর্গ হোক! আমার দিক থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন কেন? এবার তিনি আমার প্রতি মনোযোগী বলে বললেন: একজন তোমার সর্বাধিক প্রিয় না বারোজন? (হায়াতুস সাহাবা-৩/২১৪-১৫,সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা-৪/১৪৪)।

    রাসূলুল্লাহর সাথে উকবা সর্ব প্রথম উহুদে কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়েন। এরপর রাসূলুল্লাহর সা: জীবদ্দশায় সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে তিনি একজন মুজাহিদ হিসেবে সিরিয়া অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন। দিমাশক জয়ের দিনে তিনি তীর নিক্ষেপে অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেন। দিমাশক বিজয়ের পর সেনাপতি আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা) তাকে মদীনায় পাঠান খলীফাকে এ সংবাদ দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য। তিনি মাত্র আট দিনে এক জুমআ থেকে অন্য জুমআর মধ্যে রাতদিন বিরামহীন চলার পর মদীনায় খলীফার কাছে সংবাদটি পৌঁছান। সিফফীন যুদ্ধে তিনি হযরত আমীর মুআবিয়া (রা) এর পক্ষে অংশ গ্রহণ করেন। মিসর জয়ের পর হযরত মুআবিয়া (রা) তাকে এক সময় তথাকার ওয়ালী বা শাসক নিয়োগ করেন। আবু আমর আল কিন্দী বলেন: মুআবিয়া তাকে মিসরের খারাজ (রাজস্ব) আদায় ও নামাযের ইমামতির দায়িত্ব অর্পণ করেন। পরে যখন তাকে অপসারণের ইচ্ছা করেন, তখন তিনি উকবাকে রোডস্ আক্রমণের নির্দেশ দেন। উকবা তখন রোডসের পথে অগ্রসর হচ্ছেন তখনই তিনি নিজের স্থলে মাসলামার নিযুক্তির কথা শুনতে পেলেন। তখন তিনি মন্তব্য করেন: দূরে পাঠিয়ে তারপর অপসারণ? এটা হিজরী ৪৭ সনের কথা। বরখাস্তের পর তিনি অভিযান থেকে ‍হাত গুটিয়ে নেন। হযরত উকবার মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। সঠিক বর্ণনামতে হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতকালে হিজরী ৫৮ সনে মিসরে ইনতিকাল করেন। তাকে বর্তমান কায়রোর দক্ষিণ দিকে ‘মুয়াত্তাম’ পাহাড়ের পাদদেশে দাফন করা হয়। (আল ইসাবা-৩/৪৮৯) তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৩)।

    জ্ঞান ও মর্যাদার দিক দিয়ে হযরত উকবা ছিলেন এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। কুরআন, হাদীস, ফিকাহ, ফারায়েজ ও কাব্য ছিল তার এক বিশেষ স্থান। আল্লামা জাহাবী বলেন, তিনি ছিলেন একাধারে ফকীহ, আল্লামাহ, আল্লাহর কিতাবের ক্বারী, ফারায়েজ শাস্ত্রের তত্বজ্ঞানী, প্রাঞ্জলভাষী ও উঁচু দরের এক কবি।’ (তাজকিরাতুল হুফফাজ ১/৪৩)।

    পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াত শিক্ষার প্রতি ছিল তার বিশেষ আগ্রহ। দারুণ আবেগ ও আগ্রহের সাথে তিনি কুরআন পাকের তিলাওয়াত শিক্ষা করতেন। কোন কোন সূরা তিনি খোদ রাসূলুল্লাহর সা: নিকটেই শিখেছেন। একবার তিনি রাসূল সা: এর পায়ের ওপর পড়ে নিবেদন করেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমাকে সূরা হুদ ও সূরা ইউসুফ একটু শিখিয়ে দিন। এ প্রবল আগ্রহই তাকে একজন বিখ্যাত ক্বারী বানিয়ে দেয়।

    তিনি ছিলেন সুমধুর কন্ঠের অধিকারী। সুললিত কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। গভীর রাতে যখন নিরবতা নেমে আসতো, তিনি হৃদয়গ্রাহী কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করতেন। রাসূল সা: এর সাহাবীরা কান লাগিয়ে সে তিলাওয়াত শুনতেন। আল্লাহর ভয়ে তাদের হৃদয় বিগলিত হয়ে পড়তো এবং চোখ সজল হয়ে উঠতো। খলীফা হযরত উমার (রা) একবার তাকে বলেন: ‘উকবা, আমাদের কিছু কুরআন ‍শুনাও। উকবা তিলাওয়াত শুরু করলেন। সে তিলাওয়াত শুনে উমার (রা) কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন, চোখের পানিতে ‍তাঁর দাড়ি ভিজে গেল। হযরত উকবা নিজ হাতে পবিত্র কুরআনের একটি সংকলন তৈরী করেন। হিজরী নবম শতক পর্যন্ত মিসরের ‘জামে উকবা ইবন আমের’ নামক মসজিদে এ কপিটি সংরক্ষিত ছিল। কপিটির শেষে লেখা ছিল ‘এটি উকবা ইবন আমের আল জুহানী লিখেছেন।’ এটা ছিল পৃথিবীতে প্রাপ্ত কুরআনের প্রাচীনতম কপি। কিন্তু হতভাগা মুসলিম জাতি আরও অনেক কিছুর মত এই মূল্যবান সম্পদটিও হারিয়েছে। (তাহজীবুত তাহজীব-৭/২৪৩, সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা-৪/১৪৮-৪৯, মুহাজিরিন-২/২৩৬)

    রাসূলুল্লাহ সা: এর হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে তিনি একেবারে পিছিয়ে নন। তার বর্ণিত হাদীসের সর্বমোট সংখ্যা পঞ্চান্ন। তার মধ্যে সাতটি মুত্তাফাক আলাইহি এবং একটি বুখারী ও সাতটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। বহু বড় বড় সাহাবী দীর্ঘপথ ভ্রমণ করে তার কাছে হাদীস শুনার জন্য আসতেন। হযরত আবু আইউব কেবল একটিমাত্র হাদীস শুনার জন্য মদীনা থেকে মিসরে যান এবং হাদীসটি শুনেই আবার মদীনার দিকে যাত্রা করেন। হিবরুল উম্মাহ হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসও (রা) তার নিকট থেকে ইলম হাসিল করেন। তাছাড়া বহু বিখ্যাত তাবেয়ী তার জ্ঞান ভান্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করেন। ইবন আসাকির ইবরাহীম ইবন আবদির রহমান ইবন আউফ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন: আল্লাহর কসম, মৃত্যুর পূর্বে উমার ইবনুল খাত্তাব লোক পাঠিয়ে রাসুলুল্লাহর সা: সাহাবী- আবদুল্লাহ ইবন হুজাফা, আবুদ দারদা, আবু যার ও উকবা ইবন আমেরকে বিভিন্ন স্থান থেকে ডেকে এনে বলেন: তোমরা রাসূলুল্লাহ থেকে এত যে হাদীস বর্ণনা কর- এগুলি কী? তারা বললেন: আপনি কি আমাদেরকে হাদীস বর্ণনা করতে নিষেধ করেন? তিনি বললেন: না। তবে তোমরা আমার কাছে থাকবে। যতদিন আমি জীবিত আছি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না। উমার যতদিন বেঁচে ছিলেন তাকে ছেড়ে তারা দূরে কোথাও যাননি। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২৪০-৪১)

    ফিকাহ শাস্ত্রেও হযরত উকবার ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। দ্বীনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত জ্ঞান তথা: খিতাবাহ (বক্তৃতা-ভাষণ), কবিতা ইত্যাদিতে তার ছিল বিরাট দখল। উকবা (রা) যদিও একজন উঁচু দরের সাহাবী ছিলেন, তথাপি দ্বীনী দায়িত্ব পালণে ভীষণ ভয় পেতেন। তিনি এক সময় মিসরে ইমামতির দায়িত্ব পালন করেন, তবে পরে ইমামতি এড়িয়ে চলতেন। আবু আলী হামাদানী বলেন: একবার এক সফরে লোকেরা তাকে বলে, যেহেতু আপনি রাসূলুল্লাহর সা: সাহাবী, আপনি নামায পড়াবেন। বললেন: না। আমি আল্লাহর রাসূলকে বলতে শুনেছি, যদি কোন ব্যক্তি ইমামতি করে এবং সঠিক সময়ে সঠিকভাবে নামায পড়ায়, ইমাম ও মুকতাদী উভয়ের জন্য সওয়াব আছে। আর যদি কোন ত্রুটি হয় তাহলে ইমামকে জবাবদিহি করতে হবে এবং মুকতাদির কোন দায়-দায়িত্ব নেই।

    হযরত রাসূলে কারীমের সা: সেবা করা ছিল তার একমাত্র হবি। সফরে, তিনি প্রায়ই রাসূলুল্লাহর সা: খচ্চর ‘আশ শুহবা’র লাগাম ধরে টেনে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। এই সেবা ও সাহচর্যকালে তিনি দ্বীনী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হাতছাড়া করতেন না। তিনি বর্ণনা করেছেন: একবার আমি এক সফরে রাসূলুল্লাহর সা: সঙ্গী ছিলাম। আমি রাসূলুল্লাহর বাহন টেনে নিয়ে চলছি এমন সময় তিনি বললেন: উকবা, আমি কি তোমাকে পাঠযোগ্য দুটি উত্তম সূরার কথা বলবো? আমি আরজ করলাম: বলুন। তিনি বললেন: সূরা দুটি হলো: কুল আউযুবি রাব্বিল ফালাক ও কুল আউযুবি রাব্বিন নাস।

    তিনি রাসূলকে সা: এতই সম্মান করতেন যে, তার বাহনের ওপর বসাও বে আদবী বলে মনে করতেন। একবার তিনি সফরে নির্ধারিত খিদমতের দায়িত্ব পালন করছেন, এমন সময় রাসূল সা: সওয়ারী পশুটি থামিয়ে বসিয়ে দেন। সওয়ারীর পিঠ থেকে নেমে এসে তিনি বলেন: উকবা, তুমি বাহনের পিঠে সওয়ার হও। উকবা বললেন: সুবহানাল্লাহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি আপনার বাহনে সওয়ার হব? রাসূল সা: আবারও নির্দেশ দিলেন। উকবা একই উত্তর দিলেন। অবশেষে বারবার পীড়াপীড়ির পর আদেশ পালনার্থে উকবা বাহনের পিঠে উঠে বসেন, আর রাসূল সা: পশুর লাগাম ধরে টেনে নিয়ে চলতেন। এ কারণে তাকে রাদীফু রাসুলিল্লাহ-(রাসূলুল্লাহর বাহনের পিছনে আরোহণকারী বলে ডাকা হতো)। মানুষের দোষ গোপন করা ছিল উকবার বিশেষ গুণ। কারও কোন দোষ প্রচার করাকে তিনি খুবই নিন্দনীয় মনে করতেন। একবার তার সেক্রেটারী এসে বললো, আমাদের প্রতিবেশী লোকগুলি মদ পান করছে। তিনি বললেন: করতে দাও, কাউকে বলো না। সেক্রেটারী বললো: আমি পুলিশকে খবর দেই। তিনি বললেন: খুবই পরিতাপের বিষয়! এড়িয়ে যাও। আমি রাসূলুল্লাহকে সা: বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারও কোন দোষ গোপন করলো সে যেন একটি মৃতকে জীবিত করলো। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪২৩)।

    সামরিক বিদ্যা বিশেষত: তীরন্দাযীর প্রতি ছিল তার বিশেষ আকর্ষণ। এ বিদ্যা অর্জনের জন্য তিনি অন্যদেরকেও উতসাহিত করতেন। ‍একবার খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে ডেকে তিনি বলেন: ‘আমি রাসুলুল্লাহকে সা: বলতে শুনেছি, আল্লাহ একটি তীরের বিনিময়ে তিনজনকে জান্নাত দান করবেন-তীরটির প্রস্তুতকারী, আল্লাহর রাস্তায় তীরটি বহনকারী ও তীরটির নিক্ষেপকারী। তিনি এ কথাও বলেছেন: সকল প্রকার খেলা ধূলার মধ্যে মাত্র তিনটি খেলা জায়েয- তীরন্দাযী, অশ্বারোহন প্রশিক্ষণ এবং নিজ স্ত্রীর সাথে হাসি তামাশা। যে ব্যক্তি তীর নিক্ষেপ বিদ্যা অর্জন করে ভুলে গেছে সে মূলত: একটি বিরাট সম্পদ হারিয়েছে।’ (মুসনাদু ইমাম আহমাদ-৪/১৪৮) তিনি যুদ্ধের বহু অস্ত্র শস্ত্র জমা করেন। মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির খোঁজ নিয়ে দেখা গেল তার ঘরে সত্তরের চেয়ে কিছু বেশি ধনুক রয়েছে। আর সেই ধনুকগুলির সাথে বেশ কিছু তীর ও ফলা। সবগুলিই তিনি আল্লাহর রাস্তায় দান করে যান। (সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা-৪/১৫০-৫১)।

    হযরত উকবা (রা) ছিলেন সচ্ছল ব্যক্তি। তার চাকর বাকরও ছিল। তা সত্তেও নিজের সব কাজ নিজ হাতে করতেন।

    হযরত উকবা (রা) মিসরে অন্তিম রোগ শয্যায়। এ অবস্থায় সন্তানদের ডেকে এই উপদেশটি দান করেন: ‘আমার সন্তানেরা! আমি তোমাদের তিনটি কাজ থেকে নিষেধ করছি, ভালো করে স্মরণ রেখ। ১) নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও নিকট থেকে রাসূল সা: এর হাদীস গ্রহণ করো না। ২) আবা (সামনে খোলা ঢিলে ঢালা মোটা জুব্বা) পরলেও কখনও ঋণগ্রস্ত হয়ো না। ৩) তোমরা কবিতা লিখবে না। কারণ তাতে তোমাদের অন্তর কুরআন ছেড়ে সেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বে।’ (হায়াতুস সাহাবা-৩/২০১)।

    মোট কথা, ছাগলের রাখাল হযরত উকবার মধ্যে যে সুপ্ত প্রতিভা ছিল রাসূল সা: এর স্বল্পকালীন সাহচর্যে তার সেই প্রতিভার চরম বিকাশ ঘটে। উত্তরকালে তিনি সাহাবাদের মধ্যে একজন শ্রেষ্ঠ আলেম, শ্রেষ্ঠ কারী, শ্রেষ্ঠ বিজয়ী সেনাপতি ও শ্রেষ্ঠ শাসকে পরিণত হন। যখন তিনি ছাগলের রাখালী ছেড়ে রাসূলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হন তখন তিনি ঘুনাক্ষরেও এ কথা জানতেন না যে, একদিন তিনি দিমাশক বিজয়ী বাহিনীর অগ্র সৈনিক হবেন এবং দিমাশকের ‘বাবে তুমায়’ তার একটি বাড়ী হবে। যে দিন তিনি মদীনায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন সেদিন তার মনে একবারও এ কথা উদয় হয়নি যে, একদিন তিনি মিসর বিজয়ের অন্যতম নেতা, তথাকার ওয়ালী হবেন এবং কায়রোর ‘মুকাত্তাম’ পাহাড়ে তার একটি বাড়ী হবে। ইসলাম তার সুপ্ত প্রতিভার এমন বিকাশ ঘটায় যে তিনি ছাগলের রাখালী থেকে এত কিছু হন।

  • বুরাইদাহ ইবনুল হুসাইব (রা)

    বুরাইদাহ ইবনুল হুসাইব (রা)

    নাম বুরাইদাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু আবদিল্লাহ। পিতার নাম হুসাইব ইবন আবদিল্লাহ। বনু আসলাম গোত্রের সরদার। রাসুল সা: হিজরাতের সময় বুরাইদাহ ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ‘গামীম’ নামক স্থানে পৌঁছলে বুরাইদাহ রাসূলুল্লাহর খিদমতে হাজির হন। রাসূল সা: তার সামনে ইসলামের দাওয়াত পেশ করেন এবং তিনি বিনা বাক্য ব্যয়ে তা কবুল করেন। উল্লেখ্য যে, এই ‘গামীম’ মক্কা থেকে দুই মনযিল দূরে অবস্থিত। এখানে তার সাথে বনু আসলামের আরও আশি ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে। রাসূল সা: সেখানে ইশার নামায আদায় করেন এবং বুরাইদাহ ও তার সঙ্গীরা রাসূল সা: পেছনে ইকতিদা করে নামায আদায় করেন। (হায়াতুস ‍সাহাবা-১/৩) ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিজ গোত্রে অবস্থান করতে থাকেন এবং বদর ও উহুদ যুদ্ধের পর মদীনায় আসেন। অবশ্য তার ইসলাম গ্রহণ ও মদীনায় আসার সময়কাল সম্পর্কে ইতিহাস ভিন্নমতও লক্ষ্য করা যায়।

    হিজরী ষষ্ঠ সনের পূর্বে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন এবং সর্বপ্রথম হুদাইবিয়ার সন্ধিতে অংশগ্রহণ করে ‘বাইয়াতে রিদওয়ানের’ সৌভাগ্য অর্জন করেন। হিজরী ৭ম সনে খাইবার অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বর্ণনা করেন: আমরা খাইবার অবরোধ করলাম। প্রথম দিন ঝান্ডা নিলেন আবু বকর; কিন্তু জয় হলো না। দ্বিতীয় দিনও একই অবস্থা। লোকেরা হতাশ হয়ে পড়ছিল। রাসূল সা: তখন বললেন: আগামী দিন আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে ঝান্ডা তুলে দেব যে কি না আল্লাহ ও রাসূলের অতি প্রিয়। আগামী কালই বিষয়টি ফায়সালা হবে এ কথা চিন্তা করে লোকেরা খুব খুশী হলো। পরদিন প্রত্যুষে রাসূল সা: ফজরের নামায আদায়ের পর ঝান্ডা আনার নির্দেশ দিলেন। লোকেরা ছিল কাতারবন্দী। তিনি আলীকে ডাকলেন এবং তার হাতে ঝান্ডাটি তুলে দিলেন। এই দিন আলীর হাতে খাইবার জয় হয়।

    হিজরী ৮ম সনে রাসূল সা: মক্কা অভিযানে বুরাইদাহ সংগী ছিলেন এবং একটি বাহিনীর পতাকা হাতে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন। (হায়াতুস সাহাব-১/১৬৭)।

    এ প্রসঙ্গে তিনি বর্ণনা করেন যে, মক্কা বিজয়ের দিন তিন এক ওজুতে কয়েক ওয়াক্তের নামায আদায় করেন।

    তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত রাসূলে কারীম সা: মক্কা সহ বিভিন্ন অঞ্চলের লোকদের যুদ্ধে যোগদানে উতসাহিত করার জন্য বিভিন্ন গোত্রের নিকট লোক পাঠান। এ সময় তিনি বুরাইদাকে আসলাম গোত্রের নিকট পাঠান এবং তাকে নির্দেশ দেন তিনি যেন মক্কা মদীনার মধ্যবর্তী স্থান ‘ফুরআ’ নামক স্থানে উপস্থিত হন। (তারীখে ইবন আসাকির-১/১১০)।

    মক্কা বিজয়ের পর হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের নেতৃত্বে একটি বাহিনী ইয়ামনে পাঠান। বুরাইদাহও এ বাহিনীর একজন সদস্য ছিলেন। পরে হযরত আলীর নেতৃত্বে অন্য একটি বাহিনী সেখানো পাঠানো হয় এবং গোটা বাহিনীর নেতৃত্ব আলী (রা) এর হাতে অর্পণ করা হয়। যুদ্ধ শেষে হযরত আলী (রা) গণীমতের মাল থেকে একটি দাসী নিজে গ্রহণ করেন। বুরাইদাহ এটা মেনে নিতে পারেননি। মদীনায় ফিরে বিষয়টি তিনি রাসূল সা: নিকট উত্থাপন করেন। সবকিছু শুনে রাসূল সা: বলেন: বুরাইদাহ, তোমার কি আলীর প্রতি কোন বিদ্বেষ আছে? বুরাইদাহ অস্বীকার করেন। তখন রাসূল করীম সা: বলেন: আলীর প্রতি মনে কোন রকম হিংসা রেখ না। গণীমতের এক পঞ্চমাংশ থেকে সে এরচেয়েও বেশি পায়। (সহীহুল বুখারী- বাবু বা’সু আলী ইলাল ইয়ামন)।

    অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, বুরাইদাহর বক্তব্য শুনে রাসুল সা: এর চেহারা মুবারকের রং পাল্টে যায়। তিনি বলেন: বুরাইদাহ, মুমিনদের ওপর তাদের নিজ সত্তা অপেক্ষাও কি কি আমার অধিকার বেশি নয়? বুরাইদাহ জবাব দিলেন: হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ! রাসূল সা: বললেন: আমি যার মাওলা (মনিব/ দাস) আলীও তার মাওলা। বুরাইদাহ বলেন: রাসূলুল্লাহর সা: পবিত্র যবান থেকে এ বাণী শোনারপর আলীর প্রতি আমার সকল অভিযোগ দূর হয়ে যায়। আর সেই দিন থেকে তার প্রতি আমার অন্তরে যে গভীর মুহাব্বাতের সৃষ্টি হয় তা আর কারও প্রতি কখনো হয়নি। (মুসনাদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: জীবনের শেষ অধ্যায়ে উসামাকে সিরিয়ায় একটি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। এ বাহিনীর পতাকাবাহী ছিলেন বুরাইদাহ। উসামা মদীনা থেকে বের হয়ে মদীনার উপকন্ঠে শিবির স্থাপন করে যাত্রার তোড়জোড় করছেন, এমন সময় রাসূলুল্লাহর সা: অন্তিম অবস্থার খবর পেলেন। তিনি যাত্রা স্থগিত করে ছুটে এলেন রাসূলুল্লাহর সা: শয্যা পাশে। অন্যদের সাথে বুরাইদাহও ঝান্ডা হাতে মদীনায় ফিরে এলেন এবং রাসূলুল্লাহর সা: ঘরের দরজার সামনে তা গেঁড়ে দিলেন। রাসূল সা: তিরোধানের পর হযরত আবু বকর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। বুরাইদাহ খলীফার নির্দেশে আবার ঝান্ডা তুলে নিয়ে সিরিয়া যান এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে ঝান্ডা হাতে আবার মদীনায় ফিরে এলেন এবং উসামার বাড়ীর সামনে ঝান্ডাটি গেড়ে দিলেন। উসামার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ঝান্ডাটি সেখানে ছিল। (হায়াতুস সাহাবা-১/৪২৫-২৬)

    হযরত বুরাইদাহ ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহর সা: জীবদ্দশায় যতগুলি যুদ্ধ হয়েছে সবগুলিতে অংশগ্রহণ করেন। সহীহাইনে তার থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রাসূলুল্লাহর সা: মোট ১৬ (ষোল)টি যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-১১৪৬, তাবাকাতে ইবন সা’দ-মাগাযী অধ্যায়-১৩৬)।

    হযরত রাসূলে কারীমের জীবদ্দশায় বুরাইদাহ মদীনার বাসিন্দা ছিলেন। খলীফা উমারের (রা) খিলাফতকালে বসরা শহরের পত্তন হলে তিনি সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হন। হযরত বুরাইদাহর শিরা উপশিরায় জিহাদের খুন টগবগ করতো। লোকদের তিনি বলতেন: জীবনের মজা তো ঘোড়া দাবড়ানোর মধ্যেই। এই আবেগ ও উচ্ছাসের কারণে খলীফাদের যুগেও তিনি বিভিন্ন অভিযানে সৈনিক হিসাবে ঘর থেকে বের হয়ে পড়েন। হযরত উসমানের খিলাফতকালে খুরাসান অভিযানে অংশ নিয়ে ‍মারভে চলে যান এবং সেখানেই থেকে যান। হযরত বুরাইদাহ একজন বীর মুজাহিদ হওয়া সত্ত্বেও খলীফাদের যুগে মুসলমানদের পারষ্পরিক ঝগড়ায় তার তরবারি সব সময় কোষবদ্ধ থাকে। তার জীবদ্দশায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় খলীফার যুগে যত গৃহযুদ্ধ হয়েছে তার একটিতেও তিনি অংশগ্রহণ করেননি। এমনকি অত্যধিক সতর্কতার কারণে দুপক্ষের যারা সেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন তাদের সম্পর্কেও কোন মতামত ব্যক্ত করতেন না। এ প্রসঙ্গে বনী বকর ইবন ওয়াযিলের এক ব্যক্তি বলেন: একবার আমি বুরাইদাহ আল আসলামীর সাথে সিজিস্তানে ছিলাম। একদিন আমি তার কাছে আলী, উসমান, ‍তালহা ও যুবাইর সম্পর্কে তার মতামত জানার জন্য তাদের প্রসঙ্গ উঠালাম। বুরাইদাহ সংগে সংগে কিবলার দিকে মুখ করে বসে দুহাত তুলে দুআ করতে শুরু করেন: হে আল্লাহ, তুমি উসমানকে ক্ষমা করে দাও। তুমি আলী, তালহা, যুবাইরওকে মাফ করে দাও। বর্ণনাকারী বলেন: অত:পর তিনি আমার দিকে ফিরে বলেন, তুমি কি আমার হত্যাকারী হতে চাও? আমি বললাম: আমি আপনার হত্যাকারী হতে যাব কেন? তবে আপনার কাছে এমনটি চেয়েছি। বুরাইদাহ বললেন: তারা ছিলেন এমন একদল লোক যাদের সম্পর্কে আল্লাহর ইচ্ছা পূর্বেই স্থির হয়ে আছে। তিনি চাইলে তাদের ক্ষমা করে দিতে পারেন অথবা শাস্তি দিতে পারেন। তাদের হিসাব নিকাশের দায়িত্ব আল্লাহর। (ইবন সা’দ-৪/১৭৬, হায়াতুস সাহাবা-৩/৩৮৮)

    একবার তিনি হযরত আমীরে মুআবিয়ার (রা) কাছে যান। মুআবিয়া (রা) তখন একজন লোকের সাথে বসে কথা বলছিলেন। বুরাইদাহ বললেন: মুআবিয়া, আমাকেও একটু কথা বলার ‍সুযোগ দেবেন? মুআবিয়া বললেন: হাঁ, তিনি মনে করেছিলেন বুরাইদাহ হয়ত অন্যদের মতই কিছু বলবেন। কিন্তু বুরাইদাহ বললেন: আমি রাসুলুল্লাহকে সা: বলতে শুনেছি: ‘আমি আশা করি কিয়ামতের দিন জগতের সকল গাছ, পাথর ও বালুর সমপরিমাণ মানুষের জন্য সুপারিশ করবো। মুআবিয়া, আপনি এ সুপারিশের আশা করেন, আর আলী তার আশা করতে পারে না? (মুসনাদে ইমাম আহমাদ-৪/৩৪৭, হায়াতুস সাহাবা-৩/৪৯) সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি হযরত আলীর সমালোচনা করছিল এবং মুআবিয়া (রা) বুরাইদাহর মুখ থেকে তাই শোনার আশা করছিলেন। সত্য বলা ছিল তার বিশেষ গুণ। এ ব্যাপারে তিনি বিরাট ব্যক্তিত্বকেও ভয় করতেন না।

    সাহাবা সমাজের মধ্যে বুরাইদাহর ছিল বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। তিনি রাসূলুল্লাহর সা: বহু হাদীস স্মৃতিতে সংরক্ষণ করেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা প্রায় ১৬৪। তার মধ্যে মুত্তাফাক আলাইহি, দুটি বুখারী ও ১১টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণিত হাদীসগুলির সবই সরাসরি রাসূলুল্লাহর সা: যবানীতে। তার ছাত্রদের মধ্যে পুত্র আবদুল্লাহ ‍ও সুলাইমান, এবং অন্যদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন খাযায়ী, শা’বী ও মালীহ ইবন উসামা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: তার সাথে অত্যন্ত সহজ ও সাধারণ ভাবে মিশতেন। একবার বুরাইদাহ কোথাও যাচ্ছেন, পথে রাসূল সা: এর সাথে দেখা। রাসূল সা: বুরাইদাহর হাতে হাত রেখে হাঁটতে শুরু করেন।

    বুরাইদাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমরা রাসূল সা: এর নিকট বসা ছিলাম, এমন সময় ‍কুরাইশ বংশের এক ব্যক্তি আসলো। ‍রাসূল সা: তাকে ডেকে কাছে বসালেন। লোকটি যখন যাওয়ার জন্য উঠলো, রাসূল সা: আমাকে বললেন: বুরাইদাহ, তুমি কি এ লোকটিকে চেন? বললাম: হাঁ, বংশ মর্যাদার দিক দিয়ে সে কুরাইশদের মধ্যে মধ্যম শ্রেণীর। তবে সে সর্বাধিক অর্থ সম্পদের অধিকারী। কথাটি আমি তিনবার বললাম। তারপর আমি বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ, তার সম্পর্কে আমার যা জানা আছে তাই আপনাকে জানালাম। তবে আপনি আমার চেয়ে বেশি জানেন। রাসূল সা: বললেন: কিয়ামতের দিন তার এই বৈশিষ্ট্য আল্লাহর কাছে কোন গুরুত্ববহ হবে না।

    রাসূল সা: মুখ থেকে তিনি একবার যা শুনতেন তা হুবহু পালন করার চেষ্ঠা করতেন। একবার তিনি রাসূল সা: কাছে বসে ছিলেন। রাসূল সা: বললেন: আমার উম্মাতকে ঢালের ন্যায় চওড়া ও ছোট ছোট চোখ বিশিষ্ট জাতির লোকেরা তিনবার তাড়াবে। এমনকি তাড়াতে তাড়াতে ‘জাযীরাতুল আরবের’ মধ্যে ঘিরে ফেলবে। তাদের প্রথম আক্রমণে যারা পালাবে তারা বেঁচে যাবে। দ্বিতীয় আক্রমণে কিছু বাঁচবে, কিছু মারা পড়বে! কিন্তু তৃতীয় আক্রমণে সবাই মারা পড়বে। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো: ইয়া রাসূলুল্লাহ! তারা কারা? বললেন: তুর্কী। তিনি আরও বললেন: সেই সত্তার কসম যার হাতে আমার জীবন! সেই লোকেরা তাদের ঘোড়া সমূহ মুসলমানদের মসজিদের খুঁটির সাথে বাঁধবে।

    এই ভয়াবহ ভবিষ্যদ্বাণীর পর বুরাইদাহ সর্বদা দুই তিনটি উট, সফরের পাথেয় ও পানি পান করার একটি পাত্র প্রস্তুত রাখতেন। যাতে যখনই এ সময় আসুক, এ আযাব থেকে পালাতে পারেন। (মুসনাদে ইমাম আহমাদ-৫/৩৪৭)।

    হযরত বুরাইদাহ ছিলেন আসলাম গোত্রের সরদার। হযরত রাবীয়া আল আসলামী ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা: এক সহায় সম্বলহীন খাদেম। তিনি বিয়ে করলে, রাসূল সা: বুরাইদাহকে নির্দেশ দিলেন তার মোহর আদায়ের ব্যবস্থা করতে। বুরাইদাহ চাঁদা উঠিয়ে সে নির্দেশ পালন করেন।

    তিনি ইয়াযীদ ইবন মুআবিয়ার খিলাফতকালে হিজরী ৬৩ সনে পারস্যের মারভে ইনতিকাল করেন। তিনি আবদুল্লাহ ও সুলাইমান নামে দু ছেলে রেখে যান।

  • আবু সুফইয়ান ইবন হারেস (রা)

    আবু সুফইয়ান ইবন হারেস (রা)

    মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সা: ও আবু সুফইয়ান ইবন হারেসের মধ্যে যতখানি গভীর ও শক্ত সম্পর্ক ছিল তা খুব কম লোকের সাথেই ছিল। তার দুজন একই পরিবারে একই সময়ে জন্মগ্রহণ করেন। তারা দুজন পরষ্পর চাচাতো ভাই। আবু সুফইয়ানের পিতা হারেস ইবন আবদুল মুত্তালিব ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা: বড় চাচা। তিনি ইসলাম পূর্ব যুগে মারা যান। (টীকা: সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৬৩)।

    রাসূল সা: ও আবু সুফইয়ান পরষ্পর দুধ ভাই। হযরত হালীমা আস সাদিয়্যাহ তাদের দুজনকে দুধ পান করান। রাসুল সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত তাদের দুজনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক ছিল। দুজনের চেহারার মধ্যেও যথেষ্ট মিল ছিল। ইবনুল মোবারক ইবরাহীম ইবন মুনজির প্রমূখের মতে আবু সুফইয়ানের নাম মুগীরা এবং কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু সুফইয়ান। (আল ইসাবা-৪/৯০, সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৪৭)।

    নানাদিক দিয়ে দুজনের মধ্যে এত গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে এটাই স্বাভাবিক ছিল যে, রাসূলুল্লাহর সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির সূচনালগ্নেই আবু সুফইয়ান তার ওপর ঈমান আনবেন এবং তার দাওয়াতে সাড়া দেবেন। কিন্তু যা স্বাভাবিক ছিল তা না হয়ে ঘটলো তার বিপরীত। মক্কায় রাসুল সা: ইসলামের দাওয়াত দেওয়া শুরু করতেই আবু সুফইয়ানের সব বন্ধুত্ব ও আত্মীয়তা হিংসা বিদ্বেষ, শত্রুতা ও অবাধ্যতার রূপ নিল।

    রাসুল সা: যখন দাওয়াত দিতে শুরু করেন আবু সুফইয়ান তখন কুরাইশদের একজন নামযাদা অশ্বারোহী বীর এবং একজন শ্রেষ্ঠ কবি। তিনি তার জিহবা ও তীর রাসুল সা: ও তার দাওয়াতের বিরোধিতায় নিয়োজিত করেন। ইসলাম ও মুসলমানদের শত্রুতায় তিনি তার সকল শক্তি একীভূত করেন। রাসূল সা: বিরুদ্ধে কুরাইশরা যত যুদ্ধের পরিকল্পনা করে আবু সুফইয়ান তাতে ইন্ধন যোগায়। কুরাইশদের হাতে মুসলমানরা যত রকমের কষ্টভোগ করে তাতে তার বিরাট অবদান ছিল। তিনি তার কাব্য শক্তি রাসূল সা: হিজা বা নিন্দায় নিয়োজিত করেন। রাসূল সা: এর বিরুদ্ধে তিনি একটি অশালীন কবিতাও রচনা করেন। রাসূল সা: হাসসান ইবন সাবিত (রা) তার একটি বিখ্যাত কাসীদার একটি লাইনে বলেন: তুমি নিন্দা করেছ মুহাম্মাদের, আমি জবাব দিয়েছি, এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে। মূলত: এ লাইনটি আবু সুফইয়ানের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। (আল ইসাবা-৪/৯০)

    হযরত রাসূলে কারীমের সাথে আবু সুফইয়ানের এ শত্রুতা দীর্ঘ বিশ বছর চলে। এ দীর্ঘ সময়ে আল্লাহর রাসূল সা: মুসলমানদের বিরুদ্ধে যতরকম ষড়যন্ত্র করা যেতে পারে সবই তিনি করেন। বদর যুদ্ধের ব্যাপারে তার সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ বর্ণনা সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায়। হযরত আবু রাফে বর্ণনা করেন: আমি বদর যুদ্ধের পর মক্কায় যমযম কূপের নিকট বসে তীর বানাচ্ছি, এমন সময় আবু লাহাব এসে আমার পাশে বসলো। সে কোন কারণবশত: বদরে অংশগ্রহণ না করে অন্য একজনকে নিজের পরিবর্তে পাঠিয়েছিল। তারপর আবু সুফইয়ান ইবন হারেস ইবন আবদুল মুত্তালিব এলো। আবু লাহাব তাকে কাছে বসিয়ে তার কাছে বদরের ঘটনা বিস্তারিত জানতে চায়। আবু সুফইয়ান বলে: আল্লাহর কসম, তারা ছিল এমন একটি দল যাদের কাছে আমরা আমাদের কাঁধ: সমর্পণ করেছিলাম। তারা তাদের ইচ্ছামত আমাদের পরিচালিত করে, ইচ্ছেমত আমাদের বন্দী করে। আল্লাহর কসম, এত কিছু সত্ত্বেও আমি আমাদের লোকদের তিরষ্কার করি না। কারণ, আমরা আসমান ও যমীনের মাঝে সাদা কালো উড়ন্ত অশ্বের ওপর কিছু সাদা ধবধবে আরোহী দেখতে পেয়েছি। আল্লাহর কসম, কোন কিছুই তাদের মুকাবিলা করতে সক্ষম হবে না। আবু রাফে সাথে সাথে বলে ওঠেন, আল্লাহর কসম,তারা ফিরিশতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। আবু লাহাব আবু রাফের গালে এক থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৪৬-৪৭, হায়াতুস সাহাব-৩/৫৩০)

    অবশেষে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে ইসলামের ‍সাথে আবু সুফইয়ানের শত্রুতার সমাপ্তি ঘটে। ইতিহাসে তার ইসলাম গ্রহণের কাহিনীটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে: আবু সুফইয়ান বলেন, ইসলম যখন সবল হয়ে ওঠলো এবং এ খবর ছড়িয়ে পড়লো যে, রাসূল সা: মক্কা জয়ের জন্য এগিয়ে আসছেন। তখন আমি চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলাম। আমি আপন মনে বলতে লাগলাম, এখন কোথায় যাব, কার সাথে যাব এবং কোথায় কার সাথে থাকবো?

    এসব চিন্তা ভাবনার পর আমার স্ত্রী ও পুত্র কন্যাদের কাছে গিয়ে বললাম, মক্কা থেকে বের হওয়ার জন্য তৈরী হও। মুহাম্মাদের মক্কায় প্রবেশের সময় ঘনিয়ে এসেছে। মুসলমানরা আমাকে পেলেই হত্যা করবে।

    তারা আমাকে বললো, আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন আরব-অনারব সকলেই মুহাম্মাদের আনুগত্য স্বীকার করে তার দ্বীন কবুল করছে। আর আপনি এখনও তার শত্রুতার জেদ ধরে বসে আছেন? অথচ আপনারই সর্বপ্রথম তার সাহায্য সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত ছিল। এভাবে তারা আমাকে মুহাম্মাদের দ্বীনের প্রতি উতসাহী ও আকৃষ্ট করে তুলতে লাগলো। অবশেষে আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর দুয়ার উন্মুক্ত করে দিলেন।

    আমি তক্ষুণি উঠে আমার দাস মাজকুরকে একটি উট ও একটি ঘোড়া প্রস্তুত করতে নির্দেশ দিলাম। আমার পুত্র জাফরকেও আমি সংগে নিলাম। আমরা খুব দ্রুত মক্কা মদীনার মাঝখানে ‘আবওয়া’র দিকে চললাম। আমি আগেই জেনেছিলাম মুহাম্মাদ সেখানে পৌঁছেছেন। আমি ‘আবওয়ার’ কাছাকাছি পৌঁছে ছদ্মবেশ ধারণ করলাম, যাতে কেউ আমাকে চিনে ফেলে রাসূলুল্লাহর সা: সামনে হাজির পেয়ে ইসলামের ঘোষণা দেওয়ার পূর্বে মেরে না ফেলে। আমি প্রায় এক মাইল দূর থেকে পায়ে হেটে এগুতে লাগলাম। আর দেখতে লাগলাম মুসলমানদের অগ্রগামী দলগুলি একটির পর একটি মক্কার দিকে চলছে। কেউ আমাকে চিনতে পারে এই ভয় ও আশংকায় আমি তাদের পথ থেকে একটু দূর দিয়ে এগুতে লাগলাম। এই জনস্রোতের মধ্যে হঠাত রাসূলুল্লাহ সা: আমার নজরে পড়লেন। আমি খুব ত্বরিত গতিতে তার সামনে হাজির হয়ে আমার মুখাবরণ খুলে ফেললাম। তিনি আমাকে চিনতে পেরেই আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আমি ঘুরে আবার তার সামনে গেলাম। তিনি আবারও মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। এভাবে কয়েকবার করলেন।

    আমার বিশ্বাস ছিল, আমার ইসলাম গ্রহণে রাসূল সা: অত্যন্ত খুশী হবেন। কিন্তু মুসলমানরা যখন দেখলো রাসূল সা: আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন তারাও মুখ কালো করে আমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। আবু বকর আমাকে দেখে অত্যন্ত কঠিনভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমি অত্যন্ত অসহায়ভাবে উমার ইবনুল খাত্তাবের দিকে তাকালাম। তিনিও তার সাথী অপেক্ষা অধিকর কঠোরতার সাথে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। তিনি বরং একজন আনসারীকে আমার বিরুদেধ উসকে দিলেন। সেই আনসারী আমাকে লক্ষ্য করে বললো: ওরে আল্লাহর দুশমন! তুই আল্লাহর রাসূল ও তার সাহাবীদের কষ্ট দিয়েছিস। উক্ত আনসারী উচ্চ কন্ঠে আমাকে ভর্তসনা ও গালি গালাজ করছে, আর মুসলমানরা আমার পাশে ভিড় করে অত্যন্ত নির্দয়ভাবে তা শুনে উপভোগ করছে।

    এমন সময় আমি আমার চাচা আব্বাসকে দেখলাম। আমি তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম, চাচা, আমার আশা ছিল রাসূলুল্লাহর সা: সাথে আমার আত্মীয়তা এবং আমার কাওমের মধ্যে আমার মর্যাদার কারণে তিনি আমার ইসলাম গ্রহণে খুশি হবেন। আপনি রাসূল সা: এর সাথে আমার ব্যাপারে কথা বলে তাকে একটু রাজী করান। তিনি বললেন, তোমার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন এ দৃশ্য দেখার পর আমি রাসূলুল্লাহর সা: কাছে তোমার প্রসঙ্গে একটি কথাও বলতে পারবো না। তবে, যদি কখনও সুযোগ আসে বলবো। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহকে যেমন সম্মান করি তেমন ভয়ও করি।

    আমি বললাম, চাচা, আমাকে তাহলে কার দায়িত্বে ছেড়ে দিচ্ছেন?

    তিনি বললেন, এই মাত্র তুমি যা শুনলে তার অতিরিক্ত আমি কিছুই করতে পারবো না। দুশ্চিন্তা ও দূর্ভাবনায় আমার অন্তর ভরে গেল। হঠাত আমি আমার চাচাতো ভাই আলী ইবন আবু তালিবকে দেখলাম। বিষয়টি আমি তাকে বললাম। তিনিও চাচা আব্বাসের মত জবাব দিলেন, আমি আবার চাচা আব্বাসের কাছে গিয়ে বললাম, চাচা যদি আপনি আমার প্রতি রাসূলুল্লাহর অন্তর নরম করতে না পারেন, তাহলে এতটুকু অন্তত: লক্ষ্য করুন, যে লোকটি আমাকে নিন্দা করছে ও গালি দিচ্ছে এবং মানুষকে আমার প্রতি ক্ষেপিয়ে তুলছে, তাকে একটু ঠেকান। তিনি বললেন, লোকটি কেমন- একটু বর্ণনা দাওতো। আমি বর্ণনা দিলাম। তিনি বললেন, সে তো নুয়াইমান ইবনুল হারেস আন নাজ্জারী। তিনি নুয়াইমানের কাছে গিয়ে বললেন, শোন নুয়াইমান! আবু সুফইয়ান হচ্ছে রাসূলুল্লাহর চাচাতো ভাই এবং আমার ভাতিজা। যদিও আজ রাসূলুল্লাহ তার প্রতি নারাজ, তবে একদিন তিনি রাজী হয়ে যাবেন। সুতরাং তাকে এভাবে লাঞ্ছিত করো না। এভাবে বার বার তাকে বুঝালেন। অবশেষে নুয়াইমান রাজী হয়ে গেলেন এবং বললেন, এই মুহুর্তের পর থেকে আমি আর তাকে কটু কথা বলবো না।

    রাসূলুল্লাহ সা: মক্কা মদীনার পথে ‘জাহফাহ’ নামক স্থানে অবতরণ করলেন। আমি রাসূল সা: এর তাঁবুর দরযায় গিয়ে বসলাম, আর আমার ছেলে জাফর আমার পাশে দাড়িয়ে থাকলো। রাসূল সা: বের হওয়ার সময় আমাকে দেখে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। আমি কিন্তু এতেও হতাশ হলাম না। এভাবে তিনি যখন যেখানে অবতরণ করতে লাগলেন আমি আমার ছেলেকে নিয়ে তার তাঁবুর দরযায় গিয়ে বসতে ‍লাগলাম। আর রাসূল সা: ও একই আচরণ করে যেতে লাগলেন। এভাবে কিছুকাল চললো। আমি খুব কষ্ট পেতে লাগলাম। দুনিয়াটা আমার জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়লো।

    ইবন ইসহাক বলেন: আবু সুফইয়ান হারেস ও আবদুল্লাহ ইবন আবী উমাইয়্যা ‘নীকুল উকাব’ নামক স্থানে (মক্কা মদীনার পথে) আবার রাসুল সা: এর সাথে সাক্ষাতের আবেদন জানালেন। হযরত উম্মু সালামা তাদের সম্পর্কে বললেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার চাচাতো ভাই ও ফুফাতো ভাই দুজন এসেছে সাক্ষাত করতে। রাসূল সা: বললেন: তাদের আর কোন প্রয়োজন আমার নেই। আমার চাচাতো ভাই আমার সম্মান নষ্ট করেছে, আর ফুফাতো ভাই- সে আমাকে মক্কায় যা বলার বলেছে। আবু সুফইয়ানের সাথে তার পুত্র জাফরও ছিল। যখন রাসূল সা: এর এ কথা তার কানে পৌঁছলো, আবু সুফইয়ান বললেন: আল্লাহর কসম, হয় তিনি আমাকে সাক্ষাতের অনুমতি দেবেন নয়তো আমি আমার এ ছেলের হাত ধরে যমীনের যে দিকে ইচ্ছা চলে যাব এবং ক্ষুধা তৃষ্ণায় ‍মৃত্যুবরণ করবো। এ কথা যখন রাসূল সা: শুনলেন, তিনি একটু নরম হলেন এবং তাদেরকে সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। তারা দুজন রাসূল সা: এর নিকট পৌছে ইসলামের ঘোষণা দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪০০-৪০১)।

    আবু সুফইয়ান বলেন: রাসূল সা: মক্কায় প্রবেশ করেন এবং আমি ও তার কাফিলার সাথে মক্কায় প্রবেশ করলাম। তিনি মসজিদে যাওয়ার জন্য বের হলেন, আমি তার সাথে সাথে চললাম। মুহুর্তের জন্যও তার পিছু ছাড়লাম না।

    অত:পর হুনাইন অভিযানের সময় ঘনিয়ে এলো। সমগ্র আরববাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিল। এবার তারা ইসলাম ও মুসলমানদের একটা কিছু করেই ছাড়বে। রাসূল সা: তার বাহিনী নিয়ে তাদের মুকাবিলার জন্য বের হলেন। আমিও চললাম। আমি কাফিরদের বিশাল বাহিনী দেখে মনে মনে বললাম: আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহর প্রতি অতীতের সকল শত্রুতার প্রতিদান আজ আমি দেব: আজ আমি আমার কাজের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সা: কে খুশী করবো।

    দুই বাহিনী মুখোমুখি হলো। কাফিরদের তীব্র আক্রমণে মুসলমানরা ঠিকতে না পেরে ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করলো। আমি তখন দেখলাম রাসূল সা: ময়দানের মাঝখানে তার ‘শাহবা’ খচ্চরের উপর পাহাড়ের মত অটল আছেন। তিনি প্রচণ্ড বেগে তরবারি চালিয়ে নিজেকে ও আশেপাশের সংগীদের রক্ষা করছেন। তখন তাকে সিংহের মত সাহসী মনে হচ্ছিল। এ দৃশ্য দেখে আমি আমার ঘোড়ার উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে উন্মুক্ত তরবারি হাতে রাসূল সা: এর দিকে ছুটলাম। আল্লাহই জানেন, আমি তখন রাসূল সা: সামনে মৃত্যুর আশা করছিলাম। আমার চাচা আব্বাস রাসূলুল্লাহর সা: খচ্চরের লাগাম ধরে তার এক পাশে, আর আমি অন্য পাশে দাড়ালাম। আমি বাঁ হাতে রাসূল সা: বাহন এবং ডান হাতে তরবারি ধরে তীব্র আক্রমণ চালালাম। এ দৃশ্য দেখে রাসূল সা: চাচা আব্বাসকে জিজ্ঞেস করেন: এ কে? চাচা বললেন: আপনার ভাই, আপনার চাচার ছেলে- আবু সুফইয়ান ইবন হারেস। ইয়া রাসূল সা: আপনি তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। রাসূল সা: বললেন: আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। আমার প্রতি তার সকল শত্রুতা আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।

    আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লাম এবং রাসূল সা: পায়ে চুমু খেলাম। তিনি আমার দিকে ফিলে বললেন: আমার ভাই, সামনে এগিয়ে যাও, আক্রমণ কর। রাসূল সা: এর এই কথায় আমার সাহস বেড়ে গেল। আমি তীব্র আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষ বাহিনীকে তাদের স্থান থেকে হটিয়ে দিলাম। আমার সাথে অন্য মুসলিমরাও আক্রমণ চালালো। আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে প্রায় এক ফারসাখ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে গেলাম।”

    আবু সুফইয়ান ইবন হারেস এই ‍হুনাইনের ময়দান থেকে রাসূল সা: সন্তুষ্টি ও সাহচর্য লাভে ধন্য হন। তবে জীবনে আর কখনো রাসূলুল্লাহর সা: প্রতি চোখ উঁচু করে তাকিয়ে দেখেননি। অতীত আচরণের কথা মনে করে লজ্জা ও অনুশোচনায় রাসূল সা: চেহারা মুবারকের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে সাহস পাননি।

    ইসলাম গ্রহণের পর আবু সুফইয়ান তার অতীত জাহিলী জীবনের কাজ ও আচরণ এবং আল্লাহর কিতাব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা চিন্তা করে অনুশোচনায় জর্জরিত হয়েছেন। পরবর্তী জীবনে রাত দিন শুধু কুরআন তিলাওয়াত, কুরআনের বিধি বিধান ও উপদেশাবলী অনুধাবনে অতিবাহিত করতেন। তিনি দুনিয়ার সকল সুখ সম্পদ হতে দূরে থেকে নিজের সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একীভূত করে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হয়ে পড়েন। একদিন তিনি মসজিদে ঢুকছেন। রাসূল সা: তাকে দেখে হযরত আয়িশাকে ডেকে বলেন: আয়িশা, এ লোকটিকে তুমি চেন? আয়িশা বললেন: না, ইয়া রাসূলুল্লাহ। রাসূল সা: বললেন: এ হচ্ছে আমার চাচাতো ভাই আবু সুফইয়ান ইবন হারেস। দেখ, সে সবার আগে মসজিদে ঢোকে, আর সবার পরে মসজিদ থেকে বের হয়। তার জুতোর ফিতে থেকে তার দৃষ্টি কখনও অন্যদিকে যায় না।

    হযরত রাসূলে কারীমের ইনতিকালের পর আবু সুফইয়ান সন্তান হারা মায়ের মত ভীষণ কান্নাকাটি করেন। একটি কাসীদায় তার সেই বিয়োগ ব্যথা অতি চমতকার রূপে ফুটিয়ে তোলেন। ইসলাম গ্রহণের পর আবু সুফইয়ান তখনকার স্বীয় অনুভূতি ব্যক্ত ও ক্ষমা প্রার্থনা করে একটি স্বরচিত কাসীদা রাসূল সা: কে পাঠ করে শোনান। কাসীদার একটি লাইনে তিনি যখন বলেন:‘তিনি আমাকে সত্যের পথ দেখিয়েছেন যাকে আমি বিতাড়িত করেছিলাম’ তখন রাসূল সা: তার বুকে থাপ্পড় মেরে বলে ওঠেন: তুমিই আমাকে বিতাড়িত করেছিলে।’ (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪০০-৪০১)

    হযরত উমারের খিলাফতকালে আবু সুফইয়ান অনুভব করেন, তাঁর জীবন-সন্ধা ঘনিয়ে এসেছে। তিনি একদিন নিজ হাতে একটি কবর খোঁড়েন। এর তিনদিন পর তিনি এই দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। মৃত্যুর সাথে তার যেন একটি চুক্তি ছিল। মৃত্যুর পূর্বে স্ত্রী, সন্তান ও পরিবারের লোকদের বলেন: ‘তোমরা আমার জন্য কেদোঁনা। আল্লাহর কসম, ইসলাম গ্রহণের পর আমি কোন পাপ কাজ করিনি।’ এতটুকু বলার পর তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। খলীফা উমার তার জানাযার ‍নামায পড়ান। তার মৃত্যুসন হিজরী ১৫ মতান্তরে হিজরী ২০। হিশাম ইবন উরওয়াহ পিতা উরওয়াহ থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল সা: বলেন: আবু সুফইয়ান জান্নাতের অধিবাসী যুবকদের নেতা। (আল ইসাবা-৪/৯০)।