Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • উকাশা ইবন মিহসান (রা)

    উকাশা ইবন মিহসান (রা)

    নাম উকাশা বা উককাশা, কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু মিহসান। পিতা মিহসান ইবন হুরসান। জাহিলী যুদে বনী আবদে শামসের হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। হিজরতের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অন্যদের সাথে মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে যান। (উসুদুল গাবা-৪/২)।

    বদর যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য দারুণ নাম করেন। এ যুদ্ধে তার হাতের তরবারিটি ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। রাসুল সা: তাকে একটি খেজুরের ছড়ি দান করেন এবং তা দিয়েই তিনি সূচালো ছুরির মত শত্রুর ওপর আক্রমণ চালান। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তিনি এ ছড়ি দিয়েই লড়ে যান। (ইসতীয়াব) ইবন সাদ যায়িদ ইবন আসলাম ও অন্যদের থেকে বর্ণনা করছেন: বদরের দিন উকাশা ইবন মিহসানের অসিটি ভেঙ্গে যায়। রাসূল সা: তাকে একটি কাঠের লাঠি দেন। সেটি তার হাতে স্বচ্ছ ঝকমকে কঠিন লোহার তীক্ষ অসিতে পরিণত হয়। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৫৮)।

    উহুদ, খন্দক, সহ সকল প্রসিদ্ধ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তিনি চরম বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। হিজরী সপ্তম সনের রাবীউল আউয়াল মাসে বনী আসাদের মুলোতপাটনের জন্য তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মদীনার পথে ‘গামার’ কূপের আশে পাশে ছিল এই বনী আসাদের বসতি। তিনি চল্লিশ জনের একটি বাহিনী নিয়ে দ্রুত সেখানে গিয়ে ‍হাজির হন। কিন্তু বনী আসাদের লোকেরা ভয়ে আগে ভাগেই সে স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র পালিয়ে যায়। উকাশা কাউকে না পেয়ে তাদের পরিত্যক্ত দুশো উট ও কিছু ছাগল বকরী হাকিয়ে নিয়ে মদীনায় ফিরে ‍আসেন।

    হিজরী ১২ সনে প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রা) হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে ভন্ডনবী তুলাইহা আসাদীর বিদ্রোহ নির্মূলের নির্দেশ দেন। হযরত উকাশা ও হযরত সাবিত ইবন আরকাম ছিলেন হযরত খালিদের বাহিনীর দুজন অগ্র সৈনিক। তারা বাহিনীর আগে আগে চলছিলেন। হঠাত শত্রু সৈন্যর সাথে ‍তাদের সংঘর্ষ ঘটে। এই শত্রু সৈনিকদের মধ্যে তুলাইহা নিজে ও তাঁর ভাই সালামাও ছিল। তুলাইহা আক্রমণ করে উকাশাকে, আর সালামা ঝাপিয়ে পড়ে সাবিতের ওপর। সাবিত শাহাদাত বরণ করেন। এমন সময় তুলাইহা চেচিয়ে ওঠে সালামা শিগগির আমাকে সাহায্য কর। আমাকে মেরে ফেললো। সালামার কাজ তখন শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে তুলাইহার সাহায্যে এগিয়ে যায় এবং দুই ভাই এক সাথে উকাশাকে আক্রমণ করে ধরাশায়ী করে ফেলে। এভাবে উকাশা শহীদ হন।

    ইসলামী ফৌজ এই দুই শহীদের লাশের কাকে পৌঁছে ভীষণ শোকাতুর হয়ে পড়ে। হযরত উকাশার দেহে মারাত্মক যখমের চিহ্ন ছিল। তার সারা দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। বাহিনী প্রধান হযরত খালিদ ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাহিনীর যাত্রা বিরতির নির্দেশ দেন। অত:পর শহীদ দু য়ের রক্ত ভেজা কাপড়েই দাফন দিয়ে সেই মরুভূমির বালুতে দাফন করেন।

    মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনি নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের মধ্যে শামিল ছিলেন। (উসুদুল গাবা-৪/৩)

    হযরত রাসূলে কারীম সা: একবার বলেন, সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। উকাশা প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি? বললেন, তুমিও তাদের মধ্যে। অত:পর দ্বিতীয় এক ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তখন রাসূল সা: বললেন, উকাশা তোমার থেকে এগিয়ে গেছে। এই ঘটনার পর রাসুল সা: এর এই বাক্যটি প্রবাদে পরিণত হয়। কেউ কোন ব্যাপারে কাউকে ছাড়িয়ে গেলে বলা হয়, অমুক উকাশার মত এগিয়ে গেছে।

  • আবু রাফে (রা)

    আবু রাফে (রা)

    হযরত আবু রাফে’র (রা) প্রকৃত নামের ব্যাপারে প্রচুর মতভেদ দেখা যায়। যেমন: ইবরাহীম, আসলাম, সিনান, ইয়াসার, সালেহ, আবদুর রহমান, কারমান, ইয়াযীদ, সাবেত, হুরমুয ইত্যাদি। এর মধ্যে আসলাম নামটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। (আল ইসাবা-৪/৬৭) আবু রাফে তার কুনিয়াত বা ডাকনাম। বংশ কৌলিন্যের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমত করার সৌভাগ্য তার হয়েছিল। রাসুল সা: তাকে স্বীয় পরিবারের মধ্যে শামিল করে নেন। এর বেশি খান্দানী শরাফত কোন মানুষের জন্য আর হতে পারে ‍না। আসলে তিনি ছিলেন একজন হাবশী দাস।

    হযরত আবু রাফে প্রথম হযরত আব্বাসের (রা) দাস ছিলেন। তিনি রাসুল সা:কে হিবা বা দান করেন। পরে হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত আব্বাসের (রা) ইসলাম গ্রহণের খুশীতে আবু রাফেকে আযাদ করে দেন।

    তার ইসলাম সম্পর্কে বলা হয়েছে, হযরত রাসূলে পাকের সা: পবিত্র মুখমন্ডলের দীপ্তি দেখে যারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন, আবে তাদের অন্যতম। এ সম্পর্কে আবু রাফে নিজেই বলছেন: একবার কুরাইশরা আমাকে ‍তাদের কোন একটি কাজে রাসুল সা: এর নিকট পাঠায়। রাসুল সা: কে দেখা মাত্র আমার অন্তর ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুল সা: আমি আর ফিরে যাব না। তিনি বললেন: ‘আমি কাসেদ বা দূতকে ঠেকিয়ে রাখিনা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না। এখন তুমি ফিরে যাও। এভাবে যদি কিছু দিন তোমার অন্তরে ইসলামের প্রতি আবেগ বিদ্যমান থাকে তাহলে চলে এসো। তখনকার মত তো তিনি ফিরে গেলে এবং কিছুদিন পর আবার ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।

    হযরত আবু রাফে অত্যাচারী কুরাইশ শক্তির ভয়ে বদর যুদ্ধ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখেন। বদর যুদ্ধ সবে মাত্র শেষ হয়েছে এমন সময় একদিন তিনি কাবার পাশে যমযম কুয়োর ঘরে বসে তীর তৈরী করছেন। হযরত আব্বাসের স্ত্রী তার পাশেই বসা। এ সময় নরাধম আবু লাহাব সেখানে এসে বসে। আবু লাহাব তার কাছে বদর যুদ্ধের অবস্থা জিজ্ঞেস করতে লাগলো। উল্লেখ্য যে, আবু লাহাব বদর যুদ্ধে নিজে যোগদান না করে প্রতিনিধি হিসাবে আস ইবন হিশামকে পাঠায়। আবু লাহাবের জিজ্ঞাসার জবাবে আবু সুফইয়ান বললো: তুমি কি জিজ্ঞেস করছো, মুসলমানরা আমাদের সকল শক্তি চুরমার করে দিয়েছে, অনেককে হত্যা ও বহু লোককে বন্দী করেছে। এ প্রসঙ্গে এক অভিনব কাহিনী বলা হয় যে, ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত ‍সাদা কালো পোশাকের অশ্বারোহীতে পরিপূর্ণ ছিল। তার এ কথা শুনে আবু রাফে অকস্মাৎ বলে ওঠেন, তারা ফিরিশতা। আর যায় কোথায়! সঙ্গে সঙ্গে আবু সুফইয়ান আবু রাফের গালে প্রচণ্ড থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আবু রাফে আঘাতটা সামলে নিয়ে রুখে দাড়ান; কিন্তু তিনি ছিলেন দূর্বল। আবু লাহাব তাকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং বুকের ‍উপর উঠে বসে আচ্ছামত মার দেয়। হযরত আব্বাসের স্ত্রী এ অত্যাচার দেখে সহ্য করতে পারলেন না। তিনি একটি খুটি তুলে নিয়ে নরপশু আবু লাহাবের মাথায় কষে মারলেন এক বাড়ি। পাপাচারী আবু লাহাবের মাথা কেটে গেল। হযরত আব্বাসের স্ত্রী তখন বলতে লাগলেন, আবু রাফে’র মনিবের অনুপস্থিতির সুযোগে তাকে দুর্বল মনে করে মারছো? এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর ‘আদাসী’ (বসন্ত) নামক রোগে আবু লাহাবের মৃত্যু হয়। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৩০-৩১)।

    তাবরানী ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুল সা: হিজরাতের পঞ্চম বছরে আমরা রাসুল সা: এর সাথে মিলিত হই। সেটা ছিল আহযাব যুদ্ধের সময়। আমি ছিলাম আমার ভাই ফদল ইবন আব্বাসের সাথে। আমাদের সাথে আমাদের গোলাম আবু রাফেও ছিল। মদীনায় পৌঁছে আমরা রাসুল সা:কে খন্দকের মধ্যে পেলাম। এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, আবু রাফে হিজরী ৫ম সনে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭৩)।

    তবে ইবন হিশাম হযরত আয়িশার (রা) একটি বর্ণনা নকল করেছেন। হযরত আয়িশা (রা) বলেছেন, রাসুল সা: মদীনায় হিজরাতের কিছুদিন পর একটু স্থির হয়ে আমাদেরকে নেওয়ার জন্য যায়িদ ইবন হারিসা ও আবু রাফেকে মদীনা থেকে মক্কায় পাঠান। (সীরাতু ইবন হিশাম)

    এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় আবু রাফে ৫ম হিজরীর পূর্বেই মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে বসবাস করতে থাকেন।

    একমাত্র বদর যুদ্ধ সম্পর্কে আবু রাফে বর্ণনা করেন: আমরা আলীর নেতৃত্বে খাইবারে গেলাম। রাসুল সা: স্বীয় পতাকা আলীর হাতে দিয়ে খাইবারে পাঠান। আমরা দূর্গের কাছাকাছি গেলে দূর্গবাসীরা বের হয়ে এসে আমাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করলো। আলী দূর্গের একটি দরযা ছিড়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সেটা তার হাতে ছিল। তারপর ফেলে দেন। আমরা আটজন প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেটা উল্টাতে সক্ষম হইনি। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৪৬)।

    হিজরী সপ্তম সনে রাসুল সা: হুদাইবিয়ার সন্ধির চুক্তি অনুযায়ী মক্কায় গিয়ে ‘উমরাতুল কাদা’ আদায় করেন। আবু রাফে এই সফরেও রাসুল সা: সঙ্গী ছিলেন। এই সফরে মক্কায় অবস্থানকালে রাসুল সা: এর সাথে হযরত মায়মুনার শাদী মুবারক অনুষ্ঠিত হয়। মক্কায় অবস্থানের মেয়াদ শেষ হলে হযরত রাসূলে কারীম সা: আবু রাফেকে মক্কায় রেখে ‘সারফে’ চলে যান। পরে আবু রাফে হযরত মায়মুনাকে (রা) নিয়ে ‘সারফে’ পৌঁছেন এবং সেখানেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। তারপর সকলে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৭২)।

    হযরত রাসূলে রাসূলে কারীম সা: হযরত আলী (রা) নেতৃত্বে যে বাহিনীটি ইয়ামনে পাঠান তাতে আবু রাফেও ছিলেন। হযরত আলী (রা) নিজের অনুপস্থিতিতে আবু রাফে কে বাহিনীর নেতৃত্ব দান করেন।

    ইসলাম দাস তথা দূর্বল শ্রেণীর লোকদের উন্নতির যে সুযোগ দান করেছে, আবু রাফে তার উজ্জল দৃষ্টান্ত। তিনি দাস ছিলেন, তবে মর্যাদা ও যোগ্যতায় ছিলেন আযাদ লোকদের সমকক্ষ। হাদীসের গ্রন্থসমূহে তার বর্ণিত ৬৮টি হাদীস পাওয়া যায়। তার মধ্যে একটি ইমাম বুখারী ও তিনটি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

    দাসত্ব থেকে মুক্তির পরও তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমতের গৌরব হাতছাড়া করেননি। এ কারণে রাসুল সা: প্রাত্যাহিক ক্রিয়াকলাপ ও অভ্যাস সম্পর্কে তার জানা ছিল অনেক। বিশিষ্ট সাহাবীরা এ বিষয়ে তার কাছে জানার জন্য ভিড় করতেন। হযরত ইবন আব্বাস (রা) একজন সেক্রেটারী সংগে করে তার কাছে আসতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, রাসুল সা: অমুক অমুক দিন কি কি কাজ করতেন? আবু রাফে বলতেন আর সেক্রেটারী তা লিখে নিতেন। (আল ইসাবা-৪/৯২)।

    রাসুলুল্লাহ সা: তাকে আযাদ করে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেই রাসুল সা: এর খিদমতে আবদ্ধ থাকেন। রাসূল সা: যখন তাকে মুক্তি দেন, তখন আবু রাফের দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। লোকেরা তাকে বলে, দাসত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছ, এতে কান্নার কি আছে! তিনি বললেন, আজ একটি সোয়াব আমার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এরপর থেকে যদিও তিনি আইনগত মুক্ত বা স্বাধীন হয়ে যান, তবে রাসুল সা: এর খিদমতের মর্যাদা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকেন। সফরের সময় রাসুল সা: তার তাঁবু তিনিই তৈরী করতেন। রাসুল সা: এর সাথে তার এই গোলামীর সম্পর্কটা এত মধুর ও প্রিয় ছিল যে, আমরণ তিনি রাসুল সা: গোলাম বা দাস বলে নিজের পরিচয় দিতেন।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: এক সাহাবী নাওফিল ইবন হারিসকে এক মহিলার সাথে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর খাওয়ার মত কোন কিছু তার কাছে চাইলেন; কিন্তু পেলেন না। তখন রাসূল সা: স্বীয় বর্মটি আবু রাফে ও আবু আইয়ুবের হাতে দিয়ে বিক্রির জন্য পাঠালেন। তার বর্মটি এক ইয়াহুদীর নিকট বন্ধক রেখে তিরিশ সা’ যব নিয়ে রাসুল সা: এর নিকট পৌঁছলেন। রাসূল সা: যবগুলি নাওফিলের হাতে তুলে দিলেন। নাওফিল বলেন, আমরা সেই যবগুলি অর্ধ বছর খেয়েছিলাম। তারপর ওজন করে দেখলাম তা মোটেই কমেনি, পূর্বের মতই আছে। এ কথা রাসুল সা: কে বললে তিনি মন্তব্য করলেন, যদি ওজন না করতে তাহলে সারা জীবন খেতে পারতে। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৩০)।

    হযরত আবু রাফে জীবনের এক পর্যায়ে দারুণ অভাব ও অর্থ কষ্টে পড়েন। এমনকি মানুষের কাছে হাত পেতে সাদকা ও সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তবে কক্ষণো প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করেননি। তার জীবনের এ পর্যায় সম্পর্কে রাসুল সা: ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। আবু রাফে বলছেন একদিন রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘ওহে আবু রাফে’, যখন তুমি দরিদ্র হয়ে যাবে তখন কেমন হবে? আবু রাফে বললেন, আমি কি সে অবস্থায় সাদকা গ্রহণ করবো? রাসূল সা: বললেন: হা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার ‍দারিদ্র কখন আসবে? বললেন, আমার মৃত্যুর পরে। বর্ণনাকারী আবু সুলাইম বলেন, আমি তাকে দরিদ্র অবস্থায় দেখেছি। পথের ধারে বসে তিনি বলতেন, অন্ধ বৃদ্ধকে কে সাদকা করতে চায়, কে সেই ব্যক্তিকে দান করতে চায় যাকে রাসুলুল্লাহ সা: বলে গেছেন যে, সে ভবিষ্যতে দরিদ্র হবে? তিনি আরও বলে গেছেন, ধনী ব্যক্তির জন্য সাদকা গ্রহণ বৈধ নয় এবং বৈধ নয় সুস্থ্য ব্যক্তির জন্যও। আবু সুলাইম বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে আবু রাফেকে চারটি দিরহাম দান করলো। কিন্তু তিনি একটি দিরহাম ফেরত দিলেন। লোকটি বলল, আবদুল্লাহ, আমার দান আপনি ফেরত দেবেন না। আবু রাফে বললেন রাসুল সা: আমাকে অতিরিক্ত সম্পদ জমা করতে নিষেধ করেছেন। আবু সুলাইম আরও বলেন, আমি শেস পর্যন্ত আবু রাফেকে ধনী ব্যক্তি হিসেবে দেখেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, আফসুস, আবু রাফে যদি দরিদ্র অবস্থায় মারা যেত! (হায়াতুস সাহাবা-২২৫৩-৫৪) ওয়াকেদীর মতে হযরত আলীর খিলাফতকালে মদীনায় ইনতিকাল করেন। (আল ইসাবা-৪/৬৭)।

  • উবাইদাহ ইবনুল হারিস (রা)

    উবাইদাহ ইবনুল হারিস (রা)

    নাম উবাইদাহ, কুনিয়াত আবুল হারিস বা আবু মুআবিয়া। পিতা আল হারিস এবং মাতা সুখাইলা। দাদা আব্দুল মুত্তালিব ইবন আবদে মান্নাফ। কুরাইশ গোত্রের সন্তান।

    উবাইদাহ ইবনুল হারিস, আবু সালামা ইবনে আবদিল আসাদ, আল আরকাম ইবন আবিল ‍আরকাম এবং উসমান ইবন মাজউন হযরত আবু বকরের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে এক সাথে ঈমান আনেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তখন আল আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে আশ্রয় নেননি। হযরত উবাইদাহ যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি বনী আবদে মান্নাফের একজন নেতা। মক্কায় হযরত বিলালকে তিনি দ্বীনী ভাই হিসাবে গ্রহণ করেন।

    মদীনায় হিজরাতের নির্দেশ হলো। হযরত উবাইদাহ তার দুই ভাই তুফাইল, হুসাইন এবং মিসতাহ ইবন উসাসাহকে সাথে করে মদীনায় রওয়ানা হলেন। পথে মিসতাহ হাঁটা চলা করতে একেবারে অক্ষম হয়ে পড়লেন। অগ্রগামী কাফিলার লোকেরা খবর পেয়ে ফিরে এসে তাকে উঠিয়ে মদীনায় নিয়ে যান। মদীনায় হযরত আবদুর রহমান আজলানী (রা) তাদের স্বাগত জানান এবং অত্যন্ত যত্নের সাথে তাদের আতিথেয়তা করেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা: মদীনায় আগমনের পর পর হযরত উমাইর ইবন হুমাম আল আনসারীর সাথে তার ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথকভাবে বসবাসের জন্য রাসূল সা: তাকে এক খন্ড জমিও দান করেন। তার পুরো খান্দান সেখানে বসতি স্থাপন করে।

    মক্কার মুশরিকদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য হিজরাতের আট মাস পরে ৬০ জন মুহাজিরের একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে রাসূল সা: তাকে রাবেগের দিকে পাঠান। ইসলামের ইতিহাসে এটা ছিল দ্বিতীয় অভিযান। রাসুল সা: এ বাহিনীর ঝান্ডা উবাইদার হাতে সমর্পণ করেন। তারা রাবেগের নিকটে পৌঁছলে আবু সুফইয়ানের নেতৃত্বে দুশো মুশরিকের একটি বাহিনীর সাথে তাদের সামান্য সংঘর্ষ হয়। ব্যাপারটি যুদ্ধ ও রক্তপাত পর্যন্ত না গড়িয়ে কিছু তীর ও বর্শা ছোঁড়াছুড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

    এ ঘটনার পর তিনি হক ও বাতিলের প্রথম সংঘর্ষ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কাতারবন্দী হওয়ার পর মুশরিকদের পক্ষ থেকে উতবা. শাইবা ও ওয়ালীদ বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলতে থাকে- আমাদের সাথে লড়বার কেউ আছে কি? ইসলামী ফৌজ থেকে কয়েকজন নওজোয়ান আনসারী এগিয়ে গেলেন। তখন তারা চেঁচিয়ে বললো: ‘মুহাম্মাদ, আমরা অসম লোকদের সাথে লড়তে পারিনে। আমাদের যোগ্য প্রতিদ্বন্ধীদের পাঠাও।’ রাসূল সা: আলী, হামযা, ও উবাইদাহকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিনে। তারা এ আদেশের অপেক্ষায় ছিলেন। এ তিন বীর আদেশ পাওয়া মাত্র আপন আপন নিযা দোলাতে দোলাতে তিন প্রতিপক্ষের সামনে গিয়ে দাড়ালেন। হযরত উবাইদাহ ও ওয়ালীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় লড়াই চললো। তারা দুজনই মারাত্মক যখম হলেন। তবে আলী ও হামযা উভয়েই প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে ফেলেছিলেন। তারা এক সাথে ওয়ালীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করেন এবং হযরত উবাইদাহকে রণাঙ্গণ থেকে আহত অবস্থায় তুলে নিয়ে আসেন।

    হযরত উবাইদাহর একটি পা হাঁটুর নীচ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি আপাদমস্তক রক্তে রঞ্জিত হয়ে পড়েন। রাসুল সা: তাকে সান্তনা দেওয়ার জন্য তার হাটুর ওপর স্বীয় মাথাটি রেখে দেন। এ অবস্থায় উবাইদাহ বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ,এ সময় আবু তালিব জীবিত থেকে আমার এ অবস্থা দেখলে তার প্রত্যয় হতো যে, তার এ কথা বলার অধিকতর যোগ্য ব্যক্তি আমি। এই বলে তিনি আবু তালিবের একটি কবিতার এই পংক্তি আবৃত্তি করেন, “আমরা মুহাম্মাদের হিফাজত করবো। এমনকি চারপাশে মরে পড়ে থাকবো এবং আমাদের সন্তান ও স্ত্রীদের আমরা ভুলে যাব।” (সীরাতু ইবন হিশাম-২)

    যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সা: তাকে সাথে করে মদীনার দিকে রওয়ানা হন। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। পথে ‘সাফরা’ নামক স্থানে ৬৩ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। সাফরার বালুর মধ্যে তাকে দাফন করা হয়।

    হযরত রাসূলে কারীমের কাছে তার উচু মর্যাদা ছিল। রাসূল সা: তাকে অত্যন্ত সম্মান দেখাতেন। একবার রাসূল সা: ‘সাফরায়’ তার কবরের কাছে তাবু স্থাপন করেন। সাহাবীরা আরজ করেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ এখান থেকে মিশকের ঘ্রাণ আসছে। তিনি বললেন: এখানে তো আবু মুআবিয়ার কবর ছিল। সুতরাং আশ্চর্য হওয়ার কি আছে?”

    হযরত উবাইদার (রা) মৃত্যুতে হিন্দা বিনতু উসাসা ও কাব সহ বহু কবি শোকগাথা রচনা করেছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/২৪, ২৫, ৪১)।

  • হাকীম ইবন হাযাম (রা)

    হাকীম ইবন হাযাম (রা)

    নাম হাকীম, ডাক নাম আবু খালিদ। পিতা হাযাম ইবনে খুওয়াইলিদ, মাতা যয়নাব মতান্তরে সাফিয়্যা। হাকীম নিজেই বলছেন: আমি ‘আমুল ফীল’ (হস্তী বৎসর) অর্থাত আবরাহার কাবা আক্রমণের তের বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করি। ওয়াকিদী বলেন: হাকীমের জন্ম রাসূলুল্লাহর সা: জন্মের পাঁচ বছর পূর্বে। তার পিতা হাযাম ফিজার যুদ্ধে মারা যায়। তিনি নিজেও এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুবাইর ইবন বাকার বলেন: হাকীম কাবার অভ্যন্তরে জন্ম গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-১/৩৪৯)।

    ইতিহাস বলছে, তিনি আরবের একমাত্র সন্তান যে কাবার অভ্যন্তরে ভূমিষ্ট হয়েছে। তার মা কয়েকজন বান্ধবী সহ কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেদিন কোন এক বিশেষ উপলক্ষ্যে কাবার দরযা খোলা ছিল। সে সময় তার মা ছিলেন গর্ভবতী। আল্লাহর ইচ্ছায় সেখানে ‍তার প্রসব বেদনা ওঠে, তিনি বের হওয়ার সময় পেলেন না। একটি চামড়া বিছিয়ে দেওয়া হলো। তিনি একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন। তার নাম ‍রাখা হয় হাকীম ইবন হাযাম। উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ তার ফুফু।

    হাকীম মক্কার এক সম্পদশালী অভিজাত পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন অতিশয় ভদ্র ও বুদ্ধিমান। কুরাইশরা তাকে নেতা হিসাবে বরণ করে নেয়। জাহিলী যুগে আরবে যারা মক্কায় আগত হাজীদের দেখাশুনা করতো, আহার করাতো, তাদের বলা হতো ‘মুতয়িম’ অর্থাত যে আহার করায়- হাকীমও ছিলেন মক্কার এক অন্যতম ‘মুতয়িম’। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৬৪-৬৫)।

    জাহিলী যুগে যারা ‍আল্লাহর ঘর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কায় এসে দূর্দশায় পড়তো তিনি নিজের অর্থ দিয়ে তাদের সাহায্য করতেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা: অন্তরঙ্গ বন্ধু। বয়সে রাসুলুল্লাহর সা: বড় হওয়া সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহকে ভালোবাসতেন, তার সাহচর্যকে মূল্যবান মনে করতেন। অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহও তাকে ভালোবাসতেন এবং তাকে সঙ্গ দিতেন।

    অত:পর হযরত খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদের সাথে রাসুলুল্লাহর সা: বিয়ে এবং রাসুলুল্লাহর সা: সাথে ‍হাকীমের আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে তাদের পুরাতন সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। তবে খুব বিস্ময়ের ব্যাপার যে, দুজনের মধ্যে এত গভীর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মক্কা বিজয়ের পূর্ব দিন পর্যন্ত তিনি রাসুলুল্লাহর সা: ওপর ঈমান আনেননি। তিনি যখন ঈমান আনেন তখন রাসূলুল্লাহ সা: এর নবুওয়াতের বিশটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে।

    আল্লাহ তাআলা হাকীমকে যে জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও রাসুলুল্লাহর সা: আত্মীয়তা দান করেন তাতে এটাই সঙ্গত ছিল যে, তিনিই সর্ব প্রথম তার দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ঈমান আনবেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় তা হয়নি। এ ব্যাপারে আমরা যেমন বিস্মিত হই, তেমনি নিজেও নিজের আচরণে বিস্মিত হয়েছেন। ইসলাম গ্রহণেরপর আমরণ তিনি তার বিগত জীবনের কার্যকলাপের জন অনুশোচনায় দগ্ধিভূত হয়েছেন। ইসলাম গ্রহণের পর তার পুত্র একদিন তাকে দেখলেন, তিনি বসে বসে কাঁদছেন। জিজ্ঞেস করলেন:

    আব্বা, কাঁদছেন কেন?

    বেটা আমার কান্নার কারণ অনেকগুলি।

    প্রথমত আমি বিলম্বে ইসলাম গ্রহণ করেছি। ফলে বহু বড় বড় নেক কাজ থেকে পিছিয়ে পড়েছি। এখন যদি সমগ্র পৃথিবীর সমপরিমাণ স্বর্ণও আমি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করি তবুও আমি তার সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবো না।

    দ্বিতীয়ত: আল্লাহ আমাকে বদর ও উহুদে প্রাণে বাঁচান। তখন আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, আমি আর কক্ষনও রাসুলুল্লাহর সা: বিরুদ্ধে কুরাইশদের সাহায্য করব না এবং মক্কা থেকেও আর বের হব না। কিন্তু তার পরই আবার কুরাইশদের সাহায্য করার দু:সাহস দেখিয়েছি।

    তৃতীয়ত: যখনই আমি ইসলাম গ্রহণের কথা ভেবেছি তখনই বয়স্ক সম্মানিত কুরাইশ নেতাদের প্রতি লক্ষ্য করেছি। তারা তাদের জাহিলী আচার আচরণ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে। আমিও তাদের অনুসরণ করেছি। আফসুস! আমি যদি তাদের অনুসরণ না করতাম! বাপ দাদা ও নেতৃবৃন্দের অনুসরণই আমাকে ধ্বংস করেছে। বেটা, এখন আমি কেন কাঁদবো না?

    হাকীমের এত বিলম্বে ইসলাম গ্রহণে যেমন আমরা এবং তিনি নিজেও বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি খোদ রাসুলুল্লাহও সা: কম বিস্মিত হনি। তার মত অন্যান্য বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা দ্রুত ইসলামে শামিল হোক রাসূল সা: এটাই কামনা করতেন।

    মক্কা বিজয়ের পূর্বরাত্রি রাসূল সা: সাহাবীদের বললেন, মক্কার চার ব্যক্তির মুশরিক থাকা আমি পছন্দ করিনি। তারা ইসলাম গ্রহণ করুক এটাই আমি কামনা করেছি।

    প্রশ্ন করা হলো, তারা কে কে? বললেন, আত্তাব ইবন উসাইদ, জুবাইর ইবন মুতয়িম, হাকীম ইবন হাযাম ও সুহাইল ইবন আমর॥ আল্লাহর অনুগ্রহে তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সা: যখন তার সংগী সাথী সহ মক্কার শিয়াবে আবী তালীবে অবরুদ্ধ তখন মুশরিক বা পৌত্তলিক থাকা সত্ত্বেও হাকীম তার ফুফু খাদীজাকে গোপনে খাদ্য সামগ্রী পাঠাতেন। একদিন গম নিয়ে যেতে নরাধম আবু জাহলের নজরে পড়ে যান। আবু জাহল বাধা দেয়। আবুল বাখতারী ইবন হিশাম কাছেই ছিল। সে এগিয়ে এসে আবু জাহলকে বলে: সে তার ফুফুর জন্য সামান্য কিছু খাদ্য পাঠাচ্ছে। তুমি তাতে বাধা দিচ্ছ? শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বেশ মারপিট হয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৫৩-৩৫৪)।

    কুরাইশদের প্রতিরোধ সত্ত্বেও যখন মক্কার ভেতরে ও বাইরে রাসূলের সা: সাহায্যকারীর সংখ্যা বেড়ে গেল তখন কুরাইশরা বেশি বিচলিত হয়ে পড়লো। তারা রাসুলুল্লাহর সা: ব্যাপারে একটি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মক্কার ‘দারুন নাদওয়া’ গৃহে সমবেত হলো। এ বৈঠকে অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবন্দের সাথে হাকীমও উপস্থিত ছিলেন। একজন নাজদী বৃদ্ধের বেশে ইবলিসও এ বৈঠকে উপস্থিত ছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৮০-৮১)।

    কুরাইশরা বদরে অবতরণের পর তাদের কিছু লোক রাসুলুল্লাহর সা: কূপ থেকে পানি পান করার জন্য এগিয়ে এলো। তাদের মধ্যে হাকীমও ছিলেন। রাসূল সা: তাদের পানি পানে বাধা দিতে নিষেধ করলেন। যারা সেই পানি পান করেছে, একমাত্র হাকীম ছাড়া তাদের সকলে বদরে নিহত হয়েছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/ ৬২২)।

    কুরাইশরা বদরে শিবির স্থাপনের পর উমাইর ইবন ওয়াহাবকে পাঠালো মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা নিরূপণের জন্য। উমাইর মুসলিম শিবিরের আশেপাশে ঘুরে এসে বললেন: তারা তিনশো বা তার কিছু কম বা বেশি হতে পারে। উমাইর কুরাইশদের যুদ্ধে অবতীর্ণ না হওয়ার জন্য মত প্রকাশ করেন। তার কথা শুনে হাকীম ইবন হাযাম জনতার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উতবা ইবন রাবীয়ার কাছে এসে বললেন: আবুল ওয়ালীদ! তুমি কুরাইশদের নেতা ও সরদার। তুমি কুরাইশদের মান্যগণ্য ব্যক্তি। চিরদিন তাদের মধ্যে তোমার সুকীর্তি স্মরণ করা হোক তা কি ‍তুমি চাও না? উতবা বললো: হাকীম, এ কথা কেন? হাকীম বললেন: তুমি লোকদের মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। উতবা হাকীমকে আবু জাহলের নিকট পাঠায়। হাকীম বলেন, আমি আবু জাহলের কাছে গিয়ে দেখলাম সে তার ঢালে তেল লাগাচ্ছে। আমি বললাম: আবুল হাকাম! আমাকে উতবা তোমার নিকট এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছে। আবু জাহল বললো: আল্লাহর কসম! সে মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের দেখে কাপুরুষ হয়ে গেছে।

    মুহাম্মাদ ও আমাদের মধ্যে আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ফিরবো না। আর উতবা তো এমন কথা বলবেই। তার ছেলে তো রয়েছে তাদের সাথে। এ জন্য সে তোমাদের ভয় দিচ্ছে। এভাবে হাকীম ও উতবা সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য যে চেষ্ঠা করেছিলেন, আবু জাহলের গোয়ার্তুমীতে তা ভন্ডুল হয়ে যায়। আল্লাহর ইচ্ছায় বদরের প্রথম শিকার আবু জাহল। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬২২-২৪)।

    বদরের পরাজয় সম্পর্কে হাকীম পরবর্তীকালে বর্ণনা করেছেন: আমরা একটি শব্দ শুনতে পেলাম, যেন আকাশ থেকে মাটিতে এসে পড়লো। শব্দটি ছিল একটি থালার ওপর পাথর পড়ার মত। রাসুলুল্লাহ সা: সেই পাথরটি নিক্ষেপ করেছিলেন। আমরা পরাজিত হয়েছিলাম। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৫০)।

    মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সা: ‘মাররাজ জাহরান’ পৌঁছে শিবির স্থাপন করেছেন। কুরাইশদের পক্ষ থেকে গোপনে খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আবু সুফাইয়ান ইবন হারব, হাকীম ইবন হাযাম ও বুদাইল ইবন ওয়ারকা মক্কা থেকে বের হন। মক্কার অদূরে ‘আরাক’ নামক স্থানে পৌঁছে ‍তারা উট, ঘোড়া ও মানুষের শোরগোল শুনতে পান। তারা আরও এগিয়ে রাতের অন্ধকারে এক সময় মুসলিম এলাকায় ঢুকে পড়েন। মুসলিম প্রহরীরা তাদের ধরে ফেলে। আবু সুফইয়ানের ঘাড়ে উমার (রা) কয়েকটি ঘুষি বসিয়ে দেন। আবু সুফইয়ান ভয়ে চেঁচিয়ে আব্বাসের সাহায্য কামনা করেন। আব্বাস ছুটে এসে তাঁকে উমারের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এদিকে হাকীম ও বুদাইলকে বন্দী করে রাসুলুল্লাহর সা: নিকট উপস্থিত করা হলে তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু সুফইয়ানও ইসলাম গ্রহণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৬৩, ১৭০-৭২, সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪০০)।

    মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ সা: বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করছেন। তিনি হাকীম ইবন হাযামকে সম্মান প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেন। তিনি এক ঘোষণা দানের নির্দেশ দেন:

    ১. আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোন শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দাহ ও রাসূল- যারা এ সাক্ষ্য দিবে তারা নিরাপদ।

    ২. যে ব্যক্তি অস্ত্র ফেলে কাবার চত্বরে বসে পড়বে সে নিরাপদ।

    ৩. যারা নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে তারা নিরাপদ।

    ৪. যে আবু সুফইয়ানের বাড়ীতে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।

    ৫. যে হাকীম ইবন হাযামের বাড়ীতে আশ্রয় নেবে সেও নিরাপদ।

    হাকীম ইবন হাযামের বাড়ীটি ছিল মক্কার নিম্ন ভূমিতে এবং আবু সুফইয়ানের বাড়ীটি উচ্চ ভূমিতে।

    হাকীম ইবন হাযাম অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন যে, ইসলাম পূর্ব জীবনে ইসলাম ও রাসূলের সা: শত্রুতায় যে ভূমিকা ও যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন ঠিক তেমন ভূমিকা ও সেই পরিমাণ অর্থ তিনি ইসলামী জীবনে পালন ও ব্যয় করবেন।

    মক্কার ‘দারুন নদওয়া’ ছিল একটি বাড়ী। কুরাইশরা সেখানে সমবেত হয়ে পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো। কুরাইশ বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ কুসাঈ এ বাড়ীটি নির্মাণ করে। হাত বদল হয়ে ইসলাম পূর্ব যুগে হাকীম বাড়ীটির মালিক হন। ইসলাম গ্রহণের পর ‍মুআবিয়ার খিলাফতকালে তিনি বাড়ীটি এক লাখ দিরহামে বিক্রি করেন। মুআবিয়া তাকে তিরস্কার করে বলেন: তুমি বাপ দাদার মর্যাদা ও কৌলিন্য বিক্রি করে দিলে? হাকীম বললেন: এক তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ছাড়া সব সম্মান, সব কৌলিন্য বিলীন হয়ে গেছে। জাহিলী যুগে একপাত্র মদের বিনিময়ে বাড়ীটি আমি কিনেছিলাম। আর আজ এক লাখ দিরহামে বিক্রি করলাম। তোমাকে আরও জানাচ্ছি, এ অর্থের সবই আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হবে। সুতরাং ক্ষতিটি কোথায়? (সীরাতু ইবন হিশাম-১/১২৫)

    ইসলাম গ্রহণের পর হাকীম ইবন হাযাম একবার হজ্জ আদায় করলেন। মূল্যবান কাপড়ে সজ্জিত উত্তম জাতের একশো উট তার আগে আগে হাকিয়ে নিয়ে গেলেন। সবগুলিই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কুরবানী করলেন।

    আর একবার তিনি হজ্জ করলেন। যখন তিনি আরাফাতে অবস্থান করছেন তখন তার সাথে একশো দাস। প্রত্যেকের কন্ঠে একটি করে রূপোর প্লেট ঝুলছে, আর তাতে লেখা আছে: হাকীম ইবন হাযামের পক্ষ থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত দাস। তাদের সকলকে তিনি মুক্তি দেন। অন্য একটি হজ্জে তিনি এক হাজার ছাগল বকরী সংগে নিয়ে যান। সবগুলি মিনায় কুরবানী করেন এবং সেই গোশত দিয়ে মুসলমান গরীব মিসকীনদের আহার করান।

    হুনাইন যুদ্ধের পর হাকীম ইবন হাযাম রাসুল সা: এর নিকট গণীমতের সম্পদ থেকে চাইলেন। রাসূল সা: তাকে কিছু দান করলেন। তিনি আবার চাইলেন। রাসূল সা: তাকে আবারও দান করলেন। এভাবে সেদিন তিনি একাই একশো উট লাভ করলেন। তখন তিনি নওমুসলিম। (সীরাতু ইবন হিশাম-২৪৯৩)।

    অত:পর রাসূল সা: তাকে লক্ষ্য করে বলেন:

    ‘ওহে হাকীম, এই সম্পদ অতি মিষ্টি ও অতি প্রিয়। যে ব্যক্তি আত্মতৃপ্তির সাথে গ্রহণ করে তাতে বরকত দেওয়া হয়। আর যে তা লোভাতুর অবস্থায় গ্রহণ করে তাতে বরকত দেওয়া হয়না। সে ঐ ব্যক্তির মত যে আহার করে; কিন্তু পরিতৃপ্ত হয় না। আর উপরের হাতটি নীচের হাত অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। অর্থাত দাতা হাতটি গ্রহীতা হাত অপেক্ষা উত্তম।’

    রাসুলুল্লাহ সা: মুখে এ বাণী শুনে হাকীম বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ সা:, যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন সেই সত্তার নামে শপথ, আজকের পর জীবনে আর কোন দিন কারও কাছে কিছুই চাইব না। কারও কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করবো না।’ হাকীম তার শপথ যথাযথভাবে পালন করেন।

    হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে ‘বাইতুল মাল’ থেকে হাকীমের ভাতা গ্রহণের জন্য খলীফা তাকে একাধিকবার আহবান জানান। ‍হাকীম বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত উমার (রা) খলীফা হলেন। তিনিও বার বার হাকীমকে আহবান জানাতে লাগলেন তার অংশ গ্রহণের জন্য। শেষ পর্যন্ত হযরত উমার (রা) জনগণকে সাক্ষী রেখে বললেন: ওহে মুসলিম জনমন্ডলী! তোমরা শুনে রাখ, আমি হাকীমকে তার অংশ গ্রহণের আহবান জানিয়েছি, আর সে প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। এভাবে হাকীম আমরণ আর কারও কাছে হাত পেতে আর কিছুই গ্রহণ করেননি। উমার (রা) প্রায়ই বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমাকে স্বাক্ষী রেখে বলছি, আমি ‍হাকীমকে তার অংশ গ্রহণের জন্য ডেকেছি, কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করেছে। (হায়াতুস সাহাবা-২/২৫০-৫১)।

    একবার হাকীম ইবন হাযাম মুশরিক অর্থাত পৌত্তলিক অবস্থায় ইয়ামনে যান। সেখান থেকে ইয়ামনের ‘যু-ইয়াযন’ রাজার একটি চাদর খরীদ করে মদীনায় গিয়ে রাসুলুল্লাহকে সা: কে উপহার দেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা: তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমি মুশরিকের কোন হাদিয়া গ্রহণ করিনে।’ হাকীম চাদরটি বিক্রি করলে রাসূল সা: তা ক্রয় করেন এবং গায়ে দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন। হাকীম বলেন, এই পোশাকে এত সুন্দর আর কাউকে আমি আর কক্ষনও দেখিনি। রাসুলুল্লাহকে সা: যেন পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রের মত দেখাচ্ছিল। অচেতনভাবে তখন আমার মুখ থেকে রাসূলুল্লাহর সা: প্রশংসায় একটি কবিতা বেরিয়ে আসে। (হায়াতুস সাহাবা-২/২৪৩-৪৪)।

    একবার রাসূলুল্লাহ সা: কুরবানীর ছাগল ক্রয়ের জন্য একটি দীনার দিয়ে হাকীমকে বাজারে পাঠালেন। তিনি বাজারে এক দীনারে একটি ছাগল ক্রয় করে আবার তা দুই দীনারে বিক্রি করেন। অত:পর এক দীনার দিয়ে একটি ছাগল ক্রয় করে অন্য দীনারটি সহ রাসুলুল্লাহর সা: নিকট হাজির হলেন। রাসুল সা: তার রিযিকের বরকতের জন্য দুআ করলেন এবং লাভের দীনারটি সাদকা করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৩৪৫)

    হযরত হাকীমের মৃত্যুসন সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইমাম বুখারী তার ‘তারিখে’ উল্লেখ করেছেন, তিনি হিজরী ৬০ (ষাট) সনে একশো বিশ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তবে উরওয়ার মতে তিনি খলীফা হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতের দশম বছরে মৃত্যুবরণ করেন।

    নাওফিল ইবন হারেস (রা)

    নাম নাওফিল, কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু হারেস। পিতা হারেস ইবন আবদিল মুত্তালিব, মাতা গাযিয়্যা। কুরাইশ বংশের হাশেমী শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর সা: চাচাতো ভাই।

    রাসুলুল্লাহ সা: দাওয়াতী কাজ শুরু করতেই নিকটতম আত্মীয়রাও তার শত্রু হয়ে যায় এবং বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে যায়। তবে নাওফিলের অন্তরে সব সময় ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা বিদ্যমান ছিল। এ কারণে পৌত্তলিক থাকা অবস্থায়ও তিনি রাসুল সা: এর বিরোধিতা মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি। মক্কার মুশরিকদের চাপে বাধ্য হয়ে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বদরে যান। কিন্তু তখন তার মুখে এই পংক্তিটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল:

    ‘আহমাদের সাথে যুদ্ধ করা আমার জন্য হারাম, আহমাদকে আমি আমার নিকট আত্মীয় মনে করি।’

    বদরে মক্কার পৌত্তলিক বাহিনীর পরাজয় হলে অন্যদের সাথে তিনিও বন্দী হন। এই বন্দী অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেন। যখন রাসুল সা: তাকে বললেন: নাওফিল, ফিদিয়া বা মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত হয়ে যাও। নাওফিল বললেন: মুক্তিপণ দেওয়ার সামর্থ আমার নেই। নাওফিল বলে উঠলেন: আল্লাহর কসম, এক আল্লাহ ছাড়া জিদ্দার তীরগুলির কথা আর কেউ জানেনা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। জিদ্দায় তার এক হাজার তীর ছিল। অবশ্য অন্য একটি মতে তিনি খন্দক যুদ্ধের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় চলে যান। (টীকা: সীরাতু ইবন হিশাম ২/৩. আল ইসাবা-৩/৫৭৭)।

    নাওফিল ছিলেন একজন ভাল কবি। ইসলাম গ্রহণের স্বীয় অনভূতি অনেক কবিতায় প্রকাশ করেছেন। তার কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপ:

    ‘দূরে যাও, দূরে যাও, আমি আর তোমাদের নই।

    কুরাইশ নেতাদের দ্বীনের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।

    আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, মুহাম্মাদ নিশ্চয়ই নবী।

    তিনি তার প্রভুর কাছ থেকে হিদায়াত ও দিব্যজ্ঞান নিয়ে এসেছেন।

    তিনি আল্লাহর রাসূল- তাকওয়ার দিকে আহবান জানান,

    আল্লাহর রাসূল কোন কবি নন।

    এই বিশ্বাস নিয়ে আমি বেঁচে ‍থাকবো।

    কবরেও আমি এই বিশ্বাসের ওপর শুয়ে থাকবো।

    আবার কিয়ামতের দিন এই বিশ্বাস নিয়ে ওঠবো।’

    খন্দক অথবা মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে হযরত আব্বাসের সা: সাথে আবার তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আবওয়া পৌঁছে রাবীয়া ইবন হারেস ইবন আবদিল মুত্তালিব আবার মক্কায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। নাওফিল তাকে বলেন: যে স্থানের মানুষ আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যেখানের অধিবাসীরা তাকে অস্বীকার করে- সেই পৌত্তলিক ভূমিতে তুমি কোথায় ফিরে যাবে? এখন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সম্মান দান করেছেন, তার সঙ্গী সাথীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তুমি আমাদের সাথেই চলো। অত:পর কাফিলাটি হিজরাত করে মদীনায় পৌঁছে।

    ইসলাম গ্রহণের পূর্ব থেকেই নাওফিল ও আব্বাসের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। এ কারণে রাসূল সা: তাদের দুজনের মধ্যে দ্বীনী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেনএবং দুজনের বসবাসের জন্য দুটি বাড়ীও বরাদ্দ করেন। বাড়ী দুটির একটি ছিল মসজিদে নববী সংলগ্ন ‘রাহবাতুল কাদা’ নামক স্থানে এবং অন্যটি ছিল বাজারে-‘সানিয়্যাতুল বিদা’র রাস্তায়।

    মদীনায় আসার পর সর্ব প্রথম মক্কা বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। তায়েফ ও হুনাইনসহ বিভিন্ন অভিযানে যোগ দিয়ে বিশেষ যোগ্যতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। বিশেষত: হুনাইনে তিনি চরম সাহসিকতা দেখান। মুসলিম বাহিনী যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় তখনও তিনি শত্রুর মুকাবিলায় পাহাড়ের মত অটল থাকেন। এই যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীকে প্রভূত সাহায্য করেন। যাত্রার প্রাক্কালে তিন হাজার নিযা তিনি রাসুল সা: এর হাতে তুলে দেন। রাসুল সা: মন্তব্য করেন: আমি যেন দেখছি, তোমার তীরগুলি মুশরিকদের পিঠসমূহ বিদ্ধ করছে। (টীকা: সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩)।

    হযরত নাওফিল (রা) হিজরী ১৫ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন এবং খলীফা হযরত উমার তার জানাযার নামাযের ইমামতি করেন। মদীনার ‘বাকী’ গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।

    হযরত রাসুলে কারীম সা: সব সময় নাওফিলের খোজ খবর নিতেন, মদীনার এক মহিলার সাথে রাসূল সা: তার বিয়ে দেন। তখন তার ঘরে কোন খাবার নেই। রাসূল সা: স্বীয় বর্মটি আবু রাফে ও আবু আইউবের হাতে দিয়ে এক ইয়াহুদীর নিকট পাঠান। তারা বর্মটি সেই ইয়াহুদির নিকট বন্দক রেখে বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ত্রিশ সা’ যব খরীদ করে রাসুল সা: এর নিকট নিয়ে আসেন। তিনি তা নাওফিলকে দান করেন।

  • আকীল ইবন আবী তালিব (রা)

    আকীল ইবন আবী তালিব (রা)

    নাম আকীল ডাক নাম আবু ইয়াযীদ। পিতা আবু তালিব ইবন আবদিল মুত্তালিব মাতা ফাতিমা। কুরাইশ বংশের হাশেমী শাখার সন্তান। চতুর্থ খলীফা হযরত আলীর সৎ ভাই এবং আলী অপেক্ষা বিশ বছর বড়।

    আকীল পিতা আবু তালিবের কাছে প্রতিপালিত হন। রাসুলুল্লাহর সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে একবার মক্কায় দারুণ অভাব দেখা দেয়। কুরাইশদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সা: ও আব্বাসের অবস্থা তুলনামূলকভাবে একটু ভালো চিল। একদিন রাসূলুল্লাহ সা: আব্বাসকে বললেন: চাচা, আপনার ভাই আবু তালিবের অবস্থা তো আপনার জানা। তার সন্তান সংখ্যা বেশি। চলুন না আমরা তার কিছু সন্তানের দায়িত্ব নেই। তারা দুজন আবু তালিবের কাছে গিয়ে তাদের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। আবু তালিব বললেন, আকীল ছাড়া আর যাকে খুশি তোমরা নিয়ে যেতে পার। রাসূলুল্লাহ সা: আলীকে এবং আব্বাস জাফরকে নিয়ে গেলেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৫৩০)।

    আকীলের অন্তর প্রথম থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি দূবল ছিল। কিন্তু কুরাইশদের ভয়ে প্রকাশ্যে ইসলাম কবুল করতে পারেননি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সরদার মুশরিকদের সাথে বদর যুদ্ধে যোগদান করেন এবং আরও অনেকের সাথে তিনিও মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। রাসূলুল্লাহ সা: স্বীয় খান্দানের কে কে বন্দী হয়েছে তা দেখার জন্য আলীকে নির্দেশ দেন। আলী খোজ খেবর নিয়ে বলেন: নাওফিল, আব্বাস, ও আকীল বন্দী হয়েছে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সা: নিজেই তাদের দেখতে যান এবং আকীলের পাশে দাড়িয়ে বলেন: আবু জাহল নিহত হয়েছে। আকীল বললেন: এখন তিহামা অঞ্চলে মুসলমানদের কোন প্রতিপক্ষ নেই। আকীল ছিলেন রিক্তহস্ত। আব্বার তার মুক্তিপণ পরিশোধ করে তাকে ছাড়িয়ে নেন। বদরে তিনি হযরত উবাইদ ইবন আউসের হাতে বন্দী হন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৮৭)।

    বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি মক্কায় ফিরে যান। মক্কা বিজয়ের বছর মতান্তরে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর যথারীতি ইসলাম গ্রহণ করে অষ্টম হিজরী সনের প্রথম দিকে মদীনায় হিজরাত করেন। (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।

    মূতা অভিযানে অংশগ্রহণের পর আবার মক্কায় ফিরে যান এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ কারণে মক্কা বিজয়, তায়েফ ও হুনাইন অভিযানে শরীক হতে পারেননি। (উসুদুল গাবা-৩/৪২২) তবে কোন কোন বর্ণনা মতে তিনি হুনাইন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে প্রথম দিকে যখন মুসলিম বাহিনীর পরাজয় হতে চলেছিল, এমনকি মুহাজির ও আনসাররাও পালাতে শুরু করেছিল, তখন যারা দৃঢ়পদ ছিলেন তাদের একজন তিনি (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।

    ইবন হিশাম বলেন: আকীল্ ইবন আবী তালিব হুনাইন যুদ্ধের দিন রক্তমাখা তরবারি হাতে স্ত্রী ফাতিমা বিনতু শাইবা ইবন রাবীয়ার তাবুতে প্রবেশ করেন। স্ত্রী বলেন: আমি বুঝেছি তুমি যুদ্ধ করেছো। তবে কী গণীমত (যুদ্ধলদ্ধ জিনিস) আমার জন্য নিয়ে এসেছ? আকীল বললেন: এই নাও একটি সুঁচ, কাপড় সেলাই করবে। তিনি সুঁচটি স্ত্রীর হাতে দিলেন। এমন সময় রাসুলুল্লাহর সা: ঘোষকের কন্ঠ শোনা গেল। তিনি ঘোষণা করছেন: কেউ কোন জিনিস নিয়ে থাকলে ফেরত দিয়ে যাও। এমনটি একটি সুঁচ-সুতো নিয়ে থাকলে ফেরত দিয়ে যাও। আকীল স্ত্রীর দিকে ফিরে বললেন: তোমার সুঁচটিও চলে গেল। এই বলে তিনি স্ত্রীর হাত থেকে সূঁচটি নিয়ে গণীমতের সম্পদের স্তুপে ফেলে দিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪৯২)।

    রাসুলুল্লাহর সা: ইনতিকাল তথা হুনাইন যুদ্ধের পর থেকে খলীফা উসমানের খিলাফতের শেষ পর্যন্ত হযরত আকীলের ভূমিকা ও কর্মতৎপরতা সম্পর্কে ইতিহাসে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তবে হযরত উমারের খিলাফতকালে বাইতুল মালে যখন প্রচুর অর্থ জমা হতে থাকে তখন তিনি এই অর্থের ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন। হযরত আলী (রা) সকল অর্থ জনগণের মধ্যে বন্টন করে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। হযরত উসমান বললেন: প্রচুর অর্থ, সকলে পাবে। তবে কে পেল, আর কে পেল না তা হিসেব না রাখলে বিষয়টি বিশৃঙ্খলার রূপ নেবে। তখন ওয়ালীদ ইবন হিশাম ইবন মুগীরা বললেন: আমীরুল মুমিনীন। আমি শামে গিয়েছি। সেখানে রাজাদের দেখেছি, তারা দিওয়ান তৈরী করে সবকিছু পৃথকভাবে লিখে রাখেন। তার পরামর্শটি খলীফার পছন্দ হলো। তিনি আকীল, মাখরামা ও জুবাইর ইবন মুতয়িমকে নির্দেশ দিলেন মর্যাদা অনুযায়ী নাগরিকদের তালিকা তৈরী করার জন্য। এ তিনজন ছিলেন কুরাইশদের বিশিষ্ট বংশবিদ্যা বিশারদ। তারা তালিকা তৈরী করে দেন। (হায়াতুস সাহাবা-২২০)।

    হযরত আলী (রা) ও হযরত মুআবিয়ার (রা) বিরোধের সময় হযরত আকীলকে আবার ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়। যদিও তিনি আলীর (রা) ভাই, তথাপি নিজের প্রয়োজনে আমীর মুআবিয়ার (রা) সাথে সম্পর্ক রাখতেন। আলী-মুআবিয়া বিরোধের সময় তিনি মদীনা ছেড়ে শামে মুআবিয়ার কাছে চলে যান। এর কারণ ইতিহাসে এভাবে উল্লেখ হয়েছে যে, আকীল ছিলেন ঋণগ্রস্ত অভাবী মানুষ, তার ছিল অর্থের প্রয়োজন। আর আমীর মুআবিয়ার (রা) খাযানা ছিল উন্মুক্ত। দারিদ্র ও অভাব তাকে হযরত মুআবিয়ার পক্ষাবলম্বনে বাধ্য করে।

    হযরত মুআবিয়ার (রা) সাথে হযরত আলীর (রা) বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন আকীল একবার ঋণ পরিশোধের আশায় হযরত আলীর (রা) কাছে যান। আলী তাকে যথেষ্ট সমাদর করেন। তিনি পুত্র হাসানকে তার সেবার দায়িত্ব দেন। হাসান অত্যন্ত যত্নের সাথে তার বিশ্রামের ব্যবস্থা করলেন। রাতে দস্তরখানা বিছিয়ে খাবারের জন্য ডাকা হলো। আকীল এসে দেখলেন, দস্তরখানে কিছু শুকনো রুটি, লবণ ও সামান্য কিছু তরকারি সাজানো। আকীল বললেন: খাবার শুধু এই? আলী বললেন: হা। এবার আকীল নিজের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বললেন: আমার ঋণ সমূহ তুমি পরিশোধ করে দাও। আলী জিজ্ঞেস করলেন: কি পরিমাণ হবে? বললেন: চল্লিশ হাজার দিরহাম। আলী বললেন: এত অর্থ আমি কোথায় পাব? একটু অপেক্ষা করুন, আমার ভাতা চার হাজার হলে আপনাকে দিতে পারবো। আকীল বললেন: তোমার অসুবিধা কোথায়? বাইতুল মাল তো তোমার হাতে। তোমার ভাতা বৃদ্ধির অপেক্ষায় আমাকে কতদিন ঝুলিয়ে রাখবে? আলী বললেন: আমি তো মুসলমানদের অর্থের একজন আমানতদার মাত্র। আপনি কি চান, আমি সেই অর্থ আপনাকে দিয়ে খিয়ানত করি? এ উত্তর শুনে আকীল সোজা শামে আমীর মুআবিয়ার কাছে চলে যান। মুআবিয়া (রা) আকীলকে জিজ্ঞেস করেন: তুমি আলী ও তার সাথীদের কেমন দেখলে? আকীল বললেন: তারা রাসুলুল্লাহর সা: সঠিক সাহাবী। শুধু এতটুকু অভাব যে, রাসুল সা: তাদের মাঝে নেই। আর তুমি ও তোমার সংগী সাথীরা ঠিক আবু সুফইয়ানের সংগী সাথীদের মত। এমন ‍তুলনা দেওয়ার পরও আমীর মুআবিয়া (রা) পরের দিন আকীলকে ডেকে পঞ্চাশ ‍হাজার দিরহাম তার হাতে তুলে দেন। (উসুদুল গাবা-৪২৩)।

    হযরত আকীলের শামে উপস্থিতির পর হযরত মুআবিয়া (রা) তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করে বলতেন: আমি যদি সত্যের ওপর না হতাম তাহলে আকীল তার ভাই আলীকে ছেড়ে আমার পক্ষাবলম্বন করলেন কিভাবে? একবার মুআবিয়া (রা) হযরত আকীলের (রা) উপস্থিতিতে মানুষের সামনে যুক্তি উপস্থাপন করলে আকীল প্রতিবাদ করে বললেন: আমার ভাই দীনের জন্য ভাল। আর তুমি দুনিয়ার জন্য। এটা ভিন্ন কথা যে, আমি দুনিয়াকে দ্বীনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছি। আর আখিরাতের ব্যাপার- তা তার উত্তম সমাপ্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি (উসুদুল গাবা-৩/৪২৩)

    হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতকালের শেষ দিকে অথবা ইয়াযীদের শাসনকালের প্রথম দিকে হযরত আকীল ইনতিকাল করেন। (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।

    ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসুলুল্লাহর সা: দীর্ঘ সাহচর্য লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণে রাসুলুল্লাহ ‍সা: একান্ত আপন ও প্রিয়জন হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার যে পারদর্শিতা হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। তথাপি হাদীদের গ্রন্থসমূহে তার বর্ণিত দু চারটি হাদীস পাওয়া যায়। মুহাম্মাদ, হাসান বসরী, আতা প্রমূখ তাবেয়ী তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ধর্মীয় জ্ঞান ছাড়াও তিনি জাহিলী যুগের বিভিন্ন জ্ঞানে দক্ষ ছিলেন। ইলমুল আনসাব, আইয়্যামুল আরব- বংশবিদ্যা, প্রাচীন আরবের যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে তিনি ছিলেন সুবিজ্ঞ। এসব বিষয়ে জ্ঞান আহরণের জন্য মানুষ তার নিকট আসতো। তিনি মসজিদে নববীতে নামাযের পর এসব বিষয়ের আলোচনা করতেন এবং লোকেরা তা বসে বসে শুনতো।

    হিশাম আল কালবী বলেন: আকীল, মাখরামা, হুয়াইতিব ও আবু জাহম-কুরাইশদের এ চার ব্যক্তির নিকট মানুষ তাদের ঝগড়া বিবাদ ফায়সালার জন্য যেত। (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন: আবু যায়িদ, তোমার প্রতি আমার দ্বিগুণ ভালোবাসা। একটা আত্মীয়তা এবং অন্যটা আমার চাচা তোমাকে ভালোবাসতেন- এই দুই কারণে।

    সুখে দুখে সর্বাবস্থায় হযরত আকীল (রা) রাসুলুল্লাহর সা: সুন্নাতের যথাযথ অনুসারী ছিলেন। একবার তিনি নতুন বিয়ে করেছেন। সকাল বেলা পাড়া প্রতিবেশীরা তাকে স্বাগতম জানাতে এলো। তারা জাহিলী যুগে প্রচলিত দুটি শব্দ উচ্চারণ করে স্বাগতম জানালো। শব্দ দুটিতে ইসলাম বিরোধী কোন ভাবও ছিল না। তবে যেহেতু স্বাগতমের ইসলামী ভাষা বিদ্যমান ছিল তাই তিনি তাদের ভুল শুধরে দিয়ে বললেন: এমনটি নয় বরং এ কথা বলো: বারাকাল্লাহু লাকুম ওয়া বারাকাল্লাহু আলাইকুম। আমাদেরকে এভাবে বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার জীবিকার জন্য খাইবরের উৎপন্ন শস্য থেকে বার্ষিক ১৪০ ওয়াসক নির্ধারণ করে দিয়ে যান। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৫০)।

  • আবু সালামা ইবন আবদিল আসাদ (রা)

    আবু সালামা ইবন আবদিল আসাদ (রা)

    নাম আবদুল্লাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু সালামা। পিতা আবদুল আসাদ, মাতা বাররাহ বিনতু আবদিল মুত্তালিব। রাসুলুল্লাহর সা: ফুফাতো ভাই। তাছাড়া সঠিক বর্ণনা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহর সা: দুধভাই। আবু লাহাবের দাসী ‘সুওয়াইবা’ রাসুল্লাহ সা: হামযা ও আবু সালামাকে দুধ পান করান। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৯৬)।

    হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে অবস্থান নেওয়ার পূর্বে তিনি মুমিনদের দলে শামিল হন। হযরত আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহণের পর সর্বপ্রথম উসমান ইবন আফফান, তালহা ইবন উবাইদিল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তাদের সকলকে রাসুলুল্লাহর সা: এর খিদমতে নিয়ে আসেন। তারা সকলে একসাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরের দিন তিনি উসমান ইবন মাজউন, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ, আবদুর রহমান ইবন আউফ, আবু সালামা ও আল আরকাম ইবন আবিল আরকামকে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে নিয়ে যান। তারাও এক সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। (আল বিদায়াহ-৩/২৯) তার স্ত্রী হযরত উম্মু সালামাও তাকে অনুসরণ করেন। (উসুদুল গাবা-৫/২৮১)।

    হাবশায় হিজরতকারী প্রথম দলটির সাথে তিনি ও স্ত্রী উম্মু সালামা হিজরাত করেন। এই হাবশার মাটিতে তাদের কন্যা যায়নাব বিনতু আবী সালামা জন্ম গ্রহণ করেন। (সীরাতু ইবনু হিশাম-১/৩২২, ৩২৬)। কিছুদিন পর তিনি হাবশা থেকে চলে আসেন এবং আবু তালিব ইবন আবদিল মুত্তালিবের নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করেন। বনু মাখযুমের কিছু লোক আবু তালিবের নিকট এসে অভিযোগের সুরে বলে: ওহে আবু তালিব, আপনি আপনার ভাতিজা মুহাম্মাদকে আমাদের হাত থেকে হিফাজতে রেখেছেন। এখন আবার আমাদেরই এক লোককে নিরাপত্তা দিচ্ছেন? আবু তালিব বললেন: ‘সে আমার কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। তাছাড়া সে আমার বোনের ছেলে। যদি বোনের ছেলেকে নিরাপত্তা দিতে না পারি তাহলে ভায়ের ছেলেকেও আমি নিরাপত্তা দিতে পারি নে।’ এক পর্যায়ে আবু লাহাব উঠে দাড়িয়ে বলেন: কুরাইশ বংশের লোকেরা! তোমরা এই বৃদ্ধের সাথে বেশি বাড়াবাড়ি করছো। যদি এটা বন্ধ না কর, আমরা এই বৃদ্ধের পাশে এসে দাড়াবো।’ আবু লাহাবের এ কথায় বনী মাখযুমের লোকেরা সরে পড়ে। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৬৯,৩৭১)। দ্বিতীয়বারও তিনি সস্ত্রীক হাবশায় হিজরাত করেন। শেষবার হাবশা থেকে মক্কা প্রত্যাবর্তন করে কিছুদিন পর আবার মদীনায় চলে যান।

    আবু সালামার স্ত্রী হযরত উম্মু সালামা তাদের মদীনায় হিজরাত সম্পর্কে বলেন: আবু সালামা মদীনায় হিজরাতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার উটটি প্রস্তুত করলেন। আমাকে উটের পিঠে বসিয়ে আমার ছেলে ‍সালামাকে আমার কোলে দিলেন। তারপর উটের লাগাম ধরে তিনি টেনে নিয়ে চললেন। আমার পিতৃ গোত্র বনু মুগীরার লোকেরা তার পথ আগলে ধরে বললো: তোমার নিজের ব্যাপারে তুমি যা খুশী করতে পার। কিন্তু আমাদের এ মেয়েকে তোমার সাথে বিদেশ যেতে দেব না। তারা আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। এতে আবু সালামার গোত্র বনু আবদিল আসাদ ক্ষেপে গেল। তারা বললো: তোমরা যখন তোমাদের মেয়েকে কেড়ে নিয়ে গেছ, তখন আমরা আমাদের সন্তানকে অর্থাৎ সালামাকে তার মায়ের কাছে থাকতে দেব না। তারা আমার ছেলেটি নিয়ে গেল। আমি বন্দী আমার পিতৃগোত্র বনু মুগীরার হাতে, আমার কোলের বাচ্চা সালামা তার পিতৃগোত্র বনু আবদিল আসাদে, আর আমার স্বামী আবু সালামা মদীনায়। এভাবে তারা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিল।

    আমি প্রতিদিন মক্কার ‘আবতাহ’ উপত্যাকায় গিয়ে বসে বসে শুধু কাঁদতাম। প্রায় এক বছর আমি চোখের পানি ফেললাম। অবশেষে একদিন আমার পিতৃগোত্রের এক ব্যক্তি আমাকে এ অবস্থায় দেখে তার অন্তরে দয়া হলো। সে বনু মুগীরাকে বললো: তোমরা কি এ হতভাগিনীকে মক্কা ছাড়তে দেবে না? এভাবে স্বামী সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে কষ্ট দিচ্ছ কেন? তখন বনু মুগীরা আমাকে বললো: তুমি ইচ্ছা করলে তোমার স্বামীর কাছে যেতে পার। বনু আবদিল আসাদও আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিল। আমি উটে চড়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে মদীনার পথ ধরলাম। আমার সাথে আল্লাহর আর কোন বান্দা ছিল না। আমি যখন তানয়ীমে পৌঁছলাম তখন উসমান ইবন তালহার সাথে আমার দেখা। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো: আবু উমাইয়্যার মেয়ে, কোথায় যাবে? বললাম: মদীনায় আমার স্বামীর কাছে। জিজ্ঞেস করলো: সাথে আর কেউ নেই? বললাম: এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। সে আমার উটের লাগাম ধরে হাঁটতে লাগলো এবং আমাকে মদীনার উপকন্ঠে কুবার বনী আমর ইবন আউফের পল্লী পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বললো: তোমার স্বামী এখানেই থাকে। এ কথা বলে সে আবার মক্কার পথ ধরলো। এখানে আমার স্বামীর সাথে মিলিত হলাম। এই উসমান ইবন তালহা হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করে। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৫৮-৫৯)।

    হযরত আবু সালামা ইয়াসরিব বাসীদের আকাবায় রাসুলুল্লাহর সা: হাতে শপথের এক বছর পূর্বে মদীনায় হিজরাত করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৬৮)। বুখারীর একটি বর্ণনামতে তিনিই মদীনায় গমনকারী প্রথম মুহাজির। কিন্তু অন্য একটি বর্ণনায় মুসয়াব ইবন উমাইরকে মদীনার প্রথম মুহাজির বলা হয়েছে। আল্লামা ইবন হাজার রহ: এই দুই বর্ণনার সামঞ্জস্য বিধান করতে গিয়ে বলেন: আবু সালামা হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে এলে মক্কার মুশরিকরা তার ওপর ‍পুনরায় অত্যাচার ‍শুরু করে। তিনি তখন মদীনা যান- কুরাইশদের ভয়ে, সেখানে স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্য নয়। অপরদিকে মুসয়াব ইবন উমাইর মদীনায় যান হিজরাতের নির্দেশ আসার পর। এই হিসাবে দুই বর্ণনার মধ্যে মূলত: কোন বিরোধ নেই। (ফাতহুল বারী-৭/২০৩)।

    আবু সালামার মদীনায় উপস্থিতির দিনটি ছিল মুহাররম মাসের ১০ তারিখ। আমর ইবন আউফের খান্দান পুরো দুই মাস তাকে আতিথ্য দান করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: মদীনায় এসে হযরত খুসাইমা আনসারী ও তার মাঝে মুওয়াখাত বা ভাতৃত্ব সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন এবং পৃথক বসবাসের জন্য একখন্ড জমিও দান করেন।

    বদর ও উহুদ যুদ্ধে তিনি সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উহুদ যুদ্ধে আবু উসামা জাশামীর একটি তীর তাঁর বাহুতে বিদ্ধ হয়। দীর্ঘ একমাস চিকিতসা গ্রহণের পর বাহ্যিকভাবে সেরে উঠলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় তাঁর ওপর ‘কাতান’ অভিযানের দায়িত্ব অর্পিত হয়।

    ‘কাতান’ একটি পাহাড়ের নাম। এখানে বনু আসাদের বসতি ছিল। হযরত রাসূলে কারীম সা: খবর পেলেন, তুলাইহা ও আসাদ ইবন খুওয়াইলিদ নিজ গোত্র এবং তাদের প্রভাবিত অন্যান্য গোত্রকে মদীনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ক্ষেপিয়ে তুলছে। রাসূলে কারীম সা: এমন কার্যকলাপ বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের সম্মিলিত দেড়শো মুজাহিদীনের একটি বাহিনী গঠন করে আবু সালামার নেতৃত্বে হিজরী ৪ সনের মুহাররাম / সফর মাসে ‘কাতান’ অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ দেন। রাসুলুল্লাহ সা: আবু সালামার হাতে ঝান্ডা দিতে গিয়ে বলেন: রওয়ানা হয়ে যাও। বনু আসাদ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আগেই তাদেরকে বিক্ষিপ্ত করে দাও।

    হযরত আবু সালামা অপ্রসিদ্ধ পথ ধরে অগ্রসর হয়ে হঠাত বনু আসাদের জনপদে গিয়ে ‍হাজির হন। তারা এই আকস্মিক আক্রমণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পালাতে শুরু রে। আবু সালামা তার বাহিনীকে তিনভাগে বিভক্ত করে তাদের পিছু ধাওয়ার নির্দেশ দেন। তারা বহু দূর পর্যন্ত তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যান এবং প্রচুর পরিমাণে উট ও ছাগল বকরী গাণীমাত হিসাবে লাভ করেন। সকল গাণীমাতই মদীনায় রাসুলুল্লাহর খেদমতে হাজির করেন।

    হযরত আবু সালামা ‘কাতার’ অভিযান থেকে মদীনায় ফিরলেন। এদিকে ওহুদ যুদ্ধে তীরবিদ্ধ ক্ষতস্থানে আবার বিষক্রিয়া শুরু হল। বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর হিজরী ৪ সনের মতান্তরে ৩ সনের জামাদিউল আখার মাসের ৩ তারিখ ইনতিকাল করেন। ঘটনাক্রমে তার শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহুর্তে রাসূলে কারীম সা: তাকে দেখার জন্য উপস্থিত হন। তার রুহটি বেরিয়ে যাওয়ার পর রাসূল সা: নিজের পবিত্র হাতে তার খোলা চোখ দুটি বন্ধ করে দিয়ে বলেন: মানুষের রুহ যখন উঠিয়ে নেওয়া হয় তখন তার দুটি তাকে দেখার জন্য খোলা থাকে।’ (তাবাকাতু ইবন সা’দ-৩/১৭২)।

    একদিকে পর্দার অন্তরালে মহিলারা মাতম শুরু করে দেয়। রাসূল সা: তাদের নিবৃত্ত করে বলেন: এখন দুআর সময়। কারণ, যে সকল ফিরিশতা আসমান থেকে মৃতের কাছে আসে তারাও এই দুআকারীদের দুআর সাথে ‘আমীন‘ বলে। তারপর রাসূল সা: তার জন্য এভাবে দুআ করেন: ‘হে আল্লাহ, তার কবরকে প্রশস্ত ও আলোকিত করে দাও। তার গুনাহ খাতা মাফ করে দাও এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত জামায়াতের মধ্যে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দাও।’ (ইবন সা’দ-৩/১৭২)।

    হযরত আবু সালামা মদীনার উপকন্ঠে ‘আলীয়াহ’ নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি কুবা থেকে এসে এখানেই বসতি স্থাপন করেন। বনী উমাইয়্যা ইবন যায়িদের কূপ- ‘ইয়াসীরা-র’ পানি দিয়ে তাকে গোসল দেওয়া হয় এবং মদীনার পবিত্র মাটিতে তাকে দাফন করা হয়।

    সাহাবাদের মধ্যে হযরত আবু সালামা (রা) বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হযরত রাসূলে কারীম সা: প্রায়ই তাকে দেখতে যেতেন।

    হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন: একদিন আবু সালামা খুব উতফুল্লভাবে রাসুলুল্লাহর সা: দরবার থেকে ঘরে ফেরেন। তারপর বলতে থাকেন, আজ রাসুলুল্লাহর সা: একটি বাণী আমাকে খুবই খুশি করেছে। তিনি বলেছেন: কোন বিপদগ্রস্থ মুসলমান তার বিপদের মধ্যে যদি আল্লাহর দিকে রুজু হয়ে বলে: হে আল্লাহ আমাকে এই বিপদে সাহায্য কর এবং আমাকে এর উত্তম প্রতিদান দাও- তাহলে আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। সুতরাং আবু সালামার মৃত্যুতে আমি যখন ভীষণ দু:খ পেলাম, তখন আমিও ঐ দুআ করলাম। কিন্তু তক্ষুণি আমার মনে হল, আবু সালামার উত্তম বিনিময় আর কে হতে পারে? আমার ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন খোদ রাসূল সা: বিয়ের পয়গাম পাঠান তখন আমি বুঝলাম আল্লাহ উত্তম বিনিময়ের ব্যবস্থা করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ ইবন হাম্বল-৪/১২৭)। এভাবে উম্মু সালামা হলেন উম্মুল মুমিনীন।

    হযরত আবু সালামা দুই ছেলে সালামা ও উমার এবং দুই মেয়ে যয়নাব ও দুররাহ রেখে যান।

    খলীফা হযরত উমার (রা) তার খিলাফতকালে যখন প্রত্যেকের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেন তখন মুহাজির ও আনসার যারা বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের সন্তানদের জন্য দু হাজার করার নির্দেশ দেন। যখন আবু সালামার ছেলে উমারের ব্যাপারটি এলো, তখন বললেন, তাকে এক হাজার বেশি দাও। মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহ- যার পিতা আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ, যিনি উহুদে শহীদ হন, প্রতিবাদ করে বলেন: তার পিতার আমাদের পিতাদের অপেক্ষা বিশেষ কোন মর্যাদা নেই।

    খলীফা বললেন: তার পিতা আবু সালামার জন্য তাকে দু হাজার, আর তার মা উম্মু সালামার জন্য অতিরিক্ত এক হাজার। তার মার মত তোমার একজন মা থাকলে তোমাকেও এক হাজার বেশি দিতাম। (হায়াতুস সাহাবা-১/ ২১৬)-১৭)।

  • ‍সালামা ইবনুল আকওয়া (রা)

    ‍সালামা ইবনুল আকওয়া (রা)

    নাম সিনান, পিতা আমর ইবনুল আকওয়া। কুনিয়াত বা ডাক নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যথা: আবু মুসলিম, আবু ইয়াস, আবু আমের ইত্যাদি। তবে পুত্র ইয়াসের নাম অনুসারে আবু ইয়াস ডাক নামটি অধিক প্রসিদ্ধ। (আল ইসতিয়াব)।

    সীরাত বিশেষজ্ঞরা সালামার ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে নীরব। তবে এতটুকু ঐতিহাসিক সত্য যে, হিজরী ৬ষ্ঠ সনের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায়ও হিজরত করেন। অধিকাংশ মুহাজির পরিবার পরিজন সহ হিজরাত করেন; কিন্তু হযরত সালামা আল্লাহর রাস্তায় স্ত্রী ও সন্তানদের ত্যাগ করেই হিজরাত করেন।

    মদীনায় আসার পর তিনি প্রায় সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন। হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপটে ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ বা ‘বাইয়াতে শাজারা’ এর ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার ঘটনাকালে হযরত রাসূলে পাক সা: যখন মক্কার কাফিরদের হাতে হযরত উসমানের শাহাদাতের খবর শুনেন এবং রাসুলুল্লাহর সা: সাথে হুদাইবিয়ায় আগত মুসলমানদের নিকট থেকে মৃত্যুর বাইয়াত বা শপথ নেন, তখন হযরত সালামা রাসুলুল্লাহর সা: হাতে তিনবার বাইয়াত করেন। তিনি বলেছেন: ‘হুদাইবিয়ার গাছের নীচে আমি রাসুলুল্লাহর হাতে সা: মৃত্যুর বাইয়াত করলাম। তারপর একপাশে চলে গেলাম। লোকের ভিড় কিছুটা কমে গেলে রাসুলুল্লাহ সা: আমাকে দেখে বললেন: সালাম ‍তোমার কী হল, তুমি যে বাইয়াত করলে না? বললাম: ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি তো বাইয়াত করেছি। রাসুল বললেন: তাতে কি হয়েছে, আর একবার কর। আমি আবারো বাইয়াত করলাম। এ সময় রাসুলুল্লাহ সা: তাকে একটি ঢাল উপহার দেন। এরপর আবার তিনি রাসুলুল্লাহর সা: নজরে পড়েন। তিনি জিজ্ঞেস করেন: সালামা, বাইয়াত করবে না? সালামা আরজ করেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি তো দুবার বাইয়াত করেছি। বললেন: আবারো একবার কর। সালামা তৃতীয়বার বাইয়াত করেন। এবার রাসুলুল্লাহ সা: জিজ্ঞেস করেন: সালামা ঢালটি কি করেছো? তিনি বললেন: আমার চাচা একেবারে খালি হাতে ছিলেন, আমি সেটা তাকে দিয়েছি। তার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ হেসে উঠে বলেন: তোমার দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মত যে দুআ করে, হে আল্লাহ আমাকে এমন বন্ধু দান কর যে আমার নিজের জীবন অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হবে।

    হুদাইবিয়ায় রাসুলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াত চলছে, এর মধ্যে মক্কাবাসীদের সাথে মুসলমানদের সন্ধি হয়ে গেল। মুসলমানরা শান্তির নি:শ্বাস ফেলে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করতে লাগলো। হযরত সালামা নিশ্চিন্তে একটি গাছের তলায় শুয়েছিলেন। এমন সময় চারজন মুশরিক (অংশীবাদী) তার পাশে এসে বসে। তারা রাসুলুল্লাহ সা: সম্পর্কে এমন সব আলাপ আলোচনা করতে শুরু করে যা তার শুনতে ইচ্ছা হলো না। তিনি উঠে অন্য একটি গাছের নিচে গিয়ে বসলেন। তার সরে যাওয়ার পর এই চার মুশরিক নিজেদের অস্ত্র শস্ত্র রেখে শুয়ে পড়ে। এমন সময় কেউ একজন চেঁচিয়ে বলে ওঠে: ‘মুহাজিরগণ, ছুটে এস, ইবন যানীমকে হত্যা করা হয়েছে।’ এ আওয়ায কানে যেতেই সালামা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ঐ চার মুশরিকের দিকে ছুটে যান। তারা তখনও শুয়ে ছিল। সালামা তাদের অস্ত্র নিজ দখলে নিয়ে বলেন, যদি ভালো চাও সোজা আমার সাথে চলো। আল্লাহর কসম, কেউ মাথা উঁচু করলে তার চোখ ফুটো করে ফেলবো। তিনি তাদেরকে নিয়ে রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হন। সালামার চাচাও প্রায় ৭০/৭১ জন মুশরিককে বন্দী করে নিয়ে আসেন। হযরত নবী কারীম সা: তাদের সকলকে ছেড়ে দেন। এ ঘটনারই প্রেক্ষাপটে কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়:

    ‘আর সেই আল্লাহ, তিনিই তো মক্কার মাটিতে কাফিরদের ওপর তোমাদেরকে বিজয় দানের পর তাদের হাতকে তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাতকে তাদের বিরত রেখেছেন।’ (সূরা আল ফাতহ/৩)।

    মুসলমানদের কাফিলা মদীনায় প্রত্যাবর্তনকালে একটি পাহাড়ের নিকট তাবু স্থাপন করে। মুশরিকদের মনে কিছু অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করে। হযরত রাসূলে কারীম সা: তা অবগত হন। তিনি তাবু পাহারার প্রয়োজন অনুভব করেন। তিনি সেই ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দুআ করেন যে সেই পাহাড়ের ওপর বসে পাহার দেবে। এই সৌভাগ্য হযরত সালামা অর্জন করেন। তিনি রাতভর বার বার পাহাড়ের ওপর উঠে শত্রুর পদধ্বনি শোনার চেষ্টা করেন।

    হযরত রাসূলে কারীমের কিছু উট ‘জী-কারওয়া’-র চারণক্ষেত্রে চরতো। একদিন বনু গাতফান মতান্তরে বনু ফাযারার লোকেরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে রাখালকে হত্যা করে উটগুলি লুট করে নিয়ে যায়। হযরত ‍সালামা ইবন আকওয়া ঘটনাস্থলের পাশেই ছিলেন। শেষ রাতে তিনি বের হয়েছেন, আবদুর রহমান ইবন আউফের দাস তাকে খবর দিল, রাসুলুল্লাহর উটগুলি লুট হয়ে গেছে। সালামা আবদুর রহমানের দাসকে মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন রাসুলুল্লাহকে সা: খবর দেওয়ার জন্য। আর তিনি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ‘ইয়া সাবাহাহ’ (শত্রুর আক্রমণের সতর্ক ধ্বনি) বলে এমন জোরে চেঁচিয়ে ওঠেন যে, সে আওয়ায মদীনার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তিনি একাকী ডাকাত দলের পিছু ধাওয়া করেন। ডাকাতরা পানি তালাশ করছিল, এমন সময়ে তিনি সেখানে পৌঁছে যান। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দায। নির্ভুল তাক করে তীর ছাড়ছিলেন, আর মুখে গুণগুণ করে আওড়াচ্ছিলেন:

    ‘আনা ইবনুল আকওয়া

    আল-য়াউম য়াউমুর রুদ্দায়ি।’

    অর্থাত আমি আকওয়ার ছেলে- আজকের দিনটি নিচ প্রকৃতির লোকদের ধ্বংস সাধনের দিন। তিনি এমনভাবে আক্রমণ করেন যে, ডাকাতরা উট ফেলে পালিয়ে যায়। তারা দিশেহারা হয়ে তাদের চাদরও ফেলে যায়। এর মধ্যে হযরত রাসূলে কারীম সা: আরও লোকজন সংগে করে সেখানে উপস্থিত হন। সালামা আরজ করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি তাদের পানি পান করতে দেইনি। এখনই পিছু ধাওয়া করলে তাদের ধরা যাবে। রাসুল সা: বলেন, পরাজিত করার পর ক্ষমা কর। (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাবু গাযওয়া জী কারওয়াহ, সীরাতু ইবন হিশাম-২/২৮১-৮২, হায়াতুস সাহাবা ১/৫৫৯-৬১)। ঘটনাটি বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্নিত হয়েছে।

    খাইবার যুদ্ধে তিনি চরম বীরত্ব প্রদর্শন করেন। খাইবার বিজয়ের পর হযরত রাসূলে কারীমের হাতে হাত দিয়ে তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।

    খাইবারের পর তিনি সাকীফ ও হাওয়াযিনের যুদ্ধে যোগদান করেন। এই অভিযানের সময় এক ব্যক্তি উটে আরোহণ করে মুসলিম সেনা ছাউনীতে আসে এবং উটটি বেঁধে আস্তে করে মুসলিম সৈনিকদের সাথে নাশতায় শরীক হয়ে যায়। তারপর চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে মুসলমানদের শক্তি আঁচ করে আবার উটে চড়ে দ্রুত কেটে পড়ে। এভাবে এসে ‍আবার চলে যাওয়ায় গুপ্তচর বলে মুসলমানদের বিশ্বাস হয়। এক ব্যক্তি তার পিছু ধাওয়া করে। সালামাও তাঁকে অনুসরণ করেন এবং দৌড়ে আগে গিয়ে লোকটিকে পাকড়াও করার পর তরবারির এক আঘাতে তাকে হত্যা করেন। তারপর নিহত ব্যক্তিটির বাহনটি নিয়ে ফিরে আসেন। রাসুলুল্লাহ সা: জিজ্ঞেস করেন: লোকটিকে কে হত্যা করেছে? লোকেরা বললো: সালামা। রাসুল সা: ঘোষণা করেন: নিহত ব্যক্তির যাবতীয় জিনিস সেই পাবে। হিজরী ৭ম সনে হযরত রাসূলে কারীম সা: আবু বকরের নেতৃত্বে বনী কিলাবের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী পাঠালেন। সেই বাহিনীতে সালামাও ছিলেন। তিনি এই অভিযানে একাই সাতজনকে হত্যা করেন। যারা পালিয়ে গিয়েছিল তাদের অনেক নারীকে তিনি বন্দী করে নিয়ে আসেন। এই বন্দীদের মধ্যে একটি সুন্দরী মেয়েও ছিল। হযরত আবু বকর মেয়েটিকে হযরত সালামার দায়িত্বে অর্পণ করেন। হযরত সালামা মেয়েটিকে মদীনায় নিয়ে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সা: বললেন: মেয়েটিকে আমার জিম্মায় ছেড়ে দাও। সালামা মেয়েটিকে রাসূলুল্লাহর সা: জিম্মায় দিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সা: এ মেয়েটির বিনিময়ে কাফিরদের হাতে বন্দী মুসলমানদের মুক্ত করেন।

    হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) ইসলাম গ্রহণের পর কাফিরদের সাথে সংঘটিত প্রায় সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কোন কোন বর্ণনা মতে তিনি মোট চৌদ্দটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সাতটি রাসুলুল্লাহর সা: সাথী হিসাবে, আর অবশিষ্ট সাতটি রাসুলুল্লাহ সা: প্রেরিত বিভিন্ন অভিযান। মুসতাদরিকের একটি বর্ণনা মতে তার অংশগ্রহণ করা যুদ্ধের সংখ্যা মোট ষোল। একবার তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহর সাথে সাতটি এবং যায়িদ ইবন হারিসার সাথে নয়টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৫)

    পদাতিক বাহিনীর যারা তীর বর্শা নিয়ে যুদ্ধ করতো, তাদের মধ্যে সালামা ছিলেন অন্যতম দক্ষ ব্যক্তি। শত্রু সৈন্যরা যখন আক্রমণ চালাতো তিনি পিছু হটে যেতেন। আবার শত্রুরা যখন পিছু হটে যেত বা বিশ্রাম নিত, তিনি অতর্কিত আক্রমণ চালাতেন। এই ছিল তার যুদ্ধ কৌশল। এই কৌশল অবলম্বন করে তিনি একাই মদীনার উপকন্ঠে ‘জী কারাদ’ যুদ্ধে উয়াইনা ইবন হিসন আল ফিযারীর নেতৃত্বে পরিচালিত বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। তিনি একাই তাদের পিছু ধাওয়া করেন, তাদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং তাদের আক্রমণ প্রতিহত করেন। এভাবে মদীনা থেকে বহু দূর পর্যন্ত তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যান।

    বীরত্ব ও সাহসিকতায় বিশেষত: দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষেত্রে সাহাবা সমাজের মধ্যে সালামা ছিলেন বিশেষ স্থানের অধিকারী। আলা ইসাবা গ্রন্থকার লিখেছেন: তিনি ছিলেন অন্যতম বীর এবং অশ্বের চেয়ে দ্রুতগামী। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মতান্তরে ‘জী কারাদ’ অভিযানের সময় রাসুলে কারীম সা: তার প্রশংসায় মন্তব্য করেন: ‘খায়রু রাজ্জালীনা সালামা ইবনুল ‍আকওয়া- সালামা ইবন আকওয়া আমাদের পদাতিকদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৫)

    হযরত সালামা ছিলেন অত্যন্ত শক্ত মানুষ। দু:খ বেদনা কি জিনিস তা যেন তিনি জানতেন না। তবে খাইবার যুদ্ধে তার ভাই মতান্তরে চাচা হযরত আমের ইবন আকওয়ার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে একটি বিষাদ ভরা গান গুণগুণ করে গেয়েছিলেন। যার শেষ চরণটি ছিল এমন: “(হে আল্লাহ) আমাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করুন, শত্রুর মুখোমুখি আমাদের পদসমূহ দৃঢ়মূল করুন।”

    এই খাইবার যুদ্ধে তার ভাই আমের তরবারি দিয়ে সজোরে একজন মুশরিককে আঘাত হানেন। কিন্তু আঘাতটি ফসকে গিয়ে নিজের দেহে লাগে এবং তাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এ ঘটনার পর মুসলমানদের কেউ কেউ মন্তব্য করলো: ‘হতভাগা আমের- শাহাদাতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হলো।’ শুধু এই দিন, যখন অন্যদের মত সালামার মনেও এই ধারণা জন্মালো যে, তাঁর ভাই জিহাদ ও শাহাদাতের সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তখন ভীষণ ব্যথিত ও বিমর্ষ হলেন। তিনি দৌড়ে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন:

    -ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমেরের সকল নেক আমল ব্যর্থ হয়ে গেছে।-এ কথা কি ঠিক?

    রাসূল সা: বললেন:

    -সে ‍মুজাহিদ হিসেবে নিহত হয়েছে। তার জন্য দুটি পুরষ্কার রয়েছে। এখন সে জান্নাতের নদী সমূহে সাঁতার কাটছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল:৫৫৫-৫৫৬)।

    হযরত সালামা (রা) হযরত রাসূলে কারীমের সা: ওফাতের পর থেকে হযরত উসমানের (রা) শাহাদাত পর্যন্ত মদীনায় ছিলেন। হযরত উসমানের (রা) হত্যার পর এই বীর মুজাহিদ বুঝতে পারলেন, মুসলিম জাতির মধ্যে ফিতনা বা আত্ম কলহের দ্বার খুলে গেছে। যে ব্যক্তি তার ভাইদের সংগে করে সারাটি জীবন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, এখন তার পক্ষে সেই ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা শোভন নয়। মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যে দক্ষতার জন্য তিনি রাসুলুল্লাহর সা: প্রশংসা কুড়িয়েছেন, একজন মুমিনের বিরুদ্ধে সেই দক্ষতার সাথে যুদ্ধ করা অথবা সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একজন মুসলমানকে হত্যা করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়।

    এ উপলদ্ধির পর তিনি নিজের জিনিসপত্র উটের পিঠে চাপিয়ে মদীনা ছেড়ে সোজা ‘রাবজা’ চলে যান। সেখানেই আমরণ বসবাস করতে থাকেন। এই রাবজাতেই ইতিপূর্বে হযরত আবু যার আল গিফারী (রা) চলে এসেছিলেন মদীনা ছেড়ে এবং এখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।

    হযরত সালামা (রা) বাকী জীবনটা এই রাবজায় কাটিয়ে দেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে হঠাত তার মনে মদীনায় যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগে। তিনি মদীনা যান। সেখানে দুই দিন কাটানোর পর তৃতীয় দিন আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে তার হাবীবের পবিত্র ভূমিতে শহীদ ও সত্য নিষ্ঠ বন্ধুদের পাশেই তিনি সমাহিত হন। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৬-৫৭)।

    তার মৃত্যু সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য আছে। সঠিক মত অনুযায়ী তিনি হিজরী ৭৪ সনে মৃত্যু বরণ করেন। অন্য একটি মতে তার মৃত্যু সন হিজরী ৬৪। ওয়াকিদী ও তার অনুসারীদের ধারণা তিনি আশি বছর জীবিত ছিলেন। ইবন হাজার বলেন, মৃত্যু সন সম্পর্কে প্রথম মতানুযায়ী ওয়াকিদীর এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ তাতে হুদাইবিয়ার বাইয়াতের সময় তাঁর বয়স দাড়ায় দশের কাছাকাছি। আর এ বয়সে কেউ মৃত্যুর বাইয়াত করতে পারে না। তাছাড়া আমি ইবন সা’দে দেখেছি, তিনি হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতকালের শেষ দিকে ইনতিকাল করেন। বালাযুরীও এমনটি উল্লেখ করেছেন। (আল ইসাবা-২/৬৭)।

    হযরত সালামা (রা) রাসুলুল্লাহর সা: ঘনিষ্ট সাহচর্য লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন। বহু অভিযানে রাসুলুল্লাহর সফর সঙ্গী হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন। এই সুযোগ তিনি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তাছাড়া আবু বকর, উমার, উসমান ও তালহা (রা) থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সাতাত্তর (৭৭)। তার মধ্যে ষোলটি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাত বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত। ৫টি বুখারী ও ৯টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (তাহজীবুল কামাল-১৪৮) আর তাঁর নিকট থেকে যারা হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন- ইয়াস ইবন সালামা, ইয়াযীদ ইবন উবাইদ, আবদুর রহমান ইবন আবদিল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবন হানাফিয়া প্রমূখ।

    আল্লাহর রাস্তায় খরচের ব্যাপারে হযরত সালামা ছিলেন দরাযহস্ত। কেউ কিছু আল্লাহর ওয়াস্তে চাইলে তিনি খালি হাতে ফিরাতেন না। তিনি বলতেন, যে আল্লাহর ওয়াস্তে দেয় না সে কোথায় দেবে? তবে আল্লাহর ওয়াস্তে চাওয়াকে তিনি পছন্দ করতেন না।

    তিনি নিজের জন্য সাদকার মাল হারাম মনে করতেন। যদি কোন জিনিস সাদকার বলে সন্দেহ হত, তিনি তা থেকে হাত গুটিয়ে নিতেন। এ কারণে নিজের সাদকা করা কোন জিনিস দ্বিতীয়বার অর্থের বিনিময়ে খরিদ করাও পছন্দ করতেন না।

    তিনি হারাম ও হালালের ব্যাপারে এতই সতর্ক ছিলেন যে, জুয়ার সাথে সাদৃশ্য দেখায় এমন কোন খেলায় তিনি বাচ্চাদের খেলতে দিতেন না।

    মদীনায় যে সকল সাহাবী ফাতওয়া দান করতেন সালামা (রা) ছিলেন তাদেরই একজন। ইবন সা’দ যিয়াদ ইবন মীনা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলছেন: ইবন আব্বাস, ইবন উমার, আবু সাঈদ আল খুদরী, আবু হুরাইরা, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস, জাবির ইবন আবদিল্লাহ, রাফে ইবন খাদীজ, সালামা ইবন আকওয়া প্রমূখ সাহাবী মদীনায় ফাতওয়া দিতেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২৫৪)।

    ইমাম বুখারী ‘আল আদাবুল মুফরাদ’ (পৃ. ১৪৪) গ্রন্থে আবদুর রহমান ইবন রাযীন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমরা রাবজা দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের বলা হলো, এখানে সালামা ইবন আকওয়া আছেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে সালাম জানালাম। তিনি নিজের দুটি হাত বের করে আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন: আমি এই দুটি হাত দিয়ে রাসুলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াত করেছি। তিনি তার একটি পাঞ্জা বের করলেন। পাঞ্জাটি যেন উটের পাঞ্জার মত বৃহদাকৃতির। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪৯৮-৯৯)

    হযরত সালামাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হুদাইবিয়ার দিনে আপনারা কোন্ কথার ওপর রাসূলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াত করেছিলেন? বলেছিলেন: মাওত, অর্থাত মৃত্যুর ওপর। (আল ইসতিয়াব, হায়াতুস সাহাবা-১/২৪৯)।

    হযরত সালামার (রা) পুত্র ‘ইয়াস’ একটি মাত্র কথায় পিতার ফজীলাত ও বৈশিষ্ট্য চমতকার রূপে তুলে ধরেছেন। তিনি বলছেন: ‘মা কাজাবা আবী কাততু- আমার আব্বা কক্ষণো মিথ্যা বলেন নি। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৪)।

    সত্যনিষ্ঠ মানুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান লাভের জন্য একজন মানুষের জীবনে এই একটি মাত্র গুণই যথেষ্ট। তিনি তার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এই সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

    ‘আল ইলতিয়াব ফী আসমায়িল আসহাব’ গ্রন্থের লেখক আবু উমার ইউসুফ আল কুরতুবী ইবন ইসহাকের সূত্রে হযরত সালামা সম্পর্কে একটি অভিনব কাহিনীর উল্লেখ করেছেন। ইবন ইসহাক বলেন, ‘আমি শুনেছি নেকড়ে বাঘ যার সংগে কথা বলেছে, সালামা সেই ব্যক্তি। সালামা বলেছেন, আমি একটি নেকড়েকে হরিণ শিকার করতে দেখলাম। আমি তাকে তাড়া করে তার মুখ থেকে হরিণটি বের করে আনলাম। তখন নেকড়েটি বললো, ‘তোমার কি হল, আল্লাহ আমাকে যে রিযিক দিয়েছেন আমি তো তাই খেতে চাচ্ছি। আর তা তোমারও সম্পদ নয় যে, তুমি আমার মুখ থেকে কেড়ে নেবে। সালামা বলেন, আমি বললাম, ‘ওহে আল্লাহর বান্দারা, এই দেখ অভিনব ঘটনা। নেকড়ে কথা বলছে, আমার কথা শুনে নেকড়েটি বললো, এর থেকেও আশ্চর্য ঘটনা হলো, আল্লাহর রাসূল তোমাদেরকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে আহবান জানাচ্ছেন, আর তোমরা তা অস্বীকার করে মূর্তি পূজার দিকে ধাবিত হচ্ছো। সালামা বলেন, অত:পর আমি রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করি। আল্লাহই ভালো জানেন, কে এই নেকড়ে।’ (আল ইসতিয়াব)।

  • উমাইর ইবন ওয়াহাব (রা)

    উমাইর ইবন ওয়াহাব (রা)

    নাম উমাইর, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু উমাইয়া। পিতা ওয়াহাব, মাতা উম্মু সাখীলা। কুরাইশদের অন্যতম বীর নেতা। ইসলাম পূর্ব জীবনে ইসলাম ও রাসুলুল্লাহর সা: চরম দুশমন। তীক্ষ ও গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন প্রখর অনুধাবন ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব।

    তিনি বদর যুদ্ধে মক্কার কুরাইশ বাহিনীর সাথে যোগ দেন এবং যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহুর্তে কুরাইশ বাহিনী তাকে মুসলিম বাহিনীর শক্তি নিরূপণের দায়িত্ব দেয়। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে মুসলিম বাহিনীর আশে পাশে চক্কর মেরে কুরাইশ চাউনীতে ফিরে গিয়ে জানান, ‘তারা তিনশোর মত হবে। এর কিছু কম বা বেশিও হতে পারে।’ তার অনুমান যথাযথ ছিল। কুরাইশরা তাকে জিজ্ঞেস করে,‘পেছনে তাদের কোন সাহায্য আসার সম্ভাবনা আছে কি? তিনি জবাব দেন, ‘তেমন কিছু আমি পাইনি। তবে হে কুরাইশগণ! আমি তাদের উটগুলিকে কঠিন মৃত্যুকে বহন করতে দেখেছি। তরবারিগুলি ছাড়া তাদের আত্মরক্ষার আর কিছু নেই, আশ্রয় নেওয়ারও কোন স্থান নেই। আল্লাহর কসম, আমার মনে হয়েছে, তোমরা তাদের একজনকে হত্যা করলে তোমাদেরও একজন নিহত হবে। যদি তাদেরই সমসংখ্যক তোমাদের নিহত হতে হয় তাহলে আর লাভ কি? এখন তোমরা ভেবে দেখ কি করবে।’ যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার জন্য তিনি কুরাইশদেরে এ কথাও বলেন, ‘মদীনার লোকদের চেহারা সাপের মত, চরম পিপাসায়ও তারা কাতর হয় না। আমাদের সাথে যুদ্ধ করে প্রতিশোধ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব। তোমাদের মত উজ্জ্বল চেহারার লোকদের তাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত নয়।’

    কুরাইশ নেতৃবর্গের অনেকেই তার কথায় প্রভাবিত হয়। তারা প্রায় মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বসে। কিন্তু আবু জাহল তাদের সিদ্ধান্তে বাধ সাধে। হিংসা ও যুদ্ধের আগুনে তার অন্তর জ্বলছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় এ যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন হয় আবু জাহল। আর অনেকের সাথে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয় উমাইরের পুত্র ওয়াহাব।

    উমাইর ইবন ওয়াহাব স্বীয় পুত্র ওয়াহাবকে মুসলমানদের হাতে বন্দী অবস্থায় ফেলে রেখে বদর থেকে নিজে প্রাণ বাঁচিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। তার ভয় হচ্ছিল, মক্কায় তিনি রাসুলুল্লাহ ও তার ‍সাহাবীদের ওপর যে অত্যাচার করেছেন হয়তো তার বদলা নেওয়া হবে বন্দী পুত্রের ওপর। মক্কায় ফিরে এসে একদিন সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে কাবার দিকে গেলেন তাওয়াফ ও মূর্তিকে সিজদার উদ্দেশ্যে। সেখানে তিনি সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাকে কাবার চত্বরে বসা দেখতে পেলেন। তিনি সাফওয়ানের কাছে গিয়ে বললেন:

    -ওহে কুরাইশদের সরদার, সুপ্রভাত।

    -আবু ওয়াহাব, সুপ্রভাত। বস, একটু কথা বলি। কথা বললে সময় একটু কাটবে। উমাইর সাফওয়ানের পাশে বসলেন। তারা বদরের অবস্থা, বদরে আপতিত মুসীবতের কথা আলোচনা করলেন এবং মুহাম্মাদ ও তার সংগীদের হাতে বদরে কে কে বন্দী হয়েছে তা গুণলেন। বদরে যেসব কুরাইশ নেতাকে হত্যা করে ‘কালীব’ কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য তারা দু:খ প্রকাশ করলেন।

    আবেগ-উত্তেজনায় এক পর্যায়ে সাফওয়ান ইবন উমাইয়া বললো: আল্লাহর কসম, এভাবে তাদের নিহত হওয়ার পর কোন কিছুই আর ভালো লাগছে না। উমাইর বললেন:

    -তুমি সত্য বলেছ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন: কাবার প্রভুর নামে শপথ করে বলছি, যদি আমার ঘাড়ে ঋণের বোঝা এবং পরিবার পরিজনের দায় দায়িত্ব না থাকতো, আমি এক্ষুণি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদের একটা দফা রফা করে তার সকল অপকর্মের পরিসমাপ্তি ঘটাতাম। তারপর গলাটি একটু নিচু করে বললেন, ‘আমার ছেলে ওয়াহাব তো সেখানে তাদের হাতে বন্দী। আমি সেখানে গেলে কেউ কোন রকম সন্দেহ করবে না।’

    সাফওয়ান ইবন উমাইয়া সুযোগটি হাতছাড়া করলো না। উমাইরের দিকে তাকিয়ে সে বললো: -উমাইর, তোমার সকল ঋণ, তা যতই হোক না কেন, তার দায়িত্ব আমার ঘাড়ে তুলে নিলাম। আর আমি যতদিন বেঁচে থাকি এবং তোমার পরিবার পরিজনও যতদিন বেঁচে থাকে, তারা আমার সাথেই থাকবে। আমার অর্থ সম্পদের কোন অভাব নেই। তারা সুখেই থাকবে।

    উমাইর বললেন:

    -আমাদের এ আলোচনা গোপন থাকুক, কেউ যেন না জানে।

    সাফওয়ান বললো:

    -তাই হবে।

    উমাইর কাবার চত্বর থেকে উঠে বাড়ী গেলেন। মুহাম্মাদের প্রতিহিংসার আগুনে তার অন্তর জ্বলছে। তিনি তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করলেন। তার সফর প্রস্তুতির ব্যাপারে কেউ কোন রকম সন্দেহ করলো না। কারণ, বদর-বন্দীদের ছাড়ানোর জন্য মুক্তিপণ নিয়ে প্রতিনিধিদল তখন মক্কা মদীনা ছুটাছুটি করছে।

    উমাইর তরবারীতে ধার দিয়ে তীব্র বিষের মধ্যে চুবিয়ে রাখলেন। সোয়ারী প্রস্তুত করা হলো। তিনি সোয়ার হয়ে মদীনা অভিমূখে যাত্রা করলেন। হিংসা বিদ্বেষে তখন তার অন্তরটি জ্বলে কয়লা হয়ে যাচ্ছে।

    উমাইর মদীনায় পৌঁছে সোজা মসজিদের দিকে চললেন। মসজিদের দরযার কাছে সোয়ারী থেকে নেমে পড়লেন।

    এদিকে মসজিদের দরযার কাছে তখন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব ও কয়েকজন সাহাবী বসে বসে বদরের ঘটনাবলী আলোচনা করছিলেন। কুরাইশদেরকে কিভাবে নিহত হলো, কে কেমন করে বন্দী হলো এবং মুহাজির ও আনসারদের কে কেমন বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করলো ইত্যাদি বিষয়ে তারা আলাপ জমিয়েছিলেন।

    হঠাৎ হযরত উমারের চোখ পড়ে উমাইরের দিকে। তিনি সোয়ারী থেকে নেমে সোজা মসজিদের দিকে আসছেন। কাঁধে তার তরবারী ঝোলানো। উমার সন্ত্রস্ত হয়ে বলে উঠলেন:- ‘এ তো সেই কুত্তা, আল্লাহর দুশমন উমাইর ইবন ওয়াহাব। আল্লাহর কসম, তার উদ্দেশ্য ভালো নয়। মক্কায় সে আমাদের বিরুদ্ধে সবসময় কাফিরদের উত্তেজিত করতো। বদর যুদ্ধের পূর্বে সে ছিল মক্কার গুপ্তচর।’ তিনি সংগীদের দিকে ফিরে বললেন:

    -তোমরা রাসুলুল্লাহর সা: দিকে যাও, তার আশেপাশে থাক। এই পাপাত্মা যেন কোন রকম ধোকা দিতে না পারে।

    উমার দৌড়ে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গিয়ে বললেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ, সেই আল্লাহর দুশমন উমাইর এসেছে তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে। আমার মনে হয়, কোন রকম অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া সে আসেনি।

    রাসুলুল্লাহ সা: বললেন:

    -তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।

    হযরত উমার (রা) উমাইরের দিকে এগিয়ে গিয়ে একহাত তার গলার কাছে জামা ধরেন এবং অন্য হাতে তার তরবারির বাঁটের সাথে ঘাড়টি ঠেসে ধরে তাকে রাসুলুল্লাহর সা: নিকট হাজির করেন। তার এ অবস্থা দেখে রাসূল সা: উমারকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। উমার ছেড়ে দিলেন। রাসুল সা: এর নির্দেশে উমার তার নিকট থেকেও সরে দাড়ালেন। রাসুল সা: উমাইরকে লক্ষ্য করে বলেন: উমাইর একটু কাছে এসো।

    উমাইর একটু কাছে গিয়ে বলেন: সুপ্রভাত।

    জাহিলী আরবে লোকেরা এভাবে সম্ভাষণ জানাতো।

    রাসূল সা: বললেন, ‘উমাইর, তোমার সম্ভাষণ অপেক্ষা উত্তম সম্ভাষণ শিক্ষা দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। সালামের মাধ্যমে আল্লাহ মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। এ সালাম হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসীদের সম্ভাষণ।’

    উমাইর বললেন, ‘আমাদের সম্ভাষণও আপনার কাছে অপরিচিত নয়।’

    রাসূল সা: জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি উদ্দেশ্যে এসেছ?’

    -আপনাদের হাতে আমার যে বন্দীটি আছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। আর যাই হোক আপনিও তো আমাদের একই খান্দানের একই গোত্রের লোক। তার ব্যাপারে আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন।

    -তাহলে ঘাড়ে এ ঝুলন্ত তরবারি কেন?

    -আল্লাহ এই তরবারির অকল্যাণ করুন। বদরে এই তরবারি আমাদের কোন কাজে এসেছে?

    সোয়ারী থেকে নামার সময় ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলতে ভুলে গেছি। ঐ অবস্থায় রয়ে গেছে।

    -‘উমাইর, আমার কাছে সত্য কথাটি বল, তুমি কেন এসেছ?’

    -আমি শুধু বন্দী মুক্তির উদ্দেশ্যেই এসেছি। রাসূল সা: বললেন, ‘তুমি সাফওয়ানের সাথে কী শর্ত করেছো?’

    এই প্রশ্নে উমাইর ভীষণ ভয় পেয়ে যান। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কী শর্ত করেছি?’

    রাসূল সা: বললেন, ‘তুমি ও সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা কা’বার চত্বরে বসে কালীব কূপে নিক্ষিপ্ত নিহত কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সম্পর্কে আলোচনা করেছো। তুমি বলেছ, যদি আমার ঘাড়ে ঋণের বোঝা এবং পরিবার পরিজনের দায়িত্ব না থাকতো, আমি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম। তুমি আমাকে হত্যা করবে-এই শর্তে সাফওয়ান তোমার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তোমার ও তোমার উদ্দেশ্যের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে আছেন।’

    উমাইর কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলেন। তারপর একটু সচেতন হয়ে বলে উঠলেন: আশহাদু আন্নাকা রাসুলুল্লাহ- আমি ঘোষণা করছি, আপনি নিশ্চিত আল্লাহর রাসূল। ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আসমানের যেসব খবর আমাদের কাছে নিয়ে আসতেন, আপনার ওপর যে ওহী নাযিল হতো, আমরা তা অবিশ্বাস করতাম। কিন্তু সাফওয়ানের সাথে আমার যে আলোচনা, তাতো আমি আর সে ছাড়া আর কেউ জানে না। আল্লাহর কসম, আমার বিশ্বাস জন্মেছে এ খবর একমাত্র আল্লাহই আপনাকে দিয়েছেন। আল হামদুলিল্লাহ সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাকে হিদায়াত দানের জন্য আপনার কাছে নিয়ে এসেছেন। এ কথা বলে তিনি আবারো উচ্চারণ করেন, ‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ।’

    হযরত রাসূলে কারীম সা: সাহাবীদের নির্দেশ দেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাই উমাইরকে দ্বীন শিক্ষা দাও, তাকে কুরআনের তালীম ‍দাও এবং তার বন্দীকে মুক্তি দাও।

    ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হযরত উমাইর ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম ‘শয়তান’ বা নেতা। মুসলমান হওয়ার পর তিনি হলেন ইসলামের এক বিশিষ্ট হাওয়ারী বা সাথী। তার ইসলাম গ্রহণের পর হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, ‘যে সত্তার হাতে আমার জীবন তার শপথ, উমাইর যখন মদীনায় আবির্ভূত হয় তখন একটি শুকরও আমার নিকট তার চেয়ে বেশি প্রিয় ছিল। আর আজ সে আমার কোন একটি সন্তানের চেয়েও আমার নিকট অধিকতর প্রিয়।” (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩২৫)

    ইসলাম গ্রহণের পর উমাইর ইসলামী শিক্ষা দ্বারা নিজেকে পবিত্র করা এবং কুরআনের নূরের দ্বারা স্বীয় হৃদয়কে পূর্ণ করে তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি মক্কা এবং মক্কায় যাদের রেখে এসেছেন তাদের কথা প্রায় ভুলে গেলেন।

    এদিকে সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা প্রতিদিন মনে মনে রঙ্গীন স্বপ্ন দেখে। সে মক্কায় কুরাইশদের বিভিন্ন আড্ডায় গিয়ে বলতে থাকে, শিগগির, একটা মহাসুখবর তোমাদের কাছে এসে পৌঁছবে। তোমরা তাতে বদরের সান্ত্বনা পাবে।

    সাফওয়ানের প্রতীক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চললো। প্রথমে সে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো, পরে অস্থির হয়ে পড়লো। মদীনার দিক থেকে আগত প্রতিটি কাফেলা বা আরোহীকে ধরে ধরে সে উমাইর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলো। কিন্তু কেউ সন্তোষজনক জবাব দিতে পারলো না। এমন সময় মদীনা থেকে আগত এক আরোহীকে সে পেল। ঔৎসুক্যের আতিশয্যে সাফওয়ান তাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো, ‘মদীনায় কি নতুন কোন ঘটনা ঘটেনি? লোকটি জবাব দিল, হাঁ বিরাট এক ঘটনা ঘটে গেছে।’ সাফওয়ানের মুখমন্ডল দীপ্তিমান হয়ে ওঠে এবং আনন্দ উল্লাসে তার হৃদয় মন ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। সাথে সাথে সে আবার প্রশ্ন করে, ‘কী ঘটেছে আমাকে একটু খুলে বল তো।’ লোকটি বলল, ‘উমাইর ইসলাম গ্রহণ করেছে। সেখানে সে নতুন দ্বীনের দীক্ষা নিচ্ছে এবং কুরআন শিখছে।’ সাফওয়ানের দুনিয়াটা যেন ওলট পালট হয়ে গেল। তার মাথায় যেন বাজ পড়লো। তার ধারণা ছিল, দুনিয়ার সব মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও উমাইর কক্ষণো ইসলাম গ্রহণ করবে না।

    ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এই দ্বীনের প্রতি যে দায়িত্ব তা হযরত উমাইর যথাযথভাবে উপলদ্ধি করেন। তিনি অনুধাবন করেন, এ দ্বীনের বিরোধিতায় তিনি যে শক্তি ব্যয় করেছে ঠিক সেই পরিমাণ শক্তি এর খিদমতে ব্যয় করতে হবে। এ দ্বীনের বিরুদ্ধে যতখানি অপপ্রচার তিনি চালিয়েছেন ঠিক ততখানি এর দিকে আহবান জানাতে হবে। আল্লাহ ও তার রাসূলকে তিনি যে কতখানি মুহাব্বত করেন তা সততা, জিহাদ ও ইতায়াতের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।

    কিছুদিন মদীনায় ইসলামের তালীম ও তারবিয়াত নেওয়ার পর একদিন হযরত উমাইর রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি আমার জীবনের বিরাট এক অংশ আল্লাহর নূর নিভিয়ে দেওয়ার জন্য এবং ইসলামের অনুসারীদের ওপর অত্যাচার উৎপীড়নে কাটিয়ে দিয়েছি। আমার ইচ্ছা -আপনি যদি অনুমতি দেন, আমি মক্কায় যাই এবং কুরাইশদের আল্লাহ ও তার রাসুলের দিকে আহবান জানাই। তারা যদি আমার দাওয়াত কবুল করে তাহলে তা হবে অতি উত্তম কাজ। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, আমি তাদের এমন কষ্ট দেব যেমন ইতিপূর্বে রাসুলুল্লাহর সংগী সাথীদের দিয়েছি।’

    রাসুল সা: তাকে অনুমতি দিলেন। একদিন উমাইর তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে মক্কায় ফিরলেন। মক্কায় সর্ব প্রথম সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার সাথে দেখা করে বললেন, -‘ওহে সাফওয়ান তুমি মক্কার একজন নেতা, কুরাইশদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। এই যে তোমরা পাথরের পূজা কর, মূর্তির নামে জীবজন্তু জবেহ কর-এটা কি কোন দ্বীন বা ধর্ম তুমি মনে কর? তবে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’ সাফওয়ান উমাইরের ওপর ঝাপিয়ে পড়তে উদ্যত হল। কিন্তু উমাইরের তরবারি তাকে সঠিকভাবে থামিয়ে দিল। ক্ষোভে দু:খে সাফওয়ান অশ্রাব্য কিছু গালি উমাইরের কানে ছুড়ে দিয়ে পথ ছেড়ে চলে গেল।

    এভাবে উমাইর মুসলমান হয়ে মক্কায় ফিরলেন। কদিন আগে যিনি মুশরিক অবস্থায় মক্কা ছেড়ে যান, তিনি যখন আবার মক্কায় প্রবেশ করেন তখন তার রূপটি ছিল ঠিক তেমন যেমন রূপ ধারণ করেছিলেন হযরত উমার (রা) ইসলাম গ্রহণের দিন। ইসলাম গ্রহণের পর উমার চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, কুফর অবস্থায় যে যে স্থানে আমি বসেছি, ঈমান অবস্থায় সে সে স্থানে আমি বসবো।’

    উমাইর যেন এ ক্ষেত্রে উমার (রা) কে নেতা হিসাবে মানলেন। তিনি রাত দিন মক্কার অলি গলিতে দাওয়াত দিয়ে চললেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উমাইরের হাতে বিপুল সংখ্যক লোক ঈমান আনলেন। উহুদ যুদ্ধের পূর্বে মুমিনদের এই দলটি সংগে করে তিনি আবার মদীনায় চলে যান। উহুদ, খন্দক ও মক্কা বিজয় সহ সকল অভিযানে তিনি রাসুলুল্লাহ (রা) সাথে অংশগ্রহণ করেন।

    মক্কা বিজয়ের আনন্দের দিন উমাইর তার বন্ধু ও সাথী সাফওয়ানকে ভুলে যাননি। রাসূলুল্লাহ সা: মক্কা পৌঁছার পর সাফওয়ান প্রাণভয়ে মক্কা থেকে পালিয়ে ইয়ামনের পথে জিদ্দা পৌঁছে। উমাইর এ খবর পেয়ে ভীষণ ব্যথিত হন। সাফওয়ানকে শয়তানের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য তিনি দৃঢ় সংকল্প হন। দৌড়ে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গিয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর নবী! সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা তার সম্প্রদায়ের একজন নেতা। সে আপনার ভয়ে মক্কা থেকে পালিয়েছে। নিজেকে সে সাগরে নিক্ষেপ করবে। আপনি তাকে আমার বা নিরাপত্তা দিন।’ রাসুল সা: বললেন, ‘সে নিরাপদ।’ উমাইর বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাকে এমন একটি নিদর্শন দিন যা দ্বারা বুঝা যায় আপনি তাকে আমান দিয়েছেন।’ রাসূল সা: যে চাদরটি মাথায় দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন সেটি তাকে দান করেন।

    উমাইর ইবন যুবাইর বর্ণনা করেন:

    ‘চাদরটি নিয়ে উমাইর বের হলেন। তিনি যখন সাফওয়ানের কাছে পৌঁছলেন তখন সে সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বললেন: ‘সাফওয়ান, আমার মা ‍বাবা তোমার প্রতি কুরবান হোক! এভাবে তুমি নিজেকে ধ্বংস করোনা। এই তোমার জন্য রাসুলুল্লাহর আমান নিয়ে এসেছি।

    সাফওয়ান বললো:

    -‘তোমার ধ্বংস হোক। আমার কাছ থেকে সরে যাও। আমার সাথে কথা বলো না।’ উমাইর বললেন, ‘সাফওয়ান! আমার মা বাবা তোমার প্রতি কুরবান হোক। নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সা: সর্বোত্তম মানুষ। সর্বাধিক নেককার ও ধৈর্য্যশীল মানুষও তিনিই। তার ইজ্জত তোমারই মর্যাদা।’ সাফওয়ান বললো:- ‘আমি আমার জীবনের আশংকা করছি।’ উমাইর বললেন: ‘তিনি তার থেকেও সহনশীলও সম্মানিত।

    উমাইর (রা) সাফওয়ানকে সংগে করে রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হলেন। সাফওয়ান বললো: এ ব্যক্তির ধারণা আপনি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।

    রাসুলুল্লাহ সা: বললেন: সে সত্যই বলেছে।

    সাফওয়ান বললো: আমাকে দু মাসের সময় দিন।

    রাসূল সা: বললেন: তোমাকে চার মাসের সময় দেওয়া হলো।

    অল্প দিনের মধ্যেই হযরত সাফওয়ান (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল ৩২৫, হায়াতুস সাহাবা-১)

    হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে হযরত উমাইর (রা) সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজে খলীফাকে সহযোগিতা করেন। হযরত উমারের খিলাফতকালে আমর ইবনুল আস (রা) মিসর অভিযান পরিচালনা করেন। ইসকান্দারিয়া বিজয়ে যখন তার বিলম্ব ঘটছিল তখন হযরত উমার (রা) তার সাহায্যার্থে মদীনা থেকে চারজন জাদরেল সেনা কমান্ডারের নেতৃত্বে দশ হাজার সৈন্য পাঠান। এই চার কমান্ডারের একজন ছিলেন হযরত উমাইর ইবন ওয়াহাব।

    হযরত উমার এ চার কমান্ডার সম্পর্কে আমর ইবনুল আসকে হিদায়াত দেন যে, আক্রমণের সময় তাদেরকে অগ্রভাগে ‍রাখবে। তাদের প্রচেষ্ঠায় ইসকান্দারিয়া অভিযান সফল হয়। ইসকান্দারিয়া বিজয়ের পর আমরের নির্দেশে তিনি মিসরের বহু এলাকা পদানত করেন। হযরত উমারের (রা) খিলাফতের শেষ দিকে তিনি ইনতিকাল করেন।

  • আবুল আস ইবন রাবী (রা)

    আবুল আস ইবন রাবী (রা)

    আবুল আসের প্রকৃত নামের ব্যাপারে ইতিহাসে বিস্তর মতভেদ দেখা যায়। যেমন: লাকীত, হিশাম, মিহশাম, ইয়াসির, ইয়াসিম ইত্যাদি। তবে তার কুনিয়াত বা ডাকনাম আবুল ‘আস’। এ নামেই তিনি ইতিহাসে খ্যাত। তার পিতা ‘রাবী’ ইবনে ‘আবদিল উযযা’ মাতা হযরত খাদীজার (রা) সহোদরা হালা বিনতু খুওয়াইলিদ। তিনি কুরাইশ গোত্রের ‘আবদু শামস’ শাখার সন্তান হওয়ার কারণে তাকে সংক্ষেপে ‘আবশামী’ বলা হয়। খালা হযরত খাদীজা (রা) ও খালু রাসুলুল্লাহ সা: বাড়ীতে আবুল আসের অবাধ যাতায়াত ছিল। তিনি ছিলেন ‍খালা খালুর অতি স্নেহের পাত্র। আবুল আস ধীরে ধীরে যৌবনে পদার্পণ করেন। তার আকর্ষণীয় চেহারা সকলের মন কেড়ে নেয়। বংশ গৌরব এবং আরবীয় বীরত্ব, প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ ইত্যাদি গুণের জন্য তৎকালীন মক্কার যুবকদের মধ্যে তিনি এক বিশেষ স্থানের অধিকারী। তদুপরি কুরাইশদের যে বিশেষ গুণের কথা কুরআনে ঘোষিত হয়ে- রিহলাতাশ শিতায়ি ওয়াস সাইফ- শীতকালে ইয়ামানের দিকে এবং গ্রীস্মকালে শামের দিকে ‍তাদের বাণিজ্য কাফিলা চলাচল করে- আবুল আসের মধ্যেও এ গুণটির পুরোপুরি বিকাশ ঘটে। মক্তা ও শামের মধ্যে সব সময় তার বাণিজ্য কাফিলা যাতায়াত করে। সেই কাফিলায় থাকে কমপক্ষে একশো উটসহ দুশো লোক। তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি, সততা, ও আমানতদারীর জন্য মানুষ তার কাছে নিজেদের পন্যসম্ভার নিশ্চিন্তে সমর্পণ করে। ইবন ইসহাক বলেন, ‘অর্থ সম্পদ, আমানতদারী ও ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি তখন মক্কার গণ্যমান্য মুষ্টিমেয় লোকদের অন্যতম। (আল ইসাবা-৪/১২২)।

    সময় আপন গতিতে বয়ে চললো। এদিকে মুহাম্মাদের সা: বড় মেয়ে যয়নাব বেড়ে ওঠেন। মক্কার সম্ভ্রান্ত যুবকরা তাঁকে জীবন সঙ্গীনী হিসেবে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আর ব্যাকুল হবেই বা না কেন? যয়নাব হলেন, মক্কার কুরাইশ গোত্রের সর্বোত্তম শাখার কন্যা। পিতা মাতার দিক দিয়ে যেমন সর্বাধিক সম্মানিত, তেমনি চরিত্র ও আদব আখলাকের দিক দিয়েও সবচেয়ে বেশি পুত:পবিত্র। এমন পাত্রীর আশা করলেই কি সবার ভাগ্যে জোটে? অবশেষে মক্কার যুবক তারই খালাত ভাই আবুল আস ইবন রাবী এ গৌরব লাভে ধন্য হন।

    আবুল আসের সাথে যয়নাবের (রা) বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে মুহাম্মাদ সা: নবুওয়াত লাভ করেন। সত্য দ্বীন ও হিদায়াত সহকারে তিনি প্রেরিত হন। নিজের নিকট আত্মীয়দের নিকট দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর নির্দেশ লাভ করেন। হযরত খাদীজা (রা) ও তার কন্যারা যথা: যয়নাব, রুকাইয়া, উম্মু কুলসুম ও ফাতিমা (রা) রাসুলুল্লাহর সা: ওপর ঈমান আনেন। অবশ্য ফাতেমা তখন খুব ছোট। রাসুলুল্লাহর সা: জামাই আবুল আস স্ত্রী যয়নাবকে অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং সম্মানও করতেন। কিন্তু তিনি পূর্ব পুরুষের ধর্মত্যাগ করে প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন দ্বীন কবুল করতে রাজী হলেন না। এ অবস্থা চলতে লাগলো। এদিকে রাসুলুল্লাহ সা: ও কুরাইশদের মধ্যে মারাত্মক দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল। কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলো,

    “তোমাদের সর্বনাশ হোক! তোমরা মোহাম্মাদের বিয়ে করে তার দুশ্চিন্তা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিচ্ছ। তোমরা যদি এ সকল মেয়েকে তার কাছে ফেরত পাঠাতে তাহলে সে তোমাদের ছেড়ে তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতো।” তাদের অনেকে এ কথা সমর্থন করে বললো, “ এ তো অতি চমৎকার যুক্তি!” তারা সবাই আবুল আসের কাছে যেয়ে বললো, “আবুল ’আস, তুমি যে কুরাইশ সুন্দরীকে চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব।” আবুল আস বললেন, “আল্লাহর কসম! না, তা হয় না। আমার স্ত্রীকে আমি ত্যাগ করতে পারিনে। তার পরিবর্তে সকল নারী আমাকে দিলেও আমার তা পছন্দনীয় নয়।”

    রাসুলুল্লাহ সা: অন্য দুই মেয়ে রুকাইয়া ও উম্মু কুলসুমকে তাদের স্বামীগৃহ থেকে বিদায় দিয়ে পিতার কাছে পাঠিয়ে দিল। কন্যাদের স্বামী পরিত্যাক্তা হয়ে ফিরে আসায় হযরত রাসূলে কারীম সা: খুব খুশী হলেন। তিনি মনে মনে কামনা করলেন, অন্য দু’ জামাইর মত আবুল আস ও যদি যয়নাবকে বিদায় দিত! যেহেতু আবুল আসের হাত থেকে যয়নাবকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাসুলুল্লাহর সা: ছিল না এবং মুশরিকদের (পৌত্তলিক) সাথে মুমিন নারীদের বিয়ে তখনও হারাম ঘোষিত হয়নি, এ কারণে তিনি চুপ থাকলেন।

    সময় দ্রুত বয়ে চললো। হযরত রাসূলে কারীম সা: মদীনায় হিজরাত করলেন। কুরাইশদের সাথে সামরিক সংঘাত শুরু হলো। কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদরে সমবেত হল। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবুল আস কুরাইশদের সাথে বদরে গেলেন। কারণ কুরাইশদের মধ্যে তার যে স্থান তাতে না যেয়ে উপায় ছিলনা। বদরে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। তাদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক যোদ্ধা বন্দী হয়। আর অবশিষ্টরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এই বন্দীদের মধ্যে রাসুলুল্লাহর সা: জামাই আবুল আসও ছিলেন। ইবন ইসহাক বলেন, বদরে হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর ইবন নুমান (রা) তাকে বন্দী করেন। তবে ওয়াকীদীর মতে হযরত খিরাশ ইবন সাম্মাহর (রা) হাতে তিনি বন্দী হন। (আল ইসাবা-৪/১২২)

    বদরের বন্দীদের ব্যাপারে মুসলমানদের সিদ্ধান্ত হল, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। বন্দীদের সামাজিক মর্যাদা এবং ধনী দরিদ্র প্রভেদ অনুযায়ী এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হল। বন্দীদের প্রতিনিধিরা ধার্যকৃত মুক্তিপণ নিয়ে মক্কা মদীনা ছুটাছুটি শুরু করে দিল। নবী দুহিতা হযরত যয়নাব স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণ দিয়ে মদীনায় দূত পাঠালেন। ওয়াকীদির মতে আবুল আসের মুক্তিপণ নিয়ে মদীনায় এসেছিল তার ভাই আমর ইবন রাবী। হযরত যয়নাব মুক্তিপণ দিরহামের পরিবর্তে একটি হার পাঠালেন। এই হারটি তার জননী হযরত খাদীজা (রা) বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: হারটি দেখেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং স্বীয় বিষন্ন মুখ একটা পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন। প্রিয়তমা স্ত্রী ও কন্যার স্মৃতি তার মানসপটে ভেসে উঠলো।

    কিছুক্ষণ পর হযরত রাসূলে কারীম সা: সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, “যয়নাব তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে এই হার পাঠিয়েছে। তোমরা ইচ্ছা করলে তার বন্দীকে ছেড়ে দিতে পার এবং এ হারটিও তাকে ফেরত দিতে পার।” সাহাবীরা বললেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমরা তাই করবো।” সাহাবীরা রাজী হয়ে গেলেন। তবে রাসুলুল্লাহ সা: আবুল আসকে মুক্তি দেওয়ার আগে তার নিকট থেকে এই অঙ্গীকার নেন যে, সে মক্কায় ফিরে গিয়ে অনতিবিলম্বে যয়নাবকে মদীনায় পাঠিয়ে দেবে।

    আবুল আস মক্কা ফিরে গিয়েই প্রতিশ্রুতি পালনের তোড়জোড় শুরু করে দিলেন। তিনি স্ত্রী যয়নাবকে সফরের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। তিনি যয়নাবকে এ কথাও বললেন যে, মক্কার অনতিদূরে তোমার পিতার প্রতিনিধিরা তোমাকে নেওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছে। আবুল আস স্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তার ভাই আমর মতান্তরে কিনানকে ডেকে যয়নাবের সাথে যেতে বললেন এবং তাকে অপেক্ষমান দূতদের হাতে তুলে দিতে বললেন।

     ইবন ইসহাক বলেন, সফরের প্রস্তুতি শেষ হলে যয়নাবের দেবর কিনানা ইবন রাবী একটি উট এনে দাঁড় করালো। যয়নাব উটের পিঠের হাওদায় উঠে বসলেন। আর কিনানা স্বীয় ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি হাতে নিয়ে দিনে দুপুরে মক্কা থেকে বের হলো। কুরাইশদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেল। তারা ধাওয়া করে একটু দূরেই ‘যী-তুওয়া’ উপত্যকায় তাদের দুজনকে ধরে ফেললো। আলোচ্য ঘটনা সম্পর্কে সীরাত গ্রন্থসমূহে নানা রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো। কিনানা ইবন রাবী কুরাইশদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে কাঁধের ধনুকটি নামিয়ে ‍হাতে নিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললো, “তোমাদের কেউ যয়নাবের নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্ঠা করলে তার বক্ষ হবে আমার তীরের লক্ষ্যস্থল।” কিনানা ছিল একজন দক্ষ তীরন্দায, তার নিক্ষিপ্ত কোন তীর সচরাচর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না, কিনানার এ কথা শুনে আবু সুফইয়ান ইবন হারব তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো, “ভাতিজা, তুমি যে তীরটি আমাদের দিকে তাক করে রেখেছো তা একটু ফিরাও, আমরা তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।” আবু ‍সুফইয়ান বললো, “তোমার কাজটি ঠিক হয়নি, তুমি প্রকাশ্যে মানুষের সামনে দিয়ে যয়নাবকে নিয়ে বের হয়েছো, আর আমরা বসে বসে তা দেখছি। সমগ্র আরবের অধিবাসী জানে, বদরে আমাদের কী দূর্দশা ঘটেছে এবং এই যয়নাবের বাপ আমাদের কী সর্বনাশটাই না করেছে। তুমি যদি এভাবে প্রকাশ্যে তার মেয়েকে আমাদের নাকের ওপর দিয়ে নিয়ে যাও ‍তাহলে সবাই আমাদেরকে কাপুরুষ ভাববে এবং এ কাজটি সবাই আমাদের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করবে। তুমি যয়নাবকে বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কিছুদিন সে তার স্বামীর ঘরে থাকুক। এদিকে যখন লোকেরা বলাবলি করতে শুরু করবে যে, আমরা যয়নাবকে মক্কা ছেড়ে যেতে বাধা দিয়েছি, তখন তুমি তাকে গোপনে তার বাপের কাছে পৌঁছে দিও।”

    এ কথায় কিনানা/ আমর রাজী হয়ে গেল, যয়নাব মক্কায় ফিরে এল। কিছুদিন পর রাতের অন্ধকারে সে আবার যয়নাবকে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলো এবং ভায়ের নির্দেশমত তাঁকে তার পিতার প্রতিনিধিদের হাতে নির্দিষ্ট স্থানে সমর্পণ করলো।

    তাবরানী উরওয়াহ ইবন ‍যুবাইর হতে বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি যয়নাব বিনতু রাসুলুল্লাহকে সাথে নিয়ে বের হলো, কুরাইশদের দু ব্যক্তি পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তারা যয়নাবের সংগী লোকটিকে কাবু করে তাঁকে উটের পিঠ থেকে ফেলে দেয়। যয়নাব একটি পাথরের ওপর ছিটকে পড়েন। তার শরীর কেটে গিয়ে রক্ত বের হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা যয়নাবকে আবু ‍সুফইয়ানের নিকট নিয়ে যায়। আবু সুফইয়ান তাকে বনী হাশিমের মেয়েদের কাছে সোপর্দ করে। পরে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন, উটের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় যয়নাব যে ব্যাথা পান, আমরণ তিনি সে ব্যথা অনুভব করতেন এবং সেই ব্যথায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এ জন্য লোকে তাঁকে শহীদ মনে করতো। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭১)।

    হযরত আয়িশা (রা) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহর সা: কন্যা যয়নাব কিনানার সাথে মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হলো। মক্কাবাসীরা তাদের পিছু ধাওয়া করলো। হাব্বার ইবনুল আসওয়াদ সর্বপ্রথম যয়নাবকে ধরে ফেললো। সে যয়নাবের উটটি তীরবিদ্ধ করলে যয়নাব পড়ে গিয়ে আঘাত পেল। সে ছিল সন্তান সম্ভবা। এই আঘাতে তার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। অত:পর বনু হাশিম ও বনু উমাইয়া যয়নাবকে নিয়ে বিবাদ শুরু করে দিল। অবশেষে সে হিন্দা বিনতু উতবার নিকট অবস্থান করতে লাগলো। হিন্দা প্রায়ই তাকে বলতো, ‘তোমার এ বিপদ তোমার পিতার জন্যই হয়েছে।’

    একদিন রাসুলুল্লাহ সা: যায়িদ ইবন হারিসাকে বললেন, ‘তুমি কি যয়নাবকে আনতে পারবে? যায়িদ রাজী হলো। হযরত রাসূলে কারীম সা: যায়িদকে একটি আংটি দিয়ে বললেন, “এটা নিয়ে যাও। এটা যয়নাবের কাছে পৌঁছাবে।” আংটি নিয়ে যায়িদ মক্কার দিকে চললো। মক্কার উপকন্ঠে সে এক রাখালকে ছাগল চড়াতে দেখলো। সে রাখালকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কার রাখাল?’ রাখাল বললো, ‘আবুল আসের।’আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘ছাগলগুলি কার?’ বললো, ‘যয়নাব বিনতু মুহাম্মাদের।’ যায়িদ কিছুদূর রাখালের সাথে চললো। তারপর তাকে বললো, আমি যদি একটি জিনিস তোমাকে দেই, তা কি তুমি যয়নাবের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে? সে রাজী হলো। যায়িদ তাকে আংটিটি দিল, আর রাখাল সেটি যয়নাবের হাতে পৌঁছে দিল।

    যয়নাব রাখালকে জিজ্ঞাস করলো, ‘এটি তোমাকে কে দিয়েছে?’ বললো, ‘একটি লোক।’ আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তাকে কোথায় ছেড়ে এসেছো?’ বললো, ‘অমুক স্থানে।’ যয়নাব চুপ থাকলো। রাতের আঁধারে যয়নাব চুপে চুপে সেখানে গেল। যায়িদ ‍তাকে বললো, ‘তুমি আমার উটের পিঠে উঠে আমার সামনে বস।’ যয়নাব অস্বীকৃতি জানিয়ে বললো, না আপনিই আমার সামনে বসুন।’ এভাবে যয়নাব যায়িদের পেছনে বসে মদীনায় পৌঁছলো। হযরত রাসূলে কারীম সা: প্রায়ই বলতেন, ‘আমার সর্বোত্তম মেয়েটি আমার জন্যই কষ্ট ভোগ করেছে।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭১-৭২)।

    স্ত্রী যয়নাব থেকে বিচ্ছেদের পর আবুল আস কয়েক বছর মক্কায় কাটালেন। রাসুলুল্লাহ সা: মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন আগে একটা বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে তিনি সিরিয়া গেলেন। বাণিজ্য শেষে তিনি মক্কায় ফিরছেন। একশো উট ও প্রায় এক শো সত্তর জন লোকের কাফিলা। যখন তারা মদীনার কাছাকাছি স্থানে তখন মদীনা থেকে যায়িদ বিন হারিসার নেতৃত্বে প্রেরিত একটি ক্ষুদ্র টহলদানকারী বাহিনী তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং উটসহ সকল লোক বন্দী করে মদীনায় নিয়ে যায়। তবে আবুল আস পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

    অবশ্য মূসা ইবন উকবার মতে, আবু বাসীর ও তার বাহিনী আবুল আসের কাফিলার ওপর আক্রমণ চালায়। উল্লেখ্য যে, এই আবু বাসীর ও আরো কিছু লোক হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করে। তবে সন্দির শর্তানুযায়ী মদীনাবাসীরা তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ফলে তারা মক্কা থেকে পালিয়ে গিয়ে লোহিত ‍সাগরের উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করতে থাকে। তারা মক্কার বাণিজ্য কাফিলায় অতর্কিত হামলা চালাতে থাকে। তাদের ভয়ে কুরাইশদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। মক্কার কুরাইশরা বাধ্য হয় তাদেরকে মদীনায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সা: কে অনুরোধ করে। (আল ইসাবা-৪/১২২)।

    যাই হোক, আবুল আস পালিয়ে মক্কায় না গিয়ে ভীত সন্ত্রস্তভাবে রাতের অন্ধকারে গোপনে মদীনায় প্রবেশ করেন এবং সোজা যয়নাবের কাছে পৌঁছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। যয়নাব তাকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন।

     রাত কেটে গেল। হযরত রাসূলে কারীম সা: ফজরের নামাযের জন্য মসজিদে গেলে। তিনি মিহরাবে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরীমা বেঁধেছেন। পেছনের মুক্তাদীরাও তাকবীরে ‍তাহরীমা শেষ করেছে। এমন সময় পেছনে মেয়েদের কাতার থেকে যয়নাবের কন্ঠস্বর ভেসে এল, ‘জনমণ্ডলী, আমি মুহাম্মাদের কন্যা যয়নাব। আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি, আপনারাও তাকে নিরাপত্তা দিন।’

    সালাম ফিরিয়ে রাসুলুল্লাহ সা: লোকদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি যা শুনেছি, তোমরাও কি তা শুনেছো?’

    লোকেরা জবাব দিল, ‘হাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ!’ রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘যার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ, আমি এ ঘটনার কিছুই জানিনে। সে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে তাকে নিরাপত্তা দান করেছে।’ অত:পর তিনি বাড়ীতে যেয়ে মেয়েকে বললেন, ‘আবুল আসের সম্মানজনক ব্যবস্থা করবে। তবে জেনে রেখ তুমি আর তার জন্য ‍হালাল নও।’ তারপর রাসুলুল্লাহ সা: সেই বাহিনীর লোকদের ডাকলেন, যারা আবুল আসের কাফিলার উট ও লোকদের বন্দী করে নিয়ে এসেছিল। তিনি তাদের বললেন, ‘আমাদের মধ্যে এই লোকটির (আবুল আস) মর্যাদা সম্পর্কে তোমরা জ্ঞাত আছ। তোমরা তার বাণিজ্য সম্ভার কেড়ে নিয়ে এসেছো। তোমরা তার প্রতি সদয় তার মালামাল ফেরত আমি খুশি হব। আমরা তোমরা রাজী না হলে আমার কোন আপত্তি নেই। আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে তোমরা সেই মাল ভোগ করতে পার। তোমরাই সেই মালের অধিক হকদার।’ তারা সকলে বললো, ‘শোন আবুল আস, কুরাইশদের মধ্যে তুমি একজন মর্যাদাবান ব্যক্তি রাসুলুল্লাহর চাচাত ভাই এবং তার জামাই। তুমি এক কাজ কর। ইসলাম গ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এই মালামালসহ মদীনায় থেকে যাও। বেশ আরামে থাকবে।’ আবুল আস বললেন, তোমরা যা বলছো তা খুবই খারাপ কথা। আমি কি আমার নতুন দ্বীনের জীবন শুরু করবো শঠতার মাধ্যমে?

    আবুল আস তার কাফিলা ছাড়িয়ে নিয়ে মক্কায় পৌঁছলেন। মক্কায় যার যার মাল তাকে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘ওহে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা! আমার কাছে তোমাদের আর কোন কিছু পাওনা আছে কি? তারা বললো, ‘না, আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরষ্কার দান করুন। আমরা তোমাকে চমৎকার প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে পেয়েছি।

    আবুল আস আরো বললেন, ‘আমি তোমাদের হক পরিপূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষণা করছি- আশহাদু আন লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’

    মদীনায় অবস্থানকালে আমি এ ঘোষণা দিতে পারতাম। কিন্তু তা দেইনি এ জন্য যে, তোমরা ধারণা করতে আমি তোমাদের মাল ফেরত আত্মসাত করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করেছি। আল্লাহ যখন তোমাদের যার যার মাল ফেরত দেওয়ার তাওফীক ‍আমাকে দিয়েছেন এবং আমি আমার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছি, তখনই আমি ইসলামের ঘোষণা দিচ্ছি।

    অত:পর ‍হযরত আবুল আস মক্কা থেকে বের হয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহর খিদমতে ‍হাজির হন। হযরত রাসূলে কারীম সা: সম্মানের সাথে তাকে গ্রহণ করেন এবং তার স্ত্রী যয়নাবকেও তার হাতে সোপর্দ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার সম্পর্কে প্রায়ই বলতেন, ‘সে আমাকে যা বলেছে, সত্য বলেছে। আমার ওয়াদা করেছে এবং তা পালনও করেছে।’

    হযরত আবুল আস (রা) ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহর সা: সাথে কোন যুদ্ধে যোগদানের সুযোগ পাননি। হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে হিজরী ১২ সনের জিলহজ্জ মাসে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে ইবন মুন্দাহর মতে, তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। (আল ইসাবা-৪/১২৩, আল ইসতিয়াব)।

    হযরত যয়নাব ও আবুল আসের মেয়ে উমামাকে রাসুলুল্লাহ সা: খুবই স্নেহ করতেন। নামাযের মধ্যে তাকে কাঁধে উঠিয়ে নিতেন বলে বর্ণিত আছে।

  • শুরাহবীল ইবন হাসান (রা)

    শুরাহবীল ইবন হাসান (রা)

    নাম শুরাহবীল, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু আবদিল্লাহ বা আবু আবদির রহমান। পিতা আবদুল্লাহ ইবনুল মুতা’, মাতা হাসানা। তবে আবু আমরের মতে হাসানা তার মেয়ের নাম। যাই হোক,শুরাহবীলের পিতা মারা যাওয়ার পর তার মা হাসানা দ্বিতীয়বার সুফইয়ান আনসারীকে বিয়ে করেন। এ কারণে তিনি পিতার পরিবর্তে মাতার নামে পরিচিত হন। এই হাসানার বংশ সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন কিন্দা গোত্রের, কেউ বলেছেন ‍তামীম গোত্রের, আবার অনেকের মতে বনী জুমাহ গোত্রের। তিনি মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরিবারের অন্যদের সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। অত:পর সেখান থেকে মদীনায় চলে যান। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৬৪, ৩৬৯)।

    শুরাহবীল ইসলামের সূচনা পর্বেই মুসলমান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এবং মক্কা থেকে হাবশাগামী প্রথম কাফিলার সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। তারপর হাবশা থেকে সরাসরি মদীনায় আসেন এবং মায়ের দিক দিয়ে সম্পর্কিত বনী খুরাইক গোত্রে বসবাস করতে থাকেন। মদীনায় আসার পর থেকে রাসুলুল্লাহ সা: ওফাত পর্যন্ত তার জীবনের উল্লেখ যোগ্য কোন তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। সম্ভবত: রাসুলুল্লাহ সা: ওফাতের অল্প কিছুদিন আগে তিনি মদীনায় আসেন। ইসলামের খিদমতে তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মজীবন শুরু হয় খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফত কালে।

    হিজরী ১২ সনে খলীফা আবু বকর (রা) মুসলিম বাহিনীর শ্রেষ্ঠ চার সৈনিককে কমান্ডার হিসেবে নির্বাচন করেন। তাঁরা হলেন: ১. আমর ইবনুল আস, ২. ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান, ৩. আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ এবং ৪. শুরাহবীল ইবন হাসানা। প্রত্যেকের জন্য সৈনিক বাছাই করলেন এবং কে কোন পথে অগ্রসর হবেন তাও বলে দিলেন। বিজয়ের পর কে কোথাকার ওয়ালী হবেন সেটাও নির্ধারণ করে দিলেন। যথা: আমর ফিলিস্তীনের, ইয়াযীদ দিমাশকের এবং শুরাহবীল জর্দানের। (তারীখুল উম্মাহ আল ইসলামিয়্যাহ-১/১৯০-৯১)। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় পাঁচ জন সেনা কমাণ্ডারের নাম এসেছে। উপরে উল্লিখিত চারজনের মধ্যে তিন জন এবং আবু উবাইদার স্থলে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও ইয়াজ ইবন গানম আল ফিহর এর নাম বর্ণিত হয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৮৪, ১/২১৩) ইবনুল বারকী বলেন, খলীফা উমার (রা) শুরাহবীলকে শামের এক চতুর্থাংশের শাসক নিযুক্ত করেন। (আল ইসাবা২/১৪৩)।

    সিরিয়া অভিযানে বসরার যুদ্ধে শুরাহবীল ছিলেন একজন কমাণ্ডিং অফিসার। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে তাঁর প্রতিপক্ষের নেতা ‘রোমানাস’ এর মধ্যে মত বিনিময় হয়। কিন্তু তাতে কোন ফল না হওয়ায় তিনি সৈন্য সুসংগঠিত করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছেন এমন সময় হযরত খালিদ এসে উপস্থিত হলেন। খালিদ প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁরই নেতৃত্বে প্রতিপক্ষ জিযিয়া দানে সম্মত হয়। (ফুতুহুল বুলদান-১১৯)।

    বসরার পর রোমানরা আজনা দাইনে সমবেত হয়। খালিদ তাদের প্রতিহত করার জন্য অগ্রসর হন। কিছুদূর যাওয়ার পর শুরাহবীলও তাঁর সাথে যোগ দেন। উভয়ে সম্মিলিতভাবে রোমান বাহিনীর মুখোমুখি হন এবং এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। দিমাশক অভিযানে তিনি পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার এবং অবরোধের সময় একটি ফটক প্রহরার দায়িত্বে ছিলেন। বিজয়ের সমাপ্তি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।

    দিমাশক বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী ‘ফাহল’ এর পথে ‘বীসান’ এর দিকে অগ্রসর হয়। প্লাবনের কারণে পথিমধ্যে ‘ফাহল’ এ তাদের যাত্রাবিরতি করতে হয়। এ বাহিনীর সাথেও শুরাহবীল ছিলেন। তারই সতর্কতায় মুসলিম বাহিনী এক মারাত্মক বিপদ থেকে রক্ষা পায়। মূলত: রোমানরা সমুদ্রের একটি বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে ‘ফাহল’ ও ‘বীসান’ এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্লাবনের সৃষ্টি করে। মুসলিম বাহিনী যাত্রা বিরতি করে ফাহল এ শিবির স্থাপন করে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে শুরাহবীল সারা রাত জেগে শিবির পাহারা দিতেন যাতে রোমানরা অতর্কিত আক্রমণ করতে না পারে। সত্যিই সত্যিই রোমানরা একদিন হঠাৎ পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে বসে কিন্তু শুরাহবীলের দূরদর্শিতা ও সতর্কতার ফলে রোমানরা পরাজিত হয়।

    ফাহল এর পর শুরাহবীল ও ‘আমর ইবনুল ‘আস বীসান’ এর দিকে অগ্রসর হন। বীসান এর অধিবাসীরা ফাহল এর পরিণাম প্রত্যক্ষ করেছিল তারা সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ না হয়ে কিল্লার দরজা বন্ধ করে দেয়। শুরাহবীল বীসান পৌঁছেই কিল্লা অবরোধ করেন। দীর্ঘদিন এ অবরোধ চলতে থাকে। একদিন কতিপয় লোক কিল্লা থেকে বের হয়ে আক্রমণ চালানোর চেষ্ঠা করলে তাদের হত্যা করা হয়। অবশেষে তারা দিমাশকের শর্তাবলীতে সন্ধি করে। এরপর ‘তিবরিয়া’ এর অধিবাসীরা শুরাহবীলের নিকট প্রতিনিধি পাঠিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। অত:পর হযরত শুরাহবীল জর্দান এলাকা ও এর আশেপাশের সকল শহর প্রায় বিনা বাধায় ও বিনা রক্তপাতে ইসলামী শাসনের অধীনে আনেন।

    ইয়ারমুক অভিযানে মুসলিম বাহিনী সিরিয়ার সকল অঞ্চল থেকে গুটিয়ে ইয়ারমুকে সমবেত হয়। হযরত শুরাহবীলও আসেন। তিনি ও ইয়াযীদ ইবন আবু সুফইয়ান একই স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। খালিদ ছিলেন এ অভিযানের সিপাহসালার বা প্রধান সেনাপতি। তিনি গোটা সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে ছত্রিশটি ভাবে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি ভাগকে একজন অফিসারের অধীনে ন্যস্ত করেন। ডান ও বাম ভাগের দায়িত্ব অর্পিত হয় হযরত আমর ইবনুল আস ও শুরাহবীল ইবন হাসানার ওপর। এ যুদ্ধে রোমানদের প্রথম আঘাতেই মুসলিম বাহিনীর অবস্থা যখন টলটলায়মান এবং অনেকে ময়দান থেকে ভেগে যায় তখনও শুরাহবীল অটল। এ যুদ্ধে তিনি জীবনবাজী রেখে লড়েন।

    হিজরী ১৮ সনে মুসলিম বাহিনী সিরিয়া অভিযানে লিপ্ত। এ সময় ইরাক, সিরিয়া ও মিসরে মহামারি আকারে প্লেগ দেখা দেয়। আমর ইবনুল আস বললেন, এই প্লেগ হচ্ছে আল্লাহর আযাব। সুতরাং তোমরা বিভিন্ন উপত্যাকা ও গিরিপথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়। এ কথা শুনে শুরাহবীল ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি বললেন, আমর ঠিক কথা বলেনি। আমি যখন রাসুলুল্লাহর সংগী তখনও আমর তার পরিবারের উটের চেয়েও পথভ্রষ্ট। নিশ্চয় এ প্লেগ তোমাদের নবীদের দুআ রবের রহমত এবং তোমাদের পূর্ববর্তী বহু সত্যনিষ্ট লোক এতে মৃত্যুবরণ করেছেন।  (হায়াতুস সাহাবা-২/৫৮১)। তিনি ছিলেন একান্তভাবে আল্লাহ নির্ভর ব্যক্তি। তাই রোগের ভয়ে স্থান ত্যাগ করা সমীচীন মনে করেননি। তিনি স্থান ত্যাগ করলেন না। বর্ণিত আছে হযরত মু’য়াজ ইবন জাবাল, আবু উবাইদাহ, শুরাহবীল ইবন হাসানা ও আবু মালিক আল আশয়ারী (রা) একই দিন প্লেগে আক্রান্ত হন। (হায়াতুস সাহাবা-২৫৮২)। আমওয়াসের এই প্লেগে অনেকের সাথে হযরত শুরাহবীল ইবন হাসানা ৬৭ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। অবশ্য ইবন ইউনুস বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: শুরাহবীলকে মিসর পাঠান এবং সেখানেই তিনি মারা যান।  (আল ইসাবা-২/১৪৩)।

    ইবন ইউনুসের মতটি বিভিন্ন কারণে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে হয়।

    হযরত শুরাহবীলের সারাটি জীবন হাবশা প্রবাসে এবং পরবর্তীতে জিহাদের ময়দানে অতিবাহিত হলেও রাসুলুল্লাহর সা: হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন অংশে পিছিয়ে নন। তিনি বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন।

    শিফা বিনতু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গেলাম কিছু ‍সাদকা চাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তিনি সাদকা দানে অক্ষমতা প্রকাশ করলেন, আর আমিও চাপাচাপি করতে লাগলাম। ইতিমধ্যে নামাযের সময় এলো। আমি রাসুলুল্লাহর সা: নিকট থেকে বের হয়ে আমার মেয়ের ঘরে গেলাম। শুরাহবীল ইবন হাসানার স্ত্রী আমার মেয়ে। আমি শুরাহবীলকে ঘরেই পেলাম। আমি তাকে বললাম, নামাযের সময় হয়েছে, আর তুমি ঘরে বসে আছ? আমি তিরষ্কার করতে লাগলাম। তখন সে বললো, আমাকে তিরষ্কার করবেন না। আমার একখানা মাত্র কাপড়, সেটাও রাসুলুল্লাহ সা: ধার নিয়েছেন। আমি বললাম, আমার মা বাবা কোরবান হোক! আজ সারাদিন আমি রাসুলুল্লাহর সা: সংগে ঝগড়া করছি, অথচ তাঁর এ করুণ অবস্থা আমি মোটেও বুঝতে পারিনি। শুরাহবীল বলেন, ‘রাসুলুল্লাহর সা: একখানা মাত্র কাপড়, আমরা তাতে তালি লাগিয়ে দিয়েছি।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৩২৬)।