তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
উমাইর ইবন আবী ওয়াককাস (রা)

নাম উমাইর, পিতা আবু ওয়াককাস, মাতা হামনা বিনতু সুফইয়ান। ইরান বিজয়ী হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াককাসের সহোদর।
হযরত উমাইরের বড় ভাই সা’দ ইবন আবী ওয়াককাস ইসলামের সূচনা পর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন হযরত উমাইরের বয়স যদিও কম তথাপি তিনি বড় ভাই এর পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে হিজরাত করে মদীনায় পৌঁছেন। রাসূল সা: মদীনার আবদুল আশহাল গোত্রের সরদার হযরত সা’দ ইবন মুয়াজের ছোট ভাই হযরত আমর ইবন মুয়াজের সাথে তার দ্বীনী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। তারা দুজনই প্রায় সমবয়সী ছিলেন।
হিজরী ২য় সনে বদর যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। হযরত রাসূলে কারীম সা: সৈনিক নির্বাচন করছেন। হযরত উমাইরও সমাবেশে হাজির হয়েছেন। তার ভাই সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস দেখলেন, উমাইর তার দৃষ্টি এড়িয়ে অস্থির হয়ে এদিক ওদিক যাচ্ছে। তিনি যেকে জিজ্ঞেস করলেন: উমাইর, কি হয়েছে তোমার? তিনি জবাব দিলেন: ভাই, আমিও যুদ্ধে শরীক হতে চাই। হতে পারে, আল্লাহ আমাকে শাহাদাত দান করবেন। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, আমাকে ছোট মনে করে রাসূল সা: ফিরিয়ে না দেন।
রাসূল সা: সামনে যখন সকলে একের পর এক হাজির হলেন তখন উমাইরের আশংকা সত্যে পরিণত হলো। তিনি উমাইরের বয়সের দিক লক্ষ্য করে বললেন: তুমি ফিরে যাও। এ কথা শুনে হযরত উমাইর কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তার এ কান্না জিহাদের আগ্রহ ও শাহাদাতের তীব্র বাসনা দেখে রাসূলুল্লাহ সা: মুগ্ধ হন। উমাইর যুদ্ধে শরীক হওয়ার অনুমতি লাভ করেন। রাসূল সা: নিজে হাতে তার তরবারিটি ঝুলিয়ে দেন।
হযরত উমাইর (রা) তখন ষোল বছরের এক কিশোর। ভালোমত অস্ত্রশস্ত্রও ধরতে জানেন না। তার বড় ভাই তরবারী ধরা শিখিয়ে দিলেন। শাহাদাতের প্রবল আবেগ উতসাহে তিনি কাফিরদের ব্যুহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে গেলেন এবং দীর্ঘক্ষণ চরম বীরত্বের সাথে লড়লেন। এ অবস্থায় আমর ইবন আবদে উদ্দের অসির প্রচণ্ড আঘাত তার শাহাদাতের বাসনা পূর্ণ করে দেয়। ইন্না লিল্লাহি….রাজিউন। মাত্র ষোল বছর বয়সে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৯৯) খন্দকের যুদ্ধে হযরত আলী (রা) ঘাতক ‘আমর ইবন আবদে উদ্দকে হত্যা করেন। (আল ইসাবা-৩/৭০)।
শুকরান সালেহ (রা)

নাম সালেহ, লকব বা উপাধি ‘শুকরান’। পিতার নাম আদী। হযরত আবদুর রহমান ইবন আউফের (রা) হাবশী বংশজাত দাস। তবে এই দাসত্বের মধ্যেও নেতৃত্বদান তার ভাগ্যে ছিল। হযরত রাসূলে কারীম সা: নিজের কাজের জন্য তাকে নির্বাচন করেন। অর্থের বিনিময়ে তাকে আবদুর রহমানের নিকট থেকে খরীদ করেন। কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত আবদুর রহমান কোন রকম অর্থ বিনিময় ছাড়াই তাকে রাসূল সা: এর অনুকূলে হিবা করেন। তার জীবনী সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না। তিনি কখন কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কেও তেমন কোন তথ্য সীরাতের গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না।
অধিকাংশ যুদ্ধে হযরত শুকরান যুদ্ধলদ্ধ সম্পদ ও কয়েদীদের হিফাজতের দায়িত্বে নিয়োজিত হতেন। এ কারণে যুদ্ধে তিনি একদিকে গানীমাতের অংশ পেতেন, আবার অন্যদিকে যাদের কয়েদীদের দেখাশুনার দায়িত্ব পালন করতেন তাদের নিকট থেকে পারিশ্রমিক পেতেন। আবু মাশার বলেন, তিনি দাস হিসাবে বদর যুদেধ যোগদান করেন। এ কারণে গানীমাতের অংশ তাকে দেওয়া হয়নি। তবে বদরে বন্দীদের দেখাশুনার দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রত্যেকেই কিছু কিছু অর্থ তাকে দান করে। এতে যারা গানীমাতের অংশ পেয়েছিলেন তাদের থেকেও তিনি বেশি পেয়ে যান। বদর যুদ্ধে তার দায়িত্ব পালনে সতর্কতা ও দক্ষতা দেখে রাসূল সা: এতই মুগ্ধ হন যে, তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তিদান করেন।
‘মাররে ইয়াসী’ যুদ্ধে পরাজিত শত্রু বাহিনীর পরিত্যাক্ত অর্থ সম্পদ অস্ত্র-শস্ত্র, ছাগল-বকরী ও তাদের অন্যান্য দ্রব্য সামগ্রী জমা করার দায়িত্বে তাঁকে নিয়োজিত করা হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার প্রতি এত প্রসন্ন ছিলেন যে, ইনতিকালের সময় তার প্রতি সদাচরণের জন্য অসীয়াত করে যান। হযরত শুকরান (রা) আহলে বাইত বা রাসূল সা: এর পরিবার পরিজনদের সাথে দাফন-কাফনে শরীক হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ইবন ইসহাক আলী ইবনুল হুসাইনের সূত্রে বর্ণনা করেন, আলী ইবনু আবী তালিব, ফাদল ইবন আব্বাস, কুসাম ইবন আব্বাস, শুকরান মাওলা রাসুলিল্লাহ ও আউস ইবন খাওলা কবরে নেমে রাসূলুল্লাহকে কবরে শায়িত করেন। (আল ইসাবা-২/৬৬৪)।
হযরত রাসুলুল্লাহর সা: ইনতিকালের পর হযরত শুকরান (রা) মদীনায় থাকেন না বসরায় বসতি স্থাপন করেন- এ ব্যাপারে মতভেদ আছে। কারণ, বসরায় তার একটি বাড়ী ছিল। তার মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কেও সঠিকভাবে জানা যায় না। ইতিহাসে তিনি শুকরান মাওলা রাসুলিল্লাহ- রাসূলুল্লাহর আযাদকৃত দাস শুকরান নামে প্রসিদ্ধ।
মিহরায ইবন নাদলা (রা)

নাম মিহরায, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু ফাদলাহ। তবে প্রধানত: আখরাম আল আসাদী উপাধিতে প্রসিদ্ধ ছিলেন।
তিনি কখন কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন তা সঠিকভাবে জানা যায় না। তবে তিনি প্রথম পর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন বলে সীরাত বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত। মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করার পর আবদুল আশহাল গোত্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন এবং হযরত আম্মার ইবন হাযামের (রা) সাথে তার মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
মূসা ইবন উকবা, ইবন ইসহাক ও অন্যরা তাকে বদরী সাহাবীদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।
ওয়াকিদী আয়্যূব ইবন নুমান থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: বদরে মুসয়াব ইবন উমাইরের ভাই আবু আযীয ইবন উমাইর বন্দী হয়। তাকে মিহরায ইবন নাদলার হিফাজতে দেওয়া হয়। মুসয়াব মুহরিযকে বলেন: ওর হাতটি একটু কষে বাঁধ। মক্কায় ওর একজন সম্পদশালী মা আছে। আবু আযীয বলে: ভাই, আমার প্রতি আপনার এমন নির্দেশ? মুসয়াব বললেন: তোমার স্থলে মুহরিয আমার ভাই। আবু আযীযের মুক্তির জন্য তার মা চার হাজার দিরহাম পাঠায়। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩১৫)।
উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধেও তিনি জীবনবাজি রেখে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। তার জীবনের সর্বশেষ ও সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ হলো ‘জী কারাদের’ যুদ্ধ। হিজরী ৬ষ্ঠ সনে বনু ফাযারাহ মদীনার উপকন্ঠে একটি চারণক্ষেত্রে হামলা চালায় এবং রাখালদের হত্যা করে রাসূল সা: উটগুলি লুট করে নিয়ে যায়। হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া ঘটনাস্থলের নিকটেই ছিলেন। তিনি রাসূল সা: এর দাস রাবাহকে মতান্তরে আবদুর রহমান ইবন আউফের একটি দাসকে মদীনায় পাঠান খবর দেওয়ার জন্য। আর এ দিকে তিনি নিজে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ‘ইয়া সাবাহাহ’ (বিপদের সতর্ক ধ্বনি) বলে এমন জোরে ধ্বনি দেন যে, মদীনার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দীর্ঘক্ষণ একাকী তীর ও পাথরের সাহায্যে এই ডাকাত দলের মুকাবিলা করতে থাকেন। এর মধ্যে গাছের ফাঁকে রাসুল সা: এর বাহিনী ছুটে আসতে দেখা গেল। সেই বাহিনীর পুরোভাগে ছিলেন হযরত মুহরিয ইবন নাদলা। আর তাঁর পেছনে ছিলেন হযরত আবু কাতাদাহ আল আনসারী ও মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা)। হযরত সালামা ইবন আকওয়া হযরত আখরাম বা মিহরাযের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে বললেন: আখরাম, আগে অগ্রসর হবে না। আমার ভয় হচ্ছে, ডাকাতরা তোমাকে ঘিরে ফেলবে, রাসূল সা: ও তার সাহাবীদের সাথে তোমাকে মিলিত হতে দেবে না। তিনি জবাব দিলেন: সালামা, তুমি যদি আল্লাহ এবং কিয়ামতের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাক, আর তোমার যদি এ কথা জানা থাকে যে, জান্নাত ও জাহান্নাম সত্য, তাহলে আমার শাহাদাত লাভের পথে প্রতিবন্ধক হয়ো না। কথাটি তিনি এমন আবেগের সাথে উচ্চারণ করেন যে, হযরত সালামা (রা) তার ঘোড়ার লাগামটি ছেড়ে দেন। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে আবদুর রহমান ইবন ফারাযীর সামনে গিয়ে পথ রুখ করে দাড়ান। তিনি আবদুর রহমানের উপর তরবারির এমন শক্ত আঘাত হানেন যে, তার ঘোড়াটি কেটে দু টুকরো হয়ে যায়। এদিকে আব্দুর রহমানের নিক্ষিপ্ত বর্শাও লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো না। হযরত মিহরাযের শহীদ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। আর আবদুর রহমান লাফিয়ে মিহরাযের ঘোড়ার উপর চেড়ে বসে। পেছনেই ছিলেন হযরত আবু কাতাদাহ। তিনি সাথে সাথে আব্দুর রহমানের উপর তীব্র আঘাত হানেন। এভাবে কাতাদাহ (রা) আ: রহমানকে জাহান্নামে পাঠিয়ে বন্ধু হত্যার প্রতিশোধ নেন। শাহাদাতের সময় হযরত মিহরাযের বয়স হয়েছিল ৩৭ অথবা ৩৮ বছর।
উপরে উল্লেখিত ঘটনা তাঁর ঈমানী দৃঢ়তা ও শাহাদাতের তীব্র আকাংখার স্পষ্ট প্রমাণ। শাহাদাতের কয়েকদিন পূর্বে তিনি স্বপ্নে দেখেন, আকাশের দরযা সমূহ তার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তিনি সর্বোচ্চ জগতে ভ্রমণ করতে করতে সিদরাতুল মুনতাহা পৌঁছে গেছেন। সেখানে তাকে বলা হয়, এটাই তোমার আবাসস্থল।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ছিলেন স্বপ্নের তাবীর বা তাতপর্য ব্যাখ্যার সুবিজ্ঞ। হযরত মিহরায পরের দিন তার নিকট স্বপ্নটি বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আখরাম, তোমার শাহাদাতের সুসংবাদ। এ ঘটনার কিছুদিন পর ‘জী কারাদ’ অভিযানে তার স্বপ্ন বাস্তবে পরিণত হয় এবং তিনি তার স্থায়ী আবাসস্থল ‘সিদরাতুল মুনতাহা’ পৌঁছে যান।
শুজা ইবন ওয়াহাব (রা)

নাম শুজা, কুনিয়াত আবু ওয়াহাব এবং পিতা ওয়াহাব। জাহিলী যুগে তার খান্দান বনী আবদে শাࢮস এর হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ ছিল। (উসুদুল গাবা-২/৩৮৬)।
যারা ইসলামের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন, হযরত শুজা তাদেরই একজন। মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে বাধ্য হয়ে হাবশা হিজরাতকারী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশা যান। (আল ইসাবা-৩/১৩৮)।
তাদের হাবশা অবস্থানকালে যখন সেখানে এ গুজব রটে যে মক্কার সকল বাসিন্দা রাসুলুল্লাহর সা: আনুগত্য মেনে নিয়েছে, তখন স্বদেশের ভালোবাসা অনেকের মত তাকেও মক্কায় টেনে নিয়ে আসে। মক্কায় এসে দেখেন খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কিছুদিন মক্কায় অবস্থানের পর নিরাপদে মদীনায় হিজরাত করেন। এখানে হযরত আউসের সাথে তার দ্বীনী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
বদর, উহুদ সহ সকল প্রসিদ্ধ যুদ্ধে তিনি অংশ গ্রহণ করেন। হিজরী ৮ম সনের রবীউল আউয়াল মাসে বনী হাওয়াযিনের একটি দলকে নির্মূলের দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়। এই বনী হাওয়াযিন মদীনা থেকে পাঁচ দিনের দুরত্বে ‘রসসী’ নামক স্থানে তাবু স্থাপন করেছিল। হযরত শুজা চব্বিশজন দু:সাহসী মুজাহিদকে সংগে করে দিনের বেলা লুকিয়ে লুকিয়ে এবং রাতের বেলা সদম্ভে ভ্রমণ করতে করতে একদিন হঠাত সেখানে উপস্থিত হলেন। শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করে তাদের বিপুল সংখ্যক উট, ভেড়া, বকরী ছিনিয়ে মদীনায় নিয়ে আসেন। গানীমতের মালের পরিমাণ এর দ্বারা অনুমান করা যায় যে, প্রত্যেক মুজাহিদের ভাগে অন্যান্য জিনিসপত্র ছাড়াও পনেরটি উট পড়েছিল।
হুদাইবিয়া থেকে প্রত্যাবর্তনের পর রাসূল সা: ততকালীন বিশ্বের অধিকাংশ রাজা বাদশাদের নিকট পত্র সহ দূত পাঠান। রাসূল সা: শুজাকে একটি পত্র সহ হারেস ইবন আবী শিমর আল গাসসানী মতান্তরে মুনজির ইবন হারেস ইবন আবী শিমর আল গাসসানীর নিকট পাঠান। (হায়াতুস সাহাবা-১/১২৭)
এই হারেস ছিল দিমাশকের নিকটবর্তী ‘গুতা’ স্থানের শাসক। রাসূল সা: তাকে যে পত্রটি লেখেন তার প্রথম কয়েকটি বাক্য নিম্নরূপ: “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের পক্ষ থেকে হারেস ইবন আবী শিমরের প্রতি। যারা হিদায়াতের অনুসরণ করে, ঈমান আনে এবং সত্য বলে জানে তাদের উপর সালাম। আমি আপনাকে সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার দাওয়াত দিচ্ছি যিনি এক, যার কোন শরীক নেই। এমতাবস্থায় আপনার রাজত্ব বহাল থাকবে।”
হারেস এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে। তবে তার উযীর ‘মুরাই’ ইসলাম গ্রহণ করেন এবং গোপনে হযরত শুজার মাধ্যমে রাসুল সা: খিদমতে সালাম পেশ করেন।
ইমাম যুহরী বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায়, শুজা ইবন ওয়াহাব ছিলেন পারস্যের কিসরার দরবারে প্রেরিত রাসূল সা: দূত। রাসূলুল্লাহর সা: চিঠিটি তিনিই কিসরার হাতে অপর্ণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৩৬)
প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে ভন্ড নবী মুসাইলামা আল কাজ্জাবের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধে ইয়ামামার প্রান্তরে হযরত শুজা শাহাদত বরণ করেন। (আল ইসাবা-২/১৩৮)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল চল্লিশ বছরের কিছু বেশি।
শাম্মাস ইবন উসমান (রা)

নাম শাম্মাস, পিতার নাম উসমান এবং মাতার নাম সাফিয়্যাহ। কুরাইশ গোত্রের বনু মাখযুম শাখার সন্তান। হিশাম কালবী থেকে বর্ণিত হয়েছে, তার প্রকৃত নাম ছিল উসমান। শাম্মাস নামকরণের কারণ এই যে, একবার জাহিলী যুগে পরম সুন্দর এক খৃস্টান পুরুষ মক্কায় আসে। তার চেহারা থেকে যেন সূর্যের কিরণ চমকাচ্ছিল। তার এ অত্যাশ্চার্য সৌন্দর্য দেখে মানুষ বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়ে।
হযরত শাম্মাসের মামা উতবা ইবন রাবী’য়া এ সময় দাবী করলো যে, তার কাছে এর থেকেও বেশি সূর্য কিরণ বিচ্ছুরিত হচ্ছে এমন মানুষ আছে। আর সে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হযরত শাম্মাসকে উপস্থাপন করে। সেদিন থেকে উসমান শাম্মাসে পরিণত হন। শাম্মাস অর্থ অতিরিক্ত সূর্য কিরণ বিচ্ছুরণকারী। (উসুদুল গাবা-৩/৩৭৫)। যুবাইর ইবন বাক্কার বলেন: তিনি ছিলেন মক্কার অন্যতম সুদর্শন ব্যক্তি। (আল ইসাবা-১/১৫৫)।
হযরত শাম্মাস ও তার মা হযরত সাফিয়্যা বিনতু রাবী’য়া প্রথম পর্বেই রাসুল সা: এর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।
মুশরিকদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি হাবশায় হিজরত করেন। সংগে মা সাফিয়্যাকেও নিয়ে যান। সেখান থেকে মক্কায় ফিরে আবার মদীনায় হিজরাত করেন। মদীনায় হযরত মুবাশশির ইবন আল মুনজিরের অতিথি হন। হযরত হানজালা ইবন আবী আমের আল আনসারীর সাথে মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
বদর ও উহুদ যুদ্ধে হযরত শাম্মাস বীরত্বের সাথে জীবন বাজি রেখে লড়াই করেন। উহুদের যুদ্ধে হঠাত করে যখন মুসলমানদের বিজয় পরাজয়ে পরিণত হয় এবং মাত্র গুটি কয়েক জীবন জীবন উতসর্গকারী মুজাহিদ ছাড়া আর সকলে ময়দান ছেড়ে দেয়, সেই চরম মুহুর্তে যে কজন রাসুলুল্লাহর সা: পাশে থেকে কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করেন তাদের মধ্যে শাম্মাস একজন। রাসুল সা: বলতেন: এক ঢাল ছাড়া আমি শাম্মাসের আর কোন উপমা পাই না। রাসূল সা: সেদিন ডানে বায়ে যেদিকে তাকান কেবল শাম্মাসই দৃষ্টিতে পড়েন। তিনি নিজেকে সেদিন রাসুলুল্লাহর ঢালে পরিণত করেন। তার সারাটি দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে দেখা গেল প্রাণ স্পন্দন কোন রকম অবশিষ্ট আছে। এ অবস্থায় মদীনায় আনা হলো। হযরত উম্মু সালামাকে তার সেবার দায়িত্ব দেওয়া হল। কিন্তু তখন তার জীবনের শেষ পর্যায়। একদিন পর তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার রক্তমাখা জামাকাপড়েই জানাযার নামায ছাড়াই উহুদের শহীদদের কবরস্থানে দাফন করার নির্দেশ দেন। তাকে আবার উহুদে নিয়ে গিয়ে দাফন করা হয়। তবে ঐতিহাসিক ওয়াকেদী বলেন: তাকে মদীনার বাকী গোরস্তানে দাফন করা হয়। তিনি ছাড়া উহুদে শাহাদাত প্রাপ্ত আর কেউ বাকী গোরস্তানে সমাহিত হননি। (আল ইসাবা-২/১৫৫)।
হযরত হাসসান (রা) তার মৃত্যুতে শোক গাঁথা রচনা করেছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র চৌত্রিশ বছর।
উকাশা ইবন মিহসান (রা)

নাম উকাশা বা উককাশা, কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু মিহসান। পিতা মিহসান ইবন হুরসান। জাহিলী যুদে বনী আবদে শামসের হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। হিজরতের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং অন্যদের সাথে মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে যান। (উসুদুল গাবা-৪/২)।
বদর যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য দারুণ নাম করেন। এ যুদ্ধে তার হাতের তরবারিটি ভেঙ্গে খান খান হয়ে যায়। রাসুল সা: তাকে একটি খেজুরের ছড়ি দান করেন এবং তা দিয়েই তিনি সূচালো ছুরির মত শত্রুর ওপর আক্রমণ চালান। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত তিনি এ ছড়ি দিয়েই লড়ে যান। (ইসতীয়াব) ইবন সাদ যায়িদ ইবন আসলাম ও অন্যদের থেকে বর্ণনা করছেন: বদরের দিন উকাশা ইবন মিহসানের অসিটি ভেঙ্গে যায়। রাসূল সা: তাকে একটি কাঠের লাঠি দেন। সেটি তার হাতে স্বচ্ছ ঝকমকে কঠিন লোহার তীক্ষ অসিতে পরিণত হয়। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৫৮)।
উহুদ, খন্দক, সহ সকল প্রসিদ্ধ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে তিনি চরম বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। হিজরী সপ্তম সনের রাবীউল আউয়াল মাসে বনী আসাদের মুলোতপাটনের জন্য তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মদীনার পথে ‘গামার’ কূপের আশে পাশে ছিল এই বনী আসাদের বসতি। তিনি চল্লিশ জনের একটি বাহিনী নিয়ে দ্রুত সেখানে গিয়ে হাজির হন। কিন্তু বনী আসাদের লোকেরা ভয়ে আগে ভাগেই সে স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র পালিয়ে যায়। উকাশা কাউকে না পেয়ে তাদের পরিত্যক্ত দুশো উট ও কিছু ছাগল বকরী হাকিয়ে নিয়ে মদীনায় ফিরে আসেন।
হিজরী ১২ সনে প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রা) হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদকে ভন্ডনবী তুলাইহা আসাদীর বিদ্রোহ নির্মূলের নির্দেশ দেন। হযরত উকাশা ও হযরত সাবিত ইবন আরকাম ছিলেন হযরত খালিদের বাহিনীর দুজন অগ্র সৈনিক। তারা বাহিনীর আগে আগে চলছিলেন। হঠাত শত্রু সৈন্যর সাথে তাদের সংঘর্ষ ঘটে। এই শত্রু সৈনিকদের মধ্যে তুলাইহা নিজে ও তাঁর ভাই সালামাও ছিল। তুলাইহা আক্রমণ করে উকাশাকে, আর সালামা ঝাপিয়ে পড়ে সাবিতের ওপর। সাবিত শাহাদাত বরণ করেন। এমন সময় তুলাইহা চেচিয়ে ওঠে সালামা শিগগির আমাকে সাহায্য কর। আমাকে মেরে ফেললো। সালামার কাজ তখন শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে তুলাইহার সাহায্যে এগিয়ে যায় এবং দুই ভাই এক সাথে উকাশাকে আক্রমণ করে ধরাশায়ী করে ফেলে। এভাবে উকাশা শহীদ হন।
ইসলামী ফৌজ এই দুই শহীদের লাশের কাকে পৌঁছে ভীষণ শোকাতুর হয়ে পড়ে। হযরত উকাশার দেহে মারাত্মক যখমের চিহ্ন ছিল। তার সারা দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। বাহিনী প্রধান হযরত খালিদ ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাহিনীর যাত্রা বিরতির নির্দেশ দেন। অত:পর শহীদ দু য়ের রক্ত ভেজা কাপড়েই দাফন দিয়ে সেই মরুভূমির বালুতে দাফন করেন।
মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে তিনি নেতৃস্থানীয় সাহাবীদের মধ্যে শামিল ছিলেন। (উসুদুল গাবা-৪/৩)
হযরত রাসূলে কারীম সা: একবার বলেন, সত্তর হাজার মানুষ বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। উকাশা প্রশ্ন করেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি? বললেন, তুমিও তাদের মধ্যে। অত:পর দ্বিতীয় এক ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। তখন রাসূল সা: বললেন, উকাশা তোমার থেকে এগিয়ে গেছে। এই ঘটনার পর রাসুল সা: এর এই বাক্যটি প্রবাদে পরিণত হয়। কেউ কোন ব্যাপারে কাউকে ছাড়িয়ে গেলে বলা হয়, অমুক উকাশার মত এগিয়ে গেছে।
আবু রাফে (রা)

হযরত আবু রাফে’র (রা) প্রকৃত নামের ব্যাপারে প্রচুর মতভেদ দেখা যায়। যেমন: ইবরাহীম, আসলাম, সিনান, ইয়াসার, সালেহ, আবদুর রহমান, কারমান, ইয়াযীদ, সাবেত, হুরমুয ইত্যাদি। এর মধ্যে আসলাম নামটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। (আল ইসাবা-৪/৬৭) আবু রাফে তার কুনিয়াত বা ডাকনাম। বংশ কৌলিন্যের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমত করার সৌভাগ্য তার হয়েছিল। রাসুল সা: তাকে স্বীয় পরিবারের মধ্যে শামিল করে নেন। এর বেশি খান্দানী শরাফত কোন মানুষের জন্য আর হতে পারে না। আসলে তিনি ছিলেন একজন হাবশী দাস।
হযরত আবু রাফে প্রথম হযরত আব্বাসের (রা) দাস ছিলেন। তিনি রাসুল সা:কে হিবা বা দান করেন। পরে হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত আব্বাসের (রা) ইসলাম গ্রহণের খুশীতে আবু রাফেকে আযাদ করে দেন।
তার ইসলাম সম্পর্কে বলা হয়েছে, হযরত রাসূলে পাকের সা: পবিত্র মুখমন্ডলের দীপ্তি দেখে যারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন, আবে তাদের অন্যতম। এ সম্পর্কে আবু রাফে নিজেই বলছেন: একবার কুরাইশরা আমাকে তাদের কোন একটি কাজে রাসুল সা: এর নিকট পাঠায়। রাসুল সা: কে দেখা মাত্র আমার অন্তর ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসুল সা: আমি আর ফিরে যাব না। তিনি বললেন: ‘আমি কাসেদ বা দূতকে ঠেকিয়ে রাখিনা এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না। এখন তুমি ফিরে যাও। এভাবে যদি কিছু দিন তোমার অন্তরে ইসলামের প্রতি আবেগ বিদ্যমান থাকে তাহলে চলে এসো। তখনকার মত তো তিনি ফিরে গেলে এবং কিছুদিন পর আবার ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।
হযরত আবু রাফে অত্যাচারী কুরাইশ শক্তির ভয়ে বদর যুদ্ধ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখেন। বদর যুদ্ধ সবে মাত্র শেষ হয়েছে এমন সময় একদিন তিনি কাবার পাশে যমযম কুয়োর ঘরে বসে তীর তৈরী করছেন। হযরত আব্বাসের স্ত্রী তার পাশেই বসা। এ সময় নরাধম আবু লাহাব সেখানে এসে বসে। আবু লাহাব তার কাছে বদর যুদ্ধের অবস্থা জিজ্ঞেস করতে লাগলো। উল্লেখ্য যে, আবু লাহাব বদর যুদ্ধে নিজে যোগদান না করে প্রতিনিধি হিসাবে আস ইবন হিশামকে পাঠায়। আবু লাহাবের জিজ্ঞাসার জবাবে আবু সুফইয়ান বললো: তুমি কি জিজ্ঞেস করছো, মুসলমানরা আমাদের সকল শক্তি চুরমার করে দিয়েছে, অনেককে হত্যা ও বহু লোককে বন্দী করেছে। এ প্রসঙ্গে এক অভিনব কাহিনী বলা হয় যে, ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত সাদা কালো পোশাকের অশ্বারোহীতে পরিপূর্ণ ছিল। তার এ কথা শুনে আবু রাফে অকস্মাৎ বলে ওঠেন, তারা ফিরিশতা। আর যায় কোথায়! সঙ্গে সঙ্গে আবু সুফইয়ান আবু রাফের গালে প্রচণ্ড থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আবু রাফে আঘাতটা সামলে নিয়ে রুখে দাড়ান; কিন্তু তিনি ছিলেন দূর্বল। আবু লাহাব তাকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং বুকের উপর উঠে বসে আচ্ছামত মার দেয়। হযরত আব্বাসের স্ত্রী এ অত্যাচার দেখে সহ্য করতে পারলেন না। তিনি একটি খুটি তুলে নিয়ে নরপশু আবু লাহাবের মাথায় কষে মারলেন এক বাড়ি। পাপাচারী আবু লাহাবের মাথা কেটে গেল। হযরত আব্বাসের স্ত্রী তখন বলতে লাগলেন, আবু রাফে’র মনিবের অনুপস্থিতির সুযোগে তাকে দুর্বল মনে করে মারছো? এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর ‘আদাসী’ (বসন্ত) নামক রোগে আবু লাহাবের মৃত্যু হয়। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৩০-৩১)।
তাবরানী ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুল সা: হিজরাতের পঞ্চম বছরে আমরা রাসুল সা: এর সাথে মিলিত হই। সেটা ছিল আহযাব যুদ্ধের সময়। আমি ছিলাম আমার ভাই ফদল ইবন আব্বাসের সাথে। আমাদের সাথে আমাদের গোলাম আবু রাফেও ছিল। মদীনায় পৌঁছে আমরা রাসুল সা:কে খন্দকের মধ্যে পেলাম। এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, আবু রাফে হিজরী ৫ম সনে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭৩)।
তবে ইবন হিশাম হযরত আয়িশার (রা) একটি বর্ণনা নকল করেছেন। হযরত আয়িশা (রা) বলেছেন, রাসুল সা: মদীনায় হিজরাতের কিছুদিন পর একটু স্থির হয়ে আমাদেরকে নেওয়ার জন্য যায়িদ ইবন হারিসা ও আবু রাফেকে মদীনা থেকে মক্কায় পাঠান। (সীরাতু ইবন হিশাম)
এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় আবু রাফে ৫ম হিজরীর পূর্বেই মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: সাথে বসবাস করতে থাকেন।
একমাত্র বদর যুদ্ধ সম্পর্কে আবু রাফে বর্ণনা করেন: আমরা আলীর নেতৃত্বে খাইবারে গেলাম। রাসুল সা: স্বীয় পতাকা আলীর হাতে দিয়ে খাইবারে পাঠান। আমরা দূর্গের কাছাকাছি গেলে দূর্গবাসীরা বের হয়ে এসে আমাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করলো। আলী দূর্গের একটি দরযা ছিড়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সেটা তার হাতে ছিল। তারপর ফেলে দেন। আমরা আটজন প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেটা উল্টাতে সক্ষম হইনি। (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৪৬)।
হিজরী সপ্তম সনে রাসুল সা: হুদাইবিয়ার সন্ধির চুক্তি অনুযায়ী মক্কায় গিয়ে ‘উমরাতুল কাদা’ আদায় করেন। আবু রাফে এই সফরেও রাসুল সা: সঙ্গী ছিলেন। এই সফরে মক্কায় অবস্থানকালে রাসুল সা: এর সাথে হযরত মায়মুনার শাদী মুবারক অনুষ্ঠিত হয়। মক্কায় অবস্থানের মেয়াদ শেষ হলে হযরত রাসূলে কারীম সা: আবু রাফেকে মক্কায় রেখে ‘সারফে’ চলে যান। পরে আবু রাফে হযরত মায়মুনাকে (রা) নিয়ে ‘সারফে’ পৌঁছেন এবং সেখানেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। তারপর সকলে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৭২)।
হযরত রাসূলে রাসূলে কারীম সা: হযরত আলী (রা) নেতৃত্বে যে বাহিনীটি ইয়ামনে পাঠান তাতে আবু রাফেও ছিলেন। হযরত আলী (রা) নিজের অনুপস্থিতিতে আবু রাফে কে বাহিনীর নেতৃত্ব দান করেন।
ইসলাম দাস তথা দূর্বল শ্রেণীর লোকদের উন্নতির যে সুযোগ দান করেছে, আবু রাফে তার উজ্জল দৃষ্টান্ত। তিনি দাস ছিলেন, তবে মর্যাদা ও যোগ্যতায় ছিলেন আযাদ লোকদের সমকক্ষ। হাদীসের গ্রন্থসমূহে তার বর্ণিত ৬৮টি হাদীস পাওয়া যায়। তার মধ্যে একটি ইমাম বুখারী ও তিনটি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
দাসত্ব থেকে মুক্তির পরও তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমতের গৌরব হাতছাড়া করেননি। এ কারণে রাসুল সা: প্রাত্যাহিক ক্রিয়াকলাপ ও অভ্যাস সম্পর্কে তার জানা ছিল অনেক। বিশিষ্ট সাহাবীরা এ বিষয়ে তার কাছে জানার জন্য ভিড় করতেন। হযরত ইবন আব্বাস (রা) একজন সেক্রেটারী সংগে করে তার কাছে আসতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, রাসুল সা: অমুক অমুক দিন কি কি কাজ করতেন? আবু রাফে বলতেন আর সেক্রেটারী তা লিখে নিতেন। (আল ইসাবা-৪/৯২)।
রাসুলুল্লাহ সা: তাকে আযাদ করে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেই রাসুল সা: এর খিদমতে আবদ্ধ থাকেন। রাসূল সা: যখন তাকে মুক্তি দেন, তখন আবু রাফের দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। লোকেরা তাকে বলে, দাসত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছ, এতে কান্নার কি আছে! তিনি বললেন, আজ একটি সোয়াব আমার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এরপর থেকে যদিও তিনি আইনগত মুক্ত বা স্বাধীন হয়ে যান, তবে রাসুল সা: এর খিদমতের মর্যাদা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকেন। সফরের সময় রাসুল সা: তার তাঁবু তিনিই তৈরী করতেন। রাসুল সা: এর সাথে তার এই গোলামীর সম্পর্কটা এত মধুর ও প্রিয় ছিল যে, আমরণ তিনি রাসুল সা: গোলাম বা দাস বলে নিজের পরিচয় দিতেন।
হযরত রাসূলে কারীম সা: এক সাহাবী নাওফিল ইবন হারিসকে এক মহিলার সাথে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর খাওয়ার মত কোন কিছু তার কাছে চাইলেন; কিন্তু পেলেন না। তখন রাসূল সা: স্বীয় বর্মটি আবু রাফে ও আবু আইয়ুবের হাতে দিয়ে বিক্রির জন্য পাঠালেন। তার বর্মটি এক ইয়াহুদীর নিকট বন্ধক রেখে তিরিশ সা’ যব নিয়ে রাসুল সা: এর নিকট পৌঁছলেন। রাসূল সা: যবগুলি নাওফিলের হাতে তুলে দিলেন। নাওফিল বলেন, আমরা সেই যবগুলি অর্ধ বছর খেয়েছিলাম। তারপর ওজন করে দেখলাম তা মোটেই কমেনি, পূর্বের মতই আছে। এ কথা রাসুল সা: কে বললে তিনি মন্তব্য করলেন, যদি ওজন না করতে তাহলে সারা জীবন খেতে পারতে। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৩০)।
হযরত আবু রাফে জীবনের এক পর্যায়ে দারুণ অভাব ও অর্থ কষ্টে পড়েন। এমনকি মানুষের কাছে হাত পেতে সাদকা ও সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তবে কক্ষণো প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করেননি। তার জীবনের এ পর্যায় সম্পর্কে রাসুল সা: ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। আবু রাফে বলছেন একদিন রাসূল সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন: ‘ওহে আবু রাফে’, যখন তুমি দরিদ্র হয়ে যাবে তখন কেমন হবে? আবু রাফে বললেন, আমি কি সে অবস্থায় সাদকা গ্রহণ করবো? রাসূল সা: বললেন: হা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার দারিদ্র কখন আসবে? বললেন, আমার মৃত্যুর পরে। বর্ণনাকারী আবু সুলাইম বলেন, আমি তাকে দরিদ্র অবস্থায় দেখেছি। পথের ধারে বসে তিনি বলতেন, অন্ধ বৃদ্ধকে কে সাদকা করতে চায়, কে সেই ব্যক্তিকে দান করতে চায় যাকে রাসুলুল্লাহ সা: বলে গেছেন যে, সে ভবিষ্যতে দরিদ্র হবে? তিনি আরও বলে গেছেন, ধনী ব্যক্তির জন্য সাদকা গ্রহণ বৈধ নয় এবং বৈধ নয় সুস্থ্য ব্যক্তির জন্যও। আবু সুলাইম বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে আবু রাফেকে চারটি দিরহাম দান করলো। কিন্তু তিনি একটি দিরহাম ফেরত দিলেন। লোকটি বলল, আবদুল্লাহ, আমার দান আপনি ফেরত দেবেন না। আবু রাফে বললেন রাসুল সা: আমাকে অতিরিক্ত সম্পদ জমা করতে নিষেধ করেছেন। আবু সুলাইম আরও বলেন, আমি শেস পর্যন্ত আবু রাফেকে ধনী ব্যক্তি হিসেবে দেখেছি এবং তাকে বলতে শুনেছি, আফসুস, আবু রাফে যদি দরিদ্র অবস্থায় মারা যেত! (হায়াতুস সাহাবা-২২৫৩-৫৪) ওয়াকেদীর মতে হযরত আলীর খিলাফতকালে মদীনায় ইনতিকাল করেন। (আল ইসাবা-৪/৬৭)।
উবাইদাহ ইবনুল হারিস (রা)

নাম উবাইদাহ, কুনিয়াত আবুল হারিস বা আবু মুআবিয়া। পিতা আল হারিস এবং মাতা সুখাইলা। দাদা আব্দুল মুত্তালিব ইবন আবদে মান্নাফ। কুরাইশ গোত্রের সন্তান।
উবাইদাহ ইবনুল হারিস, আবু সালামা ইবনে আবদিল আসাদ, আল আরকাম ইবন আবিল আরকাম এবং উসমান ইবন মাজউন হযরত আবু বকরের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে এক সাথে ঈমান আনেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তখন আল আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে আশ্রয় নেননি। হযরত উবাইদাহ যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তিনি বনী আবদে মান্নাফের একজন নেতা। মক্কায় হযরত বিলালকে তিনি দ্বীনী ভাই হিসাবে গ্রহণ করেন।
মদীনায় হিজরাতের নির্দেশ হলো। হযরত উবাইদাহ তার দুই ভাই তুফাইল, হুসাইন এবং মিসতাহ ইবন উসাসাহকে সাথে করে মদীনায় রওয়ানা হলেন। পথে মিসতাহ হাঁটা চলা করতে একেবারে অক্ষম হয়ে পড়লেন। অগ্রগামী কাফিলার লোকেরা খবর পেয়ে ফিরে এসে তাকে উঠিয়ে মদীনায় নিয়ে যান। মদীনায় হযরত আবদুর রহমান আজলানী (রা) তাদের স্বাগত জানান এবং অত্যন্ত যত্নের সাথে তাদের আতিথেয়তা করেন। হযরত রাসূলে কারীমের সা: মদীনায় আগমনের পর পর হযরত উমাইর ইবন হুমাম আল আনসারীর সাথে তার ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথকভাবে বসবাসের জন্য রাসূল সা: তাকে এক খন্ড জমিও দান করেন। তার পুরো খান্দান সেখানে বসতি স্থাপন করে।
মক্কার মুশরিকদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য হিজরাতের আট মাস পরে ৬০ জন মুহাজিরের একটি দলের নেতৃত্ব দিয়ে রাসূল সা: তাকে রাবেগের দিকে পাঠান। ইসলামের ইতিহাসে এটা ছিল দ্বিতীয় অভিযান। রাসুল সা: এ বাহিনীর ঝান্ডা উবাইদার হাতে সমর্পণ করেন। তারা রাবেগের নিকটে পৌঁছলে আবু সুফইয়ানের নেতৃত্বে দুশো মুশরিকের একটি বাহিনীর সাথে তাদের সামান্য সংঘর্ষ হয়। ব্যাপারটি যুদ্ধ ও রক্তপাত পর্যন্ত না গড়িয়ে কিছু তীর ও বর্শা ছোঁড়াছুড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
এ ঘটনার পর তিনি হক ও বাতিলের প্রথম সংঘর্ষ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কাতারবন্দী হওয়ার পর মুশরিকদের পক্ষ থেকে উতবা. শাইবা ও ওয়ালীদ বেরিয়ে এসে চিৎকার করে বলতে থাকে- আমাদের সাথে লড়বার কেউ আছে কি? ইসলামী ফৌজ থেকে কয়েকজন নওজোয়ান আনসারী এগিয়ে গেলেন। তখন তারা চেঁচিয়ে বললো: ‘মুহাম্মাদ, আমরা অসম লোকদের সাথে লড়তে পারিনে। আমাদের যোগ্য প্রতিদ্বন্ধীদের পাঠাও।’ রাসূল সা: আলী, হামযা, ও উবাইদাহকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিনে। তারা এ আদেশের অপেক্ষায় ছিলেন। এ তিন বীর আদেশ পাওয়া মাত্র আপন আপন নিযা দোলাতে দোলাতে তিন প্রতিপক্ষের সামনে গিয়ে দাড়ালেন। হযরত উবাইদাহ ও ওয়ালীদের মধ্যে দীর্ঘ সময় লড়াই চললো। তারা দুজনই মারাত্মক যখম হলেন। তবে আলী ও হামযা উভয়েই প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে ফেলেছিলেন। তারা এক সাথে ওয়ালীদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করেন এবং হযরত উবাইদাহকে রণাঙ্গণ থেকে আহত অবস্থায় তুলে নিয়ে আসেন।
হযরত উবাইদাহর একটি পা হাঁটুর নীচ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তিনি আপাদমস্তক রক্তে রঞ্জিত হয়ে পড়েন। রাসুল সা: তাকে সান্তনা দেওয়ার জন্য তার হাটুর ওপর স্বীয় মাথাটি রেখে দেন। এ অবস্থায় উবাইদাহ বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ,এ সময় আবু তালিব জীবিত থেকে আমার এ অবস্থা দেখলে তার প্রত্যয় হতো যে, তার এ কথা বলার অধিকতর যোগ্য ব্যক্তি আমি। এই বলে তিনি আবু তালিবের একটি কবিতার এই পংক্তি আবৃত্তি করেন, “আমরা মুহাম্মাদের হিফাজত করবো। এমনকি চারপাশে মরে পড়ে থাকবো এবং আমাদের সন্তান ও স্ত্রীদের আমরা ভুলে যাব।” (সীরাতু ইবন হিশাম-২)
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সা: তাকে সাথে করে মদীনার দিকে রওয়ানা হন। তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। পথে ‘সাফরা’ নামক স্থানে ৬৩ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। সাফরার বালুর মধ্যে তাকে দাফন করা হয়।
হযরত রাসূলে কারীমের কাছে তার উচু মর্যাদা ছিল। রাসূল সা: তাকে অত্যন্ত সম্মান দেখাতেন। একবার রাসূল সা: ‘সাফরায়’ তার কবরের কাছে তাবু স্থাপন করেন। সাহাবীরা আরজ করেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ এখান থেকে মিশকের ঘ্রাণ আসছে। তিনি বললেন: এখানে তো আবু মুআবিয়ার কবর ছিল। সুতরাং আশ্চর্য হওয়ার কি আছে?”
হযরত উবাইদার (রা) মৃত্যুতে হিন্দা বিনতু উসাসা ও কাব সহ বহু কবি শোকগাথা রচনা করেছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/২৪, ২৫, ৪১)।
হাকীম ইবন হাযাম (রা)

নাম হাকীম, ডাক নাম আবু খালিদ। পিতা হাযাম ইবনে খুওয়াইলিদ, মাতা যয়নাব মতান্তরে সাফিয়্যা। হাকীম নিজেই বলছেন: আমি ‘আমুল ফীল’ (হস্তী বৎসর) অর্থাত আবরাহার কাবা আক্রমণের তের বছর পূর্বে জন্মগ্রহণ করি। ওয়াকিদী বলেন: হাকীমের জন্ম রাসূলুল্লাহর সা: জন্মের পাঁচ বছর পূর্বে। তার পিতা হাযাম ফিজার যুদ্ধে মারা যায়। তিনি নিজেও এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুবাইর ইবন বাকার বলেন: হাকীম কাবার অভ্যন্তরে জন্ম গ্রহণ করেন। (আল ইসাবা-১/৩৪৯)।
ইতিহাস বলছে, তিনি আরবের একমাত্র সন্তান যে কাবার অভ্যন্তরে ভূমিষ্ট হয়েছে। তার মা কয়েকজন বান্ধবী সহ কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সেদিন কোন এক বিশেষ উপলক্ষ্যে কাবার দরযা খোলা ছিল। সে সময় তার মা ছিলেন গর্ভবতী। আল্লাহর ইচ্ছায় সেখানে তার প্রসব বেদনা ওঠে, তিনি বের হওয়ার সময় পেলেন না। একটি চামড়া বিছিয়ে দেওয়া হলো। তিনি একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন। তার নাম রাখা হয় হাকীম ইবন হাযাম। উম্মুল মুমিনীন হযরত খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদ তার ফুফু।
হাকীম মক্কার এক সম্পদশালী অভিজাত পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন অতিশয় ভদ্র ও বুদ্ধিমান। কুরাইশরা তাকে নেতা হিসাবে বরণ করে নেয়। জাহিলী যুগে আরবে যারা মক্কায় আগত হাজীদের দেখাশুনা করতো, আহার করাতো, তাদের বলা হতো ‘মুতয়িম’ অর্থাত যে আহার করায়- হাকীমও ছিলেন মক্কার এক অন্যতম ‘মুতয়িম’। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৬৪-৬৫)।
জাহিলী যুগে যারা আল্লাহর ঘর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কায় এসে দূর্দশায় পড়তো তিনি নিজের অর্থ দিয়ে তাদের সাহায্য করতেন। নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ছিলেন রাসুলুল্লাহ সা: অন্তরঙ্গ বন্ধু। বয়সে রাসুলুল্লাহর সা: বড় হওয়া সত্ত্বেও রাসুলুল্লাহকে ভালোবাসতেন, তার সাহচর্যকে মূল্যবান মনে করতেন। অনুরূপভাবে রাসুলুল্লাহও তাকে ভালোবাসতেন এবং তাকে সঙ্গ দিতেন।
অত:পর হযরত খাদীজা বিনতু খুওয়াইলিদের সাথে রাসুলুল্লাহর সা: বিয়ে এবং রাসুলুল্লাহর সা: সাথে হাকীমের আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে তাদের পুরাতন সম্পর্ক আরও মজবুত হয়। তবে খুব বিস্ময়ের ব্যাপার যে, দুজনের মধ্যে এত গভীর সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মক্কা বিজয়ের পূর্ব দিন পর্যন্ত তিনি রাসুলুল্লাহর সা: ওপর ঈমান আনেননি। তিনি যখন ঈমান আনেন তখন রাসূলুল্লাহ সা: এর নবুওয়াতের বিশটি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে।
আল্লাহ তাআলা হাকীমকে যে জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও রাসুলুল্লাহর সা: আত্মীয়তা দান করেন তাতে এটাই সঙ্গত ছিল যে, তিনিই সর্ব প্রথম তার দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ঈমান আনবেন। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় তা হয়নি। এ ব্যাপারে আমরা যেমন বিস্মিত হই, তেমনি নিজেও নিজের আচরণে বিস্মিত হয়েছেন। ইসলাম গ্রহণেরপর আমরণ তিনি তার বিগত জীবনের কার্যকলাপের জন অনুশোচনায় দগ্ধিভূত হয়েছেন। ইসলাম গ্রহণের পর তার পুত্র একদিন তাকে দেখলেন, তিনি বসে বসে কাঁদছেন। জিজ্ঞেস করলেন:
আব্বা, কাঁদছেন কেন?
বেটা আমার কান্নার কারণ অনেকগুলি।
প্রথমত আমি বিলম্বে ইসলাম গ্রহণ করেছি। ফলে বহু বড় বড় নেক কাজ থেকে পিছিয়ে পড়েছি। এখন যদি সমগ্র পৃথিবীর সমপরিমাণ স্বর্ণও আমি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করি তবুও আমি তার সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবো না।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ আমাকে বদর ও উহুদে প্রাণে বাঁচান। তখন আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, আমি আর কক্ষনও রাসুলুল্লাহর সা: বিরুদ্ধে কুরাইশদের সাহায্য করব না এবং মক্কা থেকেও আর বের হব না। কিন্তু তার পরই আবার কুরাইশদের সাহায্য করার দু:সাহস দেখিয়েছি।
তৃতীয়ত: যখনই আমি ইসলাম গ্রহণের কথা ভেবেছি তখনই বয়স্ক সম্মানিত কুরাইশ নেতাদের প্রতি লক্ষ্য করেছি। তারা তাদের জাহিলী আচার আচরণ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে আছে। আমিও তাদের অনুসরণ করেছি। আফসুস! আমি যদি তাদের অনুসরণ না করতাম! বাপ দাদা ও নেতৃবৃন্দের অনুসরণই আমাকে ধ্বংস করেছে। বেটা, এখন আমি কেন কাঁদবো না?
হাকীমের এত বিলম্বে ইসলাম গ্রহণে যেমন আমরা এবং তিনি নিজেও বিস্মিত হয়েছেন, তেমনি খোদ রাসুলুল্লাহও সা: কম বিস্মিত হনি। তার মত অন্যান্য বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা দ্রুত ইসলামে শামিল হোক রাসূল সা: এটাই কামনা করতেন।
মক্কা বিজয়ের পূর্বরাত্রি রাসূল সা: সাহাবীদের বললেন, মক্কার চার ব্যক্তির মুশরিক থাকা আমি পছন্দ করিনি। তারা ইসলাম গ্রহণ করুক এটাই আমি কামনা করেছি।
প্রশ্ন করা হলো, তারা কে কে? বললেন, আত্তাব ইবন উসাইদ, জুবাইর ইবন মুতয়িম, হাকীম ইবন হাযাম ও সুহাইল ইবন আমর॥ আল্লাহর অনুগ্রহে তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসুলুল্লাহ সা: যখন তার সংগী সাথী সহ মক্কার শিয়াবে আবী তালীবে অবরুদ্ধ তখন মুশরিক বা পৌত্তলিক থাকা সত্ত্বেও হাকীম তার ফুফু খাদীজাকে গোপনে খাদ্য সামগ্রী পাঠাতেন। একদিন গম নিয়ে যেতে নরাধম আবু জাহলের নজরে পড়ে যান। আবু জাহল বাধা দেয়। আবুল বাখতারী ইবন হিশাম কাছেই ছিল। সে এগিয়ে এসে আবু জাহলকে বলে: সে তার ফুফুর জন্য সামান্য কিছু খাদ্য পাঠাচ্ছে। তুমি তাতে বাধা দিচ্ছ? শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে বেশ মারপিট হয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৫৩-৩৫৪)।
কুরাইশদের প্রতিরোধ সত্ত্বেও যখন মক্কার ভেতরে ও বাইরে রাসূলের সা: সাহায্যকারীর সংখ্যা বেড়ে গেল তখন কুরাইশরা বেশি বিচলিত হয়ে পড়লো। তারা রাসুলুল্লাহর সা: ব্যাপারে একটি চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মক্কার ‘দারুন নাদওয়া’ গৃহে সমবেত হলো। এ বৈঠকে অন্যান্য কুরাইশ নেতৃবন্দের সাথে হাকীমও উপস্থিত ছিলেন। একজন নাজদী বৃদ্ধের বেশে ইবলিসও এ বৈঠকে উপস্থিত ছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৮০-৮১)।
কুরাইশরা বদরে অবতরণের পর তাদের কিছু লোক রাসুলুল্লাহর সা: কূপ থেকে পানি পান করার জন্য এগিয়ে এলো। তাদের মধ্যে হাকীমও ছিলেন। রাসূল সা: তাদের পানি পানে বাধা দিতে নিষেধ করলেন। যারা সেই পানি পান করেছে, একমাত্র হাকীম ছাড়া তাদের সকলে বদরে নিহত হয়েছিল। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/ ৬২২)।
কুরাইশরা বদরে শিবির স্থাপনের পর উমাইর ইবন ওয়াহাবকে পাঠালো মুসলিম বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা নিরূপণের জন্য। উমাইর মুসলিম শিবিরের আশেপাশে ঘুরে এসে বললেন: তারা তিনশো বা তার কিছু কম বা বেশি হতে পারে। উমাইর কুরাইশদের যুদ্ধে অবতীর্ণ না হওয়ার জন্য মত প্রকাশ করেন। তার কথা শুনে হাকীম ইবন হাযাম জনতার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে উতবা ইবন রাবীয়ার কাছে এসে বললেন: আবুল ওয়ালীদ! তুমি কুরাইশদের নেতা ও সরদার। তুমি কুরাইশদের মান্যগণ্য ব্যক্তি। চিরদিন তাদের মধ্যে তোমার সুকীর্তি স্মরণ করা হোক তা কি তুমি চাও না? উতবা বললো: হাকীম, এ কথা কেন? হাকীম বললেন: তুমি লোকদের মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। উতবা হাকীমকে আবু জাহলের নিকট পাঠায়। হাকীম বলেন, আমি আবু জাহলের কাছে গিয়ে দেখলাম সে তার ঢালে তেল লাগাচ্ছে। আমি বললাম: আবুল হাকাম! আমাকে উতবা তোমার নিকট এ উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছে। আবু জাহল বললো: আল্লাহর কসম! সে মুহাম্মাদ ও তার সাথীদের দেখে কাপুরুষ হয়ে গেছে।
মুহাম্মাদ ও আমাদের মধ্যে আল্লাহর ফায়সালা না হওয়া পর্যন্ত আমরা ফিরবো না। আর উতবা তো এমন কথা বলবেই। তার ছেলে তো রয়েছে তাদের সাথে। এ জন্য সে তোমাদের ভয় দিচ্ছে। এভাবে হাকীম ও উতবা সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য যে চেষ্ঠা করেছিলেন, আবু জাহলের গোয়ার্তুমীতে তা ভন্ডুল হয়ে যায়। আল্লাহর ইচ্ছায় বদরের প্রথম শিকার আবু জাহল। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬২২-২৪)।
বদরের পরাজয় সম্পর্কে হাকীম পরবর্তীকালে বর্ণনা করেছেন: আমরা একটি শব্দ শুনতে পেলাম, যেন আকাশ থেকে মাটিতে এসে পড়লো। শব্দটি ছিল একটি থালার ওপর পাথর পড়ার মত। রাসুলুল্লাহ সা: সেই পাথরটি নিক্ষেপ করেছিলেন। আমরা পরাজিত হয়েছিলাম। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৫০)।
মক্কা বিজয়ের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সা: ‘মাররাজ জাহরান’ পৌঁছে শিবির স্থাপন করেছেন। কুরাইশদের পক্ষ থেকে গোপনে খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আবু সুফাইয়ান ইবন হারব, হাকীম ইবন হাযাম ও বুদাইল ইবন ওয়ারকা মক্কা থেকে বের হন। মক্কার অদূরে ‘আরাক’ নামক স্থানে পৌঁছে তারা উট, ঘোড়া ও মানুষের শোরগোল শুনতে পান। তারা আরও এগিয়ে রাতের অন্ধকারে এক সময় মুসলিম এলাকায় ঢুকে পড়েন। মুসলিম প্রহরীরা তাদের ধরে ফেলে। আবু সুফইয়ানের ঘাড়ে উমার (রা) কয়েকটি ঘুষি বসিয়ে দেন। আবু সুফইয়ান ভয়ে চেঁচিয়ে আব্বাসের সাহায্য কামনা করেন। আব্বাস ছুটে এসে তাঁকে উমারের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এদিকে হাকীম ও বুদাইলকে বন্দী করে রাসুলুল্লাহর সা: নিকট উপস্থিত করা হলে তারা স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। আবু সুফইয়ানও ইসলাম গ্রহণ করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৬৩, ১৭০-৭২, সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪০০)।
মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ সা: বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করছেন। তিনি হাকীম ইবন হাযামকে সম্মান প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেন। তিনি এক ঘোষণা দানের নির্দেশ দেন:
১. আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তার কোন শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দাহ ও রাসূল- যারা এ সাক্ষ্য দিবে তারা নিরাপদ।
২. যে ব্যক্তি অস্ত্র ফেলে কাবার চত্বরে বসে পড়বে সে নিরাপদ।
৩. যারা নিজ ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকবে তারা নিরাপদ।
৪. যে আবু সুফইয়ানের বাড়ীতে আশ্রয় নেবে সে নিরাপদ।
৫. যে হাকীম ইবন হাযামের বাড়ীতে আশ্রয় নেবে সেও নিরাপদ।
হাকীম ইবন হাযামের বাড়ীটি ছিল মক্কার নিম্ন ভূমিতে এবং আবু সুফইয়ানের বাড়ীটি উচ্চ ভূমিতে।
হাকীম ইবন হাযাম অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি এ অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন যে, ইসলাম পূর্ব জীবনে ইসলাম ও রাসূলের সা: শত্রুতায় যে ভূমিকা ও যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন ঠিক তেমন ভূমিকা ও সেই পরিমাণ অর্থ তিনি ইসলামী জীবনে পালন ও ব্যয় করবেন।
মক্কার ‘দারুন নদওয়া’ ছিল একটি বাড়ী। কুরাইশরা সেখানে সমবেত হয়ে পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো। কুরাইশ বংশের উর্ধ্বতন পুরুষ কুসাঈ এ বাড়ীটি নির্মাণ করে। হাত বদল হয়ে ইসলাম পূর্ব যুগে হাকীম বাড়ীটির মালিক হন। ইসলাম গ্রহণের পর মুআবিয়ার খিলাফতকালে তিনি বাড়ীটি এক লাখ দিরহামে বিক্রি করেন। মুআবিয়া তাকে তিরস্কার করে বলেন: তুমি বাপ দাদার মর্যাদা ও কৌলিন্য বিক্রি করে দিলে? হাকীম বললেন: এক তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতি ছাড়া সব সম্মান, সব কৌলিন্য বিলীন হয়ে গেছে। জাহিলী যুগে একপাত্র মদের বিনিময়ে বাড়ীটি আমি কিনেছিলাম। আর আজ এক লাখ দিরহামে বিক্রি করলাম। তোমাকে আরও জানাচ্ছি, এ অর্থের সবই আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় হবে। সুতরাং ক্ষতিটি কোথায়? (সীরাতু ইবন হিশাম-১/১২৫)
ইসলাম গ্রহণের পর হাকীম ইবন হাযাম একবার হজ্জ আদায় করলেন। মূল্যবান কাপড়ে সজ্জিত উত্তম জাতের একশো উট তার আগে আগে হাকিয়ে নিয়ে গেলেন। সবগুলিই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কুরবানী করলেন।
আর একবার তিনি হজ্জ করলেন। যখন তিনি আরাফাতে অবস্থান করছেন তখন তার সাথে একশো দাস। প্রত্যেকের কন্ঠে একটি করে রূপোর প্লেট ঝুলছে, আর তাতে লেখা আছে: হাকীম ইবন হাযামের পক্ষ থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে মুক্তিপ্রাপ্ত দাস। তাদের সকলকে তিনি মুক্তি দেন। অন্য একটি হজ্জে তিনি এক হাজার ছাগল বকরী সংগে নিয়ে যান। সবগুলি মিনায় কুরবানী করেন এবং সেই গোশত দিয়ে মুসলমান গরীব মিসকীনদের আহার করান।
হুনাইন যুদ্ধের পর হাকীম ইবন হাযাম রাসুল সা: এর নিকট গণীমতের সম্পদ থেকে চাইলেন। রাসূল সা: তাকে কিছু দান করলেন। তিনি আবার চাইলেন। রাসূল সা: তাকে আবারও দান করলেন। এভাবে সেদিন তিনি একাই একশো উট লাভ করলেন। তখন তিনি নওমুসলিম। (সীরাতু ইবন হিশাম-২৪৯৩)।
অত:পর রাসূল সা: তাকে লক্ষ্য করে বলেন:
‘ওহে হাকীম, এই সম্পদ অতি মিষ্টি ও অতি প্রিয়। যে ব্যক্তি আত্মতৃপ্তির সাথে গ্রহণ করে তাতে বরকত দেওয়া হয়। আর যে তা লোভাতুর অবস্থায় গ্রহণ করে তাতে বরকত দেওয়া হয়না। সে ঐ ব্যক্তির মত যে আহার করে; কিন্তু পরিতৃপ্ত হয় না। আর উপরের হাতটি নীচের হাত অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর। অর্থাত দাতা হাতটি গ্রহীতা হাত অপেক্ষা উত্তম।’
রাসুলুল্লাহ সা: মুখে এ বাণী শুনে হাকীম বললেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ সা:, যিনি আপনাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন সেই সত্তার নামে শপথ, আজকের পর জীবনে আর কোন দিন কারও কাছে কিছুই চাইব না। কারও কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করবো না।’ হাকীম তার শপথ যথাযথভাবে পালন করেন।
হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে ‘বাইতুল মাল’ থেকে হাকীমের ভাতা গ্রহণের জন্য খলীফা তাকে একাধিকবার আহবান জানান। হাকীম বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত উমার (রা) খলীফা হলেন। তিনিও বার বার হাকীমকে আহবান জানাতে লাগলেন তার অংশ গ্রহণের জন্য। শেষ পর্যন্ত হযরত উমার (রা) জনগণকে সাক্ষী রেখে বললেন: ওহে মুসলিম জনমন্ডলী! তোমরা শুনে রাখ, আমি হাকীমকে তার অংশ গ্রহণের আহবান জানিয়েছি, আর সে প্রত্যাখ্যান করে চলেছে। এভাবে হাকীম আমরণ আর কারও কাছে হাত পেতে আর কিছুই গ্রহণ করেননি। উমার (রা) প্রায়ই বলতেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমাকে স্বাক্ষী রেখে বলছি, আমি হাকীমকে তার অংশ গ্রহণের জন্য ডেকেছি, কিন্তু সে প্রত্যাখ্যান করেছে। (হায়াতুস সাহাবা-২/২৫০-৫১)।
একবার হাকীম ইবন হাযাম মুশরিক অর্থাত পৌত্তলিক অবস্থায় ইয়ামনে যান। সেখান থেকে ইয়ামনের ‘যু-ইয়াযন’ রাজার একটি চাদর খরীদ করে মদীনায় গিয়ে রাসুলুল্লাহকে সা: কে উপহার দেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সা: তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমি মুশরিকের কোন হাদিয়া গ্রহণ করিনে।’ হাকীম চাদরটি বিক্রি করলে রাসূল সা: তা ক্রয় করেন এবং গায়ে দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করেন। হাকীম বলেন, এই পোশাকে এত সুন্দর আর কাউকে আমি আর কক্ষনও দেখিনি। রাসুলুল্লাহকে সা: যেন পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্রের মত দেখাচ্ছিল। অচেতনভাবে তখন আমার মুখ থেকে রাসূলুল্লাহর সা: প্রশংসায় একটি কবিতা বেরিয়ে আসে। (হায়াতুস সাহাবা-২/২৪৩-৪৪)।
একবার রাসূলুল্লাহ সা: কুরবানীর ছাগল ক্রয়ের জন্য একটি দীনার দিয়ে হাকীমকে বাজারে পাঠালেন। তিনি বাজারে এক দীনারে একটি ছাগল ক্রয় করে আবার তা দুই দীনারে বিক্রি করেন। অত:পর এক দীনার দিয়ে একটি ছাগল ক্রয় করে অন্য দীনারটি সহ রাসুলুল্লাহর সা: নিকট হাজির হলেন। রাসুল সা: তার রিযিকের বরকতের জন্য দুআ করলেন এবং লাভের দীনারটি সাদকা করে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৩৪৫)
হযরত হাকীমের মৃত্যুসন সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইমাম বুখারী তার ‘তারিখে’ উল্লেখ করেছেন, তিনি হিজরী ৬০ (ষাট) সনে একশো বিশ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তবে উরওয়ার মতে তিনি খলীফা হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতের দশম বছরে মৃত্যুবরণ করেন।
নাওফিল ইবন হারেস (রা)
নাম নাওফিল, কুনিয়াত বা ডাক নাম আবু হারেস। পিতা হারেস ইবন আবদিল মুত্তালিব, মাতা গাযিয়্যা। কুরাইশ বংশের হাশেমী শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর সা: চাচাতো ভাই।
রাসুলুল্লাহ সা: দাওয়াতী কাজ শুরু করতেই নিকটতম আত্মীয়রাও তার শত্রু হয়ে যায় এবং বিরোধিতায় কোমর বেঁধে লেগে যায়। তবে নাওফিলের অন্তরে সব সময় ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা বিদ্যমান ছিল। এ কারণে পৌত্তলিক থাকা অবস্থায়ও তিনি রাসুল সা: এর বিরোধিতা মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি। মক্কার মুশরিকদের চাপে বাধ্য হয়ে তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বদরে যান। কিন্তু তখন তার মুখে এই পংক্তিটি বারবার উচ্চারিত হচ্ছিল:
‘আহমাদের সাথে যুদ্ধ করা আমার জন্য হারাম, আহমাদকে আমি আমার নিকট আত্মীয় মনে করি।’
বদরে মক্কার পৌত্তলিক বাহিনীর পরাজয় হলে অন্যদের সাথে তিনিও বন্দী হন। এই বন্দী অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করেন। যখন রাসুল সা: তাকে বললেন: নাওফিল, ফিদিয়া বা মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত হয়ে যাও। নাওফিল বললেন: মুক্তিপণ দেওয়ার সামর্থ আমার নেই। নাওফিল বলে উঠলেন: আল্লাহর কসম, এক আল্লাহ ছাড়া জিদ্দার তীরগুলির কথা আর কেউ জানেনা। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। জিদ্দায় তার এক হাজার তীর ছিল। অবশ্য অন্য একটি মতে তিনি খন্দক যুদ্ধের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায় চলে যান। (টীকা: সীরাতু ইবন হিশাম ২/৩. আল ইসাবা-৩/৫৭৭)।
নাওফিল ছিলেন একজন ভাল কবি। ইসলাম গ্রহণের স্বীয় অনভূতি অনেক কবিতায় প্রকাশ করেছেন। তার কয়েকটি পংক্তি নিম্নরূপ:
‘দূরে যাও, দূরে যাও, আমি আর তোমাদের নই।
কুরাইশ নেতাদের দ্বীনের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।
আমি সাক্ষ্য দিয়েছি, মুহাম্মাদ নিশ্চয়ই নবী।
তিনি তার প্রভুর কাছ থেকে হিদায়াত ও দিব্যজ্ঞান নিয়ে এসেছেন।
তিনি আল্লাহর রাসূল- তাকওয়ার দিকে আহবান জানান,
আল্লাহর রাসূল কোন কবি নন।
এই বিশ্বাস নিয়ে আমি বেঁচে থাকবো।
কবরেও আমি এই বিশ্বাসের ওপর শুয়ে থাকবো।
আবার কিয়ামতের দিন এই বিশ্বাস নিয়ে ওঠবো।’
খন্দক অথবা মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে হযরত আব্বাসের সা: সাথে আবার তিনি মদীনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আবওয়া পৌঁছে রাবীয়া ইবন হারেস ইবন আবদিল মুত্তালিব আবার মক্কায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। নাওফিল তাকে বলেন: যে স্থানের মানুষ আল্লাহর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করে, যেখানের অধিবাসীরা তাকে অস্বীকার করে- সেই পৌত্তলিক ভূমিতে তুমি কোথায় ফিরে যাবে? এখন আল্লাহ তাঁর রাসূলকে সম্মান দান করেছেন, তার সঙ্গী সাথীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তুমি আমাদের সাথেই চলো। অত:পর কাফিলাটি হিজরাত করে মদীনায় পৌঁছে।
ইসলাম গ্রহণের পূর্ব থেকেই নাওফিল ও আব্বাসের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ছিল। এ কারণে রাসূল সা: তাদের দুজনের মধ্যে দ্বীনী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেনএবং দুজনের বসবাসের জন্য দুটি বাড়ীও বরাদ্দ করেন। বাড়ী দুটির একটি ছিল মসজিদে নববী সংলগ্ন ‘রাহবাতুল কাদা’ নামক স্থানে এবং অন্যটি ছিল বাজারে-‘সানিয়্যাতুল বিদা’র রাস্তায়।
মদীনায় আসার পর সর্ব প্রথম মক্কা বিজয়ে অংশগ্রহণ করেন। তায়েফ ও হুনাইনসহ বিভিন্ন অভিযানে যোগ দিয়ে বিশেষ যোগ্যতা ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। বিশেষত: হুনাইনে তিনি চরম সাহসিকতা দেখান। মুসলিম বাহিনী যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে এবং পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয় তখনও তিনি শত্রুর মুকাবিলায় পাহাড়ের মত অটল থাকেন। এই যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীকে প্রভূত সাহায্য করেন। যাত্রার প্রাক্কালে তিন হাজার নিযা তিনি রাসুল সা: এর হাতে তুলে দেন। রাসুল সা: মন্তব্য করেন: আমি যেন দেখছি, তোমার তীরগুলি মুশরিকদের পিঠসমূহ বিদ্ধ করছে। (টীকা: সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩)।
হযরত নাওফিল (রা) হিজরী ১৫ সনে মদীনায় ইনতিকাল করেন এবং খলীফা হযরত উমার তার জানাযার নামাযের ইমামতি করেন। মদীনার ‘বাকী’ গোরস্তানে তাকে দাফন করা হয়।
হযরত রাসুলে কারীম সা: সব সময় নাওফিলের খোজ খবর নিতেন, মদীনার এক মহিলার সাথে রাসূল সা: তার বিয়ে দেন। তখন তার ঘরে কোন খাবার নেই। রাসূল সা: স্বীয় বর্মটি আবু রাফে ও আবু আইউবের হাতে দিয়ে এক ইয়াহুদীর নিকট পাঠান। তারা বর্মটি সেই ইয়াহুদির নিকট বন্দক রেখে বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ত্রিশ সা’ যব খরীদ করে রাসুল সা: এর নিকট নিয়ে আসেন। তিনি তা নাওফিলকে দান করেন।
আকীল ইবন আবী তালিব (রা)

নাম আকীল ডাক নাম আবু ইয়াযীদ। পিতা আবু তালিব ইবন আবদিল মুত্তালিব মাতা ফাতিমা। কুরাইশ বংশের হাশেমী শাখার সন্তান। চতুর্থ খলীফা হযরত আলীর সৎ ভাই এবং আলী অপেক্ষা বিশ বছর বড়।
আকীল পিতা আবু তালিবের কাছে প্রতিপালিত হন। রাসুলুল্লাহর সা: নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে একবার মক্কায় দারুণ অভাব দেখা দেয়। কুরাইশদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সা: ও আব্বাসের অবস্থা তুলনামূলকভাবে একটু ভালো চিল। একদিন রাসূলুল্লাহ সা: আব্বাসকে বললেন: চাচা, আপনার ভাই আবু তালিবের অবস্থা তো আপনার জানা। তার সন্তান সংখ্যা বেশি। চলুন না আমরা তার কিছু সন্তানের দায়িত্ব নেই। তারা দুজন আবু তালিবের কাছে গিয়ে তাদের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলেন। আবু তালিব বললেন, আকীল ছাড়া আর যাকে খুশি তোমরা নিয়ে যেতে পার। রাসূলুল্লাহ সা: আলীকে এবং আব্বাস জাফরকে নিয়ে গেলেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৫৩০)।
আকীলের অন্তর প্রথম থেকেই ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি দূবল ছিল। কিন্তু কুরাইশদের ভয়ে প্রকাশ্যে ইসলাম কবুল করতে পারেননি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সরদার মুশরিকদের সাথে বদর যুদ্ধে যোগদান করেন এবং আরও অনেকের সাথে তিনিও মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হন। রাসূলুল্লাহ সা: স্বীয় খান্দানের কে কে বন্দী হয়েছে তা দেখার জন্য আলীকে নির্দেশ দেন। আলী খোজ খেবর নিয়ে বলেন: নাওফিল, আব্বাস, ও আকীল বন্দী হয়েছে। এ কথা শুনে রাসুলুল্লাহ সা: নিজেই তাদের দেখতে যান এবং আকীলের পাশে দাড়িয়ে বলেন: আবু জাহল নিহত হয়েছে। আকীল বললেন: এখন তিহামা অঞ্চলে মুসলমানদের কোন প্রতিপক্ষ নেই। আকীল ছিলেন রিক্তহস্ত। আব্বার তার মুক্তিপণ পরিশোধ করে তাকে ছাড়িয়ে নেন। বদরে তিনি হযরত উবাইদ ইবন আউসের হাতে বন্দী হন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৬৮৭)।
বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি মক্কায় ফিরে যান। মক্কা বিজয়ের বছর মতান্তরে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর যথারীতি ইসলাম গ্রহণ করে অষ্টম হিজরী সনের প্রথম দিকে মদীনায় হিজরাত করেন। (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।
মূতা অভিযানে অংশগ্রহণের পর আবার মক্কায় ফিরে যান এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ কারণে মক্কা বিজয়, তায়েফ ও হুনাইন অভিযানে শরীক হতে পারেননি। (উসুদুল গাবা-৩/৪২২) তবে কোন কোন বর্ণনা মতে তিনি হুনাইন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে প্রথম দিকে যখন মুসলিম বাহিনীর পরাজয় হতে চলেছিল, এমনকি মুহাজির ও আনসাররাও পালাতে শুরু করেছিল, তখন যারা দৃঢ়পদ ছিলেন তাদের একজন তিনি (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।
ইবন হিশাম বলেন: আকীল্ ইবন আবী তালিব হুনাইন যুদ্ধের দিন রক্তমাখা তরবারি হাতে স্ত্রী ফাতিমা বিনতু শাইবা ইবন রাবীয়ার তাবুতে প্রবেশ করেন। স্ত্রী বলেন: আমি বুঝেছি তুমি যুদ্ধ করেছো। তবে কী গণীমত (যুদ্ধলদ্ধ জিনিস) আমার জন্য নিয়ে এসেছ? আকীল বললেন: এই নাও একটি সুঁচ, কাপড় সেলাই করবে। তিনি সুঁচটি স্ত্রীর হাতে দিলেন। এমন সময় রাসুলুল্লাহর সা: ঘোষকের কন্ঠ শোনা গেল। তিনি ঘোষণা করছেন: কেউ কোন জিনিস নিয়ে থাকলে ফেরত দিয়ে যাও। এমনটি একটি সুঁচ-সুতো নিয়ে থাকলে ফেরত দিয়ে যাও। আকীল স্ত্রীর দিকে ফিরে বললেন: তোমার সুঁচটিও চলে গেল। এই বলে তিনি স্ত্রীর হাত থেকে সূঁচটি নিয়ে গণীমতের সম্পদের স্তুপে ফেলে দিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪৯২)।
রাসুলুল্লাহর সা: ইনতিকাল তথা হুনাইন যুদ্ধের পর থেকে খলীফা উসমানের খিলাফতের শেষ পর্যন্ত হযরত আকীলের ভূমিকা ও কর্মতৎপরতা সম্পর্কে ইতিহাসে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। তবে হযরত উমারের খিলাফতকালে বাইতুল মালে যখন প্রচুর অর্থ জমা হতে থাকে তখন তিনি এই অর্থের ব্যাপারে বিশিষ্ট সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করেন। হযরত আলী (রা) সকল অর্থ জনগণের মধ্যে বন্টন করে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। হযরত উসমান বললেন: প্রচুর অর্থ, সকলে পাবে। তবে কে পেল, আর কে পেল না তা হিসেব না রাখলে বিষয়টি বিশৃঙ্খলার রূপ নেবে। তখন ওয়ালীদ ইবন হিশাম ইবন মুগীরা বললেন: আমীরুল মুমিনীন। আমি শামে গিয়েছি। সেখানে রাজাদের দেখেছি, তারা দিওয়ান তৈরী করে সবকিছু পৃথকভাবে লিখে রাখেন। তার পরামর্শটি খলীফার পছন্দ হলো। তিনি আকীল, মাখরামা ও জুবাইর ইবন মুতয়িমকে নির্দেশ দিলেন মর্যাদা অনুযায়ী নাগরিকদের তালিকা তৈরী করার জন্য। এ তিনজন ছিলেন কুরাইশদের বিশিষ্ট বংশবিদ্যা বিশারদ। তারা তালিকা তৈরী করে দেন। (হায়াতুস সাহাবা-২২০)।
হযরত আলী (রা) ও হযরত মুআবিয়ার (রা) বিরোধের সময় হযরত আকীলকে আবার ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়। যদিও তিনি আলীর (রা) ভাই, তথাপি নিজের প্রয়োজনে আমীর মুআবিয়ার (রা) সাথে সম্পর্ক রাখতেন। আলী-মুআবিয়া বিরোধের সময় তিনি মদীনা ছেড়ে শামে মুআবিয়ার কাছে চলে যান। এর কারণ ইতিহাসে এভাবে উল্লেখ হয়েছে যে, আকীল ছিলেন ঋণগ্রস্ত অভাবী মানুষ, তার ছিল অর্থের প্রয়োজন। আর আমীর মুআবিয়ার (রা) খাযানা ছিল উন্মুক্ত। দারিদ্র ও অভাব তাকে হযরত মুআবিয়ার পক্ষাবলম্বনে বাধ্য করে।
হযরত মুআবিয়ার (রা) সাথে হযরত আলীর (রা) বিরোধ যখন তুঙ্গে তখন আকীল একবার ঋণ পরিশোধের আশায় হযরত আলীর (রা) কাছে যান। আলী তাকে যথেষ্ট সমাদর করেন। তিনি পুত্র হাসানকে তার সেবার দায়িত্ব দেন। হাসান অত্যন্ত যত্নের সাথে তার বিশ্রামের ব্যবস্থা করলেন। রাতে দস্তরখানা বিছিয়ে খাবারের জন্য ডাকা হলো। আকীল এসে দেখলেন, দস্তরখানে কিছু শুকনো রুটি, লবণ ও সামান্য কিছু তরকারি সাজানো। আকীল বললেন: খাবার শুধু এই? আলী বললেন: হা। এবার আকীল নিজের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বললেন: আমার ঋণ সমূহ তুমি পরিশোধ করে দাও। আলী জিজ্ঞেস করলেন: কি পরিমাণ হবে? বললেন: চল্লিশ হাজার দিরহাম। আলী বললেন: এত অর্থ আমি কোথায় পাব? একটু অপেক্ষা করুন, আমার ভাতা চার হাজার হলে আপনাকে দিতে পারবো। আকীল বললেন: তোমার অসুবিধা কোথায়? বাইতুল মাল তো তোমার হাতে। তোমার ভাতা বৃদ্ধির অপেক্ষায় আমাকে কতদিন ঝুলিয়ে রাখবে? আলী বললেন: আমি তো মুসলমানদের অর্থের একজন আমানতদার মাত্র। আপনি কি চান, আমি সেই অর্থ আপনাকে দিয়ে খিয়ানত করি? এ উত্তর শুনে আকীল সোজা শামে আমীর মুআবিয়ার কাছে চলে যান। মুআবিয়া (রা) আকীলকে জিজ্ঞেস করেন: তুমি আলী ও তার সাথীদের কেমন দেখলে? আকীল বললেন: তারা রাসুলুল্লাহর সা: সঠিক সাহাবী। শুধু এতটুকু অভাব যে, রাসুল সা: তাদের মাঝে নেই। আর তুমি ও তোমার সংগী সাথীরা ঠিক আবু সুফইয়ানের সংগী সাথীদের মত। এমন তুলনা দেওয়ার পরও আমীর মুআবিয়া (রা) পরের দিন আকীলকে ডেকে পঞ্চাশ হাজার দিরহাম তার হাতে তুলে দেন। (উসুদুল গাবা-৪২৩)।
হযরত আকীলের শামে উপস্থিতির পর হযরত মুআবিয়া (রা) তাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করে বলতেন: আমি যদি সত্যের ওপর না হতাম তাহলে আকীল তার ভাই আলীকে ছেড়ে আমার পক্ষাবলম্বন করলেন কিভাবে? একবার মুআবিয়া (রা) হযরত আকীলের (রা) উপস্থিতিতে মানুষের সামনে যুক্তি উপস্থাপন করলে আকীল প্রতিবাদ করে বললেন: আমার ভাই দীনের জন্য ভাল। আর তুমি দুনিয়ার জন্য। এটা ভিন্ন কথা যে, আমি দুনিয়াকে দ্বীনের ওপর প্রাধান্য দিয়েছি। আর আখিরাতের ব্যাপার- তা তার উত্তম সমাপ্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করি (উসুদুল গাবা-৩/৪২৩)
হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতকালের শেষ দিকে অথবা ইয়াযীদের শাসনকালের প্রথম দিকে হযরত আকীল ইনতিকাল করেন। (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি রাসুলুল্লাহর সা: দীর্ঘ সাহচর্য লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এ কারণে রাসুলুল্লাহ সা: একান্ত আপন ও প্রিয়জন হওয়া সত্ত্বেও জ্ঞানের ক্ষেত্রে তার যে পারদর্শিতা হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। তথাপি হাদীদের গ্রন্থসমূহে তার বর্ণিত দু চারটি হাদীস পাওয়া যায়। মুহাম্মাদ, হাসান বসরী, আতা প্রমূখ তাবেয়ী তার নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ধর্মীয় জ্ঞান ছাড়াও তিনি জাহিলী যুগের বিভিন্ন জ্ঞানে দক্ষ ছিলেন। ইলমুল আনসাব, আইয়্যামুল আরব- বংশবিদ্যা, প্রাচীন আরবের যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ে তিনি ছিলেন সুবিজ্ঞ। এসব বিষয়ে জ্ঞান আহরণের জন্য মানুষ তার নিকট আসতো। তিনি মসজিদে নববীতে নামাযের পর এসব বিষয়ের আলোচনা করতেন এবং লোকেরা তা বসে বসে শুনতো।
হিশাম আল কালবী বলেন: আকীল, মাখরামা, হুয়াইতিব ও আবু জাহম-কুরাইশদের এ চার ব্যক্তির নিকট মানুষ তাদের ঝগড়া বিবাদ ফায়সালার জন্য যেত। (আল ইসাবা-২/৪৯৪)।
হযরত রাসূলে কারীম সা: তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন: আবু যায়িদ, তোমার প্রতি আমার দ্বিগুণ ভালোবাসা। একটা আত্মীয়তা এবং অন্যটা আমার চাচা তোমাকে ভালোবাসতেন- এই দুই কারণে।
সুখে দুখে সর্বাবস্থায় হযরত আকীল (রা) রাসুলুল্লাহর সা: সুন্নাতের যথাযথ অনুসারী ছিলেন। একবার তিনি নতুন বিয়ে করেছেন। সকাল বেলা পাড়া প্রতিবেশীরা তাকে স্বাগতম জানাতে এলো। তারা জাহিলী যুগে প্রচলিত দুটি শব্দ উচ্চারণ করে স্বাগতম জানালো। শব্দ দুটিতে ইসলাম বিরোধী কোন ভাবও ছিল না। তবে যেহেতু স্বাগতমের ইসলামী ভাষা বিদ্যমান ছিল তাই তিনি তাদের ভুল শুধরে দিয়ে বললেন: এমনটি নয় বরং এ কথা বলো: বারাকাল্লাহু লাকুম ওয়া বারাকাল্লাহু আলাইকুম। আমাদেরকে এভাবে বলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার জীবিকার জন্য খাইবরের উৎপন্ন শস্য থেকে বার্ষিক ১৪০ ওয়াসক নির্ধারণ করে দিয়ে যান। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৫০)।


















