তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
আবু সালামা ইবন আবদিল আসাদ (রা)

নাম আবদুল্লাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু সালামা। পিতা আবদুল আসাদ, মাতা বাররাহ বিনতু আবদিল মুত্তালিব। রাসুলুল্লাহর সা: ফুফাতো ভাই। তাছাড়া সঠিক বর্ণনা অনুযায়ী রাসুলুল্লাহর সা: দুধভাই। আবু লাহাবের দাসী ‘সুওয়াইবা’ রাসুল্লাহ সা: হামযা ও আবু সালামাকে দুধ পান করান। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৯৬)।
হযরত রাসূলে কারীম সা: হযরত আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে অবস্থান নেওয়ার পূর্বে তিনি মুমিনদের দলে শামিল হন। হযরত আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহণের পর সর্বপ্রথম উসমান ইবন আফফান, তালহা ইবন উবাইদিল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম, সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তাদের সকলকে রাসুলুল্লাহর সা: এর খিদমতে নিয়ে আসেন। তারা সকলে একসাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। পরের দিন তিনি উসমান ইবন মাজউন, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ, আবদুর রহমান ইবন আউফ, আবু সালামা ও আল আরকাম ইবন আবিল আরকামকে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে নিয়ে যান। তারাও এক সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। (আল বিদায়াহ-৩/২৯) তার স্ত্রী হযরত উম্মু সালামাও তাকে অনুসরণ করেন। (উসুদুল গাবা-৫/২৮১)।
হাবশায় হিজরতকারী প্রথম দলটির সাথে তিনি ও স্ত্রী উম্মু সালামা হিজরাত করেন। এই হাবশার মাটিতে তাদের কন্যা যায়নাব বিনতু আবী সালামা জন্ম গ্রহণ করেন। (সীরাতু ইবনু হিশাম-১/৩২২, ৩২৬)। কিছুদিন পর তিনি হাবশা থেকে চলে আসেন এবং আবু তালিব ইবন আবদিল মুত্তালিবের নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করেন। বনু মাখযুমের কিছু লোক আবু তালিবের নিকট এসে অভিযোগের সুরে বলে: ওহে আবু তালিব, আপনি আপনার ভাতিজা মুহাম্মাদকে আমাদের হাত থেকে হিফাজতে রেখেছেন। এখন আবার আমাদেরই এক লোককে নিরাপত্তা দিচ্ছেন? আবু তালিব বললেন: ‘সে আমার কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। তাছাড়া সে আমার বোনের ছেলে। যদি বোনের ছেলেকে নিরাপত্তা দিতে না পারি তাহলে ভায়ের ছেলেকেও আমি নিরাপত্তা দিতে পারি নে।’ এক পর্যায়ে আবু লাহাব উঠে দাড়িয়ে বলেন: কুরাইশ বংশের লোকেরা! তোমরা এই বৃদ্ধের সাথে বেশি বাড়াবাড়ি করছো। যদি এটা বন্ধ না কর, আমরা এই বৃদ্ধের পাশে এসে দাড়াবো।’ আবু লাহাবের এ কথায় বনী মাখযুমের লোকেরা সরে পড়ে। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৬৯,৩৭১)। দ্বিতীয়বারও তিনি সস্ত্রীক হাবশায় হিজরাত করেন। শেষবার হাবশা থেকে মক্কা প্রত্যাবর্তন করে কিছুদিন পর আবার মদীনায় চলে যান।
আবু সালামার স্ত্রী হযরত উম্মু সালামা তাদের মদীনায় হিজরাত সম্পর্কে বলেন: আবু সালামা মদীনায় হিজরাতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার উটটি প্রস্তুত করলেন। আমাকে উটের পিঠে বসিয়ে আমার ছেলে সালামাকে আমার কোলে দিলেন। তারপর উটের লাগাম ধরে তিনি টেনে নিয়ে চললেন। আমার পিতৃ গোত্র বনু মুগীরার লোকেরা তার পথ আগলে ধরে বললো: তোমার নিজের ব্যাপারে তুমি যা খুশী করতে পার। কিন্তু আমাদের এ মেয়েকে তোমার সাথে বিদেশ যেতে দেব না। তারা আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। এতে আবু সালামার গোত্র বনু আবদিল আসাদ ক্ষেপে গেল। তারা বললো: তোমরা যখন তোমাদের মেয়েকে কেড়ে নিয়ে গেছ, তখন আমরা আমাদের সন্তানকে অর্থাৎ সালামাকে তার মায়ের কাছে থাকতে দেব না। তারা আমার ছেলেটি নিয়ে গেল। আমি বন্দী আমার পিতৃগোত্র বনু মুগীরার হাতে, আমার কোলের বাচ্চা সালামা তার পিতৃগোত্র বনু আবদিল আসাদে, আর আমার স্বামী আবু সালামা মদীনায়। এভাবে তারা আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দিল।
আমি প্রতিদিন মক্কার ‘আবতাহ’ উপত্যাকায় গিয়ে বসে বসে শুধু কাঁদতাম। প্রায় এক বছর আমি চোখের পানি ফেললাম। অবশেষে একদিন আমার পিতৃগোত্রের এক ব্যক্তি আমাকে এ অবস্থায় দেখে তার অন্তরে দয়া হলো। সে বনু মুগীরাকে বললো: তোমরা কি এ হতভাগিনীকে মক্কা ছাড়তে দেবে না? এভাবে স্বামী সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে কষ্ট দিচ্ছ কেন? তখন বনু মুগীরা আমাকে বললো: তুমি ইচ্ছা করলে তোমার স্বামীর কাছে যেতে পার। বনু আবদিল আসাদও আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দিল। আমি উটে চড়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে মদীনার পথ ধরলাম। আমার সাথে আল্লাহর আর কোন বান্দা ছিল না। আমি যখন তানয়ীমে পৌঁছলাম তখন উসমান ইবন তালহার সাথে আমার দেখা। সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো: আবু উমাইয়্যার মেয়ে, কোথায় যাবে? বললাম: মদীনায় আমার স্বামীর কাছে। জিজ্ঞেস করলো: সাথে আর কেউ নেই? বললাম: এক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ নেই। সে আমার উটের লাগাম ধরে হাঁটতে লাগলো এবং আমাকে মদীনার উপকন্ঠে কুবার বনী আমর ইবন আউফের পল্লী পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বললো: তোমার স্বামী এখানেই থাকে। এ কথা বলে সে আবার মক্কার পথ ধরলো। এখানে আমার স্বামীর সাথে মিলিত হলাম। এই উসমান ইবন তালহা হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করে। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৫৮-৫৯)।
হযরত আবু সালামা ইয়াসরিব বাসীদের আকাবায় রাসুলুল্লাহর সা: হাতে শপথের এক বছর পূর্বে মদীনায় হিজরাত করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৬৮)। বুখারীর একটি বর্ণনামতে তিনিই মদীনায় গমনকারী প্রথম মুহাজির। কিন্তু অন্য একটি বর্ণনায় মুসয়াব ইবন উমাইরকে মদীনার প্রথম মুহাজির বলা হয়েছে। আল্লামা ইবন হাজার রহ: এই দুই বর্ণনার সামঞ্জস্য বিধান করতে গিয়ে বলেন: আবু সালামা হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে এলে মক্কার মুশরিকরা তার ওপর পুনরায় অত্যাচার শুরু করে। তিনি তখন মদীনা যান- কুরাইশদের ভয়ে, সেখানে স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্য নয়। অপরদিকে মুসয়াব ইবন উমাইর মদীনায় যান হিজরাতের নির্দেশ আসার পর। এই হিসাবে দুই বর্ণনার মধ্যে মূলত: কোন বিরোধ নেই। (ফাতহুল বারী-৭/২০৩)।
আবু সালামার মদীনায় উপস্থিতির দিনটি ছিল মুহাররম মাসের ১০ তারিখ। আমর ইবন আউফের খান্দান পুরো দুই মাস তাকে আতিথ্য দান করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: মদীনায় এসে হযরত খুসাইমা আনসারী ও তার মাঝে মুওয়াখাত বা ভাতৃত্ব সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন এবং পৃথক বসবাসের জন্য একখন্ড জমিও দান করেন।
বদর ও উহুদ যুদ্ধে তিনি সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উহুদ যুদ্ধে আবু উসামা জাশামীর একটি তীর তাঁর বাহুতে বিদ্ধ হয়। দীর্ঘ একমাস চিকিতসা গ্রহণের পর বাহ্যিকভাবে সেরে উঠলেও ভেতরে ভেতরে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় তাঁর ওপর ‘কাতান’ অভিযানের দায়িত্ব অর্পিত হয়।
‘কাতান’ একটি পাহাড়ের নাম। এখানে বনু আসাদের বসতি ছিল। হযরত রাসূলে কারীম সা: খবর পেলেন, তুলাইহা ও আসাদ ইবন খুওয়াইলিদ নিজ গোত্র এবং তাদের প্রভাবিত অন্যান্য গোত্রকে মদীনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য ক্ষেপিয়ে তুলছে। রাসূলে কারীম সা: এমন কার্যকলাপ বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তিনি মুহাজির ও আনসারদের সম্মিলিত দেড়শো মুজাহিদীনের একটি বাহিনী গঠন করে আবু সালামার নেতৃত্বে হিজরী ৪ সনের মুহাররাম / সফর মাসে ‘কাতান’ অভিমুখে যাত্রার নির্দেশ দেন। রাসুলুল্লাহ সা: আবু সালামার হাতে ঝান্ডা দিতে গিয়ে বলেন: রওয়ানা হয়ে যাও। বনু আসাদ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আগেই তাদেরকে বিক্ষিপ্ত করে দাও।
হযরত আবু সালামা অপ্রসিদ্ধ পথ ধরে অগ্রসর হয়ে হঠাত বনু আসাদের জনপদে গিয়ে হাজির হন। তারা এই আকস্মিক আক্রমণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পালাতে শুরু রে। আবু সালামা তার বাহিনীকে তিনভাগে বিভক্ত করে তাদের পিছু ধাওয়ার নির্দেশ দেন। তারা বহু দূর পর্যন্ত তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যান এবং প্রচুর পরিমাণে উট ও ছাগল বকরী গাণীমাত হিসাবে লাভ করেন। সকল গাণীমাতই মদীনায় রাসুলুল্লাহর খেদমতে হাজির করেন।
হযরত আবু সালামা ‘কাতার’ অভিযান থেকে মদীনায় ফিরলেন। এদিকে ওহুদ যুদ্ধে তীরবিদ্ধ ক্ষতস্থানে আবার বিষক্রিয়া শুরু হল। বেশ কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর হিজরী ৪ সনের মতান্তরে ৩ সনের জামাদিউল আখার মাসের ৩ তারিখ ইনতিকাল করেন। ঘটনাক্রমে তার শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহুর্তে রাসূলে কারীম সা: তাকে দেখার জন্য উপস্থিত হন। তার রুহটি বেরিয়ে যাওয়ার পর রাসূল সা: নিজের পবিত্র হাতে তার খোলা চোখ দুটি বন্ধ করে দিয়ে বলেন: মানুষের রুহ যখন উঠিয়ে নেওয়া হয় তখন তার দুটি তাকে দেখার জন্য খোলা থাকে।’ (তাবাকাতু ইবন সা’দ-৩/১৭২)।
একদিকে পর্দার অন্তরালে মহিলারা মাতম শুরু করে দেয়। রাসূল সা: তাদের নিবৃত্ত করে বলেন: এখন দুআর সময়। কারণ, যে সকল ফিরিশতা আসমান থেকে মৃতের কাছে আসে তারাও এই দুআকারীদের দুআর সাথে ‘আমীন‘ বলে। তারপর রাসূল সা: তার জন্য এভাবে দুআ করেন: ‘হে আল্লাহ, তার কবরকে প্রশস্ত ও আলোকিত করে দাও। তার গুনাহ খাতা মাফ করে দাও এবং হিদায়াতপ্রাপ্ত জামায়াতের মধ্যে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দাও।’ (ইবন সা’দ-৩/১৭২)।
হযরত আবু সালামা মদীনার উপকন্ঠে ‘আলীয়াহ’ নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি কুবা থেকে এসে এখানেই বসতি স্থাপন করেন। বনী উমাইয়্যা ইবন যায়িদের কূপ- ‘ইয়াসীরা-র’ পানি দিয়ে তাকে গোসল দেওয়া হয় এবং মদীনার পবিত্র মাটিতে তাকে দাফন করা হয়।
সাহাবাদের মধ্যে হযরত আবু সালামা (রা) বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হযরত রাসূলে কারীম সা: প্রায়ই তাকে দেখতে যেতেন।
হযরত উম্মু সালামা (রা) বলেন: একদিন আবু সালামা খুব উতফুল্লভাবে রাসুলুল্লাহর সা: দরবার থেকে ঘরে ফেরেন। তারপর বলতে থাকেন, আজ রাসুলুল্লাহর সা: একটি বাণী আমাকে খুবই খুশি করেছে। তিনি বলেছেন: কোন বিপদগ্রস্থ মুসলমান তার বিপদের মধ্যে যদি আল্লাহর দিকে রুজু হয়ে বলে: হে আল্লাহ আমাকে এই বিপদে সাহায্য কর এবং আমাকে এর উত্তম প্রতিদান দাও- তাহলে আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন। সুতরাং আবু সালামার মৃত্যুতে আমি যখন ভীষণ দু:খ পেলাম, তখন আমিও ঐ দুআ করলাম। কিন্তু তক্ষুণি আমার মনে হল, আবু সালামার উত্তম বিনিময় আর কে হতে পারে? আমার ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর যখন খোদ রাসূল সা: বিয়ের পয়গাম পাঠান তখন আমি বুঝলাম আল্লাহ উত্তম বিনিময়ের ব্যবস্থা করেছেন। (মুসনাদে আহমাদ ইবন হাম্বল-৪/১২৭)। এভাবে উম্মু সালামা হলেন উম্মুল মুমিনীন।
হযরত আবু সালামা দুই ছেলে সালামা ও উমার এবং দুই মেয়ে যয়নাব ও দুররাহ রেখে যান।
খলীফা হযরত উমার (রা) তার খিলাফতকালে যখন প্রত্যেকের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেন তখন মুহাজির ও আনসার যারা বদরে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের সন্তানদের জন্য দু হাজার করার নির্দেশ দেন। যখন আবু সালামার ছেলে উমারের ব্যাপারটি এলো, তখন বললেন, তাকে এক হাজার বেশি দাও। মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহ- যার পিতা আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ, যিনি উহুদে শহীদ হন, প্রতিবাদ করে বলেন: তার পিতার আমাদের পিতাদের অপেক্ষা বিশেষ কোন মর্যাদা নেই।
খলীফা বললেন: তার পিতা আবু সালামার জন্য তাকে দু হাজার, আর তার মা উম্মু সালামার জন্য অতিরিক্ত এক হাজার। তার মার মত তোমার একজন মা থাকলে তোমাকেও এক হাজার বেশি দিতাম। (হায়াতুস সাহাবা-১/ ২১৬)-১৭)।
সালামা ইবনুল আকওয়া (রা)

নাম সিনান, পিতা আমর ইবনুল আকওয়া। কুনিয়াত বা ডাক নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। যথা: আবু মুসলিম, আবু ইয়াস, আবু আমের ইত্যাদি। তবে পুত্র ইয়াসের নাম অনুসারে আবু ইয়াস ডাক নামটি অধিক প্রসিদ্ধ। (আল ইসতিয়াব)।
সীরাত বিশেষজ্ঞরা সালামার ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে নীরব। তবে এতটুকু ঐতিহাসিক সত্য যে, হিজরী ৬ষ্ঠ সনের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনায়ও হিজরত করেন। অধিকাংশ মুহাজির পরিবার পরিজন সহ হিজরাত করেন; কিন্তু হযরত সালামা আল্লাহর রাস্তায় স্ত্রী ও সন্তানদের ত্যাগ করেই হিজরাত করেন।
মদীনায় আসার পর তিনি প্রায় সকল যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন। হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপটে ‘বাইয়াতে রিদওয়ান’ বা ‘বাইয়াতে শাজারা’ এর ইসলামের ইতিহাসে এক বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার ঘটনাকালে হযরত রাসূলে পাক সা: যখন মক্কার কাফিরদের হাতে হযরত উসমানের শাহাদাতের খবর শুনেন এবং রাসুলুল্লাহর সা: সাথে হুদাইবিয়ায় আগত মুসলমানদের নিকট থেকে মৃত্যুর বাইয়াত বা শপথ নেন, তখন হযরত সালামা রাসুলুল্লাহর সা: হাতে তিনবার বাইয়াত করেন। তিনি বলেছেন: ‘হুদাইবিয়ার গাছের নীচে আমি রাসুলুল্লাহর হাতে সা: মৃত্যুর বাইয়াত করলাম। তারপর একপাশে চলে গেলাম। লোকের ভিড় কিছুটা কমে গেলে রাসুলুল্লাহ সা: আমাকে দেখে বললেন: সালাম তোমার কী হল, তুমি যে বাইয়াত করলে না? বললাম: ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি তো বাইয়াত করেছি। রাসুল বললেন: তাতে কি হয়েছে, আর একবার কর। আমি আবারো বাইয়াত করলাম। এ সময় রাসুলুল্লাহ সা: তাকে একটি ঢাল উপহার দেন। এরপর আবার তিনি রাসুলুল্লাহর সা: নজরে পড়েন। তিনি জিজ্ঞেস করেন: সালামা, বাইয়াত করবে না? সালামা আরজ করেন: ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি তো দুবার বাইয়াত করেছি। বললেন: আবারো একবার কর। সালামা তৃতীয়বার বাইয়াত করেন। এবার রাসুলুল্লাহ সা: জিজ্ঞেস করেন: সালামা ঢালটি কি করেছো? তিনি বললেন: আমার চাচা একেবারে খালি হাতে ছিলেন, আমি সেটা তাকে দিয়েছি। তার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ হেসে উঠে বলেন: তোমার দৃষ্টান্ত সেই ব্যক্তির মত যে দুআ করে, হে আল্লাহ আমাকে এমন বন্ধু দান কর যে আমার নিজের জীবন অপেক্ষা অধিকতর প্রিয় হবে।
হুদাইবিয়ায় রাসুলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াত চলছে, এর মধ্যে মক্কাবাসীদের সাথে মুসলমানদের সন্ধি হয়ে গেল। মুসলমানরা শান্তির নি:শ্বাস ফেলে একে অপরের সাথে কোলাকুলি করতে লাগলো। হযরত সালামা নিশ্চিন্তে একটি গাছের তলায় শুয়েছিলেন। এমন সময় চারজন মুশরিক (অংশীবাদী) তার পাশে এসে বসে। তারা রাসুলুল্লাহ সা: সম্পর্কে এমন সব আলাপ আলোচনা করতে শুরু করে যা তার শুনতে ইচ্ছা হলো না। তিনি উঠে অন্য একটি গাছের নিচে গিয়ে বসলেন। তার সরে যাওয়ার পর এই চার মুশরিক নিজেদের অস্ত্র শস্ত্র রেখে শুয়ে পড়ে। এমন সময় কেউ একজন চেঁচিয়ে বলে ওঠে: ‘মুহাজিরগণ, ছুটে এস, ইবন যানীমকে হত্যা করা হয়েছে।’ এ আওয়ায কানে যেতেই সালামা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে ঐ চার মুশরিকের দিকে ছুটে যান। তারা তখনও শুয়ে ছিল। সালামা তাদের অস্ত্র নিজ দখলে নিয়ে বলেন, যদি ভালো চাও সোজা আমার সাথে চলো। আল্লাহর কসম, কেউ মাথা উঁচু করলে তার চোখ ফুটো করে ফেলবো। তিনি তাদেরকে নিয়ে রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হন। সালামার চাচাও প্রায় ৭০/৭১ জন মুশরিককে বন্দী করে নিয়ে আসেন। হযরত নবী কারীম সা: তাদের সকলকে ছেড়ে দেন। এ ঘটনারই প্রেক্ষাপটে কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়:
‘আর সেই আল্লাহ, তিনিই তো মক্কার মাটিতে কাফিরদের ওপর তোমাদেরকে বিজয় দানের পর তাদের হাতকে তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাতকে তাদের বিরত রেখেছেন।’ (সূরা আল ফাতহ/৩)।
মুসলমানদের কাফিলা মদীনায় প্রত্যাবর্তনকালে একটি পাহাড়ের নিকট তাবু স্থাপন করে। মুশরিকদের মনে কিছু অসৎ উদ্দেশ্য কাজ করে। হযরত রাসূলে কারীম সা: তা অবগত হন। তিনি তাবু পাহারার প্রয়োজন অনুভব করেন। তিনি সেই ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দুআ করেন যে সেই পাহাড়ের ওপর বসে পাহার দেবে। এই সৌভাগ্য হযরত সালামা অর্জন করেন। তিনি রাতভর বার বার পাহাড়ের ওপর উঠে শত্রুর পদধ্বনি শোনার চেষ্টা করেন।
হযরত রাসূলে কারীমের কিছু উট ‘জী-কারওয়া’-র চারণক্ষেত্রে চরতো। একদিন বনু গাতফান মতান্তরে বনু ফাযারার লোকেরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে রাখালকে হত্যা করে উটগুলি লুট করে নিয়ে যায়। হযরত সালামা ইবন আকওয়া ঘটনাস্থলের পাশেই ছিলেন। শেষ রাতে তিনি বের হয়েছেন, আবদুর রহমান ইবন আউফের দাস তাকে খবর দিল, রাসুলুল্লাহর উটগুলি লুট হয়ে গেছে। সালামা আবদুর রহমানের দাসকে মদীনায় পাঠিয়ে দিলেন রাসুলুল্লাহকে সা: খবর দেওয়ার জন্য। আর তিনি পাহাড়ের চূড়ায় উঠে ‘ইয়া সাবাহাহ’ (শত্রুর আক্রমণের সতর্ক ধ্বনি) বলে এমন জোরে চেঁচিয়ে ওঠেন যে, সে আওয়ায মদীনার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তিনি একাকী ডাকাত দলের পিছু ধাওয়া করেন। ডাকাতরা পানি তালাশ করছিল, এমন সময়ে তিনি সেখানে পৌঁছে যান। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দায। নির্ভুল তাক করে তীর ছাড়ছিলেন, আর মুখে গুণগুণ করে আওড়াচ্ছিলেন:
‘আনা ইবনুল আকওয়া
আল-য়াউম য়াউমুর রুদ্দায়ি।’
অর্থাত আমি আকওয়ার ছেলে- আজকের দিনটি নিচ প্রকৃতির লোকদের ধ্বংস সাধনের দিন। তিনি এমনভাবে আক্রমণ করেন যে, ডাকাতরা উট ফেলে পালিয়ে যায়। তারা দিশেহারা হয়ে তাদের চাদরও ফেলে যায়। এর মধ্যে হযরত রাসূলে কারীম সা: আরও লোকজন সংগে করে সেখানে উপস্থিত হন। সালামা আরজ করেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি তাদের পানি পান করতে দেইনি। এখনই পিছু ধাওয়া করলে তাদের ধরা যাবে। রাসুল সা: বলেন, পরাজিত করার পর ক্ষমা কর। (বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, বাবু গাযওয়া জী কারওয়াহ, সীরাতু ইবন হিশাম-২/২৮১-৮২, হায়াতুস সাহাবা ১/৫৫৯-৬১)। ঘটনাটি বিভিন্ন গ্রন্থে ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্নিত হয়েছে।
খাইবার যুদ্ধে তিনি চরম বীরত্ব প্রদর্শন করেন। খাইবার বিজয়ের পর হযরত রাসূলে কারীমের হাতে হাত দিয়ে তিনি মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।
খাইবারের পর তিনি সাকীফ ও হাওয়াযিনের যুদ্ধে যোগদান করেন। এই অভিযানের সময় এক ব্যক্তি উটে আরোহণ করে মুসলিম সেনা ছাউনীতে আসে এবং উটটি বেঁধে আস্তে করে মুসলিম সৈনিকদের সাথে নাশতায় শরীক হয়ে যায়। তারপর চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে মুসলমানদের শক্তি আঁচ করে আবার উটে চড়ে দ্রুত কেটে পড়ে। এভাবে এসে আবার চলে যাওয়ায় গুপ্তচর বলে মুসলমানদের বিশ্বাস হয়। এক ব্যক্তি তার পিছু ধাওয়া করে। সালামাও তাঁকে অনুসরণ করেন এবং দৌড়ে আগে গিয়ে লোকটিকে পাকড়াও করার পর তরবারির এক আঘাতে তাকে হত্যা করেন। তারপর নিহত ব্যক্তিটির বাহনটি নিয়ে ফিরে আসেন। রাসুলুল্লাহ সা: জিজ্ঞেস করেন: লোকটিকে কে হত্যা করেছে? লোকেরা বললো: সালামা। রাসুল সা: ঘোষণা করেন: নিহত ব্যক্তির যাবতীয় জিনিস সেই পাবে। হিজরী ৭ম সনে হযরত রাসূলে কারীম সা: আবু বকরের নেতৃত্বে বনী কিলাবের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী পাঠালেন। সেই বাহিনীতে সালামাও ছিলেন। তিনি এই অভিযানে একাই সাতজনকে হত্যা করেন। যারা পালিয়ে গিয়েছিল তাদের অনেক নারীকে তিনি বন্দী করে নিয়ে আসেন। এই বন্দীদের মধ্যে একটি সুন্দরী মেয়েও ছিল। হযরত আবু বকর মেয়েটিকে হযরত সালামার দায়িত্বে অর্পণ করেন। হযরত সালামা মেয়েটিকে মদীনায় নিয়ে আসলেন। রাসুলুল্লাহ সা: বললেন: মেয়েটিকে আমার জিম্মায় ছেড়ে দাও। সালামা মেয়েটিকে রাসূলুল্লাহর সা: জিম্মায় দিয়ে দিলেন। রাসুলুল্লাহ সা: এ মেয়েটির বিনিময়ে কাফিরদের হাতে বন্দী মুসলমানদের মুক্ত করেন।
হযরত সালামা ইবনুল আকওয়া (রা) ইসলাম গ্রহণের পর কাফিরদের সাথে সংঘটিত প্রায় সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কোন কোন বর্ণনা মতে তিনি মোট চৌদ্দটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সাতটি রাসুলুল্লাহর সা: সাথী হিসাবে, আর অবশিষ্ট সাতটি রাসুলুল্লাহ সা: প্রেরিত বিভিন্ন অভিযান। মুসতাদরিকের একটি বর্ণনা মতে তার অংশগ্রহণ করা যুদ্ধের সংখ্যা মোট ষোল। একবার তিনি বলেন: আমি রাসুলুল্লাহর সাথে সাতটি এবং যায়িদ ইবন হারিসার সাথে নয়টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৫)
পদাতিক বাহিনীর যারা তীর বর্শা নিয়ে যুদ্ধ করতো, তাদের মধ্যে সালামা ছিলেন অন্যতম দক্ষ ব্যক্তি। শত্রু সৈন্যরা যখন আক্রমণ চালাতো তিনি পিছু হটে যেতেন। আবার শত্রুরা যখন পিছু হটে যেত বা বিশ্রাম নিত, তিনি অতর্কিত আক্রমণ চালাতেন। এই ছিল তার যুদ্ধ কৌশল। এই কৌশল অবলম্বন করে তিনি একাই মদীনার উপকন্ঠে ‘জী কারাদ’ যুদ্ধে উয়াইনা ইবন হিসন আল ফিযারীর নেতৃত্বে পরিচালিত বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। তিনি একাই তাদের পিছু ধাওয়া করেন, তাদের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করেন এবং তাদের আক্রমণ প্রতিহত করেন। এভাবে মদীনা থেকে বহু দূর পর্যন্ত তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যান।
বীরত্ব ও সাহসিকতায় বিশেষত: দ্রুত দৌড়ানোর ক্ষেত্রে সাহাবা সমাজের মধ্যে সালামা ছিলেন বিশেষ স্থানের অধিকারী। আলা ইসাবা গ্রন্থকার লিখেছেন: তিনি ছিলেন অন্যতম বীর এবং অশ্বের চেয়ে দ্রুতগামী। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মতান্তরে ‘জী কারাদ’ অভিযানের সময় রাসুলে কারীম সা: তার প্রশংসায় মন্তব্য করেন: ‘খায়রু রাজ্জালীনা সালামা ইবনুল আকওয়া- সালামা ইবন আকওয়া আমাদের পদাতিকদের মধ্যে সর্বোত্তম।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৫)
হযরত সালামা ছিলেন অত্যন্ত শক্ত মানুষ। দু:খ বেদনা কি জিনিস তা যেন তিনি জানতেন না। তবে খাইবার যুদ্ধে তার ভাই মতান্তরে চাচা হযরত আমের ইবন আকওয়ার লাশের পাশে দাঁড়িয়ে একটি বিষাদ ভরা গান গুণগুণ করে গেয়েছিলেন। যার শেষ চরণটি ছিল এমন: “(হে আল্লাহ) আমাদের ওপর প্রশান্তি নাযিল করুন, শত্রুর মুখোমুখি আমাদের পদসমূহ দৃঢ়মূল করুন।”
এই খাইবার যুদ্ধে তার ভাই আমের তরবারি দিয়ে সজোরে একজন মুশরিককে আঘাত হানেন। কিন্তু আঘাতটি ফসকে গিয়ে নিজের দেহে লাগে এবং তাতেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এ ঘটনার পর মুসলমানদের কেউ কেউ মন্তব্য করলো: ‘হতভাগা আমের- শাহাদাতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হলো।’ শুধু এই দিন, যখন অন্যদের মত সালামার মনেও এই ধারণা জন্মালো যে, তাঁর ভাই জিহাদ ও শাহাদাতের সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তখন ভীষণ ব্যথিত ও বিমর্ষ হলেন। তিনি দৌড়ে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গিয়ে প্রশ্ন করেন:
-ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমেরের সকল নেক আমল ব্যর্থ হয়ে গেছে।-এ কথা কি ঠিক?
রাসূল সা: বললেন:
-সে মুজাহিদ হিসেবে নিহত হয়েছে। তার জন্য দুটি পুরষ্কার রয়েছে। এখন সে জান্নাতের নদী সমূহে সাঁতার কাটছে। (রিজালুন হাওলার রাসূল:৫৫৫-৫৫৬)।
হযরত সালামা (রা) হযরত রাসূলে কারীমের সা: ওফাতের পর থেকে হযরত উসমানের (রা) শাহাদাত পর্যন্ত মদীনায় ছিলেন। হযরত উসমানের (রা) হত্যার পর এই বীর মুজাহিদ বুঝতে পারলেন, মুসলিম জাতির মধ্যে ফিতনা বা আত্ম কলহের দ্বার খুলে গেছে। যে ব্যক্তি তার ভাইদের সংগে করে সারাটি জীবন কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, এখন তার পক্ষে সেই ভাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করা শোভন নয়। মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যে দক্ষতার জন্য তিনি রাসুলুল্লাহর সা: প্রশংসা কুড়িয়েছেন, একজন মুমিনের বিরুদ্ধে সেই দক্ষতার সাথে যুদ্ধ করা অথবা সেই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে একজন মুসলমানকে হত্যা করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়।
এ উপলদ্ধির পর তিনি নিজের জিনিসপত্র উটের পিঠে চাপিয়ে মদীনা ছেড়ে সোজা ‘রাবজা’ চলে যান। সেখানেই আমরণ বসবাস করতে থাকেন। এই রাবজাতেই ইতিপূর্বে হযরত আবু যার আল গিফারী (রা) চলে এসেছিলেন মদীনা ছেড়ে এবং এখানেই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
হযরত সালামা (রা) বাকী জীবনটা এই রাবজায় কাটিয়ে দেন। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে হঠাত তার মনে মদীনায় যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা জাগে। তিনি মদীনা যান। সেখানে দুই দিন কাটানোর পর তৃতীয় দিন আকস্মিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে তার হাবীবের পবিত্র ভূমিতে শহীদ ও সত্য নিষ্ঠ বন্ধুদের পাশেই তিনি সমাহিত হন। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৬-৫৭)।
তার মৃত্যু সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য আছে। সঠিক মত অনুযায়ী তিনি হিজরী ৭৪ সনে মৃত্যু বরণ করেন। অন্য একটি মতে তার মৃত্যু সন হিজরী ৬৪। ওয়াকিদী ও তার অনুসারীদের ধারণা তিনি আশি বছর জীবিত ছিলেন। ইবন হাজার বলেন, মৃত্যু সন সম্পর্কে প্রথম মতানুযায়ী ওয়াকিদীর এ ধারণা সঠিক নয়। কারণ তাতে হুদাইবিয়ার বাইয়াতের সময় তাঁর বয়স দাড়ায় দশের কাছাকাছি। আর এ বয়সে কেউ মৃত্যুর বাইয়াত করতে পারে না। তাছাড়া আমি ইবন সা’দে দেখেছি, তিনি হযরত মুআবিয়ার (রা) খিলাফতকালের শেষ দিকে ইনতিকাল করেন। বালাযুরীও এমনটি উল্লেখ করেছেন। (আল ইসাবা-২/৬৭)।
হযরত সালামা (রা) রাসুলুল্লাহর সা: ঘনিষ্ট সাহচর্য লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন। বহু অভিযানে রাসুলুল্লাহর সফর সঙ্গী হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছিলেন। এই সুযোগ তিনি যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তাছাড়া আবু বকর, উমার, উসমান ও তালহা (রা) থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সাতাত্তর (৭৭)। তার মধ্যে ষোলটি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাত বুখারী ও মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত। ৫টি বুখারী ও ৯টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (তাহজীবুল কামাল-১৪৮) আর তাঁর নিকট থেকে যারা হাদীস বর্ণনা করেছেন, তাদের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা হলেন- ইয়াস ইবন সালামা, ইয়াযীদ ইবন উবাইদ, আবদুর রহমান ইবন আবদিল্লাহ, মুহাম্মাদ ইবন হানাফিয়া প্রমূখ।
আল্লাহর রাস্তায় খরচের ব্যাপারে হযরত সালামা ছিলেন দরাযহস্ত। কেউ কিছু আল্লাহর ওয়াস্তে চাইলে তিনি খালি হাতে ফিরাতেন না। তিনি বলতেন, যে আল্লাহর ওয়াস্তে দেয় না সে কোথায় দেবে? তবে আল্লাহর ওয়াস্তে চাওয়াকে তিনি পছন্দ করতেন না।
তিনি নিজের জন্য সাদকার মাল হারাম মনে করতেন। যদি কোন জিনিস সাদকার বলে সন্দেহ হত, তিনি তা থেকে হাত গুটিয়ে নিতেন। এ কারণে নিজের সাদকা করা কোন জিনিস দ্বিতীয়বার অর্থের বিনিময়ে খরিদ করাও পছন্দ করতেন না।
তিনি হারাম ও হালালের ব্যাপারে এতই সতর্ক ছিলেন যে, জুয়ার সাথে সাদৃশ্য দেখায় এমন কোন খেলায় তিনি বাচ্চাদের খেলতে দিতেন না।
মদীনায় যে সকল সাহাবী ফাতওয়া দান করতেন সালামা (রা) ছিলেন তাদেরই একজন। ইবন সা’দ যিয়াদ ইবন মীনা হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলছেন: ইবন আব্বাস, ইবন উমার, আবু সাঈদ আল খুদরী, আবু হুরাইরা, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস, জাবির ইবন আবদিল্লাহ, রাফে ইবন খাদীজ, সালামা ইবন আকওয়া প্রমূখ সাহাবী মদীনায় ফাতওয়া দিতেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/২৫৪)।
ইমাম বুখারী ‘আল আদাবুল মুফরাদ’ (পৃ. ১৪৪) গ্রন্থে আবদুর রহমান ইবন রাযীন থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমরা রাবজা দিয়ে যাচ্ছিলাম। আমাদের বলা হলো, এখানে সালামা ইবন আকওয়া আছেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে সালাম জানালাম। তিনি নিজের দুটি হাত বের করে আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন: আমি এই দুটি হাত দিয়ে রাসুলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াত করেছি। তিনি তার একটি পাঞ্জা বের করলেন। পাঞ্জাটি যেন উটের পাঞ্জার মত বৃহদাকৃতির। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪৯৮-৯৯)
হযরত সালামাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হুদাইবিয়ার দিনে আপনারা কোন্ কথার ওপর রাসূলুল্লাহর সা: হাতে বাইয়াত করেছিলেন? বলেছিলেন: মাওত, অর্থাত মৃত্যুর ওপর। (আল ইসতিয়াব, হায়াতুস সাহাবা-১/২৪৯)।
হযরত সালামার (রা) পুত্র ‘ইয়াস’ একটি মাত্র কথায় পিতার ফজীলাত ও বৈশিষ্ট্য চমতকার রূপে তুলে ধরেছেন। তিনি বলছেন: ‘মা কাজাবা আবী কাততু- আমার আব্বা কক্ষণো মিথ্যা বলেন নি। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৫৫৪)।
সত্যনিষ্ঠ মানুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান লাভের জন্য একজন মানুষের জীবনে এই একটি মাত্র গুণই যথেষ্ট। তিনি তার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এই সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
‘আল ইলতিয়াব ফী আসমায়িল আসহাব’ গ্রন্থের লেখক আবু উমার ইউসুফ আল কুরতুবী ইবন ইসহাকের সূত্রে হযরত সালামা সম্পর্কে একটি অভিনব কাহিনীর উল্লেখ করেছেন। ইবন ইসহাক বলেন, ‘আমি শুনেছি নেকড়ে বাঘ যার সংগে কথা বলেছে, সালামা সেই ব্যক্তি। সালামা বলেছেন, আমি একটি নেকড়েকে হরিণ শিকার করতে দেখলাম। আমি তাকে তাড়া করে তার মুখ থেকে হরিণটি বের করে আনলাম। তখন নেকড়েটি বললো, ‘তোমার কি হল, আল্লাহ আমাকে যে রিযিক দিয়েছেন আমি তো তাই খেতে চাচ্ছি। আর তা তোমারও সম্পদ নয় যে, তুমি আমার মুখ থেকে কেড়ে নেবে। সালামা বলেন, আমি বললাম, ‘ওহে আল্লাহর বান্দারা, এই দেখ অভিনব ঘটনা। নেকড়ে কথা বলছে, আমার কথা শুনে নেকড়েটি বললো, এর থেকেও আশ্চর্য ঘটনা হলো, আল্লাহর রাসূল তোমাদেরকে আল্লাহর বন্দেগীর দিকে আহবান জানাচ্ছেন, আর তোমরা তা অস্বীকার করে মূর্তি পূজার দিকে ধাবিত হচ্ছো। সালামা বলেন, অত:পর আমি রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করি। আল্লাহই ভালো জানেন, কে এই নেকড়ে।’ (আল ইসতিয়াব)।
উমাইর ইবন ওয়াহাব (রা)

নাম উমাইর, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু উমাইয়া। পিতা ওয়াহাব, মাতা উম্মু সাখীলা। কুরাইশদের অন্যতম বীর নেতা। ইসলাম পূর্ব জীবনে ইসলাম ও রাসুলুল্লাহর সা: চরম দুশমন। তীক্ষ ও গভীর দৃষ্টি সম্পন্ন প্রখর অনুধাবন ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিত্ব।
তিনি বদর যুদ্ধে মক্কার কুরাইশ বাহিনীর সাথে যোগ দেন এবং যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহুর্তে কুরাইশ বাহিনী তাকে মুসলিম বাহিনীর শক্তি নিরূপণের দায়িত্ব দেয়। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে মুসলিম বাহিনীর আশে পাশে চক্কর মেরে কুরাইশ চাউনীতে ফিরে গিয়ে জানান, ‘তারা তিনশোর মত হবে। এর কিছু কম বা বেশিও হতে পারে।’ তার অনুমান যথাযথ ছিল। কুরাইশরা তাকে জিজ্ঞেস করে,‘পেছনে তাদের কোন সাহায্য আসার সম্ভাবনা আছে কি? তিনি জবাব দেন, ‘তেমন কিছু আমি পাইনি। তবে হে কুরাইশগণ! আমি তাদের উটগুলিকে কঠিন মৃত্যুকে বহন করতে দেখেছি। তরবারিগুলি ছাড়া তাদের আত্মরক্ষার আর কিছু নেই, আশ্রয় নেওয়ারও কোন স্থান নেই। আল্লাহর কসম, আমার মনে হয়েছে, তোমরা তাদের একজনকে হত্যা করলে তোমাদেরও একজন নিহত হবে। যদি তাদেরই সমসংখ্যক তোমাদের নিহত হতে হয় তাহলে আর লাভ কি? এখন তোমরা ভেবে দেখ কি করবে।’ যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার জন্য তিনি কুরাইশদেরে এ কথাও বলেন, ‘মদীনার লোকদের চেহারা সাপের মত, চরম পিপাসায়ও তারা কাতর হয় না। আমাদের সাথে যুদ্ধ করে প্রতিশোধ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব। তোমাদের মত উজ্জ্বল চেহারার লোকদের তাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া উচিত নয়।’
কুরাইশ নেতৃবর্গের অনেকেই তার কথায় প্রভাবিত হয়। তারা প্রায় মক্কায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বসে। কিন্তু আবু জাহল তাদের সিদ্ধান্তে বাধ সাধে। হিংসা ও যুদ্ধের আগুনে তার অন্তর জ্বলছিল। আল্লাহর ইচ্ছায় এ যুদ্ধের প্রথম ইন্ধন হয় আবু জাহল। আর অনেকের সাথে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয় উমাইরের পুত্র ওয়াহাব।
উমাইর ইবন ওয়াহাব স্বীয় পুত্র ওয়াহাবকে মুসলমানদের হাতে বন্দী অবস্থায় ফেলে রেখে বদর থেকে নিজে প্রাণ বাঁচিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। তার ভয় হচ্ছিল, মক্কায় তিনি রাসুলুল্লাহ ও তার সাহাবীদের ওপর যে অত্যাচার করেছেন হয়তো তার বদলা নেওয়া হবে বন্দী পুত্রের ওপর। মক্কায় ফিরে এসে একদিন সকালবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে কাবার দিকে গেলেন তাওয়াফ ও মূর্তিকে সিজদার উদ্দেশ্যে। সেখানে তিনি সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যাকে কাবার চত্বরে বসা দেখতে পেলেন। তিনি সাফওয়ানের কাছে গিয়ে বললেন:
-ওহে কুরাইশদের সরদার, সুপ্রভাত।
-আবু ওয়াহাব, সুপ্রভাত। বস, একটু কথা বলি। কথা বললে সময় একটু কাটবে। উমাইর সাফওয়ানের পাশে বসলেন। তারা বদরের অবস্থা, বদরে আপতিত মুসীবতের কথা আলোচনা করলেন এবং মুহাম্মাদ ও তার সংগীদের হাতে বদরে কে কে বন্দী হয়েছে তা গুণলেন। বদরে যেসব কুরাইশ নেতাকে হত্যা করে ‘কালীব’ কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে তাদের জন্য তারা দু:খ প্রকাশ করলেন।
আবেগ-উত্তেজনায় এক পর্যায়ে সাফওয়ান ইবন উমাইয়া বললো: আল্লাহর কসম, এভাবে তাদের নিহত হওয়ার পর কোন কিছুই আর ভালো লাগছে না। উমাইর বললেন:
-তুমি সত্য বলেছ। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন: কাবার প্রভুর নামে শপথ করে বলছি, যদি আমার ঘাড়ে ঋণের বোঝা এবং পরিবার পরিজনের দায় দায়িত্ব না থাকতো, আমি এক্ষুণি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদের একটা দফা রফা করে তার সকল অপকর্মের পরিসমাপ্তি ঘটাতাম। তারপর গলাটি একটু নিচু করে বললেন, ‘আমার ছেলে ওয়াহাব তো সেখানে তাদের হাতে বন্দী। আমি সেখানে গেলে কেউ কোন রকম সন্দেহ করবে না।’
সাফওয়ান ইবন উমাইয়া সুযোগটি হাতছাড়া করলো না। উমাইরের দিকে তাকিয়ে সে বললো: -উমাইর, তোমার সকল ঋণ, তা যতই হোক না কেন, তার দায়িত্ব আমার ঘাড়ে তুলে নিলাম। আর আমি যতদিন বেঁচে থাকি এবং তোমার পরিবার পরিজনও যতদিন বেঁচে থাকে, তারা আমার সাথেই থাকবে। আমার অর্থ সম্পদের কোন অভাব নেই। তারা সুখেই থাকবে।
উমাইর বললেন:
-আমাদের এ আলোচনা গোপন থাকুক, কেউ যেন না জানে।
সাফওয়ান বললো:
-তাই হবে।
উমাইর কাবার চত্বর থেকে উঠে বাড়ী গেলেন। মুহাম্মাদের প্রতিহিংসার আগুনে তার অন্তর জ্বলছে। তিনি তার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করলেন। তার সফর প্রস্তুতির ব্যাপারে কেউ কোন রকম সন্দেহ করলো না। কারণ, বদর-বন্দীদের ছাড়ানোর জন্য মুক্তিপণ নিয়ে প্রতিনিধিদল তখন মক্কা মদীনা ছুটাছুটি করছে।
উমাইর তরবারীতে ধার দিয়ে তীব্র বিষের মধ্যে চুবিয়ে রাখলেন। সোয়ারী প্রস্তুত করা হলো। তিনি সোয়ার হয়ে মদীনা অভিমূখে যাত্রা করলেন। হিংসা বিদ্বেষে তখন তার অন্তরটি জ্বলে কয়লা হয়ে যাচ্ছে।
উমাইর মদীনায় পৌঁছে সোজা মসজিদের দিকে চললেন। মসজিদের দরযার কাছে সোয়ারী থেকে নেমে পড়লেন।
এদিকে মসজিদের দরযার কাছে তখন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব ও কয়েকজন সাহাবী বসে বসে বদরের ঘটনাবলী আলোচনা করছিলেন। কুরাইশদেরকে কিভাবে নিহত হলো, কে কেমন করে বন্দী হলো এবং মুহাজির ও আনসারদের কে কেমন বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন করলো ইত্যাদি বিষয়ে তারা আলাপ জমিয়েছিলেন।
হঠাৎ হযরত উমারের চোখ পড়ে উমাইরের দিকে। তিনি সোয়ারী থেকে নেমে সোজা মসজিদের দিকে আসছেন। কাঁধে তার তরবারী ঝোলানো। উমার সন্ত্রস্ত হয়ে বলে উঠলেন:- ‘এ তো সেই কুত্তা, আল্লাহর দুশমন উমাইর ইবন ওয়াহাব। আল্লাহর কসম, তার উদ্দেশ্য ভালো নয়। মক্কায় সে আমাদের বিরুদ্ধে সবসময় কাফিরদের উত্তেজিত করতো। বদর যুদ্ধের পূর্বে সে ছিল মক্কার গুপ্তচর।’ তিনি সংগীদের দিকে ফিরে বললেন:
-তোমরা রাসুলুল্লাহর সা: দিকে যাও, তার আশেপাশে থাক। এই পাপাত্মা যেন কোন রকম ধোকা দিতে না পারে।
উমার দৌড়ে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গিয়ে বললেন: ইয়া রাসুলুল্লাহ, সেই আল্লাহর দুশমন উমাইর এসেছে তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে। আমার মনে হয়, কোন রকম অসৎ উদ্দেশ্য ছাড়া সে আসেনি।
রাসুলুল্লাহ সা: বললেন:
-তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।
হযরত উমার (রা) উমাইরের দিকে এগিয়ে গিয়ে একহাত তার গলার কাছে জামা ধরেন এবং অন্য হাতে তার তরবারির বাঁটের সাথে ঘাড়টি ঠেসে ধরে তাকে রাসুলুল্লাহর সা: নিকট হাজির করেন। তার এ অবস্থা দেখে রাসূল সা: উমারকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। উমার ছেড়ে দিলেন। রাসুল সা: এর নির্দেশে উমার তার নিকট থেকেও সরে দাড়ালেন। রাসুল সা: উমাইরকে লক্ষ্য করে বলেন: উমাইর একটু কাছে এসো।
উমাইর একটু কাছে গিয়ে বলেন: সুপ্রভাত।
জাহিলী আরবে লোকেরা এভাবে সম্ভাষণ জানাতো।
রাসূল সা: বললেন, ‘উমাইর, তোমার সম্ভাষণ অপেক্ষা উত্তম সম্ভাষণ শিক্ষা দিয়ে আল্লাহ আমাদের সম্মানিত করেছেন। সালামের মাধ্যমে আল্লাহ মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। এ সালাম হচ্ছে জান্নাতের অধিবাসীদের সম্ভাষণ।’
উমাইর বললেন, ‘আমাদের সম্ভাষণও আপনার কাছে অপরিচিত নয়।’
রাসূল সা: জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি উদ্দেশ্যে এসেছ?’
-আপনাদের হাতে আমার যে বন্দীটি আছে তাকে ছাড়াতে এসেছি। আর যাই হোক আপনিও তো আমাদের একই খান্দানের একই গোত্রের লোক। তার ব্যাপারে আমার প্রতি অনুগ্রহ করুন।
-তাহলে ঘাড়ে এ ঝুলন্ত তরবারি কেন?
-আল্লাহ এই তরবারির অকল্যাণ করুন। বদরে এই তরবারি আমাদের কোন কাজে এসেছে?
সোয়ারী থেকে নামার সময় ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলতে ভুলে গেছি। ঐ অবস্থায় রয়ে গেছে।
-‘উমাইর, আমার কাছে সত্য কথাটি বল, তুমি কেন এসেছ?’
-আমি শুধু বন্দী মুক্তির উদ্দেশ্যেই এসেছি। রাসূল সা: বললেন, ‘তুমি সাফওয়ানের সাথে কী শর্ত করেছো?’
এই প্রশ্নে উমাইর ভীষণ ভয় পেয়ে যান। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘কী শর্ত করেছি?’
রাসূল সা: বললেন, ‘তুমি ও সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা কা’বার চত্বরে বসে কালীব কূপে নিক্ষিপ্ত নিহত কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সম্পর্কে আলোচনা করেছো। তুমি বলেছ, যদি আমার ঘাড়ে ঋণের বোঝা এবং পরিবার পরিজনের দায়িত্ব না থাকতো, আমি মদীনায় গিয়ে মুহাম্মাদকে হত্যা করতাম। তুমি আমাকে হত্যা করবে-এই শর্তে সাফওয়ান তোমার সকল দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তোমার ও তোমার উদ্দেশ্যের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে আছেন।’
উমাইর কিছুক্ষণের জন্য হতভম্ব হয়ে গেলেন। তারপর একটু সচেতন হয়ে বলে উঠলেন: আশহাদু আন্নাকা রাসুলুল্লাহ- আমি ঘোষণা করছি, আপনি নিশ্চিত আল্লাহর রাসূল। ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি আসমানের যেসব খবর আমাদের কাছে নিয়ে আসতেন, আপনার ওপর যে ওহী নাযিল হতো, আমরা তা অবিশ্বাস করতাম। কিন্তু সাফওয়ানের সাথে আমার যে আলোচনা, তাতো আমি আর সে ছাড়া আর কেউ জানে না। আল্লাহর কসম, আমার বিশ্বাস জন্মেছে এ খবর একমাত্র আল্লাহই আপনাকে দিয়েছেন। আল হামদুলিল্লাহ সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর যিনি আমাকে হিদায়াত দানের জন্য আপনার কাছে নিয়ে এসেছেন। এ কথা বলে তিনি আবারো উচ্চারণ করেন, ‘আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ।’
হযরত রাসূলে কারীম সা: সাহাবীদের নির্দেশ দেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাই উমাইরকে দ্বীন শিক্ষা দাও, তাকে কুরআনের তালীম দাও এবং তার বন্দীকে মুক্তি দাও।
ইসলাম গ্রহণের পূর্বে হযরত উমাইর ছিলেন কুরাইশদের অন্যতম ‘শয়তান’ বা নেতা। মুসলমান হওয়ার পর তিনি হলেন ইসলামের এক বিশিষ্ট হাওয়ারী বা সাথী। তার ইসলাম গ্রহণের পর হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) বলেন, ‘যে সত্তার হাতে আমার জীবন তার শপথ, উমাইর যখন মদীনায় আবির্ভূত হয় তখন একটি শুকরও আমার নিকট তার চেয়ে বেশি প্রিয় ছিল। আর আজ সে আমার কোন একটি সন্তানের চেয়েও আমার নিকট অধিকতর প্রিয়।” (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩২৫)
ইসলাম গ্রহণের পর উমাইর ইসলামী শিক্ষা দ্বারা নিজেকে পবিত্র করা এবং কুরআনের নূরের দ্বারা স্বীয় হৃদয়কে পূর্ণ করে তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি মক্কা এবং মক্কায় যাদের রেখে এসেছেন তাদের কথা প্রায় ভুলে গেলেন।
এদিকে সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা প্রতিদিন মনে মনে রঙ্গীন স্বপ্ন দেখে। সে মক্কায় কুরাইশদের বিভিন্ন আড্ডায় গিয়ে বলতে থাকে, শিগগির, একটা মহাসুখবর তোমাদের কাছে এসে পৌঁছবে। তোমরা তাতে বদরের সান্ত্বনা পাবে।
সাফওয়ানের প্রতীক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চললো। প্রথমে সে কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলো, পরে অস্থির হয়ে পড়লো। মদীনার দিক থেকে আগত প্রতিটি কাফেলা বা আরোহীকে ধরে ধরে সে উমাইর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে শুরু করলো। কিন্তু কেউ সন্তোষজনক জবাব দিতে পারলো না। এমন সময় মদীনা থেকে আগত এক আরোহীকে সে পেল। ঔৎসুক্যের আতিশয্যে সাফওয়ান তাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলো, ‘মদীনায় কি নতুন কোন ঘটনা ঘটেনি? লোকটি জবাব দিল, হাঁ বিরাট এক ঘটনা ঘটে গেছে।’ সাফওয়ানের মুখমন্ডল দীপ্তিমান হয়ে ওঠে এবং আনন্দ উল্লাসে তার হৃদয় মন ফেটে পড়ার উপক্রম হয়। সাথে সাথে সে আবার প্রশ্ন করে, ‘কী ঘটেছে আমাকে একটু খুলে বল তো।’ লোকটি বলল, ‘উমাইর ইসলাম গ্রহণ করেছে। সেখানে সে নতুন দ্বীনের দীক্ষা নিচ্ছে এবং কুরআন শিখছে।’ সাফওয়ানের দুনিয়াটা যেন ওলট পালট হয়ে গেল। তার মাথায় যেন বাজ পড়লো। তার ধারণা ছিল, দুনিয়ার সব মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেও উমাইর কক্ষণো ইসলাম গ্রহণ করবে না।
ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে এই দ্বীনের প্রতি যে দায়িত্ব তা হযরত উমাইর যথাযথভাবে উপলদ্ধি করেন। তিনি অনুধাবন করেন, এ দ্বীনের বিরোধিতায় তিনি যে শক্তি ব্যয় করেছে ঠিক সেই পরিমাণ শক্তি এর খিদমতে ব্যয় করতে হবে। এ দ্বীনের বিরুদ্ধে যতখানি অপপ্রচার তিনি চালিয়েছেন ঠিক ততখানি এর দিকে আহবান জানাতে হবে। আল্লাহ ও তার রাসূলকে তিনি যে কতখানি মুহাব্বত করেন তা সততা, জিহাদ ও ইতায়াতের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
কিছুদিন মদীনায় ইসলামের তালীম ও তারবিয়াত নেওয়ার পর একদিন হযরত উমাইর রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমি আমার জীবনের বিরাট এক অংশ আল্লাহর নূর নিভিয়ে দেওয়ার জন্য এবং ইসলামের অনুসারীদের ওপর অত্যাচার উৎপীড়নে কাটিয়ে দিয়েছি। আমার ইচ্ছা -আপনি যদি অনুমতি দেন, আমি মক্কায় যাই এবং কুরাইশদের আল্লাহ ও তার রাসুলের দিকে আহবান জানাই। তারা যদি আমার দাওয়াত কবুল করে তাহলে তা হবে অতি উত্তম কাজ। আর যদি প্রত্যাখ্যান করে, আমি তাদের এমন কষ্ট দেব যেমন ইতিপূর্বে রাসুলুল্লাহর সংগী সাথীদের দিয়েছি।’
রাসুল সা: তাকে অনুমতি দিলেন। একদিন উমাইর তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে মক্কায় ফিরলেন। মক্কায় সর্ব প্রথম সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার সাথে দেখা করে বললেন, -‘ওহে সাফওয়ান তুমি মক্কার একজন নেতা, কুরাইশদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। এই যে তোমরা পাথরের পূজা কর, মূর্তির নামে জীবজন্তু জবেহ কর-এটা কি কোন দ্বীন বা ধর্ম তুমি মনে কর? তবে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’ সাফওয়ান উমাইরের ওপর ঝাপিয়ে পড়তে উদ্যত হল। কিন্তু উমাইরের তরবারি তাকে সঠিকভাবে থামিয়ে দিল। ক্ষোভে দু:খে সাফওয়ান অশ্রাব্য কিছু গালি উমাইরের কানে ছুড়ে দিয়ে পথ ছেড়ে চলে গেল।
এভাবে উমাইর মুসলমান হয়ে মক্কায় ফিরলেন। কদিন আগে যিনি মুশরিক অবস্থায় মক্কা ছেড়ে যান, তিনি যখন আবার মক্কায় প্রবেশ করেন তখন তার রূপটি ছিল ঠিক তেমন যেমন রূপ ধারণ করেছিলেন হযরত উমার (রা) ইসলাম গ্রহণের দিন। ইসলাম গ্রহণের পর উমার চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি, কুফর অবস্থায় যে যে স্থানে আমি বসেছি, ঈমান অবস্থায় সে সে স্থানে আমি বসবো।’
উমাইর যেন এ ক্ষেত্রে উমার (রা) কে নেতা হিসাবে মানলেন। তিনি রাত দিন মক্কার অলি গলিতে দাওয়াত দিয়ে চললেন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে উমাইরের হাতে বিপুল সংখ্যক লোক ঈমান আনলেন। উহুদ যুদ্ধের পূর্বে মুমিনদের এই দলটি সংগে করে তিনি আবার মদীনায় চলে যান। উহুদ, খন্দক ও মক্কা বিজয় সহ সকল অভিযানে তিনি রাসুলুল্লাহ (রা) সাথে অংশগ্রহণ করেন।
মক্কা বিজয়ের আনন্দের দিন উমাইর তার বন্ধু ও সাথী সাফওয়ানকে ভুলে যাননি। রাসূলুল্লাহ সা: মক্কা পৌঁছার পর সাফওয়ান প্রাণভয়ে মক্কা থেকে পালিয়ে ইয়ামনের পথে জিদ্দা পৌঁছে। উমাইর এ খবর পেয়ে ভীষণ ব্যথিত হন। সাফওয়ানকে শয়তানের হাত থেকে উদ্ধারের জন্য তিনি দৃঢ় সংকল্প হন। দৌড়ে রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গিয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর নবী! সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যা তার সম্প্রদায়ের একজন নেতা। সে আপনার ভয়ে মক্কা থেকে পালিয়েছে। নিজেকে সে সাগরে নিক্ষেপ করবে। আপনি তাকে আমার বা নিরাপত্তা দিন।’ রাসুল সা: বললেন, ‘সে নিরাপদ।’ উমাইর বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমাকে এমন একটি নিদর্শন দিন যা দ্বারা বুঝা যায় আপনি তাকে আমান দিয়েছেন।’ রাসূল সা: যে চাদরটি মাথায় দিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন সেটি তাকে দান করেন।
উমাইর ইবন যুবাইর বর্ণনা করেন:
‘চাদরটি নিয়ে উমাইর বের হলেন। তিনি যখন সাফওয়ানের কাছে পৌঁছলেন তখন সে সাগর পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বললেন: ‘সাফওয়ান, আমার মা বাবা তোমার প্রতি কুরবান হোক! এভাবে তুমি নিজেকে ধ্বংস করোনা। এই তোমার জন্য রাসুলুল্লাহর আমান নিয়ে এসেছি।
সাফওয়ান বললো:
-‘তোমার ধ্বংস হোক। আমার কাছ থেকে সরে যাও। আমার সাথে কথা বলো না।’ উমাইর বললেন, ‘সাফওয়ান! আমার মা বাবা তোমার প্রতি কুরবান হোক। নিশ্চয় রাসুলুল্লাহ সা: সর্বোত্তম মানুষ। সর্বাধিক নেককার ও ধৈর্য্যশীল মানুষও তিনিই। তার ইজ্জত তোমারই মর্যাদা।’ সাফওয়ান বললো:- ‘আমি আমার জীবনের আশংকা করছি।’ উমাইর বললেন: ‘তিনি তার থেকেও সহনশীলও সম্মানিত।
উমাইর (রা) সাফওয়ানকে সংগে করে রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হলেন। সাফওয়ান বললো: এ ব্যক্তির ধারণা আপনি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন।
রাসুলুল্লাহ সা: বললেন: সে সত্যই বলেছে।
সাফওয়ান বললো: আমাকে দু মাসের সময় দিন।
রাসূল সা: বললেন: তোমাকে চার মাসের সময় দেওয়া হলো।
অল্প দিনের মধ্যেই হযরত সাফওয়ান (রা) ইসলাম গ্রহণ করেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল ৩২৫, হায়াতুস সাহাবা-১)
হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে হযরত উমাইর (রা) সকল গুরুত্বপূর্ণ কাজে খলীফাকে সহযোগিতা করেন। হযরত উমারের খিলাফতকালে আমর ইবনুল আস (রা) মিসর অভিযান পরিচালনা করেন। ইসকান্দারিয়া বিজয়ে যখন তার বিলম্ব ঘটছিল তখন হযরত উমার (রা) তার সাহায্যার্থে মদীনা থেকে চারজন জাদরেল সেনা কমান্ডারের নেতৃত্বে দশ হাজার সৈন্য পাঠান। এই চার কমান্ডারের একজন ছিলেন হযরত উমাইর ইবন ওয়াহাব।
হযরত উমার এ চার কমান্ডার সম্পর্কে আমর ইবনুল আসকে হিদায়াত দেন যে, আক্রমণের সময় তাদেরকে অগ্রভাগে রাখবে। তাদের প্রচেষ্ঠায় ইসকান্দারিয়া অভিযান সফল হয়। ইসকান্দারিয়া বিজয়ের পর আমরের নির্দেশে তিনি মিসরের বহু এলাকা পদানত করেন। হযরত উমারের (রা) খিলাফতের শেষ দিকে তিনি ইনতিকাল করেন।
আবুল আস ইবন রাবী (রা)

আবুল আসের প্রকৃত নামের ব্যাপারে ইতিহাসে বিস্তর মতভেদ দেখা যায়। যেমন: লাকীত, হিশাম, মিহশাম, ইয়াসির, ইয়াসিম ইত্যাদি। তবে তার কুনিয়াত বা ডাকনাম আবুল ‘আস’। এ নামেই তিনি ইতিহাসে খ্যাত। তার পিতা ‘রাবী’ ইবনে ‘আবদিল উযযা’ মাতা হযরত খাদীজার (রা) সহোদরা হালা বিনতু খুওয়াইলিদ। তিনি কুরাইশ গোত্রের ‘আবদু শামস’ শাখার সন্তান হওয়ার কারণে তাকে সংক্ষেপে ‘আবশামী’ বলা হয়। খালা হযরত খাদীজা (রা) ও খালু রাসুলুল্লাহ সা: বাড়ীতে আবুল আসের অবাধ যাতায়াত ছিল। তিনি ছিলেন খালা খালুর অতি স্নেহের পাত্র। আবুল আস ধীরে ধীরে যৌবনে পদার্পণ করেন। তার আকর্ষণীয় চেহারা সকলের মন কেড়ে নেয়। বংশ গৌরব এবং আরবীয় বীরত্ব, প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ ইত্যাদি গুণের জন্য তৎকালীন মক্কার যুবকদের মধ্যে তিনি এক বিশেষ স্থানের অধিকারী। তদুপরি কুরাইশদের যে বিশেষ গুণের কথা কুরআনে ঘোষিত হয়ে- রিহলাতাশ শিতায়ি ওয়াস সাইফ- শীতকালে ইয়ামানের দিকে এবং গ্রীস্মকালে শামের দিকে তাদের বাণিজ্য কাফিলা চলাচল করে- আবুল আসের মধ্যেও এ গুণটির পুরোপুরি বিকাশ ঘটে। মক্তা ও শামের মধ্যে সব সময় তার বাণিজ্য কাফিলা যাতায়াত করে। সেই কাফিলায় থাকে কমপক্ষে একশো উটসহ দুশো লোক। তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি, সততা, ও আমানতদারীর জন্য মানুষ তার কাছে নিজেদের পন্যসম্ভার নিশ্চিন্তে সমর্পণ করে। ইবন ইসহাক বলেন, ‘অর্থ সম্পদ, আমানতদারী ও ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি তখন মক্কার গণ্যমান্য মুষ্টিমেয় লোকদের অন্যতম। (আল ইসাবা-৪/১২২)।
সময় আপন গতিতে বয়ে চললো। এদিকে মুহাম্মাদের সা: বড় মেয়ে যয়নাব বেড়ে ওঠেন। মক্কার সম্ভ্রান্ত যুবকরা তাঁকে জীবন সঙ্গীনী হিসেবে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। আর ব্যাকুল হবেই বা না কেন? যয়নাব হলেন, মক্কার কুরাইশ গোত্রের সর্বোত্তম শাখার কন্যা। পিতা মাতার দিক দিয়ে যেমন সর্বাধিক সম্মানিত, তেমনি চরিত্র ও আদব আখলাকের দিক দিয়েও সবচেয়ে বেশি পুত:পবিত্র। এমন পাত্রীর আশা করলেই কি সবার ভাগ্যে জোটে? অবশেষে মক্কার যুবক তারই খালাত ভাই আবুল আস ইবন রাবী এ গৌরব লাভে ধন্য হন।
আবুল আসের সাথে যয়নাবের (রা) বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যে মুহাম্মাদ সা: নবুওয়াত লাভ করেন। সত্য দ্বীন ও হিদায়াত সহকারে তিনি প্রেরিত হন। নিজের নিকট আত্মীয়দের নিকট দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর নির্দেশ লাভ করেন। হযরত খাদীজা (রা) ও তার কন্যারা যথা: যয়নাব, রুকাইয়া, উম্মু কুলসুম ও ফাতিমা (রা) রাসুলুল্লাহর সা: ওপর ঈমান আনেন। অবশ্য ফাতেমা তখন খুব ছোট। রাসুলুল্লাহর সা: জামাই আবুল আস স্ত্রী যয়নাবকে অত্যন্ত ভালবাসতেন এবং সম্মানও করতেন। কিন্তু তিনি পূর্ব পুরুষের ধর্মত্যাগ করে প্রিয়তমা স্ত্রীর নতুন দ্বীন কবুল করতে রাজী হলেন না। এ অবস্থা চলতে লাগলো। এদিকে রাসুলুল্লাহ সা: ও কুরাইশদের মধ্যে মারাত্মক দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল। কুরাইশরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করলো,
“তোমাদের সর্বনাশ হোক! তোমরা মোহাম্মাদের বিয়ে করে তার দুশ্চিন্তা নিজেদের ঘাড়ে তুলে নিচ্ছ। তোমরা যদি এ সকল মেয়েকে তার কাছে ফেরত পাঠাতে তাহলে সে তোমাদের ছেড়ে তাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতো।” তাদের অনেকে এ কথা সমর্থন করে বললো, “ এ তো অতি চমৎকার যুক্তি!” তারা সবাই আবুল আসের কাছে যেয়ে বললো, “আবুল ’আস, তুমি যে কুরাইশ সুন্দরীকে চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দেব।” আবুল আস বললেন, “আল্লাহর কসম! না, তা হয় না। আমার স্ত্রীকে আমি ত্যাগ করতে পারিনে। তার পরিবর্তে সকল নারী আমাকে দিলেও আমার তা পছন্দনীয় নয়।”
রাসুলুল্লাহ সা: অন্য দুই মেয়ে রুকাইয়া ও উম্মু কুলসুমকে তাদের স্বামীগৃহ থেকে বিদায় দিয়ে পিতার কাছে পাঠিয়ে দিল। কন্যাদের স্বামী পরিত্যাক্তা হয়ে ফিরে আসায় হযরত রাসূলে কারীম সা: খুব খুশী হলেন। তিনি মনে মনে কামনা করলেন, অন্য দু’ জামাইর মত আবুল আস ও যদি যয়নাবকে বিদায় দিত! যেহেতু আবুল আসের হাত থেকে যয়নাবকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ক্ষমতা রাসুলুল্লাহর সা: ছিল না এবং মুশরিকদের (পৌত্তলিক) সাথে মুমিন নারীদের বিয়ে তখনও হারাম ঘোষিত হয়নি, এ কারণে তিনি চুপ থাকলেন।
সময় দ্রুত বয়ে চললো। হযরত রাসূলে কারীম সা: মদীনায় হিজরাত করলেন। কুরাইশদের সাথে সামরিক সংঘাত শুরু হলো। কুরাইশরা মুসলমানদের সাথে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বদরে সমবেত হল। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আবুল আস কুরাইশদের সাথে বদরে গেলেন। কারণ কুরাইশদের মধ্যে তার যে স্থান তাতে না যেয়ে উপায় ছিলনা। বদরে কুরাইশরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। তাদের বেশ কিছু নেতা নিহত হয় এবং বহু সংখ্যক যোদ্ধা বন্দী হয়। আর অবশিষ্টরা পালিয়ে প্রাণ বাঁচায়। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, এই বন্দীদের মধ্যে রাসুলুল্লাহর সা: জামাই আবুল আসও ছিলেন। ইবন ইসহাক বলেন, বদরে হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর ইবন নুমান (রা) তাকে বন্দী করেন। তবে ওয়াকীদীর মতে হযরত খিরাশ ইবন সাম্মাহর (রা) হাতে তিনি বন্দী হন। (আল ইসাবা-৪/১২২)
বদরের বন্দীদের ব্যাপারে মুসলমানদের সিদ্ধান্ত হল, মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হবে। বন্দীদের সামাজিক মর্যাদা এবং ধনী দরিদ্র প্রভেদ অনুযায়ী এক হাজার থেকে চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ নির্ধারিত হল। বন্দীদের প্রতিনিধিরা ধার্যকৃত মুক্তিপণ নিয়ে মক্কা মদীনা ছুটাছুটি শুরু করে দিল। নবী দুহিতা হযরত যয়নাব স্বামী আবুল আসের মুক্তিপণ দিয়ে মদীনায় দূত পাঠালেন। ওয়াকীদির মতে আবুল আসের মুক্তিপণ নিয়ে মদীনায় এসেছিল তার ভাই আমর ইবন রাবী। হযরত যয়নাব মুক্তিপণ দিরহামের পরিবর্তে একটি হার পাঠালেন। এই হারটি তার জননী হযরত খাদীজা (রা) বিয়ের সময় তাকে উপহার দিয়েছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: হারটি দেখেই বিমর্ষ হয়ে পড়লেন এবং স্বীয় বিষন্ন মুখ একটা পাতলা কাপড় দিয়ে ঢেকে ফেললেন। প্রিয়তমা স্ত্রী ও কন্যার স্মৃতি তার মানসপটে ভেসে উঠলো।
কিছুক্ষণ পর হযরত রাসূলে কারীম সা: সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, “যয়নাব তার স্বামীর মুক্তিপণ হিসেবে এই হার পাঠিয়েছে। তোমরা ইচ্ছা করলে তার বন্দীকে ছেড়ে দিতে পার এবং এ হারটিও তাকে ফেরত দিতে পার।” সাহাবীরা বললেন, “ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনার সন্তুষ্টির জন্য আমরা তাই করবো।” সাহাবীরা রাজী হয়ে গেলেন। তবে রাসুলুল্লাহ সা: আবুল আসকে মুক্তি দেওয়ার আগে তার নিকট থেকে এই অঙ্গীকার নেন যে, সে মক্কায় ফিরে গিয়ে অনতিবিলম্বে যয়নাবকে মদীনায় পাঠিয়ে দেবে।
আবুল আস মক্কা ফিরে গিয়েই প্রতিশ্রুতি পালনের তোড়জোড় শুরু করে দিলেন। তিনি স্ত্রী যয়নাবকে সফরের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। তিনি যয়নাবকে এ কথাও বললেন যে, মক্কার অনতিদূরে তোমার পিতার প্রতিনিধিরা তোমাকে নেওয়ার জন্য প্রতীক্ষা করছে। আবুল আস স্ত্রীর সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে তার ভাই আমর মতান্তরে কিনানকে ডেকে যয়নাবের সাথে যেতে বললেন এবং তাকে অপেক্ষমান দূতদের হাতে তুলে দিতে বললেন।
ইবন ইসহাক বলেন, সফরের প্রস্তুতি শেষ হলে যয়নাবের দেবর কিনানা ইবন রাবী একটি উট এনে দাঁড় করালো। যয়নাব উটের পিঠের হাওদায় উঠে বসলেন। আর কিনানা স্বীয় ধনুকটি কাঁধে ঝুলিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি হাতে নিয়ে দিনে দুপুরে মক্কা থেকে বের হলো। কুরাইশদের মধ্যে হৈ চৈ পড়ে গেল। তারা ধাওয়া করে একটু দূরেই ‘যী-তুওয়া’ উপত্যকায় তাদের দুজনকে ধরে ফেললো। আলোচ্য ঘটনা সম্পর্কে সীরাত গ্রন্থসমূহে নানা রকম বর্ণনা পাওয়া যায়। কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো। কিনানা ইবন রাবী কুরাইশদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে কাঁধের ধনুকটি নামিয়ে হাতে নিয়ে তীরের বাণ্ডিলটি সামনে ছড়িয়ে দিয়ে বললো, “তোমাদের কেউ যয়নাবের নিকটবর্তী হওয়ার চেষ্ঠা করলে তার বক্ষ হবে আমার তীরের লক্ষ্যস্থল।” কিনানা ছিল একজন দক্ষ তীরন্দায, তার নিক্ষিপ্ত কোন তীর সচরাচর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতো না, কিনানার এ কথা শুনে আবু সুফইয়ান ইবন হারব তার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো, “ভাতিজা, তুমি যে তীরটি আমাদের দিকে তাক করে রেখেছো তা একটু ফিরাও, আমরা তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।” আবু সুফইয়ান বললো, “তোমার কাজটি ঠিক হয়নি, তুমি প্রকাশ্যে মানুষের সামনে দিয়ে যয়নাবকে নিয়ে বের হয়েছো, আর আমরা বসে বসে তা দেখছি। সমগ্র আরবের অধিবাসী জানে, বদরে আমাদের কী দূর্দশা ঘটেছে এবং এই যয়নাবের বাপ আমাদের কী সর্বনাশটাই না করেছে। তুমি যদি এভাবে প্রকাশ্যে তার মেয়েকে আমাদের নাকের ওপর দিয়ে নিয়ে যাও তাহলে সবাই আমাদেরকে কাপুরুষ ভাববে এবং এ কাজটি সবাই আমাদের জন্য অপমান বলে বিবেচনা করবে। তুমি যয়নাবকে বাড়ী ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কিছুদিন সে তার স্বামীর ঘরে থাকুক। এদিকে যখন লোকেরা বলাবলি করতে শুরু করবে যে, আমরা যয়নাবকে মক্কা ছেড়ে যেতে বাধা দিয়েছি, তখন তুমি তাকে গোপনে তার বাপের কাছে পৌঁছে দিও।”
এ কথায় কিনানা/ আমর রাজী হয়ে গেল, যয়নাব মক্কায় ফিরে এল। কিছুদিন পর রাতের অন্ধকারে সে আবার যয়নাবকে নিয়ে মক্কা থেকে বের হলো এবং ভায়ের নির্দেশমত তাঁকে তার পিতার প্রতিনিধিদের হাতে নির্দিষ্ট স্থানে সমর্পণ করলো।
তাবরানী উরওয়াহ ইবন যুবাইর হতে বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি যয়নাব বিনতু রাসুলুল্লাহকে সাথে নিয়ে বের হলো, কুরাইশদের দু ব্যক্তি পিছু ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তারা যয়নাবের সংগী লোকটিকে কাবু করে তাঁকে উটের পিঠ থেকে ফেলে দেয়। যয়নাব একটি পাথরের ওপর ছিটকে পড়েন। তার শরীর কেটে গিয়ে রক্ত বের হয়ে যায়। এ অবস্থায় তারা যয়নাবকে আবু সুফইয়ানের নিকট নিয়ে যায়। আবু সুফইয়ান তাকে বনী হাশিমের মেয়েদের কাছে সোপর্দ করে। পরে তিনি মদীনায় হিজরাত করেন, উটের পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ায় যয়নাব যে ব্যাথা পান, আমরণ তিনি সে ব্যথা অনুভব করতেন এবং সেই ব্যথায় শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। এ জন্য লোকে তাঁকে শহীদ মনে করতো। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭১)।
হযরত আয়িশা (রা) হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহর সা: কন্যা যয়নাব কিনানার সাথে মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হলো। মক্কাবাসীরা তাদের পিছু ধাওয়া করলো। হাব্বার ইবনুল আসওয়াদ সর্বপ্রথম যয়নাবকে ধরে ফেললো। সে যয়নাবের উটটি তীরবিদ্ধ করলে যয়নাব পড়ে গিয়ে আঘাত পেল। সে ছিল সন্তান সম্ভবা। এই আঘাতে তার গর্ভের সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। অত:পর বনু হাশিম ও বনু উমাইয়া যয়নাবকে নিয়ে বিবাদ শুরু করে দিল। অবশেষে সে হিন্দা বিনতু উতবার নিকট অবস্থান করতে লাগলো। হিন্দা প্রায়ই তাকে বলতো, ‘তোমার এ বিপদ তোমার পিতার জন্যই হয়েছে।’
একদিন রাসুলুল্লাহ সা: যায়িদ ইবন হারিসাকে বললেন, ‘তুমি কি যয়নাবকে আনতে পারবে? যায়িদ রাজী হলো। হযরত রাসূলে কারীম সা: যায়িদকে একটি আংটি দিয়ে বললেন, “এটা নিয়ে যাও। এটা যয়নাবের কাছে পৌঁছাবে।” আংটি নিয়ে যায়িদ মক্কার দিকে চললো। মক্কার উপকন্ঠে সে এক রাখালকে ছাগল চড়াতে দেখলো। সে রাখালকে জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কার রাখাল?’ রাখাল বললো, ‘আবুল আসের।’আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘ছাগলগুলি কার?’ বললো, ‘যয়নাব বিনতু মুহাম্মাদের।’ যায়িদ কিছুদূর রাখালের সাথে চললো। তারপর তাকে বললো, আমি যদি একটি জিনিস তোমাকে দেই, তা কি তুমি যয়নাবের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে? সে রাজী হলো। যায়িদ তাকে আংটিটি দিল, আর রাখাল সেটি যয়নাবের হাতে পৌঁছে দিল।
যয়নাব রাখালকে জিজ্ঞাস করলো, ‘এটি তোমাকে কে দিয়েছে?’ বললো, ‘একটি লোক।’ আবার জিজ্ঞেস করলো, ‘তাকে কোথায় ছেড়ে এসেছো?’ বললো, ‘অমুক স্থানে।’ যয়নাব চুপ থাকলো। রাতের আঁধারে যয়নাব চুপে চুপে সেখানে গেল। যায়িদ তাকে বললো, ‘তুমি আমার উটের পিঠে উঠে আমার সামনে বস।’ যয়নাব অস্বীকৃতি জানিয়ে বললো, না আপনিই আমার সামনে বসুন।’ এভাবে যয়নাব যায়িদের পেছনে বসে মদীনায় পৌঁছলো। হযরত রাসূলে কারীম সা: প্রায়ই বলতেন, ‘আমার সর্বোত্তম মেয়েটি আমার জন্যই কষ্ট ভোগ করেছে।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭১-৭২)।
স্ত্রী যয়নাব থেকে বিচ্ছেদের পর আবুল আস কয়েক বছর মক্কায় কাটালেন। রাসুলুল্লাহ সা: মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন আগে একটা বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে তিনি সিরিয়া গেলেন। বাণিজ্য শেষে তিনি মক্কায় ফিরছেন। একশো উট ও প্রায় এক শো সত্তর জন লোকের কাফিলা। যখন তারা মদীনার কাছাকাছি স্থানে তখন মদীনা থেকে যায়িদ বিন হারিসার নেতৃত্বে প্রেরিত একটি ক্ষুদ্র টহলদানকারী বাহিনী তাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায় এবং উটসহ সকল লোক বন্দী করে মদীনায় নিয়ে যায়। তবে আবুল আস পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
অবশ্য মূসা ইবন উকবার মতে, আবু বাসীর ও তার বাহিনী আবুল আসের কাফিলার ওপর আক্রমণ চালায়। উল্লেখ্য যে, এই আবু বাসীর ও আরো কিছু লোক হুদাইবিয়ার সন্ধির পর ইসলাম গ্রহণ করে। তবে সন্দির শর্তানুযায়ী মদীনাবাসীরা তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ফলে তারা মক্কা থেকে পালিয়ে গিয়ে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করতে থাকে। তারা মক্কার বাণিজ্য কাফিলায় অতর্কিত হামলা চালাতে থাকে। তাদের ভয়ে কুরাইশদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। মক্কার কুরাইশরা বাধ্য হয় তাদেরকে মদীনায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সা: কে অনুরোধ করে। (আল ইসাবা-৪/১২২)।
যাই হোক, আবুল আস পালিয়ে মক্কায় না গিয়ে ভীত সন্ত্রস্তভাবে রাতের অন্ধকারে গোপনে মদীনায় প্রবেশ করেন এবং সোজা যয়নাবের কাছে পৌঁছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। যয়নাব তাকে নিরাপত্তার আশ্বাস দেন।
রাত কেটে গেল। হযরত রাসূলে কারীম সা: ফজরের নামাযের জন্য মসজিদে গেলে। তিনি মিহরাবে দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে তাকবীরে তাহরীমা বেঁধেছেন। পেছনের মুক্তাদীরাও তাকবীরে তাহরীমা শেষ করেছে। এমন সময় পেছনে মেয়েদের কাতার থেকে যয়নাবের কন্ঠস্বর ভেসে এল, ‘জনমণ্ডলী, আমি মুহাম্মাদের কন্যা যয়নাব। আমি আবুল আসকে নিরাপত্তা দিয়েছি, আপনারাও তাকে নিরাপত্তা দিন।’
সালাম ফিরিয়ে রাসুলুল্লাহ সা: লোকদের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি যা শুনেছি, তোমরাও কি তা শুনেছো?’
লোকেরা জবাব দিল, ‘হাঁ, ইয়া রাসুলুল্লাহ!’ রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘যার হাতে আমার জীবন, সেই সত্তার শপথ, আমি এ ঘটনার কিছুই জানিনে। সে সকল মুসলমানের পক্ষ থেকে তাকে নিরাপত্তা দান করেছে।’ অত:পর তিনি বাড়ীতে যেয়ে মেয়েকে বললেন, ‘আবুল আসের সম্মানজনক ব্যবস্থা করবে। তবে জেনে রেখ তুমি আর তার জন্য হালাল নও।’ তারপর রাসুলুল্লাহ সা: সেই বাহিনীর লোকদের ডাকলেন, যারা আবুল আসের কাফিলার উট ও লোকদের বন্দী করে নিয়ে এসেছিল। তিনি তাদের বললেন, ‘আমাদের মধ্যে এই লোকটির (আবুল আস) মর্যাদা সম্পর্কে তোমরা জ্ঞাত আছ। তোমরা তার বাণিজ্য সম্ভার কেড়ে নিয়ে এসেছো। তোমরা তার প্রতি সদয় তার মালামাল ফেরত আমি খুশি হব। আমরা তোমরা রাজী না হলে আমার কোন আপত্তি নেই। আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে তোমরা সেই মাল ভোগ করতে পার। তোমরাই সেই মালের অধিক হকদার।’ তারা সকলে বললো, ‘শোন আবুল আস, কুরাইশদের মধ্যে তুমি একজন মর্যাদাবান ব্যক্তি রাসুলুল্লাহর চাচাত ভাই এবং তার জামাই। তুমি এক কাজ কর। ইসলাম গ্রহণ করে মক্কাবাসীদের এই মালামালসহ মদীনায় থেকে যাও। বেশ আরামে থাকবে।’ আবুল আস বললেন, তোমরা যা বলছো তা খুবই খারাপ কথা। আমি কি আমার নতুন দ্বীনের জীবন শুরু করবো শঠতার মাধ্যমে?
আবুল আস তার কাফিলা ছাড়িয়ে নিয়ে মক্কায় পৌঁছলেন। মক্কায় যার যার মাল তাকে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘ওহে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা! আমার কাছে তোমাদের আর কোন কিছু পাওনা আছে কি? তারা বললো, ‘না, আল্লাহ তোমাকে উত্তম পুরষ্কার দান করুন। আমরা তোমাকে চমৎকার প্রতিশ্রুতি পালনকারী রূপে পেয়েছি।
আবুল আস আরো বললেন, ‘আমি তোমাদের হক পরিপূর্ণরূপে আদায় করেছি। এখন আমি ঘোষণা করছি- আশহাদু আন লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসুলুল্লাহ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং নিশ্চয় মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’
মদীনায় অবস্থানকালে আমি এ ঘোষণা দিতে পারতাম। কিন্তু তা দেইনি এ জন্য যে, তোমরা ধারণা করতে আমি তোমাদের মাল ফেরত আত্মসাত করার উদ্দেশ্যেই এমনটি করেছি। আল্লাহ যখন তোমাদের যার যার মাল ফেরত দেওয়ার তাওফীক আমাকে দিয়েছেন এবং আমি আমার দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছি, তখনই আমি ইসলামের ঘোষণা দিচ্ছি।
অত:পর হযরত আবুল আস মক্কা থেকে বের হয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহর খিদমতে হাজির হন। হযরত রাসূলে কারীম সা: সম্মানের সাথে তাকে গ্রহণ করেন এবং তার স্ত্রী যয়নাবকেও তার হাতে সোপর্দ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার সম্পর্কে প্রায়ই বলতেন, ‘সে আমাকে যা বলেছে, সত্য বলেছে। আমার ওয়াদা করেছে এবং তা পালনও করেছে।’
হযরত আবুল আস (রা) ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহর সা: সাথে কোন যুদ্ধে যোগদানের সুযোগ পাননি। হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে হিজরী ১২ সনের জিলহজ্জ মাসে তিনি ইনতিকাল করেন। তবে ইবন মুন্দাহর মতে, তিনি ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। (আল ইসাবা-৪/১২৩, আল ইসতিয়াব)।
হযরত যয়নাব ও আবুল আসের মেয়ে উমামাকে রাসুলুল্লাহ সা: খুবই স্নেহ করতেন। নামাযের মধ্যে তাকে কাঁধে উঠিয়ে নিতেন বলে বর্ণিত আছে।
শুরাহবীল ইবন হাসান (রা)

নাম শুরাহবীল, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু আবদিল্লাহ বা আবু আবদির রহমান। পিতা আবদুল্লাহ ইবনুল মুতা’, মাতা হাসানা। তবে আবু আমরের মতে হাসানা তার মেয়ের নাম। যাই হোক,শুরাহবীলের পিতা মারা যাওয়ার পর তার মা হাসানা দ্বিতীয়বার সুফইয়ান আনসারীকে বিয়ে করেন। এ কারণে তিনি পিতার পরিবর্তে মাতার নামে পরিচিত হন। এই হাসানার বংশ সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন কিন্দা গোত্রের, কেউ বলেছেন তামীম গোত্রের, আবার অনেকের মতে বনী জুমাহ গোত্রের। তিনি মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরিবারের অন্যদের সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। অত:পর সেখান থেকে মদীনায় চলে যান। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৬৪, ৩৬৯)।
শুরাহবীল ইসলামের সূচনা পর্বেই মুসলমান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন এবং মক্কা থেকে হাবশাগামী প্রথম কাফিলার সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। তারপর হাবশা থেকে সরাসরি মদীনায় আসেন এবং মায়ের দিক দিয়ে সম্পর্কিত বনী খুরাইক গোত্রে বসবাস করতে থাকেন। মদীনায় আসার পর থেকে রাসুলুল্লাহ সা: ওফাত পর্যন্ত তার জীবনের উল্লেখ যোগ্য কোন তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। সম্ভবত: রাসুলুল্লাহ সা: ওফাতের অল্প কিছুদিন আগে তিনি মদীনায় আসেন। ইসলামের খিদমতে তাঁর উল্লেখযোগ্য কর্মজীবন শুরু হয় খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফত কালে।
হিজরী ১২ সনে খলীফা আবু বকর (রা) মুসলিম বাহিনীর শ্রেষ্ঠ চার সৈনিককে কমান্ডার হিসেবে নির্বাচন করেন। তাঁরা হলেন: ১. আমর ইবনুল আস, ২. ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান, ৩. আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ এবং ৪. শুরাহবীল ইবন হাসানা। প্রত্যেকের জন্য সৈনিক বাছাই করলেন এবং কে কোন পথে অগ্রসর হবেন তাও বলে দিলেন। বিজয়ের পর কে কোথাকার ওয়ালী হবেন সেটাও নির্ধারণ করে দিলেন। যথা: আমর ফিলিস্তীনের, ইয়াযীদ দিমাশকের এবং শুরাহবীল জর্দানের। (তারীখুল উম্মাহ আল ইসলামিয়্যাহ-১/১৯০-৯১)। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় পাঁচ জন সেনা কমাণ্ডারের নাম এসেছে। উপরে উল্লিখিত চারজনের মধ্যে তিন জন এবং আবু উবাইদার স্থলে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও ইয়াজ ইবন গানম আল ফিহর এর নাম বর্ণিত হয়েছে। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৮৪, ১/২১৩) ইবনুল বারকী বলেন, খলীফা উমার (রা) শুরাহবীলকে শামের এক চতুর্থাংশের শাসক নিযুক্ত করেন। (আল ইসাবা২/১৪৩)।
সিরিয়া অভিযানে বসরার যুদ্ধে শুরাহবীল ছিলেন একজন কমাণ্ডিং অফিসার। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে তাঁর প্রতিপক্ষের নেতা ‘রোমানাস’ এর মধ্যে মত বিনিময় হয়। কিন্তু তাতে কোন ফল না হওয়ায় তিনি সৈন্য সুসংগঠিত করে সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছেন এমন সময় হযরত খালিদ এসে উপস্থিত হলেন। খালিদ প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁরই নেতৃত্বে প্রতিপক্ষ জিযিয়া দানে সম্মত হয়। (ফুতুহুল বুলদান-১১৯)।
বসরার পর রোমানরা আজনা দাইনে সমবেত হয়। খালিদ তাদের প্রতিহত করার জন্য অগ্রসর হন। কিছুদূর যাওয়ার পর শুরাহবীলও তাঁর সাথে যোগ দেন। উভয়ে সম্মিলিতভাবে রোমান বাহিনীর মুখোমুখি হন এবং এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। দিমাশক অভিযানে তিনি পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার এবং অবরোধের সময় একটি ফটক প্রহরার দায়িত্বে ছিলেন। বিজয়ের সমাপ্তি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
দিমাশক বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী ‘ফাহল’ এর পথে ‘বীসান’ এর দিকে অগ্রসর হয়। প্লাবনের কারণে পথিমধ্যে ‘ফাহল’ এ তাদের যাত্রাবিরতি করতে হয়। এ বাহিনীর সাথেও শুরাহবীল ছিলেন। তারই সতর্কতায় মুসলিম বাহিনী এক মারাত্মক বিপদ থেকে রক্ষা পায়। মূলত: রোমানরা সমুদ্রের একটি বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে ‘ফাহল’ ও ‘বীসান’ এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্লাবনের সৃষ্টি করে। মুসলিম বাহিনী যাত্রা বিরতি করে ফাহল এ শিবির স্থাপন করে। এই নাজুক পরিস্থিতিতে শুরাহবীল সারা রাত জেগে শিবির পাহারা দিতেন যাতে রোমানরা অতর্কিত আক্রমণ করতে না পারে। সত্যিই সত্যিই রোমানরা একদিন হঠাৎ পেছন দিক থেকে আক্রমণ করে বসে কিন্তু শুরাহবীলের দূরদর্শিতা ও সতর্কতার ফলে রোমানরা পরাজিত হয়।
ফাহল এর পর শুরাহবীল ও ‘আমর ইবনুল ‘আস বীসান’ এর দিকে অগ্রসর হন। বীসান এর অধিবাসীরা ফাহল এর পরিণাম প্রত্যক্ষ করেছিল তারা সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ না হয়ে কিল্লার দরজা বন্ধ করে দেয়। শুরাহবীল বীসান পৌঁছেই কিল্লা অবরোধ করেন। দীর্ঘদিন এ অবরোধ চলতে থাকে। একদিন কতিপয় লোক কিল্লা থেকে বের হয়ে আক্রমণ চালানোর চেষ্ঠা করলে তাদের হত্যা করা হয়। অবশেষে তারা দিমাশকের শর্তাবলীতে সন্ধি করে। এরপর ‘তিবরিয়া’ এর অধিবাসীরা শুরাহবীলের নিকট প্রতিনিধি পাঠিয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। অত:পর হযরত শুরাহবীল জর্দান এলাকা ও এর আশেপাশের সকল শহর প্রায় বিনা বাধায় ও বিনা রক্তপাতে ইসলামী শাসনের অধীনে আনেন।
ইয়ারমুক অভিযানে মুসলিম বাহিনী সিরিয়ার সকল অঞ্চল থেকে গুটিয়ে ইয়ারমুকে সমবেত হয়। হযরত শুরাহবীলও আসেন। তিনি ও ইয়াযীদ ইবন আবু সুফইয়ান একই স্থানে অবস্থান গ্রহণ করেন। খালিদ ছিলেন এ অভিযানের সিপাহসালার বা প্রধান সেনাপতি। তিনি গোটা সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে ছত্রিশটি ভাবে বিভক্ত করেন এবং প্রতিটি ভাগকে একজন অফিসারের অধীনে ন্যস্ত করেন। ডান ও বাম ভাগের দায়িত্ব অর্পিত হয় হযরত আমর ইবনুল আস ও শুরাহবীল ইবন হাসানার ওপর। এ যুদ্ধে রোমানদের প্রথম আঘাতেই মুসলিম বাহিনীর অবস্থা যখন টলটলায়মান এবং অনেকে ময়দান থেকে ভেগে যায় তখনও শুরাহবীল অটল। এ যুদ্ধে তিনি জীবনবাজী রেখে লড়েন।
হিজরী ১৮ সনে মুসলিম বাহিনী সিরিয়া অভিযানে লিপ্ত। এ সময় ইরাক, সিরিয়া ও মিসরে মহামারি আকারে প্লেগ দেখা দেয়। আমর ইবনুল আস বললেন, এই প্লেগ হচ্ছে আল্লাহর আযাব। সুতরাং তোমরা বিভিন্ন উপত্যাকা ও গিরিপথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়। এ কথা শুনে শুরাহবীল ভীষণ রেগে গেলেন। তিনি বললেন, আমর ঠিক কথা বলেনি। আমি যখন রাসুলুল্লাহর সংগী তখনও আমর তার পরিবারের উটের চেয়েও পথভ্রষ্ট। নিশ্চয় এ প্লেগ তোমাদের নবীদের দুআ রবের রহমত এবং তোমাদের পূর্ববর্তী বহু সত্যনিষ্ট লোক এতে মৃত্যুবরণ করেছেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৫৮১)। তিনি ছিলেন একান্তভাবে আল্লাহ নির্ভর ব্যক্তি। তাই রোগের ভয়ে স্থান ত্যাগ করা সমীচীন মনে করেননি। তিনি স্থান ত্যাগ করলেন না। বর্ণিত আছে হযরত মু’য়াজ ইবন জাবাল, আবু উবাইদাহ, শুরাহবীল ইবন হাসানা ও আবু মালিক আল আশয়ারী (রা) একই দিন প্লেগে আক্রান্ত হন। (হায়াতুস সাহাবা-২৫৮২)। আমওয়াসের এই প্লেগে অনেকের সাথে হযরত শুরাহবীল ইবন হাসানা ৬৭ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। অবশ্য ইবন ইউনুস বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: শুরাহবীলকে মিসর পাঠান এবং সেখানেই তিনি মারা যান। (আল ইসাবা-২/১৪৩)।
ইবন ইউনুসের মতটি বিভিন্ন কারণে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে হয়।
হযরত শুরাহবীলের সারাটি জীবন হাবশা প্রবাসে এবং পরবর্তীতে জিহাদের ময়দানে অতিবাহিত হলেও রাসুলুল্লাহর সা: হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কোন অংশে পিছিয়ে নন। তিনি বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন।
শিফা বিনতু আবদিল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহর সা: কাছে গেলাম কিছু সাদকা চাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তিনি সাদকা দানে অক্ষমতা প্রকাশ করলেন, আর আমিও চাপাচাপি করতে লাগলাম। ইতিমধ্যে নামাযের সময় এলো। আমি রাসুলুল্লাহর সা: নিকট থেকে বের হয়ে আমার মেয়ের ঘরে গেলাম। শুরাহবীল ইবন হাসানার স্ত্রী আমার মেয়ে। আমি শুরাহবীলকে ঘরেই পেলাম। আমি তাকে বললাম, নামাযের সময় হয়েছে, আর তুমি ঘরে বসে আছ? আমি তিরষ্কার করতে লাগলাম। তখন সে বললো, আমাকে তিরষ্কার করবেন না। আমার একখানা মাত্র কাপড়, সেটাও রাসুলুল্লাহ সা: ধার নিয়েছেন। আমি বললাম, আমার মা বাবা কোরবান হোক! আজ সারাদিন আমি রাসুলুল্লাহর সা: সংগে ঝগড়া করছি, অথচ তাঁর এ করুণ অবস্থা আমি মোটেও বুঝতে পারিনি। শুরাহবীল বলেন, ‘রাসুলুল্লাহর সা: একখানা মাত্র কাপড়, আমরা তাতে তালি লাগিয়ে দিয়েছি।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৩২৬)।
যায়িদ ইবনুল খাত্তাব (রা)

নাম যায়িদ, ডাক নাম আবু আবদির রহমান। পিতা খাত্তাব ইবন নুফাইল, মাতা আসমা বিনতু ওয়াহাব। হযরত উমার ইবনুল খাত্তাবের বৈমাত্রীয় ভাই এবং বয়সে হযরত উমার থেকে বড়। (উসুদুল গাবা-২/২২৮)।
ইসলামের সূচনা পর্বে উমারের বাড়াবাড়ির কারণে যদিও খাত্তাবের বাড়ী সন্ত্রস্ত ছিল, তথাপি যায়িদ উমারের পূর্বেই ইসলাম কবুল করেন এবং মুহাজিরদের প্রথম কাফিলার সাথে মদীনায় হিজরাতও করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: মদীনায় আসার পর মা’ন ইবন ’আদী আল ’আজলানীর সাথে তার মুওয়াখাত বা ভাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।
মদীনায় আসার পর সর্বপ্রথম ‘বদর’ যুদ্ধে শরীক হন। তারপর উহুদেও অংশ গ্রহণ করেন। দারুন সাহসী ছিলেন। প্রত্যেক যুদ্ধে তিনি যতটা না বিজয় কামনা করতেন তার চেয়ে বেশি কামনা করতেন শাহাদাত। উহুদে তিনি অসীম সাহসের সাথে লড়ছেন। এমন সময় তার ভাই উমার লক্ষ্য করলেন যায়িদের বর্মটি খুলে পড়ে গেছে এবং সে দিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি নাঙ্গা শরীরে শত্রু বাহিনীর মাঝখানে ঢুকে পড়ছেন। উমার ভাইকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি চিতকার করে ভাইকে ডেকে বললেন, ‘খুজ দিরয়ী’ ইয়া যায়িদ, ফা কাতিল বিহা’- যায়িদ, এই নাও আমার বর্মটি। এটি পরে যুদ্ধ কর।’
যায়িদ উত্তর দিলেন, ‘ইন্নী উরীদু মিনাশ শাহাদাতি মা তুরীদুহু ইয়া উমার’-ওহে উমার, তোমার মত আমারও তো শাহাদাতের সুমধুর পানীয় পান করার আকাংখা আছে।’ তারপর দুজনেই বর্ম ছাড়াই যুদ্ধ করেন। (তাবাকাত ইবন সা’দ-৩/২৭৫. হায়াতুস সাহাব-১/৫১৫, রিজালুন হাওলার রাসূল-৩৪৪)।
তিনি হুদাইবিয়ার ঘটনায় উপস্থিত ছিলেন এবং হযরত রাসূলে কারীমের সা: হাতে বাইয়াত করেন। তাছাড়া খন্দক, হুনাইন আওতাস প্রভৃতি যুদ্ধেও তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বিদায় হজ্জেও তিনি রাসুল্লাহর সা: সফরসঙ্গী ছিলেন। এ সফরেই তিনি রাসুলুল্লাহর সা: এ বাণী শোনেন, ‘তোমরা যা নিজেরা খাও, পর, তাই তোমাদের দাস দাসীদের খাওয়াও, পরাও। যদি তারা কোন অপরাধ করে, আর তোমরা তা ক্ষমা করতে না পার, তাহলে তাকে বিক্রি করে দাও।’ (তাবাকাত-৩/২৭৪)।
হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) খিলাফতকালে ধর্মদ্রোহীদের যে ফিতনা বা অশান্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তা নির্মূলের জন্য হযরত যায়িদ অন্যদের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং অনেক মুরতাদকে তিনি স্বহস্তে হত্যা করেন। বিখ্যাত মুরতাদ নাহার ইবন উনফুহ যার ইসলাম ত্যাগ করা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সা: তার মুসলমান থাকাকালেই ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, তাকে হযরত যায়িদ নিজ হাতে খতম করেন। মুসাইলামা কাজ্জাবের সাথে ইয়ামামার যুদ্ধে ইসলামী ঝান্ডা বহনের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। যুদ্ধ চলাকালে বনু হানীফা একবার এমন মারাত্মক আক্রমণ চালায় যে, মুসলিম বাহিনী পরজায়ের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। কিছু সৈনিক তো যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যায়। এতে যায়িদের সাহস আরও বেড়ে যায়। তিনি চিৎকার করে সাথীদের আহবান জানিয়ে বলতে লাগলেন, ‘ওহে জনমন্ডলী, তোমরা দাঁত কামড়ে ধরে শত্রু নিধন কার্য চালিয়ে যাও। তোমরা সুদৃঢ় থাক। আল্লাহর কসম, আল্লাহ তাদের পরাজিত না করা অথবা আমি আল্লাহর সাথে মিলিত না হওয়া পর্যন্ত কোন কথা আমি বলবো না। আল্লাহর সাথে মিলিত হলে সেখানেই আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করে কথা বলবো।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩৪৫)। তারপর তিনি সংগী সাথীদের ভুলের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমাপ্রার্থী হয়ে বলতে থাকেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আ’তাজিরু ইলাইকা মিন মিরারে আসহাবী’- হে আল্লাহ, আমার সংগী সাথীদের ভেগে যাওয়ায় আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই।’ (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৩৪-৩৫)। এ অবস্থায় তিনি পতাকা দুলিয়ে শত্রু বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে চলে যান এবং তরবারী চালাতে চালাতে শাহাদত বরণ করেন। তাঁর শাহাদাতের পর সালেম (রা) পতাকা তুলে নেন। হযরত যায়িদের মৃত্যু সন হিজরী ১২। (আল ইসাবা -১/৫৬৫)।
হযরত যায়িদ ছিলেন হযরত উমারের (রা) অতি প্রিয়জন। তাঁর মৃত্যুতে হযরত উমার অত্যন্ত শোকাভিভূত হয়ে পড়েন। তাঁর সামনে কোন মুসীবত উপস্থিত হলেই তিনি বলতেন, যায়িদের মৃত্যুশোক আমি পেয়েছি এবং সবর করেছি।’ যায়িদের হত্যাকারীকে দেখে উমার (রা) বলেন, ‘তোমার সর্বনাশ হোক, তুমি আমার ভাইকে হত্যা করেছো। প্রভাতের পূবালী বায়ু তারই স্মৃতি নিয়ে আসে।’ (হায়াতুস সাহাবা-২/৫৯২) এত প্রিয় ভায়ের মৃত্যুশোকে তিনি কিন্তু দিশেহারা হয়ে পড়েননি। মদীনায় খলীফা আবু বকরের সা: সাথে তিনি ইয়ামামা প্রত্যাগত সৈনিকদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছিলেন। তাদের কাছে ভায়ের শাহাদাতের খবর শুনে তিনি বলে ওঠেন, ‘সাবাকানী ইলাল হুসনাইন আসলামা কাবলী ওয়া ইসতাশহাদা কাবলী’- দুটি নেক কাজে তিনি আমার থেকে অগ্রগামী রয়ে গেলেন- আমার আগেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আমার আগে শাহাদাতও বরণ করলেন।” (আল ইসাবা-১/৫৬৫)।
ঠিক এই সময় আরবের ততকালীন এক বিখ্যাত কবি মুতাম্মিম ইবন নুওয়াইরার এক ভাইও একটি যুদ্ধে খালিদ ইবনুল ওয়ালীদের হাতে নিহত হয়। কবি মুতাম্মিম তার ভাইকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি মৃত ভায়ের স্মরণে এমন এক করুণ মরসিয়া রচনা করেন যে, তা শুনে শ্রোতাদের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়তো। ঘটনাক্রমে হযরত উমারের (রা) সাথে কবির সাক্ষাত হয়। উমার (রা) তাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি তোমার ভায়ের মৃত্যুতে কতখানি শোক পেয়েছো?’ কবি বললেন, ‘কোন এক রোগে আমার একটি চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে শুরু করে আজ পর্যন্ত তা আর বন্ধ হয়নি।’ তার কথা শুনে হযরত উমার মন্তব্য করেন, ‘শোক দু:খের এটাই হচ্ছে চূড়ান্ত পর্যায়। যে চলে যায় তার জন্য কেউ এতখানি ব্যাথাতুর হয় না।’ তারপর তিনি বলেন, ‘আল্লাহ যায়িদকে ক্ষমা করুন। যদি আমি কবি হতাম তার জন্য আমি মরসিয়া রচনা করতাম।’ এ কথা শুনে কবি মুতাম্মিম বলে ওঠেন, ‘আমীরুল মু’মিনীন, যদি আপনার ভায়ের মত আমার ভাই শহীদ হতো, আমি কক্ষনো অশ্রু বিসর্জন করতাম না।’ কবির এ কথায় হযরত উমার (রা) অনেকটা সান্তনা লাভ করেন। তারপর তিনি বলেন, এর থেকে উত্তম সান্তনা বাণী আর কেউ আমাকে শুনায়নি।’ বিভিন্ন ব্যক্তি হযরত যায়িদ ইবনুল খাত্তাব থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবন সুহাইল (রা)

নাম আবদুল্লাহ, ডাক নাম বা কুনিয়াত আবু সুহাইল। পিতা সুহাইল এবং মাতা ফাখতা বিনতু আমের।
ইসলামের প্রথম পর্বে ঈমান আনেন এবং হাবশা অভিমূখী দ্বিতীয় কাফিলার সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। কিছুদিন হাবশায় অবস্থানের পর মক্কায় ফিরে এলে পিতা তাকে বন্দী করে এবং তার ওপর নির্দয় অত্যাচার চালায়। আবদুল্লাহ অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ইসলাম ত্যাগ করে পুনরায় মুশরিকী জীবনে বা পৌত্তলিকতায় ফিরে যাওয়ার ভান করেন। মাতা পিতা ও মক্কার মুশরিকরা তার বাহ্যিক আচরণ দেখে ইসলাম পরিত্যাগ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়।
এদিকে হযরত রাসূলে কারীম সা: মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে যান। মক্কা ও মদীনার মাঝে সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়। মক্কাবাসীরা আবদুল্লাহকে তাদের সহযোদ্ধা হিসেবে বদরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়বার জন্য নিয়ে যায়। কিন্তু যে হৃদয়ে একবার ঈমানের নুর প্রবেশ করে সেখানে যে কক্ষনো শিরকের অন্ধকার প্রবেশ করতে পারে না- এ কথাটি তাদের জানা ছিল না। মূলত: আবদুল্লাহ কোনদিন ইসলাম ত্যাগ করেননি। তিনি শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। বদরে মুসলিম বাহিনীতে যোগদান করেন।
এক আকস্মিক ঘটনায় আবদুল্লাহর পিতা ক্রোধে ফেটে পড়ে। সে এর প্রতিশোধকল্পে প্রচণ্ড বেগে আক্রমণ চালায়। কিন্তু তাতে কোন লাভ হলোনা। আবদুল্লাহ তখন স্বাধীন, তাঁর দ্বীনী ভাইদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পিতার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়ছেন। অবশেষ বিজয় হলো মুসলমানদের। বদরের পর সকল প্রসিদ্ধ যুদ্ধেই হযরত আবদুল্লাহ রা: রাসুলুল্লাহ’র সা: সংগে থেকে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। হুদাইবিয়ার সন্ধি ও বাইয়াতে রিদওয়ানেও তিনি শরীক ছিলেন। (আল ইসাবা-২/৩২৩)।
মক্কা বিজয়ের সময়ও হযরত আবদুল্লাহ রা: রাসুলুল্লাহর সা: সফরসঙ্গী ছিলেন। তার পিতা সুহাইল তখনও মক্কায় কাফির অবস্থায় জীবিত। হযরত আবদুল্লাহ রা: পিতার জন্য রাসুলুল্লাহ সা: এর নিকট আমান বা নিরাপত্তা চাইলেন। এ সম্পর্কে তার পিতা সুহাইল বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সা: যখন মক্কায় প্রবেশ করেন, আমি আমার ঘরে প্রবেশ করে দরযা বন্ধ করে দিলাম। তারপর আমার ছেলে আবদুল্লাহকে আমার নিরাপত্তার আবেদন জানানোর জন্য মুহাম্মাদের সা: নিকট পাঠালাম। কারণ, আমি যে নিহত হবোনা, এমন বিশ্বাস আমার ছিল না। আবদুল্লাহ রাসুলুল্লাহর সা: নিকট গিয়ে বললো, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ, আমার পিতাকে কি আমান বা নিরাপত্তা দান করছেন?’ রাসুলুল্লাহ সা: বললেন: ‘হাঁ। তাকে আল্লাহর আমানে আমান বা নিরাপত্তা দেওয়া গেল। সে আত্মপ্রকাশ করুক।’ অত:পর রাসুলুল্লাহ সা: তার আশে পাশের লোকদের বললেন, ‘সুহাইল ইবন আমরকে কেউ যেন হেয় চোখে না দেখে। আল্লাহর কসম, সে একজন সম্মানী ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি। এমন ব্যক্তি কক্ষণো ইসলামের সৌন্দর্য থেকে অজ্ঞ থাকতে পারে না। এখন তো সে দেখতে পেয়েছে, সে যার সাহায্যকারী ছিল তাতে কোন কল্যাণ নেই।’
হযরত আবদুল্লাহ রা: পিতার নিকট উপস্থিত হয়ে রাসুলুল্লাহ’র সা: নির্দেশ শুনিয়ে সুসংবাদ দিলেন। পিতা পুত্রের সৌভাগ্যে আনন্দে বিগলিত হয়ে বলে ওঠেন, ‘ আল্রাহর কসম, তুমি ছোটবেলা ও বড় হয়ে উভয় জীবনে সতকর্মশীল।’ রাসুলুল্লাহ সা: এ আশ্বাসের পর সুহাইল দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দোদুল্যমান অবস্থায় তাঁর দরবারে হাজির হন। হুনাইন যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ সা: সাথে মক্কা থেকে রওয়ানা হন। পথে মক্কার অনতিদূরে ‘জি’রানা’ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম সা: হুনাইনের গণীমত থেকে তাঁকে ১০০ (একশো) উট দান করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৭৩-১৭৪)।
খলীফা আবু বকর সিদ্দীক রা: এর খিলাফত কালে আরব উপদ্বীপে যাকাত অস্বীকারকারী ও ভন্ড নবীদের যে বিদ্রোহ দেখা দেয়, হযরত আবদুল্লাহ রা: সেই বিদ্রোহ দমনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। হিজরী ১২ সনে ইয়ামামার প্রান্তরে ভন্ড নবী মুসাইলামার সাথে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়, আবদুল্লাহ সেখানেই শাহাদত বরণ করেন। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতানুসারে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র আটত্রিশ বছর।
আবদুল্লাহর রা: পিতা সুহাইল তখনও মক্কায় জীবিত। এ ঘটনার পর খলীফা হযরত আবু বকর রা: হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসেন। তিনি আবদুল্লাহর পিতার সাথে দেখা করে তাঁকে সান্তনা দেওয়ার চেষ্ঠা করেন। আবদুল্লাহর পিতা খলীফাকে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ সা: বলেছেন, একজন শহীদ ব্যক্তি তার পরিবারের সত্তর (৭০) জনের শাফায়াত বা সুপারিশ করবে। আমার আশা আছে, সে সময় আমার ছেলে আমাকে ভুলবে না।’
আমের ইবন ফুহাইরা (রা)

নাম আমের, ডাক নাম আবু আমর। পিতা ফুহাইরা, মতান্তরে ফুহাইরা তাঁর মাতার নাম। ইবন হিশাম বলেন, ‘আমের ইবন ফুহাইরা বনী আসাদের এক অনারব নিগ্রো দাস। হযরত আবু বকর সিদ্দীক তাঁকে খরীদ করে আযাদ করে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/২৫৯)। অন্য একটি বর্ণনা মতে, আমের ছিলেন হযরত আয়িশার বৈপিত্রীয় ভাই ইযদ গোত্রের তুফাইল ইবন আবদিল্লাহর দাস। হযরত সিদ্দীকে আকবর রা: হিজরাতের পূর্বে যাদের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন ‘আমের ইবন ফুহাইরা তাদের মধ্যে সপ্তম ব্যক্তি। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩১৮)।
হযরত রাসূলে কারীম সা: মক্কায় হযরত আরকামের গৃহে আশ্রয় গ্রহণের পূর্বেই ইসলামের সেই সূচনালগ্নে ‘আমের ইবন ফুহাইরা তাওহীদের দাওয়াত কবুল করেন। একে তো অসহায় দাস, তার ওপর ইসলাম গ্রহণ, ফলে মুসীবতের পাহাড় তাঁর ওপর নেমে আসে। নির্যাতনের নানা রকম কৌশল তার ওপর প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু তিনি সকল অত্যাচারের মুখেও পাহাড়ের মত অটল থাকেন। অবশেষ হযরত সিদ্দীকে আকবরের (রা) বদন্যতায় তিনি দাসত্বের জিঞ্জির থেকে মুক্তি পান। (উসুদুল গাবা-৩/১৯১)।
হযরত রাসূলে কারীম সা: যখন আবু বকর সিদ্দিককে রা: সংগে করে মক্কা থেকে মদীনার উদ্দেশ্যে বের হয়ে ‘সাওর’ পর্বতের গুহায় আত্মগোপন করেন, তখন ‘আমের ইবন ফুহাইরা সারাদিন ‘সাওর’ পর্বতের আশেপাশের চারণক্ষেত্রে আবু বকরের রা: বকরী চরাতেন এবং যেখানে রাসুলুল্লাহ সা: ও আবু বকর দুধ খাইয়ে তাঁদের পানের ব্যবস্থা করতেন। আর এদিকে হযরত আবু বকরের পুত্র আবদুল্লাহ প্রতিদিন রাতে গোপনে সাওর পর্বতের গুহায় আসতেন রাসুলুল্লাহ সা: ও সিদ্দীকে আকবরকে মক্কার অবস্থা জানাতে। সকালে তিনি যখন বাড়ীতে ফিরতেন ‘আমের বকরীর পাল নিয়ে তার পিছে পিছে চলতেন, তার পায়ের নিশানা মুছে যায় এবং কারো মনে কোন রকম সন্দেহ না দেখা দেয়। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৮৬, বুখারী- কিতাবুল মাগাযী)।
অত:পর রাসুলুল্লাহ সা: ও আবু বকর রা: সাওর পর্বতের গুহা থেকে বেরিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করেন এং আবু বকর রা: স্বীয় বাহনের পেছনে আমেরকে উঠিয়ে নেন। এভাবে আমের মদীনায় হিজরাত করেন। মদীনা তিনি হযরত সা’দ ইবন খুসাইমার রা: অতিথি হন এবং হযরত হারিস ইবন আউসের সাথে তার মুওয়াখাত বা দ্বীনী ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। (তাবাকাতে ইবন সা’দ-৩/১৬৪)।
মক্কা থেকে মদীনায় আগত যে সকল লোকের স্বাস্থ্যের জন্য প্রথম প্রথম মদীনার আবহাওয়া উপযোগী হচ্ছিল না আমের তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন হযরত আয়িশা রা: বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: মদীনায় হিজরত করলেন, তখন মদীনা আল্লাহর যমীনের মধ্যে সর্বাধিক জ্বরের এলাকা। সেখানে রাসুলুল্লাহর সা: সঙ্গী সাথীরা ব্যাপকভাবে জ্বরে আক্রান্ত হলেন। আবু বকর রা: তাঁর দুই আযাদকৃত দাস- আমের ইবন ফুহাইরা ও বিলালের সাথে একই ঘরে থাকতেন। তারা সবাই জ্বরে পড়লেন। আমি তাদের দেখতে গেলাম। এটা পর্দার হুকুমের আগের কথা। প্রচণ্ড জ্বরে তখন তাঁদের অচেতন অবস্থা। প্রথমে আবু বকরের কুশলাদি জিজ্ঞেস করার পর আমি আমের ইবন ফুহাইরার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “আমের, কেমন অনুভব করছেন? তিনি দুলাইন কবিতা আউড়িয়ে জবাব দিলেন, ‘মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের পূর্বেই আমি তাকে পেয়েছি, নিশ্চয় কাপুরুষের মৃত্যু ওপর থেকে হঠাত আছে। প্রতিটি মানুষ তার সাধ্য অনুযায়ী বাঁচার চেষ্ঠা করে, যেমন গরু তার শিং দিয়ে চামড়া বাঁচিয়ে থাকে।’
আয়িশা রা: বলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমের নিজেই জানে না, সে কী বলছে।’ তারপর হযরত আয়িশা রা: বিলালের কুশলাদি জিজ্ঞেস করে রাসুলুল্লাহ সা: এর নিকট ফিরে যান এবং তাদের অবস্থা রাসুলুল্লাহ সা: কে অবহিত করেন। রাসুলুল্লাহ সা: তখন দুআ করেন, ‘হে আল্লাহ, মদীনাকে তুমি আমাদের নিকট মক্কার মত বা তার চেয়ে বেশি পছন্দনীয় ও প্রিয় বানিয়ে দাও, তার খাদ্য দ্রব্যে আমাদের জন্য বরকত দাও এবং তার রোগ ব্যাধি ‘মাহইয়া’ নামক স্থানে সরিয়ে নাও।’ (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৫৮৮-৮৯), সহীহুল বুখারী- বাবু হিজরাতিন নাবী ওয়া আসহাবিহী)।
রাসুলুল্লাহ সা: এর দোআ কবুল হয় এবং তাঁরা সকলে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
হযরত আমের ইবন ফুহাইরা বদর ও উহুদ যুদ্ধে শরীক ছিলেন। উহুদ যুদ্ধের পর আবু বারা আমের ইবন মালিক নামক এক ব্যক্তি মদীনায় রাসুলুল্লাহর সা: খিদমতে হাজির হয়। হযরত রাসূলে কারীম সা: তার কাছে ইসালামের দাওয়াত পেশ করেন ; কিন্তু সে না করলো কবুল এবং না প্রত্যাখ্যান করলো। সে বললো, ‘হে মুহাম্মাদ, আপনি যদি আপনার সাথীদের মধ্য থেকে কিছু লোককে নাজদবাসীদের নিকট পাঠাতেন এবং তারা যদি নাজদীদের কাছে আপনার দাওয়াত পেশ করতেন তাহলে আমার বিশ্বাস তারা আপনার দাওয়াত কবূল করতো।’ রাসূলুল্লাহ সা: বললেন, ‘আমি নাজদীদের পক্ষ থেকে তাদের ওপর আক্রমণের ভয় করছি।’ আবু বারা বললো, ‘তাদের ব্যাপারে আমি জিম্মাদার। আপনি লোক পাঠান এবং তারা আপনার দ্বীনের দাওয়াত দিক। তার কথার উপর আস্থা রেখে হযরত রাসূলে কারীম সা: চল্লিশ মতান্তরে সত্তর জন লোককে বাছাই করে একটি দল গঠন করেন। এই দলের মধ্যে হযরত আমের ইবন ফুহাইরাও ছিলেন। রাসুলুল্লাহ রাসুলুল্লাহহর সা: নির্দেশে এই দলটি উহুদ যুদ্ধ শেষ হওয়ার চতুর্থ মাসে ৪ হিজরী সনে মদীনা থেকে যাত্রা করে এবং বনী আমের ও হাররা বনী সুলাইমের মধ্যবর্তী ‘বিরে মাউনা’ নামক স্থানে তাঁবু স্থাপন করে।
অত:পর তারা হারাম ইবন মিলহানের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহর সা: একটি চিঠি আমের ইবন তুফাইলের কাছে পাঠান। চিঠিটি পাঠ না করেই আমের ইবন তুফাইল দূত হারাম ইবন মিলহানকে হত্যা করে। তারপর বনী সুলাইম, রি’ল ও যাকওয়ানের সহায়তায় দলটির ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে একমাত্র কা’ব ইবন যায়িদ মতান্তরে আমর ইবন উমাইয়া দামারী রা: ছাড়া সকলকে হত্যা করে। হযরত কাব মারাত্মক আহত অবস্থায় কোন রকমে বেঁচে যান। পরে তিনি খন্দক যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৮৩-৮৬)
গাদ্দার জাব্বার ইবন সালমার বর্শা যখন হযরত আমের ইবন ফুহাইরার রা: বক্ষ বিদীর্ণ করে গেল, তখন অবলীলাক্রমে তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল- ‘ফুযতু ওয়াল্লাহ- আল্লাহর কসম, আমি সফলকাম হয়েছি।’ লাশ লাফিয়ে আসমানের দিকে উঠে গেল। ফিরিশতারা তার দাফন কাফন করে। তার পবিত্র রুহের জন্য আলা ইল্লীয়্যীনের দরযা উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। এই অলৌকিক দৃশ্য অবলোকনে ঘাতক জাব্বার ইবন সালমা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে এবং এত প্রভাবিত হয় যে, সে ইসলাম গ্রহণ করে। বিরে মাউনার এই হৃদয় বিদারক ঘটনার পর হযরত রাসূলে কারীম সা: একাধারে চল্লিশ দিন ফজরের নামাযে ‘কুনুতে নাযিলা’ পাঠ করে এবং এই ঘাতকদের জন্য বদ দুআ করেন। এই ঘটনার পর আমের ইবন তুফাইল মদীনায় আসে এবং রাসুলুল্লাহকে সা: জিজ্ঞেস করে, হে মুহাম্মাদ, ঐ ব্যক্তি কে যাকে তীরবিদ্ধ করার পরই আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়? রাসুলুল্লাহ সা: বললেন, সে আমের ইবন ফুহাইরা। (টীকা সীরাতু ইবন হিশাম-১/১৮৬, তাবাকাত ইবন সা’দ- মাগাযী)।
হযরত আমের ইবন ফুহাইরার দেহের বাহ্যিক রং ছিল হাবশী নিগ্রোদের মত কালো এবং তাঁর (চৌত্রিশ) বছর জীবনের বেশির ভাগ অত্যাচারী মনিবদের দাসত্ব ও গোলামীতে অতিবাহিত হয়েছে। তবে চারিত্রিক সৌন্দর্যে তিনি ছিলেন মহীয়ান। তিনি বিভিন্ন বিপদ মুসীবতে যে ধৈর্য্য ও দৃঢ়তা দেখিয়েছেন তাতেই তার চারিত্রিক মাধুর্য অতি চমতকার রূপে দীপ্তিমান হয়ে উঠেছে। তিনি এমন বিশ্বাসী ছিলেন যে, রাসুলুল্লাহ সা: বহু সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে তার ওপর আস্থা রেখেছেন। শাহাদাতের তীব্র আকাঙ্খা তাকে দুনিয়ার প্রতি উদাসীন করে তুলেছিল। তাই বিরে মাউনার সংঘর্ষে যখন তার বুকে বর্শা বিধিয়ে দেওয়া হলো, অবলীলায় তার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল ফুযতু ওয়াল্লাহ-আল্লাহর কসম, আমি সফলকাম হয়েছি।
‘উতবা ইবন গাযওয়ান (রা)

নাম উতবা, ডাক নাম আবু আবদিল্লাহ। পিতা গাযওয়ান ইবন জাবির। জাহিলী যুগে তার গোত্র বনী নাওফাল ইবন আবদে মান্নাফের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল। ইসলামের সূচনালগ্নে তাওহীদের আহবানে সাড়া দানকারীদের মধ্যে উতবা অন্য ব্যক্তি। একবার এক ভাষণে তিনি দাবী করেন, তিনি সপ্তম মুসলমান। (উসুদুল গাবা-৩)
মক্কায় কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে হাবশার দ্বিতীয় হিজরাতে শরিক হন। তখন তার বয়স ৪০ বছর। কিছুদিন হাবশায় থাকার পর আবার মক্কায় ফিরে এসে বসবাস করতে থাকেন। হযরত রাসূলে করীম সা: তখনও মক্কায়। (আল ইসতিসাব, উসুদুল গাবা-৩/৩৬৪)।
রাসুলুল্লাহ সা: যখন মদীনায় হিজরাত করেন এবং কুফর ও ইসলামের মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হলো, তিনি এবং মিকদাদ একটি কুরাইশ বাহিনীর সাথে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। ইকরামা ইবন আবী জাহল ছিল এই বাহিনীর নেতা। পথে মদীনার মুসলিম মুজাহিদদের একটি ক্ষুদ্র দলের সাথে এই বাহিনীর ছোট-খাট একটি সংঘর্ষ হয়। এই মুজাহিদ দলটির নেতা ছিলেন হযরত উবাইদা ইবনুল হারিস। উতবা এবং মিকদাদ সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। তারা সুযোগমত মুজাহিদ দলটির সাথে যোগ দেন। মদীনায় পৌঁছে উতবা হযরত আবদুল্লাহ ইবন সালামা আজলানীর অথিতি হন এবং হযরত আবু দুজানা আনসারীর সাথে তার ভাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। (তাবাকাতে ইবন সা’দ-৩/৬৯)।
হযরত উতবা ইবন গাযওয়ান ছিলেন একজন দক্ষ তীরন্দায। বদর, উহুদ, খন্দক ছাড়াও যে সকল যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সা: প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন তার সবগুলোতো তিনি অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন। আবদুল্রাহ ইবন জাহাশের নেতৃত্বে রাসুলুল্লাহ সা: যে অনুসন্ধানী দলটি নাখলার দিকে পাঠান, তিনি সে দলেরও সদস্য ছিলেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩৫০)।
হিজরী ১৪ সনে দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমার রা: ইরাকের সামুদ্রিক বন্দর উবুল্লা, মায়সান ও তার আশ পাশের এলাকায় অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করে একটি বাহিনীসহ মদীনা থেকে পাঠান। ঘটনাটি বিভিন্ন গ্রন্থে এভাবে বর্ণিত হয়েছে: “আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রা: ইশার নামাযের পর একটু বিশ্রামের জন্য বিছানায় গেলেন, যাতে একটু পরে রাতে নগর ভ্রমণে বের হতে পারেন। কিন্তু তাঁর দুচোখে ঘুম নেই। দূত খবর নিয়ে এসেছে, পরাজিত পারস্য বাহিনী পাল্টা আক্রমণের জন্য বিক্ষিপ্ত অবস্থা থেকে সুসংগঠিত হয়েছে। খলীফাকে আরো জানানো হয়েছে, বসরার নিকটবর্তী ‘উবুল্লা’ নগরী পরাজিত পারস্য বাহিনীর অর্থ ও লোক সরবরাহের প্রধান উতস। খলীফা পারস্য বাহিনীর এই উতস বন্ধ করার জন্য ‘উবুল্লায়’ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু অপর্যাপ্ত সামরিক শক্তি তার এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাড়ালো। কারণ, মদীনায় তখন অল্প কিছু লোক ছাড়া প্রায় সকলে বিভিন্ন ফ্রন্টে অভিযানে লিপ্ত। খলীফা উমার রা: তখন তাঁর চিরাচরিত পদ্ধতি কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। আর তা হলো, সৈন্যের স্বল্পতা শক্তিশালী ও যোগ্য নেতৃত্বের দূরীকরণ। তিনি সেনা কমান্ডারদের সম্পর্কে ভাবলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আপন মনে বলে উঠলেন: পেয়েছি। হাঁ আমি পেয়েছি। তারপর এ কথা বলতে বলতে তিনি বিছানায় গেলেন, তিনি সেই মুজাহিদ যাকে বদর, উহুদ ও খন্দকের মত যুদ্ধ সমূহ চিনেছে। ইয়ামামাও তার যোগ্যতা ও ভূমিকার সাক্ষী। কোন যুদ্ধেই তার তরবারী ভোতা হয়নি, তার একটি তীরও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি। তদুপরি তিনি দুইটি হিজরাতের অধিকারী, ধরাপৃষ্টে তিনি সপ্তম মুসলমান।
সকাল বেলা তিনি বললেন: তোমরা কেউ উতবা ইবন গাযওয়ানকে ডেকে দাও। খলীফা তাঁকে তিনশোর কিছু বেশি সদস্য বিশিষ্ট একটি বাহিনীর নেতৃত্ব দান করেন এবং পশ্চাতগামী আরো কিছু সৈন্য দিয়ে সাহায্য করার অঙ্গীকারও করেন।
মদীনা থেকে উতবা তার বাহিনীসহ রওয়ানা হওয়ার প্রাক্কালে খলীফা উমার বাহিনী প্রধান উতবাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন:
“আল্রাহর রহমত ও বরকতের ওপর নির্ভর করে আরবের শেষ সীমা ও অনারব সাম্রাজ্যের নিকটবর্তী অংশের দিকে আপনার সঙ্গীদের নিয়ে আপনি রওয়ানা হয়ে যান। যতদূর সম্ভব তাকওয়া অবলম্বন করবেন এবং স্মরণ রাখবেন, আপনারা শত্রু ভূমিতে যাচ্ছেন। আমি আশা করি আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন। আমি আলা ইবনুল হাদরামীকে লিখেছি, আরফাজা ইবন হারসামাকে পাঠিয়ে আপনাকে সাহায্য করার জন্য। শত্রুর মোকাবেলায় তিনি এক করিৎকর্মা মুজাহিদ। তিনি আপনার উপদেষ্ঠা হিসেবে থাকবেন। অনারবদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানাবেন। যারা সে আহবান মেনে নেবে, তাদেরকে নিরাপত্তা দেবেন। আর যারা তা অস্বীকার করবে, জিযিয়া দিয়ে শাসিত জীবন যাপনে বাধ্য করবেন। অন্যথায় তলোয়ারের সাহায্যে ফায়সালা করবেন। চলার পথে যে সকল আরব গোত্রের পাশ দিয়ে যাবেন তাদেরকে শত্রুর সাথে যুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করবেন এবং সর্ব অবস্থায় আল্লাহকে ভয় করবেন। (উসুদুল গাবা-৩/৩৬৪)।
উতবা ইবন গাযওয়ান তার বাহিনী নিয়ে রওয়ানা দিলেন। সেই বাহিনীর সাথে তার স্ত্রী সহ অন্য সৈনিকদের আরো পনেরো জন মহিলাও চললেন। তারা ‘উবুল্লা’ শহরের অদূরে ‘কাসবা’ নামক এক প্রকার জলজ উদ্ভিদ বিশিষ্ট ভূমিতে পৌঁছলেন। তাদের কাছে তখন খেয়ে বেঁচে থাকার মত কোন কিছু নেই। যখন তারা মারাত্মক ক্ষুধার সম্মুখীন হলেন, উতবা তাঁর বাহিনীর কতিপয় সদস্যকে খাওয়ার কোন কিছু তালাশ করার নির্দেশ দিলেন। তাঁদের এই খাদ্য তালাশের সাথে একটি চমকপ্রদ কাহিনী জড়িত আছে। তাদেরই একজন বর্ণনা করছেন:
“আমরা খাদ্যের সন্ধানে ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। সেখানে দুটো বস্তা পড়ে থাকতে দেখলাম। তার একটিতে খেজুর ভর্তি এবং অন্যটিতে এক প্রকার সাদা শস্যদানা যার উপরিভাগ সোনালী আবরণে আবৃত। আমরা বস্তা দুটো টেনে আমাদের সেনা ছাউনীর কাছাকাছি নিয়ে এলাম। আমাদের একজন শস্যদানা ভরা বস্তাটির দিকে তাকিয়ে বললো, “এটা বিষ, শত্রুরা রেখে দিয়েছে। কেউ এর ধারে কাছে যাবে না।” আমরা খেজুর খেতে লাগলাম। এর মধ্যে আমাদের ঘোড়া ছুটে গিয়ে শস্যদানার বস্তায় মুখ দিয়ে খেতে শুরু করলো। আমরা তো প্রায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম, ঘোড়াটি মারা যাবার পূর্বেই জবেহ করে দেওয়ার, যাতে তার গোশত আমরা খেতে পারি।
অত:পর ঘোড়ার মালিক আমাদের বললো: একটু অপেক্ষা করা যাক, আজ রাত আমরা ঘোড়াটি পাহারা দেই। যদি দেখা যায়, সত্যি সত্যিই ঘোড়াটি মারা যাচ্ছে তাহলে জবেহ করা যাবে। কিন্তু সকালে দেখা গেল ঘোড়াটি সম্পূর্ণ সুস্থ। তখন আমার বোন আমাকে বললো: ভাই আমার আব্বাকে বলতে শুনেছি, বিষ আগুনে জ্বালিয়ে সিদ্ধ করা হলে তার ক্রিয়া নষ্ট হয়ে যায়। তারপর সে কিছু শস্যদানা নিয়ে হাঁড়িতে ফেলে সিদ্ধ করা শুরু করলো। কিছুক্ষণ পর সে আমাদের ডেকে বলল, দেখুন, কেমন লাল হয়ে গেছে। সে দানাগুলির খোসা ছড়িয়ে সাদা দানা বের করলো। আমরা সেগুলি একটি পাত্রে রাখলাম। উতবা বললেন: তোমরা বিসমিল্লাহ বলে খেয়ে ফেল। আমরা খেয়ে দেখলাম চমৎকার স্বাদ। পরে আমরা জেনেছিলাম এই শস্যদানার নাম “ধান”।
এই ‘উবুল্লা’ ছিল দিজলার তীরে, শত্রু বাহিনীর একটি সুদৃঢ় ঘাঁটি। উতবা মাত্র ছয়’শ যোদ্ধা ও কতিপয় মহিলাকে সাথে নিয়ে এ ঘাঁটি জয় করেন। তাদের অস্ত্র শস্ত্রও ছিল অতি মামুলী ধরণের। যথা: তীর, তরবারি, বর্শা ইত্যাদি। কিন্তু তিনি মেধা, বুদ্ধিমত্ত ও সাহসিকতার সাহায্যে এ অসাধ্য সাধন করেন।
উতবা মহিলাদের জন্য অনেকগুলি পতাকা বানিয়ে বর্শার মাথায় বেঁধে দেন। তাদেরকে নির্দেশ দেন, তারা যেন মুসলিম মুজাহিদদের পেছনে সেগুলি উঁচু করে ধরে রাখে। তিনি তাদের আরো বলেন, আমরা যখন ‘উবুল্লা’ শহরের কাছাকাছি পৌঁছে যাব তখন তোমরা খুব বেশি করে ধুলো উড়াবে, যাতে চারিদিক ধূলোয় অন্ধকার হয়ে যায়।
মুসলিম বাহিনী যখন উবুল্লার নিকটবর্তী হলো, পারস্য বাহিনী শহর থেকে বেরিয়ে এসে দিগন্তব্যাপী ধূলোর মেঘ ও অসংখ্য পতাকার ওঠানামা দেখতে পেল। তারা পরষ্পর বলাবলি করল: এতো অগ্রবর্তী বাহিনী। এদের পেছনে অসংখ্য সৈন্য রয়েছে, তারাই এ ধূলো উড়াচ্ছে। তাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার হলো, আতঙ্কে তারা অস্থির হয়ে পড়লো। তারা হাতের কাছে যা পেল তাই নিয়ে দিজলা নদীতে নোঙ্গর করা নৌকায় উঠে পালিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে গেল। উতবা তার বাহিনীর একজন সদস্যকেও না হারিয়ে উবুল্লায় প্রবেশ করেন। অত:পর দিজলা উপকূলবর্তী নগর ও গ্রামসমূহ পদানত করে ইসলামী ঝান্ডা সমুন্নত করেন।
উবুল্লায় মুসলিম বাহিনী অগণিত গণিমত লাভ করে। মুসলিম বাহিনীর এক সৈনিক মদীনায় এলে মদীনাবাসীরা তাকে প্রশ্ন করে উবুল্লায় মুসলমানরা কেমন আছে? তিনি বলেন, তোমরা কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করছো? আল্লাহর কসম, আমি যখন তাদেরকে রেখে এসেছি তখন তারা সোনা রূপা পাল্লায় করে ওজন দিচ্ছে।” এ কথা শুনে মদীনাবাসীরা উবুল্লার দিকে সওয়ারী হাঁকালো।
উবুল্লা জয়ের পর হযরত উতবা ভেবে দেখলেন, যদি তাঁর সৈন্যরা এই বিজাতীয় ভূমিতে শহরের স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে সহ অবস্থান করে তাহলে খুব তাড়াতাড়ি বিজাতীয় আচার আচরণে অভ্যস্ত হয়ে তাদের স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলবে। বিষয়টি তিনি খলীফা উমার রা: কে জানান এবং বসরা নামক স্থানে একটি সামরিক শহর নির্মাণের অনুমতি প্রার্থনা করেন। এই বসরা ছিল উবুল্লা বন্দরের নিকটবর্তী একটি স্থান যেখানে পারস্য উপসাগরে চলাচলরত ভারতবর্ষ ও পারস্যের জাহাজসমূহ নোঙ্গর করতো। হযরত উতবা রা: আটশো লোক সঙ্গে করে সর্ব প্রথম উক্ত স্থানে যান এবং বসরা নগরীর ভিত্তি স্থাপন করেন। প্রত্যেক গোত্রের জন্য তিনি পৃথক মহল্লা নির্ধারণ করে দেন। জামে মসজিদ নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করেন হযরত মিহজান ইবনুল আদরা এর ওপর। নগরীর বাড়ী ঘর প্রথমত: গাছ পাথর দিয়ে তৈরী হয়। এ কারণে জামে মসজিদও গাছপালা দিয়ে নির্মিত হয়। তবে তিনি নিজের জন্য কোন প্রাসাদ নির্মাণ করেননি। কাপড়ের তৈরী তাঁবুতে তিনি বসবাস করতেন। (উসুদুল গাবা-৩/৩৬৪)।
হযরত উতবা রা: এই নতুন শহরের প্রথম শাসক নিযুক্ত হন এবং ছয় মাস যাবত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু পার্থিব সুখ-সম্পদের প্রতি তাঁর যুহদ ও নির্মোহ স্বভাব তাঁকে পদ থেকে সরে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করে। তাছাড়া তিনি বসরার মুসলমানদের বিলাসী জীবন যাবন লক্ষ্য করে আঁতকে ওঠেন। যারা কিছুদিন পূর্বেও সিদ্ধ ধানের চেয়ে উত্তম খাবার চিনতো না, এখন তারা পারস্যের অভিজাত খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। তিনি দ্বীনের ব্যাপারে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এই সময় তিনি মসজিদে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তার কিয়দাংশ নিম্নরূপ:
“বন্ধুগণ! দুনিয়া গতিশীল ও বিলীয়মান। তার বেশী অংশ অতিক্রান্ত হয়েছে। তোমরা নিশ্চিতভাবে এই দুনিয়া থেকে এমন এক স্থানে স্থানান্তরিত হবে যার কোন ধ্বংস নেই। তাহলে সর্বোত্তম পাথেয় সংগে নিয়ে যাচ্ছ না কেন? আমাকে বলা হয়েছে, যদি কোন প্রস্তর খন্ড জাহান্নামের কিনারা থেকে নিক্ষেপ করা হয় তাহলে সত্তর বছরেও তার তলদেশে পৌঁছতে পারবে না। কিন্তু আল্লাহর কসম! তোমরা তা পূর্ণ করে ফেলবে। কি, তোমরা অবাক হচ্ছো? আল্লাহর কসম আমাকে বলা হয়েছে, জান্নাতের দরযা এত প্রশস্ত হবে যে, সেই দূরত্ব অতিক্রম করতে চল্লিশ বছর লাগবে। কিন্তু এমন একদিন আসবে যখন সেখানে প্রচণ্ড ভীড় জমে যাবে। আমি যখন ঈমান আনি তখন রাসুলুল্লাহ সা: সঙ্গে মাত্র ছয় ব্যক্তি। অভাব ও দারিদ্র্যের এমন চরম অবস্থা ছিল যে, গাছের পাতাই ছিল আমাদের জীবন ধারণের প্রধান অবলম্বন। সেই পাতা খেতে খেতে আমাদের ঠোঁটে ঘা হয়ে যেত। একদিন আমি একটি চাদর কুঁড়িয়ে পাই। সেটা ফেঁড়ে আমি ও সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাস পরনের তহবন্দ বানিয়ে নেই। কিন্তু আজ এমন দিন এসেছে যখন আমাদের প্রত্যেকেই কোন না কোন শহরের আমীর হয়েছে। আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে বড় মনে করি-এমন অবস্থা থেকে আল্লাহর পানাহ চাই। নবুওয়াত শেষ হয়েছে। অবশেষে রাজতন্ত্র কায়েম হবে এবং খুব শিগগিরই তোমরা অন্যান্য আমীরদের পরীক্ষা করবে। (মুসনাদে আহমাদ ইবন হাম্বল-৪/১৭৪)।
অত:পর হযরত উতবা রা: হযরত মাজাশি ইবন মাসউদকে ফুরাতের তীরবর্তী অঞ্চল সমূহে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন এবং হযরত মুগীরা ইবন শু’বাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফ যান। সেখানে আমীরুল মুমিনীন হযরত উমার রা: ও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি খলীফার নিকট দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চান; কিন্তু খলীফা তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বারবার আবেদন করেন, আর খলীফাও বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেন। খলীফা তাঁকে বসরায় ফিরে গিয়ে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের নির্দেশ দেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি খলীফার নির্দেশ মেনে নেন। মক্কা থেকে বসরা অভিমুখে যাত্রাকালে উটের পিঠে আরোহনের পূর্ব মুহুর্তে অত্যন্ত বিনীতভাবে তিনি দুআ করেন- আল্লাহুম্মা লা তারুদ্দানী ইলাইহা, আল্লাহুম্মা লা তারুদ্দানী ইলাইহা- ওহে আল্লাহ, তুমি আমাকে বসরায় ফিরিয়ে নিওনা, হে আল্লাহ তুমি আমাকে সেখানে ফিরিয়ে নিওনা। আল্লাহ পাক তাঁর দুআ কবুল করেন। পথিমধ্যে হঠাৎ উটের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে মা’দানে সালীম নামক স্থানে পঁচাত্তর বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যু সন হিজরী ১৭ মতান্তরে ২০। সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য সুনান গ্রন্থসমূহে উতবা ইবন গাযওয়ান থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
হাতিব ইবন আবী বালতা’য়া (রা)

নাম হাতিব, কুনিয়াত আবু মুহাম্মাদ, আবু আবদিল্লাহ। পিতার নাম আবু বালতা’য়া আমর। তাঁর বংশ পরিচয় ও মক্কায় উপস্থিতির ব্যাপারে সীরাত লেখকদের মতভেদ আছে। সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য মতে পিতৃ-পুরষের আদি বাসস্থান ইয়ামান। বনী আসাদ, অত:পর যুবাইর ইবনুল আওয়ামের হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ হয়ে তারা মক্কায় বসবাস করতো। আবার কেউ বলেছেন, তিনি উবাইদুল্লাহ ইবনে হুমাইদের দাস ছিলেন। মুকাতাবা বা চুক্তির ভিত্তিতে অর্থ পরিশোধ করে দাসত্ব থেকে মুক্তি লাভ করেন। (উসুদুল গাবা-১/৩৬১)।
মারযুবানী তাঁর মুজামুশ শু’য়ারা গ্রন্থে বলেন, “তিনি জাহিলী যুগে কুরাইশদের অন্যতম খ্যাতিমান ঘোড় সাওয়ার ও কবি ছিলেন”। (আল ইসাবা-১/৩০০)
হিজরাতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদীনা ইসলামের কেন্দ্ররূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর তাঁর দাস সা’দকে সংগে করে তিনি মদীনায় উপস্থিত হন। সেখানে হযরত মুনজির ইবন মুহাম্মাদ আল আনসারীর অতিথি হন এবং হযরত খালিদ ইবন রাখবালার রা: সাথে মুওখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
মুসা ইবন উকবা ও ইবন ইসহাক বলেন, রাসুলুল্লাহ সা: সাথে তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। হুদাইবিয়ার সন্ধিতেও তিনি উপস্থিত ছিলেন। (উসুদুল গাবা-১/৩৬১)। তাছাড়া বিভিন্ন বর্ণনা মতে উহুদ, খন্দক সহ রাসুলুল্লাহর সা: সংগে সংঘটিত সকল যুদ্ধে যোগদান করেন।
উহুদ থেকে ফিরে হিজরী ষষ্ঠ সনে ইসলামের মুবাল্লিগ বা প্রচারক হিসেবে রাসুলুল্লাহ সা: তাঁকে মিসর অধিপতি মাকুকাসের দরবারে পাঠান। তিনি মাকুকাসের নিকট রাসুলুল্লাহ’র সা: যে পত্রটি বহন করে নিয়ে যান তার বিষয়বস্তু নিম্নরূপ:
“অত:পর আমি আপনাকে ইসলামী দাওয়াতের দিকে আহবান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করলে আপনি নিরাপদ থাকবেন এবং আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ বিনিময় দান করবেন। আর যদি প্রত্যাখ্যান করেন তাহলে সকল কিবতীর পাপ আপনার ওপর বর্তাবে। হে আসমানী কিতাবের অধিকারীরা! আপনারা এমন একটি কালেমা বা কথার দিকে আসুন যা আমাদের ও আপনাদের সকলের জন্য সমান। অর্থাত আমরা শুধু এক আল্লাহর ইবাদাত করবো, তার সাথে অন্য কিছু শরীক করবো না এবং আমাদের একজন আর একজনকে খোদার আসনে বসাবো না।”
হযরত হাতিব ইবন আবী বালতা’য়া মিসরে মাকুকাসের দরবারে উপস্থিত হয়ে তার হাতে রাসুলুল্লাহর সা: উপরোক্ত পত্রটি পৌঁছে দেন। তাঁদের দুজনের মধ্যে নিম্নোক্ত আলোচনা হয়:
হাতিব: আপনার পূর্বে এখানে এমন একজন শাসক অতীত হয়েছেন যিনি নিজেকে খোদা মনে করতেন। আল্লাহ পাক তাঁকে দুনিয়া ও আখেরাতের আযাবে নিমজ্জিত করে দৃষ্টান্তমূলক প্রতিশোধ গ্রহণ করেছেন। অন্যদের থেকে আপনারও উপদেশ হাসিল করা উচিত। আপনি নিজেই উপদেশ লাভের স্থলে পরিণত হন, এমনটি বাঞ্ছনীয় নয়।
মাকুকাস: আমরা এক ধর্মের অনুসারী। যতদিন অন্য কোন ধর্ম সে ধর্ম থেকে উন্নততর প্রমাণিত না হয় ততদিন আমরা তা পরিত্যাগ করতে পারিনে।
হাতিব: আমরা আপনাকে দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি- যা অন্য সকল দ্বীন থেকে উত্তম ও পরিপূর্ণ। এই নবী যখন মানুষকে এ দ্বীনের দাওয়াত দিলেন, কুরাইশরা তখন তীব্র বিরোধিতা করলো। তাছাড়া ইহুদীরা সর্বাধিক বৈরী ভাব প্রকাশ করে। তবে তুলনামুলকভাবে খৃস্ট ধর্মাবলম্বীরা নমনীয় ছিল। আল্লাহর কসম! মূসা আ: যেমন ঈসার আ: সুসংবাদ দিয়েছিলেন তেমনি ঈসা আ: ও মুহাম্মাদ সা: এর সুসংবাদ দিয়ে গেছেন। আপনার যেমন ইনজীলের দিকে ইহুদিদেরকে আহবান জানান আমরাও তেমনি আপনাদেরকে কুরআনের দাওয়াত দেই। নবীদের আভির্বাবকালীন সময়ে পৃথিবীতে যত কাওম বা জাতি থাকে তারা সকলে সেই নবীর উম্মাত এবং তাদের ওপর সেই নবীর আনুগত্য ফরয। যেহেতু আপনি একজন নবীর যুগ লাভ করেছেন, তাই তাঁর ওপর ঈমান আনা আপনার অবশ্য কর্তব্য। আমরা আপনাকে দ্বীনে মসীহ থেকে অন্য দিকে ফিরিয়ে নিচ্ছিনা, বরং সঠিকভাবে সেদিকেই নিয়ে যেতে চাচ্ছি।
মাকুকাস: মুহাম্মাদ কি সত্যিই একজন নবী?
হাতিব: কেন সত্য নয়?
মাকুকাস: কুরাইশরা যখন তাঁকে নিজ শহর থেকে তাড়িয়ে দিল, তিনি তাদের জন্য বদ-দু’আ করলেন না কেন?
হাতিব: আপনারা কি বিশ্বাস করেন ঈসা আ: আল্লাহর রাসূল? যদি তাই হয়, তাহলে যখন তাঁকে শূলীতে চড়ানো হয়, তাঁর কাওমের লোকদের জন্য বদ দুআ করলেন না কেন?
এমন অন্তরভেদী তাতক্ষণিক জবাবে অবলীলাক্রমে মাকুকাসের মুখ থেকে প্রশংসাসূচক ধ্বনি উচ্চারিত হলো। তিনি আরো বললেন, নিশ্চয়ই আপনি একজন মহজ্ঞানী এবং একজন মহাজ্ঞানীর পক্ষ থেকেই এসেছেন। (উসুদুল গাবা-১/৩৬১)। “আমি যতটুকু ভেবে দেখেছি, এই নবী কোন অনর্থক কাজের আদেশ দেন না এবং কোন পছন্দনীয় বিষয় থেকেও বিরত রাখেন না। আমি না তাঁকে ভ্রান্ত যাদুকর বলতে পারি, আর না মিথ্যুক ভবিষ্যদ্বক্তা। তাঁর মধ্যে নবুওয়াতের অনেক নির্দশন বিদ্যামান আমি শিগগিরই বিষয়টি গভীরভাবে ভেবে দেখবো।” কথাগুলি বলে তিনি হযরত রাসূলে কারীমের সা: পবিত্র পত্রখানি উঠিয়ে হাতির দাঁতের একটি বাক্সে বন্দী করেন এবং সীলযুক্ত করে উপস্থিত এক দাসীর হিফাজতে দিয়ে দেন।
মাকুকাস অত্যন্ত সম্মানের সাথে হযরত হাতিবকে বিদায় দেন এবং তাঁর কাছে রাসুলুল্লাহর জন্য তিনজন দাসী, দুলদুল নামের একটি খচ্চর এবং বেশ কিছু কাপড়সহ মূল্যবান উপহার পাঠান। (যাদুল মাআদ-২৫৭)। মাকুকাস প্রেরিত দাসীত্রয়ের একজন হযরত মারিয়া কিবতিয়া, হযরত রাসূলে কারীম সা: তাঁকে নিজের জন্য রাখেন এবং তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন রাসুলুল্লাহর সা: পুত্র হযরত ইবরাহীম। দ্বিতীয় দাসীটি হযরত মারিয়ার বোন সীরীন। রাসুলুল্লাহ সা: তাঁকে দান করেন প্রখ্যাত কবি হাসসান বিন সাবিত রা: কে তাঁর গর্ভেই জন্মগ্রহণ করে হযরত আবদুর রহমান ইবন হাসসান। তৃতীয় দাসীটিকে রাসুলুল্লাহ সা: দান করেন আবু জাহম ইবন হুজাইফা আল আদাবীকে। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৪০-৪১, উসুদুল গাবা-১/৩৬২)।
হিজরী ৮ম সনে মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি শুরু হয়। বিষয়টি যাতে প্রতিপক্ষ মক্কার কুরাইশরা জানতে না পারে সেজন্য রাসুলুল্লাহ সা: সকলকে সতর্ক করে দেন। হযরত হাতিব মক্কায় বসবাস না করলেও কুরাইশদের সাথে পুরাতন বন্ধুত্বের কারণে তাদের প্রতি দূর্বল হয়ে পড়েন। তিনি মদীনাবাসীদের এই গোপন প্রস্তুতির খবরসম্বলিত একটি পত্রসহ মুযাইনা গোত্রের এক মহিলাকে মক্কার দিকে পাঠান। এর বিনিময়ে মহিলাটিকে তিনি নির্ধারিত মজুরী দেবেন বলে চুক্তি হয়। পত্রখানি মাথার চুলের বেণীর মধ্যে লুকিয়ে মহিলাটি মক্কার দিকে যাত্রা করে। এদিকে ওহীর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সা: সব খবর অবগত হলেন। সাথে সাথে তিনি মহিলাটির পিছু ধাওয়া করে পত্রটি উদ্ধারের জন্য আলী, যুবাইর ও মিকদাদকে নির্দেশ দিলেন। তাঁরা তিনজন খুব দ্রুত সাওয়ারী দাবড়িয়ে “খালীকা” মতান্তরে “রাওদাতু খাক” নামক স্থানে মহিলাকে ধরে ফেলেন। প্রথমে তাঁরা তার বাহনে সন্ধান করে কিছুই পেলেন না। তারপর হযরত আলী রা: মহিলাকে বললেন, “আমি আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, রাসুলুল্লাহ সা:কে মিথ্যা খবর দেওয়া হয়নি এবং আমাদেরকেও মিথ্যা বলা হয়নি। হয় তুমি নিজেই পত্রটি বের করে দাও, নয়তো আমরা তোমাকে উলংগ করে তালাশ করবো।” তাঁদের এ কঠোরতা দেখে মহিলা বললো, তোমরা একটু সরে যাও। তারা সরে দাড়ালেন। সে তার মাথার বেণী খুলে তার মধ্য থেকে পত্রটি বের করে দিল। তারা তিনজন পত্রটি নিয়ে রাসুলুল্লাহ সা: এর খিদমতে হাজির হলেন। পত্রটি পাঠ করে রাসুলুল্লাহ সা: বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করেন, ওহে হাতিব তুমি এমন কাজ করলে কেন? হাতিব বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমার ব্যাপারে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেবেন না। যদিও আমি কুরাইশ বংশের কেউ নই, তবুও জাহিলী যুগে তাদের সাথে আমার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যেহেতু মুহাজিরদের সকলে তাদের মক্কাস্থ আত্মীয় বন্ধুদের সাহায্য সহায়তা করে থাকেন, এজন্য আমার ইচ্ছে হলো, আমার আত্মীয় স্বজনদের সাথে কুরাইশরা যে সদ্ব্যবহার করে থাকে তার কিছু প্রতিদান কমপক্ষে আমি তাদের দান করি। এ কাজ আমি মুরতাদ হয়ে বা ইসলাম ত্যাগ করে অথবা কুফরকে ইসলামের ওপর প্রাধান্য দেওয়ার কারণে করিনি। (সহীহুল বুখারী, কিতাবুল মাগাযী)।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, হাতিব বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমার পরিবার পরিজন তাদের মধ্যে রয়েছে। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জন্য ক্ষতিকর হবে না-এমনটি মনে করেই আমি চিঠিটি লিখেছি। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে আল্লাহ সম্পর্কে আমার মনে কোন সন্দেহ দেখা দেয়নি। কিন্তু মক্কায় আমি ছিলাম একজন বহিরাগত এবং সেখানে আমার মা, ভাই ও ছেলেরা রয়েছে। (আল ইসাবা-১/৩০০) হায়াতুস সাহাবা-২/৪২৫)।
হাতিবের বক্তব্য শুনার পর হযরত রাসূলে কারীম সা: উপস্থিত সাহাবাদের লক্ষ্য করে বললেন, সে সত্য কথাটি প্রকাশ করে দিয়েছে। এ কারণে কেউ যেন তাকে গালমন্দ না করে। হযরত উমার রা: আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! সে আল্লাহ, রাসূল ও মুসলমানদের প্রতি আস্থাহীনতার কাজ করেছে। অনুমতি দিন, আমি এ মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেই। রাসুলুল্লাহ সা: বললেন, সে কি বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেনি? আল্লাহ বদরের যোদ্ধাদের অনুমতি দিয়েছেন, তোমরা যা খুশি কর জান্নাত তোমাদের জন্য অবধারিত। রহমাতুল লিল আলামীন দয়ার নবীর এ অপূর্ব উদারতায় উমারের দু চোখ সজল হয়ে ওঠে। (সহীহুল বুখারী, ফদলু মান শাহেদা বদরান)।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই পবিত্র কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়,
“ওহে তোমরা যারা ঈমান এনেছো, আমার শত্রু ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করো না। তোমরা তাদের সাথে বন্ধুত্বের আচরণ কর, অথচ তোমাদের নিকট যে সত্য এসেছে তা তারা অস্বীকার করেছে। (সূরা মুমতাহিনা-১)।
হযরত রাসূলে কারীমের সা: ওফাতের পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বাকার রা: তাঁকে দ্বিতীয়বার মাকুকাসের দরবারে পাঠান এবং মাকুকাসের সাথে একটি সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করেন। হযরত আমর ইবনুল আসের রা: মিসর জয়ের পূর্ব পর্যন্ত উভয় পক্ষের মধ্যে এ চুক্তি বহাল থাকে। (আল ইসতিয়াব)।
হিজরী ৩০ সনে ৬৫ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইনতিকাল করেন। হযরত উসমান রা: জানাযার নামাযের ইমামতি করেন এবং বিপুল সংখ্যক লোকের উপস্থিতিতে তাঁর দাফন কাজ সম্পন্ন হয়। (আল ইসতিয়াব)।
প্রতিশ্রুতি পালন, উপকারের প্রতিদান দেওয়া এবং ষ্পষ্ট ভাষণ তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আত্মীয় বন্ধুদের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন দরদ। মক্কা বিজয়ের পূর্বে তিনি যে পত্রটি লেখেন তা ছিল মূলত: এ দরদের তাকিদেই। আর রাসূল সা: তা উপলদ্ধি করেই তাঁকে ক্ষমা করে দেন। তাঁর স্বভাব ছিল কিছুটা রুক্ষ। দাসদের সাথে কঠোর আচরণ করতেন। এ কারণে রাসুল সা: ও পরবর্তী খলীফারা মাঝে মাঝে তাঁকে বকাঝকা করে সংশোধন করতেন। একবার তাঁর এক দাস হযরত রাসূলে কারীমের সা: খিদমতে হাজির হয়ে তাঁর কঠোরতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বললো, ইয়া রাসুলাল্লাহ, নিশ্চয়ই হাতিব জাহান্নামে যাবে। রাসূল সা: বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো। যে ব্যক্তি বদর ও হুদাইবিয়ায় অংশ নিয়েছে সে জাহান্নামে যেতে পারে না। (ইসতিয়াব)।
হযরত উমার রা:-র খিলাফতকালে বহুবার তাঁর দাসেরা তাঁর বিরুদ্ধে খলীফার নিকট কঠোরতার অভিযোগ এনেছে। একবার তাঁর এক দাস মুযাইনা গোত্রের এক ব্যক্তির একটি উট জবেহ করে দেয়, তার শাস্তি স্বরূপ তিনি সেই দাসের জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করেন। খলীফা জানতে পেয়ে তাঁকে ডেকে বলেন, জানতে পেলাম, তুমি তোমার দাসদের অনাহারে রাখ। খলীফা তাকে কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন।
ব্যবসা ছিল তার জীবিকার প্রধান উতস। খাবারের একটি দোকান থেকে তিনি প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। মৃত্যুকালে চার হাজার দীনার এবং অনেকগুলি বাড়ী রেখে যান। কেউ বলেছেন, হাতিব থেকে রাসুলুল্লাহর সা: তিনটি হাদীস, আবার কেউ বলেছেন, দুটি হাদিস বর্ণিত আছে।


















