Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:

    ((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))

    “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:

    ((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))

    “এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    «أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»

    “আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:

    «عليك بتقوى الله ما استطعت»

    “তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:

    «فاتقوا الله ولو بشق تمرة»

    “একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।

    তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))

    “আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:

    ((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))

    “যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))

    “মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:

    ((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))

    “মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:

    ((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))

    “পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]

    এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))

    “যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:

    ((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))

    “এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:

    ((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))

    “হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমজান এর শিক্ষা

    রমজান এর শিক্ষা

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্‌কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:

    রমজান – রহমতের মাস:

    এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।

    রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।

    সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।

    আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর  মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।

    সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।

    জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।

    রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।

    ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্‌ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।

    এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।

    রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:

    রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।

    এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।

    রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্‌কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।

    তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।

    তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্‌র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্‌ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্‌কে রাগান্বিত করে।

    আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্‌ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।

    এখানে আল্লাহ্‌ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।

    উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্‌ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্‌ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”

    আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।

    তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্‌ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)

    এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)

    অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্‌ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।

    এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্‌ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্‌কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।

    তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।

    আর আল্লাহ্‌কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্‌র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।

    বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।

    রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।

    রমজান – কোরআনের মাস:

    একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।

    আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?

    আল্লাহ্‌ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্‌র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।

    এখানে আল্লাহ্‌ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্‌ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?

    বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।

    যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্‌ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্‌ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”

    আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”

    একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”

    তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)

    আল্লাহ্‌ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।

    সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্‌র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্‌ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।

    অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।

    যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।

    বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।

    রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:

    আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্‌ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।

    রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।

    কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্‌র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।

    আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।

    তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্‌ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্‌ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।

    রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)

    আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্‌র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।

    হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্‌ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্‌র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।

    পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)

    অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্‌র ক্ষমা পাওয়া যায় না।

    রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:

    পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।

    রমজান এর পর কী হবে?

    প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।

    রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্‌র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্‌র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্‌র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।



    আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
    ২৫শে শাবান, ১৪৩৩
    ১৪ই জুলাই, ২০১২ 

  • খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)

    খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)

    নাম আবু সুলাইমান খালিদ, লকব সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি)। পিতা ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা এবং মাতা লুবাবা আস-সুগরা, উম্মুল মুমিনীন হযরত মাইমুনা বিনতুল হারিস ও হযরত আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিবের স্ত্রী লুবাবা আল-কুবরার বোন। রাসূলুল্লাহ (সা) ও হযরত আব্বাস (রা) তাঁর খালু। (উসুদুল গাবা-২/৯৩)

    তাঁর খান্দান ছিল জাহিলী আরবের কুরাইশদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত। কুব্বা ও আয়িন্না (সৈন্য ও সেনা ক্যাম্পের পরিচালন দায়িত্ব) –এ দু’টি দায়িত্ব ছিল তাঁর খান্দানের ওপর। ইসলামের অভ্যুদয়ের সময় খালিদ ছিলেন এই পদে অধিষ্ঠিত। (আল-ইসতিয়াব-১/১৫৭) হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রাককালে মুসলমানদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য কুরাইশদের যে দলটি মক্কা থেকে বের হয়েছিল, তার নেতা ছিলেন খালিদ। উহুদ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েন এবং মক্কার মুশরিক বাহিনীর সুনিশ্চিত পরাজয়কে বিজয়ে রূপদান করেন।

     হযরত খালিদ ইসলাম গ্রহণের সময় সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তবে মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি আছে।

    হযরত আমর ইবনুল আস (রা) হাবশা থেকে মদীনায় চলেছেন ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে। পথে মদীনা অভিমুখী আরেকটি কাফিলার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। তারাও চলেছেন একই উদ্দেশ্যে মদীনায়। দ্বিতীয় এই দলটির সাথে ছিলেন হযরত খালিদ। হযরত আমর ইবনুল আস খালিদকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন দিকে?’ খালিদ জবাব দিলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমার নিশ্চিত বিশ্বাস এ ব্যক্তি নবী –আর কতদিন এভাবে চলবে চলো যাই ইসলাম গ্রহণ করি।’ (আল-ইসাবা-১/৪১৩, মুসনাদে আহমাদ) তাঁর মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হলেন। প্রথমে খালিদ, তারপর আমর ইবনুল আস রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেন। আমর মক্কায় ফিরে আসেন; কিন্তু খালিদ মদীনায় থেকে যান।

    হযরত খালিদ বলেন, আমার ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার মধ্যে বুদ্ধির ছাপ দেখেছিলাম, আমার আশা ছিল এ বুদ্ধি শেষ পর্যন্ত তোমাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের কাছেই সমর্পন করবে।’ খালিদ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করার সময় বলেছিলাম, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে যত পাপ আমি করেছি তা ক্ষমার জন্য দু’আ করুন। রাসূল (সা) বলেছিলেন, ইসলাম অতীতের সকল গুনাহ-খাতা নশ্চিহ্ন করে দেয়। আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এ কথার ওপরই আমি বাইয়াত করলাম। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, তোমার পথে বাধা সৃষ্টি করে যত অপরাধ সে করেছে, তুমি তা ক্ষমা করে দাও। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৪-৮৫)

    ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর ইসলাম –পূর্ব খান্দানী সামরিক পদে বহাল রেখে তাঁর খিদমত গ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা-২/৯৩) ইসলাম পূর্ব জীবনে তিনি ছিলেন মুসলমানদের চরম দুশমন, আর ইসলাম গ্রহণের পর মুশরিকদের জন্য হয়ে দাঁড়ান ভীষণ বিপদজ্জনক। অসংখ্য যুদ্ধে তাঁর তরবারি মুশরিকদের ঐক্য ছিন্নভিন্ন করে দেয়।

    ইসলাম গ্রহণের পর হযরত খালিদ সর্বপ্রথম মূতা অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) দাওয়াতী কার্যক্রমের আওতায় হযরত হারিস ইবন উমাইর আযাদীকে একটি পত্রসহ বসরার শাসকের নিকট পাঠান। শুরাহবীল ইবন আমর গাসসানী মূতা নামক স্থানে হারিসকে হত্যা করে। এ ঘটনার প্রতিশোধকল্পে রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত যায়িদ ইবন হারিসার নেতৃত্বে দু’হাজার সৈন্যের এক বাহিনী পাঠান। প্রতিপক্ষ রোমান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় দু’লাখ। যায়িদ ইবন হারিসার বাহিনী মদীনা থেকে যাত্রার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের উপদেশ দেন, “যুদ্ধে যায়িদ যদি শহীদ হয় তাহলে জা’ফর এবং জা’ফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বাহিনীর নেতৃত্ব দেবে। আর যদি আবদুল্লাহও শহীদ হয় তাহলে তোমরা তোমাদের কাউকে আমীর বানিয়ে নেবে।”

    তাঁরা ছিলেন তিনজন –যায়িদ, জা’ফর ও আবদুল্লাহ। তাঁরা সিরিয়ার মূতা অভিযানের তিন বীর। এ অসম যুদ্ধে তাঁরা নজীরবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একে একে শাহাদাত বরণ করেন। অবশেষে হযরত খালিদ নেতৃত্ব লাভ করেন। একের পর এক তিন সেনাপতির শাহাদাত বরণে মুসলিম বাহিনী সাহস হারিয়ে ফেলে। খালিদ শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে না পারলেও মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করেন।

    হযরত রাসূলে করীম (সা) উল্লেখিত তিন সেনাপতির শাহাদাত ও খালিদের নেতৃত্ব গ্রহণের খবর মদীনায় ঘোষণা করেছিলেন এভাবেঃ

    “যায়িদ ইবন হারিসা পতাকা হাতে নিয়ে শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করে। তারপর জা’ফর সেই পতাকা তুলে নেয় এবং সেও যুদ্ধ করে শহীদ হয়। তারপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেই পতাকা হাতে তুলে নেয় এবং সেও শহীদ হয়। অতঃপর ‘সাইফুন মিন সুয়ূফিল্লাহ’ –আল্লাহর অন্যতম এক তরবারি সে পতাকা হাতে তুলে ধরে এবং তার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করেন।” (রিজালুন হাওলার রাসূল -২৮৬) এইভাবে তিনি লাভ করেন ‘ফাইফুল্লাহ’ –আল্লাহর অসি উপাধি। অবশ্য এই উপাধি লাভের ঘটনা বা সময় সম্পর্কে ভিন্নমতও আছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, কোন এক স্থানে হযরত রাসূলে করীম (সা) অবস্থান করছিলেন। কেউ পাশ দিয়ে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, -কে? জবাবে বলা হচ্ছিল অমুক। এক সময় খালিদ গেলেন। রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, -কে? বলা হলো, খালিদ। তিনি বললেন, আল্লাহর বান্দাহ খালিদ কত ভালো। সে আল্লাহর অন্যতম এক তরবারি। এটা মূতার পরের ঘটনা। (উসুদুল গাবা-২/৯৪, আল-ইসাবা-১/৪১৩)

    যায়িদ, জা’ফর ও আবদুল্লাহ –এ তিন সেনাপতির অধীনে হযরত খালিদ একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে মূতা অভিযানে যোগদান করেছিলেন। উল্লেখিত তিনজনের শেষ ব্যক্তি শাহাদাত বরণ করলে হযরত সাবিত ইবন আকরাম দৌড়ে পতাকার কাছে যান এবং মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যাতে কোন বিশৃংখলা দেখা না দেয় সে জন্য ডান হাতে পতাকা উচু করে ধরেন। পতাকা তুলে ধরে তিনি এক দৌড়ে হযরত খলিদের কাছে এসে বলেন, ‘খুজ আল-লিওয়াআ ইয়া আবা সুলাইমান, -‘আবু সুলাইমান, পতাকাটি তুমি ধর’। যে বাহিনীর মধ্যে প্রথম পর্ব ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারগণ ছিলেন, সেই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার কোন অধিকার-যে খালিদের মত নও মুসলিমের থাকতে পারেনা এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সাবিত ইবন আক্রামকে বলেন, ‘না, পতাকা আমি গ্রহণ করতে পারিনা, আপনিই এর যোগ্যতম ব্যক্তি। আপনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ এবং বদরী (অর্থাৎ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী)।’ সাবিত জবাব দিলেন, ‘ধর, যুদ্ধে তুমি আমার থেকে পারদর্শী। এ পতাকা আমি তোমার জন্যই তুলে এনেছি।’ তারপর হযরত সাবিত (রা) মুসলিম বাহিনীকে সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমারা কি খালিদের নেতৃত্বে রাজি?’ তারা সমস্বরে জবাব দিলঃ ‘হাঁ, আমরা রাজি’। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৬-৮৭) খলিদ বলেন, মূতার যুদ্ধে আমার হাতে সাতখানি তরবারি ভাঙ্গে। অবশেষে একখানি ইয়ামানী তরবারী অক্ষত থাকে। (উসুদুল গাবা-২/৯৪)

    মক্কা বিজয়কালে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গী ছিলেন। রাসূল (সা) মুসলিম বাহিনীর দক্ষিণ ভাগের দায়িত্ব তাঁকে দেন। বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় হলেও খালিদের হাতে সেদিন কতিপয় মুশরিক প্রাণ হারায়। তিনি ‘কুদার’ দিক দিয়ে মক্কায় ঢুকছিলেন, পথে মক্কার একটি মুশরিক দলের মুখোমুখি হন। মুশরিকরা তীর নিক্ষেপ শুরু করে। তিনি তীর ছুঁড়ে তাদের জবাব দেন। তাতে কয়েকজন মুশরিক নিহত হয়। এজন্য তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট জবাবদিহি করতে হয়। রাসূল (সা) যখন জানলেন, মুশরিকরাই প্রথম আক্রমণ চালিয়াছে, তখন তিনি এটাকে আল্লাহর ইচ্ছা হিসাবে মেনে নিয়ে চুপ করে যান।

    হুনাইন অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। বারো হাজার সৈন্য নিয়ে গঠিত হয় মুসলিম বাহিনী। হযরত রাসূলে করীম (সা) গোটা বাহিনীকে গোত্র ভিত্তিক কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। বনু সুলাইম গোত্র ছিল গোটা বাহিনীর পুরোভাগে। আর এর কম্যাণ্ডিং অফিসার ছিলেন হযরত খালিদ। এ যুদ্ধে তিনি দারুণ সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর শরীরের একাধিক স্থানে আহত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে দেখতে আসেন, তাঁর আহত স্থানসমূহে ফুঁক দেন এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। (উসুদুল গাবা-২/৯৫) তায়িফ অভিযানে খালিদ ছিলেন অগ্রগামী বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসার। হিজরী নবম সনে তাবুক অভিযানেও অংশগ্রহণ করেন। রাসূল (সা) এ যুদ্ধে দুমাতুল জান্দাল –এর সরদার উকাইদার ইবন আবদিল মালিকের বিরুদ্ধে চার শো সৈনিক সহ পাঠান। খালিদ উকাইদারের ভাইকে হত্যা করেন এবং উকাইদারকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির করেন।

    হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ (সা) খালিদকে দাওয়াতী কাজের উদ্দেশ্যে বনী জুজাইমা গোত্রে পাঠান। খালিদের দাওয়াতে বনী জুজাইমা গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অজ্ঞাতবশতঃ সঠিক ভাষায় তা ব্যক্ত করতে না পারায় খালিদ তাদের ভুল বুঝেন। তিনি আক্রমণের নির্দেশ দেন। ফলে, এই গোত্রের বহু লোক হতাহত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বিষয়টি অবগত হয়ে ভীষণ দুঃখিত হন। তিনি হাত উঠিয়ে দু’আ করেন; ‘হে আল্লাহ, আমি খালিদের এই কাজের ব্যাপারে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত’ তারপর হযরত আলীকে পাঠিয়ে তাদের সকল ক্ষতিপূরণ দান করেন। তাদের নিহত কুকুরগুলিরও ক্ষতিপূরণ আদায় করেন। (বুখারীঃ কিতাবুল মাগাযী, উসুদুল গাবা-২/৯৪)

    এই ঘটনার পর খালিদ মদীনায় ফিরে এলে বিষয়টি নিয়ে তাঁর ও আবদুর রহমান ইবন আউফের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে খালিদ আবদুর রহমানকে কিছু গালমন্দ করেন। কথাটি রাসূলুল্লাহর (সা) কানে পৌছালে তিনি রেগে যান এবং খালিদকে বলেন, “আমার সাহাবীদের গালি দেবে না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করে তবুও সে তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক পরিমাণ ব্যয়ের সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবে না।” (উসুদুল গাবা -২/৯৫)

    হিজরী দশম সনে হযরত রাসূলে করীম (সা) খালিদকে নাজরানের ‘বনু আবদিল মাদ্দান’ গোত্রে ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য পাঠান। যেহেতু খালিদ বনু জুজাইমার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মারাত্মক ভুল করেছিলেন, এ কারণে রাসূল (সা) যাত্রার পূর্বে তাঁকে বিশেষ হিদায়াত দেনঃ ‘কেবল ইসলামের দাওয়াতই দেবে, কোন অবস্থাতেই তলোয়ার উঠাবে না’। তিনি এ হিদায়াত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তাঁর দাওয়াতে গোটা আবদুল মাদ্দান গোত্র ইসলাম কবুল করে। এভাবে রণক্ষেত্রের এক সৈনিক প্রথমবারের মত সত্যিকার ‘দায়ী-ই ইসলাম’ ইসলামের দাওয়াত দানকারী রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সকল নওমুসলিমকে তিনি তালীম ও তারবিয়াত দেন এবং তাদেরকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে নিয়ে আসেন। একই বছর ইয়ামনবাসীদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য আলী ও খালিদকে (রা) পাঠানো হয়। তাঁদের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইয়ামনবাসী ইসলাম কবুল করে।

    জাহিলী আরবের কুরাইশদের মূর্তি পূজার কেন্দ্রসমূহের একটি ছিল ‘উযযা’। রাসূলুল্লাহ (সা) খালিদকে পাঠালেন কেন্দ্রটি ধ্বংসের জন্য। তিনি সেখানে পৌঁছে নিম্নের পংক্তিটি আবৃতি করতে করতে কেন্দ্রটি মাটিতে মিশিয়ে দেনঃ “ওহে উযযা, তুমি পবিত্র নও, আমরা তোমার অস্বীকার করি, আমি দেখেছি, আল্লাহ তোমায় অপমানিত করেছে।” (উসুদুল গাবা-২/৯৪)

    হযরত রাসূলে করীমের (সা) ইনতিকালের সাথে সাথে আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ইসলাম ত্যাগকারী, নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার ও যাকাত অস্বীকারকারীদের মারাত্মক ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই ফিতনাবাজদের শির-দাঁড়া গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য খলীফা আবু বকর (রা) সেনা বাহিনী প্রস্তুত করে নিজেই যাত্রার জন্য ঘোড়ায় চড়লেন। কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবীরা মনে করলেন খলীফার এ সময় দারুল খিলাফা মদীনায় থাকা উচিত। হযরত আলী (রা) খলীফার ঘোড়ার লাগামটি ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর রাসূলের খলীফা, কোন দিকে? উহুদের দিনে রাসূলুল্লাহ (সা) আপনাকে যে-কথা বলেছিলেন, আমি সে কথাই বলছিঃ ওহে আবু বকর, তোমার তরবারি উম্মত্ত হয়ে গেছে, তুমি তোমার নিজেকে দিয়ে আমাদের ব্যথিত করো না।” খলীফা সিদ্ধান্ত বাতিল করে মদীনায় থেকে গেলেন। তিনি গোটা সেনা বাহিনীকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করেন এবং একটি ভাগের দায়িত্ব প্রদান করেন খালিদকে। খালিদকে মদীনা থেকে বিদায় দেওয়ার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমার সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, ‘খালিদ আল্লাহর একটি তরবারি –যা আল্লাহ কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছেন। খালিদ আল্লাহর কতইনা ভালো বান্দা এবং গোত্রের কতই না ভালো ভ্রাতা’। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯১)

    হযরত খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে মদীনা থেকে রওয়ানা হন। প্রতিটি অভিযানের পূর্বে তিনি তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিতেনঃ তোমরা কৃষকদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে না। তাদের নিরাপদে থাকতে দেবে। তবে তাদের কেউ যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।

    ভণ্ড নবী তুলাইহার বিরুদ্ধে খালিদ অভিযান পরিচালনা করেন। তুমুল লড়াই চলছে। প্রতিটি সংঘর্ষেই তুলাইহার সঙ্গীরা পরাজয় বরণ করছে। একদিন তুলাইহা তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জিজ্ঞেস করলো, আমাদের এমন পরাজয় হচ্ছে কেন? তারা বললো, কারণ, আমাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীটি তার আগে মারা যাক। অন্যদিকে আমরা যাদের সাথে লড়ছি, তাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীর পূর্বে সে মৃত্যুবরণ করুক। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৯৩) খালিদ তুলাইহার সঙ্গী-সাথীদের হত্যা করেন এবং তার তিরিশ জন সঙ্গীকে বন্দী করে মদীনায় পাঠান। তিনি মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। হযরত হামযার হন্তা হযরত ওয়াহশীর হাতে ভণ্ড মুসাইলামা নিহত হয়।

    ভণ্ড নবীদের ফিতনা নির্মূল করার পর হযরত খালিদ যাকাত দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী ও মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী) –দের দিকে ধাবিত হন। সর্বপ্রথম আসাদ ও গাতফান গোত্রদ্বয়ে আঘাত হানেন। তাদের কিছু মারা যায়, কিছু বন্দী হয়, আর অবশিষ্টরা তাওবাহ করে আবার ইসলামে ফিরে আসে। (তারীখুল খুলাফাঃ সুয়ূতী-৭২) মুরতাদদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল অভিযানে খালিদ ছিলেন অগ্রভাগে। তাবারী বলেছেঃ ‘মুরতাদদের বিরুদ্ধে অভিযানে যত বিজয় অর্জিত হয়েছে, তার সবই খালিদ ও অন্যান্যদের কৃতিত্ব।’

    আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা দমনের পর হযরত খালিদ ইরাকের দিকে অগ্রসর হন। মুজার, কাইসার, আলীম, আমগীশীয়া, হীরা, আমবার, আইতুন তামার, দুমাতুল জান্দাল, হাসীদ, খানাফিস, সানা ও বিশর, ফিরাদ প্রভৃতি যুদ্ধে তিনি অতুলনীয় সাহস ও কৌশল প্রদর্শন করে সমগ্র ইরাক পদানত করেন। হযরত খালিদের সাথে ইরাকীদের সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ফিরাদে। ফুরাতের এক তীরে মুসলিম বাহিনী ও অপর তীরে সম্মিলিত ইরাকী-বাহিনী। ইরাকীরা প্রস্তাব দিলঃ হয় তোমরা এপারে আস, না হয় আমাদের ওপারে যাওয়ার সুযোগ দাও। হযরত খালিদ প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাদের এপারে আসার সুযোগ করে দিলেন। উভয় পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ শুরু হলো। মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেললো। পেছনে তাদের তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ ফুরাত নদী। পেছনে সরে গেলে ডুবে মরা এবং সামনে এগুলে মুসলিম সৈন্যদের তরবারির শিকার হওয়া ছাড়া আর কোন পথ তাদের ছিল না। হযরত খালিদ গোটা শত্রু বাহিনীকে এমন এক যাঁতাকলে আটক করে পিষে ফেলেন। এ যুদ্ধের পর হযরত খালিদ গোপনে হজ্জে চলে যান।

    হযরত খালিদ যখন ইরাকে যুদ্ধরত, সিরিয়ায় তখন অন্য একটি মুসলিম বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত। খালিদের ইরাক অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে খলীফার দরবার থেকে তাঁকে নির্দেশ দেয়া হলো সিরিয়ায় অবস্থানরত বাহিনী সাথে মিলিত হওয়ার জন্য। খালিদ ইরাক থেকে বসরা উপস্থিত হলেন। পূর্ব থেকেই ইসলামী ফৌজ সেখানে খালিদের প্রতীক্ষায় ছিল। খালিদ পৌঁছেই বসরা আক্রমণ করেন। বসরাবাসীর সন্ধি চুক্তি করে জীবন রক্ষা করে।

    বসরা অভিযান শেষ করে হযরত খালিদ ও আবু উবাইদা আজনাদাইন পৌঁছেন। পূর্ব থেকেই হযরত আমর ইবনুল আস সেখানে অবস্থান করছিলেন। হিজরী ১৩ সনে তুমুল লড়াই হয়। আজনাদাইন খালিদের পদানত হয়।

    সেনাপতি আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তিনি দিক থেকে দিমাশক অবরোধ করে বসে আছে। এক দিকের দায়িত্বে হযরত খালিদ নিয়োজিত। তিন মাস অবরোধ করেও কোন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় দিমাশকের পাদ্রীর এক পুত্র সন্তান জম্ম লাভ করে। নগরীবাসী সেই জম্ম উৎসবে মদ পান করে আনন্দে বিভোর হয়ে পড়ে। হযরত খালিদ যুদ্ধের সময় রাতে প্রায় ঘুমাতেন না। রাতে সামরিক ব্যবস্থাপনা ও দুশমনদের তথ্য সন্ধানে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি দিমাশকবাসীর অবস্থা অবগত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন, তাকবীর ধ্বনি শোনার সাথে সাথে তারা যেন নগর-প্রাচীরের ফটকে ছুটে গিয়ে আক্রমণ চালায়। এদিকে তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট সৈনিককে নির্বাচন করে রশির সাহায্যে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং অতর্কিতে ফটকের প্রহরীকে হত্যা করে তালা ভেঙ্গে তাকবীর দেওয়া শুরু করেন। তাকবীর শোনার সাথে সাথে বাইরে অপেক্ষমান সৈন্যরা একযোগে ভেতরে প্রবেশ করে। নগরবাসী তখন ঘুমে অচেতন। এমন অতর্কিত হামলায় তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনাপতি আবু উবাইদার নিকট সন্ধির প্রস্তাব দেয় এবং নিজেদের হাতে নগর প্রাচীরের অন্য দ্বারগুলি উম্মুক্ত করে দেয়। একদিকে হযরত খালিদ বিজয়ীর বেশে, অন্যদিকে হযরত আবু উবাইদা সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে নগরের অর্ধেক যুদ্ধ করে দখল করা হয়, তবুও আবু উবাইদা গোটা নগরবাসীর সাথে সন্ধির শর্তানুযায়ী সমান আচরণ করেন। (তারীখঃ ইবনুল আসীর ৬/৩২৯)

    ফাহলের যুদ্ধেও খালিদ অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রবর্তী বাহিনীর কম্যাণ্ডার। রোমানরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। ফাহলের পর খালিদ ও আবু উনাইদা হিমসের দিকে অগ্রসর হন। দিমাশকের প্রশাসনিক দায়িত্বে তখন ইয়ায়িদ বিন আবু সুফিয়ান। রোমানরা পুনরায় দিমাশক দখলের পায়তারা চালায়। ইয়াযিদ বাধা দেন। প্রচণ্ড লড়াই চলছে। এমন সময় পেছনের দিক থেকে ধুমকেতুর মত হাজির হলেন হযরত খালিদ। রোমান বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য ছাড়া সকলেই খালিদ-বাহিনীর হাতে নিহত হয়।

    সিরিয়ার বিভিন্ন ফ্রন্টে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের খবর শুনে এক পর্যায়ে তথাকার রোমান শাসক মুসলমানদের সাথে শান্তি চুক্তির ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তার পরিষদবর্গ তাকে যুদ্ধের প্ররোচনা দিয়ে বলেঃ আমরা অবশ্যই আবু বকরের অশ্বারোহীদের আমাদের ভূমিতে প্রবেশে বাধা দেব। তারা সেনাপতি মাহানের নেতৃত্বে দু’লাখ চল্লিশ হাজার সদস্যের এক বিরাট বাহিনী ইয়ারমুকে সমাবেশ করে। তাদের পাদ্ররী পুরোহিতরাও নির্জবাস থেকে বেরিয়ে ধর্মের নামে জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলে। খলীফা আবু বকর (রা) এ খবর শুনে মন্তব্য করেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি খালিদের দ্বারা তাদের প্রবৃত্তির এ প্ররোচনার নিরাময় করবো।’ ‘হ্যাঁ, খালিদ ছিলেন সেদিন রোমানদের সেই মহাব্যাধির ধস্বস্তরী প্রতিষেধক।

    হযরত খালিদ ময়দানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন কম্যাণ্ডার পৃথকভাবে নিজ নিজ সৈন্য পরিচালনা করছে। তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণ দেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হামদ-সানার পর বলেনঃ “আজকের এ দিনটি আল্লাহর অন্যতম একটি দিন। এ দিনে গর্ব ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা উচিত নয়। তোমরা তোমাদের জিহাদে নিষ্ঠাবান হও, তোমাদের কাজের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা কর। এসো আমরা ইমারাহ বা নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে নিই। আমাদের কেউ আজ, কেউ আগামীকাল এবং কেউ পরশু আমীর হোক। এভাবে তোমাদের সকলেই আমীর হবে। তোমরা আজকের দিনটি আমাকে ছেড়ে দাও।” সকলে প্রস্তাবে রাজি হলো। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫) তিনি গোটা বাহিনীকে মোট ৩৮/৩৬ টি ভাগে একজন অফিসার নিয়োগ করেন। সেদিন তিনি মুসলিম বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যাস করেন যে, আরবরা পূর্বে তেমন আর কখনো দেখেনি।

     ইয়ারমুকে মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ অবস্থান গ্রহণের পর হযরত খালিদ মহিলাদের আহবান জানান এবং প্রথম বারের মত তাদের হাতে তরবারি দিয়ে নির্দেশ দেন, তোমরা মুসলিম মুজাহিদদের পেছনে অবস্থান গ্রহণ করবে। কাউকে পালিয়ে পেছনে সরে আসতে দেখলে তাকে এ তরবারি দিয়ে হত্যা করবে। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫)

    এই তোড়জোড়ের মধ্যে একজন মুসলিম মুজাহিদ হতাশ কন্ঠে বললোঃ রোমানদের সংখ্যা কত বেশী, আর আমাদের সংখ্যা কত কম। খালিদ তাকে বললেনঃ তোমার কথা ঠিক নয়। বরং একথা বল, রোমানরা কত কম, এবং মুসলমানরা কত বেশী –মানুষের সংখ্যা দ্বারা নয়; বরং বিজয়ের দ্বারা সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পরাজয়ের দ্বারা হ্রাস পায়। আল্লাহর কসম, যদি আমার ঘোড়ার ক্ষুর ভালো থাকতো আমি তাদের এ আধিক্যের পরোয়া করতাম না। (তারীখুল উম্মাহ আল –ইসলামিয়াহ ১/১৯৩) উল্লেখ্য যে, র্দীঘ ভ্রমণে হযরত খালিদের ঘোড়া ‘আসকার’ –এর ক্ষুর আহত হয়ে পড়েছিল।

    ইয়ারমুক যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে রোমান সেনাপতি ‘মাহান’ দূত মারফত জানালো যে, সে খালিদের সাথে সরাসরি কথা বলতে চায়। খালিদ রাজি হলেন। দু’বাহিনীর মধ্যবর্তী ময়দানে দু’সেনাপতি মুখোমুখি হলেন। রোমান সেনাপতি খালিদকে বললোঃ “আমরা জেনেছি, কঠোর শ্রম ও ক্ষুধা তোমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। তোমরা চাইলে তোমাদের প্রত্যেককে আমরা দশটি দীনার, এক প্রস্থ পোশাক ও কিছু খাদ্য দিতে পারি। বিনিময়ে তোমরা দেশে ফিরে যাবে। আগামী বছরও অনুরূপ জিনিস আমি তোমাদের কাছে পাঠাবো।” রোমান সেনাপতির এ কথায় যে –অপমান প্রচ্ছন্ন ছিল খালিদ তা অনুধাবন করলেন। তিনি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উপযুক্ত জবাবটা ছুঁড়ে মারলেন। বললেনঃ “ –ক্ষুধা আমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে আনেনি –যেমনটি তোমরা বলেছো। তবে আমরা একটি রক্তপায়ী জাতি। আমরা জেনেছি, রোমানদের রক্ত অপেক্ষা অধিক লোভনীয় ও পবিত্র রক্ত নাকি পৃথিবীতে আর নেই। তাই সেই রক্তের লোভে আমরা এসেছি।” কথাগুলি ছুঁড়ে দিয়েই মহাবীর খালিদ ঘোড়ার লাগাম ধরে টান দিলেন এবং সোজা নিজ বাহিনীতে ফিরে এসে ‘আল্লাহু আকবর, হুয়্যি রিয়াহাল জান্নাহ’ –ধ্বনি দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।

    রোমান বাহিনী এমন ভয়ংকররূপ অগ্রসর হলো যে, আরবরা এমনটি আর কখনো দেখেনি। মুসলিম বাহিনীর মধ্যভাগের দায়িত্বে ছিলেন ইকরিমা ইবন আবী জাহল ও কাকা ইবন আমর। খালিদ তাঁদের আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। তাঁরা দু’জন গানের পংক্তি আবৃত্তি করতে করতে শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলো। খালিদ তাঁর গোটা বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। খালিদ রোমান অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর মধ্যভাগে ঢুকে পড়লেন। তিনি যেদিকে গেলেন, রোমান বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লো। একাধারে একদিন ও এক রাত তুমুল লড়াই চললো। পরদিন সকালে খালিদকে দেখা গেল রোমান সেনাপতির মঞ্চের ওপর। তাবারীর মতে, এ যুদ্ধে রণক্ষেত্রে নিহতদের ছাড়াও পশ্চাৎদিকে পলায়নপর সৈনিকদের মধ্যে এক লাখ বিশ হাজার রোমান সৈন্য জর্দান নদীতে ডুবে মারা যায়।

    যুদ্ধ শেষ। পরদিন সকালে ইকরিমা ও তাঁর পুত্র আমর ইবন ইকরিমাকে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল। খালিদ ইকরিমার মাথা নিজের উরু ও আমরের মাথা পায়ের নলার ওপর রেখে, তাঁদের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন এবং গলায় ফোঁটা ফোঁটা পানি ঢালতে ঢালতে বলতে লাগলেনঃ ‘ইবনুল হানতামা’ অর্থাৎ উমার মনে করেছিলেন আমরা শাহাদাত বরণ করতে জানিনে। কক্ষণো নয়।’ এ যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। (তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ -১/১৯৩)

    খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ব্যক্তিত্ব রোমান বাহিনীকে কতটুকু প্রভাবিত করেছিল বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যায়। ইয়ারমুকের যুদ্ধ তখন চলছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রোমান বাহুনীর এক কম্যাণ্ডার, নাম ‘জারজাহ’ নিজ ছাউনী থেকে বেরিয়ে এল। তার উদ্দেশ্য খালিদের সাথে সরাসরি কথা বলা। খালিদ তাঁকে সময় ও সুযোগ দিলেন। জারজাহ বললোঃ “খালিদ, আমাকে একটি সত্যি কথা বলুন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মিথ্যা বলেন না। আল্লাহ কি আকাশ থেকে আপনাদের নবীকে এমন কোন তরবারি দান করেছেন যা তিনি আপনাকে দিয়েছেন এবং সেই তরবারি যাদেরই বিরুদ্ধে উত্তোলিত হয়েছে, তারা পরাজিত হয়েছে?

    খালিদঃ না।

    জারজাহঃ তাহলে আপনাকে ‘সাইফুল্লাহ’ –আল্লাহর তরবারি বলা হয় কেন?

    খালিদঃ আল্লাহ আমাদের মাঝে তাঁর রাসূল পাঠালেন। আমাদের কেউ তাঁকে বিশ্বাস করলো, কেউ করলো না। প্রথমে আমি ছিলাম শেষোক্ত দলে। অতঃপর আল্লাহ আমার অন্তর ঘুরিয়ে দেন। আমি তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনে তাঁর হাতে বাইয়াত করি। রাসূল (সা) আমার জন্য দু’আ করেন। আমাকে তিনি বলেনঃ তুমি আল্লাহর একটি তরবারি। এভাবে আমি হলাম ‘সাইফুল্লাহ’।

    জারজাহঃ কিসের দিকে আপনারা আহবান জানান?

    খালিদঃ আল্লাহর একত্ব ও ইসলামের দিকে।

    জারজাহঃ কিভাবে? আপনারা তো এগিয়ে আছেন।

    খালিদঃ আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে উঠেছি, বসেছি। আমরা দেখেছি তাঁর ম’জিযা ও অলৌকিক কর্মকাণ্ড। যা কিছু আমরা দেখেছি তা কেউ দেখলে, যা শুনেছি তা কেউ শুনলে, অবশ্যই তার উচিত সহজেই ইসলাম গ্রহণ করা। আর আপনারা যারা তাঁকে দেখেননি, তাঁর কথা শুনেননি, তারপরও অদৃশ্যের ওপর ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতিদান অধিকতর শ্রেষ্ঠ। যদি আপনারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন।”

    জারজাহ অশ্ব হাঁকিয়ে খালিদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেনঃ খালিদ, আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।

    জারজাহ ইসলাম গ্রহণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। এ দু’রাকাতই তার জীবনের প্রথম ও শেষ নামায। তারপর এ নও মুসলিম-রোমান শাহাদাতের বাসনা নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে চললেন রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। আল্লাহ পাক তার বাসনা পূর্ণ করলেন। তিনি শহীদ হলেন (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৯-৩০১)।

    ইয়ারমুকে রোমান বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের খবর শুনে হিরাক্লিয়াস হিমস নগরী পেছনে ফেলে পিছু হটে যান। যাবার সময় তিনি বলেছিলেন –‘সালামুন আলাইকা ইয়া সুরিয়া সালামান লা লিকাআ বা’দাহ’ –হে সিরিয়া, তোমাকে বিহায়ী সালাম, যে সালামের পর আর কোন সাক্ষাৎ নেই। ইয়ারমুকের পর হযরত খালিদ ‘হাদির’ জয় করেন।

    হাদির অভিযান শেষ করে খালিদ চললেন ‘কিন্নাসরীণ’ –এর দিকে। কিন্নাসরীনবাসীরা আগে ভাগেই মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কিল্লায় প্রবেশ করে দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। হযরত খালিদ তাদের লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘তোমরা যদি মেঘমালার ওপর আশ্রয় নাও আল্লাহ সেখানেও আমাকে উঠিয়ে নেবেন অথবা তোমাদের নামিয়ে নিয়ে আসবেন আমাদের কাছে।’ (তারিখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ-২/৪) কিন্নাসরীণের অধিবাসীরা হিমসবাসীদের পরিণতি চিন্তা করে খালিদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে।

    বাইতুল মাকদাস অবরোধ করা হয়েছে। এ অবরোধে মুসলিম বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসারদের মধ্যে খালিদও আছেন। বাইতুল মাকদাসের খৃষ্টান অধিবাসীরা কোন দিশা না পেয়ে সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তারা আবদার রেখেছে স্বয়ং আমীরুল মুমিনীন উমার নিজ হাতে সেই সন্ধিপত্রে সাক্ষর করবেন। তাদের আবদার রক্ষার জন্য খালিদ মদীনা থেকে সিরিয়া এসেছেন। তিনি সিরিয়ায় অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর অফিসারবৃন্দকে ‘জাবিয়া’ তলব করেছেন। অত্যন্ত জাঁকজমক পোশাক পরে খালিদ এসেছেন। খলীফার দৃষ্টিতে পড়তেই তিনি ঘোড়া থেকে নেমে খালিদের প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ করে বলেনঃ ‘এত শিগগির অভ্যাস পাল্টে ফেলেছো? খালিদ হাতিয়ার উচু করে ধরে বললেন, ‘তবে সৈনিক সুলভ অভ্যাস যায়নি।’ খলীফা বললেন, ‘তাহলে কোন দোষ নেই।’ হিজরী ১৭ সনে আবু উবাইদা ও খালিদ যৌথভাবে হিমসের বিদ্রোহ দমন করেন। আর সেই সাথে সমগ্র সিরিয়ায় শত শত বছরের রোমান শাসনের অবসান ঘটে।

    এতবড় সেনাপতিকেও খলীফা হযরত উমার রেহাই দেননি। তিনি খালিদকে সেনাপতির পদ থেকে সাধারণ সৈনিকের পদে নামিয়ে দেন। বরখাস্তের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য আছে। কারো মতে হযরত উমারের খিলাফতের পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর হিজরী ১৭ সনে তাঁকে অপসারণ করা হয়। আবার কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরই তাঁকে বরখাস্ত করেন, হযরত খালিদ তখন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।

    হযরত খালিদের অপসারণের ঘটনা বিভিন্ন জনে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ইয়ারমুকে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। এমন সময় মদীনা থেকে নতুন খলীফা উমারের (রা) দূত এমটি চিঠি নিয়ে রণাঙ্গনে উপস্থিত হলো। চিঠির বিষয়বস্তু দুইটি –আবু বকরের (রা) মৃত্যু সংবাদ এবং খালিদকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে আবু উবাইদার নিয়োগ। খালিদ চিঠিটি পাঠ করে আবু বকরের জন্য মাগফিরাত ও উমারের সাফল্য কামনা করে দু’আ করলেন। তারপর পত্রবাহককে অনুরোধ করলেন সে যেন পত্রের বিষয় কারো কাছে প্রকাশ না করে। এভাবে খালিদ আবু বকরের (রা) মৃত্যু সংবাদ ও উমারের নির্দেশ গোপন করে তার কমাণ্ড চালিয়ে অব্যশ্যম্ভাবী বিজয় ছিনিয়ে আনেন। তারপর আবু উবাইদার নিকট উপস্থিত হয়ে একজন সাধারণ সৈনিকের মত তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। আবু উবাইদা প্রথমে মনে করলেন, এ হয়তো রসিকতা। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলেন এ রসিকতা নয়; বরং বাস্তব ও সত্য। পোশাক খুলে আবু উবাইদার সামনে রাখলেন।

    উল্লেখিত ঘটনাটি কেউ কেউ এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ হযরত খালিদের ব্যয় কখনও সীমা অতিক্রম করে যেত। কবি-সাহিত্যিকদের তিনি মোটা অংকের অর্থ দান করতেন। কবি আশায়াস ইবন কায়েসকে দশ হাজার দিরহাম দান করেন। খলীফা উমার এ কথা অবগত হয়ে আবু উবাইদাকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন খালিদকে জিজ্ঞেস করেন কোন খাত থেকে এ অর্থ তিনি দান করেছেন? মুসলিম উম্মাহর অর্থ থেকে দিয়ে থাকলে খিয়ানাত বা বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করেছেন, আর নিজের অর্থ থেকে দিয়ে থাকলে অপব্যয় করেছেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবু উবাইদা খলীফার এ ফরমান লাভ করেন ইয়ারমুকের রণক্ষেত্রে। তিনি খালিদকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন নিজের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে দান করেছি। অতঃপর আবু উবাইদা তাকে খলীফার ফরমান পাঠ করে শোনান এবং সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্তের ইঙ্গিত হিসাবে খালিদের মাথা থেকে টুপি নামিয়ে নেন এবং পাগড়ি ঘাড়ের ওপর নামিয়ে দেন। খালিদ শুধু মন্তব্য করেন, আমি খলীফার ফরমান শুনেছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এখনও আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মানতে এবং খিদমাত অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। খলীফা তাঁকে মদীনায় তলব করেন। তিনি মদীনায় পৌঁছলে তাঁর সম্পদের কঠোর হিসাব গ্রহণ করা হয়; কিন্তু কোন অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। অতঃপর খলীফা উমার (রা) সর্বত্র ঘোষণা করে দেন, আমি খালিদকে আস্থাহীনতা, ক্রোধবশতঃ বা এ জাতীয় কোন কারণে অপসারণ করিনি। (ইবনুল আসীর-২/৪১৮)

    উল্লেখিত ঘটনা ছাড়াও খালিদের অপসারণের আরো কারণ ছিল। খালিদের সৈনিক স্বভাবে ছিল রুক্ষতা। প্রতিটি কাজে তিনি নিজের মর্জিমত চলতেন, খলীফার সাথে পরামর্শের প্রয়োজন মনে করতেন না। সেনাবাহিনীর আয়-ব্যয়ের হিসাবও খলীফার দরবারে নিয়ম মত পাঠাতেন না। ইরাক অভিযান শেষ করেই তিনি খলীফা আবু বকরের (রা) অনুমতি ছাড়াই হজ্জের উদ্দেশ্যে মককায় চলে যান। তাঁর এ কাজে হযরত আবু বকর (রা) ভীষণ বিরক্ত হন। খলীফা তাঁকে বার বার সতর্ক করেন। তিনি খলীফাকে জবাব দেন, আমাকে আমার মর্জিমত কাজ করার সুযোগ দিন, অন্যথায় আমি নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবো। খালিদের এসব কাজে আবু বকরের (রা) সময় থেকেই হযরত উমার (রা) অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি বার বার আবু বকরকে (রা) পরামর্শ দান করেন খালিদকে বরখাস্ত করার জন্য। আবু বকর (রা) প্রতিবারই জবাব দেন, আমি এমন তরবারিকে কোষবদ্ধ করতে পারিনা যাকে আল্লাহ কোষমুক্ত করেছেন। উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর খালিদকে সংশোধনের চেষ্টা করেন; কিন্তু ফলোদয় না হওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করেন।

    তাছাড়া তাঁকে অপসারণের পশ্চাতে তৃতীয় যে কারণটির কথা ইতিহাসে উল্লেখ আছে তা হলো, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে এ ধারণা ও বিশ্বাস জম্ম লাভ করে যে, ইসলামের বিজয় মূলতঃ খালিদের বাহুবলের ওপর নির্ভরশীল। এ ধরনের অমূলক ধারণা খলীফা উমারের মোটেই মনোপূত ছিল না। তিনি খালিদকে অপসারণ করে এ বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণ করেন।

    বিষয়টি যেভাবে এবং যেমন করেই ঘটুক না কেন, এ ক্ষেত্রে হযরত খালিদের ভূমিকা লক্ষ্যণীয় বিষয়। তিনি যে আনুগত্য নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ইতিহাসে তার কোন নজীর পাওয়া যাবে না। এমনটি করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন এ কারণে যে, তিনি বিশ্বাস করতেন সেনাপতি ও সাধারণ সৈনিক –উভয় অবস্থা সমান। সর্ব অবস্থায় আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং যে দ্বীনের প্রতি তিনি ঈমান এনেছেন, তাদের সকলের প্রতি দায়িত্ব পালন করা নিজের অপরিহার্য কর্তব্য বলে মনে করতেন। একজন অনুগত সেনাপতি এবং একজন অনুগত সাধারণ সৈনিক –এ দু’য়ের মধ্যে মূলতঃ কোন প্রভেদ তাঁর দৃষ্টিতে ছিল না। তাই তিনি সেনাপতির পদ ছেড়ে সাধারণ সৈনিক হিসেবে সমানভাবে কাজ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। আর একই কারণে আবু উবাইদার হাতে সেনাপতির দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার পর সাধারণ সৈনিকের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি বলতে পেরেছিলেনঃ ‘এই উম্মাতের আমীন বা পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি আবু উবাইদাকে তোমাদের আমীর নিয়োগ করা হয়েছে।’

    খলীফা হযরত উমার (রা) খালিদকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করার পর তাঁকে বিভিন্ন প্রদেশে ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ করেন। কিছুদিন পর খালিদ স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন এবং মদীনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। হিজরী ২১/২২ সনে কিছু দিন অসুস্থ থাকার পর মদীনায় ইনতিকাল করেন। অনেকের মতে তিনি হিমসে ইনতিকাল করেন; কিন্তু একথা সঠিক নয় বলে ধারণা হয়। কারণ, খলীফা হযরত উমার (রা) তাঁর জানাযায় শরিক হন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। (উসুদুল গাবা ২/৯৬, আল ইসাবা-১/৪১৫)

    হযরত খালিদের (রা) মৃত্যুর পর খলীফা হযরত উমার (রা) বলেছিলেনঃ ‘নারীরা খালিদের মত সন্তান প্রসবে অক্ষম হয়ে গেছে।’ খালিদের মৃত্যুর পর খলীফা অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে কেঁদেছিলেন। মানুষ পরে জেনেছিল, শুধু খলিদের বিয়োগ ব্যথায় তিনি এভাবে কাঁদেননি; বরং খালিদের অপসারণের কারণ দূরীভূত হওয়ায় তিনি তাঁকে আবার সেনাপতির পদে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। মৃত্যু তাঁর সেই ইচ্ছার প্রতিবন্ধক হওয়ায় তিনি এত কেঁদেছিলেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫)

    প্রথম থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত হযরত খালিদের জিহাদের ময়দানে অতিবাহিত হয়েছে। এ কারণে হযরত রাসূলে পাকের (সা) সুহবতে থাকার সুযোগ ও সময় খুব কম পেয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেনঃ ‘জিহাদের ব্যস্ততা কুরআনের বিরাট একটি অংশ শিক্ষা থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছে।’ (আল ইসাবা-১/৪১৫) তা সত্বেও সুহবতে নববীর ফয়েজ ও ইলমের সৌভাগ্য থেকে তিনি বঞ্চিত ছিলেন, তা নয়। রাসূলে পাকের (সা) ইনতিকালের পর মদীনার আলিম ও মুফতি সাহাবীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। তবে সৈনিক স্বভাবের কারণে ইফতা’র মসনদে কখনো তিনি বসেননি। তাঁর ফতোয়ার সংখ্যা দু’চারটির বেশী পাওয়া যায় না। (আ’লামুল মুওয়াক্কিয়ীন) তিনি মোট ১৮টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে দু’টি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম এবং একটি বুখারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

    একবার আম্মার বিন ইয়াসির (রা) ও তাঁর মধ্যে ঝগড়া হয়। খালিদ তাঁকে ভীষণ গালমন্দ করেন। আম্মারও রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট শিকায়েত করেন। সকল বৃত্তান্ত শুনে রাসূল (সা) মন্তব্য করেনঃ ‘যে আম্মারের সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে সে আল্লাহর সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে।’ খালিদের ওপর রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণীর এমন প্রতিক্রিয়া হলো যে, তিনি তক্ষুণি আম্মারের কাছে ছুটে যান এবং তাঁকে খুশী করেন। খালিদ নিজেই বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে ওঠার পর আম্মারের সন্তুষ্টি অর্জন করা ছাড়া আমার নিকট অধিক প্রিয় আর কোন জিনিস ছিল না। হযরত খালিদের হৃদয়ে রাসূলে পাকের (সা) প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা এত তীব্র ছিল যে, রাসূলুল্লাহর (সা) শানে কেউ কোন সামান্য অমার্জিত কথা বললে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। একবার রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কিছু স্বর্ণ এলো। তিনি তা নজদী সরদারদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। কুরাইশ ও আনসারদের কেউ কেউ এতে আপত্তি জানায়। এক ব্যক্তি বলে বসে, ‘মুহাম্মাদ আল্লাহকে ভয় করুন।’ রাসূল (সা) বলেনঃ ‘আমি আল্লাহর নাফরমানী করলে আল্লাহর ইতায়াত বা আনুগত্য করে কে?’ লোকটির এমন অমার্জিত কথায় খালিদ ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই। রাসূল (সা) তাঁকে শান্ত করেন। (বুখারী)

    হযরত খালিদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও গৌরবজনক অধ্যায় ‘জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ’ –আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। জীবনের বেশীর ভাগ সময় তাঁর রণক্ষেত্রে কেটেছে। তাঁর বীরত্বব্যঞ্জক কর্মকাণ্ড ও জিহাদের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কারণে হযরত রাসূলে পাকের পক্ষ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। প্রায় সোয়া শো যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। যেখানেই গেছেন বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন। তাঁর ওপর হযরত রাসূলে পাকের এতখানি আস্থা ছিল যে, তাঁর হাতে পতাকা এলে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে যেতেন। প্রচুর সমরাস্ত্র তিনি পৈতৃক বিষয় হিসেবে লাভ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সব কিছুই আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দেন। (তাবাকাত) তাঁর বন্ধু ও শত্রুরা তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেঃ ‘তিনি এমন ব্যক্তি যিনি নিজেও ঘুমান না, অন্যকেও ঘুমাতে দেন না।’ খালিদ নিজেই বলতেনঃ “এমন একটি রাত্রি যা আমি নব বধুর সাথে কাটাতে পারি, অথবা যে রাত্রে আমাকে একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয় –তা অপেক্ষা একটি প্রচণ্ড শীতের রাত্রে একটি মুহাজির দলের সাথে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালাই, তা আমার নিকট অধিক প্রিয়।”

    মৃত্যুশয্যায় একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি শতাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, আমার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তরবারি, তীর অথবা বর্শার দু’একটি আঘাত রয়েছে। আর আজ আমি জ্বরাগ্রস্ত উটের মত বিছানায় পা দাপিয়ে মৃত্যুবরণ করছি।” কথাগুলি তিনি যখন বলছিলেন তখন তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫-৩০৬, উসুদুল গাবা-২/৯৫)

    মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি খলীফা উমারের (রা) অনুকূলে অসীয়াত করে যান। সেই পরিত্যক্ত সম্পত্তি তাঁর ঘোড়াটি ও কিছু যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবে জীবদ্দশায় তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তু-দু’টি মরণের পরও আল্লাহর রাস্তায় অয়াকফ করে যান।

    হযরত রাসূলে করীম (সা) নানা প্রসঙ্গে একাধিকবার তাঁর প্রশংসা করেছেন। মক্কা বিজয়ের সময় একদিন কিছু দূরে খালিদকে দেখা গেল। রাসূল (সা) আবু হুরাইরাকে (রা) বললেন, দেখতো কে? তিনি বললেন, খালিদ। রাসূল (সা) বললেন, আল্লাহর এ বান্দাটি কতই না ভালো। একবার তিনি সাহাবীদের বলেন, খালিদকে তোমরা কষ্ট দেবে না। কারণ, সে কাফিরদের বিরুদ্ধে চালিত আল্লাহর তরবারি।

    একবার রাসূল (সা) উমারকে (রা) পাঠালেন যাকাত আদায়ের জন্য। ইবন জামীল, খালিদ ও আব্বাস –এ তিনজন যাকাত দিতে অস্বীকার করলো। রাসূল (সা) একথা অবগত হয়ে বললেনঃ ইবন জামীল ছিল দরিদ্র, আল্লাহ তাকে সম্পদশালী করেছেন। এ তার প্রতিদান। তবে খালিদের প্রতি তোমরা বাড়াবাড়ি করেছো। সে তার সকল যুদ্ধাস্ত্র আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছে। তার ওপর যাকাত হয় কেমন করে? আর আব্বাস?তার দায়িত্ব আমার ওপর। তোমাদের কি জানা নেই চাচা পিতৃস্থানীয়? (আবু দাউদ-১/১৬৩)

    হযরত খালিদ (রা) কেবল একজন সৈনিকই ছিলেন না, তিনি একজন দক্ষ দা’য়ী-ই-ইসলাম –ইসলামের দাওয়াত দানকারীও ছিলেন। বনী জুজাইমা ও মালিক ইবন নুওয়াইরার ব্যাপারে তরিৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে যে ক্ষতি হয় তা লক্ষ্য করে রাসূল (সা) পরবর্তীতে দায়িত্ব দিয়ে কোথাও পাঠানোর সময় তাঁকে উপদেশ দেন –‘শুধু ইসলামের দাওয়াত দেবে, তলোয়ার ওঠাবে না।’ তেমনিভাবে ইয়ামনে পাঠানোর সময়ও নির্দেশ দেন, ‘যুদ্ধের সূচনা যেন তোমার পক্ষ থেকে না হয়।, এ হিদায়াত লাভের পর যত যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন কোথাও কোন প্রকার বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে জানা যায় না। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পরেও তিনি যথাযথভাবে দা’য়ীর দায়িত্ব পালন করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা) ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য চতুর্দিকে যে বিভিন্ন মিশন পাঠান, তার কয়েকটির দায়িত্ব খালিদ পালন করেন। বনী জুজাইমা ও বনী আবদিল মাদ্দান তাঁরই চেষ্টায় ইসলাম গ্রহন করে। ইয়ামনের দাওয়াতী কাজে তিনি হযরত আলীর (রা) সহযোগী ছিলেন। তাঁরই চেষ্টায় ভণ্ড নবী তুলাইহা আসাদীর সহযোগী বনু হাওয়াযিন, বনু সুলাইম, বনু আমের প্রভৃতি গোত্র পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে। এছাড়াও অসংখ্য লোক বিভিন্ন সময় তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করে। প্রতিটি যুদ্ধ শুরুর আগে ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষকে সব সময় তিনি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে প্রচণ্ড যুদ্ধের মাঝেও তিনি সফল দায়ীর ভূমিকা পালিন করেছেন। ইয়ারমুকের রোমান সৈনিক ‘জারজাহ’ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

    সংক্ষিপ্ত কোন প্রবন্ধে খালিদের জীবনের সব কথা তুলে ধরা যাবে না। আমীরুল মু’মিনীন উমার (রা) খালিদের মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে যে –কথাগুলি বলেছিলেন, আমরাও সেই কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করছি, ‘রাহেমাল্লাহ আবা সুলাইমান, মাইনদাল্লাহ খায়রুন মিম্মা কানা ফীহিল্লা, লাকাদ আশা হামীদান ওয়া মাতা সা’ঈদান –আল্লাহ আবু সুলাইমান খালিদের ওপর রহম করুন। তিনি যে অবস্থায় ছিলেন আল্লাহর কাছে তার থেকে উত্তম কিছু নেই। তিনি জীবনে প্রশংসিত এবং মরণে সৌভাগ্যবান।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৮)

  • আমর ইবনুল আস (রা)

    আমর ইবনুল আস (রা)

    আমর নাম, আবু আবদিল্লাহ ও আবু মহাম্মাদ কুনিয়াত। পিতা আস ও মাতা নাবিগা। তাঁর বংশের উর্ধপুরুষ কা’ব ইবন লুই-এর মাধ্যমে রসূলুল্লাহর (সা) নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে।

    জাহিলী যুগেই আমর ইবনুল আসের খান্দান-‘বনু সাহম’ সম্ভ্রান্ত খান্দান হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। কুরাইশদের ঝগড়া-বিবাদের সালিশ-মিমাংসার দায়িত্ব এই খান্দানের ওপর অর্পিত হত। তাঁর জম্ম ও শৈশবকাল সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে পর্যন্ত তিনি ছিলেন কট্টর ইসলাম-দুশমন। কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে একাত্ম হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতায় তাঁর ছিল দারুণ উৎসাহ।

    বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহর (সা) চরম শত্রু কুরাইশদের তিন প্রধান পুরুষের একজন ছিলেন তিনি। যাদের বুরুদ্ধে শেকায়েত করে রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর কাছে দু’আ করতেন এবং আল্লাহ তার জবাবে এ আয়াত নাযিল করেনঃ “লাইসা লাকা মিনাল আমরে শাইয়্যুন, আও ইয়াতুবা আলাইহিম আও ইউ ’আজ্জিবাহুম, ফাইন্নাহুম যালিমুন।” (আলে ইমরান-১২৮)- “কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন অধিকার তোমার নেই। আল্লাহ তাদের প্রতি সদয় হয়ে ক্ষমা করে দিতে পারেন অথবা শাস্তিও দিতে পারেন। কারণ, তারা যালিম-অত্যাচারী।” রাসূলুল্লাহ বুঝতে পারলেন তাদের ওপর বদদু’আ করতে নিষেধ করা হচ্ছে। তিনি বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেন। এই তিন জনের একজন হলেন পরবর্তীকালে ইসলামের মহা সেনা নায়ক, আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ র্ধূত কূটনীতিক, মিসরবাসীর মুক্তি দাতা হযরত আমর ইবনুল আস (রা)। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৬১৪)

    মুসলমানদের যে প্রথম দলটি হাবশায় যায়, তার সবচেয়ে উৎসাহী সদস্য ছিলেন এই আমর ইবনুল আস। তিনি হাবশায় রাজা ও রাজদরবারে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে কথা বলেন এবং মুসলমানদের হাবশা থেকে বহিস্কারের ব্যাপারে তাদেরকে স্বমতে আনার সব রকম চেষ্টা চালান। বাদশার দরবারে মুসলমানদের বিরুদ্ধে র্ধ্মত্যাগের অভিযোগ উত্থাপন করে জ্বালাময়ী ভাষণও দেন। কিন্তু তাঁর সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

    খন্দকের যুদ্ধে আরব উপদ্বীপের প্রায় সকল গোত্র কুরাইশদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে মুসলমানদের সমুলে বিনাশ করার জন্য মদীনার উপকণ্ঠে হাজির হন। এখানেও আমর ছিলেন কুরাইশ পক্ষের এক প্রধান পুরুষ। খন্দকের পর কোথা থেকে কি যেন ঘটে গেল। এমন যে গোঁড়া ইসলাম-দুশমন তার মধ্যেও ভাবান্তর সৃষ্টি হল। ইসলামের দাওয়াত ও বাণী সম্পর্কে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, “এই চিন্তা-ভাবনার ফলে ইসলামের মূলকথা ধীরে ধীরে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। আস্তে আস্তে আমি মুসলমানদের বিরোধিতা থেকে দূরে সরে যেতে লাগলাম। কুরাইশ নেতারা তা বুঝতে পেরে আমার কাছে একজন লোক পাঠালো। সে আমার সাথে তর্ক শুরু করলো। আমি তাকে বললাম, ‘বলতো, সত্যের ওপর আমরা, না পারসিক ও রোমানরা?’ সে বললো, ‘আমরা’, জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুখ-সম্পদ ও ঐশ্বর্যের অধিকারী তারা, না আমরা?’ সে বললো, তারা। আমি বললাম, ‘এ জীবনের পরে যদি আর কোন জীবন না থাকে তাহলে আমাদের এ সত্যাশ্রয়ী জীবন কী কাজে আসবে? এ দুনিয়াতেই আমরা মিথ্যাশ্রয়ীদের তুলনায় দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় আছি, আর পরলোকেও আমাদের পুরস্কার লাভের কোন সাম্ভাবনা নেই। এ কারণে মুহাম্মাদের (সা) এ শিক্ষা- মরণের পর আর একটি জগত হবে, সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মের ফল লাভ করবে-অত্যন্ত সঠিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।” খন্দকের পর তার মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) সাফল্য সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, বিজয়ী হওয়ার জন্যই ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে। এ বিশ্বাসই তাঁকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করে।

    তিনি বলেন, খন্দক যুদ্ধ থেকে মক্কায় ফিরে আমি আমার নিকটতম আত্মীয় বন্ধুদের ডেকে বললাম, তোমরা জেনে রাখ মুহাম্মাদের কথা সকল কথার ওপর বিজয়ী হবে-এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আমার একটি সুচিন্তিত মতামত আছে, বিষয়টি তোমরা কিভাবে নেবে তা আমি জানতে চাই। তিনি বললেন, চলো আমরা নাজাশীর কাছে গিয়ে অবস্থান করতে থাকি। মুহাম্মাদ যদি আমাদের ওপর বিজয়ী হয় আমরা নাজাশীর কাছেই থেকে যাব। আর যদি আমাদের কাওম বিজয়ী হয় তাহলে তো আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। সে ক্ষেত্রে আমাদের সাথে নাজাশীর আচরণ উত্তমই হবে। আমার এ মতামত সকলে মেনে নিল। অতঃপর আমরা নাজাশীর জন্য কি উপহার নিয়ে যাওয়া যায় তা আলোচনা করলাম। উপহার দেওয়ার মত সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ছিল আমাদের এখানকার চামড়া। আমরা বেশ কিছু চামড়া নিয়ে হাবশায় পৌঁছলাম।

    আমরা নাজাশীর দরবারে যাচ্ছি, এমন সময় আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামারীও সেখানে পৌঁছেন। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) বিশেষ কোন প্রয়োজনে তাঁকে মদীনা থেকে হযরত জাফর ইবন আবী তালিবের কাছে পাঠিয়েছেন। জাফর ইবন আবী তালিব তখনও হাবশায় অবস্থান করছিলেন। কিছুক্ষণ পর আমর নাজাশীর দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা নাজাশীকে অনুরোধ করবো আমরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য। আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে যদি তিনি আমরকে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা তাকে হত্যা করবো। এতে কুরাইশরা বুঝবে আমরা মুহাম্মাদের দূতকে হত্যা করে বদলা নিয়েছি। এ সিদ্ধান্তের পর আমি নাজাশীর দরবারে উপস্থিত হলাম। নিয়ম মাফিক তাঁকে কুর্ণিশ করে আমাদের উপহার সামগ্রী তাঁর সামনে পেশ করলাম। উপহারগুলি তাঁর খুবই মনোপূত হল।

    অতঃপর আমি আরজ করলাম, এখনই যে ব্যক্তি আপনার দরবার থেকে বেরিয়ে গেল সে আমাদের ঘোরতর শত্রুর দূত। আপনি যদি তাকে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা তাকে হত্যা করবো। আমার এ আবেদনে নাজাশী ক্রোধে ফেটে পড়লেন। অবস্থা বেগতিক দেখে বিনীতভাবে বললাম, আমার এ আবেদন আপনাকে এতখানি উত্তেজিত করবে জানতে পেলে আমি এ আবেদন জানাতাম না। নাজাশী বললেন, তুমি কি চাও, যে ব্যক্তির কাছে আসেন ‘নামুসে আকবর’ যিনি মূসার (আ) কাছেও এসেছেন, তাঁর দূতকে আমি হত্যার জন্য তোমাদের হাতে তুলে দিই? আমি বললাম, সত্যিই কি তিনি এমন ব্যক্তি? তিনি বললেন, আমর, তোমাদের অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক। আমার কথা শোন, তোমরা তাঁর আনুগত্য কর। আল্লাহর কসম, তিনিই সত্যপন্থী। তিনি তাঁর বিরোধীদের ওপর বিজয়ী হবেন, যেমন হয়েছিলেন মূসা ফিরআউন ও তার লোক লস্করদের ওপর। আমি বললাম, আপনি তাহলে তার পক্ষে আমার বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ নিন। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং আমি তাঁর হাতে ইসলামের বাইয়াত গ্রহণ করলাম। আমার সাথীদের কাছে আমি ফিরে গেলাম; কিন্তু তখন আমার চিন্তাধারায় একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। আমি তাদের কাছে কিছুই প্রকাশ করলাম না।

    আমি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াতের উদ্দেশ্যে হাবশা থেকে রওয়ানা হলাম। পথে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সাথে দেখা। তিনিও মক্কা থেকে মদীনার দিকে যাচ্ছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আবু সুলাইমান, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, মারাত্মক পরীক্ষার সম্মুখীন। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস এ ব্যক্তি নবী। এখন খুব তাড়াতাড়ি ইসলাম কবুল করা উচিত। এই দ্বিধা-সংশয় আর কত দিন ! বললাম, আমিওতো এই উদ্দেশ্যে চলেছি। অতঃপর আমরা দু’জন এক সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হলাম। আমাদের দু’জনকে দেখেই রাসূলুল্লাহর (সা) চেহরা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘লাকাদ রামাতকুম মাককাহ বিফালাজাতি আকবাদিহা-মক্কা তার কলিজার সুতীক্ষ্ণ বা মূল্যবান অংশসমূহ তোমাদের প্রতি ছুড়ে মারেছে।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল)

    প্রথমে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত হন। তারপর আমি একটু নিকটে এসে আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমিও বাইয়াত হবো। তবে আমার পূর্বের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিতে হবে। তিনি বললেন, আমর, বাইয়াত কর। ইসলাম পূর্বের সকল পাপ মুছে দেয়, হিজরাতও পূর্বের সকল অপরাধ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আমি রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করে ফিরে গেলাম। এটা সপ্তম হিজরীর প্রথম দিকে খাইবার বিজয়ের ছয় মাস পূর্বের ঘটনা। (সীরাতু ইবন হিশাম, ২য়, ২৭৬-২৭৮, আল-ফাতহুর রাব্বানী খণ্ড-২২, মুসনাদে ইমাম আহামাদ, হায়াতুস সাহাবা-১/১৫৭-৬০)

    ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মক্কায় ফিরে যান। কিছুদিন মক্কায় অবস্থানের পর আবার মদীনায় হিজরাত করেন। আমর ইবনুল আস ছিলেন ইসলাম ও কুফর উভয় অবস্থায় চরমপন্থী। পূর্বে যেমন ইসলামের মূলোৎপাটনে ছিলেন বদ্ধপরিকর তেমনি ছিলেন ইসলাম গ্রহণের পর কুফর ও শিরকের ব্যাপারেও। তিনি বলেন, “আমার কাফির অবস্থায় আমি ছিলাম রাসূলুল্লাহর (সা) সবচেয়ে বড় দুশমন। তখন মারা গেলে জাহান্নামই হত আমার ঠিকানা। আর মুসলমান হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও আমার চোখের আড়াল হতে পারতেন না।” তাঁর ইসলাম গ্রহণের পরও একাধিক যুদ্ধে সংঘটিত হয়; কিন্তু তাঁর অংশ গ্রহণের বিষয়ে বিস্তারিত তেমন কিছু জানা যায় না। তবে একাধিক ক্ষুদ্র অভিযান যে তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয় সেকথা ইতিহাসে জানা যায়।

    ইবন সাদ বলেন, মক্কা বিজয়ের পর বনু কাদা’আর কিছু লোক সংঘবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করে। রাসূল (সা) তিনশ’ মুজাহিদের একটি বাহিনী আবু উবাইদার নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে পাঠান। রাসূল (সা) মদীনা থেকে তাঁর সাহায্যের জন্য দুশ’ মুজাহিদের একটি বাহিনী আবু উবাইদার নেতৃত্বে পাঠান। এই দলে আবু বকর, উমার প্রমুখের মত বিশিষ্ট সাহাবীও ছিলেন। তাঁরা সকলে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে শত্রুদের পরাজিত করেন। ইতিহাসে এ অভিযান ‘গাযওয়া জাতুস সালাসিল’ নামে পরিচিত।

    আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ গোত্র মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করে। কোন কোন গোত্র ইসলাম কবুল করলেও যুগ যুগ ধরে লালিত কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না। মূর্তি ও মূর্তি উপাসনার কেন্দ্র ভেংগে ফেলতে ভয় পাচ্ছিল। তাই রাসূল (সা) এসব মূর্তি ভাংগার জন্য কয়েকটি বাহিনী বিভিন্ন দিকে পাঠান। যাতে নও মুসলিমদের অন্তর থেকে মূর্তিপুজার কেন্দ্রের নাম ছিল ‘সু’আ’। এই কেন্দ্রটির কাছে পৌঁছলে স্থানীয় লোকেরা তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পেরে বললো, আপনি এই কেন্দ্র ধ্বংস করতে পারবেন না। তার আত্মরক্ষা সে নিজেই করবে। আমর বললেন, তোমারা এখনও এমন ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কুসংস্কারে হাবুডুবু খাচ্ছ? যার দেখা ও শোনার ক্ষমতা নেই সে কিভাবে আত্মরক্ষা করবে? তারপর তিনি কেন্দ্রটি নিশ্চহ্ন করে দেন। এদৃশ্য দেখে স্থানীয় জনসাধারণের ঈমান মজবুত হয়ে যায়।

    মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা) আরব উপদ্বীপের আশে-পাশের রাজা-বাদশাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করে চিঠিটি নিয়ে যান। উমানের শাসক চিঠি পেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (সা) আমরকে উমানের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহর ওফাত পযর্ন্ত আমর উমানেই অবস্থান করেন। (ফুতুহুল বুলদান)

    হযরত আবু বকরের (রা) খলীফা হওয়ার পর আরব উপদ্বীপে ভণ্ড নবী ও যাকাত অস্বীকারকারীদের ফিতনা ও বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমর ইবনুল আস তখন উমানেই। খলীফার নির্দেশে তিনি উমান থেকে বাহরাইনের পথে অগ্রসর হন। পথে বনি আমরের নেতা ‘কুররাহ বিন হুরায়রার অতিথি হন। কুররাহ তাঁকে যথেষ্ট সমাদর করেন। বিদায়ের সময় তিনি আমরকে বলেন, যদি যাকাত আদায় করা হয় তাহলে আরববাসী কারও ইমারাত বা নেতৃত্ব মেনে নেবে না। যাকাত আদায় স্থগিত হলে তারা অনুগত ও বাধ্য থাকবে। এ কারণে যাকাত রহিত করা উচিত।

    আমর বললেন, কুররাহ, তুমি কি ইসলাম ত্যাগ করেছ? আমাকে আরববাসীর ভয় দেখাচ্ছো?আল্লাহর কসম, এমন লোকদের আমি ঘোড়ার পায়ে পিষে ফেলবো। পরবর্তীকালে কুররাহ অন্য বিদ্রোহীদের সাথে বন্দী হয়ে মদীনায় আসেন এবং আমর তাঁকে মুক্ত করেন। উমান থেকে আমর মদীনায় পৌঁছলে খালীফা আবুবকর (রা) তাঁকে বনু কাদা’আর বিদ্রোহ দমনের জন্য পাঠান। তাঁর চেষ্টায় বনু কাদা’আহ আবার ইসলাম ফিরে আসে। বিদ্রোহ দমিত হলে তিনি আবার উমানে ফিরে যান।

    খলীফা হযরত আবু বকর (রা) হিজরী ১৩ সনে সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠান। তিনি আমরকে লিখলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে উমানের ওয়ালী নিয়োগ করেছিলেন, তাই তোমাকে আমি দ্বিতীয়বার সেখানে পাঠিয়েছিলাম। এখন তোমার ওপর আমি এমন দায়িত্ব অপর্ণ করতে চাই যা তোমার চাই যা তোমার ইহ-পরকালের জন্য কল্যাণকর হবে। জবাবে আমর লিখলেন, আমি তো আল্লাহর একটি তীর। আর আপনি একজন দক্ষ তীরন্দায। যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে এ তীর নিক্ষেপ করার অধিকার আপনার আছে। খলীফা তাঁকে উমান থেকে সরিয়ে ফিলিস্তীন সেক্টারে নিয়োগ করেন।

    মুসলিম বাহিনী চতুর্দিক থেকে সিরিয়ায় চালালো। রোমান সম্রাট মুসলিম বাহিনীর মুকাবিলার জন্য ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠালো। ভিন্ন ভিন্ন রোমান বাহিনী অবশেষে আজনাদাইনে সমবেত হয়। আমর ইবনুল আস ফিলিস্তীন থেকে আজনাদাইনের দিকে অগ্রসর হলেন। এদিকে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবায়দা বসরা অভিযান শেষ করে আমরের সাহায্যের জন্য আজনাদাইনে পৌঁছলেন। হিজরী ১৩ সনে মুসলিম ও রোমান বাহিনীর মধ্যে এই আজনাদাইনে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। রোমান সেনাপতি নিহত হয় এবং তারা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। আজনাদাইনে রোমান সেনাপতি একজন আরব গুপ্তচরকে মুসলিম বাহিনীর খবর সংগ্রহের জন্য পাঠায়। সে মুসলিম সেনা ছাউনী ঘুরে ফিরে দেখে য়াওয়ার পর রোমান সেনাপতি তাকে জিজ্ঞেস করে, কি খবর নিয়ে এলে?সে সত্য কথাটি প্রকাশ করে দেয়। সে বলেঃ এই লোকগুলি ইবাদতের মধ্যে রাত্রি অতিবাহিত করে এবং দিনে রণক্ষেত্রে ঘোড় সওয়ার। তাদের শাহজাদাও যদি কোন অপরাধ করে, তারও ওপর শরীয়াতের বিধান কার্যকর করা হয়। এ কথা শুনে সেনাপতি মন্তব্য করে, সত্যিই যদি তারা এমন গুণাবলীর অধিকারী হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়ে মাটিতে পুঁতে যাওয়া অধিক শ্রেয়।

    দিমাশক অভিযানেও আমর তাঁর দুই সংগী খালিদ ও আবু উবাইদার সাথে অংশ গ্রহণ করেন এবং দিমাশকের ‘তুমা’ ফটক অবরোধের দায়িত্ব পালন করেন। দিমাশকের পর ‘ফাহল’ অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানেও তিনি মুসলিম বাহিনীর একটি অংশের সফল নেতৃত্ব দান করেন।

    মুসলিম বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণে রোমান বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে থাকে। অবশেষে রোমান সম্রাটের নির্দেশে বিপর্যস্ত রোমান বাহিনী নতুন ভাবে সংগঠিত হয়ে দু’লাখ সদস্যের এক বিশাল বাহিনীতে পরিণত হয় এবং মুসলিম বাহিনীকে চুড়ান্ত ভাবে প্রতিরোধের জন্য ‘ইয়ারমুক’ নামক স্থানে সমবেত হয়। খলিদ, আমর ও শুরাহবীল ইবন হাসানার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীও ইয়ারমুকে উপস্থিত হয়। তবে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী অপেক্ষা রোমান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা চারগুণ বেশী ছিল। ইয়ারমুকের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আমর ইবনুল আস অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। রোমান বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। সমগ্র সিরিয়ায় ইসলামের ঝাণ্ডা সমুন্নত হয়।

    ইয়ারমুকের পূর্বেই আমর ইবনুল আস ফিলিস্তীনের কিছু অঞ্চলের বিজয় অভিযান শেষ করেছিলেন। এখন ইয়ারমুকের পর তিনি ফিলিস্তীনের সবচেয়ে বড় শহর ‘ঈলিয়া’ বা বাইতুল মাকদাস অভিযানে মনোযোগী হন। তিনি বাইতুল মাকদাস অবরোধ করেন। আবু উবাইদাও তাঁকে সাহায্য করেন। কোন রকম রক্তক্ষয় ছাড়াই তিনি বাইতুল মাকদাস জয় করেন। ঈলিয়াবাসীদের দাবী অনুযায়ী খালীফা উমার (রা) মদীনা থেকে বাইতুল মাকদাস উপস্থিত হন এবং তাদের সাথে এক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন। এভাবে এই প্রথমবারের মত এই গৌরবময় শহরটি মুসলমানদের অধিকারে আসে।

    বাইতুল মাকদাস বিজয়ের বছরই সমগ্র সিরিয়া, ইরাক ও মিসরে মহামারি আকারে তাউন বা প্লেগ দেখা দেয়। হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর শিকার হয়। আমর ইবনুল আস সেনাপতি আবু উবাইদাকে সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে কোন নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তাকদীরে গভীর বিশ্বাসী আবু উবাইদা সে পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর জীবনও শেষ পযর্ন্ত প্লেগ কেড়ে নেয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আমরকে সেনাপতি নিয়োগ করে যান। আমর ইবনুল আস প্লেগ আক্রান্ত স্থান থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেন।

    সিরিয়া বিজয় সমাপ্তির পর আমর মিসরে অভিযান পরিচালনার জন্য খলীফা উমারের অনুমতি প্রার্থনা করেন। জাহিলী যুগে ব্যবসা উপলক্ষে আমর মিসরে আসা যাওয়া করতেন। এ কারণে মিসর সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ছিল। খলীফা প্রথমতঃ তার প্রার্থনা মঞ্জুর করতে ইতস্ততঃ করলেও শেষ পর্যন্ত অনুমতি দান করেন। আমর তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে মিসর রওয়ানা হলে খালীফা উমার তাঁকে সাহায্যের জন্য যুবাইর ইবনুল আওয়ামের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান।

    হযরত আমর ইবনুল আস বাবুল ইউন, আরীশ, আইনু শামস বা ফুসতাত প্রভৃতি যুদ্ধে একের পর এক জয়লাভ করেন। অতঃপর তিনি ইসকান্দারিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য খলীফা উমারের অনুমতি চেয়ে পাঠান। অনুমতি লাভ করে বিজিত অঞ্চলের দায়িত্ব হযরত খারিজা ইবন হুজাফার ওপর ন্যস্ত করে তিনি ইসকান্দারিয়া অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ইস্কান্দারিয়া অবরোধ করলেন। মাকুকাসের বাহিনী এবং শহরবাসী সুরক্ষিত কিল্লায় আশ্রয় নিয়ে প্রতিরোধ সৃষ্টি করলো। তার মাঝে মাঝে কিল্লার বাইরে এসে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে আবার কিল্লায় ফিরে যেত। এ অবস্থায় প্রায় দু’বছর কেটে গেল। খলীফা উমার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি আমরকে লিখলেন, তোমরা দু’বছর ধরে অবরোধ করে বসে আছ। এখনও কোন ফলাফল প্রকাশ পেল না। মনে হচ্ছে, রোমানদের মত তোরাও ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে বসেছো। আমার এ চিঠি তোমার হাতে এখন পৌঁছবে তখনই লোকদের ডেকে তাদের সামনে জিহাদ সম্পর্কে ভাষণ দেবে এবং আমার এ চিঠি তাদের পাঠ করে শুনাবে। তারপর জুম’আর দিনে শত্রু বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাবে।

    খলীফার নির্দেশমত তিনি শত্রু বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালান এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইস্কান্দারিয়া মুসলিম বাহিনীর অধিকারে আসে। খলীফাকে এ বিজয়ের খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য মুয়াবিয়া ইবন খাদীজকে মদীনায় পাঠান। মুয়াবিয়া যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন অপরাহ্ন। তিনি সোজা মসজিদে নববীতে চলে যান। খলীফা খবর পেয়ে সাথে সাথে তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি আমার বাড়ীতে না এসে সোজা মসজিদে গেলে কেন?মুয়াবিয়া বললেন, আমি ধারণা করেছিলাম, এখন আপনার বিশ্রামের সময়। খলীফা বললেন, আমি দিনে ঘুমিয়ে প্রজাদের ধ্বংস করতে পারি?

    ইসকান্দারিয়া বিজয়ের পর তিনি বারকা, যুওয়াইলা, তারাবিলস, আল-মাগরিব, সাবরা প্রভৃতি অঞ্চল একের পর এক জয় করেন। তারাবিলস বিজয়ের পর তিনি দূত মারফত খলীফাকে সুসংবাদ পাঠান। তিউনিসিয়া, মরক্কো, আলজিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চল সেখান থেকে মাত্র নয় দিনের দূরত্বে। তিনি খলীফার নিকট এ সকল অঞ্চলে অভিযান পরিচালনায় অনুমতি চাইলেন। বিজিত অঞ্চলের শান্তি-শৃংখলার কথা চিন্তা করে খলীফা পশ্চিম আফ্রিকার অভিযান স্থগিত রাখার নির্দেশ দিলেন। আমর ইবনুল আসের আফ্রিকা অভিযান এখানেই থেমে গেল।

    মিসর বিজয় শেষ হওয়ার পর খলীফা উমার (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। এর অল্প কিছু দিন পর হযরত উমার শহীদ হন। খলীফা উসমানও আমরকে তাঁর পূর্বে পদে বহাল রাখেন। এই সময় রোমান উস্কানীতে ইসকান্দারিয়াবাসীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আমর ইবনুল আস অত্যন্ত কঠোর হস্তে এ বিদ্রোহ দমন করেন এবং ভবিষ্যতে বিদ্রোহের আশংকায় ইসকান্দারিয়া শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীন ভেঙ্গে ফেলেন।

    হিজরী ২৬ সনে হযরত উসমান (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করেন। তাবারী বলেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া খলীফা উসমান কাকেও অপসারণ করতেন না। তাঁর অপসারণের কারণ সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, মিসর অত্যন্ত উর্বর দেশ হওয়া সত্বেও আমরের সময়ে আশানুরূপ রাজস্ব আদায় হতো না। হযরত উমারের যুগ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ছিল। এ বিষয়ে খলীফা উমার (রা) তাঁকে একটি পত্রও লিখেছিলেন। হযরত উসমানের সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ছিল। হযরত উসমান (রা) এ ব্যাপারে তাঁকে একটি পত্র লিখেন আমর জবাব দেনঃ ‘গাভী এর থেকে বেশী দুধ দিতে সক্ষম নয়।’ এই জবাবের পর হযরত উসমান (রা) রাজস্বের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে তা আবদুল্লাহ ইবনে সা’দের হাতে ন্যস্ত করেন। এই ঘটনার পর থেকে আমর ও আবদুল্লাহর মধ্যে মত বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং মিসরের শাসন ব্যবস্থা অনেকটা অচল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা) আমরকে অপসারণ করে আবদুল্লাহকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। (তাবারী, ইবনুল আসীর) অন্য একটি বর্ণনা মতে ইসকান্দারিয়ার বিদ্রোহের পূর্বেই আমরকে অপসারণ করা হয়। বিদ্রোহ দেখা দিলে খলীফা উসমান তাঁকে বিদ্রোহ দমনে নিয়োগ করেন। বিদ্রোহ নির্মূলের পর খলীফা তাঁকে কেবল প্রতিরক্ষা বিষয়ক দায়িত্ব নিয়োগ করতে চান। তিনি খলীফার এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বলেন, “আমি শিং ধরবো, আর সে দুধ দুইবে” এমন হতে পারে না। এই বর্ণনা মতে হিজরী ২৫ সনে তাঁর অপসারণ করা হয়।

    হযরত আমর ইবনুল আস মিসর থেকে অপসারিত হয়ে মদীনায় চলে আসেন। হযরত উসমানের ওপর কিছুটা অসন্তুষ্ট হন। মদীনায় আসার পর খলীফার সাথে তাঁর কথোপকথন হয় এবং তাতে এ অসন্তুষ্টির ভাব ফুটে ওঠে। খলীফার সাথে যখন তাঁর কথা হয়, তখন মিসর প্রেরিত রাজস্ব খলীফার নিকট পৌঁছে গেছে। সে রাজস্ব আমর ইবনুল আস প্রেরিত রাজস্ব থেকে বেশী ছিল। খলীফা বললেন, ‘দেখ, গাভী বেশী দুধ দিয়েছে।’ আমর সাথে সাথে জবাব দেন, ‘হ্যাঁ তবে বাচ্চা অভুক্ত থাকবে।’ এ ঘটনার পরও হযরত আমর ইবনুল আস (রা) পূর্বের মতই খলীফা উসমানের হিতাকাঙ্খী ও বিশ্বস্ত ছিলেন। মিসর থেকে বিদ্রোহীরা যখন মদীনায় পৌঁছে তখন হযরত উসমান (রা) তাদেরকে বুঝনোর জন্য আমারকে পাঠান। তিনি তাঁর পূর্বের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহীদের ফেরত পাঠান। তাছাড়া যখনই হযরত উসমানের (রা) সামনে কোন সমস্যা দেখা দিত, আমর ইবনুল আসের সাথে পরামর্শ করতেন। তিনি অত্যন্ত সততার সাথে পরামর্শ দিতেন। খলীফা হযরত উসমানের (রা) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র যখন চরম আকার ধারণ করে তিনি তখন মজলিসে শূরার বৈঠক আহবান করেন। হযরত আমর ইবনুল আস ছিলেন এ বৈঠকের অন্যতম সদস্য। শূরার সাথে পরামর্শের পর খলীফা আমরের কাছে বিশেষভাবে তাঁর মতামত জিজ্ঞেস করেন। তিনি খলীফাকে তাঁর পূর্ববর্তী দুই খলীফা-আবু বকর ও উমারের (রা) পদাঙ্ক অনুসরণের পরামর্শ দেন। অর্থাৎ প্রয়োজনে কোমল ও প্রয়োজনে কঠোর হতে বলেন।

    মিসরের ওয়ালীর পদ থেকে অপসারিত হয়ে মূলতঃ তিনি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান এবং ফিলিস্তীনে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। তবে মাঝে মাঝে মদীনায় আসা-যাওয়া করতেন। বিদ্রোহীদের দ্বারা খলীফা উসমান যখন অবরুদ্ধ হন, আমর ইবনুল আস তখন মদীনায়। তিনি যখন দেখলেন বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে তখন এ কথা বলে মদীনা ত্যাগ করেন যে, উসমানের হত্যায় যার হাত থাকবে আল্লাহ তাকে অপমান করবেন এবং যে তাকে সাহায্য করতে পারবে না তার মদীনা ত্যাগ করা উচিত। তিনি মদীনা ছেড়ে সিরিয়া চলে গেলেন। তবে সব সময় লোক মারফত মদীনার খোঁজ-খবর রাখতেন। অতঃপর হযরত উসমানের শাহাদাত এবং উটের যুদ্ধ সংঘটিত হয়; কিন্তু তিনি সিরিয়ার নির্জনবাস থেকে বের হলেন না। কোন কিছুতেই জড়িত হলেন না।

    হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার মধ্যে বিরোধ শুরু হল। হযরত আলী হযরত মুয়াবিয়ার কাছে আনুগত্যের দাবী করলেন। মুয়াবিয়া আমর ইবনুল আসের সাথে পরামর্শ করলেন। বর্ণিত আছে, প্রথমত আমর মুয়াবিয়াকে বলেছিলেন, কোন অবস্থাতেই মুসলিম উম্মাহ আপনাকে আলীর পদমর্যাদা দেবে না। কিন্তু পরে দেখা গেল এই ঝগড়ায় আমর ইবনুল আস সম্পূর্ণভাবে মুয়াবিয়ার পক্ষ অবলম্বন করলেন। সিফফীনে উভয় পক্ষের মধ্যে যে যুদ্ধ হয় তাতে আমর ছিলেন মুয়াবিয়ার (রা) বাহিনীর সিপাহসালার। আমরের পরামর্শেই এ যুদ্ধে আসন্ন পরাজয়ের মুহূর্তে বর্শার মাথায় কুরআন ঝুলিয়ে মুয়াবিয়া আলীর (রা) কাছে অপোষ-মিমাংসার প্রস্তাব দেন এবং আলীকে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণায় বাধ্য করেন। অতঃপর বিরোধ নিস্পত্তির লক্ষ্যে দু’সদস্য বিশিষ্ট যে সালিশী বোর্ড গঠন করা হয়, সে বোর্ডে আমর ইবনুল আস ছিলেন মুয়াবিয়ার মনোনিত, আর আবু মুসা আশয়ারী (রা) ছিলেন আলীর (রা) মনোনীত সদস্য।

    আমর ও আবু মুসা আশয়ারী বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর দু’মাতুল জান্দালে উপস্থিত হলেন তাদের সিদ্ধান্ত ঘোষণার জন্য। কিন্তু ঘোষণার মুহূর্তে আমর পূর্ব সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে কূটনৈতিক প্যাঁচের মাধ্যমে মুয়াবিয়াকে খলীফা বলে ঘোষণা দান করেন এবং সাথে সাথে প্রতিপক্ষ আবু মুসার (রা) মুখ দিয়েও আলীকে (রা) বরখাস্তের কথাটি ঘোষণা করিয়ে নেন।

    মুসলিম উম্মার অত্মঘাতী বিরোধ নিস্পত্তির যে সাম্ভাবনা সালিশী বোর্ড গঠনের মাধ্যমে দেখা দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে তা হযরত আমরের কূটকৌশলের কারণে ব্যর্থ হয়। উভয় পক্ষে আবার বিরোধ ও যুদ্ধ শুরু হয়। আমর মিসর আক্রমণ করে হযরত আলী কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গর্ভণর মুহাম্মাদ বিন আবী বকরকে পরাজিত ও হত্যা করে মিসর দখল করেন।

    অতঃপর চরমপন্থী খারেজী সম্প্রদায়ের কতিপয় লোক সিদ্ধান্ত নেয় যে, যেহেতু মুসলিম উম্মার বিভেদের কারণ প্রধানতঃ তিন ব্যক্তিঃ আলী, মুয়াবিয়া ও আমর। সুতরাং তাদেরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। ইবন মুলজিম, বারক বিন আবদিল্লাহ ও আমর ইবন বকর আত-তামীমীর ওপর এ কাজের দায়িত্ব অর্পিত হয়। সিদ্ধান্ত মুতাবিক নির্ধারিত দিন ও সময়ে তারা তিন জনের ওপর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আক্রমণ চালায়। হযরত আলী শহীদ হলেন, মুয়াবিয়া সামান্য আহত হয়ে বেঁচে গেলেন। আর আমর অসুস্থ থাকায় তাঁর পরিবর্তে খারেজা ইবন হুজাফা নামায পড়াতে বেরিয়েছিলেন, আততায়ী তাঁকেই আমর ইবনুল আস মনে করে আঘাত হানে এবং তাকে হত্যা করে। এভাবে আমারও বেঁচে গেলেন।

    আমীর মুয়াবিয়া (রা) আমরকে মিসরের ওয়ালী নিযুক্ত করলেন। মিসরের ওয়ালী থাকাকালে তাঁর ও আমীর মুয়াবিয়ার মধ্যে কিছুটা ভুল বুঝবুঝির সৃষ্টি হলেও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় উভয়ের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং তিনি মিসরের ওয়ালীর পদে বহাল থাকেন। মিসরের ওয়ালী থাকাকালীন হিজরী ৪৩ মতান্তরে ৪৭ অথবা ৫১ সনে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জীবনের আশা ছেড়ে দেন। জীবনের শেষ দিনগুলিতে তিনি অতীত ভুলের জন্য অনুশোচনায় ভীষণ দগ্ধিভূত হন।

    তিনি যখন মৃত্যু শয্যায়, ইবন আব্বাস তাঁকে দেখতে আসেন। সালাম বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলেন, আবু আবদিল্লাহ,কেমন অবস্থা? আমর জবাব দিলেন, আপনি কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করছেন? আমার দুনিয়া তৈরী হয়েছে, কিন্তু দ্বীন বিনষ্ট হয়েছে। যদি এমন না হয়ে এর বিপরীত হতো, তাহলে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আমি সফলকাম হতাম। যদি শেষ জীবনের চাওয়া ফলপ্রসূ হতো তাহলে অবশ্যই চাইতাম। যদি পালিয়ে বাঁচার পথ থাকতো, পালাতাম। কিন্তু মিনজিনিকের মত আমি এখন আসমান ও যমীনের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় আছি। হাতের সাহায্যে না উপরে উঠতে পারছি, না পায়ের সাহায্যে নীচে নামতে পারছি। ভাতিজা, আমার উপকারে আসে এমন কিছু নসীহত আমাকে কর। ইবন আব্বাস বললেন, আফসুস! সে সময় আর কোথায়! এখন তো ভাতিজা বৃদ্ধ হয়ে আপনার ভাই হয়ে গেছে। এখন যদি আপনি আমাকে কাঁদতে বলেন, কাঁদতে পারি। আমর বললেন, এখন আমার বয়স আশি বছরেরও কিছু বেশী। এখন তুমি আমাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করছো। হে আল্লাহ, এই ইবন আব্বাস আমাকে তোমার রহমত থেকে নিরাশ করছে। তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও এমন শাস্তি তুমি এখনই আমাকে দাও। ইবন আব্বাস বললেন, আবু আবদিল্লাহ, যে জিনিস আপনি নিয়েছিলেন তাতো নতুন আর যা দিচ্ছেন তাতো পুরাতন। আমর বললেন, ইবন আব্বাস, তোমার কি হয়েছে, আমি যা বলছি, তুমি তার উল্টা বলছো? (আল-ইসতিয়াব)

    আবদুর রহমান ইবন শাম্মাসা বলেন, তিনি আমর ইবনুল আসকে মৃত্যু শয্যায় দেখতে যান। আমর দেয়ালের দিকে মুখ করে কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বললেন, আব্বা, কাঁদছেন কেন? রাসূলুল্লাহ (সা) কি আপনাকে অমুক অমুক বাশারাত বা সুসংবাদ দাননি? তিনি জবাব দিলেন, আমার সর্বোত্তম সম্পদ –লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর শাহাদাত বা সাক্ষ্য। আমার জীবনের তিনটি পর্ব অতিক্রান্ত হয়েছে। একটি পর্ব এমন গেছে যখন আমি ছিলাম কট্টর দুশমন। আমার চরম বাসনা ছিল, যে কোনভাবেই রাসূলুল্লাহকে (সা) হত্যা করা। তারপর আমার জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু। রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করে ইসলাম কবুল করলাম। তখন আমার এমন অবস্থা যে, রাসূলুল্লাহর (সা) চেয়ে আর কোন ব্যক্তি আমার নিকট অধিকতর প্রিয় বা সম্মানী বলে মনে হয়নি। অতিরিক্ত সম্মান ও ভীতির কারণে তাঁর প্রতি আমি ভালো করে চোখ তুলে তাকাতে পারিনি। কেউ যদি এখন আমাকে তাঁর চাহারা মুবারক কেমন ছিল জিজ্ঞেস করে, আমি তাকে কোন কিছুই বলতে পারিনে। তখন যদি আমার মরণ হতো, জান্নাতের আশা ছিল। এরপর আমার জীবনের তৃতীয় পর্ব। এ সময় আমি নানা রকম কাজ করেছি। আমি জানিনে এখন আমার কি অবস্থা হবে। আমার মৃত্যু হলে বিলাপকারীরা যেন আমার জানাযার সাথে না যায়। দাফনের সময় ধীরে ধীরে মাটি চাপা দেবে। দাফনের পর একটি জন্তু জবেহ করে তার গোশত ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া যায়, এতটুকু সময় কবরের কাছে থাকবে। যাতে আমি তোমাদের উপস্থিতিতেই কবরের সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে পারি এবং আল্লাহর দূতের প্রশ্নসমূহের জবাব ঠিক করে নিতে পারি। (মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)

    তিনি তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে মৃত্যুর পর তাঁকে কিভাবে দাফন করতে হবে সে সম্পর্কে অসীয়াত করলেন। তারপর জিকরে মশগুল হলেন। বলতে লাগলেন, “হে আল্লাহ, তুমি নির্দেশ দিয়েছিলে, আমি তা অমান্য করেছি, তুমি নিষেধ করেছিলে, আমি নাফরমানী করেছি। আমি নির্দোষ নি যে, ওজর পেশ করবো, আমি শক্তিমানও নই যে, বিজয়ী হব।” তারপর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে পড়তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হিজরী ৪৩ সনের ১লা শাওয়াল ঈদুল ফিতরের নামাযের পর তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ জানাযার নামায পড়ান। মিসরের ‘মাকতাম’ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। তাঁর নিজ হাতে তৈরী মিসরের প্রথম মসজিদ ‘জামে’ আমর ইবনুল আস’ –এর পাশে তাঁর কবরটি আজও চিহ্নিত রয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল নব্বই বছর।

    ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আমর ইবনুল আসের জীবনের বেশী অংশ জিহাদের ময়দানেই কেটেছে। এ কারণে জ্ঞান অর্জন ও চর্চার সময় সুযোগ তিনি কমই পেয়েছেন। কুরআন তিলাওয়াতে তিনি বিশেষ পুলক ও স্বাদ অনুভব করতেন। অত্যন্ত সুন্দর করে তিলাওয়াত করতেন। জীবনটি জিহাদের ময়দানে কাটলেও যতটুকু সময় পেয়েছেন রাসূলুল্লাহর (সা) সুহবত থেকে ইলম ও আমলের উন্নতি সাধন করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ৩৯টি হাদীস বা বাণী তিনি বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে ৩টি মুত্তাফাক আলাইহি অথাৎ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছেন। ৩টি এককভাবে মুসলিম বর্ণনা করেছেন। বহু সাহাবী ও তাবেঈ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

    হযরত আমর ইবনুল আস জিহাদের ব্যস্ততা সত্বেও শিক্ষাদান ও ওয়াজ-নসীহতের দায়িত্বও পালন করতেন। ‘জাতুস সালাসিল’ যুদ্ধে বিজয়ের পর সেখানে অবস্থান করে নও-মুসলিমদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের পর দুনিয়ার প্রতি কিছু মানুষের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেলে তিনি বক্তৃতা-ভাষণে রাসূলুল্লাহর আদর্শ অনুসরণের প্রতি মানুষকে আহবান জানাতেন।

    তিনি সাহিত্য রসিকও ছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখক। অল্পকথায় অধিক ভাব প্রকাশ, সুন্দর উপমা প্রয়োগ এবং বাক্য ও ভাবের অলঙ্করণ তাঁর সাহিত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে তাঁর সাহিত্যের বহু নমুনা সংরক্ষিত হয়েছে। বিশেষতঃ ‘আমুর রামাদাহ’ অর্থাৎ যে বছর আরবে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, সে বছর খলীফা উমার মদীনা থেকে মিসরে অবস্থানরত আমরকে খাদ্যশস্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে যে চিঠি লিখেছিলেন এবং সে চিঠির জবাবে আমর যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন তা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তাছাড়া তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ, পত্রাবলী ও বিভিন্ন ধরনের লেখায় সাহিত্যে প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে।

    হযরত আমর ইবনুল আসের সমগ্র জীবন আলোচনা করলে দেখা যায় তিনি তাঁর জীবনে পরীক্ষার বিভিন্ন পর্ব অতিক্রম করেছেন। সবগুলি পর্বে তিনি সমানভাবে সফলকাম হতে পারেননি। বিশেষতঃ সাহাবী জীবনের শেষ পর্বের কিছু ঘটনার যৌক্তিক আপাতঃ দৃষ্টিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। ইসলামী উম্মাহ ইমামরা জীবনের শেষ পর্বের এসব ভূমিকাকে তাঁর ইজতিহাদী ভুল বলে সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেছেন। তবে জীবনের এ পর্বের কতিপয় বিতর্কিত ঘটনা ছাড়া অন্য সকল সাহাবীদের মত তাঁর সামগ্রিক জীবনকে রাসূলুল্লাহর (সা) সুহবত বা সাহর্য ফুলের মত শুভ্র ও সুন্দর করে তুলেছিল।

    আমর ইবনুল আসের (রা) ঈমানের বলিষ্ঠতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, আর আমর ইবনুল আস ঈমান এনেছে।’ অন্য এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আসের দুই পুত্র –হিশাম ও আমর ঈমান এনেছে।’ (মুসনাদে ইমাম আহমাদ) এ কথার সত্যতা তাঁর জীবনের একটি ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একবার হযরত রাসূলে কারীম (সা) খবর পাঠালেন, আমর যেন পোশাক পরে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে একনই হাজির হয়। নির্দেশ মত আমর সাথে সাথে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) অজু করেছিলেন, তিনি চোখ তুলে তাকালেন। তারপর চোখ নীচু করে বললেন, তোমাকে আমীর বানিয়ে পাঠাতে চাই। ইনশাআল্লাহ তুমি নিরাপদ থাকবে এবং প্রচুর গনীমাত লাভ করবে। সেই গনীমাত থেকে তুমিও একটা অংশ পাবে। সঙ্গে সঙ্গে আমর বলে ওঠেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা), আমি সম্পদের লোভে ইসলাম গ্রহণ করিনি; বরং তা গ্রহণ করেছি অন্তরের টানে। রাসূল (সা) বললেন, ‘পবিত্র সম্পদ সত্যনিষ্ঠ মানুষের জন্যই উত্তম।’ আরেকবার রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, আমর ইবনুল আস কুরাইশদের নেককার ব্যক্তিদের অন্যতম। (মুসনাদে আহমদ)

    একদিন তিনি কা’বার দেয়ালের ছায়ায় বসে লোকদের হাদীস শুনাচ্ছেন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে কোন ইমামের হাতে বাইয়াত করেছে, সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাঁর সহায়তা করা উচিত।” আবদুর রহমান ইবন আবদে কা’বা (এই হাদীসের বর্ণনাকারী) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি হাদীসটি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে শুনেছেন? আমর নিজের কান ও অন্তরের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আমার এ দু’টি কান শুনেছে ও অন্তর সংরক্ষণ করেছে।’ এরপর আবদুর রহমান বললেন, আপনার চাচাতো ভাই মুয়াবিয়া আমাদেরকে অবৈধভাবে একে অপরের সম্পদ খাওয়ার ও অন্যায়ভাবে প্রাণ নষ্ট করার আদেশ দেয়। এ কথা শুনে আমর চুপ হয়ে যান। তারপর বলেন, “আল্লাহর নাফরমানি যাতে না হয় তা মান এবং যাতে নাফরমানি হয় তা মানবে না।” এ দ্বারা বুঝা যায় তিনি প্রকৃতিগত ভাবেই ছিলেন সত্যনিষ্ঠ।

    হযরত রাসূলে কারীম (সা) আমর ইবনুল আসকে (রা) তার কাজের জন্য ভালোবাসতেন। হযরত হাসান (রা) বলেন, এক ব্যক্তি আমর ইবনুল আসকে জিজ্ঞেস করেন, এমন ব্যক্তি কি সৎ স্বভাব বিশিষ্ট নয়, যাকে রাসূলুল্লাহ (সা) শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভালোবাসতেন? তিনি বললেন, তার সৌভাগ্য সম্পর্কে কে সন্দেহ পোষোণ করতে পারে? লোকটি বললেন, ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা) আপনাকে ভালোবাসতেন।’

    জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের কতিপয় ব্যক্তির অন্যতম। ইমাম শা’বী বলতেন, ইসলামী আরবে কূটনীতিক চার জন। তন্মধ্যে আমর ইবনুল আস অন্যতম। (আল-ইসাবা) কূটনীতিতে একমাত্র হযরত মুগীরা ইবন শু’বা (রা) ছিলেন তাঁর সমকক্ষ। তাঁর দৈহিক গঠন, চাল-চলন, কথা-বার্তা প্রভৃতির মাঝে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠতো যে, তিনি নেতৃত্বের জন্যই জম্ম লাভ করেছেন। বর্ণিত আছে, একদিন আমীরুল মু’মিনীন উমার (রা) তাঁকে আসতে দেখে প্রথমে একটু হেসে উঠলেন, তারপর বললেন, ‘আমীর বা নেতা হওয়া ছাড়া আবু আবদিল্লাহর পৃথিবীতে হেঁটে বেড়ানো উচিত নয়।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল -৬১৮)

    রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সুস্থ মতামতের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ‘তুমি ইসলামে সঠিক মতামতের অধিকারী’ –এ কথা রাসূল (সা) তাঁকে বলেছেন। (কানযুল উম্মাল) হযরত ফারুকে আজম (রা) যখন কোন মোটা বুদ্ধির লোক দেখতেন, বিস্ময়ের সাথে বলতেন, এই ব্যক্তি ও আমর ইবনুল আসের স্রষ্টা একই সত্তা! (আল-ইসাবা)

    হযরত আমরের এই সীমাহীন বুদ্ধিমত্তা ও দুঃসাহসের জন্য হযরত রাসূলে পাক (সা) বহু গুরুত্বপুর্ণ অভিযানের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করেছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে আবু বকর, উমার ও আবু উবায়ইদার (রা) মত উচু মর্যাদার অধিকারী সাহাবীদের ওপরও তাঁকে আমীর নিয়োগ করা হয়েছে। প্রকৃতই তিনি মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি দুর্যোগময় মুহূর্তে আমীর বা নেতার মত যোগ্যতা ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর যোগ্যতা লক্ষ্য করেই উমারের (রা) মত বিচক্ষণ শাসক তাঁকে ফিলিস্তীন, জর্দান, তারপর মিসরের আমীর নিযুক্ত করেছিলেন এবং তিনি তাঁর খিলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত এ পদে বহাল রেখেছিলেন।

    ইতিহাসে তাঁকে ‘ফাতেহ মিসর’ –মিসর বিজয়ী বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু যে অর্থে তাঁকে বিজয়ী বলা হয় সেই অর্থে বিজয়ী নন। প্রকৃতপক্ষে তিনি মিসরবাসীর মুক্তিদাতা। রোমানদের শত শত বছরের দাসত্ব ও শৃঙ্খল থেকে তিনি মিসরবাসীকে মুক্তি দেন এবং সমগ্র আফ্রিকায় ইসলামী দাওয়াতের পথ সুগম করেন।

    জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ হযরত আমরের (রা) জীবনের গৌরবময় অধ্যায়। সকল যুদ্ধেই তিনি প্রখ্যাত সেনানায়ক হযরত খলিদ বিন ওয়ালিদের (রা) পাশাপাশি থেকেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, সেই প্রথম থেকে যুদ্ধের ময়দানে রাসূল (সা) অন্য কাউকে আমার ও খালিদের সমকক্ষ মনে করেননি। (মুসতাদরিক) মদীনায় যখনই কোন বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তরবারি কোষমুক্ত করে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। একবার কোন কারণে মদীনায় ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। হযরত আবু হুজায়ফার গোলাম সালেম তলোয়ার হাতে মদীনার মসজিদে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরও অসি কোষমুক্ত করে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন। পরে রাসূলে পাক (সা) খুতবার মধ্যে বললেন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আশ্রয়ে আস না কেন এবং আমর ও সালেমকে কেন আদর্শ হিসেবে গ্রহণ কর না? (আল-ইসাবা)

    হযরত আমর ইবনুল আস ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। আল্লাহর রাস্তায় তিনি প্রশস্ত চিত্তে ব্যয় করেছেন। খোদ রাসূলে খোদা (সা) একাধিকবার সে কথা স্বীকার করেছেন। আলকামা ইবন রামসা বালাবী বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) এক বাহিনী সহ আমরকে পাঠালেন বাহরাইন এবং নিজে বের হলেন অন্য এক অভিযানে। আমিও রাসূলুল্লাহর (সা) এ অভিযানে সহযাত্রী ছিলাম। একদিন রাসূল (সা) একটু তন্দ্রালু হলেন। তন্দ্রা কেটে গেলে বললেন, ‘আল্লাহ আমরের ওপর রহম কর।’ আমাদের মধ্যে যারা এ নামের ছিল, আমরা প্রত্যেকেই তাদের কথা চিন্তা করলাম। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার তন্দ্রাভিভূত হলেন এবং জেগে উঠে একই একই কথা বললেন। আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কোন আমরের কথা বলছেন?’ বললেনঃ আমর ইবনুল আস। আমরা কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ আমার সেই সময়ের কথা স্মরণ হয়ে গেল যখন আমি মানুষের কাছে সাদাকাহ বা দান চেয়েছি, সে প্রচুর সাদাকাহ নিয়ে এসেছে। যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছি, এত সাদাকাহ কোথা থেকে নিয়ে এসেছো? সে বলেছে, আল্লাহ দিয়েছেন। অন্য একবার রাসূল (সা) তিনবার বলেন, “হে আল্লাহ, তুমি আমর ইবনুল আসকে ক্ষমা করে দাও। যখন আমি তাকে সাদাকাহ দেয়ার জন্য বলেছি, সে সাদাকাহ নিয়ে হাজির হয়েছে।”

  • মিকদাদ ইবন ’আমর (রা)

    মিকদাদ ইবন ’আমর (রা)

    নাম মিকদাদ, কুনিয়াত আবুল আসওয়াদ, আবু ’আমর ও আবু সাঈদ। পিতা ’আমর ইবন সা’লাবা। তাঁর পিতৃ পুরুষের আদি বাসস্থান ‘বাহারা’। ইবনুল কালবী বর্ণনা করেন, মিকদাদের পিতা ’আমর তাঁর গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ‘কিসাস’ বা প্রতিশোধের ভয়ে ‘হাদরামাউতেই’ পালিয়ে যান এবং কিন্দার সাথে মৈত্রী চুক্তি করেন। এ কারণে তাঁকে ‘কিন্দী’ বলা হয়। তিনি হাদরামাউতের এক নারীকে বিয়ে করেন এবং তার গর্ভেই ‘মিকদাদ’ জম্মগ্রহণ করেন। এই হাদরামাউতেই মিকদাদ বেড়ে ওঠেন। এখানে আবু শাম্মার ইবন হাজার আল কিন্দী নামক এক ব্যক্তির সাথে তাঁর ঝগড়া হয় এবং তরবারির এক আঘাতে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। অতঃপর পালিয়ে মক্কায় চলে যান। মক্কায় তিনি আল-আসওয়াদ ইবন ’আবদ ইয়াগূসের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন। আল-আসওয়াদের সাথে তাঁর সম্পর্ক এত মধুর ও ঘনিষ্ঠ হয় যে, মিকদাদকে তিনি পালিত পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (আসওয়াদের পুত্র মিকদাদ) নামে পরিচিতি লাভ করেন। অতঃপর পবিত্র কুরআনের ‘ওয়াদয়ূহুম লি আবায়িহিম’ (তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক)-এ আয়াতটি নাযিল হলে তিনি আল-আসওয়াদের পরিবর্তে ‘মিকদাদ ইবন আমর’ (আমরের পুত্র মিকদাদ)-এ পরিচিতি গ্রহণ করেন। আর এ কারণে ইতিহাসে কোথাও তাঁকে মিকদাদ ইবন আমর আবার কোথাও মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। (আল-ইসাবা, উসুদুল গাবা)।

    মিকদাদ মক্কায় আশ্রয় নেয়ার পর কিছুদিন যেতে না যেতে তাওহীদের আওয়ায তাঁর কানে প্রবেশ করে। হযরত রাসূলে করীমের দাওয়াত ও তাবলীগ তাঁকে ইসলামের সাথে প্রথম পরিচয় করে দেয়। এ সেই সময়ের কথা যখন ইসলামের কট্টর দুশমনরা মুসলমানদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছিল। তাদের ভয়ে অনেকেই তখন ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখেছিল। কিন্তু মিকদাদ ইসলাম গ্রহণ করার পর সত্যকে গোপন করে রাখা সমীচীন মনে করলেন না। তিনি প্রথম পর্যায়ের সাত ব্যক্তির অন্যতম, যারা সেই চরম সন্ত্রাসের মুহূর্তে প্রকাশ্যে নিজেদের ঈমান আনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এই সাত জনের অন্য ছয়জন হলেন রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর, ’আম্মার, তাঁর মা সুমাইয়্যা, সুহাইব ও বিলাল (রা)। (হায়াতুস সাহাবা-১/২১৮)।

    রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো বোন ‘দুবায়া বিনতু যুবাইর ইবন আবদিল মুত্তালিবের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বর্ণিত আছে, একদিন আবদুর রহমান ইবন আউফের সাথে তিনি বসে আছেন। হঠাৎ আবদুর রহমান জিজ্ঞেস করেন, মিকদাদ তুমি বিয়ে করছো না কেন? মিকদাদ সরলভাবে সাথে সাথে জবাব দেন, তোমার মেয়েকেই আমার সাথে বিয়ে দাও না। এ কথায় আবদুর রহমান অপমান বোধ করেন। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং মিকদাদকে যথেষ্ট গালমন্দ করেন। মিকদাদ রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে এসে আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। রাসূল (সা) বললেন, আমিই তোমার বিয়ে দেব। অতঃপর তিনি চাচাত বোন ‘দুবায়া’-র সাথে মিকদাদের বিয়ে দেন। (আল-ইসাবা)

    প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়ার পর মিকদাদের ওপর মুসীবত নেমে আসে। রাসূলুল্লাহর (সা) অনুমতি নিয়ে তিনি হাবশায় হিজরাত করেন। সেখানে কিছুকাল অবস্থানের পর আবার মক্কায় ফিরে আসেন। তখন মদীনায় হিজরাতের হিড়িক পড়ে গেছে। বিশেষ কিছু অসুবিধার কারণে তিনি মদীনায় হিজরাত করতে পারলেন না। এমন কি রাসূলুল্লাহর মদীনায় হিজরাতের পরও তিনি মক্কায় থেকে গেলেন। মক্কা ও মদীনার মধ্যে সাময়িক সংঘর্ষ হলে তিনি এবং উতবা ইবন গাযওয়ান কুরাইশদের একটি অগ্রবর্তী অনুসন্ধানী দলের সদস্য হিসাবে মদীনার দিকে রওয়ানা হন। এই বাহিনীর নেতা ছিলেন ইকরিমা ইবন আবী-জাহল। পথিমধ্যে মদীনার মুজাহিদদের একটি দলের সাথে তাদের ছোট খাট একটা সংঘর্ষ হয়। এই মুসলিম মুজাহিদ দলের নেতা বা আমীর ছিলেন হযরত উবাইদা ইবনুল হারিস (রা)। সুযোগ বুঝে এ সময় মিকদাদ ও উতবা ইবন গাযওয়ান মুসলিম মুজাহিদ দলে ভিড়ে যান এবং তাদের সাথে মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় তাঁরা হযরত কুলসুম ইবন হিদামের অতিথি হন। (উসুদুল গাবা) মদীনায় তিনি হযরত উবাই ইবন কা’বের (রা) অনুরোধে বনী আদীলা (মতান্তরে জাদীলা)-তে বসবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাসূল (সা) তাঁকে সেই এলাকায় একখণ্ড জমি দান করেন।

    হিজরী দ্বিতীয় সনে শিরক ও তাওহীদের মধ্যে প্রথম প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়। এ বছরই কুরাইশ বাহিনী বদর প্রান্তরে উপনীত হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের জন্য এ ছিল প্রথম পরিক্ষা। রাসূল (সা) এ ব্যাপারে তাঁদের পরামর্শ চেয়ে তাঁদের ঈমানের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। হযরত সিদ্দীকে আকবর ও ফারুকে ’আজম প্রমুখ সাহাবা ভাষণ দিয়ে তাঁদের কুরবানী ও আত্মত্যাগের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। হযরত মিকদাদও এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এক আবেগময় ভাষণ দান করেন। ভাষণে তিনি রাসূলকে (সা) আশ্বাস দান করে বলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলুন। আপনার সাথে আছি। আল্লাহর কসম, বনী-ইসরাইলরা তাদের নবী মুসাকে বিলেছিলঃ তুমি ও তোমার রব দু’জন যাও এবং যুদ্ধ কর, আর আমরা এখানে বসে থাকি – আমরা আপনাকে তেমন কথা বলবো না। বরং আমরা আপনাকে বলবোঃ আপনি ও আপনার রব দু’জন যান ও তাদের সাথে যুদ্ধ করুন আমরাও আপনাদের সাথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। যিনি সত্যসহ আপনাকে পাঠিয়েছেন সেই সত্তার কসম, আপনি যদি আমাদের ‘বারকুল গিমাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যান, আমরা আপনার সাথে যাব এবং আপনার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে ও পেছনে সর্বদিক থেকে যুদ্ধ করবো –যতক্ষণ না আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেন।” (রিজালুন হাওলার রাসূল) তাঁর এই আবেগময় ভাষণ শুনে খুশীতে রাসূলুল্লহর (সা) চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

    বদর যুদ্ধ শুরু হলো। এ যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে মাত্র তিনজন ছিলেন অশ্বরোহী। মিকদাদ ইবন আমর, মুরছেদ ইবন আবী মুরছেদ ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম। এ তিনজন ছাড়া অন্য সকলেই ছিলেন পদাতিক ও উষ্ট্ররোহী। তবে একাধিক বর্ণনা মতে এ যুদ্ধে মিকদাদই ছিলেন একমাত্র অশ্বরোহী মুজাহিদ। এ কারণে বলা হয়েছে, ‘মিকদাদই সর্বপ্রথম আল্লাহর রাস্তায় তাঁর ঘোড় দৌড়িয়াছেন।’

    বদর ছাড়াও উহুদ, খন্দকসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করে বীরত্বর পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। হিজরী ২০ সনে হযরত আমর ইবনুল আস মিসর অভিযান পরিচালনা করেন। রাজধানী মদীনায় তিনি অতিরিক্ত সামরিক সাহায্য চেয়ে পাঠান। খলীফা উমার (রা) দশ হাজার সিপাহী ও চারজন অফিসার পাঠান। এই চারজনের একজন মিকদাদ ইবন আমর। খলীফা একটি চিঠিতে আমর ইবনুল আসকে লিখে জানান, ‘এই চার জনের প্রত্যেকেই শত্রু পক্ষের দশ হাজার সিপাহীর সমান’। এই সিপাহীদের যোগদানের পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র মিসরে ইসলামের পতাকা উডডীন হয়।

    হযরত খুবাইবকে (রা) মক্কার মুশরিকরা শূলে চড়িয়ে হত্যা করে। রাসূলুল্লাহ (সা) খুবাইবের লাশ রাতের আঁধারে শূল থেকে নামিয়ে আনার জন্য যুবাইর ও মিকদাদকে পাঠান। তাঁরা খুবাইবের লাশ শূল থেকে নামিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে যখন রওয়ানা দেন তখন কুরাইশরা টের পেয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। (হায়াতুস সাহাবা)

    হযরত মিকদাদের পেটটি ছিল খুবই মোটা। এ কারণে বার্ধক্যে তিনি ভীষণ কষ্ট পেতে থাকেন। এ কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে তাঁর এক রোমান দাস তার পেটে অস্ত্রোপচার করে; কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় তিনি মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে ‘জুরুফ’ নামক স্থানে হিজরী ৩৩ সনে ইহলোক ত্যাগ করেন। আমীরুল মুমিনীন হযরতব উসমান (রা) তাঁর জানাযার নামায পড়ান। লাশ মদীনার বাকী গোরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭০ বছর।

    হযরত মিকদাদের মধ্যে সর্বোত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটেছিল। বদর যুদ্ধের সময় তিনি যে নিষ্ঠা ও সততাপূর্ণ আবেগ প্রকাশ করেন তাতে সমগ্র সাহাবা সমাজ তাঁকে ঈর্ষা করতে থাকে। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলতেনঃ ‘আফসূস! আমি যদি তখন বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণের উপযুক্ত হতাম এবং মিকদাদের কথাগুলি আমার মুখ থেকে বের হতো’। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন, ‘বদর যুদ্ধে আমি মিকদাদের সাথে ছিলাম। এ যুদ্ধে তাঁর সাথে থাকার বিষয়টি আমার কাছে এত প্রিয় যে, তার তুলনায় দুনিয়ার সব কিছু একেবারেই মূল্যহীন’। ইসলামের সূচনালগ্নের চরম দারিদ্র ও অভাব তাঁকে অনেকখানি সহনশীল ও বাস্তববাদী করে তুলেছিল। তিনি বলেন, “হিজরাত করে আমি যখন মদীনায় আসলাম, আমার থাকা-খাওয়ার কোন ঠিক-ঠিকানা ছিল না। ক্ষুধায় আমার মরণ-দশা হয়েছিল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সা) আমার দু’জন সংগীসহ আমাকে তাঁর আশ্রয়দাতা কুলসুম ইবন হিদামের বাড়ীতে স্থান দেন। তখন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট মাত্র চারটি ছাগী। আমরা এতগুলি মানুষ এই ছাগীগুলির দুধপান করেই জীবন ধারণ করতাম। একদিন রাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বাইরে কোথাও বেরিয়ে গেলেন। ফিরতে দেরী হল। আমি মনে করলাম, হয়তো কোন আনসারী তাঁকে দাওয়াত দিয়েছেন, তিনি খেয়েই ফিরবেন। এই ধারণা আমার মনে উদয় হতেই আমি উঠে পড়লাম এবং রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য রাখা দুধটুকু এক চুমুকে পান করে ফেললাম। কিন্তু পরক্ষণেই চেতনা হলো, আমার ধারণা যদি ভুল হয় তাহলে তো ভীষণ লজ্জায় পড়তে হবে। আমার এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রাসূল (সা) ফিরে আসলেন এবং সোজা দুধ যেখানে থাকে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন, পেয়ালা শুন্য। আমি আমার ভুলের জন্য লজ্জা ও অনুশোচনায় জর্জরিত হতে লাগলাম। বিশেষ করে তিনি যখন কিছু বলার জন্য হাত উঠালেন তখন আমার ভয়ের কোন সীমা থাকলো না। আমার ধারণা হল, রাসূলুল্লাহর (সা) বদ দুআয় এখনই আমার ইহ-পরকাল সব বরবাদ হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁকে আমি বলতে শুনলাম, ‘আল্লাহুম্মা আতয়িমহু মান আতয়ামানী ওয়া আসকি মান সাকানী’- হে আল্লাহ, যে আমাকে আহার করালো তাকে তুমি আহার করাও, যে আমাকে পান করালো তাঁকে তুমি পান করাও। এই দুআ শুনে আমার মধ্যে সাহস সঞ্চার হলো। আমি উঠে ছাগীগুলির কাছে গেলাম, কোন ছাগীর ওলানে কিছু দুধ পাওয়া যায় কিনা এই আশায়। কিন্তু আল্লাহর সীমাহীন কুদরতে যে ছাগীর উলানেই হাত দিই না কেন প্রত্যেকটি দুধে পরিপূর্ণ পেলাম। প্রচুর পরিমাণে দুধ দুইয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে পেশ করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সবাই পান করেছ কি? আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি প্রথমে পান করুন, তারপর সমস্ত ঘটনা খুলে বলছি। রাসূল (সা) পেট ভরে পান করলেন। আমার পূর্বের ভুল ও অনুশোচনার কথা মনে হওয়ায় হঠাৎ হেসে উঠলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবুল আসওয়াদ, হাসছো কেন?’ আমি সব কথা খুলে বললাম। সব কিছু শুনে তিনি বললেন, “এ ছিল আল্লাহর রহমত। তুমি তোমার সাথী দু’জনকে ঘুম থেকে জাগালে না কেন, তারাও অনুগৃহীত হতো?”

    হযরত মিকদাদ ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। তাঁর বুচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় বহু ক্ষেত্রে ও ঘটনায়। তাঁর এক সাথী বর্ণনা করেছেন, একদিন আমরা মিকদাদের কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় একজন তাবেয়ী তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন লাভে ধন্য আপনার চোখ দু’টি কতই না সৌভাগ্যের অধিকারী। আল্লাহর কসম, আপনি যা কিছু দেখেছেন, তা দেখার এবং যেসব দৃশ্য ও ঘটনায় আপনি উপস্থিত হয়েছেন তাতে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমি খুবই লালায়িত। একথা শুনে মিকদাদ লোকটির উপর খুবই ক্ষেপে গেলেন। লোকেরা বললো, তা এত উত্তেজিত হওয়ার কি আছে? তিনি বললেন, বর্তমানকে ছেড়ে অতীতকে কামনা করা বৃথা কাজ। কারণ, একথা তার জানা নেই, তখন সে থাকলে তার ভূমিকা কী হতো। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহর (সা) সমসাময়িক বহুলোক ঈমান না আনার কারণে তাদের ঠিকানা হয়েছে জাহান্নাম। সে কি জানে সে কোন দল্ভুক্ত হতো? এমন বিপদ থেকে আল্লাহ যে তাকে রক্ষা করেছেন এবং তিনি তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমানদার বানিয়েছেন এজন্য কি সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে না?

    রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন তাঁকে একটি দলের আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি ফিরে আসলে রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করেন, ‘ইমারাত বা নেতৃত্ব কেমন লাগলো?’ জবাবে তিনি বড় একটি সত্য কথা বলে ফেলেন। বলেন, ‘নিজেকে আমার সবার ওপরে এবং অন্যদের আমার নীচে মনে হয়েছে। যিনি সত্যসহ আপনাকে পাঠিয়েছেন,তাঁর শপথ, আজকের পর আর কক্ষণো আমি দু’ব্যক্তির ওপর আমীর হবো না’। তিনি নিজের দুর্বলতা ঢাকার বা সত্য গোপন করার চেষ্টা করেননি। তিনি সব সময় রাসূলুল্লাহর এ হাদীসটি আওড়াতেনঃ ‘ফিতনা থেকে যে ব্যক্তি পরিত্রাণ পেয়েছে, সে প্রকৃত সৌভাগ্যবান।’

    রাসূলুল্লাহকে (সা) তিনি নিজের প্রাণের চেয়ে ভেশী ভালোবাসতেন। তাঁর মধ্যে ছিল আল্লাহর রাসূলের (সা) হিফাজত বা নিরাপত্তার চরম দায়িত্বানুভূতি। মদীনায় কোন প্রকার হৈ চৈ দেখা গেলেই রাসূলুল্লাহর (সা) বাসগৃহের দরজায় তাঁকে সশস্ত্র ও অশ্বরোহী অবস্থায় দেখা যেত। ইসলামের বিধি-বিধান যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। ইসলামের প্রকাশ্য দুশমনদের বিরুদ্ধে যেমন ছিলেন সজাগ, তেমনি ছিলেন নিজের বন্ধুদের ইসলাম সম্পর্কে সামান্য উদাসীনতা ও ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে দারুণ সচেতন। একবার তিনি একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর সাথে অভিযানে বের হলেন। শত্রু বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলে। বাহিনীর আমীর নির্দেশ দিলেন, বাহিনীর কোন সহস্যই আজ তাঁর সোয়ারী- পশু চড়ানোর জন্য ছাড়বে না। কিন্তু একজন মুজাহিদ বিষয়টি অবহিত ছিলেন না। তিনি আমীরের আদেশের বিপরীত কাজ করেন। এ জন্য তিনি আমীরের নিকট থেকে তাঁর প্রাপ্য শাস্তি থেকেও অধিক শাস্তি লাভ করেন। মুজাহিদটি কাঁদছিল, এমন সময় মিকদাদ তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করে বিষয়টি অবগত হলেন। অতঃপর তাঁর ডান হাতটি ধরে তাঁকে আমীরের কাছে টেনে নিয়ে গেলেন এবং আমীরের সাথে তর্ক করে তাঁর ভুল স্বীকার করতে বাধ্য করেন। আমীরকে তিনি বলেন, লোকটিকে কিসাস গ্রহণের সুযোগ দিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করুন। মিকদাদের কথা আমীর মাথা পেতে নিলেন। অবশ্য লোকটি আমীরকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে তিনি দ্বীনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সর্বদা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতেন। তিনি প্রায় সব সময় বলতেন, ‘আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাকে ভালোবাসতে এবং আমাকে এ খবরও দিয়েছেন যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন।’ এভাবে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা লাভে ধন্য হয়েছেন।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীকে সাতজন বিশ্বস্ত সাথী ও উযীর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাকে দেওয়া হয়েছে চৌদ্দ জন। তারা হলেনঃ হামযা, জাফর, আবু বকর, উমার, আলী, হাসান, হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, সালমান, আম্মার, হুজাইফা, আবু জাফর, মিকদাদ ও বিলাল।

    তোষামোদ বা প্রসংশা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার হযরত উসমানের (রা) দরবারে কিছু লোক মিকদাদের সামনেই তাঁর প্রশংসা শুরু করে দিল। তিনি এতে রুষ্ট হলেন যে, তাদের মুখে মাটি ছুঁড়ে মারলেন। হযরত উসমান (রা) বলে উঠলেন, মিকদাদ, এ কী হচ্ছে? বললেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা প্রশংসাকারীর মুখে মাটি ছুঁড়ে মার।’

    ব্যবসা ছিল তাঁর আসল পেশা। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে খাইবার অঞ্চলে কিছু ভূমি দান করেন। পরবর্তীকালে মিকদাদের ওয়ারিসদের নিকট থেকে এক লাখ দিরহামের বিনিময়ে হযরত মুয়াবিয়া (রা) তা খরীদ করে নেন।

    হযরত মিকদাদের স্ত্রী দুবায়া বর্ণনা করেন, একবার মিকদাদ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাকী’র একটি নির্জন স্থানে যান। তিনি কর্ম সমাধা করছেন, এমন সময় দেখতে পেলেন একটি ইঁদুর তার গর্ত থেকে একটি দিনার বের করে আনছে। এভাবে ইঁদুরটি মোট সতেরটি দীনার বের করে আনে। তিনি সেগুলি কুড়িয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে এসে ঘটনা খুলে বলেন। তিন গর্তে হাত দুকিয়েছেন কিনা রাসূল (সা) তা জানতে চান। তিনি যখন বললেন, না, তিনি হাত ঢুকাননি, তখন রাসূল (সা) বললেন, আল্লাহ তোমার এ সম্পদে বরকত দিন। তোমার এ সম্পদের উপর কোন যাকাত নেই। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৪৫)

    হযরত মিকদাদ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) থেকে বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং আলী, আনাস, উদাইদুল্লাহ ইবন আদী, হাম্মাম ইবনুল হারস, আবদুর রহমান ইবন আবী লাইলা প্রমুখ সাহাবী তাঁর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

  • আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল আস (রা)

    আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল আস (রা)

    নাম আবদুল্লাহ, কুনিয়াত আবু মুহাম্মাদ, আবু আবদির রহমান ও আবু নুসাইর। তবে প্রথমোক্ত কুনিয়াত দু’টি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। পিতা প্রখ্যাত সেনানায়ক ও কূটনীতিবিদ হযরত ‘আমার ইবনুল’ আস (রা) ও মাতা রীতা বিনতু মুনাববিহ। বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহর ইসলাম-পূর্ব নাম ‘আল-আস’ (পাপী, অবাধ্য)। আবু যারয়া তাঁর তারীখে উল্লেখ করেছেন, একটি জানাযার অনুষ্ঠানে রাসূল (সা) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমার নাম কি?’ তিনি যখন বললেন, ‘আল-আস’, আসূল (সা) তখন বললেন, না, আজ থেকে তোমার নাম হবে ‘আবদুল্লাহ’। সেই দিন থেকে ‘আল-আস’ হলেন আবদুল্লাহ।

    ইবন সা’দ বলেন, আবদুল্লাহ তাঁর পিতা আমর ইবনুল আসের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পুত্র আবদুল্লাহ অপেক্ষা পিতা আমরের বয়স মাত্র দশ থেকে বারো বছর বেশী ছিল। তবে ওয়াকিদীর মতে পুত্র অপেক্ষা পিতা বিশ বছরের বড় ছিলেন। (তাজকিরাতুল হুফফাল, আল-ইসাবা, আল-ইসতিয়াব) পিতা-পুত্র উভয় মক্কা বিজয়ের পূর্বেই মদীনায় হিজরাত করেন। ইসলাম গ্রহণের পর অধিকাংশ সময় আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সা) সহবত বা সহচর্যে ব্যয় করতেন। ক্রোধ বা শান্ত উভয় অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে যা কিছু বের হতো, তিনি সব কিছু লিখে রাখতেন। কোন কোন সাহাবী এমনটি না করার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, উত্তেজিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে যা কিছু বের হয় তা না লেখা উচিত। বিষয়টি তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উত্থাপন করলেন। রাসূল (সা) বললেন, ‘তুমি আমার সব কথা লিখতে পার। সত্য ছাড়া অন্য কিছুই আমি বলতে পারিনে’। (মুসনাদে আহমদ, আল-ইসতিয়াব) তাঁর পিতা আমর অপেক্ষা রাসূল (সা) তাঁকেই বেশি ভালবাসতেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট তাঁর গুরুত্ব ছিল বেশী।

    রাসূলল্লাহর (সা) সুহবত বা সাহচর্যে কাটানোর পর যে অতিরিক্ত সময়টুকু আব্দুল্লাহ পেতেন, তার সবটুকু প্রায় দিনে রোযা রেখে এবং রাতে ইবাদাতে কেটে যেত। ধীরে ধীরে এ কাজে তিনি এত গভীরভাবে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন যে, স্ত্রী-পরিজন ও দুনিয়ার সবকিছুর প্রতি নিরাসক্ত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তার পিতা রাসূলল্লাহর খিদমতে হাজির হয়ে তাঁর এই অস্বাভাবিক বৈ্রাগী জীবনে বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। রাসূল (সা) আব্দুল্লাহকে ডেকে পিতার আনুগত্যের নির্দেশ দেন।তিনি বলেন, ‘আব্দুল্লাহ, রোযা রাখ, ইফতার কর, নামায পড়, বিশ্রাম নেও এবং স্ত্রী-পরিজনে্র হকও আদায় কর। এই আমার তরীকা বা পন্থা। যে আমার তরীকা প্রত্যাখান করবে সে আমার উম্মাতের মধ্যে গণ্য হবেনা।’

    রাসূলল্লাহর (সা) যুগে সংঘঠিত সব যুদ্ধে হযরত আব্দুল্লাহ অংশগ্রহন করেন। যুদ্ধের সময় সাধারণত সোয়ারী পশুর ব্যবস্থা করেন ও জিনিসপত্র পরিবহনের দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হতো। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবু মুহাম্মদ, আমরা যেখানে বসবাস করি সেখানে দিরহাম ও দীনারের প্রচলন নেই। গৃহপালিত পশু ও জীব-জন্তু আমাদের প্রধান সম্পদ। আমরা ছাগলের বিনিময়ে উট ক্রয়-বিক্রয় করে থকি। এতে কোন আপত্তি নেই তো? তিনি বললেন, একবার রাসূলল্লাহ (সা) নির্দেশ দিলেন একটি উষ্ট্রারোহী বাহিনী গড়ার। আমার কাছে যতগুলো উট ছিল, এক এক করে সবগুলি বিলি করলাম। তবুও সোয়ারী বিহীন কিছু লোক রয়ে গেল। আমি রাসূলল্লাহর খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলাম, ‘ইয়া রাসূলল্লাহ (সা), আমার কাছে যতগুলি উট ছিল, সবগুলি বন্টন করার পরও একদল লোক রয়ে গেছে।’ রাসূল (সা) নির্দেশ দিলেন, ‘একটি উটের বিনিময়ে সদকার দু’টি, তিনটি করে উট দানের অঙ্গীকার করে কিছু উট খরীদ করে নাও।’ আমি সেই মত প্রয়োজনীয় উট সংগ্রহ করে নিলাম। (দারু কুতনী)

    ইয়ামুকের যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি লড়াই করেন। এই যুদ্ধে হযরত ‘আমর ইবনুল আস তাঁর নেতৃত্বের ঝাণ্ডা আবদুল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

    সিফফীনে হযরত আমর ইবনুল আস ছিলেন হযরত মুয়াবিয়ার পক্ষে। পুত্র আবদুল্লাহকে তিনি মুয়াবিয়ার বাহিনীতে যোগদান করতে বাধ্য করেন। প্রকৃতপক্ষে এই গৃহযুদ্ধের প্রতি তিনি ছিলেন ভীষণ বিতৃষ্ণ। এ কারণে মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষে যোগ দিলেও বাস্তবে তিনি যুদ্ধে কোন প্রকার অংশগ্রহণ করেননি। বারবার তিনি পিতাকে এই আত্মঘাতী যুদ্ধ থেকে দূরে সরে থাকার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। (তাজকিরাতুল হুফফাজ)

    হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রা) সিফফীনে হযরত আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করে শহীদ হন। আম্মারের শাহাদাত রাসূলুল্লাহর (সা) একটি বাণীর কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি পিতা আমর ইবনুল আসকে (রা) জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহকে (সা) একথা বলতে শুনেননি, আফসুস, ইবন সুমাইয়্যা (আম্মার)-কে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হত্যা করবে।’ একথা শুনে আমর ইবনুল আস হযরত মুয়াবিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেন, আবদুল্লাহ যা বলছে, তা-কি আপনি শুনছেন না?’ আবদুল্লাহর কথার ব্যাখ্যা করে মুয়াবিয়া (রা) বলেন, ‘সে সবসময় নতুন নতুন সমস্যা নিয়ে আসে। আম্মারকে কি আমরা হত্যা করেছি? প্রকৃতপক্ষে তাঁর হত্যার দায়-দায়িত্ব তাদের যারা তাকে ঘর থেকে বের করে এখানে সংগে নিয়ে এসেছে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

    হযরত আম্মারকে (রা) দুই ব্যক্তি একই সাথে আক্রমণ করে হত্যা করে। তারা এককভাবে এ কৃতিত্ব দাবী করে ঝগড়া করতে করতে হযরত মুয়াবিয়ার নিকট হাজির হয়। ঘটনাক্রমে সেখানে হযরত আবদুল্লাহ (রা) উপস্থিত ছিলেন। তাদের ঝগড়া শুনে তিনি বলেন, ‘তোমাদের দ’জনের কোন একজনের উচিত সন্তুষ্ট চিত্তে তার প্রতিপক্ষের দাবী মেনে নেওয়া। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি, আম্মারকে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হত্যা করবে।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি হযরত মুয়াবিয়াকে বলেন, আম্মারের হত্যাকারীকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিন।’ একথা শুনে হযরত মুয়াবিয়া (রা) বিরক্তি সহকারে তাঁর পিতাকে বলেন, ‘আমর, তোমার এই পাগল ছেলেটিকে কি আমার সামনে থেকে দূরে সরিয়ে নেবে না?’ তারপর তিনি নিজেই আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন, ‘যদি এমনই হয়, তাহলে তুমি আমার সাথে কেন?’ হযরত আবদুল্লাহ জবাব দিলেন, ‘এজন্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যতদিন বাঁচবে তোমার পিতার অনুগত থাকবে।’

    সিফফীনের এই আত্মঘাতী যুদ্ধে যদিও তাঁর হাত কলুষিত হয়নি, তবুও এতে শরীক হওয়ার জন্য আজীবন তিনি অনুশোচনার জর্জরিত হয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘হায়, আমি যদি এর দশ বছর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করতাম!’ হযরত মুয়াবিয়ার পক্ষ অবলম্বন করায় এবং তাঁর হাতে ঝাণ্ডা থাকায় সারা জীবন তিনি তাওবাহ ও ইসতিগফার করেছেন। (আল-ইসতিয়াব)

    হযরত রাজা’ (রা) বলেনঃ একবার আমি একদল লোকের সাথে মসজিদে নববীতে বসেছিলাম। আব্দুল্লাহ ইবন আমর ও আবু সাঈদ খুদরীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইনকে (রা) আসতে দেখে আবদুল্লাহ বলে উঠলেন, ‘এই ব্যক্তি সম্পর্কে আমি কি আপনাদের একটি কথা জানাবো?’ লোকেরা বললো, ‘কেন জানাবে না?’ তিনি বললেন, ‘সিফফীনের যুদ্ধের পর থেকে তাঁর সাথে আমার কোন কথা হয়নি। অথচ তাঁর সন্তুষ্টি আমার নিকট দুনিয়ার সবকিছু থেকে অধিক প্রিয়।’ আবু সাঈদ খুদরী বললেন, ‘আপনি কি তাঁর কাছে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চান?’ তিনি বললেন, হাঁ !’ পরদিন আবু সাঈদ খুদরী (রা) তাঁকে সংগে করে হযরত হুসাইনের (রা) বাড়ী গেলেন। হযরত হুসাইন (রা) সাক্ষাৎ দান করতে প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করেন। পরে আবদুল্লাহর (রা) পীড়াপীড়িতে সম্মত হন। সিফফীনে তাঁর অংশগ্রহণের পটভূমি ব্যাখা করে তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অনুযায়ী আমি আমার তরবারি উম্মুক্ত করিনি, নিযা দ্বারা যেমন কাউকে আহত করিনি তেমনি কোন তীরও চালাইনি।’ (উসুদুল গাবা)

    জ্ঞান ও মান-মর্যাদার দিক দিয়ে সমগ্র সাহাবা সমাজের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ (রা) বিশেষ স্থান ছিল। মাতৃভাষা আরবী ছাড়াও হিব্রু ভাষায় তাঁর পান্ডিত্য ছিল। তাওরাত ও ইনজিল তিনি গভীরভাবে অধ্যায়ন করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার একহাতে মধু, অন্য হাতে চর্বি এবং আমি তা চেটে চেটে খাচ্ছি। ‘স্বপ্নের এ কথা আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বললাম। তিনি বললেন, ‘তুমি দু’খানা গ্রন্থ তাওরাত ও আল-কুরআন পাঠ করবে’। (আল-ইসাবা)

    হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ নিঃসৃত বাণীর বিরাট একটি অংশ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি তাঁর সংগ্রহটির নাম রেখেছিলেন ‘সাদেকা’। তাঁর কাছে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে এবং সে সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিতে কিছু না থাকলে উক্ত ‘সাদেকা’ দেখে উত্তর দিতেন। (মুসনাদে আহমদ) এই সংগ্রহটি ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয়। মুজাহিদ বলেনঃ একবার আমি তাঁর বিছানার নীচ থেকে একখানা বই বের করে দেখতে লাগলাম। তিনি নিষেধ করলেন। বললাম, ‘আপনি তো আমাকে কোন ব্যাপারে নিষেধ করেন না। আজ এমন করছেন কান?’ বললেন, ‘এ সত্যের সেই গ্রন্থ যা আমি একাই রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনে সংগ্রহ করেছি’। তিনি আরও বলেন, ‘এই গ্রন্থখানি এবং পবিত্র কুরআন ও ওয়াহাজের ঐ জায়গীরটি যদি আমাকে দেওয়া হয় তাহলে দুনিইয়ায় আমার আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই।’

    হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সাত শত। তারমধ্যে সতেরটি মুত্তাফাক আলাইহি, আটটি বুখারী এবং কুড়িটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (তাহজীব)

    হযরত আবদুল্লাহর (রা) হালকায়ে দারসে-হাদীসের সীমা ছিল সুপ্রশস্ত। দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ হাদীস শোনার জন্য তাঁর দারসে হাজির হতো। তাছাড়া তিনি যেখানেই যেতেন, জ্ঞান পিপাসুদের বিশাল সমাবেশ ঘটতো তাঁর পাশে। একজন নাখয়ী শায়খ বর্ণনা করেন, ‘একবার আমি ইলিয়ার মসজিদে জামায়াতের সাথে নামায আদায় করেছিলাম। এক ব্যক্তি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। নামায শেষে চারদিক থেকে মানুষ তাঁর নিকট গুটিয়ে বসলো। জিজ্ঞেস করে জানতে পেলাম, ইনি আবদুল্লাহ ইবন আমার ইবনুল আস।

    হযরত আবদুল্লাহ তাঁর ছাত্রদের গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তাঁর সমকালীন জ্ঞানীদের প্রতিও তিনি ছিলেন গভীর শ্রদ্ধাশীল। একবার তাঁর সামনে হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের (রা) প্রসঙ্গ উঠলো। তিনি বললেন, ‘তোমরা এমন এক ব্যক্তির প্রসঙ্গ উঠিয়েছো যাঁকে আমি সেই দিন থেকে ভালোবাসি যেদিন রাসূল (সা) বলেছিলেন, তোমরা চার ব্যক্তির নিকট থেকে কুরআনের জ্ঞান অর্জন কর এবং সর্বপ্রথম তিনি আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের নামটি উচ্চারণ করেছিলেন।’

    হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) বহু সংখ্যক সাহাবীর নিকট থেকে, যেমনঃ উমার, আবু দারদা, মুয়াজ, আবদুর রহমান বিন আউফ, তাঁর পিতা আমর প্রমুখ- হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবু নুয়াঈম বলেন, ‘সাহাবীদের মধ্যে ইবন উমার, আবু উমামা, মিসওয়ার, সায়িব ইবন ইয়াযিদ ও আবুত তুফাইল এবং বহু সংখ্যক বিশিষ্ট তাবেঈ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল-ইসাবা)

    তাকওয়া, পরহিযগারী ও অতিরিক্ত ইবাদাতকারী হিসাবে আবদুল্লাহ ইবন আমরের বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। ইতিহাসে তাঁকে প্রার্থনাকারী, তাওবাকারী, ইবাদাত গুজার, ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁর পিতা আমর ছিলেন যেমন বুদ্ধিমত্তা, চাতুর্য ও কৌশলীদের গুরু, তেমনি তিনি ছিলেন আবেদ, যাহেদ ও স্পষ্টবাদীদের মধ্যমণি। তাঁর জীবনের সবটুকু ইবাদাতে ব্যয় হয়েছে। যখন যতটুকু কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, মুখস্থ করে ফেলেছেন। কুরআনের অবতরণ শেষ হলে তিনিও হলেন সমগ্র কুরআনের হাফেজ। জিহাদের ময়দানে সব সময় তাঁকে প্রথম সারিতে দেখা যেত। আবার সশস্ত্র জিহাদ শেষ হলে তাঁকে দেখা যেত মসজিদে-দিনে রোযাদার এবং রাতে ইবাদাত গুজার। কুরআন ও তাসবীহ তিলাওয়াত অথবা তাওবাহ ইসতিগফারে তিনি নিমগ্ন থাকতেন। মোটকথা, যখন জিহাদের ডাক না থাকতো, চব্বিশ ঘন্টা তিনি সাওম, সালাত ও তিলাওয়াতে ডুবে থাকতেন।

    প্রকৃতিগতভাবেই রুহবানিয়্যাত বা বৈরাগ্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক প্রবণতা ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) একবার তাঁকে ডেকে বললেন, ‘আবদুল্লাহ, আমি জানতে পেরেছি, তুমি সারাটি জীবন দিয়ে রোযা রেখে ও রাতে ইবাদাত করে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য সংকল্প করেছো’। তিনি বললেন, ‘হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল (সা) বললেন, ‘সে শক্তি তোমার নেই। রোযা রাখ, আবার ইফতারও কর এবং নামায পড়, আবার বিশ্রামও কর। মাসে শুধু তিন দিন রোযা রাখ। কারণ, প্রতিটি নেকীর দশগুণ বদলা দেওয়া হয়।’ তিনি আরজ করলেন, ‘আমি এর থেকেও বেশী শক্তি রাখি’। রাসূল (সা) বলেলেন, ‘একদিন রোয রাখবে এবং দইদিন ইফতার করবে’। তিনি আবার আরজ করলেন, ‘আমি এর থেকেও বেশী শক্তি রাখি। ‘রাসূল (সা) বললেন’, একদিন রোযা রাখবে এবং একদিন ইফতার করবে। এটাই হযরত দাউদের (আ) তরীকা এবং এটাই রোযার সর্বোত্তম তরীকা বা পদ্ধতি’। তিনি আবারও আরজ করলেন। ‘আমি এর থেকেও উত্তম রোযা রাখতে পারি’। রাসূল (সা) বললেন, ‘এর থেকে উত্তম রোযা আর নাই’। অন্য একবার রাসূল (সা) তাঁর বাড়ীতে যেয়ে বলেন, ‘তোমার দেহের, তোমার চোখের, তোমার পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবের তোমার ওপর হক বা অধিকার আছে’।

    সারাটি জীবন তিনি রোযার ক্ষেত্রে দাউদের (আ) অনুসরণ করেন এবং রাতের বেশীর ভাগ সময় ইবাদাতে অতিবাহিত করেন। কুরআন তিলাওয়াতের এত বেশী আগ্রহ ছিল যে, প্রতি তিন দিনে একবার খত করতেন। তবে শেষ জীবনে এত অধিক ইবাদাত তাঁর জন্য কষ্টদায়ক হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে আফসুস করে বলতেন, ‘হায়, যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সা) প্রদত্ত ‘রুখসত’ বা কম করার অনুমতি গ্রহণ করতাম। (আল-ইসাবা)

    দুনিয়ার প্রতি আবদুল্লাহর এই উদাসীনতা দেখে তাঁর পিতা ’আমর ইবনুল ’আস প্রায়ই রাসূলুল্লাহর কাছে অভিযোগ করতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) আবদুল্লাহর দাতটি ধরে তাঁর পিতার হাতের মধ্যে দিয়ে বলেন, ‘তোমাকে আমি যা বলি তাই কর, এবং তোমার পিতার ইতায়াত বা আনুগত্য কর’। [রিজালুন হাওলার রাসূল (সা)] আবদুল্লাহ আজীবন তাঁর পিতার আনুগত্য করেছেন। পিতার নির্দেশেই তাই তিনি মুয়াবিয়ার পক্ষে সিফফীনে গিয়েছেন।

    হযরত ’আমর ইবনুল ’আস (রা) পৈত্রিক মীরাস থেকে বিশাল সম্পত্তি ও বহু দাস-দাসী লাভ করেন। তায়েফ ‘ওয়াহাজ’ নামক যে জায়গীরটি তিনি লাভ করেন তার মুল্য ছিল প্রায় দশ লাখ দিরহাম। (উসুদুল গাবা) তাঁর পক্ষ থেকে সেখানে চাষাবাদ করা হতো। এই জায়গীর নিয়ে একবার আম্বাসা ইবন সুফইয়ানের সাথে বিবাদ দেখা দেয়। উভয় পক্ষে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যাওয়ার উপক্রম হয়। আবদুলাহর ভাই হযরত খালিদ ইবনুল ’আস আসলেন তাঁকে বুঝানোর জন্য। তিনি খালিদকে বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের হিফাজত বা রক্ষণবেক্ষোণ করতে যেয়ে নিহত হবে সে শহীদ-তোমার কি রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণী স্মরণ নেই?’ (মুসনাদে আহমদ)

    হযরত আবদুল্লাহর (রা) মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কে সীরাত লেখকদের মতভেদ রয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স কত হয়েছিল সে সম্পর্কেও ঐতিহাসিকরা একমত হতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর স্থান সম্পর্কে যেমন শাম, মক্কা, তায়েফ ও মিসরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি সন হিসাবে ৬৫, ৬৮ ও ৬৯ হিজরীর কথা বলা হয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে তিনি হিজরী ৬৫ সনে ‘ফুসতাত’ (মিসর) নগরে ৭২ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তখন মারওয়ান ইবনুল হাকাম ও আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই চলছিল, এ কারণে তাঁর লাশ সাধারণ গোরস্তানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁকে তাঁর আবাস স্থলেই দাফন করা হয়। (আল-ইসাবা, তাজকিরাতুল হুফফাজ)

  • আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ (রা)

    আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ (রা)

    নাম আবদুল্লাহ, আবু মুহাম্মাদ কুনিয়াত। পিতা জাহাশ, মাতা উমায়মা। বিভিন্ন দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক। মা উমায়মা বিনতু আবদিল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফু। বোন উম্মুল মু’মিনীন হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশ রাসূলুল্লাহর (সা) স্ত্রী। তাই একাধারে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফাতো ভাই ও শ্যালক।

    তাঁর জম্ম সন সম্পর্কে ইতিহাসে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে হিজরী তৃতীয় সনে উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল চল্লিশ বছরের কিছু বেশী। এ তথ্যের উপর ভিত্তি করে বলা যায় রাসূলুল্লাহর (সা) নবুয়াত লাভের চব্বিশ/পঁচিশ বছর পূর্বে তিনি মক্কায় জম্ম গ্রহণ করেন। জাহিলী যুগে তিনি হারব ইবন উমাইয়্যার হালীফ (মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ) ছিলেন। তবে কেউ কেউ বনু আবদি শামসকে তাঁর হালীফ বলে উল্লেখ করেছেন। মূলতঃ দু’টি বর্ণনার মধ্যে কোন বিরোধ নেই। কারণ, হারব ইবন উমাইয়্যা ছিল বনু আবদি শামসেরই একজন সদস্য।

    হযরত আবদুল্লাহ ছিলেন ‘সাবেকীন ইলাল ইসলাম’ বা প্রথম ভাগে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (সা) দারুল আরকামে আশ্রয় গ্রহণের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

    ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশদের যুলুম-অত্যাচারের হাত থেকে তিনি ও তাঁর গোত্র রেহাই পাননি। এই কারণে দুইবার হাবশায় হিজরত করেন। শেষের হিজরাতে তাঁর পরিবারের সকল সদস্য অর্থাৎ দুই ভাই আবু আহমদ ও উবাইদুল্লাহ, তিন বোন যয়নাব, উম্মু হাবীবা, হামনা এবং উবায়দুল্লাহর স্ত্রী উম্মু হাবীবা বিনতু আবী সুফইয়ান তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তাঁর ভাই উবায়দুল্লাহ হাবশায় পৌঁছে ইসলাম ত্যাগ করে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে এবং মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) অবস্থায় সেখানে মারা যায়।

    ইসলাম ত্যাগ করায় তার স্ত্রী উম্মু হাবীবা তাঁর থেকে পৃথক হয়ে যান এবং পরবর্তীকালে রাসূল (সা) তাঁকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা কান করেন। (আল ইসাবা ২/২৭২) হাবশায় কিছুকাল অবস্থানের পর হযরত আবদুল্লাহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় ফিরে এসে দেখেন তাঁর গোত্র বনু গানাম- এর সকল সদস্য ইসলাম গ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) অনুমতি নিয়ে তিনি তাঁদের সকলকে সঙ্গে করে মদীনায় হিজরাত করেন। তাঁদের পূর্বে কাবল হযরত আবু সালামা মদীনায় হিজরাত করেছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, তাঁর গোত্রের সকলই ইসলাম গ্রহণ করেছলেন, তিনি গোত্রের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে সঙ্গে করেন মদীনায় পৌঁছেন। বনু গানামের একটি লোককেও তিনি মক্কায় ছেড়ে যাননি।

    তাঁরা মক্কা থেকে যাত্রা করার কিছুক্ষণ পর কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যথাঃ উতবা, আবু জাহল প্রমুখ ঘর থেকে বের হয়ে বনু গানামের মহল্লার দিকে যায়। তাদের উদ্দেশ্য, গানাম গোত্রের কে কে গেল, আর কে কে থাকলো এটাই দেখা। তারা দেখলো, গোটা মহল্লা জন-মানবহীন। কোন বাড়ীর দরজা খোলা, আবার কোনটা তালাবদ্ধ। এ অবস্থা দেখে উতবা মন্তব্য করলো ‘বনু জাহাশের বাড়ীগুলি তো খা খা করছে, তাদের অধিবাসীদের জন্য মাতাম করছে।’ একথা শুনে আবু জাহল আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের ঘরে হাত লাগালো। জিনিসপত্র ইচ্ছে মত লুটপাট করলো। গোটা মহল্লার মধ্যে আবদুল্লাহর ঘরটি ছিল সবচেয়ে সুন্দর ও প্রচুর্যময়। আব্দুল্লাহ রাসূলুল্লাহর নিকট তাঁর বাড়ীতে আবু জাহলের লুটপাটের কথা উল্লেখ করলে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘আবদুল্লাহ, তুমি কি খুশী নও যে, এর বিনিময়ে আল্লাহ জান্নাতে তোমাকে একটি বাড়ী দান করবেন।’ জবাবে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়, ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল (সা) বললেন, ‘তুমি তাই লাভ করবে।’ আবদুল্লাহ খুশী হলেন।

     মদীনা পৌঁছার পর আবদুল্লাহর গোটা খন্দানকে হযরত আসিম ইবন সাবিত আল-আনসারী আশ্রয় দান করেন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের দু’জনের মধ্যে মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।

    হিজরী দ্বিতীয় সনের রজব মাসে রাসূল (সা) আটজন সাহাবীর একটি দলকে নির্বাচন করলেন। এই আট জনের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ও সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসও ছিলেন। রাসূল (সা) সকলকে সম্বোধন করে বললেন, তোমাদের মধ্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় যে সর্বাধিক সহনশীল তাঁকেই তোমাদের আমীর বানাবো। অতঃপর আবদুল্লাহকে তিনি আমীর মনোনীত করলেন। এভাবে তিনি মুমিনদের একটি দলের প্রথম আমীর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। রাসূল (সা) তাঁকে যাত্রাপথ নির্দেশ করে তাঁর হাতে একটি সীল মোহর অঙ্কিত চিঠি দিয়ে বললেন, ‘দুই দিনের আগে এই চিঠিটি খুলবে না। দুইদিন পথ চলার পর খুলে পড়বে এবং এই চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবে।’

    হযরত আবদুল্লাহ তাঁর সাথীদের নিয়ে মদীনা থেকে রওয়ানা হলেন। দুইদিন পথ চলার পর নির্দেশ মত চিঠিটি খুলে পড়লেন। চিঠিতে নির্দেশ ছিল, মক্কা ও তায়েফের মাঝখানে নাখলা নামক স্থানে পৌছে কুরাইশদের গতিবিধি ও অন্যান্য অবস্থা অবগত হবে। তিনি অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে এ হুকুম মাথা পেতে নিলেন। সঙ্গীদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, ‘বন্ধুগণ, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) এ আদেশ কার্যকরী করে ছাড়বো। তোমাদের মধ্যে যে শাহাদাতের অভিলাষী সে আমার সাথে যেতে পারে, এবং যে তা পছন্দ না কর ফিরে যেতে পার। আমি কাউকে বাধ্য করবো না।’ এ ভাষণ শুনে সকল তাঁর সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। নাখলা পৌঁছে তাঁরা কুরাইশদের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে লাগলেন। একদিন কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফিলা এই পথ দিয়ে অতিক্রম করছিল। এই কাফিলায় ছিল চার ব্যক্তি। ‘আমর ইবনুল হাদরামী, হাকাম ইবন কায়সান, উসমান ইবন আবদিল্লাহ এবং উসমানের ভাই মুগীরা। তাদের সাথে ছিল চামড়া, কিসমিস ইত্যাদি পণ্য সামগ্রী।

    কাফিলাটি আক্রমণ করা না করা বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবন জাহশ তাঁর সঙ্গীদের সাথে পরামর্শ করলেন। সেই দিনটি ছিল হারাম মাসসমূহের সর্বশেষ দিন। উল্লেখ্য যে, জুল কা’দা, জুল হিজ্জা, মুহাররম ও রজব- এ চারটি মাস হচ্ছে হারাম মাস। প্রচীন কাল থেকে আরবরা এ মাসগুলিতে যুদ্ধবিগ্রহ ও খুন-খারাবী নিষিদ্ধ বলে মনে করতো। তাঁরা ভেবে দেখলেন, একদিকে আজ কাফিলাটি আক্রমণ করলে হারাম মাসে তা করা হবে। অন্যদিকে আজ আক্রমণ না করে আগামীকাল করলে কাফিলাটি মক্কার হারামের আওতায় পৌঁছে যাবে। মক্কার হারাম সকলের জন্য নিরাপদ স্থান। সেখানে তাদের আক্রমণ করলে হারাম কাজ করা হবে। পরামর্শের পর তারা আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তাঁরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কাফিলার নেতা ‘আমর ইবনুল হাদরামীকে হত্যা, উসমান ইবন আবদিল্লাহ ও হাকাম ইবন কায়সানকে বন্দী করেন এবং অন্যজন পালিয়ে যায়। তাঁরা প্রচুর পণ্যসামগ্রী গনীমাত হিসাবে লাভ করেন। আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ অর্জিত গ্নীমাতের এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য রেখে দিয়ে অবশিষ্ট চার ভাগ তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করে দেন। তখনও গনীমাত বন্টনের কোন নিয়ম-নীতি নির্ধারণ হয়নি। তবে আবদুল্লাহর এই ইজতিহাদ সঠিক হয়েছিল।পরে তাঁর এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে কুরআনে ‘খুমুস’ (পঞ্চমাংশ) –এর আয়াত নাযিল হয়।

    হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ গনীমাতের এক পঞ্চমাংশ নিয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হলেন। রাসূল (সা) তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, আমি তো তোমাকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ মাসে রক্তপাতের নির্দেশ দিইনি।

    আবদুল্লাহর এই দুঃসাহস ও বাড়াবাড়ির জন্য অন্য মুসলিমরাও তাঁর নিন্দা করলেন। কুরাইশরাও এই ঘটনাকে খুব ফলাও করে প্রচার করতে লাগলো। তারা বলে বেড়াতে লাগলো, মহাম্মাদের (সা) সাহাবীরা হারাম মাসগুলিকে হালাল বানিয়ে নিয়েছে। হত্যা ও রক্ত ঝরিয়ে তারা এই মাসগুলির অবমাননা করেছে। হযরত আবদুল্লাহ ও তাঁর সাথীরা ভীষণ বিপদে পড়লেন। রাসূলুল্লাহর (সা) অবাধ্যতা হয়েছে এই ভয়ে তাঁরা ভীত হয়ে পড়লেন। তাঁরা অনুশোচনায় জর্জরিত হতে লাগলেন। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা তাদের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল করলেনঃ ‘হারাম (নিষিদ্ধ) মাস সম্পর্কে তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, সে মাসে যুদ্ধ করা কি জায়েয? আপনি বলে দিন, এই মাসে যুদ্ধ করা বড় ধরনের অপরাধ। আর আল্লাহর রাস্তায় বাধা দেওয়া, তাঁকে অস্বীকার করা, মসজিদে হারাম (কা’বা) থেকে বিরত রাখা এবং তার অধিবাসীদের সেখান থেকে বিতাড়িত করা আল্লাহর কাছে তার থেকেও বড় অপরাধ। আর ফিতনা বা বিপর্যয় সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষাও খারাপ কাজ।’ (আল বাকারাহ- ২১৭)

    কুরআনের এ আয়াত নাযিলের পর তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মুসলমানরা দলে দলে তাঁদের অভিনন্দন জানালেন এবং তাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাসূল (সা) তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, তাদের নিকট থেকে গনীমাতের অংশ গ্রহণ করলেন এবং মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দী দু’জনকে মুক্তি দিলেন।

    প্রকৃতপক্ষে আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ও তাঁর সঙ্গীদের এ ঘটনাটি ছিল মুসলমানদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁদের এ গনীমাত ইসলামের প্রথম গনীমাত, তাঁদের হাতে নিহত ব্যক্তি মুসলমানদের হাতে নিহত প্রথম মুশরিক বা অংশীবাদী, তাঁদের হাতে বন্দীদ্বয় মুসলমানদের হাতে প্রথম বন্দী- তাঁদেরকে দেওয়া পতাকা রাসূলুল্লাহর (সা) তুলে দেওয়া প্রথম পতাকা এবং এই দলটির আমীর আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ প্রথম আমীর যাঁকে আমীরুল মু’মিনীন বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন জাহাশই প্রথম ব্যক্তি যিনি গনীমাতের ব্যাপারে সর্বপ্রথম খুমুসের প্রবর্তন করেন এবং আল্লাহ তা’য়ালা অহী নাযিল করে তা সমর্থন করেন। (আল-ইসতিয়াব)

    হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াককাস বর্ণনা করেছেন, উহুদ যুদ্ধের একদিন আগে আমি ও আবদুল্লাহ দুআ করলাম। আমার ভাষা ছিল, ‘হে আল্লাহ, আগামীকাল যে দুশমন আমাদের সাথে লড়বে সে যেন অত্যন্ত সাহসী ও রাগী হয়। যাতে আমি তোমার রাস্তায় আমি তাঁকে হত্যা করে তার অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিতে পারি।’ আমার এ দুআ শুনে আবদুল্লাহ ‘আমীন’ বলে উঠে। তারপর সে হাত উঠিয়ে দুআ করেঃ হে আল্লাহ, আমাকে এমন প্রতিদ্বন্দ্বী দান কর যে হবে ভীষণ সাহসী ও দ্রুত উত্তেজিত। আমি তোমার রাস্তায় তার সাথে যুদ্ধ করবো। সে আমাকে হত্যা করে আমার নাক কান কেটে ফেলবে। যখন আমি তোমার সাথে মিলিত হব এবং তুমি জিজ্ঞেস করবে, ‘আবদুল্লাহ, তোমার নাক-কান কিভাবে কাটা গেল?’ তখন আমি বলবো,তোমার ও তোমার রাসূলের জন্য।’ তিনি যেন দৈব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিলেন, তাঁর এ বাসনা পূর্ণ হতে চলেছে। তাই বার বার কসম খেয়ে বলছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমি শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবো এবং সে আমাকে হত্যা করে আমার নাক-কান কেটে আমাকে বিকৃত করবে।’ (উসুদুল গাবা)

    হিজরী তৃতীয় সনের শাওয়াল মাসে উহুদ প্রান্তরে তুমুল লড়াই শুরু হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ এমন তীব্র আক্রমণ চালালেন যে তাঁর তরবারিটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে খেজুর শাখার একটি ছড়ি দান করলেন। দীর্ঘক্ষণ তিনি তা দিয়ে লড়তে থাকেন। এ অবস্থায় আবুল হাকাম ইবন আখনাস সাকাফীর একটি প্রচন্ড আঘাতে তাঁর শাহাদাতের বাসনা পূর্ণ হয়ে যায়। মুশরিকরা তাঁর দেহের বিকৃতি সাধন করে। নাক-কান কেটে সুতায় মালা গাঁথে। হযরত সা’দ এ দৃশ্য দেখে বলে ওঠেনঃ ‘আল্লাহর কসম, আবদুল্লাহর দুআ আমার দুআ অপেক্ষা উত্তম ছিল।’

     চল্লিশ বছরের কিছু বেশী সময় তিনি জীবিন লাভ করেছিলেন। তাঁর মামা সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত হামযার সাথে একই কবরে তাঁকে দাফন করা হয়।

    নাখলা অভিযানে আবদুল্লাহকে আমীর নিযুক্ত করে পাঠানোর সময় রাসূল (সা) তাঁর সঙ্গীদের বলেছিলেনঃ ‘যদিও আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ তোমাদের মদ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নয় তবে সে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সবচেয়ে বেশী সহ্য করতে পারে।’ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ভালোবাসা তাঁকে দুনিয়ার সব কিছু থেকে উদাসীন করে তোলে। প্রিয় জীবনটি আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর একমাত্র বাসনা। তাঁর সে বাসনা পূর্ণ হয়েছিল। ‘আল-মুজাদ্দা’ ফিল্লাহ’ (আল্লাহর রাস্তায় কানকাটা) এ সম্মানজনক উপাধি তিনি লাভ করেছিলেন। বদর যুদ্ধে বন্দীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) আবু বকর, উমার ও আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের সাথে পরামর্শ করেছিলেন।

  • আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা)

    আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা)

    আবদুল্লাহ নাম, কুনিয়াত আবু আবদির রহমান। পিতা ‘উমার ইবনুল খাত্তাব, মাতা যায়নাব। সঠিক বর্ণনা মতে হিজরী তৃতীয় সনে উহুদ যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর। এই হিসাবে নবওয়াতের দ্বিতীয় বছরে তার জম্ম। নবওয়াতের ষষ্ঠ বছরে হযরত্ন উমার যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, তখন আবদুল্লাহর বয়স প্রায় পাঁচ।

    বুদ্ধি হওয়ার পব থেকেই আবদুল্লাহ নিজের বাড়ীটি ইসলামের আলোকে আলোকিত দেখতে পান। ইসলামী পরিবেশেই তিনি বেড়ে ওঠেন। অবশ্য কোন কোন বর্ণনা মতে, পিতার পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহন করেন। তবে সঠিক মত এই যে, পিতার ইসলাম গ্রহণের সময় তিনি অল্প বয়স্ক। অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান হিসাবে তিনিও পিতার ধর্মানুসারী হয়ে যান।

    হযরত উমার (রা) কাফিরদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পরিবার-পরিজনসহ মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। পিতার সাথে আবদুল্লাহও মদীনায় চলে যান। হিজরাতের পর সত্য-মিথ্যার প্রথম সংঘর্ষ হয় বদর প্রান্তরে। ইবন উমর তখন তের বছরের কিশোর। জিহাদে যোগদানের আবেদন জানালেন। জিহাদের বয়স না হওয়ায় রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করলেন। এক বছর পর আবার সামনে এলো উহুদের যুদ্ধ। এবার তিনি নাম লেখালেন। একই কারণে এবারও রাসূলুল্লাহর (সা) অনুমতি লাভে ব্যর্থ হলেন। এর দুই বছর পর হিঃ পঞ্চম সনে খন্দকের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আবদুল্লাহর বয়স পনেরো। এই প্রথম তিনি জিহাদে গমনের জন্য রাসূলুল্লাহর অনুমতি লাভ করেন।

    ষষ্ঠ হিজরীতে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সফর সংঙ্গী ছিলেন এবং বাইয়াতে রিদওয়ানের সৌভাগ্য অর্জন করেন। ঘটনাক্রমে পিতা হযরত উমারের (রা) পুর্বেই তিনি এ গৌরব লাভ করেন। এদিন হযরত উমার (রা) এক আনসারীর নিকট থেকে একটি ঘোড়া আনার জন্য তাঁকে পাঠিয়েছিলেন। তিনি পথে বের হতেই শুনতে পেলেন রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীদের নিকট থেকে বাইয়াত গ্রহণ করছেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে প্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেন।

    খাইবার অভিযানেও তিনি শরীক ছিলেন। এই সফরে রাসূল (সা) হালাল-হারামের যে বিধান ঘোষণা করেন, তিনি তার একজন বর্ণনাকারী। (বুখারী)

    মক্কা বিজয়ের সময় ইবন উমার বিশ বছরের নওজোয়ান। এ অভিযানের তিনি অন্য মুজাহিদদের পাশাপাশি ছিলেন। তাঁর হাতিয়ার ছিল একটি দ্রুতগামী ঘোড়া ও একটি ভারি নিযা। গায়ে ছিল এক প্রস্থ চাদর। এ সময় একদিন তিনি নিজ হাতে ঘোড়ার ঘাস কাটছিলেন, এ অবস্থায় রাসূল (সা) তাঁকে দেখে বলে ওঠেন- ‘আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ।’ মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহর পেছনে পেছনে খানায়ে কাবায় প্রবেশ করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সর্বপ্রথম উসামা বিন যায়িদ, উসমান বিন তালহা ও বিলাল ইবন রিবাহ প্রবেশ করেন। তারপর আমিই প্রথম কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশ করি।

    মক্কা বিজয়ের পর হুনাইন অভিযান এবং তায়িফ অবরোধেও তিনি অংশগ্রহণ করেন। অসংখ্য মুসলমানের সাথে ইবন উমারও রাসূলুল্লাহর (সা) বিদায় হজ্জে সংগী হয়ে এ হজ্জ আদায় করেন।

    নবম হিজরীতে পরিচালিত হয় তাবুক অভিযান। তিরিশ হাজার মুজাহিদসহ রাসূল (সা) তাবুক যাত্রা করেন। ইবন উমারও ছিলেন এ বাহিনীর অন্যতম সদস্য। মোটকথা খন্দক থেকে শুরু করে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সকল গুরুত্বপুর্ণ অভিযান ও ঘটনায় তিনি শরীক ছিলেন।

     প্রথম খলীফার সময়কালে ইবন উমারকে উল্লেখযোগ্য কোন কর্মকাণ্ডে জড়িত দেখা যায় না। অথবা জড়িত থাকলেও ইতিহাসে সে সম্পর্কে তেমন কিছু পাওয়া যায় না।

    তবে দ্বিতীয় খলীফার যুগে কোন কোন অভিযানে সাধারণ সৈনিক হিসাবে তাঁর উপস্থিতি ইতিহাসে দেখা যায়। নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। সিরিয়া ও মিসর অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণ করেন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। সিরিয়া ও মিসর অভিযানে তাঁর অংশগ্রহণের কথা ইতিহাসে জানা যায়। তবে এসব অভিযানে তাঁর উল্লেখযোগ্য কোন অবদানের কথা জানা যায় না। এ সময় রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডেও তাঁকে অনুপস্থিত দেখ যায়। এর কারণ সম্ভবতঃ এই যে, খলীফা উমার (রা) তাঁর নিকট আত্মীয়দের খিলাফতের বিশষ কোন কাজে জড়িত হওয়া পছন্দ করতেন না। এতদসত্তেও মুসলিম উম্মাহর লাভ-ক্ষতির কোন প্রশ্ন দেখা দিলে তিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পিতার সকল কঠোরতা মাথা পেতে নিতেন। দৃষ্টান্তস্বরুপ বলা যায়, খলীফা উমার (রা) যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ইবন উমার তাঁর বোন উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসার (রা) মুখে শুনতে পেলেন, উমার (রা) কাউকে তাঁর স্থলাভিষক্ত করে যেতে চান না। ইবন উমার পিতার অবর্তমানে উম্মাতেরন ভবিষ্যত সমস্যার কথা চিন্তা করলেন। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পিতার সামনে উপস্থিত হয়ে সাহসের সাথে আরজ করলেন, “মানুষের নানা কথা আমার কানে আসছে, আপনাকে তা জানাতে এসেছি। তাদের ধারণা আপনি কাউকে স্থলাভিষিক্ত করে যেতে চান না। তিনি আরো বলেন, ধরে নিন কোন রাখাল আপনার উট-বকরী চরায়। সে যদি উট-বকরীর পাল মাঠে ছেড়ে দিয়ে আপনার কাছে চলে আসে, তাহলে তার পরিণতি কেমন হয়? মানুষের রাখালী তো আরো কঠিন কাজ।” এ যুক্তিপুর্ণ কথা খলীফা উমারের মনোঃপুত হল। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি বললেন, আল্লাহ নিজেই তার পশু পালের তত্বাবধায়ক।শেষ পর্যন্ত তিনি পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের দায়িত্ব একদল উঁচু পর্যায়ের সাহাবীদের ওপর ন্যস্ত করে যান।

    পিতার ওফাতের পর সর্বপ্রথম ইবন উমারকে খলীফা নির্বাচনের মজলিসে দেখা যায়। হযরত উমার অসীয়াত করে যান যে, পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের ব্যাপারে আবদুল্লাহ শুধুমাত্র পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করবে। তাকে খলীফা বানানো চলবে না।

    খলীফা উসমানের যুগে প্রশাসনিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহনের সুযোগ লাভ করেন। তবে অবৈধ কোন ফায়দা লাভের চেষ্টা কখনো করেননি। খলীফা উসমান (রা) তাঁকে কাজীর পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেন। তিনি প্রত্যাখ্যান করেন এই বলে যে, আমি দুই ব্যক্তির মাঝে না ফয়সালা করে থাকি, না দুই ব্যক্তির ইমামতি করে থাকি। কারণ, রাসূল (সা) বলেছেন, ‘কাজী তিন শ্রেণীর। এক, জাহিল। তাদের ঠিকানা জাহান্নাম। দুই, দুনিয়াদার আলিম, তারাও জাহান্নমী। তিন, যারা ইজতিহাদ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। তাদের জন্য না শাস্তি না পুরস্কার।’ খলীফা বললেন, ‘তোমার পিতাও তো ফয়সালা করতেন’। বললেনঃ হাঁ, একথা সত্য। তবে কোন সমস্যায় পড়লে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে যেতেন। রাসূলও (সা) যখন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অপারাগ হতেন তখন জিবরাঈলের শরণাপন্ন হতেন। কিন্তু আমি এখন কার কাছে যাব? আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে অব্যাহতি দিন। খলীফা তাকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন। তবে তার কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, একথা তিনি অন্য কারো নিকট প্রকাশ করবেন না। কারণ, খলীফা জানতেন, লোকেরা যদি জানতে পারে ইবন উমার কাজীর পদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়াছে, তাহিলে এ পদের জন্য আর কোন সত্যনিষ্ঠ মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। সকলে ইবন উমারের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে।

    খিলাফতের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে দূরে থাকলেও জিহাদ ফী সাবিলিল্লাহ থেকে কখনো দূরে থাকেননি। জিহাদের ডাক যখনই এসেছে, সাড়া দিয়েছেন। হিজরী ২৭ সনে আফ্রিকা (তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া ও মরক্কো) অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। হিজরি ৩০ সনে সাঈদ ইবন আসের সাথে খুরাসান ও তিবরিস্তান অভিযানে শরীক হন। কিন্তু আভ্যন্তরীণ হাঙ্গামা ও ফিত্না-ফাসাদ শুরু হওয়ার পর সম্পূর্ণ নির্জনতা অবলম্বলন করেন। কিলাফতের কোন কর্মকান্ডে আর অংশগ্রহণ করেননি। হযরত উসমানের (রা) শাহাদাতের পর লোকেরা তাঁকে খলীফার পদটি গ্রহণের অনুরোধ জানায়। তিনি দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। লোকেরা তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে স্বীয় সিদ্বান্তে অটল থাকেন।

    আলী ও মুয়াবিয়া (রা) – এ দু’জনের মধ্যে কার কিলাফত তিনি মেনে নিয়েছিলেন, সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইবন হাজার বলেন, ‘ইবন উমার মনে করতেন যতক্ষণ পযর্ন্ত কোন লোকের ব্যাপারে জনগণের ইজমা বা ঐক্যমত না হয় ততক্ষণ তার হাতে বাইয়াত করা উচিত নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই তিনি আলীর (রা) হাতে বাইয়াত করেননি। কিন্তু মুসতাদরিকের একটি বর্ণনামতে এই শর্তে আলীর (রা) হাতে বাইয়াত করেছিলেন যে, তিনি আলীর সাথে গৃহযুদ্ধে জড়িত হবেন না। আলী তাঁর এই শর্ত অনুমোদনও করেছিলেন। তাঁর হাতে কোন মুসলমানের এক বিন্দু রক্তও ঝরেনি। তবে তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলীর (রা) পক্ষে যোগদান না করায় একটা তীব্র অপরাধ বোধ করেছেন।

    সিফফীনের যুদ্ধের পর আবু মুসা আশয়ারী ও আমার ইবনুল আস উভয়পক্ষের বিচারক নিযুক্ত হন। আবু মুসা তাঁর প্রতিপক্ষের নিকট খলীফা হিসাবে আবদুল্লাহ ইবন উমারের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু আমর ইবনুল আস এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। বিচারকদ্বয়ের সিদ্বান্ত শোনার জন্য অন্যান্য মুসলমানের সাথে ইবন উমারও দু’মাতুল জান্দালে উপস্থিত হয়েছিলেন।

    হযরত আলীর শাহাদাতের পর তিনি আমীর মুয়াবিয়ার খিলাফত মেনে নেন। তাঁর যুগের বিভিন্ন অভিযানে তিনি শরীক হন। কমস্টান্টিনোপল অভিযানে তিনি যোগদান করেছিলেন।

    আমীর মুয়াবিয়ার (রা) পর ইয়াযিদ খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুসলিম উম্মাহর পারস্পরিক বিভেদজনিত ফিতনা থেকে বাঁচার জন্য তাঁর হাতে বাইয়াত করেন। এ সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যঃ ‘যদি তা ভালো হয়, আমরা খুশী থাকবো, আর যদি তা মন্দ হয়, আমরা ধৈর্য ধারণ করবো।’ কিছুদিন পর মদীনাবাসীরা ইয়াযিদের প্রতি কৃত তাদের বাইয়াত প্রত্যাহার করলে তিনি তাঁর পরিবারের লোকদের ডেকে বলেন, আমি ইয়াযিদের হাতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের বাইয়াত করেছি। ……তোমাদের কেউ যেন এ বাইয়াত ভঙ্গ না করে। যদি কেউ ভঙ্গ করে তাহলে তরবারিই আমার ও তার মধ্যে ফায়সালা করবে।’ তার মতে এ বাইয়াত ফাসখ বা প্রত্যাহারের অর্থ হল এক ধরনের ধোঁকাবাজী। আর শরীয়াতে ধোঁকাবাজীর কঠোর শাস্তি নির্ধারিত আছে। কোন লোভের বশবর্তী হয়ে তিনি ইয়াযিদের হাতে বাইয়াত করেননি।

    ইয়াযিদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় মুয়াবিয়া খলীফা হলেন। মাত্র তিন মাসের জন্য তিনি খিলাফতের দায়িত্ব পরিচালনা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর একদিকে মক্কায় আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) নিজেকে খলীফা বলে ঘোষণা করেন। ইরাক, হিজায ও ইয়ামনের জনগণ তাঁর হাতে বাইয়াত করে। অন্যদিকে মারওয়ান নিজেকে খলীফা দাবী করে সিরিয়াবাসীর বাইয়াত আদায় করেন। তৎকালীন ইসলামী খিলাফতের অধিকাংশ অঞ্চল যদিও আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের সমর্থক ছিল, তবুও আবদুল্লাহ ইবন উমার তার দাবীর প্রতি বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দেননি। খিলাফতের দাবী নিয়ে যখন দুই বিবদমান গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে, তখন এক ব্যক্তি ইবন উমারকে বললো, আল্লাহ ফিতনা প্রতিরোধের জন্য জিহাদ করতে বলেছে। জবাবে তিনি বলেন, যখন ফিতনা ছিল, আমরা জিহাদ করেছি। কাফিররা মুসলমানদের আল্লাহর ইবাদতের অনুমতি দিত না এই ছিল সে দিনের ফিতনা। আজকের এ গৃহযুদ্ধ জিহাদ নয়, বরং বাদশাহীর জন্য আত্মঘাতী লড়াই। তবে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ যখন মক্কায় আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের ওপর আক্রমণ চালায় এবং কা’বার একাংশ ধ্বংস করে ফেলে তখন তিনি ভীষণ বিরক্তি ও নিন্দা প্রকাশ করেন।

    আবদুল মালিকের হাতে যখন খিলাফতের বাইয়াত হলো, ইবন উমারও একটা লিখিত বাইয়াত পাঠিয়ে দিলেন। তাঁর বাইয়াতের বিষয়বস্তু ছিল এমনঃ ‘আল্লাহ ও রাসূলের সুন্নাতের ওপর আমি ও আমার পুত্র আমীরুল মুমিনীন আবদুল মালিকের যথাসাধ্য আনুগত্যের অঙ্গীকার করছি।’ আবদুল মালিক ইবন উমারকে খুবই সম্মান করতেন এবং শরীয়াতের নির্দেশ পালনে তাঁকেই অনুসরণ করতেন। হজ্জের সময় আরকানে হজ্জ পালনের ব্যাপারে ইবন উমারকে অনুসরণের নির্দেশ জারি করতেন।

    হিজরী ৭৪ সনে ৮৩ অথবা ৮৪ বছর বয়সে তিনি ইনতিকাল করেন। হজ্জের সময় এক ব্যক্তির বিষাক্ত বর্শার ফলা তাঁর পায়ে বিঁধে যায়। এই বিষই শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়। সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে, শুধুমাত্র ঘটনাক্রমে এমনটি হয়নি, বরং এর পেছনে হাজ্জাজের ইঙ্গিত ছিল। কারণ, কা’বায় আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য ইবন উমার হাজ্জাজের ভীষণ তিরস্কার করেন। এতে হাজ্জাজ ক্ষুব্ধ হন। অতঃপর তাঁরই ইঙ্গিতে একজন শামী সৈনিক তাঁকে এভাবে আহত করে। অবশ্য ইবন হাজার বলেছেন, আবদুলন মালিক হাজ্জাজকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ইবন উমারের সাথে সংঘাতে না যাওয়ার জন্য। হাজ্জাজের কাছে এ নির্দেশ ছিল অত্যন্ত পীড়াদায়ক। তাই তিনি এই বিকল্প পথে ইবন উমারকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেন।

    ইবন সা’দ বর্ণনা করেন, একবার হাজ্জাজ খুতবার মধ্যে ইবন যুবাইরের প্রতি দোষারোপ করেন যে, তিনি কালামুল্লাহর বিকৃতি সাধন করেছেন। ইবন উমার সাথে সাথে প্রতিবাদ করে বলে ওঠেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছো। ইবন যুবাইরের এমন ক্ষমতা নেই এবং এমন অভিযোগ উত্থাপনের তোমারও কোন সুযোগ নেই।’ সাধারণ সমাবেশে এমন কঠোর প্রতিবাদ হাজ্জাজ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু প্রকাশ্যে ইবন উমারের সাথে কোন রকম অসৌজন্যমূ্লক আচরণের সাহসও তাঁর ছিল না। তাই তিনি এমন গোপন ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেন।

    অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, একদিন হাজ্জাজ এত দীর্ঘ খুতবা দিলেন যে, আসর নামাযের সময় সংকীর্ণ হয়ে পড়লো। ইবন উমার বিরক্ত হয়ে বলে ওঠেন- ‘সূর্য তোমার প্রতীক্ষা করতে পারে না।’ যাইহোক, বিভিন্ন কারণে স্বৈরাচারী হাজ্জাজ সত্যের সৈনিক ইবন উমারকে সহ্য করতে পারছিলেন না। তাই এভাবে তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

    বিষের ক্রিয়ায় ইবন উমার যখন শয্যাশায়ী, তখন হাজ্জাজ তাঁকে দেখতে গেলেন। কুশল বিনিময়ের পর হাজ্জাজ বললেন, অপরাধীকে আমি চিনতে পেলে তার গর্দান নিতাম। ইবন উমার বললেন, সবকিছু তো তুমি করেছো। তারপর বললছো, অপরাধীকে পেলে হত্যা করতে। মুখের ওপর এমন অপ্রিয় সত্য কথা শোনার পর হাজ্জাজ চুপ হয়ে যান।

    মদীনা মুনাওয়ারায় জীবনের শেষ নিশ্বাসটি ত্যাগ করার একান্ত ইচ্ছা ছিল হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমারের। তাঁর অবস্থা যখন অবনতির দিকে যেতে লাগলো, তিনি দুআ করতে লাগলেন; হে আল্লাহ, আমাকে মক্কায় মৃত্যুদান করো না। ‘পুত্র সালেমকে অসীয়াত করেন, ‘মক্কায় আমার মৃত্যু হলে মক্কার হারামের বাইরে কোন এক স্থানে আমাকে দাফন করবে। যে যমীন থেকে আমি হিজরত করেছি, সেখানে সমাহিত হওয়া ভালো মনে হচ্ছে না। ‘পুত্র সালেমকে অসীয়াতের অল্প কিছু দিন পর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

    মৃত্যুর পর লোকেরা তাঁর অসীয়াত অনুযায়ী হারামের বাইরে লাশ দাফন করতে চায়। কিন্তু হাজ্জাজ তাতে বাধা দেন। তিনি নিজেই জানাযার নামায পড়ান এবং ‘ফাখ’ নামক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করেন।

    সফর ও ইকামাত বা বাড়ী এবং বাড়ীর বাইরে ভ্রমণে থাকা- সর্বাবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) সাহচর্য, হযরত ফারুক আজমের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, আর্বোপরি তাঁর নিজের অনুসন্দিৎসা তাঁকে ইসলামী জ্ঞানের সমুদ্রে পরিণত করেছিল। কুরআন, হাদীস, ফিকাহ ইত্যাদি শাস্ত্রে তিনি ছিলেন অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। সেকালে মদীনায় যে সকল মনিষীকে বলা হতো ইলম ও আমলের ‘মাজমাউল বাহারাইন’ বা দুই সমুদ্রের সঙ্গম স্থল, ইবন উমার ছিলেন তাঁদের অন্যতম।

    পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের প্রতি তাঁর দারুণ আকর্ষণ ছিল। কুরআনের সূরা ও আয়াত সমূহের ওপর গবেষণা করে জীবনের বিরাট এক অংশ ব্যয় করেন। কেবল সূরা বাকারার ওপর গবেষণায় চৌদ্দটি বছর অতিবাহিত হয়। এতে অনুমান করা যায় কুরআন বুঝার জন্য তিনি কি পরিমাণ শ্রম ও সময় ব্যয় করেছেন। কুরআনের প্রতি এই ব্যতিক্রমধর্মী আকর্ষণই তাঁর মধ্যে কুরআনের তাফসীর ও তাবীলের এক অনন্য যোগ্যতা সৃষ্টি করে। কুরআন বুঝার ক্ষমতা যৌবনের সূচনা লগ্নেই তাঁর মধ্যে জম্ম নেয়। এ কারণে বড় বড় সাহাবীদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) মজলিসে তাঁকে শরীক দেখা যায়।

    কুরআনের পর হাদীসের স্থান। ইবন উমার ছিনলেন প্রথম কাতারের হাফেজে হাদীস। তাঁর বর্ণিত হদীসের সংখ্যা ১৬৩০ (এক হাজার ছ’শ তিরিশ)। এর মধ্যে ১৭০ টি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছেন। ৮১টি বুখারী ও ৩১টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিটি কথাও কাজ জানার প্রবল আকাংখা তাঁর মধ্যে ছিল।” রাসূলুল্লাহর (সা) সান্নিধ্য থেকে যে সময়টুকু তিনি দূরে থাকতেন তখন যাঁরা তাঁর খিদমতে উপস্থিত থাকতেন তাঁদের কাছ থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) সেই সময়ের কথা ও কাজ জেনে নিতেন এবং তা স্মৃতিতে ধরে রাখতেন। তাঁর অজানা নতুন কোন কথা জানতে পেলে সংগে সংগে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে অথবা প্রথম রাবীর কাছে উপস্থিত হয়ে তার সত্যতা যাচাই করে নিতেন। এই অনুসন্ধিৎসু মন ইবন উমারকে হাদীস শাস্ত্রের এক বিশাল সমুদ্রে পরিণত করে। রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ নিঃসৃত বাণীর প্রতিটি অক্ষর স্মরণ না থাকলে তিনি তা বর্ণনা করতেন না। তাঁর সমসায়িক লোকেরা বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কমবেশী হওয়া সম্পর্কে ইবন উমার অপেক্ষা অধিক সতর্ক ব্যক্তি সাহাবীদের মধ্যে আর কেউ নেই।’

    হযরত ইবন উমারের মাধ্যমে ইলমে হাদীসের বিস্তর অংশ প্রচারিত হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের পর ষাট (৬০) বছরের বেশী সময় জীবিত ছিলেন। এ দীর্ঘ সময় তিনি একাগ্রচিত্তে ইলমে দ্বীনের চর্চা করেছেন। ইবন শিহাব যুহরী বলেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) ও তাঁর সাহাবীদের কোন বিষয় ইবন উমারের অজানা ছিল না।’ জ্ঞানের ঐ চর্চা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে কোন সরকারী দায়িত্ব তিনি তখনও গ্রহণ করেননি। তাঁর স্থায়ী ‘হালকায়ে দরস’ ছিল মদীনায়। হজ্জের মওসুমে তিনি ফাতওয়া দিতেন। মানুষের বাড়ীতে গিয়েও তিনি হাদীস শুনাতেন।বর্ণিত আছে, একদিন তিনি আবদুল্লাহ ইবন মুতী’র বাড়ীতে যান। আবদুল্লাহ তাঁকে বসতে দিলেন। বসার পর ইবন ‘উমার বললেন, তোমাকে একটি হাদীস শোনানোর জন্য আমি এ সময় তোমার এখানে এসেছি। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য থেকে দূরে থাকবে কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় উঠবে যে তাঁর কাছে কোন প্রমাণ থাকবে না। আর যে ব্যক্তি জামায়াত থেকে পৃথক হয়ে মৃত্যুবরণ করলো সে যেন জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করলো।’

    রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে কমবেশী হওয়াকে ভীষণ ভয় পেতেন। এ কারণে খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন। ইমাম শা’বী বলেন, আমি এক বছর যাবত আবদুল্লাহ ইবন ‘উমারের কাছে বসেছি। এর মধ্যে কোন হাদীসই তিনি আমার কাছে বর্ণনা করেননি। হাদীস বর্ণনা তিনি খারাপ মনে করতেন বা কম বর্ণনা করতেন এমন নয়, বরং জরুরী বলে তিনি মনে করতেন। শব্দের হেরফের পছন্দ করতেন না।

    হাদীস বর্ণনায় তাঁর অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের কারণে মুহাদ্দিসদের নিকট তাঁর বর্ণিত হাদীস সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্য হয়। ইবন শিহাব যুহরী তো কোন বিষয় ইবন উমারের হাদীস পেলে আর কারো হাদীসের প্রয়োজন মনে করতেন না। হাদীস বর্ণনার সনদের ক্ষেত্রে ‘মালিক ‘আন নাফে’ ‘আন ইবন ‘উমার’- এই সনদটিকে মুহাদ্দিসরা ‘সিলসিলাতুজ জাহাব’ বা সোনালী চেইন নামে অভিহিত করে থাকেন। কারণ, ইবন ‘উমার প্রায় পনেরটি বছর রাসূলুল্লাহর (সা) সুহবতে কাটিয়াছেন। আবু বকর ও উমারের পুরো সময়টা প্রত্যক্ষ করেছেন। উমারের সাহচর্যে প্রায় তিরিশটি বছর অতিবাহিত করেছেন। এই সনদের দ্বিতীয় ব্যক্তি ‘নাফে’ ইবন উমারের গোলাম। প্রায় তিরিশটি বছর তিনি মনিবের খিদমতে খাটিয়েছেন। সনদের তৃতীয় ব্যক্তি ইমাম মালিক। তিনি তাঁর উস্তাদ না’ফের হালাকায়ে দরসে দশ বারো বছর বসার সুযোগ লাভ করেন।

    রাসূলুল্লাহ (সা) ছাড়াও ইবন উমার, আবু বকর, ‘উসমান’, আলী, যায়িদ বিন সাবিত, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, বিলাল, সুহাইব, রাফে, আয়িশা ও হাফসার (রা) মত শ্রেষ্ঠ সাহাবীদের নিকট থেকেও জ্ঞান অর্জন করেন।

    হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমারের জীবনটি ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। হযরত আবু হুজায়ফা বলতেনঃ রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের পর প্রতিটি মানুষের কিছু না কিছু পরিবর্তন হয়, কিন্তু ‘উমার ও তাঁর পুত্র আবদুল্লাহর কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ইবন উমারের একান্ত খাদেম নাফে’ তাঁর তাবেঈ ছাত্রদের বলতেন, এ যুগে যদি ইবন উমার বেঁচে থাকতেন, তাহলে রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাত অনুসরণের ক্ষেত্রে তাঁর কঠোরতা দেখে তোমরা বলতে, লোকটি পাগল’ তিনি প্রায় পঁচাশি বছর জীবিত ছিলেন এবং শৈশবেই রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি বলেছেনঃ ‘রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াতের পর থেকে আমার আজকের এ দিনটি পর্যন্ত তা ভঙ্গ করিনি বা তাতে কোন পরিবর্তন করিনি।’ শুধু ইবাদতের ক্ষেত্রেই নয়, রাসূলুল্লাহর (সা) মানবসুলভ কাজ ও অভ্যাসসহ প্রতিটি আচরণের তিনি অনুসরণ করতেন। যেমন, হজ্জের সফরে রাসূল (সা) যেখানে যেখানে রাত্রি যাপন করতেন, পরবর্তীকালে তিনিও একই স্থানে রাত্রি যাপন করতেন। রাসূল (সা) যে সকল স্থানে নামায আদায় করতেন, তিনি সেখানে নামায আদায় করতেন। যে রাস্তা দিয়ে রাসূল (সা) চলতেন তিনিও সেই রাস্তা দিয়ে চলতেন। এমন কি যে সকল স্থানে রাসূল (সা) অজু-গোসল করেছেন তিনিও সেখানে একই কর্ম সম্পাদন করতেন। মোটকথা, রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিটি পদক্ষেপ তিনি হুবহু অনুসরণ করতেন। তাঁর প্রতিটি কথা ও কাজকে লোকেরা মনে করতো প্রকৃতপক্ষে তা রাসূলুল্লাহর (সা) কথা ও কাজ। যেহেতু লোকে তাঁকে অনুসরণ করতো, তাই ব্যক্তিগত কারণে কোন ক্ষেত্রে সুন্নাতের অনুসরণ করতে না পারলে স্পষ্ট করে বলে দিতেন, এটা রাসূলুল্লাহর (সা) কাজ বা আমল নয়। বিশেষ ওজর বশতঃ আমি এমন করেছি। তাতে মানুষের বিভ্রান্তি দূর হয়ে যেত। হযরত আয়িশা (রা) তাঁর ইত্তেবায়ে সুন্নাত সম্পর্কে বলেছেনঃ ‘ইবন ‘উমারের মত আর কেউ রাসূলুল্লাহর (সা) পদাংক অনুসরণ করেন না।’

    তাফাককুহ ফিদ-দ্বীন বা দ্বীন সম্পর্কিত চিন্তা-গবেষণা তাঁর মধ্যে পরিপূর্ণতা দান করেছিল। সারাটি জীবন তাঁর জ্ঞানচর্চা ও ফাতওয়া দিয়েই কাটে। মদীনার প্রখ্যাত মুফতী সাহাবীদের মধ্যে তিনিও একজন। তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিশেষজ্ঞরাও তাঁর কাছে বিভিন্ন মাসয়ালার সমাধান চাইতেন। সাঈদ ইবন জুবাইরের মত শ্রেষ্ঠ তাবেঈও তাঁর কাছ থেকে বিভিন্ন মাসয়ালার সমাধান নিতেন। পরবর্তীকালে মালেকী মাজহাব মূলতঃ ইবন উমারের এসব ফাতওয়ার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। ইমাম মালিক বলতেন, ইবন উমার দ্বীনের অন্যতম ইমাম। তাঁর ফাতওয়া সংগৃহীত হলে তা বৃহদাকার গ্রন্থে পরিণত হত। ফাতওয়া দেওয়ার ব্যাপারে ভীষণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। হাফেজ ইবন আবদিল বার বলেনঃ ‘ইবন উমার তাঁর ফাতওয়া ও আমল উভয় ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতেন। খুব ভাবনা-চিন্তা করে যেমন কথা বলতেন তেমনি কাজও করতেন ভেবে-চিন্তে।

    দ্বীন ইলম ছাড়া তৎকালীন আরবের প্রচলিত জ্ঞান যেমনঃ কবিতা, কুষ্ঠিবিদ্যা, বাগ্মীতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইবন উমারের বিশেষ আগ্রহ ছিল বলে মনে হয় না। এর সাম্ভাব্য কারণ এই যে দ্বীনী ইলম ছাড়া অন্য কোন জ্ঞানের চর্চায় সময় ব্যয় সমীচীন মনে করতেন না।

    একথা সত্য যে, সকল সাহাবীর ওপর সার্বিকভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ছাপ পড়েছিল, তবে ইবন উমারের ওপর পড়েছিল একটু গভীরভাবে। তার প্রতিটি কথা ও আচরণে রাসূলুল্লাহর (সা) স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠতো।

    আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনের সাহাবীদের প্রশংসায় বলেছেন, ‘ইজা জুকেরাল্লাহু ওয়াজিলাত কুলুবুহুম-তাদের কাছে যখন আল্লাহর কথা বলা হয় তখন তাদের হৃদয় ভয়ে কেঁপে ওঠে। ইবন উমারের মধ্যে এ অবস্থার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। একবার তাঁর সামনে এ আয়াতটি পাঠ করা হলো- ফাকায়ফা ইজা জি’না মিন কুল্লি উম্মাতিন শাহীদা-তখন কেমন হবে যখন আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্যে সাক্ষী উপস্থিত করবো। ইবন উমার এ আয়াতটি শুনে এত কাঁদলেন যে চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেল এবং তাঁর আশেপেশে লোকেরাও তাতে প্রভাবিত হলো।

    ইবন উমার ছিলেন একজন বড় ধরনের আবেদ ও শবগুজার ব্যক্তি। রাতের সিংহভাগ ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। তাঁর খাদেম নাফে বলেন, তিনি সারা রাত নামায আদায় করতেন। সুবেহ সাদিকের সময় আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, সকাল কি হলো? আমি যদি হাঁ বলতাম, তাহলে আর একটু ফর্সা হওয়া পর্যন্ত ইসতিগফারে কাটাতেন। আর ‘না’ বললে আবার নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। কুরাআন তিলওয়াতে তিনি এক অপার্থিব স্বাদ অনুভব করতেন। ছোট ছোট ইবাদাতও তিনি ছাড়তেন না। প্রত্যেক নামাযের জন্য নতুন ভাবে অজু করতেন। মসজিদে যাওয়ার সময় ধীরে ধীরে পা ফেলতেন যাতে কদম সংখ্যা বেড়ে যায় এবং সওয়াবও বেশী অর্জিত হয়।

    ইবন উমার ছিলেন যুহদ ও তাকওয়ার বাস্তব নমুনা। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের অতুলনীয় যাহিদ ও মুত্তাকী। হযরত জাবির (রা) বলতেন, আমাদের মধ্যে ইবন উমার ছাড়া এমন আর কেউ ছিল না যাকে দুনিয়ার চাকচিক্য আকৃষ্ট করেনি। বাল্যকাল থেকেই তাঁর মধ্যে তাকওয়ার ভাবটি গালিব ছিল। রাসুল (সা) তাঁর এই তাকওয়া স্বভাব দেখে বলেছিলেন, ‘রাজুলুস সালেহ- নেককার বান্দা।’

    তিনি ছিলেন খুবই দানশীল। সবসময় প্রিয়তম জিনিসটি আল্লাহর রাস্তায় দান করতেন। যে দাস বা দাসীটি তাঁর কাছে ভালো মনে হতো,তাকে আযাদ করে দিতেন। এক বৈঠকে তিনি হাজার দিরহাম বিলিয়ে দিতেন। তিনি এত বেশী দাস-দাসী আযাদ করতেন যে, তাঁর আযাদকৃত দাস-দাসীর সংখ্যা এক হাজারের উর্ধ্বে। একবার খুব সুন্দর একটি উট তার ওপর সোয়ার হয়ে হজ্জে রওয়ানা হলেন। উটটির চলন তাঁর খুবই ভালো লাগলো। হঠাৎ তিনি নেমে পড়লেন এবং পিঠ থেকে জিনিসপত্র নামিয়ে ফেলে তাকে কুরবানীর পশুর সাথে মিলিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। আইউব ইবন ওয়ায়িল আর- রাসিবী বলেন, একদিন ইবন উমারের হাতে চার হাজার দিরহাম ও একটি মখমলের চাদর এলো।পরদিন তিনি ইবন উমারকে দেখলেন বাজার থেকে তাঁর সোয়ারী পশুর জন্য বাকীতে খাদ্য কিনছেন, ইবন ওয়ায়িল তখনই ইবন উমারের বাড়ীতে গিয়ে তাঁর পরিবারের লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, গতকালই কি ইবন উমারের হাতে চারহাজার দিরহাম ও একটি মখমলের চাদর আসেনি? তারা বললো, ‘হাঁ’। ইবন ওয়ায়িল বললেন, আজ আমি তাঁকে বাজার থেকে বাকীতে পশুর খাদ্য কিনতে দেখলাম। তারা বললো, সেগুলিতো তিনি রাত পোহানোর আগেই বিলিয়ে দিয়েছেন। তারপর সেই চাদরটি কাঁধে করে বাইরে গেলেন, যখন বাড়ী ফিরলেন, দেখলাম সেটিও নেই। জিজ্ঞেস করলে বললেন, ফকীরকে দান করেছি। একথা শুনে ইবন ওয়ায়িল হাতে তালি দিতে দিতে বাজারের দিকে ছুটলেন এবং একটি উচু স্থানে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সম্বোধন করলেনঃ ওহে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়! তোমরা দুনিয়া দিয়ে কী করবে? এই যে ইবন উমার, তাঁর হাতে চার হাজার দিরহাম আসলো, আর তিনি সেগুলি বিলিয়ে দিলেন। তারপর সকাল বেলায় ধারে পশু খাদ্য কিনলেন।’

    এভাবে তিনি ছিলেন-‘লান তানালুল বিররা হাত্তা তুনফিকু মিম্মা তুহিব্বূন’- তোমরা কখনও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমারা তোমাদের প্রিয় জিনিস ব্যয় করবে –এ আয়াতের বাস্তব তাফসীর। ‘প্রতিবেলা দু’একজন গরীব-মিসকীন সংগে না নিয়ে তিনি আহার করতেন না। প্রায়ই তিনি তাঁর ছেলেদের তিরস্কার করতেন যখন তারা খাবারের জন্য ধনীদের আমন্ত্রণ জানাতো এবং তাদের সাথে ফকীর-মিসকীনকে ডাকতো না। তিনি বলতেন, ‘তোমরা ভরাপেট লোকদের ডেকে আন এবং ক্ষুধার্তদের ছেড়ে আস।’

     তিনি ছিলেন সফল ব্যবসায়ী। কৃষিযোগ্য ভূমিও ছিল। বাইতুল মাল থেকে ভাতাও পেতেন। তবে নিজে খুব অল্পই ভোগ করতেন। সব বিলিয়ে দিতেন। একবার তাঁর এক বন্ধু তাঁকে একটি ভরা পাত্র উপহার দিল। জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি? বন্ধুটি বললেন, একটা ওষুধ। ইরাক থেকে আমি আপনার জন্য এনেছি। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এর গুণাগুণ কি? বন্ধুটি বললেন, ‘হজম শক্তি বৃদ্ধি করে! অথচ আজ চল্লিশ বছর যাবত আমি পেট ভরে আহারই করিনে।’ তিনি কি কৃপন বা অভাবী ছিলেন? না, ইতিহাস তা বিলে না। রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর পিতা উমার ইবনুল খাত্তাবের প্রতি সমবেদনা ও সহানুভূতি প্রকাশের জনই এমনটি করেছেন।

    রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি তাঁর ছিল গভীর ভালোবাসা। প্রিয় নবীব ইনতিকালে তাঁর অন্তরটি ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহর (সা) কথা স্মরণ হলেই ডুকরে কেঁদে উঠতেন। সফর থেকে যখনই মদীনায় ফিরতেন ‘রওজা পাকে’ গিয়ে সালাম পেশ করতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতি ভালোবাসার কারণে তাঁর পরিবার-পরিজনদেরও গভীর ভাবে ভালো বাসতেন। একবার এক ইরাকী বেদুঈন তাঁর কাছে মশা হত্যার কাফফারা জিজ্ঞেস করে। তিনি সাথীদের বললেন, এই লোকটিকে দেখে নাও। সে মশার রক্তের কাফফারা জিজ্ঞেস করছে, অথচ তারাই প্রিয় নবীর কলিজার টুকরো হুসাইনকে শহীদ করেছে। রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসার কারণে মদীনা শহরকেও তিনি দারুন ভালোবাসতেন। শত দুঃখ-কষ্টেও মদীনা ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা কখনও করেননি।

    হযরত ইবন উমার (রা) মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হতে পারে এমন সব কাজ থেকে সব সময় বিরত থাকতেন। তিনি ছিলেন সত্য ভাষী। তবে মাঝে মাঝে মুসলিম উম্মাহর ক্ষতির সম্ভাবনা দেখলে চুপ থাকতেন। একবার হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা) দাবী করলেন খিলাফত লাভের অধিকার আমার থেকে বেশী আর কার কাছে? ইবন উমার একথার জবাব দিত গিয়েও ফিত্না-ফাসাদের ভয়ে দেননি। তিনি চুপ থাকেন। এমনি ভাবে মিনায় খলিফা উসমানের পেছনে চার রাকায়াত নামায আদায় করেন। অথচ তিনি মনে করতেন রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর ও উমারের সুন্নাত অনূযায়ী সেখানে কসর হওয়া উচিত। আবার একাকী পড়লে দু’রাকায়াতই পড়লেন। বিভেদ সৃষ্টির আশংকায় উসমানের পেছনে চার রাকায়াত পড়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘বিভেদ সৃষ্টি করা খারাপ কাজ।’ তিনি আরো বলতেন, সমগ্র উম্মাতে মুহাম্মদী যদি আমাকে খলীফা বলে মেনে নায় এবং মাত্র দু’ব্যক্তি মানতে অস্বীকার করে তবুও আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো না।

    বিভেদ সৃষ্টির ভয়েই তিনি সকল খলীফার হাতে বাইয়াত করেছিলেন। সেই ফিতনা-ফাসাদের যুগে তিনি সব আমীরের পেছনে নামায আদায় করতেন এবং তাদের হাতে যাকাত তুলে দিতেন। তবে এ আনুগত্য দ্বীনের সীমার মধ্যে সীমিত থাকতো। এ কারণে প্রথমে হাজ্জাজের পেছনে নামায আদায় করলেও পরে হাজ্জাজ নামাযে বিলম্ব করতে শুরু করলে তিনি তার পেছনে নামায আদায় ছেড়ে দেন। এমন কি মক্কা ছেড়ে মদীনায় চলে যান।

    সত্য কথা বলতে ইবন উমার কখনও ভয় পেতেন না। উমাইয়্যা বংশীয় শাসকদের সামনাসামনি সমালোচনা করতেন। একবার হাজ্জাজ খুতবা দিচ্ছিলেন। ইবন উমার তাঁকে লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘এই লোকটি আল্লাহর দুশমন। সে মক্কার হারামের অবমাননা করেছে, বাইতুল্লাহ ধ্বংস করেছে এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের হত্যা করেছে।’

    আরেকবার হাজ্জাজ খুতবা এত দীর্ঘ করলেন যে, আসর নাময দেরী হয়ে গেল। ইবন উমার চেঁচিয়ে বললেন, নামাযের সময় চলে যাচ্ছে, কথা শেষ কর। এভাবে তিনবার ‘উমার উপস্থিত লোকদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি উঠে গেলে, তোমরা কি আমার সাথে যাবে? লোকেরা বললো, ‘হ্যা’। ইবন ‘উমার উঠে গেলেন। হাজ্জাজ তড়িঘড়ি মিম্বর থেকে নেমে নামায পড়ালেন। পরে হাজ্জাজ ইবন উমারকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি এমনটি করলেন কেন? তিনি জবাব দিলেন, আমরা মসজিদে আসি নামাযের জন্য। নামাযের সময় হয়ে গেলে সাথে সাথে পড়িয়ে দেওয়া উচিত। তারপর যতক্ষণ ইচ্ছা তুমি বকবক করতে পার। তাঁর এই স্পষ্টবাদিতার কারণেই বনী উমাইয়্যার স্বৈরাচারী শাসকরা তাঁকে ভীষণ ভয় পেত।

    কোন মানুষের অসম্মান এবং অহেতুক সম্মান হয়, ইসলাম এমন সব কাজ ও বৈশিষ্ট্যকে খতম করে দিয়েছে। ইবন ‘উমার ছিলেন এই ইসলামী সাম্যের বাস্তব দৃষ্টান্ত। এই সাম্যের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি হতে পারে এমন সব আচরণ তিনি মোটেই পসন্দ করতেন না। এ কারণে যেখানে লোকেরা তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়াত সেখানে তিনি বসতেন না। তিনি তাঁর চাকর-বাকর ও দাস-দাসীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এই সাম্যের প্রতি লক্ষ্য রাখতেন। তিনি তাদের আত্মসম্মান বোধ শিক্ষাদিতেন। নিজের সাথে বসিয়ে তাদের আহার করাতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, দাস-দাসীদের আহার ও পোষাকের প্রতি যত্ন না নেওয়া বড় ধরনের পাপ। সালেম বলেন, ইবন উমার জীবনে একবার ছাড়া আর কখনও কোন দাস-দাসীকে বকাঝকা করেননি। একবার তিনি একটি দাসকে কোন কারণে মেরে বসেন। মারার পর এত অনুতপ্ত হন যে, তাকে আযাদ করে দেন।

    বিনয় ও নম্রতা তাঁর চরিত্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। নিজের প্রশংসা শুনতে তিনি ভীষণ অপছন্দ করতেন। এক ব্যক্তি তাঁর মুখে মাটি ছুঁড়ে মারলেন। অতঃপর তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) এ হাদীস- প্রশংসাকারীর মুখে মাটি ছুঁড়ে মারো- শুনিয়ে দিলেন। কোন বাছ-বিচার না করে ছোট বড় সকলকে সালাম করতেন। পথ চলতে কোন ব্যক্তিকে সালাম করতে ভুলে গেলে ফিরে এসে তাকে সালাম করে যেতেন। অত্যন্ত কটু কথা শুনেও হজম করে যেতেন, কোন জবাব দিতেন না। এক ব্যক্তি কটু ভাষায় তাকে গালি দিল। জবাবে তিনি শুধু বললেন, আমি ও আমার ভাই অত্যন্ত উচু বংশের। এতটুকু বলে চুপ থাকলেন।

    ইবন উমারের জীবনীতে আমরা দেখতে পাই, তাঁর আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত স্বচ্ছল ছিল। হাজার হাজার দিরহাম একই বৈঠকে ফকীর-মিসকীনদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। কিন্তু তার নিজের ঘরের আসবাবপত্রের মোট মূল্য এক শো দিরহামের বেশী ছিল না। মায়মূন ইবন মাহরান বলছেন, ‘আমি ইবন উমারের ঘরে প্রবেশ করে লেপ, তোষক, বিছানাপত্র ইত্যাদির দাম হিসাব করলাম। সব মিলিয়ে একশো দিরহামের বেশী হলো না।’ তিনি এমনই সরল ও অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। নিজের কাজ তিনি নিজ হাতে করতেন। নিজের কাজে অন্য কারো সাহায্য গ্রহণ তাঁর মনোপুতঃ ছিল না।

    হযরত উমারের যুগে যখন সকল সাহাবীরা ভাতা নির্ধারিত হয়, তখন ইবন উমারের ভাতা নির্ধারিত হয় আড়াই হাজার দিরহাম। পক্ষান্তরে উসামা ইবন যায়িদের ভাতা নির্ধারিত হয় তিন হাজার দিরহাম। ইবন উমার পিতা উমারের (রা) নিকট এ বৈষম্যের প্রতিবাদ করে বলেন, কোন ক্ষেত্রেই যখন আমি তাঁর থেকে এবং আপনি তাঁর পিতা থেকে পেছনে নেই, তখন এই বৈষম্যের কারণ কি? উমার (রা) বলেন, সত্যই বলেছো। তবে রাসূল (সা) তাঁর পিতাকে তোমার পিতা থেকে এবং তাঁকে তোমার থেকে বেশী ভালোবাসতেন। জবাব শুনে ইবন উমার (রা) চুপ হয়ে যান।

    তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী এ সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে লিখে প্রকাশ করা যাবে না। জনৈক তাবেঈ তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, “আমি যদি কোন ব্যক্তির জন্য সাক্ষ্য দিতাম যে সে জান্নাতের অধিবাসী, তাহলে অবশ্যই ইবন উমারের জন্য দিতাম।”

  • উসমান ইবন মাজউন (রা)

    উসমান ইবন মাজউন (রা)

    নাম উসমান, কুনিয়াত আবু সায়িব। পিতা মাজউন, মাতা সুখাইলা বিনতু উনাইস। জাহিলী যুগেও তিনি অত্যন্ত পূতঃ পবিত্র স্বভাব-প্রকৃতির অধিকারী ছিলেন। স যুগের বিপুল সংখ্যক লোক মদ পানে অভ্যস্ত ছিল। কিন্তু তিনি তা একবারও স্পর্শ করেননি। যারা মদপান করতো, তাদেরকে তিনি বলতেন, এমন জিনিস পান করে কী লাভ যাতে মানুষের বুদ্ধি লোপ পায়, নীচ শ্রেণীর লোকের হাসির পাত্রে অরিণত হতে হয় এবং নেশা অবস্থায় মা-বোনের কোন বাছ-বিচার থাকেনা?

    তাঁর অন্তরটিও ছিল দারুণ স্বচ্ছ। রাসূলুল্লাহর (সা) দাওয়াত খুব দ্রুত তাঁকে প্রভাবিত করে। সীরাত লাখকদের মতে তাঁর পুর্বে মাত্র তের ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি হলেন চৌদ্দতম মুসলমান। ইবন সা’দের একটি বর্ণনায় জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা) আরকামের গৃহে আশ্রয় নেওয়ার পুর্বেই, উসমান ইবন মাউজন, উবাইদা ইবনুল হারিস।আবদুর রহমান ইবন আউফ, আবু সালামা আবদিল আসাদ এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ এক সাথে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মদীনায় স্বাভাবিক মৃত্যুবরণকারী প্রথম মুহাজির এবং মদীনার বাকী গোরস্তানে দাফনকৃত প্রথম মুসলমান।

    নবওয়াতের পঞ্চম বছরে সর্বপ্রথম মুসলমানদের একটি দল রাসূলুল্লাহর (সা) ইজাযত নিয়ে হাবশায় হিজরাত করেন। উসমান ইবন মাজউন ছিলেন এই মুহাজির দলটির আমীর বা নেতা। এই দলটির সাথে তাঁর পুত্র সায়িবও ছিলেন। বেশ কিছুকাল হাবশায় অবস্থানের পর সংবাদ পেলেন যে মক্কার গোটা কুরাইশ খান্দান ইসলাম কবুল করেছে। তিনি আনন্দ সহকারে মক্কার দিকে যাত্রা করলেন। মক্কার কাছাকাছি পৌঁছে যখন বুঝতে পারলেন খবরটি ভিত্তিহীন, তখন ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়লেন। কারণ এত দূর দেশে আবার ফিরে যাওয়া যেমন কষ্টকর, তেমনি মক্কায় প্রবেশ করাও নিরাপদ নয়। আস্তে আস্তে যখন তাঁর সকল সঙ্গী-সাথী নিজ নিজ মুশরিক আত্মীয়-স্বজনের সহায়তায় মক্কায় ফিরে গেলেন, তখন তিনিও ওয়ালিদ ইবন মুগীরার নিরাপত্তায় মক্কায় প্রবেশ করেন। ওয়ালিদ ইবন মুগীরার প্রভাবে হযরত উসমান ইবন মাজউন দৈহিক অত্যাচার উৎপীড়নের হাত থেকে তো রেহাই পেলেন, কিন্তু রাসূল (সা) ও অন্যান্য সাহাবীদের ওপর যে যুলুম-অত্যাচার চলছিল ত দেখে মোটেই সুখী হতে পারলেন না। একদিন তিনি নিজেকে তিরস্কার করে বললেনঃ আফসুস! আমার আত্মীয়-বন্ধু ও গোত্রের লোকারা নানা রকম যুলিম-অত্যাচার সহ্য করছে আর আমি এক মুশরিকের সহায়তায় সুখে জীবন যাপন করছি। আল্লাহর কসম! এটা আমার নিজের সত্তার দারুণ দুর্বলতা।’

    এমনই একটা চিন্তায় তিনি ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়লেন। একটা অপরাধ বোধে তিনি জর্জরিত হতে লাগলেন। তিনি ওয়ালিদের কাছে গিয়ে বললেনঃ ‘ওহে আবু আবদি শামস, তোমার দায়িত্ব তুমি যথাযথভাবে পালন করছো। এতদিন আমি তোমার আশ্রয়ে কাটিয়েছি, কিন্তু এখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হিফাজতে থাকাই আমি শ্রেয় মনে করি। আমার জন্য আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সাহাবীদের দৃষ্টান্তই যথেষ্ট’। ওয়ালিদ বললোঃ ‘কেউ হয়তো তোমাকে কষ্ট দিয়েছে’। তিনি বললেন, না। আসল কথা, আল্লাহ ছাড়া আর কারো সাহায্য এখন আমার প্রয়োজন নেই। তুমি এখনই আমার সাথে কা’বায় চলো এবং যেভাবে আমাকে আশ্রয় দানের কথা ঘোষণা করেছিলে তেমনিভাবে তা প্রত্যাহারের ঘোষণাটিও দিয়ে দাও’। তার পীড়াপীড়িতে ওয়ালিদ কা’বার চত্বরে সাধারণ সমাবেশ ঘোষণা দান করলো এবং উসমানও দাঁড়িয়ে ওয়ালিদের কথা সত্যায়িত করে বললেঃ বন্ধুগন, আমি ওয়ালিদকে প্রতিশ্রুতি পালনকারী ও দয়াশীল পেয়েছি। যেহেতু এখন আমরা আল্লাহর ও তাঁর রাসূল ছাড়া আর কারো সহায়তা পছন্দীয় নয়, তাই আমি নিজেই ওয়ালীদের ইহসান বা উপকারের বোঝা আমার ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলেছি’।

    এই ঘোষণার পর উসমান ইবন মাজউন গেলেন লাবীদ ইবন রাবীয়ার সাথে কুরাইশদের একটি মজলিসে। লাবীদ ছিলেন তৎকালীন আরবের বিখ্যাত কবি। তিনি উপস্থিত হতেই কবিতার আসর শুরু হয়ে গেল। লাবীদ তাঁর কাসীদা আবৃত্তি করতে শুরু করলেন। যখন তিনি এ ছত্রে পৌঁছলেন-‘আলা কুল্লু শাইয়িন মা খালাল্লাহা বাতিলুন’-‘ওহে, আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই বাতিল-আসর’ তখন উসমান হঠাৎ বলে উঠলেন ‘তুমি সত্য কথাই বলেছো’। কিন্তু লাবীদ যখন দ্বিতীয় ছত্রটি পাঠ করলেন-‘ওয়া কুল্লু নাঈমিন লামাহালাতা যায়িলুন’-এবং সকল সম্পদই নিশ্চিত ধ্বংস হবে –তখন তিনি প্রতিবাদী কন্ঠে বলে উঠেন ‘তুমি মিথ্যা বলেছো’। মজলিসে উপস্থিত সকলেই ক্রোধভরা দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকালো। তারা লাবীদকে শ্লোকটি পুনরায় আবৃত্তি করতে অনুরোধ করলো। লাবীদ আবার আবৃত্তি করলো এবং উসমানও প্রথম ছত্রটি সত্য ও দ্বিতীয়টি মিথ্যা বলে মত প্রকাশ করে বললেনঃ ‘তুমি মিথ্যা বলেছো। জান্নাতের নিয়ামত বা সুখ-সম্পদ কখনও ধ্বংস হবে না। একথা শুনে লাবীদ একটু রুষ্ট হয়ে বললোঃ ‘কুরাইশ গোত্রের লোকেরা, তোমাদের মজলিসের এ অবস্থা তো পুর্বে কখনও ছিলনা।’ এই উস্কানিমুলক উক্তিতে সমগ্র মজলিস ক্রোধে ফেটে পড়লো। ইত্যবসরে এক হতভাগা উসমানের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁর মুখে সজোরেনেক ঘুষি মেরে দেয়। ঘুষি খেয়ে তাঁর একটি চোখ রক্ত জমে কালো হয়ে যায়। লোকেরা বললো, উসমান, তুমি ত ওয়ালিদের আশ্রয়ে বেশ ভালোই ছিলে এবং তোমার চোখও এ কষ্ট থেকে নিরাপদে ছিল’। জবাবে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর আশ্রয়ই সবচেয়ে বেশী নিরাপদ ও সম্মানজনক, আমার যে চোখটি এখনো ভালো আছে, সেটাও তার বন্ধুর কষ্টের ভাগো হওয়ার জন্য উদ্গ্রীব।’ ওয়ালিদ জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি আবার আমার হিফাজতে আসতে চাও?’ তিনি বললেন, ‘এখন আল্লাহর হিফাজতই যথেষ্ট।’ তাঁর এ সময়ের অনুভূতির চমৎকার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাঁর স্বরচিত একটি কাসীদায়। হযরত আলীও তাঁর একটি কবিতায় উসমানের এ ঘটনা সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। (দ্রষ্টব্যঃ হায়াতুস সাহাবা, ১ম খন্ড)

    এভাবে দীর্ঘদিন যাবত হযরত উসমান মক্কার নানা রকম অত্যাচার ও উৎপীড়ন ধৈর্য সহকারে সহ্য করতে থাকেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) সকল সাহাবীকে মদীনায় হিজরাতের অনুমতি দিলেন। হযরত উসমান ইবন মাজউন তার দুই ভাই কুদামা ইবন মাজউন, আবদুল্লাহ ইবন মাজউন ও পুত্র সায়িব ইবন উসমানসহ পরিবারের অন্য সকলকে নিয়ে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। হযরত উসমান তাঁর খান্দানের একটি লোককেও মক্কায় রেখে যাননি। মদীনা পৌঁছে তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবন সালামা আজলানীর (রা) অতিথি হন।

    রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনা পৌঁছে হযরত উসমান ও তাঁর ভাইদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য এক খণ্ড প্রশস্ত ভূমি দান করেন এবং হযরত আবুল হাইসাম ইবন তাইহানের ভ্রাতৃ সম্পর্ক কায়েম করে দেন।

    সত্য ও মিথ্যার প্রথম সংঘাত ঘটে বদর প্রান্তরে। ইনি শরিক ছিলেন এ যুদ্ধে। যুদ্ধ থেকে ফেরার পরই তিনি রোগে আক্রান্ত হন। তাঁর আনসারী ভাই এবং স্ত্রী পরিজনরা যথেষ্ট সেবা করেও

    মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে পারলেন না। হিজরতের তিরিশ মাস পরে হযরত উসমান ইবনে মাজউন মদীনায় ইনতিকাল করেন।

    হযরত উম্মুল আলা আল আনসারিয়্যা- যার বাড়ীতে হযরত উসমান ইনতিকাল করেন, বলেনঃ গোসল ও কাফন দেওয়ার পর জানাযা তৈরী হলে রাসুল (সা) তাশরীফ আনলেন। আমি বলতে লাগলাম, \’আবু সাইব, আল্লাহর রহমত তোমার উপর বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তোমাকে সম্মানিত করবেন।\’ রাসুল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, \’তুমি কিভাবে জানলে আল্লাহ তাকে সম্মানিত করবেন?\’ আমি বললাম, \’ইয়া রাসুলাল্লাহ, সে যদি না হয় তাহলে আর কাকে সম্মানিত করবেন?\’ রাসুল (সা) বললেন, \’উসমান ছিল দৃঢ় ঈমানের অধিকারী। তার ভালো হবে এমনটিই আমি আশা করি। কিন্তু আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসুল হয়েও জানিনে আমার কী পরিণাম হবে?\’

    হযরত উসমান ইবনে মাজউনের মৃত্যুতে রাসুল (সা) ভীষণ ব্যথিত হন। তিনি তিনবার ঝুঁকে পড়ে তার কপালে চুমু দেন। তখন রাসুলাল্লাহ (সা) চোখের পানিতে উসমানের গণ্ডদ্বয় সিক্ত হয়ে যায়। তারপ মাথা সোজা করে কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি বলেনঃ আবু সাইব, আমি তোমার থেকে পৃথক হয়ে যাচ্ছি। আল্লাহ তোমার ওপর রহম করুন! দুনিয়া থেকে তুমি এমনভাবে বিদায় নিলে যে, তার থেকে তুমি কিছু নিলে না এবং দুনিয়াও তোমার থেকে কিছুই নিতে পারেনি।\’

    হযরত উসমানের (রা) মৃত্যুর পরও রাসুল (সা) তাঁকে ভুলে যাননি। রাসুলাল্লাহর (সা) কন্যা হযরত রুকাইয়্যা মারা গেলে তিনি কন্যাকে সম্বোধন করে বলেন, \’যাও আমাদের উত্তম অগ্রগামী উসমান ইবনে মাজউনের সাথে গিয়ে মিলিত হও।\’

    হযরত উসমান ইবনে মজউন যখন মারা যান তখন মদীনায় মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট কোন গোরস্থান ছিল না। উসমানের ওফাতের পর রাসুল (সা) মদীনার \’বাকী\’ নামক স্থানকে গোরস্থানের জন্য নির্বাচন করেন। রাসুল্লাল্লাহর (সা) সাহাবীদের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই এখানে সমাহিত হন। রাসুল (সা) নিজেই জানাযার নামায পড়ান এবং কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দাফন কাজ তত্ত্বাবধান করেন। তারপর কবরের ওপর কোন একটি জিনিস চিহ্ন হিসেবে পুতে দিয়ে বলেন, \’এখন কেউ মারা গেলে এর আশে পাশেই দাফন কড়া হবে।\’

    হযরত উসমানের চারিত্রিক মান অত্যন্ত উঁচু পর্যায়ের ছিল। জাহিলী যুগেই তিনি ছিলেন শরাবের প্রতি বিতৃষ্ণ। লজ্জা ছিল তাঁর স্বভাব বৈশিষ্ট্য।

    রুহবানিয়্যাত বা বৈরাগ্যের প্রতি তাঁর গভীর ঝোঁক ছিল। একবার ইচ্ছা করলেন প্রবৃত্তির কামনা বাসনা ধ্বংস করে মরুচারী রাহিব বা সংসার-ত্যাগী হয়ে যাবেন। কিন্তু রাসুল (সা) জানতে পেয়ে তাঁকে এ উদ্দেশ্য থেকে বিরত রাখেন। তিনি বলেন, \’আমি কি তোমার জন্য সর্বোত্তম আদর্শ নই? আমি আমার স্ত্রীর সাথে মিলিত হই, গোশত খাই, রোযা রাখি এবং ইফতারও করি। রোযাই হলো আমার উম্মাতের খাসি বা নিবীর্য হওয়া। সুতরাং সে খাসি করবে বা খাসি হবে সে আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত নয়।\’

    ইবাদাত বা শবগোজারী ছিল তাঁর প্রিয়তম কাজ। সারা রাত তিনি নামায আদায় করতেন। বছরের অধিকাংশ দিনে রোযা রাখতেন। বাড়ীর একটা ঘর ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট করেছিলেন। রাত দিনে সেখানে ইতিকাফ করতেন। একদিন রসুল (সা) এই ঘরের চৌকাঠ ধরে দুই অথবা তিনবার বলেছিলেন, \’উসমান, আল্লাহ্ আমাকে রুহবানিয়্যাত বা বৈরাগ্যের জন্য পাঠাননি। সহজ সরল দ্বীনে হানিফ সকল দ্বীন থেকে আল্লাহর প্রিয়তম।

    ইবাদাতের প্রবল আগ্রহ স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি তাঁকে উদাসীন করে তোলে। একদিন তাঁর স্ত্রী নবী-গৃহে আসেন। নবীর (সা) সহধর্মিণী তার মলিন বেশ-ভূষা দেখে জিজ্ঞেস করেনঃ

    ‘তোমার এ অবস্থা কেন? তোমার স্বামী তো কুরাইশদের মধ্যে একজন ধনী ব্যাক্তি।’ জবাবে তিনি বললেনঃ তাঁর সাথে আমার কি সম্পর্ক। তিনি সারা রাত নামায পড়েন, দিনে রোযা রাখেন। ‘উম্মুল মুমিনীনগণ বিষয়টি রাসূলুল্লাহর (সা) গোচরে আনেন। রাসূল (সা) তখনই উসমান ইবন মাজউনের বাড়ীর দিকে ছুটে যান এবং তাকে ডেকে বলেনঃ ‘উসমান, আমার নিজের জীবন কি তোমার জন্য আদর্শ নয়?’ উসমান বললেন, আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক’। রাসূল্ম (সা) বললেন ‘তুমি সারা রাত ইবাদাত কর, অধিকাংশ দিন রোযা রাখ।’ বললেন হাঁ, এমনটি করে থাকি। ইরশাদ হলো, এরূপ করবেন না। তোমার ওপর তোমার চোখের, তোমার দেহের এবং তোমার পরিবার পরিজনের হক বা অধিকার আছে। নামায পড়, আরাম কর, রোযা ও রাখ এবং ইফতার কর।’ এই হিদায়াতের পর তাঁর স্ত্রী একদিন নবী গৃহে আসলেন। তখন কিন্তু তাঁকে নব বধুর সাজে সজ্জিত দেখাচ্ছিল। তাঁর শরীর থেকে সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ছিল।

    হযরত খাদীজার (রা) ইন্তিকালের পর হযরত উসমান ইবন মাজউনের স্ত্রী হযরত খাওলা বিনতু হাকীম, হযরত আয়িশা ও হযরত সাওদার সাথে বিয়ের প্রস্তাবটি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পেশ করেছিলেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় মূলতঃ রাসূলুল্লাহর (সা) এ দু’টি বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা-২/৬৫৩)

  • আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)

    আম্মার ইবন ইয়াসির (রা)

    নাম ‘আম্মার, কুনিয়াত ‘আবুল ইয়াকজান’। পিতা ইয়াসির, মাতা সুমাইয়্যা। পিতা কাহতান বংশের সন্তান। আদি বাসস্থান ইয়ামন। তাঁর এক ভাই হারিয়ে যায়। হারানো ভাইয়ের খোঁজে অন্য দু’ভাই হারিস ওমালিককে সংগে করে তিনি মক্কায় পৌঁছেন। অন্য দু’ভাই ইয়ামন ফিরে গেলেও ইয়াসির একা মক্কায় থেকে যান। মক্কার বনী মাখযুমের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে আবু হুজাইফা মাখযুমির ‘সুমাইয়্যা’ নাম্নী এক দাসীকে বিয়ে করেন। এই সুমাইয়্যার গর্ভেই হযরত আম্মার জম্মগ্রহণ করেন। আবু হুজাইফা শিশুকালেই আম্মারকে আযাদ করে দেন এবং আমরণ পিতা-পুত্রের মত দু’জনের সম্পর্ক বজায় রাখেন।

    হযরত আম্মার ও হযরত সুহাইব ইবন সিনান দু’জনই একই সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। আম্মার বলেনঃ ‘আমি সুহাইবকে আরকামের বাড়ীর দরযায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করলামঃ ‘তোমার উদ্দেশ্য কি? সে বললোঃ প্রথমে তোমার উদ্দেশ্য কি তাই বল।’ বললাম, মুহাম্মদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁর কিছু কথা শুনতে চাই। সে বললো, ‘আমারও সেই একই উদ্দেশ্য।’ তারপর দু’জন একসাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। আম্মারের সাথে অথবা কিছু আগে বা পরে তার পিতা ইয়াসিরও ইসলাম গ্রহণ করেন।

    হযরত ‘আম্মার ইসলাম গ্রহণ করে দেখলেন, আবু বকর ছাড়া আর পাঁচজন পুরুষ ও দ’জন মহিলা তার পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তবে এর অর্থ এই যে, তখন মাত্র এ ক’জনই তাদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন। অন্যথায় সহীহ বর্ণনা মতে আম্মারের পূর্বে তিরিশেরও বেশী সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাদের অধিকাংশ কাফিরদের ভয়ে ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখেছিলেন।

    মক্কা হযরত ‘আম্মারের জম্মভূমি নয়। আপন বলতে সেখানে তাঁর কেউ ছিল না। পার্থিব আভিজাত্য বা ক্ষমতার দাপটও তাঁর ছিল না। তাছাড়া তখন পর্যন্ত তাঁর মা ‘সুমাইয়্যা’ বনী মাখযুমের দাসত্ব থেকে মুক্ত হতে পারেননি। এমনি এক অবস্থায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঈমানী জযবায় একদিনও বিষয়টি গোপন রাখতে পারলেন না। সবার কাছে প্রকাশ করে দিলেন। মক্কার মুশরিকরা দুর্বল পেয়ে তাঁর এবং তাঁর পরিবারের লোকদের ওপর নানা ধরণের নির্যাতন শুরু করে দিল। দুপুরের প্রচন্ড গরমের সময় উত্তপ্ত পাথরের ওপর তাঁকে চিৎ করে শুইয়ে দেয়া হতো, জ্বলন্ত লোহা দিয়ে শরীর ঝলসে দেওয়া হতো। কিন্তু আম্মারের ঈমানী শক্তির কাছে মুশরিকদের সকল অত্যাচার ও উৎপীড়ন পরাজিত হলো।

    হযরত আম্মারের মা হযরত সুমাইয়্যাকে নরাধ্ম আবু জাহল নিজের নিযা দিয়ে নির্মমভাবে শহীদ করে। ইসলামের ইতিহাসে হযরত সুমাইয়্যা প্রথম শহীদ। আম্মারের পিতা ইয়াসির এবং ভাই আবদুল্লাহও মুশরিদের অত্যাচারের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। একদিন মুশরিকরা আম্মারকে আগুনের অঙ্গারের ওপর শুইয়ে দিয়েছে। এমন সময় রাসূল (সা) সেখানে উপস্থিত হলেন। তিনি ব্যথিত চিত্তে আম্মারের মাথায় পবিত্র একটি হাত রেখে বললেনঃ ‘হে আগুন, ইব্রাহিমের মত তুই আম্মারের জন্য ঠাণ্ডা হয়ে যা।’ রাসূল (সা) যখনই আম্মার পরিবারের বাড়ীর ধার দিয়ে যেতেন এবং তাদেরকে নির্যাতিত অবস্থায় দেখতে পেতেন, সান্ত্বনা দিতেন। একদিন তিনি বলেনঃ ‘আম্মার পরিবারের লোকেরা, তোমাদের জন্য সুসংবাদ। জান্নাত তোমাদের জন্য প্রতীক্ষা করছে।’ একবার হযরত আম্মার রাসূলুল্লাহর নিকট এই অসহনীয় যুলম অত্যাচারের বিরুদ্ধে শিকায়েত করলো। রাসূল (সা) বললেন, ‘সবর কর, সবর কর।’ তারপর দু’আ করলেন, ‘হে আল্লাহ, ইয়াসির খান্দানের লোকদের ক্ষমা করে দাও।’

    একদিন মুশরিকরা তাঁকে এত দীর্ঘক্ষণ পানিতে ডুবিয়া রাখে যে, তিনি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন। এ অবস্থায় শত্রুরা তাঁর মুখ দিয়ে তাদের ইচ্ছেমত স্বীকৃতি আদায় করে নেয়। তিনি চেতনা ফিরে পেয়ে অনুশোচনায় জর্জরিত হতে লাগলেন। কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে হাজির হলেন। রসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আম্মার, খবর কি?’ আম্মার জবাব দিলেনঃ ‘আজ আপনার শানে কিছু খারাপ এবং তাদের উপাস্যদের সম্পর্কে কিছু ভলো কথা না বলা পর্যন্ত আমি মুক্তি পাইনি।’ রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার অন্তর কি বলছে?’ ‘আমার অন্তর ঈমানে পরিপূর্ণ।’ প্রিয় নবী (সা) অত্যন্ত দরদের সাথে তাঁর চোখের পানি মুছে দিয়ে বললেন, ‘কোন ক্ষতি নেই। এমন অবস্থার মুখোমুখি হলে আবারও এমনটি করবে।’ তারপর তিনি সূরা আন নাহালের নিম্নোক্ত আয়াতটি তিলাওয়াত করেনঃ ‘যে ব্যক্তি ঈমান আনার পর কুফরী করে, তবে যাদেরকে বাধ্য করা হয় এবং তাদের অন্তর ঈমানের ওপর দৃঢ় (তাদের কোন দোষ নেই)।’ (আন নাহল/১৪)

    একবার হযরত সাঈদ ইবন যুবাইর (রা) হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাসকে (রা) জিজ্ঞেস করেছিলঃ কুরাইশরা কি মুসলমানদের ওপর এতই অত্যাচার চালাতো যে, তারা দ্বীন ত্যাগ করতে বাধ্য হতো? জবাবে তিনি বলেছিল, “আল্লাহর কসম, হাঁ। কুরাইশরা তাদেরকে মারতো, অনাহারে রাখতো। এমন কি তারা এতই দুর্বল হয়ে পড়তো যে, উঠতে বসতে অক্ষম হয়ে যেত। এ অবস্থায় তাদের অন্তরের বিরুদ্ধে স্বীকৃতি আদায় করে নিত। এসব নির্যাতিত মুসলিমদের একজন আম্মার।”

    হযরত আম্মার হাবশায় হিজরাত করেছিলেন কিনা সে সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, তিনি হাবশাগামী দ্বিতীয় কাফিলার সহগামী হয়েছিলেন। মদীনায় হিজরাতের হুকুম হলে তিনি মদীনায় হিজরত করেন এবং হযরত মুবাশশির ইবনুল মুনযিরের মেহমান হন। রাসূল (সা) হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান আল আনসারীর সাথে তাঁর ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য তাঁকে একখন্ড ভূমিও দান করেন।

    হিজরাতের ছয়-সাত মাস পর মদীনার মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করা হয়। রাসূল (সা) নিজেও মসজিদ তৈরীর কাজে অংশগ্রহণ করেন। হযরত আম্মারও সক্রিয়ভাবে মসজিদ তৈরীতে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি মাথায় করে ইট বহন করেছিলেন আর মুখে এই চরণটি আওড়াচ্ছিলেনঃ ‘নাহনুল মুসলিমুন নাবতানিল মাসাজিদ-আমরা মুসলিম, আমরা বানাই মসজিদ।’ হযরত আবু সাঈদ বলেন, আমরা একটি করে ইট উঠাচ্ছিলাম, আর আম্মার উঠাচ্ছিলেন দু’টি করে। একবার আম্মার যাচ্ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) পাশ দিয়ে। রাসুল (সা) অত্যন্ত স্নেহের সাথে তাঁর মাথার ধূলো-বালি ঝেড়ে দিয়ে বললেন, ‘আফসুস আম্মার ! একটি বিদ্রোহীদল তোমাকে হত্যা করবে।তুমি তাদেরকে আল্লাহর দিকে ডাকবে, আর তারা তোমাকে ডাকবে জাহান্নামের দিকে।’ একবার কেউ তাঁর মাথায় এত বোঝা চাপিয়ে দিল যে, লোকেরা চেঁচিয়ে উঠলো, ‘আম্মার মারা যাবে, আম্মার মারা যাবে’ রাসূল (সা) এগিয়ে গিয়ে আম্মারের মাথা থেকে ইট তুলে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলেন।

    বদর থেকে তাবুক পর্যন্ত যত যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সবগুলিতে আম্মার অংশগ্রহণ করেন। হযরত আবু বকরের (রা) যুগে সংঘটিত অধিকাংশ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষেও তিনি সাহসী যোদ্ধার পরিচয় দেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার বলেন, ‘ইয়ামামার যুদ্ধে আম্মারের একটি কান দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়ে লাফাতে থাক। তা সত্বেও তিনি বেপরোয়াভাবে হামলার পর হামলা চালাতে থাকেন। যে দিকে তিনি যাচ্ছিলেন, কাফিরদের ব্যুহ তছনছ হয়ে যাচ্ছিল। একবার মুসলিম বাহিনী প্রায় ছত্রভঙ্গ হবার উপক্রম হলো। আম্মার এক বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝেখানে একটি পাথরের কাছে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলতে থাকেনঃ ‘ওহে মুসলিম মুজাহিদবৃন্দ! তোমরা কি জান্নাত থেকে পালাচ্ছো? আমি আম্মার ইবন ইয়াসির। এসো, আমার দিকে এসো।’ এই আওয়ায মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যাদুর মত কাজ করে তারা আবার রুখে দাঁড়ায়। বিজয় ছিনিয়ে আনে।

    হিজরী ২০ সনে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমার (রা) তাঁকে কুফার ওয়ালী বা শাসক নিয়োগ করেন। এক বছর নয় মাস অতি দক্ষতার সাথে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় বসরাবাসীরা কিছু নতুন বিজিত এলাকা বসরার সাথে দেওয়ার জন্য খলীফার নিকট দাবী করে। কুফার কিছু নেতৃবৃন্দ তাদের আমির আম্মারকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন উক্ত এলাকা সমূহ কুফার সাথে দেওয়ার ব্যাপারে খলীফাকে সম্মত করেন। কিন্তু হযরত আম্মার এ ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়তে রাজী হলেন না। কুফার নেতারা ক্ষেপে গেলেন। একজন তাকে ‘কান কাটা’ বলে গালিই দিয়ে বসেন। জবাবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আফসুস, তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় ও উত্তম কানটিকে গালি দিলে, যে কানটি আল্লাহর পথে কাটা গেছে।’

    এই বিষয়টি নিয়ে কুফার কিছু নেতৃবৃন্দ তাঁর বিরুদ্ধে শাস্ন কার্যে অদক্ষ বলে অভিযোগ উত্থাপন করেন। খলীফা তাঁকে বরখাস্ত করেন। বরখাস্তের পরের দিন খলীফা ডেকে জিজ্ঞেস করেছেন, সত্য কথাটি বলতে হবে। পূর্বে আমার নিয়োগের সময় খুশী ছিলাম না, তেমনি এখন বরখস্তের সময় নাখোশও নই।’

    তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের (রা) খিলাফতকালে চতুর্দিকে যখন বিক্ষোভ ও অসন্তোষ ধুমায়িত হয়ে ওঠে, তখন হিজরী ৩৫ সনে তার কারণ অনুসন্ধানের জন্য খলীফা একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। হযরত আম্মারও ছিলেন এই কমিশনের অন্যতম সদস্য। বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র মিসরের তদন্তভার তাঁর ওপর ন্যস্ত হয়। তিনি মিসর যান।

    কমিশনের অন্য সদস্যরা খুব তাড়াতাড়ি ফিরে এসে নিজ নিজ এলাকার রিপোর্ট পেশ করেন।কিন্তু হযরত আম্মার ফিরতে আশাতিরিক্ত দেরী করলেন। এদিকে দারুল খিলাফত মদীনায় তাঁর সম্পর্কে নানা রকম গুজব ও ধারণা ছাড়িয়ে পড়তে লাগলো। তিনি যখন মিসর থেকে ফিরে এলেন তখন বিদ্রোহ ও বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীদের দ্বারা তাঁকে প্রভাবিত দেখা গেল। তিনি প্রকাশ্য মিটিং মজলিসে হযরত উসমানের শাসনপদ্ধতি ও প্রাদেশিক ওয়েলীদের নানাবিধ কাজের কঠোর সমালোচনা শুরু করলেন। ফলে খলীফার লোকদের সাথে বিবাদ শুরু হয়ে গেল।একবার উসমানের (রা) চাকর-বাকরেরা তাঁকে এমন মারাত্মক পিটুনি দেয় যে, তাঁর সমস্ত শরীর ফুলে গেল। তিনি পাঁজরের একটি হাড়ে ভীষণ চোট পেলেন। বনী মাখযুমের তাঁর জাহিলী যুগে চুক্তি ছিল। তাঁরা খলীফার দরবারে পৌঁছে হুমকি দেয়, যদি আম্মার এই আঘাত থেকে প্রাণে না বাঁচেন তাহলে আমরা অবশ্যই প্রতিশোধ নেব। (আল-ইসতিয়াব) এমনি ধরনের ঘটনা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। যখন বিশৃংখলা সৃষ্টিকারীরা মদীনায় চড়াও হয়, হযরত ‘উসমান (রা) হযরত সা’দ ইবন আবী ওয়াক্কাসকে আম্মারের কাছে বলে পাঠান, তিনি যেন তার প্রভাব খাটিয়ে তাদেরকে ফেরত পাঠান। কিন্তু আম্মার অস্বীকার করেন।(তাবারী)

    হযরত উসমান (রা) শহীদ হলেন। খিলাফতের দায়িত্ব হযরত আলীর ওপর ন্যস্ত হলো। হযরত আয়িশা, তালহা, যুবাইর প্রমুখ উসমানের রক্তের বদলা দাবী করে বসরার দিকে চললেন। হযরত আলী কুফাবাসীদেরকে স্বপক্ষে আনার জন্য ইমাম হাসানের সাথে আম্মারকে পাঠালেন কুফায়। হযরত আম্মার যখন কুফা পৌঁছেন, হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা) তখন কুফার জামে মসজিদে এক জনসমাবেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন। তাঁকে মিম্বর থেকে নামিয়ে দিয়ে প্রথমে হযরত হাসান, পরে হযরত আম্মার ভাষণ দেন এবং আলীর (রা) প্রতি কুফাবাসীদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হন। পরদিন সকালে প্রায় সাড়ে নয় হাজার সৈনিকের একটি বাহিনী আলীর (রা) পক্ষে লড়বার জন্য আম্মারের পাশে সমবেত হয়।

    হিজরী ৩৬ সনে জমাদিউল আখের মাসে বসরার অদূরে ‘যিকার’ নামক স্থাকে হযরত আলী ও আয়িশার বাহিনী মুখোমুখি হলো। হযরত আম্মার কুফার বাহিনী সহ এ যুদ্ধে যোগ দিলেন। যুদ্ধের সূচনাপর্বেই হযরত যুবাইর যখন দেখলেন আম্মার আলীর পক্ষে, তখন তার স্মরণ হলো রাসূলুল্লাহর বাণী, ‘সত্য আম্মারের সাথে, বিদ্রোহী দল তাঁকে হত্যা করবে।’ তিনি নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। রণে ভঙ্গ দিয়ে কেটে পড়লেন। এ যুদ্ধে হযরত আম্মারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তিনি সত্যের ওপর আছেন। তাই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন এবং বিজয়ী হন। ইতিহাসে এ যুদ্ধ ‘উটের যুদ্ধ’ নামে খ্যাত।

    উটের যুদ্ধের পর হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার মধ্য সিফ্ফীনের যুদ্ধ হয়। হযরত আম্মার এ যুদ্ধেও হযরত আলীর পক্ষে যোগদান করেন। তখন তাঁর বয়স একানব্বই, মতান্তরে তিরানব্বই বছর। এই বৃদ্ধ বয়সেও তিনি জিহাদের অনুপ্রেরণায় ঘরে বসে থাকতে পারেননি। তিনি নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, সত্য আলীর (রা) পক্ষে। তাই এই বয়সেও তিনি সিওঙ্ঘের ন্যায় বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেন। তিনি যেদিকেই আক্রমণ চালাচ্ছিলেন বিপক্ষ শিবির ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছিল। একবার বিপক্ষ শিবিরের পতাকাবাহী হযরত আমর ইবনুল আসের ওপর তাঁর নজর পড়লো।তিনি বলেন, ‘আমি এই পতাকাবিহীর বিরুদ্ধে রাসূলুল্লাহর সাথে তিনবার যুদ্ধ করেছি। তার সাথে এ আমার চতুর্থ যুদ্ধ। আল্লাহর কসম, সে যদি আমাকে পরাজিত করে ‘হাজার’ নামক স্থানেও ঠেলে নিয়ে যায়, তবুও আমি বিশ্বাস করবো, আমরা সত্য এবং তারা মিথ্যার ওপর।’(তাবাকাত ১/১৮৫)

    সিফফীনের যুদ্ধে আলীর (রা) পক্ষে যোগদানের জন্য তিনি মানুষকে আহবান জানিয়ে বলতেন, “ওহে জনমন্ডলী, আমার সাথে এমন লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদে বের হও, যারা মনে করে তারা উসমানের রক্তের বদলা নিচ্ছে। আল্লাহর কসম, রক্তের বদলা তাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে তারা দুনিয়ার মজা লাভ করছে। সে মজা আরো লাভ করতে চায়। …… ইসলামের প্রাথমিক যুগে তাদের এমন কোন অবদান নেই যার ভিত্তিতে তারা মুসলিম উম্মার আনুগত্য দাবী করতে পারে। মুসলিম উম্মার নেতৃত্বের কোন হক তাহের নেই। তাদের অন্তরে এমন কিছু আল্লাহর ভীতি নেই যাতে তারা হকের অনুসারী হতে পারে। তারা উসমানের রক্তের বদলার কথা বলে মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছে। স্বৈরাচারী রাজা হওয়া ছাড়া তদের কোন উদ্দেশ্য নেই”। (রিজালুন হাওলার রাসূল/২১৬)

    সিফফীনের যুদ্ধ তখন চলছে। একদিন সন্ধ্যায় হযরত আম্মার কয়েক ঢোক দুধ পান করে বললেন, ‘রাসূল (সা) আমাকে বলেছেন, দুধই হবে আমার শেষ খাবার। তারপর-‘আজ আমি আমার নন্ধুদের সাথে মিলিত হব, আজ আমি মুহাম্মদ (সা) ও তাঁর সাথীদের সাথে মিলিত হব’-এ কথা বলতে বলতে সৈনিকদের সারিতে যোগ দিলেন। অতঃপর প্রচন্ডবেগে শত্রু শিবিরের ওপর আক্রমণ চালালেন। কারণ, আম্মার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সা) ভবিষ্যদ্বাণী এবং তাঁর বিরাট ফজিলাত ও মর্যাদা তাদের জানা ছিল। কিন্তু তদের মধ্যে অনেক নও-মুসলিম ছিল যারা আম্মার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানতো না।তাদেরই একজন ইবনুল গাবিয়া-তীর নিক্ষেপ করে আম্মারকে প্রথম মাটিতে ফেলে দেয়। তারপর অন্য একজন শামী ব্যক্তি তরবারি দিয়ে দেহ থেকে তাঁর মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

    আম্মারকে শহীদ করার পর হত্যাকারী দু’জনই এককভাবে এ কৃতিত্ব দাবী করে ঝগড়া শুরু করে দেয়। ঝগড়া করতে করতে তারা মুয়াবিয়ার (রা) কাছে উপস্থিত হয়। ঘটনাক্রমে হযরত আমর ইবনুল আসও তখন সেখনে উপস্থিত ছিলেন। ব্যাপার দেখে তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম,এরা দু’জন জাহান্নামের জন্য ঝগড়া করছে।’ একথায় হযরত আমীর মুয়াবিয়া একটু ক্ষুন্ন হয়ে বললেন, ‘আমর, তুমি এ কি বলছো? যারা আমাদের জন্য জীবন দিচ্ছে, তাদের সম্পর্কে এমন কথা বলছো’? আমর বললেন, ‘আল্লাহর কসম, এটাই সত্য। আজ থেকে বিশ বছর পূর্বে যদি আমার মরণ হতো, কতই না ভালো হতো।’

    হযরত আম্মারের (রা) শাহাদতের পর হযরত আমর ইবনুল আস দারুণ বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি এ সংঘাত থেকে দূরে সরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া তাকে এই বলে সান্ত্বনা দেন যে, আম্মারের হত্যাকারী আমরা নই, বরং যারা তাকে ঘর থেকে বের করে এই যুদ্ধের ময়দানে সংগে করে নিয়ে এসেছে প্রকৃতপক্ষে তারাই তাঁর হত্যাকারী। (তাবাকাত)

    হযরত আম্মারের শাহাদাতের মাধ্যমে সত্য মিথ্যার ফয়সাল হয়ে যায়। হযরত খুযাইমা ইবন সাবিত (রা) উট ও সিফফীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কোন পক্ষেই তরবারি কোষমুক্ত করেননি। হযরত আম্মারের শাহাদাতের পর তিনি বুঝলেন, আলীর পক্ষ অবলম্বন করাই উচিৎ। তিনি এবার তরবারি কোষমুক্ত করে হযরত মুয়াবিয়ার (রা) বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শাহাদাত বরণ করেন। এমনিভাবে যে সকল সাহাবী দ্বিধা-দ্বন্দ্বের আবর্তে দোলা খাচ্ছিলেন, তাঁরাও সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে আলীর (রা) পক্ষ অবলম্বন করেন।

    হযরত আলী (রা) তাঁর প্রিয় সংগী হযরত আম্মারের (রা) শাহাদাত শুনে দুঃখের সাথে বলে ওঠেন, “যেদিন আম্মার ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার ওপর আল্লাহ রহম করেছেন, যেদিন সে শাহাদাত বরণ করেছে, তার ওপর আল্লাহ রহম করেছেন এবং যেদিন সে জীবিত হয়ে উঠবে আল্লাহ তার ওপর রহম করবেন। আমি সেই সমই তাঁকে রাসূলুল্লাহর সাথে দেখেছি যখন মাত্র চার-পাঁচ জন সাহাবীর ঈমানের ঘোষণা দানের সৌভাগ্য হয়েছিল।প্রথম পর্যায়ের সাহাবীদের কেউই তাঁর মাগফিরাতের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারেন না। আম্মার এবং সত্য একে অপরের সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। তাঁর হত্যাকারী নিশ্চিত জাহান্নামী।”

    অতঃপর হযরত আলী (রা) হযরত আম্মারের কাফন দাফনের নির্দেশ দেন। হযরত আলী জানাযার নামায পড়ান এবং আম্মারের রক্তে-ভেজা কাপড়েই দাফনের নির্দেশ দেন। এ হিজরী ৮৭ সনের ঘটনা। হযরত আম্মার হলেন কুফার মাটিতে সমাহিত রাসূলুল্লাহর (সা) প্রথম সাহাবী।

    হযরত আম্মার ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু। তাকওয়া ও খাওফে খোদার কারণে সব সময় চুপচাপ থাকতেন। খুব কম কথা বলতেন। ফিতনা-ফাসাদ থেকে সর্বদা আল্লাহর পানাহ্ চাইতেন। কিন্তু আল্লাহ সবচেয়ে বড় ফিতনা দ্বারা তাঁর পরীক্ষা নেন এবং সার্থকভাবে সত্যের সহায়তাকারী বানিয়ে দেন।

    বিনয় ও নম্রতার তিনি ছিলেন মূর্ত প্রতীক। মাটিই ছিল তাঁর আরামদায়ক বিছানা। ওয়ালী থাকাকালেও অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। হাট বাজারের কেনাকাটা নিজেই করতেন এবং নিজেই সবকিছু পিঠে বহন করতেন। সব কাজ নিজ হাতে করতেন। হযরত আম্মারের এক সমসাময়িক ব্যাক্তি ইবন আবিল হুজাইল বলেন, ‘আমি কুফার আমীর আম্মারকে দেখলাম, তিনি কুফায় কিছু শশা খরীদ করলেন। তারপর সেগুলি রশি দিয়ে বেঁধে পিঠে উঠালেন এবং বাড়ীর দিকে যাত্রা কলেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২১১)

    হযরত আম্মারের (রা) প্রতিটি কাজের মূল প্রেরণা ছিল আল্লাহর রিজামন্দী। সিফফীনের যুদ্ধে যাওয়ার পথে বার বার তিনি বলেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমি যদি জানতাম পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে অথবা পানিতে ডুব দিয়ে আমার জীবন বিলিয়ে দিলে তুমি খুশী হবে, আমি তোমাকে সেই ভাবে খুশী করতাম। আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। আমার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র তোমার রিজামন্দী। আমি আশা করি, তুমি আমার এ উদ্দেশ্য বিফল করবে না”। (তাবাকাত) তাঁর চারিত্রিক মহত্ব ও ঈমানী বলিষ্ঠতা সম্পর্কে খোদ রাসূল (সা) বলেছেন, ‘আম্মারের শিরা উপশিরায় ঈমান মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। রাসূল (সা) অন্য সাহাবীদের নিকট আম্মারের ঈমান নিয়ে গর্ব করতেন। একবার প্রখ্যাত সেনা নায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আম্মারের মধ্যে কোন একটি বিষয় নিয়ে কিছু ভুল বুঝাবুঝি হয়। বিষয়টি রাসূলুল্লাহর গোচরে এলে তিনি বলেন, ‘যে আম্মারের সাথে শত্রুতা করবে আল্লাহ তার সাথে শত্রুতা করবেন। যে আম্মারেকে হিংসা করবে আল্লাহও তাকে হিংসা করবেন। অন্য একটি হাদীসে আছে আমার পরে তোমরা আবু বকর ও উমারের অনুসরণ করবে। তোমরা আম্মারের পথ ও পন্থা থেকে হিদায়াত গ্রহণ করবে।

    হযরত আম্মার আল্লাহর ইবাদতে বিশেষ মজা পেতেন। সারা রাত আল্লাহর স্মরণে অতিবাহিত করতেন। কোন অবস্থাতেই নামায কাযা করতেন না। একবার সফরে ছিলেন। গোসলের প্রয়োজন দেখা দিল। বহু চেষ্টার পরও পানি পেলেন না। তাঁর স্মরণ হলো, মাটিতো পানির বিকল্প। গোসলের পরিবর্তে তিনি সার দেহে ধূলোবালি মেখে নামায আদায় করলেন। সফর থেকে ফিরে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট বিষয়টি বর্ণনা করলে তিনি বললেন, ‘এমন অবস্থায় শুধু তায়াম্মুমই যথেষ্ট।’

    প্রখ্যাত সাহাবী হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামানকে (রা) বলা হয় ‘সিররু রাসূলিল্লাহ’-রাসূলুল্লাহর (সা) যাবতীয় গোপন জ্ঞানের অধিকারী। তিনি যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, লোকেরা যখন দ্বিধা বিভক্ত হয়ে যাবে তখন কার সাথে থাকতে আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন? জবাবে বললেন, ‘তোমরা ইবন সুমাইয়্যার সাথে থাকবে। তিনি আমরণ সত্য থেকে বিচ্যুৎ হবেন না। মহান সাহাবী হুজাইফার এটাই ছিল জীবনের শেষ কথা। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২১২)

    রাসূল (সা) থেকে তিনি বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁরন থেকে আবু মূসা আশয়ারী, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবন জাফর প্রমুখ সাহাবীসহ বহু তাবেয়ী হাদীস বর্ণনা করছেন।

  • সুহাইব ইবন সিনান আর-রুমী (রা)

    সুহাইব ইবন সিনান আর-রুমী (রা)

    নাম ‘সুহাইব, কুনিয়াত আবু ইয়াহইয়া। পিতা সিনান, মাতা সালমা বিনতু কাঈদ। পিতা আরবের বনী নুমাইর এবং মাতা বনী তামীম খান্দানের সন্তান। তাঁকে রুমী বা রোমবাসী বলা হয়। আসলে তিনি কিন্তু রোমবাসী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন আরব।

    রাসূলুল্লাহর (সা) নবুওয়াত প্রপ্তির আনুমানিক দ’দশক পূর্বে পারশ্য সাম্রাটের প্রতিনিধি হিসাবে তার পিতা সিনান ইবনে মালিক বসরার এক প্রচীন শহর ‘উবুল্লার’ শাসক ছিলেন। সুহাইব ছিলেন পিতার প্রিয়তম সন্তান। তাঁর মা সুহাইবকে সংগে করে আরো কিছু লোক লস্করসহ একবার ইরাকের ‘সানিয়্যা’ নামক পল্লীতে বেড়াতে যান। হঠাৎ এক রাতে রোমান বাহিনী অতর্কিতে পল্লীটির ওপর আক্রমন করে ব্যাপক হত্যাও লুটতরাজ চালায়। নারী ও শিশুদের বন্দী করে দাস দাসীতে পরিনত করে। বন্দীদের মধ্যে শিশু সুহাইবও ছিলেন। তখন তাঁর বয়স পাঁচ বছরের বেশী হবেনা

    সুহাইবকে রোমের এক দাস ক্রয়-বিক্রয়ের বাজারে বিক্রি করা হলো। তিনি এক মনিবের হাত থেকে অন্য মনিবের হাতে গেলেন ক্রমাগতভাবে। তৎকালীন রোমা সমাজে দাসদের ভাগ্যে এমনই ঘটতো। এভাবে ভেতর থেকেই রোমান সমাজের গভীরে প্রবেশ করার এবং সেই সমাজের অভ্যন্তরে সংটিত অশ্লীলতা ও পাপাচার নিকট থেকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ তিনি লাভ করেন।

    সুহাইব রোমের ভূমিতে লালিত পালিত হয়ে যৌবনে পদার্পন করেন। তিনি আরবী ভাষা ভুলে যান অথবা ভুলে যাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছেন। তবে তিনি যে মরু আরবের সন্তান, এ কথাটি এক দিনের জন্যও ভুলেননি। সর্বদা তিনি প্রহর গুনতেন, কবে দাসত্বের শৃঙখল থেকে মুক্ত হবেন এবং আরবে নিজ গোত্রের সাথে মিলিত হবেন। তাঁর এ আগ্রহ প্রবলতর হয়ে ওঠে যে দিন তিনি এক খৃষ্টান কাহিনের (ভবিষ্যদ্বক্তা) মুখে শুনতে পেলনঃ ‘সে সময় সমাগত যখন জাযীরাতুল আরবের মক্কায় একজন নবী আবির্ভূত হবেন। তিনি ঈসা ইবন মরিয়মের রিসালাতকে সত্যায়িত করবেন এবং মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসবেন।’

    সুহাইব সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকলেন। সুযোগ এসেও গেল। একদিন মনিবের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে মক্কায় চলে এলেন। মক্কার লোকেরা তাঁর সোনালী চুল প জিহ্বার জড়তার কারণে তাঁকে সুহাইব আর রুমী বলতে থাকে। মক্কায় তিনি বিশিষ্ট কুরাইশ নেতা আবদুল্লাহ ইবন জুদআনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে তাঁর সাথে যৌথভাবে ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করেন। ব্যবসায় দারুণ সাফল্য লাভ করেন। অবশ্য অন্য একটি বর্ণনা মতে আরবের বনী কালব তাঁকে খরীদ করে মক্কায় নিয়ে আসে। আবদুল্লাহ ইবন জুহআন তাদের নিকট থেকে তাঁকে খরীদ করে আযাদ করে দেন।

    সুহাইব মক্কায় তাঁর কারবার ও ব্যবসা বাণিজ্যের হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও এক মুহূর্তের জন্য সেই খৃষ্টান কাহিনের ভবিষ্যদ্বানীর কথা ভুলেননি। সে কথা স্মরণ হলেই মনে মনে বলতেনঃ তা কবে হবে? এ ভাবে অবশ্য তাঁকে বেশী দিন কাটতে হয়নি।

    একদিন তিনি এক সফর থেকে ফিরে এসে শুনতে পেলেন, মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ নবওয়াত লাভ করেছেন। মানুষকে তিনি এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য আহবান জানাচ্ছেন, তাদেরকে আদল ও ইহসানের প্রতি উৎসাহিত করছেন এবং অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন। সুহাইব মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, ‘যাঁকে আল আমীন বলা হয় ইনি কি সেই ব্যক্তি?’ লোকেরা বললো ‘হ্যাঁ’। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর বাসস্থান কোথায়? বলা হলো, ‘সাফা পাহাড়ের কাছে আল-আরকাম ইবন আবিল আরকামের বাড়ীতে তিনি থাকেন। তবে সর্তক থেকো কুরাইশদের কেউ যেন তোমাকে তাঁর কাছে দেখে না ফেলে। যদি তারা মুহাম্মাদের কাছে তোমাকে দেখতে পাঁয়, তোমার সাথে তেমন আচরণই তারা করবে যেমনটি তারা আমাদের সাথে করে থাকে। তুমি একজন ভিনদেশী মানুষ, তোমাকে রক্ষা করার কেউ এখানে নেই। তোমার গোত্র গোষ্ঠীও এখানে নেই।

    সুহাইব চললেন দারুল আরকামের দিকে অত্যন্ত সন্তর্পনে। আরকামের বাড়ীর দরযায় পৌঁছে দেখতে পেলেল সেখানে আম্মার ইবনে ইয়াসির দাঁড়িয়ে। আগেই তাঁর সাথে পরিচয় ছিল। একটু ইতস্ততঃ করে তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ‘আম্মার তুমি এখানে?

    আম্মার পাল্টা জিজ্ঞেস করলেন, বরং তুমিই বল, কি জন্য এসেছ?’ সুহাইব বললেন, ‘আমি এই লোকটির কাছে যেতে চাই, তাঁর কিছু কথা শুনতে চাই।’

    আম্মার বললেন, আমারও উদ্দেশ্য তাই। ‘সুহাইব বললেন, ‘তাহলে আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে ঢুকে পড়ি।’

    দু’জনে এক সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে পৌঁছে তাঁর কথা শুনলেন। তাঁদের অন্তর ঈমানের নূরে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। দু’জনেই এক সাথে রাসূলুল্লাহ্র (সা) দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কালেমা শাহাদত পাঠ করলেন। সে দিনটি তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাহর্চযে থেকে তাঁর উপদেশপুর্ণ বাণী শ্রবণ করলেন। গভীর রাতে মানুষের শোরগোল থেমে গেলে তাঁরা চুপে চুপে অন্ধকারে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার থেকে বেরিয়ে নিজ নিজ আস্তানার দিকে বেরিয়ে পড়লেন। হযরত সুহাইবের পূর্বে তিরিশেরও বেশী সাহাবী ইসলাম গ্রহন করেছিলেন। তাঁদের অধিকাংশ কুরাইশদের ভয়ে নিজেদের ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখেছিলেন। সুহাইব যদিও বিদেশী ছিলেন, মক্কায় তাঁর কোন আত্বীয় বন্ধু ছিল না, তা সত্বেও তিনি তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখলেন না। তিনি তাঁর ইসলাম গ্রহনের কথা ঘোষণা করে দিলেন। বিলাল, আম্মার, সুমাইয়্যা, খাব্বাব প্রমুখের ন্যায় তিনিও কুরাইশদের নিষ্ঠুর অত্যাচারের শিকারে পরিণত হলেন। অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে সকল নির্যাতন সহ্য করেতে থাকেন। তিনি জানতেন, জান্নাতের পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়।

    রাসূলুল্লাহ (সা) যখন হিজরাতের সংকল্প করলেন, সুহাইব তা অবগত হলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, তিনিই হবেন ‘সালেসু সালাসা-তিনজনের তৃতীয় জন। অর্থাৎ রাসূল (সা), আবু বুকর ও সুহাইব। কিন্তু কুরাইশদের সচেতন পাহারার কারণে তা হয়নি। কুরাইশরা তাঁর পিছু লেগে ছিল, যাতে তিনি তাঁর বিপুল ধন-সম্পদ নিয়ে মক্কা থেকে সরে যেতে না পারেন।

    রাসূলুল্লাহর হিজরাতের পর সুহাইব সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেন। কুরাইশরাও তাকে চোখের আড়াল হতে দেয় না। অবশেষে তিনি এক কৌশলের আশ্রয় নিলেন।

    এক প্রচন্ড শীতের রাতে বার বার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাড়ীর বাইরে যেতে লাগলেন। একবার যেয়ে আসতে না আসতে আবার যেতে লাগলেন। কুরাইশ পাহারাদাররা বলা বলি করলো, লাত ও উযযা তার পেট খারাপ করেছে। তারা কিছুটা আত্মতৃপ্তি বোধ করলো এবং বাড়ীতে ফিরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। এই সুযোগে সুহাইব বাড়ী থেকে বের হয়ে মদীনার পথ ধরলেন।

    সুহাইব মক্কা থেকে বেরিয়ে কিছু দূর যেতে না যেতেই পাহারাদাররা বিষয়টি জানে ফেলে। তারা তাড়াতাড়ি দ্রুতগতি সম্পন্ন ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে তাঁর পিছু ধাওয়া করে। সুহাইব তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে একটি উচু টিলার ওপর উঠে তীর ও ধনুক বের করে তাদেরকে সম্বোধন করে বলেন, ‘কুরাইশ সম্প্রদায়! তোমরা জান, আমি তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক তীরন্দায ও নিশানবায ব্যক্তি। আল্লাহর কসম, আমার কাছে যতগুলি তীর আছে, তার প্রত্যেকটি দিয়ে তোমাদের এক একজন করে খতম না করা পর্যন্ত তোমরা আমার কাছে পৌঁছতে পারবে না। তারপর আমার তরবারি তো আছেই।’ কুরাইশদের একজন বললোঃ ‘আল্লাহর কসম! তুমি জীবনও বাঁচাবে এবং অর্থ-সম্পদও নিয়ে যাবে তা আমরা হতে দেব না। তুমি মক্কায় এসেছিলে শুন্য হাতে। এখানে এসেই এসব ধন-সম্পদের মালিক হয়েছো।’

    সুহাইব বললেন, ‘আমি যদি আমার ধন-সম্পদ তোমাদের হাতে তুলে দিই, তোমরা আমার রাস্তা ছেড়ে দেবে?’ তারা বললো, ‘হাঁ’।

    সুহাইব তাদেরকে সংগে করে মক্কায় তাঁর বাড়ীতে নিয়ে গেলেন এবং ধন-সম্পদ তাদের হাতে তুলে দিলেন। কুরাইশরাও তাঁর পথ ছেড়ে দিল। এভাবে সুহাইব দ্বীনের খাতিরে সবকিছু ত্যাগ করে মদীনায় চলে এলেন। পেছনে ফেলা আসা কষ্টোপার্জিত ধন-সম্পদের জন্য তিনি একটুও কাতর হননি। পথে যখনই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, রাসূলের (সা) সাথে সাক্ষাতের কথা স্মরণ হতেই সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে আবার যাত্রা শুরু করেন। এভাবে তিনি কুবায় পৌঁছেন। রাসূল (সা) তখন কুবায় কুলসূম ইবন হিদামের বাড়ীতে। রাসূল (সা) তাঁকে আসতে দেকে উৎফুল্ল হয়ে বলে ওঠেন, ‘আবু ইয়াহইয়া, ব্যবসা লাভজনক হয়েছে,’ তিন বার তিনি একথাটি বলেন। সুহাইবের মুখমন্ডল আনন্দে উজ্জল হয়ে ওঠে। তিনি বলে উঠেন, ‘আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার আগে তো আপনার কাছে কেউ আসেনি। নিশ্চয় জিবরীল এ খবর আপনাকে দিয়েছে।’ সত্যিই ব্যবসাটি লাভজনকই হয়েছিল। একথার সমর্থনে জিবরীল (আ) ওহী নিয়ে হাজির হলেন, ‘ওয়া মিনন নাসে মান ইয়াশরী নাফসাহু ইবতিগা মারদাতিল্লাহ। ওয়াল্লাহু রাউফুম বিল ইবাদ’কিছু মানুষ এমনও আছে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের জীবনও বিক্রি করে দেয়। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।

    হযরত সুহাইব মদীনায় সা’দ ইবন খুসাইমার অতিথি হন এবং হারিস ইবনুস সাম্মা আল-আনসারীর সাথে তাঁর ভ্রাতৃ-সম্পর্ক কায়েম হয়।

    হযরত সুহাইব ছিলেন দক্ষ তীরন্দাসয। বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সহযাত্রী ছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে জন সমাবেশে তিনি এসব যুদ্ধ বিগ্রহের কাহিনী চিত্তাকর্ষক ভঙ্গিতে বর্ণনা করতেন।

    রাসূলুল্লাহর (সা) সাহচর্য সম্পর্কে তিনি নিজেই বলতেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি ভুমিকায় আমি উপস্থিত থেকেছি। তিনি যখনই কোন বাইয়াত গ্রহণ করেছেন, আমি উপস্থিত থেকেছি। তাঁর ছোট ছোট অভিযান গুলিতে অংশগ্রহণ করেছি। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত যত যুদ্ধ তিনি করেছেন তার প্রত্যেকটিতে আমি তাঁর ডানে অথবা বামে অবস্থান করে যুদ্ধ করেছি। মুসলমানরা যতবার এবং যেখানেই পেছনের অথবা সামনের শত্রুর ভয়ে ভীত হয়েছে, আমি সব সময় তাদের সাথে থেকেছি। রাসূলুল্লাহকে (সা) কক্ষনো আমরা নিজের ও শত্রুর মাঝখানে হতে দিইনি। এভাবে রাসূল (সা) তাঁর প্রভুর সান্নিধ্যে গমন করেন।’(রিজালুন হাওলার রাসূল-১৩০)

    হযরত সুহাইব সম্পর্কে হযরত ‘উমারের (রা) অত্যন্ত সুধারণা ছিল। তিনি তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। মৃত্যর পুর্বে তিনি অসীয়াত করে যান, সুহাইব তাঁর জানাযার ইমামতি করবেন। শুরার সদস্যবৃন্দ যতক্ষণ নতুন খলিফার নাম ঘোষণা না করবেন, তিনিই খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন। হযরত উমারের (রা) মৃত্যুর পর তিন দিন পযর্ন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন।

    হিজরী ৩৮ সনে ৭২ বছর বয়সে তিনি মদীনায় ইন্তিকাল করেন। মদীনার ‘বাকী’ গোরস্তানে তাঁকে দাফন করা হয়।

    হযরত সুহাইব (রা) জীবনের বিরাট এক অংশ রাসূলে পাকের সাহচার্যে কাটানোর সুযোগ লাভ করেছিলেন। তিনি বলতেনঃ ওহী নাযিলের পূর্ব থেকেই রাসূলুল্লাহর (সা) সুহবত লাভের সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।’ একারণে সকল সৎগুনাবলীর সমাবেশ তাঁর মধ্যে ঘটেছিল। সচ্চরিত্রতা, আত্ম মর্যাদা বোধের সাথে সাথে উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, হাস্য কৌতুক ইত্যাদি গুণাবলী তাঁর চরিত্রকে আরও মাধুর্য্য দান করেছিল।

    তিনি ছিলেন অতিথি পরায়ণ ও দানশীল। গরিব দুঃখীর প্রতি ছিলেন দরাযহস্ত। মাঝে মাঝে মানুষের ধারণা হতো, তিনি দারুণ অমিতব্যয়ী। একবার হযরত উমার (রা) তাঁকে বলেন, তোমার কথা আমার ভালো লাগে না। কারণ, ‘প্রথমতঃ তোমার কুনিয়াত আবু ইয়াহইয়া। এই নামে একজন নবী ছিলেন। আর এ নামে তোমার কোন সন্তান নেই। দ্বিতীয়তঃ তুমি বড় অমিতব্যয়ী। তৃতীয়তঃ তুমি নিজেকে একজন আরব বলে দাবী কর।’জবাবে তিনি বলেন, ‘এই কুনিয়াত আমি নিজে গ্রহণ করিনি। রাসুলুল্লাহর (সা) নির্বাচিত। দ্বিতীয়তঃ অমিতব্য্যিতা। তা আমার একাজের ভিত্তি হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণী-‘ যারা মানুষকে অন্নদান করে এবং সালামের জবাব দেয় তারাই তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। তৃতীয় অভিযোগটির জবাব হলো, প্রকৃতই আমি একজন আরব সন্তান। শৈশবে রোমবাসী আমাকে লুট করে নিয়ে যায়, আমাকে আমার গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে দাসে পরিণত করে, এ-কারণে আমি আমার গোত্র ও খান্দানকে ভুলে যাই।’

    হযরত সুহাইবের দৈহিক গঠন ছিল মধ্যমাকৃতির। না লম্বা না খাটো। চেহরা উজ্জ্বল, মাথার চুল ঘন। বার্ধক্যে মেহেন্দীর খিযাব লাগাতেন। জিহবায় কিছুটা জড়তা ও তোৎলামী ছিল। একবার তাঁর চাকর ইয়াহনাসকে ডাকছিলেন। তা যেন শুনা যাচ্ছিল, ‘নাস’। নাস অর্থ মানুষ। হযরত উমার সে ডাক শুনে বলে ওঠেন, ‘লোকটি এভাবে ‘নাস’ ‘অর্থাৎ মানুষকে ডাকছে কেন?’ হযরত উম্মে সালামা (রা) বললেন, ‘সে নাস’ দ্বারা মানুষ কে নয়, বরং তার চাকর ইয়াহনাসকে ডাকছে। জিহবার জড়তার দরুণ নামটি ভালো মত উচ্চারণ করতে পারে না।

  • আবু মুসা আল আশয়ারী (রা)

    আবু মুসা আল আশয়ারী (রা)

    আব্দুল্লাহ নাম, আবু মুসা কুনিয়াত। কুনিয়াত দ্বারাই তিনি অধিক পরিচিত। পিতা কায়েস, মাতা তাইয়েব্র। তার ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। এতটুকু জানা যায় যে, তিনি ইয়ামানের অধিবাসী ছিলেন। তথাকার আল আশয়ার গোত্রের সন্তার হওয়ায় তিনি আল আশয়ারী হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। হযরত আবু মুসা ইসলামের পরিচয় লাভ করে ইয়ামান থেকে মক্কায় আসেন এবং রাসূলুল্লাহ (সা) এর হাতে বাইয়াত হন। মক্কার আবদু শামস গোত্রের সাথে বন্ধু সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কিছুদিন মক্কায় অবস্থানের পর স্বদেশবাসীকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইয়ামান ফিরে যান। হযরত আবু মুসা ছিলেন তার খান্দানের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। খান্দানের লোকেরা খুব দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে দাওয়াতে সাড়া দেয়। প্রায় পঞ্চাশজন মুসলমানের একটি দলকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে যাওয়ার জন্য ইয়ামান থেকে সমুদ্র পথে যাত্রা করেন। সমুদ্রের প্রতিকুল আবহাওয়া এ দলটিকে হিজাযের পরিবর্তে হাবশা ঠেলে নিয়ে যায়। এদিকে হযরত জাফর বিন আবী তালীব ও তার সংগী সাথীরা যারা তখনও হাবশায় অবস্থান করছিলেন, মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। আবু মুসা তার দলটিসহ এই কাফিলার সাথে মদীনার পথ ধরলেন। তারা মদীনায় পৌছলেন, আর এদিকে রাসূলুল্লাহর (সা) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী খাইবার বিজয় শেষ করে মদীনায় ফিরেন। রাসূল সা. আবু মুসা ও তার সংগী সকলকে খাইবারের গনীমতের অংশ দান করেন। হযরত আবু মুসা মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধে শরীক ছিলেন। হুনাইনের ময়দান থেকে পালিয়ে বনু হাওয়াযিন আওতাস উপত্যকায় সমবেত হয়। রাসূল সা তাদেরক সমূলে উত্খাতের জন্য হযরত আবু আমেরের নেতৃত্বে একটি দল পাঠান। তারা আওতাস পৌছে হাওয়াযিন সর্দার দুরাইদ ইবন্যুস সাম্মাকে হত্যা করে তাদের ছত্র্রভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে হাশামী নামক এক মুশরিকের নিক্ষিপ্ত তীরে আবু আমের মারাত্নকভাবে আহত হন। আবু মুসা আশয়ারী পিছু ধাওয়া করে এই মুশরিককে হত্যা করেন। হযরত আবু আমের তার মৃত্যুর পূর্বে আবু মুসাকে তার স্থলাভিষিক্ত করেন্ এবং আবু মুসার কাছে এই বলে অনুরোধ করেন যে, ভাই রাসূলুল্লাহর খেদমতে আমার শেষ সালাম পৌছে দেবেন এবং আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে বলবেন। আবু আমের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। আবু মুসা তার বাহিনী সহ মদীনায ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সা কে আবু আমেরের অন্তীম অসীয়তের কথা বর্ণনা করলেন। রাসূল সা: পানি আনিয়ে ওযু করলেন এবং আবু আমেরের জন্য মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করলেন। আবু মুসা আরজ করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ আমার জন্যও একটু দোয়া করুন। রাসূল সা: করণের হে আল্লাহ আব্দুল্লাহ ইবনে কায়েসের পাপসমূহ মাফ করে দিন। কিয়ামতের দিন তাকে সম্মানের সাথে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ দিন। হিজরী নবম সনে তাবুক অভিযানের তোড়জোড় চলছে। আবু মুসার সংগী সাথীরা তাকে পাঠালেন রাসূলুল্লাহর সা: কাছে তাদের জন্য সওয়ারী চেয়ে আনার জন্য। ঘটনাক্রমে আবু মুসা যখন পৌছলেন তখন রাসূলুল্লাহ সা: কোন কারণে উত্তেজিত ছিলেন। আবু মুসা তা না বুঝে আরজ করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ আমার সাথীরা আমাকে পাঠিয়েছে, আপনি যেন তাদেরকে সওয়ারী দান করেন। রাসূল সা: বসে ছিলেন। উত্তেজিত কন্ঠে তিনি বলে ওঠেন আল্লাহর কসম তোমাদের আমি কোন সওয়ারী দেবনা। আবু মুসা ভীত হয়ে পড়লেন, না জনি কোন বেয়াদবী হয়ে গেল। অত্যন্ত দু:থিত মনে ফিরে এসে সংগী সাখীদের তিনি এ দু:সংবাদ জানালেন। কিন্তু তখনও তিনি স্থির হয়ে দাড়াতে পারেননি, এর মধ্যে বিলাল দৌড়ে এলেন আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস কোথায় তুমি? চলো রাসূলুল্লাহ সা: তোমাকে ডাকছেন। তিনি বিলালের সাথে রাসুলুল্লাহর সা: দরবরে হাজির হলেন। রাসূল সা: নিকটে বাধা দুটি উটের দেকে তিনি ইঙ্গিত করে বললেন: এ দুটিকে তোমার সাথীদের কাছে নিয়ে যাও। হযরত আবু মুসা উট দুটি নিয়ে গোত্রীয় লোকদের কাছে ফিরে এসে বললেন রাসূল সা: তোমাদের এ দুটি উট সওয়ারী হিসেবে রুপে দান করেছেন, তবে তোমাদের কিছু লোককে আমার সাথে এমন কোন লোকরে কাছে যেতে হবে যে রাসূলুল্লাহর পূর্বের কথা শুনেছিল। যাতে তোমাদের মনে এ ধারণা না হয় যে, আমি আগে যা বলেছিলাম তা আমার মনগড়া কথা ছিল। লোকেরা বলল আল্লাহর কসম আমরা আপনাকে সত্যবাদী বলেই বিশ্বাস করি। তবে আপনি যখন বলছেন. চলুন। এভাবে কিছু লোককে সংগে নিয়ে তিনি তার পূর্বের কথার সত্যতা প্রমান করেন। তাবুক থেকে ফেরার পর একদিন আশয়ারী গোত্রের দুইজন নেতৃ্স্থানীয় ব্যাক্তি হযরত আবু মুসা আশয়ারীকে সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে গেল। তারা রাসূলুল্লাহর কাছে যে কোন একটি পদ লাভের আকাঙ্খা ব্যক্ত করল। রাসূলুল্লাহ সা মিসওয়াক করছিলেন। তাদের কথা শুনে তার মিসওয়াক করা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আবুর দিকে ফিরে বললেন আবু মুসা আবু মুসা। আবু মুসা আরজ করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ আমি তাদের অন্তরের কথা জানতাম না। আমি জানতাম না তারা কোন পদ লাভের আকাঙ্খা ব্যক্ত করবে। রাসূল সা: বললেন যদি কেউ নিজেই কোন পদের আকাঙ্খী হয়, আমি তাকে কখখনো সেই পদে নিয়োগ করবোনা। তবে, আবু মুসা তুমি ইয়ামানে যাও। আমি তোমাকে সেখানকার ওয়ালী নিযুক্ত করলাম। সেই প্রাচীনকাল থেকে ইয়ামান দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। ইয়ামান আকসা ও ইয়ামান আদনা। হযরত মুয়াজ বিন জাবালকে ইয়ামন আকসার এবং আবু মুসাকে ইয়ামন আদনার দায়িত্ব দেয়া হল। দুজনকে বিদায় দিয়ে রাসূল সা: তাদের উদ্দেশ্যে বললেন: “ইয়ামন বাসীর সাথ নরমে ব্যবহার করবে, কোন প্রকার কঠোরতা করবেনা। মানুষকে খুশী রাখবে, ক্ষেপিয়ে তুলবেনা। পরস্পর মিলে মিশে বসবাস করবে।‍‍” নিজ দেশ হওয়ার কারণে ইয়ামন বাসীর ওপর হযরত আবু মুসার যথেষ্ট প্রভাব শুরু থেকেই ছিল। তাই সুষ্ঠুভাবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। পার্শ্ববর্তী ওয়ালী হযরত মুয়াজের সাথে তার ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল। মাঝে মাঝে সীমান্তে গিয়ে তারা মিলিত হতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পর মত বিনিময় করতেন। হিজরী দশম সনে রাসূলুল্লাহ সা: হজ্জ আদায় করেন। হযরত আবু মুসা ইয়ামন থেকে এসে হজ্জে অংশগ্রহন করেন। রাসূলুল্লাহ সা: তাকে জিজ্ঞেস করলেন : আব্দুল্লাহ ইবনে কায়েস, কি হজ্জের উদ্দেশ্যে এসেছ? তিনি জবাব দিলেন: হা ইয়া রাসুলুল্লাহ! রাসূল সা: প্রশ্ন করলেন: তোমার নিয়ত কি ছিল? তিনি বলেন: আমি বলেছিলাম রাসূলুল্লাহর সা: যে নিয়াত আমারও সেই নিয়ত। রাসূল সা: আবার প্রশ্ন করলেন কুরবানীর পশু সংগে এনেছ কি? তিনি বললেন না:। রাসূল সা: নির্দেশ দিলেন তাওয়াফ্ ও সায়ী করবার পর ইহরাম ভেঙ্গে ফেল।(সহীহুল বুখারী) উল্লেখ্য যে. রাসূল (সা) হজ্জে কিরান আদায় করেছিলেন। আর হজ্জে কিরানের জন্য কুরবানীর পশূ সংগে নিয়ে আসা জরুরী। হজ্জ শেষে আবু মুসা ইয়ামনে ফিরে আসেন। এদিকে আসওয়াদ আনাসী নামক এক ভন্ড নবী নবুওয়াত দাবী করে, বিদ্রোহ ঘোষনা করে বসে। এমনকি হযরত মুয়াজ বিন জাবাল আবু মুসার রাজধানী মারেব চলে আসতে বাধ্য হন। এখানেও তারা বেশী দিন থাকতে পারলেনা। অবশেষে তারা হাদরামাউতে আশ্রয় নেন। যদিও ইবনে মাকতুহ মুরাদী আসওয়াদ আনাসীকে হত্যা করেন, তবুও রাসুলুল্লাহ সা: এর ইনতিকালে আবার বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অত:পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা: মদীনা থেকে বাহিনী পাঠিয়ে এই বিদ্রোহ নিমূর্ল করেন। ইয়ামনের দুই ওয়ালী নিজেদের স্থানে আপন আপন দায়িত্বে ফিরে যান। হযরত আবু মুসা হাদরামাউত থেকে নিজ কর্মস্থল হাদরামাউতে ফিরে আসেন। এবং দ্বিতীয় খলিফার খিলাফত কালের প্রথম পযার্য় অত্যন্ত সফলভাবে দায়িত্ব পালন করতে খাকেন। হযরত উমারের রা: খিলাফাতকালে বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা শুরু হলে আবু মুসা রা: জিহাদে শরীক হওয়াল প্রবল আকাঙ্খায় ওয়ালীর দায়িত্ব ত্যাগ করে হযরত সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসের বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। হিজরী ১৭ সনে সেনাপতি সাদের নির্দেশে তিনি নাসিবীন জয় করেন। এবছরই বসরার ওয়াশী মুগীরা ইবন শুবাকে রা: অপসারণ করে তার স্থলে আবু মুসা রা: কে নিয়োগ করা হয়। খুযিস্তান হচ্ছে বসরার সীমান্ত সংগলগ্ন এলাকা। ঐ এলাকাটি তখনো ইরানীদের দখলে ছিল। হিজরী ১৬ সনে খুযিস্তান দখলের উদ্দেশ্যে হযরত মুগীরা রা: আহওয়াযে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। আহওয়াযের সর্দার অল্প কিছু অর্থ বার্ষিক করদানের বিনিময়ে মুগীরার সাথে সন্ধি করেন। মুগীরা ফিরে যান। হিজরী ১৭ সনে মুগীরার স্থলে আবু মুসা দায়িত্ব গ্রহন করলে আহওয়াজবাসী কর প্রদান বন্ধ করে দিয়ে বিদ্রোহ করে। বাধ্য হয়ে আবু মুসা সৈন্য পাঠিয়ে আহওয়াজ দখল করেন এবং মানাযির পযর্ন্ত অভিযান অব্যহত রাখেন। বিশিষ্ট সেনা অফিসার হযরত মুহাজির ইবন যিয়াদ রা: এই মানাযির অভিযানের এক পযার্য়ে শাহাদাত বরণ করেন। শত্রু বাহিনী তার দেহ থেকে মস্তিষ্ক বিচ্ছিন্ন করে কিল্লার গম্বুজে ঝুলিয়ে রাখে। আবু মুসা হযরত মুহাজিরের ভাই হযরত রাবীকে মানাযির দখলের দায়িত্ব দেন। রাবী মানাযির দখলে সফল হন। এদিকে আবু মুনা সোস অবরোধ করেন। শহরবাসী কিল্লায় আশ্রয় নেয়। অবশেষে তাদের নেতা এই শর্তে আবু মুসার সাথে সমঝোতায় পৌছেন যে, তার খান্দানের একশত ব্যক্তিকে জীবিত রাখা হবে। নেতা এক এক করে একশ ব্যক্তিকে হাজির করলো এবং আবু মুসা শর্ত অনুযায়ী তাদের মুক্তি দিলেন। দুভাগ্যক্রমে নেতা নিজের নামটি পেশ করতে ভুলে গেল এবং সন্ধির শর্তানুযায়ী তাকে হত্যা করা হলো। সোস অবরোধের পর আবু মুসা ‘রামহরমুয’ অবরোধ করেন এবং বার্ষিক আট লাখ টাকা দিরহাম কর আদায়ের শর্তে তাদের সাথে সন্ধি হয়। চারদিক থেকে তাড়া খেয়ে শাহানশাহে ইরানের সেনাপতি হরমুযান শোশতার এর মজবুত কেল্লায় আশ্রয় নিয়েছে। আবু মুসা শহরটি অবরোধ করে বসে আছেন। শহরটি পতনের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে। একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে এক ব্যক্তি গোপনে শহর খেকে বেরিয়ে আবু মুসার ছাউনীতে চলে এলো। সে প্রস্তাব দেয়, যদি তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হয় তাহলে সে শহরের পতন ঘটিয়ে দেবে। লোকটির শর্ত মনজুর হলো। সে আশরাস নামক এক আরবকে সংগে নিল।আশরাস চাদর দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে চাকরের মত লোকটির পিছে পিছে চলল। তারা নদী ও গোপন সুড়ংগ পথে শহরে প্রবেশ করে এবং নালা অলি গলি পেরিয়ে হরমুযানের খাস মহলে গিয়ে হাজির হয়। এভাবে আশরাস গোপনে শহরের সব অবস্থা পযর্বেক্ষন করে গোপনে আবার আবু মুসার কাছে ফিরে আসে এবং বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করে। অত:পর আবু মুসার নির্দেশে আশরাস দু’শো জানবাজ সিপাহী সংগে করে হঠাত্ আক্রমন করে দ্বার রক্ষীদের হত্যা করে দরযা খুলে দেয়। এদিকে আবু মুসা ও তার সকল সৈন্যসহ দরজার মুখেই্উপস্থিত ছিলেন। দরযা খোলার সাথে সাথে সকল সৈনিক একযোগে নগরের অভ্যন্তরে প্রবেশ কর্ শহরে হৈ চৈ পড়ে যায়। হরমুযান দৌড়ে কিল্লায় আশ্রয় নেয়। মুসলিম বাহিনী কিল্লার পাশে পৌছলে হরমুযান কিল্লার গম্বুজে উঠে ঘোষনা করে যে, যদি আত্নসমর্পনে রাজী। তার শর্ত মঞ্জুর করা হয় এবং তাকে হযরতের সাথে দারুল খিলাফাত মদীনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। শোশতার বিজয়ের পর আবু মুসার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জুনদিসাবুর অবরোধ করে। এ অবরোধ বেশ কিছুদিন ধরে চলছিল। একদিন শহরবাসী হঠাত শহরের ফটক উন্মুক্ত করে দেয়। তারা অত্যন্ত শান্তভাবে আপন আপন কাজে ব্যস্ত। মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে তাদের এমন নি:শঙ্কভাব দেখে অবাক হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করলে তারা জানালো, কেন আমাদের তো জিযিয়ার শর্তে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। খোজ খবর নিয়ে জানা গেল, মুসলিম বাহিনীর এক দাস সকলের অগোচরে একাই এ নিরাপত্তার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সেনাপতি আবু মুনা দাসের এ চুক্তি মানতে অস্বীকার করলেন। শহরবাসী বলল, কে দাস, কে স্বাধীন তা আমরা জানিনে। শেষে এ বিষয়টি মদীনার খলিফার দরবারে উত্থাপিত হলো। খলীফা জানালো, মুসলমানদের দাসও মুসলমান। যাদেরকে সে আমান বা নিরাপত্তা দিয়েছে, সকল মুসলমানই যেন তাদের আমান দিয়েছে। এভাবে আবু মুসার নেতৃত্বে গোটা খুযিস্তানে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। এবং সেই সাথে তার অবস্থান স্থল বসরা শত্রুর হুমকি থেকে মুক্ত হয়ে যায়। খুযিস্তানের পতনের পর হিজরী ২১ সনে ইরানীরা নিহাওয়ান্দে এক চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। খলীফা ইমার রা: নুমান ইবনে মুকরিনকে বিরাট এক বাহিনীসহ নিহাওয়ান্দে পাঠান এবং আবু মুসাকে তাকে সাহায্য করার নির্দেশ দেন। খলীফার নির্দেশ পেয়ে বিরাট এক বাহিনীসহ তিনি নিহাওয়ান্দে পৌছেন। এ যুদ্ধেও ইরানী বাহিনী মারাত্নকভাবে পরাজয় বরণ করে। খুযিস্তান জয়ের পর বিজিত এলাকা বসরার সাথে একীভূত করার জন্য আবু মুসা আবেদন জানালেন খলীফার কাছে। এদিকে কুফাবাসীরাও কুফার সাথে একীভূত করার দাবী জানালো তাদের ওয়ালী আম্মার ইবনে ইয়াসিরের (রা;) নিকট। খলীফ আবু মুসার দাবী সমর্ধন করে বিজিত এলাকা বসরার সাথে একীভূত করলেন। এ দিকে কুফাবাসী তাদের দাবী পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় আম্মারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠ্। অবশেষে খলীফা কুফাবাসীদের দাবী অনুযায়ী আম্মারকে সরিয়ে হিজরী ২২ সনে আবু মুসাকে কুফার ওয়ালী নিযুক্ত করেন। কিন্তু এক বছর পর হিজরী ২৩ সনে আবার বসরায় বদলী হন। এ বছরই (হি: ২৩) দাব্বা নামক এক ব্যক্তি খলীফার কাছে আবু মুসার বিরুদ্ধে নিম্নের অভিযোগগুলি উত্থাপন করে:

    ১. আবু মুসা যুদ্ধবন্দীদের থেতে ষাটজন সর্দার পুত্রকে নিজেই নিয়ে নিয়েছেন।

    ২. তিনি শাসনর্কাযের যাবতীয় দায়িত্ব যিয়াদ ইবন সুমাইয়ার ওপর ন্যস্ত করেছেন এবং প্রকৃতপক্ষে  যিয়াদ এখন সকল দন্ডমুন্ডের মালিক।

    ৩. তিনি কবি হুতাইয়্যাকে এক হাজার দিরহাম ইনয়াম দিয়েছেন।

    ৪. আকলিয়্যা নাম্মী তার এক দাসীকে দু’বেলা উত্তম খাবার দেয়া হয়; অথচ তেমন খাবার সাধারণ মানুষ খেতে পায়না।

    হজরত উমার নিজহাতে অভিযোগগুলি লিখলেন। আবু মুসাকে মদীনায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। অভিযোগগুলির ত্য মিথ্যা নিরুপনের জন্য যথারীতি অনুসন্ধান চালালেন। প্রথম অভিযোগটি মিথ্যা প্রমানিত হল। দ্বিতীয় অভিযোগের জবাব দিলেন যে, যিয়াদ একজন তুখোড় রাজনীতিক ও দক্ষ প্রশাসক। তাকে আমি উপদেষ্টা নিয়োগ করেছি। খলীফা যিয়াদকে ডেকে পরীক্ষা নিলেন এবং তাকে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে দেখতে পেলেন। যিয়াদকে তার পদে বহাল রাখার নির্দেশ দিলেন। তৃতীয় অভিযোগের জবাবে বললেন, হুতাইয়্যা যাতে আমার হিজু(নিন্দা) না করে এজন্য আমি তাকে আমার নিজ অর্থ থেকে উপঢৌকন দিয়েছি। কিন্তু চতুর্থ অভিযোগের কোন জবাব তিনি দিতে পারলেন না। হযরত উমার রা: একটু বকাবকি করে তাকে ছেড়ে দিলেন।(তাবারী)

    আবু মুসা এ বছরই (হি: ২৩) ইস্পাহানে অভিযান চালিয়ে অঞ্চলটি ইসলামী খিলাফাতের অন্তর্ভূ্ক্ত করেন। ইস্পাহান বিজয় শেষ করে ফিরে এলে সেই বছরই তাকে বসরা থেকে কুফায় বদলী করা হয়। বসরাবাসীদের ভীষন পানি-কষ্ট চিল। বিষয়টি খলীফার দরবারে পৌছানো হলো। দিজলা নদী থেকে খাল কেটে বসরা শহর পযর্ন্ত নেওয়ার জন্য খলীফা নির্দেশ দিলেন। আবু মুসার নেতৃত্বে দশ মাইল দীর্ঘ একটি খাল খনন করে বসরাবাসীদের পানি-কষ্ট দূর করা হয়। ইতিহাসে এ খাল নহরে আবি মুসা নামে প্রসিদ্ধ। হিজরী ২৩ সনে জিলহজ্জ মাসে দ্বিতীয় মাসে খলীফা উমার শাহাদাত বরণ করেন। হযরত উসমান(রা:) খিলাফাতের দায়িত্বভার গ্রহনের পর প্রশাসনের কাঠামোতে অনেক রদবদল করেন। কিন্তু হিজরী ২৯ সন পযর্ন্ত আবু মুসা বসরার ওয়ালী পদে বহাল থাকেন। হিজরী ২৯ সনে কুর্দীরা বিদ্রোহ ঘোষনা করে। আবু মুসা মসজিদে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ সর্ম্পকে এক জ্বালাময়ী ভাষন দান করেন। ভাষনে আল্লাহর রাস্তায় পায়ে হেটে চলার ফযীলত বর্ণনা করেন। তার প্রতিক্রিয়া স্বরুপ কিছু মুজাহিদ তাদের নিকট ঘোড়া থাকা সত্ত্বেও পায়ে হেটে চলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। আবু মুসার সমালোচক তাদেরকে বলল: আমাদের এত তাড়াতাড়ি করা উচিত হবে না। দেখা যাক আমাদের আমীর আবু মুসা কিভাবে চলেন। আবু মুসাও ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে বের হয়ে এলেন। মুজাহিদরা তার ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রতিবাদ করে বসল। আসলে আবু মুসার ভাষনের অর্থ এমন ছিলনা যে, যাদের ঘোড়া আছে তারা তাদের কাঝে তা ব্যবহার করবে না। বস্তুত: তখন সময়টি ছিল ফিতনা ও ষড়যন্ত্রের। হাঙ্গামাবাজরা এই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে মদীনায় চলে গেল এবং তার অপসারণ দাবী করলো। খলীফা উসমান তাকে সরিয়ে নিলেন। হিজরী ৩৪ সনে কুফাবাসীদের সাঈদ ইবনুল আসের স্থলে খলীফা উসমা, আবু মুসাকে আবার কুফার ওয়ালী নিযুক্ত করেন। খিলাফতের সবর্ত্র তখন চলছে দারুণ চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। রাসূলুল্লাহ সা: আবু মুসার স্মরণে ছিল। তাই তিনি তার বক্তৃতা ভাষনে সবর্দা কুফাবাসীদের এ ভবিষদ্বানীর কথা শোনাতেন। তাদেরকে সব ফিতনা থেকে দুরে থাকার উপদেশ দিতেন। হিজরী ৩৫ সনে হযরত উসমানের (রা:) শাহাদাত ও হযরত আলীর খলীফা হওয়ার পর সেই ফিতনা আত্নপ্রকাশ করে। তৃতীয় খলিফা হযরত উসমানের রা: রক্তের কিসাসের দাবীতে সোচ্চার হয়ে হযরত আয়িশা, তালহা ও যুবাইর রা: মক্কা থেকে বসরার দিকে রওয়ানা হলেন। এদিকে তাদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে খলীফা হযরত আলী রা: উপস্থিত হলেন যি’কার নামক স্থানে। অন্যদিকে আম্মার ইবনে ইয়াসিরের সাথে হযরত হাসানকে পাঠালেন কুফায়। হযরত হাসান যখন কুফা পৌছলেন, আবু মুসা আশয়ারী তখন কুফা মসজিদে এক বিশাল মসজিদে এক বিশাল জনসমাবেশে ভাষন দিচ্ছিলেন। ভাষনে তিনি জনগনকে এ্ই ফিতনা থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিচ্ছিলেন। হযরত হাসান সেথানে উপস্থিত হলেন এবং আবু মুসার রা: সাথে তার কিছু বাক বিতন্ডা হয়। আবু মুসা নীরবে মসজিদের মিম্বর থেতে নেমে আসেন এবং কোন রকম প্রতিবাদ না করে সোজা সিরিয়ার এক অজ্ঞাত গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। এভাবে তিনি গৃহযুদ্ধে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন। সিফফিনে হযরত আলী(রা:) ও হযরত মুয়াবিয়া রা: যুদ্ধ বিরতি ঘোষনা করলেন এই শর্তে যে, উভয় পক্ষ একজন করে দু’জন নিরপেক্ষ বিচারকের ওপর বিষয়টি নিষ্পত্তির ভার দেওয়া হবে। তাদের মিলিত সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষ মেনে নেবে। আলীর রা: পক্ষ আবু মুসাকে এবং মুয়াবিয়ার রা: পক্ষ আমর ইবনুল আসকে রা: বিচারক নিযুক্ত করেন। উভয় পক্ষ ‘‌দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে একত্র হলেন। বিষয়টি নিয়ে দু’জনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হলো। অবশেষে তারা এ্‌ই সিদ্ধান্তে পৌছলেন যে, উম্মাতের স্বার্থে আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কে খিলাফতের পদ থেকে অপসারণ করতে হবে এবং মজলিসে শুরা তৃতীয় কাউকে খলীফা নিবার্চন করবে। তারা উভয়ে জনগনের সামনে হাজির হলেন তাদের সিদ্ধান্ত ঘোষনার জন্য। আমর ইবনুল আসের অনুরোধে আবু মুসা প্রথমে উঠে সিদ্ধান্ত ঘোষনা করলেন; আবু মুসা তার পূর্ব সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে হযরত মুয়াবিয়াকে খলীফা ঘোষনা করে বসলেন। আবু মুসা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।

     আসলে আবু মুসা ছিলেন অত্যন্ত সরল ও সাদাসিধে প্রকৃতির। ধোকা ও কূটনীতি কি জিনিস তিনি জানতেন না। এ কারণে তাকে বিচারক নিযুক্ত করার ব্যাপারে হযরত আলী রা: দ্বিমত পোষন করেছিলেন। কিন্তু তার পক্ষের লোকদের চাপাচাপিতে তিনিও মেনে নেন। আমর ইবনুল আসের কুটনৈতিক জালে পরাজিত হয়ে আবু মুসা অনুশোচনায় এত দগ্ধিভূত হলেন যে, সেই মুহুর্তে তিনি মক্কার পথ ধরলেন। জীবনে আর কোন ব্যাপারে তিনি অংশগ্রহন করেননি। তার মৃত্যু সন ও স্থান সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। কারো মতে মক্কায় আবার কারো মতে তিনি কুফায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে তিনি মক্কায় ইনতিকাল করেন। অনুরূপভাবে তার মৃত্যুসন হি: ৪২, ৪৪ ও ৫২ সন বলে একাধিক মত রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ মতে হি: ৪৪ তার মৃত্যুসন। (তাজকিরাতুল হুফফাজ)

     হযরত আবু মুসা রা: জীবনের শেষ পর্যন্ত রাসুলুল্লাহর সা: আদেশ নিষেধ পালনে অত্যন্ত যত্ববার ছিলেন। এমনকি যখন তার অবস্থা সঙ্কটজনক হয়ে পড়ে এবং তিনি চেতনা হারিয়ে ফেলেন, তখন মহিলানা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। সেই মারাত্নক মুহুর্তেও ক্ষনিকের জন্য চেতনা ফিরে পেয়ে বলে ওঠেন: যে জিনিস থেকে রাসুল সা: এমন বিলাপকারিনীদের থেকে দায়িত্ব মুক্তির কথা বলেছেন। প্রথম জীবনে দারিদ্র ছিল তার নিত্য সঙ্গী। কিন্তু পরবর্তী জীবন সচ্ছলতায় কেটেছে। হযরত উমার রা: তার ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

     রাসূলুল্লাহর সা: বিশেষ নৈকট্য লাভের সৌভাগ্যে যাদের হয়েছিল হযরত আবু মুসা রা: সেই সব বিশিষ্ট সাহাবীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। রাসূলুল্লাহর সা: জীবদ্দশায় যে ছয় ব্যাক্তি ফাতওয়া দানের অনুমতি পেয়েছিলেন, তিনি তাদের অন্যতম। (তাজকিরাতুল হুফফাজ) আসওয়াদ নামক একজন তাবেয়ী বলেন আমি কুফায় হযরত আলী রা: ও হযরত আবু মুসা রা: অপেক্ষা জ্ঞানী ব্যাক্তি আর দেখিনি। হযরত আলী রা: বলতেন: মাথা খেকে পা পর্যন্ত আবু মুসা ইলমের রঙে রঞ্জিত। তিনি সব সময় জ্ঞানী-ব্যক্তিবর্গের সাহচর্যে থাকতেন এবং তিনি তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন। এ আলোচনা কখনও কখনও বাহাস-মুনাজিরা পর্যন্ত পৌছে যেত। বিশেষত: আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও মুয়াজ বিন জাবালের রা: সাথে তার বিশেষ তর্ক-বাহাস হতো। একবার তায়াম্মুমের মাসআলার ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা: ও আবু মুসার রা: মধ্যে বিতর্ক হয়। ইমাম বুখারী তায়াম্মুম অধ্যায়ে এ বিতর্ক বর্ণনা করেছেন। তিনি যে শুধু জ্ঞান পিপাসু ছিলেন তাইনা, জ্ঞানের প্রচার ও প্রসারে জন্য আপ্রান চেষ্টা করতেন। তিনি মনে করতেন, যতটুকু তিনি জানবেন অন্যকে তা জানানো ফরজ। একবার এক ভাষণে বলেনধ যে ব্যক্তিকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন, তার উচিত অন্য ভাইদের তা জানানো। তবে যে বিষয়ে তার কোন জ্ঞান নেই সে সম্পর্কে একটি শব্দও মুখ থেকে বের করবে না। তার দারসের পদ্ধতিও ছিল বিভিন্ন ধরণের। যথারীতি হালকায়ে দারস ছাড়াও কখনও কখনও লোকজন জড়ো করে তাদের সামনে ভাষন দিতেন। পথে ঘাটে কোথাও এক স্থানে কিছু লোকের দেখা পেলে তাদের কাছে রাসূলুল্লাহর সাধ দু”একটি বাণী পৌছে দিতেন। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি খুব কোমল আচরণ করতেন। কেউ অজ্ঞতা বশত: বোকার মত প্রশ্ন করে বসতো, তিনি উত্তেজিত হতেন না। অত্যন্ত নরম সুরে তাকে বুঝিয়ে দিতেন।

     পবিত্র কুরআনের সাথে আবু মুসার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। রাত-দিনের প্রায় প্রতিচি মূহুর্ত কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআন শিক্ষাদানের মাধ্যমে ব্যয় করতেন। ইয়ামনের ওয়ালী থাকাকালে একবার মুয়াজ বিন জাবাল জিজ্ঞেস করেছিলেন. আপনি কিভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন? বললেন: রাত্র দিনে যখনই সুযোগ পাই একটু করে তিলাওয়াত করে নিই। তিনি সুমধুর কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। রাসূল সা: বলতেন: আবু মুসা দাউদের আ: লাহানের কিছু অংশ লাভ করেছে।

     তার রাসূল সা: খুব্ই পছন্দ ছিল। তার কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পেলেই রাসূল সা: দাড়িয়ে যেতেন। একবার হযরত আশিয়াকে রা: সংগে করে রাসূল সা: কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আবু মুসার কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পেয়ে সেখানেই দাড়িয়ে যান। কিছুক্ষন শোনার পর আবার সামনে অগ্রসর হন। একবার আবু মুসা জোর আওয়াজে ইশার নামাজে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সুমধুর আওয়াজ শূনে উম্মুহাতুল মুমিনীন হুজরার পর্দার কাছে এসে কান লাগিয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে থাকেন। সকালে যখন এ কথা জানতে পারলেন বললেন: আমি যদি এ কথা জানতে পারতাম তাহলে আরো চিত্তাকর্ষক আওয়াজে তিলাওয়াত করে তাদেরকে কুরআনের আশেক বানিয়ে দিতাম। তার এই অসাধারণ খোশ লাহানের কারণেই রাসূল সা: মুয়াজ বিন জাবালের সাথে তাকেও নওমুসলিমদের কুরআনের তালীম দানের জন্য ইয়ামনে পাঠান। পবিত্র কুরআনের সাথে সাথে হাদীছের খিদমতেও তার অবদান কোন অংশ কম ছিলনা। কুফায় তার স্বতন্ত্র হালকায়ে দারসে হাদীছ ছিল। এই দরসের মাধ্যমে বড় বড় মুহাদ্দিসীন সৃষ্টি হয়েছে। তার বর্ণিত হাদীছের সংখ্যা ৩৬০। তন্মধ্যে ৫০ টি মুত্তাফাক আলাইহি, ৪৫টি বুখারী এবং ২৫টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। কুরআন ও হাদীছে তার প্রভূত দখল থাকা সত্ত্বেও নিজের ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তেমনিভঅবে অন্যের জ্ঞানের কদরও করতেন। এববার তিনি মীরাস সংক্রান্ত একটি মাসয়ালায় ফাতওয়া দিলেন। ফাত্‌ওয়া জিজ্ঞেসকারী আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদের কাছেও বিষয়টি জিজ্ঞেস করে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ অন্যরকম ফতোয়া দিলেন। আবু মুসা নিজের ভুল স্বীকার করে মন্তব্য করেন, আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ জীবিত থাকা পর্যন্ত তোমাদের আমার কাছে আসা উচিত নয়। হযরত আবু মুসার জীবনটি ছিল, রাসূলের পাকের জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সর্বদা তিনি চেষ্টা করতেন রাসূলুল্লাহর সা: প্রতিটি কাজ, চলন, বলন, ইত্যাদি হুবহু অনুকরণ ও অনুসরণ করতে। একবার তিনি মক্কা থেকে মদীনা যাচ্ছিলেন। পথে ইশার নামাজে দুউ রাকায়াত আদায় করলেন। তারপর আবার দাড়িয়ে সূরা আন নিসার ১০০টি আয়াত পাঠের মাধ্যমে এক রাকায়াত আদায় করলেন। লোকেরা প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, আমি সব সময় চেষ্টা করে. যেখানে যেখানে রাসূল সা: রেখেছেন সেখানে সেখানে কদম রাখার এবং তিনি যে কাজ করেছেন হুবহু তাই করার।

      রামাদানের রোযা ছাড়াও নফল রোজা এজন্য রাখতেন যে, রাসূল সা: তা রেখেছেন। আশুরার রোযা তিনি বরাবর রাখতেন এবং মানুষকে তা রাখার জন্য বলতেন। সুন্নাত ছাড়া মু্স্তাহাবেরও তিনি ভীষন পাবন্দ ছিলেন। কুরবানীর পশু নিজ হাতে জবেহ করা মুস্তাহাব। শুধু এ কারণে তিনি তার নিজ কন্যাদেরকেও হুকুম দিতেন নিজ হাতে পশু জবেহ করার জন্য।

     রাসূলুল্লাহর সা: নির্দেশ ছিল কোন ব্যাক্তি যখন কারো বাড়িতে যাবে তখন ভিতরে প্রবেশ করার আগে যেন অনুমতি নেয়। যদি তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরেও অনুমতি না পাওয়া যায় তাহলে সে যেন ফিরে আসে। একবার আবু মুসা গেলেন খলীফা উমারের সাথে দেখা করতে। এক এক করে তিনবার তিনি অনুমতি চাইলেন, কিন্তু খলীফা অন্য কোন কাজে ব্যস্ত থাকায় সাড়া দিতে পারলেন না। আবু মুসা ফিরে আসলেন। অন্য এক সময় খলীফা জিজ্ঞেস করলেন আবু মুসা ফিরে গেলে কেন? বললেন, আমি তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরেও সাড়া পাইনি তাই ফিরে গেছি। এই কথার পর তিনি এ সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহর সা: হাদীছটি বর্ণনা করে শুনালেন। উমার রা: বললেন, হাদীছটি তুমি ছাড়া অন্যকেউ শুনেছে এমন একজন সাক্ষী নিয়ে আসো। আবু মুসা ভয়ে কাপতে কাপেতে আনসারীদের এক মজলিসে উপস্থিত হলেন। সেখানে উপস্থিত উবাই বিন কাবও হাদীছটি শুনেছিলেন। তিনি উমারের রা: কাছে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন। শাবী বলেন: ছয়জনের কাছ থেকে ইলম গ্রহন করা হয়: উমার, আলী, উবাই,ইবনে মাসউদ, যায়িদ ও আবু মুসা।

    খলীফ উমার রা: তাকে বসরার ওয়ালী নিযুক্ত করে পাঠালেন। সবরায় পৌছে তিনি সমবেত জনতার সামনে ভাষন দিতে গিয়ে বলেন আমীরুল মুমিনীন আমাকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। আমি আপনাদেরকে আপনাদের রবের কিতাব ও তার নবীর সুন্নাত শিক্ষা দেব এবং আপনাদের পখ ঘাট সমূহ আপনাদের কল্যানের জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করবো। ভাষন শুনে জনতাতো অবাক। জনগনকে সংস্কৃতিবান করে তোলা, তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত করাতো শাসকের দায়িত্বের আওতায় পড়তে পারে। কিন্তু তাদের পথঘাটসমূহ পরিষ্কার করার দায়িত্ব তিনি কেমন করে পালন করতে পারেন? ব্যাপারটি তাদের কাছে ভীষন আশ্চর্য্যের মনে হলো। তাই হযরত হাসান রা: তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন : তার চেয়ে উত্তম আরোহী বসরাবাসীদের জন্য আর কেউ আসেনি। (রিজালুন হালার রাসূল) রাসূল সা: তার সম্পর্কে বলতেন: আবু মুসা অশ্বারোহীদের নেতা।

     হযরত আবু মুসার সামনে উম্মাতের কল্যান চিন্তাটাই ছিল সবচেয়ে বড়। এজন্য সারাজীবন ব্যক্তিগত সব লাভ ও সুযোগের প্রতি পদাঘাত করেছেন। আলী রা: ও মুয়াবিয়ার রা: মধ্যে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন একদিন মুয়াবিয়া আবু মুসাকে বলেছেন. যদি তিনি মুয়াবিয়া সমর্থন করেন, তাহলে তার দু ছেলেকে যথাক্রমে বসরা ও কুফার ওয়ালী নিয়োগ করবেন এবং তার সুযোগ-সুবিধার প্রতিও যত্নবান হবেন। জবাবে আবু মুসা লিখলেন: আপনি উম্মাতে মুহাম্মাদীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে লিখেছেন। যে জিনিস আপনি আমার সামনে পেশ করেছেন, তার আমার প্রয়োজন নেই।

     লজ্জা-শরম ঈমানের অঙ্গ। আবু মুসার মধ্যে এই উপাদানটি পরিপূর্ণরুপে ছিল। রাতে ঘুমানোর সময়ও বিশেষ ধরণের পোশাক পড়ে নিতেন, যাতে সতর উন্মুক্ত না হয়ে যায়। একবার কিছু লোককে তিনি দেখলেন, তারা পানির মধ্যে উলঙ্গ হয়ে গোসল করছে। তিনি বললেন, বার বার মনে জীবিত হওয়া আমার মন:পূত তবুও একাজ আমার পছন্দ নয়।