তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
সালেম মাওলা আবী হুজাইফা (রা)

হযরত রাসূলে কারীম(সা) একদিন সাহাবীদের নির্দেশ দিলেন, “তোমরা কুরআন শেখ চার ব্যক্তির নিকট থেকেঃ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালেম মাওলা আবী হুজাইফা, উবাই ইবনে কা’ব ও মুয়ায ইবনে জাবাল।” কে এই সালেম মাওলা আবী হুজাইফা- যাকে কুরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ(সা) নির্ভরযোগ্য বলে ঘোষণা করেছেন?
তাঁর নাম সালেম, কুনিয়াত আবু আব্দুল্লাহ। পিতার নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে। ইবন মুন্দাহ বলেছেন, ‘উবায়েদ ইবনে রাবী’য়া। আবার কারো কারো মতে, মা’কাল। ইরানী বংশোদ্ভূত। পারস্যের ইসতাখরান তাঁর পূর্বপুরুষের আবাসভূমি। হযরত সুবাইতা বিনতু ইউ’য়ার আল আনসারিয়্যার দাস হিসেবে মদীনায় পৌছেন। হযরত সুবাইতা ছিলেন আবী হুজাইফার(রা) স্ত্রী। সুবাইতা তাকে নিঃশর্ত আযাদ করে দিলে আবু হুজাইফা তাকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি সালেম ইবনে আবু হুজাইফা নামে পরিচিত হন যেমন হয়েছিলেন যায়িদ ইবনে মুহাম্মাদ। কেউ কেউ তাঁকে আবু হুজাইফার দাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এসব কারণে তাঁকে মুহাজিরদের মধ্যে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে হযরত সুবাইতার আযাদকৃত দাস হিসেবে তাঁকে আনসারীও বলা হয়। আবার মূলে পারস্যের সন্তান হওয়ার কারণে কেউ কেউ তাঁকে আজমী বা অনারব বলেও উল্লেখ করেছেন।
হযরত সালেম মক্কায় হযরত আবু হুজাইফার সাথে বসবাস করতেন। এই আবু হুজাইফা ছিলেন মক্কার কুরাইশ সর্দার ইসলামের চির দুশমন উতবা’র ছেলে। ইসলামী দাওয়াতের সূচনালগ্নেই যারা লাব্বাইক বলে সাড়া দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে আবু হুজাইফা ও তাঁর পালিত পুত্র সালেম ও ছিলেন। তাঁরা পিতা-পুত্র দুজনে নীরবে ও বিনীতভাবে তাঁদের রবের ইবাদত করে চললেন এবং কুরাইশদের নির্মম অত্যাচারের মুখে সীমাহীন ধৈর্য্য অবলম্বন করলেন। একদিন পালিতপূত্র গ্রহণের প্রথা বাতিল করে কুরআনের আয়াত নাযিল হলো-‘উদয়ুহুম লি আবায়িহিম’-তাদেরকে তাদের পিতার নামে সম্পৃক্ত করে ডাক। প্রত্যেক পালিত পুত্র আপন আপন জন্মদাতা পিতার নামে পরিচিতি গ্রহণ করলো। যেমন যায়িদ ইবনে মুহাম্মদ হলো যায়িদ ইবনে হারিসা। কিন্তু সালেম এর পিতৃপরিচয় ছিল অজ্ঞাত। তাই তিনি পরিচিত হলেন ‘সালেম মাওলা আবী হুজাইফা’-আবু হুজাইফার বন্ধু, সাথী, ভাই বা আযাদকৃত দাস সালেম হিসেবে।
ইসলাম পালিত পুত্রের প্রথা বাতিল করে। সম্ভবত ইসলাম একথা বলতে চায় যে, রক্ত, আত্মীয়তা বা অন্য কোনো সম্পর্ককে ইসলামী ভ্রাতৃত্বের সম্পর্কের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেওয়া তোমাদের উচিত নয়। বিশ্বাস বা আকীদার ভিত্তিতেই তোমাদের সম্পর্ক নির্মিত হওয়া উচিত। প্রথম পর্যায়ের মুসলমানরা এ ভাবটি খুব ভাল করে বুঝেছিলেন। তাই, তাঁদের কাছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পর তাঁদের দ্বীনি ভাই অপেক্ষা অধিক প্রিয় আর কিছু ছিল না। এটা আমরা আনসার ও মুহাজিরদের মধ্যে দেখেছি। তেমনিভাবে দেখে থাকি সম্ভ্রান্ত কুরাইশ আবু হুজাইফা ও তাঁর পিতৃ পরিচয়হীন অজ্ঞাত অখ্যাত দাস সালেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
হযরত সালেমের ঈমান ছিল সিদ্দীকিনদের ঈমানের মত এবং আল্লাহর পথে তিনি চলেছিলেন মুত্তাকীনদের মত। সমাজে তাঁর স্থান কি এবং তাঁর জন্ম-পরিচয়ই বা কি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করেন নি। ইসলাম যে নতুন সমাজ বিনির্মাণ করেছিল, সেই সমাজ তাঁর তাকওয়া ও ইখলাসের জন্য তাঁকে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছিল। এই মহান পূণ্যময় নতুন সমাজেই আবু হুজাইফা-গতকাল যে তাঁর দাস ছিল তাকে ভাই বা বন্ধুরূপে গ্রহণ করে গৌরব বোধ করেছিলেন। এমনকি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ফাতিমা বিনতুল ওয়ালিদকে তাঁর সাথে বিয়ে দিয়ে নিজ পরিবারকে সম্মান ও গৌরবের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যে সমাজ ব্যবস্থা সকল প্রকার যুলুম অত্যাচার দূর করে সব রকম মিথ্যা আভিজাত্যকে বাতিল ঘোষণা করেছিল, সেখানে সালেমের ঈমান, সততা ও দৃঢ়তা তাঁকে প্রথম সারির ব্যক্তিরূপে প্রতিষ্ঠিত করে।
হযরত রাসূলে কারীমের হিজরতের পূর্বেই তিনি তাঁর দ্বীনি বন্ধু আবু হুজাইফার সাথে মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় তিনি হজরত আব্বাদ ইবনে বিশরের অতিথি হন। মক্কায় রাসূলুল্লাহ(সা) আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহর সাথে তাঁর দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব কায়েম করে দেন। কিন্তু মদীনায় তাঁর ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় হযরত মুয়াজ ইবনু মায়েজ আল আনসারীর সাথে।
সাহাবীদের যুগে কিরআত শিল্পে যাদেরকে ইমাম গণ্য করা হতো, সালেম তাঁদের অন্যতম। তিনি এমন সুমধুর কন্ঠের অধিকারী ছিলেন যে, কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলে শ্রোতারা তা মুগ্ধ হয়ে শুনত। একদিন উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশার রাসূলুল্লাহ(সা) এর নিকট হাজির হতে দেরি হল। রাসূলুল্লাহ(সা) জিজ্ঞেস করলেন- তোমার দেরি হল কেন? আয়িশা বললেন- একজন কারী সুমধুর কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করছিল, তাই শুনছিলাম। তিনি তাঁর তিলাওয়াতের মাধূর্য্য বর্ণনা করলেন। তাঁর বর্ণনা শুনে রাসূলুল্লাহ(সা) চাদরটি টেনে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখলেন, সেই ক্বারী আর কেউ নয়, তিনি সালেম মাওলা আবু হুজাইফা। রাসূলুল্লাহ(সা)তাঁর তিলাওয়াত শুনে মন্তব্য করলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাজী জা’য়ালা ফী উম্মাতী মিছলাক”-আমার উম্মাতের মধ্যে যিনি তোমার মত লোককে সৃষ্টি করেছেন সেই আল্লাহর জন্য সকল প্রশংসা। (উসুদুল গাবা-২/২৪৬)।
সুমধুর কন্ঠস্বর এবং বেশি কুরআন হিফজ থাকার কারণে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে সালেমকে অত্যধিক সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখা হতো। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমার(রা) বলেন, “রাসূলুল্লাহ(সা) মদীনায় হিজরতের পূর্বে যারা মদীনায় হিজরত করেছিলেন, মসজিদে কুবায় সালেম তাদের নামাজে ইমামতি করতেন।” (বুখারী) হযরত আবু বাকর ও হযরত উমারের(রা) মত বিশিষ্ট সাহাবীরাও তাঁর পেছনে নামায আদায় করতেন।
বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধেই তিনি রাসূলে কারীমের(সা) সাথে ছিলেন।(উসুদুল গাবা-২/২৪৬) বদর যুদ্ধে তিনি কাফের উমাইর ইবন আবী উমাইরকে নিজ হাতে হত্যা করেন। (ইবন হিশাম-১/৭০৮)।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ(সা) মক্কার চারিদিকের গ্রাম ও গোত্রগুলিতে কতকগুলি দাওয়াতী প্রতিনিধি দল পাঠালেন। তিনি তাদেরকে বলে দিলেন, “যোদ্ধা হিসেবে নয়, বরং দায়ী বা আহবানকারী হিসেবে তোমাদের পাঠানো হচ্ছে।” এমন একটি দলের নেতা ছিলেন হযরত খালিদ ইবনু ওয়ালীদ। খালীদ তাঁর গন্তব্যস্থানে পৌছার পর এমন এক ঘটনা ঘটলো যে, তিনি তরবারী চালালেন এবং তাতে প্রতিপক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলো। এ খবর রাসূলুল্লাহ(সা) এর কানে পৌছলে তিনি দীর্ঘক্ষণ আল্লাহর কাছে এই বলে ওজর পেশ করলেন-“হে আল্লাহ, খালিদ যা করেছে, তার দায় দায়িত্ব থেকে আমি তোমার কাছে অব্যাহতি চাই।” এ অভিযানে হযরত সালেম হযরত খালিদের সহগামী ছিলেন। খালিদের এ কাজ সালেম নীরবে মেনে নেন নি। তিনি খালিদের এ কাজের তীব্র প্রতিবাদ করেন। তাঁর প্রতিবাদের মুখে মহাবীর খালিদ কখনো লা-জওয়াব হয়ে যান, আবার কখনও আত্মপক্ষ সমর্থন করে যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। আবার কখনও সালেম এর সাথে প্রচন্ড বাক বিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু সালেম স্বীয় মতের উপর অটল থাকেন। খালিদের ভয়ে সেদিন তিনি সত্য বলা হতে চুপ থাকেন নি।
সালেম কদিন আগেও যিনি ছিলেন মক্কার এক দাস, আজ তিনি খালিদের মত মক্কার এক সম্ভ্রান্ত কুরাইশ সিপাহশালারের কোনো পরোয়াই করেন নি। খালিদও কোনোপ্রকার বিরক্তিবোধ করেন নি। কারণ, ইসলাম তাঁদের উভয়কে সমমর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। নেতার প্রতি অহেতুক ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে সালেম সেদিন খালিদ এর ভুল মেনে নেননি। বরং তিনি দায়িত্বের অংশীদার হিসেবে প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন। তিনি আত্মতৃপ্তি বা নামের জন্য এ কাজ করেন নি বরং বারংবার তিনি রাসূলুল্লাহ(সা) এর কাছে শুনেছিলেন, “আদ-দ্বীন আন নাসীহা”- দ্বীনের অপর নাম সতোপদেশ। এ উপদেশই সেদিন তিনি খালিদকে দান করেছিলেন।
হযরত খালিদের এ বাড়াবাড়ির কথা রাসূলুল্লাহ(সা) এর কানে পৌছলে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন- “কেউ কি তার এ কাজের প্রতিবাদ বা নিন্দে করে নি?” রাসূলে পাকের ক্রোধ পরে গেল যখন তিনি শুনলেন, “হ্যাঁ, সালেম প্রতিবাদ করেছিল। তাঁর সাথে ঝগড়া হয়েছিল।”
হযরত রাসূলে কারীম(সা) আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন। হযরত আবু বকরের খিলাফত মুরতাদ বা ধর্মত্যাগীদের ষড়যন্ত্রের সম্মুখীন হলো। তাদের সাথে সংঘটিত হয় ভয়াবহ ইয়ামামার যুদ্ধ। এমন ভয়াবহ যুদ্ধ ইতোপূর্বে ইসলামের ইতিহাসে আর সংঘটিত হয় নি। মুসলিম বাহিনী মদীনা হতে ইয়ামামার উদ্দেশ্যে বের হলো। সালেম এবং তাঁর দ্বীনি ভাই আবু হুজাইফা অন্যদের সাথে বেরিয়ে পড়লেন। যুদ্ধের প্রথম পর্বে মুসলিম বাহিনী কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এতে তাঁরা বুঝতে পারে, যুদ্ধ যুদ্ধই এবং দায়িত্ব দায়িত্বই। হযরত খালিদ ইবনু ওয়ালিদ নতুন করে তাদের সংগঠিত করেন এবং অভূতপূর্ব কায়দায় তিনি বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। প্রথমতঃ যখন মুসলিম বাহিনী পিছু হটে যাচ্ছিল, তখন হযরত সালেম চিৎকার করে উঠলেন, “আফসুস, রাসূলুল্লাহ(সা) এর সময়ে আমাদের অবস্থা তো এমন ছিল না।” তিনি নিজের জন্য একটি গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে অটল হয়ে দাঁড়িয়ে যান।(উসুদুল গাবা-২/২৪৬)।
ইয়ামামার যুদ্ধে প্রথমে হযরত যায়িদ ইবনুল খাত্তাবের হাতে ছিল মুসলিম বাহিনীর পতাকা। তিনি শাহাদাত বরণ করলে পতাকাটি মাটিতে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে সালেম তা তুলে ধরেন। কেউ কেউ তাঁর পতাকা বহনে আপত্তি করে বলে, “আমরা তোমার দিক থেকে শত্রুবাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা করছি।” সালেম বলেন, “তাহলে তো আমি হয়ে যাব কুরআনের এক নিকৃষ্ট বাহক।”(হায়াতুস সাহাবা-১/৫৩৫)।
শত্রু বাহিনীকে আক্রমণের পূর্বে দুই দ্বীনি ভাই-আবু হুজাইফা ও সালেম পরস্পর বুক মেলালেন এবং দ্বীনে হকের পথে শহীদ হওয়ার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হলেন। তারপর উভয়ে শত্রুবাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আবু হুজাইফা একদিকে চিৎকার করে বলছেন, “ওহে কুরআনের ধারকরা, তোমরা তোমাদের আমল দ্বারা কুরআনকে সজ্জিত কর।” আর অন্যদিকে মুসাইলামা কাজ্জাবের বাহিনীর উপর তরবারির আঘাত হানছেন। আর একদিকে সালেম চিৎকার করে বলছেন, “আমি হব কুরআনের নিকৃষ্ট বাহক-যদি আমার দিক হতে শত্রুবাহিনীর আক্রমণ আসে।” মুখে তিনি একথা বলছেন আর দুহাতে তরবারী শত্রু সৈন্যের গর্দানে মারছেন।
এক ধর্মত্যাগীর অসির তীব্র আঘাত তাঁর ডান হাতে পড়লো। হাতটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি বাম হাতে পতাকাটি উঁচু করে ধরেন। বাম হাতটিও শত্রুর আঘাতে কেটে পড়ে গেলে পতাকাটি গলার সাথে পেঁচিয়ে ধরেন। এ অবস্থায় তিনি উচ্চারণ করতে থাকেন কুরআনের এ আয়াত, “ওয়ামা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল, ওয়াকা আইয়্যিন মিন নাবিয়্যিন কা-তালা মা’য়াহু রিব্বিয়ূনা কাসীর।”….“মুহাম্মাদুর আল্লাহর এক রাসূল ছাড়া আর কিছু নন। অতীতে কত নবীর সহযোগী হয়ে কত আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিই না যুদ্ধ করেছে। আল্লাহর পথে তাদের উপর যে বিপদ মুসীবত আপতিত হয়েছে, তাতে তাঁরা দুর্বল হয়ে পড়েনি এবং থেমেও যায়নি। আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের ভালবাসেন।” এই ছিল তাঁর মৃত্যুর পূর্বমুহুর্তের শ্লোগান।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মুরতাদদের একটি দল সালেমকে ঘিরে ফেলে। মহাবীর সালেম লুটিয়ে পড়েন। তখনও তাঁর দেহে জীবনের স্পন্দন অবশিষ্ট ছিল। মুসাইলামা কাজ্জাবের নিহত হওয়ার সাথে মুসলমানদের বিজয় ও মুরতাদদের পরাজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। মুসলমানরা আহত নিহতদের খোঁজ করতে লাগলো। সালেমকে তাঁরা জীবনের শেষ অবস্থায় খুঁজে পেল। এ অবস্থায় সালেম তাঁদের জিজ্ঞেস করেন- আবু হুজাইফার অবস্থা কি?
-সে শাহাদাত বরণ করেছে।
-যে ব্যক্তি আমার দিক হতে শত্রু বাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা করেছিল তাঁর অবস্থা কি?
-শহীদ হয়েছে।
-আমাকে তাঁদের মাঝখানেই শুইয়ে দাও।
-তাঁরা দুজন তোমার দুপাশেই শহীদ হয়েছে।
হযরত সালেম শেষবারের মত শুধু একটু মুচকি হাসি দিয়েছিলেন। আর কোনো কথা বলেন নি। সালেম এবং আবু হুজাইফা উভয়ে যা আন্তরিকভাবে কামনা করেছিলেন, লাভ করেন। তাঁরা একসাথে ইসলাম গ্রহণ করেন, একসাথে জীবন যাপন করেন এবং একসাথে একস্থানে শাহাদাত বরণ করেন।
হযরত সালেমের কাহিনী বিলাল ও অন্যান্য অসংখ্য অসহায় দাসদের কাহিনীর মতই। ইসলাম তাঁদের সকলের কাঁধ হতে দাসত্বের জোয়াল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তাঁদেরকে সত্য ও কল্যাণময় সমাজে ইমাম, নেতা ও পরিচালকের আসনে বসিয়ে দেয়। তাঁর মধ্যে মহান ইসলামের যাবতীয় গুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তিনি যা সত্য বলে জানতেন অকপটে তা প্রকাশ করে দিতেন, তা বলা হতে কক্ষনো বিরত থাকতেন না। তাঁর মুমিন বন্ধুরা তাঁর নাম রেখেছিল-‘সালেম মিনাস সালেহীন’-সত্যনিষ্ঠদের দলভুক্ত সালেম।
হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব(রা) সালেমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বে খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে বলেছিলেন, “আজ সালেম জীবিত থাকলে শুরার পরামর্শ ছাড়াই আমি তাঁকে খিলাফতের দায়িত্ব দিতাম।”(উসুদুল গাবা-২/২৪৬)।
হযরত সালেম ছিলেন নিঃসন্তান। তাই মৃত্যুর পর তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যাপারে ওসীয়ত করে যান। এক তৃতীয়াংশ দাসমুক্তি ও অন্যান্য ইসলামী কাজের জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ পূর্বতন মনিব হযরত সুবাইতার অনুকূলে। হযরত আবু বাকর(রা) অসীয়ত মত এক তৃতীয়াংশ সুবাইতার কাছে পাঠালে তিনি এই বলে তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান যে, আমি তো তাঁকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়েছি, বিনিময়ে কোনো কিছু আশা করিনি। পরে খলীফা উমার(রা) তা বায়তুল মালে জমা দেন।(আল ইসতিয়াব, উসুদুল গাবা-২/২৪৭)।
হযরত সালেম থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আবার অনেক সাহাবী তাঁর নিকট হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আবু হুজাইফা ইবন উতবা (রা)

নাম আবু হুজাইফা হাশীম, মতান্তরে হাশেম, পিতা উতবা, মাতা ফাতিমা বিনতু সাফওয়ান এবং ডাকনাম উম্মু সাফওয়ান। কুরাইশ গোত্রের সন্তান।
আবু হুজাইফা সাবেকীনে ইসলাম অর্থাৎ প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম ব্যক্তি। তাঁর পিতা উতবা ইসলামের চরম দুশমন কুরাইশ নেতৃবৃন্দের এক প্রধান পুরুষ। ইসলামের বিরোধিতায় সে তার জীবন উৎসর্গ করেছিল। কিন্তু আল্লাহর কি মহিমা, তারই পুত্র আবু হুজাইফা ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ করতে মোটেও বিলম্ব করেননি। মক্কায় রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে আশ্রয় নেওয়ার পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণের গৌরব অর্জন করেন এবং আরো অনেকের মত কুরাইশদের হাতে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন। (উসুদুল গাবা-৫/১৭০) ইবন ইসহাক বলেন, তিনি তেতাল্লিশ (৪৩) জনের পর ইসলাম গ্রহণ করেন। (আল- ইসাবা – ৪/৪২)
আবু হুজাইফা (রা) হাবশায় দু’টি হিজারাতেই অংশগ্রহণ করেন। প্রথমবার হিজরাত করে আবার মক্কায় ফিরে আসেন। পরে আবার হাবশায় চলে যান। হাবশায় হিজরাতে তাঁর স্ত্রী হযরত সাহলা বিনতু সুহাইলও সাথী ছিলেন। তাঁদের পুত্র মুহাম্মাদ ইবন আবী-হুজাইফা সেই প্রবাসে হাবশায় জম্মগ্রহণ করেন। (উসুদুল-গাবা – ৫/১৭০)।
হাবশা থেকে দ্বিতীয়বারের মত মক্কায় ফিরে এসে তিনি দেখতে পেলেন, মক্কায় অবস্থানরত মুসলমানদের মধ্যে মদীনায় হিজরাতের হিড়িক পড়ে গেছে। তাঁর দাস সালেমকে সংগে করে তিনিও মদীনায় পৌঁছলেন এবং হযরত আব্বাদ ইবন বিশর আল-আনসারীর অতিথি হলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁদের দু’জনের মধ্যে ‘মুওয়াখাত’ বা ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। (উসুদুল গাবা – ৫/১৭০)।
রাসূলুল্লাহর (সা) সময়ে সংঘটিত সকল যুদ্ধে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অংশগ্রহণ করেন। বিশেষতঃ বদর যুদ্ধের ঘটনাটি ছিল তাঁর ও সকল মুসলমানের জন্য দারুন শিক্ষণীয়। এ যুদ্ধে এক পক্ষে তিনি এবং অন্য পক্ষে তাঁর পিতা উতবা বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করেন। সত্য ও ন্যায়ের প্রেম সেদিন মুসলমানদেরকে আপন পর সম্পর্ক বিস্মৃত করে দিয়েছিল। সেদিন আবু হুজাইফা চিৎকার করে আপন পিতা প্রতিপক্ষের দুঃসাহসী বীর উতবাকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহবান জানান। তাঁর এ আহবান শুনে তাঁর সহোদরা হিন্দা বিনতু উতবা একটি কবিতায় তাঁকে ভীষণ তিরস্কার ও নিন্দা করে। উসুদুল গাবা গ্রন্থে কবিতাটির দু’টি পংক্তি সংকলিত হয়েছে।
বদর যুদ্ধে আবু হুজাইফার পিতা উতবাসহ অধিকাংশ কুরাইশ নেতা মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয় এবং তাদের সকলের লাশ বদরের একটি কূপে নিক্ষেপ করে মাটি চাপা দেওয়া হয়। হযরত রাসূলে কারীম (সা) সেই কূপের কাছে দাঁড়িয়ে নিহত কুরাইশ নেতৃবৃন্দের এক একজন করে নাম ধরে ডেকে বলতে লাগলেন, “ওহে উতবা, ওহে শাইবা, ওহে উমাইয়া ইবনে খালাফ, ওহে আবু জাহল! তোমরা কি আল্লাহর অঙ্গীকার সত্য পেয়েছ? আমি তো আমার অঙ্গীকার সত্য পেয়েছি।” (বুখারী) ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, সে সময় হযরত আবু হুজাইফাকে খুবই উদাস ও বিমর্ষ মনে হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তার এ অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করেন, “আবু হুজাইফা, সম্ভবত তোমার পিতার জন্য তোমার কষ্ট হচ্ছে।” আবু হুজাইফা বলেন, “আল্লাহর কসম, না। তাঁর নিহত হওয়ার জন্য আমার কোন দুঃখ নেই। তবে আমার ধারণা ছিল, তিনি একজন বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও সিদ্ধান্তদানকারী ব্যক্তি। তাই আমার আশা ছিল, তিনি ঈমান আনার সৌভাগ্য অর্জন করবেন। কিন্তু রাসূল (সা) যখন তাঁর ‘কুফর’ অবস্থায় মৃত্যুবরণের নিশ্চয়তা দান করলেন, তখন আমার দুরাশার জন্য আফসুস হলো।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) আবু হুজাইফার জন্য দু’আ করলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম – ১/৬৩৮-৪১, উসুদুল গাবা – ৫/১৭১)
হযরত রাসূলে কারীমের ওফাতের পর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রা) খিলাফতকালে আরব উপদ্বীপে কতিপয় ভণ্ড নবীর ফিতনা ও উৎপাত শুরু হয়। ইয়ামামার মুসাইলামা কাজ্জাবও ছিল সেইসব ভণ্ড নবীর একজন। খলীফা তার বিরুদ্ধে এক বাহিনী পাঠান। এই বাহিনীতে হযরত আবু হুজাইফাও (রা) ছিলেন। ভণ্ড মুসাইলামার বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সাথে লড়াই করে তিনি ইয়ামামার রণক্ষেত্রে শহীদ হন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৩ অথবা ৫৪ বছর।
হযরত আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বদর যুদ্ধের সময় একদিন সাহাবীদের বললেন, “আমি জানতে পেরেছি, বনী হাশেম ও অন্য কতিপয় গোত্রের কিছু লোককে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য বাধ্য করা হয়েছে। তাদের সাথে যুদ্ধ করার কোন প্র্যোজন আমাদের নেই। তোমাদের কেউ বনী হাশেমের কোন ব্যক্তির মুখোমুখি হলে তাকেও হত্যা করবে না। কেউ আবুল বুখতারী ইবন হিশামের দেখা পেলে তাকে হত্যা করবে না। কারণ, তিনি বাধ্য হয়ে এসেছেন।” সংগে সংগে আবু হুজাইফা বলে উঠলেন, “আমরা আমাদের পিতা, পুত্র ও ভ্রাতাদের হত্যা করবো, আর আব্বাসকে ছেড়ে দেব? আল্লাহর কসম, আমি তার সাক্ষাৎ পেলে তরবারি দিয়ে তাকে টুকরো টুকরো করে ফেলবো।” রাসুলুল্লাহ (সা) হুজাইফার এ কথা শুনে বললেন, “ওহে আবু হাফস (উমার), আল্লাহর রাসূলের চাচাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করা হবে?” উমার বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন, তরবারি দিয়ে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিই। আল্লাহর কসম, সে একজন মুনাফিক।” আবু হুজাইফা বলেন, “সেদিন যে কথাটি বলেছিলাম, সে জন্য আমি নিরাপত্তা বোধ করি না এবং শাহাদাতের মাধ্যমে তার কাফফারা আদায় না করা পর্যন্ত সর্বদা আমি ভীত সন্ত্রস্ত।” ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হয়ে তিনি তাঁর কাফফারা আদায় করেন। (হায়াতুস সাহাবা – ২/৩৬৪-৬৫)।
মুগীরা ইবন শু’বা (রা)

নাম আবু আবদিল্লাহ মুগীরা, পিতা শু’বা ইবন আবী আমের। আবু আবদিল্লাহ ছাড়াও আবু মুহাম্মাদ ও আবু ঈসা তাঁর কুনিয়াত। বনী সাকীফ গোত্রের সন্তান। তাঁর মা উমামা বিনতু আফকাম বনী নাসের ইবন মুয়াবিয়া গোত্রের কন্যা। হিজরী পঞ্চম সনে খন্দক যুদ্ধের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঐ বছরই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহচর্যে অবস্থান করতে থাকেন। (আল-ইসাবা-৩/৪৫২, উসূদুল গাবা-৪/৪০৬, আল-ইসতিয়াব)
হযরত রাসূলে কারীমের (সা) সাথে মুগীরার সর্বপ্রথম কখন পরিচয় হয় সে সম্পর্কে একটি ঘটনা বায়হাকী বর্ণনা করেছেন। মুগীরা বলেনঃ আমি প্রথম যেদিন রাসূলুল্লাহর সাথে পরিচিত হই, সেদিন আবু জাহল ও আমি মক্কার এক ছোট্ট গলিপথ দিয়ে হাঁটছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হল। রাসূল (সা) আবু জাহলকে বললেনঃ ইয়া আবাল হাকাম – ওহে আবুল হাকাম; আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে এস। আবু জাহল বললোঃ ইয়া মুহাম্মাদ! তুমি কি আমাদের ইলাহ বা মা’বুদদের নিন্দামন্দ থেকে বিরত হবে না? তুমি কি শুধু চাও আমরা সাক্ষ্য দিই যে, তুমি পৌঁছিয়েছ? তাহলে আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি পৌঁছে দিয়েছে। আল্লাহর কসম, আমি যদি জানতাম তুমি যা বলছো তা সত্য, তাহলে আমরা তোমার ইত্তেবা বা অনুসরণ করতাম।
রাসূলুল্লাহ (সা) চলে গেলেন। আবু জাহল আমাকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলোঃ আল্লাহর কসম! আমি নিশ্চিতভাবে জানি, মুহাম্মাদ যা বলে তা সত্য। কিন্তু আমাকে তা গ্রহণ করতে যে জিনিস বাধা দেয় তা হচ্ছেঃ বনু কুসাই দাবী করলো, হিজাবাহ আমাদের। (অর্থাৎ কা’বার চাবি তাদের কাছে থাকে, তাদের অনুমতি ব্যতীত কেউ কা’বার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে না) আমরা বললামঃ হাঁ। তারা বললোঃ সিকায়াহ আমাদের। (হাজীদের পানি পান করানোর দায়িত্ব) আমরা বললামঃ হাঁ। তারা বললোঃ ‘আন-নাদওয়াহ আমাদের।’ (পরামর্শ সভার দায়িত্ব) আমরা বললামঃ হাঁ। তারপর তারা বললোঃ’আল-লিওয়া’ (যুদ্ধের পতাকা) আমাদের।’ আমরা বললামঃ হাঁ। তারা মানুষকে আহার করায়, আমরাও আহার করলাম। এই ব্যাপারে আমরা যখন তাদের সমকক্ষতা অর্জন করলাম, তখন তারা বললোঃ আমাদের নবী আছে। আল্লাহর কসম, আমি তা মানতে পারিনে। (হায়াতুস সাহাবা ১/৮৪)
তিনি হুদাইবিয়া অভিযানে রাসূলুল্লাহর (সা) সফরসঙ্গী হয়ে বাইয়াতে রিদওয়ানে শরিক হন। কুরাইশরা মক্কায় প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করে। কুরাইশ পক্ষে উরওয়া ইবন মাসউদ আস-সাকাফী রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে আলোচনার জন্য আসে। আরবের সাধারণ প্রথা অনুযায়ী সে কথা বলার মধ্যে মাঝে মাঝে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রবিত্র দাড়ির দিকে হাত বাড়াতে থাকে। মুসলমানদের নিকট এটা ছিল অমার্জিত আচরণে তিনি উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলেন। যখনই উরওয়া হাত সম্প্রসারণ করছিল, মুগীরার হাত অবলীলাক্রমে তার তরবারির বাঁটের ওপর চলে যাচ্ছিল। এক সময় ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। তিনি ধমকের সুরে বললেনঃ সাবধান! হাত নিয়ন্ত্রণে রাখ। উরওয়া ঘাড় ফিরে তাকালো। তাঁকে চিনতে পেরে বললোঃ ‘ওরে ধোঁকাবাজ! আমি কি তোর পক্ষে কাজ করিনি? উল্লেখ্য যে, উরওয়া ছিল মুগীরার চাচা। জাহিলী যুগে মুগীরা কয়েকজন লোককে হত্যা করে। এই উরওয়া ইবন মাসউদ নিহত লোকদের দিয়াত বা রক্তমূল্য আদায় করে। উরওয়া এই ঘটনার প্রতিই ইঙ্গিত করেছিল। (বুখারীঃ কিতাবুশ শুরুতে ফিল জিহাদ ওয়াল মুসালিহা, উসুদুল গাবা-৪/৪০৬ হায়াতুস সাহাবা-১/১০২)
হুদাইবিয়ার পর তিনি একাধিক অভিযানে অংশগ্রহণের গৌরব অর্জন করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) একটি বিশেষ বাহিনীর সাথে তাঁকে ও আবু সুফইয়ানকে তায়েফে পাঠান। তাঁরা বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করেন।
বনী সাকীফ গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইইয়াতের উদ্দেশ্যে মদীনায় এলো। মদীনার উপকন্ঠে মুগীরা উট চরাচ্ছিলেন, সর্বপ্রথম তাঁর সাথেই সাকীফ গোত্রের লোকদের দেখা হল। মুগীরা তাদের দেখেই রাসূলুল্লাহকে (সা) এ সুসংবাদটি দেওয়ার জন্য দৌড় দিলেন। পথে আবু বকরের (রা) সাথে দেখা হলে তাঁকে সংবাদটি দিলেন। তিনি মুগীরাকে কসম দিয়ে অনুরোধ করলেন, তুমি আমার আগে রাসূলুল্লাহকে (সা) এ সুসংবাদটি দিওনা। সর্বপ্রথম আমিই রাসূলুল্লাহকে (সা) বিষয়টি অবহিত করতে চাই। মুগীরা তাঁর অনুরোধ রক্ষা করলেন। আবু বকরই (রা) সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহর (সা) কানে সুসংবাদটি পৌঁছালেন। তারপর মুগীরা সাকীফ গোত্রের নিকট পৌঁছে ইসলামী কায়দায় কিভাবে রাসূলুল্লাহকে (সা) সালাম করতে হবে তা তাদেরকে শিক্ষা দিলেন। (হায়াতুস সাহাবা ১/১৮৪)
রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের পর দাফন-কাফনের সময় হাজির ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র মরদেহ লোকেরা কবরে নামিয়ে যখন ওপরে উঠে এসেছে, হঠাৎ তিনি ইচ্ছা করে নিজের আংটিটি কবরের মধ্যে ফেলে দিলেন। হযরত আলী (রা) তাঁকে আংটিটি উঠিয়ে আনতে বললেন। তিনি কবরে নেমে রাসূলুল্লাহর (সা) পবিত্র পা হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে যখন মাটি চাপা দেওয়া হচ্ছিল, তিনি কবর থেকে উঠে আসলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে সর্বশেষ বিদায়ী ব্যক্তির সম্মান ও গৌরবের অধিকারী হওয়ার উদ্দেশ্যেই তিনি এ কাজ করেছিলেন তিনি প্রায়ই মানুষের কাছে গর্বের সাথে বলতেন, আমি তোমাদের সকলের শেষে রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছি। (তাবাকাত)
হযরত রাসূলে কারীমের ওফাতের পর প্রথম দুই খলীফার যুগে অধিকাংশ যুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। হযরত আবু বকরের (রা) নির্দেশে সর্বপ্রথম তিনি ‘বাহীরা’ অভিযানে যান। ইয়ামামার ধর্মত্যাগীদের নির্মূল করার ব্যাপারেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।
ভণ্ড নবীদের বিদ্রোহ দমনের পর তিনি ইরাক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ‘বুয়াইব’ বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী কাদেসিয়ার দিকে অগ্রসর হলে পারস্য সেনাপতি বিখ্যাত বীর রুস্তম আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে মুসলমানদের প্রতিনিধি পাঠানোর অনুরোধ জানায়। তার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে একাধিক দূতের যাতাযাত চললো। সর্বশেষ এ দায়িত্ব অর্পিত হয় হযরত মুগীরার ওপর।
পারসিকরা মুসলিম দূতকে ভীত ও আতঙ্কিত করে তোলার জন্য সেনাপতি রুস্তমের দরবারে খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে সজ্জিত করে। পারস্য বাহিনীর সকল অফিসার রেশমের বহুমূল্য পোশাক পরিধান করে। স্বয়ং রুস্তম স্বর্ণখচিত মুকুট মস্তকে ধারণ করে গর্বভরে মঞ্চের ওপর উপবিষ্ট হয়। দামী কার্পেটে সমগ্র দরবার আচ্ছাদিত হয়। হযরত মুগীরা দরবারে পৌঁছে নিঃসংকোচে সোজা মঞ্চের ওপর উঠে রুস্তমের পাশে বসে পড়েন। এমন সাহসিকতার সাথে তাঁকে বসতে দেখে রুস্তমের পরিষদবর্গ ভীষণ বিরক্ত হয়। তারা মুগীরার হাত ধরে টেনে এনে মঞ্চের নীচে বসিয়ে দেয়। মুগিরা বললেনঃ
“আমরা আরববাসী, আমাদের সেখানে এক ব্যক্তি খোদা হবে, আর অন্যরা তার পূজা করবে এমন বিধান নেই। আমরা সকলে সমান। তোমার আমাদের ডেকে এনেছো, আমরা উপযাচক হয়ে এখানে আসিনি। তোমাদের এমন আচরণ কি যুক্তিসম্মত? তোমাদের অবস্থা যদি এমন থাকে, খুব শিগগির তোমরা বিলীন হয়ে যাবে। আমি বুঝলাম, তোমাদের শাসন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এবং তোমাদের পরাজয় অনিবার্য এবং এমন বুদ্ধির কোন সাম্রাজ্য টিকে থাকতে পারে না।”
দরবারের নীচ শ্রেণীর লোকেরা মন্তব্য করলো, এই আরবী লোকটি সত্য কথাই বলেছে।
ইরানীরা এমন সাম্যের সাথে পরিচিত ছিল না। মুগীরার কথা শুনে তারা একটু দমে গেল। রুস্তমও একটু লজ্জিত হল। সে বললো, এটা চাকর-বাকরদের ভুল। তারপর মুগীরাকে খুশী করার উদ্দেশ্যে মুগীরার তুনির থেকে তীর বের করে রসিকতার সুরে জিজ্জেস করে, ‘এ দিয়ে কি হবে?’ মুগীরা জবাব দিলেনঃ ‘স্ফুলিঙ্গ ক্ষুদ্র হলেও তা আগুন।’ রুস্তম এবার মুগীরার তরবারির দিকে ইঙ্গিত করে বলে, ‘তোমার এই তলোয়ারটি তো অনেক পুরানো।’ মুগীরা বললেন, ‘বাঁট পুরনো হলেও ধার আছে।’ এরপর মূল বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়।
রুস্তম স্বজাতির শৌর্য বীর্য, শক্তি ও ক্ষমতা এবং আরবদের তুচ্ছতা ও দারিদ্র্যের উল্লেখ করে বলে, ‘তোমরা আমাদের প্রতিবেশী, তোমাদের সাথে আমরা ভালো ব্যবহার করে থাকি, তোমাদের বিপদ-আপদও আমরা দেব না। আর তোমাদের প্রত্যেক সৈনিকক তাদের মর্যাদা অনুসারে আমরা উপঢৌকন দেব।’
মুগীরা বললেনঃ
“দুনিয়া আমাদের উদ্দেশ্যে নয়, আমাদের একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য আখিরাত। আল্লাহ আমাদের নিকট একজন নবী পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তাঁকে বলেছেনঃ যারা আমার দ্বীন গ্রহণ করবে না, আমি তাদের উপর এই দলটিকে বিজয়ী করবো, এদের দ্বারা তাদের থেকে প্রতিশোধ নেব। তারা যতদিন দ্বীন আঁকড়ে থাকবে, আমি তাদের বিজয়ী রাখবো। অপমানিত ব্যক্তিরা এ দ্বীন প্রত্যাখ্যান করবে এবং সম্মানিত তা আঁকড়ে থাকবে।”
রুস্তমঃ ‘সেই দ্বীন কি?’
মুগীরাঃ ‘সেই দ্বীনের ভিত্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ – আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, এই কথার শাহাদাত বা সাক্ষ্য এবং আল্লাহর নিকট থেকে যা কিছু এসেছে তার স্বীকৃতি দান।’
রুস্তমঃ‘এ তো খুব চমৎকার কথা! আর কি?’
মুগীরাঃ‘প্রতিটি মানুষই আদমের সন্তান, প্রত্যেকেই আমরা ভাই-ভাই।’
রুস্তমঃ ‘কী চমৎকার! যদি আমরা তোমাদের দ্বীন গ্রহণ করি তোমরা কি তোমাদের দেশে ফিরে যাবে?’
মুগীরাঃ ‘আল্লাহর কসম, আমরা ফিরে যাব। তারপর ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোন প্রয়োজন ছাড়া আমরা তোমাদের দেশের কাছেই ঘেঁষবো না।’
রুস্তমঃ ‘খুবই ভালো কথা!’
বর্ণনাকারী বলেন, মুগীরা বের হয়ে গেলে রুস্তম তার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে ইসলাম সম্পর্কে আলোচনা করে। তারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। আল্লাহ তাদের অকল্যাণ ও লাঞ্ছিত করেন।
অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, আলোচনার এক পর্যায়ে রুস্তম বলেঃ ‘আমরা তোমাদের হত্যা করবো।’
মুগীরা বলেনঃ ‘তোমরা আমাদের হত্যা করলে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করবো, আর আমরা তোমাদের হত্যা করলে তোমাদের ঠিকানা হবে জাহান্নাম এবং তোমরা তখন জিযিয়া দানে বাধ্য হবে।’ জিযিয়ার কথা শুনে তারা চিৎকার করে ওঠে।
মুগীরা বলেনঃ ‘জিযিয়া’ দানে অস্বীকৃত হলে তরবারিই হবে তোমাদের ও আমাদের শেষ ফয়সালা।’ এমন কঠোর উত্তরে রুস্তম ক্রোধোম্মত্ত হয়ে পড়ে। সে বলেঃ ‘সূর্যের শপথ! আগামীকাল সূর্যোদয়ের পূর্বেই তোমাদের সেনাবাহিনী নাস্তানাবুদ করে ফেলা হবে।’
মুগীরা বলেনঃ ‘নদী পার হয়ে তোমরা আমাদের দিকে যাবে, না আমরা তোমাদের দিকে আসবো?’
রুস্তমঃ ‘আমরাই নদী পার হয়ে তোমাদের দিকে যাব।’
এই আলোচনার পর মুগীরা শিবিরে ফিরে আসেন। মুসলিম সৈনিকরা একটু পিছু হটে পারস্য বাহিনীকে নদী পার হওয়ার সুযোগ করে দেয়। এ যুদ্ধে হযরত মুগীরা অংশগ্রহণ করেন এবং পারস্য বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। (হায়াতুস সাহাবা-১/২২০, ২২২-২৩, ৩/৬৮৭-৯২, তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ-১/২০৯)।
হিজরী উনিশ সনে রায়, কাওমাস ও ইসপাহানবাসীরা শাহানশাহ ইয়াযদিগিরদের সাথে যোগাযোগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষাট হাজার সৈন্যের এক বাহিনী গড়ে তোলে। হযরত আম্মার বিন ইয়াসির খলীফা উমারকে (রা) বিষয়টি জরুরী ভিত্তিতে অবহিত করেন। বাহিনীসহ খলীফা নিজেই রওয়ানা হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন; কিন্তু অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলার কথা চিন্তা করে সে ইচ্ছা ত্যাগ করেন। তিনি বসরা ও কূফার আমীরদ্বয়কে নির্দেশ দেন, তারা যেন নিজ নিজ বাহিনীসহ নিহাওয়ান্দের দিকে অগ্রসর হয়। তিনি নু’মান ইবন মুকাররিনকে সেনাপতি নিয়োগ করে হিদায়াত দেন, যদি তুমি শহীদ হও, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান হবে তোমার স্থলভিষিক্ত। হুজাইফা শহীদ হলে জারীর ইবন আবদিল্লাহ আল বাজালী তার স্থলাভিষিক্ত হবে, আর সে শহীদ হলে মুগীরা ইবন শু’বা পতাকা তুলে ধরবে।
মুসলিম সৈন্যরা নিহাওয়ান্দের নিকটে ছাউনী ফেলার পর ইরানীরা আবারো আলাপ আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে একজন দূত পাঠানোর অনুরোধ জানায়। যেহেতু পূর্বেই একবার সাফল্যের সাথে মুগীরা দৌত্যগিরির দায়িত্ব পালন করেছিলেন, এ কারণে দ্বিতীয়বার এ দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকেই নির্বাচন করা হয়। দূত হিসাবে ইরানীদের দরবারে উপস্থিত হয়ে দেখলেন, অবস্থা আগের মতই। ইরানী সেনাপতি স্বর্ণখচিত মুকুট পরে মঞ্চে বসে আছে। দরবারের অন্যান্য সিপাহী সান্ত্রীরা চকচকে তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে ভাব-গম্ভীর ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। সমগ্র দরবারের নিস্তব্ধ-নীরব। মুগীরা কারো প্রতি কোন রকম ভ্রুক্ষেপ না করে সোজা ঢুকে গেলেন। পথে প্রহরীরা বাধা দিতে চাইলো। তিনি তাদের বিললেন, ‘দূতের সাথে এমন আচরণ শোভনীয় নয়।’ আলোচনা শুরু হল। পারস্য সেনাপতি মারওয়ানশাহ বললো, “তোমরা আরবের অধিবাসী, তোমাদের অপেক্ষা অধিক হতভাগ্য, দারিদ্রপীড়িত ও অপবিত্র জাতি দুনিয়ার দ্বিতীয়টি নেই। আমর সৈনিকরা অনেক আগেই তোমাদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতো; কিন্তু তোমরা এত নীচ যে, তোমাদের ক্ষমা করে দেব। অন্যথায় রণক্ষেত্রে তোমাদের লাশ তোমরা তড়পাতে দেখবে।”
হযরত মুগীরা হামদ ও নাতের পর বললেনঃ “তোমার ধারণা মত নিশ্চয় আমরা এক সময় তেমনই ছিলাম। কিন্তু আমাদের রাসূল (সা) আমাদের আদল বা কায়া পাল্টে দিয়েছেন। এখন চতুর্দিকে আমাদের ক্ষেত্র পরিস্কার। যতক্ষণ রণক্ষেত্রে আমাদের লাশ তড়পাতে না থাকবে, আমরা তোমাদের সিংহাসন ও মুকুট ছিনিয়ে নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারিনে।”
দৌত্যগিরি ব্যর্থ হল। উভয়পক্ষে যুদ্ধের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। হযরত মুগীরাকে নিয়োগ করা হল বাম ভাগের দায়িত্বে। নিহাওয়ান্দের এ যুদ্ধে হযরত নু’মান ইবন মুকাররিন মারাত্মকভাবে আহত হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনতে লাগলেন। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর শক্তি, সাহস ও দৃঢ়তায় কোন পরিবর্তন হল না। পারস্য বাহিনী পরাজয় বরণ করলো। যুদ্ধ শেষে হযরত মা’কাল দেখতে গেলেন হযরত নু’মান ইবন মুবাররিনকে। তখনও তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস চলছিল, দৃষ্টিশক্তিও কাজ করছিল। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কয়ে?’ মা’কাল নিজের পরিচয় দিলেন। নু’মান জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘যুদ্ধের ফলাফল কি?’ মাকাল বললেনঃ ‘আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করেছেন।’ তিনি বললেনঃ ‘আল-হামদুলিল্লাহ – সকল প্রশংসা আল্লাহর। উমারকে অবহিত কর।’ এ কথাগুলো বলেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিহাওয়ান্দের পর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠিয়ে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। হামদান অভিযানের সার্বিক দায়িত্ব হযরত মুগীরার ওপর অর্পিত হয়। অত্যন্ত সাফল্যের সাথে তিনি হামদানবাসীদের পরাজিত করে তাদেরকে সন্ধি করতে বাধ্য করেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধেও তিনি যোগ দেন। এ যুদ্ধে তিনি চোখে মারাত্মক আঘাত পান। (আল-ইসাবা-৩/৪৫৩, উসুদুল গাবা-৪/৪০১)
বসরা শহর পত্তনের পর হযরত উমার (রা) তাঁকে সেখানকার ওয়ালী নিয়োগ করেন। তিনি বসরার ওয়ালী থাকাকালীন অনেক নিয়ম-পদ্ধতি চালু করেন। সৈনিকদের বেতন-ভাতা ইত্যাদি দেওয়ার জন্য সর্বপ্রথম বসরায় একটি পৃথক ‘দিওয়ান’ বা দফতর প্রতিষ্ঠা করেন। (আল-ইসাবা-৩/৪৫৩) কিছুদিন পর তাঁর চরিত্রের প্রতি মারাত্মক এক দোষারোপের কারণে খলিফা উমার (রা) ওয়ালীর পদ থেকে তাঁকে বরখাস্ত করেন। তদন্তের পরে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। (উসুদুল গাবা-৪/৪০৬) রাসূলুল্লাহর (সা) একজন সাহাবী তাঁর প্রতি আরোপিত জঘন্য অভিযোগ থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় হযরত উমার (রা) অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে আল্লাহর প্রশংসা আদায় করেন। এ ঘটনার পর হযরত উমার (রা) তাঁকে আম্মার ইবন ইয়াসিরের (রা) স্থলে কূফার ওয়ালী নিয়োগ করেন। হযরত উমারের খিলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। হযরত উসমান (রা) তাঁকে উক্ত পদ থেকে বরখাস্ত করেন। (উসুদুল গাবা – ৪/৪০৭)
খলীফা হযরত উসমানকে (রা) তিনি সবসময় সৎ পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। ইমাম আহমাদ মুগীরা থেকে বর্ণনা করেছেন। হযরত উসমান যখন গৃহবন্দী তখন মুগীরা একদিন তাঁর কাছে গেলেন। তিনি খলীফাকে বললেন, ‘আপনি জনগণের ইমাম বা নেতা। আপনার ওপর যা আপতিত হয়েছে, তা আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। আমি আপনাকে তিনটি পন্থার কথা বলবো, এর যে কোন একটি গ্রহণ করুন। ১ আপনি ঘর থেকে বের হয়ে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করুন। ২ আপনি বাড়ীর পেছন দরজা দিয়ে গোপনে বের হয়ে বাহনে আরোহণ করুন এবং সোজা মক্কায় চলে যান। সেখানে আপনার কোন ক্ষতি করবে না। ৩ আপনি সিরিয়া চলে যান। কারণ, সেখানে মুয়াবিয়া আছেন। জবাবে খলীফা উসমান বললেনঃ প্রথমতঃ আমি রাসূলুল্লাহর (সা) উম্মাতের মধ্যে প্রথম রক্তপাতকারী হতে চাই না। দ্বিতীয়তঃ আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছিঃ একজন কুরাইশ ব্যক্তিকে মক্কায় কবর দেওয়া হবে, তার ওপর বিশ্বের অর্ধেক আযাব বা শাস্তি আপতিত হবে। আমি অবশ্যই সেই ব্যক্তি হতে চাই না। তৃতীয়তঃ দারুল হিজরাহ ও মুজাবিরাতু রাসূলিল্লাহ – হিজরাতস্থল ও রাসূলুল্লাহর (সা) নৈকট্য (মদীনা) ত্যাগ করে সিরিয়া যেতে আমি ইচ্ছুক নই। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩৯৬)
হযরত আলী (রা) ও হযরত মুয়াবিয়ার (রা) মধ্যে বিরোধ শুরু হল। প্রথম দিকে হযরত মুগীরা (রা) হযরত আলীর (রা) পক্ষে ছিলেন। তিনি আলীর (রা) খিদমতে হাজির হয়ে সরলভাবে পরামর্শ দেন, “যদি আপনি আপনার খিলাফত শক্তিশালী করতে চান তাহলে তালহা-যুবাইরকে যথাক্রমে কুফা ও বসরার ওয়ালী নিয়োগ করুন। আর আমীর মুয়াবিয়াকে তার পূর্ব পদে আপাততঃ বহাল রাখুন, তারপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যা ইচ্ছা হয় করবেন।” হযরত আলী (রা) তাঁকে জবাব দেন, “তালহা-যুবাইরের ব্যাপারে ভেবে দেখবো; তবে মুয়াবিয়া যতদিন তার বর্তমান কার্যকলাপ বন্ধ না করবে, আমি তাঁকে না কোথাও ওয়ালী নিযুক্ত করবো, না তার কোন সাহায্যগ্রহণ করবো।” এই জবাবে মুগীরা ক্ষুব্ধ হন। (আল-ইসতিয়াব) হযরত উসমানের (রা) হত্যার পর মুসলিম উম্মাহর দু’ বিবদমান পক্ষের মধ্যে সংঘাত সংঘর্ষ হয়। তিনি এসব সংঘর্ষ থেকে সযত্নে দূরে থাকেন। সিফফীনের পর দু’মাতুল জান্দালে সালিশী রায় শোনার জন্য তিনিও উপস্থিত ছিলেন। দু’মাতুল জান্দালে সালিশী ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি হযরত মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষে যোগদান করেন এবং তার হাতে বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ করেন। এরপর থেকে তিনি প্রকাশ্যে হযরত আলীর (রা) বিরোধিতা শুরু করেন। (আল-ইসাবা ৩/৪৫৩, মুসতাদরিক-৩/৪৫০)
হযরত মুগীরার (রা) সমর্থন ও সহযোগিতা হযরত মুয়াবিয়ার বিশেষ উপকারে আসে। অনেক বড় বড় সমস্যা তিনি তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধির সাহায্যে খুব তাড়াতাড়ি সমাধান করে দেন। খিলাফতের ব্যাপারে আমীর মুয়াবিয়ার (রা) সামনে এমনসব কঠিন সমস্যা উপস্থিত হয়েছে, তখন যদি মুগীরার বুদ্ধি ও মেধা কাজ না করতো তাহলে হযরত মুয়াবিয়াকে অত্যন্ত মারাত্মক সংকটের সম্মুখীন হতে হতো। যিয়াদ ছিলেন আরবের অতি চালাক ও কৌশলী লোকদের মধ্যে অন্যতম প্রধান পুরুষ। তিনি ছিলেন হযরত আলীর (রা) পক্ষ থেকে পারস্যের ওয়ালী এবং হযরত মুয়াবিয়ার (রা) চরম বিরোধী। হযরত আলীর (রা) শাহাদাতের পর হযরত হাসান (রা) খিলাফতের দাবী থেকে সরে দাঁড়ানোর পর হযরত মুয়াবিয়া (রা) যখন সমগ্র মুসলিম জাহানের একচ্ছত্র খলীফা, তখনও যিয়াদ তাঁকে খলীফা বলে স্বীকার করেননি। হযরত মুগীরা এমন কট্টর দুশমনকেও হযরত মুয়াবিয়ার (রা) অনুগত বানিয়ে দেন এবং মুয়াবিয়াকে এক মারাত্মক বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
হিজরী ৪১ সনে হযরত আমীর মুয়াবিয়া বিশেষ অবদানের পুরস্কার স্বরূপ হযরত মুগীরাকে কূফার ওয়ালী নিয়োগ করেন। হিজরী ৩৩ সনে কূফার খারেজীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করলে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই বিদ্রোহ দমন করেন। এভাবে তিনি হযরত মুয়াবিয়ার (রা) খিলাফত শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা পালন করেন।
হযরত মুগীরার মৃত্যু সন সম্পর্কে মতভেদ আছে। অনেকে বলেছেন, হিজরী ৫০ সনে কূফায় যে প্লেগ দেখা দেয় সেই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন হিজরী ৪৯/৫১ সনে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ (সত্তর) বছর।
হযরত মুগীরা (রা) যদিও একজন বিজ্ঞ কূটনীতিক ও সৈনিক ছিলেন, তথাপি দ্বীনি বিদ্যায় যথেষ্ট পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। সমবয়সীদের মধ্যে অগাধ জ্ঞানের জন্য তাঁর একটা বিশেষ মর্যাদা ছিল। হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত (১৩৩) টি হাদীস দেখা যায়। তারমধ্যে ৯টি মুত্তাফাক আলাইহি, একটি বুখারী ও দু’টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। বহু সাহাবী ও তাবেঈ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ তাঁর তিন পুত্র – উরওয়া, হামযা, আককার এবং অন্যান্যের মধ্যে যুবাইর ইবন ইয়াহয়িয়া, মিসওয়ার ইবন মাখরাম, কায়েস ইবন আবী হাযেম, মাসরূক ইবন আজদা, নাফে ইবন হুবায়রা, উরওয়া ইবন যুবাইর, আমর ইবন ওয়াহহাব প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গ।
দ্বীনী জ্ঞানে পারদর্শী হওয়া সত্বেও তিনি ইলম ও ইফতা’র মসনদের পরিবর্তে রাজনীতি ও কূটনীতির জটিল ময়দানে বিচরণ করেন। এ অঙ্গনেই তাঁর প্রতিভা ও যোগ্যতার পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তাঁকে আরবের শ্রেষ্ঠতম কূটনীতিকদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইমাম শা’বী বলেন, আরবের অতি চালাক ব্যক্তি চারজন – মুয়াবিয়া ইবন আবী সুফইয়ান, আমর ইবনুল আস মুগীরা ইবন শুবা ও যিয়াদ। (উসুদুল গাবা-৪/৪০৭, আল ইসাবা ৩/৪৫৩) ইবন সা’দ বলেন, তাঁর অসাধারণ বুদ্ধি ও মেধার কারণে লোকে তাঁকে ‘মুগীরাতুল রায়’ মতামত বা সিদ্ধান্তের অধিকারী মুগীরা বলে উল্লেখ করতো। (আল-ইসতিয়াব) এ সকল অসাধারণ গুণের কারণে হযরত উমার (রা) তাঁকে অনেক বড় বড় পদে নিয়োগ করেন। এমন কি ইরানী দরবারে দৌত্যগিরির দুর্লভ সম্মানও অর্জন করেন।
কাবীসা ইবন জাবির বলেন, আমি দীর্ঘদিন মুগীরার সাহচর্যে কাটিয়াছি। তিনি এত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান ছিলেন যে, যদি কোন শহরের এমন আটটি দরজা থাকে যে, তার কোন একটির ভেতর দিয়েও কৌশল ও চাতুর্য ছাড়া বের হওয়া যায় না, মুগীরা তার প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম ছিলেন। জটিল বিষয়ের জট খোলার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাবারী বলেন, কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত ব্যক্তকালে তা থেকে সরে আসার পথও বের করে রাখতেন। যখনই কোন দু’টি বিষয় সংশয়পূর্ণ হয়ে পড়তো, অবশ্যই একটির ব্যাপারে তাঁর সঠিক রায় প্রকাশ পেত। (আল-ইসাবা ৩/৪৫৩)
হযরত মুগীরার চাতুর্য ও কূটনীতির বহু কৌতুকপূর্ণ ঘটনা ইতিহাসে দেখা যায়। হযরত উমার (রা) তাঁকে বাহরাইনের ওয়ালী নিয়োগ করেন। বাহরাইনবাসীরা তাঁর বিরুদ্ধে খলীফার নিকট অভিযোগ উত্থাপন করে। হযরত উমার তাঁকে বরখাস্ত করেন। তিনি যাতে দ্বিতীয়বার সেখানে ওয়ালীর পদে নিয়োগ না পান সেজন্য সেখানকার দাহকান বা সরদার এক মারাত্মক ষড়যন্ত্রকরে। সে এক লাখ দিরহাম সংগ্রহ করে খলীফার নিকট জমা দিয়ে বলে, ‘মুগীরা বাইতুল মাল থেকে এ অর্থ আত্মসাৎ করে আমার কাছে জমা রেখেছিলেন।’ হযরত উমার অত্যন্ত কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। বিষয়টি ছিল অত্যন্ত নাজুক। একদিকে রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবী, অন্যদিকে অসংখ্য লোক তাঁর বুরুদ্ধে সাক্ষী, আত্মসাৎকৃত অর্থও উপস্থিত। দোষ প্রমাণের জন্য অতিরিক্ত কোন সাক্ষী-সাবুতের প্রয়োজন নেই। এমন পরিস্থিতিতেও মুগীরা বুদ্ধির ভারসাম্য বজায় রাখেন। অত্যন্ত ধীর স্থিরভাবে তিনি বলেন, দাহকান বা সরদার মিথ্যা বলেছে। আমি তো তার নিকট দু’লাখ জমা রেখেছিলাম, একলাখ সে আত্মসাৎ করেছে।’ একথা শুনে ‘দাহকান’ ভয়ে মুষড়ে পড়ে। এখন তো তাকে দু’লাখই বাইতুল মালে জমা দিতে হবে। সে অকপটে তার কারসাজির কথা স্বীকার করে। বার বার কসম খেয়ে বলতে থাকে, ‘মুগীরা আমার কাছে কোন অর্থই জমা রাখেননি।’ এভাবে সত্য প্রকাশ হয়ে পড়ে। মুগীরার দুর্নাম রটানোর জন্য সে মনগড়া কাহিনী তৈরী করেছিল,বিষয়টি মিটমাট হয়ে যাওয়ার পর হযরত উমার (রা) মুগীরাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি দু’লাখের কথা স্বীকার করলে কেন?’ তিনি বললেন, ‘সে আমার প্রতি মিথ্যা দোষারোপ করেছিল, এভাবে ছাড়া তার বদলা নেওয়ার আমার আর কোন উপায় ছিল না’। (আল-ইসাবা ৩/৪৫৩)
প্রখ্যাত সাহাবী নু’মান ইবন মুকাররিন (রা) একবার মুগীরাকে বলেন, ‘ওয়াল্লাহি ইন্নাকা লাজু মানাকিব – অর্থাৎ তুমি বুদ্ধিমত্তা, পরামর্শদান ও সঠিক মতামতের অধিকারী ব্যক্তি।’ (হায়াতুস সাহাবা – ১/৫১২)
আবদুর রহমান ইবন আবী বকর (রা)
তাঁর ইসলাম-পূর্ব যুগের নাম আবদুল কা’বা, মতান্তরে আবদুল উযযা। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর নাম রাখেন আবদুর রহমান। তাঁর ডাক নাম বা কুনিয়াত তিনটিঃ আবু আবদিল্লাহ, তাঁর পুত্র মুহাম্মাদের নামানুসারে আবু মুহাম্মাদ ও আবু উসমান। তবে আবু আবদিল্লাহ সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। পিতা প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা) ও মাতা উম্মু রুমান বা উম্মু রূম্মান। পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান এবং উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশার (রা) সহোদর। (উসুদুল গাবা-৩/৩০৪-৩০৫)
হযরত আবু বকর সুদ্দীকের সন্তানদের সকলে প্রথম ভাগেই ইসলাম গ্রহণ করলেও আবদুর রহমান দীর্ঘদিন পর্যন্ত ইসলাম থেকে দূরে থাকেন। বদর যুদ্ধে মক্কার কুরাইশদের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি পর্বে তিনি একটু সামনে এগিয়ে এসে মুসলমানদের প্রতি চ্যালেঞ্জের সুরে বললেনঃ ‘হাল মিন মুবারিযিন’ – আমার সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধের সাহস রাখে এমন কেউ কি আছ? তাঁর এ চ্যালেঞ্জ শুনে পিতা আবু বকরের (রা) চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। তিনি তাঁর সাথে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন, কিন্তু হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে নিবৃত্ত করেন। উহুদের যুদ্ধেও তিনি মক্কার কুরাইশদের সাথে ছিলেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন কুরাইশদের তীরন্দায বাহিনীর অন্যতম সদস্য। (উসুদুল গাবা-৩/৩০৫) পরবর্তীকালে একদিন আবদুর রহমান পিতা আবু বকরকে (রা) বলেন উহুদের ময়দানে আমি আপনাকে পেয়েও এড়িয়ে গিয়েছিলাম। জবাবে আবু বকর (রা) বলেন, আমি তোমাকে দেখলে ছেড়ে দিতাম না। (হায়াতুস সাহাবা-২/৩১৩)
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় হযরত আবদুর রহমান ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মদীনায় হিজরাত করে পিতা আবু বকরের (রা) সাথে বসবাস করতে থাকেন। হযরত আবু বকরের (রা) যাবতীয় কাজ কারবার তিনিই দেখাশুনা করতেন। একবার রাত্রিবেলা হযরত আবু বকর (রা) আসহাবে সুফফার কতিপয় লোককে দাওয়াত করলেন। তিনি আবদুর রহমানকে বললেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে যাচ্ছি, আমার ফিরে আসার পূর্বেই তুমি মেহমানদের খাইয়ে দেবে।’ পিতার নির্দেশমত আবদুর রহমান যথাসময়ে মাহমানদের সামনে খাবার হাজির করলেন। কিন্তু তাঁরা মেযবানের অনুপস্থিতিতে খেতে অস্বীকার করলেন। ঘটনাক্রমে সেদিন হযরত আবু বকর (রা) দেরীতে ফিরলেন। ফিরে এসে যখন জানলেন, মেহমানরা এখনও অভুক্ত রয়েছে, তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে আবদুর রহমানকে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! তোকে আমি খাবার দেব না।’ আবদুর রহমান ভয়ে জড়সড় হয়ে বাড়ীর এক কোণে বসে ছিলেন। একটু সাহস করে তিনি বললেন, ‘আপনি মেহমানদের একটু জিজ্ঞেস করুন, আমি তাঁদের খাওয়ার জন্য সেধেছিলাম কিনা।’ মেহমানরা আবদুর রহমানের কথা সমর্থন করলেন। তাঁরাও কসম খেয়ে বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আবদুর রহমানকে খেতে না দেবেন, আমরা খাবনা।’ এভাবে আবু বকরের রাগ প্রশমিত হয় এবং সকলে এক সাথে বসে আহার করেন। আবদুর রহমান বলেন, “সেদিন আমাদের খাবারে এত বরকত হয়েছিল যে, আমরা খাচ্ছিলাম, কিন্তু তা মোটেই কমছিল না। আমি সেই খাবার থেকে কিছু রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য নিয়ে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) বেশ কিছু সাহাবীসহ তা আহার করেন।” (বুখারী)
স্বভাবগত ভাবেই হযরত আবদুর রহমান ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। তিনি ছিলেন দক্ষ তীরন্দায। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যত যুদ্ধ হয়, তিনি প্রত্যেকটিতে অংশগ্রহণ করে বীরত্ব ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। খাইবার অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সহযাত্রী হন এবং খাইবারের গনীমাত থেকে চল্লিশ ‘ওয়াসাক’ খাদ্যশস্য লাভ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম ২/৩৫২) বিদায় হজ্জেও তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সফরসঙ্গী ছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা) তাঁকে হযরত আয়িশার (রা) সাথে ‘তানয়ীমে’ পাঠিয়েছিলেন নতুন করে ইহরাম বাঁধার জন্য। উল্লেখ্য যে হযরত আয়িশা (রা) এ সফরে ঋতুবতী হওয়ার কারণে হজ্জের কিছু অবশ্য পালনীয় কাজ স্থগিত রেখে ইহরাম ভেঙ্গে ফেলেন। সুস্থ হওয়ার পরে রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশে ‘তানয়ীমে’ গিয়ে পুনরায় ইহরাম বেঁধে স্থগিত কাজগুলি সম্পাদন করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৬০২)
রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে যে বিদ্রোহ দেখা দেয় তা দমনে তিনি অন্যদের সাথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ভণ্ড-নবী মুসাইলামা আল কাজ্জাবের সাথে ইয়ামামার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি চরম বীরত্বের পরিচয় দেন। এ যুদ্ধে তিনি শত্রুপক্ষের সাতজন বিখ্যাত বীরকে একাই হত্যা করেন। ইয়ামামার শত্রুপক্ষের দুর্গের এক স্থানে ফেটে ছোট্ট একটি পথ হয়ে গিয়েছিল। মুসলিম মুজাহিদরা বার বার সেই ছিদ্র পথ দিয়ে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে ব্যর্থ হচ্ছিল। কারণ, শত্রুপক্ষের মাহকাম ইবন তুফাইল নামক এক বীর সৈনিক অটলভাবে পথটি পাহারা দিচ্ছিল। হযরত আবদুর রহমান তার সিনা তাক করে একটি তীর নিক্ষেপ করেন এবং সেই তীরের আঘাতে সে মাটিতে ঢলে পড়ে। মুসলিম মুজাহিদরা সাথে সাথে সঙ্গীদের পায়ে পিষতে পিষতে ভেতরে প্রবেশ করে দুর্গের দরজা খুলে দেন। এভাবে দুর্গের পতন হয়। হযরত উসমানের শাহাদাতের পর হযরত আলী ও হযরত আয়িশার (রা) মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে যে উটের যুদ্ধ হয়, সেই যুদ্ধে আবদুর রহমান বোনের পক্ষে যোগ দিয়েছিলেন। (আল-ইসাবা-২/৪০৮)
হযরত আমীর মুয়াবিয়া (রা) তাঁর জীবদ্দশাতেই পুত্র ইয়াযিদকে স্থলাভিষিক্ত করার প্রচেষ্টা শুরু করেন। তিনি স্বীয় উত্তরাধিকারী হিসেবে ইয়াযিদের নাম মদীনায় জনগণের বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ নেয়ার জন্য মদীনার ওয়ালী মারওয়ানকে নির্দেশ দিলেন। তাঁর এ নির্দেশ মদীনার মসজিদে সমবেত লোকদের পাঠ করে শুনানোর কথাও বললেন। মারওয়ান মুয়াবিয়ার (রা) এ আদেশ যথাযথভাবে পালন করলেন। তিনি মসজিদে মদীনার জনগণকে সমবেত করে আমীর মুয়াবিয়ার নির্দেশ পাঠ করে শুনালেন। তাঁর পাঠ শেষ হতে না হতেই হযরত আবদুর রহমান ইবন আবী বকর লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং মজলিসের নীরবতা ভঙ্গ করে গর্জে উঠলেন। “আল্লাহর কসম! তোমরা উম্মাতে মুহাম্মাদীর মতামতের পরোয়া না করে খিলাফতকে হিরাকলী পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করছো। এক হিরাকলের মৃত্যু হলে আর এক হিরাকল তার স্থলাভিষিক্ত হবে।” অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, মারওয়ান বলেনঃ এ তো আবু বকর ও উমার প্রবর্তিত পদ্ধতি। আবদুর রহমান প্রতিবাদ করে বলেনঃ না, এটা হিরাকল ও কায়সারের পদ্ধতি। পিতার পর পুত্রকে সিংহাসনে বসানোর পদ্ধতি। আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর এবং হুসাইন ইবন আলীও আবদুর রহমানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করেন। (আল-ইসাবা-২/৪০৮, উসুদুল গাবা-৩/৩০৬)
মারওয়ান তখন অত্যন্ত উত্তেজিত কন্ঠে আবদুর রহমানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেনঃ বন্ধুগণ! এ সেই ব্যক্তি যার সম্পর্কে কুরআনের এ আয়াত নাযিল হয়েছেঃ “ যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে বলে, তোমাদের জন্য আফসুস” অর্থাৎ পিতা-মাতার আনুগত্য না করার জন্য আল্লাহ তার নিন্দা করেছেন, সূরা আহকাফ-১৭। উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়িশা (রা) তাঁর হুজরা থেকে তার এ কথা শুনলেন। তিনি উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেনঃ ‘আল্লাহর কসম! না, আবদুর রহমানের শানে নয়। যদি তোমরা চাও, কোন ব্যক্তির শানে এ আয়াতটি নাযিল হয়েছিল, আমি তা বলতে পারি। (আল-ইসাবা ৪/৪০৮, উসুদুল গাবা-৩/৩০৬)
হযরত আবদুর রহমান সেদিন উপলব্ধি করেছিলেন, মুয়াবিয়ার (রা) এ ইচ্ছা পূর্ণ হলে মুসলিম উম্মাহ এক মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হবে। তিনি নিশ্চিতভাবে বুঝেছিলেন, এটা ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা উৎখাত করে মুসলিম উম্মাহর ওপর কায়সারিয়্যাহ চাপিয়ে দেয়ার একটি ষড়যন্ত্র।
হযরত আবদুর রহমান হযরত মুয়াবিয়ার এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জোর গলায় প্রতিবাদ জানাতে লাগলেন। হযরত মুয়াবিয়া (রা) এবার ভিন্ন পথ অবলম্বন করলেন। তিনি আবদুর রহমানের কন্ঠরোধ করার জন্য এক লাখ দিরহামসহ একজন দূত তাঁর কাছে পাঠালেন। হযরত সিদ্দীকে আকবরের পুত্র আবদুর রহমান দিরহামের থলিটি দূরে নিক্ষেপ করে দূতকে বললেনঃ ‘ফিরে যাও। মুয়াবিয়াকে বলবে, আবদুর রহমান দুনিয়ার বিনিময়ে দ্বীন বিক্রি করবে না।’ (আল-ইসতিয়াব, উসুদুল গাবা-৩/৩০৬, হায়াতুস সাহাবা-২/২৫৪, রিজালুন হাওলার রাসূল-৫২৮)
এ ঘটনার পর হযরত আবদুর রহমান যখন জানতে পেলেন হযরত মুয়াবিয়া (রা) সিরিয়া থেকে মদীনায় আসছেন, তিনি সাথে সাথে মদিনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। সেখানে শহর থেকে দশ মাইল দূরে ‘হাবশী’ নামক স্থানে বসবাস করতে থাকেন এবং সর্বাধিক সঠিক মতানুযায়ী হিজরী ৫৩ সনে ইয়াযিদের বাইয়াতের পূর্বেই ইনতিকাল করেন। অত্যন্ত আকস্মিকভাবে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর দিন সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় প্রতিদিনের মত যথারীতি শুয়ে পড়েন; কিন্তু সেই ঘুম থেকে আর জাগেননি। হযরত আয়িশার মনে একটু সন্দেহ হয়, কেউ হয়তো তাকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। এর কিছুদিন পরে এক সুস্থ সবল মহিলা হযরত আয়িশার (রা) নিকট আসে এবং নামাযে সিজদারত অবস্থায় মারা যায়। এ ঘটনার পর তাঁর মনের খটকা দূর হয়ে যায়। হযরত আবদুর রহমানের সঙ্গী-সাথীরা তাঁর লাশ মক্কায় এনে দাফন করে।
হযরত আয়িশা (রা) ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে হজ্জের নিয়তে মক্কায় যান এবং কবরের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। কান্নার মধ্যে কবি মুতাম্মিম ইবন নুওয়াইরাহ রচিত একটি শোক গাঁথার শ্লোক বার বার আওড়াচ্ছিলেন। তারপর ভাইয়ের রূহের উদ্দেশ্যে বলেনঃ “আল্লাহর কসম! আমি তোমার মরণ সময় উপস্থিত থাকলে এখন এভাবে কাঁদতাম না এবং যেখানে তুমি মৃত্যুবরণ করেছিলে সেখানেই তোমাকে দাফন করতাম।” (মুসতাদরিক ৩/৪৭৬, আল-ইসাবা-২/৪০৮)
হযরত আবদুর রহমান (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। বহু সাহাবী ও তাবেঈ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
খাব্বাব ইবনুল আরাত (রা)

নাম খাব্বাব, কুনিয়াত আবু আবদিল্লাহ, পিতার নাম আরাত। তাঁর বংশ সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, তিনি বনু তামীম, আবার কেউ বলেছেন, বনু খুযা’য়া গোত্রের সন্তান। তবে সহীহ মতানুযায়ী তিনি বনু তামীম গোত্রের সন্তান। (সীরাত ইবন হিশাম-১/২৫৪) শৈশবে তিনি দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। তাঁর দাসত্বের কাহিনী ইতিহাসে এভাবে বর্ণিত হয়েছেঃ
বনু খুযা’য়া গোত্রের উম্মু আনমার নাম্মী এক মহিলা মক্কার দাস কেনা-বেচার বাজারে গেল। তার উদ্দেশ্য, সে সুস্থ ও তাজা-মোটা দেখে এমন একটি দাস কিনবে, যে তার যাবতীয় কাজ সম্পাদন করতে পারবে। বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনীত দাসদের চেহারা সে গভীরভাবে দেখতে লাগলো। অবশেষে সে একটি কিশোর দাস নির্বাচন করলো, যে তখনও যৌবনে পদার্পণ করেনি। তবে দাসটি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। চোখে-মুখে তার বুদ্ধিমত্তার ছাপ। আর এটা দেখেই সে তাকে চয়ন করেছে। দাম মিটিয়ে কিশোর দাসটিকে সে সংগে নিয়ে চললো।
কিছুদূর যাওয়ার পর উম্মু আনমার দাসটির দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলোঃ
বৎস, তোমার নাম কি?
খাব্বাব।
আব্বার নাম?
আল-আরাত।
তোমার জম্মভূমি কোথায়?
নাজদ।
তাহলে তুমি আরবের অধিবাসী?
হাঁ, বনু তামীমের সন্তান।
তুমি মক্কার এ দাসের আড়তে এলে কিভাবে?
আরবের কোন এক গোত্র আমাদের গোত্রের উপর আক্রমণ করে গৃহপালিত পশু-পাখি লুট করে নিয়ে যায়, পুরুষদের হত্যা করে এবং নারী-শিশুদের বন্দী করে দাসে পরিণত করে। আমি সেই বন্দী শিশুদের একজন। তারপর হাত বদল হয়ে মক্কায় পৌঁছেছি এবং বর্তমানে আপনার হাতে।
উম্মু আনমার তার দাসটিকে তরবারি নির্মাণের কলা-কৌশল শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে মক্কার এক কর্মকারের হাতে সোপর্দ করলো। অল্প দিনের মধ্যে এ বুদ্ধিমান দাস তরবারি নির্মাণ শিল্পে দক্ষ হয়ে ওঠে। উম্মু আনমার একটি দোকান ভাড়া নিয়ে কর্মকারের সাজ-সরঞ্জাম ক্রয় করে তাকে তরবারি তৈরীর কাজে লাগিয়ে দেয়।
তাঁর সততা, নিষ্ঠা, আমানতদারি এবং তরবারি তৈরীর দক্ষতার কথা অল্প দিনের মধ্যে মক্কায় ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ তাঁর নির্মিত তরবারি খরীদের জন্য তাঁর দোকানে ভীড় জমাতে থাকে।
তরুণ হওয়া সত্বেও খাব্বাব লাভ করেছিলেন বয়স্কদের বুদ্ধিমত্তা ও বৃদ্ধদের জ্ঞান। তিনি কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে জাহিলী সমাজ যে বিপর্যয়ের মধ্যে আপাদমস্তক নিমজ্জিত সে সম্পর্কে আপন মনে ভাবতেন। তিনি ভাবতেন, কী মারাত্মক মূর্খতা ও ভ্রান্তির মধ্যেই না গোটা আরব জাতি হাবুডুবু খাচ্ছে এবং যার এক নিকৃষ্ট বলি সে নিজেই। তিনি চিন্তা করতেন, অবচেতন মনে মাঝে মাঝে বলতেন, এই রাত্রির শেষ অবশ্যই আছে। এই শেষ দেখার জন্য মনে মনে তিনি দীর্ঘায়ূ কামনা করতেন।
দীর্ঘদিন খাব্বাবকে অপেক্ষা করতে হলো না। তিনি শুনতে পেলেন, বনু হাশিমের এক যুবক মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহর মুখ থেকে নূরের জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। তিনি ছুটে গেলেন। তাঁর কথা শুনলেন এবং সেই জ্যোইত অবলোকন করলেন। সাথে সাথে হাত বাড়িয়ে উচ্চারণ করলেনঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু। এভাবে তিনি হলেন বিশ্বের ষষ্ঠ মুসলমান। এ কারণে তাঁকে ‘সাদেসুল ইসলাম’ বলা হয়। অবশ্য মুজাহিদ বলেনঃ সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ (সা) ইসলামের ঘোষণা দেন। তারপর যথাক্রমেঃ আবু বকর, খাব্বাব, সুহাইব, বিলাল, আম্মার ও আম্মারের মা সুমাইয়্যা ইসলামের ঘোষণা দেন। এই বর্ণনা মতে খাব্বাব তৃতীয় মুসলমান। (উসুদুল গাবা-২/৯৮, আল-ইসাবা-১/৪২৬) হযরত রাসূলে কারীম (সা) যখন হযরত আরকাম ইবন আবিল আরকামের গৃহে গোপনে ইসলামের দাওয়াত দিতেন, খাব্বাব তখনই ইসলাম গ্রহণ করেন।
এখন থেকে খাব্বাবের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলো। আর তা হলো সত্যের জন্য হাসিমুখে যুলুম-অত্যাচার সহ্য করা ও সত্যের প্রচারে জীবন বাজি রাখার অধ্যায়। খাব্বাব তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা কারো কাছে গোপন করলেন না। অল্প সময়ের মধ্যে এ খবর তাঁর মনিব উম্মু আনমারের কানে পৌঁছল। ক্রোধে সে উম্মত্ত হয়ে উঠলো। সে তার ভাই সিবা ইবন আবদিল উযযাসহ বনী খুযা’য়ার একদল লোক সংগে করে খাব্বাবের কাছে গেল। তিনি তখন গভীর মনোযোগের সাথে কাজে ব্যস্ত। একটু এগিয়ে গিয়ে সিবা বললোঃ
তোমার সম্পর্কে আমারা একটি কথা শুনেছি, আমরা তা বিশ্বাস করিনি।
কি কথা?
শুনেছি, তুমি নাকি ধর্মত্যাগ করে বনী হাশিমের এক যুবকের অনুসারী হয়েছো?
আমি ধর্মত্যাগী হইনি, তবে লা শরীক এক আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি। তোমাদের মুর্তিপূজা ছেড়ে দিয়েছি এবং সাক্ষ্য দিয়েছি, মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।
খাব্বাবের কথাগুলি তাদের কানে পৌঁছার সাথে সাথে তারা তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। হাত দিয়ে কিল-ঘুষি ও দিয়ে দিয়ে পিষতে শুরু করলো। তাঁর দোকানের সব হাতুড়ি, লোহার পাত ও টুকরা তাঁর ওপর ছুঁড়ে মারলো। খাব্বাব সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন, দেহ তাঁর রক্তে রঞ্জিত হলো।
অন্য এক দিনের ঘটনা। কুরাইশদের কতিপয় ব্যক্তি তাদের অর্ডার দেওয়া তরবারি নেওয়ার জন্য খাব্বাবকে বাড়ীতে গেল। খাব্বাব তরবারি তৈরী করে মক্কায় বিক্রি করতেন এবং বাইরেও চালান দিতেন। ব্যস্ততার কারণে তিনি খুব কম সময়ই বাড়ী থেকে অনুপস্থিত থাকতেন। কিন্তু তারা খাব্বাবকে বাড়ীতে পেলনা। তারা তাঁর অপেক্ষায় থাকলো। কিছুক্ষণ পর খাব্বাব বাড়ীতে এলেন। তাঁর মুখমণ্ডলে একটা উজ্জ্বল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। তিনি আগত লোকদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বসলেন। তারা জিজ্ঞেস করলোঃ খাব্বাব, তরবারিগুলি কি বানানো হয়েছে?
খাব্বাবের চোখে মুখে একটা খুশীর আভা। আপন মনে তিনি কি যেন ভাবছেন। এ সময় অবেচেতনভাবে বলে উঠলেনঃ ‘তাঁর ব্যাপারটি বড় অভিনব ধরনের।’
সাথে সাথে লোকগুলি প্রশ্ন করলোঃ তুমি কার কথা বলছো? আমরা তো জানতে চাচ্ছি, তরবারিগুলি বানানো হয়েছে কিনা।
তাদের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে খাব্বাব বললেনঃ
তোমারা কি তাঁকে দেখেছো? তাঁর কোন কথা কি তোমরা শুনেছো?
তারা বিস্ময়ের সাথে একজন আরেকজনের দিকে তাকালো। তাদের একজন একটু রসিকতা করে জিজ্ঞেস করলোঃ তুমি কি তাকে দেখেছো?
খাব্বাব একটু হেঁয়ালীর মত প্রশ্ন করলেনঃ তুমি কার কথা বলছো?
উত্তেজিত কন্ঠে লোকটি জবাব দিলঃ তুমি যার কথা বলছো, আমি তার কথাই বলছি।
সত্য প্রকেশের এ সুযোগটুকু খাব্বাব ছাড়লেন না। তিনি বললেনঃ হাঁ, তাঁকে আমি দেখেছি এবং তাঁর কথাও শুনেছি। আমি দেখেছি, সত্য তাঁর চতুর্দিক থেকে প্রবাহিত হচ্ছে, নূর তাঁর মুখের মধ্যে দীপ্তিমান হয়ে উঠেছে।
আগত লোকেরা এখন বিষয়টি বুঝতে শুরু করলো। তাদের একজন চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলোঃ
ওহে উম্মু আনমারের দাস! তুমি কার কথা বলছো? শান্তভাবে খাব্বাব জবাব দিলেনঃ
আমার আরব ভায়েরা, তিনি আর কে, তোমাদের কাওমের মধ্যে তিনি ছাড়া আর কে আছেন যার চতুর্দিক থেকে সত্য প্রবাহিত, যার মুখে নূরের আভা দীপ্তিমান?
আমাদের ধারণা, তুমি মুহাম্মাদের কথাই বলছো। খাব্বাব মাথাটি একটু দুলিয়ে উৎফুল্লভাবে বললেনঃ
হাঁ, তিনি আমাদের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর আসূল। আমাদের আন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে আসার জন্য আল্লাহ তাঁকে পাঠিয়েছেন।
এ কথা গুলি উচ্চারণের পর তাঁর মুখ থেকে আর কি বেরিয়েছিল, অথবা তাকে কী বলা হয়েছিল, তিনি তা জানেন না। যতটুকু মনে আছে, কয়েক ঘন্টা পর যখন তিনি জ্ঞান ফিরে পেলেন, দেখলেন সেই লোকগুলি নেই। তাঁর শরীর ব্যথা-বেদনায় অসাড় এবং সমস্ত শরীর ও পরনের কাপড়-চোপড় রক্তে একাকার। ঘটনাটি তাঁর বাড়ীর সামনেই ঘটলো। তিনি কোন মতে উঠে বাড়ীর ভেতরে গেলেন, আহত স্থানে পট্টি লাগিয়ে নতুন পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৩০)
এভাবে হযরত খাব্বাব দ্বীনের খাতিরে যুলুম-অত্যাচারের শিকার মানুষদের মধ্যে এক বিশেষ স্থানের অধিকারী হলেন। দরিদ্র ও দুর্বল হওয়া সত্বেও যারা কুরাইশদের অহমিকা ও বিকৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন খাব্বাব তাঁদের এক প্রধান পুরুষ।
শুকনো পাতার আগুনের মত খাব্বাবের নতুন দ্বীন গ্রহণ এবং তাঁর শাস্তি ভোগের কথা মক্কার অলি-গলিতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো। খাব্বাবের দুঃসাহসে মক্কাবাসীরা বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল। ইতোপূর্বে তারা একথা আর কক্ষণো শোনেনি যে, কেউ মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে এভাবে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জের সুরে মানুষের সামনে তা ঘোষণা করেছে।
খাব্বাবের ব্যাপারটি কুরাইশ নেতাদের নাড়া দিল। উম্মু আনমারের নাম-গোত্র ও সহায় সম্বলহীন এ দাস কর্মকারটি-যে এভাবে তাদের ক্ষমতা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এবং তাদের উপাস্য দেব-দেবী ও পিতৃ-পুরুষের ধর্মের নিন্দে-মন্দের আস্পর্ধা ও দুঃসাহস দেখাবে, তা তাদের ধারণায় ছিল না। তারা মনে করলো, এমন পিটুনির পর সে হয়তো শান্ত হয়ে যাবে, কক্ষণো আর এমন বোকামী করবে না।
কুরাইশদের ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হলো। বরং উল্টো ফল ফললো। খাব্বাবের এই দুঃসাহসে তাঁর সঙ্গী-সাথীদের সাহস বেড়ে গেল। প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা দেওয়ার জন্য তারাও উৎসাহী হয়ে পড়লো। একের পর এক তারা সত্যের কালেমা ঘোষণা করতে শুরু করলো।
আবু সুফইয়ান ইবন হারব, ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা, আবু জাহল প্রমুখ কুরাইশ নেতৃবৃন্দ কা’বার চত্বরে সমবেত হলো। তারা মুহাম্মাদের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলো। তারা দেখলো, তাঁর বিষয়টি দিন দিন, এমনকি ঘন্টায় ঘন্টায় বৃদ্ধি ও গুরুত্ব লাভ করে চলেছে। তারা বিষয়টি আর বাড়তে না দিয়ে এখনই মূ্লোৎপাটনের দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করে সিদ্ধান্ত নিলঃ আজ থেকে প্রতিটি গোত্র, সেই গোত্রের মুহাম্মাদের অনুসারীদের ওপর যুলুম-অত্যাচার চালাতে শুরু করবে। এতে হয় তারা তাদের নতুন দ্বীন ত্যাগ করবে, না হয় মৃত্যুবরণ করবে।
সিবা ইবন আবাদিল উযযা ও তার গোত্রের ওপর খাব্বাবকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব অর্পিত হলো। মধ্যাহ্ন সূর্যের প্রচণ্ড খরতাপে মাটি যখন উত্তপ্ত হয়ে উঠতো, তারা খাব্বাবকে মক্কার উপত্যকায় টেনে আনতো। তাঁর শরীর সম্পূর্ণ উদোম করে লোহার বর্ম পরাতো। প্রচণ্ড গরমে পিপাসায় তিনি কাতর হয়ে পড়তেন, তবুও এক ফোঁটা পানি দেওয়া হতো না। দারুণ পিপাসায় তিনি যখন ছটফট করতে থাকতেন, তারা তাঁকে বলতোঃ
মুহাম্মাদ সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কি?
বলতেনঃ তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। অন্ধকার থেকে আলোয় নেওয়ার জন্য সত্য ও সঠিক দ্বীন সহকারে তিনি আমাদের নিকট এসেছেন।
তারা আবার মারপিট করতো ও কিল-ঘুষি মারতো। তারপর জিজ্ঞেস করতোঃ
লাত ও উযযা সম্পর্কে তোমার বক্তব্য কি? বলতেনঃ ক্ষতি বা কল্যাণের কোন ক্ষমতা এ দু’টি বোবা-বধির মূর্তির নেই।
তারা আবার পাথর আগুনে গরম করে সেই পাথরের ওপর তাঁকে শুইয়ে দিত। খাব্বাব বলেনঃ একদিন তারা আমাকে ধরে নিয়ে গেল। তারা আগুন জ্বালিয়ে পাথর গরম করলো এবং সেই পাথরের উপর আমাকে শুইয়ে দিয়ে একজন তার একটি পা আমার বুকের ওপর উঠিয়ে ঠেসে ধরে রাখলো। (হায়াতুস, সাহাবা-১/২৯২) এভাবে তিনি শুয়ে থাকতেন, আর তাঁর দু’ কাধের চর্বি গলে বেয়ে পড়তো। ইমাম শা’বী বলেন, তাঁর পিঠের মাংস উঠে যেত।
তাঁর মনিব উম্মু আনমার তার ভাই সিবা অপেক্ষা হিংস্রতায় কোন অংশে কম ছিল না। একদিন নবী মুহাম্মাদকে (সা) খাব্বাবের দোখানে দাঁড়িয়ে তাঁর সাথে কথা বলতে দেখে সে ক্ষ্যাপা কুকুরের মত হয়ে গেল। সে একদিন পর পর খাব্বাবের দোকানে আসতো এবং খাব্বাবের হাপরে লোহার পাত গরম করে তাঁর মাথায় ঠেসে ধরতো। তীব্র যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে করতে চেতনা হারিয়ে ফেলতেন।
একদিন যখন লোহা গরম করে খাব্বাবের মাথায় ঠেসে ধরা হচ্ছে, ঠিক সেই সময় ঐ পথ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) কোথাও যাচ্ছিলেন। খাব্বাবের এই অবস্থা দেখে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। হৃদয় বিগলিত হয়ে গেল। কিন্তু তাঁর কী-ই বা করার ক্ষমতা ছিল? খাব্বাবের জন্য দু’আ ও তাঁকে কিছু সান্তনা দেওয়া ছাড়া তিনি আর কিছুই করতে পারলেন না। দু’হাত আকাশের দিকে উঠিয়ে অত্যন্ত আবেগের সাথে বললেনঃ ‘আল্লাহুমা উনসুর খাব্বাবানা – হে আল্লাহ। খাব্বাবকে আপনি সাহায্য করুন।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩৩১)
উম্মু আনমারের প্রতি খাব্বাবের বদ-দু’আ আল্লাহ পাক কবুল করেছিলেন। তিনি স্বচক্ষে মক্কা থেকে মদীনায় হিজারাতের পূর্বেই তার ফল দেখতে পান। উম্মু আনমারের মাথায় অকস্মাৎ এমন যন্ত্রণা শুরু হয় যে, সে সব সময় কুকুরের মত ঘেউ ঘেউ করতে থাকে। তার ছেলেরা চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন ডাক্তারের কাছে গেল। সব ডাক্তারই বললোঃ এ যন্ত্রণা নিরাময়ের কোন ঔষধ নেই। তবে লোহা আগুনে গরম করে মাথায় সেক দিলে একটু উপশম হতে পারে। লোহার পাত গরম করে তার মাথায় সেক দেওয়া শুরু হলো।
খলীফা হযরত উমারের (রা) খিলাফতকালে একদিন খাব্বাব গেলেন তাঁর কাছে। খলীফা অত্যধিক সমাদরের সাথে তাঁকে একটা উচু গদির ওপর বসিয়ে বললেনঃ একমাত্র বিলাল ছাড়া এই স্থানে বসার জন্য তোমার থেকে অধিকতর উপযুক্ত ব্যক্তি আর কেউ নেই। খাব্বাব বললেনঃ তিনি আমার সামান হতে পারে কেমন করে? মুশরিকদের মধ্যেও তাঁর অনেক সাহায্যকারী ছিল; কিন্তু এক আল্লাহ ছাড়া আমার প্রতি সমবেদনা জানানোর আর কেউ ছিল না। কুরাইশদের হাতে তিনি যে নির্যাতন ভোগ করেছিলেন, খলীফা তা জানতে চাইলেন। কিন্তু খাব্বাব তা জানাতে সংকোচ বোধ করলেন। খলীফার বার বার পীড়াপীড়িতে তিনি চাদর সরিয়ে নিজের পিঠটি আলগা করে দিলেন। খলীফা তাঁর পিঠের বীভৎস রূপ দেখে আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করেন; এ কেমন করে হলো?
খাব্বাব বললেনঃ পৌত্তলিকরা আগুন জ্বালালো। যখন তা অঙ্গারে পরিণত হলো, তারা আমার শরীরের কাপড় খুলে ফেললো। তারপর তারা আমাকে জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে তার ওপর চিৎ করে শুইয়ে দিল। আমার পিঠের হাড় থেকে মাংস খসে পড়লো। আমার পিঠের গলিত চর্বিই সেই আগুন নিভিয়ে দেয়। এ ঘটনায় তাঁর পিঠের চামড়া শ্বেতী-রোগীর মত হয়ে গিয়েছিল। (হায়াতুস সাহাবা-১/২৯২, মুসতাদরিক, সীরাতু ইবন হিশাম, টীকা-১/৩৪৩)
দৈহিক নির্যাতনের সাথে সাথে কুরাইশরা তাঁকে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ ও উপহাস করতো। তাঁর পাওনা অর্থও তাঁরা আত্মসাৎ করে ফেলতো। ইবন ইসহাক বলেনঃ আস ইবন ওয়ায়িল আস-সাহমী নামক মক্কার এক কাফির তাঁর নিকট থেকে কিছু তরবারি খরিদ করে এবং এ বাবদ কিছু অর্থ তার কাছে বাকী থাকে। খাব্বাব পাওনা অর্থের তাগাদায় গেলেন। সে বললোঃ ওহে খাব্বাব, তোমাদের বন্ধু মুহাম্মাদ – যার দ্বীনের অনুসারী তুমি –সে কি এমন ধারণা পোষণ করেনা যে, জান্নাতের অধিবাসীরা স্বর্ণ, রৌপ্য, বস্ত্র অথবা চাকর-বাকর যা চাইবে লাভ করবে? খাব্বাব বললেনঃ হাঁ, করেন। সে বললোঃ খাব্বাব কিয়ামত পর্যন্ত একটু সময় দাও, আমি সেখানে গিয়ে তোমার পাওনা পরিশোধ করবো। আল্লাহর কসম, তোমার বন্ধু মুহাম্মাদ ও তুমি আমার থেকে আল্লাহর বেশী প্রিয়পাত্র নও। তোমরা আমার থেকে বেশী সৌভাগ্যও লাভ করতে পারবে না। এ ঘটনার পর আল্লাহ তা’আলা নিম্মোক্ত আয়াতগুলি নাযিল করেনঃ “তুমি কি লক্ষ্য করেছ সেই ব্যক্তিকে, যে আমার আয়াতসমুহ অস্বীকার করে এবং বলে, ‘আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হবেই। সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে অথবা দয়াময়ের নিকট হতে কোন প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে? কক্ষণোই নয়, তারা যা বলে আমি তা লিখে রাখবো এবং তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করতে থাকবো। আর সে যে বিষয়ের কথা বলে তা থাকবে আমার অধিকারে এবং সে আমার নিকট আসবে একাকী।” (সূরা মরিয়ামঃ ৭৭-৮০)
একদিন খাব্বাব তাঁর মত আরো কতিপয় নির্যাতিত বন্ধুর সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হয়ে নিজেদের দুঃখ-দুর্দশার কথা বললেন। খাব্বাব বলেনঃ আমরা যখন আমাদের কথা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট বললাম, তখন তিনি একটি ডোরাকাটা চাদর মাথার নীচ দিয়ে কা’বার ছায়ায় শুয়ে ছিলেন। আমরা বললামঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য ও ক্ষমা চাইবেন না?
আমাদের কথা শুনে রাসূলুল্লাহর (সা) চেহরা মুবারক লাল হয়ে গেল। তিনি ওঠে বসলেন। তারপর বললেনঃ “তোমাদের পূর্ববর্তী অনেক লোককে ধরে গর্তে খুঁড়ে তার অর্ধাংশ পোতা হয়েছে, তারপর করাত দিয়ে মাথার মাঝখান থেকে ফেঁড়ে ফেলা হয়েছে। লোহার চিরুনী দিয়ে তাদের হাড় থেকে গোশত ছড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তবুও তাদের দ্বীন থেকে তারা বিন্দুমাত্র টলেনি। আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই এই দ্বীনকে পূর্ণতা দান করবেন। এমন একদিন আসবে যখন একজন পথিক ‘সান’আ’ থেকে ‘হাদরামাউত’ পর্যন্ত ভ্রমণ করবে। এই দীর্ঘ ভ্রমণে সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো ভয় করবে না। তখন নেকড়ে মেষপাল পাহারা দিবে। কিন্তু তোমরা বেশী অস্থির হয়ে পড়ছো’ (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৩১, উসুদুল গাবা-২/৯৮)
খাব্বাব ও তাঁর বন্ধুরা মনোযোগ সহকারে রাসূলুল্লহর (সা) এ বাণী শুনলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যে পরিমাণ সবর ও কুরবাণী – ধৈর্য ও ত্যাগ পছন্দ করেন, তাঁরা তা করবেন। এভাবে তাঁদের ঈমান আরো মজবুত হয়ে যায়।
উম্মু আনমার খাব্বাবকে আযাদ করার পূর্ব পর্যন্ত তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলতে থাকে। ইমাম শা’বী বলেন, ‘শত নির্যাতনের মুখেও খাব্বাব ধৈর্য ধারণ করেন। কাফিরদের অত্যাচারে তাঁর শিরদাঁড়া একটুও দুর্বল হয়ে পড়েনি।’ মক্কায় অবস্থানকালে তিনি তাঁর সবটুকু সময় ইবাদাত ও তাবলীগে দ্বীনের কাজে ব্যয় করতেন। মক্কায় তখনও যারা ভয়ে নিজেদের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেনি, তিনি গোপনে তাদের বাড়ীতে যেয়ে যেয়ে কুরআন শিক্ষা দিতেন। হযরত উমারের (রা) বোন-ভগ্নিপতি ফাতিমা ও সা’ঈদকে তিনি গোপনে কুরআন শিক্ষা দিতেন। যেদিন হযরত রাসূলে কারীমকে হত্যার উদ্দেশ্যে উমার (রা) বের হলেন এবং পথে নু’য়াইম ইবন আবদিল্লাহর নিকট তাঁর বোন-ভগ্নিপতির ইসলাম গ্রহণের খবর শুনে তাদের বাড়ীতে উপস্থিত হলেন, সেদিন সেই সময় খাব্বাব (রা) তাদের কুরআন শিক্ষা দিচ্ছলেন। উমারের (রা) উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি ফাতিমার বাড়ীর এক কোণে আত্মগোপন করেন। অতঃপর উমারের (রা) মধ্যে কুরআন পাঠের পর ভাবান্তর সৃষ্টি হলে তিনি যখন বললেন, তোমরা আমাকে মুহাম্মাদের কাছে নিয়ে চল, তখন খাব্বাব গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে আসেন। তিনি উমারকে (রা) বলেন, ওহে উমার, আমি আশা করি তোমার ব্যাপারে আল্লাহর নবীর দু’আ কবুল হয়েছে। গতকাল আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) দু’আ করতে শুনেছিঃ ‘হে আল্লাহ, তুমি আবুল হাকাম অথবা উমার ইবনুল খাত্তাব – এ দু’ ব্যক্তির কোন একজনের দ্বারা ইসলামকে সাহায্য কর।’ উমার বললেনঃ খাব্বাব মুহাম্মাদ এখন কোথায় আমাকে একটু বল। আমি তাঁর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে চাই। খাব্বাব বললেনঃ তিনি এখন সাফা পাহাড়ের নিকটে একটি বাড়ীতে তাঁর কিছু সংগীর সাথে অবস্থান করছেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৪৩, ৩৪৫, হায়াতুস সাহাবা-১/২৯৭)
একদিন কুরাইশদের দুই নেতা আকরা ইবন হাবিস ও উ’য়াইনা ইবন আল-ফাযারী রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে দেখলো, তিনি আম্মার, সুহাইব, বিলাল, খাব্বাব প্রমুখ দাস ও দুর্বল মু’মিনদের সাথে বসে আছেন। নেতৃদ্বয় উপস্থিত সকলকে উপেক্ষা করে হযরত রাসূলে কারীমকে (সা) একটু দূরে ডেকে নিয়ে যেয়ে বললোঃ আরবের নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধি আপনার কাছে আসে। এই দাসদের সাথে আমরা এক সংগে বসি, তাদের একটু দূরে সরিয়ে দেবেন। রাসূল (সা) তাদের কথায় সায় দিলেন। তারা বললো, বিষয়টি তাহলে এখনই লেখাপড়া হয়ে যাক। রাসূল (সা) আলীকে ডেকে কাগজ-কলম আনালেন। খাব্বাব বলেনঃ আমরা তখন একটু দূরে বসে আছি। এমন সময় জিবরীল (আ) এ আয়াতগুলি নিয়ে হাজির হলেনঃ “যারা তাদের প্রতিপালককে সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ডাকে তাদের তুমি দূরে সরিয়ে দিওনা। তাদের কর্মের জবাবদিহির দায়িত্ব তোমার নয় যে, তুমি তাদের বিতাড়িত করবে। আর তা করলে তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” (সূরা আল আনআমঃ ৫২-৫৩)
খাব্বাব বলেন, উপরোক্ত আয়াত নাযিলের সাথে সাথে হযরত রাসূলে কারীম (সা) কাগজ-কলম ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমাদেরকে কাছে ডাকলেন। আমরা কাছে গেলে তিনি আমাদের সালাম জানালেন। আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) হাঁটুর সাথে হাঁটু মিলিয়ে বসলাম। আর তক্ষুণি আল্লাহ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেনঃ
“তুমি নিজেকে ধৈর্যশীল রাখবে তাদের সাথে যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের প্রতিপালককে আহবান করে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এবং তুমি পার্থিব জীবনের শোভা কামনা করে তাদের দিক হতে তোমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিওয়া।” (সূরা কাহাফ-২৮)
খাব্বাব বলেন, এর পর থেকে আমরা যখনই রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে বসতাম, আমরা না ওঠা পযর্ন্ত তিনি উঠতেন না। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪৭৫)
খাব্বাব দীর্ঘকাল মক্কার কুরাইশদের সীমাহীন নির্যাতন ধৈর্যের সাথে সহ্য করে মক্কার মাটি আঁকড়ে থাকেন। অবশেষে আল্লাহ পাক হিজরাতের অনুমতি দান করেন এবং তিনি মদীনায় হিজরাত করেন। অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রিজামন্দী-লাভের উদ্দেশ্যেই তিনি হিজরাত করেছেন। তিনি বলতেন, আমি কেবল আল্লাহর জন্যই রসূলুল্লাহর সাথে হিজরাত করেছি। মদীনায় আসার পর হযরত রাসূলে কারীম (সা) হযরত খিরাশ ইবন সাম্মার সাথে মতান্তরে জিবর ইবন উতাইকের সাথে তাঁর মুওয়াখাত বা দ্বীনী-ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। (উসুদুল গাবা-২/৯৯)
মদীনায় আসার পর হযরত খাব্বাবের জীবনে একটু শাস্তি ও নিরাপত্তা দেখা দেয়। যে শাস্তি ও নিরাপত্তা থেকে তিনি আজম্ম বঞ্চিত ছিলেন। এখানে তিনি রাসূলে কারীমের একান্ত সান্নিধ্যে লাভের সুযোগ পান। বদর ও উহুদসহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে যোগ দেন। উহুদের যুদ্ধে তিনি উম্মু আনমারের ভাই সিবা’র পরিণতি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। এদিন সে হযরত হামযার (রা) হাতে নিহত হয়।
হযরত খাব্বাবের (রা) সারাটি জীবন দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়েছে। ইসলাম-পূর্ব ও ইসলাম-পরবর্তী কিছুকাল তরবারি নির্মাণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জীবনের শেষ ভাগে তাঁর যথেষ্ট সচ্ছলতা আসে। খলীফা হযরত উমার ও হযরত উসমানের খিলাফতকালে যখন সকল সাহাবীর নিজ নিজ মর্যাদা অনুসারে ভাতা নির্ধারিত হয়, হযরত খাব্বাব তখন থেকে মোটা অংকের ভাতা লাভ করেন। তখন প্রচুর অর্থ তাঁর হাতে জমা হয়ে যায়। তবে সেই অর্থের সাথে তাঁর আচরণ ছিল ব্যতুক্রমধর্মী। তিনি তাঁর দিরহাম ও দীনারসমুহ একটি উম্মুক্ত স্থানে রেখে দেন। অভাবগ্রস্ত ও ফকীর মিসকীনরা সেখান থেকে ইচ্ছামত নিজেদের প্রয়োজন অনুসারে নিয়ে যেত। এজন্য কোন অনুমতির প্রয়োজন হতো না। এতকিছু সত্বেও এ চিন্তা করে তিনি সব সময় ভীত ছিলেন যে, হয়তো আল্লাহ তাঁর এ সম্পদের হিসাব চাইবেন এবং এ জন্য শাস্তি ভোগ করতে হবে।
তাঁর সংগী-সাথীদের একটি দল বলেনঃ “ আমরা খাব্বাবের অন্তিম রোগ শয্যায় তাঁকে দেখতে গেলাম। তিনি তাঁর জরাজীর্ণ ঘরের একদিকে ঈঙ্গিত করে আমাদের বললেনঃ এই স্থানে আশি হাজার দিরহাম আছে। আল্লাহর কসম, কক্ষণো স্থানটির মুখ বন্ধ করিনি এবং কোন সায়েলকেও তা থেকে গ্রহণ করতে নিষেধ করিনি। একথা বলে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বন্ধুরা তাঁকে বললেনঃ আপনি কাঁদছেন কেন? বললেনঃ আমার সঙ্গীরা দুনিয়াতে তাদের কাজের কোন প্রতিদান না নিয়ে চলে গেছে। আমি বেঁচে আছি এবং এত সম্পদের মালিক হয়েছি। আমার ভয় হয়, এই সম্পদ আমার সৎকাজের প্রতিদান কিনা। আর এজন্য আমি অস্থির হয়ে কাঁদি। তারপর তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, যখন তিনি নিজের জন্য ক্রয় করা দামী কাফনের দিকে ইঙ্গিত করে একথাগুলি বললেনঃ তোমরা দেখ, এই আমর কাফনের কাপড়। কিন্তু রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা হযরত হামযা উহুদে শাহাদাত বরণ করলে তাঁর কাফনের জন্য একটি চাদর ছাড়া আর কোন কাপড় পাওয়া গেল না। সেই চাদর দিয়ে তার মাথা ঢাকলে পা এবং পা ঢাকলে মাথা বেরিয়ে পড়ছিল।”
হিজরী ৩৭ সনে তিনি কূফায় রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। চিকিৎসা সত্বেও রোগ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। দীর্ঘদিন রোগ যন্ত্রণা ভোগ করতে থাকেন। এ অবস্থায় তিনি মাঝে মাঝে বলতেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) যদি মৃত্যু কামনা করতে নিষেধ না করতেন তাহলে আমি মৃত্যুর জন্য দু’আ করতাম। (আল-ইসাবা-১/৪১৬, উসদুল গাবা-২/৯৯) তাঁর মৃত্যুর সন, স্থান ও মৃত্যুকালে বয়স সম্পর্কে সীরাত লেখকদের মধ্যে মতভেদ আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতানুযায়ী হিজরী ৩৯ সনে সিফফীন যুদ্ধের পর ৭২ বছর বয়সে কূফায় ইনতিকাল করেন। অসুস্থতার কারণে সিফফীন যুদ্ধে যোগদান করতে পারেননি। হযরত আলী (রা) সিফফীন যুদ্ধ থেকে ফেরার পথে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পান এবং তিনিই নামাযে জানাযার ইমামতি করেন। কূফাবাসীরা সাধারণতঃ শহরের ভেতরেই মৃতদের দাফন করতো। মৃত্যুর পূর্বে হযরত খাব্বাব অসিয়াত করে যান, তাঁকে যেন শহরের বাইরে দাফন করা হয়। তাঁর অসিয়াত মুতাবিক তাঁকে কূফা শহরের বাইরে দাফন করা হয়। কূফা শহরের বাইরে দাফনকৃত প্রথম সাহাবী তিনি। (উসুদুল গাবা-২/১০০)
হযরত খাব্বাবকে দাফন করার পর আমীরুল মুমিনীন আলী (রা) তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছিলেনঃ “আল্লাহ খাব্বাবের ওপর রহম করুন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন ব্যাকুলভাবে, হিজরাত করেন অনুগত হয়ে এবং জীবন অতিবাহিত করেন মুজাহিদ রূপে। যারা সৎকাজ করে আল্লাহ তাদের ব্যর্থ করেন না।”
হযরত খাব্বাবের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) কথা ও কাজ জানার প্রবল ঔৎসুক্য ছিল। কখনও কখনও রাসূলুল্লাহর (সা) অজ্ঞাতসারে রাত জেগে জেগে তাঁর ইবাদাতের কায়দা-কানুন দেখতেন এবং সকাল বেলা সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন। একবার রাসূল (সা) সারারাত নামায পড়লেন, আর তিনি চুপিসারে তা দেখলেন। সকালে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট এসে বললেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার মাতা-পিতা আপনার প্রতি কুরবান হোক। গত রাতে আপনি এমন নামায পড়েছেন যা এর আগে আর কখনও পড়েননি। তিনি বলেলনঃ হাঁ, এটা ছিল আশা ও ভীতির নামায, আমি আল্লাহর কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছিলাম, দু’টি দান করেছেন; কিন্তু একটি দেননি। একটি ছিল, আল্লাহ যেন আমার উম্মাতের দুর্ভিক্ষের দ্বারা ধ্বংস না করেন। এটা কবুল করেছেন। আরেকটি ছিল, বিজাতীয় কোন শত্রুকে যেন আমার উম্মাতের উপর বিজয়ী না করেন। এটাও আল্লাহ কবুল করেছেন। তৃতীয়টি ছিল, আমার উম্মাতের একদলের হাতে অন্যদল যেন নিষ্ঠুরতার শিকার না হয়। এটা কবুল হয়নি। (উসুদুল গাবা-২/৯৯)
তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) তেত্রিশটি (৩৩) হাদীস বর্ণনা করেছেন। তম্মধ্যে তিনটি মুত্তাফাক আলাইহি, দু’টি বুখারী ও একটি মুসলিম এককভেবে বর্ণনা করেছেন। সাহাবা ও তাবেঈদের মধ্যে যে সকল উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্য তাঁর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেনঃ তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ, আবু উমামা বাহিলী, আবু মা’মার, আবদুল্লাহ ইবন শুখাইর, কায়েস ইবন আবী হাযেম, মাসরূক ইবন আজাদা, আলকামা ইবন কায়েস প্রমুখ।
হযরত খাব্বাব ইবনুল আরাতের কন্যা বর্ণনা করেছেন। আমার আব্বা একবার জিহাদে চলে গেলেন। বিদায় বেলা আমাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য একটি মাত্র ছাগী রেখে বলে গেলেনঃ ছাগীটির দুধ দোহনের প্রয়োজন হলে আহলুস সুফফার কাছে নিয়ে যাবে। আমরা ছাগীটি তাদের কাছে নিয়ে গেলাম। আমরা সেখানে রাসূলকে (সা) বসা দেখলাম। তিনি ছাগীটি বেঁধে দুইলেন। তিনি বললেনঃ তোমাদের ঘরের সবচেয়ে বড় পাত্রটি আমার কাছে নিয়ে এস। আমি আটা মাখার পাত্রটি নিয়ে এলাম। তিনি তাতে দুধ দুইলেন এবং তা ভরে গেল। তিনি দুধ ভরা পাত্রটি আমাদের হাতে দিয়ে বললেনঃ নিয়ে যাও, নিজেরা পান করবে, পাড়া-প্রতিবেশীদেরও দেবে। আর যখনই প্রয়োজন হয় ছাগীটি আমার কাছে এনে দুইয়ে নিয়ে যাবে। আমরা প্রায়ই ছাগীটি রাসূলুল্লাহর (সা) হাত দ্বারা দুইয়ে নিয়ে আসতাম। আমার আব্বা জিহাদ থেকে ফিরে এলেন। তিনি যখনই ছাগীটি দুইতে গেলেন, দুধ বন্ধ হয়ে গেল। আমার আম্মা বললেনঃ তুমি ছাগীটি নষ্ট করে দিলে আগে আমরা এই পাত্র ভরে দুধ পেতাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ কে দুইতো? আম্মা বললেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা)। তিনি বললেনঃ তুমি কি আমাকে তাঁর সমকক্ষ মনে করলে? তাঁর চেয়ে বেশী বরকত বিশিষ্ট হাত আর কার আছে? (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৩৭)
আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ আস-সাহমী-(রা)

আবু হুজাফাহ আবদুল্লাহ নাম। পিতার নাম হুজাফাহ। কুরাইশ গোত্রের বনী সাহম শাখার সন্তান। ইসলামী দাওয়াতের প্রথম ভাগে মুসলমান হন এবং দীর্ঘদিন যাবত হযরত রাসূলেপাকের (সা) সাহচর্যে অবস্থান করেন। তাঁর ভাই কায়েস ইবন হুজাফাহকে সঙ্গে করে হাবশাগামী মুহাজিরদের দ্বিতীয় কাফিলার সাথে হাবশায় হিজরাত করেন। (আল-ইসতিয়াব)
একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধেই তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে শরিক হন। আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) তাঁকে ‘বদরী’ বা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মুসা বিন উকবা, ইবন ইসহাক ও অন্যরা তাঁকে ‘বদরী’ বলে উল্লেখ করেননি। (আল-ইসতিয়াব)
রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে একটি অভিযানের আমীর বানিয়ে পাঠান। যাত্রার প্রাক্কালে তাঁর অধীনস্থ সৈনিকদের রাসূল (সা) নির্দেশ দেন, কক্ষণো তার নির্দেশ অমান্য করবে না। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার পর হযরত আবদুল্লাহ কোন কারণে ভীষণ রেগে যান। তিনি সৈনিকদের জিজ্ঞেস করেন, রাসুল (সা) কি আমার আনুগত্যের নির্দেশ দেননি? তারা বললোঃ হ্যাঁ দিয়েছে। তিনি বললেন, কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালিয়ে তার মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়। মুজাহিদরা কাঠ সংগ্রহ করে আগুন জ্বালায়। তারপর সেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে তারা একে অপরের দিকে তাকায়। অনেকে এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে বলে, আমরা আগুনের হাত থেকে বাঁচার জন্যই রাসূলুল্লাহর (সা) অনুসরণ করেছি, আর এখন সেই আগুনে জীবন দেব? এই বিতর্ক চলতে থাকে, আর এদিকে আগুন নিভে যায়। আবদুল্লাহর রাগও পড়ে যায়। অভিযান থেকে ফিরে এসে তারা ঘটনাটি রাসূলুল্লাহকে (সা) জানায়। রাসূল (সা) বললেন, যদি তোমরা ঐ আগুনে ঢুকে পড়তে, আর কোনদিন তা থেকে বের হতে পারতে না। আনুগত্য কেবল এমন সব ব্যাপারে ওয়াজিব, যার অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন। (বুখারীঃ কিতাবুল আহকাম, বাবুস সাময়ে ওয়াত তায়াহ, হায়াতুস সাহাবা-১/৬৭)
উল্লেখিত ঘটনাটি কোন কোন বর্ণনায় ভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। সেই সব বর্ণনা মতে, হযরত আবদুল্লাহর আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশটি প্রকৃত নির্দেশ ছিলনা। তিনি তাঁর সৈনিকদের সাথে একটু রসিকতা করেছিলেন। হযরত আবু সাঈদ আল খুদরী (রা) ঘটনাটি এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনীকে এক অভিযানে পাঠালেন। তিনি আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহকে এ বাহিনীর আমীর নিয়োগ করলেন। আবদুল্লাহ ছিলেন রসিক লোক। কিছুদূর চলার পর তারা এক স্থানে থামলেন। আবদুল্লাহ তাঁর বাহিনীর সদস্যদের নিকট জিজ্ঞেস করলেন, তোমাদের কি আমার আনুগত্যের নির্দেশ দেওয়া হয়নি? তারা বললোঃ হ্যাঁ। তিনি বললেন, আমি যদি তোমাদের একটি নির্দেশ দিই তোমরা পালন করবে? তারা বললোঃ হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ আমি আমার অধিকার ও আনুগত্যের দাবীতে নির্দেশ দিচ্ছি, তোমরা এ আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়। নির্দেশ লাভের সাথে সাথে বাহিনীর কোন কোন সদস্য ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। তখন তিনি বললেনঃ থাম, আমি তোমাদের সাথে একটু রসিকতা করেছি মাত্র। বাহিনী মদীনায় ফিরে আসার পর বিষয়টি রাসূলুল্লাহর (সা) কর্ণগোচর হলো। তিনি বললেনঃ কেউ যদি আল্লাহর নাফরমানির নির্দেশ দেয় তোমরা তা মানবে না। (সীরাতু ইবন হিশাম ২/৬৪০)
হিজরী ৬ষ্ঠ মতান্তরে ৭ম সনে হযরত রাসূলে কারীম (সা) আশ-পাশের রাজা বাদশাহ ও শাসকদের নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত পত্রসহ দূত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তি রোম ও পারস্য সম্রাটদ্বয়ের নিকটও দূত পাঠাবেন বলে স্থির করলেন। কিন্তু কাজটি খুব সহজ ছিলনা। এর অসুবিধার দিকগুলিও রাসূল (সা) অবহিত ছিলেন। যে সকল দেশে দূতগণ যাবে তথাকার ভাষা, সাংস্কৃতি ও মানুষ সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। সেখানে তারা সে দেশের রাজা-বাদশাহকে তাদের পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেবে। নিঃসন্দেহে এ দৌত্যগিরি মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ কাজ। হয়তো সেখানে যারা যাবে তারা আর কোনদিন ফিরে আসবে না। রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীদের সমবেত হওয়ার নির্দেশ দিলেন। তিনি ভাষণ দিতে দাড়ালেন। হামদ ও সানার পর কালেমা-ই-শাহাদাত পাঠ করলেন। তারপর বললেনঃ আম্মা বাদ! আমি তোমাদের কিছু লোককে আজমী বা অনারব বাদশাহদের নিকট পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমরা আমার সাথে দ্বিমত পোষণ করবে না, যেমন করেছিল বনী ইসরাইল ঈসা ইবন মরিয়মের সাথে।
সাহাবীরা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমরা আপনার ইচ্ছা পূরণ করবো। আপনার যেখানে ইচ্ছা আমাদের পাঠান।
হযরত রাসূলেপাক (সা) আরব-আজমের রাজা-বাদশাহদের নিকট দাওয়াতপত্র বহন করার জন্য ছয়জন সাহাবীকে নির্বাচন করলেন। এই ছয়জনের একজন হলেন আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ। পারস্য সম্রাট কিসরার নিকট রাসূলুল্লাহর (সা) বাণী বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে নির্বাচন করা হয়।
আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে স্ত্রী-পুত্রের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বের হলেন। উচু-নিচু ভূমির বিচিত্র পথ ধরে তিনি চললেন। সম্পূর্ণ একাকী। এক আল্লাহ ছাড়া সংগে আর কেউ নেই। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পারস্য পৌঁছলেন। সম্রাটের জন্য একটি পত্র নিয়ে এসেছেন – একথা তাঁর পারিষদবর্গকে জানিয়ে তিনি সম্রাটের সাথে সাক্ষাতের অনুমতি চাইলেন। বিষয়টি সম্রাটের কানে গেল। তিনি দরবার সাজানোর জন্য পারিষদবর্গকে নির্দেশ দিলেন। দরবার সাজানো হলে পারস্যের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে দরবারে ডেকে আনা হলো। তারপর আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন।
রাসূলুল্লাহর (সা) দূত হযরত আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ একটি পাতলা ‘শামলাহ’ (শরীরে পেঁচানো হয় যে চাদর) এবং একটি মোটা ‘আবা’ (লম্বা কোর্তা) গায়ে জড়িয়ে একজন সাধারণ বেদুঈন বেশে কিসরার রাজ দরবারে প্রবেশ করলেন। তিনি ছিলেন লম্বা-চওড়া সুঠাম দেহের অধিকারী। ইসলামের গরিমা ও ঈমানের গর্বে ছিলেন তিনি গর্বিত।
আবদুল্লাহকে ঢুকতে দেখেই কিসরা একজন পারিষদকে তাঁর হাত থেকে পত্রটি নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ পত্রটি লোকটির হাতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বললেনঃ ‘না, রাসূলুল্লাহ (সা) পত্রটি সরাসরি আপনার হাতে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি সে নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারিনে।’
কিসরা তাঁর লোকদের বললেন, ‘তাঁকে ছেড়ে দাও, আমার নিকট আসতে দাও।’ তিনি এগিয়ে গিয়ে কিসরার হাতে চিঠিটি দিলেন। হীরার অধিবাসী একজন আরাবী ভাষী সেক্রেটারীকে ডেকে পত্রটি খুলে পাঠ করতে বললেন। পত্রটি পাঠ করা শুরু হলঃ
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম – করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর পক্ষ থেকে পারস্য সম্রাট কিসরার প্রতি। সালামুন আলা মান ইত্তাবায়া আল-হুদা – যারা হিদায়াত গ্রহণ করেছে তাদের প্রতি সালাম।”
পত্রটির এতটুকু শুনেই কিসরা ক্রোধে ফেটে পড়লেন; তাঁর চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল, ঘাড়ের রগ ফুলে উঠলো। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা) পত্রটির সুচনা করেছেন নিজের নাম দিয়ে, অর্থাৎ কিসরার নামের পূর্বে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ এসেছে। কিসরা পত্রটি পাঠকের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন। পত্রটির বক্তব্য কি তা আর জানার প্রয়োজন বোধ করলেন না। তিনি চিৎকার করে বললেনঃ ‘সে আমার দাস, আর সে কিনা আমাকে এভাবে লিখেছে?’ তারপর আবদুল্লাহকে মজলিস থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। তাঁকে বের করে নিয়ে যাওয়া হল।
আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ কিসরার দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি জানেন না তাঁর ভাগ্যে আল্লাহ কি নির্ধারণ করেছেন। তাঁকে কি হত্যা করা হবে, না মুক্তি দেওয়া হবে? নানা রকম চিন্তা তাঁর মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগলো। মুহূর্তেই তিনি সব দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে আপন মনে বললেনঃ ‘আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহর (সা) পত্র পৌঁছানোর পর এখন আমার কপালে যা হয় হোক। আমি কোন কিছুর পরোয়া করিনে।’ একথা বলে তিনি আল্লাহর নাম নিয়ে বাহনে সাওয়ার হয়ে রওয়ানা হলেন। এদিকে কিসরার ক্রোধ কিছুটা প্রশমিত হলে আবদুল্লাহকে আবার হাজির করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তাঁকে আর পাওয়া গেল না। তারা তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাঁর কোন সন্ধান পেল না। আরব উপদ্বীপ অভিমুখী রাস্তায় খোঁজ নিয়ে তারা জানতে পেল তিনি স্বদেশের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। তাঁর আর নাগাল পাওয়া গেল না।
হযরত আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হয়ে কিসরার কাণ্ডকারখানা সবিস্তার বর্ণনা করলেন। সব কিছু শুনে রাসূল (সা) মন্তব্য করলেনঃ ‘মাযযাকাহুল্লাহু মুলকাহু – আল্লাহ তার সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন করে ফেলুন।’ (আল-ইসতিয়ার)
এদিকে ‘কিসরা’ তাঁর প্রতিনিধি, ইয়ামনের শাসক ‘বাজান’কে লিখলেন, “তোমারা ওখান থেকে দু’জন তাগড়া ও শক্তিশালী লোক পাঠিয়ে হিজাযে যে ব্যক্তি নবী বলে দাবী করেছে তাকে ধরে আমার কাছে নিয়ে আসার নির্দেশ দাও।” ‘বাজান’ দু’জন লোক নির্বাচন করে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট পাঠালো। তাদের হাতে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট লিখিত একটি পত্রও ছিল। তাতে নির্দেশ ছিল, তিনি যেন কাল বিলম্ব না করে পত্র বাহকদের সাথে কিসরার দরবারে হাজির হন। ‘বাজান’ লোক দু’টিকে আরো নির্দেশ দিল, তারা রাসূলুল্লাহ (সা) সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে ফিরে এসে তাকে অবহিত করবে।
লোক দু’টি ইয়ামন থেকে যাত্রা করে রাত-দিন ক্রমাগত চলার পর তায়েফে উপনীত হল। সেখানে তারা একটি কুরাইশ ব্যবসায়ী দলের সাক্ষাৎ লাভ করলো। তদের কাছে মুহাম্মাদ (সা) সম্পর্কে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করলো। তারা জানলো, মুহাম্মাদ এখন ইয়াসরিব (মদীনা) নগরে। কুরাইশরা লোক দু’টির আগমনের উদ্দেশ্য জানতে পেরে মহাখুশী হয়ে মক্কায় ফিরলো। তারা মক্কাবাসীদের সুসংবাদ দিলঃ “তোমরা উল্লাস কর। কিসরা এবার মুহাম্মাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। তার অনিষ্ট থেকে তোমরা এবার মুক্তি পাবে।”
এদিকে লোক দু’টি মদীনায় পৌঁছলো। তারা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে সাক্ষাৎ করে ‘বাজান’ –এর পত্রটি তাঁর হাতে দিয়ে বললোঃ “শাহানশাহ কিসরা আমাদের বাদশাহ ‘বাজান’কে লিখেছেন, তিনি যেন আপনাকে নেওয়ার জন্য লোক পাঠান। আমরা তাঁরই নির্দেশে আপনাকে নিতে এসেছি। আমাদের আহবানে সাড়া দিলে আপনার যাতে মঙ্গল হয় এবং তিনি যাতে আপনাকে কোন রকম শাস্তি না দেন সে ব্যাপারে আমরা কিসরার সাথে কথা বলবো। আর আমাদের আহবানে সাড়া না দিলে একটু বুঝে শুনে দেবেন। কারণ আপনাকে এবং আপনার জাতিকে ধ্বংস করার ব্যাপারে তাঁর শক্তি ও ক্ষমতাতো আপনার জানা আছে।”
তাদের কথা শেষ হলে রাসূলুল্লাহ (সা) মৃদু হেসে বললেনঃ ‘তোমরা আজ তোমাদের অবস্থানে ফিরে যাও, আগামীকাল আবার একটু এসো।’
পরদিন তারা রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হয়ে বললোঃ ‘কিসরার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আমাদের সাথে যাওয়ার জন্য কি আপনি প্রস্তুতি নিয়েছেন?’ রাসূল (সা) বললেন! “তোমরা আর কক্ষণো কিসরার দেখা পাবে না। আল্লাহ তাকে ধ্বংস করেছেন। অমুক মাসের অমুক তারিখ তার পুত্র ‘শীরাওয়াইহ’ তাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেছে।” একথা শুনেবিস্ময়ে চোখ ছানাবড়া করে তারা রাসূলুল্লাহকে (সা) দেখতে লাগলো। তারা বললোঃ
“আপনি কি বলছেন তা-কি ভেবে দেখেছেন? আমরা কি ‘বাজান’কে একথা লিখে জানাবো?”
রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ “হাঁ। আর তোমরা তাকে একথাও লিখবে যে, আমার এ দ্বীন কিসরার সাম্রাজ্যের প্রান্তসীমা পর্যন্ত পৌঁছাবে। তুমি যদি ইসলাম গ্রহণ কর, তোমার অধীনে যা কিছু আছে তা-সহ তোমার জাতির কর্তৃত্ব তোমাকে দেওয়া হবে।”
লোক দু’টি রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার থেকে বের হয়ে সোজা ‘বাজান’ – এর নিকট পৌঁছলো এবং তাকে রাসূলুল্লাহর (সা) সমস্ত কথা অবহিত করলো। ‘বাজান’ মন্তব্য করলোঃ “মুহাম্মদ যা বলেছেন তা সত্য হলে তিনি অবশ্যই নবী। আর সত্য না হলে, আমরা তাকে উচিত শিক্ষা দেব।”
তদের এ আলোচনা চলছে, এমন সময় ‘বাজানের’ নিকট শীরাওয়াইহ’র পত্র এসে পৌঁছলো। পত্রের বিষয়বস্তু এরূপঃ “অতঃপর আমি কিসরাকে হত্যা করেছি। আমার জাতির পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই তাকে হত্যা করা হয়েছে। ……… আমার এ পত্র তোমার নিকট পৌঁছার পর তোমার আশে-পাশের লোকদের নিকট থেকে আমার আনুগত্যের অঙ্গীকার নেবে।”
‘বাজান’ শীরাওয়াইহ’র পত্রটি পাঠ করার সাথে সাথে তা ছুঁড়ে ফেলে এবং নিজেকে একজন মুসলমান বলে ঘোষণা দেয়। তার সাথে তার আশে-পাশে ইয়ামনে যত পারসিক ছিল তারা সকলে ইসলাম গ্রহণ করে।
এহলো পারস্য সম্রাট কিসরার সাথে হযরত আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহর (রা) ঘটনাটির সংক্ষিপ্তসার। রোমান কাইসারের সাথে তাঁর যে ঘটনাটি ঘটেছিল, তা আরো চমকপ্রদ। এ ঘটনাটি ঘটে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের খিলাফতকালে।
হিজরী ১৯ সনে খলীফা উমার (রা) রোমানদের বিরুদ্ধে একটি বাহিনী পাঠালেন। এই বাহিনীতে আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ আস-সাহমীও ছিলেন। কাইসার মুসলিম মুজাহিদদের ঈমান, বীরত্ব এবং আল্লাহ ও রাসূলের জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার বহু কাহিনী শুনতেন। তিনি তাঁর সৈন্যদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোন মুসলমান সৈনিক বন্দী হলে তাকে জীবিত অবস্থায় তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেবে। আল্লাহর ইচ্ছায় হযরত আবদুল্লাহ রোমানদের হাতে বন্দী হলেন। রোমানরা তাকে তাদের বাদশার নিকট হাজির করে বললোঃ “এ ব্যক্তি মুহাম্মাদের একজন সহচর, প্রথম ভাগেই সে তাঁর দ্বীন গ্রহণ করেছে। আমাদের হাতে বন্দী হয়েছে, আমরা আপনার নিকট উপস্থিত করেছি।”
রোমান সম্রাট আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহর দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললোঃ
‘আমি তোমার নিকট একটি বিষয় উপস্থাপন করতে চাই।’ আবদুল্লাহঃ ‘বিষয়টি কি?’
সম্রাটঃ “আমি প্রস্তাব করছি তুমি খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ কর। যদি তা কর, তোমাকে মুক্তি দেব এবং তোমাকে সম্মানিত করবো।”
বন্দী আবদুল্লাহ খুব দ্রুত ও দৃঢ়তার সাথে বললেনঃ
‘আফসুস! যেদিকে আপনি আহবান জানাচ্ছেন তার থেকে হাজার বার মৃত্যু আমার অধিক প্রিয়।’
সম্রাটঃ ‘আমি মনে করি তুমি একজন বুদ্ধিমান লোক। আমার প্রস্তাব মেনে নিলে আমি তোমাকে আমার ক্ষমতার অংশীদার বানাবো, আমার কন্যা তোমার হাতে সমর্পণ করবো এবং আমার এ সম্রাজ্য তোমাকে ভাগ করে দেব।’
বেড়ী পরিহিত বন্দী মৃদু হেসে বললেনঃ “আল্লাহর কসম, আপনার গোটা সাম্রাজ্য এবং সেই সাথে আরবদের অধিকারে যা কিছু আছে সবই যদি আমাকে দেওয়া হয়, আর বিনিময়ে আমাকে বলা হয় এক পলকের জন্য মুহাম্মাদের (সা) দ্বীন পরিত্যাগ করি, আমি তা করবো না।”
সম্রাটঃ ‘তাহলে আমি তোমাকে হত্যা করবো।’
বন্দীঃ ‘আপনার যা খুশী করতে পারেন।’
সম্রাটের নির্দেশে বন্দীকে শূলীকাষ্ঠে ঝুলিয়ে কষে বাঁধা হল। দু’হাতে ঝুলিয়ে বেঁধে খৃষ্টধর্ম পেশ করা হল, তিনি অস্বীকার করলেন। তারপর দু’পায়ে ঝুলিয়ে বেঁধে ইসলাম পরিত্যাগের আহবান জানানো হল, তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করলেন।
সম্রাট তাঁর লোকদের থামতে বলে তাঁকে শূলীকাষ্ঠ থেকে নামিয়ে আনার নির্দেশ দিলেন। তারপর বিশাল এক কড়াই আনিয়ে তার মধ্যে তেল ঢালতে বললেন। সেই তেল আগুনে ফুটানো হল। টগবগ করে যখন তেল ফুটতে লাগলো তখন অন্য দু’জন মুসলমান বন্দীকে আনা হল। তাদের একজনকে সেই উত্তপ্ত তেলের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। ফেলার সাথে তার দেহের গোশত ছিন্নভিন্ন হয়ে হাড় থেকে পৃথক হয়ে গেল।
সম্রাট আবদুল্লাহর দিকে ফিরে তাকে আবার খৃষ্টধর্ম গ্রহণের আহবান জানালেন। আবদুল্লাহ এবার পূর্বের চেয়ে আরো বেশী কঠোরতার সাথে প্রত্যাখ্যান করলেন। সম্রাটের নির্দেশে এবার আবদুল্লাহকে সেই উওপ্ত তেল ভর্তি কড়াইয়ের কাছে আনা হল। এবার আবদুল্লাহর চোখে অশ্রু দেখা দিল। লোকেরা সম্রাটকে বললো, ‘বন্দী এবার কাঁদছে।’ সম্রাট মনে করলেন, বন্দী ভীত হয়ে পড়েছে। তিনি নির্দেশ দিলেন, ‘বন্দীকে আমার কাছে নিয়ে এস।’ তাঁকে আনা হল। এবারও তিনি ঘৃণাভরে খৃষ্টধর্ম প্রত্যাখ্যান করলেন। সম্রাট তখন আবদুল্লাহকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমার ধ্বংস হোক! তাহলে কাঁদছো কেন?’ আবদুল্লাহ জবাব দিলেনঃ “আমি একথা চিন্তা করে কাঁদছি যে, এখনই আমাকে এই কড়াইয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে এবং আমি শেষ হয়ে যাব। অথচ আমার বাসনা, আমার দেহের পশমের সমসংখ্যক জীবন যদি আমার হতো এবং সবগুলিই আল্লাহর রাস্তায় এই কড়াই’য়ের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারতাম।”
এবার খোদাদ্রোহী সম্রাট বললেনঃ ‘অন্ততঃপক্ষে তুমি যদি আমার মাথায় একটা চুম্বন কর, তোমাকে আমি ছেড়ে দেব।’
আবদুল্লাহ প্রথমে এ প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করলেন। তবে শর্ত আরোপ করে বললেন, ‘যদি আমার সাথে অন্য মুসলিম বন্দীদেরও মুক্তি দেওয়া হয়, আমি রাজি আছি।’
সম্রাট বললেনঃ হ্যাঁ, অন্যদেরও ছেড়ে দেওয়া হবে।’
আবদুল্লাহ বলেনঃ ‘আমি মনে মনে বললাম, বিনিময়ে অন্য মুসলিম বন্দীদেরও মুক্তি দেওয়া হবে, এতে কোন দোষ নেই।’ তিনি সম্রাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে তাঁর মাথায় চুম্বন করলেন। রোমান সম্রাট মুসলিম বন্দীদের একত্র করে আবদুল্লাহর হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। সর্বমোট বন্দীর সংখ্যা ছিল ৮০ জন।
হযরত আবদুল্লাহ (রা) মদীনায় ফিরে এসে খলীফা উমারের (রা) নিকট ঘটনাটি আনুপূর্বিক বর্ণনা করলেন। আনন্দে খলীফা ফেটে পড়লেন। তিনি উপস্থিত সেই বন্দীদের প্রতি তাকিয়ে বললেনঃ ‘প্রতিটি মুসলমানের উচিত আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহর মাথায় চুম্বন করা এবং আমিই তার সুচনা করছি।’ এই বলে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর মাথায় চুম্বন করলেন। (দ্রষ্টব্যঃ হায়াতুস সাহাবা – ১/৩০২, আল-ইসাবা-২/২৯৬-৯৭, আল-ইসতিয়ার, সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা – ১/৫১-৫৬, উসুদুল গাবাহ-৩/১৪৩)
মক্কা বিজয়ের পর রাসূলুল্লাহ (সা) খালিদ ইবনুল ওয়ালিদকে বনী জুজাইমা গোত্রে ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য পাঠান। ভুল বুঝাবুঝির কারণে খালিদ তাদের ওপর আক্রমণ চালান এবং তাদের বেশ কিছু লোক হতাহত হয়। এ ঘটনায় রাসূল (সা) মর্মাহত হন। তিনি নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দান করেন এবং খালিদকেও ক্ষমা করে দেন। ইবন ইসহাক বলেন, এ ব্যাপারে খালিদকে নিন্দামন্দ করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ আস-সাহামী আদেশ দিয়েছিলেন বলেই আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করেছিলাম। তিনি বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেনঃ যদি তারা ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থাকে, রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের সাথে যুদ্ধের নির্দেশ তোমাকে দিয়েছেন।’ (সীরাতু ইবন হিশাম – ২/৪৩০)
একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) মিম্বরের ওপর বসে ঘোষণা করেন, “আমি এখানে বসে থাকাকালীন তোমাদের যে কোন ব্যক্তি যে কোন প্রশ্ন করলে তার জবাব দেওয়া হবে।” আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ উঠে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আমার পিতা কে?’ রাসূলুল্লাহ (সা) ‘বললেন, তোমার পিতা হুজাফাহ।’ (আল-ইসাবা – ২/২৯৬) তাঁর মা একথা শুনে বলেন, ‘তুমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কী মারাত্মক প্রশ্নই না করেছিলে। আল্লাহ না করুন, তিনি যদি অন্য কিছু বলতেন, আমার অবস্থা কেমন হতো?’
আবদুল্লাহ জবাব দিলেন, “আমি নসবের সত্যতা যাচাই করছিলাম। তিনি যদি আমাকে কোন হাবশী দাসের সাথে সম্পৃক্ত করতেন, আমি তা মেনে নিতাম।” (আল-ইসতিয়াব)
হযরত আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ থেকে বেশ কয়েকটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তম্মধ্যে একটি বুখারী বর্ণনা করেছেন। উল্লেখযোগ্য যারা তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেন – আবু ওয়ায়িল, সুলাইমান ও ইবন ইয়াসার।
ইবন ইউনুস বলেন, আবদুল্লাহ মিসর অভিযানে অংশ গ্রহণ করেন এবং হযরত উসমানের খিলাফতকালে মিসরেই ইনতিকাল করেন। তিনি মিসরেই সমাহিত হন। (আল-ইসাবা – ২/২৯৬)
জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কিছু সাহায্য চাইলেন। তিনি দান করলেন। তারপর আরেক ব্যক্তি চাইলো। তিনি অঙ্গীকার করলেন। উমার ইবনুল খাত্তাব উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার কাছে সাহায্য চাওয়া হয়েছে, আমি দিয়েছি। আবার চাওয়া হয়েছে, আবারো দিয়েছি। তারপর আবার চাওয় হয়েছে, অঙ্গীকার করেছি।” মনে হলো। তাঁর কথাটি রাসূলুল্লাহর (সা) পছন্দ হলোনা। আবদুল্লাহ ইবন হুজাফাহ, তখন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি খরচ করুন, আরশের অধিকারী যিনি তার কাছে স্বল্পতার আশংকা করবেন না।” রাসূল (সা) বললেনঃ ‘আমাকে একথারই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ (হায়াতুস সাহাবা – ২/১৪৫)
ইবন আসাকির যুহরী থেকে বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলো, ‘তিনি একজন রসিক ও হাস্য-কৌতুকপ্রিয় মানুষ।’ তিনি বললেন, “তার কথা ছেড়ে দাও। কারণ, তার একটি বড় পেট আছে। সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে বড় ভালোবাসে।” (হায়াতুস সাহাবা – ২/৩২১)
খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ (রা)

নাম আবু সুলাইমান খালিদ, লকব সাইফুল্লাহ (আল্লাহর তরবারি)। পিতা ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা এবং মাতা লুবাবা আস-সুগরা, উম্মুল মুমিনীন হযরত মাইমুনা বিনতুল হারিস ও হযরত আব্বাস ইবন আবদিল মুত্তালিবের স্ত্রী লুবাবা আল-কুবরার বোন। রাসূলুল্লাহ (সা) ও হযরত আব্বাস (রা) তাঁর খালু। (উসুদুল গাবা-২/৯৩)
তাঁর খান্দান ছিল জাহিলী আরবের কুরাইশদের মধ্যে অতি সম্ভ্রান্ত। কুব্বা ও আয়িন্না (সৈন্য ও সেনা ক্যাম্পের পরিচালন দায়িত্ব) –এ দু’টি দায়িত্ব ছিল তাঁর খান্দানের ওপর। ইসলামের অভ্যুদয়ের সময় খালিদ ছিলেন এই পদে অধিষ্ঠিত। (আল-ইসতিয়াব-১/১৫৭) হুদাইবিয়ার সন্ধির প্রাককালে মুসলমানদের গতিবিধি লক্ষ্য করার জন্য কুরাইশদের যে দলটি মক্কা থেকে বের হয়েছিল, তার নেতা ছিলেন খালিদ। উহুদ যুদ্ধে বীরত্বের সাথে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েন এবং মক্কার মুশরিক বাহিনীর সুনিশ্চিত পরাজয়কে বিজয়ে রূপদান করেন।
হযরত খালিদ ইসলাম গ্রহণের সময় সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। তবে মক্কা বিজয়ের অল্প কিছুদিন পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে সর্বাধিক প্রসিদ্ধি আছে।
হযরত আমর ইবনুল আস (রা) হাবশা থেকে মদীনায় চলেছেন ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে। পথে মদীনা অভিমুখী আরেকটি কাফিলার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ। তারাও চলেছেন একই উদ্দেশ্যে মদীনায়। দ্বিতীয় এই দলটির সাথে ছিলেন হযরত খালিদ। হযরত আমর ইবনুল আস খালিদকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোন দিকে?’ খালিদ জবাব দিলেন, ‘আল্লাহর কসম, আমার নিশ্চিত বিশ্বাস এ ব্যক্তি নবী –আর কতদিন এভাবে চলবে চলো যাই ইসলাম গ্রহণ করি।’ (আল-ইসাবা-১/৪১৩, মুসনাদে আহমাদ) তাঁর মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হলেন। প্রথমে খালিদ, তারপর আমর ইবনুল আস রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করেন। আমর মক্কায় ফিরে আসেন; কিন্তু খালিদ মদীনায় থেকে যান।
হযরত খালিদ বলেন, আমার ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার মধ্যে বুদ্ধির ছাপ দেখেছিলাম, আমার আশা ছিল এ বুদ্ধি শেষ পর্যন্ত তোমাকে কল্যাণ ও মঙ্গলের কাছেই সমর্পন করবে।’ খালিদ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করার সময় বলেছিলাম, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে যত পাপ আমি করেছি তা ক্ষমার জন্য দু’আ করুন। রাসূল (সা) বলেছিলেন, ইসলাম অতীতের সকল গুনাহ-খাতা নশ্চিহ্ন করে দেয়। আমি বলেছিলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এ কথার ওপরই আমি বাইয়াত করলাম। তিনি বললেন, হে আল্লাহ, তোমার পথে বাধা সৃষ্টি করে যত অপরাধ সে করেছে, তুমি তা ক্ষমা করে দাও। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৪-৮৫)
ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর ইসলাম –পূর্ব খান্দানী সামরিক পদে বহাল রেখে তাঁর খিদমত গ্রহণ করেন। (উসুদুল গাবা-২/৯৩) ইসলাম পূর্ব জীবনে তিনি ছিলেন মুসলমানদের চরম দুশমন, আর ইসলাম গ্রহণের পর মুশরিকদের জন্য হয়ে দাঁড়ান ভীষণ বিপদজ্জনক। অসংখ্য যুদ্ধে তাঁর তরবারি মুশরিকদের ঐক্য ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত খালিদ সর্বপ্রথম মূতা অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) দাওয়াতী কার্যক্রমের আওতায় হযরত হারিস ইবন উমাইর আযাদীকে একটি পত্রসহ বসরার শাসকের নিকট পাঠান। শুরাহবীল ইবন আমর গাসসানী মূতা নামক স্থানে হারিসকে হত্যা করে। এ ঘটনার প্রতিশোধকল্পে রাসূলুল্লাহ (সা) হযরত যায়িদ ইবন হারিসার নেতৃত্বে দু’হাজার সৈন্যের এক বাহিনী পাঠান। প্রতিপক্ষ রোমান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় দু’লাখ। যায়িদ ইবন হারিসার বাহিনী মদীনা থেকে যাত্রার পূর্বে রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁদের উপদেশ দেন, “যুদ্ধে যায়িদ যদি শহীদ হয় তাহলে জা’ফর এবং জা’ফর শহীদ হলে আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা বাহিনীর নেতৃত্ব দেবে। আর যদি আবদুল্লাহও শহীদ হয় তাহলে তোমরা তোমাদের কাউকে আমীর বানিয়ে নেবে।”
তাঁরা ছিলেন তিনজন –যায়িদ, জা’ফর ও আবদুল্লাহ। তাঁরা সিরিয়ার মূতা অভিযানের তিন বীর। এ অসম যুদ্ধে তাঁরা নজীরবিহীন বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে একে একে শাহাদাত বরণ করেন। অবশেষে হযরত খালিদ নেতৃত্ব লাভ করেন। একের পর এক তিন সেনাপতির শাহাদাত বরণে মুসলিম বাহিনী সাহস হারিয়ে ফেলে। খালিদ শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে না পারলেও মুসলিম বাহিনীকে ধ্বংসের হাত থেকে উদ্ধার করেন।
হযরত রাসূলে করীম (সা) উল্লেখিত তিন সেনাপতির শাহাদাত ও খালিদের নেতৃত্ব গ্রহণের খবর মদীনায় ঘোষণা করেছিলেন এভাবেঃ
“যায়িদ ইবন হারিসা পতাকা হাতে নিয়ে শত্রু বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে শাহাদাত বরণ করে। তারপর জা’ফর সেই পতাকা তুলে নেয় এবং সেও যুদ্ধ করে শহীদ হয়। তারপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা সেই পতাকা হাতে তুলে নেয় এবং সেও শহীদ হয়। অতঃপর ‘সাইফুন মিন সুয়ূফিল্লাহ’ –আল্লাহর অন্যতম এক তরবারি সে পতাকা হাতে তুলে ধরে এবং তার হাতে আল্লাহ বিজয় দান করেন।” (রিজালুন হাওলার রাসূল -২৮৬) এইভাবে তিনি লাভ করেন ‘ফাইফুল্লাহ’ –আল্লাহর অসি উপাধি। অবশ্য এই উপাধি লাভের ঘটনা বা সময় সম্পর্কে ভিন্নমতও আছে। অন্য একটি বর্ণনায় রয়েছে, কোন এক স্থানে হযরত রাসূলে করীম (সা) অবস্থান করছিলেন। কেউ পাশ দিয়ে গেলে তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, -কে? জবাবে বলা হচ্ছিল অমুক। এক সময় খালিদ গেলেন। রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, -কে? বলা হলো, খালিদ। তিনি বললেন, আল্লাহর বান্দাহ খালিদ কত ভালো। সে আল্লাহর অন্যতম এক তরবারি। এটা মূতার পরের ঘটনা। (উসুদুল গাবা-২/৯৪, আল-ইসাবা-১/৪১৩)
যায়িদ, জা’ফর ও আবদুল্লাহ –এ তিন সেনাপতির অধীনে হযরত খালিদ একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে মূতা অভিযানে যোগদান করেছিলেন। উল্লেখিত তিনজনের শেষ ব্যক্তি শাহাদাত বরণ করলে হযরত সাবিত ইবন আকরাম দৌড়ে পতাকার কাছে যান এবং মুসলিম বাহিনীর মধ্যে যাতে কোন বিশৃংখলা দেখা না দেয় সে জন্য ডান হাতে পতাকা উচু করে ধরেন। পতাকা তুলে ধরে তিনি এক দৌড়ে হযরত খলিদের কাছে এসে বলেন, ‘খুজ আল-লিওয়াআ ইয়া আবা সুলাইমান, -‘আবু সুলাইমান, পতাকাটি তুমি ধর’। যে বাহিনীর মধ্যে প্রথম পর্ব ইসলাম গ্রহণকারী মুহাজির ও আনসারগণ ছিলেন, সেই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার কোন অধিকার-যে খালিদের মত নও মুসলিমের থাকতে পারেনা এ কথা তিনি ভালো করেই জানতেন। তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সাবিত ইবন আক্রামকে বলেন, ‘না, পতাকা আমি গ্রহণ করতে পারিনা, আপনিই এর যোগ্যতম ব্যক্তি। আপনি বয়োঃজ্যেষ্ঠ এবং বদরী (অর্থাৎ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী)।’ সাবিত জবাব দিলেন, ‘ধর, যুদ্ধে তুমি আমার থেকে পারদর্শী। এ পতাকা আমি তোমার জন্যই তুলে এনেছি।’ তারপর হযরত সাবিত (রা) মুসলিম বাহিনীকে সম্বোধন করে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমারা কি খালিদের নেতৃত্বে রাজি?’ তারা সমস্বরে জবাব দিলঃ ‘হাঁ, আমরা রাজি’। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৮৬-৮৭) খলিদ বলেন, মূতার যুদ্ধে আমার হাতে সাতখানি তরবারি ভাঙ্গে। অবশেষে একখানি ইয়ামানী তরবারী অক্ষত থাকে। (উসুদুল গাবা-২/৯৪)
মক্কা বিজয়কালে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সঙ্গী ছিলেন। রাসূল (সা) মুসলিম বাহিনীর দক্ষিণ ভাগের দায়িত্ব তাঁকে দেন। বিনা রক্তপাতে মক্কা বিজয় হলেও খালিদের হাতে সেদিন কতিপয় মুশরিক প্রাণ হারায়। তিনি ‘কুদার’ দিক দিয়ে মক্কায় ঢুকছিলেন, পথে মক্কার একটি মুশরিক দলের মুখোমুখি হন। মুশরিকরা তীর নিক্ষেপ শুরু করে। তিনি তীর ছুঁড়ে তাদের জবাব দেন। তাতে কয়েকজন মুশরিক নিহত হয়। এজন্য তাঁকে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট জবাবদিহি করতে হয়। রাসূল (সা) যখন জানলেন, মুশরিকরাই প্রথম আক্রমণ চালিয়াছে, তখন তিনি এটাকে আল্লাহর ইচ্ছা হিসাবে মেনে নিয়ে চুপ করে যান।
হুনাইন অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। বারো হাজার সৈন্য নিয়ে গঠিত হয় মুসলিম বাহিনী। হযরত রাসূলে করীম (সা) গোটা বাহিনীকে গোত্র ভিত্তিক কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। বনু সুলাইম গোত্র ছিল গোটা বাহিনীর পুরোভাগে। আর এর কম্যাণ্ডিং অফিসার ছিলেন হযরত খালিদ। এ যুদ্ধে তিনি দারুণ সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করেন। তাঁর শরীরের একাধিক স্থানে আহত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে দেখতে আসেন, তাঁর আহত স্থানসমূহে ফুঁক দেন এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। (উসুদুল গাবা-২/৯৫) তায়িফ অভিযানে খালিদ ছিলেন অগ্রগামী বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসার। হিজরী নবম সনে তাবুক অভিযানেও অংশগ্রহণ করেন। রাসূল (সা) এ যুদ্ধে দুমাতুল জান্দাল –এর সরদার উকাইদার ইবন আবদিল মালিকের বিরুদ্ধে চার শো সৈনিক সহ পাঠান। খালিদ উকাইদারের ভাইকে হত্যা করেন এবং উকাইদারকে বন্দী করে রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির করেন।
হিজরী নবম সনে রাসূলুল্লাহ (সা) খালিদকে দাওয়াতী কাজের উদ্দেশ্যে বনী জুজাইমা গোত্রে পাঠান। খালিদের দাওয়াতে বনী জুজাইমা গোত্র ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু অজ্ঞাতবশতঃ সঠিক ভাষায় তা ব্যক্ত করতে না পারায় খালিদ তাদের ভুল বুঝেন। তিনি আক্রমণের নির্দেশ দেন। ফলে, এই গোত্রের বহু লোক হতাহত হয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বিষয়টি অবগত হয়ে ভীষণ দুঃখিত হন। তিনি হাত উঠিয়ে দু’আ করেন; ‘হে আল্লাহ, আমি খালিদের এই কাজের ব্যাপারে সম্পূর্ণ দায়মুক্ত’ তারপর হযরত আলীকে পাঠিয়ে তাদের সকল ক্ষতিপূরণ দান করেন। তাদের নিহত কুকুরগুলিরও ক্ষতিপূরণ আদায় করেন। (বুখারীঃ কিতাবুল মাগাযী, উসুদুল গাবা-২/৯৪)
এই ঘটনার পর খালিদ মদীনায় ফিরে এলে বিষয়টি নিয়ে তাঁর ও আবদুর রহমান ইবন আউফের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। এক পর্যায়ে খালিদ আবদুর রহমানকে কিছু গালমন্দ করেন। কথাটি রাসূলুল্লাহর (সা) কানে পৌছালে তিনি রেগে যান এবং খালিদকে বলেন, “আমার সাহাবীদের গালি দেবে না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও ব্যয় করে তবুও সে তাদের এক মুদ বা তার অর্ধেক পরিমাণ ব্যয়ের সমকক্ষতা অর্জন করতে পারবে না।” (উসুদুল গাবা -২/৯৫)
হিজরী দশম সনে হযরত রাসূলে করীম (সা) খালিদকে নাজরানের ‘বনু আবদিল মাদ্দান’ গোত্রে ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য পাঠান। যেহেতু খালিদ বনু জুজাইমার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে মারাত্মক ভুল করেছিলেন, এ কারণে রাসূল (সা) যাত্রার পূর্বে তাঁকে বিশেষ হিদায়াত দেনঃ ‘কেবল ইসলামের দাওয়াতই দেবে, কোন অবস্থাতেই তলোয়ার উঠাবে না’। তিনি এ হিদায়াত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তাঁর দাওয়াতে গোটা আবদুল মাদ্দান গোত্র ইসলাম কবুল করে। এভাবে রণক্ষেত্রের এক সৈনিক প্রথমবারের মত সত্যিকার ‘দায়ী-ই ইসলাম’ ইসলামের দাওয়াত দানকারী রূপে আত্মপ্রকাশ করেন। এ সকল নওমুসলিমকে তিনি তালীম ও তারবিয়াত দেন এবং তাদেরকে সঙ্গে করে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে নিয়ে আসেন। একই বছর ইয়ামনবাসীদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য আলী ও খালিদকে (রা) পাঠানো হয়। তাঁদের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইয়ামনবাসী ইসলাম কবুল করে।
জাহিলী আরবের কুরাইশদের মূর্তি পূজার কেন্দ্রসমূহের একটি ছিল ‘উযযা’। রাসূলুল্লাহ (সা) খালিদকে পাঠালেন কেন্দ্রটি ধ্বংসের জন্য। তিনি সেখানে পৌঁছে নিম্নের পংক্তিটি আবৃতি করতে করতে কেন্দ্রটি মাটিতে মিশিয়ে দেনঃ “ওহে উযযা, তুমি পবিত্র নও, আমরা তোমার অস্বীকার করি, আমি দেখেছি, আল্লাহ তোমায় অপমানিত করেছে।” (উসুদুল গাবা-২/৯৪)
হযরত রাসূলে করীমের (সা) ইনতিকালের সাথে সাথে আরব উপদ্বীপের চতুর্দিকে ইসলাম ত্যাগকারী, নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার ও যাকাত অস্বীকারকারীদের মারাত্মক ফিতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এই ফিতনাবাজদের শির-দাঁড়া গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য খলীফা আবু বকর (রা) সেনা বাহিনী প্রস্তুত করে নিজেই যাত্রার জন্য ঘোড়ায় চড়লেন। কিন্তু বিশিষ্ট সাহাবীরা মনে করলেন খলীফার এ সময় দারুল খিলাফা মদীনায় থাকা উচিত। হযরত আলী (রা) খলীফার ঘোড়ার লাগামটি ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “আল্লাহর রাসূলের খলীফা, কোন দিকে? উহুদের দিনে রাসূলুল্লাহ (সা) আপনাকে যে-কথা বলেছিলেন, আমি সে কথাই বলছিঃ ওহে আবু বকর, তোমার তরবারি উম্মত্ত হয়ে গেছে, তুমি তোমার নিজেকে দিয়ে আমাদের ব্যথিত করো না।” খলীফা সিদ্ধান্ত বাতিল করে মদীনায় থেকে গেলেন। তিনি গোটা সেনা বাহিনীকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করেন এবং একটি ভাগের দায়িত্ব প্রদান করেন খালিদকে। খালিদকে মদীনা থেকে বিদায় দেওয়ার সময় তাঁকে লক্ষ্য করে বলেন, তোমার সম্পর্কে আমি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছি, ‘খালিদ আল্লাহর একটি তরবারি –যা আল্লাহ কাফির ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে কোষমুক্ত করেছেন। খালিদ আল্লাহর কতইনা ভালো বান্দা এবং গোত্রের কতই না ভালো ভ্রাতা’। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯১)
হযরত খালিদ তাঁর বাহিনী নিয়ে মদীনা থেকে রওয়ানা হন। প্রতিটি অভিযানের পূর্বে তিনি তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দিতেনঃ তোমরা কৃষকদের সাথে দুর্ব্যবহার করবে না। তাদের নিরাপদে থাকতে দেবে। তবে তাদের কেউ যদি তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয়, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।
ভণ্ড নবী তুলাইহার বিরুদ্ধে খালিদ অভিযান পরিচালনা করেন। তুমুল লড়াই চলছে। প্রতিটি সংঘর্ষেই তুলাইহার সঙ্গীরা পরাজয় বরণ করছে। একদিন তুলাইহা তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে জিজ্ঞেস করলো, আমাদের এমন পরাজয় হচ্ছে কেন? তারা বললো, কারণ, আমাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীটি তার আগে মারা যাক। অন্যদিকে আমরা যাদের সাথে লড়ছি, তাদের প্রত্যেকেই চায় তার সঙ্গীর পূর্বে সে মৃত্যুবরণ করুক। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৯৩) খালিদ তুলাইহার সঙ্গী-সাথীদের হত্যা করেন এবং তার তিরিশ জন সঙ্গীকে বন্দী করে মদীনায় পাঠান। তিনি মুসাইলামা কাজ্জাবের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। হযরত হামযার হন্তা হযরত ওয়াহশীর হাতে ভণ্ড মুসাইলামা নিহত হয়।
ভণ্ড নবীদের ফিতনা নির্মূল করার পর হযরত খালিদ যাকাত দানে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারী ও মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগকারী) –দের দিকে ধাবিত হন। সর্বপ্রথম আসাদ ও গাতফান গোত্রদ্বয়ে আঘাত হানেন। তাদের কিছু মারা যায়, কিছু বন্দী হয়, আর অবশিষ্টরা তাওবাহ করে আবার ইসলামে ফিরে আসে। (তারীখুল খুলাফাঃ সুয়ূতী-৭২) মুরতাদদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সকল অভিযানে খালিদ ছিলেন অগ্রভাগে। তাবারী বলেছেঃ ‘মুরতাদদের বিরুদ্ধে অভিযানে যত বিজয় অর্জিত হয়েছে, তার সবই খালিদ ও অন্যান্যদের কৃতিত্ব।’
আভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা দমনের পর হযরত খালিদ ইরাকের দিকে অগ্রসর হন। মুজার, কাইসার, আলীম, আমগীশীয়া, হীরা, আমবার, আইতুন তামার, দুমাতুল জান্দাল, হাসীদ, খানাফিস, সানা ও বিশর, ফিরাদ প্রভৃতি যুদ্ধে তিনি অতুলনীয় সাহস ও কৌশল প্রদর্শন করে সমগ্র ইরাক পদানত করেন। হযরত খালিদের সাথে ইরাকীদের সর্বশেষ যুদ্ধ হয় ফিরাদে। ফুরাতের এক তীরে মুসলিম বাহিনী ও অপর তীরে সম্মিলিত ইরাকী-বাহিনী। ইরাকীরা প্রস্তাব দিলঃ হয় তোমরা এপারে আস, না হয় আমাদের ওপারে যাওয়ার সুযোগ দাও। হযরত খালিদ প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাদের এপারে আসার সুযোগ করে দিলেন। উভয় পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ শুরু হলো। মুসলিম বাহিনী শত্রুবাহিনীকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেললো। পেছনে তাদের তরঙ্গ বিক্ষুদ্ধ ফুরাত নদী। পেছনে সরে গেলে ডুবে মরা এবং সামনে এগুলে মুসলিম সৈন্যদের তরবারির শিকার হওয়া ছাড়া আর কোন পথ তাদের ছিল না। হযরত খালিদ গোটা শত্রু বাহিনীকে এমন এক যাঁতাকলে আটক করে পিষে ফেলেন। এ যুদ্ধের পর হযরত খালিদ গোপনে হজ্জে চলে যান।
হযরত খালিদ যখন ইরাকে যুদ্ধরত, সিরিয়ায় তখন অন্য একটি মুসলিম বাহিনী সংঘর্ষে লিপ্ত। খালিদের ইরাক অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে খলীফার দরবার থেকে তাঁকে নির্দেশ দেয়া হলো সিরিয়ায় অবস্থানরত বাহিনী সাথে মিলিত হওয়ার জন্য। খালিদ ইরাক থেকে বসরা উপস্থিত হলেন। পূর্ব থেকেই ইসলামী ফৌজ সেখানে খালিদের প্রতীক্ষায় ছিল। খালিদ পৌঁছেই বসরা আক্রমণ করেন। বসরাবাসীর সন্ধি চুক্তি করে জীবন রক্ষা করে।
বসরা অভিযান শেষ করে হযরত খালিদ ও আবু উবাইদা আজনাদাইন পৌঁছেন। পূর্ব থেকেই হযরত আমর ইবনুল আস সেখানে অবস্থান করছিলেন। হিজরী ১৩ সনে তুমুল লড়াই হয়। আজনাদাইন খালিদের পদানত হয়।
সেনাপতি আবু উবাইদাহর নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী তিনি দিক থেকে দিমাশক অবরোধ করে বসে আছে। এক দিকের দায়িত্বে হযরত খালিদ নিয়োজিত। তিন মাস অবরোধ করেও কোন ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ সময় দিমাশকের পাদ্রীর এক পুত্র সন্তান জম্ম লাভ করে। নগরীবাসী সেই জম্ম উৎসবে মদ পান করে আনন্দে বিভোর হয়ে পড়ে। হযরত খালিদ যুদ্ধের সময় রাতে প্রায় ঘুমাতেন না। রাতে সামরিক ব্যবস্থাপনা ও দুশমনদের তথ্য সন্ধানে ব্যস্ত থাকতেন। তিনি দিমাশকবাসীর অবস্থা অবগত হন এবং সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর বাহিনীকে নির্দেশ দেন, তাকবীর ধ্বনি শোনার সাথে সাথে তারা যেন নগর-প্রাচীরের ফটকে ছুটে গিয়ে আক্রমণ চালায়। এদিকে তিনি কয়েকজন বিশিষ্ট সৈনিককে নির্বাচন করে রশির সাহায্যে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং অতর্কিতে ফটকের প্রহরীকে হত্যা করে তালা ভেঙ্গে তাকবীর দেওয়া শুরু করেন। তাকবীর শোনার সাথে সাথে বাইরে অপেক্ষমান সৈন্যরা একযোগে ভেতরে প্রবেশ করে। নগরবাসী তখন ঘুমে অচেতন। এমন অতর্কিত হামলায় তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে সেনাপতি আবু উবাইদার নিকট সন্ধির প্রস্তাব দেয় এবং নিজেদের হাতে নগর প্রাচীরের অন্য দ্বারগুলি উম্মুক্ত করে দেয়। একদিকে হযরত খালিদ বিজয়ীর বেশে, অন্যদিকে হযরত আবু উবাইদা সন্ধি-চুক্তি সম্পাদন করে নগরের অর্ধেক যুদ্ধ করে দখল করা হয়, তবুও আবু উবাইদা গোটা নগরবাসীর সাথে সন্ধির শর্তানুযায়ী সমান আচরণ করেন। (তারীখঃ ইবনুল আসীর ৬/৩২৯)
ফাহলের যুদ্ধেও খালিদ অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি ছিলেন অগ্রবর্তী বাহিনীর কম্যাণ্ডার। রোমানরা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। ফাহলের পর খালিদ ও আবু উনাইদা হিমসের দিকে অগ্রসর হন। দিমাশকের প্রশাসনিক দায়িত্বে তখন ইয়ায়িদ বিন আবু সুফিয়ান। রোমানরা পুনরায় দিমাশক দখলের পায়তারা চালায়। ইয়াযিদ বাধা দেন। প্রচণ্ড লড়াই চলছে। এমন সময় পেছনের দিক থেকে ধুমকেতুর মত হাজির হলেন হযরত খালিদ। রোমান বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু সদস্য ছাড়া সকলেই খালিদ-বাহিনীর হাতে নিহত হয়।
সিরিয়ার বিভিন্ন ফ্রন্টে রোমান বাহিনীর পরাজয়ের খবর শুনে এক পর্যায়ে তথাকার রোমান শাসক মুসলমানদের সাথে শান্তি চুক্তির ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তার পরিষদবর্গ তাকে যুদ্ধের প্ররোচনা দিয়ে বলেঃ আমরা অবশ্যই আবু বকরের অশ্বারোহীদের আমাদের ভূমিতে প্রবেশে বাধা দেব। তারা সেনাপতি মাহানের নেতৃত্বে দু’লাখ চল্লিশ হাজার সদস্যের এক বিরাট বাহিনী ইয়ারমুকে সমাবেশ করে। তাদের পাদ্ররী পুরোহিতরাও নির্জবাস থেকে বেরিয়ে ধর্মের নামে জনসাধারণকে উত্তেজিত করে তোলে। খলীফা আবু বকর (রা) এ খবর শুনে মন্তব্য করেন, ‘আল্লাহর কসম, আমি খালিদের দ্বারা তাদের প্রবৃত্তির এ প্ররোচনার নিরাময় করবো।’ ‘হ্যাঁ, খালিদ ছিলেন সেদিন রোমানদের সেই মহাব্যাধির ধস্বস্তরী প্রতিষেধক।
হযরত খালিদ ময়দানে উপস্থিত হয়ে দেখতে পান মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন কম্যাণ্ডার পৃথকভাবে নিজ নিজ সৈন্য পরিচালনা করছে। তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সংক্ষিপ্ত এক ভাষণ দেন। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হামদ-সানার পর বলেনঃ “আজকের এ দিনটি আল্লাহর অন্যতম একটি দিন। এ দিনে গর্ব ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করা উচিত নয়। তোমরা তোমাদের জিহাদে নিষ্ঠাবান হও, তোমাদের কাজের মাধ্যমে তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা কর। এসো আমরা ইমারাহ বা নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে নিই। আমাদের কেউ আজ, কেউ আগামীকাল এবং কেউ পরশু আমীর হোক। এভাবে তোমাদের সকলেই আমীর হবে। তোমরা আজকের দিনটি আমাকে ছেড়ে দাও।” সকলে প্রস্তাবে রাজি হলো। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫) তিনি গোটা বাহিনীকে মোট ৩৮/৩৬ টি ভাগে একজন অফিসার নিয়োগ করেন। সেদিন তিনি মুসলিম বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যাস করেন যে, আরবরা পূর্বে তেমন আর কখনো দেখেনি।
ইয়ারমুকে মুসলিম বাহিনী নিজ নিজ অবস্থান গ্রহণের পর হযরত খালিদ মহিলাদের আহবান জানান এবং প্রথম বারের মত তাদের হাতে তরবারি দিয়ে নির্দেশ দেন, তোমরা মুসলিম মুজাহিদদের পেছনে অবস্থান গ্রহণ করবে। কাউকে পালিয়ে পেছনে সরে আসতে দেখলে তাকে এ তরবারি দিয়ে হত্যা করবে। (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৫)
এই তোড়জোড়ের মধ্যে একজন মুসলিম মুজাহিদ হতাশ কন্ঠে বললোঃ রোমানদের সংখ্যা কত বেশী, আর আমাদের সংখ্যা কত কম। খালিদ তাকে বললেনঃ তোমার কথা ঠিক নয়। বরং একথা বল, রোমানরা কত কম, এবং মুসলমানরা কত বেশী –মানুষের সংখ্যা দ্বারা নয়; বরং বিজয়ের দ্বারা সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং পরাজয়ের দ্বারা হ্রাস পায়। আল্লাহর কসম, যদি আমার ঘোড়ার ক্ষুর ভালো থাকতো আমি তাদের এ আধিক্যের পরোয়া করতাম না। (তারীখুল উম্মাহ আল –ইসলামিয়াহ ১/১৯৩) উল্লেখ্য যে, র্দীঘ ভ্রমণে হযরত খালিদের ঘোড়া ‘আসকার’ –এর ক্ষুর আহত হয়ে পড়েছিল।
ইয়ারমুক যুদ্ধ শুরুর পূর্ব মুহূর্তে রোমান সেনাপতি ‘মাহান’ দূত মারফত জানালো যে, সে খালিদের সাথে সরাসরি কথা বলতে চায়। খালিদ রাজি হলেন। দু’বাহিনীর মধ্যবর্তী ময়দানে দু’সেনাপতি মুখোমুখি হলেন। রোমান সেনাপতি খালিদকে বললোঃ “আমরা জেনেছি, কঠোর শ্রম ও ক্ষুধা তোমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। তোমরা চাইলে তোমাদের প্রত্যেককে আমরা দশটি দীনার, এক প্রস্থ পোশাক ও কিছু খাদ্য দিতে পারি। বিনিময়ে তোমরা দেশে ফিরে যাবে। আগামী বছরও অনুরূপ জিনিস আমি তোমাদের কাছে পাঠাবো।” রোমান সেনাপতির এ কথায় যে –অপমান প্রচ্ছন্ন ছিল খালিদ তা অনুধাবন করলেন। তিনি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উপযুক্ত জবাবটা ছুঁড়ে মারলেন। বললেনঃ “ –ক্ষুধা আমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে এখানে আনেনি –যেমনটি তোমরা বলেছো। তবে আমরা একটি রক্তপায়ী জাতি। আমরা জেনেছি, রোমানদের রক্ত অপেক্ষা অধিক লোভনীয় ও পবিত্র রক্ত নাকি পৃথিবীতে আর নেই। তাই সেই রক্তের লোভে আমরা এসেছি।” কথাগুলি ছুঁড়ে দিয়েই মহাবীর খালিদ ঘোড়ার লাগাম ধরে টান দিলেন এবং সোজা নিজ বাহিনীতে ফিরে এসে ‘আল্লাহু আকবর, হুয়্যি রিয়াহাল জান্নাহ’ –ধ্বনি দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।
রোমান বাহিনী এমন ভয়ংকররূপ অগ্রসর হলো যে, আরবরা এমনটি আর কখনো দেখেনি। মুসলিম বাহিনীর মধ্যভাগের দায়িত্বে ছিলেন ইকরিমা ইবন আবী জাহল ও কাকা ইবন আমর। খালিদ তাঁদের আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। তাঁরা দু’জন গানের পংক্তি আবৃত্তি করতে করতে শত্রু বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হলো। খালিদ তাঁর গোটা বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। খালিদ রোমান অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর মধ্যভাগে ঢুকে পড়লেন। তিনি যেদিকে গেলেন, রোমান বাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়লো। একাধারে একদিন ও এক রাত তুমুল লড়াই চললো। পরদিন সকালে খালিদকে দেখা গেল রোমান সেনাপতির মঞ্চের ওপর। তাবারীর মতে, এ যুদ্ধে রণক্ষেত্রে নিহতদের ছাড়াও পশ্চাৎদিকে পলায়নপর সৈনিকদের মধ্যে এক লাখ বিশ হাজার রোমান সৈন্য জর্দান নদীতে ডুবে মারা যায়।
যুদ্ধ শেষ। পরদিন সকালে ইকরিমা ও তাঁর পুত্র আমর ইবন ইকরিমাকে ক্ষত-বিক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল। খালিদ ইকরিমার মাথা নিজের উরু ও আমরের মাথা পায়ের নলার ওপর রেখে, তাঁদের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন এবং গলায় ফোঁটা ফোঁটা পানি ঢালতে ঢালতে বলতে লাগলেনঃ ‘ইবনুল হানতামা’ অর্থাৎ উমার মনে করেছিলেন আমরা শাহাদাত বরণ করতে জানিনে। কক্ষণো নয়।’ এ যুদ্ধে তিন হাজার মুসলিম সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন। (তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ -১/১৯৩)
খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের ব্যক্তিত্ব রোমান বাহিনীকে কতটুকু প্রভাবিত করেছিল বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে তা অনুধাবন করা যায়। ইয়ারমুকের যুদ্ধ তখন চলছে। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রোমান বাহুনীর এক কম্যাণ্ডার, নাম ‘জারজাহ’ নিজ ছাউনী থেকে বেরিয়ে এল। তার উদ্দেশ্য খালিদের সাথে সরাসরি কথা বলা। খালিদ তাঁকে সময় ও সুযোগ দিলেন। জারজাহ বললোঃ “খালিদ, আমাকে একটি সত্যি কথা বলুন, মিথ্যা বলবেন না। স্বাধীন ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি মিথ্যা বলেন না। আল্লাহ কি আকাশ থেকে আপনাদের নবীকে এমন কোন তরবারি দান করেছেন যা তিনি আপনাকে দিয়েছেন এবং সেই তরবারি যাদেরই বিরুদ্ধে উত্তোলিত হয়েছে, তারা পরাজিত হয়েছে?
খালিদঃ না।
জারজাহঃ তাহলে আপনাকে ‘সাইফুল্লাহ’ –আল্লাহর তরবারি বলা হয় কেন?
খালিদঃ আল্লাহ আমাদের মাঝে তাঁর রাসূল পাঠালেন। আমাদের কেউ তাঁকে বিশ্বাস করলো, কেউ করলো না। প্রথমে আমি ছিলাম শেষোক্ত দলে। অতঃপর আল্লাহ আমার অন্তর ঘুরিয়ে দেন। আমি তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনে তাঁর হাতে বাইয়াত করি। রাসূল (সা) আমার জন্য দু’আ করেন। আমাকে তিনি বলেনঃ তুমি আল্লাহর একটি তরবারি। এভাবে আমি হলাম ‘সাইফুল্লাহ’।
জারজাহঃ কিসের দিকে আপনারা আহবান জানান?
খালিদঃ আল্লাহর একত্ব ও ইসলামের দিকে।
জারজাহঃ কিভাবে? আপনারা তো এগিয়ে আছেন।
খালিদঃ আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে উঠেছি, বসেছি। আমরা দেখেছি তাঁর ম’জিযা ও অলৌকিক কর্মকাণ্ড। যা কিছু আমরা দেখেছি তা কেউ দেখলে, যা শুনেছি তা কেউ শুনলে, অবশ্যই তার উচিত সহজেই ইসলাম গ্রহণ করা। আর আপনারা যারা তাঁকে দেখেননি, তাঁর কথা শুনেননি, তারপরও অদৃশ্যের ওপর ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতিদান অধিকতর শ্রেষ্ঠ। যদি আপনারা নিষ্ঠার সাথে আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন।”
জারজাহ অশ্ব হাঁকিয়ে খালিদের পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেনঃ খালিদ, আমাকে ইসলাম শিক্ষা দিন।
জারজাহ ইসলাম গ্রহণ করে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। এ দু’রাকাতই তার জীবনের প্রথম ও শেষ নামায। তারপর এ নও মুসলিম-রোমান শাহাদাতের বাসনা নিয়ে মুসলিম বাহিনীর সাথে চললেন রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। আল্লাহ পাক তার বাসনা পূর্ণ করলেন। তিনি শহীদ হলেন (রিজালুন হাওলার রাসূল-২৯৯-৩০১)।
ইয়ারমুকে রোমান বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ের খবর শুনে হিরাক্লিয়াস হিমস নগরী পেছনে ফেলে পিছু হটে যান। যাবার সময় তিনি বলেছিলেন –‘সালামুন আলাইকা ইয়া সুরিয়া সালামান লা লিকাআ বা’দাহ’ –হে সিরিয়া, তোমাকে বিহায়ী সালাম, যে সালামের পর আর কোন সাক্ষাৎ নেই। ইয়ারমুকের পর হযরত খালিদ ‘হাদির’ জয় করেন।
হাদির অভিযান শেষ করে খালিদ চললেন ‘কিন্নাসরীণ’ –এর দিকে। কিন্নাসরীনবাসীরা আগে ভাগেই মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কিল্লায় প্রবেশ করে দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। হযরত খালিদ তাদের লক্ষ্য করে বললেনঃ ‘তোমরা যদি মেঘমালার ওপর আশ্রয় নাও আল্লাহ সেখানেও আমাকে উঠিয়ে নেবেন অথবা তোমাদের নামিয়ে নিয়ে আসবেন আমাদের কাছে।’ (তারিখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ-২/৪) কিন্নাসরীণের অধিবাসীরা হিমসবাসীদের পরিণতি চিন্তা করে খালিদের সাথে সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করে।
বাইতুল মাকদাস অবরোধ করা হয়েছে। এ অবরোধে মুসলিম বাহিনীর কম্যাণ্ডিং অফিসারদের মধ্যে খালিদও আছেন। বাইতুল মাকদাসের খৃষ্টান অধিবাসীরা কোন দিশা না পেয়ে সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তারা আবদার রেখেছে স্বয়ং আমীরুল মুমিনীন উমার নিজ হাতে সেই সন্ধিপত্রে সাক্ষর করবেন। তাদের আবদার রক্ষার জন্য খালিদ মদীনা থেকে সিরিয়া এসেছেন। তিনি সিরিয়ায় অবস্থানরত মুসলিম বাহিনীর অফিসারবৃন্দকে ‘জাবিয়া’ তলব করেছেন। অত্যন্ত জাঁকজমক পোশাক পরে খালিদ এসেছেন। খলীফার দৃষ্টিতে পড়তেই তিনি ঘোড়া থেকে নেমে খালিদের প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ করে বলেনঃ ‘এত শিগগির অভ্যাস পাল্টে ফেলেছো? খালিদ হাতিয়ার উচু করে ধরে বললেন, ‘তবে সৈনিক সুলভ অভ্যাস যায়নি।’ খলীফা বললেন, ‘তাহলে কোন দোষ নেই।’ হিজরী ১৭ সনে আবু উবাইদা ও খালিদ যৌথভাবে হিমসের বিদ্রোহ দমন করেন। আর সেই সাথে সমগ্র সিরিয়ায় শত শত বছরের রোমান শাসনের অবসান ঘটে।
এতবড় সেনাপতিকেও খলীফা হযরত উমার রেহাই দেননি। তিনি খালিদকে সেনাপতির পদ থেকে সাধারণ সৈনিকের পদে নামিয়ে দেন। বরখাস্তের সন সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মতপার্থক্য আছে। কারো মতে হযরত উমারের খিলাফতের পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর হিজরী ১৭ সনে তাঁকে অপসারণ করা হয়। আবার কোন কোন বর্ণনা মতে হযরত উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরই তাঁকে বরখাস্ত করেন, হযরত খালিদ তখন ইয়ারমুকের রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন।
হযরত খালিদের অপসারণের ঘটনা বিভিন্ন জনে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ইয়ারমুকে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। এমন সময় মদীনা থেকে নতুন খলীফা উমারের (রা) দূত এমটি চিঠি নিয়ে রণাঙ্গনে উপস্থিত হলো। চিঠির বিষয়বস্তু দুইটি –আবু বকরের (রা) মৃত্যু সংবাদ এবং খালিদকে অপসারণ করে তাঁর স্থলে আবু উবাইদার নিয়োগ। খালিদ চিঠিটি পাঠ করে আবু বকরের জন্য মাগফিরাত ও উমারের সাফল্য কামনা করে দু’আ করলেন। তারপর পত্রবাহককে অনুরোধ করলেন সে যেন পত্রের বিষয় কারো কাছে প্রকাশ না করে। এভাবে খালিদ আবু বকরের (রা) মৃত্যু সংবাদ ও উমারের নির্দেশ গোপন করে তার কমাণ্ড চালিয়ে অব্যশ্যম্ভাবী বিজয় ছিনিয়ে আনেন। তারপর আবু উবাইদার নিকট উপস্থিত হয়ে একজন সাধারণ সৈনিকের মত তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করলেন। আবু উবাইদা প্রথমে মনে করলেন, এ হয়তো রসিকতা। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝলেন এ রসিকতা নয়; বরং বাস্তব ও সত্য। পোশাক খুলে আবু উবাইদার সামনে রাখলেন।
উল্লেখিত ঘটনাটি কেউ কেউ এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ হযরত খালিদের ব্যয় কখনও সীমা অতিক্রম করে যেত। কবি-সাহিত্যিকদের তিনি মোটা অংকের অর্থ দান করতেন। কবি আশায়াস ইবন কায়েসকে দশ হাজার দিরহাম দান করেন। খলীফা উমার এ কথা অবগত হয়ে আবু উবাইদাকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন খালিদকে জিজ্ঞেস করেন কোন খাত থেকে এ অর্থ তিনি দান করেছেন? মুসলিম উম্মাহর অর্থ থেকে দিয়ে থাকলে খিয়ানাত বা বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করেছেন, আর নিজের অর্থ থেকে দিয়ে থাকলে অপব্যয় করেছেন। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবু উবাইদা খলীফার এ ফরমান লাভ করেন ইয়ারমুকের রণক্ষেত্রে। তিনি খালিদকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন নিজের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে দান করেছি। অতঃপর আবু উবাইদা তাকে খলীফার ফরমান পাঠ করে শোনান এবং সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্তের ইঙ্গিত হিসাবে খালিদের মাথা থেকে টুপি নামিয়ে নেন এবং পাগড়ি ঘাড়ের ওপর নামিয়ে দেন। খালিদ শুধু মন্তব্য করেন, আমি খলীফার ফরমান শুনেছি এবং তা মেনে নিয়েছি। এখনও আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ মানতে এবং খিদমাত অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত। খলীফা তাঁকে মদীনায় তলব করেন। তিনি মদীনায় পৌঁছলে তাঁর সম্পদের কঠোর হিসাব গ্রহণ করা হয়; কিন্তু কোন অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। অতঃপর খলীফা উমার (রা) সর্বত্র ঘোষণা করে দেন, আমি খালিদকে আস্থাহীনতা, ক্রোধবশতঃ বা এ জাতীয় কোন কারণে অপসারণ করিনি। (ইবনুল আসীর-২/৪১৮)
উল্লেখিত ঘটনা ছাড়াও খালিদের অপসারণের আরো কারণ ছিল। খালিদের সৈনিক স্বভাবে ছিল রুক্ষতা। প্রতিটি কাজে তিনি নিজের মর্জিমত চলতেন, খলীফার সাথে পরামর্শের প্রয়োজন মনে করতেন না। সেনাবাহিনীর আয়-ব্যয়ের হিসাবও খলীফার দরবারে নিয়ম মত পাঠাতেন না। ইরাক অভিযান শেষ করেই তিনি খলীফা আবু বকরের (রা) অনুমতি ছাড়াই হজ্জের উদ্দেশ্যে মককায় চলে যান। তাঁর এ কাজে হযরত আবু বকর (রা) ভীষণ বিরক্ত হন। খলীফা তাঁকে বার বার সতর্ক করেন। তিনি খলীফাকে জবাব দেন, আমাকে আমার মর্জিমত কাজ করার সুযোগ দিন, অন্যথায় আমি নিজেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবো। খালিদের এসব কাজে আবু বকরের (রা) সময় থেকেই হযরত উমার (রা) অসন্তুষ্ট ছিলেন। তিনি বার বার আবু বকরকে (রা) পরামর্শ দান করেন খালিদকে বরখাস্ত করার জন্য। আবু বকর (রা) প্রতিবারই জবাব দেন, আমি এমন তরবারিকে কোষবদ্ধ করতে পারিনা যাকে আল্লাহ কোষমুক্ত করেছেন। উমার খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর খালিদকে সংশোধনের চেষ্টা করেন; কিন্তু ফলোদয় না হওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করেন।
তাছাড়া তাঁকে অপসারণের পশ্চাতে তৃতীয় যে কারণটির কথা ইতিহাসে উল্লেখ আছে তা হলো, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের মধ্যে এ ধারণা ও বিশ্বাস জম্ম লাভ করে যে, ইসলামের বিজয় মূলতঃ খালিদের বাহুবলের ওপর নির্ভরশীল। এ ধরনের অমূলক ধারণা খলীফা উমারের মোটেই মনোপূত ছিল না। তিনি খালিদকে অপসারণ করে এ বিশ্বাসের অসারতা প্রমাণ করেন।
বিষয়টি যেভাবে এবং যেমন করেই ঘটুক না কেন, এ ক্ষেত্রে হযরত খালিদের ভূমিকা লক্ষ্যণীয় বিষয়। তিনি যে আনুগত্য নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ইতিহাসে তার কোন নজীর পাওয়া যাবে না। এমনটি করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন এ কারণে যে, তিনি বিশ্বাস করতেন সেনাপতি ও সাধারণ সৈনিক –উভয় অবস্থা সমান। সর্ব অবস্থায় আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল এবং যে দ্বীনের প্রতি তিনি ঈমান এনেছেন, তাদের সকলের প্রতি দায়িত্ব পালন করা নিজের অপরিহার্য কর্তব্য বলে মনে করতেন। একজন অনুগত সেনাপতি এবং একজন অনুগত সাধারণ সৈনিক –এ দু’য়ের মধ্যে মূলতঃ কোন প্রভেদ তাঁর দৃষ্টিতে ছিল না। তাই তিনি সেনাপতির পদ ছেড়ে সাধারণ সৈনিক হিসেবে সমানভাবে কাজ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। আর একই কারণে আবু উবাইদার হাতে সেনাপতির দায়িত্ব বুঝে দেওয়ার পর সাধারণ সৈনিকের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত এক ভাষণে তিনি বলতে পেরেছিলেনঃ ‘এই উম্মাতের আমীন বা পরম বিশ্বাসী ব্যক্তি আবু উবাইদাকে তোমাদের আমীর নিয়োগ করা হয়েছে।’
খলীফা হযরত উমার (রা) খালিদকে সেনাপতির পদ থেকে অপসারণ করার পর তাঁকে বিভিন্ন প্রদেশে ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ করেন। কিছুদিন পর খালিদ স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণ করেন এবং মদীনায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। হিজরী ২১/২২ সনে কিছু দিন অসুস্থ থাকার পর মদীনায় ইনতিকাল করেন। অনেকের মতে তিনি হিমসে ইনতিকাল করেন; কিন্তু একথা সঠিক নয় বলে ধারণা হয়। কারণ, খলীফা হযরত উমার (রা) তাঁর জানাযায় শরিক হন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ আছে। (উসুদুল গাবা ২/৯৬, আল ইসাবা-১/৪১৫)
হযরত খালিদের (রা) মৃত্যুর পর খলীফা হযরত উমার (রা) বলেছিলেনঃ ‘নারীরা খালিদের মত সন্তান প্রসবে অক্ষম হয়ে গেছে।’ খালিদের মৃত্যুর পর খলীফা অত্যন্ত ব্যাকুলভাবে কেঁদেছিলেন। মানুষ পরে জেনেছিল, শুধু খলিদের বিয়োগ ব্যথায় তিনি এভাবে কাঁদেননি; বরং খালিদের অপসারণের কারণ দূরীভূত হওয়ায় তিনি তাঁকে আবার সেনাপতির পদে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন। মৃত্যু তাঁর সেই ইচ্ছার প্রতিবন্ধক হওয়ায় তিনি এত কেঁদেছিলেন। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫)
প্রথম থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত হযরত খালিদের জিহাদের ময়দানে অতিবাহিত হয়েছে। এ কারণে হযরত রাসূলে পাকের (সা) সুহবতে থাকার সুযোগ ও সময় খুব কম পেয়েছেন। তিনি নিজেই বলেছেনঃ ‘জিহাদের ব্যস্ততা কুরআনের বিরাট একটি অংশ শিক্ষা থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছে।’ (আল ইসাবা-১/৪১৫) তা সত্বেও সুহবতে নববীর ফয়েজ ও ইলমের সৌভাগ্য থেকে তিনি বঞ্চিত ছিলেন, তা নয়। রাসূলে পাকের (সা) ইনতিকালের পর মদীনার আলিম ও মুফতি সাহাবীদের মধ্যে তিনিও ছিলেন একজন। তবে সৈনিক স্বভাবের কারণে ইফতা’র মসনদে কখনো তিনি বসেননি। তাঁর ফতোয়ার সংখ্যা দু’চারটির বেশী পাওয়া যায় না। (আ’লামুল মুওয়াক্কিয়ীন) তিনি মোট ১৮টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে দু’টি মুত্তাফাক আলাইহি অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম এবং একটি বুখারী এককভাবে বর্ণনা করেছেন।
একবার আম্মার বিন ইয়াসির (রা) ও তাঁর মধ্যে ঝগড়া হয়। খালিদ তাঁকে ভীষণ গালমন্দ করেন। আম্মারও রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট শিকায়েত করেন। সকল বৃত্তান্ত শুনে রাসূল (সা) মন্তব্য করেনঃ ‘যে আম্মারের সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে সে আল্লাহর সাথে হিংসা ও শত্রুতা রাখে।’ খালিদের ওপর রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণীর এমন প্রতিক্রিয়া হলো যে, তিনি তক্ষুণি আম্মারের কাছে ছুটে যান এবং তাঁকে খুশী করেন। খালিদ নিজেই বলেছেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে ওঠার পর আম্মারের সন্তুষ্টি অর্জন করা ছাড়া আমার নিকট অধিক প্রিয় আর কোন জিনিস ছিল না। হযরত খালিদের হৃদয়ে রাসূলে পাকের (সা) প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা এত তীব্র ছিল যে, রাসূলুল্লাহর (সা) শানে কেউ কোন সামান্য অমার্জিত কথা বললে তিনি সহ্য করতে পারতেন না। একবার রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট কিছু স্বর্ণ এলো। তিনি তা নজদী সরদারদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। কুরাইশ ও আনসারদের কেউ কেউ এতে আপত্তি জানায়। এক ব্যক্তি বলে বসে, ‘মুহাম্মাদ আল্লাহকে ভয় করুন।’ রাসূল (সা) বলেনঃ ‘আমি আল্লাহর নাফরমানী করলে আল্লাহর ইতায়াত বা আনুগত্য করে কে?’ লোকটির এমন অমার্জিত কথায় খালিদ ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, অনুমতি দিন, তার গর্দান উড়িয়ে দিই। রাসূল (সা) তাঁকে শান্ত করেন। (বুখারী)
হযরত খালিদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও গৌরবজনক অধ্যায় ‘জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ’ –আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। জীবনের বেশীর ভাগ সময় তাঁর রণক্ষেত্রে কেটেছে। তাঁর বীরত্বব্যঞ্জক কর্মকাণ্ড ও জিহাদের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণের কারণে হযরত রাসূলে পাকের পক্ষ থেকে ‘সাইফুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন। প্রায় সোয়া শো যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। যেখানেই গেছেন বিজয়ী হয়ে ফিরেছেন। তাঁর ওপর হযরত রাসূলে পাকের এতখানি আস্থা ছিল যে, তাঁর হাতে পতাকা এলে তিনি নিশ্চিন্ত হয়ে যেতেন। প্রচুর সমরাস্ত্র তিনি পৈতৃক বিষয় হিসেবে লাভ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সব কিছুই আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দেন। (তাবাকাত) তাঁর বন্ধু ও শত্রুরা তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেঃ ‘তিনি এমন ব্যক্তি যিনি নিজেও ঘুমান না, অন্যকেও ঘুমাতে দেন না।’ খালিদ নিজেই বলতেনঃ “এমন একটি রাত্রি যা আমি নব বধুর সাথে কাটাতে পারি, অথবা যে রাত্রে আমাকে একটি পুত্র সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয় –তা অপেক্ষা একটি প্রচণ্ড শীতের রাত্রে একটি মুহাজির দলের সাথে প্রত্যুষে মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালাই, তা আমার নিকট অধিক প্রিয়।”
মৃত্যুশয্যায় একদিন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমি শতাধিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি, আমার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে তরবারি, তীর অথবা বর্শার দু’একটি আঘাত রয়েছে। আর আজ আমি জ্বরাগ্রস্ত উটের মত বিছানায় পা দাপিয়ে মৃত্যুবরণ করছি।” কথাগুলি তিনি যখন বলছিলেন তখন তাঁর দু’চোখ দিয়ে অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছিল। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৫-৩০৬, উসুদুল গাবা-২/৯৫)
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি তাঁর পরিত্যক্ত সম্পত্তি খলীফা উমারের (রা) অনুকূলে অসীয়াত করে যান। সেই পরিত্যক্ত সম্পত্তি তাঁর ঘোড়াটি ও কিছু যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবে জীবদ্দশায় তাঁর সর্বাধিক প্রিয় বস্তু-দু’টি মরণের পরও আল্লাহর রাস্তায় অয়াকফ করে যান।
হযরত রাসূলে করীম (সা) নানা প্রসঙ্গে একাধিকবার তাঁর প্রশংসা করেছেন। মক্কা বিজয়ের সময় একদিন কিছু দূরে খালিদকে দেখা গেল। রাসূল (সা) আবু হুরাইরাকে (রা) বললেন, দেখতো কে? তিনি বললেন, খালিদ। রাসূল (সা) বললেন, আল্লাহর এ বান্দাটি কতই না ভালো। একবার তিনি সাহাবীদের বলেন, খালিদকে তোমরা কষ্ট দেবে না। কারণ, সে কাফিরদের বিরুদ্ধে চালিত আল্লাহর তরবারি।
একবার রাসূল (সা) উমারকে (রা) পাঠালেন যাকাত আদায়ের জন্য। ইবন জামীল, খালিদ ও আব্বাস –এ তিনজন যাকাত দিতে অস্বীকার করলো। রাসূল (সা) একথা অবগত হয়ে বললেনঃ ইবন জামীল ছিল দরিদ্র, আল্লাহ তাকে সম্পদশালী করেছেন। এ তার প্রতিদান। তবে খালিদের প্রতি তোমরা বাড়াবাড়ি করেছো। সে তার সকল যুদ্ধাস্ত্র আল্লাহর রাস্তায় ওয়াকফ করে দিয়েছে। তার ওপর যাকাত হয় কেমন করে? আর আব্বাস?তার দায়িত্ব আমার ওপর। তোমাদের কি জানা নেই চাচা পিতৃস্থানীয়? (আবু দাউদ-১/১৬৩)
হযরত খালিদ (রা) কেবল একজন সৈনিকই ছিলেন না, তিনি একজন দক্ষ দা’য়ী-ই-ইসলাম –ইসলামের দাওয়াত দানকারীও ছিলেন। বনী জুজাইমা ও মালিক ইবন নুওয়াইরার ব্যাপারে তরিৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে যে ক্ষতি হয় তা লক্ষ্য করে রাসূল (সা) পরবর্তীতে দায়িত্ব দিয়ে কোথাও পাঠানোর সময় তাঁকে উপদেশ দেন –‘শুধু ইসলামের দাওয়াত দেবে, তলোয়ার ওঠাবে না।’ তেমনিভাবে ইয়ামনে পাঠানোর সময়ও নির্দেশ দেন, ‘যুদ্ধের সূচনা যেন তোমার পক্ষ থেকে না হয়।, এ হিদায়াত লাভের পর যত যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন কোথাও কোন প্রকার বাড়াবাড়ি হয়েছে বলে জানা যায় না। রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় এবং তাঁর ওফাতের পরেও তিনি যথাযথভাবে দা’য়ীর দায়িত্ব পালন করেছেন। মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা) ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য চতুর্দিকে যে বিভিন্ন মিশন পাঠান, তার কয়েকটির দায়িত্ব খালিদ পালন করেন। বনী জুজাইমা ও বনী আবদিল মাদ্দান তাঁরই চেষ্টায় ইসলাম গ্রহন করে। ইয়ামনের দাওয়াতী কাজে তিনি হযরত আলীর (রা) সহযোগী ছিলেন। তাঁরই চেষ্টায় ভণ্ড নবী তুলাইহা আসাদীর সহযোগী বনু হাওয়াযিন, বনু সুলাইম, বনু আমের প্রভৃতি গোত্র পুনরায় ইসলামে ফিরে আসে। এছাড়াও অসংখ্য লোক বিভিন্ন সময় তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করে। প্রতিটি যুদ্ধ শুরুর আগে ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষকে সব সময় তিনি ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। যুদ্ধের ময়দানে প্রচণ্ড যুদ্ধের মাঝেও তিনি সফল দায়ীর ভূমিকা পালিন করেছেন। ইয়ারমুকের রোমান সৈনিক ‘জারজাহ’ তার জ্বলন্ত প্রমাণ।
সংক্ষিপ্ত কোন প্রবন্ধে খালিদের জীবনের সব কথা তুলে ধরা যাবে না। আমীরুল মু’মিনীন উমার (রা) খালিদের মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করে যে –কথাগুলি বলেছিলেন, আমরাও সেই কথাগুলির পুনরাবৃত্তি করছি, ‘রাহেমাল্লাহ আবা সুলাইমান, মাইনদাল্লাহ খায়রুন মিম্মা কানা ফীহিল্লা, লাকাদ আশা হামীদান ওয়া মাতা সা’ঈদান –আল্লাহ আবু সুলাইমান খালিদের ওপর রহম করুন। তিনি যে অবস্থায় ছিলেন আল্লাহর কাছে তার থেকে উত্তম কিছু নেই। তিনি জীবনে প্রশংসিত এবং মরণে সৌভাগ্যবান।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল-৩০৮)
আমর ইবনুল আস (রা)

আমর নাম, আবু আবদিল্লাহ ও আবু মহাম্মাদ কুনিয়াত। পিতা আস ও মাতা নাবিগা। তাঁর বংশের উর্ধপুরুষ কা’ব ইবন লুই-এর মাধ্যমে রসূলুল্লাহর (সা) নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে।
জাহিলী যুগেই আমর ইবনুল আসের খান্দান-‘বনু সাহম’ সম্ভ্রান্ত খান্দান হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল। কুরাইশদের ঝগড়া-বিবাদের সালিশ-মিমাংসার দায়িত্ব এই খান্দানের ওপর অর্পিত হত। তাঁর জম্ম ও শৈশবকাল সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে পর্যন্ত তিনি ছিলেন কট্টর ইসলাম-দুশমন। কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সাথে একাত্ম হয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতায় তাঁর ছিল দারুণ উৎসাহ।
বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহর (সা) চরম শত্রু কুরাইশদের তিন প্রধান পুরুষের একজন ছিলেন তিনি। যাদের বুরুদ্ধে শেকায়েত করে রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর কাছে দু’আ করতেন এবং আল্লাহ তার জবাবে এ আয়াত নাযিল করেনঃ “লাইসা লাকা মিনাল আমরে শাইয়্যুন, আও ইয়াতুবা আলাইহিম আও ইউ ’আজ্জিবাহুম, ফাইন্নাহুম যালিমুন।” (আলে ইমরান-১২৮)- “কোন ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন অধিকার তোমার নেই। আল্লাহ তাদের প্রতি সদয় হয়ে ক্ষমা করে দিতে পারেন অথবা শাস্তিও দিতে পারেন। কারণ, তারা যালিম-অত্যাচারী।” রাসূলুল্লাহ বুঝতে পারলেন তাদের ওপর বদদু’আ করতে নিষেধ করা হচ্ছে। তিনি বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেন। এই তিন জনের একজন হলেন পরবর্তীকালে ইসলামের মহা সেনা নায়ক, আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ র্ধূত কূটনীতিক, মিসরবাসীর মুক্তি দাতা হযরত আমর ইবনুল আস (রা)। (রিজালুন হাওলার রাসূল-৬১৪)
মুসলমানদের যে প্রথম দলটি হাবশায় যায়, তার সবচেয়ে উৎসাহী সদস্য ছিলেন এই আমর ইবনুল আস। তিনি হাবশায় রাজা ও রাজদরবারে বিভিন্ন ব্যক্তির সাথে কথা বলেন এবং মুসলমানদের হাবশা থেকে বহিস্কারের ব্যাপারে তাদেরকে স্বমতে আনার সব রকম চেষ্টা চালান। বাদশার দরবারে মুসলমানদের বিরুদ্ধে র্ধ্মত্যাগের অভিযোগ উত্থাপন করে জ্বালাময়ী ভাষণও দেন। কিন্তু তাঁর সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
খন্দকের যুদ্ধে আরব উপদ্বীপের প্রায় সকল গোত্র কুরাইশদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে মুসলমানদের সমুলে বিনাশ করার জন্য মদীনার উপকণ্ঠে হাজির হন। এখানেও আমর ছিলেন কুরাইশ পক্ষের এক প্রধান পুরুষ। খন্দকের পর কোথা থেকে কি যেন ঘটে গেল। এমন যে গোঁড়া ইসলাম-দুশমন তার মধ্যেও ভাবান্তর সৃষ্টি হল। ইসলামের দাওয়াত ও বাণী সম্পর্কে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি নিজেই বলেছেন, “এই চিন্তা-ভাবনার ফলে ইসলামের মূলকথা ধীরে ধীরে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। আস্তে আস্তে আমি মুসলমানদের বিরোধিতা থেকে দূরে সরে যেতে লাগলাম। কুরাইশ নেতারা তা বুঝতে পেরে আমার কাছে একজন লোক পাঠালো। সে আমার সাথে তর্ক শুরু করলো। আমি তাকে বললাম, ‘বলতো, সত্যের ওপর আমরা, না পারসিক ও রোমানরা?’ সে বললো, ‘আমরা’, জিজ্ঞেস করলাম, ‘সুখ-সম্পদ ও ঐশ্বর্যের অধিকারী তারা, না আমরা?’ সে বললো, তারা। আমি বললাম, ‘এ জীবনের পরে যদি আর কোন জীবন না থাকে তাহলে আমাদের এ সত্যাশ্রয়ী জীবন কী কাজে আসবে? এ দুনিয়াতেই আমরা মিথ্যাশ্রয়ীদের তুলনায় দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় আছি, আর পরলোকেও আমাদের পুরস্কার লাভের কোন সাম্ভাবনা নেই। এ কারণে মুহাম্মাদের (সা) এ শিক্ষা- মরণের পর আর একটি জগত হবে, সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তার কর্মের ফল লাভ করবে-অত্যন্ত সঠিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।” খন্দকের পর তার মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) সাফল্য সম্পর্কে পূর্ণ বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল। তিনি বুঝেছিলেন, বিজয়ী হওয়ার জন্যই ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে। এ বিশ্বাসই তাঁকে ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করে।
তিনি বলেন, খন্দক যুদ্ধ থেকে মক্কায় ফিরে আমি আমার নিকটতম আত্মীয় বন্ধুদের ডেকে বললাম, তোমরা জেনে রাখ মুহাম্মাদের কথা সকল কথার ওপর বিজয়ী হবে-এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। আমার একটি সুচিন্তিত মতামত আছে, বিষয়টি তোমরা কিভাবে নেবে তা আমি জানতে চাই। তিনি বললেন, চলো আমরা নাজাশীর কাছে গিয়ে অবস্থান করতে থাকি। মুহাম্মাদ যদি আমাদের ওপর বিজয়ী হয় আমরা নাজাশীর কাছেই থেকে যাব। আর যদি আমাদের কাওম বিজয়ী হয় তাহলে তো আমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। সে ক্ষেত্রে আমাদের সাথে নাজাশীর আচরণ উত্তমই হবে। আমার এ মতামত সকলে মেনে নিল। অতঃপর আমরা নাজাশীর জন্য কি উপহার নিয়ে যাওয়া যায় তা আলোচনা করলাম। উপহার দেওয়ার মত সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু ছিল আমাদের এখানকার চামড়া। আমরা বেশ কিছু চামড়া নিয়ে হাবশায় পৌঁছলাম।
আমরা নাজাশীর দরবারে যাচ্ছি, এমন সময় আমর ইবন উমাইয়্যা আদ-দামারীও সেখানে পৌঁছেন। হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) বিশেষ কোন প্রয়োজনে তাঁকে মদীনা থেকে হযরত জাফর ইবন আবী তালিবের কাছে পাঠিয়েছেন। জাফর ইবন আবী তালিব তখনও হাবশায় অবস্থান করছিলেন। কিছুক্ষণ পর আমর নাজাশীর দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা নাজাশীকে অনুরোধ করবো আমরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য। আমাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে যদি তিনি আমরকে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা তাকে হত্যা করবো। এতে কুরাইশরা বুঝবে আমরা মুহাম্মাদের দূতকে হত্যা করে বদলা নিয়েছি। এ সিদ্ধান্তের পর আমি নাজাশীর দরবারে উপস্থিত হলাম। নিয়ম মাফিক তাঁকে কুর্ণিশ করে আমাদের উপহার সামগ্রী তাঁর সামনে পেশ করলাম। উপহারগুলি তাঁর খুবই মনোপূত হল।
অতঃপর আমি আরজ করলাম, এখনই যে ব্যক্তি আপনার দরবার থেকে বেরিয়ে গেল সে আমাদের ঘোরতর শত্রুর দূত। আপনি যদি তাকে আমাদের হাতে তুলে দেন, আমরা তাকে হত্যা করবো। আমার এ আবেদনে নাজাশী ক্রোধে ফেটে পড়লেন। অবস্থা বেগতিক দেখে বিনীতভাবে বললাম, আমার এ আবেদন আপনাকে এতখানি উত্তেজিত করবে জানতে পেলে আমি এ আবেদন জানাতাম না। নাজাশী বললেন, তুমি কি চাও, যে ব্যক্তির কাছে আসেন ‘নামুসে আকবর’ যিনি মূসার (আ) কাছেও এসেছেন, তাঁর দূতকে আমি হত্যার জন্য তোমাদের হাতে তুলে দিই? আমি বললাম, সত্যিই কি তিনি এমন ব্যক্তি? তিনি বললেন, আমর, তোমাদের অবস্থা সত্যিই দুঃখজনক। আমার কথা শোন, তোমরা তাঁর আনুগত্য কর। আল্লাহর কসম, তিনিই সত্যপন্থী। তিনি তাঁর বিরোধীদের ওপর বিজয়ী হবেন, যেমন হয়েছিলেন মূসা ফিরআউন ও তার লোক লস্করদের ওপর। আমি বললাম, আপনি তাহলে তার পক্ষে আমার বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ নিন। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন এবং আমি তাঁর হাতে ইসলামের বাইয়াত গ্রহণ করলাম। আমার সাথীদের কাছে আমি ফিরে গেলাম; কিন্তু তখন আমার চিন্তাধারায় একটা বিপ্লব ঘটে গেছে। আমি তাদের কাছে কিছুই প্রকাশ করলাম না।
আমি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াতের উদ্দেশ্যে হাবশা থেকে রওয়ানা হলাম। পথে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের সাথে দেখা। তিনিও মক্কা থেকে মদীনার দিকে যাচ্ছেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আবু সুলাইমান, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, মারাত্মক পরীক্ষার সম্মুখীন। আমার নিশ্চিত বিশ্বাস এ ব্যক্তি নবী। এখন খুব তাড়াতাড়ি ইসলাম কবুল করা উচিত। এই দ্বিধা-সংশয় আর কত দিন ! বললাম, আমিওতো এই উদ্দেশ্যে চলেছি। অতঃপর আমরা দু’জন এক সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হলাম। আমাদের দু’জনকে দেখেই রাসূলুল্লাহর (সা) চেহরা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি সাহাবীদের লক্ষ্য করে বলেন, ‘লাকাদ রামাতকুম মাককাহ বিফালাজাতি আকবাদিহা-মক্কা তার কলিজার সুতীক্ষ্ণ বা মূল্যবান অংশসমূহ তোমাদের প্রতি ছুড়ে মারেছে।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল)
প্রথমে খালিদ বিন ওয়ালিদ রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত হন। তারপর আমি একটু নিকটে এসে আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ ! আমিও বাইয়াত হবো। তবে আমার পূর্বের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দিতে হবে। তিনি বললেন, আমর, বাইয়াত কর। ইসলাম পূর্বের সকল পাপ মুছে দেয়, হিজরাতও পূর্বের সকল অপরাধ নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আমি রাসূলুল্লাহর হাতে বাইয়াত করে ফিরে গেলাম। এটা সপ্তম হিজরীর প্রথম দিকে খাইবার বিজয়ের ছয় মাস পূর্বের ঘটনা। (সীরাতু ইবন হিশাম, ২য়, ২৭৬-২৭৮, আল-ফাতহুর রাব্বানী খণ্ড-২২, মুসনাদে ইমাম আহামাদ, হায়াতুস সাহাবা-১/১৫৭-৬০)
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মক্কায় ফিরে যান। কিছুদিন মক্কায় অবস্থানের পর আবার মদীনায় হিজরাত করেন। আমর ইবনুল আস ছিলেন ইসলাম ও কুফর উভয় অবস্থায় চরমপন্থী। পূর্বে যেমন ইসলামের মূলোৎপাটনে ছিলেন বদ্ধপরিকর তেমনি ছিলেন ইসলাম গ্রহণের পর কুফর ও শিরকের ব্যাপারেও। তিনি বলেন, “আমার কাফির অবস্থায় আমি ছিলাম রাসূলুল্লাহর (সা) সবচেয়ে বড় দুশমন। তখন মারা গেলে জাহান্নামই হত আমার ঠিকানা। আর মুসলমান হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সা) কখনও আমার চোখের আড়াল হতে পারতেন না।” তাঁর ইসলাম গ্রহণের পরও একাধিক যুদ্ধে সংঘটিত হয়; কিন্তু তাঁর অংশ গ্রহণের বিষয়ে বিস্তারিত তেমন কিছু জানা যায় না। তবে একাধিক ক্ষুদ্র অভিযান যে তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয় সেকথা ইতিহাসে জানা যায়।
ইবন সাদ বলেন, মক্কা বিজয়ের পর বনু কাদা’আর কিছু লোক সংঘবদ্ধ হয়ে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনা করে। রাসূল (সা) তিনশ’ মুজাহিদের একটি বাহিনী আবু উবাইদার নেতৃত্বে তাদের বিরুদ্ধে পাঠান। রাসূল (সা) মদীনা থেকে তাঁর সাহায্যের জন্য দুশ’ মুজাহিদের একটি বাহিনী আবু উবাইদার নেতৃত্বে পাঠান। এই দলে আবু বকর, উমার প্রমুখের মত বিশিষ্ট সাহাবীও ছিলেন। তাঁরা সকলে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে শত্রুদের পরাজিত করেন। ইতিহাসে এ অভিযান ‘গাযওয়া জাতুস সালাসিল’ নামে পরিচিত।
আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ গোত্র মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করে। কোন কোন গোত্র ইসলাম কবুল করলেও যুগ যুগ ধরে লালিত কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলতে পারছিল না। মূর্তি ও মূর্তি উপাসনার কেন্দ্র ভেংগে ফেলতে ভয় পাচ্ছিল। তাই রাসূল (সা) এসব মূর্তি ভাংগার জন্য কয়েকটি বাহিনী বিভিন্ন দিকে পাঠান। যাতে নও মুসলিমদের অন্তর থেকে মূর্তিপুজার কেন্দ্রের নাম ছিল ‘সু’আ’। এই কেন্দ্রটির কাছে পৌঁছলে স্থানীয় লোকেরা তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পেরে বললো, আপনি এই কেন্দ্র ধ্বংস করতে পারবেন না। তার আত্মরক্ষা সে নিজেই করবে। আমর বললেন, তোমারা এখনও এমন ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কুসংস্কারে হাবুডুবু খাচ্ছ? যার দেখা ও শোনার ক্ষমতা নেই সে কিভাবে আত্মরক্ষা করবে? তারপর তিনি কেন্দ্রটি নিশ্চহ্ন করে দেন। এদৃশ্য দেখে স্থানীয় জনসাধারণের ঈমান মজবুত হয়ে যায়।
মক্কা বিজয়ের পর রাসূল (সা) আরব উপদ্বীপের আশে-পাশের রাজা-বাদশাদের নিকট ইসলামের দাওয়াত পেশ করে চিঠিটি নিয়ে যান। উমানের শাসক চিঠি পেয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (সা) আমরকে উমানের ওয়ালী নিযুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহর ওফাত পযর্ন্ত আমর উমানেই অবস্থান করেন। (ফুতুহুল বুলদান)
হযরত আবু বকরের (রা) খলীফা হওয়ার পর আরব উপদ্বীপে ভণ্ড নবী ও যাকাত অস্বীকারকারীদের ফিতনা ও বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমর ইবনুল আস তখন উমানেই। খলীফার নির্দেশে তিনি উমান থেকে বাহরাইনের পথে অগ্রসর হন। পথে বনি আমরের নেতা ‘কুররাহ বিন হুরায়রার অতিথি হন। কুররাহ তাঁকে যথেষ্ট সমাদর করেন। বিদায়ের সময় তিনি আমরকে বলেন, যদি যাকাত আদায় করা হয় তাহলে আরববাসী কারও ইমারাত বা নেতৃত্ব মেনে নেবে না। যাকাত আদায় স্থগিত হলে তারা অনুগত ও বাধ্য থাকবে। এ কারণে যাকাত রহিত করা উচিত।
আমর বললেন, কুররাহ, তুমি কি ইসলাম ত্যাগ করেছ? আমাকে আরববাসীর ভয় দেখাচ্ছো?আল্লাহর কসম, এমন লোকদের আমি ঘোড়ার পায়ে পিষে ফেলবো। পরবর্তীকালে কুররাহ অন্য বিদ্রোহীদের সাথে বন্দী হয়ে মদীনায় আসেন এবং আমর তাঁকে মুক্ত করেন। উমান থেকে আমর মদীনায় পৌঁছলে খালীফা আবুবকর (রা) তাঁকে বনু কাদা’আর বিদ্রোহ দমনের জন্য পাঠান। তাঁর চেষ্টায় বনু কাদা’আহ আবার ইসলাম ফিরে আসে। বিদ্রোহ দমিত হলে তিনি আবার উমানে ফিরে যান।
খলীফা হযরত আবু বকর (রা) হিজরী ১৩ সনে সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠান। তিনি আমরকে লিখলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাকে উমানের ওয়ালী নিয়োগ করেছিলেন, তাই তোমাকে আমি দ্বিতীয়বার সেখানে পাঠিয়েছিলাম। এখন তোমার ওপর আমি এমন দায়িত্ব অপর্ণ করতে চাই যা তোমার চাই যা তোমার ইহ-পরকালের জন্য কল্যাণকর হবে। জবাবে আমর লিখলেন, আমি তো আল্লাহর একটি তীর। আর আপনি একজন দক্ষ তীরন্দায। যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে এ তীর নিক্ষেপ করার অধিকার আপনার আছে। খলীফা তাঁকে উমান থেকে সরিয়ে ফিলিস্তীন সেক্টারে নিয়োগ করেন।
মুসলিম বাহিনী চতুর্দিক থেকে সিরিয়ায় চালালো। রোমান সম্রাট মুসলিম বাহিনীর মুকাবিলার জন্য ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠালো। ভিন্ন ভিন্ন রোমান বাহিনী অবশেষে আজনাদাইনে সমবেত হয়। আমর ইবনুল আস ফিলিস্তীন থেকে আজনাদাইনের দিকে অগ্রসর হলেন। এদিকে খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আবু উবায়দা বসরা অভিযান শেষ করে আমরের সাহায্যের জন্য আজনাদাইনে পৌঁছলেন। হিজরী ১৩ সনে মুসলিম ও রোমান বাহিনীর মধ্যে এই আজনাদাইনে প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। রোমান সেনাপতি নিহত হয় এবং তারা শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। আজনাদাইনে রোমান সেনাপতি একজন আরব গুপ্তচরকে মুসলিম বাহিনীর খবর সংগ্রহের জন্য পাঠায়। সে মুসলিম সেনা ছাউনী ঘুরে ফিরে দেখে য়াওয়ার পর রোমান সেনাপতি তাকে জিজ্ঞেস করে, কি খবর নিয়ে এলে?সে সত্য কথাটি প্রকাশ করে দেয়। সে বলেঃ এই লোকগুলি ইবাদতের মধ্যে রাত্রি অতিবাহিত করে এবং দিনে রণক্ষেত্রে ঘোড় সওয়ার। তাদের শাহজাদাও যদি কোন অপরাধ করে, তারও ওপর শরীয়াতের বিধান কার্যকর করা হয়। এ কথা শুনে সেনাপতি মন্তব্য করে, সত্যিই যদি তারা এমন গুণাবলীর অধিকারী হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়ে মাটিতে পুঁতে যাওয়া অধিক শ্রেয়।
দিমাশক অভিযানেও আমর তাঁর দুই সংগী খালিদ ও আবু উবাইদার সাথে অংশ গ্রহণ করেন এবং দিমাশকের ‘তুমা’ ফটক অবরোধের দায়িত্ব পালন করেন। দিমাশকের পর ‘ফাহল’ অভিযান পরিচালিত হয়। এ অভিযানেও তিনি মুসলিম বাহিনীর একটি অংশের সফল নেতৃত্ব দান করেন।
মুসলিম বাহিনীর ধারাবাহিক আক্রমণে রোমান বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করতে থাকে। অবশেষে রোমান সম্রাটের নির্দেশে বিপর্যস্ত রোমান বাহিনী নতুন ভাবে সংগঠিত হয়ে দু’লাখ সদস্যের এক বিশাল বাহিনীতে পরিণত হয় এবং মুসলিম বাহিনীকে চুড়ান্ত ভাবে প্রতিরোধের জন্য ‘ইয়ারমুক’ নামক স্থানে সমবেত হয়। খলিদ, আমর ও শুরাহবীল ইবন হাসানার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনীও ইয়ারমুকে উপস্থিত হয়। তবে সম্মিলিত মুসলিম বাহিনী অপেক্ষা রোমান বাহিনীর সৈন্য সংখ্যা চারগুণ বেশী ছিল। ইয়ারমুকের এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আমর ইবনুল আস অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার সাথে লড়াই করেন। রোমান বাহিনী শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। সমগ্র সিরিয়ায় ইসলামের ঝাণ্ডা সমুন্নত হয়।
ইয়ারমুকের পূর্বেই আমর ইবনুল আস ফিলিস্তীনের কিছু অঞ্চলের বিজয় অভিযান শেষ করেছিলেন। এখন ইয়ারমুকের পর তিনি ফিলিস্তীনের সবচেয়ে বড় শহর ‘ঈলিয়া’ বা বাইতুল মাকদাস অভিযানে মনোযোগী হন। তিনি বাইতুল মাকদাস অবরোধ করেন। আবু উবাইদাও তাঁকে সাহায্য করেন। কোন রকম রক্তক্ষয় ছাড়াই তিনি বাইতুল মাকদাস জয় করেন। ঈলিয়াবাসীদের দাবী অনুযায়ী খালীফা উমার (রা) মদীনা থেকে বাইতুল মাকদাস উপস্থিত হন এবং তাদের সাথে এক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন। এভাবে এই প্রথমবারের মত এই গৌরবময় শহরটি মুসলমানদের অধিকারে আসে।
বাইতুল মাকদাস বিজয়ের বছরই সমগ্র সিরিয়া, ইরাক ও মিসরে মহামারি আকারে তাউন বা প্লেগ দেখা দেয়। হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুর শিকার হয়। আমর ইবনুল আস সেনাপতি আবু উবাইদাকে সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে কোন নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু তাকদীরে গভীর বিশ্বাসী আবু উবাইদা সে পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর জীবনও শেষ পযর্ন্ত প্লেগ কেড়ে নেয়। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আমরকে সেনাপতি নিয়োগ করে যান। আমর ইবনুল আস প্লেগ আক্রান্ত স্থান থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে নেন।
সিরিয়া বিজয় সমাপ্তির পর আমর মিসরে অভিযান পরিচালনার জন্য খলীফা উমারের অনুমতি প্রার্থনা করেন। জাহিলী যুগে ব্যবসা উপলক্ষে আমর মিসরে আসা যাওয়া করতেন। এ কারণে মিসর সম্পর্কে তার অভিজ্ঞতা ছিল। খলীফা প্রথমতঃ তার প্রার্থনা মঞ্জুর করতে ইতস্ততঃ করলেও শেষ পর্যন্ত অনুমতি দান করেন। আমর তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে মিসর রওয়ানা হলে খালীফা উমার তাঁকে সাহায্যের জন্য যুবাইর ইবনুল আওয়ামের নেতৃত্বে একটি বাহিনী পাঠান।
হযরত আমর ইবনুল আস বাবুল ইউন, আরীশ, আইনু শামস বা ফুসতাত প্রভৃতি যুদ্ধে একের পর এক জয়লাভ করেন। অতঃপর তিনি ইসকান্দারিয়ার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য খলীফা উমারের অনুমতি চেয়ে পাঠান। অনুমতি লাভ করে বিজিত অঞ্চলের দায়িত্ব হযরত খারিজা ইবন হুজাফার ওপর ন্যস্ত করে তিনি ইসকান্দারিয়া অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ইস্কান্দারিয়া অবরোধ করলেন। মাকুকাসের বাহিনী এবং শহরবাসী সুরক্ষিত কিল্লায় আশ্রয় নিয়ে প্রতিরোধ সৃষ্টি করলো। তার মাঝে মাঝে কিল্লার বাইরে এসে ঝটিকা আক্রমণ চালিয়ে আবার কিল্লায় ফিরে যেত। এ অবস্থায় প্রায় দু’বছর কেটে গেল। খলীফা উমার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি আমরকে লিখলেন, তোমরা দু’বছর ধরে অবরোধ করে বসে আছ। এখনও কোন ফলাফল প্রকাশ পেল না। মনে হচ্ছে, রোমানদের মত তোরাও ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে বসেছো। আমার এ চিঠি তোমার হাতে এখন পৌঁছবে তখনই লোকদের ডেকে তাদের সামনে জিহাদ সম্পর্কে ভাষণ দেবে এবং আমার এ চিঠি তাদের পাঠ করে শুনাবে। তারপর জুম’আর দিনে শত্রু বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাবে।
খলীফার নির্দেশমত তিনি শত্রু বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালান এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইস্কান্দারিয়া মুসলিম বাহিনীর অধিকারে আসে। খলীফাকে এ বিজয়ের খবর পৌঁছে দেওয়ার জন্য মুয়াবিয়া ইবন খাদীজকে মদীনায় পাঠান। মুয়াবিয়া যখন মদীনায় পৌঁছেন তখন অপরাহ্ন। তিনি সোজা মসজিদে নববীতে চলে যান। খলীফা খবর পেয়ে সাথে সাথে তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি আমার বাড়ীতে না এসে সোজা মসজিদে গেলে কেন?মুয়াবিয়া বললেন, আমি ধারণা করেছিলাম, এখন আপনার বিশ্রামের সময়। খলীফা বললেন, আমি দিনে ঘুমিয়ে প্রজাদের ধ্বংস করতে পারি?
ইসকান্দারিয়া বিজয়ের পর তিনি বারকা, যুওয়াইলা, তারাবিলস, আল-মাগরিব, সাবরা প্রভৃতি অঞ্চল একের পর এক জয় করেন। তারাবিলস বিজয়ের পর তিনি দূত মারফত খলীফাকে সুসংবাদ পাঠান। তিউনিসিয়া, মরক্কো, আলজিরিয়া প্রভৃতি অঞ্চল সেখান থেকে মাত্র নয় দিনের দূরত্বে। তিনি খলীফার নিকট এ সকল অঞ্চলে অভিযান পরিচালনায় অনুমতি চাইলেন। বিজিত অঞ্চলের শান্তি-শৃংখলার কথা চিন্তা করে খলীফা পশ্চিম আফ্রিকার অভিযান স্থগিত রাখার নির্দেশ দিলেন। আমর ইবনুল আসের আফ্রিকা অভিযান এখানেই থেমে গেল।
মিসর বিজয় শেষ হওয়ার পর খলীফা উমার (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। এর অল্প কিছু দিন পর হযরত উমার শহীদ হন। খলীফা উসমানও আমরকে তাঁর পূর্বে পদে বহাল রাখেন। এই সময় রোমান উস্কানীতে ইসকান্দারিয়াবাসীরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আমর ইবনুল আস অত্যন্ত কঠোর হস্তে এ বিদ্রোহ দমন করেন এবং ভবিষ্যতে বিদ্রোহের আশংকায় ইসকান্দারিয়া শহরের প্রতিরক্ষা প্রাচীন ভেঙ্গে ফেলেন।
হিজরী ২৬ সনে হযরত উসমান (রা) তাঁকে মিসরের ওয়ালীর পদ থেকে অপসারণ করেন। তাবারী বলেন, কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া খলীফা উসমান কাকেও অপসারণ করতেন না। তাঁর অপসারণের কারণ সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, মিসর অত্যন্ত উর্বর দেশ হওয়া সত্বেও আমরের সময়ে আশানুরূপ রাজস্ব আদায় হতো না। হযরত উমারের যুগ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ছিল। এ বিষয়ে খলীফা উমার (রা) তাঁকে একটি পত্রও লিখেছিলেন। হযরত উসমানের সময়ও তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ ছিল। হযরত উসমান (রা) এ ব্যাপারে তাঁকে একটি পত্র লিখেন আমর জবাব দেনঃ ‘গাভী এর থেকে বেশী দুধ দিতে সক্ষম নয়।’ এই জবাবের পর হযরত উসমান (রা) রাজস্বের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে তা আবদুল্লাহ ইবনে সা’দের হাতে ন্যস্ত করেন। এই ঘটনার পর থেকে আমর ও আবদুল্লাহর মধ্যে মত বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং মিসরের শাসন ব্যবস্থা অনেকটা অচল হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় হযরত উসমান (রা) আমরকে অপসারণ করে আবদুল্লাহকে মিসরের ওয়ালী নিয়োগ করেন। (তাবারী, ইবনুল আসীর) অন্য একটি বর্ণনা মতে ইসকান্দারিয়ার বিদ্রোহের পূর্বেই আমরকে অপসারণ করা হয়। বিদ্রোহ দেখা দিলে খলীফা উসমান তাঁকে বিদ্রোহ দমনে নিয়োগ করেন। বিদ্রোহ নির্মূলের পর খলীফা তাঁকে কেবল প্রতিরক্ষা বিষয়ক দায়িত্ব নিয়োগ করতে চান। তিনি খলীফার এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে বলেন, “আমি শিং ধরবো, আর সে দুধ দুইবে” এমন হতে পারে না। এই বর্ণনা মতে হিজরী ২৫ সনে তাঁর অপসারণ করা হয়।
হযরত আমর ইবনুল আস মিসর থেকে অপসারিত হয়ে মদীনায় চলে আসেন। হযরত উসমানের ওপর কিছুটা অসন্তুষ্ট হন। মদীনায় আসার পর খলীফার সাথে তাঁর কথোপকথন হয় এবং তাতে এ অসন্তুষ্টির ভাব ফুটে ওঠে। খলীফার সাথে যখন তাঁর কথা হয়, তখন মিসর প্রেরিত রাজস্ব খলীফার নিকট পৌঁছে গেছে। সে রাজস্ব আমর ইবনুল আস প্রেরিত রাজস্ব থেকে বেশী ছিল। খলীফা বললেন, ‘দেখ, গাভী বেশী দুধ দিয়েছে।’ আমর সাথে সাথে জবাব দেন, ‘হ্যাঁ তবে বাচ্চা অভুক্ত থাকবে।’ এ ঘটনার পরও হযরত আমর ইবনুল আস (রা) পূর্বের মতই খলীফা উসমানের হিতাকাঙ্খী ও বিশ্বস্ত ছিলেন। মিসর থেকে বিদ্রোহীরা যখন মদীনায় পৌঁছে তখন হযরত উসমান (রা) তাদেরকে বুঝনোর জন্য আমারকে পাঠান। তিনি তাঁর পূর্বের প্রভাব কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহীদের ফেরত পাঠান। তাছাড়া যখনই হযরত উসমানের (রা) সামনে কোন সমস্যা দেখা দিত, আমর ইবনুল আসের সাথে পরামর্শ করতেন। তিনি অত্যন্ত সততার সাথে পরামর্শ দিতেন। খলীফা হযরত উসমানের (রা) বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র যখন চরম আকার ধারণ করে তিনি তখন মজলিসে শূরার বৈঠক আহবান করেন। হযরত আমর ইবনুল আস ছিলেন এ বৈঠকের অন্যতম সদস্য। শূরার সাথে পরামর্শের পর খলীফা আমরের কাছে বিশেষভাবে তাঁর মতামত জিজ্ঞেস করেন। তিনি খলীফাকে তাঁর পূর্ববর্তী দুই খলীফা-আবু বকর ও উমারের (রা) পদাঙ্ক অনুসরণের পরামর্শ দেন। অর্থাৎ প্রয়োজনে কোমল ও প্রয়োজনে কঠোর হতে বলেন।
মিসরের ওয়ালীর পদ থেকে অপসারিত হয়ে মূলতঃ তিনি রাজনীতি থেকে দূরে সরে যান এবং ফিলিস্তীনে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। তবে মাঝে মাঝে মদীনায় আসা-যাওয়া করতেন। বিদ্রোহীদের দ্বারা খলীফা উসমান যখন অবরুদ্ধ হন, আমর ইবনুল আস তখন মদীনায়। তিনি যখন দেখলেন বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের বাইরে তখন এ কথা বলে মদীনা ত্যাগ করেন যে, উসমানের হত্যায় যার হাত থাকবে আল্লাহ তাকে অপমান করবেন এবং যে তাকে সাহায্য করতে পারবে না তার মদীনা ত্যাগ করা উচিত। তিনি মদীনা ছেড়ে সিরিয়া চলে গেলেন। তবে সব সময় লোক মারফত মদীনার খোঁজ-খবর রাখতেন। অতঃপর হযরত উসমানের শাহাদাত এবং উটের যুদ্ধ সংঘটিত হয়; কিন্তু তিনি সিরিয়ার নির্জনবাস থেকে বের হলেন না। কোন কিছুতেই জড়িত হলেন না।
হযরত আলী ও হযরত মুয়াবিয়ার মধ্যে বিরোধ শুরু হল। হযরত আলী হযরত মুয়াবিয়ার কাছে আনুগত্যের দাবী করলেন। মুয়াবিয়া আমর ইবনুল আসের সাথে পরামর্শ করলেন। বর্ণিত আছে, প্রথমত আমর মুয়াবিয়াকে বলেছিলেন, কোন অবস্থাতেই মুসলিম উম্মাহ আপনাকে আলীর পদমর্যাদা দেবে না। কিন্তু পরে দেখা গেল এই ঝগড়ায় আমর ইবনুল আস সম্পূর্ণভাবে মুয়াবিয়ার পক্ষ অবলম্বন করলেন। সিফফীনে উভয় পক্ষের মধ্যে যে যুদ্ধ হয় তাতে আমর ছিলেন মুয়াবিয়ার (রা) বাহিনীর সিপাহসালার। আমরের পরামর্শেই এ যুদ্ধে আসন্ন পরাজয়ের মুহূর্তে বর্শার মাথায় কুরআন ঝুলিয়ে মুয়াবিয়া আলীর (রা) কাছে অপোষ-মিমাংসার প্রস্তাব দেন এবং আলীকে যুদ্ধ বিরতি ঘোষণায় বাধ্য করেন। অতঃপর বিরোধ নিস্পত্তির লক্ষ্যে দু’সদস্য বিশিষ্ট যে সালিশী বোর্ড গঠন করা হয়, সে বোর্ডে আমর ইবনুল আস ছিলেন মুয়াবিয়ার মনোনিত, আর আবু মুসা আশয়ারী (রা) ছিলেন আলীর (রা) মনোনীত সদস্য।
আমর ও আবু মুসা আশয়ারী বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর দু’মাতুল জান্দালে উপস্থিত হলেন তাদের সিদ্ধান্ত ঘোষণার জন্য। কিন্তু ঘোষণার মুহূর্তে আমর পূর্ব সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে কূটনৈতিক প্যাঁচের মাধ্যমে মুয়াবিয়াকে খলীফা বলে ঘোষণা দান করেন এবং সাথে সাথে প্রতিপক্ষ আবু মুসার (রা) মুখ দিয়েও আলীকে (রা) বরখাস্তের কথাটি ঘোষণা করিয়ে নেন।
মুসলিম উম্মার অত্মঘাতী বিরোধ নিস্পত্তির যে সাম্ভাবনা সালিশী বোর্ড গঠনের মাধ্যমে দেখা দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে তা হযরত আমরের কূটকৌশলের কারণে ব্যর্থ হয়। উভয় পক্ষে আবার বিরোধ ও যুদ্ধ শুরু হয়। আমর মিসর আক্রমণ করে হযরত আলী কর্তৃক নিযুক্ত মিসরের গর্ভণর মুহাম্মাদ বিন আবী বকরকে পরাজিত ও হত্যা করে মিসর দখল করেন।
অতঃপর চরমপন্থী খারেজী সম্প্রদায়ের কতিপয় লোক সিদ্ধান্ত নেয় যে, যেহেতু মুসলিম উম্মার বিভেদের কারণ প্রধানতঃ তিন ব্যক্তিঃ আলী, মুয়াবিয়া ও আমর। সুতরাং তাদেরকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে হবে। ইবন মুলজিম, বারক বিন আবদিল্লাহ ও আমর ইবন বকর আত-তামীমীর ওপর এ কাজের দায়িত্ব অর্পিত হয়। সিদ্ধান্ত মুতাবিক নির্ধারিত দিন ও সময়ে তারা তিন জনের ওপর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আক্রমণ চালায়। হযরত আলী শহীদ হলেন, মুয়াবিয়া সামান্য আহত হয়ে বেঁচে গেলেন। আর আমর অসুস্থ থাকায় তাঁর পরিবর্তে খারেজা ইবন হুজাফা নামায পড়াতে বেরিয়েছিলেন, আততায়ী তাঁকেই আমর ইবনুল আস মনে করে আঘাত হানে এবং তাকে হত্যা করে। এভাবে আমারও বেঁচে গেলেন।
আমীর মুয়াবিয়া (রা) আমরকে মিসরের ওয়ালী নিযুক্ত করলেন। মিসরের ওয়ালী থাকাকালে তাঁর ও আমীর মুয়াবিয়ার মধ্যে কিছুটা ভুল বুঝবুঝির সৃষ্টি হলেও তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতায় উভয়ের মধ্যে এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং তিনি মিসরের ওয়ালীর পদে বহাল থাকেন। মিসরের ওয়ালী থাকাকালীন হিজরী ৪৩ মতান্তরে ৪৭ অথবা ৫১ সনে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং জীবনের আশা ছেড়ে দেন। জীবনের শেষ দিনগুলিতে তিনি অতীত ভুলের জন্য অনুশোচনায় ভীষণ দগ্ধিভূত হন।
তিনি যখন মৃত্যু শয্যায়, ইবন আব্বাস তাঁকে দেখতে আসেন। সালাম বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলেন, আবু আবদিল্লাহ,কেমন অবস্থা? আমর জবাব দিলেন, আপনি কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করছেন? আমার দুনিয়া তৈরী হয়েছে, কিন্তু দ্বীন বিনষ্ট হয়েছে। যদি এমন না হয়ে এর বিপরীত হতো, তাহলে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আমি সফলকাম হতাম। যদি শেষ জীবনের চাওয়া ফলপ্রসূ হতো তাহলে অবশ্যই চাইতাম। যদি পালিয়ে বাঁচার পথ থাকতো, পালাতাম। কিন্তু মিনজিনিকের মত আমি এখন আসমান ও যমীনের মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় আছি। হাতের সাহায্যে না উপরে উঠতে পারছি, না পায়ের সাহায্যে নীচে নামতে পারছি। ভাতিজা, আমার উপকারে আসে এমন কিছু নসীহত আমাকে কর। ইবন আব্বাস বললেন, আফসুস! সে সময় আর কোথায়! এখন তো ভাতিজা বৃদ্ধ হয়ে আপনার ভাই হয়ে গেছে। এখন যদি আপনি আমাকে কাঁদতে বলেন, কাঁদতে পারি। আমর বললেন, এখন আমার বয়স আশি বছরেরও কিছু বেশী। এখন তুমি আমাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করছো। হে আল্লাহ, এই ইবন আব্বাস আমাকে তোমার রহমত থেকে নিরাশ করছে। তুমি সন্তুষ্ট হয়ে যাও এমন শাস্তি তুমি এখনই আমাকে দাও। ইবন আব্বাস বললেন, আবু আবদিল্লাহ, যে জিনিস আপনি নিয়েছিলেন তাতো নতুন আর যা দিচ্ছেন তাতো পুরাতন। আমর বললেন, ইবন আব্বাস, তোমার কি হয়েছে, আমি যা বলছি, তুমি তার উল্টা বলছো? (আল-ইসতিয়াব)
আবদুর রহমান ইবন শাম্মাসা বলেন, তিনি আমর ইবনুল আসকে মৃত্যু শয্যায় দেখতে যান। আমর দেয়ালের দিকে মুখ করে কাঁদতে শুরু করলেন। তাঁর ছেলে আবদুল্লাহ বললেন, আব্বা, কাঁদছেন কেন? রাসূলুল্লাহ (সা) কি আপনাকে অমুক অমুক বাশারাত বা সুসংবাদ দাননি? তিনি জবাব দিলেন, আমার সর্বোত্তম সম্পদ –লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ-এর শাহাদাত বা সাক্ষ্য। আমার জীবনের তিনটি পর্ব অতিক্রান্ত হয়েছে। একটি পর্ব এমন গেছে যখন আমি ছিলাম কট্টর দুশমন। আমার চরম বাসনা ছিল, যে কোনভাবেই রাসূলুল্লাহকে (সা) হত্যা করা। তারপর আমার জীবনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু। রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে বাইয়াত করে ইসলাম কবুল করলাম। তখন আমার এমন অবস্থা যে, রাসূলুল্লাহর (সা) চেয়ে আর কোন ব্যক্তি আমার নিকট অধিকতর প্রিয় বা সম্মানী বলে মনে হয়নি। অতিরিক্ত সম্মান ও ভীতির কারণে তাঁর প্রতি আমি ভালো করে চোখ তুলে তাকাতে পারিনি। কেউ যদি এখন আমাকে তাঁর চাহারা মুবারক কেমন ছিল জিজ্ঞেস করে, আমি তাকে কোন কিছুই বলতে পারিনে। তখন যদি আমার মরণ হতো, জান্নাতের আশা ছিল। এরপর আমার জীবনের তৃতীয় পর্ব। এ সময় আমি নানা রকম কাজ করেছি। আমি জানিনে এখন আমার কি অবস্থা হবে। আমার মৃত্যু হলে বিলাপকারীরা যেন আমার জানাযার সাথে না যায়। দাফনের সময় ধীরে ধীরে মাটি চাপা দেবে। দাফনের পর একটি জন্তু জবেহ করে তার গোশত ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া যায়, এতটুকু সময় কবরের কাছে থাকবে। যাতে আমি তোমাদের উপস্থিতিতেই কবরের সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে পারি এবং আল্লাহর দূতের প্রশ্নসমূহের জবাব ঠিক করে নিতে পারি। (মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)
তিনি তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে মৃত্যুর পর তাঁকে কিভাবে দাফন করতে হবে সে সম্পর্কে অসীয়াত করলেন। তারপর জিকরে মশগুল হলেন। বলতে লাগলেন, “হে আল্লাহ, তুমি নির্দেশ দিয়েছিলে, আমি তা অমান্য করেছি, তুমি নিষেধ করেছিলে, আমি নাফরমানী করেছি। আমি নির্দোষ নি যে, ওজর পেশ করবো, আমি শক্তিমানও নই যে, বিজয়ী হব।” তারপর ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পড়তে পড়তে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হিজরী ৪৩ সনের ১লা শাওয়াল ঈদুল ফিতরের নামাযের পর তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ জানাযার নামায পড়ান। মিসরের ‘মাকতাম’ নামক স্থানে তাকে দাফন করা হয়। তাঁর নিজ হাতে তৈরী মিসরের প্রথম মসজিদ ‘জামে’ আমর ইবনুল আস’ –এর পাশে তাঁর কবরটি আজও চিহ্নিত রয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল নব্বই বছর।
ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আমর ইবনুল আসের জীবনের বেশী অংশ জিহাদের ময়দানেই কেটেছে। এ কারণে জ্ঞান অর্জন ও চর্চার সময় সুযোগ তিনি কমই পেয়েছেন। কুরআন তিলাওয়াতে তিনি বিশেষ পুলক ও স্বাদ অনুভব করতেন। অত্যন্ত সুন্দর করে তিলাওয়াত করতেন। জীবনটি জিহাদের ময়দানে কাটলেও যতটুকু সময় পেয়েছেন রাসূলুল্লাহর (সা) সুহবত থেকে ইলম ও আমলের উন্নতি সাধন করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ৩৯টি হাদীস বা বাণী তিনি বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে ৩টি মুত্তাফাক আলাইহি অথাৎ বুখারী ও মুসলিম উভয়ে বর্ণনা করেছেন। ৩টি এককভাবে মুসলিম বর্ণনা করেছেন। বহু সাহাবী ও তাবেঈ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হযরত আমর ইবনুল আস জিহাদের ব্যস্ততা সত্বেও শিক্ষাদান ও ওয়াজ-নসীহতের দায়িত্বও পালন করতেন। ‘জাতুস সালাসিল’ যুদ্ধে বিজয়ের পর সেখানে অবস্থান করে নও-মুসলিমদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ওফাতের পর দুনিয়ার প্রতি কিছু মানুষের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেলে তিনি বক্তৃতা-ভাষণে রাসূলুল্লাহর আদর্শ অনুসরণের প্রতি মানুষকে আহবান জানাতেন।
তিনি সাহিত্য রসিকও ছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখক। অল্পকথায় অধিক ভাব প্রকাশ, সুন্দর উপমা প্রয়োগ এবং বাক্য ও ভাবের অলঙ্করণ তাঁর সাহিত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইতিহাসের গ্রন্থসমূহে তাঁর সাহিত্যের বহু নমুনা সংরক্ষিত হয়েছে। বিশেষতঃ ‘আমুর রামাদাহ’ অর্থাৎ যে বছর আরবে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, সে বছর খলীফা উমার মদীনা থেকে মিসরে অবস্থানরত আমরকে খাদ্যশস্য পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে যে চিঠি লিখেছিলেন এবং সে চিঠির জবাবে আমর যে চিঠিটি পাঠিয়েছিলেন তা সাহিত্যের উৎকৃষ্ট নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে। তাছাড়া তাঁর বক্তৃতা-ভাষণ, পত্রাবলী ও বিভিন্ন ধরনের লেখায় সাহিত্যে প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছে।
হযরত আমর ইবনুল আসের সমগ্র জীবন আলোচনা করলে দেখা যায় তিনি তাঁর জীবনে পরীক্ষার বিভিন্ন পর্ব অতিক্রম করেছেন। সবগুলি পর্বে তিনি সমানভাবে সফলকাম হতে পারেননি। বিশেষতঃ সাহাবী জীবনের শেষ পর্বের কিছু ঘটনার যৌক্তিক আপাতঃ দৃষ্টিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। ইসলামী উম্মাহ ইমামরা জীবনের শেষ পর্বের এসব ভূমিকাকে তাঁর ইজতিহাদী ভুল বলে সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেছেন। তবে জীবনের এ পর্বের কতিপয় বিতর্কিত ঘটনা ছাড়া অন্য সকল সাহাবীদের মত তাঁর সামগ্রিক জীবনকে রাসূলুল্লাহর (সা) সুহবত বা সাহর্য ফুলের মত শুভ্র ও সুন্দর করে তুলেছিল।
আমর ইবনুল আসের (রা) ঈমানের বলিষ্ঠতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজেই স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করেছে, আর আমর ইবনুল আস ঈমান এনেছে।’ অন্য এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আসের দুই পুত্র –হিশাম ও আমর ঈমান এনেছে।’ (মুসনাদে ইমাম আহমাদ) এ কথার সত্যতা তাঁর জীবনের একটি ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একবার হযরত রাসূলে কারীম (সা) খবর পাঠালেন, আমর যেন পোশাক পরে অস্ত্র সজ্জিত হয়ে একনই হাজির হয়। নির্দেশ মত আমর সাথে সাথে হাজির হলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) অজু করেছিলেন, তিনি চোখ তুলে তাকালেন। তারপর চোখ নীচু করে বললেন, তোমাকে আমীর বানিয়ে পাঠাতে চাই। ইনশাআল্লাহ তুমি নিরাপদ থাকবে এবং প্রচুর গনীমাত লাভ করবে। সেই গনীমাত থেকে তুমিও একটা অংশ পাবে। সঙ্গে সঙ্গে আমর বলে ওঠেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা), আমি সম্পদের লোভে ইসলাম গ্রহণ করিনি; বরং তা গ্রহণ করেছি অন্তরের টানে। রাসূল (সা) বললেন, ‘পবিত্র সম্পদ সত্যনিষ্ঠ মানুষের জন্যই উত্তম।’ আরেকবার রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, আমর ইবনুল আস কুরাইশদের নেককার ব্যক্তিদের অন্যতম। (মুসনাদে আহমদ)
একদিন তিনি কা’বার দেয়ালের ছায়ায় বসে লোকদের হাদীস শুনাচ্ছেন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে কোন ইমামের হাতে বাইয়াত করেছে, সর্বশক্তি নিয়োগ করে তাঁর সহায়তা করা উচিত।” আবদুর রহমান ইবন আবদে কা’বা (এই হাদীসের বর্ণনাকারী) জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি হাদীসটি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট থেকে শুনেছেন? আমর নিজের কান ও অন্তরের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আমার এ দু’টি কান শুনেছে ও অন্তর সংরক্ষণ করেছে।’ এরপর আবদুর রহমান বললেন, আপনার চাচাতো ভাই মুয়াবিয়া আমাদেরকে অবৈধভাবে একে অপরের সম্পদ খাওয়ার ও অন্যায়ভাবে প্রাণ নষ্ট করার আদেশ দেয়। এ কথা শুনে আমর চুপ হয়ে যান। তারপর বলেন, “আল্লাহর নাফরমানি যাতে না হয় তা মান এবং যাতে নাফরমানি হয় তা মানবে না।” এ দ্বারা বুঝা যায় তিনি প্রকৃতিগত ভাবেই ছিলেন সত্যনিষ্ঠ।
হযরত রাসূলে কারীম (সা) আমর ইবনুল আসকে (রা) তার কাজের জন্য ভালোবাসতেন। হযরত হাসান (রা) বলেন, এক ব্যক্তি আমর ইবনুল আসকে জিজ্ঞেস করেন, এমন ব্যক্তি কি সৎ স্বভাব বিশিষ্ট নয়, যাকে রাসূলুল্লাহ (সা) শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভালোবাসতেন? তিনি বললেন, তার সৌভাগ্য সম্পর্কে কে সন্দেহ পোষোণ করতে পারে? লোকটি বললেন, ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ (সা) আপনাকে ভালোবাসতেন।’
জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন তৎকালীন আরবের কতিপয় ব্যক্তির অন্যতম। ইমাম শা’বী বলতেন, ইসলামী আরবে কূটনীতিক চার জন। তন্মধ্যে আমর ইবনুল আস অন্যতম। (আল-ইসাবা) কূটনীতিতে একমাত্র হযরত মুগীরা ইবন শু’বা (রা) ছিলেন তাঁর সমকক্ষ। তাঁর দৈহিক গঠন, চাল-চলন, কথা-বার্তা প্রভৃতির মাঝে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠতো যে, তিনি নেতৃত্বের জন্যই জম্ম লাভ করেছেন। বর্ণিত আছে, একদিন আমীরুল মু’মিনীন উমার (রা) তাঁকে আসতে দেখে প্রথমে একটু হেসে উঠলেন, তারপর বললেন, ‘আমীর বা নেতা হওয়া ছাড়া আবু আবদিল্লাহর পৃথিবীতে হেঁটে বেড়ানো উচিত নয়।’ (রিজালুন হাওলার রাসূল -৬১৮)
রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সুস্থ মতামতের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ‘তুমি ইসলামে সঠিক মতামতের অধিকারী’ –এ কথা রাসূল (সা) তাঁকে বলেছেন। (কানযুল উম্মাল) হযরত ফারুকে আজম (রা) যখন কোন মোটা বুদ্ধির লোক দেখতেন, বিস্ময়ের সাথে বলতেন, এই ব্যক্তি ও আমর ইবনুল আসের স্রষ্টা একই সত্তা! (আল-ইসাবা)
হযরত আমরের এই সীমাহীন বুদ্ধিমত্তা ও দুঃসাহসের জন্য হযরত রাসূলে পাক (সা) বহু গুরুত্বপুর্ণ অভিযানের দায়িত্ব তাঁর ওপর অর্পণ করেছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে আবু বকর, উমার ও আবু উবায়ইদার (রা) মত উচু মর্যাদার অধিকারী সাহাবীদের ওপরও তাঁকে আমীর নিয়োগ করা হয়েছে। প্রকৃতই তিনি মুসলিম উম্মাহর প্রতিটি দুর্যোগময় মুহূর্তে আমীর বা নেতার মত যোগ্যতা ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর যোগ্যতা লক্ষ্য করেই উমারের (রা) মত বিচক্ষণ শাসক তাঁকে ফিলিস্তীন, জর্দান, তারপর মিসরের আমীর নিযুক্ত করেছিলেন এবং তিনি তাঁর খিলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত এ পদে বহাল রেখেছিলেন।
ইতিহাসে তাঁকে ‘ফাতেহ মিসর’ –মিসর বিজয়ী বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু যে অর্থে তাঁকে বিজয়ী বলা হয় সেই অর্থে বিজয়ী নন। প্রকৃতপক্ষে তিনি মিসরবাসীর মুক্তিদাতা। রোমানদের শত শত বছরের দাসত্ব ও শৃঙ্খল থেকে তিনি মিসরবাসীকে মুক্তি দেন এবং সমগ্র আফ্রিকায় ইসলামী দাওয়াতের পথ সুগম করেন।
জিহাদ ফি সাবীলিল্লাহ হযরত আমরের (রা) জীবনের গৌরবময় অধ্যায়। সকল যুদ্ধেই তিনি প্রখ্যাত সেনানায়ক হযরত খলিদ বিন ওয়ালিদের (রা) পাশাপাশি থেকেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, সেই প্রথম থেকে যুদ্ধের ময়দানে রাসূল (সা) অন্য কাউকে আমার ও খালিদের সমকক্ষ মনে করেননি। (মুসতাদরিক) মদীনায় যখনই কোন বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তরবারি কোষমুক্ত করে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছেন। একবার কোন কারণে মদীনায় ত্রাস ছড়িয়ে পড়ে। হযরত আবু হুজায়ফার গোলাম সালেম তলোয়ার হাতে মদীনার মসজিদে দাঁড়িয়ে গেলেন। আমরও অসি কোষমুক্ত করে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন। পরে রাসূলে পাক (সা) খুতবার মধ্যে বললেন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আশ্রয়ে আস না কেন এবং আমর ও সালেমকে কেন আদর্শ হিসেবে গ্রহণ কর না? (আল-ইসাবা)
হযরত আমর ইবনুল আস ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। আল্লাহর রাস্তায় তিনি প্রশস্ত চিত্তে ব্যয় করেছেন। খোদ রাসূলে খোদা (সা) একাধিকবার সে কথা স্বীকার করেছেন। আলকামা ইবন রামসা বালাবী বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) এক বাহিনী সহ আমরকে পাঠালেন বাহরাইন এবং নিজে বের হলেন অন্য এক অভিযানে। আমিও রাসূলুল্লাহর (সা) এ অভিযানে সহযাত্রী ছিলাম। একদিন রাসূল (সা) একটু তন্দ্রালু হলেন। তন্দ্রা কেটে গেলে বললেন, ‘আল্লাহ আমরের ওপর রহম কর।’ আমাদের মধ্যে যারা এ নামের ছিল, আমরা প্রত্যেকেই তাদের কথা চিন্তা করলাম। এভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার তন্দ্রাভিভূত হলেন এবং জেগে উঠে একই একই কথা বললেন। আমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো। আমরা জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কোন আমরের কথা বলছেন?’ বললেনঃ আমর ইবনুল আস। আমরা কারণ জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ আমার সেই সময়ের কথা স্মরণ হয়ে গেল যখন আমি মানুষের কাছে সাদাকাহ বা দান চেয়েছি, সে প্রচুর সাদাকাহ নিয়ে এসেছে। যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছি, এত সাদাকাহ কোথা থেকে নিয়ে এসেছো? সে বলেছে, আল্লাহ দিয়েছেন। অন্য একবার রাসূল (সা) তিনবার বলেন, “হে আল্লাহ, তুমি আমর ইবনুল আসকে ক্ষমা করে দাও। যখন আমি তাকে সাদাকাহ দেয়ার জন্য বলেছি, সে সাদাকাহ নিয়ে হাজির হয়েছে।”
মিকদাদ ইবন ’আমর (রা)

নাম মিকদাদ, কুনিয়াত আবুল আসওয়াদ, আবু ’আমর ও আবু সাঈদ। পিতা ’আমর ইবন সা’লাবা। তাঁর পিতৃ পুরুষের আদি বাসস্থান ‘বাহারা’। ইবনুল কালবী বর্ণনা করেন, মিকদাদের পিতা ’আমর তাঁর গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ‘কিসাস’ বা প্রতিশোধের ভয়ে ‘হাদরামাউতেই’ পালিয়ে যান এবং কিন্দার সাথে মৈত্রী চুক্তি করেন। এ কারণে তাঁকে ‘কিন্দী’ বলা হয়। তিনি হাদরামাউতের এক নারীকে বিয়ে করেন এবং তার গর্ভেই ‘মিকদাদ’ জম্মগ্রহণ করেন। এই হাদরামাউতেই মিকদাদ বেড়ে ওঠেন। এখানে আবু শাম্মার ইবন হাজার আল কিন্দী নামক এক ব্যক্তির সাথে তাঁর ঝগড়া হয় এবং তরবারির এক আঘাতে তার একটি পা বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। অতঃপর পালিয়ে মক্কায় চলে যান। মক্কায় তিনি আল-আসওয়াদ ইবন ’আবদ ইয়াগূসের সাথে মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে থাকেন। আল-আসওয়াদের সাথে তাঁর সম্পর্ক এত মধুর ও ঘনিষ্ঠ হয় যে, মিকদাদকে তিনি পালিত পুত্র হিসাবে গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (আসওয়াদের পুত্র মিকদাদ) নামে পরিচিতি লাভ করেন। অতঃপর পবিত্র কুরআনের ‘ওয়াদয়ূহুম লি আবায়িহিম’ (তাদেরকে তাদের পিতার নামেই ডাক)-এ আয়াতটি নাযিল হলে তিনি আল-আসওয়াদের পরিবর্তে ‘মিকদাদ ইবন আমর’ (আমরের পুত্র মিকদাদ)-এ পরিচিতি গ্রহণ করেন। আর এ কারণে ইতিহাসে কোথাও তাঁকে মিকদাদ ইবন আমর আবার কোথাও মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। (আল-ইসাবা, উসুদুল গাবা)।
মিকদাদ মক্কায় আশ্রয় নেয়ার পর কিছুদিন যেতে না যেতে তাওহীদের আওয়ায তাঁর কানে প্রবেশ করে। হযরত রাসূলে করীমের দাওয়াত ও তাবলীগ তাঁকে ইসলামের সাথে প্রথম পরিচয় করে দেয়। এ সেই সময়ের কথা যখন ইসলামের কট্টর দুশমনরা মুসলমানদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছিল। তাদের ভয়ে অনেকেই তখন ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রেখেছিল। কিন্তু মিকদাদ ইসলাম গ্রহণ করার পর সত্যকে গোপন করে রাখা সমীচীন মনে করলেন না। তিনি প্রথম পর্যায়ের সাত ব্যক্তির অন্যতম, যারা সেই চরম সন্ত্রাসের মুহূর্তে প্রকাশ্যে নিজেদের ঈমান আনার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এই সাত জনের অন্য ছয়জন হলেন রাসূলুল্লাহ (সা), আবু বকর, ’আম্মার, তাঁর মা সুমাইয়্যা, সুহাইব ও বিলাল (রা)। (হায়াতুস সাহাবা-১/২১৮)।
রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো বোন ‘দুবায়া বিনতু যুবাইর ইবন আবদিল মুত্তালিবের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বর্ণিত আছে, একদিন আবদুর রহমান ইবন আউফের সাথে তিনি বসে আছেন। হঠাৎ আবদুর রহমান জিজ্ঞেস করেন, মিকদাদ তুমি বিয়ে করছো না কেন? মিকদাদ সরলভাবে সাথে সাথে জবাব দেন, তোমার মেয়েকেই আমার সাথে বিয়ে দাও না। এ কথায় আবদুর রহমান অপমান বোধ করেন। তিনি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং মিকদাদকে যথেষ্ট গালমন্দ করেন। মিকদাদ রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে এসে আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন। রাসূল (সা) বললেন, আমিই তোমার বিয়ে দেব। অতঃপর তিনি চাচাত বোন ‘দুবায়া’-র সাথে মিকদাদের বিয়ে দেন। (আল-ইসাবা)
প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়ার পর মিকদাদের ওপর মুসীবত নেমে আসে। রাসূলুল্লাহর (সা) অনুমতি নিয়ে তিনি হাবশায় হিজরাত করেন। সেখানে কিছুকাল অবস্থানের পর আবার মক্কায় ফিরে আসেন। তখন মদীনায় হিজরাতের হিড়িক পড়ে গেছে। বিশেষ কিছু অসুবিধার কারণে তিনি মদীনায় হিজরাত করতে পারলেন না। এমন কি রাসূলুল্লাহর মদীনায় হিজরাতের পরও তিনি মক্কায় থেকে গেলেন। মক্কা ও মদীনার মধ্যে সাময়িক সংঘর্ষ হলে তিনি এবং উতবা ইবন গাযওয়ান কুরাইশদের একটি অগ্রবর্তী অনুসন্ধানী দলের সদস্য হিসাবে মদীনার দিকে রওয়ানা হন। এই বাহিনীর নেতা ছিলেন ইকরিমা ইবন আবী-জাহল। পথিমধ্যে মদীনার মুজাহিদদের একটি দলের সাথে তাদের ছোট খাট একটা সংঘর্ষ হয়। এই মুসলিম মুজাহিদ দলের নেতা বা আমীর ছিলেন হযরত উবাইদা ইবনুল হারিস (রা)। সুযোগ বুঝে এ সময় মিকদাদ ও উতবা ইবন গাযওয়ান মুসলিম মুজাহিদ দলে ভিড়ে যান এবং তাদের সাথে মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় তাঁরা হযরত কুলসুম ইবন হিদামের অতিথি হন। (উসুদুল গাবা) মদীনায় তিনি হযরত উবাই ইবন কা’বের (রা) অনুরোধে বনী আদীলা (মতান্তরে জাদীলা)-তে বসবাসের ইচ্ছা প্রকাশ করলে রাসূল (সা) তাঁকে সেই এলাকায় একখণ্ড জমি দান করেন।
হিজরী দ্বিতীয় সনে শিরক ও তাওহীদের মধ্যে প্রথম প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘর্ষ শুরু হয়। এ বছরই কুরাইশ বাহিনী বদর প্রান্তরে উপনীত হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের জন্য এ ছিল প্রথম পরিক্ষা। রাসূল (সা) এ ব্যাপারে তাঁদের পরামর্শ চেয়ে তাঁদের ঈমানের পরীক্ষা নিতে চাইলেন। হযরত সিদ্দীকে আকবর ও ফারুকে ’আজম প্রমুখ সাহাবা ভাষণ দিয়ে তাঁদের কুরবানী ও আত্মত্যাগের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। হযরত মিকদাদও এ সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি এক আবেগময় ভাষণ দান করেন। ভাষণে তিনি রাসূলকে (সা) আশ্বাস দান করে বলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা বাস্তবায়নে এগিয়ে চলুন। আপনার সাথে আছি। আল্লাহর কসম, বনী-ইসরাইলরা তাদের নবী মুসাকে বিলেছিলঃ তুমি ও তোমার রব দু’জন যাও এবং যুদ্ধ কর, আর আমরা এখানে বসে থাকি – আমরা আপনাকে তেমন কথা বলবো না। বরং আমরা আপনাকে বলবোঃ আপনি ও আপনার রব দু’জন যান ও তাদের সাথে যুদ্ধ করুন আমরাও আপনাদের সাথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। যিনি সত্যসহ আপনাকে পাঠিয়েছেন সেই সত্তার কসম, আপনি যদি আমাদের ‘বারকুল গিমাদ’ পর্যন্ত নিয়ে যান, আমরা আপনার সাথে যাব এবং আপনার শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে ও পেছনে সর্বদিক থেকে যুদ্ধ করবো –যতক্ষণ না আল্লাহ আপনাকে বিজয় দান করেন।” (রিজালুন হাওলার রাসূল) তাঁর এই আবেগময় ভাষণ শুনে খুশীতে রাসূলুল্লহর (সা) চেহারা মুবারক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
বদর যুদ্ধ শুরু হলো। এ যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদদের মধ্যে মাত্র তিনজন ছিলেন অশ্বরোহী। মিকদাদ ইবন আমর, মুরছেদ ইবন আবী মুরছেদ ও যুবাইর ইবনুল আওয়াম। এ তিনজন ছাড়া অন্য সকলেই ছিলেন পদাতিক ও উষ্ট্ররোহী। তবে একাধিক বর্ণনা মতে এ যুদ্ধে মিকদাদই ছিলেন একমাত্র অশ্বরোহী মুজাহিদ। এ কারণে বলা হয়েছে, ‘মিকদাদই সর্বপ্রথম আল্লাহর রাস্তায় তাঁর ঘোড় দৌড়িয়াছেন।’
বদর ছাড়াও উহুদ, খন্দকসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করে বীরত্বর পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। হিজরী ২০ সনে হযরত আমর ইবনুল আস মিসর অভিযান পরিচালনা করেন। রাজধানী মদীনায় তিনি অতিরিক্ত সামরিক সাহায্য চেয়ে পাঠান। খলীফা উমার (রা) দশ হাজার সিপাহী ও চারজন অফিসার পাঠান। এই চারজনের একজন মিকদাদ ইবন আমর। খলীফা একটি চিঠিতে আমর ইবনুল আসকে লিখে জানান, ‘এই চার জনের প্রত্যেকেই শত্রু পক্ষের দশ হাজার সিপাহীর সমান’। এই সিপাহীদের যোগদানের পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র মিসরে ইসলামের পতাকা উডডীন হয়।
হযরত খুবাইবকে (রা) মক্কার মুশরিকরা শূলে চড়িয়ে হত্যা করে। রাসূলুল্লাহ (সা) খুবাইবের লাশ রাতের আঁধারে শূল থেকে নামিয়ে আনার জন্য যুবাইর ও মিকদাদকে পাঠান। তাঁরা খুবাইবের লাশ শূল থেকে নামিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠিয়ে যখন রওয়ানা দেন তখন কুরাইশরা টের পেয়ে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। (হায়াতুস সাহাবা)
হযরত মিকদাদের পেটটি ছিল খুবই মোটা। এ কারণে বার্ধক্যে তিনি ভীষণ কষ্ট পেতে থাকেন। এ কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে তাঁর এক রোমান দাস তার পেটে অস্ত্রোপচার করে; কিন্তু তা ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় তিনি মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে ‘জুরুফ’ নামক স্থানে হিজরী ৩৩ সনে ইহলোক ত্যাগ করেন। আমীরুল মুমিনীন হযরতব উসমান (রা) তাঁর জানাযার নামায পড়ান। লাশ মদীনার বাকী গোরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭০ বছর।
হযরত মিকদাদের মধ্যে সর্বোত্তম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটেছিল। বদর যুদ্ধের সময় তিনি যে নিষ্ঠা ও সততাপূর্ণ আবেগ প্রকাশ করেন তাতে সমগ্র সাহাবা সমাজ তাঁকে ঈর্ষা করতে থাকে। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলতেনঃ ‘আফসূস! আমি যদি তখন বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণের উপযুক্ত হতাম এবং মিকদাদের কথাগুলি আমার মুখ থেকে বের হতো’। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ বলেন, ‘বদর যুদ্ধে আমি মিকদাদের সাথে ছিলাম। এ যুদ্ধে তাঁর সাথে থাকার বিষয়টি আমার কাছে এত প্রিয় যে, তার তুলনায় দুনিয়ার সব কিছু একেবারেই মূল্যহীন’। ইসলামের সূচনালগ্নের চরম দারিদ্র ও অভাব তাঁকে অনেকখানি সহনশীল ও বাস্তববাদী করে তুলেছিল। তিনি বলেন, “হিজরাত করে আমি যখন মদীনায় আসলাম, আমার থাকা-খাওয়ার কোন ঠিক-ঠিকানা ছিল না। ক্ষুধায় আমার মরণ-দশা হয়েছিল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ (সা) আমার দু’জন সংগীসহ আমাকে তাঁর আশ্রয়দাতা কুলসুম ইবন হিদামের বাড়ীতে স্থান দেন। তখন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট মাত্র চারটি ছাগী। আমরা এতগুলি মানুষ এই ছাগীগুলির দুধপান করেই জীবন ধারণ করতাম। একদিন রাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বাইরে কোথাও বেরিয়ে গেলেন। ফিরতে দেরী হল। আমি মনে করলাম, হয়তো কোন আনসারী তাঁকে দাওয়াত দিয়েছেন, তিনি খেয়েই ফিরবেন। এই ধারণা আমার মনে উদয় হতেই আমি উঠে পড়লাম এবং রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য রাখা দুধটুকু এক চুমুকে পান করে ফেললাম। কিন্তু পরক্ষণেই চেতনা হলো, আমার ধারণা যদি ভুল হয় তাহলে তো ভীষণ লজ্জায় পড়তে হবে। আমার এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে রাসূল (সা) ফিরে আসলেন এবং সোজা দুধ যেখানে থাকে সেদিকে এগিয়ে গেলেন। দেখলেন, পেয়ালা শুন্য। আমি আমার ভুলের জন্য লজ্জা ও অনুশোচনায় জর্জরিত হতে লাগলাম। বিশেষ করে তিনি যখন কিছু বলার জন্য হাত উঠালেন তখন আমার ভয়ের কোন সীমা থাকলো না। আমার ধারণা হল, রাসূলুল্লাহর (সা) বদ দুআয় এখনই আমার ইহ-পরকাল সব বরবাদ হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁকে আমি বলতে শুনলাম, ‘আল্লাহুম্মা আতয়িমহু মান আতয়ামানী ওয়া আসকি মান সাকানী’- হে আল্লাহ, যে আমাকে আহার করালো তাকে তুমি আহার করাও, যে আমাকে পান করালো তাঁকে তুমি পান করাও। এই দুআ শুনে আমার মধ্যে সাহস সঞ্চার হলো। আমি উঠে ছাগীগুলির কাছে গেলাম, কোন ছাগীর ওলানে কিছু দুধ পাওয়া যায় কিনা এই আশায়। কিন্তু আল্লাহর সীমাহীন কুদরতে যে ছাগীর উলানেই হাত দিই না কেন প্রত্যেকটি দুধে পরিপূর্ণ পেলাম। প্রচুর পরিমাণে দুধ দুইয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে পেশ করলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা সবাই পান করেছ কি? আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আপনি প্রথমে পান করুন, তারপর সমস্ত ঘটনা খুলে বলছি। রাসূল (সা) পেট ভরে পান করলেন। আমার পূর্বের ভুল ও অনুশোচনার কথা মনে হওয়ায় হঠাৎ হেসে উঠলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবুল আসওয়াদ, হাসছো কেন?’ আমি সব কথা খুলে বললাম। সব কিছু শুনে তিনি বললেন, “এ ছিল আল্লাহর রহমত। তুমি তোমার সাথী দু’জনকে ঘুম থেকে জাগালে না কেন, তারাও অনুগৃহীত হতো?”
হযরত মিকদাদ ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান। তাঁর বুচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায় বহু ক্ষেত্রে ও ঘটনায়। তাঁর এক সাথী বর্ণনা করেছেন, একদিন আমরা মিকদাদের কাছে বসে ছিলাম। এমন সময় একজন তাবেয়ী তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন, রাসূলুল্লাহর (সা) দর্শন লাভে ধন্য আপনার চোখ দু’টি কতই না সৌভাগ্যের অধিকারী। আল্লাহর কসম, আপনি যা কিছু দেখেছেন, তা দেখার এবং যেসব দৃশ্য ও ঘটনায় আপনি উপস্থিত হয়েছেন তাতে উপস্থিত হওয়ার জন্য আমি খুবই লালায়িত। একথা শুনে মিকদাদ লোকটির উপর খুবই ক্ষেপে গেলেন। লোকেরা বললো, তা এত উত্তেজিত হওয়ার কি আছে? তিনি বললেন, বর্তমানকে ছেড়ে অতীতকে কামনা করা বৃথা কাজ। কারণ, একথা তার জানা নেই, তখন সে থাকলে তার ভূমিকা কী হতো। আল্লাহর কসম, রাসূলুল্লাহর (সা) সমসাময়িক বহুলোক ঈমান না আনার কারণে তাদের ঠিকানা হয়েছে জাহান্নাম। সে কি জানে সে কোন দল্ভুক্ত হতো? এমন বিপদ থেকে আল্লাহ যে তাকে রক্ষা করেছেন এবং তিনি তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ঈমানদার বানিয়েছেন এজন্য কি সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবে না?
রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন তাঁকে একটি দলের আমীর নিযুক্ত করেন। তিনি ফিরে আসলে রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করেন, ‘ইমারাত বা নেতৃত্ব কেমন লাগলো?’ জবাবে তিনি বড় একটি সত্য কথা বলে ফেলেন। বলেন, ‘নিজেকে আমার সবার ওপরে এবং অন্যদের আমার নীচে মনে হয়েছে। যিনি সত্যসহ আপনাকে পাঠিয়েছেন,তাঁর শপথ, আজকের পর আর কক্ষণো আমি দু’ব্যক্তির ওপর আমীর হবো না’। তিনি নিজের দুর্বলতা ঢাকার বা সত্য গোপন করার চেষ্টা করেননি। তিনি সব সময় রাসূলুল্লাহর এ হাদীসটি আওড়াতেনঃ ‘ফিতনা থেকে যে ব্যক্তি পরিত্রাণ পেয়েছে, সে প্রকৃত সৌভাগ্যবান।’
রাসূলুল্লাহকে (সা) তিনি নিজের প্রাণের চেয়ে ভেশী ভালোবাসতেন। তাঁর মধ্যে ছিল আল্লাহর রাসূলের (সা) হিফাজত বা নিরাপত্তার চরম দায়িত্বানুভূতি। মদীনায় কোন প্রকার হৈ চৈ দেখা গেলেই রাসূলুল্লাহর (সা) বাসগৃহের দরজায় তাঁকে সশস্ত্র ও অশ্বরোহী অবস্থায় দেখা যেত। ইসলামের বিধি-বিধান যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর। ইসলামের প্রকাশ্য দুশমনদের বিরুদ্ধে যেমন ছিলেন সজাগ, তেমনি ছিলেন নিজের বন্ধুদের ইসলাম সম্পর্কে সামান্য উদাসীনতা ও ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে দারুণ সচেতন। একবার তিনি একটি ক্ষুদ্র বাহিনীর সাথে অভিযানে বের হলেন। শত্রু বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলে। বাহিনীর আমীর নির্দেশ দিলেন, বাহিনীর কোন সহস্যই আজ তাঁর সোয়ারী- পশু চড়ানোর জন্য ছাড়বে না। কিন্তু একজন মুজাহিদ বিষয়টি অবহিত ছিলেন না। তিনি আমীরের আদেশের বিপরীত কাজ করেন। এ জন্য তিনি আমীরের নিকট থেকে তাঁর প্রাপ্য শাস্তি থেকেও অধিক শাস্তি লাভ করেন। মুজাহিদটি কাঁদছিল, এমন সময় মিকদাদ তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করে বিষয়টি অবগত হলেন। অতঃপর তাঁর ডান হাতটি ধরে তাঁকে আমীরের কাছে টেনে নিয়ে গেলেন এবং আমীরের সাথে তর্ক করে তাঁর ভুল স্বীকার করতে বাধ্য করেন। আমীরকে তিনি বলেন, লোকটিকে কিসাস গ্রহণের সুযোগ দিয়ে নিজেকে দায়মুক্ত করুন। মিকদাদের কথা আমীর মাথা পেতে নিলেন। অবশ্য লোকটি আমীরকে ক্ষমা করে দেন। এভাবে তিনি দ্বীনের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় সর্বদা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতেন। তিনি প্রায় সব সময় বলতেন, ‘আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন তোমাকে ভালোবাসতে এবং আমাকে এ খবরও দিয়েছেন যে, তিনি তোমাকে ভালোবাসেন।’ এভাবে তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা লাভে ধন্য হয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নবীকে সাতজন বিশ্বস্ত সাথী ও উযীর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমাকে দেওয়া হয়েছে চৌদ্দ জন। তারা হলেনঃ হামযা, জাফর, আবু বকর, উমার, আলী, হাসান, হুসাইন, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ, সালমান, আম্মার, হুজাইফা, আবু জাফর, মিকদাদ ও বিলাল।
তোষামোদ বা প্রসংশা তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। একবার হযরত উসমানের (রা) দরবারে কিছু লোক মিকদাদের সামনেই তাঁর প্রশংসা শুরু করে দিল। তিনি এতে রুষ্ট হলেন যে, তাদের মুখে মাটি ছুঁড়ে মারলেন। হযরত উসমান (রা) বলে উঠলেন, মিকদাদ, এ কী হচ্ছে? বললেন, রাসূলুল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা প্রশংসাকারীর মুখে মাটি ছুঁড়ে মার।’
ব্যবসা ছিল তাঁর আসল পেশা। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে খাইবার অঞ্চলে কিছু ভূমি দান করেন। পরবর্তীকালে মিকদাদের ওয়ারিসদের নিকট থেকে এক লাখ দিরহামের বিনিময়ে হযরত মুয়াবিয়া (রা) তা খরীদ করে নেন।
হযরত মিকদাদের স্ত্রী দুবায়া বর্ণনা করেন, একবার মিকদাদ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য বাকী’র একটি নির্জন স্থানে যান। তিনি কর্ম সমাধা করছেন, এমন সময় দেখতে পেলেন একটি ইঁদুর তার গর্ত থেকে একটি দিনার বের করে আনছে। এভাবে ইঁদুরটি মোট সতেরটি দীনার বের করে আনে। তিনি সেগুলি কুড়িয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে এসে ঘটনা খুলে বলেন। তিন গর্তে হাত দুকিয়েছেন কিনা রাসূল (সা) তা জানতে চান। তিনি যখন বললেন, না, তিনি হাত ঢুকাননি, তখন রাসূল (সা) বললেন, আল্লাহ তোমার এ সম্পদে বরকত দিন। তোমার এ সম্পদের উপর কোন যাকাত নেই। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৪৫)
হযরত মিকদাদ (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) থেকে বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং আলী, আনাস, উদাইদুল্লাহ ইবন আদী, হাম্মাম ইবনুল হারস, আবদুর রহমান ইবন আবী লাইলা প্রমুখ সাহাবী তাঁর নিকট থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।
আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবনিল আস (রা)

নাম আবদুল্লাহ, কুনিয়াত আবু মুহাম্মাদ, আবু আবদির রহমান ও আবু নুসাইর। তবে প্রথমোক্ত কুনিয়াত দু’টি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। পিতা প্রখ্যাত সেনানায়ক ও কূটনীতিবিদ হযরত ‘আমার ইবনুল’ আস (রা) ও মাতা রীতা বিনতু মুনাববিহ। বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহর ইসলাম-পূর্ব নাম ‘আল-আস’ (পাপী, অবাধ্য)। আবু যারয়া তাঁর তারীখে উল্লেখ করেছেন, একটি জানাযার অনুষ্ঠানে রাসূল (সা) তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমার নাম কি?’ তিনি যখন বললেন, ‘আল-আস’, আসূল (সা) তখন বললেন, না, আজ থেকে তোমার নাম হবে ‘আবদুল্লাহ’। সেই দিন থেকে ‘আল-আস’ হলেন আবদুল্লাহ।
ইবন সা’দ বলেন, আবদুল্লাহ তাঁর পিতা আমর ইবনুল আসের পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পুত্র আবদুল্লাহ অপেক্ষা পিতা আমরের বয়স মাত্র দশ থেকে বারো বছর বেশী ছিল। তবে ওয়াকিদীর মতে পুত্র অপেক্ষা পিতা বিশ বছরের বড় ছিলেন। (তাজকিরাতুল হুফফাল, আল-ইসাবা, আল-ইসতিয়াব) পিতা-পুত্র উভয় মক্কা বিজয়ের পূর্বেই মদীনায় হিজরাত করেন। ইসলাম গ্রহণের পর অধিকাংশ সময় আবদুল্লাহ রাসূলুল্লাহর (সা) সহবত বা সহচর্যে ব্যয় করতেন। ক্রোধ বা শান্ত উভয় অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে যা কিছু বের হতো, তিনি সব কিছু লিখে রাখতেন। কোন কোন সাহাবী এমনটি না করার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, উত্তেজিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে যা কিছু বের হয় তা না লেখা উচিত। বিষয়টি তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উত্থাপন করলেন। রাসূল (সা) বললেন, ‘তুমি আমার সব কথা লিখতে পার। সত্য ছাড়া অন্য কিছুই আমি বলতে পারিনে’। (মুসনাদে আহমদ, আল-ইসতিয়াব) তাঁর পিতা আমর অপেক্ষা রাসূল (সা) তাঁকেই বেশি ভালবাসতেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট তাঁর গুরুত্ব ছিল বেশী।
রাসূলল্লাহর (সা) সুহবত বা সাহচর্যে কাটানোর পর যে অতিরিক্ত সময়টুকু আব্দুল্লাহ পেতেন, তার সবটুকু প্রায় দিনে রোযা রেখে এবং রাতে ইবাদাতে কেটে যেত। ধীরে ধীরে এ কাজে তিনি এত গভীরভাবে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন যে, স্ত্রী-পরিজন ও দুনিয়ার সবকিছুর প্রতি নিরাসক্ত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় তার পিতা রাসূলল্লাহর খিদমতে হাজির হয়ে তাঁর এই অস্বাভাবিক বৈ্রাগী জীবনে বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। রাসূল (সা) আব্দুল্লাহকে ডেকে পিতার আনুগত্যের নির্দেশ দেন।তিনি বলেন, ‘আব্দুল্লাহ, রোযা রাখ, ইফতার কর, নামায পড়, বিশ্রাম নেও এবং স্ত্রী-পরিজনে্র হকও আদায় কর। এই আমার তরীকা বা পন্থা। যে আমার তরীকা প্রত্যাখান করবে সে আমার উম্মাতের মধ্যে গণ্য হবেনা।’
রাসূলল্লাহর (সা) যুগে সংঘঠিত সব যুদ্ধে হযরত আব্দুল্লাহ অংশগ্রহন করেন। যুদ্ধের সময় সাধারণত সোয়ারী পশুর ব্যবস্থা করেন ও জিনিসপত্র পরিবহনের দায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত হতো। একবার এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আবু মুহাম্মদ, আমরা যেখানে বসবাস করি সেখানে দিরহাম ও দীনারের প্রচলন নেই। গৃহপালিত পশু ও জীব-জন্তু আমাদের প্রধান সম্পদ। আমরা ছাগলের বিনিময়ে উট ক্রয়-বিক্রয় করে থকি। এতে কোন আপত্তি নেই তো? তিনি বললেন, একবার রাসূলল্লাহ (সা) নির্দেশ দিলেন একটি উষ্ট্রারোহী বাহিনী গড়ার। আমার কাছে যতগুলো উট ছিল, এক এক করে সবগুলি বিলি করলাম। তবুও সোয়ারী বিহীন কিছু লোক রয়ে গেল। আমি রাসূলল্লাহর খিদমতে হাজির হয়ে আরজ করলাম, ‘ইয়া রাসূলল্লাহ (সা), আমার কাছে যতগুলি উট ছিল, সবগুলি বন্টন করার পরও একদল লোক রয়ে গেছে।’ রাসূল (সা) নির্দেশ দিলেন, ‘একটি উটের বিনিময়ে সদকার দু’টি, তিনটি করে উট দানের অঙ্গীকার করে কিছু উট খরীদ করে নাও।’ আমি সেই মত প্রয়োজনীয় উট সংগ্রহ করে নিলাম। (দারু কুতনী)
ইয়ামুকের যুদ্ধে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তিনি লড়াই করেন। এই যুদ্ধে হযরত ‘আমর ইবনুল আস তাঁর নেতৃত্বের ঝাণ্ডা আবদুল্লাহর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
সিফফীনে হযরত আমর ইবনুল আস ছিলেন হযরত মুয়াবিয়ার পক্ষে। পুত্র আবদুল্লাহকে তিনি মুয়াবিয়ার বাহিনীতে যোগদান করতে বাধ্য করেন। প্রকৃতপক্ষে এই গৃহযুদ্ধের প্রতি তিনি ছিলেন ভীষণ বিতৃষ্ণ। এ কারণে মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষে যোগ দিলেও বাস্তবে তিনি যুদ্ধে কোন প্রকার অংশগ্রহণ করেননি। বারবার তিনি পিতাকে এই আত্মঘাতী যুদ্ধ থেকে দূরে সরে থাকার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। (তাজকিরাতুল হুফফাজ)
হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রা) সিফফীনে হযরত আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করে শহীদ হন। আম্মারের শাহাদাত রাসূলুল্লাহর (সা) একটি বাণীর কথা তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি পিতা আমর ইবনুল আসকে (রা) জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহকে (সা) একথা বলতে শুনেননি, আফসুস, ইবন সুমাইয়্যা (আম্মার)-কে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হত্যা করবে।’ একথা শুনে আমর ইবনুল আস হযরত মুয়াবিয়ার দিকে তাকিয়ে বলেন, আবদুল্লাহ যা বলছে, তা-কি আপনি শুনছেন না?’ আবদুল্লাহর কথার ব্যাখ্যা করে মুয়াবিয়া (রা) বলেন, ‘সে সবসময় নতুন নতুন সমস্যা নিয়ে আসে। আম্মারকে কি আমরা হত্যা করেছি? প্রকৃতপক্ষে তাঁর হত্যার দায়-দায়িত্ব তাদের যারা তাকে ঘর থেকে বের করে এখানে সংগে নিয়ে এসেছে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
হযরত আম্মারকে (রা) দুই ব্যক্তি একই সাথে আক্রমণ করে হত্যা করে। তারা এককভাবে এ কৃতিত্ব দাবী করে ঝগড়া করতে করতে হযরত মুয়াবিয়ার নিকট হাজির হয়। ঘটনাক্রমে সেখানে হযরত আবদুল্লাহ (রা) উপস্থিত ছিলেন। তাদের ঝগড়া শুনে তিনি বলেন, ‘তোমাদের দ’জনের কোন একজনের উচিত সন্তুষ্ট চিত্তে তার প্রতিপক্ষের দাবী মেনে নেওয়া। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বলতে শুনেছি, আম্মারকে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হত্যা করবে।’ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, তিনি হযরত মুয়াবিয়াকে বলেন, আম্মারের হত্যাকারীকে জাহান্নামের সুসংবাদ দিন।’ একথা শুনে হযরত মুয়াবিয়া (রা) বিরক্তি সহকারে তাঁর পিতাকে বলেন, ‘আমর, তোমার এই পাগল ছেলেটিকে কি আমার সামনে থেকে দূরে সরিয়ে নেবে না?’ তারপর তিনি নিজেই আবদুল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন, ‘যদি এমনই হয়, তাহলে তুমি আমার সাথে কেন?’ হযরত আবদুল্লাহ জবাব দিলেন, ‘এজন্য যে, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যতদিন বাঁচবে তোমার পিতার অনুগত থাকবে।’
সিফফীনের এই আত্মঘাতী যুদ্ধে যদিও তাঁর হাত কলুষিত হয়নি, তবুও এতে শরীক হওয়ার জন্য আজীবন তিনি অনুশোচনার জর্জরিত হয়েছেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, ‘হায়, আমি যদি এর দশ বছর পূর্বেই মৃত্যুবরণ করতাম!’ হযরত মুয়াবিয়ার পক্ষ অবলম্বন করায় এবং তাঁর হাতে ঝাণ্ডা থাকায় সারা জীবন তিনি তাওবাহ ও ইসতিগফার করেছেন। (আল-ইসতিয়াব)
হযরত রাজা’ (রা) বলেনঃ একবার আমি একদল লোকের সাথে মসজিদে নববীতে বসেছিলাম। আব্দুল্লাহ ইবন আমর ও আবু সাঈদ খুদরীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হযরত ইমাম হুসাইনকে (রা) আসতে দেখে আবদুল্লাহ বলে উঠলেন, ‘এই ব্যক্তি সম্পর্কে আমি কি আপনাদের একটি কথা জানাবো?’ লোকেরা বললো, ‘কেন জানাবে না?’ তিনি বললেন, ‘সিফফীনের যুদ্ধের পর থেকে তাঁর সাথে আমার কোন কথা হয়নি। অথচ তাঁর সন্তুষ্টি আমার নিকট দুনিয়ার সবকিছু থেকে অধিক প্রিয়।’ আবু সাঈদ খুদরী বললেন, ‘আপনি কি তাঁর কাছে গিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে চান?’ তিনি বললেন, হাঁ !’ পরদিন আবু সাঈদ খুদরী (রা) তাঁকে সংগে করে হযরত হুসাইনের (রা) বাড়ী গেলেন। হযরত হুসাইন (রা) সাক্ষাৎ দান করতে প্রথমে একটু ইতস্ততঃ করেন। পরে আবদুল্লাহর (রা) পীড়াপীড়িতে সম্মত হন। সিফফীনে তাঁর অংশগ্রহণের পটভূমি ব্যাখা করে তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ অনুযায়ী আমি আমার তরবারি উম্মুক্ত করিনি, নিযা দ্বারা যেমন কাউকে আহত করিনি তেমনি কোন তীরও চালাইনি।’ (উসুদুল গাবা)
জ্ঞান ও মান-মর্যাদার দিক দিয়ে সমগ্র সাহাবা সমাজের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ (রা) বিশেষ স্থান ছিল। মাতৃভাষা আরবী ছাড়াও হিব্রু ভাষায় তাঁর পান্ডিত্য ছিল। তাওরাত ও ইনজিল তিনি গভীরভাবে অধ্যায়ন করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম, আমার একহাতে মধু, অন্য হাতে চর্বি এবং আমি তা চেটে চেটে খাচ্ছি। ‘স্বপ্নের এ কথা আমি রাসূলুল্লাহকে (সা) বললাম। তিনি বললেন, ‘তুমি দু’খানা গ্রন্থ তাওরাত ও আল-কুরআন পাঠ করবে’। (আল-ইসাবা)
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ নিঃসৃত বাণীর বিরাট একটি অংশ সংগ্রহ করেছিলেন। তিনি তাঁর সংগ্রহটির নাম রেখেছিলেন ‘সাদেকা’। তাঁর কাছে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে এবং সে সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিতে কিছু না থাকলে উক্ত ‘সাদেকা’ দেখে উত্তর দিতেন। (মুসনাদে আহমদ) এই সংগ্রহটি ছিল তাঁর ভীষণ প্রিয়। মুজাহিদ বলেনঃ একবার আমি তাঁর বিছানার নীচ থেকে একখানা বই বের করে দেখতে লাগলাম। তিনি নিষেধ করলেন। বললাম, ‘আপনি তো আমাকে কোন ব্যাপারে নিষেধ করেন না। আজ এমন করছেন কান?’ বললেন, ‘এ সত্যের সেই গ্রন্থ যা আমি একাই রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে শুনে সংগ্রহ করেছি’। তিনি আরও বলেন, ‘এই গ্রন্থখানি এবং পবিত্র কুরআন ও ওয়াহাজের ঐ জায়গীরটি যদি আমাকে দেওয়া হয় তাহলে দুনিইয়ায় আমার আর কোন কিছুর প্রয়োজন নেই।’
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা সাত শত। তারমধ্যে সতেরটি মুত্তাফাক আলাইহি, আটটি বুখারী এবং কুড়িটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (তাহজীব)
হযরত আবদুল্লাহর (রা) হালকায়ে দারসে-হাদীসের সীমা ছিল সুপ্রশস্ত। দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ হাদীস শোনার জন্য তাঁর দারসে হাজির হতো। তাছাড়া তিনি যেখানেই যেতেন, জ্ঞান পিপাসুদের বিশাল সমাবেশ ঘটতো তাঁর পাশে। একজন নাখয়ী শায়খ বর্ণনা করেন, ‘একবার আমি ইলিয়ার মসজিদে জামায়াতের সাথে নামায আদায় করেছিলাম। এক ব্যক্তি আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। নামায শেষে চারদিক থেকে মানুষ তাঁর নিকট গুটিয়ে বসলো। জিজ্ঞেস করে জানতে পেলাম, ইনি আবদুল্লাহ ইবন আমার ইবনুল আস।
হযরত আবদুল্লাহ তাঁর ছাত্রদের গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তাঁর সমকালীন জ্ঞানীদের প্রতিও তিনি ছিলেন গভীর শ্রদ্ধাশীল। একবার তাঁর সামনে হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের (রা) প্রসঙ্গ উঠলো। তিনি বললেন, ‘তোমরা এমন এক ব্যক্তির প্রসঙ্গ উঠিয়েছো যাঁকে আমি সেই দিন থেকে ভালোবাসি যেদিন রাসূল (সা) বলেছিলেন, তোমরা চার ব্যক্তির নিকট থেকে কুরআনের জ্ঞান অর্জন কর এবং সর্বপ্রথম তিনি আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের নামটি উচ্চারণ করেছিলেন।’
হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা) বহু সংখ্যক সাহাবীর নিকট থেকে, যেমনঃ উমার, আবু দারদা, মুয়াজ, আবদুর রহমান বিন আউফ, তাঁর পিতা আমর প্রমুখ- হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবু নুয়াঈম বলেন, ‘সাহাবীদের মধ্যে ইবন উমার, আবু উমামা, মিসওয়ার, সায়িব ইবন ইয়াযিদ ও আবুত তুফাইল এবং বহু সংখ্যক বিশিষ্ট তাবেঈ তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আল-ইসাবা)
তাকওয়া, পরহিযগারী ও অতিরিক্ত ইবাদাতকারী হিসাবে আবদুল্লাহ ইবন আমরের বিশেষ প্রসিদ্ধি ছিল। ইতিহাসে তাঁকে প্রার্থনাকারী, তাওবাকারী, ইবাদাত গুজার, ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তাঁর পিতা আমর ছিলেন যেমন বুদ্ধিমত্তা, চাতুর্য ও কৌশলীদের গুরু, তেমনি তিনি ছিলেন আবেদ, যাহেদ ও স্পষ্টবাদীদের মধ্যমণি। তাঁর জীবনের সবটুকু ইবাদাতে ব্যয় হয়েছে। যখন যতটুকু কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, মুখস্থ করে ফেলেছেন। কুরআনের অবতরণ শেষ হলে তিনিও হলেন সমগ্র কুরআনের হাফেজ। জিহাদের ময়দানে সব সময় তাঁকে প্রথম সারিতে দেখা যেত। আবার সশস্ত্র জিহাদ শেষ হলে তাঁকে দেখা যেত মসজিদে-দিনে রোযাদার এবং রাতে ইবাদাত গুজার। কুরআন ও তাসবীহ তিলাওয়াত অথবা তাওবাহ ইসতিগফারে তিনি নিমগ্ন থাকতেন। মোটকথা, যখন জিহাদের ডাক না থাকতো, চব্বিশ ঘন্টা তিনি সাওম, সালাত ও তিলাওয়াতে ডুবে থাকতেন।
প্রকৃতিগতভাবেই রুহবানিয়্যাত বা বৈরাগ্যের প্রতি তাঁর ঝোঁক প্রবণতা ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) একবার তাঁকে ডেকে বললেন, ‘আবদুল্লাহ, আমি জানতে পেরেছি, তুমি সারাটি জীবন দিয়ে রোযা রেখে ও রাতে ইবাদাত করে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য সংকল্প করেছো’। তিনি বললেন, ‘হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল (সা) বললেন, ‘সে শক্তি তোমার নেই। রোযা রাখ, আবার ইফতারও কর এবং নামায পড়, আবার বিশ্রামও কর। মাসে শুধু তিন দিন রোযা রাখ। কারণ, প্রতিটি নেকীর দশগুণ বদলা দেওয়া হয়।’ তিনি আরজ করলেন, ‘আমি এর থেকেও বেশী শক্তি রাখি’। রাসূল (সা) বলেলেন, ‘একদিন রোয রাখবে এবং দইদিন ইফতার করবে’। তিনি আবার আরজ করলেন, ‘আমি এর থেকেও বেশী শক্তি রাখি। ‘রাসূল (সা) বললেন’, একদিন রোযা রাখবে এবং একদিন ইফতার করবে। এটাই হযরত দাউদের (আ) তরীকা এবং এটাই রোযার সর্বোত্তম তরীকা বা পদ্ধতি’। তিনি আবারও আরজ করলেন। ‘আমি এর থেকেও উত্তম রোযা রাখতে পারি’। রাসূল (সা) বললেন, ‘এর থেকে উত্তম রোযা আর নাই’। অন্য একবার রাসূল (সা) তাঁর বাড়ীতে যেয়ে বলেন, ‘তোমার দেহের, তোমার চোখের, তোমার পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবের তোমার ওপর হক বা অধিকার আছে’।
সারাটি জীবন তিনি রোযার ক্ষেত্রে দাউদের (আ) অনুসরণ করেন এবং রাতের বেশীর ভাগ সময় ইবাদাতে অতিবাহিত করেন। কুরআন তিলাওয়াতের এত বেশী আগ্রহ ছিল যে, প্রতি তিন দিনে একবার খতম করতেন। তবে শেষ জীবনে এত অধিক ইবাদাত তাঁর জন্য কষ্টদায়ক হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে আফসুস করে বলতেন, ‘হায়, যদি আমি রাসূলুল্লাহ (সা) প্রদত্ত ‘রুখসত’ বা কম করার অনুমতি গ্রহণ করতাম। (আল-ইসাবা)
দুনিয়ার প্রতি আবদুল্লাহর এই উদাসীনতা দেখে তাঁর পিতা ’আমর ইবনুল ’আস প্রায়ই রাসূলুল্লাহর কাছে অভিযোগ করতেন। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) আবদুল্লাহর দাতটি ধরে তাঁর পিতার হাতের মধ্যে দিয়ে বলেন, ‘তোমাকে আমি যা বলি তাই কর, এবং তোমার পিতার ইতায়াত বা আনুগত্য কর’। [রিজালুন হাওলার রাসূল (সা)] আবদুল্লাহ আজীবন তাঁর পিতার আনুগত্য করেছেন। পিতার নির্দেশেই তাই তিনি মুয়াবিয়ার পক্ষে সিফফীনে গিয়েছেন।
হযরত ’আমর ইবনুল ’আস (রা) পৈত্রিক মীরাস থেকে বিশাল সম্পত্তি ও বহু দাস-দাসী লাভ করেন। তায়েফ ‘ওয়াহাজ’ নামক যে জায়গীরটি তিনি লাভ করেন তার মুল্য ছিল প্রায় দশ লাখ দিরহাম। (উসুদুল গাবা) তাঁর পক্ষ থেকে সেখানে চাষাবাদ করা হতো। এই জায়গীর নিয়ে একবার আম্বাসা ইবন সুফইয়ানের সাথে বিবাদ দেখা দেয়। উভয় পক্ষে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যাওয়ার উপক্রম হয়। আবদুলাহর ভাই হযরত খালিদ ইবনুল ’আস আসলেন তাঁকে বুঝানোর জন্য। তিনি খালিদকে বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার সম্পদের হিফাজত বা রক্ষণবেক্ষোণ করতে যেয়ে নিহত হবে সে শহীদ-তোমার কি রাসূলুল্লাহর (সা) এ বাণী স্মরণ নেই?’ (মুসনাদে আহমদ)
হযরত আবদুল্লাহর (রা) মৃত্যুর সন ও স্থান সম্পর্কে সীরাত লেখকদের মতভেদ রয়েছে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স কত হয়েছিল সে সম্পর্কেও ঐতিহাসিকরা একমত হতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর স্থান সম্পর্কে যেমন শাম, মক্কা, তায়েফ ও মিসরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, তেমনি সন হিসাবে ৬৫, ৬৮ ও ৬৯ হিজরীর কথা বলা হয়েছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে তিনি হিজরী ৬৫ সনে ‘ফুসতাত’ (মিসর) নগরে ৭২ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। তখন মারওয়ান ইবনুল হাকাম ও আবদুল্লাহ ইবন যুবাইরের বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই চলছিল, এ কারণে তাঁর লাশ সাধারণ গোরস্তানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাঁকে তাঁর আবাস স্থলেই দাফন করা হয়। (আল-ইসাবা, তাজকিরাতুল হুফফাজ)
আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ (রা)

নাম আবদুল্লাহ, আবু মুহাম্মাদ কুনিয়াত। পিতা জাহাশ, মাতা উমায়মা। বিভিন্ন দিক দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁর আত্মীয়তার সম্পর্ক। মা উমায়মা বিনতু আবদিল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফু। বোন উম্মুল মু’মিনীন হযরত যয়নাব বিনতু জাহাশ রাসূলুল্লাহর (সা) স্ত্রী। তাই একাধারে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফাতো ভাই ও শ্যালক।
তাঁর জম্ম সন সম্পর্কে ইতিহাসে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে হিজরী তৃতীয় সনে উহুদের যুদ্ধে শাহাদাত বরণের সময় তাঁর বয়স হয়েছিল চল্লিশ বছরের কিছু বেশী। এ তথ্যের উপর ভিত্তি করে বলা যায় রাসূলুল্লাহর (সা) নবুয়াত লাভের চব্বিশ/পঁচিশ বছর পূর্বে তিনি মক্কায় জম্ম গ্রহণ করেন। জাহিলী যুগে তিনি হারব ইবন উমাইয়্যার হালীফ (মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ) ছিলেন। তবে কেউ কেউ বনু আবদি শামসকে তাঁর হালীফ বলে উল্লেখ করেছেন। মূলতঃ দু’টি বর্ণনার মধ্যে কোন বিরোধ নেই। কারণ, হারব ইবন উমাইয়্যা ছিল বনু আবদি শামসেরই একজন সদস্য।
হযরত আবদুল্লাহ ছিলেন ‘সাবেকীন ইলাল ইসলাম’ বা প্রথম ভাগে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। রাসূলুল্লাহ (সা) দারুল আরকামে আশ্রয় গ্রহণের পূর্বেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।
ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশদের যুলুম-অত্যাচারের হাত থেকে তিনি ও তাঁর গোত্র রেহাই পাননি। এই কারণে দুইবার হাবশায় হিজরত করেন। শেষের হিজরাতে তাঁর পরিবারের সকল সদস্য অর্থাৎ দুই ভাই আবু আহমদ ও উবাইদুল্লাহ, তিন বোন যয়নাব, উম্মু হাবীবা, হামনা এবং উবায়দুল্লাহর স্ত্রী উম্মু হাবীবা বিনতু আবী সুফইয়ান তাঁর সঙ্গে ছিলেন। তাঁর ভাই উবায়দুল্লাহ হাবশায় পৌঁছে ইসলাম ত্যাগ করে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করে এবং মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) অবস্থায় সেখানে মারা যায়।
ইসলাম ত্যাগ করায় তার স্ত্রী উম্মু হাবীবা তাঁর থেকে পৃথক হয়ে যান এবং পরবর্তীকালে রাসূল (সা) তাঁকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা কান করেন। (আল ইসাবা ২/২৭২) হাবশায় কিছুকাল অবস্থানের পর হযরত আবদুল্লাহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন। মক্কায় ফিরে এসে দেখেন তাঁর গোত্র বনু গানাম- এর সকল সদস্য ইসলাম গ্রহণ করেছেন। রাসূলুল্লাহর (সা) অনুমতি নিয়ে তিনি তাঁদের সকলকে সঙ্গে করে মদীনায় হিজরাত করেন। তাঁদের পূর্বে কাবল হযরত আবু সালামা মদীনায় হিজরাত করেছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করেছি, তাঁর গোত্রের সকলই ইসলাম গ্রহণ করেছলেন, তিনি গোত্রের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে সঙ্গে করেন মদীনায় পৌঁছেন। বনু গানামের একটি লোককেও তিনি মক্কায় ছেড়ে যাননি।
তাঁরা মক্কা থেকে যাত্রা করার কিছুক্ষণ পর কুরাইশ নেতৃবৃন্দ যথাঃ উতবা, আবু জাহল প্রমুখ ঘর থেকে বের হয়ে বনু গানামের মহল্লার দিকে যায়। তাদের উদ্দেশ্য, গানাম গোত্রের কে কে গেল, আর কে কে থাকলো এটাই দেখা। তারা দেখলো, গোটা মহল্লা জন-মানবহীন। কোন বাড়ীর দরজা খোলা, আবার কোনটা তালাবদ্ধ। এ অবস্থা দেখে উতবা মন্তব্য করলো ‘বনু জাহাশের বাড়ীগুলি তো খা খা করছে, তাদের অধিবাসীদের জন্য মাতাম করছে।’ একথা শুনে আবু জাহল আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের ঘরে হাত লাগালো। জিনিসপত্র ইচ্ছে মত লুটপাট করলো। গোটা মহল্লার মধ্যে আবদুল্লাহর ঘরটি ছিল সবচেয়ে সুন্দর ও প্রচুর্যময়। আব্দুল্লাহ রাসূলুল্লাহর নিকট তাঁর বাড়ীতে আবু জাহলের লুটপাটের কথা উল্লেখ করলে তিনি সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘আবদুল্লাহ, তুমি কি খুশী নও যে, এর বিনিময়ে আল্লাহ জান্নাতে তোমাকে একটি বাড়ী দান করবেন।’ জবাবে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়, ইয়া রাসূলুল্লাহ।’ রাসূল (সা) বললেন, ‘তুমি তাই লাভ করবে।’ আবদুল্লাহ খুশী হলেন।
মদীনা পৌঁছার পর আবদুল্লাহর গোটা খন্দানকে হযরত আসিম ইবন সাবিত আল-আনসারী আশ্রয় দান করেন। পরে রাসূলুল্লাহ (সা) তাদের দু’জনের মধ্যে মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।
হিজরী দ্বিতীয় সনের রজব মাসে রাসূল (সা) আটজন সাহাবীর একটি দলকে নির্বাচন করলেন। এই আট জনের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ও সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসও ছিলেন। রাসূল (সা) সকলকে সম্বোধন করে বললেন, তোমাদের মধ্যে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় যে সর্বাধিক সহনশীল তাঁকেই তোমাদের আমীর বানাবো। অতঃপর আবদুল্লাহকে তিনি আমীর মনোনীত করলেন। এভাবে তিনি মুমিনদের একটি দলের প্রথম আমীর হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। রাসূল (সা) তাঁকে যাত্রাপথ নির্দেশ করে তাঁর হাতে একটি সীল মোহর অঙ্কিত চিঠি দিয়ে বললেন, ‘দুই দিনের আগে এই চিঠিটি খুলবে না। দুইদিন পথ চলার পর খুলে পড়বে এবং এই চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবে।’
হযরত আবদুল্লাহ তাঁর সাথীদের নিয়ে মদীনা থেকে রওয়ানা হলেন। দুইদিন পথ চলার পর নির্দেশ মত চিঠিটি খুলে পড়লেন। চিঠিতে নির্দেশ ছিল, মক্কা ও তায়েফের মাঝখানে নাখলা নামক স্থানে পৌছে কুরাইশদের গতিবিধি ও অন্যান্য অবস্থা অবগত হবে। তিনি অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা সহকারে এ হুকুম মাথা পেতে নিলেন। সঙ্গীদের সম্বোধন করে তিনি বললেন, ‘বন্ধুগণ, আমি রাসূলুল্লাহর (সা) এ আদেশ কার্যকরী করে ছাড়বো। তোমাদের মধ্যে যে শাহাদাতের অভিলাষী সে আমার সাথে যেতে পারে, এবং যে তা পছন্দ না কর ফিরে যেতে পার। আমি কাউকে বাধ্য করবো না।’ এ ভাষণ শুনে সকল তাঁর সঙ্গী হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেন। নাখলা পৌঁছে তাঁরা কুরাইশদের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতে লাগলেন। একদিন কুরাইশদের একটি বাণিজ্য কাফিলা এই পথ দিয়ে অতিক্রম করছিল। এই কাফিলায় ছিল চার ব্যক্তি। ‘আমর ইবনুল হাদরামী, হাকাম ইবন কায়সান, উসমান ইবন আবদিল্লাহ এবং উসমানের ভাই মুগীরা। তাদের সাথে ছিল চামড়া, কিসমিস ইত্যাদি পণ্য সামগ্রী।
কাফিলাটি আক্রমণ করা না করা বিষয়ে আবদুল্লাহ ইবন জাহশ তাঁর সঙ্গীদের সাথে পরামর্শ করলেন। সেই দিনটি ছিল হারাম মাসসমূহের সর্বশেষ দিন। উল্লেখ্য যে, জুল কা’দা, জুল হিজ্জা, মুহাররম ও রজব- এ চারটি মাস হচ্ছে হারাম মাস। প্রচীন কাল থেকে আরবরা এ মাসগুলিতে যুদ্ধবিগ্রহ ও খুন-খারাবী নিষিদ্ধ বলে মনে করতো। তাঁরা ভেবে দেখলেন, একদিকে আজ কাফিলাটি আক্রমণ করলে হারাম মাসে তা করা হবে। অন্যদিকে আজ আক্রমণ না করে আগামীকাল করলে কাফিলাটি মক্কার হারামের আওতায় পৌঁছে যাবে। মক্কার হারাম সকলের জন্য নিরাপদ স্থান। সেখানে তাদের আক্রমণ করলে হারাম কাজ করা হবে। পরামর্শের পর তারা আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। তাঁরা অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে কাফিলার নেতা ‘আমর ইবনুল হাদরামীকে হত্যা, উসমান ইবন আবদিল্লাহ ও হাকাম ইবন কায়সানকে বন্দী করেন এবং অন্যজন পালিয়ে যায়। তাঁরা প্রচুর পণ্যসামগ্রী গনীমাত হিসাবে লাভ করেন। আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ অর্জিত গ্নীমাতের এক পঞ্চমাংশ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের জন্য রেখে দিয়ে অবশিষ্ট চার ভাগ তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করে দেন। তখনও গনীমাত বন্টনের কোন নিয়ম-নীতি নির্ধারণ হয়নি। তবে আবদুল্লাহর এই ইজতিহাদ সঠিক হয়েছিল।পরে তাঁর এই সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে কুরআনে ‘খুমুস’ (পঞ্চমাংশ) –এর আয়াত নাযিল হয়।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ গনীমাতের এক পঞ্চমাংশ নিয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হলেন। রাসূল (সা) তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। তিনি বললেন, আমি তো তোমাকে ‘হারাম’ বা নিষিদ্ধ মাসে রক্তপাতের নির্দেশ দিইনি।
আবদুল্লাহর এই দুঃসাহস ও বাড়াবাড়ির জন্য অন্য মুসলিমরাও তাঁর নিন্দা করলেন। কুরাইশরাও এই ঘটনাকে খুব ফলাও করে প্রচার করতে লাগলো। তারা বলে বেড়াতে লাগলো, মহাম্মাদের (সা) সাহাবীরা হারাম মাসগুলিকে হালাল বানিয়ে নিয়েছে। হত্যা ও রক্ত ঝরিয়ে তারা এই মাসগুলির অবমাননা করেছে। হযরত আবদুল্লাহ ও তাঁর সাথীরা ভীষণ বিপদে পড়লেন। রাসূলুল্লাহর (সা) অবাধ্যতা হয়েছে এই ভয়ে তাঁরা ভীত হয়ে পড়লেন। তাঁরা অনুশোচনায় জর্জরিত হতে লাগলেন। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা তাদের কাজে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে কুরআনের এই আয়াতটি নাযিল করলেনঃ ‘হারাম (নিষিদ্ধ) মাস সম্পর্কে তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে যে, সে মাসে যুদ্ধ করা কি জায়েয? আপনি বলে দিন, এই মাসে যুদ্ধ করা বড় ধরনের অপরাধ। আর আল্লাহর রাস্তায় বাধা দেওয়া, তাঁকে অস্বীকার করা, মসজিদে হারাম (কা’বা) থেকে বিরত রাখা এবং তার অধিবাসীদের সেখান থেকে বিতাড়িত করা আল্লাহর কাছে তার থেকেও বড় অপরাধ। আর ফিতনা বা বিপর্যয় সৃষ্টি করা হত্যা অপেক্ষাও খারাপ কাজ।’ (আল বাকারাহ- ২১৭)
কুরআনের এ আয়াত নাযিলের পর তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। মুসলমানরা দলে দলে তাঁদের অভিনন্দন জানালেন এবং তাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রাসূল (সা) তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন, তাদের নিকট থেকে গনীমাতের অংশ গ্রহণ করলেন এবং মুক্তিপণ গ্রহণ করে বন্দী দু’জনকে মুক্তি দিলেন।
প্রকৃতপক্ষে আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ ও তাঁর সঙ্গীদের এ ঘটনাটি ছিল মুসলমানদের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁদের এ গনীমাত ইসলামের প্রথম গনীমাত, তাঁদের হাতে নিহত ব্যক্তি মুসলমানদের হাতে নিহত প্রথম মুশরিক বা অংশীবাদী, তাঁদের হাতে বন্দীদ্বয় মুসলমানদের হাতে প্রথম বন্দী- তাঁদেরকে দেওয়া পতাকা রাসূলুল্লাহর (সা) তুলে দেওয়া প্রথম পতাকা এবং এই দলটির আমীর আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ প্রথম আমীর যাঁকে আমীরুল মু’মিনীন বলে সম্বোধন করা হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবন জাহাশই প্রথম ব্যক্তি যিনি গনীমাতের ব্যাপারে সর্বপ্রথম খুমুসের প্রবর্তন করেন এবং আল্লাহ তা’য়ালা অহী নাযিল করে তা সমর্থন করেন। (আল-ইসতিয়াব)
হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। হযরত সা’দ ইবন আবি ওয়াককাস বর্ণনা করেছেন, উহুদ যুদ্ধের একদিন আগে আমি ও আবদুল্লাহ দুআ করলাম। আমার ভাষা ছিল, ‘হে আল্লাহ, আগামীকাল যে দুশমন আমাদের সাথে লড়বে সে যেন অত্যন্ত সাহসী ও রাগী হয়। যাতে আমি তোমার রাস্তায় আমি তাঁকে হত্যা করে তার অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিতে পারি।’ আমার এ দুআ শুনে আবদুল্লাহ ‘আমীন’ বলে উঠে। তারপর সে হাত উঠিয়ে দুআ করেঃ হে আল্লাহ, আমাকে এমন প্রতিদ্বন্দ্বী দান কর যে হবে ভীষণ সাহসী ও দ্রুত উত্তেজিত। আমি তোমার রাস্তায় তার সাথে যুদ্ধ করবো। সে আমাকে হত্যা করে আমার নাক কান কেটে ফেলবে। যখন আমি তোমার সাথে মিলিত হব এবং তুমি জিজ্ঞেস করবে, ‘আবদুল্লাহ, তোমার নাক-কান কিভাবে কাটা গেল?’ তখন আমি বলবো,তোমার ও তোমার রাসূলের জন্য।’ তিনি যেন দৈব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছিলেন, তাঁর এ বাসনা পূর্ণ হতে চলেছে। তাই বার বার কসম খেয়ে বলছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার নামে কসম খেয়ে বলছি, আমি শত্রুর সাথে যুদ্ধ করবো এবং সে আমাকে হত্যা করে আমার নাক-কান কেটে আমাকে বিকৃত করবে।’ (উসুদুল গাবা)
হিজরী তৃতীয় সনের শাওয়াল মাসে উহুদ প্রান্তরে তুমুল লড়াই শুরু হয়। হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ এমন তীব্র আক্রমণ চালালেন যে তাঁর তরবারিটি ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে খেজুর শাখার একটি ছড়ি দান করলেন। দীর্ঘক্ষণ তিনি তা দিয়ে লড়তে থাকেন। এ অবস্থায় আবুল হাকাম ইবন আখনাস সাকাফীর একটি প্রচন্ড আঘাতে তাঁর শাহাদাতের বাসনা পূর্ণ হয়ে যায়। মুশরিকরা তাঁর দেহের বিকৃতি সাধন করে। নাক-কান কেটে সুতায় মালা গাঁথে। হযরত সা’দ এ দৃশ্য দেখে বলে ওঠেনঃ ‘আল্লাহর কসম, আবদুল্লাহর দুআ আমার দুআ অপেক্ষা উত্তম ছিল।’
চল্লিশ বছরের কিছু বেশী সময় তিনি জীবিন লাভ করেছিলেন। তাঁর মামা সাইয়্যিদুশ শুহাদা হযরত হামযার সাথে একই কবরে তাঁকে দাফন করা হয়।
নাখলা অভিযানে আবদুল্লাহকে আমীর নিযুক্ত করে পাঠানোর সময় রাসূল (সা) তাঁর সঙ্গীদের বলেছিলেনঃ ‘যদিও আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ তোমাদের মদ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি নয় তবে সে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সবচেয়ে বেশী সহ্য করতে পারে।’ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের ভালোবাসা তাঁকে দুনিয়ার সব কিছু থেকে উদাসীন করে তোলে। প্রিয় জীবনটি আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেওয়াই ছিল তাঁর একমাত্র বাসনা। তাঁর সে বাসনা পূর্ণ হয়েছিল। ‘আল-মুজাদ্দা’ ফিল্লাহ’ (আল্লাহর রাস্তায় কানকাটা) এ সম্মানজনক উপাধি তিনি লাভ করেছিলেন। বদর যুদ্ধে বন্দীদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) আবু বকর, উমার ও আবদুল্লাহ ইবন জাহাশের সাথে পরামর্শ করেছিলেন।


















