Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • ধার্মিকতা একটি প্রবৃত্তি

    ধার্মিকতা একটি প্রবৃত্তি

    মানুষের মধ্যে জীবনী শক্তি আছে যা তাকে কাজের ক্ষেত্রে চালিত করে এবং তুষ্টি কামনা করে। এই জীবন শক্তির দুটি দিক রয়েছে: তাদের মধ্যে একটির অনিবার্য তুষ্টি প্রয়োজন, এবং এটি তুষ্ট না হলে মানুষ মারা যাবে। এটি জৈবিক চাহিদা, যেমন খাওয়া, পান করা এবং প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া। দ্বিতীয়টিরও তুষ্টি প্রয়োজন, কিন্তু তা তুষ্ট না হওয়ার কারণে মানুষ মরে না, যদিও তা তুষ্ট না হওয়া পর্যন্ত সে তাড়িত থাকবে; আর এটি হল প্রবৃত্তি, যা স্বাভাবিক অনুভূতির মাধ্যমে ক্রিয়াশীল থাকে এবং উদগীরণের তুষ্টি অন্বেষন করে। যাইহোক, তাড়নাভেদে প্রবৃত্তি জৈবিক চাহিদার থেকে ভিন্ন। এর কারণ হল জৈবিক চাহিদা ভিতর থেকে তাড়িত হয়, আর প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে কিংবা এর তুষ্টির প্রয়োজন অনুভূত হয় এমন চিন্তা অথবা ভৌত বাস্তবতা দ্বারা যা তুষ্টির জন্য আবেগকে উদ্দীপিত করে। প্রজনন প্রবৃত্তি (গারীজাত-আল-নাও’) উদাহরণস্বরূপ, একটি সুন্দর মেয়ের কথা বা যৌন সম্পর্কিত কিছু চিন্তা করে কিংবা একটি সুন্দরী মেয়েকে দেখে বা যৌন সম্পর্কিত কিছু দেখে উত্তেজিত হয়। যদি এরূপ কিছু না ঘটে থাকে, তাহলে প্রবৃত্তিকে উত্তেজিত করার মতো কিছুই ঘটবে না। একইভাবে ধার্মিকতার প্রবৃত্তি (গারীজাত আল-তাদাউয়্যুন) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আয়াত, কেয়ামত বা এর সাথে সম্পর্কিত কিছু, আসমান ও জমিনে আল্লাহর নিখুঁত সৃষ্টি অথবা এর সাথে সম্পর্কিত কিছু সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে আন্দোলিত হয়। এভাবে, প্রবৃত্তির প্রভাব দেখা দেয় যখন এমন কিছু থাকে যা একে তাড়িত করে। যা একে তাড়িত করে তার অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে, কিংবা যা একে উত্তেজিত করে সে বিষয়টি এমনভাবে ব্যাখ্যা করলে তথা যা ব্যক্তির প্রবৃত্তিকে উদ্দীপিত করে তার মূল বৈশিষ্ট্যের ধারণাটি হারিয়ে ফেললে আমরা এর প্রভাব আর দেখতে পাই না।

    ধর্মীয় প্রবৃত্তি প্রাকৃতিক এবং অপরিবর্তনীয়, এটি স্রষ্টা ও পালনকর্তার প্রতি চাহিদার অনুভূতি থেকে আগত, তা সে স্রষ্টা ও পালনকর্তার ব্যাপারে ধারণা যা-ই হোক না কেন।

    এই অনুভূতি মানুষ হিসাবে তার মধ্যে সহজাত, সে স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস করুক কিংবা তাকে অবিশ্বাস করুক, কিংবা সে বস্তু বা প্রকৃতিতে বিশ্বাস করুক। মানুষের মধ্যে এই অনুভূতির উপস্থিতি অনিবার্য, কারণ এটি একটি মানুষের মধ্যে তার সৃষ্টির অংশ হিসাবে সৃষ্ট; এবং তার থেকে একে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয়। এটাই ধার্মিকতা।

    এই ধার্মিকতার বহিঃপ্রকাশ হল স্রষ্টা ও পালনকর্তা বলে যাকে বিশ্বাস করা হয় কিংবা স্রষ্টা ও পালনকর্তাকে অবতার হিসেবে যার মধ্যে কল্পনা করা হয় তার প্রতি চুড়ান্ত ভক্তি প্রদর্শন (তাকদীস)। এই তাকদীস তার প্রকৃত রূপে আবির্ভূত হতে পারে, তখন একে বলা হয় উপাসনা (’ইবাদাহ)। এটি হতে পারে কোনো নিম্নতর রূপে প্রদর্শিত হতে পারে, যেমন শ্রদ্ধা ও বন্দনা।

    তাকদীস হলো মানুষের অন্তরের চূড়ান্ত ভক্তির বহিঃপ্রকাশ। এটা ভীতি থেকে নয়, বরং ধার্মিকতা থেকে। কারণ ভয়ের প্রকাশ তাকদীস নয়, বরং চাটুকারি, সুরক্ষার রেহাইপ্রাপ্তি; এসব তাকদীস-এর বাস্তবতার বিরোধী। সুতরাং, তাকদীস ধার্মিকতার প্রকাশ, ভয়ের নয়। অতএব, ধার্মিকতা বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি থেকে স্বাধীন একটি প্রবৃত্তি, আর ভয় হচ্ছে (বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির) প্রকাশগুলোর মধ্যে একটি। এই কারণেই মানুষ ধার্মিক হয়, এবং আমরা তাকে কিছু না কিছু উপাসনা করতে দেখি যখন থেকে আল্লাহ তাকে পৃথিবীতে নিয়ে এসেছেন। সে সূর্য, গ্রহ, আগুন ও মূর্তি পূজা করেছে। সে আল্লাহর ইবাদতও করেছে। আমরা কোনো যুগে, কোনো জাতি বা সম্প্রদায়কে কোনো না কোনো কিছুর উপাসনা করা ছাড়া দেখি না। এমনকি জনগণ, যখন কর্তৃপক্ষ তাদের ধার্মিকতা ত্যাগ করতে বাধ্য করেছিল, তা তাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও তারা ধার্মিক ছিল এবং কিছু না কিছুর উপাসনা করেছে। ইবাদত-বন্দেগি করার প্রয়াসে তাদের অনেক দুর্ভোগের শিকার হতে হয়েছে। এমন কোন শক্তি নেই যা মানুষের কাছ থেকে ধার্মিকতাকে ছিনিয়ে নিতে পারে, তার থেকে সৃষ্টিকর্তার তাকদীস (তথা চুড়ান্ত ভক্তি প্রদর্শন) দূর করতে পারে এবং তাকে উপাসনা থেকে বিরত রাখতে পারে। এটি একটি সময়ের জন্য (বড়জোড়) দমন করতে পারবে। এর কারণ হল উপাসনা (’ইবাদাত) হল ধার্মিকতার একটি স্বাভাবিক প্রকাশ, যা মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।

    উপাসনার অনুপস্থিতি বা উপাসনাকে উপহাস করার যে বিষয়টি কিছু নাস্তিকদের মধ্যে দেখা যায়, এ ধরনের লোকেদের মধ্যে ধার্মিকতার প্রবৃত্তি আল্লাহর উপাসনা থেকে সৃষ্টির উপাসনার দিকে সরে গেছে। প্রকৃতি, বীরত্বপূর্ণ মহান বিষয়াদি এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে তাদের তাকদীস (তথা চুড়ান্ত ভক্তি প্রদর্শন)-এর প্রকাশ ঘটেছে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিক্ষিপ্ততা, বিকৃতি এবং বিষয়াদির ভুল ব্যাখ্যাকে ব্যবহার করা হয়েছে।

    অতএব, কুফর (কুফর) ঈমানের (বিশ্বাস) চেয়েও কঠিন, কারণ এটি মানুষকে তার সহজাত স্বভাব (ফিতরাহ) থেকে বিক্ষিপ্ত করে এবং এর প্রকৃত প্রকাশ থেকে সরিয়ে রাখে। এর জন্য অনেক বড় প্রচেষ্টা প্রয়োজন হয়। তার সহজাত প্রকৃতির (ফিতরাহ) জন্য যা প্রয়োজনীয় তা থেকে দূরে সরে যাওয়া মানুষের পক্ষে কতইনা কঠিন!

    অতএব, আমরা দেখি নাস্তিকদের কাছে সত্য (হক্ক) প্রকাশ পেলে, এবং যখন তারা আল্লাহর অস্তিত্ব অনুভব করে অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা দ্বারা যখন তাঁর অস্তিত্ব নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি করে, দেখবেন তারা সাচ্ছন্দ্য ও প্রশান্তি সহকারে ঈমানের দিকে ছুটে যায়; এবং একটি ভারী দুঃস্বপ্ন যা তাদের বোঝা আকারে চেপে ছিল, তা অদৃশ্য হয়ে যায়। এ ধরনের লোকদের ঈমান শক্তিশালী এবং অবিচল হয়, কারণ তা সংবেদনশীলতা এবং নিশ্চিত হবার মাধ্যমে আসে। এর কারণ হল তাদের চিন্তা তাদের আবেগের সাথে সংযুক্ত থাকে, তাই তারা যখন নিশ্চিতভাবে আল্লাহর অস্তিত্ব উপলব্ধি করে, তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কে তাদের একটি অনুভূতি তৈরি হয়। এভাবে তাদের সহজাত প্রকৃতি (ফিতরাহ) তাদের চিন্তার সাথে মিলিত হয়, তাই শক্তিশালী ঈমান তৈরি হয়।

    Taken from the book “Islamic Thought”

  • ম্যাকার্থিজমের পুনঃঅনুমোদন

    ম্যাকার্থিজমের পুনঃঅনুমোদন

    ফরেন ইন্টেলিজেন্স সার্ভিলেন্স অ্যাক্ট (FISA) এর ৭০২ ধারা পুনঃঅনুমোদিত করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের সাম্প্রতিক অনুমোদন নাগরিক স্বাধীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই বিতর্কিত নজরদারি কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক স্বাধীনতা সংস্থাগুলির মধ্যে উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে বিচারিক ওয়ারেন্ট ছাড়াই ইলেকট্রনিক নজরদারি পরিচালনা করতে সুযোগ করে দেয় ৷ ৬০-৩৪ ভোটে বিলটির পাস, জাতীয় নিরাপত্তা এবং মার্কিন নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে চলমান উত্তেজনাকে তুলে ধরছে।

    ম্যাককার্থিজম, যা Second Red Scare নামেও পরিচিত, যা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৪০-৫০ সাল মধ্যকার রাজনৈতিক দমন-নিপীড়ন এবং ৫০এর দশকের শেষের দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের উপর কথিত কমিউনিস্ট ও সোভিয়েত প্রভাব এবং সোভিয়েত গুপ্তচরবৃত্তির ভয় ছড়ানোর একটি প্রচারণা। অসংখ্য শিক্ষক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, প্রযোজক ও পরিচালকদের এই উইচহান্ট এর শিকার হতে হয়েছিল। ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝির পরে, মার্কিন সিনেটর জোসেফ ম্যাককার্থি, যিনি প্রচারণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ধীরে ধীরে সে তার জনপ্রিয়তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা হারায় যখন তার বেশ কয়েকটি অভিযোগ মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। প্রধান বিচারপতি আর্ল ওয়ারেনের অধীনে ইউএস সুপ্রিম কোর্ট নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের উপর একাধিক রায় দেয় যা বেশ কয়েকটি মূল আইন এবং আইন প্রণয়ন নির্দেশকে বাতিল করে এবং Second Red Scare এর অবসান ঘটাতে সাহায্য করে। পরবর্তীতে অন্যান্য মার্কিন সরকারও একই ধরণের গুপ্তচরবৃত্তির প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে। তারই ধারাবাহিকতা Section 702 এর আলোচনা এসেছে।

    বর্তমানে, ধারা ৭০২ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে মার্কিন ভূখণ্ডের বাইরে মার্কিন নাগরিকরা বিদেশিদের সাথে কিভাবে যোগাযোগ করে তার উপর নজরদারির কর্তৃত্ব দেয়। মূলত, এই বিধানটি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলিকে মার্কিন নাগরিক এবং অ-নাগরিকদের মধ্যে যোগাযোগ আটকাতে এবং সংগ্রহ করতে সুযোগ করে দেয়, সেক্ষেত্রে মার্কিন নাগরিক নজরদারির লক্ষ্য হোক বা না হোক। এর মধ্যে ফোন কল, ইমেল, টেক্সট মেসেজ বা অন্য যেকোনো ধরনের যোগাযোগ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

    অনিয়ন্ত্রিত নজরদারি, অপব্যবহার এবং গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একেবারেই নতুন নয়; বরং, এটাই মূল ধারা। “নিরাপত্তার উদ্বেগ” দেখিয়ে ৭০২ ধারা পুনঃঅনুমোদিত করার সিদ্ধান্তটি মার্কিন নাগরিকদের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের ডিরেক্টর ক্রিস্টিন আবিজাইদ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক সিনেট কমিটিকে সম্বোধন করে বলেন, “গত মাসের ঘটনাগুলো থেকে প্রমাণিত যে, সন্ত্রাসবাদের হুমকির পরিধি অত্যন্ত ডাইনামিক এবং আমাদের দেশকে [সন্ত্রাস এর বিরুদ্ধে] অবশ্যই মৌলিক বিষয়গুলো রক্ষা করতে হবে।” তিনি ‘ইসরায়েল’-এর উপর হামাসের আক্রমণের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন এবং কংগ্রেসকে “এই গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃপক্ষকে পুনঃঅনুমোদিত করার” আহ্বান জানিয়েছেন।

    অতএব, ৭০২ ধারা তাদের ধর্ম, জাতিগত কিংবা রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীগুলির নজরদারী করার জন্য প্রয়োজনীয় অজুহাত প্রদান করা অব্যাহত রাখবে, এবং এটি  ব্যক্তি স্বাধীনতাকে যে পদদলিত করে তার ব্যপারে তারা উদ্বিগ্ন নয়। যখন নির্বাচিত কর্মকর্তারা প্যালেস্টাইনপন্থী গোষ্ঠীগুলির ব্যাপারে তদন্তের আহ্বান জানান তখন সরকারের নজরদারি ক্ষমতা বাড়ানোর চাপ আরো বাড়তে থাকে। ইতোমধ্যে ভার্জিনিয়ায়, অ্যাটর্নি জেনারেল ফিলিস্তিনের তহবিল সংগ্রহের কার্যক্রমের তদন্ত শুরু করেছেন, এতে অভিযোগ রয়েছে যে এটি হামাসকে সমর্থন করে। স্পষ্টতই, পুনঃঅনুমোদনের পিছনে রয়েছে ভিন্নমতকে চুপ করিয়ে দেওয়া এবং বিরোধিতাকে দমন করার প্রচেষ্টা, বিশেষ করে গাজায় চলমান ঘটনাগুলির বিষয়ে। মার্কিন প্রশাসনের প্রতি ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং গাজায় গণহত্যায় তার ভূমিকার মধ্যে সাম্প্রতিক ভোটটি আসে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনিয়ন্ত্রিত সরকারী নজরদারি বজায় রাখতে হবে এবং এটি তারা যেকোনো মূল্যে করবে। এটি হল আমেরিকার নীতি এবং ইসলামের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মুসলমানদের বশীভূত করার একটি উপায়। মুসলিম হিসেবে, আমরা এই কঠোর পদক্ষেপগুলোকে আমাদের ভীত করবার অনুমতি দিতে পারি না এবং আমাদের অবশ্যই হক কথা বলতে হবে। ইসলামের আলো অবশ্যই বিরাজ করবে।

    আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    [إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُواْ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ لِيَصُدُّواْ عَن سَبِيلِ اللّهِ فَسَيُنفِقُونَهَا ثُمَّ تَكُونُ عَلَيْهِمْ حَسْرَةً ثُمَّ يُغْلَبُونَ وَالَّذِينَ كَفَرُواْ إِلَى جَهَنَّمَ يُحْشَرُونَ]

    নিঃসন্দেহ যারা কুফরী করে তারা তাদের ধনসম্পত্তি খরচ করে আল্লাহ্‌র পথ থেকে বাধা দেবার জন্যে। তারা এটা খরচ করবেই, তারপর এটি হবে তাদের জন্য মনস্তাপের কারণ, তারপর তাদের পরাজিত করা হবে। আর যারা কুফরী করে তাদের জাহান্নামের দিকে একত্রিত করা হবে [আনফাল: ৩৬]

    উৎস: হাইছাম বিন ছাবিত কর্তৃক লিখিত প্রবন্ধ

  • এডেন উপসাগরের জলদস্যু, ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার!

    এডেন উপসাগরের জলদস্যু, ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার!

    বৃটেন-আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে এডেন উপসাগর। এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগর হচ্ছে পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথের মধ্যে একটি।  আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যবর্তী স্থানে সংকীর্ণভাবে এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরের অবস্থান যেটি ভারত মহাসাগরকে সুয়েজ খাল এবং ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে।  এডেন উপসাগরের একপাশে আছে সোমালিয়া ও অপর পাশে আছে ইয়েমেন। এই বাণিজ্য পথেই পৃথিবীর ১৫ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য সংঘটিত হয়। প্রতিবছর গড়ে চব্বিশ হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। পৃথিবীর ২০% পণ্যবাহী কন্টেইনার, ১০% সমুদ্রজাত তেল ও ৮% তরলকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিহবন হয়ে এই পথে। তাই ভৌগলিকভাবে এই সামুদ্রিক পথ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, কোন রাষ্ট্র যদি এই সামুদ্রিক পথের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে তাহলে পূরো পৃথিবীর আমদানী ও রপ্তানির বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ তার হাতেই থাকবে।

    ইয়েমেনে ব্যপক অত্যাচার ও লুটপাটের পর ১৯৬৭ সালে বৃটিশরা ইয়েমেন থেকে তাদের সামরিক সরঞ্জাম ও বাহিনী তুলে নিলেও এখনো সেখানে রাশেদ আল আলিমির মত বৃটেনপন্থী দালাল শাসক বলবৎ রয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকা চাচ্ছে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বৃটেনপন্থী সরকারকে উৎখাত করে তার নিজের নিয়ন্ত্রিত সরকারকে প্রতিষ্ঠা করতে যেন এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরে তার একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। বৃটিশভিক্তিক প্রতিষ্ঠান চ্যাটহাম ইন্সটিটিউটকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের জায়ান্ট ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তারিক সালেহ বলেন- “যা ঘটছে অর্থাৎ হুথিদের দ্বারা বাণিজ্যিক জাহাজ ছিন্তাই করা, তার সাথে গাজার ঘটনার কোন যোগসূত্র নেই,” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “যা ঘটছে তা ইরান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালীর মতো বাব আল-মান্দাব প্রণালীকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সম্পূর্ণরূপে ইরানী পদক্ষেপ।” তিনি ইরানকে হুথিদের অস্ত্র সরবরাহ করার জন্য অভিযুক্ত করেছেন। অর্থাৎ এটা স্পষ্ট যে, ইয়েমেন সরকারকে উৎখাত করতে একদিকে যেমন হুথি বিদ্রোহীদেরকে ব্যবহার করা হচ্ছে, অপরদিকে হুথিদের দ্বারা বাণিজ্যিক জাহাজ ছিন্তাই এর ঘটনা বৃটেনের মিত্রদেশগুলো অর্থাৎ ইউরোপ ইউনিয়নের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। যা মূলত এডেন উপসাগরে আমেরিকার ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে বাস্তবায়নে ত্বরান্বিত করছে। ইউরোপ ইউনিয়নের বাণিজ্যিক জাহাজগুলো লোহিত সাগরের নৌপথকে ব্যবহার করতে না পারলে তাদেরকে দীর্থ ১১ দিনের অতিরিক্ত পথ ভ্রমন করে পণ্য পরিবহন করতে হবে। যা জায়ান্ট ব্র্যান্ডগুলোকে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দিবে। ফলে ব্রিটেনের মিত্রদেশগুলোর আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর সম্ভাবনা থাকবে। ইসলামের রাজনৈতিক উত্থান ঠেকানো ও চীনকে নিয়ন্ত্রনে ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকা তার IPS (INDO PACIFIC STRATEGY) প্রকল্পের অংশ হিসেবে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও বাংলাদেশকে যুক্ত করেছে। সোমালিয়ার জলদস্যুদের কর্তৃক ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ বুলগেরিয়ার ও বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক জাহাজ ছিন্তাই হবার পর আমেরিকা ভারতকে দিয়ে বুলগেরিয়ার জাহাজটি উদ্ধার করিয়েছে। ভারত জ্বালানী তেল আমদানীর জন্য এডেন উপসাগরের নৌপথের উপর নির্ভরশীল। তাই নিজের বাণিজ্যিক নিরাপত্তার জন্য হলেও আমেরিকার ইন্টারেস্টে তাকে যুক্ত হতেই হবে। ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকা ভারতের নৌবাহিনীকে ব্যবহার করছে এবং নিশ্চিত করছে ভারত যেন আমেরিকার স্বার্থে আঞ্চলিক চৌকিদার হয়ে কাজ করে। এভাবে আমেরিকা লোহিত সাগর হতে শুরু করে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত তার ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের জাল বিস্তার করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বীমা, নিরাপত্তার অজুহাতে সিকিউরিটি টাস্কফোর্স সেবা ও  সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির মাধ্যমে সে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে নিচ্ছে। ইতোঃমধ্যেই বাইডেন প্রশাসন ৩.৯৯ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন ভারতের কাছে বিক্রি করতে সম্মতি দিয়েছে। অর্থাৎ “মরার উপর খাঁড়ার ঘা।” 

    এই সকল সমস্যার উদ্ভব ঘটছে পশ্চিমা সম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের নব্য উপনিবেশ স্থাপন ও আধিপত্যবাদী তাড়না থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বাধিক সামুদ্রিক শক্তি হিসাবে আবির্ভূত হয়। মানব ইতিহাসের নিয়ম হিসাবে সর্বদাই ক্ষমতাবানরা নিজের স্বার্থমত আইন তৈরি করে যাকে তারা তখন “আন্তর্জাতিক আইন” বলে। ১৯৪৫ সালে, মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস. ট্রুম্যান তার প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা ও জাতির অধিকারের কথা বলে আন্তর্জাতিক নীতির বুলি ব্যবহার করে তার মহাদেশীয় সমস্ত প্রাকৃতিক সম্পদের উপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করেছিলেন। অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো দ্রুত এই কৌশলটি গ্রহণ করেছিল, কিছু রাষ্ট্র তাদের মাছ ধরার জল ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত প্রসারিত করেছিল, অন্যরা তাদের জাতীয় সমুদ্রকে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত প্রসারিত করেছিল। এর পরে, এই ধারণাগুলি তিনটি কনভেনশনের মাধ্যমে বৈধ করা হয়েছিল যেখানে বলা হয় রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরের সমস্ত জলকে আন্তর্জাতিক জল হিসাবে বিবেচনা করা হবে, যা সমস্ত জাতির জন্য বৈধ হবে এবং কারও কাছে কোনও অধিকার বা দাবি থাকবে না। আমরা দেখতে পাই যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এবং অন্যান্য পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি একই তথাকথিত আন্তর্জাতিক জলসীমায় দাঁড়িয়ে তাদের বিমানবাহী জাহাজ থেকে মুসলিম দেশগুলিতে বোমা মেরে আমাদের রক্তাক্ত করে, এমনকি তাদের নৌবাহিনীও সুয়েজ খাল, হরমুজ প্রণালী এবং মালাক্কা প্রণালীর মতো মুসলিম দেশগুলির আঞ্চলিক জলসীমার মধ্য দিয়ে যায় এবং এই সমস্ত কিছু আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে শাসন করে।

    দক্ষিণ চীন সাগরে চীন তার অধিকার দাবি করে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ করছে, যাতে এটি তার সমুদ্রসীমা প্রসারিত করতে পারে, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমারা এটিকে আন্তর্জাতিক জলসীমা লঙ্ঘন বলে অভিহিত করছে। আমেরিকা তার স্বার্থ হাসিলে ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের রাষ্ট্রেসমূহের সামরিক বাহিনীর সাথে বাংলাদেশের মত করে আকসা ও জিসোমিয়ার মত সামরিক সহায়তার চুক্তি করতে তৎপর হয়েছে যাতে করে অন্য রাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় সে তার নিজের স্বার্থ উদ্ধার করে নিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা এভাবেই আন্তর্জাতিক আইনের নামে সাম্রাজ্যবাদকে টিকিয়ে রেখেছে। এই বিষয়টিই স্পষ্ট করে, আমেরিকার মত শক্তিশালী রাষ্ট্রের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে সামরিক সহায়তা দাবি করার অর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সক্ষমতা আছে এই অঞ্চলে সমুদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার।

    মুসলমানরা খিলাফতে রাশিদার সময় থেকে তাদের নৌবাহিনী শুরু করেছিল, যেখানে উমাইয়া খিলাফতই রোমান সাম্রাজ্যের নৌ শক্তির অবসান ঘটিয়েছিল যার ফলে মুসলমানরা বিশ্বের একমাত্র নৌ শক্তি ছিল যার নিয়ন্ত্রণ সমুদ্রের উপর ছড়িয়ে পড়েছিল যা ভূমধ্যসাগর থেকে লোহিত সাগর, পারস্য উপসাগর এবং আরব সাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।উসমানীয়দের আগমন পর্যন্ত আব্বাসীয় খিলাফতে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত ছিল। পূর্ব-পশ্চিম বাণিজ্য পথ মুসলমানদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল অর্থাৎ ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের ভারত ও চীনে পৌঁছানোর জন্য খিলাফতের সমূদ্রসীমার মধ্য দিয়ে যেতে হতো। ইউরোপের জন্য একটি বিকল্প অবশিষ্ট ছিল, যেখানে তারা খিলাফতের সীমানা এড়িয়ে ভারত ও চীনে পৌঁছাতে পারে এবং সেটি হল কনস্টান্টিনোপল। কিন্তু ১৪৫৩ সালে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ কর্তৃক কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের পর এই পথটিও ইউরোপের হাত ছাড়া হয়ে যায়।

    সোমালিয়ার বা হুতির বিদ্রোহীরা যারা এই জলদস্যুতা করছে মুসলিমদের ইতিহাস তা নয়। মুসলিমরা এই অঞ্চলগুলোতে বাণিজ্যিক পথকে নিরাপদ করেছিল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভারসাম্য স্থাপনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু আজকে মার্কিন-বৃটিশ-ফ্রান্স এর প্রভাবে সোমালিয়া এবং ইয়েমেনের মুসলিমরা জলদস্যুতে পরিণত হয়েছে। মুসলিমরা যেখানেই ভূমি জয় করেছিলো, সেখানে উপনিবেশ স্থাপন করে সম্রাজ্যবাদীদের মত লুটপাট করেনি বরং ন্যায় ও ইনসাফের শাসন কায়েম করেছিলো যার ফলে দলে দলে মানুষ মুসলিম হয়েছিল এবং সেখানকার সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়েছিল। ভারতীয় উপমহাদেশ যার উৎকৃষ্ট উদাহরন যেখানে বৃটিশরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামে উপনিবেশ গড়ার পর ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ লুট করে নিয়ে যায়। প্রথম শতাব্দীর মুসলিমরা যেভাবে সমুদ্রপথে দূরবর্তী দেশগুলোতে ইসলামী দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিল এবং জিহাদের মাধ্যমে পশ্চিমে স্পেন জয় করেছিল, তাদের উদাহরণগুলি আজ আমাদের জন্য একটি মাপকাঠি যে আমাদেরও উচিত সমস্ত সম্ভাব্য উপায়ে দাওয়াহ ও জিহাদের মাধ্যমে ইসলামকে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে দেওয়া এবং এটি কেবলমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেই সম্ভব হতে পারে। আসন্ন খিলাফত রাষ্ট্র সোমালিয়া, ইয়েমেনসহ সমস্ত মুসলিম ভূমিকে ইসলামের ছায়াতলে একত্রিত করবে।

    রাসুল (সা) বলেন,

    একটি গাযওয়াহ (সামুদ্রিক অভিযান) ভূমিতে দশটি গাজাওয়াতের (যুদ্ধের অভিযান) চেয়ে উত্তম। আর যে ব্যক্তি সমুদ্রকে অনুমতি দিল, সে যেন সমস্ত উপত্যকাকে অনুমতি দিল। । (আল-হাকিম নং ২৬৩৪ এবং আল-মুজাম আল-কবীরে আল-তাবরানি)

    সমুদ্রকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সকল মানুষের জন্য সর্বজনীন সম্পত্তি ঘোষণা করেছেন, তাই খিলাফত রাষ্ট্র কাউকে এর থেকে উপকৃত হতে বাধা দেবে না।  এমনকি মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত রাষ্ট্রের দরিদ্র জেলেদেরকেও সমুদ্র থেকে রিজিক পেতে বাধা দেওয়া হবে না। তবে তারা পেট্রোলিয়াম এবং গ্যাসের মতো খনিজ সম্পদ উত্তরণ করতে পারবে না।

    “আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন এর প্রভাব পড়ে আল্লাহর শুত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপর ও যাদেরকে তোমরা চিনো না কিন্তু আল্লাহ তাদেরকে চেনেন। ।” [সূরা আল-আনফাল:  ৬০]।

    অতএব, খিলাফতের নৌ-নীতি এই আয়াতের উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে মুসলমানদেরকে পূর্ণ শক্তি অর্জনের জন্য একটি সাধারণ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।  এ জন্য আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, ড্রোন, সাবমেরিন ও বিমানবাহী রণতরী প্রস্তুত করতে হবে যাতে করে স্থলে ইসলামের আধিপত্য যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, সেভাবে সমুদ্রে ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

  • লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য

    লাইলাতুল কদরের তাৎপর্য

    মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:

    إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ * وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ * لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ * تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ * سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ

    আমি একে নাযিল করেছি কদর রাত্রি। কী আপনাকে জানাবে কদর রাত্রি কী? কদর রাত্রি এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। একটি নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। [সূরা আল-কদর]

    আমরা এখন রমজানের শেষ তৃতীয়াংশে প্রবেশ করেছি এবং আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই শেষ ১০ দিন সম্পর্কে বলেছেন,

    «تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ»

    “রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত তালাশ করো।”

    সূরা আল কদরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এবং অনেক হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লায়লাতুল কদরের মহিমা, ‘শক্তির রাত’ সম্পর্কে কথা বলেছেন। এটি আমাদের রবের পক্ষ থেকে মহান রহমত, পুরস্কার এবং আশীর্বাদের একটি রাত; এমন একটি রাত যেখানে উপাসনা এবং সম্পাদিত সৎকাজ এক হাজার মাসের (তথা ৮৩ বছর) ইবাদতের চেয়েও বেশি মূল্যবান – যা কিনা সারা জীবন ইবাদত করার সমতুল্য; এবং আমাদের গুনাহের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে মহান ক্ষমার একটি রাত এটি, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا، غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِ»

    “যে ব্যক্তি (খাঁটি) ঈমানের সাথে এবং (আত্মপর্যালোচনাসহ) আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে নামাজের জন্য দাঁড়ায়, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়…”

    তাই মুসলিম হিসেবে আমরা লাইলাতুল কদরের সন্ধান করি, বেশি বেশি নামায, কুরআন তেলাওয়াত, যিকির, দুআ, তওবা চাওয়া, ইসলামের আলোচনা এবং আমাদের রব, আল্লাহ আজ্জা ওয়াজ্জালকে সন্তুষ্ট করার মতো অন্যান্য কাজ করার চেষ্টা করি। তবে, রমজানের এই শেষ ১০ দিনে, আমাদের কিছু সময় ব্যয় করা উচিত যে মহান আল্লাহ তায়ালা ‘লাইলাতুল কদর’ কে কত গুরুত্ব ও ওজন দিয়েছেন তা অনুধাবণ করা এবং আমাদের দ্বীনের জন্য এই রাতের তাৎপর্যের কারণ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করা।

    প্রথমত, এই রাতটির জন্য যে নামটি উল্লেখ করা হয়েছে – “শক্তির রাত” আল্লাহর দৃষ্টিতে এই রাত কতটুক মহিমাময় তা প্রতিফলিত করে। সূরাতুল কদরে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

    وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ

    কী আপনাকে জানাবে (বোঝাবে/ব্যখ্যা করবে) কদর রাত্রি কী?

    মূলত আমাদের বলছেন, “এই শক্তির রাত কী তা পৃথিবীর কোন জিনিস আপনাকে ব্যাখ্যা করতে পারে? আপনি কীভাবে এই রাতের ওজনের প্রশংসা বা কল্পনা করতে পারেন?”, এর মহিমা এবং গুরুত্বের উপর জোর দিয়ে।

    তারপর তিনি আমাদের জানান যে ফেরেশতারা এই রাতে প্রচুর পরিমাণে রহমত ও বরকতের  সাথে অবতরণ করেন – যারা ফজর পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে তাদেরকে সালামের জবাবে সালাম প্রদান করে। মুফাসসিরীনরা তাদের সূরা আল-কদরের তাফসীরে বর্ণনা করেছেন, এই রাতের এত বরকত যে পৃথিবী ফেরেশতা দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যায়। অতঃপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের জানিয়ে রাতটিকে আরও বেশি বরকতময়  করেন যে ‘রুহ’ তথা জিবরাঈল (আ.) – এর মত সর্বশ্রেষ্ঠ ফেরেশতাও এই রাতে অবতরণ করেন – যিনি নবীদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন; যিনি আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কুরআনের বাণী নিয়ে এসেছিলেন, যার ব্যপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে তার ৬০০টি ডানা রয়েছে, যার প্রতিটি ডানা পুরো দিগন্তকে পূর্ণ করে (অর্থাৎ পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত যতদূর চোখ যায়) – এটি এই রাতের মর্যাদাকে আরও বৃদ্ধি  করে।

    কিন্তু কোন জিনিসটি এই রাতের এত বেশি  মর্যাদা, ওজন ও গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়? কারণ এটিই সেই রাত যা আল্লাহ তায়ালা মহান কুরআন নাযিলের জন্য বেছে নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

    إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ * فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ * أَمْرًا مِّنْ عِندِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ * رَحْمَةً مِّن رَّبِّكَ إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ

    আমি একে নাযিল করেছি এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। আমার পক্ষ থেকে আদেশক্রমে, আমিই প্রেরণকারী। আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। [সূরা আদ-দুখান ৩-৬]

    সুতরাং লাইলাতুল কদরের মহান মর্যাদা সরাসরি সেই মহান মর্যাদার সাথে জড়িত যা আল্লাহ তায়ালা কুরআন ও এর মধ্যে থাকা বাণীকে দান করেছেন। এবং এই রাতের মহিমা একটি নতুন জীবনধারার মহিমার সাথে যুক্ত যা সেই রাতে বিশ্বের জন্য জন্ম হয়েছিল যা মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যাবে। তাই শক্তির রাতকে সত্যিকার উপলব্ধি করার অর্থ হচ্ছে কুরআনের বিষয়বস্তুর প্রকৃত মূল্যকে উপলব্ধি করা।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই কুরআন সম্পর্কে বলেন,

    وَلَوْ أَنَّ قُرْآنًا سُيِّرَتْ بِهِ الْجِبَالُ أَوْ قُطِّعَتْ بِهِ الأَرْضُ أَوْ كُلِّمَ بِهِ الْمَوْتَى بَل لِّلّهِ الأَمْرُ جَمِيعًا

    যদি কোন কুরআন এমন হত, যার সাহায্যে পাহাড় চলমান হয় অথবা জমিন খণ্ডিত হয় অথবা মৃতরা কথা বলে, তবে কী হত? বরং সব কাজ তো আল্লাহর হাতে। [আর-রা’দ: ৩১]

    এই আয়াতে, বিশ্বজগতের পালনকর্তা আমাদের কুরআনে বর্ণিত বাণীর সেই গুরুত্ব ও তাৎপর্য সম্পর্কে জানাচ্ছেন – যে এত বিশাল কাঠামো হওয়া  সত্ত্বেও এই পাহাড়গুলো এই মহিমান্বিত গ্রন্থটিতে থাকা বানী, এর সমাধানের ভারে চলমান হয়ে যেত।

    আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

    وَلَوْ أَنَّمَا فِي الْأَرْضِ مِن شَجَرَةٍ أَقْلَامٌ وَالْبَحْرُ يَمُدُّهُ مِن بَعْدِهِ سَبْعَةُ أَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ كَلِمَاتُ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

    পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথেও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর বাক্যাবলী লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [লুকমান: ২৭]

    এই সুন্দর আয়াতে, তিনি আমাদেরকে শক্তিশালীভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে পৃথিবীর সমস্ত গাছ কলম হলেও এবং সমস্ত সমুদ্র তাদের মতো আরও সাতটি দিয়ে কালি হয়ে গেলেও – তারা এর বিষয়বস্তুর সাথে তাল মেলাতে সক্ষম হবে না, অর্থাৎ জীবন ও মানবতার জন্য সমাধান যা আল্লাহর বাণী কুরআনে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন, সমাজবিজ্ঞান এবং পারিবারিক জীবনের মতো বিষয়ের সমস্ত বই যদি গ্রন্থাগার, বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান হতে একত্রিত করা হয় তবে কুরআনের তুলনায় তা ম্লান হয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে, এটি সৃষ্টিকর্তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করার মতো হবে – একেবারেই কোন তুলনা নেই।

    অতএব, এই কুদরতি রাতের তাৎপর্য হল যে এতে মহিমান্বিত কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে এবং একটি ব্যাপক দ্বীনের উত্থান ঘটেছে যা মানবজাতির ব্যক্তি হিসাবে, সমাজ হিসাবে কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে তার সমাধান নিয়ে এসেছে। হোক তা আধ্যাত্মিক, নৈতিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক, আইন বা রাজনৈতিক – এমন সমাধান যা মানবজাতি যা তৈরি করতে পারে তার সাথে তুলনাহীন; এবং মানুষের আইনের বিপরীতে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই এটি সমস্ত প্রজন্ম, স্থান, কাল ও পাত্রের জন্য প্রযোজ্য। এটি একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবস্থার উত্থানকে চিহ্নিত করে যা একজন ব্যক্তির হৃদয় ও মনে প্রশান্তি আনবে এবং যা দুর্নীতিগ্রস্ত ও অন্যায় ধারণা, ঐতিহ্য ও আইনকে উপড়ে ফেলবে, মানুষকে বিভ্রান্তি, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি এবং দুর্দশা থেকে মুক্ত করবে। একটি ব্যবস্থা যা সকল মানুষের জন্য তাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে ঐশী মূল্যবোধ দ্বারা ন্যায়পরায়ণতা ও ভারসাম্য নিশ্চিত করে, মানবতার জন্য এটি সত্যিকারের রহমত ও আলো।

    এবং এটি এমন একটি ব্যবস্থা ছিল যা ১৩০০ বছর ধরে প্রয়োগ করা হয়েছিল – মদীনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় থেকে শুরু করে এবং তাঁর পরে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত খিলাফাহ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা হয়েছিল – – ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও চিকিৎসায় শ্রেষ্ঠত্বের বিস্তার, নিরাপত্তা, মহিলাদের জন্য মর্যাদা, এবং স্পেন থেকে চীন পর্যন্ত মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে সম্প্রীতি।

    কিন্তু আজ, এই খিলাফাহ রাষ্ট্রের অনুপস্থিতিতে, মহিমান্বিত কুরআনের আইনগুলি আর আমাদের মুসলিম ভূমিতে সামগ্রিকভাবে প্রয়োগ করা হয় না, ইসলাম এই পৃথিবীর মানবতার জন্য যে আলো ও করুণার ব্যবস্থা এনেছিল তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এর অতুলনীয় সমাধানগুলো – যা বিশ্বের সমস্ত গ্রন্থের বিষয়বস্তুর চেয়ে উচ্চতর – যার অনুপস্থিতি এই উম্মাহ ও মানবজাতিকে অন্ধকার, ব্যাপক দারিদ্র্য, অসম্মান, নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভোগে নিমজ্জিত করেছে।

    দারিদ্র্য দূরীকরণ:

    আজ মানবতার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ দরিদ্রতার আত্মা-ধ্বংসকারী পঙ্গু জ্বরে ভুগছে এবং এমনকি আমরা মানুষকে অনাহারে মারা যেতে দেখছি যদিও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা প্রতিটি ব্যক্তির জন্য এবং এর বাইরেও একটি ভাল জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট সম্পদ তৈরি করেছেন। তিনি বলেন,

    وَبَارَكَ فِيهَا وَقَدَّرَ فِيهَا أَقْوَاتَهَا فِي أَرْبَعَةِ أَيَّامٍ

    তিনি পৃথিবীতে উপরিভাগে অটল পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, তাতে কল্যাণ নিহিত রেখেছেন এবং চার দিনের মধ্যে তাতে তার খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন…। [ফুস্সিলাত: ১০]

    আর আজ আমরা দেখছি আমাদের ভাই-বোনরা রুটি ও নোংরা পানির উপর বেঁচে আছে এবং রোগে আক্রান্ত বস্তিতে বসবাস করছে, আমাদের মায়েরা তাদের পরিবারের খাওয়ানোর জন্য আবর্জনা থেকে খাবার তুলেছে, এবং আমাদের দাদিরা রাস্তায় ভিক্ষা করছে যদিও আল্লাহ আমাদের মুসলিম ভূমিগুলোকে তার নিয়ামতে পরিপূর্ণ করেছেন। আমাদের রয়েছে বিশ্বের সিংহভাগ তেল, গ্যাস, স্বর্ণের মজুদ এবং কোটি কোটি একর পৃথিবীর সবচেয়ে উর্বর ভূমি – যাতে আমাদের উম্মাহকে একটি দিনও আর্থিক কষ্ট করতে না হয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা যদি মুসলিম বিশ্বের একটি নমুনা দেখি যে, পাকিস্তানের মাত্র ২০ জন ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে যদি যাকাত সংগ্রহ করা হয় তবে এটি $৬০০ মিলিয়নেরও বেশি উপার্জন হবে এবং পাকিস্তানের কয়লা ক্ষেত্রগুলির মাত্র ২% মজুদ আগামী ৪০ বছরের জন্য দেশটির জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে, জনগণকে এক সেকেন্ড ব্ল্যাকআউটের শিকার হতে হবে না; বাংলাদেশে কুইক রেন্টালের জন্য যে পরিমান অতিরিক্ত অর্থ খরচ হয় তা দিয়ে একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌছানো সম্ভব এবং যদি এককভাবে নাইজেরিয়ায় সঠিকভাবে চাষ করা হয় তবে এটি সমগ্র আফ্রিকাকে খাওয়াতে পারে। সুবহানাল্লাহ!

    আমাদের উম্মাহর আজ যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থা, তা হল কুরআনে  বর্ণিত আইনের রহমত এবং কিভাবে আমাদের দেশের সম্পদকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী সংগঠিত করা যায় তা পরিত্যাগ করার ফল। কিন্তু যখন এই আইনগুলো তাঁর سبحانه وتعالى-এর ব্যবস্থা তথা খিলাফতের অধীনে বাস্তবায়িত হয়েছিল, তখন তা ছিল একেবারেই ভিন্ন বাস্তবতা। এই রাজ্যের অধীনে, ৮ম শতাব্দীতে, যখন উমর বিন আবদুল আজিজ মুসলমানদের খলিফা ছিলেন, তিনি একবার ইরাকে তার এক কর্মকর্তা আবদুল-হামিদ ইবনে আবদুর-রহমানকে চিঠি লিখেছিলেন, যাতে তিনি তাকে জনগণের পাওনা পরিশোধ করতে বলেছিলেন। ‘আব্দুল-হামিদ জবাবে  তাঁকে লিখেছিলেন, “আমি জনগণের পাওনা পরিশোধ করেছি এবং বায়তুল-মাল (কেন্দ্রীয় কোষাগার)-এ এখনও অর্থ রয়েছে।” অতঃপর উমর (রা.) তাকে লিখেছিলেন যে যারা টাকা ধার করেছে এবং তার ঋণ পরিশোধ করেছে তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করতে। আবদুল-হামিদ তাকে আবার লিখেছিলেন, “আমি তাদের ঋণ পরিশোধ করেছি, এবং বায়তুল-মালে এখনও টাকা আছে”। উমর তাকে আবার লিখেছিলেন যে প্রত্যেক সেই পুরুষকে খুঁজতে যার কাছে টাকা নেই কিন্তু বিয়ে করতে চায় এবং তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে এবং তার জন্য মাহর পরিশোধ করতে। আবদুল-হামিদ তাকে আবার লিখেছিলেন, “আমি যাদের খুঁজে পেয়েছি তাদের প্রত্যেককে বিয়ে করিয়েছি এবং মুসলমানদের বায়তুল-মালে এখনও অর্থ রয়েছে।” উমর তখন তাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন যে যাদের খারাজ (জমি কর) পাওনা ছিল এবং জমি চাষের জন্য সাহায্যের প্রয়োজন ছিল তাদের সন্ধান করতে এবং তাদের এটি করতে সাহায্য করার জন্য যা যা প্রয়োজন তা তাদের ধার দিতে।

    সুবহানাল্লাহ! এটা কোন স্বপ্ন নয়। এটি একটি ভূমিতে কুরআন ও সুন্নাহর মধ্যে থাকা ইসলামী অর্থনৈতিক আইন বাস্তবায়নের করুণা ও ফল – যা সমৃদ্ধি তৈরি করতে পারে এবং প্রত্যেকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা নিশ্চিত করতে পারে।

    রাজনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা:

    আজ মুসলিম বিশ্ব রাজনৈতিক দমন-পীড়নে জর্জরিত – তা গণতন্ত্র দ্বারা শাসিত হোক বা একনায়কতন্ত্র দ্বারা। আমাদের এমন নেতৃত্ব আছে যারা ভয় দিয়ে শাসন করে – তাদের নাগরিকদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করে, মিডিয়াকে তাদের দুর্নীতি ও অন্যায্য কাজের জবাবদিহি করতে বাধা দেয় এবং যারা তাদের অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের গ্রেফতার, কারাগারে, নির্যাতন এবং এমনকি দায়মুক্তির মাধ্যমে হত্যা করে। তারা এমন শাসক যারা নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে দেখেন, সংবিধান পরিবর্তন করেন এবং জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করেন, উম্মাহর সম্পদ লুট করেন এবং যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন তাদের হিসাব-নিকাশের কাজগুলো হয়ে ওঠে অপরাধমূলক। 

    এটি ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, খিলাফতকে পরিত্যাগ করার এবং আল্লাহ প্রদত্ত বিধানের এর পরিবর্তে আমাদের ভূমিগুলিকে পরিচালনা করার জন্য অনৈসলামিক ধর্মনিরপেক্ষ বা ধণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেখানে মানুষ আইন প্রণয়ন করে তার প্রত্যক্ষ ফলাফল। এবং এর ফলস্বরূপ, আমাদের এখন এমন নেতৃত্ব রয়েছে যারা জনগণের চাহিদা এবং ভোগান্তির প্রতি উদাসীন বরং তাদের স্বার্থ ও ক্ষমতার আসন রক্ষা তাদের গ্রাস করে আছে।

    এর সম্পূর্ণ বিপরীতে, কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত আইন দ্বারা গঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীনে, খিলাফত, রাজনৈতিক ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা, শাসনে স্বচ্ছতা, আইনের শাসন নিশ্চিত করে এবং এতে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নাগরিকদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি কিংবা নির্যাতন নিষিদ্ধ। এবং এসব শাসনের অবিচ্ছেদ্য নীতি।  প্রকৃতপক্ষে, ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাকওয়াপূর্ণ শাসকদের তৈরি করেছে যারা তাদের নাগরিকদের তাদের দায়িত্বের জন্য তাদের কাছে জবাবদিহি করবে এবং তাদের সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধের ইসলামী দায়িত্ব পালনে তাদের উৎসাহিত ও সহায়তা করবে।

    উদাহরণস্বরূপ, উমর বিন আল-খাত্তাব (রা.), খলিফার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর জনগণকে একত্রিত করেন এবং তাদের দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হলে তাকে তাদের শাসক হিসেবে জবাবদিহী করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমার দায়িত্ব পালনে আমি পবিত্র গ্রন্থ থেকে নির্দেশনা নেব এবং মহানবী (সা.) ও আবু বকর (রা.) এর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করব। এ কাজে আমি আপনাদের সহযোগিতা কামনা করছি। যদি আমি সঠিক পথে চলি তবে আমাকে অনুসরণ করবেন। যদি আমি সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হই তবে আমাকে সংশোধন করবেন যাতে আমরা বিপথগামী না হই। একবার জনসভায় জনৈক ব্যক্তি তাকে চিৎকার করে বলল, “হে উমর! আল্লাহকে ভয় কর!” শ্রোতারা তাকে নীরব করতে চেয়েছিলেন কিন্তু উমর এটিকে বাধা দিয়েছিলেন, বলেছিলেন: “যদি লোকেদের দ্বারা এই ধরনের অকপটতা দেখানো না হয়, তাহলে তারা কোন কিছুর জন্যই ভালো নয় এবং, যদি আমরা তাদের কথা না শুনি, তাহলে আমরা তাদের মতই হব (অর্থাৎ কিছুই ভালো হবে না)।” এটা শুধু মুখের কথাই ছিল না, প্রতি বছর হজের সময় তিনি রাষ্ট্রের সকল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে তার কাছে রিপোর্ট করতে বলতেন এবং এই সময়ে যে কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের যে কোনো অভিযোগ তুলে ধরতে পারতেন। একবার একজন ব্যক্তি অভিযোগ করলেন যে একজন গভর্নর তার কোন দোষ না থাকায় তাকে বেত্রাঘাত করেছেন। তদন্তের পর, গভর্নরকেও প্রকাশ্যে একই সংখ্যক বেত্রাঘাত করা হয়েছিল।

    রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রতি এই গুরুত্ব দেওয়া এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপনে জনগণকে সমর্থন করা এবং শাসকের জবাবদিহিতা ইসলামী শাসনের শতাব্দী জুড়ে অব্যাহত ছিল। উদাহরণস্বরূপ, মামুন আর-রশিদ, আব্বাসীয় খলিফদের একজন, বিশেষভাবে তার জনসাধারণের শ্রোতাদের অভিযোগ শোনার জন্য রবিবার আলাদা করে রাখতেন। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত, প্রত্যেকেই – নারী-পুরুষ – খলিফার কাছে তাদের অভিযোগ পেশ করতে পারত, যা তাৎক্ষণিকভাবে মেনে নেওয়া হতো। একদিন এক দরিদ্র বৃদ্ধা অভিযোগ করলেন যে একজন নিষ্ঠুর ব্যক্তি তার সম্পত্তি হস্তগত করেছে। “কে সেই ব্যক্তি?” খলিফাকে জিজ্ঞেস করলেন। “তিনি আপনার পাশে বসে আছেন,” খলিফার ছেলে আব্বাসের দিকে ইশারা করে বৃদ্ধ মহিলা উত্তর দিলেন। আব্বাস দ্বিধাগ্রস্ত সুরে তার পদক্ষেপকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছিল যখন বুড়ি তার যুক্তিতে আরও জোরালো হচ্ছিল। খলিফা বলেন যে এটি তার মামলার সততা যা তাকে সাহসী করে তুলেছিল এবং পরবর্তীতে তিনি তার পক্ষে এবং তার নিজের ছেলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন।

    এগুলো কুরআন ও সুন্নাহর আইন দ্বারা পরিচালিত সমাজের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত অপ্রতিদ্বন্দ্বী ন্যায়বিচারের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।

    মুসলমানদের জীবন ও ইজ্জত রক্ষা:

    আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে আমাদের উম্মাহর রক্ত, জীবন ও সম্মানের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি – তা সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মায়ানমার, আফগানিস্তান, মধ্য আফ্রিকা, চীন এবং তার বাইরে যেখানেই হোক। আমাদের ভাই-বোনদের রক্ত পানির চেয়েও সস্তা হয়ে গেছে এবং এমন কোনো রাষ্ট্র বা ব্যবস্থা নেই যা তাদের রক্তকে রক্ষা করতে পারে কিংবা তাদের জন্য অভয়ারণ্যের ব্যবস্থা করতে পারে যেখানে তারা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারে, নাগরিকত্বের পূর্ণ অধিকার ভোগ করতে পারে।

    এটি আজ আমাদের দেশে সেসব নেতৃত্ব থাকার ফলাফল যারা কুরআনে থাকা আইন ও সমাধানের পরিবর্তে তাদের নিজস্ব ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা অনুসারে শাসন করে। এইসব অনৈসলামিক শাসনব্যবস্থা আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী উম্মাহ ও দ্বীনের স্বার্থে তাদেরকে একত্রিত করার পরিবর্তে উম্মাহর সৈন্যবাহিনীকে তাদের স্বার্থপর জাতীয় স্বার্থ বা ক্ষমতার সিংহাসন রক্ষার জন্য ব্যবহার করে। এইসব নেতৃত্ব কুরআনের আয়াতের চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, যেখানে বলা হয়েছে,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

    মুমিনরা তো পরস্পর ভাই-ভাই। অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে এবং আল্লাহকে ভয় করবে-যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও। [সরা আল-হুজুরাত: ১০]

    এবং যেমনটি বলা হচ্ছে,

    إِنَّ هَذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ

    নিঃসন্দেহ তোমাদের এই সম্প্রদায় একই সম্প্রদায়, আর আমিই তোমাদের প্রভু, সুতরাং আমাকেই তোমরা উপাসনা করো। [আল-আনবিয়া: ৯২]

    এবং যেমনটি বলা হচ্ছে,

    وَاعْتَصِمُواْ بِحَبْلِ اللّهِ جَمِيعًا وَلاَ تَفَرَّقُواْ وَاذْكُرُواْ نِعْمَةَ اللّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنتُمْ أَعْدَاء فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُم بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنتُمْ عَلَىَ شَفَا حُفْرَةٍ مِّنَ النَّارِ فَأَنقَذَكُم مِّنْهَا

    আর তোমরা সবে মিলে আল্লাহ্‌র রশি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, আর বিচ্ছিন্ন হয়ো না, আর স্মরণ করো তোমাদের উপরে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ, — যথা তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, তারপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে সম্প্রীতি ঘটালেন, কাজেই তাঁর অনুগ্রহে তোমরা হলে ভাই-ভাই। আর তোমরা ছিলে এক আগুনের গর্তের কিনারে, তারপর তিনি তোমাদের তা থেকে বাঁচালেন। এইভাবে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য তাঁর নির্দেশাবলী সুস্পষ্ট করেন যেন তোমরা পথের দিশা পাও। [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]

    যাইহোক, যখন কুরআন সেই ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল যা আমাদের জমিন শাসন করেছিল, তখন এই উম্মাহ তার অগণিত আশীর্বাদগুলির মধ্যে একটি হিসাবে এই সত্যিকারের ইসলামী ব্যবস্থা তথা খিলাফতের নেতৃত্বে পূর্ণ সুরক্ষা, সুরক্ষা এবং অভিভাবকত্ব উপভোগ করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, ৯ম শতাব্দীতে খলিফাহ আল-মুতাসিম বিল্লাহর শাসনামলে, একজন মুসলিম নারী একজন রোমান সৈন্য দ্বারা বন্দী এবং লাঞ্ছিত হয়েছিল। ভীত ও অসহায় সেই নারী দুঃখে সাহায্যের জন্য খলিফার নাম ডাকলেন; “[ওয়া মু’তাসিমা] হায় মু’তাসিম (কোথায় তুমি?)।” ঘটনার খবর মুতাসিমের কাছে পৌঁছালে তিনি জবাব দেন, “লাব্বাইক [আমি আপনার ডাকে সাড়া দিচ্ছি]।” এবং তিনি বললেন, “ওয়াল্লাহি (আল্লাহর শপথ), আমি এমন একটি বাহিনী পাঠাব যেটি এত বড় যে যখন এটি তাদের কাছে পৌঁছাবে তখনও তারা আমাদের ঘাঁটি ছেড়ে যেতে থাকবে। এবং আমাকে এই রোমানদের সবচেয়ে শক্তিশালী শহরটি বলুন এবং আমি সেই শহরে সেনাবাহিনী পাঠাব।” রমজান মাস হলেও তিনি এ কাজে দেরি করেননি। বরং তিনি অবিলম্বে মহিলাটিকে উদ্ধার করার জন্য রোমানদের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ আমুরিয়া শহরে ৯০,০০০ শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন। শহরটি তার অত্যাচারীদের হাত থেকে মুক্ত হয়েছিল এবং ইসলামের শাসনের অধীনে এসেছিল, এবং আল-মু’তাসিম তার নিজের হাতে মহিলাটিকে মুক্ত করেছিলেন, এমনকি তার জন্য অপেক্ষা করতে থাকা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, “প্রিয় বোন, আমি আরো আগে আসতে পারলাম না, কারণ বাগদাদ থেকে তোমার পথ অনেক দূর ছিল।” তাই, শুধুমাত্র একজন নারীকে উদ্ধার করার জন্য একটি সম্পূর্ণ সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল কারণ ইসলামী শাসন তার রাষ্ট্রের নাগরিকদের সম্মান ও সুরক্ষা প্রদান করে; এবং খিলাফতের দায়িত্ব ও সামর্থ্য এরূপই ছিল যে সে তার উম্মাহকে রক্ষা করতে তার বিশাল ভূখণ্ড থেকে সম্পদ ও সৈন্যদের একত্রিত করতো, বিনা দ্বিধায়।

    তাই আবার বলছি, এটি কোনো স্বপ্ন নয়। এটি মহিমান্বিত কুরআনে থাকা আইন ও সমাধান অনুসারে আমাদের ভুমি শাসন করার মাধ্যমে এই উম্মাহর জন্য রহমত ও সুরক্ষা।

    সুতরাং, আমরা রমজানের এই শেষ ১০ দিনে লাইলাতুল কদরের সন্ধান করার জন্য, আমাদের প্রভুর কাছে তাঁর ক্ষমা, রহমত ও পুরস্কারের জন্য প্রার্থনা করছি এবং মহিমান্বিত কুরআনের তেলাওয়াত সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করছি, আসুন আমরা চিন্তা করি যে এই ক্ষমতার রাতটি কেন তাৎপর্যপূর্ণ – অর্থাৎ আল্লাহর কিতাব এবং এর মধ্যে যা কিছু আছে তার অবতীর্ণ হওয়া। এবং এর সাথে, আসুন আমরা নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করি যে আমরা এই কুরআনকে আমাদের জীবনে এবং পৃথিবীতে এমন মর্যাদা দিয়েছি কিনা যা এর প্রাপ্য – এমন এক মর্যাদা যা বিশ্বপালনকর্তা سبحانه وتعالى কর্তৃক বর্ণিত যা তা প্রতিফলিত করে এই কুরআন যে রাতে অবতীর্ণ হয়েছিল সেই রাত ১০০০ মাসের চেয়েও উত্তম! কারণ এই মহিমান্বিত কুরআন নিছক তেলাওয়াতের জন্য একটি আধ্যাত্মিক গ্রন্থ নয়, বা এমন কিছু নয় যা কেবল কিছু নিয়ম-কানুন সংজ্ঞায়িত করে যা আমরা অনুসরণ করি। না! বরং এটি মানবজাতির স্রষ্টা سبحانه وتعالى কর্তৃক তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি অবতীর্ণ একটি গ্রন্থ যা আমাদের সমগ্র জীবনকে গঠন করতে এবং আমাদের সমস্ত বিষয়গুলিকে পরিচালনা করে – রাজনৈতিক অর্থনৈতিক, বিচারিক, সামাজিক এবং এর বাইরে যা কিছু রয়েছে – এবং এমনভাবে পরিচালনা শেখায় যা আল্লাহর রহমত নিয়ে আসে। মানবতার জন্য তার দ্বীনের আলো নিয়ে আসে এই পৃথিবীতে। এই গ্রন্থকে অন্যথায় মনে করা বা এর চেয়ে কম কিছু মনে করা আমাদের হাতে থাকা এই রত্নটির মূল্যকে অবমূল্যায়ন করা, অথচ এর নিদর্শন তাদের কাছে প্রকাশিত হলে পাহাড়গুলোও সরে যেত!

    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

    «إِنَّ اللَّهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا، وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ»

    আল্লাহ্ এই কিতাবের মাধ্যমে কিছু জাতিকে উন্নীত করেন এবং অন্যদেরকে এর দ্বারা অধঃপতন করবেন” [মুসলিম]

    মূল: ডা. নাজরিন নওয়াজ কর্তৃক প্রবন্ধ, ঈষৎ পরিমার্জিত

  • আইন জালুতের যুদ্ধ

    আইন জালুতের যুদ্ধ

    আইন জালুতের যুদ্ধ (৬৫৮ হিজরি) ছিল তাতারদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের অন্যতম সেরা বিজয়গুলোর মধ্যে একটি । ৬৫৬ হিজরিতে তাতাররা ইসলামি খিলাফতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু করে, যার ফলে তারা খিলাফতের রাজধানী বাগদাদ দখল করে নেয়, খলিফা মুসতা’সিম বিল্লাহকে হত্যা করে, মুসলিমদের তিন চতুর্থাংশ ভূমি দখল করে নেয়। তারা মুসলিমদের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ মিশরের আমিরকে দূত মারফত চিঠি প্রেরণ করে বলে “আমরা খিলাফতের এই ভূমিকে ধংস করে দিয়েছি, শিশুদের এতিম বানিয়েছি, মুসলিমদের নির্যাতন করেছি আর হত্যা করেছি, সম্মানিতদের অমর্যাদা করেছি আর বন্দি করে রেখেছি”। তুমি কি মনে কর তোমরা আমাদের হাত থেকে বাঁচতে পারবে? একটু পর তুমিও জানতে পারবে তোমাদের উপর কী আসছে…। তাতারদের এমন হুমকিতে মুসলিমদের দুর্বলতা ও নৈতিক স্খলনের  সময়টাতে তাদের প্রতিরোধের মানসিকতাই হারিয়ে ফেলবে বলে মনে করা হয়েছিল। পরাজিত মানসিকতা তাদের অন্তরে প্রচণ্ডভাবে কাজ করছিল। সবাই প্রায় আশাই হারিয়ে ফেলছিল। ঠিক সে সময় সাইফুদ্দিন কুতুজ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তাদের জবাব দেন। তিনি তাতার দূতকে হত্যা করে তাঁর রাজধানীর কেন্দ্রে ঝুলিয়ে রাখেন, যার ফলে একদিকে যেমন মুসলিমদের মধ্যকার পরাজিত মানসিকতা দূর হয়ে প্রতিশোধের মানসিকতা জেগে উঠে অন্যদিকে এর মাধ্যমে তিনি তাতারদেরসহ গোয়েন্দা ও দালালদের মানসিকতায় কুটারাঘাত করেন।

    সাইফুদ্দিন কুতুজের এমন সাহসিকতাপূর্ণ কাজে মুসলিমদের ঈমানী স্পৃহা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, শত্রুরা শংকিত হয়ে পড়ে এবং বুঝতে পারে, তারা একজন সাহসী নেতার মোকাবেলা করতে যাচ্ছে। কুতুজ অনিবার্য এই যুদ্ধের জন্য মুসলিমদের প্রস্তুত করতে থাকেন। তাঁর নেতৃত্বে মুসলিমরা শত্রুর মোকাবেলায় ঈমানের সাথে ঐক্যবদ্ধ হন এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্র জোগাড় করতে থাকেন। তিনি অন্যান্য মুসলিম শাসক ও আলেমদের ঐক্যবদ্ধ হতে আহ্বান জানান এবং ইসলামের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মুসলিমদের হারানো ভূমিগুলো পুনরূদ্ধারে এগিয়ে যান। অবশেষে ২৫শে রমজান ৬৫৮ হিজরি সনে আকাঙ্ক্ষিত আইন জালুতের যুদ্ধ শুরু হয়। শুরুতে সাইফুদ্দিন কুতজ পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে তাঁর শিরস্ত্রাণ খুলে ফেলে মুসলিম সেনাবাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বলতে থাকেন “ওয়া ইসলামাহ, ওয়া ইসলামাহ” তিনি শত্রুদের বিরুদ্ধে মুসলিমদেরকে দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে আহ্বান করেন। সাইফুদ্দিন কুতজের এমন বক্তব্য ও তাঁর আলোকিত চেহারা দেখে দুর্বল হয়ে পড়া মুসলিম সেনা অফিসারগণ প্রচণ্ডভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠেন এবং শত্রুর মোকাবেলায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। কুতুজের এমন সাহসিকতায় মুসলিম সেনাবাহিনীর ঈমানী শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং তাঁদের নেতৃত্ব সুদৃঢ় হতে থাকে। যার ফলে মুসলিমদের আক্রমণে অল্প সময়ের মধ্যে তাতার সেনাবাহিনী ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পরাজয় বরণ করে এবং যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালাতে থাকে।

    পুনরায় ইসলাম ও মুসলিমরা  বিজয় লাভ করেন। ফলে, তাতাররা পরাজিত হয়, তাদের কর্তৃত্ব শেষ হয়ে আসে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে মুসলিমরা একে একে (সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন ইত্যাদি) হারানো ভূমিগুলো পুনরুদ্ধার করে। আমাদের এখনকার অবস্থার মতো শত্রুবেষ্টিত দুর্বলতার সময়েও মুসলিমরা শুধুমাত্র আন্তরিক নেতৃত্বের কারণে জয়লাভ করেন।

    কিভাবে বিজয়লাভ হবে?

    ইসলামের ইতিহাসে রমজান মাস ছিল রোজা, ইবাদত ও জিহাদের জন্য বিখ্যাত। রাসুল (সা) এবং পরবর্তী মুসলিমদের সময়ও অনুরূপ ছিল।

    বর্তমান সময়েও রমজান মাসে মুসলিমরা যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। ১৯৪৮ সালের এই মাসে ইসরাইলের বিরুদ্ধে, ৯ই রমজান  মুসলিমরা  ইয়েমেন গৃহযুদ্ধে (১৯৬২-১৯৭০), মিশরীয় মুসলিমরা সুয়েজখাল পার হয়ে ১০ই রমজান ১৯৭৩ সালে ইসরাইলের বিরুদ্ধে, ১৯৭৫-১৯৯০ সালের ১৭ই রমজান লেবানন যুদ্ধ শুরু হয়।। সম্প্রতি আফগান, ইরাক যুদ্ধেও যেখানে মুসলিমরা বারবার পরাজিত। আর বর্তমানে ফিলিস্তিনের গাজার মর্মান্তিক নজিরতো রয়েছেই।

    কিন্তু খিলাফতের সময়কালের সাথে এইসব যুদ্ধ বিবেচনা করলে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যায়। মুসলিমদের বারবার পরাজয় বরণের মুল কারণ হল ঐক্যবদ্ধতা ও খিলাফত রাষ্ট্রের একক নেতৃত্বের অনুপস্থিতি। সালাউদ্দিন আইয়ুবী এটি বুঝতে পেরিছিলেন, তাই তিনি ঐতিহাসিক জেরুজালেম বিজয়ের পূর্বে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।

    ইমাম মুসলিম হতে বর্ণিত, রাসুল (সা) বলেন-

    “ইমাম হচ্ছে ঢাল স্বরূপ, যার পিছনে থেকে জনগণ যুদ্ধ করে ও নিরাপত্তা লাভ করে”

    ইতিহাস বলে খিলাফত ছাড়া মুসলিমরা সবসময় পরাজিত। মুসলিমদের এইসব পরাজয় মূল কারণ  খিলাফত রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অভাব। আমরা তাকালেই দেখতে পাই খিলাফতের সাময়িক দুর্বলতার সময় ক্রুসেডাররা আল কুদস দখল করে নেয়। কিন্তু অল্প সময়ে মধ্যে মুসলিমরা দুর্বলতা কাঠিয়ে উঠে এবং তাঁদের হারানো ভূমি আল কুদস পুনর্দখল করার চেষ্ঠা করা শুরু করে এবং তাতে সফল হয়। সর্বোপরি এটাই ছিল রাষ্ট্রের অবস্থা। খিলাফত রাষ্ট্র সালাউদ্দিন আইয়ুবীর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধে করেন এবং মুসলিমদের ভুমি পুনরুদ্ধার করেন। সেই খিলাফতের রাষ্ট্রীয় কাঠামো এখন কোথায় যা মুসলিমদের ভূমিগুলো পুনরুদ্ধার করবে? ফিলিস্তিনকে মুক্ত করবে? চেচনিয়া অথবা কাশ্মীরকে মুক্ত করবে?

    কোথায় সেই খিলাফত যা মধ্যপ্রাচ্যকে মুক্ত করবে? জোট বাহিনী থেকে মধ্য এশিয়াকে মুক্ত করবে? বর্তমান অবৈধ মুসলিম শাসকরা শুধু মুসলিমদের পরাজয়কে বর্ধিত করবে, তারা শুধু তাদের পশ্চিমা প্রভুদের স্বার্থ রক্ষার্থে যুদ্ধে জড়াবে। উপরন্তু খিলাফত ছাড়া মুসলিমরা কখনো তাদের ভুমি মুক্ত করতে পারবেনা।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

    হে মুমিনগণ! তোমাদের কি হল যে, যখন তোমাদের বলা হয়, বের হও আল্লাহর পথে, তখন তোমরা মাটিতে লেগে থাক (অলসভাবে বসে থাক)। তাহলে কি তোমরা পরকালের বিনিময়ে পার্থিব জীবনের উপর পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? বস্তুতঃ পার্থিব জীবনের ভোগ বিলাসতো আখিরাতের তুলনায় কিছুই নয়, অতি সামান্য। (আত-তাওবা: ৩৮)

    নিশ্চয়ই আমি আমার রাসুলদেরকে ও মুমিনদের সাহায্য করব পার্থিব জীবনে এবং সেদিন সাক্ষীগণ দণ্ডায়মান হবে। (গাফির: ৫১)

    আবার রমজান মাসকে বিজয়ের মাস করি

    আলহামদুলিল্লাহ, মুসলিমদের কাছে সোভাগ্যশালী রমজান মাস আবারও ফিরে এসেছে। এই মাসে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা লাওহে মাহফুজ থেকে কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। এই মাসে ইবাদতকারীদের জন্য আল্লাহ লাইলাতুল কদর নামে এমন একটি রজনী রেখেছেন যা হাজার মাস থেকে উত্তম। রমজান মাসে আল্লাহ মুসলিমদের রোজা রাখতে আদেশ করেছেন, শয়তানকে শৃঙ্খলিত করেছেন, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে রেখেছেন এবং জান্নাতের দরজাসমুহ খুলে দিয়েছেন, সর্বোপরি মুসলিমদের আল্লাহর নৈকট্যে যাওয়ার সুযোগ বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। আল্লাহ সর্বশক্তিমান, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ট।

    পূর্ব প্রজন্মের মুসলিমগণ, আল্লাহর প্রদত্ত কুরআন দিয়ে শাসন করেছেন, রমজান দ্বারা সৌভাগ্যশালী হয়েছেন, এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছেন। রমজান মাসেই রাসূল (সা) এর নেতৃত্বে মুসলিমরা সংখ্যায় কম ও দুর্বল অস্ত্রশস্ত্র থাকা সত্ত্বে আরবদের নেতৃত্বশীল গোত্র কোরাইশদের বিরুদ্ধে বদরের যুদ্ধে জয়লাভ করেন।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,

    আর নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে বদরে সাহায্য করেছিলেন এবং তোমরা দুর্বল ছিলে, অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও। (আলে ইমরান: ১২৩)

    এছাড়া রমজান মাসে মক্কা বিজয় সূচিত হয়, কুরাইশরা ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। তাদের জুলুমের শাসনের অবসান ঘটে এবং পুরো আরব ভূমি ইসলামি রাষ্ট্রের অধীনে চলে আসে। মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নাযিল করেন-

    যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়, তখন তুমি দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে মানুষকে প্রবেশ করতে দেখবে। (আন নাসর: ১-২)

    রাসুল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদার পরও শতশত বছরের খিলাফত রাষ্ট্রের ইতিহাসে রমজান মাসেই ভয়ানক সব শত্রুদের পরাজিত করে মুসলিমরা বিজয় অর্জন করেছে। মুসলিমরা সফলভাবে আস-শাম থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করেছে যদিও তারা ক্ষুদ্র একটি ভূমি শত বছর দখল করে রাখতে পেরেছিল। মুসলিমদের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পরও বর্বর তাতারদের বিরুদ্ধে আইন জালুতের যুদ্ধে মুসলিমরা বিজয় লাভ করে।

    সুতরাং, যখনই মুসলিমরা ইসলাম দ্বারা শাসিত হয়েছেন, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা তাদের বৈষয়িক বিষয়াদি নির্ধারিত হয়েছে শুধুমাত্র তখনই মুসলিমরা রমজান মাসে শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করেছে। অথচ, এই রমজান মাসেই ইসলামি রাষ্ট্র খিলাফত ছাড়া এই উম্মাহর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শত্রুদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়ে রয়েছে।

    এই রমজানে আমরা যদি মুসলিমদের বাস্তবতা দেখি, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো মুসলিম ভূমি ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিনের উপর জোর করে দখলদারিত্ব স্থাপন করেছে। এই রমজানে মুসলিম সেনাবাহিনীগুলো মুসলিমদের উদ্ধারে ইতস্তত বোধ করছে অন্যদিকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থ রক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে। এই রমজানে পশ্চিমাদের লিবারেল দষিত চিন্তাগুলো শিক্ষাব্যবস্থায় প্রবেশ, মিডিয়া ও নানা উপায়ে মুসলিমরা সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আকীদা ও দ্বীনের উপর আক্রমণ করছে। এই রমজানেই মুসলিমদের বিশাল সম্পদ সাম্রাজ্যবাদীদের লুণ্ঠনের ফলে উম্মাহর চরম কষ্ট স্বীকার করতে হচ্ছে।

    বিশাল ভূমি, খনিজ সম্পদ, জনসংখ্যা, সেনাবাহিনী, সর্বোত্তম সম্পদ একমাত্র সঠিক দীন ইসলাম থাকা সত্ত্বেও উম্মাহ কাফিরদের কাছে অপদস্থ। ইসলামি রাষ্ট্র খিলাফত, রাজনীতি ও শাসন, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ ছাড়া এমন হওয়াই অনিবার্য। বর্তমান শাসকগোষ্ঠী রাজনীতি ও শাসনকে সাম্রজ্যবাদীদের ইচ্ছায় যা আদেশ করে ও যা তারা ঘৃণা করে তাই বাস্তবায়ন করছে। শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, মুসলিমদের বিজয় অর্জন করতে রাজনীতি করা হচ্ছেনা। উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের সন্তুষ্ট রাখতে বর্তমান শাসক ও তাদের পরিবর্তে যারা আসতে চাইছে তারা সস্তা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে রাজনীতিকে কলঙ্কিত করছে।

    হে মুসলিম ভাইয়েরা, এই রমজানে শুধু ইবাদত ও রোজা রেখে আল্লাহর সন্তুষ্টির চেষ্টা করে আপনি সন্তুষ্ট থাকলে হবে না কারণ কাফিরদের যড়যন্ত্রের কারণে উম্মাহ চরমভাবে নির্যাতিত। বরং খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করতে হবে, যাতে আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়িত হয়, এবং সকল দীনের উপর ইসলাম বিজয় লাভ করে। যাতে রমজান আবারও বিজয়ের পর বিজয়ের সাক্ষী হয়ে থাকে। বর্তমান শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তন এবং খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্টায় কাজ করা এটি শুধুমাত্র জীবন মৃত্যুর বিষয় নয়। এটি আল্লাহ প্রদত্ত একটি ফরজ দায়িত্ব। যদি মুসলিমরা এই দায়িত্ব পালনে বিরত থাকে তবে শাসকদের পাপসমূহ তাদের উপরও আরোপিত হবে। দুনিয়ায় তাদের অবস্থা আরো খারাপ হবে এবং আখিরাতে শাস্তির সম্মুখীন হবে। রাসূল (সা) বলেছেন,

    আল্লাহ কিছু ব্যাক্তির পাপের কারণে সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেন না। যতক্ষন পর্যন্ত তারা ঐ ব্যক্তিগুলোর মুনকার দেখে এবং তা প্রতিরোধ করে, যদি তারা প্রতিরোধ না কর, তবে আল্লাহ ঐ পাপী ব্যক্তিগুলোসহ সবাইকে শাস্তি প্রদান করেন। (আহমেদ)

    সুতরাং চলুন রমজান মাসের সুফল ভোগ করি। আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। এই দূর্নীতিগ্রস্থ শাসকদের অপসারণ করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কারণ একমাত্র খিলাফতই ইসলামের কর্তৃত্ব স্থাপন করবে, মুসলিমদের নিরাপত্তা দিবে, তাদের দ্বীনের নিরাপত্তা দিবে এবং শত্রুর অন্তরে ভীতির সঞ্চার করবে। আমরা একমাত্র আল্লাহর ব্যপারে সত্যনিষ্ঠ হলে তিনি আমেদেরকে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    আর তোমরা নিরাশ হয়োনা ও বিষন্ন হয়োনা এবং যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তাহলে তোমরাই বিজয়ী হবে। (সুরা আলে ইমরান: ১৩৯)

  • দক্ষিণ বিশ্বের উত্থান

    দক্ষিণ বিশ্বের উত্থান

    বৈশ্বিক দক্ষিণ বা দক্ষিণ বিশ্ব একটি নতুন ট্রেন্ড, সবাই এ নিয়ে কথা বলছে। চীন ও রাশিয়া বলছে তারাই বিশ্বের ভবিষ্যত এবং পশ্চিমারা যারা এদের দীর্ঘ সময় ধরে অবহেলা করেছে তারাও একটি উদার ভবিষ্যত বজায় রাখার জন্য এদের অপরিহার্য হিসেবে দেখে। গোটা পৃথিবীর ক্ষমতার ভারসাম্যের যখন টালমাতাল অবস্থা তখন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামোকে অবশ্যই গ্লোবাল সাউথ তথা বৈশ্বিক দক্ষিণকে বিবেচনায় নিতে হবে।

    এ পর্যন্ত ভূরাজনীতি পৃথিবীকে দেখে এসেছে পূর্ব পশ্চিম দৃষ্টিকোণ থেকে। বিশ্বের ধনী দেশ, বৃহত্তম সামরিক বাহিনী ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশগুলি সেখানে উপস্থিত রয়েছে। এটি বাণিজ্য ও যোগাযোগের অনুমোদন দেয় এমন জলপথে তাদের পদচারণার উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে ছিল। বৈশ্বিক উত্তরে বসবাসকারী জাতিগুলি উত্তরেই তাদের মূল সম্পর্ক ও প্রতিযোগিতাকে দেখেছে এবং এই কারণেই তাদের মধ্যে  পূর্ব-পশ্চিমের দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান ছিল।

    তাই গ্লোবাল নর্থ তথা বৈশ্বিক উত্তর বলতে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলোকে বোঝায় (ঐতিহাসিকভাবে যাদের ১ম বিশ্ব বলা হতো) যেখানে দক্ষিণ বলতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বোঝায় (ঐতিহাসিকভাবে যাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিশ্ব বলা হতো) যাদের উত্তরের বিপরীতে শিল্পোন্নত এবং পরিষেবা ভিত্তিক অর্থনীতির পরিবর্তে পণ্য-ভিত্তিক অর্থনীতি রয়েছে। গত ৫০০ বছর ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতি উত্তরের পক্ষে ছিল এবং তাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল, আর ঐতিহাসিকভাবে গ্লোবাল সাউথকে উচ্চ মাত্রার অর্থনৈতিক বৈষম্য দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।

    গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোকে দীর্ঘকাল ধরে ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রান্তিক সদস্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়ে এসেছে। তারা বৈশ্বিক ঘটনাগুলোকে পরিচালিত করার পরিবর্তে প্রতিক্রিয়া দেখাতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যখন দ্বি-মেরুর বিশ্বের আবির্ভাব ঘটে তখন বিশ্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল, যারা উভয়ই তাদের প্রভাব বিস্তার করতে এবং বিশ্বকে তাদের বলয় কিংবা জোটে অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল। বিশ্বের অনেক জাতি এই যুদ্ধকে তাদের স্বায়ত্তশাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এসেছিল। যদিও তারা উভয় শক্তিকে অর্থ ও অস্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেছিল, কিন্তু তারা বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে কিছু করতে পারেনি, এমনকি নিরপেক্ষও থাকতে পারেনি।

    এই প্রেক্ষাপটে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের আবির্ভাব ঘটে এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় G-77 এর আবির্ভাব ঘটে। উভয়ই খুব বেশি অর্জন করতে পারেনি কারণ বিশ্বের ঘটনাবলীর উপর তাদের সামান্যই প্রভাব ছিল। ১৯৭০-এর দশকে স্থবিরতা, বেকারত্ব ও তারল্য সংকট এর কারণে অনেককে ঋণগ্রস্ত হতে হয়েছিল এবং যখন স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হয় তখন গ্লোবাল সাউথ স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রান্তিক সদস্য হিসেবেই রয়ে যায়।

    বৈশ্বিক লিবারেল ব্যবস্থা যখন বেকায়দায় পড়েছে তখন গ্লোবাল সাউথ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শুধুমাত্র গ্লোবাল নর্থকে তাদের পণ্য ও সেবা দিয়ে পরিবেশন করার প্রেক্ষাপটে তারা তাদের অর্থনীতির ব্যাপারে একটি ভিন্ন পথ নিতে চায়। ব্রাজিল ও ভারত ময়দানে নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাশিয়ার জন্য এবং রাজনৈতিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রাজিলের পণ্যভিত্তিক অর্থনীতি চীনের পাশাপাশি ইউরোপের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোকে রাশিয়া, তুরস্ক, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তাদের নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করছে।

    বৈশ্বিক উত্তরের দেশগুলোর মধ্যে উদীয়মান প্রতিযোগিতা গ্লোবাল সাউথ তাদের নিজেদের পক্ষে দেখছে। গত ৫০০ বছরের বেশিরভাগ সময় ধরে গ্লোবাল নর্থ বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে এসেছে এবং বৈশ্বিক দক্ষিণকে এর সঙ্গে তাল মেলানোর নিয়মনীতি ঠিক করে দিয়ে এসেছে। আগামীতে বৈশ্বিক উত্তরকে জনসংখ্যাগত ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে গিয়ে অনেকাংশেই বৈশ্বিক দক্ষিণের উপর নির্ভর করতে হবে। এই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে ফ্রান্স ২০২৩ সালের আগস্টে BRICS সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য একটি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল, কিন্তু শি জিন পিং সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

    জাপান ২০২৩ সালে একটি নথি প্রকাশ করেছে যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য সম্পর্কিত এই শ্বেতপত্র বিশ্ব অর্থনীতিকে তিনটি বলয়ে বিভক্ত করেছে: পশ্চিম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে; পূর্ব, চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বে এবং নিরপেক্ষ দেশ। এতে বলা হয়েছে যে গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে সহযোগিতা গড়ে তোলা এবং জোরদার করা একটি অগ্রাধিকার ছিল, ভারতের উপর বিশেষ জোর দিয়ে।

    গ্লোবাল সাউথ কি বিশ্বের নতুন মেরুতে পরিণত হতে পারবে? এটি অর্জনে বৈশ্বিক দক্ষিনকে অবশ্য বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। ‘গ্লোবাল সাউথ’ এর কোনো আইনি বা রাজনৈতিক বাস্তবতা নেই, এটি সুবিধার জন্য উঠে আসা একটি শব্দ। গ্লোবাল সাউথের বেশিরভাগ আলাপ-আলোচনা দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে ঘটে। বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশ দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতায় ভুগছে, যা উদীয়মান সম্ভাবনাময় সুবিধাগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। গ্লোবাল সাউথ যদি উত্তরের করুণায় বেঁচে থাকার পরিবর্তে বিশ্বের উপর শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তবে এটি ২১ শতকে একটি বড় পরিবর্তনকে চিহ্নিত করবে।

    আবদুর রহমান খান

  • সেকুলারিজম কি একটি আকীদা?

    সেকুলারিজম কি একটি আকীদা?

    দ্বীনকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি, অর্থাৎ দুনিয়াবি জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা অনেক সহজ হত যদি ব্যক্তি এটিকে জটিল না করত, এবং যদি সে এটিকে অস্পষ্ট না করত, তবে তা আরও পরিষ্কার হত। অতএব, রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতার উৎস সম্পর্কিত ইতিহাসকে স্পর্শ না করেই এবং এর পরিণতির ঐতিহাসিক ও বাস্তব দিক আলোচনা ছাড়াই, আমাদের অধ্যয়নকে বরং সেই চিন্তার দিকে মনোনিবেশ করা উচিত যা আমাদের সামনে রয়েছে: এই চিন্তা কি কোনো আকিদা গঠন করে? অন্য কথায়, এই চিন্তার বাস্তবতা কি আকিদার মত হয় কিনা? সমস্যাটি হচ্ছে বাস্তবতা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট চিন্তার অধ্যয়ন। এটা কি আকিদা নাকি না?

    চিন্তাটির বাস্তবতা অধ্যয়ন করার আগে, আমাদের উচিত প্রথমে আকিদার বাস্তবতা অধ্যয়ন করা, তারপর চিন্তাটির বাস্তবতা অধ্যয়ন করা, তারপর চিন্তার উপর আকিদার বাস্তবতা প্রয়োগ করা। এই বাস্তবতা যদি এর সাথে মানানসই হয়, তাহলে তা আকিদা হবে, অন্যথায় তা হবে না।

    আক্বীদার বিষয়টি হলো, যাতে হৃদয় নিজেকে ঘিরে রেখেছে। হৃদয় বলতে আকল বোঝানো যেতে পারে বা হৃদয় বোঝাতে যেমনটি আমরা জানি তেমন, এবং এই ক্ষেত্রে যার অর্থ আবেগ তথা ‘উইজদান’। “হৃদয় কর্তৃক চারপাশে গিঁট দেওয়া” এর অর্থ হল হৃদয় এটিকে ধারণ করেছে এবং স্বাচ্ছন্দ্য এবং স্বস্তির সাথে এটিকে সম্পূর্ণ ও দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছে। এর অর্থ এই যে ‘উইজদান’ এই চিন্তাটি গ্রহণ করবে এবং এটিকে এর দিকে টেনে নেবে এবং একই সাথে এর সাথে সে সম্মত হবে, এমনকি তা যদি চুক্তির স্বীকরোক্তিও হয়। অতএব, ‘ই’তিকাদ’ (বিশ্বাস) এর উৎস হচ্ছে মনের সম্মতিতে কোনো চিন্তার চারপাশে হৃদয়ের গিঁট। অন্য কথায় এর উৎস হচ্ছে হৃদয় (উইজদান) কর্তৃক দৃঢ় বিশ্বাস। তবে এই দৃঢ় বিশ্বাসের শর্ত হতে হবে মনের সম্মতি। যদি এই দুটি বিষয় ঘটে থাকে: অর্থাৎ, হৃদয়ের দৃঢ় বিশ্বাস অর্থাৎ উইজদান কর্তৃক এবং এই বিশ্বাসের সাথে মনের সম্মতি, এর অর্থ হবে হৃদয়ের গিঁট হয়ে গেছে অর্থাৎ আক্বীদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অর্থাৎ বিশ্বাস সংঘটিত হয়েছে।

    এটাই আকিদার বাস্তবতা, তা সে যে আকিদাই হোক না কেন, তবে, আংশিক চিন্তার চারপাশে হৃদয়ের গিঁট, যে চিন্তা মৌলিক নয়, তা আকিদার স্তরে উন্নীত হবে না, কারণ কিছুই একটি আংশিক চিন্তার শাখা হবে না, এবং কোনো কিছু হতে তা বের হয়ে আসে না। যদিও শুরুতে এটি দৃঢ় বিশ্বাসের মতো হবে, তবে এটি শীঘ্রই তা দৃঢ়তার (উইজদানের) বৃত্ত থেকে বেরিয়ে যাবে, এবং তা কর্মের দিকে ধাবিত হবে কিংবা প্রত্যাখ্যানের দিকে। অতএব, হৃদয় কর্তৃক শুধুমাত্র মৌলিক চিন্তার চারপাশেই গিঁট দেওয়া যায়, অন্তত এক কিংবা তা থেকে বের হয়ে আসা একাধিক বিষয়ের ক্ষেত্রে। অতএব, ‘আকাইদ’ (মতবাদ) হবে ভিত্তি কিংবা মৌলিক চিন্তা, আর আনুষঙ্গিক চিন্তার ক্ষেত্রে, তা আকায়েদের অংশ হবে না।

    মৌলিক চিন্তাগুলি হল সেগুলি যার পূর্বে অন্য কোনও চিন্তা নেই। যদি সেগুলির পূর্বে অন্য চিন্তা থাকে তবে সেগুলি মৌলিক হবে না। অতএব, চিন্তার ভিত্তি হওয়ার জন্য, কোন চিন্তাই এর আগে থাকা উচিত নয়। অতএব, আক্বীদা হবে একটি ভিত্তি চিন্তার চারপাশে হৃদয়ের গিঁট, এই চিন্তাটি হয় মৌলিক হতে পারে, বা মৌলিক চিন্তার অংশ হতে পারে।

    এটা হল আকিদা, এটা হল সেই মৌলিক চিন্তা যা হৃদয় তার চারপাশে গেঁথে আছে, অন্য কথায় এটা সেই চিন্তা যা হৃদয়, মানে উইজদান, মনের সম্মতিতে দৃঢ়ভাবে সত্য বলে মেনে নিয়েছে।

    মৌলিক চিন্তা যার পূর্বে অন্য কোন চিন্তা নেই তা হবে সেই চিন্তা যা মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান করে, মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে তা করে, তা ভুল বা সঠিকভাবে সমাধান করা হোক না কেন। এই চিন্তা যা ব্যক্তির কাছে সমাধান আকারে দেয়া হয়েছে, একজন মানুষ হিসাবে, অর্থাৎ মানুষের কাছে, এটি হবে মৌলিক চিন্তা, অর্থাৎ এটি সেই চিন্তা যা মনের সম্মতিতে হৃদয় নিজেকে দিয়ে ঘিরে রেখেছে। এটিই হবে আক্বীদা, যেটি যেকোন সেই চিন্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য যা এর অংশ বলে বিবেচিত হয়, হয় এটি থেকে উদ্ভুত কিংবা এর উপর প্রতিষ্ঠিত।

    এটি এই কারণে যে, যেকোনো মানুষ তিনটি প্রশ্ন দ্বারা তাড়িত হয়, যা উত্তর খুঁজতেই থাকে: এই অস্তিত্বের আগে কি কিছু ছিল অর্থাৎ এই অস্তিত্বের পূর্বে অন্য কোনো অস্তিত্ব যা সে উপলব্ধি করতে ও বুঝতে পারে, নাকি এই অস্তিত্ব অনাদি-অনন্ত, এর পূর্বে কিছুই ছিল না? এবং এই অস্তিত্বের পরে কি কিছু থাকবে, যেমন অন্য একটি অস্তিত্ব, কারণ বস্তু হারিয়ে যায়, বিলোপ হয়ে যায়, তাই তা কি আবার ফিরে আসবে নাকি না? আর অন্য কোন স্থানে কি তা যাবে নাকি না? আর বর্তমান অস্তিত্বের কি এর পূর্ববর্তী বাস্তবতার সাথে কোন সম্পর্ক আছে নাকি তা থেকে মুক্ত এবং এর পরে যা আসে তার সাথে কি এর কোন সম্পর্ক আছে নাকি তা থেকে তা বিচ্ছিন্ন?

    এই তিনটি প্রশ্ন সকল মানুষের মাঝেই খেলা করে। এর সূচনা হয় যখন থেকে সে তার পারিপার্শ্বিক বাস্তবতাকে বুঝতে শুরু করে।

    এভাবে সে নিজেকে এই তিনটি প্রশ্ন করে। এর অর্থ এই নয় যে মানুষ হুবহু এই তিনটি প্রশ্নই জিজ্ঞাসা করবে, তবে সে এই প্রশ্নগুলির সাথে সম্পর্কিত সমস্ত বা আংশিক কিংবা এই প্রশ্নগুলির আশেপাশের বিষয়াদি অনুসন্ধান করবে, তার এই অনুসন্ধানই মোটা দাগে এই তিনটি প্রশ্ন গঠন করে। এবং সময়ের সাথে সাথে, এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য একটি অবিরাম তাড়না তৈরি হয়। তাই সে একটি উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে, যদি সে ব্যর্থ হয়; তাহলে সে অন্যের সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা করে এবং হয় তার কথা উড়িয়ে দেয়া হয়, অথবা সে সন্তোষজনক উত্তর খুঁজে পায় না, তাই তার মধ্যে এ সংশ্লিষ্ট প্রশ্ন এড়ানোর প্রবণতা তৈরি হয় এবং সে (অসন্তোষজনক) উত্তরগুলো এড়ানোর চেষ্টা করে এবং তার এই সবচেয়ে বড় সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সে শান্তি পাবে না। সে হয়ত নিজেই এর সমাধান করতে পারে, অথবা সে অন্য লোকেদের সাথে সমাধান খুঁজে পেতে পারে। যদি তার জন্য এটি সমাধান করা হয়, তবে সে শান্ত হবে এবং একটি নির্দিষ্ট পথ অনুসারে তার জীবনযাপন করবে; আর যদি এটি সমাধান না করা হয় তবে সে বিচলিত ও অস্থির থাকবে এবং সে জীবনের একটি নির্দিষ্ট পথে স্থির হবে না।

    অতএব, মৌলিক চিন্তাই হবে সেই চিন্তা যা মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান করে এবং তা হচ্ছে আক্বীদা, অর্থাৎ এটি সেই চিন্তা যার চারপাশে হৃদয় গেঁথে আছে। এই কারণেই আক্বীদাকে মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিন্তাভাবনা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। কারণ ব্যক্তিটি এমন একজন মানুষ যে মহাবিশ্বে বাস করে, এবং মহাবিশ্বে বসবাস করার কারণে, তিনটি প্রশ্ন তার মনে উদয় হবে এবং সবচেয়ে বড় সমস্যাটি দেখা দেবে। যদি সে এর সমাধান খুঁজে পায়, যেকোন সমাধান, তাহলে সে মৌলিক চিন্তাটি অথবা একটি মৌলিক চিন্তা অর্জন করেছে, অর্থাৎ সে আক্বীদাটি বা একটি আক্বীদা অর্জন করেছে এবং এটি মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি চিন্তার উপস্থিতির দ্বারা অর্জন করা হয়েছে, অর্থাৎ মহাবিশ্বে বসবাসকারী একজন মানুষ হিসাবে তার সম্পর্কে।

    অতএব, আক্বীদা হবে মহাবিশ্বে বসবাসকারী মানুষ সম্পর্কে একটি মৌলিক চিন্তা, এবং এই মৌলিক চিন্তাটি অবশ্যই সামগ্রিক হতে হবে। তাই আক্বীদা হচ্ছে মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে সামগ্রিক চিন্তাভাবনা।

    পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে, এটি হল রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা, অর্থাৎ জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা, অর্থাৎ জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা; বা রাষ্ট্র থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা, মানে জীবন থেকে দ্বীনের বিচ্ছিন্নতা। তথাপি, এই চিন্তাই হচ্ছে মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান যতদূর পশ্চিমারা উদ্বিগ্ন। অন্য কথায়, এটি তিনটি প্রশ্নের উত্তর হবে। পশ্চিমে, মানুষের মুখোমুখি এই সমস্যাটি সমাধান করা হয়েছে, এবং সে এটিকে জীবনের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করেছে, অর্থাৎ নির্দিষ্ট পথ যা অনুসারে সে জীবনে অগ্রগতি করবে। এটাই চিন্তাটির বাস্তবতা, এবং এটি একটি আক্বীদা হওয়ার বাস্তবতা। এই চিন্তার উৎপত্তির জন্য, কীভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষ সংগ্রাম করেছিল এবং হাজারো মানুষ তা অর্জনের জন্য নিহত হয়েছিল এবং কত শতাব্দী ধরে সংগ্রাম চলেছিল, এটি বিবেচ্য বিষয় নয়। যাইহোক, বাস্তবে এটি দ্বীনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তারপরে এটিকে পৃথক করেছে, এবং এটি যে দ্বীনকে স্বীকৃতি দিয়েছে তার অর্থ এই যে এটি দ্বীন সম্পর্কে একটি মতামত দিয়েছে এবং এটি যে দ্বীনকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে তা জীবনের একটি মতামতকে নির্ধারণ করে। এসব চিন্তাটির একটি ব্যাখ্যা এবং এটিকে বোঝার কাছাকাছি আনতে সাহায্য করে। এসব কিছু চিন্তাটির বাস্তবতাকে প্রভাবিত করবে না, বরং সহজভাবে তার কিছু দিক ব্যাখ্যা করে। এখানে মূল আলোচনার বিষয় চিন্তাটি নিজেই, অর্থাৎ দ্বীনকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তা, এটাকে সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান মনে করা, এটা কি আকিদা নাকি না?

    আকিদার বাস্তবতাকে জীবন থেকে দ্বীনকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তার বাস্তবতার সাথে মেলালে, আমরা দেখতে পাব যে এটি ঠিক এটির সাথে খাপে খাপে মিলে যায়, যেমনটি এটি বস্তুবাদের (আল-মাদ্দিয়া) সাথে মিলে যায় এবং যেমনটি এটি মিলে যায় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুন রাসূলুল্লাহ”র সাথে; এবং এখানে ব্যাখ্যাটি নিম্নরূপ:

    প্রশ্ন: এই অস্তিত্বের আগে কি কিছু ছিল নাকি না? আক্বীদা এই বলে এর উত্তর দিয়েছে যে এটি জীবনের মুখ্য কোন বিষয় নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র বিষয় এবং এটি মানবসমাজের জন্য কোনো বিষয় নয় এবং এটি দুনিয়ার জীবনের জন্য কোনো বিষয় নয়। তাই এটি মানব হিসাবে মানুষের সাথে তার সম্পর্ককে অস্বীকার করেছে, জীবনের সাথে তার সম্পর্ক এবং মহাবিশ্বের সাথে তার সম্পর্ককে অস্বীকার করেছে।

    মানব, জীবন ও মহাবিশ্বের সাথে এর সম্পর্ককে অস্বীকার করার মাধ্যমে, এটি আর মুখ্য বিষয় হিসেবে রইল না, এভাবে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। প্রথম প্রশ্নের উত্তর দিয়ে, আকিদা দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, এ বিষয়ে যে বাস্তব অনুভূতির বিবেচনায় এই অস্তিত্বের আগে কিছু ছিল কি না। অতএব, যেহেতু এটি পূর্ববর্তী বিষয়াদির সাথে বর্তমান বিষয়াদির সম্পর্ককে অস্বীকার করে থাকে তবে এটি অস্তিত্বে ছিল কি ছিল না এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া একটি অর্থহীন বিষয়, কারণ (প্রথম) প্রশ্নটি করার কারণ ছিল সম্পর্ক তৈরির জন্য অনুসন্ধান করা। এটি এই কারণে যে, অস্তিত্ব ছিল কি ছিল না এ প্রশ্নটি অনুভুত এই বাস্তবতা এবং এর আগে যা এসেছিল তার মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে কিনা তা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যেই অবতারনা করা হয়েছিল। অতএব, যদি সম্পর্ক অস্বীকার করা হয়, তাহলে প্রশ্নটি সেখানেই শেষ হয়ে যায় এবং উত্তরও সাথে সাথে পাওয়া যায়। অতএব, অস্তিত্বের আগে ও পরে এবং তাদের মধ্যকার সম্পর্কের অস্বীকার করার মাধ্যমে অন্য দুটো প্রশ্ন বাতিল হয়ে যায় এবং প্রশ্নগুলোকে আলোচনার বিষয়ের সাথে সম্পর্কহীন করে দেয়। এভাবে তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়, যাতে উত্তরটি মানুষের সামনে অবস্থিত সবচেয়ে বড় সমস্যাটির সমাধান করে দেয়। যদি কিছু ব্যক্তি এরপর জীবনের পূর্বে ও পরের বাস্তবতাকে বিশ্বাস কিংবা অস্বীকার করতে চায় তবে তারা তা করার ব্যাপারে স্বাধীন এবং তাদের এই কাজের দরূন কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হবে না, কারণ এটি আলোচনার মুখ্য বিষয় না। একবার জীবনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী কিছুর সাথে জীবনের সম্পর্ক অস্বীকার করা হলে, এই বিষয়গুলি অধ্যয়ন করার কোন অর্থ থাবে না, কারণ এই বিষয়সমূহ অনুসন্ধানের পিছনের উদ্দেশ্য ছিল জীবনে সাথে এদের কী সম্পর্ক তা নির্ধারণ করা। এই সম্পর্কের দিক বিবেচনায়, এবং যেহেতু সম্পর্কটির বাস্তবতা আর নেই, তাই অনুসন্ধানের বাস্তবতাও থাকছে না; তবে মানুষকে অনুসন্ধান না করার ব্যাপারে বাধ্য না করে, বরং তাদের ছেড়ে দেয়া হয়, কারণ অনুসন্ধান তাদের কোনো সমাধানের দিকে নিবে না, কারণ জীবনের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই, অর্থাৎ যেহেতু এর সাথে মানব, জীবন ও মহাবিশ্বের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

    সুতরাং, দ্বীনকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তাই তিনটি প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে, অর্থাৎ এটি মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান দেয়। সুতরাং এটি মহাবিশ্বে বসবাসকারী একজন মানুষের সম্পর্কে একটি মৌলিক চিন্তা আকারে দেখা হবে, অর্থাৎ এটি মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে একটি সামগ্রিক চিন্তাভাবনা হবে, এভাবে এটি একটি আকিদা ও একটি আদর্শ হবে, ঠিক কমিউনিজমের মতো এবং ঠিক ইসলামের মতো।

    ২২ জুমাদা আল-ঊলা ১৩৯০ হিজরী

    ২৫ জুলাই ১৯৭০

  • প্রশ্ন-উত্তর: ব্যাংক কিংবা ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে চাকরী করা

    প্রশ্ন-উত্তর: ব্যাংক কিংবা ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে চাকরী করা

    নিম্নোক্ত প্রশ্নটি আমরা আমাদের একজন পাঠকের কাছ থেকে পেয়েছি এবং আমাদের উত্তর দেয়া হলো:

    প্রশ্ন: অনুগ্রহ করে ব্যখ্যা করবেন, ব্যাঙ্কে কাজ করার অনুমতি আছে কি এবং যদি তা-ই হয় তাহলে কোন ধরনের পদে, যেমন ব্যাঙ্কে আইটি বা সফ্টওয়্যার এ কাজ করা কি অনুমোদিত? এছাড়াও সাধারণভাবে আর্থিক খাতের জন্য একই প্রশ্ন, যেমন স্টক মার্কেট, বীমা, ইত্যাদি।

    উত্তর: শেখ তাকিউদ্দীন আন-নাবহানী রচিত ‘ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’-এর ইংরেজি অনুবাদ থেকে বিষয়টির উপর আলোকপাত করে  নিম্নে একটি নির্যাস দেওয়া হল:

    নিষিদ্ধ বিষয়ে নিয়োগ প্রদান সংক্রান্ত বিধান:

    কোনো কাজে কারো নিয়োগ আইনত বৈধ হওয়ার জন্য, বিষয়টি অবশ্যই অনুমোদিত (হালাল) হতে হবে। অর্থাৎ কর্মচারীকে নিষিদ্ধ কিছু করার জন্য নিয়োগ দেয়া বৈধ নয়। তদনুসারে, একজন কর্মীকে দিয়ে কাউকে মদ বিক্রি করানো কিংবা মদ তৈরি করানো বৈধ নয়, কিংবা তাকে শুকর বা মৃত জন্তুর গোস্ত বহন করানোর জন্য নিয়োগ দেয়া বৈধ নয়। আত-তিরমিযী আনাস বিন মালিক থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদের ব্যপারে দশ প্রকার লোককে অভিশাপ দিয়েছেন, যে তা প্রস্তুত করে, যে উৎপাদন করায়, যে তা পান করে, যে তা বহন করে, যার কাছে তা বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়, যে তা পরিবেশন করে, এর বিক্রেতা, যার জন্য তা বিক্রি করা হয়, এর ক্রেতা এবং যার জন্য তা কেনা হয়।” সুদের কোনো কাজে নিয়োগ দেওয়াও অনুমোদিত নয়, কারণ এটি একটি নিষিদ্ধ সুবিধার জন্য নিয়োগ প্রদান করা এবং কারণ ইবনে মাজাহ ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) সুদ গ্রহণকারীকে, যে তা দান করে, যে দু’জন এর জন্য সাক্ষী থাকে এবং যে তা লিখে রাখে তাদের অভিশাপ দিয়েছেন। ব্যাংক ও কয়েনেজ (মিন্টিং) বিভাগ ও সুদ নিয়ে কাজ করে এমন সমস্ত সংস্থার কর্মচারীদের বিষয়ে বাস্তবতা পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। যে কাজটি করার জন্য তাদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা যদি সুদের একটি কাজ হয়, সেক্ষেত্রে সুদ একচেটিয়াভাবে সেই কাজের পণ্য হোক কিংবা অন্যদের সাথে মিলে কাজের দ্বারা উৎপাদিত হোক না কেন, মুসলমানদের জন্য এ জাতীয় কাজ করা নিষিদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছে ব্যবস্থাপক, হিসাবরক্ষক, নিরীক্ষক এবং প্রতিটি কাজ যা সুদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত সুবিধা প্রদান করে। কিন্তু যে কাজগুলি সুদের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত নয়, যেমন কুলি, কুক, গার্ড, ক্লিনার এবং এর মতো – এই কাজগুলি অনুমোদিত, কারণ এটি একটি অনুমোদিত সুবিধার উপর নিয়োগ, এবং কারণ সুদলেখক ও সাক্ষীর ক্ষেত্রে যা প্রযোজ্য, তাদের উপর তা প্রযোজ্য নয়। একইভাবে, ব্যাংকের কর্মচারীদের মতোই সরকারী কর্মচারী অর্থাৎ যারা সুদের লেনদেনের সাথে জড়িত, যেমন কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা কৃষকদের সুদে ঋণ দিতে কাজ করে এবং ট্রেজারি কর্মকর্তা-কর্মচারী যারা সুদের কাজে জড়িত এবং এতিম বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যারা সম্পত্তি সুদে ধার দেয়; এ সকল কাজ নিষিদ্ধ কাজ; যে কেউ তাদের সাথে জড়িত সে একটি মহাপাপ করছে, যদি সে সুদলেখক কিংবা সুদের সাক্ষী হয় তবে এটি তার উপর প্রযোজ্য। একইভাবে একজন মুসলমানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো কাজে নিয়োগ প্রদান করা বৈধ নয়।

    এমন কাজ যা হতে মুনাফা অর্জিত হওয়া কিংবা যার সাথে জড়িত থাকা নিষিদ্ধ কারণ তা আইনত অবৈধ, যেমন, বীমা কোম্পানী, শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানী এবং সমবায় সমিতি ইত্যাদি, তাদের ব্যপারটি পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। যদি বিষয়টি এমন হয়, যে কাজটি করার ব্যাপারে বলা হচ্ছে তা যদি হারাম হয়, কিংবা এর চুক্তির বাস্তবতা যদি  অবৈধ (বাতিল) বা ত্রুটিপূর্ণ (ফাসিদ) হয়, বা তাদের থেকে যে ফলাফল বের হয়ে আসে, তবে একজন মুসলিমকে এর অনুমতি দেওয়া হয় না, কারণ একজন মুসলিমকে অবৈধ কোনো কিছুর সাথে সরাসরি জড়িত হওয়ার অনুমতি নেই। এমন কোন চুক্তি বা কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয় না যা হুকম শর’ঈ (ওহীর বিধান) অনুমোদন দেয় না এমন কোনো চুক্তি কিংবা কাজের সাথে একজন মুসলিমের জড়িত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং একইভাবে এর সাথে জড়িত থাকার জন্য তাকে নিয়োগ দেওয়াও নিষিদ্ধ। এটি সেই কর্মচারীর মতো যিনি বীমা চুক্তি লিপিবদ্ধ করেন যদিও তিনি তা অপছন্দ করেন, যিনি বীমার শর্তাবলী নিয়ে আলোচনা করেন কিংবা যিনি বীমা গ্রহণ করেন। একইভাবে সেই কর্মচারীর মতো যে সদস্য হোল্ডিং অনুযায়ী সমবায় সমিতির মুনাফা বন্টন করেন, যে কর্মচারী কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে বা শেয়ার স্টক অ্যাকাউন্টিংয়ে কাজ করে, কিংবা যে সমবায় সমিতির জন্য বিজ্ঞাপন দেয়। তবে সে সকল কোম্পানির কর্মচারীগণ, যাদের কাজ বৈধভাবে সম্পাদন করার অনুমতি রয়েছে, তাদের এই ধরনের পদে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া বৈধ। কিন্তু যদি একজন ব্যক্তির নিজের জন্য আইনত একটি কাজ করার অনুমতি না থাকে, তবে এটি করার জন্য কর্মচারী হওয়ার জন্যও কাউকে অনুমতি দেওয়া হয় না। কাজেই যে কাজগুলো করা নিষিদ্ধ, মুসলমানের জন্য তাতে অন্যকে নিয়োগ দেওয়া কিংবা তাতে নিজে নিযুক্ত হওয়াও নিষিদ্ধ।

    একটি ব্যাঙ্ক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আইটি ডিপার্টমেন্টে কাজ করার বিষয়ে এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত একটি প্রশ্নোত্তর থেকে নিম্নলিখিতগুলি পয়েন্টসগুলো দেওয়া হলো:

    এ বিষয়ে তিনটি প্রাসঙ্গিক নীতি রয়েছে,

    ১. নিষিদ্ধ কিছু করা নিষিদ্ধ।

    ২. যা প্রধানত নিষিদ্ধ কিছুর দিকে পরিচালিত করে বলে ধারণা করা হয় তাও নিষিদ্ধ।

    ৩. যা সরাসরি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে সংযুক্ত তাও নিষিদ্ধ।

    সুতরাং একটি সুদের-চুক্তি নিষিদ্ধ। আর তা লেখা নিষিদ্ধ, যেমন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

    সুদ গণনা করে এমন একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করা নিষিদ্ধ নয়, কারণ কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি অনুমোদিত কাজ।

    যাইহোক, যখন এটি সরাসরি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে যুক্ত থাকে (যেমন সুদ), এটিও নিষিদ্ধ। উদাহরণ স্বরূপ:

    যদি কেউ একটি ব্যাঙ্কের কাছ থেকে একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করার আদেশ পায় যা (অন্যদের মধ্যে) সুদ (রিবা) গণনা করতে ব্যবহার করা হবে, তাহলে এটি সরাসরি সংযুক্ত। এই ক্ষেত্রে, এই এপ ডেভেলপ করা নিষিদ্ধ, এটি সহায়তা হিসাবে বিবেচিত হয়। যদি কেউ এই জাতীয় কম্পিউটার প্রোগ্রাম স্বাধীনভাবে ডেভেলপ করে (কোন ব্যাঙ্কের আদেশ ছাড়াই) এবং এটি বাজারে বিক্রি করে তবে এটি অনুমোদিত হবে (এমনকি যদি ক্রেতাদের মধ্যে এমন ব্যাংক থাকে যারা সফ্টওয়্যারটি কিনে এবং ব্যবহার করে)। এটি এই কারণে যে এটি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে সরাসরি সংযুক্ত না, তাই এটিকে সহায়তা হিসাবে বিবেচনা করা যায় না।

    আরেকটি উদাহরণ: যদি কেউ ব্যাঙ্কে টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করেন, যিনি নিষিদ্ধ জিনিসগুলির জন্য ব্যবহৃত কম্পিউটারগুলি রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তাহলে এটি নিষিদ্ধ, কারণ এটি সরাসরি সংযুক্ত, তার মানে সহায়তা। যদি তাকে ব্যাঙ্কের দ্বারা তাদের কর্মীদের কাছে পিজ্জা সরবরাহ করার আদেশ দেওয়া হয়, তবে এটি অনুমোদিত হবে, কারণ এটিকে সহায়তা হিসাবে গণ্য করা হবে না এবং নিষিদ্ধ কিছুর সাথে এর সরাসরি সংযোগ নেই।

    জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন বিষয় নিয়ে কাজের কথা এসেছে যা সরাসরি নিষিদ্ধ কিছুর সাথে যুক্ত।

  • হাদীস সম্পর্কে কিছু বিভ্রান্তিকর সন্দেহ ও তার জবাব

    হাদীস সম্পর্কে কিছু বিভ্রান্তিকর সন্দেহ ও তার জবাব

    আমরা যেই হাদীসের বইগুলো পড়ি সেগুলো ৩০০ হিজরি বা হিজরতের তিনশত বছর পর লেখা হয়েছে। এত বছর পর কি আসলেই রাসুল (সা) এর কথা ও কাজ নিখুঁতভাবে জানা ও লিপিবদ্ধ করা সম্ভব? হাদীসগুলো লেখা হয়েছে নবী (সা) এর মৃত্যুর পর, খুলাফায়ে রাশিদিনদের পর, উমাইয়া খেলাফতের পর এবং আব্বাসীয় খেলাফতের শুরুর দিকে। এর মধ্যে কত যুগ ও প্রজন্ম গত হয়েছে কিন্তু এরপরও কিছু লেখক ও গবেষকরা কিভাবে দাবি করতে পারে এগুলো রাসুল (সা) এর হাদীস? এটা কি বাস্তব সম্মত?

    ইমাম বুখারি নাকি ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করে এরপর বিচার বিশ্লেষণ করে সহীহ বুখারি রচনা করেছেন। এটা কি একজন ব্যক্তির পক্ষে কখনো সম্ভব যে সে ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করতে পারবে? এত অল্প সময়ে এটা কীভাবে সম্ভব? আর সবচেয়ে বড় কথা হলো নবীজি (সা) কীভাবে ছয় লক্ষ হাদীস বর্ননা করবেন। এতো বিশাল সংখক হাদীসের সংখ্যাই বলে দিচ্ছে এর মধ্যে একটা বড় অংশ বানোয়াট। আসলে এই হাদীসের বইগুলোর উপর কোনোভাবেই আস্থা রাখা যায় না।

    উপরের এই কথাগুলো যখন সাধারণ মুসলিম একজন শুনে তখন অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। আর এই কাজটাই করে যাচ্ছে কিছু ব্যক্তিরা যারা ইসলামি শরীয়তের ভিত্তি হিসাবে সুন্নাহকে মানতে চায় না। কিন্তু এই কথাটা একজন আম মুসলিমকে সরাসরি বলা সম্ভব না তাই তারা এইরকম চতুরতার আশ্রয় নিয়েছে। তারা জানে যদি হাদীসের বিশুদ্বতা নিয়ে সন্দেহ তৈরী করা যায় তাহলে স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো ব্যক্তি সুন্নাহকে ত্যাগ করবে এবং শরীয়তে বেশিরভাগ হুকুম আহকাম অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। আসলে যারা হাদীস সম্পর্কে এই মিথ্যা সন্দেহ ছড়াচ্ছে তাদের অন্তর ব্যাধিগ্রস্ত। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর হুকুমকে তারা মানতে নারাজ। ইসলামের হুকুম আহকাম তাদের জন্য বোঝা। কারণ তারা তাদের প্রবৃত্তির দাসত্ব করতেই পছন্দ করে, আল্লাহর হুদূদগুলো যেমন- চুরি করলে হাত কাটা, ব্যভিচার করলে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা, মুরতাদের মৃত্যুদণ্ড ইত্যাদি নিয়ে তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে এবং পশ্চিমাদের পছন্দসই ইসলামের আধুনিক ভার্সন তৈরি করে নিজেকে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য করতে মরিয়া হয়ে থাকে। আর এই উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সুন্নাহকে কীভাবে বাদ দেওয়া যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা করতে তারা ব্যস্ত।

    আসলেই কি তিনশত হিজরির পূর্বে কোনো হাদীসের বই লেখা হয় নাই? ইমাম বুখারি সত্যি সত্যি ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন? এটা সত্যি যে রাসুল (সা) এর মৃত্যুর পর হাদীসের সংখ্যা অস্বাভিকভাবে বেড়েছে কিন্তু মজার বিষয় হলো এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা কিন্তু কীভাবে? আর হাদীস সংগ্রহের এই প্রক্রিয়া আসলে কতোটুকু নির্ভরযোগ্য? কীভাবে আমরা এতো বছর পরও এর উপর নির্ভর করে বিভিন্ন বিশ্লেষণ করতে পারি? এই সকল বিষয়ে নিয়ে আজকে আমি আলোচনা করবো যাতে করে শরীয়তের দ্বিতীয় উৎস হাদীস যে কতটা বিশুদ্ধ তা আমরা বুঝতে পারি।

    এক্ষেত্রে সবার শুরুতে আমাদের হাদীস কীভাবে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে তা নিয়ে আলোকপাত করতে হবে। একটি হাদীস সঠিক কিনা সেটা যাচাই করার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের অবশ্যই ন্যূনতম ধারণা অর্জন করতে হবে। যে সকল ধাপ অতিক্রম করার পর একটা হাদীসকে গ্রহণ করা হয় তা হল:

    ১) সনদের ধারাবাহিকতা বা ইত্তিসাল আস সনদ (continuity of the chain)

    ২) বর্ণনাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা বা আদালাতুর রুউউয়াহ (Probity or trustworthiness of narrators)

    ৩) বর্ণনাকারী নির্ভুল ও সঠিক হওয়া বা দাব তার রুউউয়াহ (The precision and accuracy of narrators)

    ৪) হাদীসটি অন্য কোনো হাদীসের সাথে সাংঘর্ষিক হয় কিনা বা হাদীসটির মধ্যে কোনো লুক্কয়িত সমস্যা আছে কিনা সেটা খুঁজে বাহির করা। (The absence of shuzooz and al-‘illah)

    এরপর হাদীসগুলোকে গ্রেডিং বা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। উপরের ধাপ গুলো ছাড়াও বিশুদ্ধ হাদীস নির্ণয়ে ত্রুটি এড়ানোর জন্য বা জালিয়াতি ও প্রতারণা সনাক্তকরণের জন্য আরো অসংখ্য কৌশলের অনুসরণ করা হয়। আমরা এখানে সংক্ষিপ্তভাবে প্রতিটি ধাপ নিয়ে আলোচনা করবো।

    সনদের ধারাবাহিকতা বা ইত্তিসাল আস সনদ

    সর্বপ্রথম একটি হাদীসের বর্ণনাকারীদের মধ্যে কোনো গ্যাপ বা ধারাবাহিকতার অভাব আছে কিনা তা দেখা হয়। এক্ষেত্রে সকল বর্ণনাকারীকে চিহ্নিত করা হয়। সকলের পরিচয় পাওয়া বাধ্যতামূলক। এছাড়াও বর্ণনাকারীদের জন্ম ও মৃত্যু তারিখ ও তাদের ভৌগলিক অবস্থান দিয়ে ক্রস ম্যাচ করা হয় যে আসলেই সে যার কাছ থেকে শুনেছে সেটা বাস্তবসম্মত কিনা। যদি দেখা যায় তাদের ভৌগলিক অবস্থান অনেক দূরবর্তী যে তাদের মধ্যে কখনো দেখা হওয়া সম্ভব না বা তারা একই প্রজন্মের  না তাহলে সেটা সনদের ধারাবাহিকতাকে নষ্ট করে দেয়।

    বর্ণনাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা বা আদালাতুর রুউউয়াহ

    বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হওয়ার পরের ধাপ হলো তাদের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া। আদিল হওয়ার শর্ত হচ্ছে যে, ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হিসাবে পরিচিত না, হরহামেশা বা প্রকাশ্যে গুনাহ করতো না এবং অসভ্য বা অসম্মাননক আচার-আচরণ থেকে মুক্ত। এছাড়াও কোনো একজন বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি অন্য আরেকজনকে আদিল হিসাবে নিশ্চায়ন করলে সেটাও গ্রহণযোগ্য হবে।

    বর্ণনাকারী নির্ভুল ও সঠিক হওয়া বা দাবত আর রুউউয়াহ

    মানুষ ভুল করতে পারে এটা স্বাভাবিক কিন্তু দাবিত হচ্ছে সেই ব্যক্তি যিনি সাধারণত ভুল করেন না। যিনি তার বলা প্রতিটি বক্তব্যের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন যেনো ভুল না হয়। এর পাশাপাশি অন্য বর্ণনাকরীদের বর্ণনার সাথে তার কথা মিলে কিনা সেটা দিয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়। অনেকসময় কোনো একজন ভালো বর্ণনাকারী জীবনের পরবর্তী সময়ে তার সক্ষমতা হারাতে পারেন সেটাও সবসময় বিবেচনা করা হয়।

    শাজ (অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রম) এবং ইল্লাহ (অনিয়ম) এর অনুপস্থিতি নিশ্চিত করা

    কোনো একটি হাদীসকে শাজ বলে ধরা হয় যখন এর মতন ও সনদ অন্য আরেকটি হাদীস যা কিনা আরো বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত তার মতন ও সনদের সাথে সাংঘর্ষিক হয়। এর মাধ্যমে কোনো একটি ভুল বা জাল হাদীসকে চিহ্নিত  করার পাশাপাশি বর্ননাকারীর বিশ্বাসযোগ্যতা ও নির্ভুলতাকেও পুনরায় যাচাই করা যায়।

    হাদীসের মধ্যে ইলাল বা এমন ত্রুটি যা সহজে দেখা যায় সেটা খুঁজে বাহির করার কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও কঠিন যা কিনা একজন অভিজ্ঞ হাদীস বিশারদ করে থাকেন। হাদীসের মতন ও সনদ উভয়ের মধ্যেই এই ধরনের ত্রুটি থাকতে পারে যা একজন মুহাদ্দিস তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে করে থাকেন।

    জালিয়াতি ও প্রতারণা সনাক্তকরণ

    হাদীসের মতন ও সনদের মধ্যে জালিয়াতি বা মিথ্যার সংযোজন সনাক্তকরণের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়ে থাকে।

    যেমন- সনদের ক্ষেত্রে অনেক সময় কোনো বর্ণনাকারী যদি স্বীকার করে যে, সে জালিয়াতি করেছে তাহলে তার নাম লিপিবদ্ধ করা হয় এবং তার দ্বারা বর্ণিত সকল হাদীস বাতিল করা হয়। কোনো বর্ণনাকারী যে স্কলারের কাছ থেকে হাদীসটি শুনেছে তার সাথে যদি সরাসরি দেখা না হয়ে থাকে বা সেই স্কলারের মৃত্যুর পর জন্ম গ্রহণকরে থাকে বা সেই এলাকায় যদি কখনো না গিয়ে থাকে যেখানে সে হাদীসটি শুনেছে সেটা জালিয়াতি বা মিথ্যাকে নির্দেশ করে। এর পাশাপাশি বর্ণনাকারীর জীবন যাপনকেও গবেষণা করে দেখা হয় যে তার এই ধরনের হাদীস বর্ণনার পেছনে কোনো বৈষয়িক স্বার্থ থাকতে পারে কিনা।  এভাবে অসংখ্য জাল হাদীসকে সহজে চিহ্নিত  করা হয়েছে।

    একইভাবে হাদীসের মতন বা বর্ণনা নিয়েও এই রকম কৌশল প্রয়োগ করে ভুল বা মিথ্যাকে খুঁজে বাহির করা হয়। যেমন যে সকল হাদীসের সত্যতা নিয়ে আমরা সুনিশ্চিত সেগুলোর বর্ণনার ধরন এবং ভাষার গুণগত মান থেকে আমরা রাসূল (সা) কথার ভঙ্গিমা সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পাই যার সাথে আরেকটি হাদীসের ভাষাকে মিলিয়ে দেখা হয়। এভাবেও জাল হাদীস সনাক্ত করা হয়ে থাকে। এছাড়াও যে সকল বর্ণনা অর্থের দিক থেকে অতিরঞ্জিত বা বুদ্বিবৃত্তিকভাবে অসাড় সেগুলোকেও বাদ দেওয়া হয়ে থাকে। যে সকল বর্ণনা কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক সেগুলোকেও পরিত্যাগ করা হয়। এরপর কোনো একটি বর্ণনা যদি কোনো প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য এর বিপরীত হয়, বর্ণনার মধ্যে যদি গোত্রীয় দৃষ্টিভংগি বা পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গির উপস্থিতি থাকে তবে তা বাদ দেওয়া হয়।

    দ্বন্দ্বমূলক বা পরস্পর বিরোধী হাদীস সম্পর্কিত বিজ্ঞান বা মুখতালাফুল হাদীস (Science of Conflicting Hadeeth)

    এটা খুবই স্বাভাবিক যে বর্ণনার দিক থেকে বিবেচনা করলে কিছু হাদীসকে পরস্পর বিরোধী মনে হতে পারে। এর বিভিন্ন কারণ হতে পারে। যেমন- একটি হাদীস এসেছে সাধারণ পরিস্থিতিকে উদ্দেশ্য করে আবার অন্যটি এসেছে কোনো একটি সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে উদ্দেশ্য করে অথবা মিসকোট বা ভুলজায়গায় উদ্ধৃতি করা হয়েছে অথবা নির্দেশটি পরবর্তীতে রহিত হয়ে গিয়েছে। সুতরাং, এই ধরনের দ্বন্দ্বমূলক মনে হওয়া হাদীসগুলোকে রিকনসাইল করার জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতির অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। যেকারণে মুখতালাফুল হাদীস শাস্ত্রের উৎপত্তি। এক্ষেত্রে তিনটি পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়:

    ক) জাম বা সমন্বয়সাধন – দুটি হাদীসের মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয় এবং কোনোটাকেই বাদ দেওয়া হয় না।

    খ) তারজিহ (যখন হাদীস দুটির কালানুক্রম অজানা থাকে) – অনেকভাবেই এটা করা হয় যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুটি দ্বন্দ্বমূলক হাদীসের মধ্যে যেটা অন্য কোন বিশুদ্ধ হাদীস এর সাথে মিলে সেটাকে গ্রহণ করে অন্যটি বাদ দেওয়া।

    গ) নাকশ বা রহিতকরণ (যখন হাদীস দুটির কালানুক্রম জানা থাকে) – দুটি হাদীসের মধ্যে যদি সমন্বয়সাধন সম্ভব না হয় কিন্তু তাদের কালানুক্রম আমাদের জানা আছে তাহলে আগের হাদীসটিকে রহিত হয়েছে ধরে নেওয়া হয়।

    ঘ) উপরের তিন উপায়ে যদি সমাধান না হয় তাহলে পরস্পর বিরোধী দুটি হাদীসকে অস্তিত্বহীন ধরে নেওয়া হয়।

    একটি হাদীসকে গ্রহণ করার আগে মুহাদ্দিসগণ এই রকম গভীর গবেষণা করে থাকলে আর এর ফলে আমরা সহিহ বুখারি, মুসলিম, সিহাহ সিত্তাহ এর মতো বিশুদ্ধ হাদীসের কিতাব পেয়েছি। কিন্তু এরপরও যারা সন্দেহ ছড়ায় তারা আম মুসলিমদের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে সহিহ বুখারিকে নিয়েও সন্দেহ তৈরি করার চেষ্টা করছে। তারা বলে ইমাম বুখারি দাবি করেছেন যে তিনি ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন এবং এর এর মধ্য থেকে যাচাই বাছাই করে তিনি সহীহ বুখারি রচনা করেছেন। তারা বলে হাদীস সংগ্রহের যে কঠিন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় সে অনুসারে একজন ব্যক্তির পক্ষে ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করা কখনো সম্ভব না। সুতরাং এগুলো বানোয়াট।

    আসলে, ইমাম বুখারি কোথাও বলেননি যে তিনি নিজে ছয় লক্ষ হাদীস সংগ্রহ করেছিলেন বরং তার সময়ে ছয় লক্ষ হাদীস প্রচলিত ছিল। যার মধ্য থেকে তিনি হাদীসের বিভিন্ন বিশুদ্ধতার মাপকাঠি ব্যবহার করে অল্প কিছু হাদীস গ্রহণ করে সহিহ বুখারি রচনা করেছেন। কেন আমরা মনে করছি যে, ইমাম বুখারিকেই ছয় লক্ষ হাদীস নিজে থেকেই সংগ্রহ করতে হবে। এখানে একটা ভুল ধারণাছড়ানো হচ্ছে যে ইমাম বুখারির আগে কোনো হাদীস কিতাব ছিলো না বা হাদীস এর লিখিত সংকলন ছিল না। এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং, সহিহহ বুখারির আগেই অনেক কিতাব লেখা হয়েছিল যা নিয়ে আমরা একটু পর বিস্তারিত আলাপ করবো।

    আরেকটা কথা বলা হয়, ছয় লক্ষ হাদীসের যে বিশাল সংখ্যা সেটাই বলে দিচ্ছে বেশিরভাগ হাদীস বানোয়াট কারণ নবীজি (সা) এর তেইশ বছরে নবুয়্যতের জীবনে এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ হাদীসের সংখ্যা হওয়া বাস্তবসম্মত না। এখানেও তারা জেনে-শুনে চতুরতার আশ্রয় নিচ্ছে অথবা তারা এতটাই মূর্খ যে জানেই না কিভাবে হাদীসের সংখ্যা পরিমাপ করা হয়। হাদীসের সংখ্যা কিভাবে গণণা করা হয় সেটা বুঝলে আমাদের কাছে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। প্রথমত, বেশিরবভাগ হাদীসেরই বর্ণনাকারী শুধুমাত্র তিনটি প্রজন্মের  মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, সাহাবি, তাবেঈ এবং তাবে-তাবেঈন। হতে পারে কোনো একটা চেইনে তাবেঈ তিনজন, তাবে-তাবেঈ চারজন কিন্তু দিনশেষে তিন প্রজন্মের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ। এখন, একজন সাহাবি থেকে একজন তাবেঈ শুনলেন আর তার থেকে আরেকজন তাবে-তাবেঈ জানলেন তাহলে এটা একটা ইউনিক হাদীস। এখন যদি ঐ একই সাহাবি থেকে সেই তাবেঈ জানলেন আর তার থেকে অন্য একজন তাবে তাবেঈ জানলেন তখন কিন্তু সেটাকে আরেকটা ইউনিক হাদীস হিসাবে কাউন্ট করা হবে। এভাবে হাদীসের ইসনাদের মধ্যে যত পরিবর্তন আসবে তত সংখ্যক আলাদা আলাদা হাদীস হিসাবে গণণা করা হবে যদিওবা তা একই সাহাবা থেকে একইরকম বর্ণনা সম্বলিত হাদীস। তার মানে হাদীসের টেক্সট এর অনন্য হওয়া দিয়ে হাদীস গণণা করা হয় না বরং প্রত্যেকটা ইউনিক চেইন বা সনদকে আলাদা একটা হাদীস হিসাবে ধরা হয়। তাহলে চিন্তা করেন একটা হাদীস একজন সাহাবি থেকে অসংখ্য আলাদা আলাদা বর্ণনাকারীর মাধ্যমে তিন প্রজন্মের পর কয়েকশতে পরিণত হতে পারে। আর এভাবেই এসে নবী (সা) এর অল্প কিছু হাদীস তাবে-তাবেঈনদের যুগে এসে লক্ষ লক্ষ হাদীসে পরিণত হয়েছে। সুতরাং, হাদীসের প্রকৃত সংখ্যা বাড়েনি বরং বর্ণনা বা ইসনাদের সংখ্যা বেড়েছে।

    অতীতে আমাদের স্কলারগণ বলেছিলেন যে, সহিহ হাদীসের সংখ্যা চার হাজারের আশেপাশে হবে। যেটা খুবই বাস্তব সম্মত সংখ্যা। আধুনিক যুগেও এই বিষয়ে একটা চমৎকার গবেষণা হয়েছে যেখানেও দেখা গেছে ইউনিক হাদীসের সংখ্যা চার হাজারের কম। একজন বিখ্যাত গবেষক সালেহ আহমেদ শামি তার লেখা গ্রন্থ “ওয়াজিজ ফি আল সুন্নাহ আল নাবাউইয়্যাহ” গ্রন্থে এই বিষয়টা উপস্থাপন করেছেন। তিনি শুরুতে বর্তমান সময়ে গ্রহণযোগ্য সহিহ হাদীসের ১৪ টা বই এর সকল হাদীসকে একত্রিত করেন এবং এর মধ্য থেকে যে হাদীসগুলো পুনরাবৃত্তি হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে শুধু একটিকে গণনা করেছেন। যেমন: কোনো একটি হাদীস একজন সাহাবি থেকে বর্ণিত হওয়ার পর যদি পরবর্তীতে অসংখ্য বর্ণনাকারী সংযোজনের কারণে অনেকগুলো আলদা সনদ বা চেইন লাভ করে সেক্ষেত্রে তিনি সেটাকে শুধুমাত্র একটা হাদীস হিসাবে গণনা করেছেন। কিন্তু একই রকম টেক্সট বা বর্ণনা সম্বলিত হাদীস যদি অন্য আরেকজন সাহাবির মাধ্যমে পাওয়া যায় তবে তাকে আরেকটা হাদীস হিসাবে গণনা করেছেন। ধরুন একই রকম মতন সম্বলিত একটা হাদীস তিন জন সাহাবা আলাদা আলদাভাবে বর্ণনা করেছেন তাহলে সেটা তিনটা হাদীস ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ, এখানেও অল্প কিছু পুনরাবৃত্তিকে গ্রহণ করা হয়েছিল। এরপরও, ইউনিক হাদীসের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় চার হাজারেরো কম। এটা খুবই বাস্তবসম্মত সংখ্যা যা সাহাবাদের মাধ্যমে হাদীস আকারে আমরা পেয়েছি।

    রাসূল (সা) এর হাদীসগুলোই কুরআনের ব্যাখ্যা স্বরূপ এবং আমাদের জন্য বিস্তারিত দিক নির্দেশনা। তাইতো নবী (সা) এর সাহাবিগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন যেনো হাদীসগুলো হারিয়ে না যায়। মূলত হাদীস সংরক্ষণের জন্য চার ধরনের প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পাই- মুখস্থকরা, আলোচনা করা, আনুশীলন করা এবং লিপিবদ্ধ করা।

    ক) মুখস্থ করা

    সাহাবাগণ(রা) হাদীসগুলোকে তাদের অন্তরে গেঁথে রাখতেন। হাদীস অনুসারে জীবন যাপন করা এবং তা মুখস্থ করে মনে রাখার জন্য তারা সর্বোচ্চ সময় ব্যয় করতেন। তাদের মধ্যে একটা বড় অংশ বাসায় না থেকে মসজিদে থাকতেন যেন সরাসরি রাসূল (সা) – এর কথা শুনতে পান। আর সেই সময়ের আরবের অধিবাসীগণের স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ। তারা খুব সহজেই কবিতার কয়েকশত লাইন মুখস্থ করে ফেলতে পারতো আর এটা ছিল তাদের নিত্যদিনের চর্চা। কয়েক হাজার কবিতা মুখস্থ ছিল এরকম লোকও আমরা আরব সাহিত্যে খুঁজে পাই। তারা তাদের বংশ পরম্পরা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান রাখতো। শুধু তাই না তাদের উট এবং ঘোড়াগুলো বংশানুক্রমও মনে রাখতো।

    আরবরা তাদের স্মৃতিশক্তি নিয়ে অনেক গর্ব করতো এবং লেখার চেয়ে স্মৃতিশক্তির উপর বেশি আস্থা রাখতো। কবিতাকে লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করাকে তারা লজ্জাজনক মনে করতো এবং লিখলেও সেটা প্রকাশ করতো না কারণ এর মাধ্যমে তাদের স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা প্রকাশ পেতো। আর সাহাবাগণ এই চর্চাকেই কাজে লাগিয়েছিলেন। হাদীস মুখস্থ করার জন্য তাদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল তথাকথিত এইসব কবিতা ও সাহিত্য মুখস্থ করার চাইতে অনেক গুণ বেশি।

    আবু হুরাইরা (রা) রাতকে তিনভাগে ভাগ করতেন। একভাগে ইবাদত করতেন, এক ভাগে ঘুমাতেন আর একভাগে হাদীস মুখস্থ করতেন। একদা, মদিনার গভর্নর আবু হুরাইরা (রা) এর স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য উনাকে তার বাসায় দাওয়াত দিলেন এবং উনাকে কিছু হাদীস শুনাতে বললেন। একইসময় মারোয়ান তার পত্রলেখককে পর্দার আড়ালে নিযুক্ত করলেন হাদীসগুলো লিখে রাখার জন্য। এরপর এক বছর পর মারোয়ান আবু হুরাইরা (রা)-কে আবারো আসতে বললেন এবং সেই হাদীসগুলো শুনাতে বললেন। এরপর আগের হাদীসের সাথে মিলেয়ে দেখা গেলো আবু হুরাইরা (রা) হুবহু একই রকমভাবে বর্ণনা করেছেন।

    হাদীস বিশেষজ্ঞগণ ‘আসমা উর রিজাল’ নামক শাস্ত্র গড়ে তুলেছিলেন যেখানে বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উপায়ে একজন বর্ণনাকারী স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করা হতো এবং স্মৃতিশক্তি উচ্চমানসম্পন্ন না হলে তারা হাদীস গ্রহণ করতেন না।

    খ) পারস্পরিক আলোচনা

    সাহাবাগণ (রা) নিজেদের মধ্যে হাদীসগুলো নিয়ে পারস্পরিক আলোচনা করতেন। তারা যখনি রাসূল (সা) এর কাছ থেকে নতুন কোনো কিছু শিখতেন তা তারা অন্যদের সাথে আলোচনা করতেন। ইসলামে জ্ঞান অর্জন করা এবং তা প্রচার করা বাধ্যতামুলক। এই চর্চাটি হাদীস সংরক্ষণে ব্যাপক ভুমিকা রেখেছে।

    গ) বাস্তব অনুশীলন

    রাসূল (সা) হাদীসগুলো শুধুমাত্র কোন তত্ত্ব বা দর্শন না বরং এগুলো আমাদের জীবনযাপানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বা বাস্তবজীবনে প্রয়োগের সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং, সাহাবীগণ (রা) যাই শিখতেন সাথে সাথে তা হুবহু তাদের জীবনে প্রয়োগ করতেন। আর এইভাবে হাদীসগুলো বাস্তব জীবনে চর্চা বা অনুশীলনের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে।

    ঘ) লিপিবদ্ধকরণ

    অনেক সাহাবী (রা) হাদীস লিখে রাখতেন এবং এর মাধ্যমে অনেক হাদীস সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটা সত্য যে শুরুর দিকে রাসূল (সা) কোরআনের আয়াত ব্যতীত অন্য কিছু লিখে রাখতে নিষেধ করেছিলেন। যার কারণ ছিল, শুরুর দিকে সাহাবারা (রা) কোরআনের ভাষাশৈলির সাথে পুরোপুরি পরিচিত ছিলেন না আর সেই সময় কোরআন বই আকারেও ছিল না তাই এই সম্ভাবনা ছিল যে হাদীসগুলো লিখে রাখলে তা কুরআনের সাথে মিশ্রিত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু পরবর্তীতে যখন সাহাবাগিণ (রা) কোরআনের  ভাষাশৈলি সম্পর্কে পুরোপুরি ধারণা লাভ করলেন তখন আর হাদীস লিখে রাখলে তা মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলো না। এমতাবস্থায় রাসূল (সা) তার সাহাবাদের নির্দেশ দিলেন হাদীস লিখে রাখার জন্য। এইজন্যই আমরা হাজার হাজার হাদীস লিখিত অবস্থায় পেয়েছি যা রাসুল (সা) ও চার খলিফার সময়েই লেখা হয়েছিল। সুতরাং, আমাদের মধ্যে যে ভুল ধারণা ছড়ানো হচ্ছে হাদীস সংকলন শুরু হয়েছিল তিনশত হিজরি সনের পরে তা পুরোপুরি মিথ্যা। লিখিত কিছু হাদীস সংকলনের উদাহারণ নিচে দেওয়া হলো:

    • রাসূল (সা) এর নির্দেশ মোতাবেক একটি নথি লেখা হয়েছিল যেখানে যাকাত সম্পর্কিত শরিয়তের হুকুম আহকাম বিস্তারিতভাবে ছিলো। এর নাম দেওয়া হয়েছিল ”আল সাহিফাহ আল সাদাকাহ”। আব্দুল্লাহ ইবন উমার (রা) বলেন, “রাসূল (সা) এর নির্দেশে যাকাতের প্রতিলিপি লেখা হয়েছিল এবং তার(সা) এর ওফাতের পর তা গভর্নরদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তিনি (সা) এটা তার (সা) তলোয়ারের সাথে সংযুক্ত করেছিলেন। তিনি (সা) যখন মৃত্যু বরণ করেন এরপর আবু বকর (রা) আমৃত্যু এটা অনুসরণ করেন, এরপর উমর (রা) আমৃত্যু এটা অনুসরণ করেন…। (তিরমিযি)
    • দশম হিজরিতে, মুসলিমরা যখন নাজরান বিজয় করে রাসুল (সা) তখন আমর ইবন হাজম (রা) কে ইয়েমেনের গভর্নর হিসাবে নিয়োগ করেন। সে সময় রাসুল (সা) উবাই ইবন কাব (রা) কে দিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিলিপি লেখান এবং আমর ইবন হাজম (রা) কে প্রেরণ করেন। এই প্রতিলিপিতে কিছু সাধারণ উপদেশ ছাড়াও পবিত্রতা, নামায, যাকাত, উশর, হাজ্জ, উমরাহ, জিহাদ, গনিমত, ট্যাক্স, রক্তপণ, প্রশাসন, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে শরীয়াহ হুকুম লেখা ছিল। হযরত আমর ইবন হাজম (রা) এই প্রতিলিপি অনুসারেই ইয়েমেনের শাসন কাজ পরিচালনা করতেন।
    • আবু হুরাইরা (রা) সবচেয়ে বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইসলাম গ্রহণেরর পর তিনি তার সম্পূর্ণজীবন এই হাদীস জানা ও সংরক্ষণের জন্য কাজ করে গেছেন। আবু হুরাইরা (রা) এর কাছে রাসুল (সা) হাদীস সম্বলিত অনেক বই ছিল শুধু তাই না উনার ছাত্ররা তার কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করে অনেক বই তৈরি করেছিলেন।
    • হযরত আনাম ইবন মালিক (রা) রাসূল (সা) এর সাথে দশ বছর ছিলেন। এই সময়ে তিনি বিশাল সংখ্যক হাদীস শুনেন এবং সেগুলো লিখে রাখেন।
    • হযরত আলি (রা) এর কাছেও বিশাল সংখ্যক হাদীস লিখিত ছিল যা ইমাম বুখারি সহিহ বুখারিতে যা ছয়টি জায়গায় উল্লেখ করেছেন।
    • রাসুল (সা) যখন মৃত্যু বরণ করেন তখন আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) অনেক ছোট ছিলেন। হাদীস সংরক্ষণের জন্য তিনি যেগুলো সরাসরি শুনেছেন সেগুলো লিখে রাখেন এবং অন্যান্য সাহাবিদের কাছে যেতেন ও জ্ঞান অর্জন করতেন আর সেগুলোও লিখে রাখেন। তার লেখা বই এর সংখ্যা এতো বেশি ছিলো যে সেগুলো বহন করতে একটা উটের প্রয়োজন হত। ইবন আব্বাস (রা) এর ছাত্ররাও সেই হাদীসের বই গুলো কপি করে অসংখ্য বই লিখেছেন।
    • এছাড়াও পরবর্তী সময় প্রসিদ্ধ ইমামগণ বিভিন্ন ফিকহের বই লিখেন যা মধ্যে দলিল হিসাবে অসংখ্য হাদীস লেখা ছিল। ইমাম শাফেই ২০৫ হিজরি সনে ‘আল-উম্ম’ ও ‘আর-রিসালাহ’ নামক বই লিখেন যেখানে তিনি শত শত হাদীস উল্লেখ করেছেন। আর এর মধ্যেই ইমাম মালিক তার মুয়াত্তা লিখে ফেলেছেন যা বর্তমানে হাদীসের বই হিসাবে পরিচিত হলেও এটা মূলত ফিকহের বই।

    সুতরাং, আমরা দেখতে পাচ্ছি স্বয়ং রাসুল (সা) এর সময় থেকে শুরু করে ইমাম বুখারি ও মুসলিমের আগমনের আগেই সব সময় লিখিতভাবে হাদীস সংকলনের প্রচলন ছিল। ইমাম বুখারি যেটা করেছেন সেটা হলো হাদীস গ্রহণ করার মাপকাঠিগুলোকে আরো নিখুঁত করেছেন এবং হাদীস সংগ্রহের একটি নিখুঁত প্রক্রিয়া তৈরি করেছেন যাতে করে করে বিশুদ্ধভাবে রাসুল (সা) এর হাদীসগুলো কেয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়।

    এখানে আমরা অতি সংক্ষেপে হাদীস সংগ্রহ ও সংকলন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করেছি। এছাড়া হাদীস এর সত্যতা নিয়ে যে সন্দেহগুলো ছড়ানো হচ্ছে সেগুলো যে ভিত্তিহীন তা তুলে ধরেছি। আশা করি, এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা যদি নিষ্ঠার সাথে চিন্তা ভাবনা করি তাহলে আমাদের ঈমান আরো শক্তিশালী হবে এবং যাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে তারা সঠিক পথে ফিরে আসতে পারবেন। আমিন।

  • ইউক্রেন যুদ্ধের ক্লান্তি

    ইউক্রেন যুদ্ধের ক্লান্তি

    ফেব্রুয়ারি ২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ তার প্রথম বছর পূর্ণ করেছে এবং ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এর দু বছর পূর্ণ হবে। রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে আত্মরক্ষার জন্য গভীরভাবে জমে থাকা ক্ষোভের সদ্ব্যবহার করতে প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তা দিয়েছিল। সিরিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের মতো, ইউক্রেন সংঘাতেও মার্কিন পদক্ষেপে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা খুব কমই ছিল। আর এর মধ্যেই ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে আরও মেরুকরণ ঘটতে থাকে।

    যুদ্ধে আমেরিকান সম্পৃক্ততার প্রথম অংশটি ছিল ইউক্রেনকে সাহায্য-সহযোগিতা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং একই সাথে রাশিয়ার উপর যাতে বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় আরোপিত হয়।  যখন রাশিয়ার ব্লিটজক্রেগ (সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত আক্রমণ) ব্যর্থ হল তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা শুরু হয় যা ইউক্রেনকে একটি পাল্টা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করছিল যার ফলে রাশিয়া ইউক্রেনকে কিছু ভূখণ্ড ফিরিয়ে দিবে এবং অবশেষে শক্তিশালী  অবস্থান থেকে সে রাশিয়াকে আপসের প্রস্তাব দিবে। কিন্তু আমেরিকার যুদ্ধ প্রচেষ্টার এই অংশে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ইউক্রেন তার ২০২৩ এর পাল্টা আক্রমণে যে লক্ষ্যগুলি নির্ধারণ করেছিল তা অর্জন করতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য ছিল রাশিয়ান ফ্রন্টকে ডনবাস থেকে ক্রিমিয়া পর্যন্ত বিভক্ত করে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ভেদ করে তা ব্ল্যাক সি পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া। আক্রমণের ৫ মাস পরে, ইউক্রেনে শীত শুরু হওয়ার সাথে সাথে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ভেদ করতে সে ব্যর্থ হয়েছিল।

    মার্কিন সামরিক সহায়তা একটি পরিচিত প্যাটার্ন অনুসরণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে পদাতিক অস্ত্র দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং এটি যুদ্ধের শুরুর দিকে হওয়ায় তাতে সামান্যই বিরোধিতা ছিল। ইউক্রেন তখন আর্টিলারি সিস্টেমের জন্য বলেছিল, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ প্রসারিত করবে কিনা এবং ইউরোপীয় মহাদেশকে আরো অস্থিতিশীল করা ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। অবশেষে, অনেক বিতর্কের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলি ইউক্রেনকে আর্টিলারি সিস্টেম সরবরাহ করে। ইউক্রেন তখন বলেছিল যে, রাশিয়ান বাহিনীর বিরুদ্ধে আরও অগ্রসর হওয়ার জন্য তাদের ট্যাঙ্ক দরকার এবং তখন কে তাদের ট্যাংক সরবরাহ করবে তা নিয়ে আরেকটি বিতর্ক শুরু হয়েছিল। ইউক্রেন আব্রামস ট্যাঙ্ক চেয়েছিল, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের ইউক্রেনে ট্যাঙ্ক স্থানান্তর করার জন্য চাপ দেয় যেহেতু সেগুলো ইউরোপীয় মহাদেশে রয়েছে। অনেক বিতর্ক ও মিডিয়া সার্কাসের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ট্যাঙ্ক সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছিল, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা প্রদান করা হয়নি বা কোন স্টক থেকে ইউক্রেনকে তা সরবরাহ করা হবে তাও বলা হয়নি। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা তখন বলেছিলেন যে, তাদের সেনাদের কভার দেওয়ার জন্য যুদ্ধবিমান দরকার। এবার আবার বিতর্ক শুরু হয় যে, কে এসব সরবরাহ করবে এবং কোথা থেকে তা আসবে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র F-16 এর ইউরোপীয় স্টক ইউক্রেনে স্থানান্তর করার ব্যাপারে সম্মত হয়, এই প্রচেষ্টার জন্য মার্কিন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে ইউক্রেনীয় পাইলটদের প্রশিক্ষণ শিবির স্থাপন করা হয়। ইউক্রেন তখন বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন দেখায় এবং আবারও অনেক ধুমধাম করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি’ সরবরাহ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করছে এবং তারপরে পরিমাণ সীমিত করে রাখছে যার অর্থ ইউক্রেন রাশিয়াকে যে একটি গুরুতর সামরিক আঘাত দেবে এমনটি কখনই ঘটবে না।

    যুদ্ধের অর্থনৈতিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যাচ্ছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারা রাশিয়াকে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার দেশ বানিয়েছে। ইউরোপ কার্যত রাশিয়া থেকে জ্বালানী আমদানি বন্ধ করে দেয় এবং মার্কিন নেতৃত্বে পশ্চিমারা রাশিয়াকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করতে কাজ করে। নিষেধাজ্ঞাগুলি কেবল তখনই কার্যকর হয় যখন প্রত্যেকে তা প্রয়োগ করে। যদিও ইউরোপ তার জ্বালানী আমদানি কমিয়েছে, রাশিয়া ভারত, চীন ও তুরস্ককে তার জ্বালানী কিনতে এবং কার্যকরভাবে ইউরোপীয় বাজার প্রতিস্থাপন করতে খুবই আগ্রহী রূপে পেয়েছে। এই মুহূর্তে রাশিয়া অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দিকটি অনুভব করছে না কারণ ২০১৪ সাল থেকেই সে তার ‘রাশিয়ান দুর্গ’ কৌশলের অংশ হিসেবে এমন কোনো ঘটনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্কিন ট্রেজারি ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রাশিয়া নিষেধাজ্ঞাগুলি এড়াতে ব্যবহার করা ১৫০ জন ব্যক্তি ও সংস্থার উপর আরো  জরিমানা করার ঘোষণার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর তার স্ক্রু আরো শক্ত করছে।

    ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে আমেরিকার নজর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দিকে চলে যায় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে শান্তি আলোচনা শুরু করার জন্য চাপ দিতে শুরু করে। এটি একটি বড় ইউ-টার্ন বিশেষ করে যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে আলোচনা করতে পূর্বে অস্বীকার করেছে এবং ইউক্রেনও যাতে কখনই রাশিয়ার সাথে আলোচনা না করে তার জন্য তাকে বাধ্য করেছে। ৪ নভেম্বর ২০২৩-এ ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েনের সাথে একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সময়, রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি স্বীকার করেন যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার দেশের যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমে ছিল ক্রমবর্ধমান ক্লান্তি এবং “এটি পরিষ্কার যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ.. …আন্তর্জাতিক মনোযোগ তাদের দিক থেকে সরিয়ে অন্যদিকে নিয়ে গিয়েছে।” এই স্বীকারোক্তি ইউক্রেনীয় জেনারেলের বক্তব্যের এক সপ্তাহ পর এলো যেখানে তিনি স্বীকার করেন যে, যুদ্ধ একটি অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছে। রাশিয়ার প্রধান দাবি সর্বদাই ছিল ‘ইউক্রেনীয় নিরপেক্ষতা’। কিন্তু যুদ্ধের অগ্রগতির সাথে সাথে রাশিয়া খেরসন, জাপোরিঝিয়া, দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে দখল করে নিয়েছে এবং এখন বলছে যে কোনো শান্তি চুক্তির জন্য অবশ্যই এই অঞ্চলগুলোকে রাশিয়ার অঞ্চল হিসাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।

    ২০২৪ নির্বাচনের বছর হওয়ায় বাইডেন প্রশাসন ঘরোয়া বিষয়গুলিতে মনোনিবেশ করবে। তবে ২০২৪ সালে একমাত্র চলক হচ্ছে যদি রাশিয়া তার নিজস্ব একটি পাল্টা আক্রমণ শুরু করার জন্য তার সংঘবদ্ধ সৈন্যদের ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেয়।

    Taken from “Strategic Estimate 2024” by Adnan Khan