তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২করোনা সংকট মোকাবেলায় ইসলামের সমাধান

সরকার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের অনুকরণে “ভাইরাস অথবা ক্ষুধা”-এর মধ্যে যেকোন একটিকে বেছে নিতে জনগণকে বাধ্য করছে
একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র অর্থনীতি ও জনজীবনকে সচল রেখে মহামারী সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম
হে দেশবাসী, আমরা এমন একটি সময়ে মহিমান্বিত রমযান মাস প্রত্যক্ষ করছি, যখন আমরা ঈমানের দিকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছি এবং অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের দিক থেকেও চরম অবস্থানে আছি। মহিমান্বিত এই মাস সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “রমযান হচ্ছে সেই মাস যে মাসে কুর’আন নাযিল হয়েছে, মানবজাতির হিদায়াত ও পথনির্দেশ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” [সূরা আল-বাক্বারাহ্ : ১৮৫]। এবং এই কুর’আন সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে শাসন করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না।” [সূরা আন-নিসা : ১০৫]। আমরা প্রত্যক্ষ করছি, কিভাবে আল্লাহদ্রোহী ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী আদর্শের অনুসারী পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের অনুসারী সরকারগুলো করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষকে নজিরবিহীনভাবে গৃহবন্দি করে অর্থনীতি ও জনজীবনকে অচল করে দিয়েছে, এবং এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। কুফর ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অন্ধ অনুসারী এই সরকার আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান বাদ দিয়ে, করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রেও পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের নীতি অনুসরণ করেছে, যার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশও করোনা সংকটে বিপর্যস্ত, এবং লকডাউনে ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ অথবা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ এই দুই বিকল্প ছাড়া এই সরকার আপনাদের সামনে কোন সমাধান অবশিষ্ট রাখে নাই। তাই, এই সঙ্কট থেকে আশু মুক্তির লক্ষ্যে, এই সংকটের মূল কারণ এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং এই সংকট থেকে উত্তরণে আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান অর্থাৎ ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সমাধান উপস্থাপন করছি। আমরা যদি ঈমানের ভিত্তিতে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি তবে এই রমযান হবে আমাদের জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মাস, ইনশা’আল্লাহ্।
প্রথমত, এই ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠী বাণিজ্যিক, সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে নিজ দেশের জনগণের উপর প্রাধান্য দিয়েছে, তাই চীন যেমন ভাইরাসটির প্রাণঘাতি চরিত্র নিয়ে তথ্য গোপন করেছে, ঠিক তেমনি পুঁজিবাদী ইউরোপ, আমেরিকাও ভাইরাসটির বিস্তার রোধে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে। ফলে ভাইরাসটি তার উৎপত্তিস্থল চীনের উহান থেকে সমস্ত চীনে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাধিক সতর্ক বার্তা সত্ত্বেও সরকার শুধুমাত্র তার মুজিববর্ষ উৎযাপন এবং চীন ও পশ্চিমা দেশসমূহের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্বিঘ্ন রাখতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সনাক্তের বিষয়টি গোপন রাখে, এমনকি তা নিশ্চিত করতে গ্রেফতার ও ভয়-ভীতির পথ অবলম্বন করে। সরকার বিদেশ থেকে আগতদের মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকাতেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
দ্বিতীয়ত, যখন এই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগী পুঁজিপতিশ্রেণী প্রত্যক্ষ করল ভাইরাসটি ধনী-গরীব পার্থক্য করে না, রাষ্ট্রপ্রধান, শীর্ষনেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, প্রভাবশালীরা আক্রান্ত হচ্ছে, এবং এতে প্রতিষেধকহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে তারা অমানবিক লকডাউন কার্যকর করে, জনগণকে বলির পাঠা বানায়। সরকারও এর ব্যতিক্রম থাকেনি, গত ৮ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম করোনা রোগী সনাক্তের ঘোষণার পর ২৩ মার্চ (২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত) ছুটি ঘোষণার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শহর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, যার ফলে সমস্ত দেশে সংক্রমণটি ছড়িয়ে পড়ে, এবং ভিআইপি হসপিটালের মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন এই ভাইরাসজনিত যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে সেগুলো আড়াল করতে সরকারের হুমকি-ধামকির কারণে সংবাদ সংস্থাগুলি এসব মৃত্যুর নতুন নাম দিয়েছে “জ্বর-কাশিতে মৃত্যু”!
তৃতীয়ত, চাকুরীহীন মুহুর্তের মধ্যে বিশ্বের শত শত কোটি মানুষ কর্মহীন, চাকুরীহীন, ব্যবসাহীন হয়ে পড়ে। তখন বর্তমান সরকার পুঁজিপতিগোষ্ঠীর বিশ্বস্ত অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে দুর্যোগকালীন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নামে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার (১১.২ বিলিয়ন ডলার যা জিডিপি’র প্রায় ৩.৩ শতাংশ) ‘বেইলআউট’ প্যাকেজ ঘোষণা করে। পুঁজিপতি ও বৃহৎ কর্পোরেশনগুলো যারা ইতিপূর্বে ব্যাংকের অর্থ লুট করেছে, তাদেরকে স্বল্প সুদে এই ঋণ সুবিধা প্রদান, যা কেবলই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বা ই.ইউ-এর নীতিসমূহের অন্ধ অনুকরণ, অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে দুর্দশার মধ্যে নিপতিত রেখে প্রথমেই পুঁজিপতিদের স্বার্থ ও মুনাফাকে সুরক্ষিত করা। এখন আবার সেই পুঁজিপতিদের ব্যবসার চাকা সচল রাখতে সরকার পোষাক কারখানাগুলো খুলে দিয়ে লক্ষ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকেই জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতে যাচ্ছে।
চতুর্থত, লকডাউন কার্যকর করতে সরকার পক্ষ থেকে জনগণকে হুমকি দেয়া হচ্ছে, “ঘরে থাকবেন, না কবরে যাবেন এটা আপনার সিদ্ধান্ত, কিন্তু জনগণ দেখছে ঘরে থাকলে তাকে ক্ষুদার জ্বালায় মরতে হবে, কারণ তথাকথিত সরকারী ত্রাণ, লুটেরাদের ঘরেই ঢুকছে, তখন কাজ ও অন্নের খোঁজে নিরুপায় ও বাধ্য হয়ে বের হওয়া এই জনগণকেই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য দায়ী করা হচ্ছে, বলা হচ্ছে, জনগণ অকারণে রাস্তায় বের হচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব মানছে না, ইত্যাদি।
সর্বোপরী, এই করোনাভাইরাস আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের অনুসারী সরকারগুলো কতই না ভঙ্গুর! পশ্চিমারা এবং তাদের দালাল শাসকেরা তাদের অর্থনীতি ও সেবাখাতের দুর্বলতাকে করোনার দোহাই দিয়ে আড়াল করতে চাইছে। অথচ, প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদের কৃত্রিম অর্থনীতি, যা পুঁজিবাজার, ইন্সুরেন্স, সুদ, ফটকাবাজারি, কালোবাজারি, ইত্যাদির উপর প্রতিষ্ঠিত, তা বিরাট কৃত্রিম অর্থনৈতিক বেলুন তৈরি করেছে। এই কাল্পনিক অর্থনীতিটি মাকড়শার জালের চেয়েও দুর্বল, করোনার মত একটি রোগ সমস্ত পুঁজিবাদী বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, এর পতনের সূচনা করেছে। তাদের তথাকথিত উন্নয়ন চিন্তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ, যেখানে জনগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার চিকিৎসা সেবাকে গুরুত্ব দেয়ার চেয়ে বিশাল আকারের জিডিপি, তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই, মাস্কের মত সামান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম কিংবা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ-ভেন্টিলেটর স্থাপন তাদের উন্নয়ন চিন্তায় স্থান পায়নি। ১৯২টি আইসিইউ বেড নিয়ে সমস্ত বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মোকাবেলা করা হচ্ছে। [ঢাকা ট্রিবিউন, ২০ এপ্রিল, ২০২০]। ইউরোপ ও আমেরিকাতে স্বাস্থ্যকর্মীরা সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে আন্দোলন করছে, সেখানে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে ব্যাপক প্রাণহানী ঘটছে।
বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের উপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে, মানুষ প্রশ্ন করছে পুঁজিবাদ আদৌ কি মানব সভ্যতার কল্যাণে সক্ষম, এমনকি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের জনগণেরও আস্থায় ফাটল ধরেছে, তারা প্রত্যক্ষ করছে, এই ব্যবস্থা তাদেরকে না ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে পেরেছে, না খাদ্যের অভাব থেকে। তা সত্ত্বেও আল্লাহ্’র প্রতি অবাধ্য হাসিনা ও অন্যান্য মুসলিম শাসকেরা, সংকট কাটাতে ইসলামের সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা বাদ দিয়ে অন্ধের মত সেই পুঁজিবাদী নীতিরই অনুসরণ করে লকডাউনের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে সীমাহীন ক্ষুধা, দারিদ্রতা ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।
হে মুসলিমগণ! দিক-নির্দেশনা ক্ষুধা, দারিদ্রতা নিরসনে খিলাফত রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে এবং খলীফা সেসব নির্দেশনা পালনে বাধ্য। এটি কোন কর্পোরেট রাষ্ট্র নয় যে, এটি শুধুমাত্র ক্ষুদ্র পুঁজিপতিগোষ্ঠী ও কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষা করবে, বরং এই খোদাভীরু রাষ্ট্র হচ্ছে মানবতার জন্য রাষ্ট্র, যা শুধু তার নাগরিকদেরই নয় বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমতপূর্ণ রাষ্ট্র। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “নিশ্চয়ই খলীফা হচ্ছেন অভিভাবক এবং তিনি তার নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল।” [বুখারী/মুসলিম]। খিলাফত রাষ্ট্র মানুষের ক্ষুধা কিংবা খাদ্যাভাবকে বর্তমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মত মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ধনীদের অনুদান অথবা ত্রাণের উপর ছেড়ে দেয় না, বরং খিলাফত রাষ্ট্র একেবারে ব্যক্তিপর্যায়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণকে নিশ্চিত করতে তার শক্তি ও সম্পদকে ব্যবহার করে, যাতে সর্বাবস্থায় রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয় এবং খাদ্যাভাব দূর হয়। খিলাফতের বাস্তব অর্থনীতি পণ্যের উৎপাদন ও তার সেবা মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়াকে কেন্দ্র করে পরিচালিত, এবং তা নিশ্চিত করার সরবরাহ লাইন হচ্ছে কারখানা, শ্রমিক, ক্ষুদ্রব্যবসা, স্বাস্থ্যখাত, অফিস ও প্রতিষ্ঠানসমূহ – কোন দুর্যোগে তা ভেঙ্গে পড়ে না। জাতীয় আয়ের অধিকাংশ অর্থ ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পের সুদ প্রদানে ব্যয় না হওয়ায়, স্বাভাবিক কিংবা সংকটকালীন উভয় অবস্থায় এই আয় রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম “রোগ কিংবা ক্ষুধা” দু’টির মধ্যে একটিকে বেছে নাও – জনগণকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করে না, বরং খিলাফত রাষ্ট্র রোগ এবং ক্ষুধা দুটোকেই নির্মূল করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় দিন শুরু করল যে তার পরিবার নিরাপদ ও সুস্থ; এবং তার নিকট দিন যাপনের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপকরণ বিদ্যমান, সে যেন সমস্ত পৃথিবীকে তার হাতে পেল।”
হে মুসলিমগণ! পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠীর এই চরম ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে আমরা দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে মহামারী মোকাবেলায় ইসলাম নির্দেশিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরছি:
সংক্রমিত রোগ ও মহামারীর মোকাবিলার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী সঠিক পদক্ষেপ হচ্ছে: খিলাফত রাষ্ট্র শুরু থেকেই রোগটিকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখবে এবং রোগটিকে তার উৎপত্তিস্থলেই অবরূদ্ধ রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করবে, এবং অন্য অঞ্চলের বাকি সুস্থ জনগণ কাজ ও উৎপাদন কর্মকান্ড অব্যাহত রাখবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে:
প্রথমত, খিলাফত রাষ্ট্র সংক্রমিত রোগটিকে তার উৎপত্তিস্থলেই আবদ্ধ রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নিবে। ইমাম বুখারী কর্তৃক উসামা বিন যায়িদ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “তোমরা যদি কোন জায়গায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে অবহিত হও, সেখানে গমন করো না; যদি এমন অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয় যেখানে তুমি অবস্থান করছ, তবে সেখান থেকে পালিয়ে যেওনা।” অন্য আরেকটি বর্ণনায় মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “প্লেগ হচ্ছে একটি মহাবিপর্যয় যা বনী ইসরাইলদের উপর আপতিত হয়েছে, অথবা তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর প্রেরণ করা হয়েছে। যদি তোমরা কোন এলাকায় এর উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পাও, তবে সেখানে যেও না, এবং যদি এটি তোমাদের বসবাসরত এলাকায় হানা দেয়, তবে উক্ত স্থান ত্যাগ করো না, এটি হতে পালিয়ে যেও না।” চীন শুরুতে উহানকে কোয়ারেন্টাইন করেনি এবং ভাইরাস সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরও ৪,৩০,০০০ জন চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমন করেছে, যার মধ্যে উহান থেকে ভ্রমনকারীও রয়েছে। হাসিনা সরকারও মহামারীর কেন্দ্রবিন্দু উহানসহ আক্রান্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে বিমান যোগাযোগ চালু রাখে।
দ্বিতীয়ত, সংক্রমিত রোগের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে “তোমরা অসুস্থদের সুস্থদের সাথে রেখো না।” [বুখারী]। তাই অসুস্থদেরকে চিহ্নিত করে পৃথক করা হবে এবং বিনা খরচে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। সংক্রমণের উপসর্গধারণকারীরা যাতে স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে থাকেন এজন্য তাদেরকে কুর’আন-সুন্নাহ্ দ্বারা উৎসাহিত করা হবে। অসুস্থদের সেবাদানকারী এবং চিকিৎসকদের জন্য সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করাতে হবে যাতে সংক্রমণটি কমিউনিটি পর্যায়ে না ছড়ায়। যার অভাবে বর্তমানে আমরা প্রত্যক্ষ করছি বাংলাদেশে মোট সংক্রমণের ১১ ভাগই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। অন্যদিকে, সুস্থ ব্যক্তিগণ তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও সামাজিক জীবন অব্যাহত রাখবে। ফলে মহামারী সাধারণ মানুষের জীবনকে স্থবির ও অর্থনীতিকে পঙ্গু করে তুলবে না।
তৃতীয়ত, কোয়ারান্টাইনের ক্ষেত্রে ইসলামে নীতি পুঁজিবাদী নীতির বিপরীত, অর্থাৎ ইসলাম রোগকে কোয়ারান্টাইন করার উপর গুরুত্ব দেয়, মানুষকে কোয়ারান্টাইন করে না। ব্যাপক সেনিটাইজেশন ও জীবানুনাশক কার্যক্রম পরিচালনা করাসহ মাস্ক ও সুরক্ষা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, এবং এগুলো ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। তাছাড়া সংক্রমণের নীরব বাহকদের মাধ্যমে যাতে রোগটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে না পড়তে পারে, সে ব্যাপারেও ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। যেহেতু নীরব বাহকরা সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ, এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “তোমরা ক্ষতি করো না, কিংবা ক্ষতির শিকারও হয়ো না।” [ইবনে মাজাহ্]। রাষ্ট্র ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে টেস্টের আওতায় এনে দ্রুত সময়ের মধ্যে নীরব বাহকদের চিহ্নিত করবে।
চতুর্থত, খিলাফত রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা খলীফা’র উপর দায়িত্ব। খিলাফত রাষ্ট্রকে অবশ্যই গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উপায় যেমন, পুষ্টি, ব্যায়াম কিংবা ঔষধ, হারবাল ও ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা যায়। তাছাড়া মহামারী সংক্রান্ত রোগের ক্ষেত্রে, জনগণের মধ্যে সংক্রমিত হবার পর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এন্টিবডির মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠার ক্ষমতা, যা হ্যার্ড ইমিউনিটি (herd immunity) নামে পরিচিত, এর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গবেষণা চালাবে। পাশাপাশি ভ্যাক্সিনের নিরাপত্তা ও কার্যকারীতা নিয়েও গবেষণা চালাবে। স্বাস্থ্যখাতকে কোনভাবে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর মত কাফির সাম্রাজ্যবাদীদের উপর নির্ভরশীল করা অথবা পুঁজিবাদী কোম্পানীর মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার বানানো সম্পূর্ণ শারী’আহ্ পরিপন্থী।
পঞ্চমত, সাবধানতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সাবধানতার নামে দায়িত্বহীনতার শিক্ষা দিচ্ছে, লাশ দাফনে বাধা দেয়া, অসুস্থদের সাহায্যে এগিয়ে না আসা, ইত্যাদি যার কিছু বহিঃপ্রকাশ। খিলাফত রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যাতে জনগণ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে অসুস্থদের পাশে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, যেমন, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা আগে থেকেই এ্যাজমা, ডায়বেটিকস, ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত, তাদের যাতে বিশেষ যত্ন নেয়া হয়। রাষ্ট্র জনগণকে বার বার স্মরণ করাবে, সংক্রমিত রোগকে নয়, বরং আল্লাহ্’কে ভয় পেতে হবে, হায়াত-মউত-রিযিক শুধুমাত্র আল্লাহ্’র হাতে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, “আপনি বলুন, আমাদের কাছে কিছুই পৌঁছবে না, কিন্তু যা আল্লাহ্ আমাদের জন্য পূর্বনির্ধারিত করেছেন; তিনি আমাদের কার্যনির্বাহক। আল্লাহ্’র উপরই মু’মিনদের ভরসা করা উচিত।” [সূরা আত-তওবা: ৫১]
সর্বোপরী, ইসলাম শুধুমাত্র মহামারীকালীন শারিরিক এবং আর্থিক ক্ষতিকেই কমিয়ে আনেনা, এর পাশাপাশি এই ধরনের মহামারীতে মৃত্যুকে মুসলিমরা কিভাবে দেখবে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বুখারী কর্তৃক আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, এবং রাসূলুল্লাহ (সা:) তাকে (রা) বলেন, বলেন, যার উপর আল্লাহ্ ইচ্ছা করেন, কিন্তু আল্লাহ্ ঈমানদারদের জন্য এটিকে রহমত বানিয়েছেন, প্রত্যেক আল্লাহ্’র বান্দা, যিনি প্লেগের সম্মুখীন হয়েছেন কিন্তু ধৈর্য্যধারণ করে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করেছেন এটা জেনে যে, আল্লাহ্ কর্তৃক তার জন্য নির্ধারিত কিছু ছাড়া তার উপর অন্যকোন বিপদ আপতিত হবে না, তার জন্য শহীদের ন্যায় পুরস্কার রয়েছে।” সুতরাং, মুসলিমরা পশ্চিমা কাফিরদের ন্যায় ভয়ে এবং আতঙ্কে হতবিহ্বল না হয়ে বালা-মুসিবতে ধৈর্য্যধারণ করবে, আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশা করবে, এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাহায্য পেতে অব্যাহতভাবে দু’আ করবে যাতে তিনি এই বিপদ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেন।
এভাবে ইসলাম নিশ্চিত করে যাতে মহামারীটি সীমিত পরিসরে থাকে এবং বিস্তার লাভ করে সমগ্র দেশে না ছড়ায়, এবং পূর্ণ লকডাউনের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, যেমনটি আমরা আমেরিকাসহ বিভিন্ন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ করছি। মুসলিমরা ইতিহাসে বহুবার একই রকম পরিস্থিতি অতিক্রম করেছে, হিজরী ৬ষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি মুসলিমরা “আল-শাকফা” দ্বারা আক্রান্ত হয়, যা একধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত চামড়ার সংক্রমণ। মুসলিমরা ৮ম শতকের মাঝামাঝি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, যা দামেস্কের প্রলয়ংকারী প্লেগ নামে পরিচিত, কিন্তু এগুলোর কোন ক্ষেত্রেই মসজিদ, জুম্মা, তারাবী কিংবা জামাতে নামায বন্ধ করা হয়নি। এবং জনগণকেও তাদের গৃহের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়নি, কিন্তু অসুস্থদের আলাদা রাখা হয়েছে, এবং সুস্থরা মানব সভ্যতা বিনির্মাণে কাজ চালিয়ে গেছেন। তারা ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে গিয়েছেন এবং অসুস্থদের সঠিক সেবা ও চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি এই রোগের কবল থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহ্’র দরবারে ফরিয়াদ করেছেন।
হে মুসলিমগণ, এই সংক্রমণব্যাধি করোনা আপনাদেরকে অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় আল্লাহ্’র দিকে ধাবিত করেছে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুসারীরা আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে প্রদত্ত এই বালা-মুসিবতকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আবরণ দিতে চাইছে, যাতে আপনারা আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন থেকে দূরে থাকেন, সুতরাং তাদের দ্বারা প্রতারিত হবেন না। যখন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এক অতিক্ষুদ্র সৃষ্টির নিকট বিপর্যস্ত, অথচ তা প্রত্যক্ষ করেও হাসিনার এই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকেরা মানবজাতির তত্ত্বাবধানের জন্য অযোগ্য সেই কুফর পুঁজিবাদী আদর্শের দিকেই ছুটছে, ইঞ্চি-ইঞ্চি পদচিহ্নে সেটি অনুসরণ করছে, সেখানেই সমাধান ও প্রতিষেধক খুঁজছে। আবু সা’ঈদ (রা.) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পন্থা পুরোপুরি অনুসরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে। এমনকি তারা যদি গো-সাপের গর্তেও ঢুকে, তবে তোমরাও তাতে ঢুকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! আপনি কি ইহুদী এবং খৃষ্টানদের কথা বলছেন?” তিনি (সা:) বললেন, “তবে আর কার কথা?” [বুখারী/মুসলিম]। এই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকদের প্রতি আর কোন আশা বাকি নাই। প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টাহীন এই পুঁজিবাদী আদর্শের অনুসারীরা বর্তমান এই সংকটসহ পৃথিবীব্যাপী ফিতনা-ফ্যাসাদ তৈরির জন্য দায়ী। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “স্থলে ও জলে যে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে তা মানুষের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ্ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসে।” [সূরা রূম : ৪১]। সুতরাং, মহিমান্বিত এই রমযান মাসে, কুর’আন নাযিলের এই মাসে, আসুন আমরা এই শপথ নিই যে, আমরা এই ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণের রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবো, আমরা বুঝে কিংবা না বুঝে, কিংবা ভয়ে কোন অবস্থাতেই এই ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা ও শাসকগোষ্ঠীকে অনুসরণ ও সমর্থন করবো না, এবং আল্লাহ্’র দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন তথা খিলাফতে রাশিদাহ্ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে সর্বশক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করবো, আল্লাহ্ প্রদত্ত যে রহমতপূর্ণ শাসনব্যবস্থাকে আমরা ৯৯ হিজরী বছর পূর্বে ২৮শে রজব ১৩৪২ হিজরীতে পৃথিবী থেকে হারিয়ে ফেলেছি।
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “সুলতান (খলীফা) হচ্ছে জমিনে (পৃথিবীতে) আল্লাহ্’র ছায়া (রহমত)।” [দারাকুতনি]
রবিবার, ৩ রমযান, ১৪৪১ হিজরী
২৬ এপ্রিল, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ
করোনা ও প্রতিক্রিয়াশীল ধার্মিকতা

করোনার ভয়ে ধর্ম চর্চা বৃদ্ধি ইসলামি আকিদাকে আমরা কতটুকু বুঝি??
করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বৃদ্ধির সংবাদে আমরা অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি? নিজের উপর করোনা বিপদ আসন্ন দেখছে সবাই। এই দুর্গতিতে নিজের অক্ষমতা বুঝতে পারছে। অনেকেরই আকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা সৃষ্টিকর্তাকে। মাঝে মাঝে মনে হয় শরীরে করোনার আসার ঐ ছিদ্রটি বন্ধ করলেই মনে হয় এই যাত্রায় রক্ষা। আবার পরক্ষণেই আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির খবর শুনে ভীত! যাব কি যাবনা, লকডাউন আর ছোঁয়াচের দোটানা। পরিসংখানের উত্থান পতনে নিয়মিত উঠানামা করছে ধর্ম চর্চার জ্বরের থার্মোমিটার!
দোটানা থেকে জগাখিচুড়ি টাইপ আচরনের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিদিনকার মত আধ্যাত্মিক কিছু চর্চা ছাড়া, জীবনের বাকি সব কিছুতেই, ভয়ে আকড়ে ধরা সৃষ্টিকরতার কি কোন সম্পর্ক নেই?
এই কম্প্রমাইজ চিন্তার ভিত্তি কী?
উন্নত জাতি হিসেবে মনে করে কাফিরদের মুল চিন্তা সেকুলারিজমকে মুসলিমরা আকড়ে ধরে আছে। যারা দোটানায় পড়ে ধর্মকে জীবন থেকে আলাদা করে তারা আদতে সেকুলারিজম নামের একটি কম্পোমাইজড চিন্তাকে গ্রহণ করে। ব্যক্তির পছন্দমত রবিবার জন্য তারা ধর্ম চর্চাকে নির্ধারণ করেছে। বাকি জীবনে সে নিজের বিধানই পালন করবে। অর্থাৎ সে নিজের বানানো আইন-কানুনে চলবে। নিজের পছন্দমত আইন তৈরি করবে, নিজের খেয়ালখুশি মত লাভ-লোকসান নির্ধারণ করবে এবং পরিচালিত হবে অর্থাৎ তার সমাজ জীবনের সাথে সৃষ্টিকর্তার কোন সম্পর্ক থাকবেনা!
অধঃপতিত জাতি হিসেবে এই অঞ্চলের মানুষও অন্ধভাবে সেকুলারিজমের এই ভিত্তিটা গ্রহণ করেছে। কারণ পশ্চিমা বিজয়ী এই চিন্তাকে তারা উত্তম মনে করে বা না বুঝে অনুকরণ করে।
যার ফলাফল হিসেবে আমরা করোনার ভয়ে ব্যক্তিগত ভাবে আধ্যাত্মিক চর্চা বৃদ্ধি করলেও দৈনন্দিন অন্য কোন কাজের ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক খুঁজে পাইনা। ইসলাম ও সেকুলারিজম মিশিয়ে এই বিভ্রান্ত চিন্তার জন্য আমাদের পার্থিব জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্গতি।
পার্থিব জীবনের দুর্গতিতো আমাদের চোখের সামনেই। তাছাড়া ফলাফল স্বরূপ নষ্ট চিন্তার সমাজ থেকে উঠে আসছে একের পর এক দ্বায়িত্বহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা নে্তৃত্ব, চোরের খনি……………।
ইসলামী আকিদার স্বরূপ কী?
ইসলামী আকিদা একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস বা চিন্তার পদ্ধতি যা মানব জীবন মহাবিশ্ব সব ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর নির্দেশনাকে দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করা। মানব, জীবন মহাবিশ্বের আগে-পরে আল্লাহ, সে আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে, এই আকিদা থেকে উঠে আসা অন্য চিন্তা গুলো দিয়ে সে জীবনকে পরিচালিত করবে। যার ফলে একজন মুসলিম যেমন আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে আল্লাহর ইবাদত করে তেমনে তার জীবনের সব ক্ষেত্রেও আল্লাহর বিধান দ্বারা পরিচালিত হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে তথা ইসলামী আকিদাকে গ্রহণ করে। সে সাময়িক ভীত হয়ে আল্লাহকে স্বরণ করেনা বরং তার আকিদা দ্বারা জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে। সেটা ব্যক্তিগত ইবাদত হোক, সমাজের সাথে তাঁর সম্পর্ক হোক বা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত রাষ্ট্রে ব্যবস্থা দ্বারা জীবন পরিচালনা।
এক কথায় মানব, জীবন ও মহাবিশ্বের সবকিছুতে ইসলামি আকিদাকে গ্রহণ করা।
যেমন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন-
…………আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলিম) জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরুপ, পথ নির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদ স্বরুপ, তোমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি। (১৬:৮৯)
……তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর আর কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? তোমাদের মধ্যে যারা এরুপ করে তাদের পার্থিব জীবনে দুর্গতি ব্যতীত কিছুই নেই এবং উত্থান দিনে তারা কঠোর শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে……। (২:৮৫)
সুতরাং করোনার ভয়ে ভীত হয়ে ইসলামী আকিদাকে আমরা আধ্যাতিকতা কেন্দ্রীক দেখলে হবেনা। সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে।
প্রশ্ন-উত্তর: কোন অধিকারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে?

প্রশ্ন: বর্তমান ব্যবস্থায় মানুষ কোন কোন অধিকারগুলো আদায় করার জন্য প্রচলিত আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে?
উত্তর: কোনো অধিকার পুনরুদ্ধার বা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে, শরীয়াহ স্বীকৃত অন্যায় অপসারণের ক্ষেত্রে তা জায়েয; অর্থাৎ অধিকারটি ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা স্বীকৃত এবং যে অন্যায়টি করা হয়েছে তাও ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা অন্যায় বলে স্বীকৃত। সুতরাং, যে অধিকারটি ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা স্বীকৃত নয় তা পুনরুদ্ধার বা ফিরিয়ে দেবার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে না। যদি কোনো শ্রমিক প্রচলিত আইন অনুসারে কোন অধিকার দাবি করে যা শরীয়াহ অনুসারে অধিকার হিসেবে স্বীকৃত না, তবে তার পক্ষে তা করা জায়েয নয়। আর কেউ যদি প্রচলিত আইন অনুসারে কোন অধিকার দাবি করে, যা শরিয়াহ অনুসারেও অধিকার হিসেবে স্বীকৃত তবে তা দাবি করার অনুমতি শরীয়াহতে তাকে দেয়া হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, সত্যি কথা বলা এবং তার উপর অবিচল থাকার কারণে যদি কোনো ব্যক্তির উপর অবিচার করা হয় এবং তাকে কারাবাসের মুখোমুখি করা হয়, তবে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ীও এটা অবিচার ও অন্যায় হিসেবে গৃহীত এবং এক্ষেত্রে ইসলাম তাকে রক্ষা করে এবং তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে। সুতরাং তাকে অন্যায়–অবিচার থেকে মুক্ত করে কারাগার থেকে বের করে আনার জন্য তার নিজের পক্ষ হতে কাউকে নিয়োগ দেয়া তার জন্য শরীয়াহ কর্তৃক অনুমোদিত।
উদাহরন স্বরুপ, আরো বলা যায়, কেউ যদি ছিনতাই এর স্বীকার হয় তবে তার জন্য ইসলাম প্রদত্ত অধিকার হচ্ছে তার চুরি হওয়া বা ছিনতাই হওয়া অর্থ তাকে ফিরিয়ে দেয়া। সুতরাং, চুরি যাওয়া অর্থ ফিরে পাওয়ার জন্য ছিনতাই বা চুরির স্বীকার হওয়া ব্যাক্তি, আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য নিজের পক্ষ হতে যে কাউকে নিযুক্ত করতে পারে যা শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত।
আবার, যদি কোনো বিক্রেতা তার বাড়িটি ক্রেতার সাথে এই চুক্তিতে বিক্রি করে যে, ক্রেতা প্রাথমিক ডাউন পেমেন্ট দিবে এবং বাকী টাকাটা পরিশোধের একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে (কিস্তি) ধীরে ধীরে দিবে এবং এক্ষেত্রে, ক্রেতা যদি কেবল ডাউন পেমেন্ট প্রদান করে, এবং বাকী অর্থ প্রদান করতে অস্বীকার করে, যদিও সে ঘরটি সত্যিই কিনেছে এবং এইখানে সে বাস করে। সেক্ষেত্রে, ইসলাম ক্রেতার কাছ থেকে বিক্রেতার অধিকার পুনরুদ্ধার করবে। এবং এক্ষেত্রে বিক্রেতা বাকি টাকা যা ক্রেতা দিতে অস্বীকার করেছিল উদ্ধার করার জন্য নিজের পক্ষ থেকে কাউকে নিযুক্ত করে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে।
সুতরাং, যে শ্রমিক তার এবং তার নিয়োগকর্তার মধ্যে কাজের চুক্তি অনুসারে একটি নির্দিষ্ট বেতনে কাজ করে এবং নিয়োগকর্তা যদি তার বেতন কমিয়ে দেন, ইসলাম, শ্রমিককে তার পুরো বেতন দিতে বাধ্য করে এবং তাই শ্রমিকের পক্ষে এটি অনুমোদিত যারা তার পুরো বেতন আদায় করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে সক্ষম, তাদের সহায়তা নেয়া।
অর্থাৎ, যদি তার জন্য নির্ধারিত অধিকার ইসলামি আইন দ্বারাও অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং কেউ যদি এটা হরণ করে তবে তার এই হৃত অধিকার পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি নিজের পক্ষ থেকে কাউকে নিযুক্ত করে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে। এর বিপরীতে, যদি মানব –রচিত আইন দ্বারা তার অধিকার নির্ধারিত হয় এবং তা যদি ইসলামী শরীয়াহ’র সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে এই অধিকার পুনরুদ্ধার করার জন্য কারো সহায়তা নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া তার জন্য জায়েজ হবে না।
উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন চুক্তিতে গঠিত একটি যৌথ স্টক সংস্থায় শেয়ারের মালিক হন এবং যখন শেয়ারহোল্ডারদের কাছে লভ্যাংশ বিতরণের সময় আসে তখন যদি সে লক্ষ্য করে যে তার লভ্যাংশের অংশটি, চুক্তিগতভাবে তার যে পরিমান পাওয়ার কথা তার চেয়ে কম। এক্ষেত্রে, এই অধিকার আদায়ের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া তার জন্য বৈধ নয়, কারণ এই অধিকারটি মানব-রচিত আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে এবং এটি শরীয়াহ’র পরিপন্থী। কারণ, যেহেতু কোম্পানির গঠন প্রক্রিয়াটাই শরীয়াহ অনুযায়ী বাতিল (অবৈধ) সেহেতু এই কোম্পানীর মাধ্যমে পাওয়া কোনো কিছুই তার জন্য শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত হবে না, লাভ তো দুরের কথা। সুতরাং এ জাতীয় সংস্থার কাঠামো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া মুসলমানের উপর ওয়াজিব।
উদাহরণস্বরূপ আরো বলা যায়, যদি কেউ একটি নির্দিষ্ট সুদের হারে একটি সুদ ভিত্তিক ব্যাংকে তার টাকা জমা রাখে কিন্ত ব্যাংক যখন তাকে তার শেয়ার দেয়, তখন যদি সে আবিষ্কার করে যে তার নিজস্ব হিসাবে যে টাকাটা ব্যাংকের কাছ থেকে তার পাওয়ার কথা ব্যাংকের দেয়া টাকাটা তার থেকে কম। এক্ষেত্রে, এই সুদের বাকি টাকা দাবি করার জন্য আদালতের সহায়তা অবলম্বন করা তার জন্য বৈধ নয়, কারন, এই অধিকারটি মানবসৃষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে এবং এটি শরীয়াহ’র পরিপন্থী, যা এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে এই সুদ ভিত্তিক ব্যাংকগুলিতে অধিকার হিসেবে অনুমোদিত কিন্তু ইসলামি আইন অনুযায়ী এটি তার জন্য অনুমোদিত নয়। সুতরাং ব্যাংকের সাথে এই সুদের চুক্তি বাতিল করা মুসলমানদের উপর কর্তব্য (ওয়াজিব)।
সংক্ষেপে, যদি প্রচলিত আইন অনুসারে শ্রমিকের দাবি করা অধিকারগুলি ইসলামী শরীয়াহ অনুসারেও অধিকার হয় বা শরীয়াহ দ্বারা নির্দেশিত হয় অথবা যদি তার কাজের চুক্তিতে শরীয়তের পরিপন্থী শর্তাদি না থাকে তবে, প্রচলিত আইন অনুসারে শ্রমিকদের তাদের অধিকার দাবি করা অনুমোদিত। তবে, যদি শ্রমিকের দাবি করা অধিকারগুলি মানব-রচিত আইন অনুসারে অধিকার হয় এবং শরীয়াহ দ্বারা নির্ধারিত অধিকার না হয়, তবে শ্রমিকদের আদালতের সামনে তাদের দাবি উত্থাপন করা শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত হবে না।
মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর
উৎস: Claiming a Right Stipulated by Non-Islamic Law
আরো পড়ুন: প্রশ্ন-উত্তর: অনৈসলামিক ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকারের দাবী করা কি বৈধ?
করোনা, ব্যর্থ সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা এবং এর প্রকৃত সমাধান

করোনা মহামারিতে লক ডাউনে কার্যত স্থবির একটা বাস্তবতায় আপনাদের সাথে কিছু প্রয়োজনীয় আলাপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। করোনা ভাইরাস যাতে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পরতে না পারে তার জন্য ২৬শে মার্চ থেকে ২৫শে এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষনা করেছে সরকার। স্বাস্থ্য অদিদপ্তরের ভাষ্য মতে এখন পর্যন্ত দেশের অন্তত ১৯টি জেলা কার্যত লক ডাউন রয়েছে আর আংশিক লক ডাউন অবস্থায় রয়েছে ১৬টি জেলা। এখন প্রশ্ন হল একটার পর একটা জেলা লক ডাউনে যাওয়ার প্রেক্ষাপট কি?
চীনের উহানে কোভিড-১৯ এর প্রাদূর্ভাব দেখা দেওয়ার পর যখন দক্ষিন কোরিয়া যখন করোনা মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে তখন বাংলাদেশ সরকারের ফোকাস পয়েন্ট ছিল মুজিববর্ষ উদযাপন। আর করোনা মোকাবেলায় এইটাই সরকারের দায়িত্বহীনতার প্রথম দৃষ্টান্ত।
আমরা জানি, এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে আর এর উৎপত্তিস্থল নারায়নগঞ্জ বা চুয়াডাঙা, গাইবান্ধা জেলা না। করোনা প্রকোপকালে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যে লক্ষাধিক কর্মজীবি মানুষ দেশে এসেছেন তাদের করোনা টেস্ট এবং আইসোলশনে নিশ্চিত করা গেলে আজকের এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপট তৈরী হতোনা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বললে “ফইল্লে বান কাডি দিইয়ে, ফরে বালতি দিয়েরে ফানি হেছের” অর্থ্যাৎ ফসলের মাঠে বাধ কেটে খালের পানি প্রবেশের সুযোগ দিয়ে এখন বালতি দিয়ে পানি সরানো হচ্ছে। সরকার এর ‘No Test, No Corona’ নীতি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে IEDCR। নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আর করোনা টেস্ট নিয়ে IEDCR এর ভূমিকা একই রকম। নিয়মিত আপনারা যারা পত্রিকা পড়ছেন আপনারা জানতে পারছেন কিভাবে খোদ ঢাকা শহরেই করোনা টেস্ট নিয়ে জনগণকে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রতিদিন করোনার উপসর্গ জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় মানুষ মারা যাচ্ছে।
পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তি মালিকানাকে উৎসাহিত করেছে এবং সরকারী হাসপাতালের সক্ষমতাকে দূর্বল করেছে, যার ফলাফলে চিকিৎসা একটা ব্যয়বহুল বিষয়ে পরিনত হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ সুলভে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। এমনকি এই করোনা দূর্যোগের সময়েও ঢাকা থেকে শুরু করে উপজেলা সদর পর্যন্ত করোনা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যাপক ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। পিপিই, আইসোলেশন শয্যা, আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটর এ সব কিছুর অপ্রতুলতা একটা প্রকাশিত সত্য। করোনা সংকট মোকাবেলায় সরকার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করেছে, কিন্তু তা মূলত ব্যবসায়ীদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা। লক ডাউনে অচল স্থবির হয়ে পরা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কোটি কোটি মানুষের আয়-উপার্জন সরকার শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। এই করোনা সংকটের মধ্যেও বকেয়া বেতনের দাবিতে উত্তরার আজমপুরে, টঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীতে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছে। ৪% সুদে কৃষকের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজটিও একটা ঋণ সহায়তা। আমরা জানি, কৃষক ধান উৎপাদন করে ধারাবাহিকভাবে ভাবেই লোকসানে আছেন, তার উপর খাদ্য সংকটের হুমকিতে থাকার পরিস্থিতিতে সরকার কৃষকদের নগদ অর্থ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। সরকারের পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সুদভিত্তিক ঋণ প্রদান করাই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা সর্বপ্রথম হাতিয়ার। দেশের ৬ কোটি শ্রমশক্তির ৫ কোটি ২০ লক্ষ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের কাজ বন্ধ থাকায় তাদের খাদ্যের যোগান কোথা থেকে হবে সে ব্যপারে সরকার নির্বিকার। অথচ এই মূহুর্তে প্রয়োজন ছিল জরুরি ভিত্তিতে নগদ টাকা এবং খাদ্য সহায়তা। ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় দ্রুত দরিদ্র পরিবারের তালিকা করে এই সহায়তা পৌছানোর সক্ষমতা থাকা সত্বেও মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সরকার দ্রুততার সাথে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এক কোটি দরিদ্র পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দিলে লাগে ১০ হাজার কোটি টাকা। এই “মেগা প্রকল্প’’ এর দেশে এই পদক্ষেপ অসম্ভব কিছু হওয়ার কথা ছিলা না। এমনকি সরকারের জনসেবার বিজ্ঞাপন ১০ টাকা কেজিতে ও.এম.এস এর চাল বিতরণ কর্মসূচি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অজুহাতে (প্রকৃতার্থে ব্যপক চাল চুরির কারণে) তা বন্ধ করে দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রনালয়।
এপ্রিল থেকে মে মাস বাংলাদেশের কৃষির জন্য গুরত্বপূর্ণ দুই মাস। হাওরের ধান পেকে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে কারণ কাটার জন্য দেশের দক্ষিনাঞ্চলের কৃষি শ্রমিকেরা সেখানে যেতে পারছেন না। সরকারের দায়িত্বহীনতার আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। ব্যাপক হারে করোনা টেস্ট, আইসোলেশনের মাধ্যমে হাওর অঞ্চলকে করোনামুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা, কৃষি-শ্রমিক, কৃষি-যান্ত্রিক কারিগরদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে হাওর অঞ্চলে পৌছে দেওয়া, স্কুল কলেজ শিক্ষার্থীদের ধান কাটার জন্য মাঠে না নামালে হাওরের ২০% বোরো ধানের যোগান বন্ধ হয়ে যাবে এবং হাওর অঞ্চলে খাদ্যভাব দেখা দিতে পারে।
এই ধরনের বাস্তবতায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু বিষয় আলোকপাত করছি।
খিলাফত রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে খলীফা, খলিফার সহকারীগণ এবং ওয়ালী বা গভর্নরবৃন্দ জনগনের সার্বিক বিষয়ে দেখাশুনা করেন আহকাম শরীয়াহ এর মাধ্যমে। জনগনের দেখাশোনা করাকে ইংরেজীতে politics বা আরবীতে সিয়াসাহ (سياسة) বলা হয়। রাষ্ট্র এই কাজ কার্যকরীভাবে বাস্তবায়ন করে এবং শাসককে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করে। রাসূল (সা) বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্বের ব্যপারে জবাবদিহি করতে হবে।” তিনি আরো বলেন: “ইমাম তথা শাসক জনগণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্বের ব্যপারে প্রশ্ন করা হবে।“ তিনি বলেন: “ইমাম হচ্ছেন অভিভাবক এবং তার জনগণের ব্যপারে দায়িত্বশীল।”
পুঁজিবাদী দৃষ্টিকোন থেকে মুনাফা অর্জন করাই মানবজীবনের কাজের একমাত্র মানদন্ড। তাই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একটা প্রাইভেট সেক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যাতে মুনাফা অর্জন করা যায়। এই দূর্যোগকালীন সময়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অক্ষমতা এই মুনাফাকেন্দ্রিক নীতির ব্যর্থতাকে পুরোপুরি প্রকাশ করছে। শরীয়াহ দলীলের ভিত্তিতে ইসলাম চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যখাতকে জনগণের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই খিলাফত রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় হাসপাতালগুলোকে বিনামূল্যে জনগণের চিকিৎসা প্রদানের জন্য উপযোক্ত করে গড়ে তুলবে। সুলভে প্রয়োজনীয় মেডিসিন, ভ্যাকসিন তৈরীর জন্য রিসার্চ সেন্টার, ল্যবোরেটরী স্থাপন করবে। পৃথিবী তখন কিউবা মডেলের পরিবর্তে খিলাফত মডেলের বিষয়ে উৎসাহিত হবে।
রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি মহামারীর প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন অঞ্চলে বসবাস করছে সে যেন সেখানেই অবস্থান করে এবং সেই অঞ্চল পরিত্যাগ করে না বরং ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর পুরষ্কারের আশা করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তার উপর কোন কিছুই আপতিত হবে না যা আল্লাহ তার জন্য নির্ধারন করে রেখেছেন, তখন সে এমন পুরষ্কার প্রাপ্ত হবে যা একজন শহীদের জন্য রয়েছে”।
মহামারী থেকে একটা অঞ্চলকে রক্ষা করার মৌলিক নীতি আমরা এই হাদিস থেকে বুঝতে পারছি। আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষকে হোম কোয়ারাইন্টাইনের প্রেস্ক্রিপশন দিয়ে নিজ নিজ এলাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়টি লক করা হয়নি এবং যারা আসছে তাদের করোনা টেস্ট করা হয় নি। আজকে পুরো দেশকে লক ডাউন করে অগণিত মানুষকে ক্ষুদার্থ, অভুক্ত রেখে এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করছে সরকার। আক্রান্ত দেশ থেকে আগত মানুষকে বিনা পরীক্ষায় বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে ঘরে ঘরে করোনা প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে এই গণতান্ত্রিক সরকার। ব্যপক টেস্ট, আইসোলেশন ট্রিটমেন্ট এর মাধ্যমে অসুস্থদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া এবং সুস্থদের দৈনন্দিন যাবতীয় কাজে সক্রিয় রাখা এটাই সঠিক সমাধান এবং এই নীতিই খিলাফত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
দ্রুততর সময়ে ব্যপক পরীক্ষার মাধ্যমে হাওর অঞ্চলকে করোনামুক্তাঞ্চল ঘোষনা না করলে, হাওর অঞ্চলে কৃষি শ্রমিকদের প্রবেশের সুযোগ না দিলে ব্যপক খাদ্য সংকট তৈরীর সম্ভাবনা রয়েছে। হাদিসে বর্ণিত নীতিমালা অনুসরণের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র সহজেই এই ধরণের স্থবিরতা থেকে সমাজকে সুরক্ষা দিবে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে।
খাদ্যের ব্যপারে ইসলামের হুকুম হচ্ছে খাদ্য হতে হবে হালাল এবং পবিত্র। খিলাফত রাষ্ট্র কাজি উল হিসবাহ এর মাধ্যমে বাজারে খাদ্য সরবরাহর ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি অনুসরণকে মনিটর করবে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইসলামের দৃষ্টিকোন থেকে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই মহামারীসহ যেকোন দূর্যোগকালীন সময়ে দরিদ্র মানুষের ঘরে খাদ্য ও নগদ অর্থ পৌছে দিতে খলীফা শরীয়াহগতভাবে বাধ্য যাতে মানুষ খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারে।
বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্টি তার দায়িত্বশীলতার বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য OMS এর চাল বিতরণের একটি ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ১ কোটি দরিদ্র পরিবারকে ১০,০০০ টাকা করে দিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা সক্ষমতা থাকা সত্বেও কঠোর পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। তার পরিবর্তে জনরোষ ও গণবিদ্রোহ ঠেকানোর দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ মূল্যায়ন করতে হবে।
কোভিড-১৯ ভাইরাস আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলার)-এর একটি অতিক্ষুদ্র সৃষ্টি যা বিশ্বব্যপী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-ই এই সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা, মালিক। তিনি তার সৃষ্ট মানুষের জন্য ইসলামকেই একমাত্র জীবনব্যবস্থা/মতাদর্শ হিসেবে পাঠিয়েছেন। খিলাফত রাষ্ট্র কাঠামোর মাধ্যমে এই জীবনব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখানো সম্ভব নয়। এই দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহকেই পালন করতে হবে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন: “এইভাবে আমি তোমাদেরকে উম্মাতান ওয়াসাতান বা ন্যায়পরায়ণ জাতি করেছি যাতে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্য এবং যাতে রাসূল সাক্ষদাতা হন তোমাদের জন্য’’। (সূরা বাকারা: ১৪৩)
রজব মাসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় রয়েছে। কিছু দিন, সপ্তাহ কিংবা মাস। মুসলমানরাও এর ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য এবং সত্যই স্মরণযোগ্য এই ঘটনাটি অবাক হওয়ার মতো যে, ৭ম শতাব্দীর বিশ্বে ইসলামী সভ্যতা একটি নতুন ভোর এনেছিল, কারণ এটি দিক-দিগন্ত জয় করে জমিনে জ্ঞান, সভ্যতা এবং সত্যিকারের অগ্রগতি নিয়ে এসেছিল। এটি সুপরিচিত যে ইসলামী চন্দ্র ক্যালেন্ডারে রজব একটি মাসের পবিত্র মাস এবং এটি সত্যিই এমন একটি মাস যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বহন করে। বিশেষত, রজব ইসলামী ইতিহাসে চারটি ঘটনা দেখেছিল যা ইতিহাসের গতিপথকে পরিবর্তিত করেছিল।
এটি নবুওয়াতের দশম বছরের রজব (৬২০ খ্রিস্টাব্দ) যখন আল-ইসরা ওয়া ওয়াল-মি’রাজ হয়েছিল। এক রাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে জেরুজালেমে, তারপর আকাশে ও তার উপরের শেষপ্রান্তে চলে গেলেন। তাঁর চাচা আবু তালিব যে তাঁর দাওয়াতের শুরু থেকেই তাকে রক্ষা করেছিলেন, পাশাপাশি তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা) – কে হারিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। মক্কার নেতৃত্ব মুসলিমদের উপর তাদের নির্যাতন ও নিপীড়নের চুড়ান্তে পৌঁছেছিল। ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার লড়াইয়ের এমন এক শীর্ষ পর্যায় এসেছিল যে, আল্লাহ তাঁর মনোনীত বান্দাকে তাঁর এক বৃহত্তর নিদর্শন দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এক রাতে তাঁকে নিয়ে গেলেন, এর একটি অংশে তাকে জেরুজালেম এর পবিত্র মসজিদ দেখালেন, সেখানে তিনি অন্যান্য নবীদের সালাতে নেতৃত্ব দিলেন। এবং সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো সর্বোচ্চ আকাশে, যেখানে তাকে উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত উপহার দেওয়া হলো।
রজব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক গৌরবময় সামরিক বিজয়ও দেখেছিলেন; তাবুকের যুদ্ধ, যা ৯ হিজরিতে সংঘটিত হয়েছিল যা সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামি সামরিক কর্তৃত্বের নিদর্শনরূপে চিহ্নিত হয়। তীব্র উত্তাপ এবং ৩০,০০০ সৈন্যের মদীনা থেকে দীর্ঘ যাত্রা সত্ত্বেও, মুসলিমগণ নিরলসভাবে আল-শামের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য রোমান সেনাবাহিনী তাবুকের কাছে শিবির স্থাপন করেছিল, কিন্তু যখন তারা শুনেছিল যে মুসলিম বাহিনীর বৃহৎ আকার এবং শক্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে এবং তারা স্বয়ং আল্লাহর রাসূলের নের্তৃত্বে ছিল, তখন তারা আতঙ্কিত হয়ে তাদের দুর্গগুলির সুরক্ষার জন্য আল-শামের অভ্যন্তরে ফিরে যায়। এভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লড়াই ছাড়াই তাবুক দখলের কাজটি করে ফেলেছিলেন। তিনি সেখানে অন্যান্য দুর্বলচিত্তের প্রতিরোধী বাহিনীর বিরুদ্ধে একমাসের জন্য অবস্থান করেছিলেন এবং সেই অঞ্চলে রোমান নিয়ন্ত্রণে থাকা নেতৃবৃন্দ ও গভর্নরদের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন, যারা তাঁর সাথে শান্তি স্থাপন করেছিলেন এবং জিজিয়াকে প্রদান করতে রাজি হয়েছিলেন।
এটি ৫৮৩ হিজরি (১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ) এর রজবে সালাহ আল-দীন জেরুজালেম যাত্রা করেছিলেন এবং ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের খপ্পর থেকে তা মুক্ত করেছিলেন যখন ইতোমধ্যে এটি তারা প্রায় এক শতাব্দী ধরে শাসন করেছিল আসছিল। এই বিজয়টি কেবলমাত্র ইসলামে জেরুজালেমের অদম্য গুরুত্বের কারণে নয়, মুসলিম ভূমিগুলিকে বিজয়ী করার জন্য ক্রুসেডার প্রচেষ্টায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছুরিকাঘাত হিসাবে ভূমিকা পালন করার কারণে তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কয়েক মাস আগে সালাহ উদ-দীন হিট্টিনের যুদ্ধে গাই অফ লুসিগান এবং ত্রিপোলির তৃতীয় রেমন্ডের ক্রুসেডার সেনাকে ধ্বংস করেছিলেন। এটি ছিল ক্রুসেডারদের জন্য একটি বড় বিপর্যয় এবং মুসলমানদের অনুকূলে ক্রুসেডের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
বহু শতাব্দী পরে, ১৩৪২ হিজরিতে (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ), রজব মাস আবার মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি ইতিহাস স্থাপনের ঘটনা নিয়ে আসে তবে এবার আগের দুটির মতো নয়, এটি প্রশংসার যোগ্য এমন ঘটনা ছিল না, যদিও অবশ্যই স্মরণযোগ্য। ৩রা মার্চ তথা রজব-এর ২৮ তারিখে মোস্তফা কামাল পাশার হাতে খিলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। যে প্রতিষ্ঠানটি মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং ১৩শ বছরের বেশি সময় ধরে শরীয়ত বাস্তবায়ন করে আসছিল তা বাতিল করা হয়েছিল। যে প্রতিষ্ঠানটি বহু শতাব্দী ধরে মুসলমানদের ঢাল হিসাবে ভূমিকা পালন করেছিল তা সরানো হয়েছিল। এরপরে যা ঘটেছিল তা প্রত্যাশিত ছিল। ঢাল ব্যতীত মুসলমান, তাদের সম্পদ এবং তাদের জমিগুলি অবিশ্বাসী ঔপনিবেশবাদীদের কাছে যুদ্ধের লুটপাট ছাড়া আর কিছু ছিল না, যারা খিলাফতকে নির্মূল করা এবং সেক্যুলার শাসনের দ্বারা প্রতিস্থাপন নিশ্চিত করার জন্য লম্বা সময় ধরে এ ষড়যন্ত্র করে আসছিল।
ইসলামী ইতিহাসের এই চারটি ঘটনা প্রকৃতপক্ষে এক মুহূর্তের ঘটনা। এসব ঘটনা ইতিহাসের গতিপথকে একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যায়। তাই সেসব ঘটনা আমাদের স্মরণে রাখার মতো তাৎপর্যপূর্ণ। এসব বিষয় রোমন্থন করার জন্য কোনও পাশ্চাত্য স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং ইসলামি ইতিহাসের শিক্ষনীয় ঘটনা। আমরা রাত আলোকসজ্জা করে, অযৌক্তিক মিছিল ও শিঙা বাজিয়ে, কিংবা পুরুষদের মূর্তি ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে এসব স্মরণ করি না। বরং আমাদের স্মরণীয়তা কারণ হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত ও মননের দিকে মনোনিবেশ করা: তাঁর মহান অনুগ্রহের জন্য তাঁর প্রশংসা করা এবং আমাদের ত্রুটিগুলির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহর স্মরণে অতিরিক্ত নামাজ পড়া, আরও বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা এবং অতিরিক্ত জিকর করা। আমাদের পরিস্থিতি ও বাস্তবতা বুঝে, শিক্ষা নিয়ে উম্মাহর জন্য তার সঠিক প্রতিফলন ঘটানো আমাদের ইসলামি বাধ্যবাধকতার মধ্যে এটি পড়ে।
রজবে প্রবেশের সাথে সাথে আমাদের মহান ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া উচিত এবং উপরোক্ত বিষয়গুলির ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি নির্ভেজাল আন্তরিকতার সাথে তাঁর সন্তুষ্টির সন্ধানের একক প্রেরণায় অগ্রসর হবার সুযোগ নেওয়া উচিত। আমাদের প্রশ্ন করা উচিত: আমরা যখন ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, তখন আমরা কি ইসলামকে প্রভাবশালী করার লক্ষ্যে জড়িত? আমাদের প্রশ্ন করা উচিত: পবিত্র শহর জেরুজালেমকে যখন আবারও কুফরশক্তি দখল করে নিয়েছে এবং সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে রয়েছে তখন আমরা কীভাবে ভাল থাকতে পারি? আজকের সালাহ উদ-দীন কোথায়? খেলাফতের ধ্বংসের দিবসে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত: খিলাফতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামী পুনর্জাগরণ-এর প্রচেষ্টাতে আমাদের অবদান কী? আমরা ইসলামের দ্বারা শাসন এবং মানবতার রোল মডেল হয়ে আল্লাহর কাছে আমাদের সম্মিলিত বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য কী করছি, যা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে? ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ইতিহাস থেকে পাঠ গ্রহণে আমাদের এই প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করতেই হবে।
প্রথম প্রকাশ: ১৪ই মার্চ ২০২০
বর্তমানে কিভাবে মুসলিম উম্মাহ পুনর্জাগরিত হতে পারে?

পুনর্জাগরণ এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান। উন্নতি বলতে কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বোঝায় না। প্রমাণস্বরূপ কুয়েত অর্থনৈতিক দিক থেকে ইউরোপীয় রাষ্ট্র সুইডেন, হল্যান্ড এবং বেলজিয়াম থেকে উন্নত হলেও; সুইডেন, হল্যান্ড এবং বেলজিয়ামকে উন্নত মনে করা হয়। কিন্তু কুয়েতকে উন্নত মনে করা হয় না। তাছাড়া নৈতিকভাবে উন্নতিও পুনর্জাগরণ নয়। পৃথিবীতে যেকোন রাষ্ট্রের চেয়ে মদিনা নৈতিকভাবে সবচেয়ে উন্নত হলেও, এটাকে উন্নত মনে করা হয় না। সুতরাং, বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থানই একমাত্র পুনর্জাগরণ বা উন্নতি।
পুনর্জাগরণ সঠিক বা ভূল হতে পারে। যেমন, আমেরিকা, ইউরোপ এবং রাশিয়া ভূল ভাবে উন্নত। কারণ তাদের পুনর্জাগরণ আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। সঠিক পুনর্জাগরণ সেটাই যা আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ যে পুনর্জাগরণ বা বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয় তা একধরণের ভূল বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান। সুতরাং ইসলামি চিন্তা (আকিদা) ব্যতিত কোন উত্থানই সঠিক পুনর্জাগরণ নয়। কারণ একমাত্র ইসলামি পুনর্জাগরণই আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।
পুনর্জাগরণ শুরু করতে হলে, বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন ও বিচার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে সরকার কাঠামো দাঁড় করাতে হবে। বিদ্যমান আইন কানুন ঠিক রেখে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে পুনর্জাগরণ ঘটানো সম্ভব হবে না, বরং এই পন্থা আরো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে ও পুনর্জাগরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কর্তৃত্ব ও শাসন কাঠামো একটি সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া পুনর্জাগরণ কখনো সম্ভব হবে না। উপরন্তু, মানব জীবনের সব সমস্যার সমাধান ঐ চিন্তা থেকে গ্রহণ করা হবে, যা থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন ও বিচার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করে ও কিছু স্বাধীনতা যুক্ত চিন্তার ভিত্তিতে ইউরোপীয়রা পুনর্জাগরিত হয়। “বস্তুবাদ ও বস্তুগত বিবর্তন অর্থাৎ প্রকৃতির সবগুলো বস্তু উন্নতির দিকে পরিবর্তিত হয়” এই চিন্তার ভিত্তিতে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ ঘটে। ১৯১৭ সালে এই চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ ঘটে । আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত “ইসলামি চিন্তার” ভিত্তিতে যখন রাসুল (সা) শাসন কাঠামো ও কর্তৃত্ব (সুলতান) প্রতিষ্ঠা করেন তখন আরবরা পুনর্জাগরিত হয়। প্রকৃতপক্ষে আরবরা যখন ইসলামি চিন্তা গ্রহণ করে ও তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো গঠন করে কেবল তখনই তাঁরা পুনর্জাগরিত হয়।
প্রমাণস্বরূপ, তুরষ্কে পুনর্জাগরণ ঘটানোর লক্ষ্যে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর সরকার প্রতিষ্ঠা ও আইন কানুন চালু করেছিল। মোস্তফা কামাল জবরদস্তি পশ্চিমা শাসন পদ্ধতি ও আইন প্রয়োগ শুরু করেছিল, ফলস্বরূপ তুরষ্ক পুনর্জাগরণের পরিবর্তে পূর্বেকার অবস্থা থেকে আরো বেশি অধঃপতিত হয়। বর্তমানের তুরষ্ক সবচেয়ে অধঃপতিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি। অন্যদিকে মোস্তফা কামালের সমসময়ে, লেনিন যখন রাশিয়ার পুনর্জাগরণ শুরু করেছিল তখন কার্যকরীভাবে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ সংগঠিত হয়েছিল। ফলে রাশিয়াকে (পতনপূর্ব) শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি মনে করা হত। কারণ, লেনিন কমিউনিস্ট চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিল। ঐ চিন্তা থেকে দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সমাধান করত যেমন রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইন কানুন। সুতরাং বলা যায় কমিউনিস্ট চিন্তার ভিত্তিতে লেনিন শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে এবং আইন কানুন গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান করে। ১৯১৭ সালে লেনিন একটি চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে ফলে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ সংগঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করে ফলে এটি ব্যর্থ হল এবং আরো বেশি অধঃপতিত হল।
মোহগ্রস্থ হয়ে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করে পুনর্জাগরণে ব্যর্থ হয় তুরষ্ক।
মিশরে জামাল আব্দুল নাসেরও এই ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯৫২ সালে জামাল আব্দুল নাসের বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করে। শুরুতে সে রাজতন্ত্রকে অপসারণ করে গণপ্রজাতন্ত্রীক সরকার প্রতিষ্ঠা করে এবং কৃষিজমির বন্টন করে দেয়। তারপর সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে কিন্ত তা সত্ত্বেও মিশরকে পুনর্জাগরিত করতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু, ১৯৫২ সালের সামরিক ক্যু পূর্বেকার সময় থেকে আজকের মিশর বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আরো বেশি অধঃপতিত। এমনকি ১৯৫২ সালের পার্লামেন্ট মেম্বারদের সাথে বর্তমান পার্লামেন্ট (জাতীয় কাউন্সিল) মেম্বারদের রাজনৈতিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ তুলনা করলে তাদের অধঃপতন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করার কারণে মিশর পুনর্জাগরণে ব্যর্থ হয়। কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই পুনর্জাগরণ ঘটানো সম্ভব।
চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এমন নয় যে, সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে পূর্বেকার একই চিন্তার ভিত্তিতে সরকার গঠন করা। এই পন্থা অবলম্বনে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল হতে পারে কিন্তু পুনর্জাগরণ ঘটতে পারে না। বরং যে চিন্তার ভিত্তিতে পুনর্জাগরণ ঘটানো হবে সেটি উম্মাহকে বা উম্মাহর প্রভাবশালী অংশকে ব্যাখ্যা করা, ওই চিন্তার ভিত্তিতে উম্মাহকে জীবনসংগ্রামে পরিচালিত করা, ঐ চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করা, এভাবেই নিশ্চিতভাবে পুনর্জাগরণ সংগটিত হবে। সুতরাং পুনর্জাগরণ বলতে ক্ষমতা দখল করা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করে ঐ চিন্তার ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করা।
ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং ঐ চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করা হবে। ক্ষমতা দখল করা এখানে মুল উদ্দেশ্য নয়, এবং ক্ষমতা দখল করার চিন্তা একটি ভূল উদ্দেশ্য। বরং ক্ষমতা গ্রহণ করে চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করা পুনর্জাগরণের একটি পদ্ধতি। এভাবেই আমাদের পুনর্জাগরণ সংগঠিত হবে। রাসুল (সা) এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। যখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর রাসুল (সা)-কে ইসলাম এর বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, তখন রাসুল (সা) সবাইকে ইসলামের আকিদার (চিন্তার) দিকে আহবান করেছিলেন। এবং মদিনায় যখন আউজ ও খাজরাজ গোত্র এই চিন্তাটি গ্রহণ করে ঐক্যবদ্ধ হলো, তাঁদের জীবনকে এই চিন্তা দিয়ে পরিচালিত করতে আরম্ভ করলো, তখন রাসুল (সা) মদিনায় শাসন কর্তৃত্ব গ্রহণ করলেন এবং ঘোষণা করলেন; ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত লোকজনের সাথে যুদ্ধ করতে থাকব যতক্ষণ না তারা বলে “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”। যদি তাঁরা এটিকে মেনে নেয় তাহলে তাঁদের রক্ত এবং সম্পদ আমার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পাবে..’। শুরুতে রাসুল (সা) ইসলামি আকিদার চিন্তার দিকে মানুষকে আহবান করেন, ফলে মদিনার পুনর্জাগরণ শুরু হয়, সমগ্র আরবের পুনর্জাগরণ হয় এবং ইসলাম গ্রহণ করা প্রত্যেকের পুনর্জাগরণ সংগঠিত হয়। অর্থাৎ চিন্তা গ্রহণ করা এবং জনগণের দৈনন্দিন বিষয়াদি দেখাশুনা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
আজকে, সবগুলো দেশে ইসলামি উম্মাহ নিঃসন্দেহে অধঃপতিত অবস্থায় আছে, দুইশত বছর চেষ্টার পরও পুনর্জাগরণ অর্জনে তাঁরা ব্যর্থ। কারণ সরকার অনৈসলামি ব্যবস্থা, আইন ও শাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত। অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র কুফর ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত। ইয়েমেনের মত কিছু রাষ্ট্রে আস-সাল্লাহর বিপ্লব পূর্ব ইসলামি ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হলেও সবাই অধঃপতিত ছিল। এমনকি ইসলামি ব্যবস্থা ও শরিয়ার উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করার পরও পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়নি। সুতরাং ইসলামি চিন্তার ভিত্তিতে শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে পুনর্জাগরণ শুরু করতে হবে, অর্থাৎ ইসলামি আকিদার উপর প্রতিষ্টা করা। “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এই ভিত্তির উপর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেই পুনর্জাগরণ সংগটিত হবে। অন্যদিকে কোন মাযহাব অথবা তাহতাউই এর মত কোন গ্রন্থ বা শরিয়ার উপর প্রতিষ্ঠা করলেও পুনর্জাগরণ সংঘটিত হবে না।
সুতরাং একমাত্র “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এই ভিত্তির উপর রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করলেই পুনর্জাগরণ সংগটিত হবে। তারপর আল্লাহর আদেশ অনুসারে তাঁদের সক্ষমতার ভিত্তিতে শরিয়া গ্রহণ করা হবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সমুহ তাঁদের জন্য কল্যাণকর বা অকল্যাণকর হোক অথবা পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনা না করে বাস্তবায়ন করা হবে। কারণ তা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তাআলা পাঠিয়েছেন এবং একমাত্র “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এই ভিত্তি চিন্তা হতে উৎসারিত হয়েছে, এভাবেই পুনর্জাগরণ সংঘটিত হবে।
সুতরাং এই উম্মাহকে উন্নত বা পুনর্জাগরণ সংঘঠিত করতে গেলে তাকে অবশ্যই ইসলামি আকিদাকে গ্রহণ করতে হবে, এর ভিত্তিতে জীবনকে পরিচালিত করতে হবে, এই ভিত্তির উপর শাসন এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, দৈনন্দিন বিষয়াদির সমস্যাগুলো এই আকিদা দিয়ে সমাধান করতে হবে। উল্লেখ্য, সক্ষমতার ভিত্তিতে শরিয়া গ্রহণ আল্লাহর নির্দেশনা হিসেবে করা হবে অন্য কোন কারণে নয়। এভাবেই সঠিক পুনর্জাগরণ পদ্ধতিতেই নিশ্চিতভাব পুনর্জাগরণ সংঘঠিত হবে, অন্যকোন পুনর্জাগরণ পন্থার মাধ্যমে নয়। এভাবেই উম্মাহ তাঁর হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং পৃথিবীর কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ চুড়ায় আরোহণ করবে।
Taken from an old leaflet written by Sheikh Taqi uddin an Nabhani (rah)
NRC ও CAA ইস্যুতে ভারত উত্তাল: সমস্যা ও সমাধান

গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ এ ভারতের সংসদে Citizenship Amendment Act (CAA) বা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আইন হিসেবে পাশ হয়েছে। এটি ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইনের সংশোধন। এই সংশোধিত আইনের মূল কথা হচ্ছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত অবৈধ অধিবাসীদের মধ্যে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান ধর্মাম্ববলী বা অবৈধ অভিবাসীরা যদি ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করে থাকে তবে তারা ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার উপযুক্ত।
তবে মুসলিমদের জন্য এরকম কোন সুযোগ রাখা হয়নি অর্থাৎ এই তিন দেশ থেকে আগত মুসলিমরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী যেমন, ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গা মুসলিমগণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং অন্য ধর্মাবলম্বীরা শরণার্থী।
National Register of Citizens (NRC) বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি হচ্ছে ভারত ও ভারতের বাহিরে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের তালিকা যা আসামে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিজেপি সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে সমগ্র ভারতে NRC বাস্তবায়ন করা। NRC এর মূল কথা হচ্ছে পূর্বপুরুষ ভারতে বসবাস করার বিষয়ে যদি কেউ উপযুক্ত দলিল প্রমাণ পেশ করতে না পারে তবে সে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।
আসামের চূড়ান্ত NRC তালিকা (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) থেকে যে ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছে তাদের ১৪ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাকি ৫ লক্ষ মুসলিম। আসাম প্রেক্ষাপটে NRC ২০১৯ এবং CAA ২০১৯ এর সমন্বয় করলে ফলাফল হচ্ছে NRC ২০১৯ থেকে বাদ পড়া ১৪ লক্ষ হিন্দু CAA ২০১৯ এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব ফিরে পাচ্ছে আর ৫ লক্ষ মুসলিম হচ্ছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। ভারতের কুটনৈতিক ভাষায় এরা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক যারা অবৈধভাবে আসামে বসবাস করছে। NRC ২০১৯ এবং CAA ২০১৯ এর সমন্বিত ফলাফল আসামে প্রত্যক্ষ করার পর ভারতে অবস্থানরত মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। ফলতঃ অস্তিত্বের প্রয়োজনে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে।
জাতিরাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত দূর্বলতা হচ্ছে এই রাষ্ট্র ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে একটি সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করার সক্ষমতা রাখেনা যার প্রমাণ হচ্ছে চীন ও ভারতের শাসকশ্রেণীর মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতা।
ইসলাম নির্দিষ্ট সীমানা কেন্দ্রিক জাতি রাষ্ট্রের চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। খিলাফত রাষ্ট্র কাঠামোর মাধ্যমে ইসলাম মতাদর্শ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়। নাগরিকত্ব ইস্যুতে আমাদেরকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হবে যা আসন্ন খিলাফত অনুসরণ করবে।
১. খিলাফত রাষ্ট্রে ‘সংখ্যালঘু’ নামক কোন Concept নাই। কোন অমুসলিম যদি খিলাফত রাষ্ট্রে এসে বসবাস করতে চায় তবে তাকে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে এবং নিরাপত্তা দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “ইমাম (তথা খলীফা) হচ্ছে অভিভাবক এবং সে তার আওতাধীন নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল” (মুসলিম এবং বুখারী উভয়ে একমত)। এখানে ‘নাগরিক’ শব্দটি সার্বজনীন এবং এর মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিম অন্তর্ভূক্ত। একইভাবে, নাগরিকত্বের সাথে সম্পর্কিত সকল সাধারন দলিলসমূহ নির্দেশ করে যে, মুসলিম ও অমুসলিম, আরব ও অনারব এবং সাদা ও কালোর ক্ষেত্রে কোন ধরনের বৈষম্যমূলক আচরন করা নিষিদ্ধ। বরং, ইসলামী নাগরিকত্ব বহনকারী সকল ব্যক্তির বিষয়াদি দেখাশোনার কাজে ও তাদের জীবনের, সম্মানের ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শাসক, কিংবা ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে বিচারক, কোনরূপ বৈষম্য না করে সকলের ক্ষেত্রে সমান আচরণ করবে। এছাড়াও তাদের সাথে দয়া, ধৈর্য্য এবং ক্ষমাশীল আচরন করতে হবে। তারা চাইলে ইসলামী সামরিক বাহিনীতে যোগদান করতে পারে এবং মুসলিমদের পাশে থেকে যুদ্ধ করতে পারে।
২. মানুষকে তার বাসস্থান থেকে উৎখাত করা শরিয়াহতে নিষিদ্ধ। ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মিগণ তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে এবং নিরাপদে বসবাস করবে। জিম্মি হলো সেইসব ব্যক্তি যারা ইসলাম ব্যতিত অন্য দ্বীনকে আঁকড়ে থাকে এবং ইসলাম ভিন্ন অন্য বিশ্বাসকে ধারন করে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হয়। জিম্মি শব্দটি জিম্মাহ্ শব্দ থেকে উদ্ভুত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে শপথ বা ওয়াদা। অর্থাৎ, জিম্মি হচ্ছে সেইসব ব্যক্তি যাদেরকে আমরা শান্তি চুক্তি মোতাবেক আচরন করার এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী তাদের বিষয়াদি দেখাশোনা করার ও মেলামেশা করার ওয়াদা প্রদান করেছি। জিম্মিদেরকে তাদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে বাধা প্রদান করা যাবে না, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বক্তব্য আবু উবায়েদ, উরওয়া হতে আল-আমওয়াল-এ বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়েমেনের লোকদের উদ্দেশ্য করে লেখেন: “ইহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্মমতে বিশ্বাসী মানুষদের উপর বল প্রয়োগ করে বিশ্বাস পরিত্যাগে বাধ্য করা যাবে না”।
৩. ইসলাম জিম্মাহ্ চুক্তির অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনেক বিধান প্রদান করেছে, যেগুলোতে তাদেরকে নাগরিকত্বের অধিকার প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে এবং তাদের উপর এর দায়িত্বসমূহ অর্পণ করা হয়েছে। জিম্মিদের বিষয়াদি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এবং লেনদেন ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে শাসক এবং বিচারকগণ জিম্মিদের প্রতি মুসলিমদের মতো একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। সুতরাং মুসলিমদের মতো জিম্মিরাও সমভাবে একই অধিকার ভোগ করে থাকে এবং এটা তাদের কাছ থেকে আশা করা হয় যে, তারাও তাদের উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব পালন করবে, উদাহরণস্বরূপ: ওয়াদা পূরন ও রাষ্ট্রের আদেশ পালন। এটাকে এভাবে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বহনকারীদের বিষয়াদিসমূহ যথাযথভাবে দেখাশোনা করা হবে এবং এক্ষেত্রে তারা মুসলিম নাকি অমুসলিম সেটা কোন বিচার্য বিষয় নয়। যারা ইসলামী নাগরিকত্ব অর্জন করবে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন করা নিষিদ্ধ, কারণ শাসন ও বিচার এবং বিষয়াদি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দলিল-প্রমানসমূহের সার্বজনীনতা এটাই নির্দেশ করে। ইসলাম এরকম একটি রূপরেখা প্রদান করে যে, জিম্মিরা আমাদের মতো একই অধিকার ভোগ করবে এবং আমাদের মতো একই আইন মেনে চলবে। তারা ন্যায়-বিচার ও সম অধিকার ভোগ করবে- এ বিষয়টি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র বানী হতে সাধারন আদেশ হিসেবে উদ্ভুত হয়েছে: “এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে।” [সূরা নিসা: ৫৮] এটা একটা সাধারণ নির্দেশনা যা মুসলিম ও অমুসলিম সকল মানুষের উপর প্রযোজ্য। এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেছেন: “এবং তোমরা অবিচল থাকবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে; এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কখনও ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করবে, এটাই ত্বাকওয়ার নিকটবর্তী” (মায়িদাহ্:৮), এবং কিতাবধারী ব্যক্তিদের মধ্যে ন্যায়বিচারের বিষয়ে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র বাণী থেকেও এটা স্পষ্ট হয়: “আর যদি বিচার ফয়সালা করেন তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ভাবে বিচার করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন” (মায়িদাহ:৪২)।
পরিশেষে বলবো, সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ তথা কাশ্মীর, বাবরী মসজিদ এর ইস্যুগুলো একের পর এক এসে আমাদের জানান দিচ্ছে যে তথাকথিত সেকুলার জীবনব্যবস্থা সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ। শুধুমাত্র ভারতে কেন, সারাবিশ্বেই একই চিত্র। একমাত্র ইসলামই হচ্ছে সে আদর্শ যা অতীতে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল এবং চাইলে আজও পারবে। সুতরাং, আসুন আমরা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সংগ্রামে এগিয়ে আসি যা পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে ইসলামের সুমহান আদর্শের দিকে আহ্বান করবে। মুসলিমবিদ্বেষী ভারতীয় মুশরিক শাসকদের নিপীড়ন থেকে মুসলিম উম্মাহকে মুক্ত করবে এবং ভারতকে পুনরায় ইসলামের পূণ্যভুমিতে রুপান্তর করবে ইনশাআল্লাহ্।
আবু হুরায়রাহ্ (রা) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
“অবশ্যই তোমাদের মধ্যে একটি সেনাবাহিনী হিন্দুস্তানের (ভারত) সাথে যুদ্ধ করবে, আল্লাহ্ সেই বাহিনী যোদ্ধাদের বিজয় দান করবেন। তারা হিন্দুস্তানের শাসকদের বেড়ি পড়িয়ে নিয়ে আসবে। আল্লাহ্ সেই বাহিনী যোদ্ধাদের মাগফিরাত দান করবেন…” [কিতাবুল ফিতান]
আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর

আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর বিষয়টি একটি বহুল আলোচিত বিষয় এবং একটি গভীর চিন্তা-ভাবনার বিষয়। আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর বিষয়টি মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন নাকি পরাধীন সে বিষয়ের আলোচনা। অতীতে বহু স্কলার বিভিন্নভাবে বিষয়টিকে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করেন কুর’আন এবং সুন্নাহ’র ভিত্তিতে। তারা বিষয়টিকে আল্লাহ’র সৃষ্টি, জ্ঞান ও তাঁর ইচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে যৌক্তিক (logical) ভাবে আলোচনা করেন। এখানে উল্লেখ্য, আল্লাহর রাসূল ও সাহাবীদের আমলে আল-কাদা ওয়াল কাদর অর্থাৎ মানুষ কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন না পরাধীন – এ আলোচনা ছিল না, তাদের মধ্যে কেবল আল-কদর তথা আল্লাহর সুবিশাল জ্ঞান নিয়ে আলোচনা ছিল, অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই, সবকিছু তার জ্ঞান অনুযায়ী ঘটে। কিন্তু এ বিষয়টি মানুষকে স্বাধীন করে না পরাধীন করে, এ আলোচনা ছিল না। বরং তাবেঈ আমলে এ আলোচনাটি নব্য ইসলামে প্রবেশকারী গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত মুসলিমদের হতে আলোচনাটি উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং উম্মাহর মাঝে তিনটি গোষ্ঠী তিনভাবে আলোচনাটি চলমান রাখে। যেমন: আহলুস সুন্নাহ তথা আশ’আরি, আল জাবরিয়াহ ও আল মু’তাজিলা। জাবরিয়্যাহগণ দাবী করেন মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে পরাধীন, মানুষের উদাহরন ঠিক সেরকম যেরকম একটি পাখির পালক বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তার কোন নিজস্ব স্বাধীনতা নেই, বাতাস তাকে যেদিকে নেয়, সেদিকেই ভেসে যায়। অপরদিকে, মু’তাজিলারা দাবি করে, মানুষ তার কাজ ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন, কারণ আল্লাহ হচ্ছেন আল-আদিল (ন্যায়পরায়ণ)। সুতরাং, তিনি যদি মানুষকে জোর করে সবকিছু করিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে তা যুলুম হয়, সুতরাং, মানুষ স্বাধীনভাবে সবকিছু করে এবং সে তার কাজের ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। এ দুই চিন্তার মাঝে সমাধান করার জন্য অপর এক চিন্তার উদ্ভব হয়, তারা নিজেদের আহলুস সুন্নাহ বলতো, তাদেরকে আল-আশআরীও ডাকা হয়। তারা বলেন মানুষ কেবল চিন্তার ক্ষেত্রে স্বাধীন, সে চিন্তা করলে আল্লাহ তাদের কাজ সৃষ্টি করে দেন, এভাবে স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে মানুষ তার কর্ম কামাই (কাসব ইখতিয়ারি) করে এবং তার জন্য জবাবদিহী করবে। এ তিন গোষ্ঠীই তাদের চিন্তা গায়েব সংক্রান্ত কুরআন ও সুন্নাহর দলীল দিয়ে করছিল।
প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, আমাদের সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ জ্ঞান দ্বারা গায়েবের বিষয় তথা আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে জানা অসম্ভব। আল্লাহ’র সৃষ্টির রহস্য, তিনি কিভাবে সবকিছু জানেন এবং তা লাওহে মাজফুযে লিখে রেখেছেন, তিনি কিভাবে ইচ্ছা করেন এবং তা কিভাবে মানুষের উপর কাজ করে এই বিষয়গুলো সবই মানুষের চিন্তার সীমার বাইরে। মানুষ তার বুদ্ধিবৃত্তি খাটিয়ে এসব বিষয়ের গুঢ় রহস্যভেদ করতে অক্ষম। যেহেতু আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগ দ্বারা বুঝা অসম্ভব, তাই একে শুধুমাত্র আমাদের বিশ্বাসের অংশই করা যায়। আমাদের দৈনন্দিন সকল কাজের ক্ষেত্রে প্রধানত বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন অথবা আল্লাহ’র দেওয়া শাস্তি অথবা পুরষ্কার। অর্থাৎ একটি কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষ চিন্তা করবে এ কাজে কি আল্লাহর পুরস্কার রয়েছে? যদি থাকে, তবে সে কাজটি করতে ধাবিত হবে। আর যদি কাজটিতে শাস্তি থাকে তাহলে সে কাজটি হতে বিরত থাকবে। এর বাইরে অন্য কোনো ভিত্তিতে সে চিন্তা করবে না। গায়েবের অচিন্তনীয় বিষয়াদিকে দুনিয়াবী বাস্তবতার উপর যৌক্তিকভাবে (logically) প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকতে হবে এবং এ দুয়ের মাঝে মোটা দেয়ালের ব্যবধান রাখতে হবে।
এই মহাবিশ্বে যত ঘটনা ও কাজ হয় তা প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায় মানুষ দুটো বলয় বা প্রেক্ষাপটের মাঝে অবস্থান করে। একটি বলয়কে সে নিয়ন্ত্রন করে, আর অপর বলয়ে তার নিয়ন্ত্রন থাকে না। মহাবিশ্বে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, যেমন, সূর্য উদয় এবং অস্ত যাওয়া, সূর্যের চারিপার্শ্বে গ্রহের আবর্তন, মানুষের জন্ম-মৃত্যু, মানুষ সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া, প্রাকৃতিক দূর্যোগসমূহ ইত্যাদি কাজগুলো সংঘটনের ক্ষেত্রে মানুষের কোন চুড়ান্ত নিয়ন্ত্রন নেই এবং এই কাজগুলো মহাবিশ্বের নিয়মের অধীন। এই কাজগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়। আবার, কিছু ঘটনা রয়েছে যা মানুষ সূচনা করে, কিন্তু, পরে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। যেমন: সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একজন মানুষ পা পিছলে পড়া, হাত থেকে মোবাইল নিচে পড়ে যাওয়া, আপেল কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলা, পানি পান করতে গিয়ে নাকে পানি উঠে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলা, লক্ষস্থির করে কোনো কিছু নিক্ষেপ করার পর তা লক্ষচ্যুত হওয়া, কোনো দেয়ালের উপর দিয়ে হেটে চলার সময় পিছল খেয়ে নিচে কোনো কিছুর উপর পরা ইত্যাদি ঘটনাগুলো মানুষ দ্বারাই ঘটে; কিন্তু তা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। এই ঘটনাগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয় এবং এগুলো মহাবিশ্বের কোন নিয়মের মধ্যে পড়ে না।
উপরের ঘটনাগুলোকে বিবেচনা করলেই সহজে বুঝতে পারি, কোন কাজগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রনের বাইরে তথা আল্লাহ দ্বারা নির্দিষ্ট। সুতরাং, যে বলয়ে সংঘটিত ঘটনার ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব নেই, সে বলয়ের ঘটনাগুলোকে ক্বাদা বলা হয়, এবং এসব ক্বাদা – ভালো কিংবা মন্দ হোক – আল্লাহ পক্ষ হতে এবং এসব সিদ্ধান্ত আল্লাহর সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই বলয়ে সংঘটিত কাজের জন্য তাকে আল্লাহর মুখোমুখি হতে হবে না অর্থাৎ কোন শাস্তি পাবে না। এসব বাস্তবতার বাইরে কুরআন সুন্নাহ হতেও আমরা বেশ কিছু ক্বাদার উদাহরণ পাই, যেমন, রিযক এর পরিমান নির্ধারিত, মানুষ যেহেতু জানে না কত পরিমান নির্ধারিত, তাই সে চেষ্টা করে এটি কামাই বা বেশি পাবার জন্য, কিন্তু সে ততটুকুই রিযক অর্জন করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই দিনের শেষে কম পেয়েছে মনে করে তার হতাশার কোনো কারণ নেই। এছাড়াও, আল্লাহর পথে, ইসলামের দিকে সমাজকে আহ্বান করার সময় আল্লাহর পথে জেল, যুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়াও এক প্রকার ক্বাদা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। সুতরাং, ক্বাদা তা আপাত দৃষ্টিতে ভালো মনে হোক কিংবা মন্দ মনে হোক, তা আল্লাহর পক্ষ হতে আসা সিদ্ধান্ত এবং এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অসহিষ্ণু না হয়াই বাঞ্ছনীয়।
এ গেল যে বলয়ে মানুষের কোনে নিয়ন্ত্রন নেই। এখন, যে বলয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রন রয়েছে অর্থাৎ, মানুষ কোন ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং কোন ক্ষেত্রে পরাধীন তা সহজেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বোঝা যায়। মানুষের তার জীবিকা কিভাবে আহরণ করবে, এ ক্ষেত্রে সে কি ঘুষ, চুরি, ডাকাতি করবে নাকি ব্যবসা, চাকরি ইত্যাদি দিয়ে করবে; সে কী খাবে বা সে কী খাবে না, তা তার ইচ্ছাশক্তির সাথে সম্পর্কিত। এতে তার সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। এগুলো করার ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এছাড়াও সে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে কি করবেনা, তাও তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সাথে সম্পর্কিত। এ বলয়ে সংগঠিত কাজের ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব রয়েছে এবং সেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া বিধান অনুযায়ী করলে পুরস্কৃত হবে আর না করলে শাস্তির মুখোমুখি হবে।
এক্ষেত্রে অনেকেই একটি বিভ্রান্তিতে থাকেন। অনেকে শরীআহ তথা হালাল-হারাম বহির্ভুত সেকুলার জীবনপ্রণালীতে অভ্যস্ত থাকায় মনে করেন, তারা যা করছেন তার বাইরে যাওয়াটি অসম্ভব, তারা এভাবেই সৃষ্ট। কেউ কেউ মনে করেন, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রবৃত্তিকে সৃষ্টি করেন, এবং চাইলে এ প্রবৃত্তিকে দমন করা সম্ভব। আবার কেউ কেউ মনে করে নির্দিষ্ট কিছু বস্তুর বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট কিছু ফলাফল বা বিবর্তন বয়ে আনে, এতে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে তারা বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তির প্রবৃত্তি সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এক্ষেত্রে ক্বদর এর আলোচনা চলে আসে। ক্বদর শব্দের অর্থ হল বৈশিষ্ট্য। এই মহাবিশ্বে মানুষ ও বস্তু সমূহের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুনাগুন রয়েছে। যেমন: পাতার রং সবুজ, সূর্যের তাপ, পানির স্বাদ ও রং, ছুরির ধার, আগুনের তাপ, লবনের স্বাদ, চিনির স্বাদ মিষ্টি ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয়। এছাড়া মানুষের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য দেয়া আছে, যেমন: প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদাসমূহ ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেন। প্রবৃত্তিগুলো মানুষের মাঝে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়, যেমন, যৌনাকাংখা, আবেগ, লোভ, ক্ষমতার লিপ্সা, বাড়ি গাড়ির আকাঙ্ক্ষা, সন্তান, বাবা, মা ও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি। জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাদ্য খাওয়া, ঘুমানো, পানি পান করা, নিশ্বাস নেয়া ইত্যাদি। বস্তু ও ব্যক্তির মাঝে এ বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার ক্ষেত্রে মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই এবং এগুলোকে দমন বা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে মানুষের কোনো সক্ষমতা নেই, বরং এগুলো আল্লাহর দ্বারা নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য। তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই সকল বৈশিষ্ট্য দ্বারা কখনো মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বাধ্য করেন না। যেমন: যৌনাকাংখা কখনো মানুষকে তা পূরণে বাধ্য করে না কিংবা ব্যক্তি তা পূরণ করলেও কোনো নির্দিষ্টভাবে পূরণ করতে সে বাধ্য না। মানুষ তার ইচ্ছাশক্তি দ্বারাই তা কোনো এক পন্থায় তা পূরণ করে। এই সকল বৈশিষ্ট্যকে মানুষ ভালো কাজে ব্যবহার করলে অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে ব্যবহার করলে পুরস্কার পাবে, আর ভুল কাজে ব্যবহার করলে শাস্তি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, ছুরির ধার আল্লাহর দেয়া, এ ছুড়ি দিয়ে মানুষের ক্ষতি হতে পারে, আবার এ ছুড়ি দিয়ে মানুষ কল্যাণকর কাজও করতে পারে। এখন যে আল্লাহর বিধান অমান্য করে এ ছুড়ি দিয়ে অকল্যাণকর কাজ করবে, সে তার জন্য গুনাহগার হবে, আবার যে তা দিয়ে কল্যাণকর কাজ করবে, সে তার জন্য পুরস্কৃত হবে। আবার, যৌনাকাংখা মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তির একটি প্রকাশ। এখন ব্যক্তি চাইলে তার প্রবৃত্তির এ তাড়না দিয়ে আল্লাহর হুকম অমান্য করে যেনায় লিপ্ত হতে পারে, আবার আল্লাহর হুকম অনুযায়ী বিয়ের মাধ্যমে তা পূরণ করতে পারে। প্রবৃত্তি এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ, প্রবৃত্তি মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি দিয়ে তা পূরণ করতে বলে না, বরং মানুষ নিজেই তার স্বাধীন ইচ্ছা খাটিয়ে একটি জীবনপদ্ধতি অনুযায়ী চলে। অনেকে একটি জীবনপদ্ধতিতে লম্বা সময় ধরে চলা কারণে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, এবং অন্য জীবনপদ্ধতিতে যাওয়াটিতে কষ্টকর মনে করেন। কিন্তু কোনো কিছু কষ্টকর হওয়া মানে তা অসম্ভব তা নয় কিংবা এ পথে তাকে তার প্রবৃত্তি বাধ্য করছে, তাও নয়। বরং, দৃঢ় প্রত্যয় অবলম্বন করে নতুন জীবনপদ্ধতিতে চলতে শুরু করলেই তা এক সময় সহজতর হয়ে যায়।
এ আলোচনা থেকে বোঝা গেল, আল-ক্বাদা ওয়াল ক্বদরের ঐতিহাসিক আলোচনার সাথে মানুষের কাজের কোনোই সম্পর্ক নেই। কুরআন, সুন্নাহর গায়েবি বিষয়াদি ও যুক্তির মাধ্যমে মানুষ স্বাধীন কি স্বাধীন না – এটি একটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক। বরং মানুষের কাজ করবার ভিত্তি হলো কাজটির মাঝে আল্লাহর তরফ হতে পুরস্কার না শাস্তি রয়েছে। আর জীবনের কোন ক্ষেত্রে মানুষ স্বাধীন বা পরাধীন – তা সে তার বুদ্ধিবৃত্তি খাটালেই বুঝতে পারবে। এই হলো আল-ক্বাদা ওয়াল ক্বদরের আলোচনা। যে আলোচনা উপলব্ধি করলে একজন মুসলিম সকল হতাশা, অদৃষ্টবাদ ঝেড়ে ফেলে ধাবিত হবে আল্লাহর পুরস্কার পাবার জন্য ও তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য। এ আলোচনা একটি সমাজকে কর্মবিমুখতা হতে বের করে পুনর্জাগরণের দিকে নিয়ে যাবে। সে সমাজে একজন মুসলিম তার সকল কাজ, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সকল সময় সতর্ক থাকবে। সে তার সকল কাজগুলোকে অতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে পালন করবে এবং এর বাইরে আরো কল্যাণকর কাজের দিকে ধাবিত হবে। সফল হলে সে শুকরিয়া আদায় করবে এবং বিফল হলে ধৈর্য্যধারণ করবে। যে কোন আপতিত ক্বাদা বা বিপদে তিনি ধৈর্য্যধারণ করবেন। কারণ সকল ভাল ও মন্দ বিপদ-আপদ আসে আল্লাহর পক্ষ হতে, আর মুমিনের দায়িত্ব হল আল্লাহর বিধান মেনে কাজটি সঠিক ভাবে করার চেষ্টা করা এবং ফলাফলের উপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। সে আখিরাতের শাস্তির ব্যাপারে ভীত থাকবে এবং পুরস্কারের আশায় থাকবে। এবং এর চাইতেও উত্তম বিষয় তার চুড়ান্ত আকাংক্ষায় থাকবে, আর তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিদওয়ান আল্লাহ)।
পুঁজিবাদের অলীক সুখ-স্বপ্ন

Capitalism তথা পুঁজিবাদ সুখের ডেফিনেশন দেয় consumerism তথা ভোগবাদের মাধ্যমে। ইন্দ্রিয়গত পরিতৃপ্তি সর্বোচ্চ বস্তুগত ভোগে, সবচেয়ে বেশি stuffs আর gadgets এর প্রাপ্তিতেই আমাদের সুখের definition খুঁজে ফেরা, এটা পশ্চিম পেয়েছে গ্রীক রোমানদের উত্তরসূরি হিসেবে।
কিন্তু এখন জীবন সম্বন্ধে এই concepts গুলো আইডোলজিকাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে, ইন্টেলেকচুয়ালি সব জায়গায় ডমিনেট করছে। দিনশেষে সবই যা খুশি তাই করার, ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মাঝেই জীবনের অর্থ খুজে নেওয়ার তাগিদ দেয়। এই পশ্চিমা ওয়ার্ল্ডভিউয়ের কারণে আমরা পেয়েছি একটা ডিপ্রেসড সিভিলাইজেশন।যারা অর্থপূর্ন কোন কিছুর দিকে ছুটছে না, বরঞ্চ অলীক সুখের ঘূর্নিপাকে পড়ে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারের ভাঙনে, আত্মহত্যা নয়তো মানসিক বিকারে। হারিয়ে যাচ্ছে ড্রাগে, হারিয়ে যাচ্ছে ফুলানো ফাপানো স্ট্যাটাস, সৌন্দর্য, অর্থের শো অফের অলিগলিতে।
Capitalism এ তাই ব্যাবসায়ীরা মানুষের ‘অপূর্নতা’ নিয়ে ব্যাবসা করে। তাদের “পন্য” ভোগ করলেই আপনি “পূর্নতা” পাবেন। আইফোন ইউজ করলেই আপনি এমপাওয়ার্ড হবেন, হবেন ফ্রি। হবেন হ্যাপি। কেএফসিই ‘হ্যাপি মিল’ দেবে। আপনার দাগেভরা চেহারা আপনার অপূর্নতা। গার্নিয়ার নাহলে নিভিয়া ক্রিম লাগবেই। একটা পিম্পলের জন্যে তারা আপনাকে ঘুমোতে দেবে না। একটা ভুড়িওয়ালা পেট, অনাকর্ষনীয়। সিক্স প্যাক, ছাড়াও লাগবে নামী বেনামী ডাইট প্রডাক্টস। পূর্নতাই সুখ, পার্ফেক্টনেস। আর মানুষ এভাবেই বস্তুগত চাহিদার পেছনে তার সুখের ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। এক অসম অবাস্তব প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এভাবে তার অপূর্নতাও কক্ষনও ঘোচে না, আর অতৃপ্তি থেকে যায়।
বনী আদম চাহিদার সাথে সুখকে বেধে ফেললেই সুখ আর কখনই পাওয়া সম্ভব না। কারণ তাকে এক সোনার পাহাড় দিলে আরেকটা সোনার পাহাড় চাইবে। পূর্নতা নিয়ে কেউ জন্মায় না, কেউ পূর্নতা নিয়ে মরতেও পারে না। চাহিদার পূর্নতা সারা জীবনেও মানুষ পেতে পারে না। দুনিয়ার সকল সম্পদ কাজে লাগিয়েও।
এইজন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَوْ كَانَ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى ثَالِثًا، وَلاَ يَمْلأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ ‘
” যদি আদম সন্তানের দুটি উপত্যকাপূর্ণ ধনসম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া লোভী আদম সন্তানের পেট ভরবে না। অবশ্য যে ব্যাক্তি তওবা করবে আল্লাহ তা আলা তার তওবা কবুল করবেন।” [বুখারী, হাদিস নং ৫৯৯৩]
পুঁজিবাদ মানুষের এই বাস্তবতাটাই ধরতে ব্যর্থ। তাই “সুখ” অধরাই থেকে যায়, সোনার হরিন হয়ে।
যারা দুনিয়ার বস্তুগত প্রাচুর্য আর সুখের দাসত্ববরন করে, এবং এসকল বিষয়ে মত্ত থেকে আখিরাতের চিরন্তন জীবনকে অবহেলা করে, দুনিয়ায় নিজের সুখ ও আনন্দের পূর্নতা কামনা করে মিথ্যা আশায় বুক বাধে তাদের অবিসম্ভাবী ধ্বংসের ঘোষনা এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা) এর মুখ থেকেই,تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَمِ وَالْقَطِيفَةِ وَالْخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ
” দিনার, দিরহাম, রেশমী চাঁদর (শাল), পশমী কাপড়ের (চাদর) গোলামরা ধ্বংস হোক। যাদের এসব দেয়া হলে সন্তুষ্ট থাকে আর দেয়া না হলে অসন্তুষ্ট হয়।” [বুখারী ৫৯৯২]
এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাও তার নবীকে আদেশ করছেন,
ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ
” তাদেরকে ছেড়ে দাও তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং (মিথ্যা) আশা ওদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখুক, পরিণামে তারা বুঝবে।” [হিজর ৩]মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের সকল ভোগ ও আনন্দের অবসান ঘটবে। যা তাদের চিরন্তন এক জীবনের সামনে দাড় করিয়ে দিবে, যেখানে তাদের দিনার দিরহাম কোন কাজেই আসবে না। সুখ পার্থিব কোন বিষয় নয়। পার্থিব চাওয়া পাওয়ার সমীকরন সুখ নয়। সৃষ্টিকর্তার সাথে নাড়ছেড়া জীবন-দর্শন কখনই সুখের খোজ দিতে পারবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই দুনিয়ার শত অপ্রাপ্তি নিয়েও সুখী হওয়া সম্ভব হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে আখিরাতেই মানুষ ‘পূর্নতা’ লাভ করবে।
قَالَ اللَّهُ هَٰذَا يَوْمُ يَنفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ ۚ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
”আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্যে রয়েছে– উদ্যান; যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত হবে; তারা তাতে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এটিই মহান সফলতা।” [সূরা মায়িদা, আয়াত: ১১৯]
আবু ই’য়ালা
খিলাফত একমাত্র সমাধান

জুলুমের শাসন আমাদের কন্ঠ পুরোপুরি রোধ করার আগেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরুন, যা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে।
বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার অপরাধ ছিল সে ফেসবুকে ভারতের সাথে পানিবন্টন চুক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিয়েছিল। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
এই ঘটনা আজ নতুন ঘটছে না, অতীতেও আমরা অসংখ্যবার এই একই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। দেশবাসী দেখেছে কীভাবে বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকরেরও পরিণতি হয়েছিল একইরকম।
এরকম এক একটা ঘটনা ঘটে আর আমরা প্রচন্ড ক্রোধে মাঠে রাস্তায় নেমে আসি খুনীর বিচার চাওয়ার জন্যে, তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য পুরো দেশ যেন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের বিক্ষোভের মুখে সরকার চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য কয়েকজনকে গ্রেফতার করে, তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। লোকজন ভুলে যায় কী ঘটেছিল।
আবার নতুন করে আরেকটা ঘটনা ঘটে এবং আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি আর জোর দাবি তুলি হত্যাকারীদের বিচার করার জন্য।
এভাবেই ঘটে আসছে আজ দিনের পর দিন। আমরা কেউ সমস্যার উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভাবি না, শুধু শাখা-প্রশাখা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি, তাহলে দেখব; এই সমস্যার মূলে রয়েছে এই মানবরচিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জুলুমের শাসন, যা মানুষকে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সরকারকে যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার দিয়ে দিয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে, তার টুঁটি চেপে ধরা হয়। তাকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়, নয়ত গ্রেফতার করা হয়।
সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত না এই জুলুমের শাসনের অবসান ঘটানো হচ্ছে, একে পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হচ্ছে – ততক্ষণ পর্যন্ত এসব ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে এবং আমরাও আমাদের শক্তি খরচ করে মাঠে-ঘাটে চেঁচিয়ে যাব, কিন্তু সমাধান হবে না। কারণ এই জুলুমের শাসন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।
এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী বাস্তবায়িত সেই খিলাফত রাষ্ট্র যেখানে খলীফা সকল জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য দায়বদ্ধ থাকেন। এই খিলাফত রাষ্ট্রের ২য় খলীফা হযরত ওমর(রা) যখন বলেছিলেন, “আমি যদি কুর’আন সুন্নাহ’র বাইরে অন্যকিছু দিয়ে শাসন করি তবে তোমরা কি করবে? জবাবে তাকে বলা হয়েছিল, এই তরবারী দিয়ে আপনাকে সোজা করে দেওয়া হবে।“
একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সাধারণ এক নাগরিক এইভাবে জবাবদিহিতা করতে পারে বা তার মত পরিষ্কার ভাষায় বলতে পারে শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রেই। এই গণতান্ত্রিক জুলুমের রাষ্ট্রে নয়।
সুতরাং আসুন, আমরা সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি, যা আমাদেরকে আমাদের মতামত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার মতো সুযোগ করে দেবে।
























