Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • শীতের যুদ্ধ ও গনীমত

    শীতের যুদ্ধ ও গনীমত

    গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে শীতকাল একটি অল্প সময়ের বিষয় এবং এ সময়কালে যেমন কিছু সহজ বাস্তবতা রয়েছে তেমনি রয়েছে কিছু কষ্টসাধ্য বাস্তবতা। বিশেষ করে ঈমানদারদের এ সময়ে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন, সালাতের সময়ে পরিবর্তন। রাত গড়াতে শুরু করলে ঈশার সালাত পড়া অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, একইভাবে ঘুম থেকে উঠে ফজর সালাত পড়াও অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়। আবার, জোহর, আসর ও মাগরিবের সালাতের মাঝের ব্যবধান এতই কমে আসে যে একটু দেরি করলেই অনেকের জন্য সালাত কাযা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর বাইরে শীতের তীব্রতায় ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল কিংবা ওযু করাটিও কষ্টকর কাজ।

    তবে লড়াই যত কঠিন, এর পুরস্কারও তেমন ব্যাপক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিনটি আমল পাপ মোচন করে—সংকটকালীন দান, গ্রীষ্মের রোজা ও শীতের অজু।’ (আদ দোয়া লিত তাবরানি: ১৪১৪)। উমর (রা.) তাঁর ছেলের উদ্দেশে বলেন, ‘শীতের দিনে ভালোভাবে অজু করা বড় গুরুত্বপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ।’ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা বলব না! যা দ্বারা গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি হয়?’ সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ‘মন না চাইলেও অজু করা, অধিক পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করা।’ (মুসলিম)।

    একইভাবে শীতকালের সকাল, সন্ধ্যা কিংবা রাত্রিতে একজন ঈমানদার আল্লাহর দ্বীনের জন্য, দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য, ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকলক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করার দাবির যে সুমহান দাওয়াত তা পৌঁছিয়ে দেওয়ার স্বার্থে যেকোনো দৌড়ঝাপ তথা যেকোনো কষ্টসাধ্য কাজই করুক না কেন তার পুরস্কারও ঠিক সেরকমই বিশাল হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সকল কাজ পর্যবেক্ষন করেন।

    আবার যদি মুদ্রার অপর পিঠে আসি তবে শীতের কিছু সহজ বাস্তবতায়ও রয়েছে। তবে এ বাস্তবতা কি ঈমানদারের প্রয়োজন নাকি প্রয়োজন ছাড়াই বাড়তি প্রাপ্তি?

    উমর (রা) বলতেন:

    الشتاء غنيمة العابدين

    [আশ-শিতা-উ গনীমাতুল ’আ-বিদীন]

    “শীতকাল ইবাদতকারীদের জন্য গনীমতসরূপ”

    যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে আরবীতে গনীমত বলা হয়। গনীমত একজন ঈমানদার সৈনিকের জন্য অতিরিক্ত প্রাপ্তি। একে আনফালও বলা হয়ে থাকে (যা নফল বা অতিরিক্ত থেকে এসেছে) অর্থাৎ, এটি অতিরিক্ত প্রাপ্তি। ঈমানদার গনীমতের জন্য যুদ্ধ করে না। বরং ঈমানদার লড়াই করে ইসলামের পতাকাকে তুলে ধরার জন্য, আল্লাহর কালিমাকে সুউচ্চ করার জন্য, এবং এর বদলে সে আখিরাতের পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষা করে, বৈষয়িক ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তি সে আশা করে না। সুতরাং, একজন মুমিনের জন্য গনীমত অতিরিক্ত প্রাপ্তি বৈ আর কিছু নয়।

    যথার্থই, শীতকালে রাতগুলো দীর্ঘ ও দিনগুলো ছোট এবং রাতে কিয়াম করা খুবই সহজতর। যেহেতু রাত দীর্ঘ, কিছুটা ঘুমিয়েও কিয়াম উল-লাইল করা যায়। আর যারা ঘুমোতে চান না তাদের জন্য কিয়াম করার জন্য রয়েছে রাতের দীর্ঘ সময়।

    এছাড়াও, দিনগুলো ছোট, তাই সিয়াম পালন করা সহজতর। অল্প সময়কাল রোজা রেখেও একজন পুরো একটি রোজার আজর বা পুরষ্কার পায়।

    একজন খুশূ’প্রাপ্ত ঈমানদারের জন্য গ্রীষ্মকালের রাতে সালাত আদায় করা কঠিন কিছু নয়, যদিওবা রাত্রিগুলোর ব্যপ্তি ছোট এবং ঘুমের সময় অল্প। একজন বিশ্বাসী ঠিকই তার সময় বের করে নেয়। একইভাবে, একজন ঈমানদারের জন্য গ্রীষ্মকালের দীর্ঘ ও উত্তপ্ত দিনগুলোয় রোজা রাখা গুরুতর কিছু নয়। মু’আজ বিন জাবাল (রা) বলতেন: ’হে আল্লাহ আমি এই জন্য বেঁচে থাকতে চাই না যে আমি দুনিয়া চাই। বরং আমি এই জন্য বেচে থাকতে চাই যাতে আমি গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিনগুলোতে রোজা রাখতে পারি এবং শীতের দীর্ঘ রাতগুলোতে কিয়াম করতে পারি।’ শীতকাল আগমন করলে উবাঈদ বিন উমাঈর (রা.) বলতেন, ‘হে কুরআনের ধারক! তোমাদের রাতগুলো তিলাওয়াতের জন্য প্রলম্বিত করা হয়েছে, অতএব তা পড়তে থাকো। আর রোজা রাখার জন্য তোমাদের দিনগুলো সংক্ষেপিত করা হয়েছে, তাই বেশি বেশি রোজা রাখো।’

    এসবকিছুর পাশাপাশি, শীতকাল একজন আল্লাহর পথে দায়ীর জন্য দাওয়া করার জন্য একটি সুবর্ণ সময়। যদিও শীত-গ্রীষ্ম সকল ঋতুতেই একজন দায়ী ইসলামী আদর্শের দাওয়াত নিয়ে সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে আহ্বানে ব্যস্ত থাকে। তবে, শীতকালে আবহাওয়া শীতল ও রাত দীর্ঘ হবার কারণে মানুষ দীর্ঘ সময় বাইরে থাকে, বিভিন্ন লোক-সমাগমের স্থান, যেমন, মাঠ-ময়দান, রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকানগুলো সরগরম থাকে, মানুষ আড্ডা দেয়, বন্ধু-বান্ধব পরিচিতদের সাথে সময় কাটায়। তাই যেকোনো বিষয়বস্তু নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করার অবকাশ থাকে। তাই একজন দা’ঈ শীতের অল্প কয়েক মাসে অনেক মানুষকে দাওয়া করার সুযোগ পায় এবং এভাবে অল্প সময়ে অনেক বেশি পুরষ্কার অর্জন করতে পারে।

    সুতরাং, যদিও শীতকালের সহজতর অংশটুকু প্রকৃত ঈমানদারের জন্য কোনো চাহিদাপূরণ নয়, এরপরও একজন ঈমানদারের জন্য শীতকাল এক প্রকারের বোনাস যেখানে অল্প পরিশ্রমে বেশি পুরস্কার অর্জন করা যায়। এবং একজন প্রকৃত ঈমানদার এ সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করবে না, হেলায় হারাবে না।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ

    কিন্তু যে কেউ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ভালো কাজ করে, সেটি তার জন্য ভালো। [বাকারাহ: ১৮৪]

    كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ، وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ

    তারা রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটায়, আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকে। [সুরা জারিয়াত: ১৭-১৮]

    وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ

    ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে। নিশ্চয় তা যথেষ্ট কঠিন কেবলমাত্র তাদের ছাড়া যারা বিনয়ী (খুশু’প্রাপ্ত) [বাকারাহ: ৪৫]

    وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا

    আর যারা রাত্রি কাটিয়ে দেয় তাদের পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত ও দন্ডায়মান হয়ে [ফুরকান: ৬৪]

    وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ

    আর যদি রোজা রাখ, তবে তা তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার [বাকারাহ: ১৮৪]

  • পুনর্জাগরণের পথে বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিই একমাত্র সঠিক চিন্তা পদ্ধতি

    পুনর্জাগরণের পথে বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিই একমাত্র সঠিক চিন্তা পদ্ধতি

    মুসলিমদের মাঝে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি এবং ফলশ্রুতিতে সঠিক ইসলামী চিন্তা না থাকার ফলে ‘জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে’ মুসলিম মননে বেশ কিছু ভুল চিন্তা পদ্ধতি স্থান করে নিয়েছে। এ ধারা বেশ আগে থেকেই হয়ে রয়েছে, তবে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এখন তা দ্রুত সারফেসে উঠে আসছে। ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য মুসলিম। এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। তবে আমরা সংক্ষেপে কয়েকটি বিপথগামি চিন্তা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করবো ইন শা আল্লাহ।

    ১) আবেগি চিন্তা পদ্ধতি

    এ ধরনের চিন্তায় মানুষ গভীর চিন্তা খাটিয়ে সমাধানে আসে না। বরং আবেগকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। উপরিতলের চিন্তায় আবেগীভাবে মশগুল থাকাটাই এ চিন্তার বৈশিষ্ট্য। এ ধরণের চিন্তায় মানুষ ‘সেভিয়র’ তথা ‘ত্রাণকর্তা’ খুঁজে বা কাউকে ত্রাণকর্তা হিসেবে গ্রহণ করে। যেহেতু চিন্তা করে সমাধান নেয়া এই চিন্তা পদ্ধতিতে দুষ্কর কাজ তাই মানুষ তার জীবনের বড় সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য সবসময় ত্রাণকর্তা খুঁজে বেড়ায়। দুর্ভাগ্যবশত, অধিকাংশ সাধারন খেটে খাওয়া মানুষই এ চিন্তা পদ্ধতি অনুসরণ করে। এটি তাদের যতটা না দোষ, তার চেয়ে বেশি করুণ বাস্তবতা।ইমাম মাহদী এসে সব সমস্যার সমাধান করবেন – এ ক্যাটাগরির চিন্তায় মানুষ এই আকাঙ্ক্ষায় বিভোর থাকতে পুলকিত বোধ করে।

    ২) প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা পদ্ধতি

    এ ধরণের চিন্তা অনেক আবেগী চিন্তার মতোই, তবে প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় সল্প মেয়াদে বেশি আবেগী। এ চিন্তায় মানুষ কোনো বড় দুর্যোগ বা প্রেক্ষাপট তৈরি হলেই প্রতিক্রিয়া দেখায়, এর বাইরে সে তার গথবাধা জীবন পরিচালনা করে। এরাও চিন্তার দিক বিবেচনায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। ‘শক’ তাদের সল্প মেয়াদে কিছুটা চিন্তাশীল করে, কিন্ত তা ক্রমেই ক্ষীন হয়ে যায়। সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ হতে উচ্চ মধ্যবিত্ত পর্যন্ত যেকোনো লেয়ারেই এই ধরণের মানুষ থাকতে পারে। এদের মধ্যে অনেকসময় তীব্র আবেগ দেখা যায় আবার কখনো দেখা যায় পরাজিত মানসিকতা।

    উপরের দুই চিন্তা পদ্ধতিতে যেহেতু চিন্তা থেকে আবেগ বেশি প্রাধান্য পায়, তাই এসব মানুষ দীর্ঘমেয়াদে কিভাবে অগ্রসর হবে, তা দেখতে পায় না, খুঁজে বের করার চেষ্টাও করতে চায় না। এদের মাঝে কেউ কেউ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আবেগ দ্বারা বেশি তাড়িত হন এবং সমাধানের জন্য নিজস্ব চেষ্টার গন্ডিতে কোনোরূপ কারণ-ফলাফলের হিসেব-নিকেষ না করে, কেবল কিছু ইবাদত-বন্দেগি তথা আচার-অনুষ্ঠানের করেই গায়েবি তথা সয়ংক্রিয় কোনো সমাধানের আশায় থাকেন।

    ৩) লজিকাল চিন্তা পদ্ধতি

    এ ধরণের চিন্তা সাধারণত সমাজের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্যমান। বৃটিশদের কেরানী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থায় পাবলিক-প্রাইভেটে পড়ে এই জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। এরা নিজেদের সমাজের অন্যান্য মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে তাই তাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত অন্যদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে ধরেই এরা চিন্তা করে। এ চিন্তায় মানুষ যতটা না বাস্তবতাকে বুঝে চিন্তা করেন, তার চেয়ে যৌক্তিক মানসিকতা নিয়ে চিন্তা করে। তারা তাদের এডুকেটেড মেন্টালিটিকে মানুষের বাস্তবতাকে বোঝার বা অনুমান/পরিমাপ করার জন্য যথেষ্ঠ মনে করে। এতে করে তারা ক্রমেই সাধারন মানুষের চিন্তা ও আবেগ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। এদের মধ্যে যারা সরাসরি ফিল্ড রিয়েলিটি ভালোভাবে বুঝে বা বুঝতে চায়, ব্যক্তি হিসেবে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ধন্য হয় সমাজে। লজিকাল শিক্ষায় শিক্ষায় শিক্ষিত হবার কারণে এরা ইসলামকেও লজিকালি নিতে চায়। ইসলামী চিন্তাকে এরা অন্ধভাবে নিলেও ইসলামের কাজকে এরা যৌক্তিকভাবে নিতে চায়, এবং যুক্তির মানদন্ডে না টিকলে তারা সে ইসলামী কাজকে হীনজ্ঞান করে এবং মেনে নিতে দ্বিধাদন্দ্ব প্রকাশ করে। আবার এদের অনেকে হাদীসে আসা অল্পবিস্তর কিয়ামতের আলামত ঘেটে, লজিকাল মাইন্ড খাটিয়ে পূণদৈঘ্য “ইসলামী শেষ জমানা” নামক চলচিত্রও তৈরি করেন, যার হিরো হচ্ছেন ঈসা (আ) ও সাইডকিক আল-মাহদী। এবং তারা তা দেখে পুলকিত বোধ করে সুখনিদ্রা যান। দুর্ভাগ্যবশতঃ উম্মাহর কল্যাণে কোনো একশন পয়েন্টে যেতে পারেন না, এবং কোনো ডিরেকশনও দিতে পারেন না। ভাগ্য গণনাকারীরা যেমন ভাগ্য গণনা করে ভবিষ্যত বলে দেন, এনারাও সুসংবাদ দেয়া ও হতাশা দূরকারী হাদীসগুলোকে ভবিষ্যত গণনার উপকরণে পরিণত করেছেন।

    এখানে উল্লেখ্য যে, আবেগী ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার মানুষদের মাঝেও ইমাম মাহদী বা ঈসা (আ)-এর এসে সমস্যা সমাধান করে দিবেন – এরূপ চিন্তা থাকতে পারে। তবে তারা এসব ব্যপারে লজিকালদের মতো জটিলভাবে চিন্তা করেন না, কেবল পরিত্রানদাতা হিসেবে এদের কল্পনা করেন এবং আবেগী কল্পনায় বিভোর হন।

    সমাজে অল্পকিছু ব্যক্তি থাকতে পারেন যাদের মাঝে তীব্র লজিকাল মাইন্ডসেট এবং তীব্র আবেগ দুটোই কার্যকর বলে মনে হয়, তবে তারা মূলত লজিকাল চিন্তা দ্বারা দিনের শেষে সিদ্ধান্ত নেন। এরা নিজেদের বস্তুগত স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে তাদের জীবনের কেন্দ্রে রেখে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেন। মানবসমাজের এরাই খুব সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক চরিত্র। তবে এরা যদি সত্যের পক্ষে একনিষ্ঠভাবে চলে আসেন, তবে তারা প্রভুত কল্যাণের উসিলাও হতে পারেন।

    ৪) বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি

    এ চিন্তা পদ্ধতি লজিকাল চিন্তা পদ্ধতিরই একটি সাবসেট তথা শাখা। এমপিরিকাল ড্যাটার উপর ভিত্তি করে এই চিন্তা করা হয়। বিজ্ঞান কোনো দৃষ্টিভংগি দেয় না, আবার কোনো নির্দিষ্ট একশন পয়েন্টও দেয় না। সর্বোচ্চ একটি পরিধি দিতে পারে। বর্তমানে পশ্চিমা সেকুলার-লিবারেল হিউম্যানিস্ট জীবনচিন্তার মানুষদের অনেকেরই সিদ্ধান্ত তারা বৈজ্ঞানিক চিন্তা দিয়ে করে। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের অনেকেই মানবজীবনের সমাধান বিজ্ঞান দিয়ে করার চেষ্ঠা করে। কিন্তু এতে তাদের সমস্যার সমাধান হয়না, পাশাপাশি তাদের এই পলিসির কারণে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর ব্যাপক চাপ পড়ে।

    ৫) ফিকহী চিন্তা পদ্ধতি

    এ ধরণের চিন্তায় মানুষ একটি ফিকহী মনস্তত্ব দ্বারা তাদের কার্যক্রম নির্ধারণ করতে চায়। কাজ করার সময় যখন প্রশ্ন করা হয় – “ভাই, কাজটাতো হালাল, সুতরাং করলে সমস্যা কোথায়”। সমস্যা এই সংকীর্ণ মনস্তত্ত্বের মাঝেই। আমাদের বোঝা প্রয়োজন, বিজ্ঞানের মতো আইনশাস্ত্র তথা ফিকহও কোনো একশন পয়েন্ট দেয়না, সর্বোচ্চ একটি সীমানা দিতে পারে। সুতরাং, এ চিন্তায় এক এক মানুষ এক এক একশন পয়েন্টে ফোকাস দিবে এবং এতে জাতিগত ঐক্য তৈরি হবার সম্ভাবনা হয়ে পরে দুরূহ। উদাহরণস্বরূপ, আপনি একটি ফুটবল ম্যাচ এর কথা চিন্তা করুন। যাকে মিডফিল্ডার হিসেবে নামানো হয়েছে, সে যদি চিরকাল আইনী বিবেচনায় চিন্তা করতে থাকে, তাহলে সে প্রয়োজন সাপেক্ষে কখনোই গোল দেবার জন্য ছুটে যাবে না, আবার প্রয়োজন সাপেক্ষে কখনোই গোল ঠেকাবার জন্য ডিফেন্সে নেমে আসবে না। আবার, যাদের দৃষ্টিভংগি ম্যাচ জেতা, তারা কোচ কাকে কোথায় দাড় করিয়েছে সে বিবেচনা না করে ম্যাচ জেতার জন্য যখন যে বাস্তবতায় যেটি করা প্রয়োজন পুরো টিম মিলে সে দৃষ্টিভংগিতে এগিয়ে যাবে। এখানে ডিসিশন থেকে দৃষ্টিভংগিই গুরুত্বপূর্ণ।—

    প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জীবন পরিচালনার প্রকৃত চিন্তার ভিত্তি হবে আমাদের আকীদা যা আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভংগি প্রদান করে, যা অন্য যেকোনো মতাদর্শ হতে পৃথক একটি সতন্ত্র মতাদর্শিক দৃষ্টিভংগিও বটে। এবং সেই দৃষ্টিভংগিই নির্ধারণ করবে আমাদের একশন পয়েন্ট কী হবে। এবং সেই জীবনযাত্রায় ফিকহ, বিজ্ঞান ও উম্মাহর আবেগ হচ্ছে কেবল এক একটি সহায়ক শক্তি। লজিকাল চিন্তাকে টুকটাক মেকানিক ট্রাবলশুটিং টাইপ কাজে সীমাবদ্ধ রেখে, ফিকহী চিন্তাকে আইন বের করার কাজে সীমাবদ্ধ রেখে এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে কেবলমাত্র বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে মানবজীবনকে বাস্তবতাকে সামনে রেখে করা “বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা” প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার মধ্যে রয়েছে সমাজের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তি।

    আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিন।

  • ইসলামে পিতৃত্বের অবস্থান (Fatherhood in Islam)

    ইসলামে পিতৃত্বের অবস্থান (Fatherhood in Islam)

    ভূমিকা: একজন মুসলিম পিতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শক্ত ভিত গড়ে দেন

    ইসলামে পিতৃত্ব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মূলত এর মাধ্যমেই মুসলিমদের বংশ-পরিচয় নির্ধারিত হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ] “তাদেরকে (সন্তানদেরকে) তোমরা তাদের পিতার পরিচয়ে সম্বোধন কর। এটাই আল্লাহ্’র দৃষ্টিতে অধিক ন্যায়সঙ্গত” [সূরা আল-আহযাব: ৫]। এই আয়াত পিতৃত্বের ভিত গড়ে দিয়েছে, যা হচ্ছে সন্তান লালন-পালনে পিতার বাধ্যবাধকতার ভিত্তি। যার মধ্যে রয়েছে সাহচর্য বা সঙ্গদান, আর্থিক ভরণপোষণ, ইসলামী চিন্তাসমূহ প্রোথিত করা, আক্বীদার প্রতি বিশ্বাস সুদৃঢ়করণ ও তাদেরকে শাসনের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল রাখা। নিঃসন্দেহে বলা যায় ইসলামে পিতার ভূমিকা শুধুমাত্র ছেলে-মেয়েদের নামকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর চেয়ে অনেক ব্যাপক।

    ইসলামী উম্মাহ্’র শিক্ষক হিসেবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ভূমিকাকে পিতার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি (সা) বলেন, إِنَّمَا أَنَا لَكُمْ بِمَنْزِلَةِ الْوَالِدِ أُعَلِّمُكُمْ “আমি যেভাবে তোমাদেরকে শিক্ষা দেই, সেই অর্থে আমি বস্তুত তোমাদের পিতার মত” [সুনানে আবু দাউদ]। আমাদের নেতা ও শিক্ষক আল্লাহ্’র রাসূল (সা) নারী ও পুরুষের পুরো একটি প্রজন্মকে অভিভাবকের মতো লালন-পালন করে তাদেরকে ইসলামের একেকটি পিলার হিসেবে তৈরি করেছেন, যাদের প্রভাব মুসলিম উম্মাহ্’র ওপর এখনও বিদ্যমান। তিনি চারজন মহিমান্বিত কন্যাকে লালন-পালন করেছেন, যারা মুসলিম উম্মাহ্’র জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। তিনি (সা) তাঁর বয়োঃজেষ্ঠ কিন্তু গরিবতম চাচার সন্তান আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে লালন-পালন করেছেন, যিনি পরবর্তী সময়ে ইসলামের চতুর্থ খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি (সা) তাঁর পালকপুত্র যায়েদ ইবনে হারিসা ও তার সন্তান উসামা বিন যায়ীদকে দ্বীনি পরিবেশে বড় করেছেন। তাঁর (সা) তত্ত্বাবধানে থাকা তরুণদের জন্য তিনি ছিলেন যত্নবান সঙ্গী ও ধৈর্যশীল শিক্ষক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলিম তরুণদেরকে ইসলামী চিন্তা দ্বারা গড়ে তুলেছেন, ইসলামী আক্বীদার প্রতি তাদের ঈমানকে সুদৃঢ় করেছেন এবং তাদেরকে প্রজ্ঞা ও সহানুভূতি দ্বারা সুশৃঙ্খল করেছেন। তাঁর (সা) তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা মুসলিম নারী ও পুরুষেরাই এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র বিধান বাস্তবায়নকারী ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে নবুয়্যতের আদলে প্রতিষ্ঠিত প্রথম খিলাফত রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। পর্যায়ক্রমে সাহাবাগণ (রা.) কর্তব্যনিষ্ঠ পিতা হিসেবে একটি আল্লাহভীরু ও সাহসী প্রজন্মকে লালন-পালন করেন; উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চারজন আব্দুল্লাহ্’র কথা, যারা ইয়াজিদের যুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শাসক কিংবা সামরিক নেতৃত্ব, স্বামী কিংবা প্রতিবেশী ইত্যাদি জীবনের সকল ক্ষেত্রেই অনুকরণীয় মানদন্ড হিসেবে অনুসরণের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের জন্য আমরা নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দৃষ্টান্তের কাছে ফিরে যাই। সুতরাং, আজকে যারা পিতা তাদের উচিত তাদের সন্তানদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা স্মরণ রাখা, কেননা বর্তমান প্রজন্ম দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্’র প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করছে। তাদের উচিত তাদের প্রত্যেকের ঘরের মধ্যে সেই শক্তিশালী ইসলামী ব্যক্তিত্বদেরকে প্রস্তুত করা যারা ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুনরায় বাস্তবায়ন করবে এবং ইসলামকে দাওয়াহ্ হিসেবে সমগ্র পৃথিবীর কাছে নিয়ে যাবে।

    পিতা তার সন্তানের যত্নবান সঙ্গী

    একদিকে পিতা যেমন সন্তানের শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতকারী, ঠিক তেমনি তিনি কোমল ও যত্নবান সহচর। স্বীয় কন্যাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন কোমল, শ্রদ্ধাশীল, যত্নশীল অভিভাবক। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ كَانَ أَشْبَهَ بِالنَّبِيِّ ﷺ كَلاَمًا وَلاَ حَدِيثًا وَلاَ جِلْسَةً مِنْ فَاطِمَةَ. وَكَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا رَآهَا قَدْ أَقْبَلَتْ رَحَّبَ بِهَا، ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا فَقَبَّلَهَا، ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِهَا فَجَاءَ بِهَا حَتَّى يُجْلِسَهَا فِي مَكَانِهِ، وَكَانَتْ إِذَا أَتَاهَا النَّبِيُّ ﷺ رَحَّبَتْ بِهِ، ثُمَّ قَامَتْ إِلَيْهِ فَقَبَّلَتْهُ‏ “কথোপকথন, বক্তব্য কিংবা আচরণে আমি ফাতিমার (রা.) তুলনায় এমন কাউকে দেখিনি যে কিনা আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফাতিমা (রা.) যখন আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর কাছে আসতেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে সালাম জানাতেন, তার সম্মানে উঠে দাঁড়াতেন, তার কপালে চুমু খেতেন এবং তার হাত ধরে টেনে নিয়ে তার নিজের আসনে বসাতেন। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফাতিমার ঘরে বেড়াতে যেতেন তখন ফাতিমা অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্’কে সালাম জানাতেন, তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়াতেন এবং তাঁর কপালে চুমু খেতেন।” [আল-আদাবুল মুফরাদ]।

    আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, কতিপয় বেদুইন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাছে আসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি আপনার সন্তানদেরকে চুমু খান?” তিনি (সা) বললেন, “হ্যাঁ।” এর প্রেক্ষিতে তারা বলল, “আল্লাহ্’র শপথ আমরা আমাদের সন্তানদের চুমু খাইনা।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “তবে আমার কিইবা করার আছে যদি আল্লাহ্ তোমাদেরকে রহমত থেকে বঞ্চিত রাখেন?” [মুসলিম]। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আল-আক্বরা বিন হাবিস দেখলেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাসান (রা.)-কে চুমু দিচ্ছেন। তখন আল-আক্বরা বললেন, “আমার দশটি সন্তান রয়েছে কিন্তু আমি কখনই তাদেরকে চুমু দেইনি,” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “যে তার সন্তানদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না, তার প্রতিও (আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে) কোন দয়া প্রদর্শন করা হবে না।” [মুসলিম]।

    উপরন্তু, ইসলামে একজন পিতাকে সন্তানদের প্রতি তার স্নেহ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সমতা নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে যেন কোন পক্ষপাত না হয়। নুমান বিন বশির (রা) বর্ণনা করেছেন, ذَهَبَ بِي أَبِي إِلَى النَّبِيِّ ﷺ يُشْهِدُهُ عَلَى شَىْءٍ أَعْطَانِيهِ فَقَالَ: أَلَكَ وَلَدٌ غَيْرُهُ‏.‏ قَالَ نَعَمْ‏.‏ وَصَفَّ بِيَدِهِ بِكَفِّهِ أَجْمَعَ كَذَا أَلاَ سَوَّيْتَ بَيْنَهُمْ “আমার পিতা আমাকে রাসূলের কাছে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে মূল্যবান কিছু একটা দিবেন যার জন্য আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে সাক্ষী হিসেবে রাখতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি আর কোন সন্তান রয়েছে? আমার পিতা বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার হাত দিয়ে আনুভূমিকভাবে ইশারা করে বললেন, তাহলে সবাইকে তুমি সমানভাবে অনুগ্রহ করছ না কেন? [আন নাসাঈ]।

    পৃথিবীতে ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিশাল দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুদের চাহিদার দিকে সবসময় একজন পিতার মত মনোযোগী থাকতেন। আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতেন। আমার একটি ছোট ভাই ছিল, যার ডাকনাম ছিল আবু উমাইর। তার একটি পোষা চড়–ই পাখি ছিল যাকে নিয়ে সে খেলা করত। একদিন পাখিটা মরে গেল। এরপর একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বেড়াতে এসে দেখলেন আবু উমাইরের মন খারাপ। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওর কি হয়েছে?” আমরা বললাম, ওর চড়–ই পাখিটা মরে গিয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ আবু উমাইরকে বললেন, “আবু উমাইর তোমার চড়–ই পাখিটার কি হয়েছিল?” (আবু দাঊদ)।

    একজন মুসলিম পিতা শিশুদের সাথে শিশুসুলভ, কিন্তু প্রয়োজনের সময় তিনি একজন দৃঢ়চেতা পুরুষ। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) বলেন, “একজন পুরুষের এই গুণটি আমাকে মোহিত করে যে, সে তার পরিবারের কাছে শিশুসুলভ কিন্তু তাকে যখন প্রয়োজনের সময় ডাকা হয় তখন তাকে সত্যিকারের পৌরুষদীপ্ত মানুষ হিসেবে পাওয়া যায়।” [সুত্র: সোয়াব আল-ইমান ৭৮৫১]। একজন পিতার পৌরুষদীপ্ততার উৎস হল তার শক্তিশালী ইসলামী চরিত্র এবং তার মর্যাদার উৎস হলো তার দ্বীন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, একজন পুরুষের ব্যক্তিত্বের মূলভিত্তি হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি, তার মর্যাদা বা সম্মান হল তার দ্বীন, তার চরিত্রের মধ্যে রয়েছে তার পৌরুষদীপ্ততা। [সুত্র: আদাব আল-দুনিয়া ওয়াল-দ্বীন ১/১৭]। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম পিতা তার সন্তানদের একজন ভালো বন্ধু হয়ে সন্তানকে খারাপ সঙ্গের ধ্বংসাত্মক প্রভাব ও নেতিবাচক উদ্দীপনা থেকে রক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ “একজন মানুষ তার বন্ধুর দ্বীন অনুসরণ করে, সুতরাং প্রত্যেককেই এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিৎ সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।” [আবু দাউদ]

    একজন মুসলিম পিতা ধৈর্যশীল ও প্রেরণাদায়ক শিক্ষক

    সন্তানকে শিক্ষাদানের সময় একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানকে তার দুর্বলতার জন্য উপহাস বা বিদ্রুপ করেন না, অভিশাপ দেন না, গালিগালাজ করেন না কিংবা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা হেয়-প্রতিপন্ন করেন না, বরং তিনি ধৈর্য্যরে সাথে তাদের সম্মান বজায় রেখে কথা বলেন, তাদের মধ্যে সম্মানবোধ জাগিয়ে তোলা ও তাদেরকে সম্মান প্রাপ্তিতে প্রবল আগ্রহপূর্ণ করে তোলেন। তিনি তাদেরকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করা এবং তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ “একজন মুমিন কাউকে উপহাস করে না, অভিসম্পাত করে না, অশ্লীল শব্দের দ্বারা আহ্বান করে না এবং কাউকে গালমন্দ করে না।” (তিরমিজি)। ওমর বিন আল-খাত্তাব (রা.) বলেন, “কোন ব্যক্তির তর্জন-গর্জন শুনে তোমরা বিমোহিত হয়ো না, বরং সে যদি তার আমানত রক্ষা করে, অন্য মানুষের সম্মানে আঘাত করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে তবেই সে একজন সত্যিকারের পুরুষ।” [আল যুহদ ওয়াল রাক্বাইক ৬৮১]।

    নিঃসন্দেহে ইসলামের বিভিন্ন যুগের প্রখ্যাত আলেমগণ মন্তব্য করেছেন যে, একজন ব্যক্তির পৌরুষের প্রমাণ হলো সে কাউকে অপমান করে না, কারো সমালোচনা করে না কিংবা কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না। ইমাম আইয়্যুব আল শাখতিয়ানী (রহ.) বলেন, “একজন পুরুষ কখনোই তার পৌরুষে পৌঁছাতে পারবে না কিংবা পৌরুষের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে দুটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে না পারে: মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং তাদের ভুলত্রুটিকে উপেক্ষা করা। ইমাম আব্দুল্লাহ্ ইবনে আল মুবারক (রহ.) বলেন, “যে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করল সে অচিরেই তার পৌরুষ হারিয়ে ফেলবে।” [সিয়ার আ‘লাম আল নুবালা ১৭/২৫১]। সাঈদ ইবন আল-আস (রহ.), যিনি একসময় মদিনার ওয়ালী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, ঘোষণা করেন, আমি যৌবনে পদার্পণ করার পর থেকে কখনো কাউকে অপমান করিনি। [আল-হিলম লি-ইবন আবি দুনিয়া, ১১৯]

    কম বয়সী সাহাবাদের শিক্ষাদানের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) যথেষ্ট ধৈর্য্য প্রদর্শন করতেন এবং তাদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসকে অক্ষুন্ন রাখতেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, خَدَمْتُ النَّبِيَّ ﷺ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ‏ وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ “আমি দীর্ঘ ১০ বছর আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে গৃহস্থালী কাজে সাহায্য করেছি। তিনি কখনোই আমার প্রতি বিরক্তিসূচক উফ্ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি কিংবা কখনোই এই বলে অভিযোগ করেননি যে, এটা কেন করেছ বা ওটা কেন করো নাই। [বুখারী]। কম বয়সী সাহাবাদের শিক্ষাদানের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের কোমল মনকে চিন্তাশীলতার দিকে উদ্বুদ্ধ করতেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ فَأُتِيَ بِجُمَّارٍ فَقَالَ ‏ إِنَّ مِنَ الشَّجَرِ شَجَرَةً مَثَلُهَا كَمَثَلِ الْمُسْلِمِ ‏‏.‏ فَأَرَدْتُ أَنْ أَقُولَ هِيَ النَّخْلَةُ، فَإِذَا أَنَا أَصْغَرُ الْقَوْمِ فَسَكَتُّ، قَالَ النَّبِيُّ ﷺ ‏ هِيَ النَّخْلَةُ “আমরা রাসুলুল্লাহ্’র সাথে ছিলাম এমন সময় কিছু তাজা খেজুর তার নিকট নিয়ে আসা হল। তিনি বললেন, গাছের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে একজন মুসলিমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তখন আমি বলতে চেয়েছিলাম এর উত্তর হলো খেজুরগাছ, কিন্তু যেহেতু আমি বয়সে সবার ছোট ছিলাম তাই চুপ করে থাকলাম। তখন রাসূল নিজেই বললেন, এর উত্তর হলো খেজুর গাছ।” [বুখারী]।

    রাসূলুল্লাহ্ (সা) শিশু-কিশোরদেরকে একজন আদর্শ পিতার মত ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করতেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা.) তার বোন উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) এর কাছ থেকে জানতে পারেন যে, তিনি (সা) হাফসা (রা.)-কে বলেছেন, إِنَّ عَبْدَ اللَّهِ رَجُلٌ صَالِحٌ لَوْ كَانَ يُكْثِرُ الصَّلاَةَ مِنَ اللَّيْلِ “আব্দুল্লাহ্ একজন ন্যায়পরায়ন ও ধার্মিক লোক, তবে সে যদি রাতে আরো বেশি সালাত আদায় করত তবে আরো ভালো হতো। [বুখারী]। আল জুহরী বলেন, “এরপর থেকে আব্দুল্লাহ্ (রা.) রাতের বেলায় বেশি করে সালাত আদায় করতেন।”

    কর্তৃত্বপ্রয়াসী মানসিকতার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তরুণ সাহাবাদেরকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করে তাদেরকে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করতেন। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ওসামা বিন যায়িদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি সেনা অভিযান প্রেরণ করেন। এরপর কেউ কেউ যখন ওসামার নেতৃত্বের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলতে লাগলো তখন রাসূলুল্লাহ্ ঘোষণা করলেন, إِنْ تَطْعُنُوا فِي إِمَارَتِهِ فَقَدْ كُنْتُمْ تَطْعُنُونَ فِي إِمَارَةِ أَبِيهِ مِنْ قَبْلُ، وَايْمُ اللَّهِ، إِنْ كَانَ لَخَلِيقًا لِلإِمَارَةِ “যদি এটা হয় যে, তোমরা ওসামার নেতৃত্বের সমালোচনা করছ, যেমনটি পূর্বে তার পিতার (যায়েদ বিন হারিসা) ব্যাপারে করেছিলে। আল্লাহ্’র কসম! তবে জেনে রাখ, সে নেতৃত্বের যোগ্য ছিল। [বুখারী]

    পিতা তার সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা ও পরিবেশে বড় করবেন

    সন্তানদের রক্ষা করতে তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত করা মুসলিম পিতার দায়িত্ব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ] “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। [আত-তাহরীম: ৬]। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “তোমরা আল্লাহ্’র আনুগত্য কর, তাঁর অবাধ্য হইও না এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ্’র আনুগত্যের আদেশ কর। তাহলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তোমাদের সকলকে একত্রে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।” আলী (রা.) বলেন, “অবশ্যই তোমরা এবং তোমাদের পরিবার সৎকাজ করবে এবং অবশ্যই পরিবারকে সঠিক পথে রাখতে শাসন করবে।” মুজাহিদ (রহ.) বলেন, “তোমরা তাকওয়া অর্জন কর এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে তাকওয়া অর্জনের আদেশ দাও।” কাতাদা (রহ.) বলেন, “তার দায়িত্ব হল আল্লাহ্’র আনুগত্যের এবং আল্লাহ্’র অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার আদেশ প্রদান করা। সে তার পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ্’র আনুগত্যের আদেশ দেয় এবং তাদেরকে আল্লাহ্’র আনুগত্য করতে সাহায্য করে। যখনই সে তাদের কারো মধ্যে আল্লাহ্’র প্রতি অবাধ্যতা লক্ষ্য করে সে তাদেরকে নিবৃত করে এবং তা করতে নিষেধ করে।

    পিতা তার সন্তানের জন্য এমন একজন শিক্ষক যিনি তার সন্তানদেরকে হালাল ও হারাম সম্পর্কে শিক্ষা দেন। সূরা তাহরীম এর ৬ নম্বর আয়াত সম্পর্কে আদ-দাহ্হাক ও মুক্বাতিল বলেন, নিকটাত্মীয়দেরকে ফরজ ও হারাম সম্পর্কে শিক্ষা দেয়াটা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক। সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব। তবে, এই দায়িত্ব তিনি নিজে সরাসরি সন্তানকে শিক্ষাদানের মাধ্যমে পালন করতে পারেন কিংবা অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগের মাধ্যমেও করতে পারেন, যিনি পিতার সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দিবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ  “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক।” [তিরমিজি]। এই বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে সকল প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের ব্যাপারে জ্ঞানার্জন; যার মধ্যে রয়েছে সালাত, সাওম, আর্থিক লেনদেন, বিপরীত লিঙ্গের সাথে সম্পর্ক এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ।

    ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর আল ফারুক (রা.)-এর কাছে একবার এক লোক তার সন্তানের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন যে, তার পুত্র তাকে সম্মান করেনা। ওমর (রা.) তার পুত্রকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কেন তোমার পিতাকে অবজ্ঞা/অসম্মান কর?” উত্তরে লোকটির ছেলে বলল, “হে আমীরুল মুমিনীন! সন্তানের কি তার পিতার উপর কোন অধিকার নেই?” ওমর (রা.) বললেন: “অবশ্যই আছে।” তখন ছেলেটি প্রশ্ন করল, “সেগুলো কি?” এর জবাবে ওমর (রা.) বললেন, “পিতা তার জন্য ভালো মা নির্বাচন করবে, তার একটি সুন্দর নাম রাখবে এবং তাকে কুর‘আন শিক্ষা দিবে।” তখন ছেলেটি বলল, “আপনি নিশ্চিত থাকেন আমার পিতা এগুলোর কোনোটিই করেনি। আমার মা একজন অগ্নি উপাসক, সে (পিতা) আমার নাম রেখেছে যুলান (যার অর্থ গুবড়েপোঁকা) এবং সে আমাকে কুর‘আন-এর একটি হরফও শিক্ষা দেয়নি। এটা শুনে ওমর (রা.) তার পিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে জনাব! তুমি তোমার ছেলের বেয়াদবির ব্যাপারে অভিযোগ করতে আমার কাছে এসেছ। তোমার পুত্র তোমার হক্ব আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার আগে তুমি নিজেই তোমার পুত্রের হক্ব আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছ। সে তোমার প্রতি অন্যায় করার পূর্বেই তুমি তার প্রতি অন্যায় করেছ।”

    অপরদিকে ওমর (রা.) পিতা হিসেবে তার নিজের ছেলে আব্দুল্লাহ্ বিন ওমর (রা.)-এর প্রতি তার হক্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একজন সাহাবা, তিনি ছিলেন একজন ফকিহ্ এবং মুসলিম সমাজের জন্য একজন শক্তিমান ও কার্যকর নেতা ও পথপ্রদর্শক। বাস্তবিক অর্থে তিনি (রা.) ছিলেন চারজন বিখ্যাত আব্দুল্লাহ্’র মধ্যে একজন যিনি আমির মুয়াবিয়াকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করেছিলেন যখন মুয়াবিয়া তার সন্তানকে পরবর্তী খলিফা হিসাবে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বলেছিলেন, “এই খিলাফত ব্যবস্থা বাইজেন্টাইন, সিজার কিংবা খসরুর রাজতন্ত্র নয় যেখানে সন্তান তার বাবার রাজত্বের উত্তরাধিকারী হয়। যদি তাই হত তাহলে আমার পিতার মৃত্যুর পর আমি খলিফার দায়িত্ব পালন করতাম। এমনকি আমার পিতা আমার নাম ৬ জন মনোনয়ন প্রার্থীর মধ্যেও রাখেননি, তিনি খিলাফতের নির্ধারিত শর্তের বাইরে অন্যকিছুকে প্রাধান্য দেননি।”

    মালিকী মাযহাবের ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে খালাফ আল-কাসিম (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছা পোষণ করে তার সন্তানকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার জন্য চক্ষু শীতলকারী হিসেবে মঞ্জুর করবেন, সে যেন সন্তানকে কুর‘আন শিক্ষাদানে ব্যয়কৃত অর্থের ব্যাপারে কৃপণ না হয়। সে যদি তার সন্তানের কুর‘আন শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করে তাহলে তা তার জন্য একটি চমৎকার নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ্। আর যে তার সন্তানকে ভালোভাবে শিক্ষাদান করবে, তার পড়াশোনার তদারকী বা অগ্রগতি সাধন করবে এবং তাকে শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করবে, তাহলে সে একটি উত্তম আমল করল এবং আশা করা যায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  তাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন।”

    পিতা তার সন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবেন

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  বলেন, [وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ] “এরই উপদেশ দিয়েছিল ইব্রাহীম তার সন্তানদের এবং একইভাবে ইয়াকুবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এ দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনও মৃত্যুবরণ করো না।” [আল-বাকারা ১৩২]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেভাবে দারুল-আরকামে কিশোর/তরুণ সাহাবাদেরকে ঈমানী চেতনায় গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে একজন মুসলিম পিতার উচিত তার সন্তানদেরকে ইসলামী আকীদার উপর অটল ঈমানের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের ঈমানের উপর ভিত্তি করে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং তাদের পূণ্যবান পিতাদের সাথে একত্রিত হবে। নিঃসন্দেহে এটি হবে মৃত্যুর সাময়িক বিরতির পর এক আনন্দঘন চিরস্থায়ী সাক্ষাৎ। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ] “যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তান-সন্ততিরাও ঈমানের ক্ষেত্রে তাদেরকে অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তান-সন্ততিকে তাদের অনুরূপ মর্যাদায় সমুন্নত করব এবং তাদের নিজেদের পুরস্কার (মর্যাদার) কোনো কমতি হবে না।” [আত তুর-২১]। ইসলাম একজন মুসলিম পিতাকে তার সন্তানের জন্য দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য সম্পদ, লেখাপড়া ও বৈষয়িক সুবিধার প্রতিযোগীতায় মশগুল হয়ে পরার তুচ্ছ স্বপ্ন দেখায় না, বরং আখিরাতের সুউচ্চ সম্মান অর্জনের লোভনীয় স্বপ্ন দেখায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ] “আর স্মরণ কর যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছিল, হে আমার পুত্র! আল্লাহ্’র ইবাদতে কাউকে শরিক করবে না, কারণ র্শিক হল সবচেয়ে বড় জুলুম। [লুকমান- ১৩]। একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ় করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন, কারণ তিনি জানেন যে সন্তানের সঠিকপথ বা হিদায়েত লাভের জন্য পিতা-মাতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ “প্রত্যেক আদম সন্তানই মুসলিম হিসেবে ভূমিষ্ঠ হয়, কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে একজন ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা অগ্নি-উপাসক বানিয়ে ফেলে। [বুখারী ও মুসলিম]।

    ইসলামের প্রতি সঠিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বর্তমানের মুসলিম পিতারা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার কারণে অনেক বড় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, যে ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত আমাদের দ্বীনের ক্ষতি সাধন করে চলেছে। ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা ধর্মকে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ধর্মবিশ্বাসের গুরুত্ব শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হয়েছে। যার ফলে, এতে অবাক হওয়ার কোনোও কারণ নেই যে পৃথিবীব্যাপী সন্দেহবাদী (agnostic) লোকের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে যারা বলে যে জীবনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এই সন্দেহবাদ (agnosticism) এর উত্থান কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি হল বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সরাসরি ফলাফল, যেগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আর তাই একজন সন্তানের মধ্যে সঠিক ঈমান প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুসলিম পিতাকে অবশ্যই একটি শক্তিশালী এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ ইসলামী শিক্ষাদান পদ্ধতির সাহায্য নিতে হবে।

    একজন মুসলিম পিতাকে অবশ্যই আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়সমূহকে নিজে জানতে হবে ও সন্তানকে শিখাতে হবে; যার মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অস্তিত্বের অপরিহার্যতা, নবী রাসুলের প্রয়োজনীয়তা, মহাগ্রন্থ আল কুর‘আন-এর মোজেজা, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সুন্নাহ্’কে ওহী হিসেবে প্রমাণ এবং ক্বাদা ও ক্বদর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। পাশাপাশি তাকে এ ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে যে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় বস্তুবাদকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যেখানে ইসলামী আক্বীদার অকাট্যতাকে এবং এর ঐশীবাণীসমূহের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। তাকে স্থানীয় বা আঞ্চলিক প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে, যেখানে পূর্বপুরুষের ধর্মবিশ্বাসকে কোন যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই গ্রহণ করা হয়। তাকে অদৃষ্টবাদিতার (fatalism) ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে যা মুসলিমদের ইসলামী দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারকে দুর্বল করে দেয়। এর অর্থ হল, একজন মুসলিম পিতা তার ঘরকে দারুল-আরকামের আদলে পরিচালনা করবেন যেখানে হিদায়েতের আলো প্রস্ফুটিত হবে এবং একই সাথে সকল ভ্রান্ত ও কুফরী বিশ্বাসগুলোর কবর রচিত হবে। আর এই সঠিক প্রক্রিয়া আমাদের সন্তানদেরকে কুফরের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার শক্তি যোগাবে যে সংক্রমণ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেও ভয়ঙ্কর; কেননা কুফর চিরস্থায়ী আখিরাতকে ধ্বংস করে দেয়। এ সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র কাছে এই বিশ্বাস নিয়ে ক্রমাগত দোয়া করবেন যেন আমাদের এই কঠিন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তার সন্তানের ঈমান দৃঢ় থাকে। কেননা হিদায়াত একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ই হাতে এবং পিতা হলেন এমন ব্যক্তি সন্তানের জন্য যার দোয়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ফিরিয়ে দেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ يُسْتَجَابُ لَهُنَّ لاَ شَكَّ فِيهِنَّ دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ لِوَلَدِهِ “তিনটি দোয়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  অবশ্যই কবুল করেন; অত্যাচারীতের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া।” [ইবনে মাজাহ]

    পিতা সন্তানদেরকে ইসলামের হুকুম পালনে অভ্যস্ত করে তুলবেন

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَاماً] “এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দান করুন এমন স্ত্রী ও সন্তানদের যারা আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারক হবে এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য নেতা বানিয়ে দিন।” [আল-ফুরক্বান-৭৪]। একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব হল তার সন্তানদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ইবাদতের দিকে ধাবিত করা এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্যের আদেশ দেওয়া। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের লুকমান (আ:)-এর ঘটনা স্মরণ করিয়ে পবিত্র কুর‘আন-এ বলেন, [يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ] “হে আমার পুত্র! সালাত কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ কর এবং (এর ফলশ্রুতিতে) তোমার উপর যে বিপদ আপতিত হয় তা তুমি ধৈর্য্যসহকারে মোকাবেলা কর। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাহসিকতাপূর্ণ কাজ যা দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।” [লুকমান-১৭]। একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র কাছে দোয়া করবেন এবং দৃঢ়তার সাথে এটি নিশ্চিত করবেন যেন তার সন্তানদের মধ্যে ন্যায়পরায়নতার গুণাবলী প্রোথিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحاً تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ] “তারা বলে, হে আমাদের রব! আমার ও আমার পিতামাতার প্রতি আপনার অনুগ্রহকে স্মরণ করে আমি যেন আপনার শুকরিয়া আদায় করতে পারি সেই তৌফিক দান করুন। এবং আমার সন্তানদেরকে ন্যায়পরায়ণতার পথে পরিচালিত করুন। আমি আপনার নিকট তওবা করছি এবং কেবল আপনার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করছি। [আহক্বাফ- ১৫]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدًا مِنْ نَحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ পিতা কর্তৃক পুত্রকে দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হল উত্তম আচরণ শিক্ষাদান। [তিরমিযী]

    সুতরাং মুসলিম পিতা একজন বন্ধুসুলভ ও যত্নবান শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি তার সন্তানকে প্রজ্ঞার সাথে শাসন দ্বারা সুশৃঙ্খল করবেন, যেন তার প্রিয় সন্তানকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ক্রোধ ও আখেরাতের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, لأَنْ يُؤَدِّبَ الرَّجُلُ وَلَدَهُ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يَتَصَدَّقَ بِصَاعٍ “একজন ব্যক্তির জন্য এক সা‘আ পরিমাণ সম্পদ দান করার চেয়ে তার সন্তানকে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলা অধিক উত্তম।” [তিরমিযী]। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আরও বলেন, مَنْ عَالَ ثَلاَثَ بَنَاتٍ فَأَدَّبَهُنَّ وَزَوَّجَهُنَّ وَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ فَلَهُ الْجَنَّةُ “কোন ব্যক্তি যদি তিনটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করে, তাদেরকে সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তুলে, তাদেরকে উত্তমভাবে বিয়ে দেয় এবং তাদের জন্য কল্যানকর কিছু করে তাহলে সে জান্নাতী।” [আবু দাউদ]।

    সন্তানের প্রতি একজন মুসলিম পিতার শাসন হওয়া উচিত সন্তানের প্রতি তার মমতা ও যত্নশীলতার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ। এই শাসন কখনোই হতাশা, রাগ কিংবা শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব থেকে হওয়া উচিত নয়। সন্তানের জন্য দুনিয়ার পদমর্যাদার আকাঙ্খা থেকেও একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানকে শাসন করবেন না, বরং এই শাসন হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং চিরস্থায়ী আখিরাতে সন্তানের উচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “সাহরি না খেয়ে কেউ যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে তাহলে সে নাস্তা না খেয়ে তার রোজা সম্পূর্ণ করবে এবং কেউ যদি সকালে নাস্তা খেয়ে ফেলে তাহলে ইফতার পর্যন্ত বাকি দিন সে না খেয়ে থাকবে।” [মুসলিম]। ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন, সাহাবাগণ (রা.) বলেছেন, “সুতরাং আমরা সবাই আশুরার দিনে সওম পালন করতাম এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র রহমতে আমাদের সন্তানরাও সাওম পালন করত। আমরা সন্তানদেরকে নিয়ে মসজিদে চলে যেতাম এবং তাদের জন্য তুলা দিয়ে খেলনা বানিয়ে নিতাম। যখন তাদের ক্ষুধা পেত এবং খাবারের জন্য কান্না করত তখন আমরা এই খেলনাগুলো তাদেরকে দিতাম যেন ইফতার পর্যন্ত তাদের কান্না বন্ধ থাকে।”

    যথাযথভাবে শিক্ষাদান, উৎসাহ প্রদান, উপদেশ দেওয়া, আদেশ করা, তিরস্কার করা এবং ভীতি প্রদর্শনের পরও যদি দশ বা তার অধিক বছরের সন্তান সালাত আদায় না করে তাহলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে মুসলিম পিতার উচিত সন্তানকে প্রহার করা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مُرُوا الصَّبِيَّ بِالصَّلَاةِ إِذَا بَلَغَ سَبْعَ سِنِينَ، فَإِذَا بَلَغَ عَشْرَ سِنِينَ فَاضْرِبُوهُ عَلَيْهَا সাত বছর পূর্ণ হলে তোমরা সন্তানদেরকে সালাত আদায়ের আদেশ কর। যদি বয়স ১০ বছর পূর্ণ হয় তাহলে সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহারের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল কর। [আবু দাউদ, তিরমিযী]।

    আজকের দিনের মুসলিম পিতাকে সন্তানদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে, কেননা বর্তমানে জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম অনুপস্থিত। বিশ্বব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষতার আধিপত্যের কারণে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্যবোধসমূহ মুসলিম তরুণদের বিপথগামী করছে। এর পরিণাম হিসেবে উদ্ভূত সমস্যাগুলো মুসলিম পিতাদের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যাদের বয়সন্ধিকালীন ও কিশোর বয়সী সন্তান রয়েছে। এই বয়সী সন্তানের বাবাদেরকে প্রায়শই তাদের নিজেদের কিশোর সময়ের স্মৃতিচারণ করে পরিতাপ প্রকাশ করতে দেখা যায়। শিক্ষাব্যবস্থার পশ্চিমীকরণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের ধ্বংসাত্মক পরিণতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাক্তিস্বাধীনতার চর্চা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা তরুণদের মধ্যে অন্য কারো প্রভুত্ব বা শাসন না মানার সহজাত প্রবণতা তৈরি করেছে; যেখানে তারা পিতা তো দূরে থাক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র আদেশও মানতে চায় না।

    বস্তুবাদ ও হেডোনিসম (hedonism) তরুণদের মধ্যে কামনা-বাসনা বশবর্তী হওয়ার অদম্য আকাঙ্খা তৈরি করেছে, যেখানে তারা কোনো বিধিনিষেধ বা পরামর্শের তোয়াক্কাই করছেনা। বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থায় মুসলিম তরুণদের হরহামেশাই বিভিন্ন ফরজ দায়িত্ব পরিত্যাগ করতে এবং হারাম কাজে জড়িত হতে দেখা যায়; যেমন, মদ্যপান, নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন ও যিনা-ব্যভিচার। পাপাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক অবিবাহিত মেয়েরা গর্ভপাত করছে এবং কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে নিজেদেরকে সমকামী হিসেবে ঘোষণা করছে। এসব কিছুই ঘটছে কারণ আমাদের মুসলিম পরিবারগুলো অসংখ্য দুর্বল ব্যক্তিত্ব তৈরি করছে। এসব অপকর্মের পাশাপাশি এই দুর্বল ব্যক্তিত্বের মানুষগুলো তাদের রাগকে দমন করতে পারছেনা এবং নারী ও শিশুদেরকে অত্যাচার করছে; সেটা নির্দয় শারীরিক প্রহারই হোক কিংবা মানসিক নির্যাতনই হোক। এই সমস্যাগুলো পশ্চিমা সমাজে যেমন বিদ্যমান তেমনি মুসলিম দেশগুলোতেও দৃশ্যমান; পার্থক্য শুধুমাত্র তীব্রতার মাত্রায়।

    আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব পিতার

    ইসলামে স্ত্রী ও তার সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করা পিতার উপর ফরজ। সন্তানের মা যতই অর্থ-বিত্তের মালিক হোন না কেন সন্তান কিংবা স্বামীর ভরণপোষণের কোন দায়বদ্ধতা তার নেই। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ] “পুরুষ হলো নারীর অভিভাবক/তত্ত্বাবধায়ক, কারণ পুরুষকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তার দায়িত্ব হলো নারীর ভরণপোষণ। [নিসা: ৩৪]। স্ত্রী-সন্তানের পাশাপাশি একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব হলো তার স্বীয় পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  বলেন, [قُلْ مَا أَنفَقْتُم مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ] “বল, আর যা কিছুই তোমরা খরচ কর তা তোমাদের পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য।” [সূরা আল বাকারা-২১৫]। এই আর্থিক ভরণপোষণ কোন অনুগ্রহ কিংবা দান নয়, বরং তা হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  প্রদত্ত একটি ফরজ দায়িত্ব। ভরণপোষণ এমনভাবে প্রদান করতে হবে যেন তা প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট হয় এবং এক্ষেত্রে কৃপণতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর কোনরুপ ব্যতয় একটি গুরুতর বিষয় যার জন্য ইসলামী বিচারক পিতার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করবেন। হিন্দ বিন্ত উতবা রাসূলুল্লাহ্-এর কাছে অভিযোগ করে বললেন, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ মানুষ যার কারণে তার সম্পদ থেকে অগোচরে আমাকে ব্যয় করতে হয়। উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, خُذِي مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ “তোমার নিজের ও সন্তানদের প্রয়োজন মতো খরচ কর যা তোমাদের জন্য যথেষ্ট (বিল মা‘রুফ) হয়। [বুখারী]।

    আর্থিক ভরণপোষণের ক্ষেত্রে বিল-মা‘রুফ এর অন্তর্ভুক্ত হল সকল মৌলিক চাহিদাসমূহ; যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং কিছু বিলাস দ্রব্য। বিল-মা‘রুফ হতে হবে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে যেখানে কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের বসবাসের স্থানের জীবনযাত্রার মানকে মূল বিবেচ্য হিসেবে ধরা হবে; উদাহরণস্বরূপ: ভরণপোষণে বিল মা‘রুফ এর পরিমাণ শহর অঞ্চলে বেশি, গ্রাম অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম এবং মরু অঞ্চলে (বেদুইনদের) আরো কম।

    বর্তমান মুসলিম বিশ্বে যুক্তিসঙ্গত ভরণপোষণ নিজেই একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আনুপস্থিতিতে অনেক পিতাকেই সন্তানের জন্য প্রাইভেট শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিদারূণ সঙ্কটের মুখে পড়তে হচ্ছে। ভরণপোষণ প্রদান করা একজন মুসলিম পিতার জন্য একটি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব, তবে একমাত্র দায়িত্ব নয়। অন্যান্য দায়িত্বপালনতো দূরে থাক একজন মুসলিম পিতা বর্তমানে আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

    উপসংহার: ধর্মপ্রাণ সন্তানরা পিতার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্যই কল্যাণকর

    নিঃসন্দেহে একজন মুসলিম পিতাকে তার সন্তানদের প্রতি অনেকগুলো ফরজ দায়িত্ব পালন করতে হয় যেগুলো সঠিকভাবে পালন করলে যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র পক্ষ থেকে পুরস্কার রয়েছে ঠিক তেমনি উপেক্ষা করলে শাস্তি রয়েছে। একজন পিতা তার পরিবারের উপর দায়িত্বশীল এবং এই দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, إن الله َسائلٌ كلَّ راعٍ عما استرعاه أَحَفِظَ أم ضيَع حتى يُسألَ الرجلُ عن أهلِ بيتِه “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তাদের দায়িত্বের আওতাভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন যে সে তা সঠিকভাবে পালন করেছিল, নাকি উপেক্ষা করেছিল এবং অবশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা একজন ব্যক্তিকে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন।” [নাসাঈ, ইবনে হিব্বান]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرعِيهِ اللهُ رَعِيَّة يَموتُ يَوْمَ يَمُوتُ وهو غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلا حَرَّمَ اللهُ عليه الجَنَّةَ “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র বান্দাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে কিছু মানুষের উপর দায়িত্ববান করা হয়েছিল কিন্তু সে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি যার জন্য জান্নাতকে হারাম করা হয়নি।” (মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন,  مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً فَلَمْ يَحُطْهَا بِنَصِيحَةٍ إِلَّا لَمْ يجد رَائِحَة الْجنَّة  “কাউকে যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  কিছু লোকের উপর কর্তৃত্ব দেন এবং সে তার অধীনস্থদেরকে সদুপদেশ দ্বারা রক্ষা না করে তবে সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না।” [বুখারী]। তিনিই একজন সৌভাগ্যবান পিতা যিনি সন্তানদেরকে যথাযথ শিক্ষাদান ও শাসন এর মাধ্যমে সুপথে পরিচালিত করেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অনুগ্রহে ন্যায়পরায়ন সন্তান পেয়ে থাকেন। এই ন্যায়পরায়ন সন্তানরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসা থেকে স্বেচ্ছায় তাদের পিতাকে তার হক্ব মোতাবেক যথাসাধ্য মান্য করবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অনুগ্রহে এমন একজন কর্তব্যপরায়ন পিতা দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে ধন্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ “একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার আমলের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়; তিনটি ব্যতীত, সাদাকায়ে যারিয়া, তার রেখে যাওয়া জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং একজন ধর্মপ্রাণ সন্তান যে তার পিতার জন্য দোয়া করতে থাকে।” [আন-নাসাঈ]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, إِنَّ الرَّجُلَ لَتُرْفَعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُولُ أَنَّى هَذَا فَيُقَالُ بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ “একজন ব্যক্তিকে জান্নাতে তার অর্জিত সম্মানের চেয়ে অধিক সম্মানজনক স্থানে রাখা হবে। এর ফলে সে জিজ্ঞাসা করবে, এই বাড়তি সম্মান কেন দেওয়া হল?। তখন তাকে বলা হবে, এর কারণ এই যে তোমার সন্তান তোমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করত।” (ইবনে মাজাহ)।

    হে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা! পিতা হিসেবে আমরা যেন আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারি। আমাদের পুত্র-কন্যারা যেন আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারক হয় এবং মুসলিম উম্মাহ্’র একেকটি পিলারে পরিণত হয়। আমাদের সন্তানরা যেন দ্বিতীয় খিলাফতে রাশেদাহ্ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদের সাথে যোগদান করে এবং ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠার পর এর দাওয়াহ-কে পুরো বিশ্বের কাছে নিয়ে যেতে পারে। আমিন।

    রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র আহকামের যথাযথ ব্যাখ্যা তার নিজের উক্তিতে সুন্নাহর অংশ হিসেবে আমাদেরকে অবহিত করেছেন এবং তিনি ওহী ব্যতীত কোন কথা বলতেন না, যা বিশ্বজগতের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হত। আহমদ বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, تَكُونُ النُّبُوَّةُ فِيكُمْ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةٌ عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا عَاضًّا فَيَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةً فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّة “আমার নবুয়াত তোমাদের মধ্যে ততকাল থাকবে যতকাল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  ইচ্ছা করেন। এরপর আসবে নবুয়াতের আদলে খিলাফত এবং তা ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছাপোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে আঁকড়ে ধরা (বংশের) শাসন এবং তা ততদিন অবস্থান করবে যতদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে অত্যাচারী জালিমের শাসন এবং তা ততকাল অবস্থান করবে যতকাল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা  এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আবার আসবে খিলাফত, নবুয়্যতের আদলে।” এরপর আল্লাহ্’র রাসূল (সা) চুপ থাকলেন।

  • প্রশ্ন-উত্তর: নামাযে দূরত্ব বজায় রাখা একটি বিদ’আহ্, যার গুনাহ্ শাসকদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে

    প্রশ্ন-উত্তর: নামাযে দূরত্ব বজায় রাখা একটি বিদ’আহ্, যার গুনাহ্ শাসকদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে

    নিচের অনুবাদটি সম্মানিত মুজতাহিদ ও মুফাচ্ছির শাইখ আতা ইবন খলীল আবু আল-রাশতা (আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন) কর্তৃক দেয়া এক প্রশ্নের জবাব, আরবী থেকে অনুদিত

    সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র, এবং আল্লাহ্’র রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক রাসূলুল্লাহ্ (সা), তাঁর (সা) পরিবার, সাহাবাগণ (রা), এবং তাঁর (সা) অনুসারীদের প্রতি।

    তাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে এই প্রশ্নোত্তর, যারা আমাকে জুম্মা এবং অন্যান্য জামাতে নামায আদায়ের সময়ে ইবাদতকারী এবং তার পাশের জনের মধ্যে দুই-মিটার ব্যবধান বা দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন… এবং তারা বলেছেন, কিছু মুসলিম দেশের শাসকেরা মসজিদসমূহ বন্ধ করে এবং অতঃপর সেগুলো খুলে দেয়ার পর তারা ইবাদতকারীদেরকে পরষ্পরের মধ্যে দুই-মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করছে। তারা এই বিষয়টিকে এটা বলে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে, যেহেতু অসুস্থ ব্যক্তির ওজর রয়েছে এবং তাকে বসে নামায আদায়ের অনুমতি দেয়া হয়েছে, সেহেতু ক্বিয়াস অনুসারে একজন মুসলিম তার পাশের ব্যক্তি থেকে দুই মিটার দূরে থাকতে পারেন, যদিওবা তিনি অসুস্থ না হন, কিন্তু অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা করেন, সেক্ষেত্রে তার এই দূরত্ব বজায় রাখা উচিত… এবং তারা জিজ্ঞেস করেছেন: উল্লেখিত পদ্ধতিতে দূরত্ব বজায় রেখে পৃথকভাবে নামায আদায়ে বাধ্য করা কি শাসকদের জন্য বৈধ? কিংবা, এই দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি কি দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন এক উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) যার গুনাহ শাসকদের আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে? প্রশ্নকারীগণ উত্তরগুলো খুঁজে পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন…

    তাদের প্রশ্নের জবাবে বলছি, এবং আল্লাহ্ সকল সাফল্যের একমাত্র অভিভাবক:

    আমরা ইতিপূর্বে নতুন কিছু উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) সম্পর্কিত একাধিক প্রশ্নোত্তর প্রদান করেছি, এবং প্রশ্নকারীগণ যদি সেগুলো পর্যালোচনা করেন তবে তাদের নিকট এই উত্তরটি পরিষ্কার হয়ে যাবে যে, নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি এমন এক নতুন উদ্ভাবন যা পালনে শাসকগণ যদি মানুষকে বাধ্য করে তবে তারা এর জন্য গুনাহ্গার হবে, এবং এর ব্যাখ্যা নিম্নরূপ:

    প্রথমত: আরবী ২৮শে রজব, ১৪৩৪ হিজরীতে, এবং ইংরেজি ০৭/০৬/২০১৩ খ্রিস্টাব্দে আমরা একটি প্রশ্নোত্তর প্রকাশ করি, যেখানে বলা হয়েছিল:

    (শারী’আহ্’র কোন একটি বিষয়ে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা হচ্ছে একটি সুস্পষ্ট সীমালঙ্ঘনকারী কাজ, যখন বিষয়টি ইতিমধ্যে শারী’আহ্ কর্তৃক সুনির্ধারিত হয়ে আছে। লিসান আল-আরব-এ উদ্ভাবন সম্পর্কে ভাষাতত্ত্বের দৃষ্টিকোন থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে: “المبتدع الّذي يأتي أمراً على شبهٍ لم يكن…، وأبدعت الشّيء: اخترعته لا على مثالٍ” “নতুন কিছু আনয়নকারী একটি বিষয়কে নতুন একরূপে নিয়ে আসে যা তার আগ পর্যন্ত অস্তিত্বহীন ছিল… একটি বিষয় ‘উদ্ভাবন’ করে সেটার স্বপক্ষে কোন উদাহরণ (দলিল) ছাড়াই মনগড়াভাবে তৈরি করে”। ইসলামী চিন্তাগত দৃষ্টিকোন থেকে এর অর্থও একই। উদাহরণস্বরূপ, যদি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে কিছু করেন এবং একজন মুসলিম সেই পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়, তবে এটি একটি বিদ’আহ্। অতএব,কোন একটি শারী‘আহ্ হুকুম পালনের জন্য শারী’আহ্ নির্ধারিত পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হওয়াটাই বিদ’আহ্। এবং, এই হাদীসটির অনুমিত অর্থ হচ্ছে: «وَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ» “যে কেউ আমাদের এই বিষয়ে (অর্থাৎ, ইসলামে) এমন কিছু প্রবর্তন করে যা এর অন্তর্ভূক্ত নয়, তবে তা প্রত্যাখ্যাত।” [বুখারী ও মুসলিম]

    উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ তার নামাযে দুইটির বদলে তিনটি সিজদাহ্ দেয়, অর্থাৎ সে নতুন একটি বিষয় উদ্ভাবন করে, তবে সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে গণ্য হবে। যদি কেউ মিনায় সাতটি পাথরের পরিবর্তে আটটি পাথর নিক্ষেপ করে, তবে সেটা হবে তার পক্ষ থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবন, কারণ এটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক প্রদর্শিত কাজের বিরোধিতার শামিল। এবং, উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ আযানে নতুন কোন শব্দ যুক্ত করে, বা আযান হতে কোন শব্দ বাদ দিয়ে দেয়, তবে সেই ব্যক্তিও বিদ’আহ্-এর মধ্যে পতিত হবে, যেহেতু নবী করিম (সা) আযানের জন্য সুনির্দিষ্ট শব্দসমূহ অনুমোদন করে গেছেন।

    তবে, শারী’আহ্ বিষয়বস্তু (যাতে কোনো পৃথক পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়নি) হতে বিচ্যুতির বিষয়ে হুকুম হচ্ছে, সেটি একটি আইনী অধ্যাদেশের মধ্যে পড়বে, অর্থাৎ: সেটা হয় হারাম, মাকরুহ, ইত্যাদি হিসেবে বিবেচিত হবে; আর যদি সেটা নিয়ন্ত্রক অধ্যাদেশের (হুকুম ওয়াদ’ঈ) অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রযোজ্য ইঙ্গিতের উপর নির্ভর করে, তবে সেটি বাতিল, ফাসিক, ইত্যাদি শ্রেণীর আওতাভুক্ত হবে।

    উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সালাতের বর্ণনা স¤পর্কে আয়েশা (রা) হতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (রা) বলেছেন: «…وَكَانَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ لَمْ يَسْجُدْ، حَتَّى يَسْتَوِيَ قَائِمًا، وَكَانَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السَّجْدَةِ، لَمْ يَسْجُدْ حَتَّى يَسْتَوِيَ جَالِسًا…» “রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখন সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে সিজদাহ্’তে যেতেন না, এবং যখন সিজদাহ্ থেকে মাথা উঠাতেন তখন সোজা হয়ে না বসে পুনরায় সিজদাহ্’তে যেতেন না”।

    তদানুসারে, এই বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদেরকে দেখিয়েছেন যে, নামাযরত অবস্থায় একজন মুসলিমের রুকু হতে মাথা উঠানো উচিত এবং সোজা হয়ে দন্ডায়মান না হওয়া পর্যন্ত তার সিজদায় যাওয়া উচিত নয়, এবং যদি সে সিজদাহ্ থেকে উঠে আসে তবে সে যেন সোজা হয়ে বসার আগ পর্যন্ত পুনরায় সিজদাহ্ অবস্থায় ফিরে না যায়। এটাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি, এবং যদি কেউ এই নির্ধারিত পদ্ধতি হতে বিচ্যুত হয় তবে সে নতুন উদ্ভাবন (বিদ’আহ্) মধ্যে পড়ে যাবে। সুতরাং, নামাযে যদি কোন মুসলিম রুকু ও সিজদাহ্’র মধ্যে সোজা হয়ে দন্ডায়মান না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রুকু থেকে সিজদায় চলে যায়, তবে সে বিদ’আহ্-এর মধ্যে পতিত হবে, কারণ এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ্’র (সা) প্রদর্শিত পদ্ধতির বিরোধিতা করা হবে। এটি হবে একটি বেআইনী উদ্ভাবন এবং এর সম্পাদনকারী গুরুতর গুনাহ্’র মধ্যে পতিত হবে।

    উবায়দাহ্ বিন সামিত-এর বর্ণনার ভিত্তিতে মুসলিম কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে যে, إِنِّي سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «يَنْهَى عَنْ بَيْعِ  الذَّهَبِ بِالذَّهَبِ، وَالْفِضَّةِ بِالْفِضَّةِ، وَالْبُرِّ بِالْبُرِّ، وَالشَّعِيرِ بِالشَّعِيرِ، وَالتَّمْرِ بِالتَّمْرِ، وَالْمِلْحِ بِالْمِلْحِ، إِلَّا سَوَاءً بِسَوَاءٍ، عَيْنًا بِعَيْنٍ، فَمَنْ زَادَ، أَوِ ازْدَادَ، فَقَدْ أَرْبَى “আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি: তিনি (সা) তৎক্ষণাৎ ও সমান মাপের লেনদেন না হলে স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, এবং লবণের বিনিময়ে লবণ বিক্রয় করাকে নিষিদ্ধ করেছেন, যে ব্যক্তি কোন কিছু যোগ করে কিংবা অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে এই লেনদেন করবে সে সুদের (রিবা) মধ্যে লিপ্ত হয়।” যদি কোন মুসলিম এই হাদীসটিকে লঙ্ঘন করে, এবং ওজনের সাথে ওজন পরিমাপ না করে স্বর্ণের বিনিময়ে বর্ধিত (সুদ) পরিমাণ স্বর্ণ বিক্রয় করে, তবে বলা হয়নি যে, সে বিদ‘আহ্ করেছে, বরং বলা হয়েছে যে, সে হারাম করেছে, অর্থাৎ, সুদে লিপ্ত হয়েছে।

    উপসংহারে বলা হয়েছিল: রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতি থেকে বিচ্যুতি হচ্ছে বিদ’আহ্। এবং, কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতি বর্ণনা ব্যতিরেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত চূড়ান্ত আদেশ থেকে বিচ্যুতি আইন ও অধ্যাদেশের (আহকাম শারী‘আহ্) নিম্নোক্ত যেকোন একটির অন্তর্ভুক্ত: হারাম এবং মাকরুহ, ফাসিদ এবং বাতিল… শারী’আহ্ দলিলসমূহ অনুসারে এটাই নির্ধারিত হয়েছে।) উদ্ধৃতি সমাপ্ত।

    আরবী ৮ই জিলহজ, ১৪৩৬ হিজরী, এবং ইংরেজি ২২/০৯/২০১৫ খ্রিস্টাব্দে আমরা বিদ’আহ্-এর বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্যসম্বলিত উত্তর প্রকাশ করেছি, এবং আমরা এর আগে ও পরে অন্যান্য উত্তরও প্রদান করেছি, যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহে যথেষ্ট।

    দ্বিতীয়ত: তদনুসারে, যদি মুসলিম দেশগুলোর সরকারসমূহ শুক্রবার বা ওয়াক্তের নামাযের জামায়াতে সংক্রমণের ভয়ে, বিশেষ করে রোগের কোনরূপ উপসর্গ ছাড়াই ইবাদতকারীদেরকে পরষ্পরের কাছ থেকে এক বা দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করে, তবে তারা গুরুতর গুনাহ্’র কাজ করবে, কারণ এটি একটি বিদ’আহ্, যেহেতু শারী’আহ্ (আইনী) দলিল দ্বারা প্রমাণিত যে, এটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্দেশিত পদ্ধতির, অর্থাৎ কাতারবন্দী হওয়া এবং পরস্পর কাছাকাছি থাকার হুকুম হতে পরিষ্কার বিচ্যুতি, নিম্নোক্ত হাদীসসমূহ এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত:

    – আল বুখারী তাঁর সহীহ্-তে আবু সুলায়মান মালিক ইবনে আল হুওয়াইরিস হতে বর্ণনা করেছেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে সমবয়সী যুবক অবস্থায় এসেছিলাম। আমরা তাঁর (সা) সাথে বিশ রাত অতিবাহিত করেছিলাম… তিনি দয়ালু ও সহানুভূতিশীল ছিলেন, এবং বলেছিলেন: «فَقَالَ ارْجِعُوا إِلَى أَهْلِيكُمْ فَعَلِّمُوهُمْ وَمُرُوهُمْ وَصَلُّوا كَمَا رَأَيْتُمُونِي أُصَلِّي وَإِذَا حَضَرَتِ الصَّلَاةُ فَلْيُؤَذِّنْ لَكُمْ أَحَدُكُمْ ثُمَّ لِيَؤُمَّكُمْ أَكْبَرُكُمْ» “তোমাদের পরিবারের কাছে ফিরে যাও। তাদেরকে শিক্ষা দাও এবং আদেশ কর। তোমরা আমাকে যেভাবে নামায পড়তে দেখেছ সেভাবে নামায পড়। যখন নামাযের সময় হবে তখন তোমাদের মধ্য হতে কাউকে আযান দিতে দাও, এবং তোমাদের মধ্যে যিনি প্রবীণতম ব্যক্তি তাকে নামাযের নেতৃত্ব দিতে দাও।”

    – এবং আল-বুখারী তাঁর সহীহ্-তে আনাস বিন মালিক হতে বর্ণিত করেছেন, তিনি বলেছেন: যখন ইকামাহ্ ঘোষণা করা হয়তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন: «أَقِيمُوا صُفُوفَكُمْ، وَتَرَاصُّوا، فَإِنِّي أَرَاكُمْ مِنْ وَرَاءِ ظَهْرِي» “তোমরা কাতার সোজা করো এবং একসাথে কাছাকাছি দাঁড়াও, নিশ্চয়ই আমি আমার পিছন হতেও তোমাদেরকে দেখতে পাই।”

    – মুসলিম তাঁর সহীহ্-তে আল নুমান ইবনে বশীর (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের কাতারগুলোকে তীরের মত সোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি ততক্ষণ পর্যন্ত বিষয়টির উপর তাগিদ দিতে থাকতেন যতক্ষণ না তিনি বুঝতে পারতেন আমরা এটি তার কাছ থেকে শিখতে পেরেছি (এর তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম হয়েছি)। একদিন তিনি মসজিদে এসে দাঁড়ালেন। তিনি তাকবীর (আল্লাহ্ মহান) দিতে যাচ্ছিলেন, তখন তিনি এমন এক ব্যক্তিকে লক্ষ্য করলেন যার বুক কাতার থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তাই তিনি বললেন: «عِبَادَ اللهِ لَتُسَوُّنَّ صُفُوفَكُمْ، أَوْ لَيُخَالِفَنَّ اللهُ بَيْنَ وُجُوهِكُمْ» “হে আল্লাহ্’র বান্দাগণ, তোমাদের অবশ্যই নিজেদের কাতার সোজা করে নেয়া উচিত, নতুবা আল্লাহ্ তোমাদের চেহারাসমূহকে বৈপরীত্যের (পরস্পর মতভেদ) মধ্যে পতিত করবেন।”

    এবং মুসলিম তাঁর সহীহ্-তে জাবির ইবনে সামরাহ্ হতে বর্ণিত করেছেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «أَلَا تَصُفُّونَ كَمَا تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟» فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللهِ، وَكَيْفَ تَصُفُّ الْمَلَائِكَةُ عِنْدَ رَبِّهَا؟ قَالَ: «يُتِمُّونَ الصُّفُوفَ الْأُوَلَ وَيَتَرَاصُّونَ فِي الصَّفِّ» “ফেরেশতারা যেভাবে তাদের প্রতিপালকের সামনে সারি বেঁধে দাঁড়ায় তোমরা কেন সেভাবে সারি বেঁধে দাঁড়াও না? আমরা বলছেলিাম: হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা), কিভাবে ফেরেশতারা তাদের রবের সামনে কাতারবন্দী হন? তিনি (সা) বলেছিলেন: তারা প্রথম সারি আগে র্পূণ করে এবং পরষ্পররে সাথে মিলে দাঁড়ায়”।

    – আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে আল-হাকমি র্বণনা করছেনে এবং মুসলমি-এর র্শতানুযায়ী এটিকে নির্ভরযোগ্য হিসেবে অভিহিত করেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «مَنْ وَصَلَ صَفّاً وَصَلَهُ اللَّهُ، وَمَنْ قَطَعَ صَفّاً قَطَعَهُ اللَّهُ» “যে ব্যক্তি একটি কাতার পূর্ণ করে আল্লাহ্ তার প্রতি সদয় হন, এবং যে ব্যক্তি কাতার ভঙ্গ করে আল্লাহ্ তাকে বিচ্ছিন্ন বা ধ্বংস করে দেন।”

    – আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর হতে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «أَقِيمُوا الصُّفُوفَ فَإِنَّمَا تَصُفُّونَ بِصُفُوفِ الْمَلَائِكَةِ وَحَاذُوا بَيْنَ الْمَنَاكِبِ وَسُدُّوا الْخَلَلَ وَلِينُوا فِي أَيْدِي إِخْوَانِكُمْ وَلَا تَذَرُوا فُرُجَاتٍ لِلشَّيْطَانِ وَمَنْ وَصَلَ صَفّاً وَصَلَهُ اللَّهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى وَمَنْ قَطَعَ صَفّاً قَطَعَهُ اللَّهُ» “তোমরা কাতারগুলোকে সোজা করে নাও, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও, ফাঁকগুলো বন্ধ করে দাও, তোমাদের ভাইদের হাতের প্রতি সদয় থাক, এবং শয়তানের দন্ডায়মান হওয়ার জন্য ফাঁক রেখো না। যদি কেউ একটি কাতারে যোগ দেয় তবে আল্লাহ্ তার সাথে যোগ দেন, কিন্তু কেউ যদি একটি কাতার ভেঙে দেয় তবে আল্লাহ্ তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেন।”

    কিভাবে জামায়াতে নামায আদায় করতে হবে সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে এটি একটি পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা, এবং সাহাবায়ে কেরামগণ (রা) এর প্রতি অবিচল ছিলেন। আল-মুওয়াতায় মালিক এবং আস-সুনান আল কুবরায় আল বায়হাকী বর্ণনা করেছেন যে, “উমর ইবনে আল-খাত্তাব নামাযের কাতারসমূহ সোজা করার নির্দেশ দিতেন, এবং তারা যখন তার কাছে এসে তাকে বলতো যে, কাতারগুলো সোজা হয়েছে তখন তিনি তাকবীর দিতেন।”

    তৃতীয়ত: এটা বলা হয়নি যে, সংক্রামক ব্যাধি এমন একটি ওজর যা নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার অনুমতি প্রদান করে, এরকম বলা হয়নি কারণ সংক্রামক ব্যাধি হলে তা মসজিদে না যাওয়ার ওজর হিসেবে বিবেচিত হবে, কিন্তু মসজিদে গমন করা এবং নামাযে পাশের ইবাদতকারী থেকে ১ বা ২ মিটার দূরত্বে থাকার ওজর হিসেবে এটি বিবেচিত হবে না!! কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যুগেও সংক্রামক রোগের (প্লেগের) প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক এটা বর্ণিত নেই যে, প্লেগে আক্রান্ত অসুস্থ ব্যক্তি নামায পড়তে গিয়েছে এবং তার ভাই থেকে ২ মিটার দূরত্ব বজায় রেখেছে, বরং তাকে এ বিষয়ে অব্যাহতি দেয়া হতো এবং সে গৃহে নামায আদায় করে নিত… যে অঞ্চলে ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে সেখানে রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে বিনা খরচে ও সযত্নে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হয়, এবং অসুস্থদের সুস্থদের সাথে মেশানো/একত্রিত করা হয় না… যেমনটি উসামা বিন যায়েদ হতে মুসলিম তার সহীহ্-তে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: «الطَّاعُونُ آيَةُ الرِّجْزِ ابْتَلَى اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ بِهِ نَاساً مِنْ عِبَادِهِ، فَإِذَا سَمِعْتُمْ بِهِ فَلَا تَدْخُلُوا عَلَيْهِ وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلَا تَفِرُّوا مِنْهُ» “প্লেগ হচ্ছে দুর্যোগের নিদর্শন, যার দ্বারা মহিমান্বিত ও গৌরবময় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যকার জনগোষ্ঠীকে আক্রান্ত করেন। সুতরাং, যখন তোমরা এর উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হবে তখন সেখানে প্রবেশ করো না (যেখানে এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে), এবং যখন এটি কোন ভূ-খন্ডে ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তোমরা সেখানে অবস্থান করছো, তখন সেখান থেকে পালিয়ে যেও না।” অর্থাৎ, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগী সুস্থ লোকের সাথে মিশবে না এবং তাকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র নির্দেশ মোতাবেক পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা দেয়া হবে। সুস্থ ব্যক্তিগণ মসজিদে যাবে এবং শুক্রবার ও জামাতে নামায আদায় করবে, কোনরূপ দূরত্ব বজায় না রেখেই।

    চতুর্থত: অনুরূপভাবে এটি বলাও সঠিক নয় যে, মহামারীর সময়ে নামাযে দূরত্ব বজায় রাখার বিষয়টি অসুস্থতার সময়ে বসে নামায আদায় করার অনুমতির (রুখসা) সঙ্গে ক্বিয়াসের মাধ্যমে নির্ধারিত। কেননা, এটি কোন শরঈ ক্বিয়াস নয়, কারণ অসুস্থ ব্যক্তি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত রুখসা’র কারণে বসে নামায পড়তে পারেন, আর এই ওজর-এর কারণ হলো তার অসুস্থতা। ওজর বা অব্যাহতিগুলো হলো আসবাব, কারণ বা যুক্তি (ইলাল) নয়, তাই শরঈ সেগুলোর কারণ ব্যাখ্যা করেনি, বরং প্রতিটি ওজরকে সেই হুকুমের জন্য ওজর হিসেবে নির্ধারণ করেছে, যা কেবলমাত্র নির্দিষ্ট সেই হুকুমের জন্যই প্রযোজ্য হবে, অন্য কোন হুকুমের জন্য নয়, কারণ এটি শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট হুকুমের জন্যই বিশেষ ওজর হিসেবে এসেছে, এবং এটি সকল হুকুমের জন্য প্রযোজ্য সাধারণ ওজর নয়; এটি ইল্লাহ্-এর কারণ (ওয়াজহ আল-ইল্লাহ্) দিকেও ইঙ্গিত (মুফহিম) করে না। সুতরাং, এর দ্বারা ক্বিয়াস করা যাবে না, কেননা এটি (আসবাব) সুনির্দিষ্ট, এবং এটিকে অন্য কোন ক্ষেত্রে প্রসারিত করা যায় না, যা দিয়ে তুলনা করা যাবে। এটি ইল্লাহ্ হতে আলাদা, কেননা ইল্লাহ্ যে হুকুমের জন্য প্রণীত কেবলমাত্র সেই হুকুমের জন্য সুনির্দিষ্ট নয়, বরং তা অন্যান্য হুকুমে ক্ষেত্রেও প্রসারিত করা যায়, এবং এর দ্বারা ক্বিয়াস করা যায়… অতএব এটি সুস্পষ্ট যে, ইবাদত সংক্রান্ত কাজগুলো হচ্ছে আসবাব, এবং ইলাল নয়, ইবাদত সংক্রান্ত কাজগুলো তাওকিফিয়া (আইনপ্রণেতা কর্তৃক নির্দিষ্ট), ইল্লাহ্ (যুক্তি/কারণ) প্রদান করে না, এবং এগুলোর উপর কোন ক্বিয়াস করার সুযোগ নেই; কেননা আসবাব সুনির্দিষ্টভাবে শুধুমাত্র আসবাব হওয়ার কারণের সাথে সম্পর্কিত।

    পঞ্চমত: এছাড়াও, রুখসা (আইনি বৈধতা/অনুমতি) ঘোষণামূলক সুস্পষ্ট বিধিসমূহের (হুকুম ওয়াদ’) অন্তর্ভুক্ত, যা ঘোষণা বা সুস্পষ্ট বক্তব্য হিসেবে বান্দার কাজ সংক্রান্ত বিষয়ে আইনপ্রণেতার বক্তব্য হিসেবে এসেছে, এবং যেহেতু এটি আইনপ্রণেতার বক্তব্য সেহেতু অবশ্যই এর স্বপক্ষে আইনী (শরঈ) দলিল থাকতে হবে যা এটিকে নির্দেশ করবে। উদাহরণস্বরূপ, অসুস্থ ব্যক্তির বসে নামায পড়ার বিষয়ে আল-বুখারী তার সহীহ্ গ্রন্থে ‘ইমরান বিন হুসাইন হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেন: আমার পাইলস ছিল, তাই আমি নামাযের বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি (সা) বললেন: «صَلِّ قَائِماً فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِداً، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ» “দাঁড়িয়ে নামায পড়, এবং যদিনা পারো তাহলে বসে পড়, এবং সেটাও যদি না পারো তাহলে কাত হয়ে শুয়ে নামায পড়ো”, এটি একটি অনুমতি (রুখসা) যা একটি বৈধ অব্যাহতি, এবং আইনী দলিলগুলোতে সুনির্দিষ্ট হুকুমের জন্য অব্যাহতি হিসেবে যা যা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোই অব্যাহতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া যেগুলোর স্বপক্ষে কোন দলিল নেই সেগুলোর কোনো মূল্য নেই, এবং সেগুলো বৈধ অব্যহতি হিসেবে বিবেচিত হবে না। এবং যেহেতু অসুস্থ ব্যক্তির জন্য তার পাশের জনের থেকে ১ বা ২ মিটার দূরত্বে নামায পড়ার পক্ষে কোন দলিল নেই, সেহেতু এই বক্তব্যের কোন মূল্য নেই এবং এটি সঠিক নয়। এটি কেমন সিদ্ধান্ত, সে অসুস্থ নয়, অথচ কেবলমাত্র রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় সে তা করবে…?!

    ষষ্ঠত: উপরোক্ত ব্যাখ্যার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ:

    ১- রাসূলুল্লাহ্ (সা) নামাযের জন্য যে পদ্ধতি নির্ধারণ করেছেন, তার পরিবর্তন বিদ’আহ্ হিসেবে পরিগণিত। এবং, এ বিষয়ে শরঈ হুকুম হলো সুস্থ ব্যক্তি স্বাভাবিক নিয়মে নামায পড়তে যাবেন, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, সোজা সারিবদ্ধ হয়ে, কোনো ফাঁকা জায়গা না রেখে। আর, অসুস্থ ব্যক্তি যার কোন সংক্রামক ব্যাধি রয়েছে, তিনি মসজিদে যাবেন না এবং অন্যদেরকে সংক্রমিত করবেন না।

    ২- যদি রাষ্ট্র মসজিদসমূহ বন্ধ করে দেয়, এবং অতঃপর সুস্থ ব্যক্তিদেরকে শুক্রবার ও জামাতে নামায পড়া থেকে বিরত রাখে, তাহলে এটি শুক্রবার ও জামাতের নামায বিঘ্ন করার গুরুতর গুনাহ্ হিসেবে বিবেচিত হবে, কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী মসজিদসমূহ নামাযের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।

    ৩- অনুরূপভাবে, যদি রাষ্ট্র রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশিত পদ্ধতিতে নামায আদায় করা থেকে মুসল্লীদেরকে নিষেধ করে, এবং যদি একজন মুসল্লীকে তার পাশের জনের সাথে সংক্রমণের ভয়ে এক বা দুই মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করে, বিশেষ করে দৃশ্যত কোন উপসর্গ না থাকা সত্ত্বেও, তবে এটা একটি গুরুতর গুনাহ।

    এ বিষয়ে এটিই হলো শরঈ হুকুম যা আমার বিবেচনায় সঠিক, আর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সবচেয়ে ভালো জানেন এবং তিনি সর্বজ্ঞানী… এবং, আমি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি মুসলিমদেরকে ন্যায়ের পথে এবং তাঁর নির্দেশ মোতাবেক তাঁর ইবাদতের দিকে পরিচালিত করেন। এবং, তাদের জন্য এটি ফরয যে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং কোন বিচ্যুতি ব্যতিরেকে খিলাফতে রাশিদাহ্ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সঠিক শরঈ প্রতিষ্ঠা করে, যার মধ্যে আছে উত্তম বিষয়াবলী এবং বিজয়, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র অনুগ্রহে, যিনি আসমান ও জমিনের কোন কিছু দ্বারা ব্যর্থ হন না, তিনি সর্বশক্তিমান, মহাজ্ঞানী।

    ওয়াসসালামু আলাইকুম ওয়া রহ্মতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।

    ১৭ই শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

    ০৮/০৬/২০২০ খ্রিষ্টাব্দ

  • বর্ণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ: আদর্শিক দৈন্যতায় ভারাক্রান্ত বিশ্ব…বিকল্প কী?

    বর্ণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদ: আদর্শিক দৈন্যতায় ভারাক্রান্ত বিশ্ব…বিকল্প কী?

    ২৫শে মে২০২০যুক্তরাষ্ট্রের মিনিয়াপোলিসে ৪৬ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা ডেরেক চাওভিন। ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় যে ফ্লয়েডকে গাড়ি থেকে বের করে কোন কারণ ছাড়াই এই পুলিশ অফিসার রাস্তার উপরে তার ঘাড়ে হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রাখে। এমন অবস্থায় ফ্লয়েড বারবার সেই পুলিশ অফিসারকে বলতে থাকেন যে তিনি নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। কিন্তু সেই পুলিশ অফিসার হাঁটু সরিয়ে না নেয়ায় আস্তে আস্তে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন। এরপর দেখা যায় যেএকটি এ্যাম্বুলেন্স এসে রাস্তায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা ফ্লয়েডকে তুলে নেয়এবং পরবর্তীতে জানা যায় যে তিনি মারা গেছেন। এই ঘটনার চারদিন পর ২৯শে মে মিনিয়াপলিসে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানগণ বিক্ষোভ শুরু করেন এবং ক্রমান্বয়ে তাদের সাথে শ্বেতাঙ্গসহ মিশ্র বর্ণের মানুষেরা যুক্ত হয়ে দেশটির বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বর্ণবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে গর্জে ওঠে। এর ঢেউ লাগে ইউরোপের বিভিন্ন দেশেওযেখানে জনগণকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধেস্লোগানে স্লোগানে ফুঁসে উঠতে দেখা গেছে। এমনকি আমরা যুদ্ধবাজ জুনিয়র বুশসহ সাবেক আমেরিকান প্রেসিডেন্টদেরও নিন্দা জ্ঞাপন করতেদেখছিযদিওবা তাদের সময়ও কৃষ্ণাঙ্গরা বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যে পুলিশ এই ঘটনা ঘটিয়েছে সেই পুলিশ বাহিনীর অন্য সদস্যরাও হাঁটু গেড়ে প্রতীকী প্রতিবাদের মাধ্যমে এ হত্যাকান্ডের নিন্দা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালত বলেছে যে এই কেসটি এমনভাবে সাজানো হবে যাতে অপরাধী পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এমন বর্ণবাদী আচরণ চিরতরে নির্মূল হয়।

    জর্জ হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠা বিক্ষোভ দমনে যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি অঙ্গরাজ্যের ৪০টি শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এখন পর্যন্ত শত শত মানুষ গ্রেফতারের খবর পাওয়া গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। দিবেনইতোকারণ তিনিও তো একজন বর্ণবাদীযা বিভিন্ন সময়ে তার মন্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে। ২০১৮ সালের ১১ই জানুয়ারি তারিখে অভিবাসন নীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি হাইতিহন্ডুরাসসহ কিছু আফ্রিকান দেশকে “শিট হোল”-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন!! যুগ যুগ ধরে চলে আসা এমন বর্ণবাদী আচরণের কারণে ১৯৬৩ সালে তৎকালীন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হত্যার পর কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে: আমিও এরকম হত্যাকান্ডের শিকার হবকারণ আমেরিকার সমাজ হচ্ছে একটি অসুস্থ সমাজ।

    প্রথমে “বর্ণবাদ কী”-সেবিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক। এটি এমন একটি মতবাদ যাতে বিশ্বাস করা হয় যে কোন গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্যের কারনে উঁচু বা নিচু স্তরেরকিংবা তাদের উপর তারা কর্তৃত্ব করার অধিকারীবা তুলনামূলকভাবে বেশি যোগ্য। বর্ণবাদী আচরন ও বৈষম্য কখনো গায়ের চামড়ার রঙের ভিত্তিতে করা হয় – অর্থাৎ: সাদা বা কালোকখনো করা হয় গোত্র কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেআবার কখনোবা করা হয় ভিন্ন আঞ্চলিকতার কারনে। কিছু উদাহরনের মাধ্যমে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা পেতে পারি:শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বে চলমান শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে যে বর্ণবাদী আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে তার সর্বশেষ উদাহরণ হলো জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ড। এমনকি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সারা জীবন সংগ্রাম করে আসা দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ নেতা নেলসন মেন্ডেলা জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর সেদেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২৫ বছর অতিবাহিত করার পরেও গণমাধ্যমে বলা হয়েছে যে এখনও সেখানে বর্ণবাদ প্রকট। কোথায় নেই বর্ণবাদহোক সেটা অধিকার আদায়ে কিংবা ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রেক্রিকেট বা ফুটবল দুনিয়ায়বা সিনেমা পাড়ায়। ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান ক্রিকেটার ক্রিস গেইল তার দল ও আইসিসির বিরুদ্ধে বর্ণবাদের অভিযোগ তুলেছেন। ফুটবল স্ট্রাইকার লুকাকু বলেছেন যে তিনি যখন গোল করেন তখন তিনি হিরো হিসেবে মর্যাদা পান আর দল হেরে গেলে তিনি হয়ে যান একজন ঘৃণিত কঙ্গো বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ!! ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জয়ী ফুটবলার এমবাপ্পেকেও আলজেরিয়ার নিগ্রো বলে গালি দেয়া হয়যখন দল বা ক্লাব ফুটবলে তার অবদান কম হয়। পশ্চিমা দুনিয়ায় কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিগৃহীত হওয়ার খবর আমরা প্রায়ই গণমাধ্যমে পাই। এই করোনা মহামারীর সময়েও দারিদ্র ও বৈষম্যের কারণে কৃষ্ণাঙ্গদের অনেকেরই যাদের স্বাস্থ্য বীমা নেই তারা চিকিৎসা পাচ্ছে নাবরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদেরকে সংক্রমণের ঝুঁকির মধ্যেও জোরপূর্বক কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে।

    ধর্মজাত বা গোত্রের ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈষম্যপূর্ণ আচরণ পরিলক্ষিত হয়ভারতে উচু বা নিচু জাতের ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ (পুরোহিত জাতীয় লোক) বা ক্ষত্রিয়দের (শাসক প্রশাসক ও যোদ্ধা) মাধ্যমে দলিতদের উপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের খবর প্রায়শঃই গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ২০১৪ সালে জার্মান বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার মেসুত ওজিল অভিযোগ করেছিলেন যে২০১৮ সালে দল হেরে যাওয়াতে তাকে তুর্কি মুসলিম বলে গালি দেয়া হয়!! এছাড়াও আমরা দেখি যে নাইন-ইলেভেনের পরে সমগ্র বিশ্বে পরিকল্পিতভাবে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে বর্ণবাদী আচরণ উসকে দেয়া হয়েছিল তার অন্যতম ফলাফল হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে টেরেন্ট ব্রেন্টন নামক এক বর্ণবাদী কর্তৃক জুমু‘আর নামাজের সময়ে ৫০ জন মুসলিমকে গুলি করে হত্যা। গত ২৮শে এপ্রিল ইসরাইলী পুলিশ কর্তৃক একজন প্রতিবন্ধী ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যার ঘটনা এসবের ধারাবাহিকতা মাত্র। ভারতের মুসলিমগণও এই ধরনের আচরণ থেকে রেহাই পায়নিযেখানে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরনের গুজব সৃষ্টি করে মুসলিমদেরকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এছাড়াও মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে বৌদ্ধদের দ্বারা বর্ণনাতীত নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়। এগুলো ছাড়াও পশ্চিমা বিশ্বসহ প্রায় প্রতিটি দেশেই মৌলিক অধিকার হরণসহ কর্মক্ষেত্রে মুসলিমদের সাথে বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ খুবই মামূলি বিষয়।

    গত ৬ই মার্চ নিউইয়র্ক সিটিতে ভিন্ন আঞ্চলিকতার কারনে ডানপন্থীদের দ্বারা বর্ণবাদের একটি ঘটনা ঘটতে দেখা গেছেভিডিও ফুটেজ এসেছেযে সাবওয়ে ট্রেনে এক ব্যক্তির সাথে অন্য এক ব্যক্তি তর্ক করছে এবং এশিয়ান-আমেরিকান ওই ব্যক্তির উপরে এয়ার ফ্রেশনার স্প্রে করে দেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে জনাথন মক নামের এক সিঙ্গাপুরী তরুণকে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হতে হয়েছেলন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রীট দিয়ে হাঁটার সময় ৩ বা ৪ জনের একটি দল তাকে বলে যেআমরা আমাদের দেশে করোনা ভাইরাস চাইনাএবং তাকে কিল-ঘুষি মেরে মারাত্মকভাবে আহত করেকারণ সে একজন এশিয়ান। এরকম হাজারো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে যা বলে শেষ করা যাবে না।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বর্তমান সমাজগুলোতে বিদ্যমান জাতিগত বৈষম্য ও বিভাজনকে তুলে ধরেছে। যদিও মানুষ বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সরবতথাপি যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তার বসবাস সেখানেই নিহিত রয়েছে এমন বৈষম্যের বীজ। আমেরিকা ধনী এবং সম্পদশালী রাষ্ট্র হলেও পুঁজিবাদী আদর্শের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা বা দৈন্যতার কারনে তাদের সমাজে আজ প্রতিনিয়ত সংঘর্ষউত্তেজনা ও রক্তপাতের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। আর এই অন্তর্নিহিত আদর্শিক দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সুবিচারের অভাবসম্পদের অসম বন্টনবর্ণবাদ এবং জাতিগত বৈষম্য। আর কেবল কালোরাই নয়বরং শেতাঙ্গ-অশেতাঙ্গ থেকে শুরু করে ন্যূনতম সম্পদের মালিক সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সকলেই এগুলোর শিকার। এজন্যই তারা আজ “নো জাস্টিসনো পিস” স্লোগানে রাজপথ মুখরিত করে তুলেছেযা আসলেই বাস্তব সত্য। পুঁজিবাদী আদর্শ বৈশ্বিকভাবে সমাজে যথাযথ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং সম্পদের সুষম বন্টনের মাধ্যমে গণমানুষের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বোপরি যেকোন ধরনের বৈষম্য দূর করে সমাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সুশাসন নিশ্চিতের সক্ষমতার মাপকাঠিতেও এই পুঁজিবাদী আদর্শ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে এবং এর আদর্শিক দৈন্যতার কারনে সমগ্র বিশ্ব কে আজ ভয়াবহ মূল্য চুকাতে হচ্ছে। অতএববিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কর্তৃক প্রদত্ত ত্রুটিমুক্ত আদর্শ “ইসলাম” কিভাবে মানবজাতিকে সকল ধরনের বৈষম্যবর্ণবাদের অভিশাপ এবং দুঃখ-দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে পারে সেবিষয়ে যাওয়ার আগে “জাতীয়তাবাদ কী” এবং ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোন থেকে মুসলিম বিশ্বে এর প্রভাব কি সেবিষয়ে আসুন কিছু ধারনা পাওয়ার চেষ্টা করি।

    জাতীয়তাবাদ হচ্ছে এমন একটি বন্ধন যা লোকদের মধ্যে পারিবারিক বা গোত্রীয় সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। আধিপত্য অর্জনের মনোভাব থেকেই এটি উদ্ভূত হয়। এটি পরিবার থেকে এর শুরু হয় যেখানে একজন সদস্য পরিবারের অন্য সদস্যের উপর কর্তৃত্ব করতে চায়। পরিবারের উপর কর্তৃত্ব পাওয়ার পর সে যে কমিউনিটিতে বসবাস করে তাদের উপর কর্তৃত্ব অর্জনের চেষ্টা করে। পরবর্তীতে তারা একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয় যাতে করে সার্বিক কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করার সাথে সাথে সবধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান-প্রতিপত্তি অর্জন করতে সক্ষম হয়। ইসলামের বাণী আসার আগে আরব উপদ্বীপ বিভিন্ন গোত্রীয় ধারায় বিভক্ত ছিল এবং তৎকালীন আরব সমাজে জাতীয়তাবাদী ওদেশপ্রেমের বন্ধন বিদ্যমান ছিল। একই বাড়িতে বসবাসকারী লোকেরা একটি পরিবার গঠন করেছিল। একটি পরিবার থেকে বংশ তৈরী হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়েছিল। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধান ছিল যার দ্বারা লোকেরা শাসিত হতো। সমস্ত ক্রিয়া-কলাপ এই কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং যে কেউ এই সীমা ছাড়িয়ে গেলে তাকে তাদের শাস্তির সম্মুখীন হতে হতো। গোত্রের প্রতিদৃঢ় আনুগত্যের কারণে আন্তঃগোত্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে তুচ্ছ বিষয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। যেমন: মদীনার আওস ও খাজরাজ গোত্র উটের রশি নিয়ে ৮ বছর যুদ্ধ করেছিল!

    বহু শতাব্দী ধরে বিদ্যমান আরব সমাজের গোত্রীয় কাঠামো ইসলামের আগমনের ফলে নির্মূল হয়েছিল। ইসলামী আক্বীদার ভিত্তিতে গঠিত আদর্শিক বন্ধন মুসলিমদের মধ্যে প্রায় চৌদ্দশ বছর যাবৎ সুদৃঢ়ভাবে অব্যাহত ছিল। বর্ণগোত্রভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষকে ইসলাম ঐক্যবদ্ধ করেছিল। এ বন্ধন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি ছিল। ক্রুসেডে মুসলিমদের পরাজিত করতে ব্যর্থ হয়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত মতবাদ দ্বারা মুসলিমদেরকে পৃথক করার দিকে নজর দেয়। উসমানীয় খিলাফতের সময় পশ্চিমা মিশনারীরা মুসলিমদের বিভক্ত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে প্রথমে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে তারা আরব ও তুর্কি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৫৭ সালে মিশনারীরা সিরিয়ান বিজ্ঞান সংঘ এবং ১৮৭৫ সালে বৈরুতে গুপ্তসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়। এসব সংগঠন আরব জাতীয়তাবাদকে ধারণ করে প্রাক-ইসলামী সংস্কৃতিকে মেনে নিতে উসমানীয় খিলাফতকে চাপ দেয় এবং তুর্কিদেরকে আরবদের কাছ থেকে খিলাফতকে চুরি করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। এভাবে মুসলিম উম্মাহ্’র মধ্যে আরব জাতীয়তাবাদের প্রচলন করা হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জাতীয়তাবাদের জ্বর ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি কোণে ছড়িয়ে পড়ে। যখন উপনিবেশবাদীরা ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তিতে দখল করে নিল তখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুসলিমদের ভিতরে দেশপ্রেমের জন্ম দেয়া হয়। এ সময় ইসলামী রাষ্ট্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে মুসলিমদের মধ্যে আক্বীদাগত বন্ধন নষ্ট হয়ে যায়এবং তারা বর্ণগোত্র ও ভৌগলিক অবস্থানের ভিতরে আবদ্ধ হয়ে পড়ে।

    খিলাফত রাষ্ট্র ধ্বংস হওয়ার পরে মুসলিম উম্মাহ্’র মধ্যে কাফিরদের দ্বারা প্রোথিত জাতীয়তাবাদের বিষাক্ত বীজ সময়ের পরিক্রমায় বিষবৃক্ষে পরিনত হয়। আমরা বিভিন্ন সময়ে দেখেছি যে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিমদের মধ্যে জাতিগতগোত্রীয় বা বর্ণগত উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে। বর্তমান পুঁজিবাদী শাসকেরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য জাতীয়তাবাদের সবক দেয় এবং তারা মুসলিমদেরকে জাতিগোত্রবর্ণ ওভৌগলিক অবস্থানের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে কিছু উপাদান ব্যবহার করেযেমন: পশ্চিমা পরাশক্তিদের দালাল শাসকদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে কিংবাখেলাধূলায় মুসলিম দেশগুলো যখন একে অপরের প্রতিপক্ষ হয় তখন এক মুসলিম অন্য মুসলিমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে পরষ্পরের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেতখন তাদের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায় সৌদি মুসলিম বা ইরানি মুসলিম বা ইয়েমেনি মুসলিমবাংলাদেশি মুসলিম বা পাকিস্তানি মুসলিমমিশরীয় মুসলিম বা নাইজেরিয়ান মুসলিম। আর এই ভিন্ন ভিন্ন জাতি পরিচয়ের অজুহাতে সৌদি আরবমিশরতুরস্কইরান সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের মুসলিমদেরকে রক্ষার জন্য ইসরাইল অভিমুখে তাদের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে মার্চ করার নির্দেশদেয় নাপাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী কাশ্মিরীদেরকে ভারতীয় মুশরিকদের কবল থেকে উদ্ধারের জন্য ব্যারাক থেকে বের হয় নাবাংলাদেশমালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার সেনাবাহিনী মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাহায্যে এগিয়ে আসে না!! কারন কিএগুলো হচ্ছে এসব দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট জাতি-রাষ্ট্রের সীমানার পবিত্রতা যেকোন মূল্যে অক্ষুন্ন রাখতে হবেনাউজুবিল্লাহ্।

    আসুনএখন আমরা আলোচনা করে দেখি যে ইসলাম কিভাবে জাতীয়তাবাদ কিংবা বর্ণবাদের মতো বৈষম্য সৃষ্টিকারী চিন্তার মূলোৎপাটন করবে?

    আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন জাতীয়তাবাদগোত্রবাদবর্ণবাদের মতো কুফর ধ্যান-ধারনার পরিবর্তে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতি আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) মুসলিমদের মধ্যে বন্ধন হিসেবে ইসলামী আক্বীদাকে ভিত্তি হিসেবে নেয়ার তাগিদ দিয়েছেনতিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: “হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করবে না তোমাদের পিতা ও তোমাদের ভাইদেরযদি তারা কুফরীকে প্রিয় মনে করে ঈমানের তুলনায়” (সূরা আত-তাওবা: ২৩)। মদিনায় নব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রে এক অমুসলিম যুবক কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে আওস ও খাজরাজ গোত্রকে বু‘আছ অভিযানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের মধ্যে পুরনো আবেগকে জাগিয়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে সেখানে অস্ত্রের ঝনঝনানি শুরু হয়ে গেল। যখন রাসূল (সা)-এর কাছে এই সংবাদ পৌঁছাল তখন তিনি (সা) ছুটে এসে পরিস্থিতি অবলোকন করে বললেন: “হে মুসলিমগণ! আল্লাহকে স্মরণ করো,আল্লাহ্কে স্মরণ করো। আল্লাহ্ যখন তোমাদেরকে ইসলামে এনেছেনএর দ্বারা সম্মানিত করেছেনপৌত্তলিকতা থেকে দূরে সরিয়েছেনতখন আমি তোমাদের সাথে উপস্থিত থাকা অবস্থায় তোমরা কি ওদের মতো কাজ করবেইসলাম তো তোমাদের একে অপরকে বন্ধু বানিয়েছে”। আওস ও খাজরাজ গোত্র এ কথা শুনে কেঁদে ফেলল এবং একে-অপরকে মুসলিম ভাই হিসেবে জড়িয়ে ধরল। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: “আর স্মরণ কর আল্লাহ্’র সেই অনুগ্রহ যা তোমাদের উপর করা হয়েছেতোমরা ছিলে পরস্পর শত্রুআল্লাহ্ তোমাদের হৃদয়ে মহব্বত সৃষ্টি করেছেনফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে গেলে। তোমরা ছিলে এক অগ্নিকুন্ডের কিনারেআল্লাহ্ তা থেকে তোমাদের রক্ষা করুন” (সূরা আল ইমরান: ১০৩)। তাই মুসলিমদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল ইসলামী আক্বীদার উপর ভিত্তি করে। পারিবারিক পটভূমি বা বর্ণগোত্র নির্বিশেষে সবার প্রতি একই আচরণ করা হয়েছিল। যে কেউ  শাহাদাঘোষণা করেছে সে স্পষ্টতই মুসলিম উম্মাহ্’র অংশ হয়ে গেছে। রাসূলুলাহ্ (সা:) আসাবিয়াহ্ তথা জাতীয়তাবাদকে নিষিদ্ধ করেছেনতিনি বলেছেন: “সে আমার উম্মত নয় যে জাতীয়তাবাদের কথা বলেজাতীয়তাবাদের পক্ষে লড়াই করেবা এর জন্য মৃত্যুবরণ করে” (আবু দাউদ)।

    ভাইয়েরা আমার! পশ্চিমা দেশসমূহে শ্বেতাঙ্গরা স্লোগান দেয়: “হোয়াইট ইজ রাইটকিল দা ব্ল্যাক বাস্টার্ডস”। তাদের স্লোগানেই তাদের মনোভাব প্রকাশ পায়। আজ থেকে ৪২ বছর আগে লন্ডনে খুন হন বাংলাদেশি যুবক আলতাব আলীযাকে গণমাধ্যম বলা হয়েছে “বাংলাদেশের জর্জ”আর এই আলতাব আলীর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশিরা স্লোগান দিয়েছে: “সাদাকালো জোট বাঁধোবর্ণ ঘৃণা নির্মূল করো”। অথচবর্ণ ঘৃণা নির্মূলতো হয়ইনি বরং দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছেভারতের পুলিশও আমেরিকার পুলিশের  মত হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে মুসলিমদেরক নির্যাতন করছে। এই অবস্থার পরিবর্তন ততক্ষন পর্যন্ত আমরা দেখব নাযতক্ষণ না আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার যে মডেল দিয়ে গেছেন সেই ব্যবস্থায়ফেরত যেতে পারি। সেই ব্যবস্থায় হাবশী কৃষ্ণাঙ্গ বেলাল (রা) ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। হিজরী অষ্টম সনেঅর্থাৎ ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে যখন মক্কা বিজয় হয়তখন রাসুল (সা:) কুরাইশদের পরাজিত করে মক্কা নগরীতে শাসক হিসেবে প্রবেশ করে প্রবিত্র কাবা ঘরের  দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি (সা) প্রথমে জানতে চাইলেন – বেলাল কোথায়বেলালকে আমার কাছে নিয়ে আসো। কাবা’রদরজার সন্মুখে দাঁড়িয়ে তিনি (সা:) যখন বেলাল (রা:)-এর জন্য অপেক্ষা করছিলেন তিনি (সা:) বললেন, “আল্লাহ্র কসমআমি আজও সেই দিনগুলো স্মরণ করি যখন তারা এই কাবা’র সামনে বেলালকে নির্যাতন করত”। বেলাল (রা:) হাজির হলেন। রাসুল (সাঃ) তাকে বললেন, “বেলাল ভিতরে প্রবেশ কর। আজ একমাত্র তুমি আমার সাথে কাবা’র ভিতরে নামাজে শরীক হবে”। নামাজ শেষে রাসুল (সা) বেলাল (রা) বললেন, “কাবা’র উপর উঠে দাঁড়াও”। বেলাল (রা) চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন উচ্চ কাবা ঘরের উপড় উঠে দাঁড়াতে। নবীজি (সা) দেখলেন আশেপাশে কে আছে তাকে সাহায্য করার জন্য। আর তিনি (সা) পেয়ে গেলেন হযরত আবু বকর (রা) ও হযরত ওমর (রা)-কে। নবীজির নির্দেশে তারাদুজনই বেলাল (রাঃ) কে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। হযরত বেলাল (রা) তার ডান পা হযরত ওমর (রা) এবং তার বাম পা হযরত আবু বকর (রাঃ) এর কাঁধে রেখে প্রবিত্র কাবা ঘরের উপড়ে উঠে দাঁড়ালেন। রাসুল (সা) বললেন, “ও বেলালআল্লাহর কসম তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নাই। আল্লাহ্’র সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে এই কাবা ঘরের মর্যাদা সুমহান আর তোমার সম্মান তার কাছে আজ এর চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ।” বেলাল (রা) তখন কাবা ঘরের উপর থেকে আযানের মাধ্যমে উপস্থিত ১০ হাজার বীর যোদ্ধাদেরকে তাওহীদের মহান বাণী শোনালেনযাদের মধ্যে আরব ও কুরাইশদের সন্মানিত নেতাগণ ছিলেন এবং ইসলামের মহান সাহাবাগনও (রা) ছিলেন। ইসলাম এভাবে একজন সামান্য ক্রীতদাসকেও সম্মানিত করেছিল।

    এই প্রেক্ষিতে আরেকটি ঘটনা আপনাদের সামনে আমি তুলে ধরতে চাইমুসলিম বাহিনী ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে ব্যাবিলন দুর্গ (আজকে যেটি কপটিক কায়রো নামে পরিচিত অঞ্চল) অবরোধ করেছিলযেখানে মিশরীয় শাসক আল-মুকাওকিসকে আটক করা হয়েছিল। জেনারেল আমর ইবনে আল-আস (রা) আল-মুকাওকিসের সাথে কথা বলার জন্য উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা)-এর নেতৃত্বে দশ জন ব্যক্তির একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছিলেন। উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা) কালো ছিলেন এবং প্রতিনিধি দলটি যখন নৌকায় করে আল-মুকাওকিসের উদ্দেশ্যে যাত্রার পরে তার জায়গায় প্রবেশ করলতখন উবাদাহ (রা) সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং আল-মুকাওকিস তার কৃষ্ণ বর্ণের কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বলেছিলেন, “এই কালো মানুষটিকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যান এবং অন্য কেউ এসে আমার সাথে কথা বলুন”! বাকিরাবললেন: “এই কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় আমাদের মধ্যে সেরা। তিনি আমাদের নেতা এবং আমাদের মধ্যে সর্বোত্তমএবং তাকে আমাদের উপরে নিযুক্ত করা হয়েছে। আমরা সকলেই তার মতামতের গুরুত্ব দেই এবং আমাদের নেতা তাকে আমাদের উপরে নিযুক্ত করেছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন”। আল-মুকাওকিস প্রতিনিধিদলকে বলেছিলেন: “আপনারা কিভাবে এই কালো মানুষটিকে আপনাদের মধ্যেসেরা হিসেবে গ্রহণ করতে পারেনবরং সে আপনাদের মধ্যে সবচেয়ে কম মর্যাদাসম্পন্ন হওয়া উচিত”। তারা বলল: “নাযদিও আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে তিনি কালোতথাপি তিনি আমাদের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সেরাআমাদের মধ্যে অন্যতম এবং বুদ্ধিমান। কালো বর্ণ আমাদের মধ্যে খারাপ কিছু নয়”। আল-মুকাওকিস তখন উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা)-কে বললেন: “হে কালো মানুষএগিয়ে আসুন এবং আমার সাথে মৃদুভাষায় কথা বলুনকারণ আপনার কালো বর্ণ আমাকে শঙ্কিত করেএবং আপনি কড়া কথা বললে তা আমাকে আরও শঙ্কিত করবে। উবাদাহ বিন আস-সামিত (রা) এগিয়ে গিয়ে বললেন: “আপনি যা বলেছেন তা আমি শুনেছি। আমার যে সঙ্গীদের আমি রেখে এসেছি তাদের মধ্যে এমন এক হাজার পুরুষ রয়েছেন যারা সকলেই আমার মতো কালোএমনকি আমার চেয়েও কালো এবং দেখতে আরও ভয়ানক। আপনি যদি তাদেরকেদেখেন তবে আপনি আরও শঙ্কিত হয়ে পড়বেন। আমার যৌবন চলে গেছেতবুও আমি ভয় করব না যদি আমার শত্রুদের মধ্য হতে একশতলোক একসাথে আমার মুখোমুখি হতে চায়এবং আমার সহচরদের ক্ষেত্রেও এটি সত্যকারণ আমাদের আশা ও আমাদের আকাঙ্খা হচ্ছে কেবল আল্লাহ্’র জন্যতাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জিহাদে সংগ্রাম করা”।

    ইসলামী জীবন ব্যবস্থার সাথে পশ্চিমা জীবন ব্যবস্থার কি অসাধারণ বৈপরীত্য! ইসলাম মানব জাতিকে মুক্ত করেছে মানুষের গায়ের রংমুখের ভাষাজন্মের স্থানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার মত অসুস্থতা থেকে। ইসলাম শিখিয়েছে কিভাবে মানুষের মন থেকে বর্ণবাদকে উপড়ে ফেলে সাম্যের ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে পরস্পরকে আবদ্ধ করতে হয়। অন্যদিকে পশিমা জীবনাদর্শ শ্বেতবর্ণের খ্রিস্টান ও শ্বেতবর্ণের নাস্তিক ব্যতীত সকলেই দ্বিতীয়শ্রেণির নাগরিক বা অর্ধ-মানব বলে গণ্য করে। তার বহিঃপ্রকাশ কেবলমাত্র তাদের শোষণমূলক পররাষ্ট্রনীতিতেই নয়বরং আজ তাদের নিজেদের ভূমিতেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড নামক একজন কৃষ্ণাঙ্গের হত্যা থেকে উদ্ভূত আমেরিকাসহ পশিমা বিশ্বে চলমান বর্ণবাদ বিরোধী বিক্ষোভ ও দাঙ্গার মধ্য দিয়ে মৃতপ্রায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার কতটুক পাওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় আছে। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় যেযতক্ষণ না এই পশ্চিমা অপব্যবস্থার অপসরণ হবে এবং ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে মানুষ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে শুধরেনেবেবর্ণবাদকে নির্মূল করা সম্ভব হবে না। মানব জাতি আজ বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের যে ভয়াল সমস্যার সন্মুখিন তার সমাধান নিহিত রয়েছে রাসুল (সা)-এর দেখানো ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায়। একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই পারে সমাজে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে বর্ণবাদের বিষবৃক্ষকে সমূলে উপড়ে ফেলতে।

    ভাইয়েরাচলুন আমরা এমন এক আদর্শিক শাসন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাই যেখানে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শান্তিতে বসবাস করবে। বিনা কারণে জর্জদের প্রাণ দিতে হবে নাযত্ন নেয়া হবে বেলালদেরঅমুসলিমরা হবে খিলাফত রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক এবং তারা সবসময় নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপন করবেনাগরিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুবিধা লাভের জন্য তাদের সাথে চুক্তি থাকবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংখ্যালঘু নামের কোন অমর্যাদাকর উপলব্ধি তাদের থাকবে নাসকল মুসলিম তাদের সাথে সৎ ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ করতে বাধ্যথাকবে। কারণআল্লাহ্’র রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের ক্ষতি করল সে যেন আমাকে ক্ষতিগ্রস্থ করল” (আবু দাউদ)। খিলাফতের ইতিহাসে এধরনের অনেক অবিস্মরণীয় ঘটনা ঘটেছেযার মধ্য থেকে দু’টি উদাহরণ আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। একটি হচ্ছে সপ্তম শতাব্দীর ঘটনা: একজন ইহুদি নাগরিক খলিফা আলী (রাঃ)-এর তলোয়ারের ঢাল চুরি করলে বিষয়টি বিচারালয়ে উত্থাপিত হয়। তখন কাজীঅর্থাৎ বিচারক তার পক্ষে সাক্ষী উপস্থিত করতে বললে তিনি তার পুত্রকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করেন। বিচারক মামলাটি এই বলে খারিজ করে দেয় যে কোন পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষী গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায় বিচারের এই চমৎকারিত্ব দেখে ওই ইহুদি দারুণভাবে অভিভূত হইয়া চুরির কথা স্বীকার করে নিজেই মুসলিম হয়ে যান। আরেকটি ঘটনা হচ্ছে: ১৫ শতাব্দীতে ইহুদিদেরকে যখন স্পেন থেকে বের করে দেওয়া হয় তখন ওই ইহুদীরা আশ্রয়স্থল খুঁজে পায় ইসলামী খিলাফতের ছায়াতলে। নাগরিক হিসেবে তারা স্বাস্থ্যসেবামেটাল ওয়ার্কিং ইত্যাদি খাতে সরকারকে প্রচুর সহযোগিতা করেছিল। তাদের ছিল অসামান্য মেধাকর্মদক্ষতা ও বিদেশী জ্ঞানতাদের এই অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে তদানীন্তন উসমানী সুলতান দ্বিতীয় বায়েজিদ একটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন: “তোমরা কি করে স্প্যানিশ রাজা ফার্দিনান্দকে বুদ্ধিমান বলযে নিজের নাগরিকদেরবের করে দিয়ে নিজেকে করেছে গরীবআর আমাকে করেছে ধনী”। পরিশেষে রাসূল (সা)-এর একটি উক্তি স্মরণ করে শেষ করছিতিনি বলেছেন: “কোন অনারবের উপর আরবের মর্যাদা নেইকোন আরবের উপর অনারবের মর্যাদা নেইকৃষ্ণাঙ্গের উপর মর্যাদা নেই সাদারসাদার উপর কৃষ্ণাঙ্গের মর্যাদা নেইমর্যাদা কেবল তাক্বওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়” (মুসনাদে আহমদ)।

    অতএবআসুন আমরা মানবতার সামনে হুমকি হয়ে দাঁড়ানো এই বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদের আশ্রয়স্থল পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ পরিত্যাগ করে ইসলামী আদর্শের বন্ধনে আবদ্ধ হই। যেভাবে রাসুল বলে গেছেন: “একজন হাবশি ক্রীতদাসও যদি তোমাদের শাসক নির্বাচিত হয়যার মাথা কিসমিসের মততবুও তোমরা তাকে মান্য করবে”। আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।

  • করোনা সংকট মোকাবেলায় ইসলামের সমাধান

    করোনা সংকট মোকাবেলায় ইসলামের সমাধান

    সরকার পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের অনুকরণে “ভাইরাস অথবা ক্ষুধা”-এর মধ্যে যেকোন একটিকে বেছে নিতে জনগণকে বাধ্য করছে

    একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্র অর্থনীতি ও জনজীবনকে সচল রেখে মহামারী সংকট মোকাবেলা করতে সক্ষম

    হে দেশবাসী, আমরা এমন একটি সময়ে মহিমান্বিত রমযান মাস প্রত্যক্ষ করছি, যখন আমরা ঈমানের দিকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছি এবং অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের দিক থেকেও চরম অবস্থানে আছি। মহিমান্বিত এই মাস সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, রমযান হচ্ছে সেই মাস যে মাসে কুর’আন নাযিল হয়েছেমানবজাতির হিদায়াত ও পথনির্দেশ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” [সূরা আল-বাক্বারাহ্ : ১৮৫]। এবং এই কুর’আন সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছিযাতে আপনি মানুষের মধ্যে শাসন করেনযা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না।” [সূরা আন-নিসা : ১০৫]। আমরা প্রত্যক্ষ করছি, কিভাবে আল্লাহদ্রোহী ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী আদর্শের অনুসারী পশ্চিমা রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের অনুসারী সরকারগুলো করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে শুধু ব্যর্থই হয়নি, বরং পৃথিবীর শত শত কোটি মানুষকে নজিরবিহীনভাবে গৃহবন্দি করে অর্থনীতি ও জনজীবনকে অচল করে দিয়েছে, এবং এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। কুফর ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের অন্ধ অনুসারী এই সরকার আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান বাদ দিয়ে, করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রেও পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের নীতি অনুসরণ করেছে, যার ফলে বর্তমানে বাংলাদেশও করোনা সংকটে বিপর্যস্ত, এবং লকডাউনে ক্ষুধায় মৃত্যুবরণ অথবা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ এই দুই বিকল্প ছাড়া এই সরকার আপনাদের সামনে কোন সমাধান অবশিষ্ট রাখে নাই। তাই, এই সঙ্কট থেকে আশু মুক্তির লক্ষ্যে, এই সংকটের মূল কারণ এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং এই সংকট থেকে উত্তরণে আল্লাহ্ প্রদত্ত বিধান অর্থাৎ ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সমাধান উপস্থাপন করছি। আমরা যদি ঈমানের ভিত্তিতে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারি তবে এই রমযান হবে আমাদের জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের মাস, ইনশা’আল্লাহ্।

    প্রথমত, এই ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠী বাণিজ্যিক, সংকীর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে নিজ দেশের জনগণের উপর প্রাধান্য দিয়েছে, তাই চীন যেমন ভাইরাসটির প্রাণঘাতি চরিত্র নিয়ে তথ্য গোপন করেছে, ঠিক তেমনি পুঁজিবাদী ইউরোপ, আমেরিকাও ভাইরাসটির বিস্তার রোধে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে। ফলে ভাইরাসটি তার উৎপত্তিস্থল চীনের উহান থেকে সমস্ত চীনে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাধিক সতর্ক বার্তা সত্ত্বেও সরকার শুধুমাত্র তার মুজিববর্ষ উৎযাপন এবং চীন ও পশ্চিমা দেশসমূহের সাথে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্বিঘ্ন রাখতে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সনাক্তের বিষয়টি গোপন রাখে, এমনকি তা নিশ্চিত করতে গ্রেফতার ও ভয়-ভীতির পথ অবলম্বন করে। সরকার বিদেশ থেকে আগতদের মাধ্যমে সংক্রমণ ঠেকাতেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

    দ্বিতীয়ত, যখন এই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সহযোগী পুঁজিপতিশ্রেণী প্রত্যক্ষ করল ভাইরাসটি ধনী-গরীব পার্থক্য করে না, রাষ্ট্রপ্রধান, শীর্ষনেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, প্রভাবশালীরা আক্রান্ত হচ্ছে, এবং এতে প্রতিষেধকহীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করতে হয়। এই প্রেক্ষাপটে তারা অমানবিক লকডাউন কার্যকর করে, জনগণকে বলির পাঠা বানায়। সরকারও এর ব্যতিক্রম থাকেনি, গত ৮ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম করোনা রোগী সনাক্তের ঘোষণার পর ২৩ মার্চ (২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত) ছুটি ঘোষণার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শহর থেকে বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়, যার ফলে সমস্ত দেশে সংক্রমণটি ছড়িয়ে পড়ে, এবং ভিআইপি হসপিটালের মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন এই ভাইরাসজনিত যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে সেগুলো আড়াল করতে সরকারের হুমকি-ধামকির কারণে সংবাদ সংস্থাগুলি এসব মৃত্যুর নতুন নাম দিয়েছে “জ্বর-কাশিতে মৃত্যু”!

    তৃতীয়ত, চাকুরীহীন মুহুর্তের মধ্যে বিশ্বের শত শত কোটি মানুষ কর্মহীন, চাকুরীহীন, ব্যবসাহীন হয়ে পড়ে। তখন বর্তমান সরকার পুঁজিপতিগোষ্ঠীর বিশ্বস্ত অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়ে দুর্যোগকালীন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নামে ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার (১১.২ বিলিয়ন ডলার যা জিডিপি’র প্রায় ৩.৩ শতাংশ) ‘বেইলআউট’ প্যাকেজ ঘোষণা করে। পুঁজিপতি ও বৃহৎ কর্পোরেশনগুলো যারা ইতিপূর্বে ব্যাংকের অর্থ লুট করেছে, তাদেরকে স্বল্প সুদে এই ঋণ সুবিধা প্রদান, যা কেবলই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বা ই.ইউ-এর নীতিসমূহের অন্ধ অনুকরণ, অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে দুর্দশার মধ্যে নিপতিত রেখে প্রথমেই পুঁজিপতিদের স্বার্থ ও মুনাফাকে সুরক্ষিত করা। এখন আবার সেই পুঁজিপতিদের ব্যবসার চাকা সচল রাখতে সরকার পোষাক কারখানাগুলো খুলে দিয়ে লক্ষ লক্ষ গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকেই জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করতে যাচ্ছে।

    চতুর্থত, লকডাউন কার্যকর করতে সরকার পক্ষ থেকে জনগণকে হুমকি দেয়া হচ্ছে, “ঘরে থাকবেন, না কবরে যাবেন এটা আপনার সিদ্ধান্ত, কিন্তু জনগণ দেখছে ঘরে থাকলে তাকে ক্ষুদার জ্বালায় মরতে হবে, কারণ তথাকথিত সরকারী ত্রাণ, লুটেরাদের ঘরেই ঢুকছে, তখন কাজ ও অন্নের খোঁজে নিরুপায় ও বাধ্য হয়ে বের হওয়া এই জনগণকেই ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য দায়ী করা হচ্ছে, বলা হচ্ছে, জনগণ অকারণে রাস্তায় বের হচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব মানছে না, ইত্যাদি।

    সর্বোপরী, এই করোনাভাইরাস আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে পশ্চিমা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ ও তাদের অনুসারী সরকারগুলো কতই না ভঙ্গুর! পশ্চিমারা এবং তাদের দালাল শাসকেরা তাদের অর্থনীতি ও সেবাখাতের দুর্বলতাকে করোনার দোহাই দিয়ে আড়াল করতে চাইছে। অথচ, প্রকৃতপক্ষে পুঁজিবাদের কৃত্রিম অর্থনীতি, যা পুঁজিবাজার, ইন্সুরেন্স, সুদ, ফটকাবাজারি, কালোবাজারি, ইত্যাদির উপর প্রতিষ্ঠিত, তা বিরাট কৃত্রিম অর্থনৈতিক বেলুন তৈরি করেছে। এই কাল্পনিক অর্থনীতিটি মাকড়শার জালের চেয়েও দুর্বল, করোনার মত একটি রোগ সমস্ত পুঁজিবাদী বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, এর পতনের সূচনা করেছে। তাদের তথাকথিত উন্নয়ন চিন্তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ, যেখানে জনগণের অন্যতম মৌলিক অধিকার চিকিৎসা সেবাকে গুরুত্ব দেয়ার চেয়ে বিশাল আকারের জিডিপি, তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্পকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পিপিই, মাস্কের মত সামান্য সুরক্ষা সরঞ্জাম কিংবা রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ-ভেন্টিলেটর স্থাপন তাদের উন্নয়ন চিন্তায় স্থান পায়নি। ১৯২টি আইসিইউ বেড নিয়ে সমস্ত বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মোকাবেলা করা হচ্ছে। [ঢাকা ট্রিবিউন, ২০ এপ্রিল, ২০২০]। ইউরোপ ও আমেরিকাতে স্বাস্থ্যকর্মীরা সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে আন্দোলন করছে, সেখানে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ সাপোর্টের অভাবে ব্যাপক প্রাণহানী ঘটছে।

    বিশ্বব্যাপী পুঁজিবাদের উপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলছে, মানুষ প্রশ্ন করছে পুঁজিবাদ আদৌ কি মানব সভ্যতার কল্যাণে সক্ষম, এমনকি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহের জনগণেরও আস্থায় ফাটল ধরেছে, তারা প্রত্যক্ষ করছে, এই ব্যবস্থা তাদেরকে না ভাইরাস থেকে রক্ষা করতে পেরেছে, না খাদ্যের অভাব থেকে। তা সত্ত্বেও আল্লাহ্’র প্রতি অবাধ্য হাসিনা ও অন্যান্য মুসলিম শাসকেরা, সংকট কাটাতে ইসলামের সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা বাদ দিয়ে অন্ধের মত সেই পুঁজিবাদী নীতিরই অনুসরণ করে লকডাউনের মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে সীমাহীন ক্ষুধা, দারিদ্রতা ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে।

    হে মুসলিমগণ! দিক-নির্দেশনা ক্ষুধা, দারিদ্রতা নিরসনে খিলাফত রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা রয়েছে এবং খলীফা সেসব নির্দেশনা পালনে বাধ্য। এটি কোন কর্পোরেট রাষ্ট্র নয় যে, এটি শুধুমাত্র ক্ষুদ্র পুঁজিপতিগোষ্ঠী ও কর্পোরেটদের স্বার্থ রক্ষা করবে, বরং এই খোদাভীরু রাষ্ট্র হচ্ছে মানবতার জন্য রাষ্ট্র, যা শুধু তার নাগরিকদেরই নয় বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য রহমতপূর্ণ রাষ্ট্র। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “নিশ্চয়ই খলীফা হচ্ছেন অভিভাবক  এবং  তিনি  তার  নাগরিকদের  জন্য দায়িত্বশীল।” [বুখারী/মুসলিম]। খিলাফত রাষ্ট্র মানুষের ক্ষুধা কিংবা খাদ্যাভাবকে বর্তমান পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মত মিথ্যা প্রতিশ্রুতি, ধনীদের অনুদান অথবা ত্রাণের উপর ছেড়ে দেয় না, বরং খিলাফত রাষ্ট্র একেবারে ব্যক্তিপর্যায়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণকে নিশ্চিত করতে তার শক্তি ও সম্পদকে ব্যবহার করে, যাতে সর্বাবস্থায় রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয় এবং খাদ্যাভাব দূর হয়। খিলাফতের বাস্তব অর্থনীতি পণ্যের উৎপাদন ও তার সেবা মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়াকে কেন্দ্র করে পরিচালিত, এবং তা নিশ্চিত করার সরবরাহ লাইন হচ্ছে কারখানা, শ্রমিক, ক্ষুদ্রব্যবসা, স্বাস্থ্যখাত, অফিস ও প্রতিষ্ঠানসমূহ – কোন দুর্যোগে তা ভেঙ্গে পড়ে না। জাতীয় আয়ের অধিকাংশ অর্থ ঋণনির্ভর উন্নয়ন প্রকল্পের সুদ প্রদানে ব্যয় না হওয়ায়, স্বাভাবিক কিংবা সংকটকালীন উভয় অবস্থায় এই আয় রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব পালনে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম “রোগ কিংবা ক্ষুধা” দু’টির মধ্যে একটিকে বেছে নাও – জনগণকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করে না, বরং খিলাফত রাষ্ট্র রোগ এবং ক্ষুধা দুটোকেই নির্মূল করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় দিন শুরু করল যে তার পরিবার নিরাপদ ও সুস্থএবং তার নিকট দিন যাপনের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপকরণ বিদ্যমানসে যেন সমস্ত পৃথিবীকে তার হাতে পেল।”

    হে মুসলিমগণ! পশ্চিমের ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্ঠীর এই চরম ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে আমরা দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে মহামারী মোকাবেলায় ইসলাম নির্দেশিত কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরছি:

    সংক্রমিত রোগ ও মহামারীর মোকাবিলার ক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী সঠিক পদক্ষেপ হচ্ছে: খিলাফত রাষ্ট্র শুরু থেকেই রোগটিকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখবে এবং রোগটিকে তার উৎপত্তিস্থলেই অবরূদ্ধ রাখতে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করবে, এবং অন্য অঞ্চলের বাকি সুস্থ জনগণ কাজ ও উৎপাদন কর্মকান্ড অব্যাহত রাখবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে:

    প্রথমত, খিলাফত রাষ্ট্র সংক্রমিত রোগটিকে তার উৎপত্তিস্থলেই আবদ্ধ রাখতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ নিবে। ইমাম বুখারী কর্তৃক উসামা বিন যায়িদ হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “তোমরা যদি কোন জায়গায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে অবহিত হওসেখানে গমন করো নাযদি এমন অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব হয় যেখানে তুমি অবস্থান করছতবে সেখান থেকে পালিয়ে যেওনা।” অন্য আরেকটি বর্ণনায় মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “প্লেগ হচ্ছে একটি মহাবিপর্যয় যা বনী ইসরাইলদের উপর আপতিত হয়েছেঅথবা তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর প্রেরণ করা হয়েছে। যদি তোমরা কোন এলাকায় এর উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পাওতবে সেখানে যেও নাএবং যদি এটি তোমাদের বসবাসরত এলাকায় হানা দেয়তবে উক্ত স্থান ত্যাগ করো নাএটি হতে পালিয়ে যেও না।” চীন শুরুতে উহানকে কোয়ারেন্টাইন করেনি এবং ভাইরাস সম্পর্কে অবগত হওয়ার পরও ৪,৩০,০০০ জন চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমন করেছে, যার মধ্যে উহান থেকে ভ্রমনকারীও রয়েছে। হাসিনা সরকারও মহামারীর কেন্দ্রবিন্দু উহানসহ আক্রান্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সাথে বিমান যোগাযোগ চালু রাখে।

    দ্বিতীয়ত, সংক্রমিত রোগের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে “তোমরা অসুস্থদের সুস্থদের সাথে রেখো না।” [বুখারী]। তাই অসুস্থদেরকে চিহ্নিত করে পৃথক করা হবে এবং বিনা খরচে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। সংক্রমণের উপসর্গধারণকারীরা যাতে স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে থাকেন এজন্য তাদেরকে কুর’আন-সুন্নাহ্ দ্বারা উৎসাহিত করা হবে। অসুস্থদের সেবাদানকারী এবং চিকিৎসকদের জন্য সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করাতে হবে যাতে সংক্রমণটি কমিউনিটি পর্যায়ে না ছড়ায়। যার অভাবে বর্তমানে আমরা প্রত্যক্ষ করছি বাংলাদেশে মোট সংক্রমণের ১১ ভাগই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। অন্যদিকে, সুস্থ ব্যক্তিগণ তাদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও সামাজিক জীবন অব্যাহত রাখবে। ফলে মহামারী সাধারণ মানুষের জীবনকে স্থবির ও অর্থনীতিকে পঙ্গু করে তুলবে না।

    তৃতীয়ত, কোয়ারান্টাইনের ক্ষেত্রে ইসলামে নীতি পুঁজিবাদী নীতির বিপরীত, অর্থাৎ ইসলাম রোগকে কোয়ারান্টাইন করার উপর গুরুত্ব দেয়, মানুষকে কোয়ারান্টাইন করে না। ব্যাপক সেনিটাইজেশন ও জীবানুনাশক কার্যক্রম পরিচালনা করাসহ মাস্ক ও সুরক্ষা সরঞ্জাম পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে, এবং এগুলো ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। তাছাড়া সংক্রমণের নীরব বাহকদের মাধ্যমে যাতে রোগটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে না পড়তে পারে, সে ব্যাপারেও ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। যেহেতু নীরব বাহকরা সম্ভাব্য ক্ষতির কারণ, এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “তোমরা ক্ষতি করো নাকিংবা ক্ষতির শিকারও হয়ো না।” [ইবনে মাজাহ্]। রাষ্ট্র ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে টেস্টের আওতায় এনে দ্রুত সময়ের মধ্যে নীরব বাহকদের চিহ্নিত করবে।

    চতুর্থত, খিলাফত রাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা খলীফা’র উপর দায়িত্ব। খিলাফত রাষ্ট্রকে অবশ্যই গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উপায় যেমন, পুষ্টি, ব্যায়াম কিংবা ঔষধ, হারবাল ও ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করা যায়। তাছাড়া মহামারী সংক্রান্ত রোগের ক্ষেত্রে, জনগণের মধ্যে সংক্রমিত হবার পর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া এন্টিবডির মাধ্যমে সুস্থ হয়ে উঠার ক্ষমতা, যা হ্যার্ড ইমিউনিটি (herd immunity) নামে পরিচিত,  এর  সম্ভাব্যতা  যাচাইয়ে  গবেষণা  চালাবে। পাশাপাশি ভ্যাক্সিনের নিরাপত্তা ও কার্যকারীতা নিয়েও গবেষণা চালাবে। স্বাস্থ্যখাতকে কোনভাবে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর মত কাফির সাম্রাজ্যবাদীদের উপর নির্ভরশীল করা অথবা পুঁজিবাদী কোম্পানীর মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার বানানো সম্পূর্ণ শারী’আহ্ পরিপন্থী।

    পঞ্চমত, সাবধানতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী সাবধানতার নামে দায়িত্বহীনতার শিক্ষা দিচ্ছে, লাশ দাফনে বাধা দেয়া, অসুস্থদের সাহায্যে এগিয়ে না আসা, ইত্যাদি যার কিছু বহিঃপ্রকাশ। খিলাফত রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে যাতে জনগণ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে অসুস্থদের পাশে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, যেমন, বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা আগে থেকেই এ্যাজমা, ডায়বেটিকস, ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত, তাদের যাতে বিশেষ যত্ন নেয়া হয়। রাষ্ট্র জনগণকে বার বার স্মরণ করাবে,  সংক্রমিত  রোগকে  নয়,  বরং  আল্লাহ্’কে  ভয় পেতে হবে, হায়াত-মউত-রিযিক শুধুমাত্র আল্লাহ্’র হাতে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, আপনি  বলুনআমাদের কাছে  কিছুই  পৌঁছবে  না,  কিন্তু  যা আল্লাহ্ আমাদের জন্য পূর্বনির্ধারিত করেছেনতিনি আমাদের কার্যনির্বাহক। আল্লাহ্’র উপরই মু’মিনদের ভরসা করা উচিত।” [সূরা আত-তওবা: ৫১]

    সর্বোপরী, ইসলাম শুধুমাত্র মহামারীকালীন শারিরিক এবং আর্থিক ক্ষতিকেই কমিয়ে আনেনা, এর পাশাপাশি এই ধরনের মহামারীতে মৃত্যুকে মুসলিমরা কিভাবে দেখবে সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বুখারী কর্তৃক আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্লেগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন, এবং রাসূলুল্লাহ (সা:) তাকে (রা) বলেন, বলেন, যার উপর আল্লাহ্ ইচ্ছা করেনকিন্তু আল্লাহ্ ঈমানদারদের জন্য এটিকে রহমত বানিয়েছেনপ্রত্যেক আল্লাহ্’র বান্দাযিনি প্লেগের সম্মুখীন হয়েছেন কিন্তু ধৈর্য্যধারণ করে নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করেছেন এটা জেনে যেআল্লাহ্ কর্তৃক তার জন্য নির্ধারিত কিছু ছাড়া তার উপর অন্যকোন বিপদ আপতিত হবে নাতার জন্য শহীদের ন্যায় পুরস্কার রয়েছে।” সুতরাং, মুসলিমরা পশ্চিমা কাফিরদের ন্যায় ভয়ে এবং আতঙ্কে হতবিহ্বল না হয়ে বালা-মুসিবতে ধৈর্য্যধারণ করবে, আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশা করবে, এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাহায্য পেতে অব্যাহতভাবে দু’আ করবে যাতে তিনি এই বিপদ থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেন।

    এভাবে ইসলাম নিশ্চিত করে যাতে মহামারীটি সীমিত পরিসরে থাকে এবং বিস্তার লাভ করে সমগ্র দেশে না ছড়ায়, এবং পূর্ণ লকডাউনের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, যেমনটি আমরা আমেরিকাসহ বিভিন্ন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে প্রত্যক্ষ করছি। মুসলিমরা ইতিহাসে বহুবার একই রকম পরিস্থিতি অতিক্রম করেছে, হিজরী ৬ষ্ঠ শতকের মাঝামাঝি মুসলিমরা “আল-শাকফা” দ্বারা আক্রান্ত হয়, যা একধরনের ব্যাকটেরিয়া জনিত চামড়ার সংক্রমণ। মুসলিমরা ৮ম শতকের মাঝামাঝি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়, যা দামেস্কের প্রলয়ংকারী প্লেগ নামে পরিচিত, কিন্তু এগুলোর কোন ক্ষেত্রেই মসজিদ, জুম্মা, তারাবী কিংবা জামাতে নামায বন্ধ করা হয়নি। এবং জনগণকেও তাদের গৃহের মধ্যে বন্দি করে রাখা হয়নি, কিন্তু অসুস্থদের আলাদা রাখা হয়েছে, এবং সুস্থরা মানব সভ্যতা বিনির্মাণে কাজ চালিয়ে গেছেন। তারা ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে গিয়েছেন এবং অসুস্থদের সঠিক সেবা ও চিকিৎসা প্রদানের পাশাপাশি এই রোগের কবল থেকে মুক্তির জন্য মহান আল্লাহ্’র দরবারে ফরিয়াদ করেছেন।

    হে মুসলিমগণ, এই সংক্রমণব্যাধি করোনা আপনাদেরকে অন্য যেকোন সময়ের তুলনায় আল্লাহ্’র দিকে ধাবিত করেছে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী ও তাদের অনুসারীরা আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে প্রদত্ত এই বালা-মুসিবতকে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্বের আবরণ দিতে চাইছে, যাতে আপনারা আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন থেকে দূরে থাকেন, সুতরাং তাদের দ্বারা প্রতারিত হবেন না। যখন পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এক অতিক্ষুদ্র সৃষ্টির নিকট বিপর্যস্ত, অথচ তা প্রত্যক্ষ করেও হাসিনার এই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকেরা মানবজাতির তত্ত্বাবধানের জন্য অযোগ্য সেই কুফর পুঁজিবাদী আদর্শের দিকেই ছুটছে, ইঞ্চি-ইঞ্চি পদচিহ্নে সেটি অনুসরণ করছে, সেখানেই সমাধান ও প্রতিষেধক খুঁজছে। আবু সা’ঈদ (রা.) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পন্থা পুরোপুরি অনুসরণ করবেপ্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে। এমনকি তারা যদি গো-সাপের গর্তেও ঢুকেতবে তোমরাও তাতে ঢুকবে।” আমরা জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! আপনি কি ইহুদী এবং খৃষ্টানদের কথা বলছেন?” তিনি (সা:) বললেন, তবে আর কার কথা?” [বুখারী/মুসলিম]। এই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকদের প্রতি আর কোন আশা বাকি নাই। প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টাহীন এই পুঁজিবাদী আদর্শের অনুসারীরা বর্তমান এই সংকটসহ পৃথিবীব্যাপী ফিতনা-ফ্যাসাদ তৈরির জন্য দায়ী। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “স্থলে ও জলে যে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে তা মানুষের কৃতকর্মের ফল। আল্লাহ্ তাদেরকে তাদের কিছু কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চানযাতে তারা (সঠিক পথে) ফিরে আসে।” [সূরা রূম : ৪১]। সুতরাং, মহিমান্বিত এই রমযান মাসে, কুর’আন নাযিলের এই মাসে, আসুন আমরা এই শপথ নিই যে, আমরা এই ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণের রাজনৈতিক সংগ্রামে অংশগ্রহণ করবো, আমরা বুঝে কিংবা না বুঝে, কিংবা ভয়ে কোন অবস্থাতেই এই ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা ও শাসকগোষ্ঠীকে অনুসরণ ও সমর্থন করবো না, এবং আল্লাহ্’র দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন তথা খিলাফতে রাশিদাহ্ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে সর্বশক্তি দিয়ে আত্মনিয়োগ করবো, আল্লাহ্ প্রদত্ত যে রহমতপূর্ণ শাসনব্যবস্থাকে আমরা ৯৯ হিজরী বছর পূর্বে ২৮শে রজব ১৩৪২ হিজরীতে পৃথিবী থেকে হারিয়ে ফেলেছি।

    রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেছেন: “সুলতান (খলীফা) হচ্ছে জমিনে (পৃথিবীতে) আল্লাহ্’র ছায়া (রহমত)।” [দারাকুতনি]

    রবিবার, ৩ রমযান, ১৪৪১ হিজরী

    ২৬ এপ্রিল, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ

  • করোনা ও প্রতিক্রিয়াশীল ধার্মিকতা

    করোনা ও প্রতিক্রিয়াশীল ধার্মিকতা

    করোনার ভয়ে ধর্ম চর্চা বৃদ্ধি ইসলামি আকিদাকে আমরা কতটুকু বুঝি??

    করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু বৃদ্ধির সংবাদে আমরা অভ্যস্ত হতে শুরু করেছি? নিজের উপর করোনা বিপদ আসন্ন দেখছে সবাই। এই দুর্গতিতে নিজের অক্ষমতা বুঝতে পারছে। অনেকেরই আকড়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা সৃষ্টিকর্তাকে। মাঝে মাঝে মনে হয় শরীরে করোনার আসার ঐ ছিদ্রটি বন্ধ করলেই মনে হয় এই যাত্রায় রক্ষা। আবার পরক্ষণেই আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির খবর শুনে ভীত! যাব কি যাবনা, লকডাউন আর ছোঁয়াচের দোটানা। পরিসংখানের উত্থান পতনে নিয়মিত উঠানামা করছে ধর্ম চর্চার জ্বরের থার্মোমিটার!

    দোটানা থেকে জগাখিচুড়ি টাইপ আচরনের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিদিনকার মত আধ্যাত্মিক কিছু চর্চা ছাড়া, জীবনের বাকি সব কিছুতেই, ভয়ে আকড়ে ধরা সৃষ্টিকরতার কি কোন সম্পর্ক নেই?

    এই কম্প্রমাইজ চিন্তার ভিত্তি কী?

    উন্নত জাতি হিসেবে মনে করে কাফিরদের মুল চিন্তা সেকুলারিজমকে মুসলিমরা আকড়ে ধরে আছে। যারা দোটানায় পড়ে ধর্মকে জীবন থেকে আলাদা করে তারা আদতে সেকুলারিজম নামের একটি কম্পোমাইজড চিন্তাকে গ্রহণ করে। ব্যক্তির পছন্দমত রবিবার  জন্য তারা ধর্ম চর্চাকে নির্ধারণ করেছে। বাকি জীবনে সে নিজের বিধানই পালন করবে। অর্থাৎ সে নিজের বানানো আইন-কানুনে চলবে। নিজের পছন্দমত আইন তৈরি করবে, নিজের খেয়ালখুশি মত লাভ-লোকসান নির্ধারণ করবে এবং পরিচালিত হবে অর্থাৎ তার সমাজ জীবনের সাথে সৃষ্টিকর্তার কোন সম্পর্ক থাকবেনা!

    অধঃপতিত জাতি হিসেবে এই অঞ্চলের মানুষও অন্ধভাবে সেকুলারিজমের এই ভিত্তিটা গ্রহণ করেছে। কারণ পশ্চিমা বিজয়ী এই চিন্তাকে তারা উত্তম মনে করে বা না বুঝে অনুকরণ করে।

    যার ফলাফল হিসেবে আমরা করোনার ভয়ে ব্যক্তিগত ভাবে আধ্যাত্মিক চর্চা বৃদ্ধি করলেও দৈনন্দিন অন্য কোন কাজের ক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক খুঁজে পাইনা। ইসলাম ও সেকুলারিজম মিশিয়ে এই বিভ্রান্ত চিন্তার জন্য আমাদের পার্থিব জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্গতি।

    পার্থিব জীবনের দুর্গতিতো আমাদের চোখের সামনেই। তাছাড়া ফলাফল স্বরূপ নষ্ট চিন্তার সমাজ থেকে উঠে আসছে একের পর এক  দ্বায়িত্বহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা নে্তৃত্ব, চোরের খনি……………।

    ইসলামী আকিদার স্বরূপ কী?

    ইসলামী আকিদা একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্বাস বা চিন্তার পদ্ধতি যা মানব জীবন মহাবিশ্ব সব ক্ষেত্রে আল্লাহ ও তাঁর নির্দেশনাকে দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ করা। মানব, জীবন মহাবিশ্বের আগে-পরে আল্লাহ, সে আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে, এই আকিদা থেকে উঠে আসা অন্য চিন্তা গুলো দিয়ে সে জীবনকে পরিচালিত করবে। যার ফলে একজন মুসলিম যেমন আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে আল্লাহর ইবাদত করে তেমনে তার জীবনের সব ক্ষেত্রেও আল্লাহর বিধান দ্বারা পরিচালিত হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করে তথা ইসলামী আকিদাকে গ্রহণ করে। সে সাময়িক ভীত হয়ে আল্লাহকে স্বরণ করেনা বরং তার আকিদা দ্বারা জীবনের সকল সমস্যার সমাধান করে। সেটা ব্যক্তিগত ইবাদত হোক, সমাজের সাথে তাঁর সম্পর্ক হোক বা আল্লাহ্‌ কর্তৃক নির্ধারিত রাষ্ট্রে ব্যবস্থা দ্বারা জীবন পরিচালনা।

    এক কথায় মানব, জীবন ও মহাবিশ্বের সবকিছুতে ইসলামি আকিদাকে গ্রহণ করা।

    যেমন আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন-

    …………আমি আত্মসমর্পণকারীদের (মুসলিম) জন্য প্রত্যেক বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরুপ, পথ নির্দেশ, দয়া ও সুসংবাদ স্বরুপ, তোমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি। (১৬:৮৯)

    ……তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশ বিশ্বাস কর আর কিছু অংশ অবিশ্বাস কর? তোমাদের মধ্যে যারা এরুপ করে তাদের পার্থিব জীবনে দুর্গতি ব্যতীত কিছুই নেই এবং উত্থান দিনে তারা কঠোর শাস্তির দিকে নিক্ষিপ্ত হবে……। (২:৮৫)

    সুতরাং করোনার ভয়ে ভীত হয়ে ইসলামী আকিদাকে আমরা আধ্যাতিকতা কেন্দ্রীক দেখলে হবেনা। সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে হবে।

  • প্রশ্ন-উত্তর: কোন অধিকারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে?

    প্রশ্ন-উত্তর: কোন অধিকারের ক্ষেত্রে প্রচলিত আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে?

    প্রশ্ন: বর্তমান ব্যবস্থায় মানুষ কোন কোন অধিকারগুলো আদায় করার জন্য প্রচলিত আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে?

    উত্তর: কোনো অধিকার পুনরুদ্ধার বা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে, শরীয়াহ স্বীকৃত অন্যায় অপসারণের ক্ষেত্রে তা জায়েয; অর্থাৎ অধিকারটি  ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা স্বীকৃত এবং যে অন্যায়টি করা হয়েছে তাও ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা অন্যায় বলে স্বীকৃত। সুতরাং, যে অধিকারটি ইসলামী শরীয়াহ দ্বারা স্বীকৃত নয় তা পুনরুদ্ধার বা ফিরিয়ে দেবার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া যাবে না। যদি কোনো শ্রমিক প্রচলিত আইন অনুসারে কোন অধিকার দাবি করে যা  শরীয়াহ অনুসারে অধিকার হিসেবে স্বীকৃত না, তবে তার পক্ষে তা করা জায়েয নয়। আর কেউ যদি প্রচলিত  আইন অনুসারে কোন অধিকার দাবি করে, যা শরিয়াহ অনুসারেও অধিকার হিসেবে স্বীকৃত তবে তা  দাবি করার অনুমতি শরীয়াহতে তাকে দেয়া হয়েছে।

    উদাহরণস্বরূপ, সত্যি কথা বলা এবং তার উপর অবিচল থাকার কারণে যদি কোনো ব্যক্তির উপর অবিচার করা হয় এবং তাকে কারাবাসের মুখোমুখি করা হয়, তবে ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ীও এটা অবিচার ও অন্যায় হিসেবে গৃহীত এবং এক্ষেত্রে ইসলাম তাকে রক্ষা করে এবং তাকে কারাগার থেকে মুক্ত  করে। সুতরাং তাকে অন্যায়–অবিচার থেকে মুক্ত করে কারাগার থেকে বের করে আনার জন্য তার নিজের পক্ষ হতে কাউকে নিয়োগ দেয়া তার জন্য শরীয়াহ কর্তৃক অনুমোদিত।

    উদাহরন স্বরুপ,  আরো বলা যায়,  কেউ যদি ছিনতাই এর স্বীকার হয় তবে  তার জন্য ইসলাম প্রদত্ত অধিকার হচ্ছে তার চুরি হওয়া বা ছিনতাই হওয়া অর্থ তাকে ফিরিয়ে দেয়া। সুতরাং, চুরি যাওয়া অর্থ ফিরে পাওয়ার জন্য ছিনতাই বা চুরির স্বীকার হওয়া ব্যাক্তি, আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য নিজের পক্ষ হতে যে কাউকে নিযুক্ত করতে পারে যা শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত।

    আবার, যদি  কোনো বিক্রেতা তার বাড়িটি ক্রেতার সাথে এই চুক্তিতে  বিক্রি করে যে, ক্রেতা  প্রাথমিক ডাউন পেমেন্ট দিবে এবং বাকী টাকাটা পরিশোধের একটি পরিকল্পনার মাধ্যমে (কিস্তি) ধীরে ধীরে দিবে এবং এক্ষেত্রে, ক্রেতা যদি কেবল ডাউন পেমেন্ট প্রদান করে, এবং বাকী অর্থ প্রদান করতে অস্বীকার করে, যদিও সে ঘরটি সত্যিই কিনেছে এবং এইখানে সে বাস করে। সেক্ষেত্রে, ইসলাম ক্রেতার কাছ থেকে বিক্রেতার অধিকার পুনরুদ্ধার করবে।  এবং এক্ষেত্রে বিক্রেতা বাকি টাকা যা ক্রেতা দিতে অস্বীকার করেছিল উদ্ধার করার জন্য নিজের পক্ষ থেকে কাউকে নিযুক্ত করে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে।

    সুতরাং, যে শ্রমিক তার এবং তার নিয়োগকর্তার মধ্যে কাজের চুক্তি অনুসারে একটি নির্দিষ্ট বেতনে কাজ করে এবং   নিয়োগকর্তা যদি তার বেতন কমিয়ে দেন, ইসলাম,  শ্রমিককে তার পুরো বেতন দিতে বাধ্য করে এবং তাই শ্রমিকের পক্ষে এটি অনুমোদিত যারা তার পুরো বেতন আদায় করার ব্যাপারে তাকে সাহায্য করতে সক্ষম, তাদের সহায়তা নেয়া।

    অর্থাৎ, যদি তার জন্য নির্ধারিত অধিকার ইসলামি আইন দ্বারাও অধিকার হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং কেউ যদি এটা হরণ করে তবে তার এই হৃত অধিকার পুনরুদ্ধার করার জন্য তিনি নিজের পক্ষ থেকে কাউকে নিযুক্ত করে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবে। এর বিপরীতে, যদি মানব –রচিত আইন দ্বারা তার অধিকার নির্ধারিত হয় এবং তা যদি ইসলামী শরীয়াহ’র সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে এই অধিকার পুনরুদ্ধার করার জন্য কারো সহায়তা নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়া তার জন্য জায়েজ হবে না।

    উদাহরণস্বরূপ, যদি কেউ শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন চুক্তিতে গঠিত একটি যৌথ স্টক সংস্থায় শেয়ারের মালিক হন এবং যখন শেয়ারহোল্ডারদের কাছে লভ্যাংশ বিতরণের সময় আসে তখন যদি সে লক্ষ্য করে যে তার লভ্যাংশের অংশটি, চুক্তিগতভাবে তার যে পরিমান পাওয়ার কথা তার চেয়ে কম। এক্ষেত্রে, এই অধিকার আদায়ের জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়া তার জন্য বৈধ নয়, কারণ এই অধিকারটি মানব-রচিত আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে  এবং এটি শরীয়াহ’র পরিপন্থী। কারণ, যেহেতু কোম্পানির গঠন প্রক্রিয়াটাই শরীয়াহ অনুযায়ী বাতিল (অবৈধ) সেহেতু  এই কোম্পানীর মাধ্যমে পাওয়া কোনো কিছুই তার জন্য শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত হবে না, লাভ তো দুরের কথা। সুতরাং এ জাতীয় সংস্থার কাঠামো থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া মুসলমানের উপর ওয়াজিব।

    উদাহরণস্বরূপ আরো বলা যায়, যদি কেউ একটি নির্দিষ্ট সুদের হারে একটি সুদ ভিত্তিক ব্যাংকে তার টাকা জমা রাখে কিন্ত ব্যাংক যখন তাকে তার শেয়ার দেয়, তখন যদি সে আবিষ্কার করে যে তার নিজস্ব হিসাবে যে টাকাটা ব্যাংকের কাছ থেকে তার পাওয়ার কথা ব্যাংকের দেয়া টাকাটা তার থেকে কম। এক্ষেত্রে, এই সুদের বাকি টাকা  দাবি করার জন্য আদালতের সহায়তা অবলম্বন করা তার জন্য বৈধ নয়, কারন, এই অধিকারটি মানবসৃষ্ট আইন দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে এবং এটি শরীয়াহ’র পরিপন্থী, যা এই পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তিতে এই সুদ ভিত্তিক  ব্যাংকগুলিতে অধিকার হিসেবে অনুমোদিত কিন্তু ইসলামি আইন অনুযায়ী এটি তার জন্য অনুমোদিত নয়। সুতরাং ব্যাংকের সাথে এই সুদের চুক্তি বাতিল করা মুসলমানদের উপর কর্তব্য (ওয়াজিব)।

    সংক্ষেপে, যদি প্রচলিত  আইন অনুসারে শ্রমিকের দাবি করা অধিকারগুলি ইসলামী শরীয়াহ অনুসারেও অধিকার হয় বা শরীয়াহ দ্বারা নির্দেশিত হয় অথবা যদি তার কাজের চুক্তিতে শরীয়তের পরিপন্থী শর্তাদি না থাকে তবে, প্রচলিত  আইন অনুসারে শ্রমিকদের তাদের অধিকার দাবি করা অনুমোদিত। তবে, যদি শ্রমিকের দাবি করা অধিকারগুলি   মানব-রচিত আইন অনুসারে অধিকার হয় এবং শরীয়াহ দ্বারা নির্ধারিত অধিকার না হয়, তবে শ্রমিকদের  আদালতের সামনে তাদের দাবি উত্থাপন করা শরীয়াহ দ্বারা অনুমোদিত হবে না।

    মূল: শায়খ আতা ইবন খলীল আবু রাশতা কর্তৃক এক প্রশ্নোত্তর

    উৎস: Claiming a Right Stipulated by Non-Islamic Law

    আরো পড়ুন: প্রশ্ন-উত্তর: অনৈসলামিক ব্যবস্থায় নিজেদের অধিকারের দাবী করা কি বৈধ?

  • করোনা, ব্যর্থ সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা এবং এর প্রকৃত সমাধান

    করোনা, ব্যর্থ সেকুলার রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা এবং এর প্রকৃত সমাধান

    করোনা মহামারিতে লক ডাউনে কার্যত স্থবির একটা বাস্তবতায় আপনাদের সাথে কিছু প্রয়োজনীয় আলাপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছি। করোনা ভাইরাস যাতে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পরতে না পারে তার জন্য ২৬শে মার্চ থেকে ২৫শে এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষনা করেছে সরকার। স্বাস্থ্য অদিদপ্তরের ভাষ্য মতে এখন পর্যন্ত দেশের অন্তত ১৯টি জেলা কার্যত লক ডাউন রয়েছে আর আংশিক লক ডাউন অবস্থায় রয়েছে ১৬টি জেলা। এখন প্রশ্ন হল একটার পর একটা জেলা লক ডাউনে যাওয়ার প্রেক্ষাপট কি?

    চীনের উহানে কোভিড-১৯ এর প্রাদূর্ভাব দেখা দেওয়ার পর যখন দক্ষিন কোরিয়া যখন করোনা মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে তখন বাংলাদেশ সরকারের ফোকাস পয়েন্ট ছিল মুজিববর্ষ উদযাপন। আর করোনা মোকাবেলায় এইটাই সরকারের দায়িত্বহীনতার প্রথম দৃষ্টান্ত।

    আমরা জানি, এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়াচ্ছে আর এর উৎপত্তিস্থল নারায়নগঞ্জ বা চুয়াডাঙা, গাইবান্ধা জেলা না। করোনা প্রকোপকালে আক্রান্ত দেশগুলো থেকে যে লক্ষাধিক কর্মজীবি মানুষ দেশে এসেছেন তাদের করোনা টেস্ট এবং আইসোলশনে নিশ্চিত করা গেলে আজকের এই মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপট তৈরী হতোনা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বললে “ফইল্লে বান কাডি দিইয়ে, ফরে বালতি দিয়েরে ফানি হেছের” অর্থ্যাৎ ফসলের মাঠে বাধ কেটে খালের পানি প্রবেশের সুযোগ দিয়ে এখন বালতি দিয়ে পানি সরানো হচ্ছে। সরকার এর ‘No Test, No Corona’ নীতি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে IEDCR। নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আর করোনা টেস্ট নিয়ে IEDCR এর ভূমিকা একই রকম। নিয়মিত আপনারা যারা পত্রিকা পড়ছেন আপনারা জানতে পারছেন কিভাবে খোদ ঢাকা শহরেই করোনা টেস্ট নিয়ে জনগণকে দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। প্রতিদিন করোনার উপসর্গ জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় মানুষ মারা যাচ্ছে।

    পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তি মালিকানাকে উৎসাহিত করেছে এবং সরকারী হাসপাতালের সক্ষমতাকে দূর্বল করেছে, যার ফলাফলে চিকিৎসা একটা ব্যয়বহুল বিষয়ে পরিনত হয়েছে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ সুলভে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। এমনকি এই করোনা দূর্যোগের সময়েও ঢাকা থেকে শুরু করে উপজেলা সদর পর্যন্ত করোনা চিকিৎসার জন্য হাসপাতালকে প্রস্তুত রাখার ক্ষেত্রে সরকারের ব্যাপক ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। পিপিই, আইসোলেশন শয্যা, আইসিইউ এবং ভেন্টিলেটর এ সব কিছুর অপ্রতুলতা একটা প্রকাশিত সত্য। করোনা সংকট মোকাবেলায় সরকার ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষনা করেছে, কিন্তু তা মূলত ব্যবসায়ীদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ সহায়তা। লক ডাউনে অচল স্থবির হয়ে পরা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কোটি কোটি মানুষের আয়-উপার্জন সরকার শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। এই করোনা সংকটের মধ্যেও বকেয়া বেতনের দাবিতে উত্তরার আজমপুরে, টঙ্গীর বিসিক শিল্প নগরীতে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ করেছে। ৪% সুদে কৃষকের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজটিও একটা ঋণ সহায়তা। আমরা জানি, কৃষক ধান উৎপাদন করে ধারাবাহিকভাবে ভাবেই লোকসানে আছেন, তার উপর খাদ্য সংকটের হুমকিতে থাকার পরিস্থিতিতে সরকার কৃষকদের নগদ অর্থ প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি। সরকারের পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সুদভিত্তিক ঋণ প্রদান করাই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা সর্বপ্রথম হাতিয়ার। দেশের ৬ কোটি শ্রমশক্তির ৫ কোটি ২০ লক্ষ্য অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। তাদের কাজ বন্ধ থাকায় তাদের খাদ্যের যোগান কোথা থেকে হবে সে ব্যপারে সরকার নির্বিকার। অথচ এই মূহুর্তে প্রয়োজন ছিল জরুরি ভিত্তিতে নগদ টাকা এবং খাদ্য সহায়তা। ওয়ার্ড থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় দ্রুত দরিদ্র পরিবারের তালিকা করে এই সহায়তা পৌছানোর সক্ষমতা থাকা সত্বেও মুনাফাকেন্দ্রিক পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সরকার দ্রুততার সাথে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এক কোটি দরিদ্র পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দিলে লাগে ১০ হাজার কোটি টাকা। এই “মেগা প্রকল্প’’ এর দেশে এই পদক্ষেপ অসম্ভব কিছু হওয়ার কথা ছিলা না। এমনকি সরকারের জনসেবার বিজ্ঞাপন ১০ টাকা কেজিতে ও.এম.এস এর চাল বিতরণ কর্মসূচি সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার অজুহাতে (প্রকৃতার্থে ব্যপক চাল চুরির কারণে) তা বন্ধ করে দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রনালয়।

    এপ্রিল থেকে মে মাস বাংলাদেশের কৃষির জন্য গুরত্বপূর্ণ দুই মাস। হাওরের ধান পেকে মাটিতে পড়ে যাচ্ছে কারণ কাটার জন্য দেশের দক্ষিনাঞ্চলের কৃষি শ্রমিকেরা সেখানে যেতে পারছেন না। সরকারের দায়িত্বহীনতার আরেকটি নিদর্শন হচ্ছে এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। ব্যাপক হারে করোনা টেস্ট, আইসোলেশনের মাধ্যমে হাওর অঞ্চলকে করোনামুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা, কৃষি-শ্রমিক, কৃষি-যান্ত্রিক কারিগরদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে হাওর অঞ্চলে পৌছে দেওয়া, স্কুল কলেজ শিক্ষার্থীদের ধান কাটার জন্য মাঠে না নামালে হাওরের ২০% বোরো ধানের যোগান বন্ধ হয়ে যাবে এবং হাওর অঞ্চলে খাদ্যভাব দেখা দিতে পারে।

    এই ধরনের বাস্তবতায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু বিষয় আলোকপাত করছি।

    খিলাফত রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে খলীফা, খলিফার সহকারীগণ এবং ওয়ালী বা গভর্নরবৃন্দ জনগনের সার্বিক বিষয়ে দেখাশুনা করেন আহকাম শরীয়াহ এর মাধ্যমে। জনগনের দেখাশোনা করাকে ইংরেজীতে politics বা আরবীতে সিয়াসাহ (سياسة) বলা হয়। রাষ্ট্র এই কাজ কার্যকরীভাবে বাস্তবায়ন করে এবং শাসককে জবাবদিহিতার মুখোমুখি করে। রাসূল (সা) বলেছেন: “তোমাদের প্রত্যকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্বের ব্যপারে জবাবদিহি করতে হবে।” তিনি আরো বলেন: “ইমাম তথা শাসক জনগণের ব্যাপারে দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্বের ব্যপারে প্রশ্ন করা হবে।“ তিনি বলেন: “ইমাম হচ্ছেন অভিভাবক এবং তার জনগণের ব্যপারে দায়িত্বশীল।”

    পুঁজিবাদী দৃষ্টিকোন থেকে মুনাফা অর্জন করাই মানবজীবনের কাজের একমাত্র মানদন্ড। তাই চিকিৎসা ব্যবস্থাকে একটা প্রাইভেট সেক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যাতে মুনাফা অর্জন করা যায়। এই দূর্যোগকালীন সময়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অক্ষমতা এই মুনাফাকেন্দ্রিক নীতির ব্যর্থতাকে পুরোপুরি প্রকাশ করছে। শরীয়াহ দলীলের ভিত্তিতে ইসলাম চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যখাতকে জনগণের অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই খিলাফত রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় হাসপাতালগুলোকে বিনামূল্যে জনগণের চিকিৎসা প্রদানের জন্য উপযোক্ত করে গড়ে তুলবে। সুলভে প্রয়োজনীয় মেডিসিন, ভ্যাকসিন তৈরীর জন্য রিসার্চ সেন্টার, ল্যবোরেটরী স্থাপন করবে। পৃথিবী তখন কিউবা মডেলের পরিবর্তে খিলাফত মডেলের বিষয়ে উৎসাহিত হবে।

    রাসূল (সা) বলেছেন: “যে ব্যক্তি মহামারীর প্রাদুর্ভাব রয়েছে এমন অঞ্চলে বসবাস করছে সে যেন সেখানেই অবস্থান করে এবং সেই অঞ্চল পরিত্যাগ করে না বরং ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর পুরষ্কারের আশা করে এবং বিশ্বাস রাখে যে, তার উপর কোন কিছুই আপতিত হবে না যা আল্লাহ তার জন্য নির্ধারন করে রেখেছেন, তখন সে এমন পুরষ্কার প্রাপ্ত হবে যা একজন শহীদের জন্য রয়েছে”।

    মহামারী থেকে একটা অঞ্চলকে রক্ষা করার মৌলিক নীতি আমরা এই হাদিস থেকে বুঝতে পারছি। আক্রান্ত অঞ্চল থেকে আগত লক্ষ লক্ষ মানুষকে হোম কোয়ারাইন্টাইনের প্রেস্ক্রিপশন  দিয়ে নিজ নিজ এলাকায়  পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়টি লক করা হয়নি এবং যারা আসছে তাদের করোনা টেস্ট করা হয় নি। আজকে পুরো দেশকে লক ডাউন করে অগণিত মানুষকে ক্ষুদার্থ, অভুক্ত রেখে এই ভাইরাসকে মোকাবেলা করছে সরকার। আক্রান্ত দেশ থেকে আগত মানুষকে বিনা পরীক্ষায় বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে ঘরে ঘরে করোনা প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে এই গণতান্ত্রিক সরকার। ব্যপক টেস্ট, আইসোলেশন ট্রিটমেন্ট এর মাধ্যমে অসুস্থদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া এবং সুস্থদের দৈনন্দিন যাবতীয় কাজে সক্রিয় রাখা এটাই সঠিক সমাধান এবং এই নীতিই খিলাফত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

    দ্রুততর সময়ে ব্যপক পরীক্ষার মাধ্যমে হাওর অঞ্চলকে করোনামুক্তাঞ্চল ঘোষনা না করলে, হাওর অঞ্চলে কৃষি শ্রমিকদের প্রবেশের সুযোগ না দিলে ব্যপক খাদ্য সংকট তৈরীর সম্ভাবনা রয়েছে। হাদিসে বর্ণিত নীতিমালা অনুসরণের মাধ্যমে খিলাফত রাষ্ট্র সহজেই এই ধরণের স্থবিরতা থেকে সমাজকে সুরক্ষা দিবে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে।

    খাদ্যের ব্যপারে ইসলামের হুকুম হচ্ছে খাদ্য হতে হবে হালাল এবং পবিত্র। খিলাফত রাষ্ট্র কাজি উল হিসবাহ এর মাধ্যমে বাজারে খাদ্য সরবরাহর ক্ষেত্রে ইসলামের নীতি অনুসরণকে মনিটর করবে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইসলামের দৃষ্টিকোন থেকে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই মহামারীসহ যেকোন দূর্যোগকালীন সময়ে দরিদ্র মানুষের ঘরে খাদ্য ও নগদ অর্থ পৌছে দিতে খলীফা শরীয়াহগতভাবে বাধ্য যাতে মানুষ খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারে।

    বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ শাসকগোষ্টি তার দায়িত্বশীলতার বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য OMS এর চাল বিতরণের একটি ব্যর্থ চেষ্টা করছে। ১ কোটি দরিদ্র পরিবারকে ১০,০০০ টাকা করে দিয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা  সক্ষমতা থাকা সত্বেও কঠোর পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহন করেনি। তার পরিবর্তে জনরোষ ও গণবিদ্রোহ ঠেকানোর দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ মূল্যায়ন করতে হবে।

    কোভিড-১৯ ভাইরাস আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলার)-এর একটি অতিক্ষুদ্র সৃষ্টি যা বিশ্বব্যপী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অক্ষমতাকে প্রকাশ করেছে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-ই এই সমগ্র বিশ্বজগতের স্রষ্টা, মালিক। তিনি তার সৃষ্ট মানুষের জন্য ইসলামকেই একমাত্র জীবনব্যবস্থা/মতাদর্শ হিসেবে পাঠিয়েছেন। খিলাফত রাষ্ট্র কাঠামোর মাধ্যমে এই জীবনব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনা ছাড়া মানবজাতিকে সঠিক পথ দেখানো সম্ভব নয়। এই দায়িত্ব মুসলিম উম্মাহকেই পালন করতে হবে।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন: “এইভাবে আমি তোমাদেরকে উম্মাতান ওয়াসাতান বা ন্যায়পরায়ণ জাতি করেছি যাতে তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানবমন্ডলীর জন্য এবং যাতে রাসূল সাক্ষদাতা হন তোমাদের জন্য’’। (সূরা বাকারা: ১৪৩)

  • রজব মাসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

    রজব মাসের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

    ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময় রয়েছে। কিছু দিন, সপ্তাহ কিংবা মাস। মুসলমানরাও এর ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য এবং সত্যই স্মরণযোগ্য এই ঘটনাটি অবাক হওয়ার মতো যে, ৭ম শতাব্দীর বিশ্বে ইসলামী সভ্যতা একটি নতুন ভোর এনেছিল, কারণ এটি দিক-দিগন্ত জয় করে জমিনে জ্ঞান, সভ্যতা এবং সত্যিকারের অগ্রগতি নিয়ে এসেছিল। এটি সুপরিচিত যে ইসলামী চন্দ্র ক্যালেন্ডারে রজব একটি মাসের পবিত্র মাস এবং এটি সত্যিই এমন একটি মাস যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বহন করে। বিশেষত, রজব ইসলামী ইতিহাসে চারটি ঘটনা দেখেছিল যা ইতিহাসের গতিপথকে পরিবর্তিত করেছিল।

    এটি নবুওয়াতের দশম বছরের রজব (৬২০ খ্রিস্টাব্দ) যখন আল-ইসরা ওয়া ওয়াল-মি’রাজ হয়েছিল। এক রাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে জেরুজালেমে, তারপর আকাশে ও তার উপরের শেষপ্রান্তে চলে গেলেন। তাঁর চাচা আবু তালিব যে তাঁর দাওয়াতের শুরু থেকেই তাকে রক্ষা করেছিলেন, পাশাপাশি তাঁর প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা) – কে হারিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। মক্কার নেতৃত্ব মুসলিমদের উপর তাদের নির্যাতন ও নিপীড়নের চুড়ান্তে পৌঁছেছিল। ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার লড়াইয়ের এমন এক শীর্ষ পর্যায় এসেছিল যে, আল্লাহ তাঁর মনোনীত বান্দাকে তাঁর এক বৃহত্তর নিদর্শন দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এক রাতে তাঁকে নিয়ে গেলেন, এর একটি অংশে তাকে জেরুজালেম এর পবিত্র মসজিদ দেখালেন, সেখানে তিনি অন্যান্য নবীদের সালাতে নেতৃত্ব দিলেন। এবং সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো সর্বোচ্চ আকাশে, যেখানে তাকে উম্মতের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত সালাত উপহার দেওয়া হলো।

    রজব রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক গৌরবময় সামরিক বিজয়ও দেখেছিলেন; তাবুকের যুদ্ধ, যা ৯ হিজরিতে সংঘটিত হয়েছিল যা সমগ্র আরব উপদ্বীপে ইসলামি সামরিক কর্তৃত্বের নিদর্শনরূপে চিহ্নিত হয়। তীব্র উত্তাপ এবং ৩০,০০০ সৈন্যের মদীনা থেকে দীর্ঘ যাত্রা সত্ত্বেও, মুসলিমগণ নিরলসভাবে আল-শামের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্য রোমান সেনাবাহিনী তাবুকের কাছে শিবির স্থাপন করেছিল, কিন্তু যখন তারা শুনেছিল যে মুসলিম বাহিনীর বৃহৎ আকার এবং শক্তি তাদের দিকে এগিয়ে আসছে এবং তারা স্বয়ং আল্লাহর রাসূলের নের্তৃত্বে ছিল, তখন তারা আতঙ্কিত হয়ে তাদের দুর্গগুলির সুরক্ষার জন্য আল-শামের অভ্যন্তরে ফিরে যায়। এভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লড়াই ছাড়াই তাবুক দখলের কাজটি করে ফেলেছিলেন। তিনি সেখানে অন্যান্য দুর্বলচিত্তের প্রতিরোধী বাহিনীর বিরুদ্ধে একমাসের জন্য অবস্থান করেছিলেন এবং সেই অঞ্চলে রোমান নিয়ন্ত্রণে থাকা নেতৃবৃন্দ ও গভর্নরদের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন, যারা তাঁর সাথে শান্তি স্থাপন করেছিলেন এবং জিজিয়াকে প্রদান করতে রাজি হয়েছিলেন।

    এটি ৫৮৩ হিজরি (১১৮৭ খ্রিস্টাব্দ) এর রজবে সালাহ আল-দীন জেরুজালেম যাত্রা করেছিলেন এবং ইউরোপীয় ক্রুসেডারদের খপ্পর থেকে তা মুক্ত করেছিলেন যখন ইতোমধ্যে এটি তারা প্রায় এক শতাব্দী ধরে শাসন করেছিল আসছিল। এই বিজয়টি কেবলমাত্র ইসলামে জেরুজালেমের অদম্য গুরুত্বের কারণে নয়, মুসলিম ভূমিগুলিকে বিজয়ী করার জন্য ক্রুসেডার প্রচেষ্টায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছুরিকাঘাত হিসাবে ভূমিকা পালন করার কারণে তা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কয়েক মাস আগে সালাহ উদ-দীন হিট্টিনের যুদ্ধে গাই অফ লুসিগান এবং ত্রিপোলির তৃতীয় রেমন্ডের ক্রুসেডার সেনাকে ধ্বংস করেছিলেন। এটি ছিল ক্রুসেডারদের জন্য একটি বড় বিপর্যয় এবং মুসলমানদের অনুকূলে ক্রুসেডের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

    বহু শতাব্দী পরে, ১৩৪২ হিজরিতে (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দ), রজব মাস আবার মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি ইতিহাস স্থাপনের ঘটনা নিয়ে আসে তবে এবার আগের দুটির মতো নয়, এটি প্রশংসার যোগ্য এমন ঘটনা ছিল না, যদিও অবশ্যই স্মরণযোগ্য। ৩রা মার্চ তথা রজব-এর ২৮ তারিখে মোস্তফা কামাল পাশার হাতে খিলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। যে প্রতিষ্ঠানটি মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল এবং ১৩শ বছরের বেশি সময় ধরে শরীয়ত বাস্তবায়ন করে আসছিল তা বাতিল করা হয়েছিল। যে প্রতিষ্ঠানটি বহু শতাব্দী ধরে মুসলমানদের ঢাল হিসাবে ভূমিকা পালন করেছিল তা সরানো হয়েছিল। এরপরে যা ঘটেছিল তা প্রত্যাশিত ছিল। ঢাল ব্যতীত মুসলমান, তাদের সম্পদ এবং তাদের জমিগুলি অবিশ্বাসী ঔপনিবেশবাদীদের কাছে যুদ্ধের লুটপাট ছাড়া আর কিছু ছিল না, যারা খিলাফতকে নির্মূল করা এবং সেক্যুলার শাসনের দ্বারা প্রতিস্থাপন নিশ্চিত করার জন্য লম্বা সময় ধরে এ ষড়যন্ত্র করে আসছিল।

    ইসলামী ইতিহাসের এই চারটি ঘটনা প্রকৃতপক্ষে এক মুহূর্তের ঘটনা। এসব ঘটনা ইতিহাসের গতিপথকে একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যায়। তাই সেসব ঘটনা আমাদের স্মরণে রাখার মতো তাৎপর্যপূর্ণ। এসব বিষয় রোমন্থন করার জন্য কোনও পাশ্চাত্য স্মৃতিচিহ্ন নয়, বরং ইসলামি ইতিহাসের শিক্ষনীয় ঘটনা। আমরা রাত আলোকসজ্জা করে, অযৌক্তিক মিছিল ও শিঙা বাজিয়ে, কিংবা পুরুষদের মূর্তি ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে এসব স্মরণ করি না। বরং আমাদের স্মরণীয়তা কারণ হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত ও মননের দিকে মনোনিবেশ করা: তাঁর মহান অনুগ্রহের জন্য তাঁর প্রশংসা করা এবং আমাদের ত্রুটিগুলির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহর স্মরণে অতিরিক্ত নামাজ পড়া, আরও বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা এবং অতিরিক্ত জিকর করা। আমাদের পরিস্থিতি ও বাস্তবতা বুঝে, শিক্ষা নিয়ে উম্মাহর জন্য তার সঠিক প্রতিফলন ঘটানো আমাদের ইসলামি বাধ্যবাধকতার মধ্যে এটি পড়ে।

    রজবে প্রবেশের সাথে সাথে আমাদের মহান ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া উচিত এবং উপরোক্ত বিষয়গুলির ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি নির্ভেজাল আন্তরিকতার সাথে তাঁর সন্তুষ্টির সন্ধানের একক প্রেরণায় অগ্রসর হবার সুযোগ নেওয়া উচিত। আমাদের প্রশ্ন করা উচিত: আমরা যখন ইসলাম ও কুফরের মধ্যকার তীব্র লড়াইয়ের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি, তখন আমরা কি ইসলামকে প্রভাবশালী করার লক্ষ্যে জড়িত? আমাদের প্রশ্ন করা উচিত: পবিত্র শহর জেরুজালেমকে যখন আবারও কুফরশক্তি দখল করে নিয়েছে এবং সত্তর বছরেরও বেশি সময় ধরে রয়েছে তখন আমরা কীভাবে ভাল থাকতে পারি? আজকের সালাহ উদ-দীন কোথায়? খেলাফতের ধ্বংসের দিবসে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত: খিলাফতকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য ইসলামী পুনর্জাগরণ-এর প্রচেষ্টাতে আমাদের অবদান কী? আমরা ইসলামের দ্বারা শাসন এবং মানবতার রোল মডেল হয়ে আল্লাহর কাছে আমাদের সম্মিলিত বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য কী করছি, যা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে? ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে আমাদের ইতিহাস থেকে পাঠ গ্রহণে আমাদের এই প্রশ্নগুলি জিজ্ঞাসা করতেই হবে।

    প্রথম প্রকাশ: ১৪ই মার্চ ২০২০