তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
জেন্ডার, অস্পষ্ট জেন্ডার, ট্রান্সজেন্ডার ও ট্রানসেক্সুয়াল সম্পর্কিত ইসলামের বিধান

জেন্ডারিজম (Genderism) নিজস্ব খেয়াল-খুশি দ্বারা লিঙ্গকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য একটি পাশ্চাত্য ধারণা
বিগত কয়েক দশকে পশ্চিমারা জেন্ডার বিষয়ে একটি নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। খৃষ্টান চার্চ এবং এর নিপীড়নমূলক মতবাদের কারণে নারীদের প্রতি শতাব্দী ধরে নিষ্ঠুর বৈষম্যের আচরণ করার ফলে পশ্চিমারা লিঙ্গকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য ‘জেন্ডারিজম’ এর দিকে ঝুঁকেছে। ফলে পশ্চিমারা (প্রাকৃতিক) লিঙ্গ ধারণা তথা বায়োলজিকাল জেন্ডারের ধারণা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, অর্থাৎ পুরুষ ও নারী জেন্ডারের পরিবর্তে ‘জেন্ডারিজম’ ধারণার দিকে ঝুঁকছে। জেন্ডারিজমের অধীনে, একজন ব্যক্তির সাংস্কৃতিক ও সামাজিক গঠন অনুসারে লিঙ্গ সংজ্ঞায়িত করা হয়। জেন্ডারিজমের অধীনে, লিঙ্গটি একজন ব্যক্তির চিন্তার দ্বারা নির্ধারিত হয়, আত্ম-উপলব্ধি দ্বারা, জীববিজ্ঞান দ্বারা নয়। যেমনটি ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক, সিমোন ডি বেউভোয়ার বলেছেন, “একজন (নারী) জন্মগ্রহণ করেন না, বরং একজন নারী হয়ে ওঠেন (ফরাসি: On ne naît pas femme, on le devient)” তার বই “দ্য সেকেন্ড সেক্স” (ফরাসি: Le Deuxième Sexe)।
জেন্ডারিজম, মূলত, নারীবাদের দ্বিতীয় ঢেউয়ের অংশ হিসাবে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার প্রচেষ্টায় উদ্ভূত হয়েছিল। সুতরাং, জেন্ডারিজম নারী পুরুষের মধ্যে বৈষম্য দূর করতে চেয়েছিল। এর মাধ্যমে তারা এ বৈষম্যের পরিণতি, তথা নারী-পুরুষের ব্যপারে গদবাধা চিন্তা করা এবং সমাজে নারী-পুরুষ কে কোন কাজ করতে পারবে তা সীমাবদ্ধ করে দেওয়া, যা তারা নিপীড়নমূলক বলে মনে করছিল তা দূর করার চেষ্টা করেছিল।
জেন্ডারিজম সমকামী আন্দোলন দ্বারা গৃহীত হয়
মূলত, পুরুষদের দ্বারা নারীর প্রতি বৈষম্য প্রতিরোধ করার জন্য জেন্ডারিজম গৃহীত হয়েছিল। যাইহোক, জেন্ডারিজম নারীর অধিকারের সমর্থন থেকে সমকামী অধিকারের সমর্থনে প্রসারিত হয়েছে। যারা নিজেদেরকে সমকামী বলে ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে সমকামিতার সমর্থকদের দ্বারা জেন্ডারবাদকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করা হয়েছিল। এভাবে, জেন্ডারিজমের উদ্দেশ্য আর নারীর প্রতি বৈষম্যের অবসানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলো না। বায়োলজিকাল জেন্ডার যা-ই হোক না কেন, খেয়াল-খুশি দ্বারা যারা নিজেদের জন্য একটি লিঙ্গ বেছে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অবসান ঘটাতে জেন্ডারিজমকে অগ্রসর করানো হয়।
ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ধারণার মাধ্যমে পশ্চিমারা নিজেদের মধ্যে লিঙ্গ নির্ধারণের অনুমতি দিয়েছে, নিজেদের তথাকথিত ‘আত্মউপলব্ধি’র মাধ্যমে। সুতরাং, জেন্ডারিজম অনুসারে, একজন পুরুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে তিনি একজন নারী, যদিও তিনি বায়োলজিকালি একজন পুরুষের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তিনি নিজের জন্য বেছে নেওয়া লিঙ্গে রূপান্তর করতে অস্ত্রোপচার এবং হরমোন থেরাপি নিতে পারেন। একজন তথাকথিত ‘ট্রান্সজেন্ডার’ এভাবে পুরুষের বায়োলজিকাল বৈশিষ্ট্যগুলিকে লুকিয়ে রাখতে পারে এবং নারীর জৈবিক বৈশিষ্ট্যগুলি অর্জন করতে পারে। ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিরা যারা এভাবে তাদের লিঙ্গ পরিবর্তন করার জন্য চিকিৎসা সহায়তা ব্যবহার করে, তাদেরকে ট্রান্সসেক্সুয়াল বলা হয়। একইভাবে, একজন নারী নিজেই হঠাৎ উপলব্ধি (!) করতে পারে যে সে একজন পুরুষ। একটি বিখ্যাত ঘটনা হল সেই নারী, এলেন পেইজের, যিনি অস্ত্রোপচার ও হরমোনের পরিবর্তনের পরে এলিয়ট পেজে পরিণত হন। তাই, এখন পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে ট্রান্সজেন্ডার মানুষ বলে কিছু মানুষ আছে, যাদের একটি লিঙ্গ পরিচয় আছে, যা জন্মের সময় তাদের জৈবিক লিঙ্গ থেকে আলাদা হতে পারে।
ইসলামে জেন্ডার ও জেন্ডারের দায়িত্বের ব্যপারে দৃষ্টিভংগি
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
وَلَيْسَ الذَّكَرُ كَالْأُنثَىٰ
“এবং পুরুষ মহিলার মত নয়।” [সূরা আলে ইমরান, TMQ 3:36]। ইসলাম অনুযায়ী মৌলিকভাবে জেন্ডার দুটো। দুটো জেন্ডারই শুধুমাত্র জৈবিক বিবেচনা দ্বারা নির্ধারিত হয়। জেন্ডার ব্যক্তির খেয়ালখুশি বা স্ব-উপলব্ধির সিদ্ধান্ত দ্বারা নির্ধারিত হয় না। অস্পষ্ট জেন্ডার বিশেষজ্ঞদের দ্বারা নির্ধারিত হয়, কারণ তা দুটি জেন্ডারের মধ্যে একটি হবে। এরপর, জেন্ডারের ভূমিকা ওহী দ্বারা প্রকাশিত শরীয়াহ আইন দ্বারা নির্ধারিত হবে। ইসলামে, সমস্ত মানুষ তথা সকল পুরুষ ও নারীর জন্য যেমন শরীয়াহ বিধিবিধান রয়েছে, তেমনি লিঙ্গ-নির্দিষ্ট শরিয়াহ বিধানও রয়েছে। যেমন ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের দায়িত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি, ইসলাম ঋতুস্রাব, গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মের বিষয়ে শুধুমাত্র নারীর জন্য কিছু শর’ঈ বিধান দিয়েছে। ইসলাম পুরুষের উপরে নারীকে সন্তানের তত্ত্বাবধান (Custodianship)-এর অধিকারও দিয়েছে। ইসলাম নারীকে উপার্জনের অধিকার দিয়েছে, যেখানে তার সম্পত্তিতে তার স্বামীর কোনো অধিকার নেই, যেখানে পুরুষকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণপোষণ দিতে বাধ্য করেছে। যুদ্ধ করা নারীদের উপর ফরয নয়, পুরুষের উপর ফরয।
নারী বা পুরুষের উপর নিপীড়ন সৃষ্টি করাতো দুরের বিষয়, শরীয়াহ আইন নিশ্চিত করে যে পুরুষ ও নারী একে অপরকে সহযোগিতা করবে, ফলে একটি শক্তিশালী পারিবারিক কাঠামো তৈরি হবে এবং একটি স্থিতিশীল সমাজ তৈরি করতে তা সহায়তা করবে। এমনকি বর্তমানে খিলাফতবিহীন অবস্থায় যখন নিপীড়ন ও পদস্খলন দূর করবার জন্য কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা নেই, সেসময়ও মুসলিম বিশ্বের পারিবারিক জীবনগুলো আলোর বাতিঘর হয়ে আছে, বিশেষ করে তাদের জন্য যারা পাশ্চাত্যে তাদের পারিবারিক জীবন ধ্বংসের মারাত্মক পরিণতি ভোগ করছে।
ইসলাম অস্পষ্ট জেন্ডারকে (خُنْثَى খুনছা) দুই জেন্ডার থেকে একটি জেন্ডার নির্ধারণ করে দেয়
‘খুঁনছা’ শব্দটি এমন একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাকে জৈবিক বিবেচনায় পুরুষ বা নারী হিসাবে সহজে চিহ্নিত করা যায় না। এটি সেই মানুষ যার পুরুষ ও মহিলা উভয় শারীরস্থান রয়েছে, বা যার কোনটিই নেই। ইসলামে, বিশেষজ্ঞরা জৈবিক বাস্তবতা অধ্যয়নের পরে অস্পষ্ট জেন্ডারকে দুটি জেন্ডার তথা পুরুষ কিংবা নারীর মধ্যে একটি নির্ধারণ করে দেন। প্রখ্যাত আইনবিদ ইবনে কুদামাহ তার আল-মুগনি গ্রন্থে অস্পষ্ট জেন্ডারের বিষয়ে বলেছেন: “এটি পুরুষ বা নারী থেকে ভিন্ন কিছু না (অর্থাৎ, দুইয়ের মধ্যে যেকোন একটি)।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَأَنَّهُ خَلَقَ الزَّوْجَيْنِ الذَّكَرَ وَالأُنْثَى
“এবং উভয়ের মাধ্যমে তিনি অগণিত পুরুষ ও নারীকে ছড়িয়ে দিয়েছেন” [সূরা আন-নিসা, TMQ 4:1] এবং তাই তৃতীয় কোনো সৃষ্টি নেই।
সুতরাং, ইসলাম তৃতীয় লিঙ্গ নির্ধারণ করে না। একজন বিশ্বস্ত মুসলিম ডাক্তার যিনি জন্মগত ত্রুটি, লিঙ্গ, শারীরস্থান, জেনেটিক্স এবং জেন্ডার আচরণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তিনি জেন্ডার নিশ্চিত করবেন। তাই তিনি, সহানুভূতি সহকারে এবং সংবেদনশীলভাবে, জৈবিক, শারীরবৃত্তীয়, শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলি বিশদভাবে পরীক্ষা করবেন, প্রথমে, পুরুষ বা নারীর বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে কী প্রাধান্য রয়েছে তা দেখবেন। তিনি শারীরিক বিষয় পরীক্ষা করবেন, যেমন যৌনাঙ্গ, সেইসাথে X এবং Y যৌন ক্রোমোজোম বিবেচনা করে, যা লিঙ্গ গঠন করে। যদি, খুব বিরল ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র শারীরবৃত্তীয় এবং জেনেটিক বৈশিষ্ট্যগুলি অস্পষ্টতার সমাধান না করে, তাহলে জেন্ডার নির্ধারণের আগে পুরুষ এবং নারীর জৈবিক, যৌন প্রবণতা এবং তাগিদগুলির বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। এরপরে, ইসলামি বিধি-বিধানগুলি যেমন বিবাহ, জেন্ডারের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারিত জেন্ডার অনুসারে প্রযোজ্য হবে।
একবার জেন্ডার নির্ধারণ করা হয়ে গেলে, এটি খলিফাহর আদেশ দ্বারা অনুমোদিত হয়, মুসলমানদের কর্তৃপক্ষ হিসাবে, যাকে অবশ্যই মানতে হবে। এরপরে, কোনও বৈষম্য ছাড়াই নির্দিষ্ট জেন্ডার অনুসারে, বৃহত্তর সম্প্রদায়ের দ্বারা ব্যক্তিকে গ্রহণ করে নেয়া হবে। নারী কিংবা পুরুষকে ইসলামী সমাজের একটি মূল্যবান সদস্য হিসাবে মনে করা হয়, যাতে সমস্ত শর’ঈ দায়িত্ব সে পালন করতে পারে, যাতে সমস্ত শর’ঈ অধিকার তাকে প্রদান করা হয়।
মেয়েলি (মুখান্নাছ) পুরুষ এবং পুরুষালী (মুতারাজ্জিলাহ) নারীদের সম্পর্কে ইসলামের বিধান
ইবন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন,
«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ، وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ»
“আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অভিশাপ দিয়েছেন সেই সব পুরুষদের যারা নারীদের আচার-ব্যবহার করে এবং সেই সব নারীরা পুরুষদের আচার-ব্যবহার করে। [বুখারী]। ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন যে,
«لعن الله الْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالْمُتَرَجِّلَاتِ مِنَ النِّسَاءِ وَقَالَ أخرجوهم من بُيُوتكُمْ»
“আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মেয়েলি পুরুষ (মুখান্নাস) ও পুরুষালী নারী (মুতারাজ্জিলাহ)-দের প্রতি অভিসম্পাত করেছেন, এবং তিনি (সা) বলেছেন, ‘তাদেরকে ঘর থেকে বের করে দাও’।” রাসূল (সা) বলেন,
«ثَلاَثَةٌ لاَ يَنْظُرُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُّ لِوَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ وَالدَّيُّوثُ»
“তিনজন আছে যাদের দিকে আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাকাবেন না: যে তার পিতা-মাতার অবাধ্য, পুরুষালি নারী এবং দায়ূছ (পরিবারে অশ্লীলতা প্রসার হতে দেয় যে)।” [আন-নাসাঈ]
জেন্ডারের সাদৃশ্য একটি সাধারণ অর্থে আসে, পরিচয়, চরিত্র, পোশাক ও আচরণের ক্ষেত্রে। আবার এটি কোন সীমাবদ্ধতা এবং পার্থক্য ছাড়াই একটি পরম অর্থে আসে। এই পাপ একই জেন্ডারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেয় এবং আর যা যা সেদিকে মানুষকে পরিচালিত করে। সুতরাং, ইসলামে কামনা-বাসনা বা খেয়ালখুশি দ্বারা কর্ম নির্ধারিত হয় না। বরং, শরীয়াহ বিধান পুরুষ ও নারীর মধ্যকার সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেয় এবং সেইসাথে তাদের নিজ নিজ আচার-আচরণ ও ভূমিকা নির্ধারণ করে দেয়। ইসলামে সম্পর্কের রূপ বিশদভাবে নির্ধারণের পর, বৈবাহিক বন্ধনের মাধ্যমে পুরুষ ও নারীর মধ্যে প্রেম ও অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়। খিলাফতই হলো সেই ব্যবস্থা যা এমন এক পরিবেশ তৈরি করবে যা সঠিক জেন্ডার গঠনে ভূমিকা পালন করবে। পশ্চিমা সভ্যতা স্বাধীনতা ও তার ‘জেন্ডারিজম’-এর বহিঃপ্রকাশ মাধ্যমে যে বিভ্রান্তি, দুঃখ-দুর্দশা সৃষ্টি করেছে ইসলামী সমাজ তা থেকে যোজন যোজন দুরত্বে অবস্থিত।
ট্রান্সজেন্ডার ও ট্রান্সসেক্সুয়ালের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
জন্মের সময়কার বায়োলজিকাল বাস্তবতা উপেক্ষা করে জেন্ডার স্ব-উপলব্ধি দ্বারা নির্ধারিত হয় না। একজন ব্যক্তির লিঙ্গ পুরুষ থেকে নারীতে পরিবর্তন করা, বা বিপরীতভাবে, আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করা হারাম বলে বিবেচিত হয়, সেটি হরমোনাল থেরাপি হোক কিংবা প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হোক। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
إِن يَدْعُونَ مِن دُونِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِن يَدْعُونَ إِلَّا شَيْطَانًا مَّرِيدًا (117) لَّعَنَهُ اللَّهُ ۘ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا (118) وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللَّهِ ۚ وَمَن يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِّن دُونِ اللَّهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُّبِينًا (119) يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ ۖ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا
তারা আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শুধু নারীর আরাধনা করে এবং শুধু অবাধ্য শয়তানের পূজা করে। যার প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন। শয়তান বলল: আমি অবশ্যই তোমার বান্দাদের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করব। তাদেরকে পথভ্রষ্ট করব, তাদেরকে আশ্বাস দেব; তাদেরকে পশুদের কর্ণ ছেদন করতে বলব এবং তাদেরকে আল্লাহর সৃষ্ট আকৃতি পরিবর্তন করতে আদেশ দেব। যে কেউ আল্লাহকে ছেড়ে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে পতিত হয়। সে তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদেরকে আশ্বাস দেয়। শয়তান তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেয়, তা সব প্রতারণা বৈ নয়। [সূরা আন-নিসা, TMQ 4:117-120]
পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে, এটি হয় নারীর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করা হচ্ছে কিংবা পুরুষের বৈশিষ্ট্যগুলিকে গোপন করা হচ্ছে। তবে এটি জন্মের সময় সেই ব্যক্তির বায়োলজিকাল বাস্তবতাকে পরিবর্তন করে না, যা ইসলামে জেন্ডার নির্ধারণের ভিত্তি। সুতরাং তার লিঙ্গের পরিবর্তন হলেও এর মূল উৎপত্তির উপর ভিত্তি করেই তা জেন্ডারের ব্যাপারে বিধান নির্ধারিত থাকবে। কোনো পুরুষের জন্য অন্য পুরুষ লিঙ্গ উদ্ভুত ব্যক্তির সাথে বিবাহের চুক্তি সম্পাদন করা জায়েয নয়, পরিবর্তন যাই হোক না কেন।
উপসংহার: জেন্ডারিজমের মিথ্যার মোকাবেলা করা
নিজ দেশে পরিবার ও পারিবারিক মূল্যবোধের ধ্বংস নিশ্চিত করে পশ্চিমারা মুসলিম শাসকদের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ চালাতে কাজ করছে। পশ্চিমে, পশ্চিমা সরকারগুলি সহজেই তাদের জনগণকে পরিচালনা করতে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, পরিবারের বিচ্ছিন্নতা এবং এর ফলে সংহতির অভাব, সম্প্রদায়ের অনুভুতির অভাব এবং সম্মিলিত পদক্ষেপের অভাবের কারণে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী এখন মুসলমানদের জন্যও তাই চায়, তারা বুদ্ধিবৃত্তিক ও মতবাদের দিক থেকে ইসলামের মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা এখন মুসলমানদের মধ্যে জেন্ডারিজম ছড়িয়ে দিতে চায় যাতে আমাদের চিন্তা ও আবেগকে কলুষিত করতে পারে এবং আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা ও দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন ধ্বংস করতে চায়। এটি এ কারণে যাতে পশ্চিমারা নবুওয়াতের আদলের খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থার মাধ্যমে উম্মাহর পুনরুজ্জীবন প্রতিরোধ করতে পারে বা অন্তত কিছুটা বিলম্ব করে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মুসলিম হিসেবে এটি আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে দাড়িয়েছে যাতে আমরা আমাদের প্রতিরক্ষামূলক ঢাল তথা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজ করার মাধ্যমে ইসলামী আকীদা দ্বারা পুনরিজ্জীবত হয়ে তা থেকে বের হয়ে আসা নিজেদেরকে শক্তিশালী সংস্কৃতির উপর দাড়িয়ে এ জাহিলিয়্যাতের আগ্রাসনের মোকাবিলা করতে পারি।
Taken from the Article written by brother Mus’ab ibn Umair
ইসরায়েল কি অজেয়?

অনেকে বলে থাকেন, চারটি যুদ্ধে ইতোমধ্যে ইসরাইল নিজেকে অপরাজেয় প্রমাণ করেছে; মুসলিম উম্মাহ্’র উচিত এর অবস্থানকে মেনে নেয়া। আসুন আমরা বিশ্লেষন করে দেখি বিষয়টি কতটুকু সত্য:
১৯৪৮ সালে ইসরাইল সৃষ্টির পর থেকে এর সামরিক শক্তিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অপরাজেয় হিসেবে তুলে ধরবার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। মজার ব্যাপার হল এ ধরণের আষাঢ়ের গল্প ইসরাইল নিজে স্বপ্রণোদিত না হয়ে যতটা প্রকাশ করবার চেষ্টা করেছে তার চেয়ে বেশী কাজ করেছে বিশ্বাসঘাতক মুসলিম শাসকগুলো।
১৯৪৮, ১৯৫৬, ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ এর যু্দ্ধগুলোতে পারদর্শিতা সামরিকক্ষেত্রে ইসরাইলের পরিষ্কার প্রাধান্যকে প্রমাণ করে। এ পরিষ্কার প্রাধান্য ও মুসলিম ভূমির জবরদখল আরব রাষ্ট্রসমূহকে এই ধারণা দেয় যে, সামরিক নয় বরং কূটনৈতিক সমঝোতাই একমাত্র বাস্তবসম্মত বিকল্প। সেকারণে শান্তি প্রক্রিয়ার নামে বিভিন্ন পরিকল্পনায় ইসরাইলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করে নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
ইসরাইলের এই সামরিক ক্ষমতা সম্পর্কে আলোকপাত করতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে কোন স্বার্থে এ ধরণের আষাঢ়ে গল্পের প্রচলন করা হয়েছে?
১৯৪৮ সালের যুদ্ধ—ইসরাইলের সৃষ্টি
১৯৪৮ সাল ছিল ইসরাইল রাষ্ট্রের সৃষ্টির বছর। বাহ্যিকভাবে এটা বুঝা যাচ্ছে না কিভাবে ৪০ মিলিয়ন আরব মাত্র ৬০০০০০ ইহুদীর সাথে যুদ্ধে পেরে উঠল না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমুহের বর্তমান ও অতীত ভূমিকা ইসরাইলের প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে।
ট্রান্সজর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ, মিশরের বাদশাহ ফারুক, প্যালেস্টাইনের মুফতিগণ সকলেই বৃটিশ নিয়ন্ত্রিত দূর্বল শাসক ছিলেন—যারা প্রাথমিকভাবে ফিলিস্তিনীদের প্রতিনিধি ছিল। বাদশাহ আবদুল্লাহ নিজেকে ফিলিস্তিনীদের রক্ষাকবচ হিসেবে দাবী করাটা ছিল ছলনা মাত্র। শোনা যায় তিনি এবং ইসরাইলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বেন গুরিয়ন একসাথে ইস্তাম্বুলে পড়াশোনা করতেন এবং একটি গোপন বৈঠকে আবদুল্লাহ আরব জনঅধ্যুষিত অঞ্চল ফিলিস্তিনের উপর জর্ডানের নিয়ন্ত্রনের বিনিময়ে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাকে গ্রহণ করে নেবার প্রস্তাব করা হয়।
বাদশাহ আবদুল্লাহর বিদায়ের সময় আরব জনগণের মধ্যে ইংরেজ জেনারেল জন গ্লাবের নেতৃত্বে ৪৫০০ লোকের একটি সুপ্রশিক্ষিত ইউনিটও ছিল। গ্লাব তার স্মৃতিচারণে উলেখ করেছেন যে, বৃটেনের পক্ষ থেকে তাকে কড়া নির্দেশ দেয়া ছিল যাতে তিনি ইহুদী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে প্রবেশ না করেন। মিশর ইসরাইলের উপর আক্রমনের ধার কমিয়ে দেয় এবং তখন প্রধানমন্ত্রী নাকরাশি পাশা নিয়মিত সেনাবাহিনীকে আক্রমনের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মাত্র সেবছরের জানুয়ারীতে গঠিত হওয়া স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রেরণ করে। জর্ডান তার অঞ্চল দিয়ে যাবার সময় ইরাকী সেনাবাহিনীর যাত্রাকে প্রলম্বিত করে ইসরাইলে হামলার ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। একারনে জর্ডানের সেনাবাহিনীর মনোবল জাগিয়ে তুলবার জন্য নিয়োগ পাওয়া একজন অন্ধ ইমাম যুদ্ধে অপ্রস্তত বাদশাহ আবদুল্লাহকে এই বলে অপমানিত করেছিলেন যে, “হে সেনাবাহিনী যদি তোমরা আমাদের হতে” (আরব অঞ্চল ব্রিটিশ কর্তৃত্বের অধিনস্ত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে)।
৪০০০০ মুসলিম সৈন্যের মধ্যে মাত্র ১০০০০ ছিল প্রশিক্ষিত। ইহুদীদের ৩০০০০ সশস্ত্র যোদ্ধা ছিল, ১০০০০ স্থানীয় নিরাপত্তায় নিয়োজিত এবং অন্য ২৫০০০ ছিল আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য। এছাড়াও ৩০০০ এর মত ইরগুন ও ষ্টার্ণ গ্যাং সন্ত্রাসী ছিল। সরবরাহ করা হয় সবার্ধুনিক মারণাস্ত্র এবং ব্রিটেন এবং আমেরিকার জায়নবাদী সংগঠনগুলো তাদের অর্থায়ন করে। ইহুদীদের প্রস্ততি ছাড়াও মুসলিম শাসকদের চরম বিশ্বাসঘাতকতা ফিলিস্তিনে জায়নবাদীদের আখড়া গড়তে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে।
১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সংকট
এ যুদ্ধটি কোনক্রমেই ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজ খালকে নিয়ন্ত্রনের জন্য আমেরিকা ও বৃটেনের মধ্যকার একটি সংঘাত।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রতিপত্তিকে সুসংহত করবার জন্য মিশরকে তারা গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে দেখেছিল। সি.আই.এ—র সহায়তা নিয়ে ১৯৫২ সালে একটি অভূত্থানের মাধ্যমে বৃটিশ অনুগত বাদশাহ ফারুককে অপসারণ করে জামাল আব্দুল নাসেরের নেতৃত্বে ফ্রি অফিসার্স—কে ক্ষমতায় নিয়ে আসা হয়। “একজন মুসলিম বিলি গ্রাহাম— এর খোঁজে (The Search for a Moslem Billy Graham)” নামে ১৯৫১ সালে সি.আই.এ একটি প্রজেক্ট পরিচালনা করে। সি.আই.এ কর্মকর্তা মাইক কোপল্যান্ড ১৯৮৯ সালে ‘দি গেম প্লেয়ার’ নামক স্মারকগ্রন্থে উলেখ করেন কিভাবে তাদের প্রত্যক্ষ মদদে বৃটিশ পুতুল শাসক বাদশাহ ফারুককে ক্যু এর মাধ্যমে অপসারণ করা হয়। এই প্রজেক্টের দায়িত্বে থাকা কোপল্যান্ড বর্ণণা করেন যে, ’অত্র অঞ্চলে আমেরিকাবিরোধী প্রচারণাকে রুখবার জন্য সি.আই.এ এর একজন অতি জনপ্রিয় তুখোড় নেতার দরকার হয়ে পড়েছিল।’ তিনি আরও উলেখ করেন যে, সি.আই.এ এবং নাসেরের মধ্যে ইসরাইলের ব্যাপারে একটি চুক্তি হয়। যদিও নাসেরের সাথে ইসরাইলের যুদ্ধের ব্যাপারে আলোচনা করা ছিল নিতান্তই অযৌক্তিক। আলোচনার বিষয় ছিল সুয়েজ খালের উপর বৃটিশ কতৃর্ত্বকে খাটো করা। কেননা ব্রিটেন ছিল নাসেরের শত্রু“।
১৯৫৬ সালে নাসের আমেরিকার দাবি মোতাবেক সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করে। ব্রিটেনের প্রচেষ্টা ছিল এর সাথে ফ্রান্স এবং ইসরাইলকে সংযুক্ত করা। ঐতিহাসিক করেলি বার্নেট তার ‘দি কলাপ্স অব ব্রিটিশ পাওয়ার (ব্রিটিশ কর্তৃত্বের পতন)’ গ্রন্থে উলেখ করেন, ‘ফ্রান্স নাসেরের প্রতি বিরুপ ছিল কারণ মিশর আলজেরিও বিদ্রোহের সাহায্য করছিল এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ফ্রান্স এই খালের সাথে সম্পর্কিত ছিল কেননা একজন ফরাসী এটি খনন করেছিলেন। ফিলিস্তিনের ফিদেইন হামলা এবং মিশর কর্তৃক তিরান প্রনালীর অবরোধের কারনে ইসরাঈল যেকোন উপায়ে নাসেরের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অপেক্ষায় ছিল। সেকারণে স্যার অ্যান্থনী এডেন (ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী) ফ্রান্স এবং ইসরাইলের সাথে একটি ত্রিপক্ষীয় কূট পরিকল্পনা হাতে নেন ।’ তিনি আরও বলেন, ‘সিনাই উপদ্বীপ এলাকা দিয়ে ইসরাইল মিশরকে দখল করে নেবে। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স তখন বিবদমান পক্ষগুলোকে যুদ্ধ বন্ধ করবার জন্য একটি সময়সীমা বেধে দেবে অথবা খালটিকে ‘রক্ষার’ জন্য হস্তক্ষেপ করবে।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন সরে যাবার জন্য ব্রিটেনের উপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে। রাশিয়া— লন্ডন এবং প্যারিসকে পারমাণবিক হামলার হুমকি দেয়। ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের কারণে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স মিশর থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। আইজেনহাওয়ার এর নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের মাধ্যমে ইসরাইলকে অধিকৃত মিশরের ভূমি থেকে সরে আসবার জন্য চাপ দিতে থাকে—যদিও ইসরাইলের জন্য তখন এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ছিল অসুবিধাজনক। আর এরপরই মার্কিনীরা মধ্যপ্রাচ্যে প্রাধান্য বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে আবিভূর্ত হয়।
১৯৬৭ সালের ৬ দিনের যুদ্ধ
এ যুদ্ধটিও ছিল এ অঞ্চলে ইঙ্গ—মার্কিন আধিপত্যের দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসেবে ১১ বছর আগে ভূমিকা খর্ব হলেও জর্ডান, সিরিয়া ও ইসরাইলে ব্রিটেনের প্রতি অনুগত শাসকগণ তখনও ছিল। নাসেরকে দুর্বল করবার লক্ষ্যে ভবিষ্যত শান্তিপ্রক্রিয়ায় দর কষাকষির উপকরণ হিসেবে মিশরের কিছু ভূমি দখল করে নেবার জন্য ব্রিটেন ইসরাইলকে যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য করে। ১৯৬৭ সালের ৫ জুন তারিখে ইসরাইল আক্রমণ করে মিশরের শতকরা ৬০ ভাগ ভূমিতে অবস্থানরত বিমানবাহিনী এবং সিরিয়া ও জর্ডানের শতকরা ৬৬ ভাগ যুদ্ধরত বিমানবাহিনী ধ্বসিয়ে দেয়। জর্ডান নিয়ন্ত্রিত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম ইসরাইল দখল করে নেয়। যুদ্ধের আগে বাদশাহ হোসেন তার সেনাবাহিনীকে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দুরে সরিয়ে রাখে। মাত্র ৪৮ ঘন্টার মধ্যে পশ্চিম তীরের গুরুত্বপূর্ণ শহরসমূহ ইসরাইল দখল করে নেয়। যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনের মাথায় তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোলান মালভূমি দখল করে নেয়। গোলান মালভূমিতে অবস্থানরত সিরীয় সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বেতারের মাধ্যমে জানতে পারে ইসরাইল গোলান মালভূমি দখল করে নিয়েছে—যদিও তখনও গোলান মালভূমি সিরিয়ার অধিকারেই ছিল। তিরানে যাবার জলপথ শার্ম—আল—শেখ দখল করে নেবার মাধ্যমে ইসরাইল মার্কিনপন্থী নাসেরকে ভয়াবহ ধাক্কা দেয়। নাসেরের ক্ষমতাকে খর্ব করার লক্ষ্য অর্জিত হয় এবং অত্র অঞ্চলে ব্রিটিশ আধিপত্য পাকাপোক্ত হয়। ইসরাইলের আরও ভূমি দখল করে নেবার সক্ষমতা ছিল এবং ১৯৪৮ সালের মত দখলের খাতিরে দখলের জন্য নয় বরং এটাকে এখন পর্যন্ত শান্তি প্রক্রিয়ায় দর কষাকষির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ বিভাজন পরিকল্পনার (UN Partition Plan) আওতায় ইসরাইলকে শতকরা ৫৭ ভাগ ভূমি ও ফিলিস্তিনীদের শতকরা ৪২ ভাগ ভূমি প্রদান করে। কিন্তু ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরাইল এটাকে বাড়িয়ে ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের ৭৮ ভাগ দখল করে নেয়।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধ
মিশর এবং সিরিয়া কতৃর্ক ইসরাইলের বিরুদ্ধে চালানো ১৯৭৩ সালের যুদ্ধ বিশেষণ করলে দেখা যায়—এর লক্ষ্য ছিল সীমিত এবং কখনওই এটা ফিলিস্তিনীদের মুক্ত করবার জন্য পরিচালিত হয়নি। এমনকি গোলান মালভূমিকে (যা ছিল সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যকার শান্তিচুক্তির বিষয়) মুক্ত করবার জন্যও এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়নি। এ যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল অনেকটা সেনাঅভ্যূত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অপেক্ষাকৃত নতুন রাষ্ট্রনায়ক আনোয়ার সাদাত ও হাফিয আল আসাদের অবস্থানকে সুদৃঢ় করবার জন্য। সাদাতের অবস্থান এক্ষেত্রে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ছিল। কেননা তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় নাসেরের স্থলাভিসিক্ত হয়েছিলেন।
যুদ্ধের প্রত্যক্ষদশীর্ ও ১৯৫৭—১৯৭৪ সাল পর্যন্ত আল আহরামের সম্পাদক মুহম্মদ হেকেল তার বই ‘দি রোড টু রামাদান’—এ এই যুদ্ধে আনোয়ার সাদাতের লক্ষ্য সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি সাদাতের একজন জেনারেল মুহম্মদ ফাউজীর বরাত দিয়ে বলেন, সংঘটিত যুদ্ধকে তুলনার জন্য একটি সামুরাই চিত্র যেখানে একটি লম্বা তলোয়ার ও খাটো তলোয়ার রয়েছে সেটি উপস্থাপন করা হয়। জেনারেল ফাউজী ছোট তলোয়ারটিকে দেখিয়ে বলেন, এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য অত্যন্ত সীমিত।
ইসরাইলের সাথে একটি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবার কোন অভিলাষ আনোয়ার সাদাতের ছিল না। সেকারণে যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করা হয়। প্রথম ২৪ ঘন্টার যুদ্ধে মিশর মাত্র ৬৮ জনের প্রাণের বিনিময়ে সুয়েজ খালের পূর্বদিকে অবস্থিত বার—লেভ প্রাচীরগুলো গুড়িয়ে দেয়। ২ টি সিরীয় ডিভিশন ও ৫০০ ট্যাঙ্ক গোলান মালভূমির দিকে অগ্রসর হয়ে ১৯৬৭ সালে অধিকৃত কিছু অংশ পূর্ণদখল করে নেয়। মাত্র দু’দিনের যুদ্ধে ইসরাইল ৪৯ টি এয়ারক্রাফট ও ৫০০ টি ট্যাঙ্ক হারায়। এর মধ্যে আনোয়ার সাদাত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জারকে পাঠানো একটি খবরে যুদ্ধের উদ্দেশ্য সম্পর্কে উলেখ করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং কোন আংশিক সমঝোতা নয়’ এই খবরের অর্থ দাড়ায় যে, যদি ইসরাইল দখলকৃত ভূমি ছেড়ে চলে যায় তাহলে মিশর জাতিসংঘ কিংবা অন্য কোন নিরপেক্ষ কারও মধ্যস্থতায় শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে প্রস্তত।
কৌশলগত দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সত্তেও আনোয়ার সাদাত শান্তি চুক্তিতে প্রস্তত ছিল। আনোয়ার সাদাতের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ছাড় দেবার কারণে ইসরাইল মার্কিনীদের সমর্থন নিয়ে অধিকৃত অঞ্চল ছেড়ে খুব সহজে সটকে পড়ে। আর এতে করে ১৯৭৪ সালের ২৫ অক্টোবর তারিখে যুদ্ধের অবসান ঘটে।
ইসরাইলের সাথে সংঘটিত প্রতিটি যুদ্ধে মুসলিম প্রতারক শাসকগন ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করবার জন্য সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আন্তরিকতার সাথে লড়েনি। উপরের যুদ্ধের ঘটনাসমূহ সঠিকভাবে না জানা থাকার কারণে ইসরাইলের ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ ব্যাপক বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। বিশ্বাসঘাতক মুসলিম শাসকগন এ ধরণের বিভ্রান্তি সৃৃষ্টির পেছনে বড় ভূমিকা পালন করেছে। ইসরাইলের আধিপত্যকে তারা লালন করেছে, উস্কে দিয়েছে এবং বহাল তবিয়তে বলবৎ রেখেছে। আরব বিশ্ব কখনই ইসরাইলকে উৎখাতের জন্য এককভাবে অথবা সম্মিলিতভাবে কাজ করেনি। প্রতিটি যুদ্ধের পেছনে ইসরাইলের সমূল উৎপাটন কিংবা ফিলিস্তিন মুক্ত করবার বদলে অন্য উদ্দেশ্যগুলো কাজ করেছে। সম্মিলিতভাবে ব্যাপক শক্তিশালী আরব দেশসমূহ ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা ও বৈধতাকে কখনই আন্তরিকতার সাথে চ্যালেঞ্জ করেনি।
সাইফুল আজম: ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি বিমান গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন যে বাংলাদেশি

খবর:
ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে বিরোধ চলছে কয়েক দশক ধরে। গোটা আরব মিলে ইসরাইলের সঙ্গে এ পর্যন্ত ৩ বার যুদ্ধ হয়েছে। তৃতীয় আরব ইসরাইল যুদ্ধ হয় ১৯৬৭ সালে। তবে এই যুদ্ধে বীরত্ব দেখায় এক বাংলাদেশী। ইসরাইলের বিমান ভূপাতিত করে রেকর্ড করেন তিনি। এমনকি ইসরাইলের ইতিহাসে কোন একক ব্যক্তির হাতে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ বিমান ধ্বংসের রেকর্ড এই বাংলাদেশীর। বাংলাদেশের এই আকাশ যোদ্ধার নাম সাইফুল আজম সুজা। পৃথিবীর মাত্র ২২ জন “লিভিং ইগল” খেতাব পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনি একজন। আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুল আজম একটি অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন। ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি ভূপাতিত করেছেন সর্বোচ্চ তিনটি ইসরায়েলি বিমান। (https://www.youtube.com/watch?v=nG34intSig4)
মন্তব্য:
মুসলিম ফাইটার পাইলট সাইফুল আজমের এই সাহসী গল্প প্রমাণ করেছে যে, মুসলিম সামরিক বাহিনী শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শারীয়াহ্ বাধ্যবাধকতাকে কখনোই সে যুদ্ধের সম্ভাব্য পরিণতি/ফলাফলের (Consequences) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না। বরং মুসলিম সেনাবাহিনী দখলকৃত ইসলামী ভূমিকে শত্রুদের কবল থেকে মুক্ত করাকে সর্বদাই শরীয়াহ বাধ্যবাধকতা (ওয়াজিব) হিসেবে বিবেচনা করেছে। যার ফলে ইসলামী উম্মাহ্’র এই অকুতোভয় ও সাহসী বীর সন্তান সাইফুল আজম ব্যাকডেটেড সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে উন্নতমানের সামরিক সরঞ্জামে সজ্জিত শত্রুদেরকে ধরাশায়ী এবং পরাস্ত করার রোল মডেল হয়ে উঠেছিলেন। সে সময়ে ইসরাইলি সুপারসনিকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সমকক্ষ বিমান আরবদের না থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধের সম্ভাব্য ফলাফল/পরিণতির দিকে চিন্তা না করে ইসরাইলিদের ঠেকাতে শুধুমাত্র সাধারণ মানের “হকার হান্টার’ জঙ্গি বিমান দিয়ে ক্ষিপ্রগতির দুটি ইসরাইলি সুপারসনিক ঘায়েল করেন সাইফুল আজম। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রথম ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুল আজম সর্বোচ্চ তিনটি ইসরাইলি বিমান ভূপাতিত করার অনন্য রেকর্ড তৈরি করেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সাইফুল আজমের মতো অগণিত সাহসী যোদ্ধারা এখনও মুসলিম সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও মুসলিম ভূখন্ডের দালাল শাসকরা ফিলিস্তিনকে মুক্ত করতে সামরিকভাবে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাব্য ফলাফল, সহকর্মী কিংবা উচ্চপদস্থ ও অধীনস্ত অফিসারদের প্রতিক্রিয়া এবং এই পদক্ষেপের সফলতার অনিশ্চয়তার ব্যাপারে তাদেরকে প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে। অথচ মুসলিম ভুমিতে কাফিরদের আক্রমণ ও আগ্রাসনের মুখে শারীয়াহ্’র স্পষ্ট ফরজ (ওয়াজিব) বিধান হল উপযুক্ত সামরিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তাদেরকে বিতাড়িত করা। এবং এক্ষেত্রে এইকাজে যাদের ‘সক্ষমতা’ আছে তাদের উপর তথা সামরিক বাহিনীর উপর মূল দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু বর্তমান দালাল শাসকগোষ্ঠী তাদেরকে জাতিসংঘের অধীনে পশ্চিমা কাফিরদের কুফর যুদ্ধে অংশ নিতে ও জীবন দিতে প্রেরণ করছে আর মুসলিমদের সাহায্যের বেলায় তাদেরকে ব্যারাকে বন্দি করে রেখেছে। তাই এরাই সামরিক বাহিনীর শারীয়াহ্ হুকুমের দায়িত্ব পালনের পথে প্রধান বাধা।
তাই সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের মধ্যে যারা মসজিদুল আকসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমিকে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রের কবল মুক্ত করার চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও ব্যাকুল হয়ে আছেন তাদেরকে অবশ্যই অনতিবিলম্বে দালাল শাসকগোষ্ঠীকে অপসারণ করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম জাহানের খলিফার নেতৃত্বে আসতে হবে। যিনি দ্রুততার সহিত আমাদের এই সুসংগঠিত ও প্রশিক্ষিত বাহিনীকে অভিযানে পাঠাবেন যাতে অবৈধ ইহুদী রাষ্ট্রটি দুনিয়া থেকে স্থায়ীভাবে বিলিন হয় এবং মাসজিদুল আক্বসা ও ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি মুক্ত হয়। আমাদের সামরিক বাহিনীর নিষ্ঠাবান অফিসারদের তাদের পূর্বসুরী সাইফুল আজম, সালাউদ্দিন আইয়্যুবী, সাইফুদ্দিন কুতুজ এর পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। দখলদার ইহুদী সত্ত্বার তথাকথিত অজেয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কল্পকথা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। ইতিপূর্বে ফিলিস্তিনকে মুক্ত করার বীর সেনানায়ক সালাহউদ্দিন আইয়ুবিও জেরুজালেম অভিযানের সময় এর ফলাফলের চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত হননি যাকে ক্রুসেডাররা সতর্ক করে বলেছিল, “জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হলে আপনার একটি চোখ নষ্ট হতে পারে। উত্তরে সালাহউদ্দিন বললেন: “আমি আল্লাহ্’র নামে শপথ করে বলছি, আমি জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হবোই, এমনকি যদি আমাকে জেরুজালেমে অন্ধ হয়েও প্রবেশ করতে হয়!” এমনকি যখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, “আপনি মিশর, সিরিয়া এবং অন্যান্য ভূ-খণ্ডের সুলতান তবুও আমরা আপনাকে হাসতে দেখি না, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: যখন বায়তুল মাকদিস, জেরুজালেম ক্রুসেডারদের হাতে বন্দি তখন কীভাবে আমি হাসতে পারি?”
– সিফাত নেওয়াজ
ইউরোপে সেকুলারিজমের উত্থান

পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক মুল্যবোধ চাপিয়ে দিতে প্রতিনিয়ত ইসলাম ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আঘাত করে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকার রাষ্ট্রদূতগণ একের পর এক সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত মুসলিম ভুমিগুলোতে সফর শুরু করে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের ইসলামী জীবনাদর্শ দূরে রাখা এবং সেকুলার পুঁজিবাদী আদর্শ মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেওয়া। আমরা এই আর্টিকেলে ইউরোপে সেকুলার চিন্তার উত্থান নিয়ে আলোচনা করব। সেকুলার পুঁজিবাদী চিন্তা কত ঠুনকো, প্রতিক্রিয়াশীল এবং কোন স্বাভাবিক/বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নয়; আমরা তা আলোকপাত করব।
সুদীর্ঘ সময় চার্চের জুলুম অত্যাচারের ফলে ১৮ শতকে ইউরোপের মানুষের মাঝে একধরনের চিন্তার বিপ্লব ঘটে। ফলে চার্চ সবক্ষেত্রে তার জুলুমে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ও শাসন কর্তৃত্ব হারায়। এই উত্থান ছিল মুলতঃ চার্চের বিরুদ্ধে তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের দীর্ঘ সংগ্রামের ফল। তাদের এই উত্থান মানব, জীবন ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে মানুষের পুর্ববর্তী দৃষ্টিভংগী পালটে দিতে থাকে। ইউরোপের জনগণ চার্চের চাপিয়ে দেওয়া সব নিয়মকানুনের বিরদ্ধে চলে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে রাজতন্ত্র; চার্চ এবং খৃষ্টানধর্মকে জনগণের উপর জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ফলে তৎকালীন চিন্তাবিদ ও দার্শনিকগণ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর পুরোপরি আস্থা হারিয়ে ফেলে। তারা এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাজ থেকে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। পরবর্তিতে এই চিন্তাবিদগণ দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের একপক্ষ চার্চকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করার ডাক দেয় এবং অপরপক্ষ ধর্ম থেকে রাষ্ট্রকে পৃথক করার দাবি তুলে। যারা সম্পূর্ণরূপে চার্চকে বিলুপ্তির কথা বলে তাদের থেকে পরবর্তিতে কমিউনিজম এবং রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করার পক্ষ থেকে সেকুলার পুজিবাদের উত্থান ঘটে। বর্তমানে তাদের ধর্মনিরপেক্ষ/সেকুলার গণতন্ত্রের তল্পিবাহক রুপে আমরা দেখতে পাই। সেকুলারদের উত্থান সম্পর্কে জানতে মধ্যযুগের ইউরোপে চার্চের ভুমিকা ও ইতিহাস নিয়ে আমরা আলোকপাত করব।
চার্চের ভুমিকা:
তৃতীয় শতকে রোমান সাম্রাজের কর্তৃত্ব কমে আশার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডে চার্চের ভুমিকা বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাজা কন্সটানটিনের পর থেকে চার্চ এবং রাষ্ট্র সরকারীভাবে একীভুত হয়ে পড়ে। চার্চ এবং রাজতন্ত্রের এই জোটবদ্ধ মুহুর্ত থেকে ইউরোপীয় জনগণের উপর অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা নেমে আসে। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপের অভ্যন্তরে বিভক্তি শুরু হয় (internal divide and rule by church) ফলে নতুন নতুন দূর্বল সামন্ত রাজ্যের উত্থান ঘটে। সামন্ত রাজ্যগুলোর দূর্বলতার কারণে চার্চ আরো বেশি আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ পায়।
খ্রিস্টান ধর্মে জনগণের কর্মকান্ড দেখাশুনা করার মত কোন পদ্ধতি নেই। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে চার্চ পুরোনো রোমান সাম্রাজ্যের নিয়মকানুনগুলো ধার করে নিয়ে আসে। চার্চ জ্ঞানের প্রচার এবং আইন-কানুন তৈরির উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। স্বাভাবিকভাবেই নতুন নতুন উত্থান ঘটা সামন্ত রাজাগণ তাদের রাজ্যগুলো পরিচালনার নিয়মকানুন ধারণ করার ক্ষেত্রে পুরোপুরি চার্চের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
শুরুর দিক পোপ রোমান সাম্রাজ্যের অল্প সল্প জায়গা শাসন করলেও সময়ের সাথে সাথে ইংল্যান্ড, সিসিলি ও জেরুজালেমের উপর চার্চ শাসন কতৃত্ব লাভ করে। ধীরে ধীরে চার্চ হয়ে উঠে ইউরোপের বুকে সবচেয়ে বড় কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার; সে চাইলেই যেকোন সামন্ত রাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একসময় চার্চের লোকাল কার্ডিনালরা (পাদ্রী) সামন্ত রাজাদের নিয়োগ দেওয়ার কর্তৃত্বও পেয়ে যায়, এমনকি সামন্ত রাজাদের নামকরণও হয়ে উঠে চার্চ প্রিন্স নামে। অন্যদিকে এইসব কার্ডিনালরা সরাসরি পোপ কর্তৃত্ব নিয়োগ প্রাপ্ত হত। চার্চ ইউরোপের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু পরিণত হয়। পোপ হয়ে উঠে শক্তির উৎস। পোপ চাইলে যেকোন বিশপদের নিয়োগ দিতে ও পাদ্রীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, লোকাল চার্চগুলোর উপর ট্যাক্স আরোপ করত এবং পোপ চাইলেই জীবনের সবক্ষেত্রে (আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক) যেকোন নিয়মকানুন জারী করতে পারত। বিশ্বাস করা হত পোপের সাথে সরাসরি খোদার যোগাযোগ আছে। ধর্মের নামে ও জান্নাতের ওয়াদা করে নির্দোষ জনগণকে শোষণ করা হত। ধীরে ধীরে চার্চ সকল সীমারেখা অতিক্রম করে বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে। ইতিহাসে যা নজীরবিহীন।
ধনী খৃষ্টানদের অর্থ-সম্পদের বিনিময়ে জান্নাতের চাবি বিক্রি ছিল চার্চের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। ইউরোপের বেশিরভাগ উর্বর জমি ও সম্পদে চার্চগুলো পুঞ্জিভুত হতে থাকে। চার্চের ঘোষণার মাধ্যমে বিশাল সংখ্যক মুক্তবুদ্ধির নারীদের ডাইনী নাম দিয়ে অত্যাচার এবং হত্যা করা হয়। চার্চের নিয়মের বিরুদ্ধে যায় এমন কোন তত্ত্ব, কোন বিজ্ঞানী প্রচার করলে তাকে হত্যা করা হত। শত অত্যচার সত্বেও চার্চের জুলুম-নিপীড়নের ভয়ে কেউ প্রতিবাদের সাহস পেত না। চার্চ দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা বলে শেষ করা যাবে না। এই যুগটাকেই ইউরোপিয়ানরা মধ্যযুগ বা অন্ধকার যুগ নামে চিহ্নিত করে।
এভাবে ১৪শতকে অসন্তোষ দানা বাধার আগ পর্যন্ত চার্চের শাসন চলতে থাকে। এই যুগকে ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ্গণ মধ্যযুগের শেষ সময় হিসেবে চিহ্নিত করে।
দ্যা গ্রেট খিলাফত রাষ্ট্রের হাতে বারবার ক্রুসেডে হারের ফল ছিল চার্চের বিরুদ্ধে ততকালীন ইউরোপীয় চিন্তাবিদের বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে খৃষ্টানধর্ম যেহেতু সমাজের সকল সমাধান দিতে অক্ষম ছিল, ফলে সামাজিক সমস্যাগুলো দিনদিন আরো বেশি বিপর্যয়কর হয়ে উঠে। এই সম্মিলিত কারণগুলোর ফলে ইউরোপের বুকে চার্চ এবং খৃষ্টানধর্মের পতন দেখা দিতে শুরু করে।
ত্রিশ বছরের যুদ্ধ:
১৬শতকে; ইউরোপে ধর্মতাত্ত্বিক (ধর্মের ভুমিকা কী হবে) বিতর্ক তীব্র হতে থাকে। এতে চার্চ দূর্বল হয়ে পড়ে। প্রত্যেক সামন্ত রাজ্য অন্য রাজ্যগুলো নিয়ন্ত্রণ নিতে চার্চকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে পুরো ইউরোপ পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লিপ্ত হয়। এই যুদ্ধের তীব্রতা পূর্বে ঘটা যেকোন সামন্ত বিবাদকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে। এই যুদ্ধে জার্মানী সহ পুরো ইউরোপ ধংসের ধারপ্রান্তে চলে যায়, শহরের পর শহর ও মিল-কারখানাগুলো ধংস হয়ে যায়। যুদ্ধের তীব্রতা, যুদ্ধের ফলে প্লেগ ও দুর্ভিক্ষের কারণে ইউরোপের এক তৃতীয়াংশ মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হয়। এমনকি স্পেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ১৬৫৯ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলমান ছিল।
কম্প্রোমাইজ বা আপস:
যুদ্ধটি শেষের কোন লক্ষণ দেখা না যাওয়ায় ফলে চিন্তাবিদগণ আপোষের সিদ্ধান্ত নেয়। এই আপোষের ফল ছিল ধর্মকে রাষ্ট্রের সকল কর্মকান্ড থেকে আলাদা করে ফেলা। প্রোটেন্সটেন্ট সংস্কারবাদী মার্টিন লুথার ও ক্যালভিন; চার্চের রাজনীতি করাকে লজ্জার বলে ঘোষনা দেয়। তারা আরো বলেন; খৃষ্টানদের প্রধান দ্বায়িত্ব হচ্ছে কর্তৃত্বশীলদের আনুগত্য করা। তারা এই ক্ষেত্রে ধুর্ততা অবলম্বন করে। ফলে সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নের জন্ম দেয়; কার শাসন করা উচিত? মানুষের না খোদার? এবং এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়াই অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই কোন চিন্তা-ভাবনাহীন সম্পূর্ণ নতুন একটি মতাদর্শের জন্ম হয়।
গ্রীক দর্শনের আবির্ভাব:
পশ্চিমা চিন্তাশূন্য সিদ্ধান্তহীন এই অবস্থান থেকে চার্চকে মানুষের জীবন থেকে অপসারণ করা হয়। তৎকালীন চিন্তাবিদগণ অন্যকোন উৎসের সন্ধান না করে হাজার বছরের পুরোনো গ্রীক দর্শন থেকে এই সমস্যার সমাধানের পদক্ষেপ নেয় (প্রকৃত সত্য ইসলামকে তারা বর্জন করে)। পর্বরতীতে এই সব চিন্তাবিদগণ দুটি পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একপক্ষ প্রকৃতিবাদকে ধারণ করে এবং মানুষই সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে বলে দাবি করে, অপরপক্ষ যারা চার্চের পক্ষে অবস্থান নেয় তারা বাস্তববাদীতাকে ধারণ করে এবং সৃষ্টকর্তাকে বর্জনে অক্ষমতা প্রকাশ করে। ফলে সংশয়পূর্ণ সেকুলার চিন্তার উদ্ভব ঘটে।
ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করা বা ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে পৃথক করার চিন্তা নিয়ে এই সমাজ আগাতে থাকে। মানুষের জীবনের সাথে মহাবিশ্বের সম্পর্কটিও অস্বচ্ছ ও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। এই অস্বচ্ছ অবস্থায় ইউরোপে নতুন নতুন দার্শনিকদের উন্মেষ ঘটে। জীবনের উদ্দেশ্য ও গুরুত্ব নিয়ে দার্শনিকগণ নতুন নতুন তত্ত্ব নিয়ে হাযির হন। তাদের মধ্যে ফ্রান্সের দার্শনিক রেনে ডেকার্তে অভিমত দেয় যে; “জনগণের ভিন্নতার ভিত্তিতে বাস্তবতাও ভিন্ন হতে পারে। সৃষ্টিকর্তার ধারণা সম্পূর্ণরুপে ব্যাক্তির নিজস্ব চিন্তা চেতনার উপর ছেড়ে দেওয়া উত্তম।” এই চিন্তার ফলে সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাসকে ব্যক্তি স্বাধীনতার উপর ছেড়ে দেওয়া হয়। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট দাবি করেন; “মানুষের মন হচ্ছে বস্তুর অস্তিত্বের কারণ, আর বস্তুর ভোগই ইন্দ্রীয় সুখ।”
পুঁজিবাদের প্রাথমিক লক্ষণ:
মধ্যযুগীয় চার্চের শাসক কর্তৃত্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথেই সেকুলারিজমের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলো প্রতিষ্ঠা হয় এবং ইউরোপে পুঁজিবাদী নতুন আদর্শের উত্থান ঘটে। রাষ্ট্রগুলো শুধুমাত্র তাদের নাগরিকদের কথা চিন্তা শুরু করে। বর্ণ এবং নিজস্ব জাতিগত অবস্থা, ভৌগলিকভাবে আলাদা হওয়া, নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ও ভিন্নতার কারণে তারা একে অপর থেকে শ্রেষ্ঠ ও নিখুঁত জাতি দাবি করা শুরু করে। নিজ নিজ স্বাধীনতা রক্ষায় তারা সচেতন হয়। এমনকি ১৪শতকে জার্মান প্রকাশকগণ তাদের রাজাদের শাসন করার পারদর্শিতা উপস্থাপন করে দাবি করে, তারা জাতি হিসেবে বীরত্বপূর্ণ এবং জার্মানরা অন্য জাতিদের শাসন করার অধিকার রাখে। রাইন নদীর তীর নিয়ন্ত্রণ ও ফরাসী জনগণের বানিজ্য করার অধিকার পাওয়ার কারণে ফরাসী জনগণ জনপ্রিয়তা পায় ফলে তারাও শ্রেষ্ঠত্বের দাবি শুরু করে। ব্রিটেনও কম যায়না; চিন্তাবিদ জন ফরটেস এর মতে ব্রিটেনের সংবিধান ও আইন অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠ। মুলতঃ ইউরোপীয়রা এরিসটটলের পার্টিকুলারিজম (নিজেদের কমন স্বার্থকেন্দ্রিক) চিন্তা ধারণ করার কারণে তাদের মধ্যে জাতিয়তাবাদের প্রবণতার উদ্ভব ঘটে।
রাজতন্ত্রের উপর চার্চ সম্পূর্ণরুপে আধিপত্য হারায়, উলটো জনগণকে নিয়ন্ত্রণে সেকুলার রাষ্ট্রগুলো চার্চকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। পুঁজিবাদের আসফালনের ফলে, সেকুলার রাষ্ট্র ও আইন কানুনের সাথে তাল মিলিয়ে চলা ছাড়া চার্চের আর কোন গতি ছিল না। যার নজির আমরা চার্চের ঘোষণার মাধ্যমে দেখতে পাই; চার্চ বলে যার সেকুলার রাষ্ট্রে সততা ও বিশ্বসতার সাথে জীবন যাপন করবে তারা সৃষ্টিকর্তার সামনে ধার্মিক হিসেবে থাকবে। তাছাড়া প্রতিনিয়ত চার্চকে সংশোধন করে সেকুলার রাষ্ট্রের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যহত আছে।
পুঁজিবাদের রাজনৈতিক চিন্তা:
ইতালীর পৌত্তলিক মেকিয়্যভেলি তার The discourses on the First Ten Books of Livy এবং The Prince এই দুটি বিখ্যাত বইয়ের মাধ্যমে আধুনিক পুঁজিবাদের চিন্তা ধারা প্রতিষ্ঠা করে।
ম্যাকেয়াভেলির মতে রাজনীতি সম্পূর্ণ একটি সেকুলার কর্মকান্ড। তার মতে রাজনীতি মানুষের ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা মাত্র। ম্যাকিয়াভেলির মতে মানুষ প্রকৃতপক্ষে বর্বর, স্বার্থপর কেন্দ্রিক রাজনীতি সবার মধ্যে বিরাজমান। তার মতে সফল শাসক জনগণকে জানার চেষ্টা করে; তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সবসময় পর্যবেক্ষণে রাখে এবং দূর্বলদের শোষণের চেষ্টা করে।
বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজে রাজনীতিবিদরা হুবহু ম্যাকিয়াভেলীর আদর্শকে ধারণ করে রাজনীতি করে। একজন আর্টিস্ট শুধুমাত্র শিল্পের কারণে আর্ট করে, যা জনগণের কোন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত নয়। লেখকরা সমাজের ভালোর জন্য না লিখে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা জন্য লিখে। খাচায় বন্দি বুদ্ধিজীবীরা সমাধান না দিয়ে শুধুমাত্র প্রতিশ্রুতি দেয়। পুঁজিবাদী এই সমাজে সরকারগুলোর ১% ধনীদের স্বার্থ হাসিলের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হয়, এই সমাজের মানুষগুলো পরিবার ও সমাজকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র নিজের জন্য বাঁচে।
পরবর্তীতে ১৭৯০ সালে ফরাসী বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং বর্তমান পার্লামেন্টারী পদ্ধতিকে তারা গ্রহণ করে। আমেরিকা সহ সব ইউরোপীয় দেশগুলো এই রেভুলেশন দ্বারা প্রভাবিত হয়। নেপোলিয়ানের শাসনের পর থেকে, ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলো সারা বিশ্বে পুঁজিবাদকে বহন করে চলেছে। অর্থনৈতিক শোষণের উদ্দেশ্যে উপনিবেশ স্থাপন করাই পুঁজিবাদের উদ্দেশ্য। বর্তমানে তারা কলোনী স্থাপন পদ্ধতিতে একটু পরিবর্তন করে পুঁজিবাদকে আরো কার্যকারীভাবে বাস্তবায়ন করে চলেছে।
বর্তমান ইউরোপ চার্চ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। করপোরেট কোম্পানী ও ব্যাংকগুলো চার্চের স্থান দখল করেছে মাত্র। এটাই সেই পুঁজিবাদ যার দিকে পশ্চিমারা সারা বিশ্ব ও মুসলিমদের ডাকছে। বর্তমান বিশ্বও আগের মতই আরেকটি দ্বন্দ্ব শুরুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। আমরা আশা করি তারা নতুন কোন কম্প্রোমাইজের দিকে না গিয়ে তাঁদের চিন্তা শক্তিকে ব্যবহার করবে। আমরা মুসলিমরা এই সেকুলার পুঁজিবাদী জাহেলিয়াতকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করেছি। আমরা মানবজাতির জন্য আল্লাহ প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা ইসলামকে ধারণ করি। আল্লাহর দ্বীনের জন্য কাজ করি। যেন আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সারা বিশ্ব প্রকৃত হকের দিকে ফিরে আসে।
উৎস: আর-রায়া ম্যাগাজিন, এপ্রিল ১৯৯৪
নারী কিসে আটকায়?

খবর:
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রেন্ডিং বা আলোচনায় আছে যে বিষয়টি তা হলো, নারী কিসে আটকায়। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টইন ট্রুডো ও তাঁর স্ত্রী সোভি গ্রেগয়ের ট্রুডোর আলাদা থাকার ঘোষণার পরই আলোচনাটির সূত্রপাত। এর জের হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইতে শুরু করে মিম, ট্রল আর পোস্ট–পাল্টা পোস্টের ঝড়। এর মধ্যে একটি পোস্টের বক্তব্য ছিল এমন, ‘জাস্টিন ট্রুডোর ক্ষমতা, বিল গেটসের টাকা, হাকিমির জনপ্রিয়তা হুমায়ুন ফরিদীর ভালোবাসা, তাহসানের কণ্ঠ কিংবা হৃত্বিক রোশানের স্মার্টনেস। কোনো কিছুই নারীকে আটকাতে পারে নাই, বলতে পারবেন নারী কিসে আটকায়?’ (https://www.prothomalo.com/onnoalo/treatise/f8o1qkyren)
মন্তব্য:
“বিবাহবন্ধন” শব্দটি আমাদের বর্তমান সেক্যুলার সমাজে সত্যিকার অর্থেই ‘বন্ধন’ বা ‘handcuff’ এর চেয়ে অতিরিক্ত কোন তাৎপর্য বহন করছেনা। বিয়ে বর্তমানে নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে শৃংখলার নামান্তর। ‘নারী কিসে আটকায়’ ট্রেন্ডিং এর বিপরীতে প্রথম আলোর ‘পুরুষ যেখানে আটকায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনও আছে যেখানে বলা হচ্ছে, “আফসোস! কেউ বলছে না, পুরুষ কিসে আটকায়? কিন্তু যে কথাটা সবাই জানে এবং মানে, কিন্তু বলে না; সেটি হলো সম্পর্কের ফাটকে দীর্ঘমেয়াদে সে আটকা থাকে বটে; কিন্তু সেই থাকায় তার সায় থাকে না” অর্থাৎ, নারী ও পুরুষ উভয়েই হতাশ যে বিয়ের পর তারা পারিবারিক দ্বায়িত্ববোধের কাছে আটকা পড়ে যাচ্ছে, বৈবাহিক সম্পর্ক প্রশান্তির বদলে হয়ে যাচ্ছে এক শৃংখলাবৃত কয়েদখানা।
একটি স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা যদি দেখি, মানুষ হিসেবে আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে আমরা সঙ্গী খুঁজি, বংশবৃদ্ধি করতে চাই; স্বামী/স্ত্রী-সন্তানসন্ততি নিয়ে পরিবার গঠন করতে চাই। এই পরিবার গঠনের মাধ্যমে একদিকে আমাদের যেমন প্রজনন প্রবৃত্তি পূরণ হয়, তেমনি একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, নির্ভরশীলতা ও দায়দায়িত্বও তৈরি হয়। একসাথে থাকতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক সময় সুবিধা-অসুবিধা, পছন্দ-অপছন্দ কিংবা মতের অমিল হয়, যার যার নিজের জায়গা থেকে কিছু বিষয় ছাড় দিতে হয়। এটা যেকোনো পরিবারের মধ্যকার স্বাভাবিক একটা বিষয়। কিন্তু বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার অন্যতম স্তম্ভ ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’ মানুষকে শেখায়, ‘প্রত্যেক ব্যক্তিই নাকি চায় তার নিজের মত করে জীবন কাটাতে, সমস্ত সিদ্ধান্ত নিজের মত করে, নিজের ইচ্ছায় নিতে’। নারী-পুরুষের সম্পর্কের উদ্দেশ্যকে এখানে শুধুমাত্র যৌন চাহিদা পূরণকে কেন্দ্র করে আবর্তিত করা হয়েছে। যার ফলস্বরূপ, বিবাহ-পরবর্তী পারিবারিক প্রত্যাশা বা দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ের কাছে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ মনে হতে থাকে। ব্যক্তিস্বাধীনতার এই চিন্তা থেকে সংসারের, সঙ্গীর কিংবা সন্তানের প্রয়োজনে নিজের পছন্দ-অপছন্দ, চাকরি, বেড়ানো এমনকি শপিং এর মত ছোটখাট বিষয়ে ছাড় দেওয়া, একে অপরকে প্রাধান্য দেওয়া, দোষত্রুটি ক্ষমা করা, পরিবারের কল্যানে শ্রম দেওয়া ইত্যাদি স্বাভাবিক বিষয়গুলোও কঠিন হয়ে যায়। সর্বক্ষণ কি পেলাম, কি দিলাম এর হিসাব নিকাশ চলতে থাকে। নিজের মত করে জীবন কাটানোর ব্যক্তি-স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ – এই দুই বিষয়ে তখন দ্বৈরথ তৈরি হয়। তাছাড়া, সৃষ্টিকর্তা বিবর্জিত ধর্মনিরপেক্ষবাদ যখন সমাজের ভিত্তি অর্থাৎ আখিরাতের সাথে জীবনের কোন সম্পর্ক নাই, তখন ছোটবড় এই স্যাক্রিফাইসগুলো মানুষের জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, এর বিনিময়ে আল্লাহ্’র কাছ থেকে উত্তম কোন প্রতিদান পাওয়ার ব্যাপারে সে ভরসা খুঁজে পায় না। কোনকিছু নিজের পছন্দমত না হলে নিজেকে সে সবসময় বঞ্চিত মনে করে। এভাবে অনেক ‘না পাওয়া’ বা ‘করতে না পারা’র বাধা যখন পুঞ্জিভূত হয়ে বড় আকার ধারণ করে, ব্যক্তি তখন সম্পর্কের ব্যাপারে শ্বাসরুদ্ধ বা শৃঙ্খলিত বোধ করে, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পায় এবং একপর্যায়ে সে সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেতে চায়। যার কারণে আমরা দেখি, ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণার কর্ণধার ফ্রান্সে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৫৫ শতাংশ। মার্কিন ডিভোর্স এটর্নি স্কট স্ট্যাডলারের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে প্রথম বিবাহে ডিভোর্সের হার ৫০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় বিয়েতে ৬৭ শতাংশ এবং তৃতীয় বিয়েতে সেটা ৭৩ শতাংশে গিয়ে ঠেকছে। আমাদের দেশেও গত এক বছরে ডিভোর্সের হার বেড়ে গেছে দ্বিগুন। ঢাকা শহরে প্রতি ৪০ মিনিটে একটা করে ডিভোর্স হচ্ছে। তাদের এই দূষিত চিন্তা গ্রহণ করার ফলে তাদের মতই আমাদের পরিবারব্যবস্থা এবং গোটা সমাজব্যবস্থায় ভাঙ্গন ধরতে শুরু করেছে।
অথচ, একটি তাক্বওয়াভিত্তিক সমাজে ব্যক্তিস্বাধীনতা বা মানুষের নিজেদের খেয়ালখুশি দিয়ে পরিচালিত হবার সুযোগ নেই। কারণ, মুসলিম মাত্রই সে আল্লাহ্’র দাস এবং আল্লাহ্’র আদেশ-নিষেধের কাছে আত্মসমর্পনকারী। মহান আল্লাহ্’র আদেশ মেনে নারী ও পুরুষ বিয়ে করে, যার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র যৌন চাহিদা পূরণ নয়, বরং দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে পরিবার গঠন ও এর যত্ন করা। আল্লাহ্’র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তারা তখন একে-অপরের যত্ন নেয়, ছাড় দেয়, ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে, কিছু অপ্রাপ্তি থাকলেও আখিরাতের কথা ভেবে বিচলিত হয়না এবং এভাবেই স্বেচ্ছাচারিতার বদলে একটি সুস্থ সুন্দর দায়িত্বশীল পরিবার তথা সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, “তোমরা তোমাদের সঙ্গীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর, যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যেখানে আল্লাহ্ তোমাদের জন্য অনেক কল্যাণ রেখেছেন” (সুরা আন-নিসা, আয়াত ১৯)। সুতরাং, বিশ্বব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের ভিত্তিতে গড়ে উঠা সমাজগুলোতে পরিবার ভাংগনের যে সামাজিক মহামারী চলছে, তার প্রতিষেধক রয়েছে কেবলমাত্র আল্লাহ্’র দেয়া জীবনব্যবস্থায়। সচেতন মুসলিম হিসেবে আমাদের উচিত নিজেদের আক্বীদার প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখা এবং ইসলাম প্রদত্ত ভারসাম্যপূর্ণ সামাজিক ব্যবস্থার পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের ডাক সমাজের সর্বত্র পৌঁছে দেওয়া। পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থা গঠনে ইসলামের নেতৃত্ব আজ শুধু মুসলিমদেরই প্রয়োজন নয়, বরং পুরো মানবজাতির একমাত্র বিকল্প।
– যায়নাব মায়সূরা
৭ মাসে ১০ বার ডুবল চট্রগ্রাম

বাস্তবতা: ভারী বর্ষন ও জোয়ারের পানিতে যাতে জলাবদ্ধতা না হয় সে জন্য অনেক ব্যয় বহুল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিটি কর্পোরেশনের একটি, চট্রগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সি ডি এ) দুটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্পের আওতায় ১১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার কাজ চলছে। এর মধ্যে গত ছয় বছরে ৫ হাজার ৭৯০ কোটি টাকার খরচ হলেও খুব বেশি সুফল আসেনি। জোয়ার ঠেকাতে নগরের বিভিন্ন খালের মুখে ৪০ টি জলকপাটের মধ্যে মাত্র ৫ টি নির্মান কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৩৫ টি কাজ ছয় বছর ধরেই চলছে।
মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, (সি ডি এ) তাদের প্রকল্পের আওতাধীন খাল গুলো থেকে যে পরিমাণ মাটি (সাড়ে ৯ লক্ষ ঘনমিটার) উত্তোলনের কথা, তার চার ভাগের একভাগ ও তোলেনি। রাস্তা করার জন্য খালের প্রশস্থতা কমিয়েছে। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মাটি উত্তোলন না করায় খালের গভীরতা কমেছে। জাতে পানি প্রবাহের পরিমাণ কমে গেছে। এছাড়া জলকপাট গুলো এখনো চালু হয়নি। পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা করেনি। এসব কারণে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
তবে এই দাবি অস্বীকার করে (সিডিএ) প্রধান প্রৌকশলী কাজী হাসান বিন শামস প্রথম আলোকে বলেন, তাদের প্রকল্পের আওতায় খালগুলো ঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন নালা গুলো পরিষ্কার করেনি। যার কারণে নালা থেকে খালে পানি নামতে পারছেনা, এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: “৭ মাসে ১০ বার ডুবল চট্রগ্রাম” প্রথম আলো প্রতিবেদন থেকে।”
মন্তব্য: চট্রগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতার অণুঘটক গুলো নিন্মরুপ:
১) জলাবদ্ধতা প্রকল্পোর জলকাপট গুলো কার্যকর রাখা হয়নি।
২) নালা ও খালগুলো পরিষ্কার করা হয়নি।
৩) অতিরিক্ত পানি জমা রাখার জন্য কোন জলাধার তৈরি করা হয়নি
৪) জোয়ারের সময় জলকপাটগুলো বন্ধ করে খাল থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন পাম্প স্থাপন করা হয়নি।
সিটি কর্পোরেশন এবং সিডিএ কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে উল্লেখিত টেকনিক্যাল সমস্যা গুলোর সমাধান করতে পারেনি। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করে প্রত্যেক বছর তারা একে অপরকে দোষারোপ করছে।
ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী রাজনৈতিক কাঠামোর গর্ভজাত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বে জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে উদাসীন। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তারা কেবল নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি, শান-শওকত এবং জনগণের সম্পদ লুন্ঠনের হাতিয়ার হিসাবে বুণে। মানব রচিত মতবাদ মানেই গনদুর্ভোগ। বিদ্যমান গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এবং লুটেরা শাসকদের কাছ থেকে আমরা কি প্রত্যাশা করতে পারি? ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিতে রাজনীতি থেকে স্রষ্টাকে পৃথক করার কারণে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ এবং প্রশাসকবৃন্দ তাদের কর্মকান্ড এবং অর্পিত দায়িত্বে ‘লাভ-ক্ষতি’ ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করতে পারে না।
ইসলামের মাধ্যমে জনগণের বিষয়াদি অভ্যন্তরীণভাবে দেখাশুনা করা ও বহিশক্তির আগ্রাসন থেকে জনগণকে রক্ষা করাই সত্যিকারের রাজনীতি। খিলাফত হলো সেই রাষ্ট্রকাঠামো যে সেটি বাস্তবে জনগণের পক্ষ থেকে বাস্তবে এই কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকে। কেবল আল্লাহ্ সুবহান তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য শাসক জনগণের দেখাশুনা করবে ইনশাল্লাহ। রাসুল (সা) বলেন: “খলিফা হচ্ছেন অভিভাবক এবং তিনিই তাঁর নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল।”
রায়হান রফিক
প্রশ্ন-উত্তর: মুদ্রা বিনিময়

প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু,
আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে আপনি ভাল আছেন, সুস্থ আছেন এবং ভাল করছেন এবং আমি আশা করি যে অবশেষে মুস্তাফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুসংবাদ এসে পৌছেছে। আমার প্রশ্ন হল: কোনো কিছু নগদ না করে একটি মুদ্রা অন্যের সাথে বিনিময় করা এবং এটি অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা কি অনুমোদিত? উদাহরণস্বরূপ: আমি সবকিছুর সাথে একমত হয়ে এক্সচেঞ্জারের কাছ থেকে ১০০০ দিনার কিনতে চাই এবং আমি তাকে ঘটনাস্থলেই সম্মতি অনুযায়ী অর্থ প্রদান করেছি এবং ১০০০ দিনার নগদ না করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে টাকা পাঠানোর জন্য তাকে জানিয়েছি। এটা কি অনুমোদিত নাকি নগদ বুঝে নিয়ে হওয়া উচিত? আল্লাহ আপনাকে বরকত দিন, আপনাকে সাহায্য করুন, আপনাকে অবিচল রাখুন এবং বিজয়ের দান করুন।
মোহাম্মদ আজ-জারু থেকে
উত্তর:
ওয়া আলাইকুম উস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু
এই লেনদেনটি শুধুমাত্র এক্সচেঞ্জেই থেমে থাকে না, তবে এটিতে একটি বিনিময় লেনদেনও অন্তর্ভুক্ত, যেহেতু আপনি অন্য মুদ্রা দিয়ে দিনার কিনছেন, তাই উদাহরণস্বরূপ আপনি তাকে ১০০০ দিনারের জন্য ৩০০০ রিয়াল দিচ্ছেন এবং তারপরে তিনি আপনার পছন্দ অনুযায়ী স্থানে তা স্থানান্তর করছেন, অর্থাৎ, এটি প্রথমে বিনিময় করা হয়েছে এবং তারপর স্থানান্তর করা হয়েছে:
বিভিন্ন অর্থের মধ্যে বিনিময়ের ক্ষেত্রে, এটি হাতে হাতে হতে হবে, অর্থাৎ এটি সরাসরি বিনিময় হতে হবে, অন্যথায় এটি হারাম হবে:
বুখারী সুলাইমান বিন আবু মুসলিম থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: আমি আবু আল-মিনহালকে হাতে-হাতে বিনিময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তাই তিনি বললেন: “আমি এবং আমার ব্যবসার অংশীদার হাতে-হাতে কিছু জিনিস কিনেছিলাম এবং বাকিতেও।” আল-বারা ইবনে আযিব এলেন এবং আমরা তাকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম, তখন তিনি বললেন: “আমার ব্যবসায়িক অংশীদার যায়েদ ইবনে আরকাম এবং আমি এটি করেছিলাম, তাই আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম এবং তিনি বললেন: «مَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ ، فَخُذُوهُ وَمَا كَانَ نَسِيَةً فَذَرُوهُ» “যা সরাসরি হাতে-হাতে কেনা হয়েছিল, তা নিয়ে নাও, কিন্তু যা বাকিতে কেনা হয়েছিল, তা ছেড়ে দাও।”
মুসলিম মালিক বিন আওস বিন আল-হাদাছান থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি বলেছেন: আমি এসে বলছিলাম: “কে দিরহাম বিনিময় করবে?” তাই, তালহা বিন ওবায়েদুল্লাহ, যখন তিনি উমর বিন আল-খাত্তাব (রা)-এর কাছে ছিলেন, তখন বলেছিলেন: “আমাদেরকে তোমার স্বর্ণ দেখাও, তারপর আমাদের কাছে এসো। যদি আমাদের চাকর আসে, আমরা আপনাকে তোমার টাকা দেব।” উমর বিন আল-খাত্তাব (রা) বললেন: “না, আল্লাহর নামে বলছি, আপনি তাকে তার টাকা দেবেন অথবা তাকে তার স্বর্ণ ফিরিয়ে দেবেন, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الْوَرِقُ بِالذَّهَبِ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ، وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ، وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ، وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ رِبًا، إِلَّا هَاءَ وَهَاءَ»
অর্থের বিনিময়ে স্বর্ণের লেনদেন হল রিবা (সুদ), ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত; এবং গমের বিনিময়ে গম কেনাকাটা করা হল রিবা, ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত; এবং যবের সাথে যবের লেনদেন করা হল রিবা, ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত। খেজুরের সাথে খেজুর হল রিবা, ঘটনাস্থলে (হাতে-হাতে) লেনদেন ব্যতীত।”
মুসলিম উবাদা বিন আস-সামিত থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«الذَّهَبُ بِالذَّهَبِ، وَالْفِضَّةُ بِالْفِضَّةِ، وَالْبُرُّ بِالْبُرِّ، وَالشَّعِيرُ بِالشَّعِيرِ، وَالتَّمْرُ بِالتَّمْرِ، وَالْمِلْحُ بِالْمِلْحِ، مِثْلًا بِمِثْلٍ، سَوَاءً بِسَوَاءٍ، يَدًا بِيَدٍ، فَإِذَا اخْتَلَفَتْ هَذِهِ الْأَصْنَافُ، فَبِيعُوا كَيْفَ شِئْتُمْ، إِذَا كَانَ يَدًا بِيَدٍ»
“স্বর্ণের বিনিময়ে স্বর্ণ, রৌপ্যের বিনিময়ে রৌপ্য, গমের বিনিময়ে গম, যবের বিনিময়ে যব, খেজুরের বিনিময়ে খেজুর, লবণের বিনিময়ে লবন লেনদেন, অনুরূপের বিনিময়ে যখন লেনদেন করা হয়, একই রকম এর সাথে, হাতে-হাতে যদিওবা সে জিনিসগুলো বিভিন্ন ধরণের, তা সত্ত্বেও তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী বিক্রি করতে পারো, যতক্ষণ পর্যন্ত এটি হাতে-হাতে (লেনদেন হয়ে) থাকে।”
‘হাতে-হাতে’ এর অর্থ হল কেনা-বেচাটি হাত দ্বারা হয়, অর্থাৎ এক ব্যক্তিকে রিয়ালে অর্থ প্রদান করা হচ্ছে, এবং দ্বিতীয় ব্যক্তিকে দিনারে অর্থ প্রদান করা হচ্ছে, সব একই সময়ে ঘটছে…
এটি ক্যাশ-ইন করার পরে, আপনি এটিকে ঐ স্থানে স্থানান্তর করতে পারেন তা সেটি এই এক্সচেঞ্জারের মাধ্যমে হোক কিংবা অন্য।
কেউ বলতে পারে: এই অর্থ নগদ করে লাভ কী যখন এটি স্থানান্তরই হবে? এর উত্তর তথা এর পেছনের কারণ হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস, কারণ এতে স্পষ্ট ও নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে যাতে কোনো সন্দেহ বা অস্পষ্টতা নেই, কারণ তাতে স্পষ্টভাবে নগদ করার বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে: “ঘটনাস্থলে লেনদেন ব্যতীত”, ‘হাতে-হাতে’ এবং এ সমস্ত বাক্যাংশগুলি এটিকে ক্যাশ করার জন্য স্পষ্ট প্রমাণ, তাই কোনও অজুহাত বা বিকল্প ব্যাখ্যা গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এ থেকে আমি এভাবেই বিষয়টি বুঝেছি, আর আল্লাহই সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়।
আপনাদের ভাই
শীতের যুদ্ধ ও গনীমত

গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে শীতকাল একটি অল্প সময়ের বিষয় এবং এ সময়কালে যেমন কিছু সহজ বাস্তবতা রয়েছে তেমনি রয়েছে কিছু কষ্টসাধ্য বাস্তবতা। বিশেষ করে ঈমানদারদের এ সময়ে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যেমন, সালাতের সময়ে পরিবর্তন। রাত গড়াতে শুরু করলে ঈশার সালাত পড়া অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে, একইভাবে ঘুম থেকে উঠে ফজর সালাত পড়াও অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়। আবার, জোহর, আসর ও মাগরিবের সালাতের মাঝের ব্যবধান এতই কমে আসে যে একটু দেরি করলেই অনেকের জন্য সালাত কাযা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এর বাইরে শীতের তীব্রতায় ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল কিংবা ওযু করাটিও কষ্টকর কাজ।
তবে লড়াই যত কঠিন, এর পুরস্কারও তেমন ব্যাপক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিনটি আমল পাপ মোচন করে—সংকটকালীন দান, গ্রীষ্মের রোজা ও শীতের অজু।’ (আদ দোয়া লিত তাবরানি: ১৪১৪)। উমর (রা.) তাঁর ছেলের উদ্দেশে বলেন, ‘শীতের দিনে ভালোভাবে অজু করা বড় গুরুত্বপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ।’ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন কাজের কথা বলব না! যা দ্বারা গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি হয়?’ সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন, ‘মন না চাইলেও অজু করা, অধিক পদক্ষেপে মসজিদে যাওয়া এবং এক নামাজের পর আরেক নামাজের জন্য অপেক্ষা করা।’ (মুসলিম)।
একইভাবে শীতকালের সকাল, সন্ধ্যা কিংবা রাত্রিতে একজন ঈমানদার আল্লাহর দ্বীনের জন্য, দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য, ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্রের সকলক্ষেত্রে বাস্তবায়িত করার দাবির যে সুমহান দাওয়াত তা পৌঁছিয়ে দেওয়ার স্বার্থে যেকোনো দৌড়ঝাপ তথা যেকোনো কষ্টসাধ্য কাজই করুক না কেন তার পুরস্কারও ঠিক সেরকমই বিশাল হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সকল কাজ পর্যবেক্ষন করেন।
আবার যদি মুদ্রার অপর পিঠে আসি তবে শীতের কিছু সহজ বাস্তবতায়ও রয়েছে। তবে এ বাস্তবতা কি ঈমানদারের প্রয়োজন নাকি প্রয়োজন ছাড়াই বাড়তি প্রাপ্তি?
উমর (রা) বলতেন:
الشتاء غنيمة العابدين
[আশ-শিতা-উ গনীমাতুল ’আ-বিদীন]
“শীতকাল ইবাদতকারীদের জন্য গনীমতসরূপ”
যুদ্ধলব্ধ সম্পদকে আরবীতে গনীমত বলা হয়। গনীমত একজন ঈমানদার সৈনিকের জন্য অতিরিক্ত প্রাপ্তি। একে আনফালও বলা হয়ে থাকে (যা নফল বা অতিরিক্ত থেকে এসেছে) অর্থাৎ, এটি অতিরিক্ত প্রাপ্তি। ঈমানদার গনীমতের জন্য যুদ্ধ করে না। বরং ঈমানদার লড়াই করে ইসলামের পতাকাকে তুলে ধরার জন্য, আল্লাহর কালিমাকে সুউচ্চ করার জন্য, এবং এর বদলে সে আখিরাতের পুরস্কারের আকাঙ্ক্ষা করে, বৈষয়িক ব্যক্তিগত কোনো প্রাপ্তি সে আশা করে না। সুতরাং, একজন মুমিনের জন্য গনীমত অতিরিক্ত প্রাপ্তি বৈ আর কিছু নয়।
যথার্থই, শীতকালে রাতগুলো দীর্ঘ ও দিনগুলো ছোট এবং রাতে কিয়াম করা খুবই সহজতর। যেহেতু রাত দীর্ঘ, কিছুটা ঘুমিয়েও কিয়াম উল-লাইল করা যায়। আর যারা ঘুমোতে চান না তাদের জন্য কিয়াম করার জন্য রয়েছে রাতের দীর্ঘ সময়।
এছাড়াও, দিনগুলো ছোট, তাই সিয়াম পালন করা সহজতর। অল্প সময়কাল রোজা রেখেও একজন পুরো একটি রোজার আজর বা পুরষ্কার পায়।
একজন খুশূ’প্রাপ্ত ঈমানদারের জন্য গ্রীষ্মকালের রাতে সালাত আদায় করা কঠিন কিছু নয়, যদিওবা রাত্রিগুলোর ব্যপ্তি ছোট এবং ঘুমের সময় অল্প। একজন বিশ্বাসী ঠিকই তার সময় বের করে নেয়। একইভাবে, একজন ঈমানদারের জন্য গ্রীষ্মকালের দীর্ঘ ও উত্তপ্ত দিনগুলোয় রোজা রাখা গুরুতর কিছু নয়। মু’আজ বিন জাবাল (রা) বলতেন: ’হে আল্লাহ আমি এই জন্য বেঁচে থাকতে চাই না যে আমি দুনিয়া চাই। বরং আমি এই জন্য বেচে থাকতে চাই যাতে আমি গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিনগুলোতে রোজা রাখতে পারি এবং শীতের দীর্ঘ রাতগুলোতে কিয়াম করতে পারি।’ শীতকাল আগমন করলে উবাঈদ বিন উমাঈর (রা.) বলতেন, ‘হে কুরআনের ধারক! তোমাদের রাতগুলো তিলাওয়াতের জন্য প্রলম্বিত করা হয়েছে, অতএব তা পড়তে থাকো। আর রোজা রাখার জন্য তোমাদের দিনগুলো সংক্ষেপিত করা হয়েছে, তাই বেশি বেশি রোজা রাখো।’
এসবকিছুর পাশাপাশি, শীতকাল একজন আল্লাহর পথে দায়ীর জন্য দাওয়া করার জন্য একটি সুবর্ণ সময়। যদিও শীত-গ্রীষ্ম সকল ঋতুতেই একজন দায়ী ইসলামী আদর্শের দাওয়াত নিয়ে সমাজের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষকে আহ্বানে ব্যস্ত থাকে। তবে, শীতকালে আবহাওয়া শীতল ও রাত দীর্ঘ হবার কারণে মানুষ দীর্ঘ সময় বাইরে থাকে, বিভিন্ন লোক-সমাগমের স্থান, যেমন, মাঠ-ময়দান, রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকানগুলো সরগরম থাকে, মানুষ আড্ডা দেয়, বন্ধু-বান্ধব পরিচিতদের সাথে সময় কাটায়। তাই যেকোনো বিষয়বস্তু নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করার অবকাশ থাকে। তাই একজন দা’ঈ শীতের অল্প কয়েক মাসে অনেক মানুষকে দাওয়া করার সুযোগ পায় এবং এভাবে অল্প সময়ে অনেক বেশি পুরষ্কার অর্জন করতে পারে।সুতরাং, যদিও শীতকালের সহজতর অংশটুকু প্রকৃত ঈমানদারের জন্য কোনো চাহিদাপূরণ নয়, এরপরও একজন ঈমানদারের জন্য শীতকাল এক প্রকারের বোনাস যেখানে অল্প পরিশ্রমে বেশি পুরস্কার অর্জন করা যায়। এবং একজন প্রকৃত ঈমানদার এ সুযোগ কখনোই হাতছাড়া করবে না, হেলায় হারাবে না।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُ وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
কিন্তু যে কেউ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ভালো কাজ করে, সেটি তার জন্য ভালো। [বাকারাহ: ১৮৪]كَانُوا قَلِيلًا مِنَ اللَّيْلِ مَا يَهْجَعُونَ ، وَبِالْأَسْحَارِ هُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
তারা রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটায়, আর রাতের শেষ প্রহরে এরা ক্ষমা চাওয়ায় রত থাকে। [সুরা জারিয়াত: ১৭-১৮]
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةٌ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ
ধৈর্য্যর সাথে সাহায্য প্রার্থনা কর নামাযের মাধ্যমে। নিশ্চয় তা যথেষ্ট কঠিন কেবলমাত্র তাদের ছাড়া যারা বিনয়ী (খুশু’প্রাপ্ত) [বাকারাহ: ৪৫]
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا
আর যারা রাত্রি কাটিয়ে দেয় তাদের পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সেজদাবনত ও দন্ডায়মান হয়ে [ফুরকান: ৬৪]
وَأَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
আর যদি রোজা রাখ, তবে তা তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা তা বুঝতে পার [বাকারাহ: ১৮৪]পুনর্জাগরণের পথে বুদ্ধিবৃত্তিক পদ্ধতিই একমাত্র সঠিক চিন্তা পদ্ধতি

মুসলিমদের মাঝে ইসলামী রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি এবং ফলশ্রুতিতে সঠিক ইসলামী চিন্তা না থাকার ফলে ‘জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে’ মুসলিম মননে বেশ কিছু ভুল চিন্তা পদ্ধতি স্থান করে নিয়েছে। এ ধারা বেশ আগে থেকেই হয়ে রয়েছে, তবে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে এখন তা দ্রুত সারফেসে উঠে আসছে। ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য মুসলিম। এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। তবে আমরা সংক্ষেপে কয়েকটি বিপথগামি চিন্তা পদ্ধতির কথা উল্লেখ করবো ইন শা আল্লাহ।
১) আবেগি চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরনের চিন্তায় মানুষ গভীর চিন্তা খাটিয়ে সমাধানে আসে না। বরং আবেগকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। উপরিতলের চিন্তায় আবেগীভাবে মশগুল থাকাটাই এ চিন্তার বৈশিষ্ট্য। এ ধরণের চিন্তায় মানুষ ‘সেভিয়র’ তথা ‘ত্রাণকর্তা’ খুঁজে বা কাউকে ত্রাণকর্তা হিসেবে গ্রহণ করে। যেহেতু চিন্তা করে সমাধান নেয়া এই চিন্তা পদ্ধতিতে দুষ্কর কাজ তাই মানুষ তার জীবনের বড় সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য সবসময় ত্রাণকর্তা খুঁজে বেড়ায়। দুর্ভাগ্যবশত, অধিকাংশ সাধারন খেটে খাওয়া মানুষই এ চিন্তা পদ্ধতি অনুসরণ করে। এটি তাদের যতটা না দোষ, তার চেয়ে বেশি করুণ বাস্তবতা।ইমাম মাহদী এসে সব সমস্যার সমাধান করবেন – এ ক্যাটাগরির চিন্তায় মানুষ এই আকাঙ্ক্ষায় বিভোর থাকতে পুলকিত বোধ করে।
২) প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরণের চিন্তা অনেক আবেগী চিন্তার মতোই, তবে প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় সল্প মেয়াদে বেশি আবেগী। এ চিন্তায় মানুষ কোনো বড় দুর্যোগ বা প্রেক্ষাপট তৈরি হলেই প্রতিক্রিয়া দেখায়, এর বাইরে সে তার গথবাধা জীবন পরিচালনা করে। এরাও চিন্তার দিক বিবেচনায় পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী। ‘শক’ তাদের সল্প মেয়াদে কিছুটা চিন্তাশীল করে, কিন্ত তা ক্রমেই ক্ষীন হয়ে যায়। সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ হতে উচ্চ মধ্যবিত্ত পর্যন্ত যেকোনো লেয়ারেই এই ধরণের মানুষ থাকতে পারে। এদের মধ্যে অনেকসময় তীব্র আবেগ দেখা যায় আবার কখনো দেখা যায় পরাজিত মানসিকতা।
উপরের দুই চিন্তা পদ্ধতিতে যেহেতু চিন্তা থেকে আবেগ বেশি প্রাধান্য পায়, তাই এসব মানুষ দীর্ঘমেয়াদে কিভাবে অগ্রসর হবে, তা দেখতে পায় না, খুঁজে বের করার চেষ্টাও করতে চায় না। এদের মাঝে কেউ কেউ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আবেগ দ্বারা বেশি তাড়িত হন এবং সমাধানের জন্য নিজস্ব চেষ্টার গন্ডিতে কোনোরূপ কারণ-ফলাফলের হিসেব-নিকেষ না করে, কেবল কিছু ইবাদত-বন্দেগি তথা আচার-অনুষ্ঠানের করেই গায়েবি তথা সয়ংক্রিয় কোনো সমাধানের আশায় থাকেন।
৩) লজিকাল চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরণের চিন্তা সাধারণত সমাজের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্যমান। বৃটিশদের কেরানী তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থায় পাবলিক-প্রাইভেটে পড়ে এই জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। এরা নিজেদের সমাজের অন্যান্য মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে তাই তাদের যেকোনো সিদ্ধান্ত অন্যদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হবে ধরেই এরা চিন্তা করে। এ চিন্তায় মানুষ যতটা না বাস্তবতাকে বুঝে চিন্তা করেন, তার চেয়ে যৌক্তিক মানসিকতা নিয়ে চিন্তা করে। তারা তাদের এডুকেটেড মেন্টালিটিকে মানুষের বাস্তবতাকে বোঝার বা অনুমান/পরিমাপ করার জন্য যথেষ্ঠ মনে করে। এতে করে তারা ক্রমেই সাধারন মানুষের চিন্তা ও আবেগ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। এদের মধ্যে যারা সরাসরি ফিল্ড রিয়েলিটি ভালোভাবে বুঝে বা বুঝতে চায়, ব্যক্তি হিসেবে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি ধন্য হয় সমাজে। লজিকাল শিক্ষায় শিক্ষায় শিক্ষিত হবার কারণে এরা ইসলামকেও লজিকালি নিতে চায়। ইসলামী চিন্তাকে এরা অন্ধভাবে নিলেও ইসলামের কাজকে এরা যৌক্তিকভাবে নিতে চায়, এবং যুক্তির মানদন্ডে না টিকলে তারা সে ইসলামী কাজকে হীনজ্ঞান করে এবং মেনে নিতে দ্বিধাদন্দ্ব প্রকাশ করে। আবার এদের অনেকে হাদীসে আসা অল্পবিস্তর কিয়ামতের আলামত ঘেটে, লজিকাল মাইন্ড খাটিয়ে পূণদৈঘ্য “ইসলামী শেষ জমানা” নামক চলচিত্রও তৈরি করেন, যার হিরো হচ্ছেন ঈসা (আ) ও সাইডকিক আল-মাহদী। এবং তারা তা দেখে পুলকিত বোধ করে সুখনিদ্রা যান। দুর্ভাগ্যবশতঃ উম্মাহর কল্যাণে কোনো একশন পয়েন্টে যেতে পারেন না, এবং কোনো ডিরেকশনও দিতে পারেন না। ভাগ্য গণনাকারীরা যেমন ভাগ্য গণনা করে ভবিষ্যত বলে দেন, এনারাও সুসংবাদ দেয়া ও হতাশা দূরকারী হাদীসগুলোকে ভবিষ্যত গণনার উপকরণে পরিণত করেছেন।
এখানে উল্লেখ্য যে, আবেগী ও প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তার মানুষদের মাঝেও ইমাম মাহদী বা ঈসা (আ)-এর এসে সমস্যা সমাধান করে দিবেন – এরূপ চিন্তা থাকতে পারে। তবে তারা এসব ব্যপারে লজিকালদের মতো জটিলভাবে চিন্তা করেন না, কেবল পরিত্রানদাতা হিসেবে এদের কল্পনা করেন এবং আবেগী কল্পনায় বিভোর হন।
সমাজে অল্পকিছু ব্যক্তি থাকতে পারেন যাদের মাঝে তীব্র লজিকাল মাইন্ডসেট এবং তীব্র আবেগ দুটোই কার্যকর বলে মনে হয়, তবে তারা মূলত লজিকাল চিন্তা দ্বারা দিনের শেষে সিদ্ধান্ত নেন। এরা নিজেদের বস্তুগত স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে তাদের জীবনের কেন্দ্রে রেখে জীবনের সিদ্ধান্তগুলো নেন। মানবসমাজের এরাই খুব সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক চরিত্র। তবে এরা যদি সত্যের পক্ষে একনিষ্ঠভাবে চলে আসেন, তবে তারা প্রভুত কল্যাণের উসিলাও হতে পারেন।
৪) বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি
এ চিন্তা পদ্ধতি লজিকাল চিন্তা পদ্ধতিরই একটি সাবসেট তথা শাখা। এমপিরিকাল ড্যাটার উপর ভিত্তি করে এই চিন্তা করা হয়। বিজ্ঞান কোনো দৃষ্টিভংগি দেয় না, আবার কোনো নির্দিষ্ট একশন পয়েন্টও দেয় না। সর্বোচ্চ একটি পরিধি দিতে পারে। বর্তমানে পশ্চিমা সেকুলার-লিবারেল হিউম্যানিস্ট জীবনচিন্তার মানুষদের অনেকেরই সিদ্ধান্ত তারা বৈজ্ঞানিক চিন্তা দিয়ে করে। তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের অনেকেই মানবজীবনের সমাধান বিজ্ঞান দিয়ে করার চেষ্ঠা করে। কিন্তু এতে তাদের সমস্যার সমাধান হয়না, পাশাপাশি তাদের এই পলিসির কারণে সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার উপর ব্যাপক চাপ পড়ে।
৫) ফিকহী চিন্তা পদ্ধতি
এ ধরণের চিন্তায় মানুষ একটি ফিকহী মনস্তত্ব দ্বারা তাদের কার্যক্রম নির্ধারণ করতে চায়। কাজ করার সময় যখন প্রশ্ন করা হয় – “ভাই, কাজটাতো হালাল, সুতরাং করলে সমস্যা কোথায়”। সমস্যা এই সংকীর্ণ মনস্তত্ত্বের মাঝেই। আমাদের বোঝা প্রয়োজন, বিজ্ঞানের মতো আইনশাস্ত্র তথা ফিকহও কোনো একশন পয়েন্ট দেয়না, সর্বোচ্চ একটি সীমানা দিতে পারে। সুতরাং, এ চিন্তায় এক এক মানুষ এক এক একশন পয়েন্টে ফোকাস দিবে এবং এতে জাতিগত ঐক্য তৈরি হবার সম্ভাবনা হয়ে পরে দুরূহ। উদাহরণস্বরূপ, আপনি একটি ফুটবল ম্যাচ এর কথা চিন্তা করুন। যাকে মিডফিল্ডার হিসেবে নামানো হয়েছে, সে যদি চিরকাল আইনী বিবেচনায় চিন্তা করতে থাকে, তাহলে সে প্রয়োজন সাপেক্ষে কখনোই গোল দেবার জন্য ছুটে যাবে না, আবার প্রয়োজন সাপেক্ষে কখনোই গোল ঠেকাবার জন্য ডিফেন্সে নেমে আসবে না। আবার, যাদের দৃষ্টিভংগি ম্যাচ জেতা, তারা কোচ কাকে কোথায় দাড় করিয়েছে সে বিবেচনা না করে ম্যাচ জেতার জন্য যখন যে বাস্তবতায় যেটি করা প্রয়োজন পুরো টিম মিলে সে দৃষ্টিভংগিতে এগিয়ে যাবে। এখানে ডিসিশন থেকে দৃষ্টিভংগিই গুরুত্বপূর্ণ।—
প্রকৃতপক্ষে, আমাদের জীবন পরিচালনার প্রকৃত চিন্তার ভিত্তি হবে আমাদের আকীদা যা আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভংগি প্রদান করে, যা অন্য যেকোনো মতাদর্শ হতে পৃথক একটি সতন্ত্র মতাদর্শিক দৃষ্টিভংগিও বটে। এবং সেই দৃষ্টিভংগিই নির্ধারণ করবে আমাদের একশন পয়েন্ট কী হবে। এবং সেই জীবনযাত্রায় ফিকহ, বিজ্ঞান ও উম্মাহর আবেগ হচ্ছে কেবল এক একটি সহায়ক শক্তি। লজিকাল চিন্তাকে টুকটাক মেকানিক ট্রাবলশুটিং টাইপ কাজে সীমাবদ্ধ রেখে, ফিকহী চিন্তাকে আইন বের করার কাজে সীমাবদ্ধ রেখে এবং বৈজ্ঞানিক চিন্তাকে কেবলমাত্র বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে মানবজীবনকে বাস্তবতাকে সামনে রেখে করা “বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা” প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনার মধ্যে রয়েছে সমাজের প্রকৃত কল্যাণ ও মুক্তি।
আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিন।
ইসলামে পিতৃত্বের অবস্থান (Fatherhood in Islam)

ভূমিকা: একজন মুসলিম পিতা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শক্ত ভিত গড়ে দেন
ইসলামে পিতৃত্ব এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, মূলত এর মাধ্যমেই মুসলিমদের বংশ-পরিচয় নির্ধারিত হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ] “তাদেরকে (সন্তানদেরকে) তোমরা তাদের পিতার পরিচয়ে সম্বোধন কর। এটাই আল্লাহ্’র দৃষ্টিতে অধিক ন্যায়সঙ্গত” [সূরা আল-আহযাব: ৫]। এই আয়াত পিতৃত্বের ভিত গড়ে দিয়েছে, যা হচ্ছে সন্তান লালন-পালনে পিতার বাধ্যবাধকতার ভিত্তি। যার মধ্যে রয়েছে সাহচর্য বা সঙ্গদান, আর্থিক ভরণপোষণ, ইসলামী চিন্তাসমূহ প্রোথিত করা, আক্বীদার প্রতি বিশ্বাস সুদৃঢ়করণ ও তাদেরকে শাসনের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল রাখা। নিঃসন্দেহে বলা যায় ইসলামে পিতার ভূমিকা শুধুমাত্র ছেলে-মেয়েদের নামকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর চেয়ে অনেক ব্যাপক।
ইসলামী উম্মাহ্’র শিক্ষক হিসেবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর ভূমিকাকে পিতার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি (সা) বলেন, إِنَّمَا أَنَا لَكُمْ بِمَنْزِلَةِ الْوَالِدِ أُعَلِّمُكُمْ “আমি যেভাবে তোমাদেরকে শিক্ষা দেই, সেই অর্থে আমি বস্তুত তোমাদের পিতার মত” [সুনানে আবু দাউদ]। আমাদের নেতা ও শিক্ষক আল্লাহ্’র রাসূল (সা) নারী ও পুরুষের পুরো একটি প্রজন্মকে অভিভাবকের মতো লালন-পালন করে তাদেরকে ইসলামের একেকটি পিলার হিসেবে তৈরি করেছেন, যাদের প্রভাব মুসলিম উম্মাহ্’র ওপর এখনও বিদ্যমান। তিনি চারজন মহিমান্বিত কন্যাকে লালন-পালন করেছেন, যারা মুসলিম উম্মাহ্’র জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। তিনি (সা) তাঁর বয়োঃজেষ্ঠ কিন্তু গরিবতম চাচার সন্তান আলী ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে লালন-পালন করেছেন, যিনি পরবর্তী সময়ে ইসলামের চতুর্থ খলীফা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি (সা) তাঁর পালকপুত্র যায়েদ ইবনে হারিসা ও তার সন্তান উসামা বিন যায়ীদকে দ্বীনি পরিবেশে বড় করেছেন। তাঁর (সা) তত্ত্বাবধানে থাকা তরুণদের জন্য তিনি ছিলেন যত্নবান সঙ্গী ও ধৈর্যশীল শিক্ষক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলিম তরুণদেরকে ইসলামী চিন্তা দ্বারা গড়ে তুলেছেন, ইসলামী আক্বীদার প্রতি তাদের ঈমানকে সুদৃঢ় করেছেন এবং তাদেরকে প্রজ্ঞা ও সহানুভূতি দ্বারা সুশৃঙ্খল করেছেন। তাঁর (সা) তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা মুসলিম নারী ও পুরুষেরাই এই পৃথিবীতে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র বিধান বাস্তবায়নকারী ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে নবুয়্যতের আদলে প্রতিষ্ঠিত প্রথম খিলাফত রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন। পর্যায়ক্রমে সাহাবাগণ (রা.) কর্তব্যনিষ্ঠ পিতা হিসেবে একটি আল্লাহভীরু ও সাহসী প্রজন্মকে লালন-পালন করেন; উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চারজন আব্দুল্লাহ্’র কথা, যারা ইয়াজিদের যুলুমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শাসক কিংবা সামরিক নেতৃত্ব, স্বামী কিংবা প্রতিবেশী ইত্যাদি জীবনের সকল ক্ষেত্রেই অনুকরণীয় মানদন্ড হিসেবে অনুসরণের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের জন্য আমরা নিঃসন্দেহে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দৃষ্টান্তের কাছে ফিরে যাই। সুতরাং, আজকে যারা পিতা তাদের উচিত তাদের সন্তানদের লালন-পালনের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন তা স্মরণ রাখা, কেননা বর্তমান প্রজন্ম দ্বিতীয় খিলাফতে রাশিদাহ্’র প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সুসংবাদ বাস্তবায়নের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করছে। তাদের উচিত তাদের প্রত্যেকের ঘরের মধ্যে সেই শক্তিশালী ইসলামী ব্যক্তিত্বদেরকে প্রস্তুত করা যারা ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুনরায় বাস্তবায়ন করবে এবং ইসলামকে দাওয়াহ্ হিসেবে সমগ্র পৃথিবীর কাছে নিয়ে যাবে।
পিতা তার সন্তানের যত্নবান সঙ্গী
একদিকে পিতা যেমন সন্তানের শিক্ষক, পরামর্শদাতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতকারী, ঠিক তেমনি তিনি কোমল ও যত্নবান সহচর। স্বীয় কন্যাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ্ (সা) ছিলেন কোমল, শ্রদ্ধাশীল, যত্নশীল অভিভাবক। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) বলেন, مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِنَ النَّاسِ كَانَ أَشْبَهَ بِالنَّبِيِّ ﷺ كَلاَمًا وَلاَ حَدِيثًا وَلاَ جِلْسَةً مِنْ فَاطِمَةَ. وَكَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا رَآهَا قَدْ أَقْبَلَتْ رَحَّبَ بِهَا، ثُمَّ قَامَ إِلَيْهَا فَقَبَّلَهَا، ثُمَّ أَخَذَ بِيَدِهَا فَجَاءَ بِهَا حَتَّى يُجْلِسَهَا فِي مَكَانِهِ، وَكَانَتْ إِذَا أَتَاهَا النَّبِيُّ ﷺ رَحَّبَتْ بِهِ، ثُمَّ قَامَتْ إِلَيْهِ فَقَبَّلَتْهُ “কথোপকথন, বক্তব্য কিংবা আচরণে আমি ফাতিমার (রা.) তুলনায় এমন কাউকে দেখিনি যে কিনা আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফাতিমা (রা.) যখন আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-এর কাছে আসতেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে সালাম জানাতেন, তার সম্মানে উঠে দাঁড়াতেন, তার কপালে চুমু খেতেন এবং তার হাত ধরে টেনে নিয়ে তার নিজের আসনে বসাতেন। যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফাতিমার ঘরে বেড়াতে যেতেন তখন ফাতিমা অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্’কে সালাম জানাতেন, তাঁর সম্মানে উঠে দাঁড়াতেন এবং তাঁর কপালে চুমু খেতেন।” [আল-আদাবুল মুফরাদ]।
আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, কতিপয় বেদুইন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাছে আসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কি আপনার সন্তানদেরকে চুমু খান?” তিনি (সা) বললেন, “হ্যাঁ।” এর প্রেক্ষিতে তারা বলল, “আল্লাহ্’র শপথ আমরা আমাদের সন্তানদের চুমু খাইনা।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “তবে আমার কিইবা করার আছে যদি আল্লাহ্ তোমাদেরকে রহমত থেকে বঞ্চিত রাখেন?” [মুসলিম]। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, আল-আক্বরা বিন হাবিস দেখলেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাসান (রা.)-কে চুমু দিচ্ছেন। তখন আল-আক্বরা বললেন, “আমার দশটি সন্তান রয়েছে কিন্তু আমি কখনই তাদেরকে চুমু দেইনি,” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, “যে তার সন্তানদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না, তার প্রতিও (আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে) কোন দয়া প্রদর্শন করা হবে না।” [মুসলিম]।
উপরন্তু, ইসলামে একজন পিতাকে সন্তানদের প্রতি তার স্নেহ ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সমতা নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে যেন কোন পক্ষপাত না হয়। নুমান বিন বশির (রা) বর্ণনা করেছেন, ذَهَبَ بِي أَبِي إِلَى النَّبِيِّ ﷺ يُشْهِدُهُ عَلَى شَىْءٍ أَعْطَانِيهِ فَقَالَ: أَلَكَ وَلَدٌ غَيْرُهُ. قَالَ نَعَمْ. وَصَفَّ بِيَدِهِ بِكَفِّهِ أَجْمَعَ كَذَا أَلاَ سَوَّيْتَ بَيْنَهُمْ “আমার পিতা আমাকে রাসূলের কাছে নিয়ে গেলেন এবং আমাকে মূল্যবান কিছু একটা দিবেন যার জন্য আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে সাক্ষী হিসেবে রাখতে চাইলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার কি আর কোন সন্তান রয়েছে? আমার পিতা বললেন, হ্যাঁ। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার হাত দিয়ে আনুভূমিকভাবে ইশারা করে বললেন, তাহলে সবাইকে তুমি সমানভাবে অনুগ্রহ করছ না কেন? [আন নাসাঈ]।
পৃথিবীতে ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিশাল দায়িত্ব পালন করা সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর তত্ত্বাবধানে থাকা শিশুদের চাহিদার দিকে সবসময় একজন পিতার মত মনোযোগী থাকতেন। আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের বাসায় বেড়াতে আসতেন। আমার একটি ছোট ভাই ছিল, যার ডাকনাম ছিল আবু উমাইর। তার একটি পোষা চড়–ই পাখি ছিল যাকে নিয়ে সে খেলা করত। একদিন পাখিটা মরে গেল। এরপর একদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বেড়াতে এসে দেখলেন আবু উমাইরের মন খারাপ। তিনি আমাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, “ওর কি হয়েছে?” আমরা বললাম, ওর চড়–ই পাখিটা মরে গিয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ আবু উমাইরকে বললেন, “আবু উমাইর তোমার চড়–ই পাখিটার কি হয়েছিল?” (আবু দাঊদ)।
একজন মুসলিম পিতা শিশুদের সাথে শিশুসুলভ, কিন্তু প্রয়োজনের সময় তিনি একজন দৃঢ়চেতা পুরুষ। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) বলেন, “একজন পুরুষের এই গুণটি আমাকে মোহিত করে যে, সে তার পরিবারের কাছে শিশুসুলভ কিন্তু তাকে যখন প্রয়োজনের সময় ডাকা হয় তখন তাকে সত্যিকারের পৌরুষদীপ্ত মানুষ হিসেবে পাওয়া যায়।” [সুত্র: সোয়াব আল-ইমান ৭৮৫১]। একজন পিতার পৌরুষদীপ্ততার উৎস হল তার শক্তিশালী ইসলামী চরিত্র এবং তার মর্যাদার উৎস হলো তার দ্বীন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, একজন পুরুষের ব্যক্তিত্বের মূলভিত্তি হলো তার বুদ্ধিবৃত্তি, তার মর্যাদা বা সম্মান হল তার দ্বীন, তার চরিত্রের মধ্যে রয়েছে তার পৌরুষদীপ্ততা। [সুত্র: আদাব আল-দুনিয়া ওয়াল-দ্বীন ১/১৭]। একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম পিতা তার সন্তানদের একজন ভালো বন্ধু হয়ে সন্তানকে খারাপ সঙ্গের ধ্বংসাত্মক প্রভাব ও নেতিবাচক উদ্দীপনা থেকে রক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, الرَّجُلُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ “একজন মানুষ তার বন্ধুর দ্বীন অনুসরণ করে, সুতরাং প্রত্যেককেই এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিৎ সে কার সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করছে।” [আবু দাউদ]
একজন মুসলিম পিতা ধৈর্যশীল ও প্রেরণাদায়ক শিক্ষক
সন্তানকে শিক্ষাদানের সময় একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানকে তার দুর্বলতার জন্য উপহাস বা বিদ্রুপ করেন না, অভিশাপ দেন না, গালিগালাজ করেন না কিংবা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা হেয়-প্রতিপন্ন করেন না, বরং তিনি ধৈর্য্যরে সাথে তাদের সম্মান বজায় রেখে কথা বলেন, তাদের মধ্যে সম্মানবোধ জাগিয়ে তোলা ও তাদেরকে সম্মান প্রাপ্তিতে প্রবল আগ্রহপূর্ণ করে তোলেন। তিনি তাদেরকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করা এবং তাদের আত্মমর্যাদাবোধকে দৃঢ়ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, لَيْسَ الْمُؤْمِنُ بِالطَّعَّانِ وَلَا اللَّعَّانِ وَلَا الْفَاحِشِ وَلَا الْبَذِيءِ “একজন মুমিন কাউকে উপহাস করে না, অভিসম্পাত করে না, অশ্লীল শব্দের দ্বারা আহ্বান করে না এবং কাউকে গালমন্দ করে না।” (তিরমিজি)। ওমর বিন আল-খাত্তাব (রা.) বলেন, “কোন ব্যক্তির তর্জন-গর্জন শুনে তোমরা বিমোহিত হয়ো না, বরং সে যদি তার আমানত রক্ষা করে, অন্য মানুষের সম্মানে আঘাত করা থেকে নিজেকে বিরত রাখে তবেই সে একজন সত্যিকারের পুরুষ।” [আল যুহদ ওয়াল রাক্বাইক ৬৮১]।
নিঃসন্দেহে ইসলামের বিভিন্ন যুগের প্রখ্যাত আলেমগণ মন্তব্য করেছেন যে, একজন ব্যক্তির পৌরুষের প্রমাণ হলো সে কাউকে অপমান করে না, কারো সমালোচনা করে না কিংবা কাউকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে না। ইমাম আইয়্যুব আল শাখতিয়ানী (রহ.) বলেন, “একজন পুরুষ কখনোই তার পৌরুষে পৌঁছাতে পারবে না কিংবা পৌরুষের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে দুটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে না পারে: মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং তাদের ভুলত্রুটিকে উপেক্ষা করা। ইমাম আব্দুল্লাহ্ ইবনে আল মুবারক (রহ.) বলেন, “যে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করল সে অচিরেই তার পৌরুষ হারিয়ে ফেলবে।” [সিয়ার আ‘লাম আল নুবালা ১৭/২৫১]। সাঈদ ইবন আল-আস (রহ.), যিনি একসময় মদিনার ওয়ালী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, ঘোষণা করেন, আমি যৌবনে পদার্পণ করার পর থেকে কখনো কাউকে অপমান করিনি। [আল-হিলম লি-ইবন আবি দুনিয়া, ১১৯]
কম বয়সী সাহাবাদের শিক্ষাদানের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) যথেষ্ট ধৈর্য্য প্রদর্শন করতেন এবং তাদের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসকে অক্ষুন্ন রাখতেন। আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, خَدَمْتُ النَّبِيَّ ﷺ عَشْرَ سِنِينَ، فَمَا قَالَ لِي أُفٍّ وَلاَ لِمَ صَنَعْتَ وَلاَ أَلاَّ صَنَعْتَ “আমি দীর্ঘ ১০ বছর আল্লাহ্’র রাসূল (সা)-কে গৃহস্থালী কাজে সাহায্য করেছি। তিনি কখনোই আমার প্রতি বিরক্তিসূচক উফ্ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি কিংবা কখনোই এই বলে অভিযোগ করেননি যে, এটা কেন করেছ বা ওটা কেন করো নাই। [বুখারী]। কম বয়সী সাহাবাদের শিক্ষাদানের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের কোমল মনকে চিন্তাশীলতার দিকে উদ্বুদ্ধ করতেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, كُنَّا عِنْدَ النَّبِيِّ ﷺ فَأُتِيَ بِجُمَّارٍ فَقَالَ إِنَّ مِنَ الشَّجَرِ شَجَرَةً مَثَلُهَا كَمَثَلِ الْمُسْلِمِ . فَأَرَدْتُ أَنْ أَقُولَ هِيَ النَّخْلَةُ، فَإِذَا أَنَا أَصْغَرُ الْقَوْمِ فَسَكَتُّ، قَالَ النَّبِيُّ ﷺ هِيَ النَّخْلَةُ “আমরা রাসুলুল্লাহ্’র সাথে ছিলাম এমন সময় কিছু তাজা খেজুর তার নিকট নিয়ে আসা হল। তিনি বললেন, গাছের মধ্যে এমন একটি গাছ রয়েছে যা বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে একজন মুসলিমের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। তখন আমি বলতে চেয়েছিলাম এর উত্তর হলো খেজুরগাছ, কিন্তু যেহেতু আমি বয়সে সবার ছোট ছিলাম তাই চুপ করে থাকলাম। তখন রাসূল নিজেই বললেন, এর উত্তর হলো খেজুর গাছ।” [বুখারী]।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) শিশু-কিশোরদেরকে একজন আদর্শ পিতার মত ইতিবাচকভাবে অনুপ্রাণিত করতেন। আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা.) তার বোন উম্মুল মুমিনীন হাফসা (রা.) এর কাছ থেকে জানতে পারেন যে, তিনি (সা) হাফসা (রা.)-কে বলেছেন, إِنَّ عَبْدَ اللَّهِ رَجُلٌ صَالِحٌ لَوْ كَانَ يُكْثِرُ الصَّلاَةَ مِنَ اللَّيْلِ “আব্দুল্লাহ্ একজন ন্যায়পরায়ন ও ধার্মিক লোক, তবে সে যদি রাতে আরো বেশি সালাত আদায় করত তবে আরো ভালো হতো। [বুখারী]। আল জুহরী বলেন, “এরপর থেকে আব্দুল্লাহ্ (রা.) রাতের বেলায় বেশি করে সালাত আদায় করতেন।”
কর্তৃত্বপ্রয়াসী মানসিকতার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তরুণ সাহাবাদেরকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করে তাদেরকে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদান করতেন। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ওসামা বিন যায়িদ (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি সেনা অভিযান প্রেরণ করেন। এরপর কেউ কেউ যখন ওসামার নেতৃত্বের ব্যাপারে নেতিবাচক কথা বলতে লাগলো তখন রাসূলুল্লাহ্ ঘোষণা করলেন, إِنْ تَطْعُنُوا فِي إِمَارَتِهِ فَقَدْ كُنْتُمْ تَطْعُنُونَ فِي إِمَارَةِ أَبِيهِ مِنْ قَبْلُ، وَايْمُ اللَّهِ، إِنْ كَانَ لَخَلِيقًا لِلإِمَارَةِ “যদি এটা হয় যে, তোমরা ওসামার নেতৃত্বের সমালোচনা করছ, যেমনটি পূর্বে তার পিতার (যায়েদ বিন হারিসা) ব্যাপারে করেছিলে। আল্লাহ্’র কসম! তবে জেনে রাখ, সে নেতৃত্বের যোগ্য ছিল। [বুখারী]
পিতা তার সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা ও পরিবেশে বড় করবেন
সন্তানদের রক্ষা করতে তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত করা মুসলিম পিতার দায়িত্ব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ] “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের সেই আগুন থেকে রক্ষা করো যার জ্বালানী হবে মানুষ ও পাথর। [আত-তাহরীম: ৬]। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, “তোমরা আল্লাহ্’র আনুগত্য কর, তাঁর অবাধ্য হইও না এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ্’র আনুগত্যের আদেশ কর। তাহলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তোমাদের সকলকে একত্রে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন।” আলী (রা.) বলেন, “অবশ্যই তোমরা এবং তোমাদের পরিবার সৎকাজ করবে এবং অবশ্যই পরিবারকে সঠিক পথে রাখতে শাসন করবে।” মুজাহিদ (রহ.) বলেন, “তোমরা তাকওয়া অর্জন কর এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে তাকওয়া অর্জনের আদেশ দাও।” কাতাদা (রহ.) বলেন, “তার দায়িত্ব হল আল্লাহ্’র আনুগত্যের এবং আল্লাহ্’র অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার আদেশ প্রদান করা। সে তার পরিবার-পরিজনকে আল্লাহ্’র আনুগত্যের আদেশ দেয় এবং তাদেরকে আল্লাহ্’র আনুগত্য করতে সাহায্য করে। যখনই সে তাদের কারো মধ্যে আল্লাহ্’র প্রতি অবাধ্যতা লক্ষ্য করে সে তাদেরকে নিবৃত করে এবং তা করতে নিষেধ করে।
পিতা তার সন্তানের জন্য এমন একজন শিক্ষক যিনি তার সন্তানদেরকে হালাল ও হারাম সম্পর্কে শিক্ষা দেন। সূরা তাহরীম এর ৬ নম্বর আয়াত সম্পর্কে আদ-দাহ্হাক ও মুক্বাতিল বলেন, নিকটাত্মীয়দেরকে ফরজ ও হারাম সম্পর্কে শিক্ষা দেয়াটা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক। সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব। তবে, এই দায়িত্ব তিনি নিজে সরাসরি সন্তানকে শিক্ষাদানের মাধ্যমে পালন করতে পারেন কিংবা অন্য কোন উপযুক্ত ব্যক্তিকে নিয়োগের মাধ্যমেও করতে পারেন, যিনি পিতার সরাসরি তত্ত্বাবধানে থেকে সন্তানকে ইসলাম শিক্ষা দিবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক।” [তিরমিজি]। এই বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে সকল প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহের ব্যাপারে জ্ঞানার্জন; যার মধ্যে রয়েছে সালাত, সাওম, আর্থিক লেনদেন, বিপরীত লিঙ্গের সাথে সম্পর্ক এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর আল ফারুক (রা.)-এর কাছে একবার এক লোক তার সন্তানের ব্যাপারে অভিযোগ করলেন যে, তার পুত্র তাকে সম্মান করেনা। ওমর (রা.) তার পুত্রকে ডেকে পাঠালেন এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুমি কেন তোমার পিতাকে অবজ্ঞা/অসম্মান কর?” উত্তরে লোকটির ছেলে বলল, “হে আমীরুল মুমিনীন! সন্তানের কি তার পিতার উপর কোন অধিকার নেই?” ওমর (রা.) বললেন: “অবশ্যই আছে।” তখন ছেলেটি প্রশ্ন করল, “সেগুলো কি?” এর জবাবে ওমর (রা.) বললেন, “পিতা তার জন্য ভালো মা নির্বাচন করবে, তার একটি সুন্দর নাম রাখবে এবং তাকে কুর‘আন শিক্ষা দিবে।” তখন ছেলেটি বলল, “আপনি নিশ্চিত থাকেন আমার পিতা এগুলোর কোনোটিই করেনি। আমার মা একজন অগ্নি উপাসক, সে (পিতা) আমার নাম রেখেছে যুলান (যার অর্থ গুবড়েপোঁকা) এবং সে আমাকে কুর‘আন-এর একটি হরফও শিক্ষা দেয়নি। এটা শুনে ওমর (রা.) তার পিতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “হে জনাব! তুমি তোমার ছেলের বেয়াদবির ব্যাপারে অভিযোগ করতে আমার কাছে এসেছ। তোমার পুত্র তোমার হক্ব আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার আগে তুমি নিজেই তোমার পুত্রের হক্ব আদায় করতে ব্যর্থ হয়েছ। সে তোমার প্রতি অন্যায় করার পূর্বেই তুমি তার প্রতি অন্যায় করেছ।”
অপরদিকে ওমর (রা.) পিতা হিসেবে তার নিজের ছেলে আব্দুল্লাহ্ বিন ওমর (রা.)-এর প্রতি তার হক্ব যথাযথভাবে আদায় করেছেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একজন সাহাবা, তিনি ছিলেন একজন ফকিহ্ এবং মুসলিম সমাজের জন্য একজন শক্তিমান ও কার্যকর নেতা ও পথপ্রদর্শক। বাস্তবিক অর্থে তিনি (রা.) ছিলেন চারজন বিখ্যাত আব্দুল্লাহ্’র মধ্যে একজন যিনি আমির মুয়াবিয়াকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করেছিলেন যখন মুয়াবিয়া তার সন্তানকে পরবর্তী খলিফা হিসাবে মুসলিমদের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর (রা.) বলেছিলেন, “এই খিলাফত ব্যবস্থা বাইজেন্টাইন, সিজার কিংবা খসরুর রাজতন্ত্র নয় যেখানে সন্তান তার বাবার রাজত্বের উত্তরাধিকারী হয়। যদি তাই হত তাহলে আমার পিতার মৃত্যুর পর আমি খলিফার দায়িত্ব পালন করতাম। এমনকি আমার পিতা আমার নাম ৬ জন মনোনয়ন প্রার্থীর মধ্যেও রাখেননি, তিনি খিলাফতের নির্ধারিত শর্তের বাইরে অন্যকিছুকে প্রাধান্য দেননি।”
মালিকী মাযহাবের ইমাম আবুল হাসান আলী ইবনে খালাফ আল-কাসিম (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি ইচ্ছা পোষণ করে তার সন্তানকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তার জন্য চক্ষু শীতলকারী হিসেবে মঞ্জুর করবেন, সে যেন সন্তানকে কুর‘আন শিক্ষাদানে ব্যয়কৃত অর্থের ব্যাপারে কৃপণ না হয়। সে যদি তার সন্তানের কুর‘আন শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করে তাহলে তা তার জন্য একটি চমৎকার নেক আমল হিসেবে গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ্। আর যে তার সন্তানকে ভালোভাবে শিক্ষাদান করবে, তার পড়াশোনার তদারকী বা অগ্রগতি সাধন করবে এবং তাকে শৃঙ্খলা শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করবে, তাহলে সে একটি উত্তম আমল করল এবং আশা করা যায়, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দিবেন।”
পিতা তার সন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করবেন
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَوَصَّى بِهَا إِبْرَاهِيمُ بَنِيهِ وَيَعْقُوبُ يَا بَنِيَّ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَى لَكُمُ الدِّينَ فَلا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ] “এরই উপদেশ দিয়েছিল ইব্রাহীম তার সন্তানদের এবং একইভাবে ইয়াকুবও যে, হে আমার সন্তানগণ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য এ দ্বীনকে মনোনীত করেছেন। কাজেই তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনও মৃত্যুবরণ করো না।” [আল-বাকারা ১৩২]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেভাবে দারুল-আরকামে কিশোর/তরুণ সাহাবাদেরকে ঈমানী চেতনায় গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে একজন মুসলিম পিতার উচিত তার সন্তানদেরকে ইসলামী আকীদার উপর অটল ঈমানের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন, আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের ঈমানের উপর ভিত্তি করে জান্নাতের সুউচ্চ মর্যাদা লাভ করবে এবং তাদের পূণ্যবান পিতাদের সাথে একত্রিত হবে। নিঃসন্দেহে এটি হবে মৃত্যুর সাময়িক বিরতির পর এক আনন্দঘন চিরস্থায়ী সাক্ষাৎ। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ] “যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের সন্তান-সন্ততিরাও ঈমানের ক্ষেত্রে তাদেরকে অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তান-সন্ততিকে তাদের অনুরূপ মর্যাদায় সমুন্নত করব এবং তাদের নিজেদের পুরস্কার (মর্যাদার) কোনো কমতি হবে না।” [আত তুর-২১]। ইসলাম একজন মুসলিম পিতাকে তার সন্তানের জন্য দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য সম্পদ, লেখাপড়া ও বৈষয়িক সুবিধার প্রতিযোগীতায় মশগুল হয়ে পরার তুচ্ছ স্বপ্ন দেখায় না, বরং আখিরাতের সুউচ্চ সম্মান অর্জনের লোভনীয় স্বপ্ন দেখায়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [وَإِذْ قَالَ لُقْمَانُ لِابْنِهِ وَهُوَ يَعِظُهُ يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ] “আর স্মরণ কর যখন লুকমান তার পুত্রকে উপদেশ দিয়ে বলেছিল, হে আমার পুত্র! আল্লাহ্’র ইবাদতে কাউকে শরিক করবে না, কারণ র্শিক হল সবচেয়ে বড় জুলুম। [লুকমান- ১৩]। একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের ঈমানকে সুদৃঢ় করার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকবেন, কারণ তিনি জানেন যে সন্তানের সঠিকপথ বা হিদায়েত লাভের জন্য পিতা-মাতার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ “প্রত্যেক আদম সন্তানই মুসলিম হিসেবে ভূমিষ্ঠ হয়, কিন্তু তার পিতা-মাতা তাকে একজন ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা অগ্নি-উপাসক বানিয়ে ফেলে। [বুখারী ও মুসলিম]।
ইসলামের প্রতি সঠিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বর্তমানের মুসলিম পিতারা ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার কারণে অনেক বড় প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, যে ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত আমাদের দ্বীনের ক্ষতি সাধন করে চলেছে। ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থা ধর্মকে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ধর্মবিশ্বাসের গুরুত্ব শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হয়েছে। যার ফলে, এতে অবাক হওয়ার কোনোও কারণ নেই যে পৃথিবীব্যাপী সন্দেহবাদী (agnostic) লোকের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে যারা বলে যে জীবনের উদ্দেশ্যের ব্যাপারে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। এই সন্দেহবাদ (agnosticism) এর উত্থান কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি হল বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সরাসরি ফলাফল, যেগুলো ধর্মনিরপেক্ষতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আর তাই একজন সন্তানের মধ্যে সঠিক ঈমান প্রতিষ্ঠা করার জন্য মুসলিম পিতাকে অবশ্যই একটি শক্তিশালী এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ ইসলামী শিক্ষাদান পদ্ধতির সাহায্য নিতে হবে।
একজন মুসলিম পিতাকে অবশ্যই আক্বীদার সাথে সম্পৃক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়সমূহকে নিজে জানতে হবে ও সন্তানকে শিখাতে হবে; যার মধ্যে রয়েছে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অস্তিত্বের অপরিহার্যতা, নবী রাসুলের প্রয়োজনীয়তা, মহাগ্রন্থ আল কুর‘আন-এর মোজেজা, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর সুন্নাহ্’কে ওহী হিসেবে প্রমাণ এবং ক্বাদা ও ক্বদর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। পাশাপাশি তাকে এ ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে যে ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার ছত্রছায়ায় বস্তুবাদকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির কারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যেখানে ইসলামী আক্বীদার অকাট্যতাকে এবং এর ঐশীবাণীসমূহের বৈধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। তাকে স্থানীয় বা আঞ্চলিক প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে, যেখানে পূর্বপুরুষের ধর্মবিশ্বাসকে কোন যথাযথ প্রমাণ ছাড়াই গ্রহণ করা হয়। তাকে অদৃষ্টবাদিতার (fatalism) ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে যা মুসলিমদের ইসলামী দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারকে দুর্বল করে দেয়। এর অর্থ হল, একজন মুসলিম পিতা তার ঘরকে দারুল-আরকামের আদলে পরিচালনা করবেন যেখানে হিদায়েতের আলো প্রস্ফুটিত হবে এবং একই সাথে সকল ভ্রান্ত ও কুফরী বিশ্বাসগুলোর কবর রচিত হবে। আর এই সঠিক প্রক্রিয়া আমাদের সন্তানদেরকে কুফরের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার শক্তি যোগাবে যে সংক্রমণ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেও ভয়ঙ্কর; কেননা কুফর চিরস্থায়ী আখিরাতকে ধ্বংস করে দেয়। এ সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র কাছে এই বিশ্বাস নিয়ে ক্রমাগত দোয়া করবেন যেন আমাদের এই কঠিন দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তার সন্তানের ঈমান দৃঢ় থাকে। কেননা হিদায়াত একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ই হাতে এবং পিতা হলেন এমন ব্যক্তি সন্তানের জন্য যার দোয়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ফিরিয়ে দেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, ثَلاَثُ دَعَوَاتٍ يُسْتَجَابُ لَهُنَّ لاَ شَكَّ فِيهِنَّ دَعْوَةُ الْمَظْلُومِ وَدَعْوَةُ الْمُسَافِرِ وَدَعْوَةُ الْوَالِدِ لِوَلَدِهِ “তিনটি দোয়া আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অবশ্যই কবুল করেন; অত্যাচারীতের দোয়া, মুসাফিরের দোয়া এবং সন্তানের জন্য পিতার দোয়া।” [ইবনে মাজাহ]
পিতা সন্তানদেরকে ইসলামের হুকুম পালনে অভ্যস্ত করে তুলবেন
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَاماً] “এবং যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দান করুন এমন স্ত্রী ও সন্তানদের যারা আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারক হবে এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য নেতা বানিয়ে দিন।” [আল-ফুরক্বান-৭৪]। একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব হল তার সন্তানদেরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ইবাদতের দিকে ধাবিত করা এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও রাসূলের আনুগত্যের আদেশ দেওয়া। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের লুকমান (আ:)-এর ঘটনা স্মরণ করিয়ে পবিত্র কুর‘আন-এ বলেন, [يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ] “হে আমার পুত্র! সালাত কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ কর এবং (এর ফলশ্রুতিতে) তোমার উপর যে বিপদ আপতিত হয় তা তুমি ধৈর্য্যসহকারে মোকাবেলা কর। নিঃসন্দেহে এটি একটি সাহসিকতাপূর্ণ কাজ যা দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়।” [লুকমান-১৭]। একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানের জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র কাছে দোয়া করবেন এবং দৃঢ়তার সাথে এটি নিশ্চিত করবেন যেন তার সন্তানদের মধ্যে ন্যায়পরায়নতার গুণাবলী প্রোথিত হয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَى وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحاً تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ] “তারা বলে, হে আমাদের রব! আমার ও আমার পিতামাতার প্রতি আপনার অনুগ্রহকে স্মরণ করে আমি যেন আপনার শুকরিয়া আদায় করতে পারি সেই তৌফিক দান করুন। এবং আমার সন্তানদেরকে ন্যায়পরায়ণতার পথে পরিচালিত করুন। আমি আপনার নিকট তওবা করছি এবং কেবল আপনার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করছি। [আহক্বাফ- ১৫]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مَا نَحَلَ وَالِدٌ وَلَدًا مِنْ نَحْلٍ أَفْضَلَ مِنْ أَدَبٍ حَسَنٍ পিতা কর্তৃক পুত্রকে দেওয়া সবচেয়ে মূল্যবান উপহার হল উত্তম আচরণ শিক্ষাদান। [তিরমিযী]
সুতরাং মুসলিম পিতা একজন বন্ধুসুলভ ও যত্নবান শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি তার সন্তানকে প্রজ্ঞার সাথে শাসন দ্বারা সুশৃঙ্খল করবেন, যেন তার প্রিয় সন্তানকে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র ক্রোধ ও আখেরাতের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, لأَنْ يُؤَدِّبَ الرَّجُلُ وَلَدَهُ خَيْرٌ مِنْ أَنْ يَتَصَدَّقَ بِصَاعٍ “একজন ব্যক্তির জন্য এক সা‘আ পরিমাণ সম্পদ দান করার চেয়ে তার সন্তানকে সুশৃঙ্খলভাবে গড়ে তোলা অধিক উত্তম।” [তিরমিযী]। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আরও বলেন, مَنْ عَالَ ثَلاَثَ بَنَاتٍ فَأَدَّبَهُنَّ وَزَوَّجَهُنَّ وَأَحْسَنَ إِلَيْهِنَّ فَلَهُ الْجَنَّةُ “কোন ব্যক্তি যদি তিনটি কন্যা সন্তানকে লালন-পালন করে, তাদেরকে সুশৃঙ্খল হিসেবে গড়ে তুলে, তাদেরকে উত্তমভাবে বিয়ে দেয় এবং তাদের জন্য কল্যানকর কিছু করে তাহলে সে জান্নাতী।” [আবু দাউদ]।
সন্তানের প্রতি একজন মুসলিম পিতার শাসন হওয়া উচিত সন্তানের প্রতি তার মমতা ও যত্নশীলতার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ। এই শাসন কখনোই হতাশা, রাগ কিংবা শত্রুভাবাপন্ন মনোভাব থেকে হওয়া উচিত নয়। সন্তানের জন্য দুনিয়ার পদমর্যাদার আকাঙ্খা থেকেও একজন মুসলিম পিতা তার সন্তানকে শাসন করবেন না, বরং এই শাসন হবে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং চিরস্থায়ী আখিরাতে সন্তানের উচ্চ মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “সাহরি না খেয়ে কেউ যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে তাহলে সে নাস্তা না খেয়ে তার রোজা সম্পূর্ণ করবে এবং কেউ যদি সকালে নাস্তা খেয়ে ফেলে তাহলে ইফতার পর্যন্ত বাকি দিন সে না খেয়ে থাকবে।” [মুসলিম]। ইমাম মুসলিম আরও বর্ণনা করেন, সাহাবাগণ (রা.) বলেছেন, “সুতরাং আমরা সবাই আশুরার দিনে সওম পালন করতাম এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র রহমতে আমাদের সন্তানরাও সাওম পালন করত। আমরা সন্তানদেরকে নিয়ে মসজিদে চলে যেতাম এবং তাদের জন্য তুলা দিয়ে খেলনা বানিয়ে নিতাম। যখন তাদের ক্ষুধা পেত এবং খাবারের জন্য কান্না করত তখন আমরা এই খেলনাগুলো তাদেরকে দিতাম যেন ইফতার পর্যন্ত তাদের কান্না বন্ধ থাকে।”
যথাযথভাবে শিক্ষাদান, উৎসাহ প্রদান, উপদেশ দেওয়া, আদেশ করা, তিরস্কার করা এবং ভীতি প্রদর্শনের পরও যদি দশ বা তার অধিক বছরের সন্তান সালাত আদায় না করে তাহলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে মুসলিম পিতার উচিত সন্তানকে প্রহার করা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, مُرُوا الصَّبِيَّ بِالصَّلَاةِ إِذَا بَلَغَ سَبْعَ سِنِينَ، فَإِذَا بَلَغَ عَشْرَ سِنِينَ فَاضْرِبُوهُ عَلَيْهَا সাত বছর পূর্ণ হলে তোমরা সন্তানদেরকে সালাত আদায়ের আদেশ কর। যদি বয়স ১০ বছর পূর্ণ হয় তাহলে সালাত আদায় না করলে তাদেরকে প্রহারের মাধ্যমে সুশৃঙ্খল কর। [আবু দাউদ, তিরমিযী]।
আজকের দিনের মুসলিম পিতাকে সন্তানদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে, কেননা বর্তমানে জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম অনুপস্থিত। বিশ্বব্যাপী ধর্মনিরপেক্ষতার আধিপত্যের কারণে ব্যক্তিস্বাধীনতার মূল্যবোধসমূহ মুসলিম তরুণদের বিপথগামী করছে। এর পরিণাম হিসেবে উদ্ভূত সমস্যাগুলো মুসলিম পিতাদের জন্য গভীর চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে যাদের বয়সন্ধিকালীন ও কিশোর বয়সী সন্তান রয়েছে। এই বয়সী সন্তানের বাবাদেরকে প্রায়শই তাদের নিজেদের কিশোর সময়ের স্মৃতিচারণ করে পরিতাপ প্রকাশ করতে দেখা যায়। শিক্ষাব্যবস্থার পশ্চিমীকরণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে তরুণদের মধ্যে এক ধরনের ধ্বংসাত্মক পরিণতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ব্যাক্তিস্বাধীনতার চর্চা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতা তরুণদের মধ্যে অন্য কারো প্রভুত্ব বা শাসন না মানার সহজাত প্রবণতা তৈরি করেছে; যেখানে তারা পিতা তো দূরে থাক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র আদেশও মানতে চায় না।
বস্তুবাদ ও হেডোনিসম (hedonism) তরুণদের মধ্যে কামনা-বাসনা বশবর্তী হওয়ার অদম্য আকাঙ্খা তৈরি করেছে, যেখানে তারা কোনো বিধিনিষেধ বা পরামর্শের তোয়াক্কাই করছেনা। বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থায় মুসলিম তরুণদের হরহামেশাই বিভিন্ন ফরজ দায়িত্ব পরিত্যাগ করতে এবং হারাম কাজে জড়িত হতে দেখা যায়; যেমন, মদ্যপান, নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন ও যিনা-ব্যভিচার। পাপাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক অবিবাহিত মেয়েরা গর্ভপাত করছে এবং কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে নিজেদেরকে সমকামী হিসেবে ঘোষণা করছে। এসব কিছুই ঘটছে কারণ আমাদের মুসলিম পরিবারগুলো অসংখ্য দুর্বল ব্যক্তিত্ব তৈরি করছে। এসব অপকর্মের পাশাপাশি এই দুর্বল ব্যক্তিত্বের মানুষগুলো তাদের রাগকে দমন করতে পারছেনা এবং নারী ও শিশুদেরকে অত্যাচার করছে; সেটা নির্দয় শারীরিক প্রহারই হোক কিংবা মানসিক নির্যাতনই হোক। এই সমস্যাগুলো পশ্চিমা সমাজে যেমন বিদ্যমান তেমনি মুসলিম দেশগুলোতেও দৃশ্যমান; পার্থক্য শুধুমাত্র তীব্রতার মাত্রায়।
আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব পিতার
ইসলামে স্ত্রী ও তার সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করা পিতার উপর ফরজ। সন্তানের মা যতই অর্থ-বিত্তের মালিক হোন না কেন সন্তান কিংবা স্বামীর ভরণপোষণের কোন দায়বদ্ধতা তার নেই। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ] “পুরুষ হলো নারীর অভিভাবক/তত্ত্বাবধায়ক, কারণ পুরুষকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নারীর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তার দায়িত্ব হলো নারীর ভরণপোষণ। [নিসা: ৩৪]। স্ত্রী-সন্তানের পাশাপাশি একজন মুসলিম পিতার দায়িত্ব হলো তার স্বীয় পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দেরকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, [قُلْ مَا أَنفَقْتُم مِّنْ خَيْرٍ فَلِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ] “বল, আর যা কিছুই তোমরা খরচ কর তা তোমাদের পিতামাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য।” [সূরা আল বাকারা-২১৫]। এই আর্থিক ভরণপোষণ কোন অনুগ্রহ কিংবা দান নয়, বরং তা হল আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা প্রদত্ত একটি ফরজ দায়িত্ব। ভরণপোষণ এমনভাবে প্রদান করতে হবে যেন তা প্রয়োজন পূরণের জন্য যথেষ্ট হয় এবং এক্ষেত্রে কৃপণতাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর কোনরুপ ব্যতয় একটি গুরুতর বিষয় যার জন্য ইসলামী বিচারক পিতার বিরুদ্ধে রায় প্রদান করবেন। হিন্দ বিন্ত উতবা রাসূলুল্লাহ্-এর কাছে অভিযোগ করে বললেন, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ মানুষ যার কারণে তার সম্পদ থেকে অগোচরে আমাকে ব্যয় করতে হয়। উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, خُذِي مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ “তোমার নিজের ও সন্তানদের প্রয়োজন মতো খরচ কর যা তোমাদের জন্য যথেষ্ট (বিল মা‘রুফ) হয়। [বুখারী]।
আর্থিক ভরণপোষণের ক্ষেত্রে বিল-মা‘রুফ এর অন্তর্ভুক্ত হল সকল মৌলিক চাহিদাসমূহ; যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং কিছু বিলাস দ্রব্য। বিল-মা‘রুফ হতে হবে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে যেখানে কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের বসবাসের স্থানের জীবনযাত্রার মানকে মূল বিবেচ্য হিসেবে ধরা হবে; উদাহরণস্বরূপ: ভরণপোষণে বিল মা‘রুফ এর পরিমাণ শহর অঞ্চলে বেশি, গ্রাম অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম এবং মরু অঞ্চলে (বেদুইনদের) আরো কম।
বর্তমান মুসলিম বিশ্বে যুক্তিসঙ্গত ভরণপোষণ নিজেই একটি বিরাট প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আনুপস্থিতিতে অনেক পিতাকেই সন্তানের জন্য প্রাইভেট শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিদারূণ সঙ্কটের মুখে পড়তে হচ্ছে। ভরণপোষণ প্রদান করা একজন মুসলিম পিতার জন্য একটি অবশ্যপালনীয় দায়িত্ব, তবে একমাত্র দায়িত্ব নয়। অন্যান্য দায়িত্বপালনতো দূরে থাক একজন মুসলিম পিতা বর্তমানে আর্থিক ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
উপসংহার: ধর্মপ্রাণ সন্তানরা পিতার জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্যই কল্যাণকর
নিঃসন্দেহে একজন মুসলিম পিতাকে তার সন্তানদের প্রতি অনেকগুলো ফরজ দায়িত্ব পালন করতে হয় যেগুলো সঠিকভাবে পালন করলে যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র পক্ষ থেকে পুরস্কার রয়েছে ঠিক তেমনি উপেক্ষা করলে শাস্তি রয়েছে। একজন পিতা তার পরিবারের উপর দায়িত্বশীল এবং এই দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, إن الله َسائلٌ كلَّ راعٍ عما استرعاه أَحَفِظَ أم ضيَع حتى يُسألَ الرجلُ عن أهلِ بيتِه “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে তাদের দায়িত্বের আওতাভুক্ত বিষয়গুলো নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন যে সে তা সঠিকভাবে পালন করেছিল, নাকি উপেক্ষা করেছিল এবং অবশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা একজন ব্যক্তিকে তার পরিবারের সদস্যদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করবেন।” [নাসাঈ, ইবনে হিব্বান]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرعِيهِ اللهُ رَعِيَّة يَموتُ يَوْمَ يَمُوتُ وهو غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلا حَرَّمَ اللهُ عليه الجَنَّةَ “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র বান্দাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যাকে কিছু মানুষের উপর দায়িত্ববান করা হয়েছিল কিন্তু সে তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি যার জন্য জান্নাতকে হারাম করা হয়নি।” (মুসলিম)। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً فَلَمْ يَحُطْهَا بِنَصِيحَةٍ إِلَّا لَمْ يجد رَائِحَة الْجنَّة “কাউকে যদি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা কিছু লোকের উপর কর্তৃত্ব দেন এবং সে তার অধীনস্থদেরকে সদুপদেশ দ্বারা রক্ষা না করে তবে সে জান্নাতের গন্ধও পাবে না।” [বুখারী]। তিনিই একজন সৌভাগ্যবান পিতা যিনি সন্তানদেরকে যথাযথ শিক্ষাদান ও শাসন এর মাধ্যমে সুপথে পরিচালিত করেন এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অনুগ্রহে ন্যায়পরায়ন সন্তান পেয়ে থাকেন। এই ন্যায়পরায়ন সন্তানরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) প্রতি ভালোবাসা থেকে স্বেচ্ছায় তাদের পিতাকে তার হক্ব মোতাবেক যথাসাধ্য মান্য করবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র অনুগ্রহে এমন একজন কর্তব্যপরায়ন পিতা দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে ধন্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ “একজন মানুষের মৃত্যুর পর তার আমলের সকল দরজা বন্ধ হয়ে যায়; তিনটি ব্যতীত, সাদাকায়ে যারিয়া, তার রেখে যাওয়া জ্ঞান যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং একজন ধর্মপ্রাণ সন্তান যে তার পিতার জন্য দোয়া করতে থাকে।” [আন-নাসাঈ]। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন, إِنَّ الرَّجُلَ لَتُرْفَعُ دَرَجَتُهُ فِي الْجَنَّةِ فَيَقُولُ أَنَّى هَذَا فَيُقَالُ بِاسْتِغْفَارِ وَلَدِكَ لَكَ “একজন ব্যক্তিকে জান্নাতে তার অর্জিত সম্মানের চেয়ে অধিক সম্মানজনক স্থানে রাখা হবে। এর ফলে সে জিজ্ঞাসা করবে, এই বাড়তি সম্মান কেন দেওয়া হল?। তখন তাকে বলা হবে, এর কারণ এই যে তোমার সন্তান তোমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করত।” (ইবনে মাজাহ)।
হে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা! পিতা হিসেবে আমরা যেন আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারি। আমাদের পুত্র-কন্যারা যেন আমাদের জন্য চক্ষুশীতলকারক হয় এবং মুসলিম উম্মাহ্’র একেকটি পিলারে পরিণত হয়। আমাদের সন্তানরা যেন দ্বিতীয় খিলাফতে রাশেদাহ্ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমাদের সাথে যোগদান করে এবং ইসলামকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে পুনরায় প্রতিষ্ঠার পর এর দাওয়াহ-কে পুরো বিশ্বের কাছে নিয়ে যেতে পারে। আমিন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা’র আহকামের যথাযথ ব্যাখ্যা তার নিজের উক্তিতে সুন্নাহর অংশ হিসেবে আমাদেরকে অবহিত করেছেন এবং তিনি ওহী ব্যতীত কোন কথা বলতেন না, যা বিশ্বজগতের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হত। আহমদ বর্ণনা করেছেন যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, تَكُونُ النُّبُوَّةُ فِيكُمْ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةٌ عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا عَاضًّا فَيَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ يَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةً فَتَكُونُ مَا شَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّة “আমার নবুয়াত তোমাদের মধ্যে ততকাল থাকবে যতকাল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছা করেন। এরপর আসবে নবুয়াতের আদলে খিলাফত এবং তা ততদিন থাকবে যতদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছাপোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে আঁকড়ে ধরা (বংশের) শাসন এবং তা ততদিন অবস্থান করবে যতদিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আসবে অত্যাচারী জালিমের শাসন এবং তা ততকাল অবস্থান করবে যতকাল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইচ্ছা পোষণ করেন। এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা এর অবসান ঘটাবেন। এরপর আবার আসবে খিলাফত, নবুয়্যতের আদলে।” এরপর আল্লাহ্’র রাসূল (সা) চুপ থাকলেন।


















