Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • বর্তমানে কিভাবে মুসলিম উম্মাহ পুনর্জাগরিত হতে পারে?

    বর্তমানে কিভাবে মুসলিম উম্মাহ পুনর্জাগরিত হতে পারে?

    পুনর্জাগরণ এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান। উন্নতি বলতে কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে বোঝায় না। প্রমাণস্বরূপ কুয়েত অর্থনৈতিক দিক থেকে ইউরোপীয় রাষ্ট্র সুইডেন, হল্যান্ড এবং বেলজিয়াম থেকে উন্নত হলেও; সুইডেন, হল্যান্ড এবং বেলজিয়ামকে উন্নত মনে করা হয়। কিন্তু কুয়েতকে উন্নত মনে করা হয় না। তাছাড়া নৈতিকভাবে উন্নতিও পুনর্জাগরণ নয়। পৃথিবীতে যেকোন রাষ্ট্রের চেয়ে মদিনা নৈতিকভাবে সবচেয়ে উন্নত হলেও, এটাকে উন্নত মনে করা হয় না। সুতরাং, বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থানই একমাত্র পুনর্জাগরণ বা উন্নতি।

    পুনর্জাগরণ সঠিক বা ভূল হতে পারে। যেমন, আমেরিকা, ইউরোপ এবং রাশিয়া ভূল ভাবে উন্নত। কারণ তাদের পুনর্জাগরণ আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়। সঠিক পুনর্জাগরণ সেটাই যা আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ যে পুনর্জাগরণ বা বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয় তা একধরণের ভূল বুদ্ধিবৃত্তিক উত্থান। সুতরাং ইসলামি চিন্তা (আকিদা) ব্যতিত কোন উত্থানই সঠিক পুনর্জাগরণ নয়। কারণ একমাত্র ইসলামি পুনর্জাগরণই আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত।

    পুনর্জাগরণ শুরু করতে হলে, বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন ও বিচার ব্যবস্থা বাদ দিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে সরকার কাঠামো দাঁড় করাতে হবে। বিদ্যমান আইন কানুন ঠিক রেখে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলে পুনর্জাগরণ ঘটানো সম্ভব হবে না, বরং এই পন্থা আরো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে ও পুনর্জাগরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কর্তৃত্ব ও শাসন কাঠামো একটি সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া পুনর্জাগরণ কখনো সম্ভব হবে না। উপরন্তু, মানব জীবনের সব সমস্যার সমাধান ঐ চিন্তা থেকে গ্রহণ করা হবে, যা থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, আইন ও বিচার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে আলাদা করে ও কিছু স্বাধীনতা যুক্ত চিন্তার ভিত্তিতে ইউরোপীয়রা পুনর্জাগরিত হয়। “বস্তুবাদ ও বস্তুগত বিবর্তন অর্থাৎ প্রকৃতির সবগুলো বস্তু উন্নতির দিকে পরিবর্তিত হয়” এই চিন্তার ভিত্তিতে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ ঘটে। ১৯১৭ সালে এই চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে, যার ফলে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ ঘটে । আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত “ইসলামি চিন্তার” ভিত্তিতে যখন রাসুল (সা) শাসন কাঠামো ও কর্তৃত্ব (সুলতান) প্রতিষ্ঠা করেন তখন আরবরা পুনর্জাগরিত হয়। প্রকৃতপক্ষে আরবরা যখন ইসলামি চিন্তা গ্রহণ করে ও তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো গঠন করে কেবল তখনই তাঁরা পুনর্জাগরিত হয়।

    প্রমাণস্বরূপ, তুরষ্কে পুনর্জাগরণ ঘটানোর লক্ষ্যে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর সরকার প্রতিষ্ঠা ও আইন কানুন চালু করেছিল। মোস্তফা কামাল জবরদস্তি পশ্চিমা শাসন পদ্ধতি ও আইন প্রয়োগ শুরু করেছিল, ফলস্বরূপ তুরষ্ক পুনর্জাগরণের পরিবর্তে পূর্বেকার অবস্থা থেকে আরো বেশি অধঃপতিত হয়। বর্তমানের তুরষ্ক সবচেয়ে অধঃপতিত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি। অন্যদিকে মোস্তফা কামালের সমসময়ে, লেনিন যখন রাশিয়ার পুনর্জাগরণ শুরু করেছিল তখন কার্যকরীভাবে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ সংগঠিত হয়েছিল। ফলে রাশিয়াকে (পতনপূর্ব) শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি মনে করা হত। কারণ, লেনিন কমিউনিস্ট চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিল। ঐ চিন্তা থেকে দৈনন্দিন সমস্যাগুলোর সমাধান করত যেমন রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইন কানুন। সুতরাং বলা যায় কমিউনিস্ট চিন্তার ভিত্তিতে লেনিন শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে এবং আইন কানুন গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যাগুলোর সমাধান করে। ১৯১৭ সালে লেনিন একটি চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে ফলে রাশিয়ার পুনর্জাগরণ সংগঠিত হয়েছিল। অন্যদিকে ১৯২৪ সালে মোস্তফা কামাল পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করে ফলে এটি ব্যর্থ হল এবং আরো বেশি অধঃপতিত হল।

    মোহগ্রস্থ হয়ে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করে পুনর্জাগরণে ব্যর্থ হয় তুরষ্ক।

    মিশরে জামাল আব্দুল নাসেরও এই ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯৫২ সালে জামাল আব্দুল নাসের বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করে। শুরুতে সে রাজতন্ত্রকে অপসারণ করে গণপ্রজাতন্ত্রীক সরকার প্রতিষ্ঠা করে এবং কৃষিজমির বন্টন করে দেয়। তারপর সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করে রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে কিন্ত তা সত্ত্বেও মিশরকে পুনর্জাগরিত করতে ব্যর্থ হয়। উপরন্তু, ১৯৫২ সালের সামরিক ক্যু পূর্বেকার সময় থেকে আজকের মিশর বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আরো বেশি অধঃপতিত। এমনকি ১৯৫২ সালের পার্লামেন্ট মেম্বারদের সাথে বর্তমান পার্লামেন্ট (জাতীয় কাউন্সিল) মেম্বারদের রাজনৈতিক সক্ষমতা, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ তুলনা করলে তাদের অধঃপতন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনের উপর সরকার গঠন করার কারণে মিশর পুনর্জাগরণে ব্যর্থ হয়। কেবলমাত্র সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই পুনর্জাগরণ ঘটানো সম্ভব।

    চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এমন নয় যে, সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে পূর্বেকার একই চিন্তার ভিত্তিতে সরকার গঠন করা। এই পন্থা অবলম্বনে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল হতে পারে কিন্তু পুনর্জাগরণ ঘটতে পারে না। বরং যে চিন্তার ভিত্তিতে পুনর্জাগরণ ঘটানো হবে সেটি উম্মাহকে বা উম্মাহর প্রভাবশালী অংশকে ব্যাখ্যা করা, ওই চিন্তার ভিত্তিতে উম্মাহকে জীবনসংগ্রামে পরিচালিত করা, ঐ চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করা, এভাবেই নিশ্চিতভাবে পুনর্জাগরণ সংগটিত হবে। সুতরাং পুনর্জাগরণ বলতে ক্ষমতা দখল করা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট চিন্তার ভিত্তিতে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করে ঐ চিন্তার ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করা।

    ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং ঐ চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করা হবে। ক্ষমতা দখল করা এখানে মুল উদ্দেশ্য নয়, এবং ক্ষমতা দখল করার চিন্তা একটি ভূল উদ্দেশ্য। বরং ক্ষমতা গ্রহণ করে চিন্তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করা পুনর্জাগরণের একটি পদ্ধতি। এভাবেই আমাদের পুনর্জাগরণ সংগঠিত হবে। রাসুল (সা) এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। যখন সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাঁর রাসুল (সা)-কে ইসলাম এর বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, তখন রাসুল (সা) সবাইকে ইসলামের আকিদার (চিন্তার) দিকে আহবান করেছিলেন। এবং মদিনায় যখন আউজ ও খাজরাজ গোত্র এই চিন্তাটি গ্রহণ করে ঐক্যবদ্ধ হলো, তাঁদের জীবনকে এই চিন্তা দিয়ে পরিচালিত করতে আরম্ভ করলো, তখন রাসুল (সা) মদিনায় শাসন কর্তৃত্ব গ্রহণ করলেন এবং ঘোষণা করলেন; ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত লোকজনের সাথে যুদ্ধ করতে থাকব যতক্ষণ না তারা বলে “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”। যদি তাঁরা এটিকে মেনে নেয় তাহলে তাঁদের রক্ত এবং সম্পদ আমার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা পাবে..’। শুরুতে রাসুল (সা) ইসলামি আকিদার চিন্তার দিকে মানুষকে আহবান করেন, ফলে মদিনার‍ পুনর্জাগরণ শুরু হয়, সমগ্র আরবের পুনর্জাগরণ হয় এবং ইসলাম গ্রহণ করা প্রত্যেকের পুনর্জাগরণ সংগঠিত হয়। অর্থাৎ চিন্তা গ্রহণ করা এবং জনগণের দৈনন্দিন বিষয়াদি দেখাশুনা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

    আজকে, সবগুলো দেশে ইসলামি উম্মাহ নিঃসন্দেহে অধঃপতিত অবস্থায় আছে, দুইশত বছর চেষ্টার পরও পুনর্জাগরণ অর্জনে তাঁরা ব্যর্থ। কারণ সরকার অনৈসলামি ব্যবস্থা, আইন ও শাসনের উপর প্রতিষ্ঠিত। অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্র কুফর ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত। ইয়েমেনের মত কিছু রাষ্ট্রে আস-সাল্লাহর বিপ্লব পূর্ব ইসলামি ব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হলেও সবাই অধঃপতিত ছিল। এমনকি ইসলামি ব্যবস্থা ও শরিয়ার উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করার পরও পুনর্জাগরণ সম্ভব হয়নি। সুতরাং ইসলামি চিন্তার ভিত্তিতে শাসন প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে পুনর্জাগরণ শুরু করতে হবে, অর্থাৎ ইসলামি আকিদার উপর প্রতিষ্টা করা। “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এই ভিত্তির উপর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেই পুনর্জাগরণ সংগটিত হবে। অন্যদিকে কোন মাযহাব অথবা তাহতাউই এর মত কোন গ্রন্থ বা শরিয়ার উপর প্রতিষ্ঠা করলেও পুনর্জাগরণ সংঘটিত হবে না।

    সুতরাং একমাত্র “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এই ভিত্তির উপর রাষ্ট্র প্রতিষ্টা করলেই পুনর্জাগরণ সংগটিত হবে। তারপর আল্লাহর আদেশ অনুসারে তাঁদের সক্ষমতার ভিত্তিতে শরিয়া গ্রহণ করা হবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সমুহ তাঁদের জন্য কল্যাণকর বা অকল্যাণকর হোক অথবা পছন্দ-অপছন্দ বিবেচনা না করে বাস্তবায়ন করা হবে। কারণ তা আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তাআলা পাঠিয়েছেন এবং একমাত্র “লা ইলাহা ইল্লালা মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ” এই ভিত্তি চিন্তা হতে উৎসারিত হয়েছে, এভাবেই পুনর্জাগরণ সংঘটিত হবে।

    সুতরাং এই উম্মাহকে উন্নত বা পুনর্জাগরণ সংঘঠিত করতে গেলে তাকে অবশ্যই ইসলামি আকিদাকে গ্রহণ করতে হবে, এর ভিত্তিতে জীবনকে পরিচালিত করতে হবে, এই ভিত্তির উপর শাসন এবং কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে, দৈনন্দিন বিষয়াদির সমস্যাগুলো এই আকিদা দিয়ে সমাধান করতে হবে। উল্লেখ্য, সক্ষমতার ভিত্তিতে শরিয়া গ্রহণ আল্লাহর নির্দেশনা হিসেবে করা হবে অন্য কোন কারণে নয়। এভাবেই সঠিক পুনর্জাগরণ পদ্ধতিতেই নিশ্চিতভাব পুনর্জাগরণ সংঘঠিত হবে, অন্যকোন পুনর্জাগরণ পন্থার মাধ্যমে নয়। এভাবেই উম্মাহ তাঁর হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং পৃথিবীর কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ চুড়ায় আরোহণ করবে।

    Taken from an old leaflet written by Sheikh Taqi uddin an Nabhani (rah)

  • NRC ও CAA ইস্যুতে ভারত উত্তাল: সমস্যা ও সমাধান

    NRC ও CAA ইস্যুতে ভারত উত্তাল: সমস্যা ও সমাধান

    গত ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ এ ভারতের সংসদে Citizenship Amendment Act (CAA) বা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল আইন হিসেবে পাশ হয়েছে। এটি ১৯৫৫ সালের নাগরিক আইনের সংশোধন। এই সংশোধিত আইনের মূল কথা হচ্ছে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত অবৈধ অধিবাসীদের মধ্যে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান ধর্মাম্ববলী বা অবৈধ অভিবাসীরা যদি ৩১শে ডিসেম্বর ২০১৪ সালের আগে ভারতে প্রবেশ করে থাকে তবে তারা ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার উপযুক্ত।

    তবে মুসলিমদের জন্য এরকম কোন সুযোগ রাখা হয়নি অর্থাৎ এই তিন দেশ থেকে আগত মুসলিমরা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী যেমন, ভারতে অবস্থানরত রোহিঙ্গা মুসলিমগণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এবং অন্য ধর্মাবলম্বীরা শরণার্থী।

    National Register of Citizens (NRC) বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি হচ্ছে ভারত ও ভারতের বাহিরে থাকা ভারতীয় নাগরিকদের তালিকা যা আসামে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। বিজেপি সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে ২০২১ সালের মধ্যে সমগ্র ভারতে NRC বাস্তবায়ন করা। NRC এর মূল কথা হচ্ছে পূর্বপুরুষ ভারতে বসবাস করার বিষয়ে যদি কেউ উপযুক্ত দলিল প্রমাণ পেশ করতে না পারে তবে সে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী।

    আসামের চূড়ান্ত NRC তালিকা (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) থেকে যে ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছে তাদের ১৪ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাকি ৫ লক্ষ মুসলিম। আসাম প্রেক্ষাপটে NRC ২০১৯ এবং CAA ২০১৯ এর সমন্বয় করলে ফলাফল হচ্ছে NRC ২০১৯ থেকে বাদ পড়া ১৪ লক্ষ হিন্দু CAA ২০১৯ এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব ফিরে পাচ্ছে আর ৫ লক্ষ মুসলিম হচ্ছে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। ভারতের কুটনৈতিক ভাষায় এরা মূলত বাংলাদেশের নাগরিক যারা অবৈধভাবে আসামে বসবাস করছে। NRC ২০১৯ এবং CAA ২০১৯ এর সমন্বিত ফলাফল আসামে প্রত্যক্ষ করার পর ভারতে অবস্থানরত মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে। ফলতঃ অস্তিত্বের প্রয়োজনে তারা প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে।

    জাতিরাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত দূর্বলতা হচ্ছে এই রাষ্ট্র ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে একটি সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ করার সক্ষমতা রাখেনা যার প্রমাণ হচ্ছে চীন ও ভারতের শাসকশ্রেণীর মুসলিমবিদ্বেষী তৎপরতা।

    ইসলাম নির্দিষ্ট সীমানা কেন্দ্রিক জাতি রাষ্ট্রের চিন্তাকে প্রত্যাখ্যান করে। খিলাফত রাষ্ট্র কাঠামোর মাধ্যমে ইসলাম মতাদর্শ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়। নাগরিকত্ব ইস্যুতে আমাদেরকে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হবে যা আসন্ন খিলাফত অনুসরণ করবে।

    ১. খিলাফত রাষ্ট্রে ‘সংখ্যালঘু’ নামক কোন Concept নাই। কোন অমুসলিম যদি খিলাফত রাষ্ট্রে এসে বসবাস করতে চায় তবে তাকে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে এবং নিরাপত্তা দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “ইমাম (তথা খলীফা) হচ্ছে অভিভাবক এবং সে তার আওতাধীন নাগরিকদের জন্য দায়িত্বশীল” (মুসলিম এবং বুখারী উভয়ে একমত)। এখানে ‘নাগরিক’ শব্দটি সার্বজনীন এবং এর মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিম অন্তর্ভূক্ত। একইভাবে, নাগরিকত্বের সাথে সম্পর্কিত সকল সাধারন দলিলসমূহ নির্দেশ করে যে, মুসলিম ও অমুসলিম, আরব ও অনারব এবং সাদা ও কালোর ক্ষেত্রে কোন ধরনের বৈষম্যমূলক আচরন করা নিষিদ্ধ। বরং, ইসলামী নাগরিকত্ব বহনকারী সকল ব্যক্তির বিষয়াদি দেখাশোনার কাজে ও তাদের জীবনের, সম্মানের ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে শাসক, কিংবা ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে বিচারক, কোনরূপ বৈষম্য না করে সকলের ক্ষেত্রে সমান আচরণ করবে। এছাড়াও তাদের সাথে দয়া, ধৈর্য্য এবং ক্ষমাশীল আচরন করতে হবে। তারা চাইলে ইসলামী সামরিক বাহিনীতে যোগদান করতে পারে এবং মুসলিমদের পাশে থেকে যুদ্ধ করতে পারে।

    ২. মানুষকে তার বাসস্থান থেকে উৎখাত করা শরিয়াহতে নিষিদ্ধ। ইসলামী রাষ্ট্রে জিম্মিগণ তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করবে এবং নিরাপদে বসবাস করবে। জিম্মি হলো সেইসব ব্যক্তি যারা ইসলাম ব্যতিত অন্য দ্বীনকে আঁকড়ে থাকে এবং ইসলাম ভিন্ন অন্য বিশ্বাসকে ধারন করে ইসলামী রাষ্ট্রের নাগরিক হয়। জিম্মি শব্দটি জিম্মাহ্ শব্দ থেকে উদ্ভুত হয়েছে, যার অর্থ হচ্ছে শপথ বা ওয়াদা। অর্থাৎ, জিম্মি হচ্ছে সেইসব ব্যক্তি যাদেরকে আমরা শান্তি চুক্তি মোতাবেক আচরন করার এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী তাদের বিষয়াদি দেখাশোনা করার ও মেলামেশা করার ওয়াদা প্রদান করেছি। জিম্মিদেরকে তাদের বিশ্বাস ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে বাধা প্রদান করা যাবে না, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বক্তব্য আবু উবায়েদ, উরওয়া হতে আল-আমওয়াল-এ বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়েমেনের লোকদের উদ্দেশ্য করে লেখেন: “ইহুদী ও খ্রিষ্টান ধর্মমতে বিশ্বাসী মানুষদের উপর বল প্রয়োগ করে বিশ্বাস পরিত্যাগে বাধ্য করা যাবে না”

    ৩. ইসলাম জিম্মাহ্ চুক্তির অন্তর্ভূক্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনেক বিধান প্রদান করেছে, যেগুলোতে তাদেরকে নাগরিকত্বের অধিকার প্রদানের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে এবং তাদের উপর এর দায়িত্বসমূহ অর্পণ করা হয়েছে। জিম্মিদের বিষয়াদি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এবং লেনদেন ও শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব না করে শাসক এবং বিচারকগণ জিম্মিদের প্রতি মুসলিমদের মতো একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। সুতরাং মুসলিমদের মতো জিম্মিরাও সমভাবে একই অধিকার ভোগ করে থাকে এবং এটা তাদের কাছ থেকে আশা করা হয় যে, তারাও তাদের উপর অর্পিত সকল দায়িত্ব পালন করবে, উদাহরণস্বরূপ: ওয়াদা পূরন ও রাষ্ট্রের আদেশ পালন। এটাকে এভাবে দেখা যায় যে, রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বহনকারীদের বিষয়াদিসমূহ যথাযথভাবে দেখাশোনা করা হবে এবং এক্ষেত্রে তারা মুসলিম নাকি অমুসলিম সেটা কোন বিচার্য বিষয় নয়। যারা ইসলামী নাগরিকত্ব অর্জন করবে তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরন করা নিষিদ্ধ, কারণ শাসন ও বিচার এবং বিষয়াদি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দলিল-প্রমানসমূহের সার্বজনীনতা এটাই নির্দেশ করে। ইসলাম এরকম একটি রূপরেখা প্রদান করে যে, জিম্মিরা আমাদের মতো একই অধিকার ভোগ করবে এবং আমাদের মতো একই আইন মেনে চলবে। তারা ন্যায়-বিচার ও সম অধিকার ভোগ করবে- এ বিষয়টি আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র বানী হতে সাধারন আদেশ হিসেবে উদ্ভুত হয়েছে: “এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক বিচার করবে।” [সূরা নিসা: ৫৮] এটা একটা সাধারণ নির্দেশনা যা মুসলিম ও অমুসলিম সকল মানুষের উপর প্রযোজ্য। এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেছেন: “এবং তোমরা অবিচল থাকবে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে; এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কখনও ন্যায়বিচার বর্জন করতে প্ররোচিত না করে। ন্যায়বিচার করবে, এটাই ত্বাকওয়ার নিকটবর্তী” (মায়িদাহ্:৮), এবং কিতাবধারী ব্যক্তিদের মধ্যে ন্যায়বিচারের বিষয়ে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)র বাণী থেকেও এটা স্পষ্ট হয়: “আর যদি বিচার ফয়সালা করেন তবে তাদের মধ্যে ন্যায়ভাবে বিচার করবেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ন্যায়বিচারকারীদের ভালবাসেন” (মায়িদাহ:৪২)।

    পরিশেষে বলবো, সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ তথা কাশ্মীর, বাবরী মসজিদ এর ইস্যুগুলো একের পর এক এসে আমাদের জানান দিচ্ছে যে তথাকথিত সেকুলার জীবনব্যবস্থা সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ। শুধুমাত্র ভারতে কেন, সারাবিশ্বেই একই চিত্র। একমাত্র ইসলামই হচ্ছে সে আদর্শ যা অতীতে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও বৈষম্যহীনতা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল এবং চাইলে আজও পারবে। সুতরাং, আসুন আমরা খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সংগ্রামে এগিয়ে আসি যা পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে ইসলামের সুমহান আদর্শের দিকে আহ্বান করবে। মুসলিমবিদ্বেষী ভারতীয় মুশরিক শাসকদের নিপীড়ন থেকে মুসলিম উম্মাহকে মুক্ত করবে এবং ভারতকে পুনরায় ইসলামের পূণ্যভুমিতে রুপান্তর করবে ইনশাআল্লাহ্।

    আবু হুরায়রাহ্ (রা) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:

    “অবশ্যই তোমাদের মধ্যে একটি সেনাবাহিনী হিন্দুস্তানের (ভারত) সাথে যুদ্ধ করবে, আল্লাহ্ সেই বাহিনী যোদ্ধাদের বিজয় দান করবেন। তারা হিন্দুস্তানের শাসকদের বেড়ি পড়িয়ে নিয়ে আসবে। আল্লাহ্ সেই বাহিনী যোদ্ধাদের মাগফিরাত দান করবেন…” [কিতাবুল ফিতান]

  • আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর

    আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর

    আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর বিষয়টি একটি বহুল আলোচিত বিষয় এবং একটি গভীর চিন্তা-ভাবনার বিষয়। আল ক্বাদা ওয়াল ক্বদর বিষয়টি মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন নাকি পরাধীন সে বিষয়ের আলোচনা। অতীতে বহু স্কলার বিভিন্নভাবে বিষয়টিকে আলোচনা ও ব্যাখ্যা করেন কুর’আন এবং সুন্নাহ’র ভিত্তিতে। তারা বিষয়টিকে আল্লাহ’র সৃষ্টি, জ্ঞান ও তাঁর ইচ্ছার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে যৌক্তিক (logical) ভাবে আলোচনা করেন। এখানে উল্লেখ্য, আল্লাহর রাসূল ও সাহাবীদের আমলে আল-কাদা ওয়াল কাদর অর্থাৎ মানুষ কাজের ক্ষেত্রে স্বাধীন না পরাধীন – এ আলোচনা ছিল না, তাদের মধ্যে কেবল আল-কদর তথা আল্লাহর সুবিশাল জ্ঞান নিয়ে আলোচনা ছিল, অর্থাৎ আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কিছুই নেই, সবকিছু তার জ্ঞান অনুযায়ী ঘটে। কিন্তু এ বিষয়টি মানুষকে স্বাধীন করে না পরাধীন করে, এ আলোচনা ছিল না। বরং তাবেঈ আমলে এ আলোচনাটি নব্য ইসলামে প্রবেশকারী গ্রীক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত মুসলিমদের হতে আলোচনাটি উম্মাহর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং উম্মাহর মাঝে তিনটি গোষ্ঠী তিনভাবে আলোচনাটি চলমান রাখে। যেমন: আহলুস সুন্নাহ তথা আশ’আরি, আল জাবরিয়াহ ও আল মু’তাজিলা। জাবরিয়্যাহগণ দাবী করেন মানুষ তার কাজের ক্ষেত্রে পরাধীন, মানুষের উদাহরন ঠিক সেরকম যেরকম একটি পাখির পালক বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তার কোন নিজস্ব স্বাধীনতা নেই, বাতাস তাকে যেদিকে নেয়, সেদিকেই ভেসে যায়। অপরদিকে, মু’তাজিলারা দাবি করে, মানুষ তার কাজ ও ইচ্ছার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ স্বাধীন, কারণ আল্লাহ হচ্ছেন আল-আদিল (ন্যায়পরায়ণ)। সুতরাং, তিনি যদি মানুষকে জোর করে সবকিছু করিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের শাস্তি দেবার ক্ষেত্রে তা যুলুম হয়, সুতরাং, মানুষ স্বাধীনভাবে সবকিছু করে এবং সে তার কাজের ব্যাপারে জবাবদিহী করবে। এ দুই চিন্তার মাঝে সমাধান করার জন্য অপর এক চিন্তার উদ্ভব হয়, তারা নিজেদের আহলুস সুন্নাহ বলতো, তাদেরকে আল-আশআরীও ডাকা হয়। তারা বলেন মানুষ কেবল চিন্তার ক্ষেত্রে স্বাধীন, সে চিন্তা করলে আল্লাহ তাদের কাজ সৃষ্টি করে দেন, এভাবে স্বাধীন ইচ্ছার মাধ্যমে মানুষ তার কর্ম কামাই (কাসব ইখতিয়ারি) করে এবং তার জন্য জবাবদিহী করবে। এ তিন গোষ্ঠীই তাদের চিন্তা গায়েব সংক্রান্ত কুরআন ও সুন্নাহর দলীল দিয়ে করছিল।

    প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, আমাদের সীমাবদ্ধ ও সংকীর্ণ জ্ঞান দ্বারা গায়েবের বিষয় তথা আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে জানা অসম্ভব। আল্লাহ’র সৃষ্টির রহস্য, তিনি কিভাবে সবকিছু জানেন এবং তা লাওহে মাজফুযে লিখে রেখেছেন, তিনি কিভাবে ইচ্ছা করেন এবং তা কিভাবে মানুষের উপর কাজ করে এই বিষয়গুলো সবই মানুষের চিন্তার সীমার বাইরে। মানুষ তার বুদ্ধিবৃত্তি খাটিয়ে এসব বিষয়ের গুঢ় রহস্যভেদ করতে অক্ষম। যেহেতু আল্লাহ’র জ্ঞান ও ইচ্ছা সম্পর্কে আমাদের সীমাবদ্ধ জ্ঞান বা বুদ্ধিবৃত্তির প্রয়োগ দ্বারা বুঝা অসম্ভব, তাই একে শুধুমাত্র আমাদের বিশ্বাসের অংশই করা যায়। আমাদের দৈনন্দিন সকল কাজের ক্ষেত্রে প্রধানত বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত আল্লাহ’র সন্তুষ্টি অর্জন অথবা আল্লাহ’র দেওয়া শাস্তি অথবা পুরষ্কার। অর্থাৎ একটি কাজ করার ক্ষেত্রে মানুষ চিন্তা করবে এ কাজে কি আল্লাহর পুরস্কার রয়েছে? যদি থাকে, তবে সে কাজটি করতে ধাবিত হবে। আর যদি কাজটিতে শাস্তি থাকে তাহলে সে কাজটি হতে বিরত থাকবে। এর বাইরে অন্য কোনো ভিত্তিতে সে চিন্তা করবে না। গায়েবের অচিন্তনীয় বিষয়াদিকে দুনিয়াবী বাস্তবতার উপর যৌক্তিকভাবে (logically) প্রয়োগ করা হতে বিরত থাকতে হবে এবং এ দুয়ের মাঝে মোটা দেয়ালের ব্যবধান রাখতে হবে।

    এই মহাবিশ্বে যত ঘটনা ও কাজ হয় তা প্রত্যক্ষ করলে দেখা যায় মানুষ দুটো বলয় বা প্রেক্ষাপটের মাঝে অবস্থান করে। একটি বলয়কে সে নিয়ন্ত্রন করে, আর অপর বলয়ে তার নিয়ন্ত্রন থাকে না। মহাবিশ্বে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, যেমন, সূর্য উদয় এবং অস্ত যাওয়া, সূর্যের চারিপার্শ্বে গ্রহের আবর্তন, মানুষের জন্ম-মৃত্যু, মানুষ সুন্দর বা কুৎসিত হওয়া, প্রাকৃতিক দূর্যোগসমূহ ইত্যাদি কাজগুলো সংঘটনের ক্ষেত্রে মানুষের কোন চুড়ান্ত নিয়ন্ত্রন নেই এবং এই কাজগুলো মহাবিশ্বের নিয়মের অধীন। এই কাজগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয়। আবার, কিছু ঘটনা রয়েছে যা মানুষ সূচনা করে, কিন্তু, পরে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলে। যেমন: সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় একজন মানুষ পা পিছলে পড়া, হাত থেকে মোবাইল নিচে পড়ে যাওয়া, আপেল কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলা, পানি পান করতে গিয়ে নাকে পানি উঠে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, গাড়ি চালাতে গিয়ে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলা, লক্ষস্থির করে কোনো কিছু নিক্ষেপ করার পর তা লক্ষচ্যুত হওয়া, কোনো দেয়ালের উপর দিয়ে হেটে চলার সময় পিছল খেয়ে নিচে কোনো কিছুর উপর পরা ইত্যাদি ঘটনাগুলো মানুষ দ্বারাই ঘটে; কিন্তু তা মানুষ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। এই ঘটনাগুলো দ্বারা মানুষ প্রভাবিত হয় এবং এগুলো মহাবিশ্বের কোন নিয়মের মধ্যে পড়ে না।

    উপরের ঘটনাগুলোকে বিবেচনা করলেই সহজে বুঝতে পারি, কোন কাজগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রনের বাইরে তথা আল্লাহ দ্বারা নির্দিষ্ট। সুতরাং, যে বলয়ে সংঘটিত ঘটনার ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব নেই, সে বলয়ের ঘটনাগুলোকে ক্বাদা বলা হয়, এবং এসব ক্বাদা – ভালো কিংবা মন্দ হোক – আল্লাহ পক্ষ হতে এবং এসব সিদ্ধান্ত আল্লাহর সিদ্ধান্ত হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই বলয়ে সংঘটিত কাজের জন্য তাকে আল্লাহর মুখোমুখি হতে হবে না অর্থাৎ কোন শাস্তি পাবে না। এসব বাস্তবতার বাইরে কুরআন সুন্নাহ হতেও আমরা বেশ কিছু ক্বাদার উদাহরণ পাই, যেমন, রিযক এর পরিমান নির্ধারিত, মানুষ যেহেতু জানে না কত পরিমান নির্ধারিত, তাই সে চেষ্টা করে এটি কামাই বা বেশি পাবার জন্য, কিন্তু সে ততটুকুই রিযক অর্জন করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাই দিনের শেষে কম পেয়েছে মনে করে তার হতাশার কোনো কারণ নেই। এছাড়াও, আল্লাহর পথে, ইসলামের দিকে সমাজকে আহ্বান করার সময় আল্লাহর পথে জেল, যুলুম ও নির্যাতনের শিকার হওয়াও এক প্রকার ক্বাদা, যার মাধ্যমে আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষা করেন। সুতরাং, ক্বাদা তা আপাত দৃষ্টিতে ভালো মনে হোক কিংবা মন্দ মনে হোক, তা আল্লাহর পক্ষ হতে আসা সিদ্ধান্ত এবং এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অসহিষ্ণু না হয়াই বাঞ্ছনীয়।

    এ গেল যে বলয়ে মানুষের কোনে নিয়ন্ত্রন নেই। এখন, যে বলয়ে মানুষের নিয়ন্ত্রন রয়েছে অর্থাৎ, মানুষ কোন ক্ষেত্রে স্বাধীন এবং কোন ক্ষেত্রে পরাধীন তা সহজেই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বোঝা যায়। মানুষের তার জীবিকা কিভাবে আহরণ করবে, এ ক্ষেত্রে সে কি ঘুষ, চুরি, ডাকাতি করবে নাকি ব্যবসা, চাকরি ইত্যাদি দিয়ে করবে; সে কী খাবে বা সে কী খাবে না, তা তার ইচ্ছাশক্তির সাথে সম্পর্কিত। এতে তার সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি রয়েছে। এগুলো করার ক্ষেত্রে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন। এছাড়াও সে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করবে কি করবেনা, তাও তার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির সাথে সম্পর্কিত। এ বলয়ে সংগঠিত কাজের ক্ষেত্রে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও কর্তৃত্ব রয়েছে এবং সেগুলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দেয়া বিধান অনুযায়ী করলে পুরস্কৃত হবে আর না করলে শাস্তির মুখোমুখি হবে।

    এক্ষেত্রে অনেকেই একটি বিভ্রান্তিতে থাকেন। অনেকে শরীআহ তথা হালাল-হারাম বহির্ভুত সেকুলার জীবনপ্রণালীতে অভ্যস্ত থাকায় মনে করেন, তারা যা করছেন তার বাইরে যাওয়াটি অসম্ভব, তারা এভাবেই সৃষ্ট। কেউ কেউ মনে করেন, তারা নিজেরাই নিজেদের প্রবৃত্তিকে সৃষ্টি করেন, এবং চাইলে এ প্রবৃত্তিকে দমন করা সম্ভব। আবার কেউ কেউ মনে করে নির্দিষ্ট কিছু বস্তুর বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট কিছু ফলাফল বা বিবর্তন বয়ে আনে, এতে পরিবর্তনের সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে তারা বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তির প্রবৃত্তি সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। এক্ষেত্রে ক্বদর এর আলোচনা চলে আসে। ক্বদর শব্দের অর্থ হল বৈশিষ্ট্য। এই মহাবিশ্বে মানুষ ও বস্তু সমূহের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা গুনাগুন রয়েছে। যেমন: পাতার রং সবুজ, সূর্যের তাপ, পানির স্বাদ ও রং, ছুরির ধার, আগুনের তাপ, লবনের স্বাদ, চিনির স্বাদ মিষ্টি ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্ধারিত ও অপরিবর্তনীয়। এছাড়া মানুষের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য দেয়া আছে, যেমন: প্রবৃত্তি ও জৈবিক চাহিদাসমূহ ইত্যাদি। এই বৈশিষ্ট্যসমূহ দিয়ে আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেন। প্রবৃত্তিগুলো মানুষের মাঝে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়, যেমন, যৌনাকাংখা, আবেগ, লোভ, ক্ষমতার লিপ্সা, বাড়ি গাড়ির আকাঙ্ক্ষা, সন্তান, বাবা, মা ও স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি। জৈবিক চাহিদাগুলোর মধ্যে খাদ্য খাওয়া, ঘুমানো, পানি পান করা, নিশ্বাস নেয়া ইত্যাদি। বস্তু ও ব্যক্তির মাঝে এ বৈশিষ্ট্যগুলো থাকার ক্ষেত্রে মানুষের কোনো স্বাধীনতা নেই এবং এগুলোকে দমন বা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে মানুষের কোনো সক্ষমতা নেই, বরং এগুলো আল্লাহর দ্বারা নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য। তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই সকল বৈশিষ্ট্য দ্বারা কখনো মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ করতে বাধ্য করেন না। যেমন: যৌনাকাংখা কখনো মানুষকে তা পূরণে বাধ্য করে না কিংবা ব্যক্তি তা পূরণ করলেও কোনো নির্দিষ্টভাবে পূরণ করতে সে বাধ্য না। মানুষ তার ইচ্ছাশক্তি দ্বারাই তা কোনো এক পন্থায় তা পূরণ করে। এই সকল বৈশিষ্ট্যকে মানুষ ভালো কাজে ব্যবহার করলে অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া বিধান অনুসারে ব্যবহার করলে পুরস্কার পাবে, আর ভুল কাজে ব্যবহার করলে শাস্তি পাবে। উদাহরণস্বরূপ, ছুরির ধার আল্লাহর দেয়া, এ ছুড়ি দিয়ে মানুষের ক্ষতি হতে পারে, আবার এ ছুড়ি দিয়ে মানুষ কল্যাণকর কাজও করতে পারে। এখন যে আল্লাহর বিধান অমান্য করে এ ছুড়ি দিয়ে অকল্যাণকর কাজ করবে, সে তার জন্য গুনাহগার হবে, আবার যে তা দিয়ে কল্যাণকর কাজ করবে, সে তার জন্য পুরস্কৃত হবে। আবার, যৌনাকাংখা মানুষের প্রজনন প্রবৃত্তির একটি প্রকাশ। এখন ব্যক্তি চাইলে তার প্রবৃত্তির এ তাড়না দিয়ে আল্লাহর হুকম অমান্য করে যেনায় লিপ্ত হতে পারে, আবার আল্লাহর হুকম অনুযায়ী বিয়ের মাধ্যমে তা পূরণ করতে পারে। প্রবৃত্তি এক্ষেত্রে নিরপেক্ষ, প্রবৃত্তি মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট জীবনপদ্ধতি দিয়ে তা পূরণ করতে বলে না, বরং মানুষ নিজেই তার স্বাধীন ইচ্ছা খাটিয়ে একটি জীবনপদ্ধতি অনুযায়ী চলে। অনেকে একটি জীবনপদ্ধতিতে লম্বা সময় ধরে চলা কারণে তাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, এবং অন্য জীবনপদ্ধতিতে যাওয়াটিতে কষ্টকর মনে করেন। কিন্তু কোনো কিছু কষ্টকর হওয়া মানে তা অসম্ভব তা নয় কিংবা এ পথে তাকে তার প্রবৃত্তি বাধ্য করছে, তাও নয়। বরং, দৃঢ় প্রত্যয় অবলম্বন করে নতুন জীবনপদ্ধতিতে চলতে শুরু করলেই তা এক সময় সহজতর হয়ে যায়।

    এ আলোচনা থেকে বোঝা গেল, আল-ক্বাদা ওয়াল ক্বদরের ঐতিহাসিক আলোচনার সাথে মানুষের কাজের কোনোই সম্পর্ক নেই। কুরআন, সুন্নাহর গায়েবি বিষয়াদি ও যুক্তির মাধ্যমে মানুষ স্বাধীন কি স্বাধীন না – এটি একটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক। বরং মানুষের কাজ করবার ভিত্তি হলো কাজটির মাঝে আল্লাহর তরফ হতে পুরস্কার না শাস্তি রয়েছে। আর জীবনের কোন ক্ষেত্রে মানুষ স্বাধীন বা পরাধীন – তা সে তার বুদ্ধিবৃত্তি খাটালেই বুঝতে পারবে। এই হলো আল-ক্বাদা ওয়াল ক্বদরের আলোচনা। যে আলোচনা উপলব্ধি করলে একজন মুসলিম সকল হতাশা, অদৃষ্টবাদ ঝেড়ে ফেলে ধাবিত হবে আল্লাহর পুরস্কার পাবার জন্য ও তাঁর শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য। এ আলোচনা একটি সমাজকে কর্মবিমুখতা হতে বের করে পুনর্জাগরণের দিকে নিয়ে যাবে। সে সমাজে একজন মুসলিম তার সকল কাজ, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সকল সময় সতর্ক থাকবে। সে তার সকল কাজগুলোকে অতি দায়িত্ব ও কর্তব্যের সাথে পালন করবে এবং এর বাইরে আরো কল্যাণকর কাজের দিকে ধাবিত হবে। সফল হলে সে শুকরিয়া আদায় করবে এবং বিফল হলে ধৈর্য্যধারণ করবে। যে কোন আপতিত ক্বাদা বা বিপদে তিনি ধৈর্য্যধারণ করবেন। কারণ সকল ভাল ও মন্দ বিপদ-আপদ আসে আল্লাহর পক্ষ হতে, আর মুমিনের দায়িত্ব হল আল্লাহর বিধান মেনে কাজটি সঠিক ভাবে করার চেষ্টা করা এবং ফলাফলের উপর আল্লাহর উপর নির্ভর করা। সে আখিরাতের শাস্তির ব্যাপারে ভীত থাকবে এবং পুরস্কারের আশায় থাকবে। এবং এর চাইতেও উত্তম বিষয় তার চুড়ান্ত আকাংক্ষায় থাকবে, আর তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি (রিদওয়ান আল্লাহ)।

  • পুঁজিবাদের অলীক সুখ-স্বপ্ন

    পুঁজিবাদের অলীক সুখ-স্বপ্ন

    Capitalism তথা পুঁজিবাদ সুখের ডেফিনেশন দেয় consumerism তথা ভোগবাদের মাধ্যমে। ইন্দ্রিয়গত পরিতৃপ্তি সর্বোচ্চ বস্তুগত ভোগে, সবচেয়ে বেশি stuffs আর gadgets এর প্রাপ্তিতেই আমাদের সুখের definition খুঁজে ফেরা, এটা পশ্চিম পেয়েছে গ্রীক রোমানদের উত্তরসূরি হিসেবে।

    কিন্তু এখন জীবন সম্বন্ধে এই concepts গুলো আইডোলজিকাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে, ইন্টেলেকচুয়ালি সব জায়গায় ডমিনেট করছে। দিনশেষে সবই যা খুশি তাই করার, ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মাঝেই জীবনের অর্থ খুজে নেওয়ার তাগিদ দেয়। এই পশ্চিমা ওয়ার্ল্ডভিউয়ের কারণে আমরা পেয়েছি একটা ডিপ্রেসড সিভিলাইজেশন।যারা অর্থপূর্ন কোন কিছুর দিকে ছুটছে না, বরঞ্চ অলীক সুখের ঘূর্নিপাকে পড়ে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারের ভাঙনে, আত্মহত্যা নয়তো মানসিক বিকারে। হারিয়ে যাচ্ছে ড্রাগে, হারিয়ে যাচ্ছে ফুলানো ফাপানো স্ট্যাটাস, সৌন্দর্য, অর্থের শো অফের অলিগলিতে।

    Capitalism এ তাই ব্যাবসায়ীরা মানুষের ‘অপূর্নতা’ নিয়ে ব্যাবসা করে। তাদের “পন্য” ভোগ করলেই আপনি “পূর্নতা” পাবেন। আইফোন ইউজ করলেই আপনি এমপাওয়ার্ড হবেন, হবেন ফ্রি। হবেন হ্যাপি। কেএফসিই ‘হ্যাপি মিল’ দেবে। আপনার দাগেভরা চেহারা আপনার অপূর্নতা। গার্নিয়ার নাহলে নিভিয়া ক্রিম লাগবেই। একটা পিম্পলের জন্যে তারা আপনাকে ঘুমোতে দেবে না। একটা ভুড়িওয়ালা পেট, অনাকর্ষনীয়। সিক্স প্যাক, ছাড়াও লাগবে নামী বেনামী ডাইট প্রডাক্টস। পূর্নতাই সুখ, পার্ফেক্টনেস। আর মানুষ এভাবেই বস্তুগত চাহিদার পেছনে তার সুখের ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। এক অসম অবাস্তব প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এভাবে তার অপূর্নতাও কক্ষনও ঘোচে না, আর অতৃপ্তি থেকে যায়।

    বনী আদম চাহিদার সাথে সুখকে বেধে ফেললেই সুখ আর কখনই পাওয়া সম্ভব না। কারণ তাকে এক সোনার পাহাড় দিলে আরেকটা সোনার পাহাড় চাইবে। পূর্নতা নিয়ে কেউ জন্মায় না, কেউ পূর্নতা নিয়ে মরতেও পারে না। চাহিদার পূর্নতা সারা জীবনেও মানুষ পেতে পারে না। দুনিয়ার সকল সম্পদ কাজে লাগিয়েও।

    এইজন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

    لَوْ كَانَ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى ثَالِثًا، وَلاَ يَمْلأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ ‘

    ” যদি আদম সন্তানের দুটি উপত্যকাপূর্ণ ধনসম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া লোভী আদম সন্তানের পেট ভরবে না। অবশ্য যে ব্যাক্তি তওবা করবে আল্লাহ তা আলা তার তওবা কবুল করবেন।” [বুখারী, হাদিস নং ৫৯৯৩]

    পুঁজিবাদ মানুষের এই বাস্তবতাটাই ধরতে ব্যর্থ। তাই “সুখ” অধরাই থেকে যায়, সোনার হরিন হয়ে।

     যারা দুনিয়ার বস্তুগত প্রাচুর্য আর সুখের দাসত্ববরন করে, এবং এসকল বিষয়ে মত্ত থেকে আখিরাতের চিরন্তন জীবনকে অবহেলা করে, দুনিয়ায় নিজের সুখ ও আনন্দের পূর্নতা কামনা করে মিথ্যা আশায় বুক বাধে তাদের অবিসম্ভাবী ধ্বংসের ঘোষনা এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা) এর মুখ থেকেই,

    تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَمِ وَالْقَطِيفَةِ وَالْخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ

    ” দিনার, দিরহাম, রেশমী চাঁদর (শাল), পশমী কাপড়ের (চাদর) গোলামরা ধ্বংস হোক। যাদের এসব দেয়া হলে সন্তুষ্ট থাকে আর দেয়া না হলে অসন্তুষ্ট হয়।” [বুখারী ৫৯৯২]

    এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাও তার নবীকে আদেশ করছেন,

    ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ

     ” তাদেরকে ছেড়ে দাও তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং (মিথ্যা) আশা ওদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখুক, পরিণামে তারা বুঝবে।” [হিজর ৩]

    মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের সকল ভোগ ও আনন্দের অবসান ঘটবে। যা তাদের চিরন্তন এক জীবনের সামনে দাড় করিয়ে দিবে, যেখানে তাদের দিনার দিরহাম কোন কাজেই আসবে না। সুখ পার্থিব কোন বিষয় নয়। পার্থিব চাওয়া পাওয়ার সমীকরন সুখ নয়। সৃষ্টিকর্তার সাথে নাড়ছেড়া জীবন-দর্শন কখনই সুখের খোজ দিতে পারবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই দুনিয়ার শত অপ্রাপ্তি নিয়েও সুখী হওয়া সম্ভব হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে আখিরাতেই মানুষ ‘পূর্নতা’ লাভ করবে।

    قَالَ اللَّهُ هَٰذَا يَوْمُ يَنفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ ۚ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

    ”আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্যে রয়েছে– উদ্যান; যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত হবে; তারা তাতে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এটিই মহান সফলতা।” [সূরা মায়িদা, আয়াত: ১১৯]

    আবু ই’য়ালা  

  • খিলাফত একমাত্র সমাধান

    খিলাফত একমাত্র সমাধান

    জুলুমের শাসন আমাদের কন্ঠ পুরোপুরি রোধ করার আগেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরুন, যা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে।

    বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার অপরাধ ছিল সে ফেসবুকে ভারতের সাথে পানিবন্টন চুক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিয়েছিল। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

    এই ঘটনা আজ নতুন ঘটছে না, অতীতেও আমরা অসংখ্যবার এই একই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। দেশবাসী দেখেছে কীভাবে বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকরেরও পরিণতি হয়েছিল একইরকম।

    এরকম এক একটা ঘটনা ঘটে আর আমরা প্রচন্ড ক্রোধে মাঠে রাস্তায় নেমে আসি খুনীর বিচার চাওয়ার জন্যে, তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য পুরো দেশ যেন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের বিক্ষোভের মুখে সরকার চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য কয়েকজনকে গ্রেফতার করে, তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। লোকজন ভুলে যায় কী ঘটেছিল।

    আবার নতুন করে আরেকটা ঘটনা ঘটে এবং আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি আর জোর দাবি তুলি হত্যাকারীদের বিচার করার জন্য।

    এভাবেই ঘটে আসছে আজ দিনের পর দিন। আমরা কেউ সমস্যার উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভাবি না, শুধু শাখা-প্রশাখা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি, তাহলে দেখব; এই সমস্যার মূলে রয়েছে এই মানবরচিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জুলুমের শাসন, যা মানুষকে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সরকারকে যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার দিয়ে দিয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে, তার টুঁটি চেপে ধরা হয়। তাকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়, নয়ত গ্রেফতার করা হয়।

    সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত না এই জুলুমের শাসনের অবসান ঘটানো হচ্ছে, একে পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হচ্ছে – ততক্ষণ পর্যন্ত এসব ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে এবং আমরাও আমাদের শক্তি খরচ করে মাঠে-ঘাটে চেঁচিয়ে যাব, কিন্তু সমাধান হবে না। কারণ এই জুলুমের শাসন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

    এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী বাস্তবায়িত সেই খিলাফত রাষ্ট্র যেখানে খলীফা সকল জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য দায়বদ্ধ থাকেন। এই খিলাফত রাষ্ট্রের ২য় খলীফা হযরত ওমর(রা) যখন বলেছিলেন, “আমি যদি কুর’আন সুন্নাহ’র বাইরে অন্যকিছু দিয়ে শাসন করি তবে তোমরা কি করবে? জবাবে তাকে বলা হয়েছিল, এই তরবারী দিয়ে আপনাকে সোজা করে দেওয়া হবে

    একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সাধারণ এক নাগরিক এইভাবে জবাবদিহিতা করতে পারে বা তার মত পরিষ্কার ভাষায় বলতে পারে শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রেই। এই গণতান্ত্রিক জুলুমের রাষ্ট্রে নয়।

    সুতরাং আসুন, আমরা সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি, যা আমাদেরকে আমাদের মতামত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার মতো সুযোগ করে দেবে।  

  • ডেঙ্গুর মহামারি

    ডেঙ্গুর মহামারি

    সরকারের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণ টের পাচ্ছে। কার্যত ঢাকা এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে এবং সারাদেশে তা আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতি ১ মিনিটে গড়ে ১ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামালাতে হিমশিম খাচ্ছে। আক্রান্তদের স্বজনরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ছুটে বেড়াচ্ছেন। সাধারণ জনগণ পরিবারের সদস্যদের বিশেষত শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ একদিকে যেমন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে মৃতের সংখ্যাও। এবার বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে এমন আগাম সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও জনগণের প্রতি উদাসীন এই সরকার ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার নিধন ও বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে গুরুত্ব দেয়নি। বরং, মশার ঘনত্ব ১০গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জটিল আকার ধারণ করা বর্তমান এই পরিস্থিতির পেছনে সরকারের শুধু দায়িত্বহীনতাই নয় দুর্নীতিও প্রতীয়মান হয়েছে, আইসিডিডিআরবি এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে তা অকার্যকর, এতে এডিস মশা মরে না। ২২ মে, গবেষণা রিপোর্টটি প্রাপ্তির পরও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এই ওষুধ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে! এরপরও নির্লজ্জ মন্ত্রী-মেয়ররা নিজেদের ব্যর্থতা ঠাকতে অকার্যকর ওষুধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, কখনো মশাকে দোষারোপ করে বলেছেন মশা অনেক শক্তিশালী তাই ওষুধে কাজ হচ্ছে না, কখনোবা চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যাচ্ছেন না বলে রোগীদের দুষেছেন, এমনকি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো, তাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না! এছাড়াও, দেশের এই দুর্যোগময় মুহুর্তে প্রধানমন্ত্রী বিদেশ বেড়াচ্ছেন, সড়কমন্ত্রী সিনেমার মহরতে যোগ দিয়ে মানুষের কষ্টের সাথে তামাশা করছেন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্ত্রনালয়ের সবার ছুটি বাতিল করে পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া ঘুরতে গেছেন।

    মানুষের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা নিয়ে এমন নিষ্ঠুর উদাসীনতার পর নির্লজ্জ এই শাসকগোষ্ঠী এখন দায় এড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবে গুজবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের ব্যর্থতার যেকোন খবরকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দেয়া এবং গুজবকারী হিসেবে জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠকে রোধ করাই এর উদ্দেশ্য, যেরকম প্রেসিডেণ্ট ট্রাম্প তার যেকোনো মিথ্যা বা ব্যর্থতার খবর প্রকাশ হলেই তাকে “fake news” বলে উড়িয়ে দিতে চায়। সংবাদ মাধ্যমে যখন ডেঙ্গু আক্রান্ত ও প্রাণহানীর প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত হওয়া শুরু করলো তখন দক্ষিণের মেয়র সেটিকে গুজব আখ্যা দিয়ে হুমকি দিয়ে বললেন, ছেলেধরা ও সাড়ে তিন লাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একই সূত্রে গাঁথা। সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞভাবে এই ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবেলা করবে, কঠিন জবাব দিবে।

    জনগণের কষ্ট ও যন্ত্রণার সাথে তামাশাকারী এই মন্ত্রী বা মেয়ররা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নামক বিষবৃক্ষের বিষফল, যা এদের লালন-পালন এবং রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছে। এই শাসনব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়, অতঃপর সবসময় আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, ফলে দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার জন্য কারো নিকট জবাবদিহি করতে হয়না, দুঃশাসন বিস্তার লাভ করে। অতঃপর জনগণ যখন তাদের দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখন তারা জনগণের বিরুদ্ধে নতুন নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয়। তাই এই দুর্বৃত্ত শাসকদের প্রত্যাখ্যান করলেই চলবে না বরং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকেও প্রত্যাখ্যান করতে হবে, আল্লাহ্ প্রদত্ত রহমতপূর্ণ শাসনব্যবস্থা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

    খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণ যে উন্নত স্বাস্থ্যসেবাসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হয়েছে ইতিহাস তার সাক্ষী। খিলাফতের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে জনগণ এই ডেঙ্গু সমস্যার মত যেকোনো বালা-মুসিবত হতে পরিত্রাণ পাবে, কারণ খলিফা তার উপর অর্পিত ফরয হিসেবে জনগণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিবেন এবং এক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সন্তুষ্টি এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাঁর জবাবদিহিতার ভয়ে সর্বদা বিচলিত থাকবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “যে ব্যক্তি মুসলিমদের কোন একটি বিষয়ের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত, অথচ তাদের চাহিদা, দারিদ্রতা ও প্রয়োজন পূরণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’ও ঐ ব্যক্তির চাহিদা, দারিদ্রতা ও প্রয়োজন হতে মুখ ফিরিয়ে নিবেন।” [আবু দাউদ]

    স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে খিলাফত রাষ্ট্রের নীতি হচ্ছে: “রাষ্ট্র সকলের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সুবিধা দেবে। তবে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত চিকিৎসা অনুশীলন, চিকিৎসা সেবা গ্রহণ কিংবা ঔষধ বিক্রয় করাকে বাধা দেবে না।” ইসলাম চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং মানুষের একটি অন্যতম মৌলিক চাহিদা হিসেবে গণ্য করে। তাই, খিলাফত রাষ্ট্র ধনী-গরীব নির্বিশেষে প্রত্যেককে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করবে। স্বাস্থ্যখাতে গবেষণার মান ও পরিধি বাড়াতে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবে। “…নিশ্চয়ই আল্লাহ্ প্রত্যেকটি রোগের জন্য তৈরি করেছেন চিকিৎসা এবং ঔষধ, কেবলমাত্র একটি রোগ ছাড়া (বার্ধক্য)” [তিরমিজি]। খিলাফত রাষ্ট্রের বিজ্ঞানীগণ নতুন নতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার ও উন্নয়নে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হবেন। ফলে ডেঙ্গু কিংবা ইবোলার মত ভাইরাসের ওষুধ তৈরিতে মুনাফার বিষয়টি মাথায় না নিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গৃহিত হবে। তাছাড়া মহামারীর মত ক্ষেত্রে ত্বরিত ব্যবস্থা গৃহিত হবে যেভাবে খলীফা উমর (রা)-এর সময়ে সিরিয়াতে প্লেগের মহামারীর ক্ষেত্রে করা হয়েছিল, “যখন কোন অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাবে সেখান থেকে কেউ অবস্থান পরিবর্তন করবে না এবং বাইরে থেকে কেউ সেখানে প্রবেশ করবে না”। অতএব খিলাফত রাষ্ট্র কোন স্থানে মহামারী দেখা দিলে সেই স্থানকে বিচ্ছিন্ন রাখবে এবং পাশাপাশি ঐ স্থানে যত দ্রুত সম্ভব ওষুধ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিবে। এছাড়াও, রাস্তা-ঘাট, ঝোপ-ঝাড় পরিস্কার রাখার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিবে ইসলামী রাষ্ট্র। আমরা সীরাতে দেখতে পাই, মদীনায় যাবার পরপরই বেশ কিছু সাহাবী এক ধরনের বিশেষ জ্বরে আক্রান্ত্র হন, আয়েশা (রা) বর্ণনা অনুযায়ী মদীনার নিম্নভুমিতে একধরনের পঁচা দুর্ঘন্ধযুক্ত পানির উপস্থিতি ছিল অর্থাৎ, ধারনা করা হচ্ছিল এ থেকে রোপের উপদ্রব। পরবর্তীতে রাসূল (সা) মদীনাকে (মক্কার মতো) হারাম ঘোষনা করেন অর্থাৎ, মদীনাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নতুন করে গড়ে তুলেন।

    হে মুসলিমগণ! এই দুর্বৃত্ত শাসকগোষ্ঠী ও শাসনব্যবস্থার বোঝা আর বহন করবেন না, তাদের দায়িত্বহীনতার নির্মম শিকার আর হবেন না। তাদের চরম দুঃশাসনের ফলে সৃষ্ট গজব কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। মন্ত্রী, সচীবের স্ত্রী, পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তা, অভিনেতা, ডাক্তার, বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সবাই আজ আক্রান্ত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “যারা কোন অত্যাচার হতে দেখেও হাত গুটিয়ে রাখে আল্লাহ্ তাদের সকলকে শান্তির সম্মুখীন করবেন।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেছেন: “যখন কোন জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয় এবং কেউই তাদের প্রতিরোধ করে না তখন আল্লাহ্ গোটা জাতির উপর শাস্তি নাযিল করেন যা তাদের সকলকে ছেয়ে ফেলে।” [আবু দাউদ, ৩৭৭৫]।

    জাতির এই সঙ্কটকালীন মুহুর্তে আমাদের নীরবতা একটি চরম গুনাহ্। সুতরাং, এই দুঃশাসন হতে মুক্তির লক্ষ্যে হাসিনা সরকার ও তার ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে রহমতপূর্ণ খিলাফতে রাশিদাহ্ শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ুন। আল্লাহ্ আমাদেরকে সেই পরিস্থিতি থেকে হেফাজত করুন যেই পরিস্থিতির ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আমাদেরকে সাবধান করে গেছেন: “সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সত্য ও ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায় ও অসত্যের প্রতিরোধ করবে। তা না করলে খুব শীঘ্রই আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন। তখন তোমরা দোয়া করবে কিন্তু আল্লাহ্ তোমাদের দোয়া কবুল করবেন না।”

    ইন শা আল্লাহ, খুব শীঘ্রই আমরা আল্লাহর পক্ষ হতে বিজয় প্রত্যক্ষ করবো এবং ঈমান ও তাকওয়ার সেই আকাংক্ষিত পরিবেশ ফিরে পাবো। আল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন।

    আর যদি সে জনপথের অধিবাসীরা ঈমান আনতো এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমীনের নেয়ামতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম…” [সূরা আল-আরাফ : ৯৬]

  • সামাজিক অবক্ষয় রোধে তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা

    সামাজিক অবক্ষয় রোধে তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা

    বর্তমানে আমার আমাদের সামাজের দিকে তাকালে আমাদের এই সমাজে দেখতে পাই প্রতিনিয়ত কিভাবে মুসলিমরা একে অপরকে খুন করছে, ভাই ভাইকে হত্যা করছে, সন্তান পিতা মাতাকে হত্যা করছে, প্রতিবেশী অপর প্রতীবেশীকে হত্যা করছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে শতশত মানুষের সামনে এমনকি বিচারকের খাস কামরায় একে অপরকে হত্যা করছে। আজ নারী থেকে শিশু সন্তান পর্যন্ত তার পরিবারে সদস্য থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশী এমনকি শিক্ষকের হাতে তার শিশু ছাত্রীর সম্ভ্রম পর্যন্ত নিরাপদ নয়। এমনকি স্বামীর কাছে স্ত্রী এবং স্ত্রীর কাছে স্বামী নিরাপদ নয়। এমতাবস্থায় আমাদের সমাজে এই অন্যায় অনাচারের রোধে নতুন নতুন আইন হচ্ছে, এসকল আইনে মৃত্যু দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে তারপরও এর সাথে মাত্রা দিয়ে নতুন নতুন অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা চলছে কিন্তু নতুন নতুন কৌশলে অপরাধ নতুন রূপ লাভ করছে। 

    আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন: “কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ‘হারাজ’ হবে। রাবী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ‘হারাজ’ কী? তিনি বলেন: ব্যাপক গণহত্যা। কতক মুসলমান বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এখন এই এক বছরে এত মুশরিককে হত্যা করেছি।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তা মুশরিকদের হত্যা করা নয়, বরং তোমরা পরস্পরকে হত্যা করবে; এমনকি কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে, চাচাতো ভাইকে এবং নিকট আত্মীয়-স্বজনকে পর্যন্ত হত্যা করবে। কতক লোক বললো, হে আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: অধিকাংশ লোকের জ্ঞান লোপ পাবে এবং অবশিষ্ট থাকবে নির্বোধ ও মুর্খ।” (ইবনে মাজা) 

    আসলে আমারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা বাদ দিয়ে অন্যপন্থায় এর সমাধান খুজতে গিয়ে সমস্যা কমাতে গিয়ে আরো বাড়িয়ে ফেলছি। আল্লাহ্‌র রাসূল সমাজে অনাচার বৃদ্ধির কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইসলামী জ্ঞানের অজ্ঞতা এবং নির্বোধ ও মুর্খতাকে। অর্থাৎ সমাজে মানুষের মাঝে ইসলামী জ্ঞানের আলোকে জীবন ধারণ বা দিয়ে নির্বোধ ও মূর্খের মত জীবনের সমাধান খোঁজার কারণের মানুষের মধ্যে অনাচারের প্রভাব বিস্তার পাচ্ছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন, 

    “নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির করে।” (আল মাআরিজ-১৯) 

    অর্থাৎ মানুষ স্বভাবতই অস্থির প্রকৃতির। তাই একটি সমাজে মানুষকে যত উত্তেজিত করার উপাদান থাকবে মানুষ ততই অপরাধ প্রবন হয়ে পড়বে। আমাদের সমাজে সবার মাঝে আজ অধিক সম্পদ ও সুখ অর্জনের তাড়না প্রকট হয়ে পড়েছে। সবার মাঝে এই ধারনা তৈরি করা হয়েছে যে, যে অধিক সম্পদের অধিকারী সে অধিক নিরাপদ এবং সুখী। এই সমাজকে যদি আমরা পরিশুদ্ধ করতে চাই তাহলে আমাদের সমাজের মানুষের এই নেতিবাচক প্রবনতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রকৃত সত্য হল সে-ই অধিক নিরাপদ ও সুখী যে অধিক তাকওয়াবান। এই সমাজে যদি মানুষকে আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনের দিকে ধাবিত হয় ও আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয় তাহলে মানুষ তত বেশি তাকওয়া অর্জনের দিকে ধাবিত হবে এবং সমাজে তাকওয়াপূর্ণ পরিবেশ মানুষকে আল্লাহ্‌র ভয়ের কারণে অধিকাংশ অপরাধ হতে দূরে থাকবে। কারণ তাকওয়ার পরিবেশের কারণে তার ইসলাম জ্ঞান লোপ পায় না, বরং সবসময় জীবন্ত থাকে এবং মানুষের চিন্তা পরিশুদ্ধ করতে থাকে এবং তার মাঝে উন্নত আখলাক তৈরি করে। 

    যেমনটি আমরা খুলাফা আর-রাশিদুন এর আমলে দেখতে পাই। উমর (রা) এর খিলাফতের আমলে এক তরুণ এক বৃদ্ধকে হত্যা করলে তাকে খলীফার দরবারে নিয়ে আসা হয়। অনেকে উপস্থিত হন সেই বিচারকার্য দেখবার জন্য। উমর (রা) তরুণকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তুমি তাকে হত্যা করলে? তরুণ জবাবে বললো, বৃদ্ধটি আমাদের উট হত্যা করেছিল, তাই রাগের মাথা তাকে আমি পাথর ছুড়ে মেরে ছিলাম এবং সেই আঘাতে বৃদ্ধটি মারা যায়। তরুণটি অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে উমর (র) তাকে জানান, (মৃতের সন্তানদের দাবী অনুযায়ী) তোমার উপর শাস্তি কায়েম করা হবে। এতে তরুণ বলে উঠল: হে আমীরুল মুমিনীন, আমার কিছু জমানো সম্পদ রয়েছে যা আমি এমন স্থানে লুকিয়ে রেখেছি কেউ তা জানেনা। আপনি যদি আমাকে কিছুটা সময় দিতেন তাহলে আমি তা বের করে আমার ভাইদের দিয়ে যেতাম। উমর (রা) বললেন, তুমি কি আমাকে বোকা পেয়েছে? তরুণ এরপরও অনুরোধ করতে থাকে। এতে খলীফা বললেন, সেক্ষেত্রে তুমি একজন জামিনদার খুঁজে বের করো যে তোমার জামিন হবে, অর্থাৎ সে তোমার দায়িত্ব নেবে, তুমি ফিরে না আসলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তরুণ আশেপাশে তাকিয়ে আর্তনাদ করতে থাকে, কেউ কি আছেন আমার জামিন নেবার জন্য? কেউ জামিন নিতে রাজি না, কেবলমাত্র ভিড়ে পিছন হতে একজনের আওয়াজ ভেসে এল, আমি হব তার জামিন। তিনি আর কেউ নন, সাহাবী আবু জর আল-গিফারী। অতঃপর তরুণটিকে পরদিন মাগরিব পর্যন্ত সময় দেয়া হল তার কাজ শেষ করে ফিরে আসার জন্য। পরদিন মাগরিব এর ঠিক আগ মুহুর্ত, সবাই অপেক্ষা করছে দরবারে। কিন্তু তরুণের কোনো দেখা নেই। অপেক্ষা করতে করতে সবাই যখন আশা ছেড়েই দিচ্ছিল ঠিক তখনই দেখা গেল ঘোড়া ছুটিয়ে কেউ আসছে। দেখা গেল সেই তরুণ উপস্থিত। উমর (রা) তরুণকে বললেন, হে তরুণ, তুমি ফিরে আসলে কেন? আমি তো তোমার পেছনে কোনো গোয়েন্দা বা পেয়াদা প্রেরণ করিনি! তুমি তো চাইলে পালিয়ে চলে যেতে পারতে এবং কেউ তোমাকে ধরতে যেত না। জবাবে তরুণটি বলল: হে আমীরুল মুমিনীন, আমি তো কথা দিয়েছিলাম ফিরে আসবো, আর আমি চাইনি মানুষ বলুক, একজন মুসলিম কথা দিয়েছিল কিন্তু সে তার কথা রাখেনি। এরপর উমর (রা) আবু যর এর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু যর, কী কারণে আপনি এই যুবক এর জামিন হয়েছিলেন? জবাবে আবু যর বললেন, সে আমাদের কাছে জামিন চেয়েছিল, আর আমি চাইনি মানুষ বলুক, একজন মুসলিম জামিন চেয়েছিল, কিন্তু কোনো মুসলিম তাকে জামিন দেয় নি। অতঃপর এ আমানতদারিতা দেখে সেই বৃদ্ধের সন্তানেরা উমর (রা) কে বলল, আমরা তাকে ক্ষমা করে দিলাম, কারণ আমরা চাইনা মানুষ বলুক একজন মুসলিম ক্ষমা চেয়েছিল কিন্তু কেউ তাকে ক্ষমা করেনি। 

    সুবহানাল্লাহ! এই হলো ইসলামী সমাজ তথা তাকওয়াপূর্ণ সমাজ, যেখানে শুধুমাত্র দুনিয়াবী শাস্তির ভয় দেখিয়ে অপরাধ রোধ করা হতো না, বরং সমাজে সঠিক ইসলামী পরিবেশ তৈরি করে, সঠিক আকীদা ও দৃষ্টিভংগি তৈরি করে সমস্যা সমাধান করা হতো। যে সমাজের কোর্টে অপরাধী, বাদী, বিবাদী ও সাক্ষী – সকলের মধ্যে তাকওয়া বিরাজ করতো। সে সমাজে ভোগবাদিতা বিরাজ করতো না, বরং তাকওয়ার পরিবেশ এর কারণে অপরাধ তেমন হতোই না, আর হলেও এই উন্নত পরিবেশের কারণে তা সহজেই মিটমাট হয়ে যেত, বছরের পর বছর ধরে কেস লড়ে যেতে হতো না, কিংবা আদালতের সামনে হানাহানি করতে হতো না। এই হচ্ছে ইসলামী সমাজের তাকওয়ার পরিবেশের রূপরেখা যা ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, যা আমাদের এই মুহুর্তে বড্ড প্রয়োজন এবং এর জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

    আল্লাহ তাআলা বলেন, 

    “হে মুমিনগণ! ধৈর্য অবলম্বন কর, দৃঢ়তা প্রদর্শন কর, নিজেদের প্রতিরক্ষাকল্পে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (আল ইমরান- ২০০)  

  • মুত্তাকীন

    মুত্তাকীন

    হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।” [আল-বাক্বারাহ্: ১৮৩]

    নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুসলিমের লক্ষ্য হওয়া উচিত মুত্তাকী হওয়া, কারণ মুত্তাকীগণ হচ্ছেন সেসব ব্যক্তি যাদেরকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ভালবাসেন এবং যাদেরকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সহায়তা, করুণা, ক্ষমা, বিশাল পুরস্কার এবং জান্নাতের পাশাপাশি ক্ষয়-ক্ষতি থেকে রক্ষা ও উত্তম কাজে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    কিন্তু হ্যাঁ, যে কেউ তার অঙ্গীকার পালন করে এবং আল্লাহ্কে ভয় করে – নিশ্চয়ই তখন, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা মুত্তাকী।” [আল-ইমরান: ৭৬]

    একদা উমর ইবনে আল খাত্তাব (রা) উবাই ইবনে কাব (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন: “আপনি তাক্বওয়াকে কিভাবে বর্ণনা করবেন?” উবাই (রা) বললেন: “আপনি কি কখনো দীর্ঘ, ঢোলা ও মাটিতে লুটানো বস্ত্র পরিধান করে একটি কণ্টকাকীর্ণ পথের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছেন?” উমর (রা) উত্তরে বললেন: ‘হ্যাঁ’। উবাই (রা) তখন জিজ্ঞেস করলেন: “সে সময়ে আপনি কি করেছিলেন?” উমর(রা) বললেন: “আমি আমার চারপাশে আঁটসাট করে পোশাকটিকে পেঁচিয়ে নিয়েছিলাম যাতে সেটা কাঁটার সাথে লেগে না যায়, কিংবা কাঁটার আঘাতে ছিন্নভিন্ন না হয়, এবং এরপর আমি সতর্কভাবে আমার রাস্তা খুঁজে নিয়েছিলাম”। উবাই (রা) বললেন: ‘এটাই তাক্বওয়া’।

    আলী (রা) রাতের অন্ধকারে তার দাঁড়ি আঁকড়ে ধরতেন এবং বলতেন: “হে পঙ্কিল দুনিয়া! তুমি কি আমাকে মোহাবিষ্ট করতে চাও? যাও এবং অন্য কাউকে মোহাচ্ছন্ন করার চেষ্টা করো। আমি তোমার মালিক হওয়ার ইচ্ছা রাখি না এবং তোমাকে পেতে চাই না। আমি তোমাকে তিনবার তালাক দিয়েছি, যা প্রত্যাহারের অযোগ্য। তুমি আমাকে যে আনন্দময় জীবনের হাতছানি দাও তা খুবই স্বল্পসময়ের”।

    ইবনে উমর কর্তৃক বর্ণিত আছে যে: আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি: “বনী ইসরাইলের কিফাল তার খারাপ কাজের পাপকে ভয় করত না। একদিন একজন মহিলা আসে এবং কিফাল তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ৬০ দিনার প্রদান করে। যখন সে মহিলাটির দিকে অগ্রসর হয় তখন সে কাঁপতে থাকে এবং কাঁদতে শুরু করে। তখন কিফাল জিজ্ঞেস করে: তুমি কাঁদছো কেন? সে উত্তরে বলে: এটা এমন কিছু যা আমি আগে কখনো করিনি। এটি শুধুমাত্র আমার প্রয়োজন যা আমাকে একাজ করতে বাধ্য করছে। কিফাল বলল: তুমি এরকম করছ কারণ তুমি আল্লাহকে ভয় করো! অতএব আল্লাহকে আমার আরও অধিক ভয় করা উচিত। টাকাটা নাও এবং যাও, আল্লাহ্’র কসম আমি আর কখনো আল্লাহকে অমান্য করবো না। সে রাতে কিফাল মারা যায় এবং তার দরজায় লিখিত পাওয়া যায় যে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কিফালকে ক্ষমা করেছেন’, আর লোকেরা এটা জেনে অবাক হয়ে যায়”। আত-তিরমিজি এই হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন এবং হাসান হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করেছেন। আল-হাকিম এটাকে সহীহ্ হিসেবে শ্রেণীভূক্ত করেছেন এবং আয-যাহাবী এতে সম্মতি প্রদান করেছেন। ইবনে হিব্বান তার সাহীহ্ এবং আল-বাইহাকী তার শু‘আব গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহ্’কে ভয় করো, আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক কী সে প্রেরণ করছে আগামীকালের জন্য – এবং আল্লাহ্’কে ভয় করো। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করছ আল্লাহ্ সে-সন্বন্ধে পূর্ণ-ওয়াকিবহাল।” [আল-হাশর: ১৮]

    আল-হাসান আল-বসরী বলেছেন: “তাক্বওয়াবান ব্যক্তি (আল-মুত্তাকিন) হলেন তারাই যারা আল্লাহ্ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে এবং যা আদেশ করেছেন তার উপর আমল করে”।

    খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বলেন: “তাক্বওয়া মানে কেবল দিনে রোজা রাখা এবং রাতে ইবাদত করা নয়, কিংবা এ দু’য়ের মধ্যে সংমিশ্রন করা নয়, বরং তাক্বওয়া হলো আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা এবং যা ফরজ করেছেন তা আদায় করা। একজন ব্যক্তি এই কাজ করলে আল্লাহ্ তাকে উত্তম প্রতিফল দান করবেন”।

    অতএব, মুত্তাকীন হলেন সেসব ব্যক্তি যারা সকল কাজ ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে – আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক – আল্লাহ্কে মান্য করে। সুতরাং:

    – তাক্বওয়াবান ব্যক্তি কেবল নামাজ পড়ে ও রোজাই রাখে না, বরং স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, পিতা-মাতা এবং আত্মীয়দের প্রতি সদয় আচরণ করে এবং ইসলামের আঙ্গিকে তাদের প্রত্যেকের অধিকার আদায় করে।

    – তিনি তাক্বওয়াবান ব্যক্তি নন যিনি কেবল কি’য়ামে দাঁড়ান, কুর‘আন তেলাওয়াত করেন, জিকির ও নফল নামাজ আদায় করেন, বরং যিনি এগুলোর পাশাপাশি ইসলামের মূল্যবোধ ও বিপরীত লিঙ্গের সাথে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামী সামাজিক বিধানসমূহ মেনে চলেন তিনিই তাক্বওয়াবান।

    যার তাক্বওয়া রয়েছে সে কেবল সাদাকাই দেয় না, বরং ইসলামের হুকুম অনুযায়ী সে তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনসমূহ পরিচালনা করে, রিবা বা সুদ থেকে দূরে থাকে এবং ইসলামী অর্থনৈতিক চুক্তি ও আইন মেনে চলে।

    তাক্বওয়াবান ব্যক্তি কেবল তাদেরকেই জবাবদিহি করে না যারা নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না বা পর্দা করে না, বরং তারা মুসলিম শাসকদেরকে জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য সোচ্চার হয় এবং তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

    এবং, তাক্বওয়াবান ব্যক্তি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মায়ানমার এবং অন্যত্র আমাদের উম্মাহ’র বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যার বিরুদ্ধে নীরব থেকে কেবল জায়নামাজে বা মসজিদে অবস্থান করে না, বরং এধরনের নৃশংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

    মুসলিমদের জন্য সাহাবাগণ (রা) হচ্ছেন অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গ, কারণ তাদের উপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সন্তুষ্ট এবং তারা মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত।

    যখন রাসুলুল্লাহ্ (সা) ইয়েমেনে নতুন মুসলিমদের শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষক খুঁজছিলেন তখন তিনি মু‘য়াজ ইবনে জাবাল (রা)-কে তাদের আমির নিযুক্ত করেন এবং তাকে এই প্রশ্নসমূহ জিজ্ঞাসা করেন: “তুমি কিভাবে রায় দেবে বা কোন বিবাদের নিষ্পত্তি করবে?” উত্তরে মু‘য়াজ বলেন,“আমি আল্লাহ্’র কিতাব দিয়ে তাদের শাসন করবো।” তারপর তিনি (সা) বলেন, “যদি এ ব্যাপারে সেখানে কিছু না পাও তবে কি করবে?” তখন মু‘য়াজ বলেন, “তাহলে আমি রাসূলের সুন্নাহ্’র মধ্যে তা খুঁজবো।” এটা শুনে রাসূল (সা) তাকে বলেন, “যদি সেখানেও না পাও তবে কি করবে?” উত্তরে মু‘য়াজ বলেন, “তাহলে আমার জ্ঞান অনুযায়ী বিচারিক যুক্তি (ইজতিহাদ) অনুযায়ী রায় দিব।” একথা শুনে আল্লাহ্’র রাসূল (সা) অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন, “প্রশংসা সেই আল্লাহ্’র যিনি তাঁর রাসূলের বার্তাবাহককে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন।”

    সুতরাং, সাহাবীদের (রা) মতো মুত্তাকী হওয়ার জন্য আমাদেরকেও আল্লাহ্ (আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-কে ভয় করতে হবে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে হারাম এবং হালালকে অনুসরণ করতে হবে এবং আমাদের মধ্যকার বিবদমান বিষয়সমূহ ইসলামী শারী‘আহ্ অনুসারে ফয়সালা করতে হবে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    নিশ্চয়ই! যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখে ভয় করে, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” [আল-মূলক: ১২]

  • জান্নাত ও জাহান্নামের চিন্তা: একটি জীবন পরিবর্তনকারী চেতনা

    জান্নাত ও জাহান্নামের চিন্তা: একটি জীবন পরিবর্তনকারী চেতনা

    জান্নাত জাহান্নামে বিশ্বাস মুসলিমদের আকীদার অংশ। আকীদা হল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বিশ্বাস যার ভিত্তিতে মানুষ তার জীবন পরিচালনা করে। কিন্তু বর্তমান সমাজে মানুষের কাছে জান্নাত জাহান্নাম অনেকটা তথ্যের মত রয়েছে; এটি জীবন পরিচালনাকারী বোধ বা চেতনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বিশ্বাস হিসেবে নেই। এর একটি প্রধান কারণ হল বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা (এর শাসক, সমাজব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা) যা আমাদেরকে প্রতিনিয়ত দুনিয়ার সফলতার কথা মনে করিয়ে দিলেও আখেরাতের বিষয়ে নীরব। কিন্তু একটি সময় ছিল খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময় যখন শাসক জনগনকে পরকাল, দুনিয়ার জীবনের তুচ্ছতা মনে করিয়ে দিত।  

    উসমান ইবনে আফফান (রা) তার জীবনের শেষ খুতবায় বলেন,

    “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তোমাদেরকে এ দুনিয়া দিয়েছেন যাতে তোমরা আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পার,একে নিয়ে পড়ে থাকার জন্য নয়,এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী অথচ আখেরাত চিরস্থায়ী। অতএব এমন কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থেকো না যা তোমাকে অবশেষে অবহেলিত করবে,এমন কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থেকো না যা ক্ষণস্থায়ী। সেই পথের সন্ধান কর যা চিরস্থায়ী। অবশ্যই আমাদের দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে এবং আমাদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে মিলিত হতে হবে। মৃত্যু আমাদের আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়,এর চেয়ে ভাল স্মরণ আর কি আছে?”  

    ইসলামের ইতিহাসের প্রথম প্রজন্মকে রাসূলুল্লাহ (সা) জান্নাত জাহান্নামের ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাস দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। তারা জীবনের সব কিছুর সাথে, সব কাজের সাথে জান্নাত-জাহান্নামকে সর্ম্পকযুক্ত করতে পারতেন। সকালবেলার সূর্যরশ্মি যখন উমর (রা) এর চোখে পড়ল এবং এতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল, তিনি বলে উঠলেন, ‘আল্লাহুম্মা আজির না মিনান নার।’ আফসোস, আমরা আজকে এভাবে জান্নাত জাহান্নামকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্ম্পকিত করতে পারি না।

    দুনিয়ার কোন ডিগ্রী অর্জন করা, ভাল চাকুরী বা ব্যবসা করা, বিলিওনিয়ার হওয়া, অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া, সুরম্য অট্টালিকার মালিক বনে যাওয়া, বিলাসী জীবন লাভ করা সফলতা নয়, বরং সফলতা হল জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করা।

    “জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেয়া হবে। যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতিত কিছু নয়।” (সূরা আল ইমরান: ১৮৫)

    ইসলাম কুরআন এবং সুন্নাহ’র মাধ্যমে জান্নাতকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে আমরা জান্নাতের ব্যাপারে লালায়িত হই এবং জাহান্নামকে ভয়াবহ আযাবকে ভয় পাই। এটি বান্দার প্রতি আল্লাহ’র মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ।

    “আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম,তোমরা ভাল করেছ। অতএব স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ কর।” (সূরা যুমার: ৭৩)

    সাহাবা (রা) দের জান্নাতের আকাঙ্খা এত তীব্র ছিল যে, কেউ কেউ হাতে রাখা খেজুর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেছে, এগুলো খাওয়া পর্যন্ত অনাকাঙ্খিত দীর্ঘ হায়াত নিয়ে বেচে না থেকে দ্রুত জান্নাতে চলে যাওয়াই উত্তম। তারা জান্নাত জাহান্নামকে অতি নিকট বাস্তবতার মত করে দেখতেন। আবার কেউ বর্শা বিদ্ধ হয়ে আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে বলে উঠেছে, ‘কাবা’র রবের কসম,আমি সফল হয়ে গেছি।’ মুতার যুদ্ধে জায়েদ বিন হারেসার শাহাদার পর দুই লক্ষ রোমান সৈন্যের বিপরীতে মাত্র তিনহাজার জন মুসলিম সৈন্যের নেতৃত্ব দানকালে জাফর বিন আবু তালিব (রা) আবৃত্তি করছিলেন, “স্বাগতম হে জান্নাত! যার আগমন-শুভলক্ষণ,যার পানি শীতল। রোম তো রোমই-যার শাস্তি ঘনিয়েছে। কাফের-ছিন্ন বিচ্ছিন্ন তাদের বংশ। যদি তাদের সাক্ষাত পাই।” এ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তিনি শহীদ হয়ে যান। জান্নাতে তাকে দেয়া হয়েছে দু’টি ডানা- যা দিয়ে সেখানে তিনি উড়ে বেড়ান।

    জাবির বর্নিত মুত্তাফিকুন আলাইহি-এর একটি হাদীসে এসেছে যে,

    ওহুদের দিন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করলো, “আজ যদি আমি নিহত হই, তাহলে আমার অবস্থান কোথায় হবে? ”উত্তরে তিনি (সা) বললেন, “জান্নাত। অতঃপর ঐ ব্যক্তি তাঁর হাতের সমস্ত খেজুর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গেলো যতক্ষণ না তিনি শহীদ হন।’’ [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    মুসলিম উল্লেখিত হাদীসে আনাস (রা) বর্ণনা করেন যে:

    “রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং সাহাবীগণ, মুশরিকদের আগমনের পূর্বেই বদর প্রান্তরে পৌঁছান। যখন মুশরিকরা উপস্থিত হলো তখন তিনি (সা) সাহাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন: চলো এমন এক জান্নাতের দিকে ছুটে যাই যার প্রশস্ততা আসমান ও জমীন পর্যন্ত বিস্তৃত। ‘উমায়ের বিন আল হাম্মাম আল আনসারী অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহ্’র রাসূল, এমন এক জান্নাত যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত? তিনি (সা) বললেন: হ্যাঁ। উমায়ের প্রতিক্রিয়া জানালো: আহ্ কী চমৎকার! রাসূল (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোন জিনিস তোমাকে এরূপ মন্তব্যে উদ্ধুদ্ধ করলো? জবাবে সে বললো: হে আল্লাহ্’র রাসূল, আল্লাহ্’র কসম, আমি ঐ অধিবাসীদের একজন হবো, এই প্রত্যাশা ছাড়া অন্য কোনো প্রত্যাশা থেকে আমি এ মন্তব্য করিনি। অতঃপর রাসূল (সা) বললেন: ‘নিশ্চয়ই তুমি সেই বাসিন্দাদের একজন’। তখন উমায়ের তার থলে হতে কিছু খেজুর বের করে সেগুলো খাওয়া শুরু করলো। এবং মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো যে, যদি আমি এই খেজুরগুলো শেষ করার অপেক্ষায় থাকি তাহলে তা হবে সময়কে দীর্ঘায়িত করা। অতঃপর তিনি তার হাতের অবশিষ্ট খেজুরগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং শহীদ হওয়া পর্যন্ত কাফিরদের সাথে যুদ্ধে করতে থাকেন।”

    আনাস (রা) বর্ণিত মুত্তাফিকুন আলাইহির আরেকটি হাদীসে এসেছে:

    “আমার চাচা আনাস বিন আন নদর বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)! মুশরিকদের বিরুদ্ধে আপনার প্রথম যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম। যদি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধে অংশগ্রহনের সুযোগ প্রদান করতেন, তবে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) প্রত্যক্ষ করতেন, কত সাহসিকতার সহিত আমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হই।” অতঃপর যখন ওহুদের ময়দান হতে মুসলিমগণ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলো এবং পালাচ্ছিল, তখন তিনি (রা) বললেন, “হে আল্লাহ্, এরা (সাহাবীগণ) আজ যা করছে, তা হতে আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং এই মুশরিকরা যা করছে তাকে আমি তীব্র ভাষায় ধিক্কার জানাই।” অতঃপর তিনি যখন ওহুদের ময়দানের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন, তখন তাঁর সাথে সাদ বিন মু’য়াজ (রা) সাক্ষাৎ হলো। তিনি (নদর) তাকে আহ্বান করে বললেন, “হে সাদ বিন মু’য়াজ! জান্নাত। আন-নদরের রবের কসম! (এই পাহাড়ের পেছন থেকে তথা) ওহুদের ময়দান হতে আমি তার সুভাস পাচ্ছি।” অতঃপর সা’দ বললেন: “হে আল্লাহ্’র রাসূল! আনাস সেই দিন যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে আমি তা পারিনি। আমরা তার সমস্ত শরীরে তলোয়ার, বর্শা ও তীরের আঘাতজনিত আশিটিরও অধিক ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাই। আমরা তাকে মৃত অবস্থায় পাই। মুশরিকরা তার সমস্ত শরীরকে এমন নৃশংসভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত তার বোন আঙুল দেখে তাঁকে সনাক্ত করতে সমর্থ্য হয়।” আনাস (রা) বলেন, “আমরা সবাই ভাবতাম নিম্নোক্ত আয়াতটি হয়তো তাকে (আন-নদর) বা তার মত কাউকে উদ্দেশ্য করে নাযিল হয়েছে; মু’মিনদের মধ্যে কতক ব্যক্তি রয়েছেন যারা আল্লাহ্’র নিকট তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন।” [সূরা আল আহযাব:২৩] 

    “জান্নাতে ধনুক পরিমাণ স্থান দুনিয়ার যেসব বস্তুর উপর সূর্য উদিত হয় বা অস্তমিত হয়, তাদের চেয়ে উত্তম।” (বুখারী: ৩২৫০)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্য হতে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে যে দুনিয়ার জীবনে সবচেয়ে সুখী ও বিলাসী ছিল। অতপর তাকে জাহান্নামে একবার মাত্র ঢুকানো হবে এবং বের করার পর তাকে বলা হবে, ‘হে আদম সন্তান,তুমি কি কখনও ভাল জিনিস দেখেছ?তোমার কাছে কি কখনও সুখ সামগ্রী এসেছে?’সে বলবে, ‘না,আল্লাহ’র কসম হে প্রভূ।’ আর জান্নাতীদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে যে দুনিয়াতে সবচেয়ে দু:খী ও অভাবী ছিল। তাকে জান্নাতে একবার মাত্র ঢুকানো হবে এবং বের করার পর তাকে বলা হবে, ‘হে আদম সন্তান,দুনিয়াতে তুমি কখনও কষ্ট দেখেছ?তোমার উপর কী কখনও বিপদ এসেছে?’সে বলবে ‘না,আল্লাহ’র কসম! আমার উপর কখনও কষ্ট আসেনি,আমি কখনও বিপদেও পতিত হইনি”। (মুসলিম)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “সর্বশেষ যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে তার সর্ম্পকে অবশ্যই আমার জানা আছে। এক ব্যক্তি হামাগুড়ি দিয়ে অথবা বুকে ভর দিয়ে জাহান্মাম থেকে বের হবে। তখন আল্লাহ বলবেন, ‘যাও জান্নাতে প্রবেশ কর।’ সুতরাং সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে,জান্নাত পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সে ফিরে আসবে এবং বলবে, ‘হে আমার প্রভূ,জান্নাত তো পরিপূর্ণ দেখলাম।’ আল্লাহ আবার বলবেন, ‘যাও,জান্নাতে প্রবেশ কর।’ তাই সে আবার ফিরে আসবে এবং বলবে, ‘হে আমার প্রভূ,জান্নাত তো পরিপূর্ণ দেখলাম।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ‘যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমার জন্য থাকল পৃথিবীর সমতুল্য দশটি পৃথিবীর মত বিশাল জান্নাত।’ তখন সে বলবে, ‘হে প্রভূ তুমি কী আমার সাথে ঠাট্টা করছ অথচ তুমি একজন বাদশাহ?” বর্ণণাকারী বলেন, ‘তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এমনভাবে হাসতে দেখলাম যে, তাঁর চোয়ালের দাঁতগুলো প্রকাশিত হয়ে গেল।’ তিনি (সা) বললেন, “এ হল সর্বনিম্নমানের জান্নাতী (বুখারী-মুসলিম)  

    “এ জান্নাতী যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন তখন তার দু’টি হুরী স্ত্রী কাছে এসে বলবে, ‘সেই আল্লাহ’র প্রশংসা, যিনি তোমাকে আমাদের জন্য এবং আমাদেরকে তোমার জন্য বাচিয়ে রেখেছেন।’ তখন সে বলবে, ‘আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা অন্য কাউকে দেয়া হয়নি।”(মুসলিম)

    হাদীস থেকে জানা যায়, জান্নাতের রয়েছে আটটি দরজা। এগুলো হল: বাবুস সালাহ, বাবুল জিহাদ, বাবুস সাদাকাহ, বাবুর রাইয়ান, বাবুল হাজ্জ, বাবুল কাজীমিনাল গাইজ ওয়াল আফিনা আনিননাস (রাগ সংবরণকারী ও অন্যদের ক্ষমাকারী), বাবুল আইমান (আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুলকারী যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে), বাবুস জিকর (যারা ঘন ঘন আল্লাহকে স্মরণ করেছে)।”

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “যে ব্যক্তি আল্লাহ’র রাস্তায় জোড়া বস্তু ব্যয় করে তাকে জান্নাতে দরজাসমূহ থেকে ডাকা হবে, ‘হে আল্লাহ’র বান্দা এ দরজাটি উত্তম। এদিকে এস।’ সুতরাং যে নামাজীদের দলভুক্ত হবে তাকে সালাতের দরজা থেকে ডাকা হবে,যে মুজাহিদদের দলভুক্ত হবে তাকে জিহাদের দরজা থেকে ডাকা হবে,যে রোযাদারদের অর্ন্তভুক্ত হবে তাকে রাইয়ান নামক দরজা থেকে ডাকা হবে। আর দাতাকে দানের দরজা থেকে ডাকা হবে।” এসব শুনে আবু বকর (রা) বললেন, ‘হে আল্লাহ’র রাসূল! আমার মাতা পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। যাকে ডাকা হবে তার তো ঐসব দরজার প্রয়োজন নেই। এমন কেউ হবে কি! যাকে সব দরজা থেকে ডাকা হবে?’ তিনি (সা) বললেন, “হ্যা,আর আশা করি তুমি তাদের দলভুক্ত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)


    হে মুসলিম, হে আল্লাহ’র বান্দা, জান্নাত অন্বেষণকারীরা অন্যদের চেয়ে আলাদা। রাতে মানুষ যখন ঘুমায়, তারা তখন নামাজ পড়ে। মানুষ যখন পানাহার করে, তারা তখন রোযা রাখে। মানুষ যখন জমা করে, তখন তারা সাদাকা করে। মানুষ যখন ভীরুতা প্রদর্শন করে তখন তারা সালফে সালেহীনদের মত জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলতে ভয় পায় না। তারা আল্লাহকে ভয় করে গোপনে ও প্রকাশ্যে। তারা কবিরাহ গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ’র স্মরণে তাদের হৃদয় কেপে উঠে। কুরআন তেলাওয়াত শুনে তাদের তাকওয়া বৃদ্ধি পায়। তারা আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল করে। বেহুদা কথা বার্তা থেকে বিরত থাকে। লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আমানত ও ওয়াদা রক্ষা করে। রাগ সংবরণ করে ও লোকদের ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহ’র ওয়াস্তে কাউকে ভালবাসে ও আল্লাহ’র ওয়াস্তে তারা শত্রুতা করে। আত্মীয়তার সর্ম্পক বজায় রাখে। তারা হাসি ঠাট্টার ছলে মিথ্যা কথা বলে না, গীবত করে না, নিজের ভাইকে অপদস্ত করে না বা তাকে বিপদের মুখে পরিত্যাগও করে না।

    একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) মসজিদে নববীর মিম্বারে দাড়িয়ে বারবার বলছিলেন, “আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে সতর্ক করছি। আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে সতর্ক করছি। আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে সতর্ক করছি।” সেদিন পাশের বাজারে দাড়ানো লোকেরাও রাসূলের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল। অস্থিরতার দরুণ রাসূলের কাধের চাদর পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল। তিনি আরও বলছিলেন, “আমি জাহান্নামের চেয়ে ভয়ংকর কোন জিনিস কখনও দেখিনি,যার পলায়নকারীরা ঘুমন্ত। আমি জান্নাতের চেয়ে লোভনীয় কিছু দেখিনি,যার সন্ধানকারীরা ঘুমন্ত।” (সহিহ তিরমিযী)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    জাহান্নামের ভেতর সবচেয়ে হালকা শাস্তি হবে সে ব্যক্তির,যার দু’টি আগুনের জুতা থাকবে এবং যার কারণে উত্তাপে তার মগজ ফুটতে থাকবে। সে অন্য কাউকে তার চেয়ে বেশী শাস্তি ভোগকারী মনে করবে না,যদিও সেই সর্বনিম্নশাস্তিভোগকারী। (মুসলিম)  

    আল্লাহ বলেন, 

    “নিশ্চয় যাক্কুম বৃক্ষ পাপীদের খাদ্য। গলিত তন্ত্রের মত পেটের ভেতর ফুটতে থাকবে, যেমন ফুটে গরম পানি।” (দুখান: ৩৫-৩৬)

    “যদি যাক্কুমের এক ফোটা দুনিয়ায় টপকে পড়ত, তবে এতে বসবাসকারীদের জীবন উপকরণ ধ্বংস হয়ে যেত। সে ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে যার খাদ্যই হবে যাক্কুম।” (আহমাদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)

    “নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং তার ব্যাপারে অহঙ্কার করেছে, তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষন না উট সূচের ছিদ্রতে প্রবেশ না করে। আর এভাবেই আমি অপরাধীদের প্রতিদান দেই।” (সূরা আ’রাফ: ৪০)

    আমাদের প্রতিটি কাজে সাহাবা (রা) এর মত জান্নাতের তীব্র আকাঙ্খা ও জাহান্নামের ভয় থাকতে হবে। তবেই আমরা তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপন করে সঠিক গন্তব্যে পৌছতে পারব ইনশাআল্লাহ। আমাদেরকে আল্লাহ জান্নাত লাভ করা ও জাহান্নামের কঠিন আগুন থেকে মুক্তি দানের মাধ্যমে সফলতা দান করুক, আমীন, সুম্মা আমীন।

  • বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির একপথ খিলাফত

    বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির একপথ খিলাফত

    ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে একটি অভিবাসনপ্রত্যাশী দলের অন্তত ৬০ জন মারা গেছেন। নৌকার আরোহীদের মধ্যে ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন। (১) উচ্চ শিক্ষিত ছাত্রদের সবচেয়ে কাম্য ৪০ তম বিসিএস পরীক্ষায় অনুষ্টিত হল মে মাসে। তাতে মাত্র ১৯০৩টি চাকরীর বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩২ টি।(২) এই পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় ৪ লাখ ১০ হাজার বেকারের কোন গতি হবেনা। সাথে কোটা নামের বৈষম্যতো আছেই। বেকার যুবকরা সরকারী চাকরীতে প্রবেশের সীমা ৩৫ করার দাবী করছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে বেকার ৩কোটি। শুভংকরের ফাকি বাদ দিলে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা ৬ কোটির উপর। অর্থাৎ দেশের মোট কর্মক্ষম জনগোষ্টির ৩৯.৪০শতাংশ বেকার। প্রতি বছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে ২২ লাখ যাদের মধ্যে কাজ পায় মাত্র ৭ লাখ।(৩)

    যে কোন দেশের কর্মসংস্থান নির্ভর করে তাঁর উৎপাদন বা ম্যানুকচারিং উপর।

    বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সমুহ ও বাস্তবতা:

    অর্থনীতি যে সকল খাতের অবদান যত তাঁর উপর নির্ভর করে মোট কর্মসংস্থান তৈরীর সুযোগ।

    বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় আয়ে সেবা খাতের অবদান ৫৬, শিল্পের ৩০ দশমিক ১৭ ও কৃষি খাতের ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। (৪)

    সেবা খাত: সেবাখাত মূলত সেবা প্রদান করে থাকে, কিন্তু কোনো কিছু উৎপাদন করে না । খুচরা বিক্রয়, ব্যাংক, বিমা, হোটেল, রিয়েল স্টেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কম্পিউটার সেবা, বিনোদন, প্রচার মাধ্যম, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ ইত্যাদি কাজ সেবাখাতের অন্তর্ভুক্ত।

    বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জুলুমের খাত এটি। এ খাতকে আমরা অধিকারের খাত বললে যথোপযুক্ত হয়।এগুলো পেতেআমাদের উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয় তাছাড়া উৎপাদনের সাথে জড়িত না হওয়ার কারনে কর্মসংস্থান খুবই সীমিত।তাছাড়া সেবা খাতে বেসরকারী চাকরীর বেশিরভাগ উচ্চপদস্থ চাকরীগুলো ভারতীয়দের দখলে। সরকারের দুর্নীতির ডিজিটাল দাবির ফানুস এই সেবা খাতকে কেন্দ্র করে যা পদ্মা সেতু থেকে স্যাটালাইট পর্যন্ত হলেও ফাকা বেলুন ছাড়া কিছুই নয়। সেবা খাত যতই ডিজিটাল হোকনা কেন তা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে না এবং বেকারত্বও দূর হয়না ।

    শিল্প খাত: এ দেশে শিল্প মুলত তৈরি পোশক ও টেক্সটাইলের উপর দাঁড়িয়ে আছেঅন্যদিকে শিল্প বিষয়ক আমদানি রপ্তানি চিত্র দেখলে বুঝা যায় গার্মেন্টস সেক্টরে সব কিছুই আমদানি করে, শুধুমাত্র কাট এন্ড মেইক ভিক্তিতে পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য তৈরি করা হয়। অর্থাৎ এখাতের সাপোরটিভ যে শিল্প থাকা দরকার তাও গড়ে উঠেনি।

    সাড়ে ২২ লাখ মহিলা এ খাতে চাকরিরত। অর্থাৎ দেশের বেশিরভাগ ম্যনুফেকচারিং বা উৎপাদন শিক্ষা বঞ্চিত আমাদের মা বোনরাই করে থাকেন। অল্প বেতনের কারণে তাঁদের ১০জনে ৯ জনই ৩ বেলা খেতে পারেন না, ৮৭ শতাংশ পোশাক শ্রমিক ঋণগ্রস্থ।তাঁদের বেশির ভাগই বিরতি হীন কাজ করার কারণে পিঠব্যাথা,মেরুদন্ড ব্যাথা মূত্রনালী সমস্যা ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত। (৫)

    আর অন্যান্য শিল্পের মধ্যে পাট,চিনি মৃত প্রায়। কাগজ, জাহাজ, কেমিকেল সহ শিল্পগুলো সরকারী পলিসি গত কারণে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ নেই । সরকারের নতজানু নীতির কারণে ২০০২ সালে বিশ্বব্যংক পাট শিল্পকে ধংস করে দেয়, ফলে বেকার হয়ে পড়ে এ শিল্পের সাথে জড়িত সবাই । এখন আমরা আমাদের সোনালী কাঁচা পাট ভারতে রপ্তানী করে ওদের শিল্প উন্নয়ন ঘটাচ্ছি । কর্ম সংস্থান অনেক দুরের বিষয়।

    কৃষি খাত: বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে কৃষি।২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, এটি মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ যোগান দিয়ে থাকে খাদ্যশস্যের উৎপাদন মূলত এই খাতটি হতে আসে । (৬)

    জমির লিজ, বীজ সংগ্রহ, কীটনাশক, ইউরিয়া পটাশ, মজুরী এসব খরচের পর কৃষকরা লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করেন। দেশে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার পরও গত দুই বছরে ৬০ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়। চাল সস্তা হয়ে পড়ায় বিপদে পড়ছে কৃষক, তারা উৎপাদন খরচও তুলে আনতে পারছেন না। ফলে চাল উৎপাদনে নিরুসাহিত হচ্ছে কৃষক। ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অনেকেই বেকার হয়ে পড়ছে। কৃষির সাথে জড়িত অন্যান্য সেক্টরগুলোর অবস্থাও একই ।

    প্রবাসে কর্মসংস্থান: ৭৫ লাখ বাংলাদেশি মোট প্রবাসে কর্মরত আছেন। যাদের মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার মহিলা।

    প্রতিবছর ৩ হাজার লাশ হয়ে দেশে আসেন। বাংলাদেশে অভিবাসন খরচ পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশের তুলনায় বেশি, সুদে ঋণ করে, ঘরবাড়ী বিক্রি করে বেশির ভাগ লোক প্রবাসে যান, ঋণ টানতে টানতে এসব টকবগে ত্রুণের জীবন শেষ। প্রবাসে মহিলা নির্যাতন ও শ্রমিকের রক্তঝরা রেমিটেন্সের বেশির ভাগই আমদানির খরচ মিটাতে চলে যায়। তার উপর শাসক শ্রেণীর দুর্নীতিতো আছেই। ফলতঃ এই রেমিটেন্স উৎপাদন খাতে কোন কাজে আসছেনা।

    কর্ম সংস্থানের অভাবে যা ঘটছে: শিক্ষিত ও শিক্ষা বঞ্চিত দেশে বর্তমানে ৬ কোটি তরুণের ১.৫ কোটি মাদকাসক্ত। (৭) বঙোপসাগর, ভুমধ্যসাগর বিপদজনক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অনেকে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছেন, যাদের অনেকেই সমুদ্রে ডুবে মারা যাচ্ছেন। দেশে প্রতি বছর ১১ হাজারে অধিক আত্মহত্যা করে, যার অন্যতম কারণ বেকারত্ব। (৮) শিক্ষিত যুবকরা চাকরী না পেয়ে হতাশায় ডুবে আছেন। মাথা নিচু করে উবার, পাটাও বা ফুডপান্ডার বোঝা বহণ করে বেঁচে থাকতে চাইছেন কিছু হতাশাগ্রস্থ বেকার যুবক।

    পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ ও গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিই সমস্যার মূল কারণ:

    আমেরিকা তথা পশ্চিমারাই পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে কলোনী স্থাপনের মাধ্যমে শোষণ করে । তাই তারা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে কিছু এজেন্টদের গণতন্ত্রের মুখ রুপে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। প্রভুদের পলিসি বাস্তবায়ন করাই এই সব বিশ্বাসঘাতক শাসকদের একমাত্র কাজ। এক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রে কি কি উৎপাদন হবে আর কোন জায়গাগুলো ব্লক থাকবে তা প্রভুরা যা নির্ধারণ করে তাই তারা বাস্তবায়ন করে। এসব শাসক এজেন্টদের সহযোগিতায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র গুলো সরাসরি বা বিশ্বব্যাংক/আইএমএফ এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো অর্জনে বাধা প্রদান করে পাশাপাশি উৎপাদন খাতকে ধংস করে আমদানি নির্ভর করে তোলে। স্বাভাবিক ভাবে আমদানি নির্ভর এ অর্থনীতিতে লোকাল ক্ষুদ্র কিছু পুজিপতি গোষ্ঠী জন্মায়। তাদের কাজ পুজি পুঞ্জিভূত করে পাচার করা। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যেমন তাদের নিয়ে পরিকল্পনা থাকেনা, তাদেরও রাষ্ট্রের শিল্পায়ন ও উৎপাদনে খুব একটা ভূমিকা থাকেনা। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়না।

    সর্বোপরি একটি রাষ্ট্র আদর্শিক না হলে তার কোন ভিশন থাকেনা। সে কেন জনগণকে শিক্ষিত করবে? কিভাবে শিক্ষিত করবে? তাদের কোথায় কোথায় কাজে লাগাবে? সম্পদের ব্যবহার কিভাবে করবে? সে কি উৎপাদন করবে? কেন করবে? তাঁর কোন পরিকল্পনা থাকেনা। পর্যাপ্ত খনিজ ও অন্যান্য সম্পদ থাক ষত্বেও তারুণ্যের শক্তি তার কাছে বোঝা স্বরুপ।

    সমাধান কোথায়? সম্মানের সাথে আমরা নিতে প্রস্তুত কিনা?

    শিল্প খাত: ইসলাম বাস্তবায়ন করা ও সমগ্র বিশ্ব ছড়িয়ে দেওয়ার অভিন্ন লক্ষ্য ও রাজনৈতিক আকাংখা নিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র সব পরিকল্লনা সাজাবে। মুসলিম উম্মাহকে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ও ইসলামের ভুখন্ড গুলো একত্রিত করবে। নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা ও শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে সামরিক বাহিনীর কোন বিকল্প নেই। সামরিক দিক দিয়ে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করতে মিলিটারী শিল্প গড়ে তোলা হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    “এবং আমি সৃষ্টি করেছি লোহা, যাতে রয়েছে বিপুল শক্তি এবং সেই সাথে মানব জাতির জন্য নানা উপকার”। (সুরা হাদিদ: ২৫)

    স্বাভাবিকভাবেই খিলাফতকে দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত করবে। প্রয়োজন হবে ব্যাপক শিল্পায়ন ও সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান। যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল মুসলিমদের রাজনৈতিক এই আক্ষাংকাই শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়েছিল। ইউরোপের বুকে ইসলামকে বিজয় করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই মুসলিমরা ভুমধ্যসাগরে জাহাজ শিল্প নির্মাণ করেছিল যা পরবর্তীতে ১৭ শতক পর্যন্ত ভুমধ্যসাগরে উসমানীয় খিলাফতের অধীনে মুসলিম নোবাহিনীর কতৃত্বে ছিল।

    খিলাফত মুসলিমদের অন্যন্য ভুমি গুলো একত্রিত করার কারণে ভারী শিল্পের উপাদান ও সম্পদ সহজে যোগান দিতে পারবে। তাছাড়া পঞ্চ বার্ষিকী বা এই ধরনের অল্প সময়ের মধ্যে পরিকল্পত সামরিক কেন্দ্রিক ভারী শিল্প গড়ে উঠবে। যেমন: ১৯২৮-১৯৩২ সালের মধ্যে সোভিয়েত রাশিয়া কৃষি নির্ভর শিল্পকে ভারী শিল্পে রূপান্তরিত করেছিল।

    খিলাফতের অর্থনীতি হবে প্রতিরক্ষা শিল্প কেন্দ্রিক অর্থনীতি। উন্নত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা,তার ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়নই হবে উন্নয়নের মুল চালিকা শক্তি। এধরনের অর্থনীতি যে শুধুমাত্র কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টি করবে তা নয় বরং বৈরি আগ্রাসী পরাশক্তিগুলো থেকেও খিলাফতকে রক্ষা করবে। পাশাপাশি সহায়ক শিল্প (support industry) যেমন-স্টিল, লোহা, কয়লা, যানবাহন নির্মাণ, খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করণ ইত্যাদি শিল্প গড়ে তোলা হবে। যা সম্পূর্ণরুপে উৎপাদন নির্ভর ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।(৯)

    ভারী শিল্পের সহায়ক শিল্পেকে উন্নত করতে একটি ফোরাম গড়ে তোলা হবে যা শুধুমাত্র শিল্পপতিদের নিয়ে কাজ করবে যারা শিল্প খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে প্রয়োজনে খিলাফত তাদের বিশেষ প্রনোদনা দেবে । যার ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। (১০)

    ১৯৫২ সালে জাপানী মার্কিন দখলদারীত্বের অবসান ঘটলে এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

    কৃষি খাত: একটি টেকসই শিল্পায়নের ভিত্তি হল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। উর্বর ভুমি ও কৃষকের পরিশ্রমের কারণে সরকারি কোন সাহায্য না থাকার পরও আমরা ইতোমধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে এই খাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাত করণ শিল্প গড়ে তোলা হবে ফলে এ খাতে আরো কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি হবে।

    সেবা খাত: ভারী শিল্প গড়ে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই সেবা খাতের পরিধির ব্যাপকতা বড় হয়ে উঠবে।সেবার যে বিষয় গুলো অধিকারের সাথে সম্পর্কিত তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য রিয়েল স্টেট, কম্পিউটার সেবা, প্রচার মাধ্যম, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ সহ নাগরিক অধিকার সমুহের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করণ, ও সার্বিক তদারকি ও বাস্তবায়নে প্রচুর কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    ”তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে…….” (আলে ইমরান: ১১০)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে মাথা অবনত করে থাকার জন্য নয়। বেকারত্ব, দারিদ্রতা, বৈষম্য দূর করে একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই আমাদের নেতৃত্বশীল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। খিলাফত এমন একটি রাষ্ট্র যার মাধ্যমে অভ্যন্তরীন সমস্যার সমাধান করে মুসলিমরা ১৩শত বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। রাসূল (সা)-এর পর খুলাফা আর-রাশিদুন থেকে উসমানীয় খিলাফত পর্যন্ত যার সুদীর্ঘ ব্যপ্তি। আমরা সম্মানিত হতে চাইলে অবশ্যই খিলাফত রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে। হতাশায় না ডুবে, বালির বাঁধে আটকে থাকা এই পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আপনার মাথা তুলে দাড়ানোর সাথে সাথে ধ্বসে পড়বে ইন শা আল্লাহ।

    রাসুল (সা) বলেছেন-

    “ইমাম (খলীফা) জনগণের উপর দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারি)

    খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিনিধি খলিফা উম্মাহ্র সেবক হিসেবে জনগনের সেবা করবে । কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে উম্মাহর সকল দ্বায়িত্ব নিবেন এবং একটি নেতৃত্বশীল জাতিতে পরিণত করবেন। উন্নত জীবনের সন্ধানে ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ না করে এই জাতির তরুণেরা তখন ইসলামের বিখ্যাত সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের মতো ভুমধ্যসাগরে ইউরোপ জয় করার মতো অভিযান পরিচালনা করবেন।

    চলুন হে ভাইয়েরা, আমরা খিলাফতের এই ফরজ দ্বায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতে নিজেকে সম্মানিত করি।

    আল্লাহ সুবাহানুতালা বলেন-

    ”হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সেই আহবানে সাড়া দাও যা তোমাদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করে।” (সুরা আনফাল: ২৪)

    সুত্র:

    ১- প্রথম আলো ১৮মে ২০১৯,

    ২- প্রথম আলো ৩ মে ২০১৯,

    ৩- ইনকিলাব ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ৪- বণিকবার্তা , সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮,

    ৫-প্রথম আলো ১মে,২০১৯,

    ৬-উইকিপিড়িয়া।

    ৭- http://www.banglatribune.com/others/news/73343/‘দেশে-মাদক-ব্যবসায়ী-৩০-লাখ

    ৮- https://bangla.dhakatribune.com/bangladesh/2019/01/20/6830/%27দেশে-প্রতিবছর-১১-হাজার-আত্মহত্যা%27

    ৯- ইসলামি খিলাফত সরকারের শিল্পায়ন মডেল।