তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২ভয় (খাউফ)

বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির একটি বহিপ্রকাশ হল ভয়। এটি মানুষের স্বভাবজাত। বাহ্যিক প্রণোদনা ছাড়া ভয় প্রকাশ পায় না। এ প্রণোদনাটি হতে পারে বাস্তবিক অথবা ভয়ের সাথে সর্ম্পকযুক্ত কোন চিন্তা। বাস্তবিক প্রণোদনার একটি উদাহরণ হল পাগলা কুকুর এবং চিন্তা বা কল্পনার সাথে বিজড়িত প্রণোদনা হল ভূতের ভয়-যার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই।
ভয়ের কারণে অধপতিত ব্যক্তি ও দূর্বল জাতি অপমানিত হয় এবং পিছিয়ে থাকে। যদি কোন ব্যক্তির উপর ভয় প্রাধান্য বিস্তার করে তবে তার জীবনের সুখ থাকে না, তার মানসিক বিকার ঘটে, হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়, স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়, সে মহৎ গুনাবলী বিবর্জিত হয় এবং ভাল মন্দ সনাক্ত করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।
সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের ভয় হল চিন্তা বা কল্পনা থেকে উদ্ভুত। এটি দূর্বল মনেই উদয় হয়। শিশুদের মত অবিকশিত মনে এরূপ হতে পারে অথবা বাস্তবতার সাথে সর্ম্পকযুক্ত করার মত যথাযথ তথ্য না থাকায় কোন ব্যক্তির মধ্যে এরকম ভয়ের উদ্রেক হতে পারে । অশিক্ষিত অথবা জীবনযাপনের পদ্ধতির কারণে, বোকা লোকের কম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মস্তিষ্ক বা একেবারেই প্রতিবন্ধী হওয়ায় তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে। এ ধরনের লোকের ভয় দূর করার উপায় হল তাদের সাথে ভয়ের বিষয়ে গভীর কোন আলোচনা দেয়া অথবা এ বিষয়ের সাথে সত্যিকারের বাস্তবতাকে তার বোধগম্যতার মধ্যে নিয়ে আসা।
কল্পনার চেয়ে কম নিকৃষ্ট ধরনের ভয় আসে ভুল বিবেচনাবোধ থেকে। একজন মানুষ এমন কোন কিছুকে ভীতিকর ভাবতে পারে যা আসলে তা নয়। সে একটি ঘুমন্ত কুকুরকে সেই পাগলা কুকুর ভাবতে পারে যেরকম একটি পাগলা কুকুর সে আগে দেখেছে। সুতরাং সে রাস্তা পার হতে ভয় পেতে পারে এবং সেটি থেকে পালাতে চেষ্টা করে। এরকম কারও বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা দরকার। হতে পারে এটি একটি পোষা কুকুর এবং এখন ঘুমিয়ে আছে ও লোকটির উপস্থিতি বুঝতে পারছে না। এই ধরনের ভয় বেশি কাজ করে কোন জায়গায় একটি প্রবন্ধ লেখা বা বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে অথবা কোন শাসক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে আলোচনা করার ক্ষেত্রে। সঠিক বিবেচাবোধ না থাকায় ক্ষতির ভয় থেকে একজন ব্যক্তি লেখা, আলোচনা ও বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকে।
আর এক ধরনের ভয় ক্রিয়া করে যা একটি কাজ করা অথবা না করার পরিণাম সর্ম্পকিত তুলনামূলক চিন্তা থেকে উদ্ভুত হয়। অথচ একাজটি করলেও ক্ষতি হবে এবং না করলেও ক্ষতি হবে। যেমন: একজন জালিম শাসকের জুলুমের ভয় যা কোন ব্যক্তি অথবা উম্মাহ’র ক্ষতিসাধন করতে পারে। এটি একটি সৈন্যের যুদ্ধের ময়দানে মারা যাওয়ার ভয় যা পুরো সৈন্যবাহিনী অথবা সৈন্যবাহিনীর সদস্য হিসেবে একজনের উপর ধ্বংস ও অপমান ডেকে আনতে পারে। আকীদার কারণে জেলে যাওয়ার ভয় তাকে আকীদা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আকীদা থেকে বিচ্ছিন্নতা জেলে যাওয়ার চেয়েও গর্হিত কাজ। এই ধরনের ভয় উম্মাহ’র জন্য জেলে যাওয়া বা বিনাশ হয়ে যাওয়ার চেয়েও ভয়ানক।
তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভয় কেবল উপকারীই নয়, বরং অপরিহার্য। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এবং তার শাস্তিকে ভয় করা বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য এবং এটি সুরক্ষাদানকারী ও নির্দেশনামূলক। সুতরাং অন্তরে আল্লাহ’র ভয়কে জাগ্রত করা, কুফর অথবা গুনাহের কারণে আল্লাহ শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কতটা কঠোর তা বর্ণণা করা অপরিহার্য ও অত্যাবশ্যকীয়।
“একমাত্র আমাকেই ভয় কর।” [সূরা আল-বাক্বারা: ৪১]
“আমি ছাড়া কাউকে ভয় করো না।” [সূরা আল-বাক্বারা: ৪০]
“নিশ্চয়ই শয়তান শুধুমাত্র তার বন্ধুগণ হতে তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে; কিন্তু যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তবে তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় করো।” [সূরা আলি ইমরান: ১৭৫]
“অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো।” [সূরা আল-মা’য়িদাহ্: ৩]
“হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো।” [সূরা আন-নিসা: ১]
“যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহ্’র নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়ে।” [সূরা আল-আনফাল: ২]
“এবং যারা বজায় রাখে ঐ সম্পর্ক, যা বজায় রাখতে আল্লাহ্ আদেশ দিয়েছেন এবং স্বীয় পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কঠোর হিসাবের আশঙ্কা রাখে।” [সূরা রাদ: ২১]
“এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম: ১৪]
“যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্যে রয়েছে দু’টি উদ্যান (অর্থাৎ, জান্নাতে)।” [সূরা আর-রহমান: ৪৬]
“তোমাদের কি হল, (যে তোমরা আল্লাহ্-কে (তাঁর শাস্তি) ভয় করছো না, এবং) (আল্লাহ্-এর কাছ থেকে) মানমর্যাদা পাওয়ার মোটেই আশা পোষণ করো না?” [সূরা নুহ: ১৩
এর অর্থ হলো তোমাদের কি হলো যে তোমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-এর শ্রেষ্ঠত্বকে ভয় করছো না।
সুন্নাহ্-এর দলিলের ক্ষেত্রে বলা যায়, কিছু হাদীসের সরাসরি শব্দ প্রয়োগ (মানতূক) এবং কিছু হাদীসের অন্তর্নিহিত অর্থ (মাফহূম) থেকে আল্লাহ্-কে ভয় করা ফরয হওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে:
আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলতে শুনেছি:
“শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্-এর আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। তাঁরা হলেন: একজন ন্যায়বিচারক শাসক, একজন যুবক যে আল্লাহ্-এর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, একজন ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদের সাথে সংযুক্ত, দুইজন ব্যক্তি যারা কেবলমাত্র আল্লাহ্-এর ওয়াস্তে একে অপরকে ভালবাসে-যারা একত্রিত হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্নও হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে, যাকে কোন অভিজাত পরিবারের সুন্দরী রমণী অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য আহ্বান জানায় এবং তখন সে বলে, ‘আমি আল্লাহ্-কে ভয় পাই’, একজন লোক যে গোপনে এমনভাবে দান করে যে, সে ডানহাতে দান করলে তার বাম হাত তা জানতে পারে না এবং সে ব্যক্তি যিনি একাকী গোপনে আল্লাহ্-কে স্মরণ করেন এবং অতঃপর তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে।”
আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“আমি যা জানি যদি তোমরা তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশি।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]
আদী বিন হাতিম (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
“বিচার দিবসে তোমাদের কারোই তার এবং আল্লাহ্-এর মাঝে কোন মধ্যস্থতাকারী থাকবে না, সে তার ডানদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না, এবং অতঃপর সে তার বামদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। অতঃপর সে তার সামনে তাকাবে এবং আগুন ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না। এবং সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেই তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচানো উচিত, এমনকি একটি খেজুরের অর্ধাংশ (দান)-এর বিনিময়ে হলেও।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]
আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত, যিনি বলেছেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন:
“লোকেরা খালি পায়ে, নগ্ন ও খৎনাবিহীন অবস্থায় হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে।” ‘আয়েশা (রা) বললেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! পুরুষ এবং মহিলাগণ কি একে অপরেরর দিকে তাকাবে?” প্রত্যুত্তরে তিনি (সা) বললেন, “পরিস্থিতি তাদের জন্য এতটাই ভয়াবহ হবে যে তারা এতে মনযোগ দেয়ার কোন সুযোগই পাবে না।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]
নু’মান বিন আল-বাশী’র (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন যে:
“বিচারের দিন যে ব্যক্তি দোযখের অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে কম কষ্ট পাবে, তার পা দুটিকে জ্বলন্ত অঙ্গারের নীচে স্হাপন করা হবে এবং এতে করে তার মগজ ফুটতে থাকবে।”
ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
“দুনিয়ার সব মানুষ তার প্রভূর সামনে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে যে, তখন প্রত্যেকে তার ঘামে কানের মধ্যখান পর্যন্ত ডুবে যাবে।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]
আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
“শেষবিচারের দিন মানুষ এমন অঝোরে ঘামতে থাকবে যে তাদের ঘামে ভৃ-পৃষ্ঠে সত্তর হাত গভীরতা তৈরি হবে, এবং তাদের কান অবদি ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তা থামবে না।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
“ঈমানদারগণ যদি জানতো যে আল্লাহ্ কী ধরণের শাস্তি মজুদ করে রেখেছেন, তাহলে তাদের কেউ আর জান্নাতের আশা পোষণ করতো না। এবং কাফিররা যদি জানতো আল্লাহ্’র হাতে কত ধরনের রহমত রয়েছে, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশের আশা কখনও ত্যাগ করতো না।” [মুসলিম]
আবু হুরায়রা (রা)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন যে, তাঁর রব বলেন:
“আমার ইজ্জতের কসম, আমি আমার বান্দার জন্য দু’বারের জন্য ভয় এবং দু’বারের জন্য সুরক্ষা বয়ে আনবো না। যদি সে দুনিয়াতে আমাকে ভয় করে, তাহলে বিচার দিবসে আমি তাকে সুরক্ষা দিবো। আর দুনিয়াতে সে যদি (আমার ভয়ের ব্যাপারে) নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে, তাহলে আখিরাতে আমি তার জন্য ভয়ের কারণ হবো।”
এটি ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহতে উল্লেখ করেন।
বর্ণিত আছে যে, ইবনে আব্বাস (রা) বলেন:
“যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর।’’ [সূরা আত-তাহরীম:৬]; একদা রাসূল (সা) সাহাবীগণদের সামনে আয়াতটি তিলাওয়াত করেন, তখন আয়াতটি শুনে এক যুবক অজ্ঞান হয়ে গেলো। রাসূল (সা) বালকটির হৃদপিন্ডের উপর হাত রাখলেন এবং তখনও তার স্পন্দন পেলেন, এবং বালকটিকে বললেন: হে যুবক, বল: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্। যুবকটিও পুনরাবৃত্তি করলো: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: এটা কি আমাদের মধ্য হতে তার জন্য, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)? জবাবে রাসূল (সা) বললেন: তোমরা কি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এ আয়াতটি শুনতে পাওনি: “এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে (বিচার দিবসে অথবা আমার শাস্তির ভয়ে) দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকেও ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম: ১৪]; ইহা আল-হাকিম হতে বর্ণিত এবং তিনি একে যাচাই করেছেন।
অমূলক ভয়কে দূর করার আর একটি উপায় হল ইসলামিক আক্বীদার অংশ ‘ভাগ্যের ভাল এবং মন্দ’ বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করা। আমাদের রিযক ও আজল বা আয়ুষ্কাল পূবনিধারিত। আল্লাহ’র রাস্তায় করা কোন কাজ রিযক বা আয়ুষ্কালকে কমাবে না। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে হক্ কথা বলা হতে বিরত না রাখে যখন তা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়; সত্য বলা এবং সৎকর্ম করা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না।” [আহমদ, ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ্]
জালিম শাসক বা মানুষের ভয় যাতে আমাদের হক্ব কথা বলা থেকে বিরত না রাখে।
বুখারী এবং মুসলিম শরীফের হাদীসে আবু সায়ীদ (রা) থেকে বণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
“মানুষের ভয় যাতে তোমাদের মুনকারের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা না হয় যখন তা (মুনকার) শুন অথবা দেখ।“
আবু সায়ীদ (রা)-এর বরাত দিয়ে ইবনে মাজাহ উল্লেখ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘‘তোমাদের কেউ যাতে নিজেকে অপমান না কর।’ তারা (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, কীভাবে একজন তার নিজেকে অপমান করে?’ তিনি (সা) বললেন, ‘সে এমন একজন পাপী ব্যক্তিকে দেখল যার বিষয়ে আল্লাহ’র বক্তব্য থাকা সত্ত্বেও তাকে তা জানাল না।’ এরকম ব্যক্তিকে আল্লাহ বলবেন, ‘কী তোমাকে এটি বলা থেকে বিরত রেখেছিল?’ সে বলবে, ‘লোকের ভয়।’ অতপর আল্লাহ বলবেন, ‘আস, আস আমার দিকে, ভয়ের সবচেয়ে বড় হক্বদার তো আমিই ছিলাম।’’
আল্লাহ’র রাস্তায় ইসলামের জন্য কাজ করলেই কেবল মানুষ মারা যায় না, বিপদের সম্মুখীন হয় না-তা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চিন্তা করলেই বুঝা যায়। বাংলাদেশে কেবলমাত্র সড়ক দূঘটনায় বছরে প্রায় সাড়ে সাতহাজার লোক মারা যায়, পরিবেশ দূষণজনিত কারণে বছরে প্রায় বিশ হাজার লোক মারা যায়, প্রায় দেড় লক্ষ লোক প্রতি বছর ক্যান্সারে মারা যায়। এছাড়াও রয়েছে দূঘটনাজতি মৃত্যু-রানা প্লাজা, নিমতলী, তাজরীন গামেন্টস, চকবাজার ট্রাজেডী। বাংলাদেশের জেলে দুই তৃতীয়াংশ বন্দী বিনা বিচারে আটক রয়েছে। এতসব মৃত্যু, দূঘটনা, জেল কী ইসলাম প্রতিপালন করার কারণে হচ্ছে? পঙ্গু হাসপাতালে কয়জন রোগী ইসলাম পালন করে হয়েছে? ঢাকা মেডিকেল, বারডেম বা পিজির মগের লাশসমূহ কী ইসলাম পালন করে হয়েছে? আজমপুর গোরস্তানসহ দেশের সব গোরস্তানের কয়টি লাশ বছরে দাফন হয়েছে যারা আল্লাহ’র কাজ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে?
আমাদেরকে আল্লাহ’র ক্রোধকে ভয় করতে হবে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের ক্ষেত্রে জালিম শাসককে ভয় পেলে চলবে না।
“আর তোমার পরওয়ারদেগার যখন কোন পাপপূর্ণ জনপদকে পাকড়াও করেন, তখন এমনিভাবেই করে থাকেন। নিশ্চয়ই তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক, কঠিন। নিশ্চয়ই ইহার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্য যে আখিরাতের আযাবকে ভয় করে। উহা এমন একটি দিন, যেদিন সমস্ত মানব সম্প্রদায়কে একসাথে সমবেত করা হবে, সেদিনটি হলো সকলের হাযিরের দিন। আর আমি ওটা শুধু সামান্য কালের জন্যে বিলম্বিত রেখেছি। যখন সেই দিন আসবে তখন কোন ব্যক্তি আল্লাহ্’র অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না। অনন্তর তাদের মধ্যে কতক তো দূর্ভাগা হবে এবং কতক হবে ভাগ্যবান। অতএব, যারা দূর্ভাগা হবে তারা তো দোযখে এই অবস্হায় থাকবে যে, তাতে তাদের চীৎকার ও আর্তনাদ হতে থাকবে।” [সূরা হুদ: ১০২-১০৬]
“আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর (শাস্তি) সমপর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন।” [সূরা আলি ইমরান: ২৮]
“হে মানব সম্প্রদায়! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিসমৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুত: আল্লাহ্’র আযাব অত্যন্ত কঠিন।” [সূরা আল-হাজ্জ্ব: ১-২]
“সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতার কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।” [সূরা আবাসা: ৩৪-৩৭]
রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন,
‘‘এক শহরের অধিবাসীদের উপর আলাহ্ তাআলা শাস্তি প্রদান করেন। তাদের মধ্যে আঠার হাজার লোক এমন ছিল যাদের আমল ছিল নবীদের আমলের সমতুল্য।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা:)! কেন তবে তাদের উপর শাস্তি এসেছিল?’ রাসূলুলাহ্ (আ:) বললেন, ‘এই কারণে যে, (বাকীদের পাপকাজ করতে দেখেও) তারা আল্লাহ্’র উদ্দেশ্য বাকীদের উপর ক্রুদ্ধ হতো না এবং তাদেরকে (পাপকাজ থেকে) বারণ করতো না।’’
রাসূলুল্লাহ(সা:) বলেন,
“সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, তোমাদেরকে অবশ্যই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে হবে, না হলে অবশ্যই আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের উপর শাস্তি পাঠাবেন, অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবে না।” [তিরমিযি]
রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,
“তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং লোকদের কল্যাণময় কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করব। অন্যথায় আল্লাহ কোনো আযাবের মাধ্যমে তোমাদের ধ্বংস করে দেবেন কিংবা তোমাদের মধ্য থেকে খারাপ লোকদেরকে তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দেবেন। এসময় তোমাদের মধ্যকার ভালো লোকেরা আল্লাহ্’র কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তা কবুল হবে না।” [মুসনাদে আহমদ]
হযরত আবু বকর (রা) বলেন, আমি রাসূলুলাহ্ (সা:) কে বলতে শুনেছি:
“মানুষ যখন কোনো অসৎকাজ দেখে আর তারা সেটাকে পরিবর্তন করে না, তাহলে আল্লাহ তাদেরকে ব্যাপকভাবে তাঁর আযাবে ছেয়ে ফেলবেন।” [ইবনে মাজাহ]
রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল বিশেষ কোনো ব্যক্তির পাপাচারের জন্য জনসাধারণকে শাস্তি দেন না। কিন্তু যখন তারা (জনসাধারণ) তাদের সামনে মুনকার (অসৎকাজ) হতে দেখে এবং তা প্রতিহত করে না, যদিও তাদের তা প্রতিহত করার ক্ষমতা রয়েছে। তারা যদি এরূপ করে তখন আল্লাহ্ ব্যক্তিবিশেষ ও জনসাধারণ উভয়কেই শাস্তি দেন।” [আহমদ]
এক্ষেত্রে আমাদের সালফে সালেহীনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (র), আহমাদ ইবনে হাম্বল (র) হক্ব কথা বলতে গিয়ে শাসকের নিযাতনের স্বীকার হওয়া সত্বেও তারা তাতে অটল ছিলেন। আমরা নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতে তাদের মাযহাব অনুসরণ করি। এইসব সালেহীনগণ শাসককে নয়, মানুষকে নয়, একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে ভয় করে দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত ছিলেন।
নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত কম জানে, আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।
বাস্তবতা (reality) ও চিন্তা (concepts) প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে

প্রবৃত্তি জৈবিক চাহিদা থেকে ভিন্ন যদিও উভয়টি মানবজীবনের অপরিহার্য জীবনীশক্তি। জৈবিক চাহিদাকে অনিবার্যভাবে পূরণ করতে হয়, তা পূরণ না হলে মানুষের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু প্রবৃত্তির চাহিদার ব্যাপারটি ভিন্ন, এটি স্রেফ তৃপ্ত হতে চায়। এটি তৃপ্ত না হলে মানুষ অস্থিরতায় ভোগে, কিন্তু মানুষ বেঁচে থাকে, মৃত্যুবরন করে না। মানুষ যদি খাদ্য গ্রহন না করে বা প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া না দেয়, সে মারা যাবে; কিন্তু যদি প্রবৃত্তির চাহিদা তৃপ্ত না করে তার মৃত্যু হবে না। যদি সে কোনো নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক না করে কিংবা যদি সে উপাসনা না করে সে মারা যাবে না, কারণ প্রবৃত্তির চাহিদা অনিবার্যভাবে পূরণ হতে চায় না। উপরন্তু, জৈবিক চাহিদা পূরণের তাড়না মানুষ তার নিজের মধ্য থেকেই অনুভব করে এবং এটা বাইরের উপাদান দ্বারা আলোড়িত হয়। এটা প্রবৃত্তি থেকে ভিন্ন, কারণ প্রবৃত্তি কখনোই অভ্যন্তরীনভাবে আলোড়িত হয় না এবং বাহ্যিক আলোড়ন ছাড়া এটি কখনোই তৃপ্ত হবার অনুভুতি তৈরি করে না। যদি বাহ্যিক কোনো কিছু একে তাড়িত করে, তবে তা আলোড়িত হয়, এবং তৃপ্ত হবার অনুভুতি বজায় থাকে।
প্রবৃত্তিকে উস্কে দেবার জন্য যদি বাহ্যিক কোনো কিছু না থাকে, তবে এটি সুপ্ত থাকে এবং প্রবৃত্তি পূরণের কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকে না। সুতরাং, ক্ষুধা মানুষের মাঝে স্বাভাবিকভাবে ভেতর থেকে আসে এবং এটি বিদ্যমান থাকার জন্য কোনো বাহ্যিক বাস্তবতা (external motive) প্রয়োজন হয় না। অতঃপর জৈবিক চাহিদা পূরণের আকাঙ্ক্ষা মানুষ নিজ থেকেই অনুভব করে, যদিওবা বাহ্যিকভাবে এটি করার জন্য কিছু নেই। তবে, বাহ্যিক উপাদান ক্ষুধাকে উস্কে দিতে পারে। সুতরাং, মজাদার খাবার আমাদের ক্ষুধাকে উস্কে দিতে পারে বা কোনো মজাদার খাবারের আলাপ যদি আমরা করি তাও ক্ষুধাকে উস্কে দিতে পারে। কিন্তু যৌন আকাঙ্ক্ষা নিজ থেকে তাড়িত হয় না, বরং একে উস্কে দেবার জন্য বাহ্যিক কোনো কিছুর প্রয়োজন হয়। তাই, প্রবৃত্তির যে অনুভুতি তৃপ্ত হতে চায় তা মোটেও মানুষের নিজের মধ্য হতে উদ্ভুত হয় না; আর মানুষ তা অনুভুব করে না যতক্ষন কোনো বাহ্যিক উপাদান তা তাড়িত করে। সুতরাং, যৌন সম্পর্কের জন্য কোনো আকাংক্ষা থাকবে না, কিংবা কোনো অনুভুতি থাকবে না যতক্ষন না মানুষ কোনো ভৌত বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করবে যা এই অনুভুতির সূচনা করবে; অথবা কোনো ব্যক্তি তার সম্মুখে কিছু বাস্তবতা আলোচনা করতে পারে যা এই অনুভুতিকে উস্কে দিতে পারে; অথবা কোনো বোধ তার মাথায় আসতে পারে যা তার মাঝে তাড়িত করবার জন্য কিছু ধারণার জন্ম দিতে পারে। সুতরাং, যতক্ষন না কোনো ভৌত বাস্তবতা কিংবা চিন্তা থাকছে, ততক্ষন পর্যন্ত এই অনুভুতি তাড়িত হবে না।
তাই বলা যায়, শুধুমাত্র প্রবৃত্তির উপস্থিতি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে না। বরং অনুভুতির যে তাড়না তৃপ্ত হতে চায় তা উদ্বিগ্নের কারণ হয়ে দাড়ায় যখন তা তৃপ্ত হয় না। যদি তৃপ্তি পূরণের কোনো উস্কে দেয়া অনুভুতি না থাকে, তাহলে কখনোই কোনো উদ্বেগ থাকবে না। তাই যৌন চাহিদা পূরণের অভাব থাকলে ব্যক্তির কোনো উদ্বেগের বিষয় নেই, এবং একে দমন করারও কোনো প্রয়োজন নেই যদি একে আলোড়িত করবার জন্য কোনো বাস্তবতা না থাকে। তাই জনগণের মাঝে যৌন চিন্তার দিকে উদ্রেক ঘটায় করে এমন বইপত্র, নাটক-সিনেমার প্রচার–প্রসার এক ধরনের নির্বুদ্ধিতা ও অদুরদর্শিতা। একইভাবে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার বাস্তব পরিবেশ বজায় রাখা যা প্রজনন প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে একধরনের নির্বুদ্ধিতা ও অদূরদর্শী। কারণ এর অর্থ দাড়ায় যে বাস্তবতা একে উস্কে দেয় তা তৈরি করা, এবং উদ্বেগ তৈরি করা যতক্ষন না তা প্রশমিত হয়, এবং পরবর্তীতে আবার সেই বাস্তবতা তৈরি করা যা একে পুনরায় উস্কে দিবে, সুতরাং তা তৃপ্তির জন্য সবসময় তাড়িত হতেই থাকে। এভাবে সে (যৌন তাড়নাকে) প্রশমিত করবার চিন্তায় নিমজ্জিত থাকে কিংবা অতৃপ্ততা জনিত উদ্বিগ্নতায় ভোগে। এটি নিশ্চিতই বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতন এবং স্থায়ী অস্থিরতা। তাই, নারী-পুরষের অবাধ মেলা–মেশা সমাজের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর, কারণ তা (মানুষের যৌন তাড়নাকে) তৃপ্ত করবার চেষ্টার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং একে প্রশমিত করবার জন্য মস্তিস্ককে ব্যস্ত রাখে কিংবা ব্যক্তিকে (অতৃপ্ততাজনিত) উদ্বিগ্নতায় ক্রমাগত ভোগায়। তাই যৌনতায় পরিপূর্ণ বই, (গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা)-এর ব্যপক প্রসার সমাজের জন্য মারত্মক ক্ষতিকর।
যৌনতাকে ইতিবাচকভাবে সুসংগঠিত করার জন্য ইসলাম বিয়ে ও বিয়ে সংক্রান্ত সকল বিশদ ব্যবস্থার ধারনা নিয়ে এসেছে। ব্যক্তি ও তার মধ্যকার যাবতীয় সেসব বিষয় যা তার প্রজনন অনুভুতিকে উস্কে দেয় এবং তৃপ্ত হতে দেয় না তা বন্ধ করতে এসেছে, এবং ব্যক্তি তার মধ্যকার যাবতীয় যেসব বিষয় তাকে তার অধিকাংশ সময়ে তার প্রজনন প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করবার কাজের চিন্তায় ব্যস্ত রাখে তা বন্ধ করতে এসেছে। তাই ইসলাম একজন পুরুষের জন্য তার স্ত্রী ব্যতিত অন্য গায়রে মাহরাম নারীর সাথে একান্ত অবস্থান (খালওয়া) কে নিষিদ্ধ করেছে। কেননা এটি প্রজনন প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে যা সে তার গ্রহণ করা ব্যবস্থা অনুযায়ী পূরণ করতে পারে না। এটি তার মধ্যে উদ্বেগের কারণ তৈরি করবে, কিংবা সে অশোভনভাবে ব্যবস্থা লংঘন করবে। বিশুদ্ধ হাদীসে (খালওয়ার) নিষেধাজ্ঞা পরিস্কারভাবে এসেছে,
যেখানে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ
“তোমাদের কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে অবস্থান না করে যদি না তার সাথে মাহরাম কেউ থাকে।”
তিনি (সা) আরো বলেছেন,
لاَ يَدْخُلَنَّ رَجُلٌ بَعْدَ يَوْمِى هَذَا عَلَى مُغِيبَةٍ إِلاَّ وَمَعَهُ رَجُلٌ أَوِ اثْنَانِ
“আজ থেকে কোন পুরুষ কোন নারীর সাথে গোপনে একা থাকতে পারবে না যদি না তার সাথে একজন পুরুষ বা দুইজন উপস্থিত থাকে।”
অন্য একটি হাদীসে তিনি (সা) ব্যাখা করেছেন, খালওয়ার ক্ষেত্রে শয়তান পুরুষ ও নারীকে প্ররোচিত করে কারণ তখন তৃতীয় জন থাকে শয়তান।
রাসূল (সা) বলেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
“কোনো পুরুষ নেই যে কোনো নারীর সাথে একাকী থাকলে, শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয়।”
সুতরাং, ইসলামের বিধান হচ্ছে যা প্রজনন প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে এবং তাদের অনুভুতিকে উস্কে দেয় তা মানুষকে অবশ্যই অপসারণ করতে হবে।
Taken from the Book “Islamic Thought”
ইয়েমেনের স্কুল শিশু হত্যাকারী কসাই এবং উম্মাহর তেল সম্পদ লুণ্ঠনকারী পাকিস্তানে অবশ্যই স্বাগতম না

সংকোচন নীতির আওয়াজ ও হৈচৈ তুলে, বাজওয়া-ইমরান সরকার সৌদি শাসক বিন সালমান (‘এমবিএস’) -কে স্বাগত জানানোর জন্য কোন খরচ বাদ দিচ্ছে না, উম্মাহর সম্পত্তি মুক্তভাবে খরচ করছে। ওদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে, কিন্তু পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জেএফ-১৭ জেট এর মাধ্যমে এমবিএস এর জেট এর প্রোটোকল প্রদানের ক্ষেত্রে নির্বিচারে জ্বালানী খরচ করছে। অথচ দখলকৃত কাশ্মিরের মুসলিমদের সামরিক সাহায্য হতে বঞ্চিত করছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ব্যস্ত রাখছে এমবিএসকে নিরাপদ করার জন্য, যদিও তার শতাধিক সৌদি আরবীয় রয়েল গার্ড রয়েছে। অথচ গৃহায়নের জন্য জনগণের উপর অভিশপ্ত সুদ ভিত্তিক ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। সরকার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন সাজাচ্ছে, ওদিকে এমবিএস ১১০০ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী ব্যক্তি, পাঁচ ট্রাক ব্যক্তিগত মালপত্র, আশি কন্টেইনার লাগেজ এবং ডজনখানেক গাড়ি আনয়ন করেছে। পাশাপাশি সম্পূর্ণরূপে দুটি পাঁচ তারকা হোটেল এবং তিন শত ল্যান্ড ক্রুসার গাড়ি বুকিং করেছে। আর এগুলো আবার পাকিস্তানের এয়ারস্পেস, ট্র্যাফিক এবং ফোন যোগাযোগের ব্যাঘাতের অর্থনৈতিক খরচ ব্যতিত হিসাব।
কে এই এমবিএস যাকে এরকম ঢের খরচ ও বিঘ্ন ঘটিয়ে স্বাগত জানানোর জন্য উপযুক্ত মনে করে সরকার?! এমবিএস হচ্ছে জামাল খাশুগজির খুনী, যে পাকিস্তান সফর করছে তার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ভেঙ্গে দেয়ার উদ্দেশ্যে, যাতে তিনি ভালভাবে বাজওয়া-ইমরান এর প্রভু, আমেরিকার সেবা করতে পারেন। ইয়েমেনের নৃশংস সৌদি সামরিক হস্তক্ষেপের কারিগর এই এমবিএস, মুসলিমদের বিশুদ্ধ রক্ত ঝরিয়ে, পৃথিবীর চার প্রান্তে এর জনগণকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে এই এমবিএস। ‘ভিশন ২০৩০’ এর প্রকৌশলী এই এমবিএস, যা হারামাইনের বরকতময় জমির উপর ধ্বংসাত্মক পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কবজা তৈরির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এমবিএস সেই সৌদি শাসক পরিবারের অংশ যা উম্মাহর তেল সম্পদকে দখল করে আছে, যদিও ইসলাম একে উম্মাহর সুবিধার জন্য জনসাধারণের সম্পত্তি হিসাবে ধার্য করেছে। এমবিএস সেই সৌদি ‘রাজতন্ত্রের’ ভবিষ্যত যা আল্লাহ তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা শাসন করে না, যে আলেমদের কারাবন্দী ও হত্যা করে এবং মসজিদ আল-আকসার দখলদারদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। আর এমবিএস হচ্ছে অর্থনৈতিক মাফিয়ার মুখ্য ব্যক্তি, যা এখন বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের নামে পাকিস্তানে অবস্থিত উম্মাহর সম্পদকে কুক্ষিগত করতে চায়।
হে পাকিস্তানের মুসলিমগণ! আমাদের শাসকগণ সারা মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আমাদের জন্য একটি বোঝা। তারা আমাদের সম্পদ থেকে খরচ করার ক্ষেত্রে একইরকম, যেমন এটি তাদের পিতৃপুরুষদের উত্তরাধিকারী সম্পদ। আমাদের দ্বীন, ভূমি ও সম্পদের লঙ্ঘন সত্ত্বেও ঔপনিবেশিক স্বার্থকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তারা এক। আসুন আমরা আর আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন ও আমাদের জনগণের হত্যার দর্শক না হই। নিপীড়নের মুখে ধৈর্য কোনো গুনাবলী না, এটি পাপ ও মূর্খতা। আসুন আমরা দৃঢ়তার সাথে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত এর সমর্থকদের সাথে কাজ করি যাতে যুলুমের শাসনের চুড়ান্ত এক পতন ঘটে। আহমদ হুজাইফা বিন ইয়ামান এর বরাতে রাসূলুল্লাহ (সা) হতে বর্ণনা করেন,
«ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةً فَتَكُونُ مَاشَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ ثُمَّ سَكَتَ»
“এরপর আসবে জবরদস্তির শাসন, তা থাকবে যতক্ষন আল্লাহ চান তা থাকুক, এরপর আল্লাহ এর পতন ঘটাবেন যখন তিনি তা চান, এরপর আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত।” এরপর তিনি চুপ থাকলেন।”
ইমরান খান IMF-কে সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করছে

২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আইএমএফ প্রধানের সাথে ইমরান খান এর বৈঠকটির দ্বারা উপনিবেশবাদীরা পাকিস্তানের জন্য নতুন বিপদ নিয়ে আসছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রকাশিত ফিল্ড ম্যানুয়াল, সেপ্টেম্বর, ২০০৮ এর একটি লেখা অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী উপনিবেশিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্ষতির একটি বড় উত্স হিসেবে বিবেচনা করে, যেমন IMF, বিশ্বব্যাংক ও OECD আর্থিক, অগতানুগতিক, “সাধারণ সহ বৃহৎ আকারের যুদ্ধকালীন সময়ের অস্ত্র”। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি সত্য যে আইএমএফ একটি ঔপনিবেশিক হাতিয়ার যা ঔপনিবেশিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কোনও দেশকে তার পায়ে দাঁড়াতে ঋণ গ্রহণ করতে কখনও অনুমতি দেয় না। ক্ষমতায় আসার আগেই ইমরান খান এই সত্যটি স্বীকার করেছিলেন। ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান এ প্রকাশিত, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ তারিখে ইমরান খান সতর্ক করে দিয়েছিলেন, “একটি দেশ যা সাহায্যের উপর নির্ভর করে! মৃত্যু তার চেয়ে ভাল। এটি আপনাকে আপনার সম্ভাব্যতা অর্জনে বাধা দেয়, ঠিক যেমন ঔপনিবেশিকতা করেছিল। সাহায্য অপমানজনক। যত দেশ আমূল্যে সাজানো হয়েছে।মি জানি যারা IMF বা বিশ্বব্যাংকের কর্মসূচী গ্রহণ করেছে তা শুধুমাত্র দরিদ্রকে আরো দরিদ্র করেছে এবং ধনীকে আরো ধনী করেছে।” তবুও, ইমরান খান উত্সাহ সহকারে ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৯-এ টুইট করেছেন “IMF এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিন লাগার্ডের সঙ্গে আজ আমার বৈঠকে টেকসই উন্নয়নের পথে দেশকে প্রবেশ করাতে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভংগি ছিল, যাতে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলি সুরক্ষিত থাকে।” গভীর কাঠামোগত সংস্কার (Deep Structural Reform) উদযাপনের কারণ হওয়া থেকে অনেক দূরে। তারা ঔপনিবেশিক ফর্মুলা ও ওয়াশিংটনের ঐক্যমত অনুযায়ী পরিচালিত, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ও স্থানীয় দেশের মুদ্রা, শিল্প ও কৃষির মূল্যে সাজানো হয়েছে।
হে পাকিস্তানের মুসলিমগণ! ইমরান খান নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করেছেন যে, শুধুমাত্র চেহারা পরিবর্তন কখনও পাকিস্তানে পরিবর্তন আনবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানে মানবরচিত আইনের ব্যবস্থা বোঝা হয়ে আছে, ততক্ষন এটি ক্রমাগত ভোগান্তিতে থাকবে। প্রত্যেক পূর্ববর্তী শাসককে বর্তমানের তুলনায় আরও ভালো মনে হবে, কেবলমাত্র এই কারণে যে পাকিস্তান ক্রমাগত উপনিবেশিক ফাঁদে আরো গভীরভাবে ডুবে যাচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে কর বৃদ্ধি, ভর্তুকির হ্রাস, দুর্বল রুপি এবং হাড়ভাঙা দামবৃদ্ধির যাতাকলে পিষ্ট। যতদিন পাকিস্তান IMF এর সদস্য থাকবে, বাস্তবতা আরও খারাপ হবে। এখন আমাদের সকলের উপর বর্তায় যে আমরা খিলাফতের আহ্বানকারীদের দাবির সমর্থন করবো যাতে পাকিস্তান সব ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানকে ছেড়ে দেয়, আইএমএফ কিংবা জাতিসংঘ, কারণ এসব উপাদানের মাধ্যমে কাফেরগণ আমাদের কার্যাবলীর উপর কর্তৃত্ব রাখতে পারে এবং এগুলো মহা ক্ষতির উৎস।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
﴿وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا﴾
“এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না” [সূরা নিসা: ১৪১]
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
«لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ»
“কোনো ক্ষতি নয়, কোনো ক্ষতির বদলে ক্ষতিও নয়” [মুওয়াত্তা ইবন মালিক, ইবন মাজাহ]
আমাদের সকলের জন্য বর্তায় যে আমরা রাত-দিন একত্র করে হলেও সেই ব্যবস্থা তথা নবুয়্যতের আদলের খিলাফতের জন্য কাজ করি যা পাকিস্তানকে তার পূর্ণ সম্ভাব্যতা অর্জন করতে সহায়তা করবে।
একমাত্র খিলাফত শাসনব্যবস্থাই অর্থপাচার রোধ করে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে

সাম্প্রতিক সময়ে গ্লোবাল ফিনেনশিয়াল ইন্টেগ্রিটি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে অর্থ পাচারে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। বৈশ্বিকভাবে ১৯ তম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের এক বছরেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় ৫ শ’ ৯০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পাচারের অর্থের বেশিরভাগই গেছে আমদানি-রফতানির বাণিজ্যের আড়ালে। ১৫ সালের আগের এগারো বছরে পাচার হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। (কালের কন্ঠ ২৯/১/২০১৯)
দেশ থেকে অতিমাত্রায় অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারন হল বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী শাসকেরা ৪৯ বছরেও দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে নি।
মূল সমস্যা নিয়ে আলোচনা না করে ঢালাওভাবে অর্থপাচারের দায় ফেলা হয় হুন্ডি, ভিওআইপি ব্যাবসার উপরে। কিন্তু আলোচনা করা হয় না কেন জনগন দেশে টাকা রাখতে চায় না। এতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অরাজকতাই দায়ী তা সামনে আসে না।
দেশে বিনিয়োগ ও ব্যাবসা-বানিজ্যের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতির জন্য সহায়ক অবকাঠামো, উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা এবং শক্তিশালী স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা যার মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি সহ দেশের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় পন্য সরবরাহ করা যায়; এর কিছুই এদেশের শাসকশ্রেনী নিশ্চিত করতে পারে নি বরং ব্যর্থ হয়েছে।
দেশের অর্থনীতির প্রতি এরুপ অবহেলা প্রদর্শন করে, দুর্নীতিতে বিরল নজির স্থাপন করে, জনগণের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরঞ্চ ‘অর্থপাচার দেশের অর্থনীতিতে কোন প্রভাব ফেলবে না’ বলে বক্তব্য দিয়েছে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।(যুগান্তর, ১৯/১/২০১৯) এভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকেরা এদেশের জনগনের সাথে প্রতারনা করেই যাচ্ছে,এবং জনগনের স্বার্থকে উপেক্ষা করেই যাচ্ছে।
দেশে আওয়ামী-বিএনপি কোন্দলে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে ব্যাবসা বানিজ্যে তীব্র মন্দা বিনিয়োগের পরিবেশ নেতিবাচক হচ্ছে। দেশে চাদাবাজি, দূর্নীতি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর গুন্ডাবাহিনীর তান্ডবে মানুষ বাধ্য হচ্ছে যেকোন উপায়ে নিজেদের অর্থ সম্পদ বাইরের দেশগুলোতে পাঠিয়ে রক্ষা করতে। দেশে বিনিয়োগ না করে বরং বিদেশে বিনিয়োগ করতে। দেশের জ্বালানী সম্পদ ব্যাবহার করে ভারী ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে তোলার জন্য যে সুউচ্চ ভিশন তা বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসকদের না থাকায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। বরঞ্চ আমাদের শাসকেরা এদেশের জ্বালানী খাতকে পশ্চিমা কোম্পানীগুলোর হাতে তুলে দিয়েছে, ফলে জ্বালানীর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এর ফলে দেশে পন্য উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ায়, দেশ আমদানীমুখী হয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই আমদানীর প্রভাবে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।
এছাড়াও ব্যাবসা বানিজ্যে নানাবিধ অতিরিক্ত কর আরোপ করার কারনেও দেশে বিনিয়োগে সদিচ্ছার অভাব দেখা দিচ্ছে। করের হাত থেকে টাকা বাচাতে তা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে সুইজারল্যান্ড সহ বিভিন্ন ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ দেশগুলোতে।
দেশের শিক্ষার মান না থাকায় অন্য দেশে পড়াশোনা ও তার করতে যাচ্ছে প্রচুর ছাত্র, যাদের বেশিরভাগই বিদেশে পড়শোনা শেষ করে সেখানেই চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছরই মানুষ হচ্ছে বিদেশমুখী। যার ফলে প্রচুর অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
এদেশের গণতান্ত্রিক শাসকরাও দূর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করছেন। প্রকৃতপক্ষে আমাদের শাসকেরা জনগণের কল্যান সাধনের কোন তোয়াক্কাই করে না বরঞ্চ নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যাস্ত।
সমাধান
একমাত্র নবুয়্যতের আদলের খিলাফতই পারে ক্রমবর্ধমান এই অর্থপাচার (capital flight) ঠেকাতে।
১। একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই এক খলিফার নের্তৃত্বে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
“রাসুল (সা) বলেন, যখন একজন ইমামের হাতে বাইয়াত সম্পূর্ন হয়ে যায় তখন তাকে যথাসাধ্য মান্য করবে, এমতাবস্থায় যদি কেউ তার সাথে বিরোধ করতে আসে, তবে দ্বিতীয়জনকে হত্যা করবে।“[সহিহ মুসলিম হাদিস নং ১৮৪৪]
তাই রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টির কোন সুযোগ থাকবে না।
২। এছাড়াও দেশের অফুরন্ত সম্পদ কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি নির্মান করবে খিলাফত, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। যেভাবে ১৪০০ বছরের একটি শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি করেছিল খিলাফত।
খিলাফত রাষ্ট্র দেশের জ্বালানী খাতকে গণমালিকানাধীন সম্পদে পরিনত করবে, এবং দেশের জ্বালানী বৈদেশিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ভারী শিল্প কাঠামো গড়ে তুলবে। ফলে পর্যাপ্ত জ্বালানী সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। শুধুমাত্র তাই নয়, এটি খিলাফত রাষ্ট্রের ভিশন কারণ ভারী সমরশিল্প গড়ে তোলা, এবং উন্নত প্রযুক্তির বিকাশ সাধন খিলাফত রাষ্ট্রের জন্য ফরয, কেননা আল্লাহ বলেন,
“ আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শুত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপর ও যাদেরকে তোমরা জান না; আল্লাহ তাদেরকে চেনেন। বস্তুতঃ যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহর রাহে, তা তোমরা পরিপূর্ণভাবে ফিরে পাবে এবং তোমাদের কোন হক অপূর্ণ থাকবে না”। [আনফাল ৬০]
ফলে দেশের অর্থ বাইরে যাওয়ার হার কমে আসবে। কেননা এভাবে খিলাফত রাষ্ট্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে।
৩। খিলাফত রাষ্ট্র জনগনের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করবে, এতে করে সম্পদ ও অর্থের পাচার থেমে যাবে। আবু বাকরা (রা) রাসুল (সা) থেকে বর্ননা করেন,
أَلاَ إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا
“নিশ্চই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান আল্লাহ পবিত্র ও হারাম করেছেন যেমন তোমাদের এই দিন, এই শহর, এই মাস”। [বুখারী, হাদিস নং ৪৪০৩, আসসুনাসুস সাগির লি বাইহাকি, হাদিস নং ৩১২১]
৪। খিলাফত রাষ্ট্র খারাজ, জিজিয়া ও উশর ছাড়া অন্য কোন কর আরোপ করবে না। কেননা আয়কর, এবং বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ইসলাম হারাম ঘোষনা করেছে। শুধুমাত্র ব্যাবসায়িক পন্য থেকে এর যাকাত নেওয়া হবে, অন্য কোন কর থাকবে না। ফলে জনগন করের বোঝায় জর্জরিত হয়ে অর্থ বিদেশে পাঠাবে না।রাসুল সা বলেছেন,
«لَا يَدْخُلُ صَاحِبُ مَكْسٍ الْجَنَّةَ» ‘
“অবৈধভাবে কর আদায়কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না” [মুসনাদ আল আহমাদ, হাদিস নং ১৭০২৩]
৫। খিলাফত রাষ্ট্র উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যেরকমভাবে পূর্বে যখন ইউরোপ অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল, তখন খিলাফত রাষ্ট্রে ফেয, কর্ডোভা, আলেক্সান্দ্রিয়া, বাগদাদ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের পীঠস্থান ছিল। তাই ইউরোপ থেকে ছাত্র এসে খিলাফত রাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়ালেখা করত।
৬। খিলাফত রাষ্ট্র উন্নত চিকিৎসার ব্যাবস্থা করবে, খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানে ১৬৪ ধারায় রয়েছে:
‘রাষ্ট্র সকলের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করবে’।
কেননা রাসুল (সা) মদীনায় ডাক্তার নিয়োগ করেছিলেন। তাই খিলাফত রাষ্ট্রে বাইতুল মাল চিকিৎসাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যাবস্থা করবে। এতে করে দেশের অর্থ বিদেশে যাবে না।
৭। এছাড়াও, খিলাফত রাষ্ট্র দূর্নীতি রোধে সর্বত্র তাকওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এতে করে প্রশাসন থেকে শুরু করে সব জায়গায় দূর্নীতি দূর করা সম্ভব হবে। এছড়াও হিসবাহ আদালত সকল পর্যায়ে দূর্নীতি মনিটর করবে যাতে তা কমে আসে। ফলে জনমনে উদ্বিগ্নতা ও আস্থার অভাব (lack of confidence) দূর হবে। অর্থ বাহিরে বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার জন্য প্রেরন করার প্রবণতা হ্রাস পাবে। শাসকরা বায়তুল মাল থেকে প্রাপ্ত ভাতার বাইরে কোন ধরনের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত থাকতে পারবে না। তাদেরকে অর্থসম্পদের উপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হবে। যেকোন অনাকাংক্ষিত অর্থ বৃদ্ধি দেখা গেলে তা বাজেয়াপ্ত করে বায়তুল মালে জমা করা হবে। তাই শাসকশ্রেনীর অর্থের পাহাড় গড়ে তা পাচারের সুযোগ খিলাফত রাষ্ট্রে থাকবে না।
এবং এভাবেই খিলাফত রাষ্ট্র ইসলামী বিধিবিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত হবে, এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবে।
وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الآخِرَةَ وَلاَ تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلاَ تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّالْمُفْسِدِينَ
“আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান কর, এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভূলে যেয়ো না। তুমি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [কাসাস: ৭৭]
লেখক: ইবনুল আযরাক
প্রাগমেটিজম: একটি অনৈসলামি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি

প্রাগমেটিজম শব্দের কোন যুতসই বাংলা প্রতিশব্দ না পেয়ে এর ইংরেজী পরিভাষাটিই ব্যবহার করছি। শাব্দিক অর্থ নয় বরং এর প্রায়োগিক দিকটি নিয়েই আলোচনা করব। প্রাগমেটিজম বলতে বাস্তবতা প্রবণতাকে বুঝায়। কোন ব্যক্তির চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি নিছক বাস্তবতাই হয় তবে তাকে প্রাগমেটিক বলে। সাধারণত যারা পুঁজিবাদী আদর্শ অনুসারে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা প্রাগমেটিক বা বাস্তবতানুরাগী হয়। কারণ পুঁজিবাদে সুনির্দিষ্ট কোন নীতি নেই, বরং বাস্তবতা থেকে আইন আসে বা বাস্তবতা হল আইনের উৎস। কিন্তু ইসলামে আইনের উৎস হল ইসলামী শরী’আহ-যা সুনির্দিষ্ট। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে এই শরী’আহ পরিবর্তনীয় নয়। সেকারণে একজন মুসলিম বিভিন্ন বাস্তবতায় সঙ্গতিপূর্ণ অপরিবর্তনীয় শরী’আহ এর দলিল থেকে তার করণীয় নির্ধারণ করে। সে কখনওই বাস্তবতা থেকে তার করণীয় ঠিক করবে না। বাস্তবতা এখানে চিন্তা বা সিদ্ধান্তের উৎস নয়, বরং বিষয়বস্তুমাত্র। সে সঙ্গতিপূর্ন অপরিবর্তনীয় শরী’আহ থেকে বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য হুকুম গ্রহণ করবে। বিধায় একজন ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী প্রাগমেটিক হলেও মুসলিম কখনওই প্রাগমেটিক হতে পারে না। মুসলিম প্রাগমেটিক হলে সে হুকুম শরী’আহ ব্যবহার করে বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারবে না, বরং সেই বাস্তবতা অনুসারে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। অনেকে এ আলোচনা শুনে মনে করতে পারেন তাহলে একজন মুসলিম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে কী বিবেচনায় রাখবে না? উত্তর হল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে, কিন্তু বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া যাবে না। বাস্তবতাকে বিবেচনায় না রাখলে সে কী করে বাস্তবতাকে পরিবর্তন করবে?
কুরআন এবং সুন্নাহতে এ বিষয়ে অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য রয়েছে। পবিত্র কুরআনে পূর্বের অনেক নবী রাসূলদের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ বর্ণণা করা হয়েছে। নিশ্চয় এগুলো থেকে উম্মাতে মোহাম্মদীর জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে। অন্যথায় এগুলো কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা উল্লেখ করতেন না। আমরা দেখি সাইয়্যুদনা ইবরাহীম (আ) আল্লাহ’র নির্দেশে পরাক্রমশালী বাদশাহ নমরুদের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে কিরূপ অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন একা। অনেকে তার এই একাকী অবস্থান নেয়াকে বাস্তবানুগ বা প্রাগম্যাটিক না ও বলতে পারেন। কিন্তু সাইয়্যুদনা ইবরাহীম (আ) আল্লাহ’র নির্দেশ পালনকে বাস্তবতার উপর প্রাধান্য দিয়েছিলেন। একারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাইয়্যুদনা ইবরাহীম (আ) কে নমরুদের ভয়ংকর অগ্নিকুন্ডের মধ্যে হেফাজত করেছিলেন এবং নমরুদকে নগন্য মশা দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। সাইয়্যুদনা মুসা (আ) এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি পরাক্রমশালী ফেরাউনকে আল্লাহ’র একত্ববাদ বা তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছিলেন। তখন শক্তির দিক থেকে মুসা (আ) ফেরাউনের সমকক্ষ ছিলেন না বলে প্রাগমেটিক লোকেরা তার এ আচরণকে ভুল ভাবতে পারেন। ফেরাউনের ভয়ে মুসা (আ)কে প্রায় দশ বছর নির্বাসনেও কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ’র রাস্তায় দৃঢ় থাকায় দিনশেষে আল্লাহ মুসা (আ) কে বিজয়ী করেছেন এবং অত্যাচারী ফেরাউনকে বিপর্যস্ত করেছেন। একই কথা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা) এর ক্ষেত্রেও সত্য। মক্কায় অত্যন্ত প্রতিকূল একটি পরিবেশে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবী (রা) ইসলামের দাওয়াত বহন করেছেন। এক্ষেত্রে তারা অসম প্রতিদ্বন্দীতার মুখোমুখি হয়েছেন। মক্কার কাফেরদরে কর্তৃক মিথ্যা প্রপাগান্ডা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হত্যার বাস্তবতায় আপোসের প্রস্তাবে রাজী হয়ে তারা প্রাগমেটিক হননি। রাসূল (সা) এবং সাহাবীগন বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে একমাত্র শরী’আহ’র প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছেন। যার পরিণতিতে তারাই বিজয়ী হয়েছেন। কারণ বিজয় তো হুকুম প্রদানকারী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকেই আসে। আর তিনিই বাস্তবতাকে মুমিনদের অনুকূলে এনে দেন। তিনিই ভয়কে নিরাপত্তা ও সম্মান দ্বারা প্রতিস্থাপন করেন।
এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) মি’রাজের ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য। মানুষের ক্ষুদ্র জ্ঞানে অসম্ভব একটি সফর ছিল ইসরা ও মিরাজ। রাসূল (সা) এমন একটি সময়ে মিরাজে গিয়েছিলেন যখন বিচক্ষণ স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরা (রা) ইন্তেকাল করেছেন এবং আশ্রয় দানকারী চাচা আবু তালিবও ইইলোক ত্যাগ করেছিলেন। আর মক্কার পরিস্থিতি ছিল দারুণভাবে প্রতিকূল। এই ভয়ংকর প্রতিকূল পরিবেশে ইসরা ও মিরাজ থেকে ফিরে এসে রাসূল (সা) এ বিষয়টি আল্লাহ’র নির্দেশে মক্কাবাসীকে জানাতে চাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় আপাতত না জানানোর ব্যাপারে তার তৎকালীণ স্ত্রী পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু রাসূল (সা) প্রাগমেটিক না হয়ে আল্লাহ’র নির্দেশে তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু আবু জাহেলকে দিয়ে মিরাজের বিষয়টি প্রচার করা শুরু করলেন। কাফেরগণ ইসরা ও মিরাজের ঘটনাকে বাস্তবতাবিবর্জিত ও অসুস্থ মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা বলে প্রপাগান্ডার নতুন জাল বুনতে লাগল। এমতাবস্থায় একদিন কাবা’র সামনে কাফেররা রাসূল (সা)কে বায়তুল মাকদিস সর্ম্পকে বর্ণণা দিতে বলল। আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বায়তুল মাকদিসকে রাসূল (সা) এর সামনে এনে রাখল এবং তিনি (সা) দেখে দেখে কাফেরদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন এবং কাফেররা সেদিন নতশিরে অপমানিত হয়ে চলে গিয়েছিল। প্রাগমেটিক না হয়ে আল্লাহ’র নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করায় সেদিন রাসূল (সা) কাফেরদের ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পেরেছিলেন।
বদর, খন্দক, তাবুক প্রভৃতি জিহাদের বিজয়ও অসম প্রতিদ্বন্দীতার মাধ্যমে এসেছিল। অর্থাৎ সেখানে কাফেরদের সংখ্যা, অস্ত্র ও আয়োজনের বিপরীতে মুসলিমদের সংখ্যা ও প্রস্তুতি ছিল অনুল্লেখযোগ্য। তারপরও বাস্তবতা নয়, তাওয়াক্কুল ও শরী’আহকে প্রাধান্য দেয়ায় আল্লাহ বিজয়ী করেছিলেন।
নবী-রাসূলদের এসব ঘটনা শুনার পর অনেক প্রাগমেটিক লোক এগুলো নবীদের মত বিশেষ মানুষ দ্বারা সম্ভব হিসেবে দেখতে পারে। এবং আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য এইরকম হুকুম মানা বাস্তবসম্মত নয় বলে যুক্তি দেখাতে পারে। কিন্তু আমরা দেখেছি রাসূল (সা) ওফাতের পর সাহাবী (রা), তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনগন এবং তৎপরবর্তী মুসলিমগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাগমেটিক ছিলেন না, বরং শরী’আহ’র অনুবর্তী ছিলেন। রাসূল (সা) এর ওফাতের পর আবু বকর (রা) যখন ধর্মত্যাগ, ভন্ডপীর, যাকাত অস্বীকারকারীদের উদ্ভব হয়েছিল তখন তিনি প্রাগমেটিক না হয়ে এদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। যদিও সেসময় উমর (রা) আবু বকর (রা) কে মদীনায় উম্মুল মুমিনীনদের অরক্ষিত রেখে বাইরে গিয়ে মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই উমর (রা) স্বীকার করেছিলেন যে, আবু বকর (রা) এর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। কারণ তিনি বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তাওয়াক্কুলের সাথে শরী’আহ মেনে করণীয় নির্ধারণ করেছিলেন।
ইসলামের ইতিহাসে তারপর অসংখ্য বিজয় এসেছে। মুসলিমগণ তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেন বিজয় নিশ্চিত করেছিল সামান্য কিছু সৈনিক নিয়ে, মহাবীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবী ক্রুসাডারদের বিশাল সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। তারা কেউই নবী ছিলেন না। বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি একক সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোভুক্ত আরও প্রায় ৪০টি দেশ নিয়ে বিগত ১৮ বছর ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে পুরো আফগানিস্তান তালেবানমুক্ত করতে পারছে না। উল্টো তালেবানরা আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ ভূমি এখনও দখল করে রেখেছে এবং আমেরিকা তাদের সাথে সমঝোতায় বসতে বাধ্য হচ্ছে। তালেবানদের নেই সুপ্রশিক্ষিত বাহিনী, আমেরিকার মত সর্বাধুনিক অস্ত্র-ভান্ডার, পারমাণবিক বোমা, যুদ্ধ জাহাজের বহর। তাহলে বাস্তবতার বিপরীতে গিয়ে কীভাবে এটি সম্ভব হচ্ছে?
তিরমিযী শরীফের একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
‘‘যখন কেউ আল্লাহকে অখুশী করে মানুষকে খুশী করে,তখন তাকে মানুষের মর্জির উপর ছেড়ে দেয়া হয়। আর যখন কেউ মানুষকে অখুশী করে আল্লাহকে খুশী করে,তখন তাকে মানুষের নির্ভরশীলতা থেকে (আল্লাহ) মুক্ত করে দেন।’’
সেকারণে ইসলাম বহন করার সময় কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুন্নাহ’র বাইরে যাওয়া উচিত হবে না। যদি সুন্নাহ’র বাইরে যায় তবে তারা দুনিয়াতে হবে লাঞ্চিত এবং আখেরাতে পাবে মর্মন্তুদ শাস্তি। আর একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে কুরআন এবং সুন্নাহতে রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর যে আদেশসমূহ আমভাবে এসেছে সেগুলো মুসলিম হিসেবে আমরা সবাই মানতে বাধ্য। এক্ষেত্রে নবী কি নবী না, সাহাবী কী সাহাবী না, এটি বিবেচ্য বিষয় নয়।
“বল,যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস,তাহলে আমার অনুসরণ কর,আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু।”(সূরা আল ইমরান:৩১)
“‘রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর,আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন-তা থেকে বিরত হও।”(সূরা হাশর:৭)
উইঘুরের মুসলিমদের ভোগান্তি শেষ হওয়ার এটাই কি সঠিক সময় নয়?

উইঘুরের মুসলিমদের ভোগান্তি শেষ হওয়ার এটাই কি সঠিক সময় নয়?
চীনকে মনে রাখার মতো শিক্ষা দেয়ার এটি কি উপযুক্ত সময় নয়?
সাম্প্রতিক মাসগুলিতে আমরা মুসলিম ভুমির পূর্বপ্রান্তের দেশ পূর্ব তুর্কিস্তানের বসবাসকারী উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীনের আগ্রাসী নীতির নৃশংস বৃদ্ধির খবর শুনেছি। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং তথা চীনা কমিউনিস্ট শাসন কর্তৃক ১ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলমানদের হত্যা ও ২৫ হাজার মসজিদ ধ্বংস করার পর চীনের সীমানার সাথে একে যুক্ত করা হয়েছিল। আটলান্টিক ম্যাগাজিন, বিবিসি ও আল-জাজিরার মতো অন্যান্য মিডিয়া দ্বারা প্রকাশিত তদন্তের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, চীন পূর্ব তুর্কিস্তান প্রদেশের প্রায় দশ লক্ষ মুসলিম বন্দী শিবিরে আটক! তদন্তে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতিতে বলা হয়, শিবিরের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামকে ত্যাগ করার জন্য এই অঞ্চলের উইঘুর মুসলিমদের মগজধোলাই করা, এবং এটি সুপরিচিত যে চীন অন্যতম প্রকাশ্য এক ইসলাম বিরোধী দেশ। ইন্টিলিজেন্স পত্রিকা চীনের ঘোষণাটি প্রকাশ করেছে যে, ইসলাম সংক্রামক রোগ এবং যেকোনো ভাবেই হোক, এমনকি নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমেও চিকিত্সা করা উচিত।
পূর্ব তুর্কিস্তানে ঘটিত অপরাধগুলো ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। আমাদের ভাইদের সেখানে বন্দী করে ফাঁসি দেওয়া হয়, সিমেন্ট এবং কংক্রিট তাদের মুখের মধ্যে ঢেলে দেওয়া হয়, আমদের বোনদের গর্ভধারণ ও জন্ম দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়, পুরুষদের খোজা করা হয়। কাফির চীনা শাসন গোয়েন্দাগিরির জন্য প্রতিটি গৃহে কাফির চীনা নাগরিককে তাদের প্রতিবেশী রাখে এবং চীনা সংস্কৃতির শিক্ষার অযুহাতে তাদের গোপনীয়তা ও পবিত্রতা উপেক্ষা করে। মুসলিমদের বরকতময় রমজানের রোযা রাখতে বাঁধা দেওয়া হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, মুসলিমদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের হুমকির মুখে ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। বিবিসি জানায়, চীনা কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে তারা ত্রি-অশুভ বিষয় মোকাবেলা করতে বাধ্য হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থী মতাদর্শ এবং বিচ্ছিন্নতার জন্য আহ্বান। এসব মিথ্যা স্লোগানগুলির অযুহাতে সরকার বিভিন্ন দমনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
পূর্ব তুর্কিস্তানে উইঘুর মুসলিমদের সাথে এসব ঘটছে এবং কেউই আঙ্গুল তুলছে না, এমনকি মুসলিম বিশ্বের শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নিন্দাও জানানো হচ্ছে না, যেন উইঘুরের জনগণ মুসলিম উম্মাহর অংশ নয়! তারা কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সেই বাণী শুনেনি, যখন তিনি বলেন,
وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا
“আর তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহর রাহে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও”। [নিসা: ৭৫]
পূর্ব তুর্কীস্তান ইসলামী রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। উসমানী খিলাফত ধ্বংস হয়ে মুসলিম বিশ্ব ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রে পরিনত হওয়ার আগ পর্যন্ত চীন এটিকে তাদের সীমান্তের সাথে সংযুক্ত করার সাহসও পায়নি। সুতরাং একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই উইঘুরের নিপীরিত মুসলিমদের মুক্ত করা সম্ভব।
কিভাবে অতীত বর্তমানের সদৃশ্য হয়… দৃশ্যগুলো চলছে এবং একইভাবে দর্শকও!

ইহুদি সত্ত্বার দখলদার সৈন্যরা গত ৩০ জানুয়ারী ফিলিস্তিনের একটি মেয়েকে দখলকৃত আল-কুদস (জেরুজালেম)-এর আল-জাইম চেকপয়েন্টে গুলি দিয়ে ঝাঝরা করে হত্যা করেছে। এই শহীদ একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল, যে তার মৃত্যুদণ্ডের সময় তার স্কুল ব্যাগ বহন করছিল; কথিত ছুরিকাঘাত অপারেশন চালানোর চেষ্টার অভিযোগে তাকে হত্যা করা হয়। দখলদার সৈন্যরা তাকে বাঁচাতে অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের কাছে নিয়ে যেতে বাধা দেয়। তাকে রক্তঝরা অবস্থায় মৃত্যুর জন্য ফেলে রাখা হয়।
অপরাধ ও গণহত্যার ধারাবাহিকতায় আরেকটি অপরাধ যুক্ত হল, যা ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে, এর যুবক পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ ও সন্তানদের বিরুদ্ধে ইহুদি সত্তা কর্তৃক সন্ত্রাসবাদ ও নিষ্ঠুরতাকে কেবল প্রতিফলিত করে, যা তারা তাদের মিথ্যা যুক্তি এবং তাদের তৈরি মিথ্যা প্রেক্ষাপট দিয়ে ন্যায্যতা দেয়। আমরা মানবাধিকার সমর্থক, শিশু ও নারী অধিকার কর্মী কিংবা ইসলামি দেশগুলোর লাঞ্চনার শাসন থেকেও কোন আপত্তি বা উত্থান শুনতে পাইনি। শহীদ, সামাহ মুবারক, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার প্রতি রহম করুন, ১৬ বছরের কম বয়সী ছিল এবং শুধুমাত্র তার বই আর খাতা বহন করত এবং তার হৃদয় ও আচরণে তার বিশ্বাস ও ধর্মকে বহন করত। এর ফলে সে তার মুখ থেকে নিকাব উত্তোলন করতে অস্বীকার করেছিল, যা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করেছিল, ফলে তারা তাকে হত্যা ও মৃত্যুর জন্য রক্তপাতের যোগ্য বলে মনে করেছিল! এমনকি তারা যে ভিডিওগুলি প্রকাশ করেছে সেগুলি কেবল একটি মেয়েকে চেকপয়েন্টে প্রবেশ করতে দেখায়, এবং তারপর তারা তার কাছ থেকে কোনও অপরাধ ছাড়াই গুলি করে তবে কেবল তার নিকাব (পর্দা) না খোলার কারণে। তারা তখন দাবি করা শুরু করল যে সে তাদের মধ্যে একজনকে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেছে! কিভাবে বর্তমান অতীতের সদৃশ্য হয়, যখন তারা শহীদ হাদীল আল-হাশলমনকে হত্যা করেছিল (আল্লাহ তার উপর রহম করুন), তখনও একই কারণ, একই অবস্থা এবং একই দৃশ্যের অবতারনা হয়েছিল।
এই অপরাধটি তথাকথিত আরব লীগ কর্তৃক একটি বিবৃতি প্রদানের সাথে সংঘটিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে এটি ১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিনের অধিকারগুলির পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার কাউন্সিল ডাকা হয়েছিল এবং তাদের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল!! আমরা লজ্জা ও অপমানের এসব কর্তৃত্ব থেকে নিন্দা, আপত্তি, এমনকি শোক প্রকাশও দেখিনি, কিন্তু যখন একজন বসতি স্থাপনকারী বা অধিষ্ঠিত ইহুদি সৈনিককে হত্যা করা হয়, তখন এটি ইহুদীদের কাছে কে এই কৃতকর্ম সম্পাদন করেছে তাকে সোপর্দ করার আগ পর্যন্ত তা বিশ্রাম নেয় না। কত জঘন্য তাদের এই আচরন!
হে বরকতময় অঞ্চল (ফিলিস্তিন)-এর অধীবাসীগণ
কতদিন এই কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে নীরবতা ও হতাশা থাকবে, যারা ইহুদীকে তাদের সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার ব্যাপারে সহায়তা করে!! কতক্ষণ আপনি এই কর্তৃপক্ষের উপর নীরব থাকবেন, যারা কর সংগ্রহ করে কিন্তু অভিভাবকত্ব নেয় না! এটি দালাল কর্তৃপক্ষ এবং ইহুদীদের নিরাপত্তা বাহিনী! আপনার জন্য কি সঠিক সমাধান খোঁজার সময় আসে নি, যা ইহুদীদের উচ্ছেদ করবে, দেশকে মুক্ত করবে এবং সম্মান দেবে? কোন সংগঠন, কোন সম্মেলন, কোন বিবৃতি, কোন পুতুল সরকার ও বিশ্বাসঘাতক শাসক, যারা সস্তাভাবে উম্মাহর ক্ষমতা এবং সম্পদ বিক্রি করে আপনাকে উপকৃত করবে। ইসলামের দ্বারা পরিচালিত শুধুমাত্র একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার মালিকদের অধিকার পুনরুদ্ধার করবে এবং নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও যুবককে রক্ষা করবে। তা হচ্ছে নবুয়্যতের আদলের দ্বিতীয় খিলাফত রাশিদা (সৎকর্মপরায়ন খিলাফত), যা প্রতিটি অন্যায়কারীকে লৌহ হস্ত দ্বারা আঘাত করবে, যারা আত্মীয়তা ও মুমিনদের সাথে অঙ্গীকারকে সম্মান করে না। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন:
فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُهُمْ وَيُحِبُونَهُ أَذِلَةً عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَةٍ عَلَى الكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
“হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী”। (আল-মায়েদা: ৫৪)
আল-রুকবান শরণার্থী শিবিরের শিশুরা কি শীতার্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে মরে যাবে, তবে কি তারা তাদের উদ্ধারের জন্য কাউকে খুঁজে পাবে না

মঙ্গলবার ১৫/১/২০১৯ তারিখে ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, পনেরোটি বিচ্ছিন্ন শিশু, তাদের বেশিরভাগ সদ্য প্রসূত শিশু, সিরিয়াতে মারাত্মক ঠান্ডা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবের কারণে মারা গেছে। এদের মধ্যে ১৩ জন শিশু, যারা এক বছরের কম বয়সী দক্ষিণ-পূর্ব সিরিয়ায় জর্ডান সীমান্তের নিকট আল-রুকবান ক্যাম্পে মারা যায়। আল-রুকবান এবং অন্যান্য শিবিরে মানবিক সাহায্যের গুরুতর অভাব রয়েছে, বিশেষ করে যখন উদ্বাস্তুরা পূর্বের শেষ আইএসআইএস ছিটমহল থেকে ক্লান্তিকর যাত্রা করে পালিয়ে আসে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জিয়ার ক্যাপ্লেয়ার বলেন, আল-রুকবান অঞ্চলের তাপমাত্রা এবং কঠোর জীবনযাত্রার কারণে শিশুরা ক্রমবর্ধমানভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে, “এক মাসের মধ্যে, অন্তত আট সন্তানের মৃত্যু হয়েছে – এদের মধ্যে বেশিরভাগই চার মাস বয়সী এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুর বয়স ছিল মাত্র এক ঘন্টা।”
সিরিয়ান-জর্ডান সীমান্তে আল-রুকবান ক্যাম্পে এই কঠিন জীবনযাপন ও মানবিক অবস্থার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার সিরিয়ার উদ্বাস্তু শরণার্থী বাস করছে, মাটির ঘরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে এবং খাদ্য ও ঔষধের গুরুতর ঘাটতি ভোগ করছে। কয়েকদিন আগে, সংবাদ মাধ্যমটি আল-রুকবান ক্যাম্পের একটি সিরিয়ান শরণার্থী নারীর খবর জানিয়েছে, যে তার তিন সন্তানের জন্য খাদ্য সরবরাহ করতে অক্ষম হওয়ায় নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। ক্যাম্পের সিভিল প্রশাসনের মুখপাত্র খালিদ আল আলী রোববার ১৩/১/২০১৯ এ জার্মান প্রেস এজেন্সি (ডিপিএ)-কে বলেন, আল-রুকবান ক্যাম্পে বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং বিদ্যালয়ের জন্য অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। পাশাপাশি শীতকালীন আগমন উদ্বাস্তুদের ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে। এই মরুভূমি অঞ্চলকে গরম করার জন্য গাছের উপস্থিতি এবং জ্বালানি তেলের সামগ্রী ক্রয়ের সক্ষমতা নেই। শিবির অধিবাসীরা খাদ্য ও শাকসবজিগুলির দাম বৃদ্ধির ভয়ে ভুগছেন, যা শাসন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি।
আল-রুকবান শিবিরের তুলনায় সিরিয়ার অভ্যন্তরে বা বাইরের অন্যান্য শরণার্থী ক্যাম্পের অবস্থা ভাল নয় এবং এই ক্যাম্পের লোকদের এবং তাদের সন্তানদের অবস্থা আল-রুকবান ক্যাম্পের শিশুদের চেয়ে ভাল নয়। তারা সবাই অবিচার, ভোগান্তি ও পরিত্যাগের ক্ষেত্রে সমান। লা হাওয়ালা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ, আল-আলী আল-’আযীম।
সিরিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে দুর্বল মুসলমানদের সমর্থন কোন উপহার বা দাতব্য নয়, বরং ইসলামী ধর্মের ভ্রাতৃসমাজের দায়িত্ব, এবং মহৎ আয়াত ও হাদীসগুলি এর জন্য আহ্বান করে।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন:
( وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ )
“আর তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য চায়, তাহলে তোমাদের দায়িত্ব তাদের সাহায্য করা।”
রাসূল (সা) বলেছেন:
«مَا مِنِ امْرِئٍ يَخْذُلُ مُسْلِماً فِي مَوْطِنٍ يُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ، وَيُنْتَقَصُ فِيهِ عِرْضُهُ إِلا خَذَلَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ، وَمَا مِنِ امْرِئٍ يَنْصُرُ مُسْلِماً فِي مَوْطِنٍ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَتُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ إِلا نَصَرَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ»
“কোন (মুসলিম) মানুষ অন্য কোনো মুসলিমকে পরিত্যাগ করবে না এমন কোনো স্থানে যেখানে তার সম্মান লঙ্ঘন করা হতে পারে যে আল্লাহ তাকে এমন স্থানে স্থানান্তরিত করবেন যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করবে। এবং কোন (মুসলিম) ব্যক্তি কোন জায়গায় কোনো মুসলমানকে সাহায্য করবে না যেখানে তার সম্মানের লংঘন হতে পারে যে আল্লাহ তাকে এমন কোন জায়গায় সাহায্য করবেন যেখানে তার সম্মান লঙ্ঘন হতে পারে এবং যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করে।”
কিন্তু নিপীড়িত ও দুর্বলদের সমর্থন হল সেইসব শব্দ যা জর্দানীয় শাসকদের অভিধানে বিদ্যমান নয়, তার অভিধানে রয়েছে শুধুমাত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র, এবং দাওয়া বহনকারীদের গ্রেফতার করা যারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার কাজ করে। এই শাসন সীমান্তের শরণার্থীদের মুখোমুখি হয়ে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, যারা অবিচার ও অত্যাচার থেকে পালিয়ে এসেছে। এবং একে বন্ধ সামরিক অঞ্চল হিসাবে ঘোষণা করে এবং শিবিরের উপর অবরোধ আরোপ করে, তার নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য এবং ‘সন্ত্রাসীদের’ অনুপ্রবেশকে রোধ করে।
যদিও আমরা জর্দান সরকার কিংবা তার মতো অন্যান্য মুসলিম বিশ্বের শাসকদের অত্যাচারিদের পক্ষে এবং তাদের প্রতি শক্তি ও সমর্থন প্রদর্শনমূলক কোনো অবস্থান দেখতে পাচ্ছি না, তবে আমরা জর্ডানের মুসলমানদের কাছ থেকে সম্মানিত অবস্থান দেখেছি, সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিতাড়িত জনগণ সিরিয়া সীমান্তে আসলে জর্ডান সরকার সিরিয়া থেকে আর উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করতে পারবেনা ঘোষণা দেওয়ার পরেও তারা তাদের ভাইদের গ্রহণের প্রস্তুতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি ইসলামে অনুপস্থিত নয়, যা আমাদের উন্নত চরিত্রের রাসূল (সা) এক দেহ হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং আমরা উম্মাহকে এই কৃত্রিম বিভক্ত সীমানা অপসারণের আহ্বান জানাচ্ছি যা মুসলমানদের একে অপরের সমর্থন ও মুসলিম রাষ্ট্রকে এক রাষ্ট্রের অধীনে একত্রিত করতে বাধা দেয় এবং এক ইমামের দ্বারা শাসিত এক ব্যানারের অধীনে আসতে বাধা দেয়।
বাংলাদেশ কি গরিব নাকি গরিব করে রাখা হয়েছে?

বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হলেই হতদরিদ্র, অপুষ্ট, প্রাকৃতিক দূর্যোগে পর্যুদস্ত একটি জনপদের চিত্র মানুষের চোখে ভেসে উঠে। সচেতন লোকমাত্রই জানে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের ‘মিসকীন’ নামে ডাকা হয়। যদিও বর্তমান সরকারের সময়ে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এ রূপান্তরিত হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা হয়। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র বাংলাদেশ ও ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এর মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পায় না। ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ তকমাটির সাথে সরকার কিছু পরিসংখ্যানের কথা বলছে। সেগুলো হল: মাথাপিছু আয়, দৃঢ় জিডিপি, বিভিন্ন সামাজিক সূচক (স্বাক্ষরতার হার, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতাধীন জনগণ, বাল্যবিবাহ, চিকিৎসা সুবিধার আওতাধীন জনগণ ইত্যাদি) প্রভৃতি। এসবক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে কিনা এটি প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য পরিসংখ্যান একটি ভাল উপায় এবং এসব উপাত্ত অর্জনের প্রক্রিয়ার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। তাছাড়া পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে আমাদের শাসকদের বিশ্বাস করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় যুতসই শাসক জনগণকে ধোঁকা দেয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হবে-এটাই স্বাভাবিক ও নিয়ম।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে পরোক্ষ উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদে প্রবেশ করে। নব্য উপনিবেশবাদে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহ প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও একজন দালাল শাসক দ্বারা ঐ দেশের জনগণকে পরোক্ষভাবে শাসন, শোষন করে। সে পুতুল শাসক কাফের উপনিবেশবাদীদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে, আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী শোষণমূলক অর্থনীতিকে ঢেলে সাজায়, উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে দেশের গণমালিকানাধীন সম্পদ (খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ) তুলে দেয়। বিনিময়ে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ঐ দালাল শাসককে ক্ষমতায় টিকে থাকার গ্যারান্টি প্রদান করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লার মালিকানা এ দেশের জনগণের হলেও উপনিবেশবাদী বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর (শেভরণ, ইউনোকল, কনকো ফিলিপস, এশিয়া এনার্জি, গ্যাসপ্রম, নাইকো প্রভৃতি) কাছে বিভিন্ন সরকার মালিকানার সত্ত্ব বিক্রি করে এবং পরবর্তীতে উচ্চ আর্ন্তজাতিক মূল্যে সেগুলো জনগণের কাছে বিক্রি করে। এভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের কাছে চলে যায় এবং জনগণকে দারিদ্রের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ রাখা হয়।
মোদ্দাকথা, উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এবং তাদের ঘৃণিত জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজকে গরীব হয়ে আছে।
অমিত সম্ভাবনার এক দেশ-বাংলাদেশ। একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য সব যোগ্যতাই বাংলাদেশের রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই সমতল ও উর্বর। দীর্ঘদিন যাবত ক্রমহ্রাসমান উর্বর কৃষিজমি ক্রমবর্ধমান জনগনের খাদ্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করে আসছে । এখানকার প্রায় সব লোক এক ভাষাতেই কথা বলার কারণে তথ্য আদান প্রদান এবং ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা খুবই সহজ । বাংলাদেশের গ্যাস, কয়লা, ইউরেনিয়ামের মজুদ জনগণের জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের রোদ, নদী, বিশাল সৈকতের বাতাস থেকেও শক্তি উৎপাদন সম্ভব। আমাদের রয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত-যাও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। আমাদের সামুদ্রিক জল সীমানাও খনিজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ। তিন দিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ের সারি ও দক্ষিণ দিকে থাকা অসভীর সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশকে সামরিকভাবে ‘ডিফেন্ডারস হেভেন’ এ পরিণত করেছে। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও চীনের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের জনগনের বড় একটি অংশ তরুণ-যাদেরকে সহজেই জনসম্পদের পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনগণ পরিশ্রমী, মেধাবী ও সৃজনশীল। খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন, ণির্মাণ শিল্প, বস্ত্রশিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। এতসব আর্শীবাদ থাকা সত্ত্বেও দূরদর্শী আদর্শিক নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশকে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শাসন, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা উপনিবেশবাদী শক্তি দ্বারা আরোপিত। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস ইসলাম থেকে এসেছে কিন্তু জীবন পরিচালনার সব ব্যবস্থা ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন কিছু থেকে এসেছে। সেকারণে বিশ্বাস ও ব্যবস্থার বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশ এগুতে পারছে না। বাংলাদেশকে যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি পরাশক্তিতে পরিণত করতে চাই তাহলে ইসলামি মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থা লাগবে। আর এরকম ব্যবস্থাই হল খিলাফত ব্যবস্থা। একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
























