তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২বাংলাদেশ কি গরিব নাকি গরিব করে রাখা হয়েছে?

বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হলেই হতদরিদ্র, অপুষ্ট, প্রাকৃতিক দূর্যোগে পর্যুদস্ত একটি জনপদের চিত্র মানুষের চোখে ভেসে উঠে। সচেতন লোকমাত্রই জানে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের ‘মিসকীন’ নামে ডাকা হয়। যদিও বর্তমান সরকারের সময়ে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এ রূপান্তরিত হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা হয়। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র বাংলাদেশ ও ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এর মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পায় না। ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ তকমাটির সাথে সরকার কিছু পরিসংখ্যানের কথা বলছে। সেগুলো হল: মাথাপিছু আয়, দৃঢ় জিডিপি, বিভিন্ন সামাজিক সূচক (স্বাক্ষরতার হার, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতাধীন জনগণ, বাল্যবিবাহ, চিকিৎসা সুবিধার আওতাধীন জনগণ ইত্যাদি) প্রভৃতি। এসবক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে কিনা এটি প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য পরিসংখ্যান একটি ভাল উপায় এবং এসব উপাত্ত অর্জনের প্রক্রিয়ার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। তাছাড়া পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে আমাদের শাসকদের বিশ্বাস করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় যুতসই শাসক জনগণকে ধোঁকা দেয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হবে-এটাই স্বাভাবিক ও নিয়ম।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে পরোক্ষ উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদে প্রবেশ করে। নব্য উপনিবেশবাদে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহ প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও একজন দালাল শাসক দ্বারা ঐ দেশের জনগণকে পরোক্ষভাবে শাসন, শোষন করে। সে পুতুল শাসক কাফের উপনিবেশবাদীদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে, আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী শোষণমূলক অর্থনীতিকে ঢেলে সাজায়, উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে দেশের গণমালিকানাধীন সম্পদ (খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ) তুলে দেয়। বিনিময়ে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ঐ দালাল শাসককে ক্ষমতায় টিকে থাকার গ্যারান্টি প্রদান করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লার মালিকানা এ দেশের জনগণের হলেও উপনিবেশবাদী বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর (শেভরণ, ইউনোকল, কনকো ফিলিপস, এশিয়া এনার্জি, গ্যাসপ্রম, নাইকো প্রভৃতি) কাছে বিভিন্ন সরকার মালিকানার সত্ত্ব বিক্রি করে এবং পরবর্তীতে উচ্চ আর্ন্তজাতিক মূল্যে সেগুলো জনগণের কাছে বিক্রি করে। এভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের কাছে চলে যায় এবং জনগণকে দারিদ্রের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ রাখা হয়।
মোদ্দাকথা, উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এবং তাদের ঘৃণিত জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজকে গরীব হয়ে আছে।
অমিত সম্ভাবনার এক দেশ-বাংলাদেশ। একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য সব যোগ্যতাই বাংলাদেশের রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই সমতল ও উর্বর। দীর্ঘদিন যাবত ক্রমহ্রাসমান উর্বর কৃষিজমি ক্রমবর্ধমান জনগনের খাদ্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করে আসছে । এখানকার প্রায় সব লোক এক ভাষাতেই কথা বলার কারণে তথ্য আদান প্রদান এবং ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা খুবই সহজ । বাংলাদেশের গ্যাস, কয়লা, ইউরেনিয়ামের মজুদ জনগণের জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের রোদ, নদী, বিশাল সৈকতের বাতাস থেকেও শক্তি উৎপাদন সম্ভব। আমাদের রয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত-যাও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। আমাদের সামুদ্রিক জল সীমানাও খনিজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ। তিন দিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ের সারি ও দক্ষিণ দিকে থাকা অসভীর সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশকে সামরিকভাবে ‘ডিফেন্ডারস হেভেন’ এ পরিণত করেছে। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও চীনের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের জনগনের বড় একটি অংশ তরুণ-যাদেরকে সহজেই জনসম্পদের পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনগণ পরিশ্রমী, মেধাবী ও সৃজনশীল। খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন, ণির্মাণ শিল্প, বস্ত্রশিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। এতসব আর্শীবাদ থাকা সত্ত্বেও দূরদর্শী আদর্শিক নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশকে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাংলাদেশের শাসন, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা উপনিবেশবাদী শক্তি দ্বারা আরোপিত। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস ইসলাম থেকে এসেছে কিন্তু জীবন পরিচালনার সব ব্যবস্থা ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন কিছু থেকে এসেছে। সেকারণে বিশ্বাস ও ব্যবস্থার বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশ এগুতে পারছে না। বাংলাদেশকে যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি পরাশক্তিতে পরিণত করতে চাই তাহলে ইসলামি মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থা লাগবে। আর এরকম ব্যবস্থাই হল খিলাফত ব্যবস্থা। একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র: নব্য উপনিবেশবাদের মোক্ষম হাতিয়ার

উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের স্বাভাবিক পরিণতি। ইউরোপে খ্রীস্টান ধর্মযাজক, শাসকশ্রেণী এবং নির্যাতিত সাধারণ জনগণ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মধ্যে শতকের পর শতক ধরে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তারা জীবন থেকে ধর্মকে পৃথকীকরণের প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত- ধর্মনিরপেক্ষতায় উপনীত হয়। এটি ছিল ইউরোপীয়দের পূর্ণজাগরণ। এ পূর্ণজাগরণ ইউরোপীয়দের একটি চিন্তার (অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা) ভিত্তিতে গড়ে উঠা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে বস্তুগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে শিল্প বিপ্লব আসে। কাঁচামাল, পুজি, জ্বালানী ও বাজারের জন্য ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসূহ এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহে প্রত্যক্ষ উপনিবেশ স্থাপন করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল ছিল ব্রিটেন। তার পরের সারিতেই ছিল ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল।
ব্রিটিশদের সর্ম্পকে বলা হয় তারা তাদের মগজের শেষটুকু দিয়ে চেষ্টা করে। যে কারণে তারা অন্যদের চেয়ে একটু বেশীই সফল। শক্তিশালী নৌবাহিনী, ধূর্ত রাজনৈতিক কূটকৌশল, সুদূরপ্রসারী আদর্শিক চিন্তাকে ব্যবহার করে বিশাল উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশরা। তারা যেখানে গিয়েছে সেখানে কেবল ভূমিকে দখল করেনি, সে ভূমির মানুষের মগজকেও দখল করেছে। এর জন্য শিক্ষাব্যবস্থা তথা কালচারের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তাদের মত চিন্তা করতে, জীবনকে দেখতে শিখিয়েছে। যেখানে তারা গিয়েছে সেখানে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করেছে। এতে করে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয় মুসলিম বিশ্বের। কারণ মুসলিমদের রয়েছে নিজস্ব আক্বীদা, শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা-যা কাফির ব্রিটিশদের চেয়ে সম্পূর্ণরূপে পৃথক।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ব্রিটিশদের জন্য প্রত্যক্ষ উপনিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী অর্থনীতি বাস্তবায়নের ফলে উপনিবেশবাদকে তারা নতুন রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিল। এই নতুন রূপের উপনিবেশবাদের নাম হল নব্য উপনিবেশবাদ বা নিও কলোনিয়ালিজম। এখানে ব্রিটিশরা প্রত্যক্ষভাবে কোন ভূমিতে শাসনে না থাকলেও তাদেরই পছন্দনীয় ঐ ভূমির কাউকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। ফলে জনগণের মধ্যে স্বাধীন সার্বভৌমত্বের একধরনের নকল অনুভূতি বিরাজ করতে থাকে-যদিও এ অনুভূতিই শেষ কথা। বাস্তবে এ রাষ্ট্রসমূহ স্বাধীন বা সার্বভৌম নয়। এই দালাল শাসক ঐ ভূমিতে ব্রিটিশদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং ব্রিটিশরা এর বিনিময়ে ঐ শাসককে ক্ষমতার থাকার নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই শাসক এক নায়ক স্বৈরাচার হতে পারে, আবার গণতান্ত্রিকও হতে পারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্বিভূত হয়। তারা মুসলিম এবং অমুসলিম বিশ্বে নব্য উপনিবেশবাদের এ ধারাকে অব্যাহত রাখে।
মুসলিম বিশ্বে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশকালীন সময়ে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশদের শেখানো রাজনৈতিক কালচারের ফলাফল। ব্রিটিশরা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল তারা চলে যাওয়ার পর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো তাদের দেখানো রাজনৈতিক ধারার মধ্যেই থাকে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে-যার প্রতিষ্ঠাতা কোন ভারতীয় নয়, বরং একজন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ- এলান অক্টোভিয়ান হিউম। ব্রিটিশ ওয়েস্ট মিনিস্টার ধারার রাজনীতিতে দুইটি বড় রাজনৈতিক দল থাকে যারা পালাক্রমে জনগণকে শাসন করে। একই চিত্র আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখতে পাই। এ দু’টি দলের মধ্যে একটি থাকে দেশপ্রেমিক ঘরানার এবং অন্যটি জাতীয়তাবাদী ঘরানার। মুসলিম বিশ্বে এদের কোনটি আমেরিকান ব্লকের আবার কোনটি ব্রিটিশ ব্লকের। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরষ্ক, তিউনেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এরকমই।
১. আদর্শিক হওয়ায় দ্বিদলীয় রাজনীতি আমেরিকা, ব্রিটেনের জনগণকে বিভক্ত না করলেও গণতন্ত্র মুসলিম বিশ্বে আরোপিত ব্যবস্থা হওয়ায় জনগণকে বিভক্ত করে। বিধায় রাষ্ট্রের মধ্যে নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা দেখা দেয়। জনগণ ও রাজনৈতিক দলের বিভক্তি উপনিবেশবাদীদের খবরদারি ও দরকষাকষির মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। এভাবে মুসলিম বিশ্বে কাফের উপনিবেশিক শক্তিসমূহের আধিপত্য ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।
২. পুঁজিবাদ বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ জনগণ জুলুমের মধ্যে থাকে এবং ক্ষোভ দানা বাধতে থাকে। কয়েক বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নতুন চেহারা নিয়ে এসে সেই ক্ষোভ প্রশমনের ব্যবস্থা করা হয়। জনগন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও ভোট প্রদানের মাধ্যমে নতুন কাউকে নিয়ে এসে পুরাতন জালিমকে প্রতিস্থাপন করে ক্ষোভকে প্রশমিত করে।
৩. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মিডিয়া কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে এবং জনগণ সভা সমাবেশ করার অধিকার পায়। এভাবেও ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হয়। তবে উপনিবেশবাদীদের পছন্দনীয় শাসকের পক্ষে জনগমত তৈরির ও জনগনের সাথে প্রতারণার জন্যও মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু একই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকায় নতুন মুখও কিছুদিনের মধ্যে জালিম হয়ে উঠে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা উপনিবেশিকদের পছন্দমত শাসক না আসলে সেসব দেশে তারা পছন্দনীয় এক নায়ককে বেছে নেয়। যেমনটি ঘটেছে মিশরে। সেখানে আমেরিকা জনপ্রিয় শাসক মুরসীকে সেনাপ্রধান ফাত্তাহ আল সিসির মত একনায়ক দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছে। এতে গণতন্ত্র ধর্ষিত হলেও উপনিবেশবাদীদের কোন ক্ষতি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ স্বৈরশাসক আমেরিকা ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র রপ্তানি করতে আমেরিকা ইরাক আফগানিস্তানকে চরদখলের মত জবরদখল করলেও মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের নিয়ে তাদের কোন সংকোচ বোধ বা অ্যালার্জি নেই। এ থেকে বুঝা যায়, মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র নিয়ে আমেরিকা ব্রিটেন যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশী চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন সেসব দেশে যে কোন প্রকারে নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখার ক্ষেত্রে। কারণ নব্য উপনিবেশবাদের মাধ্যমে ধূর্ততার সাথে পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলিম বিশ্বের জনগণ ও সম্পদের উপর কর্তৃত্ব, খবরদারি ও আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। আর মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র এক্ষেত্রে একটি মোক্ষম হাতিয়ার।
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও সঠিক ইসলামি ভাবনা

নির্বাচনকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবার সরগরম হয়ে উঠেছে। পশ্চিমাদের অনুকরণে ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রনে গড়ে উঠা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানেই হল জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেমের সস্তা বুলি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াইয়ের হীন মহোৎসব। ইসলামে রাজনীতি বা সিয়াসাহ একটি ফরয বিষয়-যার অর্থ হল জনগনের দেখভাল করা। অপরদিকে পুঁজিবাদে রাজনীতি এর অথনীতিকে ঘিরে আবতিত হয়। সেকারণে পুঁজিবাদে রাজনীতি হল সাধারণ জনগনকে জিম্মী করে অথবা তাদেরকে ধোকা দিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণীর পুঁজি বাড়ানোর একটি ঘৃণ্য কৌশল। মুখে উন্নয়ন, জনগনের সেবা ইত্যাদি শ্লোগান থাকলেও, পুঁজিবাদী রাজনীতি হল পুঁজিপতি শাসকশ্রেণীর ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম। একারণে বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থে আইন প্রণয়ন করে। ছলে বলে কৌশলে জনগণের কষ্টার্জিত সম্পদ আইনের মাধ্যমে নিজেদের পকেটে পুড়ে নেয়। একারণে এইসব রাজনীতিবিদ ও এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা আম গাছ লাগিয়ে জাম খাওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখার মতই অবান্তর।
আর এ ক্ষেত্রে নির্বাচন হল পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শাসকের চেহারা পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। নিবাচনের মাধ্যমে কখনওই ব্যবস্থা পরিবর্তন হয় না, বরং নির্বাচন হল একটি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়া মাত্র। মিডিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা উপনিবেশিকগন তাদের এদেশীয় সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ এজেন্টদের মাধ্যমে এ নির্বাচনকে জনগণের পছন্দমত শাসকশ্রেণী বেছে নেয়ার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু এসব নির্বাচন এজেন্ট রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে উপনিবেশিক প্রভূদের দরকষাকষির একটি সুগোগ করে দেয়। দরকষাকষির মাধ্যমে একটি রফা হওয়ার পর পছন্দনীয় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন নামক সাজানো নাটকের মাধ্যমে ক্ষমতায় নিয়ে আসা হয়। এসব নির্বাচনে জনগণকে প্রভাবিক করতে ব্যবহার করা হয় উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাসমূহকে। এ বাস্তবতা প্রতীয়মান হয় যখন বতমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসংখ্যবার সংসদে ও সংসদের বাইরে বলে, ‘২০০১ সালে গ্যাস বিক্রি করতে রাজি হইনি বলে ক্ষমতায় আসতে পারিনি।’ স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যবধি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণে সম্পূণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
১. ওয়াল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোট ২০১৭: চীন ভারতের চেয়েও দ্রুতহারে ধনী বাড়ছে বাংলাদেশে (সূত্র: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)।
বাংলাদেশের অতি ধনীদের সম্পদ প্রতিবছর ১৭.৩% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির দ্বিগুনেরও বেশি। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির চেয়ে বেশি। এর অর্থ হল ধর্মনিরপেক্ষে পুঁজিবাদী রাজনীতি সম্পদকে কেবলমাত্র ধনীদের মধ্যে কুক্ষিগত ও কেন্দ্রীভূত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ইত্যাদি প্রচারণা উদ্দেশ্যমূলক পরিসংখ্যানিক ও রাজনৈতিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
২. মাথাপিছু ঋণ ৬০ হাজার টাকা (সূত্র: ০৯জুন- ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)। এ সুদের পরিমাণ পদ্মা সেতুর ব্যয়ের দ্বিগুন।
ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাজনীতি ও বিশ্বব্যাংক আই এম এফ নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি আমাদের সাধারণ জনগনের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে মাথাপিছু ঋণ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। এ ঋণ পরিশোধের জন্য সরকার প্রতিটি বাজেটে জনগণের উপর নিপীড়নমূলক ভ্যাট ও কর বাড়িয়ে চলেছে। অপরদিকে শেভরণ, কনকো ফিলিপস এর মত উপনিবেশিক মাল্টিন্যাশনাল জায়ান্টদের স্বার্থে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে চলেছে এবং সামিট পাওয়ারের মত দেশী বিদেশী লুটেরাদের পকেটে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ তুলে দিতে বিদ্যুতের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলেছে।৩. What makes Dhaka the second worst city to live in? (বসবাসের ক্ষেত্রে কী ঢাকাকে দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম নগরীতে পরিণত করল?) (সূত্র:১৭ আগস্ট, ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউন)
৪. Global Innovation Index 2018: Bangladesh ranked least innovative country in Asia (বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে সবনিম্ন উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ) (সূত্র: ১৮ সেপ্টেম্বর,২০১৮, ডেইলি স্টার)
ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসকেরা আমাদেরকে এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দিয়েছে যা মানুষের সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে অন্তরায়। জাতি হিসেবে আমরা পরিশ্রমী ও মেধাবী হওয়া সত্বেও শাসকশ্রেণীর ভিশন না থাকায় আমাদের দেশ থেকে ক্রমাগত মেধা ও সৃজনশীলতা পাচার হয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেট খেলা, রাস্তার সৌন্দযবর্ধন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকার খরচ করলেও গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির পেছনে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন প্রয়াস দেখা যায় না-যদিও বলা হয় বাজেটের শতকরা ১৫ ভাগ মানবস্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয়।
৫. দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ২০১৮)
ঘরে ঘরে চাকুরী দেয়ার সস্তা শ্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও ১৬ কোটি মানুষে মধ্যে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। দ্য ইকোনিমিস্টের মতে বাংলাদেশে স্নাতকদের মধ্যে ৪৭% বেকার। এ করুণ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কোন সদিচ্ছা বা পরিকল্পনাও এসব অযোগ্য শাসকদের মধ্যে দেখা যায় না।
৬. ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউন রিপোট, অর্থ মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী দেশে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ১৩১৬৬৬ কোটি টাকা।
এ টাকা সংগ্রহে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। বরং সরকার জনগণের উপর বিভিন্নভাবে কর ও ভ্যাট বৃদ্ধির মাধ্যমে জুলুম চাপিয়ে দিচ্ছে। কিছু দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদকে ব্যাংক থেকে জনগণের অর্থ লুটপাটের পথ সুগম করে দিচ্ছে সরকার। ২০১২ সালে হলমার্ক গ্রুপ কর্তৃক সোনালী ব্যাংকের ৩৬০০ কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় এবং বেসিক ব্যাংক কর্তৃক ২০১০-২০১৩ সালে ৫০০০ কোটি টাকা ঋণ প্রতারণার কেলেঙ্কারিতে লজ্জিত না হয়ে এই সরকার এসব লুটেরাদের রক্ষার জন্য ব্যাংকগুলোকে অনৈতিক ভর্তুকি প্রদান করে চলেছে। উপরন্তু, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) এই খাতে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যাতে কষ্ট করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতকারী এসব “সম্মানিত উদ্যোক্তাদের” ঋণ পরিশোধে সহায়তা দেয়া যায়, যা দেশের মানুষের সাথে পরিহাস করারই নামান্তর।
৭. ১২ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত অপর এক রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৭ সালে গুমের শিকার হয়েছেন মোট ৮৬ জন-যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট শেয়ার করা সাবেক কূটনীতিবিদও রয়েছেন।
এখানে মাত্র ৭ টি উদাহরণ দেয়া হল। এরকম আরও অসংখ্য তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার প্রকৃত বাস্তবতা আমরা উপলদ্ধি করতে পারি।
বাংলাদেশে নির্বাচনের পর নির্বাচন হয়েছে। অথচ কোন নির্বাচনের মাধ্যমে এমন সরকার আসেনি যে জনগণের আশা আকাংখা অনুযায়ী দেশকে শাসন করেছে। আমরা আগেই বলেছি নির্বাচনের মাধ্যমে যেহেতু একটি ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখা হয় সেহেতু এর মাধ্যমে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই বিগত নির্বাচনগুলোর মত আসন্ন নির্বাচনও সুনিশ্চিতভাবে জনগণের জন্য সত্যিকারের পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসবে না। কেননা বিএন পি বা বিএনপি যুক্তফ্রন্ট জোট ইত্যাদি আওয়ামীলীগকে প্রতিস্থাপন করলেও তারা একই ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে। এমতাবস্থায় আমাদের মাহী বি চৌধুরীর প্লান বি এর চটকদার কথার ফাঁদে পড়লে চলবে না। বি চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না বা ডক্টর কামালের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাজনীতির মোহে বিভ্রান্ত হলে চলবে না। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদ সবসময়ই কপট, অসাধু ও দূনীতিবাজ শাসক তৈরি করে। আর এ ব্যবস্থা আমাদের মাকিন-ব্রিটিশ-ভারত উপনিবেশিক বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ রাখবে; বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর নিয়ন্ত্রনাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর জুলুমের মধ্যেই বেধে রাখবে। এই ব্যবস্থায় আমাদের বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থা আমাদের খনিজ সম্পদের উপর উপনিবেশিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রন থেকে মুক্ত করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থা সম্পদের বৈষম্য দূর করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থায় উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়নি এবং কখনও সম্ভব হবেও না, এই ব্যবস্থা জনগণের সম্পদ লুটপাট ঠেকাতে পারেনি এবং পারবেও না। ব্যক্তি, দল বা কোন জোটের পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন আসবে না। বরং এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত, পক্ষপাতশূন্য, পূণাঙ্গ ও জবাবদিহীতামূলক ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে হবে-যা রহমত ও একমাত্র দ্বীন বা ব্যবস্থা হিসেবে মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জন্য মনোনীত করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘…আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম..’ (সূরা মায়েদাহ:৩)
মুসলিম হিসেবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে মেনে নিতে পারি না। এটি কাফেরদের জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের আক্বীদা-যা পুরোপুরি হারাম-যেভাবে একজন মুসলিমের জন্য মদ খাওয়া হারাম, সুদ খাওয়া হারাম, জিনা করা হারাম। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের মধ্যে সব ধর্মের সমান সুযোগ নয়, বরং এর মানে হল ইসলাম কেবলমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে থাকবে এবং জীবনের আর কোন অংশে ইসলাম থাকবে না। অথাৎ আমাদের সামাজিক জীবন, অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক জীবন, বিচারকার্য কোথাও ইসলাম থাকবে না। কোথাও ইসলাম থাকবে না মানে হল আল্লাহ’র হুকুম থাকবে না এবং আল্লাহ’র সাবভৌমত্বের বদলে মানুষের সাবভৌমত্ব মেনে নিতে হবে। অথচ কুরআন এবং সুন্নাহতে মানুষের সামগ্রিক জীবন সম্পর্কে স্রষ্টার নিদেশনা ও হুকুম রয়েছে-যা মানা আমাদের জন্য ফরয বা বাধ্যতামূলক। একজন মুসলিমের জন্য ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করা (নামাজ পড়া, রোযা রাখা, হজ্জ করা ইত্যাদি) এবং বাদবাকী জীবনে (সামাজিক জীবন, অথনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক জীবন, বিচারকার্য ইত্যাদি) মানবরচিত আইন দিয়ে পরিচালনা করা ইসলামে নিষিদ্ধ অথাৎ তার জীবনের সবক্ষেত্রে আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা যেভাবে হারাম সেভাবে তা থেকে উদ্ভুত যে কোন ব্যবস্থা বা সমাধানও (পুজিবাদ, গণতন্ত্র) হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘..তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং বাকী অংশ অবিশ্বাস কর? যদি এরূপ কর, তবে তোমরা দুনিয়ার জীবনে হবে লাঞ্চিত এবং আখেরাতে তোমাদের জন্য রয়েছে মমন্তুদ শাস্তি..।’ (সূরা বাক্বারা:৮৫)
কেবলমাত্র ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা তার জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা প্রত্যেকটি ব্যক্তি পযায়ে গিয়ে নিশ্চিত করবে এবং জিডিপি, জিএনপি, মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যানিক প্রতারণা দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিবে না। খলিফা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তির কমসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। মাহকামাতুল মাজালিম, মাজলিশ আল উম্মাহ ও ইসলামি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে শাসকশ্রেণীর জবাবদিহীতা সুনিশ্চিত করা হবে। প্রতিরক্ষা শিল্পকেন্দ্রিক ভারী শিল্প নিভর অথনীতি হওয়ায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইসলামী অথনীতির মূলনীতি হবে, সম্পদ যাতে কেবলমাত্র ধনীদের মধ্যে পরিগ্রহ না করে। ইসলামী অথনীতির সুশীতল ছায়ায় সাধারণ জনগণ ভ্যাট ও আয়করের জুলুম থেকে রক্ষা পাবে ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। তাকওয়া হবে রাষ্ট্রের জ্বালানী। মসজিদের ইমাম সাহেব যেভাবে নামাজে দূনীতি করেন না তেমনিভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের ইমামও শাসনকায পরিচালনার ক্ষেত্রে দূনীতি করবেন না। কেননা দু’টোই ইবাদত। গণমালিকানাধীন সম্পত্তি (খনিজ সম্পদ, নদী, চারণভূমি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) রাষ্ট্রীয় তত্তাবধানে প্রয়োজন অনুযায়ী জনগণের জন্যই ব্যয় করা হবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মত কোন ব্যক্তি বা বহুজাতিক কোম্পানিকে গণমালিকানাধীন সম্পত্তির মালিকানা বা অংশীদার করা হবে না। অন্যান্য ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সাপেক্ষে গণমালিকানাধীন বিশাল সম্পদ যখন খিলাফত রাষ্ট্রের তত্তাবধানে জনগণের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী বন্টন করা হবে তখনই জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর সাধ্যমত বিলাসপণ্যের চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে। আর তখনই খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ এর সময়ের মত এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যখন যাকাত নেয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া হবে বিরল ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আর জনপদের অধিবাসীরা যদি ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি আসমান ও জমীনের সব নেয়ামত উজাড় করে দিতাম।…’ (সূরা আল আ’রাফ:৯৬)
খিলাফত রাষ্ট্র আমাদের অবশ্যই অথনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিবে। তবে কেবলমাত্র এই অথনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা কাজ করব না। বরং কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা এ সাহাবার শক্তিশালী ও প্রামাণিক দলিল রয়েছে যা সাব্যস্ত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা একটি গুরুত্বপূণ ফরয। এটি উম্মুল ফারায়েজ তথা সকল ফরযের মা, অর্থাৎ এটি সবচেয়ে মৌলিক ফরয। কারণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা না করলে ইসলামের অনেক ফরজ হুকুম অবাস্তবায়িত থেকে যায়। যেমন: সব ইসলামী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, হুদুদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয়ভাবে জিহাদ ঘোষণা করা ইত্যাদি। তাই আমাদের প্রতিটি মুসলিমের কালবিলম্ব না করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীণ হতে হবে। কারণ বতমান ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তাহীন, অপমানজনক ও জুলুমের অবস্থা থেকে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সম্মানের জীবনে উত্তরণের জন্য যারপরনাই প্রচেষ্টা ও ত্যাগের বিকল্প নেই। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আমি ততক্ষণ পযন্ত কোন জাতির ভাগ্যের পরিবতন করি না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের পরিবতনে সচেষ্ট হয়…।’ (সূরা রা’দ:১১)
‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের আল্লাহ ওয়াদা দিচ্ছেন যে, তিনি পৃথিবীতে তাদের শাসন কতৃত্ব দান করবেন, যেভাবে তিনি দান করেছিলেন পূববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে যাকে তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবতে নিরাপত্তা প্রদান করবেন…।’ (সূরা নূর:৫৫)
উইগুর: দশ লক্ষাধিক বন্দির মুসলিম জনগোষ্ঠী

چین و عرب ہمارا، ہندوستان ہمارا
مسلم ہیں ہم، وطن ہے سارا جہاں ہمارا“চীন ও আরাব হামারা, হিন্দুস্তান হামারা,
মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ হামারা…”– ১৯১০ সালে মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে লেখা আল্লামা ইকবাল [১৮৭৭-১৯৩৮]-এর বিখ্যাত গান “তারানা-ই-মিল্লি” [জাতীয় সঙ্গীত] এভাবেই শুরু। ইকবাল যখন বলছিলেন: “চীন ও আরব আমাদের, ভারতবর্ষ আমাদের / মুসলিম আমরা, সারা পৃথিবীই আমাদের দেশ…” – তখন ইকবাল কি “চীন” বলতে আমরা এখন যে “চীন” রাষ্ট্রকে চিনি, সেটাকে বুঝিয়েছিলেন? এই “চীন” তো কখনোই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না! তাহলে?
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে “উইগুর” নামে বিশ্বের এক নিপীড়িত জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল।
আসলে ইকবালের সময়কালে “চীন” বলতে বর্তমান মধ্য এশিয়াকে বোঝাত – কোনো একক রাষ্ট্র বা রাজত্বকে বোঝাত না।
সেই মধ্য এশিয়ার আরেকটি প্রাচীন পরিচয় “তুর্কিস্তান” নামে। এই নামে অবশ্য কখনো কোনো স্বাধীন দেশ তৈরি হয়নি। “তুর্কিস্তান” শব্দের আক্ষরিক অর্থ “তুর্কিদের দেশ”। পারস্যের ভূগোলবিদরা প্রাচীন তুর্কি জাতিসমূহের আবাসস্থল বোঝাতে সর্বপ্রথম “তুর্কিস্তান” শব্দের ব্যবহার করেন। বর্তমান ইরান থেকে চীন পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকাটিকেই “তুর্কিস্তান” হিসেবে অভিহিত করা হতো। ইরানের উত্তরে তুর্কিস্তান ও দক্ষিণে মক্কার অবস্থান ছিল বলেই ইরানের বিখ্যাত কবি শেখ সাদী মানবজীবনের লক্ষ্য ও পথের বৈপরীত্য বোঝাতে লেখেন:
ترسم نرسی به کعبه ای اعرابی
این ره که تو میروی به ترکستان[তারসাম না রসি বা-কাবা এ্যায় আরাবী
ই রাহকে তু মিরোবি বা-তুর্কিস্তানাস্ত]
“আমার ভয় হচ্ছে তুমি কাবায় পৌঁছাবে না, হে যাযাবর!
কারণ তুমি যেদিকে যাচ্ছ, তা তুর্কিস্তানের পথ।”
[“গুলিস্তাঁ“, দ্বিতীয় অধ্যায়, ষষ্ঠ কাহিনী থেকে উদ্ধৃত]আসলে গত শতাব্দীতে জাতিরাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্ধারিত হওয়ার আগে আরব, চীন, ভারত, পারস্য বা তুর্কিস্তান বলতে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে বোঝাত না, বরং একেকটি বিস্তৃত এলাকাকে বোঝাত। এসব এলাকার রাজনৈতিক সীমানা বা রাষ্ট্রীয় আকার একেক সময় একেক রকম হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সীমানার এসব ভাঙাগড়ার মাঝেই কোনো কোনো জনগোষ্ঠী আটকে গেছে জাতিরাষ্ট্রের সীমান্তের কাঁটাতারে। রোহিঙ্গারা যেমন আটকে গেছে উগ্র বার্মিজ জাতীয়তাবাদের কাছে, তেমনিভাবে চীনের উগ্র জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনে আটকে গেছে উইগুর জনগোষ্ঠী। দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের মতোই জাতিরাষ্ট্রের সীমানা, ভাষা ও ধর্মের পার্থক্য।
তুর্কিস্তানের পূর্ব অংশে উইগুর জনগোষ্ঠীসহ মধ্য এশিয়ার আরো আরো কিছু তুর্কি জনগোষ্ঠী [যেমন, উজবেক, কিরগিজ, কাজাখ, তাজিক ইত্যাদি] বাস করে। এই পূর্ব তুর্কিস্তানের অবস্থান চীনের সীমানা নির্দেশক বিখ্যাত মহাপ্রাচীরের বাইরে। তাই পূর্ব তুর্কিস্তান ঐতিহাসিকভাবে চীনের অংশ নয়, বরং মধ্য এশিয়ার অংশ। তবে বর্তমানে ওই অঞ্চলটি শিনচিয়াং (Xinjian) নামে চীনের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ।
উইগুররা পূর্ব তুর্কিস্তানে কবে থেকে বসবাস করে – সেটা নিয়ে উইগুরদের ও চীনা সরকারের পরস্পরবিরোধী মতামত আছে। উইগুর স্কলার মুহাম্মদ আমিন বুগরা দাবি করেন, উইগুররা ওই অঞ্চলে অন্তত ৯০০০ বছর আগে থেকে বসবাস করছে। আরেক উইগুর স্কলার তুরগুন আলমাসের মতে, তুর্কিস্তানে উইগুরদের বসবাস ৬৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে। ওয়ার্ল্ড উইগুর কংগ্রেসের মতে, ৪০০০ বছরের বেশি সময় ধরে উইগুরদের পূর্ব তুর্কিস্তানে বসবাসের তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।
অন্যদিকে চীনা সরকারের দাবি, নবম শতাব্দীতে উইগুররা মঙ্গোলিয়া থেকে ওই অঞ্চলে বসবাসের জন্য আসে।
তবে পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন মমি বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, উইগুরদের তুর্কি পূর্বপুরুষরা অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ সাল থেকে সেখানে বসবাস করত।
আসলে ইউরোপের বিভিন্ন যাযাবর গোত্র আজ থেকে ৬ হাজার বছর আগে থেকেই মধ্য এশিয়া ও চীনের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি জমায়।
চীনের প্রাচীন ইতিহাসেও উল্লেখ আছে, চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বাইরে “লম্বা চুলবিশিষ্ট সাদা দেহের” [ইউরোপিয়ান] মানুষরা বসবাস করতো। [“The Tarim Mummies”, J. P. Mallory and Victor H. Mair, p. 55]
পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন যাযাবর গোত্রের স্বাধীন কনফেডারেশন শিয়োগনু (Xiongnu) শাসন চলছিল।
প্রাচীন বাণিজ্য পথ Silk Route এই অঞ্চল দিয়েই চীন থেকে ইউরোপের দিকে গেছে। ফলে এই অঞ্চলটির স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব ছিল ব্যাপক।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে চীনের হান সম্রাট উ (Wu) প্রথমবারের মতো পূর্ব তুর্কিস্তান অঞ্চলটি চীনের দখলে নেয়। তখন এই অঞ্চলটির চীনা নাম ছিল শিয়ু (Xiyu) যার অর্থ পশ্চিম অঞ্চল।
ইসলামের আবির্ভাবের আগে উইগুররা মূলত বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিকের শাসনামলে (৭০৫-৭১৫) খোরাসানের গভর্নর কুতায়বা ইবন মুসলিম মধ্য এশিয়া/তুর্কিস্তানের বিশাল ভূখণ্ডকে উমাইয়া খিলাফতের অধীনে আনেন। কুতায়বা ৭১৫ সালে চীনের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পূর্ব তুর্কিস্তানের তৎকালীন রাজধানী কাশগর জয় করেন। চীনে তখন তাং রাজবংশের শাসন চলছিল এবং সেটা ছিল চীনা সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কাশগর জয়ের পর কুতায়বা চীনের মাটিতে পা রাখার শপথ নেন এবং তাঁর নিয়ে সেনাবাহিনী চীনের প্রাচীরের দিকে অগ্রসর হন। চীনের তৎকালীন রাজা শুয়ানজং (Xuanzong) আরব সৈন্যদের আগমনের সংবাদে এতটাই ভীত হয়ে পড়েন যে, তিনি একটি প্রতিনিধি দলকে চীনের মাটিসহ কুতায়বার কাছে পাঠান এবং বলেন যে, তিনি উমাইয়া খিলাফতকে জিজিয়া কর দিতে রাজি আছেন এবং কুতায়বা আর না এগিয়ে রাজার পাঠানো চীনের মাটিতে পা রেখে তাঁর শপথ পূরণ করুক!
তবে উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে কুতায়বাকে ফিরে আসতে হয় এবং পূর্ব তুর্কিস্তান আবারও চীনাদের দখলে চলে যায়।
পরবর্তীতে মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি সুলতান সাতুক বুগরা খান গাজী [মৃত্যু: ৯৫৫ সাল] দশম শতাব্দীর মাঝামাঝিতেতে কাশগর পুনরায় জয় করেন এবং পূর্ব তুর্কিস্তানে ইসলামী শাসন চালু করেন।
তখন থেকে উইগুররা ইসলাম গ্রহণ করা শুরু করে। তুর্কি Kara-Khanid Khanate-দের শাসনামলে পূর্ব তুর্কিস্তান ও রাজধানী কাশগর ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ-সময়ে শত শত উইগুর মুসলিম স্কলার পুরো দুনিয়ায় খ্যাতিমান হন, হাজার হাজার গ্রন্থ এ-সময়ে রচিত হয়। বিখ্যাত উইগুর স্কলার আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী (১৯১২-১৯৭১) ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায় ১৯৬০-এর দশকে “হেড মাওলানা” ছিলেন। তাঁর নামে আলিয়া মাদ্রাসায় একটি হল আছে। তাঁর কবর আজিমপুর গোরস্তানে।
১৮৭৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব তুর্কিস্তানে সমৃদ্ধ ইসলামী রাজত্ব চালু থাকে। চীনের মাঞ্চু সাম্রাজ্য ওই বছর থেকে পূর্ব তুর্কিস্তানে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। ১৮৭৬ সালের আগস্টে চীনা জেনারেল Zuo Zongtang-এর নেতৃত্বে পূর্ব তুর্কিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ উরুমচি (Ürümqi) শহর দখল করে নেয় চীনারা। পরের বছর রাজধানী কাশগরের পতন ঘটে। এভাবে ধাপে ধাপে পুরো পূর্ব তুর্কিস্তান মুসলিমদের হাত থেকে চীনাদের হাতে চলে যায় এবং ১৮৮৪ সালের ৪ নভেম্বর চীনের মাঞ্চুরা পূর্ব তুর্কিস্তানকে “শিনচিয়াং” (Xinjian অর্থ নতুন সীমান্ত) নামে চীনের নতুন প্রদেশে পরিণত করে। তখন থেকেই উইগুর মুসলিমদের পরাধীনতা ও জাতিগত দুর্দশার সূচনা হয়। এই সময়কালেই আল্লামা ইকবাল তাঁর “তারানা-ই-মিল্লি”-তে লেখেন: “চীন ও আরাব হামারা” অর্থাৎ তুর্কিস্তান মুসলিমদেরই। কিন্তু মধ্য এশিয়ার ওই প্রান্তটি কি উইগুরদের দাবিকৃত পূর্ব তুর্কিস্তান, নাকি চীনাদের দাবিকৃত Xinjian (নতুন সীমান্ত) – সেই প্রশ্নের মীমাংসাতেই এখনো আটকে আছে ওই এলাকাতে বসবাসরত দেড় কোটি উইগুরের জাতিগত আত্মপরিচয়।
১৯১১ সালে চীনের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীরা চীনের মাঞ্চু রাজবংশকে উৎখাত করে এবং সান ইয়াত-সেনের নেতৃত্বে চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনাদের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে উইগুররা লড়াই চালিয়ে যায়। বিশেষত ১৯৩৩ সালে ও ১৯৪৯ সালে দু’টি স্বল্পমেয়াদী স্বাধীন “পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র” গঠিত হয়েছিল।
১৯৪৯ সালে চীনে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে গঠিত স্বাধীন “পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র”-কে মাও বন্দুকের জোরে তাঁর নবঘোষিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। মাওয়ের নিজেরই বিখ্যাত উক্তি: “Political power grows out of the barrel of a gun”. [বন্দুকের নলই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস]
মাও বলতেন, “Politics is war without bloodshed while war is politics with bloodshed”. মাও তাঁর নিষ্ঠুর সেনা অফিসার Wang Zhen-কে স্বাধীনতাকামী উইগুরদের উপর লেলিয়ে দেন। জেনারেল Wang Zhen-এর নেতৃত্বাধীন সেনা অভিযানে ১০ লক্ষাধিক উইগুর নিহত হয়, প্রায় ২৫ হাজার মসজিদ ধ্বংস করা হয়। Wang Zhen ছিলেন শিনচিয়াংয়ে মাওয়ের নিয়োগকৃত সামরিক সরকারের প্রধান। তিনি ভয়াবহ নৃশংসতার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি Xinjian থেকে মাও-কে লিখতেন যে, উইগুররা হচ্ছে “গোলযোগ সৃষ্টিকারী সংখ্যালঘু” (a troublemaking minority) এবং পরামর্শ দিতেন যে, ভবিষ্যৎ সমস্যা এড়ানোর জন্য উইগুরদেরকে “সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন” (thoroughly wiped out) করে দিতে হবে!
বোঝাই যাচ্ছে কেন উইগুর মায়েরা তাদের শিশুদের ভয় দেখায় যে, “ভালো হয়ে যাও, নয়তো Wang Zhen এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে!” ১৯৯৩ সালে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে Wang Zhen-এর মৃত্যু ঘটলে তাঁর মৃত্যুসংবাদে The New York Times লিখেছিল:
After the Communist victory in 1949, Wang Zhen was assigned to tame the northwest Xinjiang region, home to Muslims of Turkish extraction. He subdued the area with efficiency and brutality, and it is said that some mothers in Xinjiang still warn their children to be good “or else Wang Zhen will come and get you.”
উইগুরদের প্রতি চীনা কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ এখনো একই রকম আছে। ব্যাপক নির্যাতন, গ্রেফতার, গুম ইত্যাদি উইগুরদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ! উইগুর মুসলিমদের রোজা, হিজাব, দাড়ি সবকিছুতেই চীনা সরকার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তেলসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদে ভরপুর Xinjian প্রদেশটিতে চীনারা নিয়মিতই বিভিন্ন পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ চালাতে থাকে। The Economist-এর ভাষায়, চীনের অধীনে Xinjian প্রদেশটি “বিশ্বের নজিরবিহীন পুলিশি রাষ্ট্র”-তে পরিণত হয়েছে।
দশ লক্ষাধিক উইগুরকে চীনারা বন্দি রেখেছে বলে জাতিসংঘের একটি কমিটির সাম্প্রতিক তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ খবরটি পুরোপুরি অস্বীকার করেনি, তবে তাদের ভাষায় ওই ১০ লক্ষাধিক উইগুর কোনো বন্দিশিবিরে নয়, বরং Re-education ক্যাম্পে আছে!
চীনের এসব তথাকথিত Re-education ক্যাম্প যে কেমন, সেটা বোঝা যায় সেখান থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন এমন উইগুর নাগরিকদের বক্তব্যে। এরকম কয়েকজনের সাথে কথা বলেছে বিবিসি। ওমির নামে একজন উইগুর বলেছেন, “তারা আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাকে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হতো। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটাতো। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সুই দিয়ে শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এসব যন্ত্রপাতি রাখা হতো। এসময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করত সেটাও আমি শুনতে পেতাম।”
চীনের দেড় কোটি উইগুর মুসলিম কেন এমন ভয়াবহ পরিবেশে আছেন, সেটার উত্তর হয়ত আল্লামা ইকবাল ও শেখ সাদী তাঁদের উপরে উদ্ধৃত লেখাতেই দিয়ে গেছেন: বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব ভুলে মুসলিম উম্মাহ এখন কাবার পথ ছেড়ে উল্টো পথে চলতে শুরু করেছে। তাই এখন আর খলিফা ওয়ালিদের মতো কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নেই, তাই এখন আর কুতায়বা কিংবা সুলতান বুগরা খানের মতো কোনো সামরিক কমান্ডার নেই!
লিখেছেনঃ Sk Omar Rasel
মূল লেখাঃ উইগুর: দশ লক্ষাধিক বন্দির মুসলিম জনগোষ্ঠীকুরআনকে যেভাবে বুঝা উচিত ছিল

পবিত্র কুরআন হল সেই গ্রন্থ যা সাহাবা (রা) এর জীবনে ব্যক্তিগতভাবে এবং সামষ্টিকভাবে ইসলাম গ্রহণের আগের জীবন ও পরের জীবনের মধ্যে ব্যাপক পাথর্ক্য গড়ে দিয়েছিল। নিষ্ফলা মরুভূমি ও বর্বর হওয়ায় রোমান ও পারস্য পরাশক্তিসমূহ আরবের যে অংশে রাসূলুল্লাহ (সা) এসেছিলেন সে অংশের প্রতি ছিল অনাগ্রহী এবং এ অংশের লোকদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। কিন্তু কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআন সে বর্বর লোকগুলোকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করল এবং রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পদানত করে এমন এক দীঘমেয়াদী উন্নত সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল যা ছিল নজিরবিহীন।এর জন্য তারা শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা) কে যিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন। সাহাবীদের অবিকল সেই কুরআন এখন আমাদের মধ্যে আছে।
এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। [সূরা হা মীম আস-সাজদাহ: ৪২]
আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। [সূরা হিজর: ৯]
প্রশ্ন হচ্ছে একই কুরআন কেন আমাদের আজকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জাতিতে রূপান্তরিত করতে পারছেনা। আজকে কেন মুসলিম দেশসমূহই যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, তৃতীয়বিশ্বের? আমাদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য আলেমে দ্বীন-যাদের কেউ মুফাসসিরে কুরআন, কেউ মাওলানা, কেউ মুফতি, কেউ বা হাফেজে কোরআন, কেউ ক্বারী, কেউ বা ফকীহ। কুরআন শিক্ষা ও হিফজ করার জন্য রয়েছে অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান যেখানে লক্ষ লক্ষ মুসলিম কুরআন শিখছেন অথবা হিফজ করছেন। অনেক জগতবিখ্যাত ক্বারী সাহেবেদের নাম শোনা যায় যারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআন সুললিতভাবে তেলাওয়াত করার জটিল কৌশল রপ্ত করেছেন। মিডিয়াতে মিউজিক্যাল রিয়েলিটি শো এর মত কুরআন তেলাওয়াত করার জাতীয় ও আান্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশের মত অনারবী মুসলিম তরুণগণ এসব প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করছে। কিন্তু এ প্রথম স্থান অধিকার বা কুরআনের লক্ষ লক্ষ হাফেজ তৈরি করা বাংলাদেশকে আমেরিকার মত সুপার পাওয়ার করছে না, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিচ্ছে না, ১৮ কোটি লোকের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। তাহলে বর্তমান আইফোন বা ইন্টারনেটের অত্যাধুনিক জমানায় কুরআন কি তার কার্যকারীতা হারিয়ে ফেলেছে? আসতাগফিরুল্লাহ। মুহাম্মদ (সা) অন্য নবীদের মত একটি সুনিদিষ্ট সময় ও কোনো নিদিষ্ট বংশ, গোত্র বা জাতির জন্য আসেননি। বরং তিনি এসেছেন কেয়ামত পযন্ত, সমগ্র মানবজাতির জন্য। তদ্রুপ তার উপর নাজিলকৃত কুরআনও কেয়ামত পযন্ত কার্যকর এবং তা পুরো পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য। তাহলে সমস্যা কোথায়?
তিনি (সা) বলেন:
নিশ্চয়ই আল্লাহ এ কিতাবের মাধ্যমে কিছু সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটাবেন এবং কিছু সম্প্রদায়ের পতন ঘটাবেন। [মুসলিম]
উত্তর হল এই কুরআনকে আমরা সেভাবে বুঝতে পারছি না বা বুঝার চেষ্টা করছিনা যেভাবে সাহাবা (রা) উপলদ্ধি করেছিলেন, গ্রহণ করেছিলেন।
ইমাম আহমেদ বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কিছু বলার পর বললেন, “এমন একটি সময় আসবে যখন জ্ঞান হারিয়ে যাবে।” ইবনে লুবায়েদ (রা) বললেন, হে রাসূলুল্লাহ (সা), এটি কী করে হবে, যখন আমি নিজে কুরআন শিক্ষা করছি এবং আমার সন্তানকে তা শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমার সন্তান তার পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিবে।’ রাসূল (সা) বললেন, “তোমার মা তোমাকে হারাক! আমি ভাবতাম তুমি মদীনার সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। তুমি মদীনার ইহুদী ও খ্রীস্টানদের দেখতে পাও না যাদের সাথে তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইনজীল আছে, অথচ তারা সেখান থেকে উপকৃত হচ্ছে না (সেগুলো তারা অনুসরণ করছে না)।”
কুরআন তাকে সাজিয়ে রাখার জন্য বা অলংকৃত হওয়ার জন্য বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার জন্য আসেনি। আজকাল কুরআনকে এত অলংকৃত করা হয়, এত সাজানো হয় যে সাধারণ কেউ এটিকে হাতে নিতেও ভয় পায়। আবু দারদা (রা) বলেন, ‘যখন এমন সময় আসবে তোমরা মসজিদকে এবং কুরআনকে বেশী অলংকৃত করবে তখন তোমরা ধ্বংস হবে। কারণ তখন তোমরা মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রতীককে অধিকতর গুরুত্ব দিবে।
আবু দারদার সময়ে কুরআন লিখিত ছিল হাড়, পাতা, চামড়ার টুকরোতে। অথচ আজকের কুরআন উন্নত কাগজ ও মুদ্রণ যন্ত্রের আশীর্বাদপুষ্ট। এমনকি বিভিন্ন অ্যাপ এর মাধ্যমে আমাদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মধ্যে চলে এসেছে। আজকের লোকজন কুরআনকে হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআনকে দেখলে ভাবত এটি কুরআনের অপমান। অথচ হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআন লিখলে তা অপমান হয় না, বরং অসম্মান হয় যখন তা অনুসৃত হয় না।
“আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগন উপদেশ গ্রহণ করে।’ [সূরা সোয়াদ: ২৯]
“তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তা কুরআনে আমাদের কেবল তা তেলাওয়াত করতে বলেননি, বরং এটি দিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে বলেছেন। আমাদের তাদাব্বুর বা গভীর মনোনিবেশ করতে হবে কুরআনের বিষয়ে।
সাহাবাগণ কীভাবে কুরআনকে অধ্যয়ন করেছিলেন?
আমাদের মনে রাখা দরকার কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআনই জন্ম দিয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর, শ্রেষ্ঠ শহীদ আমীর হামজা (রা), শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বিন আউফ (রা), শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)…
আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘সূরা বাক্বারা হিফয করতে আমার ১৪ বছর সময় লেগেছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমি এত খুশী হয়েছিলাম যে, লোকদের একটি উট কুরবানী দিয়ে নিমন্ত্রন করেছিলাম।’ আমরা এখন পুরো কুরআন এক বছরে হি’ফজ করতে পারি, তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কী করে সূরা বাক্বারা হিফজ করতে এত সময় লাগল? এর ব্যাখ্যা একজন তাবেয়ীন দিয়েছেন এভাবে, ‘আমার কিছু সাহাবী (রা) এর সাথে পরিচয় ছিল এবং তারা আমাকে বলেছেন, কুরআনের দশটি আয়াতকে তারা নিতেন এবং এগুলো অধ্যয়ন করতেন, এ দশ আয়াতের মধ্যে ঈমান, ইলম, হালাল, হারাম অধ্যয়ন করতেন এবং তারপর এ দশ আয়াত হিফজ করতেন। তারপর পরবর্তী দশ আয়াতে আবার গভীর মনোনিবেশ করতেন। তারা ততক্ষণ পযন্ত পরবর্তী দশ আয়াতে যেতেন না যতক্ষন না আগের দশ আয়াত জীবনে প্রয়োগ করতেন। আমি একথা একজন নয়, বহু সাহাবীকে বলতে শুনেছি।’
ইমাম আহমেদ আল গাজ্জালি বলেন, ‘আমি দশ বছর বয়সে কুরআনের হাফেজ হয়েছি। উপলদ্ধি করা ছাড়া কেবলমাত্র মুখস্থ করার দরুণ যখন আমি বড় হলাম এবং কুরআনকে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করলাম, তখন দেখলাম এটি অত্যন্ত কষ্টকর। কেননা আমি কেবল বারংবার আওড়াতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অনেক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের পর আমি এ চক্র ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং অবশেষে কুরআনের আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা ও উপলদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলাম।’ এ ঘটনার বাস্তবতা আমাদের বর্তমান কুরআন না বুঝে হিফজ করার শিক্ষাপদ্ধতির অসারতা তুলে ধরে। সুতরাং কুরআনকে বুঝতে হলে আমাদের সাধনা ও প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে যেতে হবে।
কুরআনকে নিয়ে তাদাব্বুর করতে হলে এর ভাষা আরবী শিখতে হবে। কারণ এটি আরবী কুরআনরূপে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নাজিল করেছেন এবং এটি আরবীতেই একটি মু’জিযা। দুনিয়ার ভাষা ইংরেজি শেখার জন্য আমাদের কত অধ্যবসায়। কেউ ইংরেজী শিখতে পারলে ভাবে দুনিয়ার সুযোগের দরজা জানালা তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ সেটি আন্তর্জাতিক ভাষা, ইন্টারনেটের ভাষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা। জান্নাতের দরজা জানাগুলো খোলার জন্য আমাদের কী আরবী শেখা উচিত নয়? দুনিয়ার যে কোন বিখ্যাত ব্যক্তি একটি বার্তা প্রেরণ করলে আমরা উদগ্রীব হয়ে যাই তা পাঠোদ্ধার করতে। অথচ মহাবিশ্বের মহান অধিপতি, রাজাধিরাজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বার্তা বুঝার জন্য সে ভাষা শিখছি না। এটা কি বুদ্ধিমানের আচরণ?
এখনকার সময়ে যে কোন অনুষ্ঠানের শুরুতে ও শেষে কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। মানুষ তার তাকের মধ্যে কুরআনকে রেখে পুরো জীবন পার করে দেয় এবং অতপর সে লোকটি মারা গেলে অন্য কেউ সে কুরআন থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে এবং আবার কুরআনটিকে তাকে রেখে দেয়। যখন বিয়ে হয় তখন সূরা ফাতিহা এবং যখন কেউ মারা যায় তখন সূরা ইয়াসিন পাঠ করা হয়। লোকেরা কুরআনের এই হক্ব আদায় করছে!!
সুবহানআল্লাহ, আল্লাহ’র কিতাব শুরুর দিকের মুসলিমদের চালিকা শক্তি ছিল। কুরআন নিয়ে বাঁচা এবং একে গুরুত্বের সাথে নেয়ার অর্থ হল আমরা আল্লাহ’র কিতাবকে ভালবাসব। আমরা যদি কুরআনের সাথে আত্নাকে একীভূত না করে তা পড়ি এবং তেলাওয়াত করি তাহলে সেটা থেকে কোন সুফল পাব না। এটি বুঝা যায়, উসমান ইবনে আফফান (রা) এর একটি বক্তব্যে, ‘যদি হৃদয় পবিত্র হয়, তবে সেটি আল্লাহ’র কিতাবের ক্ষুধা থেকে কখনওই মুক্তি পাবে না।’ আমরা যদি আল্লাহ’র কিতাবের প্রতি মহব্বত পোষণ করি তবে হৃদয় কখনওই এতে তৃপ্ত হবে না।
যখন একজন তাবেয়ীন আবদুল্লাহ ইবনে উমরের ইবাদত সম্পর্কে জানার জন্য তার ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করল, তখন সে বলল, ‘তিনি সালাতে যেতেন এবং এর মধ্যবর্তী সময় কুরআন অধ্যয়ন করতেন।’ এটি এরকম স্বাভাবিক বিষয় ছিল। যদি সালাতের মধ্যবর্তী সময় তিনি অন্য কাজ করতেন তবে এটি করা তার পক্ষে সম্ভবপর হত না। হায়! আমাদের অনেকেরই মাসের পর মাস চলে যায় অথচ আল্লাহ’র কিতাবকে স্পর্শও করি না। অথচ আবদুল্লাহ ইবনে উমরের জীবন কুরআনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত। ওসমান ইবনে আফফান (রা) কিয়ামুল লাইলে দু’রাকাআত নামাজে দাঁড়িয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, রাত শেষ হয়ে যেত অথচ তার নামাজ শেষ হত না। এতে তিনি একঘেয়ে অনুভব করতেন না, ক্লান্তি অনুভব করতেন না, কেননা কুরআনের প্রতি ছিল তার অপরিমেয় ভালবাসা। আল্লাহ তার জন্য এটিকে সহজ করে দিয়েছিলেন।
আমাদেরকে আল্লাহ’র কিতাবের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং এর অধ্যয়ন থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আমরা অনেক সময় কুরআন বাদ দিয়ে অন্যান্য ইসলামি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করি এবং ভাবি অনেক জ্ঞান অজন করেছি। ইসলামি সাহিত্য পড়া ফলদায়ক হলেও, কুরআনের গভীর উপলদ্ধি ছাড়া ইসলামের জ্ঞানার্জন সম্পূর্ণ হয় না।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের কুরআনকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করলেই চলবে না, বরং আমাদের সমাজ ও গোটা বিশ্বকে কুরআনের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। একটি উদাহরণ: আনাস বিন মালিক (রা) এর মা- উম্মে মাহারা কুরআন অধ্যয়ন করেন এবং উপলদ্ধি করতে পারলেন ইসলাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং জলে স্থলে জিহাদ হবে। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘সমুদ্রপথে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করবে তাদের মধ্যে আমিও থাকতে চাই।’ এ কথা শুনে রাসূল (সা) তার জন্য দোয়া করলেন যাতে তিনি জিহাদে অংশ নিতে পারেন । তিনি মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা) এর সময়ে মুসলিমদের প্রথম নৌ জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের একজন ছিলেন-সুবহানআল্লাহ। তিনি এ উপলদ্ধি পেয়েছিলেন কুরআনে বর্ণিত সমুদ্রকে মানুষের অধীনস্ত করে দেয়ার আয়াত থেকে:
‘আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা মাছের গোশত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে যা পানি চিরে চলেছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অনুসরণ করতে পার এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর।’ (সূরা নাহল:১৪)
তিনি কখনও সমুদ্রে না গেলেও এই আয়াত পড়েই বুঝে গিয়েছিলেন একদিন সমুদ্রপথে আল্লাহ’র দ্বীন বিস্তার লাভ করবে।
এখন জলপথে ২০-৩০ হাজার জাহাজ পুরো পৃথিবীব্যাপী দাপিয়ে বেড়ায়। পৃথিবীর দশ ভাগের আটভাগ সমুদ্র হলেও সেই সমুদ্রে মুসলিমদের তৈরি কোন জাহাজ ঘুরে বেড়ায় না। একটি সাবমেরিনও মুসলিমরা তৈরি করে না। সুতরাং উপরের আয়াত অনুসারে আমাদের অবস্থান কোথায়? কুরআন সম্পর্কে আমাদের উপলদ্ধি কোথায়? সাহাবাদের জীবনের সাথে সমুদ্রের কোন যোগসূত্র না থাকলেও তারা খুব দ্রুত নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ছিলেন মুসলিম নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল ধরে ইসলামি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পৃথিবীর মহাসমুদ্রগুলোতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে এবং প্রাধান্য বিস্তারকারী বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, আমরা কুরআনের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে আছি।
কুরআনকে কী আমরা সাহাবাদের মত করে উপলদ্ধি করব নাকি এ সময়ে আমাদের মত করে উপলদ্ধি করব?
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘তাদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদি ও কিতাবসমূহ এবং তোমার প্রতি নাজিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে।’ [সূরা নাহল: ৪৪]
কুরআনের ব্যাখ্যা এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাধ্যমে এবং তার সরাসরি ছাত্র ছিল সাহাবা (রা)। সুতরাং সাহাবাগণ হচ্ছে সে প্রজন্ম যারা নিজেদের উপর কুরআন প্রয়োগ করেছিলেন। কুরআনকে বুঝার জন্য সাহাবাদের জীবন ও রাসূল (সা)-এর বক্তব্য অনুধাবন করা অপরিহার্য। যে কোন বই উদাহরণসহ বুঝা সহজতর। আমরা যদি কুরআনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ না নেই এবং খোলাফায়ে রাশেদীনগণ কীভাবে এগুলো উপলদ্ধি করেছেন তা অনুধাবন করতে না পারি তাহলে তা বুঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। কারণ আরবি ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা এবং একটি শব্দের পনেরটি মত অর্থও থাকতে পারে। এখানে কোন অর্থটি নেয়া উচিত তা আমরা কী করে বুঝব যদি আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা না নেই ও সাহাবা (রা) এর উপলদ্ধিকে অনুধাবন না করি। যেমন: সূরা বাক্বারা এর ১৯৫ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, ‘…নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না…’। মুসলিম এবং রোমানদের মধ্যে একটি যুদ্ধ হচ্ছিল। একজন মুসলিম সৈন্য দলচ্যুত হয়ে রোমান সৈন্যবাহিনীর ভেতর ঢুকে পড়ল। তা দেখে একজন মুসলিম বলল, ‘এই ব্যক্তি নিজের ধ্বংসের কারণ হয়েছে।’ পাশে দাড়ানো আইয়ূব আল আনসারী (রা) বললেন, ‘তুমি সে আয়াতটি (সূরা বাক্বারা:১৯৫) বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে আমাদের অর্থাৎ আনাসারদের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আল্লাহ যখন মক্কায় বিজয় দান করলেন তখন আমরা ভাবলাম এখন আমরা ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত যেতে পারি। এ আয়াত নাজিল করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সাবধান করেছিলেন যে, ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত গেলে আমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই করছি। রাসূল (সা) বিজয়ী হওয়ার পরও তাকে আমাদের পরিত্যাগ করা সঠিক হবে না এবং জিহাদ ও ত্যাগ অব্যাহত রাখতে হবে।’
সুতরাং আইয়ুব আল আনসারী (রা) আমাদেরকে কুরআনের এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি আমাদের না জানালে আমরা হয়ত এ আয়াতটির সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে পারতাম না।
তাফহীমুল কুরআনে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী বলেন, ‘It should be remembered nevertheless that full appreciation of the spirit of the Quran demands practical involvement with a struggle to fulfil its mission. The Quran is neither a book of abstract theories and cold doctrines which the reader can grasp while seated in a cosy arm chair nor is it merely a religious book like other religious books, the secrets of which can be grasped in seminaries and oratories. On the contrary, it is the blueprint and guidebook of a message of a mission of a movement. As soon as the Book was revealed, it drove a quiet, kind hearted man who was in isolation and seclusion and placed him on the battlefield of life to challenge a world that has gone astray. It inspired him (saws) to raise his voice against falsehood and pitted him in a grim struggle against the standard bearers of unbelief, of disobedience to God, of waywardness and error.’ (এটি মনে রাখা উচিত, কুরআনের মূল বাণী আমাদের এর লক্ষ্য পূরণের আন্দেলনে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবি করে। কুরআন কোন দ্রুপদী তত্ব অথবা হিমশীতল আদর্শিক কিতাব নয় যা আরাম কেদারায় বসে পড়া যায় অথবা অন্য ধর্মের মত কোন নিছক ধর্মীয় কিতাব নয় – যার রহস্য সেমিনার বা বক্তব্যের মাধ্যমে অনুধাবন করা যাবে। বরং এটি হল একটি মিশনকে সামনে রেখে আন্দোলনের বার্তার নির্দেশিকা অথবা নীলনকশা। যখন বইটি নাজিল হল তখন তা একজন শান্ত, সহৃদয়বান মানুষ যিনি জনারণ্য থেকে নিভৃতে ছিলেন তাকে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য জীবনযুদ্ধে টেনে নিয়ে আসে। এটি তাকে মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল এবং কুফর, আল্লাহদ্রোহিতা, পথভ্রষ্টতা এবং বিভ্রান্তির ধারকদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর লড়াইয়ে অবতীণ করেছিল।
কুরআন যে বাস্তবতায় নাজিল হয়েছিল সে বাস্তবতার ভেতর দিয়ে সাহাবা (রা) গিয়েছিলেন। সে কারণে কুরআন তাদের জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কুরআনের রঙে নিজেদের রাঙাতে পেরেছিল। আজকেও আমরা সাহাবীদের মত একটি পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মুসলিমগণ আজকে অভিভাবকহীন, রাষ্ট্রবিহীন, খিলাফতবিহীন। যারা নিজেদেরকে সাহাবীদের মত কুরআনকে জীবনের সবক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে রত নেই, তারা কুরআনকে সাহাবাদের মত উপলদ্ধি করতে পারবে না। কুরআন নিয়ে নিছক তাত্ত্বিক গবেষণা, একাডেমিক আলোচনার মাধ্যেমে এর ভাবার্থ অনুধাবন করা যাবে না। একে জীবনের সাথে মেলাতে হবে। তবেই কুরআন আমাদেরকে সাহাবীদের মত শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে যাবে। যারা আল্লাহ’র জমিনে আল্লাহ’র দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য, রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রদর্শিত খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ, জালিম শাসকের জুলুমের শিকার তারাই কেবলমাত্র সূরা বাক্বারার ২১৪ নং আয়াতকে উপলদ্ধি করতে পারবে,
‘তোমরা কী এই ধারণা করেছ যে, সহজেই জান্নাতে চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি যারা তোমাদের পূর্বে এসেছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হয়েছে যে নবী ও তার উম্মতেরা বলা শুরু করেছিল, কখন আসবে আল্লাহ’র সাহায্য। জেনে রেখো আল্লাহ’র পক্ষ থেকে আসা বিজয় অতি নিকটে।’
জালিম শাসকের দোসর হয়ে অথবা তার বিরুদ্ধে নীরব থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মখমলের গালিচায় মোড়া ড্রয়িংরুমের আরাম কেদারায় বসে এই আয়াত হাজারবার পড়লেও তা কোন সাধারণ মুসলিম তো দূরের কথা আলেমের উপলদ্ধিতেও আসবে না। দাওয়াকারীই কেবলমাত্র কুরআনে বর্ণিত নুহ (আ)-এর চরম অধ্যবসায় থেকে শিক্ষা নিতে উদ্ধুদ্ধ হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রে চিন্তার অধঃপতন কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করে সেটি লুত (আ)-এর কওম থেকে শিখতে পারবে। কোন অবস্থাতেই দাওয়া করতে গিয়ে ধৈর্যহারা হওয়া যাবে না তা শেখা যাবে ইউনুস (আ)এর দাওয়াতী জীবন থেকে। মুসা (আ)-এর কাছ থেকে শেখা যাবে কীভাবে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে পৌরুষদীপ্ত হয়ে হক্ব কথা বলতে হয়। ইউসুফ (আ) এর কাছ থেকে এই চরম ফিতনার সময়ে একজন যুবক কী করে ত্বাকওয়া ও দ্বীনদারিতায় ইস্তিকামাত থাকতে পারে তা শিখবে। সূরা লাহাব থেকে শিখবে কীভাবে জালিম শাসককে বা নেতৃত্বস্থানীয় লোকদের কঠোর ভাষায় জবাবদিহী করতে হয়। সূরা নূরের ৫৫ আয়াত খিলাফত আসার ব্যাপারে তার বিশ্বাসকে দৃঢ় করবে। কেবলমাত্র বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আয়াতুল কুরসী পড়ে ক্ষান্ত থাকবে না, বরং সেখানে মানুষ নয়, আল্লাহ’র সাবভৌমত্বের ঘোষণাকে উপলদ্ধি করবে। সূরা আসর পড়ে মানবজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পকে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে কুরআনের সঠিক বুঝ দান করুক। আমীন।
উই ওয়ান্ট জাস্টিস

রাজধানী ঢাকার এয়ারপোর্ট রোডে কুর্মিটোলা হাসপাতালের সামনে জাবালে নূর বাসের ধাক্কায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় পুরো দেশব্যাপী এক অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে উঠে। সরকারের দূর্নীতিগ্রস্ত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সর্বোপরি দুঃশাসনের বিরুদ্ধে প্রধানত স্কুলের কিশোর কিশোরী ও তাদের অভিভাবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে টানা সাত দিন ব্যাপী যে তীব্র ঘৃণা ও বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে তা ছিল নজিরবিহীন। সরকার এ তুমুল জনপ্রিয় আন্দোলনকে আগের মত প্রতারণা এবং দলীয় পেশী শক্তি ও প্রশাসনের মাধ্যমে দমন করার চেষ্টা করেছে। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এ ধরনের আন্দোলন এ সরকারের সময়ে আরও হয়েছে। যেমন শাহবাগী নাস্তিক চক্রের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা হেফাজতের আন্দোলন, ভ্যাটবিরোধী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সারাদেশ ব্যাপী গড়ে উঠা বৈষম্যপূর্ণ কোটা বিরোধী আন্দোলন।
যখন পুঁজিবাদী ও তথাকথিত ইসলামিক রাজনৈতিক দলসমূহ সরকারের দূর্নীতি, অপশাসন, লুটপাট, স্বেচ্ছাচারিতা ও জুলুমের বিরুদ্ধে কার্যকর গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে তখন এ ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, ঘৃণা ও প্রত্যাখান সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অবশ্য ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্ষেত্রে আন্দোলনকে ছড়িয়ে দিতে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। এই দশকের শুরুর দিকে আরব বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া আরব বসন্তের সাথে এসব আন্দোলনের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতন্ত্র অথবা স্বৈরতন্ত্রের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বব্যাপী নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখা হয়েছে। পুঁজিবাদে আপামর জনগণকে দারিদ্রতার মধ্যে রেখে সম্পদ মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির হাতে কৌশলে তুলে দেয়া হয় । মানুষের আইন তৈরির ক্ষমতার কারণে এ ব্যবস্থায় দূর্নীতি, দুঃশাসন, প্রতারণা, স্বেচ্ছাচারিতা খুবই স্বাভাবিক। সেকারণে মুসলিম বিশ্বের বিশ্বাসঘাতক শাসকগণ তাদের উপনিবেশবাদী প্রভূদের মত জনগণকে প্রতারণা ও ত্রাস সৃষ্টি করার মাধ্যমে ন্যায্য দাবি থেকে দূরে রাখে। কিন্তু মুহম্মদ (সা) এর উম্মতের মধ্যে খায়ের থাকার কারণে উম্মাহ একটি সময় পর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠে। কারণ উম্মাহ’র মধ্যে সব সময় একটি নিষ্ঠাবান ও অধিক সংবেদনশীল অংশ রয়ে যায়- যারা উম্মাহ’র বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্রকে সাহসিকতার সাথে উন্মোচন করে দূর্নীতিবাজ শাসকের মুখোশ খুলে দেয়। তবে এসব আন্দোলন অনেক সময় কাঙ্খিত লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। এসব আন্দোলনের ভাগ্যে যাই ঘটুক-আন্দোলনের স্পিরিটের সাথে নিষ্ঠাবান যে কেউ একাত্মতা ঘোষণা করবে ও স্বাগত জানাবে।
তবে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের ভাবতে হবে কেন উম্মাহ’র এ আন্তরিক প্রতিবাদসমূহ জুলুমের পুরোপুরি অবসান ঘটিয়ে সত্যিকারের পরিবর্তন সূচনা করছে না। এর একটি কারণ হল আন্দোলনগুলো ছিল ইস্যুভিত্তিক। সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য অর্থাৎ আদর্শিক পরিবর্তনের জন্য সেভাবে কোন আন্দোলন গড়ে উঠেনি। ইস্যু আদায় হয়ে গেলে ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলন এর অপরিহার্যতা হারিয়ে ফেলে। জনগণ ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন করতে থাকলে শাসকশ্রেণীর তাতে খুব বড় সমস্যা হয় না। কেননা ত্রটিপূর্ণ পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা মানুষের জীবনে বাস্তবায়িত থাকার কারণে সমস্যার কোন অন্ত নেই। প্রতিটি সমস্যা নিয়ে রাস্তায় নামতে থাকলে একজন মানুষের এক জীবন যথেষ্ট নয়। আর দূর্নীতিপূর্ণ একটি ব্যবস্থাকে অটুট রেখে এর কিয়দংশে সংস্কার করলে সেই ব্যবস্থা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে, কারণ তখন সেটি আগের চেয়ে কম ত্রুটিপূর্ণ বলে মানুষ মনে হতে থাকে। তাই ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন উম্মাহ’র গুরুত্বপূর্ণ প্রাণশক্তি ও উদ্দীপনাকে নষ্ট করে এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। আন্দোলনের নেতৃত্ব এর লক্ষ্য সর্ম্পকে দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনে দৃঢ়তা প্রদর্শন সম্ভব নয়। আর আদর্শিক উপনিবেশিক শক্তি আন্দোলনরত জনগনকে ধোকা দিয়ে এর গতিপথকে নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করেছে এবং সর্বশেষ ফলাফলটি নিজের ঘরে তুলে নিয়েছে। আরব বসন্ত এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ। এসব আন্দোলনের মাধ্যমে দূর্ভাগ্যবশতঃ মুসলিমগণ ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং একধরনের কসমেটিক পরিবর্তন হয়েছে। খুব শীঘ্রই উম্মাহ বুঝতে পেরেছে যে, উপনিবেশবাদী কাফেররা পুরোদমেই নিয়ন্ত্রনে আছে।
তাহলে সমাধান কী? সমাধান হল মূল সমস্যাকে ধরতে পারা এবং এর বিলোপ সাধনের জন্য সব শক্তিকে বিনিয়োগ করা। মূল সমস্যা হল ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং এর শাসনব্যবস্থা গণতন্ত্র-যা থেকে অন্য সব উপসর্গ সমস্যা তৈরি হয়। মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে উপসর্গের চিকিৎসা কখনওই প্রকৃত পরিবর্তন বয়ে আনবে না। আবার কেউ যদি মনে করে কেবলমাত্র গণআন্দোলনের মাধ্যমে ব্যবস্থার পরিবর্তন আসবে সেটাও ঠিক নয়। ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য জনসচেতনতা তৈরি করা একটি সামগ্রিক পরিবর্তনের আংশিক কাজ মাত্র। জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্র ও সমাজের পাওয়ার পকেটসমূহ থেকে কার্যকর সাহায্য পাওয়া গেলেই কেবলমাত্র ব্যবস্থা বা আদর্শিক পরিবর্তন সম্ভব। এর প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ হল আরব বসন্ত। তিউনিসিয়া, লিবিয়া, মিশর, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ইসলামী ব্যবস্থার পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন থাকলেও পাওয়ার পকেটসমূহ বা সেনাবাহিনী থেকে কার্যকর সাহায্য না পাওয়ায় সেসব দেশ দারুল ইসলামে (ইসলামী রাষ্ট্রে) পরিণত হতে পারেনি। সাধারণ জনগন ও পাওয়ার পকেটের কার্যকর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই পৃথিবীর ইতিহাসে আদর্শিক সব পরিবর্তন হয়েছে। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনার আউস ও খাজরাজ গোত্রের সাধারণ জনগণ ও গোত্র প্রধানদের (যারা পাওয়ার পকেট বা আহলুল হাল ওয়াল আকদ ছিলেন) ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ফরাসী বিপ্লব, বলশেভিক বিপ্লব, চীনে কমিউনিস্ট বিপ্লব সব একইভাবে হয়েছে। আদর্শিক পরিবর্তনের এ বাস্তবতা পরিবর্তকামী প্রতিটি ব্যক্তিকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং এ অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের শ্লোগানসমূহ বেশ নজর কেড়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক আলোচিত ছিল ‘ওই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা ন্যায়বিচার চাই)। আসলে এই ‘জাস্টিস’ শব্দটি ব্যাপক। যে কারও মনে হতে পারে এই জাস্টিস কার কাছে চাওয়া হচ্ছে? উত্তর হতে পারে সরকারের কাছে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে মানুষের সার্বভৌমত্ব কায়েম রয়েছে সেখান থেকে কী জাস্টিস পাওয়া সম্ভব? ইসলামে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। মানুষকে এ ক্ষমতা দেয়া হয়নি কারণ সে সীমাবদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী এবং পরিবেশ দ্বারা প্রভাবিত। এ কারণেই আওয়ামীলীগ যে আইন করে তা বিএনপির বিরুদ্ধে যায়। আবার বিএনপি যখন আইন করেছিল তখন তার সুবিধার্থে তা করেছিল। মানুষকে আইন করতে দিলে সে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠে। সেকারণে আমরা দেখতে পাই শিক্ষার্থীগন মন্ত্রী, এমপি, পুলিশের অফিসার ও সচিবদের নিকট ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করে পায়নি। অর্থাৎ শাসকশ্রেণী যে আইন করে সে আইন তারা নিজেরাই মানে না। জনগন শাসকের কাছে জবাবদিহী করে, কিন্তু শাসকের জবাবদিহীতা না থাকায় সে হয়ে উঠে দূর্বিনীত স্বৈরাচার ও জালিম। এই মানবীয় দূর্বলতা অসঙ্গতি, জুলুম ও ভোগান্তির জন্ম দেয়। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুরআনে বলেন, ‘যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিচার ফায়সালা করে তারাই জালিম’ (সূরা মায়েদাহ)। সেকারণে মানবরচিত ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে জাস্টিস পাওয়ার আকাঙ্খা আম গাছ লাগিয়ে জাম খাওয়ার মত আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। জাস্টিস পাওয়া যাবে একটি জাস্ট ব্যবস্থা এবং এই ব্যবস্থার ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকের কাছ থেকে। মহাবিশ্বের স্রষ্টা কোন ব্যক্তি বা দল দ্বারা প্রভাবিত নয় এবং মানুষের স্রষ্টা হিসেবে তার বাস্তবতা সর্ম্পকে সম্যক ধারণা থাকায়, তিনিই একটি ত্রটিমুক্ত জীবনব্যবস্থা দিতে পারেন। আর একমাত্র ইসলামই হল জাস্ট ব্যবস্থা এবং ইসলামের ভিত্তিতে পরিচালিত শাসকই ন্যায়পরায়ণ। জাস্টিস তাই ইসলামী ব্যবস্থা ও ইসলামি খলিফার কাছে চাওয়া যেতে পারে, অন্য কারও কাছে নয়। জাস্টিস চাওয়া যেতে পারে ওমর (রা) এর মত শাসকের কাছে কেননা তিনি জনসম্মুখে জবাবদিহীতার সম্মুখীন হতে পরোয়া করতেন না। জাস্টিস চাইতে হবে আলী (রা) এর মত শাসকের কাছে যিনি ছেলে ব্যতিরেকে আর কোন সাক্ষী না থাকার কারণে বিচারপতির কাছে চুরি যাওয়া তলোয়ার ফেরত পাননি। জাস্টিস চাইতে হবে ওমর বিন আবদুল আজিজ (র) এর মত শাসকের কাছে যার সময় যাকাত নেওয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া যেত না অথচ রাষ্ট্রের মধ্যে দরিদ্র লোকের তালিকায় তার নাম শীর্ষে উঠে এসেছিল।
যদি আমরা সবাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর তরীকা অনুসারে এই জাস্ট ব্যবস্থা-ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি, তাহলে সেইদিন খুব বেশী দূরে নয়, যখন জাস্টিসের জন্য লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামতে হবে না, জাস্টিসের জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে কোন মা কে সন্তান হারাতে হবে না, জালিম শাসকের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষিপ্ত হতে হবে না, বরং প্রত্যেক প্রাপককে তার যথাযথ প্রাপ্য পৌঁছে দেয়া হবে এবং সবক্ষেত্রে জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত হবে ইনশাআল্লাহ।
খিলাফত রাষ্ট্রের সঙ্গীত

অন্যান্য জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্র থেকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে আলাদা করার জন্য বিশেষ কোন শ্লোগাণ বা সঙ্গীত গ্রহণ করা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত (মুবাহ্) একটি বিষয়। অতীতে মুসলিমদের নির্দিষ্ট শ্লোগাণ ছিল, যা তারা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রট্টপক্ষকে মুকাবিলা করার সময় ব্যবহার করতো। রাসূল (সা) এর সময়ই এ বিষয়টি প্রচলিত ও অনুমোদিত ছিল। খন্দক ও বনু কুরাইযা’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে মুসলিমদের শ্লোগাণ ছিল ‘হা মীম, তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না’। আর, বনু মুসতালিক এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের শ্লোগাণ ছিল ‘তোমরা, যারা সাহায্যপ্রাপ্ত, মৃত্যু বহন করে আনো, মৃত্যু বহন করে আনো’ ইত্যাদি।
এছাড়া, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও বাকশক্তি, এগুলো মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার রহমত হিসাবে প্রদত্ত বৈশিষ্ট্য এবং এ বিষয়গুলো দলিল অনুযায়ী ইবাহাহ্ বা মুবাহ (অনুমোদিত) বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং, মানুষ যা চায় বলতে পারে, যা চায় দেখতে পারে কিংবা, কোন বিষয়ে আবেগাপ্লুত হতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন নির্দিষ্ট বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে কোন শারী’আহ্ দলিল থাকে।
সুতরাং, ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য একটি নির্দিষ্ট শ্লোগাণ বা সঙ্গীত গ্রহণ করা অনুমোদিত, যার মাধ্যমে তারা আবেগাপ্লুত হবে এবং যা দিয়ে তারা অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে নিজেদের পৃথক করবে। অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহৃত হবে এবং খলীফা যখন আন্যান্য রাষ্ট্রে সফর করবেন তখন এটি তাকে সঙ্গ দেবে, অর্থাৎ, এ শ্লোগাণটি ব্যবহার করা হবে। এছাড়া, এটি জনগণকে আবেগাপ্লুত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেমন: সমাবেশ, গণজমায়েত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা, সম্প্রচার কেন্দ্রগুলোতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
শ্লোগাণ ব্যবহার করার পদ্ধতির মধ্যে থাকবে: ব্যাপক শোরগোল, নাসিক্যের আওয়াজ ব্যবহার করে বা, না করে নিম্নস্বরে বা উচ্চস্বরে কথা বলা, ইত্যাদি; এসবই শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত। কারণ, অতীতে সাধারণত: মুসলিমরা (রাসূলের (সা) সময়েও) বিভিন্ন উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে তাদের আবেগ প্রকাশের লক্ষ্যে উত্তেজিত ভঙ্গীতে কবিতা আবৃত্তি করতো।
খিলাফত রাষ্ট্রের জন্য একটি শ্লোগাণ বা সঙ্গীত গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনানুসারে এটি ব্যবহার করা হবে; বিশেষ করে খলীফা যখন অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ করবেন তখন এটি ব্যবহৃত হবে। এছাড়া, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে উম্মাহ্’র এটি ব্যবহার করবে। আল্লাহ্’র ইচ্ছায় যখন দ্বিতীয়বার নবুয়্যতের আদলে খিলাফত আসবে, তখন রাষ্ট্রের শ্লোগাণ বা সঙ্গীতের ব্যাপারে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ মনে রাখতে হবে:
১. এতে উল্লেখিত থাকবে, রাসূল (সা) প্রদত্ত সুসংবাদ অনুযায়ী দ্বিতীয়বার খিলাফত ফিরে আসার ভবিষ্যতদ্বাণী পূর্ণ হবার কথা এবং আবারও উকাবের ব্যানার তথা রাসূলু (সা) এর ব্যানার উত্থিত হওয়ার কথা।
২. এতে উল্লেখিত থাকবে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) প্রদত্ত সেই সুসংবাদের কথা যে, যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবে, তখন এ পৃথিবী তার সমস্ত সম্পদ উজাড় করে দেবে, আসমান তার সমস্ত রহমত বর্ষিত করবে এবং সমগ্র পৃথিবী জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতনে পরিপূর্ণ হবার পর আবারও ন্যায়বিচারে পরিপূর্ণ হবে।
৩. এতে উল্লেখিত থাকবে, খিলাফত রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবার পর সমগ্র বিশ্বব্যাপী এর জয়যাত্রা এবং সত্য ও ন্যায়ের আলোকদ্যুতি চর্তূদিকব্যাপী বিস্তারের কথা; বিশেষ করে তিনটি পবিত্র ভূমিতে: অর্থাৎ, যে ভূমিগুলোতে মসজিদ-উল-হারাম, মসজিদ-উল-নববী এবং মসজিদ-উল-আকসা, যেখান থেকে ইহুদীদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করা হবে।
৪. এটি শেষ হবে, এ উম্মাহ্’র পূণরায় শ্রেষ্ঠ উম্মাহ্ হিসাবে প্রত্যাবর্তনের বর্ণনা দিয়ে, যেভাবে আল্লাহ্ তা’আলা তাদের দেখতে চেয়েছেন; যেখানে তাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জন, যিনি তাদের স্বীয় রহমত, ক্ষমা ও করুণার মাধ্যমে জান্নাতুল ফেরদৌস প্রদান করে সম্মানিত করবেন।
৫. এতে অবশ্যই তাকবীর ধ্বনিটি পুনঃ পুনঃ অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। কারণ, ইসলাম ও মুসলিমদের জীবনে তাকবীর ধ্বনির রয়েছে বিশেষ প্রভাব। বস্তুতঃ তাকবীরই হচ্ছে সেই ধ্বনি যা মুসলিমদের বিজয় উৎসবে, অবকাশ যাপনের দিনগুলোতে, কিংবা, যে কোন অনুষ্ঠানে কার্যকরীভাবে এবং তাদের মুখ থেকে সবসময় উচ্চারিত হবে। উপরোক্ত বিষয়সমূহ বিবেচনায় রেখে এই বইয়ের সূচীপত্রে এ রকম একটি সঙ্গীত একদিন সংযুক্ত করা হবে এবং আল্লাহ্’র ইচ্ছায় এর পরিবেশন পদ্ধতিও যথাসময়ে ঘোষণা করা হবে, ইন্শাআল্লাহ্ ।
আমাদের শেষদোয়া হল শুধুই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রশংসা করা, যিনি এ বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রভু ও মহান প্রতিপালক।
রাষ্ট্রের পতাকা ও ব্যানার

ইসলামী রাষ্ট্রের পতাকা (আল-ওয়্যিয়াহ্) ও ব্যানার (রাইয়াত) থাকবে যা নেয়া হয়েছে মদিনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের উদাহরণ থেকে। এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা নিম্নরূপ:
১. ভাষাগতভাবে পতাকা ও ব্যানারকে ’আলম বলা হয়। আল কামুস আল মুহীতে উল্লেখিত আছে যে, মূলতঃ আল-রাইয়া অর্থ হল আল-আলম, যার বহুবচন হল রাইয়াত। এছাড়া, আল-লিওয়া শব্দমূল থেকে আল-আলম শব্দটি এসেছে যার বহুবচন হল আল-ওয়্যিয়াহ্। এর পাশাপাশি এইসব প্রতিটি শব্দের শারী’আহ্ নির্ধারিত অর্থ ও তাৎপর্য রয়েছে:
– পতাকা (লিওয়া) হবে সাদা, যেখানে কাল অক্ষরে লেখা থাকবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদ উর রাসূলুল্লাহ্’। এটা সেনাবাহিনীর আমীর বা নেতার সাথে বাঁধা থাকবে। এটা তার অবস্থানের নিদর্শন হিসেবে থাকবে এবং এটি তার সাথে সাথে যাবে। এ বিষয়ে দলিল হল, মক্কাবিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি সাদা পতাকা উড়িয়েছিলেন। এ হাদীসটি জাবিরের সূত্রে ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন। এছাড়া, আন-নাসায়ী আনাস থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) উসামা বিন যায়েদকে সেনাবাহিনীর আমীর নিযুক্ত করেন তখন তিনি নিজ হাতে উসামার পতাকা বেঁধে দেন।
– আর, ব্যানার (রাইয়া) হবে কাল যাতে সাদা অক্ষরে লেখা থাকবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদ উর রাসূলুল্লাহ্’। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগের আমীরগণ এটা বহন করবেন (রেজিমেন্ট, ডিটাচমেন্ট এবং অন্যান্য সামরিক ইউনিটসমূহ)। এ বিষয়ে দলিল হল, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বারের যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন তখন ঘোষণা করেছিলেন: “আগামীকাল আমি এমন একজনকে রাইয়া প্রদান করবো যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে এবং তারপর তিনি এটি আলীকে দিলেন।” এই হাদীসের ব্যাপারে সকলের ঐক্যমত আছে (মুত্তাফিকুন ’আলাইহি)। তখন আলীকে একটি ডিভিশন বা রেজিমেন্টর নেতা হিসাবে ধরা হয়েছিল। এছাড়া, আল-হারিছ বিন হাস্সান বিন আল-বকরী বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছে, “আমরা মদিনাতে এলাম এবং রাসূল (সা) কে মিম্বরে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখলাম, যখন বিলাল তাঁর সামনে তলোয়ার পরিহিত অবস্থায় দন্ডায়মান ছিল। রাসূল (সা) এর সামনে কিছু কাল পতাকা ছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “এগুলো কিসের পতাকা?” তারা বলল, “আমর ইবনুল ’আস এইমাত্র অভিযান থেকে এসেছেন।” “সেখানে কিছু কাল পতাকা ছিল” – একথাটির অর্থ হল, সেনাবাহিনী অনেক পতাকা বহন করছিল, যদিও এর নেতৃত্বে ছিল একজন, যিনি ছিলেন আমর ইবনুল ’আস। এটা নির্দেশ করে যে, সেনাবাহিনীর একটি মাত্র পতাকা (ইলওয়া) থাকবে, কিন্তু, ব্যানার অনেক থাকতে পারে। সুতরাং, পতাকা (লিওয়া) হল সেনাবাহিনী প্রধানের চিহ্ন (’আলম) বা প্রতীক; আর, ব্যানার (রাইয়া) হল সৈন্যদলের প্রতীক (’আলম)।
২. পতাকা (লিওয়া) সেনাবাহিনীর আমীরের সাথে বাঁধা থাকবে – যা সেনাপ্রধানের প্রধান কার্যালয়ের প্রতীক হিসাবে নির্দেশিত হবে। তবে, যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধের আমীর, হোক তিনি সেনাবাহিনীর আমীর অথবা তার পক্ষ থেকে নিযুক্ত কেউ, তাকে যুদ্ধকালীন সময়ের জন্য ব্যানার (রাইয়া) প্রদান করা হবে। একারণে ব্যানারকে (রাইয়া) যুদ্ধের জননী বলা হয়, কারণ যুদ্ধরত নেতাগণ যুদ্ধের ময়দানে এটি বহন করে থাকে।
সুতরাং, প্রকৃত অর্থে যখন যুদ্ধ সংঘটিত হবে, তখন যুদ্ধের প্রতিটি আমীর এর জন্য একটি করে ব্যানার থাকবে – যার প্রচলন অতীতে ছিল। ব্যানারকে উচ্চে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নেতাদের শক্তিমত্তা প্রকাশিত হত। যুদ্ধের ঐতিহ্য অনুসারে এ বিষয়টিকে একটি প্রশাসনিক নির্দেশ হিসাবে পালন করা হত ।
আল্লাহ্’র রাসূল (সা) জা’ফর, যায়িদ ও ইবন রুওয়াহা’র মৃত্যুসংবাদ সেনাবাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে ফিরে আসার আগেই ঘোষণা করেছিলেন:
“যায়িদ ব্যানার (রাইয়া) তুলে নিল, এবং নিহত হল; এবং তারপর, জা’ফর তা তুলে নিল এবং সেও নিহত হল। এবং তারপর, ইবন রুওয়াহা তা নিল এবং সেও নিহত হল।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩৫৭৫)এছাড়া, যুদ্ধের সময় যদি যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে খলীফা থাকেন, তবে পতাকা (লিওয়া) ও ব্যানার (রাইয়া) দু’টোই বহন করা যেতে পারে। এ বিষয়ে সীরাত ইবনে হিশামে গাজওয়া বদর (বদরের যুদ্ধ) সম্পর্কে কিছু বর্ণনা আছে যে, সেখানে পতাকা ও ব্যানার দু’টোই ছিল।
আর, যুদ্ধ শেষে শান্তির সময় সাধারণতঃ ব্যানারগুলোকে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, রেজিমেন্ট, ডিভিশন এবং ব্যাটেলিয়ানের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হয় এবং তারা এগুলো বহন করে, যা কিনা আল-হারিছ ইবন হাস্সান আল-বকরী বর্ণিত হাদীসে আমর ইবনুল ’আস এর বাহিনী সম্পর্কে বলা হয়েছে।
৩. ইসলামে খলীফা হলেন সেনাবাহিনীর প্রধান। এজন্য, আইনত পতাকা তার কার্যালয়ের উপরে উত্তোলিত থাকবে; অর্থাৎ, তার বাসভবনের উপরে। কারণ, এ পতাকা সেনাপ্রধানের সাথে বাঁধা থাকবে। এছাড়া, প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খলীফার বাসভবনের উপর ব্যানার উত্তোলন করাও অনুমোদিত; কারণ, খলীফা রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানেরও প্রধান। এছাড়া, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, বিভাগের ও স্থাপনার ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র ব্যানার উত্তোলিত হবে। কারণ, পতাকা শুধুমাত্র সেনাপ্রধানের প্রতীক, যা তার অবস্থানকে নির্দেশ করে।
৪. পতাকা সাধারণতঃ সূচালো লাঠির শেষ মাথায় বাঁধা অবস্থায় থাকবে। সেনাবাহিনীর সংখ্যার উপর ভিত্তি করে এটি সেনাবাহিনীর আমীরকে দেয়া হবে। সুতরাং, এটা বাঁধা থাকবে প্রথম বাহিনী, দ্বিতীয় বাহিনী কিংবা, আলশামের বাহিনী, ইরাকের বাহিনী, আলিপ্পোর বাহিনী অথবা বৈরুতের বাহিনী, ইত্যাদি বাহিনীসমূহের প্রধানদের সাথে।
মূলতঃ বর্শার শেষ মাথায় পতাকা প্যাঁচানো অবস্থায় থাকবে এবং প্রয়োজন ব্যতীত এটি খোলা হবে না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, খলীফা বাসভবনের উপর এটি উত্তোলিত থাকবে তার গুরুত্ব বা মর্যাদা বোঝানোর খাতিরে। একই কথা প্রযোজ্য হবে শান্তির সময় সেনাবাহিনীর অন্যান্য আমীরদের অবস্থানের ক্ষেত্রে, যেন উম্মাহ্ তাদের সেনাবাহিনীর শৌর্যবীর্য ও প্রভাবপ্রতিপত্তি অনুভব করতে পারে। কিন্তু, এ বিষয়টি যদি নিরাপত্তার জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়, যেমন: এর ফলে যদি শত্রট্টপক্ষ আমীরদের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত হয়, তবে, মূল নিয়মে ফিরে যেতে হবে; অর্থাৎ, এটি পেঁচানো অবস্থায় থাকবে এবং প্রয়োজন ব্যতীত খোলা হবে না।
ব্যানারের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, এটি বাতাসে পত্পত্ করে উড়ার জন্য মুক্ত রাখা হবে, যেভাবে এখন পতাকা ব্যবহার করা হয়। এজন্য এটিকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগের উপরে উত্তোলন করা হবে। সংক্ষেপে পুরো বিষয়টিকে এভাবে বলা যায়:
প্রথমত: সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রে:
১. প্রকৃত যুদ্ধের সময় পতাকা সেনাবাহিনীর আমীরের সাথে সংযুক্ত থাকবে। মূলনীতি অনুযায়ী, সাধারণতঃ এটি খোলা হবে না বরং বর্শার মাথায় প্যাঁচানো অবস্থায় থাকবে। নিরাপত্তা সম্পর্কিত ইস্যুগুলো বিবেচনায় রেখে এটিকে প্রসারিত করা যেতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধক্ষেত্রের আমীর একটি ব্যানার বহন করবে। যদি খলীফা রণক্ষেত্রে উপস্থিত থাকেন তাহলে ব্যানার এর সাথে পতাকাও বহন করা যাবে।
২. শান্তির সময় সেনাবাহিনীর আমীরদের সাথে পতাকা প্যাঁচানো অবস্থায় থাকবে। তবে, তারা যেখানে অবস্থান করবেন সেখানে পতাকা উত্তোলন করা যাবে। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ, রেজিমেন্ট, ব্যাটালিয়ন ইত্যাদি ব্যানার উত্তোলন করবে। প্রত্যেক বিভাগ, রেজিমেন্ট, ব্যাটালিয়নের জন্য আবার নির্দিষ্ট ব্যানার থাকতে পারে যেন তাদের প্রশাসনিকভাবে আলাদা করা যায় – যা মূল ব্যানারের সাথে উত্তোলন করা হবে।
দ্বিতীয়ত: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য বিভাগ (departments) ও স্থাপনাগুলোতে ব্যানার উত্তোলন করা হবে; কিন্তু, সেনাবাহিনী প্রধান হিসাবে শুধুমাত্র খলীফার বাসভবনে পতাকা উত্তোলন করা হবে। এছাড়া, প্রশাসনিক দৃষ্টিকোন থেকে খলীফার বাসভবনে ব্যানারও উত্তোলন করা হবে; কারণ, খলীফা রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানেরও প্রধান। সাধারণ জনগণ শুধুমাত্র তাদের বাসভবন, স্কুল-কলেজ কিংবা, অন্যান্য স্থাপনাসমূহে ব্যানার উত্তোলন করতে পারবে; বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলোতে, যেমন: ঈদ, বিজয়ের উৎসব ইত্যাদি।
মাজলিস আল উম্মাহ্

(উম্মাহ্’র কাউন্সিল, শূরা ও জবাবদিহিতা)
মাজলিস আল উম্মাহ্ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি কাউন্সিল বা পরামর্শ সভা, যা বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং যাদের সাথে প্রয়োজন হলে খলীফা বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাপারে পরামর্শ করবেন। আবার, অপরদিকে তারা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার ক্ষেত্রে উম্মাহ্’র প্রতিনিধিত্ব করবে। এ বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কর্মকান্ডের আলোকে গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ, তিনি (সা) আনসার ও মুহাজির’দের কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে পরামর্শ করতেন, যারা তাদের নিজ নিজ গোত্রের প্রতিনিধিত্ব করতেন। এছাড়া, তিনি (সা) পরামর্শদাতা হিসাবে কিছু সাহাবীকেও মনোনীত করেছিলেন, পরামর্শ কালে তিনি (সা) সাধারণতঃ অন্যদের চাইতে তাঁদের মতামতকে বেশী গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতেন; যেমন: আবু বকর (রা), উমর (রা), হামযাহ্ (রা), আলী (রা), সালমান আলফারসী (রা), হুজাইফা (রা) প্রমূখ ব্যক্তিবর্গ।
এছাড়া, এ বিষয়ে আরও দলিল পাওয়া যায় আবু বকরের জীবনী থেকে। প্রকৃত অর্থে, আবু বকর (রা) আনসার ও মুহাজির’দের মধ্য হতে কিছু ব্যক্তিকে মনোনীত করেছিলেন এবং যখন কোন ঘটনা ঘটত (যে বিষয়ে পরামর্শ করা প্রয়োজন) তখন তিনি উক্ত বিষয়ে তাদের মতামত চাইতেন। আবু বকরের সময়ে শূরা কাউন্সিলের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ওলামা ও ফাত্ওয়া প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিবর্গ। ইবনে সা’দ, আল-কাসিম হতে বর্ণনা করেছেন যে, যখন কোন ঘটনা ঘটত এবং আবু বকর মতামত প্রদানে সক্ষম ব্যক্তি ও ফকীহ্গণের সাথে আলোচনা করতে চাইতেন, তখন তিনি আনসার ও মুহাজির’দের মধ্য হতে কিছু ব্যক্তিকে ডাকতেন। আবু বকরের সময় উমর (রা), উসমান (রা), আলী (রা), আবদুর রহমান বিন আউফ (রা), উবাই বিন কাব (রা), যায়িদ বিন ছাবিত (রা), মু’য়াজ বিন জাবাল (রা) প্রমুখ সাহাবীগণ তাঁদের মতামত প্রদান করতেন। লোকেরা তাদের ফাত্ওয়া বা রায়ও গ্রহণ করত। পরবর্তীতে, উমর (রা) যখন খলীফা হলেন তখন তিনিও এসব ব্যক্তিবর্গের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এছাড়া, মুসলিমদের পক্ষ থেকে শাসকদের জবাবদিহি করার বিষয়েও দলিল-প্রমাণ রয়েছে। খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) সময় মুসলিমরা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতো। বস্তুতঃ যেহেতু শূরা বা কাউন্সিলের মাধ্যমে উম্মাহ্’র মতামতের প্রতিনিধিত্ব করা অনুমোদিত; একইভাবে, এ কাউন্সিলের মাধ্যমে উম্মাহ্’র পক্ষ থেকে শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাও অনুমোদিত। উপরোল্লিখিত সমস্ত কিছুই প্রমাণ করে যে, মতামত প্রদান ও শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার জন্য উম্মাহ্’র পক্ষ থেকে একটি বিশেষ পরামর্শ সভা বা কাউন্সিল গঠন করা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত, যা কিনা গঠিত হবে আল্লাহ্’র কিতাব ও রাসূল (সা)এর সুন্নাহ্’র আলোকে। এটিকে “উম্মাহ্’র কাউন্সিল” বলা হবে, কারণ এ কাউন্সিল বা পরামর্শ সভাটি উম্মাহ্’র থেকে মতামত প্রদান ও শাসককে জবাবদিহি করার জন্য গর্ঠিত হয়েছে।
রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদেরও এ কাউন্সিলের সদস্য হবার অনুমোদন রয়েছে, যেন তারা তাদের উপর শাসকদের দ্বারা কোন অন্যায়-অবিচার সংঘটিত হলে; কিংবা, তাদের উপর শারী’আহ্ আইনের অপপ্রয়োগ হলে; কিংবা, সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনপ্রকার ঘাটতি হলে বা এ জাতীয় কোন সমস্যা হলে অভিযোগ দায়ের করতে পারে।
শূরার অধিকার
শূরা হল সমস্ত মুসলিমের অধিকার যা পূরণ করা খলীফার কর্তব্য। খলীফাকে পরামর্শ দেয়া তাদের অধিকার এবং খলীফার উচিত বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ বলেন,
‘কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ কর। অতঃপর যখন কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেল, তখন আল্লাহ্’র উপর ভরসা কর।’
[সূরা আল ইমরান: ১৫৯]তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
‘তারা পারষ্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে।’
[সূরা আশ শূরা: ৩৮]রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকদের কাছে মতামত চাইতেন এবং তাদের পরামর্শ শুনতেন। বদরের যুদ্ধের দিন তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের অবস্থান নিয়ে সাহাবীদের (রা) সাথে পরামর্শ করেছিলেন, এবং ওহুদের যুদ্ধের সময় মদিনার ভেতরে না বাইরে যুদ্ধ করা উচিত এ বিষয়ে সাহাবীদের (রা) সাথে আলোচনা করেছিলেন। বদরের যুদ্ধের দিন তিনি (সা) যুদ্ধকৌশলের ব্যাপারে অভিজ্ঞ আল হাবাব ইবনুল মুনজির (রা) এর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। ওহুদের যুদ্ধের দিন তিনি (সা) সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করেছিলেন, যদিও এ ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব মতামত ছিল ভিন্ন।
উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) মুসলিমদের সাথে ইরাকের ভূমি বিষয়ে পরামর্শ করেছিলেন। যেহেতু এটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ছিল, সেহেতু এগুলো কি মুসলিমদের মধ্যে বন্টন করে দেয়া হবে, নাকি মালিকানা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের হাতে রেখে খারাজ প্রদানের শর্তে এ অঞ্চলের লোকদের হাতেই ভূমিগুলো ছেড়ে দেয়া হবে। তারপর তিনি তাঁর নিজের ইজতিহাদ অনুসারে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং অধিকাংশ সাহাবী (রা) এ ব্যাপারে সমর্থন দিয়েছিলেন। অর্থাৎ, তিনি সে অঞ্চলের লোকদের হাতেই ভূমিগুলো ছেড়ে দেন এবং তাদের খারাজ প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন।
জবাবদিহিতার অধিকার
মুসলিমদের এ অধিকার রয়েছে যে, খলীফা তাদের পরামর্শ করবেন এবং সেইসাথে, তাদেরও অবশ্যই শাসকদের গৃহীত সিদ্ধান্ত ও কর্মকান্ড সম্পর্কে তাদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতে হবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাকে মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন; এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) মুসলিমদের অকাট্য নির্দেশের মাধ্যমে আদেশ দিয়েছেন যেন মুসলিমরা শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করে এবং অপসারিত করে, যদি তারা জনগণের অধিকার ক্ষুন্ন করে, তাদের প্রতি দায়িত্বপালনে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় কিংবা, জনগণের কোন বিষয় অবহেলা করে, বা, শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘন করে, কিংবা, আল্লাহ্’র আইন ব্যতীত অন্য কোন আইন দিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করে। উম্মে সালামা (রা) থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“এমন কিছু আমীর আসবে যাদের কিছু কাজের ব্যাপারে তোমরা একমত পোষণ করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখান করবে। সুতরাং, যারা তাদের ভাল কাজের ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করবে তারা গুনাহ থেকে মুক্তি পেল; যে মন্দ কাজকে প্রত্যাখান করল সেও নিরাপদ হয়ে গেল। কিন্তু, তার কী হল যে (মন্দ কাজকে) গ্রহণ করল এবং তা প্রত্যাখান করল না? তারা জিজ্ঞেস করলেন, ‘এমতাবস্থায় আমাদের কী তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উচিত নয়?’ উত্তরে তিনি (সা) বললেন, ‘না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সালাত কায়েম রাখে।”এখানে সালাত বলতে শারী’আহ্ আইন অনুযায়ী শাসন করাকে বোঝানো হয়েছে।
আবু বকরের খিলাফতের সময় উমর (রা) ও তাঁর অনুসারী মুসলিমগণ মুরতাদদের বিরুদ্ধে আবু বকরের যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে অস্বীকার করেছিলেন (যখন প্রথম মুরতাদ সম্পর্কিত সমস্যা শুরু হয়েছিল)। আল বুখারী ও মুসলিম আবু হুরাইরা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
“যখন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ইন্তেকাল করলেন এবং আবু বকর খলীফা হলেন তখন আরবের কিছু গোত্র মুরতাদ (অর্থাৎ, ইসলাম ত্যাগ করল) হয়ে গেল। উমর বললেন, ‘আপনি কিভাবে লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“আমি (আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে) আদিষ্ট হয়েছি যেন মানুষের সাথে আমি ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ করতে থাকি যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা “আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্’র রাসূল” এ কথার স্বীকৃতি দেয় এবং নামাজ কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে। অতএব, যদি তারা তা করে তবে তাদের জীবন ও সম্পদ আমার নিকট হতে নিরাপদ, তবে যেটা আল্লাহ্’র আইন (অর্থাৎ, শারী’আহ্ লঙ্ঘনে প্রাপ্য শাস্তি) তা ব্যতীত। আর, তাদের হিসাবনিকাশ তো আল্লাহ্’র কাছে।”
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২৯৪৬)উত্তরে আবু বকর বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম! আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব যারা সালাত ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করেছে। কারণ, যাকাত হল সম্পদের উপর (আল্লাহ্’র) অধিকার। আল্লাহ্’র কসম, তারা যদি কোন বাচ্চা ছাগীও যাকাত দিতে অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে দিত, এই অস্বীকৃতির কারণে আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করব।’ তখন উমর (রা) বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম, তিনিই আল্লাহ্ যিনি দ্রুত আবু বকরের হৃদয়কে প্রশস্ত করে দিয়েছেন এবং আমি জানি তিনি সত্য বলেছেন।’
উমর (রা) এর সময় বিলাল ইবনে রাবাহ্ এবং আল-যুবায়ের সহ অন্যান্যরাও মুজাহিদদের মাঝে ইরাকের ভূমি বন্টন না করার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। একজন বেদুইনও উমরের রাষ্ট্রের জন্য কিছু জমি সংরক্ষিত করার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখান করেছিল। আবু উবাইদ তার আল-আমওয়াল গ্রন্থে আমীর আব্দুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের হতে এবং ইবন যুবায়ের তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেছেন যে, ‘একজন বেদুইন উমরের কাছে আসল এবং বলল, ‘হে আমীরুল মু’মিনীন, অন্ধকার যুগে এগুলো আমাদের ভূমি ছিল যেগুলোর জন্য আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। এখন আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং এগুলো আমাদেরই থাকার কথা। তাহলে, আপনি কেন এ ভূমি সংরক্ষিত করতে চাইছেন?’ উমর একথা শোনার পর মাথা নাড়াতে লাগলেন এবং নিজের গোঁফে আঙুল চালাতে লাগলেন। যখন কোন বিষয় নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়তেন তখন তিনি এরকম করতেন। এমতাবস্থায় বেদুইন উমরকে আবারও প্রশ্ন করল। অতঃপর উমর বললেন, ‘সম্পদের মালিক হলেন আল্লাহ্ এবং লোকেরা তাঁর দাস মাত্র। আল্লাহ্’র কসম, আমি যদি ফি সাবিলিল্লাহর (জিহাদের) ব্যাপারে কোনরূপ চাপ অনুভব না করতাম তাহলে এই জমির এক ইঞ্চিও রাখতাম না।’ তারপর, উমর গণমালিকানাধীন সম্পদ হতে মুসলিমদের (জিহাদে ব্যবহৃত) ঘোড়ার জন্য কিছু ভূমি অধিগ্রহণ করেন। এছাড়া, (বিবাহের সময়) চারশত দিরহামের বেশী মোহরানা ধার্য না করার ব্যাপারে উমরের নিষেধাজ্ঞাকে এক মহিলা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। উক্ত মহিলা উমরকে বলেছিলেন, ‘হে উমর, ‘আপনার এটা বলার কোন অধিকার নেই। আপনি কি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার এ আয়াত শুনেননি যে, “তোমরা যদি তাদের একজনকে রাশি রাশি ধন প্রদান করে থাকো, তবে তার মধ্য হতে কিছুই ফিরিয়ে নিও না।” [সূরা নিসা : ২০]
তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘এই মহিলা সঠিক আর উমর ভুল।’
এছাড়া, উসমানের (রা) সাথে, যখন তিনি আমীর-উল-মু’মিনীন ছিলেন, আলী (রা) হজ্জ্ব ও উমরাহ্ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন। আহমাদ বিশুদ্ধ সনদ সহকারে আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “আমরা উসমানের সাথে আল-জুফাহ্’তে থাকাকালে আল-শাম থেকে আগত একদল লোক, যাদের মধ্যে হাবীব ইবন মাসলামা আল-ফাহ্রী ছিলেন। উসমানকে হজ্জ্বের সাথে (তামাত্তু) উমরাহ্’র বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন: ‘হজ্জ্বের মাসে হজ্জ্ব ও উমরাহ একসাথে না করাই উত্তম। এটা ভাল হবে যে, তোমরা দ্বিতীয়বার আল্লাহ্’র ঘরে না আসা পর্যন্ত উমরাহ’কে বিলম্বিত করে নিও। কারণ, তিনি তাঁর এ ঘরকে সৎকাজের জন্য প্রশস্ত করেছেন।’ আলী এসময় এ উপত্যকায় উট চরাচ্ছিলেন। উসমানের উমরাহ্’র বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গী জানার পর তিনি তাঁর দিকে অগ্রসর হলেন যে পর্যন্ত না তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন এবং বললেন: ‘তুমি কি রাসূলের সুন্নাহ্’কে পাল্টে দিতে চাও এবং আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে তাঁর বান্দাদের যে বিষয়ে অনুমতি (রুখসাহ্) দিয়েছেন তা রহিত করতে চাও? তুমি এ ব্যাপারে নিষেধ করছো, অথচ যারা দূরবর্তী স্থান থেকে আসে সে সকল লোকের জন্য এটা অনুমোদিত।’ একথা শুনে উসমান লোকদের দিকে ফিরলেন এবং বললেন, ‘আমি কি তোমাদের এটা করতে নিষেধ করেছি? না, আমি তা করিনি। এটা শুধু আমার দৃষ্টিভঙ্গী এবং উপদেশ। যে কেউ চাইলে এটা গ্রহণ করতে পারে কিংবা, না চাইলে প্রত্যাখান করতে পারে।”
সুতরাং, উম্মাহ্’র কাউন্সিল বা পরামর্শ সভার পরামর্শ (শূরা) দেয়ার অধিকার রয়েছে এবং শাসকদের জবাবদিহি করা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক।
শূরা এবং জবাবদিহিতার মধ্যকার পার্থক্য সুস্পষ্ট। শূরা হল একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এ ব্যাপারে মতামত চাওয়া এবং শোনা; আর, জবাবদিহিতা হল সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সমালোচনা বা বিরোধিতা করা।
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচন
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যরা নির্বাচিত, নিয়োগ প্রাপ্ত নন। জনগণের মতামতকে জোরালোভাবে উপস্থাপনের জন্য তারা হলেন জনগণের প্রতিনিধি। প্রতিনিধি তাদের দ্বারাই নির্বাচিত হওয়া উচিত যাদের প্রতিনিধিত্ব তারা করবেন এবং কোন অবস্থাতেই এ প্রতিনিধিদের জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না। তাছাড়া, যেহেতু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মতামত জোরালোভাবে উপস্থাপনের জন্য এবং তাদের পক্ষ থেকে শাসককে জবাবদিহি করার জন্য উম্মাহ্’র কাউন্সিল গঠন করা হয়, সেহেতু এ উদ্দেশ্য কখনও অর্জিত হবে না, যদি উক্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত না করে।
এছাড়া, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) যাদের সাথে পরামর্শ করতেন তাদের তিনি ব্যক্তিত্ব, যোগ্যতা বা সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্বাচিত করতেন না; বরং, তাদের নির্বাচন করার ক্ষেত্রে তিনি (সা) দুটি বিষয়কে প্রাধান্য দিতেন। প্রথমত: তারা তাদের গোত্র বা গোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন, তাদের যোগ্যতা যাই হোক না কেন। আর, দ্বিতীয়ত: তারা আনসার আর মুহাজিরদের প্রতিনিধিত্ব করতেন। কারণ, শূরা গঠনের মূল উদ্দেশ্য হল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা। সুতরাং, যে নীতির ভিত্তিতে উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন, তা হল: প্রথমত: জনগণের প্রতিনিধিত্ব করা – যা প্রতিফলিত হয়েছিল রাসূল (সা) কর্তৃক গোত্র প্রধানদের নির্বাচিত করার মাধ্যমে। আর, দ্বিতীয়ত: কোন দল বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করা – যা প্রতিফলিত হয়েছিল তিনি (সা) কর্তৃক আনসার ও মুহাজিরদের প্রতিনিধি বাছাই করার ক্ষেত্রে। বস্তুতঃ অগনিত মানুষ ও দলের ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যতীত এ প্রতিনিধি নির্বাচন করা সম্ভব নয়। আর, তাই উম্মাহ্ কাউন্সিলের সদস্যদের অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে।
তবে এটা সত্য যে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) যাদের সাথে পরামর্শ করতেন তাদের তিনি (সা) নিজেই মনোনীত করেছিলেন। এর কারণ হল, মদিনা ছিল একটি ছোট অঞ্চল এবং এখানে সকল মুসলিমই তাঁর পরিচিত ছিল। বিপরীতভাবে, আমরা দেখতে পাই যে, আক্বাবার দ্বিতীয় শপথের সময় যে মুসলিমরা তাঁকে বাই’আত দিয়েছিলেন তারা তাঁর পরিচিত ছিল না বিধায় তিনি নেতা নির্বাচনের বিষয়টি তাদের উপর ন্যস্ত করেছিলেন এবং বলেছিলেন:
“তোমরা তোমাদের মধ্য হতে বারো জন নেতা নির্বাচিত করো যারা তাদের লোকেদের উপর দায়িত্বশীল।”
এ ঘটনাটি কা’ব ইবন মালিকের সূত্রে সীরাত ইবন হিশামে বর্ণিত আছে।
উপরোক্ত ঘটনাবলী থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, যেহেতু উম্মাহ্ বা শূরা কাউন্সিলের সদস্যগণ বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিনিধিত্ব করে, এবং যেহেতু এ কাউন্সিল গঠনের মূল উদ্দেশ্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মতামতকে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা এবং সেইসাথে, তাদের পক্ষ থেকে শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা; এবং যেহেতু এ উদ্দেশ্য অর্জন করা কখনো সম্ভব নয় যদি না প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণের মধ্য হতে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হয়; সুতরাং, এটা প্রমাণিত যে, উম্মাহ্ বা শূরা কাউন্সিলের সদস্যদের অবশ্যই নির্বাচিত হতে হবে, তারা রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত হবে না।
উম্মাহ্’র কাউন্সিল নির্বাচিত করার পদ্ধতি
১. গভর্ণর (ওয়ালী) সংক্রান্ত আলোচনায় আমরা পূর্বেই বলেছি যে, আমরা দু’টি কারণে উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল (যা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে) নির্বাচনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। প্রথমত: উলাই’য়াহর জনগণের প্রয়োজন ও অবস্থা সম্পর্কে ওয়ালীকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা। এর কারণ হল, ওয়ালীকে তার দায়িত্ব পালনে এমনভাবে সহায়তা করা যাতে উলাই’য়াহর জনগণের স্বস্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয় এবং সেইসাথে, তাদের প্রয়োজন পূরণ ও সেবার বিভিন্ন অনুসঙ্গ সরবরাহ করা যায়। দ্বিতীয়ত: উলাই’য়াহর শাসনকার্য পরিচালনার ব্যাপারে জনগণের সন্তুষ্টি ও অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত হওয়া। কারণ, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের অধিকাংশের অভিযোগ ওয়ালীর অপসারণকে অনিবার্য করে তুলে। সুতরাং, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের বাস্তবতা প্রশাসনিক – যা উলাই’য়াহর জনগণের অবস্থা সম্পর্কে এবং ওয়ালীর কাজের ব্যাপারে সন্তুষ্টি ও অভিযোগ অবহিতকরণের মাধ্যমে ওয়ালীকে তার দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে। এ সমস্ত কিছুই ওয়ালীকে প্রতিনিয়ত তার কাজ উন্নত করতে উদ্ধুদ্ধ করে। এছাড়া, উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর মত এই কাউন্সিলের কিছু আবশ্যিক বা নির্বাহী
ক্ষমতা (mandatory power) রয়েছে যে সম্পর্কে (উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর আবশ্যিক বা নির্বাহী ক্ষমতা সম্পর্কে) কিছু পরে আলোচিত হবে।
২. আমরা সমগ্র উম্মাহ্’র জন্য একটি কেন্দ্রীয় উম্মাহ্ কাউন্সিল (শূরা ও জবাবদিহিতার জন্য) গঠন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি, যা অবশ্যই উম্মাহ্’র দ্বারা নির্বাচিত হবে এবং উম্মাহ্’কে প্রতিনিধিত্ব করবে। এর আবশ্যিক ক্ষমতাগুলো পরবর্তীতে আলোচিত হবে।
৩. এর অর্থ হল উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচনের জন্য একটি নির্বাচন হবে এবং উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্যদের জন্য আরেকটি নির্বাচন হবে।
৪. নির্বাচনী প্রক্রিয়া সহজতর করার লক্ষ্যে ও জনগণকে পুনঃনির্বাচনের বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আমরা প্রথমে উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি; তারপর, যারা এ নির্বাচনে জয়লাভ করবে তারা নিজেদের মধ্য হতে উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচিত করবে। এর অর্থ হল, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর সদস্যগণ উম্মাহ্ কর্তৃক সরাসরি নির্বাচিত হবেন; আর, উম্মাহ্’র কাউন্সিল উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর দ্বারা নির্বাচিত হবে। অর্থাৎ, উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল এর শুরু ও শেষের মেয়াদকাল উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর শুরু ও শেষের মেয়াদকাল একই হবে।
৫. উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল থেকে যিনি উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হবেন, তার শূণ্য আসনটি
উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল নির্বাচনে পরাজিত ব্যক্তিদের মধ্য হতে যিনি সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত হয়েছিলেন, তার দ্বারা পূরণ করা হবে। যদি এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যে দু’জন ব্যক্তি সমান ভোট পেয়েছিলেন, সেক্ষেত্রে লটারির মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পন্ন করা হবে।
৬. অমুসলিমগণ (আহলুল দিম্মা) উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলে তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচন করবে এবং তারাই আবার উম্মাহ্’র কাউন্সিলে তাদের নিজস্ব সদস্য নির্বাচন করবেন। এ সমস্ত কিছুই উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল নির্বাচন ও উম্মাহ্’র কাউন্সিল নির্বাচনের সময়ে সংঘটিত হবে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে, আমরা একটি আইন প্রস্তুত করেছি, যা উপরে বর্ণিত বিষয়সমূহকে বিবেচনা করবে এবং উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল ও উম্মাহ্’র কাউন্সিল নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তুতি ও সাবধানতা সমূহকে বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করবে। এই আইনটি যথাসময়ে আলোচিত ও গৃহীত হবে, ইনশাআল্লাহ্ ।
উম্মাহ্ কাউন্সিলের সদস্যপদ
যে কোন ব্যক্তি, যে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বহন করে, যদি সে পরিণত ও সুস্থ মস্তিকের অধিকারী হয়, তবে তার উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচিত হবার এবং কাউন্সিল এর সদস্য নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে; সে ব্যক্তি নারী বা পুরুষ যে’ই হোক না কেন। এর কারণ হল, উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর শাসন করার কোন এখতিয়ার নেই। এজন্য এটি রাসূল (সা) এর সেই প্রসিদ্ধ হাদীস যা নারীদের শাসক পদে নিযুক্ত করার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তা এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এটা বরং শূরা (পরামর্শ) ও জবাবদিহিতার সাথে সম্পর্কিত, যা কিনা নারী এবং পুরুষ উভয়েরই অধিকার। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এর নবুয়্যতের তেরতম বছরে, অর্থাৎ যে বছরে তিনি হিজরত করেছিলেন, সে বছর মদিনা থেকে ৭৫ জন মুসলিম মক্কায় আগমন করেছিলেন, যাদের মধ্যে দুই জন ছিলেন নারী; এবং তারা সকলেই তাঁকে বাই’আত দিয়েছিলেন, যা আক্বাবার দ্বিতীয় শপথ নামে পরিচিত। প্রকৃতপক্ষে এ বাই’আত ছিল যুদ্ধের বাই’আত, ছিল স্বশস্ত্র সংগ্রাম ও রাজনৈতিক বাই’আত। তারা সকলে বাই’আত দেবার পর রাসূল (সা) বললেন:
“তোমরা তোমাদের মধ্য হতে বারো জন নেতা (নাকীব) নির্বাচিত করো যারা তাদের লোকেদের উপর দায়িত্বশীল।”এটি কা’ব ইবন মালিকে সূত্রে আহমাদ বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের অংশ; এবং এটা তাঁর পক্ষ থেকে উপস্থিত সকলের মধ্য হতে বারোজন নির্বাচিত করার নির্দেশ।
এখানে তিনি (সা) পুরুষদের কথা বিশেষভাবে বলেননি, আবার নারীদেরকেও বাদ দেননি কিংবা, কাদের নির্বাচিত করা হবে বা কারা নির্বাচিত করবে, সে বিষয়েও কিছু বলেননি। সুতরাং, এক্ষেত্রে শারী’আহ্’র মুতলাক্ব (অনির্ধারিত) এর নিয়ম অনুসরণ করা হবে, যে পর্যন্ত এমন কোন দলিল পাওয়া যায় যা এ বিষয়ে কোন সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছে। এছাড়া, একইসাথে এক্ষেত্রে ’আম (সাধারণ) নির্দেশের আওতায় এ নির্দেশটিকে ধরা হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না কোন দলিলের মাধ্যমে এটি নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। উপরোক্ত হাদীসের ক্ষেত্রে রাসূল (সা) এর নির্দেশটি ছিল মুতলাক্ব (অনির্ধারিত) এবং আ’ম (সাধারণ) এবং এ ব্যাপারে এমন কোন দলিল নেই যা, নির্দিষ্টকরণ বা কোনপ্রকার সীমাবদ্ধতা আরোপ করাকে নির্দেশ করে। সুতরাং, এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এখানে উক্ত দু’জন নারীকেও তাদের নাকীব নির্বাচন করার এবং তাদের পক্ষ থেকে নাকীব হিসাবে নির্বাচিত হবার অধিকার প্রদান করেছেন।
একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাই’আত গ্রহণ করছিলেন, যখন তাঁর সাথে আবু বকর (রা) ও উমর (রা) ও ছিলেন। এসময় তিনি (সা) নারী-পুরুষ উভয়েরই বাই’আত গ্রহণ করেছিলেন। এই বাই’আত ইসলামের জন্য ছিল না, বরং শাসনের জন্য ছিল; আর ঐসব নারীগণ তখন মুসলিমই ছিল। হুদাইবিয়ার প্রান্তরে রিদওয়ানের বাই’আতের পর নারীগণও তাঁকে বাই’আত দিয়েছিল। আল্লাহ্ বলেন,
‘হে নবী, ঈমানদার নারীরা যখন আপনার কাছে এসে আনুগত্যের শপথ করে যে, তারা আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, জারজ সন্তানকে স্বামীর ঔরস থেকে আপন গর্ভজাত সন্তান বলে মিথ্যা দাবি করবে না এবং ভাল কাজে আপনার অবাধ্যতা করবে না, তখন তাদের আনুগত্য গ্রহণ করুন এবং তাদের জন্যে আল্লাহ্’র কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমাশীল অত্যন্ত দয়ালু।’
[সূরা মুমতাহিনা: ১২]এই আয়াতে বর্ণিত বাই’আতও শাসনের বাই’আত। পবিত্র কুর’আনের বর্ণনা অনুযায়ী নারীরা এখানে ঈমানদার এবং তাদের প্রদত্ত বাই’আত এই বিষয়ে যে, তারা সৎ কাজে আল্লাহ্’র রাসূলকে অমান্য করবে না।
এছাড়া, নারীদের রয়েছে প্রতিনিধিত্ব করার ও মতামত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত হবার অধিকার। এর কারণ হল, তার নিজস্ব মত উপস্থাপন বা প্রকাশের অধিকার রয়েছে; সুতরাং, তার প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকারও রয়েছে। উপরন্তু, যেহেতু এ ধরনের প্রতিনিধিত্বের জন্য পুরুষ হওয়া আবশ্যিক নয়, তাই যারা তাকে নির্বাচিত করবে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকারও তার রয়েছে।
এছাড়া, এটাও প্রমাণিত যে, আমাদের নেতা উমর (রা) যখন কোন সমস্যায় পড়তেন – হোক সেটা হুকুম শারী’আহ্ সংক্রান্ত বা, শাসনকার্য সংক্রান্ত বা, রাষ্ট্রীয় কোন কাজ সংক্রান্ত, তখন তিনি এসব ব্যাপারে মতামতের জন্য মুসলিমদের দ্বারস্থ হতেন। কোন সমস্যার মুখোমুখি হলে তিনি সাধারণতঃ মদিনার মুসলিমদের মসজিদে সমবেত হতে বলতেন, এবং নারী ও পুরুষ সকলকেই তিনি আহ্বান করতেন এবং তাদের সকলেন কাছে মতামত চাইতেন। মোহরানার সীমাবদ্ধতা আরোপের ব্যাপারে যখন একজন নারী তার সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করেছিল, তখন উমর তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন।
অমুসলিমদেরও মুসলিমদের মত উম্মাহ্’র কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব করার এবং তাদের নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে; যেন তারা এর মাধ্যমে তাদের পক্ষ থেকে, তাদের উপর শারী’আহ্ আইনের অপপ্রয়োগ এবং তাদের উপর পতিত শাসকের জুলুম-নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে ধরতে পারে।
তবে, শারী’আহ্ আইনের সাথে সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে অমুসলিমগণ তাদের মতামত উপস্থাপন করতে পারবে না, কেননা শারী’আহ্ আইন ইসলামী আক্বীদাহ্ থেকে উৎসারিত। বস্তুতঃ আহ্কাম শারী’আহ্ হচ্ছে বাস্তবে প্রয়োগের লক্ষ্যে বিশদ দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে গৃহীত একগুচ্ছ শারী’আহ্ আইনের সমষ্টি, যা মানুষের জীবনের সাথে জড়িত সকল সমস্যাকে ইসলামী আক্বীদাহ্ নির্দেশিত একটি বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করে। আর, অমুসলিমরা জীবন সম্পর্কে এমন এক বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে যা সম্পূর্ণ ভাবে ইসলামী আক্বীদাহ্ বর্হিভূত ও এর সাথে সাংঘর্ষিক; সেইসাথে, জীবন সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গীও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সংঘর্ষপূর্ণ। তাই, শারী’আহ্ আইনসংক্রান্ত বিষয়ে তাদের মতামত বিবেচনা করা হয় না।
এছাড়া, অমুসলিমদের খলীফা নির্বাচন করারও কোন অধিকার নেই; না তাদের খলীফা নির্বাচিত হতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের তালিকা সংক্ষেপণে অংশগ্রহণ করার অধিকার রয়েছে; কারণ, শাসনকার্য সম্পর্কিত কোন বিষয়ে তাদের অধিকার নেই। এছাড়া অন্যান্য বিষয়ে, যা উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর আবশ্যিক ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত, এ সকল বিষয়ে মুসলিমদের মতোই তার মতামত জোরালোভাবে উপস্থাপনের অধিকার রয়েছে।
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যপদের মেয়াদকাল
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সদস্যপদের মেয়াদকাল সীমাবদ্ধ। কারণ, আবু বকরের (রা) তাদের সাথে পরামর্শ করার ব্যাপারে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা) পরামর্শ করতেন। আবার, উমর ইবনুল খাত্তাবের (রা) উপরও আবু বকর (রা) তাঁর শাসনামলের শেষদিকে যাদের সাথে পরামর্শ করতেন, তাদের সাথে পরামর্শ করার ব্যাপারে কোনপ্রকার বাধ্যবাধকতা ছিল না। উমর (রা) তাঁর শাসনামলের প্রথম বছরগুলোতে যাদের সাথে পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন, পরের বছরগুলোতে তিনি পরামর্শের জন্য অন্যান্যদের পছন্দ করেছেন। এ ঘটনাসমূহ থেকে বোঝা যায় যে, উম্মাহ্’র কাউন্সিল এর সদস্যপদ একটি নির্দিষ্ট মেয়াদকালের জন্য। আমরা এই মেয়াদকাল পাঁচ বছর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি।
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতাসমূহ
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতাসমূহ নিম্নরূপ এবং এগুলো হল:
১. ক) খলীফাকে অবশ্যই কাউন্সিলের সাথে পরামর্শ করতে হবে এবং কাউন্সিলের অধিকার রয়েছে খলীফাকে এমন সব বাস্তব বিষয় ও কর্মকান্ডের ব্যাপারে পরামর্শ দেয়ার, যেগুলো আভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নের সাথে জড়িত এবং যে সমস্ত বিষয়ে গভীর চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার কোন প্রয়োজন হয় না। যেমন: শাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি ইত্যাদি। বস্তুতঃ এ সমস্ত ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা জনগণের জীবনকে করে আনন্দময় ও প্রশান্তিমন্ডিত। এ বিষয়গুলো ছাড়াও রয়েছে নগরসমূহের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, জনগণের জীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শত্রু হুমকী বিদূরিত করা ইত্যাদি। এ সমস্ত বিষয়ে কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক; অর্থাৎ, এক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত কার্যকরী করা হবে।
খ) এছাড়া, বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় যেগুলোতে গভীর চিন্তা ও বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে, যেমন: তথ্য প্রকাশ, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া, কিংবা, যে সমস্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় তথ্যের দরকার হয়, যেমন: সামরিক পরিকল্পনা এবং সকল ধরনের প্রযুক্তি বা শিল্পসংক্রান্ত বিষয় – এ সকল ক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করা হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়। একই কথা প্রযোজ্য হবে, অর্থনীতি, সেনাবাহিনী ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে। এ সমস্ত বিষয়ে শারী’আহ্ আইনের আলোকে খলীফার নিজস্ব মত ও ইজতিহাদ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আছে, এ সমস্ত বিষয় উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত হবে না। তবে, খলীফার অধিকার রয়েছে এ বিষয়সমূহ কাউন্সিলের মাধ্যমে জনগণের সামনে উপস্থাপন করা এবং তাদের মতামত সম্পর্কে অবহিত হওয়া। কিন্তু, এ সকল বিষয়ে তাদের মতামত গ্রহণ করতে খলীফা বাধ্য নন।
২. আইন গ্রহণ সংক্রান্ত বিষয়ে কাউন্সিলের পরামর্শ বা মতামত জানতে চাওয়া হবে না। বরং, আইন প্রণয়ণ করা হবে শুধুমাত্র আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূলের সুন্নাহ্, সাহাবীদের ইজমা’ এবং সঠিক ইজতিহাদের মাধ্যমে কৃত ক্বিয়াসের ভিত্তিতে। এভাবেই বিভিন্ন বিষয়ে শারী’আহ্ আইন গ্রহণ ও কার্যকর করা হবে। তবে, খলীফা চাইলে তিনি যে আইন ও বিধিবিধান গ্রহণ করতে চান তা কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন। কাউন্সিলের মুসলিম সদস্যগণ এ বিষয়ে তাদের মতামত প্রদান ও বিতর্ক করতে পারেন। তবে, রাষ্ট্র কর্তৃক শারী’আহ্ আইন গ্রহণ করার যে শারী’আহ্ মূলনীতি (উসুল) গৃহীত হয়েছে, কোন বিষয়ে খলীফার উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণ যদি এ মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক বা মূলনীতি বহির্ভূত হয়, তবে কাউন্সিলের (মুসলিম) সদস্যরা এ আইনের বিরোধীতা করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে, এ বিষয়টি মাহকামাতুল মাযালিম এর কাছে ন্যস্ত করা হবে এবং এ বিষয়ে তার প্রদত্ত সিদ্ধান্তকেই বাস্তবায়ন করা হবে।
৩. উম্মাহ্’র কাউন্সিল রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কার্যকরীভাবে সংঘটিত যে কোন বিষয়ের ব্যাপারে খলীফাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার অধিকার সংরক্ষণ করে; তা আভ্যন্তরীণ বিষয়, বৈদেশিক বিষয়, অর্থনৈতিক বিষয় বা সামরিক বিষয় যে কোন ধরনের বিষয় সম্পর্কেই হোক। যে সকল ক্ষেত্রে কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যদের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক, সে সকল ক্ষেত্রে তাকে তাদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। আর, যে সকল বিষয়ে অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করার উপর কোন বাধ্যবাধকতা নেই, সেক্ষেত্রে তাদের রায় মেনে নেয়া আবশ্যিক হবে না।
যদি উম্মাহ্’র কাউন্সিল ও খলীফার সাথে এমন কোন বিষয়ে মতবিরোধের সৃষ্টি হয়, যা ইতোমধ্যে কার্যকরী হয়ে গেছে, তবে সেক্ষেত্রে এ বিষয়টি সমাধানের জন্য মাযালিম আদালতে উপস্থাপন করতে হবে এবং এ আদালতে প্রদত্ত রায়ই বাস্তবায়ন করতে হবে।
৪. উম্মাহ্’র কাউন্সিল খলীফার সহকারী, ওয়ালী ও আমীলদের ব্যাপারে অসন্তুষ্টি প্রকাশের অধিকার সংরক্ষণ করে। এসব ক্ষেত্রে তাদের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক এবং কাউন্সিলের মতামতের ভিত্তিতে
খলীফাকে তাদের তৎক্ষণাৎ পদচ্যূত করতে হবে। যদি ওয়ালী বা আমীলদের উপর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি বিষয়ে
উম্মাহ্’র কাউন্সিলের সাথে সংশ্লিষ্ট উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের মতপার্থক্য দেখা দেয়, তবে এক্ষেত্রে উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হবে।
৫. খলীফা হিসাবে নিযুক্ত হবার সকল শর্তপূরণের মাধ্যমে যারা এ পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার জন্য মাহকামাতুল মাযালিম কর্তৃক ছাড়পত্র পেয়েছেন, উম্মাহ্’র কাউন্সিলের মুসলিম সদস্যগণ তাদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করতে পারেন; হতে পারে এই সংখ্যা দুই বা ছয়, যা কিনা ইতোমধ্যে খলীফা নির্বাচন অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের মতামত গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক এবং তাদের সংক্ষিপ্তকৃত তালিকার বাইরে কোন প্রার্থীকে বিবেচনা করা হবে না।
বস্তুতঃ এগুলোই হল উম্মাহ্’র কাউন্সিলের আবশ্যিক ক্ষমতাসমূহ। এগুলোর দলিল-প্রমাণ সম্পর্কিত আলোচনা নিম্নরূপ:
প্রথম অনুচ্ছেদ, ক. বাস্তবতা ভিত্তিক বিষয় ও কর্মকান্ডসমূহে, যেগুলোর ব্যাপারে কোন গভীর চিন্তাভাবনা বা পর্যালোচনার প্রয়োজন নেই, এ সকল ক্ষেত্রে উম্মাহ্’র কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করা যে খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক তার দলিল হিসাবে বলা যায় যে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ওহুদের যুদ্ধের সময় মদিনার বাইরে মুশরিক শত্রুপক্ষের মুকাবিলার ব্যাপারে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করেছিলেন, যদিও এ বিষয়ে তাঁর ও তাঁর সাহাবীদের মতামত ছিল মদিনার বাইরে না গিয়ে ভেতরে থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করা।
এ নীতিটি আরও গ্রহণযোগ্য হয়েছে আবু বকর (রা) ও উমর (রা) এর প্রতি রাসূল (সা) এর উক্তি থেকে: “যদি তোমরা দু’জনে কোন বিষয়ে পরামর্শের মাধ্যমে একমত হও তবে আমি তোমাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করবো না।”
সুতরাং, মতামতের সাথে জড়িত বাস্তবভিত্তিক যে সমস্ত বিষয়, যেমন: নাগরিকের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সেবাপ্রদান করা, তাদের নিরাপত্তা বিধান করা, নগরের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা, জনগণের জন্য হুমকীস্বরূপ বিষয়গুলোকে দূরীভূত করা ইত্যাদি বিষয়ে খলীফাকে বাধ্যতামূলক ভাবে উম্মাহ্ কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করতে হবে, যদিও এ ব্যাপারে খলীফার মতামত ভিন্ন হয়ে থাকে। এর কারণ, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ওহুদের যুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতকে মেনে নিয়েই মদিনার বাইরে শত্রুপক্ষের মুকাবিলা করেছিলেন।
প্রথম অনুচ্ছেদ, খ. নীতিগতভাবে, খলীফা এ অনুচ্ছেদে আলোচিত বিষয়সমূহের ব্যাপারে বিজ্ঞ পন্ডিত ব্যক্তিবর্গ, বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। এ বিষয়ের দলিল হল, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বদরের যুদ্ধের স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে আল-হাবাব বিন আল-মুনদির (রা) এর পরামর্শ গ্রহণ করেছিলেন। সীরাত ইবন হিশামে বর্ণিত আছে যে,
“যখন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বদরের কুপের কাছাকাছি তাঁবু স্থাপন করলেন, তখন তাঁর স্থান নির্বাচনের বিষয়ে আল-হাবাব বিন আল-মুনদির সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। তিনি রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল! আল্লাহ্ কি আপনাকে এ স্থানে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন যে আমরা এ স্থান ত্যাগ করতে পারবো না? নাকি, এটা যুদ্ধ ও কৌশলের ব্যাপারে আপনার নিজস্ব মতামত? তিনি (সা) বললেন: ‘এটা যুদ্ধ ও কৌশলের ব্যাপারে শুধুই একটা মতামত।’ তখন আল-হাবাব বিন আল-মুনদির বললেন: ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল! যুদ্ধ করার জন্য এটা সঠিক স্থান নয়। এখান থেকে লোকদের সরিয়ে নিন যে পর্যন্ত না আমরা শত্রুপক্ষের কাছাকাছি অবস্থিত কুপের নিকট পৌঁছাই এবং আমরা সেখানে অবস্থান গ্রহণ করবো; তারপর আমরা কুপের পানি অন্যত্র সরিয়ে নেব, তার উপর আমরা একটি বেসিন (পাত্র সদৃশ) তৈরী করবো; তারপর উক্ত বেসিনটি পানি দিয়ে পূর্ণ করবো। তারপর, আমরা আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো, যাতে আমরা পানি পান করি, কিন্তু, পান করার জন্য তারা কোন পানি না পায়।’ আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বললেন: ‘তুমি ঠিক কথাই বলেছো।’ সুতরাং, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এবং মুসলিমরা উঠে দাঁড়ালেন এবং হাঁটতে শুরু করলেন যে পর্যন্ত না শত্রুপক্ষের নিকটবর্তী কুপের কাছে পৌঁছালেন এবং সেখানেই তাঁবু স্থাপন করলেন। তারপর, তিনি (সা) উক্ত কুপের পানি সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ দিলেন এবং তাই করা হল। এরপর, একটি বেসিন তৈরী করে তা পানি দিয়ে পূর্ণ করা হল এবং বাকী কুপগুলো বন্ধ করে দেয়া হল এবং তারা তাদের পানির পাত্রগুলো উক্ত বেসিনে নিক্ষেপ করলেন।”
সুতরাং,
এক্ষেত্রে আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আল-হাবাবের মতামতের সাথে একমত পোষণ করেছিলেন।
এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে যুদ্ধ ও কৌশলই মুখ্য, এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের কোন মূল্য নেই। বরং, একজন বিশেষজ্ঞের মতামতই এক্ষেত্রে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া, প্রযুক্তি সংক্রান্ত ও গভীর চিন্তাভাবনার সাথে জড়িত বিষয়গুলো যেখানে পর্যাপ্ত গবেষণা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন সে সকল ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য হবে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে, সাধারণ মানুষের মতামতের চাইতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মতামতকে অধিক গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে। বস্তুতঃ এ সকল বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতের কোন মূল্যই নেই। বরং, মূল্য আছে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও পান্ডিত্যের।
অর্থনৈতিক বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ, হুকুম শারী’আহ্ অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্র, যা অবশ্যই সংগ্রহ করতে হবে এবং এ প্রাপ্ত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রগুলোও সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে। এছাড়া, কখন ও কোন অবস্থায় জনগণের উপর কর ধার্য করা যাবে সেটাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। সুতরাং, অর্থ সংগ্রহ বা বরাদ্দের ব্যাপারে জনগণের মতামত জানতে চাওয়ার কোন প্রয়োজন এখানে নেই। একই কথা সেনাবাহিনীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, হুকুম শারী’আহ্ খলীফাকে সেনাবাহিনীর বিষয়সমূহ পরিচালনা করার অধিকার দিয়েছে এবং জিহাদের সম্পর্কিত আইনকানুনও শারী’আহ্ কর্তৃক নির্ধারণ করে দিয়েছে। সুতরাং, শারী’আহ্ নির্ধারিত বিষয়সমূহে জনগণের মতামতের কোন মূল্য নেই। একই কথা খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক বিষয়েও প্রযোজ্য। কারণ, এ বিষয়ে মতামত প্রদান করতে হলে পর্যাপ্ত চিন্তাভাবনা, গবেষণা, পর্যালোচনা ও গভীর অর্ন্তদৃষ্টি প্রয়োজন এবং এ বিষয়টি জিহাদের সাথেও সম্পর্কিত। উপরন্তু, এ বিষয়টি যুদ্ধ ও এর কৌশলের সাথে জড়িত। সুতরাং, এ বিষয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ কিংবা লঘিষ্ঠ কারো মতামতেরই কোন মূল্য নেই। তবে, এ বিষয়ে জনগণের সাথে পরামর্শ বা তাদের মতামত জানার জন্য খলীফার এ বিষয়সমূহকে কাউন্সিলের সামনে উপস্থাপন করার অধিকার রয়েছে। কারণ, এ বিষয়টি মুবাহ্ (অনুমোদিত) বিষয়ের অন্তর্ভূক্ত। তবে, বদরের প্রান্তরের মতো এক্ষেত্রে কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক নয়। বরং, এ সিদ্ধান্তগুলো যোগ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্কিত।
‘ক’ ও ‘খ’ অনুচ্ছেদের মধ্যে পার্থক্যের নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি যে,
প্রায় সম্পূর্ণভাবে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন একটি গ্রামে বসবাসরত মানুষের স্বার্থরক্ষার্থে অর্থাৎ, উক্ত গ্রামের বাসিন্দাদের যাতায়াতের সুবিধার্থে কোন নদীর উপর যদি একটি সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তবে এক্ষেত্রে জনসাধারণের যাতায়াত সমস্যা সমাধান করার লক্ষ্যে উম্মাহ্’র কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে, প্রযুক্তিগত দিক থেকে সেতু নির্মাণের উপযুক্ত স্থান এবং সর্বোত্তম প্রকৌশল ও স্থাপত্য নকশা নির্ধারণের ক্ষেত্রে, যেমন: সেতুটি কি ঝুলন্ত হবে না বা ভিত্তির উপর নির্মাণ করা হবে, ইত্যাদি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের সাথেই পরামর্শ করা উচিত। এক্ষেত্রে, কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করা অবান্তর।
একইভাবে, কোন এক গ্রামে শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে, যেখানে এসব শিশুদের জন্য দূরবর্তী শহরে গিয়ে পড়াশোনা করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য বিষয়, এক্ষেত্রে কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু, মাটির ধারণ ক্ষমতার উপর নির্ভর করে প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী বিদ্যালয়টি গ্রামের কোন এলাকায় হলে ভাল হয়, কিংবা, ভবনের নকশাটি কেমন হওয়া উচিত, কিংবা, বিদ্যালয়টি রাষ্ট্রের অধীনে থাকবে কিনা, বা, এর জন্য বরাদ্দকৃত জমি কি লিজ নেয়া হবে নাকি ক্রয় করা হবে, এ সমস্ত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের পরামর্শই গ্রহণ করতে হবে। যদিও খলীফা চাইলে এ বিষয়সমূহের ব্যাপারে কাউন্সিলের সাথে পরামর্শ করতে পারেন, কিন্তু, এক্ষেত্রে তাদের মতামত গ্রহণ করা তার জন্য বাধ্যতামূলক হবে না।
একইভাবে, রাষ্ট্রের কোন অঞ্চল যদি একেবারে সীমান্তবর্তী এলাকায় হয় এবং শত্রুর আক্রমণের ঝুঁকির মধ্যে থাকে, এক্ষেত্রে অঞ্চলটিকে সুরক্ষিত করা, শত্রুপক্ষের আক্রমণ থেকে নিরাপদ করা, এ অঞ্চলে বসবাসরত জনগণকে শত্রুর হাতে হত্যা ও নিজভূমি হতে বিতাড়ন বা যে কোন ধরনের সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষার খাতিরে কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক। তবে, উক্ত অঞ্চলকে সুরক্ষিত করার পদ্ধতি এবং শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করার বা তাদের সাথে যুদ্ধ করার পদ্ধতি সম্পর্কে কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যদের মতামতের পরিবর্তে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: আইন প্রণয়নের একমাত্র অধিপতি হচ্ছেন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আল্লাহ্ ছাড়া কারও বিধান দেবার ক্ষমতা নেই।’
[সূরা ইউসুফ: ৪০]‘কিন্তু না, তোমার রবের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের বিবাদবিসম্বাদের ভার তোমার উপর ন্যস্ত করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পায় না এবং তা হƒষ্টচিত্তে কবুল করে নেয়।’
[সূরা নিসা: ৬৫]‘তারা আল্লাহ্’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।’
[সূরা তওবাহ: ৩১]এ আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন, হাদীসটি আদি ইবনে হাতীমের মাধ্যমে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন:
‘আমি একদিন একটি স্বর্ণের ক্রস পরিহিত অবস্থায় নবী (সা) এর সামনে উপস্থিত হলাম। তিনি বললেন, হে আদি! এই মূর্তি ছুড়ে ফেল। তারপর, আমি তাঁকে সূরা আল-বারা’আহ্ তেলাওয়াত করতে শুনলাম, ‘তারা আল্লাহ্’র পরিবর্তে তাদের ধর্মযাজক ও সাধুদের নিজেদের প্রভু বানিয়ে নিয়েছে।’ তিনি বললেন, ‘তারা তাদের উপাসনা করত না, কিন্তু, তারা যে ব্যাপারে অনুমোদন দিত তাকে তারা হালাল মনে করত এবং যেটা নিষেধ করত সেটাকে হারাম মনে করত।’
(সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-৩০৯৫)সুতরাং, কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত, এমনকি সর্বসম্মতিক্রমেও আইনগ্রহণ করা যাবে না। বরং, এটা গ্রহণ করতে হবে আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূলের সনন্নাহ ও এগুলোর ভিত্তিতে কৃত সঠিক ইজতিহাদের মাধ্যমে। সেকারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হুদাইবিয়ার সন্ধিতে অধিকাংশের মতামতকে অগ্রাহ্য করেছেন এবং বলেছেন,
‘আমি হচ্ছি আল্লাহ্’র বান্দা ও তাঁর প্রেরিত রাসূল এবং কখনোই তার আদেশ অমান্য করব না।’
এর কারণ হল, এই শান্তিচুক্তি ছিল আল্লাহ্’র দেয়া একটি বিধান। এজন্য এক্ষেত্রে জনগণের মতামত গ্রহণ করা হয়নি। এর উপর ভিত্তি করে বলা যায় যে, আহ্কাম শারী’আহ্ গ্রহণ করা, কোন শারী’আহ্ বিধানকে কার্যকর করা এবং শারী’আহ্ বিধিবিধান ও আইনকানুন জারি করা একমাত্র খলীফার আবশ্যিক ক্ষমতার অন্তর্ভূক্ত, যে বিষয়ে পূর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। তবে, হুকুম শারী’আহ্ গ্রহণ বা কোন আইনকানুন জারি করার পূর্বে উম্মাহ্’র মতামত সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য খলীফা চাইলে এ বিষয়সমূহকে উম্মাহ্’র কাউন্সিলে উপস্থাপন করতে পারেন। যেমনটি হয়েছিল, ইরাকের যুদ্ধলব্ধ ভূমিসমূহ বন্টনের বিষয়ে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে উমর (রা) মুসলিমদের মতামত জানার জন্য তাদের কাছে এ বিষয়টি উপস্থাপন করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে সাহাবীরা (রা) তাঁকে বাঁধা দেননি। মুসলিমরা তাঁকে এ ভূমি মুজাহিদদের (যারা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে) মধ্যে বন্টন করে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু, উমর তাঁর নিজস্ব ইজতিহাদ অনুযায়ী এ ভূমি মুসলিমদের মধ্যে বন্টন না করে উক্ত জনপদের বাসিন্দাদের হাতেই ছেড়ে দিয়েছিলেন, বিনিময়ে তাদেরকে মাথাপিছু জিযিয়া প্রদানের পাশাপাশি উক্ত জমির উপর খারাজ দেবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সাহাবীদের উপস্থিতিতে উমরের এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যেখানে তাঁরা কেউ তাঁকে এ ব্যাপারে বাঁধা দেননি, প্রমাণ করে যে এ ব্যাপারে সাহাবীদের ইজমা ছিল। এটাই প্রমাণ করে যে, খলীফার এ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আছে।
এছাড়া, কোন বিষয়ে শারী’আহ্ আইন গ্রহণ সম্পর্কে, কিংবা, রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত উসুলের সাথে সংঘর্ষপূর্ণ দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে আইন গ্রহণ, ইত্যাদি বিষয়ে খলীফার সাথে উম্মাহ’র কাউন্সিলের কোনপ্রকার মতবিরোধের সৃষ্টি হলে তা মাহকামাতুল মাযালিম এর নিকট পেশ করতে হবে। এ সকল ক্ষেত্রে, মাহকামাতুল মাযালিম এর বিচারক খলীফা কর্তৃক গৃহীত আইনটি শারী’আহ্ দলিলের ভিত্তিতে পর্যালোচনা করবেন; অর্থাৎ, এর কি শারী’আহ্ দলিল-প্রমাণ আছে কিনা, কিংবা, যে দলিল তিনি উপস্থাপন করেছেন তা ঐ বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা যাচাই-বাছাই করবেন। সুতরাং, খলীফা গৃহীত কোন হুকুমের বৈধতার ব্যাপারে যদি তার সাথে উম্মাহ্ কাউন্সিলের বেশীর ভাগ সদস্যের মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়, তবে এ বিবাদ নিরসনের দায়িত্ব অবশ্যই মাহকামাতুল মাযালিম এর হাতে ন্যস্ত করতে হবে। কারণ, এটা তার বিশেষত্ব বা এ সমস্যা সমাধানে তিনিই একমাত্র যোগ্যব্যক্তি এবং এ ব্যাপারে মাযালিম এর বিচারকের রায় গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হবে।
কাউন্সিলের অমুসলিম সদস্যদের খলীফা যে সমস্ত শারী’আহ্ আইনকানুন গ্রহণ করতে চান, সে ব্যাপারে পর্যালোচনা করা বা মতামত দেয়ার কোন অধিকার নেই। কারণ, তারা ইসলামী মতাদর্শে বিশ্বাস করে না। তাদের অধিকার শুধুমাত্র শাসকের মাধ্যমে তাদের উপর আপতিত জুলুম-নির্যাতন বা তাদের উপর শারী’আহ্ আইন অপপ্রয়োগের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
তৃতীয় অনুচ্ছেদ: এটি শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার সাথে সম্পৃক্ত সার্বজনীন শারী’আহ্ দলিল থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। ইবনে উমর (রা) থেকে আহমদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘তোমাদের উপর এমন আমীর আসবেন তারা তোমাদের যা করতে বলবেন তা নিজেরা করবেন না। যে তাদের মিথ্যাকে বিশ্বাস করবে এবং তাদের জুলুমে সহায়তা করবে তারা আমার দলভুক্ত নয় এবং আমিও তাদের দলভুক্ত নই এবং সে ব্যক্তি আমার সাথে হাউজে কাউসারে অংশ নেবে না।’
(আল মুনদিরী, আল তারগীব ওয়াল তারহীব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২০৩)আবু সা’ঈদ আল খুদরী (রা) থেকে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৪৪)আল হাকীম, আল জাবের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, নবী (সা) বলেছেন,
‘শহীদদের সর্দার হল হামযাহ্ বিন আবদুল মুত্তালিব এবং সেই ব্যক্তি যে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে (হক্ব কাজের) আদেশ করলো এবং (মন্দ কাজ থেকে) নিষেধ করলো এবং ঐ শাসক তাকে হত্যা করল।
(আল মুনদিরী, আল তারগীব ওয়াল তারহীব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২৯)উম্মে সালামাহ্ (রা) হতে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে,
“এমন কিছু আমীর আসবে যাদের কিছু কাজের ব্যাপারে তোমরা একমত পোষণ করবে এবং কিছু কাজ প্রত্যাখান করবে। সুতরাং, তাদের ভাল কাজের ব্যাপারে যারা ঐক্যমত পোষণ করবে তারা গুনাহ থেকে মুক্তি পেল; যে মন্দ কাজকে প্রত্যাখান করল সেও নিরাপদ হয়ে গেল। কিন্তু, তার কী হল যে (মন্দ কাজকে) গ্রহণ করল, আর তা প্রত্যাখান করল না? (অর্থাৎ, সে নিরাপদ নয়)।”
এ দলিলগুলো সার্বজনীন এবং এখানে, শারী’আহ্ আইন অনুযায়ী শাসকদের জবাবদিহি করার কথা বলা হয়েছে। এই জবাবদিহিতা শাসকদের যে কোন কাজের ব্যাপারেই হতে পারে। উম্মাহ্’র কাউন্সিল কর্তৃক এই জবাবদিহিতা খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ, গভর্ণর বা আমীলের যে কোন কাজ, যা কিনা শারী’আহ্ আইনের সাথে সাংঘর্ষিক, কিংবা, মুসলিমদের জন্য ক্ষতিকারক, কিংবা, তাদের ভুল সিদ্ধান্ত অথবা, জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণের দিক থেকে তাদের প্রতি অবিচারসুলভ, ইত্যাদি। এ জবাবদিহিতার ব্যাপারে খলীফাকে অবশ্যই ইতিবাচক সাড়া দিতে হবে এবং তার বক্তব্য ও কাজের স্বপক্ষে উপযুক্ত দলিল-প্রমাণ হাজির করতে হবে, যেন কাউন্সিল তার সততা, যোগ্যতা ও আন্তরিকতার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারে। আর, যদি কাউন্সিলের কাছে তার বক্তব্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণ গৃহীত না হয়, তবে বিষয়টি ভালভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। যদি বিষয়টি এমন হয়, যে ব্যাপারে কাউন্সিলের অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করা খলীফার জন্য বাধ্যতামূলক যেমনটি বলা হয়েছে ১(ক) অনুচ্ছেদে তবে, খলীফাকে কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করতে হবে। যেমন: পূর্বে বর্ণিত বিদ্যালয়ের উদাহরণ থেকে বলা যায় যে, যদি খলীফাকে উক্ত গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপনের ব্যাপারে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা হয়, তবে তার জন্য এ জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক। আর, যদি জবাবদিহিতা হয় বিদ্যালয়ের জন্য তার বাছাইকৃত নকশা বিষয়ক, তবে এক্ষেত্রে এ জবাবদিহিতা তার জন্য বাধ্যতামূলক হবে না।
আর, যারা তাকে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করবেন তারা যদি কোন শারী’আহ্ আইনের ব্যাপারে আইনী দৃষ্টিকোন থেকে তার বিরোধিতা করে, তবে কাউন্সিলকে অবশ্যই অন্যায় আচরণ সংক্রান্ত আদালত বা মাহকামাতুল মাযালিম এর কাছে বিষয়টি ন্যস্ত করতে হবে। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুর’আনে বলেন:
‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে উপর যারা কর্তৃত্বশীল তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।’
[সূরা নিসা : ৫৯]অর্থাৎ, মুসলিমরা যদি কোন বিষয়ে কর্তৃত্বশীল কারও সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়, তাহলে তা অবশ্যই আল্লাহ্ ও রাসূলের কাছে সমর্পণ করতে হবে এবং এটাই শারী’আহ্’র নির্দেশ। আল্লাহ্ ও রাসূলের কাছে সমর্পণ করার অর্থ হল বিচারব্যবস্থার কাছে সমর্পণ করা, অর্থাৎ, মাহকামাতুল মাযালিম এর কাছে বিষয়টি ন্যস্ত করা। কারণ, এই সমস্ত ক্ষেত্রে একমাত্র আদালতেরই আবশ্যিক ক্ষমতা আছে।
চতুর্থ অনুচ্ছেদ: এ অনুচ্ছেদের দলিল হিসাবে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর বাহরাইনে নিযুক্ত আমীল, আল ’আলা ইবনে আল-হাদরামীকে অপসারণ করেছিলেন। কারণ, আবদ ক্বায়েস এর প্রতিনিধিগণ তার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে অভিযোগ করেছিলেন। মুহম্মদ বিন উমরের বরাত দিয়ে ইবনে সা’দ বর্ণনা করেছেন যে,
“আল্লাহ্’র রাসূল (সা) পত্র মারফত আল ’আলা ইবন আল-হাদরামীকে ’আবদ ক্বায়েসের বিশজন প্রতিনিধিসহ তাঁর নিকট উপস্থিত হবার নির্দেশ দিলেন। তিনি বিশজন লোকসহ তাঁর কাছে হাজির হলেন, যাদের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল্লাহ্ বিন আউফ আল-আসহাজ্জ্ব; এবং তারপরে, এ দলের দায়িত্বে ছিল আল-মুনদির বিন সাওয়া। প্রতিনিধিবৃন্দ রাসূল (সা)এর কাছে আল ’আলা হাদরামীর ব্যাপারে অভিযোগ করলে তিনি (সা) তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণ করেন এবং তার স্থলে ইবান বিন সাইদ বিন আল-আস’কে নিযুক্ত করেন এবং তাকে বলেন: “আবদ ক্বায়েসের দেখাশোনা করবে এবং তাদের নেতৃস্থানীয়দের সম্মান করবে।”
এছাড়া, উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) শুধুমাত্র জনগণের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে একটি উলাই’য়াহ্ থেকে সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাসকে অপসারণ করেছিলেন এবং বলেছিলেন: “আমি তাকে তার অযোগ্যতা বা বিশ্বাসঘাতকতার জন্য অপসারণ করিনি।” এ সমস্ত উদাহরণ থেকে বোঝা যায় যে, ওয়ালী বা আমীলদের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি বা উষ্মা প্রকাশের অধিকার উলাই’য়াহ্’র জনগণের রয়েছে এবং এক্ষেত্রে, খলীফাকে অবশ্যই তাদের অপসারণ করতে হবে। একইভাবে, বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসাবে উম্মাহ্’র কাউন্সিলেরও ওয়ালী ও আমীলের ব্যাপারে তাদের অসন্তুষ্টি বা উষ্মা প্রকাশের অধিকার রয়েছে; এবং এ অভিযোগ যদি উলাই’য়াহ্ কাউন্সিল বা উম্মাহ্’র কাউন্সিলের অধিকাংশ সদস্যদের পক্ষ থেকে আসে তাহলে খলীফাকে তৎক্ষণাৎ তাদের অপসারণ করতে হবে। আর, যদি এমন হয় যে, দুটি কাউন্সিলের মধ্যে এ বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে, তবে খলীফা উলাই’য়াহ্ কাউন্সিলের মতামতকে প্রাধান্য দেবেন। কারণ, ওয়ালী ও আমীলদের কার্য সম্পর্কে এ কাউন্সিল উম্মাহ্’র কাউন্সিলের চাইতে অনেক বেশী সচেতন ও অবগত।
পঞ্চম অনুচ্ছেদ: এখানে দু’টি ইস্যু রয়েছে: প্রথমটি হল মনোনীতদের তালিকা সংক্ষেপন এবং দ্বিতীয়ত, এই তালিকা সংক্ষিপ্ত করে প্রথমে ছয় এবং পরে দুইজনে নামিয়ে আনা।
প্রথম ইস্যুর ক্ষেত্রে, খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) ধারা অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাই তালিকা সংক্ষেপনের দায়িত্ব সরাসরি মুসলিমদের প্রতিনিধিরা পালন করতেন অথবা তাদের পক্ষ থেকে খলীফাকে এ দায়িত্ব পালনে অনুরোধ করা হত। বনু সাঈদার প্রাঙ্গনে মনোনীতরা ছিলেন আবু বকর (রা), উমর (রা), আবু উবাইদা (রা) এবং সা’দ ইবনে উবাইদা (রা)। তাঁরা সকলের কাছেই পরীক্ষিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যেই মনোনয়ন সীমাবদ্ধ ছিল। পুরো প্রাঙ্গনভর্তি লোকের সামনে এ মনোনয়ন পর্ব অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তীতে সাহাবীগণও এ বিষয়ে সম্মতি প্রদান করেন। পরবর্তীতে, বাই’আতের মাধ্যমে তাঁরা আবু বকরকে খলীফা হিসাবে নির্বাচিত করেন।
আবু বকরের শাসনামলের শেষের দিকে তিনি তিনমাস মুসলিমদের সাথে আলোচনা করেন খলীফার পদের ব্যাপারে। আলোচনার পর তারা খলীফা হিসাবে উমরকে মনোনীত করে অর্থাৎ, এক্ষেত্রে মনোনয়ন মাত্র একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়।
তালিকা সংক্ষেপনের বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় উমর (রা) ছুরিকাঘাতে আহত হবার পর। বস্তুতঃ তখন মনোনয়ন একটি অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়। এমতাবস্থায় মুসলিমরা তাঁর কাছে যায় এবং তাদের জন্য প্রার্থী মনোনীত করতে অনুরোধ জানায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অন্যদেরকে বঞ্চিত করে তালিকা ৬ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেন; এবং এ ব্যাপারে জোরালো নির্দেশ দেন, যে ব্যাপারটি সকলের জানা আছে। এছাড়া, আলী (রা) এর মনোনয়নের সময় তিনি একমাত্র প্রার্থী ছিলেন। আর কেউ তাঁর প্রতিদ্বন্দী ছিল না। সেকারণে তালিকা সংক্ষেপনের কোন প্রয়োজন ছিল না।
তালিকা সংক্ষেপনের এই প্রক্রিয়াটি সাধারণতঃ মুসলিমদের জনসমাবেশের সামনে সংঘটিত হত; যদি বিষয়টির বিরোধিতা করা হত, এর অর্থ হত বিষয়টি আসলে অনুমোদিত নয়। কারণ, এর মাধ্যমে (তালিকা সংক্ষেপণ) আসলে অন্যদের মনোনীত হবার অধিকার রহিত হয়ে যায়। এর অর্থ হচ্ছে খলীফা পদপ্রার্থীদের তালিকা সংক্ষেপণের বিষয়টি সাহাবীদের ইজমা (ঐক্যমত)। সুতরাং, উম্মাহ্’র অর্থাৎ, প্রতিনিধিবৃন্দের জন্য তালিকা সংক্ষেপণের কাজ অনুমোদিত; এ সংক্ষিপ্তকরণ প্রক্রিয়া সরাসরি উম্মাহ্ অর্থাৎ, তার প্রতিনিধি কর্তৃক সংঘটিত হোক বা, তাদের পক্ষ থেকে বিদায়ী খলীফাকে এ অধিকার প্রদানের মাধ্যমেই হোক।
এটা গেল তালিকা সংক্ষেপণ সংক্রান্ত বিষয়। আর, প্রার্থীদের তালিকা প্রথমে ছয়জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার বিষয়টি নেয়া হয়েছে উমর (রা) এর কর্মকান্ড থেকে এবং পরবর্তীতে, ছয়জন থেকে দুইজনে নামিয়ে নিয়ে আসার বিষয়টি নেয়া হয়েছে আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) এর কর্মকান্ড থেকে। এছাড়া, এটা একইসাথে অধিকাংশ মুসলিম ভোটারের বাই’আতের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার যথার্থতা প্রমাণ করে। কারণ, যদি প্রার্থী দু’য়ের অধিক হত তাহলে হয়ত বিজয়ী প্রার্থী শতকরা ৩০ ভাগ ভোট পেত; যা কিনা অধিকাংশের চাইতে কম। আর যদি প্রার্থী দুইয়ের বেশী না হয় সেক্ষেত্রে বিজয়ী প্রার্থী সবসময়ই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেই নির্বাচিত হবে।
উম্মাহ্ কাউন্সিলের মাধ্যমে ছয়জন এবং পরবর্তীতে দুইজন বাছাই করার ক্ষেত্রে, মাহকামাতুল মাযালিম’কে এটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, প্রার্থীগণ খলীফা পদে নিযুক্ত হবার সকল শর্তাবলী পুরণ করেছেন। কারণ, উম্মাহ্ কাউন্সিল এদের মধ্য হতেই খলীফা নির্বাচনের জন্য তালিকা সংক্ষেপণ করবে। অন্য ভাবে বলা যায় যে, প্রার্থীদের অবশ্যই নিয়োগচুক্তির সকল শর্তাবলী পূরণ করতে হবে। সুতরাং, মাহকামাতুল মাযালিম চুক্তির শর্তাবলী পূরণে ব্যর্থ ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেবেন। এরপর, মাহকামাতুল মাযালিম প্রদত্ত তালিকার ভিত্তিতেই উম্মাহ্ কাউন্সিল প্রার্থীদের তালিকা সংক্ষিপ্ত করবেন।
নির্বিঘ্নে মতামত উপস্থাপন ও প্রকাশ করার অধিকার
উম্মাহ্ কাউন্সিলের প্রতিটি সদস্যের শারী’আহ্ প্রদত্ত সীমার মধ্যে থেকে নির্বিঘ্নে ও কোনপ্রকার চাপ ছাড়াই তার নিজস্ব মতামত জোরালো ভাবে উপস্থাপন করার অধিকার রয়েছে। কাউন্সিলের সদস্যরা হলেন উম্মাহ্’র মতামত উপস্থাপনের জন্য তাদের পক্ষ থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি। সুতরাং, তাদের কাজ হল খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ এবং ওয়ালী ও আমীল সহ রাষ্ট্রের সকল শাসক কিংবা, রাষ্ট্রের যে কোন বিভাগের যে কোন কর্মচারী ও জনপ্রশাসকদের কার্যাবলী সতর্কতার সাথে পর্যালোচনা করে তাদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করা, উপদেশ প্রদান করা, তাদের কাজের ব্যাপারে মতামত উপস্থাপন করা। তারা এ কাজগুলো করবেন মুসলিমদের পক্ষ থেকে যাদের উপর সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎকাজে বাঁধা দেয়া এবং শাসকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাকে আল্লাহ্ তা’আলা ফরয করেছেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মাহ্, মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাঁধা দেবে।’
[সূরা আলি ইমরান : ১১০]এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,
‘তারা এমন লোক যাদেরকে আমি পৃথিবীতে শাসন-কর্তৃত্ব দান করলে তারা নামায কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।’
[সূরা হাজ্জ: ৪১]আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এ ব্যাপারে আরও বলেন,
‘আর তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকবে যারা কল্যাণের প্রতি আহ্বান করবে এবং সৎকাজের নির্দেশ দেবে আর অসৎকাজে নিষেধ করবে এবং তারাই হবে সফলকাম।’
[সূরা আলি ইমরান: ১০৪]সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধের ব্যাপারে অসংখ্য হাদীস রয়েছে। যেমন: একটি হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন,
“ঐ সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, তোমরা অবশ্যই আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আ’নিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ) করবে। অন্যথায় অচিরেই তোমাদের উপর আল্লাহ্’র শাস্তি আরোপিত হবে। অতঃপর তোমরা তাঁকে ডাকবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবে না।’ এটি হুযাইফার বরাত দিয়ে আহমাদ বর্ণনা করেন।
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৩৬)তিনি (সা) আরও বলেছেন,
“তোমাদের মধ্যে কোন ব্যক্তি অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন তার হাত দ্বারা তা প্রতিহত করে। তার এই সামর্থ্য না থাকলে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। আর. তার যদি এ সামর্থ্যও না থাকে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা করে (ঘৃণার মাধ্যমে); আর, এটা হলো দূর্বলতম ঈমান।”
(এ হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন আবু সা’ইদ এর সূত্রে, সহীহ্, হাদীস নং-১৭৫)এইসব আয়াত ও হাদীস মুসলিমদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার ব্যাপারে নির্দেশ প্রদান করে। শাসককে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করাও এ কাজের অর্ন্তভুক্ত। কিছু কিছু হাদীসে সুনির্দিষ্ট ভাবে শাসকদের জবাবদিহি করার কথা বলা হয়েছে। আবু সা’দ এর বরাত দিয়ে উম্মে আতিয়া (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে হক্ব কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৪৪)এ হাদীসে এ কাজকে সর্বোত্তম জিহাদ হিসাবে বিবেচনা করে, শাসকের ভৎর্সনা বা সমালোচনা করা এবং তার মুখের উপর সত্য কথা উচ্চারণকে বাধ্যবাধকতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ধরনের জিহাদকে প্রচন্ডভাবে উদ্ধুদ্ধ করেছেন এবং মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত আকাঙ্খিত করেছেন, যদিও এতে জীবন নাশের ঝুঁকি থাকে। ইতোমধ্যে বর্ণিত একটি সহীহ্ হাদীসে নবী (সা) বলেছেন,
“শহীদদের সর্দার হামযাহ্ এবং ঐ ব্যক্তি, যে অত্যাচারী শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে (উক্ত শাসককে) হক্ব কথার উপদেশ দেয় এবং (ঐ শাসক) তাকে হত্যা করে।”
(আল মুনদিরী, আল-তারগীব ওয়াল তারতীব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২৯)যখন সাহাবাগণ (আল্লাহ্ তাঁদের উপর সন্তুষ্ট থাকুন) হুদাইবিয়ার শান্তিচুক্তির ব্যাপারে আল্লাহ্’র রাসূলের প্রচন্ড বিরোধিতা করেন, তখন তিনি (সা) তাঁদের এ কাজকে তিরষ্কার বা ভৎর্সনা করেননি। বরং, তিনি (সা) শুধুমাত্র তাঁদের মতামতকে প্রত্যাখান করেছিলেন এবং শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। কেননা এ ব্যাপারে আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা এসেছিল, যেখানে তাঁদের মতামতের কোন মূল্য ছিল না। তিনি (সা) সাহাবীদের এজন্য ভৎর্সনা করেছিলেন যে, তাঁরা আদেশ মান্য করেনি যখন তাঁরা কুরবানীর জন্য রাখা উটগুলোকে কুরবানী করেনি, তাঁদের মাথা মুন্ডন করেনি এবং এহরাম ভঙ্গ করেনি। এছাড়া, রাসূলুল্লাহ্ (সা) হাবাব বিন মুনযির (রা) কে বদরের যুদ্ধে ভৎর্সনা করেননি যখন তিনি নবী (সা) এর সাথে তাবু স্থাপনের অবস্থান নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন, বরং তিনি (সা) তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেছিলেন।
এছাড়া, অধিকাংশের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরাইশদের সাথে মদিনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করেছেন, যদিও এ ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব মতামত ছিল ভিন্ন। এ সমস্ত ক্ষেত্রেই রাসূল (সা) সকলের অভিযোগ শুনেছেন এবং পরে, তাঁর নিজস্ব মতামত দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পর খোলাফায়ে রাশেদীনদের শাসনামলেও সাহাবীগণ (রা) এই ধারা অব্যাহত রাখেন। এজন্য তাঁরাও কাউকে ভৎর্সনা করেননি। তাঁরা উমরকে (রা) মিম্বরে দাঁড়ানো অবস্থায় ইয়েমেনী কাপড়ের বন্টন সম্পর্কে জবাবদিহি করেছিলেন। একজন নারী তাঁকে (রা) চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, কারণ উমর (রা) মোহরানা বৃদ্ধির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন এবং সাহাবীরাও (রা) ইরাক বিজয়ের পর ইরাকের ভূমি বন্টনের ব্যাপারে উমরের (রা) সিদ্ধান্তের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন। বিশেষ করে, বিলাল (রা) ও আল যুবায়ের (রা) বিরোধিতার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি (রা) তাঁদের (রা) সাথে বিতর্ক করতেন এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর (রা) মতামত সাহাবীদের (রা) বুঝাতে পারতেন ততক্ষণ আলোচনা চালিয়ে যেতেন।
সুতরাং, বৃহত্তর মুসলিম উম্মাহ্’র প্রতিনিধি হিসেবে উম্মাহ্ কাউন্সিলের সদস্য কোনপ্রকার বাঁধা বা চাপ ব্যতীত তার ইচ্ছানুযায়ী মতপ্রকাশের অধিকার সংরক্ষণ করেন। তার রয়েছে খলীফা, মু’ওয়ায়ীন (খলীফার সহকারীবৃন্দ), ওয়ালী, আমীল ও জনপ্রশাসকদের জবাবদিহি করার অধিকার। এরা সকলেই কাউন্সিল সদস্যদের কাছে ততক্ষণ পর্যন্ত জবাবদিহি করতে বাধ্য যতক্ষণ পর্যন্ত তারা শারী’আহ্ আইনের সীমার মধ্যে এ কার্য সম্পাদন করেন এবং তাদের মতামত উপস্থাপন করেন। উম্মাহ্ কাউন্সিলের অমুসলিম সদস্যগণও শারী’আহ্ নির্ধারিত সীমার মধ্যে নির্বিঘ্ন ও চাপমুক্ত অবস্থায় তাদের উপর শাসক কর্তৃক সংঘটিত সকল জুলুম-নির্যাতনের ব্যাপারে মতামত তুলে ধরার অধিকার সংরক্ষণ করেন।
তথ্য বিভাগ (আল ই’লাম)

রাষ্ট্র এবং এর দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যতগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ আছে, তথ্যবিভাগ তাদের মধ্যে একটি। এটি জনস্বার্থের (মাসালিহ্) সাথে সম্পর্কিত নয় যে, এটি জনকল্যাণ বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত থাকবে; বরং, রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সমূহের মতোই একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটি সরাসরি খলীফার তত্ত্বাবধানের অধীন থাকবে।
একটি সুনির্দিষ্ট তথ্যনীতি যা বিশ্বের দরবারে ইসলামকে শক্তিশালী ও কার্যকরভাবে উপস্থাপন করবে, স্বাভাবিকভাবেই তা ইসলামের প্রতি গণমানুষের মনকে আকৃষ্ট করবে; সেইসাথে, তাদের আগ্রহী করবে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন ও চিন্তাভাবনা করতে। এছাড়া, মুসলিম ভূমিসমূহকে খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে একীভূত করার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া, তথ্য-উপাত্তের মধ্যে এমন অনেক বিষয় আছে, যা রাষ্ট্রের (ভাল-মন্দের) সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত; এজন্য খলীফার অনুমতি বা নির্দেশ ব্যতীত এ তথ্যগুলো প্রকাশ করা যাবে না। বিশেষতঃ এটা প্রযোজ্য সামরিক বাহিনী এবং এর সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলো, যেমন: সেনাবাহিনীর গতিবিধি; কিংবা, জয় বা পরাজয়ের সংবাদ, কিংবা, সামরিক শিল্পবিষয়ক তথ্য ইত্যাদি। এই জাতীয় তথ্যগুলো সরাসরি ইমাম বা খলীফার সাথে যুক্ত থাকতে হবে, যেন কোন কোন খবর গোপন রাখতে হবে এবং কোন কোন সংবাদ ঘোষণা এবং প্রচার করতে হবে সে বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন।
এ বিষয়ে শারী’আহ্ দলিল হল আল্লাহ্’র কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহ্।
আল্লাহ্’র কিতাবের ক্ষেত্রে, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
“আর যখন তাদের নিকট কোন শাস্তি সংক্রান্ত বা ভীতিজনক কোন বিষয় উপস্থিত হয়, তখন তারা সেটা রটনা করতে থাকে। যদি তারা ওগুলোকে (সংবাদ) রাসূল ও তাদের উপর কর্তৃত্বশীলদের কাছে পৌঁছে দিত তবে অবশ্যই তথ্যঅনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিবর্গ তা উপলব্ধি করতো।”
[সূরা নিসা: ৮৩]এ আয়াতের বিষয়বস্তু সরাসরি তথ্য-উপাত্ত সংক্রান্ত।
আর, রাসূলের সুন্নাহ্’র দলিল হিসাবে মক্কা বিজয়ের উপর ইবন আব্বাসের হাদীসটি উল্লেখ করা যায়, যে হাদীসটি আলহাকিম তার আল-মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী এটি সহীহ্ হাদীসের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে এবং আল-জাহাবী এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন: “কুরাইশদের নিকট হতে তথ্য গোপন করা হয়েছিল; যেন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এর সংবাদ তাদের কাছে না পৌঁছায়; এবং তারা যেন তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুই জানতে না পারে।”
আবু সালামাহ্’র একটি মুরসাল হাদীস (যে হাদীস সরাসরি রাসূলুল্লাহ্’র সাথে যুক্ত নয়; বরং এখানে বর্ণনাকারী সাহাবীর নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি) আছে যা ইবনে আবু শায়বাহ্ বর্ণনা করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে:
‘অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আয়েশাকে বললেন: আমাকে সবকিছু প্রস্তুত করে দাও এবং এ ব্যাপারে কাউকে কিছু বলো না। তারপর তিনি রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে দেবার নির্দেশ দিলেন, যেন মক্কার লোকেরা চলাচল করতে না পারে এবং তাদের কাছে কোন সংবাদ না পৌঁছে।’
এছাড়া, গাজওয়া ’উসরাহ্ (তাবুকের অভিযান) সম্পর্কে কা’ব বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে, যে হাদীসের ব্যাপারে ঐক্যমত আছে, এ হাদীসে বলা হয়েছে:
“রাসূল (সা) কখনও কোন অভিযানে তাঁর সঠিক গন্তব্যের ব্যাপারে পরিকল্পনা প্রকাশ করতেন না, একমাত্র সে অভিযানটি ছাড়া যেটির জন্য তিনি ভয়াবহ উত্তপ্ত আবহাওয়ায় প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন; যেটি ছিল একটি দূরবর্তী স্থানে, মরুভূমিতে এবং বিশাল সংখ্যক শত্রুর বিরুদ্ধে। সুতরাং, তিনি মুসলিমদের পুরো ব্যাপারটি বর্ণনা করলেন যাতে তারা অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকে এবং তিনি তাদেরকে তাঁর গন্তব্যও জানিয়ে দিলেন।”
এ ব্যাপারে আনাসের একটি হাদীস রয়েছে যা আল-বুখারী বর্ণনা করেন,
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) যায়িদ, জাফর ও ইবনে রুওয়াহার মৃত্যু সংবাদ পৌঁছানোর আগেই এ ব্যাপারে ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘যায়িদ প্রথমে পতাকা হাতে নিল ও শহীদ হল; অতঃপর জাফর হাতে নিল এবং সেও শহীদ হল; তারপর, ইবনে রুওয়াহা পতাকা হাতে নিল এবং সেও শহীদ হল; একথা বলতে বলতে তিনি কাঁদছিলেন। অতঃপর, আল্লাহ্’র তরবারীর মধ্য হতে একটি তরবারী তা তুলে নিল এবং আল্লাহ্ তাদের জন্য বিজয় নির্ধারণ করলেন।”
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৩৭৫৭)তথ্য সম্পর্কিত এই সমস্ত নীতির কিছু কিছু খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়েও প্রয়োগ করা হয়; যা কিনা ইবন আল-মুবারক এর জিহাদ সম্পর্কিত এক বর্ণনায় এসেছে; আল-হাকিম এটি তার আল-মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন এবং ইমাম মুসলিমের (সহীহ্ হাদীসের) শর্তানুযায়ী তিনি এটিকে বিশুদ্ধ বলেছেন, যে ব্যাপারে আল-জাহাবী একমত পোষণ করেছেন। উক্ত হাদীসটি যায়িদ ইবন আসলাম থেকে ইবন আল-মুবারক, ইবন আসলাম আবার তার পিতা হতে, তার পিতা আবার উমর ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণনা করেছেন: তিনি (’উমর) এ ব্যাপারে অবগত হলেন যে, আবু উবাইদাহ শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে গেছে এবং তারা তাদের দিকে সমবেতভাবে এগিয়ে আসছে। শোনার পর উমর তাঁকে লিখলেন, ‘তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! ঈমানদারদের উপর এমন কোন বিপদ আপতিত হয় না, যেখান থেকে উদ্ধারের জন্য আল্লাহ্ তা’আলা তাকে পথ করে দেন না; এবং (জেনে রাখ) একটি কঠিন সময় কখনও দু’টি সুসময়ের কাছে পরাজিত হয় না।’
‘হে ঈমানদানগণ! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহ্কে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।’
[সূরা আল ইমরান : ২০০]তিনি বলেন: তারপর, আবু উবায়দা তাঁকে লিখেন, ‘আপনার উপরেও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর আল্লাহ্ বলেন,
‘তোমরা জেনে রাখ, পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক, জাঁকজমক, পারষ্পরিক অহমিকা এবং ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে প্রাচুর্য লাভের প্রতিযোগিতা ব্যতীত আর কিছুই নয়।’
[সূরা হাদীদ : ২০]তারপর তিনি বলেন: অতঃপর ’উমর তাঁর হাতের বইখানা নিয়ে মিম্বারে উঠে দাঁড়ালেন এবং মদীনার লোকদের এটা পাঠ করে শোনালেন এবং বললেন, ‘হে মদিনাবাসী! আবু উবাইদা পরোক্ষভাবে তোমাদের জিহাদের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেছে, যেন তোমরা এ ব্যাপারে আগ্রহী হও।”
যে বিষয়গুলো সমরবিষয়ক তথ্যের সাথে সম্পর্কিত সেগুলো হল, সমঝোতা, শান্তিচুক্তি এবং বিতর্ক বিষয়ক তথ্য যা কিনা খলীফা কিংবা তার সহকারীবৃন্দ এবং কুফর রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে সংঘটিত হয়ে থাকে। সমঝোতার উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, হুদাইবিয়া’র প্রান্তরে আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এবং কুরাইশদের প্রতিনিধির সাথে প্রদত্ত শর্তের ভিত্তিতে শান্তিচুক্তি সংঘটিত হবার পূর্বপর্যন্ত যে সংলাপ সংঘটিত হয়েছিল। এছাড়া, সরাসরি বিতর্কের উদাহরণ হিসাবে রাসূল (সা) এর সাথে জাজরান থেকে আগত প্রতিনিধিদের বিতর্কের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়, যেখানে তিনি (সা) তাদেরকে নিজেদের উপর আল্লাহ্’র অভিশম্পাত নাযিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন যদি তারা (তাদের দাবির ব্যাপারে) সত্যবাদী না হয়ে থাকে। এছাড়া, রাসূল (সা)এর নির্দেশক্রমে তামিমের প্রতিনিধিদের সাথে ছাবিত ইবন কায়েস ও হাস্সান এর বিতর্কের ঘটনাও উল্লেখ করা যায়।
বস্তুতঃ উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলোর কোনটির ক্ষেত্রেই কোন প্রকার গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়নি।
এছাড়া, আরও অনেক ধরনের সংবাদ বা তথ্য আছে যেগুলোর রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই, সেগুলোর ক্ষেত্রে খলীফার সরাসরি অনুমোদন বা নির্দেশ অপরিহার্য নয়; যেমন: প্রতিদিনকার খবর, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং বিজ্ঞান বিষয়ক কিংবা, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ঘটনা ইত্যাদি। বস্তুতঃ এ ধরনের সংবাদ বা তথ্যসমূহে জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গী কিংবা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এজন্য, এ ধরনের সংবাদ পরিবেশন ও প্রচার বিষয়ে রাষ্ট্রের তদারকী ও পর্যবেক্ষণ প্রথমোক্ত তথ্যসমূহের থেকে ভিন্নতর হবে। এজন্য, রাষ্ট্রের তথ্য বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবশ্যই দু’টি প্রধান বিভাগ থাকতে হবে:
প্রথমত: এ বিভাগের কাজ রাষ্ট্রের সাথে সরাসরিযুক্ত এমন তথ্যের সাথে সম্পর্কিত, যেমন: সামরিক বিষয়সমূহ, সামরিক শিল্প বিষয়ক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক, ইত্যাদি। এ বিভাগের কাজ হল এ সম্পর্কিত তথ্যগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা; যেন এ ধরনের সংবাদসমূহ এ বিভাগে উপস্থাপনের পূর্বে রাষ্ট্রের কোন সংবাদ মাধ্যম বা অন্যকোন বিশেষ সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত না হয়।
দ্বিতীয়ত: এ বিভাগটি অন্যান্য খবরের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং এ ব্যাপারে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ অপরিহার্য নয়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম কিংবা, অন্যকোন বিশেষ সংবাদ মাধ্যমে এ সংক্রান্ত খবর প্রচারের জন্য কোন পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন নেই।
প্রচারমাধ্যম সমূহের অনুমোদন প্রাপ্তি
ইসলামী রাষ্ট্রে প্রচারমাধ্যমসমূহের কাজ করার জন্য কোনপ্রকার অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। বরং, রাষ্ট্রের যে কোন নাগরিক যে কোন ধরনের প্রচারযন্ত্র স্থাপন করতে পারবে, সেটা প্রকাশনার মাধ্যমে হোক কিংবা, অডিও বা ভিজ্যুয়াল যাই হোক না কেন। তবে, তিনি কোন ধরনের প্রচারযন্ত্র স্থাপন করতে চান তা অবশ্যই তাকে তথ্যবিভাগে অবহিত করতে হবে।
এবং, তাকে অবশ্যই উপরোল্লিখিত নীতি অনুসরণ করতে হবে অর্থাৎ, রাষ্ট্রের সাথে সরাসরিযুক্ত এমন তথ্য প্রচারের পূর্বে তথ্যবিভাগের অনুমতি নিতে হবে; আর অন্যান্য খবরের ক্ষেত্রে তথ্যবিভাগের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজন নেই।
সকল ক্ষেত্রে, প্রচারমাধ্যমের মালিককেই তার প্রচারিত সংবাদের দায়দায়িত্ব বহন করতে হবে এবং অন্যান্য নাগরিকের মত তাকেও জবাবাদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে, যদি তিনি তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘন করেন।
রাষ্ট্রের তথ্য নীতি
তথ্য সংক্রান্ত একটি আইন প্রকাশ করা হবে, যেখানে শারী’আহ্ আইনের আলোকে গঠিত রাষ্ট্রের তথ্যনীতির ব্যাপারে কিছু সাধারণ দিকনির্দেশনা থাকবে। ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্র এ নীতিকে অনুসরণ করবে, যেন এমন একটি পরস্পর নিবিড় সম্পর্কযুক্ত ও শক্তিশালী ইসলামী সমাজ গঠিত হয়, যা আল্লাহ্’র রজ্জুকে শক্ত ভাবে আঁকড়ে ধরবে এবং যা থেকে ক্রমাগত উন্নত আদর্শের আলোকময় শিখা বিচ্ছুরিত হবে; যেখানে অনৈতিক, দুষ্ট ও ক্ষতিকর ধ্যান-ধারণার কোন স্থান থাকবে না; থাকবে না ভ্রান্ত পথনির্দেশনাপূর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন কোন সংস্কৃতি। এটি হবে এমন একটি ইসলামী সমাজ যা নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী সকল দুষ্ট চিন্তাধারাকে নস্যাৎ করবে এবং বিচ্ছুরিত করবে ন্যায় ও সত্যাদর্শের আলোকময় শিখা এবং সকল সময়, সকল ক্ষেত্রে বিশ্বব্রহ্মান্ডের প্রভু, মহান আল্লাহ্ তা’আলার প্রশংসা জ্ঞাপন করবে।





















