Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • পুঁজিবাদের অলীক সুখ-স্বপ্ন

    পুঁজিবাদের অলীক সুখ-স্বপ্ন

    Capitalism তথা পুঁজিবাদ সুখের ডেফিনেশন দেয় consumerism তথা ভোগবাদের মাধ্যমে। ইন্দ্রিয়গত পরিতৃপ্তি সর্বোচ্চ বস্তুগত ভোগে, সবচেয়ে বেশি stuffs আর gadgets এর প্রাপ্তিতেই আমাদের সুখের definition খুঁজে ফেরা, এটা পশ্চিম পেয়েছে গ্রীক রোমানদের উত্তরসূরি হিসেবে।

    কিন্তু এখন জীবন সম্বন্ধে এই concepts গুলো আইডোলজিকাল ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে, ইন্টেলেকচুয়ালি সব জায়গায় ডমিনেট করছে। দিনশেষে সবই যা খুশি তাই করার, ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির মাঝেই জীবনের অর্থ খুজে নেওয়ার তাগিদ দেয়। এই পশ্চিমা ওয়ার্ল্ডভিউয়ের কারণে আমরা পেয়েছি একটা ডিপ্রেসড সিভিলাইজেশন।যারা অর্থপূর্ন কোন কিছুর দিকে ছুটছে না, বরঞ্চ অলীক সুখের ঘূর্নিপাকে পড়ে অতল গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে পরিবারের ভাঙনে, আত্মহত্যা নয়তো মানসিক বিকারে। হারিয়ে যাচ্ছে ড্রাগে, হারিয়ে যাচ্ছে ফুলানো ফাপানো স্ট্যাটাস, সৌন্দর্য, অর্থের শো অফের অলিগলিতে।

    Capitalism এ তাই ব্যাবসায়ীরা মানুষের ‘অপূর্নতা’ নিয়ে ব্যাবসা করে। তাদের “পন্য” ভোগ করলেই আপনি “পূর্নতা” পাবেন। আইফোন ইউজ করলেই আপনি এমপাওয়ার্ড হবেন, হবেন ফ্রি। হবেন হ্যাপি। কেএফসিই ‘হ্যাপি মিল’ দেবে। আপনার দাগেভরা চেহারা আপনার অপূর্নতা। গার্নিয়ার নাহলে নিভিয়া ক্রিম লাগবেই। একটা পিম্পলের জন্যে তারা আপনাকে ঘুমোতে দেবে না। একটা ভুড়িওয়ালা পেট, অনাকর্ষনীয়। সিক্স প্যাক, ছাড়াও লাগবে নামী বেনামী ডাইট প্রডাক্টস। পূর্নতাই সুখ, পার্ফেক্টনেস। আর মানুষ এভাবেই বস্তুগত চাহিদার পেছনে তার সুখের ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। এক অসম অবাস্তব প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়ে পড়ে। এভাবে তার অপূর্নতাও কক্ষনও ঘোচে না, আর অতৃপ্তি থেকে যায়।

    বনী আদম চাহিদার সাথে সুখকে বেধে ফেললেই সুখ আর কখনই পাওয়া সম্ভব না। কারণ তাকে এক সোনার পাহাড় দিলে আরেকটা সোনার পাহাড় চাইবে। পূর্নতা নিয়ে কেউ জন্মায় না, কেউ পূর্নতা নিয়ে মরতেও পারে না। চাহিদার পূর্নতা সারা জীবনেও মানুষ পেতে পারে না। দুনিয়ার সকল সম্পদ কাজে লাগিয়েও।

    এইজন্যই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

    لَوْ كَانَ لاِبْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لاَبْتَغَى ثَالِثًا، وَلاَ يَمْلأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلاَّ التُّرَابُ، وَيَتُوبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ تَابَ ‘

    ” যদি আদম সন্তানের দুটি উপত্যকাপূর্ণ ধনসম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয়টার আকাঙ্ক্ষা করবে। আর মাটি ছাড়া লোভী আদম সন্তানের পেট ভরবে না। অবশ্য যে ব্যাক্তি তওবা করবে আল্লাহ তা আলা তার তওবা কবুল করবেন।” [বুখারী, হাদিস নং ৫৯৯৩]

    পুঁজিবাদ মানুষের এই বাস্তবতাটাই ধরতে ব্যর্থ। তাই “সুখ” অধরাই থেকে যায়, সোনার হরিন হয়ে।

     যারা দুনিয়ার বস্তুগত প্রাচুর্য আর সুখের দাসত্ববরন করে, এবং এসকল বিষয়ে মত্ত থেকে আখিরাতের চিরন্তন জীবনকে অবহেলা করে, দুনিয়ায় নিজের সুখ ও আনন্দের পূর্নতা কামনা করে মিথ্যা আশায় বুক বাধে তাদের অবিসম্ভাবী ধ্বংসের ঘোষনা এসেছে রাসুলুল্লাহ (সা) এর মুখ থেকেই,

    تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَمِ وَالْقَطِيفَةِ وَالْخَمِيصَةِ، إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ، وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ

    ” দিনার, দিরহাম, রেশমী চাঁদর (শাল), পশমী কাপড়ের (চাদর) গোলামরা ধ্বংস হোক। যাদের এসব দেয়া হলে সন্তুষ্ট থাকে আর দেয়া না হলে অসন্তুষ্ট হয়।” [বুখারী ৫৯৯২]

    এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাও তার নবীকে আদেশ করছেন,

    ذَرْهُمْ يَأْكُلُوا وَيَتَمَتَّعُوا وَيُلْهِهِمُ الْأَمَلُ ۖ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ

     ” তাদেরকে ছেড়ে দাও তারা খেতে থাকুক, ভোগ করতে থাকুক এবং (মিথ্যা) আশা ওদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখুক, পরিণামে তারা বুঝবে।” [হিজর ৩]

    মৃত্যুর মাধ্যমে তাদের সকল ভোগ ও আনন্দের অবসান ঘটবে। যা তাদের চিরন্তন এক জীবনের সামনে দাড় করিয়ে দিবে, যেখানে তাদের দিনার দিরহাম কোন কাজেই আসবে না। সুখ পার্থিব কোন বিষয় নয়। পার্থিব চাওয়া পাওয়ার সমীকরন সুখ নয়। সৃষ্টিকর্তার সাথে নাড়ছেড়া জীবন-দর্শন কখনই সুখের খোজ দিতে পারবে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমেই দুনিয়ার শত অপ্রাপ্তি নিয়েও সুখী হওয়া সম্ভব হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যমে আখিরাতেই মানুষ ‘পূর্নতা’ লাভ করবে।

    قَالَ اللَّهُ هَٰذَا يَوْمُ يَنفَعُ الصَّادِقِينَ صِدْقُهُمْ ۚ لَهُمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۚ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ ذَٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ

    ”আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্যে রয়েছে– উদ্যান; যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত হবে; তারা তাতে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট। এটিই মহান সফলতা।” [সূরা মায়িদা, আয়াত: ১১৯]

    আবু ই’য়ালা  

  • খিলাফত একমাত্র সমাধান

    খিলাফত একমাত্র সমাধান

    জুলুমের শাসন আমাদের কন্ঠ পুরোপুরি রোধ করার আগেই খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পরুন, যা রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে।

    বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তার অপরাধ ছিল সে ফেসবুকে ভারতের সাথে পানিবন্টন চুক্তি নিয়ে ঐতিহাসিক কিছু ঘটনা উল্লেখ করে একটি পোস্ট দিয়েছিল। ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

    এই ঘটনা আজ নতুন ঘটছে না, অতীতেও আমরা অসংখ্যবার এই একই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখেছি। দেশবাসী দেখেছে কীভাবে বিশ্বজিতকে প্রকাশ্যে দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকরেরও পরিণতি হয়েছিল একইরকম।

    এরকম এক একটা ঘটনা ঘটে আর আমরা প্রচন্ড ক্রোধে মাঠে রাস্তায় নেমে আসি খুনীর বিচার চাওয়ার জন্যে, তাকে ফাঁসিতে ঝুলানোর জন্য পুরো দেশ যেন বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের বিক্ষোভের মুখে সরকার চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য কয়েকজনকে গ্রেফতার করে, তারপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। লোকজন ভুলে যায় কী ঘটেছিল।

    আবার নতুন করে আরেকটা ঘটনা ঘটে এবং আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি আর জোর দাবি তুলি হত্যাকারীদের বিচার করার জন্য।

    এভাবেই ঘটে আসছে আজ দিনের পর দিন। আমরা কেউ সমস্যার উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভাবি না, শুধু শাখা-প্রশাখা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখি, তাহলে দেখব; এই সমস্যার মূলে রয়েছে এই মানবরচিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জুলুমের শাসন, যা মানুষকে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন সরকারকে যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার দিয়ে দিয়েছে। তাই তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে, তার টুঁটি চেপে ধরা হয়। তাকেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়, নয়ত গ্রেফতার করা হয়।

    সুতরাং, যতক্ষণ পর্যন্ত না এই জুলুমের শাসনের অবসান ঘটানো হচ্ছে, একে পুরোপুরি উপড়ে ফেলা হচ্ছে – ততক্ষণ পর্যন্ত এসব ঘটনা বারবার ঘটতে থাকবে এবং আমরাও আমাদের শক্তি খরচ করে মাঠে-ঘাটে চেঁচিয়ে যাব, কিন্তু সমাধান হবে না। কারণ এই জুলুমের শাসন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

    এই সমস্যার সমাধান দিতে পারে একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী বাস্তবায়িত সেই খিলাফত রাষ্ট্র যেখানে খলীফা সকল জনগণের কাছে জবাবদিহিতার জন্য দায়বদ্ধ থাকেন। এই খিলাফত রাষ্ট্রের ২য় খলীফা হযরত ওমর(রা) যখন বলেছিলেন, “আমি যদি কুর’আন সুন্নাহ’র বাইরে অন্যকিছু দিয়ে শাসন করি তবে তোমরা কি করবে? জবাবে তাকে বলা হয়েছিল, এই তরবারী দিয়ে আপনাকে সোজা করে দেওয়া হবে

    একজন রাষ্ট্রপ্রধানকে সাধারণ এক নাগরিক এইভাবে জবাবদিহিতা করতে পারে বা তার মত পরিষ্কার ভাষায় বলতে পারে শুধুমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রেই। এই গণতান্ত্রিক জুলুমের রাষ্ট্রে নয়।

    সুতরাং আসুন, আমরা সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি, যা আমাদেরকে আমাদের মতামত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরার মতো সুযোগ করে দেবে।  

  • ডেঙ্গুর মহামারি

    ডেঙ্গুর মহামারি

    সরকারের দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতির পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণ টের পাচ্ছে। কার্যত ঢাকা এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে এবং সারাদেশে তা আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতি ১ মিনিটে গড়ে ১ জন ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামালাতে হিমশিম খাচ্ছে। আক্রান্তদের স্বজনরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ছুটে বেড়াচ্ছেন। সাধারণ জনগণ পরিবারের সদস্যদের বিশেষত শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ একদিকে যেমন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে অন্যদিকে মৃতের সংখ্যাও। এবার বর্ষায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে এমন আগাম সতর্কবার্তা থাকা সত্ত্বেও জনগণের প্রতি উদাসীন এই সরকার ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশার নিধন ও বিস্তার রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানে গুরুত্ব দেয়নি। বরং, মশার ঘনত্ব ১০গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। জটিল আকার ধারণ করা বর্তমান এই পরিস্থিতির পেছনে সরকারের শুধু দায়িত্বহীনতাই নয় দুর্নীতিও প্রতীয়মান হয়েছে, আইসিডিডিআরবি এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে যে, মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক যে ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছে তা অকার্যকর, এতে এডিস মশা মরে না। ২২ মে, গবেষণা রিপোর্টটি প্রাপ্তির পরও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এই ওষুধ ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে! এরপরও নির্লজ্জ মন্ত্রী-মেয়ররা নিজেদের ব্যর্থতা ঠাকতে অকার্যকর ওষুধের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, কখনো মশাকে দোষারোপ করে বলেছেন মশা অনেক শক্তিশালী তাই ওষুধে কাজ হচ্ছে না, কখনোবা চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যাচ্ছেন না বলে রোগীদের দুষেছেন, এমনকি রোহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাঙ্গ করে বলেছেন, এডিস মশার প্রজনন ক্ষমতা রোহিঙ্গাদের মতো, তাই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না! এছাড়াও, দেশের এই দুর্যোগময় মুহুর্তে প্রধানমন্ত্রী বিদেশ বেড়াচ্ছেন, সড়কমন্ত্রী সিনেমার মহরতে যোগ দিয়ে মানুষের কষ্টের সাথে তামাশা করছেন এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী মন্ত্রনালয়ের সবার ছুটি বাতিল করে পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়া ঘুরতে গেছেন।

    মানুষের সঙ্কটাপন্ন অবস্থা নিয়ে এমন নিষ্ঠুর উদাসীনতার পর নির্লজ্জ এই শাসকগোষ্ঠী এখন দায় এড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবে গুজবকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের ব্যর্থতার যেকোন খবরকে গুজব হিসেবে উড়িয়ে দেয়া এবং গুজবকারী হিসেবে জনগণের প্রতিবাদী কণ্ঠকে রোধ করাই এর উদ্দেশ্য, যেরকম প্রেসিডেণ্ট ট্রাম্প তার যেকোনো মিথ্যা বা ব্যর্থতার খবর প্রকাশ হলেই তাকে “fake news” বলে উড়িয়ে দিতে চায়। সংবাদ মাধ্যমে যখন ডেঙ্গু আক্রান্ত ও প্রাণহানীর প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত হওয়া শুরু করলো তখন দক্ষিণের মেয়র সেটিকে গুজব আখ্যা দিয়ে হুমকি দিয়ে বললেন, ছেলেধরা ও সাড়ে তিন লাখ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত একই সূত্রে গাঁথা। সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞভাবে এই ষড়যন্ত্রকারীদের মোকাবেলা করবে, কঠিন জবাব দিবে।

    জনগণের কষ্ট ও যন্ত্রণার সাথে তামাশাকারী এই মন্ত্রী বা মেয়ররা হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নামক বিষবৃক্ষের বিষফল, যা এদের লালন-পালন এবং রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছে। এই শাসনব্যবস্থায় শাসকগোষ্ঠী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়, অতঃপর সবসময় আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, ফলে দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার জন্য কারো নিকট জবাবদিহি করতে হয়না, দুঃশাসন বিস্তার লাভ করে। অতঃপর জনগণ যখন তাদের দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখন তারা জনগণের বিরুদ্ধে নতুন নতুন কৌশলের আশ্রয় নেয়। তাই এই দুর্বৃত্ত শাসকদের প্রত্যাখ্যান করলেই চলবে না বরং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকেও প্রত্যাখ্যান করতে হবে, আল্লাহ্ প্রদত্ত রহমতপূর্ণ শাসনব্যবস্থা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

    খিলাফত রাষ্ট্রের অধীনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনগণ যে উন্নত স্বাস্থ্যসেবাসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হয়েছে ইতিহাস তার সাক্ষী। খিলাফতের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে জনগণ এই ডেঙ্গু সমস্যার মত যেকোনো বালা-মুসিবত হতে পরিত্রাণ পাবে, কারণ খলিফা তার উপর অর্পিত ফরয হিসেবে জনগণের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিবেন এবং এক্ষেত্রে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সন্তুষ্টি এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণে তাঁর জবাবদিহিতার ভয়ে সর্বদা বিচলিত থাকবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “যে ব্যক্তি মুসলিমদের কোন একটি বিষয়ের তত্ত্বাবধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত, অথচ তাদের চাহিদা, দারিদ্রতা ও প্রয়োজন পূরণ করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’ও ঐ ব্যক্তির চাহিদা, দারিদ্রতা ও প্রয়োজন হতে মুখ ফিরিয়ে নিবেন।” [আবু দাউদ]

    স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে খিলাফত রাষ্ট্রের নীতি হচ্ছে: “রাষ্ট্র সকলের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সুবিধা দেবে। তবে রাষ্ট্র ব্যক্তিগত চিকিৎসা অনুশীলন, চিকিৎসা সেবা গ্রহণ কিংবা ঔষধ বিক্রয় করাকে বাধা দেবে না।” ইসলাম চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবাকে একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে না, বরং মানুষের একটি অন্যতম মৌলিক চাহিদা হিসেবে গণ্য করে। তাই, খিলাফত রাষ্ট্র ধনী-গরীব নির্বিশেষে প্রত্যেককে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করবে। স্বাস্থ্যখাতে গবেষণার মান ও পরিধি বাড়াতে প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করবে। “…নিশ্চয়ই আল্লাহ্ প্রত্যেকটি রোগের জন্য তৈরি করেছেন চিকিৎসা এবং ঔষধ, কেবলমাত্র একটি রোগ ছাড়া (বার্ধক্য)” [তিরমিজি]। খিলাফত রাষ্ট্রের বিজ্ঞানীগণ নতুন নতুন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার ও উন্নয়নে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হবেন। ফলে ডেঙ্গু কিংবা ইবোলার মত ভাইরাসের ওষুধ তৈরিতে মুনাফার বিষয়টি মাথায় না নিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গৃহিত হবে। তাছাড়া মহামারীর মত ক্ষেত্রে ত্বরিত ব্যবস্থা গৃহিত হবে যেভাবে খলীফা উমর (রা)-এর সময়ে সিরিয়াতে প্লেগের মহামারীর ক্ষেত্রে করা হয়েছিল, “যখন কোন অঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাবে সেখান থেকে কেউ অবস্থান পরিবর্তন করবে না এবং বাইরে থেকে কেউ সেখানে প্রবেশ করবে না”। অতএব খিলাফত রাষ্ট্র কোন স্থানে মহামারী দেখা দিলে সেই স্থানকে বিচ্ছিন্ন রাখবে এবং পাশাপাশি ঐ স্থানে যত দ্রুত সম্ভব ওষুধ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিবে। এছাড়াও, রাস্তা-ঘাট, ঝোপ-ঝাড় পরিস্কার রাখার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিবে ইসলামী রাষ্ট্র। আমরা সীরাতে দেখতে পাই, মদীনায় যাবার পরপরই বেশ কিছু সাহাবী এক ধরনের বিশেষ জ্বরে আক্রান্ত্র হন, আয়েশা (রা) বর্ণনা অনুযায়ী মদীনার নিম্নভুমিতে একধরনের পঁচা দুর্ঘন্ধযুক্ত পানির উপস্থিতি ছিল অর্থাৎ, ধারনা করা হচ্ছিল এ থেকে রোপের উপদ্রব। পরবর্তীতে রাসূল (সা) মদীনাকে (মক্কার মতো) হারাম ঘোষনা করেন অর্থাৎ, মদীনাকে সম্পূর্ণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নতুন করে গড়ে তুলেন।

    হে মুসলিমগণ! এই দুর্বৃত্ত শাসকগোষ্ঠী ও শাসনব্যবস্থার বোঝা আর বহন করবেন না, তাদের দায়িত্বহীনতার নির্মম শিকার আর হবেন না। তাদের চরম দুঃশাসনের ফলে সৃষ্ট গজব কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। মন্ত্রী, সচীবের স্ত্রী, পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তা, অভিনেতা, ডাক্তার, বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সবাই আজ আক্রান্ত। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: “যারা কোন অত্যাচার হতে দেখেও হাত গুটিয়ে রাখে আল্লাহ্ তাদের সকলকে শান্তির সম্মুখীন করবেন।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেছেন: “যখন কোন জাতি পাপাচারে লিপ্ত হয় এবং কেউই তাদের প্রতিরোধ করে না তখন আল্লাহ্ গোটা জাতির উপর শাস্তি নাযিল করেন যা তাদের সকলকে ছেয়ে ফেলে।” [আবু দাউদ, ৩৭৭৫]।

    জাতির এই সঙ্কটকালীন মুহুর্তে আমাদের নীরবতা একটি চরম গুনাহ্। সুতরাং, এই দুঃশাসন হতে মুক্তির লক্ষ্যে হাসিনা সরকার ও তার ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করে রহমতপূর্ণ খিলাফতে রাশিদাহ্ শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ুন। আল্লাহ্ আমাদেরকে সেই পরিস্থিতি থেকে হেফাজত করুন যেই পরিস্থিতির ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আমাদেরকে সাবধান করে গেছেন: “সেই সত্ত্বার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সত্য ও ন্যায়ের আদেশ এবং অন্যায় ও অসত্যের প্রতিরোধ করবে। তা না করলে খুব শীঘ্রই আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন। তখন তোমরা দোয়া করবে কিন্তু আল্লাহ্ তোমাদের দোয়া কবুল করবেন না।”

    ইন শা আল্লাহ, খুব শীঘ্রই আমরা আল্লাহর পক্ষ হতে বিজয় প্রত্যক্ষ করবো এবং ঈমান ও তাকওয়ার সেই আকাংক্ষিত পরিবেশ ফিরে পাবো। আল্লাহ আমাদের প্রচেষ্টাকে কবুল করুন।

    আর যদি সে জনপথের অধিবাসীরা ঈমান আনতো এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করতো, তবে আমি তাদের জন্য আসমান ও জমীনের নেয়ামতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম…” [সূরা আল-আরাফ : ৯৬]

  • সামাজিক অবক্ষয় রোধে তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা

    সামাজিক অবক্ষয় রোধে তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা

    বর্তমানে আমার আমাদের সামাজের দিকে তাকালে আমাদের এই সমাজে দেখতে পাই প্রতিনিয়ত কিভাবে মুসলিমরা একে অপরকে খুন করছে, ভাই ভাইকে হত্যা করছে, সন্তান পিতা মাতাকে হত্যা করছে, প্রতিবেশী অপর প্রতীবেশীকে হত্যা করছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে শতশত মানুষের সামনে এমনকি বিচারকের খাস কামরায় একে অপরকে হত্যা করছে। আজ নারী থেকে শিশু সন্তান পর্যন্ত তার পরিবারে সদস্য থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন পাড়া প্রতিবেশী এমনকি শিক্ষকের হাতে তার শিশু ছাত্রীর সম্ভ্রম পর্যন্ত নিরাপদ নয়। এমনকি স্বামীর কাছে স্ত্রী এবং স্ত্রীর কাছে স্বামী নিরাপদ নয়। এমতাবস্থায় আমাদের সমাজে এই অন্যায় অনাচারের রোধে নতুন নতুন আইন হচ্ছে, এসকল আইনে মৃত্যু দণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে তারপরও এর সাথে মাত্রা দিয়ে নতুন নতুন অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমাজে মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরির প্রচেষ্টা চলছে কিন্তু নতুন নতুন কৌশলে অপরাধ নতুন রূপ লাভ করছে। 

    আবূ মূসা আল-আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বললেন: “কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ‘হারাজ’ হবে। রাবী বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ‘হারাজ’ কী? তিনি বলেন: ব্যাপক গণহত্যা। কতক মুসলমান বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা এখন এই এক বছরে এত মুশরিককে হত্যা করেছি।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “তা মুশরিকদের হত্যা করা নয়, বরং তোমরা পরস্পরকে হত্যা করবে; এমনকি কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে, চাচাতো ভাইকে এবং নিকট আত্মীয়-স্বজনকে পর্যন্ত হত্যা করবে। কতক লোক বললো, হে আল্লাহর রাসূল! তখন কি আমাদের বিবেক-বুদ্ধি লোপ পাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: অধিকাংশ লোকের জ্ঞান লোপ পাবে এবং অবশিষ্ট থাকবে নির্বোধ ও মুর্খ।” (ইবনে মাজা) 

    আসলে আমারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিক্ষা বাদ দিয়ে অন্যপন্থায় এর সমাধান খুজতে গিয়ে সমস্যা কমাতে গিয়ে আরো বাড়িয়ে ফেলছি। আল্লাহ্‌র রাসূল সমাজে অনাচার বৃদ্ধির কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইসলামী জ্ঞানের অজ্ঞতা এবং নির্বোধ ও মুর্খতাকে। অর্থাৎ সমাজে মানুষের মাঝে ইসলামী জ্ঞানের আলোকে জীবন ধারণ বা দিয়ে নির্বোধ ও মূর্খের মত জীবনের সমাধান খোঁজার কারণের মানুষের মধ্যে অনাচারের প্রভাব বিস্তার পাচ্ছে। আল্লাহ তা’আলা মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে বলেছেন, 

    “নিশ্চয়ই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে অস্থির করে।” (আল মাআরিজ-১৯) 

    অর্থাৎ মানুষ স্বভাবতই অস্থির প্রকৃতির। তাই একটি সমাজে মানুষকে যত উত্তেজিত করার উপাদান থাকবে মানুষ ততই অপরাধ প্রবন হয়ে পড়বে। আমাদের সমাজে সবার মাঝে আজ অধিক সম্পদ ও সুখ অর্জনের তাড়না প্রকট হয়ে পড়েছে। সবার মাঝে এই ধারনা তৈরি করা হয়েছে যে, যে অধিক সম্পদের অধিকারী সে অধিক নিরাপদ এবং সুখী। এই সমাজকে যদি আমরা পরিশুদ্ধ করতে চাই তাহলে আমাদের সমাজের মানুষের এই নেতিবাচক প্রবনতা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। প্রকৃত সত্য হল সে-ই অধিক নিরাপদ ও সুখী যে অধিক তাকওয়াবান। এই সমাজে যদি মানুষকে আল্লাহ্‌র নৈকট্য অর্জনের দিকে ধাবিত হয় ও আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত হয় তাহলে মানুষ তত বেশি তাকওয়া অর্জনের দিকে ধাবিত হবে এবং সমাজে তাকওয়াপূর্ণ পরিবেশ মানুষকে আল্লাহ্‌র ভয়ের কারণে অধিকাংশ অপরাধ হতে দূরে থাকবে। কারণ তাকওয়ার পরিবেশের কারণে তার ইসলাম জ্ঞান লোপ পায় না, বরং সবসময় জীবন্ত থাকে এবং মানুষের চিন্তা পরিশুদ্ধ করতে থাকে এবং তার মাঝে উন্নত আখলাক তৈরি করে। 

    যেমনটি আমরা খুলাফা আর-রাশিদুন এর আমলে দেখতে পাই। উমর (রা) এর খিলাফতের আমলে এক তরুণ এক বৃদ্ধকে হত্যা করলে তাকে খলীফার দরবারে নিয়ে আসা হয়। অনেকে উপস্থিত হন সেই বিচারকার্য দেখবার জন্য। উমর (রা) তরুণকে জিজ্ঞাসা করেন, কেন তুমি তাকে হত্যা করলে? তরুণ জবাবে বললো, বৃদ্ধটি আমাদের উট হত্যা করেছিল, তাই রাগের মাথা তাকে আমি পাথর ছুড়ে মেরে ছিলাম এবং সেই আঘাতে বৃদ্ধটি মারা যায়। তরুণটি অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলে উমর (র) তাকে জানান, (মৃতের সন্তানদের দাবী অনুযায়ী) তোমার উপর শাস্তি কায়েম করা হবে। এতে তরুণ বলে উঠল: হে আমীরুল মুমিনীন, আমার কিছু জমানো সম্পদ রয়েছে যা আমি এমন স্থানে লুকিয়ে রেখেছি কেউ তা জানেনা। আপনি যদি আমাকে কিছুটা সময় দিতেন তাহলে আমি তা বের করে আমার ভাইদের দিয়ে যেতাম। উমর (রা) বললেন, তুমি কি আমাকে বোকা পেয়েছে? তরুণ এরপরও অনুরোধ করতে থাকে। এতে খলীফা বললেন, সেক্ষেত্রে তুমি একজন জামিনদার খুঁজে বের করো যে তোমার জামিন হবে, অর্থাৎ সে তোমার দায়িত্ব নেবে, তুমি ফিরে না আসলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তরুণ আশেপাশে তাকিয়ে আর্তনাদ করতে থাকে, কেউ কি আছেন আমার জামিন নেবার জন্য? কেউ জামিন নিতে রাজি না, কেবলমাত্র ভিড়ে পিছন হতে একজনের আওয়াজ ভেসে এল, আমি হব তার জামিন। তিনি আর কেউ নন, সাহাবী আবু জর আল-গিফারী। অতঃপর তরুণটিকে পরদিন মাগরিব পর্যন্ত সময় দেয়া হল তার কাজ শেষ করে ফিরে আসার জন্য। পরদিন মাগরিব এর ঠিক আগ মুহুর্ত, সবাই অপেক্ষা করছে দরবারে। কিন্তু তরুণের কোনো দেখা নেই। অপেক্ষা করতে করতে সবাই যখন আশা ছেড়েই দিচ্ছিল ঠিক তখনই দেখা গেল ঘোড়া ছুটিয়ে কেউ আসছে। দেখা গেল সেই তরুণ উপস্থিত। উমর (রা) তরুণকে বললেন, হে তরুণ, তুমি ফিরে আসলে কেন? আমি তো তোমার পেছনে কোনো গোয়েন্দা বা পেয়াদা প্রেরণ করিনি! তুমি তো চাইলে পালিয়ে চলে যেতে পারতে এবং কেউ তোমাকে ধরতে যেত না। জবাবে তরুণটি বলল: হে আমীরুল মুমিনীন, আমি তো কথা দিয়েছিলাম ফিরে আসবো, আর আমি চাইনি মানুষ বলুক, একজন মুসলিম কথা দিয়েছিল কিন্তু সে তার কথা রাখেনি। এরপর উমর (রা) আবু যর এর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, হে আবু যর, কী কারণে আপনি এই যুবক এর জামিন হয়েছিলেন? জবাবে আবু যর বললেন, সে আমাদের কাছে জামিন চেয়েছিল, আর আমি চাইনি মানুষ বলুক, একজন মুসলিম জামিন চেয়েছিল, কিন্তু কোনো মুসলিম তাকে জামিন দেয় নি। অতঃপর এ আমানতদারিতা দেখে সেই বৃদ্ধের সন্তানেরা উমর (রা) কে বলল, আমরা তাকে ক্ষমা করে দিলাম, কারণ আমরা চাইনা মানুষ বলুক একজন মুসলিম ক্ষমা চেয়েছিল কিন্তু কেউ তাকে ক্ষমা করেনি। 

    সুবহানাল্লাহ! এই হলো ইসলামী সমাজ তথা তাকওয়াপূর্ণ সমাজ, যেখানে শুধুমাত্র দুনিয়াবী শাস্তির ভয় দেখিয়ে অপরাধ রোধ করা হতো না, বরং সমাজে সঠিক ইসলামী পরিবেশ তৈরি করে, সঠিক আকীদা ও দৃষ্টিভংগি তৈরি করে সমস্যা সমাধান করা হতো। যে সমাজের কোর্টে অপরাধী, বাদী, বিবাদী ও সাক্ষী – সকলের মধ্যে তাকওয়া বিরাজ করতো। সে সমাজে ভোগবাদিতা বিরাজ করতো না, বরং তাকওয়ার পরিবেশ এর কারণে অপরাধ তেমন হতোই না, আর হলেও এই উন্নত পরিবেশের কারণে তা সহজেই মিটমাট হয়ে যেত, বছরের পর বছর ধরে কেস লড়ে যেতে হতো না, কিংবা আদালতের সামনে হানাহানি করতে হতো না। এই হচ্ছে ইসলামী সমাজের তাকওয়ার পরিবেশের রূপরেখা যা ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, যা আমাদের এই মুহুর্তে বড্ড প্রয়োজন এবং এর জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।

    আল্লাহ তাআলা বলেন, 

    “হে মুমিনগণ! ধৈর্য অবলম্বন কর, দৃঢ়তা প্রদর্শন কর, নিজেদের প্রতিরক্ষাকল্পে পারস্পরিক বন্ধন মজবুত কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (আল ইমরান- ২০০)  

  • মুত্তাকীন

    মুত্তাকীন

    হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।” [আল-বাক্বারাহ্: ১৮৩]

    নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুসলিমের লক্ষ্য হওয়া উচিত মুত্তাকী হওয়া, কারণ মুত্তাকীগণ হচ্ছেন সেসব ব্যক্তি যাদেরকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) ভালবাসেন এবং যাদেরকে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) সহায়তা, করুণা, ক্ষমা, বিশাল পুরস্কার এবং জান্নাতের পাশাপাশি ক্ষয়-ক্ষতি থেকে রক্ষা ও উত্তম কাজে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    কিন্তু হ্যাঁ, যে কেউ তার অঙ্গীকার পালন করে এবং আল্লাহ্কে ভয় করে – নিশ্চয়ই তখন, আল্লাহ্ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা মুত্তাকী।” [আল-ইমরান: ৭৬]

    একদা উমর ইবনে আল খাত্তাব (রা) উবাই ইবনে কাব (রা)-কে জিজ্ঞেস করলেন: “আপনি তাক্বওয়াকে কিভাবে বর্ণনা করবেন?” উবাই (রা) বললেন: “আপনি কি কখনো দীর্ঘ, ঢোলা ও মাটিতে লুটানো বস্ত্র পরিধান করে একটি কণ্টকাকীর্ণ পথের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেছেন?” উমর (রা) উত্তরে বললেন: ‘হ্যাঁ’। উবাই (রা) তখন জিজ্ঞেস করলেন: “সে সময়ে আপনি কি করেছিলেন?” উমর(রা) বললেন: “আমি আমার চারপাশে আঁটসাট করে পোশাকটিকে পেঁচিয়ে নিয়েছিলাম যাতে সেটা কাঁটার সাথে লেগে না যায়, কিংবা কাঁটার আঘাতে ছিন্নভিন্ন না হয়, এবং এরপর আমি সতর্কভাবে আমার রাস্তা খুঁজে নিয়েছিলাম”। উবাই (রা) বললেন: ‘এটাই তাক্বওয়া’।

    আলী (রা) রাতের অন্ধকারে তার দাঁড়ি আঁকড়ে ধরতেন এবং বলতেন: “হে পঙ্কিল দুনিয়া! তুমি কি আমাকে মোহাবিষ্ট করতে চাও? যাও এবং অন্য কাউকে মোহাচ্ছন্ন করার চেষ্টা করো। আমি তোমার মালিক হওয়ার ইচ্ছা রাখি না এবং তোমাকে পেতে চাই না। আমি তোমাকে তিনবার তালাক দিয়েছি, যা প্রত্যাহারের অযোগ্য। তুমি আমাকে যে আনন্দময় জীবনের হাতছানি দাও তা খুবই স্বল্পসময়ের”।

    ইবনে উমর কর্তৃক বর্ণিত আছে যে: আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি: “বনী ইসরাইলের কিফাল তার খারাপ কাজের পাপকে ভয় করত না। একদিন একজন মহিলা আসে এবং কিফাল তার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ৬০ দিনার প্রদান করে। যখন সে মহিলাটির দিকে অগ্রসর হয় তখন সে কাঁপতে থাকে এবং কাঁদতে শুরু করে। তখন কিফাল জিজ্ঞেস করে: তুমি কাঁদছো কেন? সে উত্তরে বলে: এটা এমন কিছু যা আমি আগে কখনো করিনি। এটি শুধুমাত্র আমার প্রয়োজন যা আমাকে একাজ করতে বাধ্য করছে। কিফাল বলল: তুমি এরকম করছ কারণ তুমি আল্লাহকে ভয় করো! অতএব আল্লাহকে আমার আরও অধিক ভয় করা উচিত। টাকাটা নাও এবং যাও, আল্লাহ্’র কসম আমি আর কখনো আল্লাহকে অমান্য করবো না। সে রাতে কিফাল মারা যায় এবং তার দরজায় লিখিত পাওয়া যায় যে: ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ কিফালকে ক্ষমা করেছেন’, আর লোকেরা এটা জেনে অবাক হয়ে যায়”। আত-তিরমিজি এই হাদীসটিকে বর্ণনা করেছেন এবং হাসান হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করেছেন। আল-হাকিম এটাকে সহীহ্ হিসেবে শ্রেণীভূক্ত করেছেন এবং আয-যাহাবী এতে সম্মতি প্রদান করেছেন। ইবনে হিব্বান তার সাহীহ্ এবং আল-বাইহাকী তার শু‘আব গ্রন্থে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন:

    ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহ্’কে ভয় করো, আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক কী সে প্রেরণ করছে আগামীকালের জন্য – এবং আল্লাহ্’কে ভয় করো। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করছ আল্লাহ্ সে-সন্বন্ধে পূর্ণ-ওয়াকিবহাল।” [আল-হাশর: ১৮]

    আল-হাসান আল-বসরী বলেছেন: “তাক্বওয়াবান ব্যক্তি (আল-মুত্তাকিন) হলেন তারাই যারা আল্লাহ্ যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকে এবং যা আদেশ করেছেন তার উপর আমল করে”।

    খলিফা ওমর ইবনে আবদুল আজিজ বলেন: “তাক্বওয়া মানে কেবল দিনে রোজা রাখা এবং রাতে ইবাদত করা নয়, কিংবা এ দু’য়ের মধ্যে সংমিশ্রন করা নয়, বরং তাক্বওয়া হলো আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা এবং যা ফরজ করেছেন তা আদায় করা। একজন ব্যক্তি এই কাজ করলে আল্লাহ্ তাকে উত্তম প্রতিফল দান করবেন”।

    অতএব, মুত্তাকীন হলেন সেসব ব্যক্তি যারা সকল কাজ ও জীবনের সকল ক্ষেত্রে – আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক – আল্লাহ্কে মান্য করে। সুতরাং:

    – তাক্বওয়াবান ব্যক্তি কেবল নামাজ পড়ে ও রোজাই রাখে না, বরং স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, পিতা-মাতা এবং আত্মীয়দের প্রতি সদয় আচরণ করে এবং ইসলামের আঙ্গিকে তাদের প্রত্যেকের অধিকার আদায় করে।

    – তিনি তাক্বওয়াবান ব্যক্তি নন যিনি কেবল কি’য়ামে দাঁড়ান, কুর‘আন তেলাওয়াত করেন, জিকির ও নফল নামাজ আদায় করেন, বরং যিনি এগুলোর পাশাপাশি ইসলামের মূল্যবোধ ও বিপরীত লিঙ্গের সাথে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামী সামাজিক বিধানসমূহ মেনে চলেন তিনিই তাক্বওয়াবান।

    যার তাক্বওয়া রয়েছে সে কেবল সাদাকাই দেয় না, বরং ইসলামের হুকুম অনুযায়ী সে তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনসমূহ পরিচালনা করে, রিবা বা সুদ থেকে দূরে থাকে এবং ইসলামী অর্থনৈতিক চুক্তি ও আইন মেনে চলে।

    তাক্বওয়াবান ব্যক্তি কেবল তাদেরকেই জবাবদিহি করে না যারা নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না বা পর্দা করে না, বরং তারা মুসলিম শাসকদেরকে জবাবদিহি করার বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য সোচ্চার হয় এবং তাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

    এবং, তাক্বওয়াবান ব্যক্তি সিরিয়া, ফিলিস্তিন, মায়ানমার এবং অন্যত্র আমাদের উম্মাহ’র বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যার বিরুদ্ধে নীরব থেকে কেবল জায়নামাজে বা মসজিদে অবস্থান করে না, বরং এধরনের নৃশংসতার বিরুদ্ধে কথা বলে এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।

    মুসলিমদের জন্য সাহাবাগণ (রা) হচ্ছেন অনুসরণীয় ব্যক্তিবর্গ, কারণ তাদের উপর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সন্তুষ্ট এবং তারা মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত।

    যখন রাসুলুল্লাহ্ (সা) ইয়েমেনে নতুন মুসলিমদের শিক্ষা দেয়ার জন্য শিক্ষক খুঁজছিলেন তখন তিনি মু‘য়াজ ইবনে জাবাল (রা)-কে তাদের আমির নিযুক্ত করেন এবং তাকে এই প্রশ্নসমূহ জিজ্ঞাসা করেন: “তুমি কিভাবে রায় দেবে বা কোন বিবাদের নিষ্পত্তি করবে?” উত্তরে মু‘য়াজ বলেন,“আমি আল্লাহ্’র কিতাব দিয়ে তাদের শাসন করবো।” তারপর তিনি (সা) বলেন, “যদি এ ব্যাপারে সেখানে কিছু না পাও তবে কি করবে?” তখন মু‘য়াজ বলেন, “তাহলে আমি রাসূলের সুন্নাহ্’র মধ্যে তা খুঁজবো।” এটা শুনে রাসূল (সা) তাকে বলেন, “যদি সেখানেও না পাও তবে কি করবে?” উত্তরে মু‘য়াজ বলেন, “তাহলে আমার জ্ঞান অনুযায়ী বিচারিক যুক্তি (ইজতিহাদ) অনুযায়ী রায় দিব।” একথা শুনে আল্লাহ্’র রাসূল (সা) অত্যন্ত খুশি হন এবং বলেন, “প্রশংসা সেই আল্লাহ্’র যিনি তাঁর রাসূলের বার্তাবাহককে এমন জ্ঞান দিয়েছেন যা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল ভালবাসেন।”

    সুতরাং, সাহাবীদের (রা) মতো মুত্তাকী হওয়ার জন্য আমাদেরকেও আল্লাহ্ (আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা)-কে ভয় করতে হবে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে হারাম এবং হালালকে অনুসরণ করতে হবে এবং আমাদের মধ্যকার বিবদমান বিষয়সমূহ ইসলামী শারী‘আহ্ অনুসারে ফয়সালা করতে হবে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    নিশ্চয়ই! যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখে ভয় করে, তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” [আল-মূলক: ১২]

  • জান্নাত ও জাহান্নামের চিন্তা: একটি জীবন পরিবর্তনকারী চেতনা

    জান্নাত ও জাহান্নামের চিন্তা: একটি জীবন পরিবর্তনকারী চেতনা

    জান্নাত জাহান্নামে বিশ্বাস মুসলিমদের আকীদার অংশ। আকীদা হল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বিশ্বাস যার ভিত্তিতে মানুষ তার জীবন পরিচালনা করে। কিন্তু বর্তমান সমাজে মানুষের কাছে জান্নাত জাহান্নাম অনেকটা তথ্যের মত রয়েছে; এটি জীবন পরিচালনাকারী বোধ বা চেতনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বিশ্বাস হিসেবে নেই। এর একটি প্রধান কারণ হল বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা (এর শাসক, সমাজব্যবস্থা, শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা) যা আমাদেরকে প্রতিনিয়ত দুনিয়ার সফলতার কথা মনে করিয়ে দিলেও আখেরাতের বিষয়ে নীরব। কিন্তু একটি সময় ছিল খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময় যখন শাসক জনগনকে পরকাল, দুনিয়ার জীবনের তুচ্ছতা মনে করিয়ে দিত।  

    উসমান ইবনে আফফান (রা) তার জীবনের শেষ খুতবায় বলেন,

    “আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তোমাদেরকে এ দুনিয়া দিয়েছেন যাতে তোমরা আখেরাতের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পার,একে নিয়ে পড়ে থাকার জন্য নয়,এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী অথচ আখেরাত চিরস্থায়ী। অতএব এমন কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থেকো না যা তোমাকে অবশেষে অবহেলিত করবে,এমন কোন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থেকো না যা ক্ষণস্থায়ী। সেই পথের সন্ধান কর যা চিরস্থায়ী। অবশ্যই আমাদের দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে হবে এবং আমাদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার সাথে মিলিত হতে হবে। মৃত্যু আমাদের আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়,এর চেয়ে ভাল স্মরণ আর কি আছে?”  

    ইসলামের ইতিহাসের প্রথম প্রজন্মকে রাসূলুল্লাহ (সা) জান্নাত জাহান্নামের ইয়াকীন বা দৃঢ় বিশ্বাস দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। তারা জীবনের সব কিছুর সাথে, সব কাজের সাথে জান্নাত-জাহান্নামকে সর্ম্পকযুক্ত করতে পারতেন। সকালবেলার সূর্যরশ্মি যখন উমর (রা) এর চোখে পড়ল এবং এতে তার ঘুম ভেঙ্গে গেল, তিনি বলে উঠলেন, ‘আল্লাহুম্মা আজির না মিনান নার।’ আফসোস, আমরা আজকে এভাবে জান্নাত জাহান্নামকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্ম্পকিত করতে পারি না।

    দুনিয়ার কোন ডিগ্রী অর্জন করা, ভাল চাকুরী বা ব্যবসা করা, বিলিওনিয়ার হওয়া, অঢেল সম্পদের মালিক হওয়া, সুরম্য অট্টালিকার মালিক বনে যাওয়া, বিলাসী জীবন লাভ করা সফলতা নয়, বরং সফলতা হল জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি এবং চিরস্থায়ী জান্নাত লাভ করা।

    “জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদের কর্মফল পূর্ণমাত্রায় দেয়া হবে। যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ব্যতিত কিছু নয়।” (সূরা আল ইমরান: ১৮৫)

    ইসলাম কুরআন এবং সুন্নাহ’র মাধ্যমে জান্নাতকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে যাতে আমরা জান্নাতের ব্যাপারে লালায়িত হই এবং জাহান্নামকে ভয়াবহ আযাবকে ভয় পাই। এটি বান্দার প্রতি আল্লাহ’র মহব্বতের বহিঃপ্রকাশ।

    “আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে এসে পৌছবে এবং এর দরজাসমূহ খুলে দেয়া হবে তখন জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, ‘তোমাদের প্রতি সালাম,তোমরা ভাল করেছ। অতএব স্থায়ীভাবে থাকার জন্য এখানে প্রবেশ কর।” (সূরা যুমার: ৭৩)

    সাহাবা (রা) দের জান্নাতের আকাঙ্খা এত তীব্র ছিল যে, কেউ কেউ হাতে রাখা খেজুর ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলেছে, এগুলো খাওয়া পর্যন্ত অনাকাঙ্খিত দীর্ঘ হায়াত নিয়ে বেচে না থেকে দ্রুত জান্নাতে চলে যাওয়াই উত্তম। তারা জান্নাত জাহান্নামকে অতি নিকট বাস্তবতার মত করে দেখতেন। আবার কেউ বর্শা বিদ্ধ হয়ে আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার করে বলে উঠেছে, ‘কাবা’র রবের কসম,আমি সফল হয়ে গেছি।’ মুতার যুদ্ধে জায়েদ বিন হারেসার শাহাদার পর দুই লক্ষ রোমান সৈন্যের বিপরীতে মাত্র তিনহাজার জন মুসলিম সৈন্যের নেতৃত্ব দানকালে জাফর বিন আবু তালিব (রা) আবৃত্তি করছিলেন, “স্বাগতম হে জান্নাত! যার আগমন-শুভলক্ষণ,যার পানি শীতল। রোম তো রোমই-যার শাস্তি ঘনিয়েছে। কাফের-ছিন্ন বিচ্ছিন্ন তাদের বংশ। যদি তাদের সাক্ষাত পাই।” এ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে তিনি শহীদ হয়ে যান। জান্নাতে তাকে দেয়া হয়েছে দু’টি ডানা- যা দিয়ে সেখানে তিনি উড়ে বেড়ান।

    জাবির বর্নিত মুত্তাফিকুন আলাইহি-এর একটি হাদীসে এসেছে যে,

    ওহুদের দিন এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করলো, “আজ যদি আমি নিহত হই, তাহলে আমার অবস্থান কোথায় হবে? ”উত্তরে তিনি (সা) বললেন, “জান্নাত। অতঃপর ঐ ব্যক্তি তাঁর হাতের সমস্ত খেজুর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং ততক্ষন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে গেলো যতক্ষণ না তিনি শহীদ হন।’’ [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    মুসলিম উল্লেখিত হাদীসে আনাস (রা) বর্ণনা করেন যে:

    “রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং সাহাবীগণ, মুশরিকদের আগমনের পূর্বেই বদর প্রান্তরে পৌঁছান। যখন মুশরিকরা উপস্থিত হলো তখন তিনি (সা) সাহাবীদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন: চলো এমন এক জান্নাতের দিকে ছুটে যাই যার প্রশস্ততা আসমান ও জমীন পর্যন্ত বিস্তৃত। ‘উমায়ের বিন আল হাম্মাম আল আনসারী অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহ্’র রাসূল, এমন এক জান্নাত যার প্রশস্ততা আসমান ও জমিন পর্যন্ত বিস্তৃত? তিনি (সা) বললেন: হ্যাঁ। উমায়ের প্রতিক্রিয়া জানালো: আহ্ কী চমৎকার! রাসূল (সা) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোন জিনিস তোমাকে এরূপ মন্তব্যে উদ্ধুদ্ধ করলো? জবাবে সে বললো: হে আল্লাহ্’র রাসূল, আল্লাহ্’র কসম, আমি ঐ অধিবাসীদের একজন হবো, এই প্রত্যাশা ছাড়া অন্য কোনো প্রত্যাশা থেকে আমি এ মন্তব্য করিনি। অতঃপর রাসূল (সা) বললেন: ‘নিশ্চয়ই তুমি সেই বাসিন্দাদের একজন’। তখন উমায়ের তার থলে হতে কিছু খেজুর বের করে সেগুলো খাওয়া শুরু করলো। এবং মনে মনে চিন্তা করতে লাগলো যে, যদি আমি এই খেজুরগুলো শেষ করার অপেক্ষায় থাকি তাহলে তা হবে সময়কে দীর্ঘায়িত করা। অতঃপর তিনি তার হাতের অবশিষ্ট খেজুরগুলোকে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং শহীদ হওয়া পর্যন্ত কাফিরদের সাথে যুদ্ধে করতে থাকেন।”

    আনাস (রা) বর্ণিত মুত্তাফিকুন আলাইহির আরেকটি হাদীসে এসেছে:

    “আমার চাচা আনাস বিন আন নদর বদরের যুদ্ধে অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)! মুশরিকদের বিরুদ্ধে আপনার প্রথম যুদ্ধে আমি অনুপস্থিত ছিলাম। যদি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাকে মুশরিকদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধে অংশগ্রহনের সুযোগ প্রদান করতেন, তবে তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) প্রত্যক্ষ করতেন, কত সাহসিকতার সহিত আমি যুদ্ধে অবতীর্ণ হই।” অতঃপর যখন ওহুদের ময়দান হতে মুসলিমগণ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলো এবং পালাচ্ছিল, তখন তিনি (রা) বললেন, “হে আল্লাহ্, এরা (সাহাবীগণ) আজ যা করছে, তা হতে আমি তোমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং এই মুশরিকরা যা করছে তাকে আমি তীব্র ভাষায় ধিক্কার জানাই।” অতঃপর তিনি যখন ওহুদের ময়দানের দিকে অগ্রসর হতে লাগলেন, তখন তাঁর সাথে সাদ বিন মু’য়াজ (রা) সাক্ষাৎ হলো। তিনি (নদর) তাকে আহ্বান করে বললেন, “হে সাদ বিন মু’য়াজ! জান্নাত। আন-নদরের রবের কসম! (এই পাহাড়ের পেছন থেকে তথা) ওহুদের ময়দান হতে আমি তার সুভাস পাচ্ছি।” অতঃপর সা’দ বললেন: “হে আল্লাহ্’র রাসূল! আনাস সেই দিন যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে আমি তা পারিনি। আমরা তার সমস্ত শরীরে তলোয়ার, বর্শা ও তীরের আঘাতজনিত আশিটিরও অধিক ক্ষতচিহ্ন দেখতে পাই। আমরা তাকে মৃত অবস্থায় পাই। মুশরিকরা তার সমস্ত শরীরকে এমন নৃশংসভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত তার বোন আঙুল দেখে তাঁকে সনাক্ত করতে সমর্থ্য হয়।” আনাস (রা) বলেন, “আমরা সবাই ভাবতাম নিম্নোক্ত আয়াতটি হয়তো তাকে (আন-নদর) বা তার মত কাউকে উদ্দেশ্য করে নাযিল হয়েছে; মু’মিনদের মধ্যে কতক ব্যক্তি রয়েছেন যারা আল্লাহ্’র নিকট তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করেছেন।” [সূরা আল আহযাব:২৩] 

    “জান্নাতে ধনুক পরিমাণ স্থান দুনিয়ার যেসব বস্তুর উপর সূর্য উদিত হয় বা অস্তমিত হয়, তাদের চেয়ে উত্তম।” (বুখারী: ৩২৫০)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “কিয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্য হতে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে যে দুনিয়ার জীবনে সবচেয়ে সুখী ও বিলাসী ছিল। অতপর তাকে জাহান্নামে একবার মাত্র ঢুকানো হবে এবং বের করার পর তাকে বলা হবে, ‘হে আদম সন্তান,তুমি কি কখনও ভাল জিনিস দেখেছ?তোমার কাছে কি কখনও সুখ সামগ্রী এসেছে?’সে বলবে, ‘না,আল্লাহ’র কসম হে প্রভূ।’ আর জান্নাতীদের মধ্য থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে যে দুনিয়াতে সবচেয়ে দু:খী ও অভাবী ছিল। তাকে জান্নাতে একবার মাত্র ঢুকানো হবে এবং বের করার পর তাকে বলা হবে, ‘হে আদম সন্তান,দুনিয়াতে তুমি কখনও কষ্ট দেখেছ?তোমার উপর কী কখনও বিপদ এসেছে?’সে বলবে ‘না,আল্লাহ’র কসম! আমার উপর কখনও কষ্ট আসেনি,আমি কখনও বিপদেও পতিত হইনি”। (মুসলিম)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “সর্বশেষ যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে তার সর্ম্পকে অবশ্যই আমার জানা আছে। এক ব্যক্তি হামাগুড়ি দিয়ে অথবা বুকে ভর দিয়ে জাহান্মাম থেকে বের হবে। তখন আল্লাহ বলবেন, ‘যাও জান্নাতে প্রবেশ কর।’ সুতরাং সে জান্নাতের কাছে এলে তার ধারণা হবে যে,জান্নাত পূর্ণ হয়ে গেছে। ফলে সে ফিরে আসবে এবং বলবে, ‘হে আমার প্রভূ,জান্নাত তো পরিপূর্ণ দেখলাম।’ আল্লাহ আবার বলবেন, ‘যাও,জান্নাতে প্রবেশ কর।’ তাই সে আবার ফিরে আসবে এবং বলবে, ‘হে আমার প্রভূ,জান্নাত তো পরিপূর্ণ দেখলাম।’ তখন আল্লাহ বলবেন, ‘যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। তোমার জন্য থাকল পৃথিবীর সমতুল্য দশটি পৃথিবীর মত বিশাল জান্নাত।’ তখন সে বলবে, ‘হে প্রভূ তুমি কী আমার সাথে ঠাট্টা করছ অথচ তুমি একজন বাদশাহ?” বর্ণণাকারী বলেন, ‘তখন আমি রাসূলুল্লাহ (সা) এমনভাবে হাসতে দেখলাম যে, তাঁর চোয়ালের দাঁতগুলো প্রকাশিত হয়ে গেল।’ তিনি (সা) বললেন, “এ হল সর্বনিম্নমানের জান্নাতী (বুখারী-মুসলিম)  

    “এ জান্নাতী যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন তখন তার দু’টি হুরী স্ত্রী কাছে এসে বলবে, ‘সেই আল্লাহ’র প্রশংসা, যিনি তোমাকে আমাদের জন্য এবং আমাদেরকে তোমার জন্য বাচিয়ে রেখেছেন।’ তখন সে বলবে, ‘আমাকে যা দেয়া হয়েছে তা অন্য কাউকে দেয়া হয়নি।”(মুসলিম)

    হাদীস থেকে জানা যায়, জান্নাতের রয়েছে আটটি দরজা। এগুলো হল: বাবুস সালাহ, বাবুল জিহাদ, বাবুস সাদাকাহ, বাবুর রাইয়ান, বাবুল হাজ্জ, বাবুল কাজীমিনাল গাইজ ওয়াল আফিনা আনিননাস (রাগ সংবরণকারী ও অন্যদের ক্ষমাকারী), বাবুল আইমান (আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুলকারী যারা বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে), বাবুস জিকর (যারা ঘন ঘন আল্লাহকে স্মরণ করেছে)।”

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    “যে ব্যক্তি আল্লাহ’র রাস্তায় জোড়া বস্তু ব্যয় করে তাকে জান্নাতে দরজাসমূহ থেকে ডাকা হবে, ‘হে আল্লাহ’র বান্দা এ দরজাটি উত্তম। এদিকে এস।’ সুতরাং যে নামাজীদের দলভুক্ত হবে তাকে সালাতের দরজা থেকে ডাকা হবে,যে মুজাহিদদের দলভুক্ত হবে তাকে জিহাদের দরজা থেকে ডাকা হবে,যে রোযাদারদের অর্ন্তভুক্ত হবে তাকে রাইয়ান নামক দরজা থেকে ডাকা হবে। আর দাতাকে দানের দরজা থেকে ডাকা হবে।” এসব শুনে আবু বকর (রা) বললেন, ‘হে আল্লাহ’র রাসূল! আমার মাতা পিতা আপনার জন্য কুরবান হোক। যাকে ডাকা হবে তার তো ঐসব দরজার প্রয়োজন নেই। এমন কেউ হবে কি! যাকে সব দরজা থেকে ডাকা হবে?’ তিনি (সা) বললেন, “হ্যা,আর আশা করি তুমি তাদের দলভুক্ত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)


    হে মুসলিম, হে আল্লাহ’র বান্দা, জান্নাত অন্বেষণকারীরা অন্যদের চেয়ে আলাদা। রাতে মানুষ যখন ঘুমায়, তারা তখন নামাজ পড়ে। মানুষ যখন পানাহার করে, তারা তখন রোযা রাখে। মানুষ যখন জমা করে, তখন তারা সাদাকা করে। মানুষ যখন ভীরুতা প্রদর্শন করে তখন তারা সালফে সালেহীনদের মত জালিম শাসকের সামনে হক্ব কথা বলতে ভয় পায় না। তারা আল্লাহকে ভয় করে গোপনে ও প্রকাশ্যে। তারা কবিরাহ গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকে। আল্লাহ’র স্মরণে তাদের হৃদয় কেপে উঠে। কুরআন তেলাওয়াত শুনে তাদের তাকওয়া বৃদ্ধি পায়। তারা আল্লাহ’র উপর তাওয়াক্কুল করে। বেহুদা কথা বার্তা থেকে বিরত থাকে। লজ্জাস্থানকে হেফাজত করে। আমানত ও ওয়াদা রক্ষা করে। রাগ সংবরণ করে ও লোকদের ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহ’র ওয়াস্তে কাউকে ভালবাসে ও আল্লাহ’র ওয়াস্তে তারা শত্রুতা করে। আত্মীয়তার সর্ম্পক বজায় রাখে। তারা হাসি ঠাট্টার ছলে মিথ্যা কথা বলে না, গীবত করে না, নিজের ভাইকে অপদস্ত করে না বা তাকে বিপদের মুখে পরিত্যাগও করে না।

    একদিন রাসূলুল্লাহ (সা) মসজিদে নববীর মিম্বারে দাড়িয়ে বারবার বলছিলেন, “আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে সতর্ক করছি। আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে সতর্ক করছি। আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে সতর্ক করছি।” সেদিন পাশের বাজারে দাড়ানো লোকেরাও রাসূলের কন্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছিল। অস্থিরতার দরুণ রাসূলের কাধের চাদর পর্যন্ত পড়ে গিয়েছিল। তিনি আরও বলছিলেন, “আমি জাহান্নামের চেয়ে ভয়ংকর কোন জিনিস কখনও দেখিনি,যার পলায়নকারীরা ঘুমন্ত। আমি জান্নাতের চেয়ে লোভনীয় কিছু দেখিনি,যার সন্ধানকারীরা ঘুমন্ত।” (সহিহ তিরমিযী)

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    জাহান্নামের ভেতর সবচেয়ে হালকা শাস্তি হবে সে ব্যক্তির,যার দু’টি আগুনের জুতা থাকবে এবং যার কারণে উত্তাপে তার মগজ ফুটতে থাকবে। সে অন্য কাউকে তার চেয়ে বেশী শাস্তি ভোগকারী মনে করবে না,যদিও সেই সর্বনিম্নশাস্তিভোগকারী। (মুসলিম)  

    আল্লাহ বলেন, 

    “নিশ্চয় যাক্কুম বৃক্ষ পাপীদের খাদ্য। গলিত তন্ত্রের মত পেটের ভেতর ফুটতে থাকবে, যেমন ফুটে গরম পানি।” (দুখান: ৩৫-৩৬)

    “যদি যাক্কুমের এক ফোটা দুনিয়ায় টপকে পড়ত, তবে এতে বসবাসকারীদের জীবন উপকরণ ধ্বংস হয়ে যেত। সে ব্যক্তির অবস্থা কেমন হবে যার খাদ্যই হবে যাক্কুম।” (আহমাদ, তিরমিযী, ইবনে মাযাহ)

    “নিশ্চয় যারা আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে এবং তার ব্যাপারে অহঙ্কার করেছে, তাদের জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হবে না এবং তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষন না উট সূচের ছিদ্রতে প্রবেশ না করে। আর এভাবেই আমি অপরাধীদের প্রতিদান দেই।” (সূরা আ’রাফ: ৪০)

    আমাদের প্রতিটি কাজে সাহাবা (রা) এর মত জান্নাতের তীব্র আকাঙ্খা ও জাহান্নামের ভয় থাকতে হবে। তবেই আমরা তাকওয়াপূর্ণ জীবনযাপন করে সঠিক গন্তব্যে পৌছতে পারব ইনশাআল্লাহ। আমাদেরকে আল্লাহ জান্নাত লাভ করা ও জাহান্নামের কঠিন আগুন থেকে মুক্তি দানের মাধ্যমে সফলতা দান করুক, আমীন, সুম্মা আমীন।

  • বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির একপথ খিলাফত

    বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির একপথ খিলাফত

    ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে একটি অভিবাসনপ্রত্যাশী দলের অন্তত ৬০ জন মারা গেছেন। নৌকার আরোহীদের মধ্যে ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন। (১) উচ্চ শিক্ষিত ছাত্রদের সবচেয়ে কাম্য ৪০ তম বিসিএস পরীক্ষায় অনুষ্টিত হল মে মাসে। তাতে মাত্র ১৯০৩টি চাকরীর বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩২ টি।(২) এই পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় ৪ লাখ ১০ হাজার বেকারের কোন গতি হবেনা। সাথে কোটা নামের বৈষম্যতো আছেই। বেকার যুবকরা সরকারী চাকরীতে প্রবেশের সীমা ৩৫ করার দাবী করছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে বেকার ৩কোটি। শুভংকরের ফাকি বাদ দিলে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা ৬ কোটির উপর। অর্থাৎ দেশের মোট কর্মক্ষম জনগোষ্টির ৩৯.৪০শতাংশ বেকার। প্রতি বছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে ২২ লাখ যাদের মধ্যে কাজ পায় মাত্র ৭ লাখ।(৩)

    যে কোন দেশের কর্মসংস্থান নির্ভর করে তাঁর উৎপাদন বা ম্যানুকচারিং উপর।

    বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সমুহ ও বাস্তবতা:

    অর্থনীতি যে সকল খাতের অবদান যত তাঁর উপর নির্ভর করে মোট কর্মসংস্থান তৈরীর সুযোগ।

    বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় আয়ে সেবা খাতের অবদান ৫৬, শিল্পের ৩০ দশমিক ১৭ ও কৃষি খাতের ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। (৪)

    সেবা খাত: সেবাখাত মূলত সেবা প্রদান করে থাকে, কিন্তু কোনো কিছু উৎপাদন করে না । খুচরা বিক্রয়, ব্যাংক, বিমা, হোটেল, রিয়েল স্টেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কম্পিউটার সেবা, বিনোদন, প্রচার মাধ্যম, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ ইত্যাদি কাজ সেবাখাতের অন্তর্ভুক্ত।

    বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জুলুমের খাত এটি। এ খাতকে আমরা অধিকারের খাত বললে যথোপযুক্ত হয়।এগুলো পেতেআমাদের উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয় তাছাড়া উৎপাদনের সাথে জড়িত না হওয়ার কারনে কর্মসংস্থান খুবই সীমিত।তাছাড়া সেবা খাতে বেসরকারী চাকরীর বেশিরভাগ উচ্চপদস্থ চাকরীগুলো ভারতীয়দের দখলে। সরকারের দুর্নীতির ডিজিটাল দাবির ফানুস এই সেবা খাতকে কেন্দ্র করে যা পদ্মা সেতু থেকে স্যাটালাইট পর্যন্ত হলেও ফাকা বেলুন ছাড়া কিছুই নয়। সেবা খাত যতই ডিজিটাল হোকনা কেন তা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে না এবং বেকারত্বও দূর হয়না ।

    শিল্প খাত: এ দেশে শিল্প মুলত তৈরি পোশক ও টেক্সটাইলের উপর দাঁড়িয়ে আছেঅন্যদিকে শিল্প বিষয়ক আমদানি রপ্তানি চিত্র দেখলে বুঝা যায় গার্মেন্টস সেক্টরে সব কিছুই আমদানি করে, শুধুমাত্র কাট এন্ড মেইক ভিক্তিতে পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য তৈরি করা হয়। অর্থাৎ এখাতের সাপোরটিভ যে শিল্প থাকা দরকার তাও গড়ে উঠেনি।

    সাড়ে ২২ লাখ মহিলা এ খাতে চাকরিরত। অর্থাৎ দেশের বেশিরভাগ ম্যনুফেকচারিং বা উৎপাদন শিক্ষা বঞ্চিত আমাদের মা বোনরাই করে থাকেন। অল্প বেতনের কারণে তাঁদের ১০জনে ৯ জনই ৩ বেলা খেতে পারেন না, ৮৭ শতাংশ পোশাক শ্রমিক ঋণগ্রস্থ।তাঁদের বেশির ভাগই বিরতি হীন কাজ করার কারণে পিঠব্যাথা,মেরুদন্ড ব্যাথা মূত্রনালী সমস্যা ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত। (৫)

    আর অন্যান্য শিল্পের মধ্যে পাট,চিনি মৃত প্রায়। কাগজ, জাহাজ, কেমিকেল সহ শিল্পগুলো সরকারী পলিসি গত কারণে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ নেই । সরকারের নতজানু নীতির কারণে ২০০২ সালে বিশ্বব্যংক পাট শিল্পকে ধংস করে দেয়, ফলে বেকার হয়ে পড়ে এ শিল্পের সাথে জড়িত সবাই । এখন আমরা আমাদের সোনালী কাঁচা পাট ভারতে রপ্তানী করে ওদের শিল্প উন্নয়ন ঘটাচ্ছি । কর্ম সংস্থান অনেক দুরের বিষয়।

    কৃষি খাত: বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে কৃষি।২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, এটি মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ যোগান দিয়ে থাকে খাদ্যশস্যের উৎপাদন মূলত এই খাতটি হতে আসে । (৬)

    জমির লিজ, বীজ সংগ্রহ, কীটনাশক, ইউরিয়া পটাশ, মজুরী এসব খরচের পর কৃষকরা লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করেন। দেশে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার পরও গত দুই বছরে ৬০ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়। চাল সস্তা হয়ে পড়ায় বিপদে পড়ছে কৃষক, তারা উৎপাদন খরচও তুলে আনতে পারছেন না। ফলে চাল উৎপাদনে নিরুসাহিত হচ্ছে কৃষক। ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অনেকেই বেকার হয়ে পড়ছে। কৃষির সাথে জড়িত অন্যান্য সেক্টরগুলোর অবস্থাও একই ।

    প্রবাসে কর্মসংস্থান: ৭৫ লাখ বাংলাদেশি মোট প্রবাসে কর্মরত আছেন। যাদের মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার মহিলা।

    প্রতিবছর ৩ হাজার লাশ হয়ে দেশে আসেন। বাংলাদেশে অভিবাসন খরচ পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশের তুলনায় বেশি, সুদে ঋণ করে, ঘরবাড়ী বিক্রি করে বেশির ভাগ লোক প্রবাসে যান, ঋণ টানতে টানতে এসব টকবগে ত্রুণের জীবন শেষ। প্রবাসে মহিলা নির্যাতন ও শ্রমিকের রক্তঝরা রেমিটেন্সের বেশির ভাগই আমদানির খরচ মিটাতে চলে যায়। তার উপর শাসক শ্রেণীর দুর্নীতিতো আছেই। ফলতঃ এই রেমিটেন্স উৎপাদন খাতে কোন কাজে আসছেনা।

    কর্ম সংস্থানের অভাবে যা ঘটছে: শিক্ষিত ও শিক্ষা বঞ্চিত দেশে বর্তমানে ৬ কোটি তরুণের ১.৫ কোটি মাদকাসক্ত। (৭) বঙোপসাগর, ভুমধ্যসাগর বিপদজনক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অনেকে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছেন, যাদের অনেকেই সমুদ্রে ডুবে মারা যাচ্ছেন। দেশে প্রতি বছর ১১ হাজারে অধিক আত্মহত্যা করে, যার অন্যতম কারণ বেকারত্ব। (৮) শিক্ষিত যুবকরা চাকরী না পেয়ে হতাশায় ডুবে আছেন। মাথা নিচু করে উবার, পাটাও বা ফুডপান্ডার বোঝা বহণ করে বেঁচে থাকতে চাইছেন কিছু হতাশাগ্রস্থ বেকার যুবক।

    পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ ও গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিই সমস্যার মূল কারণ:

    আমেরিকা তথা পশ্চিমারাই পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে কলোনী স্থাপনের মাধ্যমে শোষণ করে । তাই তারা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে কিছু এজেন্টদের গণতন্ত্রের মুখ রুপে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। প্রভুদের পলিসি বাস্তবায়ন করাই এই সব বিশ্বাসঘাতক শাসকদের একমাত্র কাজ। এক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রে কি কি উৎপাদন হবে আর কোন জায়গাগুলো ব্লক থাকবে তা প্রভুরা যা নির্ধারণ করে তাই তারা বাস্তবায়ন করে। এসব শাসক এজেন্টদের সহযোগিতায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র গুলো সরাসরি বা বিশ্বব্যাংক/আইএমএফ এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো অর্জনে বাধা প্রদান করে পাশাপাশি উৎপাদন খাতকে ধংস করে আমদানি নির্ভর করে তোলে। স্বাভাবিক ভাবে আমদানি নির্ভর এ অর্থনীতিতে লোকাল ক্ষুদ্র কিছু পুজিপতি গোষ্ঠী জন্মায়। তাদের কাজ পুজি পুঞ্জিভূত করে পাচার করা। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যেমন তাদের নিয়ে পরিকল্পনা থাকেনা, তাদেরও রাষ্ট্রের শিল্পায়ন ও উৎপাদনে খুব একটা ভূমিকা থাকেনা। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়না।

    সর্বোপরি একটি রাষ্ট্র আদর্শিক না হলে তার কোন ভিশন থাকেনা। সে কেন জনগণকে শিক্ষিত করবে? কিভাবে শিক্ষিত করবে? তাদের কোথায় কোথায় কাজে লাগাবে? সম্পদের ব্যবহার কিভাবে করবে? সে কি উৎপাদন করবে? কেন করবে? তাঁর কোন পরিকল্পনা থাকেনা। পর্যাপ্ত খনিজ ও অন্যান্য সম্পদ থাক ষত্বেও তারুণ্যের শক্তি তার কাছে বোঝা স্বরুপ।

    সমাধান কোথায়? সম্মানের সাথে আমরা নিতে প্রস্তুত কিনা?

    শিল্প খাত: ইসলাম বাস্তবায়ন করা ও সমগ্র বিশ্ব ছড়িয়ে দেওয়ার অভিন্ন লক্ষ্য ও রাজনৈতিক আকাংখা নিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র সব পরিকল্লনা সাজাবে। মুসলিম উম্মাহকে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ও ইসলামের ভুখন্ড গুলো একত্রিত করবে। নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা ও শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে সামরিক বাহিনীর কোন বিকল্প নেই। সামরিক দিক দিয়ে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করতে মিলিটারী শিল্প গড়ে তোলা হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    “এবং আমি সৃষ্টি করেছি লোহা, যাতে রয়েছে বিপুল শক্তি এবং সেই সাথে মানব জাতির জন্য নানা উপকার”। (সুরা হাদিদ: ২৫)

    স্বাভাবিকভাবেই খিলাফতকে দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত করবে। প্রয়োজন হবে ব্যাপক শিল্পায়ন ও সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান। যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল মুসলিমদের রাজনৈতিক এই আক্ষাংকাই শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়েছিল। ইউরোপের বুকে ইসলামকে বিজয় করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই মুসলিমরা ভুমধ্যসাগরে জাহাজ শিল্প নির্মাণ করেছিল যা পরবর্তীতে ১৭ শতক পর্যন্ত ভুমধ্যসাগরে উসমানীয় খিলাফতের অধীনে মুসলিম নোবাহিনীর কতৃত্বে ছিল।

    খিলাফত মুসলিমদের অন্যন্য ভুমি গুলো একত্রিত করার কারণে ভারী শিল্পের উপাদান ও সম্পদ সহজে যোগান দিতে পারবে। তাছাড়া পঞ্চ বার্ষিকী বা এই ধরনের অল্প সময়ের মধ্যে পরিকল্পত সামরিক কেন্দ্রিক ভারী শিল্প গড়ে উঠবে। যেমন: ১৯২৮-১৯৩২ সালের মধ্যে সোভিয়েত রাশিয়া কৃষি নির্ভর শিল্পকে ভারী শিল্পে রূপান্তরিত করেছিল।

    খিলাফতের অর্থনীতি হবে প্রতিরক্ষা শিল্প কেন্দ্রিক অর্থনীতি। উন্নত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা,তার ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়নই হবে উন্নয়নের মুল চালিকা শক্তি। এধরনের অর্থনীতি যে শুধুমাত্র কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টি করবে তা নয় বরং বৈরি আগ্রাসী পরাশক্তিগুলো থেকেও খিলাফতকে রক্ষা করবে। পাশাপাশি সহায়ক শিল্প (support industry) যেমন-স্টিল, লোহা, কয়লা, যানবাহন নির্মাণ, খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করণ ইত্যাদি শিল্প গড়ে তোলা হবে। যা সম্পূর্ণরুপে উৎপাদন নির্ভর ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।(৯)

    ভারী শিল্পের সহায়ক শিল্পেকে উন্নত করতে একটি ফোরাম গড়ে তোলা হবে যা শুধুমাত্র শিল্পপতিদের নিয়ে কাজ করবে যারা শিল্প খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে প্রয়োজনে খিলাফত তাদের বিশেষ প্রনোদনা দেবে । যার ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। (১০)

    ১৯৫২ সালে জাপানী মার্কিন দখলদারীত্বের অবসান ঘটলে এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

    কৃষি খাত: একটি টেকসই শিল্পায়নের ভিত্তি হল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। উর্বর ভুমি ও কৃষকের পরিশ্রমের কারণে সরকারি কোন সাহায্য না থাকার পরও আমরা ইতোমধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে এই খাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাত করণ শিল্প গড়ে তোলা হবে ফলে এ খাতে আরো কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি হবে।

    সেবা খাত: ভারী শিল্প গড়ে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই সেবা খাতের পরিধির ব্যাপকতা বড় হয়ে উঠবে।সেবার যে বিষয় গুলো অধিকারের সাথে সম্পর্কিত তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য রিয়েল স্টেট, কম্পিউটার সেবা, প্রচার মাধ্যম, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ সহ নাগরিক অধিকার সমুহের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করণ, ও সার্বিক তদারকি ও বাস্তবায়নে প্রচুর কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    ”তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে…….” (আলে ইমরান: ১১০)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে মাথা অবনত করে থাকার জন্য নয়। বেকারত্ব, দারিদ্রতা, বৈষম্য দূর করে একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই আমাদের নেতৃত্বশীল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। খিলাফত এমন একটি রাষ্ট্র যার মাধ্যমে অভ্যন্তরীন সমস্যার সমাধান করে মুসলিমরা ১৩শত বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। রাসূল (সা)-এর পর খুলাফা আর-রাশিদুন থেকে উসমানীয় খিলাফত পর্যন্ত যার সুদীর্ঘ ব্যপ্তি। আমরা সম্মানিত হতে চাইলে অবশ্যই খিলাফত রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে। হতাশায় না ডুবে, বালির বাঁধে আটকে থাকা এই পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আপনার মাথা তুলে দাড়ানোর সাথে সাথে ধ্বসে পড়বে ইন শা আল্লাহ।

    রাসুল (সা) বলেছেন-

    “ইমাম (খলীফা) জনগণের উপর দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারি)

    খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিনিধি খলিফা উম্মাহ্র সেবক হিসেবে জনগনের সেবা করবে । কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে উম্মাহর সকল দ্বায়িত্ব নিবেন এবং একটি নেতৃত্বশীল জাতিতে পরিণত করবেন। উন্নত জীবনের সন্ধানে ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ না করে এই জাতির তরুণেরা তখন ইসলামের বিখ্যাত সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের মতো ভুমধ্যসাগরে ইউরোপ জয় করার মতো অভিযান পরিচালনা করবেন।

    চলুন হে ভাইয়েরা, আমরা খিলাফতের এই ফরজ দ্বায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতে নিজেকে সম্মানিত করি।

    আল্লাহ সুবাহানুতালা বলেন-

    ”হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সেই আহবানে সাড়া দাও যা তোমাদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করে।” (সুরা আনফাল: ২৪)

    সুত্র:

    ১- প্রথম আলো ১৮মে ২০১৯,

    ২- প্রথম আলো ৩ মে ২০১৯,

    ৩- ইনকিলাব ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ৪- বণিকবার্তা , সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮,

    ৫-প্রথম আলো ১মে,২০১৯,

    ৬-উইকিপিড়িয়া।

    ৭- http://www.banglatribune.com/others/news/73343/‘দেশে-মাদক-ব্যবসায়ী-৩০-লাখ

    ৮- https://bangla.dhakatribune.com/bangladesh/2019/01/20/6830/%27দেশে-প্রতিবছর-১১-হাজার-আত্মহত্যা%27

    ৯- ইসলামি খিলাফত সরকারের শিল্পায়ন মডেল।

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমযান: কুর‘আন -এর মাস

    রমযান: কুর‘আন -এর মাস

    আবারও আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) আমাদেরকে এই বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ কুর‘আন আল-কারীম-এর মাসে ইবাদত করার সুযোগ দান করেছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

    নিশ্চয়ই আমি নাযিল করেছি এই কুর‘আন মহিমান্বিত রাত্রিতে।” (সূরা ক্বদর: ১)

    আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) পক্ষ থেকে এই উম্মাহ্’র জন্য রহমত হিসেবে বহু কিছু প্রদান করা হয়েছে, যেগুলোর কারনে আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত; বিশেষভাবে কুর‘আনের মাধ্যমে আমাদের প্রতি রহমত বর্ষনের জন্য আমরা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) অশেষ শুকরিয়া আদায় করি। কুর‘আন কেবল হৃদয় ও মনকে প্রশান্তি দেয় না, বরং এটি আমাদের জীবনের জন্য দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। পৃথিবীতে আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নবীদের (আ.) মহাকাব্যিক কাহিনী এবং তাদের সংগ্রাম সকল মুসলিমের জন্য আদর্শ। যেহেতু এই মাসে আমাদের কুর‘আন শোনা ও পড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, সেহেতু এই কিতাবের অন্তর্গত শক্তিশালী বক্তব্য সম্পর্কে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। এটি এমন একটি গ্রন্থ যেটি নাযিল হওয়ার পর মক্কার কাফির কুরাইশ শাসকদের সাথে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মুহাম্মাদ (সা.) এবং তার অনুসারীদের মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়। অবাধ্যতার শাস্তি সম্পর্কে মানবজাতিকে অবহিত করে আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল আমাদের প্রতি যে সতর্কবাণী প্রেরণ করেছেন তা প্রতিবার কুর‘আন তেলাওয়াতের সময় স্মরণ করা উচিত। সত্যিকার অর্থেই আমাদের জীবন শূণ্য ও অর্থহীন, যদি না আমরা কুর‘আনকে আমাদের নিকটবর্তী রাখি এবং কুর‘আনের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করি। এমনকি সমগ্র সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে যদি না আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কুর‘আন বাস্তবায়ন করতে পারি। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে কিভাবে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) আল-কুর‘আনে সমাজ পরিচালনা বিষয়টি উল্লেখ করেছেন:

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

    আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিধান দেয় না তারাই কাফির।” (সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)

    অতএব, কুর‘আন হলো এমন একটি কিতাব যা আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রমযান মাসে মানবজাতির জন্য সামগ্রিক পথ-নির্দেশ হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যাতে এর মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবন পরিচালনা করতে পারি এবং কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে এটিকে ব্যবহার করতে পারি। তাই আমাদের জীবনে একটি সক্রিয় সহচর হিসেবে কুর‘আনের ভূমিকা থাকা উচিত। এই রমযান শেষে পুনরায় পরের বছর খোলার উদ্দেশ্যে কুর‘আন তুলে রাখা উচিত নয়, বরং ঘরে নিয়মিতভাবে আমাদের এটি পড়া উচিত। কুর‘আনের প্রত্যেকটি আয়াতে কি ব্যাখ্যা রয়েছে তা বোঝার জন্য আমাদের সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করা উচিত এবং জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে কুর‘আনের শিক্ষা প্রয়োগের সংকল্প করা উচিত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

    তবে কি তারা কুর‘আন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করে না, নাকি তাদের অন্তরের উপর তালা লাগানো রয়েছে।” (সূরা মুহাম্মাদ: ২৪)

    কুর‘আন মানবজাতির জন্য একটি পথ-নির্দেশ যা মিথ্যা থেকে সত্যকে পৃথক করে। এটি মানবজাতির জন্য শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক বিষয় হতে শুরু করে ব্যক্তিগত ইবাদত পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে একটি পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই রমযান মাসে যখন আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে সূরা পড়ি তখন কি আমরা সত্যিই এই কুর‘আনকে বুঝি এবং অনুশীলন করার বিষয়ে চিন্তা করি? আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ্‘র (সা.) চরিত্রকে চলন্ত কুর‘আন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি কুর‘আনের বার্তা প্রতিফলিত হয়? আমরা কি আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়ন করি? নাকি আমরা অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের সাথে সম্পর্কিত অধিকাংশ হুকুম উপেক্ষা করে কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদতের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করি? আমরা কি সত্যিই আমাদের কাঁধে কুর‘আনের গুরুভার অনুভব করি? আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

    আমি যদি এ কুরআন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম তাহলে তুমি তাকে দেখতে আল্লাহ্’র ভয়ে বিনীত ও ভীত হয়ে গেছে। মানুষের জন্য আমি এসব দৃষ্টান্ত এজন্য বর্ণনা করি যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা হাশর: ২১)

    অতএব, আমাদের কাঁধে এই কুর‘আনের যে গুরুভার রয়েছে তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন, এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে – মসজিদে বা স্কুলে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে যেখানেই থাকুন না কেন, কিংবা একটি বাড়ি কিনুন বা একটি গাড়ি বিক্রি করুন না কেন, অথবা ব্যক্তিগত ইবাদতে মশগুল হন বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করেন না কেন – কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়াই সবসময় আল্লাহ্র আনুগত্য করার জন্য কুর‘আনকে ব্যবহার করুন। সংক্ষেপে বলা যায় যে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন, তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের কেবল ইসলামকে অনুসরণ করা উচিত।

    আসুন আমরা কুর‘আন-এর মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর এই সুবর্ণ সুযোগটিকে কাজে লাগাই। ইসলাম সম্পর্কে আমরা যত বেশি সচেতন হব ততই এর ভিত্তিতে আমাদের জীবন পরিচালনা করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء

    আল্লাহ্‘র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) প্রত্যেক রাতে ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-এর সাথে কুর‘আন অধ্যয়ন করতেন। আল-বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) রমযানে সবচেয়ে বেশি উদার ছিলেন, যখন তিনি ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং তাঁর সাথে কুর‘আন পড়তেন। ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) রমযানে প্রতি রাতে কুর‘আন শিক্ষা দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন”।

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুর‘আনের আয়াতের অর্থ অধ্যয়ন করে জ্ঞান অর্জন করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এবং তার সাহাবীদের (রা.) জীবন সম্পর্কে পড়ি: কিভাবে তারা জীবন কাটিয়েছিলেন? কিভাবে তারা এই পৃথিবীতে আল্লাহ্’র বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? আসুন আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ, কৃষি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে পড়াশোনা করি। আসুন আমরা দেখি যে ইসলাম পুরুষ ও নারী, পরিবার ও শিশুদের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কি বলে? আসুন আমরা সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে ইসলামের হুকুমসমূহ খুঁজে বের করি। মনে রাখবেন, ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং এই পবিত্র মাসে আসুন আমরা আমাদের অজানা ইসলামের কিছু অংশ হলেও জানার আন্তরিক চেষ্টা করি।

  • অধপতিত মুসলিম উম্মাহ’র পূর্ণজাগরণ কোন পথে?

    অধপতিত মুসলিম উম্মাহ’র পূর্ণজাগরণ কোন পথে?

    আল্লাহ বলেন,

    “তোমরাই (মুসলিমগণ) সর্বোত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের জন্য উত্থান ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে।” (সূরা আল ইমরান: ১১০)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কেউই মুসলিম উম্মাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলতে পারবে না। মুসলিমগণ এখন অধপতিত। এটি সবাই বুঝতে পারছে। বিশ্ব নেতৃত্বে মুসলিম উম্মাহ নেই। ইউরোপ আমেরিকার হাতে আজকে বিশ্ব নেতৃত্ব। মুসলিম উম্মাহ নির্যাতিত, নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত শরণার্থী, নৈতিকভাবে অধপতিত, জ্ঞান বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত যদিও মুসলিম ভূমিসমূহ তেল, গ্যাস, কয়লাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ।

    কিন্তু কেন মুসলিম উম্মাহ আজকে অধপতিত?

    এ ব্যাপারে নানা মুনীর রয়েছে নানা মত। মুসলিম চিন্তক, ইসলামিক বিশেষজ্ঞগনের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ মনে করছেন মুসলিম উম্মাহ অধপতিত কেননা তাদের নৈতিক পদস্খলন ব্যাপক। কেউ মনে করছেন মুসলিম উম্মাহ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, ইংরেজীতে দূর্বল, শিক্ষার হার কম, জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত, প্রবল জাতিগত বিভেদ, ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচারাদিতে অনুৎসাহ, ইউরোপ আমেরিকার মত সঠিক অর্থনৈতিক নীতির অভাব ইত্যাদি। সব প্রস্তাবনাগুলো একটু খতিয়ে দেখা দরকার। যদি জনসংখ্যার আধিক্য কোন সমস্যা হত তাহলে সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা নিয়ে চীন কী করে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হল, ভারত কী করে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হল? ইংরেজী শিক্ষায় চীন, জাপান ও কোরিয়ানদের অনাগ্রহের কথা সবাই জানে। তথাপিও এ তিনটি দেশ শিল্পক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে প্রথম সারিতে। শ্রীলংকার স্বাক্ষরতার হার প্রায় একশভাগ হওয়া সত্ত্বেও এটি ইউরোপ, আমেরিকার মত নেতৃত্বশীল জাতিতে পরিণত হতে পারেনি। মদীনার লোকেরা এখনও নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ ও কোমল প্রকৃতির। কিন্তু তারপরেও তারা খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়ের মত বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নেই। যে কোন দেশের জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সেসব দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালার উপর নির্ভরশীল। এই প্রগতিশীল নীতিমালা আসে একটি ভিশনারী রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে। আর ভিশন আসে আদর্শ থেকে। মুসলিম দেশসমূহ কি আজকে কোন আদর্শ অনুসরণ করছে? উত্তর হল না। সেকারণে সেসব দেশ জ্ঞান বিজ্ঞানে পশ্চাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র। মধ্যযুগের ইউরোপ, আমেরিকা ছিল দরিদ্র, জাতিগত হানাহানিতে পরিপূর্ণ, পশ্চাপদ। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে ইউরোপের পূর্ণজাগরণ বা রেনেসা ইউরোপের মোড় ঘুরিয়ে দিল। ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে উদ্ভুত পুজিবাদী অর্থনীতির ভিশনের ফলে তাদের শিল্পবিপ্লব ঘটল। শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্যের বাজারের জন্য তারা একের পর এক উপনিবেশ স্থাপন করল এবং বিশ্ব নের্তৃত্ব কায়েম করল। অর্থাৎ আগে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে রেনেসা হয়েছিল এবং তার পর জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে। একই কথা ইসলামিক সভ্যতার ক্ষেত্রেও সত্য। মুসলিমগণ কখন এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল যখন আফ্রিকা হয়ে উঠেছিল রুটির ঝুড়ি এবং যাকাত দেয়ার জন্য লোক খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না? কখন মুসলিমগণ ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডে দূর্ভিক্ষের সময় ত্রাণ পাঠিয়েছিল অথচ এখন মুসলিমরা নিজেরাই শরণার্থী। অবশ্যই এরকমটি ঘটেছিল ইসলামী খিলাফতের সময়ে। কখন মুসলিমগণ জ্ঞান বিজ্ঞানে বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসনে সমাসীন ছিল? কখন তারা গড়ে তুলেছিল বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ, মরক্কোর কারাউয়িন বিশ্ববিদ্যালয়, মিশরের আল আজাহার, স্পেন বা আন্দালুসিয়ার কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জগত বিখ্যাত প্রাচীন বিদ্যাপীঠ? কখন তৈরি হয়েছিল বীজগণিত ও অ্যালগরিদমের জনক আবু মুসা আল খোয়ারিজিমি, শল্য চিকিৎসাবিদ্যার জনক ইবনে সিনা, আল কেমিগন যেখান থেকে রসায়নশাস্ত্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল? উত্তর অবশ্যই ইসলামি খিলাফতের সময়ে। আজকে মুসলিমদের নৈতিক অধপতনের কথা বলি অথচ কখন নৈতিকতার সর্বশ্রেষ্ঠ নজির স্থাপন করার কারণে গোয়ালিনীর মেয়ে হয়ে গিয়েছিল প্রতাপশালী খলিফার পুত্রবধূ? কখন জীনা করার পর মুসলিম নারী এসে রাসূলুল্লাহ’র কাছে রজমের শাস্তি প্রার্থনা করেছে? এসবই ঘটেছে ইসলামী খিলাফতের সময়ে। উপরের আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, আজকে যদি আবার ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা পূণরায় ফেরত আসে তবেই মুসলিম উম্মাহ পৃথিবীব্যাপী ইসলাম ছড়িয়ে দেয়ার ভিশন থেকে জ্ঞান বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হবে, এর জন্য স্থাপিত হবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিদ্যাপীঠসমূহ। আর রাষ্ট্র ছাড়া ব্যক্তিবিশেষকে সম্ভব হলেও উম্মাহকে সামগ্রিকভাবে কালচার করা যাবে না যাতে তার নৈতিক উৎকর্ষতা ঘটে এবং ধর্মীয় আচার পালনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। কারণ রাষ্ট্রের রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, মিডিয়া এবং অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোসমূহ। একারণে পূর্ণজাগরণের জন্য মুসলিম উম্মাহ’র অন্য কোন ক্ষেত্রে প্রচেষ্ঠা বিনিয়োগ না করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশী মনোযোগ নিবদ্ধ করা উচিত।

    তবে অনেকে এ যুক্তি দেখান যে, খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যই নৈতিকভাবে উন্নত, ইসলামিক আচারাদিতে অভ্যস্ত মুসলিম বেশী করে তৈরি করা উচিত। প্রথমত: যারা এরকম কথা বলেন তারা ব্যক্তিমানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করেন। কিন্তু মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের রীতি নীতি ব্যক্তি মানুষকে প্রভাবিত করে এবং সহজ বলে ব্যক্তিমাত্রই সমাজের প্রচলিত নিয়ম কানুনের অনুগামী হয়। সেকারণে অধপতিত ও দূর্নীতিগ্রস্ত সমাজের প্রচলিত রীতি নীতি, চিন্তা, ধারণার বিপরীতে এসে অধিকাংশ মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করা বাস্তবসম্মত কোন চিন্তা নয় এবং এটি পৃথিবীর কোন সমাজে কোনকালেই সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়ত: উন্নত নৈতিক চরিত্র দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা)। তাঁর নীতি নৈতিকতার বিষয়ে সর্বাধিক জানা ছিল মক্কার লোকদের। একারণে তারা তাকে ‘আল আমীন’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। নিজেদের আমানত পর্যন্ত গচ্ছিত রাখলেও নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা ও পূর্ব পুরুষের ধ্যান ধারণার মূলে আঘাত করার অপরাধে মুহাম্মদ (সা) কে হত্যা করার মত ন্যাক্কারজনক কাজ করতে তারা পিছপা হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সম্মানিত সাহাবীগনও নৈতিকতার দিক দিয়ে মক্কার লোকদের কাছে অনুকরণীয় ছিল। কিন্তু তাদের কাউকে কাউকে তারা হত্যা করেছে, কারও সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, কারও উপর চালিয়েছে পাশবিক নির্যাতন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবী (রা) কে ইসলাম পালন ও নিরাপত্তার জন্য মক্কা পরিত্যাগ করে মদীনার হিজরত করতে হয়েছে। উন্নত নৈতিকতার মাধ্যমে মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বরং মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে মক্কাকে খিলাফতের অধীনে আনতে হয়েছে।

    রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সেকারণে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি রাজনৈতিক। রাসূলুল্লাহ (সা) বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে মদীনাতে ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফত কায়েম করেছিলেন। এক্ষেত্রে নীতি নৈতিকতার বিকাশ বা ইসলামী ব্যক্তিগত আচারাদি কোন ভূমিকা পালন করেনি। একজন মুসলিম যখন ইসলামকে সামগ্রিকভাবে তার জীবনে গ্রহণ করবে তখন সে এমনিতেই নৈতিকভাবে উন্নত ও ব্যক্তিগত ইসলামিক আচারাদিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বা খিলাফত উম্মাহ’র জন্য সামগ্রিকভাবে ইসলাম পালনকে সহজতর করে বা অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। সেকারণে মুসলিমগনকে আজকে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করে উম্মাহ’র নীত নৈতিকতা বা আমল বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা না করে ইসলামিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা উচিত।

    মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যে যেসব সমস্যা আমরা আজকে দেখতে পাই সেগুলো হয় কোন প্রধান সমস্যার শাখা সমস্যা অথবা উপসর্গ মাত্র। মুসলিম উম্মাহ’র প্রধান সমস্যা হল খিলাফত রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি। সেকারণে মুসলিমগণ আজকে নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত শরণার্থী, তার বিশাল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ এবং জনবল থাকা সত্তে¡ও সে দরিদ্র, ১৫০ কোটির মত বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা এবং পৌনে এক কোটির মত মুসলিম সেনাবাহিনী থাকা সত্তে¡ও তারা হত্যা, নির্যাতন ও লুটপাটের শিকার। খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা মুসলিম ভূমিসমূহকে একত্রিত করবে, মুসলিমদের সম্পদগুলোকে একত্রিত করে এগুলোকে তাদের কল্যাণে ব্যয় করবে, সামরিক বাহিনী সমূহকে একত্রিত করে উপনিবেশিক কাফের দখলদার শক্তিসমূহকে সমুচিত জবাব দেবে ও মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং সর্বোপরি বিশে^র বুকে একটি নেৃতত্বশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে ইনশাআল্লাহ।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

    “নিশ্চয় ইমাম/খলিফা হচ্ছেন ঢালস্বরূপ,যার পেছনে থেকে যুদ্ধ করা হয়এবং আত্মরক্ষা করা হয় “…।