Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির একপথ খিলাফত

    বেকারত্বের করাল গ্রাস থেকে মুক্তির একপথ খিলাফত

    ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে একটি অভিবাসনপ্রত্যাশী দলের অন্তত ৬০ জন মারা গেছেন। নৌকার আরোহীদের মধ্যে ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন। (১) উচ্চ শিক্ষিত ছাত্রদের সবচেয়ে কাম্য ৪০ তম বিসিএস পরীক্ষায় অনুষ্টিত হল মে মাসে। তাতে মাত্র ১৯০৩টি চাকরীর বিপরীতে আবেদন পড়েছে ৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩২ টি।(২) এই পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় ৪ লাখ ১০ হাজার বেকারের কোন গতি হবেনা। সাথে কোটা নামের বৈষম্যতো আছেই। বেকার যুবকরা সরকারী চাকরীতে প্রবেশের সীমা ৩৫ করার দাবী করছেন। বাংলাদেশে বর্তমানে বেকার ৩কোটি। শুভংকরের ফাকি বাদ দিলে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা ৬ কোটির উপর। অর্থাৎ দেশের মোট কর্মক্ষম জনগোষ্টির ৩৯.৪০শতাংশ বেকার। প্রতি বছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে ২২ লাখ যাদের মধ্যে কাজ পায় মাত্র ৭ লাখ।(৩)

    যে কোন দেশের কর্মসংস্থান নির্ভর করে তাঁর উৎপাদন বা ম্যানুকচারিং উপর।

    বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সমুহ ও বাস্তবতা:

    অর্থনীতি যে সকল খাতের অবদান যত তাঁর উপর নির্ভর করে মোট কর্মসংস্থান তৈরীর সুযোগ।

    বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় আয়ে সেবা খাতের অবদান ৫৬, শিল্পের ৩০ দশমিক ১৭ ও কৃষি খাতের ১৩ দশমিক ৮২ শতাংশ। (৪)

    সেবা খাত: সেবাখাত মূলত সেবা প্রদান করে থাকে, কিন্তু কোনো কিছু উৎপাদন করে না । খুচরা বিক্রয়, ব্যাংক, বিমা, হোটেল, রিয়েল স্টেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কম্পিউটার সেবা, বিনোদন, প্রচার মাধ্যম, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ ইত্যাদি কাজ সেবাখাতের অন্তর্ভুক্ত।

    বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি জুলুমের খাত এটি। এ খাতকে আমরা অধিকারের খাত বললে যথোপযুক্ত হয়।এগুলো পেতেআমাদের উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হয় তাছাড়া উৎপাদনের সাথে জড়িত না হওয়ার কারনে কর্মসংস্থান খুবই সীমিত।তাছাড়া সেবা খাতে বেসরকারী চাকরীর বেশিরভাগ উচ্চপদস্থ চাকরীগুলো ভারতীয়দের দখলে। সরকারের দুর্নীতির ডিজিটাল দাবির ফানুস এই সেবা খাতকে কেন্দ্র করে যা পদ্মা সেতু থেকে স্যাটালাইট পর্যন্ত হলেও ফাকা বেলুন ছাড়া কিছুই নয়। সেবা খাত যতই ডিজিটাল হোকনা কেন তা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে না এবং বেকারত্বও দূর হয়না ।

    শিল্প খাত: এ দেশে শিল্প মুলত তৈরি পোশক ও টেক্সটাইলের উপর দাঁড়িয়ে আছেঅন্যদিকে শিল্প বিষয়ক আমদানি রপ্তানি চিত্র দেখলে বুঝা যায় গার্মেন্টস সেক্টরে সব কিছুই আমদানি করে, শুধুমাত্র কাট এন্ড মেইক ভিক্তিতে পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য তৈরি করা হয়। অর্থাৎ এখাতের সাপোরটিভ যে শিল্প থাকা দরকার তাও গড়ে উঠেনি।

    সাড়ে ২২ লাখ মহিলা এ খাতে চাকরিরত। অর্থাৎ দেশের বেশিরভাগ ম্যনুফেকচারিং বা উৎপাদন শিক্ষা বঞ্চিত আমাদের মা বোনরাই করে থাকেন। অল্প বেতনের কারণে তাঁদের ১০জনে ৯ জনই ৩ বেলা খেতে পারেন না, ৮৭ শতাংশ পোশাক শ্রমিক ঋণগ্রস্থ।তাঁদের বেশির ভাগই বিরতি হীন কাজ করার কারণে পিঠব্যাথা,মেরুদন্ড ব্যাথা মূত্রনালী সমস্যা ও অপুষ্টিতে আক্রান্ত। (৫)

    আর অন্যান্য শিল্পের মধ্যে পাট,চিনি মৃত প্রায়। কাগজ, জাহাজ, কেমিকেল সহ শিল্পগুলো সরকারী পলিসি গত কারণে বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ নেই । সরকারের নতজানু নীতির কারণে ২০০২ সালে বিশ্বব্যংক পাট শিল্পকে ধংস করে দেয়, ফলে বেকার হয়ে পড়ে এ শিল্পের সাথে জড়িত সবাই । এখন আমরা আমাদের সোনালী কাঁচা পাট ভারতে রপ্তানী করে ওদের শিল্প উন্নয়ন ঘটাচ্ছি । কর্ম সংস্থান অনেক দুরের বিষয়।

    কৃষি খাত: বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে কৃষি।২০১৮ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্যমতে, এটি মোট শ্রমশক্তির ৪০.৬ ভাগ যোগান দিয়ে থাকে খাদ্যশস্যের উৎপাদন মূলত এই খাতটি হতে আসে । (৬)

    জমির লিজ, বীজ সংগ্রহ, কীটনাশক, ইউরিয়া পটাশ, মজুরী এসব খরচের পর কৃষকরা লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করেন। দেশে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন চাল উদ্বৃত্ত থাকার পরও গত দুই বছরে ৬০ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়। চাল সস্তা হয়ে পড়ায় বিপদে পড়ছে কৃষক, তারা উৎপাদন খরচও তুলে আনতে পারছেন না। ফলে চাল উৎপাদনে নিরুসাহিত হচ্ছে কৃষক। ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে অনেকেই বেকার হয়ে পড়ছে। কৃষির সাথে জড়িত অন্যান্য সেক্টরগুলোর অবস্থাও একই ।

    প্রবাসে কর্মসংস্থান: ৭৫ লাখ বাংলাদেশি মোট প্রবাসে কর্মরত আছেন। যাদের মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজার মহিলা।

    প্রতিবছর ৩ হাজার লাশ হয়ে দেশে আসেন। বাংলাদেশে অভিবাসন খরচ পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশের তুলনায় বেশি, সুদে ঋণ করে, ঘরবাড়ী বিক্রি করে বেশির ভাগ লোক প্রবাসে যান, ঋণ টানতে টানতে এসব টকবগে ত্রুণের জীবন শেষ। প্রবাসে মহিলা নির্যাতন ও শ্রমিকের রক্তঝরা রেমিটেন্সের বেশির ভাগই আমদানির খরচ মিটাতে চলে যায়। তার উপর শাসক শ্রেণীর দুর্নীতিতো আছেই। ফলতঃ এই রেমিটেন্স উৎপাদন খাতে কোন কাজে আসছেনা।

    কর্ম সংস্থানের অভাবে যা ঘটছে: শিক্ষিত ও শিক্ষা বঞ্চিত দেশে বর্তমানে ৬ কোটি তরুণের ১.৫ কোটি মাদকাসক্ত। (৭) বঙোপসাগর, ভুমধ্যসাগর বিপদজনক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অনেকে কর্মসংস্থানের চেষ্টা করছেন, যাদের অনেকেই সমুদ্রে ডুবে মারা যাচ্ছেন। দেশে প্রতি বছর ১১ হাজারে অধিক আত্মহত্যা করে, যার অন্যতম কারণ বেকারত্ব। (৮) শিক্ষিত যুবকরা চাকরী না পেয়ে হতাশায় ডুবে আছেন। মাথা নিচু করে উবার, পাটাও বা ফুডপান্ডার বোঝা বহণ করে বেঁচে থাকতে চাইছেন কিছু হতাশাগ্রস্থ বেকার যুবক।

    পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ ও গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিই সমস্যার মূল কারণ:

    আমেরিকা তথা পশ্চিমারাই পুঁজিবাদী জীবনাদর্শ মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে কলোনী স্থাপনের মাধ্যমে শোষণ করে । তাই তারা রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে কিছু এজেন্টদের গণতন্ত্রের মুখ রুপে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। প্রভুদের পলিসি বাস্তবায়ন করাই এই সব বিশ্বাসঘাতক শাসকদের একমাত্র কাজ। এক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রে কি কি উৎপাদন হবে আর কোন জায়গাগুলো ব্লক থাকবে তা প্রভুরা যা নির্ধারণ করে তাই তারা বাস্তবায়ন করে। এসব শাসক এজেন্টদের সহযোগিতায় পুঁজিবাদী রাষ্ট্র গুলো সরাসরি বা বিশ্বব্যাংক/আইএমএফ এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো অর্জনে বাধা প্রদান করে পাশাপাশি উৎপাদন খাতকে ধংস করে আমদানি নির্ভর করে তোলে। স্বাভাবিক ভাবে আমদানি নির্ভর এ অর্থনীতিতে লোকাল ক্ষুদ্র কিছু পুজিপতি গোষ্ঠী জন্মায়। তাদের কাজ পুজি পুঞ্জিভূত করে পাচার করা। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের যেমন তাদের নিয়ে পরিকল্পনা থাকেনা, তাদেরও রাষ্ট্রের শিল্পায়ন ও উৎপাদনে খুব একটা ভূমিকা থাকেনা। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়না।

    সর্বোপরি একটি রাষ্ট্র আদর্শিক না হলে তার কোন ভিশন থাকেনা। সে কেন জনগণকে শিক্ষিত করবে? কিভাবে শিক্ষিত করবে? তাদের কোথায় কোথায় কাজে লাগাবে? সম্পদের ব্যবহার কিভাবে করবে? সে কি উৎপাদন করবে? কেন করবে? তাঁর কোন পরিকল্পনা থাকেনা। পর্যাপ্ত খনিজ ও অন্যান্য সম্পদ থাক ষত্বেও তারুণ্যের শক্তি তার কাছে বোঝা স্বরুপ।

    সমাধান কোথায়? সম্মানের সাথে আমরা নিতে প্রস্তুত কিনা?

    শিল্প খাত: ইসলাম বাস্তবায়ন করা ও সমগ্র বিশ্ব ছড়িয়ে দেওয়ার অভিন্ন লক্ষ্য ও রাজনৈতিক আকাংখা নিয়ে খিলাফত রাষ্ট্র সব পরিকল্লনা সাজাবে। মুসলিম উম্মাহকে একটি নির্দিষ্ট ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ ও ইসলামের ভুখন্ড গুলো একত্রিত করবে। নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষা ও শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করতে সামরিক বাহিনীর কোন বিকল্প নেই। সামরিক দিক দিয়ে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করতে মিলিটারী শিল্প গড়ে তোলা হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    “এবং আমি সৃষ্টি করেছি লোহা, যাতে রয়েছে বিপুল শক্তি এবং সেই সাথে মানব জাতির জন্য নানা উপকার”। (সুরা হাদিদ: ২৫)

    স্বাভাবিকভাবেই খিলাফতকে দ্রুত প্রযুক্তিগত উন্নয়নের দিকে ধাবিত করবে। প্রয়োজন হবে ব্যাপক শিল্পায়ন ও সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান। যখন খিলাফত প্রতিষ্ঠিত ছিল মুসলিমদের রাজনৈতিক এই আক্ষাংকাই শিল্পায়নকে এগিয়ে নিয়েছিল। ইউরোপের বুকে ইসলামকে বিজয় করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকেই মুসলিমরা ভুমধ্যসাগরে জাহাজ শিল্প নির্মাণ করেছিল যা পরবর্তীতে ১৭ শতক পর্যন্ত ভুমধ্যসাগরে উসমানীয় খিলাফতের অধীনে মুসলিম নোবাহিনীর কতৃত্বে ছিল।

    খিলাফত মুসলিমদের অন্যন্য ভুমি গুলো একত্রিত করার কারণে ভারী শিল্পের উপাদান ও সম্পদ সহজে যোগান দিতে পারবে। তাছাড়া পঞ্চ বার্ষিকী বা এই ধরনের অল্প সময়ের মধ্যে পরিকল্পত সামরিক কেন্দ্রিক ভারী শিল্প গড়ে উঠবে। যেমন: ১৯২৮-১৯৩২ সালের মধ্যে সোভিয়েত রাশিয়া কৃষি নির্ভর শিল্পকে ভারী শিল্পে রূপান্তরিত করেছিল।

    খিলাফতের অর্থনীতি হবে প্রতিরক্ষা শিল্প কেন্দ্রিক অর্থনীতি। উন্নত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা,তার ক্রমাগত প্রবৃদ্ধি ও আধুনিকায়নই হবে উন্নয়নের মুল চালিকা শক্তি। এধরনের অর্থনীতি যে শুধুমাত্র কর্মসংস্থান ও সম্পদ সৃষ্টি করবে তা নয় বরং বৈরি আগ্রাসী পরাশক্তিগুলো থেকেও খিলাফতকে রক্ষা করবে। পাশাপাশি সহায়ক শিল্প (support industry) যেমন-স্টিল, লোহা, কয়লা, যানবাহন নির্মাণ, খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করণ ইত্যাদি শিল্প গড়ে তোলা হবে। যা সম্পূর্ণরুপে উৎপাদন নির্ভর ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।(৯)

    ভারী শিল্পের সহায়ক শিল্পেকে উন্নত করতে একটি ফোরাম গড়ে তোলা হবে যা শুধুমাত্র শিল্পপতিদের নিয়ে কাজ করবে যারা শিল্প খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে প্রয়োজনে খিলাফত তাদের বিশেষ প্রনোদনা দেবে । যার ফলে প্রচুর কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। (১০)

    ১৯৫২ সালে জাপানী মার্কিন দখলদারীত্বের অবসান ঘটলে এই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

    কৃষি খাত: একটি টেকসই শিল্পায়নের ভিত্তি হল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। উর্বর ভুমি ও কৃষকের পরিশ্রমের কারণে সরকারি কোন সাহায্য না থাকার পরও আমরা ইতোমধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত কল্পে এই খাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরো দক্ষ করে গড়ে তোলা হবে। কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাত করণ শিল্প গড়ে তোলা হবে ফলে এ খাতে আরো কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি হবে।

    সেবা খাত: ভারী শিল্প গড়ে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই সেবা খাতের পরিধির ব্যাপকতা বড় হয়ে উঠবে।সেবার যে বিষয় গুলো অধিকারের সাথে সম্পর্কিত তা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য রিয়েল স্টেট, কম্পিউটার সেবা, প্রচার মাধ্যম, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ সহ নাগরিক অধিকার সমুহের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করণ, ও সার্বিক তদারকি ও বাস্তবায়নে প্রচুর কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন-

    ”তোমরাই সর্বোত্তম উম্মত, মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে, তোমরা সৎ কাজে আদেশ করবে ও অসৎ কাজে নিষেধ করবে…….” (আলে ইমরান: ১১০)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কর্মসংস্থানের অভাবে মাথা অবনত করে থাকার জন্য নয়। বেকারত্ব, দারিদ্রতা, বৈষম্য দূর করে একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই আমাদের নেতৃত্বশীল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে। খিলাফত এমন একটি রাষ্ট্র যার মাধ্যমে অভ্যন্তরীন সমস্যার সমাধান করে মুসলিমরা ১৩শত বছর ধরে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছেন। রাসূল (সা)-এর পর খুলাফা আর-রাশিদুন থেকে উসমানীয় খিলাফত পর্যন্ত যার সুদীর্ঘ ব্যপ্তি। আমরা সম্মানিত হতে চাইলে অবশ্যই খিলাফত রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে আনতে কাজ করতে হবে। হতাশায় না ডুবে, বালির বাঁধে আটকে থাকা এই পুঁজিবাদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আপনার মাথা তুলে দাড়ানোর সাথে সাথে ধ্বসে পড়বে ইন শা আল্লাহ।

    রাসুল (সা) বলেছেন-

    “ইমাম (খলীফা) জনগণের উপর দায়িত্বশীল এবং তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সহীহ বুখারি)

    খিলাফত রাষ্ট্রের প্রতিনিধি খলিফা উম্মাহ্র সেবক হিসেবে জনগনের সেবা করবে । কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে উম্মাহর সকল দ্বায়িত্ব নিবেন এবং একটি নেতৃত্বশীল জাতিতে পরিণত করবেন। উন্নত জীবনের সন্ধানে ভুমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুবরণ না করে এই জাতির তরুণেরা তখন ইসলামের বিখ্যাত সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের মতো ভুমধ্যসাগরে ইউরোপ জয় করার মতো অভিযান পরিচালনা করবেন।

    চলুন হে ভাইয়েরা, আমরা খিলাফতের এই ফরজ দ্বায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতে নিজেকে সম্মানিত করি।

    আল্লাহ সুবাহানুতালা বলেন-

    ”হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সেই আহবানে সাড়া দাও যা তোমাদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার করে।” (সুরা আনফাল: ২৪)

    সুত্র:

    ১- প্রথম আলো ১৮মে ২০১৯,

    ২- প্রথম আলো ৩ মে ২০১৯,

    ৩- ইনকিলাব ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

    ৪- বণিকবার্তা , সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৮,

    ৫-প্রথম আলো ১মে,২০১৯,

    ৬-উইকিপিড়িয়া।

    ৭- http://www.banglatribune.com/others/news/73343/‘দেশে-মাদক-ব্যবসায়ী-৩০-লাখ

    ৮- https://bangla.dhakatribune.com/bangladesh/2019/01/20/6830/%27দেশে-প্রতিবছর-১১-হাজার-আত্মহত্যা%27

    ৯- ইসলামি খিলাফত সরকারের শিল্পায়ন মডেল।

  • রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

    এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন। 

    “হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩) 

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ

    রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি? 

    আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত। 

    এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

    আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    “আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।

    মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। 

    ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন: 

    “আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩) 

    وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ

    “আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ

    “যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮) 

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ

      “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)

    حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ

    আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।

  • রমযান: কুর‘আন -এর মাস

    রমযান: কুর‘আন -এর মাস

    আবারও আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) আমাদেরকে এই বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ কুর‘আন আল-কারীম-এর মাসে ইবাদত করার সুযোগ দান করেছেন। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

    নিশ্চয়ই আমি নাযিল করেছি এই কুর‘আন মহিমান্বিত রাত্রিতে।” (সূরা ক্বদর: ১)

    আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) পক্ষ থেকে এই উম্মাহ্’র জন্য রহমত হিসেবে বহু কিছু প্রদান করা হয়েছে, যেগুলোর কারনে আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত; বিশেষভাবে কুর‘আনের মাধ্যমে আমাদের প্রতি রহমত বর্ষনের জন্য আমরা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) অশেষ শুকরিয়া আদায় করি। কুর‘আন কেবল হৃদয় ও মনকে প্রশান্তি দেয় না, বরং এটি আমাদের জীবনের জন্য দিক-নির্দেশনা প্রদান করে। পৃথিবীতে আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য নবীদের (আ.) মহাকাব্যিক কাহিনী এবং তাদের সংগ্রাম সকল মুসলিমের জন্য আদর্শ। যেহেতু এই মাসে আমাদের কুর‘আন শোনা ও পড়ার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, সেহেতু এই কিতাবের অন্তর্গত শক্তিশালী বক্তব্য সম্পর্কে আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত। এটি এমন একটি গ্রন্থ যেটি নাযিল হওয়ার পর মক্কার কাফির কুরাইশ শাসকদের সাথে সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মুহাম্মাদ (সা.) এবং তার অনুসারীদের মধ্যে সংগ্রাম শুরু হয়। অবাধ্যতার শাস্তি সম্পর্কে মানবজাতিকে অবহিত করে আল্লাহ্ আজ্জা ওয়া জাল আমাদের প্রতি যে সতর্কবাণী প্রেরণ করেছেন তা প্রতিবার কুর‘আন তেলাওয়াতের সময় স্মরণ করা উচিত। সত্যিকার অর্থেই আমাদের জীবন শূণ্য ও অর্থহীন, যদি না আমরা কুর‘আনকে আমাদের নিকটবর্তী রাখি এবং কুর‘আনের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করি। এমনকি সমগ্র সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে যদি না আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কুর‘আন বাস্তবায়ন করতে পারি। আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে কিভাবে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) আল-কুর‘আনে সমাজ পরিচালনা বিষয়টি উল্লেখ করেছেন:

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

    আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিধান দেয় না তারাই কাফির।” (সূরা মায়িদাহ্: ৪৪)

    অতএব, কুর‘আন হলো এমন একটি কিতাব যা আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রমযান মাসে মানবজাতির জন্য সামগ্রিক পথ-নির্দেশ হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যাতে এর মাধ্যমে আমরা আমাদের জীবন পরিচালনা করতে পারি এবং কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভিত্তি হিসেবে এটিকে ব্যবহার করতে পারি। তাই আমাদের জীবনে একটি সক্রিয় সহচর হিসেবে কুর‘আনের ভূমিকা থাকা উচিত। এই রমযান শেষে পুনরায় পরের বছর খোলার উদ্দেশ্যে কুর‘আন তুলে রাখা উচিত নয়, বরং ঘরে নিয়মিতভাবে আমাদের এটি পড়া উচিত। কুর‘আনের প্রত্যেকটি আয়াতে কি ব্যাখ্যা রয়েছে তা বোঝার জন্য আমাদের সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করা উচিত এবং জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে কুর‘আনের শিক্ষা প্রয়োগের সংকল্প করা উচিত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

    তবে কি তারা কুর‘আন সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করে না, নাকি তাদের অন্তরের উপর তালা লাগানো রয়েছে।” (সূরা মুহাম্মাদ: ২৪)

    কুর‘আন মানবজাতির জন্য একটি পথ-নির্দেশ যা মিথ্যা থেকে সত্যকে পৃথক করে। এটি মানবজাতির জন্য শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি, সামাজিক বিষয় হতে শুরু করে ব্যক্তিগত ইবাদত পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে একটি পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করে দিয়েছে। এই রমযান মাসে যখন আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে সূরা পড়ি তখন কি আমরা সত্যিই এই কুর‘আনকে বুঝি এবং অনুশীলন করার বিষয়ে চিন্তা করি? আয়েশা (রা.) রাসূলুল্লাহ্‘র (সা.) চরিত্রকে চলন্ত কুর‘আন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি কুর‘আনের বার্তা প্রতিফলিত হয়? আমরা কি আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়ন করি? নাকি আমরা অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজের সাথে সম্পর্কিত অধিকাংশ হুকুম উপেক্ষা করে কেবলমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদতের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করি? আমরা কি সত্যিই আমাদের কাঁধে কুর‘আনের গুরুভার অনুভব করি? আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    لَوْ أَنزَلْنَا هَذَا الْقُرْآنَ عَلَى جَبَلٍ لَّرَأَيْتَهُ خَاشِعًا مُّتَصَدِّعًا مِّنْ خَشْيَةِ اللَّهِ وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

    আমি যদি এ কুরআন পাহাড়ের উপর নাযিল করতাম তাহলে তুমি তাকে দেখতে আল্লাহ্’র ভয়ে বিনীত ও ভীত হয়ে গেছে। মানুষের জন্য আমি এসব দৃষ্টান্ত এজন্য বর্ণনা করি যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা হাশর: ২১)

    অতএব, আমাদের কাঁধে এই কুর‘আনের যে গুরুভার রয়েছে তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করুন, এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে – মসজিদে বা স্কুলে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে যেখানেই থাকুন না কেন, কিংবা একটি বাড়ি কিনুন বা একটি গাড়ি বিক্রি করুন না কেন, অথবা ব্যক্তিগত ইবাদতে মশগুল হন বা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদান করেন না কেন – কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়াই সবসময় আল্লাহ্র আনুগত্য করার জন্য কুর‘আনকে ব্যবহার করুন। সংক্ষেপে বলা যায় যে ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবন, তথা জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের কেবল ইসলামকে অনুসরণ করা উচিত।

    আসুন আমরা কুর‘আন-এর মাধ্যমে ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর এই সুবর্ণ সুযোগটিকে কাজে লাগাই। ইসলাম সম্পর্কে আমরা যত বেশি সচেতন হব ততই এর ভিত্তিতে আমাদের জীবন পরিচালনা করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء

    আল্লাহ্‘র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)

    আপনাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) প্রত্যেক রাতে ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-এর সাথে কুর‘আন অধ্যয়ন করতেন। আল-বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ্ (সা.) রমযানে সবচেয়ে বেশি উদার ছিলেন, যখন তিনি ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং তাঁর সাথে কুর‘আন পড়তেন। ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) রমযানে প্রতি রাতে কুর‘আন শিক্ষা দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন”।

    আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুর‘আনের আয়াতের অর্থ অধ্যয়ন করে জ্ঞান অর্জন করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা.) এবং তার সাহাবীদের (রা.) জীবন সম্পর্কে পড়ি: কিভাবে তারা জীবন কাটিয়েছিলেন? কিভাবে তারা এই পৃথিবীতে আল্লাহ্’র বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? আসুন আমরা ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ, কৃষি বা অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে পড়াশোনা করি। আসুন আমরা দেখি যে ইসলাম পুরুষ ও নারী, পরিবার ও শিশুদের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কি বলে? আসুন আমরা সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে ইসলামের হুকুমসমূহ খুঁজে বের করি। মনে রাখবেন, ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এবং এই পবিত্র মাসে আসুন আমরা আমাদের অজানা ইসলামের কিছু অংশ হলেও জানার আন্তরিক চেষ্টা করি।

  • অধপতিত মুসলিম উম্মাহ’র পূর্ণজাগরণ কোন পথে?

    অধপতিত মুসলিম উম্মাহ’র পূর্ণজাগরণ কোন পথে?

    আল্লাহ বলেন,

    “তোমরাই (মুসলিমগণ) সর্বোত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের জন্য উত্থান ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং অসৎ কাজে নিষেধ করবে।” (সূরা আল ইমরান: ১১০)

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম উম্মাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় কেউই মুসলিম উম্মাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি বলতে পারবে না। মুসলিমগণ এখন অধপতিত। এটি সবাই বুঝতে পারছে। বিশ্ব নেতৃত্বে মুসলিম উম্মাহ নেই। ইউরোপ আমেরিকার হাতে আজকে বিশ্ব নেতৃত্ব। মুসলিম উম্মাহ নির্যাতিত, নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত শরণার্থী, নৈতিকভাবে অধপতিত, জ্ঞান বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত যদিও মুসলিম ভূমিসমূহ তেল, গ্যাস, কয়লাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ।

    কিন্তু কেন মুসলিম উম্মাহ আজকে অধপতিত?

    এ ব্যাপারে নানা মুনীর রয়েছে নানা মত। মুসলিম চিন্তক, ইসলামিক বিশেষজ্ঞগনের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। কেউ মনে করছেন মুসলিম উম্মাহ অধপতিত কেননা তাদের নৈতিক পদস্খলন ব্যাপক। কেউ মনে করছেন মুসলিম উম্মাহ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, ইংরেজীতে দূর্বল, শিক্ষার হার কম, জনসংখ্যার ভারে ভারাক্রান্ত, প্রবল জাতিগত বিভেদ, ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচারাদিতে অনুৎসাহ, ইউরোপ আমেরিকার মত সঠিক অর্থনৈতিক নীতির অভাব ইত্যাদি। সব প্রস্তাবনাগুলো একটু খতিয়ে দেখা দরকার। যদি জনসংখ্যার আধিক্য কোন সমস্যা হত তাহলে সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা নিয়ে চীন কী করে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হল, ভারত কী করে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হল? ইংরেজী শিক্ষায় চীন, জাপান ও কোরিয়ানদের অনাগ্রহের কথা সবাই জানে। তথাপিও এ তিনটি দেশ শিল্পক্ষেত্রে ও অর্থনীতিতে প্রথম সারিতে। শ্রীলংকার স্বাক্ষরতার হার প্রায় একশভাগ হওয়া সত্ত্বেও এটি ইউরোপ, আমেরিকার মত নেতৃত্বশীল জাতিতে পরিণত হতে পারেনি। মদীনার লোকেরা এখনও নৈতিকভাবে শ্রেষ্ঠ ও কোমল প্রকৃতির। কিন্তু তারপরেও তারা খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়ের মত বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নেই। যে কোন দেশের জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন সেসব দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালার উপর নির্ভরশীল। এই প্রগতিশীল নীতিমালা আসে একটি ভিশনারী রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে। আর ভিশন আসে আদর্শ থেকে। মুসলিম দেশসমূহ কি আজকে কোন আদর্শ অনুসরণ করছে? উত্তর হল না। সেকারণে সেসব দেশ জ্ঞান বিজ্ঞানে পশ্চাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র। মধ্যযুগের ইউরোপ, আমেরিকা ছিল দরিদ্র, জাতিগত হানাহানিতে পরিপূর্ণ, পশ্চাপদ। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে ইউরোপের পূর্ণজাগরণ বা রেনেসা ইউরোপের মোড় ঘুরিয়ে দিল। ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে উদ্ভুত পুজিবাদী অর্থনীতির ভিশনের ফলে তাদের শিল্পবিপ্লব ঘটল। শিল্পের কাঁচামাল ও পণ্যের বাজারের জন্য তারা একের পর এক উপনিবেশ স্থাপন করল এবং বিশ্ব নের্তৃত্ব কায়েম করল। অর্থাৎ আগে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে রেনেসা হয়েছিল এবং তার পর জ্ঞান বিজ্ঞানে উন্নতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে। একই কথা ইসলামিক সভ্যতার ক্ষেত্রেও সত্য। মুসলিমগণ কখন এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল যখন আফ্রিকা হয়ে উঠেছিল রুটির ঝুড়ি এবং যাকাত দেয়ার জন্য লোক খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না? কখন মুসলিমগণ ইউরোপের দেশ আয়ারল্যান্ডে দূর্ভিক্ষের সময় ত্রাণ পাঠিয়েছিল অথচ এখন মুসলিমরা নিজেরাই শরণার্থী। অবশ্যই এরকমটি ঘটেছিল ইসলামী খিলাফতের সময়ে। কখন মুসলিমগণ জ্ঞান বিজ্ঞানে বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসনে সমাসীন ছিল? কখন তারা গড়ে তুলেছিল বাগদাদের বায়তুল হিকমাহ, মরক্কোর কারাউয়িন বিশ্ববিদ্যালয়, মিশরের আল আজাহার, স্পেন বা আন্দালুসিয়ার কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত জগত বিখ্যাত প্রাচীন বিদ্যাপীঠ? কখন তৈরি হয়েছিল বীজগণিত ও অ্যালগরিদমের জনক আবু মুসা আল খোয়ারিজিমি, শল্য চিকিৎসাবিদ্যার জনক ইবনে সিনা, আল কেমিগন যেখান থেকে রসায়নশাস্ত্রের গোড়াপত্তন হয়েছিল? উত্তর অবশ্যই ইসলামি খিলাফতের সময়ে। আজকে মুসলিমদের নৈতিক অধপতনের কথা বলি অথচ কখন নৈতিকতার সর্বশ্রেষ্ঠ নজির স্থাপন করার কারণে গোয়ালিনীর মেয়ে হয়ে গিয়েছিল প্রতাপশালী খলিফার পুত্রবধূ? কখন জীনা করার পর মুসলিম নারী এসে রাসূলুল্লাহ’র কাছে রজমের শাস্তি প্রার্থনা করেছে? এসবই ঘটেছে ইসলামী খিলাফতের সময়ে। উপরের আলোচনা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, আজকে যদি আবার ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা পূণরায় ফেরত আসে তবেই মুসলিম উম্মাহ পৃথিবীব্যাপী ইসলাম ছড়িয়ে দেয়ার ভিশন থেকে জ্ঞান বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হবে, এর জন্য স্থাপিত হবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিদ্যাপীঠসমূহ। আর রাষ্ট্র ছাড়া ব্যক্তিবিশেষকে সম্ভব হলেও উম্মাহকে সামগ্রিকভাবে কালচার করা যাবে না যাতে তার নৈতিক উৎকর্ষতা ঘটে এবং ধর্মীয় আচার পালনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যায়। কারণ রাষ্ট্রের রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, মিডিয়া এবং অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও কাঠামোসমূহ। একারণে পূর্ণজাগরণের জন্য মুসলিম উম্মাহ’র অন্য কোন ক্ষেত্রে প্রচেষ্ঠা বিনিয়োগ না করে খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বেশী মনোযোগ নিবদ্ধ করা উচিত।

    তবে অনেকে এ যুক্তি দেখান যে, খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্যই নৈতিকভাবে উন্নত, ইসলামিক আচারাদিতে অভ্যস্ত মুসলিম বেশী করে তৈরি করা উচিত। প্রথমত: যারা এরকম কথা বলেন তারা ব্যক্তিমানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে চিন্তা করেন। কিন্তু মানুষ সামাজিক জীব। সমাজের রীতি নীতি ব্যক্তি মানুষকে প্রভাবিত করে এবং সহজ বলে ব্যক্তিমাত্রই সমাজের প্রচলিত নিয়ম কানুনের অনুগামী হয়। সেকারণে অধপতিত ও দূর্নীতিগ্রস্ত সমাজের প্রচলিত রীতি নীতি, চিন্তা, ধারণার বিপরীতে এসে অধিকাংশ মানুষকে নৈতিকভাবে উন্নত করা বাস্তবসম্মত কোন চিন্তা নয় এবং এটি পৃথিবীর কোন সমাজে কোনকালেই সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয়ত: উন্নত নৈতিক চরিত্র দিয়ে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা)। তাঁর নীতি নৈতিকতার বিষয়ে সর্বাধিক জানা ছিল মক্কার লোকদের। একারণে তারা তাকে ‘আল আমীন’ উপাধিতে ভূষিত করেছিল। নিজেদের আমানত পর্যন্ত গচ্ছিত রাখলেও নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা ও পূর্ব পুরুষের ধ্যান ধারণার মূলে আঘাত করার অপরাধে মুহাম্মদ (সা) কে হত্যা করার মত ন্যাক্কারজনক কাজ করতে তারা পিছপা হয়নি। রাসূলুল্লাহ (সা) এর সম্মানিত সাহাবীগনও নৈতিকতার দিক দিয়ে মক্কার লোকদের কাছে অনুকরণীয় ছিল। কিন্তু তাদের কাউকে কাউকে তারা হত্যা করেছে, কারও সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে, কারও উপর চালিয়েছে পাশবিক নির্যাতন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে, রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবী (রা) কে ইসলাম পালন ও নিরাপত্তার জন্য মক্কা পরিত্যাগ করে মদীনার হিজরত করতে হয়েছে। উন্নত নৈতিকতার মাধ্যমে মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বরং মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে মক্কাকে খিলাফতের অধীনে আনতে হয়েছে।

    রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। সেকারণে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি রাজনৈতিক। রাসূলুল্লাহ (সা) বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে মদীনাতে ইসলামী রাষ্ট্র বা খিলাফত কায়েম করেছিলেন। এক্ষেত্রে নীতি নৈতিকতার বিকাশ বা ইসলামী ব্যক্তিগত আচারাদি কোন ভূমিকা পালন করেনি। একজন মুসলিম যখন ইসলামকে সামগ্রিকভাবে তার জীবনে গ্রহণ করবে তখন সে এমনিতেই নৈতিকভাবে উন্নত ও ব্যক্তিগত ইসলামিক আচারাদিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা বা খিলাফত উম্মাহ’র জন্য সামগ্রিকভাবে ইসলাম পালনকে সহজতর করে বা অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। সেকারণে মুসলিমগনকে আজকে রাসূলুল্লাহ (সা) কে অনুসরণ করে উম্মাহ’র নীত নৈতিকতা বা আমল বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা না করে ইসলামিক বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে খিলাফত প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা উচিত।

    মুসলিম উম্মাহ’র মধ্যে যেসব সমস্যা আমরা আজকে দেখতে পাই সেগুলো হয় কোন প্রধান সমস্যার শাখা সমস্যা অথবা উপসর্গ মাত্র। মুসলিম উম্মাহ’র প্রধান সমস্যা হল খিলাফত রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি। সেকারণে মুসলিমগণ আজকে নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত শরণার্থী, তার বিশাল প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ এবং জনবল থাকা সত্তে¡ও সে দরিদ্র, ১৫০ কোটির মত বিশাল মুসলিম জনসংখ্যা এবং পৌনে এক কোটির মত মুসলিম সেনাবাহিনী থাকা সত্তে¡ও তারা হত্যা, নির্যাতন ও লুটপাটের শিকার। খিলাফত রাষ্ট্রব্যবস্থা মুসলিম ভূমিসমূহকে একত্রিত করবে, মুসলিমদের সম্পদগুলোকে একত্রিত করে এগুলোকে তাদের কল্যাণে ব্যয় করবে, সামরিক বাহিনী সমূহকে একত্রিত করে উপনিবেশিক কাফের দখলদার শক্তিসমূহকে সমুচিত জবাব দেবে ও মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং সর্বোপরি বিশে^র বুকে একটি নেৃতত্বশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে ইনশাআল্লাহ।

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

    “নিশ্চয় ইমাম/খলিফা হচ্ছেন ঢালস্বরূপ,যার পেছনে থেকে যুদ্ধ করা হয়এবং আত্মরক্ষা করা হয় “…। 

  • ইস্তিকামাহ: দ্বীনের পথে অবিচল বা দৃঢ়পদ থাকা

    ইস্তিকামাহ: দ্বীনের পথে অবিচল বা দৃঢ়পদ থাকা

    সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আস-সাকাফী রা বলেন, আমি একবার রাসুল (সা) এর নিকট গিয়ে বললাম, হে আল্লাহ রাসুল আমাকে ইসলাম এর ব্যাপারে এমন কথা বলে দিন যেন সে বিষয়ে আপনি ছাড়া আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে না হয়।তিনি (সা) বললেন, বল, আমি ঈমান আনলাম, তারপর এর ওপর অবিচল (ইস্তিকামাহ) হয়ে যাও। [ মুসনাদ আল-আহমাদ, সহীহ মুসলিম]

    এই হাদিসে রাসুল সা ঈমানের পর সকল বিষয়কে একটি শব্দের দ্বারাই প্রকাশ করেছেন আর তা হল অবিচলতা বা ইস্তিকামাহ। ঈমান আনার পর বিলাল রা তার বুকে পাথরের বোঝা বহন করার পরও বলেছিলেন আহাদ!, এটাই ইস্তিকামাতের দৃষ্টান্ত। তাওহীদের স্বীকারোক্তির পর ইয়াসির পরিবারের উপর মক্কার জালিম শাসকদের নির্যাতনের পরও তাওহীদের উপর অটল থাকা ছিল ইস্তিকামাহ। দীন প্রতিষ্ঠার জন্য সাহাবি ও রাসুল সা এর দীর্ঘ ১৩ বছরের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল ইস্তিকামাহ বা অবিচলতার নিদর্শন।

    তাই ঈমান আনার পর, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর উপর ইস্তিকামাহ থাকা, আল্লাহর আনুগত্যে কোনরকম বিচ্যুতি ছাড়াই দ্বীনের পথ আকড়ে ধরে থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    ইস্তিকামাহর অর্থ

    ইস্তিকামাহ এর শাব্দিক অর্থ ন্যায়পরায়নতা, সততা, বিচ্যুতি ছাড়াই সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকা। قام শব্দমূল থেকে এই শব্দের উৎপত্তি। মুস্তাকিম শব্দটিও একই শব্দমূল থেকে নির্গত, যার অর্থ সোজা বা সরল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা রাসুল সা কে হুকুম করছেন এই বলে,

    فَاسْتَقِمْكَمَاأُمِرْتَوَمَنتَابَمَعَكَوَلَاتَطْغَوْاۚإِنَّهُبِمَاتَعْمَلُونَبَصِيرٌ

    “তুমি (দ্বীনের পথে) দৃঢ়পদ হয়ে সোজা চলতে থাক, যেভাবে তোমাকে আদেশ করা হয়েছে, এবং তোমার সাথে যারা তওবা করেছে (তারাও) এবং সীমালঙ্ঘন করো না। তোমরা যা কিছু করছ, নিশ্চয়ই তিনি তার প্রতি দৃষ্টি রাখেন।” [সুরা হুদ: ১১২] 

    এই আয়াতে ইস্তিকামাহ দিয়ে বোঝানো হয়েছে দৃঢ় বা অবিচলভাবে সোজাপথে চলা বা দাঁড়িয়ে থাকা।যাতে করে দ্বীনের পথ থেকে কোনরুপ বিচ্যুতি না হয়। আর এটি রাসুল সা কে আদেশ দেওয়া হয়েছে, আলাদাভাবে আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে যাতে এর গুরুত্ব মুমিনরা উপলদ্ধি করতে পারে।

    উমার ইবনুল খাত্তাব রা ইস্তিকামাতের ব্যাখ্যায় বলেন,

    الِاسْتِقَامَةُأَنْتَسْتَقِيمَعَلَىالْأَمْرِوَالنَّهْيِ،وَلَاتَرُوغَرَوَغَانَالثَّعْلَبِ

    “ইস্তিকামাহ হচ্ছে আল্লাহর আদেশ নিষেধের উপর দৃঢ় থাকা, শৃগালের মত এদিক ওদিক বিচরন না করা।” [তাফসিরে বাগাবী, ৪/২০৩]

    আলী ইবনে আবু তালিব রা ইস্তিকামাহ শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন,

    ثمأدواالفرائض

    “ফরযসমূহ পালন করা।” [তাফসির আল কুরতুবি ১৫/৩৫৮]

    উসমান রা বলেন,

    ثمأخلصواالعمللله

    “আল্লাহর জন্য নিষ্ঠার (ইখলাস) সাথে কাজ করা।” [ তাফসির আল কুরতুবি ১৫/৩৫৮]

    কাতাদাহ র বলেন,

    استقامواعلىالطاعةلله

    “আল্লাহর আনুগত্যে অবিচল থাকা।” [ তাফসির আল কুরতুবি ১৫/৩৫৮]

    হাসান বসরী রহ বলেন,

    استقامواعلىأمراللهفعملوابطاعتهواجتنبوامعصيته

    “আল্লাহর আদেশের উপর অবিচল থাকা, তার আনুগত্যে কাজ করা এবং তার অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা।” [তাফসির আল কুরতুবি ১৫/৩৫৮]

    মুজাহিদ ও ইকরিমাহ রহ বলেন,

    استقامواعلىشهادةأنلاإلٰهإلااللهحتىماتوا

    “শাহাদাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর উপর মৃত্যু পর্যন্ত অবিচল থাকা।” [তাফসির আল কুরতুবি ১৫/৩৫৮]

    লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর স্বীকারোক্তি মানেই মৃত্যু পর্যন্ত এর দাবি পূরন করার দায়িত্ব কাধে নেওয়া। ফরয বিষয়গুলো মৃত্যু পর্যন্ত পালন করা। রাসুলের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। রাসুলের সুন্নাহ অনুযায়ী খিলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অবিরাম কাজ করে যাওয়া। মৃত্যু পর্যন্ত সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করার দায়িত্ব পালন করা। প্রকাশ্যে এবং গোপনে হারাম কাজ করার সুযোগ থাকা সত্তেও তা থেকে দূরে থাকা। তা না হলে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ইসলামের উপর অবিচল থাকার যে আদেশ দিয়েছেন তা লঙ্ঘিত হবে।

    দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত থাকার ফলে সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে, পারিবারিকভাবে নানা ধরনের অত্যাচার, নিপীড়ন ও পীড়াদায়ক কথার মুখোমুখি হতে হবে।

    দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ক্লান্তি, চলার পথে অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রনা আমাদের পা দুটিকে টলিয়ে দিতে পারে। শয়তান তখন তার কুটচালে আমাদের দ্বীন প্রতিষ্ঠা থেকে ও ক্রমাগত আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার উপলক্ষ্য পায়। আমাদের সিরাতুল মুস্তাকিমে চলার গতি মন্থর হয়ে যায়। লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে নববী পদ্ধতিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি এক পর্যায়ে তা অবাস্তব, অকার্যকর মনে হয়। অবিরাম কাজ করে যাওয়ার পর কোন দৃশ্যমান বস্তুগত ফলাফল না দেখায় আমরা হতাশ হয়ে পড়ি।

    كَتَبَاللَّهُلَأَغْلِبَنَّأَنَاوَرُسُلِيۚإِنَّاللَّهَقَوِيٌّعَزِيزٌ٥٨:٢١

    আল্লাহ লিখে দিয়েছেন, আমি এবং আমার রসূলগণ অবশ্যই বিজয়ী হব। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিধর, পরাক্রমশালী। [মুজাদিলা: ২১] 

    তাই শুধুমাত্র পেশিশক্তি ও শারীরিক সামর্থ্য দ্বারা এই পরিস্থিতির মুকাবিলা করা সম্ভব নয়। বরঞ্চ এর জন্য প্রয়োজন অবিচল নিষ্ঠা, সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলার জন্য দৃঢ় মানসিক শক্তি যাকে উপরোক্ত কুরআনের আয়াত ও হাদিসের ভাষায় ইস্তিকামাহ বলা হচ্ছে। এই ইস্তাকামাতের চিন্তাটা তাই আমাদের ভালোভাবে বোঝা জরুরি যে,আমাদের কোন কোন বিষয়ে অবিচল থাকতে হবে? অবিচল থাকার ফলাফল হিসেবে আমরা কি পাব? কিভাবে আল্লাহর আদেশ নিষেধের উপর ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে অবিচল থাকতে পারি?

    ইস্তিকামাহ থাকার ফলাফল

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    إِنَّالَّذِينَقَالُوارَبُّنَااللَّهُثُمَّاسْتَقَامُواتَتَنَزَّلُعَلَيْهِمُالْمَلَائِكَةُأَلَّاتَخَافُواوَلَاتَحْزَنُواوَأَبْشِرُوابِالْجَنَّةِالَّتِيكُنتُمْتُوعَدُونَنَحْنُأَوْلِيَاؤُكُمْفِيالْحَيَاةِالدُّنْيَاوَفِيالْآخِرَةِۖوَلَكُمْفِيهَامَاتَشْتَهِيأَنفُسُكُمْوَلَكُمْفِيهَامَاتَدَّعُونَنُزُلًامِّنْغَفُورٍرَّحِيمٍ

    “নিশ্চয় যারা বলে, আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ, অতঃপর তাতেই অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তা করো না এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ শোন।ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। সেখানে তোমাদের জন্য আছে যা তোমাদের মন চায় এবং সেখানে তোমাদের জন্যে আছে তোমরা দাবী কর। এটা ক্ষমাশীল করুনাময়ের পক্ষ থেকে সাদর আপ্যায়ন”। [ফুসসিলাত ৩০-৩২] 

    এই আয়াতে দ্বীনের উপর দৃঢ় ও অবিচল থাকার ফলাফল নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

    • যারা প্রকাশ্যে আল্লাহকে রব হিসেবে ঘোষনা দেয় এবং দ্বীনের উপর দৃঢ়পদ থাকে তাদের জন্য আল্লাহর রহমতের ফেরেশতা নাযিল হয়।
    • ইস্তিকামাত থাকার ফলে তাদের অন্তরের সাকিনা অর্থাৎ প্রশান্তি নাযিল হয় কেননা ফেরেশতারা তাদেরকে সুসংবাদ দেয়। দ্বীনের উপর দৃঢ় থাকার জন্য, এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল প্রতিকুলতার মুখোমুখি হতে হয় তা থেকে অভয় দেয়। আখিরাতে আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারেও অভয় দেয়। ভয় এবং দুশ্চিন্তা আখিরাতে তাদের স্পর্শ করবে না।
    • দুনিয়ায় এবং আখিরাতে ফেরেশতারা তাদের বন্ধু হবে।
    • দ্বীন প্রতিষ্ঠায় কষ্ট সহ্য করেও ইস্তিকামাত থাকার জন্য ফেরেশতারা জান্নাতের সুসংবাদ দেয়। 
    • আখিরাতে আল্লাহর অতিথি হিসেবে তাদেরকে সাদরে আপ্যায়ন করা হবে।

    যেসকল বিষয়ে ইস্তিকামাত থাকতে হবে

    আম্মার ইবনু ইয়াসির রা, বিলাল রা, খাব্বাব রা, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ রা প্রমুখ সাহাবীদের উপর আসা প্রবল নির্যাতনের পরেও এই দুর্বল, রুগ্ন মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিল, সরল পথ থেকে কখনও এক বিন্দুও বিচ্যুত হয়নি। শত জুলুম নির্যাতনের পরেও দ্বীনের দাওয়াহ ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল তারা। শিয়াবে আবু তালিবে রাসুল সা ও তার সাহাবীদের নিদারুন কষ্টের পরেও তারা ছিল দ্বীনকে বিজয়ী করতে অবিচল। তারা তাদের সমাজে ছিল সবচেয়ে তুচ্ছ, স্বল্পসংখ্যক ও দুর্বল। কিন্তু যখন সবাই জাহিলিয়্যাতের সমুদ্রে নিমজ্জিত ছিল তখন এই দুর্বল মানুষগুলোই ছিল আলোকিত চিন্তার অধিকারী, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। এই বৈরি পরিবেশে দ্বীন আল কায়্যিমে (সরল পথ) হেটে চলার শক্তিই অবিচল নিষ্ঠা, দৃঢ়পদতা বা ইস্তিকামাহ।

    তাইইবনে তাইমিয়্যাহ রহ বলেন,

    أَعْظَمُالْكَرَامَةِلُزُومُالِاسْتِقَامَةِ

    “(আল্লাহর কাছে) শ্রেষ্ঠ পদমর্যাদার জন্য প্রয়োজন ইস্তিকামাহ” [মাদারিজুস সালিকিন ২/১০৬]

    দ্বীনের উপর দৃঢ় ও অবিচল থাকার জন্যই সাহাবারা আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ পদমর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন।

    তাই আজ কুফর দ্বারা পরিচালিত এই সমাজে যেখানে হারামের সয়লাব, যেই সমাজে ঈমান ধরে রাখা হাতে জলন্ত কয়লা ধরে রাখার চেয়েও কঠিন, সেই সমাজে দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত থেকে সমাজ পরিবর্তনে রাজনৈতিক সংগ্রাম করার মাধ্যমে আমরাও আল্লাহর কাছে সাহাবীদের মত সম্মানিত হতে পারি।  

    আজকের এই পুঁজিবাদী সমাজে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে বিভিন্নভাবে আক্রমনের স্বীকার হতে হবে। কেননা পশ্চিমারা চায়, ইসলাম যাতে কখনই আবার ফিরে না আসতে পারে। তাই একে ধ্বংস করার জন্য তারা বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করছে। যার মাধ্যমে তারা মুমিনদের প্রচেষ্টাসমূহকে ব্যর্থ করে দিতে তৎপর। তাদের দ্বীন ইসলাম ও তাদের আকিদাহকে ধ্বংস করতে প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। তাই যে সকল বিষয়ে আমাদের পরীক্ষার স্বীকার হতে হবে এবং দ্বীনের উপর অবিচল থাকা প্রয়োজন তা হল:

    ১. ইসলামী চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিসমূহ, বিশ্বাস ও আইনসমুহকে পশ্চিমা কুফফার শক্তি ও তাদের দোসররা ক্রমাগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে তাদের মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমে। খিলাফাহ, জিহাদ, হুদুদ ইত্যাদি বিধিবিধানের মত মৌলিক বিষয়সমূহের প্রতি তাদের আক্রমন, বিষদ্গার চলছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের সামগ্রিক ইসলামের উপর এই আঘাতকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রতিহত করতে হবে এবং ইসলামের উপর ইস্তিকামাত থাকতে হবে। খিলাফতের জন্য কাজ করে যেতে হবে।

    ২. মুসলিম ভূমিগুলোতে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে দালাল শাসকগুলোর মাধ্যমে। যেসকল মূল্যবোধ ও চিন্তাসমূহ সম্পূর্ণরূপে শরিয়াহ বিরোধী। যেমন: স্কুল-কলেজসমূহে হিজাব নিষিদ্ধকরণ, ইসলামী রাজনীতিকে ঘৃণিতরূপে প্রচার করা, গনতন্ত্রকে বৈধতা দেওয়া। তাই কুফফারদের কোন ধরনের চাপেই নতি স্বীকার করা যাবে না, বরঞ্চ দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য অবিচল থাকতে হবে।

    ৩. দালাল গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর মাধ্যমে ইসলামের একটি পরিবর্তিত সংস্করন [reformed islam] গ্রহন করতে, এবং প্রতিষ্ঠিত করতে সকল ধরনের প্রচারনা করা হচ্ছে, যা আসলে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ ও চিন্তাসমূহকে ইসলামীকরনের একটি অপচেষ্টা। যেমন: সুফিবাদী ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে কেননা এটি রাজনীতি বিবর্জিত ইসলামের কথা বলে। এছাড়াও গণতন্ত্রের মত একটি কুফর শাসনব্যাবস্থাকে ইসলামীকরন করার প্রয়াসও এই এজেন্ডার অংশ। মানবাধিকার,নারীর ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীদেরকে ভোগ্যপন্য ও পুরুষের সাথে অসামঞ্জস্য প্রতিযোগীতা ইত্যাদি স্পষ্ট শরিয়াহর সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয়সমূহকেও শরীয়াহ সমর্থিত বলে প্রচার করা হচ্ছে। যাতে করে ইসলামী চিন্তাসমূহ তার বিশুদ্ধতা (purity) হারাচ্ছে।

    ইসলামকে পরিবর্ধন, পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ্য এই আক্রমনের দ্বারা তারা মুসলিমদেরকে প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। যাতে করে তারা প্রকৃত ইসলামের উপর অবিচল না থাকতে পারে। তাই আমাদের ইসলামকে মৌলিকভাবে [radically] এবং সার্বিকভাবে [comprehensively] গ্রহন করতে হবে এবং তা প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যেতে হবে। এবং এই ক্ষেত্রে যাতে আমাদের পদস্থলন না হয়, এবং আমরা ইস্তিকামাহ বা দৃঢ়পদ থাকি। যাতে কুফফারদের আকিদা থেকে উৎসারিত চিন্তা (ফিকরাহ) ও ব্যাবস্থাসমূহকে আমরা গ্রহন না করি। কেননা রাসুল সা কে এজন্যই ইস্তিকামাহ থাকতে আদেশ করা হয়েছে,

    وَلَاتَرْكَنُواإِلَىالَّذِينَظَلَمُوافَتَمَسَّكُمُالنَّارُوَمَالَكُممِّندُونِاللَّهِمِنْأَوْلِيَاءَثُمَّلَاتُنصَرُونَ

    “আর জালিমদের প্রতি ঝুঁকবে না। নতুবা তোমাদেরকেও আগুনে ধরবে। আর আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোন বন্ধু নাই। অতএব কোথাও সাহায্য পাবে না।” [হুদ: ১১৩]

    এটিই ইস্তিকামাত থাকার নির্দেশের পরবর্তী আয়াত যা থেকে বোঝা যায় যারা জালেম, তাদের প্রতি কোনভাবেই ঝোকা যাবে না। তাদের জীবনাদর্শ (মাবদা), সংস্কৃতি (সাকাফা), ব্যাবস্থাসমূহ (নিযাম) কোন কিছুই গ্রহন করা যাবে না। এ ব্যাপারে তাদের সাথে কোন ধরনের আপোষ করা যাবে না।  

    তাই যদি আমরা জালিম শাসকদের ও তাদের প্রভুদের সাথে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোন ধরনের আপোষ করি, তাদের দ্বীন থেকে কোন কিছু গ্রহন করি, তাদের চিন্তা-দর্শন ও আকিদাসমূহের দিকে ঝুকে পড়ি বা আকৃষ্ট হই, তাহলে তা আল্লাহর কাছে ইস্তিকামাহ হিসেবে গন্য হবে না। বরঞ্চ উপরোক্ত আয়াতে মুমিনদেরকে আল্লাহ আগুনের ভয় দেখাচ্ছেন। মুমিনরা এক্ষেত্রে বন্ধু হিসেবে কাউকে পাবে না, এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বা অন্য কোন জায়গা থেকে সাহায্যও (নুসরাহ) পাবে না।

    এছাড়া আমরা যদি ব্যক্তিগতভাবে হারাম কাজে লিপ্ত হই যেমন সালাতে অবহেলা, পরনিন্দা, হারাম সম্পর্ক, অশ্লীলতার চর্চা ইত্যাদি তাহলে আমাদের প্রচেষ্টাও আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য হবে না। যদি সমাজের প্রচলিত অনৈসলামি চিন্তাসমূহ নিজের মধ্য থেকে ছেকে না ফেলি তাহলেও একই বিধান প্রযোজ্য।

    তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সম্মান-মর্যাদা এবং সাহায্য (নুসরাহ) রেখেছেন দ্বীন এর উপর অবিচল বা ইস্তিকামাত থাকার মাঝেই। তাই আমাদের দ্বীনকে আবারো পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য রাসুল সা এর সুন্নাহ অনুযায়ী কাজ করে যেতে হবে, এবং দ্বীন থেকে কোনভাবেই বিচ্যুত হওয়া যাবে না, ইস্তিকামাহ থাকতে হবে। ইবনুল কায়্যিম রহ সালাফদের উক্তি উল্লেখ করেছেন,

    كُنْصَاحِبَالِاسْتِقَامَةِ،لَاطَالِبَالْكَرَامَةِ. فَإِنَّنَفْسَكَمُتَحَرِّكَةٌفِيطَلَبِالْكَرَامَةِ. وَرَبَّكَيُطَالِبُكَبِالِاسْتِقَامَةِ

    “অবিচলতার সাথী হও, সম্মান-মর্যাদার অন্বেষণকারী হয়ো না (মানুষের কাছ থেকে)। কেননা তোমার অন্তর মর্যাদা পেতে চায়, কিন্তু তোমার রব বলে অবিচলতার (ইস্তিকামাত) মাধ্যমে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করতে’’ [মাদারিজুস সালিকিন ২/১০৬]

    ইসলামের উপর ইস্তিকামাত থাকার উপায়

    আমরা যারা খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছি, ইসলামের উপর ইস্তিকামাত থাকতে হলে আমাদের যা করনীয় তা হল:

    *দাওয়াহ এর কাজে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করা ও একে অপরের সাথে প্রতিযোগীতা করা। আল্লাহ বলেন,

    وَمَنْأَحْسَنُقَوْلًامِّمَّندَعَاإِلَىاللَّهِوَعَمِلَصَالِحًاوَقَالَإِنَّنِيمِنَالْمُسْلِمِينَ

    “যে আল্লাহর দিকে দাওয়াহ দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার?” [ফুসসিলাত: ৩৩]

    আল্লাহ ইসলাম প্রতিষ্ঠার দাওয়াহ আগে করতে বলেছেন। অতঃপর যে আদেশ দিয়েছেন তা হল ইসলামের উপর অবিচল থাকার। এ থেকে বোঝা যায় অবিচল থাকার, আপোষহীন থাকার গুরুত্ব কত বশি। আল্লাহ বলেন, 

    فَلِذَٰلِكَفَادْعُۖوَاسْتَقِمْكَمَاأُمِرْتَۖوَلَاتَتَّبِعْأَهْوَاءَهُمْۖوَقُلْآمَنتُبِمَاأَنزَلَاللَّهُمِنكِتَابٍۖوَأُمِرْتُلِأَعْدِلَبَيْنَكُمُۖاللَّهُرَبُّنَاوَرَبُّكُمْۖلَنَاأَعْمَالُنَاوَلَكُمْأَعْمَالُكُمْۖلَاحُجَّةَبَيْنَنَاوَبَيْنَكُمُۖاللَّهُيَجْمَعُبَيْنَنَاۖوَإِلَيْهِالْمَصِيرُ

    সুতরাং আপনি এর (ইসলামের) প্রতিই দাওয়াত দিন এবং হুকুম অনুযায়ী অবিচল (ইস্তিকামাহ) থাকুন; আপনি তাদের খেয়ালখুশীর অনুসরণ করবেন না বলুন, আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন, আমি তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছি আমি তোমাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করতে আদিষ্ট হয়েছি আল্লাহ আমাদের পালনকর্তা তোমাদের পালনকর্তা আমাদের জন্যে আমাদের কর্ম এবং তোমাদের জন্যে তোমাদের কর্ম আমাদের মধ্যে তোমাদের মধ্যে বিবাদ নেই আল্লাহ আমাদেরকে সমবেত করবেন এবং তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তণ হবে। [শুরা: ১৫]

    ইসলামের উপর অবিচল থাকার জন্য নেক কাজে প্রতিযোগীতা করার মানসিকতা তৈরি করা প্রয়োজন। আল্লাহ বলেন,

    وَلِكُلٍّوِجْهَةٌهُوَمُوَلِّيهَاۖفَاسْتَبِقُواالْخَيْرَاتِۚأَيْنَمَاتَكُونُوايَأْتِبِكُمُاللَّهُجَمِيعًاۚإِنَّاللَّهَعَلَىٰكُلِّشَيْءٍقَدِيرٌ

    “আর সবার জন্যই রয়েছে কেবলা একেক দিকে, যে দিকে সে মুখ করে (এবাদত করবে)। কাজেই সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে এগিয়ে যাও। যেখানেই তোমরা থাকবে, আল্লাহ অবশ্যই তোমাদেরকে সমবেত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল।” [বাকারা: ১৪৮]

    • নিষ্ঠা (ইখলাস) বজায় রাখা: আমরা যদি সকল কাজে নিষ্ঠাবান হতে পারি, প্রত্যেক কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করার চেষ্টা করি, তাহলে তা দ্বীনের উপর অবিচল থাকতে আমাদের সাহায্য করবে।
    •  সাহায্য ও বিজয়ের জন্য প্রচুর দুয়া করা:  আল্লাহর কাছে প্রতিনিয়ত দুয়া করা, যাতে আল্লাহ মুসলিমদেরকে বিজয়ী করেন, এবং দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এবং দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত রাখেন। রাসুল সা অবিচল থাকার জন্য বেশি বেশি এই দুয়া করতেন,

    اللَّهُمَّيَامُقَلِّبَالْقُلُوبِ،ثَبِّتْقَلْبِيعَلَىدِينِكَ

    “হে আল্লাহ, হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী। আমার অন্তরকে তোমার দীনের উপর অবিচল রাখো ” (তিরমিযী,আহমাদ, হাকিম,ইবনে হিব্বান)

    • আল্লাহর উপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখা: আমাদেরকে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে যে, আল্লাহ অবশ্যই বিজয় দান করবেন, এবং মুসলিমদেরকে খিলাফতের নিয়ামত দ্বারা সম্মানিত করবেন, যদি আমরা ঈমান আনি ও সৎকাজ করতে থাকি। কেননা তা আল্লাহর ওয়াদা। এতে করে আমরা মানসিকভাবে দৃঢ়পদ থাকার শক্তি অর্জন করব।
    • ধৈর্যধারন (সবর) করা: দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হল ধৈর্য। ইসলাম প্রতিষ্ঠায় দাওয়াহ করার জন্যপশ্চিমা কুফফার ও তাদের দালালদের মাধ্যমে যে ধরনের বাধার ও অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হবে সে ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধিবিধানের উপর অবিচল থাকতে হলে আমাদের ধৈর্যধারন করতে হবে। আল্লাহর বলেন,

    يَاأَيُّهَاالَّذِينَآمَنُوااصْبِرُواوَصَابِرُواوَرَابِطُواوَاتَّقُوااللَّهَلَعَلَّكُمْتُفْلِحُونَ

    “হে ঈমানদানগণ! ধৈর্য্য ধারণ কর এবং মোকাবেলায় দৃঢ়তা অবলম্বন কর। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক যাতে তোমরা তোমাদের উদ্দেশ্য লাভে সমর্থ হতে পার।” [আলে ইমরান ২০০]

    • নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও ইসলামী জ্ঞান অর্জন: প্রতিনিয়ত কুরআন তিলাওয়াত করা ও ইসলামী জ্ঞান অর্জন করা, যা আমাদের চিন্তা সমূহকে পরিশুদ্ধ করতে সাহায্য করবে এবং আল্লাহর কাছাকাছি যেতে সহায়তা করবে। ফলে ইসলামের উপর অবিচল থাকা সম্ভব হবে। নতুবা আমরা প্রকৃত ইসলাম থেকে বিচ্যুত হব। সঠিক ইসলামী জ্ঞানের সচ্ছতাই বিচ্যুতি থেকে রক্ষা পাবার পূর্বশর্ত। রাসুল সা বলেছেন,

    অবশ্যই আল্লাহ এই কিতাবের মাধ্যমে কিছু লোকের উত্থান ঘটাবেন এবং কিছু লোকের পতন ঘটাবেন।” [মুসলিম]

    তাই আমাদেরকে অবশ্যই ইসলামী সাকাফাহ তথা সংস্কৃতির ছাচে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে; কুরআন, সুন্নাহর জ্ঞান ও এর ফিকহ অর্জনে মনোনিবেশ করার মাধ্যমে। যাতে করে আমরা দুনিয়ায় খিলাফতের মাধ্যমে নেতৃত্বদানকারী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারি। ওয়ামা তাউফিক ইল্লা বিল্লাহ।

    লেখক: ইবনুল আযরাক

  • রমযান: পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী হোন

    রমযান: পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী হোন

    রহমতের মাস রমযান শুরু হয়েছে, যে মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ থাকে এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিমদের জন্য রমযান মাসকে করুণা ও ইবাদতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-এর পক্ষ থেকে এটা আমাদের জন্য একটি বিশেষ রহমত যে তিনি আমাদেরকে এই রমযানে জীবিত থাকার সুযোগ দিয়েছেন। যেহেতু এই মাসে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ভালো কাজ করার প্রতি আমাদের আগ্রহ বেশি থাকে এবং আমাদের অন্তর ইবাদতের প্রতি অধিক মনোনিবেশ করে, সেহেতু আসুন আমরা নিজেদেরকে প্রশ্ন করি যে, পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশের মাধ্যমে আল্লাহ্’র নৈকট্য লাভের জন্য আমরা কতটা সচেষ্ট হয়েছি, যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জন্য ফরয করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” [সূরা আল-বাক্বারা: ২০৮]

    আমরা জানি যে, মহিমান্বিত এই মাসে কুর’আন নাযিল করা হয়েছে, যেখানে আমাদের জীবনের প্রতিটি দিকের জন্য নির্দেশনা বিদ্যমান – আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা, পোশাক-পরিচ্ছদ, নারী-পুরুষের সম্পর্কের ধরণ, পারিবারিক জীবন, বিয়ে, আর্থিক বিষয়াদি, অপরাধ-অভিযোগের ফয়সালা, রাষ্ট্রে শাসনকার্য পরিচালনা, শাস্তি প্রদান এবং অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ধরণসহ সমস্ত বিষয়ে – এবং, এই কুর’আন ব্যক্তি, উম্মাহ্ এবং মানবতার জন্য একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশ – যাতে আমরা এটাকে প্রতিটি ফয়সালায়, পছন্দ-অপছন্দে, সিদ্ধান্তে, আইনে, এবং প্রতিটি কাজে কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়া সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে পারি। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন:

    شَهۡرُ رَمَضَانَ الَّذِىۡٓ اُنۡزِلَ فِيۡهِ الۡقُرۡاٰنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَ بَيِّنٰتٍ مِّنَ الۡهُدٰى وَالۡفُرۡقَانِۚ

    “রমযান মাসে কুর‘আন নাযিল করা হয়েছে যা মানুষের জন্য হেদায়াত, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন, এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী।” [সূরা আল-বাক্বারা: ১৮৫]

    অতএব, এই মাসে যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা শয়তানকে শৃঙ্খলিত করে রেখেছেন, তখন কুর’আনের শিক্ষাগুলিকে আমাদের জীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণ আরম্ভ করার এটাই কি আদর্শ সময় নয়? কুর’আনের শিক্ষা কি শুধুমাত্র রমযানের জন্য কিছু ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত, নাকি আমাদের সমাজে শান্তি ও ন্যায়-বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য চূড়ান্ত নির্দেশনা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত?

    এটা প্রশংসনীয় যে, এই মাসে সাওম (রোজা) পালনের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে আমরা অত্যন্ত সচেতন, কিন্তু সমাজে সুদমুক্ত লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য নিশ্চিতের মত অন্যান্য ফরয সম্পর্কে আমাদের অবস্থান কি?

    وَاَحَلَّ اللّٰهُ الۡبَيۡعَ وَحَرَّمَ الرِّبٰو

    “অথচ আল্লাহ্ ক্রয়-বিক্রয় বৈধ করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” [সূরা আল-বাক্বারা: ২৭৫]

    আপনাদেরকে আবার মনে করিয়ে দিতে চাই যে, কুর’আন মানবজাতির জন্য পথ-নির্দেশ এবং আমাদের জীবনের প্রতিটি দিকের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা – ব্যক্তিগত ইবাদত থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় বিষয়াদি পর্যন্ত। এমনকি ইসলাম আমাদের জীবনসঙ্গী নির্বাচিত করার ক্ষেত্রেও দিক-নির্দেশনা প্রদান করে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,

    تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعٍ : لِمَالِهَا ، وَلِحَسَبِهَا ، وَلِجَمَالِهَا ، وَلِدِينِهَا ، فَاظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاك

    “একজন নারীকে চারটি জিনিসের জন্য বিয়ে করা যেতে পারে, তার সম্পদ, তার বংশধর, তার সৌন্দর্য, এবং তার দ্বীন। এমন একজনকে সন্ধান করো যে দ্বীনদার সম্পন্ন, তোমার হাত ধুলোয় ধুসরিত হোক (অর্থাৎ, যাতে তুমি কল্যাণ লাভ করতে পার)”।

    আমাদেও দ্বীনদার ও তাক্বওয়াবান পূর্বসূরীরা আন্তরিকতার সাথে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ও তাঁর রাসূলের (সা) এর আদেশ বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে উদগ্রীব ছিলেন। খলিফা উমর (রা) একজন দুধ বিক্রেতার মেয়ের তাক্বওয়ার বিষয়ে এতটাই বিমুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি তার পুত্র আসিম-এর সাথে সেই মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। আসলাম-এর পিতামহ হতে ইবনে যাঈদ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “যখন মদিনাতে উমর (রা) রাত্রিকালীন পরিভ্রমনে বের হতেন, তখন আমি একবার তার সাথে গিয়েছিলাম, আল্লাহ্ তার উপর সন্তুষ্ট হোন। তিনি ক্লান্ত বোধ করছিলেন, তাই তিনি একটি দেয়ালে হেলান দেন এবং শুনতে পান যে, একজন মহিলা তার মেয়েকে দুধ বিক্রি করার আগে দুধের সাথে পানি মেশাতে বলছে। মেয়েটি তাকে বলছিল যে, মু’মিনদের নেতা উমর এটা নিষেধ করেছেন। কিন্তু, তার মা তাকে এটা বলে জোর করলো যে, সে এমন এক জায়গায় রয়েছে যেখানে উমর ও তার উপ-পরিদর্শক তাকে দেখতে পাবে না। যাহোক, মেয়েটির বলল: আমি আল্লাহ্’র নামে শপথ করছি যে, আমি এমন কাজ করব না যার ফলে তাকে প্রকাশ্যে মান্য করা হবে এবং গোপনে অমান্য করা হবে। এরপর সে বলল: আমার বিবেক আমার খলিফা। তুমি খলিফা ও তার কর্মকর্তাদের হাত থেকে পালাতে পারো, কিন্তু কিভাবে আমরা আল্লাহ্ ও আমাদের বিবেকের হাত থেকে মুক্তি পাবো..?” সেই মেয়ে এবং আসিমের সংসারে একজন কন্যা সন্তানের জন্ম হয় যিনি পরবর্তীতে মহান খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজিজের মা হন।

    এভাবেই আমাদের তাক্বওয়াবান পূর্বসূরীরা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুর‘আন ও আল্লাহ্’র শারী’আহ্ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উচ্চতর মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন। বিবাহের ক্ষেত্রে কুর’আনের মানদ-ের ভিত্তিতে আপাতদৃষ্টিতে একটি সহজ-সরল সিদ্ধান্তের ফলে খলিফা ওমর বিন আব্দুল আজিজ-এর মত সন্তানের জন্ম হয়েছে। অতএব, শুধু কল্পনা করুন যে, সমাজের সকল ক্ষেত্রে কুর‘আনের অন্যান্য মানদ-সমূহ বাস্তবায়িত হলে কি ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরবদের মত পশ্চাদপসরণ জাতিকে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করেছেন, কারণ তারা আল্লাহ্’র কিতাব বাস্তবায়ন করেছিল, অথচ আমরা এখন ক্রমাগত কুর’আনের সামগ্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে জাতি হিসেবে ক্রমাগত অবনমিত হচ্ছি। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:  

    إِنَّ اللَّهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا ، وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ

    “আল্লাহ্ এই গ্রন্থের মাধ্যমে কিছু জাতিকে উন্নত করবেন এবং অন্যদেরকে অধঃপতিত করবেন” [সহীহ্ মুসলিম]।

    আমাদের প্রাণপ্রিয় রাসুলের (সা) একটি হাদিস স্মরণ করে আমি আমার এই বক্তব্যটি শেষ করছি:

    وَالْقُرْآنُ حُجَّةٌ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ

    “এবং এই কুর‘আন হয় আপনার পক্ষে প্রমাণ, কিংবা আপনার বিপক্ষে প্রমাণ”। (সহীহ্ মুসলিম)

    সুতরাং এই মাসে আমাদের এটাই প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত যে, কুর‘আনের সাথে আমাদের সম্পর্ককে সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করা এবং মুসলিম হিসেবে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এটাকে মানদ- হিসেবে স্থির করা। সুতরাং এই রমযান মাসে, কিংবা তারপরে এই কিতাবের যে আয়াতসমূহ আমরা তেলাওয়াত করি তা হয় আমাদের স্বপক্ষে প্রমাণ, বা আমাদের বিপক্ষে প্রমাণ- আমরা কি এর মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করি, বা এই দুনিয়াতে এটা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করি? নাকি আমরা এটাকে অবহেলা করি এবং আমাদের জন্য যা সহজ কেবল তাই পছন্দ করি?

  • ভয় (খাউফ)

    ভয় (খাউফ)

    বেঁচে থাকার প্রবৃত্তির একটি বহিপ্রকাশ হল ভয়। এটি মানুষের স্বভাবজাত। বাহ্যিক প্রণোদনা ছাড়া ভয় প্রকাশ পায় না। এ প্রণোদনাটি হতে পারে বাস্তবিক অথবা ভয়ের সাথে সর্ম্পকযুক্ত কোন চিন্তা। বাস্তবিক প্রণোদনার একটি উদাহরণ হল পাগলা কুকুর এবং চিন্তা বা কল্পনার সাথে বিজড়িত প্রণোদনা হল ভূতের ভয়-যার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই।

    ভয়ের কারণে অধপতিত ব্যক্তি ও দূর্বল জাতি অপমানিত হয় এবং পিছিয়ে থাকে। যদি কোন ব্যক্তির উপর ভয় প্রাধান্য বিস্তার করে তবে তার জীবনের সুখ থাকে না, তার মানসিক বিকার ঘটে, হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়, স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়ে যায়, সে মহৎ গুনাবলী বিবর্জিত হয় এবং ভাল মন্দ সনাক্ত করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।

    সবচেয়ে নিকৃষ্ট ধরনের ভয় হল চিন্তা বা কল্পনা থেকে উদ্ভুত। এটি দূর্বল মনেই উদয় হয়। শিশুদের মত অবিকশিত মনে এরূপ হতে পারে অথবা বাস্তবতার সাথে সর্ম্পকযুক্ত করার মত যথাযথ তথ্য না থাকায় কোন ব্যক্তির মধ্যে এরকম ভয়ের উদ্রেক হতে পারে । অশিক্ষিত অথবা জীবনযাপনের পদ্ধতির কারণে, বোকা লোকের কম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মস্তিষ্ক বা একেবারেই প্রতিবন্ধী হওয়ায় তথ্যের ঘাটতি থাকতে পারে। এ ধরনের লোকের ভয় দূর করার উপায় হল তাদের সাথে ভয়ের বিষয়ে গভীর কোন আলোচনা দেয়া অথবা এ বিষয়ের সাথে সত্যিকারের বাস্তবতাকে তার বোধগম্যতার মধ্যে নিয়ে আসা।

    কল্পনার চেয়ে কম নিকৃষ্ট ধরনের ভয় আসে ভুল বিবেচনাবোধ থেকে। একজন মানুষ এমন কোন কিছুকে ভীতিকর ভাবতে পারে যা আসলে তা নয়। সে একটি ঘুমন্ত কুকুরকে সেই পাগলা কুকুর ভাবতে পারে যেরকম একটি পাগলা কুকুর সে আগে দেখেছে। সুতরাং সে রাস্তা পার হতে ভয় পেতে পারে এবং সেটি থেকে পালাতে চেষ্টা করে। এরকম কারও বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করা দরকার। হতে পারে এটি একটি পোষা কুকুর এবং এখন ঘুমিয়ে আছে ও লোকটির উপস্থিতি বুঝতে পারছে না। এই ধরনের ভয় বেশি কাজ করে কোন জায়গায় একটি প্রবন্ধ লেখা বা বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে অথবা কোন শাসক বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে আলোচনা করার ক্ষেত্রে। সঠিক বিবেচাবোধ না থাকায় ক্ষতির ভয় থেকে একজন ব্যক্তি লেখা, আলোচনা ও বক্তব্য দেয়া থেকে বিরত থাকে।

    আর এক ধরনের ভয় ক্রিয়া করে যা একটি কাজ করা অথবা না করার পরিণাম সর্ম্পকিত তুলনামূলক চিন্তা থেকে উদ্ভুত হয়। অথচ একাজটি করলেও ক্ষতি হবে এবং না করলেও ক্ষতি হবে। যেমন: একজন জালিম শাসকের জুলুমের ভয় যা কোন ব্যক্তি অথবা উম্মাহ’র ক্ষতিসাধন করতে পারে। এটি একটি সৈন্যের যুদ্ধের ময়দানে মারা যাওয়ার ভয় যা পুরো সৈন্যবাহিনী অথবা সৈন্যবাহিনীর সদস্য হিসেবে একজনের উপর ধ্বংস ও অপমান ডেকে আনতে পারে। আকীদার কারণে জেলে যাওয়ার ভয় তাকে আকীদা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আকীদা থেকে বিচ্ছিন্নতা জেলে যাওয়ার চেয়েও গর্হিত কাজ। এই ধরনের ভয় উম্মাহ’র জন্য জেলে যাওয়া বা বিনাশ হয়ে যাওয়ার চেয়েও ভয়ানক।

    তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভয় কেবল উপকারীই নয়, বরং অপরিহার্য। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) এবং তার শাস্তিকে ভয় করা বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য এবং এটি সুরক্ষাদানকারী ও নির্দেশনামূলক। সুতরাং অন্তরে আল্লাহ’র ভয়কে জাগ্রত করা, কুফর অথবা গুনাহের কারণে আল্লাহ শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে কতটা কঠোর তা বর্ণণা করা অপরিহার্য ও অত্যাবশ্যকীয়।

    একমাত্র আমাকেই ভয় কর।” [সূরা আল-বাক্বারা: ৪১]

    আমি ছাড়া কাউকে ভয় করো না।” [সূরা আল-বাক্বারা: ৪০]

    নিশ্চয়ই শয়তান শুধুমাত্র তার বন্ধুগণ হতে তোমাদেরকে ভয় প্রদর্শন করে; কিন্তু যদি তোমরা বিশ্বাসী হও তবে তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় করো।” [সূরা আলি ইমরান: ১৭৫]

    অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো।” [সূরা আল-মা’য়িদাহ্: ৩]

    হে মানব সমাজ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো।” [সূরা আন-নিসা: ১]

    যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহ্’র নাম নেয়া হয় তখন তাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়ে।” [সূরা আল-আনফাল: ২]

    এবং যারা বজায় রাখে ঐ সম্পর্ক, যা বজায় রাখতে আল্লাহ্ আদেশ দিয়েছেন এবং স্বীয় পালনকর্তাকে ভয় করে এবং কঠোর হিসাবের আশঙ্কা রাখে।” [সূরা রাদ: ২১]

    এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকে ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম: ১৪]

    যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্যে রয়েছে দু’টি উদ্যান (অর্থাৎ, জান্নাতে)।” [সূরা আর-রহমান: ৪৬]

    তোমাদের কি হল, (যে তোমরা আল্লাহ্-কে (তাঁর শাস্তি) ভয় করছো না, এবং) (আল্লাহ্-এর কাছ থেকে) মানমর্যাদা পাওয়ার মোটেই আশা পোষণ করো না?” [সূরা নুহ: ১৩  

    এর অর্থ হলো তোমাদের কি হলো যে তোমরা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা-এর শ্রেষ্ঠত্বকে ভয় করছো না।

    সুন্নাহ্-এর দলিলের ক্ষেত্রে বলা যায়, কিছু হাদীসের সরাসরি শব্দ প্রয়োগ (মানতূক) এবং কিছু হাদীসের অন্তর্নিহিত অর্থ (মাফহূম) থেকে আল্লাহ্-কে ভয় করা ফরয হওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে:

    আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেছেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলতে শুনেছি: 

    “শেষ বিচারের দিন সাত শ্রেণীর লোক আল্লাহ্-এর আরশের নীচে ছায়া পাবে যেদিন তাঁর (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না। তাঁরা হলেন: একজন ন্যায়বিচারক শাসক, একজন যুবক যে আল্লাহ্-এর ইবাদতের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, একজন ব্যক্তি যার হৃদয় মসজিদের সাথে সংযুক্ত, দুইজন ব্যক্তি যারা কেবলমাত্র আল্লাহ্-এর ওয়াস্তে একে অপরকে ভালবাসে-যারা একত্রিত হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্নও হয় একমাত্র আল্লাহ্-এর কারণে, যাকে কোন অভিজাত পরিবারের সুন্দরী রমণী অবৈধ যৌন সম্পর্কের জন্য আহ্বান জানায় এবং তখন সে বলে, ‘আমি আল্লাহ্-কে ভয় পাই’, একজন লোক যে গোপনে এমনভাবে দান করে যে, সে ডানহাতে দান করলে তার বাম হাত তা জানতে পারে না এবং সে ব্যক্তি যিনি একাকী গোপনে আল্লাহ্-কে স্মরণ করেন এবং অতঃপর তার চোখ অশ্রুতে ভরে উঠে।”

    আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: 

    “আমি যা জানি যদি তোমরা তা জানতে তবে তোমরা হাসতে কম এবং কাঁদতে বেশি।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি] 

    আদী বিন হাতিম (রা) বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:

    “বিচার দিবসে তোমাদের কারোই তার এবং আল্লাহ্-এর মাঝে কোন মধ্যস্থতাকারী থাকবে না, সে তার ডানদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না, এবং অতঃপর সে তার বামদিকে তাকাবে এবং সে যা অর্জন করেছে তা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। অতঃপর সে তার সামনে তাকাবে এবং আগুন ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না। এবং সুতরাং, তোমাদের প্রত্যেকেই তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাচানো উচিত, এমনকি একটি খেজুরের অর্ধাংশ (দান)-এর বিনিময়ে হলেও।” [মুত্তাফিকুন আলাইহি]

    আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত, যিনি বলেছেন যে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন:

    “লোকেরা খালি পায়ে, নগ্ন ও খৎনাবিহীন অবস্থায় হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে।” ‘আয়েশা (রা) বললেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! পুরুষ এবং মহিলাগণ কি একে অপরেরর দিকে তাকাবে?” প্রত্যুত্তরে তিনি (সা) বললেন, “পরিস্থিতি তাদের জন্য এতটাই ভয়াবহ হবে যে তারা এতে মনযোগ দেয়ার কোন সুযোগই পাবে না।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি]

    নু’মান বিন আল-বাশী’র (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছেন যে: 

    “বিচারের দিন যে ব্যক্তি দোযখের অধিবাসীদের মধ্যে সবচেয়ে কম কষ্ট পাবে, তার পা দুটিকে জ্বলন্ত অঙ্গারের নীচে স্হাপন করা হবে এবং এতে করে তার মগজ ফুটতে থাকবে।” 

    ইবনে উমর (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 

    “দুনিয়ার সব মানুষ তার প্রভূর সামনে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে যে, তখন প্রত্যেকে তার ঘামে কানের মধ্যখান পর্যন্ত ডুবে যাবে।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি] 

    আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 

    “শেষবিচারের দিন মানুষ এমন অঝোরে ঘামতে থাকবে যে তাদের ঘামে ভৃ-পৃষ্ঠে সত্তর হাত গভীরতা তৈরি হবে, এবং তাদের কান অবদি ডুবে যাওয়া পর্যন্ত তা থামবে না।” [মুত্তাফাকুন আলাইহি] 

    আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: 

    “ঈমানদারগণ যদি জানতো যে আল্লাহ্ কী ধরণের শাস্তি মজুদ করে রেখেছেন, তাহলে তাদের কেউ আর জান্নাতের আশা পোষণ করতো না। এবং কাফিররা যদি জানতো আল্লাহ্’র হাতে কত ধরনের রহমত রয়েছে, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশের আশা কখনও ত্যাগ করতো না।” [মুসলিম]

    আবু হুরায়রা (রা)-এর বরাত দিয়ে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন যে, তাঁর রব বলেন: 

    আমার ইজ্জতের কসম, আমি আমার বান্দার জন্য দু’বারের জন্য ভয় এবং দু’বারের জন্য সুরক্ষা বয়ে আনবো না। যদি সে দুনিয়াতে আমাকে ভয় করে, তাহলে বিচার দিবসে আমি তাকে সুরক্ষা দিবো। আর দুনিয়াতে সে যদি (আমার ভয়ের ব্যাপারে) নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে, তাহলে আখিরাতে আমি তার জন্য ভয়ের কারণ হবো।

    এটি ইবনে হিব্বান তাঁর সহীহতে উল্লেখ করেন। 

    বর্ণিত আছে যে, ইবনে আব্বাস (রা) বলেন:

    “যখন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর রাসূল (সা)-এর উপর নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল করেন: 

    হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই অগ্নি থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর।’’ [সূরা আত-তাহরীম:৬]; একদা রাসূল (সা) সাহাবীগণদের সামনে আয়াতটি তিলাওয়াত করেন, তখন আয়াতটি শুনে এক যুবক অজ্ঞান হয়ে গেলো। রাসূল (সা) বালকটির হৃদপিন্ডের উপর হাত রাখলেন এবং তখনও তার স্পন্দন পেলেন, এবং বালকটিকে বললেন: হে যুবক, বল: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্। যুবকটিও পুনরাবৃত্তি করলো: লা’ ইলা’হা ইল্লাল্লাহ্, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিলেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: এটা কি আমাদের মধ্য হতে তার জন্য, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সা)? জবাবে রাসূল (সা) বললেন: তোমরা কি আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র এ আয়াতটি শুনতে পাওনি: “এটা ঐ ব্যক্তি পায়, যে আমার সামনে (বিচার দিবসে অথবা আমার শাস্তির ভয়ে) দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং আমার আযাবের ওয়াদাকেও ভয় করে।” [সূরা ইব্রাহীম: ১৪]; ইহা আল-হাকিম হতে বর্ণিত এবং তিনি একে যাচাই করেছেন।

    অমূলক ভয়কে দূর করার আর একটি উপায় হল ইসলামিক আক্বীদার অংশ ‘ভাগ্যের ভাল এবং মন্দ’ বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করা। আমাদের রিযক ও আজল বা আয়ুষ্কাল পূবনিধারিত। আল্লাহ’র রাস্তায় করা কোন কাজ রিযক বা আয়ুষ্কালকে কমাবে না। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,  

    “মানুষের ভয় যেন তোমাদেরকে হক্ কথা বলা হতে বিরত না রাখে যখন তা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়; সত্য বলা এবং সৎকর্ম করা কখনই মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে না এবং রিজিককেও সংকুচিত করে না।” [আহমদ, ইবনে হিব্বান, ইবনে মাজাহ্]

    জালিম শাসক বা মানুষের ভয় যাতে আমাদের হক্ব কথা বলা থেকে বিরত না রাখে।

    বুখারী এবং মুসলিম শরীফের হাদীসে আবু সায়ীদ (রা) থেকে বণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    মানুষের ভয় যাতে তোমাদের মুনকারের বিরুদ্ধে কথা বলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা না হয় যখন তা (মুনকার) শুন অথবা দেখ।

    আবু সায়ীদ (রা)-এর বরাত দিয়ে ইবনে মাজাহ উল্লেখ করে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘‘তোমাদের কেউ যাতে নিজেকে অপমান না কর।’ তারা (রা) বললেন, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ, কীভাবে একজন তার নিজেকে অপমান করে?’ তিনি (সা) বললেন, ‘সে এমন একজন পাপী ব্যক্তিকে দেখল যার বিষয়ে আল্লাহ’র বক্তব্য থাকা সত্ত্বেও তাকে তা জানাল না।’ এরকম ব্যক্তিকে আল্লাহ বলবেন, ‘কী তোমাকে এটি বলা থেকে বিরত রেখেছিল?’ সে বলবে, ‘লোকের ভয়।’ অতপর আল্লাহ বলবেন, ‘আস, আস আমার দিকে, ভয়ের সবচেয়ে বড় হক্বদার তো আমিই ছিলাম।’’  

    আল্লাহ’র রাস্তায় ইসলামের জন্য কাজ করলেই কেবল মানুষ মারা যায় না, বিপদের সম্মুখীন হয় না-তা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চিন্তা করলেই বুঝা যায়। বাংলাদেশে কেবলমাত্র সড়ক দূঘটনায় বছরে প্রায় সাড়ে সাতহাজার লোক মারা যায়, পরিবেশ দূষণজনিত কারণে বছরে প্রায় বিশ হাজার লোক মারা যায়, প্রায় দেড় লক্ষ লোক প্রতি বছর ক্যান্সারে মারা যায়। এছাড়াও রয়েছে দূঘটনাজতি মৃত্যু-রানা প্লাজা, নিমতলী, তাজরীন গামেন্টস, চকবাজার ট্রাজেডী। বাংলাদেশের জেলে দুই তৃতীয়াংশ বন্দী বিনা বিচারে আটক রয়েছে। এতসব মৃত্যু, দূঘটনা, জেল কী ইসলাম প্রতিপালন করার কারণে হচ্ছে? পঙ্গু হাসপাতালে কয়জন রোগী ইসলাম পালন করে হয়েছে? ঢাকা মেডিকেল, বারডেম বা পিজির মগের লাশসমূহ কী ইসলাম পালন করে হয়েছে? আজমপুর গোরস্তানসহ দেশের সব গোরস্তানের কয়টি লাশ বছরে দাফন হয়েছে যারা আল্লাহ’র কাজ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে?

    আমাদেরকে আল্লাহ’র ক্রোধকে ভয় করতে হবে। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধের ক্ষেত্রে জালিম শাসককে ভয় পেলে চলবে না।

    আর তোমার পরওয়ারদেগার যখন কোন পাপপূর্ণ জনপদকে পাকড়াও করেন, তখন এমনিভাবেই করে থাকেন। নিশ্চয়ই তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রনাদায়ক, কঠিন। নিশ্চয়ই ইহার মধ্যে নিদর্শন রয়েছে এমন প্রতিটি ব্যক্তির জন্য যে আখিরাতের আযাবকে ভয় করে। উহা এমন একটি দিন, যেদিন সমস্ত মানব সম্প্রদায়কে একসাথে সমবেত করা হবে, সেদিনটি হলো সকলের হাযিরের দিন। আর আমি ওটা শুধু সামান্য কালের জন্যে বিলম্বিত রেখেছি। যখন সেই দিন আসবে তখন কোন ব্যক্তি আল্লাহ্’র অনুমতি ছাড়া কথাও বলতে পারবে না। অনন্তর তাদের মধ্যে কতক তো দূর্ভাগা হবে এবং কতক হবে ভাগ্যবান। অতএব, যারা দূর্ভাগা হবে তারা তো দোযখে এই অবস্হায় থাকবে যে, তাতে তাদের চীৎকার ও আর্তনাদ হতে থাকবে।” [সূরা হুদ: ১০২-১০৬]

    আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর (শাস্তি) সমপর্কে তোমাদের সতর্ক করেছেন।” [সূরা আলি ইমরান: ২৮]

    হে মানব সম্প্রদায়! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয়ই কিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর ব্যাপার। যেদিন তোমরা তা প্রত্যক্ষ করবে, সেদিন প্রত্যেক স্তন্যধাত্রী তার দুধের শিশুকে বিসমৃত হবে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তার গর্ভপাত করবে এবং মানুষকে তুমি দেখবে মাতাল; অথচ তারা মাতাল নয় বস্তুত: আল্লাহ্’র আযাব অত্যন্ত কঠিন।” [সূরা আল-হাজ্জ্ব: ১-২]  

    “সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভ্রাতার কাছ থেকে, তার মাতা, তার পিতা, তার পত্নী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন প্রত্যেকেরই নিজের এক চিন্তা থাকবে, যা তাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে।” [সূরা আবাসা: ৩৪-৩৭]

    রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বলেন,

    ‘‘এক শহরের অধিবাসীদের উপর আলাহ্ তাআলা শাস্তি প্রদান করেন। তাদের মধ্যে আঠার হাজার লোক এমন ছিল যাদের আমল ছিল নবীদের আমলের সমতুল্য।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা:)! কেন তবে তাদের উপর শাস্তি এসেছিল?’ রাসূলুলাহ্ (আ:) বললেন, ‘এই কারণে যে, (বাকীদের পাপকাজ করতে দেখেও) তারা আল্লাহ্’র উদ্দেশ্য বাকীদের উপর ক্রুদ্ধ হতো না এবং তাদেরকে (পাপকাজ থেকে) বারণ করতো না।’’

    রাসূলুল্লাহ(সা:) বলেন,

    “সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার জীবন, তোমাদেরকে অবশ্যই সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজের নিষেধ করতে হবে, না হলে অবশ্যই আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে তোমাদের উপর শাস্তি পাঠাবেন, অতঃপর তোমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা করবে কিন্তু তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়া হবে না।” [তিরমিযি]

    রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,

    “তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং লোকদের কল্যাণময় কাজের জন্য উদ্বুদ্ধ করব। অন্যথায় আল্লাহ কোনো আযাবের মাধ্যমে তোমাদের ধ্বংস করে দেবেন কিংবা তোমাদের মধ্য থেকে খারাপ লোকদেরকে তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করে দেবেন। এসময় তোমাদের মধ্যকার ভালো লোকেরা আল্লাহ্’র কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তা কবুল হবে না।” [মুসনাদে আহমদ]

    হযরত আবু বকর (রা) বলেন, আমি রাসূলুলাহ্ (সা:) কে বলতে শুনেছি:

    “মানুষ যখন কোনো অসৎকাজ দেখে আর তারা সেটাকে পরিবর্তন করে না, তাহলে আল্লাহ তাদেরকে ব্যাপকভাবে তাঁর আযাবে ছেয়ে ফেলবেন।” [ইবনে মাজাহ]

    রাসূলুলাহ্ (সা:) বলেন,

    “নিশ্চয়ই আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল বিশেষ কোনো ব্যক্তির পাপাচারের জন্য জনসাধারণকে শাস্তি দেন না। কিন্তু যখন তারা (জনসাধারণ) তাদের সামনে মুনকার (অসৎকাজ) হতে দেখে এবং তা প্রতিহত করে না, যদিও তাদের তা প্রতিহত করার ক্ষমতা রয়েছে। তারা যদি এরূপ করে তখন আল্লাহ্ ব্যক্তিবিশেষ ও জনসাধারণ উভয়কেই শাস্তি দেন।” [আহমদ]

    এক্ষেত্রে আমাদের সালফে সালেহীনদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। ইমাম আবু হানিফা (র), আহমাদ ইবনে হাম্বল (র) হক্ব কথা বলতে গিয়ে শাসকের নিযাতনের স্বীকার হওয়া সত্বেও তারা তাতে অটল ছিলেন। আমরা নামাজসহ অন্যান্য ইবাদতে তাদের মাযহাব অনুসরণ করি। এইসব সালেহীনগণ শাসককে নয়, মানুষকে নয়, একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে ভয় করে দ্বীনের উপর ইস্তিকামাত ছিলেন।

    নিশ্চয় মানুষ অত্যন্ত কম জানে, আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানেন।

  • বাস্তবতা (reality) ও চিন্তা (concepts) প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে

    বাস্তবতা (reality) ও চিন্তা (concepts) প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে

    প্রবৃত্তি জৈবিক চাহিদা থেকে ভিন্ন যদিও উভয়টি মানবজীবনের অপরিহার্য জীবনীশক্তি। জৈবিক চাহিদাকে অনিবার্যভাবে পূরণ করতে হয়, তা পূরণ না হলে মানুষের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু প্রবৃত্তির চাহিদার ব্যাপারটি ভিন্ন, এটি স্রেফ তৃপ্ত হতে চায়। এটি তৃপ্ত না হলে মানুষ অস্থিরতায় ভোগে, কিন্তু মানুষ বেঁচে থাকে, মৃত্যুবরন করে না। মানুষ যদি খাদ্য গ্রহন না করে বা প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া না দেয়, সে মারা যাবে; কিন্তু যদি প্রবৃত্তির চাহিদা তৃপ্ত না করে তার মৃত্যু হবে না। যদি সে কোনো নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক না করে কিংবা যদি সে উপাসনা না করে সে মারা যাবে না, কারণ প্রবৃত্তির চাহিদা অনিবার্যভাবে পূরণ হতে চায় না। উপরন্তু, জৈবিক চাহিদা পূরণের তাড়না মানুষ তার নিজের মধ্য থেকেই অনুভব করে এবং এটা বাইরের উপাদান দ্বারা আলোড়িত হয়। এটা প্রবৃত্তি থেকে ভিন্ন, কারণ প্রবৃত্তি কখনোই অভ্যন্তরীনভাবে আলোড়িত হয় না এবং বাহ্যিক আলোড়ন ছাড়া এটি কখনোই তৃপ্ত হবার অনুভুতি তৈরি করে না। যদি বাহ্যিক কোনো কিছু একে তাড়িত করে, তবে তা আলোড়িত হয়, এবং তৃপ্ত হবার অনুভুতি বজায় থাকে।

    প্রবৃত্তিকে উস্কে দেবার জন্য যদি বাহ্যিক কোনো কিছু না থাকে, তবে এটি সুপ্ত থাকে এবং প্রবৃত্তি পূরণের কোনো আকাঙ্ক্ষা থাকে না। সুতরাং, ক্ষুধা মানুষের মাঝে স্বাভাবিকভাবে ভেতর থেকে আসে এবং এটি বিদ্যমান থাকার জন্য কোনো বাহ্যিক বাস্তবতা (external motive) প্রয়োজন হয় না। অতঃপর জৈবিক চাহিদা পূরণের আকাঙ্ক্ষা মানুষ নিজ থেকেই অনুভব করে, যদিওবা বাহ্যিকভাবে এটি করার জন্য কিছু নেই। তবে, বাহ্যিক উপাদান ক্ষুধাকে উস্কে দিতে পারে। সুতরাং, মজাদার খাবার আমাদের ক্ষুধাকে উস্কে দিতে পারে বা কোনো মজাদার খাবারের আলাপ যদি আমরা করি তাও ক্ষুধাকে উস্কে দিতে পারে। কিন্তু যৌন আকাঙ্ক্ষা নিজ থেকে তাড়িত হয় না, বরং একে উস্কে দেবার জন্য বাহ্যিক কোনো কিছুর প্রয়োজন হয়। তাই, প্রবৃত্তির যে অনুভুতি তৃপ্ত হতে চায় তা মোটেও মানুষের নিজের মধ্য হতে উদ্ভুত হয় না; আর মানুষ তা অনুভুব করে না যতক্ষন কোনো বাহ্যিক উপাদান তা তাড়িত করে। সুতরাং, যৌন সম্পর্কের জন্য কোনো আকাংক্ষা থাকবে না, কিংবা কোনো অনুভুতি থাকবে না যতক্ষন না মানুষ কোনো ভৌত বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করবে যা এই অনুভুতির সূচনা করবে; অথবা কোনো ব্যক্তি তার সম্মুখে কিছু বাস্তবতা আলোচনা করতে পারে যা এই অনুভুতিকে উস্কে দিতে পারে; অথবা কোনো বোধ তার মাথায় আসতে পারে যা তার মাঝে তাড়িত করবার জন্য কিছু ধারণার জন্ম দিতে পারে। সুতরাং, যতক্ষন না কোনো ভৌত বাস্তবতা কিংবা চিন্তা থাকছে, ততক্ষন পর্যন্ত এই অনুভুতি তাড়িত হবে না।

    তাই বলা যায়, শুধুমাত্র প্রবৃত্তির উপস্থিতি মানুষকে উদ্বিগ্ন করে না। বরং অনুভুতির যে তাড়না তৃপ্ত হতে চায় তা উদ্বিগ্নের কারণ হয়ে দাড়ায় যখন তা তৃপ্ত হয় না। যদি তৃপ্তি পূরণের কোনো উস্কে দেয়া অনুভুতি না থাকে, তাহলে কখনোই কোনো উদ্বেগ থাকবে না। তাই যৌন চাহিদা পূরণের অভাব থাকলে ব্যক্তির কোনো উদ্বেগের বিষয় নেই, এবং একে দমন করারও কোনো প্রয়োজন নেই যদি একে আলোড়িত করবার জন্য কোনো বাস্তবতা না থাকে। তাই জনগণের মাঝে যৌন চিন্তার দিকে উদ্রেক ঘটায় করে এমন বইপত্র, নাটক-সিনেমার প্রচার–প্রসার এক ধরনের নির্বুদ্ধিতা ও অদুরদর্শিতা। একইভাবে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার বাস্তব পরিবেশ বজায় রাখা যা প্রজনন প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে একধরনের নির্বুদ্ধিতা ও অদূরদর্শী। কারণ এর অর্থ দাড়ায় যে বাস্তবতা একে উস্কে দেয় তা তৈরি করা, এবং উদ্বেগ তৈরি করা যতক্ষন না তা প্রশমিত হয়, এবং পরবর্তীতে আবার সেই বাস্তবতা তৈরি করা যা একে পুনরায় উস্কে দিবে, সুতরাং তা তৃপ্তির জন্য সবসময় তাড়িত হতেই থাকে। এভাবে সে (যৌন তাড়নাকে) প্রশমিত করবার চিন্তায় নিমজ্জিত থাকে কিংবা অতৃপ্ততা জনিত উদ্বিগ্নতায় ভোগে। এটি নিশ্চিতই বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতন এবং স্থায়ী অস্থিরতা। তাই, নারী-পুরষের অবাধ মেলা–মেশা সমাজের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর, কারণ তা (মানুষের যৌন তাড়নাকে) তৃপ্ত করবার চেষ্টার মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং একে প্রশমিত করবার জন্য মস্তিস্ককে ব্যস্ত রাখে কিংবা ব্যক্তিকে (অতৃপ্ততাজনিত) উদ্বিগ্নতায় ক্রমাগত ভোগায়। তাই যৌনতায় পরিপূর্ণ বই, (গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা)-এর ব্যপক প্রসার সমাজের জন্য মারত্মক ক্ষতিকর।

    যৌনতাকে ইতিবাচকভাবে সুসংগঠিত করার জন্য ইসলাম বিয়ে ও বিয়ে সংক্রান্ত সকল বিশদ ব্যবস্থার ধারনা নিয়ে এসেছে। ব্যক্তি ও তার মধ্যকার যাবতীয় সেসব বিষয় যা তার প্রজনন অনুভুতিকে উস্কে দেয় এবং তৃপ্ত হতে দেয় না তা বন্ধ করতে এসেছে, এবং ব্যক্তি তার মধ্যকার যাবতীয় যেসব বিষয় তাকে তার অধিকাংশ সময়ে তার প্রজনন প্রবৃত্তিকে তৃপ্ত করবার কাজের চিন্তায় ব্যস্ত রাখে তা বন্ধ করতে এসেছে। তাই ইসলাম একজন পুরুষের জন্য তার স্ত্রী ব্যতিত অন্য গায়রে মাহরাম নারীর সাথে একান্ত অবস্থান (খালওয়া) কে নিষিদ্ধ করেছে। কেননা এটি প্রজনন প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে যা সে তার গ্রহণ করা ব্যবস্থা অনুযায়ী পূরণ করতে পারে না। এটি তার মধ্যে উদ্বেগের কারণ তৈরি করবে, কিংবা সে অশোভনভাবে ব্যবস্থা লংঘন করবে। বিশুদ্ধ হাদীসে (খালওয়ার) নিষেধাজ্ঞা পরিস্কারভাবে এসেছে,

    যেখানে আল্লাহর রাসূল (সা) বলেছেন,

    لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ

    “তোমাদের কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সাথে একান্তে অবস্থান না করে যদি না তার সাথে মাহরাম কেউ থাকে।”

    তিনি (সা) আরো বলেছেন,

    لاَ يَدْخُلَنَّ رَجُلٌ بَعْدَ يَوْمِى هَذَا عَلَى مُغِيبَةٍ إِلاَّ وَمَعَهُ رَجُلٌ أَوِ اثْنَانِ

    “আজ থেকে কোন পুরুষ কোন নারীর সাথে গোপনে একা থাকতে পারবে না যদি না তার সাথে একজন পুরুষ বা দুইজন উপস্থিত থাকে।”

    অন্য একটি হাদীসে তিনি (সা) ব্যাখা করেছেন, খালওয়ার ক্ষেত্রে শয়তান পুরুষ ও নারীকে প্ররোচিত করে কারণ তখন তৃতীয় জন থাকে শয়তান।

    রাসূল (সা) বলেন,

    لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ

    “কোনো পুরুষ নেই যে কোনো নারীর সাথে একাকী থাকলে, শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয়।”

    সুতরাং, ইসলামের বিধান হচ্ছে যা প্রজনন প্রবৃত্তিকে তাড়িত করে এবং তাদের অনুভুতিকে উস্কে দেয় তা মানুষকে অবশ্যই অপসারণ করতে হবে।

    Taken from the Book “Islamic Thought”

  • ইয়েমেনের স্কুল শিশু হত্যাকারী কসাই এবং উম্মাহর তেল সম্পদ লুণ্ঠনকারী পাকিস্তানে অবশ্যই স্বাগতম না

    ইয়েমেনের স্কুল শিশু হত্যাকারী কসাই এবং উম্মাহর তেল সম্পদ লুণ্ঠনকারী পাকিস্তানে অবশ্যই স্বাগতম না

    সংকোচন নীতির আওয়াজ ও হৈচৈ তুলে, বাজওয়া-ইমরান সরকার সৌদি শাসক বিন সালমান (‘এমবিএস’) -কে স্বাগত জানানোর জন্য কোন খরচ বাদ দিচ্ছে না, উম্মাহর সম্পত্তি মুক্তভাবে খরচ করছে। ওদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে, কিন্তু পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জেএফ-১৭ জেট এর মাধ্যমে এমবিএস এর জেট এর প্রোটোকল প্রদানের ক্ষেত্রে নির্বিচারে জ্বালানী খরচ করছে। অথচ দখলকৃত কাশ্মিরের মুসলিমদের সামরিক সাহায্য হতে বঞ্চিত করছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ব্যস্ত রাখছে এমবিএসকে নিরাপদ করার জন্য, যদিও তার শতাধিক সৌদি আরবীয় রয়েল গার্ড রয়েছে। অথচ গৃহায়নের জন্য জনগণের উপর অভিশপ্ত সুদ ভিত্তিক ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। সরকার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন সাজাচ্ছে, ওদিকে এমবিএস ১১০০ কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী ব্যক্তি, পাঁচ ট্রাক ব্যক্তিগত মালপত্র, আশি কন্টেইনার লাগেজ এবং ডজনখানেক গাড়ি আনয়ন করেছে। পাশাপাশি সম্পূর্ণরূপে দুটি পাঁচ তারকা হোটেল এবং তিন শত ল্যান্ড ক্রুসার গাড়ি বুকিং করেছে। আর এগুলো আবার পাকিস্তানের এয়ারস্পেস, ট্র্যাফিক এবং ফোন যোগাযোগের ব্যাঘাতের অর্থনৈতিক খরচ ব্যতিত হিসাব।

    কে এই এমবিএস যাকে এরকম ঢের খরচ ও বিঘ্ন ঘটিয়ে স্বাগত জানানোর জন্য উপযুক্ত মনে করে সরকার?! এমবিএস হচ্ছে জামাল খাশুগজির খুনী, যে পাকিস্তান সফর করছে তার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ভেঙ্গে দেয়ার উদ্দেশ্যে, যাতে তিনি ভালভাবে বাজওয়া-ইমরান এর প্রভু, আমেরিকার সেবা করতে পারেন। ইয়েমেনের নৃশংস সৌদি সামরিক হস্তক্ষেপের কারিগর এই এমবিএস, মুসলিমদের বিশুদ্ধ রক্ত ঝরিয়ে, পৃথিবীর চার প্রান্তে এর জনগণকে বিক্ষিপ্ত করে দিয়েছে এই এমবিএস। ‘ভিশন ২০৩০’ এর প্রকৌশলী এই এমবিএস, যা হারামাইনের বরকতময় জমির উপর ধ্বংসাত্মক পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কবজা তৈরির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এমবিএস সেই সৌদি শাসক পরিবারের অংশ যা উম্মাহর তেল সম্পদকে দখল করে আছে, যদিও ইসলাম একে উম্মাহর সুবিধার জন্য জনসাধারণের সম্পত্তি হিসাবে ধার্য করেছে। এমবিএস সেই সৌদি ‘রাজতন্ত্রের’ ভবিষ্যত যা আল্লাহ তা’আলা যা নাযিল করেছেন তা দ্বারা শাসন করে না, যে আলেমদের কারাবন্দী ও হত্যা করে এবং মসজিদ আল-আকসার দখলদারদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। আর এমবিএস হচ্ছে অর্থনৈতিক মাফিয়ার মুখ্য ব্যক্তি, যা এখন বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগের নামে পাকিস্তানে অবস্থিত উম্মাহর সম্পদকে কুক্ষিগত করতে চায়।

    হে পাকিস্তানের মুসলিমগণ! আমাদের শাসকগণ সারা মুসলিম বিশ্ব জুড়ে আমাদের জন্য একটি বোঝা। তারা আমাদের সম্পদ থেকে খরচ করার ক্ষেত্রে একইরকম, যেমন এটি তাদের পিতৃপুরুষদের উত্তরাধিকারী সম্পদ। আমাদের দ্বীন, ভূমি ও সম্পদের লঙ্ঘন সত্ত্বেও ঔপনিবেশিক স্বার্থকে এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে তারা এক। আসুন আমরা আর আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন ও আমাদের জনগণের হত্যার দর্শক না হই। নিপীড়নের মুখে ধৈর্য কোনো গুনাবলী না, এটি পাপ ও মূর্খতা। আসুন আমরা দৃঢ়তার সাথে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত এর সমর্থকদের সাথে কাজ করি যাতে যুলুমের শাসনের চুড়ান্ত এক পতন ঘটে। আহমদ হুজাইফা বিন ইয়ামান এর বরাতে রাসূলুল্লাহ (সা) হতে বর্ণনা করেন,

    «ثُمَّ تَكُونُ مُلْكًا جَبْرِيَّةً فَتَكُونُ مَاشَاءَ اللَّهُ أَنْ تَكُونَ ثُمَّ يَرْفَعُهَا إِذَا شَاءَ أَنْ يَرْفَعَهَا ثُمَّ تَكُونُ خِلَافَةً عَلَى مِنْهَاجِ النُّبُوَّةِ ثُمَّ سَكَتَ»

    “এরপর আসবে জবরদস্তির শাসন, তা থাকবে যতক্ষন আল্লাহ চান তা থাকুক, এরপর আল্লাহ এর পতন ঘটাবেন যখন তিনি তা চান, এরপর আসবে নবুয়্যতের আদলের খিলাফত।” এরপর তিনি চুপ থাকলেন।”  

  • ইমরান খান IMF-কে সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করছে

    ইমরান খান IMF-কে সহযোগিতার মাধ্যমে পাকিস্তানকে ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করছে

    ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আইএমএফ প্রধানের সাথে ইমরান খান এর বৈঠকটির দ্বারা উপনিবেশবাদীরা পাকিস্তানের জন্য নতুন বিপদ নিয়ে আসছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রকাশিত ফিল্ড ম্যানুয়াল, সেপ্টেম্বর, ২০০৮ এর একটি লেখা অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী উপনিবেশিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ক্ষতির একটি বড় উত্স হিসেবে বিবেচনা করে, যেমন IMF, বিশ্বব্যাংক ও OECD আর্থিক, অগতানুগতিক, “সাধারণ সহ বৃহৎ আকারের যুদ্ধকালীন সময়ের অস্ত্র”। প্রকৃতপক্ষে, এটি একটি সত্য যে আইএমএফ একটি ঔপনিবেশিক হাতিয়ার যা ঔপনিবেশিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কোনও দেশকে তার পায়ে দাঁড়াতে ঋণ গ্রহণ করতে কখনও অনুমতি দেয় না। ক্ষমতায় আসার আগেই ইমরান খান এই সত্যটি স্বীকার করেছিলেন। ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান এ প্রকাশিত, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ তারিখে ইমরান খান সতর্ক করে দিয়েছিলেন, “একটি দেশ যা সাহায্যের উপর নির্ভর করে! মৃত্যু তার চেয়ে ভাল। এটি আপনাকে আপনার সম্ভাব্যতা অর্জনে বাধা দেয়, ঠিক যেমন ঔপনিবেশিকতা করেছিল। সাহায্য অপমানজনক। যত দেশ আমূল্যে সাজানো হয়েছে।মি জানি যারা IMF বা বিশ্বব্যাংকের কর্মসূচী গ্রহণ করেছে তা শুধুমাত্র দরিদ্রকে আরো দরিদ্র করেছে এবং ধনীকে আরো ধনী করেছে।” তবুও, ইমরান খান উত্সাহ সহকারে ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৯-এ টুইট করেছেন “IMF এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিন লাগার্ডের সঙ্গে আজ আমার বৈঠকে টেকসই উন্নয়নের পথে দেশকে প্রবেশ করাতে গভীর কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভংগি ছিল, যাতে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলি সুরক্ষিত থাকে।” গভীর কাঠামোগত সংস্কার (Deep Structural Reform) উদযাপনের কারণ হওয়া থেকে অনেক দূরে। তারা ঔপনিবেশিক ফর্মুলা ও ওয়াশিংটনের ঐক্যমত অনুযায়ী পরিচালিত, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ও স্থানীয় দেশের মুদ্রা, শিল্প ও কৃষির মূল্যে সাজানো হয়েছে। 

    হে পাকিস্তানের মুসলিমগণ! ইমরান খান নিশ্চিতভাবেই প্রমাণ করেছেন যে, শুধুমাত্র চেহারা পরিবর্তন কখনও পাকিস্তানে পরিবর্তন আনবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত পাকিস্তানে মানবরচিত আইনের ব্যবস্থা বোঝা হয়ে আছে, ততক্ষন এটি ক্রমাগত ভোগান্তিতে থাকবে। প্রত্যেক পূর্ববর্তী শাসককে বর্তমানের তুলনায় আরও ভালো মনে হবে, কেবলমাত্র এই কারণে যে পাকিস্তান ক্রমাগত উপনিবেশিক ফাঁদে আরো গভীরভাবে ডুবে যাচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে কর বৃদ্ধি, ভর্তুকির হ্রাস, দুর্বল রুপি এবং হাড়ভাঙা দামবৃদ্ধির যাতাকলে পিষ্ট। যতদিন পাকিস্তান IMF এর সদস্য থাকবে, বাস্তবতা আরও খারাপ হবে। এখন আমাদের সকলের উপর বর্তায় যে আমরা খিলাফতের আহ্বানকারীদের দাবির সমর্থন করবো যাতে পাকিস্তান সব ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠানকে ছেড়ে দেয়, আইএমএফ কিংবা জাতিসংঘ, কারণ এসব উপাদানের মাধ্যমে কাফেরগণ আমাদের কার্যাবলীর উপর কর্তৃত্ব রাখতে পারে এবং এগুলো মহা ক্ষতির উৎস।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ﴿وَلَن يَجْعَلَ اللَّهُ لِلْكَافِرِينَ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ سَبِيلًا﴾  

    “এবং কিছুতেই আল্লাহ কাফেরদেরকে মুসলমানদের উপর বিজয় দান করবেন না” [সূরা নিসা: ১৪১] 

    রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,  

    «لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ»  

    “কোনো ক্ষতি নয়, কোনো ক্ষতির বদলে ক্ষতিও নয়” [মুওয়াত্তা ইবন মালিক, ইবন মাজাহ] 

    আমাদের সকলের জন্য বর্তায় যে আমরা রাত-দিন একত্র করে হলেও সেই ব্যবস্থা তথা নবুয়্যতের আদলের খিলাফতের জন্য কাজ করি যা পাকিস্তানকে তার পূর্ণ সম্ভাব্যতা অর্জন করতে সহায়তা করবে।