Home

  • তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ

    হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। 

    দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।

    দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-

    يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ 

    তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]

    দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।

    সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি  ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,

    وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ  

    আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]

    তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

    وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا 

    আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]

    তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।

    আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।

    নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।

    আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:)  বলেন,

    মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।

    ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,

    দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা  ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম  করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়। 

    ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।

    একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।

    ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,

    একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ  দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-

    اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ  

    নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]

    তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন। 

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

    আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,

    وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا

    আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]

    আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।

     إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

    নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]

    وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ

    যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]

    আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।

    আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।

    উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”

    আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,

    “‏الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر‏”

    “দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)

    এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।

    ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”

    আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর  চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি। 

    উল্ল্যেখিত আয়াতটি  অস্বীকার করা,

    وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ

    আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]

    নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,

    وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا

    আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]

    وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا

    আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]

    জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,

    নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,

    إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ

    সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]

    সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।

    অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,

    وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

    আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]

    فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ

    আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]

    বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,

    فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

    অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:

    أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ

    তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?

    আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:

    আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: 

    “খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”

    আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।

    আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:

    তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”

    আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:

    তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”

    ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”

    হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

    তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”

    তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,

    يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ

    হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]

  • একমাত্র খিলাফত শাসনব্যবস্থাই অর্থপাচার রোধ করে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে

    একমাত্র খিলাফত শাসনব্যবস্থাই অর্থপাচার রোধ করে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারে

    সাম্প্রতিক সময়ে গ্লোবাল ফিনেনশিয়াল ইন্টেগ্রিটি নামক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ দক্ষিন এশিয়ার মধ্যে অর্থ পাচারে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। বৈশ্বিকভাবে ১৯ তম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের এক বছরেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয় ৫ শ’ ৯০ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পাচারের অর্থের বেশিরভাগই গেছে আমদানি-রফতানির বাণিজ্যের আড়ালে। ১৫ সালের আগের এগারো বছরে পাচার হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৮৬ হাজার কোটি টাকা। (কালের কন্ঠ ২৯/১/২০১৯) 

    দেশ থেকে অতিমাত্রায় অর্থ বিদেশে চলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারন হল বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী শাসকেরা ৪৯ বছরেও দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে নি। 

    মূল সমস্যা নিয়ে আলোচনা না করে ঢালাওভাবে অর্থপাচারের দায় ফেলা হয় হুন্ডি, ভিওআইপি ব্যাবসার উপরে। কিন্তু আলোচনা করা হয় না কেন জনগন দেশে টাকা রাখতে চায় না। এতে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অরাজকতাই দায়ী তা সামনে আসে না।

    দেশে বিনিয়োগ ও ব্যাবসা-বানিজ্যের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ, উৎপাদনমুখী অর্থনীতির জন্য সহায়ক অবকাঠামো, উন্নত শিক্ষা ও চিকিৎসা এবং শক্তিশালী স্থানীয় ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা যার মাধ্যমে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি সহ দেশের অভ্যন্তরে প্রয়োজনীয় পন্য সরবরাহ করা যায়; এর কিছুই এদেশের শাসকশ্রেনী নিশ্চিত করতে পারে নি বরং ব্যর্থ হয়েছে। 

    দেশের অর্থনীতির প্রতি এরুপ অবহেলা প্রদর্শন করে, দুর্নীতিতে বিরল নজির স্থাপন করে, জনগণের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে বরঞ্চ ‘অর্থপাচার দেশের অর্থনীতিতে কোন প্রভাব ফেলবে না’ বলে বক্তব্য দিয়েছে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।(যুগান্তর, ১৯/১/২০১৯) এভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ শাসকেরা এদেশের জনগনের সাথে প্রতারনা করেই যাচ্ছে,এবং জনগনের স্বার্থকে উপেক্ষা করেই যাচ্ছে। 

    দেশে আওয়ামী-বিএনপি কোন্দলে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারনে ব্যাবসা বানিজ্যে তীব্র মন্দা বিনিয়োগের পরিবেশ নেতিবাচক হচ্ছে। দেশে চাদাবাজি, দূর্নীতি, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর গুন্ডাবাহিনীর তান্ডবে মানুষ বাধ্য হচ্ছে যেকোন উপায়ে নিজেদের অর্থ সম্পদ বাইরের দেশগুলোতে পাঠিয়ে রক্ষা করতে। দেশে বিনিয়োগ না করে বরং বিদেশে বিনিয়োগ করতে। দেশের জ্বালানী সম্পদ ব্যাবহার করে ভারী ইন্ডাষ্ট্রি গড়ে তোলার জন্য যে সুউচ্চ ভিশন তা বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসকদের না থাকায়, বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না, চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। বরঞ্চ আমাদের শাসকেরা এদেশের জ্বালানী খাতকে পশ্চিমা কোম্পানীগুলোর হাতে তুলে দিয়েছে, ফলে জ্বালানীর দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমান্বয়ে। এর ফলে দেশে পন্য উৎপাদন ব্যয়বহুল হওয়ায়, দেশ আমদানীমুখী হয়ে পড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই আমদানীর প্রভাবে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

    এছাড়াও ব্যাবসা বানিজ্যে নানাবিধ অতিরিক্ত কর আরোপ করার কারনেও দেশে বিনিয়োগে সদিচ্ছার অভাব দেখা দিচ্ছে। করের হাত থেকে টাকা বাচাতে তা পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে সুইজারল্যান্ড সহ বিভিন্ন ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ দেশগুলোতে।

    দেশের শিক্ষার মান না থাকায় অন্য দেশে পড়াশোনা ও তার করতে যাচ্ছে প্রচুর ছাত্র, যাদের বেশিরভাগই বিদেশে পড়শোনা শেষ করে সেখানেই চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রতিবছরই মানুষ হচ্ছে বিদেশমুখী। যার ফলে প্রচুর অর্থ দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

    এদেশের গণতান্ত্রিক শাসকরাও দূর্নীতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচার করছেন। প্রকৃতপক্ষে আমাদের শাসকেরা জনগণের কল্যান সাধনের কোন তোয়াক্কাই করে না বরঞ্চ নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যাস্ত।

    সমাধান 

    একমাত্র নবুয়্যতের আদলের খিলাফতই পারে ক্রমবর্ধমান এই অর্থপাচার (capital flight) ঠেকাতে। 

    ১। একমাত্র খিলাফত রাষ্ট্রই এক খলিফার নের্তৃত্বে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। 

    রাসুল (সা) বলেন, যখন একজন ইমামের হাতে বাইয়াত সম্পূর্ন হয়ে যায় তখন তাকে যথাসাধ্য মান্য করবে, এমতাবস্থায় যদি কেউ তার সাথে বিরোধ করতে আসে, তবে দ্বিতীয়জনকে হত্যা করবে।[সহিহ মুসলিম হাদিস নং ১৮৪৪] 

    তাই রাজনৈতিক অরাজকতা সৃষ্টির কোন সুযোগ থাকবে না।  

    ২। এছাড়াও দেশের অফুরন্ত সম্পদ কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী অর্থনীতি নির্মান করবে খিলাফত, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। যেভাবে ১৪০০ বছরের একটি শক্তিশালী অর্থনীতি তৈরি করেছিল খিলাফত। 

    খিলাফত রাষ্ট্র দেশের জ্বালানী খাতকে গণমালিকানাধীন সম্পদে পরিনত করবে, এবং দেশের জ্বালানী বৈদেশিক শক্তির হাত থেকে মুক্ত করে এর মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ভারী শিল্প কাঠামো গড়ে তুলবে। ফলে পর্যাপ্ত জ্বালানী সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। শুধুমাত্র তাই নয়, এটি খিলাফত রাষ্ট্রের ভিশন কারণ ভারী সমরশিল্প গড়ে তোলা, এবং উন্নত প্রযুক্তির বিকাশ সাধন খিলাফত রাষ্ট্রের জন্য ফরয, কেননা আল্লাহ বলেন, 

    আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যের মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন প্রভাব পড়ে আল্লাহর শুত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপর ও যাদেরকে তোমরা জান না; আল্লাহ তাদেরকে চেনেন। বস্তুতঃ যা কিছু তোমরা ব্যয় করবে আল্লাহর রাহে, তা তোমরা পরিপূর্ণভাবে ফিরে পাবে এবং তোমাদের কোন হক অপূর্ণ থাকবে না”। [আনফাল ৬০]  

    ফলে দেশের অর্থ বাইরে যাওয়ার হার কমে আসবে। কেননা এভাবে খিলাফত রাষ্ট্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। 

    ৩। খিলাফত রাষ্ট্র জনগনের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা প্রদান করবে, এতে করে সম্পদ ও অর্থের পাচার থেমে যাবে। আবু বাকরা (রা) রাসুল (সা) থেকে বর্ননা করেন,

     أَلاَ إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ، كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا، فِي بَلَدِكُمْ هَذَا، فِي شَهْرِكُمْ هَذَا  

    “নিশ্চই তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান আল্লাহ পবিত্র ও হারাম করেছেন যেমন তোমাদের এই দিন, এই শহর, এই মাস”। [বুখারী, হাদিস নং ৪৪০৩, আসসুনাসুস সাগির লি বাইহাকি, হাদিস নং ৩১২১] 

    ৪। খিলাফত রাষ্ট্র খারাজ, জিজিয়া ও উশর ছাড়া অন্য কোন কর আরোপ করবে না। কেননা আয়কর, এবং বিভিন্ন ধরনের শুল্ক ইসলাম হারাম ঘোষনা করেছে। শুধুমাত্র ব্যাবসায়িক পন্য থেকে এর যাকাত নেওয়া হবে, অন্য কোন কর থাকবে না। ফলে জনগন করের বোঝায় জর্জরিত হয়ে অর্থ বিদেশে পাঠাবে না।রাসুল সা বলেছেন, 

    «لَا يَدْخُلُ صَاحِبُ مَكْسٍ الْجَنَّةَ» 

    “অবৈধভাবে কর আদায়কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না” [মুসনাদ আল আহমাদ, হাদিস নং ১৭০২৩] 

    ৫। খিলাফত রাষ্ট্র উন্নত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করবে, যেরকমভাবে পূর্বে যখন ইউরোপ অন্ধকার গহ্বরে নিমজ্জিত ছিল, তখন খিলাফত রাষ্ট্রে ফেয, কর্ডোভা, আলেক্সান্দ্রিয়া, বাগদাদ আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের পীঠস্থান ছিল। তাই ইউরোপ থেকে ছাত্র এসে খিলাফত রাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়ালেখা করত। 

    ৬। খিলাফত রাষ্ট্র উন্নত চিকিৎসার ব্যাবস্থা করবে, খিলাফত রাষ্ট্রের খসড়া সংবিধানে ১৬৪ ধারায় রয়েছে: 

    ‘রাষ্ট্র সকলের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যাবস্থা করবে’। 

    কেননা রাসুল (সা) মদীনায় ডাক্তার নিয়োগ করেছিলেন। তাই খিলাফত রাষ্ট্রে বাইতুল মাল চিকিৎসাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার ব্যাবস্থা করবে। এতে করে দেশের অর্থ বিদেশে যাবে না। 

    ৭। এছাড়াও, খিলাফত রাষ্ট্র দূর্নীতি রোধে সর্বত্র তাকওয়ার পরিবেশ নিশ্চিত করবে। এতে করে প্রশাসন থেকে শুরু করে সব জায়গায় দূর্নীতি দূর করা সম্ভব হবে। এছড়াও হিসবাহ আদালত সকল পর্যায়ে দূর্নীতি মনিটর করবে যাতে তা কমে আসে। ফলে জনমনে উদ্বিগ্নতা ও আস্থার অভাব (lack of confidence) দূর হবে। অর্থ বাহিরে বিনিয়োগ ও নিরাপত্তার জন্য প্রেরন করার প্রবণতা হ্রাস পাবে। শাসকরা বায়তুল মাল থেকে প্রাপ্ত ভাতার বাইরে কোন ধরনের ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক কার্যক্রমে জড়িত থাকতে পারবে না। তাদেরকে অর্থসম্পদের উপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হবে। যেকোন অনাকাংক্ষিত অর্থ বৃদ্ধি দেখা গেলে তা বাজেয়াপ্ত করে বায়তুল মালে জমা করা হবে। তাই শাসকশ্রেনীর অর্থের পাহাড় গড়ে তা পাচারের সুযোগ খিলাফত রাষ্ট্রে থাকবে না। 

    এবং এভাবেই খিলাফত রাষ্ট্র ইসলামী বিধিবিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত হবে, এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হবে।  

    وَابْتَغِ فِيمَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الآخِرَةَ وَلاَ تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا وَأَحْسِنْ كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ وَلاَ تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّالْمُفْسِدِينَ  

    আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন, তদ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান কর, এবং ইহকাল থেকে তোমার অংশ ভূলে যেয়ো না। তুমি অনুগ্রহ কর, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [কাসাস: ৭৭] 

    লেখক: ইবনুল আযরাক  

  • প্রাগমেটিজম: একটি অনৈসলামি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি

    প্রাগমেটিজম: একটি অনৈসলামি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি

    প্রাগমেটিজম শব্দের কোন যুতসই বাংলা প্রতিশব্দ না পেয়ে এর ইংরেজী পরিভাষাটিই ব্যবহার করছি। শাব্দিক অর্থ নয় বরং এর প্রায়োগিক দিকটি নিয়েই আলোচনা করব। প্রাগমেটিজম বলতে বাস্তবতা প্রবণতাকে বুঝায়। কোন ব্যক্তির চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি নিছক বাস্তবতাই হয় তবে তাকে প্রাগমেটিক বলে। সাধারণত যারা পুঁজিবাদী আদর্শ অনুসারে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা প্রাগমেটিক বা বাস্তবতানুরাগী হয়। কারণ পুঁজিবাদে সুনির্দিষ্ট কোন নীতি নেই, বরং বাস্তবতা থেকে আইন আসে বা বাস্তবতা হল আইনের উৎস। কিন্তু ইসলামে আইনের উৎস হল ইসলামী শরী’আহ-যা সুনির্দিষ্ট। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে এই শরী’আহ পরিবর্তনীয় নয়। সেকারণে একজন মুসলিম বিভিন্ন বাস্তবতায় সঙ্গতিপূর্ণ অপরিবর্তনীয় শরী’আহ এর দলিল থেকে তার করণীয় নির্ধারণ করে। সে কখনওই বাস্তবতা থেকে তার করণীয় ঠিক করবে না। বাস্তবতা এখানে চিন্তা বা সিদ্ধান্তের উৎস নয়, বরং বিষয়বস্তুমাত্র। সে সঙ্গতিপূর্ন অপরিবর্তনীয় শরী’আহ থেকে বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য হুকুম গ্রহণ করবে। বিধায় একজন ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী প্রাগমেটিক হলেও মুসলিম কখনওই প্রাগমেটিক হতে পারে না। মুসলিম প্রাগমেটিক হলে সে হুকুম শরী’আহ ব্যবহার করে বাস্তবতা পরিবর্তন করতে পারবে না, বরং সেই বাস্তবতা অনুসারে নিজেই পরিবর্তিত হয়ে যাবে। অনেকে এ আলোচনা শুনে মনে করতে পারেন তাহলে একজন মুসলিম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে কী বিবেচনায় রাখবে না? উত্তর হল, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে, কিন্তু বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত হওয়া যাবে না। বাস্তবতাকে বিবেচনায় না রাখলে সে কী করে বাস্তবতাকে পরিবর্তন করবে?

    কুরআন এবং সুন্নাহতে এ বিষয়ে অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য রয়েছে। পবিত্র কুরআনে পূর্বের অনেক নবী রাসূলদের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ বর্ণণা করা হয়েছে। নিশ্চয় এগুলো থেকে উম্মাতে মোহাম্মদীর জন্য শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত রয়েছে। অন্যথায় এগুলো কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা উল্লেখ করতেন না। আমরা দেখি সাইয়্যুদনা ইবরাহীম (আ) আল্লাহ’র নির্দেশে পরাক্রমশালী বাদশাহ নমরুদের পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে কিরূপ অবস্থান নিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন একা। অনেকে তার এই একাকী অবস্থান নেয়াকে বাস্তবানুগ বা প্রাগম্যাটিক না ও বলতে পারেন। কিন্তু সাইয়্যুদনা ইবরাহীম (আ) আল্লাহ’র নির্দেশ পালনকে বাস্তবতার উপর প্রাধান্য দিয়েছিলেন। একারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সাইয়্যুদনা ইবরাহীম (আ) কে নমরুদের ভয়ংকর অগ্নিকুন্ডের মধ্যে হেফাজত করেছিলেন এবং নমরুদকে নগন্য মশা দিয়ে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। সাইয়্যুদনা মুসা (আ) এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তিনি পরাক্রমশালী ফেরাউনকে আল্লাহ’র একত্ববাদ বা তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছিলেন। তখন শক্তির দিক থেকে মুসা (আ) ফেরাউনের সমকক্ষ ছিলেন না বলে প্রাগমেটিক লোকেরা তার এ আচরণকে ভুল ভাবতে পারেন। ফেরাউনের ভয়ে মুসা (আ)কে প্রায় দশ বছর নির্বাসনেও কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ’র রাস্তায় দৃঢ় থাকায় দিনশেষে আল্লাহ মুসা (আ) কে বিজয়ী করেছেন এবং অত্যাচারী ফেরাউনকে বিপর্যস্ত করেছেন। একই কথা আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা) এর ক্ষেত্রেও সত্য। মক্কায় অত্যন্ত প্রতিকূল একটি পরিবেশে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং সাহাবী (রা) ইসলামের দাওয়াত বহন করেছেন। এক্ষেত্রে তারা অসম প্রতিদ্বন্দীতার মুখোমুখি হয়েছেন। মক্কার কাফেরদরে কর্তৃক মিথ্যা প্রপাগান্ডা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, হত্যার বাস্তবতায় আপোসের প্রস্তাবে রাজী হয়ে তারা প্রাগমেটিক হননি। রাসূল (সা) এবং সাহাবীগন বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে একমাত্র শরী’আহ’র প্রতি দায়বদ্ধ থেকেছেন। যার পরিণতিতে তারাই বিজয়ী হয়েছেন। কারণ বিজয় তো হুকুম প্রদানকারী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার পক্ষ থেকেই আসে। আর তিনিই বাস্তবতাকে মুমিনদের অনুকূলে এনে দেন। তিনিই ভয়কে নিরাপত্তা ও সম্মান দ্বারা প্রতিস্থাপন করেন।

    এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) মি’রাজের ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য। মানুষের ক্ষুদ্র জ্ঞানে অসম্ভব একটি সফর ছিল ইসরা ও মিরাজ। রাসূল (সা) এমন একটি সময়ে মিরাজে গিয়েছিলেন যখন বিচক্ষণ স্ত্রী খাদিজাতুল কুবরা (রা) ইন্তেকাল করেছেন এবং আশ্রয় দানকারী চাচা আবু তালিবও ইইলোক ত্যাগ করেছিলেন। আর মক্কার পরিস্থিতি ছিল দারুণভাবে প্রতিকূল। এই ভয়ংকর প্রতিকূল পরিবেশে ইসরা ও মিরাজ থেকে ফিরে এসে রাসূল (সা) এ বিষয়টি আল্লাহ’র নির্দেশে মক্কাবাসীকে জানাতে চাচ্ছিলেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় আপাতত না জানানোর ব্যাপারে তার তৎকালীণ স্ত্রী পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু রাসূল (সা) প্রাগমেটিক না হয়ে আল্লাহ’র নির্দেশে তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু আবু জাহেলকে দিয়ে মিরাজের বিষয়টি প্রচার করা শুরু করলেন। কাফেরগণ ইসরা ও মিরাজের ঘটনাকে বাস্তবতাবিবর্জিত ও অসুস্থ মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা বলে প্রপাগান্ডার নতুন জাল বুনতে লাগল। এমতাবস্থায় একদিন কাবা’র সামনে কাফেররা রাসূল (সা)কে বায়তুল মাকদিস সর্ম্পকে বর্ণণা দিতে বলল। আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বায়তুল মাকদিসকে রাসূল (সা) এর সামনে এনে রাখল এবং তিনি (সা) দেখে দেখে কাফেরদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন এবং কাফেররা সেদিন নতশিরে অপমানিত হয়ে চলে গিয়েছিল। প্রাগমেটিক না হয়ে আল্লাহ’র নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করায় সেদিন রাসূল (সা) কাফেরদের ষড়যন্ত্রের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পেরেছিলেন।

    বদর, খন্দক, তাবুক প্রভৃতি জিহাদের বিজয়ও অসম প্রতিদ্বন্দীতার মাধ্যমে এসেছিল। অর্থাৎ সেখানে কাফেরদের সংখ্যা, অস্ত্র ও আয়োজনের বিপরীতে মুসলিমদের সংখ্যা ও প্রস্তুতি ছিল অনুল্লেখযোগ্য। তারপরও বাস্তবতা নয়, তাওয়াক্কুল ও শরী’আহকে প্রাধান্য দেয়ায় আল্লাহ বিজয়ী করেছিলেন।

    নবী-রাসূলদের এসব ঘটনা শুনার পর অনেক প্রাগমেটিক লোক এগুলো নবীদের মত বিশেষ মানুষ দ্বারা সম্ভব হিসেবে দেখতে পারে। এবং আমাদের মত সাধারণ মানুষের জন্য এইরকম হুকুম মানা বাস্তবসম্মত নয় বলে যুক্তি দেখাতে পারে। কিন্তু আমরা দেখেছি রাসূল (সা) ওফাতের পর সাহাবী (রা), তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনগন এবং তৎপরবর্তী মুসলিমগণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাগমেটিক ছিলেন না, বরং শরী’আহ’র অনুবর্তী ছিলেন। রাসূল (সা) এর ওফাতের পর আবু বকর (রা) যখন ধর্মত্যাগ, ভন্ডপীর, যাকাত অস্বীকারকারীদের উদ্ভব হয়েছিল তখন তিনি প্রাগমেটিক না হয়ে এদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। যদিও সেসময় উমর (রা) আবু বকর (রা) কে মদীনায় উম্মুল মুমিনীনদের অরক্ষিত রেখে বাইরে গিয়ে মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সেই উমর (রা) স্বীকার করেছিলেন যে, আবু বকর (রা) এর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। কারণ তিনি বাস্তবতা দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে তাওয়াক্কুলের সাথে শরী’আহ মেনে করণীয় নির্ধারণ করেছিলেন।

    ইসলামের ইতিহাসে তারপর অসংখ্য বিজয় এসেছে। মুসলিমগণ তারেক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেন বিজয় নিশ্চিত করেছিল সামান্য কিছু সৈনিক নিয়ে, মহাবীর সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ূবী ক্রুসাডারদের বিশাল সম্মিলিত বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। তারা কেউই নবী ছিলেন না। বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি একক সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোভুক্ত আরও প্রায় ৪০টি দেশ নিয়ে বিগত ১৮ বছর ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে পুরো আফগানিস্তান তালেবানমুক্ত করতে পারছে না। উল্টো তালেবানরা আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশ ভূমি এখনও দখল করে রেখেছে এবং আমেরিকা তাদের সাথে সমঝোতায় বসতে বাধ্য হচ্ছে। তালেবানদের নেই সুপ্রশিক্ষিত বাহিনী, আমেরিকার মত সর্বাধুনিক অস্ত্র-ভান্ডার, পারমাণবিক বোমা, যুদ্ধ জাহাজের বহর। তাহলে বাস্তবতার বিপরীতে গিয়ে কীভাবে এটি সম্ভব হচ্ছে?

    তিরমিযী শরীফের একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,

    ‘‘যখন কেউ আল্লাহকে অখুশী করে মানুষকে খুশী করে,তখন তাকে মানুষের মর্জির উপর ছেড়ে দেয়া হয়। আর যখন কেউ মানুষকে অখুশী করে আল্লাহকে খুশী করে,তখন তাকে মানুষের নির্ভরশীলতা থেকে (আল্লাহ) মুক্ত করে দেন।’’

    সেকারণে ইসলাম বহন করার সময় কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সুন্নাহ’র বাইরে যাওয়া উচিত হবে না। যদি সুন্নাহ’র বাইরে যায় তবে তারা দুনিয়াতে হবে লাঞ্চিত এবং আখেরাতে পাবে মর্মন্তুদ শাস্তি। আর একটি বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে কুরআন এবং সুন্নাহতে রাসূলুল্লাহ (সা) এর উপর যে আদেশসমূহ আমভাবে এসেছে সেগুলো মুসলিম হিসেবে আমরা সবাই মানতে বাধ্য। এক্ষেত্রে নবী কি নবী না, সাহাবী কী সাহাবী না, এটি বিবেচ্য বিষয় নয়।

    “বল,যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস,তাহলে আমার অনুসরণ কর,আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু।”(সূরা আল ইমরান:৩১)

    “‘রাসূল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর,আর যা থেকে তিনি তোমাদের নিষেধ করেন-তা থেকে বিরত হও।”(সূরা হাশর:৭)  

  • উইঘুরের মুসলিমদের ভোগান্তি শেষ হওয়ার এটাই কি সঠিক সময় নয়?

    উইঘুরের মুসলিমদের ভোগান্তি শেষ হওয়ার এটাই কি সঠিক সময় নয়?

    উইঘুরের মুসলিমদের ভোগান্তি শেষ হওয়ার এটাই কি সঠিক সময় নয়?

    চীনকে মনে রাখার মতো শিক্ষা দেয়ার এটি কি উপযুক্ত সময় নয়?

    সাম্প্রতিক মাসগুলিতে আমরা মুসলিম ভুমির পূর্বপ্রান্তের দেশ পূর্ব তুর্কিস্তানের বসবাসকারী উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে চীনের আগ্রাসী নীতির নৃশংস বৃদ্ধির খবর শুনেছি। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুং তথা চীনা কমিউনিস্ট শাসন কর্তৃক ১ লাখেরও বেশি উইঘুর মুসলমানদের হত্যা ও ২৫ হাজার মসজিদ ধ্বংস করার পর চীনের সীমানার সাথে একে যুক্ত করা হয়েছিল। আটলান্টিক ম্যাগাজিন, বিবিসি ও আল-জাজিরার মতো অন্যান্য মিডিয়া দ্বারা প্রকাশিত তদন্তের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, চীন পূর্ব তুর্কিস্তান প্রদেশের প্রায় দশ লক্ষ মুসলিম বন্দী শিবিরে আটক! তদন্তে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতিতে বলা হয়, শিবিরের লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামকে ত্যাগ করার জন্য এই অঞ্চলের উইঘুর মুসলিমদের মগজধোলাই করা, এবং এটি সুপরিচিত যে চীন অন্যতম প্রকাশ্য এক ইসলাম বিরোধী দেশ। ইন্টিলিজেন্স পত্রিকা চীনের ঘোষণাটি প্রকাশ করেছে যে, ইসলাম সংক্রামক রোগ এবং যেকোনো ভাবেই হোক, এমনকি নির্যাতন ও হত্যার মাধ্যমেও চিকিত্সা করা উচিত।

    পূর্ব তুর্কিস্তানে ঘটিত অপরাধগুলো ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। আমাদের ভাইদের সেখানে বন্দী করে ফাঁসি দেওয়া হয়, সিমেন্ট এবং কংক্রিট তাদের মুখের মধ্যে ঢেলে দেওয়া হয়, আমদের বোনদের গর্ভধারণ ও জন্ম দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়, পুরুষদের খোজা করা হয়। কাফির চীনা শাসন গোয়েন্দাগিরির জন্য প্রতিটি গৃহে কাফির চীনা নাগরিককে তাদের প্রতিবেশী রাখে এবং চীনা সংস্কৃতির শিক্ষার অযুহাতে তাদের গোপনীয়তা ও পবিত্রতা উপেক্ষা করে। মুসলিমদের বরকতময় রমজানের রোযা রাখতে বাঁধা দেওয়া হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে, মুসলিমদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের হুমকির মুখে ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। বিবিসি জানায়, চীনা কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে তারা ত্রি-অশুভ বিষয় মোকাবেলা করতে বাধ্য হচ্ছে, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থী মতাদর্শ এবং বিচ্ছিন্নতার জন্য আহ্বান। এসব মিথ্যা স্লোগানগুলির অযুহাতে সরকার বিভিন্ন দমনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।

    পূর্ব তুর্কিস্তানে উইঘুর মুসলিমদের সাথে এসব ঘটছে এবং কেউই আঙ্গুল তুলছে না, এমনকি মুসলিম বিশ্বের শাসকগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নিন্দাও জানানো হচ্ছে না, যেন উইঘুরের জনগণ মুসলিম উম্মাহর অংশ নয়! তারা কি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সেই বাণী শুনেনি, যখন তিনি বলেন,

    وَمَا لَكُمْ لَا تُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَالْمُسْتَضْعَفِينَ مِنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ وَالْوِلْدَانِ الَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَخْرِجْنَا مِنْ هَذِهِ الْقَرْيَةِ الظَّالِمِ أَهْلُهَا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ وَلِيًّا وَاجْعَلْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ نَصِيرًا

    “আর তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহর রাহে লড়াই করছ না দুর্বল সেই পুরুষ, নারী ও শিশুদের পক্ষে, যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদিগকে এই জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দান কর; এখানকার অধিবাসীরা যে অত্যাচারী! আর তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য পক্ষালম্বনকারী নির্ধারণ করে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সাহায্যকারী নির্ধারণ করে দাও”। [নিসা: ৭৫]

    পূর্ব তুর্কীস্তান ইসলামী রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। উসমানী খিলাফত ধ্বংস হয়ে মুসলিম বিশ্ব ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রে পরিনত হওয়ার আগ পর্যন্ত চীন এটিকে তাদের সীমান্তের সাথে সংযুক্ত করার সাহসও পায়নি। সুতরাং একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থা পুনপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই উইঘুরের নিপীরিত মুসলিমদের মুক্ত করা সম্ভব।

  • কিভাবে অতীত বর্তমানের সদৃশ্য হয়… দৃশ্যগুলো চলছে এবং একইভাবে দর্শকও!

    কিভাবে অতীত বর্তমানের সদৃশ্য হয়… দৃশ্যগুলো চলছে এবং একইভাবে দর্শকও!

    ইহুদি সত্ত্বার দখলদার সৈন্যরা গত ৩০ জানুয়ারী ফিলিস্তিনের একটি মেয়েকে দখলকৃত আল-কুদস (জেরুজালেম)-এর আল-জাইম চেকপয়েন্টে গুলি দিয়ে ঝাঝরা করে হত্যা করেছে। এই শহীদ একজন উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল, যে তার মৃত্যুদণ্ডের সময় তার স্কুল ব্যাগ বহন করছিল; কথিত ছুরিকাঘাত অপারেশন চালানোর চেষ্টার অভিযোগে তাকে হত্যা করা হয়। দখলদার সৈন্যরা তাকে বাঁচাতে অ্যাম্বুলেন্স কর্মীদের কাছে নিয়ে যেতে বাধা দেয়। তাকে রক্তঝরা অবস্থায় মৃত্যুর জন্য ফেলে রাখা হয়।

    অপরাধ ও গণহত্যার ধারাবাহিকতায় আরেকটি অপরাধ যুক্ত হল, যা ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে, এর যুবক পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ ও সন্তানদের বিরুদ্ধে ইহুদি সত্তা কর্তৃক সন্ত্রাসবাদ ও নিষ্ঠুরতাকে কেবল প্রতিফলিত করে, যা তারা তাদের মিথ্যা যুক্তি এবং তাদের তৈরি মিথ্যা প্রেক্ষাপট দিয়ে ন্যায্যতা দেয়। আমরা মানবাধিকার সমর্থক, শিশু ও নারী অধিকার কর্মী কিংবা ইসলামি দেশগুলোর লাঞ্চনার শাসন থেকেও কোন আপত্তি বা উত্থান শুনতে পাইনি। শহীদ, সামাহ মুবারক, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার প্রতি রহম করুন, ১৬ বছরের কম বয়সী ছিল এবং শুধুমাত্র তার বই আর খাতা বহন করত এবং তার হৃদয় ও আচরণে তার বিশ্বাস ও ধর্মকে বহন করত। এর ফলে সে তার মুখ থেকে নিকাব উত্তোলন করতে অস্বীকার করেছিল, যা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করেছিল, ফলে তারা তাকে হত্যা ও মৃত্যুর জন্য রক্তপাতের যোগ্য বলে মনে করেছিল! এমনকি তারা যে ভিডিওগুলি প্রকাশ করেছে সেগুলি কেবল একটি মেয়েকে চেকপয়েন্টে প্রবেশ করতে দেখায়, এবং তারপর তারা তার কাছ থেকে কোনও অপরাধ ছাড়াই গুলি করে তবে কেবল তার নিকাব (পর্দা) না খোলার কারণে। তারা তখন দাবি করা শুরু করল যে সে তাদের মধ্যে একজনকে ছুরিকাঘাত করার চেষ্টা করেছে! কিভাবে বর্তমান অতীতের সদৃশ্য হয়, যখন তারা শহীদ হাদীল আল-হাশলমনকে হত্যা করেছিল (আল্লাহ তার উপর রহম করুন), তখনও একই কারণ, একই অবস্থা এবং একই দৃশ্যের অবতারনা হয়েছিল।

    এই অপরাধটি তথাকথিত আরব লীগ কর্তৃক একটি বিবৃতি প্রদানের সাথে সংঘটিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে এটি ১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিনের অধিকারগুলির পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার কাউন্সিল ডাকা হয়েছিল এবং তাদের প্রতি তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছিল!! আমরা লজ্জা ও অপমানের এসব কর্তৃত্ব থেকে নিন্দা, আপত্তি, এমনকি শোক প্রকাশও দেখিনি, কিন্তু যখন একজন বসতি স্থাপনকারী বা অধিষ্ঠিত ইহুদি সৈনিককে হত্যা করা হয়, তখন এটি ইহুদীদের কাছে কে এই কৃতকর্ম সম্পাদন করেছে তাকে সোপর্দ করার আগ পর্যন্ত তা বিশ্রাম নেয় না। কত জঘন্য তাদের এই আচরন!

    হে বরকতময় অঞ্চল (ফিলিস্তিন)-এর অধীবাসীগণ

    কতদিন এই কর্তৃপক্ষের ব্যাপারে নীরবতা ও হতাশা থাকবে, যারা ইহুদীকে তাদের সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার ব্যাপারে সহায়তা করে!! কতক্ষণ আপনি এই কর্তৃপক্ষের উপর নীরব থাকবেন, যারা কর সংগ্রহ করে কিন্তু অভিভাবকত্ব নেয় না! এটি দালাল কর্তৃপক্ষ এবং ইহুদীদের নিরাপত্তা বাহিনী! আপনার জন্য কি সঠিক সমাধান খোঁজার সময় আসে নি, যা ইহুদীদের উচ্ছেদ করবে, দেশকে মুক্ত করবে এবং সম্মান দেবে? কোন সংগঠন, কোন সম্মেলন, কোন বিবৃতি, কোন পুতুল সরকার ও বিশ্বাসঘাতক শাসক, যারা সস্তাভাবে উম্মাহর ক্ষমতা এবং সম্পদ বিক্রি করে আপনাকে উপকৃত করবে। ইসলামের দ্বারা পরিচালিত শুধুমাত্র একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার মালিকদের অধিকার পুনরুদ্ধার করবে এবং নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও যুবককে রক্ষা করবে। তা হচ্ছে নবুয়্যতের আদলের দ্বিতীয় খিলাফত রাশিদা (সৎকর্মপরায়ন খিলাফত), যা প্রতিটি অন্যায়কারীকে লৌহ হস্ত দ্বারা আঘাত করবে, যারা আত্মীয়তা ও মুমিনদের সাথে অঙ্গীকারকে সম্মান করে না। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন:

    فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُهُمْ وَيُحِبُونَهُ أَذِلَةً عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَةٍ عَلَى الكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

    “হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে যে স্বীয় ধর্ম থেকে ফিরে যাবে, অচিরে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারা তাঁকে ভালবাসবে। তারা মুসলমানদের প্রতি বিনয়-নম্র হবে এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে এবং কোন তিরস্কারকারীর তিরস্কারে ভীত হবে না। এটি আল্লাহর অনুগ্রহ-তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ প্রাচুর্য দানকারী, মহাজ্ঞানী”। (আল-মায়েদা: ৫৪)

  • আল-রুকবান শরণার্থী শিবিরের শিশুরা কি শীতার্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে মরে যাবে, তবে কি তারা তাদের উদ্ধারের জন্য কাউকে খুঁজে পাবে না

    আল-রুকবান শরণার্থী শিবিরের শিশুরা কি শীতার্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে মরে যাবে, তবে কি তারা তাদের উদ্ধারের জন্য কাউকে খুঁজে পাবে না

    মঙ্গলবার ১৫/১/২০১৯ তারিখে ইউনিসেফের রিপোর্ট অনুযায়ী, পনেরোটি বিচ্ছিন্ন শিশু, তাদের বেশিরভাগ সদ্য প্রসূত শিশু, সিরিয়াতে মারাত্মক ঠান্ডা এবং স্বাস্থ্যসেবার অভাবের কারণে মারা গেছে। এদের মধ্যে ১৩ জন শিশু, যারা এক বছরের কম বয়সী দক্ষিণ-পূর্ব সিরিয়ায় জর্ডান সীমান্তের নিকট আল-রুকবান ক্যাম্পে মারা যায়। আল-রুকবান এবং অন্যান্য শিবিরে মানবিক সাহায্যের গুরুতর অভাব রয়েছে, বিশেষ করে যখন উদ্বাস্তুরা পূর্বের শেষ আইএসআইএস ছিটমহল থেকে ক্লান্তিকর যাত্রা করে পালিয়ে আসে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক জিয়ার ক্যাপ্লেয়ার বলেন, আল-রুকবান অঞ্চলের তাপমাত্রা এবং কঠোর জীবনযাত্রার কারণে শিশুরা ক্রমবর্ধমানভাবে বিপন্ন হয়ে পড়েছে, “এক মাসের মধ্যে, অন্তত আট সন্তানের মৃত্যু হয়েছে – এদের মধ্যে বেশিরভাগই চার মাস বয়সী এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী শিশুর বয়স ছিল মাত্র এক ঘন্টা।”

    সিরিয়ান-জর্ডান সীমান্তে আল-রুকবান ক্যাম্পে এই কঠিন জীবনযাপন ও মানবিক অবস্থার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার সিরিয়ার উদ্বাস্তু শরণার্থী বাস করছে, মাটির ঘরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছে এবং খাদ্য ও ঔষধের গুরুতর ঘাটতি ভোগ করছে। কয়েকদিন আগে, সংবাদ মাধ্যমটি আল-রুকবান ক্যাম্পের একটি সিরিয়ান শরণার্থী নারীর খবর জানিয়েছে, যে তার তিন সন্তানের জন্য খাদ্য সরবরাহ করতে অক্ষম হওয়ায় নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে। ক্যাম্পের সিভিল প্রশাসনের মুখপাত্র খালিদ আল আলী রোববার ১৩/১/২০১৯ এ জার্মান প্রেস এজেন্সি (ডিপিএ)-কে বলেন, আল-রুকবান ক্যাম্পে বিদ্যুৎ, পানি, স্যানিটেশন, চিকিৎসা কেন্দ্র এবং বিদ্যালয়ের জন্য অবকাঠামোর অভাব রয়েছে। পাশাপাশি শীতকালীন আগমন উদ্বাস্তুদের ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে। এই মরুভূমি অঞ্চলকে গরম করার জন্য গাছের উপস্থিতি এবং জ্বালানি তেলের সামগ্রী ক্রয়ের সক্ষমতা নেই। শিবির অধিবাসীরা খাদ্য ও শাকসবজিগুলির দাম বৃদ্ধির ভয়ে ভুগছেন, যা শাসন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি।

    আল-রুকবান শিবিরের তুলনায় সিরিয়ার অভ্যন্তরে বা বাইরের অন্যান্য শরণার্থী ক্যাম্পের অবস্থা ভাল নয় এবং এই ক্যাম্পের লোকদের এবং তাদের সন্তানদের অবস্থা আল-রুকবান ক্যাম্পের শিশুদের চেয়ে ভাল নয়। তারা সবাই অবিচার, ভোগান্তি ও পরিত্যাগের ক্ষেত্রে সমান। লা হাওয়ালা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ, আল-আলী আল-’আযীম।

    সিরিয়া এবং অন্যান্য মুসলিম দেশে দুর্বল মুসলমানদের সমর্থন কোন উপহার বা দাতব্য নয়, বরং ইসলামী ধর্মের ভ্রাতৃসমাজের দায়িত্ব, এবং মহৎ আয়াত ও হাদীসগুলি এর জন্য আহ্বান করে।

    আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেছেন:

    ( وَإِنِ اسْتَنْصَرُوكُمْ فِي الدِّينِ فَعَلَيْكُمُ النَّصْرُ )

    “আর তারা যদি দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের সাহায্য চায়, তাহলে তোমাদের দায়িত্ব তাদের সাহায্য করা।”

    রাসূল (সা) বলেছেন:

    «مَا مِنِ امْرِئٍ يَخْذُلُ مُسْلِماً فِي مَوْطِنٍ يُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ، وَيُنْتَقَصُ فِيهِ عِرْضُهُ إِلا خَذَلَهُ اللَّهُ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ، وَمَا مِنِ امْرِئٍ يَنْصُرُ مُسْلِماً فِي مَوْطِنٍ يُنْتَقَصُ فِيهِ مِنْ عِرْضِهِ وَتُنْتَهَكُ فِيهِ حُرْمَتُهُ إِلا نَصَرَهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ فِي مَوْطِنٍ يُحِبُّ فِيهِ نُصْرَتَهُ»

    “কোন (মুসলিম) মানুষ অন্য কোনো মুসলিমকে পরিত্যাগ করবে না এমন কোনো স্থানে যেখানে তার সম্মান লঙ্ঘন করা হতে পারে যে আল্লাহ তাকে এমন স্থানে স্থানান্তরিত করবেন যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করবে। এবং কোন (মুসলিম) ব্যক্তি কোন জায়গায় কোনো মুসলমানকে সাহায্য করবে না যেখানে তার সম্মানের লংঘন হতে পারে যে আল্লাহ তাকে এমন কোন জায়গায় সাহায্য করবেন যেখানে তার সম্মান লঙ্ঘন হতে পারে এবং যেখানে সে তাঁর সাহায্য কামনা করে।”

    কিন্তু নিপীড়িত ও দুর্বলদের সমর্থন হল সেইসব শব্দ যা জর্দানীয় শাসকদের অভিধানে বিদ্যমান নয়, তার অভিধানে রয়েছে শুধুমাত্র মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ও ষড়যন্ত্র, এবং দাওয়া বহনকারীদের গ্রেফতার করা যারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার কাজ করে। এই শাসন সীমান্তের শরণার্থীদের মুখোমুখি হয়ে সীমান্ত বন্ধ করে দেয়, যারা অবিচার ও অত্যাচার থেকে পালিয়ে এসেছে। এবং একে বন্ধ সামরিক অঞ্চল হিসাবে ঘোষণা করে এবং শিবিরের উপর অবরোধ আরোপ করে, তার নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য এবং ‘সন্ত্রাসীদের’ অনুপ্রবেশকে রোধ করে।

    যদিও আমরা জর্দান সরকার কিংবা তার মতো অন্যান্য মুসলিম বিশ্বের শাসকদের অত্যাচারিদের পক্ষে এবং তাদের প্রতি শক্তি ও সমর্থন প্রদর্শনমূলক কোনো অবস্থান দেখতে পাচ্ছি না, তবে আমরা জর্ডানের মুসলমানদের কাছ থেকে সম্মানিত অবস্থান দেখেছি, সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিতাড়িত জনগণ সিরিয়া সীমান্তে আসলে জর্ডান সরকার সিরিয়া থেকে আর উদ্বাস্তুদের গ্রহণ করতে পারবেনা ঘোষণা দেওয়ার পরেও তারা তাদের ভাইদের গ্রহণের প্রস্তুতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

    এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি ইসলামে অনুপস্থিত নয়, যা আমাদের উন্নত চরিত্রের রাসূল (সা) এক দেহ হিসাবে বর্ণনা করেছেন এবং আমরা উম্মাহকে এই কৃত্রিম বিভক্ত সীমানা অপসারণের আহ্বান জানাচ্ছি যা মুসলমানদের একে অপরের সমর্থন ও মুসলিম রাষ্ট্রকে এক রাষ্ট্রের অধীনে একত্রিত করতে বাধা দেয় এবং এক ইমামের দ্বারা শাসিত এক ব্যানারের অধীনে আসতে বাধা দেয়।

  • বাংলাদেশ কি গরিব নাকি গরিব করে রাখা হয়েছে?

    বাংলাদেশ কি গরিব নাকি গরিব করে রাখা হয়েছে?

    বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বাংলাদেশ শব্দটি উচ্চারিত হলেই হতদরিদ্র, অপুষ্ট, প্রাকৃতিক দূর্যোগে পর্যুদস্ত একটি জনপদের চিত্র মানুষের চোখে ভেসে উঠে। সচেতন লোকমাত্রই জানে, বহির্বিশ্বে বাংলাদেশীদের ‘মিসকীন’ নামে ডাকা হয়। যদিও বর্তমান সরকারের সময়ে হঠাৎ করে বাংলাদেশ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এ রূপান্তরিত হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচারণা শুরু করা হয়। বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের হতদরিদ্র বাংলাদেশ ও ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ এর মধ্যে কোন পার্থক্য খুঁজে পায় না। ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ তকমাটির সাথে সরকার কিছু পরিসংখ্যানের কথা বলছে। সেগুলো হল: মাথাপিছু আয়, দৃঢ় জিডিপি, বিভিন্ন সামাজিক সূচক (স্বাক্ষরতার হার, সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতাধীন জনগণ, বাল্যবিবাহ, চিকিৎসা সুবিধার আওতাধীন জনগণ ইত্যাদি) প্রভৃতি। এসবক্ষেত্রে সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের উন্নয়ন হয়েছে কিনা এটি প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য পরিসংখ্যান একটি ভাল উপায় এবং এসব উপাত্ত অর্জনের প্রক্রিয়ার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। তাছাড়া পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে আমাদের শাসকদের বিশ্বাস করার কোন সঙ্গত কারণ নেই। কারণ বর্তমান ব্যবস্থায় যুতসই শাসক জনগণকে ধোঁকা দেয়ার ক্ষেত্রে দক্ষ হবে-এটাই স্বাভাবিক ও নিয়ম। 

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানী, ইটালী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশ থেকে পরোক্ষ উপনিবেশবাদ বা নব্য উপনিবেশবাদে প্রবেশ করে। নব্য উপনিবেশবাদে উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রসমূহ প্রত্যক্ষভাবে শাসন না করলেও একজন দালাল শাসক দ্বারা ঐ দেশের জনগণকে পরোক্ষভাবে শাসন, শোষন করে। সে পুতুল শাসক কাফের উপনিবেশবাদীদের শাসন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করে, আই এম এফ ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী শোষণমূলক অর্থনীতিকে ঢেলে সাজায়, উপনিবেশবাদী বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর হাতে দেশের গণমালিকানাধীন সম্পদ (খনিজ সম্পদ, বিদ্যুৎ) তুলে দেয়। বিনিময়ে  উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ঐ দালাল শাসককে ক্ষমতায় টিকে থাকার গ্যারান্টি প্রদান করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের গ্যাস ও কয়লার মালিকানা এ দেশের জনগণের হলেও উপনিবেশবাদী বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানীর (শেভরণ, ইউনোকল, কনকো ফিলিপস, এশিয়া এনার্জি, গ্যাসপ্রম, নাইকো প্রভৃতি) কাছে বিভিন্ন সরকার মালিকানার সত্ত্ব বিক্রি করে এবং পরবর্তীতে উচ্চ আর্ন্তজাতিক মূল্যে সেগুলো জনগণের কাছে বিক্রি করে। এভাবে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের কাছে চলে যায় এবং জনগণকে দারিদ্রের দুষ্ট চক্রে আবদ্ধ রাখা হয়। 

    মোদ্দাকথা, উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এবং তাদের ঘৃণিত জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশের অমিত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আজকে গরীব হয়ে আছে। 

    অমিত সম্ভাবনার এক দেশ-বাংলাদেশ। একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য সব যোগ্যতাই বাংলাদেশের রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিই সমতল ও উর্বর। দীর্ঘদিন যাবত ক্রমহ্রাসমান উর্বর কৃষিজমি ক্রমবর্ধমান জনগনের খাদ্য চাহিদা যথাযথভাবে পূরণ করে আসছে । এখানকার প্রায় সব লোক এক ভাষাতেই কথা বলার কারণে তথ্য আদান প্রদান এবং ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা খুবই সহজ । বাংলাদেশের গ্যাস, কয়লা, ইউরেনিয়ামের মজুদ জনগণের জ্বালানী চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট। বাংলাদেশের রোদ, নদী, বিশাল সৈকতের বাতাস থেকেও শক্তি উৎপাদন সম্ভব। আমাদের রয়েছে দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত-যাও খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। আমাদের সামুদ্রিক জল সীমানাও খনিজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ। তিন দিকে ঘিরে থাকা পাহাড়ের সারি ও দক্ষিণ দিকে থাকা অসভীর সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশকে সামরিকভাবে ‘ডিফেন্ডারস হেভেন’ এ পরিণত করেছে। তাছাড়া ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশের অবস্থান ভারত ও চীনের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের জনগনের বড় একটি অংশ তরুণ-যাদেরকে সহজেই জনসম্পদের পরিণত করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনগণ পরিশ্রমী, মেধাবী ও সৃজনশীল। খনিজ অনুসন্ধান, উত্তোলন, ণির্মাণ শিল্প, বস্ত্রশিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মূল্যবান। এতসব আর্শীবাদ থাকা সত্ত্বেও দূরদর্শী আদর্শিক নেতৃত্বের অভাবে বাংলাদেশকে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না। 

    বাংলাদেশের শাসন, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থা উপনিবেশবাদী শক্তি দ্বারা আরোপিত। বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাস ইসলাম থেকে এসেছে কিন্তু জীবন পরিচালনার সব ব্যবস্থা ইসলাম ব্যতিত অন্য কোন কিছু থেকে এসেছে। সেকারণে বিশ্বাস ও ব্যবস্থার বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশ এগুতে পারছে না। বাংলাদেশকে যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে একটি পরাশক্তিতে পরিণত করতে চাই তাহলে ইসলামি মৌলিক বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ব্যবস্থা লাগবে। আর এরকম ব্যবস্থাই হল খিলাফত ব্যবস্থা। একমাত্র খিলাফত ব্যবস্থাই বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করে একটি নেতৃত্বশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে। 

  • মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র: নব্য উপনিবেশবাদের মোক্ষম হাতিয়ার

    মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র: নব্য উপনিবেশবাদের মোক্ষম হাতিয়ার

    উপনিবেশবাদ বা সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের স্বাভাবিক পরিণতি। ইউরোপে খ্রীস্টান ধর্মযাজক, শাসকশ্রেণী এবং নির্যাতিত সাধারণ জনগণ ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মধ্যে শতকের পর শতক ধরে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর তারা জীবন থেকে ধর্মকে পৃথকীকরণের প্রতিক্রিয়াশীল সিদ্ধান্ত- ধর্মনিরপেক্ষতায় উপনীত হয়। এটি ছিল ইউরোপীয়দের পূর্ণজাগরণ। এ পূর্ণজাগরণ ইউরোপীয়দের একটি চিন্তার (অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা) ভিত্তিতে গড়ে উঠা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মাধ্যমে বস্তুগত উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে শিল্প বিপ্লব আসে। কাঁচামাল, পুজি, জ্বালানী ও বাজারের জন্য ইউরোপের পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসূহ এশিয়া, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহে প্রত্যক্ষ উপনিবেশ স্থাপন করে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল ছিল ব্রিটেন। তার পরের সারিতেই ছিল ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল।

    ব্রিটিশদের সর্ম্পকে বলা হয় তারা তাদের মগজের শেষটুকু দিয়ে চেষ্টা করে। যে কারণে তারা অন্যদের চেয়ে একটু বেশীই সফল। শক্তিশালী নৌবাহিনী, ধূর্ত রাজনৈতিক কূটকৌশল, সুদূরপ্রসারী আদর্শিক চিন্তাকে ব্যবহার করে বিশাল উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল ব্রিটিশরা। তারা যেখানে গিয়েছে সেখানে কেবল ভূমিকে দখল করেনি, সে ভূমির মানুষের মগজকেও দখল করেছে। এর জন্য শিক্ষাব্যবস্থা তথা কালচারের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। তাদের মত চিন্তা করতে, জীবনকে দেখতে শিখিয়েছে। যেখানে তারা গিয়েছে সেখানে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী অর্থনীতি বাস্তবায়ন করেছে। এতে করে সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয় মুসলিম বিশ্বের। কারণ মুসলিমদের রয়েছে নিজস্ব আক্বীদা, শাসনব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিচারব্যবস্থা-যা কাফির ব্রিটিশদের চেয়ে সম্পূর্ণরূপে পৃথক।

    দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় ব্রিটিশদের জন্য প্রত্যক্ষ উপনিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন তাদের শিক্ষাব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, নিপীড়নমূলক পুঁজিবাদী অর্থনীতি বাস্তবায়নের ফলে উপনিবেশবাদকে তারা নতুন রূপ দিতে সক্ষম হয়েছিল। এই নতুন রূপের উপনিবেশবাদের নাম হল নব্য উপনিবেশবাদ বা নিও কলোনিয়ালিজম। এখানে ব্রিটিশরা প্রত্যক্ষভাবে কোন ভূমিতে শাসনে না থাকলেও তাদেরই পছন্দনীয় ঐ ভূমির কাউকে শাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। ফলে জনগণের মধ্যে স্বাধীন সার্বভৌমত্বের একধরনের নকল অনুভূতি বিরাজ করতে থাকে-যদিও এ অনুভূতিই শেষ কথা। বাস্তবে এ রাষ্ট্রসমূহ স্বাধীন বা সার্বভৌম নয়। এই দালাল শাসক ঐ ভূমিতে ব্রিটিশদের স্বার্থ রক্ষা করে এবং ব্রিটিশরা এর বিনিময়ে ঐ শাসককে ক্ষমতার থাকার নিশ্চয়তা প্রদান করে। এই শাসক এক নায়ক স্বৈরাচার হতে পারে, আবার গণতান্ত্রিকও হতে পারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতিতে পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর্বিভূত হয়। তারা মুসলিম এবং অমুসলিম বিশ্বে নব্য উপনিবেশবাদের এ ধারাকে অব্যাহত রাখে।

    মুসলিম বিশ্বে দ্বিদলীয় গণতন্ত্র প্রত্যক্ষ উপনিবেশকালীন সময়ে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশদের শেখানো রাজনৈতিক কালচারের ফলাফল। ব্রিটিশরা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল তারা চলে যাওয়ার পর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো তাদের দেখানো রাজনৈতিক ধারার মধ্যেই থাকে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে-যার প্রতিষ্ঠাতা কোন ভারতীয় নয়, বরং একজন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ- এলান অক্টোভিয়ান হিউম। ব্রিটিশ ওয়েস্ট মিনিস্টার ধারার রাজনীতিতে দুইটি বড় রাজনৈতিক দল থাকে যারা পালাক্রমে জনগণকে শাসন করে। একই চিত্র আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখতে পাই। এ দু’টি দলের মধ্যে একটি থাকে দেশপ্রেমিক ঘরানার এবং অন্যটি জাতীয়তাবাদী ঘরানার। মুসলিম বিশ্বে এদের কোনটি আমেরিকান ব্লকের আবার কোনটি ব্রিটিশ ব্লকের। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরষ্ক, তিউনেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি এরকমই।

    ১. আদর্শিক হওয়ায় দ্বিদলীয় রাজনীতি আমেরিকা, ব্রিটেনের জনগণকে বিভক্ত না করলেও গণতন্ত্র মুসলিম বিশ্বে আরোপিত ব্যবস্থা হওয়ায় জনগণকে বিভক্ত করে। বিধায় রাষ্ট্রের মধ্যে নৈরাজ্য ও বিশৃংখলা দেখা দেয়। জনগণ ও রাজনৈতিক দলের বিভক্তি উপনিবেশবাদীদের খবরদারি ও দরকষাকষির মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। এভাবে মুসলিম বিশ্বে কাফের উপনিবেশিক শক্তিসমূহের আধিপত্য ও প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।

    ২. পুঁজিবাদ বাস্তবায়নের ফলে সাধারণ জনগণ জুলুমের মধ্যে থাকে এবং ক্ষোভ দানা বাধতে থাকে। কয়েক বছর পর পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নতুন চেহারা নিয়ে এসে সেই ক্ষোভ প্রশমনের ব্যবস্থা করা হয়। জনগন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও ভোট প্রদানের মাধ্যমে নতুন কাউকে নিয়ে এসে পুরাতন জালিমকে প্রতিস্থাপন করে ক্ষোভকে প্রশমিত করে।

    ৩. গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মিডিয়া কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করে এবং জনগণ সভা সমাবেশ করার অধিকার পায়। এভাবেও ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হয়। তবে উপনিবেশবাদীদের পছন্দনীয় শাসকের পক্ষে জনগমত তৈরির ও জনগনের সাথে প্রতারণার জন্যও মিডিয়াকে ব্যবহার করা হয়।

    কিন্তু একই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকায় নতুন মুখও কিছুদিনের মধ্যে জালিম হয়ে উঠে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা উপনিবেশিকদের পছন্দমত শাসক না আসলে সেসব দেশে তারা পছন্দনীয় এক নায়ককে বেছে নেয়। যেমনটি ঘটেছে মিশরে। সেখানে আমেরিকা জনপ্রিয় শাসক মুরসীকে সেনাপ্রধান ফাত্তাহ আল সিসির মত একনায়ক দ্বারা প্রতিস্থাপন করেছে। এতে গণতন্ত্র ধর্ষিত হলেও উপনিবেশবাদীদের কোন ক্ষতি নেই। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ স্বৈরশাসক আমেরিকা ব্রিটেনের প্রত্যক্ষ মদদে পরিচালিত হয়। গণতন্ত্র রপ্তানি করতে আমেরিকা ইরাক আফগানিস্তানকে চরদখলের মত জবরদখল করলেও মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের নিয়ে তাদের কোন সংকোচ বোধ বা অ্যালার্জি নেই। এ থেকে বুঝা যায়, মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র নিয়ে আমেরিকা ব্রিটেন যতটা না চিন্তিত, তার চেয়ে বেশী চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন সেসব দেশে যে কোন প্রকারে নব্য উপনিবেশবাদ বজায় রাখার ক্ষেত্রে। কারণ নব্য উপনিবেশবাদের মাধ্যমে ধূর্ততার সাথে পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা মুসলিম বিশ্বের জনগণ ও সম্পদের উপর কর্তৃত্ব, খবরদারি ও আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। আর মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্র এক্ষেত্রে একটি মোক্ষম হাতিয়ার।

  • বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও সঠিক ইসলামি ভাবনা

    বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও সঠিক ইসলামি ভাবনা

    নির্বাচনকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন আবার সরগরম হয়ে উঠেছে। পশ্চিমাদের অনুকরণে ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রনে গড়ে উঠা বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক সংস্কৃতি মানেই হল জাতীয়তাবাদ, দেশপ্রেমের সস্তা বুলি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক ক্ষমতার লড়াইয়ের হীন মহোৎসব। ইসলামে রাজনীতি বা সিয়াসাহ একটি ফরয বিষয়-যার অর্থ হল জনগনের দেখভাল করা। অপরদিকে পুঁজিবাদে রাজনীতি এর অথনীতিকে ঘিরে আবতিত হয়। সেকারণে পুঁজিবাদে রাজনীতি হল সাধারণ জনগনকে জিম্মী করে অথবা তাদেরকে ধোকা দিয়ে পুঁজিপতি শ্রেণীর পুঁজি বাড়ানোর একটি ঘৃণ্য কৌশল। মুখে উন্নয়ন, জনগনের সেবা ইত্যাদি শ্লোগান থাকলেও, পুঁজিবাদী রাজনীতি হল পুঁজিপতি শাসকশ্রেণীর ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম। একারণে বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী। এই ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থে আইন প্রণয়ন করে। ছলে বলে কৌশলে জনগণের কষ্টার্জিত সম্পদ আইনের মাধ্যমে নিজেদের পকেটে পুড়ে নেয়। একারণে এইসব রাজনীতিবিদ ও এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা আম গাছ লাগিয়ে জাম খাওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখার মতই অবান্তর।

    আর এ ক্ষেত্রে নির্বাচন হল পুঁজিবাদী ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শাসকের চেহারা পরিবর্তনের একটি মাধ্যম। নিবাচনের মাধ্যমে কখনওই ব্যবস্থা পরিবর্তন হয় না, বরং নির্বাচন হল একটি ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়া মাত্র। মিডিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা উপনিবেশিকগন তাদের এদেশীয় সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ এজেন্টদের মাধ্যমে এ নির্বাচনকে জনগণের পছন্দমত শাসকশ্রেণী বেছে নেয়ার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে প্রচার করে। কিন্তু এসব নির্বাচন এজেন্ট রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে উপনিবেশিক প্রভূদের দরকষাকষির একটি সুগোগ করে দেয়। দরকষাকষির মাধ্যমে একটি রফা হওয়ার পর পছন্দনীয় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচন নামক সাজানো নাটকের মাধ্যমে ক্ষমতায় নিয়ে আসা হয়। এসব নির্বাচনে জনগণকে প্রভাবিক করতে ব্যবহার করা হয় উপনিবেশিক নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাসমূহকে। এ বাস্তবতা প্রতীয়মান হয় যখন বতমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অসংখ্যবার সংসদে ও সংসদের বাইরে বলে, ‘২০০১ সালে গ্যাস বিক্রি করতে রাজি হইনি বলে ক্ষমতায় আসতে পারিনি।’ স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যবধি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণে সম্পূণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

    ১. ওয়াল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোট ২০১৭: চীন ভারতের চেয়েও দ্রুতহারে ধনী বাড়ছে বাংলাদেশে (সূত্র: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)।

    বাংলাদেশের অতি ধনীদের সম্পদ প্রতিবছর ১৭.৩% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির দ্বিগুনেরও বেশি। এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির চেয়ে বেশি। এর অর্থ হল ধর্মনিরপেক্ষে পুঁজিবাদী রাজনীতি সম্পদকে কেবলমাত্র ধনীদের মধ্যে কুক্ষিগত ও কেন্দ্রীভূত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে, জিডিপি বৃদ্ধি পেয়েছে ইত্যাদি প্রচারণা উদ্দেশ্যমূলক পরিসংখ্যানিক ও রাজনৈতিক প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

    ২. মাথাপিছু ঋণ ৬০ হাজার টাকা (সূত্র: ০৯জুন- ২০১৮, দৈনিক যুগান্তর)। এ সুদের পরিমাণ পদ্মা সেতুর ব্যয়ের দ্বিগুন। 

    ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী রাজনীতি ও বিশ্বব্যাংক আই এম এফ নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি আমাদের সাধারণ জনগনের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে মাথাপিছু ঋণ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছে। এ ঋণ পরিশোধের জন্য সরকার প্রতিটি বাজেটে জনগণের উপর নিপীড়নমূলক ভ্যাট ও কর বাড়িয়ে চলেছে। অপরদিকে শেভরণ, কনকো ফিলিপস এর মত উপনিবেশিক মাল্টিন্যাশনাল জায়ান্টদের স্বার্থে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়ে চলেছে এবং সামিট পাওয়ারের মত দেশী বিদেশী লুটেরাদের পকেটে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ তুলে দিতে বিদ্যুতের দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি করে চলেছে।
     

    ৩. What makes Dhaka the second worst city to live in? (বসবাসের ক্ষেত্রে কী ঢাকাকে দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম নগরীতে পরিণত করল?) (সূত্র:১৭ আগস্ট, ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউন)

    ৪. Global Innovation Index 2018: Bangladesh ranked least innovative country in Asia (বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে সবনিম্ন উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ) (সূত্র: ১৮ সেপ্টেম্বর,২০১৮, ডেইলি স্টার)

    ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসকেরা আমাদেরকে এমন এক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শিক্ষাব্যবস্থা উপহার দিয়েছে যা মানুষের সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে অন্তরায়। জাতি হিসেবে আমরা পরিশ্রমী ও মেধাবী হওয়া সত্বেও শাসকশ্রেণীর ভিশন না থাকায় আমাদের দেশ থেকে ক্রমাগত মেধা ও সৃজনশীলতা পাচার হয়ে যাচ্ছে। ক্রিকেট খেলা, রাস্তার সৌন্দযবর্ধন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকার খরচ করলেও গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির পেছনে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোন প্রয়াস দেখা যায় না-যদিও বলা হয় বাজেটের শতকরা ১৫ ভাগ মানবস্পদ উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয়।

    ৫. দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৮২ লক্ষ (সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, ২০১৮)

    ঘরে ঘরে চাকুরী দেয়ার সস্তা শ্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও ১৬ কোটি মানুষে মধ্যে দেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় পাঁচ কোটি। দ্য ইকোনিমিস্টের মতে বাংলাদেশে স্নাতকদের মধ্যে ৪৭% বেকার। এ করুণ অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার জন্য কোন সদিচ্ছা বা পরিকল্পনাও এসব অযোগ্য শাসকদের মধ্যে দেখা যায় না।

    ৬. ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ঢাকা ট্রিবিউন রিপোট, অর্থ মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী দেশে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ১৩১৬৬৬ কোটি টাকা। 

    এ টাকা সংগ্রহে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। বরং সরকার জনগণের উপর বিভিন্নভাবে কর ও ভ্যাট বৃদ্ধির মাধ্যমে জুলুম চাপিয়ে দিচ্ছে। কিছু দুর্নীতিগ্রস্থ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদকে ব্যাংক থেকে জনগণের অর্থ লুটপাটের পথ সুগম করে দিচ্ছে সরকার। ২০১২ সালে হলমার্ক গ্রুপ কর্তৃক সোনালী ব্যাংকের ৩৬০০ কোটি টাকা জালিয়াতির ঘটনায় এবং বেসিক ব্যাংক কর্তৃক ২০১০-২০১৩ সালে ৫০০০ কোটি টাকা ঋণ প্রতারণার কেলেঙ্কারিতে লজ্জিত না হয়ে এই সরকার এসব লুটেরাদের রক্ষার জন্য ব্যাংকগুলোকে অনৈতিক ভর্তুকি প্রদান করে চলেছে। উপরন্তু, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত চলতি অর্থবছরে (২০১৮-১৯) এই খাতে ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যাতে কষ্ট করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতকারী এসব “সম্মানিত উদ্যোক্তাদের” ঋণ পরিশোধে সহায়তা দেয়া যায়, যা দেশের মানুষের সাথে পরিহাস করারই নামান্তর।

    ৭. ১২ জানুয়ারী ২০১৮ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত অপর এক রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৭ সালে গুমের শিকার হয়েছেন মোট ৮৬ জন-যাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্ট শেয়ার করা সাবেক কূটনীতিবিদও রয়েছেন।

    এখানে মাত্র ৭ টি উদাহরণ দেয়া হল। এরকম আরও অসংখ্য তথ্য উপাত্তের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থার প্রকৃত বাস্তবতা আমরা উপলদ্ধি করতে পারি।

    বাংলাদেশে নির্বাচনের পর নির্বাচন হয়েছে। অথচ কোন নির্বাচনের মাধ্যমে এমন সরকার আসেনি যে জনগণের আশা আকাংখা অনুযায়ী দেশকে শাসন করেছে। আমরা আগেই বলেছি নির্বাচনের মাধ্যমে যেহেতু একটি ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখা হয় সেহেতু এর মাধ্যমে প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই বিগত নির্বাচনগুলোর মত আসন্ন নির্বাচনও সুনিশ্চিতভাবে জনগণের জন্য সত্যিকারের পরিবর্তন বয়ে নিয়ে আসবে না। কেননা বিএন পি বা বিএনপি যুক্তফ্রন্ট জোট ইত্যাদি আওয়ামীলীগকে প্রতিস্থাপন করলেও তারা একই ব্যর্থ ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখবে। এমতাবস্থায় আমাদের মাহী বি চৌধুরীর প্লান বি এর চটকদার কথার ফাঁদে পড়লে চলবে না। বি চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না বা ডক্টর কামালের সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাজনীতির মোহে বিভ্রান্ত হলে চলবে না। কারণ ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদ সবসময়ই কপট, অসাধু ও দূনীতিবাজ শাসক তৈরি করে। আর এ ব্যবস্থা আমাদের মাকিন-ব্রিটিশ-ভারত উপনিবেশিক বলয়ের মধ্যে আবদ্ধ রাখবে; বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এর নিয়ন্ত্রনাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর জুলুমের মধ্যেই বেধে রাখবে। এই ব্যবস্থায় আমাদের বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থা আমাদের খনিজ সম্পদের উপর উপনিবেশিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রন থেকে মুক্ত করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থা সম্পদের বৈষম্য দূর করতে পারেনি এবং পারবেও না, এই ব্যবস্থায় উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়নি এবং কখনও সম্ভব হবেও না, এই ব্যবস্থা জনগণের সম্পদ লুটপাট ঠেকাতে পারেনি এবং পারবেও না। ব্যক্তি, দল বা কোন জোটের পরিবর্তনের মাধ্যমে এসব পরিবর্তন আসবে না। বরং এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে ত্রুটিমুক্ত, পক্ষপাতশূন্য, পূণাঙ্গ ও জবাবদিহীতামূলক ইসলামি খিলাফত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে হবে-যা রহমত ও একমাত্র দ্বীন বা ব্যবস্থা হিসেবে মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের জন্য মনোনীত করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    …আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নেয়ামত সম্পূণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম..’ (সূরা মায়েদাহ:৩)

    মুসলিম হিসেবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে মেনে নিতে পারি না। এটি কাফেরদের জীবনব্যবস্থা পুঁজিবাদের আক্বীদা-যা পুরোপুরি হারাম-যেভাবে একজন মুসলিমের জন্য মদ খাওয়া হারাম, সুদ খাওয়া হারাম, জিনা করা হারাম। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে রাষ্ট্রের মধ্যে সব ধর্মের সমান সুযোগ নয়, বরং এর মানে হল ইসলাম কেবলমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে থাকবে এবং জীবনের আর কোন অংশে ইসলাম থাকবে না। অথাৎ আমাদের সামাজিক জীবন, অর্থনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক জীবন, বিচারকার্য কোথাও ইসলাম থাকবে না। কোথাও ইসলাম থাকবে না মানে হল আল্লাহ’র হুকুম থাকবে না এবং আল্লাহ’র সাবভৌমত্বের বদলে মানুষের সাবভৌমত্ব মেনে নিতে হবে। অথচ কুরআন এবং সুন্নাহতে মানুষের সামগ্রিক জীবন সম্পর্কে স্রষ্টার নিদেশনা ও হুকুম রয়েছে-যা মানা আমাদের জন্য ফরয বা বাধ্যতামূলক। একজন মুসলিমের জন্য ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করা (নামাজ পড়া, রোযা রাখা, হজ্জ করা ইত্যাদি) এবং বাদবাকী জীবনে (সামাজিক জীবন, অথনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক জীবন, বিচারকার্য ইত্যাদি) মানবরচিত আইন দিয়ে পরিচালনা করা ইসলামে নিষিদ্ধ অথাৎ তার জীবনের সবক্ষেত্রে আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা যেভাবে হারাম সেভাবে তা থেকে উদ্ভুত যে কোন ব্যবস্থা বা সমাধানও (পুজিবাদ, গণতন্ত্র) হারাম। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘..তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং বাকী অংশ অবিশ্বাস কর? যদি এরূপ কর, তবে তোমরা দুনিয়ার জীবনে হবে লাঞ্চিত এবং আখেরাতে তোমাদের জন্য রয়েছে মমন্তুদ শাস্তি..।’ (সূরা বাক্বারা:৮৫) 

    কেবলমাত্র ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থা তার জনগণের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা প্রত্যেকটি ব্যক্তি পযায়ে গিয়ে নিশ্চিত করবে এবং জিডিপি, জিএনপি, মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যানিক প্রতারণা দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দিবে না। খলিফা অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তির কমসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন। মাহকামাতুল মাজালিম, মাজলিশ আল উম্মাহ ও ইসলামি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে শাসকশ্রেণীর জবাবদিহীতা সুনিশ্চিত করা হবে। প্রতিরক্ষা শিল্পকেন্দ্রিক ভারী শিল্প নিভর অথনীতি হওয়ায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ইসলামী অথনীতির মূলনীতি হবে, সম্পদ যাতে কেবলমাত্র ধনীদের মধ্যে পরিগ্রহ না করে। ইসলামী অথনীতির সুশীতল ছায়ায় সাধারণ জনগণ ভ্যাট ও আয়করের জুলুম থেকে রক্ষা পাবে ও উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। তাকওয়া হবে রাষ্ট্রের জ্বালানী। মসজিদের ইমাম সাহেব যেভাবে নামাজে দূনীতি করেন না তেমনিভাবে ইসলামী রাষ্ট্রের ইমামও শাসনকায পরিচালনার ক্ষেত্রে দূনীতি করবেন না। কেননা দু’টোই ইবাদত। গণমালিকানাধীন সম্পত্তি (খনিজ সম্পদ, নদী, চারণভূমি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি) রাষ্ট্রীয় তত্তাবধানে প্রয়োজন অনুযায়ী জনগণের জন্যই ব্যয় করা হবে। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মত কোন ব্যক্তি বা বহুজাতিক কোম্পানিকে গণমালিকানাধীন সম্পত্তির মালিকানা বা অংশীদার করা হবে না। অন্যান্য ইসলামি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সাপেক্ষে গণমালিকানাধীন বিশাল সম্পদ যখন খিলাফত রাষ্ট্রের তত্তাবধানে জনগণের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী বন্টন করা হবে তখনই জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ হওয়ার পর সাধ্যমত বিলাসপণ্যের চাহিদাও পূরণ করা সম্ভব হবে। আর তখনই খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ এর সময়ের মত এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যখন যাকাত নেয়ার মত লোক খুঁজে পাওয়া হবে বিরল ইন শা আল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    ‘আর জনপদের অধিবাসীরা যদি ঈমান আনত ও তাক্বওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি আসমান ও জমীনের সব নেয়ামত উজাড় করে দিতাম।…’ (সূরা আল আ’রাফ:৯৬)

    খিলাফত রাষ্ট্র আমাদের অবশ্যই অথনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিবে। তবে কেবলমাত্র এই অথনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা কাজ করব না। বরং কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমা এ সাহাবার শক্তিশালী ও প্রামাণিক দলিল রয়েছে যা সাব্যস্ত করে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা একটি গুরুত্বপূণ ফরয। এটি উম্মুল ফারায়েজ তথা সকল ফরযের মা, অর্থাৎ এটি সবচেয়ে মৌলিক ফরয। কারণ খিলাফত প্রতিষ্ঠা না করলে ইসলামের অনেক ফরজ হুকুম অবাস্তবায়িত থেকে যায়। যেমন: সব ইসলামী ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, হুদুদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রীয়ভাবে জিহাদ ঘোষণা করা ইত্যাদি। তাই আমাদের প্রতিটি মুসলিমের কালবিলম্ব না করে খিলাফত প্রতিষ্ঠার বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীণ হতে হবে। কারণ বতমান ধর্মনিরপেক্ষ পুজিবাদী শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তাহীন, অপমানজনক ও জুলুমের অবস্থা থেকে ইসলামী খিলাফত ব্যবস্থার নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সম্মানের জীবনে উত্তরণের জন্য যারপরনাই প্রচেষ্টা ও ত্যাগের বিকল্প নেই। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

    আমি ততক্ষণ পযন্ত কোন জাতির ভাগ্যের পরিবতন করি না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের পরিবতনে সচেষ্ট হয়…।’ (সূরা রা’দ:১১)

    তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে, তাদের আল্লাহ ওয়াদা দিচ্ছেন যে, তিনি পৃথিবীতে তাদের শাসন কতৃত্ব দান করবেন, যেভাবে তিনি দান করেছিলেন পূববতীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই সুদৃঢ় করবেন তাদের দ্বীনকে যাকে তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরিবতে নিরাপত্তা প্রদান করবেন…।’ (সূরা নূর:৫৫)

  • উইগুর: দশ লক্ষাধিক বন্দির মুসলিম জনগোষ্ঠী

    উইগুর: দশ লক্ষাধিক বন্দির মুসলিম জনগোষ্ঠী

    چین و عرب ہمارا، ہندوستان ہمارا‬
    مسلم ہیں ہم، وطن ہے سارا جہاں ہمارا‬

    “চীন ও আরাব হামারা, হিন্দুস্তান হামারা,
    মুসলিম হ্যায় হাম, ওয়াতান হ্যায় সারা জাহাঁ হামারা…”

    – ১৯১০ সালে মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে লেখা আল্লামা ইকবাল [১৮৭৭-১৯৩৮]-এর বিখ্যাত গান “তারানা-ই-মিল্লি” [জাতীয় সঙ্গীত] এভাবেই শুরু। ইকবাল যখন বলছিলেন: “চীন ও আরব আমাদের, ভারতবর্ষ আমাদের / মুসলিম আমরা, সারা পৃথিবীই আমাদের দেশ…” – তখন ইকবাল কি “চীন” বলতে আমরা এখন যে “চীন” রাষ্ট্রকে চিনি, সেটাকে বুঝিয়েছিলেন? এই “চীন” তো কখনোই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না! তাহলে?

    আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে “উইগুর” নামে বিশ্বের এক নিপীড়িত জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল। 

    আসলে ইকবালের সময়কালে “চীন” বলতে বর্তমান মধ্য এশিয়াকে বোঝাত – কোনো একক রাষ্ট্র বা রাজত্বকে বোঝাত না।

    সেই মধ্য এশিয়ার আরেকটি প্রাচীন পরিচয় “তুর্কিস্তান” নামে। এই নামে অবশ্য কখনো কোনো স্বাধীন দেশ তৈরি হয়নি। “তুর্কিস্তান” শব্দের আক্ষরিক অর্থ “তুর্কিদের দেশ”। পারস্যের ভূগোলবিদরা প্রাচীন তুর্কি জাতিসমূহের আবাসস্থল বোঝাতে সর্বপ্রথম “তুর্কিস্তান” শব্দের ব্যবহার করেন। বর্তমান ইরান থেকে চীন পর্যন্ত মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকাটিকেই “তুর্কিস্তান” হিসেবে অভিহিত করা হতো। ইরানের উত্তরে তুর্কিস্তান ও দক্ষিণে মক্কার অবস্থান ছিল বলেই ইরানের বিখ্যাত কবি শেখ সাদী মানবজীবনের লক্ষ্য ও পথের বৈপরীত্য বোঝাতে লেখেন:

    ترسم نرسی به کعبه ای اعرابی 
    این ره که تو میروی به ترکستان

    [তারসাম না রসি বা-কাবা এ্যায় আরাবী
    ই রাহকে তু মিরোবি বা-তুর্কিস্তানাস্ত]
    “আমার ভয় হচ্ছে তুমি কাবায় পৌঁছাবে না, হে যাযাবর!
    কারণ তুমি যেদিকে যাচ্ছ, তা তুর্কিস্তানের পথ।”
    [“গুলিস্তাঁ“, দ্বিতীয় অধ্যায়, ষষ্ঠ কাহিনী থেকে উদ্ধৃত]

    আসলে গত শতাব্দীতে জাতিরাষ্ট্রগুলোর সীমানা নির্ধারিত হওয়ার আগে আরব, চীন, ভারত, পারস্য বা তুর্কিস্তান বলতে কোনো নির্দিষ্ট দেশকে বোঝাত না, বরং একেকটি বিস্তৃত এলাকাকে বোঝাত। এসব এলাকার রাজনৈতিক সীমানা বা রাষ্ট্রীয় আকার একেক সময় একেক রকম হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সীমানার এসব ভাঙাগড়ার মাঝেই কোনো কোনো জনগোষ্ঠী আটকে গেছে জাতিরাষ্ট্রের সীমান্তের কাঁটাতারে। রোহিঙ্গারা যেমন আটকে গেছে উগ্র বার্মিজ জাতীয়তাবাদের কাছে, তেমনিভাবে চীনের উগ্র জাতীয়তাবাদী আগ্রাসনে আটকে গেছে উইগুর জনগোষ্ঠী। দ্বন্দ্বের নেপথ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের মতোই জাতিরাষ্ট্রের সীমানা, ভাষা ও ধর্মের পার্থক্য।

    তুর্কিস্তানের পূর্ব অংশে উইগুর জনগোষ্ঠীসহ মধ্য এশিয়ার আরো আরো কিছু তুর্কি জনগোষ্ঠী [যেমন, উজবেক, কিরগিজ, কাজাখ, তাজিক ইত্যাদি] বাস করে। এই পূর্ব তুর্কিস্তানের অবস্থান চীনের সীমানা নির্দেশক বিখ্যাত মহাপ্রাচীরের বাইরে। তাই পূর্ব তুর্কিস্তান ঐতিহাসিকভাবে চীনের অংশ নয়, বরং মধ্য এশিয়ার অংশ। তবে বর্তমানে ওই অঞ্চলটি শিনচিয়াং (Xinjian) নামে চীনের অন্তর্ভুক্ত একটি প্রদেশ। 

    উইগুররা পূর্ব তুর্কিস্তানে কবে থেকে বসবাস করে – সেটা নিয়ে উইগুরদের ও চীনা সরকারের পরস্পরবিরোধী মতামত আছে। উইগুর স্কলার মুহাম্মদ আমিন বুগরা দাবি করেন, উইগুররা ওই অঞ্চলে অন্তত ৯০০০ বছর আগে থেকে বসবাস করছে। আরেক উইগুর স্কলার তুরগুন আলমাসের মতে, তুর্কিস্তানে উইগুরদের বসবাস ৬৪০০ বছরের বেশি সময় ধরে। ওয়ার্ল্ড উইগুর কংগ্রেসের মতে, ৪০০০ বছরের বেশি সময় ধরে উইগুরদের পূর্ব তুর্কিস্তানে বসবাসের তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।

    অন্যদিকে চীনা সরকারের দাবি, নবম শতাব্দীতে উইগুররা মঙ্গোলিয়া থেকে ওই অঞ্চলে বসবাসের জন্য আসে।

    তবে পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রাচীন মমি বিশ্লেষণ করে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, উইগুরদের তুর্কি পূর্বপুরুষরা অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ সাল থেকে সেখানে বসবাস করত। 

    আসলে ইউরোপের বিভিন্ন যাযাবর গোত্র আজ থেকে ৬ হাজার বছর আগে থেকেই মধ্য এশিয়া ও চীনের বিভিন্ন এলাকায় পাড়ি জমায়। 

    চীনের প্রাচীন ইতিহাসেও উল্লেখ আছে, চীনের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বাইরে “লম্বা চুলবিশিষ্ট সাদা দেহের” [ইউরোপিয়ান] মানুষরা বসবাস করতো। [“The Tarim Mummies”, J. P. Mallory and Victor H. Mair, p. 55]

    পূর্ব তুর্কিস্তান/শিনচিয়াং (Xinjian) অঞ্চলে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন যাযাবর গোত্রের স্বাধীন কনফেডারেশন শিয়োগনু (Xiongnu) শাসন চলছিল। 

    প্রাচীন বাণিজ্য পথ Silk Route এই অঞ্চল দিয়েই চীন থেকে ইউরোপের দিকে গেছে। ফলে এই অঞ্চলটির স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। 

    খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে চীনের হান সম্রাট উ (Wu) প্রথমবারের মতো পূর্ব তুর্কিস্তান অঞ্চলটি চীনের দখলে নেয়। তখন এই অঞ্চলটির চীনা নাম ছিল শিয়ু (Xiyu) যার অর্থ পশ্চিম অঞ্চল। 

    ইসলামের আবির্ভাবের আগে উইগুররা মূলত বৌদ্ধ ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবন আবদুল মালিকের শাসনামলে (৭০৫-৭১৫) খোরাসানের গভর্নর কুতায়বা ইবন মুসলিম মধ্য এশিয়া/তুর্কিস্তানের বিশাল ভূখণ্ডকে উমাইয়া খিলাফতের অধীনে আনেন। কুতায়বা ৭১৫ সালে চীনের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পূর্ব তুর্কিস্তানের তৎকালীন রাজধানী কাশগর জয় করেন। চীনে তখন তাং রাজবংশের শাসন চলছিল এবং সেটা ছিল চীনা সভ্যতার স্বর্ণযুগ। কাশগর জয়ের পর কুতায়বা চীনের মাটিতে পা রাখার শপথ নেন এবং তাঁর নিয়ে সেনাবাহিনী চীনের প্রাচীরের দিকে অগ্রসর হন। চীনের তৎকালীন রাজা শুয়ানজং (Xuanzong) আরব সৈন্যদের আগমনের সংবাদে এতটাই ভীত হয়ে পড়েন যে, তিনি একটি প্রতিনিধি দলকে চীনের মাটিসহ কুতায়বার কাছে পাঠান এবং বলেন যে, তিনি উমাইয়া খিলাফতকে জিজিয়া কর দিতে রাজি আছেন এবং কুতায়বা আর না এগিয়ে রাজার পাঠানো চীনের মাটিতে পা রেখে তাঁর শপথ পূরণ করুক!

    তবে উমাইয়া খিলাফতের অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে কুতায়বাকে ফিরে আসতে হয় এবং পূর্ব তুর্কিস্তান আবারও চীনাদের দখলে চলে যায়।

    পরবর্তীতে মধ্য এশিয়ার তুর্কি সেনাপতি সুলতান সাতুক বুগরা খান গাজী [মৃত্যু: ৯৫৫ সাল] দশম শতাব্দীর মাঝামাঝিতেতে কাশগর পুনরায় জয় করেন এবং পূর্ব তুর্কিস্তানে ইসলামী শাসন চালু করেন।

    তখন থেকে উইগুররা ইসলাম গ্রহণ করা শুরু করে। তুর্কি Kara-Khanid Khanate-দের শাসনামলে পূর্ব তুর্কিস্তান ও রাজধানী কাশগর ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। এ-সময়ে শত শত উইগুর মুসলিম স্কলার পুরো দুনিয়ায় খ্যাতিমান হন, হাজার হাজার গ্রন্থ এ-সময়ে রচিত হয়। বিখ্যাত উইগুর স্কলার আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী (১৯১২-১৯৭১) ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসায় ১৯৬০-এর দশকে “হেড মাওলানা” ছিলেন। তাঁর নামে আলিয়া মাদ্রাসায় একটি হল আছে। তাঁর কবর আজিমপুর গোরস্তানে।

    ১৮৭৬ সাল পর্যন্ত পূর্ব তুর্কিস্তানে সমৃদ্ধ ইসলামী রাজত্ব চালু থাকে। চীনের মাঞ্চু সাম্রাজ্য ওই বছর থেকে পূর্ব তুর্কিস্তানে ব্যাপক আক্রমণ চালায়। ১৮৭৬ সালের আগস্টে চীনা জেনারেল Zuo Zongtang-এর নেতৃত্বে পূর্ব তুর্কিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ উরুমচি (Ürümqi) শহর দখল করে নেয় চীনারা। পরের বছর রাজধানী কাশগরের পতন ঘটে। এভাবে ধাপে ধাপে পুরো পূর্ব তুর্কিস্তান মুসলিমদের হাত থেকে চীনাদের হাতে চলে যায় এবং ১৮৮৪ সালের ৪ নভেম্বর চীনের মাঞ্চুরা পূর্ব তুর্কিস্তানকে “শিনচিয়াং” (Xinjian অর্থ নতুন সীমান্ত) নামে চীনের নতুন প্রদেশে পরিণত করে। তখন থেকেই উইগুর মুসলিমদের পরাধীনতা ও জাতিগত দুর্দশার সূচনা হয়। এই সময়কালেই আল্লামা ইকবাল তাঁর “তারানা-ই-মিল্লি”-তে লেখেন: “চীন ও আরাব হামারা” অর্থাৎ তুর্কিস্তান মুসলিমদেরই। কিন্তু মধ্য এশিয়ার ওই প্রান্তটি কি উইগুরদের দাবিকৃত পূর্ব তুর্কিস্তান, নাকি চীনাদের দাবিকৃত Xinjian (নতুন সীমান্ত) – সেই প্রশ্নের মীমাংসাতেই এখনো আটকে আছে ওই এলাকাতে বসবাসরত দেড় কোটি উইগুরের জাতিগত আত্মপরিচয়।

    ১৯১১ সালে চীনের বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীরা চীনের মাঞ্চু রাজবংশকে উৎখাত করে এবং সান ইয়াত-সেনের নেতৃত্বে চীন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। চীনাদের পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেতে উইগুররা লড়াই চালিয়ে যায়। বিশেষত ১৯৩৩ সালে ও ১৯৪৯ সালে দু’টি স্বল্পমেয়াদী স্বাধীন “পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র” গঠিত হয়েছিল। 

    ১৯৪৯ সালে চীনে মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৯ সালে গঠিত স্বাধীন “পূর্ব তুর্কিস্তান প্রজাতন্ত্র”-কে মাও বন্দুকের জোরে তাঁর নবঘোষিত গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। মাওয়ের নিজেরই বিখ্যাত উক্তি: “Political power grows out of the barrel of a gun”. [বন্দুকের নলই সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস]

    মাও বলতেন, “Politics is war without bloodshed while war is politics with bloodshed”. মাও তাঁর নিষ্ঠুর সেনা অফিসার Wang Zhen-কে স্বাধীনতাকামী উইগুরদের উপর লেলিয়ে দেন। জেনারেল Wang Zhen-এর নেতৃত্বাধীন সেনা অভিযানে ১০ লক্ষাধিক উইগুর নিহত হয়, প্রায় ২৫ হাজার মসজিদ ধ্বংস করা হয়। Wang Zhen ছিলেন শিনচিয়াংয়ে মাওয়ের নিয়োগকৃত সামরিক সরকারের প্রধান। তিনি ভয়াবহ নৃশংসতার জন্য কুখ্যাতি অর্জন করেন। তিনি Xinjian থেকে মাও-কে লিখতেন যে, উইগুররা হচ্ছে “গোলযোগ সৃষ্টিকারী সংখ্যালঘু” (a troublemaking minority) এবং পরামর্শ দিতেন যে, ভবিষ্যৎ সমস্যা এড়ানোর জন্য উইগুরদেরকে “সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন” (thoroughly wiped out) করে দিতে হবে!

    বোঝাই যাচ্ছে কেন উইগুর মায়েরা তাদের শিশুদের ভয় দেখায় যে, “ভালো হয়ে যাও, নয়তো Wang Zhen এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে!” ১৯৯৩ সালে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে Wang Zhen-এর মৃত্যু ঘটলে তাঁর মৃত্যুসংবাদে The New York Times লিখেছিল

    After the Communist victory in 1949, Wang Zhen was assigned to tame the northwest Xinjiang region, home to Muslims of Turkish extraction. He subdued the area with efficiency and brutality, and it is said that some mothers in Xinjiang still warn their children to be good “or else Wang Zhen will come and get you.”

    উইগুরদের প্রতি চীনা কমিউনিস্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ এখনো একই রকম আছে। ব্যাপক নির্যাতন, গ্রেফতার, গুম ইত্যাদি উইগুরদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ! উইগুর মুসলিমদের রোজা, হিজাব, দাড়ি সবকিছুতেই চীনা সরকার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তেলসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদে ভরপুর Xinjian প্রদেশটিতে চীনারা নিয়মিতই বিভিন্ন পারমাণবিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সামরিক প্রশিক্ষণ চালাতে থাকে। The Economist-এর ভাষায়, চীনের অধীনে Xinjian প্রদেশটি “বিশ্বের নজিরবিহীন পুলিশি রাষ্ট্র”-তে পরিণত হয়েছে।

    দশ লক্ষাধিক উইগুরকে চীনারা বন্দি রেখেছে বলে জাতিসংঘের একটি কমিটির সাম্প্রতিক তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে। চীনা কর্তৃপক্ষ খবরটি পুরোপুরি অস্বীকার করেনি, তবে তাদের ভাষায় ওই ১০ লক্ষাধিক উইগুর কোনো বন্দিশিবিরে নয়, বরং Re-education ক্যাম্পে আছে!

    চীনের এসব তথাকথিত Re-education ক্যাম্প যে কেমন, সেটা বোঝা যায় সেখান থেকে পালিয়ে অন্য দেশে চলে যেতে সক্ষম হয়েছেন এমন উইগুর নাগরিকদের বক্তব্যে। এরকম কয়েকজনের সাথে কথা বলেছে বিবিসি। ওমির নামে একজন উইগুর বলেছেন, “তারা আমাদের ঘুমাতে দেয়নি। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাকে ঝুলিয়ে রেখে পেটানো হতো। কাঠ ও রবারের লাঠি দিয়ে পেটাতো। তার দিয়ে বানানো হতো চাবুক। সুই দিয়ে শরীরে ফুটানো হতো। প্লাইয়ার দিয়ে তুলে নেয়া হতো নখ। আমার সামনে টেবিলের ওপর এসব যন্ত্রপাতি রাখা হতো। এসময় অন্যরা যে ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করত সেটাও আমি শুনতে পেতাম।”

    চীনের দেড় কোটি উইগুর মুসলিম কেন এমন ভয়াবহ পরিবেশে আছেন, সেটার উত্তর হয়ত আল্লামা ইকবাল ও শেখ সাদী তাঁদের উপরে উদ্ধৃত লেখাতেই দিয়ে গেছেন: বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্ব ভুলে মুসলিম উম্মাহ এখন কাবার পথ ছেড়ে উল্টো পথে চলতে শুরু করেছে। তাই এখন আর খলিফা ওয়ালিদের মতো কোনো রাষ্ট্রপ্রধান নেই, তাই এখন আর কুতায়বা কিংবা সুলতান বুগরা খানের মতো কোনো সামরিক কমান্ডার নেই!

    লিখেছেনঃ Sk Omar Rasel
    মূল লেখাঃ উইগুর: দশ লক্ষাধিক বন্দির মুসলিম জনগোষ্ঠী

  • কুরআনকে যেভাবে বুঝা উচিত ছিল

    কুরআনকে যেভাবে বুঝা উচিত ছিল

    পবিত্র কুরআন হল সেই গ্রন্থ যা সাহাবা (রা) এর জীবনে ব্যক্তিগতভাবে এবং সামষ্টিকভাবে ইসলাম গ্রহণের আগের জীবন ও পরের জীবনের মধ্যে ব্যাপক পাথর্ক্য গড়ে দিয়েছিল। নিষ্ফলা মরুভূমি ও বর্বর হওয়ায় রোমান ও পারস্য পরাশক্তিসমূহ আরবের যে অংশে রাসূলুল্লাহ (সা) এসেছিলেন সে অংশের প্রতি ছিল অনাগ্রহী এবং এ অংশের লোকদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। কিন্তু কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআন সে বর্বর লোকগুলোকে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করল এবং রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্যকে পদানত করে এমন এক দীঘমেয়াদী উন্নত সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল যা ছিল নজিরবিহীন।এর জন্য তারা শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলেন মুহাম্মদ (সা) কে যিনি ছিলেন জীবন্ত কুরআন। সাহাবীদের অবিকল সেই কুরআন এখন আমাদের মধ্যে আছে।

    এতে মিথ্যার প্রভাব নেই, সামনের দিক থেকেও নেই এবং পেছন দিক থেকেও নেই। এটা প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। [সূরা হা মীম আস-সাজদাহ: ৪২]

    আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক। [সূরা হিজর: ৯]

    প্রশ্ন হচ্ছে একই কুরআন কেন আমাদের আজকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জাতিতে রূপান্তরিত করতে পারছেনা। আজকে কেন মুসলিম দেশসমূহই যুদ্ধবিধ্বস্ত, দুর্ভিক্ষপীড়িত, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাদপদ, তৃতীয়বিশ্বের? আমাদের মধ্যে রয়েছেন অসংখ্য আলেমে দ্বীন-যাদের কেউ মুফাসসিরে কুরআন, কেউ মাওলানা, কেউ মুফতি, কেউ বা হাফেজে কোরআন, কেউ ক্বারী, কেউ বা ফকীহ। কুরআন শিক্ষা ও হিফজ করার জন্য রয়েছে অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান যেখানে লক্ষ লক্ষ মুসলিম কুরআন শিখছেন অথবা হিফজ করছেন। অনেক জগতবিখ্যাত ক্বারী সাহেবেদের নাম শোনা যায় যারা বিভিন্ন পদ্ধতিতে কুরআন সুললিতভাবে তেলাওয়াত করার জটিল কৌশল রপ্ত করেছেন। মিডিয়াতে মিউজিক্যাল রিয়েলিটি শো এর মত কুরআন তেলাওয়াত করার জাতীয় ও আান্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন হচ্ছে। বাংলাদেশের মত অনারবী মুসলিম তরুণগণ এসব প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করছে। কিন্তু এ প্রথম স্থান অধিকার বা কুরআনের লক্ষ লক্ষ হাফেজ তৈরি করা বাংলাদেশকে আমেরিকার মত সুপার পাওয়ার করছে না, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এনে দিচ্ছে না, ১৮ কোটি লোকের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। তাহলে বর্তমান আইফোন বা ইন্টারনেটের অত্যাধুনিক জমানায় কুরআন কি তার কার্যকারীতা হারিয়ে ফেলেছে? আসতাগফিরুল্লাহ। মুহাম্মদ (সা) অন্য নবীদের মত একটি সুনিদিষ্ট সময় ও কোনো নিদিষ্ট বংশ, গোত্র বা জাতির জন্য আসেননি। বরং তিনি এসেছেন কেয়ামত পযন্ত, সমগ্র মানবজাতির জন্য। তদ্রুপ তার উপর নাজিলকৃত কুরআনও কেয়ামত পযন্ত কার্যকর এবং তা পুরো পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য। তাহলে সমস্যা কোথায়? 

    তিনি (সা) বলেন: 

    নিশ্চয়ই আল্লাহ এ কিতাবের মাধ্যমে কিছু সম্প্রদায়ের উত্থান ঘটাবেন এবং কিছু সম্প্রদায়ের পতন ঘটাবেন। [মুসলিম]

    উত্তর হল এই কুরআনকে আমরা সেভাবে বুঝতে পারছি না বা বুঝার চেষ্টা করছিনা যেভাবে সাহাবা (রা) উপলদ্ধি করেছিলেন, গ্রহণ করেছিলেন। 

    ইমাম আহমেদ বর্ণণা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কিছু বলার পর বললেন, “এমন একটি সময় আসবে যখন জ্ঞান হারিয়ে যাবে।” ইবনে লুবায়েদ (রা) বললেন, হে রাসূলুল্লাহ (সা), এটি কী করে হবে, যখন আমি নিজে কুরআন শিক্ষা করছি এবং আমার সন্তানকে তা শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমার সন্তান তার পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিবে।’ রাসূল (সা) বললেন, “তোমার মা তোমাকে হারাক! আমি ভাবতাম তুমি মদীনার সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন। তুমি মদীনার ইহুদী ও খ্রীস্টানদের দেখতে পাও না যাদের সাথে তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত ও ইনজীল আছে, অথচ তারা সেখান থেকে উপকৃত হচ্ছে না (সেগুলো তারা অনুসরণ করছে না)।” 

    কুরআন তাকে সাজিয়ে রাখার জন্য বা অলংকৃত হওয়ার জন্য বা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার জন্য আসেনি। আজকাল কুরআনকে এত অলংকৃত করা হয়, এত সাজানো হয় যে সাধারণ কেউ এটিকে হাতে নিতেও ভয় পায়। আবু দারদা (রা) বলেন, ‘যখন এমন সময় আসবে তোমরা মসজিদকে এবং কুরআনকে বেশী অলংকৃত করবে তখন তোমরা ধ্বংস হবে। কারণ তখন তোমরা মূল বিষয়বস্তুর চেয়ে প্রতীককে অধিকতর গুরুত্ব দিবে। 

    আবু দারদার সময়ে কুরআন লিখিত ছিল হাড়, পাতা, চামড়ার টুকরোতে। অথচ আজকের কুরআন উন্নত কাগজ ও মুদ্রণ যন্ত্রের আশীর্বাদপুষ্ট। এমনকি বিভিন্ন অ্যাপ এর মাধ্যমে আমাদের ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মধ্যে চলে এসেছে। আজকের লোকজন কুরআনকে হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআনকে দেখলে ভাবত এটি কুরআনের অপমান। অথচ হাড়, পাতা বা চামড়াতে কুরআন লিখলে তা অপমান হয় না, বরং অসম্মান হয় যখন তা অনুসৃত হয় না। 

    “আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগন উপদেশ গ্রহণ করে।’ [সূরা সোয়াদ: ২৯]

    “তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তা কুরআনে আমাদের কেবল তা তেলাওয়াত করতে বলেননি, বরং এটি দিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে বলেছেন। আমাদের তাদাব্বুর বা গভীর মনোনিবেশ করতে হবে কুরআনের বিষয়ে। 

    সাহাবাগণ কীভাবে কুরআনকে অধ্যয়ন করেছিলেন? 

    আমাদের মনে রাখা দরকার কেবলমাত্র কুরআন এবং কুরআনই জন্ম দিয়েছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শাসক ও রাষ্ট্রনায়ক ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর, শ্রেষ্ঠ শহীদ আমীর হামজা (রা), শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বিন আউফ (রা), শ্রেষ্ঠ সমরনায়ক খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা)… 

    আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর (রা) বলেন, ‘সূরা বাক্বারা হিফয করতে আমার ১৪ বছর সময় লেগেছিল।’ তিনি বলেন, ‘আমি এত খুশী হয়েছিলাম যে, লোকদের একটি উট কুরবানী দিয়ে নিমন্ত্রন করেছিলাম।’ আমরা এখন পুরো কুরআন এক বছরে হি’ফজ করতে পারি, তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে উমরের কী করে সূরা বাক্বারা হিফজ করতে এত সময় লাগল? এর ব্যাখ্যা একজন তাবেয়ীন দিয়েছেন এভাবে, ‘আমার কিছু সাহাবী (রা) এর সাথে পরিচয় ছিল এবং তারা আমাকে বলেছেন, কুরআনের দশটি আয়াতকে তারা নিতেন এবং এগুলো অধ্যয়ন করতেন, এ দশ আয়াতের মধ্যে ঈমান, ইলম, হালাল, হারাম অধ্যয়ন করতেন এবং তারপর এ দশ আয়াত হিফজ করতেন। তারপর পরবর্তী দশ আয়াতে আবার গভীর মনোনিবেশ করতেন। তারা ততক্ষণ পযন্ত পরবর্তী দশ আয়াতে যেতেন না যতক্ষন না আগের দশ আয়াত জীবনে প্রয়োগ করতেন। আমি একথা একজন নয়, বহু সাহাবীকে বলতে শুনেছি।’ 

    ইমাম আহমেদ আল গাজ্জালি বলেন, ‘আমি দশ বছর বয়সে কুরআনের হাফেজ হয়েছি। উপলদ্ধি করা ছাড়া কেবলমাত্র মুখস্থ করার দরুণ যখন আমি বড় হলাম এবং কুরআনকে উপলদ্ধি করার চেষ্টা করলাম, তখন দেখলাম এটি অত্যন্ত কষ্টকর। কেননা আমি কেবল বারংবার আওড়াতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অনেক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের পর আমি এ চক্র ভাঙতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং অবশেষে কুরআনের আয়াতসমূহ নিয়ে গভীর চিন্তা ও উপলদ্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলাম।’ এ ঘটনার বাস্তবতা আমাদের বর্তমান কুরআন না বুঝে হিফজ করার শিক্ষাপদ্ধতির অসারতা তুলে ধরে। সুতরাং কুরআনকে বুঝতে হলে আমাদের সাধনা ও প্রচেষ্টার ভেতর দিয়ে যেতে হবে। 

    কুরআনকে নিয়ে তাদাব্বুর করতে হলে এর ভাষা আরবী শিখতে হবে। কারণ এটি আরবী কুরআনরূপে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নাজিল করেছেন এবং এটি আরবীতেই একটি মু’জিযা। দুনিয়ার ভাষা ইংরেজি শেখার জন্য আমাদের কত অধ্যবসায়। কেউ ইংরেজী শিখতে পারলে ভাবে দুনিয়ার সুযোগের দরজা জানালা তার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কারণ সেটি আন্তর্জাতিক ভাষা, ইন্টারনেটের ভাষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা। জান্নাতের দরজা জানাগুলো খোলার জন্য আমাদের কী আরবী শেখা উচিত নয়? দুনিয়ার যে কোন বিখ্যাত ব্যক্তি একটি বার্তা প্রেরণ করলে আমরা উদগ্রীব হয়ে যাই তা পাঠোদ্ধার করতে। অথচ মহাবিশ্বের মহান অধিপতি, রাজাধিরাজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বার্তা বুঝার জন্য সে ভাষা শিখছি না। এটা কি বুদ্ধিমানের আচরণ? 

    এখনকার সময়ে যে কোন অনুষ্ঠানের শুরুতে ও শেষে কুরআন তেলাওয়াত করা হয়। মানুষ তার তাকের মধ্যে কুরআনকে রেখে পুরো জীবন পার করে দেয় এবং অতপর সে লোকটি মারা গেলে অন্য কেউ সে কুরআন থেকে কিছু আয়াত তেলাওয়াত করে এবং আবার কুরআনটিকে তাকে রেখে দেয়। যখন বিয়ে হয় তখন সূরা ফাতিহা এবং যখন কেউ মারা যায় তখন সূরা ইয়াসিন পাঠ করা হয়। লোকেরা কুরআনের এই হক্ব আদায় করছে!!

    সুবহানআল্লাহ, আল্লাহ’র কিতাব শুরুর দিকের মুসলিমদের চালিকা শক্তি ছিল। কুরআন নিয়ে বাঁচা এবং একে গুরুত্বের সাথে নেয়ার অর্থ হল আমরা আল্লাহ’র কিতাবকে ভালবাসব। আমরা যদি কুরআনের সাথে আত্নাকে একীভূত না করে তা পড়ি এবং তেলাওয়াত করি তাহলে সেটা থেকে কোন সুফল পাব না। এটি বুঝা যায়, উসমান ইবনে আফফান (রা) এর একটি বক্তব্যে, ‘যদি হৃদয় পবিত্র হয়, তবে সেটি আল্লাহ’র কিতাবের ক্ষুধা থেকে কখনওই মুক্তি পাবে না।’ আমরা যদি আল্লাহ’র কিতাবের প্রতি মহব্বত পোষণ করি তবে হৃদয় কখনওই এতে তৃপ্ত হবে না। 

    যখন একজন তাবেয়ীন আবদুল্লাহ ইবনে উমরের ইবাদত সম্পর্কে জানার জন্য তার ভৃত্যকে জিজ্ঞেস করল, তখন সে বলল, ‘তিনি সালাতে যেতেন এবং এর মধ্যবর্তী সময় কুরআন অধ্যয়ন করতেন।’ এটি এরকম স্বাভাবিক বিষয় ছিল। যদি সালাতের মধ্যবর্তী সময় তিনি অন্য কাজ করতেন তবে এটি করা তার পক্ষে সম্ভবপর হত না। হায়! আমাদের অনেকেরই মাসের পর মাস চলে যায় অথচ আল্লাহ’র কিতাবকে স্পর্শও করি না। অথচ আবদুল্লাহ ইবনে উমরের জীবন কুরআনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হত। ওসমান ইবনে আফফান (রা) কিয়ামুল লাইলে দু’রাকাআত নামাজে দাঁড়িয়ে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, রাত শেষ হয়ে যেত অথচ তার নামাজ শেষ হত না। এতে তিনি একঘেয়ে অনুভব করতেন না, ক্লান্তি অনুভব করতেন না, কেননা কুরআনের প্রতি ছিল তার অপরিমেয় ভালবাসা। আল্লাহ তার জন্য এটিকে সহজ করে দিয়েছিলেন। 

    আমাদেরকে আল্লাহ’র কিতাবের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে এবং এর অধ্যয়ন থেকে বিচ্যুত হওয়া যাবে না। আমরা অনেক সময় কুরআন বাদ দিয়ে অন্যান্য ইসলামি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করি এবং ভাবি অনেক জ্ঞান অজন করেছি। ইসলামি সাহিত্য পড়া ফলদায়ক হলেও, কুরআনের গভীর উপলদ্ধি ছাড়া ইসলামের জ্ঞানার্জন সম্পূর্ণ হয় না। 

    ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের কুরআনকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করলেই চলবে না, বরং আমাদের সমাজ ও গোটা বিশ্বকে কুরআনের চোখ দিয়ে দেখতে হবে। একটি উদাহরণ: আনাস বিন মালিক (রা) এর মা- উম্মে মাহারা কুরআন অধ্যয়ন করেন এবং উপলদ্ধি করতে পারলেন ইসলাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে এবং জলে স্থলে জিহাদ হবে। সুতরাং তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘সমুদ্রপথে যারা জিহাদে অংশগ্রহণ করবে তাদের মধ্যে আমিও থাকতে চাই।’ এ কথা শুনে রাসূল (সা) তার জন্য দোয়া করলেন যাতে তিনি জিহাদে অংশ নিতে পারেন । তিনি মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান (রা) এর সময়ে মুসলিমদের প্রথম নৌ জিহাদে অংশগ্রহণকারীদের একজন ছিলেন-সুবহানআল্লাহ। তিনি এ উপলদ্ধি পেয়েছিলেন কুরআনে বর্ণিত সমুদ্রকে মানুষের অধীনস্ত করে দেয়ার আয়াত থেকে: 

    আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা মাছের গোশত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে যা পানি চিরে চলেছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অনুসরণ করতে পার এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর।’ (সূরা নাহল:১৪)

    তিনি কখনও সমুদ্রে না গেলেও এই আয়াত পড়েই বুঝে গিয়েছিলেন একদিন সমুদ্রপথে আল্লাহ’র দ্বীন বিস্তার লাভ করবে। 

    এখন জলপথে ২০-৩০ হাজার জাহাজ পুরো পৃথিবীব্যাপী দাপিয়ে বেড়ায়। পৃথিবীর দশ ভাগের আটভাগ সমুদ্র হলেও সেই সমুদ্রে মুসলিমদের তৈরি কোন জাহাজ ঘুরে বেড়ায় না। একটি সাবমেরিনও মুসলিমরা তৈরি করে না। সুতরাং উপরের আয়াত অনুসারে আমাদের অবস্থান কোথায়? কুরআন সম্পর্কে আমাদের উপলদ্ধি কোথায়? সাহাবাদের জীবনের সাথে সমুদ্রের কোন যোগসূত্র না থাকলেও তারা খুব দ্রুত নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠিত করেছিল। মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ছিলেন মুসলিম নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা। আর সেই থেকে পরবর্তী কয়েক শতাব্দীকাল ধরে ইসলামি বাণিজ্যিক জাহাজগুলো পৃথিবীর মহাসমুদ্রগুলোতে দাপিয়ে বেড়িয়েছে এবং প্রাধান্য বিস্তারকারী বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। সুতরাং এটি সুস্পষ্ট যে, আমরা কুরআনের সঠিক উপলদ্ধি থেকে দূরে আছি।

    কুরআনকে কী আমরা সাহাবাদের মত করে উপলদ্ধি করব নাকি এ সময়ে আমাদের মত করে উপলদ্ধি করব?

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, 

    ‘তাদের প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণাদি ও কিতাবসমূহ এবং তোমার প্রতি নাজিল করেছি কুরআন, যাতে তুমি মানুষের জন্য স্পষ্ট করে দিতে পার, যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে। আর যাতে তারা চিন্তা করে।’ [সূরা নাহল: ৪৪]

    কুরআনের ব্যাখ্যা এসেছে রাসূলুল্লাহ (সা) এর মাধ্যমে এবং তার সরাসরি ছাত্র ছিল সাহাবা (রা)। সুতরাং সাহাবাগণ হচ্ছে সে প্রজন্ম যারা নিজেদের উপর কুরআন প্রয়োগ করেছিলেন। কুরআনকে বুঝার জন্য সাহাবাদের জীবন ও রাসূল (সা)-এর বক্তব্য অনুধাবন করা অপরিহার্য। যে কোন বই উদাহরণসহ বুঝা সহজতর। আমরা যদি কুরআনের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ না নেই এবং খোলাফায়ে রাশেদীনগণ কীভাবে এগুলো উপলদ্ধি করেছেন তা অনুধাবন করতে না পারি তাহলে তা বুঝার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। কারণ আরবি ভাষা একটি সমৃদ্ধ ভাষা এবং একটি শব্দের পনেরটি মত অর্থও থাকতে পারে। এখানে কোন অর্থটি নেয়া উচিত তা আমরা কী করে বুঝব যদি আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) এর ব্যাখ্যা না নেই ও সাহাবা (রা) এর উপলদ্ধিকে অনুধাবন না করি। যেমন: সূরা বাক্বারা এর ১৯৫ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন, ‘…নিজেদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিও না…’। মুসলিম এবং রোমানদের মধ্যে একটি যুদ্ধ হচ্ছিল। একজন মুসলিম সৈন্য দলচ্যুত হয়ে রোমান সৈন্যবাহিনীর ভেতর ঢুকে পড়ল। তা দেখে একজন মুসলিম বলল, ‘এই ব্যক্তি নিজের ধ্বংসের কারণ হয়েছে।’ পাশে দাড়ানো আইয়ূব আল আনসারী (রা) বললেন, ‘তুমি সে আয়াতটি (সূরা বাক্বারা:১৯৫) বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। সেখানে আমাদের অর্থাৎ আনাসারদের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা)-কে আল্লাহ যখন মক্কায় বিজয় দান করলেন তখন আমরা ভাবলাম এখন আমরা ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত যেতে পারি। এ আয়াত নাজিল করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সাবধান করেছিলেন যে, ক্ষেত খামার ও ব্যবসায় ফেরত গেলে আমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই করছি। রাসূল (সা) বিজয়ী হওয়ার পরও তাকে আমাদের পরিত্যাগ করা সঠিক হবে না এবং জিহাদ ও ত্যাগ অব্যাহত রাখতে হবে।’

    সুতরাং আইয়ুব আল আনসারী (রা) আমাদেরকে কুরআনের এ আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি আমাদের না জানালে আমরা হয়ত এ আয়াতটির সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করতে পারতাম না।

    তাফহীমুল কুরআনে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী বলেন, ‘It should be remembered nevertheless that full appreciation of the spirit of the Quran demands practical involvement with a struggle to fulfil its mission. The Quran is neither a book of abstract theories and cold doctrines which the reader can grasp while seated in a cosy arm chair nor is it merely a religious book like other religious books, the secrets of which can be grasped in seminaries and oratories. On the contrary, it is the blueprint and guidebook of a message of a mission of a movement. As soon as the Book was revealed, it drove a quiet, kind hearted man who was in isolation and seclusion and placed him on the battlefield of life to challenge a world that has gone astray. It inspired him (saws) to raise his voice against falsehood and pitted him in a grim struggle against the standard bearers of unbelief, of disobedience to God, of waywardness and error.’ (এটি মনে রাখা উচিত, কুরআনের মূল বাণী আমাদের এর লক্ষ্য পূরণের আন্দেলনে সম্পৃক্ত হওয়ার দাবি করে। কুরআন কোন দ্রুপদী তত্ব অথবা হিমশীতল আদর্শিক কিতাব নয় যা আরাম কেদারায় বসে পড়া যায় অথবা অন্য ধর্মের মত কোন নিছক ধর্মীয় কিতাব নয় – যার রহস্য সেমিনার বা বক্তব্যের মাধ্যমে অনুধাবন করা যাবে। বরং এটি হল একটি মিশনকে সামনে রেখে আন্দোলনের বার্তার নির্দেশিকা অথবা নীলনকশা। যখন বইটি নাজিল হল তখন তা একজন শান্ত, সহৃদয়বান মানুষ যিনি জনারণ্য থেকে নিভৃতে ছিলেন তাকে নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য জীবনযুদ্ধে টেনে নিয়ে আসে। এটি তাকে মিথ্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে উদ্ধুদ্ধ করেছিল এবং কুফর, আল্লাহদ্রোহিতা, পথভ্রষ্টতা এবং বিভ্রান্তির ধারকদের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর লড়াইয়ে অবতীণ করেছিল।

    কুরআন যে বাস্তবতায় নাজিল হয়েছিল সে বাস্তবতার ভেতর দিয়ে সাহাবা (রা) গিয়েছিলেন। সে কারণে কুরআন তাদের জীবনের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। কুরআনের রঙে নিজেদের রাঙাতে পেরেছিল। আজকেও আমরা সাহাবীদের মত একটি পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। মুসলিমগণ আজকে অভিভাবকহীন, রাষ্ট্রবিহীন, খিলাফতবিহীন। যারা নিজেদেরকে সাহাবীদের মত কুরআনকে জীবনের সবক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে রত নেই, তারা কুরআনকে সাহাবাদের মত উপলদ্ধি করতে পারবে না। কুরআন নিয়ে নিছক তাত্ত্বিক গবেষণা, একাডেমিক আলোচনার মাধ্যেমে এর ভাবার্থ অনুধাবন করা যাবে না। একে জীবনের সাথে মেলাতে হবে। তবেই কুরআন আমাদেরকে সাহাবীদের মত শ্রেষ্ঠত্বের আসনে নিয়ে যাবে। যারা আল্লাহ’র জমিনে আল্লাহ’র দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য, রাসূলুল্লাহ (সা) এর প্রদর্শিত খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামে অবতীর্ণ, জালিম শাসকের জুলুমের শিকার তারাই কেবলমাত্র সূরা বাক্বারার ২১৪ নং আয়াতকে উপলদ্ধি করতে পারবে, 

    ‘তোমরা কী এই ধারণা করেছ যে, সহজেই জান্নাতে চলে যাবে, অথচ সে লোকদের অবস্থা অতিক্রম করনি যারা তোমাদের পূর্বে এসেছে। তাদের উপর এসেছে বিপদ ও কষ্ট। আর এমনিভাবে শিহরিত হয়েছে যে নবী ও তার উম্মতেরা বলা শুরু করেছিল, কখন আসবে আল্লাহ’র সাহায্য। জেনে রেখো আল্লাহ’র পক্ষ থেকে আসা বিজয় অতি নিকটে।’

    জালিম শাসকের দোসর হয়ে অথবা তার বিরুদ্ধে নীরব থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মখমলের গালিচায় মোড়া ড্রয়িংরুমের আরাম কেদারায় বসে এই আয়াত হাজারবার পড়লেও তা কোন সাধারণ মুসলিম তো দূরের কথা আলেমের উপলদ্ধিতেও আসবে না। দাওয়াকারীই কেবলমাত্র কুরআনে বর্ণিত নুহ (আ)-এর চরম অধ্যবসায় থেকে শিক্ষা নিতে উদ্ধুদ্ধ হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রে চিন্তার অধঃপতন কীভাবে একটি জাতিকে ধ্বংস করে সেটি লুত (আ)-এর কওম থেকে শিখতে পারবে। কোন অবস্থাতেই দাওয়া করতে গিয়ে ধৈর্যহারা হওয়া যাবে না তা শেখা যাবে ইউনুস (আ)এর দাওয়াতী জীবন থেকে। মুসা (আ)-এর কাছ থেকে শেখা যাবে কীভাবে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে পৌরুষদীপ্ত হয়ে হক্ব কথা বলতে হয়। ইউসুফ (আ) এর কাছ থেকে এই চরম ফিতনার সময়ে একজন যুবক কী করে ত্বাকওয়া ও দ্বীনদারিতায় ইস্তিকামাত থাকতে পারে তা শিখবে। সূরা লাহাব থেকে শিখবে কীভাবে জালিম শাসককে বা নেতৃত্বস্থানীয় লোকদের কঠোর ভাষায় জবাবদিহী করতে হয়। সূরা নূরের ৫৫ আয়াত খিলাফত আসার ব্যাপারে তার বিশ্বাসকে দৃঢ় করবে। কেবলমাত্র বিপদ আপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আয়াতুল কুরসী পড়ে ক্ষান্ত থাকবে না, বরং সেখানে মানুষ নয়, আল্লাহ’র সাবভৌমত্বের ঘোষণাকে উপলদ্ধি করবে। সূরা আসর পড়ে মানবজীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পকে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে।

    আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের সবাইকে কুরআনের সঠিক বুঝ দান করুক। আমীন।