তাকওয়ার প্রকৃত অর্থ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسْلِمُونَ
হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যথাযথ ভয়। আর তোমরা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করা ছাড়া মৃত্যুবরণ করো না। [আলে ইমরান ৩:১০৩]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা পবিত্র কুরআনে অসংখ্যবার তাকওয়ার ব্যপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তাকওয়া ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার মধ্যে একটি। তাকওয়ার মাধ্যমেই (মুসলিম) সমাজের মানুষ একে অপরের সাথে সম্পর্কিত হয়, তাদের কার্যাবলী সম্পাদন করার ক্ষেত্রে। তাকওয়ার বিশাল গুরুত্বের কারণে কুরআন ও সুন্নাহতে অসংখ্যবার মুসলিমদের জীবনে তাকওয়ার প্রাসঙ্গিকতা ও তাৎপর্যের প্রতি জোর দিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে।
দুনিয়া ও আখেরাতে তাকওয়ার অবলম্বনের অসীম পুরস্কারের কথা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা জোর দিয়ে আমাদের জানিয়েছেন। এ কারণে তাকওয়া অর্জন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যাতে আমরা আল্লাহর সাহায্য বিজয় পেতে পারি।
দুর্ভাগ্যবশতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্টটি আমরা অবহেলা করে থাকি। কাফেররা ইসলামী আকীদা ও তাকওয়ার গুরুত্ব কত বেশি তা দূর অতীততের মত বর্তমান সময়েও বুঝতে পারে। কাফেররা বুঝে এই আকীদা ও তাকওয়াই কাফিরদের স্বার্থ আদায়ের ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা। মুলত ইসলামী আকিদা ও তাকওয়াই মুসলিমদের মুল শক্তি। পশ্চিমারা তাই আগ্রাসন চালায় যাতে আমরা ইসলামী জীবন ব্যবস্থা থেকে দুনিয়াকে পৃথক করে ফেলি, তারা আগ্রাসন চালায় আমরা যাতে সেকুলারিজম কিংবা বহুত্ববাদ-এর চিন্তা দ্বারা আল্লাহর দ্বীনকে পরিবর্তন করে ফেলি। আল্লাহর দ্বীনকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক সম্পর্ক থেকে পৃথক ইসলামকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মাঝে সীমাবদ্ধ করে রাখি। আল্লাহর দ্বীনের বিরুদ্ধে কাফের ও তাদের দালালদের প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রগুলোর ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা আমাদের সতর্ক করে বলেছেন-
يُرِيْدُوْنَ اَنْ يُّطْفِـُٔوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِاَفْوَاهِهِمْ وَيَاْبَي اللّٰهُ اِلَّاۤ اَنْ يُّتِمَّ نُوْرَهٗ وَلَوْ كَرِهَ الْكٰفِرُوْنَ
তারা তাদের মুখের (ফুঁক) দ্বারা আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে চায়, কিন্তু আল্লাহ (সে ব্যপারে) অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যে তিনি তাঁর নূর পরিপূর্ণ করা ছাড়া অন্য কিছু চান না, যদিও কাফিররা অপছন্দ করে। [তওবা ৯:৩২]
দুর্ভাগ্যবশত সেকুলারিজমের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আল্লাহর দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে যারা ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতা চর্চা করে অনেক সময় তাদেরকেই সমাজে আমরা মুত্ত্বাকী হিসেবে চিহ্নিত করি। দৃশ্যত এই সব ব্যক্তিবর্গ সালাত, রোজা, মসজিদে দান ও নিরাপদে একাকিত্ব জীবণ ধারণ করাকেই তাকওয়াবান হিসেবে মনে করে। অন্যদিকে এইসব ব্যক্তিবর্গ উম্মাহর জীবনে ইসলাম ফিরিয়ে আনার (পূণর্জাগরণ) কাজ থেকে নিজেকে আলাদা রাখে। পাশাপাশি এদের অনেকেই সুদের লেনদেন ও মিথ্যায় অভ্যস্ত এবং উম্মাহর পুনর্জাগরণে এদের কোনোই ভুমিকা দেখা যায় না।
সেকুলারিজমের প্রভাবের কারণেই ইসলামকে মানুষ অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই মনে করে অথচ ইসলাম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, ইসলাম মানুষের জীবনে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ সমাধান দিয়ে থাকে। বাস্তবে আমরা একজন সাধারণ মুসলিমকে সালাতের নিময়কানুনগুলো জিজ্ঞেস করলে সে সহজে উত্তর দিতে পারে। অন্যদিকে আমরা যদি ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, চুক্তি ও কোম্পানি গঠনের শর’ঈ নিয়ম অথবা প্রতিনিয়ত মুসলিম উম্মাহর উপর কাফিরদের আগ্রাসন যেমন ইরাকে গণহত্যা, ফিলিস্তিনিতে গণহত্যার ব্যাপারে শরীয়ার হুকুম কী জিজ্ঞেস করি তাহলে তারা উত্তর দিতে ব্যর্থ হন। এগুলোর ব্যাপারে কি আল্লাহ কোন হুকুম প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কি আমাদের দ্বীনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ আকারে প্রদান করেননি? আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কি পবিত্র কুরআনে বলেননি,
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتٰبَ تِبْيَانًا لِّكُلِّ شَيْءٍ وَّهُدًي وَّرَحْمَة لِلْمُسْلِمِيْنَ
আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনাসহ, হিদায়াত, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ। [নাহল ১৬:৮৯]
তাকওয়া সম্পর্কে ভূল চিন্তা পরিহার করে এর মূল অর্থ আমাদের সবার অবশ্যই জানা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহ অনুসারে তাকওয়া অর্থ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার আদেশগুলো অনুসরণ করে এবং তিনি যা নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থেকে জাহান্নামের আগুণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা।
وَلِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِيْنَ اُوْتُوا الْكِتٰبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَاِيَّاكُمْ اَنِ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ وَاِنْ تَكْفُرُوْا فَاِنَّ لِلّٰهِ مَا فِي السَّمٰوٰتِ وَمَا فِي الْاَرْضِ ؕ وَكَانَ اللّٰهُ غَنِيًّا حَمِيْدًا
আল্লাহর জন্যই রয়েছে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে। আর তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদেরকে এবং তোমাদেরকে আমি নির্দেশ দিয়েছি যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করে বেঁচে থাকো। আর যদি কুফরী কর তাহলে আসমানসমূহে যা আছে এবং যা আছে যমীনে সব আল্লাহরই। আর আল্লাহ অভাবহীন, প্রশংসিত। [নিসা ৪:১৩১]
তাকওয়া শব্দটি ওয়াকা-ইয়াকি শব্দ থেকে এসেছে এর অর্থ নিরাপত্তা তথা রক্ষা করা। অর্থাৎ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ক্রোধ ও শাস্তি হতে নিজেকে রক্ষা করা। তাকওয়া সেসব আমলের সাথে সম্পর্কযুক্ত যেসব আমল করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন তা করা, আর যে কাজগুলো করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন ঐ কাজগুলো থেকে নিজেকে বিরত রাখা, এর মাধ্যমেই তাকওয়া অর্জিত হয়।
আমাদের কাজ ও সম্পর্কগুলোতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার ব্যপারে সচেতন থাকাই হচ্ছে মূলত তাকওয়া।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ খুতবায় বলেছিলেন: “আমি তোমাদের আল্লাহকে ভয় করতে বলি, তাঁর কথা শোনো ও মান্য করো।” আয়াত এবং হাদিস উভয়ই মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের নির্দেশ দিচ্ছে। একজন ব্যক্তির উচিত তাকওয়াকে নিজের এবং আল্লাহর (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির মধ্যে একটি পর্দা তথা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে গ্রহণ করা। তাকওয়ার মাধ্যমে, একজন মুসলিম আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালার) আনুগত্য করার চেষ্টা করে এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকে।
আলী (রা:) পুত্র হাসান (রা:) বলেন,
মুত্ত্বাকী তারাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে তারা নিজেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’আলা যা করতে আদেশ করেছেন তা তারা পালন করেন।
ওমর ইবনুল আব্দুল আজিজ বলেন,
দিনে রোজা রেখে এবং রাতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। অথবা রোজা ও সালাত একত্রে পালন করার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জন হয় না। তাকওয়া হচ্ছে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা যা হারাম করেছেন তা থেকে বিরত থাকা আর যা ফরজ করেছেন তা পালন করা। যারা তা করে তারাই কল্যাণ প্রাপ্ত হয়।
ইবনে জাওযীর তাফসীরের শুরুতে বিভিন্ন শব্দের অর্থ বলতে গিয়ে তাকওয়ার অর্থ বর্ণনা করেছেন – তাকওয়ার অর্থ আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে সমস্ত কাজে আল্লাহর আনুগত্য করা এবং অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখা। এতেই রয়েছে সকল কল্যাণ।
একজন সত্যিকারের মুত্তাকী আমল করার উদ্দ্যেশ্যে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার পাঠানো কুরআন ও সুন্নাহতে বর্ণিত শর’ঈ জ্ঞানগুলোর বুঝ অর্জনের চেষ্টা করে। শরীয়াহর সঠিক জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি বুঝতে পারবে তার কী করণীয়। এ কারণেই ইসলামকে সঠিক ভাবে বুঝতে হবে। যাতে সঠিক নিয়তের মাধ্যমে আমল করে আমরা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাকে সন্তুষ্ট করতে পারি।
ইমাম আহমদ একজন সাহাবী বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করেন,
একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা), আমাকে কিছু উপদেশ দিন; রাসূল (সা) তাকে আল্লাহকে ভয় করতে উপদেশ দিলেন, কারণ এটিই সবকিছুর মূল। অন্য বর্ণনায় রাসুল (সা) বলেছেন, আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহভীতিতেই সকল কল্যাণ নিহিত আছে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকিদের পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
اِنَّ اللّٰهَ مَعَ الَّذِيْنَ اتَّقَوْا وَّالَّذِيْنَ هُمْ مُّحْسِنُوْنَ
নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল। [নাহল ১৬:১২৮]
তাছাড়া বিপদে তাকওয়ার কারণে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা দু:খ কষ্ট থেকে উদ্ধার করেন।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا
আল্লাহকে যে ভয় করে তাকে আল্লাহ উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন। [তালাক ৬৫:২]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালা মুত্তাকীদের গুনাহগুলো ক্ষমা করার ওয়াদা করেছেন,
وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُعْظِمْ لَهُ أَجْرًا
আর যে আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন এবং তার প্রতিদানকে মহান করে দেন। [তালাক ৬৫:৫]
আল্লাহ তাকওয়া অবলম্বনকারীদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন। এই ধরণের লোকদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদ নিশ্চিত করা হয়েছে, যারা তাদের কর্মকাণ্ডে আল্লাহকে তাদের প্রভু হিসেবে গ্রহণ করেছে তাদের জন্য বিশাল পুরস্কারের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ
নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়। [আ’রাফ ৭:২০১]
وَالَّذِي جَاءَ بِالصِّدْقِ وَصَدَّقَ بِهِ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
যে সত্য নিয়ে আগমন করছে এবং যারা সত্যকে সত্য মেনে নিয়েছে; তারাই তো মুত্তাকী। [যুমার ৩৯:৩৩]
আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা’য়ালার ওয়াহি হতে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ রোজা পালন ও ভালো আচার-ব্যবহার করলেই তাকওয়া অর্জিত হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে মুত্তাকী তারাই যারা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও ক্রোধ থেকে রক্ষা করা জন্য আল্লাহর অবাধ্যতা থেকে নিজেকে বিরত রাখে। মুলত মুত্তাকীরাই আল্লাহর জন্য সালাত, রোজা, আল্লাহর রাস্তায় দান, মুল্যবোধ অর্জন ও ক্ষমার গুণ অর্জনের পাশাপাশি উম্মাহর কর্মকান্ডগুলোতে নিজেকে যুক্ত করে। এগুলো পালন করাই তাকওয়াবানের উদাহরণ।
আল্লাহ দ্বীনকে দুনিয়া পরিচালিত করার জন্য পাঠিয়েছেন, আলাদা করে রাখার জন্য নয়। তাছাড়া ইসলাম কোন বৈরাগ্যবাদ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “ইসলামে কোন বৈরাগ্যবাদ নেই।
উমর ইবনুল খাত্তাব একবার নামাজরতদের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের কে কতবার মাথা উঁচু করে এবং নিচু করে, তা আমাকে ধোঁকা দেয় না। [প্রকৃত] দ্বীন হলো আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে সতর্ক থাকা, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং আল্লাহর অনুমতি ও নিষেধ অনুসারে কাজ করা।”
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,
“الدنيا سجن المؤمن وجنة الكافر”
“দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম, খণ্ড ৪,৭০৫৮)
এর অর্থ হল আমরা শরীয়তের কারাগারে বাস করছি, আমাদের প্রতিটি কাজই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহীর উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ হল আমাদের ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করতে হবে এবং সমাজ, অর্থনীতি ও খিলাফত সম্পর্কিত নিয়মকানুনসহ এর সমস্ত নিয়মকানুন মেনে নিতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা বিশ্বকে অস্বীকার করছি বরং শরীয়তের নিয়ম অনুসারে আমরা বস্তুগত উন্নয়ন ও অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করব।
ইমাম ইবন হাজার আল আসকালানী (মৃত্যু ৮৫২ হিজরি) সহীহ আল বুখারীর ব্যখ্যা ‘ফাতহ আল বারী’তে লিখেছেন, তিনি তাঁর বিশাল দলবল নিয়ে শহরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের সাথে একজন হতভাগ্য, দরিদ্র এবং হতাশ ইহুদীর সাথে দেখা হলো। ইহুদীটি যখন ইবনে হাজারকে চিনতে পারল, তখন সে তাকে ডেকে বলল, “হে ইসলামের পণ্ডিত! এটা কি সত্য নয় যে তোমাদের নবী বলেছেন যে, এই জীবন মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত? তোমরা তথাকথিত মুমিন হয়েও বিশাল সম্পদে বাস করছো, অথচ আমি এই ক্ষুদ্র ও দুর্বিষহ জীবনযাপন করছি?” ইবনে হাজার উত্তরে বললেন, “তুমি নবী (সা) সম্পর্কে যা বলেছো তা সত্য। তোমার জানা উচিত যে, তুমি যে ঐশ্বর্যের মধ্যে আমাকে বাস করতে দেখছো, তা আখেরাতে আমার জন্য যা অপেক্ষা করছে তার তুলনায় এক কারাগার। আর তোমার জানা উচিত যে, তুমি যেভাবে বাস করছো তা আল্লাহ তোমার জন্য আখিরাতে যা প্রস্তুত করেছেন তার তুলনায় জান্নাত।”
আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে, প্রতিটি মুসলিমের জন্য ইসলামী শরীয়াহর উপর সম্পূর্ণ ঈমান আনা বাধ্যতামূলক, অন্যথায় আমরা কাফির হয়ে যাব। অতএব, সেকুলার বহুত্ববাদ এর চিন্তা অর্থাৎ দ্বীনকে দুনিয়া থেকে পৃথক করা একটি কুফরী ধারণা। যা আহকাম শরীয়াহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। সামগ্রিকভাবে আহকাম শরিয়াকে অস্বীকার করা কুফরির সমান। তাছাড়া শরীয়াহর যেকোনো নিশ্চিত (ক্বাত’ঈ) বিস্তারিত হুকুমকে অস্বীকার করা কুফরী। এটি ইবাদত সংক্রান্ত আহকাম, লেনদেন (মু’আমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাদ্যদ্রব্য যে বিধানই হোকনা কেন, তা অস্বীকার করা কুফরি।
উল্ল্যেখিত আয়াতটি অস্বীকার করা,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ
আর তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা কর [বাকারাহ ২:৪৩]
নিন্মোক্ত আয়াতগুলো অস্বীকার করার সমান,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম [বাকারাহ ২:২৭৫]
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا
আর চোর নারী হোক কিংবা পুরুষ, চুরি করলে তাদের হাতগুলো কেটে দাও.. [মায়েদাহ ৫:৩৮]
জাতীয়তাবাদ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র্য আলাদা হয়ে মুসলিমকে ভাই হিসেবে না দেখা,
নিন্মলিখিত আয়াতটি অস্বীকার করার সমান,
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
সকল বিশ্বাসীরা তো পরস্পর ভাই ভাই [হুজুরাত ৪৯:১০]
সুতরাং ইরাক, ফিলিস্তিন ও ইরাকের মুসলমানরা যেমন আমাদের ভাই একইভাবে দিল্লি, ব্যাংকক বা জাকার্তার মুসলমানরাও আমাদের ভাই।
অথবা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার মাধ্যমে শাসন করার সাথে সম্পর্কিত আয়াত, যা আমরা আজ মুসলিম বিশ্বের শাসকদের উপেক্ষা করতে দেখি, যেমন,
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
আর আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে যারা ফয়সালা করবে না, তারাই যালিম [মায়েদা ৫:৪৫]
فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী আপনি তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না [মায়েদা ৫:৪৮]
বস্তুত, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) কুরআনে আমাদের স্পষ্টভাবে বলেছেন যে আমরা ইসলামের সমস্ত নিয়ম মেনে না নিলে আমরা মুমিন নই। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা) বলেছেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়। [নিসা ৪:৬৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদেরকে ইসলামকে আংশিকভাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। যদি আমরা মনে করি রাজনীতি ইসলামের অংশ নয়, অর্থনীতি ইসলামের অংশ নয়, অথবা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ইসলামের কিছু বলার নেই, তাহলে তিনি আমাদের শাস্তির জন্য অপেক্ষা করতে বলেছেন। আমাদের অবশ্যই ইসলামকে আকীদা এবং একটি ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) বলেছেন:
أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ ۚ فَمَا جَزَاءُ مَن يَفْعَلُ ذَٰلِكَ مِنكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَىٰ أَشَدِّ الْعَذَابِ ۗ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ
তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে ঈমান আন এবং কিছু অংশে কুফরী কর? তাহলে তোমাদের যারা এরূপ করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। আর তারা যা করে আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন। [বাকারা ২:৮৫]
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের কাছে দুনিয়ার বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য সর্বোত্তম ব্যবস্থা নাজিল করেছেন, তাহলে আমাদের অনেকেই কেন এটি সম্পর্কে অবগত নই?
আসুন আমরা সাহাবীগণের তাকওয়ার কিছু উদাহরণ দেখি:
আল-বুখারী ইবনে আবি আওফা (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন:
“খায়বারের রাতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়েছিলাম। খায়বারের দিন আমরা কিছু গৃহপালিত গাধা পেয়েছিলাম, তাই আমরা সেগুলো জবাই করেছিলাম। যখন হাঁড়িগুলো ফুটতে শুরু করল, তখন আল্লাহর রাসূলের আহবানকারী আমাদের ডেকে বললেন: তোমাদের হাঁড়িগুলো উল্টে দাও এবং গাধার মাংস খেও না। ‘আবদুল্লাহ বলেন: রাসুল (সা) এগুলো নিষেধ করেছেন কারণ এগুলো হতে খুমুস (অর্থাৎ গনীমতের এক পঞ্চমাংশ) বের করা হয়নি। তিনি বলেন, অন্যরা বলেছেন যে তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন। আমি সাঈদ বিন জুবাইরকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি বলেছেন, তিনি এগুলো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছেন।”
আনাস বিন মালিকের বর্ণনা: “আমি আবু তালহা আল আনসারী, উবাইদা বিন আল-জাররাহ এবং উবাই বিন কা’বকে কাঁচা খেজুর এবং তাজা খেজুর দিয়ে তৈরি পানীয় পরিবেশন করছিলাম, এমন সময় একজন দর্শনার্থী এসে বলল: অবশ্যই মদ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তখন আবু তালহা বললেন: হে আনাস! উঠে দাঁড়াও এবং এই কলসিটি ভেঙে ফেল। আমি উঠে দাঁড়িয়ে একটি সূক্ষ্ম পাথর ধরে কলসিটির নীচের অংশ দিয়ে আঘাত করলাম যতক্ষণ না এটি ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।” আল বুখারী বর্ণনা করেছেন,
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আমাদের আরও বলা হয়েছে যে, যখন আল্লাহ তা’আলা এই নির্দেশ নাজিল করেন যে, মুসলমানরা হিজরতকারী বিবাহিত মুসলিম মহিলাদের খরচ যেন মুশরিকদের ফেরত দেয় (ইসলাম গ্রহণের পর) মুসলমানরা যেন কাফের নারীদের তাদের স্ত্রী হিসেবে না রাখে, তখন উমর (রা.) তার দুই স্ত্রীকে তালাক দেন।
আল-বুখারীতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন- আল্লাহ মুহাজির নারীদের উপর রহম করুন।” যখন আল্লাহ এই আয়াতটি নাজিল করলেন:
তারা যেন তাদের ওড়না দিয়ে বক্ষদেশকে আবৃত করে রাখে [নূর ২৪:৩১]। তারা তাদের কাপড় ছিঁড়ে ফেলেন এবং সেগুলো দিয়ে নিজেদের আবৃত করেন।”
আবু দাউদ সাফিয়া বিনতে শায়বা থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
তিনি তথা ‘আয়েশা (রা.) আনসারী নারীদের কথা উল্লেখ করলেন, তাদের প্রশংসা করলেন এবং তাদের সম্পর্কে ভালো কথা বললেন। তারপর বললেন: “যখন সূরা আন-নূর নাযিল হলো, তখন তারা পর্দাগুলো নিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলল এবং সেগুলো দিয়ে মাথার ওড়না তৈরি করল।”
ইবনে ইসহাক বলেন: “…আল-আশ’আছ বিন কায়স কিন্দাহ প্রতিনিধি দলের অংশ হিসেবে আল্লাহর রাসূলের কাছে এসেছিলেন। আয-যুহরি আমাকে জানিয়েছেন যে তিনি কিন্দাহ থেকে আশি জন আরোহী নিয়ে এসেছেন। তারা রাসূলের মসজিদে প্রবেশ করেছিলেন। তাদের চুল লম্বা ছিল এবং তারা (চোখে) সুরমা লাগিয়েছিলেন। তারা রেশমের আবরণযুক্ত জুব্বা পরতেন। যখন তারা আল্লাহর রাসূলের কাছে প্রবেশ করেন, তখন তিনি তাদের বলেন: তোমরা কি ইসলাম গ্রহণ করনি? তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: ‘তাহলে তোমাদের গলায় এই রেশমটি কী? তখন তারা রেশমটি ছিঁড়ে ফেলে দিল।”
হানযালাহ বিন আবি ‘আমির (রা.) যাকে ফেরেশতারা গোসল করিয়েছিলেন, তিনি উহুদের যুদ্ধের ডাক শুনতে পান। তিনি দ্রুত ডাকে সাড়া দেন। উহুদের দিনে তিনি শহীদ হন। ইবনে ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
তোমাদের সাথীকে ফেরেশতারা গোসল করাচ্ছেন, তার পরিবারকে জিজ্ঞাসা করো তার কী হয়েছে?” তার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। সে রাতে সে বিয়ের কনে ছিল। সে বলল তিনি আহবান শুনে অপবিত্র অবস্থায় বেরিয়ে গেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, “এজন্যই ফেরেশতারা তাকে গোসল করিয়েছে।”
তাই আসুন আমরা প্রকৃত অর্থে তাকওয়া অর্জন করি। আসুন আমরা ইসলামকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করি। আসুন আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার বাণীতে মনোযোগ দিই এবং তিনি আমাদেরকে শক্তিশালী করুন যাতে আমরা তাঁর অনুসরণ করতে পারি। তিনি সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُّبِينٌ
হে মুমিনগণ, তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না । নিশ্চয় সে তোমাদের জন্য স্পষ্ট শত্রু। [বাকারা ২:২০৮]
মুমিনের জীবনে তাকওয়ার প্রভাব

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) তার বান্দাদেরকে কুরআনের অনেক স্থানে তাকওয়া অবলম্বন করতে আদেশ দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে:
((يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُواْ رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ))
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন।” [আন-নিসা: ১] এবং তিনি বলেন:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের হৃদয়ের গোপন বিষয় ভালোভাবে জানেন।” [আল-মায়িদা: ৭] এবং তার এই বলা:
((وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ))
“এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের সব কাজের খবর রাখেন।” [আল-মায়িদা: ৮] এবং হাদিসে যা আহমদ আবু যার ও মু’আজ ইবন জাবাল থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
«أوصيك بتقوى الله في سِرِّ أمرك وعلانيته»
“আমি তোমাকে আল্লাহর ব্যপারে তাকওয়া বজায় রাখার পরামর্শ দিচ্ছি, তোমার গোপন ও প্রকাশ্যে কাজগুলোর মধ্যে।” মু’আজ বলেন: হে রাসুলুল্লাহ আমাকে পরামর্শ দিন, তিনি বললেন:
«عليك بتقوى الله ما استطعت»
“তুমি যতটা পারো আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বজায় রাখো।” [আল-মুজাম আল-কবীর]। এছাড়া তিনি (সা.) বলেছেন:
«فاتقوا الله ولو بشق تمرة»
“একটি খেজুরের টুকরো দিয়ে হলেও আল্লাহর থেকে বেঁচে থাকো।” [সহীহ মুসলিম]। যে ব্যক্তি এইসব টেক্সট মনোযোগ সহকারে পড়বে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে, তাকওয়া শব্দটি কুরআনে অসংখ্য স্থানে এসেছে, এর বিভিন্ন শাব্দিক রূপ কুরআনের ২৩৯টি আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, এবং এ ব্যপারে হাদিসের সংখ্যা গণনা করা কঠিন। এটি এত বেশি সংখ্যকবার উল্লেখিত হয়েছে যে এ ব্যপারে অবাক হওয়ার কিছু নেই, যে কেউ উপলব্ধি করবে যে তাকওয়া এই জীবনের ও পরকালের সুখের চাবিকাঠি।
তাকওয়ার ভাষাগত অর্থ হলো – ভয় ও শ্রদ্ধা – যেমনটি আল-তাজে উল্লেখিত, এবং লিসান আল-আরব-এ উল্লেখিত – আমি কোনো কিছুতে ভয় পেয়েছি – মানে আমি সতর্ক ছিলাম। এটি কুরআন এবং সুন্নাহ-তে তার ভাষাগত অর্থে উল্লেখিত। তাই আল্লাহর প্রতি তাকওয়া অবলম্বন করা মানে তাকে ভয় করা, শ্রদ্ধা করা, তার আদেশ পালন করা এবং তার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলা।
আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلاَّ لِيَعْبُدُونِ))
“আমি শুধু জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি, যাতে তারা আমার উপাসনা করে।” [আল-যারিয়াত: ৫৬], এখানে উপাসনা মানে আনুগত্য, যা শুধুমাত্র আল্লাহর আদেশ পালন ও তার নিষেধাজ্ঞা পরিত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, এ কারণেই মানবজাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা তার আনুগত্যের জন্য মানবজাতিকে পুরস্কৃত করেছেন, যখন আমরা এই আয়াতগুলি পর্যালোচনা করি, তখন আমরা লক্ষ্য করি যে পুরস্কার দু প্রকারের: একটি মৃত্যু পরবর্তী এবং অন্যটি দুনিয়াবী জীবনে, প্রথমটি হলো জান্নাত অর্জন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি, এবং তার চেয়েও বড় হচ্ছে পরকালে বিচার দিবসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেছেন:
((لِلَّذِينَ اتَّقَوْا عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتٌ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الأَنْهَارُ))
“যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য তাদের রবের নিকট বাগান থাকবে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত হবে।” [আল-ইমরান: ১৫] এবং:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ))
“মুত্তাকিরা (বাগান এবং নির্ঝরিনীর মাঝে থাকবে।” [আল-হিজর: ৪৫] এবং:
((وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ))
“মুত্তাকীদের জন্য জান্নাত নিকটে আনা হবে।” [আল-শুআরা: ৯০] এবং তিনি (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) আরো বলেছেন:
((إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ))
“পবিত্ররা নিরাপদ স্থানেই অবস্থান করবে।” [আল-দুখান: ৫১]
এখন দুনিয়াবী পুরস্কারের বিষয়ে, যা এই শব্দের মূল বিষয়, তা প্রচুর ও বহুবিধ। কুরআনের অসংখ্য দ্যর্থহীন আয়াতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, যা বিশ্বাসীর জন্য তার জীবনে দুনিয়াবী পুরস্কারের প্রকাশ ঘটাবে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তাআলা) বলেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا))
“যারা আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তাদের কাজ সহজ করে দেন।” [আল-তালাক: ৪], অর্থাৎ আল্লাহ বিশ্বাসীর কাজ সহজ করে দেন এবং তার জন্য দ্রুত সমাধান তৈরি করেন। আল্লাহ আরো বলেছেন:
((وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ))
“এবং যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য একটি পথ বের করে আনেন, এবং এমন জায়গা থেকে তাকে রিজিক প্রদান করেন, যা সে কল্পনা করতে পারে না।” [আল-তালাক: ২-৩]। এর মানে হলো, যিনি আল্লাহকে ভয় করেন, তার আদেশে ও নিষেধে, আল্লাহ তার জন্য একটি উপায় বের করবেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন যা তার কল্পনায় ছিল না, আল্লাহ বলেছেন:
((يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَل لَّكُمْ فُرْقَانًا))
“হে যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদের জন্য সত্য-মিথ্যা চেনার একটি মাপকাঠি তৈরি করে দেবেন।” [আল-আনফাল: ২৯]
রমজান: ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করুন

এই মাসটিকে আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) রোজার মাস হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বিশ্বাসীদের জন্য রমজান মাসকে রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে নির্ধারিত করে অন্যান্য মাসের উপরে এটিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। নিশ্চয়ই এই মাস সকল মাস অপেক্ষা উত্তম এবং বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন, আর এই মাসেই আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) তাঁর সর্বশেষ আসমানী কিতাব আল-কুর‘আন নাযিল করেছেন।
“হে ঈমানদারগণ,যারা ঈমান এনেছ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” (সূরা আল-বাকারাহ্: ১৮৩)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمْ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ
রমজান মাসে আমরা প্রতিদিন কুর‘আন তেলাওয়াত করি এবং তারাবীতে দীর্ঘ সময় ধরে এটি পড়ে থাকি। কিন্তু, আমরা কি আদৌ এই কুর‘আন বুঝি এবং অনুশীলন করি? আয়েশা (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চরিত্রকে চলমান কুর‘আন মজিদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আমাদের চরিত্রে কি আল-কুর‘আনের বাণীর প্রতিফলন দেখা যায়? আমরা কি আমাদের জীবনে এটাকে বাস্তবায়ন করি?
আমরা মসজিদে কিংবা বাজারে, বাড়িতে বা কর্মক্ষেত্রে, যেখানেই থাকি না কেন আমাদের জীবনের সকল কর্মকা-ে কেবল আল্লাহ্’রই আনুগত্য করা উচিত। সংক্ষেপে, জীবনের সকল ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই কেবল ইসলামের অনুসরণ করা উচিত।
এই পবিত্র মাসে আমাদের ইসলামের জ্ঞান অনুসন্ধান করা এবং ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা উচিত। আমরা ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সচেতন হব, ইসলামের আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনার সম্ভাবনা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।
আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আল্লাহ্’র বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাকে সত্যিকারের ভয় করে।” (সূরা ফাতির: ২৮)
وَمِنْ النَّاسِ وَالدَّوَابِّ وَالأَنْعَامِ مُخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ كَذَلِكَ إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ
আসুন আমরা এই মহিমান্বিত মাসে কুরআনের অর্থ অনুধাবনের মাধ্যমে জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করি। আসুন আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের (রা) জীবন সম্পর্কে পড়াশোনা করে জানার চেষ্টা করি যে তারা কিভাবে তাদের জীবন কাটিয়েছিলেন, কিভাবে তারা আল্লাহ্’র (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বাণী সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য নিজেদের যৌবন, ধন-সম্পদ ও জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুস‘আব ইবনে উমাইর (রা) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে ধনী যুবক, তাঁর জামা-কাপড় ছিল সবচেয়ে দামি এবং তিনি সর্বোত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। তৎকালীন সময়ে মক্কায় তার মতো আর কোন যুবক ছিল না। যদি মুস‘আব (রা) বাজারে যেতেন তাহলে কয়েক ঘন্টা পরেও তার ব্যবহৃত সুগন্ধির সুবাস বাতাসে ভেসে বেড়াতো। যখন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর পরিবার তাকে ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মুস‘আব ইসলামের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য নিজের পরিবার, সম্পদ এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন পরিত্যাগ করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: “আমি এই মুস‘আব-কে মক্কায় তার পিতামাতার সাথে দেখেছি। তারা তাকে অঢেল প্রাচুর্য ও যতে এর মধ্যে রেখেছিল এবং তার জন্য সকল আরাম-আয়েশের ব্যবস্থা করেছিল। তার মতো আর কোনো কুরাইশ যুবক ছিল না। এরপর সে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে এবং নিজেকে তার নবীর (সা) সেবায় নিবেদিত করে”। আকাবার প্রথম বাই‘আতে যখন মদিনা থেকে আগত ব্যক্তিগণ ইসলাম শিক্ষা দেয়ার জন্য একজন শিক্ষক দিতে বলেন, তখন নবী করীম (সা) তাৎক্ষণিকভাবে এ দায়িত্ব পালনের জন্য মুস‘আব-কে নিযুক্ত করেন। মদিনায় অনেকেই তাঁর প্রচেষ্টায় ইসলামে প্রবেশ করেন এবং অধিকাংশই তাঁর কাছ থেকে ইসলাম শিখেন। মুস‘আব (রা) উহুদের যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যান্য অনেক সাহাবীর (রা) মতো তিনি ইসলামের জন্য তাঁর যৌবন, সম্পদ ও জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
ইসলাম হচ্ছে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি ইবাদত, লেনদেন (মুআমালাত), শাস্তি (উকুবাত), খাবার-দাবার ইত্যাদির সাথে সংযুক্ত। আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা) বলেন:
“আর সালাত কায়েম কর”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ৪৩)
وَأَقِيمُوا الصَّلاَةَ
“আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ এবং সুদকে অবৈধ করেছেন”।(সূরা আল-বাকারাহ্: ২৭৫)
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَواْ
“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে, এ হলো আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে দন্ড। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩৮)
وَالسَّارِقُ وَالسَّارِقَةُ فَاقْطَعُوا أَيْدِيَهُمَا جَزَاءً بِمَا كَسَبَا نَكَالاً مِنْ اللَّهِ
“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত, শূকরের মাংস, আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে জবাই করা পশু। (সূরা আল-মায়িদাহ্: ৩)
حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ
আসুন এই মহিমান্বিত মাসে আমরা ইসলামের সকল বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনের আন্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। আসুন আমরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান সম্পর্কে জানি। আসুন আমরা দেখি যে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নীতি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে।
রমজান এর শিক্ষা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার যিনি রমজান কে সকল মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বানিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার দরবারে অশেষ শুকরিয়া যে আমাদের কে এই পবিত্র মাসে আবারও অবতীর্ণ হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের কে এই মাসে ব্যাপক নফল, সাদাকা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির (আল্লাহ্কে স্মরন করা), তারাবীহ-তাহাজ্জুদ ইত্যাদি আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষন নিতে বলেছেন। রমজান মাস মুমিনদের জন্য নিজেদের কে সারা বছরের জন্য প্রস্তুতি, আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) এর প্রশিক্ষন, সবর (ধৈর্য) বা জুহদ (সংযম) এর জন্য নিজেদেরকে ঝালাই করে নেওয়ার, শক্তি অর্জন বা নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি অভাবনীয় সুযোগ। রমজান মাসেই রয়েছে লাইলাতুল কদর যে রাতে কোরআনুল কারিম নাযিল হয়েছিল। এই মাস মুসলিমদের শক্তি অর্জনের মাস, মুসলিম রাষ্ট্রের প্রথম জিহাদ রমজান মাসেই পরিচালিত হয়েছিল, এই মাসেই মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাগুতের পতাকা অবনমিত হয়েছিল এবং ইসলামের পতাকা সমুন্যত হয়েছিল। রমজান মাসের যেসব গুরুত্ব, তাৎপর্য, শিক্ষণীয় ব্যাপার আছে তা আসলে সহজে আলোচনা করে শেষ করা যায় না তবুও তাদের মধ্যে উল্যেখযোগ্য কিছু বিষয় নিয়ে নিচে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে:
রমজান – রহমতের মাস:
এই মাস অন্য সকল মাস অপেক্ষা শ্রেয়। আল্লাহের কাছে অন্য ১১টি মাস অপেক্ষা রমজান সেরকম প্রিয় – ইয়াকুব (আ) এর কাছে অন্য ১১টি পুত্রের অপেক্ষা ইউসুফ (আ) যেরকম প্রিয় ছিল।
রমজান হল সেই মাস যে মাসে আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলা শয়তান কে শিকল দ্বারা অবরুদ্ধ করেন, মুমিনদের ভাল কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দেন এবং মুমিনদের ক্ষমা করে থাকেন।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: প্রত্যেক আদম সন্তানের ভাল কাজের প্রতিদান দশ থেকে সাতশ’ গুন বেশি পাবে, কিন্তু সিয়াম (রোজা) ছাড়া কারণ রোজা আমার জন্য, আর আমি এর প্রতিদান দিব। (মুসলিম – ২৭০৭,আন নাসা’ই, আদ দারিমি, বায়হাকি)
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যখন রমজান শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজা খুলে যায়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, এবং শয়তান কে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (আল বুখারি (১৮৯৯), মুসলিম, আন নাসা’ই, আহমাদ, ইবন হাব্বান, আদ দারিমি)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: যে রমজানে ঈমান এবং ইহতিসাব (আল্লাহের কাছ থেকে পুরস্কারের আশা করা) এর সাথে সিয়াম পালন করবে, তার পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। (আল বুখারি (৩৮), নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ, ইবন হাব্বান)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: ৫ ওয়াক্ত নামাজ, এবং এক জুমূ’আহ থেকে অন্য জুমূ’আহ, এক রমজান থেকে অন্য রমজান তাদের মধ্যবর্তি সকল কিছুকে ক্ষমা করে দেয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বেচে থাকা যায়। (মুসলিম (৫৫২), আহমাদ এবং আল বুখারি হতে বর্ণিত)।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের কে রমজান মাস দিয়ে সম্মানিত করেছেন যারা প্রকৃত অর্থে সিয়াম পালন করেন। তিনি সায়েম (রোজাদার) দের জন্য জান্নাতে রাইয়ান নামক দরজা রেখেছেন, এবং কিয়ামাতের দিন সায়েম (রোজাদার) দের সাথে সাক্ষাৎ করার সুসংবাদ দিয়েছেন।
সাহল ইবন সাদ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: জান্নাতের আট টি দরজা রয়েছে, এদের একটির নাম আর রাইয়ান জার মধ্য দিয়ে সায়েম (রোজাদার) ব্যতীত অন্য কেও প্রবেশ করতে পারবে না। (আল বুখারি (৪৭৯), মুসলিম)।
আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: যার হাতে আমার সত্ত্বা তার কসম, সায়েম (রোজাদার) এর মুখের গন্ধ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কাছে মেস্ক-আম্বার (অত্যন্ত মনোরম একটি সুগন্ধি) থেকেও উত্তম, এবং সায়েম এর খুশি দুটি, প্রথম খুশি হল যখন সে ইফতার করে, এবং যখন সে তার রব এর সাথে সাক্ষাত করবে। (আল বুখারি (১৯০৪, নাসাই, ইবন মাজাহ, আহমাদ)।
সিয়াম বা রোজা মুমিনদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নিকট সুপারিশ করবেন।
জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন – “সিয়াম (রোজা) হল জুন্নাহ (ঢাল) যার দ্বারা বান্দা নিজেকে নার (জাহান্নামের আগুন) থেকে রক্ষা করে, এবং সিয়াম (রোজা) আমার জন্য – আমিই এর প্রতিদান দিই”। (আহমাদ (১৪৭২৪) হতে বর্ণিত এবং এর সনদ (ধারা) জায়্যিদ (ভাল), এটি বায়হাকিতেও বর্ণিত)।
রাসুলাল্লাহ (সাঃ) বলেছেন: কিয়ামাতের দিন সিয়াম বলবে – হে প্রভু আমি তাকে দিনের বেলায় খাওয়া এবং প্রবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কোরআন বলবে, আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদের বলবেন- তোমাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হল। (আল হাকিম, আবু নুয়া’ইম, হাসান)।
ইবন আব্বাস (রা) হতে বর্ণিত রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন: রমজান মাসে উমরাহ্ পালন করা হাজ্জ করার সমান। (ইবন মাজাহ – ২৯৯৪, নাসা’ই, আহমাদ)।
এসকল উপরিউক্ত হাদিস (এবং আরো অন্যান্য হাদীস) থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে রমজান মাস পুরোটাই হল রাহমাহ (রহমত) এবং বারাকাহ (বরকত) দ্বারা পরিপূর্ণ। এই মাস গননা করতে হবে সেকেন্ডে, দিনে নয়, কারণ প্রত্যেকটা সেকেন্ড খুবই মূল্যবান।
রমজান – ঐক্যের এবং ভাতৃত্বের মাস:
রমজানে আমরা দেখি সমগ্র বিশ্ব একসাথে রোজা রাখছে। পুরো মাস যেন মুসলিমদের মধ্যে ঐক্যের ব্যাপারটি বারবার মনে করিয়ে দেয়। মরক্কো থেকে মালায়শিয়া, উজবেকিস্তান থেকে বাংলাদেশ, এমনকি অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ যেমন ইউরোপ, চীন ইত্যাদি দেশগুলোতেও মুসলিমরা একত্রে রোজা রাখছে। প্রত্যেকটি অঞ্চলে মুসলিমরা ইশার সালাতের পর তারাবীহ আদায় করছে এমনকি মসজিদে জায়গা না হওয়াতে রাস্তাতেও মুসলিমদের ঢল নামছে, মাঝরাতে সুহুর (সেহরি) খাচ্ছে, মসজিদে বা ঘরে সবাই একসাথে ইফতার খাচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে ইত্যাদি। বিশ্বব্যাপি মুসলিমদের মধ্যে রমজানকে ঘিরে প্রায় একইরকম আচার-অনুষ্ঠান প্রচলিত দেখা যায় যা তাদের মধ্যে ঐক্যতার প্রতিফলন ঘটে। রমজানে আরও একটি বিশেষ ব্যাপার পরিলক্ষিত হয় – তা হল ভাতৃত্ববোধ। এ মাসে মুসলিমরা একত্রে ইফতার করতে পছন্দ করে। বাসায়, অফিসে, বাজারে, রাস্তায় পরিবহনে, মসজিদে বা যেকোনো জায়গাতে আমরা একত্রে ইফতার করি। তাছাড়া অন্যকে ইফতারের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মধ্যে অগ্রগামিতা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবেশীদের বাসায় ইফতার পাঠানো বা মিসকিনদের ইফতার খাওয়ানো, ইয়াতিমখানাতে ইফতার পাঠানোর ব্যাবস্থা করা বা মুসাফির বা পথচারীকে ইফতার সাধানো ইত্যাদি করতে মুসলিমদের কোন কুণ্ঠা বোধ হয় না। কারণ এখানে তার সম্পদ কমে যাওয়ার থেকে অন্যকে ইফতার খাওয়ানোতে সওয়াব অর্জনেই বেশী মনযোগী হয়। এমনকি এই রমজান আমাদের কে ঈদুল-ফিতর এর আগে মিসকিনদের যাকাতুল-ফিতর দেওয়ার মাধ্যমে তাদের প্রতি আমাদের কর্তব্য পালন করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা দেয় যেভাবে আমরা একই কাতারে সালাত আদায় করে ভাতৃত্ববোধের শিক্ষা প্রতিনিয়ত পাই। এমাসে রাসূলুল্লাহ (সা) প্রচুর দান করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) এর দানের কথা বলতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরাম বলেন: – রাসূলুল্লাহ (সা) সমস্ত মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশী দানশীল ছিলেন, রমজান যখন তিনি জিরাঈল (আ) এর সাথে সাক্ষাত করতেন আরও বেশী দানশীল হয়ে যেতেন (বুখারী, মুসলিম)।
এজন্য আমরাও রমজান মাসে অনেক সাদাকা (দান) করব।
রমজান – তাকওয়া অর্জনের মাস:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা নিজেই তার বান্দাদের তাকওয়া অর্জনের জন্য (আল্লাহভীতি বাড়ার এবং আল্লাহ তা’আলার নিকটবর্তী হওয়ার) সিয়ামের বিধান দিয়েছেন। দিনের বেলা (ফাজর থেকে মাগরিব) আল্লাহ্কে ভয় করে পানাহার বা স্বামী-স্ত্রীর সাথে সহবাস করা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহের সমস্ত আদেশ মানার জন্য নিজেকে তৈরী করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে দেওয়া হয়েছিল, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা আল বাকারা, আয়াহ ১৮৩)।
তাকওয়া অর্জনের আগে তাকওয়ার অর্থ বোঝা জরুরি। মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক অধঃপতনের কারণে তাকওয়ার মূল অর্থ পরিবর্তিত রূপ ধারন করেছে। আজকাল দ্বীন থেকে দুনিয়াকে আলাদা করে তাকওয়ার অর্থ বিক্রিত করার চেষ্টা চালান হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার (বা ধর্মহীনতার) নাম করে তাকওয়ার অর্থ শুধুমাত্র ব্যাক্তিগত বিষয় এবং আচার-ব্যাবহার এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে এবং অন্যান্য বিষয় যেমন অর্থনীতি, রাজনীতি বা সামাজিক ব্যপারে তাকওয়া বা আল্লাহভিতি আনা হয় না। মুত্তাকি (যে তাকওয়া অবলম্বন করে) বলতে আমাদের চোখে যে চেহারা ভেসে ওঠে তা অনেকটা এরকম যে কোন ব্যাক্তি যার অনেক বড় দাড়ি ও লম্বা জুব্বা পরে সালাত-সিয়াম পালন করছে, সারাক্ষন টুপি পরে মিসওয়াক করছে আর মসজিদে দানখয়রাত করছে ইত্যাদি কিন্তু জীবনের অন্যান্য বিষয়ে যেমন ব্যাবসায়ীক লেনদেন, জমিজমা বণ্টনের বা বিচারের ক্ষেত্রে শরীয়াহ থেকে নিচ্ছে না, এমনকি ব্যাংকের কোন কর্মকর্তা অন্যান্যদের ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার জন্য হাতেপায়ে ধরছে অথচ সে জানেই না এটা হারাম বা হয়ত কেউ share business বা MLM business করে মিসকিনদের ইফতার বিতরণ করছে।
তাকওয়া শব্দের উৎস হল “ওয়াকা” যার আভিধানিক অর্থ হল রক্ষা করা। এই রক্ষা করা হল আল্লাহ্র ক্রোধ বা শাস্তি থেকে নিজেকে রক্ষা করা। তাই তাকওয়া’র শরীয়াহগত অর্থ হল আল্লাহ্ভীতির কারণে সাবধানতা অবলম্বন করা অর্থাৎ এমন সব কাজ করা যা আল্লাহ্কে সন্তুষ্ট করে এবং নিজেকে এমন সব কাজ থেকে রক্ষা করা যা আল্লাহ্কে রাগান্বিত করে।
আল্লাহ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ্ কে ভয় কর যেভাবে ভয় করা উচিৎ এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ কর না। (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১০২)।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্পষ্ট বলেছেন আল্লাহকে যথাযথ ভয় করতে এবং ঈমানের পূর্বশর্ত হিসেবে আল্লাহভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে বলেছেন।
উমার বিন আব্দুল আজিজ (রা) বলেছেন – “তাকওয়া দিনের বেলা রোজা রাখা বা রাতের বেলা নামাযরত অবস্থায় থাকাকে বা উভয়ের মিশ্রণকে বোঝায় না, বরং তাকওয়া বলতে আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহ্ যা ফরয (অত্যাবশ্যকীয় কাজ) করেছেন তা পালন বা বাস্তবায়ন করা। যে ব্যাক্তি এসব করল, আল্লাহ্ তা’লা তাকে ভাল কিছু তার জন্য রেখেছেন।”
আলী ইবন আবি-তালিব (রা) এর পুত্র আল-হাসান (রা:) বলেছেন – মুত্তাকীগণ তারাই যারা আল্লাহ্ যা হারাম করেছেন তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে আর যা ফরয করেছেন তা পালন করে।
তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ-কে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল, তিনি তোমাদের কাজকর্ম কে সংশোধন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন, যে কেউ আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) এর আনুগত্য করে সে অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে।” (সূরা আল আহযাব, আয়াহ ৭০-৭১)
এবং আলাহ তা’লা বলেন: “এই হল শয়তান, একমাত্র যে তোমাদের তার আউলিয়াদের (বন্ধু, আনুসারী) ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করে, সুতরাং তোমরা তাদের (শয়তানের বন্ধু বা অনুসারী) ভয় কর না, আর তোমরা যদি ঈমানদার হয়ে থাক, তবে আমাকে ভয় কর।” (সূরা আল ইমরান, আয়াহ ১৭৫)
অন্য একটি আয়াতে তাকওয়া সম্পর্কে আল্লাহ্ আরও বলেছেন “…তোমরা মানুষকে ভয় কর না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াত সমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কর না, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ (নাযিল) করেছেন (অর্থাৎ – কোরআন) তা অনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।” (সূরা আল মায়িদাহ, আয়াহ ৪৫)।
এখানে সূরা আল আহযাবের আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করার পাশাপাশি সত্য কথা বলতে বলা হয়েছে এবং সূরা আল ইমরানের আয়াতে শয়তানের বন্ধু তথা বিভিন্ন তা’গুত (জালিম/ফাসিক শাসক যেমন- হাসিনা/খালেদা/জারদারি/বাশার আল আসাদ/ইসলাম কারিমভ ইত্যাদি, মুনাফিক রাজনীতিবিদ যেমন- Awami League, BNP এর নেতৃবৃন্দ, কাফির সরকার তথা US, UK, India, Russia/China, UN, EU, World Bank, IMF ইত্যাদি) কে ভয় না করার জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে আদেশ দিয়েছেন। এবং সূরা মায়িদার আয়াতে আল্লাহ্কে ভয় করতে এবং কোরআন দিয়ে যারা শাসন করে না তাদেরকে জালিম বলেছেন। এবং রমজান মাসই হল তাকওয়া অর্জনের প্রকৃত সময় কারণ এই মাসে আল্লাহ্ তা’লা শয়তানকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখেন, তাই শয়তান ও তার ওয়ালীদের ভয় করার প্রশ্নই আসে না।
তাহলে বোঝা যাচ্ছে তাকওয়া অর্জনের জন্য আল্লাহকে ভয় করা, শয়তানের দোস্তদেরকে (জালিম শাসক) ভয় না করা এবং তাদের সামনে হক কথা বলা (বা তাদের দুর্নীতি উন্মোচন করা বা ইসলাম দিয়ে শাসন করার আহবান করা) সবগুলো সম্মিলিতভাবে প্রয়োজন। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করাকে তাকওয়া অর্জন বলা যাবে না।
আর আল্লাহ্কে ভয় করে আল্লাহ’র জন্য সন্তুষ্টি অর্জনের সবচেয়ে উত্তম পন্থা হল জালিম শাসকের সামনে সত্যা কথা বলা যা হল সর্বোত্তম জিহাদ, কারণ এই কাজটি মোটেই সহজ না – এতে জেল-নির্যাতন-মামলা’র ভয় থাকে।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক (সত্যা কথা) বলা” (নাসা’ই, আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
এবং রাসুলাল্লাহ (সা) আরও বলেছেন: “আল্লাহ্র কসম, তোমরা “আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ)” কর, এবং জালিম শাসকের হাতকে অবরুদ্ধ কর ও তাকে হকের পথে বল প্রয়োগ কর ও তাকে হকের পথে বাধ্য কর।” (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
বর্তমান বিশ্বে কোথাও কোন ইসলামী ন্যায়-শাসন বা খিলাফাহ রাষ্ট্রব্যাবস্থা নাই বরঞ্চ পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক বা একনায়কতান্ত্রিক (কোথাও কোথাও রাজতান্ত্রিক বা সামরিক) ব্যবস্থার অধীনে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে কাফির-মুশরিকদের দালাল পুতুল শাসকবৃন্দ মুসলিমদের উপর জুলুম-নির্যাতন করছে। কাফিররা আমাদের জালিম শাসকদের সহায়তায় মুসলিমদের ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে, মুসলিমদের নির্মমভাবে হত্যা করছে, মুসলিমদের সম্পত্তি ভোগ করছে। এবং জালিম শাসকরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম অত্যাধিক বাড়িয়ে নিজেরা বিলাসিতা করছে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী আকীদার উপর একের পর এক আঘাত করছে, হিজাব নিষিদ্ধ করছে, যা কিছু মুসলিমরা কল্পনাও করেনি তাও হচ্ছে। ইসলামের নামে রাজনীতি করে ধর্মনিরপেক্ষ দলের সাথে জোট করে সরকার করছে আর সমকামিতা – এলকোহল কে অনুমতি দেয়া থেকে শুরু করে ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি পর্যন্ত করছে। এখন সময় এসেছে প্রতিবাদ করার, জালিম শাসকের চেহারা উন্মোচন করা এবং অপসারণ করে ইসলামি ব্যাবস্থা তথা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সামিল হওয়ার। এর জন্য যা যা করার দরকার তা করা – যদি এতে সময়-টাকা-জ্ঞান-শারীরিক পরিশ্রম বা নিজের জীবন ত্যাগ করতে হয় – তাও করতে হবে, কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের জন্য শহীদদের নেতা হওয়ার অপূর্ব সুযোগ রেখেছেন।
রাসুলাল্লাহ (সা:) বলেছেন: “শহীদদের নেতা হল হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব ও সেই ব্যাক্তি যে জালিম শাসকের সামনে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য দাড়ায় এবং তাকে হত্যা করা হয়।” (আল হাকিম)।
রমজান – কোরআনের মাস:
একবার আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) মক্কায় কোরাইশদের নেতৃবৃন্দের সামনে সর্বপ্রথম প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করেন ও তাদের (কাফিরদের) হাতে মার খেয়ে মুখ থেকে রক্ত নিয়ে ফেরত আসেন যদিও তিনি জানতেন কাফিররা তার সাথে এমন ব্যাবহারই করবে, এমনকি তিনি আবার একই ভাবে প্রকাশ্যে কোরআন তিলাওয়াত করতে চাচ্ছিলেন এবং তিনি বলেছিলেন “আমি মার খেয়েও কোরাইশদের থেকে আরাম অনুভব করছি”। কেন তিনি এমন করেছিলেন? তিনি কোরআন এর মধ্যে কী খুঁজে পেয়েছিলেন? কারণ কোরআন হল সেই কিতাব যা আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সমগ্র মানবজাতির জন্য নাযিল করেছেন তাদের সৎপথের নিদর্শন হিসেবে।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন: “রমজান মাস, যাতে কোরআন কে নাযিল করেছি মানুষের দিশারী, সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে।” (সূরা আল বাকারা – আয়াহ ১৮৫)।
আমরা এই রমজান মাসে কোরআন বেশি বেশি তিলাওয়াত করি, তারাবীহ নামাজে কোরআন খতম দেই। কিন্তু আমরা কি আমাদের জীবনে কোরআনের ব্যবহার বুঝি? কোরআন কেন নাযিল হয়েছিল? সাহাবাগন কিভাবে কোরআনের মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন? আয়েশা (রা) কে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চরিত্র সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করে হয়েছিল তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) এর চরিত্রকে একটি “জীবন্ত কোরআন বা চলন্ত কোরআন” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। আমাদের চরিত্র কি “চলন্ত কোরআন”এর মত? আমারা কি আমাদের জীবনের প্রত্যেক ধাপে কোরআনের আয়াহ প্রতিফলিত করি? আমরা কি আমাদের কাঁধে কোরআনের বোঝা অনুভব করতে পারি?
আল্লাহ্ তা’লা বলছেন: “যদি আমি এই কোরআনকে পর্বতের উপর অবতীর্ণ করতাম, তবে তুমি এটাকে (কোরআনকে) আল্লাহ্র ভয়ে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। আমি এই সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য যাতে তারা চিন্তা করে।” (সূরা আল হাশর – আয়াহ ২১)।
এখানে আল্লাহ্ বলছেন যে পাহাড়ের উপর কোরআন নাযিল হলে, পাহাড় আল্লাহের ভয়ে নুহ্য হত এবং পাহাড় ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যেত। আমাদের বোঝা উচিৎ, আল্লাহ্ তা’লা কোরআন কে পাহাড়ের উপর নয়, মানুষের উপর নাযিল হয়েছে। আমরা নিজেদের জিজ্ঞাসা করি, আমরা কি কোরআনের মাহাত্ব্য বুঝতে পেরেছি?
বর্তমান সমাজে ঘরে ঘরে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, মসজিদে কোরআন প্রশিক্ষন চলছে, কিন্তু বাস্তবে সমাজে কোরআনের প্রয়োগ হচ্ছে না। অথচ এই কিতাব নাযিল হয়েছে কিয়ামত পর্যন্ত সকল সমস্যার সমাধানের জন্য। শুধুমাত্র তিলাওাতের জন্য নয় বা ক্যালিগ্রাফি করে দেয়ালের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য নয়।
যেমন সূরা আন নিসাতে (১০৫) আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ্ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান…।”
আবার সূরা ইবরাহীমের ১ম আয়াতে বলনে, “আলিফ-লাম-রা, এটি একটি গ্রন্থ, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারেন, পরাক্রান্ত ও প্রশংসার যোগ্য পথে তোমার পালনকর্তার নির্দেশে।”
একদা মু’আজ ইবন জাবাল (রা) শহরের মানুষদের ডেকে বললেন – “আজকে কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা কম এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা বেশী, এমন একটা সময় আসবে যখন কোরআনের তিলাওাতকারীর সংখ্যা বেশী এবং প্রয়োগকারীর সংখ্যা কম হবে।”
তিনি আসলে আমাদের সময়ের কথাই বলছিলেন। এখন মসজিদে তারাবীহর নামাজে কোরআন খতম দেই, কিন্তু রমজান শেষ হওয়ার সাথে সাথে কোরআন তিলাওয়াতও শেষ, এমনকি নামাযও শেষ। এই কোরআন চর্চা না করার কারণে মুসলিম উম্মাহ আজ অধঃপতিত।
রাসূল (সা) বলেছেন: “আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোন জাতি কে এই বই (কোরআন) দ্বারা সমুন্নত করেন, এবং অন্য জাতিকে অধঃপতিত করেন।” (মুসলিম)
আল্লাহ্ তা’আলা বলছেন: আর জতি সে জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে আমি তাদের প্রতি আসমানি ও পার্থিব নিয়ামাহ (নেয়ামত) সমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছি। (সূরা আল আ’রাফ – আয়াহ ৯৬)।
সুতরাং উপরোক্ত কোরআনের আয়াত এবং হাদীস থেকে বোঝা যাচ্ছে, আমরা (মুসলিম উম্মাহ) আল্লাহ্র উপর ঈমান না এনে কাফিরদের উপর ঈমান আনার কারণে আজকে আল্লাহ্ আমাদেরকে নিয়ামাহ (নেয়ামত) না দিয়ে বরঞ্চ কাফিরদের দ্বারাই আমাদেরকে লাঞ্ছিত করছেন। আজ এই মুসলিম উম্মাহই পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে শোষিত, নিগৃহীত, অপমানিত। কোরআন বাস্তবায়ন না করার ফলে মুসলিম জাতি সামরিক শক্তি হারিয়েছে, অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়েছে, শরীয়াহ প্রয়োগ না করে অশান্তির সমাজে পরিণত হয়েছে।
অথচ কোরআনের প্রকৃত প্রয়োগের ফলে মাত্র কিছু বছরের মধ্যে মুসলিম উম্মাহ কিভাবে সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল, জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করেছিল, ন্যায় বিচার দিয়ে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি অঞ্চল শাসন করেছিল।
যিয়াদ ইবন লাবিদ (রা) হতে বর্ণনা করেছেন, রাসুল্লাহ (সা) কিছু একটা উল্লেখ করার পর বলেছেন: “এমন একটা সময় আসবে যখন জ্ঞান আর থাকবে না। আমি (জিয়াদ) বললাম, ও রাসূলুল্লাহ (সা) এটা কিভাবে সম্ভব যে জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যাবে যখন আমরা (সাহাবাগণ) কোরআন তিলাওয়াত করছি ও আমাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিচ্ছি এবং আমাদের সন্তানও তাদের সন্তানদের কোরআন শিক্ষা দিবে কিয়ামত পর্যন্ত। তারপর তিনি (সা) বললেন: জিয়াদ, তোমার মা তোমার জন্য ক্রন্দনরত হোক, আমি জানতাম তুমি মদীনার ধর্ম সম্পর্কে ভাল জ্ঞানীদের অন্যতম, ইয়াহুদি-নাসারাদের দেখনা যে তারা তাদের ধর্মগ্রন্থ তিলাওয়াত করে কিন্তু ধর্মগ্রন্থে যা আছে তা দ্বারা জীবনযাপন করে না?” (আহমদ, ইবন মাজাহ, তিরমিজি)।
বর্তমানে মুসলিম শাসকরা উপরিল্লিখিত বর্ণনার শামিল, যারা কোরআন তিলাওয়াত করে বা কোরআন প্রশিক্ষন বা কোরআন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে কিন্তু কোরআনের বাস্তবায়ন করে না, কোরআন দিয়ে শাসন করে না। এজন্য মক্কার হারামাইন শরীফে কোরআন তিলাওয়াত শুনি কিন্তু মক্কাতে (বা সৌদি আরব সহ সমগ্র মুসলিম জাহানে) কোরআনের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখি না।
রমজান – তাওবাহ এবং দোয়া কবুলের মাস:
আমরা জানি রমজান মাসে কোরআনুল কারীম (এবং তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল ও অন্যান্য আসমানি কিতাব) নাযিল হয়েছিল। রমজানের শেষ দশ দিন নাজাতের দশ দিন এবং এই দশ দিনের মধ্যেই লাইলাতুল ক্বাদর এর রাত পাওয়া যায়। এই দশ দিন মুমিনগণ আল্লাহের দরবারে অনেক দোয়া করেন, তওবাহ করেন – গুনাহ হতে মাফ চান, ইতিকাফ করেন, শেষ রাতে কোরআন তিলাওয়াত করেন, সুহুরের আগে তাহাজ্জুদ আদায় করেন। রমজান মাসে আল্লাহ্ তা’লা প্রতিদিন প্রচুর রোজাদারকে ক্ষমা করে দিবেন আর এজন্য সারা রমজান মাসব্যাপি মুমিনগণ আল্লাহ্র কাছে দোয়া করে ক্ষমা চাবে। রোজাদারের দোয়া কবুলের ব্যাপারে একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “তিন ব্যাক্তির দোয়া আওল্লাহ তা’আলা কখনও ফেরত দেন না – ন্যায় পরায়ণ শাসক, সাইম (রোজাদার) যখন ইফতার করে, মজলুম (অত্যাচারিত) এর দোয়া।” (ইবন মাজাহ – ১৭৫২)।
রমজান মাসে যে নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না, সে তো দুর্ভাগা ছাড়া কিছুই না।
কারণ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “…জীবরাইল (আ) আসলেন এবং বললেন – যে ব্যাক্তি রমজানে উপনীত হল এবং তার জীবনের গুনাহ মাফ করাতে পারলো না ও জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারলো না – আল্লাহ্র লানত তার উপর পতিত হক, এবং আমি (রাসুলুল্লাহ সা) বললাম- আমিন।” (আহমাদ – ৭৪৪৪, ইবন খুজাইমাহ, তিরমিজি, আল হাকিম, আল-দায়হাকি সাহিহ)।
আরেকটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: আবু হুরাইরাহ (রা) থেকে বর্ণিত- “যারা রোজা রেখেছে তাদের মধ্যে অনেকেই তৃষ্ণা ছাড়া আর কিছুই পেলো না, এবং যারা রাত্রে নামায আদায় করলো তাদের মধ্যে অনেকেই রাতযাপন ছাড়া কিছুই পেলো না” (তিরমিজি)।
তাই উপরোক্ত কয়েকটি হাদীসের বোঝা যাচ্ছে যে রমজান মাসে একজন সায়েমের (রোজাদারের) যেরকম দোয়া কবুল হওয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে ঠিক তেমনি রোজাদারের দোয়ায় আল্লাহ্ তা’লা সাড়া না দেওয়ারও অনেক সম্ভাবনা রয়েছে কারণ দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত হল – আন্তরিকতা, হালাল রিযক, পিতামাতার বাধ্যতা, তওবাহ করা, আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) করা, আল্লাহ্ তা’আলা দোয়া কবুল করবেন এমন মনোভাব পোষণ করা ইত্যাদি।
রাসুলাল্লাহ (সা) বলেছেন – “সেই স্বত্ত্বার কসম যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে হবে তা নাহলে আল্লাহ্ তোমাদের উপর শাস্তি অর্পণ করবেন এবং তখন তোমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাবে কিন্তু তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবেন না। (তিরমিজী)
আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার (সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বা জালিম শাসকের অন্যায়– অবিচার এর প্রতিবাদ না করলে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়াতা’লার শাস্তি অর্পিত হওয়ার প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন– “যদি মানুষেরা শাসকের জুলুম প্রত্যক্ষ করে এবং তাকে বাধা না দেয়, তাহলে তাদের সবাই আল্লাহ্র শাস্তির খুবই নিকটবর্তী।” (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবন মাজাহ)।
হাদীসগুলো থেকে আমরা বুঝতে পারি যে অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং ইসলামের পথে অন্যকে আহবান না করার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে, এবং তা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শাসকশ্রেণীও জুলুম শুরু করে। বর্তমানে আমাদের সমাজে তাই দেখা যায়। আমরা প্রত্যেকেই অন্যায় দেখেও না দেখার ভান করি – শুনেও ঘুমিয়ে থাকি। পুরুষ-মহিলা, প্রৌঢ়-যুবক, সাধারণ মুসলিম–আলেম সমাজ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত প্রত্যেকেই গাফেল হয়ে আছি। কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সবার দায়িত্ব, এটা কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তি বা বিশেষ কোন গোষ্ঠীর দায়িত্ব নয়। আর আমরা যদি সত্যিই আম’র বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার না করি তবে আমাদের দোয়া আল্লাহ্ তা’লা কবুল ত করবেনই না বরং আল্লাহ্র শাস্তি সমাজে আপতিত হবে।
পরিশেষে অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান সম্পর্কিত আরেকটি বহুল প্রচলিত হাদিস উল্লেখ করছি, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন – “যখন কেউ কোন অন্যায় হতে দেখলো সে যেন হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর সে যদি তা করতে না পারে, তাহলে মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর তাও যদি সে করতে না পারে তাহলে সে যেন অন্তর থেকে ঘৃণা করে এবং এটা হল ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।” (মুসলিম)
অতএব এটা পানির মত স্পষ্ট যে “সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ” হল ঈমান আনার ও তাকওয়া অর্জনের পূর্বশর্ত। সহজ ভাষায়, অন্যকে আল্লাহের পথে ডাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ বা বাধা দান না করলে মু’মিন বা মুত্তাকি হওয়া যায় না এবং আল্লাহ্র ক্ষমা পাওয়া যায় না।
রমজান – বিজয় ও শক্তি অর্জনের মাস:
পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার প্রচুর রাহমাহ / বারাকাহ পাওয়া যায়। এই মাসেই মুসলিমরা ইসলামী রাষ্ট্রের অধিনে প্রথম জিহাদ পরিচালিত করে – হিজরি ২য় সালে – বদরের ময়দানে এবং মাত্র ৩১৩ জন সাহাবি ৩০০০ ভারী অস্ত্রে সজ্জিত কাফিরদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়। ৮ম হিজরির এই মাসেই মক্কা বিজয় হয় ও পবিত্র কাবা শারিফের অভ্যন্তরের লাত, মানাত ইত্যাদি মূর্তি ধ্বংস হয়েছিল ও তাওহীদের ধ্বনি গর্জেছিল। ৯২ হিজরিতে তারিক বিন জিয়াদ মাত্র ১৭ বছর বয়সে রমজান মাসেই মাত্র ১২০০০ সৈন্য নিয়ে রাজা রড্রিকের নেতৃত্বে প্রায় ১ লাখ খ্রিস্টানের বিরুদ্ধে জিহাদ করে স্পেন, ইটালির সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ ও ফ্রান্সের অর্ধেক বিজয়ের মাধ্যমে ইউরোপে মুসলিম শাসনের ধারা শুরু করেছিলেন পরবর্তীতে যা পর্তুগাল, সাইপ্রাস ইত্যাদি দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। ৬৫৮ হিজরির রমজান মাসেই সাইফুদ্দিন কুতুস মিশর থেকে তার সেনাবাহিনী নিয়ে চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে শক্তিশালী মঙ্গোলীয় তাতার বাহিনিকে পরাজিত করেছিলেন এবং ৬৮২ হিজরির রমজান মাসে সালাহউদ্দিন আইয়ুবি ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেমের পবিত্র আল-আকসা কে মুক্ত করেছিলেন। তাই রমজান মাসকে ঈমান/তাকওয়া অর্জনের মাস বা কোরআনের মাস বলার পাশাপাশি বিজয়ের মাসও বলতে পারি, এই মাসেই মুসলিমরা আল্লাহের সাহায্যে বারবার জেগে উঠে। সময় এসেছে আবার জেগে উঠার। যে রমজান আমাদের পূর্বপুরুষদের স্পৃহার উৎস ছিল যার কারণে তারা বারবার অসম্ভব কে সম্ভব করেছিল, সে রমজান-ই হোক আমাদের স্পৃহা।
রমজান এর পর কী হবে?
প্রতি বছর রমজান আসে, আবার রমজান চলে যায়। রমজান আসলে আমাদের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা যায়। বিশেষ করে ঘরে রকমারি ইফতারের আয়োজনে বা দোকানে মজাদার ইফতারের কিনতে ব্যাস্ত থাকার কোন মানে হয় না। তাছাড়া পুরো মাস জুড়ে ঈদের কাপড়ের পরিকল্পনা করা বা কেনাকাটার জন্য বাজারে ঘুরে বেড়ানো চরম বোকামি ছাড়া কিছুই না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে রমজান কোন উৎসব নয়, এটা একটা সুযোগ যার মাধ্যমে আমরা নিজেকে ঠিকঠাক করে নিতে পারি। রমজান আসলে সাচ্ছা মুসলিম আর রমজান গেলে যেইসেই, এরকম হলে রমজান পাওয়াটাই বৃথা। আমরা যেন “রমজান-মুসলিম” না হয়ে যাই সেদিকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। রমজান চলে গেলেও আমরা যেন পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করতে পারি সে ব্যবস্থা করতে হবে।
রমজান এমনভাবে পালিত করতে হবে যেন আমরা রাতের অন্ধকারে আল্লাহ্র দরবারে তার করুণা, ক্ষমা, সাহায্য চাইব আর দিনের আলোয় সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করব। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের তৌফিক দিন যেন আমরা শয়তানকে ও তার অনুসারীদের ভয় না পেয়ে বরং আল্লাহকে ভয় করে তাকওয়া অর্জন করি, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করে ঈমান বৃদ্ধি করি, কোরআনের আলোকে সমাজ তথা খিলাফাহ (ইসলামী রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহের শাস্তি থেকে নিজেদের রক্ষা করি। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাদের শক্তি বৃদ্ধি করে দিন যেন আমরা আল্লাহ্র নুসরাহ পেয়ে যাই এবং আল্লাহ্র দ্বীন এই দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করে কাফিরদের উপর আমাদের বিজয় হয়। আমিন।
আব্দুল্লাহ আবু নাদরাহ
২৫শে শাবান, ১৪৩৩
১৪ই জুলাই, ২০১২বাইতুল মাল

বাইতুল মাল শব্দটি গঠনের দিক থেকে জটিল ও বহু অর্থবোধক এবং এটি রাষ্ট্রের এমন একটি স্থানকে নির্দেশ করে যেখানে ব্যয়ের পূর্ব পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রাপ্ত সকল রাজস্ব জমা রাখা হয়। এছাড়া, এর দ্বারা এমন একটি কর্তৃপক্ষকেও বোঝানো হয়ে থাকে, যা মুসলিমদের অধিকারকৃত সম্পদসমূহ গ্রহণ ও ব্যয়ের জন্য দায়িত্বশীল।
আমরা ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা এবং তহবিল ব্যতীত ওয়ালীকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হবে। সুতরাং, সমগ্র সেনাবাহিনীর একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ থাকবে, যার নেতৃত্বে থাকবে আমীর-উল-জিহাদ।
একইভাবে, বিচারব্যবস্থার জন্যও একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ, যাকে বিচারবিভাগ বলা হবে এবং রাষ্ট্রের সকল রাজস্ব বা তহবিল একটি কেন্দ্রীয় বিভাগের অধীনে থাকবে, যাকে বলা হবে বাইতুল মাল।
এ ব্যাপারে অসংখ্য দলিল-প্রমাণ রয়েছে যে, রাসূল (সা) এর সময় বাইতুল মাল সরাসরি তাঁর কিংবা, তিনি (সা) যাকে এর প্রধান হিসাবে নিযুক্ত করতেন তার তত্ত¡াবধানের অধীন ছিল। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ক্ষেত্রবিশেষে সরাসরি রাষ্ট্রীয় তহবিল তদারকী করতেন, যেখানে এ তহবিল একটি সিন্দুকে জমা রাখা হত। তিনি (সা) সাধারণত নিজে তহবিল গ্রহণ করতেন, এগুলো বন্টন করতেন এবং সঠিক স্থানে সেগুলো ব্যয় করতেন। আবার, কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি (সা) অন্য কাউকে এ তহবিলের দায়িত্বে নিযুক্ত করতেন। রাসূল (সা) কে অনুসরণ করে খোলাফায়ে রাশেদীনরাও (রা) একই কাজ করেছেন; হয় তাঁরা নিজেরা সরাসরি বাইতুল মাল এর দায়িত্ব নিয়েছেন কিংবা, তাঁদের পক্ষ থেকে এ দায়িত্ব পালন করার জন্য অন্য কোন ব্যক্তিকে মনোনীত করেছেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) মসজিদেই বাইতুল মাল-এর তহবিল রাখতেন। আনাসের (রা) সূত্রে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (আনাস (রা)) বলেছেন:
‘বাহরাইন থেকে আগত কিছু তহবিল নবী (সা) এর নিকট আনা হল। তিনি (সা) বললেন, ‘এগুলো মসজিদে ছড়িয়ে রাখো।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৪২১)তিনি (সা) মাঝে মাঝে এগুলো তাঁর স্ত্রীদের কক্ষে রাখতেন। এ ব্যাপারে আল বুখারী উকবা থেকে বর্ণনা করেছেন যে, উকবা বলেছেন,
‘আমি মদীনাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পেছনে আসরের সালাত আদায় করলাম। নামাজের শেষে তিনি সালাম দিয়ে অতি দ্রæত উঠে দাঁড়ালেন। তিনি কাতারবন্দী মুসলিমদের অতিক্রম করে তাঁর স্ত্রীদের ঘরের দিকে ছুটে গেলেন। লোকেরা তাঁর গতিতে অবাক হয়ে গেল। তিনি ফিরে আসলেন এবং দেখলেন লোকেরা তাঁর দ্রæতগতিতে ছুটে চলা দেখে অবাক হয়ে আছে। তিনি বললেন, ‘আমার মনে পড়ল, কিছু স্বর্ণের ধূলা আমাদের জিম্মায় আছে। এগুলো আমাকে পেছন থেকে তাড়া করবে ভেবে ভীত ছিলাম এবং সে কারণে ওগুলোকে বন্টন করার নির্দেশ দিয়ে এলাম।’’ অন্যথায় তিনি (সা) এগুলোকে তাঁর (সা) সিন্দুকে জমা রাখতেন। এ ব্যাপারে উমর (রা) থেকে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে,
‘সুতরাং আমি তাঁকে (তাঁর স্ত্রীকে) বললাম, ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোথায়?’ তিনি বললেন, ‘তিনি তাঁর সিন্দুকের ঘরে।’, আমি রাসূল (সা) এর সিন্দুকের দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ করে এক সা’ (ক্ষুদ্র পরিমাণের একক) পরিমাণ বার্লি দেখতে পেলাম এবং ঘরের ফলের রস তৈরীর জন্য এক পাশে একই পরিমাণের কিছু ফল দেখতে পেলাম; আর দেখলাম ঘরের দেয়ালে টাঙানো একখানা চামড়ার টুকরা। তা দেখে আমার দু’চোখ অশ্রæসিক্ত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন, ‘হে খাত্তাবের পুত্র, কিসে তোমাকে কাঁদালো?’ আমি বললাম, ‘হে রাসূলুল্লাহ্! কেন আমি কাঁদবো না, যখন আমি দেখতে পাচ্ছি এই পাটির দাগ আপনার শরীরে বসে গেছে এবং এই হচ্ছে আপনার সিন্দুক, যেখানে আমি যা দেখলাম এছাড়া আর কিছুই নেই।”
খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) সময়ে রাষ্ট্রীয় তহবিল রাখার স্থানকে বাইতুল মাল নামে অভিহিত করা হয়। সাহল ইবন আবু হাছমা এবং অন্যান্যদের থেকে সা’দ তার আল তাবাকাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “আল-শানে আবু বকরের একটি গৃহ ছিল যার জন্য কোন পাহারাদার নিযুক্ত ছিল না। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হল, ‘কেন আপনি এর জন্য কোন পাহারাদার নিযুক্ত করছেন না?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘এর জন্য তালা আছে।’ তিনি এ গৃহ থেকে এর মধ্যে যা রক্ষিত থাকত তা বিতরণ করতেন যে পর্যন্ত না তা খালি হয়ে যেত। যখন তিনি মদিনায় গেলেন, তিনি এটিকে (তহবিল) স্থানান্তরিত করে নিজ গৃহে রাখলেন।”
হিনাদ তার আল জুহদ গ্রন্থে আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, “এক ব্যক্তি উমরের নিকট আসলো এবং বললো, ‘হে আমীর-উল-মু’মিনীন! আমাকে সাহায্য করুন, যেন আমি জিহাদে যেতে পারি।’ উত্তরে উমর বললেন, ‘তার হাত ধর এবং তাকে বাইতুল মাল-এ নিয়ে যাও, যেন সে তার প্রয়োজন মত অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।’ আল-শাফীঈ তার আল-উম্ম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, যে বর্ণনাকে আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াদিয়্যাহ’র সূত্রে ইবন হাজার সঠিক বলেছেন, তিনি বলেছেন: ‘আবু হুজাইফা’র সালিম নামের এক দাস ছিল, পূর্বে যে আমাদের গোত্রের সালমা বিনত ইয়ার নামের এক নারীর দাস ছিল। অন্ধকার যুগেই সে তাকে মুক্ত করে দিয়েছিল। যখন উক্ত দাস ইয়ামামা’র যুদ্ধে শহীদ হলেন, তখন তার রেখে যাওয়া সম্পদ (উত্তরাধিকার) উমর ইবনুল খাত্তাবের কাছে নিয়ে আসা হল। তখন তিনি ওয়াদিয়্যাহ ইবন খিদমাহ্’কে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন: ‘এটা হল তোমার দাসের উত্তরাধিকার এবং তোমরাই এর অধিক দাবিদার।’ (একথা শুনে) তিনি বললেন: ‘হে আমির-উল-মু’মিনীন! আল্লাহ্ আমাদেরকে এর মুখাপেক্ষী করেননি। আমাদের বংশের নারী তাকে কোন শর্ত ছাড়াই মুক্ত করে দিয়েছে। সুতরাং, আমরা আমাদেরকে এ বিষয়ে অসম্মানিত করতে চাই না।’ অতঃপর, উমর তার (উক্ত দাসের) উত্তরাধিকারের সম্পদ বাইতুল মালে জমা রাখলেন।” এছাড়া, আল বায়হাকী এবং আল দারিমী বর্ণনা করেছেন এবং ইবন হাজিম এটাকে শুদ্ধ করেছেন: “সুফিয়ান ইবন আবদুল্লাহ ইবন রাবিয়্যাহ আল ছাকাফি একটি চামড়ার ব্যাগ কুড়িয়ে পান এবং তা উমর ইবন আল-খাত্তাবের কাছে নিয়ে যান। তিনি বলেন: ‘এক বছরের জন্য ঘোষণা দাও এবং এ সময়ের মধ্যে যদি কোন দাবিদার চিহ্নিত হয়, তাহলে এটি ফিরিয়ে দাও। আর, যদি না পাওয়া যায় তাহলে এটা তোমার।’
এক বছরের মধ্যে এটার কোন দাবিদার আসল না। পরের বছর তার সাথে সাক্ষাৎ কালে তাকে এটা স্মরণ করিয়ে দেয়া হল। তখন উমর বললেন: “এটা এখন তোমার। কারণ, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) আমাদের এরূপ করার নির্দেশ দিয়েছেন।” তিনি (সুফিয়ান ইবন আবদুল্লাহ) বললেন: ‘আমি এটা চাই না।’ তখন ’উমর সেটাকে নিলেন এবং বাইতুল মালে জমা রাখলেন।” এছাড়া, আবদুল্লাহ ইবন আমরু থেকে আল দারিমী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “উসমানের শাসনামলে এক ভৃত্য কোন আত্মীয়-স্বজন না রেখেই মৃত্যুবরণ করলো। তিনি তার সম্পদ বাইতুল মাল-এ জমা করার নির্দেশ দিলেন।” আনাস ইবন শিরিন থেকে ইবন আবদ আল-বার তার আল-ইসতিদকার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, “আলী সে পর্যন্ত সম্পদ বিতরণ করতেন যে পর্যন্ত না বাইতুল মাল শূণ্য হয়ে যেত। এরপর, তা পরিস্কার করা হত এবং তখন তিনি সেখানে বসতেন।”
এসব হাদীস বা ঘটনায় বাইতুল মাল’কে স্থান অর্থে বোঝানো হয়েছে। আর, বাইতুল মাল-এর দ্বিতীয় অর্থ, যেখানে এ শব্দসমূহের দ্বারা একটি দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে বোঝানো হয়; সে সম্পর্কে বলা যায় যে, তহবিল বা সম্পদ অনেক সময় কোন একটি নির্দিষ্ট স্থানে থাকে না বলে এ কর্তৃপক্ষের অপরিহার্যতা তৈরি হয়েছে, যেমন: জমি, তেলের খনি, গ্যাসের খনি, যে সব সাদাকা গ্রহণ করার পর কোন নির্দিষ্ট স্থানে না রেখেই উপযুক্ত লোকদের মাঝে তা বন্টন করে দেয়া হয় ইত্যাদি। আল বায়হাকী, আহমদ ইবনে হাম্বল এর আল মুসনাদ, আবদুর রাজ্জাক এর মুসান্নাফে বর্ণিত হাদীস অনুসারে দেখা যায় যে, বাইতুল মাল’কে কখনও কখনও একটি কর্তৃপক্ষ বোঝানোর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। লাহিক ইবনে হুমাইয়াদ থেকে জানা যায়, ‘ইবনে মাসউদকে বিচারব্যবস্থা ও বাইতুল মালের প্রধান হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল।’ এর অর্থ এই নয় যে, উমর (রা) ইবনে মাসউদকে বাইতুল মাল-এর দরজার পাহারাদার হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন; বরং, এর অর্থ হল, তাঁকে তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়ের কর্তৃত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিল। আল-হাসান থেকে ইবন আল-মুবারক তার আল-জুহদ গ্রন্থে যে ঘটনা বর্ণনা করেছেন, সেখানেও বাইতুল মাল’কে একই অর্থে বোঝানো হয়েছে। যখন বসরার আমীরগণ আবু মুসা আল-আশয়ারী’র সাথে আসলেন, তারা তাঁকে তাদের জন্য কিছু খাবার বরাদ্দ করার জন্য অনুরোধ করলেন। তিনি একথা বলে তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন: ‘হে আমীর সম্প্রদায়! আমি আপনাদের জন্য বাইতুল মাল থেকে দুটি ভেড়া এবং
এক টুকরো কৃষি (গারীব) জমি বরাদ্দ করছি।” এখানেও বাইতুল মাল বলতে দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ বোঝানো হতে পারে।
খলীফা হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি বাইতুল মালের আয়-ব্যয় তত্ত্বাবধান করেন
রাসূল (সা) হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি তাঁর নিজের কোলে উসমান (রা) এর কাছ থেকে বিপদসঙ্কুল (’উসরাহ) যাত্রার সেনাবাহিনী’র জন্য অনুদান গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া, হাসান ও গারীব থেকে তিরমিযী এবং আহমাদ বর্ণনা করেছেন এবং আব্দুর রহমান ইবন সামরাহ্ থেকে আল-হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং শুদ্ধ করেছেন এবং আল জাহাবী এর সাথে একমক পোষণ করেছেন, তিনি বলেছেন যে:
“উসমান রাসূল (সা) এর নিকট এক হাজার দিনার নিয়ে আসলেন, যখন তিনি (সা) বিপদসঙ্কুল যাত্রার সেনাবাহিনী অর্থাৎ, তাবুকের যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত করছিলেন। তিনি এ মুদ্রাগুলো রাসূল (সা) এর কোলের উপর রাখলেন। তিনি বলেন, রাসূল (সা) এগুলোকে নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন: “আজকের পর থেকে আর কোন কাজের দ্বারা উসমান ক্ষতিগ্রস্থ হবে না; এবং তিনি (সা) এ কথাটি অনেকবার বললেন।” তিনি (সা) মাঝে মাঝে বাইতুল মাল-এর অর্থ নিজেই বন্টন করতেন। আল বুখারী আনাসের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে:
“বাইরাইন থেকে আগত অর্থ রাসূল (সা) এর নিকট আনা হল। তিনি (সা) বললেন: এগুলোকে মসজিদে ছড়িয়ে রাখ। নামাজ শেষ করে তিনি (সা) এগুলোর খুব কাছে বসলেন এবং উপস্থিত কাউকে সে অর্থ থেকে বঞ্চিত করলেন না। যখন রাসূল (সা) উঠে দাঁড়ালেন তখন আর কোন অর্থই অবশিষ্ট থাকল না।”
আবু বকরের (রা) শাসনামলেও তিনি নিজে বাহরাইন থেকে আগত অর্থ বন্টনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আল বুখারী জাবিরের সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন:
“রাসূল (সা) বলেছিলেন: ‘যদি বাহরাইন থেকে অর্থ আসে তবে আমি তোমাকে এভাবে, এভাবে এবং এভাবে দেব, অর্থাৎ, তিনবার বললেন। রাসূল (সা) এর ইন্তিকালের পর বাহরাইন থেকে অর্থ আসলো। তখন আবু বকর কাউকে এ ঘোষণা দেবার নির্দেশ দিলেন: যার যার রাসূল (সা)এর কাছে কোন ঋণ বা অন্যকিছু পাওনা আছে, সে যেন আমার কাছে আসে। এ কথা শোনার পর আমি তাঁর কাছে গেলাম এবং বললাম আল্লাহ্’র রাসূল আমাকে বলেছিলেন: “আমার জন্য এভাবে, এভাবে এবং এভাবে; তারপর তিনি আমাকে তিনবার দিলেন।”
উপরে উল্লিখিত সুফিয়ান আল-ছাকাফী’র চামড়ার ব্যাগ সম্পর্কিত হাদীসটি যেখানে তিনি ব্যাগটি পাবার পর ঘোষণা দেন এবং শেষ পর্যন্ত কোন দাবিদার না পাওয়ায়: “উমর সেটাকে নিলেন এবং বাইতুল মালে জমা রাখলেন।” আল শাফীঈ তার আল-উম্ম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “একাধিক পন্ডিত ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, যখন ইরাকের যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনীমত) উমর ইবনুল খাত্তাবের নিকট আসলো, বাইতুল মাল-এর তত্ত¡াবধায়ক তাকে বললেন: “আমাকে এগুলো বাইতুল মালে রাখতে দিন।” তিনি বললেন: “না! কাবার প্রভুর শপথ! এগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত কোন গৃহে রাখা হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না এগুলোকে বন্টন করা হবে।” এরপর তিনি এগুলোকে মসজিদে রাখার নির্দেশ দিলেন এবং চামড়ার মাদুর দিয়ে এগুলোকে ঢেকে দেয়া হল। তারপর, আনসার ও মুহাজিরিনদের মধ্য হতে কিছু ব্যক্তি এগুলোকে পাহারা দেবার দায়িত্বে নিয়োজিত হল। সকাল বেলায় আল-আব্বাস ইবন আব্দুল-মুত্তালিব (রা) এবং আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রা) তাঁর (উমর (রা)) সাথে বের হলেন; হয় তিনি এদের মধ্যে কোন একজনের হাত ধরে ছিলেন কিংবা, এদের মধ্যে কেউ একজন তাঁর হাত ধরে ছিলেন। যখন তারা (পাহারাদার) তাঁকে দেখল, তারা গণীমতের মালগুলোর উপর থেকে চামড়ার মাদুর সরিয়ে নিল। এরপর তিনি এমন এক দৃশ্য অবলোকন করলেন, যা তিনি পূর্বে কখনও দেখেননি। তিনি দেখলেন স্বর্ণ, ইন্দ্রনীলমণি, ক্রিসোলাইট, মুক্তা ঝল্মল্ করছে। এ দৃশ্য অবলোকন করার পর তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। তাদের একজন বললেন, “আল্লাহ্’র কসম! আজকের এদিন কান্নার নয়; বরং, এদিন আনন্দের, এদিন (আল্লাহ্’র) প্রশংসা করার।” তিনি (উমর (রা)) বললেন: “আল্লাহ্’র কসম! তুমি বিষয়টিকে যেভাবে দেখছো আমি সেভাবে দেখছি না। এ ধরনের সম্পদ কোন জাতির মধ্যে ততক্ষণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়নি, যতক্ষণ পর্যন্ত এগুলো তাদের ক্ষতি সাধন করেছে।” তারপর তিনি কিবলা’র দিকে ফিরলেন, তাঁর দুই হাত তুলে বললেন, “হে আমার প্রভু! আমি এসবের প্রলোভন থেকে তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ তুমি বলেছো:
“আমি তাদের অজ্ঞাতসারে তাদেরকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাব।”
[সূরা ’আরাফ: ১৮২]তারপর তিনি বললেন, সুরাকা ইবন জা’শম কোথায়? তাকে নিয়ে আসা হল যখন তার দুই হাত ছিল সরু ও চুলে আবৃত। তিনি তাকে কিসরা’র বাহুবন্ধনীগুলো দিলেন এবং বললেন: ‘এগুলো পরো’। তারপর তিনি বললেন, ‘বল, আল্লাহু আকবর।’ সে বলল, ‘আল্লাহু আকবর’। তখন তিনি বললেন, ‘বল প্রশংসা সেই আল্লাহ্’র যিনি কিসরা ইবন হিরমিজের হাত থেকে এটা বের করে করেছেন এবং বনু মিদলাজের এক (সামান্য) বেদুইন সুরাকা ইবন জা’শামকে তা দিয়ে অলঙ্কৃত করেছেন।’ তারপর তিনি একটি লাঠি দিয়ে মালামালগুলো উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগলেন এবং বললেন, ‘নিঃসন্দেহে যে এগুলো আমাদের কাছে সমর্পণ করেছে সে সৎ।’ তখন এক ব্যক্তি তাঁকে বলল, ‘আমাকে বলতে দিন, আপনি আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে (আমাদের) তত্ত্বাবধায়ক(আমিন উল্লাহ্) এবং তারা আপনার কাছে তাই সর্মপণ করেছে, যা আপনি আল্লাহ্’র কাছে সর্মপণ করেছেন। একথা শুনে তিনি বললেন, ‘তুমি সত্য বলেছো।’ তারপর তিনি সেগুলোকে বন্টন করে দিলেন। এছাড়া, আমরা ইতোমধ্যে আবদুল্লাহ ইবন আমরু’র সূত্রে আল-দারিমী বর্ণিত হাদীসটি উল্লেখ করেছি: “এক ভৃত্য কোন আত্মীয়-স্বজন না রেখেই মৃত্যুবরণ করলো। সুতরাং, উসমান তার উত্তরাধিকারের সম্পদ বাইতুল মালে জমা করতে বললেন।” এর সাথে সাথে আল-ইসতিদকার গ্রন্থে উল্লেখিত আনাস ইবন শিরিন এর হাদীসটিই উল্লেখ করা হয়েছে যে: “আলী (রা) ততক্ষণ পর্যন্ত অর্থ বিতরণ করতেন যতক্ষণ পর্যন্ত না বাইতুল মাল শূণ্য হয়ে যেত (তারপর সে গৃহকে পরিস্কার করা হত এবং তিনি সেখানে বসতেন)।”
কখনও কখনও রাসূল (সা) সম্পদ বন্টনের সময় সাহাবীদের (রা) মধ্য হতে কাউকে সামগ্রিকভাবে এ বিষয়ে নেতৃত্ব দেবার জন্য মনোনীত করতেন। কিংবা, তিনি তহবিল বন্টন সম্পর্কিত কিছু বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে কাউকে নিযুক্ত করতেন। উকবাহ্’র সূত্রে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘আমার মনে পড়ল, কিছু স্বর্ণের ধূলা আমাদের জিম্মায় আছে। এগুলো আমাকে পেছন থেকে তাড়া করবে ভেবে ভীত ছিলাম এবং সে কারণে ওগুলোকে বন্টন করার নির্দেশ দিয়ে এলাম।’’
এছাড়া, ইবন শিহাবের একটি হাদীস, যা ইবন আবি শায়বাহ বর্ণনা করেছেন এবং এ বর্ণনাটি আল-হাফিয ইবন আল হাজার আল-আশক্বালানী, আল মুনদিরী এবং আল হাইছামী বিশুদ্ধ বলেছেন: “আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বিলালের সিন্দুকের ঘরে গেলেন যেখানে তিনি সাদাকাহ্ জমা রাখতেন। সেখানে তিনি (সা) কিছু স্তুপীকৃত খেজুর দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এ খেজুরগুলো কিসের জন্য, বিলাল?” তিনি বললেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ্! আমি এগুলো আপনার দূর্দিনের জন্য রেখে দিয়েছি।’ তখন তিনি বললেন, ‘তুমি কি নিজেকে নিরাপদ মনে কর, যখন তুমি ঘুম থেকে উঠো এবং নিজেকে জাহান্নামের ধোঁয়ার মধ্যে আবিস্কার করো?’ এগুলো বিতরণ করে দাও এবং আরশের মালিকের পক্ষ থেকে কোন প্রকার কৃপণতার ভয় করো না।”
এছাড়া, অন্য একটি হাদীসে বর্ণিত আছে যে, “রাসূল (সা) এর সময় আব্দুর রহমান ইবন আউফ সাদাকা’র উট ও ভেড়ার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। আর, বিলাল নিযুক্ত ছিলেন সাদাকা’র ফল-ফলাদির দায়িত্বে; আর, মাহমিয়্যাহ ইবন জুয (আল্লাহ্’র রাসূল ও তাঁর পরিবারের) এক পঞ্চমাংশের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। আর, খলীফা বলেছেন: “এবং বিলাল তাঁর ব্যয়ের জন্য দায়িত্বশীল ছিলেন।”
আবদুল্লাহ ইবন লাহী আল-হুযানী’র সূত্রে ইবন হিব্বান তার সহীহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বলেছেন: ‘আমি রাসূল (সা) এর মুয়াজ্জিন বিলালের সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘হে বিলাল! আল্লাহ্’র রাসূল এর ব্যয়ের পরিমাণ কেমন ছিল?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তাঁর (ব্যয় করার মত) কিছুই ছিল না। আমি তাঁর রাসূল হিসাবে মনোনীত হবার দিন থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলাম। তাঁর কাছে যদি কোন মুসলিম আসতো, যার পরনে কোন কাপড় থাকতো না, তিনি আমাকে দ্রুত কিছু অর্থ ঋণ করে নিয়ে আসার নির্দেশ দিতেন, যেন তিনি ঐ ব্যক্তির জন্য পোষাক ও খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন।’ ইমাম মুসলিম রাসূল (সা) এর ক্রীতদাস আবু রাফি’ থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
‘রাসূল (সা) একটি বাচ্চা উট ধার করেছিলেন। যখন তাঁর কাছে উটের সাদাকাহ্ পৌঁছাল, তখন তিনি আমাকে ঐ উটের মালিককে বাচ্চা উটটি ফেরত দেবার নির্দেশ দিলেন। আমি বললাম, চার বছরের একটি ভাল উট ছাড়া আমি আর কোন উট দেখতে পাচ্ছি না। রাসূল (সা) বললেন, ‘ওটাই তাকে দাও; কারণ, উত্তম মানুষ তারাই যারা ঋণ পরিশোধে উত্তম।’ এছাড়া, ইবনে আব্বাসের হাদীসে এটি উল্লেখিত আছে, যে ব্যাপারে চার ইমাম একমত পোষণ করেছেন:
‘রাসূল (সা) যখন মু’য়াজকে ইয়েমেনে প্রেরণ করেন, তখন তিনি (সা) তাঁকে বলেন:
‘যদি তারা তোমার কথা মেনে নেয়, তবে তাদের জানাবে যে, আল্লাহ্ তা’আলা তাদের উপর সাদাকাহ্ ধার্য করেছেন, যা তাদের মধ্যকার সম্পদশালী ব্যক্তিদের নিকট হতে সংগ্রহ করা হবে এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করা হবে। যদি তারা এটা মেনে নেয়, তবে তাদের নিকট হতে তাদের সর্বাপেক্ষা ভালো সম্পদ নেয়া থেকে বিরত থাকবে; এবং মজলুমদের অভিশাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করবে; কারণ, তাদের ও আল্লাহ্’র মধ্যে কোন পর্দা থাকে না।”
এছাড়া, আবু হুরাইরাহ থেকে দুটি সহীহ্ গ্রন্থে (সহীহ্ বুখারী ও মুসলিম) বর্ণিত আছে যে: “আল্লাহ্’র রাসূল (সা) উমর (রা) কে সাদাকাহ্ সংগ্রহের জন্য প্রেরণ করেছিলেন।”
খোলাফায়ে রাশেদীনগণও তাঁর পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিলেন; এজন্য তাঁরাও তহবিল সংক্রান্ত বিষয়াদি পরিচালনার জন্য কিছু মানুষ নিযুক্ত করেছিলেন। ইবন ইসহাক এবং খলীফা বর্ণনা করেছেন যে: “আবু বকর বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে আবু উবাইদাহ ইবন আল-জাররাহ্’কে নিযুক্ত করেছিলেন এবং তারপর, তিনি তাঁকে আল-শামে প্রেরণ করেছিলেন।”
মুয়াকিবের জীবনের উপর মন্তব্য করতে গিয়ে আল জাহাবী বলেছেন যে, আবু বকর ও উমর তাকে বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। আবদুল্লাহ ইবন যুবায়ের হতে ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন, যা আল-তারাতিব আল-ইদারিয়্যাহ (প্রশাসনিক বিন্যাস) গ্রন্থের রচয়িতা আল-হাকিম কর্তৃক প্রশংসিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: “তিনি আবু বকরকে পত্র লিখেন এবং আবু বকর তাকে বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে নিয়োজিত করেন এবং উমর ইবনুল খাত্তাব এ বিষয়ে সম্মতি প্রদান করেন।” এখানে আবদুল্লাহ ইবন আল-আরকামকে বোঝানো হয়েছে। ইবন সা’দ তার তাবাকাত গ্রন্থে এবং ইবন হাজার তার আল-ইসাবাহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, উমর (রা) এর কোষাধ্যক্ষ ছিল তাঁর ভৃত্য ইয়াছ্ছার ইবন নুমায়ের। ইমাম আহমাদ তাঁর আল-মুসনাদে এবং আব্দুর রাজ্জাক তার আল-মুসান্নাফে লাহিক ইবনে হামিদ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন: “এবং তিনি (উমর) ইবন মাসউদকে বিচারবিভাগ ও বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করলেন।” অর্থাৎ, আল-কুফাতে প্রেরণ করলেন। মালিক ইবন আনাস থেকে খলীফা এবং মালিক ইবন আনাস বর্ণনা করেছেন যায়িদ ইবন আসলাম থেকে, তিনি বলেছেন: “উমর বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দিয়ে আবদুল্লাহ ইবন আরকাম’কে নিযুক্ত করেছিলেন।”
উরওয়া ইবনে আল যুবায়ের থেকে ইবনে খুজায়মা তার সহীহ্ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, ‘আব্দুর রহমান ইবনে আব্দুল ক্বারী বলেছেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাবের সময় আমি বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে ছিলাম।’ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের গুণাবলীর বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে হাজার তার আল-ফাতহ্ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘এবং উমর ও উসমান তাঁকে কুফায় বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে নিয়োজিত করেন।’ আল জাশাইয়ারী তার আল-ওজারা ওয়াল কুত্তাব গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘মনে করা হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর লেখক (scribe) আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম ইবনে আবদ ইয়াগুছ তাঁর সময় বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব ছিলেন’ অর্থাৎ উসমান এর খিলাফত কালে। আল যুবায়ের ইবনে বক্কর থেকে আল হাকীম আল মুসতাদরাক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনে আরকাম ইবনে আবদ ইয়াগুছ ’উমরের সময়ে এবং উসমানের শাসনামলের শুরুর দিকে বাইতুল মাল এর দায়িত্বে ছিলেন, যে পর্যন্ত না তার মৃত্যু হয়; এবং তিনি কিছুদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাহচার্য পেয়েছিলেন।’
আল ইসতি’য়াব গ্রন্থে ইবনে আবদুল বার বর্ণনা করেছেন যে, “উসমানের খিলাফতের সময় যায়িদ ইবনে সাবিত বাইতুল মাল-এর দায়িত্বে ছিলেন; যায়িদ এর ওয়াহিব নামে একজন ক্রীতদাস ছিল। উসমান তাকে বাইতুল মালে সহায়তা করতে দেখেন। উসমান বললেন, ‘কে এই ব্যক্তি?’ যায়িদ প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘আমার ক্রীতদাস।’ তিনি বললেন, ‘আমি তাকে মুসলিমদের সহায়তা করতে দেখছি এবং একারণে সে কিছু পাবার অধিকার লাভ করেছে; আমি তার জন্য এটা (ভাতা) বরাদ্দ করলাম।’ এরপর, তিনি ঐ ক্রীতদাসের জন্য দু’হাজার (দিরহাম) বরাদ্দ করলেন। যায়িদ বললেন, ‘আল্লাহ্’র কসম, আপনি একজন দাসকে দু’হাজার দিতে পারেন না।’ অতঃপর, তিনি তার জন্য একহাজার বরাদ্দ করলেন।’
আল সাফাদি মিশরের পন্ডিতগণ ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাহাবীদের (রা) সম্পর্কে তার গ্রন্থে বলেছেন, ‘আবু রাফি’কে
’আলী ইবনে আবু তালিবের কাছে প্রেরণ করা হলে তিনি তাকে কুফায় বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব দেন।’ আল ইসতি’য়াব গ্রন্থে ইবনে আবদুল বার উল্লেখ করেছেন যে, ‘উবায়দুল্লাহ ইবনে রাফি’ আলীর একজন কোষাধ্যক্ষ ও সচিব ছিলেন।’ আল আইনী তার উমদাত উল ক্বারী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াহাব আল সুয়্যি’কে আলী সম্মান করতেন, ভালবাসতেন এবং বিশ্বাস করতেন। সেকারণে তিনি আল-কুফা’তে তাকে বাইতুল মাল-এর দায়িত্ব প্রদান করেন।’ এছাড়া, আলী বসরাতে এ কাজের জন্য যিয়াদকে নিযুক্ত করেন। আল জাশিয়্যারী বলেছেন, ‘আল-বসরা ত্যাগ করার সময়, তিনি তাকে আল-খারাজ ও দিওয়ানের দায়িত্ব অর্পণ করেন।’ বাইতুল মাল’কে দু’ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:
১. রাজস্ব : এর মধ্যে তিনটি দিওয়ান আছে:
– গণীমত ও খারাজ এর দিওয়ান: এর মধ্যে রয়েছে – গণীমত, খারাজ, ভূমি, জিজিয়া, যুদ্ধলব্ধ সম্পদ এবং কর।
– গণমালিকানাধীন সম্পত্তির দিওয়ান: এর মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদ, সমুদ্র, নদী, খালবিল, ঝর্ণা, বন, তৃণভূমি এবং হিমা (সংরক্ষিত ভূমিসমূহ)।
– সাদাকাহ্’র দিওয়ান: এর মধ্যে রয়েছে টাকা, ব্যবসায়িক পণ্য, ফসল ও ফলমূল, উট, গরু ও ভেড়ার উপর যাকাত ।
২. ব্যয় : এর মধ্যে আটটি দিওয়ান রয়েছে:
- খলীফার বাসভবনের দিওয়ান
- রাষ্ট্রীয় সেবার দিওয়ান
- মঞ্জুরীর দিওয়ান
- জিহাদের দিওয়ান
- সাদাকাহ্ ব্যয়ের দিওয়ান
- গণমালিকানাধীন সম্পদের ব্যয়ের দিওয়ান
- জরুরী অবস্থার দিওয়ান
- সাধারণ বাজেট, হিসাব-নিকাশ ও পরিদর্শনের দিওয়ান
প্রশাসনিক ব্যবস্থা (জনকল্যাণ বিভাগ, Administrative System)

রাষ্ট্র পরিচালনা ও জনগণের স্বার্থসংক্রান্ত কার্যাবলী বিভিন্ন অফিস, বিভাগ এবং প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় – যাদের কাজ হল জনগণের স্বার্থসংক্রান্ত বিষয়াবলী ও রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। প্রত্যেক অফিসের (মাসলাহা) প্রধান হিসেবে একজন মহাব্যবস্থাপক, প্রত্যেক বিভাগ (দায়রাহ্) ও প্রশাসনের (ইদারা) প্রধান হিসেবে একজন পরিচালক এর পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন। এই পরিচালকগণ পেশাগতভাবে তাদের অফিস, বিভাগ ও প্রশাসনের মহাপরিচালকের কাছে এবং আইন ও সাধারণ নিয়মনীতি পালনের ক্ষেত্রে ওয়ালী বা আমীলের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণত প্রশাসন পরিচালনা ও জনগণের বিষয়াদি দেখভাল করতেন এবং প্রশাসনে কর্মরত সচিবদেরও তিনি (সা) নিয়োগ দিতেন। এভাবেই, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনার লোকদের দেখাশোনার দায়িত্ব নেন, তাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করেন, তাদের মধ্যকার বিভিন্ন সম্পর্ক নির্ধারণ করেন, তাদের সকল প্রয়োজন নিশ্চিত করেন এবং তাদের জন্য যথোপযুক্ত বিষয়ে নির্দেশনা দিতেন। এসবই ছিল প্রশাসনিক বিষয় যা তাদের জীবনের বিভিন্ন জটিলতা বা সমস্যা দূর করে জীবনকে করেছিল সহজ।
শিক্ষাক্ষেত্রে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) দশজন মুসলিম শিশুকে শিক্ষা দেওয়াকে কাফের বন্দীদের জন্য মুক্তিপণ হিসেবে ধার্য করেছিলেন, যেখানে মুক্তিপণ গণীমতের মালের বিনিময়ে দেয়া হত যা মুসলিমদের সম্পদ হিসাবে গণ্য হত। এভাবেই তিনি (সা) মুসলিমদের শিক্ষা লাভের ব্যাপারটি নিশ্চিত করেছিলেন।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্র উন্নয়নের জন্য তিনি (সা) তাঁর নিজের জন্য উপহার হিসেবে প্রাপ্ত একজন ডাক্তারকে মুসলিমদের সেবার কাজে নিয়োজিত করেছিলেন। বস্তুতঃ রাসূল (সা) তাঁর নিজের জন্য প্রাপ্ত উপহারটি নিজে ব্যবহার না করে কিংবা নিজে গ্রহণ না করে জনসেবার জন্য নিয়োজিত করার ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, স্বাস্থ্যসেবা মুসলিমদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি কাজ।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক ব্যক্তিকে ভিক্ষা করার বদলে আগে একটি জামা ও পরে একটি কুঠার ক্রয় করার নির্দেশ দিলেন। তারপর সেই কুঠার দিয়ে বন থেকে কাঠ কেটে তিনি (সা) তাকে বাজারে বিক্রির নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ, ভিক্ষার ক্ষেত্রে ভিক্ষুককে কেউ ভিক্ষা দিতেও পারে আবার প্রত্যাখানও করতে পারে। এভাবে রাসূল (সা) কর্তৃক লোকটির কর্মসংস্থানের ঘটনা প্রমাণ করে যে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করাও মুসলিমদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একটি কাজ। তিরমিযী সমর্থিত আহমাদ বর্ণিত একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে,
‘আনসারদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি নবী (সা) এর কাছে আসলো এবং তাঁর কাছে সাদাকা চাইলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ঘরে কি কিছুই নেই?’ লোকটি বললো,‘আছে।’ তিনি (সা) বললেন, ‘ওগুলো আমার কাছে নিয়ে আসো।’ লোকটি রাসূল (সা) এর কথা অনুসারে কাজ করলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এগুলো হাতে নিয়ে বললেন, ‘এ দু’টিকে কে খরিদ করবে?’ একজন লোক বললো, ‘দুই দিরহামের বিনিময়ে আমি এগুলো ক্রয় করতে চাই।’ তিনি (সা) জিনিসগুলো তাকে দিলেন এবং বিনিময়ে দিরহাম দু’খানা নিলেন এবং দিরহাম দুটো আনসারীকে দিয়ে বললেন, ‘একটি দিরহাম পরিবারের জন্য খরচ কর এবং আরেকটি দিয়ে কুঠার খরিদ করে আমার কাছে নিয়ে এস।’ লোকটি তাই করল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বললেন, ‘যাও কুঠার দিয়ে বন থেকে কাঠ সংগ্রহ কর ও বিক্রয় কর; আর পনের দিনের আগে আমার সাথে দেখা করো না।’ লোকটি এ কথা মেনে নিল এবং পরবর্তীতে দশ দিরহাম নিয়ে ফেরত এল।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-১৬৪১)আল বুখারী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘মানুষের কাছে ভিক্ষা করার চাইতে তোমাদের জন্য একটি রশি দিয়ে জ্বালানী কাঠ বেঁধে পিঠে বয়ে নিয়ে বাজারে বিক্রি করে তার মুখ (সম্মান) রক্ষা করা শ্রেয়তর; কারণ মানুষ তাকে ভিক্ষা দিতেও পারে আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারে।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২০৭৫)রাস্তাঘাট নির্মাণের ক্ষেত্রে, রাসূল (সা) তাঁর সময়ে বিবাদের আশঙ্কার ক্ষেত্রে রাস্তার প্রশস্ততা সাত হাত করবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবু হুরাইরার সূত্রে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে,
‘বিবাদের আশঙ্কার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সিদ্ধান্ত ছিল রাস্তার প্রশস্ততা হবে সাত হাত।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং২৪৭৩)আর মুসলিমে বর্ণিত
‘যদি রাস্তার ব্যাপারে বিবাদ হয় তাহলে তোমরা এর প্রশস্ততা সাত হাত করো।’
তখনকার প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। শাফীঈ’র মতানুযায়ী, প্রয়োজনে রাস্তার প্রশস্ততা এর থেকে বেশী করাও অনুমোদিত।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাস্তার উপর দখল প্রতিষ্ঠা বা আগ্রাসন থেকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তাবারানী (আল জামী’) আল সগীরে বর্ণনা করেছেন যে:
‘যে ব্যক্তি মুসলিমদের রাস্তা থেকে এক হাত পরিমাণ জায়গা নিল, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাকে সাত জমীনের মাটি দ্বারা আবদ্ধ করবেন।’
সেচকাজের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, আল যুবায়ের তার জমির উপর দিয়ে যাওয়া একটি জলধারার পানি দিয়ে সেচকার্য নিয়ে একজন আনসারের সাথে দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে বলেন,
‘হে যুবায়ের, সেচকার্যের পর তোমার প্রতিবেশীকে পানি ছেড়ে দাও।’
(মুসলিমের বর্ণিত এ হাদীসটির ব্যাপারে ঐকমত্য আছে)এভাবেই রাসূল (সা) মুসলিমদের প্রতিটি বিষয় দেখাশুনা করতেন এবং কোন প্রকার জটিলতা ব্যতীত সহজ সরল ভাবে তাদের সমস্যাসমূহ সমাধান করতেন। এ সমস্ত কার্য পরিচালনার জন্য তিনি (সা) কিছু কিছু সাহাবীদের (রা) সাহায্য নিতেন, এবং এভাবেই তিনি (সা) জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশুনার বিষয়টিকে খলীফার তত্ত¡াবধানের অধীন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন; কিংবা, কোন কোন ক্ষেত্রে তিনি (সা) এ বিষয়সমূহ দেখাশুনা করার জন্য যোগ্য পরিচালক নিয়োগ করেন। এজন্যই আমরা খলীফার গুরুভার লাঘব করার জন্য এটিকে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিশেষ করে, বর্তমানে যখন জনগণ সম্পর্কিত বিষয়সমূহ বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শাখাপ্রশাখা বিস্তার করেছে। সুতরাং, জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশুনা করার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান (জনকল্যাণ বিভাগ) থাকবে, যার দায়িত্বভার একজন যোগ্য পরিচালকের হাতে ন্যস্ত করা হবে, এবং এমন উপায় উপকরণ ও পদ্ধতিতে তা পরিচালনা করা হবে যা রাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকদের জীবনকে সহজতর করে।
এ ব্যবস্থাটি বিভিন্ন প্রশাসন, বিভাগ ও পরিষদের দ্বারা গঠিত হবে। প্রশাসন হল রাষ্ট্রের যে কোন কর্মকান্ড সম্পর্কিত সার্বিক পরিচালনা, যেমন: নাগরিকত্ব, যাতায়াত, মুদ্রা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কর্মসংস্থান, রাস্তাঘাট এবং অন্যান্য বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কিত। এই প্রশাসন তার নিজস্ব কর্মকান্ড এবং এর অধীনস্থ বিভাগ ও পরিষদ সমূহের পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে। প্রতিটি বিভাগ আবার তার নিজস্ব কর্মকান্ড এবং এ বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন পরিষদের পরিচালনা করবে। পরিষদগুলো আবার তাদের নিজস্ব কর্মকান্ড এবং এর অধীনস্থ প্রতিটি শাখা ও বিভাগ পরিচালনা করবে।
বস্তুতঃ এই প্রশাসন, বিভাগ ও পরিষদ প্রতিষ্ঠা করার মূল লক্ষ্য হল রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করা এবং সেইসাথে, জনস্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়সমূহ দেখাশুনা করা।
এছাড়া, এইসব প্রশাসন, বিভাগ ও পরিষদগুলোর সুষ্ঠ পরিচালনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অবশ্যই এদের জন্য পরিচালক নিযুক্ত করতে হবে। প্রতিটি প্রশাসনে একজন মহাব্যবস্থাপক নিয়োগ করা হবে, যিনি সরাসরি এর দায়িত্বে থাকবেন এবং এর অধীনস্থ সকল বিভাগ ও পরিষদের কর্মকান্ড তদারকী করবেন। আবার, প্রত্যেক বিভাগ ও পরিষদে একজন পরিচালক নিয়োগ করা হবে, যিনি সরাসরি এর দায়িত্বে থাকবেন এবং সংশ্লিষ্ট সকল শাখা ও বিভাগসমূহের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করবেন।
প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রশাসন পরিচালনার একটি বিশেষ পদ্ধতি, এটি শাসনকার্য সম্পর্কিত নয়
প্রশাসনিক ব্যবস্থা হল কোন কাজ সম্পাদনের পন্থা (style) এবং মাধ্যম (means)। সুতরাং, এর জন্য সুনির্দিষ্ট কোন শারী’আহ্ দলিলের প্রয়োজন নেই। এজন্য, প্রশাসনের উৎস বা মূলকে নির্দেশ করে এমন সাধারণ দলিল-প্রমাণই যথেষ্ট। সুতরাং, এটা বলা ভুল হবে যে, এই পন্থা বা মাধ্যমগুলো মানুষের কাজ, যার প্রতিটির জন্য শারী’আহ্ দলিলের প্রয়োজন। কারণ, এই বিষয় সম্পর্কিত কর্মকান্ডগুলোর মূল সাধারণ দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত। সুতরাং, এই মূল থেকে উৎসারিত সকল শাখাপ্রশাখা এর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত, যতক্ষণ পর্যন্ত না এর শাখাপ্রশাখার ব্যাপারে কোন সুনির্দিষ্ট দলিল থাকে। সেক্ষেত্রে, এ নির্দিষ্ট বিষয়ে শারী’আহ্ দলিলের অনুসরণ করতে হবে। যেমন: আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
‘এবং তোমরা যাকাত আদায় কর।’
[সূরা মুয্যাম্মিল: ২০]যা মূলতঃ যাকাতের ব্যাপারে একটি সাধারণ দলিল। এরপর, এ কাজের শাখাপ্রশাখার ব্যাপারেও দলিল এসেছে। যেমন: নিসাবের পরিমাণ, যাকাত সংগ্রহকারী ব্যক্তিদের বিষয়ে এবং কোন ধরনের মানুষের কাছ থেকে যাকাত আদায় করা হবে ইত্যাদি। এই সমস্ত কর্মকান্ডই ‘তোমরা যাকাত আদায় কর’ এ আয়াত থেকে উৎসারিত হয়েছে।
কিন্তু, যাকাত সংগ্রহকারী ব্যক্তিবর্গ কোন উপায়ে যাকাত সংগ্রহ করবেন এ ব্যাপারে কোন দলিল পাওয়া যায়নি। যেমন: তারা কি পায়ে হেঁটে সংগ্রহ করবে, না কোন বাহনে চড়ে করবে? তারা কি এ কাজে তাদের সাহায্য করার জন্য কোন কর্মচারী নিযুক্ত করবে? তারা কি কোন রেকর্ড অনুযায়ী তা সংগ্রহ করবে? তারা কি এ কাজের জন্য কোন কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত করবে, যেখানে তারা সকলে একত্রিত হবে? তারা কি কোন গুদামঘর তৈরি করবে যেখানে তারা তাদের সংগৃহীত মালামাল জমা করবে? এ স্থাপনাসমূহ কি মাটির নীচে হবে, নাকি শস্য রাখবার ঘরের মতই হবে? নগদ যাকাত কি ব্যাগে নাকি তহবিলে জমা দিতে হবে? বস্তুতঃ এ সমস্ত কাজ ‘এবং তোমরা যাকাত আদায় কর’ এই আয়াত থেকে উৎসারিত এবং এ আয়াতের নির্দেশাধীন কাজ।
সুতরাং, এ সকল কাজই যাকাত আদায়ের সাধারণ দলিল-প্রমাণের আওতাধীন। কারণ, এ সকল কাজের জন্য কোন সুনির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া, এ কাজগুলো আসলে উপায় বা পন্থার সাথে সম্পর্কিত। সুতরাং, কোন কাজ করার উপায় বা পন্থা হচ্ছে সে কাজের অধীনস্থ একটি বিষয়। এ কারণেই কোন কাজের উপায় বা পন্থা নির্ধারণের জন্য কোন নির্দিষ্ট দলিল-প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। কারণ, মূল কাজটির ক্ষেত্রে প্রাপ্ত দলিলই এ বিষয়ের দলিল হিসাবে যথেষ্ট হয়।
সুতরাং, প্রশাসনিক পন্থা বা মাধ্যম যে কোন ব্যবস্থা থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে, যদি না কোন সুনির্দিষ্ট শারী’আহ্ দলিলের দ্বারা ঐ বিশেষ পন্থা বা মাধ্যম গ্রহণ করা নিষিদ্ধ বলে প্রমাণিত হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি ছাড়া, প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে পরিচালনা এবং জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশুনা করার জন্য যে কোন পন্থা বা উপায়ে প্রশাসন পরিচালনা করা যায়। এর কারণ হল, প্রশাসন পরিচালনার পন্থা বা উপায় কোন শারী’আহ্ বিধান নয় যার জন্য শারী’আহ্ দলিল প্রয়োজন। এ কারণে, উমর (রা) তাঁর সেনাসদস্য ও নাগরিকদের নামের তালিকা করার প্রয়োজনে দিওয়ান নিযুক্ত করেছিলেন যেন রাষ্ট্রীয় বা গণমালিকানাধীন সম্পদভূক্ত অর্থ থেকে তাদের জন্য বরাদ্দকৃত মজুরী বা বেতনভাতা সুষ্ঠভাবে বিতরণ করা যায়।
আল হারিস ইবনু নুফায়েলের বরাত দিয়ে ’আবিদ ইবনে ইয়াহিয়া বর্ণনা করেছেন যে, উমর মুসলিমদের সাথে দিওয়ান এর তালিকার ব্যাপারে পরামর্শ করেন। তখন আলী (রা) তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, ‘প্রতি বছরের সংগৃহীত সম্পদ না রেখে সবই আপনি বন্টন করে দিন।’ উসমান ইবনে আফফান বলেন, ‘আমি দেখছি যে বড় আকারের সম্পদ জনগণের মাঝে বন্টিত হয়। যারা পেল আর যারা পেল না এদের কোন তালিকা না করা হলে আমার ভয় হয় পরিস্থিতি আওতার বাইরে চলে যাবে।’ এ বিষয়ে আল ওয়ালিদ ইবনু হিশাম ইবনে আল মুগীরা বলেন, ‘আমি আল-শামে ছিলাম এবং লক্ষ্য করেছি যে, সেখানকার বাদশাহ্গণ সৈন্য সংগ্রহের সময় দিওয়ান ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল। সুতরাং, আপনি এটার প্রচলন করছেন না কেন?’ তখন উমর তাঁর উপদেশ গ্রহণ করেন এবং কুরাইশ যুবক আকীল ইবনে আবি তালিব, মাখরামা ইবনে নুফায়েল এবং যুবায়ের ইবনে মাতাম’কে ডেকে পাঠান এবং নির্দেশ দেন যে, ‘প্রত্যেক বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে জনসংখ্যার তালিকা প্রস্তুত কর।’
যখন ইসলাম ইরাকে পৌঁছাল, তখন তহবিল সংগ্রহ ও বেতনভাতা পরিশোধের জন্য দিওয়ান পূর্বের মতই অব্যাহত থাকে। আল-শামের দিওয়ান ছিল ল্যাটিন ভাষায়, কারণ এটি রোমান সাম্রাজ্যের অংশ ছিল; আর, বাগদাদের দিওয়ান ছিল ফারসী ভাষায়, কারণ এটি পারস্য সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। খলীফা আব্দুল মালিক ইবন মারওয়ানের সময় আল-শামের দিওয়ান আরবী ভাষায় রূপান্তর করা হয় (৮১ হিজরীতে)। জনগণের স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে প্রয়োজন অনুসারে বেশকিছু দিওয়ান চালু করা হয়। সেনাসদস্যদের অর্ন্তভূক্তি ও বরাদ্দকৃত মজ্ঞুরীর প্রয়োজনে সেনাবাহিনীতে দিওয়ানের প্রচলন করা হয় এবং বিভিন্ন ধরনের ফি ও লেনদেনের দাবি দাওয়ার তালিকা সংরক্ষরণের আরও কিছু দিওয়ানের প্রচলন করা হয়। আরেকটি দিওয়ানের সূচনা করা হয় প্রত্যেক ওয়ালী ও আমীলের নিয়োগ ও পদচ্যুতির তালিকা সংরক্ষণের জন্য। বাইতুল মালের আয় ও ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণের জন্যও দিওয়ানের প্রচলন হয়। দিওয়ানের প্রচলণ হয়েছিল প্রয়োজনের তাগিদে এবং সময়ের আবর্তে এর পন্থায় অনেক পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয়েছে। কারণ, এগুলো হল পন্থা বা মাধ্যম, যা প্রয়োজনের তাগিদে এবং সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন করা অনুমোদিত।
প্রতিটি দিওয়ানে অন্যান্য কর্মচারীসহ একজন প্রধান নিয়োগ করা হত। কখনো কখনো দিওয়ানের প্রধানকে তার অধীনস্থ কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা হত; আবার, কখনো বা তার জন্য তা নিয়োগ করে দেয়া হত।
এভাবে, প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনানুসারে এবং যে পন্থা বা উপায় উক্ত কাজকে সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতে সহায়তা করবে, সে অনুযায়ী দিওয়ান প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে; এবং এক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকা, বা উলাই’য়াহ্ ভেদে বিভিন্ন রকম পন্থা ও উপায় অনুসরণ করা অনুমোদিত।
সরকারী কর্মচারীদের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা যায় যে, একদিকে তারা রাষ্ট্রের বেতনভূক্ত কর্মচারী এবং অন্যদিকে, একইসাথে তারা রাষ্ট্রের নাগরিক। সুতরাং, পেশাগত দিক থেকে তারা তাদের নিজ নিজ বিভাগ বা পরিষদের ব্যবস্থাপকদের কাছে জবাবদিহিতা করতে বাধ্য; আবার, নাগরিক হিসাবে তারা শাসকের কাছে, অর্থাৎ, খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ বা ওয়ালীদের কাছেও জবাবদিহিতার ব্যাপারে দায়বদ্ধ। এজন্য তাদের শারী’আহ্ বিধিবিধান এবং প্রশাসনিক নিয়মনীতি সবই মেনে চলতে হবে।
প্রশাসনিক নীতি
প্রশাসনিক নীতির ভিত্তি হল ব্যবস্থার সহজীকরণ, কাজের গতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসকদেও যোগ্যতা নিশ্চিত করা। জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই এ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। কারণ, যদি কোন ব্যক্তির কর্মসংস্থান বা চাকুরীর প্রয়োজন হয়, তবে তার এ প্রয়োজন যথাসম্ভব দ্রুততার সাথে ও দক্ষ প্রক্রিয়ায় পূরণ করতে হবে। আল্লাহ্’র রাসূল (সা) বলেছেন:
‘অবশ্যই আল্লাহ্ সবকিছু নিখুঁতভাবে সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছেন; যখন তুমি হত্যা কর, তখন তা সুন্দরভাবে কর এবং যখন জবাই কর তখনও তা সুন্দরভাবে কর।’
(এ হাদীসটি সাদ্দাদ বিন আওসের সূত্রে সহীহ্ মুসলিম বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং-১৯৫৫)সুতরাং, নিখুঁত, পূর্ণাঙ্গ বা সঠিকভাবে কার্যসম্পাদন করা শারী’আহ্ কর্তৃক নির্দেশিত। আর, এ যোগ্যতা অর্জন করতে হলে প্রশাসনকে তিনটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে:
প্রথমত: প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সহজ-সরল করতে হবে, যেন তা যে কোন প্রক্রিয়াকে দ্রুতগতিসম্পন্ন করে মানুষের জীবনযাত্রাকে সহজতর করে; বিপরীতক্রমে, প্রশাসনিক জটিলতা মানুষের জীবনকে দূর্বিসহ করে।
দ্বিতীয়ত: লেনদেনের প্রক্রিয়াকে দ্রুতগতিসম্পন্ন করতে হবে, যেন তা জনগণকে অহেতুক বিলম্বজনিত হয়রানি থেকে রক্ষা করে।
তৃতীয়ত: কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে; কারণ, তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার উপরই নির্ভর করবে কাজের পূর্ণাঙ্গতা ও ফলাফল।
রাষ্ট্রীয় বিভাগে কাজের যোগ্যতা
যে কোন ব্যক্তি, যারা রাষ্ট্রের নাগরিক ও যোগ্য, হোক সে নারী কিংবা পুরুষ, মুসলিম কিংবা অমুসলিম, প্রশাসনের যে কোন বিভাগের পরিচালক বা কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত হতে পারে।
এ নীতিটি ইজারা বা অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে, যেখানে নারী বা পুরুষ, মুসলিম বা অমুসলিম যে কাউকে অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা অনুমোদিত। এর কারণ হল ইজারা’র জন্য প্রাপ্ত দলিলপ্রমাণ সার্বজনীন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্যদান করে, তবে তাদেরকে প্রাপ্য পারিশ্রমিক দেবে’
[সূরা ত্বালাক: ৬]এটি হল সার্বজনীন দলিল।
আবু হুরাইরা থেকে বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“আল্লাহ্ বলেছেন, ‘আমি হাশরের ময়দানে তিন ধরনের ব্যক্তিকে কঠিন জবাবদিহিতার মুখোমুখি করব… এবং সে ব্যক্তি যে কাউকে কাজে নিয়োগ দিল, তার কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিল কিন্তু, তাকে পারিশ্রমিক দিল না।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২২৭)এই দলিলটিও সার্বজনীন। এছাড়া, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) স্বয়ং বনু আল-দীল গোত্রের এক অমুসলিম ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের বেতনভূক্ত কর্মচারী হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন, যা প্রমাণ করে যে, মুসলিম নাগরিকের মতো রাষ্ট্রের একজন অমুসলিম নাগরিককেও প্রশাসনে নিযুক্ত করা অনুমোদিত। এছাড়া, এ বিষয়ে দলিলের সার্বজনীনতা প্রমাণ করে যে, পুরুষের মতো একজন নারীকেও এ সমস্ত কাজের জন্য নিয়োগ করা অনুমোদিত। সুতরাং, নারীকে সরকারী কোন বিভাগের পরিচালক বা কর্মচারী যে কোন পদে নিয়োগ দেয়া যেমন অনুমোদিত; তেমনিভাবে, একজন অমুসলিম নাগরিককেও পরিচালক বা কর্মচারী যে কোন পদে নিযুক্ত করা অনুমোদিত। কারণ, এরা সকলেই রাষ্ট্রের বেতনভূক্ত কর্মচারী (শাসক নন) এবং কর্মচারী নিযুক্ত করার সাধারণ দলিল-প্রমাণই এক্ষেত্রে যথেষ্ট।
বিচার বিভাগ

আদালতের রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে রায় প্রদান করা বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। এ বিভাগ জনগণের মধ্যকার বিবাদের মীমাংসা করে, জনস্বার্থ ক্ষুন্ন হতে পারে বা জনস্বার্থের জন্য হুমকীস্বরূপ বিষয়সমূহ প্রতিহত করে এবং জনগণ ও শাসনব্যবস্থার সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করে, এসব ব্যক্তিবর্গ হতে পারেন শাসক, সরকারী কর্মকর্তা, খলীফা বা অন্য কোন ব্যক্তি।
ইসলামী বিচারব্যবস্থার উৎস ও এর বৈধতার দলিল হল আল্লাহ্’র কিতাব ও রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আর আপনি তাদের পারষ্পরিক বিষয়সমূহে আল্লাহ্ যা নাযিল করেছেন তদানুযায়ী ফয়সালা করুন।’
[সূরা মায়েদা: ৪৯]তিনি (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) আরও বলেন,
‘তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্য যখন তাদেরকে আল্লাহ্ ও রাসূলের দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তাদের মধ্য হতে কোন কোন দল মুখ ফিরিয়ে নেয়।’
[সূরা নূর: ৪৮]সুন্নাহ্’র ক্ষেত্রে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে বিচারব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন এবং তিনি (সা) স্বয়ং লোকদের মধ্যে বিচার-ফায়সালা করতেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে বিচারকদের নিয়োগ দিতেন। তিনি (সা) আলীকে ইয়েমেনের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন এবং বিচারকার্য পরিচালনার জন্য এভাবে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে,
‘যদি দুইজন ব্যক্তি তোমার কাছে বিচারের জন্য আসে তাহলে ততক্ষণ পর্যন্ত একজনের পক্ষে রায় দিও না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি অপরজনের কথা শুনো; আর, এভাবেই তুমি লোকদের মধ্যে ফায়সালা করতে পারবে।’
(সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-১৩৩১ এবং মুসনাদে আহমাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৫)আহমেদ এর অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে:
‘যদি দু’জন বিবাদমান ব্যক্তি তোমার সামনে বসে তবে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কথা বলো না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি অন্যজনের কথা শোন, যেভাবে তুমি প্রথমজনের কথা শুনেছো।’
(মুসনাদে আহমাদ, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৫)এছাড়া, তিনি (সা) মুয়াজকে আল-জানাদের বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেন। উল্লেখিত এ প্রতিটি ঘটনা বিচারব্যবস্থার বৈধতাকে প্রমাণ করে।
বিচারব্যবস্থার সংজ্ঞার মধ্যে জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করা অন্তর্ভূক্ত। এছাড়া, এর মধ্যে হিসবাহ্ (জনগণের অধিকার) ও অন্তর্ভূক্ত, যার অর্থ হল: “বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জনগণকে শারী’আহ্ বিধিবিধান সম্পর্কে অবহিত করা, যে বিধিবিধান লঙ্ঘনের ফলে জনস্বার্থ ক্ষুন্ন বা জনগণের অধিকার বিনষ্ট হয়।” এই বিষয়টি খাদ্যের স্তুপ সম্পর্কিত হাদীসে স্পষ্টভাবে নির্দেশিত আছে। আবু হুরাইরার বরাত দিয়ে সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত আছে যে,
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) একবার খাবারের একটি স্তুপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি স্তুপের ভেতর তার আঙ্গুল প্রবেশ করানোর পর আর্দ্রতা অনুভব করলেন এবং তখন বিক্রেতাকে বললেন, ’এটা কি?’ তখন উক্ত বিক্রেতা তাকে বললেন, ‘হে ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা), এগুলো বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।’ তখন তিনি (সা) বললেন, ‘তুমি এগুলোকে উপরে রাখছ না কেন যাতে লোকেরা দেখতে পায়? যে প্রতারণা করে সে আমাদের কেউ নয়।’
(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১০২)এছাড়া, বিভাগের মধ্যে মাযালিম (অন্যায় আচরণ) ও অন্তর্ভূক্ত। কারণ, মাযালিম বিচারকার্যের অংশ, শাসনকার্যের নয়। প্রকৃত অর্থে, মাযালিম বলতে শাসকের বিরুদ্ধে কৃত অভিযোগকে বোঝায়। মাযালিমকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে: “সাধারণ জনগণ এবং খলীফা কিংবা, তার কোন ওয়ালী বা কর্মকর্তার মধ্যকার বিবাদ নিরসনের জন্য বাস্তবায়নের নিমিত্তে শারী’আহ্ রায় প্রদান করা; কিংবা, জনগণকে শাসন করার নিমিত্তে ব্যবহৃত কোন শারী’আহ্ দলিলের ব্যাখ্যার ব্যাপারে জনগণ ও শাসকের মধ্যে কোন প্রকার মতপার্থক্যের সৃষ্টি হলে সে বিষয়টি নিরসন করা।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মূল্য নির্ধারণ সম্পর্কিত হাদীসে মাযালিম -এর ব্যাপারটি উল্লেখিত আছে, যেখানে তিনি (সা) বলেছেন:
‘এবং আমি অবশ্যই আশা করি যে, আমি আল্লাহ্ ওয়া জাল্লার সামনে এমনভাবে হাজির হব যাতে কেউ আমার বিরুদ্ধে মাযালিমা’র (অন্যায় আচরণের) অভিযোগ না করতে পারে, সেটা রক্ত সম্পর্কিত হোক বা অর্থ সম্পর্কিতই হোক।’
(আনাসের বরাত দিয়ে আহমাদ এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন; দেখুন: আল হাইছামী, মাজমা’ আল-জাওয়ায়িদ, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ১০২)এ হাদীসটি আমাদের দিকনির্দেশনা দেয় যে, শাসক, ওয়ালী অথবা জনপ্রশাসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে মাযালিমের বিচারকদের নিকট পেশ করতে হবে এবং তিনি প্রয়োগের নিমিত্তে এ ব্যাপারে শারী’আহ্ বিধিবিধান অনুযায়ী রায় প্রদান করবেন।
সুতরাং, রাসূল (সা) এর হাদীস ও কর্মকান্ড থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বিচারব্যবস্থার সংজ্ঞার মধ্যে তিনটি বিষয় অন্তর্ভূক্ত এবং এগুলো হল: জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করা, জনগণের অধিকার ক্ষুন্ন হতে পারে এমন কর্মকান্ড প্রতিরোধ করা এবং জনগণ ও শাসকের মধ্যকার বিরোধ অথবা জনপ্রশাসক ও জনগণের মধ্যকার বিরোধের মীমাংসা করা। বিচারকদের প্রকারভেদ
ইসলামী বিচারব্যবস্থায় তিন ধরনের বিচারক রয়েছে
১. কাজী আল-খুশুমাত: যিনি হুদুদ (শাস্তি সম্পর্কিত) এবং লেনদেন বিষয়ে জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করবেন।
২. কাজী আল-মুহতাসিব: যিনি কোন আইন লঙ্ঘনের কারণে যদি জনস্বার্থ ক্ষুন্ন বা জনসম্পদ বিনষ্ট হয় তাহলে সে বিষয়ে বিচার করবেন।
৩. কাজী আল- মাযালিম: যিনি রাষ্ট্র এবং জনগণের মধ্যকার বিবাদের নিষ্পত্তি করবেন।
কাজী আল-খুশুমাত (যিনি জনগণের মধ্যকার বিবাদ নিরসন করবেন) এর ব্যাপারে দলিল হল রাসূল (সা)এর কর্মকান্ড এবং রাসূল (সা) কর্তৃক বিভিন্ন অঞ্চলে বিচারক নিযুক্তকরণ। যেমন: তিনি মুয়াজ ইবন জাবালকে ইয়েমেনের একটি অঞ্চলের বিচারক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
কাজী আল-মুহতাসিব (যিনি জনস্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়া সংক্রান্ত ব্যাপারে বিচার করবেন) এর ব্যাপারে দলিল হল রাসূল (সা) এর কাজ এবং উক্তি যেখানে তিনি বলেছেন: “যে প্রতারণা করে সে আমাদের কেউ নয়।” [এটি আবু হুরাইরার বরাত দিয়ে আহমাদ বর্ণিত একটি হাদীসের অংশ]; এ হাদীস থেকে এটি প্রমাণিত হয় যে, রাসূল (সা) প্রতারকদের জবাবদিহিতার সম্মুখীন করতেন এবং তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করতেন।
এছাড়া, তিনি (সা) ব্যবসায়ীদের ব্যবসাকালে সত্য কথা বলার এবং সাদাকা প্রদানের নির্দেশ দিতেন। কায়েস ইবনে আবি ঘারজা আল কিনানীর সূত্রে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে, আবি ঘারজা বলেছেন: “আমরা মদিনাতে সাধারণত মালামাল ভর্তি কার্গো ক্রয় করতাম এবং নিজেদের ফরিয়া বলে পরিচয় দিতাম। রাসূল (সা) আমাদের কাছে এলেন এবং আমাদের উত্তম নামে অভিহিত করলেন এবং বললেন,
‘হে ব্যবসায়ীগণ, অবশ্যই ব্যবসার সাথে শপথ গ্রহণ ও কথাবলার বিষয়গুলো জড়িত। সুতরাং, তোমরা এর সাথে সাদাকাকে সম্পর্কিত করে নাও।’
এছাড়া, আবু আল মিনহাল থেকে আহমাদ বর্ণনা করেছেন যে:
‘জায়েদ ইবনে আরকাম ও আল বারা ইবনু ’আযিব ব্যবসায়িক অংশীদার ছিল। তারা কিছু রৌপ্য নগদ অর্থে এবং কিছু বাকীতে খরিদ করল। এ খবর যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিকট পৌঁছালো তখন তিনি নির্দেশ দিলেন যে, ‘যেখানে নগদ পরিশোধ করা হয়েছে সেখানে কোন ক্ষতি নেই; কিন্তু, যা বাকীতে বিক্রয় করা হয়েছে তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।’ এভাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে ঋণের সাথে যুক্ত সুদ থেকে রক্ষা করলেন।
এ সবই কাজী হিসবাহ্’র বিচারকার্যের এখতিয়ারভূক্ত বিষয়। জনস্বার্থের জন্য হুমকীস্বরূপ বিষয়সমূহ মীমাংসা করার জন্য বিচারব্যবস্থার হিসবাহ্ নামক এ বিভাগটি আসলে একটি বিশেষ অর্থবোধক শব্দ যা দ্বারা ইসলামী রাষ্ট্রে সম্পাদিত একটি বিশেষ কাজকে বোঝানো হয়ে থাকে; যেমন: ব্যবসায়ী ও দক্ষ শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করা যেন তারা তাদের ব্যবসা, তাদের শ্রম, উৎপাদিত পণ্যের মাধ্যমে কিংবা পণ্যদ্রব্য ওজন ও পরিমাপের সময় কিংবা অন্যকোন পদ্ধতিতে জনগণকে প্রতারিত করতে না পারে, যা কিনা জনস্বার্থকে ক্ষুন্ন করতে পারে। বস্তুতঃ এটা হচ্ছে সেই কাজ যা রাসূল (সা) নিজে করে দেখিয়েছেন, এ বিষয়ে তদারকি করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে সরাসরি রায় প্রদান করেছেন; যা কিনা আল-বারা ইবনে আযিব বর্ণিত হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে, যেখানে তিনি (সা) উভয়পক্ষকে সুদভিত্তিক ঋণে ক্রয়বিক্রয় থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
এছাড়া, মক্কা বিজয়ের পর আল্লাহ্’র রাসূল (সা) সা’ইদ ইবনুল আসকে মক্কার বাজারের মুহতাসিব হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন, যা ইবন সা’দ এর তাবাকাত ও ইবন ’আবদ আল-বার এর আল-ইসতিয়াব গ্রন্থে উল্লেখিত আছে। সুতরাং, হিসবাহ্’র দলিল হল রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্। এছাড়া, উমর (রা) তাঁর নিজ গোত্রের উম্ম সুলাইমান ইবন আবি হিশমা উরফে আশ-শিফা নামের এক মহিলাকে বাজার পর্যবেক্ষক (ইন্সপেক্টর) হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন; এবং তিনি আবদুল্লাহ্ ইবন উতবাহ’কে মদিনার বাজারের বিচারক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা ইমাম মালিক তাঁর আল-মুয়াত্তা এবং ইমাম শাফী’ তাঁর মুসনাদে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া, তিনি নিজেও মুহাম্মদ (সা) এর মতো বাজারে টহল দিতেন এবং হিসবাহ সম্পর্কিত বিষয়াদি তদারকি করতেন। খলীফাগণ এভাবেই নিজেরা হিসবাহ্ সম্পর্কিত বিষয়াদি তদারকী করতে থাকেন যে পর্যন্ত না আল-মাহদী তার শাসনামলে হিসবাহ্’কে বিচারব্যবস্থার একটি বিশেষ বিভাগে পরিণত করেন। খলীফা হারুনুর রশীদের সময় মুহতাসিবগণ (হিসবাহ’র বিচারক) বাজারে ঘুরে ঘুরে টহল দিতেন, ওজন ও পরিমাপের বিষয়সমূহ তদারকি করতেন এবং সকল প্রকার লেনদেন পর্যবেক্ষণ করতেন।
আর, কাজী আল-মাযালিমের দলিল পাওয়া যায় পবিত্র কুর’আন থেকে যেখানে আল্লাহ্ তা’আলা বলেন,
‘যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পর, তাহলে তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।’
[সূরা নিসা : ৫৯]এর ঠিক আগে আল্লাহ্ বলেন,
‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহ্’র নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রাসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা কর্তৃত্বশীল তাদের।’
[সূরা নিসা: ৫৯]সুতরাং, সাধারণ জনগণ ও কর্তৃত্বশীলদের মধ্যকার যে কোন বিরোধ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল (সা) এর দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে অর্থাৎ, আল্লাহ্’র হুকুমের নিকট পেশ করতে হবে। মূলতঃ এ ব্যাপারটিই একজন বিচারকের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে যিনি এ ধরনের বিবাদের ব্যাপারে আল্লাহ্’র হুকুম অনুযায়ী রায় প্রদান করবেন; আর এ বিচারকই হচ্ছেন মাযালিমের বিচারক। এছাড়া, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এর কাজ ও উক্তি থেকেও এ বিষয়ে দলিল পাওয়া যায়। তবে, রাসূল (সা) সমগ্র রাষ্ট্রের উপর বিশেষ কাউকে মাযালিমের বিচারক হিসাবে নিয়োগ করেননি; কিংবা তাঁর পরবর্তী সময়ে খোলাফায়ে রাশেদীনগণও তা করেননি। বরং, তাঁরা নিজেরাই এ দায়িত্ব পালন করেছেন; যেমনটি হয়েছিল ’আলী ইবন আবি তালেবের (রা) সময়। কিন্তু, তিনি মাযালিমের জন্য কোন নির্দিষ্ট সময় বা বিশেষ কোন পদ্ধতি নির্ধারণ করেননি; তিনি এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই সেটি ফয়সালা করতেন। সুতরাং, এটা আসলে তিনি তার সাধারণ দায়িত্বকর্তব্যের অংশ হিসাবেই করতেন। খলীফা আব্দুল মালিক ইবন মারওয়ানের শাসনামলের পূর্ব পর্যন্ত ব্যাপারটি এভাবেই চলতে থাকে। বস্তুতঃ তিনিই হচ্ছেন প্রথম খলীফা যিনি মাযালিমের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করেন। যখনই মাযালিম সম্পর্কিত কোন বিষয় তার কাছে অস্পষ্ট মনে হত তিনি তখন তার বিচারককে এ বিষয়টি ফয়সালার দায়িত্ব দিতেন। এর পরবর্তী সময় থেকে খলীফাগণ জনগণের অভিযোগ সম্পর্কিত বিষয় দেখাশুনার জন্য সহকারী নিয়োগ করতেন। তখন থেকেই মাযালিমের জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থার জন্ম হয়, যা কিনা ‘সুবিচারের গৃহ’ বা দার-উল-আদল নামে পরিচিতি লাভ করে। মাযালিমের বিচারক নিয়োগ করা এজন্য অনুমোদিত যে, খলীফা তার নির্বাহী ক্ষমতা বলে তার পক্ষ থেকে যে কাউকে তার সহকারী হিসাবে নিযুক্ত করতে পারেন। সুতরাং, এ কাজ সম্পাদনের জন্য তিনি একজন বিচারকও নিয়োগ করতে পারেন। এছাড়া, মাযালিমের জন্য কোন বিশেষ সময় বা পদ্ধতি নির্ধারণ করাও অনুমোদিত, কারণ এসবই মুবাহ্ (অনুমোদিত) কাজের অন্তর্ভূক্ত।
বিচারকের যোগ্যতার শর্তাবলী
যিনি বিচারকের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তাকে অবশ্যই মুসলিম, স্বাধীন, পূর্ণবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, ন্যায় বিচারক, ফকীহ্ (বিজ্ঞ আলেম) এবং বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে শারী’আহ্ আইন প্রয়োগের ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। এছাড়া, যিনি মাযালিমের বিচারকের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন তাকে উপরোক্ত শর্তাবলী পূরণ করা ছাড়াও অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসাবে পুরুষ ও মুজতাহিদ হতে হবে, যা কিনা প্রধান বিচারপতির (কাজী আল কুদাহ্) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কারণ, মাযালিমের বিচারকের কাজে বিচার ও শাসন এদু’টি বিষয়ই জড়িত ও এক্ষেত্রে শাসকের উপর শারী’আহ্ আইন বাস্তবায়ন করা হয়। সুতরাং, বিচারকের অন্যান্য পদের ব্যতিক্রম হিসেবে অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসাবে মাযালিমের বিচারককে পুরুষ হতে হবে। এছাড়া, শাসকগণ আল্লাহ্’র আইন ছাড়া অন্যকোন কিছু দিয়ে শাসন করছেন কিনা, অর্থাৎ, তারা এমন কোন আইন প্রয়োগ করছেন কিনা যার কোন শারী’আহ্ দলিল নেই, সে বিষয়গুলোকে প্রতিহত করতে, কিংবা, তারা এমন কোন দলিল ব্যবহার করছেন কিনা যা ঘটনার সাথে সম্পর্কিত নয় তা বোঝার জন্য তাকে মুজতাহিদও হতে হবে। কারণ, একমাত্র একজন মুজতাহিদই মাযালিমা সম্পর্কিত এ জটিল বিষয়সমূহ বুঝতে পারেন। আর, তিনি যদি মুজতাহিদ না হন তবে এমন হতে পারে যে, তিনি এমন সব বিষয়ে বিচার করতে পারেন যে বিষয়ে তার কোন জ্ঞান নেই, যা কিনা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। একারণে, শাসক বা অন্যান্য বিচারক পদের যোগ্যতার শর্তের ব্যতিক্রম হিসাবে মাযালিমের বিচারককে মুজতাহিদ হতে হবে।
বিচারক নিয়োগ
কাজী-উল খুশুমাত, মুহতাসিব এবং মাযালিমের বিচারকগণকে সমগ্র রাষ্ট্রব্যাপী সব বিষয়ে সাধারণ ক্ষমতা দিয়ে নিয়োগ করা অনুমোদিত। আবার, তাদের ভৌগলিক অঞ্চল ভেদে কোন বিশেষ এলাকায় কিংবা, কোন বিশেষ বিষয়ের দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ দেয়াও অনুমোদিত। রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্’তে এ ব্যাপারে দলিল রয়েছে; যেমন: তিনি (সা) আলী ইবনে আবি তালিবকে সমগ্র ইয়েমেনের উপর, মু’য়াজ ইবনে জাবালকে ইয়েমেনের কিছু অঞ্চলের উপর এবং আমর ইবনে আল আসকে একটি বিশেষ বিষয়ে বিচারক হিসাবে নিয়োগ করেছিলেন।
বিচারকদের সম্মানী বা বেতন ভাতা
আল হাফিয তার আল-ফাতেহ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে: সম্মানী বা বেতন ভাতা হচ্ছে সেটাই যা মুসলিমদের স্বার্থ রক্ষার কাজে নিয়োজিত কোন ব্যক্তিকে ইমাম বাইতুল মাল থেকে প্রদান করেন। বিচারকার্য সম্পাদন করা রাষ্ট্রের এমন একটি কাজ যার জন্য অবশ্যই বাইতুল মাল থেকে সম্মানী গ্রহণ করা বৈধ। কারণ, এটি জনস্বার্থ রক্ষার্থে রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত কাজ। বস্তুতঃ কাউকে যদি মুসলিমদের স্বার্থরক্ষার্থে শারী’আহ্ আইন অনুযায়ী কোন কাজ সম্পাদন করার জন্য নিযুক্ত করা হয়, তা ইবাদত সংক্রান্ত হোক বা অন্য কোন বিষয় হোক, তাহলেই সে সম্মানী পাবার উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। এর পক্ষে দলিল হল আল্লাহ্’র আয়াত; কারণ, আল্লাহ্ তা’আলা সাদাকাহ্ সংগ্রহকারীদের জন্য সাদাকার (যাকাতের) একটি অংশ নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন:
‘এবং যারা তা সংগ্রহ করে।’
[সূরা তাওবা: ৬০]আবু দাউদের শুনান গ্রন্থে এবং ইবনে খুজায়মা’র সহীহ্ হাদীস গ্রন্থে বুরাইদা থেকে বর্ণিত একটি হাদীস রয়েছে – যাকে আল বায়হাকী ও আল হাকীম বুখারী ও মুসলিমের সহীহ্ হাদীসের শর্ত পূরণ করেছে বলে মতামত দিয়েছেন এবং আল জাহাবীও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন। উক্ত হাদীসে রাসূল (সা) বলেছেন যে:
‘আমরা যদি কোন কর্মচারীকে নিয়োগ দেই ও তার জন্য সম্মানী ভাতা নির্ধারণ করে দেই, তারপরও যদি কেউ এর অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করে তবে তা অবশ্যই প্রতারণা (ঘূলুল)।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৯৪৩)আল মাওয়ারদী তার আল-হাওয়ী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, ‘বিচারকগণ বাইতুল মাল থেকে ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন। কেননা আল্লাহ্ সাদাকার মধ্যে সাদাকা সংগ্রহকারীদের জন্য একটি অংশ নির্ধারণ করেছেন। এছাড়া, উমর (রা) সুরাই’কে নিয়োগ করেছিলেন এবং তার জন্য মাসিক একশত দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। আলীর (রা) খিলাফতের সময় তিনি সুরাই এর জন্য মাসিক পাঁচশত দিরহাম নির্ধারণ করেন; এছাড়া জায়েদ ইবনে সাবিতও (রা) বিচারকার্যের জন্য অর্থ গ্রহণ করতেন।’ আল বুখারী এ বক্তব্যের ব্যাপারে বলেছেন যে, ‘সুরাই বিচারকার্যের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করতেন।’
এছাড়া, আল-হাফিয এ মন্তব্যের ব্যাপারে বলেন যে, ‘সা’ইদ ইবন মানসুর সুরাই এর অর্থ গ্রহণের বিষয়ে সুফিয়ান হতে, সুফিয়ান মুজাহিদ হতে, আবার মুজাহিদ আশ-শা’বী থেকে আমাদের জানান যে: ‘মাশরুক বিচারকার্যের জন্য অর্থ গ্রহণ করতেন না; আর, সুরাই সম্মানী গ্রহণ করতেন।’ আল-হাফিয তার আল-ফাতিহ্ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে: ‘ইবন আল মুনদির বলেছেন যে, জায়িদ ইবন ছাবিত বিচারকার্যের জন্য সম্মানী গ্রহণ করতেন।’ নাফি’ থেকে ইবন সাদ বর্ণনা করেছেন যে: ‘উমর ইবনুল খাত্তাব যায়িদ ইবন ছাবিতকে বিচারক হিসাবে নিয়োগ দেন এবং তার জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেন।’ বিচারকার্যের জন্য সম্মানী গ্রহণ করা যে শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত এ ব্যাপারে সাহাবীদের (রা) ঐক্যমত এবং তার পরবর্তী প্রজন্মের (তাবেঈনদের) ঐক্যমত ছিল। আল-হাফিয তার আল-ফাতিহ্ গ্রন্থে বলেছেন যে: “আবু আলী আলকারাবিজি বলেছেন: বিচারকদের বিচারকার্যের জন্য সম্মানী গ্রহণ করার মধ্যে কোন দোষ নেই; এ বিষয়টিকে সাহাবী (রা) ও তাবেঈনগণ সহ ইসলামের সকল পন্ডিত একইভাবে দেখেছেন এবং বুঝেছেন। সেইসাথে, সকল প্রদেশের আইনবিদদের এ বিষয়ে একই মতামত এবং জানামতে তাদের মধ্যে এ বিষয়ে কোন মতদ্বৈততা নেই। মাশরুক এটিকে অপছন্দ করেছেন; কিন্তু, কেউই এটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেননি।” ইবন কুদামাহ্ তার আল-মুগনী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, “মুয়াজ ইবন জাবাল ও আবু উবাইদাহ’কে আল-শাম অঞ্চলে প্রেরণকালে উমর (রা) তাঁদের পত্র মারফত কিছু ভাল লোক খুঁজে বের করার এবং তাদেরকে বিচারকার্যে নিয়োগ করার নির্দেশ দেন। তিনি তাঁদের বলেন যে, “তাদের জন্য যথাসাধ্য কর, তাদের জন্য সম্পদ বরাদ্দ কর এবং আল্লাহ্’র সম্পদ দিয়ে তাদের সন্তুষ্ট কর।”
ট্রাইবুনাল গঠন
ইসলামী বিচারব্যবস্থায় একের বেশী বিচারকের সমন্বয়ে ট্রাইবুনাল (Bench) গঠন করা, যাদের বিচারের রায় প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে, তা অনুমোদিত নয়। তবে, শুধুমাত্র পরামর্শ করার খাতিরে কিংবা, মতামত ব্যক্ত করার জন্য একের অধিক বিচারকের উপস্থিতি অনুমোদিত; তবে, এক্ষেত্রে একজন বিচারক ছাড়া অন্য কারো রায় প্রদানের কোন ক্ষমতা থাকবে না বা উক্ত বিচারকের জন্য অন্যান্যদের মতামত বা পরামর্শ গ্রহণে কোনপ্রকার বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
কারণ, রাসূল (সা) কখনও একটি বিষয়ের জন্য দু’জন বিচারক নিযুক্ত করেননি; বরং, তিনি (সা) একটি বিষয়ের জন্য শুধুমাত্র একজন বিচারক নিয়োগ করেছেন। এছাড়া, বিচারব্যবস্থা হল প্রয়োগের নিমিত্তে কোন বিষয়ে শারী’আহ্ রায় প্রদান করা। আর, একজন মুসলিমের জন্য কোন বিশেষ বিষয়ে শারী’আহ্ বিধান একের অধিক হতে পারে না; কারণ, প্রদত্ত রায়টি তার জন্য আল্লাহ্’র বিধান এবং একটি বিষয়ে আল্লাহ্’র বিধান একটিই হবে। তবে এটা ঠিক যে, একটি শারী’আহ্ হুকুমের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কিন্তু, মুসলিমদের জন্য বাস্তবিকভাবে হুকুমটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটা একটি মাত্র বিধান হতে হবে এবং তা কখনও বিভিন্ন রকম হতে পারবে না। সুতরাং, বিচারক যখন কোন বিশেষ বিষয়ে প্রয়োগের নিমিত্তে কোন রায় প্রদান করবেন, তখন এই রায় অবশ্যই একটি হতে হবে। কারণ, প্রয়োগের বাধ্যবাধকতার শর্তে রায়টি প্রদান করা হয়েছে এবং এই রায় কার্যকর করার অর্থ হল উক্ত বিষয়ে আল্লাহ্’র বিধান কার্যকর করা। আর, বাস্তব দৃষ্টিকোন থেকে আল্লাহ্’র বিধান কখনও বিভিন্ন রকম হবে না, যদিও এর ব্যাখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। এজন্য, একই বিষয়ের জন্য একই আদালতে একের অধিক বিচারক নিয়োগ করা বৈধ নয়। তবে কোন দেশের ক্ষেত্রে, দুটি পৃথক আদালতে একটি অঞ্চলের সব ধরনের বিষয়সমূহ ফয়সালা করা অনুমোদিত। কারণ, বিচারব্যবস্থার কার্যাবলী খলীফার দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং, বিচারকার্য পরিচালনার জন্য কাউকে নিয়োগ করা আসলে খলীফার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি নিয়োগ করার সাথে তুলনীয়, অর্থাৎ, একের অধিক প্রতিনিধি নিয়োগ করা বৈধ; আর তাই, একই অঞ্চলে একের অধিক বিচারক থাকা বৈধ। যদি বিবাদমান দু’পক্ষ কোন ট্রাইবুনাল বা আদালতে তাদের বিবাদ মীমাংসা করবে বা কোন বিচারকের দারস্থ হবে এ বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে বিবাদীর পছন্দের উপর বাদীর পছন্দকে গুরুত্ব দেয়া হবে এবং তার পছন্দের বিচারকের হাতেই মামলা ন্যস্ত করা হবে। যেহেতু মামলা করার মাধ্যমে সে তার অধিকার দাবি করছে, তাই এক্ষেত্রে বিবাদীর চাইতে বাদীর পছন্দকে বেশী গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।
বিচারকগণ একমাত্র আদালতেই বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারেন; এবং শুধুমাত্র আদালতেই দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষ্য প্রদান এবং শপথগ্রহণ করতে হবে। কারণ, আব্দুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের (রা) এর বরাত দিয়ে আবু দাউদের সূনানে বর্ণিত আছে যে:
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) নির্দেশ দিয়েছেন যে, বিবাদমান দু’পক্ষকে অবশ্যই বিচারকের সামনে বসতে হবে।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৮৮)এ হাদীসটি বিচারকার্য কিভাবে পরিচালনা করতে হবে সে ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছে এবং এটাই বিচারকার্য পরিচালনার আইনসঙ্গত পদ্ধতি। অর্থাৎ, এ হাদীস নির্দেশ দিচ্ছে যে, বিচারকার্য পরিচালনার জন্য অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি ও কাঠামো থাকতে হবে। আর, তা হল, বিবাদমান দু’পক্ষকে অবশ্যই বিচারকের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে এবং এটাই হবে আদালত। সুতরাং, বিচারকার্যক্রমের বৈধতার ক্ষেত্রে এটা শর্ত যে, প্রথমত: এ কাজের জন্য অবশ্যই একটি নির্ধারিত স্থান থাকতে হবে যেখানে মামলা সংক্রান্ত রায় প্রদান করা হবে এবং শুধুমাত্র সেক্ষেত্রেই এই রায়কে আইনসঙ্গত রায় বলে বিবেচনা করা হবে। আর, দ্বিতীয়ত: বিবাদমান দু’পক্ষকে অবশ্যই বিচারকের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। এ বিষয়টি আলী (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারাও সমর্থিত, যেখানে রাসূল (সা) বলেছেন:
‘হে ’আলী, যদি তোমার সামনে বিচারের জন্য বিবাদমান দু’পক্ষ বসে; তাহলে ততক্ষণ পর্যন্ত একজনের পক্ষে রায় দিও না যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি প্রথম পক্ষের মত অন্য পক্ষের কথাও শুনে থাক।’
এ হাদীসটিও বিচারের জন্য একটি বিশেষ কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে; কারণ, এ হাদীসে বলা হয়েছে: ‘যদি তোমার সামনে বিচারের জন্য বিবাদমান দু’পক্ষ বসে…’।
সুতরাং, বিচারের রায় বৈধ হিসাবে বিবেচিত হবার শর্ত হিসাবে আদালতের উপস্থিতি আবশ্যক; এবং একইসাথে এটা শপথগ্রহণের জন্যও আবশ্যকীয়। কারণ, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘বিবাদীকে অবশ্যই শপথ নিতে হবে।’
এই হাদীসটি ইবনে আব্বাসের সূত্রে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন। (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২৬৬৮)বস্তুতঃ আদালত ব্যতীত বিবাদীকে বিবাদী হিসাবে বিবেচনা করা হবে না; এবং একই কথা সাক্ষ্যপ্রমাণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা ব্যতীত তা প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করা হবে না। কারণ, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘ফরিয়াদীকে সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে হবে এবং শপথগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক হবে তার প্রতিপক্ষের উপর (অর্থাৎ, আসামীর উপর)।’
(বায়হাকী)উপরন্তু, আদালত ব্যতীত কোন ফরিয়াদীকে বাদী হিসাবে বিবেচনা করা হবে না।
মামলার প্রকারভেদ অনুযায়ী বিভিন্ন স্তরের আদালত থাকা অনুমোদিত। সুতরাং, এটা অনুমোদিত যে, কিছু সংখ্যক বিচারক একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কিছু বিশেষ ধরনের মামলার দায়িত্বে থাকবেন; এবং অন্য মামলাসমূহকে তারা অন্য আদালতে পাঠাবেন।
এর কারণ হল, বিচারকার্যের জন্য বিচারক নিয়োগ করা খলীফার পক্ষ থেকে তার প্রতিনিধি নিয়োগের অনুরূপ; এবং এদুটো বিষয়ের মধ্যে মূলতঃ কোন পার্থক্য নেই। প্রকৃত অর্থে, বিচারব্যবস্থা প্রতিনিধিত্বের (deputyship) আরেকটি রূপ, যা কিনা সাধারণভাবে খলীফার প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে, আবার কোন বিশেষ বিষয়ে তার প্রতিনিধিত্ব করার অনুরূপও হতে পারে। সুতরাং, একজন বিচারককে শুধু কিছু বিশেষ ধরনের মামলা পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ করা যেমন অনুমোদিত, যেখানে উক্ত বিচারক নির্ধারিত ঐ ধরনের মামলা ছাড়া অন্য কোন মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না; আবার, অন্য কোন বিচারককে একই স্থানে নির্ধারিত ঐ ধরনের মামলাসমূহ সহ সকল প্রকার মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ করাও অনুমোদিত। সুতরাং, বিভিন্ন স্তরের ট্রাইবুনাল গঠন করা অনুমোদিত এবং অতীতে মুসলিমদের এই ধরনের ট্রাইবুনাল ছিল।
আল মাওয়ারদী তাঁর আল আহ্কাম আল সুলতানিয়্যাহ্ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে: ‘আবু আবদুল্লাহ আল যুবায়ের বলেছেন, “কিছুকাল যাবত এখানে বসরার আমীরগণ কেন্দ্রীয় মসজিদে (আল মাসজিদ আল-জামী’) একজন বিচারক নিয়োগ করতেন, তারা তাকে মসজিদের বিচারক বলে অভিহিত করতেন। তিনি (উক্ত বিচারক) সাধারণতঃ বিশ দিনার বা দুই’শ দিরহামের অনুর্ধ্ব পরিমাণ অর্থ সম্পর্কিত বিবাদগুলো মীমাংসা করতেন; এবং ভরণপোষণ আরোপ করতেন (অর্থাৎ, ভরণপোষণ সম্পর্কিত মামলাগুলো পরিচালনা করতেন)। তিনি তার জন্য নির্ধারিত ঐ স্থানের বাইরে যেতেন না কিংবা, তার জন্য বেঁধে দেয়া সীমা অতিক্রম করতেন না।”
আল্লাহ্’র রাসূল (সা) তাঁর পক্ষ থেকে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিয়োগ করতেন। যেমন: তিনি (সা) আমর ইবনুল আস’কে (রা) একটি এলাকার মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন; এবং তিনি (সা) ’আলী ইবন আবি তালিব’কে যে কোন ধরনের মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে ইয়েমেনের বিচারক হিসাবে নিযুক্ত করেন। এ সমস্ত ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ কিংবা বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন আদালত, এদু’টোই শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত।
ইসলামী বিচারব্যবস্থায় আপীল বা খারিজের জন্য কোন আদালত নেই। সুতরাং, একটি মামলার ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়া অভিন্ন হবে এবং একই হবে। যদি কোন বিচারক কোন রায় প্রদান করেন, তবে তা কার্যকর করা বাধ্যতামূলক হবে; এবং কোন অবস্থাতেই অন্য কোন বিচারকের এ রায় পরিবর্তন করার কোন এখতিয়ার থাকবে না। কারণ, শারী’আহ্ মূলনীতি অনুযায়ী: “একই বিষয়ের উপর কৃত একটি ইজতিহাদ আরেকটি ইজতিহাদ’কে বাতিল করে না।” সুতরাং, একজন মুজতাহিদের বিপক্ষে আরেকজন মুজতাহিদ প্রামাণ্য দলিল নন। সুতরাং, একটি আদালতের রায়কে খারিজ করে দিতে পারে এইরকম একটি আদালতের অস্তিত্ব অবৈধ।
তবে, যদি কোন বিচারক বিচারকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে শারী’আহ্ পরিত্যাগ করেন এবং কুফর আইন দিয়ে বিচার করেন; কিংবা, তার অনুসৃত আইন যদি আল্লাহ্’র কিতাব, রাসূলের সুন্নাহ্ এবং সাহাবীদের ইজমা’র সাথে সাংঘর্ষিক হয় কিংবা, যদি তিনি এমন কোন রায় দেন যা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন হয়, যেমন: তিনি কাউকে খুনী সাব্যস্ত করার পর যদি প্রকৃত খুনী উপস্থিত হয় – তবে, এ সকল ক্ষেত্রে বিচারের রায় পরিবর্তন করা যেতে পারে। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘যদি কেউ আমাদের দ্বীনের (ইসলামের) ভেতর এমন কোন কিছু উদ্ভাবন করে যা আসলে ইসলাম থেকে নয়, তবে তা প্রত্যাখাত।’
এ হাদীসটি আয়শা (রা) এর সূত্রে সহীহ্ আল বুখারী [হাদীস নং-২৬৯৭] ও সহীহ্ মুসলিমে [হাদীস নং১৭৯৮] বর্ণিত আছে।জাবির বিন আবদুল্লাহ’র সূত্রে বর্ণিত আছে যে: “এক ব্যক্তি এক মহিলার সাথে যিনাহ্ করলে রাসূল (সা) তাকে চাবুক মারার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে যখন তিনি জানলেন যে, লোকটি বিবাহিত, তখন তিনি তাকে পাথর নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন।” এছাড়া, মালিক বিন আনাস থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেছেন: “আমি উসমান (রা) সম্পর্কে জানতে পেরেছি যে, তাঁর কাছে একজন (যিনাহকারী) মহিলাকে আনা হল যে ছয়মাস পরে একটি সন্তান প্রসব করেছে। উসমান মহিলাটিকে পাথর মারার নির্দেশ দিলেন। আলী (রা) তাঁকে বললেন, ‘মহিলাটিকে পাথর মারা বৈধ হবে না, কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও দুগ্ধ ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস।’
[সূরা আল আহকাফ: ১৫]এবং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আরও বলেন,
‘আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর দুধ খাওয়াবে, যদি দুধ খাওয়াবার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।’
[সূরা আল বাক্বারাহ্ : ২৩৩]সুতরাং, তাকে (এখন) পাথর মারা বৈধ হবে না। একথা শুনে উসমান (রা) উক্ত মহিলাটিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু, দেখা গেল যে, ততক্ষণে পাথর নিক্ষেপ হয়ে গেছে।” আব্দুর রাজ্জাক, ইমাম ছাওরী থেকে বর্ণনা করেছেন যে: “যদি কোন বিচারক আল্লাহ্’র কিতাব কিংবা, রাসূল (সা) এর সুন্নাহ্ অথবা, সাহাবীদের ঐক্যমত আছে এমন কোন বিষয়ের বিপরীত কোন রায় প্রদান করে, তবে অন্য বিচারক চাইলে সে রায় পরিবর্তন করতে পারবেন।”
তবে, বিচারের রায় পরিবর্তনের দায়িত্ব আসলে মাযালিমের বিচারকের।
মুহ্তাসিব
মুহ্তাসিব হচ্ছেন সেই বিচারক, যিনি সেই সমস্ত মামলার বিচারকার্য পরিচালনা করেন যেগুলো জনসাধারণের অধিকারের সাথে সম্পর্কিত এবং যে সকল মামলার কোন বাদী বা ফরিয়াদী নেই, যদি না এ মামলাগুলো পেনাল কোড (হুদুদ) এবং ফৌজদারী আইন (Criminal Law) এর অন্তর্ভূক্ত হয়।
এটাই হচ্ছে হিসবাহ্’র বিচারকের সংজ্ঞা, যা কিনা রাসূল (সা) এর খাবারের স্তুপ সম্পর্কিত হাদীস থেকে নেয়া হয়েছে। রাসূল (সা) খাবারের স্তুপের ভেতর হাত দিয়ে স্যাঁতস্যাঁতে অবস্থা দেখতে পেলেন। তখন, তিনি (সা) ভেজা খাবারগুলোকে উপরে রাখার নির্দেশ দিলেন যেন লোকেরা তা দেখতে পায়। সুতরাং, এটা ছিল জনস্বার্থ সম্পর্কিত একটি বিষয়, যে ব্যাপারে রাসূল (সা) তদারকী করেছিলেন; এবং ঠকবাজি বা প্রতারণামূলক কর্মকান্ড প্রতিরোধ করার জন্য তিনি (সা) ভেজা খাবারগুলোকে উপরে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ বিষয়টি জনগণের অধিকার বা স্বার্থসম্পর্কিত একই প্রকৃতির সকল বিষয়ের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। আর, পেনাল কোড (হুদুদ) এবং ফৌজদারী আইন (Criminal Law) এর অন্তর্ভূক্ত নয়, এগুলো এই প্রকৃতির (জনগণের অধিকার বা স্বার্থসম্পর্কিত) নয়, এগুলো জনগণের মধ্যকার বিবাদ হিসাবে বিবেচনা করা হবে।
মুহ্তাসিবের আবশ্যিক ক্ষমতা
কোন অপরাধ সংঘটিত হলে, সে বিষয়ে অবহিত হবার সাথে সাথে ঘটনাস্থলেই মুহ্তাসিব সে ব্যাপারে রায় প্রদান করতে পারেন; এবং এ রায় প্রদান অপরাধ সংঘটিত হবার স্থানে কিংবা, যে কোন স্থানে হতে পারে; এজন্য তার কোন আদালতের প্রয়োজন নেই। মুহ্তাসিবের নির্দেশ এবং (যে কোন স্থানে) রায় কার্যকর করার লক্ষ্যে তার অধীনে কিছু পুলিশ নিযুক্ত থাকবে।
তার অধীনস্থ মামলাসমূহ পরিচালনার জন্য মুহ্তাসিবের কোন আদালতের প্রয়োজন নেই। যখনই তিনি নিশ্চিত হবেন যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তখনই তিনি এ ব্যাপারে রায় প্রদান করবেন; এবং তার যে কোন স্থানে এবং যে কোন সময়ে রায় প্রদানের ক্ষমতা রয়েছে; সেটা হাট-বাজারে হোক, কিংবা, কোন গৃহে হোক, কিংবা, ভ্রমনরত অবস্থায় বা যানবাহনে থাকা অবস্থায় দিনে কিংবা রাতে যে অবস্থাতেই হোক না কেন। কারণ, যে সমস্ত দলিল-প্রমাণ আদালতের প্রয়োজনীয়তার অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে, তা মুহ্তাসিবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যে হাদীসটি আদালতের অপরিহার্যতাকে প্রমাণ করে সেখানে বলা হয়েছে:
‘বিবাদমান দু’পক্ষকে বিচারকের সামনে বসতে হবে।’
এবং রাসূল (সা) আরও বলেছেন, ‘যদি বিবাদমান দু’পক্ষ তোমার সামনে বসে…।’ এ শর্তটি হিসবাহ’র বিচারকের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ, তার এখতিয়ারভূক্ত মামলাসমূহে কোন বাদী বা বিবাদী নেই; বরং, এটা জনগণের অধিকার যা ক্ষুন্ন করা হয়েছে, অথবা, এ বিষয়ে শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘিত হয়েছে।
এছাড়া, রাসূল (সা) যখন খাবারের স্তুপের বিষয়টি তদারকী করছিলেন, সে সময় তিনি (সা) বাজারের ভেতর দিয়ে হাঁটছিলেন এবং খাবারগুলো বিক্রির জন্য সাজানো ছিল। রাসূল (সা) উক্ত বিক্রেতাকে তাঁর কাছে উপস্থিত হবার নির্দেশ দেননি; বরং, তিনি (সা) অপরাধটি শনাক্ত করার সাথে সাথে ঐ স্থানেই এ বিষয়ে রায় দিয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে যে, রায় প্রদানের জন্য হিসবাহ্’র বিচারকের আদালতের প্রয়োজন নেই।
এছাড়া, মুহ্তাসিবের তার নিজের জন্য ডেপুটি নির্বাচন করার অধিকার রয়েছে। তবে, তাদেরকে অবশ্যই মুহ্তাসিব পদের সকল শর্ত পূরণ করতে হবে। এছাড়া, তিনি তার ডেপুটিদের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনের জন্য নিযুক্ত করতে পারেন। এসব ডেপুটি বা সহকারীগণ তাদের জন্য নির্ধারিত অঞ্চলে এবং তাদেরকে যে সমস্ত বিষয় তদারকী করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সে সব ক্ষেত্রে মুহ্তাসিবের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
অবশ্য এটা নির্ভর করবে, মুহ্তাসিবের নিয়োগপত্রে তাকে ডেপুটি নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান করা বা না করার উপর। যদি, এ বিষয়ে ক্ষমতা প্রদান করে তার নিয়োগপত্রে কোন অনুচ্ছেদ অন্তর্ভূক্ত থাকে, শুধুমাত্র তখনই তিনি তার নিজের জন্য সহকারী নিয়োগ করতে পারবেন। আর, যদি তাকে এ ব্যাপারে কোন ক্ষমতা দেয়া না হয়, তবে নিজের জন্য কোন সহকারী নিয়োগ করার অধিকার তার থাকবে না।
মাযালিমের বিচারক
মাযালিমের বিচারক হলেন এমন একজন বিচারক যাকে রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কৃত সকল প্রকার মাযলিমা’র (অন্যায় আচরণ) মীমাংসা করার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়; সে ব্যক্তি হতে পারে রাষ্ট্রের কোন সাধারণ নাগরিক কিংবা, হতে পারে রাষ্ট্রের শাসন-কর্তৃত্বের নীচে বসবাসরত কেউ; এবং এ অন্যায় আচরণ (মাযলিমা) খলীফা কিংবা, তার অধীনে কর্মরত কেউ কিংবা, কোন সরকারী কর্মচারী কর্তৃক সংঘটিত হতে পারে।
এটাই হল মাযালিমের বিচারকের সংজ্ঞা। মাযালিমের বিচারকের উৎস হিসাবে রাসূল (সা) এর হাদীসকে উল্লেখ করা হয়, যেখানে তিনি (সা) জনগণের উপর শাসন পরিচালনা কালে শাসক কর্তৃক নাগরিকদের উপর কৃত অন্যায় আচরণকে মাযলিমা বলে অভিহিত করেছেন। আনাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে:
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে একবার মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। তখন তা তাঁরা (সাহাবীরা) তাঁকে বললেন, ‘হে আল্লাহ্’র রাসূল, আপনি কেন দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছেন না?’ তখন তিনি (সা) বললেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ্ হচ্ছেন সৃষ্টিকর্তা, সব বিষয়ের অধিকর্তা, সম্পদ বৃদ্ধিকারী, রিযিকদাতা এবং মূল্য নির্ধারণকারী, এবং আমি আশা করি যে, আমি এ অবস্থায় আল্লাহ্’র সাথে সাক্ষাৎ করবো যাতে কেউ আমার বিরুদ্ধে মাযালিমা’র অভিযোগ না আনতে পারে, হোক সেটা রক্ত সম্পর্কিতই হোক বা অর্থ সম্পর্কিত হোক।’
এ হাদীসটি ইমাম আহমদ তার মুসনাদে উল্লেখ করেছেন (মুসনাদে আহমদ খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৮৬)।রাসূল (সা) এক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার বিষয়টিকে মাযালিমা বা অন্যায় আচরণ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ, তিনি যদি মূল্য নির্ধারণ করে দিতেন, তাহলে এক্ষেত্রে তিনি তাঁর এখতিয়ার বর্হিভূত কাজ করতেন।
এছাড়া, তিনি (সা) রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত কোন বিষয়, যা জনস্বার্থ ক্ষুন্ন করে তাকেও মাযলিমা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। জনস্বার্থ সম্পর্কিত কোন বিষয় পরিচালনার জন্য যদি কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গঠিত হয় এবং কোন ব্যক্তি যদি সে ব্যবস্থাকে তার স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করে, তবে তার বিষয়টি মাযালিমের বিচারক খতিয়ে দেখবেন। কারণ, এটি জনগণের স্বার্থরক্ষার নিমিত্তে রাষ্ট্র কর্তৃক স্থাপিত একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা। যেমন এটা হতে পারে, গণমালিকানাধীন কোন জলাধারের বিষয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী সর্বসাধারণের কৃষিজমিতে সেচকার্য করা।
এ ব্যাপারে দলিল হল, রাসূল (সা) এর সময় রাষ্ট্র কর্তৃক সেচকার্যের জন্য গৃহীত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত মদিনার একজন আনসারীর অভিযোগ। রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনাটি ছিল এরকম যে: যার জমির উপর দিয়ে জলধারা প্রথমে বয়ে যাবে সে প্রথমে সেচকাজ করবে, তারপর তার পরবর্তী জন করবে। আনসারী ঐ ব্যক্তিটি চাচ্ছিলেন যে, আল-যুবায়ের (রা) (যার জমির উপর দিয়ে প্রথমে জলধারা বয়ে গিয়েছিল) নিজের জমিতে সেচকার্য করার পূর্বেই তার (উক্ত আনসারীর) জমিতে পানি প্রবাহিত হতে দেবেন। কিন্তু, আল-যুবায়ের তা প্রত্যাখান করেন এবং শেষপর্যন্ত বিষয়টি রাসূল (সা) এর নিকট উত্থাপিত হয়। তিনি (সা) বিষয়টি ফয়সালা করে দেন এবং যুবায়েরকে তার জমিতে হালকা ভাবে সেচকার্য করার পর তার প্রতিবেশী আনসারীকে পানি ছেড়ে দিতে বলেন (অর্থাৎ, প্রতিবেশীকে সাহায্যের নিদর্শন হিসাবে তিনি (সা) আল-যুবায়েরকে তার প্রাপ্য পানি সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার করার পূর্বেই তা ছেড়ে দিতে বলেন)। কিন্তু, উক্ত আনসারী এ রায় প্রত্যাখান করে এবং আল-যুবায়েরের পূর্বে সে নিজ জমিতে সেচকার্য করার দাবি জানায়। তারপর সে রাসূল (সা) বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, আল-যুবায়ের সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই হবার কারণে তিনি (সা) এ রায় দিয়েছেন (যা ছিল আল্লাহ্’র রাসূলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুতর মিথ্যা অভিযোগ; আল-বুখারীর বর্ণনা অনুযায়ী বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার কারণে উক্ত আনসারীকে ক্ষমা করে দেয়া হয়)।
ঘটনার এ পর্যায়ে, রাসূল (সা) রায় দেন যে, যুবায়ের তার সেচকার্যের পূর্ণ অধিকার ভোগ করবে; অর্থাৎ, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তার জমিতে সেচকার্য করবে যতক্ষণ পর্যন্ত না পানি তার দেয়ালের মূলে কিংবা গাছের মূল পর্যন্ত না পৌঁছায়। যাকে আলেমগণ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, ততক্ষণ পর্যন্ত পানির উচ্চতা বাড়তে দিতে হবে যতক্ষণ পর্যন্ত তা মানুষের পা ডুবিয়ে দেয়। এই সম্পূর্ণ হাদীসটি ’উরওয়া ইবন আল-যুবায়েরের বরাত দিয়ে সহীহ্ মুসলিমে [হাদীস নং-২৩৫৭] এভাবে বর্ণিত আছে যে:
“আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়ের তাকে বলেছেন যে, আনসারদের মধ্য হতে এক ব্যক্তি রাসূল (সা) এর সামনেই সিরাজ আলহাররাহ্ নিয়ে আল-যুবায়েরের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়, যার দ্বারা তারা তাদের খেজুর বাগানে পানি দিত। উক্ত আনসারী (আল-যুবায়েরকে) পানি ছেড়ে দিতে বলে; কিন্তু, আল-যুবায়ের তা প্রত্যাখান করেন। তারা রাসূল (সা) এর সামনেই বিবাদে লিপ্ত হয়। আল্লাহ্’র রাসূল যুবায়েরকে বলেন: “হে যুবায়ের, তুমি প্রথমে সেচকাজ কর, তারপর তোমার প্রতিবেশীর জন্য পানি ছেড়ে দাও।” এতে উক্ত আনসারী খুব রাগান্বিত হয়ে যায় এবং বলে: “হে আল্লাহ্’র রাসূল, এরকম রায়ের কারণ হল সে আপনার চাচাতো ভাই।” তার একথা শুনে রাসূল (সা) এর মুখের রঙ পরিবর্তন হয়ে যায় এবং তারপর তিনি (সা) বলেন: “হে যুবায়ের! তুমি সেচকাজ কর এবং ততক্ষণ পর্যন্ত পানি ধরে রাখো যতক্ষণ পর্যন্ত না তা দেয়ালের গোড়ায় গিয়ে পৌঁছায়।” আল-যুবায়ের বলেন: “আল্লাহ্’র কসম, আমার মনে হয় এ বিষয়েই এই আয়াতটি নাযিল হয়েছে: “তোমার রবের কসম! তারা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের মনে কোনরকম সংকীর্ণতা না পায় এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে কবুল করে নেয়।” [সিরাজ আল-হাররাহ্ হল মদিনার আল-হাররাহ্ অঞ্চলের একটি নদী। আবু উবাইদ বলেছেন যে, মদিনাতে দু’টি নদী ছিল, যাতে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হত এবং মদিনার লোকেরা এ নদীগুলোর ব্যাপারে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করতো। এজন্য রাসূল (সা) সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রথম ব্যক্তি প্রথমে সেচকাজ করবে; যার অর্থ হল, নদীর শুরুর দিকে যার জমি রয়েছে সে প্রথমে সেচকাজ করবে এবং তারপর সে পানিকে পরবর্তী জমিতে প্রবাহিত হতে দেবে এবং ব্যাপারটি এভাবে চলতে থাকবে]।
সুতরাং, কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাসক বা রাষ্ট্রের কোন প্রতিষ্ঠান বা নির্দেশের কারণে যদি কোন অন্যায় আচরণ ঘটে থাকে, তবে এ বিষয়টিকে মাযলিমা হিসাবে বিবেচনা করা হবে, যা কিনা উপরোল্লিখিত দু’টি হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। এ সকল ক্ষেত্রে এ বিষয়সমূহ ফয়সালার জন্য খলীফার কাছে ন্যস্ত করা হবে কিংবা, তিনি মাযালিমের বিচারক হিসাবে তার পক্ষ থেকে যাকে নিয়োগ করবেন তার নিকট উপস্থাপন করা হবে। মাযালিমের
মাযালিমের বিচারক নিয়োগ ও অপসারণ
মাযালিমের বিচারক খলীফা বা প্রধান বিচারপতি (কাজী আল কুদাহ্) কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। এর কারণ হল, মাযালিম বিচারব্যবস্থার একটি অংশ, যার মাধ্যমে শারী’আহ্ আইন কার্যকর করার নিমিত্তে রায় প্রদান করা হয় এবং সকল ধরনের বিচারককে অবশ্যই খলীফা কর্তৃক নিযুক্ত হতে হয়। এছাড়া, রাসূল (সা) এর সীরাত থেকেও এটি প্রমাণিত যে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) নিজেই বিচারকদের নিয়োগ দিতেন। এ সবকিছুই প্রমাণ করে যে, খলীফাই মাযালিমের বিচারক নিয়োগ করবেন। তবে, প্রধান বিচারপতিও মাযালিমের বিচারক নিয়োগ করতে পারেন, যদি খলীফা তার নিয়োগপত্রে তাকে এ বিষয়ে ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টি অনুচ্ছেদ আকারে যুক্ত করেন। এটি অনুমোদিত যে, রাষ্ট্রের কেন্দ্রে থাকা মাযালিমের প্রধান আদালত (মাহকামাতুল মাযালিম) শুধুমাত্র খলীফা, তার সহকারীবৃন্দ এবং প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে সংঘটিত অন্যায় আচরণের বিষয়ে তদন্ত করবে; অন্যদিকে, বিভিন্ন প্রদেশে (উলাই’য়াহ্) অবস্থিত মাযালিম আদালতের শাখাসমূহ ওয়ালী বা রাষ্ট্রের অন্যান্য কর্মচারীদের দ্বারা সংঘটিত মাযলিমা তদন্ত করবে। খলীফা ইচ্ছা করলে মাযালিমের প্রধান আদালতকে বিভিন্ন উলাই’য়াহ্তে অবস্থিত মাযালিমের শাখা আদালত সমূহের বিচারক নিয়োগ ও অপসারণের ক্ষমতা প্রদান করতে পারেন।
তবে, খলীফাই হচ্ছেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রের কেন্দ্রে অবস্থিত মাহকামাতুল মাযালিমের সদস্যদের নিয়োগ ও অপসারণ করার অধিকার সংরক্ষণ করেন। তবে, মাহকামাতুল মাযালিমের প্রধান বিচারককে অপসারণের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, যদিও তিনিই খলীফার অপসারণ সম্পর্কিত বিষয়ে তদন্ত করবেন, তারপরেও নীতিগতভাবে খলীফারই রয়েছে তাকে অপসারণের ক্ষমতা। এর কারণ হল, খলীফাই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যার তাকে নিযুক্ত করার ক্ষমতা রয়েছে, ঠিক যেভাবে তিনি অন্যান্য বিচারকদের নিযুক্ত করে থাকেন। তবে, খলীফার বিরুদ্ধে কোন তদন্ত চলাকালে যদি তাকে মাযালিমের প্রধান বিচারককে অপসারণের ক্ষমতা প্রদান করা হয়, তবে প্রদত্ত এ ক্ষমতা তাকে হারামের দিকে পরিচালিত করতে পারে। এজন্য, এ ধরনের পরিস্থিতিতে শারী’আহ্ মূলনীতি: “যা কিছু হারামের দিকে ধাবিত করে, তা নিজেই হারাম” এটি প্রযোজ্য হবে। যেহেতু এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, সেহেতু এক্ষেত্রে শারী’আহ্ এ মূলনীতিটি প্রযোজ্য হবে।
এই ধরনের পরিস্থিতি বলতে এখানে বোঝানো হচ্ছে যে, যখন খলীফা কিংবা, তার সহকারীবৃন্দ অথবা, তার প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কোন তদন্ত বা মামলা চলতে থাকবে। এর কারণ হল, এ ধরনের পরিস্থিতিতে যদি খলীফাকে মাযালিমের প্রধান বিচারককে অপসারণ করার ক্ষমতা প্রদান করা হয়, তবে তা বিচারের রায়কে প্রভাবিত করতে পারে; এবং স্বাভাবিকভাবেই এ পরিস্থিতি, প্রয়োজনের খাতিরে উক্ত বিচারকের খলীফা বা, তার সহকারীবৃন্দ কিংবা, প্রধান বিচারককে অপসারণ করার ক্ষমতাকে সংকুচিত করবে। এক্ষেত্রে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে খলীফার হাতে উক্ত বিচারককে অপসারণ করার প্রদত্ত ক্ষমতা হারাম কার্য সম্পাদনের একটি উপায় বা পন্থা; অর্থাৎ, এ পরিস্থিতিতে খলীফার হাতে এ ক্ষমতা প্রদান করা শারী’আহ্ দৃষ্টিকোন থেকে হারাম বা নিষিদ্ধ।
এছাড়া অন্য সবক্ষেত্রে, বিধানটি একই রকম থাকবে। অর্থাৎ, মাযালিমের বিচারককে অপসারণ করার ক্ষমতা খলীফার হাতেই ন্যস্ত থাকবে, যেভাবে তার উক্ত বিচারককে নিয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে।
মাযালিমের বিচারকের আবশ্যিক ক্ষমতা
মাযালিম আদালতের অন্যায় আচরণ (মাযলিমা) সংক্রান্ত যে কোন বিষয়ে তদন্ত করার আবশ্যিক ক্ষমতা রয়েছে; সে অন্যায় আচরণ সরকারী কোন কর্মচারীর দ্বারা সংঘটিত হোক; কিংবা, খলীফার কাজের সাথে শারী’আহ্’র দ্বন্দ বিষয়ক হোক; কিংবা, সংবিধানের আইনী ব্যাখ্যা বিষয়ক হোক; কিংবা, খলীফা কর্তৃক গৃহীত আইনকানুন বা বিভিন্ন প্রকারের শারী’আহ্ বিধিবিধান যেমন: জনগণের উপর করধার্য করা বা অন্যকোন বিষয় সম্পর্কিত হোক।
মাযালিম আদালত যে কোন ধরনের অন্যায় আচরণ, তা কোন সরকারী কর্মচারীর সাথে সম্পর্কিত হোক, খলীফার দ্বারা শারী’আহ্ আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে হোক, সংবিধান, আইনী দলিল বা খলীফা কর্তৃক জারিকৃত কোন আইনকানুনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত হোক, জনগণের উপর করধার্যের বিষয়ে হোক; কিংবা, রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক জনগণের উপর কৃত জুলুম-নির্যাতন বিষয়ক হোক, যেমন: রাষ্ট্র কর্তৃক জোরপূর্বক জনগণের সম্পদ দখল করা বা, তাদের নিকট হতে সম্পদ সংগ্রহ কালে শারী’আহ্ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা; কিংবা, সরকারী কর্মচারী বা সেনাবাহিনীর সদস্যদের বেতনভাতা কমিয়ে দেয়া বা বেতন প্রদানে বিলম্বিত করা ইত্যাদি বিষয়ক হোক: এ সকল বিষয়ের তদন্ত করার জন্য কোন ব্যক্তির বিচারকের সম্মুখে উপস্থিতি, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সমনজারী বা, কোন ফরিয়াদীর প্রয়োজন নেই। বরং, এটা হল এ সকল বিষয়ে মাযালিম আদালতের তদন্ত করার আবশ্যিক ক্ষমতা, এমনকি এ সব বিষয়ে যদি কেউ কোন অভিযোগ দায়ের না করে তবুও।
এর কারণ হল, যে সমস্ত শারী’আহ্ দলিল-প্রমাণ বিচারকার্য চলাকালে বিচারকের সম্মুখে উপস্থিতিকে শর্ত হিসাবে আরোপ করে, সেগুলো মাযালিম আদালতের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ, এ সকল মামলার কোন ফরিয়াদী নেই, তাই ফরিয়াদীর আদালতে উপস্থিতি শর্ত হিসাবে বিবেচ্য নয়। বস্তুতঃ কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কোন অভিযোগ দায়ের না করলেও মাযালিম আদালতের কোন মাযলিমা (অন্যায় আচরণ) তদন্ত করার অধিকার রয়েছে; এ কারণে বাদীর আদালতে হাজির হবার কোন প্রয়োজন নেই। একইসাথে, বিবাদী বা অভিযুক্ত ব্যক্তির উপস্থিতি ব্যতীতই এ আদালত এ সকল মামলার তদন্ত করতে পারে। সুতরাং, আদালতের প্রয়োজনীয়তাকে অপরিহার্য প্রমাণিত করে এমন শারী’আহ্ দলিল এক্ষেত্রে বিবেচিত হবে না। আদালতের প্রয়োজনীতাকে অপরিহার্য করে এ রকম দলিলসমূহ হল: আবদুল্লাহ্ ইবন যুবায়েরের বরাত দিয়ে আবু দাউদ ও আহমাদ বর্ণিত হাদীসটি, যেখানে তিনি বলেছেন: “আল্লাহ্’র রাসূল (সা) নির্দেশ দিয়েছেন যে, “বিবাদমান দু’পক্ষ যেন বিচারকের সামনে বসে।” এবং আলী (রা) এর প্রতি রাসূল (সা) এর নির্দেশ: “যদি বিবাদমান দু’পক্ষ তোমার সামনে উপস্থিত হয়…।”
সুতরাং, মাযালিমের বিচারক এ ক্ষমতা সংরক্ষণ করেন যে, কোন মাযলিমা সংঘটিত হলে যে কোন স্থানে, যে কোন সময় কিংবা, কোন আদালত ব্যতীতই এ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারেন। বস্তুতঃ এ আদালতের আবশ্যিক ক্ষমতা এবং এর অবস্থানগত মর্যাদার ভিত্তিতে, অতীতে সবসময়ই এটি উচ্চ সামাজিক মর্যাদা ও আড়ম্বরপূর্ণতা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। মিশর ও আল-শামে সুলতানদের শাসনামলে, সুলতানদের কাউন্সিল যা কিনা মাযলিমা সংক্রান্ত বিষয়সমূহ দেখাশুনা করতো, তা ‘ন্যায়বিচারের গৃহ’ (House Of Justice) নামে পরিচিত ছিল; যেখানে সুলতান তার পক্ষ থেকে সহকারী নিয়োগ করতেন এবং সেইসাথে, বিচারক ও ফকীহ্গণও সেখানে উপস্থিত থাকতেন। আল মাকরিজী তার “আল-সুলুক ইলা মা’রিফাত দুওয়াল আল-মুলক” (The way to know the states of the king) নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, সুলতান আল-মালিক আল-সালিহ্ আইয়ুব হাউস অব জাস্টিস-এ তার পক্ষ থেকে ডেপুটি নিয়োগ করতেন; যেখানে তারা সাক্ষী, বিচারক এবং ফকীহ্’দের উপস্থিতিতে সকল প্রকার অন্যায় আচরণ দূরীভূত করার লক্ষ্যে কাজ করতেন। সুতরাং, মাযালিমের আদালতের জন্য চমৎকার ও আকর্ষণীয় স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ভবন নির্মাণে কোন ক্ষতি নেই; কারণ, এটি মুবাহ্ (অনুমোদিত) কাজের অন্তর্ভূক্ত; বিশেষ করে এ রকম একটি ভবনের মাধ্যমে যদি বিচারব্যবস্থার প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিফলিত হয়।
খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেকার চুক্তি, লেনদেন ও বিচারিক রায়
খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ও লেনদেন, সেইসাথে এ সংক্রান্ত আদালতের রায় যা ইতিমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ও খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেই কার্যকর হয়েছে, তা খিলাফতের অধীনে বৈধ বলে বিবেচিত হবে। খিলাফতের বিচার বিভাগ এ মামলাগুলো পূণরায় তদন্ত করবে না, বা এগুলোকে পূণরায় নিষ্পত্তি করবে না। খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর এগুলোর ব্যাপারে আর নতুন কোন মামলা গৃহীত হবে না। তবে, দু’টি বিষয় এর বাইরে থাকবে:
১) খিলাফতের পূর্বে যে মামলাটি নিষ্পন্ন হয়েছে এবং কার্যকরী হয়েছে যদি এর ধারাবাহিকতা খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পরও রয়ে যায় এবং তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক হয়।
২) যদি মামলাটি এমন কারও সাথে সম্পর্কিত হয়, যার কারণে ইসলাম ও মুসলিম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপরোক্ত দু’টি বিষয় ব্যতীত, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেকার নিষ্পত্তিকৃত চুক্তি, লেনদেন এবং মামলাসমূহ, যে সংক্রান্ত রায় খিলাফতের পূবেই কার্যকরী হয়েছে, তা পূণরায় নিষ্পত্তি না করা বা এ সংক্রান্ত মামলা নতুন করে গৃহীত না হবার দলিল হিসাবে বলা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যে গৃহ থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, মক্কাবিজয়ের পর তিনি আর সে গৃহে ফিরে যাননি। কুরাইশদের আইন অনুসারে, উকাইদ ইবন আবি তালিব তার সে সব আত্মীয়-স্বজনের গৃহসমূহ উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছিলেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং হিজরত করেছিল।
উত্তরাধিকার সূত্রে এ গৃহসমূহের মালিকানা লাভ করার পর উকাইদ এগুলো অধিগ্রহণ করে এবং পরবর্তীতে বিক্রি করে দেয়, যার মধ্যে রাসূল (সা) এর গৃহও অন্তর্ভূক্ত ছিল। মক্কাবিজয়ের পর রাসূল (সা) কে জিজ্ঞেস করা হল: “আপনি কোন গৃহে অবস্থান করতে চাচ্ছেন?” তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “উকাইদ কি আমাদের কোন গৃহ ছেড়ে দিয়েছে?” (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৩০৫৮) অন্য এক বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি বললেন: “উকাইদ কি আমাদের জন্য কোন গৃহ ছেড়ে দিয়েছে?” তখন তাঁকে বলা হল যে, উকাইদ রাসূল (সা) এর বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে, কিন্তু রাসূল (সা) তা বাতিল বলে ঘোষণা করলেন না। এই হাদীসটি উসামা বিন যায়িদের সূত্রে আল-বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (উসামা (রা)) বলেছেন: মক্কা বিজয়ের দিন তিনি বললেন, “হে আল্লাহ্’র রাসূল! আগামীকাল আপনি কোথায় থাকতে চান?” তখন রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন, “উকাইল কি আমাদের কোন বাড়ি ছেড়ে দিয়েছে?” (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৩০৫৮)
এছাড়া, আরও বর্ণিত আছে যে, আবু আল-’আস ইবন আল-রাবী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদিনায় হিজরত করেন। কিন্তু, এর পূর্বে তার স্ত্রী যয়নাব ইসলাম গ্রহণ করেন এবং বদরের যুদ্ধের পর মদিনায় হিজরত করেন, তখনও তিনি (ইবন আল-রাবী) মুশরিক অবস্থায় মক্কায় ছিলেন। (মুসলিম হবার পর) রাসূল (সা) বিবাহচুক্তি নবায়ন না করেই তার স্ত্রী’কে তার নিকট ফেরত দেন। এটা ছিল অন্ধকার যুগে সম্পাদিত বিবাহচুক্তির স্বীকৃতি প্রদান। এছাড়া, ইবন আব্বাসের সূত্রে ইবনে মাজাহ্ বর্ণনা করেছেন যে:
“রাসূল (সা) দুই বছর পর তাঁর কন্যাকে অর্থাৎ, যয়নাবকে প্রথম বিবাহের চুক্তির উপর ভিত্তি করেই আবু আল-’আস ইবন আল-রাবী কাছে ফেরত পাঠান।”
(সূনানে তিরমিযী, হাদীস নং-১১৪২)এছাড়া, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বের যেসব লেনদেন ও মামলার ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ধারাবাহিক প্রভাব বিদ্যমান থাকে, সেসব ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেগুলোকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন: ইসলামী রাষ্ট্রের অধীনে আসার পর মক্কার লোকদের উপর ইবন আব্বাসের ঋণের যে সুদ ছিল, তিনি (সা) তা বাতিল বলে ঘোষণা করেন এবং লোকেরা শুধু প্রকৃত ঋণ ফেরত দেয়। এর অর্থ হচ্ছে, দার-উল-ইসলামে তাদের উপর আরোপিত সুদ বাতিল বলে গণ্য হয়েছিল। সূলাইমান ইবন আমরু তার পিতা হতে এবং আবু দাউদ সুলাইমান হতে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি (সুলাইমানের পিতা) বলেছেন যে:
‘আমি বিদায়হজ্জ্বের দিন আল্লাহ্’র রাসূল (সা) কে বলতে শুনেছি যে:
“সাবধান! অন্ধকার যুগের (জাহিলিয়াতের) সমস্ত সুদ বাতিল করা হয়েছে। তোমরা কেবলমাত্র আসল অর্থের দাবি করতে পারবে। তোমরা একে অন্যের উপর জুলুম করো না এবং জুলুমের শিকার হয়ো না।”
এছাড়া, জাহিলিয়াতের সময় যাদের চারের অধিক স্ত্রী ছিল, দার-উল-ইসলামে তাদেরকে শুধুমাত্র চারজন স্ত্রী রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, ঘাইলান ইবনে সালামাহ্ ইবনে ছাকাফি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তার দশজন স্ত্রী ছিল যারা তার সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। “রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে স্ত্রীদের মধ্য হতে চারজনকে পছন্দ করার নির্দেশ দেন।”
সুতরাং, সেইসব চুক্তি, যার ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক ধারাবাহিক প্রভাব বিদ্যমান রয়েছে, এই ধরনের প্রভাব অবশ্যই দূরীভূত করতে হবে। এই প্রভাব দূর করা আবশ্যকীয় বলে বিবেচিত হবে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, যদি কোন মুসলিম নারী খিলাফত প্রতিষ্ঠার পূর্বে কোন খ্রিষ্টান পুরুষকে বিয়ে করে, তাহলে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথে শারী’আহ্ নিয়ম অনুযায়ী সে বিয়ে বাতিল বলে গণ্য করা হবে।
আর, যাদের দ্বারা ইসলাম ও মুসলিমগণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার ব্যাপারে বলা যায় যে, এটা অনুমোদিত এ কারণে যে, মক্কাবিজয়ের পর আল্লাহ্’র রাসূল (সা) ক্ষমা ঘোষণার সাথে সাথে কিছু কিছু কাফের ব্যক্তিদের রক্তপাতের ঘোষণা দেন; কারণ, তারা সবসময় ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতিসাধনে ব্যস্ত ছিল। এমনকি যদি তারা কাবার চাদর ধরে ঝুলে থাকে তবুও তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। যদিও এর পূর্বে তিনি (সা) এ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, “ইসলাম তার পূর্বের সবকিছুকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়”, যে হাদীসটি আমর ইবনুল ’আস (রা) এর সূত্রে আহমাদ ও তাবারানী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে। এর অর্থ হল, যারা ইসলাম ও মুসলিমদের ক্ষতিসাধন করেছে, তারা এ হাদীসের বর্হিভূত বলে বিবেচিত হবে।
তবে, যেহেতু রাসূল (সা) পরবর্তীতে এদের মধ্যে কিছু ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন, যেমন, তিনি (সা) ইকরামা ইবন আবু জাহলকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এজন্য খলীফা চাইলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন; কিংবা, তাদেরকে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।
উপরোল্লিখিত বিষয় দু’টি বাদে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বে নিষ্পত্তিকৃত সকল চুক্তি ও লেনদেন এবং এ সংক্রান্ত মামলার রায় বাতিল বলে গণ্য করা হবে না; বা, পূণরায় নিষ্পত্তি করা হবে না, যদি সেগুলো খিলাফতের পূর্বেই নিষ্পত্তি ও কার্যকরী হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, কোন ব্যক্তি যদি স্কুলের দরজা ভাঙ্গার দায়ে দু’বছরের কারাদন্ড প্রাপ্ত হয় এবং খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পূর্বেই সে তার সাজার মেয়াদ শেষ করে এবং জেল থেকে বেরিয়ে যায়; এরপর, খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হবার পর যদি সে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা শুরু করতে চায়, কারণ, তার দৃষ্টিতে তার উপর অন্যায় করা হয়েছে, তবে এ বিষয়ে কোন মামলা গৃহীত হবে না। কারণ, ঘটনাটি ঘটে গেছে এবং এ ব্যাপারে রায় প্রদান করা হয়েছে এবং সাজার মেয়াদ খিলাফত প্রতিষ্ঠার পূর্বেই শেষ হয়েছে। এ ধরনের বিষয়সমূহ পুরস্কারের আশায় আল্লাহ্’র তা’আলার কাছে পেশ করতে হবে।
কিন্তু, যদি এমন হয় যে, উক্ত ব্যক্তিকে এ অভিযোগে দশ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে এবং দশ বছরের মধ্যে সে দু’বছর সাজা ভোগ করেছে এবং এর মধ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন এক্ষেত্রে খলীফার বিষয়টি পুনঃতদন্ত করার এখতিয়ার রয়েছে; হয় তিনি শাস্তির এ রায় বাতিল করে এবং তাকে অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিয়ে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে পারেন; কিংবা, যে শাস্তি সে ইতিমধ্যে ভোগ করেছে তা যথেষ্ট মনে করে তাকে মুক্ত করতে পারেন। আবার এমনও হতে পারে যে, তিনি জনস্বার্থ ও এ সংশ্লিষ্ট শারী’আহ্ আইন বিবেচনায় রেখে, বিশেষ করে এ বিষয়টি যদি জনস্বার্থের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয় তাহলে তিনি শাস্তির বাকী সময়টুকু পূণর্বিবেচনা করতে পারেন।
শিল্প বিভাগ

শিল্প বিভাগ হচ্ছে এমন একটি বিভাগ যা শিল্প সংক্রান্ত সকল বিষয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে; তা ভারী শিল্প সম্পর্কিতই হোক, যেমন: মোটর, ইঞ্জিন, যানবাহন, সরঞ্জামাদি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি কিংবা হালকা শিল্পের সাথে সম্পর্কিতই হোক। রাষ্ট্রে অবস্থিত গণমালিকানাধীন বা ব্যক্তি মালিকানাধীন সকল শিল্পকারখানা, যেগুলোর সাথে সামরিক শিল্পের সম্পর্ক রয়েছে, সেগুলো অবশ্যই যুদ্ধনীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এর কারণ হল, জিহাদের জন্য প্রয়োজন সেনাবাহিনী; আর, সেনাবাহিনীর প্রয়োজন অস্ত্রশস্ত্র। এই সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র যেন সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন এবং সর্বাবস্থায় সহজলভ্য হয় এজন্য রাষ্ট্রের নিজস্ব শিল্পকারখানা থাকা আবশ্যক। বিশেষ করে সামরিক শিল্পকারখানা কারণ, জিহাদের সাথে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
খিলাফত রাষ্ট্র যেন স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হয় এবং অন্যকোন রাষ্ট্র যেন তাকে প্রভাবিত করতে না পারে, এজন্য রাষ্ট্রকে অবশ্যই নিজে নিজের অস্ত্রশস্ত্র তৈরী করতে হবে এবং এগুলোকে ক্রমাগতভাবে উন্নত করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এ নীতি খিলাফত রাষ্ট্রকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী করবে এবং রাষ্ট্রকে প্রযুক্তিগতভাবে সর্বাধুনিক ও সবচাইতে শক্তিশালী অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্রে পরিণত করবে। একইসাথে, এ নীতি রাষ্ট্রকে এমন সব যুদ্ধাস্ত্রের অধিকারী করবে যা রাষ্ট্রের নিশ্চিত ও সম্ভাব্য শত্রুর অন্তরে প্রচন্ড ভীতির সৃষ্টি করবে। এ ব্যাপারে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,
‘আর প্রস্তূত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন ভীতির সঞ্চার হয় আল্লাহ্’র শত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপরও যাদেরকে তোমরা জান না; আল্লাহ্ তাদেরকে চেনেন।’
[সূরা আনফাল: ৬০]সুতরাং, উপরোক্ত আয়াত অনুসারে, খিলাফত রাষ্ট্রের থাকবে নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি, সে উৎপাদন করবে তার প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্র এবং এগুলোকে সে ক্রমাগত এমন ভাবে উন্নত করবে যাতে করে রাষ্ট্রের নিশ্চিত ও সম্ভাব্য শত্রুর অন্তরে প্রবল ভীতির সৃষ্টি করার লক্ষ্যে রাষ্ট্র সর্বোচ্চ শক্তিশালী ও সর্বাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হয়। সুতরাং, নিজের অস্ত্রশস্ত্র নিজে উৎপাদন করা খিলাফত রাষ্ট্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় দায়িত্ব এবং এ ব্যাপারে অন্য কারো উপর নির্ভর করা রাষ্ট্রের জন্য অনুমোদিত নয়। কারণ, তাহলে এ নির্ভরশীলতা অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহকে খিলাফত রাষ্ট্রের ইচ্ছাশক্তি, এর অস্ত্রশস্ত্র ও এর যুদ্ধঘোষণাকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরী করে দেবে।
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এটা সুস্পষ্ট যে, অস্ত্রবিক্রেতা দেশসমূহ অন্যান্য দেশগুলোর কাছে সাধারণতঃ সব ধরনের অস্ত্র বিক্রি করে না, বিশেষ করে সর্বাধুনিক অস্ত্র। এমনকি তারা বিশেষ শর্ত আরোপ ব্যতীতও অস্ত্র বিক্রয় করে না, যাতে করে তাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়। আবার অস্ত্র বিক্রয়ের সময় ক্রেতা দেশ নয়, বরং তারা নিজেরাই এর পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকে। যা অস্ত্রবিক্রেতা দেশটিকে ক্রেতা দেশটির উপর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরী করে এবং তারা সহজেই ক্রেতা দেশটির উপর তাদের নিজস্ব ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ক্রেতা দেশটি যদি যুদ্ধরত অবস্থায় থাকে; কারণ, এ পরিস্থিতিতে তাদের ব্যাপক অস্ত্রশস্ত্র, ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদের প্রয়োজন হয়। ফলশ্রুতিতে, ক্রেতা দেশটি অস্ত্রবিক্রেতা দেশটির উপর ক্রমান্বয়ে আরও বেশী নির্ভরশীল হয়ে যায় এবং এ পরিস্থিতি দেশটিকে অন্যান্য দেশের চাওয়া-পাওয়ার অধীনস্থ করে তোলে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, অস্ত্রবিক্রেতা দেশটি ক্রেতা দেশটির স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে পুরোপুরি ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, বিশেষতঃ যুদ্ধের সময় যখন গোলাবারুদ, অস্ত্রশস্ত্র ও ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশের ব্যাপক চাহিদা থাকে। এর ফলে, ক্রেতা দেশটি অস্ত্র রপ্তানীকারক দেশটির কাছে তার নিজস্ব ইচ্ছাশক্তি বিকিয়ে দিয়ে জিম্মি রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
উপরোল্লিখিত কারণসমূহ পর্যালোচনা করে এটা বলা যায় যে, খিলাফত রাষ্ট্রকে অবশ্যই স্বাধীনভাবে নিজে নিজের অস্ত্রশস্ত্র এবং ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশসহ যুদ্ধযন্ত্রের সাথে জড়িত সমস্ত কিছু উৎপাদন করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। আর এটা কখনই সম্ভবপর হবে না, যদি না রাষ্ট্রের অধিকারে ভারী শিল্প থাকে এবং রাষ্ট্র এমন সব কলকারখানা স্থাপন করে যা সামরিক ও বেসামরিক ভারী শিল্পদ্রব্যাদি উৎপাদন করে। সুতরাং, এটা অত্যাবশ্যকীয় যে, সকল ধরনের পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র, রকেট, স্যাটেলাইট, উড়োজাহাজ, ট্যাঙ্ক, মহাকাশযান, মোটরগাড়ি, নৌযান, সাঁজোয়াযান এবং অন্যান্য সকল ভারী ও হালকা অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদনের জন্য রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় কলকারখানা স্থাপন করতে হবে; এবং সেইসাথে এটাও প্রয়োজনীয় যে, রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এমন সব কলকারখানা থাকবে যা যন্ত্রপাতি, মোটর, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি, ইলেক্ট্রনিক পণ্য ইত্যাদি তৈরী করবে। এছাড়া, রাষ্ট্রে থাকবে গণমালিকানা সম্পদের সাথে সম্পর্কিত কলকারখানা এবং সেইসাথে থাকবে সামরিকশিল্পের সাথে জড়িত হালকা সরঞ্জামাদি উৎপাদনের কারখানা। এ সমস্ত কিছুই যুদ্ধ প্রস্তুতির আওতাধীন এবং আল্লাহ্’র বিধান অনুযায়ী এ প্রস্তুতি গ্রহণ করা মুসলিমদের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য। পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন:
‘আর প্রস্তূত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে’
[সূরা আনফাল : ৬০]যেহেতু ইসলামী রাষ্ট্র দাওয়াতী কার্যক্রম ও জিহাদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলামের বাণী বহন করে নিয়ে যাবে, সেহেতু এ লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে সবসময় অব্যাহতভাবে জিহাদের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আর একারণেই, যুদ্ধনীতির উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রকে নিজস্ব ভারী ও হালকা শিল্পকারখানা গড়ে তুলতে হবে। যেন যে কোন সময় রাষ্ট্র এ কলকারখানাগুলোকে সামরিক প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে রূপান্তরিত করতে পারে। সুতরাং, খিলাফত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরস্থ সকল ভারী ও হালকা শিল্পকারখানা অবশ্যই যুদ্ধনীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যেন রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যে কোন সময় এ সকল কারখানাকে সামরিক।
পররাষ্ট্র বিষয়ক বিভাগ

পররাষ্ট্র বিভাগ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয় অর্থাৎ, খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে অন্যান্য রাষ্ট্র সম্পর্কিত সকল বিষয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে – এই বিষয় ও সম্পর্ক যাই হোক না কেন। এ বিষয়সমূহ রাজনৈতিক হতে পারে যেখানে শান্তি চুক্তি, যুদ্ধবিরতি, সমঝোতা চুক্তি, দূত নিয়োগ, বার্তাবাহক ও প্রতিনিধি প্রেরণ এবং দূতাবাস ও বাণিজ্যিক দূতের আবাস স্থাপন অন্তর্ভুক্ত। আবার অন্যান্য সম্পর্কও হতে পারে, যেমন: অর্থনৈতিক, কৃষি, বাণিজ্য, ডাকযোগাযোগ, তারযুক্ত বা তারবিহীন যোগাযোগ ইত্যাদি। খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে অন্য রাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রাখার দায়িত্বে নিয়োজিত পররাষ্ট্র বিষয়ক বিভাগ এসব কার্যই সম্পাদন করে থাকে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) অন্যান্য বৈদেশিক রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তিনি উসমান বিন আফফান (রা) কে কুরাইশদের সাথে সমঝোতার জন্য পাঠিয়েছিলেন; ঠিক একইভাবে তিনি কুরাইশ প্রতিনিধিদের সাথে সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনায় বসেছিলেন। তিনি বিভিন্ন রাজা-বাদশাহ্’র কাছে প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন এবং রাজা-বাদশাহ্ ও নেতাদের প্রতিনিধি গ্রহণ করেছেন। এছাড়া, তিনি বিভিন্ন ধরনের চুক্তি ও শান্তি চুক্তি সম্পাদন করেছেন। পরবর্তীতে, তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে খোলাফায়ে রাশেদীনগণও (রা) অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তাঁরা হয় নিজেরা এ সকল কাজ সম্পাদন করতেন কিংবা তাঁরা তাঁদের পক্ষ থেকে এ সকল কার্যাবলী সম্পাদন করার জন্য যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিনিধি নিয়োগ করতেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা, বিস্তৃতি ও বৈচিত্র্যতার কারণে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, খলীফা তার পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র বিষয়ক একটি আলাদা বিভাগ গঠন করবেন; যেখানে খলীফা হয় রাষ্ট্রের অন্যান্য শাসন বিষয়ক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের মত প্রত্যক্ষভাবে শারী’আহ্ বিধিবিধান অনুযায়ী এ সব বিষয় তদারকী করবেন কিংবা, তার নির্বাহী সহকারীর মাধ্যমে এ সকল বিষয়ের তদারকী করবেন।
আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ

আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে এবং এ বিভাগের দায়িত্বে থাকবেন একজন মহাব্যবস্থাপক। প্রত্যেক প্রদেশে এই বিভাগের একটি করে শাখা থাকবে যাকে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা শাখা বলা হবে, এর প্রধানকে বলা হবে সাহিব আল সুরতাহ্ (Sahib al-shurta) এবং সেখানে তিনি প্রাদেশিক গভর্ণরের তত্ত্বাবধানের কাজ করবেন। তবে, প্রশাসনিক বিষয়ে তিনি কেন্দ্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের অধীনস্ত থাকবেন যা পরিচালিত হবে একটি বিশেষ আইন দ্বারা।
আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট যে কোন বিষয়ের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। এ বিভাগ পুলিশবাহিনীর (সুরতাহ্) মাধ্যমে রাষ্ট্রের আইনশৃংখলা পরিস্থিতি বজায় রাখে। বস্তুতঃ এটাই হল নিরাপত্তা রক্ষার প্রধান উপকরণ। নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে পুলিশবাহিনীকে যে কোন সময়, যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করা আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের জন্য অনুমোদিত এবং এ বিভাগের নির্দেশ পাওয়া মাত্র তৎক্ষণাৎ পুলিশবাহিনীকে তা কার্যকর করতে হবে। আবার, যদি পুলিশবাহিনীর সেনাবাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন হয় তাহলে খলীফা বরাবর এ ব্যাপারে আবেদন করতে হবে। তিনি সেনাবাহিনীকে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগকে সহায়তা করার নির্দেশ দিতে পারেন কিংবা, অন্য কোন উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। তবে, খলীফা এ আবেদন প্রত্যাখানও করতে পারেন এবং পুলিশবাহিনীকেই এ কাজ সম্পাদনের নির্দেশ দিতে পারেন।
পূর্ণবয়স্ক পুরুষ নাগরিকদের দ্বারাই পুলিশবাহিনী গঠিত হবে। তবে, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখার স্বার্থে নারীদের প্রয়োজনে মহিলাদেরও পুলিশ বিভাগে নিয়োগ দেয়া অনুমোদিত। হুকুম শারী’আহ্’র আলোকে এ ব্যাপারে একটি বিশেষ আইন প্রস্তুত করা হবে।
পুলিশবাহিনী দু’ভাগে বিভক্ত থাকবে: এর এক ভাগে থাকবে সেনাপুলিশ এবং আরেক ভাগে থাকবে সরাসরি শাসকের নির্দেশাধীন পুলিশ; যাদের জন্য অবশ্যই বিশেষ পোষাক ও চিহ্ন নির্ধারিত থাকবে এবং এরা নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।
সুরতাহ্’র সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আল আজহারী বলেছেন, ‘সুরতাহ্ শব্দের অর্থ হলো কোন কিছুর মধ্যে যা উত্তম। এই অর্থ সুরাতকেও (নিরাপত্তাবাহিনীকে) বুঝায় কেননা তারা শ্রেষ্ঠ সৈন্য। এটা বলা হয় যে, সুরতাহ হল প্রথম গ্রুপ যারা সেনাবাহিনীর অগ্রে অবস্থান নেয় । তাদেরকে সুরাত বলা হয় একারণে যে, পদবি ও পোষাকের দিক থেকে তাদের রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। আল আসমা’য়ী সুরতার এই সংজ্ঞা পছন্দ করেছেন। আল কামুস অভিধান গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘সুরতাহ্’র প্রত্যেককে আলাদাভাবে সুরাত বলা হয় – যার অর্থ হল প্রথম ব্যাটালিয়ন হিসেবে যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে এবং মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকবে। এই সুরতাহ্ ওয়ালীদের সাহায্যকারীও বটে। আর, তাদেরকে এ নামে ডাকার কারণ হল একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ চিহ্ন দ্বারা তারা নিজেদের আলাদা করে নিয়েছে।’
আর, সেনা পুলিশ (military police) হল সেনাবাহিনীর একটি অংশ, তাদের রয়েছে বিশেষ চিহ্ন এবং তারা শৃংখলা রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর অগ্রে থাকবে। তারা আমীরুল জিহাদ অর্থাৎ যুদ্ধ বিভাগের আনুগত্য করবে। কিন্তু, পুলিশবাহিনী যা শাসকদের নির্দেশে চলবে তা আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের আনুগত্য করবে।
আল বুখারী আনাস হতে বর্ণনা করেছেন যে, ‘আমীরদের সাথে কথা বলার সময় কায়েস ইবনে সা’দ পুলিশের মত রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সামনে থাকত।’ এখানে কায়েস ইবনে সা’দ ইবনে উবাদা আল আনসারী আল খারাজকে বুঝানো হয়েছে। আল তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, ‘আমীরদের সাথে কথা বলার সময় কায়েস ইবনে সা’দ পুলিশের মত রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সামনে থাকত।’ আল আনসারী বলেছেন, এর অর্থ হল তাকে এ ব্যাপারে দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল।
খলীফা ইচ্ছে করলে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সুরতাহ্ বা পুলিশবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন অর্থাৎ যুদ্ধবিভাগের অধীন করতে পারেন। আবার, তিনি একটি স্বাধীন বিভাগও গঠন করতে পারেন; যেমন: আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ।
তবে, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আমরা একটি পৃথক স্বাধীন বিভাগ গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি অর্থাৎ শাসকদের নির্দেশাধীন সুরতাহ্ বা পুলিশবাহিনীকে অবশ্যই আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের অধীনস্থ থাকতে হবে – যা হবে স্বাধীন একটি বিভাগ এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত তাদের জবাবদিহিতা থাকবে সরাসরি খলীফার কাছে। আর এ ব্যাপারে দলিল হল কায়েস ইবনে সা’দ এর হাদীসটি। জিহাদের সাথে সম্পর্কযুক্ত চারটি বিভাগের স্বাধীনতা বিষয়ে পূর্বে উল্লেখিত হুমকির কারণে এগুলো একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি বিভাগই পৃথক পৃথক ভাবে খলীফার নির্দেশাধীন থাকবে। সুতরাং, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুরতাহ্ আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের অধিনস্ত থাকবে।
আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের কার্যপরিধি
আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের কাজ হল রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যে সব কর্মকান্ডের কারণে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে তাদের তালিকা বৃহৎ, যেমন:
ইসলাম ত্যাগ করা, ধ্বংসাত্মক ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা – যেমন: রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত বা সেগুলো দখল করে নেয়া কিংবা ব্যক্তিগত, গণমালিকানাধীন বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করা ইত্যাদি। এছাড়া, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
এছাড়াও আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য যেসব কর্মকান্ড হুমকি হতে পারে সেগুলো হল: চুরি, লুটপাট, ডাকাতি ও আত্মসাৎ এর মাধ্যমে অন্যায় ভাবে জনগণের সম্পদ হরণ করা এবং সেইসাথে, হয়রানি, শারীরিক অত্যাচার-নির্যাতন ও হত্যাকান্ডের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে আক্রমণ করা এবং মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদ আরোপ, কলঙ্ক লেপন ও ধর্ষণের মাধ্যমে মানুষের সম্মানহানি করা ইত্যাদি।
আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের অন্যান্য কাজের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল সন্দেহভাজনদের নজরে রাখা এবং তাদের সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রাষ্ট্র ও জনগণকে রক্ষা করা।
প্রধানতঃ এ সমস্ত কার্যাবলীই রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য সবচাইতে বেশী হুমকি স্বরূপ। আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ মূলতঃ রাষ্ট্র ও জনগণকে এসব অন্যায় ও অপরাধপ্রবণ কর্মকান্ড থেকে রক্ষা করে। সুতরাং, কেউ (ইসলাম) ধর্ম ত্যাগ করার পর যদি অনুতপ্ত না হয়, তাহলে তার মৃত্যুদন্ডের রায় হবে এবং এই বিভাগ এই রায় কার্যকর করবে। যদি ধর্মত্যাগীরা একটি দল হয় তাহলে তাদেরকে প্রথমে ইসলামে ফিরে আসার আহ্বান জানাতে হবে। যদি তারা অনুতপ্ত হয়ে ইসলামে ফিরে আসে এবং শারী’আহ্ আইনকানুন মেনে নেয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের উচিত হবে না। আর, যদি তারা ধর্মত্যাগের উপর অটল থাকে তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যদি তারা সংখ্যায় কম হয়, তাহলে আভ্যন্তরীন নিরাপত্তা রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশবাহিনীই তাদের দমন করার জন্য যথেষ্ট হবে। কিন্তু, যদি তারা সংখ্যায় বেশী হয় এবং পুলিশবাহিনী তাদেরকে দমন করার জন্য যথেষ্ট না হয়, তবে সেক্ষেত্রে তাদের অতিরিক্ত সেনাপুলিশ দিয়ে সাহায্য করার জন্য খলীফাকে অনুরোধ জানাতে হবে। যদি সেনাপুলিশও এ কাজের জন্য যথেষ্ট না হয় তাহলে তাদের অবশ্যই সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করার ব্যাপারে খলীফার বরাবর আবেদন করতে হবে।
এটা গেল ধর্মত্যাগীদের কথা। এছাড়া, সাধারণ জনগণের মধ্য হতে কেউ যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং এ বিদ্রোহমূলক কর্মকান্ডে তারা যদি অস্ত্র ব্যবহার না করে শুধুমাত্র ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড, হরতাল, বিক্ষোভ কর্মসূচী, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসমূহ দখল করে নেয়া ইত্যাদির মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে; কিংবা, ব্যাপক ভাংচুরের মাধ্যমে ব্যক্তিগত, গণমালিকানাধীন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করে, তাহলে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ এ সমস্ত ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শুধুমাত্র পুলিশবাহিনীকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু, যদি এ বিভাগ এসব আগ্রাসী কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে ধ্বংসাত্মক ও ষড়যন্ত্রমূলক এসকল কর্মকান্ড বন্ধ করার লক্ষ্যে সেনাপুলিশের সাহায্য কামনা করে খলীফা বরাবর অনুরোধ জানাতে হবে।
তবে, যদি বিদ্রোহীরা অস্ত্র ব্যবহার করে ও একটি অঞ্চলে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ফেলে এবং আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ কেবলমাত্র পুলিশের দ্বারা তাদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তাহলে অবস্থার উপর নির্ভর করে বিদ্রোহ দমনের জন্য তারা খলীফাকে সেনাবাহিনী পাঠাতে অনুরোধ জানাবে। তবে, বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার পূর্বে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা উচিত এবং তাদের অভিযোগ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করা ও তা খতিয়ে দেখা উচিত। এছাড়া, আভ্যন্তরীন নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের অস্ত্রসমর্পণের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ্’র জামায়া’ত ও রাষ্ট্রের আনুগত্যে ফিরে আসার আহবান জানাতে হবে। যদি তারা এ প্রস্তাবে ইতিবাচক ভাবে সাড়া দিয়ে আত্মসর্মপণ করে এবং রাষ্ট্রের আনুগত্যে ফিরে আসে, তবে রাষ্ট্রকে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা থেকে বিরত থাকতে হবে। কিন্তু, যদি তারা এ প্রস্তাব প্রত্যাখান করে এবং বিদ্রোহের ব্যাপারে অটল থাকে, তবে শাস্তিপ্রদান ও শৃংখলা ফিরিয়ে নিয়ে আসার লক্ষ্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করতে হবে, তাদের সমূলে উচ্ছেদ বা ধ্বংস করার লক্ষ্যে নয়। রাষ্ট্র তাদের সাথে এ লক্ষ্যে যুদ্ধ করবে যেন তারা রাষ্ট্রের আনুগত্যে ফিরে আসে, বিদ্রোহের পথ পরিবর্তন করে তাদের অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করে।
এর চমৎকার উদাহরণ হল যেভাবে ইমাম আলী বিন আবি তালিব (রা) খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তিনি তাদের প্রথমে আত্মসমর্পন করতে বলেন। তারা যদি বিদ্রোহের পথ থেকে সরে আসত তাহলে তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করতেন না। কিন্তু, তারা বিদ্রোহের সিদ্ধান্তে অটল থাকায় তিনি শৃংখলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে তাদের সাথে যুদ্ধ করেন, যেন তারা আনুগত্যের পথে ফিরে আসে, বিদ্রোহের পথ পরিবর্তন করে এবং সেইসাথে অস্ত্র সমর্পণ করে।
এছাড়া, যারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে, যেমন: যারা মহাসড়কে ডাকাতি করে সাধারণ মানুষকে আক্রমণ করে, জোরপূর্বক মহাসড়কে চলাচলকালে বাধা সৃষ্টি করে, ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয় ও হত্যা করে, তাদের দমনের জন্য আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ পুলিশবাহিনী প্রেরণ করবে এবং নিম্নোক্ত আয়াত অনুসারে তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি প্রদান করবে – যা হতে পারে হত্যা এবং ক্রুশবিদ্ধ করা, হত্যা করা, বিপরীত অঙ্গচ্ছেদ করা অথবা তাদের অন্যত্র নির্বাসনে পাঠানো ইত্যাদি।
‘যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হস্তপদসমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে।’
[সূরা মায়েদা: ৩৩]এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আর দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এক কথা নয়। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্য হল তাদের শৃংখলার ভেতর নিয়ে আসা। কিন্তু এইসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মানে হল তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো; সুতরাং, এইসব মহাসড়ক ডাকাতরা যদি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে কিংবা পালিয়েও যায়, তারপরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, উপরোক্ত আয়াত অনুসারে তাদের সাথে আচরণ করা হবে: যে হত্যা করবে এবং সম্পদ ছিনিয়ে নেবে, তাকে হত্যা করা হবে এবং শূলে চড়ানো হবে; যে শুধুমাত্র হত্যা করবে কিন্তু সম্পদ ছিনিয়ে নেবে না, তাকে হত্যা করা হবে কিন্তু শূলে চড়ানো হবে না; যে হত্যা করবে না কিন্তু সম্পদ ছিনিয়ে নেবে তাকে হত্যা না করে তার হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেয়া হবে; আর যে ব্যক্তি অস্ত্র হাতে ভয়ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টি করবে, কিন্তু হত্যাও করবে না বা স¤পদও ছিনিয়ে নেবে না তাকে নির্বাসনে পাঠানো হবে।
বস্তুতঃ আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের জন্য রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পুলিশবাহিনীকে ব্যবহার করাই অনুমোদিত। পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না, এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি না হলে আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের জন্য অন্য কোন বাহিনীকে ব্যবহার করা অনুমোদিত নয়। তবে, এরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এ বিভাগ প্রয়োজনানুসারে সেনাপুলিশ বা সেনাবাহিনীর সাহায্য কামনা করে খলীফার কাছে আবেদন করতে পারে। এছাড়া, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ চুরি, ছিনতাই, লুটপাট, ডাকাতি, আত্মসাৎ ইত্যাদির মাধ্যমে সম্পদ হরণ কিংবা, জুলুম-নির্যাতন ও হতাহত করা কিংবা, মিথ্যা অপবাদ, চরিত্র হনন বা ধর্ষণের মাধ্যমে সম্মান হানি করা ইত্যাদি অপরাধসমূহ নিয়মিত টহল, রক্ষী বা পাহারাদার মোতায়েন করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং সেইসাথে মানুষের জান, মাল ও ইজ্জতের ওপর আক্রমণকারী দূর্বৃত্তদের উপর আদালতের রায় বাস্তবায়ন করেও এইসব অপরাধ দমন করতে পারে। বস্তুতঃ কেবলমাত্র পুলিশবাহিনীর মাধ্যমেই এ কাজগুলো সম্পাদন করা যায়।
আইন-শৃংখলা রক্ষা করা, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ ও আদালয়ের রায় বাস্তবায়ন ইত্যাদি সুরতাহ্’র দায়িত্ব। আর এটা এ কারণে যে, আনাস (রা) বর্ণিত হাদীস থেকে আমরা দেখতে পাই যে, কায়েস ইবনে সা’দ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সামনে সাহিব আস সুরতাহ্ (পুলিশবাহিনীর প্রধান) হিসেবে দন্ডায়মান থাকতেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, সুরতাহ্ শাসকদের সম্মুখে দন্ডায়মান থাকে। এর অর্থ হল, শারী’আহ্ আইনকানুন বাস্তবায়ন, আইন-শৃংখলা এবং নিরাপত্তা রক্ষার কাজে শাসকদের যে কোন ধরনের নির্দেশ পালন করতে তারা বাধ্য। এর মধ্যে টহলকার্যও অন্তর্ভূক্ত যেমন: রাতের বেলা টহলের মাধ্যমে চোর-ডাকাত, অপরাধী ও দুর্বৃত্ত দমন করা ইত্যাদি। আবু বকর (রা) এর সময় আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) রাতের টহলের আমীর ছিলেন। উমর ইবন খাত্তাব (রা) নিজেই রাতের টহলের দায়িত্ব পালন করতেন এবং
কখনওবা সাথে তাঁর ভৃত্য অথবা আবদুর রহমান বিন আউফ (রা) থাকতেন।
সুতরাং, বর্তমানে কিছু কিছু মুসলিম দেশে দোকান মালিকেরা নিজ দায়িত্বে রাতের পাহারাদার নিয়োগ করে থাকে কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে দোকান মালিকদের খরচে সরকার পাহারাদার নিয়োগ করে – এ সবই সম্পূর্ণরূপে ভুল। এর কারণ হল রাতের টহল বা পাহারা পুরোপুরি রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং এটি পুলিশবাহিনীর দায়িত্বের অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং, জনগণের কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণ করা যাবে না কিংবা তাদের কাছ থেকে এজন্য কোনপ্রকার অর্থ আদায় করা যাবে না।
এছাড়া, রাষ্ট্র, সম্প্রদায় ও ব্যক্তির জন্য ক্ষতিকর এরকম সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নজরে রাখা এবং তাদের সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রাষ্ট্র ও জনগণকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। উম্মাহ্’র মধ্য থেকে কারও কাছে যদি এ ধরনের ব্যক্তির ব্যাপারে কোন তথ্য থাকে তবে তা অবশ্যই রাষ্ট্রকে অবহিত করতে হবে। এ ব্যাপারে দলিল হল আল আরকাম থেকে বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত হাদীস:
“আমি একটি অভিযানে ছিলাম এবং শুনতে পেলাম আবদুল্লাহ ইবন উবাই বলছে, আল্লাহ্’র রাসূল ও তাঁর সঙ্গীদের জন্য তোমরা ব্যয় করো না এবং তোমরা তাঁর চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাও; এরপর যখন আমরা আমার চাচা অর্থাৎ, উমরের কাছে পৌঁছালাম, তিনি এ ঘটনাটি আল্লাহ্’র রাসূলের কাছে বর্ণনা করলেন। তিনি আমাকে ডাকলেন এবং আমি তাঁর কাছে ঘটনাটি বর্ণনা করলাম।” (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং: ৪৯০১, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ২৭৭২) মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, “আমি নবী করীম (সা) এর কাছে আসলাম এবং তাঁকে আবদুল্লাহ ইবন উবাই সম্পর্কে জানালাম, যে কিনা মুসলিমদের প্রতি শত্রুতা পোষণকারী কাফিরদের সাথে ঘন ঘন সাক্ষাৎ করে এবং একইভাবে, মদীনার চারপাশের ইহুদী এবং মুসলিমদের শত্রুদের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করে।”
এ ব্যাপারটি আরও ভালভাবে বোঝার জন্য আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো যাতে করে এটি সাধারণ নাগরিকদের উপর গোয়েন্দাগিরির সাথে মিশ্রিত না হয়ে যায়, কারণ সাধারণ মানুষের উপর গোয়েন্দাগিরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে পবিত্র কুর’আনে আল্লাহ্ বলেন,
‘এবং একে অপরের গোপনীয় বিষয় সন্ধান (গোয়েন্দাগিরি) করো না।’
[সূরা হুযুরাত: ১২]সুতরাং, গোয়েন্দাগিরি বা নজরদারীর বিষয়টি শুধুমাত্র সন্দেহভাজনদের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ।
এখানে সন্দেহভাজন তারাই যারা কাফের শত্রুরাষ্ট্র অর্থাৎ, যারা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত কিংবা যাদের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে তাদের সাথে ঘন ঘন সাক্ষাৎ করে বা যোগাযোগ রক্ষা করে। এর কারণ হল, যুদ্ধের কৌশল হিসাবে এবং মুসলিমদের সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কাফিরদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত; উপরন্তু, এ বিষয়ে যে শারী’আহ্ দলিলসমূহ পাওয়া যায় তার মধ্যে সকল শত্রুভাবাপন্ন কাফিররাই অন্তর্ভূক্ত। এর কারণ হল, যদি তারা প্রকৃতপক্ষে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত জনগোষ্ঠী হয় তাহলে তাদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা আবশ্যক। আর, যদি তারা মুসলিমদের প্রতি শত্রট্টভাবাপন্ন হয়ে থাকে তবে তাদের উপর গোয়েন্দাগিরি অনুমোদিত, কেননা তাদের সাথে যে কোন সময় যুদ্ধ বাঁধার সম্ভাবনা থাকে।
সুতরাং, কোন ব্যক্তি যদি যুদ্ধরত কাফেরদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখে তাহলে সে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বলে বিবেচিত হবে; কারণ সে এমন কারও সাথে সম্পর্ক রাখছে যাদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত, অর্থাৎ কাফের শত্রট্টরাষ্ট্র।
এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা নিম্নরূপ:
১. মুসলিমদের সাথে যুদ্ধরত কাফেরদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। উপরোক্ত দলিল ছাড়াও শারী’আহ্ মূলনীতি অনুসারে, ‘ফরয সম্পাদনের জন্য যা করা প্রয়োজন তাও ফরয।’ কারণ শত্রুকে পরাজিত করতে হলে শত্রুর শক্তিমত্তা, তার পরিকল্পনা, তার লক্ষ্য এবং এর কৌশলগত অবস্থান ইত্যাদি সম্পর্কে
তথ্য জানা দরকার। আর, এ দায়িত্ব পালন করে থাকে যুদ্ধ বিভাগ। যুদ্ধের সম্পর্ক বজায় থাকায় যুদ্ধরত কাফেরদের সাথে খিলাফত রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকার যুক্তি সঙ্গত কারণ নেই। তাই যদি তাদের সাথে এ ধরনের সম্পর্ক কোন নাগরিক বজায় রাখে তাহলে গুপ্তচরবৃত্তির আওতায় সে নাগরিকও পড়বে।
২. এছাড়া, যুদ্ধে জড়িয়ে পরার সম্ভাবনা রয়েছে এমন কাফেরদের উপর গুপ্তচরবৃত্তি করা অনুমোদিত এবং ক্ষেত্র বিশেষে এটি বাধ্যতামূলক এই কারণে যে, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যায়। বিশেষ করে যদি এমন আশঙ্কা থাকে যে, তারা ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধরত রাষ্ট্রকে সহযোগিতা করবে বা তাদের সাথে যোগ দেবে, তবে অবশ্যই তাদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। যাদের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে এরকম কাফেরদের দু’ভাগে ভাগ করা যায়:
প্রথমত: নিজদেশে বসবাসরত সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্ন কাফের যাদের বিরুদ্ধে খিলাফত রাষ্ট্রের যুদ্ধবিভাগ গুপ্তচরবৃত্তি করবে।
দ্বিতীয়ত: সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্ন কাফের যারা ইসলামী রাষ্ট্রে প্রবেশ করবে, যেমন: দূত হিসাবে বা চুক্তির কারণে আগত ব্যক্তিবর্গ ইত্যাদি। আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ এদের পর্যবেক্ষণ করবে ও গোয়েন্দাগিরির আওতায় রাখবে।
আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ খিলাফত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থানরত সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্ন কাফের রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের সাথে যেসব নাগরিক নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখবে বা ঘন ঘন যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে তাদের উপরে নজরদারী ও গোয়েন্দাগিরি করবে। অন্যদিকে, খিলাফত রাষ্ট্রের যে সব নাগরিক মুসলিমদের সাথে প্রকৃত অর্থে যুদ্ধরত কাফের রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের সাথে তাদের দেশে ভ্রমণ করে দেখা সাক্ষাৎ করবে তাদের উপর যুদ্ধবিভাগ গোয়েন্দাগিরি করবে। তবে এর জন্য দু’টি শর্ত রয়েছে:
প্রথমত: আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ বা যুদ্ধ বিভাগের পর্যবেক্ষণে যদি এইরকম প্রমাণিত হয় যে, খিলাফত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বা বাইরে অবস্থানরত সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্ন কাফের রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের সাথে খিলাফত রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক সম্পর্ক বা যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে তা অস্বাভাবিক ও দৃষ্টি আকর্ষণ করবার মত।
দ্বিতীয়ত: এই দু’বিভাগের পর্যবেক্ষণ ও নজরদারীতে যা কিছু বের হয়ে আসবে তা অবশ্যই কাজী হিসবা’র সামনে
পেশ করতে হবে এবং তিনি এ ব্যাপারে রায় দিবেন।
যদি এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তবেই আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থানরত শত্রুভাবাপন্ন কাফের রাষ্ট্রের বিভিন্ন কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের সাথে যেসব নাগরিক সম্পর্ক বা যোগাযোগ রক্ষা করে চলে তাদের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করবে। অন্যদিকে, একই বাস্তবতার কারণে শত্রুভাবাপন্ন কাফের রাষ্ট্রে অবস্থানরত কাফেরদের বিভিন্ন কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিদের সাথে খিলাফত রাষ্ট্রের যেসব নাগরিক সম্পর্ক বা যোগাযোগ রক্ষা করে চলে ও সেসব রাষ্ট্রে ঘন ঘন ভ্রমণ করে তাদের উপর যুদ্ধবিভাগ গোয়েন্দাগিরি করবে। এগুলোর ব্যাপারে দলিল হল:
১. নিম্নোক্ত আয়াত অনুসারে মুসলিমদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা হারাম। আল্লাহ্ বলেন,
‘এবং একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান (গোয়েন্দাগিরি) করো না।’
[সূরা হুযুরাত-১২]এটা হল গোয়েন্দাগিরি নিষিদ্ধের ব্যাপারে স্বাভাবিক নিষেধাজ্ঞা এবং উপযুক্ত প্রমাণ ব্যতীত তা মেনে চলতে হবে। আল মুকদাদ ও আবু উমামাহ থেকে বর্ণিত এ হাদীসটিকে আহমাদ এবং আবু দাউদ নিশ্চিত করেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
“যদি কোন আমীর তার লোকদের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন তাহলে তিনি তাদেরকে অপমানিত করলেন।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৮৮৯ এবং আল হাইছামী, মাজমা’ আল-জাওয়ায়িদ, খন্ড ৫, পৃষ্ঠা ২১৮)সুতরাং, উপরোক্ত দলিলসমূহ থেকে এটা স্পষ্ট যে, মুসলিমদের বিষয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করা নিষিদ্ধ। রাষ্ট্রের অমুসলিম নাগরিকদের ব্যাপারেও এ নিয়ম প্রযোজ্য। সুতরাং, মুসলিম বা অমুসলিম যে কোন নাগরিকের উপর গোয়েন্দাগিরি করা নিষিদ্ধ।
২. সেসব কাফের যারা খিলাফত রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে এবং যাদের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে – যেমন: যারা দূত হিসাবে বা চুক্তির কারণে আমাদের রাষ্ট্রে আগত; কিংবা, নিজ দেশে অবস্থানরত মুসলিমদের সাথে প্রকৃত যুদ্ধরত কাফেরদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা বৈধ। প্রকৃত অর্থে, প্রকৃত যুদ্ধরত কাফেরদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা আবশ্যক এবং ক্ষতির সম্ভাবনা থাকলে শত্রুভাবাপন্ন কাফেরের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি ক্ষেত্র বিশেষে ফরয।
— এ ব্যাপারে দলিলসমূহ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সীরাত থেকে স্পষ্ট:
সীরাত ইবনে হিশামে আবদুল্লাহ ইবনে জাহশের (রা) অভিযান সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, নবী (সা) তাঁকে দুই দিন ভ্রমণ করার নির্দেশ দেন। দুই দিন ভ্রমণের পর আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর চিঠিখানা খুললেন এবং পড়লেন। যেখানে তাঁকে বলা হয়েছে, ‘আমার চিঠিখানা পড়ার পর তুমি মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাকলাহ্ পর্যন্ত ভ্রমণ করবে; তারপর সেখানে তাঁবু স্থাপন করবে এবং কুরাইশদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আমাদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করবে।’
— সীরাত ইবনে হিশামে বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, ইবনে ইসহাক বলেন:
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং আবু বকর (রা) ঘোড়ার পিঠে যাত্রা করছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁদের একজন বয়োবৃদ্ধ আরবের সাথে সাক্ষাৎ হল। তিনি (সা) ঐ ব্যক্তির কাছে কুরাইশ, মুহাম্মদ এবং তাঁর সাহাবীদের সম্পর্কে কোন তথ্য জানে কিনা জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আমি ততক্ষণ পর্যন্ত কোন তথ্য দেব না যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা কোত্থেকে এসেছ এ ব্যাপারে আমাকে বল। রাসূল (সা) বললেন, যদি তুমি আমাদের তথ্য দাও তাহলে আমরাও তোমাকে দেব। লোকটি বলল, তাহলে কি এটার বিনিময়ে ওটা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে তখন বলল, অমুক দিন, যদি লোকটি আমাকে সত্য বলে থাকে তাহলে তারা অমুক অমুক জায়গায় থাকবে; একথা বলে সে কুরাইশদের অবস্থানের জায়গার নাম উল্লেখ করে বললো। তারপর লোকটি বলল, তোমরা কোত্থেকে এসেছ? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: জলাশয় এবং তিনি তারপর তাঁর কাছ থেকে চলে এলেন। ইবনে ইসহাক বলেন, লোকটি তখন বলছিল, জলাশয় নাকি ইরাকের জলাশয়? তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের কাছে ফিরে গেলেন। যখন রাত নেমে এল তখন তিনি আলী ইবনে আবি তালিব, জুবায়ের ইবনে আল আওয়াম এবং সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস সহ আরও কিছু সাহাবীকে খবর সংগ্রহের জন্য বদরের কূপের দিকে পাঠালেন অর্থাৎ কুরাইশদের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য।’
— ইবনে ইসহাক আরও বলেছেন যে, ইবনে হিশাম তার সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘বাসবাস ইবনে আমরু এবং আদী ইবনে আবু আল জাগবা খবর সংগ্রহের জন্য গুপ্তচরবৃত্তি করতেন।’ তিনি বলেছেন, তারা কুরাইশদের ব্যাপারে দু’জন দাসীর কথোপকথন শুনতে পেলেন। শোনামাত্র তারা লাফিয়ে উটের পিঠে উঠলেন এবং যা শুনেছেন সে সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে অবগত করলেন।
যদিও এ তথ্যসমূহ কুরাইশদের সম্পর্কে ছিল – যারা ছিল মুসলিমদের সাথে প্রকৃত অর্থে যুদ্ধরত কাফের। কিন্তু, এ বিধানটি সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্ন কাফেরদের বেলায়ও প্রযোজ্য, কারণ তাদের সাথে যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে। পার্থক্য শুধু এতটুকু যে, প্রকৃত যুদ্ধরত কাফেরদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা বাধ্যতামূলক, কারণ শত্রুকে পরাজিত করার যুদ্ধকৌশল হিসাবে এটা প্রয়োজন। আর, অন্যদিকে সম্ভাব্য শত্রুভাবাপন্ন কাফেরদের জন্য বিষয়টি অনুমোদিত; কারণ তাদের সাথে যুদ্ধ কাঙ্খিত। তবে, যদি তাদের কাছ থেকে কোন ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, যেমন এটা যদি ধারণা করা হয় যে তারা প্রকৃত যুদ্ধরত কাফেরদের সহযোগিতা করবে কিংবা প্রকৃতঅর্থে তাদের সাথে যুদ্ধে যোগদান করবে, তবে তাদের বেলায়ও গোয়েন্দাগিরি করা ফরয হয়ে যায়।
সুতরাং, কাফের শত্রুদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করা মুসলিমদের জন্য অনুমোদিত এবং রাষ্ট্রকে বাধ্যতামূলকভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নির্দেশের কারণেই তা করতে হবে; কিংবা এক্ষেত্রে এ শারী’আহ্ মূলনীতিও প্রযোজ্য যে, ‘ফরয সম্পাদনের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন তাও ফরয।’
খিলাফত রাষ্ট্রের কোন নাগরিক, সে মুসলিম হোক বা না হোক, যদি কাফের শত্রুদের সাথে ঘন ঘন সাক্ষাৎ করে (তারা আমাদের সাথে প্রকৃত অর্থে যুদ্ধরত কাফের হোক বা আমাদের সম্ভাব্য শত্রু হোক, তারা নিজ দেশে অবস্থান করুক বা আমাদের দেশে অবস্থান করুক), তবে উক্ত নাগরিক সন্দেহভাজন ব্যক্তি বলে বিবেচিত হবে এবং তার উপর গোয়েন্দাগিরি করা ও তার ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করা অনুমোদিত হবে। কারণ, তারা এমন কারও সাথে সম্পর্ক রাখছে যাদের উপর গোয়েন্দাগিরি করা অনুমোদিত। এছাড়া, তারা যদি কাফেরদের সাহায্যর্থে গুপ্তচরবৃত্তি করে থাকে তাহলে রাষ্ট্রের প্রবল ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে, এ ধরনের নাগরিকদের উপর গোয়েন্দাগিরি করার পূর্বে উপরোল্লিখিত বিষয় দুটি ভালভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। যুদ্ধ বিভাগ সেইসব নাগরিকদের উপর গোয়েন্দাগিরি করবে যারা আমাদের সাথে যুদ্ধরত কাফেরদের সাথে ঘন ঘন সাক্ষাৎ করে এবং যারা শত্রুভাবাপন্ন কাফেরদের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সাথে তাদের দেশে ঘন ঘন সাক্ষাৎ করে। আর, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ সেইসব নাগরিকের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করবে যারা খিলাফত রাষ্ট্রে অবস্থানরত শত্রুভাবাপন্ন দেশের কাফেরদের কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করে।
আমীরুল জিহাদ-যুদ্ধ বিভাগ (সেনাবাহিনী)

যুদ্ধ বিভাগ হল রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এর প্রধানকে জিহাদের ব্যবস্থাপক না বলে আমীরুল জিহাদ বলা হয়। এর কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেনাবাহিনীর প্রধানদের আমীর নাম দিয়েছেন। ইবনে সাদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘যায়েদ বিন হারিছাহ হল মুসলিমদের আমীর; যদি তিনি শহীদ হয়ে যান তাহলে আমীর জাফর বিন আবি তালিব; এবং তিনি যদি শহীদ হন তাহলে আমীর আবদুল্লাহ ইবনে রুয়াহাহ্ এবং তিনিও যদি শহীদ হন তাহলে মুসলিমরা তাদের মধ্য হতে একজনকে আমীর নির্বাচিত করে নেবে।’
ইমাম বুখারী আব্দুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, “আল্লাহ্’র রাসূল (সা) মুতার যুদ্ধে যায়িদ ইবন হারিছাহ্’কে আমীর নিযুক্ত করেছিলেন…” আল বুখারী সালামাহ্ ইবন আল-আকওয়া বর্ণিত একটি হাদীস থেকে বর্ণনা করেছেন যে,“আমি যায়িদের সাথে একটি যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম এবং তাকে আমাদের আমীর নিযুক্ত করা হয়েছিল।”
আবুদল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেন যে: ‘নবী (সা) (যুদ্ধের উদ্দেশ্যে) একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং তাতে উসামা বিন যয়িদকে আমীর মনোনীত করেন। কেউ কেউ তার নেতৃত্বের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
‘তোমরা যদি তার নেতৃত্বে সন্দেহ প্রকাশ কর তাহলে তার পিতার নেতৃত্বেও সন্দেহ প্রকাশ করলে। আল্লাহ্’র কসম! সে অবশ্যই নেতৃত্বের যোগ্য…।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৪২৫০; সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-২৪৩৬)সাহাবীগণ (রা) সাধারণত মু’তার সেনাবাহিনীকে ‘আমীরদের সেনাবাহিনী’ বলে অভিহিত করতেন। ইবনে বুরাইদা হতে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন কাউকে কোন বাহিনী অথবা অভিযানের আমীর নিযুক্ত করতেন তখন তাকে উপদেশ দিতেন…।’
যুদ্ধবিভাগ সশস্ত্রবাহিনীর সাথে সম্পৃক্ত সব বিষয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করবে: যেমন, সেনাবাহিনী, সরঞ্জাম, অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং এ জাতীয় জিনিসপত্র। এছাড়াও মিলিটারী একাডেমী, সেনা মিশন, সেনাসদস্যদের ইসলামী এবং সাধারণ জ্ঞানার্জনের জন্য যা যা প্রয়োজন এবং যুদ্ধ ও এর পরিকল্পনা সম্পর্কিত সকল বিষয়ের দায়িত্বও যুদ্ধবিভােেগর উপর থাকবে। এছাড়া, মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত শত্রু রাষ্ট্রগুলোতে গোয়েন্দা প্রেরণ করাও যুদ্ধবিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব এবং এজন্য একটি বিশেষ বিভাগ থাকবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সীরাত থেকে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।
এসব কিছুই যুদ্ধবিভাগের তত্ত্বাবধানের থাকবে ও পরিচালিত হবে। কারণ, এ বিভাগের নামই নির্দেশ করে যে যুদ্ধ বিগ্রহের সাথে সম্পর্কযুক্ত সমস্ত কিছু এ বিভাগের অধীনে থাকবে। যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী প্রয়োজন। আর, সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব, চীফ অব স্টাফ, কর্মকর্তা ও সৈন্যের মাধ্যমে সংগঠিত ও প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
এছাড়া, সেনাবাহিনীকে সুসংগঠিত করার জন্য শারীরিক ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচীগুলোর মধ্যে যুদ্ধের কলাকৌশল, বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র পরিচালনা শিক্ষা, উন্নত ও আধুনিক অস্ত্রের ব্যবহার শিক্ষা ইত্যাদি অন্তর্ভূক্ত। সুতরাং, প্রযুক্তিগত ও সামরিক শিক্ষা, যুদ্ধকৌশল আয়ত্বের জন্য প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র পরিচালনা শিক্ষা ইত্যাদি সেনাবাহিনীর জন্য অপরিহার্য।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা মুসলিম উম্মাহ্’কে সমগ্র বিশ্বের কাছে ইসলামের আহ্বান পৌঁছে দেবার দায়িত্ব প্রদান করে সম্মানিত করেছেন। এ লক্ষ্যে তিনি দাওয়াত ও জিহাদকে ইসলাম প্রচারের পদ্ধতি হিসাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং তিনি মুসলিমদের উপর জিহাদকে ফরয করেছেন। তাই, জিহাদের প্রস্তুতি হিসাবে প্রতিটি মুসলিম পুরুষ, যারা পনের বছর বয়সে উপনীত হয়েছে তাদের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। আর, স্থায়ীভাবে সেনাবাহিনীতে যোগদানের ব্যাপারটি হল মুসলিমদের একটি সম্মিলিত দায়িত্ব (ফরযে কিফায়া)। সামরিক বাহিনীতে যোগদানের ব্যাপারে পবিত্র কুর’আনের সুস্পষ্ট দলিল আছে:
‘আর তাদের সাথে যুদ্ধ কর যতক্ষণ পর্যন্ত না ফিতনা নিশ্চিহ্ন হয়; এবং দ্বীন শুধুমাত্র আল্লাহ্’র জন্যই নির্দিষ্ট হয়।’[সূরা আনফাল : ৩৯]
এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর হাদীসও আছে,
‘মুশরিকদের বিরুদ্ধে তোমাদের সম্পদ, হাত ও জিব্বাহ দ্বারা জিহাদ কর।’ আনাস (রা) হতে আবু দাউদ এ হাদীস বর্ণনা করেন।
(সূনানে দাউদ, হাদীস নং-২৫০৪)শত্রুকে পরাজিত করা এবং নতুন নতুন ভূখন্ড জয় করার লক্ষ্যে শারী’আহ্ নির্ধারিত পথে জিহাদ পরিচালনার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য; এবং এ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা জিহাদের মতোই ফরয। কেননা শারী’আহ্ মূলনীতি হল, ‘ফরয সম্পাদনের জন্য যা করা প্রয়োজন সেটাও ফরয’। বস্তুতঃ জিহাদে যোগদানের জন্য চেষ্টা করা জিহাদের আদেশের অর্ন্তভুক্ত। কারণ, যখন আল্লাহ্ বলেন, ‘আর তাদের সাথে যুদ্ধ কর’- এটা একই সাথে যুদ্ধ করা এবং যে সমস্ত বিষয় যুদ্ধ করাকে সম্ভব করে তোলে তা করার নির্দেশ। এছাড়াও আল্লাহ্ বলেন,
‘আর প্রস্তূত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে’
[সূরা আনফাল:৬০]প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও উচ্চমান সম্পন্ন সামরিক দক্ষতা অর্জন যুদ্ধ প্রস্তুতির অন্তর্ভূক্ত; কেননা যুদ্ধ করাকে সম্ভব করে তোলার জন্য এ বিষয়গুলোর উপস্থিতি আবশ্যকীয়। সুতরাং, সামরিক প্রশিক্ষণ সামরিক শক্তিরই অংশ যা অবশ্যই অর্জন করতে হবে, যেমন: সামরিক যন্ত্রপাতি এবং সামরিক মিশন ইত্যাদির বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ ইত্যাদি।
আর, স্থায়ীভাবে সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণ কিংবা সেনাবাহিনী গঠনার্থে জনবল নিয়োগ করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে, সঠিক ও কার্যকরভাবে জিহাদ সম্পাদন এবং জিহাদের সাথে সম্পর্কিত সকল দায়িত্ব পালনের জন্য মুজাহিদিন-এর উপস্থিতি অপরিহার্য এবং এটা আমাদের জন্য ফরয। কারণ, শত্রু আক্রমণ করুক বা না করুক ইসলামের বাণীকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে অব্যাহত ভাবে জিহাদ পরিচালনা করা মুসলিমদের উপর অর্পিত ফরয দায়িত্ব। এজন্যই স্থায়ীভাবে সেনাবাহিনীতে অংশগ্রহণ করা মুসলিমদের জন্য ফরযে কিফায়াহ্ (সামষ্টিক দায়িত্ব) এবং এ দায়িত্ব জিহাদের শারী’আহ্ আদেশেরই অন্তর্ভূক্ত।
জিহাদে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে পনের বছর পূর্ণ হবার বাধ্যবাধকতা প্রসঙ্গে নাফিঈ’র বরাত থেকে আল বুখারী বর্ণিত হাদীসটি দলিল হিসাবে উপস্থাপন করা যায়:
“ইবনে উমর (রা) আমাকে (নাফিঈ’কে) বলেছেন যে, ওহুদের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর দিকে তাকালেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র চৌদ্দ এবং সে কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দেননি। আবার খন্দকের যুদ্ধের দিন তিনি আমার দিকে তাকালেন এবং যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিলেন। তখন আমার বয়স ছিল পনের।” (সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-২৬৬৪)
এছাড়া, নাফিঈ আরও বলেছেন যে, “যখন উমর বিন আবদুল আজিজ খলীফা ছিলেন তখন তাঁর সাথে আমি সাক্ষাৎ করতে যাই। আমি তাঁকে এ হাদীস সম্পর্কে বলার পর তিনি বললেন, ‘এটাই হল কৈশোর ও বয়ঃপ্রাপ্ত হবার মধ্যকার সীমা। সুতরাং, তিনি তাঁর গভর্ণরদেরকে যাদের পনের বছর হয়েছে তাদের উপর দায়িত্ব অর্পণ করার নির্দেশ দেন।” অর্থাৎ তাদের জন্য সামরিক কোষাগার থেকে অর্থ বরাদ্দের নির্দেশ দেন।
এ সকল দলিল-প্রমাণ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, কোন মুসলিম (পুরুষ) পনের বছর বয়সে পৌঁছানোর সাথে সাথে তাকে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হবে।
সেনাবাহিনীর বিভাগসমূহ
সেনাবাহিনীকে প্রধানত দু’ভাগে বিভক্ত করা হবে। প্রথম ভাগে থাকবে “রিজার্ভ সেনাবাহিনী”- যার মধ্যে জিহাদ করতে সক্ষম প্রতিটি মুসলিম পুরুষ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আর, দ্বিতীয় ভাগে থাকবে “নিয়মিত সেনাবাহিনী”- যাদের স্থায়ীভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেয়া হবে এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য যে কোন কর্মচারীর মতোই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের বেতনভাতা প্রদান করা হবে।
বস্তুতঃ রিজার্ভ বাহিনীর ধারণা এসেছে প্রতিটি মুসলিমের উপর জিহাদ ফরয হবার শারী’আহ্ অর্পিত বাধ্যবাধকতা থেকে। কারণ, হুকুম শারী’আহ্ প্রতিটি সক্ষম মুসলিমের উপর জিহাদ ফরয করেছে। তাই, এ নির্দেশ একইসাথে জিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেয়াকেও বাধ্যতামূলক করেছে। এছাড়া, নিয়মিত বাহিনী প্রস্তুত রাখার ব্যাপারটি “ফরয পালনের জন্য যা প্রয়োজন তা নিজেই ফরয” এ শারী’আহ্ মূলনীতির ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে। যেহেতু, একটি স্থায়ী ও নিয়মিত সেনাবাহিনী ব্যতীত জিহাদের দায়িত্ব অবিরামভাবে পালন করা এবং ইসলাম ও মুসলিমদের কাফিরদের হাত থেকে রক্ষা করা কোনভাবেই সম্ভব নয়, সেহেতু খলীফাকে অবশ্যই একটি স্থায়ী সেনাবাহিনী প্রস্তুত রাখতে হবে।
আর, সেনাসদস্যদের বেতন-ভাতার ক্ষেত্রে বলা যায় যে, তাদেরকে অবশ্যই রাষ্ট্রের অন্যান্য কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের মতোই দেখতে হবে। একজন অমুসলিমের উপর জিহাদ করার কোন বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু, কোন অমুসলিম যদি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করতে চায় তাহলে তাকে অনুমতি দেয়া হবে এবং এর জন্য তাকে বেতনভাতা প্রদান করাও শারী’আহ্ সম্মত হবে। কারণ, আল-জুহরী থেকে আল-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে,
‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) কিছু ইহুদীদের কাছ থেকে (যুদ্ধকালীন) সেবা গ্রহণ করেছিলেন এবং এ ব্যাপারে তাদের জন্য পারিশ্রমিকও বরাদ্দ করেছিলেন।’
এছাড়া, ইবনে হিশাম বর্ণনা করেছেন যে, ‘সাফওয়ান বিন উমাইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে হুনায়নে একটি অভিযানে যান, যদিও তখন সে মুশরিক ছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) নওমুসলিমদের (মু’য়াল্লাফাতি কুলুবিহীম) জন্য রক্ষিত গণীমতের মাল থেকে কিছু অর্থ তার জন্য বরাদ্দ করেন।’
সুতরাং, মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে অমুসলিমরাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবে এবং সেনাবাহিনীতে তাদের উপস্থিতির জন্য তাদের অর্থও প্রদান করা যাবে। তাছাড়া, ইজারা’র সংজ্ঞা অনুযায়ী নিয়োগকারী ব্যক্তি নিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে কোন উপযোগ গ্রহণ করলে ক্ষতিপূরণবাবদ সেই ব্যক্তি পারিশ্রমিক পেয়ে থাকে। তাই, এই নীতির ভিত্তিতে যে কেউ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে যে কাউকে কোন কাজে নিযুক্ত করতে পারে। সেনাবাহিনীতে অমুসলিম নিয়োগ করা এই ধরনের ইজারা’র চুক্তির মধ্যে পড়ে, কারণ এটাও এক ধরনের উপযোগ। সুতরাং, উপযোগ প্রাপ্তির লক্ষ্যে কাউকে নিযুক্ত করার ব্যাপারে যে শারী’আহ্ দলিল-প্রমাণগুলো পাওয়া যায় তার ভিত্তিতেই অমুসলিমদের সামরিকসেবা ও যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা বৈধ।
এটা গেল অমুসলিমদের কথা। আর, মুসলিমদের জন্য জিহাদ একটি ইবাদত হলেও ইজারা’র দলিল-প্রমাণের আওতায় সামরিক সেবা ও যুদ্ধের জন্য মুসলিমদেরও অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা যাবে। ইবাদতের ক্ষেত্রে কাউকে পারিশ্রমিক দেয়া তখনই বৈধ হবে যখন এর উপযোগ ঐ ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন,
‘পারিশ্রমিকের জন্য সবচাইতে উপযুক্ত কাজ হল আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দেয়ার মাধ্যমে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা।’ এ হাদীসটি ইবনে আব্বাস হতে বুখারী বর্ণনা করেছেন।
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৫৭৩৭)আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দেয়া একটি ইবাদত। যেহেতু, আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দেয়া, আযান দেয়া এবং নামাযে ইমামতি করা, এ সবকিছুর জন্যই যে কোন মুসলিমকে অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা অনুমোদিত সেহেতু সামরিক সেবা বা জিহাদের মত ইবাদতের জন্যও কাউকে অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা শারী’আহ্ সম্মত হবে। কেননা এসব কাজের উপযোগিতা (benefit) সম্পাদনকারী ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায়। তাছাড়া, মুসলিমদের জন্য জিহাদ ফরয হওয়া সত্ত্বেও অর্থের বিনিময়ে কোন মুসলিমকে জিহাদে নিযুক্ত করার ব্যাপারে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে, যা কিনা রাসূল (সা) এর হাদীসে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে। আবদুল্লাহ বিন আমরু থেকে আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল (সা) বলেছেন:
‘আল গাজীর জন্য বেতন-ভাতা রয়েছে এবং আল জা’ইলের জন্যও বেতন-ভাতা রয়েছে …।’
(সূনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৫২৬)আল গাজী এমন একজন ব্যক্তি যে নিজের জন্য জিহাদ করেছে। আর, আল জাইল এমন একজন ব্যক্তি যার পক্ষে আরেকজন পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জিহাদ করেছে। আল মুহিত অভিধানে এ ব্যাপারে উল্লেখ আছে যে, আল জা’আলা শব্দের অর্থ হলো কাউকে তার কাজের বিনিময়ে যে পরিমাণ পারিশ্রমিক দেয়া হয় এবং একজন মুজাহিদ (গাজী) যদি তোমার তরফ থেকে নিয়োগ পেয়ে জিহাদ করে এবং তার কাজের বিনিময়ে যে পরিমান পারিশ্রমিক দেয়া হয় তা হল জু’ল”। সুতরাং এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে একজনের পক্ষে অন্য আরেকজন জিহাদ করতে পারবে এবং জিহাদের জন্য কাউকে অর্থের বিনিময়ে নিযুক্ত করা যাবে।
জুবায়ের বিন নুফায়ের থেকে আল বায়হাকী বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন,
‘আমার উম্মতের মধ্যে যারা জিহাদ করে এবং পারিশ্রমিক গ্রহণ করে এবং তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তিশালী করে তারা যেন মুসার মাতার মত – যে মুসাকে দুধ পান করিয়েছে এবং তার আজর (পুরষ্কার) গ্রহণ করেছে।’
এখানে আজর বলতে পারিশ্রমিক বুঝানো হয়েছে। সুতরাং, সৈন্যদের অন্যান্য সরকারী কর্মচারীদের মতই বেতন-ভাতা দেয়া যাবে।
মুসলিম সেনাগণ বেতন-ভাতা গ্রহণ করলেও, আল্লাহ্’র কাছ থেকে তারা পুরষ্কার (সওয়াব) থেকে বঞ্চিত হবে না। আর এটা জায়েয হয়েছে আল বুখারীর হাদীস থেকে যেখানে আল্লাহ্’র কিতাব শিক্ষা দিয়ে পারিশ্রমিক নিতে বলা হয়েছে – যা মূলতঃ একটি ইবাদত। অর্থাৎ এ ধরনের শিক্ষক তার নিয়্যত অনুযায়ী আল্লাহ্’র কাছ থেকেও তার জন্য নির্দিষ্ট সওয়াব লাভ করবে।
ইসলামিক সেনাবাহিনী মূলতঃ একটি সেনাবাহিনী যা বিভিন্ন কন্টিনজেন্টের (contingents) সমন্বয়ে গঠিত। এইসব কন্টিনজেন্টকে বিভিন্ন সংখ্যা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা যায় যেমন: প্রথম, দ্বিতীয় ইত্যাদি বা বিভিন্ন প্রদেশের নামেও এদের নামকরণ করা যাবে, যেমন: আল শামের সেনাবাহিনী, মিশরের সেনাবাহিনী, সা’নার সেনাবাহিনী প্রভৃতি।
ইসলামিক সেনাবাহিনী বিশেষ ক্যাম্পে অবস্থান করে। একটি ক্যাম্পে সেনাগণ একটি ইউনিট হিসেবে অথবা একটি ইউনিটের অংশ বা অনেকগুলো ইউনিট হিসেবে থাকতে পারে। এই ক্যাম্পগুলোকে প্রত্যেকটি প্রদেশে স্থাপন করা উচিত এবং কিছু কিছু ক্যাম্পকে সেনাঘাঁটিতে রূপান্তর করা উচিত। কিছু কিছু ক্যাম্প ভ্রাম্যমান হবে এবং এগুলো হবে বিশাল। এ ক্যাম্পসমুহের নাম দেয়া যেতে পারে, যেমন: হাব্বানিয়ার ক্যাম্প। এবং প্রত্যেক ক্যাম্পের একটি করে ব্যানার থাকতে পারে।
উল্লেখিত কিছু কিছু বিষয় খলীফার জন্য মুবাহ (অনুমোদিত, permitted matter), যেমন: উলাই’য়াহর নাম অনুসারে সেনাবাহিনীর নামকরণ করা, কোন বিশেষ সংখ্যা দেয়া ইত্যাদি সবই খলীফার মতামত ও ইজতিহাদের উপর নির্ভর করে। আর অন্যান্য বিষয়সমূহের সাথে বাধ্যবাধকতার একটি ব্যাপার আছে, যেমন: রাষ্ট্রকে রক্ষা করবার প্রয়োজনীয়তা, সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা, সীমান্তে সেনাবাহিনী প্রেরণ, সব উলাই’য়াহ্ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যাম্প স্থাপন ইত্যাদি।
উমর আল খাত্তাব (রা) সব উলাই’য়াহ্ জুড়ে তার সেনাবাহিনীর ক্যাম্প ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি একটি ইউনিট ফিলিস্তিনে এবং একটি ইউনিট আল মুসুলে স্থাপন করেছিলেন ইত্যাদি। তিনি অপর একটি ইউনিটকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে রাখতেন এবং আরেকটিকে এক মুহূর্তের নোটিশে মার্চ করবার জন্য প্রস্তুত রাখতেন।
খলীফা সেনাবাহিনীর প্রধান
খলীফা হলেন সেনাবাহিনীর প্রধান এবং তিনিই চীফ অব স্টাফ, প্রত্যেক ব্রিগেডের আমীর, প্রত্যেক ডিভিশনের কমান্ডার নিয়োগ দিয়ে থাকেন। আর ব্রিগেডের কমান্ডারগণ সেনাবাহিনীর অন্যান্য নেতৃত্ব নিয়োগ দিয়ে থাকেন। সেনাবাহিনীতে কোন স্টাফ নিয়োগ হয়ে থাকে সেনাবাহিনীর সংস্কৃতি ও চীফ অব স্টাফের অনুমোদনক্রমে।
খলীফা সেনাবাহিনীর প্রধান। কারণ, খলীফা হলেন শারী’আহ্ আইনকানুন বাস্তবায়ন ও বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ইসলাম পৌঁছে দেবার জন্য সব মুসলিমের সার্বজনীন নেতৃত্ব। আর, বিশ্বের দরবারে ইসলাম পৌঁছে দেয়ার শারী’আহ্ নির্ধারিত পদ্ধতি হল জিহাদ। সুতরাং, খলীফাকেই জিহাদ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে, কারণ খিলাফতের চুক্তি তার সাথেই সম্পাদিত হয়েছে। সেকারণে তিনি ছাড়া আর কেউই এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। খলীফা নিজের কাঁধে এ দায়িত্ব তুলে নেবেন। প্রত্যেক মুসলিমের উপর জিহাদের ফরয দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে খলীফা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। সুতরাং জিহাদে অংশ নেয়া একটি বিষয় এবং জিহাদের দায়িত্ব কাধে তুলে নেয়া আরেকটি বিষয়। জিহাদে অংশ নেয়া প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য কিন্তু জিহাদের পুরো দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়ার একমাত্র দায়িত্বশীল হলেন খলীফা।
খলীফা তার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের আওতায় রেখে তার পক্ষে অন্য কাউকে এ কাজের দায়িত্বভার অর্পণ করতে পারেন। তবে সে ব্যক্তি খলীফার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান ব্যতীত স্বাধীনভাবে এ কাজ করতে পারবে না। এ প্রতিনিধিত্ব খলীফার সহকারীদের মত নয়। খলীফাকে এ ব্যাপারে নিয়মিত রিপোর্ট করার অর্থ হল খলীফার পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি খলীফার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানের থেকে এ কাজ সম্পাদন করবেন। প্রত্যক্ষ তত্তাবধান ও পর্যবেক্ষণের শর্তে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব খলীফা পছন্দমত যে কাউকে দিতে পারেন। খলীফাকে নামমাত্র প্রধান রেখে তার তত্তাবধান ও পর্যবেক্ষণ ব্যতীত কাউকে সেনাবাহিনী বা জিহাদের দায়িত্ব অর্পণ করা অনুমোদিত নয়। কেননা খিলাফতের চুক্তি তার সাথেই সম্পাদিত হয়েছে এবং তিনিই এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল। অনৈসলামিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের প্রধান নামে মাত্র সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হন এবং আরেকজন ব্যক্তি স্বাধীনভাবে সেনাবাহিনীকে পরিচালনা করেন – যা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। এটি এমন একটি বিষয় যা শারী’আহ্ কর্তৃক অনুমোদিত নয়। বরং, হুকুম শারী’আহ্ খলীফাকে সেনাবাহিনীর প্রকৃত নেতৃত্ব গ্রহণ করতে বাধ্য করেছে। এছাড়া, সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত বিষয় সমূহে নেতৃত্ব দেবার ক্ষেত্রে খলীফা তার পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করবার জন্য যে কাউকে নিযুক্ত করতে পারেন। তবে এ বিষয়সমূহও খলীফার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকতে হবে।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজেই সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব পালন করতেন, যুদ্ধের ময়দানে নেতৃত্ব দিতেন এবং যে সব যুদ্ধে তিনি (সা) অংশগ্রহণ করতেন না সেসব যুদ্ধের নেতৃত্ব নির্ধারণ করে দিতেন – যেগুলোকে মূলতঃ অভিযান বলা হয়। প্রত্যেক অভিযানেই তিনি কমান্ডার ঠিক করে দিতেন। এমনকি কিছু কিছু অভিযানে সাবধানতাবশতঃ কোন কমান্ডার নিহত হলে কে তার স্থলাভিষিক্ত হবে সেটাও আগে থেকে ঠিক করে দিতেন, যেমনটি দিয়েছিলেন মু’তার অভিযানের সময়। আবদুল্লাহ বিন উমরের (রা) রেওয়াতে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে,
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) জায়েদ বিন হারিসকে মু’তার যুদ্ধে সৈন্যদের আমীর নিযুক্ত করলেন; অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, ‘যদি তিনি শহীদ হয়ে যান তাহলে আমীর হবে জাফর বিন আবি তালিব; আর তিনিও যদি শহীদ হন তাহলে আমীর হবে আবদুল্লাহ ইবনে রুয়াহাহ’’।
সুতরাং, খলীফাই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি সেনাবাহিনীর আমীর, কমান্ডার, বিভিন্ন বিভাগের আমীরদের নিযোগ দেবেন ও পতাকা বেঁধে দেবেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক মু’তায় প্রেরিত বাহিনী বা উসামার বাহিনী, যে বাহিনীকে সিরিয়া প্রেরণ করা হয়েছিল – তা মূলতঃ একটি ব্রিগেড। কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা) উসামাকে পতাকা বেঁধে দিয়েছিলেন। এছাড়া, আরব উপদ্বীপে যেসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং পরে তারা মদীনায় ফেরত এসেছে, যেমন: সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসের (রা) মক্কা অভিমুখে গমণকৃত বাহিনী – এটা ছিল একটি ডিভিশন। এ থেকে নির্দেশনা পাওয়া যায় যে, বিভিন্ন ব্রিগেডের আমীর ও ডিভিশনের কমান্ডারদেরও খলীফা নিয়োগ দিয়ে থাকেন। তবে ব্রিগেডের আমীর ও ডিভিশনের কমান্ডার ব্যতীত অন্যান্য আমীরদের রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিয়োগ দিয়েছিলেন বলে জানা যায় না। এর অর্থ হল, অভিযানের প্রধানের উপর এ দায়িত্ব তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া, কারিগরী বা প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিষয়ের প্রধান চীফ অব স্টাফকেও খলীফা নিয়োগ দেবেন। তবে, তিনি খলীফার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ছাড়া স্বাধীনভাবে তার কাজ পরিচালনা করতে পারেন – যদিও তাকে সবসময়ই খলীফার নির্দেশাধীন থাকতে হবে।
জিহাদ

জিহাদ হল ইসলামের সর্বোচ্চ চূড়া এবং বিশ্বের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেবার জন্য ইসলাম নির্ধারিত মৌলিক পদ্ধতি। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ইসলামের বিধিবিধান বাস্তবায়নের পর ইসলামের দাওয়াতী কাজ পরিচালনা করা ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান কাজ।
আল্লাহ্’র বাণীকে সুউচ্চে তুলে ধরার জন্য যে যুদ্ধ করা হয় তাকেই জিহাদ বলে। জিহাদ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সেনাবাহিনী এবং সেইসাথে প্রস্তুত করা প্রয়োজন এই বাহিনীর নেতৃত্ব, চীফ অফ স্টাফ, কর্মকর্তা ও সৈনিকদল। এছাড়া, এই সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহ এবং যুদ্ধ সরঞ্জামও প্রয়োজন, যার জন্য দরকার শিল্প কারখানা। সুতরাং, শিল্পকারখানা হচ্ছে সেনাবাহিনী ও জিহাদের জন্য একটি অপরিহার্য বিষয়। এই বাস্তবতার কারণে রাষ্ট্রের সব শিল্পকারখানা অবশ্যই যুদ্ধ শিল্পের (war industry) ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা উচিত।
এছাড়াও আভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা যোদ্ধাদের শক্তিবৃদ্ধির সহায়ক হিসাবে কাজ করে। কারণ, যদি আভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিরাপদ ও স্থিতিশীল না হয়, তবে তা জিহাদে গমনকারী সৈন্যদের মন ও মগজ বিক্ষিপ্ত করতে পারে। বস্তুতঃ সেনাবাহিনী জিহাদে লিপ্ত থাকার সময় আভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা তাদের কর্মদক্ষতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যার পরিণতিতে সেনাবাহিনী ক্রমশঃ দূর্বল হয়ে যায় এবং এ পরিস্থিতি যুদ্ধ অব্যাহত রাখা দুঃসাধ্য করে তোলে।
বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্কও ইসলামী দাওয়াতী কার্য পরিচালনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
এ কারণে এই চারটি বিভাগ যথা: সেনাবাহিনী, আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, শিল্প এবং বৈদেশিক সম্পর্ক – খলীফা নিযুক্ত একজন আমীরের নেতৃত্বে একটি মাত্র বিভাগের আওতায় নিয়ে আসা যায়। কারণ, এ চারটি বিষয়ই জিহাদের সাথে সম্পৃক্ত।
তবে, এ চারটি বিভাগকে পরস্পর পরস্পর থেকে আলাদা রাখাও অনুমোদিত। সেক্ষেত্রে, প্রত্যেক বিভাগের জন্য খলীফা একজন ব্যবস্থাপক এবং সেনাবাহিনীর একজন আমীর নিযুক্ত করবেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণত বিভিন্ন অভিযানে প্রেরণের সময় নিজেই সেনাবাহিনীর আমীর নিযুক্ত করতেন – যার সাথে শিল্পের কোন সম্পর্ক ছিল না অর্থাৎ শিল্প বিভাগের জন্য তিনি (সা) অন্য কাউকে নিযুক্ত করতেন। আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যেমন: পুলিশ, টহল পুলিশ, হাইওয়ে ডাকাতি বা সাধারণ চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধ করা ইত্যাদি। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সময়ে বৈদেশিক সম্পর্ক যে আলাদা একটি বিভাগের অধীণে ছিল তা বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের কাছে তাঁর প্রেরিত চিঠি থেকেই বোঝা যায়।
একজন ব্যবস্থাপক নিয়োগের মাধ্যমে প্রতিটি বিভাগকে পরস্পর পরস্পর থেকে পৃথক করার বিষয়টি নিম্নোক্ত দলিলগুলো দ্বারা প্রমাণিত:
প্রথমত: সেনাবাহিনী
— রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুতার যুদ্ধে যায়েদ বিন হারিস (রা) কে আমীর নিযুক্ত করেছিলেন এবং তিনি শহীদ হয়ে গেলে পর্যায়ক্রমে যারা নেতৃত্বে থাকবে তাদের নামও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। ইবনে সা’দ থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছিলেন,
‘যায়েদ বিন হারিস সৈন্যদের আমীর; যদি তিনি শহীদ হয়ে যান তাহলে জাফর বিন আবি তালিব; এবং তিনি যদি শহীদ হন তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে রুয়াহাহ্ এবং তিনিও যদি শহীদ হন তাহলে মুসলিমগই তাদের মধ্য হতে একজনকে আমীর নির্বাচিত করে নেবে।’
আবুদল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে আল বুখারী বর্ণনা করেছেন যে,
‘মু’তার অভিযানে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যায়েদ বিন হারিসকে আমীর নিযুক্ত করলেন…’
সালামাহ্ ইবনে আল আকওয়া থেকে আল বুখারী আরও বর্ণনা করেছেন যে, ‘আমি যায়েদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম এবং তাকে আমাদের আমীর নিযুক্ত করা হয়েছিল।’
আবুদল্লাহ বিন উমর (রা) থেকে বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে,
‘নবী (সা) একটি সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং তাতে ওসামা বিন যায়েদকে আমীর মনোনীত করেন। কেউ কেউ তার নেতৃত্বের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, ‘তোমরা যদি তার নেতৃত্বে সন্দেহ প্রকাশ কর তাহলে তার পিতার নেতৃত্বেও সন্দেহ প্রকাশ করলে। আল্লাহ্’র কসম! সে অবশ্যই নেতৃত্বের যোগ্য…।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৪২৫০; সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-২৪৩৬)সাহাবীগণ (রা) সাধারণত মু’তার সেনাবাহিনীকে ‘আমীরদের সেনাবাহিনী’ নামে অভিহিত করতেন। ইবনে বুরাইদা হতে মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে, ইবন বুরাইদা বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন কাউকে কোন বাহিনীর অথবা অভিযানের আমীর নিযুক্ত করতেন তখন উপদেশ দিতেন…।”
— আবু বকর (রা) খালিদ (রা) কে মুরতাদদের বিরুদ্ধে ও ইয়ারমুকের যুদ্ধে আমীর নিযুক্ত করেন। খলীফা বর্ণনা করেছেন যে, ‘তিনি খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে লোকদের উপর নেতৃত্ব দিলেন এবং ছাবিত ইবনে কায়েস ইবনে সাম্মাসকে নিযুক্ত করলেন বিশেষ করে আনসারদের উপর। যদিও খালিদ তাদের সবাইকেই নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন।” ইয়ারমুকের যুদ্ধে খালিদের নেতৃত্বের অধীণে আবু বকর আল শামের সেনাবাহিনীকে একত্রিত করেছিলেন। ইবনে জারীর বলেছেন, ‘তিনি ইরাকে অবস্থানরত খালিদকে আল শামের সেনাবাহিনীর আমীর নিযুক্ত করার জন্য ডেকে পাঠান।’ এছাড়া, উমর (রা) আল-শামের সেনাবাহিনীকে আবু উবাইদা’র নেতৃত্বাধীনে একত্রিত করেছিলেন। ইবনে আসকীর বলেছেন, ‘এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি আশ-শামে আমীরদের আমীর নিযুক্ত করেন।’
দ্বিতীয়ত: আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা
আল বুখারী আনাস (রা) হতে বর্ণনা করেছেন যে,
‘আমীরদের সাথে কথা বলার সময় কায়েস ইবনে সা’দ পুলিশের মত রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সামনে থাকত।’
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৭১৫৫)এখানে কায়েস ইবনে সা’দ ইবনে উবাদাহ্ আল আনসারী আল খারাজীকে বুঝানো হয়েছে।
আল তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে,
‘আমীরদের সাথে কথা বলার সময় কায়েস ইবনে সা’দ পুলিশের মত রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সামনে থাকত। আল আনসারী বলেন, এর অর্থ হল তাকে এ ব্যাপারে দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল।’ ইবনে হাব্বান এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘মুশরিকদের সাথে বৈঠকের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নিরাপত্তার ভার কায়েস ইবনে সা’দ এর উপর ন্যস্ত থাকত।’
আল বুখারী থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার নবী (সা) আলী ইবনে আবি তালিব (রা) কে একস্থানে প্রেরণ করেন, যে সম্পর্কে তিনি (আলী) বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে, আল জুবায়ের এবং আল মারছাদকে প্রেরণ করলেন – আমরা প্রত্যেককেই অশ্বারোহী যোদ্ধা ছিলাম। তিনি (সা) বললেন, “রাওদাত হাজ্ব এ না পৌঁছানো পর্যন্ত তোমরা যাত্রা অব্যাহত রাখবে”। আবু আওয়ানা বলেন জায়গাটির নাম ছিল রাওদাত হাজ্ব। আরেকটি বর্ণনায় জায়গাটির নাম বলা হয় খাক্ব। ‘সেখানে একজন মহিলা আছে যার কাছে মুশরিকদের উদ্দেশ্যে লেখা হাতিব ইবনে আবি বালতাহ-এর একটি চিঠি রয়েছে। এটা আমার কাছে নিয়ে আসবে।’ সুতরাং আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ঘোড়া ছুটালাম যতক্ষণ না রাসূলুল্লাহ্ (সা) নির্দেশিত স্থানে পৌঁছালাম। মহিলাটি উটের পিঠে চড়ে যাত্রা করছিল। হাতিব মক্কাবাসীকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর অভিযান সম্পর্কে অবহিত করে পত্র লিখেছিল। আমরা বললাম, ‘তোমার নিকট রক্ষিত চিঠিটা কোথায়?’ প্রত্যুত্তরে সে বলল, ‘আমার কাছে কোন চিঠি নেই।’ আমরা তার ঘোড়াকে বসিয়ে জিনের ভেতর খুঁজলাম, কিন্তু কিছুই পেলাম না। আমি বললাম, ‘বন্ধুগণ, আমি তো তার কাছে কোন চিঠি পেলাম না। কিন্তু, আমরা জানি রাসূলুল্লাহ্ (সা) মিথ্যে বলতে পারেন না।’ অতঃপর আলী (রা) প্রতিজ্ঞা করলেন এই বলে যে, ‘যার নামে শপথ নেয়া হয় তার নামে বলছি! তোমাকে অবশ্যই চিঠিটা বের করে দিতে হবে। অন্যথায় আমি তোমার কাপড় খুলে ফেলব।’ তারপর উক্ত মহিলা তার কোমড় বন্ধনীর নীচ থেকে চিঠিটি বের করে আনলো যা দিয়ে সে তার কাপড় বেঁধে রেখেছিল। অতঃপর তারা চিঠিটি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে নিয়ে গেলেন…।”
তৃতীয়ত: শিল্প
রাসূলুল্লাহ্ (সা) পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র (catapult) ও অস্ত্র সজ্জিত বাহন (armored car) তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। আল বায়হাকী তার সুনান গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, আবু উবাইদা (রা) বলেছেন, ‘তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তায়েফের চারদিকে অবরোধ আরোপ করলেন এবং পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র তৈরী করে সতের দিন যাবত তা তাক করে রাখলেন।’ আবু দাউদ আল-মারাসিল গ্রন্থে মাখুল থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ‘রাসূলুল্লাহ্ (সা) তায়েফের লোকদের বিরুদ্ধে পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র তৈরী করেন।’ আল সানানী সুবুল আল-সালাম গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে, এই হাদীসের বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। এছাড়া, সীরাত হালাবিয়্যা গ্রন্থের লেখক বলেছেন, ‘সালমান ফারসী (রা) তাঁকে (সা) এ ব্যাপারে পরামর্শ প্রদান করেন। তিনি (রা) বলেন, ‘পারস্যে আমরা দূর্গের উপরে পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র মোতায়েন করি এবং তা দিয়ে শত্রুদের আঘাত করি।’ সালমান (রা) নিজের হাতে এ যন্ত্র তৈরি করেছিলেন বলে জানা যায়।’ সাদ ইবনে আল মু’য়াজ থেকে আল কাইম এবং ইবনে হিশাম ইবনে ইসহাকের সীরাত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন যে,
“তায়েফের দূর্গের কাছাকাছি অবরোধ আরোপের দিন থেকে, আল্লাহ্’র রাসূল (সা) এর সাহাবীদের মধ্য হতে কিছু ব্যক্তি ট্যাঙ্কের মতো এক বাহনে চড়ে দূর্গের দেয়ালের কাছাকাছি আক্রমণ করার চেষ্টা করছিল যেন খুব সহজেই দূর্গের প্রতিরক্ষা দেয়াল ধ্বসিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু, অগ্রসর হওয়া মাত্রই ছাকিফ গোত্রের লোকেরা তাঁদের দিকে জ্বলন্ত ধাতুর টুকরা ছুঁড়ে মারতে থাকে যাতে ট্যাঙ্কগুলো থেকে তারা মুক্তি পায়। এরপর মুসলিমরা আত্মরক্ষার্থে পালাতে থাকে এবং এ সুযোগে তারা মুসলিমদের দিকে বৃষ্টির মতো তীর নিক্ষেপ করে বেশকিছু মুসলিম যোদ্ধাকে হত্যা করে ফেলে।”
এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, সালমান (রা) পাথর নিক্ষেপের যন্ত্র তৈরির পরামর্শ দেন এবং তিনি নিজ হাতে এটি প্রস্তত করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে, এ সমস্ত ঘটনা অবশ্যই রাসূল (সা) এর নির্দেশ অনুযায়ীই ঘটেছিল। সীরাত গ্রন্থে আল-হালাবিয়্যার বক্তব্য লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ‘তিনি তাঁকে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।’ অর্থাৎ, রাসূল (সা) কে এ ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল।
এসব বর্ণনা থেকে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে তা হল, সমরশিল্প গড়ে তোলার দায়িত্ব হল খলীফার এবং এ কাজ পরিচালনার জন্য তিনি যাকে উপযুক্ত মনে করেন তার কাছ থেকে এ বিষয়ে সহায়তা নিতে পারেন। এজন্য শিল্পকারখানার একজন আমীরের চাইতে বরং ব্যবস্থাপকের দরকার। সালমান (রা) সমরশিল্পের আমীর ছিলেন না বরং পাথর ছোঁড়ার যন্ত্র তৈরীর ব্যবস্থাপক ছিলেন; এবং এক্ষেত্রে, তাঁকে হয়ত নিজের হাতে কাজ করতে হয়েছিল।
এছাড়া, সমরশিল্প প্রতিষ্ঠা করা বাধ্যতামূলক, কারণ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেন,
‘আর প্রস্তুত কর তাদের সাথে যুদ্ধের জন্য যাই কিছু সংগ্রহ করতে পার নিজের শক্তি সামর্থ্যরে মধ্যে থেকে এবং পালিত ঘোড়া থেকে, যেন ভীতির সঞ্চার হয় আল্লাহ্’র শত্রুদের উপর এবং তোমাদের শত্রুদের উপর আর তাদেরকে ছাড়া অন্যান্যদের উপর ও যাদেরকে তোমরা জান না; [কিন্তু] আল্লাহ্ তাদেরকে জানেন।’
[সূরা আনফাল : ৬০]বস্তুতঃ প্রস্তুতি ছাড়া এই ভয় সৃষ্টি করা সম্ভব নয় এবং প্রস্তুতির জন্য দরকার কলকারখানা। আসলে, উপরোক্ত আয়াতে পরোক্ষভাবে সমরশিল্পের প্রয়োজনের অপরিহার্যতাকেই নির্দেশ করা হয়েছে (দালালাত আল-ইলতিযাম)। আর, পরোক্ষ এ নির্দেশের মাধ্যমে মূলতঃ সমরশিল্প প্রতিষ্ঠা করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কারণ, শারী’আহ্ মূলনীতি অনুযায়ী ‘ফরয সম্পাদনের জন্য যা প্রয়োজন সেটিও ফরয’। জিহাদকে যে সব দলিলের মাধ্যমে ফরয করা হয়েছে, তার পাশাপাশি এই দালালাত আল-ইলতিযাম (প্রয়োজনের অপরিহার্যতা) হল সমরশিল্প বা কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করার বাধ্যবাধকতার আরও একটি দলিল।
তবে, রাষ্ট্র কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই সমস্ত কলকারখানাগুলো শুধুমাত্র সমরশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কলকারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাষ্ট্রকে অন্যান্য শিল্পকারখানাও প্রতিষ্ঠা করতে হবে যা আমাদের প্রণীত “খিলাফত রাষ্ট্রের কোষাগার সমূহ” (The Funds of Khilafah State) গ্রন্থে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে :
শিল্প কারখানাসূহঃ জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ দেখাশোনা করার যে বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের রয়েছে তার উপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রকে অবশ্যই দু’ধরনের কলকারখানা স্থাপন করতে হবে:
প্রথম ধরন: যে সব কারখানা গণমালিকানাধীন সম্পদের সাথে সম্পর্কযুক্ত, যেমন: খনিজ সম্পদ আহরণ, বিশোধন, বিগলন এবং তেল সম্পদ উত্তোলন ও পরিশোধন ইত্যাদির সাথে সম্পর্কযুক্ত শিল্পকারখানা। এসব কারখানা যেসব দ্রব্যাদি উৎপাদন করে সেগুলো গণমালিকানাধীন, তাই এ কারখানাগুলোও হবে গণমালিকানাধীন। ইসলামে যেহেতু গণমালিকানাধীন সম্পত্তি সকল মুসলিমের সম্পদ, সেহেতু এ সমস্ত কারখানার মালিকও সকল মুসলিম এবং রাষ্ট্র মুসলিমদের পক্ষ হতে এগুলো প্রতিষ্ঠা করবে।
দ্বিতীয় ধরন: শিল্পকারখানা, যেগুলো ভারী শিল্প ও সমরাস্ত্র শিল্পের সাথে জড়িত। এ ধরনের কারখানা ব্যক্তিখাতেও থাকতে পারে যেহেতু এগুলো ব্যক্তিগত সম্পদের অন্তর্গত। তবে এ ধরনের কারখানা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচুর বিনিয়োগের দরকার যা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে অসম্ভব। এছাড়া, আজকের দিনে অস্ত্র উৎপাদনকারী ভারী শিল্পকারখানাগুলো এখন আর ব্যক্তিমালিকানার অধীন নয়, যেমনটি ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়। বরং, এগুলোর মালিক এখন হল রাষ্ট্র; মূলতঃ দায়িত্ব পালনের দায়বদ্ধতা থেকেই রাষ্ট্র এক্ষেত্রে অর্থায়ন করে থাকে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে যখন অস্ত্রশস্ত্রের ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জামসমূহ অনেক ব্যয়বহুলও হয়ে গেছে… সুতরাং অস্ত্র উৎপাদনের জন্য ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে, এর অর্থ এই নয় যে, এর মাধ্যমে এক্ষেত্রে ব্যক্তিখাতকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এখানে বোঝানো হচ্ছে যে, এইসব শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের অর্থাৎ খলীফার। খলীফা এ সকল কাজ সম্পাদনের জন্য একজন মহাব্যবস্থাপক নিয়োগ করবেন, যিনি খলীফা, তার ডেপুটি কিংবা খলীফা যাকে পছন্দ করেন তার সাথে সরাসরি যুক্ত থাকবেন।
চতুর্থত: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
এটা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে খলীফার নির্বাহী সহকারী খিলাফত রাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনগণ (রা) তাদের সচিবদের (নির্বাহী সহকারী) মাধ্যমে সরাসরি এসব সম্পর্ক রক্ষা করতেন। এছাড়া, হুদাইবিয়া সন্ধির সময় রাসূল (সা) নিজেই মুশরিকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন এবং শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেছেন। তাছাড়া উমর (রা) থেকে জানা যায় কিসরা থেকে যখন একটি প্রতিনিধি দল তাঁর কাছে এসেছিল, সে সময় তারা তাঁকে মদীনাতুল মনোয়ারার একটি ফটকে ঘুমন্ত অবস্থায় পেয়েছিল।
সুতরাং, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, খলীফা তার নির্বাহী সহকারীর মাধ্যমে সরাসরি বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়গুলো দেখতে পারেন অথবা একজন ব্যবস্থাপক নিয়োগ করে তা পরিচালিত করতে পারেন।
সুতরাং, এ চারটি বিভাগকে একটি বিভাগের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করে আমীরুল জিহাদের বিভাগ নামে স্বতন্ত্র একটি বিভাগ করা যেতে পারে, কারণ এরা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ।
আবার, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর মত এগুলোকে স্বতন্ত্রও রাখা যেতে পারে।
এ চারটি বিভাগের কাজের পরিধি ব্যাপক। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, এ বিভাগগুলোর মধ্যে অনেক বিষয় অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগ, আভ্যন্তরীণ সমস্যা, বিভিন্ন রাষ্ট্র, তাদের এজেন্ট ও স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদ কর্তৃক গৃহীত গোপন পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্রের জাল উম্মোচন এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও আর্ন্তজাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার নিরসন ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে শিল্পকারখানার বিভিন্ন বিভাগ ও উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহার ইত্যাদি। তবে, আমীরুল জিহাদের আবশ্যিক ক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়, যেখানে তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়ে যান। কারণ, এক্ষেত্রে যদি তার তাকওয়ার অবনতি ঘটে তবে তা রাষ্ট্রের জন্য বিরাট ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য এ চারটি বিভাগকে আমরা একটি অপরটি থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেগুলো কিনা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে স্বতন্ত্র অবস্থায় সরাসরি খলীফার সাথে যুক্ত থাকবে। এ বিভাগগুলো হল:
গভর্ণরবৃন্দ (উলা’হ্)

ওয়ালী (গভর্ণর) হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি যাকে খলীফা খিলাফত রাষ্ট্রের ভেতর কোন একটি উলাই’য়াহ্ বা প্রদেশে শাসক এবং আমীর হিসেবে নিয়োগ দিয়ে থাকেন।
ইসলামী রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত ভূমিসমূহকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভক্ত করা হবে এবং প্রতিটি প্রদেশ একটি উলাই’য়াহ হিসেবে পরিগণিত হবে। প্রতিটি উলাই’য়াহকে আবার কয়েকটি জেলায় বিভক্ত করা হবে এবং প্রতিটি জেলাকে ইমালাহ্ বলা হবে। উলাই’য়াহ দায়িত্বে যাকে নিযুক্ত করা হবে তাকে ওয়ালী বা আমীর বলা হবে এবং ইমালাহ্’র দায়িত্বে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে আমীল বা হাকীম বলা হবে।
প্রতিটি ইমালাহ্ আবার কয়েকটি প্রশাসনিক এককে বিভক্ত, যাদের প্রত্যেককে কাসাবাহ্ (মেট্রোপলিস) বলা হয়। কাসাবাহ সমূহ আরও ছোট প্রশাসনিক এককে বিভক্ত যাদের প্রত্যেকটিকে হাই’ই (Hayy) বা কোয়ার্টার বলা হয়। কাসাবাহ্ এবং হাই’ইর প্রধানদের ব্যবস্থাপক (Manager) বলা হয় এবং তাদের কাজ প্রশাসনিক।
ওয়ালী হলেন একজন শাসক, কারণ, উলাই’য়াহ্’র অর্থই হচ্ছে শাসন করা। আল মুহিত অভিধানে, এটাকে নেতৃত্ব (ইমারাহ) ও কর্তৃত্ব অর্থে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। যেহেতু তারা শাসক সেহেতু তাদের শাসক হবার সকল শর্ত পূরণ করতে হবে। সে কারণে ওয়ালীকে অবশ্যই পুরুষ, মুক্ত, মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী, ন্যায়পরায়ন এবং তার কর্তব্য সম্পাদনে যোগ্য হতে হবে। তাকে খলীফা অথবা খলীফার পক্ষ থেকে কারও মাধ্যমে নিযুক্ত হতে হবে। অর্থাৎ, ওয়ালীগণ কেবলমাত্র খলীফার মাধ্যমে নিযুক্ত হতে পারেন। উলাই’য়াহ্ অথবা ইমারাহ অর্থাৎ ওয়ালী বা আমীর নিয়োগের বিষয়ে দলিল পাওয়া যায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর শাসনামল থেকে। বিভিন্ন বর্ণনানুসারে এটা নিশ্চিত যে, তিনি (সা) বিভিন্ন অঞ্চলে ওয়ালীদের নিয়োগ দিতেন এবং তাদের প্রদেশসমূহে শাসন করবার ক্ষমতা প্রদান করতেন। তিনি (সা) মুয়াজ ইবন জাবালকে আল-জানাদে, যিয়াদ ইবনে লাবিদকে হাজরামাউতে এবং আবু মুসা আল আশয়ারীকে জাবিদ এবং এডেনে (ওয়ালী হিসাবে) নিযুক্ত করেছিলেন।
যারা শাসনকার্যে যোগ্য, জ্ঞানী ও পরহেজগার (আল্লাহভীরু) বলে পরিচিত ছিলেন তাদেরই রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওয়ালী হিসেবে মনোনীত করতেন। তিনি (সা) তাদের মধ্য হতে ওয়ালী বাছাই করতেন যারা এই কাজে পারদর্শী ছিল এবং যারা মানুষের হৃদয়ে ঈমানের আলো ও রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসায় পরিপূর্ণ করতে সক্ষম ছিল। সুলাইমান ইবনে বারুদা তার বাবার বরাত দিয়ে বলেন,
“যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কোন অভিযান কিংবা সেনাবাহিনীতে একজন আমীর নিয়োগ করতেন, তখন তিনি (সা) তাকে আল্লাহ্’কে ভয় করতে এবং তার সহযোগী মুসলিমদের প্রতি সদয় ব্যবহার করার নির্দেশ দিতেন।” মুসলিমের বর্ণনা অনুসারে;
(আল-বায়হাকী, সুনান আল কুবরা, খন্ড-৯, পৃষ্ঠা-৪১)।যেহেতু ওয়ালী একটি উলাই’য়াহের আমীর, সেহেতু তার ক্ষেত্রেও এ হাদীস প্রযোজ্য।
ওয়ালীকে বরখাস্থ বা অপসারণ করার ক্ষেত্রে বলা যায় যে, এর ভার খলীফার উপরই ন্যস্থ থাকবে কিংবা যদি উলাই’য়াহের অধিকাংশ জনগণ অথবা তাদের প্রতিনিধি ওয়ালীর প্রতি অসন্তুষ্ট হন তখন ওয়ালীকে পদচ্যুত করা যাবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে দুটি কারণে উলাই’য়াহ্’র জনগণের পক্ষ থেকে একটি উলাই’য়াহ্ প্রতিনিধি পরিষদ গঠন করা হবে। প্রথমত: তারা প্রদেশের বাস্তবতার ব্যাপারে ওয়ালীকে অবহিত করবেন; কারণ, তারা ঐ প্রদেশ বা অঞ্চলে বসবাস করেন এবং সে প্রদেশের বাস্তবতা সম্পর্কে তারা ওয়ালীর চেয়ে ভাল ধারণা রাখেন। তখন ওয়ালী সে তথ্যসমূহ ব্যবহার করে আরও ভালভাবে তার কার্য সম্পাদন করতে পারবেন। আর, দ্বিতীয়ত: ওয়ালীর কাজের ব্যাপারে কাউন্সিলের মতামত গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে। যদি অধিকাংশ কাউন্সিল সদস্য ওয়ালীর কাজের ব্যাপারে অভিযোগ করেন তাহলে খলীফা তাকে অপসারণ করবেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবদ কায়েসের প্রতিনিধিদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাইরাইনের আমীর আল ’আলা ইবনে আল হাদরামীকে অপসারণ করেছিলেন। এছাড়া, কোন কারণ বা অভিযোগ ছাড়াও খলীফা ওয়ালীকে পদচ্যুত করতে পারেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়েমেনের আমীর মুয়াজ বিন জাবালকে কোন কারণ ছাড়াই অপসারণ করেন।
উমর বিন আল-খাত্তাবও (রা) ওয়ালীদের কারণে বা বিনা কারণে বরখাস্ত করতেন। তিনি যিয়াদ ইবনু আবু সুফিয়ানকে কোন কারণ ছাড়াই অপসারণ করেন এবং সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসকে জনগণের অভিযোগের ভিত্তিতে বরখাস্ত করেন এবং বলেন, “আমি তাকে অদক্ষতা বা বিদ্রোহের কারণে অপসারণ করিনি।” এ ঘটনাগুলো এটাই প্রমাণ করে যে, খলীফা কোন ওয়ালীকে তার উলাই’য়াহের জনগণের পক্ষ থেকে অভিযোগ আসুক বা না আসুক সর্বাবস্থায় অপসারণ করার ক্ষমতা রাখেন।
অতীতে দুই ধরনের উলাই’য়াহ্ ছিল: উলাই’য়াহতুল সালাহ এবং উলাই’য়াহতুল খারাজ। এ কারণে ইতিহাসের বইসমূহে উলাই’য়াহের আমীর সম্বন্ধে আমরা দু’ধরনের শব্দ ব্যবহার করতে দেখি: প্রথমটি হল সালাহ্ কিংবা খারাজ এর উপর কর্তৃত্ব (ইমারাহ) এবং অন্যটি হল সালাহ্ এবং খারাজ উভয়ের উপর কর্তৃত্ব। অন্যভাবে বললে বলা যায়, শুধুমাত্র সালাহ্ কিংবা খারাজ এর উপর ওয়ালী নিযুক্ত করা যায়। আবার, সালাহ্ এবং খারাজ উভয়ের উপর আমীর নিযুক্ত করা যায়। উলাই’য়াহ্ অথাবা ইমারার ক্ষেত্রে সালাহ্ শব্দটির অর্থ শুধু নামাজের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়া নয়, বরং এর অর্থ হল তহবিল বাদে সমস্ত বিষয় পরিচালনা করা। কারণ, সালাহ্ শব্দটির অর্থ হল কর ধার্য করার এখতিয়ার ব্যাতিরেকে সব বিষয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করা। সুতরাং, যদি একজন ওয়ালীকে সালাহ্ এবং খারাজ উভয়ের আমীর নিযুক্ত করা হয়, তাহলে সেটি সাধারণ উলাই’য়াহ্ (উলাই’য়াহ্ ’আম্মা) হিসেবে বিবেচিত হবে। আর, যদি তাকে শুধুমাত্র সালাহ্ বা খারাজ এর আমীর নিযুক্ত করা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে উলাই’য়াহ্টি বিশেষ উলাই’য়াহ্ (উলাই’য়াহ্ খাসসা) হিসেবে বিবেচিত হবে।
তবে, যেভাবেই হোক না কেন প্রকৃতঅর্থে এটা খলীফার সিদ্ধান্তের উপরই ছেড়ে দেয়া হবে। কারণ, তিনি ইচ্ছে করলে কোন উলাই’য়াহকে শুধুমাত্র খারাজ অথবা বিচারব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন, কিংবা খারাজ, বিচারব্যবস্থা ও সেনাবাহিনী ছাড়া অন্য কোনকিছুর মধ্যেও সীমাবদ্ধ রাখতে পারেন। রাষ্ট্র বা উলাই’য়াহকে পরিচালনার জন্য তিনি যে সিদ্ধান্তকে উপযোগী মনে করবেন সেটাই করতে পারেন। কারণ, হুকুম শারী’আহ ওয়ালীর জন্য কোন দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেয়নি এবং শাসনকার্যের সকল দায়িত্ব তার উপর বাধ্যতামূলক করা হয়নি। শুধুমাত্র এটা নির্দিষ্ট করা হয়েছে যে, ওয়ালী অথবা আমীরের দায়িত্ব শাসন ও কর্তৃত্বের সাথে সর্ম্পকিত হবে এবং তাকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের আমীর নিযুক্ত করতে হবে।
এ সমস্ত কিছুই আল্লাহ্’র রাসূল (সা)এর জীবনী থেকে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বস্তুতঃ হুকুম শারী’আহ্ খলীফার জন্য ওয়ালী নিযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করেছে; তার বিচার-বিবেচনার ভিত্তিতে এই ওয়ালী উলাই’য়াহ্ আম্মা অথবা উলাই’য়াহ্ খাসসা’ যে কোন উলাই’য়াহের জন্য নিযুক্ত হতে পারে। রাসূল (সা) এর কর্মকান্ড থেকে এটাই প্রতিফলিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাধারণ ভাবে শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে ওয়ালী নিয়োগ করেছেন, যেমন আমরু বিন হাজেমকে তিনি এভাবে ইয়েমেনে নিযুক্ত করেছিলেন। আবার, তিনি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েও ওয়ালী নিয়োগ করেছেন, যেমন আলী বিন আবি তালিব (রা) কে ইয়েমেনে বিচারকার্য পরিচালনার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। সীরাত ইবনে হিশামে উল্লেখিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ফারওয়া বিন মুসায়িককে মুরাদ, জুবায়ের ও মিদহাজ গোত্রের ওয়ালী নিয়োগ করেছিলেন এবং তার সাথে তিনি খালিদ বিন সায়ীদ বিন আল ’আসকে সাদাকা সম্পর্কিত বিষয়াবলী পরিচালনার ওয়ালী পদে নিয়োগ করেছিলেন। এটাও উল্লেখিত আছে যে, রাসূল (সা) যিয়াদ বিন লাবিদ আল আনসারীকে হাজরামাউতে ওয়ালী হিসাবে ও সাদাকার দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেন। এছাড়া, তিনি আলী বিন আবি তালিব (রা) কে নাজরানে সাদাকা ও জিযিয়ার দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। হাকীমের বর্ণনা অনুসারে, তিনি (সা) আলী বিন আবি তালিব (রা) কে ইয়েমেনে বিচারকের দায়িত্ব দিয়েও প্রেরণ করেছিলেন। আল-ইসতিয়া’ব গ্রন্থে উল্লেখিত আছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুয়াজ বিন জাবালকে আল জানাদের লোকদের কুর’আন, ইসলামী আইন শিক্ষা দেয়া ও বিচার ফায়সালার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তিনি (সা) তাঁকে ইয়েমেনের আমীলদের কাছ থেকে সাদাকা সংগ্রহের ক্ষমতাও দিয়েছিলেন।
যদিও খলীফার সাধারণ ও বিশেষ দু’ভাবেই ওয়ালী নিয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে, তবে এটা প্রমাণিত সত্য যে, আব্বাসীয় খিলাফতের দূর্বলতার সময় সাধারণ উলাই’য়াহ্ ওয়ালীদের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে শাসন করার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছিল। যে সময়ে খলীফা নিতান্তই একটি নামসর্বস্ব পদবীতে পরিণত হয়েছিল, যাকে কেবলমাত্র জনসভায় দোয়ার সময় স্মরণ করা হত এবং মুদ্রায় তার নাম প্রতীক হিসাবে খোদাই করা থাকত। এভাবেই, সাধারণ উলাই’য়াহ্ ব্যবস্থা ইসলামী রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেছিল।
যেহেতু খলীফার সাধারণ ও বিশেষ কর্তৃত্ব দিয়ে ওয়ালী নিযুক্ত করবার ক্ষমতা রয়েছে এবং যেহেতু সাধারণ উলাই’য়াহ্ ব্যবস্থা ইসলামী রাষ্ট্রকে ক্ষতির দিকে ধাবিত করতে পারে এবং রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে, তাই আমরা বিশেষ উলাই’য়াহ্ ব্যবস্থা বা উলাই’য়াহ্ খাসসা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেন ওয়ালীর তাকওয়া যদি কখনও নিন্মগামীও হয় তাহলেও যেন তিনি রাষ্ট্রকে বিভক্ত করতে না পারেন। গবেষণা থেকে আমরা দেখেছি, যে সকল ক্ষেত্র ওয়ালীকে শক্তিশালী করে সেগুলো হল সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা ও অর্থের উপর নিয়ন্ত্রণ। সেজন্য, এ ক্ষেত্রগুলোকে অবশ্যই ওয়ালীর কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মত খলীফার অধীনে রাখতে হবে।
অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রগুলো অবশ্যই খলীফার প্রত্যক্ষ নজরদারিতে রাখতে হবে।
ওয়ালীকে এক উলাই’য়াহ্ থেকে অন্য উলাই’য়াহতে স্থানান্তরিত করা যাবে না, বরং তাকে এক উলাই’য়াহ্’র দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে, তারপর অন্য উলাই’য়াহতে পুনঃনিয়োগ দিতে হবে। কারণ, এটা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কর্মকান্ড থেকে পরিষ্কার যে, তিনি (সা) ওয়ালীদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতেন। এরকম কোন বর্ণনা নেই যে, যেখানে দেখা যায় তিনি (সা) ওয়ালীদের এক উলাই’য়াহ্ থেকে অন্য উলাই’য়াহতে স্থানান্তর করেছিলেন। এছাড়া, উলাই’য়াহ্ হল এমন এক ধরনের চুক্তি যার ধারাসমূহ সুস্পষ্ট। সে কারণে একটি অঞ্চল বা প্রদেশে উলাই’য়াহ্ নিয়োগের চুক্তিতে যে সীমানা পর্যন্ত ওয়ালীর শাসন বিরাজমান থাকবে তা পরিস্কারভাবে উল্লেখ থাকতে হবে এবং খলীফা তাকে অপসারণ করবার পূর্ব পর্যন্ত উক্ত অঞ্চলে তার শাসনক্ষমতা বলবৎ থাকবে। কোন একটি অঞ্চল থেকে তাকে অপসারণ করবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সে অঞ্চলের ওয়ালী বলেই গণ্য হবেন। তাকে যদি অন্য কোন জায়গায় স্থানান্তর করা হয় তার মাধ্যমে তিনি পূর্বের পদ থেকে অপসারিত হবেন না কিংবা নতুন জায়গার ওয়ালীও হবেন না। কারণ, প্রথম পদ থেকে তাকে অপসারণ করতে হলে সুস্পষ্টভাবে সেই উলাই’য়াহের দায়িত্বভার থেকে মুক্ত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে এবং একইভাবে নতুন উলাই’য়াহতে তার নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে নিয়োগের চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে সেই বিশেষ অঞ্চল সম্পর্কে উল্লেখ থাকতে হবে। সে কারণে একজন ওয়ালীকে স্থানান্তর করা যায় না, বরং প্র মে নিযুক্ত পদ থেকে নিষ্কৃতি দেবার পরই নতুন স্থানে তাকে পুনঃনিয়োগ দেয়া যায়।
খলীফাকে ওয়ালীদের কাজের নিয়মিত তদন্ত করতে হবে:
খলীফাকে ওয়ালীদের কাজ তদন্ত করতে হবে এবং তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। এ কাজটি খলীফা প্রত্যক্ষভাবে করতে পারেন অথবা তিনি তার পক্ষ থেকে কাউকে এ পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়োগ করতে পারেন। মু’ওয়ায়ীনও (প্রতিনিধিত্বকারী সহকারী) খলীফাকে সাহায্য করবার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রদেশের ওয়ালীদের কাজ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। তবে, এ ব্যাপারে তার অনুসন্ধান লব্ধ তথ্য ও গৃহীত সিদ্ধান্ত অবশ্যই খলীফাকে অবহিত করতে হবে – যা প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর দায়িত্বের অধ্যায়ে ইতোমধ্যে আলোচনা করা হয়েছে। এভাবে খলীফাকে বিভিন্ন প্রদেশ সমূহের পরিস্থিতি সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে এবং নিয়মিতভাবে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এছাড়া, তাকে বিভিন্ন সময়ে ওয়ালীদের সবার সাথে অথবা কিছু সংখ্যকের সাথে বসে তাদের বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগও শুনতে হবে।
এটা নিশ্চিত যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওয়ালীদের নিয়োগের সময় তাদের যাচাই করে নিতেন, যেমনটি তিনি করেছিলেন মুয়াজ ও আবু মুসার ক্ষেত্রে। তিনি (সা) সাধারণত কিভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে সে ব্যাপারে তাদের নির্দেশনা প্রদান করতেন, যেমনটি তিনি করেছিলেন আমর বিন হাজম এর ক্ষেত্রে। এছাড়া, তিনি (সা) কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেন যেমনটি তিনি করেছিলেন আবান বিন সা’ঈদ এর ক্ষেত্রে। তাকে বাহরাইনে ওয়ালী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার সময় তিনি (সা) বলেছিলেন,
“আবদ কায়েসের দেখাশোনা করো এবং এর প্রধানদের সম্মান করো।”
এছাড়াও তিনি (সা) ওয়ালীদের জবাবদিহি করতেন, তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও তাদের বিষয়ে তদন্ত করতেন এবং তাদের সর্ম্পকিত সকল সংবাদ মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করতেন। আয়-ব্যয়ের বিষয়ে তিনি (সা) তাদের জবাবদিহি করতেন। আবু হুমায়িদ আল সা’ঈদী থেকে আল বুখারী ও মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে,
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইবন-উল-উতবিয়াকে বানু সালিম গোত্রে সাদাকা আদায়ের জন্য আমীল নিযুক্ত করেন। যখন তিনি নবী (সা) এর কাছে ফেরত এলেন, তিনি বললেন, “এটি আপনার জন্য এবং এই (উপহার) আমার জন্য।” তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন, “তুমি কেন তোমার পিতামাতার গৃহেই থেকে গেলে না যাতে সেখানেই তোমার কাছে উপহার আসে যদি তুমি সত্য বলে থাক।”
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৬৯৭৯)উমরও (রা) খুব নিবিড়ভাবে ওয়ালীদের পর্যবেক্ষণ করতেন। তিনি মুহম্মদ ইবনে মাসলামাকে ওয়ালীদের বিষয়াদি পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করার জন্য নিয়োগ করেছিলেন। হজ্জের সময় তিনি সব ওয়ালীদের কাজের দক্ষতা মূল্যায়নের জন্য তাদের একত্র করতেন এবং তাদের বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগ শ্রবণ করতেন। এছাড়া, তিনি উলাই’য়াহের বিভিন্ন বিষয় ও তাদের নিজেদের অবস্থা সম্পর্কেও খোঁজখবর নিতেন। এটা বর্ণিত আছে যে, একবার উমর (রা) তার আশেপাশের লোকদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তোমরা কি মনে কর, তোমাদের মধ্য হতে সর্বোত্তম লোকটিকে তোমাদের উপর নিযুক্ত করলে এবং তাকে ন্যায়পরায়ন হতে বললেই আমার দায়িত্ব শেষ হয়ে হবে?’ লোকেরা বলল, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি বললেন, ‘না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাজের মূল্যায়ন করব এবং নিশ্চিত হব যে, আমার আদেশ সঠিকভাবে পালিত হয়েছে।’ ওয়ালী এবং আমীলদের কঠোর ভাবে জবাবদিহিতার সম্মুখীন করার জন্য উমর (রা) প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে অকাট্য দলিল-প্রমাণ ছাড়াই তাদের মধ্যে অনেককে অপসারণ করেছেন এবং কিছু ওয়ালীকে সামান্যতম সংশয়ের কারণে অপসারণ করেছেন, যা কিনা সন্দেহের পর্যায়েও পরে না। তাঁকে এ সম্পর্কে একদা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের বিষয়াবলী দেখাশোনার ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি সংশোধনের জন্য একজন আমীরের পরিবর্তে আরেকজনকে স্থলাভিষিক্ত করা সহজ। ’
তবে, কঠোরতা সত্বেও তিনি তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন ও শাসক হিসেবে সুনাম অর্জনের জন্যও মনযোগ দিতেন। তিনি তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তাদের যুক্তিসমূহ বিবেচনায় নিতেন। যদি কোন যুক্তি তার পছন্দ হতো তাহলে তার স্বীকৃতি দেবার ব্যাপারে এবং আমীলদের প্রশংসার জোয়ারে ভাসাতে তিনি অকুন্ঠ ছিলেন। একদা হোমসের আমী’ল উমায়ের ইবনু সা’দ সম্পর্কে উমরের কাছে খবর আসল যে, মিম্বারে দন্ডায়মান থাকা অবস্থায় তিনি বলেছেন, ‘ইসলাম ততদিন অক্ষয় থাকবে যতদিন এর শাসন কর্তৃত্ব শক্তিশালী থাকবে। তবে, কর্তৃত্বের শক্তি তলোয়ারের আঘাতে হত্যা কিংবা চাবুকের ঘা দিয়ে আসে না, বরং তা সত্য দিয়ে শাসন ও ন্যায়পরায়ণতাকে সুউচ্চে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে আসে।’ এ কথা শোনার পর উমর (রা) বললেন, ‘মুসলিমদের দেখভাল করার জন্য উমায়ের ইবনে সা’দ এর মত আরও মানুষ যদি আমার থাকতো।’
নির্বাহী সহকারীগণ (মু’ওয়ায়ীন আত তানফীদ)

মু’ওয়ায়ীন আত তানফীদ এমন একজন সহকারী (ওয়াযির) যাকে খলীফা তার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত কার্যকর, তদারকি এবং নির্দেশ বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তার সহযোগী হিসাবে নিযুক্ত করে থাকেন। তিনি খলীফা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিভাগ, জনগণ ও পররাষ্ট্র বিষয় সংক্রান্ত কার্যালয়ের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী ব্যক্তি। তিনি খলীফার নিকটে এবং খলীফার নিকট থেকে বার্তা বহনের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি খলীফার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার সহকারী, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন প্রকার ক্ষমতা তার নেই। অর্থাৎ, তার ভূমিকা বাস্তবায়ন ও ব্যবস্থাপনা, কিন্তু শাসন করা নয়। তার কার্যালয় হচ্ছে এমন এক হাতিয়ার যার মাধ্যমে খলীফা আভ্যন্তরীন ও বৈদেশিক কার্যালয়সমূহে তার জারিকৃত নির্দেশসমূহ বাস্তবায়ন করে থাকেন। এবং এ সমস্ত কার্যালয়ের মাধ্যমে মু’ওয়ায়ীন আত তানফিদ এর কাছে যে সমস্ত বিষয় বা বার্তা আসবে এগুলোর প্রতিটির ব্যাপারেই তাকে খলীফার অধীনস্থ থাকতে হবে। সুতরাং, তার বিভাগ বা কার্যালয় খলীফা এবং অন্যান্যদের মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী; যেখানে এ বিভাগ খলীফার পক্ষ থেকে তার বার্তা অন্যান্যদের কাছে পৌঁছে দেয় এবং সেইসাথে, অন্যান্যদের বার্তাও খলীফার কাছে বহন করে নিয়ে যায়।
নির্বাহী সহকারীকে রাসূল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনদের সময়ে সচিব (আল কাতিব) বলা হত। এরপর, তিনি ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্র সংরক্ষণকারী দিওয়ান হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। পরবর্তীতে, এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, তাকে সমন্বয়কারী সচিব বা সমন্বয় বিভাগের সংরক্ষক বলা হবে। পরিশেষে, আইন বিশারদগণ তাকে নির্বাহী সহকারী (মু’ওয়ায়ীন আত তানফীদ) হিসাবে আখ্যায়িত করেন।
খলীফা হলেন একজন শাসক যার কাজের মধ্যে শাসন, আইন বাস্তবায়ন এবং জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশোনা করা অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু, শাসনকার্য পরিচালনা, আইন বাস্তবায়ন এবং জনগণের অভিভাবকত্বের সাথে প্রশাসনিক কর্মকান্ডও জড়িত। এজন্যই এমন একটি বিশেষ বিভাগ স্থাপন করা প্রয়োজন যা কিনা খলীফার সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করবে এবং খিলাফতের গুরুদায়িত্ব পালনে তাকে সহায়তা করবে। এ কারণে খলীফার একজন নির্বাহী সহকারী নিযুক্ত করা প্রয়োজন যিনি প্রশাসনিক কর্মকান্ড পরিচালনার ব্যাপারে খলীফাকে সহায়তা করবেন; কিন্তু, শাসনকার্যে নয়। তবে, এ সহকারী প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর মতো কোন দায়িত্ব পালন করবেন না। এটা তার জন্য অনুমোদিতও হবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, তিনি ওয়ালী বা আমীল নিয়োগ করতে পারবেন না কিংবা জনগণের বিষয়সমূহ পরিচালনা করতে পারবেন না। তার কর্মকান্ড নিতাšইÍ প্রশাসনিক। যেমন: খলীফা বা প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর শাসনকার্য সংক্রান্ত কোন নির্দেশ কিংবা প্রশাসনিক বিষয়ে তাদের কোন সিদ্ধান্তকে তিনি বাস্তবায়ন করবেন। মূলতঃ এ কারণেই তাকে নির্বাহী সহকারী বলা হয়। আইনবিশারদগণ তাকে ‘ওয়াযির তানফিদ’ বলতেন যার অর্থ আসলে মু’ওয়ায়ীন আত তানফিদ। কারণ, ওয়াযির শব্দটির ভাষাগত অর্থ হল সহকারী। তারা বলেন, এ ওয়াযির বা সহকারী খলীফার সাথে জনগণ ও ওয়ালীদের সংযোগ স্থাপনের একটি মাধ্যম, যিনি খলীফার জারিকৃত আদেশসমূহ তাদের কাছে বহন করেন, তার আদেশ বাস্তবায়ন করেন, খলীফাকে ওয়ালীদের নিযুক্তির ব্যাপারে অবহিত করেন এবং সেইসাথে, টাস্কফোর্স গঠন ও রণাঙ্গনে সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন। এছাড়া, এ সমস্ত কার্যালয় থেকে যে সমস্ত বার্তা তার কাছে আসে সেগুলোও তিনি খলীফার কাছে পৌঁছে দেন এবং নতুন কোন সমস্যা বা পরিস্থিতি উদ্ভুত হবার সম্ভাবনা থাকলে তিনি পূর্ব হতেই তা খলীফাকে অবহিত করেন, যেন এ ব্যাপারে তিনি খলীফার নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে পারেন। এ সমস্ত কিছু তাকে আদেশ পালনে খলীফার সহকারী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে, কিন্তু, কোন বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন ক্ষমতা দেয় না। তিনি বর্তমান কালের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধানের প্রধান সচিবের সমতুল্য।
যেহেতু নির্বাহী সহকারী প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর মতোই খলীফার সাথে সরাসরি যুক্ত সেহেতু তিনিও খলীফার অধীনস্থ সাহায্যকারীদের একজন। তার দায়িত্ব এমন যে, তাকে খলীফার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে, খলীফাকে সরাসরি তার কাজের তদারকি করতে হবে এবং প্রয়োজনে তাকে খলীফার সাথে একাকী, দিনে অথবা রাতে সাক্ষাৎ করতে হবে, যা কিনা ইসলামী শারী’আহ অনুসারে একজন নারীর বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক। সে কারণে নির্বাহী সহকারীকে অবশ্যই পুরুষ হতে হবে। এছাড়া, তিনি অমুসলিমও হতে পারবেন না, তাকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে; কেননা তিনি খলীফাকে সাহায্যকারী দলের অংশ। কারণ, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা পবিত্র কুর’আনে বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে [ইহুদী, নাসারা কিংবা মুশরিকদের] অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের ক্ষতি করতে এতোটুকু কুন্ঠিত হয় না। তারা তো শুধু তোমাদের ধ্বংস কামনা করে। বিদ্বেষ তাদের মুখ হতে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে, আর তাদের অন্তর যা লুকিয়ে রেখেছে তা আরও ভয়াবহ।”
[সূরা আলি ইমরান : ১১৮]খলীফার অন্তরঙ্গ পরিমন্ডলে একজন অমুসলিমকে অন্তর্ভূক্ত করা যে পুরোপুরি নিষিদ্ধ তা এ আয়াতে তা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং, প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর মত প্রত্যক্ষভাবে খলীফার সাথে যুক্ত থাকার কারণে নির্বাহী সহকারী কাফির হতে পারবেন না এবং তাকে অবশ্যই মুসলিম হতে হবে। এছাড়া, খলীফা ও অন্যান্যদের মাঝে যোগাযোগ রক্ষা করার প্রয়োজনে নির্বাহী সহকারীদের সংখ্যাও একাধিক হতে পারে।
যে সমস্ত ক্ষেত্রে মু’ওয়ায়ীন তানফীদ খলীফা এবং অন্যদের মাঝে যোগাযোগ রক্ষাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সেগুলো ৪ প্রকারের:
১. আন্তর্জাতিক বিষয়সমূহ, খলীফা এ ব্যাপারে সরাসরি নির্দেশ দিতে পারেন কিংবা এর জন্য আলাদা একটি পররাষ্ট্র বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।
২. সেনাবাহিনী।
৩.সেনাবাহিনী ছাড়া অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।
৪. নাগরিকদের সাথে সম্পর্ক।মূলতঃ নির্বাহী সহকারী এ সমস্ত বিষয়েই দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করবেন। যেহেতু তিনি খলীফা এবং অন্যান্যদের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী ব্যক্তি সেহেতু তাকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করা হবে এবং তিনি খলীফার নিকট হতে ও খলীফার নিকটে তথ্য আদান-প্রদান করবেন। এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় বিভাগ সমূহের কি কি কর্তব্য পালন করা উচিত তারও তদারকি করবেন।
খলীফা হলেন প্রকৃত শাসক। তিনিই হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি শাসনকার্য পরিচালনা, আইন বাস্তবায়ন এবং জনগণের বিষয়সমূহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করেন। সে কারণে তাকে অব্যাহতভাবে শাসনযন্ত্র, আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী এবং উম্মাহ্’র সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হয়। তিনি আইন জারি করেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, জনসেবার দায়িত্ব নেন, শাসনযন্ত্র সমূহের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করেন এবং এদের কার্য সম্পাদনে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে ও যা কিছু প্রয়োজন হয় সে ব্যাপারে খোঁজখবর রাখেন। তার কাছেই উম্মাহ্’র সকল দাবি-দাওয়া, অভাব-অভিযোগ এবং বিভিন্ন বিষয়ে উম্মাহ্’র প্রতিক্রিয়া উপস্থাপন করা হয় এবং সেইসাথে, তিনি আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীও পর্যবেক্ষণ করেন। সুতরাং, তার এ সকল কাজের প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে মু’ওয়ায়ীন আত তানফীদ এদের মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি হিসেবে কাজ করেন অর্থাৎ উম্মাহ্’র বার্তা খলীফাকে পৌঁছে দেন এবং উম্মাহ্’কে খলীফার নির্দেশ সম্পর্কে অবহিত করেন।
বস্তুতঃ খলীফা বিভিন্ন বিভাগের ব্যাপারে যে সমস্ত নির্দেশ জারি করেন এবং তাদের নিকট থেকে খলীফার কাছে যে সমস্ত বার্তা আসে এগুলোর বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। মূলতঃ নির্বাহী সহকারী এ দায়িত্বটিই পালন করেন এবং তিনি এ সকল কাজের সুষ্ঠু বাস্তবায়নকে নিশ্চিত করেন। তিনি খলীফার নির্দেশসমূহ বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিভাগের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সভাপতিত্ব করবেন এবং খলীফা বিশেষভাবে কোন ক্ষেত্রে তাকে নিষেধ না করলে তার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন। খলীফা কোন বিষয়ে দ্বিমত করলে সেক্ষেত্রে তার নির্দেশ পালনে নির্বাহী সহকারী বাধ্য; কেননা খলীফা হচ্ছেন শাসক এবং তার আদেশই বাস্তবায়ন করতে হবে।
সেনাবাহিনী ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী সম্পর্কিত ব্যাপারগুলো সাধারণত গোপন ও শুধুমাত্র খলীফার এখতিয়ারভূক্ত। এ কারণে নির্বাহী সহকারী এ বিষয়সমূহের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবেন না কিংবা এ সকল বিষয়ে কোনপ্রকার তদারকিও করবেন না, যদি না খলীফা তাকে বিশেষভাবে এ ব্যাপারে অনুরোধ করেন। যদি এ ধরনের পরিস্থিতি হয়, তবে এক্ষেত্রে তিনি শুধু সে সমস্ত বিষয়ই তদারকি করবেন যে বিষয়ে তাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আর অন্য কোন বিষয়ে নয়।
আর উম্মাহ্’র ব্যাপারে বলা যায় যে, জনগণের বিষয়সমূহ দেখাশোনা করা, তাদের দাবি-দাওয়া পূরণ করা এবং তাদের ভেতর হতে অন্যায় কার্যকলাপকে দূরীভূত করা – এ সবই খলীফা এবং তার নিযুক্ত প্রতিনিধিত্বকারী সহকারীর দায়িত্ব।
এগুলো নির্বাহী সহকারীর দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত নয়। সুতরাং, তিনি এ সমস্ত বিষয়ে কোন প্রকার তদারকিও করবেন না, যদি না খলীফা এ ব্যাপারে কোন অনুরোধ জানান। এক্ষেত্রে, তার দায়িত্ব হবে শুধুমাত্র বাস্তবায়নের, তদারকির নয়। বস্তুতঃ এ সমস্ত কিছুই নিরূপিত হবে খলীফার কাজের প্রকৃতির উপর নির্ভর করে এবং সেই অনুসারেই মু’ওয়ায়ীন আত তানফীদ- এর কাজের প্রকৃতি নিরূপিত হবে।
রাসূল (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনদের (রা) সময়ে নির্বাহী সহকারীর (যাকে তখন সচিব বলা হত) কাজের উদাহরণ নিম্নরূপ:
১. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদাহরণ:
আল মুসওয়ার ও মারওয়ানের সূত্রে আল বুখারী হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পর্কে বর্ণনা করেন যে,
‘সুতরাং, নবীজি সচিবকে ডেকে পাঠালেন…’
কিতাব উল খারাজ বইয়ে আবু ইউসুফ বলেছেন,
“মুহম্মদ ইবনে ইসহাক এবং আল কালবী আমাকে অবগত করলেন, অন্যান্যরাও এ হাদীসে যোগ করেন এই বলে: তিনি (সা) বললেন, ‘লেখ (বহুবচন)…” লেখকের নাম উল্লেখ না করে।
ইবনে কাসীর বর্ণনা করেছেন, “ইবনে ইসহাক বলেছেন, আল জুহারী বলেছেন…অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইবনে আবি তালিবকে ডাকলেন এবং বললেন, ‘লেখ (একবচন)…”
ইবনে আব্বাস হতে আবু উবায়েদ আল আমওয়াল গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন, যেখানে তিনি বলেছেন,
“…এবং তিনি আলীকে বললেন, ‘হে আলী, লেখ…’’’
আল হাকীম ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেছেন, যা আয যাহাবী সত্যায়িত করেছেন এবং গ্রহণ করেছেন:
‘…ও আলী, লিখ….’
হুদাইবিয়ার চুক্তিটি খুবই প্রসিদ্ধ এবং এ কারণে চুক্তিটির ধারাগুলো বর্ণনার এখানে প্রয়োজন নেই।
– রাসূল (সা) হিরাক্লিয়াসের কাছে চিঠি লিখেন, যে সম্পর্কে ইবনে মাজাহ্ ব্যতীত অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেছেন। আল বুখারী হাদীসটির বর্ণনা করেন ইবনে আব্বাস থেকে যিনি বর্ণনা করেছেন আবু সুফিয়ান থেকে,
“বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আল্লাহ্’র বান্দা ও রাসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে, রোমানদের নেতা হিরাক্লিয়াসের প্রতি – শান্তি বর্ষিত হোক তাদের উপর যারা হিদায়াতকে অনুসরণ করে। অতঃপর আমি তোমাকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানাচ্ছি। যদি তুমি ইসলাম গ্রহণ কর তবে আল্লাহ্ তোমাকে দ্বিগুণ পুরষ্কার দেবেন। যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও তবে রোমানদের পাপের জন্য তুমিই দায়ী থাকবে। হে আহলে কিতাবীগণ, তোমরা এগিয়ে এসো আমাদের এবং তোমাদের মাঝে ন্যায়সঙ্গত, বাণীর দিকে, যে আমরা আল্লাহ্ ছাড়া আর কারও উপাসনা না করি, আমরা তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করি এবং আল্লাহ্’র পাশাপাশি আর কাউকে প্রভূ হিসেবে গ্রহণ না করি। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়… তবে বল আমরা মুসলিম।”
(সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং-৭)– এ চিঠির প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে লিখা হিরাক্লিয়াসের চিঠি আবু উবায়েদ তার আল-আমওয়াল বইতে বকর ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ আল মুজনী থেকে বর্ণনা করেছেন, ‘…এবং সে রাসূল (সা) কে লিখল যে, সে মুসলিম এবং তাঁকে (সা) কিছু দিনার পাঠাল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) চিঠিটি পড়ে বললেন, ‘সে মিথ্যাবাদী, আল্লাহ্’র শত্রু, সে মুসলিম নয় বরং সে খ্রীস্টধর্মের উপরে আছে।’
আল হাফীজ আল-ফাতহ্’তে উল্লেখ করেন যে, হাদীসটি সহীহ্ কিন্তু বর্ণনার দিক থেকে বকর থেকে বিচ্ছিন্ন (মুরসাল)।
– উমর (রা)কে লিখা মিনবাজ-এর জনগণের চিঠি এবং উমর (রা) এর প্রত্যুত্তর, যা কিনা আবু ইউসুফ তাঁর আল-খারাজ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “আমর বিন শুয়া’ইব হতে আব্দুল মালিক ইবন জুরাইজ বর্ণনা করেছেন যে – সমুদ্রের অপরপ্রান্ত হতে আমাদের সাথে যুদ্ধরত কিছু জাতি উমর ইবন আল-খাত্তাবকে এই বলে পত্র পাঠালেন যে: “আমাদেরকে আপনার রাজ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অনুমতি দিন এবং বিনিময়ে আমাদের উপর দশভাগের একভাগ কর আরোপ করুন।” তিনি বলেন, ‘উমর এ ব্যাপারে সাহাবীদের সাথে আলোচনা করলেন এবং তারা তাকে এ বিষয়ে রাজী হবার উপদেশ দিলেন। এভাবেই, প্রথমবারের মতো যুদ্ধরত জাতির লোকেরা একদশমাংশ কর আদায় করলো।”
২. সেনাবাহিনী এবং এ সম্পর্কিত কিছু ঘটনা:
– খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রা) কে লিখা আবু বকরের (রা) চিঠি, যেখানে তিনি খালিদ (রা)কে আল শামের দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেন। কিতাব উল খারাজ গ্রন্থে আবু ইউসুফ বলেছেন, “খালিদ আল হীরাকে তাঁর কেন্দ্র হিসেবে নিতে চেয়েছিল। তবে আবু বকরের চিঠি তাঁকে আবু উবায়দা এবং মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধির জন্য আল শামের দিকে অগ্রসর হবার নির্দেশ প্রদান করে…”
– আল-শাম এর সৈন্যগণ উমরের কাছে সাহায্য চেয়ে পাঠান এবং তিনি তাদের লিখেন। ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন যা সহীহ্ বর্ণনা হিসেবে পরিগণিত যে, আবু হাতিম ইবনে হাব্বান সম্মাক’কে বলতে শুনেছেন, ‘আমি শুনেছি ইয়াদ আল আশারী বলেছেন, “আমি ইয়ারমুকের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছি যেখানে আমাদের পাঁচজন আমীর ছিল: আবু উবাইদা ইবনে আল জারাহ্, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, ইবনে হাসানাগ, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ এবং ইয়াদ (ইনি বর্ণনাকারী ইয়াদ আল আশারী থেকে ভিন্ন ব্যক্তি)। তিনি বর্ণনা করেন যে, উমর বলেন, “যদি সাংঘর্ষিক কোন অবস্থার সৃষ্টি হয়, তবে আবু উবাইদার সাহায্য কামনা করবে।” অতঃপর আমরা তাকে জানালাম যে, “মৃত্যু আমাদেও পেছনে ধাওয়া করছে এবং আমরা তার সাহায্য কামনা করছি। প্রত্যুত্তরে তিনি আমাদের জানালেন, “আমি তোমাদের পত্র পেয়েছি যেখানে তোমরা আমার সাহায্য কামনা করেছো। আমি তোমাদের এমন একজনের দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি যার সাহায্য বহুগুন বেশী শক্তিশালী এবং যার সৈন্যদল সবসময় তৈরী। তিনি হলেন আল্লাহ্ (’আজ্জা ওয়া জ্জাল); সুতরাং, তোমরা তাঁর সাহায্য প্রার্থনা কর। কারণ, মুহাম্মদ (সা) কে বদরের প্রান্তে তোমাদের চাইতে কম সংখ্যক সৈন্য থাকার পরও বিজয় দান করা হয়েছে। যখনি আমার পত্র তোমাদের কাছে পৌঁছাবে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে এবং আমার সাথে আলোচনার অপেক্ষা করবে না। তারপর, আমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করলাম এবং তাদেরকে পরাজিত করলাম। আমরা তাদের চার ফারসাখ পরিমাণ হত্যা করলাম।”
– আল-শাম এর সেনাবাহিনী উমর ইবন আল-খাত্তাবকে লিখে পাঠান যে, “যখন আমরা শত্রুপক্ষের মুকাবিলা করলাম, তাদের অস্ত্রসমূহ রেশমী কাপড়ে আবৃত অবস্থায় দেখে আমাদের হৃদয়ে ভয় সঞ্চারিত হল।” উমর প্রত্যুত্তরে তাদের জানালেন, “তবে তোমরা একই কাজ কর, অর্থাৎ অস্ত্রসমূহ রেশমী কাপড় দ্বারা আবৃত কর।” এটি ইবনে তাইমিয়া তাঁর আল-ফতওয়া গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
৩. সেনাবাহিনী ছাড়া রাষ্ট্রের অন্য কিছু প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কিছু উদাহরণ:
এক দশমাংশের ব্যাপারে মু’য়াজকে লিখা রাসূল (সা) এর চিঠি: ইয়াহিয়া ইবনে আদম শাসনকার্য বিষয়ে লেখা তার আল-খারাজ বইতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়েমেনে নিযুক্ত মু’য়াজকে লিখেছিলেন:
“বৃষ্টির পানি বা এ ধরনের পানির আধার দ্বারা চাষকৃত জমির উপর (উৎপন্ন ফসলের) খাজনা এক দশমাংশ ধার্য করা হল; আর, বালতি দিয়ে সেচকার্য চালানো হলে খাজনা হবে এক দশমাংশের অর্ধেক।” আশ-শী’ ও একই ধরনের বর্ণনা করেছেন।
– আল মুনদির ইবনে সাওয়াকে জিজিয়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর প্রেরিত চিঠি। আবু ইউসুফ তার আল- খারাজ গ্রন্থে আবু উবাইদা থেকে বর্ণনা করেন যে,
“রাসূলুল্লাহ (সা) আল মুনজীর ইবনে সাওয়াকে লিখেন যে, “যে আমাদের মতো নামাজ আদায় করবে, কিবলা’র দিকে মুখ ফিরাবে, জবাইকৃত মাংস খাবে, সে মুসলিম বলে গণ্য হবে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নিরাপত্তা লাভ করবে। মাগুসদের মধ্যে যারাই ইসলাম গ্রহণ করবে তারাই নিরাপত্তা লাভ করবে। আর, যারা তা প্রত্যাখান করবে তাদের জিযিয়া কর পরিশোধ করতে হবে।”
– বাহরাইনে পাঠানোর সময় সাদাকার দায়িত্ব সম্পর্কে আনাসকে লিখা আবু বকরের চিঠি। আনাসের সূত্রে ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন যে, “আবু বকর (রা) সাদাকার দায়িত্বের ব্যাপারে আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল যা বলেছেন সে সম্পর্কে চিঠি লিখেছিলেন…”
– দূর্ভিক্ষের বছরে আমরকে লিখা উমরের পত্র এবং আমরের জবাব। ইবনে খুজাইমাহ্ তার সহীহ গ্রন্থে এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন এবং আল হাকীম এটাকে ইমাম মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী বিশুদ্ধ বলেছেন। বায়হাকী তার সূনান গ্রন্থে, ইবনে সা’দ তার তাবাকাত গ্রন্থে জায়েদ ইবনে আসলাম হতে এবং ইবনে আসলাম তারপিতা হতে বলেছেন, “দূর্ভিক্ষের বছরে আরবের ভূমিগুলো খরায় আক্রান্ত হয়েছিল। এ সময় উমর ইবন আল-খাত্তাব আমর ইবনুল ’আসকে লিখলেন, ‘আমিরুল মু’মিনীন, আব্দুল্লাহ্’র পক্ষ থেকে, আমর ইবনুল ’আস এর প্রতি। আল্লাহ্’র কসম! তুমি এবং তোমার অঞ্চলের জনগণ যখন স্বাস্থ্যবান হচ্ছো তখন আমি এবং আমার অঞ্চলের জনগণ শুকিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সাহায্য কর!’ প্রত্যুত্তরে ’আমর জানালেন, ‘আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক! আমি সর্বদাই আপনার সেবায় নিয়োজিত; আমি আপনারই সেবায় নিয়োজিত। আপনার দিকে উটের বহর প্রেরণ করছি, যার প্রথমটি যখন থাকবে আপনার দরজায় এবং শেষেরটি থাকবে আমার দরজায়। যদিও আমি সমুদ্রপথে দ্রুত সাহায্য পাঠানোর উপায় খুঁজে বের করবো বলে আশা করছি।”
– আলীর (রা) প্রতি মুরতাদদের সম্পর্কে মুহম্মদ ইবনে আবু বকরের চিঠি এবং তাঁর উত্তর। কাবুস ইবনে আল মুখারিক থেকে ইবন শিবা বর্ণনা করেছেন, যিনি (কাবুস) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন, “মুহম্মদ ইবনে আবু বকরকে ’আলী মিশরের আমীর হিসেবে প্রেরণ করেন এবং তিনি (মুহম্মদ ইবনে আবু বকর) আলীকে কিছু ধর্মত্যাগী বা মুরতাদ সম্পর্কে লিখেন। তাদের মধ্যে কিছু লোক সূর্য ও চন্দ্রকে উপাসনা করত এবং কিছু লোক অন্যকিছুকে উপাসনা করতো যদিও তারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করত। এ ঘটনা জানতে পেরে ’আলী যারা অন্য কিছুর উপাসনা করা সত্বেও নিজেদের মুসলিম বলে দাবি করে তাদের হত্যার নির্দেশ দেন এবং অন্যদের তাদের ইচ্ছেমত উপাসনার মনযোগ দিতে বলেন।”
৪. জনগণকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে কিছু চিঠি, যাদের কিছু নীচে উল্লেখ করা হল:
– নাজরানের জনগণের প্রতি রাসূলুল্লাহ্’র পত্র। ইবন ’আব্বাস হতে আল-সুদ্দী এবং তার থেকে আবু দাউদ বর্ণনা করেন, যে ব্যাপারে আল-মুনজিরী মন্তব্য করেছেন যে, আল-সুদ্দী সরাসরি এ ব্যাপারে ইবন ’আব্বাসের কিছু আলোচনা শুনেছেন – যে আবু উবাইদা তার আল-আমওয়াল গ্রন্থে আবু আল-মালিহ্ আল-হাদহালি থেকে বর্ণনা করেছেন, যার শেষে বলা হয়েছে: “উসমান ইবন আফ্ফান এবং মু’ওয়াক্বীব এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং লিখেছেন।” আবু ইউসুফ তার আল-খারাজ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন এবং তিনি উল্লেখ করেছেন যে, এর লেখক ছিলেন আল-মুগীরাহ্ ইবন আবি শুবাহ্। তারপর, আবু ইউসুফ আবু বকরের উক্ত চিঠিটি উল্লেখ করেছেন যার লেখক ছিলেন আল-মুগীরাহ্, উমরের চিঠি যার লেখক ছিলেন মুয়াক্বীব, তাদের প্রতি উসমানের চিঠি যার লেখক ছিলেন তাঁর সাহায্যকারী হামরান, আলীর চিঠি যার লেখক ছিলেন আব্দুল্লাহ্ ইবন রাফি’।
– তামীম আল দারীর প্রতি রাসূল (সা) এর লেখা পত্র। কিতাব উল খারাজে আবু ইউসুফ বর্ণনা করেছেন যে, “লাখামের এক ব্যাক্তি তামিম আল দারী যিনি তামীম ইবনে আউস নামে পরিচিত ছিলেন বললেন, হে রাসূলুল্লাহ্ (সা), ফিলিস্তিনে রোমানদের মধ্য হতে আমার কিছু প্রতিবেশী আছে। তাদের একটি গ্রামের নাম হাবরা এবং অপরটির নাম আইনুন। যদি আল্লাহ্ আল শামস অঞ্চলে আপনাকে বিজয় দান করেন তাহলে দয়া করে ঐ দু’টি গ্রাম আমাকে দান করবেন। তিনি (সা) বললেন, “এ দুটি তোমাকে দেয়া হল।” তামিম বললেন, “তাহলে এটা আমাকে কাগজে-কলমে নির্দিষ্ট করে দিন।”
তিনি (সা) তার উদ্দেশ্যে লিখলেন, “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। আল্লাহ্’র রাসূল মুহাম্মদ এর পক্ষ থেকে তামিম ইবনে আল আউস আল দারীর প্রতি, তামীমকে হাবরা এবং বাইত আইনুন গ্রাম দুটির সব সমতল ভূমি, পাহাড়, জলধার, কৃষিযোগ্য জমি, নাবাতিন এবং গরু সবকিছু প্রদান করা হল এবং তার পরে তার সন্তানগণ এসবের মালিক হবে। কেউ এসবের মালিকানার ব্যাপারে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে না এবং কেউ অন্যায়ভাবে তার প্রাপ্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। কেউ যদি এর ব্যাত্যয় ঘটায়, তাহলে সে আল্লাহ্, ফেরেশতা এবং সমগ্র মানবকূলের অভিশাপ কুড়াবে।” এ দলিলটি আলী (রা) লিখেছিলেন।
যখন আবু বকর খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন তখন তিনি এ ব্যাপারে চিঠি লিখলেন যে, “বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। এটা আবু বকরের পক্ষ থেকে, যিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর প্রতিনিধি, যাকে এ জমিনে কর্তৃত্ব দান করা হয়েছে। তিনি দারী বংশের প্রতি এটা লিখছেন যে, হাবরা এবং আইনুন গ্রামের উপর তাদের যে অধিকার রয়েছে সেটাকে কেউ অবজ্ঞা করতে পারবে না। যে ব্যক্তি আল্লাহ্’কে মানে এবং তাঁর আনুগত্য করে সে কোনভাবেই তাদের সম্পদে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। আমার কর্তৃক নিযুক্ত প্রধান ব্যক্তি সেখানে অবশ্যই দু’টি দরজা স্থাপন করবে এবং দূর্বৃত্তদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে।”
খলীফার কার্য সম্পাদনের জন্য তিনি যতজন সম্ভব সচিব নিয়োগ করতে পারেন। বস্তুতঃ যদি তাদের সাহায্য ছাড়া কাজ করা খলীফার পক্ষে সম্ভবপর না হয় তাহলে এদের নিয়োগ দেয়া বাধ্যতামূলক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর জীবনীর রচয়িতারা জানিয়েছেন যে, তাঁর প্রায় বিশজনের মত পত্র লেখক ছিল।
সহীহ্ আল বুখারীতে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যায়িদ বিন ছাবিত (রা) কে ইহুদীদের ভাষা শেখার নির্দেশ দিয়েছিলেন যাতে করে তিনি (যায়িদ) তাদের লেখা পত্র রাসূলুল্লাহ্’কে পাঠ করে শোনাতে পারেন। সে কারণে যায়িদ ইবনে ছাবিত মাত্র পনের দিনের মধ্যে হিব্রুর ভাষা শিখে নিয়েছিলেন।
আব্দুল্লাহ্ ইবনে জুবায়ের থেকে ইবনে ইসহাক বণর্না করেছেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) আব্দুল্লাহ ইবনে আল আকরাম ইবনে আবদ ইয়াগুছকে নির্দেশনা দিতেন এবং সে অনুযায়ী তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন শাসকদের পত্রের জবাব দিতেন…।”
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা) থেকে আল বায়হাকী বর্ণনা করেছেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর কাছে একদা এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে চিঠি আসল, তখন তিনি (সা) আব্দুল্লাহ্ ইবনে আল আকরামকে বললেন, ‘আমার পক্ষ থেকে উত্তর দাও।’ তিনি তাঁর পক্ষ হতে লিখলেন ও রাসূলুল্লাহ্ (সা) কে তা পড়ে শোনালেন। তিনি (সা) বললেন, ‘তুমি লিখেছো সঠিকভাবে ও দক্ষতার সাথে।” (আল্লাহ্ তাঁকে সফলতা দান করুন)
আলী ইবনে মুহম্মদ আল মাদাইনী থেকে মুহম্মদ ইবনে সাদ তার নিজস্ব ইসনাদসহ বর্ণনা করেছেন যে, মুহম্মদ ইবনে মাসলামাহ্ হচ্ছে একজন, যিনি একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর নির্দেশক্রমে প্রতিনিধিদের প্রতি পত্র লিখছিলেন এবং রাসূল (সা) যখন কোন চুক্তি সম্পাদন করতেন তখন সাধারণত আলী ইবনে আবি তালিব চুক্তিনামা লিখতেন এবং যখন তিনি (সা) চুক্তি করতেন তিনি শান্তিচুক্তির শর্তসমূহ লিখতেন। মুয়াক্বীব ইবনে আবি ফাতিমা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সীলমোহরের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন। মুহম্মদ ইবনে বাশার তার দাদা মুয়াক্বীব থেকে এবং আল বুখারী ইবনে বাশার থেকে বর্ণনা করেছেন যে,
“রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সীল মোহরের আংটিটি ছিল রঙিন লোহার তৈরী যার উপরে রূপার আবরণ দেয়া ছিল। আর, এটা আমার কাছে সংরক্ষিত ছিল; মুয়াক্বীব রাসূল (সা) এর সীলমোহরের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ছিল।”















